Author: goutamdas

  • ফলাফলঃ শুধু বাংলাদেশ নয়,  এশিয়া থেকেও আমেরিকার আউটের সম্ভাবনা

    ফলাফলঃ শুধু বাংলাদেশ নয়,  এশিয়া থেকেও আমেরিকার আউটের সম্ভাবনা
    গৌতম দাস
    ০৫ ডিসেম্বর ২০২৪
    https://wp.me/p1sCvy-5h4

     

     

    এর লেখক সৌরভ সেন ঠিকই বুঝেছেন বাংলাদেশের এই নির্বাচনের চীনের দিকে হেলে পড়া – Bangladesh elections mark a pro-China tipping point in South Asia


    ফলাফলেঃ শুধু বাংলাদেশ নয়, এশিয়া থেকেও
    আমেরিকার আউটের সম্ভাবনা। আর সেক্ষেত্রে বাইডেন যা করতে পারেন, তা হল এই পরাজয় বা আউট হওয়া এটাকে তিনি স্মরণীয় করে রাখতে এক তাঁর বিখ্যাত মন্ত্রী ডোনাল্ড ল্যু মহাশয়ের নামে ল্যু আউট নাম রাখতে পারেন! কারণ, এই মহাশয় ছিলেন ইন্দো-প্যাসেফিক এক্সপার্ট, মানে তার দাবি আর কী! তিনি এশিয়াকে চীন-মুক্ত করে ছাড়বেনই! কিন্তু ফলাফল?
    হাসিনাকে তিনি  বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসেফিক লিখতে বাধ্য করেছিলেন। কিন্তু হাসিনার লিখিত এর জবাব কী ছিল? ল্যু তো সেদিনই পরাজিত! অথচ আত্ম-উপলব্দিও নাই। আপনি বলতে পারেন এটা চীন লিখে দিয়েছে! কিন্তু তাতে কী? ঘায়েল তো ল্যু-ই হয়েছেন। বাংলাদেশে জাপানি রাষ্ট্রদুতকে দিয়ে বলাতে বাধ্য হয়েছেন যে হাসিনার এই ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি নাকি তাদের নিজেদের মতই!!!

    আর আজ?  এন্ড অব ব্যাটেল মানে বলছে চাচ্ছি ব্যাটেল বা লড়াই শেষ হতে চলেছে! কিছুই পারলেন না! তবে অনেক আনুষ্ঠানিকতা বাকি!
    কিন্তু কোনটাকে ব্যাটেল বলছি? হাসিনার নির্বাচন বিজয়? নাকি বাংলাদেশের উপর বাইডেনের আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ?

    এর জবাব বুঝতে হবে আরো বড় কিছুতে, বড় পরিসরে!
    চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব বা পালাবদলের লড়াইয়ে আমেরিকা শুধু বাংলাদেশ নয়, আমেরিকা এশিয়া থেকেই আউট হয়ে যাবার অবস্থায় চলে যাচ্ছে!

    তাহলে এবার পুরা রেজাল্টটাও এখানেই বলে দেই। আপাতত হাসিনার বাংলাদেশ চীনের কোলে উঠে যাচ্ছে। আর এটা এমন যা আগে দেখা যায় নাই এমন কোলে উঠে পড়া এটা। যেটা খারাপ বা ভাল বিষয়টা তা নিয়ে না। মানে তা নিয়ে একথাগুলো নয়। গত ২০২১ সালে এপ্রিলে (টিকা কোথা থেকে পাবে এই হাহাকার দিনগুলোতে) বাংলাদেশের টিকা চাহিদার ৯০ভাগ যে চুক্তি বলে আমরা ফাইনালি চীনা টিকা পেলাম – সেসময় চীনা প্রতিরক্ষা এসেছিল। সেটা বুঝার চেষ্টা করেন। এটা সেসময়ের ডেইলিস্টারের রিপোর্ট। এনিয়ে লিখেছিল,  “The visit is taking place when Bangladesh and China are in discussion over Covid-19 vaccine cooperation.” মানে হল, চীনা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর না চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর আগমন ও আলোচনাটা ছিল, কোভিড ঠেকাতে চীনা-টিকা বাংলাদেশের পাওয়া নিয়ে কিন্তু সেখানে চীনা টিমের প্রধান ছিলেন চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী! মজা না!!!
    আমরা অবশ্য শেষে নিশ্চিত টিকা পেয়েছিলেম। একেবারে যাকে বলে যত লাগে সব। আর তা একেবারে বিনাপয়সায়। খালি কত লাগবে এর একখানা স্লিপ দিয়ে আমাদের সি-১৩০ বিমানটা পাঠিয়ে দিয়েছে আর চীন তা ভরেও ভরে টিকা দিয়েছিল। আর সব বিনা পয়সায়! আর টিকা পেয়ে আমাদের জীবন অর্থনীতি সেযাত্রায় বেচে গিয়েছিল!
    হা এবারও এটা সেরকম কিংবা আরো বড় পরিসরে! আপনি চীনকে পছন্দ করেন আর নাই করেন সম্ভবত তেমন কিছু আবার ঘটবে। বাংলাদেশ-চীনের নয়া সম্পর্ক হতে যাচ্ছে সবার উপরে, প্রায়োরিটিতে এক নম্বরে। এমনকি তাতে পশ্চিম বাগরা দিলে সে বাধা গুড়িয়ে যাবে শুধু না তা হাসিনা-চীনকে আমাদের কল্পনার চেয়েও বেশী ঘনিষ্ট করবে! আর আমেরিকা বা ভারত? এরা মাটিতে গড়াগড়ি যাবে। আর হাসিনা এই প্রথম ভারতের উপর খবরদারি-ডিকটেট করার অবস্থায় যাবে। তিনি সেটা কম করে ব্যবহার করতে চাইলেও তা ডিকটেটের বাপ হয়ে দাঁড়াবে। ব্যাপারটা অবজেকটিভ – হাসিনার ব্যক্তি ইচ্চা-অনিচ্চার বাইরে, তাই।

    বাইডেনের সব পরিকল্পনাই ব্যার্থঃ
    বাইডেন ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারী প্রেসিডেন্টের শপথ নিছিলেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা চার-বছর-সীমার। সে হিসাবে তার ক্ষমতার তিন বছর শেষ হবে আরো দুসপ্তাহ পরে। কিন্তু ইতোমধ্যে পরের নির্বাচনের ঘন্টা বেজে উঠেছে। তা হবে নভেম্বর ২০২৪ সালের প্রথম সপ্তাহে। কিন্তু  ট্রাম্পের পরে আসা ডেমোক্রাট প্রেসিডেন্ট বাইডেন তিনি; ফলে তার সব কারিসমা – ঘ্যাগের ওষুধ আমার কাছে – বলে বাইডেন যা এনেছিলেন এমন সবগুলো উদ্যোগ-পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই দুঃখিত, সব মুখ থুবড়ে পড়তে শুরু করেছে। বছরের বাকি দিনগুলোতে তা আরো করুণ অবস্থায় যাবে।  প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ক্ষমতা এটা ঠিকই আছে কিন্তু সরকার চালাতে অর্থ-মঞ্জুর এর সিদ্ধান্ত রিপাবলিকান সংসদের। ফলে মঞ্জুরি নাই বললেই চলে। তাও আবার এই রিপাবলিকান বলতে বুঝতে হবে এটা সরাসরি ট্রাম্প-নিয়ন্ত্রিত রিপাবলিকান। তবে কথা সেটা না। মানবাধিকার-গণতন্ত্রকে বা স্যাংশন-আরোপকে নিজ পররাষ্ট্রনীতির মুখ্য ফোকাস করা কিংবা ইউক্রেন যুদ্ধ লাগানো কিংবা ইন্দো প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি ইত্যাদি এমন প্রতিটা বাইডেন প্রগ্রাম আজ পরাজিত বা অকেজো হয়েছে বা হওয়ার পথে তা বলা যায়।
    ইইউ বা ইউরোপকে বাইডেন লোভ দেখিয়েছিল দুনিয়ায় (গত প্রায় পাঁচশ বছর) সাদাদের (white caucasian ককেশীয়) শাসন অটুট রাখতে একসাথে কাজ করবে। মানে হল, গ্লোবালি চীনাদের উত্থানে সাদা শ্রেষ্ঠত্বের ক্ষমতা খতম হতে দেয়া যাবে না। তিনি টিকিয়ে রাখতে পারবেন – এই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ ধরে রাখা বা টিকিয়ে রাখার শেষে চেষ্টার ভিত্তিতেই পশ্চিমাদের ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু ও এর পক্ষে সাদা জনমত তৈরি হতে উস্কানি  দিয়েছিল। ভেবেছিল চীন তাহলে এই যুদ্ধে স্বভাবতই পোলারাইজেশনে রাশিয়ার পক্ষ নিবে। কিন্তু তা হয় নাই। উলটা ইউক্রেনের সরকারি কর্তা-সেনাদের বেতন যোগাতেই বাইডেন ফতুর!  ফ্রান্সের ম্যাক্রো বা জর্মান শুলৎস [chancellor scholz] ইত্যাদি এরা নিজ পরের বারের নির্বাচনে জিততে পারবেন কিনা শঙ্কিত। কারণ  এই নেতারা বাইডেনের চামচা হয়ে এমন ইউক্রেন নীতির পক্ষ তারা অনুসরণ করেছেন যার চাপ এখন তাদের নিজ নিজ দেশের আম-জনতা ভোটারে জীবন মানে পড়েছে। এক ইতালিতেই সরকার বদলের দশা-প্রতিক্রিয়া দেখেন, বলা হচ্ছে এবার নাকি অতিডানপন্থিরা জিতেছে। মানে তাদের রাজনৈতিক ভাইয়েরা জিতে নাই তাই।  অথচ এতে কী যেখানে ‘ডান-বামেরই’ তাল ঠিক নাই? ইতালিতে নয়া সরকার তারা ইউক্রেনের যুদ্ধে অর্থদান ভেটো দিয়ে আটকে দিয়েছে। এখন সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের স্বপ্ন দেখা ম্যাক্রো-শুলৎস এরাই ইউক্রেনের পক্ষে মূল যুদ্ধবাজ নেতা অথচ ইতালিকে বলা হচ্ছে অতি-ডান!!!

    সব মিলিয়ে সারাংশ, বাইডেনের দোরগোড়ায় আবার নির্বাচন। অথচ তিনি এক অর্থ মঞ্জুরের পাওয়ার ক্ষমতাহীন প্রেসিডেন্ট! যে ক্ষমতার আবার অনেকটাই ট্রাম্পের হাতে।

    মূল কথাটা হল, আমরা কেউ পছন্দ করি না করি – চীন গ্লোবাল (অন্তত অর্থনৈতিক নেতা) নেতা হওয়ার পথে দাপটের সাথে উঠে আসছে। চীনের গ্লোবাল প্রভাব – মানে গ্লোবাল অর্থনীতি যা শেষে রাজনীতিকেও প্রভাবিত করে ফেলতে পারে সেটা এগিয়ে আসছে। অন্য রাষ্ট্র, মহাদেশকে প্রভাবিত করার ক্ষমতাও তাই চীনের ছেয়ে যাচ্ছে। এটা ঠেকানো যায় না। ঠিক যেমন আমেরিকার এমন উত্থানের বেলায় সেকালের নেতা বৃটিশেরাও আমেরিকার উত্থান ঠেকাতে পারে নাই।  যার পিছনের মূল কারণ একালের অর্থনীতিতে (সারপ্লাস একুমুলেশন) বাড়তি সম্পদ সবার চেয়ে বেশী সঞ্চিত হচ্ছে চীনে। আর ঠিক এঘটনাটা উল্টা ঘটতেছে আমেরিকার বেলায় মানে সঞ্চিতি কমছে।   আর এটাই আমাদের সবার-ই পছন্দ-অপছন্দের ইচ্ছা নিরপেক্ষ ঘটনাবলী। অথচ আমরা তা মানতে নারাজ!  আর উলটা একথাগুলো দেখতে পেলে বক্তা নিশ্চয় মানে আমি চীন-পন্থি এমন প্রপাগান্ডা করে নিজের অজ্ঞতার ছাপ ফেলছি। আমি চীনপছন্দের লোক বা দালাল – এসব মনে করাও আরেক ভুল। বালিতে মুখগুজে থাকার মত। ওবামা আমল থেকেই পরে ট্রাম্প আর বাইডেন সকলেই মিছাই চেষ্টা করে গেছেন যে  চীনা উত্থানের বাস্তবতা তারা উলটে দিতে পারবেন। এরই সর্বশেষ প্রযোজনা-উদ্যোগ ছিল বাইডেনের মানবাধিকার-গণতন্ত্রকে বা স্যাংশন আরোপের নীতি চালু করা। যেটার কোন কিছুতেই এখন কোন সাফল্যের দিক নাই। এক কেবল আমরা জানলাম হয়ত কে কে আর কী পরিমাণ অর্থ আমেরিকায় সরিয়েছে – অতটুকুই!

    কিন্তু এরপরে কীঃ
    এটা মোটামুটি পরিস্কার যে হাসিনার নিজেকে এখন বিজয়ী ও নয়া প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা-শপথ টাই বাকি!
    আর এরপর চীনের কাছে নগদ ডলার পেতে, হাত পাততে যেতে হবে তাঁকে। যেটার আরেক নাম বাজেট সহায়তা চাওয়া; এর নামে চীনা অনুমোদনে কোন ব্যাংক থেকে অর্থ আনা। আর যারা চীনবিরোধী তারা মনে রাখেন এই অর্থ চাওয়াতে কে আপনি –  চীন পছন্দ না অপছন্দের তা কিছুই এতে কিছু আসে যায় না। যেমন কল্পনা করে নিতে পারেন। যদি হাসিনা সরকার পরাজিত হত তাতে সাময়িক বা স্থায়ী যে সরকারই পরবর্তিতে আসত সেটা আমেরিকা সমর্থিত হত তা বলাই বাহুল্য!  কিন্তু তা সত্বেও সেই আমেরিকা সমর্থিত সরকারটাও (most likely) চীনের কাছেই যেত  একইভাবে হাত পাতত, ডলার চাইত।

    একটা সমতুল্য উদাহরণ দেই,
    বাইডেনের বিরাট করিত কর্তা নায়ক ডোনাল্ড ল্যু! যিনি বাইডেনের নির্বাচনি প্রচারণা শুরুরও আগে বাইডেন কী কী নীতি-পলিসি-বৈশিষ্টের ভিত্তিতে ভোট চাইতে যাবেন  সেসব কমিটির মেম্বার ডোনাল্ড ল্যু। তিনি ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি স্পেশালিস্ট মূল নেতা হয়ে উঠবেন। তিনি বাইডেনের নয়া ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির  এমন সাফল্য দেখাবেন যে দুনিয়া চেয়ে দেখবে। এই স্বপ্ন দেখানোর নেতা হয়ে উঠেছিলেন তখন থেকে। তাই তিনি প্রভাবশালী উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী! কিন্তু ফলাফল?????

    অল্প কথায় বললে, তিনি পাকিস্তানে ইমরান খানকে উপড়ে ফেলে দিলেন। আর সাথে দুই চোর সাজাপ্রাপ্ত চোর আর এদের সব দায়-কালিমা নিজে আর আমেরিকার গায়ে মাখায় ল্যু ছোটভাই  শাহবাজকে ক্ষমতায় বসালেন।  উদ্দেশ্য পাকিস্তানে চীনা প্রভাব কমাবেন। কারণ তিনি ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি স্পেশালিস্ট। আর এটাই তো মূল কাজ যে এশিয়া থেকে প্রতিটা দেশে চীনা সম্পর্ক, নির্ভরশীলতা কমানো পারলে নাই করে দিয়ে চীনকে একঘরে করা!

    কিন্তু এরপর কী হয়েছিল? শাহবাজ সরকার চলবে কীভাবে, অর্থনীতিতে সাপোর্ট কে করবে, নগদ ডলার?? দেখা গেল শাহবাজ নিজে চীন সফরে গিয়ে সেই চীনেরই অনুগ্রহে ডলার পেতে নিজেই চীনে গেছেন হাত পেতেছেন! তাহলে এটাই তো ডোনাল্ড ল্যু-এর সাফল্য ? তাই-ই না??
    তাহলে এখন এর জবাব কে দিবে? এটা কী ল্যু-বাইডেনের সাফল্য?

    আর আমরা যারা এসব মনিটর করি? আমরা কী এসব জানতাম না? অবশ্যই জানতাম। তাহলে?
    তাহলে, বাইডেনের আকাইম্মা চাপাবাজিতে হলেও  অন্তত গুম-খুন-অপহরণের রাষ্ট্র হয়ে যাওয়া বাংলাদেশে অন্তত কিছু পরিবর্তন – গ্লোবালি বাংলাদেশের মানবাধিকার-গণতন্ত্র এর দুরবস্থা গত পনেরো বছরে এই প্রথম কিছু নজর কেড়েছে যার কিছু সুফল আশা করা  মনে হয় না আমাদের অপরাধ! আসলে এটা এমনই এক বাইডেন তিনি আমাদের আমেরিকার অপরাধের কাফফারা চুকাতেও অক্ষম প্রমাণিত হল!  বাইডেনের আমেরিকা মানবাধিকার-গণতন্ত্র প্রশ্নে – অক্ষম উত্থানরহিত এক নায়ক এটাই এশিয়ার সবদেশের কাছেই প্রতিষ্ঠিত হল!
    তাই, এর কনসিকোয়েন্স হবে এশিয়ার আর কোন দেশ বা ওর পাবলিক নিজ সংকটে আমেরিকার উপর নির্ভর করবে না। যোগ্য মনে করবে না। আমেরিকা তাদের কেউ না হয়ে গেল! ফুলষ্টপ!

    এটাকে আপনি বাইডেন না সারা আমেরিকারও এক কূটনৈতিক পরাজয় বলেই দেখতে দেখাতে পারেন। আমি বলব এখানে মূল জিনিষটা কূটনৈতিক পরাজয় কিনা এর চেয়েও প্রভাবিত করা – ইনফ্লুয়েন্স করার ক্ষমতা হারানো।  আমেরিকা ইনফ্লুয়েন্স করতে অক্ষম হয়ে গেছে এটাই প্রমাণিত হয়ে যাচ্ছে যা আবার কেউ না চাইলেও।  আর এটাকেই বলছি গ্লোবাল নেতার নেতৃত্ব হারানো লক্ষণ! উলটা করে, ঠিক যেমন মধ্যপ্রাচ্যে দেখেন এবারের হামাস যোদ্ধাদের কারবারে! চীন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় গ্লোবাল নেতা হয়ে বসে গেছে যার সবচেয়ে বড় সাফল্য নিজ এই নয়া পক্ষের সকলকে সে একসাথে রাখতে সক্ষমতা দেখিয়েছে। আর এটাও পরিস্কার ফলাফল এখন হামাসের দিকেই আসবে! এতে হামাস এখন আর দিশাহীন থাকল না যে আপনি চাইলেই তাকে জঙ্গি বলে পার পাবেন। হামাস এখন প্যালেস্তাইনের প্রধান প্রতিরোধ যোদ্ধা এবং শসস্ত্র স্বাধীনতাকামি সংগঠন!  নইলে তার পক্ষে পশ্চিমা দেশেই মিছিল হয় কেন!
    কিন্তু সাবধান! এর পিছনের এই কূটনৈতিক সাফল্য কার? অবশ্যই চীনের! তবু এটাকে ব্লক যুগের মত চীনা ব্লক বলে ডাকবেন না।
    এটা আরসেই  ব্লক যুগ নয় হবেও না! কাজের আপনি চীনা-ব্লকের চীনাপন্থি নাকি আপনি আমেরিকাপন্থি – এসব পন্থি আর বানায়েন না প্লিজ!  বরং পরিবর্তনটা বুঝার চেষ্টা করেন সবার আগে! এছাড়া যা ঘটভছে এর ভিতরে বহু অমীমাংসিত দিক আছে প্রশ্ন আছে, যদি-কিন্তু অনেক আছে। সেসব ফয়সালা হতে সময় লাগবে! সময় দেন, স্টাডি করেন। সবার আগে বুঝাবুঝি ঠিক্টহাম পাক্কা করেন!

    তাহলে এটা পরিস্কার যে হাসিনার বাংলাদেশ অচিরেই চীনের কোলে ও প্রবল বেগে উঠতে যাচ্ছে! আর আমেরিকাকে রাস্তায় গড়াগড়ি দিতে দেখব! এরকমই কিছু একটা সিনারিও হবে!!!

    তাহলে বাংলাদেশে ভারতের কী হবেঃ
    এককথায় বললে, ভিক্ষাও পাবে না।  সবখানেই অপ্রয়োজনীয় খামোখা হয়ে যাবে। অনেকের কাছে যেমন ধরেন যারা এতদিন “খায়া লই-না আগে একটু” বলতে চান অথবা ধরেন যেমন কেউ প্রকাশ্যে দাবি করতেছে “আমি ভারতের ক্যান্ডিডেট” – দালালির এই লাইনটা সবার আগে টের পেয়ে যাবে যে আগে যা করছে করছে, এখন ভারতীয় লাইন বিপদজনক লাইন!  আওয়ামি লীগই করলাম কিন্তু এসব পুরানা লাইনে কথা কইলাম – তা হবে না! গায়ে একেবারে ছাপ্পা বা থাপ্পা পড়ে যাবে চিরদিনের মত!

    আসলে আসন্ন এই পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দেশ হবে ভারত! বেইল নাই এক ফকির হয়ে যাচ্ছে! এতদিন  হাসিনার বিজয়ের জন্য তারা দোয়া দুরুদ মানত রাখা এমনকি অন্যদিকে লিখে অন্তত সুবীর ভৌমিক গংয়েরা এত ঝগড়াঝাটিও করল এখন সেই হাসিনার বিজয় তাদের জন্য কাল হবে? শুধু তাই না আগামিতে, এমনকি অবাধে বাংলাদেশে চলাচল তথ্য সংগ্রহ, ব্যবসা সংগ্রহ, জেনারেল বা সচিব সহ কাউকেই প্রভাবিত করে ফেলতে পারত তারা এসবের কী হবে? অনুমান করে নেন!

    এককথায় বললে, বাংলাদেশ একেবারেই প্রধাণত চীনা-প্রভাবিত সরকার হয়ে যাওয়া বলতে যা বুঝাবে বাংলাদেশ তাই হয়ে যাবে।  ফলে চীন-হাসিনার সম্পর্কের জন্য যা কিছু নেতি সেসব তপ্তপরতা অপততপরতা বলে বিবেচিত হবে, স্বাভাবিক!

    কেন আজ এমন লেখা লিখতে বসলামঃ
    গত দুদিন ধরে একটা লেখা বাজারে ঘুরছিল। ইংরেজিতে লেখা, ওয়াল স্টিট জর্ণাল পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল গত ৩ জানুয়ারি। লিঙ্ক এখানে [Bangladesh Shows the Limits of Biden’s ‘Democracy Promotion’] । এমনিতেই এটা উচ্চমার্গীয় পত্রিকা মানে যারা গ্লোবাল পুঁজিবাজার মার্কেট এর সাথে সংশ্লিষ্ট তাদের। এর উপর এটা পেড (পড়তে পয়সা লাগে) পত্রিকা। তাই এটার খবর হয় নাই। কিন্তু আমাদের মানব জমিন এর একটা বাংলাভার্সান আজ সকালে অনুবাদ করে ছেড়েছে। “গণতন্ত্র প্রচারে বাইডেনের সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে দিলো বাংলাদেশ” – এখানে।

    বুঝতেই পারছেন এটা বাইডেনবিরোধী বা ধোলাই দেয়া লেখা। সবচেয়ে বড়কথা এর যে লেখক তার নাম সদানন্দ ধুমে মানে ভারতীয় অরিজিন প্রবাসী। হা তাই। এর চেয়েও বড় কথা তিনি এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাংকের আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউট [AEI] এর ফেলো। ঠিক যেম অনেকেই চিনেন আলী রিয়াজ-কে তিনিও এমন আরেক থিঙ্কট্যাঙ্ক আটল্যান্টিক কাউন্সিলের ফেলো। কিন্তু AEI-কে মনে করা হয় এটা রিপাবলিকান ধারার। AEI নিজেরা  নিজেদেরকে কনজারভেটিভ বা এমন কিছু বলে থাকে।
    যা্র ঝোঁকে সদানন্দ ধুমসে এজন্য বাইডেনকে কুপিয়েছে বলা যায়। আগেই বলেছিলেম বলে  সদানন্দের বাণী এরকমঃ বাইডেনের ডেমোক্রেসি ছড়ানোর নীতি যে ফেল করবে সেটা তো জানি-ই!

    যদিও আমাদের জন্য এটা বাইডেনের ডেমোক্রেসি ছড়ানোর নীতি কী না সে প্রশ্ন আছে। তবু আমি মনে করি বাংলাদেশের মানুষ মনে করে বাংলাদেশকে গুম-খুনের রাষ্টড় বানানো আর জঙ্গিবাদের নামে সরকারবিরোধী সকলকে নির্মুল করা; যাকে আমেরিকাসহ পশ্চিম চোখবুঝে সমর্থন করে গেছে,  দেখেও না দেখার ভান করে গেছে, এস্ববই আমরা জানি। কিন্তু একটা আশা রেখেছিলাম সেই আমেরিকাই এখন কিছু করতে চাইছে এতে যদি নুন্যতম কিছু আইনের শাসন রাষ্ট্র বাংলাদেশ হয় দেখাই যাক না! আর এটার উপর কিছু হলেও আস্থা রেখেছিল এজন্য যে পথটা তুলনায় সহিংস নয়; সিভিল মুভমেন্টের মধ্যেই থাকবে। তুলনায় সশস্ত্রতা বলা সহজ করা কঠিন। আর একটা সশস্ত্রার পরে কী হয় সেটা আমরা ১৯৭২ সাস্লের পরে দেখেছি। হয়ত সেজন্যই অল্প আস্থা রেখেছিলাম। কিন্তু হায়!!!

    তবে সদানন্দের লেখাটা ২০২৪ সালে আমেরিকার আভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা নির্বাচনের ইস্যুতে লেখা।  তা সত্বেও লেখাটা আমাকে প্রভাবিত করেছে কারণ, তিনি প্রকাশ্যেই বলছেন বাইডেন পরাজিত ব্যার্থ হচ্ছেন।
    এই ধারণাটা আমার নিজেরো আর তা গত কয়েক বছর আমার অনেক লেখাতেই স্পষ্ট। গত তিনবছর  বার বার বলেছি বাইডেনও চীনের উত্থান আগমন ঠেকানো দূরে থাকে ধীরগতি করতেও ব্যার্থ হবেন। তবু তিনি এক উজান বাইতে এসেছিলেন। তাই আগের কথাগলো আর জোরে বলি নাই; সাময়িক স্থগিত বা ঢিলা দিয়ে রেখেছিলাম। বলেছিলাম ট্রাম্প আর বাইডেন একই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের দুইটা রূপ। বাইডেনের লাইনটা হল এক্সতারনাল মানে ইউরোপকে সাথে নিয়ে সাদা শাসন শ্রেষ্ঠত্ব যেন চীন ভাঙতে না পারে এর উদ্যোগ। আর ট্রাম্পেরটা হল, গ্লোবাল সিস্টেমের দায়দায়িত্ব আমেরিকা আর নিবে না। ন্যাশনালিস্ট হবে। কালো-বাদামি চামড়া বের করে দিবে দেশ থেকে। কেবল সাদা ককেশীয়দের দেশ হবে। চোনা পন্যের উপর ৬৬% পর্যন্ত আমদানিশুল্ক বসিয়ে গেছিলেন তিনি। যা বাইডেন বাতিন করেন নাই। গ্লোবাল দায়ীত্ব ছাড়তে ট্রাম্প ন্যাটো ত্যাগ করতে চান। বিপরীতে বাইডেন ন্যাটো দিয়ে ইউক্রেন লাড়তে গিয়ে এখন ছ্যাড়াবেড়া!

    ফলাফল পরিণতি হল, কোনটাতেই চীনের উত্থান ঠেকানো যায় নাই।  আবার হয়ত ট্রাম্প না হলেও কোন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট হবেন। আর সেটাই শেষ, সেই আমেরিকার আর আমাদের মত দেশে চাইলেই হস্তক্ষেপ করতে পারে সরকার বদলাতে পারেন সে সক্ষমতা আর থাকবে না।

    এককথায় বড় গ্লোবাল চেঞ্জ আসন্ন!
    আর ভারত? ভেবেছিল সে খুবই চালাক! চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্বে সুযোগে সে দুদিক থেকে শবিধা নিয়ে নিজেই এক পরাশক্তি হয়ে যাবে। কিন্তু তার ক্ষেত্রেও ফলাফল নিম্নচাপ! জান বাচে না অবস্থা! বাংলাদেশকে কলোনি স্টাইলে ওর উপর প্রভাব রেখে আরো অনেক বচ্ছর খেয়ে চলতে পারার স্বপন এখন দুঃস্বপ্ন!

     

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০৫ জানুয়ারি   ২০২৪,

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • যেন এইবার ইন্ডিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশে ‘গণতন্ত্র’ ফিরে আসবে

    যেন এইবার ইন্ডিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশে “গণতন্ত্র” ফিরে আসবে!
    গৌতম দাস
    ৩ ডিসেম্বর ২০২৪  রাত  ২১ঃ ৪৬
    https://wp.me/p1sCvy-5gC

     

     


                 
    SREE-radha Dutta in DW Bangla 

    যেন এইবার ইন্ডিয়া বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে। নাকি অন্যকিছুর পায়তারা??? তবে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। সর্বশেষ ভারতের শ্রীরাধা দত্ত আজ ডি ডাব্লু বাংলা [DW Bangla] তে জায়গা কিনে [ব্রডকাস্টিং টাইম কিনে] কিছু একটা ছেড়ে দিয়েছে।  তাতে এটা পরিস্কার যে গত ১ জানুয়ারি থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম ভারতের পেট কামড়ে উঠেছে। কিছু একটা বের হতে চাচ্ছে। সেজন্য সুবীর ভৌমিক বা চন্দন নন্দি একযোগে মাঠে নেমে এসেছিল। আমাদের আর্মির বিরুদ্ধে সব উস্কানি দেয়া ভিত্তিহীন ‘নিউজ’ করেছিল। আজ শ্রীরাধাও বক্তব্য রেখে ভারতের সেই ততপরতার প্রথম পর্ব পর্যন্ত শেষ করলেন। পরে যার আরও পর্ব আছে, আসছে।
    এটা আসলেই একটা রেকর্ড যে ভারতের কোন সরকারি কর্তা এমনকি মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী অথবা একাদেমিক, গবেষক ইত্যাদিদের কেউ বাংলাদেশে তো বটেই এমনকি কোন পড়শি দেশে দুইটা সুনির্দিষ্ট কথা গণতন্ত্র আছে কী নাই, নির্বাচন ঠিক হচ্ছে না এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছে। কিন্তু শ্রীরাধাদত্ত আজ রেকর্ড করলেন। এমনকি একদুই বছর আগেও শ্রীরাধা বাংলাদেশ নিয়ে এমন কথা কখনও বলেন নাই।  এবার শুধু তাই না, আরো সরেস তিনি, –  অভিযোগ করে বলেছেন,   “গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিয়ে বিভ্রম তৈরি করছে আওয়ামী লীগ’।  অবিশ্বাস্য!!! ভারতের এই শ্রীরাধাদত্ত কে আমরা আগে দেখি নাই। চিনি না।  এতদিন শ্রীরাধাসহ সকল ভারতীয়ের যে বার্তা বা বক্তব্য দিতেন তা ছিল সরকথায়  যে – আমাদের হাসিনা কেই চাই, আমরা ভাল পাই। আমাদের খুব সুখ হয় – চার হাত পায়ে লুটে খেতে পাই বাংলাদেশকে। এটা আমাদের মুখ থেকে কেড়ে নেয়া যাবে না। কোথাকার কোন আমেরিকা স্যাংশন দিয়ে হাসিনাকে সরানোর চেষ্টা করে কেন?  এমনকি আরো এগিয়ে মহাকূটনীতিক অবস্থান যেন ভারত প্রকাশ করতেছে এমন ভাব দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবেও বলেছে – দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়া এটা ভারতের বাগান বাড়ি। এখানে আমেরিকা ভারতের সুখের দিকটা আমল না করে হাসিনাকে সরাতে চেষ্টা করতে পারে না।  অথচ এধরণের ছ্যাচরামো বক্তব্যে বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ কী তা বুঝা গেলেও বাংলাদেশের বাসুন্দা-নাগরিক যারা তাদের ইচ্ছা মতামত কেউ আমলে নেই নাই – সেখবর নাই। সবই যেন ভারত আর আমেরিকার কামড়াকামড়ি  করে নির্ধারণ করবে! আমরা বাংলাদেশিরা কেউ না।

    আজ শ্রীরাধাদত্ত একেবারে “গণতন্ত্র” দিয়ে সব ভাজা-পোড়ার আইটেম সব খেয়ে এসেছেন । তাই মুখ খোলা মাত্রই কেবল গণতন্ত্রই বের হয়েছে। আজিব কথা হল, তিনি বলছেন ২০১৪ আর ২০১৮ নির্বাচনও নাকি সুষ্ঠ হয় নাই। ও মোর খোদা একী শুনতেছি?? হে প্রভু……!
    তাহলে সুজাতা সিং ভারতের কে? শ্রীরাধাদত্ত কী ভারতের এই কুখ্যাত পররাষ্ট্র সচিব-কে অস্বীকার করছেন? তিনিই বাংলাদেশে সেই কারিগর  যিনি ২০১৩ সালে বিরোধীদল কে হবে – মানে জাতীয় পার্টি-ই হবে এর নির্ধারক সেটিং-কারি কর্তা! আমরা কীভাবে সুজাতাকে ভুলি???
    তাই এখনও এটা অবিশ্বাস্য-ই যে তিনি কাল সকালেই আবার বলবেন না তো যে সাময়িক হ্যাক হয়ে গেছিলেন ঠিক যেমন শুনি মানুষের ফেসবুক একাউন্ট নাকি হ্যাক হয়ে যায়???  দেখা যাক! DW বাংলা কিন্তু কার্যত পেইড চ্যানেল। মানে এটা সাংবাদিকতা নয়! ফেলো কড়ি কড়ি মাখো তেল!  সবাই আপন!
    তবে শ্রীরাধার মূল বাক্য যেটাকে শিরোনাম করা করেছেন তারা তা হল, ‘বহুদলীয় গণতান্ত্রিক নির্বাচনের বিভ্রম তৈরি করছে আওয়ামী লীগ’।

    তার মানে কী এখন নির্বাচন স্থগিত করে দিয়ে বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার লিডার এবার ইন্ডিয়া হয়ে যাচ্ছে???? না! মাথা ঘুরাচ্ছে!
    আসলে কোন প্রশ্নেরই উত্তর নাই অথচ শ্রীরাধা বিরাট এক মুখ হা করে খুলে রেখেছেন! যেমন তাহলে হাসিনার কী হবে? এটা কী শুরু না শেষ? শেষেই বা কী হবে???

    আর বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন এটা কোন ভারত? কেন সে এতদিন পরে পল্টি দিতেছে? কী উদ্দেশ্যে? সে কী জানে বাংলাদেশে ভারতের কোনই বেইল নাই! নুন্যতম কোনই বিশ্বাসযোগ্যতা নাই!

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০৪ জানুয়ারি   ২০২৪,  মধ্যরাত  ১২ঃ ৩৫

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • নির্বাচন হয়েই যেতে পারে, এনিয়ে ভারতই ভীত! কেন?

     

    নির্বাচন হয়েই যেতে পারে, এনিয়ে ভারতই ভীত! কেন?
    গৌতম দাস
    ০২ জানুয়ারী ২০২৪  রাত   ২০ঃ ২৬
    https://wp.me/p1sCvy-5fN

    বিবিসি থেকে নেয়া

     

     

    খুবই তাজ্জব সব ঘটনা! ‘র’-এর প্রপাগান্ডা মুখপাত্র সেজে চলা সুবীর ভৌমিক এক নয়া লেখা ছেপেছেন গতকাল। এতদিনের বাংলাদেশ নিয়ে ‘র’-এর হয়ে প্রপাগান্ডা (যেমন সুবীর, আবদি বা চন্দন নন্দী ইত্যাদি) মুখপাত্রদের অবস্থান ছিল আমেরিকান স্যাংশন ও চাপে বাংলাদেশের নির্বাচনে হাসিনার আবার জিতে আসা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাহলে ভারতের স্বার্থের কী হবে!!! এনিয়ে সরাসরি নাকি-কান্নায় সবচেয়ে আগিয়ে ছিলেন আবদি! আর এবার সেই তুলনায় একেবারে উল্টারথ অবস্থানে সুবীর ভৌমিক! তিনি হাসিনার নির্বাচন সম্পন্ন যেন না হয় সহানুভুতি ঘুরিয়ে দিয়েছেন। আর এই সহানুভুতি ঘুরানোর পক্ষের কিছু উদাহরণ টানতেই বাংলাদেশে আর্মি ইলেকশনের ডিউটিতে যেতে চাচ্ছে না দাবি করে এবার তাঁর লেখা লিখেছেন। যদিও সুবীরের লেখার সত্য-মিথ্যা আমরা জানি না।

    কাজেই সুবীরের লেখার মুডটা আমাদের জন্য প্রধান ইস্যু!  সেটা হল যে, হাসিনার নির্বাচন আরামে সম্পন্ন হয়ে যাক এর পক্ষে তো নয়ই বরং বিপরীতে, মানে হাসিনার “এমন করাটা ভাল হবে না” এমন ইঙ্গিত দিয়ে তিনি কথা বলেছেন। তিনি বলছেন,  বাংলাদেশে আর্মি ইলেকশনের ডিউটিতে না যেতে চাওয়া মনোভাব নাকি বাড়ছে। যুক্তি হল নাকি, এই নির্বাচন বিতর্কিত। দেশে-বিদেশে সরকার ও সাংবাদিকেরা এর অগ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ক্রমাগত লিখে চলেছে। ফলে সরকারের এমন জনস্বার্থবিরোধী ততপরতার কারণে এর সাথে আর্মি প্রতিষ্ঠানটাও কালার হয়ে বা দাগ লেগে যাবে। এনিয়েই তারা উদ্বিগ্ন”। সুবীরের কথা সত্য-মিথ্যা আমরা জানি না। অন্তত প্রকাশ্যে বা মিডিয়ায় এমন নিউজ চোখে পড়ে নাই।
    যদিও এটা বুঝা কঠিন না যে বাংলাদেশ আর্মির একটা উভয় সংকট আছে। তা হল, একদিকে সরকার নির্বাচনে তাদেরকে নিয়োগ চাইছে এর কী হবে? আর বিপরীতে এতে কী তাদের এই বিতর্কিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ হয়ে যাবে? দেখা হবে? যেখানে, জাতিসংঘের দিক থেকে সাধারণভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজে আমাদের বাহিনীকে সংশ্লিষ্ট হতে সতর্ক করা আছে! তা কী লঙ্ঘন বলে দেখা হবে? এমনিতেই এই নির্বাচন নিয়ে নিয়ে জাতিসংঘ এটাকে খুবই নেগেটিভ মার্কিং ও মূল্যায়ন করছে ও আরো করবে। আর এটা এখন প্রকাশ্য যে, ইতোমধ্যেই জাতিসংঘ আমাদের নির্বাচনে নিজ সহায়তা বা সংশ্লিষ্ঠতা বুঝায় এমন সব কাজ থেকে দূরে সরে গেছে। এই অবস্থায় এটা জাতিসংঘের কাছে আমাদের সেনাদের ইমেজ ভাল হবে না এমন শঙ্কা জোরদার করবে সন্দেহ নাই।  আর অনেকেই বোধহয় জানেন যে জাতিসংঘের কাছে আমাদের রাষ্ট্রের গত ১৫ বছরের গুম-খুন-অপহরণ ঘটার অভিযোগ আর অন্যদিকে তাতে আমাদের বাহিনীর সংশ্লিষ্ঠতার অভিযোগের কারণে এখনকার জাতিসংঘের কড়া নির্দেশ হল, কোন মানবাধিকার লঙ্ঘনের কাজে আমাদের বাহিনী সংশ্লিষ্ট হতে পারবে না। হলে এতে মিশন তাদের জন্য আন-ওয়েলকাম বা  মিশন তাদেরকে চাচ্ছে না এমন হয়ে যেতে পারে। এই হল অনুমান।
    সুবীর  এই বাস্তবতাটাকেই কাজে লাগিয়েছে।  দাবি করেছেন, এঅবস্থায় এই নির্বাচনে ইলেকশনের ডিউটি করা মানে জবরদস্তিতে হাসিনা সরকারের নির্বাচন করে নেয়া ও আবার ক্ষমতায় থেকে যাওয়া কাজের মূল সহায়ক খুঁটি হিসাবে দেখবে দেশে-বিদেশে, এমন কথাও বলে বসেছেন। এটাকেই আমি বলছি সুবীর ভৌমিকের পল্টি দেওয়া। যারা এতদিন কেন আমেরিকা স্যাংশন দিয়ে হাসিনার সম্ভাবনা কমাচ্ছে এর পক্ষে যুক্তি দিত! কিন্তু এবার এমনকি আগের জেনারেল আজিজের ২০১৮ সালের রাতের ভোটের নির্বাচনের ঘটনা-কর্তা হিসাবেও তার সাথে তুলনাও করেছেন। আর তা করে এখনকার বাহিনী যেন তা না করুক এমন সেদিকে সুবীরের কামনা ও সমর্থন দেখিয়ে তিনি এলেখা লিখেছেন। আর এটাই সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা। এককথায় তা বললে, ইন্ডিয়া বা ‘র’-এর অবস্থান স্পষ্টত বদলে গেছে! তারা কী হাসিনার এই নির্বাচন ভন্ডুলের পক্ষে যেতে চাচ্ছে? সুবীরের এই লেখার ইঙ্গিত সেটাই!! সেই ইঙ্গিত যাই হোক – মুল প্রশ্ন হল, কেন? কেন এই বদলের আমরা দেখছি? ইন্ডিয়া বা ‘র’-এতদিনের কামনা, এত প্রিয় হাসিনার বিজয়ে এই অনিহা কেন?

