Tag: GOUTAM DAS

  • ভারতের ব্যর্থ নেপাল-নীতির পরিণতি কী নির্দেশ করে

    ভারতের ব্যর্থ নেপাল-নীতির পরিণতি কী নির্দেশ করে
    গৌতম দাস
    ১০ নভেম্বর, ২০১৫

    http://wp.me/p1sCvy-cG

    নেপালে গত সাত বছরের মধ্যে দুই বারের কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি বা সংবিধান সভার নির্বাচন ও সভা পরিচালনা শেষে গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ নতুন কনষ্টিটিউশন গৃহীত ও প্রণয়নের কাজ সমাপ্তির ঘোষণা দিতে সক্ষম হয়। এর মধ্য দিয়ে নেপাল এক রিপাবলিক জনরাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু ভারত প্রকাশ্যেই এর বিরুদ্ধে নিজের আপত্তি অসন্তুষ্টি জানায়। কোন রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশন প্রণয়ন সমাপ্তি ও গৃহীত হবার ঘোষণা বিষয়গুলো একান্তই সে রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ নিজস্ব ব্যাপার। এটা ভিন রাষ্ট্রের আপত্তির বিষয়ই নয়।  ফলে এনিয়ে ভিন রাষ্ট্রের আপত্তির এক উদাহরণ দেখলাম আমরা।

    “নিজে গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে ভারত নিঃসন্দেহে সীমা ছাড়িয়ে পা ফেলেছে, শুধু তাই নয় পড়শি ছোট দেশের উপর নিজের খায়েস চাপানোর চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ভারত বারবার যে কোন রাষ্ট্রের আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে আওয়াজ তুলে গেছে। দুর্ভাগ্যবশত এই নীতি ভারত নেপালের বেলায় প্রয়োগে ইচ্ছুক নয়” – ডিপ্লোম্যাট ৭ অক্টোবর ২০১৫।  ডিপ্লোম্যাট এশিয়া প্যাসিফিক জোনে ফোকাস করে  জাপান থেকে প্রকাশিত ওয়েব ম্যাগাজিন। এশিয়ায় আমেরিকা-জাপান মিলিত উদ্যোগে কমন ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থে পরিচালিত এক থিঙ্কট্যাংকের মন্তব্য, বিশ্লেষণ প্রকাশ করে থাকে। এতে ভারতকেও সামিল করে নেয়া হয়। নিজেদের স্বার্থের দিক থেকে মূলত চীনের বিকাশ, উত্থানকে ষ্টাডি করা  এর মূল ফোকাস। এর এডিটরিয়াল ষ্টাফদের বেশির ভাগই ভারতীয়।

    তো এই ডিপ্লোম্যাট পত্রিকার পক্ষেও ভারতের নেপাল নীতি ও পদক্ষেপকে কঠিন সমালোচনা না করে থাকা সম্ভব হয় নাই। নিরবে কিন্তু কঠিন শব্দের এই মন্তব্যে ভারতের মৌলিক নীতিগত বিচ্যুতি দিক ভুলে আঙুল তুলে এটাকে “ওভারষ্টেপিং” বলা হয়েছে। ডিপ্লোম্যাটের অবস্থান ও বিশ্লেষণ খুব ইন্টারেষ্টিং। ভারতের ইন্ডায়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা দাবি করেছে, নেপালের কনষ্টিটুশন সংবিধান সভায় অনুমোদিত হয়েছে এই ঘোষণা আসার পরও ভারত সাতটা অনুচ্ছেদে পুনরায় সংশোধন আনার জন্য অফিসিয়ালি এক তালিকা হস্তান্তর করে দাবি জানিয়েছে। ভারত এতই মরিয়াভাবে  হস্তক্ষেপ করেছে। ভারত এই রিপোর্ট অস্বীকার করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে থেকে অস্বীকার করলেও বিবৃতি দিলেও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস নিজের দাবি থেকে এক চুলও পিছু হটে নাই।

    নতুন নেপাল রাষ্ট্র বৈশিষ্ঠের দিক থেকে সাত প্রদেশে বিভক্ত এক ফেডারল কাঠামোর রাষ্ট্র। যদিও প্রদেশগুলোর সীমানা বিষয়ক বিতর্ক এখন জারি আছে, তা টানার কাজ এখনও চূড়ান্ত করা হয় নাই, হবে। কিন্তু এটা নিয়ে নেপাল-ভারত সীমান্তের মাধোসি (Madhesi) ও তরাই সমতলি অঞ্চলের বাসিন্দাদের অসন্তোষকে উস্কে দিয়ে যেন কনষ্টিটিউশন প্রনয়নের কাজ সমাপ্ত হয় নাই – এবং হয় নাই বলার ভিতর দিয়ে নেপালের রাষ্ট্রগঠন ও ক্ষমতা তৈরিতে ভারতের এক ভাগীদার বা স্টেক আছে তাই সে প্রমাণ রাখতে চেয়েছে। নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের (মিলিত আসন সংখ্যা ৮৪%) এদের অভিযোগ ভারত মাধোসি ও তরাইদের মধ্যে অসন্তোষ ও উস্কানি ছড়াচ্ছে। পরিশেষে ভারত নেপালের বিরুদ্ধে অঘোষিত ভাবে বাস্তবে কার্যকর এক অবরোধ আরোপ করেছে। ল্যান্ড-লকড নেপাল, পণ্য চলাচলের দিক থেকে যা সম্পুর্ণত ভারতের উপর নির্ভরশীল, বিশেষত তেল-গ্যাস জ্বালানীর সরবরাহের দিক থেকে ১০০ ভাগ নির্ভরশীল নেপালের উপর এই অবরোধ আরোপ করে ভারতের নেপাল উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ কত গভীর তা জাহির করতে গিয়েছিল। একথা ঠিক যে অবরোধের প্রথম ৪২ দিন ধরে নেপালের প্রতিটা নাগরিক তা হারে হারে নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছিল যে ভারতের কত শক্তি । তবে ভারতের এই শক্তির ব্যবহার নেপালীদের কাছে অত্যাচারীর নির্যাতনকারির হিসাবেই হাজির হয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ার এতে ভারতের প্রাপ্তি পুরা জনগোষ্ঠির বদ-দোয়া। নেপালের জনগণ আশা করে না যে ভারত তাদের বসিয়ে খাওয়াবে। আবার এটাও আশা করে না যে ভারত তাদের স্বাভাবিক জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে।

    প্রকৃতির নিয়ম কোন জায়গা খালি থাকে না। ফলে ভারত নেপালকে জ্বালানি সরবরাহ না দিয়ে মারবে এই সিদ্ধান্ত খোদ ভারতের জন্যই বিশাল বিপদ হয়ে হাজির হতে বেশি সময় লাগে নাই। জ্বালানি সরবরাহ-হীন পরিস্থিতি নেপালকে মরিয়া হয়ে বিকল্পের সন্ধানে নামতে বাধ্য করেছিল। গত সপ্তাহ ০২ নভেম্বর থেকে ভারতের মিডিয়ার মনে পড়েছিল যে ট্রাডিশনালি ভারত নেপালের একমাত্র জ্বালানীদাতা, যা এখন আর নয়। সে জায়গা পুরণে এখন চীন হাজির হয়ে গেছে। ভারতের মিডিয়া শিরোণাম এখন এই হারানোর ব্যাথা প্রকাশ করা শুরু করে দিয়েছে। ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া শিরোনাম করে লিখেছিল, “চীন নেপালে তেল সরবরাহ পাঠানো শুরু করে দিয়েছে, ভারতের একচেটিয়া সরবরাহকারির ভুমিকা হারাল”।

    নেপাল ভুখন্ড পুব-পশ্চিম দিক করে বিস্তৃত যার পুরা দক্ষিণ সীমান্ত জুড়ে আছে ভারত। আর ঠিক একইভাবে উত্তর সীমান্ত জুড়ে আছে চীন। নেপালের উত্তর দিক  দক্ষিণ দিকের চেয়ে আরও বেশি উচু পাহাড়ি, সমুদ্রের খবর দক্ষিণ দিকের চেয়ে উত্তর সীমান্ত দিকে আরও বেশি দূরে। এছাড়া ট্রাডিশনালি ভারতের সাথে ও দিক থেকে নেপালের বহিঃবাণিজ্যের আনা-নেওয়া চালু বেশি। এবারের ভারতের নেপাল অবরোধ বিপরীত ফল বয়ে আনতে শুরু করেছিল, ভারতের একচেটিয়ার অবসান ঘটাতে যাচ্ছে তা। নেপাল-চীনের সীমান্তে চলাচলের রাস্তা ও সড়ক কাস্টম দুয়ার চার স্থানে। এর মধ্যে সবচেয়ে চালু ও যোগাযোগ সুবিধাজনক “তাতোপানি” এবং “কেরুঙ” স্থল সীমান্ত। গত ভুমিকম্পে দুটা সীমান্তেই পাহাড়ের পাথর ধ্বস নেমে পুরা রাস্তা ব্লক হয়ে গিয়েছিল। জরুরি ভিত্তিতে তা পরিস্কার করে রাস্তা উন্মুক্ত করা হয়েছে এখন। জ্বালানী তেল সরবরাহের চুক্তি নিয়ে কথা চলছে, চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। দর আর বিস্তারিত বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। এর আগে শুভেচ্ছা স্বরূপ অনুদান হিসাবে ১০০০ টন জ্বালানীর চালান আসা শুরু হয়ে গেছে গত ১ নভেম্বর থেকে। নেপালের মোট চাহিদার কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ নেপাল চীন থেকে আমদানির স্থায়ী চুক্তি করতে চায়। এই অবস্থা দেখে ভারতের মিডিয়ার সুর নরম ও হতাশার। নেপালকে চাপ দিয়ে ধরার অস্ত্র ভোতা অকেজো হয়েছে দেখে এখন উলটা তা ভারতের উপর চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করেছে বলে। ভারতের ভুল নেপাল নীতি এখন সকলের কাছে পরিস্কার হতে শুরু করেছে। ফলে নেপালকে চীনের দিকে নিজেরাই ঠেলে দিয়েছে বলে ভারতীয় মিডিয়ায় এখন আত্মসমালোচনা শুরু হয়ে গেছে। এই অবস্থায় প্রতিযোগিতা অনুভব করে, দোষ কিছু কাটাতে ভারত কিছু কিছু সীমান্ত অবরোধ শিথিল করে তেল ট্যাঙ্কার নেপাল প্রবেশ করতে দেয়া শুরু হয়েছে।
    সার করে বললে, ভারতের চাপের কৌশল ভাঙতে, অকেজো করতে নেপাল সরকার সফল হয়েছে। স্বভাবতই এখন ক্রমশ তা বাকি পণ্যে অবরোধ দুর্বল হতে থাকবে।
    এই প্রেক্ষিতে ভারতের নেপাল নীতিতে যে সুরে পরিচালিত এর প্রাপ্তি কী তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে । ফলাফল ও ভবিষ্যত নিয়েও মুল্যায়ন শুরু হয়েছে।

    ভারতের দিক থেকে ভারত-নেপালের সম্পর্ককে শুরু থেকেই এপর্যন্ত কলোনি অধস্তন সম্পর্ক হিসাবে দেখা হয়েছিল। ভারত সেখানে দাতা বড় ভাই। শুরু থেকে মানে ১৯৫০ সালের ৩১ জুলাই মাসে স্বাক্ষরিত ভারত-নেপাল শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের সময় থেকে। ভারতের বিরুদ্ধে এমন এক অভিযোগ করে কথা শুরু করতে হল কারণ এই চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল পুরানা আগের চুক্তির ধারাবাহিকতায়। আগের কলোনি মাস্টার বৃটিশ-ইন্ডিয়া ও নেপাল সরকারের মধ্যকার চুক্তির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার প্রয়োজনে। কলোনী মাস্টারের সাথে নেপালের রাজার সর্বশেষ চুক্তিটা স্বাক্ষর হয়েছিল ১৯২৩ সালে, যেখানে ঐ চুক্তির কার্যকারিতা সমাপ্তির তারিখ উল্লেখ করা ছিল ৩১ জুলাই ১৯৫০। সেকারণেই স্বাধীন ভারতের নেহেরু ও নেপালের রানা রাজবংশে রাজার মধ্যে ঐ ৩১ জুলাই ১৯৫০ তারিখেই নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে ভারতের সাথে নেপালকে চুক্তি করতে হবেই কেন? বাধ্যবাধকতাটা কোথায়? আর এটা আসলে কীসের বা কী বিষয়ক চুক্তি? সংক্ষেপে এর জবাব হল, পুরান কাল থেকেই নেপাল এক ল্যান্ড-লক ভুখন্ড; অর্থাৎ এভুখন্ড সমুদ্র যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, নেপালকে অন্য রাষ্ট্রের ভুমি মাড়িয়ে তবে সমুদ্রের নাগাল পেতে হয়। একমাত্র এভাবেই দুনিয়ার তৃতীয় যে কোন দেশের সাথে নেপালের বৈদেশিক বাণিজ্য বিনিময় সম্ভব হয়। ফলে বৃটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমল থেকেই ভারতের ভুমি ব্যবহার করে নেপালকে বৈদেশিক বাণিজ্য বিনিময় চালু রাখতে হয়েছে। আর তাই এই প্রয়োজনে সবসময়ই নেপালকে ভারতের সাথে ভুমি ব্যবহারের চুক্তির উপর নির্ভর করে, হাত জোর করে থাকতে হয়েছে। নির্ভর মানে আক্ষরিক অর্থেই বিষয়টা শুরু থেকেই সবসময় ভারতের ইচ্ছাধীন থেকেছে। প্রত্যেকবার চুক্তির ভারসাম্য ভারতের পক্ষে থেকেছে, এমন শর্ত লিখে চুক্তি করতে হয়েছে যেন নেপাল সমুদ্র বদরে প্রবেশ পেতে বিনিময়ে পুরা দেশ দাসখত হিসাবে লিখে দিয়েছে। বৃটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমলে প্রথম চুক্তি হয়েছিল ১৮১৬ সালে (Treaty of Sugauli 1816)। সে সময় এই চুক্তি করা হয়েছিল নেপালের এক তৃতীয়াংশ ভূমি বৃটিশ-ভারত কলোনী মাস্টারকে দিয়ে দেয়ার বিনিময়ে। বৃটিশ রাজ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে সদয় সন্তুষ্ট হয়েই তুলনামূলক ছাড় দেয়া এক নতুন চুক্তি করেছিল ১৯২৩ সালে। সে চুক্তির পঞ্চম দফাতেও লেখা ছিল নেপাল সরকার অস্ত্র-শস্ত্রসহ সবকিছুই আমদানী করতে পারবে (“British Government is satisfied that the intentions of the Nepal Government are friendly”) যতক্ষণ বৃটিশ সরকার সন্দেহাতীতভাবে সন্তুষ্ট থাকবে। কিন্তু কী হলে বা বৃটিশ সরকার কীসে সন্তুষ্ট হবে এর কোন তালিকা বা তাল ঠিকানা দেয়া হয় নাই। অথবা সুনির্দিষ্ট করে কোন তালিকা করে কখনও বলা হয় নাই যে কী কী জিনিষ নেপাল আমদানী করতে পারবে। অর্থাৎ কিছুই স্পষ্ট করে উল্লেখ না করে পুরা ব্যাপারটা বৃটিশ সরকারের খেয়ালী ইচ্ছাধীন করে রাখা হয়েছিল।

    কেন এরকম করে রাখা হয়েছিল, রাখতে পারে কী না – এমন প্রশ্ন করার সুযোগ ঐকালে ছিল না। অন্য রাষ্ট্রকে দখল করে কলোনি দাস বানিয়ে রাখা অন্যায় – এমন কোন আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন বলতে কোন কিছু ১৯৪৪-৪৫ সালে জাতিসংঘ গঠিত হবার আগে দুনিয়াতে ছিল না। ফলে বরং কলোনি দখলের পক্ষে এক ধরণের জোর-যার এর সাফাই এর ইঙ্গিত তখন কাজ করত। কিন্তু জাতিসংঘ গঠিত হয়েছিল আটলান্টা চার্টার চুক্তির উপর ভর করে। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ও আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মধ্যে ১৯৪১ সালে ঐ চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। “দুনিয়ায়ে আর কলোনী শাসন চলবে না” – ঠিক এমন ভাষায় না লিখে তবে কলোনী শব্দটা এড়িয়ে আটলান্টা চুক্তির সার কথাটাই ছিল। লিখা হয়েছিল “প্রত্যেক জনগোষ্ঠী নিজের ইচ্ছাধীনের সরকার গঠন, কার অধীনে থাকবে তা নির্ধারণের সার্বভৌমত্ত্ব অধিকার থাকবে”– এই ভাষায়। অর্থাৎ যুদ্ধশেষে জাতিসংঘ গঠন হয়ে যাবার পরে যে কলোনি দখল ও শাসন বেআইনি ও নিন্দনীয় হয়ে যাবে সেটা বুঝা যাচ্ছিল। হয়েছিলও তাই।
    কিন্তু তা সত্ত্বেও নেহেরুর ভারত ১৯৫০ সালে আগের কলোনী বৃটিশের অধীনস্ততা চুক্তিটাকেই রাস্তা দেখিয়ে দেয়া মডেল মনে করে, ধরে নিয়ে নেপাল-ভারতের মধ্যে নতুন আর এক দাসখত চুক্তি করেছিল।
    দাসখত বলছি এজন্য যে ১৯২৩ সালের চুক্তিতে  তাল ঠিকানাহীন বৃটিশ সরকারের “সন্তুষ্টির” উপর দাড় করানো হয়েছিল। আর ১৯৫০ সালের চুক্তিতে দশ দফা শর্তের পঞ্চম দফায় সন্তুষ্টি কথাটা সরিয়ে আরও অস্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কী শর্তে নেপাল অস্ত্র-শস্ত্র আনতে পারবে তার প্রক্রিয়া কী হবে তা চুক্তির বাইরে কেস টু কেস ভিত্তিতে পরবর্তিতে দু সরকার বসে ঠিক করবে। এছাড়া ষষ্ঠ দফায় নেপালে ভারতীয় ব্যবসায়ীদেরকে নেপালী নাগরিকের মতই সমান সুযোগ সুবিধা দেয়ার শর্ত আরোপ করা হয়। আর সপ্তম দফায় ভারতে নেপালীরা বসবাস, সম্পত্তির মালিক হওয়া, ব্যবসা করা, চলাচল ইত্যাদির সুবিধা পাবে বলে এর “রেসিপ্রোকাল” বা পালটা নেপালে ভারতীয়দেরও একই সুবিধা দেয়ার শর্ত রাখা হয়। েটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সুবিধা দেয়া আর তা নিতে পারা বা কাজে লাগানোর মধ্যে বিরাট ফারাক আছে। মূলত নেপালের অর্থনীতির ক্ষমতা ও সাইজ ভারতের তুলনায় নস্যি বলে শেষের ষষ্ঠ ও সপ্তম দফার মাধ্যমে রেসিপ্রোকাল সুবিধার কথা বললেও এর সুবিধা নিবার যোগ্যতার দিক থেকে ভারতীয়রাই এগিয়ে থাকবে, ভারতের ব্যবসায়ীরাই তা নিবার যোগ্য হবে। নেপালীরা পারবে না। ফলে কার্যত এটা বিরাট অসাম্য।  ফলে এই ছলে কৌশলে চুক্তিটাকে ভারতের পক্ষে কান্নি মারা ভাবে হাজির করা হয়েছে। এই কারণে ১৯৫০ সালে স্বাধীন ভারতে নেহেরুর করা চুক্তিটাকেও নতুন ধরনের এক কলোনি চুক্তি বলা যায়।
    নেপালের দিক থেকে আইডিয়াল চুক্তি হতে পারে, নেপালকে সবকিছুই বাধাহীন আমদানি করতে দিবার বিনিময়ে ভারত বিনিময়ে ঠিক কি চায়, কী শর্তপূরণে তা দিতে চায় এর মধ্যে কোন অস্পষ্টতা না রাখা, ভারতের খেয়ালের উপর ছেড়ে না দেওয়া, সন্তুষ্টি-জাতীয় আবছা নন-কমিটনেন্টের শব্দ এড়ানো সঠিক উপায় হতে পারে। এছাড়া ভারতের দেয়া বিনিময় শর্তের ইকোনমিক মূল্য কত তা যাচাই করা এবং শর্তের পক্ষে ভারতের ন্যায্যতা কী তা শুনতে চাইতে হবে। যেমন ভারতে ব্যবসা করার সুযোগ নেপালীদের দরকার নাই। নেপালের দরকার সমুদ্রে প্রবেশের অধিকার। অথচ এটাকে কি যুক্তি র‍্যাশনালিতে ষষ্ঠ ও সপ্তম দফা হাজির করা হয়েছে তা অস্পষ্ট।
    ভারতের দিক থেকে বললে প্রথমত, বৃটিশ উপনিবেশিক বাস্তবতায় সেকালে নেপালের সঙ্গে চুক্তিতে কলোনী দাসখতের বিষয়াদি থাকবে হয়ত এটা স্বাভাবিক।  কিন্তু সে চুক্তি ভারতের সাথে সম্পন্ন হবার কালে তখন বাস্তবতা ভিন্ন। কলোনি শাসন ইতোমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে ভারতের পুরান বৃটিশ চুক্তিটাকে অনুসরণ করার কোন কারণ নাই। এটা ভালোমানুষি প্রশ্ন নয়। রাষ্ট্রস্বার্থ ভালমানুষির কাজ বা বিষয় নয়। বিষয়টা হল, পুরাণ বৃটিশ-নেপাল চুক্তিটাকে অনুসরণ করা মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে দুনিয়াটা নতুন কী আকার নিল – এর সম্মক উপলব্দি করতে কোন বোধবুদ্ধি না থাকার প্রমাণ। দুনিয়ার এই পরিবর্তনের এর বৈশিষ্ঠসূচক দিক গুলো আঙ্গুলে গুণে নোট নিতে অক্ষমতার প্রমাণ রাখা। যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে দুনিয়াটা দেখতে কেমন হবে – ইমাজিন করে কল্পনায় একে দেখতে রুজভেল্ট চেয়েছিলেন যে, আগের কলোনি ধরণের দখল ও শাসনের কারণে বিশ্ববাণিজ্য বিনিময় খুবই সীমিত পর্যায়ে রয়ে গেলে। কলোনি সম্পর্কের উচ্ছেদ ঘটিয়ে রুজভেল্ট ব্যাপকতর বিশ্ববাণিজ্য বিনিময়, পণ্য ও পুঁজি চলাচলের এক নতুন দুনিয়া দেখতে চেয়েছিলেন। মূল এই বিষয়টা অর্থনের লক্ষ্য তিনি মেপে প্রতিটা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তবে শুরুর ইমাজিনেশন সবসময় ও সবটা পরবর্তিতে বাস্তবে হাজির হয় না। কিন্তু কলোনি সম্পর্ক উচ্ছেদের বিষয়টার ক্ষেত্রে তা হয়েছিল। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠানও অনেক সীমাবদ্ধতা, অকেজো, ঠুঠো হয়ে থাকা, কান্নি মেরে থাকা সত্ত্বেও অনেক আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, নর্মস হাজির করতে পেরেছে। শুধু তাই না ল্যান্ড লকড রাষ্ট্রগুলোর তৃতীয় রাষ্ট্র মাড়িয়ে সমুদ্রে প্রবেশ বিষয়টাকে কতগুলো বিশেষ আগাম শর্তে রাষ্ট্রগুলোর অধিকার হিসাবে আন্তর্জাতিক কনভেনশন ডেকে স্বীকৃতি দিবার পক্ষে এখন কাজ চলছে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের সদস্য এমন ৩১টা ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্র এই উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের আঙ্কটার্ডের অধীনে সমবেত হয়েছে। ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষার্থে তাদেরকে যেন পড়শী রাষ্ট্রের কলোনি-খায়েশের খোরাক না হতে হয় এর জন্য আইন কনভেনশন আনা – এটার এর মূল উদ্দেশ্য। এসব থেকে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রস্বার্থ বিষয়ক আন্তর্জাতিক চিন্তা প্রকৃতির সাধারণ অভিমুখকে চিনিয়ে নেয়া সম্ভব। এবং বলা যায়, দুনিয়া অন্তত আর কলোনি দখল ও শাসনকে আইনি ন্যায্যতা দিবে না। এমনকি ল্যান্ড-লকড বলে পড়শীর কলোনি-খায়েশের শিকার না হতে হয়, সমুদ্র পর্যন্ত প্রবেশ যেন তারও অধিকার হিসাবে দেখা হয় সে চেষ্টা এখন চলছে।
    কাজেই নেহেরু পুরান কলোনিচুক্তি সুত্রে নেপালের উপর আবার কলোনি চুক্তি চাপিয়ে দিবার সুযোগ পাওয়া গেছিল বলেই তা নিতে হবে, নিয়েছেন সেটা কোন দুরদৃষ্টিসম্পন্ন কাজের কথা নয়। এছাড়া, কলোনি সম্পর্কের বিরোধীতা প্রত্যেক জনগোষ্ঠির কাছে একটা নীতিগত ইস্যু। নিশ্চয় ভারতের বেলায় বৃটিশদের কলোনি খায়েশ খারাপ আর নেপালের বেলায় ভারতের কলোনি খায়েশ ভাল – এটা কোন নীতিগত অবস্থান হতে পারে না। তবে আবার একথাও ঠিক যে কোন রাষ্ট্রেরই পড়শী রাষ্ট্রের ভিতর নিজের স্বার্থ দেখতে পাওয়া দোষের নয়। কিন্তু তা পাবার চেষ্টা করতে হবে আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশন এসবের সীমা বজায় রেখে। আর সবচেয়ে ভাল হবে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের ততপরতায় বল প্রয়োগে পাবার পথে না হেঁটে এর বিপরীতে সদিচ্ছায় পড়শি নাগরিকের মন জয় ক্তে হবে দেয়া-নেয়ার বিনিময় ও বাণিজ্যের মাধ্যমে।

    বিগত ষাট বছরে ভারতের কূটনীতি চেয়েছে পরিচালিত হয়েছে নেপালে একটা বশংবদ দল ও নেতা তৈরি করে পুরান বৃটিশ কলোনি পথে নেপালকে নিজের অধীনে রেখে নিজের স্বার্থ আদায় করা। আজ নেপালে দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক দল্গুলো ভারতের হাত থেকে এক এক করে সবাই হাতছুটে চলে গেছে। সব হারিয়ে নেপালের একমাত্র মাধোশি-তরাই জনগোষ্ঠিই ভারতের ভরসা। ভারতের নীতির ভুলে অবস্থা এমন যায়গায় পৌচেছে যে নেপালী কংগ্রেসের পক্ষেও আজ নেপালে বসে ভারতের পক্ষে থাকা কথা বলার সুযোগ ভারতই রাখেনি। কারণ পুরা নেপাল আজ ভারত-বিরোধী হয়ে গেছে। অথচ বিগত ষাট বছরে রাজা ও নেপালী কংগ্রেসের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ভারত খেদমত পেয়েছে। রাজনীতি ও রাষ্ট্রস্বার্থ বিষয়ে আইন কনভেনশনের রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ক গ্লোবাল ট্রেন্ড বুঝবার ক্ষেত্রে ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা যে নাদানিতে আছে এব্যাপারে নেপাল একটা ভাল উদাহরণ। রাষ্ট্র হিসাবে এদের কাছে এমন মডেল হল বৃটিশ কলোনি এমপায়ার। অথচ একালটা  আর এমপায়ার হওয়ার না। না হয়েও বহু কিছু ভোগ অর্জন করা সম্ভব। বল থাকলেই বড়ভাই সেজে, ক্ষমতা দেখিয়ে তা ব্যবহার করতে হবে এই পথে সব কিছু আদায় করতে হবে – এটা খুবই আনকুথ একটা কাজ। এভাবেই আদায় করতে হবে এটা খুব কাজের কথা নয়।
    ইতিহাস স্বাক্ষী নেপালের বিরাট তাতপর্যপুর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ ও একটা রিপাবলিক রাষ্ট্রের পক্ষে নেপালের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সমবেত করে দেবার ক্ষেত্রে ভারতের ইতিবাচক ভুমিকা নির্ধারক ও অনুঘটকের এবং এক ইন্টারলকেটর হোস্ট এর। এমনকি আমেরিকার পক্ষেও ইতিবাচক ভুমিকা রাখা সম্ভব ও সহজ হত না ভারতের এমন ভুমিকা না নিলে। তাহলে এটা আজ জ্বলজ্বল করা প্রশ্ন সেই ভারতকে আজ নেপালের মূলধারার তিনসহ সব রাজনৈতিক দল বাদ একমাত্র ভরসা নাম ও যোগ্যতাহীন মাধোসী কেন? মাধোসি যারা নিজেদেরই এখনও কোন পরিপক্ক রাজনৈতিক শক্তি নয়, নেপালের রাজনৈতিক ক্ষমতা গঠনে গোনায় ধরে এমন স্টেকহোল্ডার মাধোসিরা কেউ নয়, হয়ে উঠতে পারে নাই। তাহলে কী বুঝে ২০০৫ সালে ভারত নিজের কোন স্বার্থের কথা ভেবে নেপালের রাজনীতিতে ভুমিকা রাখতে গিয়েছিল? অথচ প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের ভারতের বড় প্রভাব রাখার সুযোগ কী সে সময়টাতেই ছিল না! নেপালে ভারতের যা জেনুইন স্বার্থ তা খোলাখুলি সৎ ভাবে এই দলগুলোর সাথে আলাপ করতে পারত। না কোন চুক্তির পুর্বশর্ত হাজির করার জন্য নয়। সে হিসাবে না। উদ্দেশ্য হত ভারতের জেনুইন স্বার্থ প্রসঙ্গে নেপালি রাজনীতিবিদদেরকে স্পষ্ট ধারণা দিয়ে রাখা। আগানোর এপ্রোচের ধরণ দেখে মনে হয় না ভারত এমনভাবে ভেবেছে। বরং আমরা দেখি ভারত সব সময় বশংবদ নেপালি রাজনৈতিক দল পালা-পুষে আগানোর পথে হেটেছে। চিন্তার এই ধারাটাই উপনিবেশিক ও পশ্চাতপদ। ফলে অযোগ্যতা। এই প্রশ্ন উঠছে তাহলে ভারত নেপালি কংগ্রেস আর দুই কমিউনিষ্ট পার্টিকে – প্রধান এই তিন দলকে কেন সাহায্য করেছিল, কী বুঝে করেছিল?
    এটাই কী ভারতের রাজনীতিক, আমলা-গোয়েন্দাদের যোগ্যতার সঙ্কটের ইঙ্গিত নয়! এটা অবিশ্বাস্য যে ভারত ২০০৫ সালে নেপালকে আজকের নেপাল হতে নির্ধারক ভুমিকা রেখেছিল সেই তারা আজ নেপালের ধুলায় গড়াগড়ি যাওয়া ভিলেন কেন হবে? চিন্তার অযোগ্যতার পরিণতি এমন করুণই হয়!

    [লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়া দিগন্ত ০৮ নভেম্বর ২০১৫ সংখ্যায়। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও সম্পাদনার পর ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

  • সিরিয়ায় পুতিনঃ প্রপাগান্ডার বোমাবাজি আর কোল্ড ওয়ার ফিরে আসার ভুয়া আশাবাদ

    সিরিয়ায় পুতিনঃ প্রপাগান্ডার বোমাবাজি
    আর কোল্ড ওয়ার ফিরে আসার ভুয়া আশাবাদ

    গৌতম দাস
    ১৮ অক্টোবর ২০১৫

    http://wp.me/p1sCvy-ci

    গত ৩০ সেপ্টেম্বর সিরিয়ায় রাশিয়ান বিমান হামলা শুরু হয়েছে। রাশিয়ার দাবি সে নাকি আইএস (অথবা ISIL) তাড়াতে একাজ করছে। আর এসুযোগে অনেকেই প্রপাগান্ডায় নেমেছে, কোন বাছবিচার বিবেচনা ছাড়াই রটনা শুরু করেছে যেন দুনিয়াতে রক্ষক বা ত্রাতা হিসাবে রাশিয়া এসে গেছে আর চিন্তা নাই। রাশিয়ানরাও এটাই চেয়েছে। তাদের প্রপাগান্ডা ওয়েব সাইট “গ্লোবাল রিসার্চ” এর প্রপাগান্ডা লাইনও এটাই।  কারণ তারা ভাল মতই জানে যে, দেশে দেশে পুরানা কমিউনিস্টরা “পুণ্যভুমি” সোভিয়েত রাষ্ট্রের স্বার্থে আত্মস্বার্থ ভোলা দিওয়ানা। কোরবানি হয়ে যেতে উদ্গ্রীব। তারা নিজ নিজ বসবাসের রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থ ভুলে দিওয়ানা হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন এই ভিন রাষ্ট্রের স্বার্থে কোরবানি হয়ে যাওয়াকে শহীদি কাজ মনে করে এসেছে নিজ নিজ জন্ম থেকেই। এখন সোভিয়েত ইউনিয়ন নাই তাই শহীদ হবার সুযোগ হারায়ে তারা কষ্ট পাইতেছে। তারা সবসময় “কথিত এক বিশ্ব বিপ্লবের জোশে” এক “বিশ্ববিপ্লবের” জন্য  কাজ খুঁজে ফিরে থাকে। সোভিয়েত রাষ্ট্র স্বার্থে নিজ আত্ম- বলিদানকে তারা সেই কথিত বিশ্ববিপ্লবের পক্ষে কাজ বলে ইমান রাখে। অতএব সোভিয়েত রাষ্ট্রের জন্য শহীদ হয়ে যাওয়া সেটা শুধু সঠিক নয় বরং পুণ্যের কাজ। ফলে নিজের কর্তব্য জ্ঞান করাই স্বাভাবিক। তাই পুতিন নিশ্চিত এবং সঠিকভাবেই নিশ্চিত যে একালেও তারা রাশিয়ান স্বার্থের ভিতরেই নিজ নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ নিহিত মনে করার ভুল করবে।

    তাই হতে দেখছি আমরা। সেই পুরান সোভিয়েত ইউনিয়ন আবার এসে গেছে জাগছে এই প্রপাগান্ডা উসকিয়ে বাংলাদেশেও তাদের দামামা বাজাতে দেখছি আমরা। এটা ঠিক যে ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পর এই প্রথম রাশিয়া পুরান সোভিয়েত এলাকার বাইরে সৈন্য, অস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ সমাবেশ ঘটিয়েছে। এই হিসাবে সিরিয়ায় নতুন রাশিয়ার প্রথম অভিযান। এর অর্থ তাতপর্য আছে। কিন্তু একে কোনভাবেই পুরান কোল্ড ওয়ারের মত রাশিয়ার দিন আবার ফিরে আসতেছে বলে বুঝা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা ভিত্তিহীন এবং অর্থহীন। এটা রাশিয়াও ভালভাবে জানে। সাথে রাশিয়া এটাও জানে বাস্তবে লুপ্ত হয়ে যাওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের দিওয়ানা দেশে দেশের দ্বিবাস্বপ্ন দেখা পুরান কমিউনিস্টরা এখনও আছে। তাদের পড়ে পাওয়া সমর্থন পুতিন নিজের স্বার্থে ও কাজে না লাগানোর কোন কারণ দেখেন নাই।

    তবে একটা কথা হল, আমাদের দেশে একটা কথা প্রচলিত আছে খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। অর্থাৎ প্রপাগান্ডা যখন ঘটনার চেয়ে বড় ঘটনা হয়ে হাজির করার চেষ্টা করা হয়। যেকোন ঘটনার মধ্যে প্রপাগান্ডা একটা প্রয়োজনীয় অনুসঙ্গ দিক । কিন্তু খেয়াল রাখতে হয় মাত্রাজ্ঞান যেন থাকে, লোপ পেয়ে না যায়। প্রপাগান্ডা যেন ঘটনার চেয়ে বেশি গুরুতপুর্ণ না হয়ে উঠে। অথচ সেটাই হয়েছে দেখা যাচ্ছে।
    রাশিয়ার দিক থেকে মূলত জিনিষটা হল – সিরিয়ার আসাদের শাসনের পক্ষে রাশিয়ান ক্যাম্পেইন। ক্যাম্পেইন শব্দটা সাধারণত দুই অর্থে ব্যবহার হয়। প্রচার প্রপাগান্ডা অর্থে আবার অভিযান – সামরিক অভিযান বোমাবাজি অর্থে। এখানে দুটো অর্থই প্রযোজ্য। রাশিয়া বলতে চাইছে সিরিয়ার আসাদ – সে এত খারাপ কেউ না, তাকে রেখেও সিরিয়ায় একটা সমাধান ভাবা যেতে পারে – এরকম। কিন্তু এমন কথাগুলোর ক্যাম্পেইনে কেউই সরাসরি এই মুল উদ্দেশ্যের কথাগুলো স্বীকার করে তা করবে না, করে না। বরং একটা পপুলার দিক খুজবে, যেভাবে সবাই খুজে ও করে সেটা হল – রাশিয়া আইএসের (“দ্যা মোস্ট কালপ্রিট”, যেন “সব দোষের গোড়া”) বিরুদ্ধে রাশিয়ানরা এবার মাঠে নেমেছে। এমন ভাষ্য খাড়া করে কাজটা করবে। হয়েছেও তাই। “আমেরিকা যেখানে গিয়ে থেমে গেছে” সেখান থেকে রাশিয়ান ততপরতা শুরু। ফলে আর চিন্তা নাই। প্রপাগান্ডায় একথাগুলো অহেতুক হয়ে গেছে, বাড়াবাড়ি রকমভাবে যা নয় তেমন জায়গায় চলে গিয়ে কথাটা বলা হচ্ছে। রাশিয়া এবং তার বন্ধুরা এখানেই কদুর চেয়ে কদুর বিচি বড় করে এঁকে ফেলেছেন।

