Tag: India

  • সৌদি-পাকিস্তান সামরিক চুক্তির কী ক্রমশঃ ‘মুসলিম ন্যাটো’ জোট হয়ে উঠতে পারবে

    সৌদি-পাকিস্তান সামরিক চুক্তির কী ক্রমশঃ মুসলিম ন্যাটো জোট হয়ে উঠতে পারবে
    গৌতম দাস
    ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫   ভোর রাত ০২ঃ ৩৭
    https://wp.me/p1sCvy-6xS

     

     

    সৌদি-পাকিস্তান চুক্তি:

     

    গ্লোবাল প্রভাব ফেলতে পারে এমন এক সামরিক চুক্তিতে সই করেছে সৌদি আরব ও পাকিস্তান গত বুধবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫।  ইতোমধ্যেই তাতেই দুনিয়াজুড়ে বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক স্বার্থের দেশগুলোতে ও আমাদের এ অঞ্চলেও ব্যাপক হইচই পড়ে গেছে। অনেক পশ্চিমা মিডিয়া একে পৃথিবীর ভূমিগঠন কাঠামোতে কয়েকটা ইট খুলে নেওয়ার মতো ‘টেকটনিক’  [Tectonic] পদক্ষেপ বলেছে।

    কী সেই চুক্তিঃ
    আনুষ্ঠানিকভাবে এর নাম ‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ যা ইংরাজিতে ‘স্ট্রাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ [Strategic Mutual Defense Agreement (SMDA)]। এখানে ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স’ [Mutual defence] শব্দগুলো সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। এককথায় এর অর্থ হচ্ছে, কোনো শত্রুর দ্বারা চুক্তির এক রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে সেটা অপর রাষ্ট্র নিজের ওপর আক্রমণ বলে মনে করবে, আর নিজ বন্ধুকে রক্ষায় মোকাবিলায় এগিয়ে সক্রিয় পদক্ষেপ নেবে; দুই. এতে দুই বন্ধুর শত্রুর বিরুদ্ধে যৌথভাবে লড়বে।

    ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স’ শব্দটার অর্থ খুবই গভীর। আর তা হওয়ার পেছনে বা এই আইডিয়ার উপরই দাঁড়িয়ে জন্ম নিয়েছিল ও আছে  সেই ১৯৪৯ সালে জন্লম নেয়া থেকে ন্যাটো (নর্থ আটল্যান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন NATO)। ন্যাটোর জন্ম দলিলের বিখ্যাত হল  ‘অনুচ্ছেদ পাঁচ’। এটা লেখা হয়েছে উপরে ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স’ ধারণার আলোকে। দুনিয়াতে সেটাই প্রথম মিউচুয়াল ডিফেন্স ধারণার ব্যবহার। বইয়ের ভাষায় একে ‘কালেকটিভ ডিফেন্স প্রিন্সিপালও’ বলা হয়ে থাকে। মোট ৩২ সদস্যের ন্যাটোর কোনো এক সদস্য ন্যাটোর বাইরের কোন দেশ দ্বারা আক্রান্ত হলে এর বিরুদ্ধে ন্যাটো-সদস্যরা সবাই একসঙ্গে প্রতিরোধে নেমে পড়তে বাধ্য।

    এ কারণে অনেকেই সৌদি আরব-পাকিস্তানের এই চুক্তিকে মুসলিম ন্যাটো চুক্তির দিকে এটা যাবে এই প্রেরণা থেকে  উচ্ছ্বসিত হচ্ছে; আর ততই এটা ভারতের জন্য হচ্ছে হতাশার। কারণ সৌদির সঙ্গে অপর দেশটা হল পাকিস্তান,  আবার যে পারমাণবিক শক্তিধর! আর পাকিস্তানের অপর পার্টনার সৌদি আরব বলে এর অর্থ হল, সামরিক প্রস্তুতিতে ব্যয়ের ক্ষেত্রে অর্থ আর বড় কোনো বাধা নয়। এই নিয়ে ইংলিশ বিবিসির শিরোনাম হল, ইন্ডিয়ার কাপাকাপি শুরু হয়ে গিয়েছে [Why the Pakistan-Saudi Arabia defence pact is unsettling India]।  আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কংগ্রেস এটা মোদির ফরেন পলিসির পরাজয় বলে চারদিকে বিবৃতির হৈ চৈ তুলেছে [পাকিস্তান-সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে নরেন্দ্র মোদির ব্যর্থতা দেখছে কংগ্রেস]।
    আর সেই সঙ্গে এখন ক্রমশ জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে যে এই চুক্তিতে শামিল হতে চাইবে পুরো মধ্যপ্রাচ্য বাদশাহশাসিত দেশের ‘জিসিসি [GCC] জোটে’র ছয় দেশ (সৌদি ছাড়াও বাকি পাঁচ দেশ-ইউএই আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহারাইন ও ওমান)। সেই জল্পনাকে আরো উস্কে দিয়েছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী – তিনি বলেছেন সৌদিদের সাথে চুক্তি করে আমরা তো অন্যদের জন্য দরজা বন্ধ করে দেই নাই। DOOR NOT CLOSED শিরোনামে পাকিস্তানী ডন পত্রিকা সেকথাই লিখেছে। আমেরিকান পয়সায় স্থানীয় থিঙ্কট্যাংক এনজিও চালায় এমন ইন্ডিয়ান ব্রহ্ম চেলানী খুবই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন – সৌদিরা জানত এই চুক্তিকে ইন্ডিয়া নিজের জন্য এক সিকিউরিটি থ্রেট হিসাবে দেখবে / নিবে এরপরেও তারা এদিকে এগিয়েছে” –

    “Riyadh knew India would construe the Saudi-Pakistan pact as a direct threat to its security, yet it went ahead,”
    Brahma Chellaney, an Indian strategist, posted on X. –  BBC

    অনেকে অবশ্য আরেক সম্ভাবনার দিকটা দেখে বলতে শুরু করেছেন যে, এটা হয়তো ইরানকে একঘরে করার সৌদির পরিকল্পনা। না, এটা একেবারেই ভুল ব্যাখ্যা হবে। এটা কার্যত মুসলিম দুনিয়ার রাষ্ট্রগুলোর আন্তঃসম্পর্কের মধ্যে দুর্বলতাগুলোকে বড় করে দেখিয়ে ‘মুসলিম ন্যাটো’ হয়ে ওঠার সম্ভাবনাকে জেনে না জেনে, মুসলমান ফেরকার কথা তুলে নাকচ বা খামোশ করার এক বৃথা চেষ্টা হবে।

    তাহলে এমন দুর্বলের বদলে সবল দিকটা কীঃ
    সারা দুনিয়ায়  এর নানা ভৌগোলিক অঞ্চলের আন্তঃরাষ্ট্রীয় নানা রাষ্ট্রস্বার্থ দ্বন্দ্ব থাকে, থাকবেই। কিন্তু এসবের বাইরেও তবু সবকিছুর ঊর্ধ্বে দেখা যাবে আবার একটাই ‘প্রধান দ্বন্দ্ব’ থাকবে! যেমন, এখনকার দুনিয়ায় সেই প্রধান দ্বন্দ্বটা হল ‘চীন-আমেরিকার স্বার্থদ্বন্দ্বের বিরোধ’! এগুলো মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব – মূল কারণ এক পালাবদল মানে একালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেতৃত্বের পালাবদলের কাল এটা। যদিও ক্রমশই এটা সামরিক, কৌশলগত, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি এবং সর্বোপরি এক নয়া বয়ান হয়ে সব ফ্রন্টেরও দ্বন্দ্ব হয়ে ক্রমশই ছড়িয়ে পড়বে।

    আর আমরাও বাকি সব রাষ্ট্রই ক্রমশ এই চীন-আমেরিকা দ্বন্দ্বে নিজ নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের আগ্রহে বা বিচারে এ দুই রাষ্ট্রের কোনো একটার স্পষ্ট পক্ষভুক্ত হতে থাকব। অনেকে ইতোমধ্যেই হয়ে গেছি বা আছি। যদিও দ্বন্দ্ব-বিকাশিত হওয়ার বর্তমান স্তরে বা পর্যায়ে পরিষ্কার করে আমাদের-হয় আমেরিকা না হয় চীনের পক্ষে দাঁড়িয়ে যাওয়া – এমনটা এখনই দেখা নাও যেতে পারে। এখন হয়তো দেখা যাবে, একটা রাষ্ট্র এখনই ৫০-৮০ শতাংশ যদি চীনের পক্ষভুক্ত হয়ে গিয়েও তবু পাশাপাশি সে রাষ্ট্র আবার আমেরিকার সঙ্গেও অবশিষ্ট মাত্রার ঘনিষ্ঠতা রাখছে। যেমন পাকিস্তান। পাকিস্তানে চীনা বিনিয়োগ ইতোমধ্যেই ২০ বিলিয়ন ঢুকে পড়েছে, আর তা আগাচ্ছে পাইপলাইনে থাকা বাকি অংশের দিকে সবমিলিয়ে তা ৫০ বিলিয়নের আশপাশে যাওয়ার লক্ষ্যে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বিশেষ মজার ব্যাপারটা হল এই বিনিয়োগের বেনিফিট ব্যবহারকারী আবার খোদ চীন (একা পাকিস্তান না) নিজেও – আর সেটাই গোয়াদর প্রকল্পকে কেন্দ্র করে (যা শুধু একটা গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্প নয়)। আসলে এটা সাড়ে তিনদিক ল্যান্ডলকড চীন যার আবার পশ্চিমদিক একেবারে সুউচ্চ (হিমালয়) পর্বতমালা দিয়ে ব্লকড। তবু এই পশ্চিম দিকটা দিয়েই পাকিস্তানের সারা বুক চিরে এখন সমুদ্রে ডিপ সি-পোর্টে [গোয়াদর পোর্ট] পৌঁছানোরই অবকাঠামো নির্মাণ করে নেওয়া হয়েছে; যার বৃহৎ ব্যবহারকারী হবে চীন নিজেই। তাই বলা যায়, চীন-পাকিস্তানের সম্পর্ক মূলত অর্থনৈতিক অবকাঠামো বিনিয়োগের উপরে হলেও সব কিছুর উপরে এটা খোদ চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ – এক কথায়, চীন নিজ পুবদিকের চীন সাগর ছাড়াও চীন এখন নিজ পশ্চিমদিক দিয়ে সরাসরি আরব সাগরে পৌঁছাতে পারে।

    অথচ এতকিছুর পরও পাকিস্তান আমেরিকার হাতও ছাড়েনি; একটু দুর্বলভাবে হলেও সঙ্গেই ধরে আছে। আবার পাকিস্তানের মূল অর্থনৈতিক সম্পর্কের পুরোটাই চীননির্ভর। আবার এই সৌদি-পাকিস্তান সামরিক চুক্তির পর থেকে পাকিস্তান হয়ে গেল মুসলমান জনসংখ্যাপ্রধান রাষ্ট্রগুলোর চোখে রক্ষাকর্তাঃ অন্য ভাষায় হবু ইসলামি ‘ন্যাটোর’ মধ্যমণি।

    কেন আমেরিকান পরপর প্রেসিডেন্টরা নেতানেয়াহুর খেদমতগারির প্রতিযোগিতায়ঃ
    ইসরাইল ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফিলিস্তিনিদের জায়গাজমি দখল, তাদের উদ্বাস্তু বানানো থেকে শুরু করে এমনকি ক্রমাগত হত্যা, নির্যাতন করে চলেছে। এর সবই নাকি দখলবাজদের ‘আত্মরক্ষার অধিকারের কাজ’ বলে সাফাই দিয়ে প্রেসিডেন্ট ওবামাসহ সারা পশ্চিমাজগৎ জায়োনিজমকে উসকানি গেছে। এসবই জায়োনিস্ট ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারের নৃশংস ইতিহাস। বিশ্বযুদ্ধ শেষে বৈশ্বিক নেতা হিসাবে আমেরিকান উত্থান আর ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা একসঙ্গে হাত ধরাধরি করেই চলেছে। এক কথায় ইসরাইলকে প্রটেকশন দিয়ে অন্যের দেশভূমি দখল করে ইসরায়েলের নিজ বিস্তার ঘটানো-প্রটেকটর যেহেতু আমেরিকা, তাই পরিষ্কার করেই বলা যায় যে, দুনিয়া থেকে জায়োনিজমের অবসান ও ইসরাইল রাষ্ট্রের বিলুপ্তি বৈশ্বিক নেতা হিসাবে আমেরিকার পতনের ভেতরই নিহিত। প্রটেকটর আমেরিকার নেতাগিরির পতনের ভেতর দিয়েই একমাত্র ইসরাইলের বিনাশ ঘটতে পারে, তা বলাই বাহুল্য।

    আবার আমেরিকার নেতাগিরির অবসানের মানে হল, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেতা হিসাবে চীনের উত্থান। এই উত্থানকে ত্বরান্বিত করার অন্তত একটা চাবিকাঠি আবার সৌদি আরবের হাতে আছে। তা হলো, আমেরিকান ডলার বাদে অন্য মুদ্রায় (যেমন ইউয়ানে) সৌদি তেল বিক্রি শুরু করা। কারণ সৌদি তেল বিক্রি যা সর্বোচ্চ তা কেবল আমেরিকান ডলারেই কেনাবেচা হয়। এতে ডলারের কারেন্সি ভ্যালু অটুট রাখার ক্ষেত্রে – একটা বড় ফ্যাক্টর হল কেবল ডলারেই সৌদি তেল বিক্রি করা।

    আর এতে আমেরিকান ডলার এক আধিপত্যশীল কারেন্সি হিসাবে বৈশ্বিক বাণিজ্যে আমেরিকার নেতাগিরি টিকে যাওয়ার প্রধান কারণ। আর আমেরিকান ডলার ডমিনেন্সি টিকে থাকা মানে এটাই ইসরাইলের দানবীয় আচরণ দেখানোর শক্তির উৎস। চীনা মুদ্রা ইউয়ানে সৌদি তেল বিক্রি করা শুরু করলেই এর ফলাফলে ডলার দুর্বল হয়ে যাবে আর এতে আমেরিকা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেতা থেকে পতন হওয়ার এক বড় ঘটনা হতে পারে সেটা।

    কিন্তু সৌদিরা এটা করতে এপর্যন্ত ভয় পেয়ে এসেছে। বরং সৌদি সরকার ভয়ে ভয়ে কাজ করেছে উলটা; সৌদিরা আমেরিকার কাছেই নিজ নিরাপত্তার গ্যারান্টি চেয়ে বসে আছে। এদিকে চলতি মাসে ৯ সেপ্টেম্বর ইসরাইল সৌদি আরবের সীমান্ত দেশ কাতারেই বোমাহামলা চালায়। বলাই বাহুল্য, এটাকে সৌদিশাসকরা আমেরিকান ‘প্রতিরক্ষার আশ্বাসের’ বরখেলাপ গণ্য করেছিল।

    এখন সেখান থেকে প্রতিক্রিয়ায় সৌদিরা সরাসরি তেল বিক্রিতে ডলার ব্যবহার বন্ধ করতে পারত। কিন্তু তা কঠোর আর ভারী হয়ে যাবে ভেবে সেদিকে না গিয়ে সৌদি শাসকরা এক তুলনামূলক নরম পদক্ষেপ নিয়েছে – এটাই পাকিস্তানের সঙ্গে ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স’ চুক্তি করে বসা।

    এদিকে পাকিস্তানের ডন পত্রিকা লিখেছে, এটা দুই দেশের মধ্যকার চুক্তি হলেও এটা জিসিসি সদস্য দেশের মধ্যেও বিস্তার ঘটিয়ে বাকি গালফ দেশকেও একই ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স’ চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা নেই। মানে কাতারসহ জিসিসির বাকি দেশগুলোও এ চুক্তিতে একইভাবে সৌদিদের মতো পক্ষভুক্ত হতেই পারে।

    কিন্তু তবু অনেকের মনে খচখচ করতে পারে এই ভেবে, এটা তো ঠিক ‘ইসলামি ন্যাটো’-এর মতো হচ্ছে না। কারণ ইরান বা তুরস্ক এতে শামিল নয় বা সেটা হবে কী করে?

    আমি এখানে একটা সূত্র বলে দেই। এক্ষেত্রে ইরান মুসলিম দেশের মধ্যে সবার আগে চীনের সঙ্গে পক্ষভুক্ত হয়ে গেছে। আর তা পেরে গেছে বলেই ইরান সাহসের সঙ্গে ফিলিস্তিনির পক্ষে হামাস, হিজবুল্লাহসহ অন্যদের সংগঠিত ও সহযোগিতা করে আসছে। ইরানের তেল কেনার জন্য চীন-ইরান ২৫ বছরের চুক্তি করা আছে।

    অতএব, সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তিতে ‘মিউচুয়াল ডিফেন্স’ মানেই পাকিস্তান নিজ আরেক হাতে চীনের সঙ্গে সে যুক্ত-এটাও মনে রাখতে হবে। ফলে ইরানও এতে (আপাতত) পরোক্ষে যুক্ত!

    সৌদিদের দিক থেকে এটা হল, আমেরিকাকে দেওয়া হুঁশিয়ারি যে আমেরিকা সংশোধিত না হলে, জায়োনিস্ট রক্ষকের কাজ ত্যাগ না করলে তখন সৌদি শাসকরা সরাসরি ডলারে তেল বিক্রি বন্ধের পথে যাওয়ার কথা ভাববে।

    এক কথায় দিন শেষে এটাই দখলদার জায়োনিস্টদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক সর্বোচ্চ পদক্ষেপ হয়ে ওঠার পথে হাঁটবেই।

    গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ   ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫    


    [এই লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সানে ছাপা হয়েছিল দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় আমারই লেখা এক কলাম হিসাবে, গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫।  আজ এখানে সে লেখাটারই  আরেক বর্ধিত এক নয়া এডিটেড ভার্সান এখানে আমার নিজ সাইটে ছাপা হল। বলাই বাহুল্য এখানে শিরোনামটাই শুধু নতুন নয় বরং এমন অনেক প্রসঙ্গই নয়া এখানে যোগ করা হয়েছে যেটা পত্রিকার ভার্সানে ছিল না। আসলে পত্রিকার কলাম ভার্সান মানে যেটা যুগান্তরের এডিটরিয়াল পলিসি সঠিক মনে করে সেই ভার্সান; এভাবে দেখাটাই সঠিক হবে। আর তুলনায় এটা আমার নিজ পরিবর্ধিত-এডিটেড ভার্সান মনে করলেই সঠিক হবে বলে আমার বিশ্বাস! ]

  • প্রতি বিপ্লব কী? ওয়াকার ম্যাজিক?

    প্রতি বিপ্লব কী? ওয়াকার ম্যাজিক?
    গৌতম দাস
    ২৭ এপ্রিল ২০২৫  সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫১
    https://wp.me/p1sCvy-6rH

     

    আমার অবজারভেশন এটাই প্রতি-বিপ্লব বহনের চিহ্ন, ছবিটা বাংলা নিউজ / কালের কন্ঠ থেকে নেয়া

    দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশে বিপ্লব শব্দটা যতটা পরিচিত; আর এটাও বুঝি বা-বুঝি এটা ব্যবহার করতে দেখি আমরা অনেককেই এবং অতি সহজেই। বিশেষ করে এটা যখন “জুলাইয়ের বিপ্লব” বা “আগষ্ট বিপ্লব” বা “২৪ এর বিপ্লব” এর যুগ বা কাল পার হচ্ছি আমরা। কিন্তু ঠিক তার দ্বিগুণ হল আমাদের অজ্ঞতা বা বেখবর!!! কিন্তু কী নিয়ে? সেটা হল বিপ্লব না হয় যা হয় বুঝলাম; তাহলে প্রতি-বিপ্লব, সেটা আবার কী? এমনিতে বিপ্লব এই কথা বা ধারণাটাকে কমিউনিস্ট-প্রগিতির লোকেরা নিজেদের একচেটিয়া মনে করে থাকে। তারাই সবচেয়ে ভাল বুঝে এমনও মনে করে থাকে। তবুও তাদের মধ্যেও দেখা যায় প্রতই-বিপ্লব জিনিষটা কী? কেন তা আসে? কখন আসে? – এসব প্রশ্নে খুব স্বচ্ছ ধারণা রাখেন না। যদিও তারা প্রতি-বিপ্লব কথাটা শুনেছেন এমন দাবি করে থাকে।

    তত্ব কথা প্রতি-বিপ্লব কে বুঝানো যায়; বুঝাবও অবশ্যই। কিন্তু আগে প্রাকটিক্যালি দেখাবো। এর মূল কারণ, আমরা সকলে প্রগতি বুঝি কিংবা ইসলামিজম বুঝি অথবা আম-জনতা যাই হই না যেন বিপ্লব কী তা ৫ আগষ্টের পর থেকে আমরা সবাই বলব আমরা বুঝি। কারণ এটা বাস্তবে আমাদের সবাইকে দেখায়ে দিছে; আগে না জানলেও এখন জেনে গেছি বিপ্লব কী!
    তাহলে প্রতি-বিপ্লব কী?
    এর ইংরাজি হল,  কাউন্টার-রেভেলিউশন [counter revolution] । বুঝাই যাচ্ছে কাউন্টার মানে একটা ঘটে যাওয়া ঘটনাকে উলটা দিকে ঘুরানো।  অর্থাৎ হাসিনা উতখাত উপড়ে ফেলা যদি বিপ্লব তবে এখানে প্রতিবিপ্লব হচ্ছে হাসিনাকে ফিরে ক্ষমতায় বসানো! হা ব্যাপারটা তাই এখানে একটু টুইস্ট বা মোচড় আছে। হাসিনা ক্ষমতায় ছিল ১৬ বছর ইন্ডিয়ান আধিপত্যের প্রতিনিধি হিসাবে। তাহলে হাসিনার উতখাত মানে আসলে তা সেই ইন্ডিয়ান আধিপত্যেরও উতখাত। তাহলে এখানে প্রতিবিপ্লব মানে কেবল হাসিনাকে নয় মূলত একেবারেও মূল শক্তি হচ্ছে ইন্ডিয়ান আধিপত্য একেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা মানে ইন্ডিয়ান আধিপত্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এটাই হল মৌলিক দিক!
    আর সেখান থেকেই এতে আরো কিছু ভিন্নতা থাকবে বা দেখব আমরা। অর্থাৎ কেবল ঠিক হাসিনার পুনঃপ্রতিষ্ঠা নয় এর বদলে আমরা দেখব মূল শক্তি  ইন্ডিয়ান আধিপত্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা তাই।  এটাই প্রতি-বিপ্লব ও প্রতি-বিপ্লবী চিহ্ন বা মূল প্রতীক।

    এবার আর ইন্ডিয়ান আধিপত্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এর সাথে আরো দেখব – তারেক জিয়ার বিএনপি, স্পষ্ট করে জামায়াত, ফাঁকে কান্নি মারছে এমন হাসিনার লীগ ইত্যাদি আর সবার উপরে ভাসবে তাদের সমন্বয়ক ওয়াকার।  আর সব মিলিয়ে এরাই হতে যাচ্ছে সম্ভাব্য প্রতিবিপ্লবী শক্তি!

    এবার আরেকটু সার করে বলিঃ তাহলে ৫ আগষ্ট কে যদি ধরি হাসিনার সাজানো সেনাবাহিনী এর অর্ডার ভেঙ্গে দিয়ে এই সেনা প্রতিষ্ঠানেরই (ওয়াকার বাদে) বাকীদের (মূলত জুনিয়র অফিসারদের) আধিপত্যের বিজয় (যেখানে অসহায় ওয়াকার পুরানা পদপদবীসহই ব্যক্তি মাত্র); আর এটাই মূলত হাসিনার উতখাত ও পলায়নের মূল চালিকা শক্তি। আর পরবর্তিতে এই ঘটনাটাই ৫ আগষ্ট ২০২৪ থেকে ছাত্র-জনতার দ্বারা এন্ডোর্সড বা অনুমোদিত হয়ে যাওয়াতে  পুরা পরিবর্তন টাই একটা বিপ্লব; একটা বিল্পবী চরিত্র নিজে হাজির হয়ে যেতে পেরেছিল। যদিও ভিতরে নানান পকেটে অনেক ধরনের দুর্বলতাও থেকে গেছিল। যেমন ওয়াকারকে উপরে প্রতীকী হলেও রেখে দেওয়া। বাওইরে থেকে ইউনুস সাহেব-কে এনে সরকার প্রধান করে বসানো ইত্যাদি অনেকগুলো দুর্বল-পকেট এতে থেকে গেছিল।

    তবুও অর্থ তৈরির দিক থেকে আবেগ-উচ্ছাসে এটা সবার দিক থেকে এটা একটা বিপ্লবই গন্য হয়েছিল ।   আর এই বিপ্লব ও এই বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রথম বিরুদ্ধচারণ শুরু করেছিল ইন্ডিয়া ও মোদি। এদিকটা খেয়াল করলেই ব্যাপারটা বুঝা যাবে। এতবড় সধিপয়ত্য হারানো মূল শক্তি প্রতিবিপ্লব বা বিরোধিতার মূল হাল ধরবে তা বলাই বাহুল্য! কিন্তু এর সাথে সহযোগী হবে তারেকের বিএনপি, আগা-পিছা করা জামায়াত (যার শুরুটা হয়েছিল ইসকন-চিন্ময় আর এদের গলা জড়িয়ে ধরে চুমা দেয়াদের কে দিয়ে)। ওদিকে সেনা প্রতিষ্ঠানের ভিতর বিজয়ী শক্তিরো যতটা সম্ভব খামতি পূরণ করে পয়লা স্ত্র পেরিয়ে নিজেদের সংহত হয়ে দারাতেই নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ লেগে যায়।
    কিন্তু সবচেয়ে বড় আরেক দুর্বলতা ক্রমশ বড় হয়ে উঠতে থাকে। সেটা হল, খো ইউনুস সাব, আসিফ নজরুল ও অন্যেরা। এদের কাজটা ইনোসেন্ট বা নিস্পাপ অজ্ঞতা বলবেন হয়ত অনেকে। কিন্তু এটা আসলে বাচ্চাদের আপাত নির্দোষ পুকুরে ঢিল মআরা যেটা পুকুরের ব্যাঙের দিক থেকে প্রাণঘাতি, এরকম।  না ইউনুস না তার মন্ত্রীসভা (উপদেষ্টারা) কেউই প্রতি-বিপ্লব ব্যাপারটা কী তা আমল করেন নাই শুধু তাই না প্রায় অযোগ্যও বটে। কিন্তু এটা যে গণমানুষ রাষ্ট্রস্বার্থের দিক থেকে বাঁচামরার সেখবর তাদের নাই। এরই প্রমাণ হল, মুজিবের ছবি অবলীলায় মাথার উপরে টাঙাতে অসুবিধাবোধ না করা, লীগেরও রাজনৈতিক অধিকার দিতে ব্রি. শাখাওয়াত প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাচাল কথাবার্তা ও অপসারিত হওয়া অয়থবা ধরেন খোদ ইউনুস সাবের সস্তায় ইলিশ মাছ খাওয়ার রাষ্টড় ও সরকার প্রধান হয়ে থাকার লক্ষ্য নির্ধারণ……!!!  আমাকে বারবার লিখতে হপ্যেছে ক্ষমতা কী? রাষ্ট্রক্ষমতা মানে মারো নাহলে নিজে মরো! ফ্রেন্ড-এনিমি টনটনে বোধ! আগেই আপনাকে নির্মম্ভাবে আপনার ক্ষমতার এনিমি কে মারতে হবে নইলে পরে শত্রুর হাতেই নিজে উতখাত হতে হবে!! ক্ষমতা মানে এটাই।
    এটাই বিপ্লব কে রক্ষা করা! ফলে হয় মারো নয়ত মরো! বিপ্লব কে সুরক্ষা দাও আর নয়ত প্রতি-বিপ্লবে মারা যাও!  একথাতাই কখনও ইউনুস সাবকে পরিস্কার বুঝানো যায় নাই আধা-বুঝ ভাবে উনি থেকে গেছেন। আর ততই উনি মটিভেশন আর স্পিচ নিয়ে নিজের ক্যারিসমা দিয়ে সব জয় করতে রওনা দিয়েছেন। প্রতিবিপ্লব বুঝাতে যান নাই।  এমনকি আমি বলে আপনি নিজেও মারা পড়তে পারেন এই ভাল-ভালাইয়াতে! ক্ষমতা ভাল-ভালাইয়ার জিনিষ নয়।

    যাই হোক, আজ “জেনারেল ওয়াকার ম্যাজিকে গণমানুষের উচ্চাশা” – এই শিরোনামে যে আর্টিকেল ছাপা হয়েছে কালেরকন্ঠ সহ বসুন্ধরা, বাংলাভিষন ও এলাইক মিডিয়াতে একযোগে এতাকে আমি মনে করি আরো ঘনিভুল হয়ে আবার দাড়ানো এক প্রতিবিপ্লবী পরিকল্পনা হিসাবে। ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা বলবেন হয়ত অনেকে।

    সরকার প্রধান হওয়া তুলনামূলক সহজ কিন্তু যদি আপনার প্রতি-বিপ্লব ঠেকানো কাজটা কী ও কেন? – এমন ধারণা নাই থেকে থাকে ?????
    তবে আপনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে নিজের জন্য, দেশের ও গণস্বার্থ রক্ষার দিক থেকে বিপদজনক! তাই আপনার উচিত এদিকটা রাষ্ট্রক্ষমতা রক্ষা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য  “উপযুক্ত” যাকে ইউনুস সাব আপনার কম্পাটাবল মনে হয়;  তাকে বিশেষ এসাইনমেন্ট ক্ষমতাপ্রাপ্ত করে দিতেই পারেন। বলাই বাহুল্য তিনি ওয়াকার সাব নন! নির্দিষ্ট সময়-অন্তে এর রিভিউ ও অগ্রগতি মনিটর মিটিংয়ের ব্যবস্থাও রাখতে পারেন।


    লেখকঃ

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com


    সবশেষ আপডেটঃ  সন্ধ্যা ০৭ঃ ৩৫,    ২৭ এপ্রিল ২০২৫

  • ‘দশ ট্রাক অস্ত্র’ নিয়ে একটা একাদেমিক আলোচনা

    কোন রাষ্ট্রে সিভিল আদালতের পাশে সামরিক আদালতও কেন থাকে
    [‘দশ ট্রাক অস্ত্র’ নিয়ে একটা একাদেমিক আলোচনা]
    গৌতম দাস
    ২১ ডিসেম্বর ২০২৪    দুপুর ১২ঃ ১৩
    https://wp.me/p1sCvy-64V

     

     

    ‘দশ ট্রাক অস্ত্র’ মামলা নিয়ে এই আলোচনা, একটা একাদেমিক পর্যায়ের সমাজতাত্বিক আলোচনা। যেমন এর প্রসঙ্গ শুরু করব, একট রাষ্ট্রে কয়টা বিচার বিভাগ থাকে? এখান থেকে!
    এমন প্রশ্ন যে কোন একাদেমিক ব্যক্তিত্ব শুনলেই তিনি বলে উঠবেন এটা তো কোন প্রশ্নই হয় নাই। কারণ, জনগণ সব রাষ্ট্রক্ষমতার উতস -এমন রিপাবলিক বা জনপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র তিনটা প্রধান অঙ্গ থাকে। (প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে) নির্বাহি বিভাগ, ২. আইন সভা বা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বমূলক আইন প্রণয়নের সংসদ আর ৩. বিচার বিভাগ। রাষ্ট্রক্ষমতার মূল অংশ থাকে নির্বাহী বিভাগের হাতে; আর সাথে কিয়দংশ থাকে বাকি দুই বিভাগের কাছে। এখন এই বিচার বিভাগ নিয়ে বিস্তারে কথা তুললে বলতে হয় এর কাঠামোটা আবার সাধারণত পিরামিড ধরনের হয়। মানে সমান্তরাল না। নিম্ন আদালতের রায় ওর চেয়ে উচ্চ আদালতে পর্যালোচনা যোগ্য বা বদলে রিভিউয়ের ক্ষমতা রাখা হয়। আর সবার উপরে থাকে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ। সেটাও আবার কয় বিচারক মিলে বেঞ্চ গঠিত এবিচারে ফুল বেঞ্চ এর উপরে আর কিছু নাই। এভাবে!
    যেহেতু যেকোন পর্যায়ের আদালতের রায় ওর উপরের আদালতের আবার পর্যালোচনাযোগ্য রাখা হয়; যার লক্ষ্য অনিচ্ছার ভুল বা অবিচার ঘটে যাবার সম্ভাবনা কমানো। এছাড়া বিচারক ভেদে একই ধরনের অপরাধে দুই ধরনের শাস্তি যেন না হয় তাই পেনাল কোড ব্যবহার করা হয় যেখানে অপরাধ ও শাস্তি দুটাই যতটা সম্ভব আগাম সংজ্ঞায়িত করে রাখা হয়; ইত্যাদি এসব খুটিনাটি অনেক দিকই আছে।  এছাড়া নিম্ন আদালতকে সুপ্রীম কোর্টের ব্যবস্থাপনার অধীনে এবং নজরদারি-তদারকিতে রাখা হয়। এসবের কারণেই বিচার ব্যবস্থাটা পিরামিড কাঠামোর হয়ে যায়।  এসব বিষয়ে আইনজ্ঞরা আরো ভাল ভাল দিক তুলে ধরতে পারবেন। এই হল একটা দেশের একক বিচার বিভাগ এবং তা পিরামিড কাঠামোর এমন বিচার বিভাগ।

    যে কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রেই মোটাদাগে উপরের এই ভাগেই রাষ্ট্রক্ষমতা বিন্যাস্ত  থাকতে দেখা যায়। কিন্তু এবার একটা ব্যতিক্রমের কথা বলব। সেটা হল এতসব কিছুর পরেও প্রত্যেক রাষ্ট্রেই আবার সিভিল আদালতের বাইরে একটা করে সামরিক আদালত (Martial Court) থাকতে দেখা যায় যেখানে, মূলত প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের কাজ-ততপরতা ও শৃঙ্খলাভঙ্গের বিষয়গুলো বিচার (court Martial) করা হয়। এবং সবচেয়ে বড় কথা এটা ঐ দেশের রাষ্ট্রীয় সিভিল বিচার বিভাগের এক্তিয়ারের বাইরে রাখা হয়। অর্থাৎ সামরিক আদালতকে পিরামিড কাঠামোর সিভিল বিচার বিভাগের ভিতরে কোথাও রাখা হয় না।  কেন?

    মূল সংজ্ঞাটা সোজাঃ
    আপনি যদি রাষ্ট্রীয় সিভিলিয়ান কর্মী হন তবে আপনি কোন সংজ্ঞায়িত অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে প্রথমে নিজ বিভাগের [জনপ্রশাসনের যে বিভাগের অধীনে কর্মচারি আপনি সেই বিভাগের জন্য গঠিত শৃঙ্খলা কমিটি] অধীনে বিচারের মুখোমুখি হতে হয় যেটাকে সংক্ষেপে অনেক মিডিয়া শুধু “বিভাগীয়” বিচার শাস্তি বলে লেখা হয়। এমনকি  কিন্তু একইভাবে আপনি যদি কোন প্রতিরক্ষাবাহিনীর সদস্য হন  অথবা ঘটনা বা অপরাধের বিষয়টা রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষাবিষয়ক হয়  সেক্ষেত্রে পুরা বিচার শাস্তির প্রক্রিয়াটাই সামরিক আদালতের এক্তিয়ারে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে।

    কিন্তু কেন?
    একটা সোজ উদাহরণ দিয়ে বলা যাক। একজন সৈনিক রাষ্ট্রের সুরক্ষা-প্রতিরক্ষার কাজ করতে গিয়ে কাউকে খুন করে ফেলেছে।  এখন এর বিচার কী সিভিল আদালত দেখবে?

