Tag: India

  • লাদাখে ভূখন্ড হারিয়েও সেনা প্রত্যাহার, মোদির আপোস

    লাদাখে ভূখন্ড হারিয়েও সেনা প্রত্যাহার, মোদির আপোস

    লাদাখে ভুখন্ড হারিয়েও সেনা প্রত্যাহার, মোদীর আপোষ
    গৌতম দাস
    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    “India has no military capability to alter the situation”

    – Indian Gen. Panag

    [সার-সংক্ষেপঃ লাদাখ, ভারতের উত্তর-পুর্বে চীন-ভারত সীমান্তের নাম। গত ২০২০, মে মাস থেকে এই সীমান্তে চীন ও ভারত মুখোমুখি সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে বসেছিল। আর  ১৯৯১-৯৪ সালের সময়গুলোতে ভারত-চীন সীমান্ত আলোচনায় আপোষে চীন যেসব ভুখন্ড ভারতের অনুকূলে ছেড়ে দিয়েছিল, যা ভারতের (LAC) এলএসিতে পাওয়া ভুখন্ড মনে করা হয়, সেসব ভূখন্ড চীন মে মাসের ঐ সময়ে ফিরে দখল করে নিয়ে বসে গিয়েছিল।

    এই নিয়ে এক সামরিক সংঘাতে ১৫ জুন ২০২০ তারিখে ২০জন ভারতীয় সেনা নিহতও হয়েছিল। কিন্তু তা সত্বেও মোদি সেসময় সংসদে ও রেডিও বক্তৃতায় বলেছিলেন, “... neither has anyone entered Indian territory, nor is anyone present in Indian territory currently, and nor is any Indian post captured”। আসলে চীন গতবছর মে মাসের শুরু থেকেই ১৯৯১-৯৪ সালে ভারতকে ছেড়ে দেওয়া ভুখন্ডগুলোই পুনর্দখল করে বসেছিল। কিন্তু একথা সত্যি হওয়া সত্বেও ২০জন ভারতীয় সেনা হত্যা হওয়ার পরও মোদি অমন বিবৃতি দিয়েছিলেন। কেন?

    এর জবাব এখন পরিস্কার জানা যাচ্ছে। আসলে ১৯৯১-৯৪ সালে ভারতকে ছেড়ে দেওয়া LAC-এ পাওয়া ভূখন্ডগুলোই পুনরায় দখল কথার মানে হল এর আগের ১৯৫৯ সালের চীনের দাবিকৃত ভারত-চীন সীমান্তরেখা। এখন ভারত-চীন আলোচনায় ভারত ১৯৫৯ সালের চীনের দাবিকৃত ভারত-চীন সীমান্তরেখাকেই ভারতও তাঁদের স্থায়ী সীমান্তরেখা বলে মেনে নিয়েছে। উভয়পক্ষ এই ভিত্তিতেই সীমান্তে সেনা সমাবেশ ভেঙ্গে দিতে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা অনুসারে এর দুই পাড়ে নতুন সীমান্ত বরাবর সেনা প্রত্যাহার করতে সম্মত হয়েছে এবং ধাপে ধাপে সেটির বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

    সে অনুযায়ী, প্রথম পর্ব ছিল ‘প্যাংগং সো (Pangong Tso) লেকের দুই পাড় থেকে সেনা ও স্থাপনা প্রত্যাহার। গত ১১-১৯ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধান্ত মতই এই প্রত্যাহার কোনো ব্যত্যয় ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। আর ভারতের এই সীমান্তেরই এক সাবেক জিওসি লে জে পরাগ; এই ব্যাপারটাকে দেখে বলেছেন, … the “disengagement” is happening exactly as per China’s 1959 claim line because India has no military capability to alter the situation….it is “good for the long term peace” ।

    সোজা বাংলায়, আমাদের সামরিক মুরোদ নাই তাই চীনের দাবি মোতাবেক ১৯৫৯ সালের সীমান্ত আমরা মেনে নিয়েছি। এটা দীর্ঘস্থায়ী শাস্তির জন্য ভালই হয়েছে”। কিন্তু কেন ভারতকে এমন পাওয়া-ভুখন্ড ফিরে ত্যাগ করতে বা হারাতে হচ্ছে?]

    Ladakh Stand-Off: India & China, Pangong Tso withdrawal done

    একদম বেড়াছেড়া!

    পথ চলতে চলতে পথিক কখন কোথায় নিজের জামাকাপড় খুইয়ে এসেছে সে হুশই নাই! যখন খেয়াল হল তখন এক বেড়াছেড়া অবস্থা! কেন? কারণ এখন লজ্জা ঢাকে কী দিয়ে সে এক কঠিন সমস্যা। আরেকদিকে, কৌতূহলী আশেপাশের মানুষকে কিভাবে কেন এসব হল তার ব্যাখ্যাও দিতে পারছে না। কাজেই, এ এক বেড়াছেড়া অবস্থা বটে!

    বেড়াছেড়া শব্দটা কথ্য ভাষায় প্রচলিত শব্দ; তাই অনেকে একে ইনফরমাল শব্দ বলবেন হয়ত। তবু ‘বেড়াছেড়া’ শব্দটা আসলে খুবই এক্সপ্রেসিভ মানে, যা ঘটেছে তাকে এক শব্দে ফুটিয়ে তুলতে এক উপযুক্ত-প্রকাশক শব্দ। ইন্ডিয়া, মানে ভারতের মোদি সরকারের আজ এমনই বেড়াছেড়া দশা।

    কেন? কী হয়েছে??

    এবারে মোদির কাপড় খুলে নেয়ার অবস্থার শুরু বলা যায় গত ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে। লাদাখ – ভারতের ভাষায় তার উত্তরপূর্ব কোণের ভারত-চীন সীমান্ত যেখানে দুই দেশের সৈন্য মুখোমুখি হয়ে বসে আছে গত ২০২০ সালের মে মাস থেকে। ভারত (মিডিয়াও) এটাকে এক ‘অচলাবস্থা’ (standoff) বলে বর্ণনা করে এলেও চীনের কাছে ব্যাপারটা এমন অচল নয়। কারণ পরিস্থিতি ক্রমশ তার পক্ষেই এগিয়ে চলেছে। যেন – এবার ঘুঘু ধরা পড়েছে, অপেক্ষা কেবল তাকে কাচিয়ে উপরে তুলে পাকড়াও করার অবস্থা। এবং তাই হতে যাচ্ছে আসলে।

    কারণ অবশেষে মোদি চীনের কাছে ‘ভূখণ্ড হারিয়েছে’ স্বীকার করে নেয়ার পর উভয়পক্ষই যার যার সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে সম্মত শুধু না, তা বাস্তবায়নের প্রথম পর্যায়ও শেষ করে ফেলেছে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি। কথাটার মানে হল, চীন-ভারতের সীমান্তের যত জায়গায় সৈন্য সমাবেশ করা হয়ে আছে/ছিল তার একেকটা এলাকা থেকে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার শুরু হয়েছে। এরই প্রথম এলাকা ‘প্যাংগং সো’ নামে লেকের দুই পাড় থেকে প্রত্যাহার, যা গত দশ দিনে শেষ হয়ে গেছে। এখন পরের পর্বের প্রত্যাহার নিয়ে ফোর্স পর্যায়ে কথা বলা ও বাস্তবায়ন শুরু হবে।

    সেনা প্রত্যাহার কোথায় গিয়ে থামবে, নতুন কোন সীমান্তেঃ
    কিন্তু মূল প্রশ্ন : উভয়পক্ষ সৈন্য প্রত্যাহার করবে না হয় বোঝা গেল কিন্তু প্রত্যাহার করে কোথায় গিয়ে থামবে? অর্থাৎ কোনটাকে এখন নতুন সীমান্ত বলে উভয়পক্ষ মেনে চলবে? কারণ সব ফাটাফাটি সংঘাত বা মূল বিতর্কের উৎসই তো ছিল সেটাই!

    না, নতুন সীমান্তরেখাও এখন আর অমীমাংসিত নয়। লক্ষ করা যায়, চীন পা-ফেলে থাকে সাধারণত অনেক ক্যালকুলেশন করে। আসলে গত বছরের ৫ মে এর শুরু থেকেই চীন নিজের সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছিল ১৯৫৯ সালের এলএসি [Line of Actual Control, LAC] বা গৃহীত সীমান্তরেখা মেনে।

    যদিও কী মেনে চীন একাজ করছে তা কখনো প্রকাশ্যে বলেনি। কিন্তু “১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখায়” ফিরে যেতে বলে চলেছিল ভারতের সাথে সব মিটিংয়েই। আর এখনকার সমঝোতাও হচ্ছে সেই ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ মোদির ভারতের মেনে নিতে রাজি হওয়ার বিনিময়ে। কাজেই উভয়পক্ষের সৈন্য ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখার’ দুই পাড়ে যার যার দেশের সংলগ্ন অংশে গিয়ে বসবে। আর সেটাই হবে নতুন সীমান্তরেখা।

    এটাই সৈন্য প্রত্যাহারের ভিত্তি বলে মেনে নিতে মোদি রাজি হয়েছেন। যদিও মোদীর জন্য এখন এটাই বিরাট সমস্যা আর ইজ্জতের ব্যাপার যে পাবলিকের কাছে তিনি এই ‘ভূমি হারানোর আপস ও বিনিময়ের কথা কিভাবে বলবেন!

    পাঠক যারা কম সময় দিতে চান, কম বিস্তারে পড়তে তারা নিচের ছোট প্যারার অংশটুকু বাদ দিয়ে সরাসরি পরের প্যারায় চলে যেতে পারেন।

    ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ কী?
    একটা বড় তথ্য দিয়ে রাখি। ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ কথাটা মূলত চীনের প্রস্তাবিত একটা সীমান্ত ধারণা। কিন্তু তা উভয়পক্ষের সম্মতিতে আঁকা কোনো ম্যাপ – ঠিক তা নয়। এটা ১৯৫৯ সালে চৌ এনলাই ও নেহেরুর এ’দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার চিঠি চালাচালির ঘটনা যেখানে চৌ নেহেরুকে “ম্যাকমোহন লাইন” [McMahon line] মেনে সীমান্ত টানার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

    “ম্যাকমোহন লাইন” প্রসঙ্গে বেশি বিস্তারে যাব না। কমকথায় বললে,  এই লাইন টেনে ঝগড়া মিটাবার চেষ্টাটা ১৯১৪ সালের, তিব্বতকে নিয়ে। হ্যাঁ, তিব্বতকে নিয়ে।  কিন্তু তিব্বতের দুর্ভাগ্য হল, তিব্বত স্বাধীন নাকি চীনের অধীনে স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ এই নিয়ে বিতর্ক মাও-এর আগের চীনা-জাতিবাদী শাসক চিয়াং কাইশেকের আমলের। যদিও ভারতের দিক থেকে অনেকে সময় ধারণা দিবার চেষ্টা করা হয় যে কমিউনিস্ট মাও খারাপ ও এগ্রেসিভ বলে তিব্বত নিয়ে সমস্যা তৈরি করেছেন তিনি, ফলে দালাই লামাকে নিয়েও।

    অথচ ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। ম্যাকমোহন লাইন এর প্রমাণ। এটা ১৯১৪ সালের জুলাইয়ে ঘটনা যখন তিব্বত প্রদেশের সাথে এর সীমান্ত সংলগ্ন বৃটিশ-ইন্ডিয়ার কমন সীমান্ত ম্যাপ কী হলে উভয় পক্ষ তা মেনে নিবে সে আলোচনা চলছিল, এটাই সেকালের দশ মাস ধরে চলা সিমলা কনফারেন্স চুক্তি [Simla Accord] নামেও পরিচিত।

    ম্যাকমোহন ছিলেন বৃটিশ-ইন্ডিয়ান সেনা অফিসার ও পরে বৃটিশ-ইন্ডিয়া সরকারের বিদেশমন্ত্রী এবং সে হিসেবে তিনি ঐ সীমান্ত আলোচনার প্রধান নেগোশিয়েটর। তাই তার নামেই ম্যাকমোহন লাইন বলে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের দিন ঠিক হয়েছিল। তিব্বত প্রদেশের প্রতিনিধিসহ কেন্দ্রের চিয়াং কাইশেক সরকারের প্রতিনিধিও উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু শেষে কাইশেক সরকারের প্রতিনিধি স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন এই যুক্তিতে যে তাঁদের চোখে তিব্বত তো মূলচীনের-ই প্রদেশ। কাজেই তিব্বত কিভাবে স্বাক্ষরদাতা পার্টি হয় এই ছিল তাঁদের আপত্তি।

    অর্থাৎ তাঁদের আপত্তি ঠিক বৃটিশ-ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে নয়। তিব্বত স্বাধীন দেশ/ প্রদেশ কিনা সেই বিতর্ক। তাই পরবর্তিতে চীন মাওয়ের বিপ্লবের অধীনে কমিউনিস্ট চীন হয়ে গেলে কমিউনিস্ট চীনের অফিসিয়াল অবস্থান হয়ে যায় এটি যে, তিব্বত চীনের প্রদেশ আর ম্যাকমোহন লাইনই ভারতের সাথে সীমান্তরেখা। কিন্তু ততদিনে আবার নেহেরুর ইন্ডিয়া সেটা গ্রহণ করতে চায়নি। কারণ ইতোমধ্যে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে চীন আরও ভুখন্ড দখল করেছিল। যেটা পরে অবশ্য ছেড়েও দেয়। এরপর থেকেই [Line of Actual Control, LAC] বা গৃহীত সীমান্তরেখা কথাটার উৎপত্তি হয়।

    ঐ চিঠি চালাচালিতে বর্ণনামূলক অর্থে কথা বলার সময় কারও দখলে থাকা ভুমি বুঝাতে চীন এই [LAC] ব্যবহার করেছিল। যেটা অবশ্যই উভয়পক্ষের সম্মতিতে গৃহিত কোনো কমন ম্যাপের স্টাটাস নয়।  তাই টেকনিক্যালি ভারত কখনই ১৯৫৯ সালের কোনো সীমান্ত বুঝাতে [LAC] শব্দটা ব্যবহার করতে চায় না। তবে চীন-ভারত সীমান্ত সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল সুসময় বলা যায় ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল।

    ১৯৯১ সালে নরসীমা রাও-এর প্রধানমন্ত্রীত্বের আমলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি পেং ভারত সফরে এসেছিলেন। আর তাতে উভয়পক্ষের সম্মতিতে [LAC] কোনটা হবে এনিয়ে বিস্তর আলোচনা ও রফার শুরু হয়েছিল। এতে নরসীমার ফিরতি চীন সফর ঘটেছিল ১৯৯৩ সালে এবং  সেই সফরকালে উভয়পক্ষ [LAC] এর দুই পাড়ে শান্তি বজায় রাখার লক্ষে এক সীমান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। আর তখন থেকেই ভারতও অফিসিয়ালি [LAC] কথাটা মেনে নিয়েছিল ও ব্যবহার শুরু করেছিল। আর সেই থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বহুবার তাঁদের বিভিন্ন সীমান্তে  নতুন করে সম্মতিতে সীমান্তরেখা টানা হয়েছিল যেগুলো ঐ বছরের [LAC] যেমন, [LAC 1994] এভাবে বলার চল শুরু হয়েছিল।

    সারকথায়, ১৯৯১ সাল থেকে এবারের বলা [LAC] এর বাড়তি অর্থ হল তখন থেকে [LAC] মানে উভয়পক্ষের সম্মতি নিয়ে আঁকা সীমান্তরেখা। কিন্তু এত সম্মতির পরেও আবার ২০২০ সালে কেন সীমান্তে সেনা সমাবেশ?

    এর একমাত্র কারণ হল, ভারতের কনষ্টিটিউশনের ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা করে ২০১৯ সালের ৫ আগষ্ট সংসদে অমিত শাহের সারা কাশ্মীরই (পাকিস্তান ও চীনা অধিকৃত অংশসহ) ভারতের অংশ দাবি করা। অর্থাৎ এখানে আসলে মোদি-অমিতের সরকার দাবি করে ফেললেন যে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত যত কিছু সীমান্ত সমঝোতা ও চুক্তি হয়েছিল তা তারা মানেন না। এবং এই না মানা একপক্ষীয় ভাবে। আর একপক্ষীয়ভাবে কোনো চুক্তি বাতিল করে দেয়া মানে উভয়পক্ষ বসে কোনো আলোচনায় থেকে নয় – যেটি কূটনীতিতে খুবই অশিষ্ট [rogue] আচরণ গণ্য করা হয়, তাই ঘটানো হয়েছিল।]

    কিন্তু তা সত্ত্বেও চীন-ভারতের ভাল সম্পর্কের সময়ে, ১৯৯১-৯৪ এই পাঁচ বছরে সীমান্ত নিয়ে আপস আলোচনায় ফলাফলের ভিত্তিতে সে সময়ে প্রতি বছরই উভয়ের সম্মতিতে চীন নিজের দাবিকৃত অংশ থেকে বেশ কিছু ভূখণ্ড ভারতকে ছেড়ে দিয়েছিল। এ থেকেই এলএসি৯১, এলএসি৯২, এলএসি৯৩ ও এলএসি৯৪ এর জন্ম। তাহলে এখন ১৯৫৯ সালকেই আবার ফিরে নতুন করে সব সীমানার ভিত্তি মেনে নিয়ে এখনকার মোদির আপসনামার অর্থ কী?

    অর্থ হচ্ছে, ১৯৯১-৯৪ এই পাঁচ বছরে চীন-ভারত সীমান্ত নিয়ে আপোস আলোচনায় যা কিছু ভূখণ্ড ভারত পেয়েছিল তা আর ভারতের হাতে থাকল না। ভারত এই ভূখণ্ডের দাবিই যেন ছেড়ে দিল। সেটা ভারতের অনিচ্ছাকৃত হলেও মোদি-অমিতের “পুরা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড”, সংসদে এই দাবি করাতে এমন অর্থই তৈরি হয়ে গেছিল।

    এর সোজা মানে হল মোদীর এখন ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ মেনে আপোস করাতে ভারত চীনের কাছে বড় ভূখণ্ড হারাচ্ছে সেটা স্বীকার করে নিল। শুধু তাই না, এর আরেক বিশেষত্ব আছে।

    আগে মীমাংসিত ছিল এমন ভূখণ্ড এবার আবার চীনকে ছেড়ে দেওয়া হয়ে গেল। কিন্তু কেন? এমন তো আগে কখনো হয়নি! মোদি কি যেকোনোভাবে একটা সেনা প্রত্যাহারের চুক্তিতে আসার স্বার্থে পাগল হয়ে এমনটি করছে? একেবারেই যে তা নয় সেটা বলা মুশকিল। কারণ এই করোনাকালের আগে থেকেই মোদির ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই নাজুক। তাই এই সময় সেনা প্রত্যাহার, খরচ কমানো এবং সাথে টেনশনও কমানো ইত্যাদি মোদীর জন্য এক বিরাট চাহিদা তো বটেই। সেকারণে এই আপোস মীমাংসা মানে সেনা প্রত্যাহার বা [disengagement] এটির মূল শর্ত হলে মোদি তাতেও রাজি।

    পাঠকের কাছে ব্যাপারটা আমাদের ভাষ্যে না বলে টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপের মিডিয়ায় ছাপা হওয়া এক সাবেক কমান্ডার লে. জেনারেল পানাগের [Lt Gen HS Panag (Retd)] বয়ানে তুলে ধরব। তিনি পরপর দু’বার রাষ্ট্রীয় মেডেলপ্রাপ্ত সেনা অফিসার।

    লে. জে. পানাগ বলছেন, ‘… এই সৈন্য প্রত্যাহার ঘটছে একেবারে ঠিক চীনের দাবিকৃত ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা অনুসারে। কারণ এ পরিস্থিতিকে ভিন্ন কোনো বিকল্প আকার দেয়ার মতো সামরিক যোগ্যতা ভারতের নাই।’

    তিনি আরো বলেন, তবুও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য এটাই ভালো  [……” that the “disengagement” is happening exactly as per China’s 1959 claim line because India has no military capability to alter the situation. However, he said, it is “good for the long term peace”………”The plan, he presumed, will include acceptance of McMohan Line in Northeast with some give and take between New Delhi and Beijing, as per the 1959 proposal.”]।

    কিন্তু এই জেনারেল যে কথা কোনো রাখঢাক না করে গড়গড়ে বলে গেলেন মোদির সে সক্ষমতা নাই। কারণ লাদাখ বা সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মোদির নেয়া সব পদক্ষেপেই সততার অভাব ছিল। মোদীর অসততা হল, তিনি নিজ ভোটবাক্স ভরাতে সীমান্তে তিনি বীর, বীরত্ব দেখাচ্ছেন তিনি, হিন্দুত্বের বিজয় আনছেন তিনি ইত্যাদি ভুয়া বয়ানের সুরসুরি তুলতে এসব করেছেন।

    তিনি কাশ্মীর দখল করেছেন। পুরা কাশ্মীর ভারতের মধ্যে এনেছেন তাই তিনি ও তার দল হিন্দুত্বের বীর। এসব জাতশ্রেষ্ঠত্বের জজবা উন্মত্ত জোশ, আধা সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে মিশিয়ে তিনি এনেছেন যেকোনো অ-হিন্দুর বিরুদ্ধে। যার সবকিছুর উদ্দেশ্য ভোটবাক্সকে হিন্দুর-ভোটবাক্স এই জোয়ার তুলে।

    আবার এই মিথ্যা বীরত্বের দাবি করতে গিয়ে যেমন – ভারত-চীন প্রত্যক্ষ সেনা সংঘাতে ভারত যখন ২০ জন সৈন্য হারিয়েছিল তার পরে মোদি সর্বদলীয় বৈঠকে দাঁড়িয়ে এবং ‘মন কি বাত’ নামের রেডিও প্রোগ্রামে বিবৃতি দিয়েছিলেন যে, ‘চীন ভারতের কোনো ভূখণ্ড দখল করে নাই, কোনো অনুপ্রবেশ ঘটেনি’ ইত্যাদি। তার সোজা অর্থ হলো, ভারতের সৈন্যরাই চীনে অনুপ্রবেশ করে মার খেয়ে মরেছে। অথচ আসলে মোদীর ওই বিবৃতিতে স্বীকার করে নেয়া হয় যে, চীনা দাবিকৃত ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখাই’ তাদের উভয়ের প্রকৃত সীমান্ত। যদিও মোদি কখনোই তার ওই কথার কোনো ব্যাখ্যা দেননি। সংসদে আলোচনাও তুলতে দেননি।

    কাজেই  এখনকার ‘সেনা প্রত্যাহার’ নিয়ে মোদির বড় সমস্যা হল, তার সংসদ বা নাগরিকের কাছে তিনি কিভাবে খুলে বলবেন যে তার উগ্র জাতিবাদী হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠত্বের রাজনীতি আর হুঙ্কার আসলে সব অচল আর ভুয়া! ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নেয়ার বিনিময়ে তিনি চীনা সৈন্যদের ঠাণ্ডা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু সেজন্য তিনি বাৎচিত শুরু করছেন আরেক শঠতার আশ্রয়ে।

    এক. তিনি যে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নিয়ে বিনিময়-সওদা করছেন- এ কথা একেবারে লুকিয়ে ফেলেছেন।

    দুই. এই বিষয়ে পাবলিকের সামনে কথা শুরু করছেন চীনারা সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়ে যাচ্ছে – এখান থেকে। যেন এটা দু’পক্ষেরই সেনা প্রত্যাহার নয়, যেন শুধুই চীনা সৈন্য প্রত্যাহার হচ্ছে। অর্থাৎ যেন চীনা সেনারা ভারতে এসেছিল, এখন পালিয়ে গেল। এটাই যেন এক বিরাট সুখবর আর মোদী সরকারের বিজয়- এমন ভাব দেখাচ্ছেন। অন্তত দুটো মিডিয়া দ্যা হিন্দু আর দ্যা প্রিন্ট এ কাজে মোদির ইজ্জত বাচানোর মত করে এমন ভাষ্য লাগাতার তৈরি করে যাচ্ছে।

    অথচ সত্যিকার ব্যাপারটা হল, ভারতীয় সেনারা ‘পিছিয়ে’ ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখায় ফিরে গেল আর চীনা সৈন্য প্রত্যাহার নয় বরং ওই ছেড়ে যাওয়া ভূখণ্ডের দখল নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।

    মোদীর ইজ্জত বাঁচানোর চেষ্টায় আরেক মন্ত্রী ভিকে সিংঃ
    মোদি তাই ‘চীনারা সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়ে যাচ্ছে’ এমনই কাছাকাছি কিছু একটা ব্যাখ্যায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথকে দিয়ে সংসদে বিবৃতি পড়ে শোনান, ঐ ১১ জানুয়ারি যেদিন ভারতীয় সেনা ইতোমধ্যেই মাঠে সেনা প্রত্যাহার শুরু করে দিয়েছিল সেদিন। তবু এতকিছুর পরেও আগেই আরেক বিরাট বিপর্যয় ঘটে গেছিল। সে ঘটনাটা ঘটিয়েছিল মোদীর আরেক মন্ত্রী ভিকে সিং।

    তিনি আসলে ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান, এক ফোর-স্টার জেনারেল। সম্ভবত মোদি তাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন মিথ্যা অ্যাডভ্যান্স ঢোল পিটানোর – ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নিয়ে মোদি আপোস করছেন এদিকটা লুকিয়ে কথা শুরু করার জন্য। তিনিই প্রথম বলতে নামেন যে এই সেনা প্রত্যাহার এটাই নাকি মোদীর বিজয়। কিভাবে?

    তিনি গত ৭ জানুয়ারি ভারতের দক্ষিণে তামিলনাড়ুর মাদুরাই শহরে সফরে গিয়ে জনগণকে ব্যাপারটা ‘সহজ করে বুঝিয়ে বলার’ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু এতে তিনি হিতে বিপরীত করে ফেলেন। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন চীন-ভারত সীমান্ত সম্পর্কগুলো কত সহজ ফলে অন্যের দেশে অনুপ্রবেশ ঘটানো -এগুলো কোনো ব্যাপার না। এই ধারণা তৈরি করতে গিয়ে বলে বসেন যে ভারত কতবার যে চীনা ভূখণ্ডে ‘অনুপ্রবেশ’ করেছে এর শেষ নেই।

    আরো এক কাঠি ওপরে গিয়ে বলেছেন, “চীনারাও অনুপ্রবেশ করেছে তবে আমাদের চেয়ে কম। চীনারা ১০ বার করলে আমরা ৫০ বার করেছি”   [“Let me assure you, if China has transgressed 10 times, we must have done it at least 50 times,”।

    বলাই বাহুল্য, এরপর এটাই সমালোচনার মুখ্য বিষয় হয়ে যায়। এমনকি এ নিয়ে চীনে চীনা সরকারি মুখপাত্রকে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি কয়েক শব্দে এক মন্তব্য করেন যে, “সত্যি কথা সবসময় অজান্তেই মুখ দিয়ে বের হয়ে পড়ে।”

    আসলে ভিকে সিং সেখানে আরেক ভুয়া দাবি করে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নেয়াকে আড়াল করতে গিয়েছিলেন। তিনি তাই মনে করায় দিয়ে বলার ছলে বলেন, চীনা পণ্য বর্জন প্রোগ্রাম নিয়েছিল বিজেপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো। আর সরকার চীনা বিভিন্ন অ্যাপ-প্রোগ্রাম ভারতে নিষিদ্ধ করেছিল, ভারতে বাণিজ্যে বা টেন্ডারে অংশ নেয়া বন্ধ করেছিল। আর তাতেই নাকি চীনারা চাপে পড়েছিল তাই তারা সেনা প্রত্যাহারে রাজি হয়েছে।

    কিন্তু তার এই দাবিও আসলে ভুয়া। কারণ পরিসংখ্যান বলছে যে, বরং চীন থেকে কাঁচামাল বা তৈরি পণ্যের আমদানি বেড়ে গিয়েছে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ এক দাবি ভিকে সিং শুরুতেই করেছিলেন সেখানে। তিনি বলে বসেন, চীনের সাথে অফিসিয়াল সীমান্তরেখা বলে কোনোকিছু কখনও আঁকাই হয় নাই; [……”  official border with China has never been demarcated.“।

    তার মানে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি পেং ১৯৯১ সালে ভারতে আসেন নাই, নরসীমা রাও-ও ১৯৯৩ সালে পাল্টা চীন সফরে যান নাই। অতএব ১৯৯১-১৯৯৩ এই সময়কালের মধ্যে [LAC] নিয়ে চীন-ভারত উভয়পক্ষের মধ্যে প্রথমবারের মত কোনো সমঝোতা হয় নাই?

    আসলে এটা তিনি বলছেন কারণ মোদি নিজেই এই “অস্বীকারের” [১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নিয়ে] ফাঁদে পড়েছেন। তাই ইতিহাস উল্টাতে ভিকে সিং সারা ভারতকে সেই ফাঁদে ফেলতে চাইছেন। ওদিকে, কংগ্রেস গত সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী একে এন্থনী অভিযোগ করে বলেন, লাদাখের এই সেনা প্রত্যাহার আসলে চীনের কাছে সারেন্ডার “Disengagement in Ladakh is surrender to China,” ছাড়া কিছুই না।

    যা হোক, এই সেনা প্রত্যাহার মনে হচ্ছে সফলতার দিকেই যাবে, তাতে ভারতকে যে শর্তই পালন করতে হোক না কেন। তবে ঘটনা আরো কিছু আছে।

    আসলে এখন মোদির এত দ্রুত আপোস করে ফেলার পেছনের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মোদি আশা করতেন, চীন-আমেরিকার বাণিজ্য বিরোধটা যদি সামরিক দিকে গড়ায় তাহলে তিনিও এর আড়ালে, ভারতের চীনের সাথে বিরোধকে সামরিক দিকে ঠেলে দেয়ার সুযোগ নিতে পারবেন। কিন্তু তা হয়নি, মোদির কপাল খারাপ!

    কিন্তু রেকর্ড বলছে, ট্রাম্প তার চার বছরে পরিস্থিতি কখনোই সামরিক দিকে যেতে দেননি। যদিও অনেক গরম কথা, হুঙ্কার দিয়েছেন। আর ওই চার বছরে তিনি মোদিকেও বাকচাতুরি ছাড়া কোনো ফেভারই দেননি। কিন্তু উল্টা ভারতে অস্ত্রবিক্রির সুবিধা নিয়েছেন। সেটা যাই হোক শেষে বাইডেন এসে যাওয়াতে এসব দিকে মোদির সরকার এখন একেবারেই হতাশ। কেবল অপেক্ষা করছেন বাইডেনের সাথে প্রথম মোলাকাতে কী আলামত দেখেন তা জানতে। পছন্দ না হলে এবং বিশেষ করে মানবাধিকারের চাপ খেলে জয়শঙ্করের তৈরি আরেকটা অবস্থান আছে সে দিকে যাবেন। সেটা হলো তিনি বলবেন, এখন থেকে চীন-আমেরিকার বিরোধে ভারত আর কোনো দিকে নেই, গ্যালারির দর্শকমাত্র হয়ে থাকবে। যেন অনেকটা ঘরে খাবার নাই বলে উপোস রাখছি এমন বলে বেড়ানো হবে সেটা আর কী।

    সবশেষে, চীন গত বছর সীমান্তে সেনা সমাবেশের শুরু থেকেই আগে ভারতকে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নেয়ানো মানে, এলএসি৯১, এলএসি৯২, এলএসি৯৩ ও এলএসি৯৪ এর মাধ্যমে যেসব ভূমি ফেরত দিয়েছিল তা আবার কেড়ে নিতে এগিয়েছিল কেন?

    স্বল্পকথায় বললে, ব্যাপারটা ২০১৯ সালে মোদির “পুরা কাশ্মিরই ভারতের”- সংসদে এই দাবি করার খেসারত। সংসদে ৩৭০ ধারা বাতিল করার পরে অমিত শাহ একটা বিবৃতি দিয়েছিলেন ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, কাশ্মিরের তিন অংশ- ভারত ও পাকিস্তানের দখলের অংশ এবং চীনের দখলে থাকা অংশ- এই পুরো কাশ্মিরই ভারতের ভূখণ্ড। এই ঘোষণাতেই সবকিছুর ট্রিগার টিপে দেয়া হয়েছিল।

    আজ মোদি সরকার “১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা” মেনে নিতে বাধ্য হলেন। দুনিয়ার সব উগ্র জাতিবাদীর পতনের মত এই হিন্দুত্ব জাতিবাদ এখানেও হেরে গেল।

    চীন বলতে চাইল, ভারত আপোস আলোচনায় সীমান্তবিরোধ মিটানোর মত কোনো পার্টনারই নয়, যোগ্য নয় তাই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “সেনা প্রত্যাহারে গিয়ে মোদির যে দশা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • জাতিগিরির ‘স্বদেশী জাগরণ’ অচল ও পরাজিত

    জাতিগিরির ‘স্বদেশী জাগরণ’ অচল ও পরাজিত

    গৌতম দাস

    ১০ আগস্ট ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-38z

     

    Swadeshi Jagran Manch – स्वदेशी जागरण मंच, From Facebook

    প্রসঙ্গটা ভারত থেকে শুরু করছি এমন হলেও ব্যাপারটা কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এমন চিন্তার ফেনোমেনা আমাদের মত সব দেশেই কম-বেশি আছে। তাই এর প্রভাব সবখানে। কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীরাও এনিয়ে বিভ্রান্ত থাকে, তাই প্রচ্ছন্নে সমর্থনও করে। ‘জাতি’ বা ‘স্বদেশীপনা’ ইত্যাদি ধরণের শব্দ দিয়ে এরা নিজেদের তুলে ধরে। যদিও এগুলা একেবারেই ভুল চিন্তা। কী প্রেক্ষিতে এমন চিন্তা দুনিয়ায় উদয় হয়েছিল তা ভুলে বা আমল না করেই নকল বা ‘আউট অব কনটেক্সট’  এক চিন্তাধারা এটা। বিশেষ করে যেখানে দেশ বা রাষ্ট্র বলতেই মনে খামোখা ‘জাতি’ বলে ধারণা হাজির হয়। জাতি ধারণাটাই fetish বা ভুতুড়ে অস্পষ্ট চিন্তা। কিন্তু তাসত্বেও  আবার পরিস্কার থাকার দরকার আছে যে, ‘জনগোষ্ঠীগত কমন স্বার্থ’ অথবা ‘জনস্বার্থ’ বা ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট’- এসব ধারণাগুলো সঠিক,  ফলে এগুলো টিকে থাকবে। কারণ এধারণাগুলোর সাথে রাষ্ট্রে কোন ‘জাতি’ ধারণা থাকা না থাকার কোনো সম্পর্ক নেই, অনিবার্যও নয়।

    আসলে  কলোনি দখলবাজ ইউরোপের লুট করতে জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে পরা ব্যবসায়ীরা এরা প্রতিদ্বন্দ্বি দেশের (যেমন ইংলিশের বিরুদ্ধে ফরাসি) দখলবাজদের বিরুদ্ধে নিজ নিজ দেশের কলোনি দখলবাজেরা এই জাতি ধারণা ছড়িয়েই  দেশের সবপক্ষের পুর্ণ সমর্থন যোগাড় করেছিল। এখানে বিদেশি বিরোধিতা খুবই মুখ্য জিনিষ। যেমন ফরাসিদের  বিরুদ্ধে ইংলিশ দখলবাজদের বিদেশিবিরোধিতা কথা তুলার তাগিদে যে তত্ব হাজির করেছিল এটাই জাতিবাদ বা জাতি ধারণার শুরু। এককথায়, অন্য (আমাদের মত দেশকে) কলোনিদখলকে সমর্থন আর এই অন্যায়কে দেশের ভিতর থেকে দ্বিধাহীন  সমর্থন আর সাফাই পাবার তত্ব হল জাতিতত্ব বা জাতি ধারণা। তাহলে দাঁড়ালো, জাতি ধারণা আবার কার্যকর পেতে হলে পুর্বশর্ত হল কলোনি ব্যবস্থা দুনিয়াই আবার চালু থাকতে বা করতে হবে। অথচ.১৯৪৫ সালের পরের কপিবাজেরা, এই  জাতিবাদীরা এটা কখনও খেয়াল করে দেখেনি।

    একারণেই বিজাতীয় বা বি-জাতির বিপরীতে জাতি ধারণা – সেটা পরবর্তিতে যতই অপ্রয়োজনীয় ও নেতি হলেও তা সেকালে মিথ্যা করে “নিজেদের” বলে একটা ধারণা হাজির করে টিকানো হয়েছিল। সেই সাথে, বিদেশী মানেই খারাপ, বিদেশের বিরুদ্ধে ‘আমরা’ অথবা ‘স্বদেশী’ ধরনের এক ধারণা হলো জাতি। এখান থেকেই স্বদেশী পণ্য ভালো, তা মোটা ভাত বা মোটা কাপড় হলেও ভালো ইত্যাদি বলে ভুয়া দাবি করা হয়।

    এ ছাড়াও ১৯৪৫ সালের পরের কলোনিমুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের ধারণা হচ্ছে, একটা “জাতিবোধ” ছাড়া “দেশ”, “রাজনীতি” বা “রাষ্ট্রের” কল্পনা অসম্ভব। অথচ এসব ভিত্তিহীন কথা। কাজেই একটা জাতিবোধ থাকতেই হবে আর সেই সাথে কথিত “জাতীয়” বা দেশীয় পণ্যের প্রতি ভালোবাসা আর বিদেশী পণ্যের প্রতি ঘৃণা, পারলে তা বর্জন; না হলেও অন্তত কম-ভালোবাসা থাকার ‘স্বদেশীপনা’ তো থাকতেই হবে! এগুলা জাতি ধারণার পক্ষে ভুয়া বয়ান!
    এখানে স্বদেশীপনা শব্দটা ব্যবহার করেছি নেতি ও ঠাট্টা অর্থে। অনেকটা ছেলেমিপনা, আদেখলাপনা বা পোলাপান শব্দের মত নেতিবাচক অর্থে। অর্থাৎ যাকে ‘স্বদেশী’ বলছি তা আসলে স্বদেশী বা দেশের জন্য ইতিবাচক নয়; সেটা বুঝাতে; আর আসলে তা নয় সেই হুঁশ আনার জন্যই এমন ব্যবহার।

    আলোচনার সমস্যাঃ
    এদিকে এ ধরনের আলোচনার সমস্যা হয় যেটা তা হল, ব্যাপারটা কী তা বুঝিয়ে বললেও এবং তা ভালই বুঝা গেলেও সেটা তত্ত্বগত ধারণার মত একটা দূরত্বেই থেকে যায়। তাই অবস্থা হয় – কথা সত্য কিন্তু মানতে পারব না- ধরনের। সেকারণে, আজ এখানে কোন তত্ব নয়, একেবারে বাস্তবে ঘটেছে, বাস্তব সমস্যা হিসেবে হাজির হয়েছে সেটা দেখিয়ে এখানে কথা বলে দেখাব যে, কথিত জাতিবোধের স্বদেশীপনা একটা ভুল ও অকার্যকর ধারণা। আর সেটা এখানে দেখাব ভারতের এখনকার বাস্তব সমস্যা বা উদাহরণের পরিপ্রেক্ষিতে।
    আরো আছে। যেমন সমস্যা হচ্ছে প্রায় সবাই স্বদেশীপনা শব্দের সাথে পরিচিত। ফলে ধারণাটা জানা আছে কিন্তু কেউ বাস্তবে একালের নিজ নিজ দেশে ধারণাটা পরখ করে দেখেনি। তবে একালে ধারণাটার সত্যতা না থাকলেও এর একটা প্রবল আবেগী দিক আছে; ভুয়া হলেও তা একটা আবেগী জোশ তুলতে পারে – যেমন ‘দেশের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া’ বা ‘কল্পিত বিদেশী বা শত্রুর বিরুদ্ধে এক হওয়া’ ধরনের; আর এটাই আমাদের মত দেশের রাজনীতিবিদেরা সবাই ব্যবহার করে গেছে এ পর্যন্ত করে চলেছে, আর সমানে ফায়দা তুলে গেছে। তাতে ধারণাটা সত্য না হলেও কোনো অসুবিধা হয়নি। যেমন ভারতে এমন আরেক চরম মিথ্যা আড়ালের শব্দ হল, “ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট”। আপনি সাংবাদিক আপনি জানেন কোন একটা কথা মিথ্যা। কিন্তু তবুও “ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট” এর নামে আপনি সেকথা সত্য বলে চালাচ্ছেন। এটা মূলত মিথ্যা বলে তা কোনভাবেই সাংবাদিকতাই নয় আপনি জানেন তবু আপনি তা সত্য বলে গ্রহণ করতে বলছেন!