    সাথে অন্যদিকে আবার বিবিসির বোমাঃ 
    এককথায় বললে এটা এক আনলাইক বিবিসি রিপোর্ট। এবং মনে রাখতে হবে, ইংলিশ বিবিসি-র রিপোর্ট এটা। আনলাইক বিবিসি মানে বিবিসি এমন করে লেখে না, এটা ব্যতিক্রম।
    আর বাংলা বিবিসির গুরুত্ব নাই কেন? মানে এই ইংলিশ রিপোর্টটা বাংলায় হলেও এত গুরুত্ব দেওয়ার কিছু ছিল না। বা দিতাম না! কেন?
    বাংলা বিবিসি – অর্থ-রাজস্ব আয়ের দিক থেকে মূল বিবিসির এক লুজিং কনসার্ণ। বাংলা বিবিসি এর স্টাটাস হল মূল ইংরাজি বিবিসিরও অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষায় প্রচারিত এক প্রোগ্রাম। ঠিক যেমন উর্দু বিবিসি। কিন্তু এই ভেঞ্চারটা লাভজনক নয় এখন। সরকারের পক্ষে ভর্তুকি দিয়ে দিয়ে এটা চালানোতে তারা ক্ষমা দিতে চায়! এজন্য অনেক ছাটাইও হয়েছে।  আর সেটা করতে গিয়ে এর নীতিতেও কিছু বদল এসেছে। যেমন হাসিনা সরকার বা র-এর পক্ষে প্রপাগান্ডা ছাপিয়ে আয় বাড়ানো। এমন নীতিবিরুদ্ধে কাজে বাংলাকে ছাড় দেয়া আছে। তবু যদি টিকে থাকতে পারে, এই ভেবে! এটা বাংলা বিবিসির বেলায় ছাড় কিন্তু ইংরাজি বিবিসি এটা নীতিগত কারণে করবেই না। অর্থাৎ বাংলা বিবিসি রিপোর্ট অর্থের লোভে প্রপাগান্ডা নিউজ হওয়াটাই বেশী সম্ভাবনা ও সুযোগ!  তাই, এই বিচারে বললাম এটা ইংলিশ বিবিসি তাই এই রিপোর্টের গুরুত্ব বেশী! এমনকি ইংলিশ বিবিসি – এতে বৃটিশ সরকারের অবস্থান প্রতিফলিত হয় এমন রিপোর্ট হবার সম্ভাবনা অনেক বেশী! যদিও তা অপ্রকাশ্যে হবে এবং কাকতলীয় ভাবে হয়েছে ভাব ধরে তা দেখানো হবে!

    আলোচিত বিবিসির এই [রিপোর্ট দেখা যাবে এই লিঙ্কে] এর শিরোনামটাই অনেক সাহসী।  বাংলায় বললে শিরোনাম হল, “বাংলাদেশঃ যে নির্বাচন এক-নারীর নাটক হয়ে দাড়িয়েছে” । [Bangladesh: The election that has turned into a one-woman show]।
    যথেষ্ট ঠেস-মারা ভাষায় এই শিরোনাম। আর পুরা রিপোটটা হল, হাসিনার বিরুদ্ধে সব (মানবাধিকার বা রাজনৈতিক-রিপাবলিক-রাষ্ট্রের নর্মস বা আচার ভঙ্গের) অভিযোগগুলো এক সংকলন। আর সবশেষে ব্যতিক্রমি দুইটা প্যারা যেখানে আরো কড়া ভাষায় ইন্ডিয়ার কানমলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই দু’কথাই হাজার কথার সংকলন হয়ে গেছে।

    বিবিসির ভারত ধোলাইয়ের দুইটা প্যারাঃ
    মানুষের শোয়ার ঘরের ভিতরে একটা হাতি ঢুকে গেল কেমন হবে? কল্পনা করেন! সেটা হবে একটা তান্ডব ও বিশৃঙ্খলা হিসাবে। কারণ হাতিটা ঘরের ভিতর নুন্যতম নড়াচড়া করলেই একেকটা দেয়ালের সাথে ধাক্কা খাবে তাতে ঘরটাই ভেঙ্গে যেতে পারে। সেটা না হলেও অন্তত ঘরে আসবাব বলতে কিছু থাকবে না। তাই, কারো কারো উপস্থিতির কারণে ঘটনাস্থল একটা তান্ডব হাজির হয়েছে বুঝাতে ঘরের ভিতর হাতির তুলনাটা ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের নির্বাচন ঘটনাবলিতে ভারতের অবস্থান-উপস্থিতিকে বিবিসি তাই  ঘরে হাতির ঢুকার  মত বলে তুলনা করেছে। লিখেছে  The elephant in the room is neighbouring India, which opposes…। যে ভারত বাংলাদেশের ভিতরে কোন পরিবর্তন-সংশোধন করে নেওয়ার বিরোধী। এমনকি ভারত এটাও চায় বিনা-পয়সায় বাংলাদেশের রাস্তা ও নদি দিয়ে ভারতের নর্থ-ইস্টের অবাধ চলাচল চালু থাকুক! এমনই এর আবদার! – ভারতের এমন খারাপ মতলবের কথাও বিবিসি প্রকাশ্যে লিখে দিয়েছে!

    The elephant in the room is neighbouring India, which opposes
    any coercive action against Bangladesh.
    Delhi wants road and
    river transport access
    for its seven north-eastern states through Bangladesh.

    যদিও শেষে একটু সহানুভুতির সুরে লিখেছে, Officials in Delhi are afraid it is strategically vulnerable in any potential conflict with India’s rival, China. বাংলাকরে বললে,  দিল্লিতে ভারতীয় কর্তারা নাকি চীনের ভয়ে চিন্তিত যে যে চীনের চাপে ভারতের বড় – কৌশলগত দুর্দশা – দেখা দিতে পারে। এতে কথাটার মানে হয়ে গেছে যেন চীনের কাছে ভারতের  কৌশলগত দুর্দশা কাটানোর জন্যই হলেও জবরদস্তিতে বাংলাদেশ থেকে ভারতের করিডোর সুবিধা জায়েজ বা ভারতকে তা পাইয়ে দিতে হবে…।
    এই হল পশ্চিমা সমস্যা। মনে করে তাদের এই দালালি আমরা ধরে ফেলব না।

    এতদিন মানে ধরেন চলতি নয়া শতক যার এখন ২৩ বছর পার হল। এই তেইশ বছরে দুনিয়ার সচেতন সবাই মনে করেছিল দুনিয়ার প্রধান দ্বন্দ্ব এখন আমেরিকা বনাম চীন। মানে গ্লোবাল নেতৃত্বের এক পালাবদল হতে যাচ্ছে; আর এই পালাবদলকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্ব।  আবার দুনিয়ার কিছু অবুঝ বেদিশ বা নাদান এটাকে অর্থহীন এক শব্দ -ভূরাজনীতি [geo-politics]  – বলেও ব্যাখ্যা করে থাকে! যাই হোক এখন দুনিয়া মানে হল, আমেরিকা-চীনের দ্বন্দ্ব এর দুনিয়া! আর এই দ্বন্দ্ব কাঠামোর মধ্যে ভারত তার কথিত চীনবিরোধিতা দেখানোর উসিলায় আমেরিকার কোলে চড়ে বসতে চেয়ে গেছে অন্তত ২০০৭ সাল থেকে। এটাই আমরা দেখতাম। ভারতের লক্ষ্য আমেরিকা যেন আবার তাকে চীন ঠেকানোর ঠিকা দেক! সেই ঠিকা বা এসাইনমেন্ট যেটা মোটামুটি ২০১৭ সাল থেকেই আমেরিকা  প্রত্যাহার করে নিয়েছে। যদিও চীনবরোধী কোন ইস্যু থাকলে ভারত-আমেরিকা তা নিয়ে পরস্পর সমন্ব্য় করে কাছে থাকার চেষ্টা অব্যহত রাখে।

    বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সব পক্ষ-বিপক্ষ এলোমেলোঃ 
    চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব ইস্যুতে এটা দেখে এতদিন মনে হতে পারে ভারত তো আমেরিকার কোলেই আছে। যদিও বাংলাদেশে আমেরিকান স্যাংশন আর ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রবল হয়ে উঠলে ভারত ছটপট করে উঠছিল। প্রকাশ্যেই তাদের লোকজন বলত যে তাহলে তো স্যাংশনের কারণে ভারতের অধীনে থাকা খেদমতগার হাসিনা আর জিতে আসতে পারবে না।  বাংলাদেশে ১৫ বছর ধরে ভারতের লুটেপুটে খাওয়ার স্বার্থের কী হবে তাহলে? কিন্তু তা সত্বেও কোথায় যেন একটা নিজেই আস্থা পেত এই বলে যে  শেষে আমেরিকা নিশ্চয় ভারতের স্বার্থকেও একোমডেট মানে ভারতের জন্য লুটের কিছু একটা জায়গা করে দিবে! সরকথায় শেষে আমেরিকা বা আঙ্কেল স্যাম ভারতকে বাঁচাবে! এমন একটা বোধ তাদের মধ্যে কাজ করত!

    কিন্তু নাঃ
    ভারত এখন টের পেয়েছে বিরাট ওলটপালট হয়ে গেছে! কেন?
    ব্যাপারটা আগে অতটা বুঝা যায় নাই। কিন্তু এখন যতই ৭ জানুয়ারি এগিয়ে আসছে ততই এক নয়া বাস্তবতা সবাই অনুভব করছে। যেটা এর আগে পর্যন্ত সবাই আঙ্কেল স্যাম এর উপর ভরসা করে বসেছিল। নিশ্চয় তিনি একটা কিছু করবেন যা সকলের জন্যই ভাল হয়! কিন্তু হায়!!!
    এটা ঠিক এক নয়া বাস্তবতা হাজির হয়েছে অবশ্যই।  যা আর অস্বীকারের উপায় নাই! তাই ভারত অস্থির হয়ে উঠেছে!
    আর ব্যাপারটা এসেছে এভাবে –  দেখি না কী করে! – সেই গল্পের মত এই ঘটনা! যে গৃহস্তের বাসায় চোর এসেছে আর গৃহস্ত ভাবছে দেখি না চোর কী করে – একেবারে শেষে ধরব! আর এটা করতে করতে চোর তার কাজকর্ম প্রায় শেষ আর বমাল নিয়ে চলে যাবার অবস্থায়…!  আঙ্কেল স্যাম এর উপর ভারতসহ সকলের ভরসারই পরিণতি হল যেন এটা!

    এখন ভারতের কাছেও পরিস্কার যে ৭ জানুয়ারি দিন শেষ সন্ধ্যা থেকেই হাসিনা দাবি করতে থাকবে যে সে বিজয়ী হয়ে গেছে!  এর চেয়েও বড়কথা এক বাস্তবতা সম্ভবত হবে এরকম যে  দুই থেকে দশদিনের মধ্যে হাসিনা চীনের সাথে  চুক্তি আলাপ আলোচনায় বসে যাবে। মানে যেতে হবেই মূলত এজন্য যে এর মুখ্য কারণ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা তলানিতে, মোটা আর নগদ ডলার লাগবে। পাঠকদের কাছে চীন ভাল না মন্দ, চীন পছন্দ করেন কিনা এসব বিবেচনা এখানে একেবারেই অপ্রয়োজনীয়, গুরুত্বহীন। বাস্তবতা হল, এমন নগদ অর্থ (প্রজেক্ট-প্রকল্প নয়) দিবার সম্ভাব্য দাতা যাদের কাছেই একমাত্র হাসিনার একসেস আছে, চাইতে পারে ও তারা দিতেও পারে সেটা হল চীন।
    এককথায় বললে, বাংলাদেশে নির্বাচন নামে কিছু একটা হয়েছে আর হাসিনা তাতে নির্রচিত বলে দাবি করতে পারলেই, হাসিনা চীনের কোলে শক্ত হয়ে বসে যাবার সম্ভাবনা প্রায় ষোল আনা!  এবং ইন্ডিয়ার তোয়াক্কা না করে, চীন একে পায়ের নিচে রেখে হাসিনার থেকে সবকিছু আদায় করে নিবার এরচেয়ে ভাল সুযোগ চীন আগে কখনই পায় নাই। এই অবস্থাটা তৈরি হবে সেখানে অবলীলায়! অনেকটা টিকা-ইস্যুতে যেমন হয়েছিল!  অতএব এখন ইন্ডিয়ার কানে পানি গেছে! কিন্তু তার কিছু করার নাই!

    ফলাফলঃ তাই সুবীর ভৌমিক মানে ইন্ডিয়া বা রএর অবস্থান হল তাই হাসিনার নির্বাচন হয়ে যাকে  তারা এর বিরোধী!  সবচেয়ে তামাশার কথা ২০২১ সাল থেকে ভারত বাংলাদেশে আমেরিকার অবরোধ দেওয়ার বিরোধীতা করে গেছে, হাসিনা তাদের কত পেয়ারের বা হাসিনা ছাড়া বাচবে না – এনিয়ে তারা নাকি কান্না প্রদর্শন করে গেছে। মানে এতদিন তারা একটা প্রহসনের নির্বাচনেরই পক্ষে দ্বিধাহীন সমর্থক ছিল এটাই প্রকাশ্যে স্বীকার ও লিখে বলে করে চলেছিল। অথচ এখন উলটা?

    একটা তামাসা দেখেনঃ
    ভারতের গোয়েন্দা-গুষ্টির সবাইএখন যারপরনাই হাসিনার নির্বাচনবিরোধী! কিন্তু  সেটা কেমনে কী?
    সুবীর ভৌমিক এলেখায় আমাদেরকে আরেক ভারতীয়ের সাথে পরিচয় করিয়েছেন। যা্র নাম শুখরঞ্জন দাসগুপ্ত [ Sukhoranjan Dasgupta ]। একে তিনি পরিচয় করিয়েছেন এক Bangladesh analyst বলে। আসলে তিনি অনেক পুরানা মানে সেই শেখের আমলের ‘র’-এর এজেন্ট। যখন তার বাইরের পরিচয় ছিল তিনি আনন্দবাজার পত্রিকার ঢাকার সংবাদদাতা। পরে তিনি আনন্দবাজার ছেড়ে দেন আর কেবল ‘র’-এর এজেন্ট-ই থেকে যান। বাংলাদেশ তার খবর সোর্স এমন সংগ্রহের উতস অনেক। তিনি বাংলাদেশের বিডিনিউজ২৪ কলাম লিখেন, সাথের মাঝে মধ্যে অন্য অনেক বাংলাদেশি ‘প্রগতিশীল’ পত্রিকাতেও। তার বরাতে এবার সুবীর বলছেন,  “সক্রিয় ও কার্যকর গণতন্ত্রিক চর্চার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে বাংলাদেশে ৭ জানুয়ারির যে নির্বাচনটা হচ্ছে তা পুরানা সংসদটা ভেঙ্গে না দিয়ে আর তাতে মন্ত্রী ও এমপিদের  পদাধিকার বহাল থেকে গেছে। ফলে এই নির্বাচন প্রক্রিয়াকে তারা প্রভাবিত করার সব সুবিধা সাথে নিয়েই নির্বাচন করছে”।

    এই বক্তব্য (ইংরাজিটা নিচে দেখেন) সুবীর আর সুখরঞ্জনের বাংলাদেশের প্রতি এক দারুণ সার্ভিস!!! যেন আমরা এটা জানতামই না।
    কিন্তু ঘটনা হল, ভারতের গোয়েন্দা-প্রবরেরা এতদিন এটা তারাই জানত না ভান করে চেপে থাকত।  কিন্তু এখন কেন? এই পল্টি দেয়া কেন?
    হাসিনাকে ছাড়া তাদের চলবেই না কিংবা আমেরিকান স্যাংশন্ ভুয়া সেসব কান্না কাটি তারা তাহলে কেন করছিলেন এতদিন?

    “Unlike in most functional democracies, Bangladesh is going into the
    January 7 polls with a prorogued and not a dissolved parliament which
    allows ruling party ministers and MPs to influence the poll process…” – 

    বাংলাদেশের জন্য একটা ভাল নির্বাচন দেখতে চাওয়ার ভারতীয় আকাঙ্খা! তা ভাল কিন্তু এতদিন উলটা গান গেয়ে চলছিলেন আপনারা??? আগে সেটা বলেন।  না। পুণ্যি করলেই কেবল এমনটা দেখতে পাওয়া যেতে পারে!
    যদিও এর নীট অর্থ কী? সেটা হল, বাংলাদেশের নির্বাচন পন্ড হয়ে যাক এটাই এখন বদলে যাওয়া ভারতীয় আকাঙ্খা…! মজা না???

    ঘটনাটা কিছু শুনেছিলাম অনেকেই বলছিলেন, পিটার হাসের ভারত সফরের ঘটনা। সেখানে ভারতের সাথে কোন আনুষ্ঠানিক কিছু ছিল না। আর সেটা প্রটোকলেও পড়বে না। তবে ভারতে পিটার হাস বেড়াতে গেলে এমবেসিতে বড়দিনের ডিনার বলে ২৫ ডিসেম্বরের সামাজিক সাক্ষাত তো হতেই পারে! আর সাথে কথায় কথায় সেখানে কিছু তিক্ত কথাবার্তাও নাকি উঠে এসেছিল। যার প্রসঙ্গ ছিল চীন! ভারতের অভিযোগ বাংলাদেশে ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ দেখা হচ্ছে না; আমেরিকা দেখছে না। অথচ ভারত তো নাকি এক আঞ্চলিক ‘মহারাজা’। তাসি এটা তো তার অপমান! …! শেষে আলোচনা – কে কত চীনবিরোধী তা জানা আছে, হয়ে গেছে –  টাইপের উদাহরণ দেয়ার দিকে নেয়া যায়। আর তা থেকেই ভারত বুঝে যায় সে একা হয়ে গেছে! বাংলাদেশে কোথাও বা বাংলাদেশকে নিয়ে কোথাও তার বেল নাই…! বলা কথাগুলো শুনেছিলাম সম্ভবত ২৮ ডিসেম্বর!  তবে সাবধান কেউ এগুলোকে হুবহু এরকমই হুবহু ভাষ্য হিসাবে নিবেন না। এটা একজন থেকে আরেকজনেরে এভাবে ছড়ানো কথা!  আমিও শুনেছি দেশের বাইরের বক্তা থেকে। তিনিও শুনেছেন আমেরিকান সোর্স থেকে, এভাবে।
    কথাগুলো পরে ভুলেই গেছিলাম। এবার বিবিসির এই রিপোর্টটা পড়ে মনে হচ্ছে পশ্চিমারা এমনি এমনি ইন্ডিয়াকে তান্ডব মানে ঘরের ভিতর হাতি এমন আপদের সাথে তুলনা করে নাই???

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০৩ জানুয়ারি   ২০২৪, মধ্যরাত ১২ঃ ৩৫

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • পঞ্চম সংশোধনী বিতর্ক

    পুরানা আর্কাইভ থেকে


    পঞ্চম সংশোধনী বিতর্ক
    ফিদা হাসান (গৌতম দাসে ছদ্ম নাম)
    Sunday 07 November 2010 (পুরানা সেকালে ছাপা হওয়ার তারিখ এটা)
    ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩ (আজকের তারিখ)
    https://wp.me/p1sCvy-5fB

     

    রাজনৈতিক ঘটনাবলী দেখবার ও বিচার করবার নানান দৃষ্টিভঙ্গি স্বাভাবিকভাবে অন্য যে কোন দেশের মতো বাংলাদেশেও আছে। ঘটনার ধারাবাহিকতা বা ছেদ দেখা, ধরতে পারা ও বিচার করবার ক্ষমতা একটি জনগোষ্ঠি সহজে অর্জন করে না। তবুও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টি, শেখ মুজিবের হত্যা ও মোস্তাকের হাত ঘুরে জিয়ার হাতে ক্ষমতা থিতু হয়ে বসার প্রতি বাংলাদেশের নানান শ্রেণী ও শক্তির দৃষ্টিভঙ্গী আমরা টের পাই। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত একদল আইনি পেশার লোকজন আছেন যারা শুধু একটা দৃষ্টিভঙ্গিই তৈরি করে বসে নাই, দলীয় ও শ্রেণীগত জায়গা থেকে তারা তাদের সুনির্দিষ্ট করণীয় ও পদক্ষেপ সততই ঠিক করছেন এবং সে কাজের ব্রতে তারা সক্রিয়ও বটে। আমরা বিশেষভাবে তাদের প্রতি নজর দিচ্ছি যাদের তৎপরতা মূলত ড্রয়িংরুম ভিত্তিক; সুনির্দিষ্ট কোন নাম নাই কিন্তু একটা দলবদ্ধ গ্রুপ আকারে তাদের আমরা দেখি। এমন একটা গ্রুপের কথাই এখানে উল্লেখ করব। বারবার এদের কথা এখানে বলার সুবিধার জন্য এর নাম আমরা ধরে নিলাম ‘মিশন এক্স’। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আছেন বর্তমান প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজ (যিনি পারিবারিক সূত্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির স্বামী), সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, ব্যারিস্টার আজমামুল হোসেন কিউসি এবং আরো অনেকে। তাদের পেশাগত ও রাজনৈতিক তৎপরতা উভয় দিক থেকে স্পষ্ট করেই চেনা যায়। মিশন এক্সের চিন্তা ও প্রচেষ্টার মধ্যে অবশ্য আরও অনেকে আছেন যাদের পরিষ্কার করে চেনা যায় না। এছাড়াও অন্য অনেকে আছেন যারা মিশনের চিন্তা, প্রকল্প এবং তা বাস্তবায়নের পথে সাথে জড়িয়ে গেছেন, এরা মিশন এক্স এর ঠিক মূল গ্রুপের না; যেমন আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম প্রমুখ। এদের নাম উল্লখে করে কোন ষড়যন্ত্রের কথা আমি বলতে বসি নাই। মিশন ‘এক্স’ কোন ষড়যন্ত্রের নাম না। এদের চিন্তাটা যেরকম কাজে তার প্রকাশটাও সেরকমই। এসব বিষয় নিয়েই এখানে কথা বলবার প্রসঙ্গ। সারকথায়, মিশন এক্স এর চিন্তা ও তৎপরতার পর্যালোচনাই এই লেখার বিষয়।

    পঞ্চম সংশোধনী বাতিল মামলাকে কেন্দ্র করে মিশন এক্স এর তৎপরতা জনসমক্ষে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে। ‘পঞ্চম সংশোধনী বাতিল মামলা’ বললাম বটে কিন্তু আদালতের কাগজপত্রের ভাষায় এটা মুন সিনেমা হল মামলা। এই মামলা শেখ মুজিবের আমল থেকে শুরু করে জিয়ার আমলে চলে আসে। এরপর তা পেরিয়ে শেষের দিকে প্রায় একরকম মৃতপ্রায় অবস্থায় ছিল মামলাটি। এই মামলাকে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল মামলা হিশাবে কাজে লাগানোর প্রয়োজনে যেনবা একরকম কিনে নেয়া হয়।

    বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে অন্য অনেক অবাঙালীর পরিত্যক্ত সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে নেয়া হয়েছিল। যেমন, বাংলাদেশের কনস্টিটিউশন প্রণীত হবার আগেই অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট নজরুল ইসলামের এক ডিক্রি বলে (অস্থায়ী রাষ্ট্র্রপতি আদেশ নং ১, ডিসেম্বর ৩১, ১৯৭১) সরকারি মালিকানাধীন সম্পত্তি বলে অনেক সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে নেয়া হয়েছিল; মুন সিনেমা হল সেরকমই এক সম্পত্তি। অধিগৃহীত এই সম্পত্তি পরে সরকার থেকে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে হস্তান্তর করে দেয়া হয়েছিল।

    পাকিস্তানের বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে শেখ মুজিব দেশে ফিরে আসেন ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সনে । তিনি রাষ্ট্রপতি হিশাবে আসীন হবার আগে থেকেই মুন সিনেমা হল মামলার ঘটনা-উপাদান শুরু হয়েছিল। এরপর ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাস থেকেই ওই সম্পত্তি ফেরত পাবার জন্য মূল মালিক বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ঘুরে সরকারি অফিসে লিখিত আবেদন নিবেদন শুরু করেছিলেন। শেখ মুজিবের শাসনের সময় থেকেই এবং তার মৃত্যুর পরও নানান কায়দা কানুন, আইনের ফাঁক ফোকর গলে, শিল্প মন্ত্রণালয়কে হাত করে এমনি বহু পরিত্যক্ত সম্পত্তি ফেরত নেবার এক জোয়ার উঠেছিল। মুন সিনেমা হল মালিকের এরকম এক আবেদনের প্রেক্ষিতে ২২ অক্টোবর ১৯৭৩ সালে শিল্প মন্ত্রণালয়ের ‘পরিত্যাক্ত সম্পত্তি সেল’ ঢাকা জেলা প্রশাসনকে মাঠ তদন্ত করে রিপোর্ট পাঠাতে বলে। জেলা প্রশাসন মাঠ তদন্ত শেষে প্রায় বছর খানেক পরে ‘পরিত্যাক্ত সম্পত্তি সেল’ কে রিপোর্ট দেয়। ঐ সম্পত্তি ‘পরিত্যাক্ত সম্পত্তি নয়’ ফলে তা ফেরত দেয়া যেতে পারে বলে সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ জানায় ঐ রিপোর্ট। কিন্তু ঐ মাঠ রিপোর্ট ও সুপারিশ অবজ্ঞা করে শিল্প মন্ত্রণালয় ২৭ জুন ১৯৭৫ সালে ওই সম্পত্তি ‘পরিত্যাক্ত সম্পত্তি” বলে প্রাক্তন মালিককে চিঠি দিয়ে জানিয়ে সব আবেদন নাকচ করে দেয়।

    এখান থেকে এই ঘটনা আদালতের ইস্যু হবার দিকে মোড় নেয়। মুন সিনেমা হল মালিক ১৯৭৬ সালে সম্পত্তি ফেরত পাবার আদেশ কামনা করে হাইকোর্টে রিট করেন। রিট দায়েরের প্রায় এক বছর পর ১৯৭৭ এর ১৫ জুনে হাইকোর্ট তার রায়ে মন্ত্রণালয় ও কল্যাণ ট্রাস্টকে সম্পত্তি ফেরত দিয়ে দেবার নির্দেশ জানিয়ে রিট নিষ্পত্তি করেন।

    কিন্তু মুন সিনেমা হল মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের মালিকানায় দখলে থাকার কারণে ওই রায়ের প্রেক্ষিতে সম্পত্তি ফেরত দেবার বদলে শিল্প মন্ত্রণালয় উল্টা কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষে মালিকানা ধরে রাখতে সরাসরি রাষ্ট্রপতি জিয়ার পৃষ্টপোষকতা চায়। ফলে ঘটনা কোর্ট কাচারিতে শেষ হবার পরও জিয়াকে দিয়ে Abandoned Properties (Supplementary Provisions) Regulation, 1977 নামে এক আইন জারি করা হয় যাতে কোর্টে মামলার তর্কবিতর্ক ও রায় যাই হোক তা এড়িয়ে কল্যাণ ট্রাস্ট সহজেই মালিকানা ধরে রাখতে পারে। স্বভাবতই জিয়ার ওই আইন জারির ক্ষমতার উৎস সামরিক আইন। তবে অনুমান করা যায় ওটা মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যাপার। কাজেই মুক্তিযোদ্ধামূলক সেন্টিমেন্টের কবলে পড়ে প্রেসিডেন্ট জিয়া ওই সামরিক আদেশে আইন জারিতে প্ররোচিত হয়েছিলেন। কিন্তু বিধিবাম। মুক্তিযোদ্ধামূলক সেন্টিমেন্টের কবলে পড়াই জিয়ার জন্য কাল হয়েছিল। কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষে মালিকানা ধরে রাখতে রাষ্ট্রপতি জিয়ার ওই আইন জারি পরবর্তীকালে মিশন এক্স এর পঞ্চম সংশোধনী বাতিল প্রকল্প ও তা বাস্তবায়নের উপায় হিশাবে হাজির হয়ে যায়।

    ১৯৯৪ সালে ওই সম্পত্তি ফিরে পাবার উসিলায় নতুন এক রিট মামলা হয়; এই মামলায় আগের ওই মালিকানা বিষয়ক মামলাকে কনস্টিটিউশনাল মামলার ইস্যু হিশাবে হাজির করা হয়েছিল। যেখানে ইস্যু হল জিয়ার ১৯৭৭ সালের ওই আইন জারির কনস্টিটিউশনাল এখতিয়ার ছিল কিনা। অর্থাৎ জিয়ার ১৯৭৫ সালের ক্ষমতা গ্রহণের বৈধতা ও প্রেসিডেন্ট হিশাবে কোন আইন জারির ক্ষমতা আদৌ ছিল কি না। এই হল মুন সিনামা হল মামলা। মানে একটি মালিকানা বিষয়ক সিভিল মামলাকে কনস্টিটিউশনাল মামলার ইস্যু হিশাবে রূপান্তর ঘটিয়ে নতুন করে হাজির করা। সোজা কথায় তখন থেকে এই মামলা জিয়ার ক্ষমতা গ্রহণ বৈধ কি না সেই সাংবিধানিক তর্কের ফাঁদে পড়ে যায়। অর্থাৎ পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের মামলা হয়ে দাঁড়ায়।

    পঞ্চম সংশোধনী বাতিল আমাদের নিজেদের দেয়া নাম। আইনগত ভাষায় এটা এখনও মুন সিনেমা হল নামক সম্পত্তি ফেরত পাবার সিভিল তথা দেওয়ানী মামলা। সরাসরি কোন কনস্টিটিউশনাল মামলা না। অর্থাৎ সরাসরি কনস্টিটিউশনের পঞ্চম সংশোধনী আইন অবৈধ ঘোষণা করার দাবি জানিয়ে হাইকোর্টে দায়ের করা কোন রিট মামলা না; যেগুলোকে আমরা রাজনৈতিক মামলা বলে বুঝি।

    এটা স্পষ্ট যে কেবল একটি সম্পত্তি ফেরত পাবার উদ্দেশ্য দায়ের করা সিভিল মামলা মিশন এক্সের আগ্রহ না। কারও সম্পত্তি উদ্ধার করার মধ্য দিয়ে মিশন এক্সের কোন রাজনৈতিক প্রকল্প খাড়া হতে পারে না। তবে এই মামলাকে কেন্দ্র করে কনস্টিটিউশন মামলা হিশাবে ঘুরিয়ে তা হাজির করার সুযোগ আছে। সেই দিকটাকে কেন্দ্র করেই মিশন এক্সের মিশনের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

    কোন সিভিল মামলাকে কনস্টিটিউশনাল মামলা হিশাবে হাজির করার সুযোগ থাকলে সেই সুযোগ নেওয়া দোষের কিছু না। তবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে করণীয় মনে করার কারণে সরাসরি পঞ্চম সংশোধনী আইন বাতিল দাবি করে মিশন এক্স তার প্রকল্প হাতে নেয় নাই; এটাই এখানে লক্ষণীয় বিষয়। এখান থেকেই মিশন এক্স এর কাজকর্মের ধরন, রাজনৈতিক উদ্দশ্যে, আর কাজের উপায় বেছে নেয়া ইত্যাদি তৈরি হয়েছে। মিশন এক্স  কিভাবে তৎপর হতে পছন্দ করে তারও একটা হদিস আমরা এখান থেকে পাই। কারণ, পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের ইস্যুটা আগাগোড়াই একটা রাজনৈতিক ইস্যু। সরাসরি রাজনৈতিক লড়াই কিম্বা গণআন্দোলনের ভেতর দিয়ে তৈরি ক্ষমতার জায়গা থেকে বিদ্যমান আইনকে মোকাবেলার পথে তারা যায় নাই। চাতুর্যের সাথে রাজনৈতিক এজেন্ডাকে স্রেফ আইনি ইস্যু হিশাবে তুলে আদালতে অগ্রসর হবার কৌশল মিশন এক্স কাজে লাগায়। আদালতের করিডোরে ফয়সালার আবরণে প্রভাব তৈরি করে জিতে আসা মিশন এক্স এর প্রকল্প। এটাই তাদের পছন্দের পথ। তাও রাজনৈতিক প্রশ্নে সরাসরি কনস্টিটিউশন মামলা হিশাবে না, কোন এক সম্পত্তি ফেরত পাবার সিভিল মামলার উসিলায়। সন্দেহ নাই এটা অনেকটা গরুর রচনা লিখার নামে গরুকে নদীতে ফেলে এবার নদীর রচনা লেখার মতন ব্যাপার।

    যেকথা থেকে শুরু করেছিলাম — বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টি, শেখ মুজিবের হত্যা ও মোস্তাকের হাত ঘুরে জিয়ার হাতে ক্ষমতা থিতু হয়ে বসা ইত্যাদি ঘটনাবলী দেখার ও বিচারের নানান দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে আছে। এর মধ্যে স্বভাবতই আওয়ামী ড্রয়িংরুমের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিগুলোও অন্তর্ভুক্ত। মিশন এক্স এমনই এক আওয়ামী বৈঠকখানার দৃষ্টিভঙ্গি।

    এসব বৈঠকখানাগুলার চিন্তার বৈশিষ্ট্যসূচক কিছু দিক আমরা চিহ্নিত করার চেষ্টা করতে পারিঃ

    বৈশিষ্ট্য এক: এরা ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশনের ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ প্রেমী

    ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশন, আইন, রাষ্ট্র্র এবং ওই সময়ের শেখ মুজিবের রাষ্ট্র্রশাসন সব কিছুকেই বাংলাদেশের জন্য এরা স্বর্ণযুগ মনে করে, মনে করে এ এক  মহা অর্জন এবং অনন্য সাধারণ দৃষ্টান্ত। সেই সময়কে সিনেমার অভিনয়ের মত পুনরুৎপাদন করে বারবার হাজির করাটা এদের প্রত্যেকের জীবন-সাধনা; তাদের রাজনৈতিক অভিলাষের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য রাজনৈতিক স্বপ্ন-কামনা। এই কামনা-বাসনার কেন্দ্র হল ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশন অর্জন। মিশন এক্সের কাজ একে দুনিয়ার এক অনন্য সাধারণ, অদ্বিতীয় ও পবিত্র ঘটনা বলে জাহির করা। এই ভাবটা ধরা পরে এদের একটি ছোট্ট শব্দ ব্যবহারে। সেটা হোল,  ‘বেসিক স্ট্রাকচার বা মূল কাঠামো’। তাদের দাবি জিয়া পঞ্চম সংশোধনী আইন জারি করে ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশনের ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ ভেঙ্গেছেন। জিয়ার বিরুদ্ধে শানিত অভিযোগ এই ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ নামে  আমদানি বয়ানের অপর দাঁড়ানো। আওয়ামী ড্রয়িংরুমের এই ভাবনায় মনের কথাটা গুছিয়ে বলা সর্বশেষ উচ্চারণ আমরা পাই প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের শপথ-উত্তর সাংবাদিক কথোপকথনে। তিনি বলছেন,  ‘জাতীয় সংসদ আইনগতভাবে সংবিধানের মূল কাঠামো ব্যতীত যেকোন পরিবর্তন আনতে ক্ষমতাবান। মূল কাঠামো হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক চরিত্র, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ইত্যাদি’। কথাগুলা আমাদেরকে এখানে ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখতে হবে। অনেকবার কথা বলতে হবে এই বাঁধানো বক্তব্য নিয়ে। তবে তার আগে এখন এই প্যারাতে উঠে আসা আওয়ামী বৈঠকখানার রাজনৈতিক স্বপ্ন-কামনা প্রসঙ্গে কথা শেষ করে নিতে চাই।

    ভাল মন্দ যাই হোক পুরনো স্মৃতি আমাদের তাড়িত করা স্বাভাবিক। কিন্তু তা আঁকড়ে সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে বসে থাকা কোন কাজের কথা না। সেটা হবে বাস্তবতা ফেলে রচিত স্বপ্নের দুনিয়ায় বসবাস করা। নিজের জীবনের এটা নতুন সমস্যা। নতুন প্রয়োজন, নতুন পরিস্থিতি নিয়ে নিজে কি করতে চাই সে সম্পর্কে বেখবর থাকা। মিশন এক্সের বৈশিষ্ট হলো পুরানা স্মৃতি আগলে বসে থাকা, থাকতে পছন্দ করা। পারলে পুরানাকেই তার ভুলশুদ্ধ সহ আবার হাজির করা। অথচ স্মৃতির ভুমিকা এতটুকুই যে ও থেকে জীবনের নতুন প্রণোদনা সংগ্রহ করাই কাজ। এখনকার করণীয় টের পাওয়া, পুরনো সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়া ও সামনে এগিয়ে চলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাথেয় হিশাবে পুরানাকে সঙ্গী করা চলে। কিন্তু পুরানাকে আঁকড়ে ধরে রাখলে চলে না। এককথায় স্মৃতিকে পর্যালোচনার বিষয় হিশাবে নেয়ার সাহস দেখানোই কাজ।

    মিশন এক্স এর সেই সাহস এবং সেই মনোভাব নাই। এই মনোভাব কোন চ্যালেঞ্জ ছাড়া ধরে নেয় ও ভাবতে ভালবাসে যে শেখ মুজিবের আমল এমনই এক স্বর্ণযুগ যেখানে কোন খামতি নাই, চিন্তার ত্রুটি নাই, ব্যর্থতা নাই, অযোগ্যতা নাই, পরাজয় নাই কেবল অর্জন আর অর্জন। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, সে বুঝতে পারে না এবং সেই বুঝাটা চিন্তার সাহসেও কুলায় না যে, যদি তাই হয়, তাহলে সেই যুগটা নিজে টিকে থাকতে পারল না কেন? ফলে এরা না টিকে থাকার কারণ হিশাবে বড়জোর ষড়যন্ত্রই দেখতে পায়।

    মিশন এক্সের এই বৈশিষ্ট্যের সারকথা হল, সবকিছু পুনর্বিচার ও পর্যালোচনার আওতায় আনতে ভীতসন্ত্রস্ত হওয়ার মনোভাব। কেন শেখ মুজিবের শাসন যদি ‘স্বর্ণযুগ’ তবে কেন তার পতন ঘটেছিল তার ক্রিটিক্যাল বিচার, আত্মপর্যালোচনামূলক চিন্তার সাহস ও ক্ষমতা এদের নাই। যেন সেকাজে নামলে শেখ মুজিবের প্রতি ভক্তের অশ্রদ্ধা প্রকাশ হয়ে যাবে। এরাই ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশনের ‘বেসিক স্ট্রাকচার বা মূল কাঠামো’র ভক্তপ্রেমিক। এই ভক্তরা এতই অন্ধভক্ত যে খোদ শেখ মুজিবই যে সবার আগে ‘বেসিক স্ট্রাকচার বা মূল কাঠামো’ আস্ত রাখে নাই, বরং তুলে আছাড় মেরেছিলেন সে খবর নাই। সে খবর তারা রাখতে চায় না, সাহস করে না। আগেই জানিয়েছি প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের বেসিক স্ট্রাকচার বিষয়ক মহাবয়ান সদ্য তাঁর শপথ-উত্তর এক সাংবাদিক কথোপকথনে, আদালতের কোন রায় নয় বিধায় এখন শুধু একটা প্রশ্ন তুলে প্রসঙ্গে ঢুকব।

    ওই সাংবাদিক কথোপকথনে বেসিক স্ট্রাকচার বলতে তিনি কি বুঝেন অর্থাৎ তাঁর সংজ্ঞা নিয়ে আমাদের ভুল বুঝাবুঝির অবকাশ যাতে না থাকে সেজন্য আমাদের জানিয়ে বলেছেন, ‘মূল কাঠামো হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক চরিত্র, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ইত্যাদি’। তাঁকে ধন্যবাদ জানাই, খুবই ভাল একটা কাজ করেছেন সন্দেহ নাই। আমাদের এখন কথা বলতে আরাম হবে।

    এখন প্রশ্ন হলো, প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক কী মনে করেন কনষ্টিটিউশনের চতুর্থ সংশোধনী আইন বাকশাল জুড়ে দেবার পরও শেখ মুজিব ১৯৭২ সালের কনষ্টিটিউশনের বেসিক স্ট্রাকচার অক্ষুন্ন রেখেছিলেন? আনপ্যারালাল, অদ্বিতীয় ও পবিত্র পুস্তক ১৯৭২ সালের কনষ্টিটিউশনের মূল কাঠামো রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক চরিত্র, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ইত্যাদি এরপরেও কি রক্ষা পেয়েছিল ও বজায় ছিল?

    সকলকে মনে করিয়ে দেই,

    ১. চতুর্থ সংশোধনী আইন ১৯৭৫-এ কনস্টিটিউশনের ষষ্ঠভাগে ‘ষষ্ঠভাগ ক, জাতীয় দল’ বা বাকশাল বলে এক নতুন অনুচ্ছেদ ঢুকানো হয়েছিল। এছাড়া ওই সংশোধনীতে কনস্টিটিউশনের অনুচ্ছেদ ১১ সংশোধন করে বলা হয়েছিল, ‘Effective  participation by the people through their elected representatives in administration at all levels shall be ensured’ shall be omitted’। যার বাংলা করলে দাঁড়ায় সংশোধনের আগের কনস্টিটিউশনের অনুচ্ছেদ ১১ তে প্রশাসনের সর্বস্তরে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণের যে কথা বলা ছিল এখন তা বাতিল করে দেয়া হল। এরপরেও কি প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক এর মূল কাঠামো ধারণার ‘রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক চরিত্র’ অটুট ছিল? নাকি তা থাকতে পারে?

    ২. সংক্ষুব্ধ কোন নাগরিকের আদালতে যাবার যে মৌলিক অধিকার ৪৪ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত ছিল বাকশাল সংশোধনীতে খোদ সেই ৪৪ অনুচ্ছেদকেই বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে। সেই সাথে ১০২ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টেকে দেওয়া অধিকার অর্থাৎ সংক্ষুব্ধ কোন নাগরিকের আবেদন শুনতে এবং প্রতিকার দিতে নির্বাহি বিভাগের ওপর আদেশ দেবার আদালতের যে ক্ষমতা সেই ক্ষমতাকেও একইসাথে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। সারকথায়, চতুর্থ সংশোধনী আইন ১৯৭৫  ঘোষণা করেছিল আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষমতা নাই । এরপরেও কি প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের সংবিধানের ‘মূল কাঠামো’ ধারণার অন্তর্গত ‘আইনের শাসন’ বাকশালী রাষ্ট্রে ছিল কি? শুধু তাই না, আরও মারাত্মক ব্যাপার হল, খোদ সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যালোচনা কনস্টিটিউশনে প্রদত্ত ক্ষমতা হিশাবে আর কানাকড়িও অবশিষ্ট নাই এই ধরণের কোন ঘোষণা সংবিধানের সংশোধনী আকারে র্কাযকর করার এখতিয়ার বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কারও আছে নাকি থাকতে পারে? বাস্তবে কিন্তু এমনটাই ঘটেছিল। অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছিল নাগরিকদের জন্য উচ্চ আদালত। তছনছ হয়ে যায় তথাকথিত রাষ্ট্রের ‘মূল কাঠামো’, তথা প্রধান তিনটি বিভাগের মাঝে সর্ম্পকের গণতান্ত্রিক ভিত্তিমূল। এরপরেও কি বলা যায় বাংলাদেশে রাষ্ট্র্র ও কনস্টিটিউশন বলে কিছু ছিল?