    একটা হাইপথিটিক্যাল বা কল্পিত ঘটনা- মামলা নেই। পদ্মা সেতু নির্মাণের সময় সেখানে [ধরা যাক] প্রচুর ভারতীয় র-বাহিনীর ট্রেইন লোক [যারা বাংলা বলতে পারে না, ভাঙ্গাবাংলা বা হিন্দিতেই কথা বলে] তবে যারা তথ্য সংগ্রহে পারদর্শী; এদের  দিনে-রাতে এমন লোকেদের আনাগোনা ঐ এলাকায় বেড়েছে দেখা গেল! তাদের উদ্দেশ্য হল, ব্রীজ নির্মানের কনট্রাক্টর চীনা কোম্পানি এখানে আবার কী করতেছে এটা নিয়ে ইন্ডিয়ার কালো মনে সন্দেহ এর হাল করা। তাই ইন্ডিয়া রিস্ক নিয়ে হলেও এসব তথ্য সংগ্রহে পারদর্শী লোক পাঠিয়েছিল। বলাই বাহুল্য এমন ব্যক্তিদের বাংলাদেশে প্রবেশই বিরাট শাস্তিযোগ্য ও অবৈধ কাজ। এর উপর আবার  মনে রাখতে হবে, আমাদের সরকার ঐ নির্মিয়মান সেতু অঞ্চল-এলাকাকে আগে থেকেই কী-পয়েন্ট ইন্সটলেশন [Key-point instalation বা কেপিআই] বলে ঘোষণা করে রেখেছিল। এই টার্মটার সংজ্ঞা হল রাষ্ট্র যেকোন নির্মাণ-স্থাপনা-কে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য প্রতিরক্ষা পর্যায়ের গুরুত্বপুর্ণ বলে গণ্য করেছে, এমন ঘোষণা করতে পারে। তাই কেপিআই এলাকা মানে হল যা সামরিক নিয়ন্ত্রণে পাহারা এলাকা হয়ে যাবে সেটা। যেমন আপনার কোন ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রবেশ ও ততপরতা সীমিত করে দেয়া হয়। কেবল উপযুক্ত পরিচয় ও অনুমতি সাপেক্ষেই সেখানে প্রবেশ করা যায়। এককথায় ঐ এলাকাটাতে কোন বিদেশি অন্তর্ঘাতমূলক [subversive activity] কাজে বাধা ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। [subversive শব্দটা অপরিচিত শুনালেও এর অর্থ কঠিন কিছু নয়। sub মানে অধস্তন অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে অমান্য করা; নিচা বা খাটো-অধীনস্ত করে দেখা। আর এমনটা দেখে আমরা শঙ্কিত হই যে রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য ক্ষতিকর যেকোন কাজে লিপ্ত হওয়া এখানে ঘটতে পারে। ইন্ডিয়ান ‘র’-এই প্রতিষ্ঠানটা বাই-ডেফিনেশন  ইন্ডিয়ার বাইরে অন্তর্ঘাতমূলক [subversive activity] সংগঠিত করার জন্য প্রতিষ্ঠিত!
    এখান আসেন ঐ পদ্মা সেতু কেপিআই এলাকায় র-বাহিনীর ট্রেইন লোককে  সন্দেহজনক ততপরতা রোধ করতে গিয়ে আমাদের সেনাবাহিনী তাকে ধরা যাক হত্যা করে ফেলেছে। তাহলে এখন প্রশ্ন হল যেহেতু হত্যা মামলা তাহলে এটা নিয়ে কী আমাদের সিভিল আদালতে ৩০২ ধারায় মামলা রুজু করা হবে? করা যাবে?  জবাব হল, কোন মতেই হবে না। যেতে পারে না।  আবার প্রায় একই ধরনের ঘটনায় বাংলাদেশের সাথে কোন (কল্পনা করে বলছি) যুদ্ধে  আমাদের সৈনিকেরা যদি প্রতিপক্ষের সৈন্য হত্যা করে ফেলে সেক্ষেত্রেও কী ঘটনাটা হত্যার  যেহেতু তাই আমাদের সিভিল আদালতে আমাদের সেনাদের বিচার হবে? প্রশ্নই আসে না। এমন হলে আর রাষ্ট্র থাকার দরকার কী?  আমাদেরই প্রতিরক্ষা বাহিনী আমাদেরি রাষ্ট্র সুরক্ষা করতে গেছে আর আমরাই সেজন্য তাঁকে আমাদের সিভিল আদালতের মুখোমুখি করবো?????? এটা ত মাথার দোষ থাকলেও কাউকে করতে দেয়া যাবে না!

    কথা লম্বা না করে সারকথাটা বলে দেই। প্রথমত আমাদের দেশরক্ষা করতে গিয়ে আমাদের সেনাদের হাতে বিদেশি কেউ যদি আহত-নিহত হয় সেটা আমাদে সিভিল আদালতে তোলাই যাবে না। কারণ এক. ওরা বিদেশি এবং শত্রুপক্ষ বলে; মানে আমাদের দেশের নাগরিক নয় বলে। এমনকি আমাদের দেশে ভ্রমণে আসা বিদেশি ব্যক্তি  আহত-নিহত হলেও আমাদের সিভিল আদালতে এর বিচার হবে; সেটা হলেও। কারণ এদুইটা একই ধরনের ঘটনা নয়। এককথায় বাংলাদেশের ভুখন্ডে যেকোন হত্যা অপরাধ হওয়া মানেই তা আমাদের সিভিল আদালতের বিচার্য বিষয় বা এক্তিয়ারে নাও আসতে পারে।  কথাটা আরেক দিক থেকে বললে, ঘটনা যদি রাষ্ট্রের সুরক্ষা-প্রতিরক্ষাবিষয়ক হয় সেক্ষেত্রে যেমন, আমাদের একজন সৈনিক রাষ্ট্রের সুরক্ষা-প্রতিরক্ষার কাজ করতে গিয়ে কাউকে খুন করে ফেলে থাকে এটা সিভিল আদালতের এক্তিয়ারের বাইরের ঘটনা হবে। এনিয়ে যদি কিছু করতেই হবে সেটা সামরিক আদালত তাদের বিবেচনা ও এক্তিয়ার অনুসারে যা করার করবে।
    এখানে প্রুডেন্ট একটা খুব গুরুত্বপুর্ণ ধারণাঃ
    প্রুডেন্ট [Prudent]  বা বাংলায় একে বিচক্ষণ বা দুরদর্শী বলতে পারি; এখন প্রুডেন্ট জাজ  বা বিচক্ষণ বিচারক বলে  বা [juris-prudence বলে যে উপ-সাবজেক্ট ডাক্তারদেরও পড়তে হয়] একটা কথা আছে। বিচক্ষণ জাজ বলতে মূলত যে বুকিশ [bookish] নয়; মানে বইয়ে পড়া কোন ধারণা পেলেই তা সাধারণ আক্কেলজ্ঞান বা বুদ্ধিবিবেচনা ছাড়াই যে প্রয়োগ করতে যায় না! যে আইন দেখলে বা জানলেই চোখ বন্ধ করে তা প্রয়োগ করে না অথবা যেকোন মামলা তার সামনে আনলেই তিনি তা বিচারে বসে যান না।  তা না করে বরং এর সুদুর প্রসারি দিক অথবা পারিপাশ্বিক অন্যান্য বিষয়ও যিনি বিবেচনায় আনেন এরপর বিচারে বসেন তিনি প্রুডেন্ট জাজ। প্রুডেন্ট জাজ বুঝতে পারেন কোন মামলা তাঁর গ্রহণ করাই উচিত না।

    এবার আসি ‘দশ ট্রাক অস্ত্র’ মামলায়ঃ
    এবার আসি ‘দশ ট্রাক অস্ত্র’ মামলায়; সম্প্রতি (১৮ ডিসে. ২০২৪) ‘দশ ট্রাক অস্ত্র’ মামলা নিয়ে  [ডেথ রেফারেন্স বিষয়ক] এক মামলার রায় প্রকাশিত হয়েছে। বলা যায় রাজনৈতিক প্রভাবিত হয়ে  গত ১৬ বছর ধরে চলা বাংলাদেশের আদালত ব্যবস্থা চর্চা হাসিনা উতখাতের পরে এবারই প্রথম  এনিয়ে প্রথম একটা রায় দিল। অনেকের সাজা কমানো হয়েছে, অনেককে খালাস ইত্যাদি দেয়া হয়েছে নতুন রায়ে। কিন্তই সেসব দিক এখানে আলোচনার বিষয়বস্তু নয়।

    মূলত এখানে এটা একটা একাদেমিক আলোচনাঃ
    হা ঠিক তাই, এটা একটা একাদেমিক আলোচনা। সুনির্দিষ্ট কোন মামলা নিয়ে নয়। তবে বাস্তবের উদাহরণ হিসাবে ‘দশ ট্রাক অস্ত্র’ মামলাকে সময়ে রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। বলা যায় এটা একটা লিগাল-একাদেমিক [legal-academic] আলোচনা। আর অনুমান করি,  ফরমাল আদালতে পেশ করা ডকুমেন্টে খুব সম্ভবত সেখানে চোরাচালান শব্দটা আছে। [আমি নিজে দেখিনাই ফলে আমি নিশ্চিত নই।] কোন কোন মিডিয়া রিপোর্টিংয়ে শব্দটা আছে এভাবে যে “দশ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান” মামলা এটা।  আসলে এটাই এই মামলায় সব রহস্যের গোড়া!
    যেমন এর মানে কী, এটা চোরাচালানের অপরাধ? এভাবে চোরাচালান না বললে এটাকে অপ্রাধ বলা যাচ্ছে না তাই?  – ‘দশ ট্রাক অস্ত্র’ মামলা – এটা কেন মামলা হতে পারল, এখানে অপরাধ টা কী? কেন সেটা অপরাধ – এটাই এই আলোচনার বিষয়বস্তু।

    কী অপরাধ ঘটানোর জন্য এই মামলাঃ
    প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুসারে, “.….. ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল সিইউএফএল ঘাট থেকে আটক করা হয় ১০ ট্রাক ভর্তি অস্ত্রের চালান। এ নিয়ে কর্ণফুলী থানায় ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইন ও ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে চোরাচালানের অভিযোগ এনে দুটি মামলা হয়। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) পুলিশ দুটি মামলা একসঙ্গে তদন্ত করে। এর বিচারও একসঙ্গে শুরু হয়। অস্ত্র আইনে করা অন্য মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ হয় একই আসামিদের।

    সরকারী মামলা দেওয়ার ক্ষেত্রে সাথে বাড়তি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলা দেখা যাচ্ছে দেয়া হয়েছে তাহলে এর অর্থ হল, মামলাকারি সরকার পক্ষ নিশ্চিত হতে চাইছেন যে -মূল যে অভিযোগে মামলা – তা যদি কোন ত্রুটির কারণে প্রতিষ্ঠাই না করা যায় তবে তাতে যে আসামি খালাস হয়ে বের হয়ে না যায় তাই এই ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলা সাথে দিয়ে রাখা হয়েছে বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ যে মামলাটা দেয়া হয়েছে এর  মূল অপরাধ হল, অস্ত্রের চোরাচালান।  খোলাখুলি বললে অস্ত্রের চোরাচালানি মানে চোরাচালানি ব্যবসা বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে চোরাচালানি পণ্য দশ ট্রাক ভর্তি অস্ত্রপাতিকে দেখা বা গ্রহণ করা এক জিনিষ; যেটাকে আমরা অস্ত্রের চোরাচালানি কাজ বলতে পারি। কিন্তু এটা আর ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইন – এদুইটা সামঞ্জস্য নাই। কারণ অস্ত্র আইন টা লেখা হয়েছে বা এটা ডিল করে ব্যক্তি বা কিছু ব্যক্তিবর্গ যদি অস্ত্র হেফাজতে রাখে, বহণ করে, কারও উপর ব্যবহার করে এবং সর্বোপরি সেই অস্ত্রগুলো যে বিনা লাইসেন্সের হয়ে থাকে। ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইন মোটামুটি এধরণের মামলাগুলোকে ডিল করার জন্য বানান।
    দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা আর ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইন  এদুটোর মধ্যে মৌলিক ফারাক হল, প্রথমটা বাংলাদেশে বিক্রি, ব্যবহারের জন্য নয় তৃতীয় দেশে পাচার বা বিক্রির উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ এখানে চোরাচালানি পণ্যটা কী সেটার চেয়ে এটা তৃতীয় দেশে চোরাচালানি – সেটাই মুখ্য। আর একটা দিক হল, এই অস্ত্র বাংলাদেশে বিক্রি বা ব্যবহার এর উদ্দেশ্য নয়। সোজাকথায় এই মোটিভ-গুলোই আসলে বলছে এই মামলা ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইন এর অপরাধ হিসাবে পড়ে বা সামলানো বা কাভার করার যায় এমন নয়।  কারণ, অস্ত্রের চোরাচালান সামলানীর জন্য ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইন রচনা করা হয় নাই।

    অস্ত্রের চোরাচালান সামলানীর জন্য ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইন রচনা করা হয় নাই।

    এটা এই আইনি দুর্বলতার কথা, মামলাদাতা সরকার ও সরকারি লোকেরা জানতেন তা বুঝাই যায়। সেজন্যই কী চোরাচালান শব্দটা জুড়ে দিয়েছেন? কিন্তু দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা কী শ্রেফ একটা চোরাচালানি মামলা?
    এমনিতেই “চোরাচালানী রোধে” – সুনির্দিষ্ট করে অস্ত্রের চোরাচালিনী – এবং তাও আবার বাল্ক [bulk] মানে পাইকারি চোরাচালানির বিরুদ্ধে কোন আইনের কথা আমরা জানি না। সারকথায় দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইন দিয়ে কাভার করার দিক থেকে খুবই ছোট। কারণ, এটা পাড়ার একটা ছেলে কয়েকটা পিস্তল কিনে এসেছে বিদেশ থেকে তেমন ঘটনা বা মামলা নয়।
    আর এটা সরকার বা মামলাকারিদের কর্তাদের না জানার কথা না।  তাহলে সমস্যাটা কোথায়???

     

    কী ধরনের আইনি মামলা এটা তা সাব্যস্ত করতে মূল সমস্যাটা কোথায়ঃ
    এটাই হল মূল রহস্য।
    দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা – এটা মূলত রাষ্ট্রের সুরক্ষা-নিরাপত্তা [State Security] সংক্রান্ত মামলা। এটা  সেসময়ের সরকার ও সরকারী কর্তারা সকলেই জানতেন। এটা বুঝতে পারা কঠিন কিছু নয় যে এই অস্ত্র আনার মোটিভ বাংলাদেশে এর বিতরণ একেবারেই নয়। বাংলাদেশের বাইরে কোন বিচ্ছিন্নতাবাদি রাজনৈতিক গোষ্ঠির হাতে পাঠানোর জন্যই তা আনা হয়েছিল। যেটা সরাসরি বাংলাদেশের রাষ্ট্রস্বার্থ, এর  সুরক্ষা-নিরাপত্তা [State Security] হতে পারে এবং সেসুত্রে কিছুটা তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবমিলিয়ে এসব অর্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা ইস্যু। অতএব এই মামলা বাংলাদেশের সিভিল আদালতে তোলার মত কোন মামলাই নয়। আর এনিয়ে যদি কোন ক্রিমিনাল অপরাধ হয়েছে বলে মনে হয় তবে সেটা আমাদের  সামরিক আদালতই দেখবে আর সেটাই এর সঠিক এক্তিয়ার হত। অথচ ইন্ডিয়া হাসিনাকে ক্ষমতায় বসানোর গ্যারান্টার তাই পুরা মামলাটাকেই সিভিল আদালতে ফেলা হয়েছে। যাতে ইচ্ছা মত এটাতে মোচড় দেয়া যায়!

    অথচ যেখানে এই মামলায় অপরাধ টা আসলে কী? এর সদুত্তর নাই। 

    অথচ যেখানে এই মামলায় অপরাধ টা আসলে কী? এর সদুত্তর নাই।  রাষ্ট্র যেখানে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের প্রয়োজনে দেশের বাইরে আরেক স্থানে অস্ত্র পৌছে দিতে কী পারবে না??? এটাকে অপরাধ হিসাবে সিভিল আদালত দেখবে কোন এক্তিয়ারে? অস্ত্রের চোরাচালান মানে কী চারপাঁচটা পিস্তল নিয়ে এসে নিজ রাজধানী শহরে গুন্ডামি করতে দেয়া  – এটা কী এমন কোন মামলা???

    বাস্তবতা হল, পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদি আন্দোলন আছে আর তাতে ইন্ডিয়া সহায়তা করে থাকে বহু যুগ থেকেই। পাকিস্তানও এর পালটা সেই পাকিস্তান আমল থেকে ভারতের নর্থ-ইস্টে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনগুলোকে সহায়তা দিয়ে থাকে! পাকিস্তানে চীনের [৪০ বিলিয়নের উপরে বিনিয়োগ] গোয়াদর প্রকল্প চলছে যার অনেক অংশ চালুও হয়ে গেছে। সেখানে চীনা উইঘুর সন্ত্রাসবাদীদেরকে দিয়ে প্রশ্রয় দিতে হামলা করিয়ে ১৩ জন চিনা ইঞ্জিনিয়ার মেরে ফেলা হয়েছে। যার পিছন থেকে সহায়তা করেছে আমেরিকা ও ইন্ডিয়া !!! এই হল অভিযোগ।  সারকথায় পরস্পর শ্ত্রুদেশ পরস্পরের দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠিওগুলোকে সহায়তা করার টিট ফত টেট ধরনের ততপরতা এগুলা।

    এগুলো সিভিল আদালতে বিচার্য বিষয়ক মামলাই নয়ঃ
    তাই মূলত এগুলো সিভিল আদালতে তুলে বিচার্য বিষয়ক মামলাই নয়। রাষ্ট্রস্বার্থে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা-নিরাপত্তা [State Security] সংক্রান্ত ঘটনাবলী এগুলো।  রাষ্ট্র সেকাজে কী নীতি নিবে তা সিভিল আদালতের এক্তিয়ার হতেই পারে না। এই গভীর বিবেচনা এতটুকু প্রুডেন্ট বিচারক তার মানে কী আমাদের নাই???? কারও এই পয়েন্টা মাথাতেই এলো না যে এগুলো কী সিভিল আদালতে তোলার মত মামলা??

    ঠিক যেমন ইন্দির গান্ধীকে ১৯৭৫ সালে আমাদের পাহাড়ীদেরকে আমাদের সরকারের বিরুদ্ধে ট্রেনিং দিয়ে অস্ত্র হাতে বাংলাদেশে উস্কানি দেয় নাই। শেখ মুজিব মরার পরে কাদের সিদ্দিকীর বাহিনীকে ট্রেনিং-অস্ত্র দিয়ে ইন্দিরা কী বাংলাদেশে [subversive activity] তে আমাদের পাবলিক যাত্রী-রেলের পাতি তুলে নিতে পাঠায় নাই? তখন এই আদালত এর মুরুব্বিরা  কোথায় ছিল? তার কিইবা করার ছিল? কী প্রতিকার করেছিল? তারা দেখে নাই শুনে নাই এসব ইতিহাস?

    কাজেই আমাদের আবেদন আমাদের আদালত অন্তত একটু প্রুডেন্ট হোক, সেই চর্চায় আলোকপাত করুক!

    আবার আরেকটা হতে পারে যেমন,   পররাষ্ট্রনীতিতে যেমন ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ একমতের একটা চুক্তি করল, যে তারা একে অপরের দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে সহায়তা কার করবে না। কিন্তু সেক্ষেত্রেও লক্ষ্যনীয় এটাও আদালতের ইস্যুই নয়।

    কাজেই আদালত প্রুডেন্ট হলেই সেটা বাস্তবে মহামান্য আদালত হয়ে উঠতে পারে!!!

    এসব বিবেচনা থেকে এসপ্তাহের রায়ে প্রকাশিত বিচার রিভিউটাতে যদি পুরা  (দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা) মামলাটাই খারিজ করে দিতে পারত তবে সেটা বোধহয় বুদ্ধিমানের কাজ হত। নইলে যেমন ধরেন,  এধরণের কাজ তো ভবিষ্যতে আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থে করতে হতেও পারে। তখন কী তেমন উতসাহী সাহসী সৈনিকদের কে কী আমরা পাবো??? এখন সেসব কাজের জন্য আমাদের সৈনিকদেরকে যদি সিভিল জেল খাটতে হয় এটা তো খারাপ উদাহরণ, আত্মঘাতি!  সাহসী সৈনিক গড়তে কী কষ্ট তা আমাদের অনুমান করা কী কঠিন?? সেখানে আময়ার এক ডিসকারেজিং উদাহরণ রেখে দিচ্ছি!!! তাই না কী? এই মামলায় অনেক গোয়েন্দা বিভাগের সিনিয়ার অফিসারকেও জেল খাটতে হয়েছে। এটা কাউন্টার প্রডাকটিভ। যদিও এমন প্রধান অফিসারও আছেন যারা অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হয়ে এই তথ্য সংশ্লিষ্ট দেশে পাচার করে হারাম-আয় করেছেন। সেটা যতটুকু সত্যি-মিথ্যা যাই হোক, এসবও দেখা সামরিক আদালতের এক্তিয়ার!

    আমরা কী সবাই যার যার স্তরে একটু প্রুডেন্ট হতে পারিনা, পারবোনা কেন!! এই দেশটা তো আমাদেরই!!!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ  দুপুর ০২ঃ ০৭   ২১ ডিসেম্বর ২০২৪

     

  • বার্মা নিয়ে আমেরিকান বোকা পরিকল্পনায় উলটা, সব নিয়ন্ত্রণ এখন চীনের হাতে উঠার পথে

    বার্মা নিয়ে আমেরিকান বোকা পরিকল্পনায় উলটা,
    এখন সব নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে উঠার পথে
    গৌতম দাস
    ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা ১৭ঃ ৪৮
    https://wp.me/p1sCvy-5mC

     

    China success, Western failure in revolutionary Myanmar

     

     

    বর্তমানের বার্মা নিয়ে বিশেষ করে তার “সীমান্ত যুদ্ধ” নিয়ে অজানা আশঙ্কা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে।  যদিও এটা দুই দেশ বার্রমা ও বাংলাদেশের মধ্যে – “সীমান্তে ঘটা কোন যুদ্ধ”- নয়। বরং একই বার্মার সেনা সরকার আর বিদ্রোহী এথনিক (ethnic) গোষ্ঠির যুদ্ধ। কিন্তু ঘটনাস্থল যেহেতু বাংলাদেশ-বার্মা সীমান্ত আর সেনা সরকারের বাহিনী বলতে তারা কার্যত বার্মার সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিজিপি বা Border Guard Police) ফলে, “বিজিপি বনাম বিদ্রোহী গোষ্টির” যুদ্ধের গোলা কখনও কখনও বাংলাদেশে এসে পড়ছে। আর এটাই সীমান্ত সংলগ্ন বাংলাদেশিদের জনজীবনকে মারাত্মক আতঙ্কিত করছে। এতে এলাকার বাংলাদেশি প্রশাসন বাসিন্দাদের সরিয়ে নিরাপদ দুরত্বে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেটা সঠিক সিদ্ধান্ত।

    বার্মা কী আর, কোথা থেকে এখানে, এর পিছনের পটভুমি নিয়ে কিছু কথাঃ
    বার্মার পিছনের পটভুমির দিক নিয়ে অল্প কথায় বললে, প্রথমত, বার্মা কখনও জনগণের ক্ষমতার উপর দাঁড়ানো অন্তত মুখে বা কনষ্টিটিউশনে লিখে স্বীকার করা অর্থেও কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র করা হয় নাই, ছিল না আর এখনও নয়। রিপাবলিক বলতে বুঝায় যে, ঐদেশের শাসনক্ষমতা (ruler) যখন স্বীকার করে নেয় যে তার ক্ষমতার উতস একমাত্র জনগণ; মানে ঐ দেশের বাসিন্দা-পাবলিকেরা নিজ দেশের শাসকদেরকে একটা শাসন ব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্যে (গণভোটে বা জনপ্রতিনিধিত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে)  রায়-ম্যান্ডেট দিয়েছে। আবার এই শাসকেরা রাজা-বাদশা নয় অথবা রাজা-বাদশার উত্তরাধিকার সুত্র তারা নিজেদের রাজা বলে দাবী করছে না।  এই অর্থে বার্মা কখনই কোন রিপাবলিক নয়। এমনকি দেশের নামেও রিপাবলিক শব্দটা নাই; তাহলে বার্মা কী এর সবই অস্পষ্ট। তাই বার্মার শাসক বলতে আসলে, এখানে মূল ক্ষমতাটা এক ধরণের মিলিটারীদের একটা ক্লাবের হাতে যাদের উপরে কেউ নাই; আর তারাই দেশটাই মালিক ও ক্ষমতাধারী। এভাবেই এটা চলে আসছে অং সান সুচি এর বাবাদের [আমরা যে নামে চিনি এই “সু চি” এর বাবার নাম অং সান (Aung San)] আমল থেকে।
    কেন এরকম? এর মৌলিক কারণ হল বার্মা দেশের বাসিন্দাদের মেন্টর (Mentor) [মানে যাদের চিন্তা অনুসরণে বা প্রভাবিত হয়ে] – বার্মার এই মেন্টর কারা ছিল সেটা বুঝতে হবে আগে। যেমন, আমাদের উপর মেন্টর – প্রভাবক ভুমিকা যদি বৃটিশ কলোনিদখলদার বা ভারতের উপর বৃটিশদের রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা-কে বলি তবে বার্মার মেন্টর হল সেকালের রাজতন্ত্রী জাপান। যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) এশিয়ায় হিটলারের সহযোগী একমাত্র শাসক ছিল জাপান আর সে জাপান তখনও সম্রাট শাসিত ছিল। অর্থাৎ বিশ্বযুদ্ধে দুপক্ষের প্রধান রাষ্ট্রগুলো সকলেই রিপাবলিক হলেও জাপান ছিল এক ব্যতিক্রম – ছিল সম্রাটের সাম্রাজ্য। একারণে, এখনও জাপান রাষ্ট্রের নাম কি – তা খুঁজে দেখলে সেই আনুষ্ঠানিক নামে কোন রিপাবলিক শব্দ নাই। এর বদলে সব জায়গায় ‘ইউনিয়ন’ বলে একটা শব্দ আছে যার আবার সুনির্দিষ্ট অর্থ নাই। অর্থাত পাবলিক বা জনগণের ক্ষমতা বলে বা বুঝায় – এমন কোন ধারণা ইঙ্গিতও নাই।

    বৃটিশেরা ভারতের মতই বার্মা দখল ও কলোনি করেছিল ১৮২৪ সালে। কিন্তু এই দখলি বার্মা-কে তারা ভারতের সাথে মাখিয়েই শাসন করে গেছিল। যেমন দখলি-বার্মা ভুখন্ড যেন ভারতেরই আরেকটা প্রদেশ এভাবেই তারা শাওন শুরু করেছিল। তবে এনিয়ে তরুণ বার্মীজদের মনে চরম অসন্তুষ্টি টের পেয়ে গত ১৯৩৭ সালের এপ্রিলে প্রথম  বৃটিশ-ভারত বর্মাকে ভারত থেকে আলাদা করে বৃটিশদের কলোনি শাসন কায়েম করেছিল। অর্থাৎ এর আগে পর্যন্ত বৃটিশ-ভারতেরই আরেকটা প্রদেশ যেন বার্মা – এভাবেই বৃটিশেরা বার্মা শাসন করে গিয়েছিল।  আর চলমান ব্যাপক এই ক্ষোভে বিক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালয় তরুণদের মধ্যে থেকে নানা ঘটনাবলী শেষে একপর্যায়ে প্রথমে এদের ত্রিশজনকে (যারা বার্মার শাসকদের ভয়ে তখন থাইল্যান্ডে পালিয়ে ছিল) –  এদের জাপানে নিয়ে ট্রেনিং দিয়েছিল জাপানের রাজতন্ত্রী সরকার। এই ত্রিশজনের একজন হলেন সু চির বাবা। কিন্তু তাদের ঐ ট্রেনিংয়ের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা বা খারাপ দিকটা হল, বৃটিশ শাসকের বিরুদ্ধে যারা এই ট্রেনিং দিয়েছিল তারা রাজতন্ত্রী। তাই এই ট্রেনিং কোন রাজনৈতিক ট্রেনিং ছিল না। কোন মনার্কি [monarchy] বা রাজা-বাদশার দেশে রাজনীতি ধারণা বা রাজনৈতিক দল ভোট ইত্যাদি কিছুই থাকে না। রাজার দেশে প্রজারা স্বাধীন ব্যক্তি নয়। প্রজা মানেই তো অধীনস্ত [sub-ordinate] মানেই সে স্বাধীন সত্বা নয়। তাই সমাজে স্বাধীন ব্যক্তি ধারণা ও ব্যক্তি ধারণা উত্থান এর ধারণা আসা খুবই গুরুত্বপুর্ণ! একেবারে পুর্বশর্তের মত জরুরি।   রাজনীতিটাই বাদ দিয়ে সামরিক ট্রেনিং মাত্র; যা মারধর, গোলাগুলি আর টর্চার কিভাবে করতে হয় এসব শিখা সর্বস্ব! অথচ ঐ ত্রিশজন ট্রেইন্ড তরুণই একাল পর্যন্ত বার্মার শাসন ক্ষমতা ও কাঠামো যা হয়েছে সবকিছুর উদগাতা, কিন্তু যারা “রাজনীতি” বলতে কি তা জানে নাই একারণেই পরবর্তিতে এটা আর্মির একটা ক্লাব ছাড়া আর কিছুতে গিয়ে পৌছাতে পারে নাই। এই ত্রিশজনই তাই হয়ে উঠেছিল বার্মার সকল ক্ষমতার উৎস এবং শাসক। এটাই ১৯৪২ সালে বৃটিশ ইন্ডিয়ার সাথে লড়াই করে শাসক বৃটিশদেরকে পরাজিত করে (তবে জাপানের কোলে বসে) নিজেরা বার্মাকে স্বাধীন করেছে বলে ক্রেডিট নিত। ১৯৪৮ সালে ভারতের মত বার্মাও বৃটিশ কলোনি-শাসকেরা ত্যাগ করে চলে যায়। আর শুরু হয় “স্বাধীন বার্মায়” ঐ ত্রিশ জনের শাসন। যারা এরপর মূল দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায় কেউ সামরিক বাহিনীতে কেউ রাজনীতিতে রাজনৈতিক শাসক – এভাবে। এতে শাসন ব্যররথতার জন্য একে অপরকে দায়ী করতে থাকে। যা সমাপ্ত হয়  যখন ১৯৬২ সালের শেষ নির্বাচনের পরে ঐ মিলিটারি অংশটাই জেনারেল নে উইনের নেতৃত্বে সব ক্ষমতা দখল করে বসেছিল। এসবের উত্তরসুরি আজকের ক্ষমতাসীন সামরিক ক্লাব। তবে নে উইন সেকালে নিজেকে সোভিয়েত কমিউনিস্ট ধারার কমিউনিস্ট বলে পরিচয় দিতেন।

    অন্যদিকে, এথনিক (ethnic)-জাত বিভক্তি বার্মাতে মারাত্মক। মূল এথনিক গোষ্টি বর্মীরা [Bamar (68%)] আর বাকিদের মধ্যে আবার তুলনায় সংখ্যায় বড় এমন আরও সাতটা [The eight ‘official’ groups are the Bamar (68%), Chin (2.5%), Kachin (1.5%), Karen (7%), Kayah (1.83%), Mon (2%), Rakhine (4%) and Shan (9%).] – এভাবে এথনিক জাত গোষ্ঠির কথা আলোচিত হয়, এরা এই সাত জনগোষ্ঠি সকলেই বর্মীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহী যোদ্ধা।   মনে রাখতে হবে এতসব জাত-বিভক্তি সত্বেও এর একমাত্র সমাধান হল – কেবল রাজনীতিই পারে সকল এথনিক পক্ষকেই সাথে নিয়ে একটা রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা (রিপাবলিক) কায়েম করে সকলে সমান অধিকার বসবাস করা। কিন্তু  এটাই স্বাধীন বার্মার জন্মের আগে থেকেই অনুপস্থিত। শাসক বর্মী বা বামার-রা বার্মা নাম বদলে মায়ানমার রেখেছিল সাধু সাজতে; কিন্তু তা লোক দেখানি ছিল বলে অন্য এথনিক কেউ আমল করে নাই।
    গত ১৯৮৯ সালে নে উইনের শাসনও ক্ষমতাচ্যুত হয়, ক্ষমতা নেয় সাত-আট বর্মী জেনারেলদের একটা গোষ্ঠি; কিন্তু জাতিসংঘের অবরোধ আরোপে সেই সরকারও দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু সীমান্ত আছে বলে একমাত্র চীনই হয়ে যায় বার্মার সাথে বাকি দুনিয়ার যোগাযোগের মাধ্যম; ইনফরমাল চোরাচালানি টাইপের ‘বাণিজ্য সম্পর্ক’ শুরু হয়েছিল সেই থেকে। পরে ২০০৭ সালে ভারতের কূটবুদ্ধি-পরামর্শে দুতয়ালিতে আমেরিকা-ইউরোপ-পশ্চিমারা চীনের পাশাপাশি তারাও বার্মার মাখন খেতে এগিয়ে আসে। যার দলিল হল ২০০৮ সালের কথিত কনষ্টিটিউশন মানে সামরিক ক্ষমতাকে স্বীকৃতি (উদ্ভট ভাবে, আর্মি প্রতিনিধিরাও সংসদে ২৫% হয়ে বসবে) দিয়ে এক কনষ্টিটিউশন। এছাড়া বাইরে দেখাবে সুচি কে  যেন  তিনি সিভিল-শাসন বলে তারা সাইনবোর্ড হিসাবে রাখবে। ভারতের কূটবুদ্ধি-পরামর্শ এত তীব্র হয়ে উঠেছিল যে জেনারেলেরা এই প্ররোচনায় ইসলামবিদ্বেষী হয়ে রোহিঙ্গাদের ২০১৭ সালে মেরেধরে দেশত্যাগ করতে, বাংলাদেশে যেতে বাধ্য করেছিল। মজার কথা হল, তখন আমেরিকা, চীন, ভারত, ইউ ইত্যাদি কেউই শাসক জেনারেলদেরকে দায়ী বা দোষারোপ করে নাই। সকলেই কথিত এক আরসা (ARSA) বাহিনীকে এদের উপর দোষ চাপিয়েছিল। কারণ, বর্মি জেনারেলেরা ওসব (আমেরিকা, চীন, ভারত, ইউ ইত্যাদি) সকল-বিদেশিকেই নানান ব্যবসা বিতরণ করে দিচ্ছিল। যেটা কেউই হারাতে চায় নাই। ফলে কোন বার্মা এক্ট বা গণতন্ত্র-মানবাধিকারের কথা কারই মনে ছিল না।  কিন্তু সেটাও অচল হয়ে পড়ে ২০২০ সালের নির্বাচনের পরে, আর্মি আবার সব ভেঙ্গে দিয়ে নিজের হাতে সব ক্ষমতা নেয়।

    এবার চলতি ঘটনার দিকেঃ   
    বার্মা নানান কারণে এক অদ্ভুত জায়গা ও পরিস্থিতি। চীন বার্মায় একই সাথে সেনা সরকার এবং বিদ্রোহী এথনিক গোষ্ঠিগুলার সাথে ‘ঘনিষ্ট’ সম্পর্ক রেখে চলতে পারে। সেনা সরকার আপত্তি করে না। এমন খুব কম দেশই পাওয়া যাবে বা নাই। মানে জেনারেলদের এতই চীনকে দরকার যে বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলার অস্ত্রের উৎসও চীন অবলীলায় হতে পারে। তবে এতদিন চীন কোনপক্ষকেই একে-অন্যের উপর চড়াও হয়ে উঠতে দেয় নাই, ভারসাম্য বজায় চলতে বাধ্য করে রাখতে পেরেছিল। এটাই চীনের বর্মীজ সেনা ও বিদ্রোহীদের মধ্যে যেন একটা লাইন টেনে, বিবদমান প্রত্যেকের সীমারেখা বাতলে দিয়ে আর তাতে চীন নিজেই এক ভারসাম্য শাসক হয়ে দুপক্ষের উপর দাঁড়িয়ে থাকা শুরু হয়েছিল।  তবে মোটামুটি গত (২০২৩) ডিসেম্বরকে টার্গেট করে চীন এই ভারসাম্যটা ভেঙ্গে জেনারেলকে নিচে বা কোনঠসা করে বিদ্রোহীদেরকে চড়াও হয়ে উঠতে এলাও করেছে। কিন্তু সেটা কেন?

    আমেরিকার বার্মা এক্টঃ
    চীনের এমন আগের ভারসাম্য কিছুটা ভেঙ্গে আবার নয়াভিত্তিতে আরেক ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে ততপর হবার পিছনের কারণ আমেরিকার কথিত বার্মা এক্ট।  বাইডেনের আমেরিকার সমস্যা হল, মুরোদ থাক আর নাই থাক সবকিছু আগেই লেড়েচেড়ে আউলা করে দিতে হবে – এই নীতিরই এক ফসল হল বার্মা এক্ট। যতদুর আন্দাজ করা যায় মোটা দাগে এতে আমেরিকান পরিকল্পনাটা হল, বার্মায় দখল দেয়া মানে জেনারেলদের পতন ঘটিয়ে যেন সামরিক ক্যু হয়েছে এমনভাবে পছন্দের জেনারেল বসিয়ে তা করা। আর এর সাফাই হিসাবে বার্মায় গণতন্ত্র-ও-মানবাধিকার আনবেন বাইডেন, এর নামই বার্মা এক্ট!  ব্যাপারটা সামরিক আবার আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে আমেরিকা নিজ মেরিন বার্মার মাটিতে নামাবে না, কেবল এরিয়াল (arial) কভার মানে আকাশপথে কাউকে উড়তেই দিবে না – যাতে বার্মার কোন উড়োজাহাজই মাটি ছেড়ে ডানা না মেলতে পারে। আর বাংলাদেশের পদাতিক ব্যবহার করবে আমেরিকান মেরিনের জায়গায়।  আবার বাংলাদেশের পদাতিক মুভ করাতে চাইলে আগে আমাদের  সরকারের উপর দখল লাগবে। তাইবাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নামে বিরোধিরা বিজয়ী হতে পারলে এর সুবিধার উপর ভর করে তাতে “বাইরের” সুবিধাটা (মানে যেমন বার্মা দখল) আমেরিকা পেত। কিন্তু আগেই বলেছি আমেরিকান মুরোদের খবর নাই! তাই সবকিছু লেড়েচেড়ে আউলিয়ে সবাইকে পথে নামিয়ে ভন্ডুল করে – পুরানা সব ভারসাম্য নষ্ট করে এখন বাইডেন পলাইছে শুধু না। হাসিনাকে ‘ব্যক্তিগত’ চিঠি লিখতেছে।

    যদিও বিষয়গুলো এত সহজ নয়। পুরানা ভারসাম্য ভাঙ্গার একটা খেসারত তো থাকবেই। মোটামুটি গত ডিসেম্বর ছিল বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা – অন্তত চীনের ক্যালকুলেশন এটাই ছিল। এভাবে মার্ক করে চীনও আমেরিকান বার্মা এক্টকে মোকাবিলার নিজ পরিকল্পনা সাজাইয়েছিল। অর্থাৎ চীনের দিক থেকেও ডিসেম্বর ছিল টার্গেট; তবে তা ঠিক বাংলাদেশ নিয়ে নয় ভিন্ন অর্থে মানে, বার্মাকে নিয়ে। এইযা ভিন্নতা!

