Author: goutamdas

  • গত পরশু পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর মিথ্যা প্রপাগান্ডা

    গত পরশু পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর মিথ্যা প্রপাগান্ডা
    গৌতম দাস
    ৩১ মার্চ ২০২৪ সন্ধ্যা ০৭ঃ ৫৩
    https://wp.me/p1sCvy-5tZ

    ‘ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই পিটার হাস গা ঢাকা দিয়েছেন’

     

    রাতে বাসায় ফেরার পথে বাঁশ বাগানের নিচ দিয়ে যেতে যেতে পথিক ভুতের ভয়ে উচ্চস্বরে গান গেয়ে থাকে। সে অবস্থা হয়েছে ভারতের পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর! পিনাক বাংলাদেশে ২০০৭ সালে, ১/১১ এর শুরুর কালে ভারতীয় রাষ্ট্রদুত ছিলেন। আর, বর্তমানে রিটায়ার্ড সরকারী কূটনৈতিক চাকরি থেকে; তবে এখন নয়াদিল্লি-কেন্দ্রিক এক স্থানীয় থিঙ্কট্যাংক [ORF] এর ফেলো। ভারত সরকারের হয়ে বা র-এর হয়ে বয়ান দিতে তিনি সময় সময়ে ক্ষেপ মারা বক্তব্য দিয়ে থাকেন। এবারও তাই!  সম্প্রতি বাংলাদেশকে নিয়ে তিনি শতভাগ মিথ্যা – যেটাকে ডাহা মিথ্যা বলা হয় – এমন এক বয়ান ছেড়েছেন। পত্রিকার শিরোনামে তা হল, ‘ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই পিটার হাস গা ঢাকা দিয়েছেন’। আমাদের বাংলা ট্রিবিউন পত্রিকা যেটাকে বলা যায় প্রো-ভারত এজেন্সির দ্বিতীয় প্রজন্ম – এদের পত্রিকা; এরা হাসিনার এই কালে নিয়মিত নয়াদিল্লির এক রঞ্জন বসুর কলাম ছেপে থাকেন।  বসুন্ধরার সময় খারাপ যাচ্ছে; পত্রিকায় অর্থ ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। তাই এবার এমন ফোকাস কাজের কনট্যাক্ট পেয়েছে যেন এই বাংলা ট্রিবিউন। এখানে ছাপা হওয়া প্রোপান্ডা নিউজের শিরোনাম হল  ‘ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই পিটার হাস গা ঢাকা দিয়েছেন’। এটা লিড প্রোপাগান্ডিস্ট এর খবর। আর বাকি আরো তিনটা পত্রিকাও (যুগান্তর, ভোরের কাগজ,  প্রথম আলো ইত্যাদি) একই খবরটা নিজেরা করছে সুত্রবিহীন গায়েবি খবর হিসাবে তারা ছেপেছে। প্রথম আলোর কায়দাটা মোক্ষম, তারা একই বয়ান কিন্তু দাবি করেছে এটা তাদের দিল্লির প্রতিবেদক সৌম্য ব্যানার্জি এর পাঠানো খবর।

    ঘটনাস্থল দিল্লি কিন্তু আওয়াজ বাংলাদেশেঃ
    ঘটনাস্থল দিল্লি যেখানে পিনাক রঞ্জনের এক বই-প্রকাশ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল। তার তাতে সেই বইয়ের খবর পাশে ফেলে রেখে দিয়ে, – এই ডাহা মিথ্যা প্রপাগান্ডাটা ছড়ানো হয়েছে মূলত পিনাক রঞ্জনের মুখ দিয়ে।  আর এই প্রপান্ডা খবরের ব্যাকগ্রাউন্ড বা পটভুমিটা হল বাংলাদেশে ক্রমশ তুঙ্গে উঠা ভারত-বিরোধিতার ক্ষোভ যা ভারতের পণ্য বর্জন নামে শুরু হলেও এখন ভারত খেদাও বলে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করতে চাইছে। রাজনীতিতে যা কিছুই হাসিনাবিরোধী বা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বা গণ-মানুষের স্বার্থবিরোধী বা অপছন্দের – তাই, একই সাথে ভারতের ইন্ধনে ঘটছে বলে তা ভারতবিরোধীও – এই হল এর প্রধান বক্তব্য – প্রাইম ন্যারেটিভ লাইন অব পলিটিক্স!  আর সর্বশেষ এতে বিএনপি কার্যত পুরাদমে নেমে পড়াতে এর মোমেন্টাম এখন তুঙ্গে উঠেছে!  তা এখনই খোদ হাসিনা সরকার ও মোদির ভারতও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। অথচ এই পরিস্থিতি তো খোদ সরকারই ডেকে এনেছে।  যেমন  – “ভারত পাশে ছিল বলেই” – নাকি সরকার এখন ক্ষমতায় বলে ভারতকে হাসিনা সরকার নিজের ভগবান বানিয়ে ফেলেছে। এমন বক্তব্যটাই যে সরকারের বিরুদ্ধে যেতে পারে তা সরকার ভাবেই নাই।  এই বাড়াবাড়িটাই কী শেষে নিজেদেরই বিরুদ্ধে  চলে যাচ্ছে – বলে হাসিনা-ভারতের মনে “কু-ডাকা” শুরু করেছে বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে!
    আর এই দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা থেকে বের হতেই সম্ভবত হাজির করানো হয়েছে পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীকে। আর এবার তাঁর সাথে আছে ইসলাম  বা এনিয়ে এথনিক উন্নাসিকতার প্রতিবিম্ব বীনা সিক্রি। সাথে আমাদের “এক সাবেক” শহিদুল হকও ডাক পেয়ে বর্তে গেছেন; কিছু কাজ পেয়েছেন বেকার জীবনে!

    সবচেয়ে বড় তামাসাটা হল  একটা শিয়ালেরও যে বুদ্ধি আছে – মানে একটা শিয়ালও জানে বাঘ মামাকে কেন মামা বলে তোয়াজ করতে হবে! আবার তাই বলে মামার আসনে বসে নিজেকেই “বনের রাজা” দাবি করা বা ভাব ধরা যে চরম গর্হিত কাজ সেটা শিয়াল পরিস্কার বুঝে! তাই একাজ সে কখনও করে না!  কিন্তু পিনাক রঞ্জন তাও বুঝে নাই। তিনি দাবি করেছেন যেন মোদির ভারতই পরাশক্তি আর পিটার হাসের আমেরিকা হল ভারতের অনুসারি এক স্যাটেলাইট রাষ্ট্র! তাই ভারতের এক হুঙ্কারে –  ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই– নাকি পিটার হাস হাসিনাকে বিরক্ত করা ছেড়ে একেবারেই পালিয়েছে!!!! যুগান্তর এনিয়ে লিখেছে পিটার হাস নাকি এই হুঙ্কারেই আত্মগোপনে চলে গেছেন।  এই হল আমেরিকার জায়গায় যেন ভারতই হল যে পরাশক্তি – এমন ভাবনায় মোদির দালালটা হলেন পিনাক রঞ্জন!

    ভারতের কঠোর অবস্থান জিনিষটা কীঃ
     এখনও আমেরিকাই এক পরাশক্তি  – তাতে আমরা যতই আমেরিকান অযোগ্যতা তুলে ধরি না কেন; অথবা আমরা যতই প্রমাণ দেই যে আমেরিকার পুরান সক্ষমতা ঢিলা হয়ে যাচ্ছে। আমাদের এসব অবজারভেশন সত্য হলেও আমেরিকা এখনও পরাশক্তি!  এটা মাথায় রেখে আমাদের কথা বলতে হবে। বাইডেনের গত দুই বছরের প্রচেষ্টা ছিল মূলত চীনের বাইরেটাতে এশিয়াকে কতটা চীন-মুক্ত করা যায় এরই প্রচেষ্টা ও পরীক্ষা করতে বসা। তাই এশিয়াকে চীন-মুক্ত অর্থে বাংলাদেশকেও কতটা চীন-মুক্ত করা যায়; এই লক্ষ্যে বাইডেন তিনটা জিনিষ প্রয়োগ করেছিল – গণতন্ত্র, মানবাধিকার আর স্যাংশন।  কিন্তু ডিসেম্বর ২০২৩ ছিল টাইম লিমিট।  আর এই সময়কালের মধ্যে তারা নিজেদের টার্গেট কিছুই তেমন অর্জন করতে পারছেনা  – এটা টের পাবার পরেই তারা ২০০৭ সালের মতই দ্বিতীয়বার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে কেটে পড়ার পথে রওয়ানা দিয়েছে – আমার আগের লেখায় আমি এটাই বলছি। যেটাকে আমরা আমেরিকার ফেলে পালানো বা প্রতারণা বলছি। আর এই বিষয়টাকে আমরা তুলে ধরাতে এই সুযোগে মোদির চামচা  পিনাক রঞ্জন র-এর খেপ মারতে এসে হাজির!  ভারতের ফাঁকা বাহাদুরি যে যেন ভারত হুঙ্কার দিয়েছে বলেই  বা ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই– নাকি পিটার হাসের আমেরিকা ভাগছে!  ভারতের এসব হামবড়া বা মুই কি হনু রে ভাব এসব মফস্বলি ভাব-স্বভাব সেই নেহেরু আমলের!  যে সবসময় ভাব করতে চায় বৃটিশেরা চলে গেলেও নেহেরুই এখন ভাইসরয় বা রাণীর রেখে যাওয়া প্রতিনিধি!!! অথচ রাণীর শাসন মানে এক ঘৃণিত কলোনি দখলদারের শাসন সেটাই ভারত এখনও বুঝতে পারল না! এসব কথা বার্তা এতই পেটি-সংকীর্ণ যে কথা বলতে অস্বস্তি লাগে। যেমন পিনাক লিখছেন শুনিয়ে দেয়া – বলছেন “কড়া বার্তাটা (আমেরিকাকে) শুনিয়ে দেয়া হয়েছিল”। মানে ব্যাপারটা যেন নিম্ন আয়ের ঘরের বউ-শাশুড়ি বা বউ-ননদের কথা শুনিয়ে দেওয়ার তৃপ্তি…!  কথা শুনানোর তৃপ্তি তিনি কলকাতায় থাকার সময়ে শিখেছিলেন; এখন অভ্যাস হয়ে গেছে! অথচ সেই স্বভাব না গেলেও বনে গেছেন তো কূটনীতিক!!!

    যাহোক আমরা যদি গত ২০২৩ সাল জুড়ে র-এর তিন হাতা-চামচা; মানে সুবীর ভৌমিক, এএমএন আবদি  আর চন্দন নন্দী – এই তিনের কথা মানে তারা এসময়ে যত কিছু লিখেছেন তা পিনাক রঞ্জনকে দেখতে বলি, পরামর্শ দেই –  কারণ, তাদের সেসব লেখাই পিনাক রঞ্জন-কে মিথ্যাবাদি বলে দেখাবে! সেসময়ের এই তিন জন সমানে প্রতিটা লেখায় আকুলিবিকুলি করে গেছে আমেরিকার সমীপে আবেদন করে। যার সার কথা, আমেরিকা তুমি হাসিনা সরকারকে স্যাংশন দিয়ে দিলে বা তাতে এসরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে ভারতের আর বাংলাদেশকে চুষে লুটে খাবার গত ১৫ বছরের সুখ সব শেষ হয়ে যাবে। তাহলে এখন পিনাক রঞ্জন কী বলতে চাচ্ছেন এটাই ভারতের কঠোর অবস্থান এর নমুনা???? নিজেকেই এসব আত্ম-প্রতারণা কেন করছেন তিনি?
    এমনকি শেষ লেখায় ফেডারল পত্রিকায় সুবীর মন্তব্য করেছেন – হাসিনা সম্ভাব্য ক্ষমতাচ্যুতির পরে আমেরিকা বার্মার দখল নিলে সেটা নাকি এক []Will US do a Bosnia on Myanmar?….]https://thefederal.com/opinion/will-us-do-a-bosnia-on-myanmar-no-fly-zone-move-may-involve-india/ মানে বসনিয়া কসোভো ম্যাসাকারে এথনিক ক্লিনজিং বা নির্মুল এর মত ঘটনা হবে।  র-এর এই তিন এজেন্ট এর লেখাগুলোই বড় সাক্ষী যে গত ২০২৩ সাল জুড়ে ভারতের অবস্থান আর মুরোদ কী ছিল! পিনাক রঞ্জনের উচিত ছিল আগে কিছু পড়াশুনা করা; না আমাদের লেখা পড়ার কথা বলছি না। এবারের বই প্রকাশের নামে প্রপাগান্ডায় এসাইমেন্ট নিয়ে নামার আগে পিনাক রঞ্জনের উচিত ছিল এটুক হোম-ওয়ার্ক করে আসা!

    সেক্রেটারি ওবায়দুল কাদের কবে থেকে বলা শুরু করেন – “ভারত পাশে ছিল বলেইঃ”
    এটা নিয়েও পিনাক রঞ্জনের সবার আগে স্টাডি করে আসা দরকার ছিল – বিশেষত এবারের এসাইনমেন্ট নিবার আগে!  কারণ, সেটাই পিনাক রঞ্জনের এবারের দাবি যে পুরাটাই মিথ্যা – এরই আরেক অকাট্য প্রমাণ!
    কাদের দাবি করে বলে যাচ্ছেন যে “ভারত পাশে ছিল বলেই” – বিএনপি আমেরিকান সহায়তা নিয়ে নির্বাচন বানচাল করতে পারে নাই! আর একথারই পিনাক রঞ্জনি ভাষ্য হল, ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই পিটার হাস বাবাজি ভেগে গেছিল।

    কিন্তু প্রশ্ন হল তাহলে কাদের কবে থেকে মানে কবে প্রথম বলা শুরু করলেন যে “ভারত পাশে ছিল বলেই” – …?
    আর সাথে দুইটা প্রশ্ন। কাদের কী নির্বাচনের আগে থেকে বলা শুরু করেছিলেন, না পরে? প্রশ্ন দুইঃ পরে হলে ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের কতদিন পরে?
    জবাদটা আগেই জানায় দেই। কাদের একথা বলা শুরু করেছেন ২৮ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে।  মানে ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পরে। এবং নির্বাচনের  প্রায় তিন সপ্তাহ পরে।

    তাই, এর জবাব হাতে গুনে বলে দেয়া সম্ভব।  ওবায়দুল কাদের “ভারত পাশে ছিল বলেই” – এটা বলাটা নির্বাচনের আগে বলেন নাই। এমনকি নির্বাচনের পরে বা ৭ জানুয়ারির পরে পরেও না। এককথায় বলা যায়, ২৮ জানুয়ারি ২০২৪ এর আগে কখনই কাদের বলেন নাই।

    কেন?
    এবার ধারাক্রমে বলে দেয়া যাক!
    ১। ৮ জানুয়ারি ২০২৪ প্রথম ভারতীয় রাষ্ট্রদুত প্রণয় ভার্মা, হাসিনাকে ফোন করে কেবল নির্বাচনী বিজয়ে অভিনন্দন জানাতে পেরেছিলেন। যদিও এই খবরটুকুও দাবি করেছে কেবল আনন্দবাজার তাদের ইংলিশ ABPlive এর দাবি করা সেটা  – Indian Envoy Calls On Bangladesh PM Hasina After Her Election Victory For 5th Term। তাও আবার কিছুটা মিথ্যা দাবি আর চাতুরিতে এটা করা হয়েছে। যেমন শিরোনামে দেখেন Calls On আছে যার অর্থ কারও সাথে গিয়ে দেখা করা। এমনকি এই নিউজে একটা ছবি ব্যবহার করা হয়েছে যে হাসিনার সাথে প্রণয় ভার্মা কথা বলছেন। কিন্তু এটা কোনভাবেই কোন কল অন Calls On নয়, এটা ছিল ফোনে কথা বলা আর ঐকথার বিষয়বস্তু হল সংক্ষিপ্তভাবে নির্বাচনী বিজয়ে অভিনন্দন জানানো।  অর্থাৎ কাদেরের “ভারত পাশে ছিল বলেই” .অথবা পিনাকের ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই ইত্যাদি বলার সময় সেটা ছিল না। অথবা কোন মিডিয়াও এটা দাবি করে নাই।

    ২। পরের সাক্ষাত সেটা ঠিক সাক্ষাত না, ১৪ জানুয়ারি ২০২৪ সম্প্রীতির বাংলাদেশ নামে ভারতীয় কিছু পরিচিত বাংলাদেশি এজেন্টদের খুশি প্রকাশ। সারকথায় প্রণয় ভার্মা সেখানে সরকারের কারও সাথে কথা বলেও যান নাই। ‘মিট দ্যা সোসাইটি’ শীর্ষক আলোচনা  – এনিয়ে একমাত্র ইত্তেফাক এখানে বিরাট সার্ভিস দেয়া এক রিপোর্ট করেছে।

    ৩। পরের সাক্ষাত একেবারে ১৫ জানুয়ারি ২০২৪। বাংলাদেশ-ভারত দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাত; কারণ ওটা ছিল এর আগেই ১১ জানুয়ারিতে শপথ নেয়া নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদের সাথে প্রণয় ভার্মার প্রথম সাক্ষাত। কিন্তু সেখানেও কথাবার্তায় মুখ্য বিষয় কী ছিল? সেটাও – কাদেরের “ভারত পাশে ছিল বলেই” .অথবা পিনাকের ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই ইত্যাদি কোন প্রসঙ্গ ছিল না। এনিয়ে সরকারি বাসসের নিউজের শিরোনাম, দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্যে টাকা-রুপি ব্যবহারের উদ্যোগ প্রশংসনীয় : সৌজন্য সাক্ষাতে এলে প্রণয় ভার্মা’কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী – অর্থাৎ এখানেও এটা কাদের বা পিনাক রঞ্জনের দাবি করা ইস্যু নাই।  এই ইস্যুতে বনিক বার্তার রিপোর্ট এর শিরোনাম দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো গতিশীল হবে -ভারতীয় হাইকমিশনার যার মানে হল ভারত এখানে “উন্নয়ন অংশীদারত্ব” হতে চলে গেছে। কোনই রাজনৈতিক ইস্যু এটা ছিল না। অর্থাৎ প্রণয় ভার্মা খুজে পাচ্ছিলেন না ৭ জানুয়ারির পরে কী নিয়ে বাংলাদেশের সাথে কথা শুরু করলে তা সঠিক হবে।

    ৪।  এরপরেই একেবারে ২৮ জানুয়ারী ২০২৪।
    এদিন থেকেই কাদের ও প্রণয় ভার্মা  উভয়েই কথা মানে কথা বলার ইস্যু – খুঁজে পাওয়া শুরু করতেন।  দেশ রুপান্তর এর শিরোনাম, নির্বাচনের সময় ভারতে আমাদের পাশে জোরালোভাবে দাঁড়িয়েছিল। এরপর কালবেলা এর শিরীনাম –  অবিশ্বাসের দেয়াল ভেঙেছেন দুদেশের প্রধানমন্ত্রী : ওবায়দুল কাদের। এরপর  টিবিএস এর রিপোর্ট-  India stood beside Bangladesh when BNP tried to foil polls with another country’s help: Quader । কেন ডেইলি স্টার এর শিরোনাম – India played its part as ‘honest neighbour’: Quader । এর সোজা মানে হল, কাদের এর আগে জানতেনই না যে  আমাদের কথিত ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে-পরে “ভারত পাশে ছিল বলেই” – কিনা?
    একইভাবে পিনাক রঞ্জনও জানতেন না যে   ভারতের কোন কঠোর অবস্থানের কারণেই ইত্যাদিতে আমেরিকার পিটার হাস পালিয়ে গেছিলেন কিনা!!

    চীন আর চীন-ময়ঃ
    ৭ জানুয়ারি নির্বাচন হয়েছিল। সেই থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন আমাদের মিডিয়া শিরোনামে চীন থেকেছিল।

    ধারাক্রমে সেসব খবরঃ
    ১। ২২ জানুয়ারি বিডিনিউজ চীনা রাষ্ট্রদুত আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালের সাথে দেখা করেছেন সেই রিপোর্ট
    ২। ২২ জানুয়ারি   নয়াদিগন্ত আরেকটা রিপোর্ট নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়াতে চীনের প্রতি অনুরোধ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

    ৩। ২৫ জানুয়ারি আরেক রিপোর্ট ‘শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রী পুনর্নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন শি’ – হাসিনার সাথে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধির সাক্ষাতে। এটা বাসসের রিপোর্ট ছাপিয়েছে যুগান্তর।

    ৪। ২৫ জানুয়ারি আরেক রিপোর্ট বাংলা ট্রিবিউন, চীনের কাছে আরও সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

    ৫। ২৮ জানুয়ারির বনিক বার্তার রিপোর্ট বাংলাদেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে পাশে থাকবে চীন— রাষ্ট্রদূত
    ৬। ২৮ জানুয়ারি আরেক মারাত্মক নিউজ হাসিনার চীন সফরের দাওয়াত নিয়ে, China invites PM Hasina on official visit to Beijing। মজার কথা হল এটা সরকারি রিপোর্ট। মানে বাসসের করা রিপোর্ট যা ছেপেছে ইংলিশ ট্রিবিউন।

    ৬। ৩০ জানুয়ারি বিবিসি বাংলা (এরা বাংলাদেশের ভিতরের রিপোর্ট ছাপতে ছাপতে দেরি করে ফেলে তাই) বাংলাদেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন ‘পাশে থাকবে’ কীভাবে?

    তাহলে সারকথাটা কী দাড়ালোঃ
    মূলকথাটা হল, পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী ডাহা মিথ্যা বলছেন। এর সোজা মানে হল, ৭ জানুয়ারি কথিত নির্বাচনের আগে-পরে ভারতের হুঙ্কারে পিটার হাসের আমেরিকা ভেগে গেছিল – এটা পুরাটাই মিথ্যা দাবি।  বরং ৭ জানুয়ারির আগে ভারত অসহায়ত্ব প্রকাশ করে গেছে, আক্ষেপ করেছে।  আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল, নির্বাচনের পরের বিশদিন। প্রতিদিনের সংবাদের শিরোনাম হয়ে থেকেছিল চীন। গত ১১১ জানুয়ারি নয়া মন্ত্রীরা আর সংসদ সদস্যরা সকলেই নিজ নিজ শপথ গ্রহণ এবং নয়া মন্ত্রীসভা গঠন সব সম্পন্ন করে ফেলেছিলেন। সেই থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত চীন ছিল সব খবরের উপরে আর তা প্রতিদিন!

    কিন্তু হায় ২৮ জানুয়ারি ২০২৪ ছিল জংশন পয়েন্ট।    ঐদিনের পরে আর চীনের সাথে সরকারের কোন সম্পর্ক আলাপ দেখা সাক্ষাতের খবর মিডিয়ায় আর দেখা যায় নাই। মানে এসব ঘটেছে এমন কোন সংবাদ নাই। সোজা কথায় এসব আর ঘটে নাই। বরং একই ২৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি ওবায়দুল কাদের সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে ঢাকায় প্রণয় ভার্মার সাথে সাক্ষাত করেন। আর এরপর থেকে সব কিছু ঘুরে যায়। মজার কথা হল, ২৮ জানুয়ারি নিয়ে মিডিয়া রিপোর্টগুলো ছোট দুলাইনের। কিন্তু দিনশেষে সরকারি ভাষ্যটা আসে। যেটা সরকার UNB কে দিয়ে প্রকাশ করে। আর এতে মিডিয়ায় প্রাণ আসে। কারণ নাহলে অনুমিত কানাঘুষা শোনা দিয়ে রিপোর্ট হয় না। যেমন এজন্য ডেইলি স্টারের বড় রিপোর্টটা ২৯ জানুয়ারির।
    আর এই সরকারি ভাষ্য থেকেই শুরু হয়েছিল ভারত পাশে ছিল বলেই নির্বাচন নিয়ে কোনো দেশ অশুভ খেলার সাহস পায়নি :। যদিও ২৮ জানুয়ারির পরেই বক্তব্যটা এমন ছিল না। এমন বক্তব্য এসেছে আরো পরে ১৬ মার্চ ২০২৪। আর এর আগের বক্তব্যটা ছিল “India stood beside Bangladesh when BNP tried to foil polls with another country’s help: Quader – এরকম। এটাই ছিল খাটী সরকারি ভাষ্য। কারণ এটা টিবিএস UNB কে সরকারের প্রকাশিত বক্তব্যটাই হুবহু ছেপেছিল।  আর একই UNB এর সরকারী ভাষ্যই তবে অন্য অংশ থেকে তুলে এনে শিরোনাম করেছিল কালবেলা  অবিশ্বাসের দেয়াল ভেঙেছেন দুদেশের প্রধানমন্ত্রী : ওবায়দুল কাদের।
    প্রশ্ন হল, এখানে ২৮ জানুয়ারি কাদের কারকথা বলেছেন যার সাথে হাসিনার অবিশ্বাসের দেওয়াল ছিল??

    উত্তর সহজ। পিনাক রঞ্জন যদি দাবি করতে চান নির্বাচনের আগেই –  “ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই পিটার হাস বাবাজি ভেগে গেছিল”।  তাহলে এখন ব্যাখ্যা দেক উনি যে কাদের কেন ভারতের সাথে অবিশ্বাসের দেওয়ালের কথা বলছেন? অর্থাৎ অবিশ্বাস যে ছিল এটা তো পরিস্কার। এখানে অবিশ্বাস মানে হল আস্থাহীনতা যে ভারত কিছুই করতে পারলো না! এছাড়া আমরা উপরে দেখলাম ২৮ জানুয়ারির আগে ভারত কোন বোলচাল দাড় করাতেই পারে নাই।
    বরং এরপর ভারতের অজিত দোভাল এসেছেন ৫ ফেব্রুয়ারির আশেপাশের সময়ে। কারনে তার সফর নিয়ে আমাদের সরকার কোন পাবলিক বক্তব্য দেয় নাই। তবে কিছু কিছু পত্রিকায় অনুমিত নিউজ দেখা গেছে যেমন নিউ এজ এরটা – Ajit Doval completes brief visit to Bangladesh – ।
    আর এরপর থেকেই হাসিনা সরকার চীনের হাত ছেড়ে গাট্টিবোচকা নিয়ে ভারতের কোলে উঠা সম্পন্ন করেছিল।

    কিন্তু সাবধান! অনেকেই মনে করবেন হয়ত যে,  বুঝাই যাচ্ছে এরপর থেকেই পিনাক রঞ্জনের কাহিনী শুরু হয়েছে!! তাই কী????

    না সেটাও একেবারেই মিথ্যা।  কারণ এটা কোন পিটার হাসের আমেরিকাকে কোন “ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই – ছিল না। বরং উলটা হাসিনা সরকারের ভারতের কোলের পক্ষে ভারতের সমর্থন প্রকাশিত হয়েছিল ঐ একই ৫ ফেব্রুয়ারিতে। বাইডেন চিঠি লিখেছিলেন হাসিনাকে যেতা পিটার হাস সরকারকে পৌছে দিয়েছিলেন। অজিত দোভালের সফর আর পরে বাইডেনের আপোষের চিঠি সবটা মিলিয়েই হাসিনা চীন ত্যাগ করেছিলেন।
    আর এখন চান্স মত পিনাক রঞ্জন চাপাবাজির ঝুলি নিয়ে হাজির হয়েছেন – আমেরিকাকে কথিত ধমকদাতা হয়ে!

    আর সেই সাথে , কমপক্ষে গত ১৭ বছর ধরে “ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক” এক মহান অথবা চিরায়ত অথবা আমরা আমরাই তো ইত্যাদি ধরণের অসংখ্যা মিথ্যা আবেগ তুলে বারবার, ভাষ্য খাড়া করে গেছে ভারত; যার সার কথা হল বাংলাদেশ ভারতের সম্পত্তি বা ভারতের কলোনি। ভারতের এই  মনোভাবকে আমাদের কবর দিতে বন্দোবস্ত করতে হবে।
    এককথায়, ভারত আমেরিকার যৌথ উদ্যোগেই  হাসিনা সরকার চীনের হাত ছেড়ে গাট্টিবোচকা নিয়ে ভারতের কোলে উঠা সম্পন্ন করেছিল।  আর এটাকেই পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর মত মফস্বলী ভেবেছেন তিনি এখানে ডাহা মিথ্যা এক চাপাবাজি করলেও কেউ বুঝতে পারবে না। তাই ভারতের আমেরিকাকে ধমক দেয়া বা ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই – বলে ডাহা মিথ্যা গল্প সাজিয়েছেন।

    তবে এসব যাই হোক হাসিনা-মোদি দুই সরকারেরি অনিশ্চয়তা টেনশন ক্রমশ বাড়ছে ভারত খেদাও পরিস্থিতিতে জনমত কী তারা নিজেরাই ডেকে আনলেন? এই ডেকে এনে কী তারা ভুল করলেন?
    বাকিটা আগামিতে……।

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ     মার্চ ২০২৪ ০৭ঃ ১৯   সন্ধ্যা
    আপডেটঃ     মার্চ ২০২৪ ০৮ঃ ১০   রাত

     

  • মোদি-চন্দ্রচূড়ের আদালত কী বাংলাদেশের জন্য ‘মডেল’ প্রশিক্ষক হতে চায়?

    মোদি-চন্দ্রচূড়ের আদালত কী বাংলাদেশের জন্য ‘মডেল’ প্রশিক্ষক হতে চায়?
    গৌতম দাস
    ০৩ মার্চ ২০২৪  সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫৭
    https://wp.me/p1sCvy-5sa

     

     

     

    একটা অন্যায়-অপরাধের প্রতিকার বলতে আরেকটা অন্যায় করা নয়! কিন্তু মানুষের জিঘাংসা এতই তীব্র, সে প্রতিহিংসার আগুনে এতই সাইকো যে মানুষ সে পথেই যায়!
    আর নিজের করা বর্তমানের অন্যায়-অপরাধের সাফাই হিসাবে সে আগে তার উপরে ঘটা অন্যায়-অপরাধকে হাজির করে!  তাতে কিছুই মুছে না, দুটাই অন্যায়-ই হয়ে জ্বল জ্বলে থেকে যায়!

    গত সপ্তাহে ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আয়োজিত ঢাকার এক অনুষ্ঠানে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় যশোবন্ত চন্দ্রচূড়-কে [CJI  D. Y. CHANDRACHUD]  দাওয়াত দিয়ে আনা হয়েছিল। অফিসিয়াল দাওয়াত কার্ডের লেখা অনুসারে ব্যাপারটা ছিল – “The supreme Court of Bangladesh is going to organize an international conference on “South Asian Constitutional Court in The Twenty-First Century: Lessons from Bangladesh and India” on 23 & 24 February 2024. The valedictory scession of the conference will be held on 24 February 2024, at 10:00AM at the Bangabandhu International Conference center (BICC). – এরকম।
    মানে হল এই আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন করা হয়েছে; যদিও এতে অংশগ্রহণকারী কেবল ভারত ও বাংলাদেশ। আবার বলা হয়েছে, এটা দক্ষিণ এশিয়ার কনষ্টিটিউশনাল কোর্টের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলাপ; যেখানে আবার কেবল ভারত আর বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা-পাঠ [lessions] নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু ঘটনা হল, দক্ষিণ-এশিয়া বলতে কেবল ভারত-বাংলাদেশই বুঝায় না। এভাবে ভারত কখনই তার দক্ষিণ-এশিয়ার ধারণা বাস্তবের সাথে মিলাতে না পারলেও একই কান্ড করে থাকে! আসলে ঘটেছে যেটা ভারতের মিথ্যা আধিপত্যের খপ্পরে পড়েছে বাংলাদেশ! আর সেটা ঢাকতেই এটা “দক্ষিণ-এশিয়ার ব্যাপার” বলে নোংরামি ঢেকে রাখার ভারতের এই অক্ষম প্রচেষ্টা!

     

    অনুষ্ঠানের আরো দৃষ্টিকটু দিকঃ
    ঘটনার আরো সব মারাত্মক দিক আছে। সবচেয়ে দৃষ্টিকটু হল, একটা জুডিশিয়ারি ক্ষমতা তা যেন এক্সিকিউটিভ (বা প্রধানমন্ত্রীর) ক্ষমতার অধীনে আছে ও থাকতে হবে এই অনুমানে দাঁড়িয়ে সবকিছু আয়োজন করা হয়েছে। কোন রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী বিভাগের অধীনে থাকে না। রাখা যায় না। বিচার বিভাগ জনপ্রশাসন বিভাগের মত নির্বাহি-প্রধানমন্ত্রীর অধীনের কোন প্রতিষ্ঠান নয়, পুলিশ বা সামরিক বিভাগের মতও নয় যে এসব অফিস বা বিভাগের মত বিচার বিভাগও প্রধানমন্ত্রীর অধীনের কোন সরকারি অফিস-প্রতিষ্ঠান নয়। তাহলে এটা আর রিপাবলিক রাষ্ট্র থাকে না! জনগণই ঐ প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতার উতস  তা আর কার্যত থাকে না!
    সেপারেশন অব পাওয়ার” বা বিচার বিভাগকে প্রধানমন্ত্রী (বা রাজার) নির্বাহী ক্ষমতা থেকে বিচ্ছিন্ন বা আলাদা করার কনসেপ্ট এটা ইউরোপে রাজতন্ত্রের আমল থেকেই চালু এক পজিটিভ ধারণা। অর্থাৎ পরবর্তিতে জনগণই সব শাসন ক্ষমতার উতস – যেটাকে ঐ শাসন ক্ষমতার উতস কোন রাজা-বাদশা নয়; তাদের ডায়নেস্টির বংশ-পরম্পরা বা রাজার ছেলে রাজাও আর নয় এমন নয়া এই রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণার মুলকথা চালু হয়েছিল। বলা হয় যা রাজতন্ত্র ব্যবস্থাকে নির্মুল করে ক্ষমতা নিয়েছিল – সেই রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা আসার আগেই এটা চালু হয়েছিল যে বিচার বিভাগকে রাজার (বা পরে সমতুল্য নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর) ক্ষমতা থেকে  আলাদা বা সেপারেট করতেই হবে। নইলে বিচার করা অর্থহীন। নির্বাহী ক্ষমতার শাসকের মুখ চেয়ে যে রায় দেয়া হয় ওটা বিচার নয়!

    তাই একালে রিপাবলিক নামে এক বাংলাদেশ রাষ্ট্র বা জনগণের শাসনের নামে কিছু একটা চালু আছে আমরা দেখছি  অথচ কিছু লোক মনে করছে যেন বিচার বিভাগও সর্বময় ক্ষমতার প্রধানমন্ত্রীর বাইরে থাকে কী করে?? অধীনেই তো থাকা উচিত! বিএনপি-জামাত জঙ্গীবাদ ঠেকাতে নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই বিচার বিভাগ গড়তে হবে যারা সহি মনে করছেন এটা তাঁরা গড়ে তুললে সেটা প্রধানমন্ত্রীর মুখ চেয়ে বিচার ও রায় দিবার এক বিচার বিভাগই হবে! এর বাইরে কিছু হবার সুযোগ নাই! এমনিতেই যেটা নিয়ে সরকার-বিরোধী যেকোন নাগরিকের ইতোমধ্যেও অভিযোগ করে আসছে। আমাদের বিচার বিভাগকেই ঢেলে সাজাতে হবে বলে মনে করে এমন অভিযোগকারিরা! সেখানে সুপ্রীম কোর্ট আয়োজিত এই কনফারেন্স আসলে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগকেই পুষ্ট করল!

    এই আয়োজনে দৃষ্টিকটু ঘটনার শেষ নাই। যেমন প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান অতিথি করে আনা হয়েছে। অথচ ব্যাপারটা মূলত দুদেশের সুপ্রীম কোর্টের এক অনুষ্ঠান মাত্র।  কোর্ট যেকোন নির্বাহী (প্রধানমন্ত্রীর) ক্ষমতা থেকে দুরে বা আলাদা থাকবে সেটাই স্বাভাবিক হত। অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে তারা এনেছে হয়ত সেটা বড় সমস্যা হত না যদি নিজ পরিমিতবোধে প্রেসিডেন্ট – তিনিও কোন রাজনৈতিক বক্তব্য আনছেন না বা এড়িয়ে গেছেন। এরপর থেমে যাওয়া উচিত ছিল।  কারণ, কোন চীফ জাস্টিস প্রধানমন্ত্রীর সাথে এক আসরে হাজির থাকেন না – খুবই সীমিত ও নির্দিষ্ট কিছু আনুষ্ঠানিকতার আসর ছাড়া!  প্রধানমন্ত্রী আর বিচার বিভাগের ক্ষমতা আলাদা – এটা সব জায়গাতেই প্রতিষ্ঠিত রাখতেই হয়!

    পুর্ব-সংস্কার বা প্রিযুডিস [prejudes]
    সেপারেশনের ইস্যুটা ছাড়াও আরেকটা বিরাট বিবেচনা নিয়ে বিচারকদের চলতেই হয়, মানতেই হয়। সেটা হল – পুর্ব-সংস্কার বা প্রিযুডিস [pre-judes]। বিচারক সকালে উঠে বাসায় নাস্তার টেবিলে এক ঘনিষ্ট আত্মীয়,বন্ধু বা হয়ত নিজ স্ত্রীর মুখে মন্তব্য শুনলেন যে আজ এজলাসে যে কেসের শুনানী তিনি শুনবেন সেই আসামীই আসল বা মূল খুনী অপরাধী – এধরণের একটা মন্তব্য!  কিন্তু বিচারকের কাজ হচ্ছে কোন কারও কানকথা না শুনা, কানেই না আসে সে ব্যবস্থা করা! আর এজলাসে বসে কেস ডকুমেন্ট আর শুনানীতে বাদী-বিবাদির উকিল কী তথ্য আর যুক্তি তুলছেন কেবল সেসবের ভিত্তিতে আসামী সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা। যেটা একমাত্র এজলাসেই তৈরি হয়, শুনতে শুনতে জন্মায়। কাজের সকালে বাসায় যদি কিছু শুনেছেন আর এতে তার মন যেভাবে প্রভাবিত হয়েছে – এটাই প্রিযুডিস বা পুর্ব-সংস্কার বলা হবে। এককথায় সেটা আসলে এজলাসে-বিচারে বসার আগেই প্রভাবিত হয়ে বিচার করে ফেলার অবস্থায় নিতে পারে বিচারককে!  একজন বিচারকের জন্য প্রিযুডিস তাই সবচেয়ে বড় অপরাধের কাজ মনে করা হয়!
    বিচারকেরা তাই নিজ জীবন সাজান যেন প্রিযুডিস এড়ানো জীবনাচার হয় নিজের! এজন্য সামাজিক-পারিবারিক নিজ জীবন তিনি নিয়ন্ত্রিত করেন। সবার দাওয়াতে তিনি যান না, সব সামাজিক অনুষ্ঠানে তিনি অংশ নেন না; খুবই ঘনিষ্টজনেরটা ছাড়া! যাতে আবার কোন ব্যক্তিগত আলাপে তিনি জেনে বা না-জেনে যেন কারো দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে যান! এভাবে সতর্কতা নিতে হয় তাঁকে! কাজেই প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা-সাক্ষাত সেটা তো অনেক দুরের যেখানে নিজ সব আত্মীয়স্বজন বন্ধুর সাথেও কোন বিচারকের ততটা মেলামিশার কথাই না!

    অথচ এখানে হয়েছে উলটা প্রধানমন্ত্রীকেই এখানে চীফ গেষ্ট করা হয়েছিল। আর প্রধানমন্ত্রী প্রায় ত্রিশ মিনিটের বক্তৃতার পুরাটাই ছিল রাজনৈতিক বক্তব্য! আমাদের বিটিভির রেকর্ডেড এই বক্তৃতা ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে। এটা পুরা অনুষ্ঠানেরই ভিডিও প্রায় দুই ঘন্টার বেশি; এর মধ্যে ১ঃ৪৪ মানে একঘন্টা ৪৪ মি এর পর থেকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা শুরু হয়েছে।
    ওদিকে আরেক বড় অস্বস্তিকর ব্যাপার হল, এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে বলা হয়েছে সমাপনী বক্তা অতিথি [valedictory scession]। এটা সকাল দশটায় শুরু হলেও এটাই সমাপনি অনুষ্ঠান নয়। কারন, ঐদিনই বিকালে তিনটা থেকে ২৪ তারিখেওর আলোচনা অনুষ্ঠান হয়েছে।

    এই অনুষ্ঠানের আয়োজন কেন? মূল উদ্দেশ্য কী?
    এর জবাবটা হাসিনার দিক থেকে দেখে বললে মানে, হাসিনার আধাঘন্টার বক্তৃতার দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলে যা পাওয়া যায় তা হল, এদিনটা আসলে ছিল হাসিনার ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসার পর থেকে এপর্যন্ত তিনি কী কী অর্জন করেছে এর একটা তালিকা হাজির করা আর এসবের জন্য ভারতের সরকার সেনাবাহিনী সহ ভারতের ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান প্রায় সবাইকেই ধন্যবাদ জানানো। এর ভিতরে আবার ভারতের হাসিনাকে ছয় বছর আশ্রয় দেয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে। এর সাথে হাসিনার ভাষায় বিচার বিভাগ যেভাবে   নিয়ন্ত্রিত ভাবে আচরণ করে ১৯৭৫ সালের আগষ্টের পর থেকে বখে গেছিল একে তিনি এবার শুদ্ধ করে নিজের মত করে সাজিয়েছেন – এই অর্জনকে ভারতের সামনে তুলে ধরতে চেয়েই যেন এই কনফারেন্স আয়োজন করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে!
    এই হল, হাসিনার আধাঘন্টার বক্তৃতার সারকথা!
    কিন্তু প্রধান বিচারপতি  চন্দ্রচূড় এর কিছু মন্তব্য সব আউলায়ে দিয়েছে।  কিন্তু এরও আগে, চন্দ্রচুড়  আবার এই কনফারেন্স সম্পর্কে হাসিনার নিজ ভাষ্যকে পাশ কাটিয়ে নিজ ভাষ্য খাড়া করেছেন।

    কনফারেন্সের দাওয়াতপত্রের ভাষ্য ভারতেরঃ
    কেন ভারতের পুরা বিচার বিভাগ না হলেও এর মাথা সুপ্রীম কোর্ট এমন কনফারেন্সে যোগ দিল – এনিয়ে তাদের মনেও অস্বস্তি ছিল তা বুঝা যাচ্ছিল। যেমন, হাসিনার সাথে ভারতের বিচার বিভাগের লেনা-দেনা কী? আমাদের বিচার বিভাগের যেকারণে আমাদের নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ট হওয়া অস্বস্তিকর কারণ তাদেরকে নির্বাহী ক্ষমতা থেকে সেপারেশনে দূরে থাকাটাই একমাত্র স্বাভাবিক! বাকিটা অস্বাভাবিক!! তাহলে ঠিক একই যুক্তিতে ভারতের সুপ্রীম কোর্টও তাই অস্বাভাবিক কিছু করেছে???  তাদেরও কোন লেনা-দেখা থাকতেই পারে না। এছাড়া ভারত ও বাংলাদেশ এদুই সুপ্রীম কোর্ট কী একাদেমিক-টেকনিক্যাল বৈশিষ্ঠের কোন কনফারেন্সে মত্ত হয়েছিল? জবাব হল যে একেবারেই না। কারণ তাহলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাদের কোন কাজ থাকার কথা না ??

    তাই এই অস্বাভাবিক দিক, এদিকটা সাফাই দিতেই চন্দ্রচুড় এন্ড গং বিচারপতিরা তার সঙ্গি হয়ে এসেছেন – অনুমান করা যায় তারা অনুষ্ঠান সুচির পাতার শুরুতেই ১০-১২ লাইনের কিছু বক্তব্য ঢুকানো দেখে। নিচে তেমনই পাতাটা দেখেন।

    এককথায় বললে এটা ভারতের জুড়িশিয়াল পেশাদারদের কিছু অপ্রয়োজনীয় আতলামী ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের ভারত যেন এশিয়ায় না হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় বিচারীয় বিষয়ের বিরাট কুতুব এক অথরিটি!  এমন আগাম অনুমান ধরে নিয়ে তারা কথা বলেছে! যেমন বাক্যের প্রথমেই একটা শব্দ ব্যবহার করেছে পোস্ট-কলোনিয়াল। অনেকে আবার  পোস্ট-কলোনিয়াল শব্দটা কাউকে ব্যবহার করতে দেখলে এটা যেন বক্তার বিরাট এক জ্ঞানের বহরের প্রকাশ ভেবে মাথা নিচা করে সালাম-আনুগত্য জানাতে-বুঝাতে চায়।  অথচ এই ভাষ্যের সারকথা হল, ১৯৪৫ সালের আগের পশ্চিমাবিশ্বের অভিজ্ঞতা পরের কলোনিমুক্ত দেশে যেন আর অত কাজের না। তাই লিখেছে  – where constitutional borrowing has occured in the region rather than from europe & America. -মানে হল  পোস্ট কলোনিয়াল সময়ে ইউরোপ ও আমেরিকার চেয়ে আমাদের এই রিজিয়নে [মানে যার একছত্র নেতা হল ভারত বলে বক্তার ভুয়া অনুমান] আমাদের নিজেদের মধ্যকার অভিজ্ঞতা ধার নেয়া বেশী ঘটেছে। ফলে ভারত হল বাংলাদেশের জুডিশিয়াল বা বিচারীয় জ্ঞানের জগতে এক একছত্র নেতা ওস্তাদ। অতএব মোদি-চন্দ্রচূড় এন্ড গং-দের কথা শুনে বাংলাদেশ তুমি অনুগত হয়ে চল!!!!  আর আমাদের সুপ্রীম কোর্ট ভারতের সুপ্রীম কোর্টকে বড়ভাই মেনে আনুগত্য করুক!  কিন্তু আসলেই কী ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এর অর্জন এতই গৌরবেই? আসেন একটু চেক করে দেখি!