    তাহলে মিথ্যা হলেও তা ব্যবহারের সুযোগ কেন পাওয়া যায়ঃ
    কেন এমন সুযোগ পাওয়া যায়? কারণ দুনিয়ার শুরুর দিকে পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেন অবিকশিত অবস্থায় ছিল এবং স্বাভাবিক। তাই ব্যাপারটা মনে রাখার জন্য একটা সহজ সুত্র হল – কমুনিকেশন বা যোগাযোগ শব্দটা। যত ভাল বা বিকশিত কমিউনিকেশন ততই ভাল পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেন।

    কমিউনিকেশনঃ
    ছোট একটা শব্দ কমিউনিকেশন, কিন্তু এর অর্থ অ-নে-ক গুলো। কমিউনিকেশনের অনেকগুলো রূপ। এখানে কমুনিকেশন শব্দের সঠিক মানে কোনটা? না সবগুলো, কোনটাই বাদ নয়।  যেমন রাস্তাঘাট বুঝাতেও আমরা কমিউনিকেশন বলি। বলি কমিউনিকেশন ভাল না বা কমিউনিকেশন মিনিষ্ট্রি। কিন্তু তাও আবার সড়ক নাকি রেল নাকি এয়ার বা এরোপ্লেনের কমিউনিকেশন, এমন অনেকগুলো ভাগ আছে। আবার কমিউনিকেশন মানে তো ভাষাও, ল্যাঙ্গুয়েজ। আরো আছে। কমিউনিকেশন মানে টেলিফোন, টরেটক্কা করে পাঠানো পুরানাদিনের টেলিগ্রাফ। এমনকি তা বেতার, এফএম রেডিও  অথবা পুলিশ-আর্মির ওয়ারলেস – রজারস। আবার কমিউনিকেশন মানে আইটি – এর নেটওয়ার্ক, ইমেল, ফেসবুক বা স্যাটেলাইট ইত্যাদি সব।  অর্থাৎ এক কমিউনিকেশন শব্দ দিয়ে অনেক কিছুই বুঝায়। তা বুঝাক কোনই অসুবিধা নাই।

    তবে আসল কথাটা হল, দুনিয়াতে এই কমিউনিকেশন যত বিকশিত ততই, পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেনও সে মাত্রায় ব্যাপক। আর যতদিন  দুনিয়ায় কমিউনিকেশন দুর্বল বা অবিকশিত বলে দুনিয়ায় কোণায় কোণায় থাকা মানুষকে চেনাজানাও দুর্বল থাকে; মানে মানুষে মানুষে পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেন বিকশিত নয় বা নাই । অথবা এক জনগোষ্ঠীর সাথে অন্য জনগোষ্ঠী এবং অন্য সব জনগোষ্ঠীর সাথে পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেন নাই অথবা তেমন নাই অর্থাৎ ব্যাপক হয়ে না উঠেছে, তত দিন স্বদেশীপনা ধারণাটা যে মিথ্যা বা ধারণাটার যে সমস্যা তা টের পাওয়া যায় না।

    গত ১৬০৭ সাল থেকে ধরা হলে পরের প্রায় ৩০০ বছর ধরে  দুনিয়ায় চালু ব্যবস্থাটা বলি কলোনি যুগ; যখন দখলবাজ ছোটবড় পাঁচ-ছয় রাষ্ট্র বাকি প্রায় সব দেশকে দখল করে কলোনি বা উপনিবেশ যুগ কায়েম করেছিল। সে সময় কোনো দেশের বাইরে পণ্য বিনিময় লেনদেন বলতে ছিল  মুলত দখল-মালিক দেশ আর প্রজা দেশের মধ্যে; তাও আবার ছিল একপক্ষীয়- মূলত প্রজা বা দখলি-হওয়া দেশ থেকে লুটেরা সম্পদ দখল-মালিক দেশে নেয়া (যেমন ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া থেকে ব্রিটেনে) – এই রকম। এ ছাড়া ওদিকে পাঁচ-ছয়টা কলোনি দখলদার মালিকের নিজেদের মধ্যে লেনদেন – সেটাও ছিল প্রায় নাই না খুবই সীমিত পর্যায়ে। তাই জাতি ধারণা আর স্বদেশীপনা যে ভুয়া অচল ধারণা তা ইউরোপ কলোনিযুগে টের পায়নি। আবার কলোনি যুগের প্রায় ৩০০ বছর ইউরোপ ‘বিদেশী মাত্রই শত্রু’ গণ্য করা জাতি ধারণার জাতিরাষ্ট্র, নেশন-স্টেট ছিল। এটাই কলোনি-মালিক জাতি-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে লেনদেন ও বিনিময় বাণিজ্য প্রায় ‘নাই’ ধরনের সীমিত হয়ে থাকার আরেক কারণ। সুতরাং, এক কথায় ‘জাতি’ ধারণাটা বা দেশকে জাতি বলে বুঝা – এটা মূলত কলোনি দখল করা যেসব দেশের মূল ব্যবসা তাদেরই অনুসৃত ও প্রচলিত ধারণা। এদের চিনবার মূল বৈশিষ্ট্য হল এরা জাত বা জাতির বাইরে কারো সাথে লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় পছন্দ করে না, খারাপ মনে করে। তাই এখান থেকেই বিদেশির বিরুদ্ধে স্বদেশী বলে ধারণা জন্মানো সহজ ও সম্ভব।

    এজন্যই, স্বদেশী-জাতি-কলোনি যুগ এগুলো সম্পর্কযুক্ত শব্দ। কলোনি যুগেই জন্ম বলে জাতি বা স্বদেশী ধারণা সেখানে প্রথম পাওয়া যায়। দুনিয়াতে প্রথমত জাতি বা জাতিরাষ্ট্র ধারণাটার জন্ম বা পাওয়া যায় কলোনি যুগে; মানে ১৬০৭-১৯৪৫ অর্থাৎ প্রায় ৩০০ বছরের সময়কালের এবং মূলত ইউরোপে।

    কিন্তু পরবর্তিতে মানে কলোনি যুগ-পরবর্তী সময়কাল আগের কলোনি সময়ের তুলনায় অনেক ছোট, ৩০০ এর বিপরীতে মাত্র প্রায় ৭৫ বছর। এই পঁচাত্তর বছর, ১৯৪৫ থেকে একাল পর্যন্ত সময়টা কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার কাল। মোটা দাগে বললে সবার আগে কলোনি মুক্তি ঘটেছিল এশিয়ায়; পরে ল্যাটিন আমেরিকা আর শেষে ১৯৮০ সালের মধ্যে আফ্রিকা (সাউথ আফ্রিকা বাদে) সবাই প্রায় স্বাধীন হয়ে যায়। ফলে এবার সব রাষ্ট্রের সাথে সব রাষ্ট্রের লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় ব্যাপক রূপ নেয়া শুরু হয়। তবে কমিউনিস্টরা লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় ব্যাপারটা নিয়ে শুরু থেকেই অস্পষ্ট ও দ্বিধায় ছিল বলে তারা বাণিজ্যে রাজি হয়নি মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের কারণে। এছাড়া আর ১৯৫৩ থেকে ১৯৯১ সাল-  এই কোল্ডওয়্যারের যুগের কারণে। ফলে সোভিয়েতকে অনুসরণ করে পুরা কমিউনিস্ট ব্লক লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় করতে আসেনি, যোগ দেয় নাই। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে ১৯৯২ সাল থেকে সকলেইও অবশ্য বাণিজ্যে যোগ দেয়।

    কিন্তু এর আগেই সব অর্গল খুলে যায়। কারণ, আশির দশকের শুরু থেকেই গ্লোবালাইজেশন শুরু হয়ে গিয়েছিল। মানে যেকোনো দেশের সাথে যেকোনো দেশের লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হতে শুরু করেছিল। বাংলাদেশে আমাদের জন্য তা সহজে বোঝার চিহ্ন হল, যখন থেকে আমরা গার্মেন্ট এক্সপোর্ট শুরু করি এবং ক্রমে তা বাড়াতে থাকি।

    একটা পর্যবেক্ষণ হিসাবে বলা যায়, গত ৪০০ বছরের দুনিয়ায় দেশ (রাষ্ট্র)গুলোর মধ্যে লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় উন্মুক্ত ও পরিপাটি ব্যবস্তা ছিল মাত্র প্রায় পচাত্তর বছর। যার আবার সক্রিয় বাণিজ্য চালু ছিল কেবল  মাত্র শেষের চল্লিশ বছর। আর এর ইমিডিয়েট আগের ১৯৪৫ সালথেকে চালু হওয়া ব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের কাছে  বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত থাকলে ব্যাপক লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় চালুর প্রস্তুতি নিতেই প্রথম ত্রিশ-পয়ত্রিশ বছর চলে যায়।  এখন একটা সাধারণ সূত্র হলো, লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় না থাকা মানেই সেটা হবে জাতি বা জাতি-রাষ্ট্র বা স্বদেশী চিন্তার কাল। আর যতই গ্লোবালাইজেশন, ততই লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় ব্যাপকতর; ততই বাস্তবে জাতি বা জাতিরাষ্ট্র বা স্বদেশী চিন্তার অকার্যকারিতা বা বিলুপ্তির দিকে চলে যাবে।

    আবার মজার ফ্যাক্টস হলো, ইউরোপ ১৯৪৫ সালের পরে জাতি বা জাতিরাষ্ট্র বা স্বদেশী চিন্তা ত্যাগ করে সরে যায় অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে নিজেদের রূপান্তরিত করে নিয়ে।

    কিন্তু ট্রাজেডিটা হলো ইউরোপ রূপান্তরিত হয়ে গেলেও আমরা জানি না আর তাল বুঝি না বলে অবুঝ-নাবুঝ হয়ে আমাদের মত দেশের বেলায় রাষ্ট্রের মডেল হয়ে যায় ইউরোপের ফেলে দেওয়া ঐ ‘জাতি’ ধারণা। মানে, জাতিরাষ্ট্র বা স্বদেশী চিন্তা। এমন চিন্তার সপক্ষে কমিউনিস্টদের সাপোর্টও ছিল। কারণ তারাও বিভ্রান্ত। এখনো বেশির ভাগই জেনে না জেনে  জাতি-রাষ্ট্র করে থাকে। অথচ এটা স্ববিরোধী। কারণ জাতিরাষ্ট্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনীতি হল, কলোনি দখল যুগে থাকা এবং দখলবাজ হয়ে থাকা। আর অপর বৈশিষ্ট্য হল প্রায় নাই অথবা খুবই সীমিত বৈদেশিক লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময়ে থাকা। যার সোজা মানে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশগুলো জাতি বা স্বদেশিপনা ধারণাগুলো আকড়ে আপন করে নিয়ে থাকা এতা এক চরম স্ববিরোধিতা।  এজন্য এরা মুখে বলবে স্বদেশিপনা আত্মনির্ভরতা ইতাদি ছেদো কথা। কিন্তু ডলার দেখলে ডলার পেতে এক্সপোর্ট করতে লালা পড়বে। আপনি যদি স্বদেশি অর্থনীতির লোক তবে ঐ প্রাপ্ত ডলার দিয়ে কী করবেন?  বলাই বাহুল্য ঊনি আমদানিওও করবেন আর ঐ আমদানির মুল্য শোধ করতে ঐ ডলার ব্যভার করবেন। তাহলে কী দারালো আপনি আসলে সবটাতে সবখানেই আছেন। অথচ হুদাই স্বদেশিপনা বিদেশিবিরোধিতার ভাব ধরেন।

    এই স্ববিরোধিতা কী ধরনের সঙ্কট নিয়ে হাজির হয় তা এখন আমরা দেখব ভারতের ক্ষেত্রে। সেখানে ১৯৪৭ সালে জন্ম থেকেই এখানে জাতিরাষ্ট্র ধারণাকে খুবই শক্ত করে (অন্তত আমাদের চেয়ে অনেক বেশি) আঁকড়ে ধরা এক রাষ্ট্র গড়েছিল। এর উপর আবার ‘জাতি’ বলতে এটা হিন্দু-জাতির এক জাতিরাষ্ট্র বুঝে তারা। গত ২০১৪ সাল থেকে বিজেপি ক্ষমতায় আসাতে এই হিন্দু জাতিরাষ্ট্র বোধ সবার উপরে তাদের চাপানোর ঝোঁক আরো প্রবল। এখন চীনের সাথে সীমান্ত সঙ্ঘাতে ২০ সেনাকে হারিয়ে যতই স্বদেশীপনাকে নরেন্দ্র মোদী আঁকড়ে ধরতে চাইছেন ততই জাতিরাষ্ট্র, হিন্দুত্ব বা স্বদেশীপনা ধারণার অকার্যকারিতা আর ভুয়া আবেগসর্বস্বতা প্রকট হয়ে হাজির হচ্ছে।

    বাস্তব উদাহরণ হিন্দু জাতিরাষ্ট্র ও এর স্বদেশীপনাঃ
    ভারতের একটা মিডিয়া রিপোর্ট পড়ে শুরু করা যাক। দ্য হিন্দু পত্রিকার ঘরেরই আরেকটা পত্রিকা আছে যেটা ব্যবসা-বাণিজ্যকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকাশিত হয়, এর নাম ‘হিন্দু বিজনেস লাইন’ [Hindu Business Line]। সে পত্রিকার ২৭ জুলাইয়ের এক লিডিং রিপোর্ট বলছে, জাপান ভারতের কাছে এক আজব অনুরোধ রেখেছে। ঐ খবরের শিরোনাম দেখেন,

    Japan to India: Don’t increase tariff on Chinese inputs used by Japanese firms

    যার বাংলা করলে মোটের উপর কথাটা হল,  ‘ভারত যেন চীন থেকে আসা পণ্যের ওপর বাড়তি ট্যাক্স এবং কোনো কোনো চীনা পণ্যের আমদানির উপরেই যে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা যেন আরোপ না করা হয়।’ জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ট্রেড প্রমোশন ডিপার্টমেন্ট এই অনুরোধ নিয়ে মোদী মন্ত্রিসভার দরবারে এসেছে তদবির করতে।

    এখানে পিছনের কথা আগে একটু বলে নেই। চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ, অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর পালটা প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে মোদি ভারতে সাথে চীনের বাণিজ্য সম্পর্ককে বিরূপ করে তুলতে সব মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই সাথে চীনা পণ্য বর্জনের রাজনৈতিক কর্মসূচিও নিয়েছিলেন। এই প্রপাগান্ডা কাজের জন্য আগে থেকেই বিজেপি-আরএসএস এর দলীয় এক অঙ্গ-সংগঠন তৈরি করাই ছিল, যার নাম ‘স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ’ [Swadeshi Jagran Manch ]। নাম শুনে নিশ্চয় বুঝা যাচ্ছে এর কাজ হল স্বদেশিপনা দেখানো। এখন দেশে-বিদেশে এই সংগঠনের তৎপরতাই জোরদার করা হয়েছে- চীনা পণ্য বর্জনের স্লোগান এদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে। যেমন ইন্ডিয়ান ক্রিকেটে এবারের কোন এক টুর্ণামেন্টে স্পন্সর হয়েছিল চীনা মোবাইল কোম্পানি ‘ভিভো’ [VIVO]।

    তবে বলাই বাহুল্য, এটা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সাথে মিলে চীনা ভিভোর সাবসিডিয়ারি কোম্পানি। এখন মোদী চীনা কোম্পানির উপর বৈষম্য বা বিরূপতা আরোপের নির্দেশ জারি করাতে ওই জাগরণ মঞ্চ ক্রিকেট বোর্ডের কাছে ভিভোকে বাতিল করার আবেদন নিয়ে যায় এই যুক্তিতে যে, এটা চীনা কোম্পানি বলে  এদেরকে স্পন্সর দেয়া  হয়েছে ‘জাতির বর্তমান মুডের বিরুদ্ধে’ বোর্ডের করা কাজ [because Vivo is a Chinese company and BCCI’s move goes against the “current mood of the nation”.]।
    এছাড়া ওদিকে সিনিয়র মন্ত্রী নীতিন গড়করি যিনি বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প দেখাশুনা করেন, তিনি গত ১ জুলাই ঘোষণাই করে দিয়েছেন কোনো চীনা কোম্পানি ভারতে টেন্ডারে অংশ নিতেই পারবে না [India to ban Chinese companies from highway projects, says Nitin Gadkari]। অর্থাৎ চীনা কোম্পানির সাথে segregation বা বিচ্ছেদ ইতোমধ্যেই মাঠে কার্যকর। একই হিসাব মতে, ম্যানুফাকচারিং খাতেও চীনা পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, না হয় শুল্ক এমন বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে যেন কেউ আমদানি না করে।

    অনেকেরই ধারণা, ভারতে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী জাপান। এছাড়া চীনবিরোধী চার দেশ জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকা- এদের জোট ‘কোয়াড’ যার মধ্যে জাপানও আছে [কোয়াড নিয়ে জানত আমার এক গতবারের লেখার  কোয়াড আসছে এই শিরোনামের প্যারাটা দেখে নেয়া যেতে পারে। ] । এবং  আমেরিকা আশা করছে তারা সামরিক জোট হিসেবে কাজ করার কথাও চিন্তা করবে; এদের তো এতে পোয়া বারো। তাহলে তো জাপানের এখন চার দিকে লাভ আর লাভ হওয়ার কথা।

    কিন্তু হতাশ করা কথা হল তা ঘটছে না! আমরা বরং দেখছি উলটা এই জাপানই তার ট্রেড প্রমোশন বিভাগ দিয়ে মোদীর কাছে  দেনদরবার করছে যেন, চীনা পণ্য আমদানি অটুট থাকে, কোন বাড়তি ট্যাক্স আরোপ না করা হয়; চীনকে ভারতে নিজ পণ্য রপ্তানীতে কোনো ধরণের বাধা না দেয়া হয়। কেন?

    এর সোজা মানে তাহলে ভারতের চীনা পণ্য বর্জনের দেশপ্রেম, স্বদেশীপনা বা জাতিগিরি ফলানো এগুলো অচল হয়ে যাচ্ছে।

    জাপানের চীনা পণ্যের প্রতিইবা এমন দরদি মায়া কেন?
    ভারতে গাড়ির কোম্পানির বেশির ভাগই জাপানি ব্র্যান্ডের সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার। অন্তত প্রাইভেট কার – এই গাড়ির মার্কেটে। কিন্তু তা হলে হবে কী, এর ম্যানুফেকচারিং ও অ্যাসেম্বলিতে যন্ত্রাংশ-স্পেয়ার – ভারত বা জাপান কেউই নিজেরা বানায় না। চীন থেকে কিনে আনে। আর অ্যাসেম্বল বা জোড়া লাগিয়ে জাপানি গাড়ি তৈরি করা হয়। কেন? কারণ ওসব পার্টস জাপানে তৈরি করলে গাড়ির দাম বেড়ে  যাবে। কারণ লিভিং কষ্ট বা লেবার কষ্ট বা ন্যূনতম মজুরি জাপানে অনেক বেশি। আবার ভারতেও তা তৈরি করতে গেলে সে ক্ষেত্রেও চীনের তুলনায় অদক্ষতার কারণে দাম বেশি পড়বে, কোয়ালিটিও খারাপ হবে সামগ্রিকভাবে মোট কথা জাপানি গাড়ি বিক্রির প্রফিটে টান পড়বে। অতএব চীনা পার্টস হলে কী হবে ওটাতেই মোক্ষ। এতে অবশ্য পিছনের একেবারে মুখ্য কারণ, চীনা যেকোনো ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানায় প্রোডাকশন লাইন সাজানোর নতুন কৌশল। এটা অ্যাডভান্সড ম্যানেজমেন্ট বুদ্ধিতে সাজানো। ফলে তা দক্ষ এবং কম উৎপাদন খরচ বলে সবার চেয়ে কমপিটিটিভ। আর সেটার লোভেই জাপানিরা কোয়াড জোটের কথিত সামরিকতার লোভ ভুলে উলটা মোদীর কাছে চীনকে ভারতে পণ্য রপ্তানিতে রেখে দেয়ার সুপারিশে লেগে পড়েছেন।

    ওদিকে অবশেষে ক্রিকেট বোর্ড ভিভো মোবাইলের কী অবস্থা বা পরিণতি?
    এটাকে বলে, “পুণঃ মুসিক ভব!”। মানে আবার ইদুঁর হয়ে যা। দয়াপরবশ হয়ে এক সাধু এক ইঁদুরকে  বিরাট ক্ষমতাবান বানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মানুষ এত অত্যাচারিত হোয়ার অভিযোগ উঠতে থাকে যে বিরক্ত হয়ে সাধুকে বলতেই হয়,  “পুণঃ মুসিক ভব!”। মানে আবার ইদুঁর হয়ে যা।  ভিভোকে কিভাবে রেখে দেওয়া যায় এর তদবীর শুরু হয়েছে। কারণ এক. প্রতিবছর প্রায় ৪৪০ কোটি রুপী করে পাঁচ বছর ধরে টাকা দিয়ে আসছে। লোভ লাগার মত ভাল পরিমাণের টাকা, কারোণ এই চীনা মোবাইল ওয়ান অব দা টপ পছন্দের তাই বোর্ডকে অফার করার ক্ষমতাও প্রতিদ্বন্দ্বিদের চেয়ে বেশি। এছাড়া এখন ভিভোকে বাদ দিবার কথা তুললে উলটা ক্ষতিপুরণ দিতে হতে পারে। আর দুই. বোর্ড এখন অমিত শাহের ছেলের কর্তৃত্বে  ফলে তিনি ভিভোকে নিয়েই এগিয়ে যাবার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে এখন ঘটনা মোদীর হাতে তিনি নিশ্চয় শেষ মীমাংসাটা দিবেন। ভিভো-কে স্পন্সরশিপ থেকে বাদ দিতে গিয়ে দেখে তাদের প্রফিট মার্জিনে টান পড়ছে। কাজেই মোদীকে বলে, ভিভোকে রেখেই চলা যায় কিনা!

    অর্থাৎ সার কথা চীনাপণ্য ভারতের বাজারে ঢুকেছে নিজ যোগ্যতা ও পণ্য ক্রেতা মনোরঞ্জনের ক্ষমতার জোরে। এটাই হলো সরাসরি কথিত স্বদেশীপনা বনাম গ্লোবালাইজেশন। যে পণ্যে যে সবচেয়ে নিচের কম খরচে মানে কম শ্রমে ও দক্ষতায় বানাতে পারে, সবাই ওই পণ্য তার কাছেই কিনবে- এটাই হলো গ্লোবালাইজেশনের ভিত্তি। তাতে সে দেশী-বিদেশী না কোন দেশী সেটা কোনো বিবেচ্য নয়। ফাঁপা আবেগের দেশীবোধ বলে কিছু নেই। দেখাই যাচ্ছে এটা কাজ করছে না। অর্থাৎ গ্লোবালাইজেশনের এত ভিত্তি ও খেলার নিয়মে প্রত্যেক রাষ্ট্রকেই কোনো না কোনো পণ্যে বা ওর কোনো পার্টস উৎপাদনে সবচেয়ে কম শ্রমে ও বেশি দক্ষতায় বানাতে পারতেই হবে। তা হলেই ভ্যালু অ্যাডেড প্রোগ্রামে তাকেও অন্য সব রাষ্ট্র গোনায় ধরতেই হবে। চাইলেও বাদ দেয়া যাবে না। এভাবেই যা কিছু দেশটা ভোগ করে তার সব কিছুই আর স্বনির্ভরতা বা আত্মনির্ভরতার ভুয়া স্লোগান দিয়ে নিজের অদক্ষ হাতে বানাতে হবে না। বরং এর বিপরীত ‘গিভ অ্যান্ড টেক’। আরো বেশি করে পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতায় জড়িয়ে পড়তে হবে যাতে কেউ আলগা ‘ফুটানি’, বেশি দাম, বেশি গরজ তৈরি করতে না পারে। বরং সবাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
    তবে এখানে একটা মধ্যবিত্তের পেটিমনকে সামলাতে হবে যেন ছিঁচকে সমালোচনার চোখে না দেখা হয়।  যেমন কেউয়ু বলল চীন ছাড়া ভারতের চলেই না। না এমন খোটা দেয়া পেটি সংকীর্ণ চিন্তা। যদিও তা টংয়ের চা দোকানে চলবেই বন্ধ করা যাবে না।

    ব্যাপারটা হল গ্লোবালাইজেশন অন্যকে নিচা দেখানোর জন্য নয়।  বরং সবাই যেন কোন না কোন একটা পণ্য সবার চেয়ে বেশি দক্ষতায় উতপাদন করতে পারে – পারুক এই উদ্যোগ সফল হোক সেই কামনা। কারণ সে সফল হলে আমরা সবাই ঐ সফলতার ভাগ নিব। ব্যাপকভাবে পারস্পরিক পণ্যবিনিময়ে মেতে উঠব। একা একা কথিত স্বনির্ভরতা অর্জনের নামে আসলে অদক্ষতায় কোয়ালিটি খারাপ দাম বেশি এমন পণ্য গলাধকরণ করার বিপরীতে ব্যাপকভাবে নির্ভরশীলতা কিন্তু এটা একা না সবাই সবার উপর নির্ভরশীল এমন ইন্টার ডিপেন্ডেন্সি – তৈরি করার সম্পর্ক। যাতে কেউ একজন ডাট দেখানো,  বেশি অন্যায় সুবিধা না নিতে পারে তা কমে আসে – এটাই গ্লোবালাইজেশন । যাতে চাইলেই কেউ যুদ্ধ লাগিয়ে না দিতে পারে। কারণ যেখানে বোমা ফেলার কথা ভাবছে সেখানে ঐ শহরে নিজের স্বার্থও আছে।  আর কেউ নিজের মাথায় বোমা মারে না। কাজেই ডায়লগ আর বুঝমান হওটাটাই উভয়পক্ষের লাভ, সহজ রাস্তা।

    ভারতে চীনের রাষ্ট্রদুত সান ওয়েদং এক ওয়েবনিয়ার অন লাইন আলোচনায় এটাই মন্তব্য বা হেদায়েত করে ছেন। বলেছেন ভারত-চীনের অর্থনীতিতে বিচ্ছেদ আনা বা দুরত্ব তৈরি করা হবে একালের স্বাভাবিক স্রোতের উলটা হাটার চেষ্টা। এটা সফল হবে না। তিনি ঐ আলোচলায় ডাটা দিয়ে দেখিয়েছেন, স্পেয়ার পার্টস বা যন্ত্রাংশ কম্পিউটারে ৯২%, টিভিতে ৮২%, নেটওয়ার্কের  অপটিক্যাল ফাইবারে ৮০%, মটরসাইকেলে ৮৫% ইত্যাদি এভাবে চীনাপণ্য ভারতে আপদানি করা হয়ে থাকে।

    কিন্তু সাবধান এটা ভারতকে ছোট দেখানোর জায়গা থেকে পড়বেন না।  ভারতকে তার ভোগ্য সব পণ্য বানাতে হবে, আর সবখাতেই দক্ষ হতে হবে ইত্যাদি না একেবারেই না। এটাই জাতিচিন্তার লাইন। স্বদেশিপনার লাইন। বরং এসব উপেক্ষা করে এর বিপরীতে বরং ভারত কোন কোন পণ্য বানাতে পেরেছে আর এতে (হোক তা খুবই ছোট পণ্য) সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জন করাতে সেই পণ্যের উপর চীনের নির্ভরশীলতা তৈরি হচ্ছে, আর ঐ পণ্য চীনে আমদানি আস্তে আস্তে বাড়ছে – এসব নির্মাণ হল আসল পথ। ৈ যে বললাম হোক তা খুবই ছোট পণ্য এনিয়ে এই তাইওয়ানি উতপাদকের এক প্রবাদমূলক ব্রিলিয়ান্ট বয়ান হল, মাথা হতে হবে, হাতির মত বড় কিছুর মাথা না হতে পারলেও অসুবিধা নাই। কিন্তু মাথা হতে হবে। কিছু না পারলে মুরগীর মাথা হয়ে দেখান।
    এই হল কথিত জাতি বা মিথ্যা স্বদেশিপনা ধারণার বিপরীতে পারস্পরিক গভীর নির্ভরশীলতার সঠিক লাইন।

    কিন্তু গত লেখার শিরোনামেই বলেছিলাম ভারত এই বুঝ ধারণ  করতে বা সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। কেন?
    কারণ, সারা ভারতকে জন্ম থেকেই এই মিথ্যা অচল – ‘জাতি’ বা স্বদেশি ধারণায় বুঁদ করে রাখা হয়েছে। ডুবে আছে। একালে মোদী জমানায় একথাগুলোকেই  মিথ্যা হলেও আরও শানিয়ে তোলা হয়েছে। আর এর সাথেই তাদের হিন্দুত্বের ধারণা জুড়ে রাখা হয়েছে, হিন্দুত্ব কেন শ্রেষ্ঠ এর সাফাই টানা হয়েছে।  আর এই হিন্দুত্ব বিক্রি করেই, হিন্দুত্বের গর্ব উস্কানি দিয়েই এবার হিন্দুভোট তার ভোট সংগ্রহের বা ভোট টানার মূল মেকানিজম।  এজন্য বলেছি মোদী পারবেন না। কিন্তু সেটা তত্বকথা ঠিক আছে থাক। বাস্তবে মোদী কী করে তকার গভীর উভয় সঙ্কট সামলান, কী পরিণতি হয় সেটা দেকার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, তবে তা প্রত্যক্ষে দেখতে পাওয়া হবে আমাদের জন্য এক অর্জন।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৮ আগষ্ট ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “জাতিগিরির ‘স্বদেশী জাগরণ’ অচল” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

     

     

  • নেপালে ভারতের জমিদারি আর ফিরবে না, পাশে মর্যাদা দেন

    নেপালে ভারতের জমিদারি আর ফিরবে না, পাশে মর্যাদা দেন

    গৌতম দাস

    ১৫ জুন ২০২০, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-33n

    _Nepal’s new territorial map, released earlier this week, has shown the area in the light red shade to be part of its territory, evoking strong reactions from India. This came after India, in its new maps released in November last year, showed the Kalapani area (marked in deep red) to be part of its territory. SCMP

    এশিয়ায় বিশেষ করে ভারতের পড়শি অঞ্চলের সকলেই অবাক হয়ে আগ্রহ নিয়ে লক্ষ্য রাখছে নেপাল কী করছে, কী করে ভারত মোকাবিলা করছে। প্রশ্নটা মোকাবিলার। নেপাল-ভারত সীমান্তে অসন্তোষ ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে প্রবল টেনশন উত্তেজনা গত কয়েক মাস ধরে বেড়েই চলছিল। এরই মধ্যে নতুন ঘটনা হল, গত ১২ জুন সকাল নয়টায় ভারতের বিহার রাজ্যের সীতামারহি [Sitamarhi] জেলার সীমান্তের ওপারে নেপালের অংশে তাদের সরলাহি [Sarlahi] জেলার সীমান্ত এলাকায় নেপালি সীমান্তরক্ষীর গুলিতে একজন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। সেই সাথে ঐ গোলাগুলিতে দুজন ভারতীয় গুরুতর জখম হয়ে ভারতের হাসপাতালে জীবন নিয়ে লড়ছে আর একজন ভারতীয় নেপালি হেফাজতে আটকা আছে, যাকে ঘটনাস্থল থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
    নেপাল-ভারতের সম্পর্কের মধ্যে এবারের উত্তেজনা ও অসন্তোষের  মূল ঘটনাটা মূলত ৮ মে থেকে; যখন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং (অনলাইনে ভার্চুয়ালি) একটি সড়কের নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন। বিবিসির ভাষায়, “ভারতের উত্তরাখণ্ড, চীনের তিব্বত আর নেপালের সীমানা যেখানে মিশেছে সেখানে হিমালয়ের একটি গিরিপথের নাম লিপুলেখ। ঐ গিরিপথের দক্ষিণের ভূখণ্ডটা ‘কালাপানি’ নামে পরিচিত- যে এলাকাটি ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও নেপাল তাদের অংশ বলে দাবি করে থাকে”। নেপালের দাবির পক্ষে যুক্তি এটাIndia and Nepal Treaty of 1950তে [Sugauli Treaty 1816]  এর রেফারেন্স আছে। সুগৌলি চুক্তি হল ১৮১৪-১৬ সালের এংলো-নেপাল যুদ্ধের শেষে উভয়পক্ষের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যেটা থেকে নেপালের সীমানার রেফারেন্স টানা হয়ে থাকে। এই চুক্তির পরবর্তিতে ব্রিটিশরা আরও তাদের দখল নেয়া এলাকা ছেড়ে দিয়ে তা লিপিবদ্ধ করতে ১৯২৩ সালে আরেক আপডেটেড নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি [Nepal–Britain Treaty 1923] করেছিল। আর এই চুক্তিতে উল্লেখিত মেয়াদ শেষেই ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তি [India and Nepal Treaty of 1950] স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা নিয়ে এখনকার নেপালের প্রবল আপত্তি উঠে আছে। চুক্তি নিয়ে একটা রিভিউ প্রক্রিয়া চালু আছে। যদিও চুক্তি এখনো বহাল আছে।

    সাবধান, প্রতিহিংসা এক নেতি এনার্জি, এটা উলটা আপনারই ক্ষতি ডেকে আনতে পারেঃ
    গত ১৯৯৬ সালে নেপাল মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলন শুরুর প্রাক্কালে এই ১৯৫০ সালের চুক্তি রিভিউ বা বাতিল অন্যতম দাবি হিসাবে তাতে যুক্ত করা ছিল। বিগত প্রায় দুশ বছর ধরে নেপাল-ভারত সব সময়ই কোন না কোন এক চুক্তি  গুরুত্বপুর্ণ হয়ে থেকেছে। অন্তত তা এজন্য যে নেপাল ভুমিবেষ্টিত বা ল্যান্ডলকড। নেপালের দক্ষিণে ভারত আর উত্তরে চীন এভাবে এইদুদেশ দিয়েই নেপাল ঘেরা। যদিও আবার দক্ষিণের ভারতের দিক দিয়ে নেপালে প্রবেশপথগুলো তুলনামূলক সহজ, অন্তত দক্ষিণদিকের পাহাড়ি এলাকা বা পথ কম উচ্চতার বলে আর এদিক দিয়ে কোন সমুদ্রবন্দরে পৌছানোর দুরত্ব তুলনায় কম বলে। আর প্রাচীনকাল থেকে এপথটাই আগে থেকে চালু হয়েছিল বলে। ফলে ১৯৫০ সালের চুক্তির মুখ্য প্রসঙ্গ সমুদ্রে যেতে ভারতের অনুমতি ও শর্ত এসব (অসম) চুক্তির মাধ্যমেই বলবত থেকেছে। তবে ভারতের ইচ্ছা-আকাঙ্খা প্রতিফলিত করে ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নেপালের নতুন কনষ্টিটিউশন রচনা ও ঘোষণা হয় নাই বলে, এরপর ভারত হয়ে পণ্য আমদানীর ঐ একমাত্র পথও ভারত অবরোধে বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ভারতের এই সিদ্ধান্তই নেপালের গরীব সাধারণ মানুষের জীবন বিশেষত জ্বালানির অভাবে ভীষণ রকম কষ্টে ফেলে দেওয়ার কথা, আর তা ফেলেছিলও তাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু সবশেষে এর ফলাফল হয়েছিল একেবারে উলটা।  সেটাই নেপালের জন্য নতুন দুয়ার, নতুন পথ খোলার শর্ত হয়ে বাস্তবতা হাজির হয়েছিল। ঐ অবরোধে নেপালে রান্নার জ্বালানিসহ সব ধরণের পণ্য আমদানি বন্ধ থাকায় মাস ছয়েক পরে  নেপাল চীনকে অনুরোধ করলে চীন সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে। চীন মানে চীনা-তিব্বতের সীমানা নেপালের আরও উত্তর দিকে যেটা আরও খাড়া পাহাড়ের দিক।  চীনা-তিব্বতের এদিকে  দুটো সীমান্ত চৌকি দিয়ে বের হওয়া যেত আগে। কিন্তু এপ্রিল ২০১৫ এর নেপালের ভুমিকম্পে সেগুলো ভারী পাথর চাপা পড়ে বন্ধ হয়ে যায় বা ভেঙ্গে যায় বলে ব্যবহার অযোগ্য হয়েছিল। তবুও বিকল্প সুবিধা একটাই ছিল যে ২০১৫ সালের আগে থেকেই চীন-তিব্বত অংশ থেকে সবচেয়ে কাছাকাছি (২০০০ কিমির বেশি) চীনের কোন সমুদ্রে পৌছানোর হেভিডিউটি রেললাইনের এক প্রকল্পে নতুন করে রেললাইন পাতা ইতোমধ্যেই হয়ে গেছিল। কিন্তু নেপাল এর ব্যবহারকারি হওয়ার কোনই আলাপ ছিল না বলে ঐ রেলপথ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে কমপক্ষে ১০০কিমি দূর দিয়ে চলে গেছিল। চীন তাই ঐ রেললাইন যেন নেপাল ব্যবহার করতে পারে এর ব্যবস্থা করতে ঐ প্রায় ১০০কিমির এক নতুন কানেকটিং রেল প্রকল্প নিয়ে নেপালকে সহায়তা করতে আসে। সেই কানেকটিং রেলপথ এখন চালু হয়ে গেছে। চীনের সাতটা বন্দর এখন নেপালও ব্যবহার করতে অনুমতিপ্রাপ্ত উন্মুক্ত। তাই নেপালের ভারত-নির্ভরতার দিন এভাবেই সমাপ্ত হয়ে যায় আর, এমন শাপে বর নিয়ে নেপাল তাদের ভাগ্য গড়ার দিকে রওনা দিয়েছে। কারও অসুবিধা বা খারাপ করতে চাইলে আপনার অজান্তেই এর পরিণতি তার জন্যই ভাল হয়ে যেতে পারে। এজন্য বলা হয়, খারাপ উদ্দেশ্য বা নেতি মন বা প্রতিহিংসা – এগুলো এর কর্তার বিরুদ্ধেই প্রযোজ্য হবাব সম্ভাবনা নিয়ে আসে! কাজেই সাবধান!

    ওদিকে লিপুলেখ নিয়ে নেপালের বিপরীতে ভারতের যুক্তি হল – এলাকাটা প্রায় ‘ষাট বছর’ আগে [মানে এরও আগে বা এর চেয়ে পুরানা কালে নয়] থেকেই তাদের দখলে আছে। তাই এটা তাদের। সাথে আরেকটা যুক্তি দেয় ভারত যে, ২০১৫ সালে এটা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময়ই দুই দেশ মিলে লিপুলেখে একটি বাণিজ্যিক পোস্ট খুলতে সম্মত হয়েছিল, যা তাদের যৌথ ঘোষণায় আছে। এ কথার বিপরীতে নেপালের বক্তব্য তাতেও নেপাল  ঐ ঘোষণা কখনোই মেনে নেয়নি বলে তখন থেকেই রেজিষ্টার্ড আপত্তি জানিয়ে আসছে। তাই এখন গত মাসে ৮ মে লিপুলেখে ভারতের রাজনাথ সিং সড়ক তৈরির কাজ উদ্বোধন করা থেকেই নেপালের পুনঃআপত্তিতে প্রবল উত্তেজনা শুরু হয়ে যায়। নেপালে প্রতিবাদের বিষয়টাকে পার্লামেন্টে আইন পাস বা কনস্টিটিউশন সংশোধনের পর্যায়ে পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

    সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দেব মুখার্জিও মোদীর বিরুদ্ধে নেপালের পক্ষে এক স্বাক্ষীঃ
    নেপালে একের পর এক ভারতের পরাজয়ের শুরু বলা যায় নেপালের রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে নতুন রিপাবলিক কনষ্টিটিউশন রচনার প্রথম উদ্যোগের (First failed Constituent Asembly was dissolved on May 28, 2012 ) ব্যর্থ হয়ে পড়া থেকে। নেপালের কোন রাজনৈতিক শক্তির উপরে ভারত কোন নিয়ন্ত্রণ আনতে না পেরে ঐ রচনা প্রক্রিয়া যেন ফেল করে সেদিকে ঠেলে দিয়েছিল। এতে হতাশায় ডুবে যাওয়া সারা নেপাল এরপর আবার বহু কষ্ট সহ্য করে (কারণ সবদলের একমত হওয়া খুবই কঠিন একটা কাজ) সর্বদলীয় আবেদন নিয়ে তাদের সুপ্রীম কোর্টে গেলে  কোর্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে তাদেরকে  নতুন করে রিপাবলিকের কনষ্টিটিউশন রচনার “কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলি গঠনের নির্বাচন” অনুষ্ঠানের অনুমতি দিয়েছিল। দুনিয়ার ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির খুব কমই আছে। কিন্তু দ্বিতীয় সুযোগে নেপালের প্রধান তিনটা দলই  আয়োজনের পুর্ণ সদব্যবহার করতে নিজেদের মধ্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে ভারত থেকে (দুই কমিউনিস্ট আর নেপালি কংগ্রেসও) প্রধান তিনদল নিজেদের দূরে নিয়ে যায়। এই তিনশক্তি মিলে নেপালের নতুন রিপাবলিক কনষ্টিটিউশন রচনা সমাপ্ত ও তাতে ভারতের প্রবল আপত্তি ও বাধা উপেক্ষা করেই ঐ নতুন কনষ্টিটিউশনের ঘোষণা দিয়েছিল ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫। তাদের তিন দলীয় প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও পূরণ করেছিল। কিন্তু এতে ভারত প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়াবহ জলুনির। তারা ভারতের উপর দিয়ে নেপালে সব ধরণের পণ্য আমদানিতে অবরোধ আরোপ করেছিল। কিন্তু এটাও ব্যর্থ হয়ে পড়া থেকেই চীন-নেপাল সম্পর্কের নতুন দিনের শুরু।  অথচ অন্তত দুশত বছরের ভারত-নেপাল সম্পর্কের মধ্যে চীন কখনও কোথাও হাজির ছিল না। ২০১৬ সাল থেকেই মাত্র নেপালের মঞ্চে চীনের প্রবেশ ঘটেছে।

    এককথায় বললে, তাই কাউকে দোষারোপের আগে ভারতের সংশ্লিষ্ট সব সরকারি কর্তা, রাজনীতিক বা একাদেমিকের নিজেদের লজ্জা ঢাকতে হলে  নিজেকেই দোষারোপ করা উচিত ছিল। হয়ত আত্মসমালোচনা করে এজন্য তারা কিছু অনুশোচনামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন এমন আমাদের দেখতে পাওয়া উচিত ছিল। সে যাই হোক, তবু কিছু প্রতিক্রিয়া হয়েছে। মোদী ২০১৪ সাল থেকে ভারতের ক্ষমতায়। তাই এদের মধ্যে একটা ঝোঁক উঠে এসেছে যে ভারতের আগের সব ব্যর্থতা মোদীর মাথায় ঢেলে দেওয়া। যদিও মোদীও, তার আমলে পুরান ঘটনা থেকে কোন শিক্ষা নিয়েছেন নীতি বদলিয়েছেন তা জানা যায় না।
    ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূতরা অবসরে যাওয়ার পরে সাধারণত কোন চলতি সরকারের অবস্থানের বিরোধিতা করে প্রকাশ্যে কোনো কথা বলেন না, এড়িয়ে যান। কিন্তু সাবেক ভারতীয় এক রাষ্ট্রদূত দেব মুখার্জি মনে হচ্ছে ব্যতিক্রম। তিনি রাজনাথের সড়ক নির্মাণ উদ্বোধন ঠিক পছন্দ করেননি। আর বিবিসিকে বলছেন, ‘রাস্তা উদ্বোধনের বিষয়টা অন্যভাবে করা যেতে পারত বলেও তার অভিমত”। দেবের অভিমত নেপালের আপত্তির মুখে মোদী সরকার নাকি বলেছিল, এ নিয়ে আলোচনা হবে। তাই বিবিসি লিখেছে দেব মুখার্জি বলেছেন, “… ভারত যখন নেপালকে কথা দিয়েছে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে, তখন বলা যায় না এটা আমাদেরই এলাকা – তোমাদের এ নিয়ে কিছু বলার হক নেই”। অর্থাৎ মোদী সরকারকে তিনি খুবই শক্ত হাতে আঘাত ও সমালোচনা করেছেন বলতেই হয়। এই ঘটনাকে আমরা বোধহয় দলবদ্ধভাবে না পারলেও ব্যক্তিগতভাবে করা দেব মুখার্জির প্রায়শ্চিত্ত বলতে পারি।
    আরেক দেশের নতুন কনস্টিটিউশন গৃহীত হওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি তোলার আমি কে? এনিয়ে আপত্তি তুলে নিজেকে হাস্যকর করার কোনো মানে হয় বলে এমন কাজ  আমরা কোন রাষ্ট্রকে করতে দেখি না। কিন্তু নেপালে সব হারিয়ে ভারত তাই করেছিল। যদিও সবকিছু উপেক্ষা করে নেপালে নতুন কনস্টিটিউশন গৃহীত ও ডিক্লারেশন বা ঘোষণা হয়েছিল। কিন্তু এর পরের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে এক ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকার ক্ষমতায় আসে সেটা ছিল নেপালের বড় দুই কমিউনিস্ট পার্টি মিলে এক দলের সরকার। আর একমাত্র নেপালি কংগ্রেস কোন মতে বিরোধী দলে জায়গা হয় আর সেই সাথে তার ভারতের সাথে সম্পর্ক রক্ষার কিছু সুযোগও সামনে আসে। কিন্তু এবার, নেপালের পার্লামেন্টে লিপুলেখ নিয়ে প্রতিবাদ ইস্যুতে আলোচনায় সেই নেপালি কংগ্রেসের এক এমপি পুষ্পা ভূষল গৌতম বলেন, “১৮১৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও নেপালের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাগাউলি চুক্তি অনুসারে ওই এলাকা সম্পূর্ণভাবে নেপালের”। অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে নেপাল কংগ্রেস দলও এখন কম ভারতবিমুখ নয়। এ থেকে নেপালের অভ্যন্তরীণ অবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা বেশ খানিকটা আন্দাজ পেতে পারি।
    নেপালের মাওবাদীরা তাদের সশস্ত্র বিপ্লব নিয়ে প্রথম যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৯৬ সালে। সেখানে নেপালে তাদের রাজার মূল সহযোগী বলে ভারতকে উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে ওই বিপ্লবের মূল শত্রু বলে তারা চিহ্নিত করেছিল ভারতের শাসকদের। বিশেষ করে ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তি বাতিলের প্রধান দাবি তারা সেই থেকে শুরু করেছিল। মাঝে ২০০৭ সালের দিকে নিজেরা কৌশল বদলে সশস্ত্র থেকে গণআন্দোলনে নেমে আসারকালে চুক্তি বাতিলের কথা কিছুটা ঢিলেঢালা ছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে চুক্তি রিভিউয়ের পক্ষে আনুষ্ঠানিক দাবি তোলার একপর্যায়ে ২০১৬ সালে এটা কাজ শুরু করলেও নেপালের মূল ফোকাস সরে যায় ভারতের বিকল্প হিসেবে চীনের ভেতর দিয়ে বাইরের দুনিয়াতে বের হওয়ার ব্যবস্থা ও কোনো নতুন চুক্তির পথ খুঁজে বের করা। তা এখন চীনের মাধ্যমে কার্যকর হয়ে গেছে। এরও প্রভাব এখন নগদ দেখা যাচ্ছে। সারা নেপালের চরম ভারতবিমুখ হয়ে পড়া চলছে ধরা যায় গত সাত বছর ধরে। কিন্তু এই লিপুলেখ সীমান্তের রাস্তা নির্মাণ কেন্দ্রে করে এবারের ভারতবিমুখতা বা বিরোধিতা অনেক বাস্তব হয়ে উঠেছে। চীন-নেপালের সাতটা সীমান্ত দিয়ে বাইরের সাথে যোগাযোগ, সম্পর্ক করার কথা নেপাল প্র্যাকটিক্যালি ভাবতে পারে এখন। এক কথায় মূল কারণ এটাই যে, ভারত ছাড়াও নেপালের অর্থনৈতিক জীবন এখন সার্ভাইভ করা বাস্তবে সম্ভব। এটাই হলো এবারের ভারতবিমুখতার বিশেষ দিক।