    কোন রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশন যদি দাবি করতে চায় সে ‘প্রজাতান্ত্রিক চরিত্র’ অর্জন করেছে এবং ‘আইনের শাসন’ সে জনগণকে দিতে পারবে তবে তার প্রথম শর্ত হল ওই কনস্টিটিউশন সুপ্রিমকোর্টকে বিচারিক পর্যালোচনার পূর্ণ ক্ষমতা দিয়েছে কি না। এটাই আগে পরখ করতে হবে। জনগণ প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের র্কাযবিধি চূড়ান্ত করে কনস্টিটিউশনে, এটা জনগোষ্ঠীর নিজেদের মধ্যকার একটা বোঝাবুঝির দলিল; একমাত্র তার ভিত্তিতেই জনগণ কোন নির্বাচিত শাসককে শাসন পরিচালনার সীমা-এখতিয়ার দেয়। এখন শাসক সেই সাংবিধানিক এখতিয়ারের মধ্যে থেকে শাসন পরিচালনা, আইন প্রণয়ন করছে কি না তা বিচার করে দেখার ক্ষমতা হল সুপ্রিমকোর্টে। এই ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট জুডিসিয়াল রিভিউ’র পূর্ণ ক্ষমতা রাখে। এই অর্থে সুপ্রিমকোর্ট কনস্টিটিউশনের হেফাজতকারী। সুপ্রিমকোর্টকে বিচারিক পর্যালোচনার পূর্ণ ক্ষমতা কোন শাসক কেন, কেউই ছিনিয়ে নিতে পারে না। ছিনিয়ে নিয়েছি দাবি করা আবার ছিনিয়ে নেয়া কথা লিখে একটা আইনও (চতুর্থ সংশোধনী আইন) জারি করা হয়েছে তাই যদি অবস্থা হয়, তবে নিঃসন্দেহে তখন থেকে ওই কনস্টিটিউশন বা রাষ্ট্র অবলুপ্ত হয়ে গেছে। কারণ তখন তা ঐ শাসক বা শাসকগোষ্ঠীর কাছে যেমন খুশি কাঁটাছেড়া করার বস্তুতে পরিণত হয়। বাংলাদেশে র্কাযত, জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের জায়গায় প্রজাতন্ত্রের বদলে শেখ মুজিব নামে এক রাজার শাসন কায়েম হয়ে গেছে। প্রজাতন্ত্রের জায়গায় কায়েম হয়ে গিয়েছিল রাজতন্ত্র। নাগরিকরা যে ক্ষমতা শাসককে দেয় নাই সে ক্ষমতাই সে আইন বলে দাবি করছে। আবার ওদিকে খোদ চতুর্থ সংশোধনী আইন কনস্টিটিউশনের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে গেলেও তা নিয়ে সুপ্রিমকোর্টের কাছে নালিশী রিট করে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ নাই বা রাখা হয় নাই। কারণ সুপ্রিমকোর্টের বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষমতা নাই বলে দেয়া হয়েছে। ফলে চতুর্থ সংশোধনী আইন বিশুদ্ধ রাজতান্ত্রিক আদর্শ হিশাবে হাজির হয়েছে, একটা রাজার শাসন কায়েম হয়েছে ঐ বিধানের মধ্য দিয়ে, কনস্টিটিউশনাল রাষ্ট্র্র বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে নি। রাজাই সার্বভৌম, শেখ মুজিবই রাজা। প্রজাতন্ত্রের খোলসটা বজায় রেখে চতুর্থ সংশোধনী এক রাজার রাজত্বই কায়েম করেছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যালোচনার পূর্ণ ক্ষমতা আছে কি না এটা যে কোন কনস্টিটিউশনাল রাষ্ট্রেরই মূল কথা। বেসিক স্ট্রাকচার যদি অর্থপূর্ণ কোন নালিশ উঠানোর জায়গা হয় তবে তাকে তুলতে হবে এই জায়গা থেকে। এখান থেকে আমরা সোজা এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি, যে কোন কনস্টিটিউশনাল রাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের জুডিসিয়াল রিভিউ’র পূর্ণ ক্ষমতা নাই এটা হতে পারে না। সুপ্রিম কোর্টের জুডিসিয়াল রিভিউ’র পূর্ণ ক্ষমতা নাই একথার একটাই মানে হল রাষ্ট্রের প্রাণভোমরা বেরিয়ে গেছে, এখন রাষ্ট্র্রও নাই, তার কনস্টিটিউশনও নাই; সবই অবলুপ্ত হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক সুপ্রিম কোর্টের এই ক্ষমতা এবং জুডিসিয়াল রিভিউ’র পূর্ণ এখতিয়ার কেন গুরুত্বপূর্ণ তা আমাদের চেয়ে ভাল বুঝবেন।

    ৩. চতুর্থ সংশোধনী আইনে আগের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি বরখাস্ত করার একচেটিয়া সীমাহীন কর্তৃত্ব প্রেসিডেন্টের হাতে দিয়ে বলা হয়েছিল প্রেসিডেন্ট কেবল একটা শোকজের নোটিশ ঝুলিয়েই সুপ্রিম কোর্টের যেকোন বিচারপতিকে বরখাস্ত করতে পারবেন। ‘A judge may be removed from his office by order of the President on the ground of misbehavior or incapacity’ । এরপরেও প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক তাঁর ‘মূল কাঠামো’ নামক ধারণার বিচারে ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা’ অটুট ছিল বলে কি মনে করেন?

    তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক এর ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ বা ‘মূল কাঠামো’ ধারণার গুষ্ঠি উদ্ধার করে খোদ শেখ মুজিবই (বাকশাল) চতুর্থ সংশোধনী পাশ করেছিলেন। বলা বাহুল্য নির্বাচিত প্রথম জাতীয় সংসদেই তা অনুমোদিত হয়েছিল। এতে ‘জাতীয় সংসদ আইনগতভাবে সংবিধানের মূল কাঠামো ব্যতীত যেকোনো পরিবর্তন আনতে ক্ষমতাবান।’ বিচারপতি খায়রুল হকের এই ধারণাকে শেখ মুজিব বহু আগেই শূন্যে তুলে আছাড় দিয়ে মাটিতে ফেলেছিলেন। মূল কাঠামো রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক চরিত্র, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা — এর সবগুলোকেই শেখ মুজিবের জাতীয় সংসদই ‘আইনগতভাবে’ পরিবর্তন করে দিয়েছিল। এবং এখনও তা সেভাবেই রাখা আছে।

    তাহলে সেদিকে না তাকিয়ে পঞ্চম সংশোধনী আইন ১৯৭৯ এর দিকে আঙ্গুল উঠিয়ে ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ বিষয়ক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক এর মহাবয়ান হাজির করার উদ্দেশ্য কি? পঞ্চম সংশোধনী আইন ১৯৭৯ এর কারণে আমাদের কনস্টিটিউশনের ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ ভেঙ্গে গেছে বলে সারা দেশে যে মিথ্যা প্রপাগান্ডার ঝড় তোলা হয়েছে সেটাই হল মিশন এক্স এর প্রকল্প। নিঃসন্দেহে এটা স্রেফ একটা দলবাজি। শুধু তাই নয় বরং চিন্তা বন্ধক রেখে দলবাজ, বিচারিক নির্বুদ্ধিতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা।

    বৈশিষ্ট দুই: ঘরের শত্রু  বাকশালী চতুর্থ সংশোধনী সম্পর্কে বেমালুম নিশ্চুপ; কেবল পঞ্চম সংশোধনীই সব দুঃখের কারণ

    আমরা দেখছি তবুও ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশনের ‘বেসিক স্ট্রাকচার বা মূল কাঠামো’-র প্রতি ভক্তপ্রেমিকদের প্রেম-ভক্তি এতটুকু কমে নাই। ‘বেসিক স্ট্রাকচার’র প্রেমিক ভক্তরা ঘরের শত্রু বাকশালী চতুর্থ সংশোধনী সম্পর্কে বেমালুম চুপচাপ। কোন আলোচনা বিচার পর্যালোচনা করতে তারা রাজি না। এই ২০১০ সালে এসেও ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ নিয়ে গলাবাজি করতে এদের গলা কাঁপে না। অথচ ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ নিয়ে গলাবাজি করতে চাইলে সবার আগে মৃত শেখ মুজিবের কৃতকর্ম চতুর্থ সংশোধনী আইনকে কাঠগড়ায় তুলতে হবে। আদালতের অনেক ক্ষমতা, সুয়োমোটো অর্থাৎ স্বউদ্যোগী মামলা আজকাল বেশ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ প্রেমীদের কাউকে কোন মামলা নিয়ে আজ পর্যন্ত আদালতে হাজির হতে দেখা যায় নাই।

    ঘটনা হল, ওপরের আলোচনায় আমরা দেখলাম বেসিক স্ট্রাকচার ধারণাকে তুলে আছাড় দিয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করেছিলেন শেখ মুজিব। প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের সংজ্ঞাই যদি ধরি যে ‘মূল কাঠামো হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক চরিত্র, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ইত্যাদি’, তাহলে বেসিক স্ট্রাকচারের মৃত্যু ঘটেছে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাকশাল চতুর্থ সংশোধনী পাশ হবার দিনে। কিন্তু তিনি বা আওয়ামী ড্রয়িং রুমগুলোর ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ প্রেমীরা এটা দেখতে অক্ষম। যদি চিন্তার সততা আঁকড়ে ধরতে পারতেন তবে এঁরা বেসিক স্ট্রাকচারের মৃত্যু স্পট হিসাবে চতুর্থ সংশোধনীকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হতেন। এটা ঠিক যে জিয়ার পঞ্চম সংশোধনীকে কনষ্টিটিউশনের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ মনে করা অসম্ভব। সামরিক আইনকেও কনষ্টিটিউশনের উপরে জায়গা দেয়া অসম্ভব। কিন্তু সেজন্য আমরা মিথ্যাভাষণে বাকশাল চতুর্থ সংশোধনীতে বেসিক স্ট্রাকচারের মৃত্যু ঘটানোর দায় জিয়া ও পঞ্চম সংশোধনীর উপর চাপাতে পারি না। খাড়াভাবে বললে এটা বিশুদ্ধ দলবাজি এবং আকাশ বাতাস কাপিয়ে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করে বিভ্রান্তি ছড়ানো। আমরা যদি আসলেই বেসিক স্ট্রাকচার প্রেমী হতে চাই তবে শেখ মুজিব বা জিয়ার নামে এসব দলবাজির চোখ সবার আগে ত্যাগ করতে হবে। এরপর বাকশাল চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে যে বেসিক স্ট্রাকচারের ভেঙ্গে পড়েছে সেদিকে সাহসের সাথে নজর করতে হবে। আমরা অনেকে জেনুইন কারণে শেখ মুজিবের প্রতি শ্রদ্ধা রাখি। এর মানে এই না যে এজন্য সৎ চিন্তা করা অথবা চিন্তার সততা ত্যাগ করতে হবে। এদুটোকে আমরা পরস্পর বিরুদ্ধ ভাবনা বানাতে পারিনা। কারণ শেষ বিচারে বাংলাদেশকে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যদি আমরা আমাদের কর্তব্য জ্ঞান করে থাকি।

    ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ আয়ু ফুরিয়ে মৃত হবার ঘটনাটা বাংলাদেশের ভাগ্যে ঘটে গিয়েছিল শেখ মুজিবের খোলনলচে বদলানো  ‘বেসিক স্ট্রাকচারে’ হাত দেবার কারণে। এছাড়াও তা হতে পারে রাষ্ট্র্র নিজ অক্ষমতাগুণে অকেজো হয়ে ভেঙ্গে পড়লে অথবা নতুন কোন বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলে। সেই বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখল গণবিচ্ছিন্ন সামরিক ক্যু হতে পারে, আবার জনগণকে সাথে নিয়ে বিপ্লবও হতে পারে। যাই হোক, সব অর্থেই ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ বদলে ফেলার একটাই মানে যে রাষ্ট্র্র ভেঙ্গে গেছে; একটা উলটপালট ঘটে গেছে। ফলে স্বভাবতই এর কনস্টিটিউশনও শুধু মৃত নয় এর জানাজা-দাফনও ঘটে গেছে। এরপর যেটা দেখার বাকি থাকে তা হল, যে ইন্টারিয়াম বা অন্তর্বর্তীকালীন ধরনের কাজ চালানোর মত ক্ষমতা। মানে এই বদলে দেয়ার মধ্য দিয়ে কোন নতুন গণক্ষমতা সংগঠিত হয়ে সেই ক্ষমতার জোরে রাষ্ট্র্রকে নতুন করে তৈরি করা। জনগোষ্ঠী নিজেকে পুনর্গঠন করে নিতে পারে কি না সেই সম্ভাবনা দেখা। কিন্তু ঘটনা হল, বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী আজও তা পারে নাই।

    সে যাই হোক ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ বলতে যদি খোদ রাষ্ট্র্র বা কনস্টিটিউশনের প্রাণবায়ু বোঝানো হয় তাহলে এই অর্থে আইন প্রণয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংসদ কেবল ‘বেসিক স্ট্রাকচার ব্যতীত অন্য সকল বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতাপ্রাপ্ত’ একথার কোন মানে আছে কি? আইন প্রণয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংসদই কী ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনী পাশ করে ‘বেসিক স্ট্রাকচার” এর দফা রফা করে দেয়নি? তাহলে ১৯৭৫ সালে জাতীয় সংসদে গৃহীত চতুর্থ সংশোধনীকে কী আদালতের সবার আগে অবৈধ ও বাতিল বলে ঘোষণা করা উচিত না?  কিন্তু আমার মাথার ভেতরে আছে শেখ মুজিব ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ ভেঙ্গে দিলে জায়েয কিন্তু জিয়া অবৈধ ক্ষমতার ভিত্তিতে তা জোড়া দেবার চেষ্টা করলে তা নাজায়েয। অথবা কেবল জিয়ার পঞ্চম সংশোধনীকে নাজায়েজ বলার সুবিধা নেবার জন্য মিথ্য দলবাজি চিন্তায় ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ বলে গলা ফাটানো। এটা কখনও সৎ চিন্তা হতে পারে না। এতে সমস্যাটা শুধু সিন্সিয়ারিটি অর্থে সৎ অসৎ এর ব্যাপার হয়েই শেষ হয় না। আগেই আয়ু ফুরানো মৃত এই রাষ্ট্র্র বা কনস্টিটিউশন এই দলবাজিতে জিন্দা হয়ে যায় না এবং যাবেও না। সীমাহীন দলবাজিতে বরং রাষ্ট্র্র বা কনস্টিটিউশন অকেজো হয়ে পড়ে থাকে। গণপ্রজাতন্ত্রী হবার সকল সম্ভাবনা শুন্যে মিলিয়ে যায় আমরা তাই হতে দেখছি।

    ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ প্রেমীরা এই দলবাজিতে সর্টকার্ট মারতে ঘরের দিকে মুখ লুকিয়ে বাইরের শত্রু, ষড়যন্ত্র তালাশ করে বেড়ায়। এই ‘বেসিক স্ট্রকাচারের’ ইনসিন্সিয়ার বয়ান এদেরকে এমনই অন্ধ করে রেখেছে যে, জিয়া এবং পঞ্চম সংশোধনী হল তাদের সব দুঃখের কারণ এই ধারণা তাঁরা মনে প্রাণে গেঁথে নিয়েছে।

    পঞ্চম সংশোধনীকে অবশ্যই আমাদের পর্যালোচনা-বিচারের অন্তর্গত করতে হবে। কিন্তু সেজন্য সযত্নে আইনি বিচারের দিক থেকে চতুর্থ সংশোধনী আইন অথবা রাজনৈতিক পর্যালোচনার দিক থেকে বাকশালকে ইচ্ছা করে বাদ রাখতে হবে? এটা হতে পারে না। সোজা বাংলায় বললে এটা নিজের চিন্তার সাথে শঠতা। কেউ সক্ষম, শক্তিশালী চিন্তার সাহস অর্জন করতে চাইলে এর প্রথম শর্ত হল চিন্তাকে স্বাধীন রাখতে হবে। ওমুক জিনিসটাকে চিন্তার পর্যালোচনার বিষয় করা যাবে না। মন সেদিকে যেতে চাইলেও ওকে শিকল পরাতে হবে। এমন কোন জুয়াচুরি চলবে না। ১৯৭২ এর কনস্টিটিউশন, শেখ মুজিবের শাসন ইত্যাদিকে কারও ‘স্বর্ণযুগ’ মনে হতেই পারে।  কিন্তু পরক্ষণেই ওই ‘স্বর্ণযুগ’ ভাবনাকেও খুঁটিয়ে পুনর্বিচার পর্যালোচনার আওতায় আনতে পারতে হবে। জানা সত্যকেও বারবার পুনর্বিচার পর্যালোচনার আওতায় আনতে হবে, সজীব করে নিতে হবে। চিন্তা যা চিন্তা করতে চায় ওকে করতে দিতে হবে, কোন লাগাম পরানো চলবে না, তবেই একমাত্র চিন্তার স্বাধীনতা রক্ষা করা সম্ভব। সাহসী চিন্তা হওয়া সম্ভব।

    সম্ভব না হয় বুঝা গেল, কিন্তু কেন সাহসী চিন্তার দরকার? কারণ এটা বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য দরকার, আমাদের জনগোষ্ঠীগত স্বার্থের জন্য দরকার। এটা সংকীর্ণ আওয়ামী লীগ বা বিএনপির ব্যাপার একেবারেই না। কি করলে এটা আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপির সুবিধা হবে এটা কেবল তাদের দলবাজির লড়াই হয়ে থাকতে পারে না। ঘটনা হল, আমাদের রাষ্ট্র্র, কনস্টিটিউশন ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নাই। ফলে নতুন আমরা কি করতে পারি, সে ভাবনা চিন্তার ঝড় তুলে জনগোষ্ঠীগত স্বার্থে আমরা যদি আবার সংগঠিত হতে পারি, নিজেদের রাষ্ট্র নতুন করে গঠন বা কনস্টিটিউট করতে পারি সেই দিকেই আমাদের মনোযোগ ধাবিত হওয়া দরকার। যেন একটা জনগোষ্ঠীর সব অংশের প্রতিনিধিত্বমূলক কনস্টিটিউশন পেতে পারি সে লক্ষ্যেই কাজ করাটাই আমাদের একমাত্র প্রকল্প হয়ে ওঠা উচিত। মিশন এক্স যদি ইতিবাচক ভূমিকা নিতে চায় তবে এটাই হতে হবে তার প্রকল্প। এই বিচারের প্রেক্ষিতে পুরনো বেসিক স্ট্রাকচার ভেঙ্গেছে চতুর্থ সংশোধনী আইন, না পঞ্চম সংশোধনী আইন — এটাও অপ্রয়োজনীয় তর্ক। কারণ বাস্তবতা হল এটা ভেঙ্গে গেছে। সামনের দিকে তাকিয়ে কিছু করতে পারি কি না, আবার গড়তে পারি কি না এটাই মুখ্য প্রশ্ন। কি কারণে ভেঙ্গেছে সেটা যারা আগামী দিনের ইতিহাসবিদ তাঁদের গবেষণার কাজ হয়েই থাকুক। একটাকে আড়াল করতে অপরটাকে দোষারোপ করা দলবাজি হিশাবে হাজির হতে বাধ্য। আমাদেরকে চোখ খোলা রেখে চিন্তা স্বাধীন রেখে সামনের দিকে তাকাতে পারতে হবে, তবেই কোন ইতিবাচক প্রকল্প সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবে তৈরি হতে পারে। এজন্যই চিন্তায় সাহসী ও র‌্যাডিক্যাল হওয়া দরকার। দলবাজিতে আমাদের কোন ভবিষ্যত নাই, দেখাই যাচ্ছে।

    ‘বেসিক স্ট্রাকচার’-এর বয়ানধারীদের কেউই এখনও চিন্তায় সে সাহসের অধিকারী নয়। এজন্য চতুর্থ সংশোধনীতে ‘বেসিক স্ট্রাকচার’-কে পঞ্চম সংশোধনীর আগেই তুলে আছাড় মারা হয়েছে সেদিকে বিচার করবার বা পর্যালোচনার চোখ ফেলতে এরা রাজি না। ‘বেসিক স্ট্রাকচারের’ ধারণাটাকে যখন পঞ্চম সংশোধনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়, কাজে লাগে এরা তখনই কেবলমাত্র ‘বেসিক স্ট্রাকচারবাদী’। এতেই এই ‘বেসিক স্ট্রাকচারবাদীরা’ যে আসলেই বৈচারিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে অসৎ সেটা ধরা পড়ে।

    তবুও নিজেদের পর্যালোচনার জন্য প্রশ্নটা তোলা দরকার যে, শেখ মুজিব তো ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্র্র ও কনস্টিটিউশন আছাড় মেরে ভেঙ্গে তছনছ করে দিয়ে চলে গেলেন, যেন নিজে মরে বাঁচলেন, কিন্তু এরপর জীবিত আমাদের কি হল? ‘বেসিক স্ট্রাকচার’-এর আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়ে আদালত যে আবার কেবল পঞ্চম সংশোধনী নিয়ে ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ প্রসঙ্গে আমাদের বিরাট জ্ঞানের কথা শুনাতে বসল সেই জুডিশিয়াল রিভিউ’র ক্ষমতা ও রিট শুনার ও প্রতিকার আদেশ জারির ক্ষমতা কিভাবে কি করে ফিরে পেল? ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারির পর কবে থেকে কিভাবে সুপ্রিমকোর্ট রিট আবেদন শুনা শুরু করল? কি করে আদালত ক্ষমতা ফিরে পেল? এর হদিস করতে আমাদেরকে এখন এক নরকের পাঁক আবর্জনা ঘাঁটতে হবে। খুনী মোস্তাকের সামরিক ফরমান, খোদ প্রধান বিচারপতি সায়েমের নিজেকে স্বঘোষিত রাষ্ট্র্রপতি দাবি করা ক্ষমতার সামরিক আইন আর সেই ধারায় জিয়াউর রহমানের সামরিক আইনের ক্ষমতাবলে মৃত কনস্টিটিউশনের ‘বেসিক স্ট্রাকচার’-এর আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরে এসেছে। আসলেই কি এসেছে না আর আসতে পারে? তা আমরা একটু পরে দেখব। যা বলছিলাম, এককথায় তারা শেখ মুজিবের অমোচনীয় চতুর্থ সংশোধনীর পাপ ধুয়ে মুছার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তারা প্রত্যেকে ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ হওয়ারই কথা। সেই সাথে তাদের নিজেদের পাপ ধোয়ার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। এরই সাক্ষাত সারাংশ হল পঞ্চম সংশোধনী ১৯৭৯; এই সংশোধনী পাশের পরই জিয়াউর রহমান দাবি করেছিলেন এখন থেকে কনস্টিটিউশন আবার জিন্দা। ফলে আদালত সেটা মেনে নিয়ে তার জুডিশিয়াল রিভিউ’র কনস্টিটিউশনাল ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে ধরে নিয়ে এখন ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ প্রসঙ্গে বিরাট জ্ঞানের কথা আমাদের শুনতে হচ্ছে। এটাই হল, তামাশা।

    হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগ এখন যে কোন রিট আমলে নেবার ক্ষমতা পেয়েছে বলে মনে করে পঞ্চম সংশোধনী আইন নিয়েও সে বিচারে বসেছে। আদালতের এই ক্ষমতার ভিত্তি, এখতিয়ার কি? ভিত্তি হল কনস্টিটিউশনের পঞ্চম সংশোধনী। আমার কথা শুনে কেউ আঁতকে উঠতে পারেন কিন্তু ঘটনাটা তাই। আমি নিজের বরাতে একথা বলছি না। বলছি, আপিল বিভাগের রায়ের বরাতে।

    পাঠককে সাথে নিয়ে এখন আমরা আপিল বিভাগের রায় দেখব। এর আগে আমরা জেনেছিলাম চতুর্থ সংশোধনীতে ১০২ অনুচ্ছেদের কারণে আদালতের রিট শুনার ও আমলে নেবার ক্ষমতা ‘নাই’ হয়ে গিয়েছিল, অন্যদিকে কনস্টিটিউশনের ৪৪ অনুচ্ছেদ সংশোধিত না, একেবারে পুরা বাতিল (omitted) করার কারণে সংক্ষুব্ধ নাগরিকের মৌলিক অধিকার বলে আদালতের কাছে প্রতিকার চেয়ে রিট করারও ক্ষমতা নাই হয়ে গিয়েছিল। এই ছিল সর্বশেষ অবস্থা। এরপর পঞ্চম সংশোধনী আইন ১৯৭৯ আদালতকে ১০২ অনুচ্ছেদ আর নাগরিককে ৪৪ অনুচ্ছেদ ফিরিয়ে দিচ্ছে বলে দাবি করেছিল। সেই ক্ষমতায় ক্ষমতাধারী হয়ে মুন সিনেমা হল মামলার রায়ে (জনপ্রিয় অর্থে পঞ্চম সংশোধনী মামলা) আপিল বিভাগের ১৮৪ পৃষ্ঠার মূল রায়ের সারাংশ করা হয়েছে ১৮৩ পৃষ্ঠায়, সেখানেও যাব।

    3. (iii), 3. (iv) এবং 3. (v) এ বলা হচ্ছে:

    3. In respect of condonation made by the High Court Division, the following modification is made and condonations are made as under:

    (iii)  the  Second Proclamation (Seventh Amendment) Order,

    1976(Second Proclamation Order No. IV of 1976) and the Second Proclamation (Tenth Amendment) Order, 1977(Second Proclamation Order No. 1 of 1977) so far it relates to amendment of English text of Article 44 of the Constitution;

    (iv) the Second Proclamation (Fifteenth Amendment) Order, 1978 (Second Proclamation Order No.IV of 1978) so far it relates to substituting Bengali text  of Article 44;

    (v) The Second Proclamation (Tenth Amendment) Order, 1977(Second Proclamation Order No. 1 of 1977) so far it relates to inserting Clauses (2), (3), (4), (5), (6) and (7) of Article 96 i.e.

    provisions relating to Supreme Judicial Council and also clause (1) of Article 102 of the Constitution, and …

    সোজা বাংলায় এর অর্থটা এরকম: ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে ক্ষমতা নেয়া প্রেসিডেন্ট সায়েম ও ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ সালের ক্ষমতা নেয়া প্রেসিডেন্ট জিয়া তাদের ১৯৭৬-৭৮ এই সময়কালে সামরিক অধ্যাদেশ — এই ক্ষমতার বরাতে ৪৪ অনুচ্ছেদ ও ১০২ অনুচ্ছেদ ফিরে এসেছে বলে ঘোষণা করেছিলেন। আর মুন সিনেমা হল (জনপ্রিয় অর্থে পঞ্চম সংশোধনী) মামলার রায়ে আপিল বিভাগ সায়েম ও জিয়ার এগুলো করা ঠিক হয়েছে (condoned) বলে ঘোষণা করছে। এর মানে হল সুপ্রিম কোর্ট পঞ্চম সংশোধনী আইনই যে তার ক্ষমতা এবং জুডিশিয়াল রিভিউ’-র  এখতিয়ার ফিরে পাবার কারণ সেটা স্বীকার করছে।

    এখন আরও একটু ভেতরে যাই। পঞ্চম সংশোধনী যদি সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতার ভিত্তি হয় তাহলে এখন মোস্তাক, সায়েম ও জিয়া –যাদের সাফাই এই পঞ্চম সংশোধনী–তাদের ক্ষমতার ভিত্তি কি? মোস্তাক, সায়েম ও জিয়া সবাই দাবি করেছেন তাদের মুখের কথা অর্থাৎ সামরিক আইন ফরমান। বাংলাদেশের কনস্টিটিউশনের উর্ধ্বে এও ফরমানের অবস্থান। কিন্তু কনস্টিটিউশনের ৭ অনুচ্ছেদ বলছে কনস্টিটিউশন সব কিছুর ওপরে সুপ্রীম বা সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, একমাত্র এর অধীনেই আইনের শাসন ঘটতে পারে। অতএব মোস্তাক, সায়েম ও জিয়ার  ক্ষমতার ভিত্তি কনস্টিটিউশন-বহির্ভূত। এই বিষয়টা নিয়ে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে শুনানির সময় মেলা তর্কবিতর্কে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

    অতএব এই যুক্তিতে সুপ্রিম কোর্টের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বৈচারিক ক্ষমতা ফিরে পাওয়া ও জুডিশিয়াল রিভিউ’র এখতিয়ার পুনরায় অর্জনও কনস্টিটিউশন বহির্ভূত ও ভিত্তিহীন। মূল কারণ হল, যে তাকে বৈচারিক ক্ষমতা ফিরিয়ে দিচ্ছে এবং জুদিশিয়াল রিভিউর এখতিয়ার পুর্নবহাল করছে তার নিজের ক্ষমতাই অবৈধ। তাহলে সারকথায় সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা ফিরে পাবার ভিত্তি হল এক সামরিক আইন।

    আসলে অবৈধ এক চক্রের আবর্তে পড়ে গেছি আমরা সবাই। মশকরাটা হল, সুপ্রিম কোর্টের নিজের ক্ষমতার উৎস ঠিক নাই, বৈধতা ঠিক নাই অথচ সে অন্যের বৈধতা নিয়ে বিচারে বসেছে, রায় দিচ্ছে। অথচ যেখান থেকে সুপ্রিম কোর্ট নিজের ক্ষমতা হারিয়েছিল সেই চতুর্থ সংশোধনীকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিমকোর্টের বলবার মুরোদ হয় নাই, আজ পর্যন্ত বলতে পারে নাই যে ওই চতুর্থ সংশোধনী অবৈধ; এবং কনস্টিটিউশন লঙ্ঘনের জন্য শেখ মুজিবকে শাস্তি দেয়া হল, ইত্যাদি। বরং আজও চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে প্রশ্ন না তুলে সুপ্রিম কোর্টের নিজের ক্ষমতা ও এখতিয়ারের ভিত্তি খুঁজছে condonation এর মধ্যে; মানে, মুখ লুকাচ্ছে মোস্তাক, সায়েম জিয়ার সামরিক আইনের শাসনের সারাৎসার পঞ্চম সংশোধনী আইনের মধ্যে; বেছে বেছে যেসব কাজকে ঠিক আছে বলে রায় দিচ্ছে সেখানে। আর উল্টা দিকে কপট ভাব ধরে বলছে সামরিক আইনকে কিন্তু আমরা অনুমোদন দেই নাই। ‘While dismissing the leave petitions we are putting on record our total disapproval of Martial Law…….’ একদিকে নিজে স্বীকার করছে সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ার ও ক্ষমতার ফিরে পাবার নতুন ভিত্তি হচ্ছে এক সামরিক আইন। অন্যদিকে আবার সামরিক আইনকেই সে অবৈধ বলছে। সত্যিই বড় বিচিত্র এই বিচার!

    সুপ্রিম কোর্ট এর জুডিশিয়াল রিভিউ’র এখতিয়ার, ক্ষমতার ভিত্তি যে সামরিক আইন এটা তার অজানা নাই। একে ঢেকে রাখতে আপিল বিভাগ ওই একই রায়ের শেষে একটা জোড়াতালি দিয়ে বলছে: (f) all acts and legislative measures which are in accordance with, or could have been made under the original Constitution. অর্থাৎ মূল কনস্টিটিউশনের অধীনে এরকম আইন একটা হতেই পারত তাই condonation-এর মধ্যেই মুখ লুকিয়ে রাখতে হবে। এতে এই কথাটাই স্বীকার করছে যে, মূল কনস্টিটিউশন অনুযায়ী এই আইন হয় নাই। এখানে সুপ্রিম কোর্ট একটা ভাব ধরেছে যেন মোস্তাক, সায়েম ও জিয়ার  ক্ষমতা বা সেই অর্থে ওদের সামরিক আইন ঘটিত পঞ্চম সংশোধনী কি কি অংশ সে (condonation) মাফ করে- ঠিক আছে বলে রায় দিল। অথচ আসলে সুপ্রিম কোর্ট নিজেই নিজের ক্ষমতার ভিত্তি, এখতিয়ারের অবৈধতাকে এখন বৈধ বলে ঘোষণা করে নিল।

    অথচ ব্যাপারটা হল, মোস্তাক, সায়েম ও জিয়ার  ক্ষমতা বা সেই অর্থে তাদের সামরিক আইন ঘটিত পঞ্চম সংশোধনী সুপ্রিমকোর্টের জুডিশিয়াল ক্ষমতা ফেরৎ দিল কি দিল না তাতে কিছুই আসে যায় না। কারণ এরা নিজেই অবৈধ। এদের কাছে সুপ্রিমকোর্টের জুডিশিয়াল ক্ষমতার বৈধতা ভিক্ষা করলে সে আর সুপ্রিমকোর্ট থাকে না।

    মূল বিষয় হল, সুপ্রিমকোর্টের জুডিশিয়াল ক্ষমতা সবসময় ছিল আছে, যতদিন কনস্টিটিউশন আছে ততদিন। কারণ ওটা কনস্টিটিউশনের জন্মের সময় দেয়া ক্ষমতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, এই ক্ষমতা কেউ রদ করে দিতে পারে এমন আইনি কনস্টিটিউশনাল ক্ষমতা কনস্টিটিউশন কাউকে দেয় নাই। ফলে শেখ মুজিব চতুর্থ সংশোধনী আইন দিয়ে সে ক্ষমতা রদ করার যে দাবি করেছেন সেটাই অবৈধ। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট নিজেই এখনও চতুর্থ সংশোধনী আইনকে অবৈধ বলার কাজটা করে নাই, করতে পারে নাই। এটাই হোল এই প্রহসনের মূল দিক।

    বাস্তবে যতদিন খোদ চতুর্থ সংশোধনীকে সুপ্রিম কোর্ট চ্যালেঞ্জ না করে বরং condoned বলে মেনে নেবে ততদিন তার জুডিশিয়াল ক্ষমতার ভিত্তি, এখতিয়ার সবসময় অবৈধই থেকে যাবে।

    কিন্তু মিশন এক্সের দলবাজি প্রকল্পের কারণে, সেকাজে না গিয়ে সে পঞ্চম সংশোধনীর ওপর কামান দাগাচ্ছে। অথচ পঞ্চম সংশোধনী তার জুডিশিয়াল ক্ষমতার ভিত্তি বা এখতিয়ার হারানোর কারণ না। বেচারা ভাল মানুষ সেজে ক্ষমতা ফেরত দিতে এসেছিল। কিন্তু তার আদি পাপ হল তার নিজেরই বৈধতার ঠিক নাই।

    জিয়ার ক্ষমতার আদি পাপ হল, ক্ষমতা সে বটে সন্দেহ নাই কিন্তু বাংলাদেশের উপস্থিত কনস্টিটিউশনের চোখে ওটা সবসময় সব অর্থেই অবৈধ। কোন ক্ষমতা দখলই পুরনো কনস্টিটিউশনকে নিজ ক্ষমতার অধীনস্থ বলে ফরমান জারি করে চলতে পারে না। শব্দের সমস্যাটাই খেয়াল করুন। ‘ফরমান’ বলতে হচ্ছে কেন? কারণ এমন এক শব্দ ব্যবহার করতে হবে যেটা পুরনো কনস্টিটিউশনে নাই। আমাদের কনস্টিটিউশন অনুযায়ী জাতীয় সংসদেই একমাত্র আইন প্রণীত ও গৃহীত হতে পারে; পরে  রাষ্ট্র্রপতি সেটাকে রাষ্ট্রের আইন হিশাবে ঘোষণা দেন। আইন জারি ও বলবৎ হয়ে যায়। অথবা সংসদ অবকাশে থাকলে প্রেসিডেন্টের ‘অধ্যাদেশ’ বলে আইন যদিও হয় তবে তাও আবার পরে সংসদ বসলে সেখানে অনুমোদনে পাশ হওয়া শর্ত আছে। এখন ‘সংসদের আইন’ বা রাষ্ট্র্রপতির ‘অধ্যাদেশ’ বলে আইন এ দুই শব্দের কোনটাই মোস্তাক, সায়েম বা জিয়ার ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। ফলে এখন এমন নতুন শব্দ আমদানি করতে হচ্ছে যা কনস্টিটিউশনে নাই।

    তবে জিয়ার আদি পাপের একটাই সমাধান হতে পারত। যখন পুরনো রাষ্ট্র্র, ও কনস্টিটিউশন ক্ষমতাবলে বাতিল করে দিয়েছে তখন নজেকে এক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলে ঘোষণা করতে পারতেন জিয়াউর রহমান। কিন্তু তাঁর সামরিক বুদ্ধি অতদূর যায়নি। এর সবচেয়ে বড় কঠিন অংশটা হল নিজেকে জনগণের ক্ষমতা হিশাবে প্রমাণ করা ও নতুন কনস্টিটিউশন প্রণয়ন শেষে নতুন রাষ্ট্রের পত্তন ঘটানো। সে মুরোদ জিয়াউর রহমানের ছিল কিনা সেটা এখন বড়জোর একটা কূটতর্কের বিষয় হতে পারে।

    কুফল এই যে আমাদের প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের কাছ থেকে ‘বেসিক স্ট্রাকচার’-এর গল্প এখনও শুনে যেতে হচ্ছে। মিশন এক্সের ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ ধারণা, চিন্তার দৌড়ের এমনি মহিমা। ওদিকে মিশন এক্স যদি মূল জায়গা চতুর্থ সংশোধনী আইনকে চ্যালেঞ্জ করে কোর্টে যাবার হিম্মত দেখাতে পারত তবে ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ এর গল্পের একটা মানে থাকত। কিন্তু মিশন এক্সের পক্ষে এটা করা অসম্ভব। কারণ, নিজের চোখ আর চিন্তাকে দলবাজির কাছে বন্ধক রেখে ওর জন্ম হয়েছে। চতুর্থ সংশোধনী আইনকে চ্যালেঞ্জ করার রাজনৈতিক মূল্য আওয়ামী লীগকে এমন আঘাত করবে যাতে তার আবার উঠে দাঁড়ানো মুশকিল। মিশন এক্স আওয়ামী লীগকে বাঁচানোর কর্তব্য নিয়ে জন্ম হয়েছে। কোনদিন যদি মিশন এক্স এর হুঁশ ফিরে যে, আওয়ামী লীগ বাঁচল কি না এটা তার বিচার করার কর্তব্য নয়, বরং বাংলাদেশকে একটা গণপ্রজাতান্ত্রিক কাঠামো ও আইনের শাসন উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে সে ভূমিকা নিতে চায় তবেই একমাত্র মিশন এক্স নিজেকে বাঁচাতে পারবে। এটাকেই চিন্তার সাহস বলতে পারি আমরা। অন্যথায় মিশন এক্স একটা দলবাজির নাম।

    বৈশিষ্ট তিন: বেসামরিক বনাম সামরিক আইন

    মিশন এক্স এর মত আওয়ামী ড্রয়িংরুমের চিন্তাগুলার মধ্যে দৃঢ় মনে গেঁথে নেয়া একটা ধারণা হল, যত দোষেরই হোক শেখ মুজিবের শাসন ছিল সিভিল, ফলে ওটা জায়েজ। সামরিক আইন এটা একেবারেই না জায়েজ শুধু না, সব নষ্টের গোড়া। বাংলাদেশের দুঃখের কারণ। স্বর্ণযুগ ৭২ সালের কনস্টিটিউশন আর টিকে থাকে নাই ক্যান্টনমেন্টের কারণে। শেখ মুজিবের বাকশাল চতুর্থ সংশোধনী খারাপ কিছু ছিল হয়ত কিন্তু সেটা ছিল সংসদের আইন, সিভিল ব্যাপার স্যাপার, ফলে তা তুলনায় সামরিক শাসনের চেয়ে সরেস। ইত্যাদি। এই প্রপাগান্ডা এতই প্রবল যে আমাদের অনেকের মনে তা একটা জায়গা করতে পেরেছে।

    এই বিষয়টা নিয়ে নতুন করে কথা লম্বা করব না। কারণ ওপরের আলোচনায় এতক্ষণ আমরা দেখেছি বেসামরিক চতুর্থ সংশোধনী আইন কিভাবে খোদ কনস্টিটিউশনকেই নাই করে দিয়েছিল। প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের প্রিয় ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ আছাড় খেয়ে চুরমার হয়ে আছে। শেখ মুজিব সামরিক শাসক না কিন্তু সেকারণে আমাদের কনস্টিটিউশন, রাষ্ট্র্র আছাড় খেয়ে ভেঙ্গে চুরমার হওয়া থেকে বাঁচতে পারে নাই। এখনও বেসামরিক শেখ মুজিব ও তাঁর সংসদের কারণেই সুপ্রিমকোর্ট সহ আমরা সবাই এক অবৈধতার চক্রে আটকে আছি। ফলে আমাদের রাষ্ট্র্র, কনস্টিটিউশন ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ ধ্বংস করে ফেলার জন্য সামরিক না বেসামরিক শাসনের অধীনে ঘটেছে। তাতে কোন ফারাক পড়ে নাই, ধ্বংস যা হবার তা হয়েছে। তবু একটা তফাত টেনে বড় জোর এভাবে বলা যায়, শেখ মুজিব নিজে বাংলাদেশে  কনস্টিটিউশন এবং কনস্টিটিউশনাল শাসনের সমাপ্তি টেনে দিয়েছিলেন আর জিয়া সে আবর্জনা নিজের স্বার্থে সাফ করতে চাইলেও নিজের ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করতে না পেরে সে পাঁকচক্র আরও কতক বাড়িয়ে দিয়েছে।

    সারকথা হল, কনস্টিটিউশন এবং কনস্টিটিউশনাল শাসনের বা আমাদের খোদ রাষ্ট্র্রটাই কোন সামরিক ক্ষমতার কবলে পড়ে মারা গিয়েছে বেসামরিকদের হাতে মরে নাই –এই ভাবনা একেবারেই ভিত্তিহীন। একমাত্র এখনকার দলবাজির প্রচারণাতেই এমন দাবি টিকে আছে।

    এই দলবাজি চিন্তার এতই প্রাবল্য যে খোদ সুপ্রিম কোর্ট পঞ্চম সংশোধনী মামলাটাকে ভেবেছে এটা সামরিক আর বেসামরিক শাসনের মামলা। এবং তা ধরে নিয়েই বিচারে বসেছে। পাতার পর পাতা জুড়ে তাই পাকিস্তানের সামরিক শাসনের রেফারেন্স টেনেছে। অথচ সুপ্রিম কোর্টের খেয়ালই নাই যে, নিজের কনস্টিটিউশনাল ক্ষমতা জুডিশিয়াল ক্ষমতার ভিত্তি ও এখতিয়ার সে ফিরে পেয়েছে সামরিক ফরমানের মাধ্যমে। যেটার জোরে সে করে খাচ্ছে তা হারিয়েছে বেসামরিক শেখ মুজিব ও তাঁর বেসামরিক সংসদের হাতে।

    আওয়ামী ড্রয়িংরুম কেন্দ্রিক ‘মিশন এক্স’ ধরনের চিন্তার বৈশিষ্ট্যসূচক দিকগুলো নিয়ে আলোচনার এখানেই ইতি টানছি। এখন পরিণতিতে ইতিমধ্যে এর প্রকল্প কোথায় গিয়ে ঠেকেছে সেবিষয়ে কিছু কথা বলে শেষ করব।

    মিশন এক্স এর পরিণতি ও আশ্রয়স্থল কোথায়?