    বার্মায় কী ঘটছে এর একটা সোর্স এশিয়া টাইমসঃ
    এশিয়ান টাইমস এটা হংকং থেকে প্রকাশিত একটা সমৃদ্ধ ওয়েব ম্যাগাজিন। এটাকে এটাকে সম্ভবত এশিয়ার “ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল” বললে অত্যক্তু হবে না। অর্থাৎ নিউইয়র্কের আদি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল যেমন বাবা গ্লোবাল পুঁজি বাজার যদি ধরি তবে চীন -কেন্দ্রিক নয়া এশিয়ান পুঁজি বাজার তৈরি হয়েছে হংকং-সিঙ্গাপুর কেন্দ্রিক; আর এসবকে কেন্দ্র করে জর্নাল-টা হল এশিয়ান টাইমস। যার আবার ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস বলে আলাদা পত্রিকা হয়েছে, সাথে আরো একটা। প্রায় আটজনের একটা গ্রুপ যাদের ওয়াল স্ট্রিটে মিডিয়ায় কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তারাই মূলক এই পত্রিকাটা চালায়। এদের উপর ভর করে আবার একদল পলিটিক্যাল এনালিস্ট গড়ে উঠেছে বার্মাসহ আশিয়ান জোট এলাকার রাজনৈতিক ঘটনাবলীতে কাজ করা যাদের এলাকা। এদের একজন হল ডেভিড স্কট ম্যাথুসন [DAVID SCOTT MATHIESON]; যিনি নিজের পরিচয় লেখেন – an independent analyst working on conflict, humanitarian and human rights issues – এভাবে। এসব ততপরতা গুলোকে বলা যায় গ্লোবাল নেতা আমেরিকা-পরবর্তিতে এশিয়ায় কী হতে যাচ্ছে এরই রিপোর্টার এনাস্লিস্ট হচ্ছেন এরা।
    সেই ডেভিড স্কট বর্তমান বার্মার পরিস্থিতি নিয়ে নিএই দুখানা এনালাইটিক্যাল রিপোর্ট ছেপেছেন। আর একই সাথে নিউইয়র্ক টাইমসে ছাপা হওয়া একটা রিপোর্টের রেফারেন্স দিয়েছেন যেটা আসলে আমেরিকান প্ররোচনায় বিদেশে গঠন করা জান্তাবিরোধী সু চির সরকার এর করুন হাল নিয়ে লেখা রিপোর্ট। আনুষ্ঠানিকভাবে সু চুদের সরকারকে আমেরিকার নিজের মত করে সাজিয়ে নেয়া National Unity Government of Myanmar বা সংক্ষেপে NUG বলে ডাকা হয়।  যাদের অবস্থা হল বাংলাদেশে এখনকার বাংলাদেশি বিরোধীদলের মত যারা হাসিনা পতন বা নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েও পুরানা গান-ই গাইছে। এই অবস্থাকে বুঝাতে ইংরাজিতে শব্দটা হল এবানডান (abandon) বা পরিত্যক্ত বলতে যা বুঝায়! তো বাইডেনের আমেরিকান পরিত্যক্ত আমাদের বিরোধীদলের মতই, সু চিদের NUG সরকারের অবস্থা। নিউইয়র্ক টাইমসে ছাপা হওয়া সেই করুণ রিপোর্টও দেখতে পারেন এখানে।  এদেরকেই বাইডেন তার বার্মা এক্টের খোরাক বা কথিত হবু সরকার বানাতে চেয়েছিল, আর তাদের অবস্থা আমাদের বিরোধীদলের মত!!!

    বার্মা এক্টকে মোকাবিলার চীনা নিজ পরিকল্পনাঃ
    চীনের দিক থেকে নিজ পাল্টা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আমেরিকার নিজেরটার চেয়ে তুলনামূলক অনেক সহজ ছিল। এর মূল কারণ, আগে দীর্ঘদিন থেকেই  বর্মার সেনা সরকার আর বিদ্রোহী – এভাবে দুপক্ষের উপরই চীনা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই ছিল। মানে যদি বার্মার ভিতরের তিনটা পক্ষ আছে ধরলে, এর একটা হল জেনারেলদের জান্তা সেনা সরকার; দুই হল, সাত-আটটা এথনিক-জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্টি যারা আবার এখন চীনের প্ররোচনায় ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স নামে একত্রিত হয়েছে। নয়া পরিস্থিতিতেও জেনারেলেরা আর ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স দুইটাই এখনো চীনের নিয়ন্ত্রণে। আর তৃতীয় পক্ষটা হচ্ছে কেবল আমেরিকার নিয়ন্ত্রণের সু চিদের NUG। যেটারই এখন পরিত্যক্ত অবস্থা!
    আর  এবারের চীনা পরিকল্পনা ছিল জেনারেলদের হাতটা ধরেই রাখা কিন্তু এবার একটু ঢিলা করে ধরা যাতে বিদ্রোহীরা একটু আপার হ্যান্ড পায়। এতে যদিও আগের ভারসাম্য মানে জেনারেল আর বিদ্রোহীরা আগে প্রত্যেকে যে সীমারেখার মেনে চলার মধ্যে দিয়ে ভারসাম্য তৈরি করে বসবাস করছিল  – সেটাই এখন চীন ভেঙ্গে দিতে চাচ্ছে। আর তা দিলে চীনের স্বার্থের এতে কোন ক্ষতি হবে না কেন? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজব। মানে জেনারেলেরা এতে বিগড়ে গিয়ে চীনবিরোধী হয়ে যায় যদি? চাইকি আমেরিকার হাত ধরে ফেলে যদি?

    জবাব হল, চীন জানতে এমন দুটাই অসম্ভব। কারণ জেনারেলদের চীনবিরোধী হওয়া মানে কি ভারত? নাকি রাশিয়া বা খোদ আমেরিকার হাতধরা? না, এমন প্রত্যেকটাই বাস্তবে অসম্ভব।  চীনবিরোধী হয়ে রাশিয়া একচুলও অন্যদিকে যাবে না। আর আমেরিকা? আগেই বলেছি বাইডেনের যতই “বার্মা এক্ট” থাকুক বা সু চিদের NUG  থাকুক এই আমেরিকা তো এখন বাংলাদেশ ছেড়েই ভেগে গেছে কাজেই – মানে বাংলাদেশ থেকে সামরিক সহায়তা পাবার বাস্তবতাই আউলায়ে গেছে – আর এতে আমেরিকা তার বার্মা এক্টও এখন কিছু ছেড়া কাগজ মাত্র- মুরোদহীন। আর এতদিন আমেরিকা তো এই জেনারেলদের বিরুদ্ধেই হম্বিতম্বি করে গেছিল। ফলে সেই জেনারেলেরা এখন চীনের উপর ক্ষেপে গিয়ে বাইডেনের হাত ধরার কোন বাস্তবতাই নাই। আবার আমেরিকা বার্মার ঠিক কার হাত ধরার কথা ভেবেছিল জেনারেলেরা নাকি সু চিদের NUG দের??? অবশ্যই সেটা সু চিদের NUG। মানে জেনারেলদের ভাগ্যে আমেরিকান দীয়া-আশীর্বাদের কোন সুযোগই ছিল নাই, ছিলই না।  আর এখন তো বাইডেন নিজেই পরিত্যক্ত।  আর ওদিকে ভারতও এসবের ভিতর উল্লেখ-অযোগ্য। কারণ এর না আছে অর্থনৈতিক বা সামরিক সক্ষমতা। পারে কেবল কূটকাচালি বা প্যাচ-লাগানি। যেটাও এখানে সম্ভব না; যদিও ভারতের হম্বিতম্বি আছে সেকথায় শেষে যাবো! তবে সেটাও কারও ঘাড়ে চড়ে করতে চাইবে ভারত আর এটাই সম্হভবত হাসিনা সরকার!! আর মনে রাখতে হবে আমেরিকান বার্মা এক্ট পরিকল্পনা তো ভারতেরও স্বার্থবিরোধী করে সাজানো ছিল।
    কাজেই চীনের দিক থেকে জেনারেলদের হাত হাল্কা করে ধরার এটাই ছিল পারফেক্ট টাইম। কারণ তারা তবু চীনকে ছেড়ে কোথাও যাবার জায়গা নাই। সেজন্যই শুরুতেই যেটা বলেছি, বার্মীজ সেনা সরকারের উপর বিদ্রোহীদের চড়াও হতে দেওয়াটা আসলে চীনা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। যার দুচারটা গোলা বাংলাদেশে এসে পড়ছে। চীনা পরিকল্পনায় বাংলাদেশে সম্ভাব্য সরকার বদলের সময়কাল ছিল ডিসেম্বর-কেন্দ্রিক। তাই জেনারেলদের উপর বিদ্রোহীদের সওয়ার হওয়ার টাইমিং-টা ছিল সে-মোতাবেক !
    তাই বার্মা এক্ট সফল করতে হাসিনাকে সরাতে আমেরিকার এগিয়ে আসার আগেই সেক্ষেত্রে বাইডেন দেখত বার্মা বিদ্রোহীদের ক্ষমতায় কিন্তু জেনারেলরাই নাই, উধাও! কিন্তু এখন বাইডেনের পলায়ন ঘটে যাওয়াতে এতে নিট কিছু লাভ হতে পারে জেনারেলদের। তারা আয়ু পাবে। কিন্তু আরও অনেক পরে।

    এবার আবার ডেভিড স্কটের রিপোর্ট থেকে এনিয়ে তার বক্তব্য তুলে আনব।
    তিনি বলছেন, একটা ভুল আশা ছড়িয়ে পড়েছিল যে থাইল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনের মতো মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র। পুরা বক্তব্যটাই নিচে কোট করে দিয়েছে। ডেভিড স্কটের রিপোর্ট এর মূল লেখাটার শিরোনাম হল, China success, Western failure in revolutionary Myanmar এখানে। যার বাংলা অনুবাদ ছেপেছিল প্রথম আলো। আমি সেই অনুবাদের লিঙ্ক হল এখানে।

    মিয়ানমারের ক্ষেত্রে চীন আন্তর্জাতিক পরিসরের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়। মিয়ানমারের ওপর চীনের প্রভাবকে স্পষ্টভাবে আলাদা করা
    যায়। তিন বছর ধরে একটি চিৎকারই প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে যে মিয়ানমারের প্রতিরোধ আন্দোলনে বাইরে থেকে অস্ত্র দরকার। একটা ভুল আশা ছড়িয়ে
     পড়েছিল যে থাইল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনের মতো মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মিয়ানমারের প্রতিরোধযোদ্ধাদের
    নীরবে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে চীন। থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের ওপর চীনের কৌশলগত সমর্থন না থাকলে অপারেশন ১০২৭ সম্ভবপর হতো না।

    আর ডেভিড স্কটের শিরোনামেই প্রায় সবকথা বলা আছে। লিখছেন চায়না সাকসেস আর ওয়েস্টার্ণ ফেইলিওর। মনে রাখতে হবে ডেভিডেরা সুইডেন, সুইজারল্যান্ড বা নরওয়ের শান্তি নিয়ে কাজ করা গ্রুপের সাথে সম্পর্কিত। তবে ডেভিডের সবচেয়ে মারাত্মক কথা যে –  “একটা ভুল আশা ছড়িয়ে পড়েছিল যে থাইল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনের মতো মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র”। আর এটাই বাংলাদেশের এখনকার বিরোধী দলেরও সেই একই অবস্থা! ডেভিড আরো লিখছেন, “কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মিয়ানমারের প্রতিরোধযোদ্ধাদের  নীরবে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে চীন। থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের ওপর চীনের কৌশলগত সমর্থন না থাকলে অপারেশন ১০২৭ সম্ভবপর হতো না”।
    এই হচ্ছে ডেভিট স্কটের তথ্য ও ব্যাখ্যা। আর ঐ অপারেশন ১০২৭ হচ্ছে সেনা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সম্মিলিত অপারেশনের কোন নাম – যেটা চীন সমর্থিত।

    আমেরিকার বোকা পরিকল্পনায় এখন উলটা, সব নিয়ন্ত্রণ এখন একা চীনের হাতেঃ
    কথা ঠিক, পরিশেষে পুরা পরিস্থিতির সবটাই চীনা নিয়ন্ত্রণে।  বার্মার তিনপক্ষের সু চিরা বাইডেন হাতছেড়ে দেওয়ায় পত্রিত্যক্ত! আর বাকি দুপক্ষ মানে জেনারেলেরা আর বিদ্রোহিদের মধ্যে থে বর্তমানে চীন বিদ্রোহীদেরকে আপার হ্যান্ডে বসিয়ে রেখেছে।   কিন্তু আমি মনে করি না চীন বার্মা বিদ্রোহীদেরকে জেনারেলদের উপরে বসায় দিবে – জিতিয়ে বা জিততে দিবে। এর চেয়ে চীন বরং আবার জেনারেল আর বিদ্রোহীদের মধ্যে মানে উভয়ের ক্ষমতা ও এক্তিয়ার প্রসঙ্গে আবার নয়া এক ভারসাম্য ব্যবস্থা তৈরি করে দিবে। চীন যদি বুদ্ধিমান হয় তো এটাই করবে। তবে এটা অবশ্যই নয়া আরেক ভারসাম্যে – মানে পুরান হিসাবে নয়। এতে অনেক কিছুতেই বিদ্রোহিরা এবার আপার হ্যান্ড পাবে। আর এসবের মূল নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে আরও সবল হবে। রোহিঙ্গারা ফিরবে কিনা সে ইস্যুতে চীন এখন এককভাবে নির্ধারক হবে। অর্থাৎ মুল কথা – বার্মার যে এথনিক জাতিহগত সংঘাত এটা মিটানোর মত রাজনীতির হদিস বা রাজনৈতিক জ্ঞান বা বুঝাবুঝি এখনও বার্মার কোন কোণাতেই নাই।  চীনেরও জানা নাই। কারণ সমাধানটা হল ফেডারেলিজম (Federalism)। অনেকে আমেরিকান ফেডারেলিজম বললে বুঝে। আর এটা আমেরিকার বাইরে – মানে ইউরোপেরই কোথাও নাই। আর সবচেয়ে বড় কথা এটা হল – জাতিবাদ বা কমিউনিস্টদের জাতীয়তাবাদের বিপরীত ধারণা। অর্থাৎ জাতিবাদি লড়াই (এথনিক বিবাদ) অনেক দেশের মত বার্মারও এখন প্রধান শত্রু! 

    আর সব হারানি ভারত এসবের ফয়দা খেতে এখন হাসিনার মাধ্যমে – অন্তত বর্মা ইস্যুতে তাকে চীনবিরোধী অবস্থানে জায়গা করতেই হবে মনে করছে। এককথায়, বর্মা সীমান্তে বিশৃঙ্খলা সাময়িক হলেও ভারতেরও স্বপ্নে পোলাও খাবার মত  এক আশা তৈরি হয়েছে  যে, হাসিনা সরকারের কাঁধে চড়ে ভারতের বার্মা দখলের মুরোদ না থাকলেও একটা শেয়ার নিতে চায়। ভারত আবার প্রবল একটা আশাও খাড়া করেছে যে একাজে আমেরিকার তাদের পিছনে দাঁড়াবে। ভারতের এই অবাস্তব আশা – উচ্চাশা এটাই এখন হাসিনা সরকারকে বেচাইন করে তুলছে!  এসবের কারণে, সরকার এতে ততটাই চীন থেকে দূরে না চাইলেও হয়ে পড়ছে। সরকার সতর্ক না হলে ভুল পদক্ষেপ দিয়ে ফেললে তাতে শুধু সরকার না পুরা বাংলাদেশই – সরকারের ভারতপ্রীতিতে বা চাপে পড়ে – বিরাট বিপর্যয় ডেকে আনবে! যদিও সবকিছুই এখনও – প্রাইমারি অভিমুখ কোনটা নিবে  – সেই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে – কিন্তু লক্ষণগুলো খুবই খারাপ ঝোঁকের! এক ব্যাপক  দেশি-বিদেশি নয়া পোলারাইজেশনও ঘটাবার চেষ্টা শুরু হয়েছে। তা কতদুত সফল হবে এখনই জানি না। যদিও একারণে, ব্যাপক উঁকিঝুঁকি মারা শুরু হয়েছে!

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ১১ ফেব্রুয়ারি  ২০২৪, ভোর চারটা দশ মিনিট

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • হাসিনা কি ভারতের চাপে ভুল পথ ধরতে আগাচ্ছেন

    হাসিনা কি ভারতের চাপে ভুল পথ ধরতে আগাচ্ছেন
    গৌতম দাস
    ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪  সন্ধ্যা ১৮ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-5la

     

     

    হাসিনা সম্ভবত  ভুল করতেছেন। ভুল পথে ধরতে যাচ্ছেন।  আর এতে চীনের থেকে “বাজেট সহায়তা” বলে নগদ ডলারে, প্রায় দুই ডিজিটের ঋণ আনা বোধহয় তাঁর হাত ছুটে যাবে! আর তাতে সব মিলিয়ে মানে কি দাঁড়াবে? বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে ভাঙ্গা অর্থনীতি! যা ক্রমশ আমাদেরকে দুর্ভিক্ষদের দিকে নিবে? আর আমরা তা দাঁড়ায় দাঁড়ায় দেখব?

    কেন বলছি একথা?
    এটা আর লুকানোর কিছু না যে সরকারের অর্থনৈতিক সংকট কাঁধে নিয়ে হাসিনার একটা খেলনা নির্বাচন শেষে নিজেকে তাতে বিজয়ী-প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা কললেন বটে কিন্তু তাতে করে তার ক্ষমতায় খাড়ায় যাবার চেয়েও আরো বড় ও মারাত্মক সঙ্কট হল ‘অর্থনৈতিক’  – সেটাই এখন সরকারকে জাপটে চেপে ধরেছে! গত মাসে নয়া সরকার গঠনের পর থেকেই ঢাকার চীনা রাষ্ট্রদুত প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন মন্ত্রীর অফিসে গিয়ে সাক্ষাতের রিপোর্ট  হচ্ছে মিডিয়ায়। আর এসব রিপোর্টে কেন চীনের এসব সাক্ষাত হচ্ছে বা ইস্যু কি; তা নিয়ে আমাদের জল্পনা কল্পনাও করতে হচ্ছে না। যেমন চীনা রাষ্ট্রদুত ইয়াও ওয়েন এর সাথে নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ এর যে প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাত হয়েছে এনিয়ে হাতের কাছে দুটা রিপোর্ট দেখছি। বিবিসি বাংলার বেলায় শিরোনাম, “বাংলাদেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন ‘পাশে থাকবে’ কীভাবে?” –  আর বণিকবার্তায় শিরোনাম, বাংলাদেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে পাশে থাকবে চীন— রাষ্ট্রদূত” – মানে দুটাই প্রায় একই ভাষার শিরোনাম।

    “ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন গত বেশ কয়েকমাস যাবত বলে আসছেন যে বাংলাদেশ
    রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন পাশে দাঁড়াবে। কয়েকদিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সাথে বৈঠকের
    পর চীনের রাষ্ট্রদূত আবারো একই কথা বলছেন,
    যেটি সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট হয়েছে।” – বিবিসি

    অর্থাৎ আমাদের জল্পনা-কল্পনার কিছু নাই, কারণ ব্যাপারটা খোলাখুলি-ই যে বাংলাদেশের কঠিন রিজার্ভ সংকট বর্তমান। আর এতে সহায়তা দিতে চীন আগ্রহী বা রাজিও আছে। এরই ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে।  এছাড়া বিবিসি দুজন মন্তব্যকারীকেও নিয়ে এসেছে সংকট নিয়ে তাদের মতামত দিবার জন্য। একজন হলেন সিপিডির কর্তা দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। আর অন্যজন ডঃ জাহিদ হোসেন যিনি নিজ কেরিয়ার গড়তে সেই আশির দশকের শেষ থেকেই বিশ্বব্যাংক ওয়াশিংটনের এর সাথে কাটিয়ে শেষটা বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের চীফ ইকোনোমিস্ট হিসাবে শেষ করেছেন। এরপর আনুষ্ঠানিক অবসর নিলেও কনসালটেন্ট হিসাবে বিশ্বব্যাংক ঢাকার এক্সটারনাল বা ছুটাকাজ-সম্পর্কে জড়িত ও অভিজ্ঞ মতামত দিয়ে থাকেন।

    দেবপ্রিয় সম্পর্কেও আরেকটু বিস্তারে পরিচয় বলা দরকার। এককথায়, দেবপ্রিয় এখন শুধু সিপিডির কর্তাব্যক্তি শুধু তাই নয়, তিনি প্রায় যেন ভারতের মুখপাত্র হয়েছেন। যদিও বলা হয় সিপিডির জন্ম ১৯৯৩ সালে কিন্তু এটা প্রথম লাইম-লাইটে  এসেছিল ২০০৪ সালে। তাও আবার পরের ১/১১ এর ক্ষমতাদখলের পক্ষে প্রস্তুতিমূলক কাজ ২০০৪ সাল থেকেই শুরু হয়েছিল বলে। কিন্তু সার অর্থে সেটা ছিল আসলে ভারতের স্বার্থের পক্ষে ‘কনসালটেন্সি’ এবং তা খোলাখুলি। বিশেষত বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের নর্থ-ইস্টকে বিনা পয়সায় সব ধরণের করিডোর দেয়ার ওকালতি। এমনকি যারা সিপিডির এই দালালি ব্যবসার সাথে একমত নয় তারা সবই নাকি “অশিক্ষিত” এমন মন্তব্যও করেছিলেন রেহমান সোবহান।

    এটুকুই নয়, একেবারে সাম্প্রতিককালে দেবপ্রিয় একেবারে রানা দাসগুপ্তের সাথে পাল্লা দিয়ে তবে একসঙ্গে বাংলাদেশের প্রো-ইন্ডিয়ান প্রধান হিন্দু লিডার হতেও আপত্তি করছেন না। দেবপ্রিয়ের মুল পেশা “উন্নয়ন কনসালটেন্সি” কিন্তু একালে তিনি (সাথে সিপিডির বস রেহমান সোবহানও)  এই পরিচয় ছাপিয়ে ভারত-সমর্থিত হিন্দু নেতা হতে দ্বিধা করছেন না। কোন প্রফেশনাল মানুষের এমন কাজ ও নিচা মানের কমবিনেশন  (কনসাল্টেন্সি আর প্রো-ইন্ডিয়ান প্রধান হিন্দু লিডার একত্রে) আমরা আগে দেখি নাই। কিন্তু এমন কেন? কারণ, দেখতে দেবপ্রিয়র এটা দুটা পেশা-ততপরতা হলেও এদের মিলটা হল দুইটাই ভারতের স্বার্থ আর তিনি বাংলাদেশে থেকেও সেই স্বার্থের প্রতিনিধি।

    মুল ও গুরুতর প্রসঙ্গ হল বাংলাদেশ রিজার্ভঃ
    উপরে দেখলাম আমরা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা বা রিজার্ভের মারাত্মক সংকট আছে, তা এখন সরকারিভাবেও স্বীকৃত। তা চীনা রাষ্ট্রদুত আর নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে প্রথম আলাপেই আলোচিত ও রিপোর্টেড। আর এই সংকট মিটাতে চীন সবচেয়ে সম্ভাব্য এক মুশকিল আহসান বটে! কিন্তু এক বড় কিন্তু আছে।  সেটা হল, চীন কেন বাংলাদেশকে বৈদেশিক মুদ্রা দিবে?

    এছাড়া এখানেও আবার সব পরিসরেই আরেকটা ভুল বুঝাবুঝি আছে সেটা হল – রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন ‘পাশে থাকবে’ ; এই রিজার্ভ সংকট মানে ঠিক আসলে কি? বাংলাদেশের হাতে বা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঞ্চয় বা মজুদে ‘যথেষ্ট’ নগদ ডলার নাই। আর এটা কমপক্ষে গত দুবছরের ফেনোমেনা।  বলা যায় ২০২২ সালের আগষ্টে তেলের দাম ৫১% বাড়ানোর সময়কাল থেকেই রিজার্ভ সংকট মারাত্মক হয়ে উঠেছিল যা এখন সম্ভবত চরমকাল পার করছে।
    কিন্তু যে “রিজার্ভ সংকট” শব্দে এটা বলা হচ্ছে সেটা কি চীন যে ২০১৬ সাল থেকে ঢেলে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প দিয়েছে সেসব প্রকল্পের বৈদেশিক মুদ্রা ছাড় দেয়া ত্বরান্বিত করা অথবা নতুন করে চীন বাংলাদেশকে আরো বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে কি??
    এর সরাসরি জবাব হল  -‘না’ সেটা না। আসলে বলা হচ্ছে ১. চীনের বাংলাদেশকে নগদ ডলার এবং ২. তা বড় পরিমাণ (ধরা যাক দশ বিলিয়নের মত) নগদ ডলার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সাথে চালু চীনা উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থছাড়ের কথা অবশ্যই আছে। কিন্তু সেটা এখানে গৌণ ও ভিন্ন বিষয়! চীনের আমাদেরকে নতুন করে নগদ ডলার ঋণ দেয়া আর  চীনা উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থছাড় – এদুইটা একই জিনিষ একেবারেই না। আর এখানেই এদুটাকে মাখামাখি করে অনেকের মধ্যেই বুঝাবুঝিতে জট পাকানো ধারণা আছে।
    বাংলাদেশের রিজার্ভের দিক থেকে দেখলে একটা ২০ বিলিয়ন ডলারের চীনাসহ যে কারো কোন উন্নয়ন প্রকল্প শুনতে অনেক বড় মনে হলেও প্রতিবছর এর  অর্থছাড় বড় জোর মাত্র এক বিলিয়ন ডলার হবে। কারণ প্রকল্প যত বড়ই হোক পুরা প্রকল্পের অর্থ (বৈদেশিক মুদ্রা) তো শুরুতে বা একবারেই বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়া হয় না। বরং প্রকল্প যতটুকু বাস্তবায়ন হয় ততটুকুই অর্থছাড় ঘটে। এছাড়া প্রতিবছরের অর্থছাড়ের সব অর্থ দিয়েই তো যা কেনা হয় এর সবকিছুই বাংলাদেশি পণ্য বা শ্রম নয়। অর্থাৎ বিদেশি পণ্য কেনা মানেই সেই অর্থ (বৈদেশিক মুদ্রা) আবার বিদেশেই চলে যাবেই। তাই সারকথায়, উন্নয়ন প্রকল্পের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে্র মধ্যে ধরে রাখা খুবই কঠিন। কারণ, অর্থছাড় ব্যাপারটা আসলে ধীরগতির কাজ-বাস্তবায়ের হারের উপর নির্ভরশীল বা সম্পর্কিত; এছাড়া অর্থছাড় হলেও তা দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য বা শ্রম কেনা হবে যতটুকু কেবল ততটুকু বৈদেশিক মুদ্রাই বাংলাদেশের রিজার্ভে থেকে যাবে। একারণে আমাদের রিজার্ভ সংকট – এটা যত বড়ই বিদেশি উন্নয়ন প্রকল্প নেই না কেন – এটা মিটবে না।

     আমাদের দরকার নগদ ডলারঃ
    অর্থাৎ আমাদের রিজার্ভ সংকট মিটাতে গেলে আরো বড় বড় নতুন বা পুরানো প্রকল্পের দ্রুত অর্থছাড় দিয়েও মিটবে না। তাই আমাদের রিজার্ভ সংকট মিটানোর চাহিদাকে পরিস্কার করতে বুঝাতে বলা হবে নগদ ডলার (বৈদেশিক মুদ্রা) লাগবে। আর এটা অবশ্যই উন্নয়ন প্রকল্প ঋণ একেবারেই নয় – এভাবেই বুঝতে হবে।

    কিন্তু কি নামে দেশে সাধারণত এসে থাকে নগদ ডলার?
    এককথায় জবাব – বাজেট সহায়তা নামে এসে থাকে। এটাই এর টেকনিক্যাল বা খাতওয়ারি নাম! মানে সরকারের বাৎসরিক বাজেটের বৈদেশিক মুদ্রা অংশের দায় মিটাতেই কেবল সরকার এই নগদ ডলার ব্যবহার করতে পারবে।  এজন্য অনেকে এটাকে “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের দায়” মিটানোও জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রাও বলে থাকে। তবে মূল কথাটা হল, এটা প্রকল্প ঋণ সহায়তা নয়। আমরা যেন দুটা ধারণাকে মাখায় না ফেলি।
    ব্যাপারটা আমরা দেখছি একমাত্র স্পষ্ট করে ধরতে পেরেছেন ও ব্যাখ্যা করেছেন ডঃ জাহিদ হোসেন,  ঢাকা বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ।

    “চীন তো বলেনি যে বিনিয়োগে সমস্যা হলে, তারা বাংলাদেশের পাশে থাকবে। তারা বলেছে, রিজার্ভের সমস্যা হলে পাশে থাকবে।
    তার মানে তোমার ক্যাশ নাই, আমরা তোমাকে ক্যাশ দেব। এটাই তো মিন (বোঝানোর) করার কথা।”
    জাহিদ হোসেন মনে করেন, তিনভাবে এই সহায়তা বা পাশে থাকার বিষয়টি হতে পারে। … বাজেট সহায়তা কিংবা ব্যালেন্স
    অব পেমেন্ট সহায়তা হতে পারে।” – বিবিসি

    কিন্তু কোন দাতাদেশই নগদ ডলার বা বাজেট সহায়তা দিতে চায় নাঃ
    কেন? কারণ, ২০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন প্রকল্প দেয়া তুলনায় সহজ; অথচ ৫-৭ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা দেয়া কঠিন। দাতা দিতে চায় না।  তুলনা করে বললে, ৫-৭ বিলিয়ন ডলারের কোন উন্নয়ন প্রকল্পের সব অর্থ যদি দাতা একবারেই একাউন্ট ট্রান্সফার করে দেয় তবে সেটাই তখন কার্যত বাজেট সহায়তা হয়ে যায়। এতে তাহলে সরকার কাজ বাস্তবায়ন অনুযায়ী বছরে মাত্র কয়েক মিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে পারে আর বাকি ডলার আমদানি ব্যয়-সহ এমন সব কাজেই ব্যবহার করতে পারবে। একারণে, বাজেট সহায়তা ঋণ কোন সীমার বাইরে খরচ-ব্যবহার করা যাবে না তা কড়াভাবে বলা বা শর্তে বলা থাকে। এই অর্থে বাজেট সহায়তা হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্প ঋণের চেয়েও অনেক বাড়তি সুবিধা ঋণ গ্রহিতা পাবে বা তাকে দেয়া হয় এমন এক ঋণ। এক স্পেশাল ঋণ, যার মোবিলিটি বা ব্যাবহারযোগ্যতা ঋণ গ্রহিদার জন্য বহুগুণ!

    তাহলে কোন দাতা দেশ এমন বহুল সুবিধা সম্পন্ন ‘বাজেট সহায়তা’ ঋণ কখন ও কেন দিতে রাজি হবেঃ
    এককথায় জবার, দাতাও যখন বিনিময়ে অন্য অনেক সুবিধা পাবে! যেমন বাংলাদেশে চীন ‘বাজেট সহায়তা’ ঋণ দিবে তখন যখন সে বিনিময়ে বিশেষ স্ট্রাটেজিক সুবিধা পাবে; এমন হতে পারে !  এককথায় বিশেষ সুবিধার ঋণ তাই দাতাও এথেকে বিনিময়ে তার বিশেষ সুবিধা আদায় করতে বা পেতে চাইবেই।  সম্প্রতি শেয়ার বিজ পত্রিকা ভারতের ঋণ প্রসঙ্গে একটা রিপোর্টের শিরোনাম হল, “পাইপলাইনে আটকে আছে ৮০ শতাংশ ঋণ” । তাও আবার সেটা ১৩ বছর ধরে। এছাড়া এসব ঋণের ৭৫% পণ্য বা শ্রম ক্রয় ভারত থেকে হতে হবে এমন শর্ত দেয়া। এমনিতেই ভারতের এসব প্রকল্প মানেই হল যা বাস্তবায়ন হলে সুবিধা কেবল ভারত পাবে – এমন! মানে বাংলাদেশ থেকে কড়িডোরের সুবিধা নিবে ভারত তাও বিনা পয়সায় আর সেজন্য যে রাস্তাঘাট ব্যবহার ভারত করবে – বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঐ রাস্তাঘাট নির্মাণের খরচ মানে ঋণ গ্রহণ ও সুদ পরিশোধ করবে বাংলাদেশ। এই হল ভারতীয় স্টাইল! যেমন ভারত কলকাতা-ত্রিপুরা রোড বা ট্রেন চলাচলের সুবিধা নিবে; ভারত পদ্মা সেতু ব্যবহার করবে আর সেতুর চীনা-ঋণ নেয়া ও পরিশোধের দায় বাংলাদেশ নিবে। আর ভারত কেবল আখাউড়া থেকে  ত্রিপুরা লাইনে পাঁচ-ছয় কিমি ট্রেন লাইন প্রকল্পে অর্থ খরচ করে (যেন পুরা প্রকল্পেই) সেটাতে ভারত বাংলাদেশকে ঋণ দিয়েছে বলে দেখাবে।  এককথায় বললে এভাবেই ভারত সমস্ত স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা একপক্ষীয় ভাবে ব্যবহার করবে। আর দাবি করবে ভারত নাকি বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী ঋণদাতা! এমনকি আজকাল অনেক তরুণ ফেসবুকার কেও পাওয়া যাবে যে প্রমান করে দিবে যে বাংলাদেশকে ভারতের দেয়া ঋণ চীনের চেয়েও পরিমাণে বেশী!

    কেন এভাবে এই তুলনা করে দেখালাম?
    দেখালাম এজন্য যে জাহিদ হোসেনের সাথে একই প্রশ্ন দেবপ্রিয়কে করেছিল বিবিসি। দেবপ্রিয়-ই ভারতের সাথে তুলনা ডেকে এনেছিলেন। বিবিসি লিখেছে “…ভারতের দেয়া ক্রেডিট লাইনের কথা উল্লেখ করে মি. ভট্টাচার্য…”। এটা কি তুলনীয় ঘটনা? ভারত কি অবকাঠামো ঋণ দেয়ার মত নিজে যোগ্য অর্থনীতি হয়েছে? দেবপ্রিয় এর সেখবর নাই, তবুও তিনি কোশেশ চালিয়ে গেছেন। এমনই খেদমতগার তিনি! যে ভারত বিনা পয়সায় স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা একপক্ষীয়ভাবে নিচ্ছে তার সাথে চীনের অবকাঠামো উন্নয়নের ঋণদাতা ভুমিকার তুলনা করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, কেন বাংলাদেশ চীনের নগদ ডলার দেওয়ার বাজেট সহায়তা শিরোনামের ঋণ নিতে পারবে না – এম মিথ্যা ও ভুয়া ধারণায় ভয় দেখিয়েছে।

    “তবে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নেবার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা হতে পারে বলে
    উল্লেখ করেন মি. ভট্টাচার্য। কারণ, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ঋণ নিয়েছে এবং সামনে ঋণের আরো কিস্তি আসবে।
    এমন অবস্থায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নিতে গেলে আইএমফ বিষয়টা মানবে কি না সেটাও একটা দেখার বিষয়, বলছিলেন মি. ভট্টাচার্য।” – বিবিসি

     

    দেবপ্রিয় মস্কোর প্লেখানভ রাশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা ও পিএইচডি। ফলে সারাজীবন তিনি “পশ্চিমা পচা-গলা পুঁজিবাদের”  বিরোধীতা ও নিন্দা করে এসেছেন। যা বুঝি না তার নিন্দা করা তো খুব আরামেরই।  আর এখন মোদির “হিন্দুত্ববাদের পুঁজিবাদ” তাঁর কাছে খুব মিস্টি ও উপাদেয়। অথচ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক তার কাছেও নিপাত যাক সংগঠন। সুযোগ পেলেই তিনি এ’সংগঠনের বিরুদ্ধে বিষ উগলে দেন। অথচ উনার নিজ অযোগ্যতা হল, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এটা কি ও কেমন প্রতিষ্ঠান অথবা ১৯৪৫ সালের পরে গ্লোবাল পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক ব্যাবস্থা হিসাবে এটা কিভাবে কাজ করে? আবার এটা কোথায় কোথায় গরীব দেশের বিরোধী আবার কোথায় ঐ গরীব দেশের কাছেই “অন্ধের  কাছে তাঁর লাঠির” মতই সহায়ক – ইত্যাদি এসব দিকে তিনি বেখবর! এই গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেমটা চালু আছে বলেই কিন্তু তিনি আয়-ইনকাম করার সুযোগ পেয়েছেন সেতাই তিনি মনে হয় খেয়াল করেন নাই!