    ‘বিশেষ সম্পর্কের’ সমাপ্তি কি এখানেই ঘটবে?
    এছাড়া এরই আরেক ছাপ দেখা যাচ্ছে আবার এখন। যেমন গত ১১ জুন কাঠমান্ডু পোস্ট পত্রিকায় একটা কলাম ছাপা হয়েছে যার শিরোনাম- ‘বিশেষ সম্পর্কের’ সমাপ্তি কি এখানেই ঘটবে”? [Is this the end of the ‘special relationship’?] এখানে বিশেষ সম্পর্ক বলতে ভারত-নেপাল বিশেষ সম্পর্কের কথা বুঝানো হয়েছে। আর ঐ লেখায় কলকাতার হিন্দুস্থান টাইমসের এক সম্পাদকীয় আর এক প্রকাশিত রিপোর্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হিন্দুস্থান টাইমসের ঐ সম্পাদকীয় [The costs of anti-Indian nationalism in Nepal | HT Editorial] একেবারেই সাব স্ট্যান্ডার্ড; ওর নিম্নমান তাদের নিজের জন্যই লজ্জার। এত খারাপ তারা সাধারণত লিখে না। কিন্তু এখানে তারা নিজের দগদগে কিন্তু খামোখা “নেশনস্টেট বোধের” আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। আর কাউকে “কাজের ছেলে” গণ্য করে কোনো লেখা দাঁড় করালে যেমন হয় তারই ছাপ রেখে একটা লেখা হয়েছে এটা। ঐ সম্পাদকীয়-এরই আবার সাব-হেডলাইন হল, “কাঠমান্ডু (ভারতের সাথে) সম্পর্ক রিসেট করে ঢেলে সাজাতে চায়, এতে তারই স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে“। পত্রিকাটা অভিযোগ করেছে, নেপালে নাকি “গভীর এন্টি-ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম” ছড়িয়ে পড়েছে।
    আরো লিখছে, “নেপাল-ভারতের মধ্যে এক ‘বিশেষ সম্পর্ক’ আছে, অসন্তোষের গোড়াটা সেখানে”। লিখেছে, “বাস্তবে এর মানে ভারত-নেপালের সাথে খোলা সীমান্ত শেয়ার করে। ভারত নেপালিদের বিনা বাধায় ভারতে কাজ করতে এলাউ করে আর নেপালিরা (গুর্খা) ভারতের সেনাবাহিনীকে সেবা (কাজ) করে। এর বিপরীতে, নেপালিরা এ দুটোতেই রাজি আছে, পরোক্ষে ওরা নিজের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতকে একটা ভূমিকা দিয়েছে (এটা আর কোন সম্পাদকের আলাপ নয় রাস্তার চা দোকানের রকবাজের আলাপ হয়ে গেছে) আর নেপালিরা ভারতের নিরাপত্তার স্বার্থের ব্যাপারে সেন্সেটিভ হয়ে থাকছে। … ভারতও বিশেষ সম্পর্ক থেকে লাভবান হয়েছে। তবে এই বিশেষ সম্পর্ক রিসেট(reset) করলে নেপালকে এর মূল্য দিতে হবে”।
    “নেপালকে এর মুল্য চুকাতে হবে। এর মানে হবে কড়া সীমান্ত, এর মানে হবে নেপালিদের ভারতে অবাধে কাজ করা বন্ধ, এর মানে হবে নেপালের উন্নয়নের জন্য (ভারত থেকে) দ্বিপক্ষীয় জরুরি সহযোগিতার দ্রব্যাদি কমে যাওয়া, এর মানে হতে পারে, ত্বরাই মানে নেপালের দক্ষিণাঞ্চল থেকে যে রাজনৈতিক প্রতিরোধের ঝড় উঠবে (মানে ভারত উসকিয়ে তুলবে) তা সামলানো। কাঠমান্ডু কি এসবের জন্য তার একক সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও মূল্য চুকানোর জন্য তৈরি? এটা তো একটা পরিষ্কার প্রো-চায়না ঝোঁক ও এক আগ্রাসী ন্যাশনালিজম? এভাবে ‘বিশেষ সম্পর্ক’ সব নিঃশেষ করে দেয়া দুই দেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে, তবে নেপালের বেশি ক্ষতি হবে”।

    এখন এক কথায় বললে, হিন্দুস্থান টাইমসের এই ভাষ্য থেকে বুঝা যাচ্ছে অন্তত গত দশবছরে নেপাল-ভারতের সম্পর্কের ইতিহাস নিয়ে এদের কোন খবর নাই, মুল্যায়ন বা কমপক্ষে কোন রিডিং  নাই। তবে সেটা যাই হোক, হিন্দুস্থান টাইমস মুলত একটা মিডিয়া একটা দৈনিক, কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বের প্রতিষ্ঠান নয়। কাজেই মিডিয়া হিসাবে এই বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য। আর তাদের এই লেখার প্রেক্ষিতে মন্ব্যে বলতে হয়, কাউকে কাজের ছেলের মত ট্রিটমেন্ট আচরণ করে যদি বলা হয় “আমার পা-দাবানো ছেড়ে চলে গেলে তুই তো না খেয়ে মরবি”- এটা সেরকমের বক্তব্য।  এটা নেপালের জন্য অপমানজনক হবারই কথা। আসলে ভয় দেখিয়ে কাউকে জোয়ালে নিয়োজিত রাখার অনেক উপায় আমরা জানি, দেখেছিও। তবে এখানে দেখছি; এখানে বলা যে ‘আমারও একটু কষ্ট হবে তোর হাতে আমার পা-দাবানো পাব না, তবে তোরই না খেয়ে থাকতে বেশি কষ্ট হবে”। এটা এ ধরনের। এমনই নিম্নমানের।

    বলাই বাহুল্য, এটা কোনো পত্রিকার সম্পাদকীয় হতে পারে না। বাহ্যত উভয়ের সম্পর্ক যাই থাক, নেপাল-ভারত সম্পর্ক দুটো সমমর্যাদার রাষ্ট্রের, যেখানে কেউ কারো অধস্তন এমন মনে করাটাই অগ্রহণযোগ্য তো বটেই, বরং এভাবে বলা বা মনে এমন ধারণা পুষে  নিয়ে কথা বলাটাও অপরাধ। দুটো সমমর্যাদার রাষ্ট্রের এই সম্পর্ক-নীতির কথা মনে রেখে এই সম্পাদকীয় লেখা হয়নি। এজন্য এটা গর্হিত কাজ।

    জাতিসঙ্ঘ যেখানে ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্রের পড়শি দেশের উপর দিয়ে গিয়ে সমুদ্র ব্যবহারের একসেস পাওয়াকে অধিকার গণ্য করে রেজুলেশন তৈরির প্রক্রিয়ায় আছে, এরা তখন বেখবর হয়ে নেপালকে “এন্টি-ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম” করার মূল্য চুকাতে হবে বলে ভয় দেখাচ্ছে, হুমকি দিচ্ছে।

    এছাড়া, এটা আসলেই একটা হাসির কাণ্ড যে হিন্দুত্বের ভারত ও হিন্দুত্বের ন্যাশনালিজমের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে আমরা আরেকটা মানে নেপালের  ন্যাশনালিজম দেখে টিটকারি দিয়ে বিতৃষ্ণা প্রকাশ করতে দেখছি। আর সবচেয়ে ভয়াবহ হল নেপালের ত্বরাইবাসীরা ভারতের উসকানিতে নেপালের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে – ভারত-রাষ্ট্র তা করাবে বলে হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু হুমকি দিচ্ছেন এক পত্রিকার সম্পাদক! কোনো সরকারপ্রধান বা রাজনীতিক নয়। এখানে আবার পত্রিকার সম্পাদক এমনই জাতিবাদী হয়েছে যে, রাষ্ট্র বা সরকারের কেউ না হয়েই তিনি হুমকি দিচ্ছেন! এটা এমনই জাতিবাদিতা!   জমিদারের ছেলে যদি রেষ্টুরেন্টে গিয়ে পাশের টেবিলে বাসার এককালের কাজের ছেলেকে খেতে দেখে তাহলে যেমন জমিদার রোয়াব-ভ্যানিটি রক্ষার্তে তেলেবেগুনে ঝাপিয়ে পড়ে, হিন্দুস্থান টাইমসের সম্পাদকের অবস্থ হয়েছে তেমনই।  এই অবস্থায় সম্পাদককে একটাই কথা বলা যায় – মহাশয়, কুল ডাউন! আপনি শান্ত হোন! সাম্য, সম-মর্যাদা ব্যাপারটা বুঝেন?  আপনি বুঝে নেন জলদি, অবস্থা আরো খারাপ হবার আগেই! দেখছেন না ৪০০ বছরের আগের কালো-দাস-ব্যবসায়ী সেলিব্রেটি হয়ে এতদিন নিজের মুর্তি টাঙিয়ে খারায় ছিলেন! কিন্তু এখন? না আর না! এবার সময় হয়েছে আপনি মাটিতে, নদীতে লুটায় পড়তেছেন না? আর লুকায়ে স্বাভাবিক থাকতে পারছে না! আপনিও, কেউ বাদ যাবেন না!

    ওই সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিল গত ৮ জুন। আর নেপালে এর পালটা সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে ১১ জুন। এ থেকে নেপাল-ভারত সম্পর্ক কোন উত্তেজনায় আর কেমন পর্যায়ে আছে এরই কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।

    নেপাল সীমান্তে ভারতীয়দের উপর গুলিঃ
    তাহলে গত ১২ জুন নেপালি পুলিশের হাতে ভারতের এক নাগরিককে হত্যা, দুইজন ভারতীয় নাগরিকের মারাত্মক আহত ও একজনকে নেপালি পুলিশের গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে; এ ঘটনার কি নেপাল-ভারত সীমান্ত লিপুলেখ নিয়ে উত্তেজনার কোনো সম্পর্ক আছে? এর জবাব হল, পরোক্ষে সম্পর্ক অবশ্যই ভাল মতনই আছে, প্রত্যক্ষে সম্ভবত নেই। সাধারণ অবস্থায় নেপাল-ভারত  তো খোলা সীমান্ত, অবাধে দুদেশের নাগরিক যেতে পারে। বিশেষ করে বিহার জেলা সংলগ্ন এলাকায় সীমান্তের দুই পারের বাসিন্দাদের মধ্যে বৈবাহিক আত্মীয় সম্পর্কই প্রচুর। কিন্তু এখন নেপালে ১৪ জুন পর্যন্ত লকডাউন চলছে। নেপ[আলী সীমান্ত্রক্ষীর যুক্তি,  এসময় নেপালের মেয়ে বলে এক ভারতের বউমা অবাধে এখনই শ্বশুরবাড়ি অবাধে আসাযাওয়া করতে পারে না। লকডাউনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সেটা করতে যাওয়া থেকেই তর্কবিতর্কের শুরু। এরপর এই বাধা ভাঙতে ভারত থেকে লোকজন এনে (কমপক্ষে ৩০ জন) চাপ প্রয়োগ করতে চাইলে সীমান্তরক্ষীরা (মাত্র ৭ জন) ভয় পেয়ে ভারতীয়দের সামলাতে না পেরে গুলি ছুড়েছে। প্রথমে দশ রাউন্ড ফাঁকা ফায়ার। কিন্তু এতে কোন কাজ না হওয়ায় এবার নিচে ফায়ার করেছে। ভারতের প্রায় সব পত্রিকার বর্ণনার সারকথা এটাই। তবে নেপালের সীমান্ত সৈন্য বাড়ানোর প্রচেষ্টা আছে তা ভারতের ইকোনমিক টাইমস লিখেছে বলে কেউ কেউ লিখেছে। কাজেই পরোক্ষ লিপুলেখের টেনশন এখানেও আছে, বলা যায়। এখানে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি ভারত-নেপাল সম্পর্কের আগামি অভিমুখ সেদিকেই যাচ্ছে – মুক্ত অবাধ সীমান্ত আর থাকছেই না। চুক্তি বদল হচ্ছেই। তবে কতটা আপোষে সেটা এক বিরাট প্রশ্ন!

    তবে আমরা উপরে দেখলাম ভারতীয় সম্পাদকের মনোভাব। তিনি নেপালের এমন বেড়া দিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়া কী সহজে সহ্য করে নিবেন? সন্দেহ রাখার অবকাশ আছে অবশ্যই!   জমিদার-মন এসব সহজে নিতে পারে না। ‘বান্দি’ করে যাকে এতদিন দাবায় পায়ের নিচে রাখছিলেন তিনি, সে এখন আমারই পাশের চেয়ারে বসে কেমনে!   আর বিপরীতে ওদিকে নেপালির পত্রিকার কলামিস্ট চাইছেন নেপাল-ভারত সম্পর্ক রিসেট করা ঢেলে সাজিয়ে নিতে, যাতে অসাম্য, অমর্যাদার সম্পর্ক দূর হয়ে যায়। মানুষ না খেয়ে হলেও সম-মর্যাদার জন্য জীবন দিতেও উঠে দাড়াতে চায়। এটা কোন জমিদার মন বুঝে না। যার একটাই ওষুধ – রিপাবলিক মন – রাষ্ট্র, নাগরিক বৈষম্যহীনতা, মর্যাদা ইত্যাদি ঝাপ্টা দেওয়া।  অর্থাৎ কলামিস্ট তিনি বুঝাতে চাইছেন ১৯৫০ সালের চুক্তির বাতিল অথবা ন্যূনতম একটা রিভিউ করতে। আর বর্তমান সীমান্ত সমস্যার সমাধান চাইছেন। রিভিউ রিপোর্ট এসে গেছে। কিন্তু মোদী সময় পাচ্ছেন না বলে এড়িয়ে রেখেছেন।

    বোঝা যাচ্ছে, নেপালের সাথে ভারত তাদের সম্পর্কটা খামোখাই তিতা করে ফেলেছে, খুব সম্ভবত তাদের পুরাণা কলোনি আচরণ পছন্দ করে তা আকড়ে থাকার কারণে। আর এর তাবত দায় এখন চীনের ওপর চাপাতে চাইছে। যদিও রেকর্ড ও ফ্যাক্টস একেবারেই পরিষ্কার যে ২০১৫ সালের অক্টোবরের আগে নেপালে চীনের নামই কেউ জানত না। কোথাও উচ্চারিত হত না এমনই অপ্রয়োজনীয় মনে হত। তবে নিশ্চয় চীনও নিস্পাপ নয়। তবে সেটা এখানে প্রসঙ্গও নয়। বাস্তবতা হল, নেপালের প্রতিটা মানুষকে ভারতের চরম কষ্টকর জীবনের মুখে ফেলে দেয়া থেকেই এর ভিতরেই ত্রাতা হিসেবে হাজির হতে সুযোগ পেয়ে গেছিল চিং । যে সুযোগ সে না চাইতে পেয়েছিল এবং নিয়েছিল।  এরপর থেকে নেপালে চীনের আবির্ভাব ঘটা আর কেউ ঠেকাতে পারে নাই।  প্রতিহিংসা দিয়ে এর বিরুদ্ধে কিছুই করা যাবে না। নেপালের কিছুই করতে পারবে না, উলটা নিজের আরো ক্ষতি ছাড়া।

    ভারত কেবল নিজের আচরণ আর স্বভাবকেই দায়ী করতে পারে; আর যারা আগে সেসময় ২০১৫ সালে এটা দেখতে মিস করেছেন তাদের জন্যই সম্ভবত সেই প্রমাণ এখনো হিন্দুস্থান টাইমসের সম্পাদক আবার হাজির করেছেন!

    লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৩ জুন ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টেও  “নেপাল-ভারত সীমান্তে অসন্তোষ”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নাগরিকত্ব ইস্যুতে ভারতের বিদেশী কূটনীতিক

    নাগরিকত্ব ইস্যুতে ভারতের বিদেশী কূটনীতিক

    গৌতম দাস

    ০৬ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০৬,  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2QS

               https://gulfnews.com/photos/news

    ভারতের “নাগরিকত্ব ইস্যু” ব্যাপারটা অনেক বড় পরিসরে ছড়িয়ে গেছে। যেমন আগে এটা এনআরসি [NRC বা নাগরিক তালিকা প্রণয়ন]  বলেই নিজে বুঝা বা অন্যকে বুঝানো যেত।  এনআরসি ব্যাপারটা ছিল কেবল আসামে আর সেখানে কে নাগরিক কে নয় এরই এক বাছাই প্রক্রিয়া চলছে বলে বুঝলেই চলত।  কিন্তু বিজেপি-আরএসএসের গোপন লক্ষ্য ও পরিকল্পনার দিকটা ক্রমশ পুরাটাই উদোম হতে শুরু করেছে। এতে পরবর্তিতে তা আর এক নতুন মাত্রার দিকে গেলে সেই বিষয়টা বলা হচ্ছে সিএএ (CAA, Citizen Amendment Act) । যার সোজা মানে হল সংশোধনী বিলে  আফগান, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ এভাবে নাম ধরে উল্লেখিত দেশ থেকে মূলত হিন্দুধর্মের লোকদেরকে ডেকে নিয়ে এসে নাগরিকত্ব দেয়ার পরিকল্পনা এটা। যদিও তা আদৌও বিজেপি বাস্তবায়ন করতে পারবে তা আমরা নিশ্চিত নই। এতে এখানে গুরুত্বপুর্ণ দিক যেটা স্পষ্ট করে বলে রাখা হল ঐ তিন দেশের মুসলমানেরা এই সুবিধা পাবে না।  অর্থাৎ ঐ তিন দেশে কোন কারণে  মানবাধিকার হারানো যে কেউ “নাগরিক” নয়, কেবল মূলত হিন্দুধর্মের লোকের জন্যই এই সুবিধা। এটা এতই স্পষ্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো বৈষম্যমূলক আইন।
    আর এবছর থেকে এবার আরও এক নতুন ইস্যু এনপিআর (NPR বা জাতীয় জনগণনা) এর সাথে যোগ হচ্ছে। ভারতে প্রতি দশ বছর পরপর নিয়ম করে জনগণনা হয়। সেটা শুরু হবে এবছরের এপ্রিল থেকে আর তা কাজ শেষে প্রকাশ হবে ২০২১ সালে।  কিন্তু এবার জনগণনাতে বাড়তি প্রশ্ন ও তথ্য সংগ্রহের কিছু দিক থাকবে এমনভাবে যেন তা পরের এনআরসি ও সিএএ-এর বদ মতলবের কাজকে সাহায্য ও সহজ করে। তাই এখন থেকে ভারতের “নাগরিকত্ব ইস্যু” বলতে আমাদেরকে – NRC, CAA & NPR – এই তিনের কোন একটাকে না বুঝা তিনের সমন্বয়ে ‘পুরাটাই একটা’ এভাবে বুঝাই সঠিক হবে। তাই এখন থেকে ব্যাপারটাকে একসাথে “নাগরিকত্ব ইস্যু” লিখব।

    অনেকের ধারণা, সম্প্রতিকালের “নাগরিকত্ব ইস্যুতে” ভাল সাড়া ফেলা বিরোধী আন্দোলনের পর এখন বোহয় এর সমাপ্তি ঘটেছে। না, এমন মনে করা একেবারেই ভুল হবে। আর বাস্তবে এটা থেমেও যায়নি। বরং আসলে নতুন নতুন মাত্রা ও অভিমুখ নিয়েছে আর সেসব দিকে ছুটে চলেছে। আর এটা থেমে যেতে পারে যদি একমাত্র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কোন ঘোষণা আসে যে, পুরা ‘নাগরিকত্ব ইস্যুর’ সব কিছুই পরিত্যক্ত এবং আইনগুলো বাতিল ঘোষণা করা হল। এর আগে নয়। যদিও ব্যাপারটা বিড়ালকে মাছ খাওয়া ছেড়ে দিতে বলার মত। বিজেপি তা করতে পারবে না, বাধ্য না হলে। কারণ, বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতিই তো এটা যে, ইসলামবিদ্বেষ ছড়ানো, আর এর মাধ্যমে সাধারণভাবে সবাই নাগরিক বলে গণ্য না করা, বৈষম্যহীন সম-অধিকারের নাগরিক – সেটা নয়; বরং হিন্দুধর্মের লোকেরা শ্রেষ্ঠ এবং উপরে – এই হিন্দুত্ববাদের প্রচার তুঙ্গে তোলা যাতে এভাবে সমাজে ধর্মীয় পোলারাইজেশন ঘটে যায় আর তাতে হিন্দু ভোটে একা বিজেপির ভোটের বাক্সই ভরিয়ে তোলা যায়। কাজেই নাগরিকত্ব ইস্যু নরেন্দ্র মোদীর সরকার কখনই ত্যাগ করতে চাইবে না, যদি না তাকে আন্দোলনের মাধ্যমে বাধ্য করা না যায়।

    যদিও এটা ঠিক যে, স্বাভাবিকভাবেই এই আন্দোলনের তীব্রতা সময়ে কমবে সময়ে তুঙ্গে উঠবে, কখনো সরকার পিছু হটবে, মিথ্যা বলবে আবার মোদী সরকার কিছু সুযোগ পেলেই দ্বিগুণ বেগে ফিরে আসবে – অনুমান করা যায় সাধারণভাবে এটা এভাবেই চলবে। আর তা চলবে অন্তত চলতি সরকারের স্বাভাবিক আয়ু, ২০২৪ সাল পর্যন্ত। এমন হওয়ার অনেক কারণ আছে। এক নম্বর কারণ হল, বিজেপি সরকারের হাতে এ ছাড়া নিজের মুখরক্ষার আর কোনই ইস্যু নেই। অথচ ভারতের অর্থনৈতিক দুরবস্থা খুব খারাপ আর তা দীর্ঘায়িত হতে যাচ্ছে। ফলে এই দুর্দশা ঢাকতে উপযুক্ত ইস্যু দরকার। পেটের চিন্তা থেকে আম পাবলিকের মন সরানোর মত অন্য ব্যস্ততায় তাদের মাতিয়ে রাখার মত ইস্যু দরকার; যেটা গত ২০১৬ থেকেই মোদী করে আসছে। এ ছাড়া আরও বড় বিষয় হল, সরকারের বাকি চার বছরের আয়ুতে প্রতি বছরই গড়ে চার-পাঁচটা করে রাজ্য নির্বাচনে জনগণের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। সেখানে বলার মত নির্বাচনী ইস্যু পেতে হবে এমন জোশ তুলতে পারতে হবে সরকারকে।

    এমন অনেক কিছুর মধ্যে আগামী বছর (২০২১) দু’টি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নির্বাচন আছে – পশ্চিমবঙ্গ আর আসাম রাজ্যে। এ দুটোতে কী হবে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে; তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এতে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির (অমিত শাহ্ বলেছেন দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জিতবে) হার হলে, তা ‘নাগরিকত্ব ইস্যু’ নিয়ে এর পরে বিজেপির কোনদিন কথা বলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শামিল হবে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন আসামের আগে হবার কথা। আর পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম দু’রাজ্যেই হেরে গেলে ভারতে খোদ হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি বিপন্ন হয়ে যাবে। “মুসলমানবিদ্বেষী জিগির তুলে বিজেপির ভোট বাক্সে হিন্দু পোলারাইজেশন” – এই ফর্মুলা চিরতরে অকেজো হয়ে যেতে পারে। এমনিতেই এদুই রাজ্যে হারলে মোদী সরকারের সব হিন্দুত্ব-বয়ানেরই নৈতিক [moral] পরাজয় ঘটে যাবে। হিন্দুত্ববাদ-ভিত্তিক কোন বয়ান অনুসারে ব্যাখ্যা বক্তব্য নিয়ে পাবলিকের কাছে গেলেই মানুষের “দূর দূর” করা শুরু হতে পারে।  ফলে বাকি তিন বছর ক্ষমতায় থাকা তখন দুঃসহ হয়ে উঠতে পারে। অতএব, বিশেষ করে এ’দুই রাজ্যে অন্তত রাজ্য নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত নাগরিকত্ব ইস্যু থাকবে প্রধান ও সবচেয়ে প্রভাবশালী ইস্যু হয়ে।

    ইতোমধ্যে, অমিত শাহ আরেক ধাপ পিছু হটে নিজ মুখেই “এনআরসি ‘এখন’ নয়” – বলেই পিঠটান দিয়েছেন। এনিয়ে দৈনিক আনন্দবাজারের এক শিরোনাম হল, “এনআরসি নয় ‘এখন’, শাহের কথায় ফের ধন্দ”। মানে হল, মিডিয়াগুলো এখন মোদী-অমিতের কোনো কথাকেই আর বিশ্বাস না করার লাইন নিয়েছে তাই এদের কোন কথাকে স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে না। মিডিয়া তাই পাবলিকের মনের সাথে মিল রাখতে  প্রতিদিন ও সবসময় সন্দেহ করছে আর খুঁটিয়ে প্রশ্ন করে চলেছে। কেন? কারণ, ভারতের এখনকার “পপুলার পাবলিক মুডটা এ রকম”- আসলে সেই ইঙ্গিতই তুলে ধরছে মিডিয়াগুলো। ভারতের রাজনীতিতে সহসা এমন ক্ষিপ্ত মুড তৈরি হতে দেখা যায় না। বরং প্রত্যেক পঞ্চম বছরে, মানে কেন্দ্রের নির্বাচনের বছর ছাড়া অন্য বছরগুলোতে বড় মিছিল-মিটিং আয়োজন করে দলগুলো পয়সা খরচ করতে চায় না, তেমন কোনো ফল এতে নেই বা হবে না মনে করে বলে। কিন্তু ব্যতিক্রমে এমন ক্ষিপ্ত মুড কখনও  তৈরি হয়ে গেলে মিডিয়ায় রিপোর্ট লেখার সময় সেই পাবলিক মুডের সাথে তাল না মিলিয়ে লিখলে পত্রিকাই বাজার হারানোর রিস্কে পড়ে যাবে। আনন্দবাজারসহ  এখনকার সব মিডিয়া রিপোর্ট তাই এই মুডে লেখা। এক কথায়, বিজেপির বয়ানের প্রতি কোনো সহানুভূতি প্রকাশ করে ফেলা মিডিয়াগুলোর জন্য রিস্কি হয়ে গেছে। তবে অবশ্যই সেটা ‘টাইমস নাউ’ বা ‘রিপাবলিক’ ইত্যাদি বিজেপি ঘরানার দলীয় মিডিয়াগুলো বাদে।

    উত্তরপ্রদেশ বাসা থেকে সোনাদানা লুট শুরু হয়েছে
    নাগরিকত্ব ইস্যুতে এখন আরেক তোলপাড় চলছে উত্তরপ্রদেশে। মোট ২৩ কোটি জনসংখ্যার বিরাট রাজ্য উত্তরপ্রদেশে মুসলমান প্রায় ২০ শতাংশ। এবারের নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে আন্দোলনে প্রাণহানিতে সারা ভারতে মোট মৃতের সরকারি সংখ্যা ২৫ জন, যার ১৭ জনই এই প্রদেশের। আন্দোলনের মুখে রাজ্যসরকার পিছু হটেছিল, আর এখন ঘোষণা দিয়ে প্রতিশোধ নেয়া শুরু করেছে। এই রাজ্যের একটা আইন ছিল, কোনো আন্দোলনে সরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হলে রাজ্য সরকার এর জন্য  – দায়ী কে, তা সুনির্দিষ্ট চিহ্নিত করে, তাঁর থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবে। কিন্তু পরে আবার রিট হওয়াতে সেবার হাইকোর্ট আরও স্পষ্টভাবে বলে দেয় যে, রাজ্য সরকার নয়, হাইকোর্টে প্রমাণ সাপেক্ষে তা কোর্ট আদায় করে দিবে। অর্থাৎ হাইকোর্টের মাধ্যমে রাজ্য সরকার তা আদায় করতে পারবে; নিজেই সরাসরি কাউকে দায়ী করে নয়। সোজা কথায় নির্বাহী ক্ষমতা নিজের মত করে কিংবা আদালতে প্রমাণ হওয়া ছাড়া নিজেই নয়। অথচ উত্তরপ্রদেশ রাজ্য-পুলিশ এখন হাইকোর্টের মামলা করা অথবা রায়ে তা প্রমাণের অপেক্ষায় না থেকে নিজেই বেছে বেছে বেশির ভাগ মুসলমান নাগরিকের বাড়িতে প্রবেশ করে হয়রানি ও লুটপাট করে চলেছে- একেবারে সোনাদানা নিয়ে যাওয়া শুরু করেছে। বিবিসি সরেজমিন রিপোর্ট করেছে এ নিয়ে। যার শিরোনাম – “যোগী অদিত্যনাথের ‘বদলা’: বাড়ি বাড়ি সম্পত্তি ক্রোকের নোটিস”।
    তাই বলা যায় এক ‘খাঁটি প্রতিশোধ’ আদায়ের পালা চলছে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে।

    ভারতের বিদেশী কূটনীতিক
    ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা “নাগরিকত্ব ইস্যুতে” সম্প্রতি এক গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট ছেপেছে। ভারতে অবস্থানরত বিদেশী কূটনীতিকেরা নাগরিকত্ব ইস্যুতে মোদী সরকারকে কেমনভাবে দেখছেন, এই হল ওর বিষয়। এ নিয়ে তিন মহাদেশেরই প্রায় ১৬ জন কূটনীতিকের সাথে কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রিপোর্টার। এর শিরোনাম, “দ্রুত বন্ধু হারাচ্ছে ভারত : সিএএ কেউ সমর্থন করছে না, বিদেশী কূটনীতিকদের হুঁশিয়ারি” [No outreach on CAA, foreign diplomats warn: India fast losing friends]। সেখানে এক কূটনীতিকের মন্তব্য খুবই প্রতিনিধিত্বমূলক। ভারতে তিন বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন, এমন সেই কূটনীতিক বলেছেন, “মোদী পুনর্র্নিবাচিত হয়ে এসেছিলেন বলে নিজের স্বপক্ষে যে একটা ‘ফিল-গুড’ বা ‘স্বস্তির-ইমেজ’ [“feel-good” factor ]  তৈরি করতে পেরেছিলেন এত দিন, তার পুরোটাই এখন চলে গেছে” [“feel-good” factor about the re-elected government has “vanished”. ]।

    তবে তাঁরা মূলত সবচেয়ে অখুশি এ জন্য যে, নাগরিকত্ব ইস্যু বা এর সামাজিক প্রতিক্রিয়ায় বিরোধী আন্দোলন কিংবা জনবিভক্তিতে ক্ষোভ ইত্যাদি – এসব নিয়ে নরেন্দ্র মোদী সরকার আজও কোন কূটনৈতিক ব্রিফিং বা সরকারি ভাষ্য প্রদান করেননি। না, কূটনীতিকদের এই আকাঙ্খা এটা অনধিকার নয় বা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ঢুকে পড়া নয়। কারণ, ইতোমধ্যে মোদী সরকার এ ধরনের কাজকে এর আগেি নিজের সরকারের জন্য রুটিন করে ফেলেছেন। যেমন- ‘পুলওয়ামা-বালাকোট হামলা’র পর, আগস্ট থেকে অক্টোবরে কাশ্মির নিয়ে সিদ্ধান্তের পর এবং এমনকি সুপ্রিম কোর্টের ‘অযোধ্যা মামলা’র রায়ের পরও তারা কূটনীতিকদের ব্রিফিং করেছিলেন অথচ এখন নাগরিকত্ব ইস্যুতে চুপ- এ কারণে এবার তারা খুব অবাক হয়েছেন, [They recalled that through 2019, the Ministry of External Affairs (MEA) held several briefings, mostly after Pulwama-Balakot in February-March, followed by Kashmir from August to October — and, to their surprise, even once on the Supreme Court’s Ayodhya verdict.]।

    ওদিকে সবচেয়ে বড় কথাটা হল, বিদেশী মিডিয়াতে যেভাবে বিক্ষোভ ও সরকারের সাঁড়াশি অভিযানের ছবি ও প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছে, তা ‘বন্ধু’ রাষ্ট্রগুলোর ভারতের পক্ষে দাঁড়ানোটাকে কঠিন করে তুলেছে। কারণ ওইসব দেশের অনেকেই ‘অভিন্ন মূল্যবোধ’ নিয়ে ভারত সরকারের প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। ‘অভিন্ন মূল্যবোধ’ মানে নাগরিক অধিকার এবং নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্যহীনতা রক্ষা করে চলার প্রতিশ্রুতি, যা যেকোনো রিপাবলিক রাষ্ট্র করে থাকে, তা ভারতে কোথায় গেল সেই প্রশ্ন তুলছেন তারা, [“With each passing day, the government’s position is getting weakened, as these images are not going away. And the action against the protesters and the latest reports of torture and intimidation are giving more credence to the view that the government is intolerant of criticism and dissent,”……. “It doesn’t speak well of the world’s largest democracy,” a diplomat from a G-20 country said”…….The State Department spokesperson had earlier urged India to “protect the rights of its religious minorities” in keeping with its “Constitution and democratic values”.

    আসলে, এটা হল হিন্দুত্ববাদের রাজনীতির মৌলিক সঙ্কট, যেকোন অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে এ জন্য এমন মতবাদ অগ্রহণযোগ্য। সোজা কথাটা হল, বিজেপি অথবা আরএসএসের রাজনৈতিক চিন্তায় ‘নাগরিক অধিকার’ বলে কোন ধারণা নেই। কেবল ‘হিন্দু-জাতি’ আছে; নাগরিক বলে কোনো কিছু নেই। খাঁটি হিন্দুরা কেবল কথিত অলীক কোন হিন্দু-জাতির স্বার্থ দেখবেন, এ ধারণা আছে। দরকার হলে এ জন্য তারা অপর অন্যের মাথা ফাটিয়ে দেবেন। সেকারণে তাদের মনে হয়, ‘নাগরিক’ অথবা ‘অধিকার’ এসব শব্দ আবার কী?

    দুনিয়া যতদুর পরিক্রম করে পেরিয়ে যে জায়গায় এসেছে তাতে আমরা পছন্দ করি আর নাই করি একালে গ্লোবাল সমাজের মৌলিক ভিত্তি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র ও মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি। এমনকি তা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ রাষ্ট্রও অন্তত মুখে এই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে তা বলবার সুযোগ নাই। এবং তা বিরাট ভুল সিদ্ধান্ত হবে বলে মানে। তাই এককথায় বললে ভারতের আজকের অবস্থা হল আন্তর্জাতিক জগতে সে একঘরে, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে ক্রমাগত। এ’কথারই প্রতিধ্বনি দেখা গিয়েছে আগের কংগ্রেস আমলের প্রাক্তন সেই সরকারের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা শিব শঙ্কর মেননের মুখে। তিনি বলছেন, আমাদের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিতে “শত্রুপক্ষকে আমরা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছি’।  “দেশের বাইরে থেকে যারা সমালোচনা করছেন, তাদের তালিকা সত্যিকার অর্থেই দীর্ঘ। প্রেসিডেন্ট মখাঁ (ফ্রান্স) ও চ্যান্সেলর মার্কেল (জর্মানি) থেকে নিয়ে ইউএন হাইকমিশনার ফর রিফিউজিস এবং নরওয়ের রাজার মত ব্যক্তিরাও এর সমালোচনা করেছেন, যারা সাধারণত এ ধরনের বিষয়ে ভদ্র অবস্থানে থাকেন”।

    তবুও হয়ত ‘নাগরিক অধিকার রক্ষা”- রাষ্ট্রের এই অভিন্ন প্রতিশ্রুতি (বা মূল্যবোধ) দেয়া বা রক্ষার কথা বিজেপি বা আরএসএস নিজে মানুক না মানুক তাদের দিয়ে মুখে স্বীকার করানো যেত, যদি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন নিজ নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন ও কঠোর হতেন। কিন্তু মনে হয়, সে আশাই আর নেই। কারণ, ও দুই অফিসের নীতি হল, মোদির নির্বাহী ক্ষমতা আগ্রাসী হয়ে ধেয়ে এলেই তারা সবাই গুটিয়ে সরে যাবে। নাগরিককে সুরক্ষা দিতে কিংবা নাগরিককে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষা ও প্রতিকার দিতে গেলে নির্বাহী বিভাগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে- এমন পরিস্থিতির উদয় হলেই কোর্ট বা কমিশন এরা পাশ কাটাতে শুরু করবেন। কখনো পাশ কাটাতে তারা বছরওয়ারি শুনানির সময়ও ফেলতে থাকেন। যেমন, উত্তরপ্রদেশে রাজ্য সরকারের যেখানে এখতিয়ারই নেই সরাসরি ক্ষতিপূরণ আদায়ের, তা সত্ত্বেও নাগরিককে সীমাহীন হয়রানি করে চলছে, ঘোষিতভাবেই ‘প্রতিশোধ’ নেয়া হচ্ছে।

    বিজেপি নেতা অমিত শাহের কঠোর সমালোচনা শুরু হওয়াতে দল থেকেই তাঁকে কিছু দিন চুপ থাকতে বলা হয়েছিল। ছিলেনও। কিন্তু আবারো তিনি সরব হয়েছেন। এবার পশ্চিমবঙ্গে হুঙ্কার দিয়ে তিনি বলছেন, দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচনে (২০২১) ক্ষমতায় আসবে নাকি বিজেপি। এমনকি মমতার সাথে যদি কংগ্রেস ও বামফ্রন্টও জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করে তবুও এই ফল হবে। এতে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটা হল, নাগরিকত্ব ইস্যু যখন তৈরি ও হাজির ছিল না, তখন অমিত এমন বললে মমতা ছাড়া অন্যরা (মানে কলকাতার কংগ্রেস বা বামফ্রন্ট) কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া শ্রেয় মনে করে এসেছে আমরা দেখেছি। কিন্তু এবার বিরোধীরা সবাই অমিতের মন্তব্যের কড়া প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। অর্থাৎ গত বছরের (২০১৯) কেন্দ্রীয় নির্বাচনে ক্ষুব্ধ সিপিএম যেমন মমতাকে হারিয়ে দিতে বেনামে অঘোষিতভাবে বিজেপির পক্ষে কাজ করেছিল এবার আর সে অবস্থা নেই, তা বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, বিজেপির অবস্থা আর তেমন ভালো নেই- এটা অমিত শাহেরই স্বীকারোক্তি। যেমন অমিত বলছেন, এনআরসি নয় ‘এখন’; মানে তার দল কলকাতার নির্বাচনে ব্যাকফুটে। হয়ত, এনআরসির কথা আর ভোটের আগে বিজেপি তুলে ধরবে না, এ ব্যাপারে পিছিয়ে যাবে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ক্ষেপে গেছে, তা অমিত শাহ এভাবে পরোক্ষে স্বীকার করে নিচ্ছেন।

    পশ্চিমবঙ্গের লোক কেমন ক্ষেপে থাকতে পারে, এর এক নমুনার সরেজমিন রিপোর্ট আছে আনন্দবাজারে – আধারের জন্য সারা রাত লাইনে ১১ হাজার।  [এখানে “আধার” মানে AADHAAR – এটা আমাদের ন্যাশনাল আইডি কার্ডের মতন সমতুল্য ডকুমেন্ট। ] আর ওদিকে, আমাদের কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তের অপর পারে নদীয়া জেলা (ব্রিটিশ আমলে কুষ্টিয়া নদীয়া জেলার এক মহকুমা ছিল), এখনকার নদীয়ার এমন আরেক মহকুমা হল তেহট্ট – এই হল ঘটনাস্থল। সেখানকার একটা ঘটনা হল এই তীব্র শীতে বৃষ্টির রাতে আধার কার্ড সংশোধনের জন্য সারা রাত ১১ হাজার লোক লাইন দিয়ে বসেছিলেন। লোকের মনে আতঙ্ক যে, কার্ড না থাকলে যদি নাগরিকত্ব প্রমাণ না করতে পারার অপরাধে ভারত থেকে বের করে দেয়া বা ক্যাম্পে ফেলে রাখা হয়! নাগরিকত্ব ইস্যু হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবার মনে কী পরিমাণ আতঙ্ক জন্ম দিয়েছে, এর জলজ্যান্ত প্রমাণ এই ১১ হাজার লোকের লাইন। এই লোকগুলো অথবা যারা এদের দুর্দশা দেখছেন, তারা কেউ বিজেপিকে কি আগামীতে ভোট দিবে মনে হয়?  তবে মনে হচ্ছে না অমিত শাহ এই সাধারণ মানুষগুলোর আতঙ্ক আর অমানুষিক কষ্টের দিকটা দেখতে পাচ্ছেন। বুঝা যাচ্ছে মোদী-অমিতেরা নিজের ভোটবাক্সে হিন্দু-ভোট পোলারাইজ করে আদায় ছাড়া আর কোন দিকেই তাদের হুশ নাই, এমনই নিষ্ঠুর অমানুষের চিন্তায় পৌছে গেছে তারা।

    তাহলে এখন অমিত শাহ এত বিরাট দাবি করে বললেন, তারা জিতবেনই- এই দাবির মাজেজা কী?
    ইলেকট্রনিক ভোটিং ব্যবস্থায় মোদীর কোনও কারচুপির মেকানিজম আছে এমন অনুমান ও অভিযোগ অনেকের। তাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মমতা এবং উত্তরপ্রদেশের মায়াবতীর সবচেয়ে বেশি। এটা কি সেই ইঙ্গিত যে, অমিত শাহের এখন শেষ ভরসা সেখানে? এই প্রশ্ন দানা বাঁধছে। মমতা ইতোমধ্যে ভোটব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আলোচনার জন্য ভারতের উভয় সংসদে নোটিশ দিয়েছেন। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের একজন কমিশনার আছেন; তিনি গত নির্বাচনে মোদির নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের জন্য ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিলেন বলে পরে তার পরিবারের সদস্য সন্তান ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে সিবিআই (আমাদের দুদকের সমতুল্য তবে তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীন ও ক্ষমতাবান। ) লেলিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠে আছে। মোট কথা, অমিত শাহের দাবি অস্বাভাবিক!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা গত ০৪ জানুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “ভারতের বিদেশী কূটনীতিক ও নাগরিকত্ব ইস্যু “ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • রাষ্ট্র জাতিগঠন নয়; কিন্তু তাই মনে করা হয়েছিল