    আগে মিশন এক্স এর তৎপরতা ও কাজের পছন্দসই ধরন সম্পর্কে বলেছিলাম, তারা আদালতের করিডোরে বিচারিক প্রভাব বিস্তার করে রাজনীতির করণীয় কাজ করতে পছন্দ করে।  এর মানে মিশন এক্স এর প্রকল্প অনুযায়ী নিজেদের চিন্তার ক্ষমতা দেখিয়ে যে রাজনৈতিক লড়াই সেটা রাজনৈতিকভাবে সামাজিক সচেতনতার ঝড় তোলা লড়াই নয়। এটা বরং উল্টা আদালতে প্রভাব খাটিয়ে যতদূর সম্ভব রাজনৈতিক সচেতনতার আন্দোলন এড়িয়ে চলা। প্রতিপক্ষের চিন্তার সাথে সে লড়ে নিজের দলবাজি চিন্তার পক্ষে কোনমতে আদালতের একটা রায় জোগাড় করে। এটা বেশি করে ধরা পড়েছে মুন সিনেমা হল (জনপ্রিয় অর্থে পঞ্চম সংশোধনী) মামলায় হাইকোর্টের রায়ের পর মামলাটা নিয়ে আপিল কোর্টের ভূমিকায়। সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি অনুমোদন করে নাই। বরং আপিলের অনুমতি দেয়া হবে কি না এ নিয়ে এক সংক্ষিপ্ত শুনানি শেষে সব খামোশ করে দেয়া হয়। জানিয়ে দেয়া হয় আপিলের অনুমতি নাকচ, তবে আপিল আদালত (আপিল বিভাগ) কিছু পর্যবেক্ষণ জানাবেন। আপিল আদালতের পর্যবেক্ষণ রায় (এটাকে পর্যবেক্ষণ রায় লিখতে অস্বস্তি হচ্ছে) হাইকোর্টের রায়ের ভেতর থেকে পিক এন্ড চুজ এর এক বাছাই পর্ব মাত্র, স্বভাবতই এক অসামঞ্জস্যপূর্ণ জগাখিচুড়ি, যা আমরা এর আগের আলোচনায় দেখেছি। পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ে সুপ্রিমকোর্ট তার জুডিশিয়াল ক্ষমতার ভিত্তি, ও এখতিয়ার ফিরে পেতে শেষাবধি সামরিক আইনকেই বেছে নিয়েছে। এতে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, আপিল আদালত যদি পিক এন্ড চুজ এর এক বাছাই পর্বই করলেন তবে তারই বা ভিত্তি কি? আপিল করার অনুমতি তো আপিল কোর্ট নাকচ করছে। তাতে হাইকোর্টের রায়কে পুনরায় পূর্ণাঙ্গ বাদী-বিবাদীর বক্তব্যের আলোকে পুনর্বিচার করে দেখার অনুমতি তো আপিল বিভাগ কাউকেই দেয় নাই। ফলে আদালতের নিজেরও তা না পাওয়ারই কথা। অর্থাৎ বাদী-বিবাদী কাউকেই হাইকোর্টের রায় পুনর্বিচারের লক্ষ্যে কথা বলতে দেয়া হয় নাই, সেখানে যুক্তিতর্ক চলেছে আমাদের রাষ্ট্র্র ও কনস্টিটিউশন সংক্রান্ত ওই গুরুত্বপূর্ণ মামলার পুনর্বিচারের মেরিট আছে কি না তা নিয়ে। মামলার পুনর্বিচারে যদি আদালত যেত তবে বাদী-বিবাদী উভয়ে নতুন করে যেসব যুক্তিতর্ক সাজাতো সেই পুর্ণাঙ্গ বক্তব্য আপিল-আদালতের কাছে নাই। তাহলে আপিল-আদালতের নিজের পর্যবেক্ষণের ভিত্তি কোথায়? আপিল আদালত যদি সিদ্ধান্তে আসে হাইকোর্টের রায়ই সহি, একে আর পুনর্বিচার করে দেখার মত মনগলানো যুক্তিতর্ক বাদী বিবাদী কেউ দিতে পারে নাই তাহলে তো মামলা ডিসমিস। এরপর আবার পর্যবেক্ষণের নামে হাইকোর্টের রায় পুনর্বিচারের কোন সুযোগ আপিল কোর্টেরও নাই। আর যদি পুনর্বিচারের মত গুরুত্বপূর্ণ মেরিট থেকেই থাকে তাহলে আপিলের অনুমতি দিয়ে বাদী-বিবাদী উভয়ে নতুন করে যেসব যুক্তিতর্ক সাজাত তখন সেই পূর্ণাঙ্গ আলোচনা দিয়েই পর্যবেক্ষন সম্পন্ন হত। তা থেকেই আপিল-আদালত বিচার করার মালমসলা ও ভিত্তি যোগাড় করতে পারত।

    ওই আপিল আদালত তো আগে বলে নেয় নাই যে, আমি কিন্তু এক পর্যবেক্ষণ দিয়ে মামলা শেষ করব ফলে বাদীবিবাদী উভয়েই আমার পর্যবেক্ষণমূলক রায় কি হতে পারে সেটা মাথায় রেখে যুক্তিতর্ক সাজিয়ে কথা বলবেন। আপিলের মেরিট আছে কি না সেটা ছিল বিচার্য বিষয়।

    বিচার মানে বিচারকের মনগড়া বিবেচ্য বিষয় ঠিক করে বিচার নয়, বাদীবিবাদীর যুক্তিতর্ক পয়েন্ট এগুলোই যে মুখ্য ভিত্তি তৈরি করে সে আলোকেই ঘটনার বিচার।

    এই মামলায় হাইকোর্টের রায় হয় ২০০৫ সালে। আর রায় লিখে শেষ করে প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালে। এরপর আপিল বিভাগের প্রধান বিচারকের অবসরের ঠিক আগে আগে কোনমতে মাস খানেকের মধ্যে ছয়টা শুনানির মধ্যেই মামলা আপিল বিভাগ পার করে নেয়া হয়। অজুহাত হল, বিশেষ ওই সময়ের প্রধান বিচারক অবসর নেবেন। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় দিতে চার বছর ফেলে রাখার পরে আপিল বিভাগে এসে এই তাড়াহুড়ো নিয়ে সন্দেহ করতে হবে কেন, এটার বুঝ খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

    বাংলাদেশের কনস্টিটিউশন শুরু থেকেই জগাখিচুড়ি তালি মেরে চলেছে, চতুর্থ সংশোধনী যোগ করে সেটাকে কনস্টিটিউশন নামের অযোগ্য করে তোলা হয়েছে; এর ওপর আবার সামরিক আইনের হাতে পড়ে সেটাকে আবার জিন্দা বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যে নিজেই সামরিক আইন সে কি করে কোন কনস্টিটিউশনকে জিন্দা করবে? বাংলাদেশের এই পরিস্থিতিতে সমাজে ন্যায়বিচার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার তাগিদের দিক থেকে যদি দেখি তবে বাংলাদেশে একটা প্রতিনিধিত্বমূলক ও ইনসাফ নিশ্চিত করে এমন কনস্টিটিউশনের পক্ষে রাজনৈতিক আন্দোলন লড়াই এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই কাজটা বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের বিজয় বা সুবিধা পাইয়ে দেওয়া নয়; এমন ভাবনা সংকীর্ণ বললেও কম বলা হবে, খুদে দোকানদারের ভাবনায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড আলোচনার নীতিনির্ধারণ করার ভার দেবার মত হবে। খাস বাংলায় এটাকে আমরা দলবাজি বলি। মিশন এক্স এর চিন্তা আগাগোড়াই এই দলবাজির প্রভাব ভরপুর। জনগণ জাহান্নামে যাক, কনস্টিটিউশনে কি থাকছে না থাকছে তা নিয়ে তাদের সম্পর্কে লিপ্ত হবার যেন কিছু নাই, ওরা বেখবর আছে যেমন তেমনই থাকুক। শেখ মুজিবের চতুর্থ সংশোধনী আইন ১৯৭৫ এর সময় আমরা দেখেছি, জনগণ জেনেছে, শেখ মুজিব নাকি বাকশাল বলে একটা খারাপ কিছু করেছে। কিন্তু সেটা কি তা জনগণকে কেউ জানায় নাই। অথচ জনগণ যে খোদ তাদের রাষ্ট্র্রের কনস্টিটিউশনটাই হারিয়ে বসে আছে কেউই সেটা বলে নাই। সুপ্রিমকোর্ট তার আসল ক্ষমতা খুইয়েছে; এরপরের বিচারকরা টু শব্দও করে নাই।

    এককথায় জনগণের দিক থেকে তাদের সচেতন করা আর সচেতন প্রতিবাদ করতে সংঘটিত করা বলতে যা বুঝায় তার কিছুই করা হয় নাই। অথচ জনগণ যদি সম্যক উপলব্ধিতে সচেতন থাকত তবে তাদের সম্মিলিত প্রতিবাদই হত কনস্টিটিউশনের একমাত্র রক্ষক। মাঠে জনগণের সম্মিলিত প্রতিবাদ প্রতিরোধ যদি থাকত তবে এর সাহসই একমাত্র আদালতকে সাহসী করে বলাতে পারত যে, সুপ্রিমকোর্টের জুডিশিয়াল ক্ষমতা দুনিয়ার কেউ কেড়ে নিতে পারে না, সে ক্ষমতা কেড়ে নেবার আইন কেউই বানাতে পারে না। শেখ মুজিবের চতুর্থ সংশোধনী আইন অবৈধ ঘোষণা ও বাতিল করা হল। আমরা জানি কনস্টিটিউশনে যতই লেখা থাক যে, সুপ্রিমকোর্ট কনস্টিটিউশনের রক্ষক। তাহলে ওই লেখার তখনই অর্থ হয়, যদি সুপ্রিমকোর্টের মুরোদ দেখা যেতে পারে যদি মাঠে আসল রক্ষক জনগণ হাজির হয়ে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করতে এগিয়ে আসে। কে না জানে মাঠে কেউ নাই, একা একা কিছু বিচারক শেখ মুজিবের শাসন ও চতুর্থ সংশোধনী আইন অবৈধ ও বাতিল বলার পর জান নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন হত। হঠকারি বোকামি করে ফাঁসির কাঠে ঝুলে পড়া কোন বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না, সবার ওপরে জান বাঁচানো ফরজ।

    এজন্য কনস্টিটিউশন প্রণয়নের ঘটনা কি, তা যতদূর সম্ভব জনগণকে সচেতনভাবে জানিয়ে, একইসাথে এক গণআন্দোলনে লিপ্ত করে সমাজকে আন্দোলিত করার একপর্যায়ে কনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা করতে হয়, রাষ্ট্র্র প্রতিষ্ঠিত ও দৃশ্যমান করতে হয়। কনস্টিটিউশন লিখে কায়েম করা যায় না, কিছু উকিল মোক্তার ধরে বিভিন্ন কনস্টিটিউশনের কাটপিস জোগাড় করে জোড়া দিতে পারলেই তা কনস্টিটিউশন হয়ে যাবে না। জনগণকে সচেতনভাবে জানিয়ে, সাথে এক গণআন্দোলনে লিপ্ত করে সমাজকে আন্দোলিত করার শেষে যদি জয়লাভ করা যায় তবে কনস্টিটিউশন এমনিতে সেখানে প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়। বাকি থাকে কেবল ফর্মালিটি; একটা কাগজে লিখে ড্রাফট করে কনস্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলিতে তা পাশ করে আনা।

    এভাবে কনস্টিটিউশন কায়েমের কাজ হাতে নেয়া একেবারেই রাজনৈতিক কাজ এবং কারও সন্দেহ থাকার কারণ নাই এটা র‌্যাডিক্যাল কাজ- বিপ্লবের কাজ। ফলে তা সর্টকাট সহজ রাস্তার কাজ না। এটা সহজ না বলেই সেই কনস্টিটিউশন কারও পক্ষে  — তিনি শেখ মুজিব হলেও –এক কলমের খোঁচায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়াও সহজ নয়।

    অথচ ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ বুঝনেওয়ালা মিশন এক্স এমন একটা বড় রাজনৈতিক কাজকে বাইরের ব্যাপক জনগণ দূরে থাক আদালতের করিডোরে প্রভাব বিস্তার করে ফেলার কাজ মনে করে। তাও আবার এজলাসের গুটি কয়েক উকিল ব্যারিস্টার কেবল সেগুলো নিয়ে এক কোটারি আইনি তর্ক করুক সেটাও এরা সহ্য করতে চায় না। একে তো ভেবে বসে আছে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে দিয়ে বেসিক স্ট্রাকচার কায়েম করে ফেলবে। এর ওপর আবার সঙ্গোপনে কেমনে চতুরতার সাথে তা আপিল বিভাগ পার করে আনবে এই হল এদের কাছে কনস্টিটিউশন ও রাষ্ট্র্র কায়েম। এই ধরণের কাজ, তৎপরতা ও নিয়তটাই তো খারাপ। আওয়ামী দলবাজি কায়েম করার কাজ এটা।  মিশন এক্স এর চিন্তার মুরোদের এমনই দুর্গতি। পাঠক লক্ষ করবেন, পঞ্চম সংশোধনী আইন বাতিলের এই ঘটনায় বিএনপির ভাবনা প্রতিক্রিয়া। প্রকাশ্যেই তারা বলছেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে এসব আবার বদলে ফেলব। এর সোজাসাপ্টা মানে যে পথে মিশন এক্স তার সংকীর্ণ ভাবনা আদালতের বিষয় বানিয়েছে। আদালত কবজা করে তারা তাদের কাজ করছে, দলবাজি করে তারা তাদের কাজ করছে। ঠিক একইভাবে বিএনপিও তার দলবাজি করে জিয়াউর রহমানের মহান ভূমিকা পুনরায় প্রতিষ্ঠা করবে। আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি,  নিশ্চয়ই বাংলাদেশ রাষ্ট্র্র আওয়ামী লীগ বা বিএনপির সম্পত্তি না, হতেও পারে না। সমাজে ন্যায়বিচার, আইনের শাসন কনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা করা ঘোরতর রাজনৈতিক কাজ, চিন্তার মুরোদ দেখানোর কাজ।

    পঞ্চম সংশোধনী মামলাকে কেন্দ্র করে মিশন এক্স এর জনসমক্ষে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ আত্মপ্রকাশ হলেও এদের আরও প্রকল্প আছে। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে ইতিহাস ও তর্ক-বিতর্কের মীমাংসাকে আদালতের বিষয় বানানো, আদালতের রায় দিয়ে মুখ চেপে ধরে শহীদ মিনার প্রসঙ্গে রায় ঘোষণা ইত্যাদি থেকে শুরু করে সর্বশেষ জাতীয় সংসদে কনস্টিটিউশন সংশোধনের জন্য সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠিত হয়ে যাবার পরও একে এড়িয়ে ‘পঞ্চম সংশোধনী নিয়ে আপিল কোর্টের রায়ের সাথে সাথে আপনা আপনিই কনস্টিটিউশন সংশোধিত হয়ে গেছে কেবল পুনর্মুদ্রণ বাকি’ বলে শপথের প্রথম দিনে প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের সাংবাদিকদের স্বেচ্ছায় জানানো; সেই সাথে তৎপর সুয়োমোটো বোরখা মামলায় বিচারক এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী ও বিচারক শেখ মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ থেকে গায়ে পড়ে ‘বাংলাদেশ এখন থেকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, ‘পঞ্চম সংশোধনী বিষয়ে আপিল বিভাগের রায়ের সঙ্গে সঙ্গে ১৯৭২ এর আদি সংবিধান পুনঃস্থাপিত হয়ে গেছে’ ইত্যাদি গায়ে পড়ে মন্তব্য জুড়ে দেয়া –এসবই সেই কনসোর্টেড এফোর্ট; আইনি ভাষায় এটাকেই বলে পরস্পর যোগসাজসে ঘটানো ঘটনা, এক আইনি ক্যু; এ ক্যু কেস ইন জুরিসপ্রুডেন্স ।

    মিশন এক্স এর চিন্তা যাই হোক এখান থেকে এর কাজ করার ধরন সম্পর্কে একটা ধারণা পাচ্ছি আমরা। সেটা হল, তাদের চিন্তা নিয়ে জনগণের কাছে যাওয়া না, কোন সামাজিক রাজনৈতিক আলোচনা পর্যালোচনার ভেতর দিয়ে মিশন এক্স নিজের চিন্তার ক্ষমতার পরীক্ষা দেয়া নয়, বরং এক ‘আইনি ক্যু’ করা। দেখা যাচ্ছে এরা আর কিছু পারুক আর নাই পারুক সামরিক ক্যু থেকে দেখে তারা এটাই সহজে শিখে নিয়েছে। এতে একটা জিনিস পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে যে, মিশন এক্স এর চিন্তার ক্ষমতার মুরোদ নাই; তাই ‘আইনি ক্যু’ করে নিজেদের চিন্তার অক্ষমতা, অযোগ্যতাই প্রকাশ করেছে।

    শুধু তাই নয় নিজেদের অক্ষমতা, অযোগ্যতাকে কেউ যেন চ্যালেঞ্জ করে না বসতে পারে তাই সীমাহীন বেআইনিভাবে ‘আদালত অবমাননার’ এক ভীতিকর সামাজিক পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছে ঢাল হিশাবে। যাতে তাদের অক্ষমতা ও অযোগ্যতাকে কেউ প্রশ্ন না করতে পারে, এজন্য সবার মুখ চেপে ধরার এক ব্যবস্থা কায়েম করেছে। কেউ নিজের চিন্তার মুরোদ- নিজের সীমাহীন অযোগ্যতা ও অক্ষমতা টের পেয়ে গেলে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসাই তার একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠে। এছাড়া আর উপায় কি?

    এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ‘আদালত অবমাননা’ বিষয়ক কোন আইন না থাকা সত্ত্বেও সর্বোচ্চ কোর্ট আপিল বিভাগ একাধারে নিজেই বাদী, নিজেই বিচারক, নিজেই আদালত অবমাননার বিচার করছে। কোন আইন বলে আদালতই সেই আইন প্রণেতা হয়? জাতীয় সংসদ নয় নিজের প্রণীত আইনে কোন অপরাধের শাস্তি কি হবে বেআইনি ও মনগড়া ভাবে তার নির্ধারণ আদালত করতে পারে তার নজির আমরা বাংলাদেশে দেখেছি।

    দুনিয়ার কোন আইন-আদালতে এমন নজির বিহীন ঘটনা ঘটাতে পারে তা কল্পনারও অতীত। ‘বিচার শব্দটার মধ্যে যেসব মৌলিক ধারণা আগাম ধরে নিয়ে দুনিয়ায় চর্চা হয়ে বিচার ব্যবস্থা এ পর্যন্ত বহু দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে টিকে আছে সেই মৌলিক ধারণার গোড়ায় এরা কুঠারাঘাত করেছে। এটাই মিশন এক্স এর পরিণতি।

    রাজনীতি মানে দলবাজি তো নয়ই, এই শাস্ত্রের মানে আইনশাস্ত্র বা জুরিসপ্রুডেন্সও নয়। এটা কি আমরা বুঝতে পারব! আমাদেরকে চিন্তার মুরোদ দেখাতে পারতে হবে, আর এই মুরোদই রাজনৈতিক ক্ষমতা এনে দেবে।

    [বিঃ দ্রঃ – এই লেখাটা আমারই ২০১০ সালের ৭ নভেম্বরের একটা লেখা। একই শিরোনাম ছিল, – “পঞ্চম সংশোধনী বিতর্ক”। ছাপা হয়েছিল চিন্তা পত্রিকায়। সেই লিঙ্ক এখানে দিলাম।  আর ২০১০ সালে আমি তখনও জাতিসংঘে কর্মরত। আসলে ওয়ার অন টেররের সে আমলে আমাদের অফিশিয়াল একটা ইন্টারনাল সার্কুলার হয়েছিল যে আমরা স্টাফেরা যেন কোন রাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে না জড়াই, মতামত না রাখি। রাখলে এর পরিণতি হবে ২৪ ঘন্টার মধ্যে দেশে ফিরার টিকিট হাতে ধরিয়ে দেয়া। তাই আমি বেনামে ফিদা হাসান নাম নিয়ে লিখেছিলাম এই লেখাটা] ।  সে লেখাটাই এখানে এখন আর্কাইভ করে রাখলাম। আর আগেই বলেছি সেই প্রকাশকাল ছিল ৭ নভেম্বর ২০১০। আর এখন ২০১৩ সালে সে লেখাটা এখানে আর্কাইভ করলাম। লেখাতার ভিতরে এখন একেবারেই কোন হাত দেয়া হয় নাই; এমনকি কোন বানান ভুল থাকলেও না!]

    নিচে আগের লেখাটা ছাপা হবার পরে সেখানে ছাপা হওয়া কিন্তু পাঠক মন্তব্যঃ
    1

    A hooligan can drive out another thug from your house and eventually that hooligan start giving lessons of morality to your family members.
    Sunday 07 November 10
    haq

    2

    আপনার লেখাটির অসাধারণ একটি বিশ্লেষণাত্মক লেখা সন্দেহ নেই।ইতিহাসও জানা হয় আবার তার সাথে বর্তমানের যোগসাজটাও ধরা যায় পরিষ্কার ভাবে।তবে মতান্তরে যে কেউ লেখাটিতে অতীত নিয়ে কাঁদা ছোড়াছুড়ির গতানুগতিক প্রয়াসের গন্ধ পেতে পারে।বলতে পারে, পঞ্চম সংশোধনীকে ইম্যুনিটি দেয়ার চেষ্টায় আপনি চতুর্থ সংশোধনীর দিকে আগে আঙ্গুল উঠাচ্ছেন।আবার বুদ্ধিমান পাঠক মাত্রই এটা বুঝতে পারবে যে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান কিভাবে ঐতিহাসিক ভাবে ব্যর্থ হয়ে আসছে, যার দায় ভার বড় দুই যাত্রাদলের সঙদের ঘাড়ে সমান ভাবে বর্তায়, মূলত সমগ্র আলোচনাটাতে তারই একটি চিত্র ফুটে উঠেছে, ।আর পাঠ শেষে আসলে আমরা বাড়ি ফিরি হতাশা নিয়েই তবে শূণ্য হাতে নয়।আলোচনাটি আমাদের দেখায় সেই গতানুগতিক ব্যর্থতার চিত্র আর রাজনীতির নামে অরাজনৈতিক ডাইনামিক্স যেটি আসলে প্রতিটি স্তরেই বিদ্যমান।তবে এরকম আলোচনার দরকার আমি অস্বীকার করছিনা। আর হতাশার মধ্যেও এই লাইন গুলি আশার কথা শোনায় দিক নির্দেশনা ছাড়া্ই…… ”নতুন আমরা কি করতে পারি, সে ভাবনা চিন্তার ঝড় তুলে জনগোষ্ঠীগত স্বার্থে আমরা যদি আবার সংগঠিত হতে পারি, নিজেদের রাষ্ট্র নতুন করে গঠন বা কনস্টিটিউট করতে পারি সেই দিকেই আমাদের মনোযোগ ধাবিত হওয়া দরকার। যেন একটা জনগোষ্ঠীর সব অংশের প্রতিনিধিত্বমূলক কনস্টিটিউশন পেতে পারি সে লক্ষ্যেই কাজ করাটাই আমাদের একমাত্র প্রকল্প হয়ে ওঠা উচিত।”…

    বাঙালীর চিন্তায় রাজনৈতিক ঝড়তো সবসময়ই।যার পেটে খাদ্য নাই তাকেও ওবামার ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহী মনে হয়।কিন্তু চিন্তার ঝড়টা সমাজের যে জায়গায় হওয়া উচিত সেই সব ভরা-পেটিদের মগজে ঝড় ওঠে বলে মনে হয়না।কবে কি ভাবে আমরা একটা ”সব অংশে”র প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্র পাবো আর তার চালক প্রতিষ্ঠান গুলোকে সব অংশের জন্য নিবেদিত প্রাণ করতে পারবো জানিনা।

    আপনার লেখাটায় দুটি সাধারণ প্রশ্ন:

    – অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির ডিক্রি বলে শত্রু সম্পত্তি বা মালিকানা বিহীন সম্পত্তিকে রাষ্ট্র অধিগ্রহণ করেছিলো।মুন সিনেমার মালিকের উপস্থিতিতে এই ডিক্রি রাষ্ট্র কি করে তার উপর প্রযোজ্য করলো? এমনতো না যে মুন সিনেমার মালিকানা কে ছিলো রাষ্ট্র তা ঠাওরাতে পারেনি।মালিকের উপস্থিতিতে এই ডিক্রি কি করে তার জন্য প্রযোজ্য হলো? যতদূর জানি তিনি হিন্দু ছিলেন (আমার ভুলও হতে পারে)।এখানে ধর্ম কি কোন ফ্যাক্টর ছিলো?

    – হাই কোর্টের রায়ে নিষ্পত্তি হবার পরও শিল্প মন্ত্রণালয় কেন জিয়াকে দিয়ে এরকম একটি এ্যাক্ট জারি করিয়ে সিনেমা হলটি অধিগ্রহণ করে রাখলো? কি ছিলো সেই হলে? সোনা দানা? দেশের এতো জায়গা থাকতে মুন সিনেমা হলটির দিকে এতো নজর ছিলো কেন সরকারের? খুব সাধারন অধিগ্রহণ একে ভাবতে চিন্তায় খটকা লাগে।অভ্যন্তরের কাহিনীটি কি?

    পুরো লেখাটি অসাধারণ একটি বিশ্লেষণ। অনেক ধন্যবাদ লেখাটির জন্য।

    Wednesday 10 November 10
    estobdhota

    3

    Thanks a lot for a nice artical presented by you. Awami’s should read this artical. But they can’t tolarate anything against Mujib. Thats a great problem about Awami ignorent’s.
    Tuesday 09 October 12
    Ahsan Habib
  • আমাদের নির্বাচন ও একজন প্রতীম রঞ্জন বোস

    বাংলাদেশের নির্বাচন ও একজন প্রতীম রঞ্জন বোস
    গৌতম দাস
    ২৯ ডিসেম্বর ২০২৩  রাত ২০ঃ ২৭
    https://wp.me/p1sCvy-5ef

            Bangladesh: As elections draw close, India needs to rethink its strategies

    বাংলাদেশে নির্বাচন হচ্ছে মনে করে এনিয়ে পাড়া-পড়শি বিদেশি বিশেষ করে ভারতের ঘুম নাই। আপ্রাণ খেদমত করে চলেছে, যেভাবে পারে যেন কোনকিছুই মিস না হয়!। এর উপর আছে ভারতের মিডিয়াগুলো তারা গড়ে মনে হয় প্রতিদিন একেকটা করে মন্তব্য আর্টিকেল ছেপে চলেছে। যেসবের হিসাব রাখাও কঠিন! গত ২১ ডিসেম্বর ২০২৩ তেমনই একজন প্রতীম রঞ্জন বোস [ PRATIM RANJAN BOSE]; তিনি লিখেছেন MONEY CONTROL নামে এক পত্রিকায়। যেটা বিজনেস ইনভেস্টমেন্ট ফোকাস এক ওয়েব পত্রিকা। যাকে বাংলাদেশের খুব কম মানুষই চিনে আবার নামটা বিদঘুটে  ও একটু অপ্রচলিত বলে হয়ত বাংলাদেশে অপরিচিত তো বটেই; আমিও আগে দেখেছি কিন্তু এই প্রথম এর এত ভিতরে গিয়ে খোঁজ নিলাম। কিন্তু সেটা না, এর এই লেখক বরং নিজের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে যে তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট কলামিস্ট, রিসার্চার ও কনসালটেন্ট!  এসব কিছুর মধ্যে ভারতের প্রেক্ষিতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট শব্দটা বড় অদ্ভুত ও বেমানান। ভারতে এখন মিডিয়া ও এর লেখক বলতে বুঝায় যারা জার্ণালিজম ভুলে পেশাদার প্রপাগান্ডিস্ট যারা সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে এর ঢোল পিটানোর ওস্তাদ লোক হয়েছে! আর তাই বেশির ভাগ সময়ে দেখা যাচ্ছে যার টাকা আছে বা খোদ মোদি সরকার যে অর্থ বিলায় এরা চোখ বন্ধ করে তা খেয়ে নিয়ে এরই ঢোল পিটায়, প্রপাগান্ডা করে বেড়ায়। এটাকে সাংবাদিকতা মনে করে আবার, স্পেশালিস্ট বলে দাবিও করে।  তাতে ভারতের শেখর গুপ্তার মত সিনিয়র সম্পাদক  হলেও সবার স্বভাব এখন এক; মানে  ‘একই ওষুধ প্যারাসিটামলের’ স্বভাব বৈশিষ্ঠই সকলের! লক্ষ্য যা করেই হোক অর্থ আয় আর খেয়ে পড়ে বৌ-বাচ্চা নিয়ে টিকা থাকাই তাদের জীবন ব্রত!  মোদির পক্ষে সাফাইয়ের চিল্লা দিলে সবচেয়ে বেশী অর্থ মিলে তাই সবার লক্ষ্য এখন সেদিকে! কার উপরে কে যাবের প্রতিযোগিতা!

    তো ভারতের এমন মিডিয়া আসরে কেউ যখন লিখে দাবি করেন তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট, এটা একটা কাহিনী তো বটেই। এর অবশ্য এক নেগেটিভ মানেও হয় যে বাজারের যারা প্রপাগান্ডা-সওদা কিনবেন এমন কাউকে তিনি যোগাড় করতে পারেন নাই তাই তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট বা স্বাধীন সাজছেন হয়ত।  সেটা যাই হোক তবে আমরা সেটাও পরীক্ষা করব।

    ন্যায়-ইনসাফ  নাকি দেশপ্রেমঃ
    একটা বিতর্কে প্রবেশ করা যাক!  ন্যায়-ইনসাফ  নাকি দেশপ্রেম – সবার আগে কোনটা  মানুষের বিবেচনায় প্রধান্য হওয়া উচিত? মানুষের এদুইয়ের কোনটার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত? কোনটা বেছে নিব আমরা?  মানে, ধরা যাক কোন দেশ বা মানুষের জন্য  কোন  বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখন এক্ষেত্রে দুইটার একটা বেছে নিতে হবে – ন্যায়-ইনসাফ  নাকি দেশপ্রেম – তাহলে আমাদের কী বেছে নেয়া উচিত?  এই মারাত্মক প্রশ্নটা আগে ফয়সালা করতে হবে; খুব জরুরি এটা।

    “দেশপ্রেম” নিয়ে একটু বলে নেই। দেশপ্রেম ধারণাটা প্রবল হয়ে উঠেছিল বিশেষ করে বিশ্বযুদ্ধের (১৯৪৫) পরে যখন সারা দুনিয়া কলোনিমুক্ত হয়েছিল তখন আমাদের মত দেশের মানুষ স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র (নেশন স্টেট বা Nation State) হয়েছিল। জনগণের শাসনের ব্যবস্থা বলতে রিপাবলিক রাষ্ট্রই বুঝা হত। তবে তা নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র রূপ্টাই রিপাবলিক রাষ্ট্র মনে করা হত। অর্থাৎ কোন না কোন জাতি পরিচয়ের রাষ্ট্র ধারণা ছিল সেটা। আর বলা বাহুল্য সেটা এর বিপরীতে অধিকার-ভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা ছিল না। যাই হোক জাতিরাষ্ট্র ধারণার সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু বোধের অন্যতম হয়ে উঠেছিল এই “দেশপ্রেম” ধারণা। সে কারণে “দেশপ্রেম” ধারণাকে সর্বোচ্চ জ্ঞানের কথা  বলে জেনেছে-শিখেছে বলে মনে করাও শুরু হয়েছিল তখন। আর দেশপ্রেম-বোধ এটাকে এক উচ্চমার্গের জ্ঞানবোধ মনে করা হয়েছিল। আর এরই ফাঁদে পড়ে তারা এতদিনের ন্যায়-ইনসাফ বোধ যাকে যেকোন জ্ঞানের মুখ্য ও কেন্দ্রিয় বিষয় বলে আমাদের মত দেশের  মানুষ ভাবত যেখানে বাকি সবকিছু এর পরে সেই নীতি – এই ভুল পথে এবার তারা পুর্ব অবস্থান ত্যাগ করা শুরু করেছিল,  তুচ্ছ করে ফেলেছিল।  ফলে এদের চোখে দেশপ্রেম বড় বা প্রধান হয়ে যাওয়া থেকেই বা গণ্য হওয়াতেই ন্যায়-ইনসাফ বোধ পিছনে পরে যাওয়া শুরু হয়েছিল।  আর তারা দেশপ্রেমের চক্করে পরে নিজের বিচার-বিবেচনার উপর ভরসা না করে আবেগ বা দেশপ্রেমের আবেগ – এর ব্যবহার বা কাজে লাগানোর বাটপারীর পথেও রওনা হয়েছিল। আর তাই জাতিরাষ্ট্র মানেই হয়ে উঠেছিল হুশ হারিয়ে আবেগ-সর্বস্ব দেশপ্রেমের জয়গান গাইতে শুরু করা। অথচ যুগ যুগ ধরে একমাত্র ন্যায়-ইনসাফই সমাজকে ভিত্তি দিয়েছে, স্থিতিশীলতা দিয়ে গেছে; তা ভুলে এরা সকলে দূরে চলে যেতে লাগল। যেখানে এই কথিত দেশপ্রেমের জাতিরাষ্ট্র এমনও বলতে শুরু করল যে আমার নিজ ধর্মের অনুসারীদের পক্ষে থাকাই নাকি দেশপ্রেম! অথচ এব্যাপারে ধর্মের ভাষ্য-অবস্হানও হল ইনসাফ! দেশপ্রেম নয়।  আর ওদিকে এই আলগা বুঝের দেশপ্রেমের কারণে, তাতে দেশের সব ধরণের নাগরিক সমান অধিকার, সমাদর (সম-আদর বা ট্রিটমেন্ট) ও সমান মর্যাদার ধারণ আর জায়গা পেল না; আর এসব কথিত দেশপ্রেমিকেরা এথেকে বেখবর থেকে গেল!   অথচ ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে ও ভিত্তিতে নেয়া সিদ্ধান্ত ও এমন থাকার নীতিই কেবল একমাত্র এক দেশপ্রেমের রাষ্ট্র হতে পারে। যেখানে দেশপ্রেমকে ন্যায়-ইনসাফের অধীনে রাখতে হবে – এই হল নীতি!  যেখানে ন্যায়-ইনসাফ ছাড়া কোন কিছুকে দেশপ্রেমের ভিত্তি বলে বিবেচিত হতে পারে না।

    ঠিক যেমন, সমাজে গায়ের জোরে কোন ব্যক্তি শক্তিশালী এর ভিত্তিতে সমাজ পরিচালিত হতে পারে না আর কোনটা বা কারো কোন কাজটা সঠিক তা নির্ধারণ হতে পারে না। এভাবে সমাজ উঠে দাড়ায় না। একমাত্র ন্যায়-ইনসাফের ভিত্তিতেই সমাজ গড়ে উঠতে পেরেছিল, স্থিতিশীল হয়েছিল; এটা আমরা ভুলতে পারি না!
    আমরা শরীরের প্রবাহিত রক্ত কেমন ও কী জাতের কোন পুর্বসুরি জনজীবনের – এই অর্থে রেস [race]  এর বাংলা জাতি। এই অর্থে দুনিয়ার নানা ভুগোলে নানান মানুষ-জাতিতে আমরা অনেক রেস হয়ে দুনিয়াতে আছি। আবার  ধর্ম, সমাজ, কালচার, খাদ্যাভাস, ভাষা ভিত্তিক ইত্যাদির আরেক জাতি ধারণাও আছে যাকে এথনিক [Ethnic] জাতি বলা হয়। এটা আরেক ধরণের জাত-পরিচয়। যে অর্থে আমরা বাঙ্গালী – সেটা আসলে এক এথনিক জাতি পরিচয়। তাহলে এখন কথা হল, আমার বাঙালি জাতির লোকের পক্ষে থাকা মানেই কী সেটা আপনাতেই এক ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে থাকা হবে বা হয়ে যাবে???? কথাটা আরও সোজা করে বললে, বাঙ্গালী জাতিরাষ্ট্রে স্বার্থের পক্ষে থেকে দাঁড়িয়ে দেশপ্রেম দেখানো মানেই কী সেটা ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে থাকা হয়ে যাবে?  না, অবশ্যই না। যেকোন দেশপ্রেমের কথারও আগেই মানে, সবার আগে ন্যায়-ইনসাফের কথা বা বিবেচনাবোধ আসতেই হবে।  কিন্তু এখানে কেন দেশপ্রেমের আগেই ন্যায়-ইনসাফের কথাটা তুললাম?

    ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রতীম রঞ্জন বোস, আসলে কেঃ
    উপরের ন্যায়-ইনসাফ বনাম দেশপ্রেম তর্কটা এনেছিলাম এজন্য যে  প্রতীম নিজেকে ইন্ডিপেন্ডেন্ট মানে স্বাধীন বলে দাবি করছে। তাতে তিনি হয়ত মোদির যুগে ব্যাপকভাবে বিক্রি হয়ে যাওয়া মিডিয়া মানুষ নন তিনি – এই যুগেও হয়ত কারও দ্বারা প্রভাবিত নন বা কেউ তাকে কিনে পরিচালিত করছেন এমন না; এই অর্থ সেটা হতেও পারে। কিন্তু এই অর্থেও হয়ত প্রতীম নিজেকে স্বাধীন দাবি করছেন বললেও এই কথাটাও সঠিক না। কেন? কথাটা আরেকভাবে বলি,  এটা সত্যি যে তিনি সুবীর ভৌমিক, আবদি বা চন্দন নন্দীর মত “র”-এর প্রপাগান্ডা এসাইনমেন্ট খাটা বা নেওয়া ব্যক্তিরা যেমন হয় ঠিক সেরকম লেখক নন হয়ত, এমনই মনে হয়েছে। এই বিবেচনায় হয়ত তিনি স্বাধীন নিজের মতামত-ই লিখেছেন। কিন্তু তিনি দেশপ্রেমি নেগেটিভ অর্থে! যারা ধরে নিয়েছেন দেশপ্রেমের পক্ষে থাকা মানেই তা ন্যায়-ইনসাফ এর পক্ষে নেয়া অবস্থান।  ফলে এদের কাছে কথিত দেশপ্রেম মানেই তা জায়েজ!! এই হল প্রতীম রঞ্জনের এক গভীর ও মূল সমস্যা!

    এমনিতেই ইন্ডিয়া হিন্দুত্ব জাতবাদী এক ‘নেশন স্টেট’ হয়ে আছে জন্ম থেকেই; এর উপর আছে আবার উগ্র-হিন্দুত্ববাদী এক রাষ্ট্র ও সরকার; ফলে এর যেখানে দেশপ্রেম মানেই হিন্দুত্ববাদ ভিন্ন আর কোন ব্যাখ্যা নাই মানে,  এখানে উগ্র দেশপ্রেমের আড়ালে চলা  উগ্র হিন্দুত্ববাদের দেশ এটা – সেখানে এই লেখক প্রতীম রঞ্জন বোস তিনিও দেশপ্রেমের নামে আউড়ালে এর মানে কী দাঁড়ায় পাঠক বুঝে নেন; আর প্রতীম তার সব কাজ জায়েজ করতে এসেছেন দেশপ্রেমের কথা তুলে!!!। বলাই বাহুল্য এটা চরম বে-ইনসাফি ন্যায়ভ্রষ্ট; এই হল মারাত্মক ফারাক! কারণ, তার কথিত দেশপ্রেম যা ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থের পক্ষে থাকার দেশপ্রেম বলে আপাত মনে হয় সেটা আসলে ন্যায়-ইনসাফের তোয়াক্কা না করা এক অন্ধ বিপদজনক দেশপ্রেম। এককথায়, ভারতের স্বার্থের পক্ষে থাকা মানেই দেশপ্রেম তাতে, এতে ন্যায়-ইনসাফের লেশমাত্র না থাকলেও তা জায়েজ! এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে এলেখা লেখা হয়েছে!

    লেখা কলামের পর্যালোচনাঃ
    প্রতীমের এই লেখার শিরোনাম বাংলা করে লিখলে – “বাংলাদেশঃ এর নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে, ভারতের উচিত নিজ অনুসৃত কৌশল পুনর্বিবেচনা করা” [Bangladesh: As elections draw close, India needs to rethink its strategies]।  আমাদের মানবজমিন (২২ ডিসেম্বর ২০২৩) অবশ্য এর একটা অনুবাদ ছেপেছে, শিরোনাম – বাংলাদেশে নির্বাচন আসন্ন, ভারতকে তার কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

    শুরুতেই প্রীতম তার লেখার এক সারসংক্ষেপ নিজেই লিখেছে এভাবেঃ “
    ভারতের এই পুবের পড়শি (মানে বাংলাদেশ) একটা নিখুঁত ফ্রি-ফেয়ার নির্বাচন-ই করতে হবে এমন গোঁ ধরা ধ্যান-জ্ঞানের দেশ কখনই ছিল না। তার মানে আবার এও নয় যে এখানে নির্বাচনকে একটা ধারাবাহিক ঠাট্টা বানায় ফেলতে হবে তা নয়। তবে এটা জানা বেশ উতসাহের হবে যে ঢাকার আজকের উপস্থিত পরিস্থিতি এটা কীভাবে ভারতের স্বার্থের পক্ষে এখন যাচ্ছে ও আগামিতেও যাবে। Holding a free and fair election was never a virtue of India’s eastern neighbour. But elections had never been as consistently farcical either. It would be of keen interest to know how the prevailing scenario in Dhaka had been helping and would help the Indian cause.

    উপরে প্রীতমের শেষ বাক্যটা লক্ষ্য করা যাক। লিখেছেন, ঢাকার আজকের উপস্থিত পরিস্থিতি এটা কীভাবে ভারতের স্বার্থের পক্ষে  এখন যাচ্ছে ও আগামিতেও যাবে। কিন্তু এমন যাওয়াটা কী ঠিক? ন্যায়সঙ্গত বা ইনসাফের? না, সরি। প্রীতম এদিকে উতসাহী নন একেবারেই। বরং  প্রতীম এটা ভারতের স্বার্থের দিকেই যাচ্ছে তাতেই চরম আহ্লাদিত!!! আর এটাকে ভারতের অন্যায়ের স্বার্থমুখী করে নেয়া হয়েছে কীভাবে ও তা কারা করেছে তা নিয়েও প্রতীম মোটেই উতসাহী হয়। তার কাছে নিজ দেশপ্রেমের স্বার্থই পরম!! সবার উপরে; আর বাকি সব মিথ্যা!
    এমনকি গত ২৮ ডিসেম্বর মোদির আরেক চ্যালা শুভজ্যোতি ঘোষ, ভারত কী করে গত ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের তিন নির্বাচনে  অন্যায়ের পক্ষে থেকে বাংলাদেশকে ক্রিমিনালের মত লুটেছে তা বিবিসিতে এক লেখায় বেপরোয়াভাবে লিখেছে। দেখুন এখানে, বাংলাদেশে বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে ভারতের যে ধরনের ভূমিকা ছিল। ভারত যে  ক্রিমিনাল অপরাধীর মত লুটেছে সেটা খোদ শেখ হাসিনাও মনে করেন। তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন, তিনি ভারতকে কী না দিয়েছেন (মানে তবু তিনি প্রতিদান পাননি), এটা ভারত একদিন বুঝবে (মানে আপসোস করবে)।  কিন্তু একালে প্রতীম সেসব ঘটনাবলী-ইতিহাস নিয়ে মোটেও আগ্রহি না। তাঁর দেশপ্রেমের চোখে তিনি দেখছে – নিজ দেশ পেয়েছে, পেয়ে যাচ্ছে পেয়েও নাকি যাবে। এসবই তার কাছে সুপ্রীম – ফলে ন্যায়-ইনসাফ আবার কী!!

    প্রতীম সাফাই দিতে বলছেন, “মোট ২৯ টা দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে” (বলতে চাইছেন, সুতরাং এটা নিশ্চয় নির্বাচন হচ্ছে) আর বলছেন তৃতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টি অংশ নিচ্ছে (বলতে ইঙ্গিত দিচ্ছেন তাহলে তো আর কথাই নাই) “A total of 29 parties including League and a faction of the third-largest, Jatiya Party, will contest the election.”। কিন্তু তিনি এখানে যা লুকালেন তা হল এই কথিত তৃতীয় পার্টিকে (এরশাদের জাতীয় পার্টি) বিরোধীদল হতেই হবে সেটা সাজিয়ে দিয়ে গেছিল ২০১৩ সালে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং। আর বাংলাদেশের উপর ভারতের এই প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ এই  তথ্য বিবিসির শুভজ্যোতিও স্বীকার করেছেন। কিন্তু প্রতীম মহাশয় মনে হচ্ছে তবু তা জানতেই পারেন নাই!  আর সেঘটনার পুনরাবৃত্তি এবারও হয়েছে। এরশাদের ভাই এখনকার জাপা নেতা কাদেরও ভারত থেকে ফিরে সে ইঙ্গিত দিয়ে কথা বলেছিলেন।  আর অনেক নাটক করে শেষে নির্বাচনে সঙ্গি হয়েছেনও। কিন্তু খুব সম্ভবত এবার তিনি অতি চালাকি আর নাটক করতে গিয়ে ধরা খাবেন, দেখা যাক! কিন্তু প্রতীক মহাশয়ের চোখে সবই ভারতের সাফল্য!!