    আকাশ থেকে বোমা মারা আর মাঠে নেমে যুদ্ধের ফারাক
    গত ২০০১ সাল থেকে দুনিয়াতে আল-কায়েদা ফেনোমেনা এসে আমাদের সবাইকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। এখনও শিখাচ্ছে। যেমন যুদ্ধ মানে কী, এছাড়া প্রতিরক্ষা? এসব ধারণাগুলো কী? স্টাডির বিষয় হিসাবে এগুলোর ধারণা আল-কায়েদা ফেনোমেনা আসার আগে আরামে একভাবে বিকশিত হয়েছিল। যেমন তখন বুঝা হয়েছিল, যুদ্ধ মানেই বুঝতে হবে কনভেনশনাল যুদ্ধ– অর্থাৎ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভিন রাষ্ট্রের যুদ্ধ; ফলে ‘সেনাবাহিনী’ ধারণাটাও একই তাল ছন্দ রেখে বেড়েছিল। ব্যারাকে রেখে, জনগণ থেকে আলাদা করে পেলে-পুষে বড় করার সেনাবাহিনী এমন অর্থ-পথ ধরেই ধারণায় আগিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই এমন পথে ধারণাগুলো পরিচালিত হয়েছিল। আর তা হবার পিছনে আর এক বড় কারণ হল সেই দুনিয়াতে ৪৫ বছর ধরে প্রধান ঘটনা ছিল কোল্ড ওয়ার। সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম আমেরিকার কোল্ড ওয়ার। এই কোল্ড ওয়ার ধারণার মধ্যে যুদ্ধ ধারণাটা যার ভিতর সেকালে পোক্ত ও পুষ্ট হচ্ছিল এই ভেবে যে, যুদ্ধ মানে কেবল দুটো পক্ষ, দুটা গ্রুপে রাষ্ট্রগুলোর পক্ষভুক্ত হয়ে যাওয়া – সোভিয়েত পক্ষ না হলে আমেরিকান পক্ষ। এর আর গুরুত্বপুর্ণ বৈশিষ্ট ছিল, সম্ভবত সবচেয়ে নির্ধারক কিন্তু সবচেয়ে দৃষ্টির বাইরে থেকে যাওয়া বৈশিষ্ট হল, কোল্ড ওয়ারের পক্ষভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর পরস্পরের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রায় নাই – এমন অবস্থা । অর্থাৎ লেনদেন, পণ্য বিনিময়, মুদ্রা ফলে ভাব সংস্কৃতিও প্রায় নাই অবস্থা। দুনিয়ায় যেন দুটা অর্থনীতির দুনিয়া হয়ে গেছিল। যেন সাদা আর কালো। আর ধরে নেয়া হয়েছিল যেন যুদ্ধ মানে সারা দুনিয়ায় মাত্র দুটা পক্ষই থাকবে – বেছে নিবার চয়েজ হয় এটা না হয় ওটা এদুই অপশনের মধ্যে। অতএব যুদ্ধবিষয়ে এধারণারই আরও অনেকদিকে এক্সটেনশন ঘটেছিল – যেমন সেই বুদ্ধিমান যে দূর থেকে শত্রু মারতে পারে। যুদ্ধে লোক-ক্ষয় করা যাবে না। ফিজিক্যাল মুখোমুখি লড়াই করা যাবে না এই তত্ত্ব বিকশিত হয়েছিল। যেন ভিয়েতনামের খারাপ অভিজ্ঞতা এরানো যায়। যাতে যুদ্ধে সৈন্যের লাশের কফিন দেখে আমেরিকান পাবলিক খেপার সাইকোলজি এড়ানো যায়। অতএব দূর থেকে মিসাইল রকেট মারো। আর তা থেকে বাচতে আবার এন্টি-মিসাইল শিল্ড এর ধারণা আনা হয়। জাল টাঙিয়ে ভিতরে বসার মত করে বসে আমেরিকা ও তার গুরুত্বপুর্ণ বন্ধুরাষ্ট্রের দেশের আকাশ এন্টি-মিসাইল প্রতিরক্ষা শিল্ড কায়েম করতে পারলেই আর কোন কথা নাই। যেন একেবারে মাছিও আসতে পারবে না আরামে ঘুমানো যাবে এমনই বেহুলা-লখিন্দরের আয়রণ-শিল্ড। ধরে নেয়া হয়েছিল বাইরে মানুষের জীবন আমেরিকা যতই অতিষ্ঠ করে সুক না কেন, নিজ ঘরে ফিরে মিসাইল শিল্ডের ভিতর আরামে বসে লুডু খেলা যাবে কারণ বাইরে থেকে হামলাকারি তাকে তো মিসাইল বা রকেট হয়েই শিল্ড ভেঙ্গে পেরিয়ে তবে ভিতরে আসতে হবে। অথচ চিন্তাই করা হয় নাই যে খোদ প্যাসেঞ্জার প্লেনই যাকে ঘুর্ণাক্ষরেও রকেট বা মিসাইল মনে করা হয় নাই,‌ গণ্য হয় নাই, কত সহজে তা রকেট মিসাইলের চেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। প্যালেস্টাইনীরা অবশ্য আগেই দেখিয়েছিল পরে আল-কায়েদা ফেনোমেনা ধারণাটাকে আরও ব্যাপক এবং পোক্ত করে দেখাল যে পশ্চিমের যুদ্ধ ধারণা একটা ফালতু ব্যাপার, কত তুচ্ছ। সামান্য সুইসাইড বোমার প্রতিরোধ, আত্মঘাতি স্কোয়াড কেমন ভয়ঙ্কর হতে পারে তা পশ্চিম টের পাওয়া শুরু করল। আগের যুদ্ধ ধারণায় ধরে নেয়া হয়েছিল – শত্রু মানে সেনাবাহিনী, ফলে ধরে নেয়া ছিল শত্রু মাত্রই যার জীবনের মায়া আছে, থাকবেই। এই আগাম অনুমান ধারণার উপর দাঁড়িয়ে পুরা যুদ্ধ ধারণা, অস্ত্রের ডিজাইন করা হয়েছিল। ফলে যখন শত্রুর অর্থ দাড়াল যার জীবনের মায়া বলে কিছু নাই এর উর্ধে, ডেসপারেট শুধু নয় স্পিরিচুয়ালি স্পিরিটেড – সেক্ষেত্রে যুদ্ধ, প্রতিরক্ষা, সেনাবাহিনী, দূর থেকে মারব, প্রতিরক্ষা শিল্ড ইত্যাদি – সবকিছু অকেজো আজাইরা ধারণা হয়ে গেছে। শুধু তাই না এখন নতুন ভোকাবুলারি চালু হয়ে গেছে। বলা হচ্ছে নন-স্টেট একটর। অর্থাৎ যারা ভিন রাষ্ট্র না, তেমন শত্রু না। অথচ রাষ্ট্রের মতই গোনায় ধরতে হবে এমন পাল্টা ক্ষমতাধর শক্তি। তাই এবার স্বীকার করে নেয়া হচ্ছে ভিন রাষ্ট্র ছাড়াও মারাত্মক শত্রু কেউ কেউ হতে পারে। আলকায়েদা ধরণের ফেনোমেনার দিকে তাকিয়ে বলা হচ্ছে এরা “নন-স্টেট একটরদের” প্রধান উদাহরণ। রাষ্ট্র না হয়েও কেউ মারাত্মক শত্রু হতে পারে। আর এরাই মূলত রাষ্ট্র-ওয়ালাদের চেয়ে ভয়ঙ্কর। যাদেরকে যুদ্ধ প্রতিরক্ষা ধারণায় গোনায় ধরা হয় নাই।
    সাদ্দাম হোসেন তার ক্ষমতার শেষদিনগুলোতে পশ্চিমকে একটা হুশিয়ারি দিয়েছিল। কেউ তেমন গুরুত্ব দেয় নাই। প্রপাগান্ডা, বকওয়াজ মনে করা হয়েছিল। কথাগুলো হারে হারে সত্য ছিল, পরবর্তিতে সত্য হয়েছে। তবুও আমাদের অনেক বন্ধু সেটা বুঝে নাই টের পায় নাই। বরং এখনও আমোদে আছে। সাদ্দাম হোসেন ১৯৮৯-৯০ সালে কুয়েত আক্রমণের পর থেকেই – নিজের আকাশেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল। আমেরিকার নো-ফ্লাই জোনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মাঝে মধ্যেই তবে নিয়মিত বোমা হামলা খেয়েই থেকেছেন, নিজের কোন যুদ্ধ-উড়োজাহাজ আর কোনদিন স্টার্ট করতেও পারেন নাই। কিন্তু তা সত্ত্বেও ২০০৩ সাল পর্যন্ত সাদ্দাম বহাল তবিয়তে তিনি ক্ষমতায় ছিলেন, থেকেছেন। কোন সমস্যা হয় নাই। তাঁর ক্ষমতায় থাকা নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠে নাই। টুইন টাওয়ার, আফগানিস্তানে হামলার ঘটনা দুনিয়ায় হাজির না হলে হয়ত সাদ্দামকে আরও অনেকদিন ক্ষমতায় দেখা যেত; তাঁর ক্ষমতার এক ভিন্ন রূপ ও স্বাভাবিক পরিসমাপ্তি আমরা দেখতাম। সাদ্দাম হোসেন তখন যা বলেছিলেন ওর সারকথা হল, আমেরিকা ইরাকের আকাশের উপর কর্ত্তত্ব নিয়েছে বটে কিন্তু যদি আকাশ থেকে ইরাকের মাটিতে সরাসরি নেমে আসে তবে সেটা আমেরিকার জন্য শেষ দিন ডেকে আনা হবে। নিজের খতমের দিনকে দাওয়াত দেয়ার সামিল হবে।

    মাটিতে সৈন্য নামানো
    “মাটিতে সৈন্য নামানো”। কথাটা সহজে হয়ত চোখ এড়িয়ে যায় কিন্তু খুবই তাতপর্যপুর্ণ কথা। আবার সাদ্দামের শেষ সময়ের কালে তাঁর মুখ থেকে এসেছিল বলে সবাই বকওয়াজ মনে করে কথাটা নিয়েছিল। “মাটিতে সৈন্য নামানো” মানে কী? কাউকে শত্রু ঘোষণা দিয়ে ঐ শত্রু-রাষ্ট্রের আকাশের কর্তৃত্ব নিজ অধীনে নেয়া চাইলে এমনকি বোমা মেরে তাকে পর্যদুস্থ করে ফেলা রাখাও একটা খুবই সহজ কাজ। কিন্তু সাবধান সেটাকে কথিত শত্রুর রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকার শেষদিন বলে মনে করা হবে চরম বেকুবি, এমন ঘোষণা দেয়া বা দাবি করা ভিত্তিহীন। সাদ্দাম নো-ফ্লাই জোনের ভিতরেই দশ বছরের বেশি ক্ষমতায় থেকে তা দেখিয়ে গেছে। তাই “মাটিতে সৈন্য নামানো” কথাটার সার দিক হল, দূরে আকাশ থেকে না, মাঠে নেমে শত্রুর সামরিক শক্তি, প্রতিরোধ ক্ষমতা  নিঃশেষ করা। ফলে এরপর সহজেই তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা। এগুলো এক জিনিষ আর বিপরীতে শত্রু বা শত্রু রাষ্ট্রকে কেবল আকাশ পথে হামলা করে বিধ্বস্থ করে রেখে দেওয়া এমন অকেজো করে দেয়া আর এক জিনিষ। কারণ দ্বিতীয় বিষয়টার সারার্থ হলে সেক্ষেত্রে ঐ বোমা হামলা খাওয়া রাষ্ট্রের শাসকের ক্ষমতায় থাকা একেবারে অসম্ভব হয় এমন নয়। সে থেকে যায়। কেবল নিজের আকাশ পথটাই অরক্ষিত হয়ে যায়, বাকী সব প্রায় ঠিকই থাকে। আর একই সাথে ঐ আকাশ পথে আবার নিজ কোন শত্রুর বিরুদ্ধে আকাশ পথে হামলা করতে চাইলে আর পারে না। কেবল এমন সক্ষমতার দিকটা অকেজো হয়ে যায়। তবে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, এরপর যে আমি (যেমন আমেরিকা) নোফ্লাই জোন কার্যকর করে রেখেছে সেই আমিই যদি আর বাড়তি পরের পদক্ষেপ হিসাবে এবার  “মাটিতে সৈন্য নামানো” না করি বা পাঠাই, বা না ব্যবস্থা করি তবে ঐ বোমা হামলা খাওয়া শত্রু এর পরেও ক্ষমতায় থাকবে। কোন অসুবিধা অনুভব করবে না। তবে কেবল সে নিজে আবার আকাশ পথে কাউকে হামলা করতে পারবে না হয়ত। যেমন লিবিয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকা নোফ্লাই জোন আরোপ করেছিল, আর আমেরিকাসহ ন্যাটো নিজেরা নির্বিচারে উলটা লিবিয়ায় বোমাবাজি করেছিল। তবে আমেরিকা নিজে লিবিয়ার মাটিতে না নামলেও, সৈন্য না পাঠালেও অ-আমেরিকান এবং স্থানীয় সশস্ত্র গ্রুপের সাথে আঁতাত করে তাদের পাঠিয়েছিল বা নামিয়েছিল। এবং তারা মাঠের সিআইএ অপারেটিভের সহযোগিতায় মাঠে নামা ও কাজে লাগার মত যোগ্য ও সক্ষম ছিল বলে গাদ্দাফীর পতন হয়েছিল। ফলে এক্ষেত্রে আমেরিকা নিজে লিবিয়ার মাটিতে না নামলেও অন্য সক্ষম কাউকে নামাতে পারার কারণে গাদ্দাফীকে পরাস্ত করে লিবিয়া দখল করতে পেরেছিল। আবার আর এক মোক্ষম উদাহরণ হল, একালে সৌদি আরব। মিসর আর দুবাই এর সাথে জোট করে সৌদিরা ইয়েমেনে মাটিতে না নেমে কেবল আকাশ পথে হুতিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বোমাবাজি করেছিল। ফলে তা সত্ত্বেও ঐ যুদ্ধের ফলাফলকে নিজের পক্ষে এবং নিজের নির্ধারক ভুমিকায় আনতে পারে নাই। সম্ভব হয় নাই। এতদিন সৌদি বাদশারা আমেরিকাকে গালি দিয়েছিল, অস্থির হয়েছিল যে সৌদিদের পক্ষে সৌদিদের মত করে কেন আমেরিকা বোমাবাজি করছে না। তাই শেষে ভেবেছিল সৌদিদের নিজেদের এত এত জঙ্গী বিমান আছে তা দিয়ে এবার তারা নিজেরাই আকাশ বোমাবাজি করে দেখিয়ে দিবে। আর সহজেই এতে নিশ্চয় তাদের জিত অনিবার্য হয়ে যাবে। কিন্তু আকাশ পথে বিস্তর বোমাবাজির পরও তারা যুদ্ধকে নিজেদের পক্ষে আনতে পারে নাই, নিজেদের বিজয় হয়েছে একথাও তারা বলতে পারছে না। যুদ্ধ স্থবির বা স্টেলমেট হয়ে গেছে। এর পরই আমেরিকানদের দুঃখ দুরবস্থার কথা সৌদিরা নিজ অভিজ্ঞতায় বুঝতে পেরেছিল। কারণ সৌদিদের পক্ষে মাটিতে নেমে লড়াই করার কেউ নাই। সেকাজে হুথিরা যথেস্ট শক্তিশালী, তাদের মোকাবিলার কেউ নাই। আর বোমাবাজির সময়ে এর হাত থেকে আত্মরক্ষার কৌশলে যাওয়াই একমাত্র ও সঠিক কাজ। লুকিয়ে আড়ালে যতটুকু নিজেকেসহ অস্ত্রশস্ত্র যা রক্ষা করা যায়, বেচে যায় এগুলোর কারণেই সে যুদ্ধে না হেরে আবার মাঠের দখল বজায় রাখতে পারে ফলে ক্ষমতায় থেকে যেতে পারে। ইয়েমেনে হুতিরা তাই করেছিল। এবং এখন সৌদিদেরকে আবার তাদের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি নিগোশিয়েশনের কথা ভাবতে হচ্ছে।

    তাহলে মাঠে মাটিতে সহজে কেউ নামতে চায়না কেন?
    মূল কারণ, এককথায় বড় বাধা খরচ। ১। মাঠে নেমে যুদ্ধ করার ফ্রন্টে এর অর্থ, নন-স্টেট একটরদের হারানো সহজ নয়। কেবল আকাশ পথে দূর থেকে হামলা যত ব্যপকই হোক, এক্ষেত্রে সবসময় কেউই হারে না, একটা পর্যায়ে এসে দাবার স্টেলমেট এর মত সবসময় এটা স্থবির হয়ে রয়ে যায়। আকাশপথে বোমাবাজি খামোখা হয়ে যায়। ২। একারণেই আবার সেক্ষেত্রে লম্বা যুদ্ধে জড়িয়ে পরার আশঙ্কা তৈরি হয়। কারণ মাঠে নামা মানে নেভার এন্ডিং বা একেবারে অনিশ্চিত সমাপ্তির যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া হবে। আর লম্বা যুদ্ধে ননস্টেট একটরেরা যতদিন টেনে টিকে থাকতে সক্ষম আমেরিকার মত রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক এর উলটা ঘটে। এছাড়া লম্বা যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া মানে আমেরিকার বেলায় এটা যুদ্ধের সীমা ছেড়ে আমেরিকার অর্থনীতিকে আক্রান্ত করে ফেলে থাকে, ফেলবেই। তছনছ করে দিবে, দিয়েছেও। মনে রাখতে হবে শত্রু শেষ হবার আগেই যুদ্ধ অমীমাংসিত রেখে আফগানিস্তান, ইরাক থেকে আমেরিকার মাঠের সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের কারণ যুদ্ধের খরচ যোগাতে রাষ্ট্রীয় বাজেটের অক্ষমতার কারণে ঘটেছে। ফলে তিন বছর আগেই ঘোষণা দিয়ে বলা হয়ছিল যে ডিসেম্বর ২০১৪ তে সৈন্য প্রত্যাহার করা হবেই, তাতে যুদ্ধের সুনির্দিষ্ট কোন লক্ষ্য অর্জন এর ভিতর অর্জিত হোক আর নাই হোক। অর্থাৎ সিদ্ধান্তের ভিত্তি যুদ্ধের অর্জন কতটুকু হলে হবে তা একেবারেই নয়। বরং ২০১৪ এর পর আর যুদ্ধের খরচ চালিয়ে যাওয়ার ভার অর্থনীতির উপর চাপানো অনুচিত হবে এটাই ছিল সিদ্ধান্তের ভিত্তি ও মুল বিবেচনা। তাই সেই থেকে আমেরিকা কোথাও আর মাঠে সৈন্য নামায় নাই। সাদ্দাম হোসেনের মাঠে সৈন্য নামানোর বিরুদ্ধে হুশিয়ারির তাতপর্য এখানেই। কারণ যুদ্ধ এসময়ে একদিকে অর্থনৈতিক দিক থেকে আমেরিকার জন্য দুর্দশা হয়ে উঠেছিল, আবার অন্যদিকে ঐ সুযোগে চীনের অর্থনৈতিক সাফল্য, উদ্বৃত্ব অর্থনীতির পাহাড় হয়ে উঠা – মিলিত ফলাফলে আমেরিকার পরাশক্তির মুকুট দিন কে দিন কেড়ে নিবার অবস্থায় দিকে সেই থেকে অবধারিত ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। অবস্থা এমন, আমেরিকা হয়ত এখনও সিংহ-ই আছে ঠিকই কিন্তু বুড়া, দাত নখের ধার নাই, বিগত যৌবনা। এটা এখন নিজেই স্বীকার করা শুরু করে দিয়েছে।

    এবার আমরা দেখব আমেরিকান দুর্দশা বুড়া সিংহ হওয়াতেই শেষ হয় নাই। একের পর এক দুর্দশা লেজ ধরে আসছেই। ইরান বিপ্লবের (১৯৭৯) পর থেকে এই প্রথম আমেরিকা ইরানের সাথে পারস্পরিক সব বিরোধের মীমাংসা করল। বলা যায় বাধ্য হল। জাতিসংঘকে স্বাক্ষী রেখে পি৫+১ মানে, ভেটো ক্ষমতার নিরাপত্তা কাউন্সিলের পাঁচ সদস্য + জর্মানি – এই কমবিনেশন সবাইকে নিয়ে এক সাথে টেবিলে বসে (কোন যুদ্ধের কথা মুখে না তুলে) আমেরিকাকে ইরানের সাথে নিগোশিয়েশনে বিরোধ মীমাংসা করতে হয়েছে। এটাকে বলা যায়, মূলত আমেরিকার ইরান বিপ্লবকে সর্বশ্রেষ্ট স্বীকৃতি জানানো, একেবারে আদব-লেহাজের সাথে – এই প্রথম। একাজের ফলে ইরানের বিপ্লব আজ সত্য বলে ইরানবাসীর আকাঙ্খা ও একাজকে সালাম জানাতে দুনিয়ার কেউ আর বাদ থাকল না। সেই সাথে ইরানের হাতে পারমানবিক বোমা আছে কি আছে না সেটা বড় কথা নয় – ইরান সক্ষম, ইচ্ছা করলে সে পারমানবিক বোমার অধিকারি হতে পারে একথা আমেরিকা ও তার বন্ধুদের স্বীকার করে নিতে হল।

    কেন? এই দুর্দশা! জবাব বুড়া সিংহ! ইরানের সাথে এই চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা প্রকারন্তরে স্বীকার করে নিল যে সে বুড়া সিংহ হয়ে গেছে। সামর্থ নাই। সামরিক সক্ষমতা এখনও আগের মতই আছে কিন্তু খরচ যোগানোর অর্থ নাই। মাঠে সৈন্য পাঠানো বিষয়টা আলাদা অধ্যায়, আলাদা অর্থ। ওদিকে সেকথা বুঝতে চাওয়ার কথা নয়। ফলে মাঠে ইরাকে নতুন করে আইএস উঠে এসেছে। কিন্তু আবার সেখানে মাঠে সৈন্য পাঠানোর মত কোন অবস্থাতেই আমেরিকা আর নাই। এই দুর্দশা ঘাটতি অভাব মিটাতে আমেরিকার দরকার বাইরের রি-ইনফোর্সমেন্ট, বাইরের শক্তিতে নিজের ঘাটতি মিটানোর পথে হাটা দেওয়া, যাকে ছাড়া নিজের পক্ষে কিছু সম্ভব নয়। তাই সব উপায় হারিয়ে আমেরিকা এখন ‘আগে ব্যবহৃত হয় নাই’ এমন ফোর্স হিসাবে ইরানকে সে গোনায় ধরছে। যাতে সে আইএস এর বিরুদ্ধে আমেরিকার পক্ষের ফোর্স হিসাবে ভুমিকা নেয়। এখানেই আমেরিকার সক্ষমতার পরাজয়ের ঘন্টার সুচনা। কিন্তু সেসব ইজ্জত মান সম্মানের দিক নিয়ে ভাববার অবস্থাতেও সে নাই। আমেরিকার এখন অন্যের সহায়তায় জিতে গেলে টিকে থাকতে পারলে বাপের নাম অবস্থা। তাতে সে অন্য মানে ইরান হলেও কিছু ভাবার মত ক্ষমতায় সে নাই। আমেরিকা-ইরান ডিল চুক্তির মূল ইঙ্গিত তাতপর্য এটাই। আমেরিকা কম দুঃখে পড়ে এমন ইঙ্গিত তাতপর্য তৈরি করে নাই। এটাই সৌদিরা বুঝতে চায় নাই।

    অতএব কেউ কারও দেশের উপর আকাশপথ দখলে নিল কি না, ব্যাপক বোমাবাজি ঘটাল কি না এটা তেমন কোন নির্ধারক বিষয় নয়। মাঠে নামার এবং যা মূলত খরচ যোগানোর সামর্থের সাথে সম্পর্কিত – তা করল কি না এবং সে সামর্থ আছে কি না –এটাই নির্ধারক। কারণ মাঠে নামা মানে এর সোজা অর্থ নেভার এন্ডিং বা একেবারে অনিশ্চিত সমাপ্তির যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া। এটাই বিশাল ভাইটাল পয়েন্ট। এদিকটা বুঝে না নিয়ে, বিচার না করেই কেবল রাশিয়ার বোমাবাজি দেখে উচ্ছসিত হওয়া অর্থহীন। কোন মানে নাই। মূল বিষয় রাশিয়া কী মাঠে সৈন্য নিয়ে নিজে নামবে অথবা অন্য তবে যোগ্য কাউকে মাঠে নামাতে পারবে? এদিকটা নির্ধারক। আন্দাজ করা যায় এই সক্ষমতা রাশিয়ারও নাই।
    উপরের কথাগুলো যখন লিখেছিলাম নিচের রিপোর্ট্টটা হাতে আসে নাই। এটা ইংরাজি মস্কো টাইমসের ৩০ সেপ্টেম্বরের একটা রিপোর্ট। বলছে, “We won’t enter a risk zone, where we would be dragged into a long-term conflict or when our servicemen’s lives are at stake,” – foreign affairs committee, Konstantin Kosachyov, told the Rossiya-24 television। অর্থাৎ  মাঠে সৈন্য নামানোর বিপদ সম্পর্কে রাশিয়া পুরা ওয়াকিবহাল তা বুঝা গেল। সেজন্য রাশিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় বিষয়ক সংসদ নেতার risk zone, dragged into a long-term conflict, servicemen’s lives ইত্যাদি শব্দগুলো আমাদের বক্তব্যকেই পুষ্ট করে। এছাড়া ঐ একই রিপোর্ট থেকে চেচেনের পুতিনের পছন্দের মুসলমান নেতার প্রতিক্রিয়া থেকেও জানতে পারি। তিনি বলছেন তিনি খুশি যে রাশিয়া সিরিয়ায় নেমেছে। কিন্তু তিনি হতাশ যে রাশিয়া গ্রাউন্ড ফোর্স মাঠে নামাবে না।

    তবে রাশিয়া যা যতটুকু করল তা কেন করল?
    প্রথমত সিরিয়ায় রাশিয়ার এটা আমেরিকা থেকে গোপন রাখা কোন ততপরতা নয়। বা আমেরিকাকে আগাম কোন ধারণা না দিয়ে ঘটানো কোন ঘটনা না। গত সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই রাশিয়া আমেরিকার সাথে এবিষয়ে আলোচনার আগ্রহ জানিয়েছিল। সাধারণভাবে রাশিয়ার দিক থেকে কথা বলতে তাগিদ অনুভব করার আসলে এর প্রধান কারণ ইরানের সাথে আমেরিকার চুক্তিতে সাফল্যকে স্মরণ করা এবং হয়ত তা এর প্রতি একটু অপ্রয়োজনীয় অতি উতসাহে। তবু রাশিয়ান বার্তাটাকে অর্থ করা যায় এভাবে যে, “ইরান ইস্যুতে তো রাশিয়া-আমেরিকা আমরা একসাথে কাজ করতে পারলাম, সাফল্যও আসল। এখন সিরিয়া ইস্যুতে একটু চেস্টা করে দেখা যাক না কিছু করা যায় কি না!” রাশিয়ার আলোচনা প্রস্তাবে ওবামা প্রশাসনের দুটো মতামত এসেছিল। নিউইয়র্ক টাইমস ১৬ সেপ্টেম্বর বলছে, আলাপের প্রস্তাব পেয়ে আমেরিকা প্রশাসন প্রথমে দ্বিধাগ্রস্থ ও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল, “এক পক্ষ তর্ক করছিল, ইউক্রেন ও সিরিয়া যেহেতু দুনিয়ার গুরুত্বপুর্ণ সংঘাতপুর্ণ এলাকা তাহলে তো ঐ দুই ইস্যুতে রাশিয়াকে সংশ্লিষ্ট করেই আমাদের সমাধান তালাশ করতে হবে। অর্থাৎ রাশিয়ার সাথে কথা বলতে হবে। বিপরীতে অপর পক্ষ বলছিল, এবিষয়ে রশিয়ার সাথে কথা বলতে আগ্রহী হবার ক্ষেত্রে তাদের সুশ্চিন্তার দিকগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছিল। বলছিল, এর অর্থ হবে পুতিনের নিয়ন্ত্রণে নাচা আর আন্তর্জাতিক পরিসরে তার নানান বকওয়াজ আর প্রপাগান্ডাকে তাল দেয়া”।
    ওবামার পুতিনের প্রতি মনোভাব প্রসঙ্গে ঐ রিপোর্ট বলছে ওবামা কথা না বলার চাইতে বলা সঠিক হবে বলে মনে করেন। বিশেষ করে পুরান শত্রু কিউবা ও ইরানের ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা তাকে তাই বলে। ইউক্রেনে হামলা আর ক্রিমিয়া দখল করে নেয়ার পর থেকে ওবামার সাথে পুতিনের সম্পর্ক খুবই খারাপ যাচ্ছিল। তবু এই পরিস্থিতিতে কথা না বলা অবস্থান ভেঙ্গে শেষ পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি রাশিয়ান পরারাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই লাভরভের সাথে বৈঠক করেছিলেন। ঐ মিটিং থেকে কোন অগ্রগতি না হলেও পরস্পরকে সিরিয়া ইস্যুতে জানা শোনা বাডানো গেছিল।
    যদিও তারা পরিস্কার মনে রেখেছিল যে মাইনাস-আসাদ সিরিয়া ইস্যু সমাধানের পথে বিরোধী গোষ্ঠির সাথে যাবার ব্যাপারে আমেরিকার কমিটমেন্ট আছে। সিরিয়ার বিদ্রোহীদের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ট্রেনিং প্রকল্প অকেজো হয়ে গেলেও এখনও তা চলমান। ফলে এখানে রাশিয়ার সাথে তার অবস্থানগত মৌলিক বিরোধ আছে যেটা সহজে মিটানো বা সিমেন্টেড হবে না। তা সত্ত্বেও তারা সিরিয়া ইস্যুতে একসাথে কথা বলতে বসেছিল। কোন সমন্বিত কিছু করার উদ্যোগ সেখান থেকে না আসলেও পরস্পরকে জানা আরো আপডেটেড হয়েছিল সরাসরি বসে। তবে কোন মনোমালিন্যের মত কিছুই হয় নাই সেখানে। কিন্তু এরপর সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বাতসরিক সভায় পরস্পরকে ঠেস দিয়ে কথা বলায় প্রপাগান্ডার টেনশন উঠেছিল, পুতিন বক্তৃতায় ওবামাকে ঠেস দিয়ে কথা বলেছিল, এতটুকুই। সারকথা হল, এটা রাশিয়ার বোমাবাজি করে আমেরিকাকে দেখিয়ে দেয়ার মত কোন ঘটনাই নয়। বরং আমেরিকান উদ্যোগের পাশাপাশি রাশিয়ার কিছু করতে চাওয়ার মধ্যে কিছু সমন্বয় করে আগানো।
    খুব সম্ভবত রাশিয়ার দিক থেকে এর সার উদ্দেশ্য সিরিয়া বিষয়ক কোন সমাধান পশ্চিম চিন্তা করতে গেলে যেন রাশিয়া সেখানে গোনায় ধরা থেকে বাদ না পরে। নিজেকে অতটুকু মিনিংফুল করাটাই এখানে উদ্দেশ্য; তাতে আসাদকে রাশিয়া রাখতে পারুক কিংবা খরচ করে ফেলতে হোক – এটা সেকেন্ডারি।

    এছাড়া পুতিনের আর এক উদ্দেশ্য হল, পশ্চিমের থেকে বিচ্ছিন্ন বা একঘরে হয়ে থাকা দশা থেকে নিজেকে একটু মুক্ত করা। ইউক্রনে হামলা এবং ক্রিমিয়াকে দখল করে একে রাশিয়ার ভিতরে অন্তর্ভুক্ত করে নেবার পর থেকে সের বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। রাশিয়ান মস্কো টাইমসে মস্কোর মিলিটারি এনালিস্টের বরাতে একথাই লেখা হয়েছে।

    [লেখাটা এক সংক্ষিপ্ত ভার্সান আজ ১৮ অক্টোবর ২০১৫ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছে।]

    সর্বশেষ এডিট করা হয়েছেঃ ২১ অক্টোবর ২০১৫, ০৯ঃ৫৫ সকাল

  • জাসদ ও আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব ও সম্পর্ক

    জাসদ ও আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব ও সম্পর্ক
    গৌতম দাস
    ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-bY

    সম্প্রতিকালে জাসদ নিয়ে বিস্তর আলোচনা উঠেছে। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা জাসদের ১৯৭২-৭৫ সালের আওয়ামি লীগের বিরুদ্ধে চরম ততপরতা কার্যকলাপের প্রসঙ্গ তুলছে। তাঁরা দাবি করছে শেখ মুজিব হত্যার জন্য জাসদের নেতা বিশেষত হাসানুল হক ইনু মত নেতারা দায়ী। যেমন মানবজমিন ২৭ আগষ্ট লিখেছে, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, জাসদই বঙ্গবন্ধু হত্যার পথ পরিষ্কার করে দিয়েছিল। স্বাধীনতা বিরোধীরা কখনোই বঙ্গবন্ধুর ওপর আঘাত হানতে পারতো না যদি গণবাহিনী,জাসদ বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করে বিভিন্ন জায়গায় ডাকাতি, মানুষ হত্যা করে এমপি মেরে পরিবেশ সৃষ্টি না করতো। বঙ্গবন্ধু যেদিন মারা যান সেদিন কর্নেল তাহেরও রেডিও স্টেশনে যান”। পরের দিন “শেখ ফজলুল করিম সেলিমের বক্তব্য সমর্থন করে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ। একইদিনে প্রাক্তন জাসদ ছাত্রলীগ নেতা,বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দাবি করেন, ১৯৭৪ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও কালে হাসানুল হক ইনু এবং অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনই প্রথম গুলি করেন”। এরপরে জাসদ ইনুও পালটা আওয়ামী লীগের নেতাদের শেখ মুজিব হত্যা উত্তর মোস্তাক মন্ত্রীসভায় যোগদানে কাড়াকাড়ির প্রসঙ্গ তুলে খোচা দেয়া জবাব দেন। নিশ্চয় এই সময়ে প্রত্যেকের বক্তব্যের পিছনের প্রত্যেকের উদ্দেশ্য কী তা তাঁরাই ভাল বলতে পারবেন। তবে আওয়ামী লীগ ও জাসদ উভয়ের উদ্দেশ্যের একটা কমন দিক এখানে দেখা গেছে। তা হল, কে কতটা শেখ মুজিবের কাছের থাকেন নাই বা ছিলেন না তা নিয়ে হাসিনার কাছে নালিশ দিয়ে কান ভারী করা।

    ঘটনার পিছনের উদ্দেশ্য যাই থাক, ১৯৭২ সালে স্বাধীনের পরের সাড়ে তিন বছরে শেখ মুজিব বেঁচে থাকা এবং সরকার প্রধান থাকা অবস্থায় আওয়ামী সরকারের সবচেয়ে চরম ও কার্যকর রাজনৈতিক বিরোধীতা করেছিল জাসদ। এটাই স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সেসময়ে সবচেয়ে বড় অধ্যায় জুড়ে থাকা ঘটনা ছিল। ততকালীন সরকারের রক্ষীবাহিনী দিয়ে বলপ্রয়োগে দমন নির্যাতনের শাসনের বিরুদ্ধে কার্যকর বিরোধীতা সক্ষম করে দেখাতে পেরেছিল একমাত্র জাসদ। এই অর্থে জনগণের উপরে সরকারের দানবীয় দমন নির্যাতনকে জনগণের সামনে উদোম করে দেখিয়ে সরকারকে চরম অ-জনপ্রিয় করে তোলা এবং সরকারের রাজনৈতিক পতনের শর্ত তৈরি হয় এমন মৌলিক কাজটা ঘটেছিল জাসদের হাতে। ফলে জাসদ ১৫ আগস্ট সরাসরি ভুমিকা নিয়ে থাকুক অথবা না – এটা ঐতিহাসিক সত্য যে শেখ মুজিব সরকারকে অ-জনপ্রিয় করা ও পতন ত্বরান্বিত করার দিকে ঠেলে দেয়ার রাজনৈতিক পটভুমি জাসদের রাজনৈতিক ততপরতাতেই নির্মিত হয়েছিল। জন্মের পর থেকে সেসময় এটাই ছিল জাসদের ঘোষিত লক্ষ্য। এদিক থেকে শেখ সেলিম অথবা মোহম্মদ হানিফ ইত্যাদি যেসব আওয়ামি নেতা জাসদের নেতা হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তুলছেন তা জেনুইন। যদিও আওয়ামি লীগের কিছু নেতাদের দিক থেকে জেনুইন অভিযোগ আর জাসদের দিক থেকে দেখলে  এটাই তার জেনুইন গর্ব। এখনকার চলতি সরকার বা দলের সাথে সম্পর্ক রাখে না এমন যেকোন জাসদ কর্মী এটাকে গর্ব বলে মনে করবে। কারণ এটাই জাসদের ইতিহাস। এটা নিজের গর্ব মনে করেই জাসদ জাসদ হয়েছিল। নইলে তো সে আওয়ামী লীগ থাকত। একালে এই গর্বের চেয়ে মন্ত্রীত্ব ক্ষমতা দামি হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেজন্য ইতিহাসকে তো এখন আর বদলে নেয়া যাবে না। তবুও আওয়ামী নেতারা এখন এসব অভিযোগ কেন তুলছেন সে টাইমিং বা সময়জ্ঞান অর্থে তাদের উদ্দেশ্য কী সে প্রশ্নটা আলাদা হয়ে থেকে যাচ্ছে।

    আর এক কারণে টাইমিং এর প্রশ্ন উঠাও খুবই স্বাভাবিক। কারণ ২০০৯ সালে চলতি সরকার গঠনের শুরু থেকে জাসদ আর আওয়ামি লীগ যেন একাকার দুজনে দুজনার,পরস্পর পরস্পরের জন্য যেন জন্মিয়েছে এমন এক ঐতিহাসিক মিথ্যা ধারণা তৈরি করে সেটা শুরু করা হয়েছিল। বাইরের দিক থেকে যদি দেখি, জাসদ ও আওয়ামি লীগ ১৪ দলীয় জোটের পরস্পর দুই সাথী ও গঠিত সরকারের জোটসঙ্গী মাত্র। দুটো দল মানেই দুটো রাজনীতি। আর অবশ্যই তা পরস্পরের বিরোধী রাজনীতি। এই আলাদা রাজনীতিতে গভীর ভাবে পরস্পরের রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও কোন একটা জোটে আবার দুই দলেরই তাতে যোগ দেয়া, জোটে আবদ্ধ হওয়া এবং সে জোটের সরকার গঠন করে ফেলা- সারা দুনিয়ার রাজনীতিতে এমনটা কোন অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। ফলে এবিচারে জাসদ আর আওয়ামি লীগ এই দুদলের রাজনৈতিক সখ্যতার বিরুদ্ধে কোন প্রশ্ন তোলার কিছু নাই। এরপরেও জাসদ আর আওয়ামি লীগের রাজনৈতিক সখ্যতার বিরুদ্ধে প্রশ্নটা উঠছে সম্ভবত এজন্য যে এটার পিছনে এক আনহোলি এলায়েন্স বা অশুভ আঁতাত কাজ করছে; যার নাম প্রতিহিংসার রাজনীতি।
    কোন দেশেই নিজের ইতিহাসের বয়ান একটা থাকে না। একাডেমিক পর্যায়ে ইতিহাস নিয়ে নানান বিতর্ক তো থাকেই। আর এছাড়া রাজনৈতিক পর্যায়ে ব্যাখ্যা বয়ানের ফারাক থাকে। এটা স্বাভাবিক। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পরবর্তী ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক আছে। বিশেষত পঁচাত্তর পরবর্তী ঘটনাবলী নিয়ে। আর নভেম্বরের ঘটনাবলী নিয়ে আওয়ামী লীগ, জাসদ এবং বিএনপি এই তিন দলের কোন কমন ভাষ্য নাই ঘটনার সময় থেকেই। অথচ জাসদের জন্ম ১৯৭২ সাল থেকে চলতি সরকার গঠনের আগে পর্যন্ত এতে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে যেন বাংলাদেশের কোন কালেই এই দুই দলের মধ্যে রাজনৈতিক অবস্থানে কোন ভিন্নতা ছিল না।