    প্রথম কথা হল, কোন দেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে ওর একটা দিক হল (সবটা নয়) নগদ ডলারের অভাব বা প্রয়োজন হয়ে পরে। এর সবটা আইএমএফ দেয় না বা যোগান দিতে পারে না। এছাড়া এমন সংকটে আইএমএফের কাজ ও প্রধান ভুমিকাটা ঠিক ঋণ দেয়া বা নগদ ডলার যোগান দেয়া না। বরং ১৯৪৫ সাল থেকে আইএমএফের কাজের মধ্যে দিয়ে তৈরি হওয়া যে পেশাদার অভিজ্ঞতা তা দিয়ে সে কোন দেশের পড়ে যাওয়া অর্থনীতিকে টেনে তোলার পথ বাতলানো (যেটাকে কমিউনিস্টেরা আধো বোলে শর্ত দেয়া বলে না-বুঝা হৈ চৈ করে থাকে)। মানে পড়ে যাওয়া ট্রেনকে আবার লাইনে তোলার মত! সেকারণে গ্লোবাল পুঁজি বাজার সংশ্লিষ্ট যেকেউ এসব ক্ষেত্রে ঐ পতিত দেশের অর্থনীতি কারকশন পদক্ষেপগুলো নিয়ে উঠে এসেছে কিনা এব্যাপারে কেবল আইএমএফ এর বক্তব্য-কেই বিশ্বাস করে। এখন অসুবিধা হল মাঙনা পরামর্শ দিলে পতিত দেশ তা আমল করতে চায়না; যেন এতে সিরিয়াসনেস আনতেই বা সেটা ঠেকাতেই কিছু ঋণ ঐ সংকটে পতিত দেশকে আইএমএফও দিয়ে থাকে। যেমন, বাংলাদেশের এখন ৫-১০ বিলিয়ন ক্যাশ ডলার লাগবে বলে কথা উঠেছে সেখানে আইএমএফের দেয়া এখনকার (বছর দেড় আগে শুরু হওয়া) ঋণ হল ৪.৭ বিলিয়ন। কিন্তু তা দেয়া হবে প্রতি ছয় মাসে মাত্র ৬৮২ মিলিয়ন (৬৮.২ কোটি) ডলার করে; মানে সাড়ে তিন বছর ধরে। এভাবে সাত কিস্তিতে অর্থ পাবে। তাও আবার প্রতিবার উন্নতির (রিকভারির) যে টার্গেট  আইএমএফ দিবে তা পূরণ সাপেক্ষে পরের কিস্তির অর্থ ছাড় হবে – এভাবে।
    কিন্তু ছয় মাসে ৬৮২ মিলিয়ন মানে মাসে ১০০ মিলিয়ন ডলারের মত; এটা কোন অর্থই না।  যেখানে শুধু জ্বালানি আমদানিতে আমাদের প্রতি মাসে ব্যয় এক বিলিয়ন ডলার। মানে শুধু জ্বালানি আমদানির মোট অর্থের দশভাগের একভাগ মাত্র আইএমএফের দেয়া ঋণ প্রতি মাসে। অর্থাৎ আইএমএফের ঋণটা “টোকেন” (token) ; বা নাম কা ওয়াস্তে!
    আগের অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন এই কিস্তির ডলার উনি একলা নিজেই বাংলাদেশকে দিতে পারেন। যেটা এতই অল্প!

    অথচ জ্ঞানী দেবপ্রিয় আন্দাজে বলতেছেন যেহেতু “বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ঋণ নিয়েছে এবং সামনে ঋণের আরো কিস্তি আসবে।”– তাই আমরা আর এখাতে চীনের থেকে নগদ ডলার বা বাজেট সহায়তা খাতে নাকি ঋণ নিতে পারব না। যেন বাচ্চা বয়সে আমাদেরব শোনা সেই ডায়লগ যে বলতে চাচ্ছেন-  “না না অমন করেনা মা বকবে”।  তাই সেই ভাষায় দেবপ্রিয় বলছেন, “এমন অবস্থায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নিতে গেলে আইএমফ বিষয়টা মানবে কি না সেটাও একটা দেখার বিষয়”।

    আসলে দেবপ্রিয় বলতে চাচ্ছেন বাংলাদেশ বা হাসিনা যেন চীনের কাছে না যায়। এ্যটাই তাদের মন-কামনা!!!  আর এখানে এই তাদের মানে ভারতীয় স্বার্থের বুঝতে হবে!  হাসিনা যেন চীনের থেকে বাজেট সহায়তার নগদ ডলার ঋণ করতে না যায়।  কেন? এতে দেবপ্রিয় এর কি অসুবিধা?
    দেবপ্রিয় বলতে চাইছেন এতে ভারত রাগ করবে। কারণ, হাসিনার চীনের কাছে যাওয়া মানে তিস্তা প্রকল্প জাতীয় আরো অনেক (ভারতের মাতব্বরি অস্বীকার করে সম্মতি দেয়া) প্রকল্পে হাসিনার সম্মতি দেওয়া বা হাসিনাকে নগদ ডলার সহায়তা ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে চীনকে স্ট্রাটেজিক সুবিধা দেয়া। এখন বাংলাদেশ তার নিজ স্বার্থে চীনকে কি দিবে নিবে সেটা একান্তই বাংলাদেশের স্বার্থ! এখানে ভারতের বলার কি আছে? কিন্তু দেবপ্রিয় মনে করেন এটা তার ও ভারতের স্বার্থবিরোধী!

    এবার এর উলটা দিক থেকে দেখি। হাসিনা নগদ ডলার সহায়তা যদি না আনতে পারে তাহলে কি হবে? আগামি মাস থেকেই আমদানি ব্যয় মিটাবার সামর্থ ভেঙ্গে সব এলোমেলো হয়ে পড়বে বলা হচ্ছে। অর্থনীতি চরম বিশৃঙ্খলায় পড়বে। মুদ্রাস্ফীতি আকাশ ছুবে করবে – ধরাম করে ছাদে ঠেকবে। মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বি হওয়া কথাটার-ই আরেক ভাষ্য হল, গরীব মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শেষ। নুন্যতম খাদ্য কেনার সামর্থটাও নাই হয়ে যাবে। এটাই দুর্ভিক্ষের আরেক নামে। এজ্জন্য কোন দেশের ফরেন রিজার্ভ শুণ্যের দিকে কিনা এটাও দুর্ভিক্ষ আসবার একটা বড় সিগনাল!  অর্থাৎ ভারত বা তার এজেন্ট দেবপ্রিয় আমাদের হুমকি-ভয় দেখাচ্ছেন যেন হাসিনা চীন না ভ্রমণে না যায়। কারণ, এতে নাকি ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ চীনের কাছে ক্ষুন্ন হবে! কি আবদার!! অথচ এতে বাংলাদেশের অর্থনীতি ফেল করলে যে দুর্ভিক্ষের দিকে যাবে তবু হাসিনা তা ঠেকাতে ব্যবস্থা না নেক এটাই ভারতের আবদার!
    অথচ এনিয়ে ক্রমান্বয়ে ভারত হাসিনার উপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। সর্বশেষ বিনা পাবলিক ঘোষণায় অজিত দোভালের সফরও বাংলাদেশ সফরও সেকারণে বলে কানাঘুষা চলছে!

    একটা সমতুল্য অভিজ্ঞতাঃ
    করোনার টিকা আমরা কোথা থেকে কিনবো?  এই টিকা প্রথম অনুমোদন পেলে দেখা দিয়েছিল কাড়াকাড়ি। কারণ, বড়লোক পশ্চিমা দেশগুলো তাদের মোট চাহিদার ছয়-সাত গুণ বেশী টিকা নিজেদের জন্য সংগ্রহ-মজুত শুরু করেছিল। খামোখা নিজ সাদা শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্খায়। আর এটাই আমাদের মত গরীর দেশের অবস্থা আরো শোচণীয় করেছিল। চীন অফার দিয়েছিল তাদের টিকার গবেষণার শেষ বা তৃতীয় ফেজে যুক্ত হবার বিনিময়ে টিকা পাওয়ার। কিন্তু এতে ভারতের চেয়েও চীনের বাংলাদেশের উপর প্রভাব বেড়ে যাবে তাই এক শয়তানি চাল দিয়েছিল ভারত। বাংলাদেশ প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৪০০ মিলিয়ন ডলার ভারতের টিকা কারখানায় বিনিয়োগ করলে তারা  আমাদের প্রয়োজনীয় টিকা সরবরাহ করবে। তাহলে টিকা ক্রয় নিয়ে বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যবসায়ী- মন্ত্রী উপদেষ্টারা এই সুযোগে বিরাট আয় করে নিতে পারবে। অর্থ্বের লোভে সরকারও সেদিকেই রওনা দিয়েছিল; সরকারি সহায়তায় বেসবকারি বিনিয়োগও দিয়ে যুক্ত হয়েছিল ভারতের সাথে।  তবু চীন এনিয়ে একটাও কথা পাবলিকলি বলে নাই। রয়টার্স মুখে মাইক ধরলেও বলেছিল – নো কমেন্ট!
    আর সরকার-বেসরকারি দালালেরা ভেবেছিল তারা সহজেই জিতে গিয়েছে। ভেবেছিল চীন কি বোকা যে সহজেই ওয়াক ওভার দিয়ে দিছিল। আর তারা স্বপ্নে ৪০০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে কত হচ্ছে তা গুণা-গুনতি শুরু করেছিল!
    কিন্তু না, সব হিসাব ভুল!
    কয়েকমাসের মধ্যে মোদি ঘোষণা করে বলেছিলেন বাংলাদেশে টিকা পাবে না। আগে ভারতের জনগণ সকলে টিকা পাবে এরপর দেখা যাবে! কিন্তু তখন হাসিনা টিকা পাবেন এমন বিকল্প কোথায়? পশ্চিম উতপাদকেরা সবাই নিজেকে বা অন্য পশ্চিমাদের নিয়েই ব্যস্ত!  ফলে হাসিনার আবার সেই চীনের কাজে গিয়েই হাতেপায়ে ধরা! স্বভাবতই চীন এবার হেসেছিল কিনা আমরা জানি না! কিন্তু বাংলাদেশ থেকে চীন তাদের স্টাটেজিক সুবিধা যা তারা আগের বেছে রেখেছিল তা এবার উসুল করে নেওয়ার বিনিময় আমাদেরকে টিকা দিয়েছিল। সেজন্য টিকা চুক্তি করতে চীনা স্বাস্থ্যমন্ত্রী না এর বদলে  তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এসেছিল। বড় শিরোনামে বললে, এটাই কক্সবাজারে ছয় কিলোমিটারের (রিফুয়েলিং) রানওয়ে নির্মাণ ও এর সাথে আরো অনেক চীনা স্ট্রাটেজিক স্বার্থ বিষয়ক বিষয়ে তা পাইয়ে দিতে চুক্তিতে উপণীত হতে হয়েছিল আমাদেরকে। তার মানে দাঁড়ালো সেকালে হাসিনাকে এই কাজে ভারত-ই ঠেলে দিয়েছিল!  এবারও বাজেট সহায়তা আনতে হাসিনার সম্ভাব্য চীন সফরকে কেন্দ্র করে কি একই ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে?

    এখন ভারতের মোদিসহ বিরাট বিরাট সব স্ট্রাটেজিক এনালিস্ট, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা সব যারা যারা আছেন তারা হিসাব দেন! বলেন, বাংলাদেশকে শুরুতে চীনা টিকা গবেষণায় যুক্ত হয়ে টিকা যোগাড়ে বাগড়া দিয়ে ভারতের কি লাভ হয়েছে? অবশ্যই কোন লাভ হয় নাই। উলটা ক্ষতি হয়েছে। স্ট্রাটেজিক দিক থেকে চীনারা ভারতের ও আমেরিকার উপরেও আগিয়ে গেছে।  আর ভারতের এসব তথাকথিত স্ট্রাটেজিক পরিকল্পকেরা আপনারা তো নিজের স্বার্থই রক্ষা করতে জানেন না। এটাই প্রমাণিত হয়েছে।  মনে করেন অর্থের লোভ আর মনি-পরী হানিট্রাপের মাধ্যেমেই সব অর্জন করে ফেলবেন। আপনারা এতই বুদ্ধিমান! আর ‘র’-এর কাজ আগানোর ভিত্তিও এই অর্থ আর মেয়েমানুষ দিয়ে ট্রাপ করা! অথচ আপনারা ভাবছেন চীনের বুদ্ধি-পরিকল্পনার উপরে আপনি এই অর্থ আর মেয়েমানুষ দিয়ে ট্রাপ দিয়ে জিতে যাবেন; রাজত্ব করবেন!    এর সোজা মানে দাঁড়ালো এখন জবাব নাই আপনাদের কাছে? বাংলাদেশের করোনার টিকা চীন থেকে সংগ্রহের প্রথম পরিকল্পনাকে ফেল করিয়ে দিয়ে ভারতের কি লাভ হয়েছে? নাকি আলটিমেটলি ভারতই বাংলাদেশকে আরো বেশী করে চীনে কোলে উঠিয়ে দিয়েছে?
    ভারতের স্ট্রাটেজিক জ্ঞানীরা এখন আমাদের দিকে না তাকিয়ে ভারতের নিজের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে মুল্যায়ন করেন আগে; সাহস থাকলে!

    এরপরে এর ভিত্তিতে ঠিক করেন হাসিনাকে আবার এখন চীন সফরে (বাজেট সহায়তা আনতে) যেতে বাধা দিবেন কোন সাহসে? কোন লক্ষ্যে ও যোগ্যতায়? আপনাদের মূল সমস্যা তো অর্থনৈতিক সামর্থ নয়, হিংসা-ভিত্তিক চিন্তা! তাই চিন্তা, বুদ্ধি পরিকল্পনা সবই এখানে এসে সব শুকিয়ে যাবে আপনাদের!  অথচ সেই পুরানা পথ; অজিত দোভালকে পাঠিয়ে চাপ দিবেন??? পেটি (petite বা উচ্চারণে পেতিত মানে ক্ষুদ্র বা সংকীর্ণ) চিন্তা, পেটি দোকানদারি মানসিকতা বা হাভাতে এরা অবশ্য এগুলাই করে থাকে! যারা বিরাট চকচকে লোভের চিন্তায় শেষে সবসময় আত্মঘাতি হয়ে থাকে! মোদি কেন এর ব্যতিক্রম হবেন!

    ভারত-চীনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের শিকার না হইঃ
    এই বক্তব্যটা মন্ত্রী ওয়ায়দুল কাদেরের। গত ৪ ফেব্রুয়ারি পুরা বক্তব্যটা নিয়ে মিডিয়া শিরোনাম ছিল – আমরা যেন চীন-ভারতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত না হই: ওবায়দুল কাদের ।  দেখে পড়ে মনে হতে পারে যে হাসিনা খুবই সতর্ক বোধহয় তাই চীন-ভারত দুটা দেশ থেকেই দূরে থাকতেই হাসিনা সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। না, এই অনুমান ভাবনাটা ভুল! কারণ, এটা হল আসলে সম্ভবত হাসিনা এখন আর চীন সফরের কথা ভাববেন না! আর তাতে সবকিছু সিদ্ধান্তহীনতায় ফেলে বসে থাকতে চাইছেন। কারণ, হাসিনার চেয়ে কে সবচেয়ে বেশী জানে যে চীনের কাছ থেকে নগদ ডলার না আনা মানে অর্থনৈতিক রিকভারি হবে না; মানে দেশকে ক্রমশ এক দুর্ভিক্ষ এ’দিকে ঠেলে দেয়া হবে?

    হাসিনার কাছে পরিস্থিতিটা এখন কোন দুরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের শিকার জড়িয়ে যাওয়া বা না যাওয়ার  হিসাবে দেখতে যাওয়াটাই ভুল! হাসিনার জন্য বাংলাদেশের জন্য লক্ষ্যটা হল  অর্থনৈতিক রিকভারি আর তা করে, দুর্ভিক্ষ এড়ানো। সবচেয়ে বড় কথা এতে কোন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যাওয়া বা না যাওয়া যাই ঘটুক – তবুও দুর্ভিক্ষ যদি এড়াতে পারে তবে সবের দায় জনগণ এর কাছে সারেন্ডার করলে তারা তা শেয়ার করবে। কিন্তু কেবল মনে রাখেন একটা চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ – এটা বাংলাদেশের অভিমুখ, গতিপথ অপরের প্রত এটিচ্যুড ইত্যাদি সব বদলে দিয়েছিল। পুরা পঁচাত্তর সালটা আমাদের খুনাখুনিতে কেটেছে। ১৯৮১ সালের আগে কিছুই নুন্যতম থিতু হয় নাই! আর সেই থেকে খুড়িয়ে চলা, পড়ছি আর উঠছি, খুড়িয়ে চলছি – জনমত বিভক্ত! কোন রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকেই এরপরে আমরা নুন্যতম বের হতে পারছি না! প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা ইত্যাদি নেগেটিভ এটিচ্যুড বার বার ছাপিয়ে উঠছে!

    হাসিনা কি করতেছেন তা তিনি নিজেই স্থির মনে এখানে খুঁজে দেখতে পারেন। যেমন, তিনি মনে করেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর হয়ে ক্ষমতা নিয়েছেন। ধরে নিলাম তিনি ঠিক ও সৎ ও ন্যায্য কথাই বলছেন। কিন্তু তাহলে স্কুলের পাঠ্যবই তা ভারতে পাঠিয়ে ছাপানোর নামে তাদের অনুমোদন নিতে পাঠান কেন? এটা কি কোন মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর কাজ হতে পারে? সালমন রহমান কখনও বইয়ের ব্যবসা করেন নাই, ছিলেন না। অথচ তাকেই কেন বই ছাপিয়ে আনার দায়ীত্ব দেয়া হয়েছে কেন? পাঠ্যবই ছোটখাট জিনিষ না।  ভারতীয়দের সম্পাদিত বই পড়ালে কি বাংলাদেশ থেকে মুসলমানদের কথিত জঙ্গীবাদী মানসিকতা দূর হয়ে যাবে? কথিত ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ হয়ে গেলে জঙ্গীবাদ চলে যাবে – এটাই কি মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর এসব চিন্তার ভিত্তি নয়? অথচ এটাই তো ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের নিচে বাংলাদেশকে রেখে দেওয়া; নয় কি? আচ্ছা ভারতের পাঞ্জাবের খালিস্তান মুভমেন্ট কি জঙ্গীবাদ নয়, এটাও কি ভারতের সরকারি পাঠবই পড়েই আর তা পড়ার পরেও জন্মাইছে। তাই নয় কি? হায় মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী!!! তাহলে আমরা কোথায় দাড়াবো? আমাদের কোথায় নিয়ে চলেছেন আপনারা?

    তাহলে মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর শত্রু হল  ইসলামি জঙ্গীবাদ মানসিকতা আর এটাকে ধুয়ে পরিস্কার করতেই গঙ্গায় ডুব দেওয়ানো্র জন্যই এমন পাঠ্যবই ব্যবস্থাপনা?  এভাবে আমরা কি আমাদের মুসলমান পরিচয়কে এভাবে শুদ্ধ ও হিন্দুত্ববাদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে নিতে পারবো? নাকি এরপরও মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী বলে কিছু অবশিষ্ট থাকবে? আসলে, হিন্দুত্ববাদের অধীনস্ত হয়ে একটা “মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী” বা হাসিনার বাংলাদেশ বলেও কিছুই থাকবে না! মানে হবে না!! কারণ, নিজের অস্তিত্বের অর্থ তাতপর্য নিজেকেই তৈরি করতে হয়!

    ভারত তার পেটি স্বার্থে যতই বাধা সৃষ্ট করুক সিদ্ধান্ত নিতে হবে একান্তই নিজ দেশ-মানুষের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে তাতে চীনের খুশি-অখুশি নাকি ভারতের  খুশি-অখুশি এসব অনেক নিচের প্রায়োরিটি! বাংলাদেশের কাছে নিজ স্বার্থের উপরে কেউ নাই, থাকতে পারে না!
    অর্থনৈতিক রিকভারি আর তা করে , দুর্ভিক্ষ এড়ানো এটাই আমাদের মুখ্য স্বার্থ। আমরা আরেকবার দুর্ভিক্ষ দেখতে পারি না!  এতে ফেল করা বা পরাজিত হওয়া যাবে না!!!
    কাজেই “আমরা যেন চীন-ভারতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত না হই”-এটা হতাশা আর সংকটে পালিয়ে যায় যারা তাদের কথা!

    আমাদের শাসকদের নিজ স্বার্থ বুঝতে অন্তত সুমতি হোক!

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০৬ ফেব্রুয়ারি   ২০২৪, সন্ধ্যা  সাতটা

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!

     

    বাংলাদেশ প্রসঙ্গেঃ
    ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!

    ১৪ জুলাই ২০২৩   মধ্যরাত ০০ঃ ০৫
    https://wp.me/p1sCvy-4In

     

                        VOA  –  MODI & BIDEN

     

    “বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমেরিকা আর ভারতের কথা শুনে কোন সিদ্ধান্ত নিবে না!” – সেসব দিন শেষ হয়েছে। হ্যা কথা এটাই; যদিও কথাটা আমার নয়। কথাটা বলেছেন এসএনএম আবদি; ভারতীয় সাংবাদিক!  আবদি লিখেছেন “Heart of the Matter: India, US not on the same page in Bangladesh” আক্ষরিক অর্থে বললে, আবদি বলছিলেন “ঘটনার মূলে হল – ভারত ও আমেরিকা আর একমতে বাংলাদেশের কোন কিছুকে দেখছে না”।

    হা বাংলাদেশ নিয়ে ভারত-আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি আর এক নয়ঃ
    আবার এসএনএম আবদি [SNM Abdi] ভারতীয় সাংবাদিক;  এক দৈনিকের সাবেক  সম্পাদক এসএনএম আবদি চলতি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আবার লিখেছেন। প্রায় একমাসের বেশি কিছুদিন আগে তাঁর লেখা নিয়ে আমার আলোচনা-মন্তব্যে তাঁর পরিচয় নিয়ে অনেক লিখেছি। তাই এবার আবার সেদিকে যাচ্ছি না। তবে দৃশ্যত আবদি আর সুবীর ভৌমিক (যিনি আবদির মত গত শতকের আরেক সাংবাদিক), এরা দুজনেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ও সম্ভবত এঁরা তাদের মিডিয়া উইংয়ে কাজ করেন বলে মনে করা হয়। অনেকে যারা ভারতের রাজনীতির উত্থান-পতন ও ট্রেন্ড-অভিমুখ মনিটর করেন, খেয়াল রাখেন এটা তাদের ধারণা বা মতামত। এদের দুজনেরই তাই একই সমস্যা যে তাঁরা পাবলিকলি বলতে পারেন না যে তাঁরা এখন কী করেন বা কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে আছেন বা কাজ করেন! কোন প্রতিষ্ঠানের বেতনের লিস্টে বা পে-রোলে তাদের নাম আছে! ইত্যাদি!

    আবদি আবার বাংলাদেশ প্রসঙ্গে লিখেছেন গত ১০ জুলাইয়ে, ভারতের ফ্রি-প্রেস-জর্নাল নামে এক বহু পুরানা ইংরাজি পত্রিকাতে, যার শিরোনাম “Heart of the Matter: India, US not on the same page in Bangladesh” । আমাদের মানবজমিনও আবার সে লেখা অনুবাদ করে চাপিয়েছে – “বাংলাদেশ বিষয়ে ভারত থেকে আলাদা যুক্তরাষ্ট্র, নিতে চায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত” – এই শিরোনামে। ফলে পাঠক যারা বাংলা বা ইংরাজি যেটা থেকেই পড়তে চান পড়তে পারেন।

    আমার এলেখার বড় শিরোনাম,  “বাংলাদেশ-আমেরিকা প্রসঙ্গঃ ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!”। যেটা আবদির শিরোনামের কথাটাই তবে আমার ভাষায় লিখা বলা যায়।  আমরা বলে এসেছি, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ওয়ান ইলেভেনের ক্ষমতা দখলের পরে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। আমরা একথা বহুবার বলেছি।  ভারত কে দিয়ে আমেরিকার চীন ঠেকানোর কাজের বিনিময়-মজুরি হিশাবে। কিন্তু তা কি চিরদিনের জন্য নাকি কতদিনের জন্য??

    এই প্রশ্নে বাংলাদেশে হাসিনাবিরোধী একাংশের ধারণা এটা যতদিন হাসিনা ক্ষমতায় থাকবেন ততদিন। যদিও বাস্তবে ঘটনাটা এমন না। এভাবে ঘটে নাই। অপ্নতত এখন তো একেবারেই পরিস্কার যে দিন ফুরিয়েছে। তবুও যেমন এক. ২০১৮ সালের শেষের নির্বাচনে হাসিনা চেয়েছিল ভারত ২০১৪ সালের মত খোলাখুলি ন্যাংটা হয়ে হাসিনাকে সমর্থন জানাক! কিন্তু মোদির ভারত বুদ্ধিমান হতে চেয়েছিল সম্ভবত! তাই এত দায় না নিয়ে দূরে দাঁড়ায় কেবল মাখনটা উঠিয়ে খেতে চাওয়া এক অবস্থান নিয়েছিল। আর এতে হাসিনা ক্ষেপে গিয়ে এক প্রকাশ্য হুঙ্কারে যে  বয়ান দিয়েছিলেন “ভারতকে যা দিয়েছি সারা জীবন মনে রাখবে: শেখ হাসিনা” –  রিপোর্ট্ টা তখনকার বাংলা ট্রিবিউনের। কিন্তু তাতে কী এরপর ভারত-বাংলাদেশ স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক কী নাই হয়ে গেছিল? না ঠিক তা নয়। তবে এই ভাষায় ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাবে না। যদি বলি এরপরে মানে ২০১৯ সাল থেকে হাসিনা-মোদি সম্পর্কে আর কোন নয়া চুক্তি হয়েছে কিনা – এই বিচারে বলা যায় হাসিনা-মোদি এরপর আর কোন চুক্তি হয় নাই অথবা নয়া চুক্তি করে কিছু দেয়া হয় নাই। তবে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আগের করা চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন অর্থে ২০১৯ সালের পরেও অনেক কিছুই দেয়া হয়েছে, হচ্ছে। আর সবসময়ই একটা রুটিন সম্পর্ক তো আছেই যেটা অবশ্যই বেশ ঘনিষ্ট। এমনকি যতটা ঘনিষ্ট সময়ে এর চেয়েও বেশি করে তা দেখানোও হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতিকালে যত অ্যামেরিকান চাপ বাড়ছে ততই ভারতের মুরোদ থাকুক আর নাই হাসিনা সরকার ততই ভারতের কোলে মুখ-গুজে – “দেখেন না কিছু করতে পারেন কিনা” টাইপের  চাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে এমন রিপোর্ট ভারতীয় পত্রিকায় বেশি দেখা যাচ্ছে; যা প্রথম আলো একেবারে লজ্জ্বার মাথা খেয়ে হলেও তাদের বরাতের উপর চড়ে মিথ্যা করে ভারতীয় করিতকর্মের মিথ্যা বয়ান তৈরি করে চলেছে।   যদিও এর মানে এমনটা একেবারেই নয় যে ভারতের সাথে হাসিনার খাতিরের সম্পর্কটা অটুট আছে বা ধরে রাখা গেছে! সেটা একেবারেই নয়; বাস্তবতাই সেটা নয়। মূলকথা আমেরিকাকে সুপারিশ করে ভারতের সেই মুরোদই হারিয়ে গেছে!

    কিন্তু হাসিনার সাথে ভারতের সম্পর্কটা কী বা কেমন আর সবচেয়ে বড় কথা ভারত-বাংলাদেশের এই বিশেষ খাতিরদারি সম্পর্কটা ২০০৭ সালে কেন হতে পেরেছিল? তা নিয়ে আমাদের আম-জনতা লেবেলে জানা-বুঝা কম। বরং তর্ক হতে দেখা যায় এটা ভারত অধীনস্ত এক সরকার কীনা এনিয়ে; এবং বলাই বাহুল্য তর্কে দেখা যায় সংখ্যাগরিষ্ট অংশই মনে করে এটা ভারত অধীনস্ত এক সরকার। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন হল কেন এটা হতে পারল? এককথায় এর জবাব হল, এটা আমেরিকার কারণে। অন্যভাবে বললে বড়ভাই আমেরিকা এশিয়ায় নিজস্বার্থে চীন-ঠেকাতে ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল। আর তাতেই ভারতের ‘মুই কি হনু’ এমন এক অবস্থা তৈরি হয়েছিল। শুরুতে সে নিজেকে অ্যামেরিকান বরকন্দাজ-প্রতিনিধি বা আমেরিকার লোকাল এজেন্ট ভাবা শুরু করেছিল। আর অন্তত টানা দশবছর এটা সে উপভোগ করেছিল যতক্ষণ না ট্রাম্প এসে  ২০১৭ সালে আমেরিকার আগের সরকার-প্রশাসন গুলোর দেয়া বিশেষ সুবিধা ট্রাম্প সেবার সব কেড়ে নিয়ে বাতিল করেছিল। যদিও সেটা ছিল আসলে আগের দেয়া অর্থনৈতিক সুবিধা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক নয়।

    আর এবার সব রাজনৈতিক সুবিধা প্রত্যাহার – এটাই ঘটেছে একালে বাইডেন ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতাসীন হওয়ার শুরু থেকেই একট একটু করে। একমাত্র একালে যা সুনির্দিষ্ট আকারে দৃশ্যমান হচ্ছে!  মূলত ভারতীয় মুসলমানদের উপর নিপীড়ন নির্যাতন, বৈষম্য আর সাধারণভাবে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের অভিযোগ; যেটা প্রতিবছরের ধর্মীয় স্বাধীনতা [Freedom of religion or religious liberty – OHCHR] লঙ্ঘনের সুচকে প্রতিফলিত এবং এর  আমেরিকান কমিশনার প্রতিবছর প্রেসিডেন্টের কাছে সুপারিশ করে গেছে প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু এবার এসব কিছুকে ছাড়িয়ে বাইডেন মোদির বিরুদ্ধে কত সিরিয়াস আর কত আগিয়ে গেছে তা প্রকাশ হয়ে পরে যখন দেখা যায় মোদির বিরুদ্ধে বাইডেন প্রশাসন মোদিবিরোধী সকল গোষ্ঠির নেতা হিশাবে  কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীকে সহায়তা করছে। সেটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে,  গুজরাত হত্যার বিবিসিতে প্রচারিত ডকুমেন্টারি থেকে শুরু করে  আদানির শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি ফাঁস ও ধ্বস নামিয়ে দেয়া, আদানিকে তুলাধোনা করে জর্জ সোরেস (গ্লোবাল শেয়ার মার্কেটে হেজ ফান্ড বা hedge fund এর এক কুতুব শেঠ) এর পাবলিক বক্তৃতা ইত্যাদিতে প্রকাশিত। এরপরে রাহুল গান্ধীর প্রথমে লন্ডন ও পরে আমেরিকা সফর আর সেখানে গিয়ে সবখানেই থিঙ্কট্যাংক ও মানবাধিকার গ্রুপের সাথে দিনরাত বৈঠক – ইত্যাদি এঘটনা থেকেই প্রথম পরিস্কার হয়ে যায় যে ভারতের পিঠে হাত রাখার দিন এবার শেষ হয়েছে! ২০০৭ সালে  বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া নিয়ে আমেরিকা যেভাবে অভিযুক্ত যাই হোক না – মূল ভারত-আমেরিকান সম্পর্কই এখন আর সেই আগের জায়গায় নাই হয়ে গেছে। কারণ, বাইডেন এখন ভারতের আগামি নির্বাচনে মোদিকে আর দেখতে চান না মর্মে অবস্থান নিয়ে ফেলেছেন আর বলা যায় তা প্রকাশ্যও হয়ে গেছে। শুধু তাই নয় এটা এখন পরিস্কার যে সেজন্য আইন বাঁচিয়ে দুরত্বে থেকে বাইডেন যতটা সম্ভব সব ভাবেই মোদি বিরোধীদের জোটের রাহুলকে নেতা মেনে গড়ে উঠার পক্ষে আগিয়ে গিয়ে সহায়তা করেছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা দেখতে পারেন এখানে।  তবে আমার আমেরিকা-ভারত দুরত্বের কথা লেখাতে অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে তাহলে, সম্প্রতিকালে মোদির আমেরিকা সফর এটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করব?

    স্বল্পে মূলকথায় বললে, এবারের মোদির সফর ছিল একেবারেই অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সফর। যেটাকে টেনেটুনে বড়জোড় সামরিক অস্ত্র কেনা-বেচা বা কিছু সামরিক ইকুইপমেন্ট ভারতে  উতপাদন করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও টেকনোলজির চুক্তি হয়েছে বলা যেতে পারে। এমনকি এই সফরে গ্লোবাল বা আঞ্চলিক কোন ভারত-আমেরিকা স্ট্রাটেজিক আলোচনা বা আমরা “কমন স্ট্রাটেজিক বন্ধু” জাতীয় কোন কথাবার্তাও হয় নাই।  তবে এশিয়ায় ভারত ও আমেরিকা উভয়েই চীনবিরোধি নিজ নিজ স্ট্রাটেজিক অবস্থানের রাষ্ট্র। যদিও তাদের মধ্যে কোন কমন জীবিত কোন প্লাটফর্মও [কোয়াডের মত যা এখন মৃত অকার্যকর অর্থে]  অবশিষ্ট নাই বা বেঁচে নাই। ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি [নন অফিসিয়াল জোট ধরণের] উদ্যোগ বলে এতে ভারত-আমেরিকা চীনবিরোধী হয়ে আছে ধরে কিছু কথা হয়; তাও সেটা যৌথতায় নয়! এছাড়া ভারত কোন সামরিক জোট করতে চায় না – এই নীতির দেশ বলে এনিয়েভারতের নুন্যতম উচ্ছসিত হওয়ার বাস্তবতাই নাই। অর্থাৎ মোদির ঐ সফরটার একমাত্র ফোকাস বাণিজ্যিক। কোন রাজনৈতিক আলোচনায় সেখানে হয় নাই। বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা তো অনেক দুরের বাত!

    তাহলে হানিমুন শেষঃ
    হা শেষ! ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন ঘটিয়ে যেটা শুরু হয়েছিল – আমেরিকা বড় ভাই ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল বলে ভারত নিজেই ‘হাসিনার বাংলাদেশের’ মালিক হয়ে গেছে বলে যে ভাব নিয়ে চলছিল এর অবসান হয়েছে। এটাকে আবদি তার এবারের লেখায় বলেছেন বাংলাদেশ নাকি ভারতের প্রভাব বলয়ের দেশ [… Bangladesh is in India’s zone of influence, New Delhi is mum on the sudden proactive US role in Bangladesh’s internal affairs. ] অথবা কখনও বলেছেন হাসিনা হলো ভারতমুখাপেক্ষী সরকার [pro-India Prime Minister Sheikh Hasina-led Awami League …।]।  এবং এভাবেই ভারত এতদিন নিজেকে ভুয়াবাজি মিথ্যা করে হলেও পরাশক্তি ভাব ধরে চলেছিল – এরই সমাপ্তিকাল!
    এর মূল কারণ, এখন বাইডেন প্রশাসন মোদি-যুগের অবসান দেখতে মনস্থ করেছে।  মোদির মুসলমান বিদ্বেষ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন কে ব্যবহার করে বাইডেন তাই এপ্রসঙ্গকে সামনে উঠিয়ে ফোকাসে এনেছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ এটাই। এতে ইতোমধ্যেই মোদিবিরোধী জোট সবল হচ্ছে – নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিভেদকে সেকেন্ডারি করে কার্পেটের নিচে তা চাপা দিতে পেরেছে – মিডিয়াও মোদিবিরোধীয় সরব হয়ে উঠছে। এমনকি এর ছাপ আদালত পাড়াতেও পড়েছে যে মোদির বিরুদ্ধে রায় দেয়া যেন এখন সহজ ও সম্ভব।   কেন্দ্রীয় ক্ষমতার হাতে থাকা প্রতিষ্ঠান সিবিআই, ইডি, রাজ্যপালের অফিস বা আয়কর বিভাগ লেলিয়ে দিয়ে  বিরোধীদের শাসিত রাজ্যে মোদি নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার চরমে উঠেছে – আর এর অবসানে বিরোধীরা জোটবদ্ধ ও নিজেরা ভোকাল হওয়া সম্ভব বলে মনে করতে শুরু করেছে –  বাইডেনের একটু দুরবর্তি সহায়তাতেই!
    এসবের সারকথা হল, যদি ২০২৪ সালে মোদি যদি পুনরায় নির্বাচিত হতে না পারেন তবে মোদিবিরোধী সেই ভারতের উপর অ্যামেরিকান প্রভাব অনেক বেশি হবে।  চাই কী সেই ভারত, আমেরিকার এশিয়া নীতি যেমন বার্মা নীতির সাথে এলাইন [align] বা সমপাতিত করে নিজেকে পুনর্গঠিত হতে পারে বলে আমেরিকার মনে আশা জাগতে পারে।  আর সেই আমেরিকা হবে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমেরিকা যেকথা বলবে সেটাই শেষ কথা! এনিয়ে ভারতের সাথে কোন আলোচনাই নয়।  ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক সেই অভিমুখেই ইতোমধ্যে   রওনা দিয়ে দিয়েছে – এটাই আবদির এই নয়া লেখার প্রধান দাবি!!

    এজন্যই আবদি বলছেন, বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমেরিকার হঠাত সক্রিয় ভুমিকার বিরুদ্ধে ভারত বোবা হয়ে গেছে ও আছে [… New Delhi is mum on the sudden proactive US role in Bangladesh’s internal affairs]। বাংলাদেশের ভিতরেও যতটা শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ যেভাবে নিজস্বার্থ উপযোগী করে আকার দিয়ে, এজেন্সি দিয়ে দাঁড় করিয়ে এতদিন রাজত্ব করছিল এমন সবকিছু থেকে আপাতত গুটিয়ে প্রত্যাহার শুরু হয়েছে।  আর হয়ত তা সীমিত করে পুনর্গঠিত করার ইচ্ছায়ও হতে পারে। এসবেরই সোজা মানে হল,  যেই “বাবা আমেরিকা” ভারতকে পড়শিদের উপর কিছু মাতব্বরি করার ক্ষমতা দিয়েছিল  সেই বাবা এখন ভারতের সব ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ভারতকে ফকির করে দিচ্ছে।

    যে রাশিয়ান জাহাজের মালামাল খালাসের মুরোদ ভারতের হয় নাইঃ
    আবদি তার লেখার শেষের দিকে বাংলাদেশের রূপপুরে পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কিছু রাশিয়ান ইকুইপমেন্ট নিয়ে বাংলাদেশে আসতে চাওয়া এক রাশিয়ান জাহাজ-কে কিভাবে মাল খালাস না করে তা রাশিয়ায় ফেরত নিয়ে যেতে হয়েছিল এর বর্ণনা দিয়েছেন – একটা বড় উদাহরণ হিশাবে।  ঘটনা হলো রাশিয়ান জাহাজটা ছিল আমেরিকার স্যাংশন খাওয়া তালিকায়।  তাই ঐ জাহাজে বাংলাদেশে ভীড়তে গেলে আমেরিকা তা রোধ করতে বাংলাদেশকে আগাম তথ্য জানিয়ে সতর্ক করেছিল। এতে প্রতিক্রিয়ায়  রাশিয়া ও বাংলাদেশের সাথে আলাপ করে ভারত লিড নিয়ে রাজি হয়েছিল যে ঐ নিষিদ্ধ জাহাজ সে কলকাতার হলদিয়ায় ভিড়িয়ে মালামাল নামিয়ে সহজেই সড়ক পথে সেসব মালামাল বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিবে। কিন্তু বিধি বাম! কারণ সেদিন শেষ হয়েছে। তাই আমেরিকা ভারতকেও তার আপত্তির কথা জানিয়ে দেয় যাতে সে নিষিদ্ধ জাহাজ নোঙ্গর না করায় কলকাতা। আবদি লিখছে, আমেরিকা আপত্তির পদক্ষেপে এগিয়ে এলে ভারত পিছু হটে যায়!