    প্রতীমের পরের প্রসঙ্গ আর্মিঃ
    সামরিক আর বেসামরিক শাসন নিয়ে তুলনা আর শেষে খোদ যেকোন প্রকারের বেসামরিক শাসনের পক্ষে রায় দেয়া – এই চাতুরি বয়ানের  চর্চা চালু করে গেছিলেন প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খান (এখন মারা গেছেন)। তিনি নিজেই একালেও বাকশালের পক্ষে কথা বলতে লজ্জা পেতেন না, এতই অবুঝ বাকশাল-প্রেমি ছিলেন। আসলে, তখন রাষ্ট্রটাকেই নাই করে দেয়া হয়েছিল এমন কনষ্টিটিউশন সংশোধনী আনা হয়েছিল; যেটাকে আমরা বাকশাল বা চতুর্থ সংশোধনী বলে চিনি। মিজানুর বলতেন রাজনৈতিক দলের এই কান্ডটাও জায়েজ কারণ তা মুজিবের বেসামরিক শাসন সেটা করেছিল।  মানে তুলনায় সামরিক শাসন সেটা খুবই খারাপ!

    এই বক্তব্য শঠতাপুর্ণ বা চাতুরির। সাধারণভাবে বাংলাদেশে –  রাজনীতি জিনিষটা কী এনিয়ে চিন্তা-বোধ এর বিকাশ খুবই দুর্বল। এর পিছনের প্রধান কারণ সমাজতন্ত্রী-প্রগতিশীলতা ধারণা।  সমাজতন্ত্রী-প্রগতিশীলরা মনে করেই তারাই নাকি সবচেয়ে অগ্রসর ধারণা। কাজেই রাষ্ট্র-রাজনীতি কী সেটা জানার দরকার নাই, এগুলো তো পশ্চাতপদ, ডানপন্থি বা বুর্জোয়া ধারণা। অথচ  যারা মৌলিকভাবে রাজনীতি-রাষ্ট্র জিনিষটা কী, রিপাবলিক ধারণাটা কী এসবনিয়ে নুন্যতম ধারণা জানা-বুঝার আগেই সমাজতন্ত্রী-প্রগতিশীল হয়ে গিয়ে এমন আত্মঘাতি হয়ে আছেন। অবশ্য সেটা এমন হয়ে যাবার যুগও ছিল, সেটা অন্তত গতশতকের শেষ অর্ধেক জুড়েই (১৯৪৫-২০০০) মৌমাছির মত সেকালের তরুণদেরকে টেনেছিল। সোভিয়েত পতনের পরে এটা আর টিকে থাকতে পারে নাই। নিজ-অযোগ্যতায় এর জোশের সিংঘভাগই এখন খামোশ হয়ে গেছে।  কিন্তু আমাদের বেলায় যা ক্ষতি করে দিয়ে যাবার তা ঘড়েগিয়েছিল। এরই প্রমাণ হল, বাকশাল সম্পর্কে – কেন বাকশাল আপত্তিকর তা হল তা নিয়ে প্রকাশিত ধারণা গুলোকে দেখেন। ন্যাপ-কমিউনিস্ট বা ইসলামিদল গুলোর (পরে এরা বিএনপি করা শুরু করলেও) সবার মুখে মুখে সেসময়ের বয়ান হল যে, এটা একদলীয় ব্যবস্থা আর চারটা সংবাদপত্রের শাসন; এটাই মুখ্য অভিযোগ। এই হলো আমাদের বুঝ ও সমালোচনা। অথচ রিট [writ] কী আমরা খবর নেই নাই, জানি না। একটা কনষ্টিটিউশনে যদি রিট করার সুযোগ না থাকে তাহলে কী ক্ষতি; কী আসে যায় আমরা জানি নাই। সমাজতন্ত্রী-প্রগতিশীলতার এতই দৌরাত্ম! বাকশাল সংশোধনী আমাদের কনষ্টিটিউশন থেকে রিট করার সুযোগ তুলেই দিছিল – তা আমরা বাকশালবিরোধীরা কেউ টের পাইনি!

    মানে? মানে হল – রিট কথাটার সোজা মানে হল যে কোন কনষ্টিটিউশনের মুখ্য বা কেন্দ্রীয় বিষয় বা জায়গা হচ্ছে নাগরিকের মৌলিক অধিকার আর তার রক্ষাকবচ কিসাবে কী রাখা হয়েছে সেসব অংশগুলো। আমাদের কনষ্টিটিউশনের এটাই তৃতীয় অধ্যায়। এখন নাগরিকের প্রাপ্য মৌলিক অধিকার যদি সরকার বা কনষ্টিটিউশন প্রণেতারা রোধ করে দেয় বা রোধ-কারী কোন আইনই সংসদ পাশ করে দেয় তাহলে প্রতিকার হিসাবে নাগরিকের কী করার আছে? আইডেয়েলি বললে, নাগরিক তখন অধিকার হারানোর বিষয়টা হাইকোর্টের নজরে আনতে পারে। এটাই সব সৎ কনষ্টিটিউশন প্রণেতারা স্কোপ করে রাখেন। এভাবে আদালতের এই নজরে আনা বা প্রতিকার চেয়ে নালিশ দেয়াটাই রিট করা। পরে আদালত ঐ নালিশের শুনানিতে একমত হলে এরপর আদালত সরকারকে বাধ্য করতে আদেশ দিতে ক্ষমতা রাখে। এমনকি সংসদে পাশ করা কোন আইন তৈরি হয়ে গেলেও তা বাতিল ঘোষণা করে দিতে পারে। এই হল, খুবই সংক্ষেপে রীটের সারকথা।
    আর আমাদের ঐ বাকশাল সংশোধনীর আগের কনষ্টিটিউশনে দুই জায়গায় আলাদা করে এমন রীট করার অধিকার দেয়া ছিল। প্রথমটা নাগরিককে দেয়া তাদের যেকোন ইস্যুতে রীট করার অধিকার হিসাবে। আবার একইভাবে ১০২ অনুচ্ছেদে উচ্চ-আদালত (হাইকোর্ট ও এর উপরের) সকল বিচারককে রীট শুনবার অধিকারও পরিস্কার ও আলাদা করে দেয়া ছিল। আর গুরুত্বপুর্ণ কথা হল ২৫ জানুয়ারী ১৯৭৫ সালে পাশ হওয়া চতুর্থ সংশোধনী বা বাকশাল সংশোধনী রীট সংক্রান্ত এদুই অধিকারকেই হয় বিলুপ্ত বা স্থগিত করে রেখে দিয়েছিল। ফলে বাকশাল চালুর পরে দেশে কারও পক্ষেই আর রীট করা বা রীট শোনার আর কোন বালাই এক্তিয়ার থাকে নাই।

    মজার কথা হল পরে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে জিয়াউর রহমান  তিনিই নাগরিকের রীট করা ও আদালতের তা শোনার অধিকার ফিরে কায়েম করেছিলেন – সেকালের সিনিয়র এডভোকেট বা সাবেক বিচারকদের পরামর্শে জিয়া একাজ করেছিলেন। তিনি এই মর্মে এক প্রেসিডেন্সিয়াল অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন। এখন পাঠকেরাই বলেন বা ভাবেন বেসামরিক শাসন ক্ষমতার জোরে বাকশাল সংশোধনী জারি করা নাকি সামরিক শাসনের ক্ষমতাবলে (যা আবার পরে পঞ্চম সংশোধনীতে জায়েজ করে নেয়া) রিট করার অধিকার ফেরত দেয়া কোনটা জায়েজ বা কোনটা তুলনায় ভাল ও সৎ পদক্ষেপ?

    তবে আমাদের এই আলোচনার জন্য মুখ্য ইস্যু হচ্ছে এটা বুঝতে পারার যে নাগরিকের রিট করার অধিকার কেন ফান্ডামেন্টাল? কেন রিটের অধিকার না থাকার মানে সেটা  আর কোন রাষ্ট্র-ই না; বরং কার্যত তা এক রাজতান্ত্রিক শাসন, সেটা আর রিপাবলিক বা জনগণের ক্ষমতার শাসন নয়!   অথচ সমাজতন্ত্রী-প্রগতিশীল মন ও শিক্ষা আমাদের টেরও পেতে দিল না যে বাকশাল সংশোধনীতে বাংলাদেশ এই স্বাধীন রিপাবলিক খোদ রাষ্ট্রটাই নাই হয়ে গেছিল। এমনই সমাজতন্ত্রী বোদ্ধা সব একেকজন!  বাকশাল-কে গালি বানাতে পেরেছি কিন্তু রাষ্ট্র-রাজনীতি-জনগণ এসবের অর্থ আজও ঠিকমত বুঝি নাই! এনিয়ে আমার অনেক পুরানা একটা লেখা আছে। লেখাটা এখন খুঁজে পেয়েছি যার শিরোনাম ছিল – “পঞ্চম সংশোধনী বিতর্ক”। লিঙ্ক এখানে।  আর সেটা সেই ২০১০ সালে লিখেছিলাম। [আর ২০১০ সালে আমি তখনও জাতিসংঘে কর্মরত। আর ওয়ার অন টেররের পরে আমাদের একটা ইন্টারনাল সার্কুলার হয়েছিল যে আমরা যিন কোন রাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে না জড়াই, মতামত না রাখি। রাখলে এর পরিণতি হবে ২৪ ঘন্টার মধ্যে দেশে ফিরার টিকিট হাতে ধরিয়ে দেয়া। তাই আমি বেনামে ফিদা হাসান নাম নিয়ে লিখেছিলাম এই লেখাটা] এখনই সেই পুরানা লেখাটার একটা লিঙ্ক এখানেও পারেন।
    । সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটা লেখাও পড়তে পারেন আগ্রহিরা। এটা ২০১৭ সালে লেখা – প্রথম আলোর রাজনীতির একটি ব্যবচ্ছেদ। এটা আমার লিজের নামেই লেখা।


    কিন্তু এর সাথে প্রতীম রঞ্জনের কী সম্পর্ক?

    তিনি লিখেছেন, “Army was at the helm in Bangladesh between 1975 and 1990.”। বাংলা করলে, “১৯৭৫ ও ১৯৯০ সালের দিকে বাংলাদেশে আর্মি সব ক্ষমতার শীর্ষে ছিল!”।  এই বাক্যটা মিজান খানের বাকশালী সামরিক বনাম বেসামরিক এর মধ্যে কোনটা তুলনায় ভালো এই চাতুরির ধারণা লুকিয়ে আছে। বেসামরিক শাসন হলেই একে ভাল বলতে হবে – এটা একেবারেই শঠতার এক বক্তব্য! সেজন্যই উপরে দেখালাম, বেসামরিকতা দিয়েই [বেসামরিকতা মানেই যেন এক পবিত্র ক্ষমতা] একটা জনগণের ক্ষমতার রাষ্ট্র বা রিপাবলিক রাষ্ট্রকে নাই করে দিয়ে একে রাজতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারি শাসন বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু এই মিজান এন্ড বাকশালী গং আমাদেরকে বেসামরিক শাসনের পবিত্রতা শিখাচ্ছে! আর একালের প্রতীম মহাশয়ও আমাদের সেই সামরিক শাসনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

    এমনিতেই সেকালের সোভিয়েত-মার্কিন [ সেটা ছিল ব্লকের যুগ মানে  দুই দেশের দুই ব্লকের সদস্য হওয়ার যুগ] বা কোল্ড ওয়ারের যুগে (১৯৫৩-৯১)। আমাদের মত দেশে আমেরিকা মাস-পপুলার লেবেলে  সোভিয়েত প্ররভাবের সাথে না পেরে সামরিক শাসন জারি করে আমাদের মত দেশগুলোর উপর নিজ সব ধরণের প্রভাব জারি রাখত। তাই সামরিক শাসনের সরকার ছিল প্রধান ফেনোমেনা। আবার আমাদের বেলায় ছিল আরেক সমস্য। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে পৌছানো কখনই হত না যদি না আমরা সেই সময়ে স্পষ্ট করে সোভিয়েত ব্লকে যোগ না দিতাম! আবার এতে কমিউনিস্ট গিরি সমাজে রাজনীতিতে বেড়ে যাওয়াতে স্বাধীনের পরের সাড়ে তিন বছর কথিত সমাজতন্ত্রের অর্থনীতি করতে আমরা বাধ্য হয়েছিলাম। আর তাজউদ্দিন এন্ড গংয়ের এই প্রচেষ্টাইয় গিয়ে তা শেষে এমন পরাজয় ও ব্যর্থতা আসলো যে দুর্ভিক্ষে মানুষ মারলাম। আবার দুর্ভিক্ষের জন্য একে-তাকে দোষ চাপালাম। আবার অন্যদিকে কোন রাষ্ট্র একবার সোভিয়েত ব্লকে ঢুকলে তা থেকে বের হওয়া বিরাট খেসারত, বিরাট মুল্য চুকাতে হয়। আমাদের বেলাতেও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। শেখ মুজিব আমাদের সোভিয়েত ব্লক থেকে বের করার ব্যবস্থা করে গেছিলেন কিন্তু তা দেখে যাবার আগেই জীবন দিয়েছিলেন। এই ছিল আমাদের সত্যিকার ১৯৭৫।  যা সবদিক থেকে দেখে ব্যাখ্যা করতেই হবে কারণ পুরা ফেনোমেনা-ঘটনাটা নেহায়তই কোন সামরিক শাসনের প্লট নয়! এটা শ্রেফ একটা সামরিক শাসন জারি করার মামলা একেবারেই নয়!
    আর ১৯৯০ সাল বলে – যেটা বলছেন সেটা আসলে এরশাদের ১৯৮২ সালের সামরিক ক্ষমতা দখল। কিন্তু এই ক্ষমতা দখলের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বব্যাংকের আমাদের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কার। ফলে এটাও কোন সামরিক প্লট না। যা সামরিক শাসন খুবই খারাপ বলে ব্যাখ্যা করা যাবে না।  সেই আশির দশকের শুরুতেও আমাদের দেশে কমিউনিস্ট প্রভাব যথেষ্ট ভারি ছিল। বিশেষত ট্রেড ইউনিয়নে আর রাজনৈতিক কালচারে। যেমন প্রায় সব উতপাদন ছিল সরকারি মালিকানায়। যেকোন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে সংস্কার মানেই প্রথম পর্যায়ে শ্রমিক বা কর্মি ছাটাই হবেই। কিন্তু সংস্কারের বা ঢেলে সাজানোর পরে কত মানুষ চাকরি পাবে সেটা দিয়ে এর সাফল্য মাপতে হবে।  শুধু শ্রমিক ছাটাই হচ্ছে কেন তা দিয়ে নয়! এখন বাংলাদেশে সংস্কারের কাজে নামলে বিশেষত বিশ্বব্যাংক একাজে কমিউনিস্ট চাপে (বিশেষত ছাটাই ইস্যুতে) পড়তে পারে যেটা তারা মুখোমুখি হতে চায় না। তাই আগে সামরিক শাসন জারি করে নিয়ে সংস্কার কাজ শুরু করতে মনস্থ করেছিল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। তাই এরশাদের ক্ষমতা দখল। নিশ্চয় এরশাদ এত বুদ্ধিমান ছিলেন না যে প্রশাসনিক সংস্কার (পপুলারলি উপজেলা) তার মাথা থেকে বের হয়েছে!
    এখন এখানে এতসব দিককে আপনি স্রেফ সামরিক লোকেরাই সবকিছুর নষ্টের গোড়া বলে বাহাদুরি-গাথা গাইতেই পারেন! অজ্ঞতায় কতকিছুই না দাবি করে ফেলা যায়!
    আর কিছুই না-বুঝে  প্রতীম রঞ্জন বোস এসব  সামরিকবিরোধী বাহাদুরি-গাথার পাল্লায় পড়েছে। আসলে এতে বুঝা গেল ভারতের ১৯৯০ সালের আইএমএফের সাথে ব্যালেন্স অফ পেমেন্টের ঘাটতিতে পরে তা মোকাবোলায় সেখান থেকে কেন ভারতকে সংস্কারের পথে যেতেই হয়েছিল এসব নিয়ে প্রতীম রঞ্জন বোস এর কোন স্টাডি অনুমান কিছুই নাই। এমনকি এখনও এই মোদি আমলে ভারতে আরও অর্থনৈতিক সংস্কারের কথা উঠছে কেন; সেটা কখনও তিনি আমল করেন নাই বলেই মনে হয়।
    অথচ তিনি এসেছেন গাধা-বোকাদের সামরিক-বেসামরিক তর্কে প্রবেশ অরে এনিয়ে কথা বলতে!!!

    চীনা প্রসঙ্গঃ
    প্রতীম রঞ্জন বোস খুবই নাদান কিসিমের তাই যেসব ইস্যু নিয়ে তিনি কথা তোলার যোগ্য হন নাই, সাবজেক্টটা বুঝতেই শেখেন নাই তা নিয়ে তিনি কলাম লিখে ফেলায়ছেন। তার আপত্তি হল, বাংলাদেশে চীনের গুরুত্ব কেন ভারতের নাই কেন?  অথচ উনি কী জানেন  একই ভাবে খোদ ভারতের চীনের গুরুত্ব আছে, দেয়া হয়? যে জানে সে দেয়! কিন্তু চীনের গুরুত্ব কথার মানে কী?

    এটা কেউ চীনকে বেশী ভালবাসে বলে দেয় ব্যাপারটা কী সেরকম?
    একেবারেই না। চীনের গুরুত্ব কথার সিধা মানেটা হল, আমাদের মত দেশ (এমনকি ভারতেও) অবকাঠামো খাতে একালে ঋণ দেবার সক্ষমতা একমাত্র চীনের আছে। যা সমতুল্য আমেরিকারও নাই।  তবে এটাই আমেরিকারও ছিল। সেকারণেই একালে চীনের এই গুরুত্ব। এখন প্রতীম কী জানেন ভারতেও চীনা এমন অবকাঠামো প্রকল্পগুলো ছিল? বিশেষত ২০১৪ সালে মোদি প্রথম ক্ষমতায় আসার পরে! কোথায় সেসব প্রকল্পগুলো, তাদের কী হল? সেগুলো বাতিল করে দেয়া হলে সেই সরকারি ঘোষণাটাই বা কই? রেল ব্যবস্থা আধুনিকিকরণ, স্টাফ ট্রেনিং সহ যে চীনা প্রকল্প ছিল তা এখন কোথায়? আগামিতে ভারতে আরো প্রায় পঞ্চাশটা শহর গড়ে উঠতে যাচ্ছে। সেগুলোর অনেকগুলোই পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার অবকাঠামোগত বিনিয়োগের দায়ীত্বে চীনের যাবার কথা হয়েছিল সেগুলোই বা কোথায়? এর সব তথ্য নেট থেক সরায় নেয়া হয়েছে কেন? গৌতম আদানিরা চীনা লোন (হংকং থেকে এনেছে বলে চালিয়ে দিয়ে) বিদ্যুৎ কেন্দ্র বানিয়ে সেই  বিদ্যুৎ বাংলাদেশে রপ্তানি করে এবার ভারত নিজেকে চীনবিরোধী দাবি করছে? এতে করে লাভ কি?
    এখন ভারত কী অবকাঠামো ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বি? নাকি ভারত নিজেই অবকাঠামো ঋণের এখনও খাতক?  কাজেই এসব সম্পর্কে নুন্যতম ওয়াকেবহাল না থেকে এক দেশপ্রেমিক ভারতীয় সেজে বাংলাদেশে সব ইস্যুতে চীন কেন – এই প্রশ্ন করা মানে বুঝিয়ে দেয়া যে আপনি ইস্যুই বুঝেন না, আর আপনার কাছে নুন্যতম তথ্যই নাই।

    তিনি লিখেছেন,
    Despite all the drumbeating about bilateral co-operation, the last five years were marked
    by unprecedented consolidation of Chinese interests in Bangladesh while Indian interests suffered.

    সারকথায় বললে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশে চীনা স্বার্থ কেন উপরে আর ভারতের স্বার্থ কেন নিচে? প্রশ্নটা তিনি তুলছেন অবকাঠামো প্রসঙ্গে। তবু প্রথম কথা হল, বাংলাদেশ এমনকি হাসিনার বাংলাদেশে তিনি কাকে বেশী গুরুত্ব দিবেন ভারত না চীনকে – এটা নির্ধারণের এক্তিয়ার তো হাসিনার?  নাকি না?  প্রতীম মহাশয় তিনি কী বলতে চাইছেন হাসিনা ভারতের দালাল তাই তিনি ভারতকে চীনের উপরে দিচ্ছেন না কেন? এরকম?
    আসলে এসব কথা নিয়ে নিজেকে ইন্ডিপেডেন্টে বুঝানো যায় না! বরং এসব ইস্যু নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে নিজে কতটা অযোগ্য তা বুঝা যায়!  আমরা কেবল এতটুকু বলতে পারি এই নির্বাচন যদি হয়েই যায় তখন ভারতের কী দুর্দশা হয় সেটা নিয়ে বরং মুরোদে কুলালে প্রতীম মহাশয় ব্যস্ত হয়ে উঠতে পারেন। কারণ, এটাই সম্ভবত হট-কেকে হয়ে উঠতে যাচ্ছে!

    ভারত কেন বাংলাদেশে কখনই পপুলার নয়ঃ
    সবক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যা প্রতীক মহাশয় ডিল করলে পারেন না সেসবেই তার আগ্রহ!   এভারেজ এক ইন্ডিয়ানের মত তাঁরও পুঁজি হল কেবল এক উগ্র দেশপ্রেম? থচ columnist, researcher, and consultant.এর আকাঙ্খা রাখেন? সেকাজে তো নুন্যতম সমাজতত্ব, সমাজবিজ্ঞান ও অর্থনীতির পাঠ থাকতে হবে, নাকি? অথচ তিনি বলতেছেন,

    … India was never popular in Bangladesh, not even in December 1971, when Delhi
    became a party to their Liberation War. This is largely due to religious differences
    that were the prime inspiration behind the creation of Pakistan.

    এটা কী কোন গবেষকের বক্তব্য হতে পারে? যোগ্য? বলছেন ১৯৭১ সাল থেকেই ভারত কখনও বাংলাদেশে পপুলার ছিল না। ভালকথা, কিন্তু কেন? এর একটা বুদ্ধিমত্তা-সম্পন্ন ব্যাখ্যা করেন তাহলে! কিন্তু না। এই মহা বিদ্যান লোক ফতোয়া দিলেন এক মহা আবিস্কারের যে নাকি ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে ভারত বাংলাদেশে পপুলার না! কান্ড দেখেন, প্রতীম রঞ্জন মফস্বলের চা দোকানের বেঞ্চিতে বসা আলাপ তুলেছেন তিনি!!!
    সাধারণভাবে বললে, প্রায়ই এই প্রশ্নটা সামনে চলে আসে যে ভারত আমাদের সাহায্য করতে আসার উসিলায় নিজের স্বার্থ হাসিলে ততপর। এখন এমন প্রশ্ন উঠাই স্বাভাবিক। তাই আগাম এমন বুঝাবুঝি যেন না উঠে আসা তা নিয়ে সতর্ক থাকা। কিন্তু তা তো হয় নাই। বরং সব জায়গায় ১৯৪৭ সালের দেশভাগের প্রতিশোধ নিবার বাসনা প্রকাশিত হয়েছে যেন! আর সবচেয়ে খারাপ কাজটা করেছেন ইন্দিরা গান্ধী! তাঁর তো অন্তত এমন কিছুই করা উচিত না যেটা ভারতের নিজের ক্ষতি ডেকে আনবে। অথচ তিনি তাই করেছেন। কেন তিনি হবু বাংলাদেশ কী হবে কী পরিচয় তা নিয়ে এমন সব ধারণা ব্যবহার করেছেন যা ভারত নিজেই নয়। যেমন কথিত সেকুলার, অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি হয়ে হবে হবু বাংলাদেশকে! কিন্তু কেন?
    তারচেয়েও বড়কথা খোদ ভারতই তেমন কোন রাষ্ট্র নয়; আর এর কথার বেশির ভাগই অর্থহীন!  অথবা যা বলছে ওর ব্যবহারিক রূপটা এর উলটা। বরং সারকথায় বাংলাদেশ ৯০ ভাগের মত মুসলমান জনসংখ্যা। এখন কী বলে কী করে ঈই মুসলমান পরিচয় দাবিয়ে রেখে দেয়া যায় এই ছিল ইন্দিরার সব কসরতের মূল্কথা! অথচ সবচেয়ে বড় অসংগতি হল খোদ ভারত-ই তো হিন্দুত্ব বা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের দেশ হয়ে আছে যে পথ  কংগ্রেস নিয়েছে সেই ১৮৮৫ সাল থেকে! তাহলে হবু বাংলাদেশের ভারতকে অনুসরণের সুযোগ বাস্তবতা কোথায়?

    আসলে কথা একটাই জমিদার আমল থেকেই জমিদার-হিন্দুদের মুসলমানদের উপর আধিপত্যের আকাঙ্খার শুরু সেই নীতি সব জায়গায় থেকেই গেছে। মূল সমস্যা আধিপত্য – রাজনৈতিক বা সাংস্ক্ররতিক আধিপত্য ভারতকে বা জমিদার হিন্দুদেরকে করতেই হবে বা পেতেই হবে – এটাই রূপ সমস্যা। অথচ সকলেই আম=বার ব্যভারিকভাবে বুঝুক না বুঝউক   এক রিপাবলিক রাষ্ট্রই গড়তে গিয়েছে। যার সারকথা হল, নাগরিক সাম্য। মানে এক জনগোষ্ঠির অপরের উপর আধিপত্য করা বা সুযোগ নেয়া নয়। বরং আধিপত্যের উলটা, এক নাগরিক সাম্য। যেটা সেকালের না ইন্দিরা বা কোনকালে খোদ কংগ্রেস বুঝতেই পারে নাই। একেবারে প্রতীম রঞ্জন বোস পর্যন্ত একই গান চলছে!

    যা হোক, এই গল্প-কেচ্ছার শেষ নাই। কেবল আমাদেরকে আমাদের মত থাকতে দেক, এটাই কাম্য!

    প্রতীম রঞ্জনের সবচেয়ে বিরক্তিকর কান্ডটা হল, তিনি শিরোনামে বলছে ভারতকে নিজ স্ট্রাটেজি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। অথচ তিনি পরিস্কার বলতেই পারলেন না বদল করে কোথায় নিবে? মানে চাপাবাজির ভাবসাব আরকি!!!

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ    ৩০  ডিসেম্বর ২০২৩,   দুপুর ১২ঃ ৩৬

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • জাতিসংঘ কী কেন এমন, সেই বোধ-বুঝের অভাবে থাকা ভারতের জয়শঙ্কর

     

    জাতিসংঘ কী কেন এমন, সেই বোধ-বুঝের অভাবে থাকা ভারতের জয়শঙ্কর
    গৌতম দাস
    ২৫ দিসেম্বর ২০২৩   ১৯ঃ ৫৮
    https://wp.me/p1sCvy-5cJ

    এস জয়শঙ্কর [S. Jaishankar] ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মানে সরকারি হিন্দিভাষায় বললে “বিদেশমন্ত্রী”। তিনি স্থানীয়ভাবে মানে ভারতের ব্যাঙ্গালুরু রাজ্যের এক সামাজিক সভায় বক্তৃতা করছিলেন গত ১৭ ডিসেম্বর ২০২৩।  ্সেখানে তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বা সিকিউরিটি কাউন্সিল [UNSC] ও এর পাঁচ ভেটো সদস্যদের বিরুদ্ধে ভারতের সব রাগ ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে কথা বলেছেন। জয়শঙ্করের ভারতের প্রধান ক্ষোভ হল, বর্তমানের পাঁচ ভেটো সদস্যকে গালি দেয়া এই বলে যে এরা কেন ভারতকেও নিরাপত্তা কাউন্সিলের স্থায়ী সদস্য বা ভেটো সদস্য করে নেয় না?

    তবে এবারই প্রথম ভারতের লাগাম-ছাড়া ক্ষোভ দেখছি আমরা। এতদিন যে ভেটো সদস্যপদ পাওয়া ছিল ভারতের আকাঙ্খা!  মানে  এতদিন ভারত তার আকাঙ্খার কথা তুলত আর নিজেকেই সান্ত্বনা দিয়ে বলত যে,  এই তো ভেটো সদস্যপদ পেয়েই গেল বলে!! কিন্তু এবার ব্যতিক্রম হয়ে অনেকভাবেই ক্ষোভ ঝেড়েছে। যেমন, পাঁচ ভেটো সদস্য “ওরা বুড়া তাই” যারা তরুণ তাদের জন্য জায়গা ছাড়ে না; অথবা এরা ক্লাবের বুড়া সদস্য যারা নতুন সদস্য নিতে চায় না জায়গা ছাড়তে চায় না; অথবা  এরা যাত্রীবাহী বাসের এমন প্যাসেঞ্জার যারা অন্যদের জন্য সিট ছাড়তেই চায় না ইত্যাদি – এরকম। এমন ভঙ্গিতে  আগের কোন ভারত সরকার এমন করে কথা বলে নাই। তাহলে কেন এখন বলছে???

    আচ্ছা, ভারত সরকার কী সবসময়ই এমন ভেটো সদস্য হতে চেয়ে কথা বলত বা বলেছে?? এসম্পর্কে ফ্যাক্টস বা জবাব হল – না, একেবারেই না। বরং ভেটো সদস্যপদের আকাঙ্খী কোন এক ভারত – আমরা দেখছি কেবল এই চলতি শতকে; তাও সেটা বুশের আমলে (২০০১-৮) গোপনে আর ওবামার আমলে (২০০৯-২০১৬) প্রকাশ্যে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, ২০০৭ সালের সেকেন্ড হাফে যখন এশিয়ায় চীন ঠেকাও [china Containment] বলে  আমেরিকা খামোখা ও বাস্তবায়ন-অযোগ্য এক শখে পড়ে এই এসাইনমেন্ট বা ঠিকা সে ভারতকে দিয়েছিল; তা থেকেই সবকিছুর উতপত্তি!! তবে এতে মজুরি হিসাবে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়ে গেছিল!। যদিও আগে আমেরিকা বুঝে নাই যে তার চীন ঠেকানোর খায়েস – এটা খামোখা ও বাস্তবায়ন-অযোগ্য এক শখ মাত্র। আর এটা ২০১৯ সালের পর থেকে আমেরিকা নিশ্চিত হয়ে যায়; ফলে বাদ রেখে দিয়েছে। যার বাইরের প্রকাশ আমরা একটাই দেখেছিলাম যে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে [পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে] বাংলাদেশকে আলাদা করা হয়েছিল; মানে ভারতের সাথে একই ডেস্ক বা বিভাগ থেকে আর পরিচালনা করা হয় না। আর বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার বাতচিত-পরিকল্পনা ২০০৭ সালের শেষের দিকে খতম হয়ে গেলেও  – সেটা পেকে উঠেছিল ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে যখন ওবামা নয়া প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়েছিলেন এর পরে। ততদিনে হাসিনা সরকারও বাংলাদেশে আসীন হয়ে গেছিল। আর সেসব দিনগুলোতে আমার প্রতিটা লেখায় ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে আমি লিখতাম, মুরুব্ববি আমেরিকা ভারতের পিঠে একটু হাত রেখেছে তাতেই ভারতের আচার-আচরণে একটা পরাশক্তি ভাব যেন, সে পরাশক্তি হয়েই গেছে তা ফুটিয়ে তোলা শুরু করে দিয়েছিল ভারত! তখন প্রণব মুখার্জিরা বলে বেড়াত ওবামা নাকি তাদেরকে আশ্বস্ত করেছে যে ভেটোসদস্যপদ এবার তারা পাচ্ছেই!!  আর এর কয়েকমাসের মধ্যে ভারতেও কংগ্রেস পার্টি টানা দ্বিতীয়বারও ক্ষমতা এসেছিল। আর প্রণব মুখার্জি সেবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছেড়ে অর্থমন্ত্রী হয়েছিলেন। সেসময় তিনি ধরেই নিয়েছিলেন আর সেভাবেই কথা বলতেন যেন ভারত তো ভেটো সদস্য হয়েই গেছে বা যাচ্ছে!!!  যদিও এটা ঠিক যে বুশের আমলে ২০০৫ সালে বুশের দিল্লি সফরে ভারত-মার্কিন অসামরিক পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়ে গেছিল। আর এরপরের ২০০৯ সালে  চীন ঠেকাও এর ঠিকা পাওয়াতে ভারত তখন  ফ্ল্যাইয়িং হাই [flying high] বা আকাশে উড়ছে!! প্রেসিডেন্ট ওবামা নাকি তাঁকে বলেছিল, তাই প্রণব মুখার্জি বিশ্বাস করতেন যে ভারতের ভেটো-পদ পাওয়ার আকাঙ্খা ওবামা সমর্থন করবেন। এমনকি ২০১০ সালের জানুয়ারিতে হাসিনা প্রথম ভারত সফরে গেলে উতসাহের ঠেলায় প্রণব মুখার্জি ভারত-বাংলাদেশ যৌথ ঘোষণায় লেখায় নেন যে বাংলাদেশও সেটা সমর্থন করছে।  অথচ বোকাদের এমন কান্ড  এর মানে হল, প্রণব মুখার্জির জাতিসংঘ সম্পর্কে বুঝটা হল যে, প্রেসিডেন্ট ওবামা বা হাসিনা সমর্থন করলেই ভারতের ভেটো সদস্যপদ পাওয়া আর ঠেকায় কে???

    জাতিসংঘ সম্পর্কে ভারতের বুঝের অভাব নিজ জন্মসময় থেকেইঃ
    প্রনব মুখার্জিই প্রথম নেতা নন যার জাতিসংঘ সম্পর্কে বুঝে ঘাটতি আছে। এবং শুনতে খারাপ লাগলেও কথাটা সত্য যে,  জাতিসংঘ জিনিষটা কী সে সম্পর্কে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি গোঁয়াড় ও  অ-বুঝের ধারণা ছিল জওহরলাল নেহেরুর! আর একালে এটা জয়শঙ্কর পর্যন্ত আমরা দেখতে পাচ্ছি, অবস্থা একই আছে। মানে কোন জিনিষ সম্পর্কে বুঝাবুঝি না থাকলে আর গোয়াড় হলে অবলীলায় গর্বের মুডে ডাটের সাথে বোকা বোকা প্রশ্ন তো করাই যায়!! তাই না?

    প্রথম কথা হল জাতিসংঘ কী? মানে কী ধরণের সংগঠন এটা?  যদিও অনেকরই অদ্ভুত সব অযাচিত ধারণা  আছে জাতিসংঘ নিয়ে; এর মধ্যে আবার যারা কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল তারা আরেক কাঠি সরেস! যেমন এদেরকে এমন জ্ঞানের ভান্ডার খুলে বসতে দেখা যায় যে  – জাতিসংঘ একটা সাম্যের (ইউনিফর্ম রাইট বা সমান অধিকার) সংগঠন। মানে হল জাতিসংঘ যেন এমন একটা সংগঠন যার সদস্যদের সবারই সমান অধিকারের।  কিন্তু জাতিসংঘ এমন তা একেবারেই নয়। জাতিসংঘের সব সদস্য-রাষ্ট্রের সমান বা একই অধিকারের অধিকারী তা নয়।  বরং জন্ম থেকেই জাতিসংঘ-কে অসাম্য করে রেখেই, অসাম্যের ভিত্তিতেই  গড়ে তোলা হয়েছে।  সিকিউরিটি কাউন্সিল বলে জাতিসংঘের ভিতরেই একটা আলাদা কমিটি বানানো আছে যা মোট ১৫ সদস্যের (১০ সদস্য অস্থায়ী বিভিন্ন মহাদেশ থেকে দুবছরের জন্য একেক্টা রাষ্ট্রকে এর সদস্য করা হয় ) আর (৫টা স্থায়ী এবং ভেটো সদস্য) এভাবে। এই সিকিউরিটি কাউন্সিল আর ভেটো-পদ দেখলেই তো পরিস্কার বুঝা যায় যে জাতিসংঘের গঠন-প্রণালি সাম্য-নীতির ভিত্তিতে নয়। তা ইচ্ছা করেই করা হয়েছে। কিন্তু কেন, সেটাই আমরা এখানে বুঝার চেষ্টা করব।

    প্রশ্ন হল, কেন ভেটো-পদ ওয়ালা এক জাতিসংঘ-ই বানানো হয়েছিল?। আর সেটা জানা হলে আর এই প্রশ্ন বোকামির হয়ে যাবে যে কেন জাতিসংঘ সাম্য-নীতির প্রতিষ্ঠান হল না নয়। বরং বুদ্ধিমানের হবে প্রশ্ন করা যে ভেটো-পদ ওয়ালা এক জাতিসংঘ-ই কেন বানানো হয়েছিল?  আর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের একছত্র নেতা জোসেফ স্টালিন; তিনি কেনইবা এই অসাম্য-নীতির মানে “ভেটো-পদওয়ালা এক জাতিসংঘ-ই” মেনে নিয়েছিলেন? মনে রাখতে হবে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের চোখে স্টালিন তো নাকি “দুনিয়ার সব শোষণের বিরুদ্ধে আপোষহীন” এক কঠিন লড়াকু!!!