    রাষ্ট্র জাতিগঠন নয়; কিন্তু তাই মনে করা হয়েছিল

    গৌতম দাস

    ১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Pa

     

    [সার সংক্ষেপঃ জিন্নাহকে সব দোষে দোষী করার লোকের অভাব নেই, বিশেষত সাতচল্লিশের পরের জমিদারি হারানো কমিউনিস্টদের চোখ ও ভাষ্যে। অথচ ঘটনা হল, রামমোহন থেকে গান্ধী-নেহরুর আমল পর্যন্ত এসব মহারথীদের চিন্তাকে অনুসরণ ও  মুল্যায়ন করতে খুটিয়ে দেখার চিন্তাগত মুরোদ খুব কমজনেরই থাকতে দেখা যায়।  এদের চিন্তার মৌলিক ত্রুটি ও তা থেকে বিভ্রান্তির কারণ  হল মূলত “জাতি” ধারণা। যেমন এর একটা নমুনা হল, এই মহারথীরা  সবাই “রাষ্ট্র গঠন” বলতে “জাতি গঠন” বুঝতেন। অথচ যেখানে জাতি মানে আসলে “রাষ্ট্র” কখনোই নয়। এছাড়া একটা অপ্রয়োজনীয় এবং বিভ্রান্তিকর ভুল ধারণা হল জাতি [Nation]।   আবার কথা হল, ‘জাতি’ বলতে তারা কেবল আবার “ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ” বুঝতেন। যেমন তাদের বেলায় “হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ” বুঝতেন তাঁরা। অর্থাৎ মুল কথাটা হল, ধর্ম ছাড়া জাতি হয় কেমনে! – এই ছিল তাদের প্রবল ভুল অনুমান।

    রাষ্ট্র মানে জাতি আর, ধর্ম ছাড়া জাতি হয় না –  এই হল তাঁদের ‘দুই ভুল অনুমান। এর উপর দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত হল বৃটিশেরা চলে গেলে তাঁদের একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদ ভারত “জাতি” চাই। অথবা এভাবে বলা যেতে পারে যে, হিন্দু জাতির একটা ভারত ছাড়া আর কীইবা তারা চাইতে পারে! কারণ তাদের চোখে এর অন্যথা কিছুই তো হতে পারে না।  ভারতবর্ষের “হিন্দু জাতি” তো একটা  “হিন্দু জাতির” ভারত ছাড়া অন্য কিছু চাইলেও কায়েম করতে বা হতে পারবে না – এই ছিল  সারকরে তাদের ভুল অনুমান।  রামমোহনের মূল কর্মততপরতার কালের শুরু ১৮১৫ সাল থেকে ১৯৪৮ সালে গান্ধীর মৃত্যু পর্যন্ত এই একশ ত্রিশ বছর হিন্দু জাতি বুঝের তাদের জার্নিটাই ছিল এমন।

    লক্ষ্যণীয় উপরের প্যারায় শুরুতে রাষ্ট্র শব্দটা একবারই ব্যবহার হয়েছে, তাও সম্পর্ক দেখানোর জন্য। মূলত “রাষ্ট্র” শব্দটাই তাদের কোন চিন্তা বা অনুমানের মধ্যে থাকত না। রাষ্ট্র শব্দটাই তাঁরা তখনও শিখেনি অথবা এই শব্দের উপযোগিতা কী, কাম কী তারা বুঝে উঠতে পারে নাই।  কারণ তাদের চোখে দিনের আলোর মত পরিস্কার লাগত যে “স্বাধীন ও দেশপ্রেমিক এক হিন্দু জাতি হিসাবে নিজেদের গঠন” – এর বাইরে তারা আর কি করতে পারে।  এজন্য সেকালে রাজনীতি বলতে তারা তিনটা শব্দ বুঝত – স্বাধীনতা, দেশপ্রেম আর জাতি। রাজনীতি বলতে এই তিন শব্দ বুঝার ক্ষেত্রে কংগ্রেস আর হিন্দু মহাসভার বুঝাবুঝিতে আলাদা কিছু ছিল না।
    এতে অসুবিধা কী?
    অসুবিধা হল রাষ্ট্র ধারণা তখনও কারও মাথায় নাই অথবা কারও মাথায় আসেনি মানে রাষ্ট্রের গাঠনিক উপাদান নাগরিক বলে কোন ধারণাই নাই। তাই রাষ্ট্র নাই মানে নাগরিক ধারণাই নাই।  আর, নাগরিকের অধিকার ধারণা নাই। অথচ জাতি ধারণা আছে। মানে জাতি বলে বড়জোড় একট কমন স্বার্থের জনগোষ্ঠিগত স্বার্থ বলে ধারণা আছে। এটাই হিন্দু জাতি ধারণা।
    তাহলে দেখা যাচ্ছে জিন্নাহ বৃটিশ-ভারতের হবু রাজনৈতিক জগতে জিন্নাহ’র আবির্ভাবের আগে থেই হিন্দু জাতি ধারণা হাজির আছে। তাহলে জিন্নাহ-ই প্রথম হিন্দু আর মুসলমান এই  দ্বিজাতি তত্বের ধারণা আনলেন এমন দাবি ভিত্তিহীন।
    দ্বিতীয়ত, ১৮৮৫ সালে কংগ্রেসের জন্মের পরে যখন নিশ্চিত হয়ে উঠছে যে কংগ্রেস হিন্দু জাতির ভারত-ই একমাত্র কায়েম করতে চায়,  তাহলে কংগ্রেস ও গান্ধীর হিন্দু ‘জাতি গঠন ধারণাকে’ অস্বীকার করে ফেলে দেয়া ছাড়া জিন্নাহর উপায় কী ছিল! এটাই তাদের মুসলমান জাতীয়তাবাদ করতে চলে যাওয়া। অথচ মুলচিন্তায়  জটিলতার কেন্দ্র হল জাতি ধারণা, কাজটা কোন  জাতি গঠন নয়। বরং রাষ্ট্রগঠন। নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্রকে কনষ্টিটিউট করা এই অর্থে রাষ্ট্রগঠন।  এভাবে ব্যাপারটা হলো আসলে ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিক, সবাই অভেদ নাগরিক এবং সমান নাগরিকের ভিত্তিতে বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্রগঠন ও কায়েম হল সব কিছু সমাধান।
    আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিক। জিন্নাহ হিন্দু-মুসলমান দুই জাতি একথা তিনি এনেছেন। একথা পেরেছেন অবশ্যই। কিন্তু কেন? হিন্দু জাতিগঠন যারা মানবে না তারা যেন আলাদা রাষ্ট্র চাইতে পারে, এই ব্যাপারটার পক্ষে যুক্তি সাজানোর জন্য।  কিন্তু জিন্নাহ লক্ষ্যচ্যুত নন। তিনি নাগরিকত্ব মানে রাষ্টড়-নাগরিক বিষয়ক মৌলিক শিক্ষা ভাঙ্গেন নাই। কিভাবে? তিনি ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব করবেন না। তিনি ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিক, সবাই অভেদ নাগরিক এবং সমান নাগরিক হবেন এই পাকিস্তানের কথা বলেছেন।

    তাই, ১১ আগস্ট ১৯৪৭ সালের বক্তৃতায় জিন্নাহ বুঝিয়ে রেখে যেতে পেরেছিলেন, ধর্মীয় স্বাদের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব এই পাকিস্তান কায়েমের লোক জিন্নাহ নন। যদিও পরবর্তিতে কনষ্টিটিশনের পাকিস্তান – এমন পাকিস্তান হলেও বাস্তবের পাকিস্তান জিন্নাহর স্বপ্ন হতে পারেনি সেকথাও সত্য। একালের ইমরান খান আবার অনেক কিছুই নতুন চোখে দেখবার আশা করতে উসকানি দিচ্ছেন। কিন্তু অমিত শাহ? আগে ছিল যেগুলো গান্ধীর হিন্দুজাতির ভারত কায়েমের চিন্তা বিষয়ক ভুল। আজ অমিত সেই হিন্দুজাতির আরও বড় ভারতের কলঙ্ক হতে রওনা দিয়েছে। বৈষম্যহীনতার সমান নাগরিকই যেখানে সব কিছুর সমাধান। তবু অমিত শাহরা হিন্দুর স্বার্থ কেবল হিন্দু পরিচয়ের মধ্যে খুজে এক মিথ্যা ভিত্তিহীন কথা ছড়িয়ে ভোটবাক্স ভর্তি করতে চাইছেন।]

     

    রাষ্ট্র মানে জাতিগঠন নয়। বৈষমহীন নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মামলা।
    কাজেই জিন্নাহর, গান্ধীর ‘হিন্দুজাতি’ গঠন ধারণাকে উপড়ে ফেলে দেওয়া ছাড়া কী করার ছিল?

    বাসায় চোর পড়লে অনেক সময় এরপর দেখা যায় চোরকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে চুরিতে নিরাপত্তার ফাঁকফোকরগুলোর দিকে নজর ও সংস্কার কাজ শুরু করে দিতে। কারণ, চুরিটা না হলে নিরাপত্তার ঘাটতির দিকগুলোতে আমাদের মনোযোগ যেত না। এই বিচারে আমরাও বাংলাদেশ থেকে এখন অমিত শাহকে আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে নিজের ঘর সুরক্ষার কাজে নামতে পারি। কারণ তিনি আমাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতাগুলোর দিকে নজর ফেলতে পরোক্ষে সুযোগ করে দিয়েছেন, যদিও তা আমরা কতটা কাজে লাগাতে পারব তা এখনই একেবারে নিশ্চিত নই আমরা।
    ভারতের নাগরিক সংশোধনী বিল ২০১৯ [Citizenship Amendment Bill, 2019 (CAB)] উভয় সংসদে পাসের পর রাষ্ট্রপতির সই নিয়ে এখন চালু হয়ে গেছে। অমিত শাহের উচ্চারণ স্পষ্ট, “মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো”। আনন্দবাজার আশা করে লিখেছে – “রাজ্যসভায় শাহের রাখঢাক নেই”। পত্রিকাটা বলতে চেয়েছে এর আগে লোকসভায় যেভাবে অমিত যেভাবে ঢেকে রেখেছিলেন সেভাবে কেন ঢেকে রাখেন নাই।
    কিন্তু তবু অমিতবিরোধী কারও কোন পক্ষ থেকে এর বিপক্ষে কী জবাব দেবে, এর তেমন জোরালো বয়ান দেখা যায়নি। কেন এটা এমন, কেন?
    ব্যাপারটা হল এত দিনের যে প্রচলিত “হিন্দুজাতির” ভারত, সেখানে কেউ মুসলমান হলে ও নাগরিকত্ব পালার ইস্যু থাকলে হিন্দুদের পক্ষ থেকে তাকে নাগরিকত্ব না দিতে চাওয়া – এটাই কি স্বাভাবিক ছিল না?  ভারতের সামাজিক পরিসরে রাষ্ট্র বিষয়ে এমন বোধবুদ্ধি, বুঝাবুঝির লজিকই তো ভারতের সমাজে এত দিন ধরে ছড়িয়ে রাখা আছে। অন্তত নেহেরু-গান্ধীর আমল থেকেই।  এটা তো অমিত শাহ হঠাৎ করে বলছেন তা তো না। আর সে জন্যই তিনি স্পষ্ট করে বলতে পারছেন। আর যারা শুনছেন তাদের কাছেও এটা নতুন, অনভ্যস্ত বা প্রথম মনে হচ্ছে না। তাই তেমন প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়াও নাই

    অথচ সোজা ঘটনাটা হল এই যে, অমিত বলতে চাইছেন ভারত রাষ্ট্রের মন কেবল কেঁদে উঠবে অন্যদেশের একমাত্র মুসলমান ছাড়া বাকি সবার বেলায়। এমনকি খ্রীশ্চান হলেও কাঁদবে! এই বক্তব্যের পিছনের অনুমান হল যে,.১. যে ভারত রাষ্ট্রের “কমন মন” বলে একটা কিছু এখানে ধরে নেয়া হয়েছে সে মুসলমানবিদ্বেষী অথবা এর ভিতরে কোন মুসলমান নাই। ২. এই বক্তব্যে সার্বজনীন সবার নাগরিকের অধিকারের জন্য হওয়া উচিত স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এটাকে হাজির করা হয়েছে মুসলমানবিদ্বেষী ভাবে আর মুসলমান বাদে ভারতে দেখা যায় এমন সব ধর্মের জন্য প্রযোজ্য করে। এর অর্থ তারা ভারতকে একটা ধর্মনির্বিশেষে নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র মনে করে নাই।  আসলে এটাই তো গান্ধীর “হিন্দুজাতি” ধারণা।

    আবার আসাম, ত্রিপুরাসহ নর্থ-ইস্টে যা দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখছি আমরা, সেটা মোদী-অমিতের সরকারের বিলের বিরুদ্ধে অবশ্যই। কিন্তু  সেটাও  ধর্ম-নির্বিশেষে সকলের সমান নাগরিকত্ব থাকা উচিত সে অবস্থানের জন্য নয়। বরং বাংলাদেশেরই বিরুদ্ধে। তবে অমিতের পক্ষে নয়। তাহলে? এই নাগরিক সংশোধনী বিল মানে ক্যাব [CAB] বিল ইস্যুতে, সাধারণভাবে নর্থ-ইস্ট মনে করে ও তাদের আশঙ্কা এই যে অমিতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের ফলে এখন নর্থ-ইস্টের লাগোয়া বাংলাদেশের সীমান্তের এপারে বাংলাদেশের হিন্দু যারা আছে, তারা এখন সদলবলে নর্থ-ইস্টের আট রাজ্যে প্রবেশ করে নাগরিকত্ব নিতে চাইবে। মূলত এর প্রবল বিরোধিতা করতেই তাদের মোদী সরকারবিরোধী দাঙ্গা-হাঙ্গামা। আর ত্রিপুরার ক্ষেত্রে এসব ছাড়াও  তাদেরবাড়তি একটা ইস্যু হল, সেখানের মোট জনগোষ্ঠির (সম্ভবত এক-তৃতীয়াংশ) আমাদের চাকমা, গাড়োরা সহ এদেরই মত মোট আট পাহাড়ি গোষ্ঠির। যারা ইতোমধ্যেই এক ধরণের স্বায়ত্বশাসন ভোগ করে জেলাভিত্তিক। এরা এখন এই সুযোগে আলাদা রাজ্য চাওয়ার দাবি জোরালো করে তুলেছে। সার কথাটা হল সারা নর্থ-ইস্টেই সমতল (মূলত বাংলাদেশ) থেকে বাঙালিরা তাদের জেলায় এসে পড়া ও আশ্রয় নেয়ার বিরোধী তারা।

    অমিত শাহ এই বিল আনার মাধ্যমে জেনে বা না জেনে দীর্ঘদিনের চাপা পড়ে থাকা দেশভাগের প্রায় সব বিতর্ককে আমাদের সামনে আবার জাহির করে দিয়েছে। এর মূল কারণ নেহরু-গান্ধীর জমানা থেকেই ভারতরাষ্ট্র যে নাগরিকে-নাগরিকের মধ্যে ফারাক বা বৈষম্য করতে পারে না। এটা যে হারাম তা তো কখনোই বাস্তবায়ন করতে গেছে তা আমরা দেখিনি। যদিও ভারতের কনষ্টিটিউশনে সেটা যেভাবেই লেখা থাক। যেকোন আধুনিক রিপাবলিক ভিত্তিমূলক যেসব মূলনীতি ধারণা থাকে এ দিক থেকে ভারতের রাজনীতিতে কখনই ভারত-রাষ্ট্রকে বুঝা বা বুঝানো ও প্রাকটিশ করার চেষ্টা করা হয়নি।

    যেমন মোদীর শাসনের চলতি এই গত ছয় বছরকেই বিচার করলে আমরা পাই  – এখানে মুসলমানদের ওপর যা খুশি জোর তো করাই যায়, বৈষম্য তো করাই যায়। মোদি-অমিত চাইলেই করতে পারে। তাই কি সারা ভারতবাসী দেখে আসেনি? মুসলমানকে জোর করে জয় শ্রীরাম বলানো অথবা গরু খাওয়া, গরু বহণ করা ইত্যাদি অভিযোগে রাস্তায় রাস্তায় তা চেক করতে বিজেপির ভিজিলেন্স পার্টি তো বসানোই যায়; আর বসিয়ে এমন মুসলমানের খোঁজ পেলে তাকে রাস্তাতেই পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়- এটাই কি ভারতবাসী দেখেনি?

    শুধু তা-ই নয়, এ নিয়ে সারা ভারতে কোথায় মামলা-বিচার কোথাও কিছু হয়নি। সর্বশেষ আবার এমন পিটিয়ে [তাবরিজ আনসারী খুনের ঘটনায়] মামলা হয়েছে যদিও কিন্তু সেটা খুনের না হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যর মামলা বলে।  গরু পালা দুধের ব্যবসায়ী পহেলু খানের হাট থেকে গরু কিনে আনাতে হাটের রশিদ দেখানোর পরেও লিঞ্চিং খুন হলে এর আসামিরা দুর্বল মামলা দেওয়ায় আসামীরা সবাই বেকসুর খালাস হয়ে গেছে। মএব্যাপারে মোদীর দ্বিতীয়বারের চলতি সরকারের আনুষ্ঠানিক সরকারি অবস্থান হল, ভারতে রাস্তায় পিটিয়ে মারা লিঞ্চিংয়ের কোনো ঘটনাই ঘটেনি, সবই গুজব, সাজানো। আবার আরএসএস নেতা ভগত বলেছেন, পিটিয়ে মারা বা লিঞ্চিং শব্দ ব্যবহার না করতে। সারা ভারতে এভাবে এমনকি সাধারণ নাগরিককে বটেই, এক মুসলমান এমপিকে আর এক হিন্দু এমপি জয় শ্রীরাম বলাতে জোর খাটাতে, জনসমক্ষে তর্ক করতে দেখা গেছে।

    মজার কথা হল, এসব নিয়ে কোনো জনস্বার্থবিষয়ক মামলা অথবা আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত মামলা বলে কোনো কিছু হতে দেখা যায়নি; বরং সোস্যাল প্রাকটিস এর বয়ান হল উল্টাটা। যেমন মমতা নাকি মুসলমানদেরকে লাই দিয়ে মাথায় তুলেছেন, তাই পশ্চিমবঙ্গে মুসমানদেরকে দাবিয়ে রাখা নাকি দরকার – এমন ভাষ্য ফেসবুক সোস্যাল মিডিয়ায় ডমিনেটিং পারসেপশন।

    সারা দুনিয়াতে আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র প্রসঙ্গে সকলের একেবারে প্রাইমারি ঐক্যমত্যের বৈশিষ্ট্যগুলো হল –
    ১. এটা অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র আর এখানে সব নাগরিক সবার অধিকার সমান।
    ২. নাগরিক মাত্রই রাষ্ট্র বৈষম্যহীনভাবে সকলকে সমান চোখ দেখতে ও আচরণ করতে বাধ্য।

    কাজেই এটা জাতিগড়া বা জাতিগঠনের বিষয়ই নয়। রাষ্ট্রের এটা নাগরিককে তার  নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মামলা। যেখানে নাগরিক আর রাষ্ট্রের সম্পর্ক হল – নাগরিকেরা হল রাষ্ট্রের গঠনের উপাদান (constituent)। রাষ্ট্র নাগরিক দিয়ে তৈরি (constituted)। আর দলিল অর্থে তৈরি জিনিষ হল constitution। এখানে ‘জাতি’ [nation] বা হিন্দু জাতিগঠন বলে জিনিষটাকে বিভ্রান্ত করা বা বিভ্রান্তি ছড়াবার অন্তত একালে আর কোন সুযোগ নাই।
    একারণেই এখানে রিপাবলিক রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট ব্যবহৃত শব্দগুলো হয় – মানবাধিকার, সমানাধিকার, বৈষম্যহীনতা, সাম্য ইত্যাদি। কিন্তু ভারতে? না এখানে সব কিছুর উপরে এক আজিব শব্দ আছে ‘সাম্প্রদায়িক’। (অথবা একই ধারণায় বিপরীত অর্থে ‘অসাম্প্রদায়িক’।)

    প্রথমত, আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার সাথে সম্পর্কিত ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে সংশ্লিষ্ট কোনো শব্দ-ধারণা দুনিয়ার কোথাও নেই; কিন্তু ভারতে এটা আছে। আর এটা হল মূলত হিন্দু জনগোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে সংকীর্ণভাবে কেবল তাদের দিক থেকে বলা শব্দ। তারা যাকে বা যে আচরণ বা রীতিকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে দায়ী করবে, সেটাই সাম্প্রদায়িক। সাধারণত মুসলমানদের অভিযুক্ত করতে তাদের এই সংজ্ঞা তারা ব্যবহার করে। যেমন ইসলামী চিহ্ন প্রকাশ হয়ে পড়ে (যেমন টুপি) এমন কোনো কিছু দেখিয়ে রাস্তায় চলাফেরা করা যাবে না। এটা নাকি সাম্প্রদায়িক। মুল কথাটা হল হিন্দু ডমিনেটিং সমাজে এটাকে তারা তাদের কর্তৃত্ব আধিপত্যকে ঢিলা করে ফেলা বা যেন অস্বীকার করার সুযোগ হিসবে কেউ না নেয়, সেটা নিশ্চিত করতেই এই “সাম্প্রদায়িক” নামে শব্দ ও বয়ান দিয়ে শাসন করা। কিন্তু সকালে পূজা-অর্চনা করে কপালে ফোঁটা বা ড্রয়িং তিলক এঁকে কাজে বা সংসদেও যাওয়া যাবে।

    কিন্তু সারা দুনিয়াতে ‘সম্প্রদায়’ বা ‘কমিউনিটি’ কথাটা খুবই ইতিবাচক। এটা নিচা, হেয় বা খারাপ বুঝানোর শব্দ না।  যেমন ইউরোপের যেকোন শহরে সমাজের জন্য যে কাজ করে, স্বেচ্ছাশ্রম দেয় সে সম্মানিত ‘কমিউনিটি’ ওয়ার্কার। কিন্তু ভারতে কমিউনিটির রুট শব্দ কমিউন [commune] – এটা ব্যবহার করা হয় নেগেটিভ অর্থে। কমিউন থেকে ‘কমিউনাল’[communal] বলে ইংরেজিতে আর এক শব্দ বের করে আনা হয়েছে যেটাr অর্থও ইতিবাচক; ‘সমাজ সম্পর্কিত’ অর্থে। কিন্তু ভারতে এর অর্থ করে নিয়েছে খুবই জঘন্য। আর এরই বাংলা করা হয়েছে “সাম্প্রদায়িক”। মানে এটাই ভারতে সবচেয়ে ঘৃণিত ও নেতিশব্দ। সাধারণত এটা মুসলমানদের উপর ব্যবহার করা হয়। যার আসল অর্থ হল, হিন্দু সামাজিক কর্ত্তৃত্ব মানতে যে অস্বীকার করে।

    আসল কথাটা হল, ব্রিটিশ আমল থেকেই হিন্দু-জমিদারি ক্ষমতায় (এর তৎপরতা কার্যক্রমের শুরু মোটা দাগে বললে ১৮০০ সাল থেকে যেখানে তখন ১৭৯৩ সাল থেকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি আইন চালু করা হয়ে গেছে কেবল) এর যে সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্য তৈরি করেছিল, তা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল সে সময়ের কোনো শব্দের কী অর্থ হবে। বিশেষ করে তাদের সাজানো সেই আধিপত্য যেন মুসলমানরা ভঙ্গ না করে সেই লক্ষ্য সাজানো সামাজিক অনুশাসন। মুসলমানরা ছিল সেই সময়ের সামাজিক স্তরভেদে নিচে ধরে নেয়া স্তরেরও সবার নিচের স্তরে বলে, এটাই মনে করানো ছিল এর উদ্দেশ্য।

    মনে রাখতে হবে, মোটা দাগে ১৮০০ সাল থেকে পরের দেড় শ’ বছর ধরে এই হিন্দু জমিদারি-কেন্দ্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্য এটাই প্রজা নিয়ন্ত্রণের বয়ান ও এর সংজ্ঞার নির্ধারক ছিল। কৃষি সে সমাজের মূল অর্থনৈতিক কার্যক্রম। তাই কৃষি মালিকানা ব্যবস্থা হিসাবে চিরস্থায়ী জমি দেয়ার বন্দোবস্ত, যা আমরা জমিদারি বলি বুঝি আর সেখানে বেশির ভাগ জমিদার ছিল হিন্দু, মানে সবমিলিয়ে এরাই মূল রুলিং ক্লাস। এ কারণে তাদের এটাই ছিল সব কিছুর ওপর ডমিনেটিং ফ্যাক্টর, সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের উৎপত্তি এখান থেকেই। আর এই ক্ষমতাটাই সব সময় নিজের নিয়ন্ত্রণ বজায় টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে ভয়-শঙ্কায় শশব্যস্ত হয়ে থাকত। তাদের ভয় ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদের জাতপ্রথার কথা তুলে জারি রেখে ক্ষমতার এই জার-স্তর তৈরি করে তারা এই সামাজিক অনুশাসন তৈরি করেছে। কাজেই মুসলমানেরা ভিন্ন ধর্মের – এই যুক্তি তুলে যদি তারা সাজানো শাসন ব্যবস্থা – মানতে অস্বীকার করে? আর এর মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতার এই সাজানো বাগান ভেঙ্গে দেয় – এই সম্ভাব্য ভঙ্গকারী যারা এরাই “সাম্প্রদায়িক”। তবে সাম্প্রদায়িক নাম দিবার পিছনের কারণ সম্ভবত এই যে এই হিন্দু আধিপত্য বলতে চায় যে এই সামাজিক অনুশাসন নিয়ম ও কর্তৃত্ব দিয়ে আমি আমার এক সম্প্রদায় খাড়া করেছি। তুমি মুসলমান এর ভিতরে আবার তোমার ভিন্ন নিয়ম ভিন্ন কেন্দ্র চালু করে ফেলতে পার, তা আমি হতে দিব না। তাই তোমাকে আমি তোমার সম্প্রদায়ের বলে আলাদা কোন ক্ষমতার কেন্দ্র বানাতে দিব না। একারণে উলটা আমি তোমাকে বিভেদ আনার শক্তি হিসাবে প্রচার করব। তুমি আলাদা সম্প্রদায় গড়ে ফেলবার সম্ভাব্য শক্তি – অতএব তোমার নাম দিলাম “সাম্প্রদায়িক”। তুমি আমার ক্ষমতাকে ভেঙ্গে দিতে বা চ্যালেঞ্জ করতে যাতে না পার তাই আগেই তুমি নেতিবাচক, তুন্মি খারাপ এই ট্যাগ লাগিয়ে এক প্রচার চালিয়ে রাখব।
    সারকথায়, এই আধিপত্যেরই আবার যা কিছু অপছন্দনীয় বা যা তার নিজ ক্ষমতাকে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ করতে পারে অথবা যাকে (মুসলমান) সে আগাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, সেসব কিছুই ‘সাম্প্রদায়িক’ ট্যাগ পাবে। মানে তার সাজানো রাজত্ব এর ভেতরে একটা ভিন্ন ‘সম্প্রদায়’ যেন যে তার সাজানো অর্ডার বিনষ্ট করতে চায়। এমন সব কিছুকে সে আগাম ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে, এই অধিপতি শ্রেণী নিজের সম্ভাব্য শত্রুকে চিনিয়ে রাখে। অনেকটা হিন্দু-জমিদারের নিজের মতো করে তার সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের সাজানো বাগান এটা সম্ভাব্য আগামীতে যে’জন তছনছ করতে পারে, সেই হলো সাম্প্রদায়িক। এই হলো সাম্প্রদায়িকতার আসল সংজ্ঞা ও উৎপত্তি।
    এ কারণে ইংরেজি ‘কমিউনাল’ শব্দটা ইংলিশ সমাজে কেবল ইতিবাচক অর্থে সমাজ-সম্প্রদায় বুঝাতে এর ব্যবহারটাই কেবল দেখতে পাবেন। বিপরীতে কেবল ভারতীয়রাই শব্দটাকে নেতিবাচক ও বিশেষ ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করে। এই সোজা মানেটা হলো, ১৮০০ বা উনিশ শতকের শুরু থেকেই যে হিন্দু জমিদারি সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণী আধিপত্যের তৎপরতা শুরু হয়েছিল, এরই স্বার্থের বিরোধী যেকোনো কিছুই (সাধারণত মুসলমান) বোঝাতে ‘কমিউনাল’ শব্দ ব্যবহার শুরু হতে দেখা গেছিল।

    কিন্তু কোন আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র কিভাবে বলে আমার বৈশিষ্ট হল ‘অসাম্প্রদায়িক’? যেখানে তার দেখার চোখ হতে হবে ধর্ম নির্বিশেষে সকলে সমান এবং সমান নাগরিক? খাড়া কথাটা হল, হিন্দু ধর্মীয়-সামাজিক গোষ্ঠির মানে বাস্তবে অপসৃয়মান হিন্দু জমিদারি সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণী আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য শব্দ সাম্প্রদায়িক – এই শব্দ বা বৈশিষ্ট তো কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্টই হতে পারে না – যেখানে ধর্ম-নির্বিশেষে সবার অধিকার সমান গণ্য রাষ্ট্রকে করতেই হবে! আর এই অধিকার কেউ ভেঙ্গেছে কিনা সেটা বিচার করাই কেবল রাষ্ট্রের কাজ। কাজেই সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক নয়, রিপাবলিক রাষ্ট্রে অধিকারে সমান না বৈষম্য করা হয়েছে এটাই একমাত্র বিবেচনার বিষয় এবং এর নির্ণায়ক।  হিন্দু আধিপত্য মানে হিন্দু জমিদারি সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণী আধিপত্য টিকিয়ে রাখা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের কাজ একেবারেই নয়। কাজেই সাম্প্রদায়িক এই শব্দটা দিয়েই আসলে নাগরিক অধিকারের বৈষম্যহীন করবার ধারণাটাকে চর্চায় সামনে আসনে দেয়া ঠেকায় রাখার ক্ষেত্রে ভুমিকা আছে।

    এর পাশাপাশি আমরা এখন রামমোহনের (১৭৭২-১৮৩৩) জমানায় যাবো। কেন রামমোহন? ভারতের প্রগতিবাদী বিশেষত সেকালের (বলতে ১৯২৬ সালের পরের বুঝতে হবে) খোদ কমিউনিস্ট পার্টির চোখে রাজা রামমোহন রায় হলেন ‘বেঙ্গল রেনেসাঁ’ এর আদিগুরু। মানে রামমোহন যিনি ব্রিটিশদের হাত ধরে ইন্ডিয়াতে আসা বা আনা ‘ইউরোপীয় রেনেসাঁ’কে সবার আগে ভারতে পরিচয় করান এবং এর চর্চা ও প্রয়োগ শুরু করেছিলেন, সেই আদি শুরুকর্তা। রামমোহন সুনির্দিষ্ট একাজটা শুরু করেছিলেন ১৮১৫ সালে, তার “আত্মীয় সভা” নামে সামাজিক সংগাঠনিক তৎপরতায়। এর পাশাপাশি আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৮৩৫ সালকে যখন ব্রিটিশরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তারা ‘ইন্ডিয়ান এডুকেশন অ্যাক্ট ১৮৩৫’ চালু করবে।
    এটাকে “এডুকেশন অ্যাক্ট” বলে অথবা এটাই হল ব্রিটিশ ‘কলোনি প্রশাসন’ এর শুরু করার আইন বলে বুঝতে পারি। এটাই ভারতীয় নেটিভ বা স্থানীয়দেরকেই ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষায় শিক্ষিত করে কলোনি প্রশাসন সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত মনে করেও পাঠ করা যেতে পারে। অর্থাৎ ইংল্যান্ড থেকে শিক্ষিত ব্রিটিশদের ব্যয়বহুল পথে (বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া) তাদের এখানে এনে আর নেয়া হবে না। স্থানীয় নেটিভদের শিক্ষিত করে নেয়া এক প্রশাসন গড়তে হবে। আর বলাই বাহুল্য, সেটা আধুনিক শিক্ষা মানে রেনেসাঁর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব ফেলার শুরু হয়েছিল এখান থেকেই।
    রামমোহনের মূল গুরুত্ব হল তিনি ব্রিটিশ মাস্টারের অনুকরণে সেকালের ব্রিটিশ-ভারতে, আমাদেরকে একটা “আধুনিক রাষ্ট্র” করতে হবে – প্রথম তিনিই এমন গড়ার স্বপ্ন দেখে ও এঁকেছিলেন। আবার ঠিক একই কারণে এতে তাঁর করা সব ভুল বা ধারণায় ঘাটতি বা তাতে অস্পষ্টতায় বিপথে যাওয়া এমন ধারণায় সব খামতির উৎপত্তিও তিনি। যদিও আধুনিক প্রগতিবাদীরা বা পরবর্তীকালে বিশ শতকে এসে কমিউনিস্টরাও রামমোহনকে তাদের আদিগুরু নেতা মানেন। বিশেষ করে যারা হিন্দু জমিদারীর “স্বদেশি ইতিহাসের ধারা” রচয়িতা।

    কিন্তু তিনি প্রথম নেতা হলেও আধুনিক রিপাবলিক ধারণার মুখ্য বৈশিষ্ট্য যে তা নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র, নাগরিক মাত্রই অধিকার সমান এক বৈষম্যহীন সাম্য ইত্যাদি – এসব মৌলিক ধারণাকে তিনি আমল করতে সক্ষম ছিলেন এর প্রমাণ নাই।  আসলে নাগরিক সাম্য নয়, সম্ভবত রেনেসাঁ তার মুল আগ্রহের বিষয় হয়েই তিনি আটকেও গেছিলেন। অধিকার বা রাষ্ট্র পর্যন্ত আর নিজ চিন্তাকে প্রসারিত করতে পারেন নাই।  এমন চিহ্ন আমরা দেখি না। আরও বড়  কারণ কী?
    মূল কারণ হল, রামমোহনদের কাছে কাজটা (উচিত অর্থে) হওয়ার কথা ছিল “রাষ্ট্রগঠন”। কিন্তু তাঁরা বুঝেছিলেন “জাতি গঠন” বলে।  এখানে সবচেয়ে ক্ষতিকর ও বিভ্রান্তিমূলক ধারণা ছিল “জাতি” [nation]। খেয়াল করলে দেখা যাবে, তারা রাষ্ট্র কথাটাই ব্যবহার করতেন না। এর বদলে ব্যাপারটাকে “জাতি” বলে কিছু একটা বুঝতে চাইতেন। এই হলো প্রথম ভুল। তবে পরের ভুলটা আরো মারাত্মক। জাতি গঠন বা জাতীয়তাবাদ বলতে তারা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বুঝতেন। তারা নিশ্চিত হয়ে থাকতেন যে জাতির মূল বৈশিষ্টই তো ধর্ম।  আর ধর্মই তো জাতিকে “জাতি” হয়ে উঠতে আঠার মত সকলকে ধরে রাখতে প্রধান ভুমিকা রাখে। কিন্তু এখনই খুশি হয়ে যেয়েন না, সাবধান হন। পরের বাক্যটার দিকে খেয়াল করেন।
    অতএব এত বড় আর প্রাচীন হিন্দু ভুখন্ডে বৃটিশ শাসন-পরবর্তিকালে এক “হিন্দুজাতির ভারত” – এটাই আমাদের কাম্য। কারণ যে “বৃটিশ জাতি” আমাদেরকে শাসন করতে আমরা দেখছি সেটাও একটা ক্রিশ্চানিটিতেই আবদ্ধ, এক বৃটিশ “জাতিগঠন” হয়েই করেই দাঁড়িয়ে আছে।  সেকালে রামমোহন এন্ড গং তাদের বুঝাবুঝির মোটা ভাষ্যটা  সাজিয়ে লিখলে তা হবে এরকমই।
    এই একই বুঝ বজায় ছিল অন্তত মহাত্মা গান্ধী পর্যন্ত; ভারতীয় রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় ভুমিকা (১৯১৪-৪৮) এই সময়কালে। অর্থাৎ স্বাধীন দেশপ্রেমিক এক ভারত বলতে তিনিও এক ভারতীয় “জাতিগঠন” করার কর্তব্য ও এর রাজনীতি বলে বুঝতেন। অর্থাৎ হিন্দুজাতি গঠন বা হিন্দু জাতীয়তাবাদ গড়া বুঝতেন। ঠিক এ কারণেই তাদের কাম্য রাষ্ট্র নাগরিকের রাষ্ট্র হল কিনা অথবা অধিকারে বৈষম্যহীন হলো কি না, নাগরিক মাত্রই সমান অধিকারের রাষ্ট্র হলো কি না- ইত্যাদি এগুলো কখনও  তাদের এজেন্ডা ছিল না।

    উল্টো এটা ধর্মীয় জাতিগঠনের জাতীয়তাবাদের বলে আধুনিক রাষ্ট্রকে বোঝার কারণেই এখনো – “মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো”, কথাগুলো এখনো অবলীলায় উচ্চারিত হতে পারছে। কারও কানেও খটকা লাগছে না।

    তাহলে রামমোহন থেকে গান্ধী সবার কাছেই ভারত রাষ্ট্র মানে কোনো বৈষম্যহীন নাগরিক রাষ্ট্র নয়, এ দিক থেকে রাষ্ট্র বোঝাই হয়নি।
    দ্বিতীয়ত, বাস্তবের যে ভারত -রামমোহন থেকে গান্ধী- এরা কল্পনা বা বাস্তবে দেখেছিলেন এটা আবার সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক বুঝের হিন্দু জমিদারের সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের রাষ্ট্র বলেই বুঝেছেন, দেখেছেন, পেয়েছেন।

    এ কারণে যারাই রাষ্ট্রের মধ্যে “অসাম্প্রদায়িকতা” বৈশিষ্ট্য খুঁজে তাদের কাছে নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা অর্জন হয়েছে কি না তা কোনো কাম্য বিষয়ই নয়।

    অতএব, গান্ধী-নেহরুরা যে ভারতের জন্ম দিয়ে গেছে সেটাই বা সেখানেই তো মোদী-অমিতের হিন্দুত্বের রাষ্ট্র কায়েমের উপযুক্ত জায়গা। অবলীলায় ‘মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো’ বলতে পারার মতো দেশ-রাষ্ট্র।  এখানে নাগরিক ধারণাটাই পোক্ত না বরং এখনও অপুষ্ট। তাই নাগরিক অধিকারও। এর আকাঙ্খার ভেতরেও তাই নাগরিক বৈষম্যহীনতার আকাঙ্খাই নাই, অনুপস্থিত। একই কারণে সুপ্রিম কোর্টের চর্চাতেও তেমন নাই। নির্বাচন কমিশনের কাছেও নেই। সে কারণে বিজেপির মত দলও কনষ্টিটিউশন মোতাবেক রাজনৈতিক ততপরতা চালাবার জন্য যোগ্য দল বলে অনুমোদন দিয়ে দেয় নির্বাচন কমিশন। সুপ্রীম কোর্টও এর মধ্যে কোন সমস্যা দেখে না। অথচ যে রাজনৈতিক দলের চিন্তা বৈষম্যমূলক নাগরিক অধিকারের সেই দল তো অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন পাওয়ারই কথা হয়। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন বা সুপ্রীম কোর্টও এটা কোন সিরিয়াস দিক মনে করে না। শেষ নির্বাচনে এদিকটা অবস্থা আরও ভয়াবহ। কোন নির্বাচনি ভায়োলেশনের অভিযোগ আমলে নিয়ে মোদীর গায়ে ফুলের টোকা দিতেও তারা রাজি হয় নাই। অবশ্য তারা বলতে চায় একজিকিউটিভ ক্ষমতার গায়ে হাত দিয়ে আমাদের খুব খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে। বিগত ১৯৭৫ সালের জুনে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি আইন যেখান থেকে ঘটেছিল সেই ইস্যুতে। সেই থেকে আদালতের অবস্থান হল, কোন নির্বাচনে যদি এক আগ্রাসী একজিকিউটিভ ক্ষমতা – নির্বাচিত হয়ে আসে তবে সে যতই আগ্রাসী আদালত ততই সংঘাত এড়িয়ে তাকে জায়গা করে দিবে।
    কিন্তু তাই বলে কি “নাগরিক বৈষম্যহীনতা করা যাবে না”- একথা ভারতের কনস্টিটিউশনে লেখা নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু আছে কনস্টিটিউশনে লিখা থাকতে হয় তাই। এর ইমপিলিকেশন কী, ব্যবহার কী এবং কোথায় – কেন থাকতে হয়, গুরুত্ব কী সেসব দিক থেকে কিছুই বুঝা হয়নি, চর্চায় নেয়া হয় নাই। এর মূল কারণ সম্ভবত – “হিন্দুজাতি গঠনের এক ভারত” গড়া হয়েছে – এটাই তো ভারতের জন্ম থেকেই ছিল মূল বিবেচ্য!
    তাহলে একালে ভারত কেন “হিন্দুজাতির ভারত” – এই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী কেন? এটা যদি কেউ দেখিয়ে প্রশ্ন তুলে তখন তারা আড়াল খুঁজে বলে – কেন তারা তো অসাম্প্রদায়িক। অর্থাৎ এটা ‘অসম্প্রদায়িক’ ও ‘হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী’ ভারত, কাজেই কোনো আর অসুবিধাই নেই।

    আচ্ছা রামমোহনের রাষ্ট্রচিন্তা যে জাতিগঠন-বাদী চিন্তা, আর এই জাতিবাদ যে ধর্মীয় এমন দাবির প্রমাণ কী? এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল রামমোহনের ‘ব্রাহ্মধর্ম’ চালু করার তাগিদ। [রবীন্দ্রনাথের দাদু দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন রামমোহনের বন্ধু, অনুসারী। সেই সুত্রে তিনিও ছিলেন ‘ব্রাহ্মধর্ম’ অনুসারী ও প্রধান পৃষ্টপোষক। রবীন্দনাথও  ব্রাহ্ম অনুসারি আর এই সুত্রে তাঁর কালেও পুনর্বার মুখপাত্র তত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক। ] সারা ভারতের সবাইকে এক ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী করে এরপর ব্রাহ্মধর্মীয় জাতিগঠনের  ভারত কায়েম এই ছিল রামমোহনের লক্ষ্য। পরবর্তী সময়ে সবাইকে ব্রাহ্ম করার ইচ্ছা বাস্তবায়ন করা যায়নি বলে গান্ধী পর্যন্ত  (এদের মাঝে বঙ্কিম, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ ইত্যাদি অনেক ব্যক্তিত্বও কমবেশি সামিল ছিলেন) এসে সবাই মেনে নেয় যে, ঐ স্থলে “হিন্দুজাতি গঠনের” জাতীয়তাবাদী ভারতই তাদের কাম্য।
    কিন্তু এই বুঝের ভিত্তিতে ১৮৮৫ সালে এসে কংগ্রেস দল জন্ম বা গঠন করার পরে এই প্রশ্ন জোরালো হতে থাকে যে, “হিন্দুজাতি গঠনের” জাতীয়তাবাদ মুসলমানরা মেনে নেবে কেন? এর জবাব গান্ধীর কাছেও ছিল না। তিনি বড়জোর হিন্দু কথাটা ধর্মীয় না কালচারাল, এমন তর্কের কথা বলে পাশ কাটাতে চাইলেন। এছাড়া আমরা দেখি  উল্টা গান্ধীর নিজের বুঝের হিন্দু ধর্ম বলতে সেটা কেমন এটাকেই তিনি ‘হিন্দুইজম’ বলে প্রায় ৪২টা বক্তৃতা দিয়েছেন। অনলাইন আকাইভেও তা পাওয়া যায়। অথচ গান্ধীর কাছে মুসলমানরা “হিন্দুইজম কী” – তা শিখতে যাবে কেন? কোন সুখে অথবা দুখে? এমনকি অনেক হিন্দুও কেন তাকেই পছন্দ করবে, গান্ধীর “হিন্দুইজম কী” এর ব্যাখ্যা নিয়ে একমত হবে –  এই প্রশ্নের জবাব নাই  অথচ এই প্রশ্ন উঠেই থেকেছে।