    যে কোন দুটো দল মানেই দুটো ভিন্ন রাজনীতি। ফলে তাদের মধ্যে সমাজের বিভিন্ন বিরোধ ইস্যুকে দেখবার ক্ষেত্রে ভিন্নতা, ফলে রাজনৈতিক অবস্থানের ভিন্নতা আছে। এমনটা থাকবেই। এটা স্বতসিদ্ধ, আপনা আপনি সত্য। কারণ ভিন্নতা আছে বলেই তো ওরা আলাদা আলাদা দুটো রাজনৈতিক দল। এমন ভিন্নতা যদি না-ই থাকত তবে তো তারা আসলে একই দল। বলা হয়ে থাকে কোন রাজনৈতিক দলের মধ্যে কখনও যদি দুটো পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক লাইন বা চিন্তা জন্ম নেয় যে সে বিরোধ নিরসন করে তারা এক কমন অবস্থানে পৌছাতেই পারল না। সম্ভব হল না। এর অর্থ ঐ দল তখন থেকে বাস্তবত দুটা আলাদা দলে পরিণত হয়ে গেছে। ফলে এরপর থেকে ওরা আনুষ্ঠানিক আলাদা দল হয়ে যাবার পথে রওনা দিবে বা দিয়েছে। সেটা আনুষ্ঠানিক কবে ঘটবে কেবল সেই সময়ের অপেক্ষা। অতএব জাসদ ও আওয়ামী লীগ দুটো আলাদা দল বলা মাত্র বুঝতে হবে দল দুটোর রাজনীতি আর এক নয়। কিন্তু ২০০৯ সা্ল থেকে এই মিথ্যা ভান তৈরি করা হয়েছিল।
    এটা কমবেশী অনেকেই জানেন যে আওয়ামী লীগের ভিতর থেকে যারা ১৯৭২ সালে স্বাধীনতা পরবর্তীতে জাসদ নামের রাজনৈতিক দল হিসাবে নিজেদের হাজির করেছিল সে উপধারার মুল নেতা সিরাজুল আলম খান। তখন থেকেই সিরাজুল আলম খানের রাজনীতি আর আওয়ামী লীগের রাজনীতি এক নয়। যদিও পাকিস্তান আমলে ষাটের দশক থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের ভিতরেই একটা উপধারা এবং সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাবশালী ঐ উপধারার মূল নেতা। আবার আওয়ামী লীগ বললাম বটে কিন্তু সিরাজুল আলম খান নিজে কখনও আওয়ামী লীগের কোন সাংগঠনিক কমিটির আনুষ্ঠানিক সদস্য ছিলেন তা জানা যায় না। তবে ষাটের দশকের শুরুর দিকে তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি হবার পর থেকে পরবর্তি গঠিত প্রত্যেক কেন্দ্রিয় কমিটিতে (তখনকার দিনে প্রত্যেক বছর সম্মেলন হত ফলে প্রতি বছর নতুন নেতৃত্বের কমিটি) প্রভাবশালী ধারাটা হত বা থাকত ব্যতিক্রমহীনভাবে সিরাজুল আলম খানের অনুসারীদের। অনুসারীদেরকে নিয়ে পরিচালিত এই গ্রুপটাকে নিজেদের মধ্যে “নিয়ক্লিয়াস” বলে হত। নিউক্লিয়াস কথাটার সারার্থ হল যারা ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের রাজনীতি ছাড়িয়ে এক র্যা ডিকাল বিপ্লব করতে চায় তাদেরই আলাদা গ্রুপ,আওয়ামী লীগের ছাত্র লীগের ভিতরে তাদেরই ভ্রুণ – এই অর্থে নিউক্লিয়াস। বাইরে থেকে দেখলে ততকালীন কোল্ড ওয়ারের যুগে যে কোন রাজনৈতিক সংগঠনের ভিতরেই যেমন বামপন্থী আর ডানপন্থী বলে উপধারা দৃশ্যমান দেখা যেত,যারা পরস্পর লড়াই ঝগড়া করত আবার কোন কাজ কর্মসুচিতে সিদ্ধান্তের বেলায় আপোষ মীমাংসা করে একসাথে একই সংগঠনে কাজ করত। ঠিক তেমনই আওয়ামী ছাত্রলীগের মধ্যেকার এই “নিউক্লিয়াস” নিজেদেরকে বামধারা মনে করত। এখানে নিউক্লিয়াস বা সিরাজুল আলম খানের রাজনীতি সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে তা আমার মুল্যায়্নের দিক থেকে বলা নয়, তার চেয়ে তাঁরা নিজেরা নিজেদের কি মনে করত সেদিক থেকে লেখা। সিরাজুল আলম খানের বিশেষ কৃতিত্ত্ব ছিল,শেখ মুজিবের আপন ভাগনে শেখ মনিকে নিজের গ্রুপের পক্ষে ও নিজের নেতৃত্বের অধীনে রাখতে পারা। এভাবে রাজ্জাক,তোফায়েল,রব,শাহজাহান সিরাজ এরা সবাই ছিল নিউক্লিয়াসের সদস্য। নিউক্লিয়াসের বিপরীতে বা বাইরে ছিলেন নুরে আলম সিদ্দিকী,আব্দুল কুদ্দুস মাখন, ফেরদৌস কোরেশী ইত্যাদি এদের মত নেতারা যারা আওয়ামী লীগের নানান কেন্দ্রীয় নেতার অনুসারি। কিন্তু সিরাজুল আলম খানের চেয়ে বেশী প্রভাব ছাত্রলীগের উপর কেউই রাখতেন না। ওখানে একছত্র প্রভাব সিরাজুল আলম খানের। আবার বিষয়টা এমন নয় যে সিরাজুল আলম খান মুল আওয়ামি লীগের বাইরের কেউ। কিন্তু আওয়ামী লীগের সাথে তাঁর সম্পর্কটা কেবল শেখ মুজিবের সাথে ও মাধ্যমে আর সরাসরি। এই দুজনের পারস্পরিক বোঝাপড়া আস্থা ছিল খুবই গভীর। ব্যক্তিগত সম্পর্কও গভীর,সৎ এবং স্পর্শকাতর। যদিও সব কিছুর উপরে রাজনৈতিক মুল্যায়ন ও বিশ্বাসের দিক থেকে সিরাজুল আলম খান নিজেকে “বিপ্লবী” আর শেখ মুজিবকে “বুর্জোয়া” মনে করতেন। ফলে মনে করা যেতে পারে যে, মূলত তাঁর এই ধারণার দিনকে দিন যথেষ্ট শক্তিশালী হয়েছিল বলে সিরাজুল আলম খান ১৯৭২ সালে নবগঠিত মুজিবের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্রভাবে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। সঠিক অথবা বেঠিক রাজনৈতিক লড়াই করেছেন। যদিও ১৯৭২ সালের জানুয়ারীতে শেখ মুজিবের পাকিস্তানের বন্দীদশা থেকে ফেরার পর থেকে পরের তিন মাস সিরাজুল আলম খান নিজের “বিপ্লবী” অবস্থান ও রাজনীতি নিয়ে মুজিবের সাথে দীর্ঘ আলাপ আলোচনা করার সুযোগ পেয়েছিলেন বা নিয়েছিলেন। তাদের উভয়ের রাজনৈতিক সম্পর্ক, ঘনিষ্ঠতা এবং বিতর্ক কোন তাত্ত্বিক ধরণের ছিল না। বা তত্ত্ব নিয়ে করেন নাই। তাঁরা কথা বলেছিলেন, সিরাজুল আলম খানের তোলা বিভিন্ন ইস্যু বা দাবীতে একমত হতে পারেন কি না। ফলে তাত্ত্বিক রাজনীতির বদলে একেবারেই ব্যবহারিক রাজনীতির – পদক্ষেপ ও করণীয় বিষয়ের দিক থেকে ছিল তাদের তর্ক ও মতভেদ। ফলে শেষ দিন পর্যন্ত সিরাজুল আলম খানের একটা আশা ছিল, হয়ত তিনি তাঁর “মুজিবভাইকে” বুঝিয়ে রাজি করাতে পারতেও পারেন – যুক্তির জোরে নয় ব্যবহারিক সম্পর্কের জোরে।
    যেমন স্বাধীনের পর প্রথম ১৯৭২ সালের মে মাসে ছাত্রলীগের কেন্দ্রিয় সম্মেলন ডাকা হয়। একই দিনে একই রাজধানী শহরে কিন্তু দু জায়গায় আলাদা আলাদা দুই আহবায়ক সে সম্মেলন ডেকেছিল। আর দুই সম্মেলনেই প্রধান অতিথি হিসাবে পোস্টারে নাম ছিল শেখ মুজিবের। স্বভাবতই শেখ মুজিব শেষমেষ সিরাজুল আলম খানের সমর্থিত অংশের বদলে এর বিরোধী অংশের সম্মেলনে অতিথি হিসাবে গিয়েছিলেন। আর এর মাধ্যমে এর পর থেকে শেখ মুজিব ও সিরাজুল আলম খানের মধ্যকার রাজনৈতিক অবস্থান বিরোধ প্রকাশ্য ও চিরস্থায়ী আলাদা পথে এবং দলে পরিচালিত হতে শুরু করেছিল। আলাদা রাজনৈতিক দল জাসদ গঠনের ঘোষণা এসেছিল আরও পাঁচ মাস পরে অক্টোবরে। কিন্তু সম্ভাব্য হবু জাসদ নামের রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন হিসাবে আলাদা ছাত্রলীগ ঐদিন থেকেই আলাদা ও প্রকাশ্য সংগঠন হয়ে যায়। শুরু হয় শেখ মুজিব ও সিরাজুল আলম খানের মধ্যকার প্রথম রাজনৈতিক বিচ্ছেদ। এই বিচ্ছেদ ঘটানো বাংলাদেশের জন্য সঠিক হয়েছিল কি না সেটা আলাদা মুল্যায়ন। ফলে আলাদা সময়ে করতে হবে। কিন্তু আপাত প্রসঙ্গের প্রয়োজনের এই বিরোধটাকে সার করে এভাবে বলা যায় যে, শেখ মুজিব ও সিরাজুল আলম খানের একসাথে করা আন্দোলন লড়াই ও সশস্ত্র যুদ্ধের শেষে ফসল হিসাবে গঠিত শেখ মুজিবের নেতৃত্বের রাষ্ট্রটাকেই এবার সরাসরি ও মুখোমুখি সশস্ত্রভাবে বিরোধীতা করা শুরু করেছিলেন সিরাজুল আলম খান। আগেই বলেছি এটা ঠিক না ভুল ছিল সেদিকে যাব না । কেবল জাসদ ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিরোধ জন্মের শুরু থেকেই যে গভীর এবং চিন্তার পার্থক্য মৌলিক, সেদিকটা নজর করাব। এর ফলে তখন থেকে সিরাজুল আলম খানের সাথে রাজনৈতিক বিচ্ছেদ ঘটিয়ে শেখ মনি রাজ্জাক,তোফায়েলকে সাথে নিয়ে মামা শেখ মুজিবের পক্ষে চলে যান।
    অতএব সারকথা দাঁড়াল, শেখ মুজিব ও সিরাজুল আলম খানের ব্যক্তিগত সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ থাক না কেন উভয়ের রাজনৈতিক বিরোধ হয়ে পড়েছিল খুবই তীব্র,যার তুলনায় ব্যক্তিগত সম্পর্ক খাটো পড়ে গেছিল। ফলে সেটা খুবই ম্লান। যেমন ৬৯ সালে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু বানানোসহ তাকে কাল্ট ও ক্যারিসমায় মুল জননেতা হিসাবে হাজির করার পরিকল্পনা ও কৃতিত্ব মূলত সিরাজুল আলম খানের। কিন্তু জাসদ গঠনের পর থেকে দলের আভ্যন্তরীণ কালচারে অথবা পাবলিক বক্তৃতায় আর কখনই জাসদের কোন নেতা শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু ডাকে নাই,কেবল শেখ মুজিব বলেছেন। এ’যেন নিজের দেয়া খেতাব মুকুট নিজেই খুলে নিতে চেয়েছিলেন তারা আর,বলতে চেয়েছিলেন জাসদের বিপ্লবী রাজনীতির চোখে শেখ মুজিব ও তাঁর রাজনীতি বিশ্বাসঘাতক।

    শুরুতে যেকথা বলছিলাম ২০০৯ সালে তবু এক মিথ্যা ভান তৈরি করা হয়েছিল যে জাসদ ও আওয়ামী লীগ যেন একই দল ছিল। যেন বলার চেষ্টা করা মুসলীম লীগ করা লোকেরাই তো আওয়ামি লীগ করেছে,ফলে তারা একই লোক ও একই রাজনীতি করে। তবে ইনুর জাসদ এর চেয়েও আরও বড় শঠতার আশ্রয় নেয়। হঠাত করে গোপনে ইনু জাসদের নেতারা বঙ্গবন্ধু বলতে শুরু করে দেন।
    যে কোন রাজনৈতিক দল নিজের অতীতের কোন কোন রাজনৈতিক অবস্থান ভুল ছিল বলে পরবর্তিকালে মুল্যায়ন করতেই পারেন। সেটা কোন অনৈতিক বা অন্যায় নয় অথবা অস্বাভাবিক বিষয় নয়। কিন্তু তা হতে হবে প্রকাশ্য প্রক্রিয়ায়,ঘোষণা দিয়ে এবং কারণ ব্যাখ্যা করে। জন্মের সময় থেকে চলে আসা জাসদীয় কালচারের চর্চা এবং আওয়ামি লীগের সাথে তার উল্লেখযোগ্য প্রতীকী ফারাক নির্দেশক ঘটনা ছিল “বঙ্গবন্ধু” আর না বলা। অথচ সেসব মৌলিক দিক ও সততার দিক বেমালুম ভুলে অস্বীকার করে ইনুর জাসদ হঠাত করে বঙ্গবন্ধু বন্ধবন্ধু বলে ঢলে পড়া শুরু করে দেয় ২০০৯ সালের সরকার গঠনের পর থেকে। এটা হল প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে ব্যক্তিগত ফয়দা বের করা। আর বিনিময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাসদের যেটুকু ইতিবাচক অবদান ছিল এর গায়ে কালি লাগিয়ে তাকে ধুলায় লুটায় দেয়া।
    তাই ঐ একই সময় থেকে গোপনে আর এক সমঝোতা হতে দেখা যায়। সেটা হল, খালেদ মোশারফের ক্যু এর ঘটনাকে কেন্দ্র করে। এই ঘটনা ১৯৭৫ সালের ২ ও ৩ নভেম্বরের মাঝের রাতে্। ১৯৭৫ এর নভেম্বরের পর থেকে ঐদিনের ঘটনা সম্পর্কে দল হিসাবে আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক অবস্থান ছিল,এটা এক ক্যু এর ঘটনা। আর এর নায়কদের সাথে আওয়ামী লীগের কোন ধরণের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা দায় ছিল বলে স্বীকৃতি না দেয়া । লীগ ২০০৯ সালের আগে পর্যন্ত এই অবস্থান থেকে সরে নাই। বরং আওয়ামী লীগ যে কোন ক্যু, ক্ষমতাদখল বা হত্যার রাজনীতির নীতিগত বিরোধী; “বেসামরিক সরকার” উচ্ছেদ করে “সামরিক সরকার” কায়েমের বিরোধী – এই ছিল আওয়ামী লীগের সাধারণ ও নীতিগত অবস্থান। ১৯৮১ সালে হাসিনা ভারত থেকে দেশে ফিরে এসে দলের সভাপতির হাল ধরার পরও এই অবস্থান বজায় ছিল। বরং খালেদ মোশারফের ক্যু এর ঘটনার প্রতি কোন বিশেষ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে তেসরা নভেম্বর (চার নেতার) “জেল হত্যা দিবস” প্রতিবছর পালন করে এসেছে আওয়ামি লীগ। এটাই লীগের দলীয় অবস্থান। বিপরীতে জাসদ খালেদ মোশারফের ক্যু এর ঘটনাকে ঘটনার পরের দিন থেকে নিজে দেখেছিল এবং লিফলেট ছড়িয়ে জনগণকে দেখিয়েছিল যে এই ক্যু আওয়ামী লীগ ও ভারতের সমর্থনের এক ক্ষমতা দখল। মনে রাখতে হবে, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তাহেরের পাল্টা ক্ষমতা দখলের পক্ষের লিফলেটে ন্যায্যতা টানার তাহেরের ভাষ্য ছিল সেটা। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ও ভারতের সমর্থনের এক সামরিক ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতেই তাহের পাল্টা “সিপাহি-জনতার ক্ষমতা দখলে” প্ররোচিত হয়েছেন। এই ছিল তাহেরের ক্ষমতা দখলের পক্ষে দেয়া সাফাই। এই অর্থে ৭ নভেম্বর সম্পর্কে জাসদের সোজা ব্যাখ্যা বয়ান হল, “৭ নভেম্বর হল, ভারতীয়-আওয়ামী ক্যু এর বিরুদ্ধে জাসদের প্রতিরোধ”। জাসদের এই বয়ান ২০০৮ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল। এবং বলাই বাহুল্য যে এই বয়ান আওয়ামীকে অভিযুক্ত করা বয়ান। অনুসন্ধিৎসু আগ্রহিরা এবিষয়ে ফলে একালেও এখান থেকে আওয়ামী লীগ ও জাসদের বয়ানের মিল খুজে আনা অসম্ভব।

    ২০০৯ সাল। এই দুই বিপরীত ভার্সনের বিরোধ নিরসন মিটমাটের গোপন সমঝোতায় নতুন কমন ভার্সন খুঁজার চেষ্টা শুরু হয় ২০০৯ সাল থেকে। সেই চেষ্টায় শেষে আসে “মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস” বলে চিহ্নিত করে আওয়ামী লীগের প্রপাগান্ডা কমিটিগুলোর পক্ষ থেকে ৩-৭ নভেম্বরের যে কোন দিনকে পালনের চেষ্টা করা হয়। একইভাবে জাসদও এমন মুল্যায়নেই পালন করতে চায় এবং করে; তবে কেবল ৭ নভেম্বরের দিনটা বাদ দিয়ে। কারণ ১৯৭৫ সাল থেকে জাসদ এটাকে সিপাই-জনতার অভ্যুত্থান দিবস হিসাবে পালন করে আসছে। যেটা আবার আওয়ামী লীগের পক্ষে একইভাবে অন্তত ৭ নভেম্বরকে পালন করা, মনে করা অসম্ভব। আওয়ামি লীগ ও জাসদের “মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস” নামে একটা কমন ভার্সান চালু করার পিছনের তাগিদ হল এই বয়ান হাজির করা যে জিয়াউর রহমান বা বিএনপি ঐ দিনগুলোতে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছে এই অভিযোগ তোলা, যাতে এসব বয়ান দিয়ে আওয়ামি লীগ ও জাসদের কমন শত্রু বিএনপির বিরুদ্ধে কামান দাগানো যায়। এটাই তাদের কমন এবং ২০০৯ সাল থেকে চালু করা নতুন মুল্যায়ন। এটা নিঃসন্দেহে এক প্রতিহিংসার রাজনীতি।
    কিন্তু এরপরেও এই কমন মুল্যায়ন যে সাধারণ যুক্তিবুদ্ধিতে সিদ্ধ,তালমিল আছে তা দেখানো যায় নাই। কারণ সত্য হল, ১৯৭৫ সালের আগষ্ট থেকে নভেম্বর এই সময়কালেও আওয়ামি লীগ ও জাসদ আগের মতনই পরস্পর পরস্পরের বিনাশ নিশ্চিহ্ন দেখতে চায় এমন দুই রাজনৈতিক দল ও শত্রু ছিল। ফলে এই শত্রুতাকে আজ ঢেকে আড়াল করে, তারা সেসময়ে “বন্ধু ছিল” বলে এমন কোন কমন বয়ান খুজে হাজির করা এককথায় বললে অসম্ভব। কারণ তাহলে জিয়াউর রহমানকে ২-৩ নভেম্বর ১৯৭৫ এর রাতে বন্দী করে খালেদ মোশারফের সামরিক ক্ষমতা দখলকে জায়েজ বলতে হবে যেটা -আওয়ামি লীগ ও জাসদ উভয়ের কেউই দাবি করতে রাজি হবে না। তাই এমন কোন কমন বয়ান খাড়া করা এককথায় অসম্ভব। তাতে আজকে তারা উভয়ে যতই বিএনপিকে তাদের কমন শত্রু মনে করে কামান দাগাতে চাক না কেন।
    প্রতিহিংসা সবসময়ই এক মারাত্মক ধ্বংসের কাজ, নেতিবাচক কাজ। মানুষের সম্ভাবনার অপব্যবহার। এরচেয়েও বড় বাজে ব্যাপার হল,ঐ প্রতিহিংসাকেই রাজনীতি করা বলে মনে করা। রাজনীতি বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টাই তবু এখন চলছে। প্রতিহিংসা বড়জোর কোন সাইকিক পেসেন্টের মনের ব্যক্তিগত জ্বালা মিটায় হয়ত। কিন্তু তাঁর রোগ ভাল হয় না তাতে। এছাড়া তবু এরপরেও তা রাজনীতি নয়।

    এভাবেই গত কয়েক বছর ধরে আমরা আওয়ামি লীগ-জাসদের প্রতিহিংসার আগুন দেখছিলাম। কিন্তু হঠাত করে গত এক মাসে তাতেও আবার ছন্দপতন দেখছি আমরা। হাসিনা নিজের মুখে বলেন নাই সত্য কিন্তু শেখ সেলিম অথবা মোহম্মদ হানিফ যারা দুজনেই শেখ হাসিনার ঘনিষ্ট আত্মীয় এরা ইনু জাসদের কাপড় খুলে দেবার চেষ্টা লক্ষ্য করার মত ছিল। এর এক সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে এমনঃ
    সম্প্রতি একটা বিষয়ে হাসিনার সরকারের বিগত দুবছরের অবস্থান পল্টি খেতে দেখা গেছে। শুরু হয়েছিল পুলিশের আইজি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মন্ত্রীসভা কমিটি আর সবশেষে খোদ প্রধানমন্ত্রী আর এরও পরে সংস্কৃতিসেবী রামেন্দ্র মজুমদার –এভাবে। আমরা দেখলাম হঠাত করে সবাই বলতে শুরু করলেন যে, – ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত দেয়া, ধর্মবিদ্বেষ ছড়ানো জাগানো এবং ঘৃণা ছড়ানোর কাজ করলে অন্যের মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়; ফলে এই লঙ্ঘন কেউ ঘটালে তাকে ১৪ বছরের সাজা দেয়া হবে। এমন পোল বদল, এটা আক্ষরিক অর্থেই নাস্তিকের আল্লাহর পথে ফিরে আসার মত ঘটনা। অথচ গত দুবছর ধরে সরকার এর উলটা নীতিই অনুসরণ করেছে। ব্লগার নামের উতপাতকারিদের অন্যের “মানবাধিকার লঙ্ঘনের” কাজকে সরকার সুরক্ষা দিয়ে গেছে। নবীকে অপমান করা ও কুৎসা রটনা করার কাজকে সেকুলারিজমের স্বাধীনতা চর্চা বলে প্রশ্রয় দিয়ে গেছে। আর এর প্রতিবাদকারিদেরকে “জঙ্গী আসছে” অথবা এগুলো “জঙ্গী ততপরতা” বলে দাবি করে তাদেরকে গুলি নির্যাতনের মুখোমুখি করা হয়েছে। আর একে কেন্দ্র করে সমাজে অস্বস্তিকর পোলারাইজেশন বিভেদ বিভক্তি চরমে পৌচেছে। সমাজের গাঠনিক তন্তু ভেঙ্গে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।

    কিন্তু সরকারের হঠাত এমন উল্টাপথে পিছটানের কারণ কী? তবে কী এটা সরকারের জনগণের প্রত্যক্ষ মুখোমুখি হওয়া অর্থাৎ ভোট চাইতে যাওয়া আসন্ন? এরই ইঙ্গিত?
    কে না জানে হাসিনার নির্বাচনে ভোট চাওয়ার রাজনীতি হল মাথায় কালো কাপড় বেধে তিনি ভোট চাইতে যান। আবার ক্ষমতাসীন হয়ে গেলে এবার সেকুলারিজমের নামে পাবলিক ন্যুইসেন্স করা লোকেদেরকে সুরক্ষার দেয়ার কাজে নামেন। একবার ক্ষমতাসীন হয়ে গেলে এসময় তাঁর ক্ষমতার ন্যায্যতার বয়ান যোগাড়ের জন্য তিনি ভর করতে চান তথাকথিত বাম প্রগতিশীলতার নস্টামির উপর। অথচ আবার নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়া যখন আসন্ন হয় তখন এই তথাকথিত বাম প্রগতিশীলতার সঙ্গ তিনি অসহ্য মনে করতে শুরু করেন,ভোটের রাজনীতিতে লায়াবিলিটি দায় মনে করেন।

    শেখ সেলিম অথবা মোহম্মদ হানিফ কি তাহলে হাসিনাকে সেই দায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছেন? সে ইঙ্গিত আরও খোলসা হওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে নানাদিকে নানাভাবে আর একটা প্রহসনের নির্বাচন আয়োজন কিভাবে করা যায় নানাদিকে সেসব কথাবার্তা উঠছে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

    [এই লেখাটা আগে অন্যদিগন্ত পত্রিকায় ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ছাপা হয়েছিল। এখানে আরও এডিট করে আবার ছাপা হল।]

  • চীনের বিশ্বব্যাংকঃ ঋণ বিতরণ শর্ত কেমন হতে যাচ্ছে

    চীনের বিশ্বব্যাংকঃ ঋণ বিতরণ শর্ত কেমন হতে যাচ্ছে

    গৌতম দাস
    ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-bO

    চীনের বিশ্বব্যাংক মানে “এশিয়ান ইনফ্রাষ্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক” (সংক্ষেপে এআইআইবি) এর কথা বলছি। আগামি বছর ২০১৬ এর শুরু থেকে এই ব্যাংক অফিস খুলে পাবলিকলি কার্যকর হবে বলে আমাদের জানাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ধরণের ব্যাংক মানে অবকাঠামো খাতে ঋণ দেয়ার এমন ব্যাংকের বিরুদ্ধে ক্রিটিক যারা তাদের প্রধান অভিযোগ হল এই ব্যাংক বিশাল বিশাল শর্তের জাল বিছায়,অহেতুক শর্ত দেয়,শর্তে বেধে ফেলে ইত্যাদি। এই ক্রিটিকদের একটা বড় অংশ হল, বাম এক্টিভিস্ট। তবে শর্ত দেয় বলেই এরা খারাপ এতটুকু বুঝ নেয়া ভুল হবে। কারণ যেকোন ধরণের ঋণদাতা তা সে পাড়ার মাহাজন হোক কিংবা কোন ব্যাংক অথবা বিশ্বব্যাংক যেই হোক শর্ত দেয় না এমন ঋণদাতা কেউ নাই। ফলে প্রশ্নটা কেবল শর্ত দেয় এখানে না। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বা বিশ্বপুজিবাদের বাজার নিরন্তর করতে রাখতে অথবা অন্য ভাষায় বললে,  বিশ্বপুঁজির বাজারে পুঁজির চাহিদাকে জিইয়ে রাখতেই বিশ্বব্যাংকের জন্ম, তার প্রতিটা সিদ্ধান্তের পিছনের কারণ। এদিকগুলো আমরা যত গভীরে বুঝব ততই সমস্ত সমালোচনা কেবল “শর্ত দেয়” – এর মধ্যে সীমিত করব না। কেন শর্ত গুলো এমন তা বুঝব। আর এসম্পর্কে বুঝ পরিস্কার থাকলে আমরা আমাদের স্বার্থ বুঝে শর্ত নিয়ে নিগোশিয়েশনের টেবিলে কথা বলতে শিখব। প্রাকটিক্যাল করণীয় প্রস্তাব করতে শিখব। যাই হোক, বিশ্বব্যাংকের ৭০ বছর শেষে এবার ইতোমধ্যে চীনের বিশ্বব্যাংকের যুগে আমরা পড়েছি।  ফলে স্বাভাবিক প্রশ্ন, এসব বিষয়ে এআইআইবি ব্যাংক কী বিশ্বব্যাংকের চেয়ে আলাদা কিছু হবে? কথাটা অন্যভাবে গুছিয়ে আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, এআইআইবি ব্যাংক এর অপারেশনাল ম্যানুয়াল বিশ্বব্যাংকের চেয়ে কতটা আলাদা হবে? অপারেশনাল ম্যানুয়ালের ড্রাফট নিয়ে কাজ চলছে। বিশ্বব্যাংক ও এডিবিতে আগে কাজ করতেন এমন প্রাক্তন কিছু কর্মীদেরকে নিয়োগ দিয়ে একটা দল গঠন করা হয়েছে যারা বিশ্বব্যাংক ও এডিবির ম্যানুয়ালগুলোর পুনর্মুল্যায়ন করতে বসেছেন, বিশেষ করে এর নিয়মের বিরুদ্ধে সমালোচনাগুলো মাথায় রেখে। উদ্দেশ্য পুরানা সমতুল্য প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক বা এডিবি এর চেয়ে এআইআইবি এর অপারেশনাল ম্যানুয়াল যেন তুলনামূলকভাবে কম সমালোচনার হয়। এটা খুব স্বাভাবিক যে এআইআইবি এর হবু ম্যানুয়াল কেমন হতে যাচ্ছে এনিয়ে বাজারে প্রচুর কৌতুহল তৈরি আছে। এপরিস্থিতিতে, এই কৌতুহল পূরণে আন্তর্জাতিক নিউজ এজেন্সী “রয়টার” গত পয়লা সেপ্টেম্বর এক এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট ছেপেছে। রিপোর্টটা এক্সক্লুসিভ অর্থাৎ কেবল তাঁরা একাই ছেপেছে এবং একই সঙ্গে এটা মুলত এক আনফিসিয়াল রিপোর্ট – অর্থাৎ এআইআইবি ব্যাংকের তরফে পাওয়া কোন অফিশিয়াল তথ্য এগুলো নয়। বরং অপারেশনাল ম্যানুয়াল খাড়া করার কাজের সঙ্গে জড়িত এমন চারজন গুরুত্বপুর্ণ সোর্সের বরাতে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লেখা। কিন্তু স্বভাবতই এসব সোর্স লোকেরা অফিসিয়ালি তাদের কাজের বিষয় নিয়ে মিডিয়াতে কথা বলার জন্য অনুমোদিত ব্যক্তি নয়।এই অর্থেও তাদের পরিচয় জনসমক্ষে লুকানো বলে তা আনফিসিয়াল। ঐ রিপোর্টে হবু ম্যানুয়ালের কিছু প্রসঙ্গে প্রকাশিত তথ্য নিয়ে এখন এখানে কথা বলব।

    শুরু করার আগে,একটা কথা মনে করিয়ে দেয়া ভাল যে, এআইআইবি ব্যাংকের উদ্যোক্তা সদস্যরাষ্ট্র হবার জন্য যখন স্বাক্ষর দেবার শেষ দিন এগিয়ে আসছিল সেসময় ঐ পুরা মাস জুড়ে আমেরিকা একরকম প্রকাশ্যেই ইচ্ছুক উদ্যোক্তা সদস্যরাষ্ট্রগুলোর উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল যাতে তারা এই উদ্যোগে সামিল না হয়। যেমন এই চাপ, কুটনৈতিক লবিইং  গুরুত্বপুর্ণ সদস্য অষ্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদির মত হবু সদস্যদেরকে বিভ্রান্ত ও থমকে দাঁড়িয়ে দ্বিধাগ্রস্থ করতে পেরেছিল। যদিও ইউরোপের বৃটেন ও জর্মানি লীড নিয়ে এআইআইবি ব্যাংকের উদ্যোক্তা সদস্য হয়ে তাতে তাদের যোগদানের সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর সব দ্বিধা বাধা হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ে বিলীন হয়ে যায়। নিসন্দেহে এটা আমেরিকার জন্য বিশাল কূটনৈতিক পরাজয়। আর এই পরাজয়ের পরেই কেবল আমেরিকা নিজের বাজে অবস্থানের কারণ ব্যাখ্যা করে নিজের মুখ রক্ষার চেষ্টা করেছিল। সেই ব্যাখ্যায় বলেছিল, হবু নতুন ব্যাংকের স্বচ্ছতা, ষ্টান্ডার্ড, পেশাদারীত্ব ও জবাবদিহিতায় এআইআইবি ব্যাংক আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে পারবে কি না তা নিয়ে আমেরিকার সংশয় আছে। তাই এমন আগাম কানকথা ছড়িয়ে বিয়ে ভেঙ্গে দেবার আচরণে আমেরিকা নাকি লিপ্ত হয়েছিল। আমেরিকার এই সাফাই এসব কথা চীন মনে রেখেছে,তা আমরা ধরে নিতে পারি। ফলে ম্যানুয়াল তৈরির এখনকার সময়ে এতে তা প্রতিফলিত হয় এমন এক জবাব চীন দিবে তাও আমরা ধরে নিতে পারি। এতে সমতুল্য দুই অবকাঠামো ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এক প্রতিদ্বন্দ্বীতার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশের মত দেশের দিক থেকে বিচারে যা সম্ভবত ইতিবাচক হবার কথা।

    রয়টারের রিপোর্টে সম্ভাব্য ম্যানুয়ালে কি থাকবে সেবিষয়ে বলা হয়েছে, প্রথমত, ঋণদানের ক্ষেত্রে এআইআইবির বেলায় এখানে নাকি সমতুল্য প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংকের চেয়ে কম শর্ত সংশ্লিষ্ট থাকবে। দ্বিতীয়ত, আইনগত দিক থেকে এআইআইবি এর নেয়া প্রজেক্ট স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে এবং যেকোন প্রজেক্টের সামাজিক ও পরিবেশতগত বিরূপ প্রভাব যেন সৃষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে সেগুলো নিশ্চিত করার পরই কেবল গ্রহণ করবে। তৃতীয়ত, অনেক সময় দেখা যায় যে ঋণ দেবার ক্ষেত্রে শর্ত থাকে যে, কিছু প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারিকরণ করতে হবে অথবা ওসব প্রতিষ্ঠানের উপর সরকারের কর্তৃত্ব নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে হবে। অথবা অনেক সময় দেখা যায় “মুক্তবাজার নীতি” বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের আগে থেকে তৈরি এক সাধারণ ম্যানুয়াল আছে – শর্ত হিসাবে তা মানতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। রয়টারের ঐ রিপোর্ট বলছে এআইআইবির বেলায় ‘বেসরকারিকরণ করতে হবে’ ধরনের শর্ত থাকবে না। এছাড়া সরকারের কর্তৃত্ব শিথিল করার শর্তও সম্ভবত থাকবে না। এছাড়া এমনিতেই মুক্তবাজার নীতি বলে সুনির্দিষ্ট কিছু আছে কিনা এর ব্যাপারে খোদ চীনেরই সন্দেহ আছে ফলে ম্যানুয়ালে এমন কথা প্রতিফলিত হবে না। বরং মুক্তবাজার নীতি বলে কিছু থাকবেনা বলে এসব প্রজেক্ট পরিচালনা তুলনামুলক সহজ হবে বলে এখানে বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন। এবিষয়ে বিস্তার করতে রিপোর্টে এক উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে, যেমন দেখা যায় কোন পানি সরবরাহ প্রকল্পে অর্থায়ন করতে গিয়ে পানির দাম বাড়ানোর শর্ত জুড়ে দেওয়া থাকে, বিশেষত অনেক সময় স্থানীয় পরিস্থিতি দাম বাড়ানোর জন্য উপযুক্ত কি না সে বিবেচনার দিকটা উপেক্ষা করেই তা করা হয়। এআইআইবির বেলায় তারা এসব দিক গভীর বিবেচনায় নিয়ে সতর্ক থাকবে, দরকার হলে ভিন্ন উৎস থেকে অর্থের সংস্থান,ভর্তুকি দেয়া ইত্যাদি বিকল্প বের করার চেষ্টা করবে, ইনোভেটিভ হবে। চতুর্থত, এআইআইবির বেলায় কয়েকটা ব্যাপারে নীতিগত অবস্থান তারা স্থির করেছে। যেমন, প্রজেক্ট দেরি করিয়ে দেওয়া বা মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখা, লাল ফিতায় আটকে রাখা তাঁরা অবশ্যই এড়িয়ে চলবে। একাজের সক্ষমতার জন্য তারা নিজস্ব “সহজ আভ্যন্তরীণ মুল্যায়ন” ও “আগাম রিস্ক অনুমানের ব্যবস্থার” বিষয়ক মেকানিজমের উপর নির্ভর করবে। পঞ্চমত, এআইআইবির বেলায় নিজ প্রতিষ্ঠান চালানোর খরচ একটা সীমার মধ্যে বেধে রাখার কথা তারা ভাবছে। সে জন্য ফিল্ড অফিস ছোট রাখা, মোট স্টাফ ৫০০-৬০০ জনের মধ্যে সীমিত রাখার পরিকল্পনা তারা করছে। আর সে মোতাবেক আকারের দিক থেকে এডিবির ছয়ভাগের একভাগ তারা কমাবে এবং বিশ্বব্যাংক পরিচালনা খরচের চেয়ে অন্তত ৫ পারসেন্ট কমাবে। স্বভাবতই এগুলো শুনতে ভালই লাগছে। তবে কতদুর কী বাস্তবে হবে দাঁড়াবে তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কারণ এগুলো কোনটাই অফিশিয়াল নয়।

    এআইআইবি ব্যাংক কী বাংলাদেশকে ঋণ দেয়ার যোগ্য ভাবতে পারবে
    অবকাঠামো খাতে ঋণে সুদের হার একটা গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। সেপ্রসঙ্গে বিস্তারে যাবার আগে, ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক নাকি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক – এই দুই ধরণের ব্যাংকের মধ্যে ফারাক কী? এনিয়ে কিছু কথা তুলব। এখানে অন্তত নামের ভিতর দিয়ে আপাত একটা ফারাক করতে দেখা যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে ডেভেলবমেন্ট বা উন্নয়ন শব্দটা একালে সমাজের সব স্তরেই বিশাল পরিচিত এক শব্দ হয়ে গেছে। অবস্থা এমন যে ডেভেলবমেন্ট নিজেই যেন বাংলা শব্দ হয়ে গেছে। কিন্তু শব্দটার অর্থ কি? কোথা থেকে কোন সুত্রে?
    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এটা গ্লোবাল অর্থনীতি বিষয়ের সাথে জড়িয়ে যাওয়া একটা শব্দ হয়েছে। সংক্ষেপে সারকথায় বললে, অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত্ব বা সঞ্চয় বলা হয় যেটাকে আর একদিক থেকে দেখলে এটাই নতুন বিনিয়োগ অর্থাৎ বিনিয়োগ সক্ষমতা। আর এই সক্ষমতাকে বাস্তব করে তুলতে গেলে প্রয়োজন বিনিয়োগের বাজা্রের ক্রেতা। শুধু তাই না প্রয়োজন হয় বিনিয়োগের বাজারকে যেন নিরন্তর বড় থেকে বড় দেখতে পাওয়া যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে, গ্লোবাল পুঁজি বাজারে নিরন্তর ক্রেতার চাহিদা হাজির দেখতে পাবার এক সহজ উপায় বের করা হয়েছিল। তা হল বিনিয়োগ সক্ষম পুঁজির কিছু অংশ খুবই কম সুদে, পারলে ব্রেক-ইভেনে বড় বড় প্রজেক্টে বিনিয়োগ করা। এটাই নতুন নতুন বিরাট পুঁজির চাহিদার বাজার তৈরি করবে। এভাবে সেই তৈরি বাজারের পুঁজির চাহিদা মিটানো মানে মুল পুঁজি বিনিয়োগ ব্যবসা – সুদ মুনাফার ব্যবসাটা আরামে করা সম্ভব।
    তো মোট বিনিয়োগ সক্ষমতার যে অংশ বাজার আরও বড় করে তৈরি বা হাজিরের উদ্দেশ্যে খুবই কম সুদে বড় প্রজেক্টে বিনিয়োগ করা হয় সেটাকে বলা হয় অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ। এই “অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ” লম্বা কথাটাকে ছেটে সংক্ষেপে বলা হয় ডেভেলবমেন্ট বা উন্নয়ন বলা হয়। তাহলে উপরের কথাগুলো সার করে আর একবার সংক্ষেপে কিছু বৈশিষ্ট আকারে চিহ্নিত করে বলা যাক।