    শুধু তাই নয় ঐ লেখার শেষে আপনি একটা মরাল লিখেছে এভাবেঃ
    এই গল্পের শেষে প্রকাশিত নৈতিক ভাষ্যটা হল, আমেরিকা এখন মনে করে তার কথাই শেষ কথা – এর উপর কোন কথা নাই। এবং পুরান দোস্ত ভারত অ্যামেরিকান এই নয়া অবস্থান পছন্দ বা অপছন্দ যাই হোক ভারতকে এমন অ্যামেরিকান ইচ্ছাকে মেনেই বেচে থাকা অভ্যাস করতেই হবে!  [“The moral of the story is that the US believes in having the last word, and even allies like India must learn to live with it whether they like it or not.”। মানে মোদিকে এমন অপমান হজম করতে শিখতে হবেই!

    কেন আবদি এমন সংবাদের বাহক হলেনঃ
    ব্যাপারটা হলো, এই নতুন অভিমুখ সম্পর্কে অনেকদিন ধরেই বলছি। কিন্তু ভারতের  কেউ এসব কথাকে সত্যি বলে বলে আমাদেরকে জানায় নাই। বরং উলটা প্রপাগান্ডা করতেই দেখেছি। তাহলে এই অসহায় ভারত – আমেরিকার সামনে গড়াগড়ি খাওয়া এই ভারতের ইমেজ আমাদের সামনে আনার দায়িত্ব আবদি কেন নিলেন? আগে উপরে লিখেছি বাংলাদেশে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের ততপরতা অন্তত আপাতত গুটিয়ে রাখার কথা কানে আসার কথা বলেছি। আবদির এই লেখা কানে আসা সেসব সংবাদ নিয়ে নিশ্চয়তা যোগালো বলা যায়।  তার মানে ভারত এই খবর নিশ্চয়তা দিয়েই ছড়িয়ে দিতে চাইছে?? মানে বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গ্রুপ বা গোষ্ঠিতে ভাঙ্গা-গড়া না হোক অন্তৎ ক্রমশ এদের ভাঙ্গার কথা নিয়মিত শুনব আমরা – তাই কি???

    যাকিছু আপোষে নিজ ইচ্ছায় আসতেই আছে ও থাকবে  তা সাদরে গ্রহণ কর জনগণ! জনগণ বুদ্ধিমান!

    সবশেষে আবদির কিছু সত্যবচনঃ
     আবদি এখানে যে অবস্থান নিয়ে লিখেছেন তা হল বাংলাদেশে হাসিনার ২০১৪ আর ২০১৮ সালের নির্বাচনে কারচুপি আর গুম খুন হত্যায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের যত অভিযোগ সেসবকেই তিনি সত্য বলে গ্রহণ করে নিয়ে কথা বলেছেন। এসব পাশ কাটিয়েও তিনি সদর্পে বলছেন হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় রাখতে হবে! কেন? তার একটাই সাফাই আর তা হল, বাংলাদেশে ভারতের গভীর স্বার্থ আছে যে হাসিনা-ই রক্ষা করে দিতে পারবে।  অর্থাৎ কোন ন্যায়-ইনসাফ বা আন্তর্জাতিক আইনের ন্যায্যতা নয়। শ্রেফ ভারতের স্বার্থ – কাজেই আব্দি ভারতের সেই স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন????? বড়ই অদ্ভুত না! মানে কোন মানুষ কী কোন ন্যায়-ইনসাফের ভিত্তি ছাড়াই – আমার  ওইটা ভাল লাগে বা ওইটা আমি খাবো আমাকে এনে দেও ইত্যাদি এভাবে কথা বলতে পারে???

    তিনি এটাও পরিস্কার করেই বলছেন তাই এই চাওয়া – ভারতের স্বার্থ বলে তা পেতে চাওয়া এটা হাসিনারও (বেইনসাফি) উচ্চাঙ্খা বটে; এমনকি এর মানে হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মই থেকে ছিটকে পিছলিয়ে পড়ে যাওয়া এমনকি যেটা বাংলাদেশকে এক দলের ও এক নেতার বাংলাদেশে পরিণত করবে…। [That would no doubt serve India’s national interests; and of course, fulfil Hasina’s ambitions; but would also mean ignoring the democratic backsliding that has reduced Bangladesh into a one-party, one-leader nation.]

    তবুও এটাই তাঁর আকাঙ্খা! কি তামসা!

     

     

    আপডেটেডঃ  ১৪  জুলাই ২০২৩; রাত ০২ঃ ০৮
    আপডেটেডঃ     জুলাই ২০২৩;

    >>>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

     

     

  • জয়শঙ্করের কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’!

    জয়শঙ্করের কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’!
    গৌতম দাস

    ০৬ জুলাই ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4Gw

     

     

     

    সময়ে কারও কাছে আঙুর ফল খুবই টক মনে হয় কারণ আঙুর হাতের নাগালে না আসা বা লাভ করা দুষ্প্রাপ্য বা নিজ অযোগ্যতা; তাই এমন কথা বলে চালিয়ে দেওয়া। ঠিক যেমন  ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’ হয়ে গেছে ।
    তিনি দাবি করেছেন, “নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বকালে “প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত সবচেয়ে কম জড়িয়েছে“। প্রতিবেশীদের কাছে এখন ভারতের পরিচয় স্থিতিশীলতার স্থায়ী প্রতীক হিসেবে”। মানে জয়শঙ্কর এখন আমাদের বিশ্বাস করতে বলছেন যে মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বকালে মানে গত নয় বছরে  অন্তত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মোদি ভারত সবচেয়ে কম জড়িয়েছে!!!!! আচ্ছা, এ তো বড় আজিব বাত! 

    তাহলে মোদির সাম্প্রতিক আমেরিকা সফর যা ছিল ২১-২৪ জুন – এই সময়কালের সপ্তাহেরও বেশি আগে থেকেই, ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের প্রমোটেড  ঘরে বসে বানানো রিপোর্ট ভারতে যারা ছাপে (মূলত হিন্দুস্তান টাইমসের রেজাউল লস্কর অথবা শিশির গুপ্তা এবং টাইমস অব ইন্ডিয়ার দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী) আর বাংলাদেশের প্রথম আলোও – এরা সকলে মিলে অন্তত তিনবার ঝলক উঠিয়ে কেন প্রপাগান্ডা করল যে বাংলাদেশের হাসিনার ভাগ্য নাকি মোদির আমেরিকা সফরে মোদি-বাইডেনের এর আলাপের মধ্যেই নির্ধারিত হবে????

    এখন প্রশ্ন হল কে মিথ্যা বলছে?
    দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী লিখেছিল, “ভারতের দুই প্রতিবেশি দেশ বছর শেষে নির্বাচনে যাচ্ছে। ভারত চায়, আমেরিকা এমন কোন উদ্যোগ যেন না নেয় যাতে ভারতের নিজস্বার্থ তাতে ক্ষুন্ন হয়ে যায়”। ভারতের নিজস্বার্থ মানে – আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে হাসিনাকে আরেকবার জবরদস্তিতে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার উপর বাধা সৃষ্টি – এটা বুঝতে হবে। কারণ, ভারতের সব মিডিয়া এই অবস্থান নিয়েই খোলাখুলি লেখা ছেপে চলেছে। আর আমেরিকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি উপদেষ্টা (NSA) জ্যাক সুলিভান [Jake Sullivan] ভারতে এসে ভারতের NSA অজিত দোভালের সাথেকার আলোচনায় নাকি এমন আলোচনা হয়েছে বলে দীপাঞ্জন দাবি করেছেন।

    “Two of India’s neighbours –Maldives and Bangladesh will go to polls later this year and early next year respectively. India is of the opinion that no initiatives should be launched in its neighbourhood that impacts its national interests adversely.”

    হিন্দুস্তান টাইমসের রেজাউল লস্কর লিখেছেন, “বাংলাদেশ-আমেরিকার সম্পর্ক একটা চাপের মধ্যে ঝাকুনিতে পড়েছে। রাষ্ট্রদুত পিটার হাস বারবার করে আগামি নির্বাচন যেন অবাধ ও স্বচ্ছ হয় এর আহবান জানাচ্ছে।”  [“…Peter Haas, repeatedly calling for the holding of a free and transparent general election”] যখন ইতোমধ্যেই আমেরিকা বাংলাদেশের উপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত যে নিজেকে এই অঞ্চলের এক পরাশক্তি বলে মিথ্যা করে হলেও ফুটানি করে ভাব দেখাতে চায় – সেই ভারতের কাছে নাকি হাসিনার সাহায্য চেয়েছে। [“Bangladesh has sought India’s assistance to tide over a rough patch in its relations with the US, especially over the conduct of elections in the neighbouring country, people familiar with the matter said on Tuesday.”]

    প্রথম আলোর প্রচেষ্টাঃ
    আর  রেজাউল লস্করের এই রিপোর্টারই উধৃতি দিয়েই আমাদের প্রথম আলো এক রিপোর্ট ছেপেছিল। যেন বাংলাদেশের সরকার ও তার সমর্থক এবং যারা ভারতের স্বার্থের ভিতরেই নিজস্বার্থ দেখে অথচ থাকে বাংলাদেশে – এমন গোষ্ঠিগুলোকে মিথ্যা করেই আস্থার কথা শোনাতে চেয়েছিল – এই অপ্রমাণিত কেবল জল্পনা-কল্পনার খবর (?) ছেপে উত্তেজনা সৃষ্টি করার মাধ্যমে!
    তবে এখানে ভারতের জ্ঞোয়েন্দা বিভাগ ও প্রথম আলোকে দেয়া তাদের এসাইনমেন্ট এর উদ্দেশ্য খুবই পরিস্কার। যেমন প্রথম আলো লিখছে, “…হিন্দুস্তান টাইমসের সূত্র বলছে, নয়াদিল্লির সঙ্গে আলোচনায় একটি মুক্ত ও সমৃদ্ধ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের গুরুত্বের দিকে ইঙ্গিত করেছে ঢাকা। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশকে চীনের দিকে ঠেলে দিতে পারে—এমন সম্ভাবনার ওপরও আলোকপাত করেছে তারা“।
    অর্থাৎ ভারত আমেরিকাকে  চীনা জুজুর ভয় দেখাচ্ছে যে, যদি আমেরিকা তোমরা বাংলাদেশের আগামি নির্বাচন যেন অবাধ ও স্বচ্ছ হয় – এই উদ্দেশ্যে হাসিনা সরকারকে ভিসা নিষেধাজ্ঞা-সহ নানান উপায়ে চাপ সৃষ্টি করতেই থাকো তাহলে নাকি হাসিনা চীনের কোলে গিয়ে উঠে পড়তে পারে!  মানে আরেকবার রাতের নির্মাবাচন করতে দাও – এই হলো ভারতের অদ্ভুত আবদার!!!  ভারত এই কথিত চীনা-জুজুর মিথ্যা ভয়ের কথা ছড়িয়ে হাসিনাকেই আরেকবার ক্ষমতায় রেখে দিবার পক্ষে কথা তুলতে চাচ্ছে।
    আচ্ছা তাহলে এটাই কী জয়শঙ্করের কথিত  ” প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত সবচেয়ে কম জড়ানো – কী তামাসা! আমরা কী প্রথম আলোর পারফরমেন্সে অভিভুত – এটা বলে উঠব!!!

    আরো আছেঃ
    প্রথম আলোর নয়াদিল্লির প্রতিনিধি সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সৌম্যের লেখা প্রথম আলোতে কখন কী পরিচয়ে ছাপা হবে এর তাল-ঠিকানা পাওয়া মুশকিল। যেমন কখনও তাঁর লেখা ছাপা হচ্ছে মতামত হিশাবে, কখনও নাম ছাড়াই শ্রেফ ‘নয়াদিল্লির প্রতিনিধি’ এভাবে পরিচয় লিখে; নয়ত প্রকাশ্যে নিজের নাম উল্লেখ করেই!!  গত ১৮ জুন সৌম্যের একটা লেখা ছাপা হয়েছিল; মানে মোদি-বাইডেন সরাসরি বা সামিট বৈঠক হয়েছিল ২৩ জুন – এর পাঁচদিন আগের ঘটনা সেটা। অর্থাৎ মোদির আমেরিকা রওয়ানা দিবার আগেই। সে লেখার সারকথা ছিল মোদি-বাইডেন বৈঠকে নাকি বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গ উঠছেই। এমনকি এভাবে লেখা হয়েছিল যে, “……সন্দেহ নেই, মোদি-বাইডেন বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের মন বোঝার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে বাংলাদেশের নির্বাচনী গতিপ্রকৃতি”। অর্থাৎ সোজাকথায়, বাংলাদেশের বা হাসিনার নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারিত হবে মোদি-বাইডেন বৈঠকে!!!!!

    সৌমের ১৮ জুনের লেখায় আরো বলা হয়েছিলঃ

    এক.
    “দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই চুক্তির দিকে দুই দেশের নজর যতটা নিবদ্ধ, ততটাই আগ্রহে এই সফরের দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ। সে দেশের জাতীয় সংসদের নির্বাচন ‘সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ’ করে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নতুন যে ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে, যা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এই মুহূর্তে সরগরম, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি”।

    দুই.
    “নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নিরন্তর চাপ, নতুন ভিসা নীতির মধ্য দিয়ে যা প্রতিফলিত, বাংলাদেশ তো বটেই, ভারতকেও তা খানিকটা অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছে। ওই নীতির রূপায়ণ, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে তার সম্ভাব্য প্রভাব এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন ভারতের অস্বস্তি ও চিন্তার কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের এই নয়া ফরমান নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহল পরস্পরের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছে। বাংলাদেশকে এই বিষয়ে আশ্বস্তও করা হয়েছে যে আসন্ন সফরে এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদি অবশ্যই মতবিনিময় করবেন”।

    তাহলে আজ ৫ জুলাই মানে মোদির সফর শেষে ১১/১২ দিন পরের।  তবু ২৩ জুন মোদি-বাইডেন বৈঠক শেষ হয়ে গেলেও এরপর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মোদি-বাইডেন বৈঠকে আসলেই কী আলোচনা হয়েছিল এসব নিয়ে ভারতের সকল মিডিয়া বা আমাদের প্রথম আলো …… অথবা কেউই না; সবাই চুপ হয়ে আছে আর মুখে কুলুপ! না সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এর কোন লেখা ??? সবাই মুখে কুলুপ এঁটে গায়েব, ডিসাপিয়ার্ড!!

     

    তবু ২৩ জুন মোদি-বাইডেন বৈঠক শেষ হয়ে গেলেও এরপর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মোদি-বাইডেন বৈঠকে আসলেই কী আলোচনা হয়েছিল এসব
    নিয়ে ভারতের সকল মিডিয়া বা আমাদের প্রথম আলো …… না সবার মুখে কুলুপ; না সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এর কোন লেখা ??? সবাই মুখে কুলুপ এঁটে গায়েব, ডিসাপিয়ার্ড!!
    আগের দুসপ্তাহ ধরে মিথ্যা চাপাবাজির সব রিপোর্ট ছাপিয়ে ২৪ জুন থেকে আজও সবাই লুকিয়ে পড়ে আছে!!! আহা! কী সুবিধা!!!

     

    এখানেই শেষ নয়ঃ
    এরপর আবার সেই সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনি হাজির! কিন্তু নতুন বেশভুষায়!
    আর এবার একই প্রথম আলোতে গত ২ জুলাই তার লেখার শিরোনাম কিন্তু এবার একেবারে উলটা কথায় –  “প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে, বললেন জয়শঙ্কর”। আর সবচেয়ে বড় কথা এটাও ঘরে বসে এক বানানো খবর! আচ্ছা কন তো সৌম্য এটা একটা কথা হইল? নিজের মান-সম্মান বিশ্বাসযোগ্যতা এগুলো কিছুই না??? টাকাই সব!
    আপনি সৌম্য এতদিন কইলেন বাংলাদেশের বা হাসিনার নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারিত হবে মোদি-বাইডেন বৈঠকে! – মানে ২৩ জুনের বৈঠকে, মানে প্রধানমন্ত্রী মোদির সরাসরি বাংলাদেশের বা হাসিনার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করবেন!! আর এখন এখানে কইতেছেন,জয়শঙ্কর বলেছেন – প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে…।

    তাইলে সৌম বা প্রথম আলো আপনারা বলেন আপনাদের কোন কথাটা সঠিক????
    আপনাদের দুইটা কথার একটা তো অবশ্যই মিথ্যা কথা, এটা নিশ্চিত!

    কোনটা নিশ্চিত মিথ্যাঃ
     প্রথম আলোতে ২ জুলাই ছাপা হওয়া সৌমের লেখাটার শিরোনাম – প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে  – গুগল সার্চে দেখা গিয়েছে এটা ভারতে কোথাও ছাপা হয়েছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায় নাই।  আর এই বানানো খবরটা বাংলাদেশে কেবল যুগান্তর, কালবেলা আর মানবজমিনে মাত্র; মানে বাংলাদেশেও আর কোন মিডিয়ায় ছাপা  হয় নয়। আর এরচেয়েও তাজ্জব ব্যাপারটা হল, এটা প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছে নয়াদিল্লি প্রতিনিধি হিশাবে সৌমের নিজস্ব রিপোর্ট হিশাবে। মানে সৌম নিজেই সোর্স!  তাহলে সে একই লেখা যুগান্তর, কালবেলা [পরে আবিস্কার হল যে সে স্বীকারোক্তি দিয়েছে যে তার খবরটা প্রথম আলোরটাই মানে ওটার কপি] আর মানবজমিনে ছাপা হয় কী করে???  খবর ছাপলে যে সোর্স বলতে হয় যেন তারা এটা জানেই না। তাই যেন এরা এই দুই মিডিয়া কেউই তাদের খবরের সোর্স কী তা লেখেই নাই।  বাংলাদেশের জার্নালিজমে সবচেয়ে বিপদজনক এক ধারা শুরু হয়েছে সোর্স-রেফারেন্স ছাড়া রিপোর্ট ছাপা অথবা আরো বিপদজনক এক শব্দ তারা লিখে  – “ডেস্ক রিপোর্ট”! অথচ  জার্নালিজমে ডেস্ক রিপোর্ট(!) বলে কিছু  কী আছে? হতে পারে না। তবে বাংলাদেশে এর মানে হল, অন্য মিডিয়া থেকে কপি করে এনেছে কিন্তু অসততা করে দেশি-বিদেশি সেই মিডিয়ার নামটাও বলতে চায় না। তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিকটা হল – ডেস্ক রিপোর্ট মানে খবরের সোর্স বলে কিছু নাই (মানে পুরাটাই মিথ্যা বা গুরুত্বপুর্ণ কোন শব্দ বা বাক্য বদলে দেয়া টুইস্ট নিউজও তা হতে পারে) অথচ একে মিডিয়া রিপোর্ট আর জার্নালিজম বলে চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে!! আর প্রথম আলো এই নষ্ট-সাংবাদিকতার নেতা উদ্গাতা!

    আরো গভীরে যাইঃ
    সৌমের প্রথম আলোতে ২ জুলাই ছাপা হওয়া লেখা এটা কী এর আগের দিন বা আগের এক সপ্তাহের মধ্যে ঘটে যাওয়া ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কোন প্রেস ব্রিফিং বা কোথায় দেয়া বক্তব্য???
    জবাব হল – না একেবারেই না। সৌম্য রিপোর্টে কেবল লিখেছেন, “……রাজধানী দিল্লির ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে নরেন্দ্র মোদির শাসনের ৯ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশের ‘সাফল্য’ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। কিন্তু কোথাও কবে  জয়শঙ্কর একথা বলেছেন সে প্রসঙ্গে সৌম লিখেছেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গত শুক্রবার এ মন্তব্য করেন।  কিন্তু গুগল সার্চে এই রিপোর্টটা এক প্রথম আলোতে সৌম্যের লেখা  ছাড়া আর কেউ লিখে নাই বা কোন পত্রিকা নিজে রিপোর্ট লিখে ছাপে নাই। আর আগেই বলেছি বাংলাদেশের যেদুই একটা মিডিয়া এটা ছেপেছে তা তারা প্রথম আলোর নাম উল্লেখ করে বা না করে মানে সোর্স উল্লেখ না করেই ছেপে দিয়েছে। আর কোন “এরেঞ্জমেন্ট” থাকলে সেটা গোপন রেখে দিয়েছে।

    কেন আর কোথাও (ভারতে বা বাংলাদেশে) সৌম্যের লেখা এই রিপোর্ট এর বিষয়ে রিপোর্ট নাইঃ
    ভারতের কেন্দ্র সরকার বা সংসদের নির্বাচন আর সাত-আট মাস বাকি; মোটামুটি বললে আগামি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এর শুরু হতে পারে।  ফলে জয়শঙ্কর-মোদি সহ সরকারের সকলের সব কাজকর্ম এখন নির্বাচন-মুখি বা মোদির ইমেজ বাড়ানোকে লক্ষ্য করেই আগাচ্ছে।  তাই গত নয় বছরে দেশে-বিদেশে মোদির সাফল্য কী – দেশের মুখ-উজ্জ্বল কী করেছেন এনিয়ে প্রপাগান্ডায় নেমে গেছেন জয়শঙ্কর! তাই তিনি এক বক্তৃতা আয়োজন করেছিলেন। আর সেখানেই দিয়েছিলেন এমন কিছু বক্তব্য। কিন্তু প্রথম কথা সেটার তারিখ কবে??? ওর তারিখ ছিল ৮ জুন। কীভাবে বের করলাম?
    অনেক খুজাখুজির পরে দেখা গেল মোদির নয় বছরের সাফল্য  আর জয়শঙ্করের বক্তব্য এদুই শব্দে মিল আছে এমন একটাই ইংরাজি রিপোর্ট আছে – যা ভারতের প্রায় সবাই ছেপেছে। যদিও স্বভাবসিদ্ধ ভাবে মোদি-বিজেপি এই প্রপাগান্ডা খবরটাকে টুইস্ট করেছে কুখ্যাত ANI কে দিয়েও। অনেকে সেটাই ছেপেছে। যেমন দ্যাপ্রিন্ট এর লেখা। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস্র লেখা। ইত্যাদি। আর এর বাইরে এক মিডিয়া যা আমার নজরে এসেছে তা হলো “লাইভ-মিন্ট” – এই কম চলা পত্রিকার রিপোর্টটা ভাল- এটা সরকারি এজেন্সি পিটিআই এর নিউজ।  কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ হল এসব খবরই ভারতে প্রকাশিত হয়েছে  ৮ জুন তারিখের; মানে যেদিন জয়শঙ্কর তা বলেছেন।
    তাহলে কী ৮ জুন তারিখে প্রকাশিত জয়শঙ্কর এর বক্তব্য প্রসঙ্গে কী জয়শঙ্কর আবার পরবর্তিতে পয়লা জুলাই তারিখে এসে তিনি একই বিষয়ে মিডিয়ায় কথা বলেছেন??? কারণ সৌম্যের রিপোর্টের দাবি এই তারিখ ১ জুলাইয়ের!!!! এটা একেবারেই অবিশ্বাস্য!!!  কারণ, যে প্রশ্নের উত্তর নাই তা হল,  সেক্ষেত্রে কেন ভারতের আর কোন মিডিয়ায় জয়শঙ্করের এই কথিত ১ জুলাইয়ের মিডিয়ার সাথে কথা বলা নিয়ে ভারতে কোন রিপোর্ট কেউ ছাপে নাই কেন??? এটা বেশ অস্বাভাবিক, বিশ্বাস অযোগ্য!!!

    তাহলে সৌম্য বন্দোপাধ্যায়  ১ জুলাই জয়শঙ্কর এমন সব কথা বলেছেন বলে দাবি করে রিপোর্ট লিখলেন কেন??? এর কোন ব্যাখ্যা নাই।
    তবে, খুব সম্ভবত একাজ করার কারণ হল কংগ্রেস দল।  আসলে জয়শঙ্কর খুব সম্ভবত আবার একই প্রসঙ্গে – ফিরে নতুন করে কিছুই বলেন নাই। কিন্তু কংগ্রেস দল চায় জয়শঙ্করের বক্তব্যকেই একটু সমালোচনা করতে যা বাংলাদেশে প্রকাশিত হবে। আর তাই সৌম্যের ঐ ভুয়া রিপোর্টে  যার মধ্যে (বাড়তি হিশাবে) কলকাতার বাঙালি এক সাবেক কূটনীতিক দেব মুখোপাধ্যায়  এর বরাতে কিছু সমালোচনা ছাপা হয়েছে। যেখানে তিনি “তিস্তা চুক্তি না হওয়া” আর “অখণ্ড ভারতের মানচিত্র” মোদি প্রকাশ করেছে বলে –  এনিয়ে অসন্তোষ উষ্মা প্রকাশ করেছেন। যদিও ফ্যাক্টস হল, ভারত বাংলাদেশ থেকে করিডোর নিয়েছে কিন্তু প্রতিশ্রুতি দিয়েও তিস্তা পানি আজও  দেয় নাই – এর প্রথম ভায়লেটর (২০১১ সালে বাংলাদেশে সফর) বা লঙ্ঘনকারী সেসময়ে কংগ্রেসেরই প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। তাঁর ক্ষমতাকালের ও ২০১১ সালে মনমোহনের বাংলাদেশ সফরকালে এটা উন্মোচিত হয়েছিল যে ভারত তিস্তা পানিচুক্তি ভঙ্গ করছে। দেখুন সেসময়ের বিবিসি রিপোর্ট।    আর সেই একই ভায়োলেটর পরের প্রধানমন্ত্রী মোদি – এই ফ্যাক্ট তো লুকানো যাবে না। সে যাই হোক তাহলে, সৌমের এই রিপোর্ট কী মোদির নয়, কংগ্রেসের অর্থে লেখানো??? প্রথম আলো অর্থের লোভে এই জুয়াচুরি-সাংবাদিকতা করেছে???

    শেষ কথাঃ প্রথম আলোতে ছাপা সৌম বন্দোপাধ্যায়ের ২ জুলাইয়ের এই রিপোর্ট  অস্পষ্ট রহস্যময়ই থেকে গেল!

    আপডেটঃ ৭ জুলাই ২০২৩; দুপুর ১২ঃ ৩৪

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ভারত কী কোন নয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে?

    ভারত কী কোন নয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে?
    গৌতম দাস

    ০৪ জুন ২০২৩   ০০ঃ ০৪
    https://wp.me/p1sCvy-4yT

     

         দেড় দশকে দেশ আরও সাম্প্রদায়িক হয়েছে – প্রথম আলো

    অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ভারত হাসিনা-বিরুদ্ধ-ততপরতায় নেমে পড়েছে, অবস্থান নিয়েছে। কিছু জায়গায় তো একেবারে প্রকাশ্যে, দেখিয়েই তা করতে শুরু করেছে।
    ভারতের মোদি সরকার বিশেষত তার গোয়েন্দা বিভাগ বাংলাদেশে হাসিনা সরকার আর টিকছে না যেন তা ধরে নিয়ে কাজকাম শুরু করে দিয়েছে। তাদের সকল ততপরতা এখন এমন হাসিনাবিরোধীতাকে টার্গেট করে যে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের জন্য তারা এখন ঝেঁড়ে কেশে হাসিনাকেই দায়ী করে বাইডেনের কাছে নালিশ দিয়েছে ও একশন দাবি করেছে। সেই চিঠির ইংরাজি পিডিএফ কপি এখানে। আর এর এক উল্লেখযোগ্য প্যারাগ্রাফ অংশ বাংলা করে দিচ্ছি নিচে।


    ” যখন থেকে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় তখন থেকে আজ অবদি বাংলাদেশের হিন্দু জনসংখ্যা অর্ধেক হয়ে গেছে। বাড়িঘর পুড়ানো, লুট করা, মন্দির ধবংস করা ও প্রতিমা ভাঙচুর, খুন রেপ আর বাধ্য করে ধর্মান্তরকরণ ইত্যাদিতে সবকিছুরই পরিণতি হয়েছে যে হিন্দুরা ভারতে পালায়ে গেছে।  শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশের খৃশ্চান জনগোষ্ঠিকেই নিপীড়ন-নির্যাতন করেছে; তাদের তাদের উপাসনালয় জ্বালিয়ে দেয়া লুট করা, পাস্টার-পাদ্রীকে জেলে নেওয়া আর ধর্মান্তকরণ এর সময় পরিবার তছনছ করে দেয়া ইত্যাদি সবই ঘটেছে”।
    চিঠির যে অংশটার বাংলা অনুবাদ এটা নিচে সেটারই ইংরাজিটা, 

    “Since Sheikh Hasina’s rise to power, the Hindu population has been halved. Looting and burning of households, destruction of temples and religious idols, murder, rape, and forced religious conversion are causing Hindus to flee Bangladesh. Sheikh Hasina’s government also has persecuted Bangladesh’s minority Christian population — burning and looting places of worship, jailing pastors, and breaking up families when religious conversion occurs”.

    আসলে ভারতীয় প্ররোচনায় ড্রাফট করা আর কংগ্রেসম্যানদের দিয়ে সে অভিযোগ তোলার সময়ে হাসিনার বিরুদ্ধে বিরোধীদলের কর্মীদেরকে যতগুলো গুম, খুন, অপহরণ, বিনাবিচারে হত্যা বা বেআইনি আটকে রাখার অভিযোগ দায়ের কাছে ভারতের কৌশল সেসব অভিযোগই আসলে যেন কেবল হিন্দুদের কিছু খৃশ্চানের উপর করা হয়েছে – এইভাবে তুলে এনে সাজানো হয়েছে ঐ চিঠিতে। আরেক দিক থেকে দেখলে মোদি যেভাবে সবকিছুতে ভারতের মুসলমানেরা হিন্দুদের ধর্মান্তকরণ [কেরালা স্টোরি সিনেমা]  করছে বলে ভুত দেখে থাকে সব জায়গায় সেভাবেই হাসিনাকেও ঐ একই ধর্মান্তকরণের কর্তা-নায়িকা বলে তুলে ধরা হয়েছে। ব্যাপারটায় বেশ আমোদ হয়েছে আমাদের! এই আর কী!
    আর আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চাইলে নিশ্চয় এখন আপসোস করতে পারেন যে গত ২০২১ সালের কুমিল্লায় দুর্গাপুজার  হামলার ঘটনায় জড়িত সকলের খবর ম্যাপ এঁকে বের করলেও কেন তিনি এদের পিছনের ভারতীয় হাত ও লিঙ্ক উন্মোচন বা-প্রকাশ করেন নাই কেন একথা ভেবে!!! স্বামীর সুখের কথা ভেবে স্ত্রীরা এভাবে আর কতদিন……।

    অর্থাৎ হাসিনা সরকার আর টিকবে না মনে হচ্ছে ভারত যেন এমন সিদ্ধান্ত-অবস্থান পৌছে গিয়েছে। এনিয়ে সুবীর ভৌমিক গেল একসপ্তাহে দুবার লেখা দিয়েছে। প্রথমটাই হাসিনাকে বিরোধিতা দেখালেও আবার দ্বিতীয়টাতে ভান করেছে যে যেন ভারত সরকার ও গোয়েন্দা বিভাগ হাসিনা সরকারের টিকানোর জন্য কাজ করেছে। নিচে দেখেন সুবীরের লেখা থেকে সেই দাবির অংশটুকুছিল এরকমঃ

    “Indian diplomats and national security officials have flown back
    and forth in a week of intense parleys
    (foreign secretary Vinay Kwatra to Washington DC, R&AW chief Samant Goel to Dhaka, to cite a few)”

     মানে হল, বাস্তবে ভারত হাসিনাকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেও সুবীর এখনও একটু নাটক করতে চাইছেন। অথচ এনিয়ে ভারত সরকার ভারতের মিডিয়াকেও হাসিনা (বাংলাদেশ)বিরোধি সরকারি গাইড লাইন দেয়া হয়েছে। যেমন দেখুন “ভিসা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পালটা কূটনৈতিক বার্তা? চিনের সঙ্গে বৈঠকে ঢাকা” ।  অথবা দ্যাহিন্দু পত্রিকার বিরাট আঁতলামো রিপোর্ট যার শিরোনাম  – Explained | How has Dhaka reacted to the U.S. threat on visas? – অথচ ভিতরে শিরোনামে দাবির কথা নিয়ে কিছুই নাই কেবল খামোখা চীনকে দোষারোপ ছাড়া।   মানে হল হাসিনা যেন চীনের পক্ষে নতুন করে যাচ্ছে অথচ এর কোনটাই সত্যি না।  আর ভারত এই উসিলা তুলছে  যেন বাইডেনের কোলে উঠে হাসিনাবিরোধি সাজতে পারে সে। ফ্যাক্টস হল, হাসিনা নতুন করে কোন চীন-ঘনিষ্ঠতা করে নাই। কারণ সেই সুযোগই নাই। এই ভোলাটাইল [volatile] বা অস্পষ্ট মুহুর্তে চীন নিজেই কোনদিকে ঝুঁকতে আগ্রহি নয়, কেবল রুটিন ততপরতা ছাড়া।

    কিন্তু কেন এখন ভারত হাসিনার হাত ছেড়ে দিতে সময় হয়েছে মনে করলোঃ
    ভারতীয় র-এর প্রধান সামন্ত গোয়েল বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন – একথা সুবীর ভৌমিক তার নিজের লেখাতেই “ভারতের বীরত্ব হিশাবে দেখাতে গিয়ে” স্বীকার করেছেন। যদিও গোয়েল সাব এসেছিলেন এনিয়ে হাসিনাবিরোধী শক্তির সাথে একসাথে কাজ করতে চাওয়ার অফার দিতে। কিন্তু বাংলাদেশের তেমন বা অমন কোন শক্তিই সামন্ত গোয়েলের সাথে কাজ করতে আগ্রহ দেখায় নাই। গোয়েল সাব ভেবেছিলেন হাসিনাবিরোধি কোন একশনে যৌথকাজ কারবারের অফার দিলে বাংলাদেশের যে কেউ ঝাপায় পড়ে গোয়েল সাব রে কোলে তুলে নিবে। আর এর ভিতর দিয়ে আগামি হাসিনা-উত্তর  নয়া সরকারের মধ্যেও হাসিনা আমলের মতই গোয়েল সাবেরা ঢুকে বসে থাকার সুযোগ নিবেন, ধারাবাহিকতা বা কন্টিনিউটি বহাল থাকবে! কিন্তু হায়! গোয়েল সাব হতাশ হয়েছেন!
    এই খবর নিয়ে যদিও আরেকটা সুত্র একটু কারেকশন দিয়েছে। তাদের মতে সামন্ত গোয়েলের সাথে বাংলাদেশের হাসিনাবিরোধী শক্তির দেখা হয়েছে সেকথা সত্য তবে সেটা বাংলাদেশে নয়, বিদেশে দেখা হয়েছে। মানে গোয়েল সাহেব বাংলাদেশে আসেই নাই। সে যাই হোক, এখানকার মূল কথাটা হল, ভারত হাসিনার হাত ছাড়ার সময় হয়েছে মনে করেছে।

    আসলে সারকথাটা হল, সামন্ত গোয়েল বা ভারত সরকার প্রচন্ড অধৈর্য ও অস্থির হয়ে উঠেছে। মূল কারণ, হাসিনা সরকারের টিকে যাওয়া-না যাওয়া নিয়ে অবস্থা তেমন ভাল না এমন ভয় অনেকের মধ্যেই ঢুকেছে; অন্তত ভারতের মত বিদেশিস্বার্থের মধ্যে “এক অনিশ্চয়তা” শুরু হয়েছে। সেখান থেকেই এমন অনুমান যে  হাসিনা যদি টিকতে নাই পারেন সেক্ষেত্রে হাসিনার সরকারের ক্ষমতা-উত্তর বাংলাদেশে কোন অন্তর্বর্তি সরকার বা পরের নির্বাচিত সরকার ইত্যাদিতে সম্ভব্য যারাই ক্ষমতায় আসবেন অনুমিত সেসবের কারোর সাথেই এখনও ভারতের কোন ঘনিষ্ঠতা দূরে থাক কোন নুন্যতম সম্পর্কের কিছুই তৈরি হয় নাই। কাজেই এই সম্পর্ক, ঘনিষ্ঠতা তৈরি করতেই এখন থেকেই ভারত বেপরোয়া অস্থির হয়ে উঠেছে। কিন্তু কী থেকে শুরু করবে তার কিছুই খুজে পাচ্ছে না।  যেখানে বিএনপি সেই প্রণয় ভার্মার বাসায় কথিত ডিনারের দাওয়াতের পরে যেন হ্যালো বলা থেকেও আরো দূরে চলে গেছে। মূল কারণ, ভারতের নিজ সম্পর্কে হুদাই খুবই উচ্চ ধারণা! ভারত ধরে নিয়ে আছে যে সেই-ই এতই ক্ষমতাবান যে বিএনপির নেতা কে হবে অথবা কী রাজনীতি করবে তা ভারত ঠিক করে দিতে পারে! যেখানে বাইডেনের হাত থেকে মোদি বাঁচে কিনা, কিভাবে তাই এখন নিলামে উঠেছে বড় বাজি হয়ে! অথচ এটা তো বুঝাই যাচ্ছে,  সরকার বদল না হলে বিএনপি কারোও সাথেই কথা বলবে না। এমনকি ভারতের বেলায় সরকার বদলের পরও কী হবে বিএনপি ভারতকে নিয়ে কী করবে এর পুরাটাই এখনও অনিশ্চিত।  সম্ভবত সঠিক শব্দ হবে যে  – সেটা এখনও বিএনপির কাছে  “এজেন্ডাই হতে পারে নাই”।  যেকারণে, সবমিলিয়ে ভারত ইতোমধ্যেই বিএনপিবিরোধী প্রপাগান্ডা শুরু করে দিয়েছে। অনেকের ভারত-ইসরায়েলি কালেকশনের সোয়েব চৌধুরীর কথা মনে আছে হয়ত। সেই সোয়েব একাজ শুরু করে দিয়েছে। যদিও এসব কাজ এখন মানুষ আর খায় না। কারণ সব গুমোর উদাম হয়ে গেছে তাই এসব ছেচড়ামির আর কোন দাম নাই!