    সোজা কথা হল যার রাজনীতি  – রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র, সমান অধিকারের রাষ্ট্র কায়েম এমন কেউ কেন “হিন্দুইজম কী” এই মাহাত্য প্রচার করতে যাবেন? গান্ধী যদি মনে করেন যে তাঁর “হিন্দুইজম কী”  ব্যাখ্যাটাই শ্রেষ্ঠ তাহলে এর মানে তিনি ধর্মতত্বের পন্ডিত হতে চাইছেন। অন্তত রাজনীতির না। ঠিক রাজনৈতিক নেতা তিনি না, ধর্মতাত্বিক নেতা হওয়া তার ঝোঁক যদি হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে রাজনীতির নেতা সেটা বাদ দেয়াই তাঁর উচিত ছিল। কারণ “হিন্দুইজম জানা বা এর  মাহাত্য প্রচার এটা না জানা থাকলেও ফেলো যেকোন ধর্মের নাগরিকের সাথে থাকার যোগ্য বিবেচিত হতে তো কোনই অসুবিধা নাই। এছাড়া এটা তো কোন নাগরিক সাম্যের রাজনৈতিক কাজ না। এগুলাই আসলে  আরও বড় প্রমাণ যে –  নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র, নাগরিক বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্র কায়েম- এসবে গান্ধী বা নেহরুর কখনই আগ্রহ ছিল না, তারা বা তাদের ভারত এটা কখনই বুঝতেই পারেনি, তাই আমল করে নাই।

    মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ
    চলতি নাগরিকত্ব বিলের তর্কে জিন্নাহ এখন সবারই অভিযোগ দায়ের করার সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গা হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানকে আলাদা হতে দিয়ে কংগ্রেস দ্বিজাতি বাস্তবায়ন হতে দিয়েছে অমিত শাহের এই ছিল অভিযোগ, এর জবাবে বলা সুপ্রীম কোর্টের কংগ্রেসের প্রধান আইনজীবী ও এমপি কাপিল সিবালের বক্তব্য ছিল, অম্বেদকারের বরাতে যে, জিন্নাহ ও সাভারকার (হিন্দু মহাসভা নেতা) দু’জনই ধর্মের ভিত্তিতে হিন্দু-মুসলমান এরা দুই জাতি,  এই ধারণার অনুসারী।

    তাহলে জিন্নাহই কি সব কিছুর জন্য দায়ী?
    প্রশ্নই ওঠে না। উপরে রামমোহন থেকে অন্তত গান্ধী পর্যন্ত সবাই রাষ্ট্র বলতে ‘জাতি’ বুঝতেন, বলেছি। আবার জাতি বলতে কেবল ধর্মীয় জাতিকে বুঝতেন। এই ছিল তাদের হিন্দু জাতিগঠন এই জাতীয়তাবাদী ভারত এর ধারণা।

    কিন্তু এই হিন্দু জাতিগঠনের ভারত প্রশ্নে মুসলমানদের অস্বস্তি ও আপত্তির কারণেই ২০ বছরের মধ্যেই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হয়। জিন্নাহও ক্রমশ একই ধরণের প্রশ্ন তুলে  কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন।

    কিন্তু কংগ্রেস তার ‘হিন্দু জাতিগঠনের ভারত’ এই নীতি গ্রহণ করাতে মুসলিম লীগও যে জাতিবাদ করতে গেল, সেটাও মুসলিম জাতীয়তাবাদ হয়ে যেতে বাধ্য হয়ে যায়। এ ছাড়া প্রতিযোগী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে পেরে উঠতে গিয়ে ‘মুসলমানের ভিত্তিতে আলাদা এক জাতি’ এমন কথা বেশি স্পষ্ট প্রধান করে বলতে হয়েছিল। লীগ এ বক্তব্যের পক্ষে বিস্তর সাফাই গাইতে অনেকগুলো সম্মেলন হয়েছিল, যেখানে বিখ্যাত কবি ইকবালের সাফাই বক্তব্যও আমরা দেখে থাকব।

    আর বিপরীতে এসব প্রশ্নের ঠেলায় কংগ্রেস ততই  ক্রমশ ছুপা-কৌশল গ্রহণ করে যে, তারা যে কৌশলগতভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারত চায় এ কথা মুখে কোথাও স্বীকার করবে না। এর ফলে দ্বিজাতিতত্ত্ব বা ধর্মের ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদ চাওয়ার সব দায় একা জিন্নাহর আর এ জন্যই অখণ্ড ভারত রাখা যায়নি- ভারতের সেই প্রপাগান্ডা সেই থেকে আজো প্রবল। একালে মানে ১৯৪৭ সালের পরে বিশেষ করে এই প্রপাগান্ডার দায় নিয়েছে কমিউনিস্টরা। যদিও তাদের ভাষ্যের প্রধান ফোকাস হলো, রাষ্ট্রের সাথে ধর্মকে মেশানো খুবই গর্হিত কাজ,কাজেই মূল পাপে পাপী হলো জিন্নাহ।

    কিন্তু সব জিনিষ লুকানো যায় না। কিন্তু মুল কারিগর কমিউনিস্ট, তাদের যুক্তিটাই সবকিছু উদোম করে দিয়েছে। কমিউনিস্টদের পয়েন্ট হল, রাজনীতিতে ধর্ম হারাম অথচ জিন্নাহ সেই ধর্মের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র গড়ার কথা খোলাখুলি নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন। কিন্তু কমিউনিস্টরা এতে নিজেই যেন নিজের জন্য ফাঁদ পেতেছে এমন হয়ে গেছে।  সেকালের সক্রিয় কমিউনিস্ট, পারিবারিকভাবে ব্রাহ্ম ও ইতিহাসের অধ্যাপক সুশোভন সরকার রামমোহন রায়কে রেনেসাঁর আদিগুরুর ভুমিকায় দাবি করে বসানোর জন্য দায়ী মনে করা হয়।  এতে সমস্যা হল যে সুশোভন হয়ত ধর্মের উপর তত ক্ষেপা নয় কিন্তু সাধারণ কমিউনিস্টরা বিশেষত সাতচল্লিশের পরের কমিউনিস্ট চরম ইসলামবিদ্বেষী হয়ে পড়েছিল। এই কমিউনিস্টদের এখন সাফাই ও জবাব দিতে হবে রাজনীতিতে ধর্ম যদি এতই হারাম হবে তাহলে রামমোহন রায় নতুন করে নিজেই আর একটা ধর্ম – ব্রাহ্মধর্ম, চালু করেছেন কেন? অন্তত জিন্নাহকে প্রশ্নের সম্মুখীন করার আগে এটা নিজেরাই লক্ষ্য করে নিজেরাই এর জবাবটা দিয়ে রাখা উচিত ছিল। আর কোন কমিউনিস্ট আজ পর্যন্ত রামমোহনের দিকে আঙুল তুলে নাই কেন?

    মজার কথা হল গান্ধী জিন্নাহর তত সমালোচনা করেন নাই, যতটা একালের কংগ্রেসি কিন্তু কমিউনিস্ট-ছাড়ানি প্রগতিধারী কেরালার এমপি শশীথারুর জিন্নাহর সমালোচনা করেছেন। কমিউন্সট পয়েন্টই তার পয়েন্ট, সিপিএমের সীতারাম ইয়াচুরিও একই দশা। ঠিক যেমন বাংলাদেশের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরি। এককথায় এরা সকলেই কখনও  খেয়ালই করেছেন যে  “হিন্দুইজম কী” বলে সংকলিত গান্ধীর  ৪২ আর্টিকেল আছে – বলে মনে হয় না। রামমোহন রায়ের কথা আর বললাম না। কাজেই এরা মনোযোগী পাঠক এমন ধরে নেওয়া আর ঠিক হবে না।

    এককথায় বললে এরা জিন্নাহর সাথে অবিচার করেছেন।  উপরে  রামমোহন আর গান্ধীর জাতিগঠন ধারণা তারা আমল করেছেন জানা যায় না। কিন্তু এর চেয়েও বড় প্রমাণ এখন হাজির করব।

    সম্পতি পাকিস্তানের এক সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট YASSER LATIF HAMDANI সব তথ্য সাবুদ জড়ো করে একটা আর্টিক্যাল লিখেছেন ভারতের এক পত্রিকায় দ্যা প্রিন্ট – এখানে তা ছাপা হয়েছে। , যার বড় একটা অংশ আবার বিবিসির নিজের করা রিপোর্ট। যার সার কথা জিন্নাহর ১১ আগস্ট ১৯৪৭ সালে প্রথম গণপরিষদের উদ্বোধনী বক্তৃতার, আগে যেখানে পাকিস্তানের যোগেন মণ্ডল তাতে সভাপতিত্ব করেছিলেন। আর ওই সভা থেকেই যোগেন মণ্ডলকে পরে প্রথম আইনমন্ত্রী বানানো হয়েছিল। জিন্নাহ এই বক্তৃতার রেকর্ড ফলে রেফারেন্স হারিয়ে ফেলা বা ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। যেটা পরে ভারতের আর্কাইভে পাওয়া যায়। যা ভারত আবার একমাত্র রাইট-টি-ইনফরমেশন আইনে  এক ভারতীয় নাগরিককে অনেক পরে সরবরাহ করেছিল।

    সেই সভায় জিন্নাহর বক্তৃতা সেটা। বিশেষ করে নাগরিকত্ব সম্পর্কে জিন্নাহর মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। এর সবচেয়ে মৌলিক অংশটা নিচে বাংলায় অনুবাদ করে দেয়া হলো :

    মুল ইংরাজিটাঃ
    We are starting in the days where there is no discrimination, no distinction between one community and another, no discrimination between one caste or creed and another. We are starting with this fundamental principle that we are all citizens and equal citizens of one State.
    আমার অনুবাদঃ
    ‘আমরা একটা এমন দিন শুরু করতে যাচ্ছি- যেখানে আজ থেকে কোনো বৈষম্য, সম্প্রদায়গত ভেদাভেদ, জাত চিহ্ন বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি নিয়ে কোনো ভেদাভেদ গণ্য করা হবে না। আমরা সবাই নাগরিক এবং সমান নাগরিক- এই নাগরিক সাম্যের মৌলিক নীতিতে এক রাষ্ট্রে আমাদের দিন শুরু করতে যাচ্ছি’।

    কিন্তু সবখানেই যে সমস্যাটা থাকে তা হলো, কথাটা বলা আর বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করে দেখানো এর ফারাক সেটা পাকিস্তানের বেলাতেও আছে। কিন্তু অন্য সবার চেয়ে জিন্নাহ এই জায়গাতেই আলাদা যে তিনি জীবদ্দশাতেই তার ইমাজিন করা রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব প্রসঙ্গে বৈষম্যহীনতা বা নাগরিক সাম্যের নীতির প্রতি তার প্রবল সমর্থন তিনি উচ্চারণ করে যেতে পেরেছিলেন।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা গত ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “জিন্নাহর নয়, গান্ধীর ভুল থেকেই…“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আসামের এনআরসি আলোচনার এজেন্ডাই হতে পারে না

    আসামের এনআরসি আলোচনার এজেন্ডাই হতে পারে না

    গৌতম দাস

    ০৫ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2EJ

     

    [সার সংক্ষেপঃ ভারতে আসামের এনআরসি প্রসঙ্গে ২০১৮ সেপ্টেম্বর ২৯,  ভয়েজ অব আমেরিকার সাথে সাক্ষাতকারে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার বক্তব্যঃ
    “ভারতে কোন অবৈধ বাংলাদেশি থাকার খবর ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ধরনের খবর উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা তাদের পলিটিক্স।’
    স্থানীয় সময় শনিবার যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব বলেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি তো মনে করি না যে, আমাদের কোনো অবৈধ বাংলাদেশি সেখানে আছে। আমাদের অর্থনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী, যথেষ্ট মজবুত; তারা সেখানে গিয়ে কেন অবৈধ হবে?’
    বিষয়টি নিয়ে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন কাউকে ফেরত পাঠানোর চিন্তা তাদের নেই।”

    তাহলে আগামি ০৭ আগষ্ট ২০১৯, আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভারত সফরে তাঁর সাথে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বৈঠকে, আসামের এনআরসি ইস্যুর কোন কিছুই এজেন্ডাতেই আসতে পারে না। অথচ ভারতীয় মিডিয়ার দাবি এটাই এজেন্ডায় আছে।]

    –

    স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরে,
    আসামের এনআরসি আলোচনার কোন এজেন্ডাই হতে পারে নাঃ
    ভারতের এনআরসি [National Register of Citizens (NRC)]  মানে আসামের তথাকথিত বৈধ ভারতীয় নাগরিক বাছাই। শেষে এটা দাড়িয়েছে এমন যেন – কারা ভারতীয় নয়, তা খুঁজে বের করার নামে এক মুসলমানবিদ্বেষী প্রক্রিয়া। যার পেছনের বিদ্বেষী ভাবনাটা হল যে, আসামের কোথাও কোন মুসলমানকে পাওয়া গেলেই তা আগাম নিশ্চিত ধরে নেয়া যে সে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ উদ্বাস্তু। এটা আরও বেশি হয়েছে, ২০১৬ সালে আসাম রাজ্য সরকারে বিজেপির কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতা নিবার পর থেকে। আর এর আগে মানে  ২০১৬ সালের আগের এব্যাপারে ভার্সানটা ছিল এমন যে কোন মুসলমান বা বাঙালি পেলেই বাছবিচার  ছাড়া আগাম ধরে হত যে সে বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ উদ্বাস্তু।  এমনই পরিস্থিতিতে গত ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, তার নিজের তত্ত্বাবধানে এনআরসি বা নাগরিক তালিকা তৈরির কাজটা শুরুর নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তিন বছরের মধ্যে এই নাগরিক তালিকা তৈরির কাজ শেষ করে এক চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতে হবে – এই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

    ইতোমধ্যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের ডেডলাইন অনেকবারই বদলানো হয়েছে। এমন চারবার বদলানোর পরে এক খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল গত বছর ৩১ জুলাই ২০১৮। ভারতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী (২০১৬), আসামের মোট জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি ৩৯ লাখ। এখন সাড়ে তিনকোটির কিছু বেশি হতে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ হিন্দু ও মুসলমান নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেনি বলে দাবি তালিকা প্রণয়নকারীদের। যদিও এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে প্রায় প্রতিদিনই খবর আসছে। যেমন বাবা-মা নাগরিক অথচ সন্তান নয় এমন কেস সামনে আসছে।  আবার কাছাকাছি নাম, বা নামের মিলের জন্য অন্যজনকে ধরে আনার ঘটনা আছে। এমন বহু আজিব কাহিনীও আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা এই প্রজন্মের ধারণা নাই, রেশন মানে কী? কেরোসিন, চিনি, লুঙ্গি, সাবান এসবের জন্য সারাদিন ধরে লাইন ধরে পড়ে থাকা – এই অভিজ্ঞতা যার নাই সে বুঝবে না এটা কী।  এককথায় বললে মানুষের নুন্যতম মর্যাদাটুকুও কেড়ে নেওয়া হয় এতে – পুরা ডি-হিউম্যানাইজ। পুরা আসামের সবাইকে বিশেষত মুসলমানদেরকে নাগরিক্ত্বের প্রমাণ করার নামে মানুষের মর্যাদা কেড়ে নেয়া হয়েছে। কারণ কাজের পুরা পদ্ধতিটাই সেই সত্তর দশকের চিন্তায়, রেশনের লাইনে পাবলিককে সারাদিন খাড়া করায় রাখার মত। যখন এডুকেটেড মানুষও জানত কী “ম্যানেজমেন্ট” মানে কী?

    এখন পর্যন্ত এই ৪০ লাখসহ পরে ঘোষিত আরো প্রায় এক লাখ বাদে বাকি জনসংখ্যা নাগরিক তালিকায় বৈধ নাগরিক বলে ভুক্তি ঘটেছে বলে ধরে নেয়া হয়েছে ওই খসড়া তালিকায়। আর গতমাসে ৩১ জুলাই ২০১৯ এই খসড়ারই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আদালতের নির্ধারিত সেই ডেডলাইন এ পর্যন্ত মোট ছয়বার বদলানোর পরে গত মাসের (জুলাই ২০১৯) শুনানিতে আর একবার মাত্র এক মাস বাড়িয়ে চূড়ান্ত তারিখ (সম্ভবত এবারই শেষ) আদালত দিয়েছে ৩১ আগস্ট ২০১৯।

    কিন্তু এবার তামাশার দিকটা হল – এতে কেউ, ভারতের কোনো পক্ষই সন্তুষ্ট নয়। না অসমিয়া বাসিন্দা, না কেন্দ্র বা রাজ্য বিজেপি, না আসাম কংগ্রেস না আসামের পাহাড়ি উপজাতিসহ আর কোনো রাজনৈতিক দল।  আসাম কংগ্রেসের নেতা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গোগোই এর দাবি আসাম এক নির্ভুল নাগরিক তালিকার বদলে আসাম একটা কাগজের তেনা পাইতে যাইতেছে [Assam won’t get an error free NRC on August 31: Tarun Gogoi ]। আর প্রতীক হাজেলা নামের মুখ্য আমলা – যাকে এই প্রকল্পের মুখ্য সমন্বয়-কর্তা হিসেবে আদালত সরাসরি নিজের অধীনে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সেই প্রতীক হাজেলাকে দায়ী করে সবপক্ষই এখন যার যার নিজেদের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন।  গত মাসের শুনানিতে আদালতে খোদ আসাম রাজ্য সরকারও অন্যদের সাথে জানিয়েছিলেন তৈরি খসড়া তালিকাও “ভুলমুক্ত” নয়। তাই একে শুদ্ধ করে তুলতে সময় অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়াতে হবে, যাতে তা একটা ভুলমুক্ত তালিকা হয়ে উঠতে পারে – এই বলে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার আদালতে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু শুনানি শেষে আদালত সে আবেদনে সাড়া দেননি। কেবল ৩১ জুলাইয়ের ফাইনাল ডেডলাইনটা মাত্র এক মাস পিছিয়ে ৩১ আগস্ট করেছেন।

    ওই আবেদন করেছিল মূলত রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার আলাদা দরখাস্তে, কিন্তু একই ভাষায়, [In identical but separate applications, they urged the Supreme Court ] অর্থাৎ মূলত বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ, যিনি এখন নিজেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তার কথাতেই এই আবেদন। কারণ, কেন্দ্রীয় সরকার বলতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ই ছিল ঐ আবেদনকারী। আর এখন জানা যাচ্ছে, কেন অমিত শাহ আবার সময় চাচ্ছিলেন। আদালতে পেশ করা ওই আবেদনে লেখা ছিল, খসড়া তালিকাটা ‘নির্ভুল’ নয়।

    কেন্দ্রিয় সরকারের এটর্নি তুষার মেহতা আদালতে পাবলিকের  অনুমানের [perception] দোহাই দিয়ে  দাবি করেছিলেন,
    “There is a growing perception. They must have done excellent work, but mistakes have crept in. The quantum of people included in certain areas is more… Wrongful inclusions are manifold in the bordering districts, lakhs of illegal immigrants have been included in the draft NRC list.”। অর্থত পাবলিক পারসেপশন হল তালিকা নির্ভুল না।
    তাই ঐ দাবির আবেদনে বলা হয়েছিল, অতএব এক নির্ভুল নাগরিক তালিকা করতে বাংলাদেশের সীমান্ত বরাবর আসামের জেলাগুলো থেকে খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ২০ শতাংশ লোকের তথ্য আবার যাচাই করতে চায় এরা। এ ছাড়া এরা বাকি পুরো আসামের খসড়া নাগরিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ১০ শতাংশ লোকের তথ্য আবার যাচাই করতে চায়। আদালত যদিও এই প্রস্তাব নাকচ করে দেন, কিন্তু অমিত শাহদের এতে উদ্দেশ্য কী ছিল?

    কথা সত্য, যে আসামে কখনই নির্ভুল নাগরিক তালিকা তৈরি করা গেছে বলে কেউ কাউকে বিশ্বাস করাতে পারবে না। কেন? পাবলিক পারসেপশন [Public perception] কথাটার মানে হল – জনমনে যে অনুভব বা ধারণা তৈরি হয়ে আছে। এই অনুভব কিন্তু বাস্তবে সত্যি হতে পারে আবার মিথ্যাও।
    কিন্তু আসামে কয়েক যুগ ধরে চলা উগ্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদী আন্দোলন – এমন একটা জনমনের অনুভব বা শক্ত পারসেপশন তৈরি করেছে যে  – “বিদেশি” বা “বাংলাদেশি বাঙালি”, “অনুপ্রবেশকারি”, “মুসলমান” ইত্যাদি শব্দগুলো – এগুলাই তাদের সব দুঃখের কারণ। এক শব্দে বললে “বিদেশিরাই” [xenophobia] এমন এক “বিদেশি-আতঙ্ক”  সব দুঃখের কারণ মনে গেথে দেওয়া হয়েছে।  কাজেই সত্যিকার নাগরিক তালিকা তৈরি মানে কিন্তু আসলে জনমনের এই অনুভব বা পারসেপশন সত্যি কিনা এর যাচাই। মনে গেথে বসা ধারণাটার পক্ষে বিনা বিচারে কোন সাফাই তৈরি করার প্রকল্প নয় এটা।   কিন্তু পুরা আসাম NRC তৈরির কাজটাকে দেখেছে এভাবে যে এই প্রক্রিয়াটা হল তাদের “জনমনের অনুভব” এর পক্ষে সাফাই তৈরির কাজ এর প্রক্রিয়া হিসাবে।
    অথচ সত্যতা যাচাই মানে তো সাফাই তৈরির কাজ না। তাই এই কারণের আসাম কখনই নির্ভুল নাগরিক তালিকা পাবে না। 

    ইতোমধ্যে আসামের রাজ্য (প্রাদেশিক) পার্লামেন্টে পার্লামেন্ট-বিষয়ক মন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারী রাজ্যভিত্তিক এনআরসির খসড়া ডাটা প্রকাশ করে দিয়েছেন। গত ০১ আগষ্ট ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকা [With district-wise data, Assam govt. pushes for NRC ] এবিষয়ে জানাচ্ছে যে, বাংলাদেশের সীমান্ত আসামের জেলাগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি মুসলমান নাগরিক তারা সবাই খসড়া তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। আসামের মুসলমান অধ্যুষিত ধুবরি, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি ও সাউথ সালমারা জেলায় যথাক্রমে ৯১.৭৮ শতাংশ, ৯২.৩৩ শতাংশ, ৯১.৯৬ শতাংশ ও ৯২.৭৮ শতাংশ মানুষ খসড়া বৈধ নাগরিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। এটাই বিজেপির বিরাট মাথাব্যথার মূল কারণ। আসামের পার্লামেন্ট-বিষয়ক মন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারী এই তথ্য তুলে ধরে এখন হায় হায় করছেন। কারণ, তালিকায় অন্তর্ভুক্ত এই ডাটা,  এটা অসমিয়া ও বিজেপির মুসলমানবিদ্বেষী যে প্রপাগান্ডা আছে যে, “মুসলমান মাত্রই এরা সবাই বাংলাদেশী” একে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়েছে। সারকথা হল, আসামের অমুসলমান সবগুলো স্থানীয় পক্ষ এবং সাথে বিজেপি- এদের সবারই মুসলমানবিরোধী যে বয়ান তা হল, সীমান্ত এলাকা বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলমানে সব ভরে গেছে। অর্থাৎ মুসলমানবিরোধী সবগুলো পক্ষের অনুমানের বয়ান আর বাস্তবতা এ দুটোর বিরাট অমিল – এই খসড়া নাগরিক তালিকায় দেখা দিয়েছে। তাই তাদের আহাজারি উঠেছে।

    তাই অমিত শাহ-দের ইচ্ছা ছিল যদি ২০ শতাংশ ডাটা আবার চেক করার সুযোগ – এই অজুহাত তারা পেত, তবে “কিছু একটা” তারা করার চেষ্টা করত, যাতে ১৯৮৫ সালের চুক্তির বয়ান আর একালে বিজেপির মুসলমানবিরোধী বয়ানকে সত্য বলে হাজির করা যেত যে, এরা বেশির ভাগই বাংলাদেশী।

    কিন্তু আদালত তাদের আবেদন পুরাই নাকচ করে সব মাটি করে দিয়েছে। যদিও আদালতের যুক্তি ছিল ভিন্ন। আদালত বলেছিল, আগেরবার তারিখ বাড়িয়ে নেয়ার আবেদন নিয়ে শুনানিতে প্রতীক হাজেলা আদালতে পেশ করা রিপোর্টে নিজেই স্বীকার করে জানিয়েছিলেন, প্রায় ২৭ শতাংশ ডাটা ইতোমধ্যে দু’বার চেক করা হয়ে গেছে। তাই এই পয়েন্টটা তুলে ধরে আদালত বলেছিল যে তাহলে এখন আবার ২০ শতাংশের দাবি কেন? বরং আরো বেশি ২৭ শতাংশ ডাটা দু’বার চেক যেহেতু হয়েই গেছে, সেই যুক্তিতে আবার সময় দেয়া আর ২০ শতাংশ ডাটা আবার চেকিংয়ের প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য।  গত মাসে ২৩ জুলাই ২০১৯, শুনানি শেষে আদালত পুরো সে আবেদনই নাকচ করে দিয়েছিলেন।

    এই পরিস্থিতিতে বাঙালিবিরোধী অহমিয়া (অসমিয়া) ও মুসলমানবিরোধী বিজেপি সবারই রাজনৈতিক বয়ান ও দাবির পক্ষে সাফাই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে দেখে এই অসন্তুষ্টিতে তারা সবাই এখন সব দোষারোপ ঢেলে দিচ্ছেন প্রতীক হাজেলার ওপর। অনেক স্থানীয় পত্রিকা প্রতীক হাজেলাকে “বিশ্বাসঘাতক’ বলতে দ্বিধা করেছেন না। নর্থ ইস্টের এমন এক পত্রিকা লিখছে- “আসাম-বিজেপির এক সভা থেকে প্রতীক হাজেলার ‘অবস্থানকে সন্দেহজনক’ বলে এক প্রস্তাব প্রকাশিত” হয়েছে [প্রান্তজ্যোতি প্রতিবেদন, গুয়াহাটি ২৬ জুলাই ২০১৯]। এছাড়া ‘নয়া ঠাহর’ নামে এ রকম আর এক পত্রিকার ভাষায় ২৫ জুলাই,   [পত্রিকাটার অসমিয়া স্টাইলের বাংলা হুবহু রেখে দেয়া হয়েছে এখানে] “আসামের জনসাধারণ,কেন্দ্র, রাজ্য সরকারকে অন্ধকারে রেখে একটি ত্রুটিপূর্ণ বিদেশী নাম যুক্ত এনআরসি প্রকাশের জন্য প্রতীক হাজেলা এক বিশেষ শক্তির নির্দেশে কাজ করছে বলে মনে হয়েছে । প্রতিক হাজেলার এমন পরিস্থিতি অসমীয়া জাতির জন্য এক অশুভ ইঙ্গিত বহন করে করছে বলে আসাম বিজেপি এক বিবৃতি যোগে প্রকাশ করেছে”।
    পত্রিকাটি আরো লিখেছে, “উল্লেখ্য, প্রতীক হাজেলার উচ্চতম ন্যায়ালয়ের কোনো নির্দেশ না হওয়ার আগেই খসড়াতে সন্নিবিষ্ট লোকের ২৭ শতাংশ পুনরায় পরীক্ষণ করা হয়েছে বলে উচ্চতম ন্যায়ালয়ে দাখিল করা বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। আসামের সুরক্ষিত ভবিষ্যতের প্রতি লক্ষ রেখে রাজ্যসরকার আর কেন্দ্রীয় সরকার এনআরসিতে নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়া নাগরিকের ২০ শতাংশ নাগরিকের নাম পুনরায় পরীক্ষার জন্য উচ্চতম ন্যায়ালয়কে আবেদন জানিয়েছিল। এই আবেদন সম্পর্কে ন্যায়ালয়ের নির্দেশ না হওয়ার আগেই ২৭ শতাংশ নাগরিকের পুনরায় পরীক্ষণ হাওয়ার কথা বলে প্রতীক হাজেলা যে বক্তব্য দিয়েছে, সেটি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয় বলেই বিজেপি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে”।

    বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরঃ
    মনে হচ্ছে, এই অবস্থায় ইতোমধ্যে অমিত শাহরা আরেক বড় পরিকল্পনা এঁটেছে। আগেই বলেছি, অমিত শাহ এবারের দ্বিতীয় মোদী সরকারে নিজেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। খবর বেরিয়েছে, তিনি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সাথে আগামী ৭ আগস্ট দিল্লিতে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন। কোন বৈঠকের অনেক আগেই বৈঠকের অ্যাজেন্ডা কী হবে তা যেকোনো পক্ষই প্রস্তাব করতে পারে। এরপর দু’পক্ষই একমত হলে তবেই তা আলোচ্যসূচি বা এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বাংলাদেশের মিডিয়ায় এই বৈঠকের এজেন্ডা কী তা নিয়ে যা প্রকাশিত হয়েছে তা হল – ‘সীমান্তে পাচার, ভারতীয় ভুয়া মুদ্রা, ভারতীয় বিদ্রোহী গ্রুপ, রোহিঙ্গা শরণার্থী ও জনগণ সম্পৃক্ত বিভিন্ন ইস্যু।’ কিন্তু এসবের বাইরে আরেক বিশেষ এজেন্ডার কথা প্রকাশিত হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপের ‘ইকোনমিক টাইমস’ পত্রিকায়, ৩০ জুলাই। লেখা হয়েছে, ‘অমিত শাহ অবৈধ মাইগ্রেন্ট ইস্যু নিয়ে কথা তুলবেন” [Amit Shah to talk illegal migrants, terror with Bangladesh counterpart]। আরো বলা হয়েছে, India is keen to ink a deportation deal…। অর্থাৎ বলা হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশের সাথে একটা একেবারে “বিতাড়িত করার চুক্তি” করতে ভারত খুবই আগ্রহী। কী নিয়ে? না, আসামের নাগরিক তালিকাতে যে ৪০ লাখ লোক বাদ পড়েছে তাদের নিয়ে। কী আজব কথা!

    এটি আসলে বিনা মেঘে বজ্রপাতের থেকেও বড় কোন ঘটনা।
    প্রথমত এটা কোনোভাবেই দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠকের এজেন্ডাতেই অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। বাংলাদেশ রাজি হতে পারেনা। কারণ, এনআরসি ইস্যুতে বাংলাদেশের ঘোষিত অবস্থানের বিরোধী এটা। যেমনঃ প্রথম পয়েন্ট – গত ২০১৮ সালের আগস্টে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর কলকাতার হিন্দুস্তান টাইমসের সাথে এক সাক্ষাৎকারে [শিরোনাম ছিল, NRC is India’s ‘local internal matter’ with ‘ethnic undertones’: Bangladesh] আসামের এনআরসি প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “প্রথমত আমরা এটিকে ভারতের আসাম রাজ্যের এক অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় রাজনৈতিক ইস্যু মনে করি”[“Firstly, we see this as an internal, local political issue with Indian state of Assam,” ]। এ ছাড়া কেন আমরা এটা মনে করি তা নিয়ে এক শক্ত যুক্তি দেখিয়ে পরের বাক্যে তিনি বলেছিলেন, “যেহেতু এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, বন্ধু পড়শি রাষ্ট্রের ব্যাপার, তাই এ নিয়ে ভারতের সাথে কথা তোলার কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই। এছাড়া গত ৪৮ বছরে ভারত সরকার কখনোই এমন ইস্যু নিয়ে আমাদের কাছে কোনো কথা তোলেনি” [“It has nothing to do with Bangladesh. The Indian government has not discussed this issue with us, nor do we have any intention to take it up with India as it is an internal matter of India, our friendly neighbour.”]।
    এবার দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, গত বছর ২০১৮ সেপ্টেম্বর ২৯, স্থানীয় সময় শনিবার যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অব আমেরিকার সাথে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার। আমাদের ইত্তেফাক ঐ সাক্ষাৎকার থেকে নেয়া এক টেক্সট রিপোর্ট ছেপেছিল পরের দিন ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮। সেখানে লেখা দেখা যাচ্ছে- ‘শেখ হাসিনা বলেন, আমি তো মনে করি না যে, আমাদের কোনো অবৈধ বাংলাদেশী সেখানে আছে। আমাদের অর্থনীতি যথেষ্ট শক্তিশালী, যথেষ্ট মজবুত; তারা সেখানে গিয়ে কেন অবৈধ হবে?”  বিষয়টি নিয়ে নরেন্দ্র মোদির সাথে তার কথা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন কাউকে ফেরত পাঠানোর চিন্তা তাদের নেই”। অর্থাৎ শেষ বাক্যটাই সব জল্পনা-কল্পনার সব কিছুর ওপর পানি ঢেলে দেয়। সার কথাটা হল, আসামের এনআরসি ইস্যুতে বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান কী, আমাদের মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী পাবলিককে তা জানিয়েছেন এবং তা খুবই স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন।

    তাহলে আসন্ন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ভারত সফরে, আসামের এনআরসি অথবা ভারতের কাউকে কোনো ‘বিতাড়িতকরণ’ ইচ্ছা নিয়ে – তা আলোচনার এজেন্ডায় উঠে আসার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

    অথচ উদ্বেগের ব্যাপার হল, ভারতের ইকোনমিক টাইমস ৩০ জুলাই এমন রিপোর্ট করার পরে এর উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশের মানবজমিন আর যমুনা টিভির নিউজ ওয়েবসাইটে রিপোর্টটি একই দিনে বাংলায় ছাপা হলেও আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের বা বাংলাদেশের ছাপা রিপোর্ট নিয়ে আমাদের আম-পাবলিককে কিছুই জানায়নি। কোন সাড়াশব্দও নাই। বাংলাদেশের প্রকাশ্যে গৃহীত অবস্থান ছাপিয়ে ভারতের সাথে একটা আলোচনার একে এক অ্যাজেন্ডা বলে হাজির করানোর দাবি করা হয়েছে, অথচ এর বিরুদ্ধে আমাদের সরকার পুরো নিশ্চুপ।

    ওই দিকে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন চলতি বছরের শুরুতে প্রথম ভারত সফরে বলে বসেছিলেন, ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক নাকি স্বামী-স্ত্রীর। এমন লুজটক করা পররাষ্ট্রমন্ত্রী দুনিয়ার কেউ কখনো দেখেছে জানা যায় না। তিনি গত মাসে আর এক লুজটক করে ভারতের স্ক্রোল পত্রিকাকে বলেছিলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু নিয়ে অনেক বিপদে আছি। তাই আমরা আর নিতে পারব না। এই গ্রহে বাংলাদেশই সবচেয়ে ঘনবসতির দেশ” [“We are already in much difficulty with the 11 lakh [Rohingya refugees], so we can’t take anymore. Bangladesh is the most densely populated country on the planet.”। অর্থাৎ তিনিও খেয়াল রাখেননি, খোঁজ নেননি আসামের এনআরসি ইস্যুতে ইতোমধ্যে আমাদের গৃহীত অবস্থান কী? আমাদের তো এনআরসি ইস্যুতে ভারতের সাথে কথা বলাই উচিত না। বললে বরং সেটা আমাদেরই স্ববিরোধী অবস্থান হবে। এছাড়া, রাষ্ট্রের বিদেশনীতির প্রথম কথাই হচ্ছে নীতিগত অবস্থানের রেকর্ড স্ট্রেট রাখা, পরিষ্কার করে রাখা আর তা মেনে চলার ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখা। এর বাইরে কোনো লুজটক না করা।

    তাহলে এর মানে কী, বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এই ভারত সফরে, আসামের এনআরসি নিয়ে অথবা ভারতের কাউকে কোনো ‘বিতাড়িতকরণ’ ইচ্ছা নিয়ে কি কোনো চুক্তি করতে যাচ্ছেন? অথবা তাহলে হচ্ছেটা কী? পাবলিক তা কার কাছ থেকে জানবে?

    অথচ হওয়া উচিত ছিল উলটা। ঐ অমিত শাহ এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন। এর আগে যখন কোন মন্ত্রী বা সরকারের কেউ ছিলেন না তখন তিনি বাংলাদেশিদেরকে তেলাপোকা, উইপোকা, পিষে মেরে ফেলবেন, ছুড়ে ফেলে দিবেন ইত্যাদি বলে পাবলিক বক্তৃতা করতেন। এখন গত মাসে  ১৭ জুলাই ভারতের রাজ্যসভায় তিনি আবার বলেছেন, “দেশের প্রতি ইঞ্চি জমি থেকে অবৈধ ভাবে বসবাসকারী অনুপ্রবেশকারীদের খুঁজে বার করবে সরকার। এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে তাদের ফেরত পাঠাবে”। ইউটিউবে দেখুন, [“Illegal Immigrants Living On Every Inch Will Be Deported”: Amit Shah] একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এধরণের কথার কোন জবাবদিহিতার ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা আদায়ের আগে এই লোকের সাথে তো আমাদের কোন বৈঠকই করা উচিত না!