    ১। সাধারণভাবে গ্লোবাল পুঁজির বিনিয়োগ বিষয়টা দুভাবে ঘটতে পারে বা ঘটে – ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অথবা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এর মাধ্যমে। ২। প্রথম ধরণের ব্যাংকের উদ্দেশ্য দ্বিতীয় ধরণের ব্যাংকের জন্য ক্রেতা চাহিদা তৈরি। যেন গ্লোবাল পুঁজি বাজারে নিরন্তর পুঁজি গ্রাহক পাওয়া যায় এমন পুঁজিবাজার তৈরি। অর্থাৎ প্রথমটা হল অবকাঠামো খাতে ঋণ দেবার ব্যাংক বা উন্নয়ন ব্যাংক। এই ব্যাংক খোলা মানে এর উদ্দেশ্য গ্লোবাল পুঁজিবাজারে পুঁজির চাহিদা বৃদ্ধির বা ক্রেতা বৃদ্ধির শর্ত তৈরির পক্ষে কাজ করা। ৩। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য অবকাঠামো ব্যাংক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে জন্ম দেওয়া ব্যাংক নয়। এটা তাই মুনাফার মোটিভ থেকে পরিচালন করা হয় না। তবে সর্বোচ্চ কম সুদে বা না-লাভ-না-ক্ষতি ভিত্তিতে ব্রেক ইভেনে এটা পরিচালনা করা হয়। কেবল অফিস পরিচালনা খরচটা তুলে আনার জন্য সার্ভিস চার্জ নেয়া হয়। অনেক সময় কিছু বিনিয়োগ লিল্লাহ বা অনুদানেও  একে দিতেই হয়।  কারণ অনেক সময় অবকাঠামো ঋণ নেবারও যোগ্য করে তুলতে তা দিতে হয়। এতে সবমিলিয়ে গড়ে মুনাফা না হোক কিন্তু আসল পুঁজি যেন কমে না যায় কেবল সেদিকে লক্ষ্য রাখলেই চলে। ৪। মুনাফা অর্জনের আসল জায়গা হল, গ্লোবাল পুঁজি বাজার – অর্থাৎ বিনিয়োগ ব্যাংক বা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক নামে যেখানে প্রতিষ্ঠান খুলে রাখা আছে। এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়েই পুঁজি বাজার। আর গ্লোবাল পুঁজি বাজার মাত্রই তা বাণিজ্যিক এবং মুনাফা এর উদ্দেশ্য। এর অধীনস্ত থাকে সমস্ত আরও নানান বাণিজ্যিক কায়কারবারি প্রতিষ্ঠান। ৫। আবার দেখা গেছে পোর্ট, ব্রীজ-রাস্তাঘাট, এনার্জি প্লান্ট, পানি সরবরাহ ও নিস্কাষণ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে অবকাঠামো ধরণের বিনিয়োগ করলে সে দেশের অর্থনীতিতে গতি আসে, অর্থনীতির সাইজ বড় হয় অর্থাৎ সে অর্থনীতিতে আরও পুঁজি পাওয়ার চাহিদা তৈরি হয়। এথেকে দুটা কথা আছে। পোর্ট, ব্রীজ-রাস্তাঘাট, এনার্জি প্লান্ট, পানি সরবরাহ ও নিস্কাষণ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে অবকাঠামো ধরণের বিনিয়োগ করে এসব ফল পাওয়া যায় বলে উলটা করে এসব খাতকেই অবকাঠামো খাত বলা হয়। আর দ্বিতীয়ত, ফলাফলে কার্যকরভাবে পুঁজি বিনিয়োগের চাহিদা তৈরি হয় কিন্তু সে বিনিয়োগ বাজারের ক্রেতা চাহিদা মিটায় (এবার এটা আর অবকাঠামো ব্যাংক নয়) বাণিজ্যিক বিনিয়োগ (ইনভেস্টমেন্ট) ব্যাংক। ঐ অর্থনীতি হয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এর ঋণখাতক বা ক্রেতা। সামগ্রিকভাবে গ্লোবাল পুঁজির ততপরতার দিক থেকে দেখলে কার্যকর মুনাফা কামানোর বিষয়টা কেবল এই ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক অংশে ঘটে।
    ৬। এই উদ্দেশ্যেই বাণিজ্যিক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের থেকে আলাদা করে ১৯৪৪ সালে বিশ্বব্যাংক নামে অবকাঠামো খাতে ব্যাংক খোলা হয়। আর প্রায় বিনা সুদে খোদ বিশ্বব্যাংককে এর আদি পুঁজি সরবরাহ করা হয়েছিল ওয়াল স্ট্রীট বা গ্লোবাল পুঁজি বাজার থেকে। ৭। ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক আর ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এর মধ্যে আর এক উল্লেখযোগ্য ফারাক হল, ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক মাত্রই তা রাষ্ট্রের মালিকানা ব্যাংক, সাধারণত একাধিক ফলে মাল্টি-ষ্ট্রেট বা বহু পক্ষীয়। কোন এক মুরুব্বিয়ানা রাষ্ট্রের নেতৃত্বে তবে বাকি সবাইকে অবশ্যই রাষ্ট্র হতে হয়। মাল্টি-রাষ্ট্রের বাইরে এর মালিকানা নাই। বিপরীতে ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক মাত্রই তা বাণিজ্যিক বিনিয়োগ ব্যাংক -এক বা একাধিক ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক।
    ৮। এই পয়েন্ট এটা সতর্কতামূলক, বিভ্রান্তি কাটানোর জন্য বলা পয়েন্ট । পোর্ট, ব্রীজ-রাস্তাঘাট, এনার্জি প্লান্ট, পানি সরবরাহ ও নিস্কাষণ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে বিনিয়োগ করতে দেখা মানেই এসব খাতে হলেও এগুলো অবকাঠামো বিনিয়োগ নাও হতে পারে। অথবা সেজন্য এগুলোকে অবকাঠামো খাত বলে বুঝতে হবে অথবা এগুলো কেবল বিশ্বব্যাংকেরই খাতক খাত – এভাবে কিছু ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে এমনটা সত্যি নাও হতে পারে। তাই অবকাঠামো বিনিয়োগ নাকি বাণিজ্যিক বিনিয়োগ তা বুঝাবুঝিতে বিভ্রান্তি এড়ানোর বেস্ট উপায় হল সুদের হারের দিকে লক্ষ্য করা; যে কোন বিনিয়োগ ঋণকে অবকাঠামো না বাণিজ্যিক বলে বুঝব এর মূল নির্ধারক হল সুদের হার। যদি দেখা যায় প্রায় বিনা-সুদ, এর মানে সেটা অবকাঠামো বিনিয়োগ অর্থাৎ অবকাঠামো ধরণের ব্যাংকের বিনিয়োগ। কোন খাতে বিনিয়োগ তা দেখে সেটা অবকাঠামো বিনিয়োগ বলে বুঝলে ভুল হতে পারে।

    তত্ত্বগত তথ্য দেয়া শেষ। চলতি গ্লোবাল পুঁজি বাজারের দুনিয়াতেই চীন এশিয়ান ইনফ্রাষ্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক নিয়ে হাজির হয়েছে। বলা হচ্ছে এই ব্যাংক বিশ্বব্যাংক ধরণের ব্যাংক; মানে অবকাঠামো বা ইনফ্রাষ্ট্রাকচার ধরণের ব্যাংক। কিন্তু চীনের ব্যাংকের নামের দিকে যদি তাকাই এর নামের মধ্যে দেখতে পাই “ইনফ্রাষ্ট্রাকচার” এবং “ইনভেস্টমেন্ট” দুটা শব্দই আছে। তবু আমরা বিভ্রান্ত না হয়ে এটাকে ‘ইনফ্রাষ্ট্রাকচার’ ব্যাংক বলেই বুঝব। অন্তত একটা কারণ যে, বলা হচ্ছে এটা বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য বা প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যাংক।

    কিন্তু রয়টারের রিপোর্টে এআইআইবি ব্যাংকের সুদের হার কি হতে যাচ্ছে সে প্রসঙ্গে দ্বৈত-অর্থ হয় এমন কথা লেখা হয়েছে। ওর গুমোর পাঠকের কাছে পরিস্কার করতেই উপরের লম্বা তত্ত্বগত তথ্য দিয়ে নিতে হল।
    “মাত্র ১০০ বিলিয়ন ডলারের ব্যাংক বলে এটা শিশু অবস্থায় গ্রাহকের ক্রেডিং রেটিং কেমন সেদিকে বেশি চোখ রেখে আগ্রহ ততপরতা দেখাবে। এর অর্থ খুব সতর্ক এপ্রোচে সে আগাবে। এর আরও অর্থ এটা বিনিয়োগ (ইনভেস্টমেন্ট) ব্যাংকের স্টাইলে আগাবে, কেবল বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক দেখা গেলেই সেসব প্রজেক্টে বিনিয়োগে আগাবে, যেখানে সম্ভব প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশীপে, তবে বাজারের সুদ হার চার্জ করবে যেটা সম্ভবত সমতুল্য বিশ্বব্যাংকের সুদহারের চেয়ে বেশি হবে”। এই বাক্যগুলো সরাসরি রয়টারের রিপোর্ট থেকে অনুবাদ করলাম।
    এখানে দুটা প্রসঙ্গ। বলা হয়েছে “বিনিয়োগ(ইনভেস্টমেন্ট) ব্যাংকের স্টাইলে আগাবে” আর “বাজারের সুদ হারে চার্জ করবে” কথা দুটোর মিলিত ইঙ্গিত আর সবশেষে স্পষ্ট করে বলা “সমতুল্য বিশ্বব্যাংকের সুদহারের চেয়ে বেশি” একথা থেকে একটা জিনিষ পরিস্কার – সেটা হল চীনের এআইআইবি ব্যাংক বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল সুদ হারে (০.৭৫%) ঋণ গ্রহিতা যেসব সদস্য রাষ্ট্র আছে (যেমন বাংলাদেশ) তাদের জন্য অবকাঠামো ব্যাংক হতে পারছে না। সম্ভবত ঋণদাতা হতে পারছে না। অর্থাৎ এই সুদ হারের গ্রাহক স্তরে (মানে বাংলাদেশের মত গ্রাহক স্তরে) এআইআইবি ব্যাংক বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হবে না। যেমন ফিলিপাইন, এই রাষ্ট্র বহু আগেই বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল সুদ হারে (০.৭৫%) ঋণ পাবার যোগ্য নয়। কারণ তার অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল। ফলে কনসেশনাল ক্যাটাগরির উর্ধে। অর্থাৎ বাংলাদেশের চেয়েও বেটার ক্যাটাগরির অর্থনীতির। এই স্তরের গ্রাহক রাষ্ট্রের সুদ হার সাধারণত ৪% বা এর বেশি হয়। এই বিচারে যেসব রাষ্ট্রের অর্থনীতি কনসেশনাল ক্যাটাগরির উর্ধে (৪% সুদ দেওয়ার যোগ্য) শুরুতে তাদের দিকে মনোযোগ দিয়ে এআইআইবি ব্যাংক নিজের কার্যকারিতা শুরু করতে পারে।

    সারকথায় রয়টারের (আনঅফিসিয়াল) রিপোর্টের ভাষ্য সত্যি হলে শুরুর পর্যায়ে বাংলাদেশ এআইআইবি ব্যাংক থেকে কোন ঋণ পাবার যোগ্য সম্ভবত বিবেচিত হবে না। তবে অবশ্যই পুরা অফিসিয়াল ভাষ্য না আসা পর্যন্ত আপাতত আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে।

  • “মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামাত-মুক্ত বিএনপির” রাজনীতি

    “মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামাত-মুক্ত বিএনপির” রাজনীতি
    গৌতম দাস
    ২৬ আগষ্ট ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-bf

    গত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। সে সফরের পর দেশের সরকার বা বিরোধী দল অথবা কোন বিদেশী কূটনীতিক কেউ দায়িত্ব নিয়ে বলেনি নরেন্দ্র মোদি কী মেসেজ রেখে গেলেন। কিন্তু কানাঘুষা,আর অনুষঙ্গী ঘটনাবলিতে ক্ষমতাসীনদের আচরণ বক্তব্য থেকে দিনে দিনে এটা স্পষ্ট হচ্ছে যে, মোদি-হাসিনা এবং মোদি-খালেদা আলোচনায় একটা নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার বিষয় ইস্যু হিসাবে উঠেছিল। অনুমানে ধরে নেয়া এই আলোচনার পক্ষে সাক্ষ্য দেয় এমন দু’টি শব্দ এরপর থেকে রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত হয়ে উঠতে দেখা যায় – “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি”। এই ব্যাপারটাকে উল্টো করে বলা যায় যে, “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” এই দু’টি বাক্য চালু হওয়া থেকে বোঝা যায় মোদির সফরে নির্বাচন বিষয়ে একটা ইস্যু সেখানে উঠেছিল। আর একটু স্পষ্ট করে বলা যায়, নির্বাচন বিষয়ে অনুমান করা ঐ আলাপের সারকথা সম্ভবত এরকম যে, “সকলকে নিয়ে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা দরকার কারণ রাজনৈতিক সঙ্কট এভাবে ফেলে রাখাটা আমাদের সবার জন্যই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে”। মোদির সফর- উত্তরকালে মোদির এই মেসেজের অর্থ কী অথবা কেমনে কী অর্থ দাঁড়িয়ে যায় সেসব সম্ভাবনার আগেই সম্ভবত শেখ হাসিনার সরকার এবং ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা নিজেই এর অর্থ নিজের মত করে সাজানো শুরু করে দেয়। সে অর্থটাই সম্ভবত “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” এই দু’টি বাক্য চালু করেছে। তবে এথেকে “মধ্যবর্তী নির্বাচন” কথাটার অর্থ কমবেশি সহজে বোঝা যায় কিন্তু “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” কথাগুলোর অর্থ তাৎপর্য কী?

    এখানে তামাশার দিকটা হল, বিএনপির রাজনীতি কেমন হবে জামায়াত ছাড়া না জামায়াত সহ এই শর্ত আওয়ামী লীগের মুখ থেকে আসছে। এক্ষেত্রে এমন একটা ভাব তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে যেন এখানে আওয়ামী লীগ দাতা আর বিএনপি গ্রহীতা। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিএনপির ক্ষমতাদাতা নয়। আওয়ামি লীগ নিজে বড়জোর নিজের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে আবার নিজের মত করে একটা নির্বাচন দিতে পারে, তাই নয় কি? কারণ এটা কারো না বুঝতে পারার কারণ নেই যে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে অনেক কিছু হয়ত দিতে পারে কিন্তু এর পরেও যা কখনই দিতে পারে না তা হল ক্ষমতা। আর যাই হোক, আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ক্ষমতাদাতা হতে পারে না। হওয়ার কথাও নয়।
    তবু এই সরল কথাটা আড়াল করে একটা ভাব ছড়ানো হয়েছে যেন এক শর্ত সাপেক্ষে ক্ষমতাসীন সরকার বিএনপির ক্ষমতাদাতা হতেও পারে। কি শর্তে? যে, বিএনপি যদি জামাতমুক্ত হয় তবে যেন সে লীগের কাছে থেকে ক্ষমতাও পেয়ে যেতে পারে! তাই আওয়ামি লীগ এখান থেকেই বিএনপিকে নির্দেশদাতা হবার ভান ধরেছে, বলছে যে জামাতমুক্ত হয়ে যাও তুমি!

    এ’এক সত্যি বিরাট তামশা। শুধু তাই না। এছারা এখানে এভাবে আর একটা ইঙ্গিত তৈরি করা হয়েছে যেন ৫ জানুয়ারিতে কোনো নির্বাচন না করা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ এর পক্ষে সাফাই দিচ্ছে এমন যেন নেহায়ত বাধ্য হয়ে ৫ জানুয়ারিতে কোনো নির্বাচন না করা সত্ত্বেও আওয়ামি লীগ নিজেকে বৈধ সরকার বলে দাবি করেছে। যেমন, লীগের হস্তক্ষেপ ছাড়া একটা ফেয়ার নির্বাচন হলে তাতে বিএনপি নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসে পড়লেও যেন আওয়ামী লীগের আপত্তি ছিল না,থাকত না। কিন্তু লীগের হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে এজন্য যে, ওই নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতযুক্ত থেকে যাবার কারণে সহযোগী জামায়াত ক্ষমতায় চলে আসবে আর কেবল ঠিক এখানেই আওয়ামী লীগের আপত্তি। জামাত ঠেকানোর মহান কর্তব্য সম্পন্ন করার জন্যই যেনবা জবরদস্তিতে আওয়ামি লীগ নির্বাচন না হতে দিয়েও নিজেকে নির্বাচিত দাবি করছে! তাই কী? আওয়ামী লীগের এমন সাফাই, এমন ইঙ্গিত অবশ্য কেউই বিশ্বাস করে না, এমনকি তারা নিজেরাও না। এটা যে ছলনামূলক মিথ্যা কথা, কেউ বিশ্বাস করবে না জেনেও মুখরক্ষার জন্য বলা কথা তা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সবাই জানে, মানে। তবু তাদের এই কথা বলা ছাড়া মুখরক্ষার সাফাই হিসেবে আর কিছু বলার নেই। এই হল, “জামাতমুক্ত বিএনপি দেখতে চাওয়া” আওয়ামি লীগের আবদারের সারকথা।
    তবে এ বিষয়ে আরও করুণ অবস্থা ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের। গত ৫ জানুয়ারি ২০১৪ নির্বাচনের আগের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেখানেও হবু নির্বাচনের পক্ষে শক্ত হয়ে দাঁড়ানো এবং এরশাদকেও হবু নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য যে যুক্তি তিনি এরশাদকে দিয়েছিলেন এরশাদের সাথে সুজাতার মিটিং শেষে তা গরম থাকতে থাকতেই এরশাদ নিজেই মিডিয়াকে স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন। সুজাতা সিং বলেছিলেন জামায়াত ক্ষমতায় এসে যাবে তা ঠেকানোটা এরশাদের আসল কাজ। মহান দায়িত্ত্ব। আর জামায়াত ঠেকাতে হবে সে জন্য এরশাদকে হাসিনার সাথে নির্বাচনে যেতে হবে। আর এই মহৎ কাজের জন্যই বিএনপি-জামায়াতকে বাইরে রাখার যে সুযোগ পাওয়া গেছে তা ব্যবহার করতে এরশাদের নির্বাচনে যেতে যেন দ্বিধা না করেন। সুজাতার যুক্তির সারকথা ছিল বাংলাদেশের ক্ষমতাকে “জামাতমুক্ত” দেখতে যাওয়ার খায়েশ। বুঝা যাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামি লীগকে ভোট না দিলেও জবরদস্তিতে লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চাওয়ার ভারতের ব্যকুলতা কত তীব্র ছিল যে একটা ভাল সাফাই যুক্তি যোগাড় করতে না পারলেও বাংলাদেশে এমন ন্যাংটা হস্তক্ষেপের পক্ষে কথা বলতে সুজাতা কত ডেসপারেট ছিলেন।
    সুজাতা সিং সেসময়ের ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের মধ্যে শীর্ষ কূটনীতিক। এই শীর্ষ কূটনীতিকের এটা নিঃসন্দেহে তার করুণ দুর্দশার চিত্র। তিনি তার হস্তক্ষেপের কাজকে,এরশাদের সাথে মিটিংয়ের বক্তব্যের স্বপক্ষে পাবলিকলি কোন সাফাই হাজির করতে পারেন নাই। এর ফলে তাঁর কথা হয়ে গেছে এমন যে, বাংলাদেশের মানুষ যদি চায়ও বিএনপি-জামায়াতকে ভোট দেবে, নিজেদের প্রতিনিধি বলে নির্বাচন করবে তবু সুজাতার ভারত তা হতে দিতে পারে না। আচ্ছা, এটা কি কোনো অতিথি পররাষ্ট্র সচিব বলতে পারেন? সেটা কি বাংলাদেশের জনগণ কাকে নির্বাচন করবে, নেতা প্রতিনিধি মানবে এর বিরুদ্ধে সুজাতার সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং বাধা দেয়ার সফর ছিলো না? সম্ভবত সে জন্য এর পর থেকে তিনি আর কখনো বাংলাদেশে মিডিয়ার মুখোমুখি হননি।
    সেই থেকে এবারও ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের একই দুর্দশা দেখা যাচ্ছে। তারা তাদের বক্তব্যের পক্ষে এবারও র‍্যাশানালিটি বা যুক্তি-বুদ্ধি হাজির করতে পারছে না। তাদের সব যুক্তির প্রধান কথা সবসময় যা থাকে তা হচ্ছে, বাংলাদেশের “ইসলামি সন্ত্রাসবাদ বা তাদের উত্থান” – এই বিষয়ে তারা উদ্বিগ্ন। খুবই ভালো কথা। ফ্যাকটস হিসেবে ভারতের এমন উদ্বিগ্নতার পক্ষে সত্যতা আছে কি না সে তর্ক না তুলেই ভারতের উদ্বিগ্নতা স্বীকার করে নেয়া যাক।
    কিন্তু সে জন্য তারা বাংলাদেশের জনগণ কাকে ভোট দেবে তা কি ঠিক করে দিতে পারে? একটা হস্তক্ষেপের নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়াতে পারে? জনগণ কোন দলকে কোন নেতাকে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা তাতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে? ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের পছন্দের দল ও নেতার পক্ষে যদি জনমত না থাকে,তাদের পছন্দের নেত্রীর পাবলিক রেটিং যদি না থাকে তারপরও কি তাদের জিতিয়ে আনার পক্ষে কিছু করার সুযোগ থাকে?
    আমরা এখানে খুবই সাধারণ একটা প্রশ্ন তুলেছি। প্রশ্নটা হলো, ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের পছন্দের দল ও নেতার পক্ষে যদি জনমত না থাকে, নেত্রীর নিজ গুণেই যদি নিজেদের পাবলিক রেটিং ধরে রাখতে না পারেন, না থাকে তাহলে কি তারা বাংলাদেশে একটা হস্তক্ষেপবিহীন নির্বাচন হতে দেবে না? এসব বিষয় মোটেও কোনো বিশাল কিছু নয়। এসব প্রশ্ন তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ১৯৪১ সালে রুজভেল্ট-চার্চিলের বিখ্যাত আটলান্টা চার্টারে সমাধা হয়ে গেছে, সেকালেই। এটা এখনও যারা মানতে পারে না তারা নিশ্চয় এখনো কলোনি শাসনের পক্ষের লোক। অথচ সে সময়ই এটা দুনিয়াতে সমাধা হয়ে গেছিল যে, জনগণকে পছন্দের নেতা প্রতিনিধি নির্বাচন করতে না দেয়া, নেতা বেছে নিতে না দেয়া মারাত্মক অপরাধ। অন্য রাষ্ট্রের এমন কাজের কোনো অধিকারই নেই। ভিন রাষ্ট্র বা পড়শি রাষ্ট্র প্রতিবেশী দেশের নির্বাচিত কোনো নেতাকে বড় জোর প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু কোন নেতাকে নির্বাচিত হতে,বেছে নিতে জনগণকে কোনোক্রমেই বাধা দিতে পারে না। ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের একালে এমন অধপতিত দশায় পড়তে হয়েছে যে তারা প্রত্যক্ষ বাধা দিচ্ছেন। আবার তাদের কাজের পক্ষে যুক্তিবুদ্ধি সাজিয়েও দাঁড়াতে পারছেন না। খোলাখুলি হাসিনার গায়ের জোরের পক্ষে গিয়ে দাঁড়াতে হচ্ছে।
    তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গোড়ার সঙ্কট হলো, হাসিনার আওয়ামী লীগ পাবলিক রেটিং নেই। অথচ ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা সেই হাসিনার ওপর সব বাজি ধরে বসতে চান। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন একটা করিয়ে নিয়েছেন,কিন্তু শান্তি নেই। নতুন নির্বাচনের প্রয়োজন এটা এখন স্বীকার না করে পারছেন না। রা নির্বাচন না দিলে আরো বড় বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। ঘটনা পরিস্থিতি সেক্ষেত্রে হাতছুট হয়ে যেতে পারে সে সম্ভাবনার রিস্ক নিতে হবে।
    তাই লজ্জার মাথা খেয়ে আওয়ামী লীগ নিজেকেই মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামায়াতমুক্ত বিএনপির কথা পাড়তে হচ্ছে। অথচ বুঝতে চাইছেন না যে আওয়ামী লীগের মুখ দিয়ে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপির’ শর্ত আওড়ানোর কোনো মানে হয় না। কারণ এর মানে কী বিএনপি জামায়াতমুক্ত হলে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ক্ষমতা দেবে? ক্ষমতায় এনে দিবে? আর বিএনপি যদি জামাতমুক্ত না হয় তাহলে লীগ কোন ফেয়ার বা হস্তক্ষেপহীন নির্বাচন হতে দিবে না? এটাই কী ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের অবস্থান বক্তব্যের স্বপক্ষে যুক্তি? ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ কথাটার পক্ষে সাফাই?

    অন্য আর একদিক থেকে বললে, জামায়াতমুক্ত বিএনপির বাসনা অবশ্য আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের থাকতেই পারে – যদি সেটা তাদের বাসনা মাত্র হয়। কারণ আইনগতভাবে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’র শর্ত আরোপ করতে পারে জনগণ অনুসমর্থিত কনস্টিটিউশনাল একটা রেফারেন্ডাম। দেশের ভিতর কে কেমন পার্টি হবে এটা বিএনপির আওয়ামী লীগের উপর কিংবা আওয়ামী লীগের বিএনপির উপর আরোপ করার বিষয় নয়। ঠিক যেমন বিএনপি আওয়ামী লীগকে বা ভাইসভারসা কেউ কাউকে ক্ষমতায় আনতে পারে না,এমনটা অবাস্তব ঠিক তেমনই শর্ত দিতে কিংবা শর্ত পূরণ করলে তবেই অন্যকে ক্ষমতায় আনব এটাও অবাস্তব। অর্থহীন কথাবার্তা। এ ছাড়াও মনে রাখতে হবে এ বিষয়ে কথা বলার দিক থেকে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা কেউ না, কোনো পার্টিই নয়।
    এ কারণে বিএনপির কোনো নেতা অথবা কোনো সুশীল বুদ্ধিজীবী অথবা প্রথম আলোর উপসম্পাদকের মতো কোনো মিডিয়া কর্মী যখন এমন কথা ছড়ায় যে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ হতে হবে এটা হাস্যকর। অবাস্তব। এক্ষেত্রে তারা অবশ্যই আদতে আওয়ামী কর্মী না হলে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দার স্বার্থ পালনকারী।

    এখানে বলে রাখা ভাল, আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা “জামায়াতমুক্ত” অথবা “জামায়াত বিরোধিতা” এমন কথা বলে বা লিখে কেবল জামায়াত রাজনৈতিক দলকে বুঝায় না। তারা আসলে বুঝাতে চায় যেকোনো ইসলামি রাজনীতি বা রাজনীতির সমর্থক; এক কথায় বললে ইসলামি ফেনোমেনা বা পুরা ইসলামি কনস্টিটুয়েন্সি। এখন আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা তারা সবাই আসলে বুঝাতে চায় তারা বাংলাদেশে কোনো ইসলামিক রাজনৈতিক অভিপ্রকাশ, রাজনীতিতে কোনো ইসলামি ফেনোমেনা তারা দেখতে চায় না। যদি তাদের চাওয়াটা ন্যায্য বলে ধরেও নেই তবু এটা বাস্তবায়ন করার উপায় লীগ-বিএনপির এক দল অপর দলকে শর্ত দেয়া নয় বরং জনসমর্থিত (রেফারেন্ডাম বা তুল্য কোনো কিছুর মাধ্যমে) এমন একটা কনস্টিটিউশন হাজির করে তা নিশ্চিত করা। কারণ এক দল অন্য দলকে ক্ষমতায় আনার কেউ নয়। কোন রাজনীতি কে করতে পারবে তা একে অপরকে ডিকটেক্ট করার তারা পরস্পরকে বলার কেউ নয়।
    আবার বাংলাদেশে কোনো “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতি থাকতে পারবে না” আর বাংলাদেশে কোনো “ইসলামিক রাজনৈতিক অভিপ্রকাশ,রাজনীতিতে কোনো ইসলামি ফেনোমেনা থাকতে পারবে না” বলা এক কথা নয়। প্রথম বক্তব্যটা কনস্টিটিউশনে বলার পরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকতে পারে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু দ্বিতীয় বক্তব্যটার বেলায় ইসলামি নাম নিয়ে আইনত কিছুই থাকতে পারবে না। তবে অবশ্যই নাম না নিয়েও তা থেকে যাবে। কারণ আইন করে একটা রাজনৈতিক চিন্তাকে স্তব্ধ করা যায় না। আবার প্রথম কথাটা পড়শি ভারতসহ যেকোনো বিদেশী আশা করতে পারবে। মানে “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির” বিরুদ্ধে বলতে পারবে, আশা করতে পারবে। কিন্তু এরপরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকলে তা নিয়ে বলার ক্ষেত্রে বিদেশীরা কিছু বলার কেউ নয়।
    আমাদের এখানকার প্রসঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওপরের শেষ বাক্যটা। অর্থাৎ ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ বলে কিছু হবে কি না এ নিয়ে ভারতের কিছু বলার নেই। ভারত বলার কেউ নয়। ‘সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতি থাকতে পারবে না’ এমন ধরনের কথা বাংলাদেশের কনস্টিটিউশনে বলার পরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকতে পারে কোনো অসুবিধা নেই। আর এ নিয়ে ভারতের কথা বলার কোনো সুযোগ নেই।
    কিন্তু এসব আইনি সাংবিধানিক কাজের দিক দিয়ে না এগিয়ে আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের মুখ দিয়ে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপির’ কথা বলানো খুবই বিপজ্জনক। কারণ একটা কথা মনে রাখতে হবে, বাস্তবতা হলো, “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির” বিরুদ্ধে মেজরিটি মানুষের একটা কনসেনসাস জনমত আছে। জনমত জরিপেও সেটা প্রতিফলিত হবে। কিন্তু যদি বলা যায় “কোনো ইসলামি রাজনৈতিক দলই বা ফেনোমেনাই বাংলাদেশে থাকতে পারবে না” সে ক্ষেত্রে দেখা যাবে এই একই জনগোষ্ঠী বা জনমতের মেজরিটি উল্টো রায় দেবে। শুধু তাই নয়,চাপাচাপি করতে যাওয়ার জন্য নিজের দেশ ভূমি জমিতে ‘সন্ত্রাসবাদ’ দেখতে চায় না এর সপক্ষের মেজরিটির ঐকমত্যের জনমতটাও এরপর আর থাকবে না। হত্যা করা হবে।
    এ ছাড়া একটা কথা সুনির্দিষ্ট করে বলার সময় হয়েছে যে বাংলাদেশে ‘সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির’ হতে পারে বা থাকতে পারে এটা ভারতের স্বার্থের বা উদ্বিগ্নতার বিষয় নয়। ভারত বরং এসব বিষয়ে তত সিরিয়াস নয়। বিষয়টাও তত সিরিয়াস নয়। রাষ্ট্রের রুটিন তৎপরতাতে সেসব দিক নিয়ন্ত্রণ করে রাখা সম্ভব এবং তাই হচ্ছেই। বরং ভারতের সিরিয়াস প্রসঙ্গ হলো, ক. বিনা শুল্কে, বিনা বিনিয়োগে, বিনিয়োগের দায় না নিয়ে ট্রানজিট হাসিল করা খ. বাংলাদেশ চীনের সাথে অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সম্পর্কে কতটা পক্ষে বা দূরে থাকবে তা বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থে নির্ধারণ করার বদলে ভারতের স্বার্থে নির্ধারণ করতে বাধ্য করা। ভারত তার নিরাপত্তার উদ্বিগ্নতার কথা বলে এর আড়ালে এসব অর্থনৈতিক রাজনৈতিক স্বার্থ বাংলাদেশ থেকে হাসিল করতে জবরদস্তি করে চলছে। এ কাজে কোনো পাবলিক রেটিংয়ে দুর্বল রাজনৈতিক দলই তার জন্য বেশি উপযুক্ত। কারণ যত জনসমর্থন বেশি ভারতের কথা তত সে শুনবে না।

    দুই.
    গত এক সপ্তাহে খালেদা জিয়ার কথিত এক মন্তব্যকে নিয়ে দু’টি প্রপাগান্ডা রিপোর্ট বের হয়েছে। প্রথমটি ভারতের ‘দি হিন্দু’ (THE HINDU) পত্রিকার খোদ সম্পাদকীয়। দ্বিতীয়টি স্টাটফোর (STRATFOR) নামে আমেরিকান গোয়েন্দা ইনটেলিজেন্স পত্রিকার এনালাইসিস রিপোর্ট। দু’টি রিপোর্টের প্রসঙ্গ একই এবং এটা পরিষ্কার যে, ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের প্রভাবে এই রিপোর্ট দু’টি তৈরি। বাংলাদেশে তারা যে অবস্থান বা নীতিতে পরিচালিত সেই নীতির পক্ষে এ দুটোই প্রপাগান্ডা রিপোর্ট। হিন্দু সম্পাদকীয় বের হয়েছে ২৮ জুলাই আর স্টাটফোরেরটা বের হয়েছে ৩০ জুলাই। দু’টি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ‘খালেদা জিয়া নাকি নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসেছেন। ফলে তাতে নাকি বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।’

    হিন্দু দাবি করছে, ‘BNP’s decision to drop its demand for the formation of a caretaker government। আর স্টাটফোর দাবি করছে, Khaleda Zia has indicated that parts of the opposition might be willing to drop some of their demands — such as imposing a neutral caretaker government to oversee elections.
    প্রথমত তথ্য হিসেবে এটা মিথ্যা যে, খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ছেড়ে দিয়েছেন, বা সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত ২৫ জুলাই খালেদা জিয়া তার গুলশানের অফিসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইনজীবীদের সাথে সাক্ষাতের সময় নাকি এ কথা বলেছেন। বিডিনিউজ২৪ পত্রিকার রাজনৈতিক লাইন বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক লাইনের সবচেয়ে কাছাকাছি। ফলে এখানে পর্যবেক্ষণ হল, সরকার আর ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের কমন অবস্থানটাই সবচেয়ে ভালো প্রতিফলিত হয় এই পত্রিকার রিপোর্টে। সেই বিডিনিউজ ঐদিনের প্রসঙ্গে খালেদার কথা কী বুঝেছে তা দেখা যাক। বিডিনিউজ২৪ ইংরাজী শিরোনাম করেছে, Khaleda says fairness is the key, caretaker or no caretaker’। আর ভেতরে কোট আনকোট লিখছে, ‘It is not necessary that elections should be under a caretaker government. Whatever it is called, we want a neutral government to ensure free and fair elections’। এতটুকু পড়ে যে কারো নিশ্চিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট যে, খালেদা কেয়ারটেকারের দাবি ত্যাগ করেছেন এমন বুঝ এখান থেকে বের করার সুযোগ নেই। কারণ সারকথা হলো, খালেদা জিয়া ‘কেয়ারটেকার’ শব্দ নিয়ে আঁকড়ে বসে থেকে ঝোলাঝুলি না করে ‘হস্তক্ষেপবিহীন নির্বাচন’ দাবি তার মূল কথা এটাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। অর্থাৎ বিডিনিউজ অন্তত ভুল বা উল্টো বোঝেনি। তবু হিন্দু আর স্টাটফোর বুঝেছে।
    তবু কি আর করা যাবে এবার তাদের বোঝার যুক্তিবুদ্ধি বা লজিকটা কী তা পরখ করা যাক।

    খালেদা জিয়া কেয়ারটেকার দাবিটা যদি ত্যাগ করেই থাকেন তো সেটা ইতিবাচক বা তার মধ্যে আশার আলো দেখার কি আছে?
    গত দু-তিন বছরে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনগুলোর ন্যূনতম ফেয়ারনেস বা গ্রহণযোগ্যতা প্রসঙ্গে যদি এই দুই মিডিয়া রিপোর্টারের ধারণা না থাকে তবে বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের এমন সম্পাদকীয় বা বিশেষণ লেখার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সুতরাং ধরে নিতে হবে শেখ হাসিনার অধীনে যেকোনো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার গুরুতর সঙ্কট যে আছে এটা তারা জানেন। আর কে না জানে হাসিনার অধীনে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নেই এ জন্য নয় যে বিরোধীরা তাতে অংশগ্রহণ করেনি। অংশগ্রহণ করলেও সেখানে আরো মারাত্মক সঙ্কট আছে। সর্বশেষ ঢাকা সিটি নির্বাচন এর সাক্ষী যেখানে খোদ খালেদার গাড়িতে নিয়মিত আক্রমণ করতেও শেখ হাসিনা দ্বিধা করেনি। ভোট কারচুপির ডেস্পারেটনেস দেখার মতো। তাহলে এ অবস্থায় খালেদা কেয়ারটেকারের দাবি ছেড়ে দিয়েছে সুতরাং এটা ভালো খবর হিসেবে উদযাপন করা উচিত, তাই কী? তার মানে এই পত্রিকা দু’টি একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হওয়াটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না, গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন খালেদার কথিত কেয়ারটেকারের দাবি ছেড়ে দেয়া, এটাকে আবার তাদের ভালো এক ‘আপসরফাও’ মনে হয়।

    পত্রিকায় রিপোর্ট লিখতে গেলে ন্যূনতম কিছু এথিকসের ওপর দাঁড়াতেই হয়। একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে সব পত্রিকা দাঁড়াবে এটাও তো স্বাভাবিক। আমরা এখানে দেখছি পত্রিকা দুটো বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়ানো দরকার মনে করছে না। এর চেয়ে বরং না করে কথিত আপসরফা করে ফেললে আমাদেরকে খুশি হতে তাগিদ দিচ্ছে। পত্রিকা দুটো নিজেরাও দেখা যাচ্ছে এ খবরে খুশি হয়েছে। নির্বাচনটা এখন বিশ্বাসযোগ্য না হলেই বরং এই দুই পত্রিকা খুশি দেখা যাচ্ছে। এ কেমন খুশি? কেমন এথিকসবোধ?