    প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা তাঁর বিরুদ্ধে ইলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় মানতে রাজি হন নাইঃ 
    ভারত রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রথম ধাক্কা খেয়েছিল ১৯৭৫ সালে। আর এতে ভারত এরপর থেকে নিজে আর কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র বলে নিজেকে দাবি করতে পারে কিনা সেই প্রশ্ন উঠেছিল। কেন?
    গত ১৯৭২ সালের কেন্দ্র-নির্বাচনে ইন্দিরার আসনে তিনি কারচুপি করেছেন আর এভাবেই তিনি এমপি আর শেষে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এমন মামলা করে তার প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী! এই মামলার হাইকোর্টের রায় বের হয় ১৯৭৫ সালে। বিচারক তাকে প্রধানমন্ত্রী পদ ত্যাগ করার সময় দিয়ে সাজা ভোগ করতে রায় দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এই রায় অমান্য করতে পালটা দেশে জরুরি আইন জারি করে পরিস্থিতি নিজের হাতে এনে নিয়ন্ত্রণে নেন; যাতে সাজা ভোগের প্রসঙ্গ চাপা পড়ে। সারকথা একটা রিপাবলিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগ আর নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী – এরা যদি কেউ কাউকে কনষ্টিটিউশনাল বাধ্যবাধ্যকতা মান্য করতে  বা কাজ করতে দিতে না চায় – এটা ছিল সেই কেস। যার সার-অর্থ হল, রাষ্ট্রটা নাই হয়ে গেছে!! ঠিক তাই হয়েছিল ভারতে।  যদিও পরে ইন্দিরা সরকারের পতন ঘটে – নির্বাচনে বিরোধী মোরারজি দেশাই এরা ক্ষমতায় আসে। আমি আর সে  সব ফারদার বিস্তারে যাচ্ছি না এখন।

    [অনেকে ভাবতে পারেন কেবল ভারত রাষ্ট্রই ইন্দিরার হাতে এমন সংকটে পরেছিল। না, একেবারেই সত্য না। শেখ মুজিবের বাংলাদেশ রাষ্ট্রও ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি শেখ মুজিবের হাতেই এমন নাই হয়ে গেছিল। আমার পুরানা  ২০১০ সালের লেখা পড়েন এখানে।]

    কিন্তু এরপর থেকে ভারতের আইন পেশার একাদেমিক, উকিল বা বিচারক কমিউনিটি দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যাদের মধ্যে ডমিনেটিং ভাষ্য হল, বিচার বিভাগের প্রধানমন্ত্রীকে সমীহ করে কম্প্রমাইজে চলা উচিত ছিল! বিচারকদেরও প্রধানমন্ত্রী জিন্দাবাদ বলতে হত!  শহরের এলিটদের বিরুদ্ধে যেভাবে গরীবেরা দাড়াতেই পারে না আগের মানসিকভাবে হেরে গিয়ে থাকে বলে – এটা ছিল অনেকটা সেরকম!
    আর সেই থেকে ভারতে এই “দেশের স্বার্থে” বলে আপোষি জাতিবাদিদের আপোষ ধারাটাই চলে আসছে এখনও। নানান বাঁক পেরিয়ে। এমনকি এখনও এই চন্দ্রচূড়েরা একই কাজ করে চলছেন! মুসলমান নিধন অত্যাচার নিগৃহ বৈষম্য চন্দ্রচুড়েরা দেখতেই পান না!  এমনকি চন্দ্রচূড় ঢাকায় এসেছেন মোদি-হাসিনার রাজনৈতিক আলোচনার ফলশ্রুতিতে। কিন্তু চন্দ্রচুড় কেন এই আলোচনায় অংশ নিবেন? মোদি বা হাসিনার সাথে এই প্যাচ-আপে তিনি কেন অংশ নিবেন? তিনি কী মোদির অধীনে কোন মন্ত্রণালয়ের সচিব?? এর উপর আবার মোদি  যে বাংলাদেশে নিজ কলোনি শাসন – আধিপত্য কায়েম করতে চলেছেন। আর চন্দ্রচূড় “পোষ্ট-কলোনিয়াল” বলে হুঙ্কার তুলে মোদির কলোনিদখলের নৌকায় উঠে বাংলাদেশে এসেছেন!  প্রধানমন্ত্রীকে সমীহ করে কম্প্রমাইজে চলা প্রধান বিচারপতির চন্দ্রচূড়ের তো পরিণতি এমনই হবার কথা; নয় কী!!!

    চন্দ্রচূড় ভাব ধরতে চান কলোনিয়াল পশ্চিমারা খুব খারাপ। একমাত্র তিনিই বীর! তো রিপাবলিক ধারণাটা কোথায় পাইছেন, মহাশয়?  ব্যক্তি-বোধ, নাগরিক, রাষ্ট্র রাজনীতি ইত্যাদি সহ ভারতে রিপাবলিক ধারণা কিভাবে এলো? মোগল আমলে ছিল?? কাজেই বকোয়াজ বন্ধ করেন। ইউরোপের আমাদের মত দেশকে কলোনি করা অন্যায় নিঃসন্দেহে! কিন্তু কলোনিদখলদারদের দেশে শাসন ব্যবস্থা চালু ছিল বলে এই হিসাবে রিপাবলিক – জনগণ ক্ষমতার উতস – রাজনীতি নাগরিক ইত্যাদি সব ধারণাওগুলো আমরা বৃটিশদের থেকেই পেয়েছি। এটা পজিটিভ পাওনা! আর বৃটিশেরাও আবার সে ধারণার গোড়াটা পেয়েছে রোমান-দের কাছে থেকে। এটা শুরুতে প্রাচীন রোম থেকে পরে হোলি রোমান এম্পায়ার সমাজ থেকে!
    এখনও আমাদের হাইকোর্টের বিচারকেরা রায় লেখার সময় দুচারটা এক্সিওম [AXIOM] বা স্বতসিদ্ধ সত্য বলে কিছু বাণীর উল্লেখ করতে খুবই ভালবাসেন। এর মাহাত্ম হল, তিনি যে রোমান এক্সিওমগুলো মুখস্ত করেছেন সেটাই যাহির করে দেখানো! এখন চন্দ্রচূড়েরা কী বৃটিশ-রোমানদেরকে কলোনি শাসক বলে তুচ্ছ বা অস্বীকার করবেন? পশ্চিমা কলোনি শাসকদের গালি দিয়ে আবার, এখন ভারতকেই  কলোনিদখলদার (বাংলাদেশকে দখল) করে গড়তে চাইবেন? মোদির হাতধরে বাংলাদেশে আসবেন???

    বৃটিশদের কাছ থেকে রাজা রামমোহন রায় বৃটিশ রিপাবলিক ধারণাটা প্রথম বুঝেছিলেন। তিনিই প্রথম এটা বুঝে তা কাজে লাগাতে গেছিলেন। কিন্তু বুঝেছিলেন উলটা। ভেবেছিলেন, রিপাবলিক জাতি-রাষ্ট্র মানে একটা ধর্মীয়-জাতি ধারণা। সেটা অর্জন করতেই তিনি অসংখ্য জাতে বিভক্ত হিন্দুদেরকে সহ সকলেই আগে এক নয়া এক ব্রাহ্ম ধর্মে নিতেচেয়েছিলেন। আর এরই শেষ আজ পরিণতি বিজেপি-আরএসএসের হিন্দুত্ববাদ! 
    একটু পড়ালেখা করেন বুঝা কঠিন না। কিন্তু হুদাই পশ্চিমাবিরোধী সাইজেন না! এর পরিণতিতেই তো বাংলাদেশকেই একালে ভারতের কোলোনি সম্পর্কে বেধে ফেলার কাজে মোদির সঙ্গি হয়ে এসেছেন!

    চন্দ্রচুড়ের হাত ধুয়ে ফেলার কোশেশঃ
    কিন্তু এসব সত্বেও চন্দ্রচুড় নিজের হাত ধুয়ে রাখতে চেয়েছেন। হাসিনার উপস্থিতিতে ঐ অনুষ্ঠানের সবটা বিটিভি সংগ্রহ ও রেকর্ডিং করেছে। কিন্তু ভারতের ইন্ডিয়া টুডে আবার সেখান থেকে নিয়ে নিজেই ইউটিউব ভিডিও করে ছেড়েছে, বিশেষ করে চন্দ্রচূড়ের আধাঘন্টা কথা। কিন্তু তাতেই এরা সনুষ্ট হয় নাই। এ’বাদেও ঐ আধাঘন্টা থেকে আবার বিশেষ আড়াই মিনিটের একটা বক্যব্যের ভিডিও-ও তারা ছেড়েছে। মনে রাখতে হবে ইন্ডিয়া টুডে মোদি সরকারেরই বা র-এর আরেক হাতিয়ার। যখন বাংলাদেশে বিরোধী বা বাংলাদেশকে টার্গেট করে কিছু তাদের প্রপাগান্ডা করার থাকে তখন তারা এই মিডিয়া ব্যবহার করে থাকে। সেই আড়াই মিনিটের লিঙ্ক এখানে। চন্দ্রচূড়ের এই অংশের বয়ানটুকুকে  তাই এন্ডিয়া টুডে নিচে লিখিত টেলপ দিয়ে এক মলিয়া পড়ে শুনিয়ে দিয়েছেন  যাতে কেউ মোদির দোষে অসৎ কাজের সঙ্গী বলে চন্দ্রচুড়কে অভিযুক্ত না করেন। চন্দ্রচুড় খারাপ ও অনিশ্চিত সময়ের কথা বলছেন যে এসব সময়ে সুপ্রীম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের মত প্রতিষ্ঠানগুলো কনষ্টিটিউশনের উপর মানুষের আস্থা-বিশ্বাস ধরে রাখার পক্ষে এগিয়ে আসে। এসব প্রতিষ্ঠানের ঠিকমত সচল থাকাটা সেজন্য গুরুত্বপুর্ন।

    In a time of uncertainty and ambiguity, the pillar of democracy are put to the test. CJ DYC speaking at the south asian constitutional court conference in Bangladesh emphasis the crucial role of institution like supreme court and election commission in upholding the trust of the people in the constitution.
    Speaking at the conference, CJ DYC said, the constitution is not like the income tax act. The legitimacy of our Governance institutions hinges on their functionality.
    He stressed that the confidence of the people in the constitution solidify when these institutions rise to the occasion.

    সারকথায় তিনি বলছেন  সুপ্রীম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের সচল ও কর্মক্ষম থাকাটা গুরুত্বপুর্ণ। মানে তিনি রেকর্ড রাখতে চান যে এদুটা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব তিনি আমাদের বুঝাইছিলেন! কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় গত পনেরো বছরে এটা হাসিনা সরকারের অধীনে একটা প্রতিষ্ঠানেরও এমন যোগ্য হয় নাই এটা কে না জানে! আর নির্বাচন কমিশন??? নিশ্চয় এবার ৭ জানুয়ারী ভোট দিয়ে জনগণ খুবই খুশি!!!! কারণ, হাসিনা বলেছেন স্বাধীন বাংলাদেশে এটাই নাকি বেস্ট নির্বাচন!  অর্থাৎ চন্দ্রচুড় হুদাই কীছু বকোয়াজ করে গেলেন আরকি!
    অবশ্য ভারতের অনেকের মনে হতে পারে সব হল আমরা মুসলমানদের স্মস্যা। আমরা পশ্চাদপদ আমরা তাই কিছু পারি না!।    তাহলে আচ্ছা ভারতের সুপ্রীম কোর্ট কী খুব একটিভ আর নির্বাচন কমিশন খুবই সুনামের?
    একই কথা বার বার লেখার চেয়ে আমার নিজেরই এক পুরানা লিখার লিঙ্ক এখানে, কী ভয়াবহ অবস্থা দেখেন এখানে। লেখাটার শিরোনাম ছিল ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া ও রবি কান্তের হতাশা । চন্দ্রচুড়ের নিজের সুপ্রীম কোর্টের অবস্থা বুঝবার জন্য। এবং এই আবেদনে নির্বাচন কমিশন ভাল হয়ে যায় নাই।
     আর ভারতের খোদ নির্বাচন কমিশন??? সে আরেক ভয়াবহ অবস্থা!!!  ভারতের নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যের; প্রধান ছাড়া আরো দুজন কমিশনার। কম কথায় বললে মামলা টা ২০১৯ সালে ভাএরতের নির্বাচনের। মোদিসহ আরো অনেক প্রার্থীই নির্বাচনি আইন ভেঙ্গে সাজা পেয়েছেন বা  ফাইন দিয়েছেন। কিন্তু একমাত্র নরেন্দ্র মোদি ছাড়া। তার নামে যৎগুলো অভিযোগ দায়ের হয়েছিল কমিশন তার একটাতেও কোনই পদক্ষেপ নিতেই যান নাই। এনিয়ে কমিশন প্রধান এক সদস্যকে পাশে পেয়ে দু-এক ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখিয়ে কোন একশনে যান নাই। আর তৃতীয়জন অশোক লাভাসা তার নাম – তিনি এরপর সরকারি নিগ্রহের শিকার হতে থাকেন – আর তা উনার স্ত্রীসহ যিনি উচ্চপদস্ত ব্যাংকার। তিনি নির্বাচন কমিশনের প্রতিটা সিদ্ধান্তে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রাখা ব্যক্তি ছিলেন। কয়েকবছর পরে আর চাপ সহ্য করতে না পেরে অশোক লাভাসা আপোষ করতে বাধ্য হন। রফাটা হল এখন তিনি নির্বাচন কমিশন ছেড়ে দিয়েছেন; [ADB] এডিবিতে ভারত সরকার পক্ষের আমলা প্রতিনিধি হিসাবে আছেন!

    অর্থাৎ সুপ্রীম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের সচল ও কর্মক্ষম থাকাটা গুরুত্বপুর্ণ বলে বিরাট জ্ঞানের কথা ছাড়লেও প্রধান বিচারপতি হিসাবে তিনি সরাসরি এর জন্য দায়ী!  অথচ বাংলাদেশে এসে জ্ঞানের কথা ছাড়ছেন???

    আমি এখনও পরিস্কার না বুঝি নাই, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ঠিক কী চান? কেন চন্দ্রচুড় ঢাকায় এসেছিলেন?  আমাদের কাছে এক প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সিনহা তার ঘটনাবলী এখনও জলজ্যান্ত আছে। তিনি গুজরাটে গেছিলেন এক বেসরকারি ল কলেজের অডিটরিয়াম উদ্বোধন – এই আমন্ত্রণে। গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য কত কী ভাল করেছেন এর ফিরিস্তি দিয়ে বক্তৃতা করে গেছিলেন। ভুলে গেছিলেন তিনি বিচার বিভাগের লোক যা প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নয়। আর তিনি কোন সচিবও নন। প্রধানমন্ত্রীর জন্য এসব জয়গাথা ছড়ানো তার কাজ দায়ীত্বের সাথে অসামন্বস্যপুর্ণ!  কিন্তু তিনি ফাঁদে পড়লেন যে তিনি কার কথা কে বেশী গুরুত্ব দিবেন! হিন্দু মনে ভাবলেন কাকা-বাবু এখানে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে প্রেফারেন্সিয়াল! ফলাফল আমরা সবাই জানি! এর মানে  আমাদের সব অভিজ্ঞতাই বলছে এসবের একটাও কাজ করে নাই! এরপরেও ঠিক কী জানতে বাকী আছে???? আমার বুঝাবুঝি-নাগালের বাইরে!

    একটা গুরুত্বপুর্ণ বিষয় “আরবিট্রেশন” – এটা ভুলে গেছিলাম, এখন যোগ করে দিচ্ছিঃ
    ধনঞ্জয় চন্দ্রচুড় তাঁর বক্তৃতায় বিচার ব্যবস্থার ভিতরেই সালিশ ব্যবস্থাও [arbitration] যোগ করার প্রস্তাব করেছিলেন।  সালিশি মানে বুঝতে হবে – যেখানে কেউ অপরাধী বলে রায় দেয়া হয় না, কাউকে সাজা দেয়া হয় না। এটা এক আপোষ-মীমাংসার পথ। ফলে স্বভাবতই কোন ক্রিমিনাল কেসে এর ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু চন্দ্রচুড় এই সালিশ-ব্যবস্থার কথাও আসলে বলেনই নাই। তাহলে?
     
    তিনি আসলে  মিন করেছেন – মানে আরবিট্রেশনের কথা বলে এই আড়ালে (হিন্দুত্ববাদী) সরকারের চাওয়ার পক্ষে রায় দেয়া। এর ইঙ্গিত দিয়েছেন। সেটাই আমরা এখন নিচে দেখব।
    বাবরি মসজিদ ধবংস করা হয়েছিল ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। যদিও মানুষে নানানভাবে এঘটনাকে ব্যাখ্যা করে কেবল নিজের পক্ষে সাফাই টেনে থাকে। আর আমার ধারণা হল এটা ছিল মুসলমানবিরোধী ঘৃণা সাজিয়ে  সেই উস্কানিতে আরএসএস-বিজেপি যে ভোটের রাজনীতি ক্ষমতাদখল ব্যবস্থা আনতে যাচ্ছে এরই আগমনী সিগনাল- বার্তা ছিল।  তাদের হিসাবে এটা ছিল এভাবে হিন্দুত্ববাদী ক্ষমতা আনবার জন্য পারফেক্ট টাইমিং; হয়েছিলোও তাই। এরই পরিণতি-প্রমাণ হল গত দশবছরের নরেন্দ্র মোদীর শাসন! ও বিচারকদের আছে তাঁর নানান চাওয়া – এর জন্য চাপ সৃষ্টি! আর এর পুর্ণতা দিবার পিছনের অন্যতম এক বিচারক হলেন ভারতের বর্তমান প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় যশোবন্ত চন্দ্রচূড়! তারঁ বাবা যশোবন্ত বিষ্ণু চন্দ্রচূড় [YBC]ও এর আগে প্রধান বিচারপতি ছিলেন। ধনঞ্জয় [DYC] হার্ভার্ড ল স্কুল গ্রাজুয়েট ও পিএইচডি হোল্ডার।  কিন্তু হায়!
    ১৯৯২ সালের মসজিদ ধবংস মামলায়  সুপ্রীম কোর্টের ফাইনাল রায় ঘোষণা হয় ২০১৯ সালে।  ধনঞ্জয় সেখানে রায় দাতা পাঁচ  বিচারকের একজন বিচারক! যেখানে বিচারকদের রায়ের সারকথা হল, মসজিদের স্থানে মন্দির করতে দেয়া হোক আর মসজিদের জন্য সরকার আলাদা জায়গা দেক! এই হল, ধনঞ্জয় চন্দ্রচূড়দের বিচারের রায়ের নামে সরকারের দালালি আর ইঙ্গিত দেয়া এটাই তাদের সালিশি ব্যবস্থা????
    তার মানে ধনঞ্জয় চন্দ্রচূড় কী আমাদের বিচার বিভাগকে সালিশের চর্চার কথা বলে  বিভিন্ন মামলায় সরকারের পক্ষে রায় দিবার কথা বলে গেলেন? মনে রাখতে হবে, প্রধানমন্ত্রীর চাওয়ার পক্ষেই বিচার বিভাগকে থাকতে হবে রায় দিতে হবে – এই অভ্যাস সেই যে ১৯৭৫ সাল থেকে ইন্দিরার হাতে শুরু হয়েছিল ভারতের বিচার বিভাগ এথেকে বের হতে পারে নাই। বরং এই চামচামির ধারা বজায় রেখে নিজের আখের গুছানো বিচারক প্রধান বিচারক হওয়াটাই ভারতের বিচার বিভাগের অনুসৃত নীতি হয়ে গেছে!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ ০৩ মার্চ ২০২৪ ০৭ঃ ১৯   সন্ধ্যা
    আপডেটঃ ০৪ মার্চ ২০২৪ ০৮ঃ ১০   রাত

     

     

     

     

     

  • আলী রীয়াজদের সংকট এবং আইলিন এর এবারের ঢলে পরা সফরে! 

    আলী রীয়াজদের সংকট এবং
    আইলিন এর এবারের ঢলে পরা সফরে! 

    গৌতম দাস
    ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা সাতটা নয়
    https://wp.me/p1sCvy-5qQ

     

       র‌্যাবের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ৫ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

     

     

    প্রতীকীভাবে “আলী রীয়াজদের” বললেও এরা আসলে কারা? বলতে চেয়েছি যারা দ্বৈত নাগরিক মানে, বিশেষ দ্বৈততার দিক আছে। তাও এটা ঠিক দ্বৈত নাগরিক মাত্রই এমন সবার কথা বলছি না। একজন ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী বা সাধারণ মানুষ যারা আপন ভাগ্য-অন্বেষণে  আমেরিকায় (বা বিদেশে) নাগরিকত্ব যোগাড় করেছেন বা যোগাড় করতে না পারলেও রেসিডেন্ট পারমিট – মানে সে দেশে থেকেই বসবাস ও কাজ-চাকুরি করার অনুমতি পেয়ে নিয়েছেন – এমন সকল মাইগ্রেন্ট বা প্রবাসী – এদের সকলকে বাইরে রেখে বাকিদের কথা বলছি। অর্থাৎ সাধারণদের প্রায় সকলকেই একেবারেই বাইরে রাখছি।  এমন এরা সকলকেই এই আলোচনার বাইরে রেখে কথা বলছি।  তাতে যাদের কথা বলছি, এরাও দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা না নিয়েছেন, তাতেও কোন ফারাক নাই।  কারণ, আমার এই কথাগুলো সাধারণদের নিয়ে নয়। তাহলে?

    আমি কথা বলছি যারাও মাইগ্রেন্ট অবশ্যই, কিন্তু যারা সেদেশের সরকারের নীতি-পলিসি সংশ্লিষ্ট পেশা নিয়েছেন যেমন কোন আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাংক ফেলো। এছাড়াও যারা আমেরিকা সরকারের নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। অথবা আরেকটা চিহ্ন যাদিয়ে এদের আলাদা করা যায় যে যারা তাদের পেশাগত কাজটাই এমন যে তাঁকে আমেরিকান প্রশাসনের পক্ষে সাফাই দেয়া বা যুক্তি-অবস্থান যোগানোই যাদের একমাত্র কাজ; এভাবেই তাদের লিখা বা কথা বলতে হয়। ফলে বলাই বাহুল্য যারা দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা রেসিডেন্ট পারমিট হোল্ডার শুধু নন; বরং বাড়তি আরো যারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে আমেরিকান প্রশাসনের সাথে জড়িয়ে আছেন বা গেছেন – আমি কেবল এদের কথা বলছি। এখানে “আলী রীয়াজদের” বলতে তাদের কথা বুঝিয়েছি। এই অর্থে এদের বিশেষ দ্বৈততার দিকেই আমার নজর তাতে এরা নাগরিক অথবা যাদের মধ্যে অনেকে শুধু-ই রেসিডেন্ট পারমিট হোল্ডার হলেও! 

    বাংলাদেশে আমেরিকান ফরেন পলিসির প্রয়োগ আছে স্বাভাবিকভাবেই আর, আপনি এই বিশেষ দ্বৈততায় নাগরিক বা হয়ত না; কিন্তু আপনি  আমেরিকান পলিসি-প্রশাসনের কর্ম প্রয়োগ-ততপরতার সাথে জড়িত; যেমন ধরা যাক আলী রিয়াজ এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক এর ফেলো। এখন আলী রিয়াজ বাংলাদেশের সিরিয়াস রাষ্ট্রস্বার্থ জড়িত এমন কোন ইস্যুতে আমেরিকান পলিসি সম্পর্কিত কোন আলোচনায় অংশ নিয়েছেন; আর সেখানে আলী রিয়াজের কথা বক্তব্য-অবস্থান – যা কিছু তিনি সেখানে বলবেন বা লিখবেন, এটাতে তিনি কাকে প্রতিনিধিত্ব করছে বলে ধরে নিব? আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ? কথাটা বলা হচ্ছে এটা মনে রেখে যে আলী রিয়াজ বাংলাদেশ-অরিজিন আমেরিকান!  তাই এককথায়, ছোট করে প্রশ্ন হচ্ছে আলী রিয়াজের ভাষ্য কী আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ এর ভাষ্য? কোনটা বলে ধরে নিব?

    এখন আমরা স্বীকার করি বা স্বীকৃতি দেই আর না দেই – বাস্তবতা হল এখানে এক গভীর “কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট” মানে, দুই রাষ্ট্রস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংঘাত-বিরোধ আছে। আর এর একেবারে প্রাথমিক কিছু অবলিগেশন [obligation] বা দায় আছে আলী রীয়াজদের! নুন্যতম সততা স্বচ্ছতার খাতিরে তাদের এবিষয়ে একটা ঘোষিত অবস্থান থাকা উচিত।  কথাটা এমন হতে পারে যে, “আমি (আলী রিয়াজেরাদের কেউ) যাকিছু পলিটিক্যাল-ইকোনমিক বক্তব্য রাখি  সেখানে আমি সুনির্দিষ্ট করে ভিন্ন কিছু উল্লেখ না করলে ধরে নিতে হবে সেখানে আমি কেবল আমেরিকাকে প্রতিনিধিত্ব করেই বক্তব্য দিয়েছি ও দেই বলেই মনে করা সঠিক হবে”।
    যদিও থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলোদের কাজ হল আমেরিকার ক্ষমতাসীন প্রশাসনের পক্ষে ঢোল বাজানো। এমনকি সেটা প্রকাশ্যে ক্রিটিক্যাল বা নেগেটিভ অবজারভেশন দেয়াও না।

    মনে রাখতে হবে থিঙ্কট্যাঙ্ক এর চাকরি বা সার্ভিস দেওয়ার চুক্তিপত্র করা, এটা কিন্তু আমেরিকায় গিয়ে কোন ইঞ্জিয়ারিং-টেকনোলজি ফার্মের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তাদেরকে সার্ভিস দেয়া ও আয় করার মত ঘটনা একেবারেই নয়; সমতুলনীয় ঘটনা নয়। কারণ, থিঙ্কট্যাংক ফেলো বা আমেরিকাকে বাংলাদেশী-কনসালটেন্ট সার্ভিস দেওয়ার পেশাটা শতভাগ রাজনীতিক ও রাষ্ট্রস্বার্থ-মুলক কাজ!  কেউ এথনিক বাঙালি জনগোষ্ঠির লোক বলে সেই ইমেজকে ব্যবহার করে নিজেকে আড়ালে রাখার সুবিধা নেয়া ভুল ও অসততা হবে। মানে, এর উপর দাঁড়িয়ে সে সুবিধা নিয়ে আমেরিকান স্বার্থ বাস্তবায়নের কথা খেয়াল করে বক্তব্য দিয়ে যাওয়া  – এটা খুবই অস্বচ্ছ কাজ এই অর্থে তা অপ-ততপরতা হতে পারে! আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে সার্ভিস দিয়ে আয় করা হয়ত সাধারণভাবে অপরাধ নয় তবে,  আগে নিজ পরিচয়-অবস্থান পরিস্কার করে রাখলে সেটাই সততা হবে যে আমি আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে চাকরি-কাজে বা সার্ভিস দেওয়াতে আছি! 

    সম্প্রতি এবিষয়টা খুবই সিরিয়াস পর্যায়ে গেছে বলে আমার মনে হয়। ওয়েবিনার [webinar] মানে অনলাইন টকশোতে কথা বলা যাকে বলি, তার মধ্যে।  ওয়েবিনার মানে, কয়েক ব্যক্তি যারা নানান দেশে বসে আছেন কিন্তু তা সত্বেও যেন তারা একসাথে এক দেশের এক রুমে বসে আলোচনা করছেন – এমন এক গোলটেবিল বৈঠকের মত সেটা। এটা সম্ভব কারণ, তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রত্যেকে অডিও-ভিডিও সব অর্থেই কানেকটেড থাকেন সেখানে। অনেকে এটাকে তাই ভার্চুয়াল [virtual] বৈঠকও বলেন। [ভার্চুয়াল মানে হল, যা বাস্তব নয় কিন্তু যেন বাস্তব মনে করে নেয়া হয়েছে ও সে  অনুযায়ী আচরণ করা হচ্ছে; যার বাংলা অনেকে করে বলেন – “জ্ঞানত” বা অনুমিত]  তেমনই সম্প্রতি এক বৈঠকের খবর প্রসঙ্গে রিপোর্ট করেছে প্রথম আলো। শিরোনাম “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” । আর এই ওয়েবিনার বৈঠকের নিজস্ব শিরোনাম ছিলঃ ওয়েবিনারের শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ ও তার প্রতিবেশী: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব’।
    সেখানেই এই প্রশ্ন যে অংশগ্রহণকারী প্রবাসীরা তাঁরা কাদের প্রতিনিধিত্ব করে কথা বলছিলেন –  আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ? –

    এমন অস্পষ্টতা ছিল পীড়াদায়ক ও বিভ্রান্তকর! 
    কারণ, শিরোনাম দেখেই জানা যাচ্ছে – তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ নিয়ে এবার কথা বলছেন অথচ আমেরিকাকে বাইরে রেখে এর সব দায় কেবল ভারতের উপর চাপাচ্ছিলেন। অথচ তাঁরা কারা? মানে তারা কাকে প্রতিনিধিত্ব করছেন? মানে প্রবাসী ব্যক্তিদের কোন রাষ্ট্রীয় পরিচয়? তারা অনেকেই বাংলাদেশি-অরিজিন আমেরিকান। তাই ঐ ওয়েবিনারে তারা কী বাংলাদেশি রাষ্ট্রস্বার্থের নাকি আমেরিকান বা বিদেশি রাষ্ট্রস্বার্থের নাগরিক-প্রতিনিধি হিসাবে কথা বলছিলেন?


    কারণ, বিষয়টাতে এই প্রশ্ন ওখানে খুবই সিরিয়াস দিক ছিল? বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের জন্য দায়ী করা হচ্ছিল কেবল ভারতকে!  কিন্তু এটা ছিল
    বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একেবারে ভারত-আমেরিকার যৌথ প্রযোজনায় ঘটা হস্তক্ষেপ!
    আমরা তো ভুলতে পারি না যে ২০০৭ সালের ১/১১ এর সেনা ক্ষমতাদখল ছিল এক আমেরিকান প্রযোজনা। যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে
    তুলে দেওয়া।  আমেরিকার পক্ষ থেকে ভারতকে ঠিকা দেয়া কাজ – এশিয়ায় ভারত চীন ঠেকানোর চেষ্টা করবে – আর বিনিময়ে এরই উপহার ছিল বাংলাদেশকে
    ভারতের হাতে তুলে দেয়া! কিন্তু আমেরিকা বাংলাদেশকে তুলে দিবার কে??? এটা তো চরম অপরাধ??
    আর এখন ওয়েবিনারের যে শিরোনাম “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত”
    এই একই কাজ যার শুরু তো সেই ১/১১ এর পর থেকেই, গত সতের বছর ধরে। তাহলে???
    আর এখন সব দায় একা ভারতের উপর চাপাচ্ছে কেন আলী রীয়াজেরা???? আমেরিকার হাত ধুয়ে ফেলানো???? এটা ঘোরতর অসততা!

    ওয়েবিনারের এই শিরোনাম আমাদেরকে নিজেই জানিয়ে দিয়েছে যে সেখানে আলোচনার প্রসঙ্গ হল – বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ। যদিও তামাসা করে বললে, এটা কিন্তু তাদের একটা ভাল অগ্রগতিও বটে!
    ভারতের বাংলাদেশে হাত ঢুকানো তো নতুন না। কারণ গত ১/১১ এর সময়ে বাংলাদেশে আমেরিকার সামরিক ক্ষমতা দখলের এক প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া যাতে ভারত পক্ষে অসংখ্য সব ধরণের করিডোর এবং সবই বিনা-পয়সায় বাংলাদেশ থেকে আদায়; এমনকি ভারতের সুবিধা করে দিতে এজন্য যা অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় বইবার দায়ীত্ব এটাও বাংলাদেশের অর্থ ও দায়! অন্যদিকে পুরা বাংলাদেশকে ভারতের নিজ পণ্যের একচেটিয়া বাজার বানানো; এনফোর্সড ও অবৈধভাবে রেমিটেন্স আদায়ের জন্য বাংলাদেশকে উতস দেশ হিসাবে ব্যবহার ইত্যাদি সহ হেন ভারতীয় স্বার্থ নাই যা তখন থেকে লুট করা শুরু করা হয় নাই। যেটা ২০১৭ সালের পর থেকে একটু ঝিমিয়ে গেলেও চলতি ফেব্রুয়ারি থেকে তা আবার আমেরিকান প্রটেকশনে বিপুল বেগে চালু করার ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে। আর এটা এতই তীব্র ও প্রকাশ্য যে আলী রীয়াজেরা এই ইস্যুতেই কেবল ভারতকেই দায়ী করে হলেও এবার বৈঠক ডেকে বসতে বাধ্যই হয়েছে। বাধ্য বলছি কারণ, গত ১৫ বছর তো আলী রিয়াজদের এনিয়ে কোন ততপরতা দেখি নাই। আলী রীয়াজদের এই চিকণ বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হয়!! এতে ভারতবিরোধী সাজা গেছে আবার আমেরিকান নীতি-পলিসি অবস্থানের পক্ষে সার্ভিসও দেয়া গেছে!
    আলী রিয়াজ আমেরিকান এক থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো হিসাবে জয়েন বা চুক্তিবদ্ধ হবার পরপরই সেসময় (২০০৭) মূলত আমেরিকান পলিসি যে – এশিয়ায় চীনের বিস্তার ঠেকাও – যা তাদের ভাষায় চায়না ঠেকাও বা China Containment নামে ডাকত তারা – একাজের সারকথা ছিল –  বাংলাদেশকে উপহার হিসাবে ভারতের হাতে তুলে দেয়া – আর তাই করা হয়েছিল। কাজেই আলী রীয়াজের এই অপরাধ এটা অজানা থাকার কোন কারণ নাই। যখন তিনি তো সেখানে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে বাংলাদেশ এক্সপার্ট হিসাবেই রিক্রুটেড!   আমি জানি এনিয়ে আলী রিয়াজকে কোন পাবলিক সভায় বা বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় সভাতে এনিয়ে প্রশ্ন করলেও তিনি এনিয়ে তিনি কিছু জানেন না – এমন ধারণাই দিয়ে গিয়েছিলেন।  কথাটা অন্যভাবেও বলা যায় গত ১৫-১৭ বছরে আলী রীয়াজেরা যেন আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া  এই গর্হিত অপরাধ কাজ কখনও হতে দেখেনই নাই!! তাই যেন এবারই প্রথম বলতে চাইছেন যে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” । এক কথায় বললে আলী রীয়াজেরা ভান করছেন যেন আগে আমেরিকার এমন অপরাধের ঘটনা দেখা যায় নাই। আর সে কারণেই নিশ্চয় আলী রীয়াজেরা এমন ইস্যুতে কখনও কিছু লিখেছেন, বলেছেন এমনটার দরকার হয় নাই! তাই তা আমরা জানি না!  আবার আলী রিয়াজদের পক্ষে আমেরিকান ততপরতা দায় নিয়ে কথা বলা এটা আমাদের আশা করা কী ঠিক হবে?  কারো এনিয়ে জানা থাকলে এখনও শেয়ার করতে পারেন, বাধিত হব। তবে যারাই আগে কখনও কিছু বলেন নাই এটাকে তাদের অপরাধ – আমরা এটাই বলব! যদি বাংলাদেশী পরিচয়কে প্রতিনিধিত্ব করেন তবে ঘোরতর অপরাধকারী এরা। আর আমেরিকাকে প্রতিনিধিত্ব বা চাকুরির খাতিরে করলে এমন কাজ করা – এরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রস্বার্থের চোখে প্রকাশ্য শত্রু! যারা আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ছুপা এজেন্ট!!

    কিন্তু আসলেই কী এটা তাঁদের অগ্রগতিঃ
    আলী রীয়াজেরা এবার এনিয়ে ওয়েবিনার বৈঠক করেছে। মানে “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” এটা বুঝতে এদের ১৫-১৭ বছর লেগেছে।  এই অগ্রগতিটুকু হতে – মানে আসলেই কী এটা তাঁদের জন্য অগ্রগতি? সন্দেহ আছে! কেন?
    কারণ তারা এসেছে এবার আমেরিকাকে বাঁচাতে! যেন ভারত-আমেরিকাকে একই দড়িতে ফাঁসি না চড়ে!

    বাইডেনের আমে্রিকা এবার স্পষ্ট করেছিল অন্তত গত শেষ দুবছরে [১০ ডিসেম্বর ২০২১ থেকে] যে বাইডেন প্রশাসন শুধু হাসিনার বাংলাদেশ না, মোদির ভারতের উপরেও গণতন্ত্র-মানবাধিকার বা স্যাংশন আরোপে পিছপা হবে না। মূলকথাটা ছিল এবারের বাইডেন প্রশাসন ভারতের হাত ধরে এশিয়াতে আসে নাই বা নিজের “এশিয়া নীতি” সাজায় নাই। ফলে ভারতের চোখ দিয়ে এশিয়া দেখতে বাইডেন যেন আসেন নাই আমাদেরকে তিনি সেই ধারণাই দিয়ে গেছিলেন। কিন্তু হায় হায়! শেষ অন্তত চার মাসে (সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে) বাইডেন এন্ড গং আর কাপড় ঠিক রাখতে পারেন নাই! ন্যাংটা হয়ে গেছেন। আর শেষে ইন্ডিয়ার কোলেই মুখ লুকিয়েছেন, এশিয়ার সব ভরসা আর নিজ আশ্রয়স্থল করেছেন ভারত। আমেরিকান এই পল্টি-মারা সত্যি অতুলনীয়!

    এককথায় বললে, বাইডেন পল্টি মেরেছেন কারণ, তিনি দেখেছেন, হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখেই নাকি বাংলাদেশে চীন ঠেকানো বা চীন প্রভাব রোধ করা সম্ভব। তাই আমরা এখন সরাসরি বলতে পারি বাইডেনের নীতি-পলিসি গণতন্ত্র-মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোন  স্যাংশন-ট্যাংশন আরোপ ছিল না। সোজা লক্ষ্য ছিল,  বাংলাদেশে চীন ঠেকানো বা চীন প্রভাব রোধ করা। তাই আমেরিকা গত সেপ্টেম্বর ২০২৩  থেকেই আমাদের বিরোধীদল ছেড়ে পল্টি মেরেছিল। যা এখন ক্রমশ আমাদের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে। আর স্পষ্টতই এটা ভারতের বিজয়! বুড়া বাইডেন এখন সব ফেলে দিয়ে ভারতের কোলে কেলায় পড়েছে! আর এতে দ্বিতীয়বার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে স্পষ্ট করে তুলে দেয়া ঘটলো!

    আর এব্যাপারে আলী রীয়াজদের মত সবার চেয়ে মুশফিকুল ফজল আনসারী অন্তত সৎ! টেক্কাকে টেক্কা বলার পদক্ষেপ তিনি নিয়েছেন। যদিও তার পারস্পেকটিভ মানে, যে ওয়েব পত্রিকার তিনি নির্বাহী সেখানে প্রকাশিত কিছু আর্টিকেল থেকেই এটা পরিস্কার বুঝা যাচ্ছিল যে আমেরিকা পল্টি মারার সিদ্ধান্ত নিয়েছে! তবু আনসারী নিজের পারস্পেকটিভ-এ লিখতে না পারলেও অন্তত ভারতের WIRE পত্রিকায় নিজের বক্তব্য ছেপে দিয়েছেন। যার বাংলা করে ছেপেছে মানবজমিন!

     

    আইলিন লা-বাকার [Eileen Laubacher] আবার বাংলাদেশ সফরেঃ
    লা-বাকারের এটা দ্বিতীয় বাংলাদেশ সফর; মানে ২০২৩ সালের ৮-১০ জানুয়ারি। সেবার তাঁর পরিচয় দেখেছিলাম যা আমাদেরকে তখন UNB দিয়েছিল যে লাবাকার আমেরিকার একজন National Security Council’s Senior Director for South Asia । আর এবার তাঁর আরো একটা বাড়তি পরিচয় যোগ হয়েছে দেখা যাচ্ছে। সেটা হল, তিনি একইসাথে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের বিশেষ সহকারী-ও [Special Assistant]। অবশ্য এমনিতেই তিনি আমেরিকান নেভির এক সিনিয়র অফিসার – রিয়ার এডমিরাল আইলিন লা-বাকার!
    লা-বাকারকে নিয়ে  মানে তার এবারের সফর  নিয়ে এখনই সবটা লিখা যাবে না। এর টেকনিক্যাল প্রবলেমটা হল, তিনি কেবল গতকালকেই ঢাকায় তাঁর প্রকাশ্য ততপরতা শুরু করেছেন যা অন্তত আজ ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। এটাই তাঁর অফিশিয়াল সিডিউল! ফলে ২৭ ফেব্রুয়ারির পরে তা আবার আমাদের করতে হতে পারে। তাই এখন একটা কেবল তুলনা করব যে, লা-বাকারের আগের বছরের সফর আর এবারের সফর নিয়ে।
    গতবারের লাবাকার এর সফরের পরে আমার এক পুরানা লেখা আছে; লিঙ্ক এখানে।

    একটা আসল কথাই বলতে ভুলে গেছি। গতবার মানে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইলিন লাবাকার এর প্রথম সফরের সময় ভারতের হয়ে আমাদের
    কাছে কুখ্যাত সুবীর ভৌমিক কী লিখেছিলেন?
    তার সেই লেখার শিরোনাম ছিল – “আমেরিকা কী বার্মা-কে বসনিয়া বানাবে? নো ফ্লাই জোনের পরিকল্পনায় ভারতকেও নিষেধাজ্ঞায় সামিল করবে”
    – অয়ার আজ সেই ডোনাল্ড লু হয়েছে ভারতের কোলে বসা এক গুডি গুডি আদরের দুধ-বালক! ল্যু এখন সুবীরদের বাপ হয়ে গেছে!
    সুবীরের পুরানা সেই লেখার লিঙ্কঃ

    সেকালে লিখেছিলাম, “বাইডেনের এক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকারকে [Director for South Asia Rear Admiral Eileen Laubacher] পাঠানো; যার  উদ্দেশ্য খোদ হাসিনাকেই বার্মা দখল প্রোগ্রামে সামিল করা বিনিময়ে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে রাখা হবে – এই প্রস্তাব কতটা কার্যকর করা যায় তা দেখতে”।
    এছাড়াও সেখানে তখন এর কয়েকলাইন আগে বা উপরে লিখেছিলাম, “আমেরিকার বার্মা দখলের বাসনা বলতে এমনকি আবার সেটাও ঠিক যে এটা শুধু- সু চিকে মুক্ত করা বা বার্মিজ জেনারেলদের উতখাত ও শায়েস্তা করা নয়। এগুলো পরোক্ষ উদ্দেশ্য। আর মুখ্য বা প্রধান উদ্দেশ্য হল এশিয়াতেই চীনবিরোধীতা [কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির খাড়া করার মতই তবে আরেকটা পদক্ষেপ] ও চীনকে চ্যলেঞ্জ করে নয়া কল্পিত হবু বার্মায়  আমেরিকান উপস্থিতি ঘটিয়ে দেখানো”।

    আর এবারের পরিস্থিতি হল, হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি এখন আর ইস্যু বা বাস্তবতা নয়। দ্বিতীয়ত, খোদ শাসক বার্মার জেনারেলেরাই এখন বিদ্রোহীদের হাতে নাস্তানাবুদ। তাই, বার্মার ক্ষমতা এখন – জেনারেল বা বিদ্রোহী – এভাবে কার কাছে কতটুকু সেটা এক গবেষণার ব্যাপার এমনই এক অস্থির পরিস্থিতি এটা। কাজেই এর ভিতরে আবার আমেরিকা বার্মাকে দখল পেতে চাইলে কাকে উতখাত করবে – জেনারেল না বিদ্রোহীদের – সেই মূল বিষয়টাই অস্পষ্ট!  কাজেই আমেরিকার বার্মাদখল ইচ্ছা – সেটা এখন আমেরিকার মনের ভিতরে আরো অস্পষ্ট হয়ে থাকাই স্বাভাবিক। ফলে এখনই হাসিনাকে বার্মা ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার পক্ষে আসতে বলা অর্থহীন!
    ওদিকে হাসিনা সরকার বা সেনাবাহিনী উভয়েই যুদ্ধের বিপক্ষে। আর তা প্রায় প্রকাশ্য! আবার হাসিনারও এনিয়ে না-বুঝা-নাই যে  নিজ অর্থনৈতিক সংকটের ভিতরে আবার যুদ্ধ লাগানো বা অন্যের লাগানো যুদ্ধের মধ্যে পরা – এর মানে কী দাঁড়াবে? কাজেই আমেরিকার বার্মাদখল ইস্যু হাসিনার কাছে এক নন-স্টার্টার ফুড এর মত মানে, যা খাওয়া শুরুর জন্য কোন সুস্বাদ এর খাদ্য না; বরং করলা ভাজার মতই তিতা!