    এদিকে, আসামের চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা ঘোষণার দিন চলতি মাসের শেষ দিন ৩১ আগস্ট ২০১৯, টিকটিক করে এগিয়ে আসছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০৩ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “আসামের এনআরসি আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর কি সম্পর্কিত?” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

  • হিন্দুত্বের মেজরিটারিয়ান-ইজম, রুল-রাষ্ট্র বলে কিছু নাই

    হিন্দুত্বের  মেজরিটারিয়ান-ইজম, রুল-রাষ্ট্র বলে কিছু নাই

    গৌতম দাস

    ০৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Co

     

    Protests: Stop making HINDUSTAN into LYNCHISTAN – REUTERS

    নির্বাচনে আবার জিতবার পরে মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে, গত ৩০ মে ২০১৯। সেই সাথে ভারত এখন হিন্দুত্বের রাজনীতিতে সয়লাব, সরকার আর প্রধান বিরোধী দল এ’দুই দলই এখন হিন্দুত্বের রাজনীতি নিয়ে – কে হিন্দুত্বের বেশি ফয়দা তুলতে পারে – সেই কাড়াকাড়ি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে গেছে। সে হিসাবে হিন্দুত্বই এখন প্রধান রাজনৈতিক ধারা, কংগ্রেস ও বিজেপি যেখানে উভয়েই হাজির।

    মানুষের প্রত্যেক সমাজেরই কিছু সামাজিকভাবে নির্ধারিত পালনীয় আচার-আচরণ থাকে। জবরদস্তিতে সেটা অমান্য করা যেমন, কেউ চাইল যে সামাজিক নর্মসের সে বিরুদ্ধে যাবে, সে রাস্তায় উলঙ্গ হয়ে হাঁটবে – বলাই বাহুল্য এটা এক ধরনের সামাজিক অসভ্যতা, পাবলিক বিড়ম্বনা বা “উপদ্রব ঘটানো” – এ বিষয়টিকেই ইংরেজিতে ‘নুইসেন্স’ [Public Nuisance] বলে। মোদীর প্রথম পাঁচ বছর কেটেছে হিন্দুত্বের নামে এমন অসংখ্য পাবলিক নুইসেন্স ঘটিয়ে। অথবা বলা যায় এই অর্থে  বিজেপি/আরএসএস হল “অসামাজিক” – এন্টি-সোশ্যাল দল। যারা পাবলিক নুইসেন্স কত রকমভাবে ঘটানো যায় তা করে দেখানোর দল।  আর সেই সাথে এটা এমন একটা দলের সরকার যার কাজ হল, এমন নুইসেন্স যেন বাধাহীনভাবে সমাজে ঘটতে পারে, তাতে সহায়তা করা। তাই মোদীর কাজ ছিল এবং এখন করছে যা এধরণের কাজকে প্ররোচিত করছে আর, প্রশ্রয় দিয়ে আগলে রাখছে। তবে গত পাঁচ বছরে এসব কাণ্ডের শীর্ষে ছিল গরুপূজা-কেন্দ্রিক অথবা ঘর-ওয়াপসি প্রোগ্রাম। মানে হল, মুসলমানসহ অন্য অহিন্দু ধর্মাবলম্বীদের হিন্দুধর্মে জবরদস্তিতে ফিরতে হবে বলে রাস্তায় দল বেধে জবরদস্তি করা, অপমান, বেইজ্জতি, হয়রানি করা, এজন্য আহত, রক্তাক্ত বা খুনই করে ফেলা বা করার ভয় দেখানো – এভাবে  নুইসেন্স তৈরি করা। আর পরবর্তীকালে গরুপূজা-কেন্দ্রিক “গোরক্ষক আন্দোলন” হয়ে উঠেছিল আরও ভয়ঙ্কর।

    গরু নিয়ে চলাচলকারী ব্যবসায়ী, গরু-পালনকারী বা কৃষিজীবীকে আক্রমণ অথবা গরুর গোশত পাওয়া গেছে মাঠে অথবা বাসায় এই অজুহাতে মুসলমান ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর আক্রমণ – এই ছিল এর সাধারণ লক্ষণ। এসবকিছুর উপরে আইনি বাধা তৈ করতে একটা আইন পাস করাও হয়েছিল। কিন্তু সুপ্রীম কোর্টের সামনে জবাব্দীহীতায় টিকতে না করে আইনটাই প্রত্যাহার করে নেই মোদী সরকার। তো এই কাজে ‘গোরক্ষক দল’ গঠন করে নজরদারির নামে পাবলিক লাইফে নুইসেন্স তৈরি করতে বিভিন্ন রাস্তা পাহারা দেয়া। আর বিজেপি-আরএসএসের নামে-বেনামের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন থেকে লোক নিয়ে গঠিত হত এসব গোরক্ষক দল। এভাবে প্রকাশ্য সরকারি সহায়তায় বাধাহীনভাবে চলত এসব ইসলামবিদ্বেষী হত্যা নিপীড়ন ও পাবলিক নুইসেন্স। এদের তৎপরতায় নৃশংসতা বর্ণনা করতে আর একটা শব্দ আছে “পাবলিক লিঞ্চিং” [Public Lynching]। ইংরেজি এই শব্দের মানে হল, বিজেপি/আরএসএসের কর্মিদের নিয়ে গঠিত গোরক্ষক বা ভিজিলেন্স ধরনের দলের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে পাবলিক উন্মাদনা এই অজুহাত তৈরি করে বা উন্মাদনা বলে চালিয়ে দিতে – এসব নিজ দলের কর্মিদের ইসলামবিদ্বেষী  নিপীড়ন হত্যাকান্ডগুলো। যেন মনে হয় কোন কথিত ইস্যুতে মুসলমান নাগরিককে গণপিটুনিতে আহত রক্তাক্ত বা হত্যা করা হয়েছে। লিঞ্চিং মানে গণ-উন্মাদনার নামে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে কাউকে রক্তাক্ত করা বা মৃত্যু ঘটানো। কিন্তু এককথায় বললে, এগুলো ছিল ধর্মীয় আক্রমণ। কেউ মুসলমান হলেই তাকে রাস্তায় দল বেধে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে রক্তাক্ত করা বা তাতে মৃত্যু ঘটানো, দলীয় কর্মিরা এমনই বেপরোয়া আর আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার বিজেপি/আরএসএসের প্রকাশ্য দলীয় কর্মসুচি।

    মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ের নতুন যোগ করে শুরু হয়েছে আরেক অজুহাতে ‘পাবলিক লিঞ্চিং’। অজুহাত বা ঘটনা অনুষঙ্গ মানে কেন কিভাবে ঘটানো হয়, তা হলো কোন বাসে, ট্রেনে বা রাস্তায় মানে পাবলিক স্পেসে প্রকাশ্যে কোন মুসলমান নাগরিককে ধরে তাকে “জয় শ্রীরাম” বলতে বাধ্য হয়। একাজে ধরেই চর-থাপ্পর মেরে জোর করে নির্যাতন করেই চলা হয় যাতে সে প্রাণ বাঁচাতে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য হয়, আর না করলে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হামলায় এর তীব্রতায় সে মারাও যেতে পারে। প্রত্যেক সপ্তাহেই এমন দু-তিনটি ঘটনা ভারতজুড়ে ঘটতে দেখা যাচ্ছে, গত মে মাসে নির্বাচনে মোদির শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ের শুরু থেকেই।

    এককথায় বললে, কীসের রাষ্ট্র, কীসের আইন, নিয়ম শৃঙ্খলা, – প্রজাতন্ত্র পার্লামেন্ট ইত্যাদি; ভারতে এমন কোন কিছু এখন নাই। ভারতে রাষ্ট্র, সমাজ, কনষ্টিটিউশন, আইন, আদালত, নির্বাচন কমিশন, পার্লামেন্ট সব মারা গেছে।  আছে কেবল এক ধর্মীয় রাজত্ম। আপনি হিন্দু ধর্মের লোক, তাই আপনি মেজরিটারিয়ান [Majoritarian]। তাই আপনি মুসলমানদের উপরে যাখুশি করতে পারেন। যা বলবেন তাই হবে! তাতে ভারতের রাষ্ট্রপতি, সরকার, কনষ্টিটিউশন, আইন, আদালত, নির্বাচন কমিশন, পার্লামেন্ট আপনাকে কিছুই বলবে না। বরং প্রটেকশন দিবে। এই হল রুল অব দা ডে! এখনকার রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া।

    আইনি দিক থেকে পাবলিক নুইসেন্স ঘটানো মানে অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা এক ক্রিমিনাল অপরাধ; পেনাল কোড ২৬৩, ২৯০, ২৯১ ধারায় পাবলিক লিঞ্চিং করা অপরাধ। তবে পাবলিক লিঞ্চিং করতে গিয়ে হতে পারে বড় অপরাধ- হত্যা করা, হত্যার উদ্দেশ্যে আহত করা ইত্যাদি; যা মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ। এ ছাড়া পাবলিক অর্ডার নষ্ট করা, গণ-উন্মাদনা তৈরি করা সেসব অপরাধের খতিয়ান তো আছেই।

    তবে এ ছাড়াও এখানে সবচেয়ে বড় অপরাধ ঘটায় শাসক সরকার, যেটা আসলে রাজনৈতিক ও কনস্টিটিউশন ভঙ্গের অপরাধ। খোদ রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলা, রাষ্ট্র একটা খামোখা – বানিয়ে ফেলা । মূল কারণ মোদী এন্ড গং আপনি এখানে পরিকল্পিত ভাবে ভারতে হিন্দুদের মেজরিটারিয়ান-ইজম চালু করেছেন। “জয় শ্রীরাম” হল হিন্দুদের মহান শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশকারি শ্লোগান। তাই আপনি মুসলমান, মানে আপনি হিন্দু নন বলেই আপনি আমার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েছেন কিনা  তা পরখ করতেই এই ন্যুইসেন্স মেজরিটারিয়ান-ইজম আপনার উপর করবে। এটা ‘নাগরিক বৈষম্য’ করা হচ্ছে কিনা, তা ঠেকানোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া প্রধানমন্ত্রীর কাজ কিনা সেসব পাশে ফেলায় রাখেন, উদাসীন থাকতে দেন। নির্লিপ্ত থেকে রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা ও পাবলিক অর্ডার ভেঙে পড়া হতে দেন ও সাহায্য করেন। অসুবিধা কী? আমি মোদী আর আমাদের হিন্দুত্ব আছে – আছে আমাদের মেজরিটারিয়ান-ইজম । কমকথায় এই হল এখনকার ভারত, তার মেজরিটারিয়ান-ইজম এর সাফাই।

    একটা মডার্ন রিপাবলিক সেসব মৌলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তা রাষ্ট্র বলে নিজেকে দাবি করতে পারে, এর এক নম্বর পয়েন্ট হল নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা বজায় রাখার কর্তব্য পালন করা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক মাত্রই সবাই সমান, সমান অধিকারের এমন হতে হয়। তাতে সে কোন ধর্মের নাগরিক, কোন গায়ের রঙের, পুরুষ না নারী, পাহাড়ি না সমতলী ইত্যাদি বিভেদ নির্বিশেষে সবাই রাষ্ট্রের সমান অধিকারের এমন হতে হয়। আর তা রক্ষা মানে নাগরিকের সম-অধিকার রক্ষা, কোনো নাগরিক যাতে অধিকার বৈষম্যের শিকার না হয়, সেটা রক্ষা ও বজায় রাখা ইত্যাদি হলো সরকারের মুখ্য কাজ। এখানে ব্যর্থ হওয়ারও সুযোগ নেই। হলে এটাই নাগরিককে দেয়া রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও কনস্টিটিউশন ভঙ্গের অপরাধ। এই ব্যর্থতার অর্থ হলো, রাষ্ট্রের অনস্তিত্ব; রাষ্ট্রের আর থাকা না থাকায় কিছু যায় আসে না বা খামাখা হয়ে যাওয়া। কিন্তু মোদী বলতে চাচ্ছেন এগুলো তত্বকথা ফেলায় রাখেন। মেজরিটারিয়ান-ইজম – এটাই শেষ কথা।

    নাগরিককে বৈষম্যহীনভাবে সুরক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল সরকার তা পালনে অপারগ বলে জানিয়ে দেয়া বা জেনে যাওয়া। ঝাড়খণ্ডের ঘটনায় তাবরিজ আনসারিকে লিঞ্চিং করে হত্যা করে হয়েছে। হত্যাকারীদের দাবি ছিল তাবরিজকে ভারতে থাকতে হলে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে হবে। এমন শর্ত দেয়ার ক্ষেত্রে তারা কে, এই হত্যাকারীদের কি অধিকার আছে এই দাবি করার- তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। এটা যে চরমতম নাগরিক বৈষম্য সৃষ্টির একটা কাজ তা নিয়ে কারো সচেতনতা আছে মনে হয়নি। এমনকি ভারতের পার্লামেন্টে হায়দরাবাদ ও বোম্বাইয়ের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত মুসলমান এমপি ওয়াসি [Asaduddin Owaisi] তার শপথের অনুষ্ঠানে, সেখানে তাকেও ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে চাপ দিতে বিজেপি এমপিরা জয় শ্রীরাম বলে গগনবিদারী চিৎকার করছিল। অর্থাৎ পার্লামেন্টেও বিজেপি এমপিদের ধারণা তারা অন্য এমপির ওপর এমন বাড়তি ক্ষমতাপ্রাপ্ত যে, তারা ওয়াসিকে জয় শ্রীরাম বলতে বাধ্য করতে পারে। বিজেপি এমপিরা বাড়তি অধিকারপ্রাপ্ত (মেজরিটারিয়ান) এটাই বলতে চাচ্ছে, মোদির বিজেপি দলের এমপিরা। তাই তাদেরই রুল মেজরিটারিয়ান-ইজম – এটাই সবকিছু।

    ওই দিকে এসব নিয়ে মোদীর প্রতিক্রিয়া আরো মারাত্মক। পার্লামেন্টে তিনি বিরোধী দলের কথা বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বলছেন, “ঝাড়খণ্ডকে লিঞ্চিংয়ের কেন্দ্র” বা হাব বলা নাকি খুবই বেইনসাফি হবে [Unfair to call Jharkhand a hub of lynching: Narendra Modi]। কারণ তিনি বলতে চাছেন, লিঞ্চিংয়ে যারা মামলা খেয়েছে তাদের বিচার তো আদালতে হচ্ছেই। মোদীর ইনসাফবোধ এখানে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আসলে কখনো কখনো ক্রিমিনাল অপরাধের চেয়ে বড় আর মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক বা কনস্টিটিউশনাল প্রতিশ্রুতি ভাঙার অপরাধ। খোদ রাষ্ট্র ভাঙ্গার অপরাধ। ঐ নাগরিক তাবরিজ আনসারিকে নাগরিক অধিকার বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন, এর শপথ নিয়েছিলেন তিনি। অথচ তাবরিজের হত্যায় তিনি নিজের অপরাধ কী তা দেখতেই পাচ্ছেন না। মনে করছেন, লিঞ্চিংকারীরা কেবল একটা কথিত পেটি ক্রিমিনাল অপরাধ। খোদ সরকার প্রধানের অপরাধ ও ব্যর্থতা অথবা রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার অপরাধ এগুলো আমল করতেও কিছু যোগ্যতা লাগে মোদীর সেটা নাই।

    তামাশার দিকটি হল ভারতের নাগরিকও সচেতন নয়, এক হিন্দুত্বের ছায়া তলে সব হারিয়ে গিয়েছে। হয়ত ভাবছে হিন্দু নাগরিকের জন্য এটা কোন সমস্যাই না। অথচ তারা জানেই না যে নাগরিকদের মধ্যে কোনো নাগরিক অধিকার বৈষম্য না করা প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে গঠন করা হয়েছিল ভারত রাষ্ট্র। রাষ্ট্র-সরকার প্রধানের অপরাধ ও ব্যর্থতা অথবা রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার কাজ করে ফেলে – এতে নাগরিক সকলেই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। রাষ্ট্র বারবার গড়ার জিনিষ না, চাইলেই নতুন আর একটা গড়া যায় না। আর মৌলিক ভিত্তিমূলক বিষয়গুলোতে নাগরিকদের মধ্যে চিন্তার ঐক্য থাকতে হয়। এর উপর আছে – এক কথায় বলতে রাষ্ট্র কেমনে, কী দেখে চিনতে হয়? প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা এর রিপাবলিক বৈশিষ্ট্য এসব কথার মানেই বা কী? কী এর মর্ম ও তাতপর্য? তা খায় না মাথায় দেয়? কেমনে তা চেনা যায়?

    এ ব্যাপারটা নেহরু থেকে ইন্দিরা হয়ে একাল, এমনকি অমর্ত্য সেন পর্যন্ত এরা নাগরিক বৈষম্য প্রসঙ্গে জানেন, রাষ্ট্র চিনতে পারেন বা এগুলো আমল করেছেন, এর প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং যেন সবারই ধারণা হল, “প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র” ধারণাটা এক কথার কথা মাত্র। নেহরুর কাছে যেমন এত বড় ভারত রাষ্ট্রকে একসাথে বেঁধে এক করে ধরে রাখা- সেটা পিটিয়ে-পাটিয়ে ধরে রাখা আর হিন্দুত্ব এই আঠা দিয়ে যুক্ত এককরে ধরে রাখা – এটাই প্রজাতন্ত্র। কারণ, নেহরুর আমলের প্রধান ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ ছিল ভারত এক রাখা। তাই হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারত রাষ্ট্র খাড়া করা হচ্ছে কি না, এর চেয়েও তার কাছে গুরুত্বের ছিল যে যদি হিন্দুত্বের ভিত্তিতেই জোরজবরদস্তিতে ভারত এক রাখা সহজ হয়, তবে সেটাই তার স্বপ্নের ভারত – এটাই তার প্রজাতন্ত্র-বুঝের ভারত। তাতে তিনি ঐ প্রাপ্তরাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তি ঢেকে আড়াল করতে সেকুলার জামা একটা পড়ে নিবেন।

    পরে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে এসে আবিষ্কার করেন সেকুলারিজমই হল প্রজাতন্ত্র, এটাই নাকি এর আসল বৈশিষ্ট্য। কিন্তু খেয়াল করলেন ভারতের কনস্টিটিউশন ১৯৪৯ সালে পাস হলেও তাতে ভারত সেকুলার কি না, তা লেখা নেই। অর্থাৎ “সেকুলার” শব্দটা লেখা না থাকলেও সে রাষ্ট্র বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র [যেটা প্রকৃত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আসল চিহ্ন] হতে পারে কিনা তা তিনিও জানতেন না। বরং ভাবলেন চান্দিতে সেকুলারিজম লিখে রাখলেই সেটা প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র হয়। এমন ভাবনার পিছনে তার যে তাড়া ছিল তা হল, সেসময় মুসলমানদের হবু বাংলাদেশের স্বাধীনতা তাকে সমর্থন করতে হবে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্টই মুসলমান – এই হবু বাংলাদেশকে তিনি কেমনে সমর্থন করেন? এর সাফাই তিনি খুজে ফিরছিলেন। তাই বাংলাদেশ নিজেকে চান্দিতে সেকুলার লিখে রাখবে এই শর্তে তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন বলে সমর্থন দিলেন। কিন্তু মনের খচখচানি তাঁর রয়েই গেল যে কনষ্টিটিউশনে ভারত সেকুলার তা লেখাই নাই। তাই ১৯৭৬ সালে অধিক ক্ষমতার পাওয়ার কালে সে সময়ে সংশোধনী এনে লেখিয়েছিলেন যে ভারত সেকুলার। তার বুঝে, এটাই হল, প্রজাতন্ত্র ভারতের আসল বৈশিষ্ট্য। আর সেই থেকে ভারতের সেকুলারিস্ট বলে প্রজন্ম প্রজাতন্ত্র কী তা বুঝাবুঝির দায়দায়িত্ব ফেলে রেখে আরামে ঘুমাতে যেতে পেরেছিল। কিন্তু একালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর কেবল এক অমর্ত্য সেনকেই দেখা যাচ্ছিল আপত্তি করছেন এই বলে যে – মোদীর  গন্ধ নাকি ঠিক নেই, কারণ তিনি সেকুলার নন। তাহলে এর মানে কী? অমর্ত্য আসলে কী বলতে চান? যে মোদীর ভারত আর প্রজাতান্ত্রিক নয়? তাই কী? কিন্তু সেটাই বা তিনি বুঝেছেন কী দিয়ে? সেটা কারো জানা নেই। যা সকলের জানা, ভারতের কনষ্টিটিউশনে যোগ করা সেই ইন্দিরার সেকুলারিজম – সেটা তো মোদী কনস্টিটিউশন থেকে ফেলে দেননি। তাতে মোদী বা তার দল বিজেপি সেকুলার না হতে পারেন। তাহলে অমর্ত্য সেনের আপত্তিটা ঠিক কী? অথচ মোদী রাষ্ট্রের ফান্ডামেন্টাল প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী প্রধানমন্ত্রী।

    এ জন্য এবারের পাবলিক নুইসেন্স তৈরি করা বা মেজরিটারিয়ান-ইজমে লক্ষণীয় হল, মোদী বা তার দলের সব নেতা এবার পুরোপুরি নিশ্চুপ। প্রধানমন্ত্রী নিজেও যেন লিঞ্চিংয়ের ঘটনা দেখেননি, জানেনই না, মিডিয়াতেও শোনেননি এমন ঘটনা। এছাড়া আইন তো আছেই যা করার পারবে, করবে। প্রধানমন্ত্রীর কী? মনোভাবটা এ রকম। আর নিজ দলকে বলা এই ফাঁকে যা পারিস অত্যাচার নুইসেন্স করে নে! আমরা আরও বড় মেজরিটারিয়ান-ইজম করতে যাচ্ছি।

    আবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, এই আদালতে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন’ [PIL, Public Interest Litigation] অর্থাৎ আদালতে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা হতে পারে, নেয়াও হয়। আইনি ক্যাচকাচালির শব্দটা অর্থ ভেঙ্গে বললে, অধিকার লঙ্ঘনের রীট মামলা করতে গেলে মামলাকারি নিজেই সংক্ষুব্ধ (ক্ষতিগ্রস্থ) তা হতে হয়। তা না হলে আদালত মামলাটাই নিতে চায় না। এই বাধাটা আদালতের তুলে নেয়া উচিত অন্তত সেসব মামলার ক্ষেত্রে যেখানে পাবলিক মানে সবার স্বার্থ জড়িত, তাই আলাদ করে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি খুজে বেড়ানোর দরকার নাই। মানে জনস্বার্থের ঘটনা এটা এজন্য। এই তর্কে আদালত একমত হয়েছিল। তাই “জনস্বার্থের মামলা” এই ক্যাটাগরিটাই আইনি ভাষায় [PIL] মামলা বলা হয়। এতে আদালত নিজেই বা সংক্ষুব্ধ বলে যে কেঊ আদালতে মামলার বাদি হতে পারে। তবে বাংলাদেশে “জনস্বার্থের মামলা” এটা প্রধানত দলবাজিতে চলে থাকে, বিপরীতে ভারতে এটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই চর্চায় প্রতিষ্ঠিত। তাই সরকারি দলের সাথে লিঙ্ক না থাকলেও বাদীর সে মামলা নেয়া হয়। পাবলিক লিঞ্চিংয়ের বিরুদ্ধে দিল্লির জামে মসজিদের ইমাম প্রতিবাদ বিবৃতিতে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে নীরব দর্শক হয়ে থাকার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন [Centre mute spectator to mob lynching incidents: Jama Masjid’s Shahi Imam]। সবচেয়ে তাতপর্যপুর্ণ বিবৃতি এটাই। কারণ তিনিই একমাত্র ব্যক্তিত্ব যে মোদীর সরকার অভিযুক্ত করেছেন দুই কারণে। এক,  নাগরিক বৈষম্য হচ্ছে অথচ মোদী সরকার নির্বিকার। দুই তিনি নাগরিককে বৈষ্ম্যের হাত থেকে রক্ষা করবেন প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন, অথচ সেই প্রতিশ্রুতি তিনি ভেঙ্গেছেন। তাঁর অভিযুক্ত করা বক্তবে কঠিন সত্যিগুলো এরকমঃ  “You gave a promise of treating 125 crore Indians with equality, irrespective of their religion and ethnicity… but unfortunately, the ground reality is not only contrary to this, but is a cause of concern for every civilised Indian citizen,”। এই ইমামের বক্তব্য থেকে মোদী চাইলে শিক্ষা নিতে পারেন।

    অথচ আদালত তাও নির্বিকার। যেন তারাও দেখেনি কিছু, জানে না। তাদের কিছু করার নেই। অথচ সোজাসাপ্টা অধিকারে বৈষম্য চলছে। মুসলমান নাগরিক বলে কাউকে দেখলেই এক হিন্দু নাগরিক মনে করছেন, তার নিজ পছন্দের শ্লোগান “জয় শ্রীরাম” বলাতে তিনি ওই মুসলমান নাগরিককে বাধ্য করতে পারেন। কারণ, যে অধিকার বৈষম্য আছে এতে তার অবস্থান তো উপরে; মেজরিটারিয়ান-ইজম তাঁকে উপরে তুলে রেখেছে।

    ওদিকে যারা লিটিগেশন মামলার গুরু, সেই প্রশান্ত ভূষণরাও কি তাই ভাবছেন? মেজরিটারিয়ানরা সবাইকে সব ব্যাপারে বাধ্য করতে পারে মনে করছেন? এতে এই যে নাগরিক বৈষম্য হচ্ছে, এই বৈষম্য করার কারণে ভারত ভেঙে যেতে পারে! এটা কী তারা বুঝতে পারছেন? তারা বুঝতে পারছেন এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সবাই নিশ্চুপ। নাকি তারা মনে করছেন,  মেজরিটারিয়ানরা এই বাধ্য করার কাজ, এ কাজটা এতই সঠিক মনে করছে যে প্রশান্ত ভূষণ বা যে কেউ এমন অধিকার বৈষম্য এর বিরুদ্ধে অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলে অভিযোগকারী প্রশান্ত ভুষণেরা নিজেরাও লিঞ্চিংয়ের শিকার হতে পারেন? ব্যাপারটা কি এমন ভয়ের? সেটাও জানা যাচ্ছে না।

    এমনকি বিচারকেরা? তারাও কি ভয়ে সিটিয়ে গেছেন? নাকি সবাই হিন্দুত্বের মহিমা দেখে আপ্লুত ও বুঁদ হয়ে গেছেন?

    মনার্কি [monarchy] বা রাজতন্ত্রের বিপরীতে প্রজাতন্ত্র ধারণা – এদুইয়ের মধ্যে এক প্রধান ফারাক হল, ক্ষমতা প্রসঙ্গে। প্রজাতন্ত্রে – এখানে শাসককে শাসন ক্ষমতা কে দিয়েছে, কোথা থেকে আনা হয়েছে এর হদিস লুকানো নয়। নাগরিক নিজেই গণসম্মতিতে প্রতিনিধি নির্বাচন করে শাসককে শাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা দিয়েছে। শাসকের ক্ষমতার উৎস তাই নাগরিকদের কাছ থেকে ডেলিগেটেড পাওয়া ক্ষমতা। বিপরীতে মনার্কিতে তাঁর ক্ষমতার উতস জানা নাই, বলতে পারবে না; যেটা আসলে গায়ের জোর জবরদস্তি।
    এ ছাড়া, প্রজাতন্ত্রের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, তালিকা করে রাখা নাগরিক মৌলিক মানবিক অধিকারগুলো রক্ষা করতে রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর, অধিকারগুলো নাগরিককে অবাধে ভোগ করতে দেয়ার নিশ্চতাবিধান আর নাগরিকের মধ্যে কোনো বৈষম্য না করে অথবা আর কাউকে তা করতে না দিয়ে এসব কাজ বাস্তবায়ন করবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই শাসক শাসনক্ষমতা পায়। এটাই মুখ্য শর্ত।

    শাসক এর ব্যত্যয় ঘটালে বুঝতে হবে রাষ্ট্র গঠনকালীন দেয়া শর্ত প্রতিশ্রুতি আর নেই, পালন করছে না। রাষ্ট্র ক্রমেই এখন দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়বে।
    তাই সেকুলারিজম বলে কোনো আলগা, অবুঝ না-বুঝ কথা নয়, বরং নাগরিক বৈষম্যহীনতা বজায় রাখা, রক্ষা করা, কাউকে করতে না দেয়া এটাই ফান্ডামেন্টাল। তবে ভারতের কনষ্টিটিউশনে যে নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা রক্ষার কথা নেই, তা নয়। কিন্তু এর গুরুত্ব রাজনৈতিকভাবে সমাজের রাজনীতিতে তা হাজির নেই, দেখাই যাচ্ছে। তাই বাস্তবত, “খামাখা”  হয়ে আছে শব্দটা। আর হিন্দু কোনো নাগরিক মনে করছে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে অন্যের ওপর নাগরিক বৈষম্য করতেই পারে। মুসলমানদের “জয় শ্রীরাম” বলাতেই পারে, বাধ্য করতে পারে। মানে মেজরিটারিয়ান-ইজম!

    অথচ রাজনীতিবিদদের হওয়া দরকার ছিল – কেন নাগরিক বৈষম্যহীনতার নীতি অনুসরণ করা নাগরিককে দেয়া রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি হয়- এটা বুঝে নেয়া। আর কেন এটা রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক ভিত্তি, কেন মৌলিক তা-ও নিজে বোঝা ও সব ধরনের নাগরিককেই সেটা বোঝানো। সেই আলোকে, আবার ওদিকে আদালতের উচিত হত নাগরিক অধিকার বাস্তবয়ায়নে বৈষম্যকারীদের সরকার বা কোন দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া। এমনকি নির্বাচন কমিশনের নিজের উচিত হত, দল বিজেপির বিরুদ্ধে একশনে যাওয়া; শর্ত আরোপ করা, যে অবিলম্বে নাগরিক বৈষম্যমূলক রাজনীতির চর্চা বন্ধ না করলে দলের রেজিস্ট্রেশন বাতিলসহ দলের নেতাদের  বিরুদ্ধে আইনি শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

    অথচ এখানে হচ্ছে পুরো উল্টা। হিন্দুত্বের প্রধানমন্ত্রী নিজেই নাগরিক বৈষম্য ঘটাচ্ছেন। যার রক্ষা করা ছিল দায়িত্ব, তিনিই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী। তিনিই আসলে মেজরিটারিয়ান-ইজম এর মূল নেতা। আর ওদিকে আদালত বা নির্বাচন কমিশন- এরা নিষ্ক্রিয়। এমনকি এক ধরনের হিন্দুত্ববাদী জনগোষ্ঠি তারাও বেপরোয়া। যেমন বিজেপির এক হিন্দু নারীনেত্রী প্রকাশ্যে লিখে মুসলমান নারীদের গণধর্ষণ করার জন্য হিন্দু পুরুষদের আহ্বান রেখেছেন। আর বিজেপি বড়জোর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে দায় শেষ করছে। কোনো ক্রিমিনাল চার্জ আনেনি। কেউ কী কাউকে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করার আহবান রাখতে পারে? আর তাতে কোন ক্রিমিনাল মামলা হয় না?

    এসব দিকগুলো তুলে ধরে আমরা অনেকবার বলছি, ভারত রাষ্ট্রটা জন্ম থেকেই গড়ে উঠেছে হিন্দুত্ববাদের ভিত্তিতে। কংগ্রেস দল জন্ম থেকেই মূলত এই কাণ্ডের হোতা। বিজেপির সাথে তার ফারাক এতটুকুই যে, বিজেপি হিন্দুত্বের ভিত্তির কথা না লুকিয়েই প্রকাশ্যেই বলতে চায়, এটাই তার রাজনীতির ভিত্তি, আর এটাই খোলাখুলি চর্চা করতে চায় সে। আর কংগ্রেস মনে করে হিন্দুত্ব পরিচয়কে সেকুলার নামে জামার নিচে লুকিয়ে রেখে হিন্দুত্ব দিয়ে চলতে হবে।

    এই বিষয়টাই এখন একেবারেই উদাম হয়ে গেছে।
    প্রধানমন্ত্রী মোদী এবার ভোট পেতে ভারত-নেপাল সীমান্তে পাহাড়ের উপর তীর্থস্থানে কেদারনাথের মন্দিরে গিয়ে ধ্যানে বসেছিলেন। আর তাতে কংগ্রেস মিডিয়াতে এসে বলেছিল, এখানে তাদের নেতা রাহুলই শ্রেষ্ঠ। কারণ মোদি ওই পাহাড়ে গেছেন হেলিকপ্টারে চড়ে আর আমাদের নেতা গেছেন শেষ মাইলখানেক হেঁটে। মানে মোদির সাথে কে কত বড় হিন্দুত্বের জিগির তুলে রাজনীতি করতে পারে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে এখন ‘সেকুলার’ কংগ্রেস। এমনকি গত নির্বাচনী প্রচারণা রাহুল তা শুরুই করেছিলেন মোদির সাথে প্রতিযোগিতা করে অসংখ্য মন্দির দর্শন করেছেন দেখিয়ে। আর কংগ্রেস এখন তো সরাসরি বলছে, তারাও হিন্দুত্বই করছে। তবে মোদিরটা হার্ড হিন্দুত্ব আর তাদেরটা নাকি, সফট হিন্দুত্ব।

    সর্বশেষ ঘটনা আরো মারাত্মক। রাহুলের মা কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া আবার দলের হাল ধরেছে্‌ নীতি ঠিক করছেন। তার দলের সংসদীয় (মূলত তাঁর অধস্তন) নেতা এবার বানিয়েছেন পশ্চিম বাংলার বহরমপুরের এমপি অধীর চৌধুরীকে। ্নির্বাচনের পরে সোনিয়ার নতুন নীতি হল, তিনিও এখন থেকে হিন্দুত্বের রাজনীতিই করবেন, বিজেপির থেকে ভাগ দাবি করবেন বা কেড়ে নেবেন। কিভাবে?

    একথা এখন সব পক্ষের কাছেই সুপ্রতিষ্ঠিত যে, মুসলমানবিদ্বেষই গত নির্বাচনে এককভাবেই এক মূল উপাদান ছিল। প্রধান প্রভাবশালী নির্বাচনি ইস্যু ছিল। মোদি এটাই ব্যবহার করে সফলভাবে জিতেছেন। মুসলমানবিদ্বেষ মানে পাকিস্তানবিদ্বেষ, আর তাই পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দিতে পারার বোলচাল- ভারতের এই রাজনীতি, আর এর সাথে সীমান্ত সঙ্ঘাত দেখানো আর সেখানে বিজেপিই একমাত্র হিন্দুস্বার্থের দল সেভাবে নিজেদের তুলে ধরা। বিজেপির সাফল্য এখানেই। তাতে পাকিস্তানের সাথে এখনই ভারতের কোন সঙ্ঘাতের ইস্যু থাক আর না-ই থাক। জলজ্যান্ত এই হিন্দুত্বকে ভারতের মিডিয়াগুলো এ বিষয়টিকে খুবই ভদ্রভাবে প্রলেপ দিয়ে বলছে, ভারতের জনগণের কাছে এটা নাকি “নিরাপত্তা” ইস্যু। মানে এটা ইসলামবিদ্বেষ না। জনগণের নিরাপত্তা বোধ। যা একমাত্র মোদীর বিজেপিই [মুসলমানবিদ্বেষ মানে পাকিস্তানবিদ্বেষ ঘটিয়ে] নিরাপত্তা বোধে স্বস্তি আনতে পারে। তাই জনগণ, মোদির আমলে চাকরি না পেলেও নিরাপত্তার ভয়ে কাবু হয়ে থাকা মানুষ – মুসলমানদের মাথায় বোমা মেরে আসা মোদিকেই ভোট দিয়েছে।

    সোনিয়াও এখন এই বয়ানটাকেই আমল করেছেন, মানে ব্যবহার করতে চান। তাই সোনিয়ার নীতিতে অধীর চৌধুরি পার্লামেন্টে এক জ্বালাময়ী হিন্দুত্ব বক্তৃতা দিয়েছেন। পাঠকের নিশ্চয় পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত বোমা ফেলতে গিয়ে সেই ভারতীয় পাইলটের কথা মনে আছে যে নিজের বিমান বিধ্বস্থ হবার পর ধরা পড়েছিল। পরে পাকিস্তান সৌজন্য দেখিয়ে তাকে ভারত ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল। “অভিনন্দন” নামের সেই পাইলট যার নিজের বিশাল আকৃতির মোচ আছে, এটাই তাঁর প্রতীক। সেকারণে অধীর ঐ বক্তৃতায় দাবি করেছেন, এখন থেকে ঐ গোঁফকে “জাতীয় গোঁফ” ঘোষণা করতে হবে। [“উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানের গোঁফকে ‘জাতীয় গোঁফ’ ঘোষণা করা হোক।” ] আবার এতে তামাশার দিকটা হল, আনন্দবাজার এই ব্যাপারটাকে দেখছে কংগ্রেসের সোনিয়ার জাতীয়তাবাদে ফেরা হিসাবে। তাই আনন্দবাজারের খবর শিরোনাম হল, “সনিয়ার নির্দেশ, জাতীয়তাবাদে ফিরছে কংগ্রেস”। একোন জাতীয়তাবাদ? এটা তো সোজাসাপ্টা হিন্দুত্ব। অথচ সেটা আড়াল করতে এটাকে শুধু জাতীয়তাবাদে ফেরা বলে সাফাই টেনে দিচ্ছে। মানে বিজেপি আর কংগ্রেস দুটোই এখন নিজেরাই স্বীকার করছে যে তারা হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দল।  হিন্দুত্বের রাজনীতি সত্যি বড়ই সুস্বাদু আর তামাশার!

    এমনকি ট্রাম্পের আমেরিকার পক্ষেও মোদীর মেজরিটারিয়ান-ইজম! কে সহ্য করা সহ্য হচ্ছে না। সারা দুনিয়াতে বিভিন্ন দেশে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা কোথায় ব্যহত হয়েছে এর একটা তালিকা প্রতিবছর আমেরিকা বের করে। এখানে বলাই বাহুল্য আমেরিকা ইউরোপের চোখে সেকুলারিজম বুঝে না। আমেরিকা মনে মানুষের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকতে হবে। আর তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়ীত্ব। তাই এই রিপোর্ট যে কোন রাষ্ট্র এই অধিকার রক্ষা করতে ব্যার্থ হয়েছে। স্বভাবতই এই তালিকায় ভারত অনেক বড় স্থান জুড়ে আছে। তাই আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট মানে এর মন্ত্রী/ উপদেষ্টা মাইক পম্পেই কঠোরভাবে ভারতে ধর্মপালনের স্বাধীনতা না থাকার অভিযোগ এনেছে। সেটা গা থেকে ছেড়ে ফেলে মোদী বলেছেন এটা ভারতের রাজনীতিতে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও পক্ষপাতিত্ব।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “হিন্দুত্বের পাবলিক লিঞ্চিং“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

    নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

    গৌতম দাস

    ১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-2wJ

    –

    যেমনই হোক, বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তবে আগামী দিনের ইতিহাস অন্য এক কারণে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন মনে করবে। কিন্তু কিসের? গ্লোবাল নেতা ও নেতৃত্ব বদলে যাবার। বলা হবে, বাংলাদেশের দিক থেকে দেখা দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল টের পাওয়া গিয়েছিল এই নির্বাচন থেকে। আমেরিকার দিন শেষ, গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে তাঁর ছুটি হয়ে গিয়েছিল। হেরে গিয়েছিল। আর বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে চীন গ্লোবাল নেতার আসন গ্রহণ করে নিয়েছিল। মুরোদহীন সোভিয়েত কমিউনিস্টরা সত্তরের দশকে একটা স্লোগান দিত – হাত গুটাও মার্কিন। তাই যেন হয়ে গেল; এসবেরই মাইলস্টোন এই নির্বাচন। আর এখান থেকেই বাংলাদেশ-সম্পর্কিত গ্লোবাল সম্পর্কগুলোর মধ্যে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে নতুন ধরণের এক স্ট্রাটেজিক ভারসাম্যে প্রবেশ করে গেল।

    আমরা যে দুনিয়াকে “গ্লোবাল রাজনৈতিক দুনিয়া” অথবা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া” বলে আজ চিনি, এর বয়স খুব বেশি না হলেও তা সর্বোচ্চ ‘সত্তর থেকে ছিয়াত্তর বছরের’। এর মানে এর আগে দুনিয়ায় কি স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল না? হ্যাঁ ঠিক তাই; ছিল না। আর সে দুনিয়া মানে ছিল এক কলোনি সম্পর্কের দুনিয়া। এখানে সম্পর্ক  কথাটা বুঝতে হবে বহুরাষ্ট্রীয় (শুধু পণ্য নয়) ভাব-ভাষাসহ  সব কিছুর লেনদেন বিনিময় – এক গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ হিশাবে। যেমন আগের সে দুনিয়ায় আমাদের নাম ছিল ব্রিটিশ-ভারত; মানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কলোনি-দখল-ভূমি হয়ে থাকা, তাদের মালিকানায় থাকা এক ভারতবর্ষ; “ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া” নাম ছিল আমাদের। এই অবস্থাটা বজায় ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত; সেকালের যার গ্লোবাল রূপটা ছিল – এক দিকে উপনিবেশ মালিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মত তবে ছোট-বড় সব মিলিয়ে ছয়-সাতটা সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র, যারা সারা দুনিয়াকে নিজেদের মধ্যে দখল-মালিকানায় ভাগ করে নিয়ে রেখেছিল। ফলে স্বাধীন রাষ্ট্র বলতে কিছুর অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। সোজা ভাষায় তাই স্বাধীন রাষ্ট্র বা কলোনিমুক্ত রাষ্ট্রের ফেনোমেনা শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পর থেকে।

    যেমন ১৯৪৫ সালের পরে ১৯৪৭ সালে এসে আমরা উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েছিলাম। তবে সেটি অবশ্য আর কোন অর্থেই আগের অখণ্ড ভারত নয়, বরং ভারত আর পাকিস্তান দুই আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা মুক্ত হয়েছিলাম। তবে বড় কথা, সেটি আবার শুধু ভারতবর্ষেরই ফেনোমেনা নয় বরং সারা দুনিয়াতেই উপনিবেশ হয়ে থাকা বেশির ভাগ রাষ্ট্র পরের ২০ বছরের মধ্যে সবাই মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যায়। তাই কথাটি এভাবে বলা যায়, ১৯৪৫ সালের আগের দুনিয়া হল – উপনিবেশ হয়ে থাকা দুনিয়া বা কলোনি মাস্টার-প্রজা সম্পর্কের দুনিয়া।

    আর এর বদলে বিশ্বযুদ্ধ শেষে এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়া হল, কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের দুনিয়া; যেটি আসলে আমেরিকার নেতৃত্বে এক নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দুনিয়া। আগের প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি শাসনের শেষে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার কথাই বলছিলাম যার বয়স মাত্র প্রায় ৭০ বছর। তবে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার প্রায় শেষ পর্বে দাঁড়িয়ে আমরা এখন কথা বলছি। এখন শুরু হবে বা হয়ে গেছে তৃতীয় পর্ব। চলতি একুশ শতকে এসে মোটামুটি এখান থেকেই শুরু হয়েছে পুরনো আমেরিকার নেতৃত্বের দিন শেষ আর বদলে তার জায়গা নিতে – বাংলাদেশের প্রেক্ষিত থেকে বলা যায়, এই নির্বাচনকালীন সময় হল সেই চিহ্ন যে চীন নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছে।

    অর্থাৎ বাংলাদেশের দিক থেকে অনুভবে চীন আর আসন্ন নয়, চীন গ্লোবাল নেতৃত্বের আসন নিয়ে নিল।  তৃতীয় এই পর্বে দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলে কবে কী ঘটেছিল – আগামী দিনের লেখা ইতিহাসে তা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে আমাদের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে মনে করা হবে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন।

    এই পথচিহ্ন নির্দেশ করবে যে, এই নির্বাচন থেকেই পুরনো নেতা আমেরিকার বাংলাদেশে নেতাগিরি সমাপ্ত হতে দেখা গিয়েছিল। আমেরিকার প্রভাব-আধিপত্যের মধ্যে বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগের মধ্যে যে বাংলাদেশ এত দিন ছিল, সেটি এখন বদল হয়ে নতুন সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা, চীনের নেতৃত্ব প্রভাবের যুগে প্রবেশ করল। যদিও অনেক আগে থেকেই চীনা প্রভাব ক্রমেই বাড়ছিল কিন্তু আমেরিকার হস্তক্ষেপের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাও পাশাপাশি থেকে গেছিল বলে এত দিন সেটাকে চীনের নেতৃত্বের যুগে প্রবেশ বলা যাচ্ছিল না। এত দিনের পরিচিত আমেরিকার প্রভাব আধিপত্য ও হস্তক্ষেপের সক্ষমতা এই প্রথম পুরাপুরি অকার্যকর হতে ও থাকতে আমরা দেখলাম আর এভাবেই যেমনই হোক বাংলাদেশের একটা নির্বাচন সমাপ্ত হল।

    সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭ শতাংশ আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও পক্ষে অথবা বিপক্ষে তার কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি।

    সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭% (২৯৮ আসনের মধ্যে ২৮৮) আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল [imperial – imperial role of Empire] বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা অথবা পক্ষে/ বিপক্ষে কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি। আসলে নেতা বা এম্পায়ার সক্ষমতা হারিয়ে কখন উত্থান রহিত হয়ে গেছে তা বুঝার সহজ ইঙ্গিত হল – যখন দেখা যাবে নেতা বোকা বোকা কথা বলছে। আমাদের নির্বাচনের পর দেখা গেল আমেরিকা বোকা বোকা কথা বলছে। কেমন নির্বাচন হল, আদৌও সেটাকে নির্বাচন বলা যায় কী না – সেসবের খবর নাই আমেরিকা বিবৃতি দিয়ে বলছে, “নির্বাচনে সব প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণ খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি” বলে মনে করছে […… decision of all major opposition political parties to participate, a positive development…।] যেন পায়ে সাপের ছোবল খেয়ে মৃত মানুষের বাসায় এসে কেউ দুঃখে বলছে যাক, ভাগ্যিস ছোবলে চক্ষুটা কাটা পরে নাই – এমনই এক বিবৃতি। কিন্তু আমেরিকার এই অবস্থান বদল কেন?