    স্টাটফোরের নামে সম্প্রতিকালে দাগ লেগেছে। সম্প্রতি উইকিলিকস সিআইএর সাথে তাদের অনৈতিক যোগাযোগের ফাইল ফাঁস করে দিয়েছে। নইলে এর আগে এটা যথেষ্ট সম্মানজনক পত্রিকা ছিল। কিন্তু ‘হি্ন্দু’ (১৮৭৮ থেকে প্রকাশিত) মাদ্রাজ থেকে বের হওয়া প্রায় দেড় শ’ বছরের পুরানো ইংরেজি পত্রিকা। যেকোনো পত্রিকা তার দেশে-বিদেশের রিপোর্ট করতে গিয়ে তার সরকারের অবস্থান তাকে কাঁধে করে ঘুরতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, যদি না মনিকাঞ্চন বা অনুগ্রহ লাভের কোনো ব্যাপার না থাকে। এ ছাড়া এটা সম্ভবও নয়। কারণ সরকার অনেক সময় অনেক অবস্থান নেয় অনেক কারণে, অনেক স্বার্থে। এর সবগুলো সবসময় ওই পত্রিকারও স্বার্থ হবে এমন কোনো কারণ নেই। বরং না হওয়াই স্বাভাবিক। যেমন নিজের দেড় শ’ বছরের ইমেজ রাখার স্বার্থ আর আমলা-গোয়েন্দা বাহিনীর প্রপাগান্ডা রিপোর্ট এই দুই স্বার্থ স্ববিরোধী হতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে তা আত্মঘাতী হয়েছে।

    এক বিচারে ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা সফল যে তারা দুটো পত্রিকাকে তাদের প্রপাগান্ডায় শামিল করতে পেরেছে। এতে পত্রিকা দুটো যে এথিক্যাল সঙ্কটে জড়িয়ে গেছে এর দায় ক্ষতি তাদের নিজেদেরই বহন করতে হবে। তবে স্টাটফোর আবার হিন্দুর থেকে এককাঠি সরেস। স্টাটফোর দাবি করছে শেখ হাসিনা নাকি গত দু-তিন বছরে যা করেছেন এটা নাকি বিরোধী দল দমন নয়, সন্ত্রাসবাদ দমন। তাই যদি হয় তাহলে আবার খালেদার সাথে আলোচনা, কম্প্রোমাইজ এসবের মানে কি? যে সন্ত্রাসী তার সাথে আবার আলোচনা নিগোশিয়েশন কম্প্রোমাইজ কি হতে পারে? তাকে তো দমন ও নির্মূল করারই কথা। এই প্রশ্ন দেখা যাচ্ছে স্টাটফোরের মাথায় আসেনি। এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে একটা স্পেস ভাড়া দেয়ার রিপোর্ট তারা করছে এটা তাদের কাছেও পরিষ্কার।

    তাহলে, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামায়াতমুক্ত বিএনপি’র রাজনীতির অর্থ হলো এক আকাক্সক্ষা যে আশা করছে বিএনপি যেমন-তেমন এক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে আওয়ামী লীগকে পুনর্বার যেভাবে হোক বিজয়ী ঘোষণা করে দেয়ার জন্য। মানুষের আকাঙ্খার রকমফেরের আসলে কোনো শেষ নেই।

    [লেখাটার প্রথম ভার্সান সংক্ষিপ্ত আকারে আগে ছাপা হয়েছিল গত ০৯ আগষ্ট ২০১৫, মাসিক অন্যদিগন্ত পত্রিকায়। এখানে আবার নতুন করে লিখে, এডিট করে ছাপা হল।]

  • আসলে সে গ্রহীতা অথচ দাতার গুরুত্ব পাওয়ার জিদ ধরেছে

    আসলে সে গ্রহীতা অথচ দাতার গুরুত্ব পাওয়ার জিদ ধরেছে

    গৌতম দাস
    ২৩ আগস্ট ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-bb

    ব্রিকস (BRICS) ব্যাংক উদ্যোক্তাদের এবছরের বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত মাস ২০১৫ জুলাইয়ের ৯ ও ১০ তারিখে রাশিয়ার উফা শহরে। আমেরিকার নেতৃত্বে চলতি গ্লোবাল অর্থনীতি বা বিশ্বব্যাপী সক্রিয় পুঁজিতান্ত্রিক গ্লোবাল ব্যবস্থার ওপর ব্রিকস সদস্য অর্থে নিজেদের কর্তৃত্ব বাড়ানোর ও পালটা নেতৃত্ব কায়েমের লক্ষ্যে পাঁচ ‘রাইজিং ইকোনমি’র উদ্যোগে গঠিত সংগঠনের নাম ব্রিকস। ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকা এভাবে প্রত্যেক রাষ্ট্রের ইংরেজি নামের আদ্যক্ষর থেকে এ নামকরণ। কিন্তু এর লক্ষ্য অনুসারে এপর্যন্ত কাজে তেমন অগ্রগতি ঘটেনি; বরং প্রয়োজনীয় মাত্রার সক্রিয়তার অভাবে বিরাট গ্যাপ আছে সত্য; কিন্তু জন্মের (২০০৯) পর থেকে ব্রিকস প্রতি বছর নিয়মিত তাদের বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন করে যাচ্ছে। ব্রিকস এবার সাত বছরে পড়ল। সে তুলনায় চীনের নেতৃত্বে পালটা বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ (AIIB, এআইআইবি) উদ্যোগ আইডিয়া হাজির করার পরে মাত্র ২ বছরেই প্রায় কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে হাজির হয়ে গেছে। আগামী বছর থেকে এ ব্যাংক পুরোদমে অপারেশনাল হয়ে যাবে। এআইআইবি (AIIB) ব্যাংক অবকাঠামো খাতে ঋণ দেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান।
    বলা যায়, ৭ বছর ধরে ব্রিকস নিয়ে চীনের নানান চেষ্টা চরিত্রের পরও অগ্রগতি কাঙ্খিত পর্যায়ে না পৌঁছানোর কারণে চীন হঠাৎ ব্রিকসের বাইরের বন্ধুদের সামনে আলাদা করে এআইআইবি ব্যাংক গড়ার প্রস্তাব হাজির করেছিল; এবং ২ বছর শেষ হওয়ার আগেই বাস্তবায়নের দিকে চলে যায়। ব্রিকস নিয়ে নানা বাধা তৈরি ও ওজর-আপত্তি তুলে ব্যাংকটিকে কার্যকর করার কাজ ধীরগতি করার পেছনে ভারতের অবদান বেশি। এর পিছনে ভারতের নীতি নির্ধারক দ্বিধা ও থিঙ্ক-ট্যাংক জাতীয় পরামর্শকদের ভুল পরামর্শ ও বিভ্রান্তি এবং সর্বপরি ভারতের নিজের সম্পর্কে অতি-মুল্যায়ন এবং আমেরিকান-পো ধরার চেষ্টা, আমেরিকান প্রভাব ইত্যাদি দায়ী। এ প্রসঙ্গে দুইটি প্রশ্ন নিয়ে এখানে আলোচনা করব। এক. ভারতের ওজর-আপত্তির অজুহাতগুলো কী ধরনের এবং কেন? ভারত কেন ব্রিকসের প্রশ্নে ওজর-আপত্তির পথে হাঁটছে কিংবা ব্যাংকটিকে এখনও নিজের জন্য প্রয়োজনীয় ও সঠিক মনে করছে না- এসব নিয়ে আলোচনা করা। কথাগুলো ব্রিকস বাস্তবায়নের পথের সমস্যা শিরোনাম দিয়েও আলোচনা করা। দুই. এআইআইবি ব্যাংক অপারেশনাল করার জন্য গঠন কাঠামো, আর্টিকেল অনুমোদন সম্পন্ন হয়ে গেছে; অর্থাৎ এআইআইবি ব্যাংক অবকাঠামো খাতে ঋণ দেয়ার ব্যাংক হিসেবে চালু করার পর্যায়ে চলে যাওয়ার পরও এবারের ব্রিকস সম্মেলন আরেক অবকাঠামো ব্যাংক, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা সংক্ষেপে এনডিবি (NDB) চালু করার সিদ্ধান্ত নিল কেন? অর্থাৎ একসাথে দুদুটো অবকাঠামো ব্যাংক উদ্যোগ কেন?

    আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থার ৭০ বছর
    দুনিয়ায় পুঁজিতন্ত্রের বয়স প্রায় ৫০০ বছর। এ সময়ের মধ্যেই এর উত্থান, আন্তঃসম্পর্কিতভাবে দুনিয়াব্যাপী বিস্তার এবং পুঁজির অন্তর্নিহিত লজিক অনুযায়ী বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বর্তমানে এটা গ্লোবাল ফেনোমেনা হয়ে হাজির হয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই ৫০০ বছরের মধ্যে চলতি শেষ পর্যায়ের মাত্র ৭০ বছর বাদ দিলে বাকি আগের পুরো সময়টাতে (১৯৪৪ সালের আগের প্রায় ৪৩০ বছর কাল পর্যন্ত) ব্যাংক বা টাকার ব্যবসার উত্থান ও বিকাশ ঘটেছে তথাকথিত প্রাইভেট সেক্টরে, রাষ্ট্রের মালিকানার বাইরে। অর্থাৎ জন্মের শুরু থেকে ক্যাপিটালিজম কলোনি যুগের বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ বা সহায়তা ছাড়া চলতে সক্ষম হয়েছিল। ক্যাপিটালিজমের কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও ছিল না। শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৪ সালে প্রথম দুইটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় বা মাল্টিল্যাটারাল প্রতিষ্ঠান আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক গড়ে তোলা হয়। এটাই পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রথম রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বা বলা যায়, আমেরিকার নেতৃত্বে রাষ্ট্রগুলোর হস্তক্ষেপ। আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিকতা দেয়া, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম গড়ে তোলা। যদিও এর মূল উদ্দেশ্য বা তাগিদ ছিল দুনিয়াব্যাপী সবার জন্য এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা কায়েম করা। যে কোনো বাণিজ্য বিনিময় ঘটার পূর্বশর্ত হলো সকল রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য এক মুদ্রা চালু থাকা এবং ওই মুদ্রার মান নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির মাধ্যমে ঐ আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা হাজির থাকা। ফলে আন্তর্জাতিক এক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা কায়েম চাওয়া মানেই সেটা আসলে আগে এক আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা কায়েম করার কাজ হাতে নেয়া। তৎকালে বাণিজ্যের দিক থেকে একমাত্র উদ্বৃত্ত অর্থনীতির রাষ্ট্র ছিল আমেরিকা। ফলে আমেরিকার নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব মেনে তার জাতীয় মুদ্রা ডলারকে একইসঙ্গে সব রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেরও মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। এর ভিত্তিতেই আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক গড়ে তোলা হয়। দুনিয়ায় এ প্রথম সংগঠিতভাবে রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা কায়েম করে।

    পুরানার বিশ্বব্যবস্থার গর্ভে নতুন ব্যবস্থার আগমন
    মোটা দাগে বিশ্ব পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাসে রাষ্ট্রের সঙ্গে এ ব্যবস্থার সম্পর্কের বিচারে তিনটি পর্যায় আমরা চিহ্নিত করতে পারি। প্রথমত, মধ্যযুগ থেকে ১৯৪৪ সালের আগ পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই আজকের তুলনায় হয়তো সীমিতভাবে বিকশিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এটাকে “কলোনি ক্যাপিটালিজমের” হাতে বিকশিত বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থাও বলা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, ১৯৪৪ সাল থেকে চলতি সাল পর্যন্ত আমেরিকান রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বে রাষ্ট্রীয় এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপে কায়েম করে গড়ে তোলা (সেকালে) নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা- পণ্য গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময়ের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বলা যায়। আমেরিকান প্রভাবের এই ব্যবস্থাটা যেটা এখনও চলতি তবে পড়তি অবস্থা, তা এখন ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। আর তৃতীয়ত, মোটামুটি চলতি শতকের শুরু থেকে আমেরিকান নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের জায়গায় চীনের নেতৃত্বে পুরনো ব্যবস্থাটার পুনর্গঠন করে নেয়ার উদ্যোগ – আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো নতুন ধরনের পালটা প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব। চলতি সময়টায় একটা গেম চেঞ্জিংয়ের কাল পার হচ্ছি আমরা। একালে এতে ভারতের গুরুত্ব ও ভূমিকা রয়েছে, পুরনো নেতা আমেরিকা কিংবা হবু নেতা চীন- উভয়ের কাছেই। গুরুত্বটা হলো, ভারত আমেরিকার কোলে বসে পুরনো ব্যবস্থার ভাঙন ঠেকিয়ে আরও কিছু দিন চলতি ব্যবস্থার আয়ু বৃদ্ধি করতে সহায়তা করা হতে পারে, একে আরও যতদিন আয়ু দেয়া যায় আমেরিকার প্রভাব তত বেশি দিন বাড়ে। আর এর বিনিময়ে আমেরিকার কাছ থেকে সুবিধা শুষে নেয়ার কাজে লাগা। তবে মনে রাখতে হবে, এ কম্ম সাময়িক লাভালাভের জন্য এবং এটা নিজের আগামীর বিরুদ্ধে কুড়াল মারাও হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে এর বিপরীত পথ হচ্ছে, চীনের পাশে দাঁড়িয়ে ভারত নিজের জন্য নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা গড়তে ত্বরান্বিত হয়ে কাজে লেগে পড়তে পারে। তবে উভয় রাষ্ট্রের কাছ থেকে ভারতের এমন গুরুত্ব পাওয়ার পেছনে মূল কারণ ভারতের বিশাল জনসংখ্যা। অর্থনীতির দৃষ্টির ভাষায় বলতে হবে, যত জনসংখ্যা তত জোড়া মুখ এবং হাত; এবং ততই বড় অভ্যন্তরীণ বাজার এবং শ্রম।
    এটা এখন নির্ধারিত যে, চীন ও ভারতের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গন্তব্য এক সূত্রে বাঁধা হয়ে গেছে- এখানে তারা উভয়ে ন্যাচারাল অ্যালায়েন্সের অ্যালাই। পুরনো গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নতুন ব্যবস্থা খাড়া করতে পারার মধ্যেই তাদের আগামী নির্ভরশীল। কিন্তু নতুন ব্যবস্থার ভেতরে চীন কতটা গুরুত্ব দিয়ে ভারতকে জায়গা ছেড়ে দেবে তা সবটা ভারতের দাবি জানিয়ে আদায় করার বিষয় নয়। নতুন ব্যবস্থায় ভারত চীনের কাছে কী কী দাবি করবে সেসবের সঙ্গে ভারতের অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত সঞ্চয় ও অর্জিত সক্ষমতার সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকতে হবে।

    ব্রিকসঃ একের ভিতর দুই কাজের ভুমিকায়
    একই ব্রিকস উদ্যোগের মধ্যে আসলে দুইটা পালটা প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ আছে – একটি আইএমএফের সমতুল্য পাল্টা প্রতিষ্ঠান, অন্যটি বিশ্বব্যাংকের। ভারতের মূল যে প্রস্তাবের কারণে ব্রিকস অগ্রগতি আটকে বাধাগ্রস্ত বা শ্লথ হয়ে আছে তা হল, এখানে পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের সকলের সমান পরিমাণ বিনিয়োগ নিয়েই শুধু প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে হবে। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অসম সক্ষমতার বাস্তবতায় থাকলেও কাউকে বেশি বিনিয়োগ করতে দিয়ে প্রতিষ্ঠান খাড়া করা যাবে না। ভারতের এ ওজর-আপত্তিতে পড়ে পরিশেষে ব্রিকস উদ্যোগের বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য অবকাঠামো ব্যাংক নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা সংক্ষেপে NDB (এনডিবি) কার্যকর হতে যাচ্ছে পাঁচ সদস্যের প্রত্যেকের সমান ১০ বিলিয়ন করে মোট ৫০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে। অনেকের মনে হতে পারে, সদস্যদের সমান বিনিয়োগ থাকাই সঠিক। কিন্তু আসলে এমন চিন্তা অহেতুক ও অর্থহীন। ঈর্ষাকাতর সন্দেহবাতিকগ্রস্ততা বলা যেতে পারে। এগুলো দিয়ে কারও প্রভাবশালী উত্থান আসন্ন হলে তা ঠেকিয়ে রাখা যায় না। যেমন আজ চীনের উত্থান কি আমেরিকা ঠেকিয়ে রাখতে পারছে, না রাখা সম্ভব হয়েছে। ভারতের অর্থনীতি নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ওই ১০ বিলিয়ন ডলার কাউকে না দিয়ে নিজ নিজ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করলেই তো পারত। তা না করে NDB প্রতিষ্ঠানের নামে তা জড়ো করার কারণ এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার একটি কমন স্বার্থ ওই পাঁচ রাষ্ট্রের সবার আছে। সেটা হল, ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুরনো বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে বা বাইরে নিজেদের কর্তৃত্ব বাড়ানো। এখন ‘বিনিয়োগে সবার সমান ভাগ থাকতে হবে’ এই নীতি মানতে গেলে নতুন অর্জিত ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটি ক্ষুদ্র থেকে যাবেই। অবকাঠামো ব্যাংক হিসাবে এই পুঁজি খুবই অল্প। আর এমন থেকে যাওয়ার কারণে বিশ্বব্যাংকের চেয়ে বড় প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এর হওয়া সম্ভব নয়। অথচ সেটাই ছিল নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গড়ার প্রধান তাগিদ।
    যেমন বিশ্বব্যাংকের বর্তমানে মোট বিনিয়োগ সক্ষমতা ৩০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, এডিবির ১৬৫ বিলিয়ন ডলার। এর তুলনায় “সবার সমান বিনিয়োগ হতে হবে” এ জেদাজেদিতে সবার ১০ বিলিয়ন ডলার করে ৫০ বিলিয়ন ডলারের ব্রিকসের এনডিবি ব্যাংক কতটা প্রভাবশালী হবে বলাই বাহুল্য এবং তা প্রশ্নসাপেক্ষ। এছাড়া মূলকথা, ভারত অন্য রাষ্ট্রকে অবকাঠামো বিনিয়োগ দাতা এখনও নয়, বরং নিজেই গ্রহীতার দেশ। ফলে এ পর্যায়ে ভারতের ‘সমান বিনিয়োগ’ তত্ত্ব ও অবস্থানের সারার্থ হচ্ছে, ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাপে নামিয়ে সবার সমান বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠান গড়া। মানে এনডিবি ব্যাংককে বামন করে রাখা। ফলে বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী কিছুই এটা হতে না দেয়া।

    ভারতের ‘সমান বিনিয়োগ’ অবস্থানঃ এক ভুয়া ও অর্থহীন তত্ত্ব
    ওদিকে ভারতের ‘সমান বিনিয়োগ’ অবস্থান যে ভুয়া ও অর্থহীন এর আর এক বড় প্রমাণ হলো ব্রিকস উদ্যোগের অপর কম্পোনেন্ট, যেটা আইএমএফের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়ার লক্ষ্যে তৎপরতা বলেছি সেদিকে তাকালে। [এখনও এটা পুরা আকার নেয় নাই ফলে নাম এখনও নাই। ব্রিকস উদ্যোগের ভিতরে আপাতত ভ্রুন প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক গাঠনিক পর্যায়ে আছে বাড়ছে যার আপাত নাম “নয়া আইএমএফ” মনে করে নেয়া যেতে পারে।] ব্রিকসের ‘সমান বিনিয়োগের’ এনডিবি ব্যাংক ছাড়াও হবু “নয়া আইএমএফ” এর জন্য আর একটি ফান্ড তৈরি করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্যে কোনো সদস্য রাষ্ট্রকে তার নিজের বৈদেশিক মুদ্রা আয়-ব্যয়ে ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতি পরিস্থিতিতে তা মেটাতে সহায়তা করা। এত দিন দুনিয়ায় এ ধরনের সহায়তা বিতরণের একমাত্র প্রতিষ্ঠান ছিল আইএমএফ। ব্রিকস উদ্যোগে এমন ফান্ড মোট ১০০ বিলিয়ন ডলারের। কিন্তু এক্ষেত্রে সদস্যরা চাঁদা দেবে অসমভাবে। চীন একাই ৪১ বিলিয়ন, সাউথ আফ্রিকা সবচেয়ে কম মাত্র ৫ বিলিয়ন আর ভারতসহ বাকি তিন সদস্য রাষ্ট্র প্রত্যেকে ১৮ বিলিয়ন ডলার করে- এভাবে মোট ১০০ বিলিয়ন ডলার। তাহলে স্বভাবতই এখানে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, এই ফান্ড সংগ্রহের বেলায় তা অসম রাখার ন্যায্যতা কী? কেন এখানেও ভারত চীনের সমান অবদান চাঁদা দিচ্ছে না? অর্থাৎ ভারত এখানে নিজেরই ‘সমান মালিকানা তত্ত্বের’ পক্ষে নিজেই দাঁড়াচ্ছে না কেন?
    নীতি কথার মানে হল, যে অবস্থানটা সবখানে ইউনিফর্মভাবে প্রয়োগ করা হবে। দেখা যাচ্ছে ভারতের কোন সুনির্দিষ্ট নীতি অবস্থান নাই, ফলে প্রয়োগে ইউনিফর্মিটি নাই। এই অবস্থা কে বলা যায় ভারতের সিরিয়াসনেসের ঘাটতি আছে, ঘাটতিজাত সমস্যা আছে। ভারতের নীতি নির্ধারকেরা এটা বুদ্ধিমানের অবস্থান মনে করে। কারণ এটা অজান্তে দোদুল্যমানতা নয়। জেনেশুনে দোদুল্যমান থাকা। ব্রিকসের ভিতরেই থাকা ছেড়ে না যাওয়া। কারণ একমাত্র এভাবে সে ব্রিকস উদ্যোগকে আটকে শ্লথ করে রাখতে পারে। আর এই সার্ভিসটা আমেরিকান রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজে লাগে বলে আমেরিকার সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিতর সেখান থেকে বিনিময়ে বাড়তি সুবিধা আদায় করা। ভারতের এই দ্বৈত ঝোঁকের কারণেই চীন হঠাত করে নিজের ঝুলি থেকে আচমকা ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ (AIIB, এআইআইবি) এর প্রস্তাব হাজির করে ২০১৪ সালে আর আগামি বছর ২০১৬ থেকে কার্যকর করে ফেলতে যাচ্ছে। ব্যাপারটা হয়েছে এমনভাবে যে চীন একাই প্রস্তাব করেছে আর ইউরোপসহ [এবং বলা বাহুল্য ভারতও] সকলে ঐ প্রস্তাবের পিছনে পিছনে ছুটেছে হা বলার জন্য। অর্থাৎ এটা প্রমানিত হয়েছে যে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ার চিন্তা ও প্রস্তাব করার ব্যাপারে চীন যেভাবে আগাতে চায় তা ঠেকানোর ক্ষমতা ভারত কেন ইউরোপেরও নাই। নাই এজন্য যে বিষয়টা চীনা নেতৃত্বের কোন খামখেয়ালিপনার ইচ্ছা নয়, বিষয়টা হল এক অবজেকটিভ বাস্তবতা – চীনের অর্জিত অর্থনৈতিক সক্ষমতা।

    ভারতের সিদ্ধান্তের অর্থ তাতপর্য
    আর ভারতের দিক থেকে দেখলে এটা তার শর্ট সাইটনেস, সংকীর্ণ দৃষ্টি অর্থাৎ আপাত নগদ লাভের দিকে প্রলুব্ধ হয়ে চলা, আর সেই সাথে নিজের আগামি লংটার্ম স্বার্থের পায়ে কুড়াল মারা। চীনের সাথে ইতিবাচক নয়, আগামির এলাই নয়, ঈর্ষাবাচক প্রতিযোগিতার চোখে পরিস্থিতিকে দেখা। অথচ বাস্তব ফ্যাকটস হলো, চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা হল ১৭ ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের ওপর দাঁড়ানো এক অর্থনীতি। এটা এখন দুনিয়ার সর্বোচ্চ। সেজন্য চীন যে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে এর প্রতি ঈর্ষামূলক অবস্থান নেয়া অর্থহীন, কারণ বিষয়টা ঈর্ষা করা নয়। বরং প্রত্যেক রাষ্ট্রকেই নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের দিকে মনোযোগ দেয়াটাই উপযুক্ত পথ, ঈর্ষা নয়। এছাড়া নিজের ওপর আস্থা রাখা উচিত যে, কালক্রমে ভারত রাষ্ট্রের যেটুক অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জিত হচ্ছে, হয়েছে; কিন্তু তা অর্জনের পরও আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো ফোরামে সমতুল্য গুরুত্ব ও জায়গা যদি অন্যরা তাকে না দেয় তবে পালটা আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান, ব্রিকস বা AIIB হাজির হবে- ভারত তৈরি করবেই। সেটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জিত হলে অন্যেরা কেউ চাইলেই ভারতকে বঞ্চিত রাখতে পারবে না। কাজেই ঈর্ষা, সন্দেহ এগুলো কোনো পথ বা কাজের কথা নয়। তবে সংকীর্ণ দৃষ্টির ভারতের নীতিনির্ধারকদের ধারণা যেহেতু নিজের ন্যাচারাল ভবিষ্যতের পথে চীনের সঙ্গে নতুন উদ্যোগে শামিল হতে ঢিলেঢালা, গড়িমসি দেখালে আমেরিকার দিকে ঝুঁকার ভয় দেখিয়ে চীনকে চাপে রাখার সুযোগ আছে, তাই সেটা নেয়া উচিত। এর অর্থ নিজের যেটুকু গুরুত্ব মূল্য পাওয়ার কথা তার চেয়ে বেশি যেন সে পেতে পারে এমন আবদারে তা পাওয়ার জন্য অযথা ঝুলাঝুলি করা। এভাবে চলতে থাকলে এক পর্যায়ে তা ভারতের জন্য আত্মঘাতী ফল বয়ে আনতে পারে। ব্রিকস উদ্যোগ এত দিন কার্যকর প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারেনি ভারতের এসব ওজর-আপত্তির কারণে।
    ভারত-চীনের সামরিক স্বার্থ বিষয়ক টেনশন আছে এটা বাস্তবতা। এর বড় কারণ মার্ক করা বা চিহ্নিত করা হয় নাই এমন বিস্তৃর্ণ কমন রাষ্ট্র সীমান্ত তাদের আছে। বিগত ১৯৬২ সালে চীনের কাছে যুদ্ধে হেরে যাবার খারাপবোধ, ট্রমা আছে। এছাড়া চলতি সময়ে অসম সামরিক সক্ষমতার বাস্তবতা এখানে আছে। এরপরেও এগুলোই একমাত্র বাস্তবতা নয়। কারণ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে আবার উলটা চীনের থেকে সহযোগিতা পাবার (অবকাঠামো ঋণ, আমদানি ব্যবসার বাজার পণ্য ও কাঁচামাল) নেবার স্বার্থ ভারতের আছে। অথচ সবকিছু মিলিয়ে দেখলে অন্তত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অহেতুক চীনভীতি ছড়ানোর চেষ্টা ভারতের মানায় না, কারণ এটা কাউন্টার প্রডাকটিভ। যেমন ব্রিকস উদ্যোগের NDB ব্যাংক গড়ার ক্ষেত্রে ভারত শর্ত দেয় প্রথম ৫ বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট ভারতের হতে হবে। শুধু তা-ই নয়, এভাবে শর্ত রাখা হয়েছে যে, রোটেশনে চীনের সুযোগ আসবে সবার শেষে, মানে ২০ বছর পর। ফলে আগামী দুই দশক চীন এই এনডিবি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হতে পারবে না। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই চীনভীতি অহেতুক। তবু চীন তাতেই রাজি হয়েছে। আর ভারতের প্রস্তাবিত ও মনোনীত ব্যক্তি কে ভি কামাথ এনডিবি ব্যাংকের প্রথম প্রেসিডেন্ট করে নেয়া হয়েছে। কিন্তু সেই সাথে চীনের আরও কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তা-ও জানা যাচ্ছে।
    ব্রিকস উদ্যোগের মূল আইডিয়ার মধ্যে চীন বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়ার আইডিয়াকে আপাতত ব্রিকসের ভেতরে সীমিতভাবে এবং ব্রিকসের বাইরেও পূর্ণভাবে- দুই জায়গাতেই বাস্তবায়ন করার পথে রওনা হয়েছে। দৃশ্যত তাই দেখা যাচ্ছে। ব্রিকসের ভেতরের অবকাঠামো ব্যাংকের নাম এনডিবি ব্যাংক। আর এউদ্যোগের বাইরের আরও পূর্ণভাবে ব্যাপক পরিসরে অবকাঠামো ব্যাংকের নাম এআইআইবি (AIIB) ব্যাংক। ভারতের খায়েশ ও চীনের প্রতি অর্থহীন সন্দেহ অনুসরণ করে ব্রিকসকে সে নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাপে বামন রাখতে চায়। অথচ ব্রিকস উদ্যোগের মূল লক্ষ্যই হল, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পালটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে গ্লোবাল অর্থনীতির ওপর আমেরিকার বদলে নিজেদের নতুন কর্তৃত্ব লাভ করা। অর্থাৎ এ দুই অবস্থান স্ববিরোধী। আর ভারত এই স্ববিরোধী অবস্থানের উদ্গাতা। এ স্ববিরোধিতা কাটতে পারে একমাত্র, ভারত যদি ব্রিকস উদ্যোগের সাফল্যের ভেতর নিজেকে গ্লোবাল নতুন কর্তৃত্বে চীনের সঙ্গে বড় অংশীদারিত্বে নিজেকে দেখতে চায় তবে, তা সম্ভব একমাত্র চীনের বড় ভূমিকা এ বাস্তবতা মেনে নিয়েই।
    এখান থেকে ভারতের জন্য শিক্ষা হল,
    ১। বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী একটা অবকাঠামো ব্যাংক গড়ার উদ্যোগ যেটা শেষে AIIB নামে বাস্তবায়িত হল – শেষ পর্যন্ত এমন ঘটনাগুলো ঠেকানোর ক্ষমতা ভারতের নাই, সম্ভব হয় নাই। কারণ এটা সম্ভব নয়। ঠেকানোর চেষ্টাটাও আসলে ভারতের স্বার্থে যায় নাই। ২। গত সাত বছর ধরে এটা ঠেকিয়ে রেখে কি ভারতের লাভ হয়েছিল না কি এখন AIIB হাজির হওয়াতে ভারতের স্বার্থ বেশি আছে তাতে? AIIB ব্যাংক আগে বাস্তবায়িত হলে কি ভারতের জন্য তা বেশি ভাল হত না! আবার চীনের সাথে পক্ষে সক্রিয় থাকলে ব্রিকস উদ্যোগের অধীনেই AIIB ব্যাংক হাজির হত। তাতে বর্তমানের চেয়েও AIIB এর উপর ভারত ব্রিকসের মাধ্যমে বেশি কর্তৃত্ব লাভ করতে পারত। সেটা সে এখন হারাল। তাহলে ভারত আমেরিকার প্ররোচনায় এতদিন কার পক্ষে কাজ করল? কি লাভ করল? এসব নিয়ে তার অবিলম্বে মুল্যায়নে বসা উচিত।

    বিরোধে না জড়ানো বুদ্ধিমান চীন
    তবে মজার দিকটা হল, ভারতের এ স্ববিরোধিতার মুখেও চীন তাকে ত্যাগ করেনি। অথবা ব্রিকস উদ্যোগকে চীন স্থবির বা গুটিয়ে ফেলেনি। বুদ্ধিমান ও ইতিবাচকভাবে ভারতকে নাড়াচাড়া মোকাবিলা করেছে। তবে দেখিয়েছে, চীন একা নিজ উদ্যোগে বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী মূল অবকাঠামো ব্যাংক গড়তে সমর্থ। তাই মাত্র ২ বছরের মধ্যে এআইআইবি ব্যাংক কার্যকর হতে যাচ্ছে। কিন্তু ভারতের স্ববিরোধী ও দোদুল্যমানতার কারণে চীন আর ব্রিকস উদ্যোগের ভেতরে রেখে এআইআইবি ব্যাংক কার্যকর করার পথে যায়নি আপাতত। এর অর্থ হলো, ভারতের নির্বুদ্ধিতার জন্য চীন এআইআইবি ব্যাংক আপাতত ব্রিকস উদ্যোগের বাইরে নিয়ে রাখল। স্বভাবতই এতে ভারতের ক্ষতি ছাড়া কোনোই লাভ হয়নি। বরং এভাবে হওয়াতে এআইআইবি ব্যাংকের বাস্তবায়নের উপর চীনের একার বক্তব্যের ওজন সবচেয়ে বেশি। এমনকি ব্রিকস উদ্যোগের ভেতরের এনডিবি ব্যাংকের উপর নিজের প্রভাবের চেয়ে তা বেশি। ফলে সমান বিনিয়োগের গোঁ ধরে ভারতেরই ক্ষতি হল। যদিও এনডিবি ব্যাংকের প্রথম প্রেসিডেন্ট কামাথ বলছেন, এআইআইবি ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় এনডিবি ব্যাংক রেখে কাজ করবে।

    এনডিবি ব্যাংক চেয়ারম্যান আরও বলছেন, তারা শুরুতে শুধু পাঁচ ব্রিকস সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে তৎপরতা সীমাবদ্ধ রাখবে। এটাও কথার কথা। কারণ ব্রিকসের ভিতরে বাস্তবে অবকাঠামো ঋণ পাওয়ার দরকার আছে, প্রথমত ভারত আর ব্রাজিলের। বাকিরা দাতা অথবা ঋণ কাজে লাগানোর উপযোগী অর্থনীতির রাষ্ট্র নয়। এর মানে দাঁড়াল, আপাতত যেন ভারত শুধু নিজের জন্য ব্যবহার করবে এনডিবি ব্যাংককে। অর্থাৎ ভারত কী চাচ্ছে আর তা পেয়ে ভারতের কী লাভ হচ্ছে – এসবের কোনো ঠায়ঠিকানা ভারত মিলাতে দেখাতে পারছে না। তবু নানান ওজর-আপত্তি তুলতে দেখছি আমরা ভারতকে।
    আসলে মূল স্ববিরোধী কঠিন বাস্তবতা হল, ভারত মূলত ঋণগ্রহীতা; কিন্তু সে ঋণদাতার ভূমিকা ও গুরুত্ব পাওয়ার জন্য জিদ ধরেছে।

    [এই লেখাটা এর আগে আগষ্ট ২, ২০১৫ তারিখে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় কিছুটা সংক্ষিপ্তভাবে ছাপা হয়েছিল। পরে সে লেখাটাই আরও বিস্তার করে এবং সম্পাদনা করে এখানে এখন ছাপা হল।]

  • জয়া চ্যাটার্জির ভিলেনঃ বাঙলার ‘হিন্দু ভদ্রলোক এলিটদের’ নিয়ে তাঁর বিপদ

    জয়া চ্যাটার্জির ভিলেনঃ বাঙলার ‘হিন্দু ভদ্রলোক এলিটদের’ নিয়ে তাঁর বিপদ

    গৌতম দাস
    ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-b1

     

    দেশভাগের ১৯৪৭ সাল। এ অঞ্চলের ইতিহাসকে দেখার ও ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যেকোন প্রশ্ন এখনও ঘুরেফিরে ভারত ভাগকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। তবে সেটা এই কারণে নয় যে, এর মধ্যদিয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের অবসান হয়েছে। বরং পরিণতিতে দুটো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম আর অন্যসব কিছুকে ছাপিয়ে, এখানে আলোচনার প্রধান জায়গা হয়ে উঠে, “ভারত ভাগ”। এবিষয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যা বা বয়ানের অভাব না থাকলেও সেসব জড়াজীর্ণতায় ক্লিশে হয়ে আছে। তবে এসবের বাইরে গিয়ে যারা ইতিহাস চর্চা করেছেন বলে একাডেমিক জগতে পরিচিতি আছে তাদের মধ্যে একজন হলেন ভারতের জয়া চ্যাটার্জি। তার পিএইচডি গবেষণার ফলাফল যেটা পরবর্তিতে বই আকারে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস লন্ডন থেকে প্রকাশিত, এর নাম “বেঙ্গল ডিভাইডেড” (১৯৯৪)। পরে বাংলাদেশ থেকে ঐ একই ইংরাজী বই বাংলায় অনুবাদ করে বাংলাদেশের ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড থেকে প্রকাশিত হয় এর নাম “বাংলা ভাগ হল” (২০০৩)। এই বইয়ে জয়া চ্যাটার্জির বাংলা ভাগের জন্য প্রচলিত ক্লিশে ধারণায় মুসলিম লীগ বা কায়েদে আজম জিন্নাহকে নয় দায়ী করেন নাই, দায়ী করেছেন বাংলার “হিন্দু ভদ্রলোক এলিট” শ্রেণীকে।

    বলা বাহুল্য এর ভিতর দিয়ে জয়া চ্যাটার্জি সরাসরি কোন রাজনৈতিক বয়ান নয়, ইতিহাসের এক একাডেমিক বয়ান হাজির করেছেন। ফলে পশ্চিম বাংলায় সামাজিক মিথ ও ইতিহাস হিসাবে ধরে নেয়া চলতি অনেক কিছুকেই জয়া ভিন্নভাবে দেখে এবং জবরদস্তিগুলোকে অস্বীকার করেই “বাংলা ভাগের” নতুন ইতিহাস বয়ান করে গেছেন। তবু জয়া লিখছেন বাংলা দুবার ভাগ হল। ওপার পশ্চিম বাংলার দৃষ্টিতে (১৯০৫ ও ১৯৪৭) দুবারই বাংলা ভাগ হওয়ার ঘটনা দুঃখ ও বিরহের। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, দুবারের একবারও পুর্ববঙ্গের প্রজা কৃষক ও মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া ও তাদের দৃষ্টিভঙ্গীটা এমন নয়, বরং এর উলটা, তারা খুশি হয়েছিল, আশা দেখেছিল। তাদের চোখে এটা ছিল আনন্দের ও নতুন সম্ভাবনার। এই খুশি হওয়া ঠিক কি বেঠিক হয়েছে, পন্ডিতেরা কি বলেন তাতে কিছু এসে যায় না। কারণ ঐতিহাসিক সত্য গ্রহণ করা না করা দিয়ে বদলানো চলে না। বরং কেন সেটা সত্য হল বড় জোর তা বুঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। তাসত্ত্বেও পুর্ববঙ্গের অবস্থান দৃষ্টিভঙ্গী যেন ভুল ছিল এমন ইতিহাসের বয়ান খাড়া করার চেষ্টার অন্ত নাই। তবে পুর্ববঙ্গ থেকে দেশান্তরী হিন্দুদের মনোভাব এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম, তাদের দুঃখ পাবারই কথা। কে নিজ ঘরবাড়ী ছেড়ে দেশান্তরী হতে চায়, দেশ ছাড়াকে সঠিক মনে করতে পারে। অতএব সার করে বললে কঠিন সত্যিটা হল, বাংলা ভাগ প্রসঙ্গে দুবাংলার মানুষ সবাই একই চোখে ব্যাপারটাকে দেখে নাই। আর দুবারই এমন ঘটেছে। ইতিহাসে সততা চাইলে এসত্য আমরা সবাই মেনে নিতে বাধ্য। ফলে আসলে যা একই চোখে দেখা হয় নাই, সেটা দেখানোর চেষ্টা করতে হবে, জবরদস্তি করতে হবে অথবা মুসলমানদের দেখাটাকে “কারেক্ট” করে দেখাতে হবে এমন চিন্তা ও ততপরতা অর্থহীন। এগুলো ব্যর্থ এবং মতলবি চেষ্টা। তবুও ফ্যাক্টস বা মাঠের সত্য যেটা তা সরাসরি না বলে এর বদলে “কিভাবে দেখা ঠিক এবং বেঠিক” তা দিয়ে ইতিহাসে ঘটনাটাকে দেখতে দেখাতে চেষ্টা করা হয়েছে। শিক্ষিতজনদের ভিতরই কেবল এটা প্রবল এবং করা সম্ভব হয়েছে। এমনটা সম্ভব হবার পিছনের সম্ভাব্য একটা বড় কারণ ইতিহাস লেখকেরা খোদ পশ্চিমবঙ্গের অথবা ইতিহাস লেখক পুর্ববঙ্গের হলেও তাঁর চিন্তার উপর পশ্চিমবঙ্গের দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব প্রবল। প্রগতিশীলতার নামে, “অসাম্প্রদায়িকতার” নামে এরাও এগুলো করেছে। সেসব প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিয়ে, চাপা পড়া সত্য সেসব কথার অনেক কিছুই এখন জয়া চাটার্জির মুখ থেকে আসছে।