    তাহলে আইলিন লাবাকারের এবারের কাজটা কী? ফোকাস?
    বাংলাদেশের সরকার-বিরোধীদেরকে রাস্তায় নামিয়ে পরে বিনাবাক্যে পলায়ন বা পল্টি মারা – এটা আগামিতে আমাদের মত দেশে আমেরিকাকে আর কোন সরকার বা বিরোধী দল সহজে বিশ্বাস করতে চাইবে না! আমেরিকার এই পরিচয়ের সিল পরে গেছে!  সম্ভবত এর খেসারত-কাফফারা দিতে দিতেই আমেরিকাকে গ্লোবাল শক্তি হিসাবে ক্রমশই উত্থানরহিত হয়েই শেষ হয়ে যেতে হবে বা যোগ্যতায় দুনম্বর অবস্থানে চলে যেতে হবে!  বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে নেতার জায়গা ছেড়ে দিয়ে যেভাবে বৃটিশ সাম্রাজ্যের সুর্যও যে ঢুবে যায় সেটা বৃটিশেরা নিজেই তা প্রমাণ করেছিল – আমেরিকা সম্ভবত সেদিকে হাঁটতে থাকবে!  সম্প্রতি স্থানীয় পার্টনারদের সাথে আলোচনায় যখন এক পশ্চিমা এমবেসি জানতে পারে যে বর্তমানে বাংলাদেশের এনজিও-গুলো আর পাবলিকও আমেরিকার উপর আর আস্থা রাখছে না, হারিয়েছে। হাসিনার টিকে যাওয়া তাদের কাছে বিরাট বাজে ও অবিশ্বাস্য উদাহরণ হয়ে কপালে লটকে গেছে! ওদিকে বিপরীতে এনজিও – এই কালচার বা ততপরতা এখনও পশ্চিমেরই একচেটিয়া; চীন এখনও এনজিও ততপরতা বলে কোনকিছুতে আগ্রহী নয় তাই শুরুই করে নাই। কখনও করবে কিনা এরই কোন পাত্তা নাই। তা সত্বেও নাকি স্থানীয় পার্টনারেরা জানিয়েছে যে বিকল্প হিসাবে  এনজিও-রা সরকারি দলে ভিরে যেতে চাইছে আর নয়ত চীন-বিকল্প হবে কবে কখন তা নিয়ে আলাপ শুরু করে দিয়েছে। মজার কথা হল, উপস্থিত পশ্চিমা প্রতিনিধিদের জন্য এই আলোচনা শোনা ছিল পাপের মত; আর তথ্য ছিল অবিশ্বাস্য আর মারাত্মক তিতা অভিজ্ঞতা!  তারা আশা করেছিল বাংলাদেশের মানুষ বড় জোর আরো কঠিন করে  আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের সমালোচনা করবে!! কিন্তু উলটা বিকল্প হিসাবে চীনের নাম সামনে নিয়ে আসা – এটা তারা স্বপ্নেও ভাবে নাই!!!

    তবু আমেরিকান চোখ বা তাঁদের বিবেচনায় বসে দেখলে, তারা মনে করে শুধু আমেরিকার পলায়ন এটা তো কোন পলায়নই না নিজ স্বার্থে সময়ে সঠিক কাজটা করা। আর সেই সাথে এথেকে ভারত-আমেরিকা মিলে গিয়ে যৌথভাবে এবং খোলাখুলি চীন ঠেকানোর কাজে নেমে পড়া নিশ্চয় বাইডেনের এক এশিয়ান অর্জন!  কাজেই লাবাকারের আপাত প্রধান ফোকাস হাসিনা সরকারকে কতটা আমেরিকার কাছের বলে অনুভব করানো যায়! কিন্তু কাজটা খুবই কঠিন! গত দুবছর ধরে হাসিনাকে আমেরিকা যে নাকানি-চুবানি খাইয়েছে সেই ক্ষত-ই এখনও শুকায় নাই; কাজের এর বিপরীত মেরুতে গিয়ে গভীর সদ্ভাবের এক সম্পর্কে  রূপান্তর খুবই কঠিন!  ব্যাপারটা যেখানে প্রধানমন্ত্রীর নিজ পরিবারের উপর অত্যাচার হিসাবে গড়িয়ে আছে – নিয়েছিলেন !  সেই আমেরিকার সাথেই আবার কী নির্ভরশীলতার সম্পর্ক আবার হাসিনা সরকার করতে চাইবেন বা সফল হবেন – মনে জমে থাকা ক্ষোভ-অবিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে বাইরে বাইরে কতটা আর বাইডেনের আমেরিকার ঘনিষ্ট হতে পারবেন হাসিনা?

    মানুষ একমাত্র মুরোদ-ধর ক্ষমতার কাছেই যায়; আর তাতে সেখানে কিছুটা নিজেকে নত দেখায়ে হলেও রাজি হয়ে। কিন্তু  একবার যদি কারো মুরোদ নিয়ে আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, মুরোদ নিয়ে সন্দেহ জাগে তাহলে সব শেষে!  আমেরিকার অবস্থা এখন সে জায়গায়, সে নিজেই নিজেকে সে জায়গায় নিয়েছে!
    আর হাসিনাও জেনে গেছেন যে বাইডেনকেই অত পাত্তা না দিয়েও টিকে যাওয়া যায়!
    কাজেই এখন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির সাফল্য আমেরিকার সাথে একসাথে বাংলাদেশের উতযাপন এর কথা বলে লাবাকার কতদুর যেতে পারবেন? বরং হাসিনার প্রেফার করার সম্রভাবনা বেশী যে আমেরিকাকে যতটুকু তাঁর দরকার তা ভারতের মাধ্যমে পেয়ে নিতে; ডিমান্ড নোট পাঠিয়ে। আর এতে মোদি-জয়শঙ্কর ততই নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করতে থাকবে হয়ত!

    কিন্তু নগদ ডলার মানে, হাসিনা সরকারের অর্থনীতিতে এর  গভীর চাহিদা হয়ে আছে এর সুরাহা কী হবে এ নিয়ে তো কিছুই হয় নাই!   কিভাবে হবে সেটাও সব অস্পষ্ট! সবাই ঘুরায়-ফিরায় চীনের বিকল্প হিসাবে জাপানকে ধরতে হবে – বলতে চায়! কিন্তু জাপানকে ধরতে চাইলে তা হাসিনা নিজেই পারে, লাবাকার-বাইডেনদেরকে হাসিনার এখানে দরকার নাই। আসলে সমস্যা তো অন্য জায়গায় –  জাপান এখন আর সেই ইয়াং  বা উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি নয়। যখন সেই সময় বলতে, ১৯৬৬ সালের আশেপাশে মানে যখন নয়া এশিয়ান ডেভলবমেন্ট ব্যাংক [ADB] খুলেছিল, সেই ১৯৬৬ সালের শেষের পর থেকে। যখন সে বড় ভাইয়া আমেরিকার অনুমতি নিয়ে এই দুদেশ মিলে এডিবি’র  সবচেয়ে বড় দুই শেয়ার-হোল্ডার মালিক হয়ে নিয়েছিল। সেই উদীয়মান জাপানের জোশ আর এখন খুজলে তো হবে না, নাই! এছাড়া, জাপানেরর সুদের হারও বেশী; ঋণ দান ক্ষমতা সামর্থও চীনের মত লেবেলের না! এই অবস্থায় আমেরিকা আর ইইউ এদুই গোষ্ঠিও যদি তাদের ঋণদানের অক্ষমতায় সেইও জাপান-ভরসা, মামে স্কলেই জাপান ভরসার গান গেয়ে উসুল করতে চায় তা আর কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব? অথচ গ্লোবাল নেতা হবার এই পালা বদলের কালে চীনের তুলনায় আমেরিকার ক্রাইসিস ও অযোগ্যতা তো এটাই!!   সিংহও একদিন বুড়া হয়! শিকার করতে অযোগ্য হয়ে না খেয়ে শুকিয়ে একদিন মরে যায়!

    কাজেই আইলিন লাবাকার এরা যতই বাংলাদেশকে রাস্তায় ফেলে রেখে পল্টি মেরে নিজেদের বুদ্ধিমান বিজয়ী ও ইন্দো-প্যাসেফিকে নিজেদের বিজয় হয়েছে বলে জোশ তুলতে চান না কেন সেটা কার্যত – বাংলাদেশকে আরেকবার ভারতের কাছে বিক্রি করে দেওয়াই হবে! হয়েছেও তাই! এবং বাইডেনের বকোয়াজ পরিণতিতে তাই হয়েছে! আবার এদিকটাও যে হাসিনা বুঝেন না তাও তো না!  কাজেই বাইডেনের টিম যা এসেছে বাংলাদেশে বা আগামিতে আসবে সবই এমন অর্থহীন-ই হবে!

    তবে এটা জানতেও কারও বাকি নাই যে বাইডেনের প্রশাসনের জন্য এটা হল ক্ষমতার শেষ বছর অতএব বাকি কিছু মাস তাইরে-নাইরে করে পার করে দেয়া যাকে, আমরা টাইম পাস বলি!! এটাই বাকারদের লক্ষ্য!
    সক্রিয়ভাবে বাইডেন প্রশাসন তো আর তো মাত্র ছয়-আট মাস ! আগামি নভেম্বর ২০২৪ এর প্রথম সপ্তাহেই পরবর্তি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলাফল কমবেশি স্পষ্ট যে সম্ভাব্য প্রার্থী ট্রাম্পই সম্ভবত বিজয়ী হচ্ছেন!  অর্থাৎ অন্তত বাইডেন আর নয়! যেটা এর মূলকথা!! ফলে যারা এবছর বাইডেন প্রশাসনের হয়ে বাংলাদেশে আসছেন তাদের কেরিয়ারও শেষ! ফুল স্টপ!!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৭ঃ৫৬ সন্ধ্যা

     

     

     

     

     

     

     

     

     

    নিচে উপরের লেখাটারই একটা সাদামাটা রচনা বা Plain Text ভার্সান দেয়া হল পরীক্ষামূলকভাবে,  অনেকে বলছেন এতে লেখা মোবাইলে পড়তে সুবিধা হবে। পাঠকেরা মন্তব্য জানাবেন আশা করিঃ

    আলী রীয়াজদের সংকট এবং
    আইলিন এর এবারের ঢলে পরা সফরে!
    গৌতম দাস

    ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা সাতটা নয়
    https://wp.me/p1sCvy-5qQ

    প্রতীকীভাবে “আলী রীয়াজদের” বললেও এরা আসলে কারা? বলতে চেয়েছি যারা দ্বৈত নাগরিক মানে, বিশেষ দ্বৈততার দিক আছে। তাও এটা ঠিক দ্বৈত নাগরিক মাত্রই এমন সবার কথা বলছি না। একজন ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী বা সাধারণ মানুষ যারা আপন ভাগ্য-অন্বেষণে  আমেরিকায় (বা বিদেশে) নাগরিকত্ব যোগাড় করেছেন বা যোগাড় করতে না পারলেও রেসিডেন্ট পারমিট – মানে সে দেশে থেকেই বসবাস ও কাজ-চাকুরি করার অনুমতি পেয়ে নিয়েছেন – এমন সকল মাইগ্রেন্ট বা প্রবাসী – এদের সকলকে বাইরে রেখে বাকিদের কথা বলছি। অর্থাৎ সাধারণদের প্রায় সকলকেই একেবারেই বাইরে রাখছি।  এমন এরা সকলকেই এই আলোচনার বাইরে রেখে কথা বলছি।  তাতে যাদের কথা বলছি, এরাও দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা না নিয়েছেন, তাতেও কোন ফারাক নাই।  কারণ, আমার এই কথাগুলো সাধারণদের নিয়ে নয়। তাহলে?

    আমি কথা বলছি যারাও মাইগ্রেন্ট অবশ্যই, কিন্তু যারা সেদেশের সরকারের নীতি-পলিসি সংশ্লিষ্ট পেশা নিয়েছেন যেমন কোন আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাংক ফেলো। এছাড়াও যারা আমেরিকা সরকারের নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। অথবা আরেকটা চিহ্ন যাদিয়ে এদের আলাদা করা যায় যে যারা তাদের পেশাগত কাজটাই এমন যে তাঁকে আমেরিকান প্রশাসনের পক্ষে সাফাই দেয়া বা যুক্তি-অবস্থান যোগানোই যাদের একমাত্র কাজ; এভাবেই তাদের লিখা বা কথা বলতে হয়। ফলে বলাই বাহুল্য যারা দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা রেসিডেন্ট পারমিট হোল্ডার শুধু নন; বরং বাড়তি আরো যারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে আমেরিকান প্রশাসনের সাথে জড়িয়ে আছেন বা গেছেন – আমি কেবল এদের কথা বলছি। এখানে “আলী রীয়াজদের” বলতে তাদের কথা বুঝিয়েছি। এই অর্থে এদের বিশেষ দ্বৈততার দিকেই আমার নজর তাতে এরা নাগরিক অথবা যাদের মধ্যে অনেকে শুধু-ই রেসিডেন্ট পারমিট হোল্ডার হলেও!

    বাংলাদেশে আমেরিকান ফরেন পলিসির প্রয়োগ আছে স্বাভাবিকভাবেই আর, আপনি এই বিশেষ দ্বৈততায় নাগরিক বা হয়ত না; কিন্তু আপনি  আমেরিকান পলিসি-প্রশাসনের কর্ম প্রয়োগ-ততপরতার সাথে জড়িত; যেমন ধরা যাক আলী রিয়াজ এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক এর ফেলো। এখন আলী রিয়াজ বাংলাদেশের সিরিয়াস রাষ্ট্রস্বার্থ জড়িত এমন কোন ইস্যুতে আমেরিকান পলিসি সম্পর্কিত কোন আলোচনায় অংশ নিয়েছেন; আর সেখানে আলী রিয়াজের কথা বক্তব্য-অবস্থান – যা কিছু তিনি সেখানে বলবেন বা লিখবেন, এটাতে তিনি কাকে প্রতিনিধিত্ব করছে বলে ধরে নিব? আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ? কথাটা বলা হচ্ছে এটা মনে রেখে যে আলী রিয়াজ বাংলাদেশ-অরিজিন আমেরিকান!  তাই এককথায়, ছোট করে প্রশ্ন হচ্ছে আলী রিয়াজের ভাষ্য কী আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ এর ভাষ্য? কোনটা বলে ধরে নিব?

    এখন আমরা স্বীকার করি বা স্বীকৃতি দেই আর না দেই – বাস্তবতা হল এখানে এক গভীর “কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট” মানে, দুই রাষ্ট্রস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংঘাত-বিরোধ আছে। আর এর একেবারে প্রাথমিক কিছু অবলিগেশন [obligation] বা দায় আছে আলী রীয়াজদের! নুন্যতম সততা স্বচ্ছতার খাতিরে তাদের এবিষয়ে একটা ঘোষিত অবস্থান থাকা উচিত।  কথাটা এমন হতে পারে যে, “আমি (আলী রিয়াজেরাদের কেউ) যাকিছু পলিটিক্যাল-ইকোনমিক বক্তব্য রাখি  সেখানে আমি সুনির্দিষ্ট করে ভিন্ন কিছু উল্লেখ না করলে ধরে নিতে হবে সেখানে আমি কেবল আমেরিকাকে প্রতিনিধিত্ব করেই বক্তব্য দিয়েছি ও দেই বলেই মনে করা সঠিক হবে”।

    যদিও থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলোদের কাজ হল আমেরিকার ক্ষমতাসীন প্রশাসনের পক্ষে ঢোল বাজানো। এমনকি সেটা প্রকাশ্যে ক্রিটিক্যাল বা নেগেটিভ অবজারভেশন দেয়াও না।

    মনে রাখতে হবে থিঙ্কট্যাঙ্ক এর চাকরি বা সার্ভিস দেওয়ার চুক্তিপত্র করা, এটা কিন্তু আমেরিকায় গিয়ে কোন ইঞ্জিয়ারিং-টেকনোলজি ফার্মের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তাদেরকে সার্ভিস দেয়া ও আয় করার মত ঘটনা একেবারেই নয়; সমতুলনীয় ঘটনা নয়। কারণ, থিঙ্কট্যাংক ফেলো বা আমেরিকাকে বাংলাদেশী-কনসালটেন্ট সার্ভিস দেওয়ার পেশাটা শতভাগ রাজনীতিক ও রাষ্ট্রস্বার্থ-মুলক কাজ!  কেউ এথনিক বাঙালি জনগোষ্ঠির লোক বলে সেই ইমেজকে ব্যবহার করে নিজেকে আড়ালে রাখার সুবিধা নেয়া ভুল ও অসততা হবে। মানে, এর উপর দাঁড়িয়ে সে সুবিধা নিয়ে আমেরিকান স্বার্থ বাস্তবায়নের কথা খেয়াল করে বক্তব্য দিয়ে যাওয়া  – এটা খুবই অস্বচ্ছ কাজ এই অর্থে তা অপ-ততপরতা হতে পারে! আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে সার্ভিস দিয়ে আয় করা হয়ত সাধারণভাবে অপরাধ নয় তবে,  আগে নিজ পরিচয়-অবস্থান পরিস্কার করে রাখলে সেটাই সততা হবে যে আমি আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে চাকরি-কাজে বা সার্ভিস দেওয়াতে আছি!

    সম্প্রতি এবিষয়টা খুবই সিরিয়াস পর্যায়ে গেছে বলে আমার মনে হয়। ওয়েবিনার [webinar] মানে অনলাইন টকশোতে কথা বলা যাকে বলি, তার মধ্যে।  ওয়েবিনার মানে, কয়েক ব্যক্তি যারা নানান দেশে বসে আছেন কিন্তু তা সত্বেও যেন তারা একসাথে এক দেশের এক রুমে বসে আলোচনা করছেন – এমন এক গোলটেবিল বৈঠকের মত সেটা। এটা সম্ভব কারণ, তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রত্যেকে অডিও-ভিডিও সব অর্থেই কানেকটেড থাকেন সেখানে। অনেকে এটাকে তাই ভার্চুয়াল [virtual] বৈঠকও বলেন। [ভার্চুয়াল মানে হল, যা বাস্তব নয় কিন্তু যেন বাস্তব মনে করে নেয়া হয়েছে ও সে  অনুযায়ী আচরণ করা হচ্ছে; যার বাংলা অনেকে করে বলেন – “জ্ঞানত” বা অনুমিত]  তেমনই সম্প্রতি এক বৈঠকের খবর প্রসঙ্গে রিপোর্ট করেছে প্রথম আলো। শিরোনাম “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” । আর এই ওয়েবিনার বৈঠকের নিজস্ব শিরোনাম ছিলঃ ওয়েবিনারের শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ ও তার প্রতিবেশী: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব’।

    সেখানেই এই প্রশ্ন যে অংশগ্রহণকারী প্রবাসীরা তাঁরা কাদের প্রতিনিধিত্ব করে কথা বলছিলেন –  আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ? –

    এমন অস্পষ্টতা ছিল পীড়াদায়ক ও বিভ্রান্তকর!
    কারণ, শিরোনাম দেখেই জানা যাচ্ছে – তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ নিয়ে এবার কথা বলছেন অথচ আমেরিকাকে বাইরে রেখে এর সব দায় কেবল ভারতের উপর চাপাচ্ছিলেন। অথচ তাঁরা কারা? মানে তারা কাকে প্রতিনিধিত্ব করছেন? মানে প্রবাসী ব্যক্তিদের কোন রাষ্ট্রীয় পরিচয়? তারা অনেকেই বাংলাদেশি-অরিজিন আমেরিকান। তাই ঐ ওয়েবিনারে তারা কী বাংলাদেশি রাষ্ট্রস্বার্থের নাকি আমেরিকান বা বিদেশি রাষ্ট্রস্বার্থের নাগরিক-প্রতিনিধি হিসাবে কথা বলছিলেন?

    কারণ, বিষয়টাতে এই প্রশ্ন ওখানে খুবই সিরিয়াস দিক ছিল? বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের জন্য দায়ী করা হচ্ছিল কেবল ভারতকে!  কিন্তু এটা ছিল
    বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একেবারে ভারত-আমেরিকার যৌথ প্রযোজনায় ঘটা হস্তক্ষেপ!
    আমরা তো ভুলতে পারি না যে ২০০৭ সালের ১/১১ এর সেনা ক্ষমতাদখল ছিল এক আমেরিকান প্রযোজনা। যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে
    তুলে দেওয়া।  আমেরিকার পক্ষ থেকে ভারতকে ঠিকা দেয়া কাজ – এশিয়ায় ভারত চীন ঠেকানোর চেষ্টা করবে – আর বিনিময়ে এরই উপহার ছিল বাংলাদেশকে
    ভারতের হাতে তুলে দেয়া! কিন্তু আমেরিকা বাংলাদেশকে তুলে দিবার কে??? এটা তো চরম অপরাধ??
    আর এখন ওয়েবিনারের যে শিরোনাম “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” এই একই কাজ যার শুরু তো সেই ১/১১ এর পর থেকেই, গত সতের বছর ধরে। তাহলে???
    আর এখন সব দায় একা ভারতের উপর চাপাচ্ছে কেন আলী রীয়াজেরা???? আমেরিকার হাত ধুয়ে ফেলানো???? এটা ঘোরতর অসততা!

    ওয়েবিনারের এই শিরোনাম আমাদেরকে নিজেই জানিয়ে দিয়েছে যে সেখানে আলোচনার প্রসঙ্গ হল – বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ। যদিও তামাসা করে বললে, এটা কিন্তু তাদের একটা ভাল অগ্রগতিও বটে!

    ভারতের বাংলাদেশে হাত ঢুকানো তো নতুন না। কারণ গত ১/১১ এর সময়ে বাংলাদেশে আমেরিকার সামরিক ক্ষমতা দখলের এক প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া যাতে ভারত পক্ষে অসংখ্য সব ধরণের করিডোর এবং সবই বিনা-পয়সায় বাংলাদেশ থেকে আদায়; এমনকি ভারতের সুবিধা করে দিতে এজন্য যা অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় বইবার দায়ীত্ব এটাও বাংলাদেশের অর্থ ও দায়! অন্যদিকে পুরা বাংলাদেশকে ভারতের নিজ পণ্যের একচেটিয়া বাজার বানানো; এনফোর্সড ও অবৈধভাবে রেমিটেন্স আদায়ের জন্য বাংলাদেশকে উতস দেশ হিসাবে ব্যবহার ইত্যাদি সহ হেন ভারতীয় স্বার্থ নাই যা তখন থেকে লুট করা শুরু করা হয় নাই। যেটা ২০১৭ সালের পর থেকে একটু ঝিমিয়ে গেলেও চলতি ফেব্রুয়ারি থেকে তা আবার আমেরিকান প্রটেকশনে বিপুল বেগে চালু করার ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে। আর এটা এতই তীব্র ও প্রকাশ্য যে আলী রীয়াজেরা এই ইস্যুতেই কেবল ভারতকেই দায়ী করে হলেও এবার বৈঠক ডেকে বসতে বাধ্যই হয়েছে। বাধ্য বলছি কারণ, গত ১৫ বছর তো আলী রিয়াজদের এনিয়ে কোন ততপরতা দেখি নাই। আলী রীয়াজদের এই চিকণ বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হয়!! এতে ভারতবিরোধী সাজা গেছে আবার আমেরিকান নীতি-পলিসি অবস্থানের পক্ষে সার্ভিসও দেয়া গেছে!

    আলী রিয়াজ আমেরিকান এক থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো হিসাবে জয়েন বা চুক্তিবদ্ধ হবার পরপরই সেসময় (২০০৭) মূলত আমেরিকান পলিসি যে – এশিয়ায় চীনের বিস্তার ঠেকাও – যা তাদের ভাষায় চায়না ঠেকাও বা China Containment নামে ডাকত তারা – একাজের সারকথা ছিল –  বাংলাদেশকে উপহার হিসাবে ভারতের হাতে তুলে দেয়া – আর তাই করা হয়েছিল। কাজেই আলী রীয়াজের এই অপরাধ এটা অজানা থাকার কোন কারণ নাই। যখন তিনি তো সেখানে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে বাংলাদেশ এক্সপার্ট হিসাবেই রিক্রুটেড!   আমি জানি এনিয়ে আলী রিয়াজকে কোন পাবলিক সভায় বা বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় সভাতে এনিয়ে প্রশ্ন করলেও তিনি এনিয়ে তিনি কিছু জানেন না – এমন ধারণাই দিয়ে গিয়েছিলেন।  কথাটা অন্যভাবেও বলা যায় গত ১৫-১৭ বছরে আলী রীয়াজেরা যেন আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া  এই গর্হিত অপরাধ কাজ কখনও হতে দেখেনই নাই!! তাই যেন এবারই প্রথম বলতে চাইছেন যে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” । এক কথায় বললে আলী রীয়াজেরা ভান করছেন যেন আগে আমেরিকার এমন অপরাধের ঘটনা দেখা যায় নাই। আর সে কারণেই নিশ্চয় আলী রীয়াজেরা এমন ইস্যুতে কখনও কিছু লিখেছেন, বলেছেন এমনটার দরকার হয় নাই! তাই তা আমরা জানি না!  আবার আলী রিয়াজদের পক্ষে আমেরিকান ততপরতা দায় নিয়ে কথা বলা এটা আমাদের আশা করা কী ঠিক হবে?  কারো এনিয়ে জানা থাকলে এখনও শেয়ার করতে পারেন, বাধিত হব। তবে যারাই আগে কখনও কিছু বলেন নাই এটাকে তাদের অপরাধ – আমরা এটাই বলব! যদি বাংলাদেশী পরিচয়কে প্রতিনিধিত্ব করেন তবে ঘোরতর অপরাধকারী এরা। আর আমেরিকাকে প্রতিনিধিত্ব বা চাকুরির খাতিরে করলে এমন কাজ করা – এরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রস্বার্থের চোখে প্রকাশ্য শত্রু! যারা আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ছুপা এজেন্ট!!

     

    কিন্তু আসলেই কী এটা তাঁদের অগ্রগতিঃ
    আলী রীয়াজেরা এবার এনিয়ে ওয়েবিনার বৈঠক করেছে। মানে “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” এটা বুঝতে এদের ১৫-১৭ বছর লেগেছে।  এই অগ্রগতিটুকু হতে – মানে আসলেই কী এটা তাঁদের জন্য অগ্রগতি? সন্দেহ আছে! কেন?
    কারণ তারা এসেছে এবার আমেরিকাকে বাঁচাতে! যেন ভারত-আমেরিকাকে একই দড়িতে ফাঁসি না চড়ে!

    বাইডেনের আমে্রিকা এবার স্পষ্ট করেছিল অন্তত গত শেষ দুবছরে [১০ ডিসেম্বর ২০২১ থেকে] যে বাইডেন প্রশাসন শুধু হাসিনার বাংলাদেশ না, মোদির ভারতের উপরেও গণতন্ত্র-মানবাধিকার বা স্যাংশন আরোপে পিছপা হবে না। মূলকথাটা ছিল এবারের বাইডেন প্রশাসন ভারতের হাত ধরে এশিয়াতে আসে নাই বা নিজের “এশিয়া নীতি” সাজায় নাই। ফলে ভারতের চোখ দিয়ে এশিয়া দেখতে বাইডেন যেন আসেন নাই আমাদেরকে তিনি সেই ধারণাই দিয়ে গেছিলেন। কিন্তু হায় হায়! শেষ অন্তত চার মাসে (সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে) বাইডেন এন্ড গং আর কাপড় ঠিক রাখতে পারেন নাই! ন্যাংটা হয়ে গেছেন। আর শেষে ইন্ডিয়ার কোলেই মুখ লুকিয়েছেন, এশিয়ার সব ভরসা আর নিজ আশ্রয়স্থল করেছেন ভারত। আমেরিকান এই পল্টি-মারা সত্যি অতুলনীয়!

    এককথায় বললে, বাইডেন পল্টি মেরেছেন কারণ, তিনি দেখেছেন, হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখেই নাকি বাংলাদেশে চীন ঠেকানো বা চীন প্রভাব রোধ করা সম্ভব। তাই আমরা এখন সরাসরি বলতে পারি বাইডেনের নীতি-পলিসি গণতন্ত্র-মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোন  স্যাংশন-ট্যাংশন আরোপ ছিল না। সোজা লক্ষ্য ছিল,  বাংলাদেশে চীন ঠেকানো বা চীন প্রভাব রোধ করা। তাই আমেরিকা গত সেপ্টেম্বর ২০২৩  থেকেই আমাদের বিরোধীদল ছেড়ে পল্টি মেরেছিল। যা এখন ক্রমশ আমাদের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে। আর স্পষ্টতই এটা ভারতের বিজয়! বুড়া বাইডেন এখন সব ফেলে দিয়ে ভারতের কোলে কেলায় পড়েছে! আর এতে দ্বিতীয়বার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে স্পষ্ট করে তুলে দেয়া ঘটলো!

    আর এব্যাপারে আলী রীয়াজদের মত সবার চেয়ে মুশফিকুল ফজল আনসারী অন্তত সৎ! টেক্কাকে টেক্কা বলার পদক্ষেপ তিনি নিয়েছেন। যদিও তার পারস্পেকটিভ মানে, যে ওয়েব পত্রিকার তিনি নির্বাহী সেখানে প্রকাশিত কিছু আর্টিকেল থেকেই এটা পরিস্কার বুঝা যাচ্ছিল যে আমেরিকা পল্টি মারার সিদ্ধান্ত নিয়েছে! তবু আনসারী নিজের পারস্পেকটিভ-এ লিখতে না পারলেও অন্তত ভারতের WIRE পত্রিকায় নিজের বক্তব্য ছেপে দিয়েছেন। যার বাংলা করে ছেপেছে মানবজমিন!

    আইলিন লা-বাকার [Eileen Laubacher] আবার বাংলাদেশ সফরেঃ
    লা-বাকারের এটা দ্বিতীয় বাংলাদেশ সফর; মানে ২০২৩ সালের ৮-১০ জানুয়ারি। সেবার তাঁর পরিচয় দেখেছিলাম যা আমাদেরকে তখন UNB দিয়েছিল যে লাবাকার আমেরিকার একজন National Security Council’s Senior Director for South Asia । আর এবার তাঁর আরো একটা বাড়তি পরিচয় যোগ হয়েছে দেখা যাচ্ছে। সেটা হল, তিনি একইসাথে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের বিশেষ সহকারী-ও [Special Assistant]। অবশ্য এমনিতেই তিনি আমেরিকান নেভির এক সিনিয়র অফিসার – রিয়ার এডমিরাল আইলিন লা-বাকার!

    লা-বাকারকে নিয়ে  মানে তার এবারের সফর  নিয়ে এখনই সবটা লিখা যাবে না। এর টেকনিক্যাল প্রবলেমটা হল, তিনি কেবল গতকালকেই ঢাকায় তাঁর প্রকাশ্য ততপরতা শুরু করেছেন যা অন্তত আজ ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। এটাই তাঁর অফিশিয়াল সিডিউল! ফলে ২৭ ফেব্রুয়ারির পরে তা আবার আমাদের করতে হতে পারে। তাই এখন একটা কেবল তুলনা করব যে, লা-বাকারের আগের বছরের সফর আর এবারের সফর নিয়ে।

    গতবারের লাবাকার এর সফরের পরে আমার এক পুরানা লেখা আছে; লিঙ্ক এখানে।

    একটা আসল কথাই বলতে ভুলে গেছি। গতবার মানে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইলিন লাবাকার এর প্রথম সফরের সময় ভারতের হয়ে আমাদের
    কাছে কুখ্যাত সুবীর ভৌমিক কী লিখেছিলেন?
    তার সেই লেখার শিরোনাম ছিল – “আমেরিকা কী বার্মা-কে বসনিয়া বানাবে? নো ফ্লাই জোনের পরিকল্পনায় ভারতকেও নিষেধাজ্ঞায় সামিল করবে”
    – অয়ার আজ সেই ডোনাল্ড লু হয়েছে ভারতের কোলে বসা এক গুডি গুডি আদরের দুধ-বালক! ল্যু এখন সুবীরদের বাপ হয়ে গেছে!
    সুবীরের পুরানা সেই লেখার লিঙ্কঃ  https://thefederal.com/…/will-us-do-a-bosnia-on…/

    সেকালে লিখেছিলাম, “বাইডেনের এক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকারকে [Director for South Asia Rear Admiral Eileen Laubacher] পাঠানো; যার  উদ্দেশ্য খোদ হাসিনাকেই বার্মা দখল প্রোগ্রামে সামিল করা বিনিময়ে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে রাখা হবে – এই প্রস্তাব কতটা কার্যকর করা যায় তা দেখতে”।

    এছাড়াও সেখানে তখন এর কয়েকলাইন আগে বা উপরে লিখেছিলাম, “আমেরিকার বার্মা দখলের বাসনা বলতে এমনকি আবার সেটাও ঠিক যে এটা শুধু- সু চিকে মুক্ত করা বা বার্মিজ জেনারেলদের উতখাত ও শায়েস্তা করা নয়। এগুলো পরোক্ষ উদ্দেশ্য। আর মুখ্য বা প্রধান উদ্দেশ্য হল এশিয়াতেই চীনবিরোধীতা [কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির খাড়া করার মতই তবে আরেকটা পদক্ষেপ] ও চীনকে চ্যলেঞ্জ করে নয়া কল্পিত হবু বার্মায়  আমেরিকান উপস্থিতি ঘটিয়ে দেখানো”।

    আর এবারের পরিস্থিতি হল, হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি এখন আর ইস্যু বা বাস্তবতা নয়। দ্বিতীয়ত, খোদ শাসক বার্মার জেনারেলেরাই এখন বিদ্রোহীদের হাতে নাস্তানাবুদ। তাই, বার্মার ক্ষমতা এখন – জেনারেল বা বিদ্রোহী – এভাবে কার কাছে কতটুকু সেটা এক গবেষণার ব্যাপার এমনই এক অস্থির পরিস্থিতি এটা। কাজেই এর ভিতরে আবার আমেরিকা বার্মাকে দখল পেতে চাইলে কাকে উতখাত করবে – জেনারেল না বিদ্রোহীদের – সেই মূল বিষয়টাই অস্পষ্ট!  কাজেই আমেরিকার বার্মাদখল ইচ্ছা – সেটা এখন আমেরিকার মনের ভিতরে আরো অস্পষ্ট হয়ে থাকাই স্বাভাবিক। ফলে এখনই হাসিনাকে বার্মা ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার পক্ষে আসতে বলা অর্থহীন!

    ওদিকে হাসিনা সরকার বা সেনাবাহিনী উভয়েই যুদ্ধের বিপক্ষে। আর তা প্রায় প্রকাশ্য! আবার হাসিনারও এনিয়ে না-বুঝা-নাই যে  নিজ অর্থনৈতিক সংকটের ভিতরে আবার যুদ্ধ লাগানো বা অন্যের লাগানো যুদ্ধের মধ্যে পরা – এর মানে কী দাঁড়াবে? কাজেই আমেরিকার বার্মাদখল ইস্যু হাসিনার কাছে এক নন-স্টার্টার ফুড এর মত মানে, যা খাওয়া শুরুর জন্য কোন সুস্বাদ এর খাদ্য না; বরং করলা ভাজার মতই তিতা!

    তাহলে আইলিন লাবাকারের এবারের কাজটা কী? ফোকাস?
    বাংলাদেশের সরকার-বিরোধীদেরকে রাস্তায় নামিয়ে পরে বিনাবাক্যে পলায়ন বা পল্টি মারা – এটা আগামিতে আমাদের মত দেশে আমেরিকাকে আর কোন সরকার বা বিরোধী দল সহজে বিশ্বাস করতে চাইবে না! আমেরিকার এই পরিচয়ের সিল পরে গেছে!  সম্ভবত এর খেসারত-কাফফারা দিতে দিতেই আমেরিকাকে গ্লোবাল শক্তি হিসাবে ক্রমশই উত্থানরহিত হয়েই শেষ হয়ে যেতে হবে বা যোগ্যতায় দুনম্বর অবস্থানে চলে যেতে হবে!  বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে নেতার জায়গা ছেড়ে দিয়ে যেভাবে বৃটিশ সাম্রাজ্যের সুর্যও যে ঢুবে যায় সেটা বৃটিশেরা নিজেই তা প্রমাণ করেছিল – আমেরিকা সম্ভবত সেদিকে হাঁটতে থাকবে!  সম্প্রতি স্থানীয় পার্টনারদের সাথে আলোচনায় যখন এক পশ্চিমা এমবেসি জানতে পারে যে বর্তমানে বাংলাদেশের এনজিও-গুলো আর পাবলিকও আমেরিকার উপর আর আস্থা রাখছে না, হারিয়েছে। হাসিনার টিকে যাওয়া তাদের কাছে বিরাট বাজে ও অবিশ্বাস্য উদাহরণ হয়ে কপালে লটকে গেছে! ওদিকে বিপরীতে এনজিও – এই কালচার বা ততপরতা এখনও পশ্চিমেরই একচেটিয়া; চীন এখনও এনজিও ততপরতা বলে কোনকিছুতে আগ্রহী নয় তাই শুরুই করে নাই। কখনও করবে কিনা এরই কোন পাত্তা নাই। তা সত্বেও নাকি স্থানীয় পার্টনারেরা জানিয়েছে যে বিকল্প হিসাবে  এনজিও-রা সরকারি দলে ভিরে যেতে চাইছে আর নয়ত চীন-বিকল্প হবে কবে কখন তা নিয়ে আলাপ শুরু করে দিয়েছে। মজার কথা হল, উপস্থিত পশ্চিমা প্রতিনিধিদের জন্য এই আলোচনা শোনা ছিল পাপের মত; আর তথ্য ছিল অবিশ্বাস্য আর মারাত্মক তিতা অভিজ্ঞতা!  তারা আশা করেছিল বাংলাদেশের মানুষ বড় জোর আরো কঠিন করে  আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের সমালোচনা করবে!! কিন্তু উলটা বিকল্প হিসাবে চীনের নাম সামনে নিয়ে আসা – এটা তারা স্বপ্নেও ভাবে নাই!!!

    তবু আমেরিকান চোখ বা তাঁদের বিবেচনায় বসে দেখলে, তারা মনে করে শুধু আমেরিকার পলায়ন এটা তো কোন পলায়নই না নিজ স্বার্থে সময়ে সঠিক কাজটা করা। আর সেই সাথে এথেকে ভারত-আমেরিকা মিলে গিয়ে যৌথভাবে এবং খোলাখুলি চীন ঠেকানোর কাজে নেমে পড়া নিশ্চয় বাইডেনের এক এশিয়ান অর্জন!  কাজেই লাবাকারের আপাত প্রধান ফোকাস হাসিনা সরকারকে কতটা আমেরিকার কাছের বলে অনুভব করানো যায়! কিন্তু কাজটা খুবই কঠিন! গত দুবছর ধরে হাসিনাকে আমেরিকা যে নাকানি-চুবানি খাইয়েছে সেই ক্ষত-ই এখনও শুকায় নাই; কাজের এর বিপরীত মেরুতে গিয়ে গভীর সদ্ভাবের এক সম্পর্কে  রূপান্তর খুবই কঠিন!  ব্যাপারটা যেখানে প্রধানমন্ত্রীর নিজ পরিবারের উপর অত্যাচার হিসাবে গড়িয়ে আছে – নিয়েছিলেন !  সেই আমেরিকার সাথেই আবার কী নির্ভরশীলতার সম্পর্ক আবার হাসিনা সরকার করতে চাইবেন বা সফল হবেন – মনে জমে থাকা ক্ষোভ-অবিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে বাইরে বাইরে কতটা আর বাইডেনের আমেরিকার ঘনিষ্ট হতে পারবেন হাসিনা?

    মানুষ একমাত্র মুরোদ-ধর ক্ষমতার কাছেই যায়; আর তাতে সেখানে কিছুটা নিজেকে নত দেখায়ে হলেও রাজি হয়ে। কিন্তু  একবার যদি কারো মুরোদ নিয়ে আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, মুরোদ নিয়ে সন্দেহ জাগে তাহলে সব শেষে!  আমেরিকার অবস্থা এখন সে জায়গায়, সে নিজেই নিজেকে সে জায়গায় নিয়েছে!

    আর হাসিনাও জেনে গেছেন যে বাইডেনকেই অত পাত্তা না দিয়েও টিকে যাওয়া যায়!
    কাজেই এখন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির সাফল্য আমেরিকার সাথে একসাথে বাংলাদেশের উতযাপন এর কথা বলে লাবাকার কতদুর যেতে পারবেন? বরং হাসিনার প্রেফার করার সম্রভাবনা বেশী যে আমেরিকাকে যতটুকু তাঁর দরকার তা ভারতের মাধ্যমে পেয়ে নিতে; ডিমান্ড নোট পাঠিয়ে। আর এতে মোদি-জয়শঙ্কর ততই নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করতে থাকবে হয়ত!

    কিন্তু নগদ ডলার মানে, হাসিনা সরকারের অর্থনীতিতে এর  গভীর চাহিদা হয়ে আছে এর সুরাহা কী হবে এ নিয়ে তো কিছুই হয় নাই!   কিভাবে হবে সেটাও সব অস্পষ্ট! সবাই ঘুরায়-ফিরায় চীনের বিকল্প হিসাবে জাপানকে ধরতে হবে – বলতে চায়! কিন্তু জাপানকে ধরতে চাইলে তা হাসিনা নিজেই পারে, লাবাকার-বাইডেনদেরকে হাসিনার এখানে দরকার নাই। আসলে সমস্যা তো অন্য জায়গায় –  জাপান এখন আর সেই ইয়াং  বা উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি নয়। যখন সেই সময় বলতে, ১৯৬৬ সালের আশেপাশে মানে যখন নয়া এশিয়ান ডেভলবমেন্ট ব্যাংক [ADB] খুলেছিল, সেই ১৯৬৬ সালের শেষের পর থেকে। যখন সে বড় ভাইয়া আমেরিকার অনুমতি নিয়ে এই দুদেশ মিলে এডিবি’র  সবচেয়ে বড় দুই শেয়ার-হোল্ডার মালিক হয়ে নিয়েছিল। সেই উদীয়মান জাপানের জোশ আর এখন খুজলে তো হবে না, নাই! এছাড়া, জাপানেরর সুদের হারও বেশী; ঋণ দান ক্ষমতা সামর্থও চীনের মত লেবেলের না! এই অবস্থায় আমেরিকা আর ইইউ এদুই গোষ্ঠিও যদি তাদের ঋণদানের অক্ষমতায় সেইও জাপান-ভরসা, মামে স্কলেই জাপান ভরসার গান গেয়ে উসুল করতে চায় তা আর কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব? অথচ গ্লোবাল নেতা হবার এই পালা বদলের কালে চীনের তুলনায় আমেরিকার ক্রাইসিস ও অযোগ্যতা তো এটাই!!   সিংহও একদিন বুড়া হয়! শিকার করতে অযোগ্য হয়ে না খেয়ে শুকিয়ে একদিন মরে যায়!