    কেন এমনটা হচ্ছে? ট্রাম্প আমেরিকাকে এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকায়” বদল করতে চেষ্টা করছে। মানে হল, গত ৭০ বছরে যে আমেরিকাকে দুনিয়া চিনে এসেছে, তা কোনো ‘ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা’ ছিল না; বরং তা ছিল গ্লোবাল এম্পেরিয়াল  আমেরিকা; অথবা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা। এই প্রথম সেই চিরচেনা ভূমিকায় আমেরিকা এবার বাংলাদেশে তার পদক্ষেপ, আচরণ রাখেনি; ত্যাগ করেছে। এটাকেই মূলত আমেরিকান হস্তক্ষেপের সক্ষমতার সমাপ্তি চিহ্ন ধরা হচ্ছে; তাতে এই হস্তক্ষেপ যে যেজায়গা থেকে দেখে ইতি বা নেতি মনে করতে পারে।

    তবে এই সমাপ্তি চিহ্ন পয়দা করতে হাসিনার কোন ভুমিকা নাই বললেই চলে। ভারতেরও নাই। এমনকি, চীনসহ অন্য কারও কোন ভূমিকার চেয়ে আসলে একক ভূমিকা ছিল খোদ আমেরিকারই। মানে হোয়াইট হাউসের। সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে ট্রাম্পের অফিস – হোয়াইট হাউজকে যদি আলাদা করি তবে আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত, অবস্থান ও ভূমিকা এককভাবে ট্রাম্পের অফিস হোয়াইট হাউজের।

    ট্রাম্পের ক্ষমতা নেয়া বা শপথ চলতি জানুয়ারিতে দুই বছর পূর্ণ হবে। গত ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকেই অর্থাৎ শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলে আসছেন যে, তিনি এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকার” অবস্থান নিবেন; নেতা হবেন, সেভাবে আমেরিকাকে সাজাবেন। অর্থাৎ গ্লোবাল এম্পায়রাল বা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া – এরই এক সাম্রাজ্যের নেতা হিসেবে ওর ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা আর থাকবে না। আমেরিকার যে চেহারাটা আমরা ৭০ বছর ধরে অভ্যস্ত হয়ে দেখেছি। ট্রাম্পের নতুন আমেরিকা কেমন হবে সে সম্পর্কে নতুন চিহ্নবাচক শব্দগুলো ট্রাম্প বলেছিলেন যেমন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ [AMERICA FAST] বা ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ এক ইকোনমি [TRUMP’s Anti-Globalization] অথবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যাদের ডমিনেটিং স্বার্থের সরকার তিনি হবেন – সেটা (গত সত্তর বছরের মত) ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ কোম্পানিগুলোর মত গ্লোবাল স্বার্থের হবে না, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোরও নয় [কারণ তাঁর শ্লোগান ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ ] – বরং তিনি হবেন – আমেরিকান স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারারদের যারা আমেরিকানদের চাকরিদাতা। এমন সব ফিচারের এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” গড়তে ট্রাম্প উদ্যোগী এবং রওনা দিয়েছেন।

    সে কারণে এই ম্যানুফ্যাকচারারদের স্বার্থে এক বাণিজ্যযুদ্ধ, আমেরিকানদের চাকরি বাঁচানো ইত্যাদি হল আমেরিকার এখনকার সেই ক্যাচি ওয়ার্ড। এসব কথা যে চিরচেনা আমেরিকার আগের গ্লোবাল ভূমিকা বদলের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত তা আমরা অনেকেই বুঝিনি, বুঝতে চাইনি অথবা যারা বুঝেছি তারা বিশ্বাস করিনি – সম্ভবত পুরনো অভ্যাসের কারণে। এই পুরনো অভ্যাস এতই তীব্র যে, সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন বলতে যা বুঝায় বলা হয় সেও ভুল করে। মনে করে ট্রাম্পের আমেরিকা যেন আগের গ্লোবাল আমেরিকাটাই – গ্লোবাল স্বার্থের নেতা আমেরিকা। এটাই হোয়াইট হাউজ আর বাদবাকি ট্রাম্প প্রশাসনের এক না থাকা, এক আপাত-ভিন্নতা। মূল কারণ আমেরিকান আমলা ব্যুরোক্রাসি গ্লোবাল আমেরিকা দেখতে দেখতেই বড় হয়েছে, হাত পাকিয়েছে। তাই এটাই রুটিন আমেরিকান প্রশাসন। আর সম্ভবত একারণেই ট্রাম্প যাকেই মন্ত্রী-উপদেষ্টার বা কর্মকর্তার নিয়োগ দেন না কেন তারা নিয়মিত ক্রমান্বয়ে পদত্যাগ করছেন, স্থিরভাবে পদে না থাকতে পারার অস্থিরতাি এখন নিয়ম মানে “নিউ নরম্যাল” হয়ে গেছে। যেটাকে আমরা “পাগলা ট্রাম্পের কান্ড” মনে করছি।

    অথচ আমেরিকা আর কখনো কোন গ্লোবাল (ইতি বা নেতি) ভূমিকা পালন করবে না – যেন সত্যিই বিড়াল এবার প্রতিজ্ঞা করছে যে সে আর মাছ খাবে না – দুই বছর ধরে এই হলো ট্রাম্পের হাতে সেট হওয়া অভিমুখ। আফগানিস্তান থেকে আরও সৈন্য প্রত্যাহার (ওবামা দশ হাজার বলে প্রতিজ্ঞা করেও শেষে ১৪ হাজার রেখে যাওয়া – সেটা থেকে আরও পাঁচ হাজার প্রত্যাহার করবেন ট্রাম্প), তালেবানদের সাথে কথা-আলাপ শুরু করেছেন সব ফেলে পালায় আসার লক্ষ্যে,  সিরিয়ায় ISIL মরে শেষ হোক আর না হোক সেখান থেকে প্রত্যাহার শুরু হয়ে গিয়েছে, জাতিসংঘে প্রদেয় আমেরিকান বার্ষিক অবদান আট থেকে  সাত বিলিয়নে নামিয়ে এনেছেন, প্রায়ই জাতিসংঘ থেকেই প্রত্যাহারের হুমকি দিচ্ছেন, ন্যাটো থেকে ফিরে যেতে চাচ্ছেন, বিশ্বযুদ্ধের পরে ‘শত্রুশক্তিকে’ রাজনৈতিক কব্জায় রাখতে জার্মানি আর জাপান আমেরিকার স্থায়ী ব্যারাকে সৈন্য রাখা আছে। স্ব স্ব দেশকে এর খরচের ভার নিতে বলছেন নইলে গুটিয়ে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন ইত্যাদি অসংখ্য প্রত্যাহারের ঘটনা আমরা বলতে পারা যাবে। এইসব প্রতিষ্ঠান গাড়া হয়েছিল গ্লোবাল নেতা আমেরিকার উদ্যোগে ও একক খরচে। ট্রাম্পের “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” মানে তো আসলেই আমেরিকার সব প্রত্যাহার, গুটিয়ে নেয়া ভুমিকা – এটাই ট্রাম্পের সেট করা আমেরিকার নতুন অভিমুখ। অতএব  এটা এখন আমাদের সু অথবা দুর্ভাগ্য যে, এই সেট করা পথে আমেরিকা আগামীতে অন্তত আরো দুই বছর থাকবে। অর্থাৎ ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হলে এরপর সম্ভবত ডেমোক্র্যাট কোনো প্রেসিডেন্ট আসলেও সেক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে আবার আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার জায়গায় ফিরে বসানোর সম্ভবত বেচে থাকবে না। তাই “ন্যাশনালিস্ট ট্রাম্পের নীতি” – এটাই আমেরিকান ভুমিকা পরিবর্তনের প্রধান ও একক নিয়ামক।  ট্রাম্পের এই নীতিই – চীনের গ্লোবাল ভূমিকা ও নেতৃত্বে এখনই বসা নিশ্চিত করছে এবং আগামীতে আরো নিশ্চিত করে চলবেন। তাই আমেরিকান গ্লোবাল ভূমিকার সমাপ্তি ঘটাতে এটা চীনের কোন লিড নয়। তবে এমন লিড না থাকলেও এই ভুমিকা সমাপ্তিতে যে নতুন পরাশক্তিগত স্ট্র্যাটেজিক ভারসাম্য তৈরি হবে, এটার মূল সুবিধাভোগী বা কোলে এসে পড়া সুবিধা যাবে এখন মূলত চীনের ভোগে।

    বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে এ থেকে বাংলাদেশে ভারত নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

    বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে ভারত বাংলাদেশে নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমতে থাকবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

    ঐক্যফ্রন্ট ফেনোমেনাঃ  হাসিনার ক্ষমতায় দাঁত বসানোর দিক থেকে বিচারে ঐক্যফ্রন্টকে অনেকে হয়ত অসফল বলবেন। কিন্তু অন্তত ভারতকে পাগল করে দেওয়ার জন্য খুবই সফল। আসলে বিএনপি একা না পারলেও ঐক্যফ্রন্ট ভারতকে বিভ্রান্ত ও পাগল করে দিয়েছিল। প্রাইম ঘটনাটা হল, গত একবছর ধরে হাসিনা অনুরোধ করে গেছিল যে ২০১৮ এর নির্বাচনে ভারত যেন ২০১৪ সালের মত প্রকাশ্য সমর্থন জানায়। কিন্তু ভারত তা উপেক্ষা করে গিয়েছে। কেন? অনেক বিবেচনা নিশ্চয় ছিল। কিন্তু সেসবের মধ্যে হাসিনার ‘পাবলিক রেটিং’ সম্পর্কে ভারতের নিজের মূল্যায়ন ছিল মুখ্য নিয়ামক। যা খুব ইতিবাচক ছিল না। তবে এ সম্পর্কে ভারতের মাপ-অনুমান যাই থাক, সেটা নিয়ে ক্রমশ একটা শঙ্কা বড় হচ্ছিল। সেটাকে আরো বড় করে ফেলে ঐক্যফ্রন্টের জন্ম ও আবির্ভাব। এসবের সবচেয়ে বড় চিহ্ন ও প্রকাশ হল, পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর বিখ্যাত উল্টা গান রচনা- হাসিনা ব্যাসিং। কারণ ভারতের সবচেয়ে ভয় হচ্ছিল “ঐক্যফ্রন্ট যদি এসে যায়” কারণ ততদিনে তাদের সব রেটিং অনুমান সেকথাই বলছিল। তাই হাসিনার অনুরোধ উপেক্ষা করা। তবে উপেক্ষার আরো কারণ হিসেবে অন্যান্য কম প্রভাবের ফ্যাক্টরগুলোও ছিল। যেমন হাসিনা চীনের বেল্টরোড প্রকল্পে ঢুকবেই আর ‘বোকার মতো’ সে কথা আবার ভারতকে বুঝাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবকে পাঠিয়েছিলেন, তিনি ভারতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েই সে কথা তুলেছিলেন।

    এ ছাড়া আরও বলা যায়, মোদী চান নাই এক্ষেত্রে তিনি সোনিয়ার কংগ্রেস হবেন যাতে তার সচিব গোখলে আগের সুজাতা সিংয়ের মত অ্যাগ্রেসিভ, প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ ও রিস্কি কূটনীতিক তৎপরতার বাজে উদাহরণ তৈরি করে। এসব মিলিয়ে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের চার থেকে সাত দিন আগেই কেবল ভারত জানতে পারে যে, নির্বাচনে লীগের নির্বাচনে নিশ্চিত জিতবার স্ট্র্যাটেজি কৌশল ও মেকানিজম কী। কিন্তু এটা জেনে ততদিনে ভারতের অবস্থান বদলের সুযোগ ছিল না বা তা কোন অর্থ বহন করত না।  ফলে ভারত হাসিনার অনুরোধে নতুন করে আর এতটুকুও হেলেনি।  কিন্তু ভারতের কাফফারা শুরু এখান থেকে হচ্ছে এবং আগামিতে তা আরও বিরাট হবে। এসব থেকে এখন এমন এক এত বিশাল থাপ্পড় খেতে যাচ্ছে ভারত, যা এর আগে কখনো কল্পনাও করেনি। শুধু তা-ই নয়, বলা যায় শুরু। হাসিনা-ভারতের সম্পর্ক গত দশ বছরেরও বেশি, এত দিন হাসিনা ছিল ভারতকে তুষ্ট করে রাখতে ব্যস্ত এক অনুগ্রহ প্রার্থী। আর এখন, সম্পর্ক অবশ্যই থাকবে কিন্তু সম্পর্কের ডিকটাট এই প্রথম চলে গেছে ও আরও আসবে হাসিনার হাতে। বাংলাদেশের হাতে যদি না-ও হয় তবুও সুদে-আসলে বহু কিছু শোধ হতে থাকবে। আর ওদিকে সোনাদিয়া বা বেল্টরোড নিয়ে কোনো কথাই তোলার অবস্থায় থাকবে না ভারত।

    না, আবারও বলছি – এগুলো ভারত অথবা চীনের ক্রেডিট অথবা ডিসক্রেডিট কোনোটাই নয়। মূল কারণ বাংলাদেশের ওপর আমেরিকার প্রভাব, আর তা থেকে হস্তক্ষেপের ভয় আশঙ্কায় থাকত যে হাসিনার। তাই মূলত এটা কাউন্টার করতেই ভারতমুখিতা।   ভারত-আমেরিকার মধ্যে চীন ঠেকানোসহ বিশেষ কিছু বোঝাবুঝি সম্পর্কের কারণে সেই সুবিধায় ভারত হাসিনার ভয় আশঙ্কাকে নিস্তেজ অথবা ব্যালেন্স করে দিত বলে একটা অনুমান কার্যকর ছিল। এছাড়া ২০১৪ সালে অনির্বাচিত সরকার গঠন পরবর্তিতে  কূটনৈতিক অস্বীকৃতির সমস্যায় হাসিনার বড় সহায় ছিল ভারত। দুনিয়াব্যাপী ভারতের কূটনৈতিক উপস্থিতি আর জাতিসঙ্ঘসহ বহুরাষ্ট্রীয় সব কূটনৈতিক ফোরাম-লবিতে ভারতের হাসিনা সরকারের পক্ষে সমর্থন ও সাফাই গেয়ে যাওয়া হাসিনার জন্য খুবই কার্যকর ও জরুরি ছিল। তাই কাছাখোলা সুবিধা দিয়ে গিয়েছে ভারতকে।

    বিপরীতে ট্রাম্পের আমেরিকার কাছ থেকে হিউম্যান রাইটস বা অন্য অজুহাতের চাপ বা হুমকি এখন থেকে হাসিনার ওপর না থাকার মতো থাকবে। মানে হাসিনার জন্য আমেরিকার হস্তক্ষেপের ফ্যাক্টর দুর্বল, প্রায় নাই হয়ে থাকবে। তাই এখন থেকে ভারতকে খাতির-তোষামোদ করে, বাংলাদেশ হস্তক্ষেপের সব সুযোগ দিয়ে, দেখেও না দেখা করে রাখার যে দরকার এতদিন হাসিনার ছিল সেটা আর তাঁর কাছে অন্তত অনিবার্য মনে হবে না। এটাকেই হাসিনা-ভারত সম্পর্কের ডিকটাট হাসিনার হাতে আসবে বলছি।

    এ ছাড়া অন্য কিছু ফ্যাক্টরও আছে, আগামী মে মাসে ভারতের নির্বাচন। এই নির্বাচন বিজয়ে মোদীর সম্ভাবনা খুবই কম, কংগ্রেস কোয়ালিশনেরও বিজয় সম্ভাবনা কিছু আছে তবে অনেক কম। আঞ্চলিক দলের ফেডারল জোটের সম্ভাবনা বাড়ছে। ধরা যাক যদি কংগ্রেস কোয়ালিশন জিতে তাহলেও সেই সরকার এখনকার মোদির চেয়েও বেশি চীনা-বন্ধু এক সরকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। যদিও সম্প্রতি উত্তর প্রদেশে দুই আঞ্চলিক দলের জোট গড়তে সক্ষম হয়ে যাওয়া মোদীর বিজেপি এবং রাহুলের কংগ্রেস দুজনের জন্যই খুবই খারাপ সঙ্কেত।  সবচেয়ে বেশি আসনের (৮০) রাজ্য, উত্তর প্রদেশ মোদী বা রাহুল এদের দুই দলেরই হাতছাড়া হয়ে গেল বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ ফেডারল জোটের বিজয় সম্ভাবনা বেড়ে গেল।

    সব মিলিয়ে হাসিনার নতুন সরকারে ভারতের ভূমিকা শুকিয়ে যাবে অনেকটাই। আর ভারতকে কাফফারা দিতে হবে, উল্টো ডিকটাট মানতে হবে। হাসিনার মন্ত্রিসভায় সিনিয়ররা না থাকা বা রাখাতে এরই ইঙ্গিত প্রকাশ পেয়েছে। চীনের আগবাড়িয়ে হাসিনাকে সমর্থন জানানোতে এমনটি হয়েছে তা সত্যি নয় বরং খোদ আমেরিকারই গুটিয়ে যাওয়া সব কারণের কারণ।

    চীনা ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তাদের পরিস্থিতির পাঠ ও মনোভাব ব্যক্ত করেছে। খুবই পুওর ‘বেচারা ধরনের’ এক মনোভাব, পুরাটাই সরাসরি ‘তেল মারা’ এক রচনা এটা। যেমন এখানে দাবি করা হয়েছে বিরোধিদের নির্বাচনি ফলাফল প্রত্যাখান পশ্চিমাশক্তির উস্কানিতে হয়েছে – [ …further fueling the opposition uproar.]। বস্তুত চীনের এমন মনে করার কোন কারণ নাই যে ‘কোনটা কেন হয়েছে’ সেটা প্রধানমন্ত্রীর জানা নাই। যদি চীনা এই ভাষ্য দিয়ে যেন তারা বুঝানোর চেষ্টা করেছে যে তারাও সরকারের মন পেতে মাখন লাগাতে আগ্রহী। মনে হয় না এই নিম্ন বিবেচনা প্রধানমন্ত্রী আমল করতে পারবেন না। তবে চীনের  এমন অনুমান ও মনোভাবের মূল কারণ, নাগরিককে রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা ও এর নিশ্চয়তা দিতে হবে এটা কোন কমিউনিস্ট রাজনৈতিক এজেন্ডাই নয়। অথবা রাষ্ট্র কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে কেবল চীন নয়, সাধারণভাবে কমিউনিস্টদের চিন্তা-ভাবনার রেকর্ড খুবই দুর্বল। সোজাসাপ্টা বললে রাজনৈতিক অধিকার, মানে নাগরিক গুম বা খুন হয়ে যাবে না, এর নিশ্চয়তা বা সুরক্ষার আইনি ও মাঠের প্রতিশ্রুতি – এগুলো কোনো কমিউনিস্ট রাজনীতির বিষয় মনে করা হয় না। তারা রাজনৈতিক অধিকার বুঝে না বা আমল করে না, কেবল বোঝে নাগরিকের ‘বৈষয়িক’ লাভালাভ। যেমন অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান লাভ তারা বুঝে। তাও ‘নাগরিক’ শব্দটি দিয়ে সেটা বুঝতে তারা রাজি নয়। কারণ নাগরিক বুঝলেই নাগরিক ‘রাজনৈতিক অধিকারের’ প্রসঙ্গ এসে পড়ে। যা হোক, চীনের মনোভাব হিসেবে লেখা ঐ রচনায় বয়ানের সারকথা হল, লীগ-বিএনপির ঝগড়ার কারণের নাকি আমেরিকা বাংলাদেশে হাত ঢুকানোর সুবিধা নিচ্ছে। আর চীন ভাল সে এমন হাত ঢুকায় না। ব্যাপার হল, রাজনীতি বা অধিকার – যা চীনের বিষয় বা প্রসঙ্গ নয় তা নিয়ে চীনের কথা বলতে যাওয়ার দরকার ছিল না। তাই এই বাজে কথাগুলো চীন না বললেই পরিস্থিতি তার পক্ষে যেত বেশি। তবে নিঃসন্দেহে চীনের বিনিয়োগ স্পৃহা আর হাসিনার উন্নয়নের রাজনীতি এদুইয়ের পরস্পর পরিপূরক হয়ে উঠার সুযোগ আছে। আর যেটা নিয়েই ভারতের বুদ্ধিবৃত্তির লোকেদের শঙ্কা ও হতাশা আছে। বাড়তি বিষয় হল, বেল্টরোড বা সোনাদিয়া ইস্যুতে বাংলাদেশের নিজেরই লম্বা ও গভীর স্বার্থ আছে।

    কিন্তু কথা অন্য দিকে। সরকার যেমনই হোক, যে মাত্রারই চোর বা সাধু হোক, চীনের নীতি হলো সব উপেক্ষা করা – জাজমেন্টাল বা ইথিকস বা পুলিশিং অবস্থান না নিয়ে কাজের সম্পর্ক করা। এই অবস্থান আমেরিকার চেয়ে ভালো না মন্দ সে বিবেচনা করতে বসা ভুল ট্রেনে চড়া হবে। আসলে চীনের এই নীতির মানে হল, রাজনৈতিক অবস্থা না, বৈষয়িক লাভালাভের সুবিধাতেই চীনের এখনকার লাভ-মতলব বেশি তাই অন্য দিকে মন না দেয়া। এই নীতিই এখনকার জন্য তার স্বার্থ উদ্ধারে বেস্ট হাতিয়ার। যেটা আবার কালকে বদলাতেও পারে। তাই ঘুষ কমিশন ছাড়া নড়ে না এমন সরকারের সাথে বেস্ট পার্টনার হতে পারে চীনা বিনিয়োগ ও চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ।। চুরির সব ব্যবস্থা সে করে দেবে। আবার কালকে ঐ দেশে তুলনামূলক ভালো সৎ, স্বচ্ছ টেন্ডার জবাবদিহিতার সরকার এলেও চীন তার সাথেও পরিচ্ছন্নভাবেই কাজ-সম্পর্ক গড়বে। মনে রাখতে হবে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প চীনের দুই বিকল্প বিশ্বব্যাংক উদ্যোগ আছে (BRICS , AIIB), যার প্রধান বিনিয়োগ খাতক হল ভারত। ফলে ভারতের স্টান্ডার্ডে সেখানে চীনকে স্বচ্ছতা, টেন্ডার বা জবাবদিহিতার বিষয়গুলো বজায় রাখতে হয়। অর্থাৎ অবস্থায় পড়লে চীন সেটাও পারে। এটা প্রমাণ করে আপনি চোর-গুণ্ডা অথবা সাধু যা হতে চান, সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে কমিশনের টাকা রাখতে চান, সব ব্যবস্থাই করে দেবে চায়না, সবকিছুরই পক্ষে আছে চীন।

    এ দিকে আমাদের নতুন সরকার গঠন হয়েছে ইতোমধ্যে। কিন্তু মনে হচ্ছে যে, সে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছ নয় – তার ভিতরে এমন সত্য বা মিথ্যাভাবে এক অনুতাপ যেন দেখা দিয়েছে মনে হচ্ছে। ভালো ইমেজ গড়ার সক্ষমতা তার থাক আর না-ই থাক, নতুন অর্থমন্ত্রী খায়েশ প্রকাশ করেছেন- ‘এক টাকাও খেলাপি ঋণ হবে না’।
    সারকথা কোনো সরকার কি নিজেই নিজের সমর্থক ভিত্তি বদলাতে পারে? মনে হয় না। তাই হেলমেট বাহিনী আর গুম-খুনই  চালু থাকতে হবে। তবুও এই নির্বাচনের পর দেশী বা বিদেশী সম্পর্কের সবখানেই নতুন ভারসাম্য হাজির হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১২ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “নির্বাচনের পরে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

    ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

    গৌতম দাস

    ০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

    https://wp.me/p1sCvy-2we

     

     

    ভারতের কেন্দ্রীয় বা লোকসভার নির্বাচন আসন্ন। সম্ভাব্য সেই নির্বাচন আগামী বছর ২০১৯ সালের মে মাসের মধ্যে, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। গতবার মানে ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে তুলনায় এবারের বিজেপির মোদী একেবারেই উল্টা – এবার অর্থনীতি নিয়ে মাঠে কোনো আলাপ না উঠলেই কেবল তিনি ভাল বোধ করছেন। [ভারতের নির্বাচনে অর্থনীতির ইস্যু মানে মূলত “কাজ বা চাকরি সৃষ্টি করতে পারার মত” অর্থনীতি বুঝায়।] অথচ গতবার ‘কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি’ একমাত্র তিনিই দিতে পারবেন। অথবা সেই মন ভোলানো শব্দ “মোদী মডেল” বা “গুজরাট মডেলের” অর্থনীতি তিনি গড়বেন – এসব প্রতিশ্রুতি ছিল গতবার মোদীর নির্বাচনে জিতার মূল স্লোগান। এখন বাস্তব মোদী জমানার গত প্রায় পাঁচ বছরের বাস্তবতা হল পুরো উল্টা। সোজাসাপ্টা আঙুলে গুণে বলা কথাটা হল, মোদীকে তাঁর দেয়া গত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে অর্থনীতিতে জিডিপি নিরন্তর ৮.২ শতাংশের ওপরে নিতে হত এবং সেখানেই ধরে রাখতে হত। অথচ বাস্তবতা হল, মোদী জমানায় কেবল এক কোয়ার্টারে (তিন মাসে) তা অর্জন সম্ভব হয়েছিল। আর এই সপ্তাহে প্রকাশিত রয়টার্সের রিপোর্ট হল, এটা আর সম্ভব নয়, আগামীতে এটা নিম্নগামী অভিমুখে ৭ শতাংশের আশপাশেই যাবে। [India’s economy grew a lower-than-expected 7.1 percent in the July-September quarter …..]

    অর্থনীতি চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারছে কতটুকু – এই প্রেক্ষিত থেকে ভারতে অর্থনীতিকে বিচারে ধারা একেবারেই একালের ২০০৪ সালের পর থেকে। মূলত ১৯৯১ সালের আগের ভারতের সরকারগুলোর এ ব্যাপারে পারফরম্যান্স ন্যূনতম আমলযোগ্যই নয়। তা প্রায় সবাই মানেন। ১৯৯১ সালের আগে সেটাকে আজকাল অনেকে ‘কোটা-লাইসেন্স-ইন্সপেক্টরদের’ রাজরাজত্বের যুগ বলছেন। [Administrative controls were set up over industries by the introduction of quota-license-inspector raj.] সুবিধা ছিল সেকালে কোনো সরকারের অর্থনীতিক নীতি-পলিসি “কাজ সৃষ্টি করতে পারার সক্ষমতার” দিক থেকে বিচার করাই হতো না। কারণ তখন সবকিছুর ওপরে “সমাজতন্ত্রের মুলা আর বোলচালের” আধিপত্য করে টিকে ছিল বা টিকে থাকতে পারত। কিন্তু ১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনীতি চরমতম ক্রাইসিসে পড়ে সব ফাঁপা বোলচাল উদোম ভেঙে পড়ে। সে মূল কারণ বা ঘটনাটা ছিল – ভারতের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রায় আয়ব্যয়ের (যেটাকে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে বলে ) অ্যাকাউন্ট ঘাটতির মুখে পড়েছিল।  এটা – India’s 1991 BOP (balance of payment ) crisis – নামে বেশি পরিচিত। এটা হল একটা রাষ্ট্র তার অর্থনীতিতে যত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে তা যথেষ্ট নয় কারণ এর চেয়ে ব্যয়ের চাহিদা বেশি হয়ে যাওয়ার। ফলে একাউন্টের খাতায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেওয়া। আর এই অবস্থায় ঘাটতি মেটাতে একমাত্র ভাল অপশন থাকে আইএমএফের ঋণ নিয়ে তা মোকাবেলা করা। স্কবভাবতই তা করতে গিয়ে এই প্রথম সকলে বাস্তবে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। সমাজতন্ত্রের ভূত আর ভুয়া বোলচাল এমনিতেই ছেড়ে চলে যায়। আর বাস্তবে অর্থনীতিতে সংস্কার করতেই হয়। ভারত সেটাই করেছিল। ১৯৯১ সালের জুন মাসে নতুন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী  নরসীমা রাওয়ের সরকারের অর্থমন্ত্রী হয়ে মনমোহন সিং সেই প্রথম সংস্কারে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

    কিন্তু কংগ্রেস সরকার পরেরবার (১৯৯৬ বা ’৯৮ অথবা ‘৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে) তবু জিততে পারেনি। আরো পরের ২০০৪ সালের নির্বাচনের বিজয়ী কংগ্রেস-কোয়ালিশন সরকার প্রথম অর্থনৈতিক সফলতার মুখ দেখাতে সক্ষম হয়। সেই সফলতাকে দেখিয়ে তাই ওর পরের ২০০৯ সালের নির্বাচন কংগ্রেস করেছিল অর্থনীতির এ সাফল্যের স্লোগানের ওপর। তাতে প্রবল উৎসাহ তুলে কংগ্রেস-কোয়ালিশন দ্বিতীয়বার ২০০৯ সালেও নির্বাচনে জিতে যায়। কিন্তু পরবর্তিতে সেই নির্বাচিত সরকার এবার আর অর্থনীতিতে সফলতার বদলে আবার পরাজিত হবার পুরানা পথ ধরেছিল। এর মূল কারণ বলা হয় – বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এর আগে যা এসেছিল তা আবার ফিরে যাওয়া শুরু হয়। পুরানা তারিখ থেকে ট্যাক্স দাবি করা শুরু করাতে। ফলে অর্থনীতিতে হতাশা দেখা দেয়। আর সেই হতাশার সময়ে পরের নির্বাচনে নতুন করে স্বপ্ন দেখানোর সুযোগটা নরেন্দ্র মোদী ঠিকঠাক নিতে পেরেছিলেন। মানুষ আবার আশার বুক বেঁধেছিল মোদীর পেছনে; ফলে মোদী নির্বাচনে (২০১৪) জিতে এসেছিলেন।

    এটাকেই মোদী-জ্বর বা মোদী-ঝড় বলা হতো তখন। আসলে কাজ বা চাকরির আকাঙ্খী নীচতলার মানুষদের প্রবল আর শেষ আকাঙ্খার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। এটাকেই আমরা “মোদী-ঝড়” বলতে শুনেছিলাম। কিন্তু আজ সেসব আশা ভরসা আবার শেষ, হতাশা একদম তলানিতে আবার। বিশেষত গত ২০১৬ সালের নভেম্বরে মোদির ডি-মনিটাইজেশন (রুপির বড় দুই নোট, পাঁচশ ও এক হাজার রুপির; সেই নোট বাতিল ও নোট বদলে দেয়া) সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে অর্থনীতি একেবারে এলোমেলো হয়ে যায়। রয়টার্সের জরিপের অনুমান ছিল গত সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া কোয়ার্টারে জিডিপি ৭.৪% হবে। এখন সেটাকেও মিথ্যা প্রমাণ করে ব্যবসার মার্কেটের প্রবল আলোচনা যে সেই জিডিপি ৭.১% হতে যাচ্ছে। গত ২০১৬ সালের পর থেকে মোদী যেসব চাপা মেরে বেড়াচ্ছিল যে এই তো এরপর থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে – সেই সুযোগও হারিয়ে গেল। ফলে এখন একেবারেই পরিষ্কার যে, এবারের ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির মো্দী তো নয়ই, অন্য কোনো দলের কাছেও আর অর্থনীতি মানে “চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি” – আমি দিব – এটা আর মূল ইস্যু কেন, কোন ইস্যুই হচ্ছে না। বরং অর্থনীতির ইস্যু খুব সম্ভবত সব দল এবং ভোটারের কাছেও এক চরম ‘হতাশার ইস্যু’ হয়ে দূরে লটকে থাকবে।

    ব্যাপারটা মোদি আঁচ করে অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই আসন্ন নির্বাচনের মূল ইস্যু ফোকাস সরিয়ে ফেলেছেন আর মুল ইস্যু আবার করেছেন ‘হিন্দুত্ব’কে। যা মূলত মুসলমানবিদ্বেষ বা ঘৃণা ছড়িয়ে ভোট জোগাড়ের কূটবুদ্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে এবারের ‘হিন্দুত্বের’ কিছু বাড়তি ব্যাখ্যা আছে। সেটা হল আসাম; মানে আসামের [National Register of Citizens (NRC)]। আসামের নাগরিকত্ব যাচাই কর্মসুচীকে বোঝানো হচ্ছে। আসামের প্রত্যেক নাগরিককে সরকারী যাচাই কেন্দ্রে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের ডকুমেন্ট দেখিয়ে সার্টফিকেট নিতে হবে। অরিজিনালি ১৮৮৫ সালে ইস্যুটা উঠেছিল যে কে আসামে বহিরাগত (মানে বাংলাদেশ থেকে [হিন্দু-মুসলমানসহ যে কেউ] ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে এসেছে) তা খুঁজে দেখা। কিন্তু বিজেপির হাতে পড়ে এটা প্রপাগান্ডায় দাঁড়িয়ে গেছে এখন কে “অনুপ্রবেশকারী মুসলমান”। সেখান থেকে এখন বিজেপি অন্য রাজ্যে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে যে – ‘প্রত্যেক রাজ্যে আসামের মত গুণে গুণে  মুসলমান অনুপ্রবেশকারী (তেলাপোকা) খুঁজে বের করার কর্মসূচি নেয়া হবে”। এই মুহুর্তে  রাজস্থান বা ছত্তিশগড়ের প্রাদেশিক রাজ্য নির্বাচন চলছে। এই নির্বাচন ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারীর” বিরুদ্ধে কামান দাগা – নতুন স্লোগান বক্তৃতায় হাজির করা হয়েছে।

    অবশ্য ওদিকে অন্য আরেক ইস্যু হাজির করার চেষ্টাও আছে সেটা হল, বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ।
    বিগত ১৯৯২ সালের সেই ঘটনার মামলা এখনো আদালতে ঝুলে আছে। যদিও রামমন্দির নির্মাণের সপক্ষে আসন্ন নির্বাচনের আগে আদালতের কোনো রায় আসার সম্ভাবনা কম। এ অবস্থায় আদালতের কোনো নির্দেশের বদলে সংসদে পাশ করে নেওয়া কোন আইনও না, একেবারে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করে মোদি রামমন্দির নির্বাচন করুক, এমন দাবি বিজেপি-আরএসএস এর অনেক ঘরের লোক তুলছেন – যার মানে হবে সে ক্ষেত্রে এটাই নির্বাচনের মুখ্য ইস্যু হয়ে যাবে – এমন এসব চিন্তা বাজারে আছে। কিন্তু মোদির ভাব এখনো স্পষ্ট নয়। এর চেয়ে বরং এবার বিজেপি-আরএসএস এর আরও যেসব সহযোগী সংগঠন আছে এরা কেউই এবার আগের মত মোদীর সাথে এক লাইনে সমন্বয়ে নেই – এটাই স্পষ্ট হয়েছে। ফলে শেষে মন্দির ইস্যু হবে কী না বা ঠিক কী হবে তা এখনই বলা মুশকিল।

    কিন্তু এবার নতুন আর একটা বিষয় ইতোমধ্যেই দানা বেঁধে গেছে।
    প্রত্যেক রাষ্ট্রেই বেশ কিছু স্টাটুটারি (statutory) স্বাধীন কনষ্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠান থাকে। এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হল, আইনি বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান যার কথা কনষ্টিটিউশনে আগেই উল্লেখ থাকে। আর যার মূল বৈশিষ্ট হল এগুলো নির্বাহী ক্ষমতার সরকারের অধীনস্ত নয়  যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, দুর্নীতি তদন্ত প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি; ভারতের ক্ষেত্রে তাদের সিবিআই (Central Bureau of Investigation), আরবিআই (Reserve Bank of India), গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান RAW ইত্যাদি। মূলকথা, এখানে স্টাটুটারি মানে, এটার কাজ ও কর্তৃত্ব কী হবে সেসবের ম্যান্ডেটই এর জন্মের আইনের মধ্যে লেখা থাকে। ফলে নির্বাহী ক্ষমতা ও নির্দেশের অধীনস্থ নয় এসব প্রতিষ্ঠান। সাধারণত স্বাধীন এক পরিচালনা বোর্ড থাকে, যা এই প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করে। এখানে স্বাধীন মানে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন থাকা, ফলে প্রভাবাধীনও নয়। অনেক সময় এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তা নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর বদলে রাষ্ট্রপতির হয়ে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে ভারতের রাষ্ট্রপতির যেখানে বাংলাদেশের মত “প্রধানমন্ত্রীর মুখ চাওয়া পোস্টবক্স রাষ্ট্রপতি” নয়, তার স্বতন্ত্র বেশ কিছু নিজ-ক্ষমতাও রয়েছে। তবে এমন প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে পরিচালিত হবে এর মৌলিক দিক নির্দেশনাগুলো ওই জন্ম-আইনেই স্থায়ীভাবে লেখা থাকে।

    মোদীই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি তার নির্বাহী ক্ষমতায় এমন তিনটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সাথে বিরোধ-সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন। অন্যভাষায় বললে প্রধানমন্ত্রী হিশাবে মোদীর বিরুদ্ধে এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ক্ষমতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। যাতে ভারতের মিডিয়া ও সংশ্লিষ্ট জগতে তোলপাড় চলছে। আর এক ভাষায় বলা যায় – এই প্রথম এ স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং রক্ষায় সোচ্চার। সেসব প্রতিষ্ঠান হলো,  ভারতের সেন্ট্রাল ব্যাংক মানে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই), সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই), আর খোদ সুপ্রিম কোর্ট। জন্মের পর থেকে ভারতের এসব প্রতিষ্ঠান কখনো রাষ্ট্রক্ষমতার নির্বাহী বিভাগ বা প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথে কোনো দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাতে লিপ্ত হয়নি। স্বভাবতই, বরং হওয়াটাই যেকোন রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।

    আরবিআইয়ের ক্ষেত্রে অল্প কথায় ইস্যুটা হল – যেমন আমাদের সরকারি ব্যাংকগুলো মত ভারতের রাজ্য পর্যায়ে সরকারি ব্যাংক যারা ইতোমধ্যেই অনাদায় ঋণে রুগ্ন স্বাস্থ্যের তাদেরকে সেন্ট্রাল ব্যাংক আরবিআই আরও লোন বিতরণ করতে সীমারেখা টেনে না করে দিয়েছে আর মোদী সরকার সেখানে উল্টো আরো লোন দিতে দাবি জানাচ্ছে এই হল মুল বিতর্কের জায়গা। তবে ভারতের বেলায় একটু তফাত হল, সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি নজরদারি সীমিত করা হয়েছে। কেবল প্রাইভেট বাণিজ্যিক ব্যাংকের উপর তার মূল তদারকী কর্তৃত্ব। কিন্তু ভারতে ব্যাংক মাত্রই তা আরবিআই-এর কর্তৃত্বে। আসন্ন নির্বাচনের আগে মোদী চাইছেন কিছু রাজ্যের মালিকানাধীন সরকারি ব্যাংক যারা লোনে ডিফল্টার, মানে লোনআদায় পারফরমেন্স গ্রহণযোগ্য মাত্রার নিচে হয়ে গেছে তারা আরো লোন বিতরণ করুক। মোদী আসন্ন নির্বাচন পার হতে ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পে আরো ঋণ বিতরণ চায় আর কৃষকেরা ফসলের মূল্য পাচ্ছে না বলে নিরন্তর শহর অভিমুখে যে মিছিল সমাবেশ নিয়ে আসছে তা মোকাবেলা করতে চায়।

    এর ফলাফল হল, মাস খানেকেরও বেশি আগে মোদী হুমকি দিয়েছেন ব্যাংকের গভর্নরের স্বাধীন ক্ষমতা খর্ব করতে “ব্যাংক ফান্ডকে মুক্ত করতে আলাদা নিয়ন্ত্রক বোর্ড” গঠন করে নেবেন তিনি। বিপরীতে রিজার্ভ ব্যাংক গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিজেদের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রক্ষায় সোচ্চার হয়েছেন। শিল্পোক্তাদের এক প্রকাশ্য সভায় ডেপুটি গভর্নর সরকারকে তার সিদ্ধান্তের বিপদ সম্পর্কে হুশিয়ার করে দেন। তিনি বলেন, সরকার নির্বাচন পার হতে যেমন খুশি সেভাবে যেন ক্রিকেটের টি-২০ খেলতে চাচ্ছে। অথচ রিজার্ভ ব্যাংকের কাজ টেস্ট খেলার মত, লংটার্মে আর বহু ফ্যাক্টরকে আমলে নিয়ে চিন্তা করে তাকে কাজ করতে হয়, করা উচিত। এর ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দেশের অর্থনীতি বিরাট রিস্কে পড়বে।
    ভারতের অর্থনীতির বাজারে টেনশন আরো তুঙ্গে উঠে একারণে যে, রিজার্ভ ব্যাংকের আইনে “আর্টিকেল সাত” বলে এক অধ্যাদেশ আছে যা কখনো ব্যবহার করা হয়নি। সেটা সরকার চালু করতে যাচ্ছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এটা এখন সুপ্ত করে রাখা – নির্বাহী বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে চাইলে সবার আগে সরকারকে যেটা কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে চাইলে ‘সচল করা হলো’ বলে ঘোষণা দিতে নিতে হবে। আর সেক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের কথা মেনে চলা গভর্নরের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। তবে ব্যাপারটা এখনও গুজব আলোচনার মধ্যে আছে।

    তাই এর পালটা গুজব আলোচনাও আছে। গভর্নর উরজিত প্যাটেলও পালটা হুশিয়ারি দিয়েছেন বলে গুজব আছে। সে ক্ষেত্রে তিনিও পদত্যাগ করতে পারেন বলে পালটা গুজব ছড়িয়ে যায়। আর সকলেই জানেন গভর্নরের পদত্যাগ ভারতের অর্থনীতির জগতে বিশেষ করে সেন্সেটিভ এরিয়া শেয়ার বাজারে এইকথার মানে কী?  মানে হবে তৎক্ষণাৎ ভয় পেয়ে আস্থার সঙ্কটে শেয়ারবাজারে ধসনামাসহ এক শ’ মিলিয়নের বেশি মানুষের এক অর্থনীতির চরমতম বিশৃঙ্খলায় ডুবে যাওয়া ঘটে যাবে। যাতে আবার ঘটনা পরম্পরায় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় আকস্মিক সরকার পতনের ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। সব মিলিয়ে গত প্রায় এক মাস ধরে এই টেনশন ভারতে চলার পর এক আপাত সন্ধি ঘটেছে কিছু নিরপেক্ষ আরবিআই এর বোর্ড সদস্যের উদ্যোগে, যদিও তাতে সঙ্কটে কেটে গেছে বলা যাবে না। টানা নয় ঘন্টা ধরে চলা রিজার্ভ ব্যাংক বোর্ডের সভায় সব পক্ষ আপাত রাজি হয়েছে যে একটা স্বাধীন কমিটি করতে যারা খতিয়ে দেখবে সরকারি ব্যাংকগুলো আরো কত পরিমাণ অর্থ বাজারে লোন দেয়ার জন্য ছাড়তে পারে। অর্থনীতি ইস্যুতে গ্লোবাল প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লমবার্গ। তাদের এক এক্সপার্ট ব্যাংক  বোর্ডের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতার উপর সরকারের হস্তক্ষেপ – এই ব্যাপারটা নিয়ে খুবই ক্ষুব্ধ। এই আপোষকে তিনি ভাল চোখে দেখেন নাই। এই আপোষ সিদ্ধান্তে সরকারও ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। কিন্তু তবুও আন্তর্জাতিক বাজারসহ ভারতের দেশী বাজার এ আপাত সন্ধিতেও বিপদ দেখছেন এই বলে যে, এটা সাময়িক, আগামীতে ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার উদ্যোগ আবার আসবে।

    কিন্তু সেন্ট্রাল ব্যাংককে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে কেন? কেন তা জায়েজ? এ ব্যাপারটা বিচার করে দেখা দরকার যে, এ ক্ষেত্রে ভেতরের মৌলিক অবস্থান বা যুক্তি কী?