    বাংলা বইয়ের শুরুতে “বাংলা সংস্করণের মুখবন্ধে” জয়া বলছেন, “১৯৮০ সালে আমি যখন এ গ্রন্থের জন্য গবেষণা শুরু করি তখন একটা সাধারণ ও অনুকুল ধারণা প্রচলিত ছিল যে, ভারত বা বাংলার বিভক্তি মুসলমানদের কাজ – হিন্দুরা তাদের মাতৃভুমির অখন্ডতাকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করতে কোন কিছুই করেনি। ঐ সময়ের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণায় প্রকাশ পায় যে, স্বাভাবিক ও ঐতিহ্যগতভাবে হিন্দুত্বের বৈশিষ্ট হল সহনশীল এবং বহুত্ববাদী। তাই হিন্দুত্বে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার সুযোগ নেই। তবে আমার গবেষণায় প্রচলিত ঐ সাধারণ ও তৃপ্তিদায়ক ধারণা তো নয়ই, বরং ভিন্ন তথ্য স্পষ্ট হয়ে উঠে। ঐ গবেষণায় প্রকাশ পায় যে, বাঙলার হিন্দু ভদ্রলোকদের (এলিটদের) ক্রম-ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও মর্যাদা হুমকির সম্মুখীন হওয়ায় তাঁরা সামাজিক অবস্থান অক্ষুন্ন রাখার লক্ষ্যে কূটকৌশল অবলম্বন করে এবং নিজেদের কাজের যৌক্তিকতা হিসাবে বিভিন্ন ভাবাদর্শকে (ideologies) ব্যবহার করে। সত্যিকার অর্থে ঐ কূটকৌশলকে একমাত্র সাম্প্রদায়িকতা হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়। আত্মরক্ষায় যুযুধান ঐ সংখ্যালঘিষ্ঠ হিন্দু ভদ্রলোকদের প্রদেশ ভাগের দাবীর পেছনে যুক্তি ছিল যে, এতে তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে। আসলে ত্রিশ চল্লিশের দশকে বাঙলায় যা ঘটে এবং উনিশ শতকের শেষ দিকে যুক্ত প্রদেশের উর্দুভাষী ভদ্রলোকদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক মুসলমান রাজনীতির যে উন্মেষ ঘটে তা একই দৃষ্টিভঙ্গীতে বিবেচনা করা যেতে পারে। এত আমরা উপলব্দি করতে পারি যে, রাজনৈতিক ও সামাজিক কৌশল হিসাবে বিভিন্ন গোষ্ঠি বিভিন্ন সময় তাদের চলমান প্রাধান্যের প্রতিকুল হুমকির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতাকে হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করেছে”।
    উপরের পুরা প্যারাটাই জয়ার লেখা থেকে তুলে আনা লম্বা উদ্ধৃতি, তবে এতে আন্ডারলাইন ও বোল্ড করা আমার। জয়ার চোখে লেখা উপরের বক্তব্যের সারকথা হল – পুরা ঘটনায় ভিলেন হলেন বাঙলার হিন্দু ভদ্রলোকেরা (এলিট)। কিন্তু এর চেয়ে তাতপর্যপুর্ণ হল, জয়া যেভাবে এই এলিটদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। প্রথমে “ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও মর্যাদা” – এই তিন বৈশিষ্টায়িত শব্দ ব্যবহার করে তিনি বলছেন, “বাঙলার হিন্দু ভদ্রলোকদের (এলিটদের) ক্রম-ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও মর্যাদা হুমকির সম্মুখীন…” হয়েছিল। অর্থাৎ এলিটদেরকে তিনি বুঝতে বলছেন প্রায় দেড়শ বছর ধরে তাদের ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও মর্যাদার রুস্তমি চালিয়ে যাওয়া লোক হিসাবে। এরপর তাদের এগুলো যখন চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়ল ফলে একে তিনি বলছেন, “ক্রম-ক্ষয়িষ্ণু” থেকে আত্মরক্ষার চাতুরি, কূটকৌশল হিসাবে যে মতাদর্শকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছিল সেটাকে তিনি বলছেন “সাম্প্রদায়িকতা”।

    সাম্প্রদায়িকতা শব্দটা বেশ অদ্ভুত। বিশেষ ব্যতিক্রম বাদ দিলে বেশির ভাগ সময় এই শব্দ ব্যবহার করা হয় মুসলমান, মুসলিম লীগ বা কায়েদে আজম জিন্নাহর বিরুদ্ধে, এদের গায়ে কালি লাগিয়ে দিতে। উপনিবেশী কলোনী শাসনের প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরা সময় ধরে হিন্দু বাঙালীর আধিপত্য – সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্য কায়েম ছিল। সেকালে বাঙালী বলতে তারা কেবল হিন্দু বাঙালী বুঝত, বুঝাত। ক্ষমতা আধিপত্যের এই সৌধের বিরুদ্ধে যে কোন প্রতিবাদ, চ্যালেঞ্জকে তারা এতদিনের হিন্দু ডোমেনকে ‘অস্থিতিশীল’ করা, নিজেদের শান্তি নষ্ট  হিসাবে দেখত আর প্রতিক্রিয়ায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে পালটা অভিযোগ করত। এই লজিকের অব্যক্ত দিকটা এরকম যে বাঙালী ধারণার ভিতর মুসলমান বলে তো কিছু নাই। ফলে এরা তো গোনায় না ধরা এক প্রজাতি। আন-হার্ড – যাদের কথা শোনার যোগ্য নয়, পাত্তা দেবার কিছু নাই অন্তজ চাষা এমন মুসলমানেরা হিন্দুদের “বাঙালী” ধারণার মধ্যে অস্বীকৃতই তো থাকবে।  মুসলমানদের চিৎকার, প্রতিবাদ, চ্যালেঞ্জকে  বাঙালী (হিন্দুরা) বাঙালী ধারণাকে বিভক্ত করবার চ্যালেঞ্জ হিসাবে মনে করবেই। হিন্দুদের শৌর্যবীর্যে আঘাত মনে করবে। সাজানো বাগান হস্তক্ষেপ মনে করবে। এই অর্থে অতএব এটা সেক্টোরিয়ান বা বিভক্তিসূচক খারাপ কাজ  – “সাম্প্রদায়িক“।

    জয়া এই ততপরতাকে এলিটদের সামাজিক অবস্থান অক্ষুন্ন রাখার লক্ষ্যে কূটকৌশল অবলম্বন করা এবং নিজেদের কাজের যৌক্তিকতা হিসাবে এক ভাবাদর্শকে (ideologies) ব্যবহার করার কথা বলছেন। বলছেন, “সত্যিকার অর্থে ঐ কূটকৌশলকে একমাত্র সাম্প্রদায়িকতা হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়”। এক্ষেত্রে জয়ার সাম্প্রদায়িক শব্দটার আসল অর্থ উপরে ব্যাখ্যার মধ্যে পাওয়া যেতে পারে।

    বইয়ে পরবর্তিতে “ভুমিকার” তৃতীয় পৃষ্ঠা থেকে বাকি অংশ জুড়ে অন্তত দশ বারো দিক থেকে এই “ভদ্রলোক” বলতে  জয়া কাদের বুঝাচ্ছেন তা বলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এর চেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল, জয়া বলছেন, ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের প্রথম বার বাংলা ভাগের সময়ও এই ভদ্রলোকেরাই বাধা দিয়েছিলেন। মুল ইংরাজি এবং বাংলা অনুবাদেও বইয়ের ভুমিকায় জয়া বলছেন, “১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে প্রদেশ ভাগ করতে সেই শ্রেণীর লোকেরাই নেতৃত্বে দেয় যারা বাংলার প্রথম ভাগের সময় থেকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করে আসছিল, যাদের পরিচিতি ছিল তথাকথিত ভদ্রলোক বা ‘সম্মানিত’ লোক”। [ভুমিকা, পৃষ্ঠা ১]

    তার মানে হল জয়া দাবি করছেন, এই “হিন্দু ভদ্রলোকেরা” ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ মানে বাংলা ভাগ করতে বাধা দেয়ার পক্ষে কাজ করেছেন এবং কাজটা ঠিক করেন নাই। তিনি তাঁর লেখায় ১৯০৫ সালের বাংলা ভাগ হওয়ার ব্যাপারটাকে বিষাদময় ঘটনা হিসাবেই দেখার চেষ্টা করছেন? আবার ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগটাকেও জয়া বিষাদময় ব্যাপার হিসাবে দেখেন। যেমন বইয়ের ভুমিকায় শুরুতে তিনি লিখছেন, “হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ভয়াবহ দাঙ্গার ফলে ১৯৪৭ সালে বাঙলা আবার ভাগ হয়। কিন্তু এসময় প্রায় কারও কন্ঠেই প্রতিবাদের ধ্বনি উচ্চারিত হল না………”। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের বিরুদ্ধে কারও কন্ঠে অন্তত প্রতিবাদ আশা করছিলেন জয়া। এটাকে প্রতিবাদ করার মত ঘটনা হিসাবে দেখছেন জয়া। সোজা কথায় দেশভাগ বা বাংলা ভাগ ভাল নয় – জয়ার দাবি এটাই। এই চিন্তা প্রস্তাবের উপর দাঁড়িয়ে পুরা বইটা লেখা হয়েছে। তাঁর এই দেখা সঠিক অথবা বেঠিক তা নিয়ে তর্ক না তুলেও বলতে হয়, দেখার এই দৃষ্টিটা কোনভাবেই ওপার বাংলার, পূর্ববঙ্গের নয়। আর সঠিক-বেঠিক ছেড়ে ঘটনার সত্য দিকটা হল, সে সময় “পাকিস্তান আন্দোলনের” পক্ষের মানুষেরা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট অঞ্চলগুলোকে নিয়ে আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্রই চেয়েছিলেন। ফলে তাদের চোখে বাংলা ভাগ সবসময়ই কাম্য ছিল। আমরা পছন্দ করি আর নাই করি, ইতিহাসের সত্য হল, পুর্ববঙ্গের আপামর মুসলমান ১৯০৫ এবং ১৯৪৭ দুবারই বাংলা ভাগকে তাদের জন্য কাম্য হিসাবেই দেখেছিল। এই নিরেট বাস্তবতার খবর জয়া এই বই লেখার সময়  বিবেচনায় নিয়েছেন এর প্রমাণ মিলে না।

    তাহলে জয়া যে আশা আকাঙ্ক্ষার উপর দাঁড়াচ্ছেন, দেশভাগ ব্যাপারটাকে দেখতে চাইছেন – সেটা “পাকিস্তান আন্দোলনের” মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গী নয়। আবার সে দৃষ্টিভঙ্গীটা দেশ ভাগের ভিলেন জয়ার ভাষায় “হিন্দু ভদ্রলোকেদেরও” নয়। তাহলে কাদের আশা আকাঙ্খার উপর জয়া দাঁড়াতে চাইছেন? দেশভাগ হওয়া সঠিক মনে করেন না এরা কারা?

    সারকথায় বললে, অখন্ড ভারতের বা অখন্ড বাংলার পক্ষে থাকা এক “ভারতীয় জাতীয়তাবাদের” জন্য আকাঙ্ক্ষা ও পক্ষপাতিত্ব জয়া চাটার্জির আছে। কিন্তু এটা একেবারেই কল্পিত, অবাস্তব কল্পনা এজন্য যে বাস্তবে এটা নাই, তবে জয়ার কাছে এটা এমন কাল্পনিক হলেও কামনার বিষয়। এক কল্পিত আদর্শও। এই রাজনৈতিক অবস্থানের উপর দাঁড়িয়ে জয়া চ্যাটার্জি তাঁর বই লিখেছেন। বাস্তবে না থাকলেও তবু মনে মনে এমন একটা খাসা সমাধানের আকাঙ্ক্ষা জয়া এখনও মনে পুঁষে রাখেন এবং এটাই তার চোখে আদর্শ সমাধান হত। জয়ার বই পড়তে গিয়ে তাঁর কল্পিত এই আদর্শ সমাধান বা “আদর্শ ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে” (যেটা বাস্তবে আছে সেটা নয়) কল্পনায় আমাদের সবসময় পাশে রাখা দরকার। যদি রাখি তাহলে সহজে জয়াকে বুঝব। জয়া বাস্তবে পাওয়া সবকিছুকে কোন কল্পিত আদর্শর প্রেক্ষিতে বিচার করছেন এবং সবকিছুর ভিতরে খুঁত দেখছেন, প্রত্যাখ্যান করছেন তা বুঝব। যেমন বাস্তবে দেখতে পাওয়া বঙ্কিম-অরবিন্দ বা কংগ্রসের ভারতীয় জাতীয়তাবাদ জয়ার চোখে কাঙ্খিত আদর্শ ভারতীয় জাতীয়তাবাদ নয়, মানদন্ড সম্মত নয়। জয়ার চোখে সম্ভবত এর একটা কারণ প্রথমবার (১৯০৫-১১) বাংলা ভাগের সময় থেকেই “এই জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করে আসছিল “হিন্দু ভদ্রলোকেরা”। জয়ার পুরা বইয়ে এই “হিন্দু ভদ্রলোকেরাই” দেশভাগের ভিলেন। “হিন্দু ভদ্রলোকেদের” হিন্দু কারবারই জয়ার চোখে তাঁর কল্পিত ও কাম্য ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বিচ্যুতি। দুধের মধ্যে চোনা। জয়ার বইয়ের সারকথা এটাই। কিন্তু আগেই বলেছি, জয়ার সারকথার (কোন অর্থেই) খাতক ততকালীন পুর্ববঙ্গ বা এখনকার বাংলাদেশ নয়। কারণ বাংলা ভাগ করেই কেবল পুর্ববঙ্গের চাষা প্রজারা নিজের মত শান্ত ও সন্তুষ্ট হয়েছে। অন্যথায় পুর্ববঙ্গের চাষা প্রজা কৃষকেরা হয়ত বিগত দুশ বছরের জমিদারি অত্যাচার উসুল করতে জয়ার ভিলেন বাঙলার হিন্দু ভদ্রলোক এলিটদের  কলকাতা থেকেও তাদের উতখাত করত। অর্থাৎ বাংলা ভাগ না করার আর এক অর্থ হল, কলোনি ঔরসে বেড়ে চলা জমিদারির রুস্তমদের কলকাতা থেকেও উতখাত করে পুরা বাংলাকেই প্রজা কৃষকের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে নেয়া।

    কিন্তু তবু জয়া স্ববিরোধী। জয়া অন্তত একটা বড় স্ববিরোধ এড়াতে পারেন নাই। যেমন বইয়ের ভুমিকার প্রথম পৃষ্ঠাতেই জয়া লিখছেন,
    “আদর্শ ও রাজনৈতিক আচরণের দিক থেকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার মধ্যকার সম্পর্ক জটিল এবং দুই বিপরীতধর্মী শক্তির একটি সংশ্লেষিত রূপ। সাম্প্রতিক গবেষণায় এমন দাবি করা হয় যে ভারতের জাতীয়তাবাদকে সাম্প্রদায়িকতার ভিন্নরূপ গণ্য করা যায় না। সাম্প্রদায়িকতার বিপরীত ধারণা হল ধর্মনিরপেক্ষতা, যা ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পৃথক করে দেয়। অবশ্যই স্বীকার করতে হয় যে, এই অর্থে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অনেক কিছুই ধর্মনিরপেক্ষ নয়। জনসমর্থন পাওয়ার জন্য ধর্মীয় কল্পমূর্তি ও ইস্যুকে জাতীয় আন্দোলন পরিচালনার সময় কৌশলে ব্যবহার করা হয়। …… এই জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সহমত পোষণ করে যে, ভারতীয় সমাজের গোড়াতে রয়েছে ধর্মীয়ভাবে সংজ্ঞায়িত সম্প্রদায়”।

    এখানে প্রথম বাক্যেই তিনি আবার তাঁর কল্পিত আদর্শের বিশুদ্ধ ভারতীয় জাতীয়তাবাদ নয় বরং তাকে ছেড়ে বাস্তবের ভারতীয় জাতীয়তাবাদ নিয়ে কথা বলছেন। বাস্তবের ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রতি তাঁর সহানুভুতি লক্ষ্যণীয়। অর্থাৎ এখানে তিনি আর তাঁর কল্পিত আদর্শের সাথে বাস্তবের দুরত্ব বা খুঁত মাপছেন না। এছাড়া এখানে এক নতুন ক্যাটাগরি সাম্প্রদায়িকতা ধারণার সুচনা ঘটাচ্ছেন তিনি। বলার অপেক্ষা রাখে না এই ক্যাটাগরি তাঁর বিচারের দিক থেকে এক নেগেটিভ ক্যাটাগরি। যার পজিটিভ ক্যাটাগরি করতে দেখা যায়, অসাম্প্রদায়িকতা । সাম্প্রদায়িকতা বলে একটা ক্যাটাগরি সুচনা করা এবং তা দিয়ে ফেনোমেনা ব্যাখ্যা করার পরিণতি সবসময় নতুন বিভ্রান্তি তৈরি করে। কারণ এই ক্যাটাগরির পিছনের ধারণা এবং ধারণার পিছনের অনুমানগুলোতে বিরাট অস্পষ্টতা আছে। সময়ে তা নিয়ে কথা তুলা যাবে। কিন্ত এখানে বাক্য রচনার গাথুনিতে এটা বুঝা যাচ্ছে যে, বাস্তব ভারতীয় জাতীয়তাবাদ এবং ধরে নেয়া চরম নেগেটিভ ক্যাটাগরি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ – এই দুইয়ের “সংশ্লেষিত রূপ” জয়ার কাছে খুব একটা অনাকাঙ্খিত নয়। পরের বাক্যে সেটা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। বলছেন, “ভারতের জাতীয়তাবাদকে সাম্প্রদায়িকতার ভিন্নরূপ গণ্য করা যায় না”। অর্থাৎ ভারতীয় জাতীয়তাবাদ সাম্প্রদায়িকতারই আর এক রূপ নয়। কথাটা সোজা করে বললে, জয়া এখানে এসে দাবি করছেন, বাস্তবের ভারতীয় জাতীয়তাবাদ তার চোখে কোন সাম্প্রদায়িকতা নয়। এই স্ববিরোধিতা কেন? একদিকে নিজেই বলছেন এটা জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার সংশ্লেষিত রূপ। অন্যদিকে আবার সার্টিফিকেট দিচ্ছেন, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ কোন সাম্প্রদায়িকতা নয়।
    এছাড়া এরপরের বাক্য আরও মারাত্মক – “সাম্প্রদায়িকতার বিপরীত ধারণা হল ধর্মনিরপেক্ষতা, যা ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পৃথক করে দেয়”। মারাত্মক বলছি বাক্যের প্রথম অংশের জন্য নয়। ভুতুড়ে ক্লিশে “সাম্প্রদায়িকতা” এই ক্যাটাগরির পরে আর এক ভুতুড়ে ক্যাটাগরি তিনি এনেছেন – ধর্মনিরপেক্ষতা । এনে দুটোকে এক সাথে ইকুয়েট তিনি করেছেন সেটাও বড় বিষয় নয়। একালে কেউ নিজের ধর্মবিদ্বেষ, ইসলাম বিদ্বেষ ও ফোবিয়া লুকাতে নিজেকে “অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ” বলে আড়াল করছেন – এটা আজকাল আর বড় বিষয় নয়। বেখবর থেকে অবলীলায় করে এসব।   ইসলাম কারও পছন্দের বিষয় নাই হতে পারে। নিজের চায়ের কাপ তিনি নাও মনে করতেই পারেন। এটা ফেয়ার এনাফ। এটা কোন দোষেরও নয়। কিন্তু তাঁকে সতর্ক থাকতে হবে এই অপছন্দ তিনি ইসলামের বা এর অনুসারির বিরুদ্ধে ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়িয়ে প্রকাশ করছেন কিনা। আর এক কিসিমের বর্ণবাদি হয়ে উঠছেন কি না। যাই হোক, তিনি দাবি করছেন, “ধর্মনিরপেক্ষতা মানে যা নাকি ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পৃথক করে দেয়”। এটা ধর্ম ও রাজনীতি যে কোনটাই বুঝে না এমন কারও বক্তব্য জয়া এখানে এনেছেন। তবে এটা বলার পর জয়া টের পেয়েছেন এই ফিল্টার মোতাবেক তাঁর প্রিয় ভারতীয় জাতীয়তাবাদী দল কংগ্রেসও সাম্প্রদায়িক দল বলে চিহ্নিত ও আটকা পড়ে যাচ্ছে। তাঁর প্রিয় বললাম এজন্য যে ভুমিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় এসে জয়া পরিপুর্ণভাবে প্রকাশ্য স্ববিরোধিতায় জড়িয়ে পড়েছেন। এবার তিনি প্রায় গায়ের জোরে কংগ্রেসকে তকমা দিচ্ছেন “অসাম্প্রদায়িক” দল বলে। আর মুসলিম লীগকে সাম্প্রদায়িক দল বলে ইঙ্গিত দিচ্ছেন। যেমন ভুমিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠার শুরুতে লিখছেন,
    “অধিকাংশ জাতীয়তাবাদী চিন্তাবিদ জাতীয় পরিচিতির বর্ণনাকালে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী ব্যবহার করেছেন – যে দৃষ্টিভঙ্গিতে একজন ভারতীয় মানে একজন হিন্দু। এ বিষয়টি বাঙলা প্রদেশের বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অরবিন্দ ঘোষ ও স্বামী বিবেকানন্দের রচনায় এবং তাদের অনুপ্রাণিত বিশেষ ধরণের “চরম” জাতীয়তাবাদে বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এ জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারা সত্যিকার অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ ছিল না, ‘সাম্প্রদায়িক’ ছিল না”।
    পাঠকেরা শেষের বাক্য আর ঠিক এর আগের বাক্য লক্ষ্য করবেন। এখানে জয়া কেন কোন জাতীয়তাবাদকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে তকমা এটে দিচ্ছেন আর কাকে ‘সাম্প্রদায়িক’নয় বলে তকমা দিচ্ছেন এর নির্ণায়ক নিরপেক্ষ নয়। ফলে বুঝা মুসকিল।
    আবার এর পরের বাক্যঃ
    “জাতীয় আন্দোলনের মুলধারা পরিচালিত হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। ঐ আন্দোলনে ধর্মকে ব্যবহার করা হয় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের অনুভুতিকে জাগ্রত করার জন্য। অন্য দিকে, সাম্প্রদায়িক দল ও আদর্শসমুহ একটি সম্প্রদায়কে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক ইউনিট হিসাবে অভিহিত করে, অন্য সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে এর ছিল চিরবৈরি সম্পর্ক”।
    এখানে, প্রথম দুই বাক্যে বঙ্গভঙ্গ বা ১৯০৫ সালে বাংলার প্রথম ভাগ হওয়া ঠেকাতে হিন্দুদের “অনুশীলন” ও “যুগান্তর” নামে দুই সশস্ত্র জঙ্গিধারার আন্দোলনের কথা বলা হচ্ছে। জয়া তুলেছেন। ঐ “জঙ্গিধারা” এদের বক্তব্যের সারকথা ছিল, দেশকে মা কালী (দেশমাতৃকা) কল্পনা করে দেশের জন্য জীবন বলি দিতে অনুপ্রাণিত করা। আইডিয়াটা বাংলার হিন্দুদের “মা-কালীর” বা শক্তির পুজারী “শাক্ত ধারার” বয়ানের সারকথা থেকে নেয়া। অর্থাৎ হিন্দুদের “অনুশীলন” ও “যুগান্তর” নামে দুই সশস্ত্র জঙ্গিধারার এই আন্দোলনে “রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার” জয়া স্বীকার করছেন। ধর্মের ব্যবহার হওয়ায় জয়ার ক্রাইটিরিয়া অনুসারেই এটা সাম্প্রদায়িক আন্দোলন হয়, “ধর্মনিরপেক্ষ” আন্দোলন হয় না। কিন্তু তার পরেও আমরা দেখি জয়া এটাকে বরং “মানুষের অনুভুতি” জাগানো বলে ন্যায্যতার সাফাই দিচ্ছেন। কিন্তু পরক্ষণেই পরের বাক্যে মুসলিম লীগকে উদ্দেশ্য করে বলছেন – এরা সাম্প্রদায়িক দল।
    ১৯০৫ সালের বাংলা ভাগকে কেন্দ্র করে জয়ার বর্ণিত তিন লাইন দেখলাম। এখন এই পুরা ঘটনাটার ফ্যাক্টস হল, ঢাকাকে রাজধানী করে বাংলা-আসাম মিলিয়ে কার্জন সাহেবের নতুন ভাগ বিভাগকে পুর্ববঙ্গ নিজেদের পক্ষের সুযোগ হিসাবে দেখেছিল। এটাকে বাঙলার হিন্দু ভদ্রলোকদের (এলিটদের) ক্ষমতা কর্তৃত্ব আর দাপট থেকে নিজেদের জন্য তুলনামূলক মুক্তির উপায় হিসাবে দেখেছিল। এজন্যই তারা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে। এখন কলোনি ঔরসের কলকাতায় বেড়ে উঠা জমিদারি ক্ষমতা কর্তৃত্ব আর দাপটের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোকে যদি জয়া হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক কাজ মনে করেন এটা জয়ার ভুল এবং স্ববিরোধীতা অবশ্যই। জয়া নিজেই যে “হিন্দু ভদ্রলোকদেরকে” ভিলেন বানিয়েছেন, জয়া বলছেন এরা জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করে আসছিল সে সময় থেকে। জয়া নিজেই বলেছেন, বাঙলার হিন্দু ভদ্রলোকদের (এলিটদের) ক্রম-ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও মর্যাদা হুমকির সম্মুখীন হওয়ায় তাঁরা সামাজিক অবস্থান অক্ষুন্ন রাখার লক্ষ্যে কূটকৌশল অবলম্বন করে এবং নিজেদের কাজের যৌক্তিকতা হিসাবে বিভিন্ন ভাবাদর্শকে (ideologies) ব্যবহার করে। সত্যিকার অর্থে ঐ কূটকৌশলকে একমাত্র সাম্প্রদায়িকতা হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়”।
    তার মানে জয়া এবার নিজেই নিজের বিরোধিতা করছেন। আগে বলেছিলেন, দুবারই বাংলা ভাগের ফলে বাঙলার হিন্দু ভদ্রলোকদের (এলিটদের) এতদিনের ক্ষমতা, ধনসম্পদ ও মর্যাদা হুমকির মুখে পড়েছিল ফলে তাদের প্রতিক্রিয়াকে “সাম্প্রদায়িকতা হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়” বলেছিলেন জয়া। পুর্ববঙ্গের মুসলমানেরা তো এই এলিট ক্ষমতাকেই ভাঙ্গতে চাইছিলেন। ফলে বঙ্গভঙ্গকে নিজেদের পক্ষের সুযোগ হিসাবে দেখেছিলেন। এর মধ্যে ভুল কোথায়? অথচ বাংলা ভাগ শুনলেই জয়া একে “সাম্প্রদায়িক” কাজ বলে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

    জয়া চ্যাটার্জির সংকট হল, একদিকে তিনি বাঙলার হিন্দু ভদ্রলোকদের (এলিটদের) ভিলেন ভুমিকা গবেষণায় আবিস্কার করেছেন। কিন্তু সমস্যা বেধেছে, আগে থেকে মাথায় থাকা আগাম এক চিন্তা ফ্রেমে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ এসব বর্গ বা ক্যাটাগরিগুলোর ভিতর দিয়ে তিনি ভিলেন ভুমিকাকে ধরতে চাইছেন, ব্যাখ্যা করতে চাইছেন। অথচ এই চিন্তা ফ্রেম বহু আগে থেকেই বর্ণবাদী ফলে প্রশ্নবিদ্ধ। আবার কলোনি শাসন মানেই বিপরীতে কিছু করলে সেটা জাতীয়তাবাদ এমন আগাম মুখস্ত অনুমানের বদলে আগে জনগোষ্ঠির রাজনৈতিকতা বোধ, রাজনৈতিক কমিউনিটি, রাজনীতি ইত্যাদি ধারণাগুলোকে এক্সপ্লোর করা দরকার। এর আগে “জাতীয়তাবাদের” নামে কোন ধারণার পক্ষে ঝাপিয়ে পড়া অর্থহীন। এছাড়া মনে রাখতে হবে সব ধরণের জাতীয়তাবাদই সেকটোরিয়ান অর্থে সাম্প্রদায়িক এবং ভিন্ন জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে বর্ণবাদী ঘৃণা বিদ্বেষ অন্তরে পুষে রাখে।

    [এই লেখাটার প্রথম ভাষ্য প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের ঈদুল ফিতর জুলাই ২০১৫ সংখ্যায়। এখানে আরও সংযোজন ও এডিট করে আবার ছাপা হল। ঈদ সংখ্যাটার কোন অনলাইন ভার্সন ছিল না, কেবল প্রিন্ট ভার্সন। তাই প্রিন্ট ভার্সানের স্ক্যান কপি আগ্রহীরা এখানে দেখতে পারেন। এলেখার এডিট গত মাসের প্রথম সপ্তাহে শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু নানান ব্যস্ততার ভিড়ে শেষ করতে পারি নাই। আজ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫ শেষ করা হল। একারণে শিরোনামের লীংক এড্রেসের তারিখ “আগস্ট” দেখাচ্ছে।]

    আপডেটঃ ২৪ মে ২০২৩, ভোররাত দুইটা তেতাল্লিশ

  • বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথার পিঠে কিছু মন্তব্য

    বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কথার পিঠে কিছু মন্তব্য
    গৌতম দাস
    ২৮ জুলাই ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-aR

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এক সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে গত মাসের ২৩ জুন দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায়। বিগত আশি’র দশকে তাকে আমরা নিজেদের মধ্যে সংক্ষেপে SIC বা সিক স্যার বলে ডাকতাম। সে সময়ে উনি কী বলেন তা শোনার, কী লিখতেন তা পড়ার একটা আগ্রহ কাজ করত, ফেসবুকের ভাষায় যাকে বলে, তাকে ফলো করতাম। যদিও গত কয়েক বছর ধরে তার কোনো লেখা ধৈর্য ধরে পড়েছি বলে আর মনে পড়ে না। গত ৮০’র দশকের শেষ থেকে আগ্রহে ভাটা পড়ে গেছে। এর কারণ সম্ভবত ওই সময় থেকে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট বুঝতে তার কথা আর কোনই কাজে লাগছিল না। অর্থাৎ ৮০’র দশকের প্রথম দিকে মনে হতো যে, বোধহয় কাজে লাগছে। ফলে একালে আলোকিত বাংলাদেশের ওই সাক্ষাৎকার পড়ার পর থেকে নিঃসন্দেহে আবার নতুন এক ধরনের আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। যা থেকে এ’লেখার সুত্রপাত।

    বাংলাদেশে সেক্যুলারিজম নিয়ে তত্ত্ব করা ও পক্ষে তত্ত্ব দেয়া তার চেয়ে বেশি বোধহয় আর কেউ করেননি। বদরুদ্দীন উমরসহ কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লিটারেচারে যারা লিখেছেন ‘সেক্যুলারিজম’ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রসঙ্গ হিসেবে সেখানে ছিল অবশ্যই। কিন্তু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর “সেক্যুলারিজম” এর বয়ান তফসির সেগুলো থেকে আলাদা। কেন আলাদা, কোথায় আলাদা তা তখন বুঝতে বা বুঝিয়ে বলতে পারতাম না, শুধু ফারাকটা টের পেতাম। পেছন ফিরে দেখলে এখন মনে হয় সম্ভবত ফারাকটা বুঝতে পারি।

    বাংলাদেশের কমিউনিস্টরা ইউরোপকে, ইউরোপের ইতিহাসকে যা জেনেছে তা শুধু লাল বই পড়ার ভেতর দিয়ে। লাল বইয়ের বাইরে দিয়ে অন্য কোনো বই পড়ে ইউরোপকে জানার চেষ্টা কমিউনিস্ট রেওয়াজে নিরুৎসাহিত করা হয়, তাই। অর্থাৎ ইউরোপের নিজের সম্পর্কে নিজস্ব লেখা পড়ে সেখান থেকে ইউরোপকে জানার চেষ্টা কমিউনিস্টদের চর্চা-অভ্যাসে নেই। নেই এজন্য যে, লাল বইয়ের বাইরের কোনো কিছু মানে ‘বুর্জোয়া’ জ্ঞান; যা কমিউনিস্টদের চোখে শত্রুর বয়ান, মানে অনাস্থা রাখতে হবে তাতে – এই ধারণা প্রবলভাবে কাজ করে। এটা করত বলা ভাল কারণ এখন সব আউলায়া গেছে, কমিউনিস্টরা আর সে ধারণা ধরে রাখতে, টিকাতে পারে নাই।

    বিপরীতে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঠিক কোনো দলীয় ধারার কমিউনিস্ট নন, আর নিজেকে তিনি কমিউনিস্ট বলার চেয়ে ‘প্রগতিশীল’ বলতে পছন্দ করেছেন দেখা গেছে। এছাড়া তিনি লন্ডনে পড়াশোনা করেছেন, সেখানে বসে ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি করেছেন। ইংরেজি সাহিত্য বোঝার প্রয়োজনে ইংলিশ সামাজিক রাজনৈতিক পটভূমি তিনি জানতে বাধ্য হয়েছিলেন। এ কারণে তিনি ইউরোপের ঘরের বই শুধু নয়, তিনি ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক, সামাজিক আন্দোলন “এনলাইটমেন্ট আন্দোলন ও আধুনিকতা” সম্পর্কে জেনেছেন, নিজের শখের পড়াশোনা সূত্রে নয়, বরং বাধ্য হয়ে, ইংরেজি ভাষার উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক ঘটনা ও এর ফলে ভাষায় বদলকে বোঝার প্রয়োজনে। একজন কমিউনিস্টের চোখে এনলাইটমেন্ট আন্দোলন ও আধুনিকতাকে বুঝা, পারলে তত্ত্বের দিকসহ বিস্তার করে বুঝা, জানা ও পড়াশোনা কোন কাজের বিষয় নয়। কারণ মোটা দাগে এগুলো সবকিছুই ‘বুর্জোয়া’ জ্ঞান যা শত্রুর বয়ান, যা এত জানার কিছু নয়। ফলে এখানে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একজন সক্রিয় কমিউনিস্টের চেয়ে একেবারেই আলাদা। অতএব তাঁর আধুনিকতা ও সেক্যুলারিজমের বর্ণনা কমিউনিস্টদের চেয়ে বিস্তারিত ও ভিন্ন হতে বাধ্য। এখন বুঝি, এই ফারাকটাই পাঠক হিসেবে আমাকে আকর্ষণ করত। তবে অবশ্যই তিনি যাই লিখতেন তা বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতিকেই সমাজে পুষ্ট করত। নিজের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রগতিশীল, আধুনিক, বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্য রাজনীতির মতাদর্শ সরবরাহকারী, পোক্তকারী।

    ফলে একালে আলোকিত বাংলাদেশের এই সাক্ষাৎকার নিঃসন্দেহে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে যিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের মতাদর্শ সরবরাহকারী, তাদের আধুনিকতা ও সেক্যুলারিজম সম্পর্কে বয়ান যার কারণে পোক্ত হয়েছে, তিনি একালে এসে যখন সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেন, “বাঙালি জাতীয়তাবাদের এখন আর দেয়ার কিছু নেই” তখন এটা খুবই ইন্টারেস্টিং ও কৌতূহল উদ্রেককারী।

    পত্রিকার সম্পাদকের চোখে সাক্ষাৎকারের এদিকটা শিরোনাম হওয়ার যোগ্য হওয়ারই কথা। হয়েছেও তাই। কিন্তু আমার মন আকর্ষিত হয়েছে শুধু এদিকটার কারণে নয়। অন্য কারণে। যারা বয়সে ১৯৪৭ সালে কমপক্ষে সজ্ঞান কিশোর বা টিনএজে ছিল, তাদের নিয়ে আমার এক বিশেষ কৌতূহল আছে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তেমনই একজন ব্যক্তিত্ব। তাঁর জন্ম ১৯৩৬ সালে, বয়স এখন ৮০ বছর। তাঁর প্রজন্মের সদস্যরা এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ অথবা দেহ রেখেছেন। এদের সেকালের প্রবল রাজনৈতিক আন্দোলন হল “পাকিস্তান আন্দোলন”, যার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাধারী ছিলেন তাদের প্রজন্ম। এ সাক্ষাৎকারেও আমরা সেটাই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু “পাকিস্তান আন্দোলনের” প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাধারী এই প্রজন্ম গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ ষাটের দশকের পর থেকে পুর্ববঙ্গের বা পুর্ব-পাকিস্তানের রাজনীতিতে ‘পাকিস্তান আন্দোলনকে’ আর নিজের মনে না করা এবং এর সাথে সম্পর্ককে অস্বীকারের নতুন বয়ান খাড়া করা শুরু হয়ে যায়। এছাড়াও ১৯৭১-২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সিক স্যারের প্রজন্ম সাধারণ কথাবার্তার মধ্যেও ‘পাকিস্তান আন্দোলনের’ কথা ঘুণাক্ষরেও যেন রেফারেন্স হিসেবে না এসে যায় সেজন্য মুখে কুলুপ আঁটেন, একাজে নিজেকে প্রশিক্ষিত করে নেন। কারণ তাদের কৈশোর বা তরুণ বয়সের অভিজ্ঞতা, তখন যা তাদের আন্দোলিত করেছিল, চরম সত্য মনে হয়েছিল তা স্বাধীনতার পরের কালে উচ্চারণ করলে নিজ পরিবারের তরুণের হাতে নিগৃহীত না হলেও কটুকথা শোনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কারণ তারা রক্ষণশীল, প্রাচীনপন্থী শুধু নয়, পরাজিত চিন্তাধারার প্রতীক বলে চিহ্নিত হতে পারেন। এভাবে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রত্যক্ষদর্শী প্রজন্ম কিন্তু সেই যে ঐকালে মুখে কুলুপ আঁটলেন সে অভিজ্ঞতা কাউকে আর তাঁরা বলেন না। এমনকি নাতি-নাতনিদেরকেও না। যদিও শুধু রাজনীতির মাঠে নয়, সেসময়ের পুর্ববঙ্গের প্রতিটা মুসলমান পরিবারের ঘরে ঘরে প্রত্যেক সদস্যের কাছে পাকিস্তান আন্দোলনে কোথায় কি হচ্ছে তা সকলের জীবনের আপন ঘটনাবলী হিসাবে লেগে ছিল। সেই প্রজন্মের এরা আজ বয়সের ভারে একে একে সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। এই প্রজন্ম শেষ হয়ে যাওয়ার আগে, আমরা তাদের অভিজ্ঞতাকে মানি আর নাই মানি, তাদের অভিজ্ঞতা একালে সংরক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

    বাঙালি জাতীয়তাবাদের কারণে আমাদের ইতিহাস বয়ান শুরু হয় ১৯৫২ সাল থেকে। যেন এর আগে পুর্ববঙ্গে আমরা কেউ ছিলাম না। ভুঁইফোঁড়ের মতো ১৯৫২ সাল থেকে যেন আমাদের আবির্ভাব ঘটেছিল। এর আগে পাকিস্তান আন্দোলন বলে যেন কিছুই ঘটেনি। অথচ মানুষ তো ভুঁইফোঁড় নয়, হতে পারে না। অতীতের সবই ভালও নয় আবার সবই মন্দও নয়। এমন অতীতের উপরেই বর্তমান জন্মায়, দাঁড়িয়ে থাকে। আবার ফাউন্ডেশনাল কিছু বৈশিষ্ট্য থাকেই, যার ওপর বর্তমান খাড়া হয়ে থাকে। পাকিস্তান আন্দোলন তেমনই একটা কিছু। এটা ভীষণ আগ্রহ ও কৌতূহলের যে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার নিজের পাকিস্তান আন্দোলনের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলছেন। আমাদের সঙ্গে শেয়ার করছেন। এখানে নিচে সেসব নিয়ে কিছু অবজারভেশন ও মন্তব্য বলে এই লেখা শেষ করব।

    এক. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী পাকিস্তান আন্দোলন ওন করছেন বা আপন বলে ধারণা দিচ্ছেন।
    তিনি বলছেন, ‘ব্রিটিশ ভারতে আমাদের জন্ম, ব্রিটিশ-বিরোধী লড়াই, পাকিস্তান আন্দোলন দেখে বড় হচ্ছি। ফলে বেড়ে ওঠার মধ্যেই একটা রাজনীতি সচেতনতা ছিল।’ অর্থাৎ পাকিস্তান আন্দোলন খারাপ কিছু ছিল না, যা তিনি সে সময় দেখেছেন এবং এখন স্মরণ করার মতো তা গুরুত্বপূর্ণ ভাবছেন। যদিও পরের প্রশ্নের জবাবে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনকে নতুন গড়ে ওঠা মুসলমান মধ্যবিত্তের আকাঙ্খার বাহক হিসেবে দেখছেন। তার এ’কথাটা সত্য, তবে আংশিক ও খন্ডিত। খুব সম্ভবত তার কাছে যা ইমিডিয়েট বা চোখের সামনে, শুধু সেই শহুরে মধ্যবিত্তের কথাই তিনি এখানে ফোকাসে এনেছেন। কেন খন্ডিত বলছি?