    কাজেই আইলিন লাবাকার এরা যতই বাংলাদেশকে রাস্তায় ফেলে রেখে পল্টি মেরে নিজেদের বুদ্ধিমান বিজয়ী ও ইন্দো-প্যাসেফিকে নিজেদের বিজয় হয়েছে বলে জোশ তুলতে চান না কেন সেটা কার্যত – বাংলাদেশকে আরেকবার ভারতের কাছে বিক্রি করে দেওয়াই হবে! হয়েছেও তাই! এবং বাইডেনের বকোয়াজ পরিণতিতে তাই হয়েছে! আবার এদিকটাও যে হাসিনা বুঝেন না তাও তো না!  কাজেই বাইডেনের টিম যা এসেছে বাংলাদেশে বা আগামিতে আসবে সবই এমন অর্থহীন-ই হবে!

    তবে এটা জানতেও কারও বাকি নাই যে বাইডেনের প্রশাসনের জন্য এটা হল ক্ষমতার শেষ বছর অতএব বাকি কিছু মাস তাইরে-নাইরে করে পার করে দেয়া যাকে, আমরা টাইম পাস বলি!! এটাই বাকারদের লক্ষ্য!

    সক্রিয়ভাবে বাইডেন প্রশাসন তো আর তো মাত্র ছয়-আট মাস ! আগামি নভেম্বর ২০২৪ এর প্রথম সপ্তাহেই পরবর্তি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলাফল কমবেশি স্পষ্ট যে সম্ভাব্য প্রার্থী ট্রাম্পই সম্ভবত বিজয়ী হচ্ছেন!  অর্থাৎ অন্তত বাইডেন আর নয়! যেটা এর মূলকথা!! ফলে যারা এবছর বাইডেন প্রশাসনের হয়ে বাংলাদেশে আসছেন তাদের কেরিয়ারও শেষ! ফুল স্টপ!!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    আপডেটঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৭ঃ৫৬ সন্ধ্যা

     

  • “ডোনাল্ড ল্যু ফের…” কোথাও আসেন নাই; আমাদেরকে ভারতের কোলে তুলে দিতে চাইছেন

    “ডোনাল্ড ল্যু ফের…” কোথাও আসেন নাই;
    আমাদেরকে ভারতের কোলে তুলে দিতে চাইছেন

    গৌতম দাস
    ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা ১৯ঃ ৫৮
    https://wp.me/p1sCvy-5pM

    The Indo-Pacific Strategy in Action: Commemorating the Second Anniversary

     

    আপনি যদি হন কোন পাগলা-প্রেমিক যে প্রেমিকা মেয়েটার  মন পাবার জন্য নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে বসে আছেন আর তাতে আবার আপনিই নিজ চোখে যদি দেখতে পান সেই মেয়েটাই আসলে আপনাকে না আরেক পুরুষের মন পাবার জন্য তাঁকে চিঠি মানে আকুল হয়ে প্রেমপত্র লিখছে – তাহলে এর মানে কী বুঝবেন??? এর অর্থ হল আপনি শুধু বেকুব পাগলা না, গাধাও বটে!!! সে “আকুল প্রেমপত্র” খানা আপনার হাতে আসার পরেও যদি আপনি নিজের সাথে প্রতারণা করেন, নিজেকে মিথ্যা প্রবোধ দিতে থাকেন যে আমেরিকার বাইডেন-ল্যু আবার আসবে, এই এলো বলে ইত্যাদি তবে আর আপনাকে আপনারই গড়া মিথ্যা মায়ার জগত ভেঙ্গে বাস্তবের জগতে আপনাকে কেউ আনতে পারবে?
    একারণেই “ডোনাল্ড ল্যু আবার…… ” – এটুকু সংবাদের শিরোনাম শুনলেই বাংলাদেশের বিরোধী-মন ফেসবুকার-সহ সকলে হুটোপটি শুরু করে দিচ্ছে! খুবই বিপদজনক লক্ষণ এটা সন্দেহ নাই!!

    মানুষ জন্মানো শিশু অবস্থায় মায়ের পেট থেকে বাইরের দুনিয়ায় একবার চলে আসা মানে, যেটাকে আমরা জন্ম নেওয়া বলি তা, একবারেরই ঘটনা। একবার জন্ম নেয়া শিশু পরে আবার সে মায়ের গর্ভে ফিরে যেতে পারে না। কোন সুযোগ নাই। আর ফিরা যায় না এমন একমুখিতা বা irreversible ঘটনা এটা! এছাড়া  মায়ের গর্ভেরও সেই পুর্ব-পরিবেশ দশা পরিস্থিতিও আর থাকে না যে সেখানে ফিরে গিয়ে শিশু চাইলেই আবার আশ্রয়-বসবাস করতে পারে! কিন্তু তবু মানুষের মধ্যে কল্পনা থাকে। ফ্যান্টাসি করে মানুষ, মানে কল্পনায় এমন বসবাস করতে চায় মানুষ! আর সেভাবে  চলে যেতে চায়; বুঝতে চায় সে অনুভুতি কেমন, ইত্যাদি। যদিও মানুষ একেবারে পরিস্কারই জানে – মানুষ জানে যে এটা একেবারেই অবাস্তবতা; তবু ফ্যান্টাসিতে করতে চায়! তাই সেখান থেকেই একটা কথ্য-ভাষ্য দেখা যায় “মায়ের গর্ভে ফিরে যাবার মতই অসম্ভব”! কোন একটা ব্যাপার একেবারেই অসম্ভব বুঝাতে তাই অনেকে বলে জন্ম নেওয়া বাচ্চার মায়ের গর্ভে ফিরে যাবার মতই অসম্ভব!

    আবার ইংরাজিতে এমনই আরেকটা বাগধারা শব্দ আছে – ব্যাক টু দা প্যাভেলিয়ন! কথাটা ক্রিকেট খেলায় বেশী ব্যবহৃত হয়।  মানে ব্যাটসম্যান খেলতে নেমে আউট হয়ে যাবার পর ক্রিকেট ফিল্ডের বাইরে চলে আসতে ও নিজ শিবিরে আশ্রয় নিতেই হয়।  আর সারকথায় এর অর্থ হল – “আপনি আউট, আপনি ব্যর্থ তাই আপনার স্থান এখন বাইরে”!!! অথবা এভাবটা বুঝাতে চায় যে – আপনি ব্যর্থ এখন তাই আপনি যেখান থেকে এসেছিলেন সেই প্যাভিলিয়া্নে বা মাঠের বাইরে ফিরে চলে যান। এই অর্থে ব্যাক টু প্যাভেলিয়ান মানে আপনি হেরে গেছেন কথাটাই আসলে একটু সুন্দর করে বলা!

    বাইডেন ব্যাক টু দা প্যাভেলিয়ন!
    হা ঠিকই ধরেছেন কথাগুলো হচ্ছে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে নিয়ে!  বাইডেন ব্যাক টু দা প্যাভেলিয়ন!! মানে বাইডেন, “তুমি হেরে গেছো তাই তুমি এখন মাঠের বাইরে যাও”!!!
    তবে কথাটা আমি বলি নাই! যারা বাইডেনের পরাজয় হয়ে গেছে বুঝে তা এখন আবার তা ঢাকতেও শুরু করেছে অথচ পরাজয় পরবর্তি বাইডেনের সকল ততপরতাই বলে দিচ্ছে যে তিনি হেরে গেছেন!  এমনিতেই বাংলাদেশিদের জন্য বাইডেন যে পরাজিত হয়েছেন তা বুঝে ফেলার ক্ষেত্রে আমরা  সবার চেয়ে একটু আগিয়ে আছি বলতেই হয়। যেমন, বাইডেনের আমেরিকাই দাবি করে জানিয়েছে যে বাংলাদেশে কোন “ফেয়ার ইলেকশন” ঘটে নাই। আর আমরা দেখতেছি  কথিত এই নির্বাচনের পরে হাসিনা-ই আবারও সরকারে আছেন, নতুন করে বসেছেন। তাই ফেয়ার ইলেকশন না হওয়ার কথা তো আর অন্তত ঢাকার কাউকেই বুঝায় বলার কিছু নাই। যার আরেক অর্থ হল, বাইডেনের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার (যেটা নাকি বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতির মুখ্য বৈশিষ্ট ও নীতি-পলিসি বলে দাবি করা হয়েছিল তা) এছাড়া এর সাথে বাইডেনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও ভিসা নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক যেসব পলিসি ছিল সেসব এখন ভাগাড়ে গেছে,  গোল্লায় গেছে, অকেজো হয়ে কোথায় হারিয়ে গেছে। এটা বাংলাদেশিরা নিজ শরীরি অনুভবেই টের পেয়েছে!

    কিন্তু এঘটনাটা বাইডেন নিজে বা তাঁর অন্তত মন্ত্রী সভাসদ এরা কীভাবে দেখছে? তারা কী এটা খোলাখুলি স্বীকার করেছে?  না করে নাই, করছে না।  কারণ তা করলে এরপর সম্ভবত বাইডেনকেই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ছেড়ে ভাইস প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা দিয়ে চলে যেতে হত; এছাড়া সেক্ষেত্রে, শাসনের নৈতিক শক্তি হারানো কোন ক্ষমতা মানে সে তো পরাজিত ক্ষমতাই! তার আর কিছুই অবশিষ্ট  থাকে না বলে স্বীকারের প্রসঙ্গ উঠতে পারছে না! তাহলে?

    যদি মনে রাখি তবে এসবেরই ঘটনা-আলামত শুরু হয়েছিল বলতে পারি –  গত বড়দিন (২৫ ডিসেম্বর ২০২৩) থেকে যখন, পিটার হাস এই বড়দিন এবার পালন করেছিলেন নয়াদিল্লিতে বসে। সেই থেকে আমাদের কাছে আমেরিকার পলায়নের সন্দেহ গভীরে বাড়ছিল কিন্তু একেবারে সুনির্দিষ্ট করে কিছু জানা বা বলা যাচ্ছিল না!  এরপর ৭ জানুয়ারির নির্বাচন হতে দেওয়ার “স্বাভাবিকতা” দেখে এরপর থেকে পরে ঘোষিত ফলাফল আর একেবারে ৪ ফেব্রুয়ারি, বাইডেনের লেখা শেখ হাসিনাকে চিঠি পর্যন্ত আরো সব আলামত ক্রমশ সব প্রকাশিত হচ্ছিল। এরপরেই শুরু হয়েছিল বাইডেনের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি – একে এক সফল কার্যক্রম বলে প্রচার যা শুরু হয়েছিল ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে যেটা শেষে ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ডোনাল্ড ল্যু এর ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির দুবছর কথিত সফল সমাপ্তি উতযাপন দেখলাম আমরা।  আসলে এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক হল ” ইউএস ইন্সটিটিউট অফ পিস” মানে, USIP [U.S. Institute of Peace], গত ১৫ ফেব্রুয়ারি এদিন আইপিএস এর দুবছর পুর্তিতে সফলতা উতযাপনে ডোনাল্ড ল্যু কে তারা  আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আর ঐ সভাতেই ল্যু এর দেয়া বক্তৃতার এক-দুইটা বাক্য মাত্র ছিল বাংলাদেশকে নিয়ে। আর তাতেই বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো ঝড় বইয়ে ফেলেছিল। আবার যদিও সেখানে ল্যু বার্মা বলতে ঠিক সেখানে যে বর্তমান সশস্ত্র সংঘাত চলছে এর কথা তুলেন নাই বা বলেন নাই। সাধারণভাবে কথা বলেছিলেন। তিনি ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা সমস্যর দায় বাংলাদেশ বইছে তা নিয়ে তিনি কথা বলেছিলেন।   মজার কথা হল সে অনুষ্ঠান ১৫ ফেব্রুয়ারি হলেও বাংলাদেশে এর প্রতিক্রিয়া হয় ১৮ ফেব্রুয়ারিতে। আর বাংলাদেশ এই শব্দ যোগ করে দিয়ে বলা পুরা কথা থেকে কেবল  ০১ঃ৪৬ মিনিটের বক্তব্যটুকুর ভিডিও এনেছে চ্যানেল ২৪ যা দেখা যাবে এখানে।

    আর যারা ঐ অনুষ্ঠানের পুরা ১ ঘন্টা ৪৬ মিনিটের রেকর্ডিং-টাই পেতে চান তা পাবেন এখানে।  তবে মনে রাখবেন, এর রেকর্ডিং চালুর আবার প্রথম ১৬ মিনিট পরে অনুষ্ঠানটা শুরু হয়েছিল তাই প্রথম ঐ ১৬ মিনিট পেরিয়ে বা বাদ দিয়ে শুরু করতে পারেন। আর শুরুর আবার ২৭ঃ৩৫ মিনিটে গিয়ে ল্যু এর প্রথম বক্তব্য শুরু হয়েছে। কিন্তু দুঃখের কথা এই বক্তৃতায় ল্যু বাংলাদেশ নিয়ে কিছুই বলেন নাই – শব্দটাও উচ্চারণ করেন নাই। এই অংশে তাঁর পুরা বক্তব্যটার প্রসঙ্গ হল কেবল শ্রীলঙ্কা। পরে সেকেন্ড রাউন্ডে সবার বক্তব্য শুরু হলে ল্যু আবার বলার সুযোগ নেন ৫৩ঃ ৫৪ মিনিটে।  আর তখনই তিনি কেবল দেড় মিনিটের বক্তব্যে বাংলাদেশ শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন আর সেটাই চ্যানেল২৪ রেকর্ড ক্লিপ এনেছে।

    একটা সোজা কথায় সে প্রশ্নটা করা যাকঃ
    ডোনাল্ড ল্যু নিজের আইপিএস উতযাপন বক্তৃতায় ছোট্ট করে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এনেছেন। তিনি বলেছেন বার্মা বা রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু ফেরার প্রসঙ্গটা দীর্ঘায়িক হতে পারে; জটিলতা বাড়তেও পারে। তাই বাংলাদেশ আর ভারতকে নাকি সতর্ক থাকতে হবে! কিন্তু কী আশ্চর্য বাইডেন-ল্যু এর বার্মা এক্ট বলে কী জানি একটা ছিল না? যেটা নাকি আমাদের রক্ষকবচ? ল্যু-রা এই বার্মা এক্ট দিয়েই নাকি আমাদেরকে রক্ষা করবেন??? এটাই তো দয়াময়ী বাইডেন-ল্যু এর আশ্বাস বাক্য ছিল না??? তো সেটা এখন কোথায় গেল?? এর তো কোনই হদিসও নাই!!!! আর উলটা ল্যু আমাদেরকে নিজ নিজেই নিজের আত্মরক্ষার কানপড়া দিচ্ছেন কেন??? আমাদের রক্ষাকর্তা হবার সাধ-আল্লাদ ছিল যার সেই আমেরিকা – আহা রে আমেরিকা – আমাদের ত্রাতা আমেরিকা তুমি কোথায় গেলে তাহলে?  

    তাই এবারের আবার ল্যু এর প্রসঙ্গ –  এটা অবশ্যই আমাদের মিডিয়ার সৃষ্টি হৈ চৈ! মানে একটা উচ্ছ্বাস বা হাইপ তোলা যেন পাঠক হৈ চৈ শুরু হয়ে এসব মিডিয়ার হিট বা TRP বাড়ে বা দর্শক আছড়ে পরে তাদের নিউজে – এটা সেধরণের এক নিউজ রিপোর্ট ছিল।
    যেমন মানবজমিনেরটা দেখা যাক – ওর শিরোনাম হল  ডনাল্ড লু ফের দৃশ্যপটে। এই শিরোনামটাই উস্কানিমূলক!  কারণ, বিগত দুবছর বাইডেনের আমেরিকা যেভাবে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতির পক্ষে, ওর পিছনে দাঁড়িয়ে নিজ নানান পদক্ষেপ বা ঘোষণায় আন্দোলনকে সাহস দিয়ে গেলেও গত সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে এরাই আবার মাঠ ছেড়ে চলে গেছিল। তবু বিরোধীদলগুলো এখনও আমেরিকান সমর্থন আবার আসবে, আমেরিকা আবার এই এলো বলে ইত্যাদি অনুমান ছড়িয়ে রেখে চলছেই – কিছুই গুটায়ে ফেলে নাই – তাতে করে আম-জনতার মনে একটা গভীর কিন্তু ভুল আশা এখনো জিইয়ে আছেই যে আমেরিকা আবার আসবেই……! !

    অথচ এই বাংলাদেশের বেলাতেই বাইডেন ব্যাক টু দা প্যাভেলিয়ন! কথার আসল অর্থ হল এবার বাইডেন-ল্যু আবার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিতে এসেছে! গত ২০০৮ সাল মানে গত ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ১/১১ এর ক্ষমতাদখলের পরের বছর যেভাবে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল যেই দগদগে ক্ষত আমাদের ভুলবার নয় – আর যা পরে ২০১৭ সাল নাগাদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে তিনি আমেরিকাকে এখন থেকে প্রত্যাহার করে নিলেও কার্যত হাসিনা সরকারের ভারত-নির্ভরতা ও ভারতকে কোলে ধরে রাখার চেষ্টা থেকেই গিয়েছিল। কারণ, বাংলাদেশ বা ভারতে দুদেশেই পুরানা ক্ষমতাসীন সরকারেরাই থেকে গেছিল বলে আমেরিকান প্রত্যাহারের কোনকিছুই প্রকাশ করতে হয় নাই বা প্রকাশ্যে দেখাতে বাধ্য হয় নাই। এছাড়া নানান উসিলায় প্রায়ই নয়া আমেরিকান চাপ আসছিলই! তাই হাসিনা ততই ভারতকে চেপে ধরে রেখে চলছিলেন যা রুটিন ওয়ার্ক  এর মত ডাল-ভাত হয়ে গেছিল!

    আবার এখন বাইডেন-ল্যু এখন ব্যাক টু দা প্যাভেলিয়ন! হয়ে গেলেও তাদের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি [আইপিএস] একেবারেই অর্থহীন অকেজো আর নুন্যতম ফল দেখাতে পারছে না অথচ সামনে্র নভেম্বর ২০২৪ বাইডেনকে আমেরিকান  নির্বাচনে নিজ জনগণের মুখোমুখি হতে হবে, তাঁর চলতি সরকারের সাফল্য কী এনিয়ে কথা বলতে হবে!  তাই মিথ্যা হলেও এবারের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে আইপিএস এর দুবছর পালনের দিন বাইডেন-ল্যু দাবি করছেন যে তারা এক সফল আইপিএস পলিসি যেন দেখিয়েছেন। চিঠি লিখে বাইডেন হাসিনাকে খায়েশ ব্যক্ত করে বলছেন যে বাংলাদেশ-আমেরিকা একসাথে  সফল আইপিএস পলিসি উতযাপন করতে চান!! আর বাস্তবতা হল, হাসিনার লিখিত আইপিএস বাইডেনের থেকে আলাদা!  হাসিনার আইপিএস-এ চীন কোন এনিমি  বা শত্রু নয় বা এভাবে দেখানো হয় নাই। বরং চীনের নামই নেন নাই হাসিনা!

    তাহলে বাইডেন-হাসিনা একসাথে সফল(?) আইপিএস পলিসি উতযাপন করবেন কীভাবে?  আর অন্তত হাসিনা তো বাস্তবে তা করেনও নাই!

    কিন্তু পরাজিত বাইডেন আবার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছেন। এটা করে হলেও বাইডেন নিজেকে সফল বলে দেখাতে চাইছেন!!!! তিনি এতই মরিয়া!! কিন্তু হাসিনা সরকার কী তা মেনে নিয়েছে!!! বা কিভাবে নিয়েছে?
    গত ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের দিনের পরের ১১ জানুয়ারির মধ্যেই হাসিনার নয়া এমপিদের শপথ থেকে শুরু করে নয়া সরকারের মন্ত্রীদেরো শপথ অনুষ্ঠানও শেষ করে ফেলেছিলেন। এরপর ১১-২৭ জানুয়ারি মোটামুটি টানা প্রায় প্রতিদিন আমরা দেখেছি চীনের প্রসঙ্গ আর ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদুতের সাথে নানা দেখা সাক্ষ্যাত, আলোচনা পরিকল্পনা। এমনকি হাসিনার সম্ভাব্য চীন সফরের লক্ষ্যে চীনা দাওয়াত জানানোও ঘটে গিয়েছিল!!
    কিন্তু হায় সব ওলট-পালট! ২৮ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভিন্ন চিত্র। ৪ ফেব্রুয়ারি বাইডেনের লেখা  হাসিনাকে চিঠি আর এর আগে ভারতের অজিত দোভালের সফর থেকে সব উলটা চিত্র হয়ে যায়। আজও কেউ বা মিডিয়ার কেউ জানে না অজিত দোভাল ঠিক কবে এসেছিলেন, কয়দিন ছিলেন- এছাড়া ঠিক কী নিয়ে আলাপ করতে এসেছিলেন।  সরকারের দিক থেকেও এই সফর সম্পর্কে আজও মিডিয়াকে কিছুই জানানো হয় নাই। তাই বাংলাদেশের মিডিয়ায় যে যতটুকু জানিয়েছে তা মূলত অনুমান-নির্ভর আর নয়ত ভারতের মিডিয়ায় ছাপানো গারবেজ-প্রপাগান্ডার বরাতে যা খুশি লেখা!  অর্থাৎ সবমিলিয়ে  – বাইডেনের হাসিনাকে লেখা চিঠি ছাড়া সব কিছুই অস্পষ্ট। আর প্রবল ইঙ্গিত ছড়ানো হয়েছে যেন বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব (আগের ২০২১ সাল বাইডেন ক্রষমতার শপথ নিবার আগের মত”  বাইডেনের গণতন্ত্র-মানবাধিকার পলিসি নিয়ে হাজির হবার আগের মতই যেন আছে!

    আগেই বলেছি গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ছিল বাইডেন-ল্যু এর পেয়ারের কিন্তু অকেজো ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি [আইপিএস] শুরুর দুবছর পুর্তি-সমাপ্তির দিন। যে দিনকে আইপিএসের কথিত সাফল্য এর দিন; আর যা বাইডেন-হাসিনা যৌথভাবে উতযাপনের জন্য প্রস্তাব রেখেছেন বাইডেন। কিন্তু হাসিনা এনিয়ে কোন সাড়া দিয়েছে আমাদের জানা নাই। তিনি নিজের কাজ নিয়ে নিজের মত ব্যস্ত থাকলেও  আমরা ডোনাল্ড ল্যু-কে পাই USIP এই থিঙ্কট্যাঙ্কের সাথে উতযাপন করতে।
    শুধু তাই না, ঐ উতযাপন অনুষ্ঠানে ডোনাল্ড ল্যু – কিছুদিন আগে শ্রীলঙ্কায় অর্থনীতিতে দুর্যোগ বা ভেঙ্গে পড়া ঘটেছিল তা থেকে উঠে জাগার ঘটনাকে আইপিএসের সাফল্য বলে দেখাচ্ছেন। এখানেই শেষ না তিনি একাজে ভারতেরও অংশগ্রহণকে আমেরিকা-ভারতের সাফল্য হিসাবে এই প্রথম তুলে ধরেছেন। যেটা এর আগে কখনই আমরা দেখি নাই শুধু না বরং ভারতেরই অসন্তোষ দেখেছি যে শ্রীলঙ্কায় ভারতের সব প্রভাব সাফল্য একা আমেরিকা নিয়ে গেল বলে। শ্রীলঙ্কায় নগদ অর্থ বা ঋণদান নয়, ভারত বস্তুগতভাবে খাদ্যপণ্য আর জ্বালানি গ্যাসের সিলিন্ডারের সরবরাহ জুগিয়েছিল। তাদের দাবি মত যা নাকি তিন বিলিয়ন ডলার মুল্যমানের মত । কিন্তু ফলাফলে দেখা যায় চীন-ভারত সবাইকে ফেলে শেষে আমেরিকার প্রভাবের সেখান জয়জয়কার হয়। অথচ এখন ল্যু শ্রীলঙ্কার এই অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে আমেরিকা-ভারতের সাফল্য হিসাবে হাজির করেছেন।

    USIP এর ঐ অনুষ্ঠানের ভিডিওতে দেখা যায় কেবল ল্যু-ই নন অন্যান্য আলোচকেরা আবার কোয়াড [QUAD] এর প্রসঙ্গ আনছেন কেন? কোয়াড কী কার্যত মৃত নয়ঃ
    USIP এর ঐ অনুষ্ঠানের ভিডিওতে দেখা যায় কেবল ল্যু-ই নন অন্যান্য আলোচকেরাও এমনভাবে ভারতের প্রসঙ্গ এনেছেন বাইডেনের গত তিন বছরের শাসনামলে যেন বাইডেন খুবই ভারত-ঘনিষ্ট ছিলেন!!!  যেটা বাস্তবে একেবারেই উলটা ছিল!  আর সেটা বাইডেনের চয়েস ছিল না। মূল কারণ, বাইডেন ভারতের উপরও নিজের  গণতন্ত্র-মানবাধিকার পলিসি প্রয়োগ করতে গেছিলেন। প্রতিবছর ভারতের মুসলমানেরা ধর্ম-পালনে ও জীবনযাপনে নিগৃহিত হচ্ছে এই ছিল তাঁর মূল বক্তব্য এবং আমেরিকান প্রশাসনিক সিস্টেমে এক স্বাধীন (ধর্মীয়) কমিশনার আছেন যার কাজই হল এনিয়ে প্রেসিডেন্টকে রিপোর্ট দেয়া যে কোন দেশের মানুষের ধর্ম পালনের অধিকার ক্ষুন্ন হল! তাই বাইডেন এনিয়ে বহুবার মোদির বিরুদ্ধে  সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন। শুধু তাই না বিপরীতে, বাইডেন কংগ্রেসের রাহুলের সাথেও যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। রাহুলদের যেন সুবিধা হয় তাই মোদির জিগরি দোস্ত গৌতম আদানির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছেন। বেচারার শেয়ার মালিকানায় ধ্বস নামিয়ে দিয়েছেন।  হেজ [Hedge] ফান্ড ব্যবসায়ী বা “ওপেন সোসাইটি” এই দাতব্য বা থিঙ্কট্যাঙ্কের মূল ফাইন্যান্সার জর্জ সোরেস-কে দিয়ে বাইডেন মোদির প্রিয় ব্যবসায়ী গৌতম আদানির ব্যবসায়িক সব গুমো্র আর কথিত অপততপরতার ফিরিস্তি দিয়ে শেষ বিচারে শুধু আদানিকেই নয় খোদ, মোদিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন!  বাইডেন নিয়মিত ভারতীয় মুসলমানদেরকে নিপীড়নের জন্য মোদিরকে দায়ী করেছেন। যে কারণে এক পর্যায়ে পুরানা প্রেসিডেন্ট ওবামাও মোদিকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন মোদির এই মুসলমানবিদ্বেষী নীতির কারণে একদিন ভারত বিভক্ত হয়ে যেতে পারে!  অর্থাৎ গত তিনবছর ধরে বাইডেন তার গণতন্ত্র-মানবাধিকার পলিসির লাইনে মোদিকে আক্রমণ করে গেছিলেন।
    অথচ এখন এবারের ঐ আইপিএস সাফল্য উতযাপন সভায় ভারতের প্রশংসায় সব ভরে উঠেছিল! আবার কোয়াড [QUAD] নিয়েও ভারতের সাথে কাজের স্মৃতি আউড়ানো হয়েছে সেখানে। অথচ কোয়াড কার্যত মৃত! কারণ, অষ্ট্রেলিয়ার আমেরিকান পারমানবিক সাবমেরিন কেনাকে কেন্দ্র করে AUKUS  নিয়ে একপর্যায়ে ভারত জানিয়ে দিয়েছিল যে ভারত কোয়াড বা অন্যকিছুর নামে অন্য দেশ বা জোটে সেটাকে সামরিক জোট বুঝায় বা  এমন ততপরতাও বুঝায় –  এমন কিছুতে ভারত থাকতে চায় না; জড়াবে না। এথেকেই QUAD অকার্যকর হয়েছিল আর AUKUS নিয়ে কিছুদিন চর্চা হয়ে সব শেষ ঠান্ডা হয়েগেছিল। যার মূল কারণ বলা যায়, মোদি সরকারের উপর বাইডেনের গণতন্ত্র-মানবাধিকার পলিসির চাপাচাপি।
    অথচ এখন তাহলে ল্যু এন্ড গংয়ের  আইপিএস সাফল্য উতযাপন সভায় ভারতের প্রশংসা কিভাবে? পুরা পরিস্থতিকে তারা এমন ভাবে তুলে ধরেছেন যেন বাইডেনের তিনবছর ভারতের সাথে সম্পর্ক তার আগের ওবামা আমলে [২০০৮ সালে বুশের সময়েই বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল যাতে ভারত বাংলাদেশ নিয়ে যা খুশিকরতে পারে যা পুরা ওবামা আমলেও বজায় ছিল ] যেমন ছিল – (ভারতের হাতে তুলে দেওয়া এক বাংলাদেশ) ঠিক তেমনই যেন আছে।  যা খুবই খারাপ ইঙ্গিতপুর্ণ! যার থেকে আমাদের শঙ্কা যে বাইডেন-ল্যু পিটার হাসেরা আমাদেরকে আবার ভারতের কোলে উঠিয়ে দিতে চাইছে!!!

    এসব কারণেই এই অনুমান জল্পনা-কল্পনা বেড়েছে যে বাইডেন ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবার আগে কী নিজ ব্যর্থতা ঢাকতে আবার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে সওদা করে দিয়ে যেতে চাচ্ছেন?
    এটা আমাদেরকে আরো স্পষ্ট পরিস্কার করে খুটিনাটি-সহ সব বুঝতে হবে। তবে ইতোমধ্যেই যেটা দৃশ্যমান তা হল হাসিনার মুখ থেকে উঠা চীন এখন আর প্রসঙ্গই নয়। আবার এর মানে বাইডেনের আমেরিকা-ভারত কোন নয়া উদ্যোগ বা অফার পেয়ে কী হাসিনা খুশি? উতফুল্ল? না তাওও নয়! মানে প্রধান দ্বন্দ্ব – গত দুবছরের বাইডেন-ল্যু এর সাথে হাসিনার দুরত্ব আর গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে হাসিনা তা ভুলে এখন বাইডেনের দিকে আগিয়ে আসছেন বলে মনে হচ্ছে না!  আর এসবের পরিণতি হল যেন সবকিছু স্থবির হয়ে গেছে! আর তামাশা হিসাবে বারবার উঠে আসছে বাইডেন-ল্যু এর বোকা বোকা পানিপ্রার্থীর মত সব আচরণ – হাসিনার মান ভাঙ্গানোর নানান কসরত ইংরাজিতে যেটাকে উউ [WOO] বলে! আর ভদ্র তবে সংস্কৃত-ঘেঁষা বাংলায় বলে “প্রণয় ভিক্ষা” চাওয়া! যেগুলোর দিকে তাকানো যায় না এমনই অসহ্য!!! এই হল এখনকার বাইডেনের পরিণতি!!!

    যদিও আগামি একমাসের মধ্যে হাসিনার মধ্যে আবারও যদি চীন সফরে যাবার জন্য ব্যাকুল-উদগ্রীব হতে দেখি তো আমাদের অবাক না হওয়াই সম্ভবত সঠিক হবে! 

    সবশেষে একটা কথাই বলব! বাইডেন-ল্যু এর দশা যদি হয় হাসিনা সরকারের প্রণয় ভিক্ষুক হওয়া; তবে আমাদের বিরোধীদলেরা সেই – বাইডেন-ল্যু এরাই আবার আমাদেরকেও নাকি উদ্ধারে আসবে; এই আসতেছে –  আসতেছে বলে তারাই বা তাহলে কার কাছে কী ভিক্ষা করছে!!! এর কোন জবাব খুঁজে পাই নাই!!! কেবলই বিস্মিত হয়ে আছি, থাকছি! আর বিরোধীদের এ এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব দেখে যাচ্ছি!!!

     আপডেটঃ  ১৯ ফেব্রুয়ারি  ২০২৪, সন্ধ্যা সাতটা ১৮
    সর্বশেষ আপডেটঃ  ২০ ফেব্রুয়ারি  ২০২৪, দুপুর দুইটা ৪৫

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ইমরানের পাকিস্তানে ডোনাল্ড ল্যু, বাইডেনদের অর্জন!

    ইমরানের পাকিস্তানে ডোনাল্ড ল্যু, বাইডেনদের অর্জন!
    গৌতম দাস
    ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
    https://wp.me/p1sCvy-5nT

     

    ডোনাল্ড লুর সঙ্গে পাকিস্তানি দূতের বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রিত্ব হারান ইমরান

     

    “গণতন্ত্র ও মানবাধিকার” মানে আমেরিকায় ডেমোক্রাট প্রেসিডেন্ট বাইডেনের “গণতন্ত্র ও মানবাধিকার” এর বোলচালের পররাষ্ট্রনীতিটাই ফুটা হয়ে গেছে। একেবারেই ন্যাংটা হয়ে যাওয়া যাকে বলে!  আমাদের দেশের সরকারবিরোধীরা এদের বিশ্বাস করে যেভাবে ঠগেছে, লুট হয়ে গেছে সে তো গেছেই। তবে বাইডেন প্রশাসন এখন পাকিস্তানের ঘটনাবলীর পরে একেবারেই ন্যাংটা হয়ে পথচলা শুরু করেছে – তা সন্দেহাতীত বলা যায়। আসলে এবার হামাস যোদ্ধাদের প্রতিরোধের সময় থেকেই বাইডেনের অবলীলায় ইসরায়েলের নেতানিয়াহুর পক্ষ নিয়ে সর্বতোভাবে হাসপাতাল পর্যন্ত গুড়িয়ে দেয়াকে সমর্থন করা থেকে বলা যায় বাইডেন প্রশাসন ফুটা হওয়া স্পষ্ট হয়ে গেছে; তাঁর গণতন্ত্র ও মানবাধিকার এর ভুঁয়া বোলচালসহ-ই! এরা হাসপাতাল পর্যন্ত গুড়িয়ে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার এর সৈনিক হতে চেয়েছেন!

    বলেছিলাম বাংলাদেশের মানুষকে পরিত্যক্ত করে ফেলে পালানোতে আমেরিকান পরিণতি হবে কেবল বাংলাদেশ না সারা এশিয়া থেকেই “আমেরিকা আউট” হয়ে যাবে। শুরু হয়েছে!!!
    বাংলাদেশের পরে প্রায় একই সুতাতে একইভাবে তা ঘটে গেছে বার্মায়। সেখানেও নিয়মিত চাপা মারা আর বার্মা এক্টের হুমকির শেষ পরিণতিও আমেরিকার পলায়ন বা হাত গুটিয়ে নেয়া! আর তাতে এখন হাহাকার উঠেছে। বিশেষ করে  তা সবচেয়ে বেশী দেখা যাচ্ছে বার্মার সিভিল নেত্রী সু চিদের ঘরে। তিনি এতই নোবেল হয়ে উঠেছিলেন যে কেবল মুসলমান বলে লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের বার্মা থেকে জেনারেলেরা খেদায় দিয়েছে, উদ্বাস্তু করে দিয়েছে। অথচ এই নোবেল-ধারী নেত্রী সু চি  তিনি এর একটু নিন্দাও করতে পারেন নাই। অথচ তাকেই এখন  “গণতন্ত্র ও মানবাধিকার” এনে দিবেন বলে সমর্থন জানিয়েছিলেন বাইডেন! অথচ সেই  সু চির অবস্থা এখন বাংলাদেশের বিরোধীদের মত তবে – সম্ভবত আরো খারাপ যা একেবারে তাকানো যায় না অবস্থা!  নিউইয়র্ক টাইমস এনিয়ে এক আর্টিকেল ছেপেছে তাতে দেখা যাচ্ছে নিজেই নিজেদের দুর্দশার জন্য এরা এখন নিজেদেরকে নিয়েই টিটকিরি দিচ্ছে। লেখার শিরোনাম “Fighting to Govern Myanmar, From a Teeny Office in Washington”। । আর সারাংশে লিখেছে যাদেরকে এখন –“……has to battle global apathy and ignorance as it struggles for recognition. – তাদের রাজনৈতিক দুর্দশার প্রতি দুনিয়ার নুন্যতম সহানুভুতি আর অবজ্ঞা পেরিয়ে এরা একটু করুণা আনার জন্য লড়ছে!
    এছাড়া আমার এর আগের বার্মা নিয়ে লেখায় দেখিয়েছি – ডেভিড স্কট, তিনি বলছেন, “একটা ভুল আশা ছড়িয়ে পড়েছিল যে থাইল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনের মতো মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র”। বাইডেন বার্মাকেও ফেলে পালিয়ে যাওয়াতে এর খেসারত দিচ্ছে এরা এখন সকলে!

    ইতোমধ্যে আরেক দেশ এর শিকার –  এবার তা হতে যাচ্ছে পাকিস্তান। তবে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উলটা। মানে এখানে ব্যাপক জনসমর্থনে থাকা ইমরান-কেই উতখাত করা বা ক্ষমতায় ফিরতে না দেয়াই  ডোনাল্ড ল্যু-দের টার্গেট। মানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যদি আমেরিকার অন্তত মুখে বলা টার্গেট হয় একটা ফেয়ার ইলেকশন; তবে  পাকিস্তানের বেলায় এর উলটা। নির্বাচনে কারচুপি-সহ নির্বাচনে ইমরান ও তার দলের অংশগ্রহণ ঠেকানো সবকিছু করে হলেও পাকিস্তানের জনগণের ম্যান্ডেট যেন ইমরানের পক্ষে না যায় এটাই হল ডোনাল্ড ল্যু-বাইডেনদের টার্গেট!     ইমরানকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সামরিক বাহিনীকে দিয়ে আমেরিকা হেন নিপীড়ন নাই যা প্রয়োগ করে নাই।  এমনকি গত ৮ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ইমরান আর তার দল যেন নির্বাচনে অংশ নিবার অযোগ্য থাকে জেলে থাকে; দল নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে ইত্যাদির বাধা তৈরিতে সবকিছু করেছে।  এমনকি এখন ভোটগ্রহণ শেষ হবার পরে ৫২ ঘন্টা হয়ে গেছে তবু ফলাফল ঘোষণা এই কেবল শেষ করা হয়েছে!
    সবশেষে বারবার বন্ধ করে রাখা কারচুপির ফলাফল ঘোষণা, এখন যেটা প্রকাশ করেছে তাতেও দেখা যাচ্ছে – ইমরান ও তার দলের লোকেরা শেষে দলের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে না পেরে সবাই দলের নির্দেশে স্বতন্ত্র-প্রার্থী হিসাবে দাড়িয়েছিল। আর তাতে এমন স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই সর্বসাকুল্যে সংখ্যাগরিষ্ট ১০২ টা আসন পেয়েছে। যেখানে দুই প্রমাণিত চোর ভায়ের দল এই কারচুপির নির্বাচন করেও তাদের মুসলিম লীগ নওয়াজ পেয়েছে ৭৫ আসন আর বিলাওয়াল ভুট্টো পেয়েছেন  ৫৪ আসন।

    এই ফলাফল ডোনাল্ড ল্যু-বাইডেনের কথিত  “গণতন্ত্র ও মানবাধিকার” এর পররাষ্ট্রনীতির আসল রূপ উদাম করে দিয়েছে। ডোনাল্ড ল্যু-বাইডেন ন্যাংটা হয়ে গেছেন।

    যে অভিযোগে ইমরান ও তার দলের নেতাদের জেলে রাখা হয়েছে, ইমরানকে সাজা দেয়া হয়েছে এই অভিযোগে এবং লোয়ার আদালতগুলোকে প্রভাবিত করেছে – দেখা যাক সেখানে অভিযোগ ঠিক কী ছিল!
    প্রত্যেকটাই বেশ তামা্শা। আর এর প্রথমটা হল খোদ ডোনাল্ড ল্যু এর প্রতিশোধ নেয়া। পটভুমিটা হল, ইমরান ক্ষমতাচ্যুতির আগের ঘটনা সেটা। ল্যু আমেরিকায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদুত-কে এর কথোপকথনের সরকার ফেলে দিবার হুমকি দিয়েছিলেন। এর প্রমাণ সহ যে নোট তিনি ততকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরানের কাছে পাঠিয়েছিলেন ইমরান তা হাতে পেয়ে এবার সাংবাদিকদের কাছে ডেকে অভিযোগ আকারে হাজির করেছিলেন। বলেছিলেন, এই ডোনাল্ড ল্যু-রা পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সাথে আতাঁত করে তার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করছেন। বাস্তবেও ব্যাপারটা তাই ঘটেছিল পরে দেখা গেছে!
    পরে চোর ছোটভাই শাহবাজের সরকার এবারের নির্বাচনের আগে মামলা দেন যে পাকিস্তানী রাষ্টদুতের সেই নোট-চিঠি নাকি ইমরান  আর অফিসে ফেরত দেন নাই। আর ঐ চিঠি যেহেতু সরকারি সম্পত্তি তাই  এটা নাকি সরকারি গোপনীয়তা ফাঁস করে দেওয়া – এই হলো অভিযোগ । এটাই গোপনীয়তা ভঙ্গ বা [CYPHAR Case] বলেও পরিচিত। আরো জানতে আগ্রহিরা দেখেন এখানে আল-জাজিরার এই নিউজে। What is the cypher case that led to jail term for Pakistan’s Imran Khan?  এই মামলায় ইমরানকে (সাথে সেসময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকেও)  দশ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে।

    পশ্চিমা বা আমেরিকান মুল্যবোধ বা ন্যায্যতাবোধঃ
    পশ্চিমা দুনিয়ায় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আমেরিকাকে তুলনামূলক সবচেয়ে ফেয়ার দাবি করা  মানে তুলনামূলক ভাবে বেশী ন্যায্যতা ও সৎ শাসনের কায়দা-কানুন ও মুল্যবোধ মেনে চলা বলে পশ্চিমাদের অনুমান! তাহলে পাকিস্তানে এখন কী দাঁড়ালো?
    ইমরান ডোনাল্ড ল্যু এর বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ এনেছিলেন প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায়। আর এতে, সাথে সাথেই আনুষ্ঠানিকভাবে বাইডেন প্রশাসন সেসময় অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। ভাল কথা, সেসব কূটনীতিক রেওয়াজ যদি মেনেও নেই তবে,   এখন এর প্রতিশোধ নিতে ডোনাল্ড ল্যু কী করলেন??
    তিনি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীকে দিয়ে ইমরানকে ক্ষমতাচ্যুত করলেন। নওয়াজ-শাহবাজ দুভাইই প্রমাণিত দুর্নীতিতে ডুবে ছিল। নওয়াজ সাজা খাটা অবস্থায় অসুস্থতার অজুহাতে জামিন নিয়ে লন্ডনে পালিয়েছিলেন। আর শাহবাজ আরেক দুর্নীতির মামলা চলাকালীন অবস্থা। তবু শাহবাজ প্রধানমন্ত্রী পদে বসেছিলেন। অথচ পরে এই দুভাই-ই পাকিস্তানে একাউন্টিবিলিটি ব্যুরোকে প্রভাবিত করে দুভাই-ই বে-কসুর খালাশ নিয়েছে; আমাদের দুদক সমতুল্য  প্রতিষ্ঠান হল পাকিস্তানে একাউন্টিবিলিটি ব্যুরো। যদিও অনেক ফারাক আছে। যেমন এই ব্যুরো মামলা দেয় এর জন্য নির্ধারিত করে রাখা ও প্রায় সংলগ্ন বিশেষ আদালতে।  আর আমাদের ক্ষেত্রে এটা একেবারেই আলাদা আদালত, যা তুলনামূলক অর্থে ভাল!

    সে যাই হোক, এর মানে ডোনাল্ড ল্যু এমন-ই দেউলিয়া অবস্থা যে “দুর্নীতিবিরোধি আর “গণতন্ত্র ও মানবাধিকার” এর প্রবক্তা ডোনাল্ড ল্যু-বাইডেন চক্র  নিজ স্বার্থসিদ্ধিতে কত নিচে নামতে পারে এর প্রমাণ তৈরি করলেন।  বিশেষ করে ডোনাল্ড ল্যু জিঘাংসা চরিতার্থ করতে ইমরানকে ক্ষমতাচ্যুত করেই থামলেন না। যে দালিলিক প্রমাণ দিয়ে তিনি ডোনাল্ড ল্যু-বাইডেনকে অভিযুক্ত করেছিলেন সেই দলিল প্রকাশ করে দিবার জন্যই তিনি কথিত পাকিস্তানি আর কথিত গোপনীয়তা ভঙ্গের অভিযোগ এনে উলটা ইমরানকেই ১০ বছরের সাজার বন্দোবস্ত করলেন। তাও এটা তারা করেছেন ৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাত্র  দুসপ্তাহ আগে। কারণ নির্বাচন হলে ইমরান বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ফিরে আসবেন তিনি আগেই  টের পেয়েছিলেন। তাই এই শেষ মরিয়া আঘাত যেন ইমরান নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে, তাই অযোগ্য করে দেয়া হয় তাকে। আবার সাথে পিটিআই দলকে নিষিদ্ধ করার সাহস হয় নাই। কিন্তু দলের প্রতীক নিষিদ্ধ করে কার্যত এই দল যেন নির্বাচনে নিষিদ্ধ থাকে এই ব্যবস্থা করেছেন!