    কিন্তু ভারত কেন এত মরিয়া হয়ে আগেই হাসিনার হাত ছাড়তে চায়?
    এর পিছনের সবচেয়ে বড় কারণ, গত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশকে চুষে চুষে খেতে, একপক্ষীয় সুবিধা নিতে যত দীর্ঘ তার অফুরন্ত স্বার্থের লিস্ট ভারত তৈরি করেছে, হাসিনা-উত্তরকালে সেসবের কী হবে? সেই একই ধারাবাহিকতা-সুবিধা তখনও  থাকার তো কোন কারণ নাই। এছাড়া চুষে-লুটে যেসব একতরফা কর্মকান্ডে বাংলাদেশের সম্পদ নিয়ে যাচ্ছে আর এসবের উপর নির্ভরশীল হয়ে যে নিজস্বার্থ ব্যবস্থা-বাণিজ্য গড়ে তুলেছে তা তো আর বজায় থাকবে না – সব অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এটাই স্বাভাবিক।  সুবীর ভৌমিক সরাসরি এসব  ইস্যুতে ভারতের স্বার্থ নিয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে বিএনপির নাম ধরেই লিখেছে যে আগামি বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে কখনও যদি ভারতকে হাসিনার দেয়া বিভিন্ন একপক্ষীর চুক্তির সুবিধা সব কেড়ে নিয়ে বাতিল করে দেয় তাহলে কী হবে [what with khateda Zia’s threart to review all agreements Hasina has signed with India]!!  সকলেই জানে এবিষয়ে ভারতের স্বার্থের স্টেক বা স্বার্থ-বহর অনেক লম্বা। তাই এখান থেকেই  ভারতের সব দুঃশ্চিন্তার শুরু। তাই বাংলাদেশে এমন যেকোন একটা রাজনৈতিক গ্রুপ বা শক্তিকে পেতে মরিয়া যারা আগামিতে সম্ভাব্য ক্ষমতাসীন হবেন – ফলে ভারতের বাংলাদেশ লুটার স্বার্থের ধারাবাহিকতা ঠিক থাকে! ভারতের দুর্ভাগ্য যে এখনও এমন কোন বাংলাদেশি শক্তির হদিস তারা পায় নাই। আর বিএনপি সে তো আরো দূরে। আর ততই গোয়েল সাহেবেরা ডেসপারেট হয়ে বলতে চাচ্ছেন হাসিনার বিরুদ্ধে কাজ করা বা তাঁকে বেচে দিয়ে হলেও ভারতকে বাংলাদেশের একটা আগামি রাজনৈতিক শক্তির নাগাল পেতেই হবে।
    ভারতের হাসিনার হাত ছাড়ার প্রথম উদ্যোগের হদিস  আমরা কিছু এখান থেকেই পাচ্ছি। তবে এটার প্রকাশ্য রূপ-ততপরতা নাগাল পাওয়া বা জানা যথেষ্ট কম-ই বলতে হবে। কারণ সেনা বা গোয়েন্দা বিষয়ক তথ্য যথেষ্ট পাওয়া যায় না আর পেলেও সেনসেটিভ বলে অত খুলে আলোচনা করা যায় না। সেটা সঠিকও না, হিতে বিপরীত হতে পারে।  তাই ভারতের দ্বিতীয় উদ্যোগটার দিকে তাকানো যাক। এটা তুলনায় অনেক স্পষ্ট  আর উন্মুক্ত।

    ভারতের দ্বিতীয় উদ্যোগঃ
    ভারতের এই উদ্যোগ অনেক প্রকাশ্য এবং অনেক দূর ইতোমধ্যে আগিয়ে গেছে।  আর সুবীর যেমন ক্রেডিট নিতে বলেছিল যে, ভারতের foreign secretary Vinay Kwatra to Washington DC, R&AW chief Samant Goel to Dhaka ) যারা হাসিনারর পক্ষে কাজ করতে ভীষণ দৌড়াদৌড়ি করছে – সেটা দৌড়াদৌড়ি ছিল অবশ্যই কিন্তু তা ছিল হাসিনার বিপক্ষে, তাঁকে বেচে হলেও হাসিনার হাত ছেড়ে দিয়ে হলেও ভারতের আগামি স্বার্থ উদ্ধার বা যা ছিল বাংলাদেশের আগামি রাজনৈতিক শক্তি যারা হবে তাদেরকে তালাশ বা অন্তত তাদের একটা লিঙ্ক যোগাড় -এই ছিল ভারতের ওসব দৌড়াদৌড়ির উদ্দেশ্য।

    কংগ্রেসম্যান বা কংগ্রেস প্রতিনিধি সম্পর্কে কিছু কথাঃ
    সরাসরি হিন্দুইজমের সমর্থক এক অ্যামেরিকান কংগ্রেস প্রতিনিধি ছিলেন তুলসী গাব্বার্ড।  [Tulsi Gabbard] এই নামে দেখুন এখানে যিনি সর্বশেষ ২০২০ সালেও কংগ্রেস সদস্য ছিলেন। তাকেঁ ঘিরে এছাড়া  হিন্দু অ্যামেরিকান ফাউন্ডেশন [Hindu American Foundation (HAF)], ইসকন এমন আরো অনেক কিছু মিলে ভারত কিছু কংগ্রেসম্যান যোগাড় করেছিলেন যাদেরকে ভারত প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ব্যবসা দিয়ে নিজরাষ্ট্র স্বার্থে  ভারত ওসব কংগ্রেসম্যানদের দিয়ে লবি করাত। আমেরিকার মোট কংগ্রেসম্যান হল ৪৩৫ জন। এদের মধ্যে নুন্যতম দশজনকে ভারত তার স্বার্থের পক্ষে লবি-কারি বানাতে পারবে সেটা নিশ্চয় অসম্ভব কিছু নয়। সেসবের একালের ততপরতা হিশাবে মনে করা যায় যখন একালে ছয় রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কাছে পাঠান এক চিঠি।

    তাই একালে  হাসিনা-উত্তরকালে  ভারতের কী হবে এর সন্ধানে থাকা ভারতের দ্বিতীয় উদ্যোগটা হল এই ছয় অ্যামেরিকান রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান (আমাদের ভাষায় যারা অ্যামেরিকান সংসদ সদস্য) প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কাছে চিঠি পাঠানো থেকে। গত ১৭ মে এমন ছয় জন কংগ্রেসম্যান একটা চিঠিতে যৌথভাবে স্বাক্ষর করে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের কাছে পাঠিয়েছিল। এই চিঠির বিষয়বস্তুই হল, বাংলাদেশে হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘণ ও এর প্রতিকার!  এই চিঠির কপি সোশাল মিডিয়ায় ঘুরছে অনেকে দেখে থাকবেন, আর এর একটা কপি ঢাকার নিউ এজ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। আবার অনেকের কাছে আমেরিকান ইউনুস সেন্টারের কপিটাও আছে দেখেছি। শুরুতে বা উপরে আমি দিয়েছে অরিজিনাল কপির লিঙ্ক।

    সবচেয়ে বড় কথা এতে শেখ হাসিনাকে চরমতম ভিলেন – হিউম্যান রাইট ভায়োলেটর, র‍্যাবের নামে ডেথ স্ক্যায়াড [death squard] বা ভাড়াতে খুনি বাহিনী চালানো, বিরোধীদেরকে নির্যাতন, ঘুম, খুন, অপহরণ ইত্যাদি সব ধরণের অভিযোগে অভিযুক্ত বলে দাবি করা হয়েছে। সবচেয়ে বড়কথা এটা হাসিনা ক্ষমতাসীন হবার সেই ২০০৯ সাল থেকেই হাসিনার অপততপরতা বলে দাবি করা হয়েছে।
    এমনকি এর মধ্যে  তাই হাসিনার সহযোগী বাহিনী হিশাবে বাংলাদেশের সেনাসহ এসব বাহিনী থেকে (স্বল্প কিছু যা) জাতিসংঘ বাহিনীতে যুক্ত হয় এদের সকল বাহিনীকেই জাতিসংঘ শান্তিবাহিনীর কাজে নিষিদ্ধের করার জন্য বাইডেনের কাছে এবার সুপারিশ করা হয়েছে।

    সেনাবাহিনী বা জাতিসংঘ সম্পর্কিত চিঠিতে এই বাড়তি অনুচ্ছেদ – এটা বেশ নতুন তা মানতেই হবে। কারণ, এর ভিতর অন্তর্নিহিত বক্তব্য-অর্থ বা ইমল্পিকেশন [implication] অনেক গভীর ও মারাত্মক। এটা সৈনিকদেরকে অফিসারদের বিরুদ্ধে খেপানোর শয়তানি কাজ, অবশ্যই। অনুমান করা হচ্ছে যে এর ভিতরের যে অন্তর্নিহিত বক্তব্য তা নিয়েই কাজ করতে  এটা সুবীর ভৌমিক কথিত সামন্ত গোয়েলের ঢাকা আগমন ঘটিয়েছিল। অর্থাৎ ভারতীয় পক্ষ থেকে তাদের এই ততপরতা ফলাও করে হাসিনার পক্ষের কাজ বলে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ ভারত করেছে উলটা কারণে, ভারতের হাসিনার হাত ছাড়তে বলা – এটাই সে ফেরি শুরু করেছে।

    কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ এবং চমক লাগানো দিক হল এই চিঠির আরেকটা অংশ, সেদিকটা। আর সেখান থেকে এটা পরিস্কার যে – এই ছয় কংগ্রেসম্যানের স্বাক্ষরে চিঠি পাঠানো – এটা ভারতেরই কাজ। তারাই কংগ্রেসম্যান জুটিয়ে এই চিঠি লেখার ঘটনাটা ঘটিয়েছে। কিন্তু  কেন?
    কংগ্রেসম্যানদের চিঠিতে কী আছে  সে সম্পর্কে আগে বলেছি। যেমন হাসিনাকে সেখানে হিউম্যান রাইট দলনকারী হিশাবে দেখানো হয়েছে তা নিয়ে  উপরে বর্ণনা দিয়েছি। কিন্তু কীভাবে সেই বর্ণনা থেকে পরের প্রসঙ্গ যাওয়া হয়েছে তাপাঠককে সরাসরি জানানো দরকার।
    প্রথমত এই চিঠিতে  এক দীর্ঘ অভিযোগে দাবি করা হয়েছে  হাসিনা  হিন্দু-খৃশ্চানদের দলনকারী, জুলুমকারী [……persecuted ethnic and religious minorities in Bangladesh.] !!!!!  মানে হাসিনা তাদের ভাষায় সংখ্যালঘুদের নির্যাতনকারী – যেকথা রানা দাসগুপ্ত বা সুলতানা কামালও বলতে চাইবেন কিনা সন্দেহ!  কিন্তু সরি। এটা এখন সত্য  যে একথা এখন রানা দাসগুপ্ত বা সুলতানা কামালও বলতে চাইছেন; আসছি সেখানে। এটাই ভারতের ম্যাসেজ বা ভারতের এখন দানের পাশা ঊল্টানো আচরণ!

    কংগ্রেসম্যানদের চিঠি হাসিনার অপরাধ সম্পর্কে লিখেছে …...The well-documented abuses by the Hasina government are not confined to her political opponents; the government also has persecuted ethnic and religious minorities in Bangladesh. মানে হাসিনার মানবাধিকার দলন এটা আর কেবল বিরোধীদলের উপরেই নাকি সীমাবদ্ধ নাই। এটা ধর্ম ও জাতিগতভাবে যারা সংখ্যালঘু [ মানে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, ভারত স্বঘোষিতভাবে যাদের কাস্টডিয়ান] দের উপরেও নির্যাতন জুলুমবাজি করছে হাসিনা!

    Since Sheikh Hasina’s rise to power, the Hindu population has been halved. Looting and burning of households, destruction of temples and religious idols, murder, rape, and forced religious conversion are causing Hindus to flee Bangladesh. Sheikh Hasina’s government also has persecuted Bangladesh’s minority Christian population — burning and looting places of worship, jailing pastors, and breaking up families when religious conversion occurs.

    কী তামসা দেখেন! দাবি করে বলা হচ্ছে হাসিনার এবারের ক্ষমতা নিবার পর থেকে বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা নাকি অর্ধেক হয়ে গেছে [Hindu population has been halved]।  আর যে অভিযোগ এই সেদিনও সেতুমন্ত্রী বিরোধীদলের উপর আবার একালে গত কয়েক সপ্তাহ আগে আরোপ করতে চাচ্ছিলেন যে বিএনপি নাকি  সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর কাজ করছে! আর আজ সে অভিযোগ ভারতের মুখ দিয়ে উঠে আসছে খোদ হাসিনার বিরুদ্ধেই। তাই এটা এক কঠিন তামাসাই বটে! তবে এখনও আমরা আসল জায়গায় যাই নাই, এখন যাব।

    ‘দেড় দশকে দেশ আরও সাম্প্রদায়িক’ হয়েছেঃ
    এই প্রসঙ্গটা হল বাংলাদেশে ঘটা একটা ঘটনা যেটা ভারতীয় উদ্যোগে ঐ ছয় কংগ্রেসম্যানের চিঠিতে হাজির করা আর হাসিনাকে হিন্দু নির্যাতনকারি হিশাবে তুলে ধরার-ই বাংলাদেশ ভার্সান ও সংশ্লিষ্ট ততপরতা। এনিয়ে  প্রথম আলো লিখছে, “দেশের বিশিষ্টজনেরা  বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় উপস্থিত হয়েছিলেন। সেটা ছিল   ‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৪: ধর্মীয়–জাতিগত সংখ্যালঘু জনগণের অধিকার’ শীর্ষক এক সভা যা বুধবার বিকেলে রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত হয়। মজার কথা হল সেখানে প্রথম আলো প্রতিষ্ঠান হিশাবে নিজেও এক অংশগ্রহণকারী দাওয়াত গ্রহিতা হিশাবে উপস্থিত ছিল। তাদের যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান এতে প্রতিনিধি হিশাবে বক্তৃতা করেন।

    আসলে এখানে অংশগ্রহণ করেছেন যারা তারা হলেন  – যারাই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ভারতীয় অর্থে বা অর্থের প্রতিপত্তিতে তৈরি হওয়া ক্ষমতাকে ব্যবহার করে তাদের আয়-জীবিকা নির্বাহ করেন। তাই,  ভারত এই সভায় তাদের সকলকে যোগ দিতে সহজেই বাধ্য করতে পেরেছে। কথিত এই মতবিনিময় সভায় প্রথম আলতে ছাপা হওয়া রিপোর্টটাকে খুটিয়ে দেখলে এমন অনেক কিছুই পরিস্কার হওয়া সম্ভব। এককথায় এটা হল, ভারত এতদিন বাংলাদেশের যাদেরকেই (কথিত হিন্দু সংগঠন ও এর নেতারা সহ) পেলেপুষে  নিজের প্রভাবে রেখেছে তাদের সর্বোচ্চ সমাবেশ ছিল এটা। এর প্রথম উদ্দেশ্য ছিল হাসিনাকে ত্যাগ করা [disown] বা হাত ছেড়ে অস্বীকার করা যে তিনি আর তাদের কেউ নন।  শুধু তাই নয় গত পনেরো বছর ধরে হাসিনা ‘সংখ্যালঘু’ নিপীড়ন-জুলুমবাজি করেছেন বলে হাসিনাকে অভিযুক্ত করে দেওয়া। এটাই সবচেয়ে কঠিন কঠোর পদক্ষেপ ছিল ভারতের।  এর মানে ঐ কথিত সভায় যারা উপস্থিত ছিলেন তারা যে ভারতের পাপেট বা হাতের পুতুল ছিলেন সেটা যেন তারাই হাজির করেছেন। কেন?
    কারণ, বাংলাদেশের ভারতের কোরস্বার্থ সহ সবকিছুই এখন কঠিন বিপদের মুখে। তাই এসকল মুখ এক্ত্রে ঐ সভায় উপস্থিত হয়ে  হাসিনার মুন্ডু-নিপাত করছেন অবলীলায়!!!  সত্যি তামাশা চলছেই!!! কারণ বাংলাদেশে হাসিনা তার সকল রাজনৈতিকবিরোধীদের উপর যে নিপীড়ন জুলুম করেছে সেসব কিছুকে এক ঘটকার এই শয়তানেরা একে হিন্দু নিপীড়ন বলে নামিয়ে ছোট করে নিজের পক্ষে নিয়ে গেল!

    ঐ সভায় উপস্থিত এক মুখ্য চরিত্র দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যঃ
    দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সিপিডির মূল উদ্যোক্তা-মালিক রেহমান সোবহান এর পরের ব্যক্তি তিনি। সেই ওয়ান-ইলেভেনের সময় থেকে ভারতের নর্থ-ইস্ট কে করিডোর দিতেই হবে; দিলে সেই আয়ে আমরা নাকি সিঙ্গাপুর হয়ে যাব – এরপক্ষে ভারতীয় দালালি দিয়েই প্রতিষ্ঠানটার বড় ততপরতা শুরু।  তাই ভারতীয় স্বার্থরক্ষার কনসালটেন্সির অর্থ তাদের এক বড় আয়ের উৎস আমরা বুঝতে পারি।  কিন্তু তাই বলে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য – তিনি বাংলাদেশের কথিত হিন্দুস্বার্থের নেতা হয়ে যাবেন?? দেবপ্রিয়ের এই ভুমিকার এত চিপ …… একথা আমাদের জানা ছিল না। খুব সম্ভবত সিপিডি “ঠিকঠাক” চালাতে গেলে এখন দেবপ্রিয়কে কথিত সংখ্যালঘু  হিন্দু নেতার ভুমিকায় নামতেই হবে, হয়েছে দেখা যাচ্ছে।  তাহলে মানুষের আত্মমর্যাদা বলতে কী  আসলে কিছু নাই?
    প্রথম আলো সুনির্দিষ্ট করে বলছে,   ” মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলেও গত দেড় দশকে দেশ আরও সাম্প্রদায়িক হয়েছে” – এই কথাটা বলেছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য!  আর তা পুনরায় সমর্থন ও উচ্চারণ করেছেন রামেন্দ্র মজুমদার, শাহরিয়ার কবির প্রমুখ। সত্যিই দেবপ্রিয়-র বিল এইবার ম্যাচিউরড আর সবাইকে ছাড়িয়ে তা বড় পরিমানের হবে।

    সাম্প্রদায়িক জিনিষটা কী তা একটু পরে আসছি। তার আগে এখন ওবায়দুল কাদের – সেতুমন্ত্রী ওকার মুখটা মনে পড়ে করুণা লাগছে।  বেচারা কত না এতদিন প্রমাণ করলেন যে “বিএনপি মানে সাম্প্রদায়িক” একথা বলে; এভাবে মনে সুখ নিচ্ছিলেন তিনি। আর এখন বাংলাদেশের হিন্দু-সব বড় বড়কর্তাদের সভায় যেটা আবার ভারতের আশীর্বাদে সমবেত এক সভা; সেখান থেকে তার মানে ওকা ও তাঁর জননেত্রী হাসিনা কাউকেই ছাড়লো না ভারতীয় স্বার্থ? তারা ওকা ও তাঁর জননেত্রী হাসিনা কেই সাম্প্রদায়িক বলে রায় দিল????

    বাংলাদেশে যেখানে গত পনেরো বছর ধরে লাগাতর সেপাই, এসআই ওসি থেকে শুরু করে সচিব পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে হিন্দুদের সর্বোচ্চ পদায়ন ঘটে চলেছে, যেটা কারও কারও হিশাবে এটা ২৫% বা এরই বেশি। হাসিনার কথা শুনেছি অনেকের মাধ্যমে তিনি নাকি ধারণা করেন যে হিন্দুরাই নাকি তাঁর সবচেয়ে বিশ্বশ্ত, মুসলমান কর্মচারিরা যেটা নাও হতে পারেন! তাহলে?  এ কোন বাংলাদেশি হিন্দু ? ভারতের এক ইশারায় যারা তামাম-ই হাসিনা ছেড়ে শুধু না; সমস্ত দায়-অভিশাপ হাসিনার উপর চাপিয়ে দিয়ে ভারত-রাষ্ট্রস্বার্থ এর পক্ষে এলাইন হয়ে গেল? হাসিনাকে ছেড়েই চলে গেল? এরপরেও কী বাংলাদেশের সব হিন্দুরা না হোক  ঐ কথিত মত বিনিময় সভায় যারা উপস্থিত ছিলেন তারা বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন? বলা যাবে, তাদের রাষ্ট্র ও নাগরিকত্ব পরিচয় বাংলাদেশী?
    ব্যক্তির রাষ্ট্র পরিচয় কেন একালে লাগে আর তা গুরুত্বপুর্ণ কেন সেটা  আগে বুঝার চেষ্টা করতে পারি আমরা।  রাষ্ট্র-পরিচয় না থাকায় বেওয়ারিশ লাশের মত কোন এয়ারপোর্টের মেঝেতে মাসের পর মাস শুয়ে রাত কাটিয়ে দেয়া মানুষের জীবনের দিকে একবার কিছুক্ষণ তাকান!! রাষ্ট্র স্পষ্ট না থাকা প্যালেসটাইনিদেরকে বুঝার চেষ্টা করেন অন্তত! মানুষের রাষ্ট্রীয় পরিচয় যেমন গুরুত্বপুর্ণ তেমন রাষ্ট্রটাকে টিকিয়ে রাখা  আর ওর দায় নেয়া বা রাষ্ট্রস্বার্থ রক্ষাও নাগরিক হিশাবে আপনার দায় – এদিকটাও বুঝতে হবে। কাজেই বাংলাদেশে আপনার যত দুঃখই থাক অভাব থাক তা মিটাতে সেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রকেই নতুন করে পুনঃগঠনের লক্ষ্যে রাজনৈতিক লড়াই করেন, এটাই আপনার একমাত্র করণীয়। কিন্তু কোনভাবেই আপনার সুখ নিরাপত্তার জন্য মোদিকে আপনাকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে আহবান করতে পারেন না। কারণ, এতে আপনিও আর কার্যত বাংলাদেশের নাগরিক থাকেন না, রাষ্ট্রও আপনার থাকে না, নাই হয়ে যায়। মোদিও কী ভারতের কোন মুসলমান নাগরিককে পাকিস্তানকে ডেকে আনার পক্ষে থাকতে এলাও করবেন? সেটা একবার ভাবেন? সেটা মোদি হিন্দুত্ববাদি বলে নয় এটা কোন রাষ্ট্রই পারে না। তবে কিছুই করতে না পারলে একালে মাইগ্রেট করে জন্মরাষ্ট্র ফেলে মাইগ্রেটেড রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া যায় সেটা ট্রাই করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে বসে নিজ সুখ বা পেটিস্বার্থের জন্য  ভারতের ব্যাগ-বোঝা বইতে পারেন না।
    এটা খুবই অদ্ভুত একজন পিএইচডি হোলডার দেবপ্রিয়-কে নিয়ে এসব কথা বলতে হচ্ছে!! কথা আরও কত কী হয়ে গেছে দেখেন।  দেবপ্রিয় এখন কোনটা নিজের সামাজিক পরিচয় বলে দাবি করবেন? তিনি কী  বাংলাদেশের হিন্দুস্বার্থের নেতা? যেটা আসলে ভারতরাষ্ট্রের বাংলাদেশে যেসব স্বার্থ আছে এর কোন তল্পিবাহক সংগঠন বা এর নেতা ছাড়া আর কিছুই নয়!  নাকি দেবপ্রিয় সিপিডির এক বড়কর্তা প্রতিনিধি? দেখেন গতকাল সিপিডি বাংলাদেশের বাজেট নিয়ে আবার সরকার সমালোচনার মুডে চলে গেছে। গতকাল কড়া সমালোচনা করেছে সিপিডির প্রতিনিধিরা। যদিও গতকাল দেবপ্রিয় সেখানে ছিলেন না,  সিপিডির অন্যেরা ছিল। এখন সপ্তাহ খানেক আগেও দেবপ্রিয় সরকারের পক্ষে দাঁড়ায়ে আইএমএফ রে দায়ী করে (বোকা বোকা দালালি) বক্তব্য দিয়েছেন। তাহলে আজকে হাসিনা ছেড়ে যাচ্ছেন কে?
    সোজা কথাটা হল, কাল যদি তিনি সিপিডির বাজেট সমালোচনায় উপস্থিত থাকতেন তাহলে তার মুখে বাজেট সমালোচনা কে বাংলাদেশের মানুষ কীভাবে নিত – আপনি বাংলাদেশের আম-মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়ে বাজেট সমালোচনা করছেন নাকি  হিন্দু নেতা হয়ে ভারতের স্বার্থের পক্ষে এটা কোন সমালোচনা?  আমাদেরকে এদুটার ফারাক বুঝবার তো কোন উপায় রাখেন নাই! যে কথিত হিন্দুস্বার্থের নেতা হতে চায় (যা আসলে ভারতরাষ্ট্রের স্বার্থ) তিনি তো একই সাথে বাংলাদেশের আম-মানুষেরো প্রতিনিধি বা বক্তা হতে পারবেন না!  

    দেখেন হাসিনা ফ্যাসিস্ট – গুম, খুন ‘ডেথ স্ক্যায়াডের’ রানী হওয়াই তার পরিণতি। কিন্তু আপনি দেবপ্রিয় এতদিন হাসিনার মাখন খেয়ে চলেছিলেন আর এখন এই বিপদে পড়া হাসিনাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, কেবল ভারতের স্বার্থে? আপনি তো হাসিনার চেয়েও খারাপ! পনেরো বছর ধরে হাসিনার ‘ডেথ স্কয়াড’ চলেছে মুখ খুলেন নাই, আকার ইঙ্গিতেও না, কেন?  এমনকি এখনও হাসিনার সমালোচনা যেটা করছেন সেটাও ভারতের ইচ্ছায়! ঐ সভায় যারা উপস্থিত তারা সকলে এই অপরাধে অভিযুক্ত, নয় কি? 

    সাম্প্রদায়িকতা কী?
    খুবই সংক্ষেপে বলব। আর আমার আগে বলা লেখা পড়ে নিতে লিঙ্ক দিব।
    সেটা ১৮০০ সালের দিকের কথা যখন হিন্দু জমিদারের বৃটিশ শাসনের অধীনে নিচে নতুন শাসক শ্রেণী হিশাবে বাংলায় আসর জমিয়ে বসতেছেন।  তারা দুটা সিদ্ধান্তের উপর তাদের নয়া বাংলার মসনদ সাজিয়েছিলেন। সারকথায় এর এক হল, মুসলমানেরা বাঙালিই না। জমিদারদের এই চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত।  কেউ বাঙালি কিনা এই এথনিক পরিচয়াবলী ভা এথনিসিটি নির্ধারণ যেন কোন শাসকের ইচ্ছা দিয়ে নির্ধারণ সম্ভব!    দুইঃ বাংলা ভাষা সংস্কৃত থেকে এসেছে। যেটার বিপরীতে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লার উচ্চারণ বাংলা সংস্কৃতের দুহিতা (কন্যা) নহে।

    এদুটা মূল সারকথার উচ্চারণে কী এমন ফারাক হয়ে গেল তা প্রগতিশীলেরা হয়ত বুঝবে না।  বলবেন হয়ত এটা হুদাই ভারতবিরোধিতা। এবিষয়ে প্রগতিশীলতা=হিন্দুত্ববাদ এই সমীকরণটা মনে রাখলেই আপাতত চলবে! এদিকে জমিদার হিন্দুর নেয়া সবচেয়ে আত্মঘাতি সিদ্ধান্তটা হল যে নয়া তাদের নে্তৃত্বে সমাজে মুসলমানদের উপর আধিপত্য (সম্পর্ক) কায়েম তাদের করতেই হবে। যেকোন জাতিবাদি চিন্তা মাত্রই তা অন্য সকল জাতির উপরে নিজ শ্রেষ্ঠত্ব কায়েম করতে চায় – এটাই তার  লক্ষ্য মনে করে থাকে। জাতিবাদ মানে তাই “জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ”। তাই জমিদারদের আধিপত্যের খায়েস মূলত হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদ কায়েমের খায়েস। এছাড়া, জমিদারির অর্থনৈতিক জবরদস্তি সে তো আছেই।

    সাম্প্রদায়িকতা শব্দটার রূট শব্দ হল ‘সম্প্রদায়’, যেটা ইংরাজি ‘কমিউনিটি’ [community] শব্দের অনুবাদ। যদিও সাবধান।  ‘কমিউনিটি’ শব্দটা খুবই ইতিবাচক শব্দ, কোনোভাবেই এটা [derogated] বা নিচু-অর্থ হয়, নেতি ধারণা হয় এমন শব্দ নয়। অথচ জমিদার হিন্দুর আবিস্কৃত বা কয়েন করা শব্দ ‘সাম্প্রদায়িকতা’ একটা নেতিবাচক শব্দ। 
    এটা ১৮০০-১৯৪৭ এই সময়কালজুড়ে হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির বয়ান তৈরি করতে শুরুর দিকেই বানিয়ে নেয়া শব্দ। বাঙালি ‘জাতি’ কী, কোনটা থাকলে বাঙালি জাতি নাহলে নয়, কী এর বৈশিষ্ট্য আর এছাড়া, কোনটা ও তা কেমন বাংলা ‘ভাষা’ ইত্যাদি এথনিক পরিচয়গুলো ঐ জমিদারি ক্ষমতার হাতে তৈরি এবং আকার, বৈশিষ্ট্য দেয়া ইত্যাদি সবই সম্পন্ন হয়েছিল তখনকার ঐ সময়কালের শুরুতেই। আর এখানেই সাব্যস্ত করা ছিল- হিন্দু জমিদারি স্বার্থ ও এর রাজনীতির এক কঠিন রায় বা সিদ্ধান্ত যে, ‘মুসলমানেরা বাঙালি নয়’।

    মুসলমানেরা বাঙালি নয় এই ফতোয়া দিলে তা মুসলমান মাত্রই তারা অধস্তন, আর তা হিন্দু জাতভেদের হিশাবে হিন্দু-জাতের সবচেয়ে নিচা মুচি বা চন্ডালদের চেয়েও নিচে  – এখানে মুসলমানদের কোন অবস্থান হবে। এছাড়া পুর্ববঙ্গে আবার মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ট। তাই এই নিচা অবস্থান দেখিয়ে দিলে জমিদারদের পক্ষে অখন্ড বাংলায় আধিপত্য করতে এটা সহায়ক হবে। কিন্তু আধিপত্য করতে হবে কেন এই প্রশ্ন কেউ করতে নিজেকে করতে চায় নাই!
    এরপরেও জমিদারদের দুঃখ ঘুচে নাই। মোটাদাগে যদি পশ্চিমবঙ্গে  মুসলমান জনসংখ্যা ২৫% ধরে নেই তবে সেটাও যথেষ্ট বড় সংখ্যা বলে এদেরকে  চাইলেও শুধু দাবিয়ে রাখা মুসকিল।  বৃটিশ ভারতে ১৮৩০ সালের দিকে আধুনিক শিক্ষা মানে স্কুল কলেজে শিক্ষা শুরু হয়েছিল।  অর্থাৎ সরকারি চাকরির জন্য জনসম্পদ [Human resource HR] তৈরি তা বৃটিশ-ইন্ডিয়া সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নিজ স্বার্থে। এই সিদ্ধান্তটাকে যদি একজামিন করি তাহলে দেখব শাসক জমিদার শ্রেণীর হাতে মুসলমানদেরকে এই সুবিধা নিতে ঠেকিয়ে দিবার মত তেমন অস্ত্র ছিল না। তাই তাদের সমাজ মানে তাদের হিন্দু আধিপত্যের সমাজে মুসলমানদের জন্যই অন্তত কিছু জায়গা ছেড়ে রাখাটাই সঠিক হবে বলে মনে করা হয়েছিল। আর সেখান থেকেই স্কুলে মুস্লমান ছেলেটাকে পাশ বসতে দিবে কিভাবে, কিংবা চাকরিস্থলে  বা এমনকি এই সুত্রে সমাজে পাশাপাশি চলতে দিবে কিনা ইত্যাদি মেলা প্রশ্ন ভর করে এসেছিল। তখন জমিদার শাসনের হিন্দু সমাজ যেসব শর্ত আরোপ করেছিল যে শর্ত পুরণ সাপেক্ষে এই “সর্ব অন্তজ-জাত” মুসলমানেরা তাদের সামনের হিন্দু ডমিনেটেড সমাজে একটি প্রবেশ ও কোনায় বসার অনুমতি পেয়েছিল সেটাই “অসাম্প্রদায়িক” হওয়া।  মুসলমান আদব কায়দা দেখানো যাবে না, ইসলামি চিহ্ন  প্রকাশ্যে প্রদর্শন করা যাবে না মানে  হিন্দু সমাজের কমন প্লেসে দেখানো যাবে না। ব্যাপারটা দাড়ায় স্কুলে ব্যাকবেঞ্চে জায়গা হয় একটু কিন্তু কেউ পাশে বসে না।  নিজেরা টিকি আর চন্দনে মুখে বা কপালে ড্রয়িং এঁকে হিন্দুরা সাত জায়গা ঘুরে বেরাচ্ছে অথচ মাথার টুপি ভুলে মাথা থেকে না খুলে প্রকাশ্য রাস্তায় বের হওয়া যাবে না। মানে সবসময় মনে করিয়ে দেয়া You are not equal to us – এই লক্ষ্যেই এটা পরিচালিত হত, শাসন সহজ করার জন্য। তাহলে সাম্প্রদায়িকতা কী? এর মানে হল যে হিন্দু সমাজ যে অধীনতা শর্ত চাপিয়েছিল মুসলমানদের উপর সেটা ভঙ্গকারিকে সাম্প্রদায়িক বলা হত।  হিন্দু সমাজ আধিপত্যের শর্ত মানতে না চাইলে আপনি সাম্প্রদায়িক। অর্থাৎ সেটা মেনে চললেই কেবল আপনি “অসাম্প্রদায়িক সার্টিফিকেট প্রাপ্ত” হয়ে শর্ত পূরণ করেছেন বলে কেবল ঐ সমাজে প্রবেশাধিকার লাভ করতে পারেন।
    কালক্রমে আবার একদল  হিন্দু একাদেমিক হিন্দুত্বের অসাম্প্রদায়িক হবার শর্ত  যেটা  সেটাই যেন আধুনিকতা, এই বলে প্রলেপ দেয়া এক নয়া সাফাই চালানোর চেষ্টা করেছিলেন।  কিন্তু  এরা জানেই না যে ‘অসাম্প্রদায়িকতার শর্ত’ যারা চাপাতে চায় তারা আধুনিকই নয়। তাদের আধুনিক হবার সুযোগ নাই। কারণ আধুনিকতা প্রথম শর্ত হচ্ছে সাম্য। অথচ আপনাদের চাওয়ার ভিত্তি তো আধিপত্য, জাত শ্রেষ্ঠত্ব। কাজেই মানুষকে সমান চোখে দেখতে শিখেন আগে। নাগরিক মাত্রই সকলেই সমান অধিকারের নাগরিক সেটা শিখতে হবে আগে। এছাড়াও প্রত্যেকের মর্যাদা, স্বাধীন নাগরিকের মর্যাদা আছে সে কথা খেয়াল রাখতে হবে।  অথচ ওদিকে সাম্প্রদায়িক শর্ত দিবার উদ্দেশ্যই তো  হিন্দু সমাজ আধিপত্যের শর্ত মানতে অপর যেকাউকে বাধ্য করা। যেটা সাম্য ধারণার উলটা। বরং জাতভেদে বিভক্ত ও ছেড়াবেড়া হিন্দুত্বের ধারণাটাই এজন্য আধুনিক হবার অযোগ্য, এটা এক মৌলিক অযোগ্যতা।  আর তাদের কথিত রেনেসাঁর আদিপুরুষ রাম মোহন রায় এজন্যই তো সবার আগে  ১৮১৫ সালেই একটা নয়া ব্রাহ্মধর্ম বা ব্রাহ্মসমাজ গড়ে নিতে চেয়েছিলেন। এসব কেন হয়েছে সেসবের ব্যাখ্যা করতে শিখেন আগে।  না বুঝে কথা বলা এসব অন্নদাশঙ্কর মার্কা  রেনেসাঁ-বুঝার ভাবসাব আর কতদিন দেখাবেন! বরং যেসব ধর্ম বা থিওলজিক্যাল ব্যাখ্যায়  বাই ডিফল্ট সাম্য অনুসরণ যোগ্য হয়েই থাকে সেসব থিওলজি থেকে আধুনিকতায় যাওয়া আসা সহজ।   মর্ডানিটি বুঝবার আগেই কমিউনিস্ট- প্রগতিশীল হয়ে যাবার সমস্যা এগুলাই!  মূল কথাটা হল, সবার আগে সবাইকে সমানজ্ঞান করা ও মর্যাদা দিতে শিখতে হবে। আর এই হল কথিত অসাম্প্রদায়িকতার গুমোড় ফাঁক!