    আসলে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান এবং একনিষ্ঠ শক্ত সমর্থক ছিল গ্রামের কৃষক-প্রজা। সব সমাজে সব কালের রাজনীতিতে কোনো না কোনো একটা প্রধান বা মুখ্য স্বার্থ দ্বন্দ্ব থাকে। যাকে ঘিরে সমাজের বাকি সব স্বার্থ দ্বন্দ্বের সংঘাত আবর্তিত হয়, আকার নেয়, অ্যালায়েন্স করে। পাকিস্তান আন্দোলনের কালে সে সমাজের প্রধান দ্বন্দ্ব ছিল জমিদার-প্রজা; এমন প্রধান দ্বন্দ্ব হয়ে তা বিরাজিত ছিল পেছনের দেড়শ’ বছরের বেশি। কলকাতা কেন্দ্রিক বা কলকাতাগামী দৃশ্যমান মুসলমান মধ্যবিত্তের উত্থান বা জন্ম ১৯০০ সালের পর থেকে। এরপরেই একমাত্র এর আগে থেকে চলে আসা গ্রামের কৃষক-প্রজার জমি পাওয়ার আন্দোলনের সঙ্গে শহুরে মধ্যবিত্তের যে রাজনৈতিক অ্যালায়েন্স গঠিত হয় সেটাকেই আমরা অন্য ভাষায় পাকিস্তান আন্দোলন বলে চিনি। এই শ্রেণীমৈত্রীর রাজনৈতিক শক্তির বাহকের নাম মুসলিম লীগ। স্মরণ করিয়ে দেয়ার দরকার আছে যে, এটা ১৯৭১ সালের মুসলিম লীগ নয়। এমনকি এটা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের পরের সব ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে কুক্ষিগত করে সাজানো দাপটে চাপা পড়া পূর্ব পাকিস্তান, এমন সময়কালের মুসলিম লীগের কথাও বলা হচ্ছে না। ১৯৪৭ সালের আগের কথা বলছি, যখন পূর্ববঙ্গের গ্রাম-শহরের এমন কোনো মুসলিম প্রজন্ম পাওয়া যাবে না যারা সেকালের মুসলিম লীগকে তাদের ভবিষ্যৎ, তাদের সব আকাঙ্খার বাহক সংগঠন মনে না করত। তৎকালের জমিদারি উচ্ছেদের প্রধান এবং একমাত্র দাবিদার সংগঠন মুসলিম লীগ। এ অর্থে মুসলিম লীগ বিপ্লবী। পূর্ববঙ্গের চোখের মণি এই আন্দোলনের নাম “পাকিস্তান আন্দোলন”। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সেই স্মৃতির কথা বলছেন।

    দুই. মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলনকে তিনি ‘জাতীয়তাবাদী আন্দোলন’ বলছেন
    এটা খুবই ইন্টারেস্টিং যে, তিনি পাকিস্তান আন্দোলনকে ‘জাতীয়তাবাদী আন্দোলন’ বলছেন। কথাটা বলছি এজন্য যে, ১৯৪৭ বা পাকিস্তান আন্দোলন সম্পর্কে ভারতের ঐতিহাসিকদের সাধারণ মূল্যায়ন বয়ান এবং অভিযোগ হলো এটা ‘ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের আন্দোলন’, ‘জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্ব’ ইত্যাদি। অতএব মুসলিম লীগের এই রাজনীতি নেতিবাচক, ‘সাম্প্রদায়িক’ ও ঘৃণিত। পূর্ববঙ্গের অনেক কমিউনিস্ট বা প্রগতিশীল এই বয়ান অনুমোদন করেন বা আপন মনে করেন। এই পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িকতা ও সেক্যুলারিজম নিয়ে বই-পুস্তক, কলাম লিখে যিনি বিখ্যাত সেই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তা আজও মনে করছেন না। পাকিস্তান আন্দোলনকে ‘জাতীয়তাবাদী আন্দোলন’ বলছেন এটা নিঃসন্দেহে ইন্টারেস্টিং। অনেকের মনে হতে পারে, এটা তার হাতছুট বা মুখ ফসকে বেরিয়ে যাওয়া কোনো কথা। তাদের নিশ্চিত করার জন্য বলছি – না তা নয়। তাঁর দ্বিতীয় প্রশ্নের লম্বা জবাবের শেষ প্যারায় তিনি আবার পাকিস্তান আন্দোলন সম্পর্কে আর একটু পরিষ্কার করে বলছেন, এটা ‘পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ’। বলছেন জিন্নাহর বক্তৃতার (১৯৪৮) প্রতিক্রিয়ায় “… এই সূত্রেই পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের যাত্রা শুরু হলো।”

    অর্থাৎ এখানে তার সার মূল্যায়ন হলো, পাকিস্তান আন্দোলন কোনো নেতিবাচক আন্দোলন তো নয়ই, কোনো ‘ঘৃণিত’ বা “সাম্প্রদায়িক” ধর্মভিত্তিক আন্দোলনও নয়; বরং জনগণের আকাঙ্খার ধারক, জনগণকে দেয়া এক প্রতিশ্রুতির আন্দোলন। তবে ১৯৪৮ সালের পর থেকে জিন্নাহর বক্তৃতায় এটা বিপথগামী বা বিচ্যুত হয়ে যায়।

    তিন. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ সাক্ষাৎকারেও নিজে একটা প্রগতিশীল পজিশন নিচ্ছেন বলে মনে করছেন।
    তিনি কোনো দলীয় কমিউনিস্ট সদস্য বলে আমার জানা নেই। তবে তিনি নিজেকে কমিউনিস্টদের প্রতি নেক আছে এমন ধারণার প্রগতিশীল বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন, দেখেছি। চতুর্থ প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রশ্ন তুলে বলছেন, “কমিউনিস্ট পার্টি কিন্তু মধ্যবিত্তেরই পার্টি আসলে। কমিউনিস্ট পার্টির এখানে প্রধান দুর্বলতা হলো, তারা কৃষকের কাছে যেতে পারেনি। এজন্য দেশে বিপ্লব হয়নি।”

    এখানে আমরা দেখছি মূলত তার অভিযোগ দুইটাঃ ‘মধ্যবিত্তেরই পার্টি’ আর ‘তারা কৃষকের কাছে যেতে পারে নাই।’ খুবই মারাত্মক অভিযোগ, সন্দেহ নেই। তবে অভিযোগ অবশ্যই জেনুইন এজন্য যে, কমিউনিস্ট পার্টি কখনও ‘জমিদারি উচ্ছেদ’ এর পক্ষে কখনও কোনো অবস্থান নেয়নি। তবু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কমিউনিস্টদের প্রতি যথেষ্ট সিমপ্যাথিটিক। তাই সাতচল্লিশের পরের কথা বলছেন, ‘পাকিস্তান রাষ্ট্রও কমিউনিস্টদের খুব অত্যাচার করতে শুরু করল।’ তার মতো অনেক কমিউনিস্ট বা একাদেমিসিয়ানরাও তাই মনে করে থাকেন যে, স্বাধীন পাকিস্তানেও কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধই থেকে গিয়েছিল। কিন্তু এগুলো বাস্তব সত্য কিন্তু সবটা সত্যি না এবং একপেশে। সেকালের এবং একালের আমাদের অনেকে মনে করতে পারেন, আয়ুব খানই পাকিস্তানে প্রথম ক্যু করেন। এ কথাটাও সঠিক নয়। প্রথম ক্যু করে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেন কমিউনিস্টরা মার্চ ১৯৫১ সালে এবং তাতে ব্যর্থ হলে তাদের দল নিষিদ্ধ হয়ে যায়, এসব জিন্নাহর মৃত্যুর পর লিয়াকত আলী খানের প্রধানমন্ত্রীর আমলের ঘটনা। ইতিহাসের খাতিরে “রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র” নামে খ্যাত এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত প্রসঙ্গ সামনে আনার দরকার আছে। ফলে একথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে সারা পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্টরা ধর্মবিরোধী বলে অজুহাতে বা আমেরিকার প্ররোচনাতে নিষিদ্ধ ছিল না।

    চার. “পাকিস্তান ধর্মরাষ্ট্র হবে এমনটা তারা চায় নাই”
    সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এই বক্তব্য পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম লীগ সম্পর্কে বহু অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণ করে। পঞ্চম প্রশ্নের জবাবে তিনি নিজের এ গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন পেশ করছেন। আবার একদিকে স্বীকার করছেন, ‘পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ছিল ধর্ম।’ কিন্তু এই পাকিস্তান আন্দোলনের সপক্ষে আবার শক্ত ন্যায্যতা নিজেই দিয়েছেন। বলছেন, “তারা একটা রাষ্ট্র (অর্থাৎ পাকিস্তান) চেয়েছে, যেখানে তারা মুক্ত হতে পারবে। তারা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা চেয়েছে। জমিদার হিন্দু, মহাজন হিন্দু, চাকরি-বাকরিতে হিন্দু, ব্যবসা-বাণিজ্যে হিন্দু ওদের হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য পাকিস্তান দরকার”।
    তবু তাঁর এই শক্ত ন্যায্যতার প্রশংসা করার পরেও একটা ক্রিটিক্যাল সমালোচনার দিক মনে রাখার দরকার আছে। একথা সত্যি সেসময়ের সমাজ বলতে সেটা ছিল হিন্দুদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক একচেটিয়া ক্ষমতা আধিপত্যের সমাজ। বিপরীতে মুসলমানদের অবস্থান হিন্দু জাত-বর্ণপ্রথায় নমশুদ্রেরও নীচে, এমনকি মুসলমানেরা বাঙালি বলেও কোন স্বীকৃতি ছিল না। এরপরেও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যেভাবে পরিস্থিতিটাকে হাজির করেছেন যে জমিদারগিরি, মহাজনগিরি, চাকরি-বাকরিতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ইত্যাদি সবকিছুতে হিন্দু প্রাধান্যে ছিল বলে পাকিস্তান আন্দোলন জমিদার হিন্দু, মহাজন হিন্দুকে সরিয়ে মুসলমান জমিদার, মুসলমান মহাজন কায়েমের আন্দোলন ছিল না। ফলে কমিউনিষ্টদের মধ্যে যেমন সব কিছুকে অর্থনীতিবাদী ঝোঁকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা থাকে এটা তা ছিল না। বরং খোদ জমিদার-প্রজা সম্পর্কটাই উতখাত, ‘জমিদারি উচ্ছেদ’ এই ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের দাবি এবং এক ঐতিহাসিক অর্জন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের পরে পুর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ কমিটি বাস্তবে পশ্চিম পাকিস্তান মুসলিম লীগের অধীনস্ত, উচ্ছিষ্টভোগী হয়ে পড়ে একথা সত্য। ফলে অচিরেই (১৯৪৯) আওয়ামি মুসলিম লীগ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। কিন্তু সেজন্য পাকিস্তান আন্দোলনের বিখ্যাত অর্জন ১৯৫১ সালের ১৫ মে জমিদারি উচ্ছেদ আইন (THE STATE ACQUISITION AND TENANCY ACT, 1950) পাশ করা সবচেয়ে বিপ্লবী ঐতিহাসিক ঘটনা। একে খাটো করতে পারি না। আজও স্বাধীন বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে আমাদের জন্য এটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল। ফলে এটা হিন্দু জমিদারের জায়গায় মুসলমান জমিদার বসানোর আন্দোলন ছিল না। এই তাতপর্য যেন আমাদের চোখ না এড়ায়।

    পাঁচঃ “নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এই দিক থেকে দেখতে হবে”
    এতক্ষণ রাষ্ট্র আলোচনায় ধারণাটাকে তিনি ‘আধুনিক রাষ্ট্র বনাম ধর্ম রাষ্ট্রের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। কিন্তু এবার ষষ্ঠ প্রশ্নে এসে ‘পুঁজিবাদী রাষ্ট্র’ বলে এক নতুন ধারণা আমদানি করেছেন। তিনি বলছেন, “নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এই দিক থেকে দেখতে হবে”। ‘নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র’ এ কথার একটাই অর্থ হতে পারে যে, নিপীড়ন বলতে তিনি শ্রেণী বা অর্থনীতিবিষয়ক নিপীড়নের কথা বলছেন। কিন্তু অর্থনীতিবিষয়ক ছাড়াও ভিন্ন ধরণের নিপীড়ন হতে পারে। যেমন জাতিগত নিপীড়ন বলতে মুখ্যত তা রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনাই বোঝায়।
    তবে এর চেয়েও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এক মারাত্মক মন্তব্য এখানে আছে – জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট বিষয়ে। তিনি ধারণাটা অপ্রয়োজনীয় দাবি করে বলছেন, ‘পৃথিবীতে জাতিরাষ্ট্র বলে কোনো রাষ্ট্র নেই। এখানে (বাংলাদেশ) একটা জাতিপ্রধান আছে বটে, কিন্তু অন্য জাতিগোষ্ঠীও আছে।’ তার কথা হয়তো সঠিক। তবে ইংরেজি শব্দ ‘রেস’ ও ‘নেশন’ ধারণার বিভ্রান্তি থেকে এসবের ভুল ধারণার উৎপত্তি। তিনিও এই বিভ্রান্তি নতুন করে ছড়ালেন। মুল সমস্যা হল, ‘রেস’ ও ‘নেশন’ দুইটি শব্দকেই বাংলায় ‘জাতি’ অনুবাদ করে সে বিভ্রান্তিকে আরও উসকে দেয়া হয়েছে। ফলে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এসব বিভ্রান্তির বাইরে এমন দাবি করা যাচ্ছে না। যেমন তিনি বলছেন, ‘রাষ্ট্র এবং জাতি এক না। একটা রাষ্ট্রে একাধিক জাতি থাকতে পারে। রাষ্ট্র হচ্ছে একটা রাজনৈতিক প্রপঞ্চ, আর ‘জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ’। এর প্রথম দুই ছোট বাক্য হয়ত সঠিক। কিন্তু “জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ” এ কথাটা তিনি যথেষ্ট ভেবে বলেছেন বলে মনে হয় না। কারণ এ বাক্যটাও ‘রেস‘ ও ‘নেশন’ বিষয়ক বিভ্রান্তির বাইরে নয়। রেস অর্থে ‘জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ’, কথাটা সঠিক। কিন্তু নেশন কথাটার বেলায় “নেশন অর্থে জাতি হচ্ছে নৃতাত্ত্বিক বর্গ’, এই কথাটা সঠিক নয়। ‘নেশন’ অবশ্যই পলিটিক্যাল ক্যাটাগরি। রাজনৈতিকভাবে কনস্ট্রাকটেড বর্গ ও ধারণা। রেস ধারণার মতো তা প্রাকৃতিক বা ‘নৃতাত্ত্বিক বর্গ’ নয়, বরং রাজনৈতিক বর্গ।
    তবে হয়তো এটা বলা যায় যে, ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণাটা অপ্রতুল ও অস্পষ্টই শুধু নয়, বেকুবি এবং অনিবার্যভাবেই তা বর্ণবাদিতায় ঢলে পড়বেই, এমন ধারণা।
    এই প্রসঙ্গটা শেষ করার আগে, “নিপীড়ন জিনিসটা আসলে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের…” প্রসঙ্গে –
    বাংলাদেশে পাহাড়িদের ওপর বাঙালি রাষ্ট্রের নিপীড়ন, এটা কি ‘পুজিবাদী রাষ্ট্রের’ কারণে ঘটছে? আমরা কি তাই বলতে পারি না এগুলো অর্থহীন কথাবার্তা হবে? আসলে এসব ‘শ্রেণী বিলাসী’ চিন্তা আমাদের ত্যাগ করতে হবে। অনেক হয়েছে। তবে তার শেষ বাক্য, তাই, “জাতিরাষ্ট্র নয়, আমরা চেয়েছি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” – এ কথা বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা কখনও মানবে না। বোঝা যাচ্ছে, শেষ বয়সে এসে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে হাত ছেড়ে দিতে চাইছেন। প্রসঙ্গটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, এ স্বল্প পরিসরের বাইরে সময় নিয়ে বিস্তারিত আলাপ তুলতে হবে।

    ছয়ঃ “হেফাজতের সঙ্গে গণজাগরণের যে দূরত্ব সেটা আসলে শ্রেণীদূরত্ব”
    গত ২০১৩ থেকে শাহবাগ অন্দোলন সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কিছু সাহসী মন্তব্য করেছেন। সাধারণ কমিউনিষ্টদের থেকে ব্যাতিক্রমী মন্তব্য করেছেন তিনি। বলেছেন, “শাহবাগ আন্দোলন পর্বে আত্মপরিচয়ের রাজনীতির চেয়ে আমার কাছে বড় দিক মনে হয়েছে শ্রেণী পরিচয়। শ্রেণী-বিভাজনটাই সেখানে ছিল প্রধান ইস্যু। হেফাজতের সঙ্গে গণজাগরণের যে দূরত্ব সেটা আসলে শ্রেণীদূরত্ব। গ্রামে মাদ্রাসাগুলোতে যারা পড়ছে তারা দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত। আমরা এখানে যারা পড়ছি তারা সুবিধাপ্রাপ্ত। এখানে দূরত্ব আছে। গণজাগরণ মঞ্চে তুমি কিন্তু শ্রমজীবীকে টানতে পারছ না। যে রিকশাঅলা তোমাকে ওখানে পৌছে দিয়ে যায় সে কিন্তু মঞ্চে যাচ্ছে না। রাস্তায় যেসব শ্রমিকরা আছে তারাও কিন্তু আসছে না। এমনকি তোমরা ভদ্রলোকরা যে সভা করছে সে তার বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়ে যেতে পারে। যে ওটা বড়লোকদের ব্যাপার, নাচানাচি করতেছে, গান বাজনা করতেছে। শ্রেণীর সমস্যাটাই হচ্ছে প্রধান সমস্যা। শ্রেণীর দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখলে এগুলো ব্যাখ্যা করা যাবে না”। তাঁর কথায় হয়ত পয়েন্ট আছে কিন্তু কোন কমিউনিষ্ট এমনকি “দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ” করার সুযোগ হিসাবে যারা “শাহবাগকে” দেখেছেন, নিয়মিত সাময়িকী বের করেছেন, টক শোতে কমিউনিষ্ট হয়েও লীগ ও সরকারের পক্ষে সাফাই, তত্ত্ব দিয়েছেন এমন কাউকেই এমন অবস্থান নিতে দেখা যায় নাই। সে হিসাবে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এমন মন্তব্য সাহসী ও ব্যতিক্রমী অবশ্যই।

    সাতঃ “আমার রাষ্ট্রের প্রধান সমস্যা কী? একটা হলো নদীর সমস্যা”
    কোন রাখঢাক না রেখে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলছেন, “বাঙালি জাতীয়তাবাদ আছে, কিন্তু তার এখন আর দেওয়ার কিছু নাই। আমার রাষ্ট্রের প্রধান সমস্যা কী? একটা হলো নদীর সমস্যা। আমাদের চুয়ান্নোটি অভিন্ন নদীর প্রবাহ যে শুকিয়ে আসছে সেটা নিয়ে কি জাতীয়তাবাদীরা কথা বলছে? হিন্দির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কি তারা কথা বলছে? নরেন্দ্র মোদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দিতে বক্তৃতা দিয়ে গেলেন। পাকিস্তানের কেউ যদি উর্দুতে বক্তৃতা দিত আমরা মানতাম? অথচ মোদিকে আমরা হাততালি দিলাম। জাতীয়তাবাদের কথা বললে। জাতীয়তাবাদের প্রধান উপাদান তো ভাষা”।
    এটা খুবই তাতপর্যপুর্ণ যে “প্রগতিশীল” আশি বছরের তরুণ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সরাসরি ভারতের বাংলাদেশ নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। অথচ এখনও অনেক কমিউনিষ্টকে আমরা পাই যারা এমন সমালোচনাকে “সাম্প্রদায়িক” হিন্দু বিরোধীতার কাজ মনে করেন। এর আগেই কখনও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে “চুয়ান্নোটি অভিন্ন নদীর প্রবাহ” নিয়ে কথা বলতে শুনেছি বলে মনে করতে পারলাম না। তাকে অজস্র ধন্যবাদ জানাই সকলকে সাহস যোগানোর জন্য। মনে হচ্ছে টেক্কা কে টেক্কা বলতে চাইছেন তিনি। আপাতত সবাইকে এর তাতপর্য অনুধাবণ করতে বলব।

    [লেখাটা এর আগে কিছুটা সংক্ষিপ্তভাবে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল গত ২৭ জুলাই ২০১৫ তারিখে। এখানে পরিপুর্ণভাবে আরও অনেক কিছু সংযোজন ও এডিট করে আবার ছাপা হল।]

    [কোন ব্যাপার নজরে আনতে বা লেখকের সাথে যোগাযোগ করতে চাইলে goutamdas1958@hotmail.com এই ঠিকানায় মেল করতে পারেন।]

  • চীনের বিশ্বব্যাংক : গঠন কাঠামো, আর্টিকেল স্বাক্ষরিত

    AIIB সিরিজ

    চীনের বিশ্বব্যাংক : গঠন কাঠামো, আর্টিকেল স্বাক্ষরিত
    গৌতম দাস

    ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-aB

    চীনের নেতৃত্বে বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যাংক, ‘এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক’ বা সংক্ষেপে AIIB এর গঠন প্রক্রিয়া চলছে, আগামী বছর থেকেে এর কর্মতৎপরতা শুরুর কথা জানিয়েছিলাম। ইতোমধ্যে উদ্যোক্তা-স্বাক্ষরদাতা সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নিয়ে পরবর্তী কাজ ‘আর্টিকেলস অব অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা ব্যাংকের গঠনতন্ত্রের মুসাবিদা করার যে কাজ চলছিল তা শেষ হয়েছে এবং তা প্রণয়ন শেষে তাতে সম্মতি স্বাক্ষরের দিন ছিল ২৯ জুন ২০১৫। ‘আর্টিকেলস অব অ্যাগ্রিমেন্ট’ দলিলে কী কী বিষয়ে একমত হওয়া গেছে, এর তাতপর্য কি সে আপডেট হলো এবারের লেখার প্রসঙ্গ।

    প্রথমতঃ ২৯ জুন ২০১৫, স্বাক্ষর শেষে কারা কারা সদস্য রাষ্ট্র হল, তা বলা এখন সহজ হয়ে গেছে। আমেরিকা ও জাপান তাদের প্রভাবাধীন রাষ্ট্রগুলো যাতে AIIB ব্যাংকের সদস্য না হয় সেজন্য গত এক বছর ধরে এই দুই রাষ্ট্র প্রবল কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছিল। কিন্তু ২৯ জুনের পর দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও জাপান এরা নিজেরা বাদে এদের প্রভাবাধীন সব রাষ্ট্রই AIIB এর ‘আর্টিকেলস অব অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা ব্যাংকের গঠনতন্ত্রে সম্মতি স্বাক্ষর দিয়েছে। এখন মোট সদস্য রাষ্ট্র সংখ্যা ৫৭, যার ৫০ জন এরই মধ্যে স্বাক্ষর করে ফেলেছে আর বাকি ৭ জন নিজ নিজ রাষ্ট্রের সম্মতি স্বাক্ষরের পক্ষে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পথে আছে।

    বিগত ২৫ বছর ধরে গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীন ক্রমেই আমেরিকার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছে আর আমেরিকান প্রভাবকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এদিক থেকে বিচারে চীনের AIIB উদ্যোগে দুনিয়ার পাঁচ মহাদেশকেই AIIB ব্যাংক গঠনে শামিল করা – এটাকে গ্লোবাল কূটনৈতিক তৎপরতায় চীনের সর্বোচ্চ সাফল্য ও সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ একদিকে আমেরিকা ও জাপানের সক্রিয় বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে চীন, অন্যদিকে ইউরোপের প্রভাবশালী প্রায় সব রাষ্ট্রকে ব্যাংক গঠন উদ্যোগে শামিল করতে পেরেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি লগ্নে বিশ্বব্যাংকের জন্ম হয়েছিল, সেই থেকে ইউরোপের অর্থনৈতিক ভাগ্য আমেরিকার সাথে গাঁটছাড়ায় বাধা পড়েছিল। সেই গাটছাড়া এই প্রথম অস্বীকার উপেক্ষা করে ইউরোপ এক তাতপর্যপুর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নিল।

    যদিও পাঁচ মহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সব রাষ্ট্রই এর সদস্য, তবু গঠনতন্ত্রে এ ধারণা পরিষ্কার রাখা হয়েছে যে, এই ব্যাংক এশিয়ান রাষ্ট্রগুলোর প্রাধান্যের ব্যাংক। যেমন বলা হয়েছে, শুধু এশিয়া অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্রগুলো সবাই মিলে এ ব্যাংকের কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ ভোটের মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করবে। আর ব্যাংকের মোট মালিকানার এই ৭৫ ভাগের মধ্যে চীন একা ২৬ দশমিক ০৬ শতাংশ ভোট শেয়ার মালিকানা নিবে। এটি সর্বোচ্চ একক মালিকানা। অর্থাৎ চীন বিনিয়োগের যোগানদার হবে। (২৬ দশমিক ০৬ শতাংশ ভোট শেয়ার মানে এটা মালিকানা বোর্ডের ভোট শেয়ারের অনুপাত। চীনের বিনিয়োজিত অর্থের অনুপাত নয়। সংখ্যা হিসাবে সমতুল্য অর্থের অনুপাত একটু বেশি। ২৬ দশমিক ০৬ শতাংশ ভোট শেয়ার এর সমতুল্য অর্থের মালিকানা শেয়ার হল ৩০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক পরিচালনা সিদ্ধান্ত গ্রহণে চীনের মোট ভোট ২৬ দশমিক ০৬ শতাংশ।

    চীনের এ মালিকানা বা ভোটের ক্ষমতার তাৎপর্য কী?

    তাৎপর্য : এক
    ব্যাংকের (এখন থেকে AIIB ব্যাংককে সংক্ষেপে এখানে ব্যাংক বলব) প্রণীত গঠনতন্ত্রে বেশ কিছু প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পূর্বশর্ত দেয়া হয়েছে যে, শুধু ৭৫ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তা অনুমোদিত হতে হবে। অর্থাৎ ৭৫ ভাগ ভোট ওই সিদ্ধান্তের পক্ষে থাকতে হবে। এমন বিষয়গুলো হল যেমন, ব্যাংকের সভাপতি নির্বাচন অথবা কোনো সদস্য রাষ্ট্রের সদস্যপদ স্থগিত করে রাখার সিদ্ধান্ত। আর এছাড়া খোদ গঠনতন্ত্রেই কোনো পরিবর্তন বা সংশোধনী আনতে চাওয়ার মতো মৌলিক কিছু বিষয়ের ক্ষেত্রে এ পূর্বশর্ত প্রযোজ্য হবে। এর সোজা অর্থ এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চাইলে চীনের সম্মতিকে সঙ্গে না নিতে পারলে তা সফল করা যাবে না। কারণ চীন ছাড়া সব সদস্য রাষ্ট্র একজোট হলেও মোট ভোটের পরিমাণ ৭৫ শতাংশের কমই থাকবে, যেহেতু একা চীনের হাতে ২৬ শতাংশের চেয়েও বেশি ভোট ক্ষমতা আছে, তাই। যেমন চেয়ারম্যান এমন ব্যক্তি নির্বাচিত বা বেছে নিতে হবে, যার ওপর চীনের আশীর্বাদ আছে।

    তাৎপর্য : দুই
    ব্যাংকের মালিকানা শেয়ার বিতরণে চীনের একার হাতে সর্বোচ্চ ২৬ দশমিক ০৬ শতাংশ শেয়ার ভোট রাখা হয়েছে তা আগেই বলেছি। কিন্তু দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট হলো ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, আর এ ভোটধারী রাষ্ট্র হলো ভারত। একইভাবে তৃতীয় হলো, ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ ভোটের অধিকারী রাষ্ট্র রাশিয়া। এমন ধারাবাহিকতায় এশিয়ার বাইরের রাষ্ট্র হিসেবে ইউরোপের সবচেয়ে প্রভাবশালী জার্মানির ভাগে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, ফ্রান্স ৩ দশমিক ৪ শতাংশ আর লাতিন আমেরিকার ব্রাজিলের ভাগে ৩ দশমিক ২ শতাংশ শেয়ার ভোট। অর্থাৎ এসবের সোজা অর্থ হলো, এ ব্যাংক পরিচালনে চীনের প্রধান সহযোগী হবে ভারত ও রাশিয়া। এসব বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি (এশিয়ান ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক) প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করে বলা যায়, বিশ্বব্যাংক যেমন আমেরিকান কর্তৃত্বে আর ইউরোপ ও জাপানের সহযোগী ভূমিকায় চলে, আর, এডিবি তেমনি জাপানের কর্তৃত্বের প্রতি আমেরিকান সমর্থনে পরিচালিত হয়। ঠিক তেমনি, AIIB ব্যাংকের বেলায় এটি চীনের নেতৃত্বে ভারত ও রাশিয়ার সহযোগী ভূমিকায় পরিচালিত হবে। অর্থাৎ পুরনো বা চলতি গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারের কোনো মাতবর বা মাতবরের সহযোগী এমন কেউই নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী অবকাঠামো ব্যাংকের পরিচালন মাতব্বরিতে নেই, রাখা হয়নি। নতুন উত্থিত মাতবর চীন আর তার প্রধান সহযোগী ভারত ও রাশিয়া, যারা কেউই পুরনো অর্ডারের মধ্যকার প্রভাবধারী কেউ নয়। ফলে নিঃসন্দেহে বলা যায়, পুরনো বা চলতি গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারের বদলে এর প্রভাব কমে আগামীতে নতুন এক গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারে আসার ক্ষেত্রে সে প্রতিযোগিতায় জিতার এক হাতিয়ার গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান হয়ে হাজির হচ্ছে AIIB ব্যাংক। ব্যাংকের মালিকানা শেয়ারবিন্যাস আমাদের সে ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ বিষয়গুলো ইউরোপের প্রধান প্লেয়ার সদস্য রাষ্ট্র জর্মান, ফ্রান্স বা বৃটেন বুঝেনি তা মনে করা ভুল হবে। অবশ্যই বুঝেছে, তবে বাস্তবতা হলো, গ্লোবাল অর্থনীতির মূলকেন্দ্র হয়ে গেছে এশিয়া (ইউরোপ বা আমেরিকা নয়) বলে এ বাস্তবতা তারা মেনে নিয়েছে। এই ফাকে একটা তুলনামূলক তথ্য দিয়ে রাখি। বিশ্বব্যাংকের মালিকানা-বিন্যাসেও জার্মানির মালিকানা শেয়ার ৪ দশমিক ৩ শতাংশ আর আমেরিকার একক সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ।  আমেরিকার নেতৃত্বে পুরনো বা চলতি গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের বদলে চীনের নেতৃত্বে নতুন কোনো গ্লোবাল অর্ডার চালু হলে আমেরিকার বদলে চীনের সহযোগী হতে ইউরোপের লিডিং অর্থনীতিগুলোর আপত্তি থাকবে না, এ ব্যাপারে তারা মনস্থির করে ফেলেছে – AIIB ব্যাংকের গঠন কাঠামো খুব সম্ভবত এমন ধারণার পক্ষে ইঙ্গিত দিচ্ছে।

    তাৎপর্য : তিন
    ভারতকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শেয়ার মালিকানা দেয়া খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। আমি বহুবার বলে এসেছি, দুনিয়ায় গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা শৃঙ্খলায় আমেরিকান নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ হয়ে গেছে, পরিবর্তন নিশ্চিতভাবে আসন্ন হয়ে উঠছে। চারদিকে সেসবের আলামত ফুটে উঠছে। পুরনো বা চলতি আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের জন্ম বা কায়েম হওয়ার প্রস্তুতিপর্ব অর্থে সময়কাল ছিল দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের ২৫ বছর। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, ১৯৪৪ সালের আশপাশে যেটা পরিণতি পায়। আমাদের এখনকার সময়টাও মানে বিগত মোটামুটি ১০ বছর ধরে আমরাও এবার আমেরিকার বদলে চীনের নেতৃত্বে নতুন কোনো গ্লোবাল অর্ডার চালু হওয়া আসন্ন হয়ে ওঠার কালে যেন আছি। এ পর্যায়ে চীনের পরে চীনের মতোই (চীনের গতিতে না হলেও) রাইজিং অর্থনীতির দেশ হলো ভারত। এভাবে বিচার টানার পেছনে বড় কারণ ও উপাদান হলো, নিজ অভ্যন্তরীণ বাজার হিসেবে ভারত চীনের মতোই বড় ও প্রবল সম্ভাবনাময়। যদিও এখনও অনেক পথ ভারতকে ঠিক ঠিক বুদ্ধিমানের মতো ঈর্ষা ত্যাগ করে হাঁটতে হবে। এ বিচারে চীন ও ভারত যদি রাইজিং ইকোনমি হয়, তবে আমেরিকার বেলায় বলতে হবে ডাউনিং ইকোনমি। ফলে স্বভাবতই ডাউনিং বা নিম্নগামী অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে চীন ও ভারতের নতুন অর্ডার কায়েমের কাজ করণীয় অনেক – একথা মনে রাখলে মানতেই হবে যে, ঢলে পড়া আমেরিকান নেতৃত্বের অর্ডারের বিরুদ্ধে  চীন ও ভারত এরা দুজন পরস্পর ‘ন্যাচারাল এলি’। কারণ তাদের লক্ষ্য করণীয় কাজ এক আর কমন প্রতিদ্বন্দ্বী আমেরিকা। কিন্তু এটি শুধু পুরনো অর্ডারের বিরুদ্ধে লড়ে এক নতুন অর্ডারের জন্ম দেয়ার ক্ষেত্রে। বাকি বিশেষত এই দুই রাষ্ট্রের নিজ নিজ নিরাপত্তা বা সামরিক স্বার্থের বিষয়ে এদের পরস্পরিক রেষারেষি, সন্দেহ, অচিহ্নিত সীমান্ত এবং সবার উপরে চীনের তুলনায় ভারতের খুবই অসম সামরিক সক্ষমতা – এগুলোও সমান বাস্তবতা। আর এ রেষারেষি, সন্দেহকে নিয়মিত আমেরিকান নানান থিঙ্কট্যাঙ্কের মাধ্যমে আমেরিকা ভারতের ইন্টেলিজেন্সিয়া, মিডিয়া ও জনগণের কাছে আরও ভীতিকরভাবে উপস্থাপনের প্রোপাগান্ডা করে যাচ্ছে আমেরিকা। আবার চীন-ভারত সম্ভাব্য কোনো সামরিক বিরোধ যদি দেখা দেয়, তবে সেক্ষেত্রে অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে ভারত শুধু আমেরিকাকেই ভাবতে পারে। এটিও বাস্তবতা। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি, ‘ন্যাচারাল এলি’ কথাটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সীমিত বলে নিতে হবে, চীন-ভারত সম্পর্কের ভেতর সামগ্রিক অর্থে যেন আমরা ভেবে না বসি। ফলে বুঝতেই পারা যায়, চীন-ভারত কুটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি সাদা-কালোর মতো সরল নয়, বরং যথেষ্ট জটিল ও ক্রিটিক্যাল।
    সম্ভবত এসব গুরুত্বপূর্ণ দিক চীন-ভারত ঠান্ডা মাথায় আমল করতে পেরেছে, অন্তত কিছু গুরুত্বপুর্ণ ক্ষেত্রে; যে কারণে চীনের পরই ভারতের ভোট শেয়ার মালিকানা প্রদান। এছাড়া, চীনের দিক থেকে পরিপক্ক চিন্তা যে ইউরোপের চেয়েও ভারতের অগ্রাধিকারের ও উপযুক্ত গুরুত্বের স্বীকৃতি দেয়া। পুঁজির অর্থের পরিমাণের দিক এটি প্রায় ৮ দশমিক ৫২ শতাংশ; (সমতুল্য ভোটের শেয়ার অর্থে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ) এভাবে শেয়ার মালিকানা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পরিমাণ তারা নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে। মোদি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবার পরে, মোদি-ওবামা প্রথম দেখা হয়েছিল ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে। সে সময় থেকেই আমেরিকা AIIB ব্যাংক উদ্যোগ থেকে ভারতকে দূরে রাখতে সব ধরণের কূটনৈতিক লবিং করে গেছে। যদিও শেষে শুধু ভারত নয়, এশিয়ায় আমেরিকার আরও দুই বিশেষ ঘনিষ্ঠ স্ট্র্যাটেজিক বন্ধু – অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াকেও AIIB উদ্যোগ থেকে দূরে রাখতে প্রাণান্ত চেষ্টা করেছে। কিন্তু সবার বেলায় নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। প্রচুর গড়িমসির পর আজ দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়া AIIB ব্যাংকে যথাক্রমে পঞ্চম ও ষষ্ঠ বড় শেয়ারহোল্ডার মালিক।

    তাৎপর্য : চার
    আমরা হয়তো অনেকেই জানি না বিশ্বব্যাংকের গঠনতন্ত্র অনুসারে, সেখানে আমেরিকার একক সর্বোচ্চ মালিকানা শেয়ার ছাড়াও প্রত্যক্ষভাবে আমেরিকাকে ভেটো ক্ষমতা দেয়া আছে। জন্ম থেকেই এ ক্ষমতা দেয়া। ২০১০ সালে ইউরোপের জার্মানি প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে আমেরিকাকে এ ভেটো ক্ষমতা ত্যাগ করতে আহ্বান জানিয়েছিল।

    এসব সূত্রে AIIB ব্যাংক উদ্যোগের কালেও কানাঘুষা উঠে যে, চীন সম্ভবত ব্যাংকের গঠনতন্ত্র প্রণয়নকালে নিজের জন্য ভেটো ক্ষমতা দাবি করবে। না তা হয় নাই। জল্পনা-কল্পনা মিথ্যা প্রমাণ করেছে, চীন তেমন কিছু করেনি। তবে ২৬ শতাংশ শেয়ার মালিকানা নিজের জন্য রেখে দেয়ার বিষয়ে কিছু মন্তব্য করেছে। চীনের ভাইস অর্থমন্ত্রী মিডিয়াকে জানিয়েছে, “চীন উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোনো ভেটো ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার দরকার বোধ করে না। তবে যাত্রার শুরুতে এই ব্যাংককে ফাংশনাল করতে গিয়ে চীনকে বেশি বিনিয়োগ দিতে হয়েছে, ফলে ‘ন্যাচারাল আউটকাম’ হিসেবে চীনের মালিকানা বেশি হয়েছে। আগামীতে এশিয়ার অন্য শেয়ারহোল্ডাররা যখন তাদের বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াবে, তখন চীনের এমন মালিকানা আর থাকবে না, কমে আসবে। চীন বিশ্বাস করে, ভবিষ্যতে যে কোনো সিদ্ধান্তে চীন তার শরিকদের বুঝিয়ে বলে তাদেরকে একমতে আনতে চীন সক্ষম হবে”।