    জাতিসংঘ তৈরির প্রস্তাব কে করেছিল ও কেনঃ
    সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন হল এটা। আর এর জবাব ঠিকমত বুঝলে বা ঠিকঠাক জেনে নিলেই একমাত্র সব পরিস্কার হবে।
    কবে থেকে জাতিসংঘ কার্যকর হয়েছে সে হিসাবে এটা ১৯৪৫ সালের ঘটনা। কিন্তু এরও আগে জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক জন্ম-ঘোষণা [DECLARATION DAY] ধরা হয় ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি।  এদিনটা একই সাথে আমেরিকার জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রথম অংশ নেওয়ার দিন ছিল। মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিস্তার (১৯৩৯-৪৫) এই সময়কাল হলেও শুরুতে আমেরিকা এথেকে দূরে ছিল, কোন পক্ষের হয়েই এই যুদ্ধে  অংশ নেয় নাই। সেই ১ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে আমেরিকা হিটলারবিরোধী মিত্রপক্ষ [allied force] গড়ে নিয়ে প্রথম যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নও সেদিন থেকে এই যুদ্ধ-জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়েছিল। আসলে হিটলারবিরোধী মিত্রপক্ষ জোট গড়া আর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠান গড়ার ধারণা একই আলাপের দুইটা অংশ। আর এই জাতিসংঘ গড়ার ধারণাটা এনে প্রস্তাব করেছিলেন ততকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট।   কথাটা আমেরিকান প্রস্তাব না বলে রুজভেল্টের প্রস্তাব বলেছি এর পিছনের কারণ আছে।
    কারণটা হল, আমেরিকা ১৯৪২ সালেই প্রথম জাতিসংঘের প্রস্তাব করেছিল তা নয়। এর আগে যে টাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮) বলি আমরা সে সময়ও যুদ্ধের শেষের দিকে আমেরিকা জাতিসংঘের মতই আরেকটা প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রস্তাব করেছিল। ওর নাম ছিল “লীগ অব নেশন” League of Nations] এর  জন্ম ও চালু হয়েছিল ১৯২০ সালে। মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাওয়া জর্মানির কাছ থেকে বৃটিশ-ফরাসীদের ক্ষতিপূরণ আদায় করতে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরিতে আলোচনা বসেছিল; যার আউটকাম বা চুক্তি,  সেটাকেই ভার্সাই চুক্তি বলে। তখনকার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ছিলেন উড্রো উইলসন। তাঁর প্রস্তাব ছিল সাথে একটা  লীগ অব নেশন প্রতিষ্ঠানও গড়ে নিবার। তাই কার্যত যেটা হয়েছিল, ক্ষতিপূরণ দেয়া বা আদায় ছিল ইউরোপীয় স্বার্থ বা ইস্যু। বিপরীতে আমেরিকা চেয়েছিল এই সুযোগে জাতিসংঘের সমতুল্য একটা “লীগ অব নেশন” গড়ে নিতে। তাই, শেষ পর্যন্ত একটা আপোষ হয়েছিল যে দুটাই করা হবে যাতে এই দুই স্বার্থই জায়গা পাবে। মানে, পরস্পর পরস্পরের স্বার্থকে স্বীকৃতি দিবে। তাই ফরমাল বাক্যটা দাড়ায় এভাবে  ক্ষতিপুরণ আদায়ের ইন্সটিটিউশন হিসাবে লীগ অব নেশন গড়ে নেয়া হবে।
    এখানে একটু সংক্ষেপে বলে নেই যে লীগ অব নেশন এর পরিণতি কী হয়েছিল। প্রথমত এটা টিকে নাই। ১৯২৯-৩০ সালের গ্লোবাল মহামন্দার  [Great Recession] বাস্তবতা সব উলটে যায়। এতে  জর্মনীর জনমত ঐ ক্ষতিপূরণ না দিবার পক্ষে শুরু থেকেই ছিল। ১৯৩২ সালে হিটলার নির্বাচিত হয়ে কোয়ালিশন সরকার গড়েছিলেন। তিনি ক্ষতিপূরণ দেয়ার দায় না মানার পক্ষে জনমত সাজিয়ে নেন। আর দ্বিতীয়ত, লীগ অব নেশন এর সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি ছিল এর সদস্যরা ছিল বিভিন্ন ধরণের যে কোন রাষ্ট্র। মানে যেমন কলোনি-দখলদার রাষ্ট্রও ছিল  আবার যে পরে কলোনি দখলে চলে যেতে পারে এমন রাষ্ট্রও ছিল। যেমন রাজতন্ত্রী ইথিওপিয়া লীগ অব নেশন এর সদস্য হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তিতে ইথিওপিয়া (হিটলারের সাগরেদ) ইতালির মুসোলিনির হাতে কলোনিদখল হয়ে যায়। অথচ এনিয়ে লীগ অব নেশন-এ  ইথিওপিয়া নালিশ দিলেও (যেখানে বৃটেন, ইতালি সবাই সদস্য) লীগ অব নেশন এর কোন বিচার করতে পারে নাই, চুপ ছিল। মূল কারণ, কে বচার করবে? কারণ প্রভাবশালী সব রাষ্ট্রই ছিল কলোনিদখলদার। তাই কে কাকে কী বলবে। যেমন বৃটেনের উপায় ছিল না যে বলে ইতালির ইথিওপিয়াকে কলোনিদখল নেয়াটা অন্যায় হয়েছে। মূলত এসব কারণেই লীগ অব নেশন কার্যত ঠুঠো-অকার্যকর হয়ে গেছিল। পরে ১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ জন্ম হলে লীগ অব নেশন তাতে বিলীন হয়ে গেছে ধরে নেয়া হয়েছিল।

    এখন প্রশ্ন হল আমেরিকা জাতিসংঘ বা লীগ অব নেশন ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়তে চায় কেন?
    জবাবে এককথায় বললে, আমেরিকাই প্রথম রাষ্ট্র যে বুঝেছিল যে যুদ্ধ ভাল জিনিষ নয়। কারণ, যুদ্ধ রাষ্ট্র-জনগণের জমানো সম্পদ নষ্ট করে দেয়। অথচ যেকোন দুই রাষ্ট্রের স্বার্থের সংঘাত নিরসনে যুদ্ধকেই একটা উপায় মানা হয়। বিশেষত যে রাষ্ট্রের সা্মরিক শক্তি ভাল বলে নিজ ধারণা থাকে। তা সত্বেও বাস্তবতা হল, যুদ্ধে জড়ানো মানেই জমানো সম্পদ নষ্ট বা পুঁজি নষ্ট এতে হবেই। আমেরিকায় এই জনমত প্রবল হয়ে উঠেছিল। এমন হবার পিছনের কারণ হল, ১৭৭৬ সালে যে আমেরিকা স্বাধীন হল, এই স্বাধীনতা মানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমেরিকায় যাদের আনা হয়েছিল তারাও সাদা-ককেশীয় হলেও তাদের ইউরোপের বড়লোক যারা কলোনিদখল ব্যবসায়ীর, তারাই এই গরীর ককেশীয়দেরকে আমেরিকা নিয়ে এসে ছেড়ে দিয়েছিল। আর তাদের আয় যা হত এর সিংহভাগ তারা লুটে নিত, এই ছিল কলোনিদখলদারদের ব্যবসা। আর এই কলোনিয়াল লুটের বিরুদ্ধেই ছিল তাদের ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ; এতে জড়ানো ও বিজয় আনা। কিন্তু এর অন্য দিকটা হল তাদেরকেও এই যুদ্ধ করতে গিয়ে তাদের সঞ্চিত সম্পদ ও পুঁজি হারাতে হয়েছিল। তা সত্বেও তাদের এই যুদ্ধ কলোনিদখলদার বিরোধী বলে স্বাধীন আমেরিকার জনমত হয়ে গেছিল প্রবল এন্টি-কলোনিয়াল। মানে, সেকালের ল্যাটিন (দক্ষিণ) আমেরিকার কোন কোন দেশকে স্বাধীন আমেরিক দখল করলেই নিজ জনমত এর কাজের বিরুদ্ধে চলে যেত। তাই স্বাধীন আমেরিকা স্বাধীন হবার পরে নিজে ফিরে কাউকেই কলোনি করে রাখতে পারে নাই।
    এর উপর আবার এর মাত্র ৮৪ বছরের মধ্যেই ১৮৬০ সালে স্বাধীন আমেরিকা আবার আরেক যুদ্ধে জড়িয়ে যায় – তবে এটা গৃহযুদ্ধ। সাদা-কালোর লড়াই বা  সাদা-কালোর সমান অধিকারের জন্য লড়াই! কেন এমন হয়েছিল?
    কারণ, আফ্রিকা থেকে আমেরিকায় ধরে আনা কালো দাসেরা ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে এই যুদ্ধে বিরুদ্ধ্বপক্ষ মানে ককেশীয় বড়লোক কলোনিমাস্টারের পক্ষে অস্ত্র হাতে লড়াই করেছিল। একারণে, স্বাধীন আমেরিকায় কালো মানুষদের জন্য সমান অধিকার রাখা বা দেয়া হয় নাই। আর সেটা নিয়েই ১৮৬০-৬৫ এই পাঁচ বছর কালো-সাদার গৃহযুদ্ধ চলেছিল। ১৮৬৫ সালে অন্তুত আমেরিকান কনষ্টিটিউশনে সংশোধনী এনে কালো-সাদা নির্বিশেষে সবার নাগরিক সমান অধিকার, সবাই সমান অধিকারের নাগরিক – এটা মেনে নিয়ে সেবারের বিরোধ মিটানো হয়েছিল। কিন্তু সেবারও আবার প্রমাণ হয়েছিল যে যুদ্ধ মানে সঞ্চিত সম্পদ নষ্ট করা।

    তাই সেই থেকে সমাজের সমষ্টিস্বার্থ নিয়ে যারা চিন্তা করতে পারে সমাজের এমন চিন্তকদের অবস্থান হয়ে দাঁড়ায় যে, যতটা সম্ভব যুদ্ধ এড়িয়ে চলাটাই সবচেয়ে ভাল। যদিও তারা বাস্তবতা বুঝত যে দুনিয়া থেকে যুদ্ধ একেবারে বিলীন করা যাবে না। আর সেখান থেকে প্রথমত সব রাষ্ট্রকে নিয়ে একটা জাতিসংঘ গড়া – একটা  গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান তৈরি করা; যাতে পরে নানান ইস্যুতে সকল সদস্যদেরকে নিয়ে নানা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক কনভেনশন, আইন তৈরি করে নেয়া যায়। যার মূল লক্ষ্য হল, ওসব আইন-কনভেনশন কে ভিত্তি মেনে সেই ভিত্তিতে যেকোন দুই রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধ সংঘাতের আপোষ মীমাংসা [arbitration] ও বিচার [ Legal judgement] করে নেয়া।
    তাহলে জাতিসংঘের মূল কাজ হল,  আন্তর্জাতিক কনভেনশন, আইন তৈরি করা; আর যেকোন দুই রাষ্ট্রের (বা কতগুলো রাষ্ট্রস্বার্থের) স্বার্থবিরোধ সংঘাত দেখা দিলে ওসব আন্তর্জাতিক কনভেনশন, আইন এর ভিত্তিতে তা নিয়ে যতদুর সম্ভব যুদ্ধ এড়িয়ে একটা আপোষ মীমাংসা [arbitration] ও বিচারে পৌছানো। এককথায় যথা সম্ভব যুদ্ধ এড়ানো।
    একটা দেশ-সমাজে যেমন বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার উপায় খুজা হয় ও সম্ভব; ঠিক সেরকম আন্তরাষ্ট্রীয় সমাজেও জাতিসংঘের অধীনে আগে থেকেই তৈরি আন্তর্জাতিক নানা আইন-কনভেনশন কে ভিত্তি মেনে একটা আপোষ মীমাংসা  ও বিচারে পৌছানোর চেষ্টা করা যাতে রাষ্ট্রস্বার্থের বিবাদগুলোতে যুদ্ধ না করেই মীমাংসা করে দেয়া যায়।

    তবে মনে রাখতে হবে জাতিসংঘের জন্ম ভিত্তি হল কোন ভুখন্ডের বাসিন্দাদেরকে অন্য কোন রাষ্ট্রই কলোনি করে রাখতে পারে না। কলোনি দখল হারাম। আর কোন ভুখন্ডের বাসিন্দারাই একমাত্র এক্তিয়ার রাখে যে তারা কার দ্বারা, কিভাবে শাসিত হতে চায়। অর্থাৎ কলোনি দখলদারদের (যেমন বৃটেন) এব্যাপারে কিছুই বলার কোন এক্তিয়ার নাই।  এটাই জাতিসংঘের জন্ম ভিত্তির নীতি।

    আবার এর ভিতর দিয়ে পড়ে পাওয়া গেছে আরেকটা দিক! কেমন সেটা?
    যেহেতু কোন ভুখন্ড বা দেশের ভাগ্য কী হবে তা নির্ধারণের একমাত্র এক্তিয়ার ও ভিত্তি হল ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দারা আর এই নীতি ও ভিত্তি মানা হয়েছে কলোনি শাসন নিষিদ্ধ করতে; কিন্তু এতে এই ফাঁকে যেকোন রাজা-বাদশা-আমীর-মোনার্কি সকলের শাসনই জাতিসংঘের চোখে অবৈধ হয়ে গেছে। যেমন বাংলাদেশের বেলায়,  কেবলমাত্র বাংলাদেশের বাসিন্দারা যদি  রাজা-বাদশা-আমীর-মোনার্কি শাসন চায় তবেই কেবল এসব শাসন থাকতে পারে। জাতিসংঘও তা মানবে। কিন্তু না হলে???  না হলে বাংলাদেশের মত সকল বাসিন্দা রাজা-বাদশা-আমীর-মোনার্কি সকলের শাসনই জাতিসংঘের চোখেও অবৈধ হয়ে যাবে।   ঠিক যে জিনিষটা এখনকার আফগানিস্তানে হয়ে আছে!!!

    নেহেরুর জাতিসংঘ বুঝঃ
    নেহেরুও জাতিসংঘের এই জন্মগত ভিত্তি নিয়ে কোন ধারণা নাই। এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল কাশ্মীর ইস্যু! নেহেরুর ধারণা কাশ্মীরের শেষ রাজা যেহেতু অখন্ড কাশ্মীরকে (-ইন্সট্রুমেন্ট অব একশেশন) চুক্তি করে ভারতের সাথে যুক্ত করে দিয়ে গেছে তাহলে তো সারা কাশ্মীরই ভারতের অংশ হয়ে গেছে। এইবার ভাল মানুষ সেজে এসব কাগুজে দলিলের কপি জাতিসংঘের কাছে পাঠিয়েছিলেন নেহেরু। এই ভরসায় যে তাহলে এই বার নিশ্চয় জাতিসংঘ অখন্ড সারা কাশ্মীরকে ভারতের অংশ বলে রায় দিবে!!! কিন্তু হায়! নেহেরু জানেনই না যে জাতিসংঘের জন্ম ভিত্তি কী? জাতিসংঘ যে রাজার এক্তিয়ার মানে না; বরং ভুখন্ডের বাসিন্দাদের মতামত মানে গণভোট বা রেফারেন্ডামকেই একমাত্র ভিত্তি মানে তা নেহেরুর জানা ছিল না। তাই জবাবে জাতিসিঘ নেহেরুকে জানায় যে কাশ্মীরে কেবলমাত্র একটা গণভোটই এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে পারে। কাজেই রাজার ইচ্ছা নয়, বাসিন্দাদের গণভোট – একমাত্র এর ভিত্তিতেই একমাত্র ঠিক হয়ে পারে কাশ্মীর কার সাথে যুক্ত হবে নাকি নিজে স্বাধীন থাকবে। এর পরবর্তিতে নেহেরু সহ কেউই সেই গণভোট অনুষ্ঠান আর আয়োজন করেন নাই। অথচ সবাই দাবি করে চলেছেন সারা কাশ্মীর নাকি ভারতের?????

    তাহলে এখন আমরা জানতে পারলাম যে কেন আমেরিকা জাতিসংঘ ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়তে চেয়ে এসেছে সব সময়। এমনকি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯২০ সালে ততকালীন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনও এক “লীগ অব নেশন” গড়তে চেয়েছিলেন একই কারণে। আর তাতে আমেরিকা বুঝে গিয়েছিল যে কলোনি শাসন দুনিয়া থেকে উচ্ছেদ না করলে  “লীগ অব নেশন” এর মত সংগঠন টিকবে না। একারণেই জাতিসংঘ গড়ার বেলায় প্রথম শর্ত বা ভিত্তি করেছিলেন যে কলোনিদখল অবৈধ – এটাই হবে মূলভিত্তি।
    আর একারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাতিসংঘ ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়তে প্রস্তাব রাখেন ততপকালীন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট!

     

    স্তালিন রুজভেল্টের জাতিসংঘ গড়ার প্রস্তাব প্রত্যাখান করেনঃ
    সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট স্তালিন রুজভেল্টের জাতিসংঘ গড়ার প্রস্তাব সবার আগে প্রত্যাখান করেন। কেন?
    স্তালিনের আপত্তি বা প্রত্যাখান ছিল জেনুইন। তাই-ই হবার কথা! কেন?
    রুজভেল্ট জাতিসংঘ চাচ্ছেন আন্তঃরাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধ গুলোকে অনেকখানি বা যতদুর সম্ভব কমিয়ে আনার জন্য – বিচার সালিশীর মাধ্যমে মীমাংসার পথ খুলবার জন্য জাতিসংঘ ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়তে চান। সেটা ঠিকই আছে। কিন্তু স্তালিনের আপত্তিটা সেখানে ছিল না। স্তালিনের আপত্তিটা ব্যবহারিক! কারণ, বাস্তব দুনিয়ায় জাতিসংঘ বাস্তবায়নের সমস্যাগুলো অন্য কোথাও। সেটা কোথায়?
    স্তালিনের সঠিক এক যুক্তি ছিল যে জাতিসংঘের কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি বা নিয়ম কী হবে?  মানে কী ধরণের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় মানে তা কী ৫০% এর বেশি সদস্যদেশ একটা অবস্থানের পক্ষে থাকলেই সেটাই জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত হয়ে যাব? স্তালিন এমন জাতিসংঘ গড়ার বিরোধী ছিলেন! এমনকি যদি বলি এটা ৫১% না; একেবারে ৬৬% সদস্য একদিকে থাকতে হবে কিংবা ৭৫% সদস্য একদিকে থাকতে হবে – এভাবে ভিত্তি ঠিক করতে হবে? তাতেই কিছু এসে যাবে না। তবু স্তালিনের আপত্তি সঠিক! কেন?

    কারণ, যেটাকে আমরা পরাশক্তি বলে বুঝি এর সারকথা হল ইনফ্লুয়েন্স বা প্রভাব! অন্য রাষ্ট্রের উপর প্রভাব ছড়ানো। এমন পরিস্থতিতে যেকোন পারসেন্টেজের ভিত্তিতেই এমন সিদ্ধান্ত হোক না কেন তা আপত্তিকর হবে। কারণ, আমেরিকা এই প্রভাব বিস্তার করতে পারার সক্ষমতা রাখে। আমেরিকা শুধু অবকাঠামো ঋণ বিতরণ করেই ৭৫% এর বেশি গরীব-দেশকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। যেটা এখন পালাবদলে চীনের হাতে ও দখলে ক্রমশ তা চলে যাচ্ছে!  অর্থাৎ ফলাফলে এভাবে জাতিসংঘের সব সিদ্ধান্তই রাশিয়া বা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আমেরিকার পক্ষে একচেটিয়া ভাবে  নিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। তাই স্তালিনের আপত্তি জেনুইন! আর ওদিকে রুজভেল্টের কাছে ব্যাপারটা হল, সোভিয়েত ইউনিয়নকেও রুজভেল্টের প্রস্তাবের পক্ষে “অনবোর্ড” বা তুলে নিতে না পারলে জাতিসংঘ ধরণের কোন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান জন্মাবার কোন চান্স নাই! তাহলে?
    সারকথায়, কাজেই স্তালিনের আপত্তির জবাব বা একটা সন্তোষজনক জবাব বা আরো ভাল করে সংশোধিত প্রস্তাব আনা – সেটা রুজভেল্টকে করতে হবেই!

    আসলে রুজভেল্টের দিক থেকে সেই মোক্ষম সংশোধিত প্রস্তাবটাই ছিল ‘ভেটো পদ্ধতি’। আসলে ভেটো মানে ঠিক কী বুঝায়?  জাতিসংঘের মত প্রতিষ্ঠানে যেসব সদস্যের ভেটো ক্ষমতা থাকবে এর মানে হল সেসব রাষ্ট্রেরও ভোট একটাই অবশ্যই। কিন্তু সে দেশ একা আপত্তি দিলেই ঐ প্রস্তাব আর পাশ করার অযোগ্য হয়ে যাবে। এই হল ভেটোসদস্য কথাটার অর্থ! অর্থাৎ জাতিসংঘের কোন প্রস্তাব পাশ ঠেকাতে গেলে এক ভেটোসদস্য ওয়ালা দেশের ভোটই যথেষ্ট! এই হল ভেটোর খাস অর্থ!

    তাহলে পাঁচ ভেটো সদস্য করার মানে কীঃ
    এটা ব্যাখ্যা বুঝলে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠানকে আরও ভাল ভাবে জানা যাবে।
    একথাটা সেই সময়ের প্রেক্ষিতে, কোন কোন দেশ তাদের একক সামরিক সক্ষমতাই এত বেশী যে সেই একক দেশ দুনিয়াতে গ্লোবাল সামরিক যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়া সম্ভব? এমন প্রভাব বিস্তারি সক্ষমতার চারটা দেশকে চিহ্নিত করা হয়েছিল প্রথমে। এরা হল,  সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়ন, আমেরিকা, ইউকে আর ফ্রান্স। কিন্তু তাতে এবার চিন্তা করে দেখা যায় যে এর সবগুলোই পশ্চিমাদেশ! কিন্তু এতে এশিয়ায় কোন দেশ নাই কেন? এই প্রশ্ন উঠবে। তাই উপস্থিত সময়ের হিসাবে সামরিকভাবে সেসময় একমাত্র জাপান-ই ছিল কলোনিয়াল পাওয়ার হিসাবে এশিয়ায় অন্য যেকোন দেশের চেয়ে সামরিক দিকে সবার চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু জাপান আবার ছিল হিটলার-মুসোলিনির ক্যাম্পের ও তাদের সঙ্গি! অতএব জাপান বাদ হয়ে যায়। এর বদলে জাপানের হাতে সবচেয়ে নিগৃহিত চীনের কথা মাথায় আসে। এছাড়া চীনের প্রতি আমেরিকার এক প্রবল আগ্রহও ছিল। তাই এশিয়া থেকে চীনকে যে আগামিতে শক্তি হয়ে উঠবে বা আমেরিকা একে গড়ে নিবে এই ধারণা থেকেই আমেরিকা চীনের নাম প্রস্তাব করেছিল। এছাড়া আসলে আমেরিকা ছাড়া বাকি তিনদেশ (সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইউকে আর ফ্রান্স) এরা নিজে ভেটো ক্ষমতা পাবে এটা শুনেই তারা আমেরিকার উপর এতই সন্তুষ্ট ছিল যে তারা আর আমেরিকার চীনের নেয়ার ব্যাপারে (ভেটো সদস্যপদ দেয়াতে) আপত্তি করে নাই। যদিও মনে রাখতে হবে সেসময়ের চীন সেটা মাওয়ের চীন নয়। মাওয়ের উত্থান বা কমিউনিস্ট বিপ্লব হয়েছিল আরো চার বছর পরে ১৯৪৯ সালে। তাই কোন দেশ আর চীন নিয়ে আপত্তির কিছু দেখে নাই!

    তাহলে সারকথাটা এখন কী হল?
    হল যে, সে সময়ের প্রেক্ষিতে সামরিক শক্তিতে যেসব দেশ একাই একটা যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি বা বাড়িয়ে নিবার ক্ষেত্রে সক্ষম তাদেরকেই ভেটো ক্ষমতা পাবার যোগ্য বিবেচনায় ভেটো-সদস্যপদ দেখা হয়েছিল। যারা একক দেশ ভেটো প্রয়োগ করে দিলে মানে তাদের যে কারো একটা ভোটই জাতিসংঘের যে কোন সিদ্ধান্ত হতে বাধা দিবার জন্য যথেষ্ট ছিল!  তার মানে সাথে আরেকটা কথাও পরিস্কার হয়ে যায় যে কোন সিদ্ধান্ত হতে গেলে ভেটোওয়ালা এই পাঁচ রাষ্ট্র একদিকে বা একমতে থাকলেই জাতিসংঘের আসরে সেতা সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে।
    কাজেই যারা সাম্যের ভিত্তিতে জাতিসংঘকে ক্লাব হিসাবে বুঝতে বা বানাতে চায় বা এমন ক্লাব কেন হয় নাই এমন আবদার করে তাদের থেকে আমরা অনেক দুরে। আর এতে আমরা এইবার অনেক জটিল সমস্যা সমাধান করে ফেলেছি তাই দেখছি!

    সারকথায়, জাতিসংঘ এর সদস্যেরা এরা সকলের সমান অধিকার ভিত্তিক পাড়ার কোন ক্লাব নয়ঃ
    এককথায় জাতিসংঘ এর সদস্যরা সবাই সম-অধিকারের এমন সদস্য না। এবং এটা বলে কয়ে। কারণ, জাতিসংঘ গড়ার ক্ষেত্রে এর সবচেয়ে বড় অসুবিধা হল, জাতিসংঘ এর যে কোন বিশেষ একটা দেশকে একেবারেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বিশেষত, যে দেশের সামরিক সক্ষমতা এমনই যে সে জাতিসংঘ সদস্যপদ ত্যাগ করে চলে যেতে পারে আর পরে একাই দুনিয়ায় হাঙ্গামা-অস্থিরতা তৈ্রি করতে সক্ষম! তাই বাস্তবের এই দুনিয়ায় সাম্য-অধিকারের ভিত্তিক কোন জাতিসংঘ গড়া অসম্ভব! জাতিসংঘ তা নয়ও!
    তাই জাতিসংঘকে বুঝতে হলে এর জন্মের প্রয়োজন কী ছিল সেদিক থেকে একে বুঝতে হবে। জাতিসংঘের জন্মের মূল প্রয়োজনটা হল যে দুনিয়াতে যুদ্ধ ছাড়াই যত বেশি আন্তঃরাষ্ট্রীয়-বিরোধ মীমাংসা করে দেয়া যায়। আর এটাই হবে জাতিসংঘ জন্এমামোর মাপকাঠি বা সাফাই! আর এতে এর সদস্য সকলের সমান অধিকারেরই হতে হবে এমন বায়না ধরা হয় নাই।

    অথচ এখন ভারতের জয়শঙ্কর-কে দেখেন! জাতিসংঘ কী ও কেন তা নাবুঝার সুবিধা নিয়ে তিনি যা মনে চায় বলে গেছেন! যাকে বলে অজ্ঞতার সুবিধা, তা তিনি পুরাটাই ভোগ করেছেন! যেমন তিনি কথা বলেছেন একটা পুর্ব-অনুমান বা এজাম্পশনের উপর দাঁড়িয়ে যে সবচেয়ে ভাল বা আদর্শ হবে যদি জাতিসংঘ কে সবাই সমান অধিকারের সদস্যদের এক ক্লাব বলে গড়ে নেয়া যায়।  তাই তিনি অবলীলায় বলে যাচ্ছেন, কেন প্যাসেঞ্জার বাসের বুড়া যাত্রীরা যেমন ছোকরাদের জন্য বা নিউ-কামারদের জন্য সিট ছেড়ে দেয় না? জয়শঙ্করের এমন উদ্ভট বক্তব্য দিতে পেরেছেন জাতিসংঘ কেন জন্ম দেয়া হয়েছিল তা না বুঝলে যে সুবিধা নেওয়া যায় তা নিয়ে এমন যা খুশি তো বলাই যায়! তাই না!

    আর বাস্তবতা হল, উপরে আমরা দেখিয়েছি কোন দেশ যদি একাই এমন সামরিক শক্তির না হয় যে সে একাই দুনিয়াতে নিয়ন্ত্রণ অযোগ্য পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে তাহলে সে দেশের ভেট ক্ষমতার সদস্যপদ পাবার সম্ভাবনা নাই।  আগে সেই সামরিক শক্তি অর্জিত হয়ে থাকতে হবে।   অথচ ভারত নিজ সক্ষমতার খবর না নিয়েই চীনা সীমান্তে এগিয়ে মার খেয়ে এসেছে!

    আবার দেখেন জয়শঙ্করের ভারত মনে করে পাঁচ ভেটো সদস্যদের চারটাই নাকি ভারতের অন্তর্ভুক্তি কামনা করে বা সমর্থন করবে! এই কথা শুনে মনে হয় এটা যেহেতু একটার বিরোধীতার বদলে চারটা ভেটো সদস্যের সমর্থন অতএব ভারতের ভেটোপদ পাওয়া উচিত! অবশ্যই এটা যথেষ্ট না। কারণ এখনকার নিরাপত্তা পরিষদের নিয়ম হল জাতিসংঘের যেকোন সিদ্ধান্ত  গৃহীত হতে হলে পাঁচ ভেটো সদস্যের পাঁচটাকেই ভারতের পক্ষে ভোট দিতে হবে। এটা ৪ঃ১ এমন না!

    তার মানে মূল সমস্যা হল, জাতিসংঘ কেন জন্ম হয়েছে কী এর লক্ষ্য ইত্যাদি এসবের কোন খবর নাই, খবর না রেখেই জয়শঙ্কর ভাবছেন তার অজ্ঞতা মানুষ বুঝবে না!

    জাতিসংঘের কথিত সংস্কার!
    গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদল ঘটা শেষ না হল জাতিসংঘের কোন সংস্কার হবার সম্ভাবনা একেবারেই কম! জাতিসংঘের যখন প্রথম জন্ম হয়েছিল তখন বাস্তবে বিপুল বিনিয়োগ করতে যোগ্য বা একাই যুদ্ধে বিপুল ব্যায়বহন সক্ষম এক আমেরিকা আগেই হাজির হয়ে ছিল। তাই সেই ওজনের উপর ভর করে প্রতিদ্বন্দ্বীদের পক্ষে নেয়া সহজ হয়েছিল। এই বিচারে পালা এবার চীনের এবং চীনের লক্ষ থেকে সেটা হতেই হবে বলেই অনুমান! জয়শঙ্করের উচিত হবে সেই ১৯৪২-৪৫ সময়কালকে স্টাডি করা। সেসময়কালের আমেরিকান ইতিহাস ঘাটতে হবে। এটা ভারত বলে নয়।  গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদল ঘটা শেষ হলে তবেই জাতিসংঘের কোন সংস্কার হবার সম্ভাবনা। তাতে এটা ভারত বলে নয় অন্য যেকোন রাষ্ট্রের বেলাতেও একই কথা!

    আশা করি সেপথে যেতে সবার আগে না জেনে ফটাফট কথা বলে বসা আমাদের বন্ধ করতে হবে!

     

     

     

     


    সর্বশেষ আপডেটঃ   ২৫ ডিসেম্বর ২০২৩,  রাত ০৮ঃ ১০

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • আরব স্প্রিং – বাঘ আসছে বলে এক ভুয়া প্রপাগান্ডা

    আরব স্প্রিং – বাঘ আসছে বলে এক ভুয়া প্রপাগান্ডা
    গৌতম দাস
    ১৯ ডিসেম্বর ২০২৩  ১৯ঃ ৫৭

    https://wp.me/p1sCvy-5bf

     

                      Timeline: How the Arab Spring unfolded

    শেষের কথা এখন শুরুতেঃ
    আজ এখন ১৯ ডিসেম্বর ২০২৩ রাত পোনে বারোটা। আজ এনটিভি নিউজে দেখলাম ঢায় রাশিয়ান রাষ্ট্রদুতের একটা বক্তব্য প্রচার ও দেখানো হয়েছে। যার সারকথা হল, তিনি বলছেন রাশিয়া বাংলাদেশে বয়াসে আমেরিকার সাথে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা করবেন না – মোটাদাগে এই হল বয়ান। যেটা ঢাকায় ম্যানুফাকচার্ড আরব স্প্রিং সংক্রান্ত অসৎ প্রপাগান্ডা থেকে তারা সরতে চায় এমন বলে মনে হয়েছে।

    প্রিন্ট মিডিয়া থেকে এখন ভোরবেলা পাওয়া বয়ানটা হলঃ
    “বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে কোনও প্রতিযোগিতা করছে না রাশিয়া। তবে পশ্চিমা দেশগুলো কী করেছে, আর কী করতে পারে, তা মস্কো তুলে ধরেছে”।

    কিন্তু কী করতে পারে বলে আগাম যা ঘটে নাই তা নিয়ে এই প্রপাগান্ডার দরকার কী?  সেটা আমরা বুঝতে পারি নাই। একাজটা নিজেই কী এক হস্তক্ষেপ নয়? ঢাকার রাশিয়া দুতাবাসের কী কাজের অভাব পড়েছে? বাংলাদেশের পাবলিক কী নিজস্বার্থ নিজে বুঝতে অক্ষম? disgusting! এটা রাষ্ট্রদুত-সুলভ এক্সপেক্টেড আচরণ হয় নাই!

    এমনিতেই সবচেয়ে বড় কথা মুখপাত্রের  জাখারভা কথিত বিবৃতি যেই দিয়ে থাকুক এটা সীমা ছাড়ানি। ঐ বিবৃতি লিখেছে – “গত ১২-১৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশে সরকারবিরোধীরা রাস্তাঘাট অবরোধ করে, যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়”। এই বক্তব্য একেবারে খুবই এক্তিয়ার বহির্ভুত। ফলে এটা রাশিয়ার প্রমাণিত হস্তক্ষেপ। কারণ,  রাশিয়া কিভাবে নিশ্চিত হল যে  গত ১২-১৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশে সরকারবিরোধীরা রাস্তাঘাট অবরোধ করে, যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে??? এটা রাশিয়ার কেউ কিভাবে জানল, নিশ্চিত হল? কোন জুডিশিয়াল তদন্ত কী হয়েছে? কে করেছে? তদন্তকারীদের সাথে রাশিয়ার যেকেউ এর কী সম্পর্ক? কী এক্তিয়ার???   ঢাকার রাশিয়ার দুতাবাসের আমেরিকা হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেই চলেছে।

    তাহলে সেই রাশিয়ান দুতাবাসের এই লিখিত বয়ান এটা কী আমেরিকানদের হস্তক্ষেপ এর চেয়ে বড় হস্তক্ষেপ নয়? তারা তো আমাদের ঠুঠো বিচার বিভাগেরও বাপ হয়ে বসেছে যে রায় দিয়ে বলে দিচ্ছে কে আগুন দিয়েছে!!! এটা কিভাবে তারা করতে পারে??????

    মূল লেখার শুরু এখান থেকেঃ
    আরব স্প্রিং – এই বাঘ আসছে বলে প্রপাগান্ডা শুরু হয়েছে বাংলাদেশে! বলা হচ্ছে এনিয়ে নাকি এক বিবৃতি দিয়েছে রাশিয়া! এনিয়ে বাংলায় রিপোর্ট করেছে সমকাল; যদিও তাদের প্রিন্ট ভার্সানে এর হদিস পাওয়া যায় নাই। তবে বাংলা বিবিসি আবার অফ চান্সে কিছু কামিয়ে নিতে নিজ মুরোদে বা বরাতে না বরং, সমকালের প্রিন্ট বা ই-পেপার ভার্সানের ঘাড়ে চড়ে একখানা রিপোর্ট ছেড়ে দিয়েছে। আবার যুগান্তর এর রিপোর্টটা এককাঠি সরেস আর সেটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা। মিথ্যা বলছি কারণ যুগান্তর লিখেছে, ১৫ ডিসেম্বর এ বিষয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছেন রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা। খবর তাসের। অথচ এই প্রপাগান্ডা খবরটা তাস (রাশিয়ান নিউজ এজেন্সী তাস বা TASS) এর সাথে সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় নাই।

    আরেকটু ভেঙ্গে বলা যাক!
    এই প্রপাগান্ডা খবরের সোর্স বা উতস বানানো হয়েছে ঢাকার রাশিয়ান দুতাবাসের ফেসবুক ভেরিফায়েড পেজ থেকে করা এক স্টাটাস কে। যদিও সেখানেও একটা টুইস্ট আছে। বলা হয়েছে এটা রাশিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাকারভা তাঁর এক মন্তব্য থেকে নেয়া [Comment by Russian Foreign Ministry Spokesperson Maria Zakharova on the danger of destabilization of the situation in Bangladesh], কিন্তু সেই মন্তব্য কোথায় পাবলিকলি দেখা যায়, ছাপা হয়েছে এমন এর হদিস দেয়া হয় নাই। মানে পাবলিকলি কোথায় ছাপা হয় নাই, হয়ত আভ্যন্তরীণভাবে রাশিয়ান সরকারি ইন্টার-অফিস মেমো কোন হতে পারে। অথবা আসলে জাকারভা এমন কোন মন্তব্য করেনই নাই। তবে ঢাকার রাশিয়ান দুতাবাসের এই ফেসবুক পেজ – এটা ভেরিফায়েড পেজ সেখানে এটা ছাপা হয়েছে– তাই এটাই কেবল ভরসা! আর আমাদের সাদা চোখে  অন্তত এটুকু বলা যায় যে – ঢাকার রাশিয়ান দুতাবাস-ই সবকিছুর জনক!!

     

    এটা তাসের খবর নয়ঃ
    কিন্তু যুগান্তরের ভাষ্য অনুসারে “এটা তাসের খবর” এর প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। যদিও এটা সত্য যে মুখপাত্র মারিয়া জাকারভার তাস-কেই তার বিবৃতিগুলো সাধারণত দিয়ে থাকেন। কিন্তু কথিত এই আরব স্প্রিং- নিয়ে খররেরটা – এটা তাসের লিস্টে নাই। জাকারভা তাসকে যে বিবৃতির কপি দিয়ে থাকেন তার চলতি এমাসের লিস্ট এখানে দেয়া হল, তাস এর ওয়েব সাইট ঘেটে। তাতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কোন বিবৃতি নাই। কাজেই যুগান্তর এর দাবি ভিত্তিহীন!

     

    প্রসঙ্গ দুইঃ আরব স্প্রিং নিয়ে মূল ফেসবুক স্টাটাসে কী লেখা আছে
    আগেই বলেছি এই প্রপাগান্ডা খবরের একমাত্র উতস হল ঢাকার রাশিয়ান এমবেসি এর ফেসবুক পেজ।  আর সেখানে আরব স্প্রিং প্রসঙ্গে এক প্যারায় শেষ বাক্যে কয়েকটা শব্দ আছে মাত্র। তা হল,……the lines of the Arab Spring are likely.। বাংলায় বললে আমেরিকা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে, আরব স্প্রিংয়ের লাইন নিতেও পারে – এরকম।
    এর বাইরে আরব স্প্রিং সংক্রান্ত কোন ভাষ্য-বক্তব্য ঐ বিবৃতিতে নাই। এর সোজা মানে হল আরব স্প্রিং বলতে  রাশিয়ান এমবেসি আসলে অস্থিতিশীলতা মানে আমেরিকার তৈরি অস্থিতিশীলতা বুঝিয়েছে। কিন্তু আরব স্প্রিং জিনিষটা কী?  মনে করার কারণ আছে যে ঢাকার রাশিয়ান এমবেসি বা মুখপাত্র জাকারভা -প্রমুখের আরব স্প্রিং বুঝাবুঝিতে ঘাটতি আছে!

    আরব স্প্রিং জিনিষটা কীঃ
    প্রথম কথা বাংলাদেশ সরকার বহুদিন থেকেই আমেরিকান সরকারকে বাংলাদেশ আরব স্প্রিং কর্মসুচী চালাতে সহযোগিতা করে আসছে। কিভাবে সেটা?
    আর বহুদিন থেকেই মানে কবে থেকে?  আরব স্প্রিং এর জন্ম মোটামুটি ২০১১ সাল থেকে, সেসময় থেকেই। উপরে সেই টাইম্লাইন নিয়ে আল-জাজিরার একটা রিপোর্টে প্রকাশিত ছবিতে সেই লিঙ্ক দিয়েছি। বাংলাদেশের প্রধান সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা অনেক কলেজে ইয়ুথ প্রোগ্রাম বলে একটা কিছু চালু আছে । এই ইয়ুথ প্রোগ্রাম টাই আরব স্প্রিং এর থিতু ভার্সান।  এটাই আমেরিকান সরকারি দাতা প্রতিষ্ঠান USAID এর প্রধান প্রোগ্রাম বা কর্মসুচী। আর আরব স্প্রিং অবশ্যই আমেরিকার সরকারি কর্মসুচি কিন্তু এর উদ্দেশ্য কোন দেশকে ঠিক “অস্থিতিশীল করা” – এটা বেশি কথা বলা, too much। তবে অবশ্যই এটা ওয়ার অন টেরর [war on terror] এর সাথে সংশ্লিষ্ট কাজ।

    কিন্তু পাঠকেরা এখন খুঁজে দেখতে পারেন দুনিয়া ১৯৩ টা দেশ (যারা সবাই জাতিসংঘের সদস্য) এদের মধ্যে কেন দেশের সরকার এতে সামিল ছিল না? বরং সবাই বুশের জমানায় (২০০১-২০০৯) বিশেষত প্রথমদিকে ওয়ার অন টেরর এরঅংশ বা সমর্থক ছিল !!! যেমন সেসময়ের পুতিনের রাশিয়া চেচেন সমস্যার কারণে, চীন উইঘুর সমস্যার কারণে (ওদিকে ভারতের কথা আর কী বলব) এতে এমন সবাই সক্রিয়ভাবে ওয়ার অন টেররে যুক্ত ছিল; মানে এভাবে কোন দেশের সরকারই বাদ ছিল না। আর সেসময়ে বাদ থাকার চেষ্টা করলে কী হত এর উদাহরণ বাংলাদেশের বিএনপি!  কারণ, সেটা ছিল বাংলাদেশে বিএনপি সরকারের আমল (২০০১-৬)। এই দল ‘বুদ্ধিমান’ সাজতে গিয়ে বেশি করে ধরা খেয়েছিল, যার প্রভাবে এখনও বিএনপি ভুগে থাকে!! বিএনপি’র সরকার বুদ্ধিমান সাজতে আমেরিকার সাথে ‘এলাইনে না থেকে’ গড়িমসি করতে গেছিল, দুনিয়া বা জাতিসংঘ বুঝে নাই বলে! তাই আমেরিকান থাবড়া খেয়েছিল। আর ঠিক এটারই সুযোগ নিয়ে হাসিনা কথিত জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াকু থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েই তো  পরে ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় এসেছিল।

    ঘটনা হল ২০০৫ সালের মাঝামাঝিতেই এটা আমেরিকার পলিসি লেভেলে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে এই ওয়ার অন টেরর-এ বিশেষত, আফগানিস্তানে আমেরিকার পা আটকে গেছে। কোনদিন শেষ হবে না এমন এক যুদ্ধে আমেরিকা আটকে গেছে। এমনকি আবার এই যুদ্ধ থেকে প্রত্যাহার করে গুটিয়ে বাড়ী ফিরে যাওয়াও সহজ না। সেটা ছিল আমেরিকার এমনই এক দশা পরিস্থিতি। অথচ এই যুদ্ধের সব শরীকদের খরচও আমেরিকাকে একা বইতে হচ্ছিল। তাই প্রথম কাজ হয়ে পড়েছিল বিকল্প কী করা যায় এনিয়ে পলিসি বদলাবার জন্য গবেষণায় নামা। একাজে যে গবেষণা ও সুপারিশটা বেশি গৃহিত হয়েছিল সেকাজটা ছিল RAND Corporation  (এক চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান, ‘স্বাধীন’ থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ধরণের) এর করা গবেষণা-সুপারিশ।  [ এনিয়ে আমার পুরানা লেখায় বিস্তারিত আছে। এমনকি এনিয়ে RAND এর রিপোর্টটা তারা পাবলিকলি কপি পাবার ব্যবস্থা করেছিল সেসময়, আমার সে লেখায় এর হদিস ও রেফারেন্স আছে। আমাকে খুজে বের করতে পাঠক একটু সময় দিবেন।] লিঙ্কটা এখন পেলাম এখানে  । আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ RAND এর সেই রিপোর্ট এখানে দিলাম।

    এখন বুশের দুই টার্মের পরের ওবামা-হিলারি প্রশাসন (২০০৯-২০১৭ জানুয়ারি) ক্ষমতায় এলে তাঁরা এই  RAND এর রিপোর্টটা বাস্তবায়নের জন্য কাজে নেমে পরেছিল। ওবামার সেই নয়া পলিসিরই টোকেন নাম ছিল আরব স্প্রিং [Arab Spring]। যদিও আমেরিকান রেওয়াজ অনুসারে ওবামা প্রশাসন এনিয়ে তারর মূল পলিসিটা (RAND এর রিপোর্টটার কোনটা আর কতখানি এর বিস্তারিত দিকটা) প্রকাশ্য পাবলিক ডকুমেন্ট করা হয় না। তবে তাদের প্রশাসনের প্রকাশ্য কাজগুলো অনুসরণ করলে বা এনিয়ে কংগ্রেস-সিনেটের তৎপরতা একেবারেই প্রকাশ্যে লাইভ-টিভিতে দেখানোর যোগ্য বলে  তাদের থেকে এর অনেকটাই জানা যায়। এছাড়া, আমেরিকান এলিটদের ফরেন এফেয়ার্স ম্যাগাজিনে হিলারি ক্লিনটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় কি কী লেখা ছেপেছিলেন [তা নিয়ে দুইটা লেখা এখানে আর এখানে পাবেন]। তাথেকেও অনেকটাই জানা যায়।

    আরব স্প্রিংয়ের দুই(!) ভার্সানঃ
    কমকথায় সংক্ষেপে বললে, ওবামার এই আরব স্প্রিং [Arab Spring]  এর আবার দুটা ব্যবহারিক রূপ বা ভার্সান দেখতে পাওয়া যায়। একটা বলা যায় কাতার-কেন্দ্রিক; যার মধ্যে জড়িত ছিল ইসলামি স্কলার কারযাভী [Yusuf al-Qaradawi]। এরই আবার সবচেয়ে বড় প্রোগ্রামটাই ছিল মিসরেরটা; যেটা পরিণতিতে মিসরে মোরসি’কে ক্ষমতায় এনেছিল। যদিও রাখতে পারে নাই। আর বাংলাদেশ থেকে অনেককেই এই ভার্সানটা দেখতে-জানতে কাতারে দাওয়াত করা হয়েছিল। তার গিয়েছিলেনও। যতদুর মনে পরে হাসিনা নিজেও আমেরিকান আমন্ত্রণে তা দেখতে গেছিলেন। আবার জামায়াতের নিজামী-মুজাহিদ তখনও বেঁচে। তাদের থেকেও একটা টিম গেছিল। মূল কারণ, সেখানে মানে কাতারে কারযাভীর নেতৃত্বে আরব স্প্রিং [Arab Spring] অফিস-ট্রেনিং কর্মসুচী যেমন ছিল তেমনি খোদ আমেরিকান প্রশাসনের আরব স্প্রিং এর নিজ অফিসও কাতারে ছিল।

    আবার ওবামা-হিলারির আরব স্প্রিংয়ের নামে আরেক ভয়ঙ্কর ভার্সানও ছিল। যেমন লিবিয়ার গাদ্দাফিকে হত্যা ও উতখাত; যেটাতে পরে  বেনাগাজীতে আমেরিকান নিজ রাষ্ট্রদুতসহ স্টাফেরা খুন হয়ে যান। কারণ, সেটা ছিল বেনামে আই-এসের সাথে এলায়েন্স তবে তখনও এই গ্রুপ আই-এস নামধারণ করে নাই। আবার এই গ্রুপকেই কথিত আছে যে আমেরিকা সিরিয়ায় আসাদকে নামানোর প্রোগ্রাম দেয়া হয়েছিল।  কিন্তু ততদিনে এরা আই-এস নামধারণ করে নিয়েছে। আর তাদের স্বার্থ ও লক্ষ্য ছিল বা হয়ে যায় ইরাক ফিরে দখল। কিন্তু এবার ওবামা এই আই-এস গ্রুপকেই দমন ও খতম করতেই ইরানের সাথে এলায়েন্স করে [ যেটা P5+1 চুক্তি] ও ইরানকে দিয়েই আই-এস কে উতখাত করে এই ধারার আরব স্প্রিং-র পরিসমাপ্তি ঘটায়।
    তবে মনে রাখতে হবে এই  দ্বিতীয় ধারার আরব স্প্রিং যেটা বলা হচ্ছে এর ততপরতাগুলো RAND এর সুপারিশের মধ্যে ছিল না। তাই একাদেমিশিয়ানেরা  আই-এস এর সাথে জড়িয়ে পরা বা সশস্ত্রভাবে ইসলামের নামেই এসব বিরুদ্ধ কাজ-ততপরতাগুলোকেও আরব স্প্রিংয়ের আরেক ধারা বলতে নারাজ। কারণ তাদের যুক্তি হল, আরব স্প্রিংয়ের মৌলিক সারকথা এটা থেকে আলাদা। আর ইরাক-লিবিয়া-সিরিয়া নিয়ে যাকিছু ওবামা-হিলারি করেছেন বা কংগ্রেসে সমালোচিত হয়েছেন সেসব ছিল RAND এর সুপারিশের অবশ্যই বাইরের; তবে সেগুলো ওবামা প্রশাসন-সরকারেরই  আলাদা কাজ-প্রোগ্রাম বা স্বার্থ বটে!