    প্রথমত, গভর্নর উরজিত প্যাটেল অবশ্যই স্বাভাবিকভাবেই কোন জবাবদিহিমুক্ত তিনি নন।  এই ইস্যুতে ভারতের সংসদীয় কমিটির আহ্বানে তিনি ইতোমধ্যেই গত সপ্তাহে সংসদে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে তার বক্তব্য ছিল একেবারে ক্লাসিক্যালি মৌলিক। মূল কথায়, তিনি বলেন, ব্যাংকের আমানত যেটার ওপর ব্যাংক তার একক কর্তৃত্ব খাটাতে চায় এর ৯৯ শতাংশের মালিকানা ব্যাংক মালিকেরা কেউ নয়; তা আসলে পাবলিক মানি, ব্যাঙ্কে জনগণের রাখা সঞ্চিত অর্থ। যেটাকে আমরা আমানত বলছি। কারণ এটা বাণিজ্যিক ব্যাংককে রক্ষা করতে হবে। ব্যক্তি মালিকানার এই ব্যাংক সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে এই নিশ্চয়তা কী? আর তা যে আদৌও করছে কী না সে তদারকী অবশ্যই করা দরকার। সেকাজটা করবে কে? এরচেয়েও বড় কথা ব্যাংক যে আমানত সংগ্রহ হল এটা এক বিরাট ক্ষমতা – কাকে লোন দিবে অথবা না দিবে? সিন্ডিকেট বানিয়ে নিজেরা তা ভাগ করে নিবে কী না – তাই এই ক্ষমতাটাকে আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ করা ও মনিটরিং করার এক প্রতিষ্ঠান দরকার। অতএব অর্থের এসব নিরাপত্তা রক্ষার্থে সেন্ট্রাল ব্যাংক বলে এই প্রতিষ্টান থাকে যাকে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে। পাবলিকের আমানত রক্ষার্থে ব্যাংকিং খাতে নিয়মশৃঙ্খলা আর জবাবদিহিতা বজায় রাখাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ম্যান্ডেটের মূল কথা। এর বোর্ড তাই মূলত অভিজ্ঞ পেশাদার আর টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত, যাতে তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে, সিদ্ধান্ত ও দায় নিতে পারে। তবে এই বোর্ডের ক্ষমতা আগাম কনষ্টিটিউশনাল আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ বা স্টাটুটারি আইন করে আবদ্ধ করে রাখা হয়। উরজিত “পাবলিক ইন্টারেস্ট” বা গণস্বার্থের এই দিকটাই সংসদীয় কমিটিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আর বলেছেন ব্যাংকের এই স্বাধীনতা এটা কেবল

    এদিকে প্রায় একই ধরনের মোদী সরকারের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে শেষে আদালতে গিয়েছে ভারতের সিবিআই। এর তুল্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই, তবে এরই খুব সীমিত আর দুর্বল এক ভার্সন হল আমাদের দুদক। সিবিআইয়ের প্রধানকে বলা হয় ডিরেক্টর। এই ডিরেক্টরের নিয়োগকর্তা হলেন তিনজনের এক কমিটি – প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা আর চিফ জাস্টিসকে নিয়ে যা গঠিত। সংক্ষেপে ঘটনা হল, ডেপুটি ডিরেক্টরকে নিয়ে। সার অভিযোগ হল, মোদির ঘনিষ্ঠ গুজরাটের সরকারি কর্তা ছিলেন এই ডেপুটি ডিরেক্টর।

    তিনি মোদীর হয়ে সিবিআইয়ের কাজ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতেন। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগও আনেন ডিরেক্টর অলোক বার্মা। তাই তাঁর কাজ তৎপরতা তদন্ত করতে ডিরেক্টরের এক অফিসার নিয়োগ করা থেকে জটিলতা শুরু। এতে মোদী ঐ ডিরেক্টরকে সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে দেখা করতে বলেন। যিনি আসলে তাঁকে পদত্যাগপত্র দিয়ে সরে যেতে বলেন। ডিরেক্টর তা না করাতে রাতারাতি মোদী এবার ডিরেক্টর আর ডেপুটি ডিরেক্টর দু’জনকেই সরিয়ে তৃতীয় একজনকে দায়িত্ব দেন। এতে সংক্ষুব্ধ ডিরেক্টর অলোক ভার্মা আদালতে নালিশ করেন যে, তাকে অপসারণের কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর একার নয়, নিয়োগকারী তিনজনের কমিটির। এ ছাড়া তার নিয়োগ এক ফিক্সড টার্ম ন্যূনতম দুই বছরের। ফলে মাঝপথে তাঁকে সরিয়ে দিয়ে তার কাজকে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। এখানে আদালতে মামলার কার্যক্রমের একটা তালিকা পাওয়া যেতে পারে।

    ঐ ডেপুটি ডিরেক্টর হলেন রাকেশ আস্থানা। তাঁর ব্যাপারে যাকে তদন্ত করতে দেয়া হয়েছিল সে তদন্ত কর্তাকেই শাস্তিমূলক বদলি করে দেয়া হয়। এতে  সেই তদন্তকর্তাও এসবের বিরুদ্ধে আদালতে এসে পুরা ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনাসহ  – খোদ অজিত দোভাল, অপর এক মন্ত্রী এমনকি খোদ গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এক বড় কর্তাসহ সবার সংশ্লিষ্টতার বিরুদ্ধে তিনি তাঁর অভিযোগ দায়ের করে বসেন। গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর জড়িয়ে যাওয়া নিয়ে আর একটা মিডিয়া রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে এখানে। এখান থেকে ব্যাপারটা কতদুর মাখিয়ে গেছে এর একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর অভিযোগ ফ্রান্স থেকে  “রাফায়েল” সামরিক বিমান কেনার সময় ঘুষ লেনদেন হয়েছে। আর সেই ঘুষের তদন্ত বন্ধ করতেই রাকেশ আস্থানা কাজ করছিলেন। ফলে মোদীর নিয়োজিত তৃতীয় যাকে এখন নতুন ডিরেক্টর নিয়োগ দেয়া হয়েছে, আদালত বলেছে এই নিয়োগকে সাময়িক মনে করতে হবে। আর তার কিছু কাজ ও সিদ্ধান্ত আদালতের নিয়োগকৃত একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের উপস্থিতিতে হতে হবে। এককথায়  পুরো সিবিআই এখন সুপ্রিম কোর্টের নজরদারি আর নির্দেশের আওতায় চলে গেছে, মামলার কার্যক্রমও চলমান। আর এনিয়ে ওদিকে মোদী বা তার লেফটেনেন্ট অমিত শাহ একেবারে নিশ্চুপ। এটা শেষ পর্যন্ত মোদী সিবিআই-এর স্বাধীন কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন কি না এরই বিচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে লক্ষণীয় যে ভারতে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর এক বড় সুবিধা হল যে, তাদের কর্মকর্তারা অবৈধ নির্দেশের বিরুদ্ধে আদালতের প্রটেকশন চাইতে পারেন বা নালিশ জানাতে পারেন।

    ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের প্রায় একই রকম অভিযোগ আদালতের। কয়েক দুয়েক আগে ভারতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি অবসরে যান। সেই বিচারপতির বিরুদ্ধে তার কলিগ অন্য সিনিয়র চার বিচারপতি সাংবাদিক ডেকে পাবলিকলি অভিযোগ এনেছিল যে তিনি গুরুত্বপুর্ণ কিছু মামলা সিনিয়র বিচারপতি কলিগদের বেঞ্চে দিচ্ছেন না। আজকে যিনি ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ – তিনিও ঐ চারজনের একজন ছিলেন।  আসলে ঐ চারজন, তাঁরা যে কথা উচ্চারণ করতে চান নাই তা হল, মোদী বা তাঁর দলের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আছে এমন কিছু মামলা ঐ প্রধান বিচারপতি (এখন অবসরে) দীপক মিশ্র  প্রভাবিত করতে নিজের হাতে রেখেছেন অথবা পছন্দের জুনিয়রদের আদালতে ফেলেছেন। বিশেকরে একটা মামলা ছিল যেটাকে এক হাইকোর্টের বিচারকের রহস্যময় খুন আর যার আদালতে এমন এক মামলা চলেছিলে যেখানে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ আসামী ছিলেন। ভারতের রাষ্ট্র ও প্রাতিষ্ঠানিকতার বিবেচনায় এটা খুবই গুরুতর অভিযোগ, সন্দেহ নাই। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত আদালত পাড়ার সিনিয়রেরা উকিলেরা সামলে নেন।

    এদিকে গত সপ্তাহে ভারতের “কন্সটিটিউশন দিবস” উপলক্ষ্যে এক আলোচনা সভায়  প্রেসিডেন্ট ও আইনমন্ত্রীর সাথে একই মঞ্চ শেয়ার করে তাতে অংশ নিয়েছিলেন চলতি প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। তিনি সেখানে ইঙ্গিতমূলক কিছু জ্ঞানের কথা বলেন। তিনি বলেন, “হয় কন্সটিটিউশনের স্থায়ী নির্দেশগুলো অনুসরণ করেন নইলে চরম এক বিশৃঙ্খলতার মুখে পড়তে রেডি হন”। [It is in the best interests of the nation to heed to the ethics and morality of the Constitution; otherwise, our hubris will end with a plunge into chaos, …] এ কাজে তিনি জ্ঞানবুদ্ধির [wisdom] ব্যবহার আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন [prudence of the majority] হতে পরামর্শ রাখেন।  জ্ঞানের ভাষায় তিনিও ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে আদালতের উপরে হস্তক্ষেপের হুশিয়ারি দিলেন।

    বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবস্থা শোচনীয় আমরা জানি। যেখানে কোন সিদ্ধান্ত, ক্ষমতা বা এক্তিয়ারটা রাষ্ট্রের, কোনটা সরকারের বা কোনটা ব্যক্তির না প্রধানমন্ত্রীর, নাকি কোন ব্যাঙ্ক গভর্ণরের, নাকি দলীয় প্রধানের অথবা কোন কাজ ও সিদ্ধান্তটা বিরোধী দলের নেতার অথবা নাকি উচ্চ বা নিম্ন আদালতের – ইত্যাদি সব কিছুতে এখানে একাকার এক ব্যক্তির। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ক্রমেই প্রধানমন্ত্রী মোদীর শিক্ষক হয়ে উঠছে বাংলাদেশ! মোদী সম্ভবত এই বাংলাদেশকে দেখে ঈর্ষান্বিত এবং উতসাহী হয়ে উঠছেন।

    শেষ কথাঃ
    কিন্তু এই সবকিছুর মূল প্রভাব প্রতিক্রিয়া আর তার অর্থ তাতপর্য হল অন্য খানে। সোজাসাপ্টা বললে, ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক মূল দুর্বলতা হল এটা কাঠামো (আমেরিকা রাষ্ট্র অর্থে) ফেডারল রাষ্ট্রের নয়। যার ফলাফলে এক রাজ্য (এব্যাপারে অভিযোগের আঙ্গুল দেখা যায় হিন্দি-বলয় বলে এক শব্দে) অন্য রাজ্যের ফসল খাচ্ছে। তাই, মুখ্যমন্ত্রী মমতা যখন হিন্দি বলয় বনাম বাংলা বলে বৈষম্যের কথা তুলে তাতে তিনি আসলে কেন্দ্র-রাজ্যের বৈষম্য ও বিবাদের কথা তুলেন। তখন সেটা এই ভারত রাষ্ট্রেরই গাঠনিক দুর্বলতা তিনি ভিন্ন ভাষায় বলেন। কিংবা দক্ষিণের সচেতনে হিন্দি-এড়ানো কেন? কেন  আঞ্চলিক দল রাজ্যের ক্ষমতায়, এমন রাজ্যের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলছে?  এগুলো কাঠামো দুর্বলতারই নানান প্রকাশ।
    কিন্তু তাহলে এত দুর্বলতার ভারত যেমনেই হোক চলছে তো! সেই ভারত চলছে কী করে, সেটাও ত প্রশ্ন। হা এই প্রশ্নের উত্তর হল, ভারত চলে মূলত দক্ষ সিভিল-মিলিটারি আমলা ও গোয়েন্দা বিভাগের কারণে। যদিও এই জবাবটাও অনেকেই জানে। কিন্তু যেটা সম্ভবত বেশির ভাগই খেয়াল করেন নাই  তা হল দক্ষ সিভিল-মিলিটারির পিছনে আর একটা ফ্যাক্টর কার্যকর আছে। সেটা হল,  স্টাটুটারি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কনষ্টিটিউশনে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা। তাই এককথায় মোদীর সস্তায় হিন্দুত্বের ভোট জিতে আনার লক্ষ্য তার নির্বাহী হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা – কেড়ে নেয়া, এর সোজা ফলাফল হবে ভারত রাষ্ট্রটা টিকে থাকার শেষ অবলম্বনের মূলে আঘাত করা। সেটা মোদীর লক্ষ্য না হলেও মোদীর কাজের ফলাফলে বস্তুত তাই হয়ে গেছে ও যাচ্ছে। বলা বাহুল্য  আভ্যন্তরীণ দিক থেকে দেখলে এটা ভারত রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।    দক্ষিণ এশিয়ায় পড়শি যারা ভারতের দানবীয় নীতি-পলিসিতে অতিষ্ঠ তারা খুশির চোখে দেখার সুযোগ নিবে।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০১ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচনী ইস্যু“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • নেপালের পর এবার ভুটানও ভারতের হাতছাড়া!

    নেপালের পর এবার ভুটানও ভারতের হাতছাড়া!

    গৌতম দাস

    ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

    https://wp.me/p1sCvy-2uc

    ভুটানের সদ্য শেষ হওয়া সাধারণ নির্বাচনে ভোটদানের অপেক্ষা

    ভারতের জন্য সম্ভবত “আরেকটা উইকেটের পতন” হতে যাচ্ছে। না, দুবাইয়ের এশিয়া কাপ ক্রিকেট খেলা নয়, ভুটানের নির্বাচন প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে। ভুটানের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮। প্রো-ইন্ডিয়ান যে দল এতদিন ক্ষমতায় ছিল যার নাম পিডিপি [Peoples’ Democratic Party’s (PDP)], এবারের নির্বাচনে এর শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। ভোটের ফলাফলে দলটি নেমে গেছে প্রথম থেকে তৃতীয় অবস্থানে। এটা অবশ্য প্রথম রাউন্ডের নির্বাচন। সেকেন্ড বা ফাইনাল রাউন্ড অনুষ্ঠিত হবে আগামি মাসে ১৮ অক্টোবর। ২১ সেপ্টেম্বর ছিল দ্বিতীয় রাউন্ডের নমিনেশন পেপার জমা দেয়ার শেষ দিন।

    দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোকে ভারত “নিজের বাড়ির পিছনের বাগানবাড়ি” মনে করতে ভালোবাসে। শুধু তাই নয়, নিজের কোনো মুরোদ থাকুক আর নাই থাকুক, চীন কেন সেখানে অবকাঠামো ঋণ নিয়ে হাজির হবে এবং এতে সেখানে চীনের প্রভাব কেন বাড়াবে তা নিয়ে ভারতের নাই-মুরোদের অস্বস্তি ও আপত্তি কেউ শুনুক আর না শুনুক, ভারত নিয়মিত এনিয়ে উষ্মা-অভিযোগ করে যেতে খুবই ভালোবাসে।

    ভুটান-ভারত বন্ধুত্বের(?) চুক্তি ১৯৪৯
    ভুটান এক দিকে ভারত ও অন্য দিকে চীন দিয়ে ঘেরা। আর এক পড়শি নেপাল রাষ্ট্রের মতই ভুটানও চারদিকে অন্যের ভুমি দিয়ে ভূমিবেষ্টিত বা ল্যান্ডলকড। বাইরে বের হতে চাইলে ভুটানকে ভারত অথবা চীনের ভুমি পেরিয়ে তবেই তাদেরই কোন সমুদ্র বন্দরের নাগাল পেতে পারে। বাণিজ্য ও পণ্য আনা নেওয়া সচল করতে পারে। সাম্প্রতিককালে ভারতের নাগপাশ ছিঁড়ে নেপালের সার্বভৌমত্বের চর্চা, সাহস এবং তার নেয়া পদক্ষেপগুলো দেখে সম্ভবত ভুটানের মনেও অনেক সাহস জমা হয়ে থাকবে। ভুটানের প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনের ফলাফলে অন্তত এর একটা প্রকাশ ঘটেছে বলে মনে করার কারণ আছে; তাই এতে ভুটানও হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ভারতের জন্য সম্ভবত আরেক উইকেটের পতনের ইঙ্গিত!

    নেপালের মত ভুটানও “ভুটান-ভারত বন্ধুত্বের চুক্তি ১৯৪৯” নামে ভারতের কাছে দাসখতের খোটায় বাধা পরে আছে। এগুলো একালে ১৯৪৭ সালের পরে ভারতের রিনিউ বা নতুন করে করা চুক্তি হলেও, সবই কলোনি আমলে বৃটিশ এম্পায়ারের সাথে ভুটানের (নেপালেরও) যে দাসত্ব চুক্তি ছিল, মুলত সেটারই কপি। কেবল “বৃটিশ সরকারের” জায়গায় “ভারত সরকার” বসিয়ে নিয়েছেন ভারতের নেহেরু সাহেব।  সে আমলে কলোনি মালিক বলতে বৃটিশ, ফরাসি, ডাচ, স্পেনিস, পর্তুগীজ মূলত এরাই ছিল, আর ছিল এদের পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কার কলোনি কে যেকোন উপায়ে টান দিয়ে নিয়ে যায় এনিয়ে প্রতিযোগিতা চলত। একারণে পুরানা রাজার রাজ্য কলোনি করে নিতে পারলে এরপর অনেক সময় সেটাকে “করদ রাজ্য” বলে ছাড় দিয়ে রাখত। আর করদ রাজ্য অন্যতম বৈশিষ্ট হত এক চুক্তিপত্র যেখানে লেখা থাকত যে ঐ রাজ্য আর বৈদেশিক বিষয়ে নিজে নিজের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে না, সেটা করবে বৃটেন। […the Kingdom of Bhutan is guaranteed its independence, but agrees to be represented by Great Britain in its foreign affairs.] এটা (১৯১০ সালে) বৃটেন ও ভুটানের মধ্যেকার চুক্তিপত্র  থেকে তুলে আনলাম। চুক্তিতে এমন লেখা থাকার মূল কারণ যাতে নেপাল বা ভুটান অন্যকোন কলোনি শক্তির সাথে নতুন চুক্তি করে চলতি চুক্তি ভেঙ্গে না দিতে পারে। পুরান চুক্তির কলোনি প্রভুদের কথাগুলোই কপি করার মধ্য দিয়ে “কথিত প্রগতিবাদী” প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর নিজেই কলোনি-প্রভু হবার খায়েস এবং কলোনি-শাসক-প্রিয়তা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। সেই থেকে ভারতের সিভিল-মিলিটারি আমলা প্রশাসনের ওরিয়েন্টেশনে ও মন-মানসিকতায় অন্য রাষ্ট্রকে কলোনি-সম্পর্কে আবদ্ধ করার আগ্রহ অভ্যাস হিসাবে রপ্ত হয়ে যায়।
    অনেকে মনে করতে পারেন কলোনি আমলে কলোনি বানানো জায়েজ হলে একালে নয় কেন, নেহেরুর তাহলে দোষ কী? অবশ্যই দোষের এবং ঘোরতর দোষের। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুনিয়া শুরু হচ্ছে রাষ্ট্রগুলোর নীতিগত অবস্থান ও কনভেনশনে যে, কলোনি শাসন অন্যায়, অবৈধ। ভিন্ন ভাষায়, “প্রত্যেক জনগোষ্ঠি কিভাবে শাসিত হবে তা তাঁরা নিজেরাই নির্ধারণ করবে। আর এই নির্ধারণ তাদের অধিকার”। তাই ১৯৪১ সালের পরে জন্ম নেয়া জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এই ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে আছে। সেকারণে কফি আনান বলতে পেরেছিলেন, সাদ্দাম-উতখাতের পরের ইরাকে আমেরিকার বুশ প্রশাসনের উপস্থিতি – জাতিসংঘের চোখে এখানে “আমেরিকা এক দখলদার শক্তি”।

    আর এটারই নেহেরু আমলে ১৯৪৯ সালের করা চুক্তির ভাষ্যে, তৃতীয় দফা আছে এভাবে, “……বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে ভারত সরকার  ভুটান সরকারকে যা বলবে ভুটান সেই পরামর্শ অনুসরণ করবে বলে রাজি হচ্ছে”। [On its part the Government of Bhutan agrees to be guided by the advice of the Government of India in regard to its external relations.] অর্থাৎ কেবল ভাষার রকম ফের করে একই জিনিষ রেখে দেয়া হয়েছে। মজার কথা হল, এই চুক্তিতে ভুটান সরকারকে বৃটিশ সরকারের একটা ক্ষতিপুরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া ছিল। যার ১৯১০ সালের মূল চুক্তি অনুযায়ী ছিল সেকালের মুদ্রায় ১০ লাখ ভারতীয় রুপী। আর ১৯৪৯ সালে এসে দেখা যায়, নেহেরু সাব একালের মুদ্রামানে বাড়ানো দূরে থাক বরং কমিয়ে করেছিলেন মাত্র ৫ লাখ রুপী। তবে এসব প্রসঙ্গগুলো ২০০৭ সালে চুক্তি আপডেট [update the 1949 Treaty] এর সময় বাদ দেয়া হয়েছে । আর সেই সাথে ২০০৭ সালের এই আপডেট চুক্তিতে কী শর্তে ভারতের ভুমি ব্যবহার করে মালামাল আমদানি করতে পারবে এই ইস্যু ঢুকানো হয়েছে। তবে বলা হয়েছে ভুটান সব কিছুই আমদানি করতে পারবে “ভারত যতক্ষণ সন্তুষ্ট” [as long as the Government of India is satisfied] থাকবে। এটা নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তির ভাষ্যটাই এটাই। এবার সেটার আলোকে ২০০৭ সালে ভারত-ভুটান আপডেট চুক্তি করে নেয়া হয়েছে। এর সোজা অর্থ হল এই চুক্তি অর্থহীন। কারণ ভারত যে কোন সময় কোন কারণ না দেখিয়ে যেকোন আমদানিকে “বন্ধ” বলতে পারবে – কেবল সে “অসন্তুষ্ট” একথা উল্লেখ করার যথেষ্ট হবে।

    এখান থেকে এটা পরিস্কার কেন ভুটান চীনের সাথে সম্পর্ক পাতাতে আগ্রহী। নেপাল বা ভুটান উভয়েই ভারতের শর্তের বেড়াজাল ভাঙতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। সম্প্রতি নেপাল কোন কিছু আমদানি করতে গেলে এতদিনের ভারতের উপর তার শতভাগ নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠার পথ পেয়ে গেছে। নেপালকে ট্রানজিট দানের ক্ষেত্রে ভারতের একচেটিয়ার দিন শেষ হয়েছে।  ভারতের বিকল্প হিসাবে চীনের ভুমি ব্যবহার করে চীনের চারটা সমুদ্র পোর্টসহ ও স্থলবন্দর মিলিয়ে মোট সাতটা পয়েন্ট দিয়ে আমদানি করতে পারার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চীনের সাথে এই চুক্তির ফলে বাস্তবত এটা নেপাল-ভারত মৈত্রী চুক্তির নামে দাসত্ব চুক্তি নেপালের কাছে “অপ্রয়োজনীয়” হয়ে গেছে। চীন-নেপাল সম্পর্কের এই নতুন বিকাশ ও অভিমুখ ভুটানের অজানা থাকার কারণ নাই। নেপালকে অনুসরণ এখন ভুটানের জন্য কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

    ২০১৩ ও ২০১৮ এর নির্বাচন কিছু তুলনামূলক আলাপ
    গত ২০০৭ সালে আগের পুরা রাজতন্ত্র থেকে কনষ্টিটিউশনাল শাসনে আসার পর থেকে এটা ভুটানের তৃতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন। তবে ভুটানে নির্বাচনব্যবস্থা দুই স্তরে সম্পন্ন হয়। তাই এবারের নির্বাচনপ্রক্রিয়া শেষ করতে, দ্বিতীয় ও শেষ স্তরের নির্বাচন হবে ১৮ অক্টোবর। যেখানে এবার প্রার্থী হতে পারবেন, ১৫ সেপ্টেম্বরের ফলাফলে সর্বোচ্চ প্রাপ্ত ভোটে যারা প্রথম ও দ্বিতীয়, কেবল সেই দুই দলের প্রত্যেকের (ভুটানের পার্লামেন্টে মোট সংসদীয় আসন ৪৭ মাত্র) ৪৭ জন করে প্রার্থী।

    ২০১৩ সালের নির্বাচনের ফলাফলের সাথে এবারের একটা তুলনার মাধ্যমে ধারণা পাওয়া যায়। সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দলের মধ্যে তুলনা করে বলা চলে যে, গত ২০১৩ সালের নির্বাচনে যে (পিডিপি) [[Peoples’ Democratic Party’s (PDP)],] দল বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় ছিল সেই দল এবার ২০১৮ সালের প্রথম রাউন্ডে হয়ে গেছে তৃতীয়। আর ২০১৩ সালে যে দল দ্বিতীয় হয়েছিল (ডিপিটি) [Druk Phuensum Tshogpa (Bhutan Peace and Prosperity Party) (DPT)]; সে এবারো দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। কিন্তু তৃতীয় দল (ডিএনটি) [Druk Nyamrup Tshogpa (DNT) দলের মূলনেতা ডাক্তার লোটে শেরিং] এবার চমক দিয়ে উঠে এসে একেবারে প্রথম হয়ে গেছে। আর প্রথম হওয়া দলটা গঠিত হয়েছিল মাত্র গত ২০১৩ নির্বাচনের আগদিয়ে।

    খুব ছোট দেশ ভুটানের লোকসংখ্যা মাত্র প্রায় আট লাখ [আমাদের মধ্যম মানের দুটা উপজেলার মোট জনসংখ্যা এরকমই; যার মধ্যে আবার এবারের মোট ভোটার প্রায় তিন লাখ (২৯১,০৯৮)। এবার ভোটদানের হারও বেশি; ভোট পড়েছে মোট ভোটারের ৬৬%, গতবার যা ছিল ৫৫.৩%। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে ভুটানি মিডিয়া বলছে, পোস্টাল ভোট এবার অনেক বেশি পড়েছে। এর বেশির ভাগ পেয়েছে প্রথম হওয়া দল। সরকারি কর্মচারী আর প্রবাসী ভুটানি (যারা আগে থেকে রেজিস্টার্ড)- এরাই মূলত পোস্টাল ভোটার। ওই দিকে বাংলাদেশের কোনো কোনো পত্রিকায় খবর বের হয়েছে [ভুটানের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন ময়মনসিংহ মেডিক্যালের ছাত্র লোটে শেরিং] – প্রথম হওয়া ডিএনটি দলের প্রধান একজন এমবিবিএস ডাক্তার, তিনি আমাদের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট। যা হোক, তার দলের বিরাট জনপ্রিয়তা ও প্রথম হওয়ার কারণ বলে মনে করা হচ্ছে যে, তার প্রধান নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল যে, তিনি বিজয়ী হলে গ্রামে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা পৌঁছে দেবেন, বিশেষ করে মা ও মেয়েদের ব্যাপারে বিশেষ জোর দিয়ে চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। মনে হচ্ছে এই প্রতিশ্রুতি তাদের মনে ধরেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেকোনো অবকাঠামো যেখানে খুবই অপ্রতুল যেমন – মোট মাত্র ১৮ হাজার বর্গমাইলের ভুটানের (তুলনায় ৫৭ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ) পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্তে যেতে আজও এক সপ্তাহ সময় লাগে।

    সাহস করে ভুটানের চীনের প্রতি আগ্রহের হাত বাড়ানো
    তবে আরেক ফ্যাক্টস হল, এবারের দ্বিতীয় হওয়া দল ২০০৮ সালের নির্বাচনে ‘ডিপিটি’ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন  করে ক্ষমতায় (২০০৮-১৩) ছিল। কিন্তু ভারতের চোখে এই দলের “অপরাধ” হল, ২০১২ সালে তৎকালীন চীনা প্রেসিডেন্ট ওয়েন জিয়াবাওয়ের সাথে ব্রাজিলে দলের নেতা ও তৎকালীন ভুটানি প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎ করেছিলেন। এতে ভারত খুবই নাখোশ হয়। এই প্রসঙ্গে টাইমস অব ইন্ডিয়ার কূটনৈতিক রিপোর্টার ইন্দ্রাণী বাগচী লিখছেন, India has had a rocky relationship with DPT which was in government between 2008 and 2013, largely because of the then PM Jigme Thinley’s interest in building ties with China.অর্থাৎ ডিপিটির প্রধানমন্ত্রী জিগমে থিনলে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী হয়ে পড়েছিলেন। আর এখান থেকেই পড়শি সব দেশে ভারতের যা করা স্বভাব যে, কোনো একটি দলকে প্রভাবিত করে সেটাকে ভারতের অন্ধ দালাল বানিয়ে ঐ দেশের রাজনীতি কলুষিত করে ফেলা, তা শুরু হয়। ফলে ভুটানের সেসময়ের ক্ষমতাসীন দল ‘ডিপিটি এর প্রতিদ্বন্দ্বি দল – পিডিপি ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে পরের নির্বাচনে হাজির হয়ে যায় ও জয়লাভ করে।

    সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত এক গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা ‘স্ট্রেইট টাইমস’।  ইন্ডিয়া থেকে এর ব্যুরো চিফ হলেন নির্মলা গণপতি। তিনি তাঁর রিপোর্টে ভুটানিরা ভারত ও চীন ইস্যুকে কিভাবে দেখে তা বোঝাতে একটা সাবহেডিং বাক্য লিখেছেন এমন – “ভুটানিরা দিল্লির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে মূল্য দেয়, কিন্তু তাঁরা একই সাথে বেইজিংয়ের সাথেও সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়”। [While Bhutanese value close ties with Delhi, they also feel need for relations with Beijing…]
    যদিও ব্যাপারটা হল- ‘মূল্য দেয়’ অবশ্যই অগত্যা। কারণ, না দিলে আরো বিপদ। কিন্তু বেইজিংকেও খুঁজতে হয়। কারণ একতরফা ভারতের কর্তৃত্ব থেকে তাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হতেই হবে।

    চীনের সাথে এখনও ভুটানের রাষ্ট্রদূত বিনিময় হয়নি। সেটা এখন প্রক্রিয়াধীন। তবে ইতোমধ্যেই ভারতে পরস্পরের অফিস বা অন্য কোন দেশের কোথাও গিয়ে তারা দেখা করে কথা বলে। কিন্তু তাতেও ঘোরতর অস্বস্তি আমরা বুঝতে পারি যখন দেখি যে ভারতের পার্লামেন্ট -লোকসভার সংসদীয় প্রশ্নোত্তরে এটাকে প্রসঙ্গ করা হয়েছিল। ব্যাপারটা এমনভাবে হাজির করা হয়েছে, যেন বৌমা কেন কোন পরপুরুষের সাথে কথা বলেছে আর শাশুড়ির তা নিয়ে কথা তোলার সুযোগ পেয়েছে। এনিয়ে সংসদীয় রিপোর্ট এখানে দেখা যাবে, [Q NO. 1470 BHUTAN-CHINA GETTING CLOSER]।

    এ দিকে, ২০০৭ সালের পর থেকে ভুটান আর রাজার খেয়ালি শাসনের দেশ নয়, সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের রাষ্ট্র। এবার নিয়ে সেখানে তৃতীয়বার পার্লামেন্ট নির্বাচন হল। আর এর আগে প্রায় শত বছরের পুরনো (১৯১০) স্বাধীন রাজতন্ত্র হলেও, ১৯৪৭ সালে নেহরুর আমল থেকে ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতনির্ভর।

    যেহেতু ভারতের ভূমির ওপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া ভুটানের ল্যান্ডলকড দশা থেকে মুক্তি নেই- এটাকেই ভারত একরকম মুক্তিপণ বানিয়ে নিয়েছে; আর ভারতনির্ভর হতে বাধ্য করার সুযোগ হিসেবে নিয়েছে। কিন্তু কত দিন ভারত সেসুযোগ পাবে? ভুটানের নতুন প্রজন্ম এথেকে মুক্তি পেতে যেন মরিয়া। যা সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই সতর্কভাবে ভুটানিজদের অন্তরে ভারত-বিরোধিতা আর চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ার হাতছানি – দুটোই বাড়ছে। নেপাল ভারতের বিকল্প এবং ভারতের চেয়ে প্রাপ্ত সুবিধাদির দিক থেকেও অগ্রসর চীনা ট্রানজিট (রেল যোগাযোগ) জোগাড় করতে পারলে, তাহলে ভুটানেরও সেটা না পারার কোনো কারণ নেই। কেবল তা কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর এটা অতীতে ১৯৪৭ সাল থেকেই নেহরুর ‘ভাইসরয়’ ভাব ধরে থাকার যে খায়েশ দেখিয়ে গেছে, ভারতের সিভিল ও গোয়েন্দা আমলা প্রশাসন এখনও যেই নীতির অনুসারি এর তো ক্ষতিপূরণ ভারতকে এখন দিতেই হবে। নেহরুর সেই আত্মঘাতী চিন্তার মূল্য ভারতকে চুকাতেই হবে।

    খুব সম্ভবত এসব চিন্তা করেই ২০০৭ সালের পর থেকে রাজার আর খামখেয়ালি তো শাসন নয়। ভারতের হাত থেকে ভুটানকে বাঁচাতে তিনি তা একা পারবেন না, তাই জনগণকে শাসন-ক্ষমতার সাথে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। স্বেচ্ছায় রাজা জননির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের সরকার আর কনস্টিটিউশনের অধীনে (রাজার খেয়াল নয়) পরিচালিত সরকার – এমন কনষ্টিটিউশনাল রাজতন্ত্র চালু করে দেন; আর সেই সাথে রাজনৈতিক দল ও তৎপরতা চালু হওয়ায় সরকার গঠনে জনসম্পৃক্ততাও আসে। এখান থেকেই ভুটান সরকারের নিজেরা নিজের সার্বভৌমত্ব চর্চা ও নিজ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের উদ্যোগ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১২ সালে তদানীন্তন চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ ছিল এর অংশ। কিন্তু ভারত এতে অসন্তুষ্ট হয়েছিল ও নিজের কোটারি স্বার্থের বিপদ দেখেছিল। ভুটানের জ্বালানি তেলের সরবরাহকারী ভারত, আর এতে ভারত কিছু ভর্তুকি দিয়ে থাকে। তাই ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগের দিন ওই নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে, নিজের পক্ষে ভুটানিদের ওপর চাপ দিতে – ভারত ওই ভর্তুকি প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছিল। হঠাৎ এই চাপের মুখে, জনমনে কিছুটা ভয়ে – সব মিলিয়ে এর প্রভাবেই ঐ নির্বাচনে ভারতপন্থী দল পিডিপি ক্ষমতায় জয়লাভ করেছিল বলে মনে করা হয় এখনও। এমনকি ভারতীয় মিডিয়াতেও  কেউ কেউ এটাকে ভারতীয় সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া বলে দোষারোপ করে থাকে।

    চীনের ঝাড়ি মারা
    কিন্তু এবারের নির্বাচনে প্রো-ইন্ডিয়ান দলের এক নম্বর অবস্থান থেকে তিনে চলে যাওয়াতে ভারতীয় মিডিয়ায় প্রচুর হইচই পড়ে যায়। এমনকি কোথাও ভারত সরকারকে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান ও পরামর্শও আসতে থাকে। তেমনি এক রিপোর্ট হল – টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন। এতে কূটনৈতিক রিপোর্টার ইন্দ্রানী বাগচী লিখছেন, “ভুটানে ভারতকে উদ্যোগ ও তৎপরতা দ্বিগুণ করতে হবে”। [India will have to work doubly hard to help its closest neighbour achieve its aspirations while securing its interest…]
    কিন্তু ভুটানে ভারতকে  “কোন উদ্যোগ” (হস্তক্ষেপের?) নিতে তিনি তাগিদ দিচ্ছেন সেটা ইন্দ্রাণী উহ্য রাখছেন। ইঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছে, তিনি আগের মত কোন ভারতীয় হস্তক্ষেপের কথা বলছেন। লিখছেন, ‘পড়শিকে তার স্বার্থরক্ষার আকাঙ্খা অর্জন করতে ভারত যেন ভুটানে নিজ প্রচেষ্টা দ্বিগুণ করে”। এটা কি সাংবাদিকতা না উগ্র জাতীয়তাবাদী মনের আধিপত্য কামনা? আবার ভাব ধরছেন বিরাট কূটনীতিকের। কসরত করেছেন কোন এক কায়দা ব্যবহার করে “ভারতকে হস্তক্ষেপ করতে” আহ্বান করবেন যা কূটনৈতিক বা সাংবাদিকতার নর্মস অথবা আইনের বরখেলাপ মনে না হয়।
    এটা আসলে পড়শির মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া না, পড়শির মাথায় চায়ের কাপ রেখে আরাম করে হাত-পা ছড়িয়ে চা খাওয়ার বেকুবি চেষ্টা। সেই নেহরুর আমল থেকে এটাই ভারতের নিয়মনীতি বা পড়শি পলিসি হয়ে আছে। এভাবেই বিশেষ করে ল্যান্ডলকড পড়শিদের নানা চুক্তিতে বাধ্য করে সুবিধা আদায় করে এসেছে ভারত। ব্রিটিশ কলোনি মাস্টার ভারত ত্যাগ করে চলে গেলেও নেপাল বা ভুটানের মতো পড়শি দেশের বেলায় নেহরুকে যেন বৃটিশ “ভাইসরয়” হিসেবে ভূমিকা পালন করতে দিয়ে গেছে। মোটকথা, পড়শিদের ভারতকে ‘ট্যাক্স’ দিয়ে চলতে হবে, যাতে নিধিরাম সর্দার ভারত দাবি করতে পারে যে – “এই চীন, এদিকে এসো না, এটা কিন্তু ভালো হচ্ছে না; এটা আমার এরিয়া অফ ইন্টারেস্ট!”

    কিন্তু কঠিন বাস্তবতাটা হল, ভারতের অর্থনীতিতে যেমন অবকাঠামো ঋণের চাহিদা ও অভাব প্রবল – আর তা মেটাতে সে চীনের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে; তেমনি নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ বা শ্রীলঙ্কার মতো পড়শিরাও একই কারণে সেটাই করছে। কারণ কলোনি আমল থেকে ভারতসহ আমাদের সবার অর্থনীতিতে স্থানীয় মানুষের হাড় ভেঙে খেটে যা উদ্বৃত্ত সঞ্চয়, যা আমাদের হক এবং হবু বিনিয়োগ পুঁজি, তা লোপাট ও নিজ দেশে পাচার করেছে ব্রিটিশরা। সে অভাব, সেই থেকে বিনিয়োগ চাহিদা আর প্রাপ্তির যে বিরাট গ্যাপ সেটা এখন একটু মনোযোগ পাচ্ছে – কারণ চীনের হাতে ব্যাপক উদ্বৃত্ত সঞ্চিত হয়েছে, যা অবকাঠামো ঋণ হিসেবে দিতে চীনও আগ্রহী।

    তাই ভারতসহ সবাই আমরা বুভুক্ষের মতো চীনা অবকাঠামো ঋণ ও প্রকল্প নেবো কারো বাধা না মেনে। তবে যাদের সরকার, রাজনীতি বা রাষ্ট্র ইতোমধ্যে যথেষ্ট শক্তপোক্ত হয়ে গেছে, ব্যাপস্থাপনায় দক্ষ; তারা প্রকল্প ও শর্তগুলো ভালো বাছবিচার করতে পারবে। না হলে কোন কোন দেশ কিছু আরও কষ্ট স্বীকার করবে, কোন কোন প্রকল্প লাটে উঠবে, চুরি দুর্নীতিতে ভরে যাবে।

    সব ঘটনার মূল কারণ তাহলে, আমাদের সীমাহীন অবকাঠামো ঋণ চাহিদা এবং বিনিয়োগ না হওয়া। এই চাহিদা প্রসঙ্গে এডিবির এক স্টাডি বলছে – এশিয়াতে বিশ্বব্যাংক, এডিবি আর এআইআইবি (AIIB, চীনের বিশ্বব্যাংক) সবাই মিলে তাদের সব সামর্থ্য ঢেলে অবকাঠামো বিনিয়োগ করলেও তাতে এশিয়ার এখন অবকাঠামো বিনিয়োগ চাহিদা যত তা পূরণ করা সম্ভব হবে না। ঘাটতি থেকেই যাবে। অবকাঠামো ঋণ পেতে এ ব্যাপারে ভারতসহ আমরা সবাই “একই নৌকায়”। ভারতের যেমন, আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের পড়শি সব রাষ্ট্রেরও একই অবস্থা। ভারতসহ সবাই এক কাতারে যে, চীন আমাদের সবার অবকাঠামো ঋণ চাহিদা পূরণকারী এবং দীর্ঘ দিনের বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ না হওয়া খরা-দশায় মূল ঋণদাতা। ফলে ‘আমার বাগানবাড়িতে চীন ঢুকে গেল’ এসব অর্থহীন কথা আর ভুয়া অহঙ্কার ভারতের বন্ধ করা উচিত। এগুলো আমাদের না কারও আর না বুঝার কিছু নাই।

    আসলে ভারতের উচিত সবার আগে নিজে “চীনা অবকাঠামো বিনিয়োগ” না নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক । চীন খোদ ভারতের অর্থনীতিতেই ঋণদাতা হয়ে ঢুকে বসে আছে, ভারত চীনের এআইআইবির (চীনের বিশ্বব্যাংক) সবচেয়ে বড় ঋণগ্রহীতা। মানে চীন ভারতের বাগানবাড়ি না খোদ মূল বাড়িতে ঢুকে বসে আছে। এটা সবাই জানে।

    ভারতীয় মিডিয়া হৈ চৈ প্রসঙ্গটা, ব্যাপারটা চীনের সরকারি ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকারও নজর এড়ায়নি।  তাই গ্লোবাল টাইমসের এক রিপোর্ট প্রশ্ন তুলেছে ভুটানের নির্বাচনী ইস্যুতে ইন্দ্রাণী বাগচীর লেখাসহ ভারতীয় মিডিয়ার হইচই নিয়ে। আর বলেছে, ‘ভারত যেটাকেই উন্নয়নের আদর্শ মডেল মনে করুক, তা যেন সব জায়গায়ই একই থাকে, আর ভারত যেন সেই একই মডেলের পক্ষে থাকে।’ উদাহরণ হিসেবে বলছে, ভুটান পূর্ব-পশ্চিমব্যাপী হাইওয়ে তৈরিতে এডিবির থেকে একটা ঋণ পেতে যাচ্ছিল কিন্তু ভারতীয় প্ররোচনায় সেটা বাতিল হলো কেন? ভারত একচেটিয়াভাবে ভুটানের সস্তা জলবিদ্যুৎ নিজে ব্যবহার করে; অথচ তৃতীয় দেশে এর বিক্রি বাণিজ্যের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রেখেছে। কিন্তু কেন?

    আইএমএফের রেফারেন্স দিয়ে পত্রিকাটি প্রশ্ন করছে, ‘ভুটান কেন ঋণগ্রস্ত, এত আকণ্ঠে নিমজ্জিত? ভুটানের মোট ঋণ তার জিডিপি-এর চেয়েও বেশি হয়ে গেছে কেন? তাহলে ভুটান নিয়ে চাপাবাজি করছে কে? [Who is bullying Bhutan, China or India?] আর সেটা হয়েছে গত মাত্র ছয় বছরে – ভুটানের ঋণ জিডিপির ৬৭ শতাংশ থেকে ১১৮ শতাংশে উঠে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, ভুটানের মোট ঋণের ৬৪ শতাংশ ঋণই হল ভারতের প্রদত্ত?

    আসলে ইন্দ্রাণীর ভারত সরকারকে সরাসরি কিছু করার (হস্তক্ষেপের) আহ্বান, নিঃসন্দেহে এটা এক বেপরোয়া কাজ হয়েছে। ইন্দ্রাণী তার লেখার শুরুতে ‘হাইলাইট’ উপ-শিরোনামে তিনটি পয়েন্ট মানে তিনটি বাক্য লিখেছেন। এর প্রথম বাক্যটা হল এই বেপরোয়া আচরণ। আর পরের দুটা হল তার হতাশার কারণ বর্ণনা। যেমন, দ্বিতীয় বাক্যে তিনি আক্ষেপ করে লিখছেন, “২০১৩ সালের মত এবারের ২০১৮ সালে ভুটানের নির্বাচনে “ভারত কোনো ইস্যুই হতে পারেনি”। আর তৃতীয় বাক্য হল, “ভুটানে যে দুটো দল প্রথম ও দ্বিতীয় হয়েছে তারা ভারতের সাথে খাতিরের সম্পর্ক গড়ার কোনো প্রতিশ্রুতি না দিয়েই আমাদের খালি কিছু আশ্বাস শুনিয়েছে”।

    আসলে ভুটানের এই নির্বাচনের বহু আগে থেকেই ভারতের বিরুদ্ধে ভুটানিদের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছিল এবং করণীয় নিয়ে খুবই সংগঠিতভাবে আলোচনা ও প্রচার তাঁরা চালিয়েছে। যেমন এনিয়ে “ভুটানিজ ফোরাম” নামে ফেসবুক গ্রুপ, সেছিল সবচেয়ে সরব। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়ার সাথে কথা বলার সময় তারা একেবারে লো প্রোফাইল। কোনো দলের ক্ষোভ থাকুক আর ভালোবাসাই থাকুক নির্বাচনের মূল তিনটা দল ভুটানে “ভারতের তৎপরতার” বিরুদ্ধে তাদের অসন্তোষ সম্পর্কে ছিল একেবারেই নিশ্চুপ। সম্ভবত তাদের ভয় ছিল, এতে ২০১৩ সালের মতো ভারতের কোনো পদক্ষেপ তাদের সাধারণ মানুষকে আরো কষ্টে ফেলে দিতে পারে। তাই তারা ভারতীয় মিডিয়ায় নয়, নিজ ভোটারের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছে, আর ভোটের বাক্সে ভোট দিয়ে আসল কাজটা করেছে; ভারতকে আসল জবাবটা দিয়েছে।

    বহু পুরনো এক প্রবাদ হলো, কারো ক্ষতি করে সেটা থেকে তোমার লাভ আসবে – সেটা আশা করো না কখনও।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “নেপালের পর এবার ভুটান হাতছাড়া!“  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]