    কিছু খুচরা তথ্য : ব্যাংকের হেড অফিস কোথায় হবে এ নিয়ে ইন্দোনেশিয়া শুরু থেকেই তা নিজের দেশে স্থাপনের অফার দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু গঠনতন্ত্রে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, হেড অফিস চীনেই হবে, তবে সাব-অফিস অন্যান্য দেশে হতে পারে।

    ব্যাংকের অফিসিয়াল ভাষা কী হবে- এ প্রশ্নে ইংরেজি সাব্যস্ত হয়েছে। এছাড়া কে ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হবেন এ প্রশ্নে আর্টিকেলে লিখে বলা হয়েছে, “এক উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ও উন্নতমানের নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এশিয়ান সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্য থেকে কোনো নাগরিককে বেছে নেয়া হবে”। এছাড়া আপাতত অফিসিয়াল মুদ্রা হবে আমেরিকান ডলার।
    স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও উচু মাত্রার প্রফেশনালিজমের ব্যাপারে চীনের পক্ষ থেকে এসব প্রসঙ্গে যেচে কথা বলার কারণ, শুরুর দিকে আমেরিকা প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলেছিল যে এই ব্যাংক উদ্যোগ বিশ্বব্যাংক বা এডিবির পর্যায়ের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও উচু মাত্রার প্রফেশনালিজম দেখাতে পারবে না; এই বলে উদ্যোগকে তুচ্ছ করতে চেয়েছিল। এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোকে যোগ না দিতে উতসাহিত করতে বিভ্রান্তিতে ফেলা ও চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল। আমেরিকার সে প্রপাগান্ডার জবাব দিতেই চীনের এমন যেচে কথা বলা।

    [এই লেখাটা লিখেছিলাম গত ১১ জুলাই, এরপর তা ছাপা হয়েছিল ১৩ জুলাই, ২০১৫ তারিখের দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশে। ছাপা হবার পর এটা আবার আরও আপডেট ও সম্পাদনা করে এখানে ছাপা হল। ]

    গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • পুরান প্রধানমন্ত্রীর আলখাল্লা গায়ে চড়িয়ে মোদি বাংলাদেশ সফর করলেন

    পুরান প্রধানমন্ত্রীর আলখাল্লা গায়ে চড়িয়ে মোদি বাংলাদেশ সফর করলেন

    গৌতম দাস
    ০৬ জুলাই, ২০১৫

    লেখার লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-aw

    গত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে মোদির বাংলাদেশ সফর শেষ হয়েছিল। মোদি নিজে আগাম অনুমান করে বলেছিলেন তাঁর ফেরত যাবার পরে এই সফর নিয়ে চর্চা শুরু হবে। তা তো অবশ্যই হবে, হচ্ছেও। তবে, এগুলোর সার কথা হচ্ছে দেনা পাওনার দিক থেকে। “হিসাব কিতাবে মোদির দিকেই পাল্লাই ভারি”– এই সফর শেষে এটাই আমরা শুনছি। এমনটা না হবার কোন কারণ নাই। সাত জুন তারিখ দিন শেষে রাত বারোটায় (আইনত আট তারিখের শুরুতে ) সংবাদ পর্যালোচনায় চ্যানেল আই টিভিতে এসেছিলেন ভারতের দৈনিক টেলিগ্রাফ পত্রিকার এক বাঙলি সাংবাদিক,দেবদ্বীপ পুরোহিত। তিনিও বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করছিলেন বাংলাদেশ সবকিছুই দিচ্ছে,এটা একপক্ষীয় লেগেছে তাঁর কাছেও। তিনি বলছিলেন বাণিজ্যিক স্বার্থের দিক থেকে কিছু দেয়া আর বিনিময়ে কিছু পাওয়া এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু এমন কিছু তিনি দেখতে পাচ্ছে না। শেষে ব্যাপারটা তিনি ব্যাখ্যা খুজে না পেয়ে বললেন, “শেখ হাসিনা খুবই উদার। মোদি তাঁকে বিনিময়ে কি দিবেন সেদিকে তিনি কিছুই চিন্তা করেন নাই”। আগের দিন বাংলাদেশের কোন সাংবাদিক নাকি তাঁকে বলেছিলেন, “ভারত কিছু চেয়েছে, পেতে আগ্রহ জানিয়েছে অথচ বাংলাদেশ তাকে তা দেয়নি এমনটা কখনও ঘটে নাই!” – দেবদ্বীপ অবলীলায় এসব স্বীকার করছিলেন। ওদিকে প্রতিদিনই মিডিয়া অসম লেনদেনের বিভিন্ন ইস্যু তুলে ধরছে। ভারতীয় ব্যবসায়ীদেরকে অসমভাবে বেশি সুবিধা দেয়ায় কিছু দেশী ব্যবসায়ী নরম স্বরে কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে আপত্তি জানানো শুরু করেছে। সারকথায় সবাই বলতে চাইছে মোদীর সফর ছিল এক বিরাট অসম বিনিময়ের সফর – কূটনৈতিক ইতিহাসে দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মধ্যে এই ধরণের অসম বিনিময়ের নজির পাওয়া কঠিন।
    আসলে কি তাই? না,কোন অসম বিনিময় এখানে হয় নাই। বাংলাদেশের দিক থেকে ১০০ ভাগের বিনিময়ে যদি ভারতের দিক থেকে মাত্র ১ ভাগ দেয়ার চুক্তি হয়ে থাকে তবু এটাও অসম নয়, হবে না। এজন্য যে যখন বিনিময়ে কারও ক্ষমতায় থাকার পক্ষে সমর্থন যোগানোর ব্যাপারটা লেনদেনের মধ্যে একটা ইস্যু হিসাবে হাজির থাকে; তখন ভারত বিনিময়ে কিছুই না দিলেও সেটা সম-বিনিময় অবশ্যই। কারণ এখানে সাথে বিনিময় হয়েছে ক্ষমতায় থাকার ন্যায্যতা লাভ।
    বাংলাদেশের ক্ষমতায় থাকার জন্য শেখ হাসিনা আভ্যন্তরীণভাবে যেসব রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছেন এসবের মধ্যে মুখ্য বিষয়টা হল,তাঁর নিজের করুণ পাবলিক রেটিং বা জনসমর্থনের ঘাটতি। মোদির সফরের ফলে বাংলাদেশের মানুষ যে বার্তা পেল তা হল যে হাসিনার বাংলাদেশকে দিল্লির খুবই দরকার,অন্তত গোয়েন্দা-আমলাদের ভারতের পারসেপশনে। যেসব সুবিধা তারা পাচ্ছে সেটা সহজে দিল্লি ত্যাগ করতে চায় না, করবে কেন! হাসিনা তাদের জন্য “সন্ত্রাসবাদ” মোকাবিলা করে দিচ্ছে, “তারা বাংলাদেশে গনতন্ত্র চায় মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ চায় না” এসব কথার আড়ালে বাংলাদেশকে দিল্লি নিজেদের পক্ষে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ষ্ট্রাটেজিক সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে। বিনিময়ে হাসিনাকে একক বৈদেশিক সমর্থনের যোগানদাতা হয়ে থাকাটা খুবই যুক্তিসংগত পররাষ্ট্র নীতি। এই সুবিধা তারা ছাড়তে চাইবে কেন!
    কিন্তু মনে রাখতে হবে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে বৈদেশিক বা বিদেশীদের সমর্থন মানে সেটা দেশের জনগণের সমর্থনের প্রকাশ নয়। এতে মানুষ বড় জোর বুঝল যে এই ক্ষমতা যেভাবেই হোক নিজের পক্ষে ভারতীয় সমর্থন যোগাড় করতে পারছে হয়ত কিন্তু সেটা নিজের প্রতি পাবলিক রেটিং বা জনসমর্থন বাড়বার লক্ষণ নয়। অর্থাৎ শেখ হাসিনার মুল প্রয়োজন যদি জনসমর্থন হয় সেটা ভারতের সমর্থনের কারণে পুরণ হচ্ছে না,হবে না, হবার নয়। ব্যাপারটা এমনও নয় যে ভারত হাসিনার পক্ষে প্রবল সমর্থন তৈরি করেছে এতে হাসিনার বিদেশী ক্ষমতার ভিত্তি শক্তিশালী দেখে নত ও ভীত হয়ে হাসিনার প্রতি পাবলিক সমর্থন ঘুরে যাবে। না,এমন ভাবার কোন কারণ নাই। কিছুটা এমন হতেও পারত যদি বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভারতের অন্তত কিছুটা সুনাম থাকত। চুক্তি করে ৬৮ বছর ধরে খেলাপী হয়ে থাকা ভারত রাষ্ট্র এবার সবে স্থল সীমান্ত চুক্তি সম্পন্ন করে বিরাট এক কাজ করেছে বলে দেখাতে চাইছে। আবার যেন এই সীমান্ত চুক্তির সুবিধা কেবল বাংলাদেশই পাবে, ফলে বাংলাদেশকেই যেন দয়া করছে দিল্লি এমন একটা ভাব তৈরির চেষ্টা করেছে। তাই এই উপস্থাপন, এতেও দিল্লীর প্রতি বাংলাদেশের জনগণের বড় একটি অংশ বিরক্ত হয়েছে। ছিটমহলের হবু বাংলাদেশি জনগণ এর সুবিধা ভোগ করবে তাই যেন ভারত এই চুক্তি সম্পন্ন করে একতরফা এক বিরাট অনুগ্রহ বা ফেবার বাংলাদেশকে করল। এই মিথ্যা ইমেজ থেকে আমাদের সকলের মুক্ত থাকা দরকার। এই চুক্তির আসল ভোক্তা যারা ভারতের হবু নাগরিক হতে চায় তারাও। ফলে এটা বাংলাদেশকে একতরফা দেয়া ভারতের কোন অনুগ্রহ একেবারেই নয়। আর এটা বার্লিন ওয়াল ভেঙ্গে পড়ার সাথে তুলনা দেয়া শুধু অতিকথন নয়, ডাহা অর্থহীন। কারণ কাঁটা তারের বেড়া এতে উঠে যায় নি, সীমান্তে বাংলাদেশিরা নিয়মিত মরছেই। এই লেখা যখন লেখা হচ্ছে তার আগের দিনও ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বাংলাদেশীদের হত্যা করেছে।
    লাইন অব ক্রেডিট
    গত ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পরের বছর হাসিনার প্রথম রাজভেট দেবার ভারত সফর ছিল বিগত ২০১০ সালের জানুয়ারি। সেবারই সফর শেষে দেশে ফিরে এসে, তিনি ভারত থেকে এক বিলিয়ন ডলারের ঋণ এনেছেন – এটাই তাঁর পক্ষে সবচেয়ে বড় বিশাল অর্জন বলে দাবি করেছিলেন। তখনকার প্রধানমন্ত্রী হাসিনার ভারত সফরের বিরাট অর্জন হল ঋণ প্রাপ্তি – এই কথাটাকে হাসিনা নিজের মিডিয়া হাইলাইট ও মটিভেশনের প্রধান ইস্যু করেছিলেন। তখন থেকেই জানা যায় লাইন অফ ক্রেডিটের রহস্য। সবাই জানি, ভারতের অর্থনীতি এমন স্তরে পৌছায় নাই যে ভারত বাংলাদেশকে বিলিয়ন ডলার ঋণ সাধতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশকে কনশেসনাল সুদ হারে (১শতাংশের নীচে) ঋণ দিবার চেয়ে বরং এমন ঋণ পেলে ভারতই নিতে আগ্রহী। তাহলে এই লাইন অব ক্রেডিট ব্যাপারটা কি?
    এককথায় বললে, ভারতের কিছু পণ্য বিশেষত সেই পণ্য ভারতীয় ইস্পাত যার কাঁচামাল — যেমন রেল লাইন, বগি, বাস ট্রাক ইত্যাদি – সেই সকল উৎপাদিত পণ্যের বিরাট অংশ প্রতি বছর অবিক্রিত থেকে যায়। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কোম্পানীগুলোকে এসব অবিক্রিত মালামালের দায় থেকে পরিত্রাণ পাইয়ে দিতে নিজে একটা ফান্ড তৈরি করেছে। এই ফান্ড পরিচালিত হয় সরকারি বিশেষ ব্যাংক “এক্সিম ব্যাংক” এর মাধ্যমে আর Export-Import Bank of India Act 1981 আইনের অধীনে। এই ব্যাংকের কাজ হল, সম্ভাব্য ক্রেতাকে লাইন অব ক্রেডিট এর আওতায় লোন দিয়ে এসব অবিক্রিত মালামাল ঋণে কিনতে সাহায্য বা বাধ্য করা। আর এভাবে প্রকারন্তরে অবিক্রিত পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা যাতে বছর শেষে উতপাদক কোম্পানীগুলোর বিক্রি না হবার লোকসান কমে আসে। সারকথায়,এই ব্যাংকের উদ্দেশ্য হল, ভারতের নিজেদের অবিক্রিত মালামাল লোনে বিক্রির ব্যবস্থা করা,যাতে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলো চালু থাকে, প্রায় ৫০ হাজার কর্মচারি যেন বেকার না হয়। লাইন অব ক্রেডিটে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করলে শ্রম বেকার হওয়ার হাত থেকে বাঁচে ভারতের এমন শ্রমিকের সংখ্যা কত এর একটা ধারণা আমাদেরকে দিয়েছে ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকা। তারা এই ইস্যুতে ভারতের Export Import Bank of India (সংক্ষেপে এক্সিম ব্যাংক) এর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াদুয়েন্দ্র মাথুরের এক সাক্ষাতকার নিয়ে ছাপিয়ে আমাদেরকে সংখ্যাটা জানিয়েছেন, (দেখুন, মোদি বাংলাদেশ সফরের দ্বিতীয় দিন,৭ জুন ২০১৫ এর টাইমস অব ইন্ডিয়া)।
    সেজন্য এই আইনের আরও কিছু মূলশর্ত আছে। যেমন এই লোনের খাতক বাংলাদেশকে কিছু শর্ত মানতে হবে। যেমন,
    ১. যেসব ভারতীয় পণ্য (ভারতীয় ইস্পাত যার কাঁচামাল যেমন রেল লাইন, বগি, বাস ট্রাক ইত্যাদি) এই আইনে ঋণে বিক্রিযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে কেবল তাই কিনতে হবে। ভারতের বা ভারতের বাইরের যে কোন পণ্য নয়।
    ২. এই ঋণের টাকায় অন্তত ৭৫% মামামাল ও সার্ভিস অবশ্যই ভারতীয় উৎস থেকে কিনতে হবে। অর্থাৎ এই ঋণ ভারত ছাড়া অন্য দেশ থেকে কোন পণ্য কিনতে ব্যবহার করা যাবে না। যেটাকে আইনি ভাষায় সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট বলা হয়।
    ৩. পারফরমেন্স গ্যারান্টি বলে আরও একটা ক্লজ আছে যার সুদ বাংলাদেশের বেলায় আরও আড়াই পার্সেন্ট যেটার কথা এখানে আড়ালে রেখে কেবল ১% সুদের বিষয়টাই উল্লেখ করা হচ্ছে। (আগ্রহিরা দেখুন Export-Import Bank of India – Role, Functions and Facilities, clause 1.2.5 Guarantee Facilities)
    ৩. বিশ্বব্যাংকের লোনের বেলায়, তুলনা করে বললে এর পরিশোধের সময় ৪০ বছর, প্লাস শুরুতে ১০ বছর গ্রেস পিরিয়ড মানে পরিশোধের হিসাব শুরু হবে ১০ বছর পরে থেকে। এর তুলনায় ভারতের লাইন অফ ক্রেডিটের বেলায় পরিশোধের সময় এখানে ২০ বছর প্লাস ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ড।
    ৫. এটা বিক্রেতার দেয়া ঋণে ক্রয় বলে, বিক্রেতা মালামালের মুল্য কত নিবে তা বাজার যাচাই করে কিনার সুযোগ নাই। বিক্রেতার ইচ্ছা মাফিক দামই শেষ কথা।
    যেহেতু এই ঋণের উদ্দেশ্য মালামাল উতপাদক ভারতীয় কোম্পানীকে অবিক্রিত মালামালের লোকসানের হাত থেকে বাচানো ফলে, মালামালের ক্রেতা দেশটির স্বার্থ দেখা এই ঋণের কোন উদ্দেশ্যই নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশকে এই ঋণের খাতক বানানো মানে ভারতীয় উৎপাদক কোম্পানীর স্বার্থ পরিপুরণই এখানে প্রধান। এই শর্তগুলো মেনে নিয়েই বাংলাদেশ নিজেকে জড়িত করছে। ভারতীয় কোম্পানীর স্বার্থকে প্রাধ্যন্যে মেনে নিয়ে নিজেকে ঐ কোম্পানীর অবিক্রিত মালামালের খাতক বানানো। এই হল লাইন অব ক্রেডিট। এর সম্ভাব্য ক্রেতা সার্ক দেশ, এই হিসাবে মোট ৬ বিলিয়ন ডলারের একটা ফান্ড তৈরি করা আছে এক্সিম ব্যাংকে।

    বিশেষজ্ঞ বা সিপিডির দুর্দশা
    হাসিনার সাথে মোদিও বলছেন, “কানেকটিভিটি (যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা) শুধু দুই দেশের জন্য নয়,এই অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ”। কানেকটিভিটি নিশ্চিত করার মানে কি? বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিতে পারবে কিনা, পছন্দের নেতা নির্বাচিত করতে পারবে কি না – এসব রাজনৈতিক মৌলিক বিষয় বাধাগ্রস্থ রেখে কানেকটিভিটি নিশ্চিত করা? এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়া কার্যকর হতে না দিয়ে “কানেকটিভিটিকে এই অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ” বলে মনে করা খুবই বিপদজনক বক্তব্য। এই বিষয়ে প্রিন্ট পত্রিকায় যতগুলো আলোচনা বের হয়েছে সেখানে বিশেষজ্ঞ বা সিপিডির দুর্দশা দেখার মত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রশ্ন সংকটগুলোকে উহ্য বা লুকিয়ে রেখে এই সফর শেষ হয়েছে কিন্তু বিশেষজ্ঞরা কেউ তা নিয়ে কথা তুলতে চাচ্ছেন না। রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো বাদে অর্থনীতিক বাণিজ্যিক মূল্যায়ন বা বিচারেও কি হাসিনা-মোদির স্বাক্ষরিত এই ২২ চুক্তি ঠিক আছে? প্রথম আলো শিরোনামে বলছে “ভারতের সুবিধা বেশি, সুযোগ আছে বাংলাদেশেরও”। বলার এই ধরণটাই বলছে অর্থনীতিক বাণিজ্যিক বিচারেও এই চুক্তি ঠিক নাই। এটা অসম।

    “সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিগুলো খুবই ইতিবাচক। কিন্তু এগুলোর আলোকে পরিকল্পিত বিনিয়োগ করতে হবে, প্রকল্প ঠিক করতে হবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে”।
    সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, “সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিগুলো খুবই ইতিবাচক। কিন্তু এগুলোর আলোকে পরিকল্পিত বিনিয়োগ করতে হবে, প্রকল্প ঠিক করতে হবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, ‘বাংলাদেশের বন্দর, সড়ক, নৌপথ বা অন্য কোনো সুবিধা ব্যবহারের জন্য মাশুলের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্য হার রয়েছে। সেই অনুযায়ী মাশুল নিতে পারলে আমরা লাভবান হব।’ – প্রথম আলো ০৯ জুন ২০১৫। অর্থাৎ মোস্তাফিজ আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে চান যে এই সফরে ট্রানজিটে দিবার চুক্তিতে গুরুত্বপুর্ণ পুর্বশর্ত বিদেশি বিনিয়োগ পরিকল্পনার কোন খবর নাই। তাই তিনি যেন বলতে চাইছেন – চুক্তি হয়ে গেছে কিছু করার নাই কিন্তু এখন বিদেশি বিনিয়োগ সংগ্রহ করতে হবে, অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। ট্রানজিটের মাসুল প্রদান পরিকল্পনারও কোন খবর নাই। অথচ যেটাকে মাসুল প্রদান পরিকল্পনা বলছি ওটাই আসলে ট্রানজিট অবকাঠামোর জন্য বিদেশি বিনিয়োগ নিলে তা পরিশোধ যোগ্য হবে কি না তা বুঝবার একমাত্র উপায়। কারণ সংগ্রহিত মাসুল বা টোল থেকে নেয়া ঋণ কিস্তিতে পরিশোধ সম্ভব এটা কাগজ কলমে প্রমাণ করে না দেখাতে পারলে কোন বিনিয়োগ দাতা বিনিয়োগ দিবার প্রশ্ন আসে না, আগ্রহি হবে না। মোদি-হাসিনা স্বাক্ষরিত “সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিগুলোর” মধ্যে এগুলো মারাত্মক নেতিবাচক দিক। কিন্তু এই মারাত্মক নেতি কথাগুলোকেই তিনি ইতিবাচক ভাব তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। সারকথায় বললে, তিনি আসলে বলছেন, “সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিগুলো খুবই ইতিবাচক। কিন্তু এগুলোর আলোকে বিনিয়োগ পরিকল্পনা নাই বলে এগুলো নেতিবাচক। কে না জানে, মাসুল প্রদান হার বা আদায় পরিকল্পনার উপর নির্ভর করছে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা, বিনিয়োগ পাওয়া আদৌ সম্ভব হবে কি না। আপাতত ভারতের দিক থেকে বিনা বিনিয়োগে পারলে বিনা মাশুলে যা পাওয়া যায় তাই আদায়ের চেষ্টা আছে –দেখছি এই স্তরে আছি আমরা। অথচ কথা তো পরিস্কার যে মাসুল আদায় পরিকল্পনা এবং তা এমন পরিমাণ হতে হবে যেন তা ট্রানজিট অবকাঠামো বিনিয়োগ পরিশোধের সামর্থের হয় – এই প্রসঙ্গটা ছাড়া ট্রানজিট বা কানেকটিভিটি নিয়ে বাংলাদেশের কারও ভারতের সাথে গলায় গলা মিলিয়ে কথা বলা মানে নিজের সাথে প্রতারণা করা। কারণ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ কেমন করে যোগাড় করা হবে সে কথা তোলা এবং চিন্তা না করার মানে হল, বাংলাদেশের নিজ অর্জিত রাজস্ব আয় ব্যয় করে গড়ে তোলা উপস্থিত ট্রানজিট অবকাঠামো ভারতের বাণিজ্য পেতে খরচ হতে দেওয়া। আর দুএক বছরের মধ্যে উপস্থিত ও সীমিত অবকাঠামো অতি ব্যবহারে ভেঙ্গেচুরে পড়ার পর ঐ সমস্ত পথ-অবকাঠামোকে বাংলাদেশের নিজেরও অর্থনীতিকে অবকাঠামোর অভাবকে সংকটে স্থবির করে ফেলা। সোজা কথা, বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, প্রতিশ্রুতি ও বাজার ব্যবস্থার হিসাব কষে সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিনিয়োগ উঠে আসা ও লাভের মুখ দেখার হিসাব নিকাশ পরিচ্ছন্ন না করে ট্রানজিট চুক্তি করা মানে বাংলাদেশের নিজের অর্থনীতিকেই মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটে ঢুকিয়ে দেয়া।
    অর্থনৈতিক যুক্তির দিকে থেকে বলা সহজ ভারতকে ট্রানজিট অবশ্যই দেয়া সম্ভব হয়ত তবে এর প্রথম শর্ত হল, ট্রানজিটের রাস্তাঘাট অবকাঠামো বিনিয়োগ মাসুল ইত্যাদি শুরু থেকেই পরিকল্পনার মধ্যে রাখা এবং এই বিনিয়োগে দুই দেশের জনগণ কেমনে লাভবান হবে তার অর্থনৈতিক হিসাবনিকাশ স্পষ্টভাবে করা । মোদি-হাসিনার যে চুক্তি সম্পন্ন হল তাতে এমন পরিকল্পনা একেবারে অনুপস্থিত। এই বিষয়ে আলোচনার কেন্দ্রিয় বিষয় – অবকাঠামো বিনিয়োগ – মাসুল আদায়। এটা মোস্তাফিজ অস্বীকার করতে পারছেন না। তাই প্রথম আলোর বেলায় বলেছিলেন – যদি অবকাঠামো বিনিয়োগ – মাসুল ইত্যাদি পরিকল্পনা থাকে তবে “সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিগুলো খুবই ইতিবাচক”। মোস্তাফিজ ভাল মতই জানেন এসব পরিকল্পনার খবর স্বাক্ষরিত চুক্তিতে নাই। বলাবাহুল্য ট্রানজিট প্রসঙ্গে আমরা কেবল অর্থনৈতিক অবস্থানের জায়গা থেকে কথা বলছি। রাজনৈতিক বিতর্ক – বিশেষত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটি এসবের বাইরে ভিন্ন একটি গুরুতর রাজনৈতিক বিষয়।
    কিন্তু সমকাল পত্রিকার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে মোস্তাফিজ এবার আর বুদ্ধিমান থাকলেন না, নিজেকে সারেন্ডার করালেন। সমকাল পত্রিকার বেলায় এসে আরও বড় ধরণের মিথ্যায় মাতলেন, যাকে তথ্যগত জোচ্চুরি বলা যায়। “সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন”, সমকাল জানাচ্ছে, “বর্তমানে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ৯০ ভাগই হয় স্থলপথে। উপকূলীয় বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন হলে সমুদ্রপথে বাণিজ্য বৃদ্ধির ব্যাপক সুযোগ তৈরি হবে। তিনি বলেন, ভারত কিংবা এ অঞ্চলের সঙ্গে ‘কানেক্টিভিটি’ প্রশ্নে বাংলাদেশে অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের দরকার হবে। ভারত নতুন যে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা দিয়ে রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন করা যাবে”। মোস্তাফিজের শেষ বাক্যটা ডাহা মিথ্যা কথা, মিথ্যা প্রলোভনের প্রলাপ।
    প্রথম কথা হল, ট্রানজিটের অবকাঠামো খাতে ব্যবহারের জন্য ভারত আমাদের কোন ঋণ অফার করে নাই। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ট্রানজিট অবকাঠামোতে বিনিয়োগের দায় ভারত নিবে কি না তা আমরা কেউই জানি না। আলোচনার টেবিলে বিষয়টি এখনও ইস্যু হতে পারে নাই। এছাড়া ট্রানজিট ব্যবহার করে ভারত আদৌ মাসুল দিবে কিনা – দিলেও সেটা নাম কা ওয়াস্তে হবে নাকি এর পরিমাণ বিদেশি অবকাঠামোগত বিনিয়োগ পরিশোধের মত পরিমাণের হবে কি না – তা আমরা কেউ এখনও পর্যন্ত কিছুই জানি না।
    এই পরিস্থিতিতে মোস্তাফিজ খামোখা দাবি করে বলছেন, “ভারত নতুন যে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা দিয়ে রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন করা যাবে”। তাঁর এই দাবির ভিত্তি কি আমরা জানি না। বরং আমরা ইতোমধ্যেই এটা জানি যে, ভারতের লোনের প্রতিশ্রুতি ভারতের অবিক্রিত ইস্পাত মালামাল বিক্রিকে প্রমোট করার জন্য – এটাই এর মুল ঘোষিত উদ্দেশ্য।
    এসব নিয়ে মোস্তাফিজকে চ্যালেঞ্জ করে অনেক কথা অবশ্যই বলা যায়। সেসব তর্ক-বিতর্কমুলক বক্তব্য নিজে না তুলে মোস্তাফিজেরই সিনিয়র, তাঁর সংগঠন সিপিডির ডিষ্টিংগুইজ ফেলো দেবব্রত ভট্টাচার্যের মুখ থেকে শোনা যাক।
    প্রথম আলোর ঐ একই রিপোর্টে দেবপ্রিয় বলছেন, “২০০ কোটি ডলার অনুদান হিসেবে রূপান্তরিত করে বহুপক্ষীয় যোগাযোগের জন্য অনুদান হিসেবে দেওয়াটাই উত্তম বলে মনে করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন,১০০ কোটি ডলারের মধ্যে ২০ কোটি ডলার পদ্মা সেতুতে অনুদান দেওয়া ছাড়া বাকি ঋণের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়”।
    অতএব দেবপ্রিয় আমাদের পরিস্কার করছেন, নিজের রিডিং আমাদের বলছেন,
    ১। এবারের মোদি সফরের লাইন অব ক্রেডিটে ২০০ কোটি বা ২ বিলিয়ন লোন এটা ট্রানজিটের (বহুপক্ষীয় যোগাযোগের) জন্য দেয়া নয়, দেবপ্রিয় আশা করেন এটা হওয়া উচিত।
    ২। এই অর্থ বাংলাদেশকে বিনা সুদে ও বিনা আসল ফেরতে অনুদান হিসাবে দেয়া উচিত।
    ৩। ২০১০ সালে হাসিনার ভারত সফরে তিনি প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলেন ১০০ কোটি ডলারের। দেবপ্রিয় ব্যাপারটা ন্যাংটা করে না খুলে সংক্ষেপে এবং ভদ্রলোকের ষ্টাইলে ও ভাষায় বলছেন, ঐ “ঋণের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়”।
    অর্থাৎ “ভারত নতুন যে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে” – মোস্তাফিজুর রহমানের এই মিথ্যা দাবি দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যই বিরোধীতা করছেন, সঠিক মনে করছেন না। এখানে সিপিডির দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এর বাইরে থেকে আমরা আর বাড়তি কি যোগ করব!
    দক্ষ ও ভোকাল প্রাক্তন আমলা্দের মধ্যে একমাত্র আকবর আলি খানকেই দেখা যায় বিভিন্ন সময় সরাসরি ট্রানজিট নিয়ে কথা বলছেন। ট্রানজিট প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থান হল, (এবং এটাই সঠিক অবস্থান) ভারত ট্রানজিট পেতে চাইলে এবং বাংলাদেশের নিজের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের দিক থেকে যদি ট্রানজিট দেওয়া ইতিবাচক মনে করে থাকে তাহলে ট্রানজিট অবকাঠামোর সমস্ত খরচ ভারতের বাংলাদেশকে বিনা সুদে বিনিয়োগ হিসাবে দেওয়া উচিত। অর্থাৎ বিনা সুদে বিনিয়োগ জোগাড়ের দায়িত্ব ভারতকে নিতে হবে। এছাড়া, বাংলাদেশ বিনিয়োগ পরিশোধ করতে হয় এমন পরিমাণের মাসুল দিতে ভারতকে প্রস্তুত হতে হবে। আকবর আলির বক্তব্যের যুক্তি হোল, যেহেতু বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশ নিজেই নিজস্ব রাজস্ব বিনিয়োগ করে ফেলেছে এবং ব্যবহার করছে। ফলে ভারত নিজের জন্য যে অবকাঠামো ব্যবহার করবে বিনা সুদে তার বিনিয়োগ বাংলাদেশকে প্রদান বা যোগাড় করে দেবার দায়দায়িত্ব একান্তই ভারতের। এবং স্বভাবতই ঐ অবকাঠামো ব্যবহারের মাসুল এমন হতে হবে যেন তা থেকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ পরিশোধ করতে সমর্থ হয়।
    যেমন নৌট্রানজিট , — যেটা এবার চুক্তি হয়েছে — সেটা একেবারেই অসম ও মাঙনায় করা হয়েছে, উপরের এই ন্যূনতম নীতিও মানা হয় নাই। শেখ মুজিবের আমলের এই চুক্তিতে লামসাম মাসুল অর্থ বছরে পাঁচ কোটি টাকা ধরা ছিল। এখন এটাকে আবার লামসাম হাঁকাও পরিমাণ ১০ কোটি টাকা করা হয়েছে। অনেকের মনে হতে পারে ভারতকে নৌট্রানজিটে দিতে আবার অবকাঠামোগত খরচ কি? কাষ্টমস অফিস আর ষ্টাফ বসানো ছাড়া বাংলাদেশের কোন খরচ এখানে নাই। ধারণাটা একেবারেই ভিত্তিহীন। নৌচলাচল উপযোগী রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং করা গুরুত্বপুর্ণ নইলে ঐপথ চলাচলের অনুপযোগী হবে। ইতোমধ্যেই ভারতের তাগিদে ড্রেজিং করা হচ্ছে। আর ভারতের দেয়া লোনে ভারতের নির্ধারিত দামেই ভারতীয় ড্রেজার কিনতে হচ্ছে। এছাড়া নৌট্রানজিট মাসুল বাণিজ্যিকভাবে নির্ধারিত হয় নাই। ঠিক আছে আপনারা চাপানি খাইয়েন – জাতীয় এক লামসাম পরিমাণ সেখানে আছে। তাও সে চা খাওয়ার পয়সাও নিয়মিত পরিশোধ করা হয় না, কয়েক বছরের বাকি পড়ে আছে।
    যাই হোক, দ্বিতীয় পয়েন্টে দেবপ্রিয় সম্ভবত আকবর আলি খানের অবস্থানটাই নিতে চাইছেন। কিন্তু দেবপ্রিয়ের একটা শব্দের অর্থে গড়মিল আছে – “অনুদান”। অনুদান শব্দটা দেবপ্রিয় ব্যবহার করেছেন যেটা ইংরাজি গ্রান্ট শব্দের বাংলা। অর্থ হল, কাউকে কিছু একটা করতে যেমন একটা স্কুল গড়তে এককালীন অর্থ গ্রান্ট দিয়ে সাহায্য করা। স্বভাবতই দিয়ে দেওয়া এই অর্থের আসল এবং সুদ কোনটাই ফেরত দেবার বালাই নাই, থাকে না। বিদেশি দাতাদের আমাদের সরকারকে দেয়া grant aid শব্দটার অর্থ এটাই। কিন্তু দেবপ্রিয় সুদ দিতে হবে না তবে আসল ফেরত দিতে হবে এই অর্থে ‘অনুদান’ শব্দটা ব্যবহার করেছেন। দেবপ্রিয়ের জন্য সঠিক শব্দ হত “বিনা সুদের ঋণ” – অনুদান নয়।
    মোদি দক্ষ সেলসম্যান
    মোদির সফর নিয়ে কংগ্রেস প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন নাকি বলেছেন মোদি তার চেয়ে বেশি দক্ষ সেলসম্যান। কারণ মনমোহন কোন প্রতিশ্রুতিই পূরণ না করেই ২০১১ সালে বাংলাদেশ সফরে ট্রানজিট নিতে এসেছিলেন, পারেন নাই। কিন্তু মোদি সেই একই প্রতিশ্রুতি না মিটানোর বান্ডিল নিয়েই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন কিন্তু এবার ট্রানজিট হাসিল করে নিয়ে গিয়েছেন। মোদির বেলায়, তাঁর মালামাল না দিবার লিষ্ট ভিন্নভাবে প্যাকেজ করার জন্যই নাকি মোদির এই সফলতা। বিষয়টা সত্যিকারের খবর নাকি কংগ্রেসের মিডিয়ার জল্পনা-কল্পনা ছাপিয়ে দেওয়া খবর তা নিশ্চিত নই। কিন্তু ইস্যুটা যেহেতু উঠেছে ওর সারকথা হল, হাসিনা ২০১১ সালে ট্রানজিট দেন নাই। সম্ভবত ভেবেছিলেন কাকাবাবু প্রণব প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে বাড়াবাড়ি করে ফেলছেন, তাকে বাংলাদেশের মানুষের সামনে বেইজ্জতি করছেন তাই তিনি থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। এছাড়া তিনি তখন তাঁর বৈধ সরকারের ক্ষমতাকালের মাঝমাঝি, ফলে বৈধতার কোন সংকটে ছিলেন না। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন, হাসিনার নিজেরই গরজ বড় প্রবল। আভ্যন্তরীণ পাবলিক রেটিং, রাজনৈতিক সংকটের তীব্রতা ভারতের সমর্থন দিয়ে পুরণ হবার বিষয় নয় জেনেও যতটা যা পাওয়া যায় তাই পুরনের কোশেশে লেগে পড়েছেন। এটাই মনমোহনের পুরানা প্রতিশ্রুতি বা পুরানা মালামাল মোদির হাত থেকে সাদরে কিনবার জন্য হাসিনার আগ্রহ বলে দাবি করা হচ্ছে। স্বভাবতই এটা পুরাপুরি মিথ্যা পাঠ।
    তবে এবারের সফর থেকে উঠে আসা এক তাৎপর্যপুর্ণ দিক হল, আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের হাহুতাশ আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষত পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বিদ্যুতপ্লান্ট তৈরির কাজ ভারতের কোম্পানী রিলায়েন্স ও আদানির লুটে নেওয়ায়। এপর্যন্ত শুধু এই ইস্যুতে এর বিরুদ্ধে প্রথম আলো দশটা রিপোর্ট করে ফেলেছে। এথেকে বোঝা যায় পশ্চিমা ও তাদের সমর্থক সুশীল রাজনীতি গ্রুপের হতাশা কত তীব্র ও গভীর। তবু এপ্রসঙ্গেও আকবর আলি খানের মন্তব্য সঠিক। তিনি বলেছেন, আমাদের চলতি রাজনৈতিক সংকটের উত্তরণে মোদির এই সফরের কোন ভুমিকা নাই। হাসিনার জন্য কোন লিভারেজ নয় এটা।
    গত ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসার সময় পরিকল্পনা ও শর্ত ছিল ভারতকে ট্রানজিট দিয়ে দেওয়া। হাসিনার ২০১০ সালের ভারত সফরের ফিরতি সফর ছিল মনমোহনের ২০১১ সালের বাংলাদেশ সফর। সেখানেই ট্রানজিট দেওয়ার চুক্তি হবার কথা ছিল। এই অর্থে ষ্টেজ যেভাবে সাজানো ছিল,সে পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১১ সালে যা অভিনীত হবার কথা ছিল তা পিছিয়ে যায়। অঙ্ক কিছুটা স্থগিত হয়ে যায়। ইতোমধ্যে একালে এসে রাজাই খোদ বদল হয়ে যায়, মনমোহনের বদলে মোদি। তবু পুরান সেই অভিনয়টা যেহেতু এইবার খোদ হাসিনারও শেষ করার আগ্রহের প্রাবল্য, তাই মোদি এবারের সফরটা হল, প্রণবের প্রম্পটে বহু আগেই নির্ধারিত প্রধানমন্ত্রীর ভুমিকায় অভিনয় করতে আসা; যেন মোদি এখন নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়েও মোদির ভুমিকায় নন, পুরান প্রধানমন্ত্রী মনমোহনের পেন্ডিং ভুমিকায় – তারই হয়ে পুরানা আলখাল্লার ভাড়া খেটে গেলেন। এই অর্থে মোদির এবারকার সফর তাঁর আমলা-গোয়েন্দার প্রম্পটের অধীনতার সফর। এটা মোদির নয়, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পদটার কিছু পুরানা দায় বহন করা। সেভাবে দেখতে হবে। তাই, আগামি ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে মোদি নিজের নতুন বাংলাদেশ নীতি দেখাতে না পারলে বুঝতে হবে তার “বিকাশের” রাজনীতি, “সবকা বিকাশ সবকা সাথ” – এসবই ভুয়া বলে প্রমাণিত হবে। বাংলাদেশের জনগণ কি নিজের পছন্দ মত ভোট দেয়া ও নেতা নির্বাচনের সুযোগ কি পাবে!