    আরব স্প্রিংয়ের সারকথা কীঃ
    সারকথা হল, মুসলমান দেশ-রাষ্ট্রের বাসিন্দাদেরকে নাগরিক অধিকার এর ধারণা বা বোধ শিখানো – এভাবে সাজিয়ে নেয়া। এজন্য এখন ঢাকায় যে ইয়ুথ প্রোগ্রাম চলছে এর প্রধান দিক হল, বাংলাদেশ রিপাবলিক রাষ্ট্রের তরুণ নাগরিকদেরকে অধিকার শিখানে বা একটা অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্টগুলো সম্পর্কে ওয়াকেবহাল করা।  বাংলাদেশের কলজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ুথ প্রোগ্রাম বলতে এটাই এখনও কার্যকর। অনেক স্টুডেন্ট কে দেখবেন ফেসবুকে পরিচয় হিসাবে নিজেই ইয়ুথ কর্মসুচীতে নিজের যোগ দেওয়ার কথা বলছেন। এর আরেক সবচেয়ে ভাল বা উপযুক্ত উদাহরণ হল মিসরের “অক্টোবর সিক্স গ্রুপ”। যেটা মিসরের মোরসির নির্বাচিত হওয়া পর্যন্তও ছিল সামাজিক সংগঠন। আর এখন যা এক রাজনৈতিক দল যারা নাগরিক রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে চায়, এমন রাজনীতি সচেতন একটা দল।

    কেন RAND এমন সুপারিশে গেছিলঃ
    বুশের ওয়ার অন টেরর সম্পর্কে একটা মৌলিক মুল্যায়ন হল, যে তিনি সেখানে আগ্রাসী ও মুসলমান-বিদ্বেষী হয়েছিলেন; এই অর্থে যে এথনিক-ধর্মীয় মুসলমানকে তিনি  নিচা ও বৈষম্যমূলক চোখে দেখে চলেছিলেন। তাই কেউ সশস্ত্র ইসলামি রাজনৈতিক ধারার না হলেও মুসলমান মাত্রই যে কেউই বুশের বৈষম্য ও নৃশসতার শিকার হয়েছিলেন। এছাড়া সাথে ছিল আরেক কারণ যে, সোভিয়েত পতনের পরে আমেরিকা তখন  দুনিয়ায় একক মেরুর ঝান্ডাধারী। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতন হয়ে গেছে বলে।  ফলে বুশের আমেরিকা চাইলে যাখুশি করতে পারে – এই মিথ্যা ও বোকার উদ্ধত্য ছিল বুশের!! ঘটনাচক্রে, ১৯৯১ ডিসেম্বরে সোভিয়েত পতনের পরে আমেরিকান রিপাবলিকান পার্টি নয় ক্ষমতায় নয় বরং দুই টার্ম প্রেসিডেন্ট ছিলেন ডেমোক্রাট ক্লিনটন। যারা রিপাবলিক বুশের চোখে বোকা অকর্ম! যারা (তখন আমেরিকা একক পরাশক্তি ফলে ) পড়ে পাওয়া সুবিধা নাকি নিতে জানে না!!!  ইত্যাদি এসবই বুশ-কে কার্যত এমন  মিথ্যা শ্রেষ্ঠত্ব ও বোকার উদ্ধত্য – এরই প্রেসিডেন্ট বুশ বানিয়েছিল। যেকোন বিশেষত, মুসলমান অধ্যুসিত রাষ্ট্র হলে তো কথাই নাই – প্রেসিডেন্ট বুশ – তিনি হতে চেয়েছিলেন এমন যেকোন দেশের রেজিম চেঞ্জের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট!

    RAND রিপোর্ট তাই উদাহরণ হিসাবে বলেছিলঃ মানে তারা সেসময়ের ওয়ার অন টেররের আমলের (আমাদের মত) গরীব মূসলমানের দেশের এক সন্ধ্যাবেলার চিত্র এঁকেছিল এভাবে; যে সন্ধ্যার পর ডিনার টেবিলে পরিবার যখন টেবলে একত্রিত হত তখন কোনায় রাখা টিভিটা চালু করে তাদের কমন প্রথম ডায়লগের বাক্যটা হত – “আজ কয়জন”? মানে হল আজ কয়জন আমেরিকান সেনা মরল!   আর সেটাই এরা উতযাপন করত! কারণ এমন প্রত্যেকটা দেশেই থাকত এক স্বৈরাচারি জনবিচ্ছিন্ন সরকার যে আমেরিকা সমর্থিত বলে জন-ঘৃণিত। অতএব ওমন দেশে মধ্য বা উচ্চ মধ্যবিত্ত সমাজ পরিবারগুলো নিজ সরকার-রাজনীতিকে না বলত, দূরে থাকত। অথচ একেবারে গ্লোবাল পরিসরে্র মূল হোতা আমেরিকাকেই গালাগালি মুন্ডপাত করত।  তাই এককথায় যেকোন তৃতীয় বিশ্বের দেশে আমেরিকা-বিরূপতা কমানো RAND এর লক্ষ্য ছিল। আর তা অর্জনের জন্য মুসলমান অধ্যুসিত দেশগুলোতে সরকার ব্যবস্থায় সংস্কার, নুন্যতম জবাবদিহিতা ও পাবলিক অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করাই ছিল লক্ষ্য। আর এতে নুন্যতম অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তায় এক রিপাবলিক হয়ে উঠুক তাদের নিজ নিজ দেশ এই ছিল লক্ষ্য; যাতে  মুসলমান অধ্যুসিত দেশগুলোতে স্থানীয় জনগণ আমেরিকাবিরোধী কম হয় ও নিজদেশের সরকারের সাথে সংস্লিষ্টতাবোধ বাড়ে!

    তবে সাবধান এর সাথে একালে বাইডেনের  মানবাধিকারের পররাষ্ট্রনীতি বা স্যাংশন আরোপ করে চাপ সৃষ্টি ইত্যাদি এসবের সাথে  সেকালের আরব স্প্রিং এর কোন সম্পর্ক নাই, ছিল না। আমরা যেন মাখায় না ফেলি।

    তাহলে কথাগুলো এখন গুছিয়ে সারাংশে বললে,
    ১। গত ২০০৩ সালে বুশের ইরাক দখলের আগে পর্যন্ত দুনিয়ার প্রায় সব সরকারই নিজ নিজ স্বার্থে ওয়ার অন টেররের এককাট্টা পক্ষে ছিল বা থাকতে বাধ্য হয়েছিল; এমনকি জাতিসংঘের যেকোন সিদ্ধান্তেও এরা সকলে একপক্ষে ছিল। যেমন আফগানিস্তান ইস্যুতে (তাই পরে আমেরিকার আফগানিস্তান দখলেও) নিরাপত্তা পরিষদে সকলেই একই পক্ষে মানে আল-কায়েদাবিরোধী দিকে ভোট দিয়েছিল। কেবল ইরাক দখলের আগে ফ্রান্স-জর্মানি এর বিরোধিতা করেছিল কিন্তু বছর খানেক পরে এরাও ইরাক-আফগানিস্তানে সেনা পাঠিয়ে অংশ নিয়েছিল।
    ২। পরে ওয়ার অন টেরর এর এক সংস্কার রূপই হল আরব স্প্রিং। লিবিয়া-সিরিয়ার ঘটনাগুলো বাইরে রাখলে রাশিয়া কখনও আরব স্প্রিং-কে সমালোচনা করেছে জানা যায় না। তাহলে এখন আরব স্প্রিং এর কথা তুলে খোঁচা মারা নেতি দেখানো রাশিয়া – এটা তো নতুন ঘটনা। তাই রাশিয়া আসলেই কী বুঝাতে চাইছে? তারা কী আরব স্প্রিং এর বিরুদ্ধে ছিল? নাকি এখন হাসিনা সরকারের পক্ষে লিপ সার্ভিস এসেছে – তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়।
    ৩। আবার এখন রাশিয়ার আরব স্প্রিং এর ভয় দেখানো এতে কার্যত সরকার কী খুশি হয়েছে? না তাও নয়! পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন এতে খুশি হয়েছেন তা বলতে-দেখাতে পারেন নাই। কারণ, মোমেন-কে প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয়েছে সেটা এই বলে যে এখন আর বাংলাদেশে আরব স্প্রিং এর সম্ভাবনা নাই। তার মানে আসলে সরকারকে দেখাতেই হয়েছে যে সে রাশিয়ার আরব স্প্রিং ভয় ছড়ানোর বিরুদ্ধে!!! তাহলে রাশিয়ার কথিত এই অবস্থান নেয়া – এটা কার পক্ষে গেছে??? মানে কেন মোমেনকে বলতে হয়েছে আরব স্প্রিং এর ভয় নাই???? এটাই হল হাসিনা সরকারের স্ববিরোধ! 
    ৪। এটা সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্ট যে মোমেনের “আরব স্প্রিং বাংলাদেশে আসবে না” এই কথাটা বলার কোনই মানে হয় নাই! কারণ, ইতোমধ্যে USAID ফান্ডেড আরব স্প্রিং এর ইয়ুথ প্রোগ্রামগুলোকে সরকারি (এনজিও ফান্ড হিসাবে) অনুমোদন দিয়েছে বলেই তো এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলছে। তাহলে  মোমেনের “আরব স্প্রিং বাংলাদেশে আসবে না” কথাটার কোনই মানে কী থাকল; পুরাটাই অপ্রাসঙ্গিক!!!

    এর মানে রাশিয়ার “আরব স্প্রিং’ নাম বলে রাশিয়ার যা কিছু খোচাখুচি তা অপ্রাসঙ্গিক, অর্থহীন। মানে এটা কীন সিরিয়াস বক্তব্য-প্রতিক্রিয়া নয়! বাংলায় বললে, এগুলোকেই আমরা খামোখা বলি!!!    জমে নাই এমন অকেজো প্রপাগান্ডা মাত্র! এজন্য কী মুখপাত্র মারিয়া জাকারভা নিজে এই কথিত বিবৃতি দেন নাই!!!

    আবার আরব স্প্রিংয়ের অনেক ফজিলত আছে! যেমন ২০১৩ সালে পাকিস্তানের ইমরানের উত্থান এমনই এক পাকিস্তানি আরব স্প্রিং থেকে।


    শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে এক “আরব স্প্রিং” বানানোর আগ্রহ ছিল আমেরিকার, কিন্তু হয় নাইঃ

    আর একটা তথ্য দেই। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে এক “আরব স্প্রিং” বানানোর আগ্রহ ছিল আমেরিকার, কিন্তু হয় নাই। দেখেন এখানে। অন্য স্বার্থের কাছে হেরে যায়, সফল হতে পারে নাই! সেই ২০১৩ সালের প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক রিপোর্টের শিরোনাম ছিলঃ

    শাহবাগে বাংলা বসন্ত

    এমন অনেক লেখা এখনও পাবেন। আর ভাষ্যগুলো খেয়াল করেন।   কথিত শাহবাগী আন্দোলনের ইমরান এইচ সরকার, তিনিও আসলে ছিলেন President at Youth for Peace & Democracy, Bangladesh (YPD)এই [YOUTH PROGRAM] মানে আরব স্প্রিংয়ের সাথে জড়িত নেতা। তাকে আমেরিকানেরা পুশ করে শাহবাগে পাঠিয়েছিল। প্রথম আলো এনিয়ে দুটা ফিচারও ছেপেছিল।

    ইমরান এইচ সরকার

     

     

     

    কিন্তু পরে রাজীব বা থাবা বাবা খুন হয়ে গেলে ইমরান সহ সকলেই নিরাপত্তা পেতে উন্মুখ হয়ে উঠে আর সরকারের কোলে গিয়ে উঠেছিল। মানে  আমেরিকান এই ইয়ুথ প্রোগ্রামের দিকটা আর সামনে আসতে পারে নাই। সোজা কথার শুরুর দিকে আমেরিকা চেয়েছিল শাহবাগ আন্দোলনকে মিসরের আরব স্প্রিংয়ের মত করে গড়ে দেয়া যায় কিনা……। যেটা শুরুতেই হেরে গেছিল, ফলে পারে নাই।

     

    … আপডেটঃ   ১৯ ডিসেম্বর ২০২৩,  রাত ৯ঃ ৩০
    সর্বশেষ আপডেটঃ   ২০ ডিসেম্বর ২০২৩,  সকাল ০৭ঃ ১০

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • বিএনপি-কে নিয়ে গতকাল, রয়টার্স এর রুমা পালের উচ্ছ্বাস!

     

    বিএনপি-কে নিয়ে গতকাল, রয়টার্স এর রুমা পালের উচ্ছ্বাস!
    গৌতম দাস
    ১৭ ডিসেম্বর ২০২৩

    https://wp.me/p1sCvy-5aD

     

                      Tens of thousands rally in Bangladesh to demand new elections

     

    গতকাল মানে ১৬ ডিসেম্বরের বাংলাদেশ নিয়ে বিএনপি কী ততপরতা করেছে তা নিয়ে রয়টার্স এর খবর খুবই তাতপর্যপুর্ণ এবং তা ইঙ্গিতপুর্ণও বটে!
    বিজয় দিবসের সমাবেশের উসিলায় গতকাল ১৬ ডিসেম্বর বিএনপি পল্টনে নিজ পার্টি অফিসের সামনে জমায়েত ঘটিয়েছিল। এনিয়ে প্রায় প্রত্যেকটা মিডিয়া রিপোর্ট উল্লেখ করেছে যে গত ২৮ অক্টোবর এর ব্যাপক সমাবেশের পরে এটাই আবার বিএনপির ব্যাপক সমাবেশ।  যেমন ধরা যাক, বিডিনিউজ২৪ এনিয়ে তাদের রিপোর্টে লিখেছে , “……গত ২৮ অক্টোবর নয়া পল্টনে সংঘর্ষের কারণে মহাসমাবেশ পণ্ড হওয়ার পর থেকেই তালাবন্ধ নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। ওই বন্ধ কার্যালয়ের সামনেই ছোট একটি ট্রাকের ওপরে অস্থায়ী মঞ্চে বিএনপির নেতারা শোভাযাত্রা শুরুর আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন”।
    গত ২০১৪ সালের কথিত নির্বাচনের পরে বিএনপি ‘জঙ্গীবাদ’ করছে বা বিএনপি ‘অগ্নিসন্ত্রাস’ করছে ইত্যাদিতে সরকারের দিক থেকে এমন সব অভিযোগ তুলে বিরোধীদের কাবু করা হয়েছিল আর এমন মিথ্যা বয়ানকেই পশ্চিমাদের প্রত্যক্ষ সমর্থন ছিল ব্যাপক। তাই সরকারের পক্ষে ব্যাপকভাবে মামলা দিয়ে সেবার বিএনপির রাজনীতির প্রকাশ্য ততপরতা স্তব্ধ করে দেয়া সহজ হয়েছিল।  সম্ভবত সে অভিজ্ঞতার কথা মনে রেখে  এবার ২৮ অক্টোবর পল্টনে মহাসমাবেশে সরকার পন্ড করে দিবার পরে তাই এবার যারা ব্যাপারটা অবজার্ভ বা মনিটর করে চলেছে এমন দেশি-বিদেশি অনেকের মনে প্রশ্ন ছিল আগামি ৭ জানুয়ারি ‘২৪ ঘোষিত নির্বাচনের  তারিখের আগে আর কী বিএনপিকে তারা আবার রাজপথে দেখতে পাবে? এমন সন্দেহ কার্যকর ছিল। বাইরের অবজারভার, এমনকি যারা আশা করছিল বিএনপি মাঠে ফিরবেই, ব্যাপক সমাগম নিয়েই ফিরবে তারাও মনে একটা সন্দেহ রেখেছিল। যেটা প্রকাশ পেয়েছে  ১৬ ডিসেম্বর বিএনপির বাস্তবে সমাবেশ ঘটিয়ে দিবার পরে এনিয়ে প্রকাশিত দেশি-বিদেশি মিডিয়া রিপোর্টগুলোতে।

    বিডিনিউজ২৪ কে মনে করা হয় ইন্ডিয়ার গোয়েন্দা বা ফরেন অফিসগুলোর জন্য বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রতিদিনের নিউজ পেপার কাটিং সংগ্রহ ও সরবরাহের প্রতিষ্ঠান। এজন্য তারা নাকি নামে-বেনামে বিডিনিউজের  শেয়ার কিনে রেখেছে এমন কথা ঢাকায় প্রচলিত আছে। আইনি দিক থেকে যা হয়ত তেমন বড় ব্যাপার নয়। তবে বটম লাইনটা হল, আমাদের সমাজের একটা কমন ধারণা যে,  ভারতের সাথে বিডিনিউজ২৪ এর সাথে “কোন একটা বিশেষ সম্পর্ক” আছে।   সে যাই হোক এই বিডিনিউজ এর গতকালের শিরোনাম ছিল –” বিএনপির শোভাযাত্রায় নেতাকর্মীদের ঢল“। এমনকি বিএনপির এই সমাবেশে সরকারের নির্যাতন বা নিগৃহিত হওয়া এড়াতে বিএনপির আত্মগোপনে থাকা অনেক নেতাও সাহস নিয়ে হলেও সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন; এর একটা ছোট তালিকাও বিডিনিউজ তাদের এই রিপোর্টে উল্লেখ করে দিয়ে রেখেছে।   মানে আমি আসলে উপরের কথাগুলো লিখেছি বিডিনিউজ২৪ এর এমন শিরোনামের কথা মাথায় রেখে যে তারো মনে করছে “বিএনপির শোভাযাত্রায় নেতাকর্মীদের ঢল নেমেছিল” ।  এমনকি বিএনপির ১৬ ডিসেম্বরের সভায় যিনি সভাপতিত্ব করেন বিএনপির সেই ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী তিনিও উল্লেখ করেছেন – “সভাপতির বক্তব্যে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী কয়েক ঘণ্টার আয়োজনে বিপুল উপস্থিতির উল্লেখ করে বলেন, বিএনপি হারিয়ে যায়নি, বিএনপি পালিয়ে যায়নি” – এটাই প্রথম আলো আমাদের জানিয়েছে।

    কিন্তু আসলে তবুও আজকের এই লিখাটা  লিখার প্ররোচনা আমি তখনও বোধ করি নাই। যদিও গত কয়েকদিন ধরে, বাংলাদেশের কথিত নির্বাচন নিয়ে ভারতসহ বিদেশের অনেক পত্রিকার রিপোর্ট পড়েছিলাম।  যেখানে আনন্দবাজার ছাড়া কোন মিডিয়া রিপোর্টই বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতিতে তাদের খুশি, আস্থা বা সন্তুষ্টি বা ইতিবাচক কোন বক্তব্যের রিপোর্ট আমি দেখি নাই! প্রকাশিত বিদেশি এমন রিপোর্ট মিডিয়ায় ছাপানো হয়েছে যেগুলো, এর একটা বড় অংশই আমেরিকান থিঙ্কট্যাংক-গবেষকদের লেখা। যেমন দ্যা ডিপ্লোম্যাট [The Diplomat.com/] ; এই পত্রিকাটা জাপানি ফান্ডে চলা পত্রিকা যা আমেরিকার ভার্জিনিয়া থেকে পরিচালিত। আর কয়েকবছর আগে (যখন আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া আর ভারতকে  চীন ঠেকানোর ঠিকা দিয়ে রেখেছিল] তখন এই পত্রিকার  এক বিশেষ ভার্সান প্রতিদিন জাপান থেকেও প্রকাশিত হত। এখন যা আর দেখি না। সেই ডিপ্লোম্যাটে পরশু ১৫ ডিসেম্বর ২০২৩ প্রকাশিত বাংলাদেশের নির্বাচন প্রস্তুতি নিয়ে একেবারেই বাস্তব সত্য ফলে নেতিবাচক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। শিরোনাম, কেন বাংলাদেশে একটা ভুয়া (বা ভারসাম্যহীন) নির্বাচন হতে যাচ্ছে [Why Bangladesh is About to Have a Lopsided Election.]।  আর এটা এতই ডিটেইল রিপোর্ট যে আমাদের ঝালকাঠিতে একটা নির্বাচনে কমিশনের তরফে খরচের বরাদ্দকৃত সীমা কত আর তা কেন অবাস্তব সে কথাও বলা হয়েছে। সেখানে [The Commission has declared that the expenditure per voter should not be more than 10 takas, equivalent to 9 cents.] এমন বাক্যও আছে।

    এই লেখা লিখতে মূলত কেন প্ররোচিত হলামঃ
    এককথায় এর জবাব, ১৬ ডিসেম্বরের বিএনপির সমাবেশ নিয়ে রয়টার্স একটা রিপোর্ট করেছে গতকাল সন্ধ্যা প্রায় সাড়ে সাতটার মধ্যে। দেখা যাচ্ছে এটা আবার বিএনপির জন্য খুবই ইতিবাচক রিপোর্ট। ফলে কদাচিত দেখা যায় এমন।  এমনি এই রিপোর্টের শিরোনাম হল – (বাংলায় বললে) “হাজার হাজার লোক সমাগমে বাংলাদেশের বিরোধী দলের র‍্যালী থেকে সরকারের প্রতি পদত্যাগের আহবান” – [Tens of thousands attend Bangladesh opposition rally calling for government to resign.]। ইংরাজি ফরমাল ডিকশনারী মতে টেন অব থাউজ্যান্ড বলতে সমাগম একলাখের নিচে বুঝাতে যে শব্দ  ব্যবহৃত হয়।

    বিস্তারে যাবার আগে  এই রিপোর্টের রিপোর্টারকে নিয়ে কিছু কথা বলে নেই। এটাই গুরুত্বপুর্ণ।
    এর রিপোর্টার হলেন রুমা পাল [RUMA PAUL]।  কোন রুমা পাল? যতদুর অনুমান তিনি কলকাতার বাঙালি যদিও, যে ইংরাজি বানানে তিনি নিজের নামের বানানটা লিখেন তা যদি RUMA PAL (মানে PAUL এর জায়গায় PAL) হত তবে নিশ্চিত হতাম যে তিনি হিন্দু বাঙালি! আর PAUL বানানটা মানে সাধারণত যা খ্রীশ্চান “পল” বুঝাতে ব্যবহৃত হয়। সেক্ষেত্রে তিনি বাঙালি খ্রীশ্চান বলে অনুমান হয়। তবে সেসব যাই হোক, তিনি বাংলাদেশের সচেতন মানুষের কাছে অনেক পরিচিত; আর তা খারাপ বা নেতিভাবেই। আর কবে থেকে? সেটা ২০২০ সাল থেকে তো বটেই! তাকে ভারতের ‘র’-এর স্বার্থ-ইচ্ছার পক্ষে কাজ করতে দেখেছি আমরা!
    দুনিয়ায় তিনটা গ্লোবাল নিউজ এজেন্সী প্রভাবশালী ও বড় বিনিয়োগে গড়া প্রতিষ্ঠান যাদের নিজস্ব মালিকানায় স্যাটেলাইট আছে যেমন – রয়টার্স, এএফপি ও এপি। আর এরা যথাক্রমে বৃটিশ, ফ্রান্স আর আমেরিকা ভিত্তিক তাতে তাদের এখনকার অফিস গ্লোবালি যেকোন দেশেই থাকুক। এদের মধ্যে রয়টার্সে সবচেয়ে বেশি ভারতীয় অরিজিন স্টাফ আছে। যারা ভাল প্রফেশনাল আর এমন একগুচ্ছ রিপোর্টারের উপরে একজন করে পশ্চিমা অরিজিন এডিটর রাখা হয়েছে যাদের নামও প্রকাশিত রিপোর্টের মধ্যেই ছাপানো থাকে। যেমন আলোচ্য রিপোর্টের শেষে লেখা আছে [Reporting by Ruma Paul; editing by Clelia Oziel]। নিয়মিত পাঠক হিসাবে রয়টার্স সাধারণভাবে আমার চোখে তুলনামূলক আস্থা বেশি রাখার মত এজেন্সী। কেবল ব্যতিক্রম এই রুমা পাল; যে র’ এর এসাইনমেন্ট কাঁধে নিয়ে ঘুরে আমরা দেখেছি। অল্প করে সেই রেফারেন্স এখানে দিয়ে রাখি।

    চীনা করোনা টিকা ইস্যুতে সেকালে মানে ২০২০ সালের ঘটনা। টিকা ইস্যুর একেবারে প্রথম দিকে যখন দুনিয়াতে কোন উতপাদকের হাতে বা বাজারে টিকা তখনও আসে নাই। ভারতীয় টিকাও আমাদের দরবেশ-কে চারশ মিলিয়ন ডলারে গছানো হবে (যা শেষ পর্যন্ত সময়ে সরবরাহ করা হয় নাই) – সেই চুক্তিও হয় নাই; আসলে সেই প্রসঙ্গও তখনও আসে নাই! সেসময়ে মূলত, চীন আমাদেরকে তাদের টিকা গবেষনার থার্ড ফেজ বা তৃতীয় ও শেষ পর্যায়ে যুক্ত হতে কিছু বাংলাদেশিকে পরীক্ষামূলকভাবে টিকা দেওয়ার প্রোগ্রাম ছিল সেটা।  মানে মুল পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হয়েছে চীনের বাইরে যেমন বাংলাদেশিদের শরীর এই টিকার গ্রহণযোগ্যতা কেমন হবে এই পরীক্ষায় পর্যায়। আর এতে অংশ নিলে পরোক্ষিত এই টিকার বাণিজ্যিক উতপাদনের বিনা পয়সায় হকদার হব আমরা। যেমন চীনা উতপাদিত কিছু টিকা পাবে আর টিকার ফর্মুলা নিজ দেশে ব্যবহার করে নিজ উতপাদনেও যেতে পারবে বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এই প্রোগ্রামে রাজি হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে সইয়ের যে আনুষ্ঠানিকতা ছিল তা সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করে নাই। কারণ, এসময়েই ভারত ঐ প্রাইভেট অফার দিয়েছিল যে বাংলাদেশের প্রাইভেট কোম্পানি চারশ মিলিয়ন ডলার আগাম বিনিয়োগ দিলে তারা বাংলাদেশ সরকারের জন্য টিকা নিতে পারবে। মূলত বাংলাদেশ এই অফারটা নিবে না চীনের সাথে গবেষণায় অংশ নিবে এনিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় সময় নষ্ট করে ফেলেছিল। ওদিকে চীনাদের পক্ষেও বাংলাদেশের জন্য তার টিকা পরীক্ষার শেষ পর্যায়টায় বাংলাদেশকে আরো সময় দেয়া সম্ভব ছিল না কারণ চীনা ঐ সিনাভ্যাক টিকা ছিল চীনের উতপাদিত প্রথম টিকা; তাই এটা শেষ করার তাদের প্রচন্ড তাগিদ ছিল। তাই চীন বাংলাদেশের জন্য আর অপেক্ষা না করে ইস্ট এশিয়ার এক দেশ (সম্ভবত ইন্দোনেশিয়াকে বাংলাদেশের জায়গায়) সামিল করে নিয়েছিল।  আর এদিকে বাংলাদেশ পরে চীনা টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা খুইয়ে আর সাথে ভারতীয় টিকা প্রাইভেট কোম্পানিকে দিকে কিনিয়ে ব্যবসা হবার লোভে ভারতের সাথে যুক্ত হওয়াকেই প্রেফার করেছিল। সেই সাথে নিজেদের অবহেলাকে ঢাকতেই এক প্রপাগান্ডা বা নিউজ-টুইস্ট করেছিল যে চীনের ঐ টিকা পরীক্ষার প্রোগ্রামে বাংলাদেশকে সামিল করতে টাকা চেয়েছিল বলেই নাকি চুক্তিটা সই হয় নাই…। আর এই রিপোর্টাই করেছিল রুমা পাল। আগ্রহিরা এখানে সে রিপোর্টটা এখনও দেখতে বা পেতে পারেন। আমাদেরসহ অনেক দেশি-বিদেশি পত্রিকা রয়টার্সের রিপোর্ট বলে রুমা পালের সেই রিপোর্ট রয়াটার্সের বরাতে ছেপেছিল বা কপি করেছিল। ফলে এই নিউজ-টুইস্ট বাজার পেয়েছিল। কিন্তু একই সাথে কয়েকদিনের মধ্যে বেনার নিউজও এনিয়ে একটা রিপোর্ট করেছিল। বেনার নিউজ [benarnews]  আমেরিকা ফান্ডেড একটা ইংলিশ পত্রিকা যার বাংলা ভার্সানও আছে।  বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এক সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে রুমা পালের ঐ রিপোর্ট ছিল। যদিও তা ছিল একটা পুর্ব-বুঝাবুঝির ভিত্তিতে। বেনার নিউজের রিপোর্ট সেটাও ছিল স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বরাতে। কিন্তু এখানে কিছু বাড়তি কথা পুরা জিনিষটাকেই ওপেন করে দিয়েছিল। আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বলা সেই বাড়তি বাক্যটা হল,

    “Possibly, they want to leave since we are unable to pay them the money they asked for the trial.”

    বাংলায় বললে মন্ত্রী বলছেন,  তারা (মানে চীনারা) টীকা ট্রায়ালের জন্য চাওয়া অর্থ আমরা দিতে পারি নাই বলেই  সম্ভবত ঐ প্রোগ্রামে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে”। অর্থাৎ মন্ত্রী নিশ্চিত নন যে কেন চীনারা নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এর পরেও মন্ত্রীর বরাতে লেখা হয়েছে চীনারা নাকি অর্থ চেয়েছিল (কো-ফাইন্যান্সিং)! মহার কথা হল, রুমা পাল  – অর্থ চেয়েছিল (কো-ফাইন্যান্সিং) শব্দটা শিরোনামে এনেছিল। কিন্তু বেনার নিউজ তা করে নাই। কেবল সাদামাটা বলেছে চীনার প্রোগ্রামটা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। আবার মজার কথা হল চীনারা যে অর্থ চেয়েছে এর স্বপক্ষে মন্ত্রী কোন (চীনাদের বাংলাদেশকে দেয়া চিঠি) চিঠি বা ডকুমেন্ট দেখাচ্ছেন না বা রেফার করছেন না। কিন্তু প্রপাগান্ডা সমানে চলছে। বেনার নিউজের সেই রিপোর্ট এখানে পেতে পারেন।

    কিন্তু অসততার কপাল সবসময়ই মন্দ হবার সম্ভাবনা থাকে! হয়েছিলোও তাই। অর্থলাভের লোভে বাংলাদেশের ক্ষমতাবানেরা সকলে ভারতের টিকা কিনতে ছুটেছিল অথচ এই টিকা পরে মোদি আর বাংলাদেশে সরবরাহ-ই হতে দেন নাই। আগে ভারতের চাহিদা মিটবে (মানে আমাদের অর্থে ভারত আগে নিজের চাহিদা মিটাবে এরপর) – এই উগ্র হিন্দুত্ববাদী-অর্থনীতি বয়ানের ঝাপ্টা। কারণ, এই বাংলাদেশের (প্রাইভেট ব্যবসায়ীর হাত দিয়ে) আগাম অর্থ পরিশোধ এটা ঠিক কোন পণ্যকেনার জন্য আগাম পেমেন্ট ছিল না বরং এটা ছিল ঐ টিকা উতপাদক কোম্পানির উতপাদন সক্ষমতা বারানোর জন্য কারখানা সম্প্রসারণে আগাম বিনিয়োগের অর্থ দান। ফলে এতে কারখানার যে সক্ষমতা বেড়েছিল এই অংশের পুরা উতপাদনের হকদার বাংলাদেশ একা!
    পরিণতিতে আবার চীনের কাছে সরকার ফিরে যায়। হাত-পা ধরে একটা খারাপ চুক্তিতে আমরা চীনা টিকা পেয়েছিলাম, তবে ভাল দিক হল আমাদেরকে আর সকল চাহিদার টিকা পাবার জন্য কোন অর্থই দিতে হয় নাই। এই হল, ‘র’-এর এসাইনমেন্ট হোল্ডার রুমা পাল আর বাংলাদেশের সম্পর্ক আর গল্প!

    এখন প্রশ্ন হল, সেই রুমা পাল এখন বিএনপিকে প্রশ্নগসা বা সম্ভাবনা হিসাবে দেখে গতকালের রিপোর্ট-টা কেন?
    এর অর্থ কী? ভারত হাসিনার উপর আস্থা হারিয়েছে? অনেকের ধারণা ফিল্ড লেভেলে ‘র’ ততপর থাকলেও  জয়শঙ্করের ফরেন অফিস মানে মোদিসহ এরা দুরত্ব তৈরির অবস্থান নিয়েছে।
    একথা সত্যি যে এখন তো ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক তলানিতে। বিশেষ করে কানাডায় কানাডীয় শিখ নাগরিক হত্যার পরে আবার খোদ আমেরিকায় শিখ হত্যার উদ্বোগ আমেরিকা ব্যর্থ করে দিবার পরে এই অবস্থায় দুই দেশ!
    ফলে মোদির অবস্থান এখন এপিজিং [appeasing] মানে বাংলায় যেটাকে আমরা মান ভাকঙ্গানো বা তেল মারা বলি! আরো বিশেষ করে আমেরিকার বাইডেন আগামি ২৬ জানুয়ারি ভারতের রিপাবলিক ডে [১৯৫০ সালে যেদিন প্রথম  নয়া কনষ্টিটিউশন চালু বা কার্যকর ঘোষণা করা হয়]  উদযাপনে প্রধান অতিথি হতে অ-রাজি হন।

    সেজন্যই কী রুমা পাল এবার উজানে উল্টা বাইতেছেন!!! এছাড়া ভারতের বেশিরভাগ মিডিয়াই এবার রয়টার্সের রুমা পালের খবরটাই  ছেপেছে?

     


    সর্বশেষ আপডেটঃ  ২০২৩,  রাত

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • টাইমস অব ইন্ডিয়ার চশমা বদলঃ বাংলাদেশে ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসনে নিজের বিপদ দেখছে

    টাইমস অব ইন্ডিয়ার চশমা বদলঃ
    বাংলাদেশে ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসনে নিজের বিপদ দেখছে

    গৌতম দাস
    ২৬ নভেম্বর ২০২৩  সন্ধ্যা ১৮ঃ ২৭
    https://wp.me/p1sCvy-59d

     

     

    “Halting Hasina: India should worry about Bangla PM’s authoritarian…”

    বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের অন্তত একটা মিডিয়া টাইমস অব ইন্ডিয়া,  গত ২২ নভেম্বর ২০২৩ এক উলটা হাওয়া বইয়ে দিয়েছে। এটা হল, কংগ্রেসের প্রণব মুখার্জির আমল বা একালের বিজেপির মোদির আমল মিলিয়ে গত সতেরো বছর ধরে অনুসরণ করে চলা ভারতের মিডিয়াগুলোর নীতির বিরুদ্ধ বা বিপরীত অবস্থান। বাংলাদেশের রাজনীতি বা ক্ষমতায় যেই আসুক ভারতের মিডিয়া এর কোন ভালমন্দ দেখতে পাবে না। তবে কেবল যে ঘটনায় ভারতের স্বার্থ আছে সেটাই সহি – এই হল বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের মিডিয়াগুলোর অবস্থান!
    আবার যেমন,  কোন পত্রিকায় অনেক রকমের লেখাই ছাপা হয় – নিউজ রিপোর্ট, ভিউজ-মতামত, সত্য-মিথ্যা প্রপাগান্ডা বা ফিচার  অথবা এমনকি উপ-সম্পাদকীয় ইত্যাদি সবই ছাপা হয়। কিন্তু পত্রিকায় যেটা সম্পাদকীয় বা এডিটরিয়াল [editorial] লেখা ছাপা হয় সেটাই একমাত্র পত্রিকার মালিক, সম্পাদক বা সম্পাদকীয় গ্রুপ বা বোর্ডের সকলের স্পষ্ট নিজস্ব  অবস্থান বা রাজনৈতিক বক্তব্য। এটা পত্রিকার পরিচালনাকারীদের নিজস্ব অবস্থান এবং নিজ দায় নিয়ে বলা কথা!  তা হলেও বাংলাদেশের রাজনীতি বা ক্ষমতা কেমন কী চলছে সেখানে এনিয়ে ভারতের প্রিন্ট- মিডিয়াগুলোর কোন সম্পাদকীয় মন্তব্য কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না! তবে বাংলাদেশে যেটা ভারতের স্বার্থ সেটাই সহি ধরে নিয়ে প্রিন্ট-মিডিয়ার অবস্থান দেখতে পাওয়া যায়!

    এদিকটাই আরেক ভাষায় বললে, গত পনেরো বছরের বেশি হবে কোন ভারতীয় পত্রিকা বাংলাদেশের মানুষের হিউম্যান রাইট বা নাগরিক অধিকার রক্ষার পক্ষে কথা বলেছে – এমন রেকর্ড নাই। এমনিতেই,  যদিও ১৯৪৭ সালে কলোনিমুক্ত স্বাধীন তবে বিভক্ত ভারতের জন্মের আগে থেকে এখনও পর্যন্ত “হিউম্যান রাইট ও নাগরিক মৌলিক অধিকার” কখনই ভারতীয় রাজনীতিতে ইস্যু ছিল না। উচ্চারিত হয় নাই; এমনকি তা ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও উচ্চারিত নয়। কারণ, সেই ১৮১৫ সাল থেকেই ভারতে রাষ্ট্র-রাজনীতি বলতে জাতি-রাষ্ট্র বা নেশন স্টেট বুঝা হয়ে এসেছে। আর এতে বলাই বাহুল্য এখানে জাতি মানে একমাত্র সেটা উগ্র হিন্দু-বোধের এক হিন্দুত্ববাদ। অধিকার বা নাগরিক ধারণার যেখানে বালাই নাই! সারকথায়, ভারতে রাজনীতি বলতেই সেটা হল – জাতিবাদ এবং তা এক উগ্র-জাতিবাদ; যা এর বাইরের সব এথনিক-জাতিকে অস্বীকার, তাঁদের উপর চাপায় দেয়া মার্জিনালাইজ বা কোনঠাসা করে রেখে অ-হিন্দু বিশেষ করে মুসলমান নাগরিক এর উপর সামাজিক, কালচারাল ও রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করে রাখার রাজনীতি।
    হিন্দুত্ববাদ মানে যেখানে অধিকার বা নাগরিক ধারণা নাই; কাজ করে না। হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্ববাদের এক হিন্দুত্ববাদ ও বোধ সেখানে সব। আর এর বাইরে সবাই কে তারা মেরে, পিটিয়ে অবাধে নির্মুল করবে; এক আধিপত্যের জগত কায়েম করবে করতে হবে এই হল যার সারকথা। এমনকি পড়শি বা অন্যরাষ্ট্র তাঁদেরও যেন নিজ স্বার্থ বলে কিছু নাই। পড়শিসহ অন্য সকল (ছোট) রাষ্ট্রকেই যেন ভারতের রাষ্ট্রস্বার্থকেই  নিজস্বার্থের উপর জায়গা দিতে হবে, তুলে রাখতে হবে। এমনকি খেলাধুলাতেও ভারতের কোন হেরে যাবার দুঃখে ভিন-রাষ্ট্রকেও দুখী হতে হবে, দুঃখবোধ দেখাতে বা প্রকাশ করতে হবে! এটা হিটলারকেও ছাড়িয়ে যাওয়া এমনই এক চরম উগ্র-জাতিবাদ!

    ফলে এসব কারণে, ভারতের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে যা কিছুই জানি না দেখি তা দেখলেও সেখানে মানুষের মৌলিক মানবাধিকার বা নাগরিক অধিকার ধরণের কোন ধারণাই ভারতের রাজনীতিতে বা সামাজিক কালচারে নাই।

    ভারত ভিন-রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠার বিরোধীঃ
    কিন্তু এই প্রথম ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া নিজের অবস্থান জানিয়ে সম্পাদকীয়তে বলছে, “হাসিনাকে থামাতে হবে। কারণ তিনি কর্তৃত্ববাদী; বিরোধীশুন্য করতে-দেখতে চান। আর এটা নাকি ভারতেরও স্বার্থবিরোধী ও উদ্বিগ্ন হওয়ার মত হাসিনার এমন এই কর্তৃত্ববাদী স্বভাব!”। এই কথাগুলো তুলে এনেছি,  টাইমস অব ইন্ডিয়া-তে তাঁদের  নয়া অবস্থান জানিয়ে যে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে তার শিরোনাম থেকে। সেটা হল, ” Halting Hasina: India should worry about Bangla PM’s authoritarian streak. It will hurt her interests as well as New Delhi’s” । আমাদের মানবজমিন এর অনুবাদ রিপোর্ট ছেপেছে।

     

    “Halting Hasina: India should worry about Bangla PM’s authoritarian
    streak. It will hurt her interests as well as New Delhi’s” –

    সবচেয়ে মজার কথা শুরুতেই বুকফুলিয়ে টাইমস বলছে, “টাইমস অব ইন্ডিয়ার এডিটরিয়াল টিম যা সিনিয়র জার্নালিস্টদের নিয়ে গঠিত তারা নিজেদের মধ্যে নাকি বিস্তর তর্ক-বিতর্ক শেষে একালের খবরাদি সম্পর্কে নিজেদের মতামত-অবস্থান নিয়ে থাকে [Times of India’s Edit Page team comprises senior journalists with wide-ranging interests who debate and opine on the news and issues of the day] । তাহলে, মানে কী দাঁড়ালো?

    গত ১৯৪৭ সালের আগের কথা বাদই রাখলাম। একালে মানে ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে রাজীব গান্ধীর আততায়ীর হাতে মৃত্যু হয়েছে ১৯৯১ সালে। অনেকের মনে হতে পারে একালে ভারত উগ্র হিন্দুত্ববাদী হয়ে উঠেছে বোধহয় বিজেপির মোদীর হাতে। না এটা মিথ্যা। বরং এর আগেই রাজীব গান্ধীর হাত ধরেই একালে মুসলমান এথনিক ক্লিঞ্জিং যেটাকে বলে বা “মুসলমান-নির্মুল” নীতি- এর শুরুটা হয়েছে ১৯৮৯ সালে। সেসময়ে এটা হয়েছিল কাশ্মীরে। সেখানে ১৯৪৭ থেকে যতই অস্থিতিশীলতা বা বিরোধ-সমস্যা থাকলেও রাজনীতিতে কোন সশস্ত্রতার ধারা নয় বরং  সেখানকার রাজনীতি ছিল চলে আসা নির্বাচনকেন্দ্রীক এক রাজনীতি। প্রকাশ্য এক গণ বা মাঠের রাজনীতি! রাজীব গান্ধী ১৯৮৯ সালের রাজ্য নির্বাচনে   কারচুপির করে জিতবার সিদ্ধান্ত  ও নীতি নিয়েছিলেন। সেটা এই অজুহাতে যে সেবার ১৯৮৯ এর নির্বাচনে ওমন কারচুপি না করলে নাকি বেশিরভাগ আসনে অ-কংগ্রেসি কাশ্মীরি মুসলমান সেখানে জিতে যাবেন। আর তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ফারুক আবদুল্লাহর পরামর্শে ও তাঁকে সাথে নিয়ে। ফারুক আবদুল্লাহও ঠিক কংগ্রেসি নন তবে তাঁর বাপের আমল থেকে তাঁদের দল প্রো-কংগ্রেসী!