    ইমরান- ল্যু  এর সংঘাত শুরুঃ
    গত ২০২২ সালের এপ্রিলে পিটিআই-এর ইমরান খান-কে ক্ষমতাচ্যুত করার কয়েকমাস আগে থেকেই মাঠে নেমেছিলেন ডোনাল্ড ল্যু। আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি বাইডেনের – দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী সেক্রেটারি অফ স্টেট। মানে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যদিও তার আসল কাজ মানে তিনি হলেন এশিয়ায় বাইডেনের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি [IPS] বাস্তবায়নের মূলকর্তা। অর্থাৎ এশিয়ার দেশগুলো থেকে  – এদের উপর চীনের প্রভাব বা চীনের উপর নির্ভরতা পারলে শুণ্যে নামিয়ে আনেন – এরই মন্ত্রী তিনি।  অথচ বাংলাদেশ, বার্মা আর পাকিস্তানে বাইডেন নীতি-পলিসি ইতোমধ্যেই পরাজিত। মানে একেবারে অকম্মা বলতে যা বুঝায়! যে এসাইমেন্ট তিনি বাসিডেন নিয়েছিলেন এর বাস্তবায়ন ছিল অসম্ভব, কারণ তা ছিল অবিবেচক টার্গেট, বাস্তবায়ন-অযোগ্য!

    কিন্তু এত কিছু করেও ফলাফল? আবার নির্বাচনে কারচুপি করা সত্বেও ফলাফলে ইমরান ও তার দল সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মোট ২৬৩ আসনে নির্বাচনে পেয়েছে ১০২ আসন! আর ঠেকাতে পারেন নাই। এতে কী ডোনাল্ড ল্যু এর জিঘাংসা অনেক সুখ পেয়েছে? আমেরিকান বা পশ্চিমাদের নৈতিকতা, আইনের শাসন বোধ অনেক সুখ আর শান্তি পেয়েছে – মর্ষকামী সুখে সয়লাব হয়েছে? এতে কী ডোনাল্ড ল্যু, আমেরিকা বা পশ্চিমা মুল্যবোধের আর সভ্যতার ভ্যানিটির অনেক অর্জন, অনেক বিজয় আর অনেক অনেক সুনাম হয়েছে???
    নাকি পাকিস্তান আজ  – নিজ জনগণ এর ম্যান্ডেটে – এর জবাব দিয়ে বিজয়ী হয়েছে?  পাকিস্তানে আজ  – নিজ জনগণ এর ম্যান্ডেট-টাই বা কী; তা কী বাইডেন প্রশাসন পড়তে পারবে? যোগ্যতা দেখাতে পারবে নাকি এই সুযোগ তারা ইতোমধ্যেই খুঁইয়েছে!
    আচ্ছা এই ডোনাল্ড ল্যু-বাইডেন প্রশাসনই কী আমাদের দেশে  “গণতন্ত্র ও মানবাধিকার” প্রতিষ্ঠার বিরোধীদলের সহযোগী হতে চেয়েছিল? তাই  আসলে থ্যাঙ্কস ডোনাল্ড ল্যু-বাইডেন প্রশাসন কিছুই করার সুযোগ নিতে পারে নাই। সেই চকোলেটের বিজ্ঞাপনের মত – “থ্যাঙ্কস ল্যু-বাইডেন, আপ লোগ কুছ না কিয়া” !!!

    আমেরিকান রাজনীতি চর্চার রেওয়াজ অনুসারে কেউ যখন প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়ায় মানে তখনকার শুরু হওয়া তৎপরতায় যেমন,  “প্রাইমারি নির্বাচনের”ও আগে থেকেই হবু প্রশাসন বা সরকারের ঘোষিত  নীতি-পলিসি কী হবে তা নিয়ে কাজ করার সময়  শুরু হয়ে যায়। আর তখন থেকেই যারা  এই কাজগুলো করে  তারাই পরবর্তিতে  (প্রার্থী প্রেসিডেন্ট বিজয়ী হয়ে গেলে) নয়া প্রশাসনে মন্ত্রী বা নানান অফিসের কর্তাপ্রধান হয়ে যান। এই হিসাবে ডোনাল্ড ল্যু গত ২০২০ সাল থেকেই ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি [IPS] বাস্তবায়ন-সংশ্লিষ্ট মূলকর্তা হয়েছিলেন। মানে তিনিই কার্যত আইপিএস [IPS] মন্ত্রী! এখন আইপিএস বলতে আসলে কী বুঝব?

    সোজা কথায় আইপিএস হল, এশিয়ায় বেশির ভাগ দেশে চীনের প্রভাব ছেয়ে গেছে। আর চীনের প্রভাব বলতে এসব গরীব বা অবকাঠামোর অভাবে থাকা গরীব ও মধ্য আয়ের দেশ নির্বিশেষে সবাই এমন অবস্থায় আছে বলে অবকাঠামো ঋণ পাওয়ার চাহিদা এশিয়ায় ব্যাপক! এজন্যই চীন আদরণীয়! এছাড়াও স্রেকটা দিক আছে। আশিয়ান দেশ [দশ দেশ  ব্রুনাই দারুসসালাম, বার্মা, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনাম] মানে যারা পুর্ব এশিয়া বা খানিকটা দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়া দেশ। অদের অনেকেই মধ্যম আয়ের ক্যাটাগরির দেশে পৌছে গেছে। কিন্তু তা হলেও এদের অবকাঠামো ঋণ চাহিদা এখনও বর্তমান। আর বিপরীতে বিশ্বব্যাংক বা এডিবি  এরা গরীব দেশেই (মানে যারা বিশ্বব্যাংকের IDA ক্যাটাগরির ঋণ [যার সুদ মাত্র ০.৭৫% আর লম্বা ৪০ বছর পরিশোধের সীমা] পাবার যোগ্য) বেশী করে খাতক দেশ খুঁজতে মনোযোগী যেন। এছাড়া আরো বড় কারণ হল, গরীবদেশের ঋণ চাহিদা পরিমাণের দিক থেকে তুলনামূলক কম। ফলে বিশ্বব্যাংকও তার তুলনামূলক পরিমাণে-স্বল্প সক্ষমতা দিয়ে ঐ গরীব ক্যাটাগরির চাহিদাই ভাল কভার বা মিটাতে পারে। একারণেই নব প্রতিষ্ঠিত চীনা AIIB ব্যাংক আবার আশিয়ান মধ্য আয়ের দেশগুলোর কাছে বেশী গম্য বা আকর্ষণীয়। তাই এশিয়ায় চীনের প্রভাবের পিছনের কথা হল চীনের এই অবকাঠামো ঋণদান সক্ষমতা; এশিয়ায় যার চাহিদা ইউনিক! এটা আফ্রিকার চাহিদা থেকেও আলাদা! অথচ যেটা থেকে বলা যায় আমেরিকাই বহু আগেই নিজেকে প্রায় গুটিয়ে ফেলেছে।

    কিন্তু আমেরিকার প্রেসিডেন্টেরা দেশের এই ঋণদান সক্ষমতা কমে যাওয়ার দিকে নজর দিতে নারাজ।   তারা মনে করে অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমেছে ঠিক আছে আর এটা অস্বীকারেরও উপায় নাই। কারণ, এনিয়ে আমেরিকার নিজেরই নিয়মিত স্টাডি, সার্ভে ও গবেষনার রিপোর্টের সারকথা ২০০৭ সাল থেকে এপর্যন্ত বারবার বলে যাচ্ছে যে চীনের সমক্ষমতা তাদের চেয়ে বেশী হয়ে যাচ্ছে অচিরেই চীন একনম্বর বড় অর্থনীতি হতে যাচ্ছে। আর এরই উলটা অনুপাতে আমেরিকান ঋণদান সক্ষমতা যা নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতারই আরেক প্রকাশ – এটা কমে নাই হব্বার পথে!
    কিন্তু ওবামা-সহ তার পরথেকে সকল প্রেসিডেন্টই এটা অস্বীকার করেই নীতি-পলিসি নিয়ে গেছে। সেটা এই মনে করে যে অর্থনৈতিক সক্ষমতা নাই তো কী হয়েছে আমেরিকার রাজনৈতিক (চাপ তৈরির সক্ষমতা) ও সামরিক সক্ষমতা (এখনও চীনের চেয়ে ছয়গুণ বেশী) আছে সেটাই তারা ব্যবহার করেও অনেকদিন চীনের চেয়ে বড় প্রভাবের দেশ হয়ে থাকতে পারবে। কিন্তু আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতার অভাব ও ক্রমশ নাই পয়ে পড়া, এটা কী রাজনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা দিয়ে পূরণ সম্ভব?  এই মুখ্য প্রশ্নটাই ওবামাসহ সকলএই একেবারেই এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করে যাচ্ছে আর বারবার পরাজিত হয়ে আসছে। ওবামার প্রশাসনের (২০০৯-১৬) বেলায় তাদের এমন সামরিক-কেন্দ্রিক নীতি-পলিসির নাম ছিল এশিয়ান পিভোট [Asian PIVOT] যেটা মুখ থুবড়ে পরে হারিয়ে গেছে। এর আকাশ্চুমী আকাঙ্খায় আমেরিকার গড়া অষ্টেলিয়ায় নির্মিত সামরিক ঘাঁটিতে “গরু চড়ছে” অবস্থা। বাইডেনের এবারের প্রচেষ্টাটাও তেমনি আরেক টা। আইপিএস বা “গণতন্ত্র ও মানবাধিকার” আর ওদিকে স্যাংশন আরোপ বা ডলারে আন্তর্জাতিক ব্যবসা চলতে বাধা ইত্যাদি ছিল এর বৈশিষ্ট। যেগুলা ছিল রাজনৈতিক চাপ (গণতন্ত্র ও মানবাধিকার” আর ওদিকে স্যাংশন আরোপ ধরণের) ও সামরিক শক্তি (বার্মা এক্ট যেমন) দেখানো বৈশিষ্টের; মানে ঋণদান এই দিকটাই এখানে অফ! যা বাইডেন ক্ষমতায় জীবিত থাকতেই তিনবছরের মাথায় পরিস্কার যে তিনি সমূলে পরাজিত হয়েছেন।   তবু ল্যু যেন জিদ্দি আর জিঘাইংসায় পরিপুর্ণ যে ইমরান কেন তাঁর কাপড় খুলে নিল – তাই ল্যু এর প্রতিশোধ চাই!

    আমেরিকার কোন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানকে বুঝতে চায় নাই, এখন আরোই নাঃ
    আমেরিকার কেউ পাকিস্তান বুঝতে চায় নাই।   সব প্রশাসন ভেবেছে পাকিস্তান – এটা তো সেই ১৯৭০ সাল থেকে আমাদেরই!  এখনো আমাদেরই। পুরানা দিনের বিস্তারে যাব না যা একালের মানে ওবামা আমলের এথেকে কিছু কথা! আমেরিকান প্রধান অপরাধ আত্মঘাতি আচরণ হল মালাক্কা প্রণালীর দিকে চোখ দেয়া।
    মালাক্কা প্রণালী [Straits of Malacca]  হল  – চীনের আটল্যান্টিক বা ভারত মহাসাগর হয়ে  যেসব পণ্য চলাচল এছাড়াও আরব সাগর থেকে তেল চীনের একমাত্র (পুর্ব-দক্ষিণ দিক সমুদ্রপথে খোলা) বন্দর দিয়ে প্রবেশপথের সবচেয়ে সংকীর্ণ এক অঞ্চল। এটা ইন্দোনেশিয়া আর মালয়েশিয়ার ভুখন্ডের মাঝের এক সংকীর্ণ জাহাজ চলাচল এরিয়া; যেটা পিরিয়েই কেবল চীনে পণ্য চলাচল সম্ভব। গত ২০০৮ সালে আমেরিকাই সবার আগে এই প্রণালী বন্ধ করে চীনের অর্থনীতিকে একটা সামরিক বাধা বা ধাক্কা দেয়া তৈরি করার দিকে মনোযোগ দিয়েছিল। অর্থাৎ চীনের অর্থনৈতিক উত্থান পালটা অর্থনীতি দিয়ে না এতে হার আশঙ্কা করে সামরিক দিকে একে ঠেলে দেয়ার এটা আমেরিকান পরিকল্পনা। [এনিয়ে বিস্তারে প্রমাণসহ আমার অন্তত দুটা পুরান লেখা আছে আগ্রহীরা দেখতে পারেন।]
    কিন্তু আমেরিকার এই  বোকা পরিকল্পনা থেকেই তাদের চেনা পাকিস্তান বদলে কোথায় চলে যাবে (ও এখন চলেই  গেছে) দিকটা আমেরিকা দেখেছে বা টের পেয়েছে মনে হয় না। হলে এবারের ল্যু-বাইডেন ইমরানের পাকিস্তান নিয়ে আরেক বোকা পরিকল্পনায় আবার যেতো না।
    ল্যু-বাইডেন এর পরিকল্পনা হল এশিয়াকে অন্তত চীনা (বিনিয়োগ) নির্ভরশীলতা ও প্রভাব থেকে মুক্ত করা তবে সেটা আমেরিকার রাজনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা দিয়ে।  অথচ তারা খেয়ালই করে নাই যে পাকিস্তানে চীনা বিনিয়োগ কেমন ও পরিসর কত বিস্তৃত! শুধু গোয়াদর (গভীর সমুদ্র বন্দর কেন্দ্রিক) প্রকল্প যেটা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্প (CPEC) নামে পরিচত এই প্রকল্পের পরিকল্পনায় তা প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলারের। পর্যায়ের পরে পর্যায় হিসাবে এর বাস্তবায়ন চলছে। ইতোমধ্যেই ২৫ বিলিয়নের আশে পাশের কাজ সমাপ্ত।  যেটা মূল পয়েন্ট এর নামে করিডোর শব্দটা কেন?  আবার কেউ যেন কোন মিথ্যা প্রপাগান্দা না করতে পারে তাই পরিস্কার করে বলা যে এটা কোন রাজনৈতিক প্রকল্প বা রাজনৈতিক (মানে সামরিকও) করিডোর একেবারেই নয়। এটা অর্থনৈতিক করিডোর মানে যার উদ্দেশ্য একেবারেই বাণিজ্যিক! কিন্তু করিডোর কেন? এর ভিতরেই সবকথা লুকিয়ে আছে! অথচ খুব কম পাঠকই এশব্দের দিকে গুরুত্ব দিয়েছে। এমনকি ল্যু-বাইডেনও সেটা আমল করেছেন তা তাদের পরিকল্পনা দেখে মনে হয় না।

    সাধারণভাবে অন্যদেশকে যখ নিজ ভুখন্ড ব্যবহার করতে দেয়া হয় কিছু শর্তে সেটাই ওদেশকে দেয়া করিডোর (Corridor)। এই করিডোরের একপ্রান্ত হল করাচি-বেলুচিস্তানের সমুদ্রসীমান্তের বন্দরে; আর এটা পাকিস্তানের বুক চিরে সবগুলো প্রদেশের ভিতর দিয়েই পাকিস্তান পার হয়ে পাক-কাশ্মীর পেরিয়ে চীনের জিনজিয়াং বা উইঘুড়ে প্রবেশ করেছে। আর এটা  দিয়েই সাড়ে তিনদিকে ল্যান্ডলকড চীন (আর তা হিমালয়ের মত পর্বতমালায় ঘেরা) এবার পশ্চিম দিক থেকেও একেবারে আরব সাগরের গোয়াদর গভীর সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে সংযুক্ত হয়ে গেল। অর্থাৎ এটা দিয়ে চীনা পশ্চিম ভুখন্ডও বন্দরে প্রবেশের যোগ্য বা করিডোর পেয়ে গেল। তাই এটা চীনের কাছে যে সে করিডোর পাওয়া নয়। এটা চীনের কাছে অর্থনৈতিক সামরিক রাজনৈতিক সব অর্থেই যা প্রাপ্তি ঘটল তাতে এটা একা চীনের কাছেই এক স্ট্রাটেজিক প্রাপ্তি ও উপহার – যা অর্জলে চীন যদি বিনা পয়সায় পাকিস্তানে এটা গড়েও দেয় তাতেও তা চীনেরই লাভ – এমন উপহার এটা। কাজেই যারা চীন ঋণ দেয় ফাঁদে ফেলার জন্য, নাকি চুষে খাবার জন্য নাকি কাবুলিওয়ালা সুদী ব্যবসা করার জন্য ইত্যাদি বলে শতভাগ অবাস্তব ও মিথ্যা প্রপাগান্ডা করেছেন তারা এখন অফ যান! নিজ জ্ঞানবুদ্ধিকে এভাবে আর ন্যাংটা করেন না!  এককথায় গোয়াদ্র বা (CPEC) চীনের জন্য স্ট্রাটেজিক প্রকল্প, এক পরে পাওয়া অমুল্য উপহার!

    কিন্তু কেন এটা এত গুরুত্বের?
    সেটাই হল, আমেরিকান খাউজানি – সবকিছুকে অপ্রয়োজনে লাড়াচাড়া দিবার আমেরিকান খাউজানিকে চীন নিজের জন্য আশীর্বাদ হিসাবে হাজির করে নিবার সুযোগ আর আমেরিকার দিক থেকে কাফফারা!  আগেই বলেছি ২০০৮ সালে গায়ে পড়ে আমেরিকা মাল্লাকা প্রণালী আটকানো যায় কিভাবে মানে চীনের একমাত্র সমুদ্রগামি প্রবেশপথে প্রতিবন্ধকতা তৈরির বিরুদ্ধে চীনা পাল্টা জবাব। এতে চৈন পুব দিকের বন্দর তো রাখলোই পশ্চিম দিক দিয়েই সমুদ্রপথে প্রবেশের নয়া রাস্তা খুলে নিল!!
    আর এথেকে পড়ে পাওয়া সুবিধা হল, পাকিস্তানে চীনের এই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ থেকে পাওয়া পাকিস্তানের উপর প্রভাব!

    এখন ল্যু-বাইডেন কী জবাব দিবেন যে এশিয়ায় চীনের প্রভাব ছুটাবেন, চীনা নির্ভরশীলতা নাই করে দিবেন আর এই লক্ষ্য এক ইন্দো প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি খাড়া করে সফল করবেন, চীনকে বের করে দিবেন  বা চীনা প্রভাবমুক্ত এশিয়া বানাবেন? কিভাবে? আপনারা সম্ভবত খেয়ালও করেন নাই পুর্বসুরি ওবামা মালাক্কা প্রণালি নিয়ে হাত ঢুকানোতে তারা নিজেদের কী ক্ষতি করেছেন – (CPEC) কী একটু চেয়ে দেখেন! এসব কিছু মুল্যায়ন করেছেন আগে? মনে হয় না। হলে অন্তত পাকিস্তানে চীনা প্রভাব ছুটানোর কথা স্বপ্নেও উচ্চারণ করতেন না!
    তাই ল্যু এর ততপরতার পরিণতি ব্যক্তিগত জিঘাংসা চরিতার্থ করাতেই পরিণত হবে ছাড়া আর কী?
    ইমরানের বিয়ে ইদ্দতকাল পার হয়ে করা হয়েছে কী না – সেটাই এখন ল্যু মহাশয়ের ভরসা! এটাই কী হবার কথা না! এটা তো ডোনাল্ড ল্যু এর জন্য বিরাট গৌরবের আর বিরাট এচিভমেন্ট! একেবারে পাহাড়সম অর্জন!!  বেচারা প্রগতিশীল, সভ্য, কালচার্ড উচা মুল্যবোধের ডোনাল্ড ল্যু আপনি শেষ পর্ন্নত ইমরানকে ঠেকাতে না পেরেআপনাকে  “ইদ্দতকাল তুলে” সাজার আয়োজন করতে হচ্ছে! বা! বা! আপনার রুচির প্রশংসা করতেই হয়! আপনারই বিজয় ঘটেছে! ল্যু-বাইডেন আপনারাই দেখাইলেন, যে কত্ত ক্ষমতাবান আপনারা!!

    আর আমেরিকার জন্য শিক্ষা এটাই যে, যা পারবেন না অযথা তা লাড়তে যাবেন না!
    যদিও পাকিস্তানে তাদের লাড়াচাড়া শেষ হয় নাই। ইমরানকে সরকার গঠন ঠেকাতে প্রমাণিত চোর নওয়াজ দাবি করছেন যে দল হিসাবে তিনিই জিতেছেন। মানে ইমরান বা পিটিআই জিতলেই তাঁর দলের চেয়ে বেশী আসন পেলেও তো ইমরান তো দল হিসাবে না স্বতন্ত্র হিসাবে জিতেছেন। অথচ ইমরানের দলের প্রতীক কেড়ে নিয়ে কার্যত দল শুণ্য করেছেন নওয়াজের ভাইরা ভাই ল্যু এর সৈনিক পাক-আর্মি!  মানে নওয়াজ মিথ্যা ধারণা ছড়াচ্ছেন যে তাঁর দলই সবচেয়ে বেশী আসন-ধারী! এটা পুরাতাই আইনিভাবে মিথ্যা। কারণ, আইনত আনুষ্ঠানিক সব আসনের ফলাফল ঘোষণার পরের ৭২ ঘন্টা সময় পাওয়া যায়। এসময়ের মধ্যে স্বতন্ত্র বিজয়ীরা কোন দলে যোগ দিতে পারেন নয়তো নতুন দল গঠন করে তাতে যোগ নিতে সুযোগ ও সময় পাবেন!
    আর দ্বিতীয়ত, নওয়াজের প্রধানমন্ত্রী হবার সুযোগ সমানে কমতেছে। কারণ, বিলাওল ভুট্টোকে প্রধানমন্ত্রী করতে রাজি না হল, নওয়াজ-ভুট্টোর কোয়ালিশন সরকার হবে না। অথচ ল্যু এর চামচারা ইতোমধ্যেই প্রপাগান্ডা শুরু করেছে যে নওয়াজ-ভুট্টোর কোয়ালিশন  জোট সরকার হয়েই গেছে  এমনকি কে কোন মন্ত্রী হচ্ছেন। এরই ছাপ দেখছি আমরা প্রথম আলো পর্যন্ত!

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ১২ ফেব্রুয়ারি  ২০২৪, সন্ধ্যা সাতটা ১৮ 

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • বার্মা নিয়ে আমেরিকান বোকা পরিকল্পনায় উলটা, সব নিয়ন্ত্রণ এখন চীনের হাতে উঠার পথে

    বার্মা নিয়ে আমেরিকান বোকা পরিকল্পনায় উলটা,
    এখন সব নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে উঠার পথে
    গৌতম দাস
    ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা ১৭ঃ ৪৮
    https://wp.me/p1sCvy-5mC

     

    China success, Western failure in revolutionary Myanmar

     

     

    বর্তমানের বার্মা নিয়ে বিশেষ করে তার “সীমান্ত যুদ্ধ” নিয়ে অজানা আশঙ্কা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে।  যদিও এটা দুই দেশ বার্রমা ও বাংলাদেশের মধ্যে – “সীমান্তে ঘটা কোন যুদ্ধ”- নয়। বরং একই বার্মার সেনা সরকার আর বিদ্রোহী এথনিক (ethnic) গোষ্ঠির যুদ্ধ। কিন্তু ঘটনাস্থল যেহেতু বাংলাদেশ-বার্মা সীমান্ত আর সেনা সরকারের বাহিনী বলতে তারা কার্যত বার্মার সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিজিপি বা Border Guard Police) ফলে, “বিজিপি বনাম বিদ্রোহী গোষ্টির” যুদ্ধের গোলা কখনও কখনও বাংলাদেশে এসে পড়ছে। আর এটাই সীমান্ত সংলগ্ন বাংলাদেশিদের জনজীবনকে মারাত্মক আতঙ্কিত করছে। এতে এলাকার বাংলাদেশি প্রশাসন বাসিন্দাদের সরিয়ে নিরাপদ দুরত্বে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেটা সঠিক সিদ্ধান্ত।

    বার্মা কী আর, কোথা থেকে এখানে, এর পিছনের পটভুমি নিয়ে কিছু কথাঃ
    বার্মার পিছনের পটভুমির দিক নিয়ে অল্প কথায় বললে, প্রথমত, বার্মা কখনও জনগণের ক্ষমতার উপর দাঁড়ানো অন্তত মুখে বা কনষ্টিটিউশনে লিখে স্বীকার করা অর্থেও কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র করা হয় নাই, ছিল না আর এখনও নয়। রিপাবলিক বলতে বুঝায় যে, ঐদেশের শাসনক্ষমতা (ruler) যখন স্বীকার করে নেয় যে তার ক্ষমতার উতস একমাত্র জনগণ; মানে ঐ দেশের বাসিন্দা-পাবলিকেরা নিজ দেশের শাসকদেরকে একটা শাসন ব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্যে (গণভোটে বা জনপ্রতিনিধিত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে)  রায়-ম্যান্ডেট দিয়েছে। আবার এই শাসকেরা রাজা-বাদশা নয় অথবা রাজা-বাদশার উত্তরাধিকার সুত্র তারা নিজেদের রাজা বলে দাবী করছে না।  এই অর্থে বার্মা কখনই কোন রিপাবলিক নয়। এমনকি দেশের নামেও রিপাবলিক শব্দটা নাই; তাহলে বার্মা কী এর সবই অস্পষ্ট। তাই বার্মার শাসক বলতে আসলে, এখানে মূল ক্ষমতাটা এক ধরণের মিলিটারীদের একটা ক্লাবের হাতে যাদের উপরে কেউ নাই; আর তারাই দেশটাই মালিক ও ক্ষমতাধারী। এভাবেই এটা চলে আসছে অং সান সুচি এর বাবাদের [আমরা যে নামে চিনি এই “সু চি” এর বাবার নাম অং সান (Aung San)] আমল থেকে।
    কেন এরকম? এর মৌলিক কারণ হল বার্মা দেশের বাসিন্দাদের মেন্টর (Mentor) [মানে যাদের চিন্তা অনুসরণে বা প্রভাবিত হয়ে] – বার্মার এই মেন্টর কারা ছিল সেটা বুঝতে হবে আগে। যেমন, আমাদের উপর মেন্টর – প্রভাবক ভুমিকা যদি বৃটিশ কলোনিদখলদার বা ভারতের উপর বৃটিশদের রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা-কে বলি তবে বার্মার মেন্টর হল সেকালের রাজতন্ত্রী জাপান। যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) এশিয়ায় হিটলারের সহযোগী একমাত্র শাসক ছিল জাপান আর সে জাপান তখনও সম্রাট শাসিত ছিল। অর্থাৎ বিশ্বযুদ্ধে দুপক্ষের প্রধান রাষ্ট্রগুলো সকলেই রিপাবলিক হলেও জাপান ছিল এক ব্যতিক্রম – ছিল সম্রাটের সাম্রাজ্য। একারণে, এখনও জাপান রাষ্ট্রের নাম কি – তা খুঁজে দেখলে সেই আনুষ্ঠানিক নামে কোন রিপাবলিক শব্দ নাই। এর বদলে সব জায়গায় ‘ইউনিয়ন’ বলে একটা শব্দ আছে যার আবার সুনির্দিষ্ট অর্থ নাই। অর্থাত পাবলিক বা জনগণের ক্ষমতা বলে বা বুঝায় – এমন কোন ধারণা ইঙ্গিতও নাই।

    বৃটিশেরা ভারতের মতই বার্মা দখল ও কলোনি করেছিল ১৮২৪ সালে। কিন্তু এই দখলি বার্মা-কে তারা ভারতের সাথে মাখিয়েই শাসন করে গেছিল। যেমন দখলি-বার্মা ভুখন্ড যেন ভারতেরই আরেকটা প্রদেশ এভাবেই তারা শাওন শুরু করেছিল। তবে এনিয়ে তরুণ বার্মীজদের মনে চরম অসন্তুষ্টি টের পেয়ে গত ১৯৩৭ সালের এপ্রিলে প্রথম  বৃটিশ-ভারত বর্মাকে ভারত থেকে আলাদা করে বৃটিশদের কলোনি শাসন কায়েম করেছিল। অর্থাৎ এর আগে পর্যন্ত বৃটিশ-ভারতেরই আরেকটা প্রদেশ যেন বার্মা – এভাবেই বৃটিশেরা বার্মা শাসন করে গিয়েছিল।  আর চলমান ব্যাপক এই ক্ষোভে বিক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালয় তরুণদের মধ্যে থেকে নানা ঘটনাবলী শেষে একপর্যায়ে প্রথমে এদের ত্রিশজনকে (যারা বার্মার শাসকদের ভয়ে তখন থাইল্যান্ডে পালিয়ে ছিল) –  এদের জাপানে নিয়ে ট্রেনিং দিয়েছিল জাপানের রাজতন্ত্রী সরকার। এই ত্রিশজনের একজন হলেন সু চির বাবা। কিন্তু তাদের ঐ ট্রেনিংয়ের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা বা খারাপ দিকটা হল, বৃটিশ শাসকের বিরুদ্ধে যারা এই ট্রেনিং দিয়েছিল তারা রাজতন্ত্রী। তাই এই ট্রেনিং কোন রাজনৈতিক ট্রেনিং ছিল না। কোন মনার্কি [monarchy] বা রাজা-বাদশার দেশে রাজনীতি ধারণা বা রাজনৈতিক দল ভোট ইত্যাদি কিছুই থাকে না। রাজার দেশে প্রজারা স্বাধীন ব্যক্তি নয়। প্রজা মানেই তো অধীনস্ত [sub-ordinate] মানেই সে স্বাধীন সত্বা নয়। তাই সমাজে স্বাধীন ব্যক্তি ধারণা ও ব্যক্তি ধারণা উত্থান এর ধারণা আসা খুবই গুরুত্বপুর্ণ! একেবারে পুর্বশর্তের মত জরুরি।   রাজনীতিটাই বাদ দিয়ে সামরিক ট্রেনিং মাত্র; যা মারধর, গোলাগুলি আর টর্চার কিভাবে করতে হয় এসব শিখা সর্বস্ব! অথচ ঐ ত্রিশজন ট্রেইন্ড তরুণই একাল পর্যন্ত বার্মার শাসন ক্ষমতা ও কাঠামো যা হয়েছে সবকিছুর উদগাতা, কিন্তু যারা “রাজনীতি” বলতে কি তা জানে নাই একারণেই পরবর্তিতে এটা আর্মির একটা ক্লাব ছাড়া আর কিছুতে গিয়ে পৌছাতে পারে নাই। এই ত্রিশজনই তাই হয়ে উঠেছিল বার্মার সকল ক্ষমতার উৎস এবং শাসক। এটাই ১৯৪২ সালে বৃটিশ ইন্ডিয়ার সাথে লড়াই করে শাসক বৃটিশদেরকে পরাজিত করে (তবে জাপানের কোলে বসে) নিজেরা বার্মাকে স্বাধীন করেছে বলে ক্রেডিট নিত। ১৯৪৮ সালে ভারতের মত বার্মাও বৃটিশ কলোনি-শাসকেরা ত্যাগ করে চলে যায়। আর শুরু হয় “স্বাধীন বার্মায়” ঐ ত্রিশ জনের শাসন। যারা এরপর মূল দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায় কেউ সামরিক বাহিনীতে কেউ রাজনীতিতে রাজনৈতিক শাসক – এভাবে। এতে শাসন ব্যররথতার জন্য একে অপরকে দায়ী করতে থাকে। যা সমাপ্ত হয়  যখন ১৯৬২ সালের শেষ নির্বাচনের পরে ঐ মিলিটারি অংশটাই জেনারেল নে উইনের নেতৃত্বে সব ক্ষমতা দখল করে বসেছিল। এসবের উত্তরসুরি আজকের ক্ষমতাসীন সামরিক ক্লাব। তবে নে উইন সেকালে নিজেকে সোভিয়েত কমিউনিস্ট ধারার কমিউনিস্ট বলে পরিচয় দিতেন।

    অন্যদিকে, এথনিক (ethnic)-জাত বিভক্তি বার্মাতে মারাত্মক। মূল এথনিক গোষ্টি বর্মীরা [Bamar (68%)] আর বাকিদের মধ্যে আবার তুলনায় সংখ্যায় বড় এমন আরও সাতটা [The eight ‘official’ groups are the Bamar (68%), Chin (2.5%), Kachin (1.5%), Karen (7%), Kayah (1.83%), Mon (2%), Rakhine (4%) and Shan (9%).] – এভাবে এথনিক জাত গোষ্ঠির কথা আলোচিত হয়, এরা এই সাত জনগোষ্ঠি সকলেই বর্মীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহী যোদ্ধা।   মনে রাখতে হবে এতসব জাত-বিভক্তি সত্বেও এর একমাত্র সমাধান হল – কেবল রাজনীতিই পারে সকল এথনিক পক্ষকেই সাথে নিয়ে একটা রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা (রিপাবলিক) কায়েম করে সকলে সমান অধিকার বসবাস করা। কিন্তু  এটাই স্বাধীন বার্মার জন্মের আগে থেকেই অনুপস্থিত। শাসক বর্মী বা বামার-রা বার্মা নাম বদলে মায়ানমার রেখেছিল সাধু সাজতে; কিন্তু তা লোক দেখানি ছিল বলে অন্য এথনিক কেউ আমল করে নাই।
    গত ১৯৮৯ সালে নে উইনের শাসনও ক্ষমতাচ্যুত হয়, ক্ষমতা নেয় সাত-আট বর্মী জেনারেলদের একটা গোষ্ঠি; কিন্তু জাতিসংঘের অবরোধ আরোপে সেই সরকারও দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু সীমান্ত আছে বলে একমাত্র চীনই হয়ে যায় বার্মার সাথে বাকি দুনিয়ার যোগাযোগের মাধ্যম; ইনফরমাল চোরাচালানি টাইপের ‘বাণিজ্য সম্পর্ক’ শুরু হয়েছিল সেই থেকে। পরে ২০০৭ সালে ভারতের কূটবুদ্ধি-পরামর্শে দুতয়ালিতে আমেরিকা-ইউরোপ-পশ্চিমারা চীনের পাশাপাশি তারাও বার্মার মাখন খেতে এগিয়ে আসে। যার দলিল হল ২০০৮ সালের কথিত কনষ্টিটিউশন মানে সামরিক ক্ষমতাকে স্বীকৃতি (উদ্ভট ভাবে, আর্মি প্রতিনিধিরাও সংসদে ২৫% হয়ে বসবে) দিয়ে এক কনষ্টিটিউশন। এছাড়া বাইরে দেখাবে সুচি কে  যেন  তিনি সিভিল-শাসন বলে তারা সাইনবোর্ড হিসাবে রাখবে। ভারতের কূটবুদ্ধি-পরামর্শ এত তীব্র হয়ে উঠেছিল যে জেনারেলেরা এই প্ররোচনায় ইসলামবিদ্বেষী হয়ে রোহিঙ্গাদের ২০১৭ সালে মেরেধরে দেশত্যাগ করতে, বাংলাদেশে যেতে বাধ্য করেছিল। মজার কথা হল, তখন আমেরিকা, চীন, ভারত, ইউ ইত্যাদি কেউই শাসক জেনারেলদেরকে দায়ী বা দোষারোপ করে নাই। সকলেই কথিত এক আরসা (ARSA) বাহিনীকে এদের উপর দোষ চাপিয়েছিল। কারণ, বর্মি জেনারেলেরা ওসব (আমেরিকা, চীন, ভারত, ইউ ইত্যাদি) সকল-বিদেশিকেই নানান ব্যবসা বিতরণ করে দিচ্ছিল। যেটা কেউই হারাতে চায় নাই। ফলে কোন বার্মা এক্ট বা গণতন্ত্র-মানবাধিকারের কথা কারই মনে ছিল না।  কিন্তু সেটাও অচল হয়ে পড়ে ২০২০ সালের নির্বাচনের পরে, আর্মি আবার সব ভেঙ্গে দিয়ে নিজের হাতে সব ক্ষমতা নেয়।

    এবার চলতি ঘটনার দিকেঃ   
    বার্মা নানান কারণে এক অদ্ভুত জায়গা ও পরিস্থিতি। চীন বার্মায় একই সাথে সেনা সরকার এবং বিদ্রোহী এথনিক গোষ্ঠিগুলার সাথে ‘ঘনিষ্ট’ সম্পর্ক রেখে চলতে পারে। সেনা সরকার আপত্তি করে না। এমন খুব কম দেশই পাওয়া যাবে বা নাই। মানে জেনারেলদের এতই চীনকে দরকার যে বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলার অস্ত্রের উৎসও চীন অবলীলায় হতে পারে। তবে এতদিন চীন কোনপক্ষকেই একে-অন্যের উপর চড়াও হয়ে উঠতে দেয় নাই, ভারসাম্য বজায় চলতে বাধ্য করে রাখতে পেরেছিল। এটাই চীনের বর্মীজ সেনা ও বিদ্রোহীদের মধ্যে যেন একটা লাইন টেনে, বিবদমান প্রত্যেকের সীমারেখা বাতলে দিয়ে আর তাতে চীন নিজেই এক ভারসাম্য শাসক হয়ে দুপক্ষের উপর দাঁড়িয়ে থাকা শুরু হয়েছিল।  তবে মোটামুটি গত (২০২৩) ডিসেম্বরকে টার্গেট করে চীন এই ভারসাম্যটা ভেঙ্গে জেনারেলকে নিচে বা কোনঠসা করে বিদ্রোহীদেরকে চড়াও হয়ে উঠতে এলাও করেছে। কিন্তু সেটা কেন?

    আমেরিকার বার্মা এক্টঃ
    চীনের এমন আগের ভারসাম্য কিছুটা ভেঙ্গে আবার নয়াভিত্তিতে আরেক ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে ততপর হবার পিছনের কারণ আমেরিকার কথিত বার্মা এক্ট।  বাইডেনের আমেরিকার সমস্যা হল, মুরোদ থাক আর নাই থাক সবকিছু আগেই লেড়েচেড়ে আউলা করে দিতে হবে – এই নীতিরই এক ফসল হল বার্মা এক্ট। যতদুর আন্দাজ করা যায় মোটা দাগে এতে আমেরিকান পরিকল্পনাটা হল, বার্মায় দখল দেয়া মানে জেনারেলদের পতন ঘটিয়ে যেন সামরিক ক্যু হয়েছে এমনভাবে পছন্দের জেনারেল বসিয়ে তা করা। আর এর সাফাই হিসাবে বার্মায় গণতন্ত্র-ও-মানবাধিকার আনবেন বাইডেন, এর নামই বার্মা এক্ট!  ব্যাপারটা সামরিক আবার আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে আমেরিকা নিজ মেরিন বার্মার মাটিতে নামাবে না, কেবল এরিয়াল (arial) কভার মানে আকাশপথে কাউকে উড়তেই দিবে না – যাতে বার্মার কোন উড়োজাহাজই মাটি ছেড়ে ডানা না মেলতে পারে। আর বাংলাদেশের পদাতিক ব্যবহার করবে আমেরিকান মেরিনের জায়গায়।  আবার বাংলাদেশের পদাতিক মুভ করাতে চাইলে আগে আমাদের  সরকারের উপর দখল লাগবে। তাইবাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নামে বিরোধিরা বিজয়ী হতে পারলে এর সুবিধার উপর ভর করে তাতে “বাইরের” সুবিধাটা (মানে যেমন বার্মা দখল) আমেরিকা পেত। কিন্তু আগেই বলেছি আমেরিকান মুরোদের খবর নাই! তাই সবকিছু লেড়েচেড়ে আউলিয়ে সবাইকে পথে নামিয়ে ভন্ডুল করে – পুরানা সব ভারসাম্য নষ্ট করে এখন বাইডেন পলাইছে শুধু না। হাসিনাকে ‘ব্যক্তিগত’ চিঠি লিখতেছে।

    যদিও বিষয়গুলো এত সহজ নয়। পুরানা ভারসাম্য ভাঙ্গার একটা খেসারত তো থাকবেই। মোটামুটি গত ডিসেম্বর ছিল বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা – অন্তত চীনের ক্যালকুলেশন এটাই ছিল। এভাবে মার্ক করে চীনও আমেরিকান বার্মা এক্টকে মোকাবিলার নিজ পরিকল্পনা সাজাইয়েছিল। অর্থাৎ চীনের দিক থেকেও ডিসেম্বর ছিল টার্গেট; তবে তা ঠিক বাংলাদেশ নিয়ে নয় ভিন্ন অর্থে মানে, বার্মাকে নিয়ে। এইযা ভিন্নতা!

    বার্মায় কী ঘটছে এর একটা সোর্স এশিয়া টাইমসঃ
    এশিয়ান টাইমস এটা হংকং থেকে প্রকাশিত একটা সমৃদ্ধ ওয়েব ম্যাগাজিন। এটাকে এটাকে সম্ভবত এশিয়ার “ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল” বললে অত্যক্তু হবে না। অর্থাৎ নিউইয়র্কের আদি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল যেমন বাবা গ্লোবাল পুঁজি বাজার যদি ধরি তবে চীন -কেন্দ্রিক নয়া এশিয়ান পুঁজি বাজার তৈরি হয়েছে হংকং-সিঙ্গাপুর কেন্দ্রিক; আর এসবকে কেন্দ্র করে জর্নাল-টা হল এশিয়ান টাইমস। যার আবার ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস বলে আলাদা পত্রিকা হয়েছে, সাথে আরো একটা। প্রায় আটজনের একটা গ্রুপ যাদের ওয়াল স্ট্রিটে মিডিয়ায় কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তারাই মূলক এই পত্রিকাটা চালায়। এদের উপর ভর করে আবার একদল পলিটিক্যাল এনালিস্ট গড়ে উঠেছে বার্মাসহ আশিয়ান জোট এলাকার রাজনৈতিক ঘটনাবলীতে কাজ করা যাদের এলাকা। এদের একজন হল ডেভিড স্কট ম্যাথুসন [DAVID SCOTT MATHIESON]; যিনি নিজের পরিচয় লেখেন – an independent analyst working on conflict, humanitarian and human rights issues – এভাবে। এসব ততপরতা গুলোকে বলা যায় গ্লোবাল নেতা আমেরিকা-পরবর্তিতে এশিয়ায় কী হতে যাচ্ছে এরই রিপোর্টার এনাস্লিস্ট হচ্ছেন এরা।
    সেই ডেভিড স্কট বর্তমান বার্মার পরিস্থিতি নিয়ে নিএই দুখানা এনালাইটিক্যাল রিপোর্ট ছেপেছেন। আর একই সাথে নিউইয়র্ক টাইমসে ছাপা হওয়া একটা রিপোর্টের রেফারেন্স দিয়েছেন যেটা আসলে আমেরিকান প্ররোচনায় বিদেশে গঠন করা জান্তাবিরোধী সু চির সরকার এর করুন হাল নিয়ে লেখা রিপোর্ট। আনুষ্ঠানিকভাবে সু চুদের সরকারকে আমেরিকার নিজের মত করে সাজিয়ে নেয়া National Unity Government of Myanmar বা সংক্ষেপে NUG বলে ডাকা হয়।  যাদের অবস্থা হল বাংলাদেশে এখনকার বাংলাদেশি বিরোধীদলের মত যারা হাসিনা পতন বা নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েও পুরানা গান-ই গাইছে। এই অবস্থাকে বুঝাতে ইংরাজিতে শব্দটা হল এবানডান (abandon) বা পরিত্যক্ত বলতে যা বুঝায়! তো বাইডেনের আমেরিকান পরিত্যক্ত আমাদের বিরোধীদলের মতই, সু চিদের NUG সরকারের অবস্থা। নিউইয়র্ক টাইমসে ছাপা হওয়া সেই করুণ রিপোর্টও দেখতে পারেন এখানে।  এদেরকেই বাইডেন তার বার্মা এক্টের খোরাক বা কথিত হবু সরকার বানাতে চেয়েছিল, আর তাদের অবস্থা আমাদের বিরোধীদলের মত!!!