    “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলেও
    বাংলাদেশ আরও সাম্প্রদায়িক হয়ে যাওয়ার কথাটি
    বলেন বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।”

    এখন আসেন, দেবপ্রিয়ের ঐ কথিত মত বিনিময় সভার কথায়। তিনি হাসিনাকে দায়ী করে বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলেও গত দেড় দশকে দেশ আরও সাম্প্রদায়িক হয়েছে”। তাহলে তিনি আসলে কী বলেছেন যা শুনে ঐ আসরের আরও অনেক কর্তা-হিন্দুনেতা হাততালি দিয়েছেন?  এর মানে তারা পনেরো বছরের হাসিনার শাসনে একেবারেই সন্তুষ্ট নন। আমরা দেখছি তারা চাচ্ছেন অসাম্প্রদায়িকতা – একটা খুব সুন্দর অসাম্প্রদায়িকতার সমাজ!  যা মুসলমান হাসিনা দিতে পারেন নাই, এই হলো অভিযোগ। কিন্তু সেটা কী জিনিষ! আচ্ছা থাক সেকথা বাদ দিলাম। বরং আসেন জিজ্ঞাসা করে জেনে নেওয়া যাক কখন হিন্দুরা অসাম্প্রদায়িকতার সমাজ উপভোগ করেছিল? তাহলে একটা ধারণা পেয়ে যেতে পারি।
    আমি নিশ্চিত দেবপ্রিয় বা রামেন্দ্র মজুমদার তো বটেই এমনকি খুশি কবির আর সাথে শামসুল হুদাও বলে উঠবেন – কেন, ১৯৪৭ সালেরও আগের জমিদার-হিন্দু আধিপত্যের সমাজে! 

    এবার কী বুঝা গেছে তাদের খাঁটি অসাম্প্রদায়িকতার মাপকাঠি কী? মানে আমাদেরকে  শুরু করতে হবে জমিদারদেরকে জমিদারি ফেরত দিয়ে। কারণ জমিদারি ফেরত না দিলে জমিদার-হিন্দু আধিপত্য আর তাদের রুস্তমির সমাজ ফিরে আসবে কোথা থেকে? আর সেটা না হলে জমিদারি-অসাম্প্রদায়িক সমাজ আসবে কোথা থেকে? আহ রে অসাম্প্রদায়িকতা, কোথায় রাখি তোরে!!!! My Foot!

    আচ্ছা তাহলে কলকাতায় কী অসাম্প্রদায়িকতার সমাজ আছে? আছে তয় মমতা মাঝে মাঝে মুসলমানদের ভোট নিতে গিয়ে সব নষ্ট করে দেয়! অবশ্য ইদানিং আরএসএস উঠে আসছে। তারা হিন্দু জনবসতির মধ্যে হোটেলে মুসলমান স্কুল শিক্ষকদের ভাড়া দিয়ে  থাকতে এলে তাদেরকে থাকতে দেওয়ার বিরুদ্ধে বিজেপি ফতোয়া দিয়েছে । ভালই হয়েছে, সব পরিস্কার হয়েছে। এটা খুবই  অসাম্প্রদায়িক কাজ হয়েছিল একটা!  অতএব শেখ হাসিনা যতই শেখের মেয়ে হোক, তিনি তো আসলে মুসলমান! মানেই বিল্ট-ইন সাম্প্রদায়িক! তাই না!

    তাহলে ভারত কেন এই মত বিনিময় সভা করে নিজের স্বার্থ জড়ো ও হাজির করছে?
    কারণ, হাসিনার অবস্থা ভাল না। যদি তিনি ক্ষমতা হারায়েই ফেলেন কোন কারণে তবে আগামির রাজনৈতিক শক্তির সাথে  ভারত যদি কোন সখ্যতাই না গড়তে পারে তবে এই হিন্দুস্বার্থে প্রতিনিধিত্বের নামে ভারত নিয়মিত ডিস্টার্বেন্স হিন্দু জন-অসন্তোষ সৃষ্টি করা ছাড়া আর তো কোন লিভার [lever বা চারাকাঠি] ভারতের হাতে থাকবে না!

    +++
    আপডেটেডঃ ০৫ জুন ২০২৩ দুপুর  ০২ঃ ৩৫

    গৌতম দাস,
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • বিবিসি ও শ্রীরাধা দত্ত

     

     

    বিবিসি ও শ্রীরাধা দত্ত
    গৌতম দাস

    ৩০ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4xe

     

            মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞার হুমকি সামলানোর

     

     

    কোন নিউজ বা মিডিয়া গ্রুপ যখন কথিত “ফাইনান্সিশিয়াল সংকটে” পড়ে তখন যে সে কত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে তা আমরা দেখেছি। বিশেষ করে সে দুনিয়াতে যদি মোদি আর তার গোয়েন্দাবিভাগ হাজির থাকে।  ভারতের ভিতরে অথবা বাইরে  অঘোষিতভাবে ভারতের (গোয়েন্দা বিভাগের) মিডিয়া কন্ট্রোল প্রতিষ্ঠান এর নাম হল এএনআই (ANI) যে নিজেই এক ‘বেসরকারি সংবাদ সংস্থা-ই’ যেন অন্য কিছু নয়, এই ভাব ধরে থাকে। অথচ এ’হলো ভারতে সরকারি প্রটেকশনে  ব্যক্তিমালিকানাধীন নিউজ এজেন্সী যে আমাদের বাসসের মত পর্যায়ের হয়ে উঠেছে কিন্তু কাজ করে সরকারি গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের বাড়ানো হাত যেন! শুধু তাই নয়, ভারতের প্রধান সরকারি নিউজ এজেন্সি প্রতিষ্ঠান পিটিআই [PTI] এর চেয়েও ভারত সরকারের কাছে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত নিউজ এজেন্সি এটা;  অথচ লিগ্যাল স্টাটাসে সে বেসরকারি সংবাদ সংস্থা মাত্র। আর তা দিয়েই কথিত সংকটে পড়া মিডিয়া গ্রুপগুলো তাদের ফাইনান্সিল খারাপ সময়ে অভাবকে ব্বযবহার করে অর্থালোভি হয়ে উঠলে তাদেরকে শিকারে নেমে পড়ার প্রতিষ্ঠান হল এই এএনআই। কথিত অর্থ-সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর খুবই কাছের বন্ধু হয়ে উঠে এই এএনআই। এমনকি সে ঘটনা বাংলাদেশের বেলাতেও একই, সত্য! বাংলাদেশের প্রথম আলোর ক্ষেত্রে দেখেছি  তার বন্ধু হয়েছে এএনআই। এভাবে বন্ধু হয়ে জার্নালিজমের বেসিক নীতি ত্যাগ করে হলেও ভারতীয়দের আকাট পাকিস্তানবিরোধী প্রপাগান্ডায় নেমে পড়েছিল ো পরে প্রায়ই এই প্রথম আলো,  স্রেফ কিছু নগদ অর্থ কামানোর জন্য।  এগুলো ২০২১ সালের শেষের দিকে সবচেয়ে বেশি ঘটেছিল; এই উসিলায় যে করোনাকালে নাকি কর্মচারীদের ঠিকমত বেতন দিতে পারে নাই বা আয় কমে গেছে – মালিক বকা দিবে – এই ছিল সম্পাদকদের অজুহাতে।

    সম্প্রতিক বছরগুলোতে বিবিসিরও অর্থসংকট, ছাটাই ইত্যাদির কথা অনেকদিন ধরে কানে আসছে আমাদের। বিশেষ করে এসময়ে বিবিসি বাংলাকে প্রায়ই “এএনআই-এর এসাইমেন্ট ধরণের” নিউজ করতে দেখছি। একালের  বিবিসি বাংলার এই  ফেনোমেনাটা হল বিজেপি-আরএসএস এর আইটি চীফ অমিত মালব্যর অনুগত-রিপোর্ট করা; যেটা মালব্য-রা লাগাতর পয়সা খরচ করে মিডিয়া কিনে প্রপাগান্ডা  তৈরি করে – সেখান থেকে এটা এএনআই পর্যন্ত বিস্তৃত এই ততপরতা। এবিষয়ে এএনআইয়ের সিন্ডিকেটেড রিপোর্ট  – যা ছাপলে উলটা মিডিয়াগুলো পয়সা পায় – এমন কুখ্যাত ততপরতা এর ভাল প্রমাণ। রিপোর্টে কলমের একটা আচড়ও বসায় না অথচ সেটা নিউজ বা জার্নালিজম বলে ছেপে দেয় এরা নগদ পয়সা পাওয়ার লোভে।  যারা অমিত মালব্যকে চিনেন নাই তারা জেনে রাখতে পারেন, ভারত-বাংলাদেশ জুড়ে ফেসবুক যার নিয়ন্ত্রণে; প্রান্তীয় পর্যায়ে  যেকোন প্রোফাইল-একাউন্ট গায়েব করে দেয়া যার কাছে তুড়ি বাজানো…।  এছাড়াও ভারতীয় অরিজিন ফেসবুকে কাজ করা স্টাফদের সবার উপরের অলিখিত কর্তাব্যক্তিটার নাম হল যেন অমিত মালব্য।  তবে এসবের বাইরেও অনেক ঘটনা আছে যেমন পুরানা যারা কলকাতা অরিজিন বিবিসি বাংলার স্টাফ যেমন, শুভজ্যোতি ঘোষ আর সে আমলে কলকাতা আরএসএসের তথাগত রায় যখন বাংলার প্রধান ব্যক্তিত্ব – এরা ছিল দুজনে দুজনার।

    গত দুদিন ধরে তেমনই এক ততপরতা আমরা দেখছি বিবিসি -বাংলায়। সেটা হল ভারতের (গোয়েন্দা বিভাগের) তরফে কিন্তু ফ্রন্টাল ফেস যেমন, ডঃ শ্রীরাধা দত্ত-কে সামনে এনে তাঁর বয়ানে ভারত ও মোদিকে বিরাট পরাশক্তিগত নেতা হিশাবে তুলে ধরার এক প্রপাগান্ডা চালিয়েছে বিবিসি।  এই নারীকে বাংলাদেশের ত্রাতা বা বাপ-মা হিসাবে তুলে ধরারও প্রকল্প এটা। কে এই শ্রীরাধা দত্ত?  ফরমালি তিনি বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন [VIF] নামের যেটা সরাসরি আরএসএস এর এক থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান, তার সিনিয়র ফেলো শ্রীরাধা।  এছাড়া ভারত আরএসএস প্রভাবিত নানান একাদেমিক / কমার্সিয়াল কিন্তু দলীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে তিনি জড়িত।  বাংলাদেশে প্রায়ই তিনি সিপিডি [CPD] ভিজিট করে থাকেন।
    সবমিলিয়ে মানে হল, তাঁর RSS  এর সাথে খোলাখুলি যুক্ত থাকা বা সংশ্লিষ্টতা আমাদেরকে তাঁর সম্পর্ক কিছু বিশেষ ধারণা দেয়।  সেখান থেকে অনেকে মনে করেন,  মোদি-আরএসএস এর দুনিয়াব্যাপী হিন্দুত্ববাদ ছড়ানোর যে স্বপ্ন-কল্পনা আছে তা বাস্তবায়নের কর্মী একজন তিনি।  তাই কার্যত ভিআইএফ (VIF), থিঙ্কট্যাঙ্কের নামে আরএসএস এর গ্লোবাল হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার এক প্রপাগান্ডা প্রতিষ্ঠান হয়েছে মনে করা ভুল হবে না; যার কান্ডারি তিনি।  যেমন  এই প্রসঙ্গ বিবিসিসহ অনেক অনেক ইউটিউব ভিডিও-ও ছাড়া হয়েছে সব জায়গায় একই প্রপাগান্ডা তুলে ধরা হয়েছে; যার প্রধান কাজ হচ্ছে  শ্রীরাধার তুলে ধরছেন – বাংলাদেশে মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা চাপানোর পরে যেন মোদি হলেন হাসিনার বাংলাদেশের ত্রাতা যে মোদি চাইলেই হাসিনা সরকারকে উদ্বার করে দিতে পারেন অথবা হাসিনা সরকারের এখনকার পরিত্রাণ যেন কথিত এক ক্ষমতাধর পরাশক্তি ভারত ও এটা মোদির ইচ্ছা বা ভাল মুডের উপর নির্ভরশীল।
    এটা ফুটিয়ে তোলা মত এক উপস্থাপক হচ্ছেন শ্রীরাধা দত্ত ও তাঁর কারিশমা; আর ওদিকে তা বাজারের ছড়িয়ে দিবার দায়ীত্ব-ঠিকাদারি পেয়েছে যেন বিবিসি বাংলা!

    বিবিসির রিপোর্টের নামে এক গারবেজের প্রসঙ্গঃ
    বিবিসির রিপোর্টের নামে এই গারবেজের শিরোনাম হল, “মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞার হুমকি সামলানোর উপায় কী হাসিনা সরকারের”, যার রিপোর্টার হলেন শাকিল আনোয়ার।
    আচ্ছা এমন শিরোনাম কেন?  মানে রিপোর্টার এখানে এটাকে একটা ‘হুমকি’ বলে ধরে নিয়েছেন কেন? কী দেখে নিশ্চিত হয়েছেন? আর ধরে নিয়েছেন যে “মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা” এটা বাংলাদেশ সরকারের উপর এক “হুমকি”?   কিন্তু  এন্থনি ব্লিঙ্কেনের টুইট বা ডোনাল্ড লু এর বাংলাদেশি টিভিতে গিয়ে ব্যাখ্যাদানের পরে হাসিনা  সরকার ও সরকারি দলের প্রতিক্রিয়া কী ? নেগেটিভ ? তা তো নয়। এমনকি   আওয়ামি লীগ, বিএনপি এমনকি জাতীয় পার্টি – এর নেতারা কেউই একে নেতিবাচক ভাবে দেখে নাই, নেয় নাই। অন্তত তাদের অফিসিয়াল ভার্সানে এটা তাই। পরেরদিন রাষ্ট্রদুত পিটার হাস এই তিন দলের প্রতিনিধিদেরকে ডেকে কথা বললে তারা কেউই “মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা” নিয়ে কোন নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া দেখান নাই।
    আবার ওবায়দুল কাদের এর প্রতিক্রিয়া দেখুন। সরকারি বাসস-এর রিপোর্ট লিখছে – “মার্কিন ভিসা নীতি নিয়ে বেকায়দায় বিএনপিঃ  ওবায়দুল কাদের”  অর্থাৎ আওয়ামি লীগ এর জন্য কোন বিপদ ঘটে নাই বরং বিএনপি এই নিষেধাজ্ঞায় বিপদে পড়েছে বলে দাবি করছেন তিনি।  অথবা আবার দেখেন,  একই বাসস কিন্তু আরও এক রিপোর্টে লিখছে – “নতুন মার্কিন ভিসা নীতিতে অগ্নিসংযোগ বন্ধ হবেঃ মোমেনের আশাবাদ“। তাহলে কিসের ভিত্তিতে শাকিল আনোয়ার এটাকে হুমকি বলে চিহ্নিত ও  প্রচার করছেন? সেটা কী এই যে এটাকে হুমকি বলে  প্রচার না করলে শ্রীরাধা দত্ত বা তার মহাজন মোদিকে –  হাসিনা সরকারের এক ত্রাতা ও বীর হিশাবে তুলে ধরা যাবে না??? বাঃ বেশ ভাল কায়দা তো!  আর সেক্ষেত্রে  হয়ত বিবিসির ক্লায়েন্ট এসাইনমেন্টের বিল সেক্ষেত্রে পে করবে না, তাই কি? তার মানে বিবিসির এই এসাইমেন্টের ফোকাস হল, মোদিকে এক বিরাট ত্রাতা আর মোদির ভারতকে একটা পরাশক্তি হিশাবে তুলে ধরা!! সেটা কতটা সত্যি – এই প্রশ্নটাকে মাথায় রেখে আমরা বিবিসির রিপোর্ট পড়ব।

    রিপোর্টের শুরুতেই বিবিসি এক গায়েবি কূটনীতিকের কথা এনেছে। নাম না আনা এই কূটনীতিক বলেছেন, “……এই রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক চাপ সামাল দিতে তলে তলে আমেরিকার সাথে দেন-দরবার দর-কষাকষির পথে যাবে সরকার“। আচ্ছা ভাইসাব,  কূটনীতিক ট্যাগ দিলেই কী কারো নামে যা খুশি লেখা বা চালানো যায়; জায়েজ?  আমেরিকার সাথে হাসিনার কোন ডিল বা রফা করতে গেলে একটা দেয়া-নেয়া লাগবে, এটা তো কোন গুঢ় জ্ঞান না, এটা সবাই জানে। এখন প্রশ্ন হল হাসিনার হাতে এমন কি আছে যেটা আমেরিকার কাছে লোভনীয় ফলে যা সে কামনা করে?  এমন কিছুই নাই, যেটুকু ছিল তা আগেই দেয়া হয়ে গেছে। আর দ্বিতীয়ত, হাসিনার সাথে আমেরিকার কোন ডিলে জড়ানোর মানে হল হাসিনার প্রথম চয়েজ তাকে আরও এক টার্ম ক্ষমতায় রাখতে হবে – আর এর দায় আমেরিকাকে নিতে হবে। কিন্তু আমেরিকা ইতোমধ্যে প্রতিটা কথাতে জুড়ে দিয়ে বলেই যাচ্ছে যে একটা ফেয়ার ইলেকশন হতেই হবে। তাহলে এখানে বটম লাইনটা হল, একটা ফেয়ার ইলেকশন আর হাসিনাও আবার ক্ষমতায় – এদুটো একসাথে ঘটাতে হবে ; কিন্নোতু সরি এদুটো একসাথে সম্ভব নয়। কোন ম্যাজিকেও সম্ভব নয়! তাহলে এসব “তলে তলে বা দর কষাকষি টাইপের” বুকিস মুখস্ত কথা বিবিসি ঐ কথিত কূটনীতিকের মুখ দিয়ে বলাচ্ছে কেন?

    তাহলে,  রিপোর্ট-টাকে কী বিবিসি কোন রহস্য উপন্যাস বানাতে চেয়েছিল ?? অবশ্য না হলে মোদি ত্রাতা, মোদি পরাশক্তির মত ক্ষমতাধর এই গল্প কিভাবে আনা যাবে? ব্যাপারটা তো তাই, তাই না?

    দুইঃ
    দেখা গেল বিবিসি এভাবে প্রথম পর্ব জমাতে পারল না। এখন পরের পর্ব। এবার প্রকাশ্যে সাবেক কূটনীতিক তৌহিদ হোসেন বলছেন “বাংলাদেশে এক সামরিক ঘাটির” কথা। যদিও তিনি নিজেই তা শুরু করেছেন এটা একটা গুজব একথা বলে।
    প্রথমত এটা গুজব নয়, এটা আমেরিকানদের একটা খায়েস যে তারা তাদের সপ্তম নৌবহর বাংলাদেশের জলসীমায় নোঙ্গর করতে পারলে তাদের শান্তি লাগত, এতে এশিয়ায় তাদের গায়ে বল বল ঠেকত। খায়েস তো মানুষের কত রকম থাকে! যেমন এই শতকের শুরুর আগে থেকেই অর্থহীন “ইসলাম কোপানিতে” লেগে পড়া ভারত-আমেরিকার দোস্তালির ইস্যুতে ভারতের  (তখন সেটা বাজপেয়ীর ভারত) সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অ্যামেরিকান প্রশাসন গ্রহণের পর থেকেই এই ঘাটি বানাবার খায়েস তারা লুকিয়ে ফেলেছিল, কোন ঘরের চালে গুজে রেখে চলছিল। কারণ, অ্যামেরিকান এই খায়েসের ইস্যুতে এর বিরুদ্ধে চীনের চেয়েও কোর আরও বড় বিরোধি হল ভারত। অর্থাৎ ভারত-ঘনিষ্ঠতা চাওয়ার আগেই আমেরিকাকে এই খায়েস ডেড করে তুলে রাখতে হত তাই করেছিল আমেরিকা। আর তাই সেটা সেই থেকে তোলাই আছে। অর্থাৎ খায়েস টা একেবারেই কোন গুজব নয়, তবে তুলে রাখা আছে, এক্টিভ নয় এই আরকি!
    কিন্তু আমেরিকান এই খায়েস নিয়ে আমাদের কী করার আছে?
    সেটা এবার এককথায় বললে, অ্যামেরিকান এই খায়েস ঠেকানো এটা আমাদের চেয়েও ভারত ও চীন এদুই শক্তির জন্য আরো বড় ইস্যু; সেটা এতই বড় যে এরা দুই রাষ্ট্রই তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে তা ঠেকাতে প্রস্তুত। কাজেই আমাদের ভুমিকা এখানে এতটুকু হলেই যথেষ্ট হবে যে বাংলাদেশকে ওদের লড়াইয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে হওয়ানো যাবে না। বরং না হয়ে ওদের পায়ের পারার নিচে চাপা পড়ে মরতে না চাইলে আমাদের ভুমিকাটা খুবই ছোট্ট! তা হল, এই ইস্যুতে কোনপক্ষের সাথে না গিয়ে কোন খাতির জমানোর ইস্যু বলে বিবেচনাই না করা  – যেটাকে বলে – এটা আমাদের জন্য NO GO ইস্যু! যদি তা না মানি তাহলে এই ইস্যুর কারণে, আমেরিকা আসার আগেই ভারত ও চীনের দুদিক থেকে আক্রমণে আমরা শেষ হয়ে যাব।  মানে এটা হাসিনা বা কারও ক্ষমতায় আসা বা ক্ষমতার আয়ু বাড়ানোর কোন ইচ্ছার আইটেমই নয়! দরকষাকষির ইস্যু নয় বা এভাবে দেখা হারাম! এই কথাটা মনে রাখতেই হবে!।   কাজেই কূটনীতিক বলে নয় যেকারোই ভাব ধরে এনিয়ে কিছু বলা বা ভয় দেখানো অর্থহীন, অমূলক!

    আচ্ছা দুনিয়াতে আমেরিকার আর একটা সামরিক ঘাটি করা না করাতেই বা কী হয়েছে? কী হতে পারে? গত ২০১৬ সালে আমেরিকা অষ্ট্রেলিয়াতে কোস্টাল এরিয়ায় একটা সামরিক ঘাটি চালু করেছে। তাতে কী হয়েছে? আমেরিকা চীনের উপর বিজয়লাভ করেছে নাকি কোন অতিরিক্ত সুবিধা পেয়েছে? কিছুই পায়নি। মনে রাখতে হবে কড়া ভাবে যে  একালে  আমেরিকা-চীনের প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এটা কোনভাবেই সামরিক চরিত্রের নয় সামরিকও নয়, এটা অর্থনৈতিক। আরো স্পষ্ট করে বললে, কার অর্থনীতি  এই মুহুর্তের দুনিয়ায় নিজ অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি সারপ্লাস একুমুলেশন  বা অতিরিক্ত সম্পদ জমা করতে সক্ষম  হয়ে উঠেছে তারই প্রকাশের লড়াই । যদিও এটা তো প্রতিযোগিতার ইস্যু নয়, অবজেকটিভ ঘটনা। অর্থনীতিতে এই বাড়তি সম্পদ এটাই অন্যদেশের  উপর আমেরিকা বা চীনের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হয়ে দেখা দিতে সক্ষম এবং হয়ও তাই।  যেখানে আমেরিকা দ্রুত তার পুরানা প্রভাব-বিস্তারের  সক্ষমতা হারাচ্ছে আর বিপরীতে চীন জাগছে। তাই আমেরিকা এটাকে সামরিক সক্ষমতা হিশাবে উলটে দিবার বা হাজির করে দেখানোর প্রাণপন চেষ্টা করছে। যে সামরিক ফিল্ডে আমেরিকা এখনও চীনের চেয়ে ছয়গুণ বেশি সক্ষম। কিন্তু আমেরিকা চাইলেই তা হচ্ছে না। কারণ, কোনদেশই সামরিক সংঘাত চাচ্ছে না, যদিও চীনের সাথে অনেক পড়শি দেশেরই সীমানা বিতর্ক  বিরোধ আছে। কিন্তু তাই বলে আমেরিকার কোলে উঠে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে কেউ আগ্রহি নয়; এটা গাধামি এটুকু সকলেই বুঝে। তাই আমেরিকা বার বার ফেল করছে এখানেই।   আর তাতে কী হয়েছে?  হয়েছে এই যে অষ্টেলিয়ায় বানানো অ্যামেরিকান সামরিক ঘাঁটি কারই অন্তত এখনই কোন কাজে আসছে না। বিনিয়োগটা খামোখা হয়ে বসে আছে!

    ভারত পাশে দাঁড়াবে?- এর গল্পঃ
    ভারত পাশে দাঁড়াবে – একথা শুনলে আজকাল আর হাসিনাও খুশি হয় না। কারণ, মোদি ও ভারত মুরোদহীন, উত্থানরহিত এক ব্যক্তি বা শক্তি! আর এই মিথ্যা কথা কে বিশ্বাস করে!
    এরপরেও বিবিসি ও শাকিল আনোয়ার এসেছেন আসলে তাদের সাবজেক্ট বা এসাইনমেন্ট নিয়ে যে – ভারত পাশে দাঁড়াবে? ! আচ্ছা একালে ভারত কবে থেকে কারও পাশে দাড়ানোর মত পরাশক্তি হয়ে গেছে? আর কিভাবে সেটা? যখন একাল বলতে গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলে আমেরিকা-চীনের রেষারেষি, লড়াই বা প্রতিযোগিতা তুঙ্গে উঠার কাল বলে এটাকে বুঝতে হবে। একালে ভারত তাহলে কী কেউ?? অবশ্যই না।  তবে ভারত বড়জোর কখনও  আমেরিকা অথবা চীনের পক্ষে তাদের কারও থেকে আলগা খেপ-মারার মত কাজ বা এসাইনমেন্ট পেয়ে গেলে সীমিত অর্থে ভারত নিজেকে কিছু ক্ষেত্রে পাওয়ারফুল বোধ করতেও পারে। যা সে আগে করেছেও; বাংলাদেশকে ভারতের হাতে আমেরিকার তুলে দিবার পরে!

    আমাদের ওয়ান-ইলেভেন ছিল ২০০৭ সালের তেমনই একটা ঘটনা।  আমেরিকার চাওয়া ছিল এশিয়ায়  চীন-ঠেকানোর ঠিকাদারির কিছু কাজ ভারতকে দিয়ে করিয়ে নেয়।  আর তাতেই বিনিময়ে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই মাখন আমেরিকা কিছুই খেতে পারেনি বরং তার চেয়ে পিঠার আসল ভাগটা গিয়েছে ভারতের মুখে! আর তাতেই ২০১৪ সালের শুরু থেকেই আমেরিকাই সরাসরি বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ ও চাওয়া-পাওয়ার  সকল ক্ষমতা ও সুযোগ হারিয়ে ফেলেছিল। আর এতে  ভারত তখন বাংলাদেশকে একেবারে লুটে আর চুষে সব খেয়ে ফেলার ভুমিকায় হাজির হয়েছিল। এখন এটাকেই কী শাকিল বলছেন – এটাই কী ভারতের পাশে দাঁড়ানো?   বিবিসি বা শাকিলের উচিত শব্দের ওজন, অর্থ জেনে মেপে এরপর ব্যবহার করা! আর এটা আমার বলার বা মনে করিয়ে দিবার কথা না, তাদের নিজেদেরই জেনে আসারই কথা!

    আরএসএসের আছে একটা গ্লোবাল স্বপ্ন-প্রকল্পঃ
    আরএসএসের একটা গ্লোবাল স্বপ্ন-প্রকল্প আছে। যেটা হিন্দুত্ববাদের ভিত্তিতে শুধু একটা অখন্ড ভারত কায়েম নয়; বরং সারা দুনিয়া জুড়ে হিন্দুত্ববাদ কায়েম করার স্বপ্ন। আর মোদি হলেন সেই স্বপ্ন-প্রকল্পের এখনকার প্রধান কান্ডারি। আমার একথার সবচেয়ে ভাল প্রমাণ মিলবে আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে বিশেষত যেসব রাজ্যে প্রবাসী ভারতীয়দের সংখ্যা বলার মত একটা চাঙ্ক! সেসব রাজ্যের দেখা যাবে ক্যালেন্ডারে আরএসএস ঘোষিত হিন্দুত্বের চোখে পালনীয় দিন, মানে সরকারি ছুটির দিন নয় – যেমন একালের রামনমমী পালনের নামে অ-হিন্দুদের কোপানোর দিন হয়ে উঠেছে; এসব দিনে আমেরিকায় বসে এরা হিন্দুত্বের জয়গান গেয়ে মিছিল-সমাবেশ করছে। মনে রাখতে হবে অ্যামেরিকান হিন্দু ফাউন্ডেশন বলে তাদের সংগঠন আছে।
    কাজেই এমন লক্ষ্য ও ততপরতার অংশ হিশাবে – বাংলাদেশের উপর অ্যামেরিকান ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এই উসিলায় ত্রাতা ও বীর মোদির ভারতকে একটা পরাশক্তি হিশাবে তুলে ধরা আর মোদি কী ত্রাতা হবেন –  এভাবে এমন মুরোদবিহীন কিন্তু উস্কানিমূলক প্রশ্ন তুলে  এরপর এরই জবাব দেওয়া বা নেওয়ার উসিলায় শ্রীরাধার কাছে গেছে বিবিসি। এটাই মোদি-আরএসএসের পক্ষে প্রোপাগান্ডা করার জন্য বিবিসিকে দেয়া এসাইমেন্ট!

    কেন কথাগুলো এত কঠোরভাবে বলছিঃ
    লেটেস্ট বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। সেটা হল বাইডেন এখন ভারতকে কিভাবে দেখছে তা বুঝতে হবে।  অন্তত এই ২০২৩ সালের শুরু থেকেই পুরানা – ভারত-আমেরিকা যতটুকু যা এলায়েন্স খাতির অথবা চীন-ঠেকানোর চুক্তি এবং হাতে হাত ধরে ওয়ার্কিং রিলেশন যা আগে তৈরি ছিল – এর সবটাই ফুল স্টপ হয়ে যায়। এর বহু আগেই অবশ্য ট্রাম্পের আমলেই ২০১৭ সালে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারের আমেরিকায় এক্সপোর্ট  এর বিশেষ সুবিধা বাতিল হয়েছিল। আবার একালে কোয়াড [] শুকিয়ে অকেজো হয়ে গেলে অথবা  ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ান তেল, কয়লা ইত্যাদি পুণঃরপ্তানি শুরু সহ নানাবিধ প্রকাশ বলছে যে দুপক্ষই অঘোষিতভাবে স্ট্রাটেজিক সম্পর্ক সমাপ্তি টেনেছে। ভারতের সাবেক কূটনীতিকেরা আমাদের জানাচ্ছে যে ভারত এখনও স্ট্রাটেজিক এলায়েন্সটা ফিরে চায়। মানে হল আমেরিকা চায় না। এসবের কারণে, আমরা বুঝতে পারি যে চীনের সামনে ভারতের অসহায়বোধ  আরও বেড়েছে। আর সর্বোপরি – আমেরিকা বড় ভাই তার পিঠে হাত রেখেছে – এতে ভারতের গা-গরম ভাবভঙ্গি ভারত সেটা গত ২৩ বছর ধরে দুনিয়ার বাজারে বিক্রি করে চলেছিল তা বন্ধ হয়ে আছে। – আর এখান থেকেই মিথ্যা আর ফাঁপা হলেও মোদির যে পরাশক্তি ভাবদেখানো এর উৎস হিশাবে আবার আমেরিকার সাথে সম্পর্ক নাই কিন্তু আছে দেখাতে মোদি-রা এখনও উদগ্রীব যদিও সেসব দেখানোটা এখন একেবারেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে!
    তবু স্ট্রাটেজিক এলায়েন্স টা যে নাই তা  বাস্তবে দেখা ঘটনা, সিম্পটম বা ইঙ্গিত দেখে বলা ঘটনা-ই, কারণ সরকারি বা ঘোষিতভাবে দুপক্ষের কেউ তা বলে নাই।  তাই এবার কিছু সরাসরি ইঙ্গিত-প্রমাণ নিয়ে কথা বলব।

    ভারত-আমেরিকার ডিভোর্সঃ
    ভারত-আমেরিকার ডিভোর্স মানে আসলে স্ট্রাটেজিক ডিভোর্স – মানে স্ট্রাটেজিক এলায়েন্সে যে দীর্ঘ কমপক্ষে ২২ বছরের সমপর্ক ছিল এর অবসান ঘটা। এর প্রমাণ হিশাবে একালে আমেরিকার বার্মা দখল বা রেজিম চেঞ্জ এর ইচ্ছা নিয়ে যতটুকু যা প্রকাশিত তা যথেষ্ট ভাল প্রমাণ অবশ্যই। কারণ এটাই অ্যামেরিকার নয়া এশিয়ান স্ট্রাটেজির বেজ বা মূল অংশ, অবশ্যই আর তা ভারতবিরোধী বা ভারতের স্বার্থকে আমল বা কেয়ার না করে হাজির করা হয়েছে। কিন্তু আমি এর কথা  এখানে এখন টানবো না। কারণ আরও বড় প্রমাণ-লক্ষণও হাজির হয়ে আছে তাই। কী সেটা?

    এককথায় এটা হল, ভারতকে সাইজ করে ছোট করা বা আসল সাইজে আনা –  বলতে পারি। মানে হল আমেরিকা যেন বলতে চাইছে গত তেইশ বছর আমার প্রভাবে থেকে ফুলে উঠা ভাব করেছো -পরাশক্তি মারাও? তাই এখন তোমাকে সাইজ করবে আমি। তোমার আসল সাইজে তোমারে ফিরিয়ে আনব।  এসব ভাব-ইঙ্গিতের বক্তব্যেরই বাইরের মানে হল –  ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর আমেরিকা-বাইডেন প্রশাসন আর মোদির শাসন দেখতে চায় না। তবে এক্ষেত্রে পরোক্ষে এবং আইন মানা সব ততপরতায় আমেরিকা ভারতের বিরোধীদলদের সুবিধা হয় সুবিধা পায় এমন সব পদক্ষেপ নিবে। এটা ইতোমধ্যেই আমেরিকা শুরু করে দিয়েছে। বলা যায় গুজরাত-ফাইল বা গুজরাতে মুসলমান নিধন এর ডকুমেন্টারি বিবিসিতে প্রচার দিয়ে এর শুরু। পরে আদানিকে ডুবিয়ে দেয়া যেটা মোদির সব ততপরতার অর্থনৈতিক উৎস ও সাপোর্ট যেখান থেকে পেত সেটাকে ধবংস করে দেয়া; রাহুল গান্ধীকে বিকল্প হিশাবে প্রমোট করা ইত্যাদি। এভাবে বিরোধী সকল দলকে ম্যাসেজ দেয়া যে রাহুলের পিছনে তারা যেন দাঁড়ায় আর নিজেদের নানান স্বার্থগুলো এলাইন করা এক রাস্তা ধরে সহযোগিতা করে সাজিয়ে নেয় যাতে তাদের সকলেরই আমেরিকার সহায়তা পেতে সুবিধা হয়, আমেরিকারও কাজগুলো সবার জন্য এফেকটিভ হয়। স্টেট ডিপার্টমেন্টের ছোট্ট একটা কথা – যা এর মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল যখন বলেন ‘আমরা সব মনিটর করছি” –  তা অনেক কথারই স্বল্পকথা আসলে।
    আবার লক্ষ্য করেন সম্প্রতি ফেসবুকে ভারতীয় স্টাফদেরকে যে সমুলে ছাটাই করা হয়েছে সেটাও বাইফ+ডেনের দিক থেকে মোদিবিরোধিদেরকে দেয়া উপহার। এটা যে মোদির ঘরে আঁচ ও আগুন লেগেছে এর কিছু নমুনা দেখতে পারেন এখানে। এই পত্রিকাটা আরএসএসের স্বরাজ -উইংয়ের পত্রিকা।

    মজার কথা হল, বাইডেন যতই এক্টিভ বা এগ্রেসিভ হচ্ছেন যা জন্মের পর থেকে ভারতের রাজনীতিতে কখনই উপস্থিত ছিল না ততই যেন মোদি পিছু হটছেন; মানে হয়ে গেছে যেন তাই করছেন বাইডেন। আমেরিকার হেফাজতে থাকা ভারতের আভ্যন্তরীণ প্রসঙ্গে যত গোয়েন্দা রিপোর্ট ডকু আছে [যেমন পুলোওয়ামায় পাকিস্তানের সাথে কোন বোমাবাজি ঘটেই নাই, সেতাই আমেরিকা মোদির পছন্দের লোক কাশ্মীরে মীদি যাকে প্রতিনিধি বা গভর্নর করে পাঠিয়েছিলেন সেই সত্য মালিক তা ফাঁস করে দিয়েছেন।] এর সবগুলো যেন বাইডেন ভারতের বিরোধীদলের সামনে খুলে দিয়েছে, এক্সেস দিয়ে দিয়েছেন।  অথচ প্রতিক্রিয়ায় মোদি ততই কুকড়ে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে, সরে যাচ্ছেন – সর্বপরি এড়িয়ে প্রতিরোধ অবস্থান ত্যাগ করে চলে যাচ্ছেন। যেন মোদি বুঝে গেছেন যে  প্রতিরোধ অবস্থানে গেলে তাঁর আরো বেশি ক্ষতি হবে, ন্যাংটা হয়ে যাবে্ন!
    এটা এক অদ্ভুত খেলা যেন! ওদিকে সর্বশেষ অনেক বাধা পেরিয়ে রাহুল তার নিজের জন্য একটা সাধারণ পাশপোর্ট ইস্যু করাতে পেরেছেন তাও সেটা আবার মাত্র তিন বছরের জন্য – বাকি আগের সব পাশপোর্ট সারেন্ডার বা বাতিল করেছে মোদি সরকার। আর এই পাশপোর্ট নিয়েই আগামি মাসে রাহুল আমেরিকা যাচ্ছেন। বাজারের অনুমান এটাই মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাথে তার ফাইনাল ডিল মানে – কাজের লক্ষ্য কী হবে, কে কী করার দায়ীত্ব নিবে ইত্যাদি এসবেরই ফাইনাল হবে সেখানে।   বাস্তবে কী হবে না হবে সে আমরা আগামিতে দেখতেই পাবো অবশ্যই।
    কিন্তু আসল কথাটা হল,  ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক যে এখন ডিভোর্সির  – স্ট্রাটেজিক এলায়েন্স থেকে পতিত হয়ে স্ট্রাটেজিক ডিভোর্স – এর একথা তো অন্তত বিবিসির কাছে কোন কিছুতে অজানা নয়! ছিল না। কারণ গুজরাত ডকু তো তারাই প্রচার করেছে! তাহলে???