    আর এরপরে বাবরি মসজিদ আক্রমণ থেকে শুরু করে ১৯৯৯ সালে ভারতে বাজপেয়ীর বিজেপির কোয়ালিশন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে ক্রমশ বিজেপি-আরএসএসের উত্থান ঘটে। ইতোমধ্যে নাইন-ইলেভেন মানে (২০০১ সালের ওয়ার অন টেরর) মানে আমেরিকা-ইন্ডিয়ার “জঙ্গী-মারার নামে” এলায়েন্স মানে এশিয়ায় হিন্দুত্ববাদের এক রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল প্য়রথমে। কিন্তু  অচিরেই সেখান থেকেও আবার সরে গিয়ে সেটা আমেরিকার হয়ে ভারতে চীন ঠেকানোর অজুহাতে ভারতকে ঠিকা দেওয়া; মানে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া – যেটা এভাবে এখন বাংলাদেশ ১৭ বছর পার করেছে। স্বভাবতই এর স্বপক্ষে পুরা সময় জুড়েই ভারতের সমগ্র মিডিয়া ইসলাম কোপানোর বয়ান তুলে মশগুল থেকেছে।
    আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের প্রতি ভারতীয় মিডিয়ার এটিচ্যুড  সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা হয়েছে মোদির গত দশ বছরে। এমনিতেই কোভিডের কারণ ভারতের মিডিয়া নিজে চলতে পারে নাই, ঠিকমত বেতন দিতে পারে না। অতএব পত্রিকা চালানোর খরচ মিটাতে মোদির হয়ে মিথ্যা প্রপাগান্ডার হাতিয়ার হয়ে উঠো – সব জায়েজ! আর তাতে ভারতের ‘র’-এর বা গোয়েন্দা বিভাগের প্রমোটেড  ঘরে বসে বানানো রিপোর্ট – ভারতে যারা ছাপে তাঁদের শিখন্ডি মিডিয়া হয়ে উঠো! এই ছিল সেসময়ের মূলনীতি! তাঁদের সে এক মহা কসরত, কার উপর দিয়ে কে যাবে! যার ফলশ্রুতিতে ফাইনালি দাড়ায় মূলত হিন্দুস্তান টাইমসের রেজাউল লস্কর অথবা শিশির গুপ্তা এবং টাইমস অব ইন্ডিয়ার দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী – এরা হয়ে উঠেন ‘র’-এর হয়ে শ্রেষ্ঠ প্রপাগান্ডিস্ট! যারা র-এর চাহিদা মত রিপোর্ট লিখতে ওস্তাদ! আগ্রহিরা এবিষয়ে আমার পুরানো লেখা পড়ে নিতে পারেন।  আমরা ভারত টাইমস অব ইন্ডিয়াকে এভাবেই চিনতাম!

     

    কিন্তু এখন এটা কী হলঃ
    কিন্তু হায়!! এটা কোন টাইমস অব ইন্ডিয়া??? যে হাসিনাকে কর্তৃত্ববাদি শাসক বলছে? মোদিকে হাসিনা থেকে সাবধান করে ইডিটরিয়াল লিখছে??? গত ২২ নভেম্বর ২০২৩ টাইমস অব ইন্ডিয়ার এডিটরিয়াল কম করে বললেও গত পন্বরো বছরের একেবারে ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত! কেন?
    এটা বুঝা কঠিন না যে ২০০৬-৭ সাল থেকে আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিবার পর থেকে ভারতীয় মিডিয়া অবাস্থান ছিল যে – যেভাবে পারো বাংলাদেশকে ভারতের পক্ষে লুটে নেও! সব জায়েজ আছে!  বাংলাদেশের উপর দিয়ে আসামের করিডোর থেকে শুরু করে সবকিছু বিনা পয়সায় খাবলে তুলে নিয়ে খাওয়া, বিনা পয়সায় পোর্ট ব্যবহার কিংবা সব নদীর পানি, বাংলাদেশকে ভারতের বাজারে পরিণত করা, সীমান্তে সমানে বাংলাদেশি হত্যা ইত্যাদি যাকিছু ভারতের স্বার্থের পক্ষে যায় বলে তারা মনে করেছে তাই ভারতের মিডিয়া সঠিক ও জায়েজ মনে করে মিথ্যা প্রপাগান্ডা রিপোর্ট লিখে গেছে! সাথে ছিল জঙ্গী আবিস্কার আর জামায়াত কোপানোর নামে ইসলাম কোপানো মুসলমানবিদ্বেষে ভরপুর এক মহোৎসব চালিয়ে গেছে ভারতের মিডিয়া। বাংলাদেশের  প্রতিটা নির্বাচনে ভোটবিহীন তামাসা চলেছে – অথচ ভারতের একটা মিডিয়া এগিয়ে আসে নাই, টু শব্দটাও করে নাই! তখন তারা কোথাও হাসিনার কর্তৃত্ববাদ দেখে নাই; রাতের ভোট হয়েছে তারা জানে নাই! সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল ২০১৩ সালের ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের সফর। বিএনপি ও জামায়াত-কে বাদ দিয়ে নির্বাচন করতে হবে; আর এরশাদের জাতীয় পার্টিকে বিরোধি দল বানাতে হবে। এই ব্যববস্থাপনার কারিগর ছিলেন সুজাতা সিং যা এরশাদের সাথে মিটিয়ের পরেই খোদ এরশাদ-ই তা মিডিয়ার সামনে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু মজার কথা কোন ভারতীয় মিডিয়া এনিয়ে কোন রিপোর্ট করে নাই। কারণ তাঁদের নীতি ছিল দুনিয়াতে ন্যায়-অন্যায়, সাংবাদিকতা-অসাংবাদিকতা, সঠিক-মিথ্যা বলে কিছু নাই। যাই ভারতের স্বার্থে তাই জায়েজ এই ছিল তাঁদের নীতি; তাই পুরাটাই মিথ্যা ও অন্যায় হলেও সেই অন্যায়ের পক্ষেই ভারতের মিডিয়াকে থাকতে হবে…!  এই ছিল গত পনেরো বছরের (দু-একটা ব্যতিক্রম বাদে) ভারতীয় সাংবাদিকতা! যা এখনও বর্তমান!!!
    কিন্তু তাহলে এর ভিতরে – এটা কোন টাইমস অব ইন্ডিয়া??? যে হাসিনাকে কর্তৃত্ববাদি শাসক বলে বুঝছে???

    কথা আরও আছেঃ
    টাইমসের রিপোর্টের ছন্দ-মিলানো প্রথম বাক্যটাই রীতিমত শায়েরি! বলছে, বাংলাদেশ ৭ জানুয়ারি যাচ্ছে নির্বাচনে [POLL]; কিন্তু বিরোধীরা যাচ্ছে সাজাপ্রাপ্ত আসামী হিশাবে জেলে[JAIL] । ইংরাজিতে পোল আর জেলের অলংকার মিলিয়েছে। আর এর চেয়েও মারাত্মক হল কোন ভারতীয় মিডিয়ার সম্ভবত এই প্রথম জামা‍য়াতে ইসলামী এই রাজনৈতিক দলের প্রতি সহানুভুতি প্রকাশ। লিখছে, [one big party stays banned.]; মানে জামায়াত নিষিদ্ধ করে দেয়া রায় বলবত রাখাকে এক ভারতীয় মিডিয়া ইউজুয়াল বদ-দোয়া দেওয়ার বদলে সহমর্মিতা জানিয়ে রিপোর্ট করছে!  যার ইঙ্গিতটা হল, এটা মতপ্রকাশের অধিকার, কনষ্টিটিউশনের সীমার মধ্যে থেকে রাজনৈতিক  দল খুলার ও জমায়েতের অধিকারকে জবরদস্তিতে কেড়ে নেওয়া, কোনঠাসা করা – মানে এককথায় রাজনীতিক ও দৈহিক নিপীড়ন করা হয়েছে এই রাজনৈতিক দলকে। তাই রিপোর্টটা একারণে জামায়াত-কে এই প্রথম ভিকটিম হিশাবে দেখছে ও দেখাচ্ছে!!! তাহলে এটা কোন টাইমস অব ইন্ডিয়া!!!  অথচ একালের এই ভারতই অন্তত গত ১৭ বছর ধরে লাগাতরভাবে জামায়াতের একাত্তর সালের ভুমিকার বিরোধিতার আড়ালে ইসলাম-মুসলমান রিলেটেড সবকিছুর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ চালিয়ে গেছে; শত্রুতা চালিয়ে গেছে। জামায়াত জঙ্গী-সংগঠন বলে প্রচার চালিয়ে নিজেদের সব অনৈতিক ততপরতাকে জায়েজ করতে গিয়েছে!
    একইভাবে বিএনপির পক্ষেও সহানুভুতিশীল হয়ে রিপোর্ট করেছে; যা অবিশ্বাস্য! বলেছে বিএনপির ১৩৯ জন নেতাকে সাজা শুনিয়ে দিয়েছে; তারা যেন নির্বাচন থেকে দূরে থাকে এর ব্যবস্থা করেছে!  এমনকি হাসিনার নিজে ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন মানে কোন কেয়ার-টেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন করার যে আইনটা ছিল সেটা হাসিনারই বাতিলের জন্যও এই প্রথম হাসিনাকেই দায়ী করলো এক ইন্ডিয়ান মিডিয়া!! মানে টাইমস অব ইন্ডিয়া, বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়া উচিত এই দাবির প্রতি (তবে পরোক্ষে) সমর্থন জানিয়ে দিল!!!  আর এভাবে বিএনপির রাস্তার আন্দোলনকে জায়েজ করে দিয়ে এই মিডিয়া লিখেছে BNP is just doing street theatre when demanding restoration of the caretaker system.। যা নিয়ে একটা ভারতীয় মিডিয়াকে আমাদের বলার আছে একটাই – এটা আন-ইউজুয়াল! আমরা ভারতের মিডিয়ায় এটা দেখতে অনভ্যস্ত ছিলাম!

    “one big party stays banned.
    The top court upheld a previous ban
    on Jamaat-e-Islami – Bangladesh’s
    largest Islamist party – from contesting elections.”

    এতদুর পর্যন্ত যা দেখলাম তাতে এটা পরিস্কার ভাবে বুঝা গেছে যে টাইমসের এটা এক বড় ধরণের অবস্থানের পরিবর্তন। এতদিন যা ছিল ‘র’-এর মুখপাত্র হয়ে সার্ভিস দেওয়ার এক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান সেই টাইমস অব ইন্ডিয়া এখন বাংলাদেশের শাসক শক্তি অথরিটিটিয়ান – মানে বাংলাদেশের শাসক কত খারাপ তা দাবি করে দেখানোর প্রতিষ্ঠান – হয়ে উঠতে চাইছে! তাহলে এই পরিবর্তনের কারণ কী? আবার যেখানে এটা ভারতের অন্য আর কোন মিডিয়ার মধ্যে এমন পরিবর্তন এখনও দেখা যায় নাই!
    এককথায় বললে, ভারতের মিডিয়া এখনও একালেও এমন নুন্যতম পলিটিক্যাল এথিক্স মেনে কেনে চলার প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে নাই। যেমন আগে এতদিন যা ছিল ‘র’-এর মুখপাত্র হয়ে সার্ভিস দেওয়ার এক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান; বুঝাই যেত সেটারও মূল চালিকাশক্তি ছিল অর্থ; কোন আদর্শিক অবস্থান তা ছিল না! তাহলে এখনকার এই পরিবর্তনও  অনুমান করি কোন আদর্শিক অবস্থান নয়! যার সোজা মানে বিক্রেতা-মিডিয়ার ক্রেতা-গ্রাহক সম্ভবত এখন বদলে গিয়েছে! আগে ছিল ক্রেতা ভারত সরকারের এক প্রতিষ্ঠান ‘র’-এর মুখপাত্র হয়ে  সার্ভিস দেওয়ার প্রতিষ্ঠান। আর তাহলে এখন?

    টাইমস অব ইন্ডিয়ার সার্ভিস ক্রেতা এখন কেঃ
    তাহলে টাইমস অব ইন্ডিয়ার  এখন এই অবস্থান বদল হওয়াতে এখনও কী মোদি সরকারই আছে? তা মনে হচ্ছে না। যদিও এটা সত্য যে জয়শঙ্করের অফিস বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হাসিনা আবার ক্ষমতায় আসুক কিংবা না – সেব্যাপারে তার খুব কিছু করণীয় আছে তা মনে করা না। যদিও তাই বলে কিছু লিপ-সার্ভিস বা কিছু রুটিন সম্পর্ক অবশ্যই আগের মত ভালই বহাল আছে।  তবুও বাংলাদেশের সরকার কর্তৃত্ববাদী কী না সেটা  টাইমসের এই দ্দেখে ফেলার সাথে কখনই মোদির রাজনীতির কোন সম্পর্ক নাই। কাজেই টাইমস অব ইন্ডিয়ার নয়া অবস্থানের পৃষ্টপোষক-অর্থদাতা অন্তত বিজেপি-মোদি নন। তাহলে কে হতে পারে?

    এর তালাশে আমরা এখন টাইমস অব ইন্ডিয়ার এই সম্পাদকীয়ের বাকি অংশে ফোকাস করব। যদিও কোন সম্পাদকীয় ছোট লেখাই হয় আর টাইমসের এই সম্পাদকীয়ও ছোট পাঁচশ- অক্ষরের নিচে। তাহলে এই শেষের অংশে কী আছে?

    সম্পাদকীয়ের শেষ অংশ ‘মারাত্মক’ কী আছেঃ
    সংক্ষিপ্তভাবে মারাত্মক সেই কথা হলঃ উপরে আমরা দেখেছি, টাইমস অভিযোগ হাসিনা সরকার অথরিটি-টেরিয়ান যে নিজেকে বিরোধিশুন্য দেখতে চায় মানে তার রাজনৈতিক সকল বিরোধী শক্তিকে সমাজ থেকে নির্মুল করতে ও দেখতে চায় ক্ষমতাসীনেরা। এবং সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন বিরোধীশুন্য কথা টার অর্থ-তাতপর্য কী? কারণ, যেকোন ক্ষমতাসীনরা দাবি করতেই পারে যে বিরোধী দল আমাদের চাপ সহ্য করে মাঠের রাজনীতিতে টিকে থাকতে না পারলে আমরা কী করতে পারি – এমন বয়ান দিতেই পারে। কিন্তু এমন বয়ান কী জায়েজ? নাকি এটা ইনোসেন্ট বা নিঃস্পাপ বয়ান যে ভাজা মাছ উলটে খেতে জানে না?

    না অবশ্যই না। এই বয়ান জায়েজ নয়! এর সোজা সহজ উদাহরণ হল, ক্ষমতাসীন যদি নির্বাচনে কৌশলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে বিরোধীদলের জন্য সুবিধাজনক নয় – এভাবে করে সাজায়? মানে হল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দল নিরেপেক্ষ করে না সাজায়? মানে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে কান্নি মেরে থাকা পুলিশ ও প্রশাসন হয়ে হাজির হয়?
    এখন এই ব্যাপারটাই হয়েছে কীনা এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল – ক্ষমতাসীনদের কিছু বয়ান এর দিকে তাকাতে হবে। যেমন বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন হাসিনা সরকারের এক প্রিয় শ্লোগান হচ্ছে তারা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি আর অন্যদিকে জামাত-বিএনপি এর বিপক্ষের! এতদুর শুনে কেউ মনে করতে পারে এর মধ্যে খারাপ কী আছে?  অথচ এটাই হল, সরকারের দিক থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া ম্যাসেজ যে তোমরা এখন বিরোধীদের সাথে সবকিছুতে বৈষম্যমূলক আচরণ করতেই পার, এটা জায়েজ আছে! কারণ তারা সবাই তো মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি! আমি সরকার সেটা বলে দিয়েছি! সুতরাং এটাই তোমাদের প্রটেকশন ভাষ্য! যেমন খেয়াল করে দেখেন বাংলাদেশের একজন অভিনেতা সম্প্রতি ক্রিকেটে ভারতীয়দের হারে খুশি হওয়া যাবে না – যারা খুশি হয় তারা  মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি বলে ব্যাখ্যা খাড়া করছে! আর এমন বয়ান এটারই চরমতম রূপ হল, আমাদের রাষ্ট্রটাকে গুম-খুনের  রাষ্ট্র হিশাবে হাজির করা – এটাই হয়ে যাবে আর যার সাফাই হবে যারা “মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি!” বলে সরকার প্রচার করবে তাঁদের কোনই রাজনৈতিক নাগরিক অধিকার তো নাই-ই!  তাই তাদেরকে গুম-খুন অপহরণ ইত্যাদি সব তো করাই যায়! এবং যাবে!!!

    তাহলে সারকথাটা হল, আমি ক্ষমতায় আর আমার রাজনৈতিক-বিরোধিদের যদি আমি আমার মতই সমান রাজনৈতিক, নাগরিক অধিকার না দিয়ে (নানা উসিলায়)  দাবায় রাখতে পারি তাহলে সেটাই পরিণতিতে ২০১৪, ২০১৮ বা ২০২৪ সালের মত নির্বাচনই হবে! শুধু তাই না, সেটা এবার এই রাজনীতিক মাঠশুন্যতা – এটাই কাশ্মীরের মত রাজনীতি আর তখন নির্বাচন-কেন্দ্রিক থাকবে না। সশস্ত্রতার রাজনীতির পথে পা বাড়াতে চাইবে!

    ঠিক এদিকটা খেয়াল রেখে তাই টাইমস তার সম্পাদকীয়ের শেষের দিকে বলছেঃ “But what raises eyebrows and concerns is the vacuum previously occupied by the opposition. Marginalising mainstream opposition parties is an invitation to radical elements in Bangladeshi politics”।
    মানে হল, বিরোধীদলদেরকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে জেলে রেখে নির্বাচন, মাঠে মিটিং মিছিল জমায়েত, মতপ্রকাশ ইত্যাদি সবকিছু থেকে তাঁদের বঞ্চিত করে দেওয়া – মানে এক শুন্যতা বা ভ্যাকুয়াম তৈরি করা – এর সোজা মানে হল, সশস্ত্র রেডিক্যাল রাজনীতিকে দাওয়াত দেয়া। বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান ধারা হয়ে উঠতে সশস্ত্র রাজনীতিকে দাওয়াত দেয়া বা ঠেলে দেওয়া।

    এরপরে আরো দুইটা প্যারা আছে। এর প্রথমটায় বলছেঃ
    “Then there is the US factor. Washington is clearly concerned about charges of authoritarianism against Hasina and is viewing Bangladesh as part of its larger strategic tussle with China.”
    মানে হল বলছেঃ “এর সাথে আছে আমেরিকা ফ্যাক্টর। যারা তাই হাসিনার এভাবে কর্তৃত্ববাদী উত্থানে উদ্বিগ্ন বিশেষ করে এর সাথে চীন-আমেরিকার যে কৌশলগত টানা-হেচড়া আছে সেদিক থেকে দেখলে”।  অর্থাৎ টাইমস ইঙ্গিত দিচ্ছে আমরা অনুমান করি যে এর অর্থ হবেঃ কর্তৃত্ববাদী হাসিনার থেকে যাওয়া মানে তাতে বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়বে!


    আর টাইমস অন ইন্ডিয়ার লেখার শেষ বা সিদ্ধান্ত বাক্য টা হল এভাবেঃ

    “Unless the opposition is given the space it should have, radical elements will create space they don’t currently have. That’s terrible news for India. A radicalised Bangladeshi establishment can bring Pakistan back into play. New Delhi should tell Hasina to change tack, in its, and her, interest.”

    অর্থ হলঃ “হাসিনা যদি তার রাজনৈতিক বিরোধীদেরকে রাজনীতিক-বিরোধীতা করার জায়গা না দেন (অর্থাৎ জেলে রেখে নির্বাচন, মাঠে মিটিং মিছিল জমায়েত, মতপ্রকাশের অধিকার ইত্যাদি সবকিছু থেকে বঞ্চিত করে দেয়) তবে রেডিক্যাল বা সশস্ত্র রাজনীতিক ধারা ঐ স্থানটা দখল করবে যাদের জায়গা এখনও বাংলাদেশে তেমন নাই! আর এটাই ভারতের জন্য খুবই ভয়ঙ্কর সংবাদ হবে!”।

    এরপরের বাক্যের অর্থ এটা একেবারেই কোন ভারতীয় লেখকের হিন্দুত্ববাদী ঘৃণা। এছাড়া তারা কখনই কোন রেফারেন্সে-ছাড়াই পাকিস্তানকে না জড়িয়ে বা গালি না দিয়ে থাকতে পারে না। সেই পটভুমিতে পরের বাক্যটা হলঃ একটা রেডিক্যাল (সশস্ত্র) বাংলাদেশ এটা পাকিস্তানকে মাঠে ফিরে ডেকে আনতে পারে! (অর্থাৎ এরমধ্যে পাকিস্তান কোথা থেকে এল কেউ জানে না) “তাই নয়াদিল্লির উচিত হবে হাসিনাকে সামলানো তাকে স্বার্থ-অভিমুখ বদলাতে বাধ্য করা!”।

    এই শেষের বাক্যটাও একই মিথ্যা হামবড়া তবে মুরোদহীন ভারতকে জাগানোর বা এর এখনও হাসিনাকে নিয়ন্ত্রণের যেন ক্ষমতা আছে এই ভাব নিয়ে বলা কথা! কারণ, ভারত যেন একটা বিরাট ক্ষমতাবান কুতুব  এই ভাব না ধরলে ভারতীয় সাংবাদিকের কলমের আগায় যেন কালি আসে না !  অথচ এতদিন হাসিনা যতটুকু চীনের সাথে সম্পর্ক বা ঘনিষ্ঠতা কায়েম করেছে তা কী ভারত ঠেকাতে পেরেছে? কাজেই হাসিনার যা সক্ষমতা সেটার সবই যেন ভারতের দেয়া এমন ভুয়া দাবির দরকার কী??? আর ভারত যা চায় এর বাইরেও হাসিনার নিজস্ব স্বার্থ বলে অনেক কিছু আছে এবং তা থাকাই স্বাভাবিক! তাতে হাসিনার স্বার্থের কোন ন্যায্যতা থাকুক আর নাই থাকুক!


    তাহলে টাইমসের এই অবস্থান বদল কেন ঘটলঃ

    টাইমসের এই অবস্থান বদল কেন ও এর তাতপর্য কী, এনিয়ে কিছুটা উপরে দাবি করে বলেছি যে, এই বদল বিজেপির মোদির আগ্রহে ঘটে নাই। কারণ টাইমসের বদলি অবস্থান কোনভাবেই সেটা মোদির রাজনীতি নয় যে মোদি হিউম্যান রাইট বা নাগরিক অধিকারের পক্ষে কথা বলবেন বা টাইমস-কে বলতে বলবেন বা অর্থ দিবেন!
    আর টাইমস মানে টাইমস অব ইন্ডিয়া কোন অর্থপ্রাপ্তি ছাড়াই এমন সম্পাদকীয় লিখার কারণ নাই! তাহলে?

    খুব সম্ভবত এটা কোন আমেরিকান উদ্যোগ! এমন অনুমান করাটা আশা করি ভুল হবে না!  যা সাধারণত কোন থিঙ্ক-ট্যাংক বা এনজিও এর মাধ্যমে হয়ে থাকে। আর এটা বাইডেনের মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার বা স্যাংশনের পররাষ্ট্রনীতির সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ, মানে সাথে যায়!
    তবে মূলকথাটা হল, হাসিনা যদি এবারও ২০১৪, ২০১৮ এর মত একই পথে বিজয়ী হতে পারে তবে টাইমস অব ইন্ডিয়ার মুখ দিয়ে প্রকাশিত এই আশঙ্কা সত্যি হবার সম্ভাবনা!

     

    আপডেটঃ  ২৬ নভেম্বর  ২০২৩,  সন্ধ্যা ০৭ঃ ৪০
    সর্বশেষ আপডেটঃ ২৭ নভেম্বর  ২০২৩,  রাত ১২ঃ ৪৭

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • অরাজকতা বা ‘বিশৃঙ্খল’ পাবলিক হতে উস্কানি দেয়া কিছু মিডিয়া……

    অরাজকতা বা ‘বিশৃঙ্খল’ পাবলিক হতে উস্কানি দেয়া;
    কিছু মিডিয়ার অর্থলোভি নেতি ততপরতা

    গৌতম দাস
    ১৫ নভেম্বর ২০২৩   ১৭ঃ ৫৬ সন্ধ্যা
    https://wp.me/p1sCvy-58v

     

                       বাংলাদেশে রুশ যুদ্ধজাহাজ, আতঙ্ক……

    আমরা কী এখন রাশিয়াপন্থী আর আমেরিকান-পন্থী এভাবে বিভক্ত জনগোষ্ঠি হয়ে যাবো??????

    নির্বাচন নিয়ে বিশেষ করে আজ নির্বাচনী সিডিউল ঘোষণা করা হবে – এনিয়ে বাংলাদেশ একটা টেনশড বা গুমোট উত্তেজনার মধ্যে আছে।
    আর এই সুযোগে সব-মিলিয়ে মানুষের এই শঙ্কিত অবস্থাকে পুঁজি করে কিছু অর্থ কামিয়ে নিবার সুযোগ হিশাবে এটাকে দেখে পথে নেমেছে কিছু মিডিয়া। এটা মূলত এভাবে কারো ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া দিয়ে খাবার চিন্তা  – প্রথমত, এটা এক অপরাধী চিন্তা। আর দ্বিতীয়ত এদের মনে রাখা উচিত, এতে নিজের আপন ঘর-প্রতিষ্ঠানও পুড়ে যেতে পারে! এমনকি নিজ সম্পদ ও নিজের জীবনও বিনাশ হয়ে যেতে পারে! ক্ষুব্ধ, উত্তেজিত বা শঙ্কিত মানুষ এর সামনে পড়ে সবকিছুরই বিনাশ ঘটতে পারে। সবকিছুই খেলার বিষয় নয়, সবকিছুই পয়সা কামাবার চান্স হিশাবে নেয়া ও দেখা, এই স্বভাব – এটা আত্মঘাতি!!!

    এই সরল বাক্যগুলো আমরা মনে রাখতে পারছি না! আসলে আমাদের কেউ কেউ পারছি না কারণ, আমাদের দু-পয়সার অর্থ-লোভ এতই তীব্র! থিওলজির ভাষায় এসব পরিস্থিতিকেই তারা বলে থাকেন – শয়তানের লাড়া আর আমাদের কেউ কেউ এই লাড়ার মধ্যে পড়েছে অথচ সব হুস সব শিক্ষা তলায় গেছে দশা এইটা!
    এভাবে দু-পয়সা কামানোর তীব্র অর্থ-লোভ বাসনা এখন বাংলাদেশের মিডিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ! ইদানিং, তারা এখন মাঠে নেমে প্রকাশ্যেই বলছে তারা খবরের কোন সোর্স বা উৎস বলতে পারবে না। এটা এমন এক ভয়ঙ্কর অপ-জার্নালিজম!  এমন মিথ্যা কথার প্রপাগান্ডা করে তারা পয়সা কামাতে চায়; মিডিয়ার হিট বাড়াতে চায়! এই মিথ্যাকথা প্রচারে যার সুবিধা হয় তার থেকে ঠিকা নিয়ে একাজ করতে চায় তাঁরা। এমনই ডেসপারেট অদম্য অর্থ-ক্ষুধা তাঁদের! বাংলাদেশে অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জনমনে শঙ্কাকে পূঁজি করে ততই এই শ্রেণী লোভি হয়ে উঠছে!

    চট্রগ্রামে রাশিয়ান যুদ্ধ জাহাজঃ
    চট্রাগ্রামে রাশিয়ান যুদ্ধ জাহাজ নোঙর ফেলেছে! এই হলো কিছু মিডিয়ার কাছে উত্তেজনা তৈরির ইস্যু আর তা নিয়ে ব্যবসা করার – দুটা পয়সা কামানো ইস্যু করেছে কয়েকটা মিডিয়া – কারণ মানুষের মনে নানান ধরণের শঙ্কাকাজ করছে। সেটাকে আরো উস্কে তুলে পত্রিকার হিট বাড়াতে হবে। অতএব এটাকে কাজে লাগিয়ে চান্স হিশাবে নিয়ে আরও ভয় শঙ্কা তৈরি করে মিডিয়ার হিট বাড়াও!

    যেসব মিডিয়া একাজে জড়িয়েছে তারা আত্মঘাতি কাজ করেছে!  মানুষের মনে শঙ্কা উস্কে দিয়ে হিট বাড়ানোর ধান্দা – এটা অপরাধ! এটা নেতিবাচক কাজ! যারা যারা একাজে শীর্ষ অবস্থানে গিয়েছে আমি আশা করব এই লেখার পরে তারা নিজেদের লোভ নিয়ন্ত্রণ করবেন! আমরা আশা করব এতে তারা নিজেরাও পুড়ে মরবেন সহায় সম্পদ  হারাবেন – এদিকটা অনুভব করবেন। বুঝবার শেষ সুযোগটা নিবেন। বলাই বাহুল্য এরা নিজেকে সহ – সাথে আমাদের সকলের জন্য ক্ষতি ডেকে আনবেন।   সবচেয়ে খারাপ কথা এতে বাংলাদেশে আমাদের নাম-পরিচয় হয়ে উঠতে পারে উশৃঙ্খল [unruly] পাবলিক! অরাজক, নৈরাজ্য মানসিকতার পাবলিক! এর ইংরাজি শব্দটা হল আনরুলি [unruly]। অনেক সময় যারা একাজ সংগঠিতভাবে রাজনৈতিক ধারা হিশাবে করে এদেরকে মানে তাঁদের কাজকে নৈরাজ্যবাদী বা এনার্কিক [anarchy] কাজ ও চিন্তা বলা হয়! স্বভাবতই উশৃঙ্খল [unruly] পাবলিক বলে খেতাব যা যেকোন দেশের জনগণের জন্য সবচেয়ে নিম্ন-শ্রেণীর খেতাব এটা! পাবলিককে অরাজকতার দিকে ঠেলে দেয়া, আনরুলি করে তোলা এটা সবসময় আত্মঘাতি কাজ! যদিও উপস্থিত জনরোষে-ক্ষোভে এমন হয়ে যেতে পারে! তবুও নিশ্চয় ঈঊ জনরোষের পাবলিকের মধ্যে কেউ কেউ থাকবেন যাদেরকে অরাজক না-হওয়ার দিকে কাজ করতেই হবে।
    আর যারা যেসব মিডিয়া এমন উস্কানি তুলে তাঁদের অর্থলোভের কু-ইচ্ছা পূরণ করে করে নিতে চাচ্ছেন – কে জানে তারাও কপাল খারাপ হলে জনরোষের সামনে পরে নিজ জান-সম্পদ সবই খুয়াতেও পারেন!

    উপরে বলেছি – জনমনে শঙ্কা উস্কে দিয়ে হিট বাড়ানোর ধান্দা – এটা অপরাধ! এটা নেতিবাচক কাজ! এটাই সেই ভেদরেখা (deparature line)। যারা এই প্রসঙ্গে রিপোর্ট লিখতে চান তাদেরকে চেনার উপায় হল এটাকে ইতিবাচক জায়গায় বসে লিখছেন কিনা!

    চট্রগ্রামে রাশিয়ান যুদ্ধ জাহাজ নোঙর ফেলেছে! এর ব্যাকগ্রাউন্ড হল, মূলত রাশিয়ান নেভি বঙ্গোপসাগরের জলসীমায় এসেছে বাংলাদেশের জন্য না। তারা এসেছিল বার্মার সাথে ঘোষিত এক সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে। বার্মা এখন গত ছয় বছর শেষে আমেরিকার নয়ানীতিতে আমেরিকার এনিমি হয়ে উঠেছে। আমেরিকা-বার্মা এখন  এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে আর এছাড়া রাশিয়া এখন ইউক্রেন যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে যারাই আমেরিকারবিরোধী তাঁদের সাথে ঘনিষ্ঠ হবার নীতি নিয়েছে। সেখান থেকেই বার্মার কিছু রাশিয়ান অস্ত্র কেনা ইত্যাদি সবমিলিয়ে তারা উভয় রাষ্ট্র এক যৌথ সামরিক মহড়া আয়োজন করেছিল।  গত ২০১০ সালের পর থেকে চীন-আমেরিকা পালাবদলের এই কালে, এশিয়ায় এমন পাল্টাপাল্টি যৌথ সামরিক মহড়ার ঘটনা অনেক বেড়ে গেছে।

    তবে কে প্রথম উদ্যোগ নিয়েছে সে প্রসঙ্গে পাশে রেখে আমরা দেখছি – রাশিয়ান বার্মার সাথে তার যৌথ মহড়া শেষে ঐ নৌবহর থেকে মাত্র দুটা আর ছোট জাহাজ বাংলাদেশে নোঙর করেছে।   য়ার এতে বাংলাদেশের অফিসিয়াল ভার্সান হল, “এটা বন্ধুত্বপূর্ণ সফর”।  প্রথম আলোতে ছাপা হওয়া এনিয়ে উত্তেজনা শান্ত করা বা উত্তেজনা না ছড়ানো বা করার রিপোর্টটা হল “অর্ধশতাব্দী পর চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ল রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ। এতে বাংলাদেশে রুশ রাষ্ট্রদুত আর চট্টগ্রামে রাশিয়ার অনারারি কনসাল আশিক ইমরান এর বরাতে যে ভাষ্য দেয়া হয়েছে – এর টোন ছিল উত্তেজনা না ছড়ানো; প্যাসিফাই করা বা শান্ত রাখা। আবার আজকের পত্রিকা বাংলাদেশের আন্তঃবাহিনীর বিবৃতির বরাতে লিখেছে এটা শুভেচ্ছা সফর। প্রথম আলোরটা না হলেও আজকের পত্রিকায় আন্তঃবাহিনীর বিবৃতিটা আমাদের গ্রহণ করা আমাদের জন্য ইতিবাচক এপ্রোচে হতে পারত! বেশির ভাগ মিডিয়া তা করে নাই।
    হাসিনার জন্য এই রাশিয়ান সফরের পাওনা হল, নিজ নেতা সমর্থকদের মনোবল বাড়ানো যে আমেরিকান  চাপের মুখে রাশিয়া আমাদের সাথে আছে – কিন্তু একথা হাসিনা উচ্চারণ করে বলেন নাই। তিনিঅনিয়ন্ত্রিত ছিলেন। কেবল উচ্চারণ না করেও যতটুকু বুঝানো যায় সেখানেই থেকেছেন, যা সুবিধা আসে তা নিয়েছেন।
    কিন্তু আজকের (১৫ নভেম্বর) মানবজমিনের কান্ডটা দেখেন,  শিরোনাম “বাংলাদেশে রুশ যুদ্ধজাহাজ, আতঙ্ক বাড়াচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায়। আর কখন এটা ছেপেছে? গতরাতে দশটায়। যখন ইতোমধ্যেই অন্তত দুঘন্টা আগেই টিভি মিডিয়া সহ অনলাইনে খবরই প্রচারিত হয়ে গেছে যে শুভেচ্ছা সফর শেষে চট্টগ্রাম বন্দর ছাড়ল রাশিয়ার ২ যুদ্ধজাহাজ। মানবজমিনের রিপোর্টে দেখায় যাচ্ছে তা ইউক্রেণীয় ক্যাম্পেইন। অথচ রাশিয়ান জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর ত্যাগের পরও এই নেতি প্রচারণায় মানবজমিনকে নামতেই হবে!!! কেন?
    এতে কী আমেরিকা খুশি হবে? মানবজমিন কতবড় আমেরিকার পক্ষের সৈনিক তা দেখানো যাবে????

    দুটা বটম লাইন আমাদের মনে রাখতেই হবেঃ
    প্রথম বটম লাইনঃ বাংলাদেশের সরকারের সাথে তৃতীয় দেশের স্বার্থবিরোধে সামরিকভাবে রাশিয়া জড়াবে না।

    এটাই কোন মিলিটারি এনগেজমেন্টের নুন্যতম বা বেসিক রূল!
    এরও আগে, প্রথম কথা বাংলাদেশের সাথে এখন অন্য কোন রাষ্ট্রেরই কোন সামরিক সংঘাত নাই। সামরিক সংঘাত হাতের মোয়া নয়!
    বর্তমানে এটা বাংলাদেশের সাথেও নয়, হাসিনা সরকারের সাথে আমেরিকান নীতি-পলিসি অবস্থানের একটা বড় বিরোধ দেখা দিয়েছে। এতটুকুই!  যা কোন মাপেই নুন্যতম ভাবেও কোন সামরিক-বিরোধ নয়।
    তাহলে এর ভিতরে  চট্টগ্রামে রাশিয়ান যুদ্ধ জাহাজ?????
    ফাজলামো চিন্তারও একটা সীমা থাকে, নাকি?
    ভারতের সাথে চীনের সীমান্তবিরোধে চীন ২০ ভারতীয় সেনা মেরে ফেলেছিল। তাতে কী আমেরিকা ভারতের পক্ষে চীনের বিরুদ্ধে সামরিকভাবে নেমে গেছিল? অথচ ভারত-ইন্ডিয়া দুরাষ্ট্রেরই পররাষ্ট্রনীতি স্ট্রাটেজি চীনবিরোধী!
    বাইডেনের আমেরিকা কেন ইউক্রেনকে আড়ালে রেখে রাশিয়ার সাথে সামরিক বিরোধে গেল? সরাসরি রাশিয়ার সাথে আমেরিকা এভাবে বাইডেন আগালো না কেন? দুনিয়াদারি সম্পর্কে নুন্যতম কিছু বুঝাবুঝি আমাদের সবার দরকার। নাহলে একালের মিডিয়া আমাদেরকে সাতবার বেঁচবে! একালের মিডিয়া দুটা পয়সার জন্য এখন সব পারে! হিট-হিট-হিট!!! মিডিয়া মানেই তা হয়ে গেছে যেভাবে পারে হিট বাড়াতে হবে! তাতে মা, বউ, সন্তান সবকিছুকে পাল্লায় তুলতে তারা রাজি!

    দ্বিতীয় বটম লাইনঃ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা আমাদের অনেকেরই কাম্য! ও ন্যায়সঙ্গত কামনা! কিন্তু সেজন্য অন্যদেশের স্বার্থে বাংলাদেশকে চীন-আমেরিকা বা রাশিয়া-আমেরিকার যুদ্ধক্ষেত্র বানাতে দিতে পারি না! 
    আমরা কী এখন রাশিয়াপন্থী আর আমেরিকান-পন্থী এভাবে বিভক্ত জনগোষ্ঠি হয়ে যাবো???  বাংলাদেশকে যুদ্ধক্ষেত্র বানাবো? বটম লাইন মানে যে সীমারেখার নিচে আমরা যেতে পারি না!

    উপরের বাক্য নিজেই যথেষ্ট স্পষ্ট করে বলা যে আমরা কতদুর যেতে পারি আর কার পরে আর নয়!  ভারতের মিথ্যা প্রপাগান্ডাকে নিউজ বলে ছাপা – এটা একালের কিছু মিডিয়ার আরেক অত্যাচার! চরম অর্থলোভি এক ততপরতা! উদ্দেশ্য মিথ্যা করে বলা যে ভারত এখনও হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য আমেরিকার সাথে কথা বলছে। কোন নুন্যতম প্রমাণ ছাড়াই এই প্রপাগান্ডা বারবার মিথ্যা প্রমাণ হয়ে যাবার পরেও ভারত তাতে থামছে না।এশিয়ায় প্রভাব পড়ে মনে করে কিছু আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো এদিকে দেখা যায়। যদিও আজ পর্যন্ত তাঁদের কী ভুমিকা অথবা তাঁদের উপস্থিতিতে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিই বা কী অর্জন করল এসবের দেখা নাই! সব খামোখা হয়ে আছে! নিজেদের উপস্থিতি তারা নিজেরাই জাস্টিফাই বা সাফাইযোগ্য করে দেখাতে পারে নাই! তবুওও এরা আছে।
    সম্প্রতিকালে দেখছি এরা এইবার ভারতের এসব নোংরা মিথ্যা প্রপাগান্ডার নুইসেন্স দেখতে পেয়েছে। এতদিন পায় নাই। যেন আমেরিকার ভারতের সাথে সম্পর্ক ও পররাষ্ট্রনীতি-পলিসি সম্পর্কে এরা জানে না বা নিশ্চিত না। তাই এতদিন এদিকে দেখে নাই!

    কিন্তু এখনও কী এরা দেখতে পেয়েছে ?
    মনে হয় না! কেন?
    তারা এখন “বাংলাদেশের সরকার কতটা স্বাধীন” – এটা নিয়ে মেতে উঠতে চাইছেন!! যেন এক মহা আবিস্কার করে ফেলেছেন? মানে  ভারতের নোংরা মিথ্যা প্রপাগান্ডার নুইসেন্স – এটা কী আমাদের স্বাধীনতার সমস্যা???
    এই ফেলো আবার দাবি করে লিখছেন – “নয়াদিল্লিতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পর্যায়ের আলোচনায় বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে” – এটা তিনি কেমনে জানলেন? ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের দাবি??? তাই!

    একজন  আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো – কীভাবে একাজ করেন? এখানে ফ্যাক্টসটা কী? এটা জানা যদি এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো হওয়া সত্বেও নিজের আমেরিকান সুত্র থেকেই স্বাধীনভাবে তাঁর নিশ্চিত জানা সম্ভব না হয়, কিংবা কঠিন বা অসম্ভব হয় তাহলে এর ভিতর দিয়ে তিনি আসলে নিজের গুরুত্বই আমাদের জানায় দিলেন। এই আর কী! কিন্তু কোন কামের তিনি তাহলে????

    তিনি আবার ডেইলি স্টারের মাহ্‌ফুজ আনাম এর রেফারেন্সে এসব কথা বলছেন! এটা বেশ মজার না??
    কারণ, এই ডেইলি স্টারই প্রথম আলো সহ আরো অন্যান্য মিডিয়ার সাথে মিলে বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের মিথ্যা প্রপাগান্ডার সাগরেদ!  হাসিনার কর্মীদের মনোবল বাড়াতে এরা নিয়মিত নুইসেন্স করে প্রচার করে আসছে যে ভারত নাকি হাসিনার পক্ষে আমেরিকার কাছে ততবির করছে – এই জাতীয় নোংরা মিথ্যা প্রপাগান্ডার নুইসেন্স ও অপ-সাংবাদিকতা করার ক্ষেত্রে ডেইলিস্টারও আরেক শিখন্ডি! অথচ এরাই এখন বলতে চাচ্ছে ভারতের এসব অপততপরতার মুখে “বাংলাদেশের সরকার কতটা স্বাধীন”-এরা এনিয়েই নাকি এখন মহা চিন্তিত!

    অদ্ভুত এই ফেলো এরা আবার IRI বা RRI এর বরাতে কথা বলেন! যারা আমেরিকান রিপাবলিকান হলেও বাংলাদেশে ভারত থেকে পরিচালিত হয়! যারা ২০১৮ সালে জরিপ করে বলেছিল  হাসিনা জিতবে। এবারও বলেছে, ৭০% লোক নাকি হাসিনার কামকাজ ততপরতাকে অনুমোদন দেয় [70% Bangladeshis approve of PM Hasina’s performance: IRI survey] । তাহলে মানে কী, এই ফেলো এরা ভারতের পক্ষের লোক?? প্রগতিশীল?? আমরা বিভ্রান্ত!!!

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ   ২০২৩,

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com