    বার্মা এক্টকে মোকাবিলার চীনা নিজ পরিকল্পনাঃ
    চীনের দিক থেকে নিজ পাল্টা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আমেরিকার নিজেরটার চেয়ে তুলনামূলক অনেক সহজ ছিল। এর মূল কারণ, আগে দীর্ঘদিন থেকেই  বর্মার সেনা সরকার আর বিদ্রোহী – এভাবে দুপক্ষের উপরই চীনা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই ছিল। মানে যদি বার্মার ভিতরের তিনটা পক্ষ আছে ধরলে, এর একটা হল জেনারেলদের জান্তা সেনা সরকার; দুই হল, সাত-আটটা এথনিক-জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্টি যারা আবার এখন চীনের প্ররোচনায় ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স নামে একত্রিত হয়েছে। নয়া পরিস্থিতিতেও জেনারেলেরা আর ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স দুইটাই এখনো চীনের নিয়ন্ত্রণে। আর তৃতীয় পক্ষটা হচ্ছে কেবল আমেরিকার নিয়ন্ত্রণের সু চিদের NUG। যেটারই এখন পরিত্যক্ত অবস্থা!
    আর  এবারের চীনা পরিকল্পনা ছিল জেনারেলদের হাতটা ধরেই রাখা কিন্তু এবার একটু ঢিলা করে ধরা যাতে বিদ্রোহীরা একটু আপার হ্যান্ড পায়। এতে যদিও আগের ভারসাম্য মানে জেনারেল আর বিদ্রোহীরা আগে প্রত্যেকে যে সীমারেখার মেনে চলার মধ্যে দিয়ে ভারসাম্য তৈরি করে বসবাস করছিল  – সেটাই এখন চীন ভেঙ্গে দিতে চাচ্ছে। আর তা দিলে চীনের স্বার্থের এতে কোন ক্ষতি হবে না কেন? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজব। মানে জেনারেলেরা এতে বিগড়ে গিয়ে চীনবিরোধী হয়ে যায় যদি? চাইকি আমেরিকার হাত ধরে ফেলে যদি?

    জবাব হল, চীন জানতে এমন দুটাই অসম্ভব। কারণ জেনারেলদের চীনবিরোধী হওয়া মানে কি ভারত? নাকি রাশিয়া বা খোদ আমেরিকার হাতধরা? না, এমন প্রত্যেকটাই বাস্তবে অসম্ভব।  চীনবিরোধী হয়ে রাশিয়া একচুলও অন্যদিকে যাবে না। আর আমেরিকা? আগেই বলেছি বাইডেনের যতই “বার্মা এক্ট” থাকুক বা সু চিদের NUG  থাকুক এই আমেরিকা তো এখন বাংলাদেশ ছেড়েই ভেগে গেছে কাজেই – মানে বাংলাদেশ থেকে সামরিক সহায়তা পাবার বাস্তবতাই আউলায়ে গেছে – আর এতে আমেরিকা তার বার্মা এক্টও এখন কিছু ছেড়া কাগজ মাত্র- মুরোদহীন। আর এতদিন আমেরিকা তো এই জেনারেলদের বিরুদ্ধেই হম্বিতম্বি করে গেছিল। ফলে সেই জেনারেলেরা এখন চীনের উপর ক্ষেপে গিয়ে বাইডেনের হাত ধরার কোন বাস্তবতাই নাই। আবার আমেরিকা বার্মার ঠিক কার হাত ধরার কথা ভেবেছিল জেনারেলেরা নাকি সু চিদের NUG দের??? অবশ্যই সেটা সু চিদের NUG। মানে জেনারেলদের ভাগ্যে আমেরিকান দীয়া-আশীর্বাদের কোন সুযোগই ছিল নাই, ছিলই না।  আর এখন তো বাইডেন নিজেই পরিত্যক্ত।  আর ওদিকে ভারতও এসবের ভিতর উল্লেখ-অযোগ্য। কারণ এর না আছে অর্থনৈতিক বা সামরিক সক্ষমতা। পারে কেবল কূটকাচালি বা প্যাচ-লাগানি। যেটাও এখানে সম্ভব না; যদিও ভারতের হম্বিতম্বি আছে সেকথায় শেষে যাবো! তবে সেটাও কারও ঘাড়ে চড়ে করতে চাইবে ভারত আর এটাই সম্হভবত হাসিনা সরকার!! আর মনে রাখতে হবে আমেরিকান বার্মা এক্ট পরিকল্পনা তো ভারতেরও স্বার্থবিরোধী করে সাজানো ছিল।
    কাজেই চীনের দিক থেকে জেনারেলদের হাত হাল্কা করে ধরার এটাই ছিল পারফেক্ট টাইম। কারণ তারা তবু চীনকে ছেড়ে কোথাও যাবার জায়গা নাই। সেজন্যই শুরুতেই যেটা বলেছি, বার্মীজ সেনা সরকারের উপর বিদ্রোহীদের চড়াও হতে দেওয়াটা আসলে চীনা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। যার দুচারটা গোলা বাংলাদেশে এসে পড়ছে। চীনা পরিকল্পনায় বাংলাদেশে সম্ভাব্য সরকার বদলের সময়কাল ছিল ডিসেম্বর-কেন্দ্রিক। তাই জেনারেলদের উপর বিদ্রোহীদের সওয়ার হওয়ার টাইমিং-টা ছিল সে-মোতাবেক !
    তাই বার্মা এক্ট সফল করতে হাসিনাকে সরাতে আমেরিকার এগিয়ে আসার আগেই সেক্ষেত্রে বাইডেন দেখত বার্মা বিদ্রোহীদের ক্ষমতায় কিন্তু জেনারেলরাই নাই, উধাও! কিন্তু এখন বাইডেনের পলায়ন ঘটে যাওয়াতে এতে নিট কিছু লাভ হতে পারে জেনারেলদের। তারা আয়ু পাবে। কিন্তু আরও অনেক পরে।

    এবার আবার ডেভিড স্কটের রিপোর্ট থেকে এনিয়ে তার বক্তব্য তুলে আনব।
    তিনি বলছেন, একটা ভুল আশা ছড়িয়ে পড়েছিল যে থাইল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনের মতো মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র। পুরা বক্তব্যটাই নিচে কোট করে দিয়েছে। ডেভিড স্কটের রিপোর্ট এর মূল লেখাটার শিরোনাম হল, China success, Western failure in revolutionary Myanmar এখানে। যার বাংলা অনুবাদ ছেপেছিল প্রথম আলো। আমি সেই অনুবাদের লিঙ্ক হল এখানে।

    মিয়ানমারের ক্ষেত্রে চীন আন্তর্জাতিক পরিসরের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়। মিয়ানমারের ওপর চীনের প্রভাবকে স্পষ্টভাবে আলাদা করা
    যায়। তিন বছর ধরে একটি চিৎকারই প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে যে মিয়ানমারের প্রতিরোধ আন্দোলনে বাইরে থেকে অস্ত্র দরকার। একটা ভুল আশা ছড়িয়ে
     পড়েছিল যে থাইল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনের মতো মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মিয়ানমারের প্রতিরোধযোদ্ধাদের
    নীরবে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে চীন। থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের ওপর চীনের কৌশলগত সমর্থন না থাকলে অপারেশন ১০২৭ সম্ভবপর হতো না।

    আর ডেভিড স্কটের শিরোনামেই প্রায় সবকথা বলা আছে। লিখছেন চায়না সাকসেস আর ওয়েস্টার্ণ ফেইলিওর। মনে রাখতে হবে ডেভিডেরা সুইডেন, সুইজারল্যান্ড বা নরওয়ের শান্তি নিয়ে কাজ করা গ্রুপের সাথে সম্পর্কিত। তবে ডেভিডের সবচেয়ে মারাত্মক কথা যে –  “একটা ভুল আশা ছড়িয়ে পড়েছিল যে থাইল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনের মতো মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র”। আর এটাই বাংলাদেশের এখনকার বিরোধী দলেরও সেই একই অবস্থা! ডেভিড আরো লিখছেন, “কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মিয়ানমারের প্রতিরোধযোদ্ধাদের  নীরবে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে চীন। থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের ওপর চীনের কৌশলগত সমর্থন না থাকলে অপারেশন ১০২৭ সম্ভবপর হতো না”।
    এই হচ্ছে ডেভিট স্কটের তথ্য ও ব্যাখ্যা। আর ঐ অপারেশন ১০২৭ হচ্ছে সেনা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সম্মিলিত অপারেশনের কোন নাম – যেটা চীন সমর্থিত।

    আমেরিকার বোকা পরিকল্পনায় এখন উলটা, সব নিয়ন্ত্রণ এখন একা চীনের হাতেঃ
    কথা ঠিক, পরিশেষে পুরা পরিস্থিতির সবটাই চীনা নিয়ন্ত্রণে।  বার্মার তিনপক্ষের সু চিরা বাইডেন হাতছেড়ে দেওয়ায় পত্রিত্যক্ত! আর বাকি দুপক্ষ মানে জেনারেলেরা আর বিদ্রোহিদের মধ্যে থে বর্তমানে চীন বিদ্রোহীদেরকে আপার হ্যান্ডে বসিয়ে রেখেছে।   কিন্তু আমি মনে করি না চীন বার্মা বিদ্রোহীদেরকে জেনারেলদের উপরে বসায় দিবে – জিতিয়ে বা জিততে দিবে। এর চেয়ে চীন বরং আবার জেনারেল আর বিদ্রোহীদের মধ্যে মানে উভয়ের ক্ষমতা ও এক্তিয়ার প্রসঙ্গে আবার নয়া এক ভারসাম্য ব্যবস্থা তৈরি করে দিবে। চীন যদি বুদ্ধিমান হয় তো এটাই করবে। তবে এটা অবশ্যই নয়া আরেক ভারসাম্যে – মানে পুরান হিসাবে নয়। এতে অনেক কিছুতেই বিদ্রোহিরা এবার আপার হ্যান্ড পাবে। আর এসবের মূল নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে আরও সবল হবে। রোহিঙ্গারা ফিরবে কিনা সে ইস্যুতে চীন এখন এককভাবে নির্ধারক হবে। অর্থাৎ মুল কথা – বার্মার যে এথনিক জাতিহগত সংঘাত এটা মিটানোর মত রাজনীতির হদিস বা রাজনৈতিক জ্ঞান বা বুঝাবুঝি এখনও বার্মার কোন কোণাতেই নাই।  চীনেরও জানা নাই। কারণ সমাধানটা হল ফেডারেলিজম (Federalism)। অনেকে আমেরিকান ফেডারেলিজম বললে বুঝে। আর এটা আমেরিকার বাইরে – মানে ইউরোপেরই কোথাও নাই। আর সবচেয়ে বড় কথা এটা হল – জাতিবাদ বা কমিউনিস্টদের জাতীয়তাবাদের বিপরীত ধারণা। অর্থাৎ জাতিবাদি লড়াই (এথনিক বিবাদ) অনেক দেশের মত বার্মারও এখন প্রধান শত্রু! 

    আর সব হারানি ভারত এসবের ফয়দা খেতে এখন হাসিনার মাধ্যমে – অন্তত বর্মা ইস্যুতে তাকে চীনবিরোধী অবস্থানে জায়গা করতেই হবে মনে করছে। এককথায়, বর্মা সীমান্তে বিশৃঙ্খলা সাময়িক হলেও ভারতেরও স্বপ্নে পোলাও খাবার মত  এক আশা তৈরি হয়েছে  যে, হাসিনা সরকারের কাঁধে চড়ে ভারতের বার্মা দখলের মুরোদ না থাকলেও একটা শেয়ার নিতে চায়। ভারত আবার প্রবল একটা আশাও খাড়া করেছে যে একাজে আমেরিকার তাদের পিছনে দাঁড়াবে। ভারতের এই অবাস্তব আশা – উচ্চাশা এটাই এখন হাসিনা সরকারকে বেচাইন করে তুলছে!  এসবের কারণে, সরকার এতে ততটাই চীন থেকে দূরে না চাইলেও হয়ে পড়ছে। সরকার সতর্ক না হলে ভুল পদক্ষেপ দিয়ে ফেললে তাতে শুধু সরকার না পুরা বাংলাদেশই – সরকারের ভারতপ্রীতিতে বা চাপে পড়ে – বিরাট বিপর্যয় ডেকে আনবে! যদিও সবকিছুই এখনও – প্রাইমারি অভিমুখ কোনটা নিবে  – সেই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে – কিন্তু লক্ষণগুলো খুবই খারাপ ঝোঁকের! এক ব্যাপক  দেশি-বিদেশি নয়া পোলারাইজেশনও ঘটাবার চেষ্টা শুরু হয়েছে। তা কতদুত সফল হবে এখনই জানি না। যদিও একারণে, ব্যাপক উঁকিঝুঁকি মারা শুরু হয়েছে!

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ১১ ফেব্রুয়ারি  ২০২৪, ভোর চারটা দশ মিনিট

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • হাসিনা কি ভারতের চাপে ভুল পথ ধরতে আগাচ্ছেন

    হাসিনা কি ভারতের চাপে ভুল পথ ধরতে আগাচ্ছেন
    গৌতম দাস
    ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪  সন্ধ্যা ১৮ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-5la

     

     

    হাসিনা সম্ভবত  ভুল করতেছেন। ভুল পথে ধরতে যাচ্ছেন।  আর এতে চীনের থেকে “বাজেট সহায়তা” বলে নগদ ডলারে, প্রায় দুই ডিজিটের ঋণ আনা বোধহয় তাঁর হাত ছুটে যাবে! আর তাতে সব মিলিয়ে মানে কি দাঁড়াবে? বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে ভাঙ্গা অর্থনীতি! যা ক্রমশ আমাদেরকে দুর্ভিক্ষদের দিকে নিবে? আর আমরা তা দাঁড়ায় দাঁড়ায় দেখব?

    কেন বলছি একথা?
    এটা আর লুকানোর কিছু না যে সরকারের অর্থনৈতিক সংকট কাঁধে নিয়ে হাসিনার একটা খেলনা নির্বাচন শেষে নিজেকে তাতে বিজয়ী-প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা কললেন বটে কিন্তু তাতে করে তার ক্ষমতায় খাড়ায় যাবার চেয়েও আরো বড় ও মারাত্মক সঙ্কট হল ‘অর্থনৈতিক’  – সেটাই এখন সরকারকে জাপটে চেপে ধরেছে! গত মাসে নয়া সরকার গঠনের পর থেকেই ঢাকার চীনা রাষ্ট্রদুত প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন মন্ত্রীর অফিসে গিয়ে সাক্ষাতের রিপোর্ট  হচ্ছে মিডিয়ায়। আর এসব রিপোর্টে কেন চীনের এসব সাক্ষাত হচ্ছে বা ইস্যু কি; তা নিয়ে আমাদের জল্পনা কল্পনাও করতে হচ্ছে না। যেমন চীনা রাষ্ট্রদুত ইয়াও ওয়েন এর সাথে নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ এর যে প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাত হয়েছে এনিয়ে হাতের কাছে দুটা রিপোর্ট দেখছি। বিবিসি বাংলার বেলায় শিরোনাম, “বাংলাদেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন ‘পাশে থাকবে’ কীভাবে?” –  আর বণিকবার্তায় শিরোনাম, বাংলাদেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে পাশে থাকবে চীন— রাষ্ট্রদূত” – মানে দুটাই প্রায় একই ভাষার শিরোনাম।

    “ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন গত বেশ কয়েকমাস যাবত বলে আসছেন যে বাংলাদেশ
    রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন পাশে দাঁড়াবে। কয়েকদিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সাথে বৈঠকের
    পর চীনের রাষ্ট্রদূত আবারো একই কথা বলছেন,
    যেটি সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট হয়েছে।” – বিবিসি

    অর্থাৎ আমাদের জল্পনা-কল্পনার কিছু নাই, কারণ ব্যাপারটা খোলাখুলি-ই যে বাংলাদেশের কঠিন রিজার্ভ সংকট বর্তমান। আর এতে সহায়তা দিতে চীন আগ্রহী বা রাজিও আছে। এরই ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে।  এছাড়া বিবিসি দুজন মন্তব্যকারীকেও নিয়ে এসেছে সংকট নিয়ে তাদের মতামত দিবার জন্য। একজন হলেন সিপিডির কর্তা দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। আর অন্যজন ডঃ জাহিদ হোসেন যিনি নিজ কেরিয়ার গড়তে সেই আশির দশকের শেষ থেকেই বিশ্বব্যাংক ওয়াশিংটনের এর সাথে কাটিয়ে শেষটা বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের চীফ ইকোনোমিস্ট হিসাবে শেষ করেছেন। এরপর আনুষ্ঠানিক অবসর নিলেও কনসালটেন্ট হিসাবে বিশ্বব্যাংক ঢাকার এক্সটারনাল বা ছুটাকাজ-সম্পর্কে জড়িত ও অভিজ্ঞ মতামত দিয়ে থাকেন।

    দেবপ্রিয় সম্পর্কেও আরেকটু বিস্তারে পরিচয় বলা দরকার। এককথায়, দেবপ্রিয় এখন শুধু সিপিডির কর্তাব্যক্তি শুধু তাই নয়, তিনি প্রায় যেন ভারতের মুখপাত্র হয়েছেন। যদিও বলা হয় সিপিডির জন্ম ১৯৯৩ সালে কিন্তু এটা প্রথম লাইম-লাইটে  এসেছিল ২০০৪ সালে। তাও আবার পরের ১/১১ এর ক্ষমতাদখলের পক্ষে প্রস্তুতিমূলক কাজ ২০০৪ সাল থেকেই শুরু হয়েছিল বলে। কিন্তু সার অর্থে সেটা ছিল আসলে ভারতের স্বার্থের পক্ষে ‘কনসালটেন্সি’ এবং তা খোলাখুলি। বিশেষত বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের নর্থ-ইস্টকে বিনা পয়সায় সব ধরণের করিডোর দেয়ার ওকালতি। এমনকি যারা সিপিডির এই দালালি ব্যবসার সাথে একমত নয় তারা সবই নাকি “অশিক্ষিত” এমন মন্তব্যও করেছিলেন রেহমান সোবহান।

    এটুকুই নয়, একেবারে সাম্প্রতিককালে দেবপ্রিয় একেবারে রানা দাসগুপ্তের সাথে পাল্লা দিয়ে তবে একসঙ্গে বাংলাদেশের প্রো-ইন্ডিয়ান প্রধান হিন্দু লিডার হতেও আপত্তি করছেন না। দেবপ্রিয়ের মুল পেশা “উন্নয়ন কনসালটেন্সি” কিন্তু একালে তিনি (সাথে সিপিডির বস রেহমান সোবহানও)  এই পরিচয় ছাপিয়ে ভারত-সমর্থিত হিন্দু নেতা হতে দ্বিধা করছেন না। কোন প্রফেশনাল মানুষের এমন কাজ ও নিচা মানের কমবিনেশন  (কনসাল্টেন্সি আর প্রো-ইন্ডিয়ান প্রধান হিন্দু লিডার একত্রে) আমরা আগে দেখি নাই। কিন্তু এমন কেন? কারণ, দেখতে দেবপ্রিয়র এটা দুটা পেশা-ততপরতা হলেও এদের মিলটা হল দুইটাই ভারতের স্বার্থ আর তিনি বাংলাদেশে থেকেও সেই স্বার্থের প্রতিনিধি।

    মুল ও গুরুতর প্রসঙ্গ হল বাংলাদেশ রিজার্ভঃ
    উপরে দেখলাম আমরা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা বা রিজার্ভের মারাত্মক সংকট আছে, তা এখন সরকারিভাবেও স্বীকৃত। তা চীনা রাষ্ট্রদুত আর নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে প্রথম আলাপেই আলোচিত ও রিপোর্টেড। আর এই সংকট মিটাতে চীন সবচেয়ে সম্ভাব্য এক মুশকিল আহসান বটে! কিন্তু এক বড় কিন্তু আছে।  সেটা হল, চীন কেন বাংলাদেশকে বৈদেশিক মুদ্রা দিবে?

    এছাড়া এখানেও আবার সব পরিসরেই আরেকটা ভুল বুঝাবুঝি আছে সেটা হল – রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন ‘পাশে থাকবে’ ; এই রিজার্ভ সংকট মানে ঠিক আসলে কি? বাংলাদেশের হাতে বা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঞ্চয় বা মজুদে ‘যথেষ্ট’ নগদ ডলার নাই। আর এটা কমপক্ষে গত দুবছরের ফেনোমেনা।  বলা যায় ২০২২ সালের আগষ্টে তেলের দাম ৫১% বাড়ানোর সময়কাল থেকেই রিজার্ভ সংকট মারাত্মক হয়ে উঠেছিল যা এখন সম্ভবত চরমকাল পার করছে।
    কিন্তু যে “রিজার্ভ সংকট” শব্দে এটা বলা হচ্ছে সেটা কি চীন যে ২০১৬ সাল থেকে ঢেলে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প দিয়েছে সেসব প্রকল্পের বৈদেশিক মুদ্রা ছাড় দেয়া ত্বরান্বিত করা অথবা নতুন করে চীন বাংলাদেশকে আরো বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে কি??
    এর সরাসরি জবাব হল  -‘না’ সেটা না। আসলে বলা হচ্ছে ১. চীনের বাংলাদেশকে নগদ ডলার এবং ২. তা বড় পরিমাণ (ধরা যাক দশ বিলিয়নের মত) নগদ ডলার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সাথে চালু চীনা উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থছাড়ের কথা অবশ্যই আছে। কিন্তু সেটা এখানে গৌণ ও ভিন্ন বিষয়! চীনের আমাদেরকে নতুন করে নগদ ডলার ঋণ দেয়া আর  চীনা উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থছাড় – এদুইটা একই জিনিষ একেবারেই না। আর এখানেই এদুটাকে মাখামাখি করে অনেকের মধ্যেই বুঝাবুঝিতে জট পাকানো ধারণা আছে।
    বাংলাদেশের রিজার্ভের দিক থেকে দেখলে একটা ২০ বিলিয়ন ডলারের চীনাসহ যে কারো কোন উন্নয়ন প্রকল্প শুনতে অনেক বড় মনে হলেও প্রতিবছর এর  অর্থছাড় বড় জোর মাত্র এক বিলিয়ন ডলার হবে। কারণ প্রকল্প যত বড়ই হোক পুরা প্রকল্পের অর্থ (বৈদেশিক মুদ্রা) তো শুরুতে বা একবারেই বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়া হয় না। বরং প্রকল্প যতটুকু বাস্তবায়ন হয় ততটুকুই অর্থছাড় ঘটে। এছাড়া প্রতিবছরের অর্থছাড়ের সব অর্থ দিয়েই তো যা কেনা হয় এর সবকিছুই বাংলাদেশি পণ্য বা শ্রম নয়। অর্থাৎ বিদেশি পণ্য কেনা মানেই সেই অর্থ (বৈদেশিক মুদ্রা) আবার বিদেশেই চলে যাবেই। তাই সারকথায়, উন্নয়ন প্রকল্পের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে্র মধ্যে ধরে রাখা খুবই কঠিন। কারণ, অর্থছাড় ব্যাপারটা আসলে ধীরগতির কাজ-বাস্তবায়ের হারের উপর নির্ভরশীল বা সম্পর্কিত; এছাড়া অর্থছাড় হলেও তা দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য বা শ্রম কেনা হবে যতটুকু কেবল ততটুকু বৈদেশিক মুদ্রাই বাংলাদেশের রিজার্ভে থেকে যাবে। একারণে আমাদের রিজার্ভ সংকট – এটা যত বড়ই বিদেশি উন্নয়ন প্রকল্প নেই না কেন – এটা মিটবে না।

     আমাদের দরকার নগদ ডলারঃ
    অর্থাৎ আমাদের রিজার্ভ সংকট মিটাতে গেলে আরো বড় বড় নতুন বা পুরানো প্রকল্পের দ্রুত অর্থছাড় দিয়েও মিটবে না। তাই আমাদের রিজার্ভ সংকট মিটানোর চাহিদাকে পরিস্কার করতে বুঝাতে বলা হবে নগদ ডলার (বৈদেশিক মুদ্রা) লাগবে। আর এটা অবশ্যই উন্নয়ন প্রকল্প ঋণ একেবারেই নয় – এভাবেই বুঝতে হবে।

    কিন্তু কি নামে দেশে সাধারণত এসে থাকে নগদ ডলার?
    এককথায় জবাব – বাজেট সহায়তা নামে এসে থাকে। এটাই এর টেকনিক্যাল বা খাতওয়ারি নাম! মানে সরকারের বাৎসরিক বাজেটের বৈদেশিক মুদ্রা অংশের দায় মিটাতেই কেবল সরকার এই নগদ ডলার ব্যবহার করতে পারবে।  এজন্য অনেকে এটাকে “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের দায়” মিটানোও জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রাও বলে থাকে। তবে মূল কথাটা হল, এটা প্রকল্প ঋণ সহায়তা নয়। আমরা যেন দুটা ধারণাকে মাখায় না ফেলি।
    ব্যাপারটা আমরা দেখছি একমাত্র স্পষ্ট করে ধরতে পেরেছেন ও ব্যাখ্যা করেছেন ডঃ জাহিদ হোসেন,  ঢাকা বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ।

    “চীন তো বলেনি যে বিনিয়োগে সমস্যা হলে, তারা বাংলাদেশের পাশে থাকবে। তারা বলেছে, রিজার্ভের সমস্যা হলে পাশে থাকবে।
    তার মানে তোমার ক্যাশ নাই, আমরা তোমাকে ক্যাশ দেব। এটাই তো মিন (বোঝানোর) করার কথা।”
    জাহিদ হোসেন মনে করেন, তিনভাবে এই সহায়তা বা পাশে থাকার বিষয়টি হতে পারে। … বাজেট সহায়তা কিংবা ব্যালেন্স
    অব পেমেন্ট সহায়তা হতে পারে।” – বিবিসি

    কিন্তু কোন দাতাদেশই নগদ ডলার বা বাজেট সহায়তা দিতে চায় নাঃ
    কেন? কারণ, ২০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন প্রকল্প দেয়া তুলনায় সহজ; অথচ ৫-৭ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা দেয়া কঠিন। দাতা দিতে চায় না।  তুলনা করে বললে, ৫-৭ বিলিয়ন ডলারের কোন উন্নয়ন প্রকল্পের সব অর্থ যদি দাতা একবারেই একাউন্ট ট্রান্সফার করে দেয় তবে সেটাই তখন কার্যত বাজেট সহায়তা হয়ে যায়। এতে তাহলে সরকার কাজ বাস্তবায়ন অনুযায়ী বছরে মাত্র কয়েক মিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে পারে আর বাকি ডলার আমদানি ব্যয়-সহ এমন সব কাজেই ব্যবহার করতে পারবে। একারণে, বাজেট সহায়তা ঋণ কোন সীমার বাইরে খরচ-ব্যবহার করা যাবে না তা কড়াভাবে বলা বা শর্তে বলা থাকে। এই অর্থে বাজেট সহায়তা হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্প ঋণের চেয়েও অনেক বাড়তি সুবিধা ঋণ গ্রহিতা পাবে বা তাকে দেয়া হয় এমন এক ঋণ। এক স্পেশাল ঋণ, যার মোবিলিটি বা ব্যাবহারযোগ্যতা ঋণ গ্রহিদার জন্য বহুগুণ!

    তাহলে কোন দাতা দেশ এমন বহুল সুবিধা সম্পন্ন ‘বাজেট সহায়তা’ ঋণ কখন ও কেন দিতে রাজি হবেঃ
    এককথায় জবার, দাতাও যখন বিনিময়ে অন্য অনেক সুবিধা পাবে! যেমন বাংলাদেশে চীন ‘বাজেট সহায়তা’ ঋণ দিবে তখন যখন সে বিনিময়ে বিশেষ স্ট্রাটেজিক সুবিধা পাবে; এমন হতে পারে !  এককথায় বিশেষ সুবিধার ঋণ তাই দাতাও এথেকে বিনিময়ে তার বিশেষ সুবিধা আদায় করতে বা পেতে চাইবেই।  সম্প্রতি শেয়ার বিজ পত্রিকা ভারতের ঋণ প্রসঙ্গে একটা রিপোর্টের শিরোনাম হল, “পাইপলাইনে আটকে আছে ৮০ শতাংশ ঋণ” । তাও আবার সেটা ১৩ বছর ধরে। এছাড়া এসব ঋণের ৭৫% পণ্য বা শ্রম ক্রয় ভারত থেকে হতে হবে এমন শর্ত দেয়া। এমনিতেই ভারতের এসব প্রকল্প মানেই হল যা বাস্তবায়ন হলে সুবিধা কেবল ভারত পাবে – এমন! মানে বাংলাদেশ থেকে কড়িডোরের সুবিধা নিবে ভারত তাও বিনা পয়সায় আর সেজন্য যে রাস্তাঘাট ব্যবহার ভারত করবে – বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঐ রাস্তাঘাট নির্মাণের খরচ মানে ঋণ গ্রহণ ও সুদ পরিশোধ করবে বাংলাদেশ। এই হল ভারতীয় স্টাইল! যেমন ভারত কলকাতা-ত্রিপুরা রোড বা ট্রেন চলাচলের সুবিধা নিবে; ভারত পদ্মা সেতু ব্যবহার করবে আর সেতুর চীনা-ঋণ নেয়া ও পরিশোধের দায় বাংলাদেশ নিবে। আর ভারত কেবল আখাউড়া থেকে  ত্রিপুরা লাইনে পাঁচ-ছয় কিমি ট্রেন লাইন প্রকল্পে অর্থ খরচ করে (যেন পুরা প্রকল্পেই) সেটাতে ভারত বাংলাদেশকে ঋণ দিয়েছে বলে দেখাবে।  এককথায় বললে এভাবেই ভারত সমস্ত স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা একপক্ষীয় ভাবে ব্যবহার করবে। আর দাবি করবে ভারত নাকি বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী ঋণদাতা! এমনকি আজকাল অনেক তরুণ ফেসবুকার কেও পাওয়া যাবে যে প্রমান করে দিবে যে বাংলাদেশকে ভারতের দেয়া ঋণ চীনের চেয়েও পরিমাণে বেশী!

    কেন এভাবে এই তুলনা করে দেখালাম?
    দেখালাম এজন্য যে জাহিদ হোসেনের সাথে একই প্রশ্ন দেবপ্রিয়কে করেছিল বিবিসি। দেবপ্রিয়-ই ভারতের সাথে তুলনা ডেকে এনেছিলেন। বিবিসি লিখেছে “…ভারতের দেয়া ক্রেডিট লাইনের কথা উল্লেখ করে মি. ভট্টাচার্য…”। এটা কি তুলনীয় ঘটনা? ভারত কি অবকাঠামো ঋণ দেয়ার মত নিজে যোগ্য অর্থনীতি হয়েছে? দেবপ্রিয় এর সেখবর নাই, তবুও তিনি কোশেশ চালিয়ে গেছেন। এমনই খেদমতগার তিনি! যে ভারত বিনা পয়সায় স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা একপক্ষীয়ভাবে নিচ্ছে তার সাথে চীনের অবকাঠামো উন্নয়নের ঋণদাতা ভুমিকার তুলনা করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, কেন বাংলাদেশ চীনের নগদ ডলার দেওয়ার বাজেট সহায়তা শিরোনামের ঋণ নিতে পারবে না – এম মিথ্যা ও ভুয়া ধারণায় ভয় দেখিয়েছে।

    “তবে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নেবার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা হতে পারে বলে
    উল্লেখ করেন মি. ভট্টাচার্য। কারণ, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ঋণ নিয়েছে এবং সামনে ঋণের আরো কিস্তি আসবে।
    এমন অবস্থায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নিতে গেলে আইএমফ বিষয়টা মানবে কি না সেটাও একটা দেখার বিষয়, বলছিলেন মি. ভট্টাচার্য।” – বিবিসি

     

    দেবপ্রিয় মস্কোর প্লেখানভ রাশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা ও পিএইচডি। ফলে সারাজীবন তিনি “পশ্চিমা পচা-গলা পুঁজিবাদের”  বিরোধীতা ও নিন্দা করে এসেছেন। যা বুঝি না তার নিন্দা করা তো খুব আরামেরই।  আর এখন মোদির “হিন্দুত্ববাদের পুঁজিবাদ” তাঁর কাছে খুব মিস্টি ও উপাদেয়। অথচ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক তার কাছেও নিপাত যাক সংগঠন। সুযোগ পেলেই তিনি এ’সংগঠনের বিরুদ্ধে বিষ উগলে দেন। অথচ উনার নিজ অযোগ্যতা হল, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এটা কি ও কেমন প্রতিষ্ঠান অথবা ১৯৪৫ সালের পরে গ্লোবাল পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক ব্যাবস্থা হিসাবে এটা কিভাবে কাজ করে? আবার এটা কোথায় কোথায় গরীব দেশের বিরোধী আবার কোথায় ঐ গরীব দেশের কাছেই “অন্ধের  কাছে তাঁর লাঠির” মতই সহায়ক – ইত্যাদি এসব দিকে তিনি বেখবর! এই গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেমটা চালু আছে বলেই কিন্তু তিনি আয়-ইনকাম করার সুযোগ পেয়েছেন সেতাই তিনি মনে হয় খেয়াল করেন নাই!

    প্রথম কথা হল, কোন দেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে ওর একটা দিক হল (সবটা নয়) নগদ ডলারের অভাব বা প্রয়োজন হয়ে পরে। এর সবটা আইএমএফ দেয় না বা যোগান দিতে পারে না। এছাড়া এমন সংকটে আইএমএফের কাজ ও প্রধান ভুমিকাটা ঠিক ঋণ দেয়া বা নগদ ডলার যোগান দেয়া না। বরং ১৯৪৫ সাল থেকে আইএমএফের কাজের মধ্যে দিয়ে তৈরি হওয়া যে পেশাদার অভিজ্ঞতা তা দিয়ে সে কোন দেশের পড়ে যাওয়া অর্থনীতিকে টেনে তোলার পথ বাতলানো (যেটাকে কমিউনিস্টেরা আধো বোলে শর্ত দেয়া বলে না-বুঝা হৈ চৈ করে থাকে)। মানে পড়ে যাওয়া ট্রেনকে আবার লাইনে তোলার মত! সেকারণে গ্লোবাল পুঁজি বাজার সংশ্লিষ্ট যেকেউ এসব ক্ষেত্রে ঐ পতিত দেশের অর্থনীতি কারকশন পদক্ষেপগুলো নিয়ে উঠে এসেছে কিনা এব্যাপারে কেবল আইএমএফ এর বক্তব্য-কেই বিশ্বাস করে। এখন অসুবিধা হল মাঙনা পরামর্শ দিলে পতিত দেশ তা আমল করতে চায়না; যেন এতে সিরিয়াসনেস আনতেই বা সেটা ঠেকাতেই কিছু ঋণ ঐ সংকটে পতিত দেশকে আইএমএফও দিয়ে থাকে। যেমন, বাংলাদেশের এখন ৫-১০ বিলিয়ন ক্যাশ ডলার লাগবে বলে কথা উঠেছে সেখানে আইএমএফের দেয়া এখনকার (বছর দেড় আগে শুরু হওয়া) ঋণ হল ৪.৭ বিলিয়ন। কিন্তু তা দেয়া হবে প্রতি ছয় মাসে মাত্র ৬৮২ মিলিয়ন (৬৮.২ কোটি) ডলার করে; মানে সাড়ে তিন বছর ধরে। এভাবে সাত কিস্তিতে অর্থ পাবে। তাও আবার প্রতিবার উন্নতির (রিকভারির) যে টার্গেট  আইএমএফ দিবে তা পূরণ সাপেক্ষে পরের কিস্তির অর্থ ছাড় হবে – এভাবে।
    কিন্তু ছয় মাসে ৬৮২ মিলিয়ন মানে মাসে ১০০ মিলিয়ন ডলারের মত; এটা কোন অর্থই না।  যেখানে শুধু জ্বালানি আমদানিতে আমাদের প্রতি মাসে ব্যয় এক বিলিয়ন ডলার। মানে শুধু জ্বালানি আমদানির মোট অর্থের দশভাগের একভাগ মাত্র আইএমএফের দেয়া ঋণ প্রতি মাসে। অর্থাৎ আইএমএফের ঋণটা “টোকেন” (token) ; বা নাম কা ওয়াস্তে!
    আগের অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন এই কিস্তির ডলার উনি একলা নিজেই বাংলাদেশকে দিতে পারেন। যেটা এতই অল্প!

    অথচ জ্ঞানী দেবপ্রিয় আন্দাজে বলতেছেন যেহেতু “বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ঋণ নিয়েছে এবং সামনে ঋণের আরো কিস্তি আসবে।”– তাই আমরা আর এখাতে চীনের থেকে নগদ ডলার বা বাজেট সহায়তা খাতে নাকি ঋণ নিতে পারব না। যেন বাচ্চা বয়সে আমাদেরব শোনা সেই ডায়লগ যে বলতে চাচ্ছেন-  “না না অমন করেনা মা বকবে”।  তাই সেই ভাষায় দেবপ্রিয় বলছেন, “এমন অবস্থায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নিতে গেলে আইএমফ বিষয়টা মানবে কি না সেটাও একটা দেখার বিষয়”।

    আসলে দেবপ্রিয় বলতে চাচ্ছেন বাংলাদেশ বা হাসিনা যেন চীনের কাছে না যায়। এ্যটাই তাদের মন-কামনা!!!  আর এখানে এই তাদের মানে ভারতীয় স্বার্থের বুঝতে হবে!  হাসিনা যেন চীনের থেকে বাজেট সহায়তার নগদ ডলার ঋণ করতে না যায়।  কেন? এতে দেবপ্রিয় এর কি অসুবিধা?
    দেবপ্রিয় বলতে চাইছেন এতে ভারত রাগ করবে। কারণ, হাসিনার চীনের কাছে যাওয়া মানে তিস্তা প্রকল্প জাতীয় আরো অনেক (ভারতের মাতব্বরি অস্বীকার করে সম্মতি দেয়া) প্রকল্পে হাসিনার সম্মতি দেওয়া বা হাসিনাকে নগদ ডলার সহায়তা ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে চীনকে স্ট্রাটেজিক সুবিধা দেয়া। এখন বাংলাদেশ তার নিজ স্বার্থে চীনকে কি দিবে নিবে সেটা একান্তই বাংলাদেশের স্বার্থ! এখানে ভারতের বলার কি আছে? কিন্তু দেবপ্রিয় মনে করেন এটা তার ও ভারতের স্বার্থবিরোধী!

    এবার এর উলটা দিক থেকে দেখি। হাসিনা নগদ ডলার সহায়তা যদি না আনতে পারে তাহলে কি হবে? আগামি মাস থেকেই আমদানি ব্যয় মিটাবার সামর্থ ভেঙ্গে সব এলোমেলো হয়ে পড়বে বলা হচ্ছে। অর্থনীতি চরম বিশৃঙ্খলায় পড়বে। মুদ্রাস্ফীতি আকাশ ছুবে করবে – ধরাম করে ছাদে ঠেকবে। মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বি হওয়া কথাটার-ই আরেক ভাষ্য হল, গরীব মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শেষ। নুন্যতম খাদ্য কেনার সামর্থটাও নাই হয়ে যাবে। এটাই দুর্ভিক্ষের আরেক নামে। এজ্জন্য কোন দেশের ফরেন রিজার্ভ শুণ্যের দিকে কিনা এটাও দুর্ভিক্ষ আসবার একটা বড় সিগনাল!  অর্থাৎ ভারত বা তার এজেন্ট দেবপ্রিয় আমাদের হুমকি-ভয় দেখাচ্ছেন যেন হাসিনা চীন না ভ্রমণে না যায়। কারণ, এতে নাকি ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ চীনের কাছে ক্ষুন্ন হবে! কি আবদার!! অথচ এতে বাংলাদেশের অর্থনীতি ফেল করলে যে দুর্ভিক্ষের দিকে যাবে তবু হাসিনা তা ঠেকাতে ব্যবস্থা না নেক এটাই ভারতের আবদার!
    অথচ এনিয়ে ক্রমান্বয়ে ভারত হাসিনার উপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। সর্বশেষ বিনা পাবলিক ঘোষণায় অজিত দোভালের সফরও বাংলাদেশ সফরও সেকারণে বলে কানাঘুষা চলছে!

    একটা সমতুল্য অভিজ্ঞতাঃ
    করোনার টিকা আমরা কোথা থেকে কিনবো?  এই টিকা প্রথম অনুমোদন পেলে দেখা দিয়েছিল কাড়াকাড়ি। কারণ, বড়লোক পশ্চিমা দেশগুলো তাদের মোট চাহিদার ছয়-সাত গুণ বেশী টিকা নিজেদের জন্য সংগ্রহ-মজুত শুরু করেছিল। খামোখা নিজ সাদা শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্খায়। আর এটাই আমাদের মত গরীর দেশের অবস্থা আরো শোচণীয় করেছিল। চীন অফার দিয়েছিল তাদের টিকার গবেষণার শেষ বা তৃতীয় ফেজে যুক্ত হবার বিনিময়ে টিকা পাওয়ার। কিন্তু এতে ভারতের চেয়েও চীনের বাংলাদেশের উপর প্রভাব বেড়ে যাবে তাই এক শয়তানি চাল দিয়েছিল ভারত। বাংলাদেশ প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৪০০ মিলিয়ন ডলার ভারতের টিকা কারখানায় বিনিয়োগ করলে তারা  আমাদের প্রয়োজনীয় টিকা সরবরাহ করবে। তাহলে টিকা ক্রয় নিয়ে বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যবসায়ী- মন্ত্রী উপদেষ্টারা এই সুযোগে বিরাট আয় করে নিতে পারবে। অর্থ্বের লোভে সরকারও সেদিকেই রওনা দিয়েছিল; সরকারি সহায়তায় বেসবকারি বিনিয়োগও দিয়ে যুক্ত হয়েছিল ভারতের সাথে।  তবু চীন এনিয়ে একটাও কথা পাবলিকলি বলে নাই। রয়টার্স মুখে মাইক ধরলেও বলেছিল – নো কমেন্ট!
    আর সরকার-বেসরকারি দালালেরা ভেবেছিল তারা সহজেই জিতে গিয়েছে। ভেবেছিল চীন কি বোকা যে সহজেই ওয়াক ওভার দিয়ে দিছিল। আর তারা স্বপ্নে ৪০০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে কত হচ্ছে তা গুণা-গুনতি শুরু করেছিল!
    কিন্তু না, সব হিসাব ভুল!
    কয়েকমাসের মধ্যে মোদি ঘোষণা করে বলেছিলেন বাংলাদেশে টিকা পাবে না। আগে ভারতের জনগণ সকলে টিকা পাবে এরপর দেখা যাবে! কিন্তু তখন হাসিনা টিকা পাবেন এমন বিকল্প কোথায়? পশ্চিম উতপাদকেরা সবাই নিজেকে বা অন্য পশ্চিমাদের নিয়েই ব্যস্ত!  ফলে হাসিনার আবার সেই চীনের কাজে গিয়েই হাতেপায়ে ধরা! স্বভাবতই চীন এবার হেসেছিল কিনা আমরা জানি না! কিন্তু বাংলাদেশ থেকে চীন তাদের স্টাটেজিক সুবিধা যা তারা আগের বেছে রেখেছিল তা এবার উসুল করে নেওয়ার বিনিময় আমাদেরকে টিকা দিয়েছিল। সেজন্য টিকা চুক্তি করতে চীনা স্বাস্থ্যমন্ত্রী না এর বদলে  তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এসেছিল। বড় শিরোনামে বললে, এটাই কক্সবাজারে ছয় কিলোমিটারের (রিফুয়েলিং) রানওয়ে নির্মাণ ও এর সাথে আরো অনেক চীনা স্ট্রাটেজিক স্বার্থ বিষয়ক বিষয়ে তা পাইয়ে দিতে চুক্তিতে উপণীত হতে হয়েছিল আমাদেরকে। তার মানে দাঁড়ালো সেকালে হাসিনাকে এই কাজে ভারত-ই ঠেলে দিয়েছিল!  এবারও বাজেট সহায়তা আনতে হাসিনার সম্ভাব্য চীন সফরকে কেন্দ্র করে কি একই ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে?

    এখন ভারতের মোদিসহ বিরাট বিরাট সব স্ট্রাটেজিক এনালিস্ট, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা সব যারা যারা আছেন তারা হিসাব দেন! বলেন, বাংলাদেশকে শুরুতে চীনা টিকা গবেষণায় যুক্ত হয়ে টিকা যোগাড়ে বাগড়া দিয়ে ভারতের কি লাভ হয়েছে? অবশ্যই কোন লাভ হয় নাই। উলটা ক্ষতি হয়েছে। স্ট্রাটেজিক দিক থেকে চীনারা ভারতের ও আমেরিকার উপরেও আগিয়ে গেছে।  আর ভারতের এসব তথাকথিত স্ট্রাটেজিক পরিকল্পকেরা আপনারা তো নিজের স্বার্থই রক্ষা করতে জানেন না। এটাই প্রমাণিত হয়েছে।  মনে করেন অর্থের লোভ আর মনি-পরী হানিট্রাপের মাধ্যেমেই সব অর্জন করে ফেলবেন। আপনারা এতই বুদ্ধিমান! আর ‘র’-এর কাজ আগানোর ভিত্তিও এই অর্থ আর মেয়েমানুষ দিয়ে ট্রাপ করা! অথচ আপনারা ভাবছেন চীনের বুদ্ধি-পরিকল্পনার উপরে আপনি এই অর্থ আর মেয়েমানুষ দিয়ে ট্রাপ দিয়ে জিতে যাবেন; রাজত্ব করবেন!    এর সোজা মানে দাঁড়ালো এখন জবাব নাই আপনাদের কাছে? বাংলাদেশের করোনার টিকা চীন থেকে সংগ্রহের প্রথম পরিকল্পনাকে ফেল করিয়ে দিয়ে ভারতের কি লাভ হয়েছে? নাকি আলটিমেটলি ভারতই বাংলাদেশকে আরো বেশী করে চীনে কোলে উঠিয়ে দিয়েছে?
    ভারতের স্ট্রাটেজিক জ্ঞানীরা এখন আমাদের দিকে না তাকিয়ে ভারতের নিজের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে মুল্যায়ন করেন আগে; সাহস থাকলে!

    এরপরে এর ভিত্তিতে ঠিক করেন হাসিনাকে আবার এখন চীন সফরে (বাজেট সহায়তা আনতে) যেতে বাধা দিবেন কোন সাহসে? কোন লক্ষ্যে ও যোগ্যতায়? আপনাদের মূল সমস্যা তো অর্থনৈতিক সামর্থ নয়, হিংসা-ভিত্তিক চিন্তা! তাই চিন্তা, বুদ্ধি পরিকল্পনা সবই এখানে এসে সব শুকিয়ে যাবে আপনাদের!  অথচ সেই পুরানা পথ; অজিত দোভালকে পাঠিয়ে চাপ দিবেন??? পেটি (petite বা উচ্চারণে পেতিত মানে ক্ষুদ্র বা সংকীর্ণ) চিন্তা, পেটি দোকানদারি মানসিকতা বা হাভাতে এরা অবশ্য এগুলাই করে থাকে! যারা বিরাট চকচকে লোভের চিন্তায় শেষে সবসময় আত্মঘাতি হয়ে থাকে! মোদি কেন এর ব্যতিক্রম হবেন!

    ভারত-চীনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের শিকার না হইঃ
    এই বক্তব্যটা মন্ত্রী ওয়ায়দুল কাদেরের। গত ৪ ফেব্রুয়ারি পুরা বক্তব্যটা নিয়ে মিডিয়া শিরোনাম ছিল – আমরা যেন চীন-ভারতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত না হই: ওবায়দুল কাদের ।  দেখে পড়ে মনে হতে পারে যে হাসিনা খুবই সতর্ক বোধহয় তাই চীন-ভারত দুটা দেশ থেকেই দূরে থাকতেই হাসিনা সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। না, এই অনুমান ভাবনাটা ভুল! কারণ, এটা হল আসলে সম্ভবত হাসিনা এখন আর চীন সফরের কথা ভাববেন না! আর তাতে সবকিছু সিদ্ধান্তহীনতায় ফেলে বসে থাকতে চাইছেন। কারণ, হাসিনার চেয়ে কে সবচেয়ে বেশী জানে যে চীনের কাছ থেকে নগদ ডলার না আনা মানে অর্থনৈতিক রিকভারি হবে না; মানে দেশকে ক্রমশ এক দুর্ভিক্ষ এ’দিকে ঠেলে দেয়া হবে?

    হাসিনার কাছে পরিস্থিতিটা এখন কোন দুরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের শিকার জড়িয়ে যাওয়া বা না যাওয়ার  হিসাবে দেখতে যাওয়াটাই ভুল! হাসিনার জন্য বাংলাদেশের জন্য লক্ষ্যটা হল  অর্থনৈতিক রিকভারি আর তা করে, দুর্ভিক্ষ এড়ানো। সবচেয়ে বড় কথা এতে কোন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যাওয়া বা না যাওয়া যাই ঘটুক – তবুও দুর্ভিক্ষ যদি এড়াতে পারে তবে সবের দায় জনগণ এর কাছে সারেন্ডার করলে তারা তা শেয়ার করবে। কিন্তু কেবল মনে রাখেন একটা চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ – এটা বাংলাদেশের অভিমুখ, গতিপথ অপরের প্রত এটিচ্যুড ইত্যাদি সব বদলে দিয়েছিল। পুরা পঁচাত্তর সালটা আমাদের খুনাখুনিতে কেটেছে। ১৯৮১ সালের আগে কিছুই নুন্যতম থিতু হয় নাই! আর সেই থেকে খুড়িয়ে চলা, পড়ছি আর উঠছি, খুড়িয়ে চলছি – জনমত বিভক্ত! কোন রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকেই এরপরে আমরা নুন্যতম বের হতে পারছি না! প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা ইত্যাদি নেগেটিভ এটিচ্যুড বার বার ছাপিয়ে উঠছে!

    হাসিনা কি করতেছেন তা তিনি নিজেই স্থির মনে এখানে খুঁজে দেখতে পারেন। যেমন, তিনি মনে করেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর হয়ে ক্ষমতা নিয়েছেন। ধরে নিলাম তিনি ঠিক ও সৎ ও ন্যায্য কথাই বলছেন। কিন্তু তাহলে স্কুলের পাঠ্যবই তা ভারতে পাঠিয়ে ছাপানোর নামে তাদের অনুমোদন নিতে পাঠান কেন? এটা কি কোন মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর কাজ হতে পারে? সালমন রহমান কখনও বইয়ের ব্যবসা করেন নাই, ছিলেন না। অথচ তাকেই কেন বই ছাপিয়ে আনার দায়ীত্ব দেয়া হয়েছে কেন? পাঠ্যবই ছোটখাট জিনিষ না।  ভারতীয়দের সম্পাদিত বই পড়ালে কি বাংলাদেশ থেকে মুসলমানদের কথিত জঙ্গীবাদী মানসিকতা দূর হয়ে যাবে? কথিত ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ হয়ে গেলে জঙ্গীবাদ চলে যাবে – এটাই কি মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর এসব চিন্তার ভিত্তি নয়? অথচ এটাই তো ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের নিচে বাংলাদেশকে রেখে দেওয়া; নয় কি? আচ্ছা ভারতের পাঞ্জাবের খালিস্তান মুভমেন্ট কি জঙ্গীবাদ নয়, এটাও কি ভারতের সরকারি পাঠবই পড়েই আর তা পড়ার পরেও জন্মাইছে। তাই নয় কি? হায় মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী!!! তাহলে আমরা কোথায় দাড়াবো? আমাদের কোথায় নিয়ে চলেছেন আপনারা?

    তাহলে মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর শত্রু হল  ইসলামি জঙ্গীবাদ মানসিকতা আর এটাকে ধুয়ে পরিস্কার করতেই গঙ্গায় ডুব দেওয়ানো্র জন্যই এমন পাঠ্যবই ব্যবস্থাপনা?  এভাবে আমরা কি আমাদের মুসলমান পরিচয়কে এভাবে শুদ্ধ ও হিন্দুত্ববাদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে নিতে পারবো? নাকি এরপরও মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী বলে কিছু অবশিষ্ট থাকবে? আসলে, হিন্দুত্ববাদের অধীনস্ত হয়ে একটা “মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী” বা হাসিনার বাংলাদেশ বলেও কিছুই থাকবে না! মানে হবে না!! কারণ, নিজের অস্তিত্বের অর্থ তাতপর্য নিজেকেই তৈরি করতে হয়!

    ভারত তার পেটি স্বার্থে যতই বাধা সৃষ্ট করুক সিদ্ধান্ত নিতে হবে একান্তই নিজ দেশ-মানুষের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে তাতে চীনের খুশি-অখুশি নাকি ভারতের  খুশি-অখুশি এসব অনেক নিচের প্রায়োরিটি! বাংলাদেশের কাছে নিজ স্বার্থের উপরে কেউ নাই, থাকতে পারে না!
    অর্থনৈতিক রিকভারি আর তা করে , দুর্ভিক্ষ এড়ানো এটাই আমাদের মুখ্য স্বার্থ। আমরা আরেকবার দুর্ভিক্ষ দেখতে পারি না!  এতে ফেল করা বা পরাজিত হওয়া যাবে না!!!
    কাজেই “আমরা যেন চীন-ভারতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত না হই”-এটা হতাশা আর সংকটে পালিয়ে যায় যারা তাদের কথা!

    আমাদের শাসকদের নিজ স্বার্থ বুঝতে অন্তত সুমতি হোক!

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০৬ ফেব্রুয়ারি   ২০২৪, সন্ধ্যা  সাতটা

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • পাকিস্তানের নির্বাচন ও সাংবাদিক হামিদ মীর

    পাকিস্তানের নির্বাচন ও সাংবাদিক হামিদ মীর
    গৌতম দাস
    ২৮ জানুয়ারি ২০২৪
    https://wp.me/p1sCvy-5kJ

     

                        Pakistan’s Elections Will Be ‘Selections’; Nawaz Sharif Will Be ‘Imposed’ as PM: Hamid Mir

     

    হামিদ মীর [Hamid Mir]।

    পাকিস্তান এর সাংবাদিক। কেরিয়ার শুরু করেছিলেন প্রিন্ট পত্রিকার সাংবাদিক হিসাবে। সবাই যেমন হয়, তেমনই। আলাদা করে মনে রাখার মত তাঁর কিছু তখন ছিল না। কিন্তু উঠে আসেন প্রধানত তিনটা ঘটনায়।   ১. ওয়ার অন টেররের আমলের এক কথিত “লিবারেল সাংবাদিক পরিচয়” বানিয়ে নিবার সুযোগে উত্থিত। ২। লা-দে-নের সাক্ষাতকার নিয়েছিলেন বলা হয় সেকালে। ৩। পাকিস্তান প্রেসিডেন্ট জেনারেল মোশাররফ এর প্রায় নয় বছরের আমলের মাঝামাঝিতে যখন পাকিস্তানের মিডিয়া – একটা তুলনামূলক কিছু খবর ছাপতে দেয় এই অর্থে লিবারেল মিডিয়া করে দেওয়ার শখ জেগেছিল প্রেসিডেন্ট বুশের।

    একই পারস্য উপসাগরে মাঝের ইরানের দুদিকে  দুবাই আর পাকিস্তান; যাদের এরিয়াল মানে বাণিজ্যিক বিমানে যাতায়াতের দুরত্ব বা ফ্লাইয়িং টাইম মাত্র দুঘন্টার। যেন একই ভারতের পুব থেকে পশ্চিমে (মুম্বাই-কলকাতা) যাবার বিমান ভ্রমণ দুরত্ব। অনেক প্রবাসী পাকিস্তানি দুবাইয়ে চাকরি করেন। এমনিতেই দুবাইয়ের ক্ষমতার করিডোরে বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তানের প্রবেশাধিকার নানা কারণে বেশী। ওদিকে মোশাররফ এরও বুশের পরামর্শ / নির্দেশ মানবার বাধ্যবাধকতা আছে। তাই তিনি এক আজিব ব্যবস্থা খাড়া করলেন। সেটা টিভি মিডিয়ায় তুলনামূলক এক মুক্ত আবহ। লিগালি টিভি খোলা হয় দুবাইয়ের কোম্পানি হিসাবে, সেখান থেকে প্রচারিতও। কিন্তু টার্গেট পাকিস্তানের আম-জনতা আর এটা ফ্রি মানে বাংলাদেশের স্থানীয় টিভি যেমন বাংলাদেশিরা ব্যবহার করে।
    আর মূল প্রোগ্রাম স্টুডিও কোথায় হবে? শুরুতে তা থেকে গেছিল দুবাইয়েই। পরে সাক্ষাতকার নেয়া, বা রিপোর্টিং সংগ্রহ করতে গিয়ে তা খোদ পাকিস্তানের মূল মূল শহরে কিন্তু বিদেশি টিভি হিসাবে এর আবির্ভাব ঘটেছিল। এভাবেই চালু হয়েছিল GEO TV।  [ARY টিভি গ্রুপ এটাও তেমনই একগুচ্ছ টিভি পরিচালনা করে থাকে ] আর জিও টিভির প্রধান কর্তা হিসাবে মানুষ চিনতে শুরু করেছিল হামিদ মীরকে। এই টিভির লিবারেলিজম বা উদারতা এমনই যে, যতটুকু মনে পরে সম্ভবত ২০০৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমি বাসায় আফ্রিকায় আমার পাকিস্তানি কলিগদের সাথে বসে বাংলাদেশ নিয়ে টিভিতে আলোচনা দেখছি। আর সেখানে বাংলাদেশের ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত সাহেবই সম্ভবত আলোচনার প্যানেলে। জিও টিভি গ্লোবাল ব্রডকাস্টেড টিভি চ্যানেল ছিল তাই আফ্রিকাতে বসেই তা দেখা যেত।

    হামিদ মীর বাংলাদেশেও ঘুরে গিয়েছেন। ওয়ার অন টেররের রমরমা কালে। কিন্তু এই হামিদ মীর ক্রমশ আমেরিকান মুখপাত্র হয়ে উঠতে থাকলেন। বিশেষ করে এই ডোনাল্ড ল্যু এর যুগে এসে, সবচেয়ে আগ্রাসী ভাবে।
    ইমরানকে যখন বাইডেনের আমেরিকার ডোনাল্ড ল্যু উতখাত করতেছেন তখন ব্যাপারটা ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার প্রধান সংবাদদাতা হয়ে উঠেছিলেন এই হামিদ মীর। প্রথম আলো পাকিস্তানের যে মিডিয়ার খবর সবচেয়ে বেশী করে কোট করে তুলে আনত তা ছিল হামিদ মীরের রিপোর্ট।  কারণ সেগুলো হত প্রো-আমেরিকান করে সাজানো।

    আর এখন?
    মানে আগামি মাসে দিন দশকের মধ্যে পাকিস্তানে (ডোনাল্ড ল্যু এর) সাধারণ নির্বাচন আটই ফেব্রুয়ারি ২০২৪।
    এদিকে হামিদ মীর পুরান অভ্যাস পরিচয়ে উদার সাংবাদিক; সৎ কথা নাকি বলতে পারেন। আর ভারতের THE WIRE ওয়েব পত্রিকাটা তুলনায় মোদির আমলে যেখানে সব পত্রিকাই মোদির কাছে ভিক্ষার পাত্র বাড়িয়ে দাড়ায় থাকার যুগ পার করছে সেখানে এই মিডিয়া এখনও সেসব লোভ বা ধান্দায় নাই। যদিও উগ্র জাতিবাদী কথিত জাতিস্বার্থের ধারণার বাইরে নয় এই মিডিয়া।  ওয়ারের করণ থাপর [Karan Thapar] হামিদ মীরের এক ভিডিও সাক্ষাতকার নিয়েছেন। এর ভিতর কি আছে তা শিরোনামেই প্রকাশিত প্রতীকিভাবে। শিরোনামটা বাংলা অনুবাদ করলে তা হয়ঃ  “পাকিস্তানের (আসন্ন) নির্বাচনে  আগাম বেছে রাখা এক “সিলেকশন” হতে যাচ্ছে; নওয়াজ শরীফকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তুলে নিয়ে তা চাপিয়ে দেয়া হবে” – হামিদ মীর। 

     Pakistan’s Elections Will Be ‘Selections’; Nawaz Sharif Will Be ‘Imposed’ as PM: Hamid Mir

    তাহলে এটা কি দাঁড়ালো?
    দাড়ালো যে তাহলে ইমরানের উতখাতের সময় থেকে এত খুশি ছিলেন কেন হামিদ মীর! সেসব এখন বিব্রতকর প্রশ্ন!!
    তবে এখন এটা পরিস্কার যে এককালে পাকিস্তানের আদালতে প্রমাণিত চোর এই নওয়াজ শরীফ এর গায়ের পচা দুর্গন্ধও ল্যু এর কাছে খুবই ভাল সুগন্ধ লাগছে!  বাইডেন-ল্যু এটাকেই তাদের বিরাট অর্জন বিজয় মনে করছেন! এটাই তাদের সম্ভবত এক মাত্র চীনবিরোধী বিজয়! ঙ্ন্তুকি হামিদ মীর জানেন এই লাশের ভার কত ওজনের! তাই তিনি আগে ভাগেই হাত ধুঁয়ে ফেলে আমাদের জানালেন যে আর এর দায় তিনি নিতে চান না!

    আর পাকিস্তানের বেলায় এই ডোনাল্ড ল্যু আর আমাদের বাংলাদেশের বেলায় ল্যু – এদুটা কি একই ব্যক্তি?
    হা সন্দেহতীতভাবে একই ব্যক্তি!  আর আমাদের মধ্যে একমাত্র সুজন ব্যক্তিরাই তা বুঝিয়ে আমাদেরকে বলতে পারবে!

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ   জানুয়ারি   ২০২৪,

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

     

  • নিজেদেরকেই রিভিউ বা হাসিনার ক্ষমতার চ্যলেঞ্জ কে বুঝা

     নিজেদেরকেই রিভিউ বা হাসিনার ক্ষমতার চ্যলেঞ্জ কে বুঝা
    গৌতম দাস

    ১৬ জানুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৫
    https://wp.me/p1sCvy-5j8

     

                  বিএনপি ক্ষমতায় আসতে অন্ধকার গলি খুঁজছে: প্রধানমন্ত্রী

     

    আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের ক্ষমতার আয়ু রাখা হয়েছে (আমাদের মত পাঁচ বছর না) চার বছরের। তাই বাইডেনের আয়ুকাল (২০২১-২৪), মানে ২০ জানুয়ারি ২০২১ থেকে ২০ জানুয়ারি ২০২৫। যে কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের বাংলাদেশের উপর প্রভাব এর বিচারে বাইডেন প্রশাসন এক ব্যতিক্রম হবেন। ইতিহাসে বাইডেনই সম্ভবত বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় আর দীর্ঘ প্রভাব ফেলা প্রেসিডেন্ট হবেন।  ফেলে ছড়িয়ে একটা ঢিলেঢালা হিসাব করলেও বাংলাদেশের উপর বাইডেনের প্রভাবের ব্যাপারটা ইতোমধ্যেই প্রায় দুবছরের।  আর সেই সময়কাল বলা যায় গত ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের বছর শেষ – এভাবে মোটামুটি এই দুবছরের কথা বলছি।  আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাইডেনের সম্ভবত চরমতম প্রভাবিত করার আয়ুকাল ছিল এই দুই বছর। যদিও এদুই বছর চরমতম প্রভাব বিস্তারের ফলাফল কী হয়েছিল বলে আগামিদিনের ইতিহাসে কী লেখা হবে?

    বাংলাদেশের আগামিদিনের ইতিহাসে বাইডেনের আমেরিকাকে নিয়ে কী লেখা হবেঃ
    প্রথমত লেখা হবে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে ব্যাপক ওলটপালট ঘটিয়ে দিবার কান্ডটা করেছেন এই বাইডেন প্রশাসন। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের কপালে যাই হোক প্রেসিডেন্ট বাইডেন নিজের দেশের জন্য বাংলাদেশ থেকে কিছু গালাগালি আর হতাশা ছড়ানোর দায় ভিন্ন খুব কিছুই ফেরত নিতে পারেন নাই। তিনি এদুই বছর বিরাট খাটাখাটনি করেছেন, কিন্তু সবই ব্যর্থ আর পন্ডশ্রম! মানে প্রচুর দামি এই শ্রম তা হলেও এটা কারোরই ভোগে লাগে নাই! বেকার গেছে। এজন্য দায়ী বাইডেন প্রশাসনের কিছু হামবড়া কর্তা যেমন আজরা জেয়া বা ডোনাল্ড ল্যু ইত্যাদি।
    আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হিসাবে সেই ১৯৪৫ সাল থেকে ছড়ি ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছে, আমাদের মত দেশে অপছন্দের সরকার হলে তাকে ফেলে দেয়া এই ছিল আমেরিকার স্টাইল।  এরপর নয়া সরকারকে দিয়ে আমেরিকা যা চায় তাই আদায় করে নিত। কিন্তু লক্ষ্য করা গেছে এই হামবড়া কর্তারা তাতেও এবার পরিবর্তন আনতে গেছেন। এরা যে স্টাইল ফলো করতে গেছেন তা হল ঠিক সরকার ফেলানো না বরং সরকার রেখেই অর উপর চাপ দিয়ে আমেরিকার পছন্দমত কাজ বা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা। অনেকটা এই কর্তারা যেন বলতে চান যে সরকার বদলে আমরা কি করব ওর চেয়ে বরং একে আমার স্বার্থের পক্ষে চুক্তি করা বা অবস্থান নিতে বাধ্য করলেই তো বেশী লাভ! আর এতে ফলাফল হয়েছে এমন যে না আমেরিকানেরা কিছু পেয়েছে না বাংলাদেশের বিরোধীদলের ভাগ্যে কিছু জুটেছে! অথচ বাইডেন প্রশাসন এই নয়া এক্সপেরিমেন্ট করতেই সবটা সময় ব্যয় করে ফেলেছে – যার আলটিমেট ফলাফল শুন্য থেকেছে!

    ওদিকে বরং ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, বাংলাদেশের। এখনকার অবস্থা হয়েছে সব রাজনৈতিক দলের (মানে সরকার ও বিরোধী সব দলের) কথা বলছি – সকলেই প্রচন্ড ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে; একেবারেই দিশাহীন ওল্টপাল্ট অবস্থা হয়েছে সবার।
    শব্দটা সবার বলেছি, মানে হাসিনা সরকারেরও। যদিও কেউ কেউ বা হাসিনা নিজেও এটাকে মনে করতে পারেন কথিত নির্বাচন তিনি সম্পন্ন করেছেন ও নিজেকে আবার বিজয়ী ঘোষণা করতে পেরেছেন; সুতরাং এটাই বাইডেনের উপর দিয়ে তার ক্রেডিট!  বিশাল বিজয় হয়েছে। কিন্তু – তাই কী?
    না,  তা একেবারেই নয়। কেন? ৭ জানুয়ারি নির্বাচন শেষ হয়েছে এখন থেকে কম করে হলেও সাতদিন আগে। কিন্তু খেয়াল করেন পুরা আওয়ামী লীগের কথাও না ধরে যদি ৩০০ এমপির (২২৩ জন খোদ লীগের নিজের আর বাকিরা ব-কলমে তো লীগেরই নয়ত লীগের অনুগ্রহপ্রাপ্ত) কথাই ধরে কথা বলি এই এমপিরা কেউ জানে না যে এখন কী? কী বলতে হবে? মানে তারা কী অর্জন করেছে বলে এখন বলতে হবে তারা কেউ জানে না! মুল কারণ, এনিয়ে হাসিনার কোন নির্দেশ আসে নাই।
    যদিও এটা ঠিক এবারের কথিত নির্বাচিতেরা সকলেই এই নির্বাচনের পরে কঠোরভাবে হাসিনার হাতের মুঠোতে সংহত বা কেন্দ্রীভুত! কিন্তু সবাই কাঠের পুতুল হয়ে আছে! কে কে জিতবে সেটা নির্ধারণ থেকে শুরু করে পরে কাকে কাকে ও কেমন মন্ত্রী করে নেয়া হবে বা কে কে বাদ পড়বে বা কেন ইত্যাদি সবই এককভাবে হাসিনার মুঠোয়! তাঁর বাইরের কেউই জানেন না ঠিক কোন লজিক বা বিবেচনায় কে বাদ পড়ছেন বা উপরে উঠছেন! অথচ সকলেই তটস্ত যে না জানি কি করার কারণে এমপি হতে বা পরে মন্ত্রী হতে বাদ পড়ে যাবেন বা গৃহিত হবেন! এমনকি নৌকা মার্কা পেলেও বাদ পড়তে পারেন!  পরে এখন তিনি যাবেন কোনদিকে কোথায় সেটাও কেবল হাসিনাই জানেন! আমাদের এই বক্তব্যগুলোর ভিত্তি গত সপ্তাহ-দশদিন ধরে বাংলাদেশের টিভিতে প্রকাশিত রাজনৈতিক ঘটনাবলীর ছবি ও বর্ণনা নিয়ে রিপোর্ট সেগুলো!  নির্বাচনের পরে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা যেকোন মন্ত্রী – ধরেন জুনাইদ আহ্‌মেদ পলক; টিভিতে তার চোখের ভাষা দেখে মনে হয় সেখানে যেন লেখা আছে যে তিনি কিভাবে জিতলেন, কেন জিতলেন এমনকি প্রতিমন্ত্রী পদটাও টিকে গেল কেমনে – তিনি জানেন না। সেজন্য কেবল শুকরিয়া আদায় – এটাই কেবল তার নিজের করা বাকি সবই তাঁর!! অথচ এলাকা হিসাবে পলকের পড়শি সদ্য প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার তার কেন এমন হল তা কেউ জানে না!  কেবল এটা সেটা কিছু অনিশ্চিত অনুমান করতে পারেন মাত্র!

    তাতপর্যপুর্ণ ১১ জানুয়ারিঃ
    কেন তাতপর্যপুর্ণ বলছি? নির্বাচনের তারিখ ছিল ৭ জানুয়ারি। এর ফলাফল কি ঘোষণা দিবে তা আন্দাজ থাকলেও এই তিনশ আসনের ফল সাজিয়ে গুছিয়ে প্রকাশ করতে ৮ জানুয়ারি দুপুর গড়িয়ে যায়।  আর এরপরের ৯-১১ জানুয়ারি এই তিনদিনে সরকার যেসব মেজর কাজ দ্রুততার সাথে হাসিনার লোকেরা শেষ করেছেন তা হল বিজয়ী তালিকা গেজেট করা মানে, নয়া সংসদ সদস্যদের তালিকা আনুষ্ঠানিক করে বানানো এরপর তাদের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ সম্পন্ন করা আর এরচেয়েও আরেক কঠিন কাজ মন্ত্রী বাছাই করা। মানে নেয়া বা বাদ দেয়া। বলা হয়েছে “সর্বশেষ গত (১১তম সংসদে) মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ছিল ৪৮ জন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও ছিলেন ২৫ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী এবং ৩ জন উপমন্ত্রী।  এদের মধ্যে ৩০ জনকেই বাদ দেয়া হয়েছে ” । মানে এক বিশাল ঢেলে সাজানো আর তাতে পুরান মন্ত্রীদের দুই-তৃতীয়াংশ  বাদের খাতায় চলে গেছেন। আর এমন বাদ দিবার পরে শেষে নতুন মন্ত্রীসভা হয়েছে ৩৭ জনের। আর তাদের মন্ত্রণালয় নয়া বন্টনো সম্পন্ন করা হয়েছে। আর এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে বোধহয় সবচেয়ে কম সময়ে ঘটা এমন ঘটনা। মাত্র তিনদিনে এটা সম্পন্ন।
    তাই বলা যায় ১১ জানুয়ারি সন্ধ্যারাতের মধ্যেই সব কাজ শেষ; এটা তাতপর্যপুর্ণ। কিন্তু তর্ক এখান থেকেই! যে এত তাড়াতাড়ির পিছনের কারণ কি?

    একদিকে সরকারবিরোধীরা এর সমালোচনা করে কর্মীদের মনোবল বাড়াতে চেয়েছে। প্রশ্ন তুলেছে বা নিজ মনোমত ব্যাখ্যা খাড়া করেছে যে সরকার ভীত সেকারণেই এই তাড়াহুড়ো করে নয়া মন্ত্রীসভা গঠন শেষ করেছে। রাজনীতিতে ঠেস মেরে বা খোটা দিয়ে সরকার আর বিরোধীদের মধ্যে বাকযুদ্ধ চলা খুবই কমন জিনিষ, যা আমাদের মত প্রায় সবদেশেই চলে। কিন্তু বাংলাদেশের বিরোধীদলের অযোগ্যতাটা অন্য খানে!

    হাসিনা এর পালটা জবাব দিয়েছেন যার সারকথা হল, আমাদের মুরোদ আছে তাই করেছি। বলেছেন, “আরে তাড়াতাড়ি, আমাদের তো সব তৈরি আছে। করব না কেন? আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হই না। জানি নির্বাচন হবে। নির্বাচনে জিতলে কী করব, হারলে কী করব—এগুলো সব আগে থেকেই তৈরি করা থাকবেই। তাই আমাদের সময় লাগবে কেন? সময় নষ্ট করব কেন? আমাদের একটা দিনেরও মূল্য আছে। উন্নয়নের ধারাটা অব্যাহত রাখতে হবে।’” – এইসব কথা।
    আসলে বিরোধীদের লক্ষ্য ছিল কথিত নির্বাচনে হাসিনা দলকে বিজয়ী বলে পেশ করাতে নিজ কর্মি-সমর্থকদের ভাঙ্গা মনোবল চাঙ্গা করা। ভাঙ্গা কারণ তারা  নির্বাচন ঠেকায় দিতে বা হাসিনারে বাধ্য করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই অর্থে বিরোধীদের পরাজয় হয়েছে এটা তো দিনের আলোর মত পরিস্কার, তা অস্বীকারের জো নাই। তবু তারা চেষ্টা করেছে এটা বুঝাতে যে এখনও যেন হাসিনা সরকারকে চাপ দিয়ে আমেরিকা অনেক কিছুই বাধ্য করতে পারে! আর এর প্রমাণ হল, হাসিনা সরকার গঠনে তাড়াহুড়ো করছে। কিন্তু আসলে কি এটা সত্যি? কতটা সত্যি?

    নয়া সরকার গঠনে হাসিনা তাড়াহুড়ো করেছে সত্য। কিন্তু কেন, এটাই প্রশ্নঃ
    কথা সত্য দেখলাম আমরা হাসিনা তিনদিনের মধ্যে সরকার গঠনের সব করেছে এমনকি দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি শেষে ১৫ তারিখ সকালেই প্রথম মন্ত্রীসভার বৈঠক করে ফেলেছেন। কিন্তু এত তাড়া কেন?
    কানখাড়া করে আমাদের শুনা ও বুঝা উচিত এটা কোনই আমেরিকান চাপ নয়।  বরং বাস্তবত আমেরিকা এধরণের সব চাপ দেয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে বা নিজেই নাই করে ফেলেছে। এটা হল কঠিন সত্যিটা। কিন্তু বিরোধীরা এটা নিজেরা বিশ্বাস করতে বা মানতে পারছে না। বা চাচ্ছে না – ব্যাপক হতাশা আসবে বলে। কেন? মানে কেন এমন হল?

    আসলে এটা মুখে মাটি ঢুকে যাওয়ার মত অবস্থা! মাটি আমাদের খাদ্য না। তাই মুখে কোন কারণে মাটি পড়লে থু থু করে ফেলা আর বারবার মুখ ধুয়ে পরিশুদ্ধ, মন কে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। বিরোধীদের সেই মাটি খাওয়া দশাটাই হল, তাদের আত্মত্যাগ, শতকষ্টের শেষ দুবছরের আন্দোলনে প্রায় শতভাগ তারা আমেরিকা-নির্ভর করে সাজানো কৌশলের মধ্যে থেকে আগাতে চেয়েছে।  এই একপেশে পশ্চিমা অতিনির্ভরতাই তাদের খেয়ে ফেলেছে, সব শ্রম-ঘাম পানি করে দিয়েছে। তাই তারা এখন বিশ্বাস করতে চায় নাই আমেরিকা ফেল করতে পারে অথবা বাইডেনের আমেরিকারই চরম অযোগ্যতাও আছে।

    আর সবার আগে, বাংলাদেশের বিরোধীরা এদিকটা যেন বুঝতেই চায় নাই যে বাইডেনের আমেরিকারই কিছু গভীর নিজস্ব স্বার্থ আছে সেটাই বাইডেনের প্রায়োরিটি বা প্রথম বিবেচনাই শুধু নয়; সরাসরি বললে সেই স্বার্থই বাইডেনের কাছে তার সব ততপরতার একমাত্র নির্ধারক উপাদান। মানে বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতিতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা ও নির্ভরতার কথা আছে মানেই এটা নয় যে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বাইডেনের কাজকর্মের চালিকাশক্তি বা ড্রাইভিং ফোর্স। অথচ আমাদের বিরোধীরা সেটাই বিশ্বাস করেছে!
    অথচ আমরা কি ভুলতে পারি হাসিনার এই দানব ক্ষমতাটা আমেরিকারই তৈরি। জঙ্গীবাদ দমনের নামে হাসিনা যে তার সকল রাজনৈতিকবিরোধীদেরকেও নির্মুল করে ফেলতেছে, বাংলাদেশ একটা গুম-খুন-অপহরণের রাষ্ট্র হয়ে উঠতেছে ইত্যাদি – সেটা কি আমেরিকাসহ পশ্চিমারা দেখে নাই? জানে না?  বরং তারা সেসব দেখেও এরাই হাসিনাকেই পিঠচাপড়ে বাহবা দিয়ে যেতে আমরা দেখেছি। এর পিছনের কারণ একটাই পশ্চিমাদের চীন ঠেকানোর স্বার্থ – এটাই সুপ্রীম। আর একাজের ভেট-উপহার হিসাবে তারা বাংলাদেশকে অবলীলায় ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। আমেরিকার স্বার্থ এতই নির্মম ও নিষ্ঠুর একচোখা আত্মস্বার্থকামী! যার কাছে তার আপন-স্বার্থই সব! এটা তো আমেরিকা সব সময়ই!

    কিন্তু অবজেকটিভিটি বা প্রকৃতির মার-প্রতিশোধ বলে কথা আছে যা কেউ এড়াতে পারে না। আর সেটাই ঘটে চলেছে বারবার। যেমন ২০০৭ সাল থেকে যখন এটা আমেরিকার কাছেই সত্য প্রমাণিত যে আফগানিস্তানে তার পা আটকে গেছে। আর এতে আমেরিকার গ্লোবাল অর্থনৈতিতে যে পিছিয়ে পড়া শুরু এটাই চীনের কাছে ‘পড়ে পাওয়া সুবিধা’ হয়ে হাজির হবে ও হয়েছেও। সেই থেকে আমেরিকা যেটাতে হাত দিয়েছে সব ক্ষেত্রেই হারতেই আছে! এখন এতে বিদেশিদের কি বিপদ হল তা ছেড়ে আমাদের দেশের ক্ষেত্রে আসি!

    হাসিনাবিরোধী সকলের শর্টকামিং বা প্রধান খামতিঃ 
    মূল বিষয়টা ক্ষমতা ধারণা। রাষ্ট্র-ক্ষমতা কি একে বুঝতে পারা। এবারের আন্দোলনে বিরোধীদলের শ্রম-ঘাম পরিশ্রম ব্যয় সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ!  তবু তাদের পদক্ষেপ দেখে কখনই মনে হয় নাই যে তারা ক্ষমতা ধারণাটা বুঝে। এই সোজাকথাটা হল, বলপ্রয়োগ। হাসিনা বলপ্রয়োগে সক্ষম ও সফল। যেই সক্ষমতাটা ব্যবহার করেই সে ক্ষমতায় আছে আর বারবার নিজেকে নির্বাচিত বলে দাবি করছে। তাহলে তাকে ক্ষমতাচ্যুত কেউ করতে চাইলে তাকেও পালটা সেও বলপ্রয়োগের যোগ্য আর সেটা আরো শক্তিশালী ক্ষমতা এটাই প্রমাণ করতে হত। মানে সেভাবে হাজির হতে হত। এটাি বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ এর লড়াইয়ের মূল কথা। এর বাইরে বাকি সবই এর ঝালর-সাজসজ্জা (ডেকোরেটিভ ও প্রেজেন্টেশন এর অংশ)।  অন্যভাষায় এটাকেই আমি প্রায়শই বলি মুরোদ। মানে পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ। আপনার এই মুরোদ আছে তো আপনি রাজনীতিতে আছেন। মুরোদ নাই তো রাজনীতিতে আপনি কেউ না হয়ে থাকবেন।

    তাহলে নির্বাচন কি? এর কি কোন ভুমিকাই নাই?
    অবশ্যই আছে। আর সেটা হল, যাদের যাদের পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ আছে এমন দলগুলোর মধ্যে একটা সমঝোতার নিয়ম সেটা। কিন্তু সাবধান; এখানে লক্ষ্য করবেন প্রমাণিত পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ আপনার আছে আপনিও সক্ষম – এভাবে সাথে আপনারও থাকলেই এরপর আপনি ঐ সমঝোতা নিয়মের সদস্য বিবেচিত হবেন, নইলে নয়। আর কি সেই সমঝোতা? সেটা হল, যাদের যাদের মুরোদ আছে কেবল তাদের মধ্যেই যে সবচেয়ে বেশী জনসমর্থন বা ভোট-কনষ্টিটুয়েন্সি আছে সেই সেবার ক্ষমতায় যাবে।
    তবে সাবধান, আপনি ক্ষমতায় গেলেও অন্য আর যারা  পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ ওয়ালা সদস্য তাদেরও কিছু কমন স্বার্থ ও সুবিধা আপনি তাদেরকেও দিতে বাধ্য থাকবেন। যেমন আপনি ক্ষমতায় আছেন বলে আমার গণ-সমাবেশ আপনি গ্রেনেড (এটা মিলিটারি গ্রেড আর্মস যা পুলিশের হাতে রাখা হয় না) হামলা করতে বা ভেঙ্গে দিতে পারবেন না। আমি রাস্তায় সমাবেশ করে আমার কথা বলতে পারব কিন্তু সেজন্য ক্ষমতাসীন আপনি মিছিলে আমাকে পায়ে-থাইয়ে গুলি করে আমাকে পঙ্গু করে দিতে বা সরাসরি বুকে গুলি করে আমাকে খামোশ বা বাধা দিতে পারবেন না। অথবা এরই আরেক বর্ধিত রূপ ক্ষমতাসীন আপনি আমাকে গুম-খুন-অপহরণ করে বাধা তৈরি করতে পারবেন না। এটাই সেই সমঝোতার নিয়ম। আরেক ভাষায় এটাই নাগরিক সকলের কনষ্টিটিউশনাল রাইট। এমনকি এই যেটাকে মুরোদওয়ালাদের সমঝোতা  বলছি এটাই আমেরিকান কনষ্টিটিউশনের প্রথম সংশোধনী (১৭৯১)।   আর এটাকেই আমরা এর এই বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ দিকটা পর্দা দিয়ে ঢেকে দিয়ে বলি “সিভিল রাজনীতি”, বা আবেগে বলি পরিচ্ছন্ন রাজনীতি। মানে যেটাকে কমিউনিস্টেরা বলে গণ-আন্দোলন (যেটা সশস্ত্র নয়) বা মাস-লাইন এর রাজনীতি।  আর আমরাও এথেকেই ভাব মারি যেন রাজনীতি মানেই ক্ষমতা নয়; মানেই বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ নয়।  কাম্য রাজনীতি মানে হল যেন সিভিল রাজনীতি!!! আর সেকারণেই বলেছি এই মুরোদওয়ালাদের মধ্যে সমঝোতা – এই সমঝোতা কনষ্টিটিউশনাল রাইট। এই রাইট বা খেলার নিয়ম যখন ক্ষমতাসীনেরা মানবে না , অস্বীকার করবে বুঝতে হবে এই অমান্য মানেই তখন পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ এর দিকে রাজনীতিকে নিতেই হবে। আর এখানটাতেই আমাদের বিরোধী দলেরা নিজেদেরকে ব্যর্থ বলে তুলে ধরেছে। ভেবেছিল আমেরিকা একাজটা করে দিবে!

    কিন্তু এবারের দুবছরের আন্দোলনে কি হয়েছেঃ
    প্রথম অপরাধ হল, রাজনীতিতে ক্ষমতায় আসতে চাইলে তা যে বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ – এই মূলসুত্র বিরোধীদলেরা মান্য করি নাই। যেন ভুলে গেছি বা থাকতে চেয়েছি।
    এর চেয়েও বড় অপরাধ হল, ধরেই নিয়েছি সব আমেরিকা করে দিবে। যেন আমাদের কাজ হল কেবল বড় সমাবেশ করে দেখিয়ে দেয়া। কিন্তু সরকার পড়বে কি করে? অনেক বড় নেতাকে বলতে শুনেছি বা জেনেছি তারা বলেছেন – সরকার কি করে পড়বে এ’দায় নাকি তাদের নয় আমেরিকার!!! সাথে এটাও বলেছেন, এভাবে আমেরিকা  তার দায় সম্পন্ন করে দিলে মানে সরকার পড়ে গেলে তারা তখন আবার নির্বাচন দিতে হবে বলে দাবি করতে থাকবে!!!!  আর এটাই শুধু অতি আমেরিকা-নির্ভরতাই নয় যেন নিজ বিবেচনা জ্ঞান-বুদ্ধি খুলে পাশে ফেলে রেখে নিজেই গাধা সেজে বসে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়া! আত্মপ্রবঞ্চনাও বোধহয় এমন ভোলেভালা হয় না! 

    এই আলোচনা থেকে এটা পরিস্কার যে এবারের দুবছরের আন্দোলনের প্রধান খামতি হল এরা জানে না বা ভুলে ছিল যে রাজনীতিতে ক্ষমতা মানে তা বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ। আর এর বাইরে কোন সত্য নাই।  সেকারণে, যেখানে দরকার ছিল আভ্যন্তরীণ যত শক্তি বা যত পালটা-বলপ্রয়োগের মুরোদ সমাজের যাদের যাদের আছে যারা সরকারের উপর ক্ষুব্ধ তাদের সকলকে সবার আগে জড়ো ও যোগাড় করা; আর পরে এর উপর দিয়ে আমেরিকান সহায়তা যত যা পাওয়া যায় তা সামিল করে পালটা-বলপ্রয়োগের মুরোদ দেখানো এভাবে; সেখানে বাস্তব ঘটনাটা হয়ে দাড়িয়েছিল যে পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ – এই অংশটাই একেবারে অনুপস্থিত। আর সাথে সব আমেরিকা করে দিবে এই মনোভাব সপ্তমে উঠানো হয়েছিল! এমনকি ২৮ অক্টোবরের সমাবেশ সেটা আহবানের পিছনেও – সব আমেরিকাই করে দিবে আর আমাদেরকে অহিংস হয়ে বসে থাকলেই হবে -এ’ছিল তাদের স্পষ্ট ভাবনা! তাই এক সাউন্ড গ্রেনেডে্র শব্দে সব অক্কা পেয়েছিল!  মঞ্চে বক্তৃতারত অবস্থাতেই সব ফেলে পালানো ঘটেছে। আর এটা হঠাত নয়, এটাই আগাম সিদ্ধান্ত ছিল! যেন আমেরিকাকে বলা যে ভাইসাব আমরা কিন্তু আমাদের করণীয় পার্ট শেষ করলাম; বাকিটা দেইখেন!

    অথচ উলটা করে চিন্তা করেন। ২৮ অক্টোবরের কর্মসুচি সেদিন না থাকলেই মানে কোন কর্মসুচি না থাকলেই সেটাতে  বিরোধীদের পক্ষে পরিস্থতি থাকত! কারণ, হাসিনা অপেক্ষা করছিল কিভাবে সহিংসতা, জঙ্গিত্বের অভিযোগ তুলে বিরোধী আন্দোলনকে মাঠ থেকে বিদায় করবে, সাজা দিয়ে জেলে রাখবে আর তার কারচুপির নির্বাচন আয়োজনের পথে ফাইনালি রওনা দিবে।
    আবার দেখেন ২৮ অক্টোবর থেকে ৭ জানিয়ারি বা এর পরেও আমেরিকা নিশ্চুপ যাকে বলে নট নড়ন-চরণ!! তার মানে বিরোধীরা – আমেরিকা ভাইজান বাকিটা দেইখেন – বলে যে মঞ্চ ছেড়ে ভেগেছিল  সেটা তারা করেছিল এবিষয়ে আমেরিকান মনোভাব কি – তারা এরপরে আসলেই কি কিছু করবে বা করতে পারে – এনিয়ে কিছু না জেনেই। তাহলে কিসের ভিত্তিতে কি লক্ষ্য করে ২৮ অক্টোবরের সমাবেশ ডাকা হয়েছিল? এটাই কি আবেগে ধরে নেয়া নয় বা ছিল না যে – আমেরিকা ভাইজান বাকিটা দেইখেন????

    মানে, মনে করা হয়েছিল গণ-মহাসমাবেশ সফল করা মানেই বিরোধীদলের দায়দায়িত্ব করণীয় সব শেষ ওখানে। এটাই কি হাসিনার বলপ্রয়োগের জোরে ক্ষমতা ধরে রাখার বিরুদ্ধে পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ দেখানো??? অবশ্যই না। এটাসি তো সবচেয়ে বড় ভুল! কারণ, তাদের ভাষাতেও যদি বলি তবে গণ-মহাসমাবেশ আর গণ-অভ্যুত্থান তো এক কথা নয়। বরং দুইয়ের দুরত্ব বহুদুর! এছাড়াও একালে গণ-অভ্যুত্থান এটাও সহজ যা যথেষ্ট নয়!  এটাও বহু কঠিন হয়ে গেছে, যেটা ১৯১৭ সালে পারা যেত সেটা এখন খুবই কঠিন। এখানে তা নিয়ে বিস্তারে বলার সুযোগ নাই তাই সংক্ষেপে বলব, একালে ১৯১৭ সালের রাশিয়ার মত হবু বা গণ-অভ্যুত্থানকামী দেশটা বাকি দুনিয়া থেকে আর বিচ্ছিন্ন নয়। প্রত্যেকটা রাষ্ট্র এখন বিপুল্ভাবে বিকশিত হয়ে পরা গ্লোবাল বাণিজ্যের কারণে এই গ্লোবাল বাণিজ্যে নানান স্বার্থের অংশ হয়ে গেছে। তাই এখন বাংলাদেশে কি হয় তাতে ওসব দেশের বিশেষ করে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর সরাসরি স্বার্থের দিক এখন জ্বলজ্বলে!  এমনকি ১৯৬৯ সালের আমাদের সাতদিন আয়ুর যে গণ–অভ্যুত্থান যেটা বলা হয় সেটাও ছিল অর্কেস্টেডেড বা সাজানো! তাই টিভি-তে এসে সেকালে আয়ুব খানের সারেন্ডার-বক্তৃতা ছিল যে,  আসেন গোলটেবিল করি, ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থার করি।

    তাহলে মূল পয়েন্টটা হল, সবার আগে সরকারবিরোধী এভেলেবল দেশীয় সকল শক্তি (সরকারি ইন্সটিটিউশন প্রশাসন যারা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ) এমন সকল সরকারবিরোধী স্বার্থ – এমন সকলকে নিয়ে একটা বুঝাবুঝি তৈরি করা এরপরে আমেরিকার কথা আসতে পারে – এমন হতে হত। এর বদলে সবই পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ এর খবর নাই তা ভুলে কেবল এক আমেরিকা ভরসা! এমনই বোকা আর এবসার্ড কাজটাই আমরা করতে গেছিলাম!

    এখানে সাথে আর একটা সাবধান বাণীঃ বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ বিষয়টা বুঝবার সময় ভুলেও এটা ন্যায় নাকি অন্যায় – এমন বিবেচনা এর ভিতর আনবেন না। মুরোদ-ই সত্য! যো জিতা ও-হি সিকান্দার! যে নিজেকে ডিফেন্ড করতে সক্ষম তার জন্যই এই দুনিয়া! বাকি সবকিছু আসবে এরপরে। সবার আগে ক্ষমতা এরপরে আইন বা ন্যয়-অন্যায় বা অধিকার বোধ ইত্যাদি! যার সোজা মানে হল, আগে মুরোদ এর বিজয় এরপরে সেই মুরোদকে গণ-মানুষের স্বার্থ, গণস্বার্থ (পাবলিক ইন্টারেস্ট), ন্যয়-অন্যয় বোধ, অধিকার বোধের পায়ে সমর্পণ বা উতসর্গ করে দেয়া! দিতে হবে! এই হল পথ! এর কোন উল্টা-পাল্টা বা আগে-পিছে করা যাবে না!  আর মুরোদ না থাকলে না বুঝলে রাজনীতি তার জন্য নয়!

    এমবেসি পাড়ার ক্ষমতার করিডোরে কান পেতে ইনফরমাল যা জানা যায়ঃ
    কেন আমেরিকা বা ওর প্রতিনিধি পিটার হাস ২৮ অক্টোবরের আগে থেকেই ক্রমশ  নিশ্চুপ? প্রায় নো এক্টিভিটি? নো স্যাংশন-নিষেধাজ্ঞায় চলে গেছিলেন?
    এর অনেকগুলো ভাষ্য-ই পাওয়া যায় যার মধ্যে বেশী মুখে মুখে ফেরা ভাষ্যটা হল যে, গত দুবছরের এই শেষের দিকে এসে আমেরিকার কাছে পরিস্কার হওয়া শুরু করেছিল যে আমেরিকা যদি এরচেয়েও বেশী  স্যাংশন-নিষেধাজ্ঞায় চাপ হাসিনা সরকারের উপর প্রয়োগ করে তবে সেটা আনবেয়ারেবল বা অসহ্য হয়ে যাওয়াতে এই সরকার এখনও যেভাবে একটু ব্যলেন্স রেখেছে যে কেবল চীন নয় (যদিও একটু বেশী নির্ভরতার) তবুও পশ্চিমের সাথেও পাশাপাশি যোগাযোগ ও লেনদেন সম্পর্ক একটা রেখে চলে। কিন্তু এটাই আর তখন একেবারেই থাকবেই না। একপেশে হয়ে সরকার একেবারেই সবকিছুর জন্য চীন-মুখি হয়ে বা চীনের কোলে উঠে যাবে। পশ্চিম থেকে পুরাটাই বিচ্ছিন্ন হয়েই বিকশিত হতে থাকবে! যেটা আমেরিকার একেবারেই কাম্য নয়!
    অনেকে আবার  একটু পাকামো করে এখানে ভারতকে টেনে তাকে ক্রেডিটটা দিতে চায় যে ভারত দীর্ঘদিন থেকে এমন ঘ্যানর ঘ্যানর করলেও বাইডেন প্রশাসন এটাকে গুরুত্ব দেয় নাই। সেটাই নাকি এখন এই ডিসেম্বরে এসে পিটার হাসের আমল পেয়েছে।
    এক্ষেত্রে আমাদের পালটা বক্তব্য হবে তাহলে – এর মানে হল “কি করিলে কি হইবে” সেসব পুর্ণ হোমওয়ার্ক সবার আগে  সম্পন্ন না করেই বাইডেন প্রশাসনের এসব আজরা জেয়া বা -ডোনাল্ড ল্যু রা মাঠে নেমেছিল??? আচ্ছা এসব লোকগুলো কি ফাজলামো না সিরিয়াস কাজ করতে এসেছিল?? যারা হোমওয়ার্ক শেষ না করেই সিদ্ধান্ত নেয় কাজে নেমে আসে তাদেরকে আমরা কি বলবো???

    কাজেই দেখা যাচ্ছে এই বয়ানও সুবিধাজনক হল না। তাই আরেক বয়ানের হদিস পাওয়া যায়। সেটা হল প্রধানমন্ত্রীর সন্তানকে মানি লন্ডারিং মামলায় আটকে চাপ দিলে সেটা বাইডেনের আমেরিকার জন্য অব্যর্থ অস্ত্রের মত কাজে দিবে, এটাই নাকি মনে করা হয়েছিল। কিন্তু  প্রধানমন্ত্রীর এজেন্ডা-ক্রম এর ভিতরে সন্তানকে বাঁচানো  – এটাকে তিনি কোন এজেন্ডাই করেন নাই বা  রাখেন নাই। তাই আজরা জেয়াদেরও কপাল ফুটা হয়ে হাজির হয়!  মানে হাসিনার পরিকল্পনার কাছে তারা সবাই হেরে যায়!
    এটা সত্য-মিথ্যা যাই হোক বরং আমরা দেখেছি হাসিনা সরকারের সবার আগেই প্রায়োরিটি ছিল যে – নির্বাচন-সম্পন্ন হয়েছে দাবি করে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে দেখানো। একাজকেই প্রথম ধ্যান-জ্ঞান করে নেমে পড়া। কারণ, এটাই হল তাঁর সব ক্ষমতার ভিত্তি না শুরু! কথা সত্য। কিন্তু তাহলে কি এরপরে সন্তান বাচানোর ইস্যু আসবে?  না তাও নয় তিনি তা করেন নাই; আগেই বলেছি এটা এখন তাঁর এজেন্ডাতেই নাই। আর এতেই বাইডেন প্রশাসনের কুতুবেরা নাকি বোবা হয়ে যায়! মানে এই প্রশাসন হাতে -বার্গেনিংয়ের বুটি – শুন্য হয়ে সব অকেজো হয়ে যায়! আর এটাই নাকি পিটার হাসের ক্রমশ নিশ্চুপতা!!!!! এর সত্য-মিথ্যা আমরা নিশ্চিত নই। তবে সন্তান বাঁচানোকে কোন প্রায়োরিটিতে না রাখার সিদ্ধান্তই সফল ও কার্যকর!
    তাহলে হাসিনার এরপরের বা সেকেন্ড প্রায়োরিটি কি?

    হাসিনার দুঃচিন্তা কি নিয়েঃ
    বলার পেক্ষা রাখে না হাসিনা নিজের এই সেকেন্ড প্রায়োরিটি সফল হবে কিনা এনিয়ে চিন্তিত। যদিও কোনভাবেই সেটা বাইডেন আবার নয়া সরকারের ক্ষমতার উপর চাপ দিতে পারে – এটা তা নয়! এটা আন্দাজে ঢিল ছোড়া আর যার মূল লক্ষ্য হতাশ কর্মীদের মনোবল খাড়া করা। এই অ্আন্দাজি কাজ এটা আত্মঘাতিমূলক! যেখানে বিরোধীদের সকলের কাজ এখন নিজেদেরকেই সঠিকভাবে মুল্যায়ন, কি কি ভুল হয়েছে এটা খুজে দেখে স্বীকার ও কারেকশন করে নেয়া সেখানে চাতুরি উলটা নেগেটিভ ভুমিকায় হাজির হবেই!
    তাহলে হাসিনার সেকেন্ড প্রায়োরিটি বা দুঃশ্চন্তা কি নিয়ে?

    এই পিটার হাস বা বাইডেন প্রশাসন স্যাংশন-নিষেধাজ্ঞা এটা এখন ক্রমশই অকেজো দুর্বল হয়ে যাবে। সেকথায় আরেকটু বিস্তারে আসব।
    এর আগে, নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করতে সক্ষম হলেও এই ২০২৪ সালেই হাসিনার জন্য অন্তত দুইটা বিপদ বা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। সবচেয়ে বড় বিপদের ইস্যু হল দেশের অর্থনীতির বেহাল – এই হাল! এটাই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ তার সামনে। পড়িমরি অবস্থা! এটা তিনি জানতেন তাই অনেক আগেই বলেছিলেন আমেরিকা নাকি দেশে দুর্ভিক্ষ আনবে।

    গত ৯ ডিসেম্বর কালের কন্ঠের এই শিরোনাম ছিল মার্চের দিকে দুর্ভিক্ষ ঘটাতে ষড়যন্ত্র হচ্ছে – গোপাল্গঞ্জে শেখ হাসিনা। কিন্তু কেন বলেছিলেন অথবা এর ঘটনা পরম্পরা কি?
    এর একেবারে প্রথমে বা শীর্ষে আছে আপাদমস্তকে চোর একটা শ্রেণী। এটা ঠিক ধনী-গরীবের ধনি শ্রেণী বলতে যা বুঝাই ঠিক তা নয় যে যেকোন সরকারের বিরুদ্ধে যেমন অভিযোগ থাকে যে সরকার ধনীদের পক্ষে কাজ করে গরীরসহ বাকি দেশের সকলকে ডুবিয়েছেন। বরং এরা হোল চোর-লুটেরা আর হাসিনাকে এমন চোরদের উপর ভরসা করেই নিজ ক্ষমতা-শ্রেণী সাজাতে হয়েছিল। হাসিনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বা খামতির দিক হল তাঁর অবস্থান ঠিক রাজনীতি না, প্রতিহিংসা! বাবার হত্যার প্রতিশোধ! তাই আকন্ঠ নিমজ্জিত চুরির সুবিধা খাওয়া একটা শ্রেণী যারা জিন্দাবাদ দিয়ে হাসিনার চোখবুজা সমর্থক সেজেছে। হাসিনা তাদের আনুগিত্য কিনেছে। অথচ প্রশাসনের ভুল পরামর্শে হাসিনা যখন তেলের দাম এক লাফে দেড়্গুণ বাড়িয়েছিল এই আকন্ঠ লুটেরারা সবার আগে সকলে মিলে মানে তারা প্রায় সকলেই ব্যাংক ঋণএর ডিফল্টার তারা কব্জায় থাকা সকল টাকা একসাথে ডলারে কনভার্ট করে দেশ ছাড়তে ততপর হয়েছিল। এতে সৃষ্ট যে ডলারের চাহিদা এটা একেবারেই কৃতিম, স্বাভাবিক অর্থনীতিতে যে ডলার লাগে সেই চাহিদা নয়। আর আমাদের অর্থনীতি এই সীমাহীন যোগান দিতেও সক্ষম ঠ্যাকার কোন কারণ নাই। এই ভারসাম্যহীনতাকেই এই এলোমেলো দশা আমরা বলছি দেশের অর্থনীতির বেহাল অবস্থা। অর্থাৎ হাসিনা নিজেই যে অর্থনৈতিক শ্রেণীর উপর ভর করে তার প্রতিহিংসা বা বাবার নাম প্রতিষ্ঠার কাজ হাতে নিতে চেয়েছিলেন সেটাই তার আসল শত্রু!
    তাহলে এখন হাসিনার চ্যালেঞ্জটা কি? তিনি চিন্তিত কেন?
    সোজা কথায় দুইটা কাজ তাকে করতেই হবে বা অর্জন করতেই হবে। এক নগদ (ক্যাশ) ডলার ঋণ যা কমপক্ষে দশ বিলিয়নের আশেপাশে। যদিও তাঁর আসল প্রায়োরিটি অর্থে প্রধান বিষয় হল, আইএমএফ এর কাছ থেকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে একটা পজিটিভ বা ভাল রিপোর্ট। মনে রাখতে হবে বিদেশী পুঁজি বাজারের কাছে কোন দেশের অর্থনৈতিক হাল মানে এর সম্ভাবনা-সংশয় নিয়ে (সেই ১৯৪৫ সালে প্রথম আইএমএফ এর জন্মের পর থেকে এপর্যন্ত) আইএমএফ এর দেয়া রিপোর্ট বাজারের কাছে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য, আন-বায়াসড রিপোর্ট বলেই মনে করা হয়। যদিও অনেকে ভুল্ভাবে মনে করে থাকেন এমন রিপোর্ট না, যেন আইএমএফ এর কাছ থেকে পাওয়া ঋণই আসল বিষয়। অবুঝ কমিউনিস্টেরা এই বোকা বুঝ তৈরি করেছে। দেশ অর্থনৈতিক সংকটে পড়লে আইএমএফ এর রিমেডি বা প্রতিকার বাতলে দেয়। আর এটাকেই কমিউনিস্টেরা হুদাই শর্ত দিল কেন বলে অবুঝ হৈচৈ শুরু করে থাকে। অথচ লক্ষ্য করলে দেখা যাবে কোন দেশের এমন অরররথনৈতিক দুর্দশায় যদি আইএমএফ এর হিসাবে প্রতিকার-বুদ্ধিতে ২০ বিলিয়ন ডলার দরকার হয় তবে আইএমএফ নিজে ছয় বিলিয়নের বেশী দেয় না। অর্থাৎ আইএমএফ এর লোন দেয়াটা মুখ্য না ওর রেকমেন্দেড করণীয় পরামর্শটাই মুখ্য। এটা ২০১৮ সালে পাকিস্তানের ইমরানের ক্ষেত্রে কি হয়েছিল সেই উদাহড়ণ মাথায় রেখে বলছি। চীন পুরা ২০ বিলিয়ন একাই দিতে চেয়েছিল, ইমরান নেন নাই। আইএমএফ ৬, চীন ৬ আর বাকিটা সৌদি (তেল শোধনাগার প্লান্ট) থেকে এভাবে নিয়েছিলেন। কারণ বাজার এসব পরিস্থিতিতে একমাত্র প্রফেশনাল বিশ্বাসযোগ্য আইএমএফ পাকিস্তানের অর্থনীতির অলিগলিতে ঢুকে সব দুর্বলার কথা জেনেছে কিনা।
    অদিকে এখন বলাই বাহুল্য আইএমএফ এর এক নম্বর শর্ত হবে চোর শ্রেণীর ইচ্ছাকৃত খেলাপী ব্যাঙ্ক ঋণ উদ্ধার করে নিয়ে আসো।  ডলারের দুধরণের বা নানান রেট বন্ধ কর। সরকারী-ব্বসরকারির মধ্যে একদুই টাকার ফারাক এমন স্থিতিশীল ডলারের মূল্য-হার ফিরিয়ে আনতেই হবে। এটাই মূল জিনিষ। অতেব নগদ ডলারের ঋণ যোগাড় আর তা নিয়ে এরপর আইএমএফ এর প্রতিকার-পরামর্শ পালন শেষ করে আইএমএফ এর কাছ থেকে ভাল অর্থনৈতিক অবস্থার একটা সার্টিফিকেট যোগাড় – এই হল হাসিনার দুই মাথা ব্যাথার নাম!
    দুটাই কঠিন কাজ!

    চোর শ্রেণীর ইচ্ছাকৃত খেলাপী ব্যাঙ্ক ঋণের অর্ধেক্টাও কি উদ্ধার করতে পারবেন?  মনে রাখতে হবে এরাই কিন্তু হাসিনার সমর্থক ও পোষ্য শ্রেণী; মানে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে নামার মত কাজ এটা! কাজেই ………!!!

    দুই বা দ্বিতীয়টা হল চীনের কাছ থেকে নগদ ডলার ঋণ আনা! কিন্তু চীন কি হাসিনার উপর আস্থা রাখবে? হাসিনা বিনিময়ে চীনকে সবকিছু দিতে রাজী থাকলেও চীন আপত্তি করতে পারে এই বলে যে তুমি তো বারবার কথা দিয়েও ভারত-প্রেমি! তাই আস্থা নাই!

    এখানে আমরা একটা কথা মনে রাখতে পারি যে এবারই প্রথম হাসিনা আমেরিকার চাপ সামলানোর জন্য ভারত-নির্ভর নয়। যেটা অন্তত ২০১২ সাল থেকেই হাসিনার ভারত-নির্ভরতার মূল কারণ! যেটা এবারই ভারতের আমেরিকার কাছে কোন সুপারিশ করেছে আর হাসিনা এর বিনিময়েই ক্ষমতায় তা নয়। কাজেই এবার ভারতের স্বার্থ নিয়ে পরে দেখব মনে করার সুযোগ হাসিনার আছে।  আর সেই লিভারেজ ব্যবহার করে সে চীনকে সন্তুষ্ট করতে লেগে পড়তে পারে! চাইকি এজন্য এবার যদি হাসিনাকেই এক নম্বর ভারত-বিরোধী ভুমিকায় দেখা যায় তাতে অবাক হবার কিছু নাই! যদিও কি হয় কি দাড়ায় সেটা আমাদের বাস্তবে দেখে বুঝতে হবে।

    আর এসব কিছুর শেষ কথাটা কীঃ
    শেষ কথাটা হলো – দেশের অর্থনীতির বেহাল দশা, নিয়ন্ত্রণহীন মুদ্রাস্ফিতিতে গরীব মানুষ ক্রয়ক্ষমতা না হারিয়ে ফেলে; খাদ্য ক্রয় করা টিকে থাকার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলার আসল নাম হল দুর্ভিক্ষ – এটা যে আমরা না ভুলি! বিরোধীদলেগুলো যত দ্রুত ঐ আমেরিকা আসতেছে – এই মিথ্যা ত্যাগ করে বাস্তবে ফিরে আসে এটা প্রথম কাজ্জ। এরপর হাসিনার চ্যাক্ষমতার চ্যালেঞ্জ বা দেশের অর্থনীতির বেহাল অবস্থাটার গুরুত্ব বুঝতে পারে আর তা থেকে করণীয় নির্ধারণ করতে পারে এবং তা ইতিবাচকভাবে এটাই হতে পারে তাদের বেরিয়ে আসার পথ! 

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ   জানুয়ারি   ২০২৪,

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে

    আমরা কী জানি না,
    আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে

    গৌতম দাস
    https://wp.me/p1sCvy-5i1

    খুবই তাতপর্যপুর্ণ হিন্দুস্তান টাইমসের এই কার্টুন যা ছাপা হয়েছে এক রিপোর্টের সাথে। সারকথায় যা I WON! আর  BANGLADESH LOST! মানে হল  ইন্ডিয়ান অন্তত এই মিডিয়া আর হাসিনার সাথে নাই! 

     

     

    আমি বিরক্ত! যারপরনাই বিরক্ত! আমরা কী জানি না,
    আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে? তাহলে?
    [যারা মনে করেন – “আমেরিকা পালাবে? আমার বিশ্বাস হয় না!” – আমি তাদের ধারণাকে সম্মান জানাচ্ছি। আর আপাতত আমরা দেখি ঘটনা কোন দিকে যায়। এর আগে পাশাপাশি থাকতে আমি অসুবিধার কিছু দেখছি না।]

    হাসিনা তো এই প্রথম নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করল না, এসব তো সে আগেও করেছে ফলে সেদিক থেকে নতুন কিছু না, সেসব। ফলে আমাদের অজানা নয়!

    কিন্তু বিরোধীরা মানে, যেমন ধরেন সুনির্দিষ্ট করে ফেসবুক-ভিত্তিক কিছু সরকারবিরোধীদের কথাই যদি ধরি – এদের মধ্যে কিছু লোক যারা বাস্তবতা ফেস করতে পারছেন না।  আচ্ছা বলেন ত – আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে এটা কী আমরা জানি না!  দেখি নাই কখনো? তাই কী এখন  অনেকে বুঝতে পারছে না যে কী হইতেছে! আমাদের উচিত হবে আমেরিকা পলাইতে নিলে এর আগে (২০১৮ নির্বাচনের পরে) আমরা কী দেখেছিলাম সেই স্মৃতি হাতড়ানো! সব খুঁজে বের করা।

    এমনিতে যারা সহজে ভাবতে পারছেন না, সমস্যা তাদের একটা না অনেক। এই সমস্যা মনোগঠনগত! যেমন বাস্তব কী, রিয়েল [real]  কি – এটা তাদের কাছে অস্পষ্ট। মনে করেন বুঝেছেন কিন্তু আসলে না। আইডিয়েল কেই তারা রিয়েল মনে করেন তাই এরা কনফিউজড বা বিভ্রান্ত, আইডিয়াল [ideal] এর সাথে রিয়েলের ফারাক করে বুঝতে হবে।  আইডিয়েল মানে যা হওয়া উচিত জ্ঞান করে ব্যাপারটা জেনেছিলেন বা শিখেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয় নাই। কারণ বাস্তবে যা হয় ওটাই তো সত্যি, বাস্তব অর্থে সত্য [reality]!
    অথচ আমাদের সরকারবিরোধী সমর্থকেরা এদের অনেকে হল এমন, যা তারা দেখতে চায় না যেন সেটা বাস্তবে ঘটতে পারবে না বা ঘটেই নাই; ঘটবে না – এমন মনে করা ব্যক্তি বা চিন্তা করে এমন ব্যক্তিত্ব!
    এটাকেই অনেকে পুষ্ট না-হওয়া মানসিক বিকাশ বলবেন হয়ত তা বলুক!  তবে  এদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটা দেখা যায় যখন সাময়িক পরাজয় আসে! আর তাতে এরা আরো বাস্তবতা বিমুখ হতে শুরু করে। আর এতে সাধারণত সবচেয়ে ক্ষতিটা হয়, এরা আবার দ্রুত উঠে দাড়াতে পারে না!

    ভগ্নদুত কীঃ
    পুরানা বা সংস্কৃত ঘেষা বাংলায় একতা শব্দ আছে ‘ভগ্নদুত’ বলে। আগেরকার রাজাদের দিনে, যেখানে কোন যুদ্ধ চলতে তা থেকে রাজধানী বা রাজার আবাসস্থল অনেক দুরেই হত। এখন সেসব যুদ্ধের খবরাখবর দেয়া-নেয়ার জন্য বিশেষ দক্ষ বিশ্বস্ত রাজদুত ছিল। তাদের মাধ্যম্বের রাজা যুদ্ধের খবরাখবর নিতেন। এখন কোন যুদ্ধে রাজার পক্ষ যদি পরাজিত হত তো সেই খবরও তো রাজার কাছে পৌছাতে হত, কেবল সাফল্যের খবরগুলোই রাজার কাছে পাঠাত তা তো না! কিন্তু সমস্যা বাধত তখনই!
    দুনিয়াতে মাথাগরম গাধার মত বোকা রাজার সংখ্যাও তো কম ছিল না। তো তেমনই রাজারা অনেকে যে কান্ডটা করে বসত তা হল, রাজার পক্ষের পরাজয়ের বার্তা বয়ে আনতে যে রাজদুত, রাজা পরাজয়ের বার্তা শুনে তাকেই খুন করে ফেলত। যেন বিরাট বিরত্ব দেখিয়েছেন ভাবত। আর এতে মানে দাড়াতো যেন দুত নেহায়ত খবরটাই ক্যারিয়ার বা বাহক নন। ঐ বাহক-ই যেন রাজাকে যুদ্ধে হারিয়েছেন! মানে হল, পরাজয়ের বার্তা যে বয়ে আনছেন আর রাজা যুদ্ধে হেরেছেন যে কারণে এদুটা যে একই জিনিষ না তা এসব গাধার বুদ্ধির রাজারা বুঝতে চাইত না। আর কিছু চামচা পারিষদ এতে তাল দিত যে দেখেছো তাদের রাজা কত সেনসেটিভ এই বলে তেল মারত।
    তো বাংলাদেশে এখন হয়েছে তাই। যারা বিরোধীদের খবর স্বীকার করে কথা বলছে তাদেরকেই দায়ী করা লোকের সংখ্যা বাড়ছেই। ভগ্ন দুত-কে হত্যা করাটাই এখন বীরত্ব! আশা করি এখন এমন বীরত্ব তারা ত্যাগ করবেন!

     

    আচ্ছা, আমেরিকা হেরে গেলে পরে, কী করে থাকেঃ
    প্রথম কথা হল, আমেরিকা হেরে গেলে কী করে? মানে পলায় কেমনে?
    তা আমরা কী আগে দেখি  নাই? মানে বলতে চাচ্ছি, এই ২০২৪ সালের আগে দেখি নাই?

    যেমন ধরেম ২০১৮ সালের নির্বাচনে, যখন বিএনপিকে সাত আসন পাইতে দেওয়া হয়; বিশেষ করে সে নির্বাচনের পরে কী হয়েছিল?
    সাহস করে নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন তো দেখি, কার আশ্বাসে বিরোধীরা সেবার নির্বাচনে গেছিল? সেবার হঠাত বিরোধীরা “নির্বাচনে যাবার কৌশল” – এপথ নেয় নাই নিশ্চয়!
    আমেরিকার কোন আশ্বাস ছাড়া তো সেটা হয় নাই! যেটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যাই হোক! এখন হতেই পারে সে আশ্বাসের বাহক ছিল কামাল হোসেন! অথবা বিরোধীদলগুলো নিজেই যে যার মত বাড়তিভাবে আমেরিকান কর্তা বা দুতাবাসের সাথে কথা বলে নিয়েছিল! মিনিমাম এতটুকু না হলে তো সেবার নির্বাচন কৌশল ওমন হয় নাই! তা বলাই বাহুল্য!

    তাহলে এখন আসেন। ঐ নির্বাচনের দিন সকালে উঠে যখন সকলে জানতে পারল যে ভোট আগের রাতে হয়ে গেছে – এমনকি জেনেছি তখনকার আমেরিকান রাষ্ট্রদুত রবার্ট মিলার [Earl R. Miller]তিনিও এর বাইরের নন! এখন বলেন তিনি কেন আম জনতার মত সকালে উঠে জানলেন? আগে কেন জানতে পারলেন না?
    আসলে কথার পিঠে কথা আসে। এই রবার্ট মিলার কোথা থেকে দৃশ্যপটে আসলেন? রাষ্ট্রদুত তো ছিল মার্শা বার্ণিকাট। হা, আমাদের ২০১৮ সালের নির্বাচনের ঠিক ৪২ দিন আগে আমেরিকা, বাংলাদেশে তার রাষ্ট্রদুত বদল করেছিল। বার্ণিকাটের বদলে মিলারকে এনেছিল।
    আর পাঠক এটা নিশ্চয় জানেন আমেরিকা কখন মাঝপথে তার রাষ্ট্রদুত বদল করে দেয়? সরকারের রানিং পলিসি আচমকা বদলে গেলে মানে আমেরিকা বদলালে  তারা পরিস্থিতি সামলাতে সাথে রাষ্ট্রদুতও বদলে দেয়। এমনকি এর আগেও ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের ঘটক রাষ্ট্রদুত বিউটিনিস-কে ১/১১ ঘটনার ছয়মাসের মধ্যে প্রত্যাহার করে বদলে দিয়েছিল আমেরিকা!  তাহলে আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে – এটা তো আমরা কিছু এক্সপেরিয়েন্স রাখি! অভ্যস্ত আমরা। তাহলে এখন বাস্তবতাকে মানতে না চাওয়া কেন?
    বরং, এখনকার প্রধান করণীয় তো বাস্তবতা বা রিয়েলিটিকে আপন করে নিয়ে আবার উঠে দাড়াতে চান যারা তারা মুল্যায়নে বসেন নয়া রাস্তা খুজেন।

    কাউকে দেবতা বানানোটা নিজেরই ভুলঃ
    এধরণের বহু বাণী আমরা জানি যে – কারো উপর এত আস্থা রেখেন না যেন সে নিজেই নিজেকে দেবতা গণ্য করতে থাকে। আমাদের এমন অসচেতনাতেই আমাদের কেউ কেউ আমেরিকাকে দেবতা গণ্য করে নিয়েছিল। আর বলাই বাহুল্য সেটা বিরাট ভুল। আর তা বুঝতে আর এই ভুল কাটাতেও তাদের বেশী সময় লাগছে বা লাগবে। এর একনম্বর ভুলটা হল, আমেরিকা হল মানবাধিকার-গণতন্ত্রের রক্ষক – পাহারাদার গণ্য করার পর্যায়ে নিয়ে গেছিলাম বুঝে না বুঝে কেউ কেউ।  এর বাস্তব দিকটা বুঝতেই চাই নাই। এভাবে বুঝতেই চাই নাই যে মানবাধিকার-গণতন্ত্রের রক্ষক আমেরিকা যে নয় তা সে নিজেও জানে। সে এসেছিল এটাকে ব্যবহার করতে, এখনকার প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতিতে এটাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন; এতটুকুই। আমরা কী জানতাম না যে গত পনেরো বছর ধরে আমেরিকান সমর্থনেই জঙ্গী তাড়ানোর অজুহাতে হাসিনা সরকার দানব হয়েছে? এমনকি দুমাস আগেও ইইউ এর নেতারা (অন্তত তিনটা দেশ) তর্ক করেছে যে হাসিনা তো ভালই নাকি জঙ্গী তাড়িয়েছে! সুতরাই তাকে সরাতে চাই কেন আমরা? হাসিনা যে কিছু হলেই জঙ্গী তাড়ানোর নামে তার সব রাজনৈতিক-বিরোধীদের নির্মুল করে দিয়েছে এটা কী আমেরিকা-ইইউ জানত না, দেখে নাই?
    কাজেই আমাদের পুরা ভার ছেড়ে দিয়ে এত আস্থা রাখা কেন? এজন্যই গত দুবছরের আমাদের মাঠের ততপরতার উপর  আমেরিকা-ইইউ এর যদি নয়া কোন সমর্থন দিয়ে থাকে সেটাকে তাদের কাফফারা হিসাবে দেখা আমাদের জন্য সবচেয়ে সঠিক হত।  যদিও বড় বিরোধী দলগুলো এপথের চেয়ে বরং পুর্ণ ভক্তি দেখিয়ে “আমরা এবিষয়ে আমেরিকান অবস্থান সমর্থন করি” ধরণের বয়ান দিয়ে গেছে আমরা দেখেছি।

    তবে এমন চিন্তার ভুল বাংলাদেশে বহুদিনের। যেমন ধরেন, বাংলাদেশ সার্বভৌম কিনা! এনিয়ে সবচেয়ে বেশী করে নিজের অজ্ঞতা দেখিয়ে থাকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা। আর এদেরই প্রভাবে বেশ খানিকটা গত দুবছরের মাঠের বিএনপি।
    যেমন ধরেন, জাতিসংঘকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, আচ্ছা বাংলাদেশ কী সার্বভৌম? তাতে ঐ কর্তা বলবে অবশ্য অবশ্যই। চাই কী তিনি জাতিসংঘের ম্যান্ডেট খুলেও দেখায় দিতে পারেন যে জাতিসংঘের চোখে বাংলাদেশ সার্বভৌম। কিন্তু এবার যদি সেই কর্তার কাছে আবার দাবি করেন যে আমি যে আমাদের দেশের জন্য যেকোন সার্বভৌম সিদ্ধান্ত  নিতে যে ক্ষমতা লাগবে সে ক্ষমতা আমারটা আমাকে বুঝায়ে দেন! তাহলে কী হবে?
    এবার সেই কর্তা বলবে আমি বিনয়ের সাথে বলছি, আসলে সার্বভৌম নিজেই হয়ে উঠতে হয়, আপনার সার্বভৌমত্ব অন্য কেউ গুনে গুনে আপনাকে আপনার সার্বভৌমত্ব বুঝিয়ে বা ফিরে দিতে পারে না! মানে নিজেই উঠে দাড়াতে হয়।

    এবারও তাই হয়েছে, আমরা বুঝেছি উল্টা। আর ওদিকে আমেরিকা চেয়েছিল আপনাদের মানবাধিকার-গণতন্ত্র ফেরত দিবার অজুহাতে এই অঞ্চলে তার কিছু এজেন্ডা ছিল ভেবেছিল তা কতটা পরিপুরণ করে নিতে পারে।  কিন্তু আপনারা সেদিকটা না খেয়াল করে যারা যারা তাকে দেবতার আসনে বসিয়ে ছিলেন তাদের এখন সেখান থেকে বের হতে একটু সময় লাগবে, লাগছে হয়ত। কিন্তু বের হতেই হবে কারণ এটাই বাস্তবতা!
    আবার এখন এসব কথা তুলছি বলে ফিরে এক প্রান্ত থেকে উলটা আরেক প্রান্ত মানে চীনকে দেবতা মানতে শুরু করে দিয়েন না!

    তাহলে এখন কী হবেঃ
    এখন যা হবে তা সবই মূলত রুটিন। সারকথায় সবাই জানাবে হাসিনা খুবই খারাপ! অন্যজনও বলবে হা সে তো অবশ্যই খারাপ!
    হাসিনা আমাদের উত্তর কোরিয়া বানায়ে ছাড়বে অথবা বাংলাদেশ একদলীয় দেশ হয়ে যাবে ইত্যাদি কথা উঠবে।
    হ্যা অবশ্যই সন্দেহ নাই। কার্যত তাই হওয়া শুরুওও হয়েছে। যদিও এর কোন প্রভাব হাসিনাকে থামাবে না বা তারা থামাতে আসবেও না।

    তবে এবার কথিত যে সংসদ কায়েম হল, তাতে ৬১ জনের বেশী স্বতন্ত্র হিসাবে বিজয়ের দাবিদার। এদের মধ্যে আবার ৯৫% এর মত হবেন যারা এখনও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কমিটির সক্রিয় সদস্য। মানি সক্রিয় আওয়ামী লীগার! তাই আগামিতে আর জাতীয় পার্টি নয়। বিরোধীদল বানাবার এবারের নয়া ফর্মুলা হবে এসব স্বতন্ত্র (আধা- মূলত আওয়ামী লীগারেরা) এরাই এবার এক সংসদে বসেই সংসদীয় বিরোধী-জোট বানায় নিবে। আর এবাই বিরোধী দলের আইনি মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা দাবি করবে। এরকমই একটা ‘বিরোধীদল’ হতে যাচ্ছে খুব সম্ভবত।  এতে হাসিনাও বাঁচবে; আর কত! বার বার এই নির্বাচন আসলেই দরাদরি  আর জাপা তারা আজকাল অনেক ডাট মারে এমনকি মাঙনা বিদ্যুতকেন্দ্র রেন্টাল বিদ্যুৎ এর মালিকানা চেয়ে বসে; সেগুলো আর কত হাসিনা সহ্য করবেন?  এছাড়া এদের জন্য হাসিনাকেও ভারতের হাত-পা ধরতে হয় যেন (জাপা) কাদেরদেরকে একটু বলে বা বকে দেয়! তাই এবারই সেসবের বালাই শেষ। এখন থেকে সবাই স্বাধীন!
    আর বাকিরা  মানে বিদেশিরা কি করবে? তারা সকলেই একটা করে বিবৃতি দিয়ে তাদের দায় শেষ করবে।

    আমেরিকান বিবৃতিঃ
    রুটিন যেভাবে বলে থাকে – মার্কিন  পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, “যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে একমত যে, এই নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু হয়নি। নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ না করায় আমরা হতাশ”। ফলে বুঝতেই পারছেন আমেরিকা এখন কী সুবিধায় আছে। মানে হল এখন উলটা দাঁড়ালো যেন বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় আমেরিকা হতাশ! কী তামসা! সাথে বিরোধীদলের প্রতি পরামর্শও রেখেছে আমেরিকা – “সব দলের প্রতি সহিংসতাকে পরিহার করারও আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটন” – কিন্তু কেন এমন পরামর্শ?
    কারণ এখন আবার বিরোধীরা কোন আন্দোলন করতে গিয়ে যদি হতাহত খুনোখুনি মৃত্যু হয় তাই, আগেভাগেই আমেরিকা হাত ধুয়ে নিল যে আমেরিকা কিন্তু এতে নাই!

    আরও আছে কিছু কথার কথা, নিচে দেখেনঃ

    “যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে একটি অবাধ ও মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় (ইন্দো–প্যাসিফিক) অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অভিন্ন
    লক্ষ্যে কাজ করা, বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষা ও নাগরিক সমাজের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা এবং দুই দেশের
    জনগণের মধ্যে ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

     এর প্রথমে আছে বাইডেনের হারু প্রোগ্রাম IPS বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি। যেটার বা এই ব্যর্থতার নেতা স্পেশালিস্ট  ডোনাল্ড ল্যু এর গলার এই হারু-মালা চড়ায়ে দেয়া ছাড়া এর আর কোন মূল্য নাই। বাইডেনের IPS এর ঘন্টা বেজে গেছে। এই কঠিন কথাগুলো বলছি এজন্য যে একবার তাকায় দেখেন যে এগারোটা দেশ হাসিনাকে তাঁর বিজয়ে গতকালই অভিনন্দন জানিয়েছে এই প্রথম সাত রাষ্ট্র কারা?

    শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানালেন যে ৭ দেশের রাষ্ট্রদূতেরাঃ
    লিঙ্ক এখানে
    । এই সাত দেশের মধ্যে চীন, রাশিয়া, ভুটান ও ভারত – এই চারজন হল হাসিনা বা চীনের ঘরের লোক! মানে এরা এ তো হোনাই থা ধরনের! কিন্তু বাকি তিন রাষ্ট্র ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কা – এরা তো এখনকার খোদ আমেরিকার প্রত্যক্ষ স্ট্রাটেজিক প্রভাবের দেশ! যার মধ্যে আবার ফিলিপাইনো???? কি সাংঘাতিক?? কোল্ডওয়ার যুগের ফ্যাসিস্ট জেনারেল মার্কোস এর ছেলের ফিলিপাইন? মানে মার্কসের ছেলে যার বর্তমান প্রেসিডেন্ট! শুধু তাই না! এই যে একটু আগে আমরা আমেরিকান বিবৃতিতে একটি অবাধ ও মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় (ইন্দো–প্যাসিফিক) অঞ্চল প্রতিষ্ঠার খায়েস পুনঃব্যক্ত হতে দেখলাম সে খায়েসের এখনকার প্রধান রাষ্ট্রই হল এই ফিলিপাইন। ফিলিপাইনকে দিয়ে আমেরিকা নিয়মিত চীনের সঙ্গে ফিলিপাইনের সমুদ্রসীমা বিষয়ক বিবাদ জীবন্ত রেখে চলেছে। তাহলে সেই ফিলিপাইন হাসিনার সমর্থনের প্রায় এক নম্বরে সমর্থন জানাতে এসে পড়েছে, সেটা কি কারণে? তাহলে বাইডেনের আমেরিকা কোথায়? তারা ফিলিপাইনকে এলাও করল কেন???

    সব আউলাইনা লাগতেছে! জেনারেল মার্কোসের ছেলে বর্তমান প্রেসিডেন্ট বংবং মার্কোস [Bongbong Marcos] আমেরিকার বাইরে এসে এ’কোন খেলা!!!

    আবার দেখেন বৃটেন। নির্বাচনের আগের তিনমাস আমার কান ঝালাপালা দেশি-বিদেশি মানবাধিকার কর্মীদেরকে বারবার তিনদেশের নাম শুনতে হচ্ছিল – বৃটেন (যুক্তরাষ্ট্র) ফ্রান্স ও জর্মানির। এদের কথা হল, হাসিনা নাকি ভালই জঙ্গি তাড়িয়েছে তাহলে আমরা হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি চাই কেন? ইত্যাদি। আর আজ দেখেন কী তামসা! রাত না পোহাতেই আমেরিকান বিবৃতি অনুসরণে সাথে সাথে বিবৃতি বাংলাদেশের নির্বাচন গণতান্ত্রিক হয়নি: যুক্তরাজ্য! মানে এরা সবদিকেই আছে লিপ সার্ভিস নিয়ে।
    আবার নিরুত্তর প্রশ্নো আছে। যেমন ধরেন এখন মানে আট জানুয়ারি তারা জানাচ্ছে  –নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠায়নি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা। অথচ এই খবরটা আগে মানে নির্বাচনের জানায় নাই কেন? বাংলাদেশে স্ব স্ব দেশের এমবেশী কী করছিল? অথচ নির্বাচনের পরে বলাতে এসব ভুয়া পর্যবেক্ষক তারা যা করতে এসেছিল এর সবটাই পুরণ করে ফেলেছে। এমনকি গতকাল বিকেলের সাংবাদিক সম্মেলন করে আরো বিভ্রান্তি ছড়ানো পর্যন্ত! আমরা এজন্য কাকে দায়ী করব?

    কিছুক্ষণ আগের, নয়া ১৯ দেশের অভিনন্দনঃ
    এই সমর্থন-অভিনন্দন গুলোর অর্থ হচ্ছে যে আপনাদের দেশে একটা নির্বাচন হয়েছে কিনা আমি আগ্রহী নই। কিন্তু আমি আপনারদেশের সাথে ব্যবস্থা চাই। আর এই উনিশ দেশের মধ্যে আছে, সৌদি আরব আর জাপান। জাপান মানে? হা এটা চীনবিরোধী আমেরিকান সবচেয়ে বড় স্ট্রাটেজিক মিত্র! আমরা তাই জানতাম। অন্তত ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যু বা অন্তত এশিয়ায় আমেরিকার চীন বিরোধীতার প্রশ্নে। অথচ হায় হায় তাহলে এ আমরা কী দেখছি? কেন?  আরো মেট্রো রেল বা সমুদ্রবন্দর প্রকল্প!!! সব চীন পেয়ে যাবে এই ভয়ে? ভাগ পেতে?
     সৌদি নয়া তেলশোধনাগার প্রকল্প! বাকিটা পাঠক বুঝে নেন।

    আসেন এখন “জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক” প্রধানঃ
    এটা নতুন না যে জাতিসংঘের বইয়ে বা দলিলে যাই থাক, জাতিসংঘ গলা চড়ায় ততটা যতটা আমেরিকা তাদের চাবকায়! গত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশ গুম-খুন-অপহরণের রাষ্ট্র হয়ে আছে “জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক” প্রধান এর তো তাতে কোন খবর ছিল না। তবে গত একদেড় বছর আমেরিকা চাবকিয়েছে তাই তাদের কিছু চিৎকার শুনেছি। এখন “জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক” প্রধান – হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক; এটাই তার সম্ভবত শেষ চিৎকার!  যদিও জোশের ঠেলায় একটু বেশী বলে ফেলেছেন। বলেছেন, “পথ পাল্টান, সত্যিকার অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পরিবেশ তৈরি করুন”! 

    কথাগুলো শুনতে খুবই ভাল লেগেছে সন্দেহ নাই। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল হাসিনাকে কী পাগলা কুত্তায় কাটছে? তিনি এসব করবেন কেন? তার ঠেকা লাগছে? তার তো কোন ঠেকা নাই!

    তাহলে কী হবে, ঠিক কী বলতে চাইঃ
    কথা খুব সহজ! যার মাথা ব্যাথ্যা তাকেই ওষুধ খুঁজে আনতে হবে। সেই মুরোদও লাগবে! মুরোদ যার ক্ষমতা তারই হবে, তার কাছে ফিরে আসতে পারে তা!!!
    এভিন্ন সবকিছুতেই রুটিন বিবৃতিই চলতে থাকবে!

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০৯ জানুয়ারি   ২০২৪,

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com