    একালে ভারতের নিজের সক্ষমতায় বাংলাদেশের পাশে দাড়ানো, কিংবা আমেরিকার কাছে বাংলাদেশের জন্য  সুপারিশ করা ইত্যাদি কোন কিছুই হচ্ছে না, কারণ মোদির তা করার মুরোদ নাই, শেষ। তা নাই এবং ছিলও না যতটুকু যা ভারত দেখিয়েছিল আগে সেটুকুও  মোদি ফুলিয়ে ফাপিয়ে নিজেকে পরাশক্তি কল্পনায় দেখিয়েছে – এসবের পিছনের কারণ ভারতের পিঠে কিছুটা সময় হাত রেখেছিল আমেরিকা – সে কারণে। অর্থাৎ অ্যামেরিকান স্বার্থে সে ভারতকে যতটুকু মাতবর বলে দাবি করার সুযোগ দিয়েছিল সেটাই। সবচেয়ে বড় কথা সেটা আর এখন একেবারেই নাই। অথচ এটাকেই মোদি ভারত পরাশক্তি হয়ে গেছে বলে চালাবার দেখাবার প্রাণান্ত চেষ্টা করে গেছে। যার সর্বশেষ প্রচেষ্টার নাম হল বিবিসি ও শ্রীরাধা দত্ত এদের ক্যারিকেচার!  তাহলে ভারত বাংলাদেশের পাশে দাড়ানো বা না দাঁড়াতে চাওয়া নিয়ে জল্পনাওকল্পনা ছড়ানো এর সবকিছুই ডাহা মিথ্যা। মোদির ইমেজ তৈরির প্রপাগান্ডা মাত্র!

    আসল কথাটা হল, যে মোদির ভারতের এখন বাইডেনের আমেরিকার কাছে নিজেদেরই বেইল নাই  – না ভারতের না মোদির – সেই মোদি কিভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে পারে? হাসিনার হয়ে বাইডেনের কাছে সুপারিশ নিয়ে যেতে পারে, কে তিনি?????

    অথচ এ পুরা ব্যাপারটাই ডিটেইল অন্তত বিবিসির নিজের জানা থাকার পরও   দিল্লি কি তাদের সেই কূটনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে – হাসিনাকে উদ্ধার টাইপের রিপোর্ট তাহলে কী করে করতে পারল??
    এটাই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের হয়ে নেয়া বিবিসির এসাইনমেন্ট!

    বিবিসি একালে অনেক এক্টিভ একাজে। বিবিসি যদি এমন চালাতেই থাকে তবে আগামিতে হাসিনার যুগ শেষে তাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।  বাংলাদেশে  গণধিকৃত মিডিয়া হিশাবে পরিচিত হবে! নিজের ভাগ্য নিজে বেছে নেওয়ার অধিকার তো অবশ্যই বিবিসি বা শাকিল আনোয়ারের!   মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্য গড়ে থাকে!

    আপডেটেডঃ ৩১ মে ২০২৩, দুপুরঃ ১০ঃ৩৯


    গৌতম দাস,
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ভারতীয় সুবীর ভৌমিক এর লেখাটা

    ভারতীয় সুবীর ভৌমিক এর লেখাটা
    গৌতম দাস

    ২২ মে, ২০২৩   ০০ঃ০৩
    https://wp.me/p1sCvy-4ul

           Wary Delhi watching Dhaka 

    ভারতীয় সুবীর ভৌমিক আবার একটা লেখা ছাপিয়েছেন – ‘দ্যা ফেডারল’ [The Federal], এই নামের দক্ষিণ-ভারতীয় পত্রিকায়। বাংলাদেশের পাঠককুল সাধারণত  সুবীরকে ধরে নেন যে তিনি ভারত সরকারের (গোয়েন্দাবিভাগ) এক অঘোষিত মুখপাত্র। বা উলটা করে বললে শুরুর দিকে সুবীরও যেন এটাই চেয়েছিলেন যার নতিজা এটা। তবে যেকোন সরকারের নানান মুখপাত্র থাকে; আর মুখপাত্র ব্যাপারটা হল,  কোন ঘটনায় সরকারের মানে সরকারি ভাষ্যটা কী তা জানাতেই এই পদের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকগুলো সরকারি প্রতিনিধি বা কর্মচারির মধ্যে  কার কথাটা সরকারের অবস্থান বলে সরকার মনে করে সেটার নির্ধারক হল কাকে মুখপাত্র বলে সরকার আগেই পরিচয় করিয়েছে।  যেমন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরও এক মুখপাত্র থাকে; সম্প্রতি বাংলাদেশেও এই প্রথম এমন পদে একজন মুখপাত্র নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু এর বাইরেও এমন কিছু মুখপাত্র দরকার হয় যারা সরকারের অফিসিয়াল বা ঘোষিত মুখপাত্র নয় বা থাকেন না; অথচ তাদের মুখ দিয়ে সরকার নিজ অবস্থানও জানায় রাখতে চান। অর্থাৎ অফিসিয়ালি তাঁকে মুখপাত্র বলে স্বীকার না করেও সরকার বিভিন্ন ইস্যুতে নিজ অবস্থান জানানোর এক ব্যবস্থা করে থাকে, যেখানে পাঠক আর সরকার – এরা উভয় পক্ষই এই অঘোষিত ব্যবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকেন। অর্থাৎ ইনফরমালি এক ফরমাল ব্যবস্থা যেন! সুবীরকে তেমনই এক মুখপাত্র মনে করা হয়!
    আবার এমন ব্যবস্থা চীনেরও আছে, যদিও তা আরেকটু গোছানো। চীনের বেশিরভাগ খবর প্রকাশিত হয় জিনহুয়া  [Xinhua] নিউজ এজেন্সি থেকে তবে তা চীনে সারা দেশের নানান নামের পত্রিকায়। কিন্তু চীনা গ্লোবাল টাইমস [Global Times] হল সরকারি অবস্থান প্রকাশ করার আলাদা এক পত্রিকা তবে সে কথাটাও অঘোষিতই থাকে। মানে কোথাও তা উল্লেখ নাই; তবুও পাঠক অনুমান করে নেয় বা ধরে নেয় যে এটাই চীনের অফিসিয়াল ভার্সান।

    সুবীরদের এই লেখার শিরোনামটাই অদ্ভুত – “নির্বাচনের আগে হাসিনা যেমন ঢাকার উত্তাপ টের পাচ্ছে দিল্লিও এক কোনায় পড়ে নিজেও তা টের পাচ্ছে” [As Hasina faces heat in Dhaka ahead of polls, Delhi finds itself in a corner too]। মানে সারকথায় সুবীর যেন বলতে চাইছেন,  বাংলাদেশের হাসিনা যেমন  আমেরিকান চাপ থেকে বের হবার পথ না পেয়ে মোদির সহায় হয়েছিলেন; মোদিও তাতে ব্যর্থতা অসহায়ত্ব দেখিয়ে ফেলে পালাতে বা কেটে পড়তে চাইছেন!

    এতদিনের ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক বা মোদি-হাসিনার সম্পর্কের কথা পাশে সরিয়ে রেখে যদি কেবল এবারেরটা মানে গত মাসে ২৫ এপ্রিল হাসিনা সরকারের জাপান সফর থেকেই আমলনামা শুরু করি – তাহলে বলতে হয় জাপান সফরটা মূলত ছিল মোদির ভারতের জন্য কিছু করে দিবার সফর। যাতে আমাদের সরকার মোদির জন্য কিছু করে দিলে  মোদি সরকারও আমাদের সরকারের জন্য গুরুত্বপুর্ণ কিছু করে দিবেন!  যেমন এক, বাংলাদেশ জাপানি লোনের ভার নিজ কাঁধে নিয়ে ভারতের নর্থ-ইস্টকে শুধু সমুদ্র বন্দর না একেবারে একটা (মাতারবাড়িতে) গভীর সমুদ্র বন্দরের ব্যবস্থা পাইয়ে দিতে জাপান সফরে গেছেন।  আর দুইঃ যদিও  মোদির ভারত ক্রমান্বয়ে নিজেকে এক পরাশক্তি বলে এক শতভাগ মিথ্যা দাবি বা আচরণ করে চলে –  যেন কোন মানুষ যখন অলীক সব স্বপ্ন-কল্পনাকে বাস্তবে তা আছে বলে মনে করে বিশ্বাস করা শুরু করে আর সেসবকে তাঁর স্মৃতি বলে চালিয়ে দিতে চায়, এটা সেরকম। যা বাস্তবে নাই ঘটেই নাই তা কারো স্মৃতি হয় কেমনে?  যেখানে বাস্তবের ভারত হল এমন এক অর্থনীতির নাম যার প্রচুর অবকাঠামো ঋণ আর এফডিআই- এদুই ধরণের বিনিয়োগ ঋণের ঘাটতিতে আছে বা থাকছে; মানে একটা বিদেশি ঋণচাহিদায় থাকা দেশ। উদ্বৃত্বের অর্থনৈতিক দেশ ভারত নয়। ফলে তার ঋণ প্রয়োজন যেটা সে সবাইকে জানিয়ে চীনের (যে এখন ঋণদাতা হিশাবে শীর্ষে) কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারে না। তার অহঙ্কার-ভ্যানিটিতে লাগবেই যদি সে নিজ পুর্ণ ক্ষমতায় বিকশিত হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু মোদির ভারতের আবার চীন-এলার্জি আছে বলে – মানে হলে হুদাই মোদি হল এক কঠোর জাতিবাদি স্বরাজ্য-জ্ঞানসম্পন্ন শক্তি হিশাবে দেখিয়ে পাবলিকের কাছে ভোট চেয়ে ফেলেছে; ফলে যেখান থেকে সে আর এখন বের হতে পারবে না –  অতএব চীন তার বিনিয়োগ চাহিদা মিটাতে পারলেও মোদিকে এখন চীনের একটা বিকল্প খুঁজতে নেমে পড়তে হয়েছে। ভারত সেই বিকল্প হিশাবে সে পেতে চায় জাপানকে। যদিও ভারত জানে এটা তেমন জুতের না; কারণ এটা আবার পায়ে জুতার কাটার মত খচখচ করে লাগে। কারণ জাপানি ঋণের খরচ তুলনায় বেশি; এছাড়া জাপানি শিল্প ভারতকে সাব-অর্ডিনেট বা অধীনস্ত করার ঝোঁক প্রবল বেশি। তবে মাঙনা যদি কিছু জাপান থেকে আসে তো খারাপ কী! এটাও ঠিক! হাসিনার সফরকে আমরা এখান থেকে দেখতে পারি!

    সমস্যা হল মোদির ভারতের অর্থনীতিবিষয়ক স্বপ্ন আসলে এক অলীক স্বপ্ন। কারণ, মোদি বা আরএসএস এর রাজনীতি এক উগ্র জাতিবাদী ধারণা বলে, তাদের অর্থনীতি জ্ঞান ও ধারনাও উগ্র জাতিবাদ প্রসুত! কিন্তু এর মানে কী? মানে হল এই চিন্তা্র শাসকেরা বাস্তবে কখনও আরেক দেশের সাথে শেষবিচারে লেনদেন বা বাণিজ্য-অর্থনীতিতে লিপ্ত হয়ে পারে না, পারবে না। কেননা এমন উগ্র জাতিবাদ মনে করে আমার দেশের মানুষ যাকিছু উতপণ্য ভোগ-ব্যবহার করব তা কেবল নিজ-দেশের উতপাদনই হতে হবে। আমিও রপ্তানি করব অন্যদেশেও আমার দেশে রপ্তানি করবে – না এমন নীতিতে উগ্র জাতিবাদ বিশ্বাস করে না। এটা কার্যত ওয়ানওয়ে  মানে কেবল একদিকে আমিই কেবল রপ্তানি করব এমন হতে হবে। এমনকি তা যদি তা সোজা আঙ্গুলে না হয় (বাস্তবে তা না হওয়ারই কথা) তবে শঠতা, প্রতারণা করে হয়েও আগাতে হবে। ভুয়াভাবে এমন বিশ্বাস আছে তা দেখাতে হবে আর এই দেখানোটা জায়েজ মনে করতে হবে। যেটা অনেকটা ছলনাময় ও চতুর কলোনিদখলদার ব্যবসায়ী বৃটিশদের মত, তাদের পররাষ্ট্রনীতির মত;  আর এটাই উগ্র জাতিবাদিদের অর্থনৈতিক মডেল।  একারণে গত একদশকেরও বেশি এই জাপান-ভারতের সম্পর্ক এক স্বপ্ন-কল্পনাই হয়ে চলছে যার তেমন কোন বাস্তবায়ন অগ্রগতি নাই। যদিও তাতে উচ্ছ্বাসে কমতি নাই। যেকারণে,  যাকিছুর নামে সাথে স্বরাজ অথবা জাগরণ ধরণের শব্দ আছে বুঝতে হবে সেসবগুলো আসলে আরএসএস এর প্রকল্প। তাই স্বরাজ্য-মাগ ম্যাগাজিনে জাপানকে নিয়ে উচ্ছাস দেখা যাবে যারা বলতে চাইবে এই তো চীনের বিকল্প এক বিড়াল হিশাবে জাপানকে পেয়ে গেছি আর চিন্তা নাই। কিন্তু এটা যে মাঙনায় পাওয়া হাসিনা সরকারের দেয়া জাপান থেকে হবু সুবিধা তা উগ্র জাতিবাদিরা পরিস্কার করে বলবে না।

    কিন্তু হাসিনা সরকার তাহলে এর বিনিময়ে নিজে কী পাবে ভেবেছিল? সেটা অনেকটা –  “দেখেন তো ভাইজান কিছু করতে পারেন কিনা – আমেরিকার ঘেরাও এর ভিতর থেকে আমাকে উদ্ধারে কিছু করতে পারেন কিনা” – ধরণের কিছু।
    এমনকি গত সপ্তাহে বাংলাদেশের হোস্ট করা (১২-১৩ মে) ভারত মহাসাগর কনফারেন্স নামে যেটা হল সেটাও ছিল আরেক রাজভেট – ভারতকে দেয়া আমাদের উপহার। সেটা আবার কী? এছাড়া এই সম্মেলনের তাতপর্যই বা কী?

    সেটা বুঝাতে একটু পিছন থেকে বলি। আগেও  অনেকবার বলেছি যে গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের একালের সকল প্রতিযোগিতার  ফোকাস-ভুখন্ড হবে (আসলে হয়ে গেছে) এশিয়া; আর যা  নুন্যতম আগামি তিনদশকের জন্য। অর্থাৎ একথাটাই আবার ভুখন্ডের দিক থেকে না বলে এর বদলে, মহাসাগর এর দিক থেকে বললে তা হল, ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর জুড়ে সমুদ্র-অঞ্চল হল এর ফোকাস এরিয়া ।  আমেরিকা নিজের সেই সমুদ্র-কেন্দ্রিক ততপরতার ফোকাস করেছে  – সমুদ্রপথে চীনের প্রবেশমুখ যেটা – সাউথ চায়না সি বলে ইতোমধ্যেই পরিচিত; তাকে কেন্দ্র করে তবে তা, অবশ্যই দুই মহাসাগর জুড়ে হৈ চৈ করে শুরু করে দিয়েছে।  চীনও কমবেশি তা করেছে তবে প্রোফাইল লো রেখে এবং সেও অবশ্যই দুই মহাসাগর জুড়েই সেটা শুরু করেছে। যেমন, আমাদের কক্সবাজর কেন্দ্রিক চীনের উপস্থিতি ও সব ততপরতা হল সেগুলোই।

    কিন্তু ‘পরাশক্তি’ নামের ভাঁড় ভারত, তার খায়েসের কী হবে? তারও একটা কিছু দেখানো যে লাগবেই! যাতে মনে হয় নকল হলেও সেও একটা পরাশক্তি! তাই এ যেন -পোলাও মনে করে গরীবের চালভাজা- খাওয়ার সুখ! আর সেটাই হাসিনার কান্ধে চড়ে এবারের ভারত মহাসাগর কনফারেন্স এর হোস্ট ভারত করে নিয়েছে বাংলাদেশকে। এটা করে, ভারত দেখাতে চাইলো সেও কম যায় না। এদিকে,  কূটনৈতিক রেওয়াজ হল কোন কনফারেন্সের গুরুত্বের মাত্রা বুঝার একটা তরিকা হল তাতে আগত বিভিন্ন দেশের কারা প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছে তা দিয়ে। মানে এরই একটা মাপকাঠি মানা হয় হল  – রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কতজন সেখানে এসেছেন। তাতে ভারতকে দেখা গেল তবু একজন রাষ্ট্রপতিকে আনতে পেরেছেন। কিন্তু কে তিনি? তিনি হচ্ছেন মরিশাসের রাষ্ট্রপতি! মহাদেশ-হিসাবে যা আফ্রিকায়; মানে আফ্রিকার পাদদেশে যে মাদাগাস্কার দ্বীপ আছে তারও আরও পুবে খুবই  ছোট্ট একদ্বীপ। মোট জনসংখ্যা যার মাত্র ১২ লাখ, মানে আমাদের মাঝারি মানের একটা উপজেলার জনসংখ্যা যেমন। আর মরিশাসের ৬৭% জনসংখ্যা আবার ভারতীয় অরিজিন। কেন এমন? কারণ,  যাদেরকে সস্তা শ্রমিক হিশাবে বৃটিশ কলোনিদখলদারেরা সেকালের বৃটিশ-ইন্ডিয়া থেকে মাইগ্রেট করে নিয়ে গেছিল, তারাই। যেমন অনেকেই লক্ষ্য করেছেন বাংলাদেশে এসে এই মরিশাস প্রেসিডেন্ট – নাম পৃথ্বীরাজসিং রূপম – তিনি  সস্ত্রীক আমাদের ঢাকেশ্বরী মন্দির দর্শন করতে গেছিলেন। সারকথায়, এজন্য এটা এক ভারত-নির্ভরশীল দ্বীপ-রাষ্ট্র। এই হল সেই একমাত্র প্রেসিডেন্টের নমুনা! দাবি করা হয়েছে পঁচিশটা দেশের প্রতিনিধি এতে উপস্থিত ছিল যার প্রায় সবই ভারতের আমন্ত্রণে বা ভারতের কূটনৈতিক জোরে।  আর বাংলাদেশ কেবল হোস্ট মাত্র যার মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশকে সদ-ব্যবহার করে দেখাতে পারে সে বাংলাদেশে অনেক প্রভাবশালী! ভারতের ‘এরিয়া অফ ইনফ্লুয়েন্সেই’,  “আমার তালুকেই”যেন বাংলাদেশ অবস্থিত!

    বিনিময়ে বাংলাদেশ সরকার কী পেলঃ
    কিন্তু এসব করার বিনিময়ে বাংলাদেশ সরকার কী পেল? হা; সেকথাটাই যেন আমাদেরকে জানাতে মোদি সরকার সুবীর ভৌমিকের আর্টিকেল্টা প্রকাশিত কররার ব্ছেযবস্থা করেছে। যেমন শিরোনাম থেকেই শুরু হয়েছে এটা বলে যে “বাংলাদেশ সরকার (অ্যামেরিকান) “চাপের” তাপ বুঝতেছে আর তাতে দিল্লিও কোণার চিপায় পড়ে গিয়েছে”। কিন্তু এতে তো ভারতকেও বিপদে পড়া দেখানো হয়ে গেল, তা কেন? কারণ এখন ভারতের খাই-দাই শেষ; মানে আমাদের সরকার ভারতের জন্য যা যোগাড় করে দিয়েছিল! ফলে এখন ভারতও নিজেকে অসহায় কোণার চিপায় পড়া দেখালেই তো দায়িত্ব শেষ – যেন বলতে চাচ্ছে, “অনেক চেষ্টা করলাম, আর পারি নাই ভাই!”  এমন বলে হলেও তো খালাস পেতে হবে!!!

    সাথে আবার সুবীরের আরও অজুহাতও আছে। এমনকি এতে খোদ ভারতই বিপদে আছে বলে সে আড়াল নিতেও চেয়েছে। একাজে, ভারতকে অসহায় দেখানোটাও জরুরি মনে করেছেন সুবীর! যেমন সাব-হেডিং দিয়েছেন, “খোদ ভারতই এক শক্ত-ঠেলার মধ্যে” [India in a tight spot] পড়েছে। এরপর বলছেন, এবারের পরিস্থতিতে দুইটা জিনিষ নাকি ভারতের বিপক্ষে, নাহলে ভারত হাসিনার জন্য কতকিছু করে দেখায় দিত!
    সে দুটা অসুবিধা কী? সুবীর বলছেন এক হল, জাতিসংঘে ভারতের হাতে চীনের মত ভেটোক্ষমতা নাই যে যেকোন অ্যামেরিকান প্রস্তাবে বিরুদ্ধে সে ভেটো মেরে দিতে পারত। আচ্ছা সুবীর সাব, আমেরিকা কী হাসিনার বিরুদ্ধে জাতিসংঘে কোন প্রস্তাব এনে হাসিনাকে চাপে রেখেছে? তা তো বাস্তবতা নয়! তাহলে এসব অপ্রাসঙ্গিক কথা কেন বলেন? বাস্তবতা হল,  আমেরিকা  নিজ-রাষ্ট্র-ক্ষমতাবলেই নানান স্যাংশন দিয়ে রেখেছে? শুধু তাই না। এখনও জাতিসংঘের যেকোন ফোরামে অ্যামেরিকান প্রভাব সবার চেয়ে বেশি। এই প্রভাবের অর্থ হল অন্যান্য ভেটো হোল্ডার সদস্যদের (চীন বা রাশিয়ার) এতে তেমন কিছুই করার নাই।  আজ জাতিসংঘ গঠন প্রায় আশি বছর হয়ে গেল তবুও গ্লোবাল নেতা আমেরিকা ঢলে পড়ার যুগে  আজ প্রবেশ করলেও  আমেরিয়ান প্রভাব এখনও একক; আমেরিকা চাইলেই কেবল জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট [OHCHR] এজেন্সি সংগঠনে যেকোন প্রস্তাব সহজে নড়েচড়ে উঠতে পারে।  ফলে ভারতের অযোগ্যতা, অসহায়ত্ব তো নতুন নয়। এমনকি আজ ভারত ভেটো ক্ষমতা পেলেও তাতে কিছুই হবে না। কারণ, এখনই আমেরিকা ছাড়াও আরও চার ভেটোক্ষমতা-ওয়ালা দেশ আছে। যার মধ্যে দুজন হল বৃটিশ ও ফরাসিরা। কই জাতিসংঘে তাদের উদ্যোগে বা চাপ কী হাসিনার বিরুদ্ধে কিছু আছে??? কাজেই ভারতের আলগা মাতবরি দেখানোর ত এখানের কিছু নাই!!! সোজা কথাটা হল, ভারতের হাতে ভেটোক্ষমতা থাকলেও সেটা হাসিনা সরকারের উপর আমেরিকান চাপের  বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারত না। কাজেই ভারতের আলগা ভাব নিবার কী আছে এখানে???
    সুবীর ভৌমিক দ্বিতীয় আরেক ওজুহাত সুনিয়েছেন হাসিনা-কে। তিনি বলছেন ২০১৪ সালের নির্বাচনের কথা। সেসময় নির্বাচনের আগের ডিসেম্বরে (২০১৩) ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংকে ভারত পাঠিয়েছিল। প্রকাশ্যেই তিনি বলে গেছিলেন, বিএনপি ছাড়াই (কারচুপির) নির্বাচন হবে কোন সমস্যা হবে না কারণ এরশাদ না চাইলেও জাতীয় পার্টিকেই গৃহপালিত বিরোধী দল করে নেয়া হবে – যেটা সুজাতার সঙ্গে এরশাদ মিটিং শেষে বেড়িয়েই মিডিয়ার সামনে সব উদাম করে দিয়েছিলেন এরশাদ। মজাটা হল,  সে ঘটনাটা সুবীর ভৌমিক এখন স্মরণ করছেন আমেরিকার বিরুদ্ধে ভারতের বিরাট কৃতিত্ব বলে দাবি করে।
    অথচ ফ্যাক্টস হল, দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতা ও এর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশের ক্ষমতা সবই তখনও এককভাবে সবই আমেরিকার দখলে ছিল। আর আজকের চেয়ে তা আরও ভাল ভাবে। যার কাছে ভারত তুচ্ছাতিতুচ্ছই ছিল। কিন্তু ঐ ভারতকে আমেরিকা এশিয়ায় চীন ঠেকানোর ঠিকাদারি বরকন্দাজ বানিয়ে রেখেছিল বলে তাতে ভারতের কিছু “ভয়েস অর্থে ক্ষমতা” তৈরি হয়েছিল যা আমেরিকা সদয় হলে ভারতকে সময়ে আমল করত। [মনে রাখতে হবে সেই ক্ষমতাটুকুও এখন ভারতের নাই]  কারণ আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতেই তুলে দিয়েছিল বলেই সুজাতা সিং অ্যামেরিকান ক্ষমতার উপর ভর করেই ওসব মাতব্বরি কথা সেকালে বলে যেতে পেরেছিল।  সুবীরের ধারণা এগুলো কেউ জানে না,  বা তার চাপাবাজি কেউ ধরতে বা বুঝতে পারবে না। পুওর সুবীর!! সুবীর তাই এবার লিখছে সুজাতার এই খেল এসবই নাকি ভানুমতির খেল  আর সেই আসলে ভানুমতি ছিলেন প্রণব মুখার্জি। যিনি এখন মারা গেছেন বলেই নাকি এবার আর হাসিনাকে অ্যামেরিকান চাপ থেকে উদ্ধারে মোদি কিছু করতে পারল না।!!!!
    মিঃ সুবীর, মিথ্যা কথা বলতে গেলেও তো কিছু নিয়ম মানতে হয়, নাকি?? সুবীর সেটাও বুঝে না। অথচ এবারের লেখাতেই সুবীর স্বীকার করে নিয়েছেন যে সুজাতার সেসময়ের ক্ষমতার অপ-ব্যবহারের ও অবৈধ হস্তক্ষেপের ক্ষমতাটাই ছিল আমেরিকারর ক্ষমতাই। সুবীর সেসব কথা স্বীকার করছে এভাবে আর লিখেছে,    its (India’s) strategic alliance with the US to take on China – মানে  চীন ঠেকানোর বরকন্দাজি সুত্রে আমেরিকার সাথে ভারতের যে স্ট্রাটেজিক এলায়্যেন্স ছিল সেটাই সেসময়ের ভারতের সুজাতার ক্ষমতার উৎস। মানে এটা ব্যক্তি প্রণব মুখার্জির কোন ক্যারিসমা বলতে কিছু ছিল না। কিন্তু তবুও সুবীর এই লেখায় দাবি করেছে [India now also lacks someone like Pranab Mukherjee……… ] – আজ প্রণব বেঁচে থাকলে ভারত আমেরিকাকে দেখায় দিতে পারত, হাসিনার বিরুদ্ধে অ্যামেরিকান চাপ থেকে হাসিনাকে উদ্ধার করে দিতে পারত!
    সুবীর এরপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেন নাই। প্রণব মুখার্জির ক্ষমতা সম্পর্কে আরো লিখে দাবি করে বসেছেন যে ….. [প্রণব].who battled it out with the US to ask the military-backed caretaker to stand down.  মানে প্রণব এতই ক্ষমতাবান যে তিনি খোদ আমেরিকার সাথে লড়ে বাংলাদেশের  সেনাবাহিনীকে সরে দাঁড়িয়ে হাসিনাকে ক্ষমতা দিবার ব্যবস্থা করে দিতে আমেরিকাকে বাধ্য করতে পেরেছিলেন।  আর এটাই এখন মোদি সরকার হাসিনার জন্য কিছু করতে পারছেন না; কারণ প্রণব মুখার্জি এই একটাই রত্ন ছিল ভারতের, তিনি তো মরে গেছেন!!

    তার মানে দাড়ালো যে প্রণব মরার পর ভারত আর হাসিনার সরকারের জন্য কিছুই করতে পারবে না। তাহলে তো ভারতের সবকথা এখানেই শেষ হয়ে যাবার কথা, নাকি?
    না, সুবীর মিথ্যা বলতেছেন।  তাই এসব বলার পরেই তিনি এবার ভারতের এখনকার মনের শঙ্কা হাজির করছেন। সেই আশঙ্কা নিচে ছবি আকারে দিয়েছি।  কথাগুলো সুবীরের লেখা থেকে নেয়া। যা বাংলা করলে হয় যে, কী হবে যদি খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে এতদিন যাকিছু হাসিনা সরকারকে দিয়ে চুক্তি করে ভারত পেয়ে নিয়েছে তার সবকিছু পুণর্মুল্যায়ন করে খালেদা যদি ওসব চুক্তি বাতিল করে দেন – এই হুমকির কী হবে???

    কিন্তু এই আশঙ্কা কেন? হাসিনা সরকার আর ভারতের মধ্যে কী কোন আন্ডারহ্যান্ড অসম বা আনফেয়ার ডিল করা হয়েছে? সুবীর সেতাই কী পরোক্ষে স্বীকার করে নিচ্ছেন না!  এই বাক্যটা লিখে সুবীর ভৌমিক সেই আশঙ্কা তার বাংলাদেশি পাঠকের মনে নিজেই স্বগোক্তিতে প্রবেশ করিয়ে দিলেন!  যখন বাংলাদেশের বিগ মেজরিটি মানুষ বিশেষ করে তরুণদের মনে “ভারত অগ্রহণযোগ্যতা” এখন সর্বোচ্চ!  বাংলাদেশে “ভারত অগ্রহণযোগ্যতা” ও নেতি লুটেরা ধারণা এর আগে কখনও এমন তুঙ্গে উঠে নাই! এই বাস্তবতায় এটাই কী তাহলে প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ ডিলিং এর নতিজা নয় কী?  – প্রণবের এসব শঠতা এটা কী আসলেই ভারতের জন্য খুবই ভাল কিছু হয়েছে? ইতোমধ্যেই যা কিছু প্রকাশিত হয়ে গেছে তা আসলেই ভারতের বিপক্ষে চলে যায় নাই, যাবার কারণ নয়? মানে আমরা যেটাকে – লাভের গুড় পিপড়াতে খেয়ে গেছে অবস্থার কথা বলি ! এটা কী তাই নয়?   সুবীর ভৌমিক সহ ভারতের নীতি নির্ধারকদের জন্য ব্যাপারটা তাদের জন্য রিভিউয়ের খোরাক হতে পারে- যদি সতভাবে চিন্তা করতে পারে তবে এই ভিউ পয়েন্ট তাদেরকে আগ্রহি করতেও পারে!

    কিন্তু এর পরেও ইতোমধ্যে আরো কিছু খারাপ ডেভেলবমেন্ট তৈরি হয়ে গেছে। আগামিতে কী হতে পারে তা নিয়ে সুবীর এক সার্ভে রিপোর্টের বরাতে অনেক কিছুই বলেছেন। আর এর সাথে  সুবীর ভৌমিকের মুখ দিয়ে আরও কিছু ভারতের নয়া খায়েস-ফরমায়েস হাজির হয়ে গেছে। সুবীর  হাসিনা সরকারের কাজে নয়া আরও চাহিদা হাজির করতে দ্বিধা করেন নাই। একাজে সুবীরের  নয়া উপশিরোনাম হল, হাসিনাকে যা করতে হবে [What Hasina needs to do]। মানে হল, ভারত যা করল তাতে হাসিনা এখন শেষ হয়ে যাচ্ছেন; অথচ সেদিকে সুবীরের কোন দৃষ্টি নাই। বরং ভারত এখনও আছে কেবল নিজ সংকীর্ণস্বার্থ নিয়ে। তাই বলতে চেয়েছেন,  নিজ স্বার্থ ভুলে হাসিনা সরকারকে এখনও এরপরেও যা করতে হবে তার  এক তালিকা দিয়েছেন সুবীর।

    এটা বেশ ইন্টারেস্টিং যে সুবিরের বরাতে আমরা জানছি যে ভারতের অবস্থান হল, বটম লাইনটা হল, “হাসিনাকে চীনের সংস্পর্শ ত্যাগ করতে হবে। কিন্তু এর সাথে যেটা বলা নাই তা হল, কেন হাসিনাকে তা করতে হবে? হাসিনার স্বার্থ বা লাভ কী এতে? এর কোন হদিস রাখেন নাই। যেন এটা ভারতের একক স্বার্থের নির্দেশ!!! ভারতের প্রেজেন্টেশন এমন সবসময় সবকিছুতে ভীষণ স্বার্থপর ও সংকীর্ণ – যেখানে সেটা হল ও মডেলটা হল কলোনিদখলদারের মডেল। যেটাপ্রথম কপি ও চালু করেছিলেন জওয়াহরলাল নেহেরু, আর তা এখনও চর্চায় ভারতের প্রধান ধারা। ব্যাপারটা সত্যিই দুঃখজনক এবং করুণার… কেন?

    কারণ, সুবীর এক আজিব ও অবিশ্বাস্য কথা বলেছেন, যেন ভুতের মুখে রামনামঃ

    Delhi wants to see the Awami League return to power but through a fair election
    that can shut up the Western nitpickers and prevent Bangladesh’s slide
    into a one-party rule that will augment Chinese influence.

    সোজা ভাষায় বলছেন,  ভারত দেখতে চায় হাসিনা আবার ক্ষমতায় ফিরুক কিন্তু একটা ফেয়ার নির্বাচনের মাধ্যমে। যদিও এই ফেয়ার নির্বাচনের মানে কী  সেটা সুবীর পরিস্কেকার করেন নাই। আবার গত কোন নির্বাচন ফেয়ার হয়েছে কিনা সেটা নিয়ে ভারত কখনও কিছুই বলতে চায় নাই, পাশ কাটিয়ে গেছে, তাই এনিয়ে ভারতের কোন উদ্বেগ ছিল না। একমাত্র উদ্বেগ ছিল নিজ স্বার্থ হাসিল, তা যেভাবেই হোক। তাহলে আজ  ফেয়ার নির্বাচনের কথা কেন?  আগে (সুজাতা সিংয়ের কেসের আমলে) ফেয়ার নির্বাচন না করার ফর্মুলা দিয়ে যাওয়া –  মানে সেটা কী তাহলে ভুল হয়েছিল? বলে এখন স্বীকার করছে? যদি তাই হয় তো  ভারত কী এর দায় নিবে?
    ঐ সার্ভে রেজাল্টের বরাতে সুবীর অনেক চেষ্টা করেও হাসিনার দলকে জিতবে বা সে সুযোগ আসবে তা দেখাতে পারে নাই। শুরু করেছিলেন যে হাসিনার লীগ দল 32 to 47 seats পাবে বলে।  পরে নানান শর্তে সেটা  83–117 seats হতে পারে বলেছেন। আর সবশেষে ১৪০ আসনের উপরে আর তুলতে পারেন নাই।  
    কিন্তু তবু, যে ফর্মুলা দিয়েছে এর সোজা মানে, আ লীগের ভিতরে যুদ্ধ শুরু করতে হবে। অপর গ্রুপকে চীনাপন্থি নামে লেভেল লাগিয়ে তাদেরকে দলছাড়া করতে হবে। এমনকি বেচারা মোমেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে ভারতকে স্বামী মেনেও নিজে আজ চীনাপন্থি তকমা পেয়েছেন। ভারত তার উতখাত চায়। এমন মন্ত্রণালয়ের নামও দিয়ে দিয়েছেন সুবীর এরা হল -” home, finance, foreign, information, industry, commerce, and water resources” ইত্যাদি।
    এই ব্যাপারটা বা ভারতের কামনার পার্জিং [purging]; বাংলায় বললে তা দলে বিভক্তি আনতে সুপারিশ করা। অর্থাৎ ভারত এখন লীগকেই চীনাপন্থি নামে লেভেল  আরেক ভাগ করতে চায়। মানে ভারতীয় হস্তক্ষেপ কত গভীরে চলে গেছে এর চিহ্ন।  সম্ভবত এর আরো বড় চিহ্ন হল, কালবেলা পত্রিকায় আরেক প্রপাগান্ডা লেখা; যার শিরোনাম আরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসছে, প্রস্তুত সরকার এই মিথ্যা জল্পনা-কল্পনা ওয়ালা রিপোর্ট ছাপা হয়েছে।  সেই রিপোটটা আওয়ামি লীগ দলে বিভক্তি আনার আরও বিস্তারিত ভারতীয় উদ্যোগ বলে মনে করছেন অনেকে।  কারণ, আমেরিকার আরও স্যাংশন দেওয়ার আর কোন কারণই নাই। কারণ সেক্ষেত্রে স্যাংশন খেয়ে হলেও হাসিনা সরকারের জন্য তো ভালই। আর সেটা এই অর্থে যে এটা হাসিনা সরকার থেকে যেতে পারে, সে সম্ভাবনা বাড়াবে!

    এখন ফিরে আবার সুবীর ভৌমিকের লেখার শিরোনাম টা মনে করা যাক  – নির্বাচনের আগে হাসিনা যেমন উত্তাপ টের পাচ্ছে দিল্লিও এক কোনায় পড়ে নিজেও তা টের পাচ্ছে।
    হাসিনা সরকার একা নয়, বাংলাদেশ ইস্যুতে সাথে ভারতও চরম বিপদে পড়েছে।  সুবীর সেই দুর্দশার একাউন্টগুলো আমাদের সামনে খুলে ফেলেছেন!

    +++++
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক