Tag: GOUTAM DAS

  • তেল রফতানি বাজারে আমেরিকার প্রবেশ ঠেকানো

    তেল রফতানি বাজারে আমেরিকার প্রবেশ ঠেকানো
    গৌতম দাস
    ২২ জানুয়ারি ২০১৬
    http://wp.me/p1sCvy-zG

    ব্যাপারটা শেষ বিচারে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে বিক্রির প্রতিযোগিতা। চলতি মাসের ১৪ তারিখে রয়টার্সের বরাতে দৈনিক ‘বণিকবার্তা’ বলছে, ১৫০ ডলার ব্যারেলের তেল এখন দাম কমতে কমতে প্রায় ৩০ ডলারেরও নিচে নেমে গেছে। বিগত শেষ ২ বছর থেকে এ কমতি দশা। বিশেষ করে বিগত প্রায় ১৩ বছর ধরে ক্রমে একটানা বাড়তিতে ২০০৮ সাল থেকে যে তেলের দাম ১৫০ ডলার উঠেছিল প্রথমে পরে সেই দাম নামতে নামতে ৭০ ডলারে থিতু হয়েছিল। কিন্তু গত ৬ মাস থেকে এটাই আবার নামতে নামতে এখন এ ২৭ ডলারে নেমে যাওয়ার দশা। প্রায় ১ বছরের কিছু আগে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর রয়টার্সের এক নিউজ রিপোর্ট শঙ্কা ব্যক্ত করেছিল যে, তেলের দাম ২০ ডলারে পৌছাতে পারে। মনে হচ্ছে, ঘটনা সেই দিকে যাচ্ছে। আল-জাজিরার টক শো “ইনসাইড স্টোরি”তে তেলের দাম ১০ ডলারে নেমে যেতে পারে কিনা তা নিয়ে আলোচনা তুলেছিল গত সপ্তাহে।

    তেলের দাম এত উঠাপড়ার সাধারণ কারণ কি আছে
    মোটা দাগে বললে, একেক পর্যায়ে তেলের দাম ওঠা বা পড়ার কারণ একেক ধরনের। তাই সাধারণীকরণ না করে প্রতি ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কারণের দিক থেকে তা বুঝতে হবে। যেমন, যে ১৩ বছর ধরে বিশেষত ২০০৩ সাল থেকে দাম উঠতির কথা বলছিলাম এর প্রধান কারণ ছিল রাইজিং ইকোনমি। ব্যাপারটা মূলত চীনকে ঘিরে। চীনের মাও মারা যান ১৯৭৬ সালে। তাঁর মৃত্যুর আগের শেষ ৬ বছরের সময়কালে পশ্চিমের সঙ্গে (মূলত আমেরিকার সঙ্গে) চীনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের বড় ধরনের রদবদল ঘটায় নতুন করে তা সাজানো হয়েছিল। যার সারকথা হলো, চীন আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিম থেকে বিপুল পরিমাণ পুঁজি নেবে, চীনে ব্যাপকভাবে বিদেশি পুঁজি আসতে দেবে। অবকাঠামো নির্মাণ খাতে এবং বাণিজ্যিক বিনিয়োগ খাতেও। এককথায় গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডারের দুনিয়ার ভেতর কমিউনিস্ট চীন পুরোপুরি প্রবেশ করবে। অন্যভাষায় বললে, কমিউনিস্ট চীন নিজে এক ব্যাপক পুঁজিতান্ত্রিক রূপান্তরে যাবে এবং এ কাজে প্রয়োজনীয় পুঁজি চীন আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিম থেকে আসতে দেবে। এরই মৌলিক নীতিগত রফাদফা সম্পন্ন হওয়ার কাল ছিল ঐ শেষ ছয় বছর। বিস্তারিত রফাদফার খুঁটিনাটি শেষ করে চীনের নিজের অভ্যন্তরীণ আইনকানুন নতুন পরিস্থিতি অনুযায়ী নতুন নিয়্মে সাজাতে সাজাতে সময় লেগে যায় প্রায় ১৫ বছর, ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। এটাকে প্রস্তুতিমূলক বা পিকআপ নেয়ার আগের সময় বলা যেতে পারে। পরের ১৯৯০-২০১০ এই ২০ বছরকে বলা হয় রাইজিং ইকোনমির বা উদীয়মান অর্থনীতির চীন। এই এক নতুন টার্ম, যেটা উন্নত পশ্চিম আর আন্ডার ডেভেলপড (অনুন্নত) তৃতীয় বিশ্ব এই দুই শব্দের বাইরে; নতুন এক শব্দ। মূলত চীনের একেবারে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর প্রভাবে আর যে চার অর্থনীতি – ভারত, ব্রাজিল, রাশিয়া ও সাউথ আফ্রিকা উঠে দাঁড়িয়েছিল মোট এ পাঁচ অর্থনীতিকে বোঝাতেই এই নতুন টার্ম রাইজিং ইকোনমি।

    তাহলে কথা দাঁড়াল, তেলের দাম দিয়ে গ্লোবাল অর্থনীতির মতিগতি বুঝতে সেকালে তেলের দাম বৃদ্ধির এক অন্যতম কারণ ছিল রাইজিং ইকোনমি – এটা বুঝতে হবে। এমনটা ঘটার বড় কারণ ছিল ১৯৯০-২০১০ এ ২০ বছরে চীনের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ডাবল ডিজিটের জিডিপিতে, যেটা খুবই মূল্যবান লক্ষণ মানা হয় এবং কোন রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে সচরাচর তা দেখা যায় না এমন। বলার অপেক্ষা রাখে না, চীনা অর্থনীতির এ প্রবৃদ্ধির সে সময়ের আর এক লক্ষণ ছিল, ক্রমবর্ধমানভাবে চীনের জ্বালানি তেলের চাহিদা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলা। এ বেড়ে চলা চীনের চলতি যে জ্বালানি প্রয়োজন হচ্ছিল শুধু সেজন্য নয়, বরং পরের কমপক্ষে ২০ বছরের পরিকল্পনায় চীনের জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটাতে সরবরাহের প্রবাহ যেন একই ধরনের থাকে, এজন্য বিভিন্ন দেশের প্রমাণিত রিজার্ভের তেল খনিতে আগাম বুকিং বা ক্রয়চুক্তি করেছিল চীন। অর্থাৎ সার কথা হলো, চীনের অর্থনীতিতে তেলের চাহিদা – এ ক্ষুধার খবর বাজারে রটে থাকাতে তেলের বাজারে বিপুল বিনিয়োগকারীর আনাগোনায় দাম ১৫০ ডলারে উঠেছিল। অতএব ওই সময়ের তেলের উচ্চমূল্য রাইজিং ইকোনমিগুলোর উচ্চ চাহিদার নির্দেশক ছিল।

    এখানে মনে রাখা ভাল চীনের অর্থনীতির ওই ক্রমবর্ধমান উচ্চ চাহিদার প্রভাবে গ্লোবাল অর্থনীতিও বৃদ্ধি দেখা দিয়েছিল ও নাড়াচাড়া পড়েছিল। বিশেষ করে তেল বিক্রির দেশ এবং বাকি রাইজিং ইকোনমির দেশের অর্থনীতিও চাঙা হয়েছিল। তেল বিক্রির দেশ, যেমন রাশিয়া, ভেনিজুয়েলা, ব্রাজিল, আলজিরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, ইকুয়েডর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, কাতার, সৌদি আরব, দুবাই এদের সবারই বাজেটের বড় বা মূল আয়ের উৎস হল তেল বিক্রি থেকে আয়। কোনো কোনো এমন দেশের ৯০ থেকে ১০০ ভাগ বিদেশি মুদ্রা আয় বা রাজস্ব আয় হল তেল বিক্রি থেকে আসা অর্থ। ফলে চীনের তেলের চাহিদা বৃদ্ধি মানে এসব তেল বিক্রি করা দেশের অর্থনীতি চাঙা করে রাখা। অর্থাৎ একটা চেইন ইফেক্ট বা পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতার এক লম্বা শিকলের মতো অর্থনীতি ওখানে ওই পরিস্থিতিতে তৈরি হয়েছিল। তবে একেক দেশের তেল উতপাদন বা তোলার বিনিয়োগ ইত্যাদির খরচে ব্যতিক্রম আছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় হলো এ হিসাবে দেখা গেছে, তেল রাজস্বের ওপর নিজের বাজেট নির্ভরশীল বলে মোটামুটি ৯০ থেকে ১০৫ ডলার – তেলের দাম ঐ জোনের মধ্যে বা উপরে থাকলে তা প্রায় সব তেল বিক্রি করে চলা দেশের অর্থনীতি চাঙাভাবে থাকে। রাষ্ট্র হাত খুলে বাজেট তৈরি ও খরচ করতে পারে। আবার মধ্যপ্রাচ্য রাষ্ট্রগুলোর সবার বেলায় তেল-রাজস্ব ঠিক মত না এলে ঠিক বাজেট ছাঁটতে হবে এমনটা নয়। বিশেষ করে সৌদি আরব। যদিও এবারই প্রথম এবারের ঘোষিত সৌদি বাজেট ঘাটতি বাজেট বলে দেখানো হয়েছে। বলা হচ্ছে, সৌদি অর্থনীতি প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন বা হাফ বিলিয়ন ডলার আয় কম হচ্ছে এই অর্থে সে ঘাটতিতে আছে। আইএমএফের এক অনুমিত হিসাব মতে, গালফ রাষ্ট্রগুলো এ বছর ৩০০ বিলিয়ন ডলারের মতো আয় হারাবে। একা সৌদি আরব ইতোমধ্যে গত একবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৭৪২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৬৪৮ বিলিয়ন ডলার হয়েছে বলে সৌদি মনিটারি এজেন্সীর বরাতে আলজাজিরা জানাচ্ছে। 

    অন্যদিকে আর একটা খবর আমাদের এ দিকের মিডিয়ায় নজরেই আসে নি। সেই খবরটা হলো, আমেরিকা এখন তেল রফতানিকারক দেশ। অনেকে অবশ্য হতে পারে আগে খেয়াল করেননি অথবা নিশ্চিত ছিলেন না যে আমেরিকা কি তেল রফতানিকারক দেশ ছিল নাকি! জবাব হচ্ছে হ্যাঁ, আগে ছিল না। তবে কথাটা ভেঙে বলতে হবে- ছিল না মানে কী? রফতানি করার মতো তেল ছিল না নাকি, তেল ছিল কিন্তু আইন করে রোধ বা নিষেধাজ্ঞা দেয়া ছিল? হ্যাঁ, দ্বিতীয়টা। অর্থাৎ আমেরিকার রফতানি করার মতো তেল থাকা সত্ত্বেও আইন করে নিষেধাজ্ঞা দেয়া ছিল, যাতে রফতানি করা না যায়। এমনকি আমেরিকার যেসব স্টেট বা রাজ্য তেল তুলে বেচার ব্যবসায় জড়িত ও তেল বেচা আয়ের উপর রাজ্য বাজেট বড়ভাবে নির্ভরশীল এমন রাজ্যগুলোর রাজস্ব আয় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আছে, যেমন আলাস্কা, নর্থ ডাকোটা, টেক্সাস, ওকলাহামা, লুসিয়ানা ইত্যাদি রাজ্যগুলো।

    কবে থেকে এবং কেন?
    কারণের বিস্তারে যাওয়া যাবে না এখন, সে অন্য প্রসঙ্গ হয়ে যাবে তাই। তবে সংক্ষেপে বললে, তৃতীয় আরব-ইসরাইলের যুদ্ধ, আরব জাতীয়তাবাদী হয়ে ১৯৭৩ সালে তৃতীয় ও শেষবার ইসরাইলের বিরুদ্ধে আরব-ইসরাইলের যুদ্ধ হয়েছিল।ঐ যুদ্ধে আরবেরা খুব খারাপভাবে হেরে গিয়েছিল। কিন্তু এতে এর চেয়ে বড় ব্যাপার হয়ে ওঠে এরপর সবাই আরব জাতীয়তাবাদের ঝাণ্ডা ফেলে নিজ নিজ রাষ্ট্রবাদী-জাতীয়তাবাদ আঁকড়ে ধরেছিল; সেই থেকে আরব জাতীয়তাবাদের ঝাণ্ডা আর কেউ বইতে রাজি হয় নাই। যেমন আরব জাতীয়তাবাদী জামাল নাসেরের মিসর এর পর থেকে হয়ে যায় মিসরীয় জাতীয়তাবাদে। এখানে বলে রাখা ভালো, বাক্যগুলোকে এভাবে লেখা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু  এটা “আরব জাতীয়তাবাদ” হারানোর কোন শোক থেকে একেবারেই নয়। বরং কথাগুলোকে আরব জোটবদ্ধতা হারানোর শোক হিসেবে দেখা যেতে পারে। সেভাবেই লেখা। আরব জোটবদ্ধ যেটা ইসরাইলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য এখনও খুবই জরুরি পূর্বশর্ত। কিন্তু সেসময়ে যুদ্ধে হেরে আরবদের দিক থেকে রাগের মাথায় একটা খুব বাজে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্ত “তেল অবরোধ” নামে পরিচিত। শুনতেও খুব ভাল, জাতীয়তাবাদী জোশে উঠে দাড়ানোর মত। ব্যাপারটা হল জ্বালানি তেলে সমৃদ্ধ আরবেরা সে সময়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিল পশ্চিমকে আর তেল বেচবে না। এই ছিল সিদ্ধান্তের সারকথা। মনে করা হয়েছিল এই সিদ্ধান্ত নিয়ে পশ্চিমকে খুব বড় বিপদে ফেলা যাবে। কারণ পশ্চিমা সভ্যতা ও এর অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে ফসিল ফুয়েল বা মাটির নিচের জ্বালানির ওপরে। দুনিয়াতে যে জ্বালানির বিরাট এক অংশ মধ্যপ্রাচ্যে আরবদের দেশে ও দখলে । ফলে পশ্চিমারা বিরাট অসুবিধায় পড়বে। কথা সত্য কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু অন্য এক সত্যও আছে। রিলেশনাল, মানে পশ্চিমের সাথে সম্পর্কিত হয়ে থাকার দিকটা কেউ ভালো করে দেখেনি। তেল না বেচলে ক্রেতার কী দশা হবে, কী অসুবিধায় পড়বে এটা যত বেশি নজর করা হয়েছিল, এর কণামাত্র নজর দেয়া হয়নি এতে বিক্রেতার কী দশা হবে। এতে ধরে নেয়া হয়ে গিয়েছিল যেন তেল বিক্রি করা বিক্রেতার একটা ঐচ্ছিক ব্যাপার খেয়াল বা শখ। তেল বিক্রি যেন বিক্রেতার দিক থেকেও গভীর প্রয়োজনের বিষয় নয়। অথচ ব্যাপারটা ছিল ঠিক এর উল্টো।  প্রতিটি আরব রাষ্ট্রের অর্থনীতি বিশেষ করে বাজেটের রাজস্ব আয়ের (৯০-১০০%) একমাত্র উৎস ছিল ফসিল ফুয়েল বিক্রি। ফলে তেল বিক্রি না করলে পশ্চিমা শক্তি বিশাল বিপদে পড়বে সন্দেহ নেই; কিন্তু তেল বিক্রেতা আরব দেশগুলোর অর্থনীতি চলবে কীভাবে? এ দিকটাতে কোন গুরুত্বই দেয়া হয়নি। অতএব বলা বাহুল্য, এই সিদ্ধান্তের ফলাফল শেষ বিচারে আত্মঘাতী হিসেবে হাজির হয়েছিল। আরব জাতীয়তাবাদ থেকে মিসরীয় জাতীয়তাবাদ অথবা সিরীয় জাতীয়তাবাদ হয়ে যাওয়ার পেছনে এই ফ্যাক্টরগুলোও কাজ করেছিল। শেষ বিচারে তেল অবরোধ হয়ে ওঠে আরবদের জন্যই বুমেরাং, কাউন্টার প্রোডাকটিভ। এ ছাড়া যুদ্ধ কোন ব্যয়-বিনিয়োগ প্রকল্প নয়, বরং আয়বিহীন বা রিটার্ণ না আসা এক বিনিয়োগ। ফলে  একদিক থেকে দেখলে যুদ্ধ মানে একটি রাষ্ট্রের আয়বিহীন এক ব্যয়ে জড়িয়ে পড়া। আরব-ইসরায়েলের যুদ্ধে সব আরব রাষ্ট্রের দশা ছিল তাই। ফলে যখন তেল বিক্রির আরব রাষ্ট্রগুলোর দরকার আরও আয় যাতে যুদ্ধ মানে ওই আয়বিহীন একটি ব্যয়ে ভারসাম্য ফেরে। অথচ তাঁরা পদক্ষেপ নিয়েছিল প্রয়োজনের উলটা – তেল অবরোধ। ফলে তেল অবরোধ সিদ্ধান্ত না টেকার পেছনে এটাও বড় একটা কারণ।
    তবু “তেল অবরোধ” নামে তৎপরতাটাই, তা সে যত কম দিন কার্যকর থাকুক তা পশ্চিমকে ভয় পাইয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট হয়েছিল। এরই প্রমাণ হলো আমেরিকার থেকে তেল রপ্তানি নিষিদ্ধ আইন। পরবর্তিতে ১৯৭৫ সালে আমেরিকা তেলে উদ্বৃত্ত হোক আর না হোক, আমেরিকান তেল কোনো ব্যবসায়ী রফতানি করতে পারবে না বলে আইন পাস হয়েছিল। আইনটা পাসের উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছিল, “আমেরিকার নিজের মজুদ তেল সংরক্ষণের (মানে আমেরিকান নিজের তেল একমাত্র শেষ হতে হবে কেবল নিজেরা ভোগ করে, বিক্রি করে নয়) জন্য রফতানিকে নিরুৎসাহিত করতে এই বিল আনা দরকার”, তাই। ‘সংরক্ষণের’ এ কথা থেকে বোঝা যায় তাদের ভয়ের মাত্রা সম্পর্কে।

    চল্লিশ বছর এতদিনে পরে এখন সেই আইন সংশোধন করে নেয়া হলো। অর্থাৎ এখন থেকে আমেরিকান তেল রফতানি করা যাবে। লন্ডন ইকোনমিস্ট ১৮ ডিসেম্বর বলছে, মূলত রিপাবলিকানদের উৎসাহ ও তাদেরই আনা বিল এবং তেল ব্যবসায়ী লবি যারা গত দু’বছর ধরে চেষ্টা করছিল এদেরই মিলিত আগ্রহে বিলটা আসে। আর ডেমোক্র্যাটরা যারা সংখ্যালঘু, এখন তারা অন্য একটি কিছু পাওয়ার আসায় সেই বিনিময়ে আনা এই আইনকে পাস হতে সম্মতি দিয়েছে। সব মিলিয়ে আইনটি পাস হয়েছে ১৮ ডিসেম্বর ২০১৫। প্রায় এক মাস আগে। এই অর্থে এটা কোনো একটা দলের একক প্রচেষ্টা আর অন্যটার বাধা দেয়া নয়, বরং বাই-পার্টিজান বা আমেরিকান দুই পার্টি মিলে নেয়া যৌথ সিদ্ধান্ত। আমেরিকান পুঁজিবাজারবিষয়ক মুখ্য পত্রিকা ১৬ ডিসেম্বর ২০১৫ ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ মন্তব্য করে লিখেছে, চল্লিশ বছর নিষিদ্ধ থাকার পরে ‘এই সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক’ এবং ‘এতে আমেরিকান তেল উৎপাদনকারীদের বাজারে চাপে ও তোড়ের মুখে পড়ে আমেরিকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পটবদল’ প্রতিফলিত। এসব বক্তব্য থেকে বোঝা গেল চল্লিশ বছর নিষিদ্ধ থাকার ঘটনাটা। কিন্তু ‘তেল উৎপাদনকারীদের বাজারে চাপে ও তোড়ে’ ঘটা ঘটনাটা কী? মানে ঠিক এখনই কেন তেল রফতানির অবরোধ তুলে নেয়া?

    নতুন ধরনের এক তেলের উৎস একালে চালু হয়েছে- শেল অয়েল। চালু হয়েছে কথাটা টেকনোলজির দিক থেকে বলা- নতুন এক টেকনোলজি চালু হওয়াতে শক্ত শ্লেট থেকে তেল উৎপাদন করা যাচ্ছে। শ্লেট-পেন্সিলে লেখার শ্লেটের মতো দেখতে, স্তরের ওপর স্তর পড়া শক্ত মাটির শ্লেট  – মাটির নিচে এর ওপর উচ্চ চাপ ও তাপের পানি পাঠিয়ে তা থেকে উত্থিত তেল ও গ্যাস সংগ্রহ করার টেকনোলজি ব্যবহার করে এই তেল উৎপাদন করা হয়। সম্ভবত এটাও আরেক ধরনের জীবাশ্ম, তবে এটা থেকে তেল বের করার কার্যকর টেকনোলজি ছিল না বলে এর ব্যবহার আগে ছিল না। এখন এই টেকনোলজির পর্যাপ্ত উপস্থিতি ও খরচ পোষায় মনে করাতে শেল অয়েলের ব্যবসায় একটা উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা চলছে। এভাবে তেল বের করার এই টেকনোলজিটাকে বলা হয় ফ্রেকিং। তাই অনেকে এটাকে ফ্রেকিং অয়েলও বলে। অথবা শ্লেট জাতীয় উপাদান বা কাঁচামাল থেকে এই তেল বের করা হয় বলে একে শেল অয়েলও বলা হয়। এ ছাড়া এই টেকনোলজিতে প্রচুর পানি ব্যবহার করতে হয় বলে এবং এর প্রক্রিয়ায় প্রচুর অব্যবহৃত তাপ উদ্ভব হয়, যেখানে দুনিয়ার তাপমাত্রা কমানোটাই এখন ইস্যু সেখানে পরিবেশগত দিক থেকে এটা পরিবেশ বিনষ্ট আরো বাড়িয়ে তোলে এমন এই টেকনোলজি। ফলে অনেকে একে নোংরা তেল বা ডার্টি অয়েল নামেও ডাকে। মাটির নিচে  মজুদ শ্লেটের এর দিক থেকে বড় বা শীর্ষে থাকা দেশ হল আমেরিকা, জর্ডান, কানাডা ইত্যাদি। বলা হচ্ছে, আমেরিকান মজুদের পরিমাণ এত বেশি যে, তা দিয়ে আমেরিকান জ্বালানি চাহিদা মেটানো তো বটেই এমনকি তা মিটিয়েও আমেরিকা শেল অয়েল রফতানি করতে পারে। তাই, গত কয়েক বছর ধরে আমেরিকায় এই শেল অয়েল উৎপাদনের জোয়ার উঠেছে। ফলে গত তিন বছর ধরে এই জোয়ার ওঠাতে আমেরিকান মিডিয়ায় শেল অয়েলের বিরুদ্ধে নেগেটিভ দিক যেগুলো আছে তা খুব কমই ছাপা হচ্ছে। এই টেকনোলজির আরেক বড় নেগেটিভ দিক হল এই টেকনোলজি ব্যবহারের তুলনামূলক খরচ মানে তেল বের করা বা তেল তুলার খরচ অনেক বেশি। বলা হয়েছিল বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলারের বেশি হলে বেশ আয়েশে এই ব্যবসা করা যায়। সারকথায় তরল জীবাশ্ম তেল উৎপাদনের চেয়ে এর খরচ বেশি। সেটা যাই হোক, আমেরিকার এই শেল অয়েল বা ফ্রেকিং অয়েল উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে বলেই এই তেল উৎপাদনকারীদের লবি চাপ ইত্যাদিতে পরে এখন চল্লিশ বছর পরে আমেরিকা থেকে তেল রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হল।

    আর ঠিক এখানেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। জীবাশ্ম তরল তেল উৎপাদকদের (মূলত মধ্যপ্রাচ্যের) এক কার্টেল-জোট হল ওপেক (OPEC)। ওপেকের সাথে পশ্চিমের স্বার্থবিরোধ অনেক পুরনো। আমেরিকান রফতানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া উপলক্ষে লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট গত মাসে ১৮ ডিসেম্বর এক রিপোর্ট বের করেছে। ওই রিপোর্টের প্রথম বাক্যটা অনুবাদ করলে হয় এরকম : “যুগ যুগ ধরে ‘বাজার’ শব্দটা বিশ্বব্যাপী তেলবাণিজ্যে এক আনফিট শব্দ হয়ে আছে। তেল উৎপাদনকারীদের আন্তর্জাতিক কার্টেল ওপেক শুধু তেলের বাজারে ইচ্ছামতো হস্তক্ষেপ করেছেই শুধু নয়, নিজের জন্য নানা মাত্রার সফলতাও বের করে নিয়ে গেছে।” এই বাক্য থেকে ওপেকের সাথে আমেরিকার স্বার্থবিরোধের তীব্রতা টের পাওয়া যায়। সারা দুনিয়ায় যে তেল উৎপাদন হয় এর এক-তৃতীয়াংশ করে ওপেক সদস্যরা সবাই মিলে। আর ওপেকে উৎপাদনেরও এক তৃতীয়াংশের কিছু বেশি একাই উৎপাদন করে সৌদি আরব- এটা প্রতিদিন মোটামুটি ১০ মিলিয়ন ব্যারেল, যেখানে এখন দুনিয়ায় দৈনিক মোট উৎপাদন ৮০ মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি। ফলে ওপেকের কোনো সিদ্ধান্তে সৌদি আরবের প্রভাব প্রায় একচেটিয়া। ফলে তেলের বাজারে আমেরিকার শেল অয়েল নিয়ে প্রবেশ ঠেকাতে সৌদি আরব লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ কাজে সে সহজেই ওপেককে নিজের পেছনে দাঁড় করিয়ে নিতে পেরেছে। এখানে শেল অয়েলকে ঠেকানোর সৌদি কৌশল হল- শেল অয়েলের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি, সেটাকে কাজে লাগানো। এ কারণে এক দিকে সৌদি আরব ক্রমান্বয়ে তেলের দাম ফেলে দিচ্ছে। আবার একই সাথে ওপেকে জোটবদ্ধ হয়ে উৎপাদন না কমিয়ে (তেলের দাম বেড়ে যাবে বলে) বরং বাড়িয়ে চলেছে। এভাবে তেলের দাম ফেলে দিয়ে ২০০৩ সালের সমান ২৭ ডলারে নামিয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাজার থেকে হটানোর মতো ফল এতে পেয়েছে। যেমন ব্রিটিশ বিপিসহ বহু তেল কোম্পানি ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই লাখ কর্মী ছাঁটাই করেছে, নতুন বিনিয়োগ বন্ধ করে রেখেছে, নতুন করে রিগ বসানোর যত পরিকল্পনা তেল তোলা কোম্পানিগুলোর ছিল, সব স্থগিত হয়ে গেছে। এতে ক্ষতি সৌদি আরবের কম হয়নি। বলা হয়, প্রতিদিন নাকি সৌদি আয় ৫০০ মিলিয়ন ডলার মানে হাফ বিলিয়ন ডলার কম হচ্ছে। আইএমএফ হিসাব করে বলছে, এ বছরে মধ্যপ্রাচ্য মোট ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হারাবে। আইএমএফ সৌদি আরবকে সাবধান করেছে এভাবে সীমাহীন তেল উৎপাদন বাড়ানোর বিপদ স্মরণ করিয়ে দিয়ে।

    সৌদিদের এই লড়াইয়ে জেতার কৌশল সহজ। তারা মনে করে, দীর্ঘ দিন ২০ ডলার বা কম দামে তেল বিক্রি করে লোকসান সহ্য করার ক্ষমতা একমাত্র তারই আছে। সুতরাং প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগে দেউলিয়া বানানোর পরেই সে বাজারের লাগাম টেনে ধরবে, উৎপাদন কমিয়ে তেলের দাম বাড়াবে। এ ব্যাপারে সৌদিদের অনুমিত সময়কাল এক বছর। অর্থাৎ আগামী বছর থেকে বাজার ঘুরে দাঁড়াবে বা সৌদিরা দাঁড় করানোর সুযোগ পাবে। এ বছরের জুন মাসের পর থেকে এসব ব্যাপারে আলামত ফুটতে শুরু করবে সৌদি আরবের বিশ্বাস। এ কাজে তার প্রধান টার্গেট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রথমত আমেরিকান শেল অয়েল। আর এর পরের টার্গেট আবার বাজারে ফিরে আসা ইরান। দেখা যাক কার নার্ভ কত শক্ত, কে কতক্ষণ টেকে!

    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ১৭ জানুয়ারি.২০১৬ সংখ্যায়  এবং ১৬ জানুয়ারি দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আবার এখানে ছাপা হল।]

  • চীনের বিশ্বব্যাংকের অপারেশন কী প্রভাবিত হবে

    দক্ষিণ চীন সাগরে দ্বীপ মালিকানা বিতর্ক
    চীনের বিশ্বব্যাংকের অপারেশন কী এতে প্রভাবিত হবে

    গৌতম দাস
    ১৭ জানুয়ারী, ২০১৬
    http://wp.me/p1sCvy-zk

     

    এআইআইবি [AIIB], চীনের বিশ্ব ব্যাংকের সংক্ষিপ্ত নাম। সংক্ষেপ ভাঙলে চীনের নেতৃত্বে এই ব্যাংকের পুরা নাম এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক। এআইআইবি শুধু ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সমতুল্য ব্যাংকই নয়, বলা হয়ে থাকে এআইআইবি জাপান-আমেরিকার নেতৃত্বে  ১৯৬৬ ডিসেম্বরে গড়ে উঠা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকেরও [ADB] প্রতিদ্বন্দ্বী। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর রয়টার্স চীনা অর্থমন্ত্রীর বরাতে চীনা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে জানিয়েছে, ২০১৬ সালের মধ্য জানুয়ারিতে নতুন ব্যাংকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবে। এছাড়া ৩০ ডিসেম্বর রয়টার্স এক রিপোর্টে আরও কিছু অগ্রগতির খবর জানিয়েছে। যেমন- আগেই সাব্যস্ত ছিল এই ব্যাংক ১০০ বিলিয়ন ডলারের পরিশোধিত ক্যাপিটাল নিয়ে যাত্রা শুরু করবে। আর এর প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা সদস্যরা প্রাথমিকভাবে ওই ১০০ বিলিয়ন ডলারের ২০ শতাংশ পরিশোধ করবেন, যা পরিশোধিত হওয়ার পথে। এছাড়া ১৭ উদ্যোক্তা সদস্য রাষ্ট্র মোট শেয়ারের মূল্যের ৫০ শতাংশ পরিশোধ করে ফেলায় এই ব্যাংক (এখানে এখন থেকে ব্যাংক বলতে এআইআইবি বুঝতে হবে) আর নেহাত এক আইডিয়া বা কল্পনা নয়, এক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুরু থেকেই আমেরিকা এই ব্যাংকের জন্ম নেয়ার বিরুদ্ধে যা যা বাধা দেয়া সম্ভব এর সবই করেছে। শুরুর দিকে তা কিছুটা কাজও করেছিল। এশিয়ায় আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অথবা আমেরিকার সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারের সম্পর্ক রেখে চলে এমন রাষ্ট্রগুলো যেমন অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, জাপান ইত্যাদির ওপর আমেরিকার এ কূটনৈতিক চাপ ভালোই কাজ করেছিল। যদিও এসব রাষ্ট্র নিজ নিজ অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে চেয়ে বুঝেছিল আমেরিকার মুখ চেয়ে এই ব্যাংক উদ্যোগের বিরুদ্ধে নিরাসক্ত ভাব নেয়া, দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখানোটা নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধাচরণ হচ্ছে। তাই প্রথম বাঁধভাঙার ঘটনাটা ঘটে ইউরোপের নেতা রাষ্ট্র ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি- এ তিনের তরফ থেকে; এরপর এশিয়া আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব রাখেনি।নে নেতৃত্ব কথাটার অর্থ ব্যাংকের সবচেয়ে বড় মালিকানা শেয়ার হোল্ডার কোন রাষ্ট্র। স্বভাবতই এর ফলে গঠন ও পরিচালনে সে রাষ্ট্রের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ইতোমধ্যেই ঘোষণা এসে গেছে যে, এই ব্যাংকের অপারেশন বা কার্যকারিতা শুরু হবে ২০১৬ সাল থেকে। ইতোমধ্যে প্রস্তুতিমূলক অনেক কাজ সম্পন্ন হয়ে গেছে। সম্প্রতি জানা যাচ্ছে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে এ মাসেই, ১৬-১৮ জানুয়ারি। এই উপলক্ষে আমাদের অর্থমন্ত্রী মাল মুহিত ইতোমধ্যেই চীন রওয়ানা দিয়েছেন।


    দক্ষিণ চীন সাগর দ্বীপ মালিকানা বিতর্কঃ

    ওদিকে নতুন এক ইস্যু “দক্ষিণ চীন সাগর দ্বীপ মালিকানা বিতর্ক” – কয়েক বছর ধরে আস্তে আস্তে কাঁটার মতো খচখচ করে সব প্রসঙ্গের মধ্যেই বিঁধতে দেখা যাচ্ছে। সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর হল সমুদ্রপথে চীনে পৌছানোর একমাত্র প্রবেশদ্বার। আসলে এই সাগর কেবল চীনের দক্ষিণে নয় বরং পূর্ব অবধিও বিস্তৃত। পূর্বের অংশকে আলাদা করে পূর্ব চীন সাগর বলা হয় যদিও কিন্তু সাগরের দক্ষিণ অংশ আর পূর্ব অংশ এ দুইয়ের মাঝে কোনো দেয়াল বা বিচ্ছেদ নেই। আর চীনের প্রবেশদ্বারের একেবারে মুখ এলাকা হিসেবে দক্ষিণ চীন সাগর অংশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আশপাশে পড়শি রাষ্ট্রের ভিড়ভাট্টা দক্ষিণ দিকে বেশি। তাই দ্বীপ মালিকানা-বিষয়ক বিতর্কটা দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক নামেই পরিচিত। এই দক্ষিণ-পূর্ব কোণটা ছাড়া চীনের সীমান্তের বাকি সব দিক দিয়েই স্থলাবদ্ধ,ল্যান্ড লকড।
    কিন্তু নতুন এক ইস্যু আস্তে আস্তে কাঁটার মতো খচখচ করতে শুরু করে। সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর- সমুদ্রপথে চীনের একমাত্র প্রবেশ দ্বার। চীন বাকি তিনদিকেই স্থলাবদ্ধ, ল্যান্ড লকড।

    আজ চীন যেমন অর্থনৈতিক শক্তি হওয়ার বিভিন্ন বিবেচনার দিক থেকে আমেরিকার তুলনায় ক্রমেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনি ১৮৮০ সালেই আমেরিকান অর্থনীতি সাইজের দিক থেকে তৎকালীন টপ কলোনি মাস্টার ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাওয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এভাবে ১৯২০ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে সব বিবেচনাতে ব্রিটেনসহ ইউরোপের সবার উপরে আমেরিকা উঠে যায়। সেকালে উত্থানের যুগে আমেরিকা নিজ রাষ্ট্রের সমুদ্রপথের প্রবেশে আশপাশের সব সমুদ্র অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। এমন আচরণের একটা সাধারণ দিক আছে। উদীয়মান রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ চ্যালেঞ্জিংভাবে সবার চেয়ে বড় হয়ে গেলে এ ঘটনার সঙ্গে এর নিরাপত্তার প্রশ্নটাই বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বড় অর্থনীতি মানে কাঁচামালের বড় আমদানি জাহাজ এবং বড় পণ্য রফতানি জাহাজের আনাগোনা। ফলে এখান থেকেই সমুদ্রপথে বাধাহীন, ভয়হীন “নীল পানি বা Blue Water” এলাকায় বয়ে যাওয়ার চাহিদা সৃষ্টি হয়। এ বিষয়টি অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠা রাষ্ট্র যে কোনোভাবে হোক নিশ্চিত করাকে নিজের রাষ্ট্রস্বার্থ গণ্য করে থাকে। আজ চীনের প্রবেশপথ দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে চীনের অবস্থানও সে রকম। সে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে বঙ্গোপসাগর হয়ে আরব সাগর পর্যন্ত অবাধ নৌবাণিজ্য জাহাজ চলাচলের ব্যাপারে সেনসিটিভ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সমুদ্রপথে চীনের প্রবেশমুখ দক্ষিণ চীন সাগরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনেক দ্বীপের মালিকানা দখলে নিতে ও রাখতে মারমুখী হয়ে উঠেছে। আর তা থেকে সামরিক-কূটনৈতিক টেনশন মারাত্মক। জাপান, কোরিয়া, ফিলিপাইন, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম ইত্যাদির সঙ্গে ছোট-বড় দ্বীপ মালিকানা বিরোধ সবার সঙ্গে তৈরি হয়েছে। এ সুযোগে আমেরিকা বিরোধে বিরোধী রাষ্ট্রকে তাল দিয়ে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ শব্দটা হয়ে উঠেছে দ্বীপ মালিকানা বিরোধের প্রতীক। চীনা নেতৃত্বের এআইআইবি উদ্যোগে যোগ দিতে অন্তত অংশগ্রহণে দ্বিধা করার ক্ষেত্রে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ বিষয়টি অনেকের কাছেই তাই একটা ইস্যু।

    আমেরিকান এমন আচরণের একটা সাধারণ দিক আছে। উদীয়মান রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ চ্যালেঞ্জিংভাবে সবার চেয়ে বড় হয়ে গেলে অনুষঙ্গ হিসেবে ওই অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের সমুদ্র-চলাচল বিষয়ক নিরাপত্তার প্রশ্নটাই সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ বড় অর্থনীতি মানে কাঁচামালের বড় আমদানি জাহাজ এবং বড় পণ্য রফতানি জাহাজের আনাগোনা। ফলে এখান থেকেই সমুদ্রপথে আসা-যাওয়া জাহাজের বাধাহীন, ভয়হীন ‘ব্লু-ওয়াটার’ নেভিগেশন এলাকা পাবার চাহিদা  ও নির্ভয়ে জাহাজ চলাচলের চাহিদা সৃষ্টি হয়। এ কারণে  দুনিয়াতে অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে চাওয়া যেকোন রাষ্ট্র এ বিষয়টাকে যে কোনোভাবে হোক নিজের জন্য নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রস্বার্থ গণ্য করে থাকে।
    আমেরিকান স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার ফিলিপাইন- দ্বীপ মালিকানা বিরোধে ‘দক্ষিণ চীন সাগর’ এ রাষ্ট্রের কাছে একটা ইস্যু। উদ্যোক্তা সদস্য হওয়ার স্বাক্ষর সে করেছে; কিন্তু বাকি আনুষ্ঠানিকতা পূরণ করতে এ ব্যাংক উদ্যোগে সদস্য হিসেবে ভাগে পাওয়া শেয়ারের অর্থ পরিশোধ করতে এত দিন সে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। যে চীনের সঙ্গে দ্বীপ মালিকানা নিয়ে তার বিরোধ তুঙ্গে যাচ্ছে, সেই চীনের উদ্যোগেই এআইআইবি ব্যাংকে যোগদান শেয়ার মালিকানা ও সদস্য হওয়া কি ঠিক হচ্ছে- এ ছিল ফিলিপাইনের দ্বিধার সুনির্দিষ্ট বিষয়।
    ফিলিপাইনের জন্য এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর শেষদিন ছিল ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫। আমেরিকান অর্থনৈতিক বা গ্লোবাল পুঁজিবাজারবিষয়ক ম্যাগাজিন বস্নুমবার্গ ৩০ ডিসেম্বর জানিয়েছে, ফিলিপাইন সরকার পরিপূর্ণ যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং নিজের ভাগের ১৬৫ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার কেনার অর্থ ৫ বছরে যা পরিশোধযোগ্য তার অর্থ জমা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ৩০ ডিসেম্বর এক রিপোর্টে জানিয়েছে, ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের ফাইলে স্বাক্ষর দিয়েছেন। ফিলিপাইনের জন্য সিদ্ধান্তটি কেন এবং কত কঠিন তা বোঝা যায় পরিপূর্ণ যোগদানের সিদ্ধান্ত জানানোর সময় এর সপক্ষে যেসব বিবেচনা অর্থসচিব তুলে ধরেছেন তা থেকে। ফিলিপিনো অর্থসচিব বলছেন, ‘সদস্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উপস্থিত বহু রাষ্ট্রীয় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের (বিশ্বব্যাংক, এডিবি) ভূমিকার দিক থেকে এআইআইবি এক সহায়ক ও পরিপূরক এবং এক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। স্বচ্ছতা, স্বতন্ত্রতা ও জবাবদিহিতার ব্যাপারে এ প্রতিষ্ঠান আস্থা রাখার মতো এবং আমাদের সে আস্থা আছে।’ বোঝা যাচ্ছে, ফিলিপাইনের ঋণ চাহিদা প্রবল আর তা পূরণে এক ইতিবাচক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সে এআইআইবিকে দেখে থাকে।
    একজন চীনা মুখপাত্রকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, সদস্যদের সবার অংশগ্রহণে লেখা ওর গঠনপ্রণালিতে যেভাবে লেখা আছে এআইআইবি নিজের অপারেশনের সময় সেটা অনুসরণ করেই ফিলিপাইন লোন পাবে কিনা তা নির্ধারিত হবে, অন্য কিছু নয়।
    মনে হচ্ছে, চীনের দিক থেকে এআইআইবির বিষয়াদিতে বাইরের কোনো বিবেচনা নয়, ব্যাংকের নিজস্ব গঠনপ্রণালি ও রুল অনুসরণ করে চলতে চায় চীন। এখন দেখা যাক, বাস্তবে চীন সেটা কতটা কীভাবে করে।

     

    দুইঃ কাপলান ও দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক
    দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে আগেই বলেছি, কোনো রাষ্ট্র অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠতে থাকলে ওর সমুদ্রপথে প্রবেশদ্বার সেনসেটিভ ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সামরিক-স্ট্র্যাটেজিক ইস্যু হয়ে যায় সেটা। এর মূল কারণ, সমুদ্রপথে জ্বালানি তেলসহ কাঁচামালের আমদানি এবং উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি নিরাপদ ও অবাধ রাখতে হয়। বাণিজ্য-নিরাপত্তার স্বার্থ বলে এটা সামরিক স্বার্থও। কিন্তু কঠিন সত্য হলো, এই সামরিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ অন্যের দান, দয়াদাক্ষিণ্য, আইনের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলে রাখতে কোনো রাষ্ট্রই পারে না।
    মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা যেমন লজিক র‌্যাশনালিটি বা আইনের দ্বারা ন্যায্য বলে সাব্যস্ত  হওয়ার অপেক্ষায় ছেড়ে দিয়ে রাখা যায় না, কেউ রাখতে পারে না চীনের কাছে দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর একক রুস্তমি করতে চাওয়া ঠিক তেমনি। এই ব্যাপারটাকে প্রতীকীভাবে ধরে এক নতুন শব্দ চালু হয়েছে ‘ব্লু ন্যাশনাল সয়েল’।
    সাধারণত সাগর-উপসাগর বলতে আমাদের কল্পনা হলো, যার অন্তত একটা দিক, সাধারণত তীর বা উপকূলের উল্টো দিক অসীম আর অবারিত। কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের চারদিকেই চীনের নানা পড়শি রাষ্ট্রের ভূখণ্ড।
    আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘের অধীনে জন্ম নেওয়া সমুদ্রসীমাবিষয়ক বিভিন্ন কনভেনশনের রেওয়াজ অনুসারে রাষ্ট্রীয় সমুদ্রসীমা টানা ও মানা হয়ে থাকে। ফলে দক্ষিণ চীন সাগরের চারদিকের প্রায় সব পড়শি রাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সমুদ্রসীমা বা জেগে ওঠা দ্বীপের মালিকানাগত বিরোধ হাজির হয়েছে ও চলছে কয়েক বছর ধরে। পূর্ব চীন সাগরে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মালিকানা নিয়েও জাপানের সঙ্গে বিরোধ-বিতর্ক আছে; গত বছর যা তুঙ্গে উঠেছিল।
    এখন সার করে বললে চীনের জন্য ইস্যুটা হলো, লজিক আইনের ঊর্ধ্বে, নৌ-বাণিজ্য জাহাজের অবাধ চলাচলের স্বার্থ। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, রেওয়াজ, সালিস ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা রাষ্ট্রের সমুদ্রসীমাবিষয়ক বিরোধ মীমাংসার পথও একটা বাস্তবতা। চীনের জন্য এই দুই সত্য সংঘাতময়, বিরোধাত্মক। ফলে চীনকে দেখাতে হচ্ছে কতটা সৃজনশীল হয়ে সে এই দুই সত্যের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত বিরোধ মীমাংসার ফর্মুলা হাজির করতে সক্ষম হয়। চীনের নেতৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জটি এখানেই।
    আমেরিকায় থিংক-ট্যাংক বা চিন্তার দোকানের শেষ নেই। আমেরিকা দুনিয়ায় রুস্তমি করে চলেছে মূলত এদেরই বদৌলতে। এই দুনিয়ার তেমনই এক শেঠ রবার্ট ডি কাপলান। নামের শেষ অংশ দিয়েই বেশির ভাগ মানুষ তাকে চেনে। ২০১৪ সালের মার্চে তার লেখা একটা বই প্রকাশিত হয়েছে : এশিয়ার ফুটন্ত কড়াই : দক্ষিণ চীন সাগর ও শান্ত প্রশান্ত মহাসাগরের দিন শেষ।
    ওই বইয়ে তিনি চীনের প্রয়োজন ও বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে চীনের সপক্ষে এক শক্ত পয়েন্ট তুলে ধরেছেন। যার শিরোনাম, “বেইজিংয়ের ক্যারেবিয়ান লজিক”।
    কাপলান প্রথমত আমেরিকার উত্থান ইতিহাসে গিয়েছেন। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আজ চীন যেমন প্রায় সব বিবেচনায় আমেরিকাকে ক্রমে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে ১৮৮০ সালে আমেরিকান অর্থনীতি আকারের দিক থেকে তৎকালীন ঔপনিবেশিক প্রভু ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে যাওয়া শুরু করেছিল। পরে এভাবে ১৯২০ থেকে ১৯৪৫ সাল সময়ের মধ্যে সব বিবেচনায় ব্রিটেনসহ ইউরোপের সবার ওপরে আমেরিকা উঠে যায়। এই উত্থান পর্যায়ে আমেরিকা নিজ রাষ্ট্রে সমুদ্রপথের প্রবেশের ক্ষেত্রে লাগোয়া প্রতিটা সমুদ্র অঞ্চলে ব্রিটেনের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।
    সেকালে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রুরাষ্ট্র ছিল ইউরোপ; যাদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আমেরিকাকে পরাশক্তি হিসেবে উঠে আসতে হয়েছে।
    সমুদ্রপথে মেক্সিকো উপসাগরসহ বৃহত্তর ক্যারিবিয়ান সাগর অঞ্চলে যেন ইউরোপের কোনো রাষ্ট্রের অবাধ আনাগোনা না থাকে, ইউরোপের সব রাষ্ট্রকে দূরে রেখে তা কেবল যেন আমেরিকার জন্য অবারিত থাকে- ১৮৮০ থেকে প্রত্যেক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট এই নীতি অনুসরণ করেছেন।
    কাপলান আমেরিকান সেই নীতির রেফারেন্স দিয়ে বলছেন, আমেরিকা অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উত্থিত হওয়ার দিন ছিল সেগুলো- ফলে আমেরিকা বৃহত্তর ক্যারিবিয়ান নৌ-অঞ্চলে নিজের জন্য ‘ব্লু ন্যাশনাল সয়েল’ নীতি অনুসরণ করেছিল। সেকালে তা ন্যায্যতা পেলে আজ দক্ষিণ চীন সাগরে চীন যা করছে, তা কেন পাবে না?
    কাপলানের এই লজিকের পক্ষে এক বাস্তবতা দেখা গিয়েছিল গত বছর। দক্ষিণের মতোই পূর্ব-চীন সাগরের দ্বীপ মালিকানা নিয়ে চীনের সঙ্গে জাপানের বিরোধ আছে। আমেরিকা গত বছর এই বিরোধকে ধারালো করতে জাপানকে তাতিয়ে তুলছিল। একপর্যায়ে এটা চরমে যায়।
    এই দেখে ওয়াল স্ট্রিট কারবারিরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ, শঙ্কিত ও বিরক্ত হয়ে ওঠে। পরের সপ্তাহের লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিস্ট পত্রিকার কাভার স্টোরিতে তা উঠে আসে। ওখানে দুটো পয়েন্ট ছিল : চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠছে, কেউ এমন পরাশক্তি হলে ব্লু-ওয়াটার ধরনের ইস্যুতে তার পেশি দেখানো স্বাভাবিক এবং এটা আমাদের নিচু গুরুত্বে দেখা উচিত। কারণ, আমরাও এমন করেছিলাম। এর চেয়েও বড় কথা, ২০০৮ সাল থেকে শুরু হওয়া দুনিয়াব্যাপী মহামন্দার ভেতর আমরা এখনো আছি। এ সময়ে চীনের মতো রাইজিং ইকোনমি না থাকলে আমাদের অবস্থা আরও করুণ হতো। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে বিবাদের খাতা খোলার চেষ্টা অর্থহীন ও আত্মঘাতী। এরপর থেকে এই ইস্যুতে জাপান লো-প্রফাইলে চলে যায়। যদিও পুব চীন সাগরের অপর অংশ দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুটা এখনো জীবন্ত, বিশেষ করে ভিয়েতনাম বা ফিলিপাইনের দিক থেকে।

    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এর ০৩ জানুয়ারী সংখ্যায়, দৈনিক নয়াদিগন্তের ০৪ জানুয়ারী সংখ্যায় এবং সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকায় ০৯ জানুয়ারি সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এখানে সেগুলোকে আবার একসাথে এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

  • মোদীর পাকিস্তান সফর আচমকা না পরিকল্পিত

    মোদীর পাকিস্তান সফর আচমকা না পরিকল্পিত
    মোদির পাকিস্তান সফরের অর্থ কী
    গৌতম দাস 

    http://wp.me/p1sCvy-tV
    ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫

     

    ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চমক দিতে ভালোবাসেন। বিশেষ করে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ ধরনের ফালতু ও অবাস্তব শব্দ ও বাজে ধারণাগুলো বাদ দিয়ে সরিয়ে রাখলে যে কোনো দুইটি রাষ্ট্র মানেই দুইটি আলাদা আলাদা স্বার্থ এবং যে সম্পর্ক আসলে আবার মৌলিকভাবে স্বার্থ-সংঘাতমূলক। কিন্তু তবু এরই ভেতর সাময়িক কোনো কোনো ইস্যুতে এক কমন অবস্থান হাজির করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। তার সুযোগ নিতে হয়, দরকার হয়ে পড়ে। তাই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক মাত্র এক জটিল বিষয়। হয়তো দেখা যাবে, ৯০ ভাগ বিষয়ে দুই রাষ্ট্রের অবস্থান ফাটাফাটি সংঘাতের, কিন্তু বাকি ১০ ভাগের কমননীতি-অবস্থানের (তবে তা সাময়িক) কারণে কোনো উদ্যোগ নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার অবস্থায় তাকে আনতে হতে পারে, আনা হয়। তো সারকথা হলো, তাই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কমাত্রই এক জটিল জিনিস। কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোদির এ চমক সৃষ্টি করার ঝোঁক সবসময়; মোদির এই ঝোঁক একদিক থেকে যেন পরোক্ষে তাঁর স্বীকার করে নেয়া যে, কূটনৈতিক সম্পর্ক জিনিসটা জটিল বলেই চমক সৃষ্টি করে মোদি একে সহজ করার কিছু সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করে থাকে। আবার আরেক দিক থেকে এ জটিল জিনিসটিকে সামলাতেই শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারস্পরিক এক গুড ইম্প্রেশন তৈরির চেষ্টা থাকে। যেটাকে আমরা ব্যক্তিগত ইমোশন শেয়ার বা ভাবের সম্পর্ক তৈরি ইত্যাদি বলি, মোদি বলতে চান এগুলো জটিল কূটনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখে। কথা সত্যি, জটিল স্বার্থ-সংঘাতের ইস্যুকে নরম করতে, অন্তত ডায়ালগ শুরু করার দিক থেকে পারস্পরিক বোঝাবুঝি ভালো থাকলে তা একটা ইতিবাচক ভূমিকা অবশ্যই রাখে। অতএব এ কথাটাকেই আমরা ভিন্নভাবে বলি যে, মোদি চমক তৈরি করতে ভালোবাসেন।

    মোদি আসলে গিয়েছিলেন পুতিনের রাশিয়া সফরে। সেখান থেকে ফেরার পথে তিনি হঠাৎ পাকিস্তানে থেমেছিলেন। দুই দিনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ সফরে গত বুধবার ২৩ ডিসেম্বর তিনি রাশিয়া পৌঁছেছিলেন। কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, সেই ’৫০-এর দশক থেকেই রাশিয়া বা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতে ভারী অস্ত্র, যুদ্ধ টেকনোলজির সরবরাহকারী। তবে মাঝে ২০০৫ সাল থেকে প্রথম আমেরিকান অস্ত্র; বিশেষত পারমাণবিক টেকনোলজি পাওয়াসহ ভারী অস্ত্র কেনা, একসাথে যৌথ উদ্যোগে নানানভাবে ভারতে এর স্থানীয় উৎপাদন ইত্যাদি অনেক বিষয়ে সম্পর্কের দুয়ার খুলেছে। কিন্তু তা খুললেও এখনো অস্ত্রবিষয়ক সম্পর্ক ও যৌথ উদ্যোগে উৎপাদন ও সরবরাহের বিষয়ে অর্থসহ সব ধরনের অঙ্ক বা ফিগারের দিক থেকে এখনো রাশিয়া সবার চেয়ে আগে এবং একমাত্র।
    ফলে গুরুত্বপূর্ণ এবার যৌথভাবে লাইট কার্গো হেলিকপ্টার উৎপাদন, যৌথভাবে ট্যাংক তৈরি, যৌথভাবে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান উৎপাদন, পারমাণবিক ক্ষমতায় চলা অ্যাটাক সাবমেরিন লিজ বা ভাড়া নেয়া এবং শত্রুর ছোড়া মিসাইল আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রাশিয়ান মিসাইল শিল্ড কেনা ইত্যাদি বিষয়ে চুক্তি শেষ করে দিল্লি ফেরার পথে শুক্রবার কয়েক ঘণ্টার জন্য মোদির আফগানিস্তানের কাবুল যাওয়ার কথা ছিল। আবার আফগানিস্তান কেন? অনেকেই জানেন, আফগানিস্তান সরকারের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পাশাপাশি ভারতের সাথেও প্রায় একই ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক আফগানিস্তানের আছে। এ দিকটা জানতে আগ্রহীরা ছাড়া এর বাইরের লোকেরা খুব কমই জানেন। আফগানিস্তানে আমেরিকান স্বার্থ ও প্রভাবের কারণে এর ফায়দা যেন শুধু পাকিস্তান না তোলে, ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের বাড়তি সুবিধা হিসাবে না হাজির হয়ে যায়, ভারতের ভাষায় তা যেন ভারসাম্যহীন না হয়, তা ঠেকাতে এর বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে ভারতের এমন সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করেছে আমেরিকা। আফগানিস্তানের সঙ্গে এসব রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক সূত্রে মান রাখার জন্য ভারত ৯০ মিলিয়ন ডলার অনুদান হিসেবে খরচ করে আফগানিস্তানের জন্য এক নতুন পার্লামেন্ট ভবন তৈরি করে দিয়েছে। ওই ভবন উদ্বোধন করতেই মোদির সংক্ষিপ্ত কাবুল সফর। এই সফরের খবর নিরাপত্তার কারণে খুব সীমিত বা লো-প্রোফাইল রাখাতে অনেকেই জানতেন না মোদি আসবেন। আর কাবুলে কর্মসূচির শেষে ওই দিনই বিকেলে তার দিল্লি ফিরে যাওয়ার কথা।
    কিন্তু চমক ঘটল কাবুল কর্মসূচি সমাপ্তিতে। মোদি এ ধরনের চমকের খবর সবার আগে নিজেই টুইট করে ঘোষণা বা প্রকাশ করতে ভালোবাসেন। ফেরার পথে তিনি টুইট করলেন যে, ভারতে ফিরে যাওয়ার আগে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সাথে দেখা করতে লাহোর যাচ্ছেন। শুক্রবার নওয়াজ শরিফের জন্মদিন, তাই তিনি শুভেচ্ছা জানাতে যাচ্ছেন আর একই সাথে শরিফের নাতির বিয়ে, ফলে শরিফের লাহোরের বাসায় তিনি যাবেন।
    ব্যাপারটাকে মানুষের শরীরের সাথে তুলনা করা যায় যে, এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন মানুষ তৎক্ষণাৎ সেই কাজ করার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে, যেন সেই ব্যাথা যা তাকে তাড়িত করছে তা রিলিজ বা উপশমের জন্য। ভারত-পাকিস্তান এ দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ককে নিয়ে কেচ্ছা-কাহিনীর শেষ নেই। বেশির ভাগ সময় সেটা ঝগড়া-বিবাদের, চরম ও গরমের। তবুও ভারত-পাকিস্তান এখন এমনই এক পরিস্থিতিতে পড়েছে; কোনো এক ব্যথা তাদের এমন তাড়িত করছে যে, তারা পরস্পরের কাছাকাছি আসতে, পুরনো কিছু বিবাদ প্রসঙ্গে মারমুখী হওয়ার বদলে তা লঘু করতে দিল্লি তৎপর হওয়া খুবই জরুরি মনে করছে। অতএব ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কাবুল সফর থেকে দিল্লি ফেরার পথে আচমকা পাকিস্তানে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। অন্তত তার মুখে বলা উদ্দেশ্য হলো, ২৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের জন্মদিন ছিল। ফলে মোদি জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য পথে শরিফের লাহোরের বাসায় এক ঘণ্টা কাটিয়ে (পাকিস্তানে মোট ব্যয়িত সময় আড়াই ঘণ্টা) দিল্লি ফিরে গেলেন। কিন্তু এমন কী সেখানে ঘটেছে, যা এ দুই শীর্ষ নেতাকে এমন বেচাইন করছে? ভারতের মোদীকে বেচাইন করেছে আইএস। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার এক রিপোর্টের শিরোনাম থেকে ধার করা ভাষায়, “ঘাড়ে নিশ্বাস এবার, আইএস এখানে অপারেশনে নামছে”।

    সেটা আজকের প্রসঙ্গ!
    এতক্ষণ চমকের দিক থেকে ধারাবর্ণনা করলেও আসলে মোদির পাকিস্তান ইস্যু নিয়ে তাগিদবোধ অনেক আগে থেকেই। সুনির্দিষ্ট করে বললে, আইএসের প্যারিস হামলা বা আক্রমণের পর প্যারিসের জলবায়ু সম্মেলনে শরিফের সাথে দেখা হওয়াকে পরিকল্পিতভাবে মোদি নতুন করে মিলিত হয়ে কথা বলার কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন ও লাগিয়েছিলেন।

    আসল টেররিজম এর পানি কানে ঢুকছে
    ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের মধ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে পরস্পরের আপত্তি ও মতবিরোধের শেষ নেই। এবং এর প্রায় প্রতিটি ইস্যু আজন্ম। ফলে পুরানা সেসব দিকে না গিয়ে একালের বিরোধের মূল ইস্যু নিয়ে কথা তুললে বলতে হয়, ভারত মনে করে, ভারতে আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতা ইতোমধ্যেই ঘটেছে, অ্যাকশন প্রস্তুতি চলছে ধরনের অবস্থায় আছে। এ বিষয়টা মোদীর কাছে পাকিস্তানের সাথে দ্রুত ডায়লগ শুরু করতে নগদ তাগিদ হিসেবে হাজির হয়। অর্থাৎ ২০০১ সাল আলকায়েদা ফেনোমেনা উত্থানের পর থেকে ভারতে এরা সরাসরি হাজির ও তৎপর না হলেও কাশ্মির-কেন্দ্রিক সশস্ত্র ইসলামি বিচ্ছিন্নতা রাজনৈতিক তৎপরতাগুলোকেই ভারত আলকায়েদার ‘টেররিজম’ বলে চালিয়ে এসেছে। কিন্তু এখন এই প্রথম ভারতকে আলকায়েদা বা একালের আইএস বিষয়ে মানে প্রকৃত “টেররিজম” মোকাবিলার জন্য তৈরি হতে হচ্ছে। ভার্তের দাবি করা এতদিন যাকে সে ছলনা করে টেরিজম বলে এসেছে তা অন্ততপক্ষে সেটা “গ্লোবাল টেররিজম” ছিল না,অথবা আমেরিকার ভাষায় যা “টেররিজম” তা এটা ছিল না। এবার আইএসের টেররিজম, “গ্লোবাল টেররিজম” – একে মোকাবেলার জন্য মোদী ভারতকে উপযুক্ত করে সাজাতে তৎপর হয়েছেন। সম্ভবত মোদি সরকারের ইচ্ছা ও অনুভব হলো, এত দিন ধরে টেররিজম বলে চালিয়ে দেয়া বিচ্ছিন্নতা আন্দোলন আর আইএসের ‘টেররিজম’এ দুইয়ের সাথে একসাথে লড়তে গেলে ভারতের সক্ষমতা ও রিসোর্সে টান পড়তে পারে, তাতে উপযুক্তভাবে মোকাবিলার কাজে নাও করা যেতে পারে। এর বদলে প্রথমটার বিষয়ে পাকিস্তানের সাথে বা পাকিস্তানের মাধ্যমে কোনো রফা করতে পারলে অথবা কমপক্ষে একে তুলনামূলক কম ভয়ঙ্কর হিসেবে হাজির রাখতে পারলেও তা ভারত সরকার ও রাষ্ট্রের সুবিধা হয়। হয়ত এটাই মোদির জন্য স্বাভাবিক ও সঠিক অনুমান। কিন্তু গোল বেধেছে তাহলে কাশ্মির ইস্যুকে সুরাহা করতে ভারতকে কোনো একটা ফর্মুলা প্রস্তাব করতেই হবে এমনকি তা কেবল নিজ পছন্দমত কান্নি মারা করে হলেও। সেটা ভারত চায় না বলে মনে করার কারণ আছে। ফলে ভারতের ইচ্ছা কাশ্মির ইস্যু পাশ কাটিয়ে আইএসের টেররিজম মোকাবেলার ইস্যুতে পাকিস্তানকে যতটা সম্ভব পাশে পাওয়া চেষ্টা করে যাওয়া। পাকিস্তানের সাথে মোদীর প্রবল তাগিদের উৎস এখানে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান পাল্টা বলতে চায়, ডায়লগ সেও অবশ্যই করতে চায় কিন্তু কাশ্মির ইস্যু পাশ কাটিয়ে শুধু টেররিজম নিয়ে ডায়লগ সে চায় না। এটাই ছিল এতদিন ভারত-পাকিস্তানের একালের মতবিরোধের মূল বিষয়। তাহলে সার বিতর্ক হলো, “টেররিজম বিষয়ে আলাপ হবে” না “কাশ্মীর ইস্যুসহ টেররিজম নিয়ে আলাপ হবে”।
    এই বিরোধে দীর্ঘ দিন এভাবে নন-ডায়লগ হয়ে পড়ে থাকার পর মোদি এবার পাকিস্তানের সাথে মতবিরোধের স্থবিরতা কাটাতে উদগ্রীব হয়েছেন। এ বিষয়ে, গত ২৫ ডিসেম্বরের নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখছে, মোদি বুঝেছেন, “তিনি যে পাকিস্তানের সাথে ডায়লগে যুক্ত হচ্ছেন, এটা দেখানো তার দরকার, কারণ তিনি আমেরিকা ও সৌদিদের চাপে আছেন”। টাইমস এ কথাগুলো লিখছে এক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক অশোক মালিকের বরাতে। মালিক অবশ্য আরেক কথা বলেছেন যে, “পাকিস্তানের আগের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সম্প্রতি বদল করে সেখানে সেনাপ্রধানের পছন্দের লোক আনা হয়েছে। কিন্তু মোদি এটাকে তার জন্য সুবিধা হিসেবে দেখেছেন, কারণ তিনি সরাসরি পাকিস্তান সেনাদের সাথে কাজ করতে চান”। অনেকে খোঁচা দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের প্রকৃত ক্ষমতা সেনাদের হাতে। নওয়াজের ভুল পদক্ষেপের কারণে নিজের আগের সরকারের আমলে তাঁর সেনাদের সাথে সম্পর্কের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না; যেটা জেনারেল মোশাররফের বিমান আকাশে আটকে রাখা আর পাল্টা তাদের ক্যু-এর ক্ষমতা দখল পর্যন্ত গিয়েছিল। তাই এবারো এমন কোনো জটিলতা যেন না সৃষ্টি হয়, সেজন্য নওয়াজের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নেয়ার আগের সময়ের ইনফরমাল ডিল হলো, কেবল সামরিক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সেনাদের অবস্থান বেশি গুরুত্ব পাবে, বাকি অন্য সব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের। এ বিষয়টাকে অনেকে খোঁচা দেয়ার কাজে ব্যবহার করে। তবে মোদী জানেন, পাকিস্তান থেকে তিনি যা চান তা পেতে গেলে তার জন্য সরাসরি সেনাদের সাথে ডিল করা ভাল, কারণ শেষ বিচারে তারাই তা দিতে পারে।
    এসব পটভূমি মাথায় রেখে মোদি প্যারিস জলবায়ু মিটিংয়ে নওয়াজ শরিফের সাথে সমঝোতা করে ডায়লগ ওপেন করেন যে, দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা টেররিজম ইস্যুতে সহযোগিতা নিয়ে ডায়লগ করবে। আর পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে একই সাথে কাশ্মির ইস্যুতে ডায়লগ চলবে। যদিও এটা মনে করার কোন কারণ নাই যে সব আলাপ প্যারিসের ঐ সাইড-টকে শুরু হয়েছিল। পাকিস্তানে ভারতের রাষ্ট্রদুতের মাধ্যমে পুর্বপ্রস্তুতিমূলক আলাপ অনেক আগে থেকেই চলছিল। নওয়াজের সাথে মুখোমুখি আলাপের মাধ্যমে দুই প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতে তা একধরণের ফরমাল বা চুড়ান্ত আকার পেয়েছিল। সেই রফা অনুযায়ী ৬ ডিসেম্বর ব্যাংককে দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ে টেররিজম ইস্যুতে ডায়লগ হয়। আর এর দুই দিন পর ৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানে সুষমা স্বরাজের সফরে কাশ্মির ইস্যুতে ডায়লগ হয়।
    বলা যায়, মোদি ভারতে আইএস তৎপরতা ছড়ানোর সম্ভাবনা ও তা মোকাবেলাকে মাথায় রেখে, এটাকে সব বিবেচনার মূল কেন্দ্রে রাখার কারণে তিনি পাকিস্তানের সাথে আলোচনা করতে সিরিয়াস হয়েছিলেন। যদিও ভারতে কাশ্মির ইস্যুতে কিন্তু পাকিস্তান-কেন্দ্রিক যেসব সশস্ত্র ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা আছে, এগুলো ২০০১ সালে আলকায়েদা ফেনোমেনা হাজির হওয়ার আগে থেকেই আছে বা ছিল।
    ফলে  আভ্যন্তরীণ মুল্যায়নে ভারতের কখনই ধরে নিবার কারণ নাই যে, এরা আর আলকায়েদা ফেনোমেনা এক। কিন্তু তবুও ভারত কাশ্মীর-কেন্দ্রিক ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতাকেই কল্পিত জঙ্গিবাদ ও টেররিজম বলে, নিজের ভূমিতে অনুপ্রবেশ ইত্যাদি কথার প্রচার চালিয়ে গেছে। উদ্দেশ্য, কল্পিত টেররিজমের সরবরাহকারীর অজুহাতে বাংলাদেশকে কব্জার মধ্যে রাখা, ভারতের জন্য বাংলাদেশের ওপরে বাণিজ্য সুবিধা আদায় করা আর ট্রানজিট করিডোর আদায় করে নেয়ার কাজে ব্যবহার করে নেওয়া। সম্প্রতি আইএস ভারত ও বাংলাদেশে উপস্থিত হয়ে থাকতে পারে, এটা তারা স্বীকার করছে। ফলে বাংলাদেশ সরকারের ভাষ্যের সাথে ভারতের রাষ্ট্রের ভাষ্যের এ প্রথম অমিল দেখা গেছে। এমনকি আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ অমিল-গরমিলকে স্বীকার করে নিয়ে গত সপ্তাহে বলেছেন, তারা ভারতের পাওয়া তথ্যের সাথে নিজের বোঝাবুঝি ও অমিলের কারণ খুঁজছে। তাহলে এ কথা মনে করার কারণ আছে যে, মোদির পাকিস্তান সফর কোনো চমক বা কারিশমা দেখানো নয়। নিউইয়র্ক টাইমসের ২৫ ডিসেম্বরের রিপোর্টে ভারতের ইংরেজি একটি দৈনিকের ডব্লিউআইআরই (WIRE)-এর সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভারাদ্বারজনের এক মন্তব্য তুলে এনেছে। “In a way, he is sending a signal to everyone that there will be no more U-turns,” said Siddharth Varadarajan, a founding editor at The Wire, an Indian news site. “He is putting his personal political brand on this process. He can’t walk away that easily now.”
    মোদী সম্পর্কে ভারাদ্বারজন বলছেন, “একভাবে দেখলে চমকের পাকিস্তান গমন করে মোদি আসলে সবার কাছে এক বার্তা দিয়ে ফেলেছেন, যা থেকে তিনি আর সরে আসতে পারবেন না। তিনি আসলে নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ইমেজ এই প্রক্রিয়ার মধ্যে জড়িয়ে ফেলেছেন। ফলে তিনি এখন আর সহজে এখান থেকে সরে যেতে পারবেন না”।

    “সমালোচকদের পাকিস্তা্ন পাঠিয়ে দিবার রাজনীতি” – ভারত আর বাংলাদেশে একই
    বিজেপি তার সমালোচককে বাংলাদেশের মতই কিছু হলেই পাকিস্তান পাঠিয়ে দেয়। বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়েই যে যখন যেভাবে সুবিধা মনে করেছে পাকিস্তান ইস্যুকে অ্যান্টি-পাকিস্তানি হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ – এক উগ্র বর্ণবাদ প্রচার করে থাকে ভোটের বাক্স ভরার দিকের নজর থেকে। কিন্তু রাষ্ট্র সরকার চালাতে গেলে তার তো একটা পাকিস্তান নীতি, পাকিস্তানের সাথে সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো কিভাবে ডিল করবে তা থাকতেই হবে। আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নির্বাচনী বক্তৃতায় ভোট পাবার জন্য পাকিস্তান-বিরোধী উস্কানি, সুড়সুড়ি জাগিয়ে ভোটের বাক্স ভড়তে যা বলা হয় তার সাথে বৈদেশিক পাকিস্তান নীতির কোন সম্পর্ক নাই। ফলে সবসময় তাদের যার যার সরকারের পাকিস্তান নীতিতে আর তাদের স্ব স্ব কালে যেকোনো নির্বাচনে পাকিস্তানবিরোধী ঝড় তুলে ভোটের বাক্স ভরার রাজনীতির মধ্যে কখনো মিল-সামঞ্জস্য রাখতে পারেনি। বরং সময়ে স্থানীয় নির্বাচনে জেতার বিষয়টিকে মুখ্য বিবেচ্য রাখতে গিয়ে বেশির ভাগ সময়ে সরকারের পাকিস্তান নীতিতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি। এসব সমস্যার কথা খেয়াল করে ভারাদ্বারজন ওই মন্তব্য করেছেন।
    কম-বেশি প্রায় এই একই সমস্যা আমাদের দেশেও হয়ে আছে। সরকারের সক্ষমতা ও মনোযোগ এরই মধ্যে (নকলভাবে) জঙ্গি বলে সাংবিধানিক রাজনীতির জামায়াত-বিএনপি দমনের কাজে সরকার ব্যবহার করে চলেছে। আবার সাম্প্রতিককালে আসল ‘টেররিজম’ আইএস বা জেএমবি দমনের কাজেও এটা ব্যবহার করছে। অর্থাৎ সরকারের মোট সক্ষমতাটা তাদেরকে দুইভাবে ভাগ করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এভাবে কত দিন চলতে পারবে, সক্ষম থাকবে কি না জানি না। তবে কেবল জেএমবি দমনের কাজে মনোযোগী থাকার জন্য সক্ষমতা কেবল সেদিকে নিবদ্ধ রাখতে আপাতত সাংবিধানিক রাজনীতিতে বিরোধীদের সাথে কোনো ডায়লগ, আঁতাত, বোঝাবুঝি কোনো কিছুর আলামত দেখা যাচ্ছে না, যাতে সরকার সব রিসোর্স সক্ষমতা একমুখী করতে পারে।

    মোদির পাকিস্তান সফরে ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়া
    মোদির সফরে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রতিক্রিয়া হয়েছে অদ্ভুত ও মারাত্মক; তবে এককথায় এবং দূরে সেভ জায়গায় দাঁড়িয়ে বললে বলতে হবে, মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তো এমন প্রতিক্রিয়াগুলোকে কয়েকটা খোপে ভাগ করে বললে, প্রথম খোপ  হল তারা যারা সরাসরি শুধু ভোটের রাজনীতির বিবেচনায় লাভালাভের দিক চেয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। এরা হলো খোদ কংগ্রেস, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ও তার জনতা দল ইউনাইটেড। খোপ দুই, যারা জম্মু ও কাশ্মীর অথবা পাকিস্তান-ভারতের জন্মের সময় থেকেই লম্বা বিবাদে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। যেমন এককথায় বললে, ভারতীয় কাশ্মীরকেন্দ্রিক সব ধরনের দল মোদির পাকিস্তান সফরকে ইতিবাচক বলেছেন। এছাড়া এদের সবার একই কথা “ডায়ালগ”; নিরবচ্ছিন্ন ডায়ালগই প্রধান কার্যকর করণীয় মনে করেন সবাই। এমনকি যারা কাশ্মীড় ইস্যুতে বিচ্ছিন্নতাবাদী লাইন অনুসরণ করে তারাও মোদিকে স্বাগত জানিয়েছেন। শ্রীনগরের মডারেট দল হুরিয়াত এটাকে সরকারের নেয়া “ইতিবাচক সঠিক পদক্ষেপ” বলেছে। আর হার্ডলাইনের আলী শাহ জিলানি বলছেন, “ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টার বিরুদ্ধে তাদের কোনো আপত্তির কিছু নেই”। বর্তমানে ভারতীয় কাশ্মীর রাজ্যে বিজেপির সঙ্গে চলতি জোট সরকার গঠনের পার্টনার স্থানীয় মডারেট দল পিডিপির নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী মুফতি মোহাম্মদ সাঈদও খুবই উচ্ছ্বসিত হয়ে এটাকে ‘সঠিক দিকে পদক্ষেপ’ বলেছেন। ওদিকে হায়দ্রাবাদকেন্দ্রিক এমআইএম দলের নেতা ও কেন্দ্রীয় লোকসভার সদস্য ব্যারিস্টার আসাদুদ্দিন ওয়ার্সীও মোদির সফরের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ডায়ালগ চালিয়ে যাওয়ার কথা তুলেছেন। কাশ্মীরের স্থানীয় দল ন্যাশনাল কংগ্রেসের শেখ আবদুল্লাহর নাতি ওমর আবদুল্লাহও স্বাগত জানিয়েছেন; তবে এমন পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয় না, ছুটে যায় বলেও আক্ষেপ করেছেন। ওদিকে বাম কমিউনিস্টদেরও (সিপিএম, আরএসপি) এই খোপে ফেলা যায়, একই ধরনের স্বাগত জানানোর কারণে। তবে এদের বাড়তি কিছু শব্দ আছে। যেমন তারা ‘টেররিজমও নিপাত যাক’ সঙ্গে যোগ করে তাদের কথা বলেছেন।

    এই সফরের খবর ভারতীয় মিডিয়ায় আসার পর কংগ্রেস প্রতিক্রিয়ায় বলেছিল, “এই সফরের কোন তালমিল প্রটোকল রাখা হয়নাই। ফলে এটা একটা ফালতু তামশা ব্যাপার হয়েছে। এর খারাপ পরিণতি হবে। এর আগে বাজপেয়ির এমন সফরের পরে কারগিল যুদ্ধ এসেছিল”। যেমন, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এনডিটিভি, দি হিন্দু,। কংগ্রেস এমন মন্তব্য করার সময় ধরেই নিয়েছে যেন আগে কোন ইনফরমাল আলাপ ছাড়াই মোদী পাকিস্থান সফরে গিয়েছেন। এর আর এক অর্থ আইএস ইস্যুতে মোদীর সরকার কী করে তাতে তাদের কোন মাথাব্যাথা নাই। আভ্যন্তরীণ ইস্যুতে নিজ দলের সুবিধাই আসল কথা।  সোনিয়ার কংগ্রেসকে কেবল ভোটের রাজনীতির বিবেচনায় বক্তব্য অবস্থান নেয়া ও প্রকাশের দলে বা খোপে ফেলাতে অনেকে বিস্মিত হতে পারেন। কিন্তু ব্যাপারটা ইদানীং এমন অবস্থাতেই ঠেকেছে। বিশেষ করে লোকসভা ২০১৪-এর নির্বাচনে কংগ্রেস শোচনীয়ভাবে হেরে মোট আসনের মাত্র ১০ ভাগেরও নিচে আসন সংখ্যা হয়ে যাওয়ার পর। যেমন মোদি সরকারের ‘ল্যান্ড বিল’ বা জমি অধিগ্রহণ আইন নামে একটি আইনের প্রস্তাব করেও বিরোধীদের বিরোধীতায় তা শেষ পর্যন্ত পাস করাতে পারেনি, পক্ষে-বিপক্ষে ভাগ হয়ে গেছে। শেষে মোদী বিলটা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বা বলা যায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাস হয়নি বলে এমনিতেই এটা প্রত্যাহার হয়ে গেছে ধরতে হবে। ওই বিলের সারকথা ছিল একদিকে চাষাবাদের জন্য জমি, অন্যদিকে অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য বা শিল্প-কারখানার জন্য জমি এ দুই ধরনের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্যের লাইনটা কোথায় টানা হলে সঠিক হবে, সব কুল রক্ষা পাবে। এ বিলের ইস্যুতে কংগ্রেসের অবস্থান খুবই সঙ্কীর্ণ বিরোধিতার। সিদ্ধান্তের পেছনে তাদের মূল বিবেচনা ছিল, কোনো চটকদার পপুলার কথা বললে তাতে দল চাঙা হবে। অথচ বিষয়টা একালের সব রাষ্ট্রের জন্যই খুব নির্ধারক এক নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। পার্লামেন্টে আলোচনার সময় রাহুল গান্ধী দলের মূল অবস্থান-বক্তব্য রেখেছিলেন। রাহুলের বক্তৃতার পর মিডিয়াসহ কংগ্রেসের নিজের দলের আলোচনার বিষয় ছিল, ‘রাহুলের পারফরম্যান্স’। রাহুল ‘কী বলেছেন’ সেটা নয়, ‘কোন অভিনয়ে’ বলেছেন সেটাই বিবেচ্য ও চর্চার বিষয় হয়েছিল। দল কি অবস্থান নিয়েছে, সেদিক নিয়ে কারও কোনো আগ্রহ ছিল না। কথাগুলো তুলে আনলাম, ভারতের এখনকার বিরোধী দল কংগ্রেসের রাজনীতির কোয়ালিটি বোঝানোর জন্য। তবে একথাও ঠিক, বিজেপি যখন বিরোধী অবস্থানে ছিল, তখনও কমবেশি এসব সমস্যা একই ছিল। সরকার ও বিরোধী দল এভাবে ভাগ করে দেখা ছাড়াও যদি একই ক্ষমতাসীন বিজেপির নির্বাচনীর রাজনীতির অবস্থান আর সরকারের নীতি বা সংসদে আনা বিলের বেলায় অবস্থান এভাবে ভাগ করে দেখি তো সেখানেও বিশাল ফারাক আর ছলচাতুরিতে ভরা অবস্থান দেখতে পাব। নভেম্বরের বিহার নির্বাচনে বিজেপির মধ্যে পাকিস্তান-বিরোধী ঘৃণা ছড়ানো কাড়াকাড়ি ছড়াছড়ি গেছে। এছাড়া ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘বিজয় দিবসে’ প্রচারণায় নামতে ভারতীয় বাহিনীকে খোদ মোদির টুইট বার্তার আহ্বান জানিয়েছিল। বিজেপির এগুলো সবই ভোটের রাজনীতি। সস্তা ইসলামবিদ্বেষ ছড়ালে ভোটের বাক্স ভরে উঠবে এ বিশ্বাসে কাজে নেমেছিল। আবার সেই মোদিই এখন পাকিস্তান সফরের মাধ্যমে চমক সৃষ্টি করার চেষ্টা থাকলেও এক সিরিয়াস বিজনেসে পাকিস্তানের সঙ্গে জড়াতে চান, একথা শতভাগ সত্যি।

    সারকথায় দেখা যাচ্ছে, ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশেই আইএস ইস্যুটা এখনও মুখ্য ইস্যু হতে এবং যথাযথ গুরুত্ব পাবার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের বিরোধী কোনঠাসার আভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে  বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

    [এই একই প্রসঙ্গে আমার দুটো লেখা কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে এবং ভিন্ন ভিন্ন পয়েন্ট তুলে  দুটি দৈনিকে ছাপা হয়েছিল। প্রথমটা ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫ দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় আর দ্বিতীয়টা ২৭ ডিসেম্বর ২০১৫ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে ঐ লেখা দুটোর পয়েন্টগুলোকে একসাথে করে এরপর নতুন করে পরিবর্ধন ও এডিট করে এখানে আবার ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

    goutamdas1958@hotmail.com

  • ইউরোপের মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন

    ইসলামবিদ্বেষের ছায়ায় দেখা
    মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন

    গৌতম দাস
    http://wp.me/p1sCvy-qH

    ২০১৫ ডিসেম্বর ২৯

    আইএস কারা, কোথা থেকে কোন দেশ থেকে এসেছে; কী ধরণের মানুষ এরা যারা আইএস সংগঠনে এসে যোগ দিচ্ছে ইত্যাদি প্রশ্নে আমরা জানি মূলত এদের এক বিশাল অংশ পশ্চিমা সমাজগুলো থেকে। কিন্তু পশ্চিমা সমাজের কারা কারা কোন ধরণের সামাজিক, অর্থনৈতিক বা পারিবারিক ব্যকগ্রাউন্ডের সন্তানেরা আইএসে যোগ দিচ্ছে এনিয়ে পশ্চিমা সমাজগুলোর অভ্যন্তরে বিশেষত ইউরোপের দেশগুলোতে পরিচালিত সামাজিক গবেষণার শেষ নাই। কী ধরণের মানুষেরা বিশেষ করে আইএস সংগঠনে যোগ দিচ্ছে এবিষয়ে প্রচলিত ধারণাগুলো মিথ্যা দাবি করে – আমেরিকান উচু কদরের দ্বিমাসিক জর্নাল “ফরেন এফেয়ার্স” এর চলতি ডিসেম্বরে প্রকাশিত জানু-ফেব্রু ২০১৬ সংখ্যায় – এক রিপোর্ট করেছে। যারা পশ্চিমা নেতা দেশ- দুনিয়া চালায় ও নীতি নির্ধারক, এমন গুরুত্বপুর্ণ লোকেদের চিন্তা ও পাঠের জন্য জরুরি বলে মনে করা হয় এই জর্নালকে – এই অর্থে এটা প্রেস্টিজিয়াস জর্নাল বলেন কেউ কেউ। যেমন হিলারি ক্লিনটন, ওবামা সরকারের সেক্রেটারি অব স্টেট থাকা অবস্থাতে এখানে লেখা ছেপেছেন। সেই জর্নালে আলোচ্য আর্টিকেলটা লিখেছেন ভারতে জন্ম বৃটিশ নাগরিক কেনান মালিক ()।
    মানুষ কেন সন্ত্রাসবাদী ভাবাদর্শ (র‍্যাডিক্যালিজম) আপন করে নেয় এবিষয়ে মোটা দাগে প্রচলিত চারটা তত্ত্বের কথা তুলেছেন লেখক কেনান মালিক।  সেগুলোর “প্রথম তত্ত্ব বলে – লোকে জঙ্গী হয় কারণ তারা ধর্মীয় অনুমোদন পিছনে আছে  এমন কিছু জঙ্গীবাদী ভাবাদর্শ সহজে তাদের  নাগালে আসে, তাই। কেনান বলছেন, কিন্তু বৃটিশ আভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা বিভাগ ২০০৮ সালে MI5 পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে (লিক হয়ে বেরিয়ে পড়া রিপোর্ট) “ধর্মীয় জোশ উন্মাদনায় উজ্জীবিত হওয়া দূরে থাক বরং যোগদানকারীদের বিরাট এক অংশ নিয়মই ধর্মকর্ম পালন করে না”। (• Far from being religious zealots, a large number of those involved in terrorism do not practice their faith regularly. Many lack religious literacy and could actually be regarded as religious novices. ) ওদিকে দ্বিতীয় তত্ত্ব বলে, অন্যান্য জঙ্গীবাদী ভাবাদর্শ সাধারণত যেভাবে মানুষে অর্জন করে তা থেকে ভিন্ন ভাবে এরা ভাবাদর্শ লাভ করে। প্রচলিত ধরে নেয়া ধারণা হল এদের ভাবাদর্শ ঘৃণা-ছড়ানী-প্রচারকদের থেকে এসেছে “ideology comes from hate preachers”, তাই। গবেষণায় এর পক্ষেও সমর্থন মিলেনি। তৃতীয় তত্ত্ব বলে, এটা যেন ভারী কিছুকে যান্ত্রিকভাবে বইবার এক কনভেয়ার বেল্ট এর মত; যার শুরু হয়  ক্ষোভ অসন্তোষে মানুষের ঐ বেল্টের উপর উঠে বসা থেকে। এরপর তা এক ধর্মভাবের ভিতর দিয়ে পার হয়ে এমন এক রেডিকেল বিশ্বাসের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয় যা পরিণতিতে সন্ত্রাসবাদে পৌছায়। কেনান বলছেন কিন্তু ২০১০ সালের আর এক বৃটিশ গবেষণা রিপোর্টও কনভেয়ার বেল্ট তত্ত্বকে নাকচ করে বলেছে এটা ভাবাদর্শ বিষয়টাকে অযথা ফুলিয়ে ফাপিয়ে দেখিয়েছে। ……conveyor belt thesis “seems to both misread the radicalization process and to give undue weight to ideological factors.”। আর চতুর্থ তত্ত্ব , এরা বারেবারে বলে মানুষকে বিশ্বাস করাতে চায় সন্ত্রাসবাদে যোগদানকারীরা হল সমাজের সেই গ্রুপ যারা সামাজিক অসাম্য ও সমাজের সাথে অ-সম্পৃক্ততার সমস্যার শিকার। ফলে মানুষ অমন সন্ত্রাসবাদী ভাবাদর্শকে আপন করে নেয়। কিন্তু কেনান বলছেন, লন্ডনের কুইন মেরী কলেজের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, “সন্ত্রাসবাদীওরা আর যাই হোক এরা সামাজিক অসাম্য ও সমাজের সাথে অ-সম্পৃক্ততার সমস্যার ভুগা ব্যাকগ্রাউন্ডের জনগোষ্ঠী থেকে আসা কেউ নয়। বরং যারা জিহাদী্ গ্রুপে যোগ দিয়েছে এরা  বয়সে আঠারো থেকে বিশ বছরের মধ্যে, এরা অবস্থাপন্ন পরিবারের সন্তান, বাসায় ইংরাজিতে কথা বলে, হাইস্কুল শিক্ষায় শিক্ষিত; কখন কখনো তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েরও। আসলে  তারুণ্য, অর্থসম্পদ ও শিক্ষিত – এ’তিনটাই গুরুত্ত্বপুর্ণ নির্ণায়ক; এমন ক্যটাগরিই সন্তানদের বেশি বিপদজনক”।

    কেনান মালিক এভাবে সামাজিক গবেষণার ক্রিটিকগুলো জড়ো করে দাবি করে বলছেন, “পশ্চিমের সমস্যা হল, তারা এইসব পুর্ব-অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তাদের আভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী নীতি সাজিয়েছে; যেগুলোর সবই ভুল”। ইউরোপে পরিচালিত বিভিন্ন সামাজিক গবেষণার বরাতে কেনান মালিক এবার নিজ বরাতে এর কারণ বলছেন এভাবেঃ “দেখা গেছে যোগ দেয়া বেশির ভাগ তরুণ টিনএজ বয়সের – এই to little interaction with others in the society. Theirs is a much more existential form of alienation. তরুণেরা জিহাদী সন্ত্রাসে যোগ দিবার কারণ হল কিছু একটা তারা খুঁজে ফেরে যেগুলো খুব বেশি বর্ণনা করা যায় না তবু সেগুলো যেমনঃ পরিচয় খুঁজে ফেরা, অর্থ খোঁজ করা, সামিল বোধ করা, সম্মানবোধ করা। আর এটা মোটেও সত্যি না যে হবু জিহাদীরা মুল সমাজের সাথে দুর্বলভাবে যুক্ত থাকে এই অর্থে যে তারা স্থানীয়ভাষা বলতে পারে না অথবা স্থানীয় আদব-কায়দা রপ্ত নাই অথবা সমাজের অন্যান্যদের সাথে আলাপ আলোচনায় অংশ নিতে পারে না বা নেয় না। কিন্তু তাদের অস্তিত্ত্বমানতাবোধ বিষয়ক এক বিচ্ছিন্নতাবোধ আছে”।

    শেষের এই বাক্যটা বলার জন্য লেখক কেনান মালিকের এতক্ষণকার কসরত। “বিচ্ছিন্নতাবোধ”। এই শব্দ ও ধারণা মার্কসবাদীদের মধ্যে বহুল প্রচলিত। বিশেষত সাহিত্যের এস্থেটিকস বা সৌন্দর্যতত্ত্ব চর্চায়। “বিচ্ছিন্নতাবোধ” ধারণাটা সার কথায় বললে, ক্যাপিটালিজম উতপাদন সম্পর্কের মধ্যেকার এক নতুন ফেনোমেনা হল, এখানে শ্রমিক নিজের উতপাদ্য বা প্রডাক্ট থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করে। নিজ উতপাদ্য, নিজের সৃষ্টির ভিতর  নিজে কোথায় সে অস্তিত্ত্বমান আছে তা খুজে পায় না। অন্তত কোনটা তাঁর শ্রমের অংশ বা ক্রেডিট তা চিনতে পারে না। এথেকে  অর্থাৎ উতপাদন থেকে উতপাদকের বিচ্ছিন্নতাবোধ, এক বিরহ সৃষ্টি হয়। এই অর্থে যে, উতপাদনের আগে বাজার দরে শ্রমিককে শ্রমমুল্য দিলেও তা উতপাদিত পণ্যে হাজির হবার পর ওর বাজার মুল্য আগের মোট সব খরচের চেয়ে বেশি হবে – যেটাকে আমরা মুনাফা বলে ধরে নেই। অর্থাৎ পণ্যের আসল এডেড ভ্যালু  ওর কাঁচামাল, মেশিনারিস ই্ত্যাদির উপর পরিশোধিত শ্রমমুল্য এসবের যোগফলের সমানের চেয়ে বেশি হবে। প্রতিটা উতপাদিত পণ্যের সাথে তৈরি হয় এই বাড়তি মুল্য। এটাই মার্কসের সারপ্লাস ভ্যালু বা “বাড়তি মুল্য তত্ত্ব”। বাড়তি মুল্য থেকে প্রমিক বঞ্চিত হয়ে চলেছে সব সময়। এটাই মুল্য হিসাবে  তা না পাবার কারণে তাঁর বিচ্ছিন্নতাবোধ  অথবা বলা যায় উতপাদিত পণ্যকে নিজের মনে না করতে পারার বিচ্ছিন্নতাবোধ। এছাড়া, কাঁচামাল থেকে  ফিনিশ প্রডাক্ট যত জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসবে  ততই প্রডাক্টের কোন অংশটা কোন শ্রমিকের শ্রমে তৈরি তা আলাদা করা মশকিল হয়ে যাবে। সবমিলিয়ে এক বিচ্ছিন্নতা বা বিরহ বোধের সৃষ্টি হবে। অনেকা যেন বাচ্চা জন্ম দিবার পর কোন কারণে মা বাচ্চার সাথে সম্পর্কিত বা টান বোধ না জাগা ধরণের সমস্যা। মানুষের মৌলিক স্বভাব বৈশিষ্ঠগুলোকে মুখ্য করে সিনেমা বানানো বা সিনেমায় সেগুলোকে আনার ক্ষেত্রে  Rainer Werner Fassbinder নামের এক জর্মন ফিল্মমেকারের কথা অনেকেই জানেন; যিনি এনিলিয়েশন বা বিচ্ছিন্নতাবোধের উপর সিনেমা বানিয়ে খ্যাত।

    বুঝা যাচ্ছে, আমাদের আলোচনার কেনান মালিক  আসলে এই বিচ্ছিন্নতাবোধ তত্ত্বের একজন খাতক। সার করে বললে, কেনান মনে করেন পশ্চিমকে রেডিক্যাল ইসলামি বিপ্লবীর সমস্যার মুখোমুখি  হতে হয়েছে তাদের জিহাদী ভাবাদর্শের জন্য – একথা তিনি মানতে নারাজ। ইসলামি রেডিক্যালিজম এর কোন কারণ নয়। এজন্য নানান গবেষণা ফলাফল হাজির করে তিনি তা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তবে তিনি মানেন এক ধরণের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অপরের প্রতি টান বা আগ্রহ কমে যাবার সমস্যা পশ্চিমা সমাজে আছে, তৈরি হয়ে আছে  এটা তিনি মানেন।আসলে তিনি ইউরোপসহ পশ্চিমকে এসবের খাস জবাব বিচ্চিন্নতাবোধ দিয়ে দিতে চান, দেয়া সম্ভব দাবি জানাতেই এই রচনা।

    তিনি বলছেন,  ইতোমধ্যেই হবু জিহাদীরা প্রধান ধারার সংস্কৃতি, ভাব এবং আচারনিয়ম ইত্যাদিতে ভালভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকা সত্ত্বেও তা ত্যাগ করেছে আর এর বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গীর খোঁজে নেমেছে। এটা মোটেই বিস্ময়কর নয় যে, জিহাদী হতে ইচ্ছুক অনেকে হয় নতুন করে ইসলামে ধর্মান্তরিত নয়ত, মুসলিম যারা দেরিতে নিজেদের ধর্মের দিকে নজর ফিরিয়েছে এমনও আছে। তবে উভয় ক্ষেত্রে তাদের সমাজ নিরাসক্ততা, বিচ্ছিন্নতা তাদেরকে সাদা-কালো ভাবে মরাল কোডের চরম ইসলামিজমের দিকে ঝুকিয়ে ফেলেছে। ফলে “এটা ঠিক কোন রেডিক্যাল ভাবাদর্শের বিষাক্ত করে ফেলা নয় বরং এটা অবশ্যই সমাজের প্রচলিত প্রধান ধারার মরাল কাঠামোর প্রতি অনাস্থা এবং একই সাথে এক বিকল্পের খোঁজে লেগে পরা”। কেনন বলছেন, “অতীতে সমাজের প্রধান ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন সহানুভুতিহীন মানুষ রাজনৈতিক রূপান্তরের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল, চরম বাম ধারা থেকে শ্রমিক আন্দোলন অথবা কোন রেসিজম- বিরোধী আন্দোলন এমন অনেক কিছুতেই যোগ দিয়েছেন”। ফলে কেনন বলছেন, স্বভাবতই সামিল থাকাহীনতা, সংশ্লিষ্টহীনতা বোধ, “এটা কোন মুসলিম সমস্যা নয়”। মুসলিম সমস্যা বলে ালিয়ে দেয়া যাবে না।

    কেননের মুখে মুসলমানেদের দায়ী না করে দেখে – এটা দেখে আমাদের ঠিক খুশি হবার কিছু নাই। আর কেনন কারণ মূল প্রশ্ন হচ্ছে, কেন পশ্চিমের বিশেষত ইউরোপের শত শত মুলত টিনএজ তরুণ আইএস এর মত সংগঠনে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। এটা আশির দশকে পপুলার বিচ্ছিন্নতাবোধ বা এলিনিয়েশন বা (মানুষ বা শ্রম তার উৎপাদিত উৎপন্নের ভিতর নিজেকে খুজে পায় না) তত্ব দিয়ে একালে আর ব্যাখ্যা করা যাবে না। কারণ এই দৃষ্টিভঙ্গি খুবই সস্তা একপেশে এবং বস্তুবাদী। এটা অর্থনীতিবাদী বা স্টালিনিস্ট ধারণাও বটে। কারণ ‘আধুনিক রাষ্ট্রে’ মানুষ (বা তাঁর শ্রম) যেমন নিজের বস্তুগত সৃষ্টির থেকে বিচ্ছিন্নতা বোধ করে, এক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় ঠিক একইভাবে মানুষের প্রতি মানুষের স্পিরিচুয়াল টান অনুভব, সকলের সাথে একই তৌহিদে মিলিত হবার আকুতি ও আকাঙ্খাও তাঁর ভিতর কাজ করে। এরও এক অভাব বোধ হয়। কারণ মানুষ শুধু শ্রমের এক আধার, বৈষয়িক অর্থনীতির এলিমেন্ট মাত্র নয়; বরং একই সাথে সে স্পিরিচুয়াল বিয়িং। সকল অপরের সাথে সম্পর্কহীনতা – এই অভাব মানুষের মধ্যে এক হাহাকারের জন্ম দেয়, সে অস্থির হয়ে উঠে, দমবন্ধ লাগে। এটাও আর এক চরম বিচ্ছিন্নতাবোধ। অতএব বিচ্ছিন্নতাবোধ মানেই কেবল বস্তুগত বিচ্ছিন্নতা্বোধ নয়; স্পিরিচুয়াল বিচ্ছিন্নতাবোধ সম্ভবত প্রভাবে এর দিক থেকে বস্তুগত বিচ্ছিন্নতা্বোধ এর চেয়েও বড়। এদিকটাই কেনান মিস করেছেন। তিনি আশির দশকে পড়ে থাকতে চাইছেন। কেননের এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে আমাদের এই সমালোচনা আরো জায়েজ মনে হয় এজন্য যে তিনি এরপরে লিখছেন, “একালের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মধ্যে মানুষের নিরাশক্তবোধ, রাজনৈতিকভাবে স্বরবিহীন থাকা অবস্থা ছেয়ে গেছে। এধরনের উদ্বেগ ও অভাবগুলোকে কোন চার্চ বা ট্রেড ইউনিয়ন বুঝবে না”। অর্থাৎ কেনান একালে ২০১৫ সালে এসে এখনও বস্তবাদ-সর্বস্ব “এলিনিয়েশন বা বিচ্ছিন্নতাবোধ” তত্ত্ব আউড়িয়ে সব রোগ সারানোর ধনন্তরি ওষুধ মনে করতে চাইছেন। বিচ্ছিন্নতা্বোধ চার্চ, মসজিদ মন্দির – বলে নজর আন্দাজ করতে চাইছেন। আমাদের দেশে “বিরহ” বলে গানের ধারা আছে; ময়মনসিংহ থেকে মানিকগঞ্জ, কুষ্টিয়া ইত্যাদি। যারা আমাদের এলিনিয়েশন ত্ত্ত্ব বুঝবার নাগাল পাবার অনেক আগে থেকে স্পিরিচুয়াল আবহে “বিরহ” গান করে আসছে।

    কেননের এই রচনার ছোট শিরোনাম “ইউরোপের বিপদজনক মাল্টিকালচারালিজম”। অর্থাৎ ভারতীয় অরিজিনের বৃটিশ  নাগরিক হলেও তিনি বৃটিশ মাল্টিকালচারালিজম নীতির সমালোচক। আবার এটাই তাঁর একই নিশ্বাসে ইউরোপের ফ্রান্সের ক্ষেত্রে ফরাসি এসিমিলিয়েশন বা ‘সবাইকে একরকম করণ’ নীতির পক্ষে দাঁড়ানো। আসলে মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন – কথা দুটোরই কোন সারবত্তা নাই। তবুও বুঝবার জন্য শব্দদুটোর অর্থ খোলসা করা দরকার। মাল্টিকালচারালিজম বলতে বৃটিশ বুঝটা হল – বৃটিশ সমাজটাকে সে নানান কমিউনিটির মিলিত এক বড় কমিউনিটি হিসাবে রাখতে, দেখতে চায়। বৃটিশ কলোনি মাস্টারের দেশ সমাজে কলোনি প্রজা দেশ থেকে আসা সবাই যে যার ফেলে আসা নৃতাত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগলিক ইত্যাদি পরিচয় বজায় রেখেই “উপরি এক বৃহত্তর বৃটিশ সমাজের”নিচে এক বৃটিশ পরিচয়ে বড় হোক; এটাই চায়। বিপরীতে ফরাসী পছন্দের এসিমিলিয়েশন (এক ছাঁচে ঢালাই করার নীতি) শুনতে ভাল লাগলেও কিন্তু আসলে অনেক বেশী বলপ্রয়োগে জবরদস্তি করে নাগরিক সবাইকে একরকম করণের প্রচেষ্টা এটা। অর্থাৎ এখানে আর ফরাসি কলোনি মাস্টারের দেশ সমাজে সবাই যে যার ফেলে আসা নৃতাত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগলিক ইত্যাদি পরিচয়ের স্বীকৃতি নাই। বরং সব ভুলে যেতে হবে, বাদ দিতে হবে। বাধ্য করা হবে। কিন্তু এই বাধ্যবাধকতার দিকটা ফরাসীরা আড়ালে রাখতে চায় বা থেকে যায়। সবাইকে “সুন্দর” ইউনিফর্ম একরকম করার নামে (ইংরাজি সিমিলার বা একরকমকরণ থেকে এসিমিলিয়েশন ) জবরদস্তিতে সবাইকে ফরাসি হতে, ফরাসি কালচারই একমাত্র চর্চার কালচার হতে, করতে বাধ্য করা। যতটুকু ও যেভাবে বর্ণনা করলাম তা থেকে মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন এর ভিন্নতা্র সবটা বুঝা বা বুঝানো যাবে না। কারণ এসব ভারি কথার আড়ালে মুল আরও এক বিষয়কে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

    প্রথম কথা হল, পশ্চিম মাইগ্রেন্ট শ্রমিকের আমদানি ঘটায় একেবারে একমাত্র নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থে, সস্তা শ্রম পাবার স্বার্থে, সবসময় এটাই সে করে এসেছে। নইলে লো-স্কিল না নো-স্কিল লেবার নিতে হত কেবল নিজ দেশীয় চামড়া থেকে ফলে এর মুল্য কমপক্ষে দ্বিগুণ তাদের যোগাতে হত। ফলে একমাত্র সস্তা মাইগ্রেন্ট শ্রমিক পাবার স্বার্থেই তাকে নিজের সমাজে এসব “মাল্টিকালচারালিজম বা এসিমিলিয়েশন” বলে বকোওয়াজের জন্ম দিতে হয়েছে। এটা প্রথম সত্য। তবে নিজ অর্থনীতি সমৃদ্ধিতে ভাল চলা অথবা মন্দা হয়ে চলার সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য অন্য চামড়ার শ্রমিক কতজনকে আসতে সে অনুমতি দিবে এটা সময়ে সময়ে তাকে কড়া নিয়ন্ত্রণে করতে যেতে হয়। অর্থনীতি ভাল মানে বেশি শ্রমিক প্রয়োজন নইলে উলটা হলে সব খেদাও – এটাই হল আসল নীতি। সবারই নীতি তবে দোষ দেয়া হয় তথাকথিত ডানপন্থি্র।

    এরপর দ্বিতীয় আর এক আজব সত্য হল, কলোনি দখলের ফেলে আসা বছরগুলোতে  কপাল গুণে বৃটিশের কলোনির তুলনায় ফরাসি কলোনির বাসিন্দারা বেশির ভাগই মুসলমান বা ইসলাম ধর্মপালনকারী। এরফলে কলোনি প্রজা দেশ থেকে সস্তা শ্রমের মধ্যে মুসলমান প্রজার হার ফ্রান্সের বেলায় বেশি। তাই সস্তা শ্রম ঢুকার অনুমতি দিতে গিয়ে একই ইউরোপে বৃটিশ ও ফরাসী হয়েও তাদের নীতি ও অভিজ্ঞতা একই রকম নয়। এভাবে ফ্রান্সে মুসলমানের সংখ্যা বলা হয় ৫০ লাখ। এসব তথ্যের দিকে নজর করে আগাম ব্যবস্থা হিসাবে ফরাসী সরকার পছন্দ করেছে – এসিমিলিয়েশন নীতি। কারণ এসিমিলিয়েশনের কথা বলে স্কার্ফ হিজাব বা কোন মুসলমান চিহ্ন প্রকাশিত হওয়া ঠেকিয়ে দেয়া যায়। ফেলে আসা নৃতাত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগলিক ইত্যাদি যেকোন পরিচয় বা চিহ্ন ভুলে গিয়ে সব কিছু ফরাসি হতেই হবে বলে বাধ্য করা যায়। অতএব “মাল্টিকালচারালিজম বা এসিমিলিয়েশন” – ফরাসি না বৃটিশ কোনটা ভাল – এসব কথা তাই আসল কথা লুকিয়ে বকোওয়াজ।

    তাহলে কথা দাড়ালো, সস্তা শ্রম থেকে বেশি মুনাফার লোভে ক্যাপিটালজম কলোনি প্রজা দেশ থেকে শ্রম আনতে বাধ্য। আবার সেই শ্রম কে কীভাবে ম্যানেজ করার সুবিধা দেখে সে ভিত্তিতে “মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন” এর কূটতর্কও সে হাজির করবে। কারণ নইলে আসল কথাগুলো সরাসরি বলতে হবে। কেনান মালিক তবু “মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন” এর ভুয়া তর্কের মধ্যে “মাল্টিকালচারালিজমকে বেশি বিপদজনক বলছেন। কারণ বৃটিশরা নাকি “মাল্টিকালচারালিজমের কথা বলে মুসলমান ধর্মীয় নেতাদেরকে কমিউনিটির প্রতিনিধি মনে করেন ভুল করে, বেশি গুরুত্ব দেন; ইত্যাদি। কেনানের কথা শুনে বৃটিশদেরকে বোকা ভাবার কোন অর্থ নাই। আবার বৃটিশদের নীতিটা বেশি ভাল তাও নয়। ব্যাপারটা হল ম্যানেজমেন্ট। নাগরিকদের বা অপজিশনকে লিবারেল স্পেসের মধ্যে রাখলে তাদের কথা বলতে দেয়া, বিরোধীতা করতে দেয়ার আইনি সুযোগ যতটা সম্ভব বেশি রাখলে তাদের সকলের বিরোধীতা সামলে রাখা তুলনামুলক সহজ হবে বলে মনে করা হয়। বৃটিশ প্রশাসন মনে করে এই লিবারেল নীতি তাদের জন্য বেশি ফলদায়ক হচ্ছে। আর ধর্মীয় নেতার প্রসঙ্গটা হল, ধর্মীয় নেতারা যদি প্রতিদ্বন্দ্বী কোন নেতার চেয়ে বেশি প্রভাবশালি হন তাহলে বৃটিশ প্রশাসন কী তা অস্বীকার করার মত বোকামি করতে পারে? বরং একথা বলাতে কেনানের কথায় ইসলাম বিদ্বেষের ছায়া দেখা যাচ্ছে। কেনান মালিক নিজেই বলেছেন “মাল্টিকালচারালিজম বা এসিমিলিয়েশন” দুটোর মধ্যেই ভাল মন্দ দুটাই আছে। তবু কোন ব্যাখ্যা ছাড়াই তিনি শিরোনামে “মাল্টিকালচারালিজমকে” বেশি বিপদজনক বললেন। এথেকেও মনে করার কারণ রয়েছে যে তিনি ফরাসিদের মত ইসলাম-বিদ্বেষ জারি রাখার সুযোগটা হারাতে চান না।

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ২১ ডিসেম্বর তারিখে। অনেক জায়গায় অপুষ্ট বা সংক্ষিপ্ত রেখেই তা ছাপতে হয়েছিল। এখানে সেসবের অনেক কিছু পরিপূরণ করে, সংযোগ ও সম্পাদনা করে আবার এখানে ছাপা হল। ]

  • নিজের হত্যাকারীকে দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনা

    নিজের হত্যাকারীকে দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনা
    গৌতম দাস
    http://wp.me/p1sCvy-nD

     

    খবরটা প্রথম প্রচারিত হয় ১৫ ডিসেম্বরের বিদেশি মিডিয়ায়। সৌদি আরব নাকি নিজের নেতৃত্বে ৩৪ ইসলামী দেশের এক সন্ত্রাসবিরোধী জোট গঠন করে ফেলেছে। আমাদের দেশে খবরটা পৌঁছায় পরের দিন। দেশে খবরটা আবার প্রচারিত হয়েছে এককাঠি অতিরিক্ত গুরুত্বে যে, বাংলাদেশ ওই জোটে অংশগ্রহণে সম্মতিও প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের দুইজন মন্ত্রীও এ খবরে সায় দিয়ে জানিয়েছেন, খবর পাকা। ফলে খবরে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা নিয়ে আর সন্দেহের অবকাশ থাকেনি। কিন্তু গোল বেঁধেছে মূল খবরটা আসলে কী, কিইবা এর তাৎপর্য এসব বিষয়ে। খবরটা নিয়ে মিডিয়ায় যতই  খোঁড়াখুঁড়ি চলছে, ততই দেখা যাচ্ছে বিভ্রান্তি বাড়ছে; সেটা দেশি এবং বিদেশি মিডিয়া, দুই জায়গাতেই। এই লেখা যখন লিখছি তখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে মূল খবরটা আসলে যতটা  প্রচারিত হয়েছে বাস্তবে  জোটের পুর্ন প্রস্তুতির ব্যাপারটা তখনও ততদুর আগায় নাই। অথচ বড় করে তা অনেক আগেই প্রচার হয়ে গেছে এবং করা হয়েছে। এছাড়া খবরের ভেতরেই শুরু থেকে বড় বড় ফাঁক রয়ে গেছে বা রেখে দেয়া হয়েছে। যেমন বেশিরভাগ খবরের শিরোনাম, “সৌদি আরব ৩৪ দেশের এন্টি-টেররিজম কোয়ালিশন গড়েছে” এটা আল জাজিরা থেকে নেয়া। এমন ধরনের শিরোনাম যতটা ভারি ওজনের ভেতরের খবর ততটা ভারি ও পোক্ত মোটেও নয়। যেমন সরাসরি আইএস বিরোধী না বলে  সাধারণভাবে “এন্টি-টেররিজম” জোট বলা হয়েছে। তবু এর অর্থ আইএস বিরোধীতাই হয়েছে। অনেকে সেই কারণেই আইএসের প্রতি ইঙ্গিত থাকে এমন শিরোনাম  দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, এটা কী ধরনের জোট? এর ম্যান্ডেট কী? এছাড়া এই জোটের ম্যান্ডেট কী হবে তা নিয়ে কোনো খসড়া কি তৈরি হয়েছে, যা থেকে হবু সদস্যরা পরিষ্কার জানবে কেমন ধরনের জোট হচ্ছে আর ওই জোট ঠিক কী করবে!  জোটে সরকার অংশগ্রহণ করবে বাংলাদেশের মন্ত্রীরা তা স্বীকার করে নেয়াতে এনিয়ে মোটা মোটা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। ১৭ ডিসেম্বর দৈনিক মানবজমিন ‘মিশ্র প্রতিক্রিয়া’ শিরোনামে রিপোর্ট করেছিল। ওই রিপোর্টে লিখেছিল, “বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, এটি সামরিক জোট নয়”। স্বভাবতই এ আধা-তথ্যে মানুষ বিষয়টা সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু উত্তর পাওয়ার চেয়ে নতুন নিরুত্তর প্রশ্নের সংখ্যাই বাড়াবে। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘প্রাথমিক আলোচনায় সৌদি আরব আমাদের যে ধারণা দিয়েছে  তা হচ্ছে এটা যুদ্ধ করার সামরিক জোট নয়। এটি মূলত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের একটি কেন্দ্র হবে। এ জোটের সঙ্গে যুদ্ধের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই”।  স্পষ্টতই মিডিয়ার খবরগুলো ইতোমধ্যেই যে উচ্ছ্বাস আগ্রহের উত্তাপ বা হাইপ এরই মধ্যে তৈরি করে ফেলেছে, প্রতিমন্ত্রীর এ বক্তব্য তাতে পানি ছিটিয়ে গুরুত্ব লঘু করার চেষ্টা। এ থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার যে, সৌদি ফরেন অফিস বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলার সময় জোট কী করবে, ফোকাস কী, কোথায় গিয়ে থামবে, সুনির্দিষ্ট কী উদ্দেশ্য ইত্যাদি প্রসঙ্গ ছিল না। বরং এদিকে হওয়ার চেয়ে যেনবা সৌদি ফরেন অফিস থেকে বাংলাদেশকে জিজ্ঞাস করা হয়েছিল সৌদি কোনো উদ্যোগকে বাংলাদেশ সমর্থন করবে কিনা এবং সঙ্গে থাকবে কিনা এতটুকুতেই সীমিত ছিল। জোটের সম্ভাব্য কাজ ভুমিকা ম্যান্ডেট ইত্যাদি ছিল খুব গৌণ। কেবল “সৌদি উদ্যোগ” এই প্রেস্টিজিয়াস জিজ্ঞাসার প্রতি আমরা সমর্থন দিচ্ছি কীনা এটাই মুখ্য বিষয় ছিল। ধাবিত ছিল। ওদিকে ১৮ ডিসেম্বরের প্রথম আলো “সৌদি জোটের ভবিষ্যৎ সংশয়ে” এই শিরোনামে এ’বিষয়ে আরও কিছু সংযোজন করেছে। প্রতিমন্ত্রী ওখানে বলেছেন, “এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে সাধারণত আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় দলিল সই হয়ে থাকে। কাজেই এখানেও বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আলোচনা করে চূড়ান্ত করার সুযোগ থাকছে”। প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্য আমাদের অনুমানকে পোক্ত করে। এ বিষয়টাকে তাই আমরা বলছি হবু জোটের ‘উদ্দেশ্য লক্ষ্য’ বিষয়ক কোনো খসড়া এখনও চালাচালিই শুরু হয়নি। তবে একথা ঠিক যে, বাংলাদেশের প্রতিমন্ত্রীর ব্রিফিং থেকে বিস্তারিত না জানলেও যা জানা গিয়েছে এসব বিষয়ে ভিন্ন কিছু বক্তব্য ১৫ ডিসেম্বরের রয়টার পরিবেশিত খবর আমাদের আরও কিছু জানাচ্ছে। সেখানে যেমন সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল আল জুবায়েরকে প্যারিসে সাংবাদিকরা যখন প্রশ্ন করেছেন “জোটের পক্ষে কোনো সামরিক শক্তি মাঠে নামবে কিনা” এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন, “সব সম্ভাবনাই টেবিলে আছে”। অর্থাৎ জোটের সামরিক তৎপরতাও থাকতে পারে। তিনি নাকচ করেননি। আবার ৩৪ দেশের জোট গঠনের বিষয়ে সৌদি রাজধানী রিয়াদে ঘোষণা নিয়ে সাংবাদিকের সামনে প্রথম এসেছিলেন সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী মুহম্মদ বিন সালমান। তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, “সন্ত্রাসবিরোধী বলতে তিনি শুধু আইএস নয়, আইএসসহ সব সন্ত্রাসবাদীকেই বুঝিয়েছেন”। তাহলে আমাদের প্রতিমন্ত্রী এখনও অনেক বিষয় আমাদের ব্রিফ করার সময় হয়নি মনে করলেও সেসব প্রশ্নে সৌদি মন্ত্রীদের মনের অনেক ডিটেইল অবস্থান জানা গেছে। তবে একথা ঠিক যে, পূর্বপ্রস্তুতিমূলক বহু কাজ শেষ না করেই এর আগেই সৌদি কূটনীতিকরা মিডিয়ায় হাজির হয়েছিলেন। বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো দেশের ওপর সৌদি আরবের যে প্রভাব তাকে কাজে লাগিয়ে সৌদি কূটনীতিকদের ঘাটতি তারা আপাতত উতরে গেছেন বা সুবিধা নিয়েছেন। তবে পাকিস্তান তার নাম সৌদিদের তালিকায় দেয়ার আগে কেন তাকে আগে জানানো হয়নি এ নিয়ে প্রথমদিন বিস্ময় প্রকাশ করলেও পরের দিন থেকে তা হজম করে মিটিয়ে ফেলেছে। আর বাংলাদেশ প্রথমদিন থেকেই হাফ ব্রিফিংয়েই সম্মতি জানানোর কথাই সরাসরি স্বীকার করেছে।
    ওদিকে এই জোট গঠনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রায় সব বিদেশি মিডিয়া যেদিক প্রশ্ন তুলেছে তা জেনুইন। তারা বলছে, সৌদি প্রস্তাবিত এই জোটে কোনো শিয়া-ইসলাম শাসিত সরকার, যেমন ইরান বা ইরাক সরকারের নাম নেই। ফলে বাস্তবত এটা শিয়া-বিরোধী সুন্নিদেরই জোট হয়ে গেছে। এছাড়া ইয়েমেনের হুতি প্রশ্নে কয়েক মাস আগেও সৌদিরা এমনই এক জোট (দুবাই, বাহরাইন, জর্ডান, মিসর ও সৌদিদের) তৈরি করে জোটের ব্যানারে নির্বিচারে ইয়েমেনে আকাশ বোমা হামলা চালিয়েছিল। সেখানেও শিয়াবিরোধী সুন্নিদেরই জোটের ছায়া বজায় ছিল এবং ওই বোমাবাজি ৬ হাজার হুতির জীবননাশ ছাড়া ইয়েমেনের সংঘাতের কোনো রাজনৈতিক সমাধানের কিছুই করতে পারেনি। তবে মনের ঝাল হয়তো মিটেছে। এদিকটাতেই সব মিডিয়া ইঙ্গিত করে সৌদি জোট একপেশে শিয়া-বিরোধী জোট হতে চায় বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। ওদিকে এনিয়ে আমেরিকান প্রতিক্রিয়া বেশ মজার ডিপ্লোম্যাটিক। আমেরিকা স্বাগত জানিয়েছে এং আরও বিস্তারিত শোনার জন্য অপেক্ষা করছে বলে জানিয়েছে। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ-বিরোধী কোনো অবস্থান তারা নিতে চায়নি। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হল, ১৯৭৩ সাল থেকে চলে আসা আমেরিকান মধ্যপ্রাচ্য নীতি এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একালে আর সৌদি স্বার্থের সঙ্গে তালমিল রেখে মন যুগিয়ে চলতে পারছে না। বিশেষত যেদিন থেকে আমেরিকা ইরানের সঙ্গে ‘পারমাণবিক ডিল’ করার জন্য উদগ্রীব হয়েছিল আর শেষে ঐ ডিল স্বাক্ষর হয়েছিল।

    মুল বিষয় সৌদি-আমেরিকান সম্পর্কের অবনতি
    খুব সংক্ষেপ করে বললে, আমেরিকান ওয়ার অন টেরর ১৪ বছরে পা দিল অথচ এই যুদ্ধে ন্যূনতম কিছু অর্জন হয়েছে অথবা যুদ্ধ সমাপ্তি বা থামার নামগন্ধ আছে এমন কোন ইঙ্গিতও কোথাও নেই। ওদিকে ২০০৭ সালের শেষ দিক থেকেই এই যুদ্ধের প্রভাব বিশেষত যুদ্ধের খরচ বইতে গিয়ে আমেরিকান অর্থনীতিকে তা ক্রমান্বয়ে ভেঙে ফেলেছে। এককথায় বললে, আমেরিকান সামরিক সক্ষমতা এখনও একই রকম বহাল আছে, কিন্তু অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমছে বলে তা সামরিক সক্ষমতার অপারেশনাল কস্ট যোগাতে অযোগ্য হওয়াতে কার্যত তা সীমিত হয়ে গেছে, অকেজো করে ফেলছে। এই দশা থেকে মুক্তি পেতেই আমেরিকাকে ইরানের সঙ্গে ডিল করতে যেতে হয়েছে। কারণ ডিল হওয়াতে এখন আইএস বিরোধ ইরানকেও আমেরিকার পক্ষে মাঠে পাওয়া যাবে। নিজের অক্ষমতার কিছুটা হাল হবে। এটাই আমেরিকান স্বার্থ। আর ঠিক এটাই সৌদি স্বার্থবিরোধী। আসলে ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের উতখাতের সময় থেকেই কেবল ইরাক প্রশ্নে কার্যত একটা ঐক্যমত ছিল যে পরবর্তিতে  শিয়াদের দিকে কান্নি মারা এমন একটা ইরাক সরকার হবে যেটা একইসাথে আমেরিকা ও ইরানের পছন্দের। কিন্তু এই ঐক্যমত বা ডিল এর কোন প্রকাশ্য স্বীকৃতি ছিল না। কেবল কার্যত তা প্রতিফলিত হতে দেখা যেত। কিন্তু নতুন করে আইএস হাজির হওয়াতে এই অস্বীকৃত এলায়েন্স আর অপ্রকাশ্য রেখে বেশি দূর যাওয়া যাচ্ছিল না। তা থেকেই ইরান-আমেরিকার প্রকাশ্য পারমানবিক ডিল স্বাক্ষর করার বাস্তবতা তৈরি হয়। কিন্তু তাতে আমেরিকার জন্য এক নতুন সমস্যা হাজির হয়। সৌদি সরকার ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পর থেকেই কোন ইরান-আমেরিকার এলায়েন্সের ঘোরতর বিরোধী হল। সৌদি রাজতন্ত্র মনে করে খোদ ইরান বিপ্লবসহ ইরানের দুনিয়ায় হাজির থাকাটাই সৌদি রাজতন্ত্রের জন্য হুমকি। তবে আগে ইরান-আমেরিকার এলায়েন্সের কোন প্রকাশ্য কিছু না থাকায় এটা সৌদিরা সহ্য করে নিয়েছিল। কিন্তু পারমাণবিক ডিল স্বাক্ষর হয়ে যাবার পর ১৯৭৩ সালের পর থেকে এই প্রথম সৌদি ফরেন পলিসি আমেরিকার থেকে বড় ধরণের ভিন্ন হয়ে যেতে বাধ্য হয়। ফলে পরস্থিতি এমন যে  আমেরিকার পক্ষে দুই বগলে দুজন সৌদি আর ইরানকে নিয়ে হেঁটে চলতে সক্ষম থাকা একেবারে অসম্ভব। কারণ এমন কোনো কার্যকর কমন ফর্মুলা নেই, আমেরিকা খুঁজে পায়নি, যাতে সৌদি ও ইরান দুই পক্ষই আমেরিকার সঙ্গে একই সঙ্গে থাকে। এজন্য এরপর থেকে আমেরিকার সঙ্গে পরপর তিনটা সৌদি বিরোধের ঘটনা ঘটে গেছে। প্রথম ঘটনা মিসরে জেনারেল সিসিকে সৌদিদের ক্ষমতায় আনা এবং এর চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ হল সেটা আমেরিকাকে উপায়হীনভাবে মেনে নিতে হয়েছে। দ্বিতীয়টা হলো, ইয়েমেনে হুতিদের ওপর সৌদি নেতৃত্বে জোটের বোমা হামলা। এখানেও সৌদি আর আমেরিকান নীতির ভিন্নতা ছিল এবং এখনও আছে। ফলে একা সৌদি ইচ্ছায় ঘটনা গড়িয়েছে। যেটার কোন ফল সৌদিদের পক্ষে আসুক আর নাই আসুক তবে – “আমাদেরটা আমারাই করে নিতে পারি” ধরণের একটা স্বান্ত্বনা সৌদিরা নিজেদের জন্য এনেছে। ইতোমধ্যে সৌদি সরকারের আর এক মরিয়া উদ্যোগ নিয়েছিল যেটা কার্যকর হয় নাই তা হল,আমেরিকার জায়গায় রাশিয়াকে অস্ত্রের সোর্স এবং নিজ ফরেন পলিসি ও রাজস্বার্থের পক্ষে পার্টনার হিসাবে পাবার চেস্টা করে দেখাওপেন দেখা সাক্ষাত আলোচনা করা হয়েছিল। কিন্তু দুই রাষ্ট্রস্বার্থ এক কমন পয়েন্ট বের করতেে নাই। আর এবারের সৌদি নেতৃত্বে ৩৪ দেশের যে জোট, তা এখনও স্পষ্ট নয় যে, তাদের উদ্দেশ্য-লক্ষ্য কী, কোথায় ফোকাস করবে। অথচ সৌদি প্রভাব যা মূলত নগদ অর্থের প্রভাব। এছাড়া বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের মতো দেশের জন্য সৌদি প্রভাবে সায় না দিলে নিয়োজিত শ্রম চাকরিচ্যুতি ঘটিয়ে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারে, এই ভয়। যেটাকে আমরা প্রভাব বলছি। অথচ আমাদের বিপরীত স্বার্থ হলো, আমরা কী সৌদিদের পো-ধরার মাধ্যমে আইএসের খামোখা চক্ষুশূল হওয়ার রিস্ক নিচ্ছি না!এভাবে শত্রুকে দাওয়াত দিয়ে আনছি কিনা সে প্রশ্ন উঠবেই।
    ওদিকে এখনও আমাদের সরকারি ভাষ্য হলো, বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নেই। সর্বশেষ গত সপ্তাহেও আমেরিকান সচিব প্রতিমন্ত্রী নিশা দেশাইদের সাক্ষাতের সময় এটাই বলা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন আরও ভালোভাবে উঠবে যে, সৌদি জোটে আমরা যাব কেন? অর্থাৎ আর পাঁচ জায়গায় সরকার যেমন তার সিদ্ধান্তের পক্ষে কোন ন্যায্যতা দেখাতে বা প্রতিষ্ঠিত করতে না পারলেও গায়ের জোরে তা বাস্তবায়ন করে যায়। ফলে এখানেও আমাদের সৌদি ইচ্ছাকে কদর করতে হবে। এছাড়া খামোখা শিয়া-সুন্নি কোন সম্ভাব্য গোষ্ঠীদাঙ্গায় বিপজ্জনক সম্প্রদায়গত পক্ষ নিতে হবে।

    এখানে আর একটা দিক আছে। গত মাসে প্যারিস হামলার পরের পরিস্থিতিতে সেটা আরও উন্মোচিত। এককথায় বললে, একেবারে মরিয়া বা অস্তিত্ব ঠেকে যাওয়া অবস্থা না হলে সারা পশ্চিমের কোন রাষ্ট্র কারও পক্ষেই আইএসের বিরুদ্ধে শুধু আকাশ বোমা নয়, মাঠে নেমে মোকাবিলার অর্থনৈতিক সামর্থ্য নেই। যুদ্ধের খরচ জোগানোর সামর্থ্য নেই। তাই হামলার পরে ফরাসি প্রেসিডেন্টের মেলা হম্বিতম্বির আইওয়াশ আমরা দেখলাম। আইএসবিরোধী জোট এই হয়ে যাচ্ছে, সর্বাত্মক যুদ্ধ এই তো সামনে যেন। অথচ সব ভুয়া শো-আপ মাত্র। আসলে তারা কেবল আকাশ পথে বোমা হামলার খরচটাই শেয়ার করল। এসব আলাপের শেষের দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির অনুরোধে ওআইসির এক মিটিং ডাকা হয়। কেরির ইচ্ছা ছিল যদি কিছু খরচ শেয়ার করতে সৌদিরা রাজি হয়! কিন্তু আমরা দেখলাম, সৌদিরা আবার স্বমূর্তিতে; ইয়েমেনের হুতি ইস্যুতে অকেজো নীতির মতোই আবার এক নীতি নিয়ে সৌদিরা হাজির। এ নীতি শুনতে অনেক ভালো লাগছে যে, ৩৪ দেশের জোট। কিন্তু সৌদি নেতৃত্বে এটা কতদূর যাবে, যেতে পারে! এতে আমেরিকার অবস্থা বেয়ারা বাচ্চার বাবার মতো। না সে বাচ্চা বাবার কথা শোনে, না বাবা তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে, না শাসন করতে পারে। সেজন্য আমেরিকা সৌদি উদ্যোগকে সরাসরি বিরোধিতা বা উড়িয়ে না দিয়ে কূটনৈতিক কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে। সৌদি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে এবার বিস্তারে পরিকল্পনা কী তা জানাতে বলছে। আসলে প্রকারান্তরে বলতে চাচ্ছে, সৌদিরা কোনো কার্যকর পরিকল্পনা দিতে পারবে না। ফলে হতাশ হয়ে যদি সে আমেরিকার নীতির কাছে আবার ফিরে যায়!
    সর্বশেষ দেখা গেল চীনও সৌদিদের সমর্থন জানিয়েছে। এটাও চীনের কূটনৈতিক কৌশলগত অবস্থান। আমেরিকার কুটনৈতিক দুর্দশার সময়ে সৌদিদেরকে “চালিয়ে যাও” বলে পিঠ চাপড়ে দেয়া।

    তবে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখলে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত উদ্বেগ জানিয়ে যত প্রতিক্রিয়া আমরা প্রকাশিত হতে দেখেছি তা জেনুইন। এই জোট যদি কার্যকর হওয়ার একটু-আধটু চেষ্টা করে তবে তা হবে শত্রুকে একেবারেই দাওয়াত দিয়ে ঘরে ডেকে আনার মতো ঘটনা। এছাড়া আমাদের বাড়তি এক বোনাস মিলবে – শিয়া-বিদ্বেষী এক জনগোষ্ঠী পরিচয়। অন্যের জন্য ভাড়া খাটা।

    [লেখাটার প্রথম ভার্সন এর আগে গত ১৯ ডিসেম্বর দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে প্রকাশিত হল।]

  • চীনা ইউয়ানকে আইএমএফের মুদ্রার স্বীকৃতি

    চীনা ইউয়ানকে আইএমএফের আন্তর্জাতিক মুদ্রার স্বীকৃতি
    গৌতম দাস
    ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-mF

     

    আইএমএফের মালিক শেয়ারহোল্ডার রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধি ২৪ সদস্যের নির্বাহী বোর্ড ৩০ অক্টোবরের সভায় চীনের মুদ্রা ইউয়ানকে আইএমএফে রিজার্ভ জমা রাখার মুদ্রা হিসাবে স্বীকৃত চারটি (ডলার,ইউরো,পাউন্ড ও ইয়েন) মুদ্রার পাশাপাশি পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংক্ষেপে বললে, দুনিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় এমন আগের টপ চারটি মুদ্রার মতোই চীনা মুদ্রা ইউয়ানকেও এবার আইএমএফ তার পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে স্বীকার করেছে। এ স্বীকৃতির অর্থ কী? তাৎপর্যই বা কী, সেসব নিয়ে এখানে কথা বলব।

    দেশের অর্থনীতি নিয়ে সাধারণ্যে যেসব ধারণা আলোচনা হয় সেখানে পুঁজিতন্ত্র বা সমাজতন্ত্র বলে ভাসাভাসি কিছু ধারণা থাকলেও সে আলোচনা কখনও মুদ্রা পর্যন্ত যেতে দেখা যায় না। অর্থাৎ মুদ্রার কাজ বা ভূমিকা কী সে সম্পর্কে এর ভালো-মন্দ অলিগলি দিক সম্পর্কে আমাদের সাধারণ ধারণা আরও কম। বলা হয়ে থাকে, কোনো জিনিসকে মুদ্রার মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে গেলে ওর তিনটা গুণ থাকা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ মুদ্রা মানে যার ঐ তিন বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন এক. গ্রহণযোগ্যতা : অর্থাৎ যে কেউই ওই মুদ্রার বিনিময়ে পণ্য বেচতে রাজি। শুধু তাই না, পণ্য বেচে ওই মুদ্রা পেতে অথবা পাওয়া মুদ্রা দিয়ে অন্য পণ্য কিনতেও সবাই রাজি। সার কথায়, বিনা দ্বিধায় বাজারের যে কেউ ওই মুদ্রায় কিনতে ও বেচতে রাজি। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য, লিকুইডিটি : এটাকে বলা যায় গ্রহণযোগ্যতার মাত্রার কমবেশি। যেমন ব্যাংকের চেকের চেয়ে নগদ মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা বেশি। অর্থাৎ নগদ মুদ্রার লিকুইডিটি সব সময় অন্য যে কোনো ধরনের মুদ্রার চেয়ে বেশি। আবার একেবারে মফস্বলের হাটে ১ হাজার টাকার নগদ নোট দিয়ে সওদা নিতে চাইলে এত বড় নোটের খুচরা পাওয়া সহজ নয় বলে সেখানে ১০ থেকে ২০ টাকার নোটের গ্রহণযোগ্যতা ১ হাজার টাকার চেয়ে বেশি। এভাবে মুদ্রার এই দুই বৈশিষ্ট্যই আসল বৈশিষ্ট্য মনে করা হয়। কেন?
    তৃতীয় বৈশিষ্ট্য, মুদ্রার বদলে সোনা: ব্যাংকে গিয়ে মুদ্রার বদলে সোনা চাইলে তৎক্ষণাৎ তা পাওয়া যায় এমন হতে হবে। এ গুণটা এখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। অর্থাৎ আগেকার দিনে যে কোনো ব্যাংক কাগুজে মুদ্রা ছাপার আগে সমমূল্যের সোনা ভল্টে রিজার্ভ রেখে নিত। এখন তা আর করে না। বিশেষত আইএমএফের ১৯৪৪ সালে জন্মের সময়ের ম্যান্ডেট বা ঘোষণাপত্রে বদল এনে ১৯৭৩ সালে নতুন করে আইএমএফ গঠন করে নেয়ার পর থেকে কাগুজে মুদ্রার বদলে সোনা ফেরত দেয়ার আইনগত বাধ্যবাধকতাও উঠে গেছে। সারকথায় তাই, এখন মুদ্রা হতে গেলে প্রথম দুই বৈশিষ্ট্যই যথেষ্ট।
    উপরের আলোচনায় সাধারণভাবে মুদ্রা নিয়ে কথা তুলা হয়েছে। কিন্তু ওই মুদ্রা কি কোনো একটা রাষ্ট্রের মুদ্রা নাকি একই সঙ্গে তা আন্তর্জাতিক মুদ্রা, সেটা পরিষ্কার করে বলা হয়নি। তাই এবার দেশি ও বিদেশি (আন্তর্জাতিক মুদ্রা) এভাবে মুদ্রাকে ভাগ করে, ভাগ মনে রেখে কিছু কথা। একালে দেশি মুদ্রা মানে কাগুজে মুদ্রা যা মূলত রাষ্ট্রীয় ভূখন্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ মুদ্রা। অর্থাৎ নিজ ভূখন্ডের বাইরে যে মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা নেই। বাংলায় বললে, চলে না। নিজ ভূখন্ডের মধ্যে দেশি মুদ্রায় সব ব্যবসা-বাণিজ্য লেনদেনে একচেটিয়াভাবে চলতে পারে। অন্যভাবে বললে, শুধু নিজ মুদ্রার ওপর নিজ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের) একক নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের সীমানা পর্যন্ত কার্যকর ও বিস্তৃত থাকে। রাষ্ট্রের সীমানার বাইরে হলে আর থাকে না। তাহলে সারকথা দাঁড়াল, প্রথমত মুদ্রা ছাড়া কোনো বাণিজ্য লেনদেন নেই, হবে না। আবার দেশি মুদ্রামাত্রই ওর ভূখন্ডগত সীমাবদ্ধতা থাকবে, নিজ রাষ্ট্র সীমানা পার হলেই ওই মুদ্রা অচল হয়ে যাবেই। তাহলে যেকোনো দুই রাষ্ট্র বাণিজ্য বিনিময় করবে কীভাবে, কোন মুদ্রায়? স্বভাবতই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য লেনদেন ঘটাতে চায় বলে সব রাষ্ট্রেরই বাকি সব রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য এক মুদ্রা বা আন্তর্জাতিক মুদ্রার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। তবে বেশি দিন আগের কথা নয়, আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় সব রাষ্ট্রের স্বীকৃত মুদ্রা বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা প্রথম চালু হয়েছিল মাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। আইএমএফ গঠন করার পেছনে ১৯৪৪ সালে প্রধান যেসব তাগিদ কাজ করেছিল তা হল, এর আগে অচল হয়ে ভেঙে পড়ে থাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেন বিনিময়কে নতুন করে এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে এক সিস্টেম ব্যবস্থা হিসেবে হাজির করা। এ আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই আইএমএফ বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। এককথায় বললে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় চালু থাকার পূর্বশর্ত হল এক আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্য মুদ্রা চালু থাকা। এটাই আইএমএফের মুখ্য কাজ। অবশ্য বলা বাহুল্য, আইএমএফের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ব বড়লোক রাষ্ট্রের পক্ষে কান্নি মারা। কারণ আইএমএফের মালিকানা শেয়ার যে রাষ্ট্রের ভাগে সবচেয়ে বেশি আইএমএফের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্বের ওপর প্রভাব তার সবচেয়ে বেশি। এই নিয়মে সাজানো আছে ও পরিচালিত হয় আইএমএফ। যেমন সর্বশেষ মালিকানা শেয়ার অনুসারে আমেরিকা (একাই ১৬ শতাংশ) ও ইউরোপে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ আর ছয়টা রাষ্ট্র মিলে ৪৩ শতাংশ মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করে আছে। আমেরিকা আর ঘনিষ্ঠ ছয় রাষ্ট্র নিজেদের মধ্যে নীতি সমন্বয়ের মাধ্যমে বিশেষ করে গরিব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিজেদের ঐকমত্য রক্ষা করার এক ক্লাব সংগঠন আছে, যার নাম গ্রুপ অব সেভেন কান্ট্রিস, সংক্ষেপে ‘গ্রুপ সেভেন’ নামে; প্রতি বছর কমপক্ষে একবার ‘গ্রুপ সেভেন’ রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতারা বসে থাকে, এমন সম্মেলন তারা নিয়মিত করে থাকে। এ গ্রুপ সেভেন আইএমএফের মালিকানার ৪৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এ সাত রাষ্ট্রের মালিকানার বিপরীতে বাংলাদেশের মতো গরিব রাষ্ট্রের মালিকানা সাধারণত এক পার্সেন্টেরও অর্ধেক হয় বলে গ্রুপ সেভেনের পক্ষে ৪৩% মালিকানা দিয়ে পুরা আইএমএফকে নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। কিন্তু তাই বলে আমাদের মতো গরিব দেশের জন্য ‘আইএমএফ নিপাত যাক’ বলা সঠিক শ্লোগান হবে না। অথবা আইএমএফ আমাদের দরকার নেই সেটাও সঠিক কথা বা দাবি হবে না। কারণ আইএমএফ নিপাত যাওয়া বা নেই এর মানে আমাদের রাষ্ট্রের জন্যও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পণ্য ও পুঁজির বিনিময় লেনদেন এবং মুদ্রাও নাই হয়ে যাবে। অথচ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ইত্যাদি আমাদের অবশ্যই দরকার। অর্থাৎ মূল পয়েন্ট হল, ব্যবস্থাটার নিপাত যাওয়া নয় বরং এটা আন ফেয়ার, অসাম্য এক ব্যবস্থা হয়ে আছে একদিকে কান্নি মারা হয়ে আছে। এর অবসান দরকার।
    একালের একটা বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার মালিকরা যেমন ওই ব্যাংকের পরিচালনার নিয়মকানুন সবটা নিজের ইচ্ছামত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বে এবং দেশের ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুসারে বাণিজ্যিক ব্যাংক পরিচালিত হয়ে থাকে, হতে বাধ্য। তবে এ কর্তৃত্বের অধীনে থাকা মেনেও এরপর যতটুকু মালিকানার ইচ্ছা প্রয়োগের সুযোগ থাকে তা অবশ্য করা হয়। অর্থাৎ বাণিজ্যিক ব্যাংকের মালিক মানেই সে-ই মূল নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের অথরিটি নয়। কারণ ব্যাংকের মালিক আর ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ অথরিটি আলাদা আলাদা। অথচ আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ক্ষেত্রে এ বিষয়টা ঠিক উল্টো। আইএমএফের মালিক রাষ্ট্রগুলোর এক বড় শেয়ার মালিকানা একটা মালিক-জোটের হাতে এবং ঐ জোটই আবার এর নিয়ন্ত্রণ অথরিটি এবং তা অনেক সরাসরি। এই সমস্যার রেডিকেল সমাধান দরকার। একথাটাকেই আরেক ভাষায় প্রায়ই হালকা সরল করে বলা হয় যে, আইএমএফের পরিচালনা সিদ্ধান্তে গরিব রাষ্ট্রের গলার স্বর আরও বেশি বা উঁচু করা দরকার। সারকথায় বললে, আইএমএফের ওপর কর্তৃত্বের চলতি কাঠামো এটা ভাঙা দরকার কিন্তু তা অবশ্যই এটা আবার ঢেলে সাজিয়ে গড়ার লক্ষ্যে। শুধু নিপাত যাক বলাটা সম্ভবত আগের বাক্যের ভেঙে আবার গড়া ধারণার সমার্থক নয়, তাই।
    তাহলে দাঁড়াল, আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেন বিনিময়ের জন্য এক দরকারি প্রতিষ্ঠান। যদিও এর সংস্কারও দরকার। বিশেষত আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাজন, শ্রমের দক্ষতা বাড়ানোর দিক থেকে এর আন্তর্জাতিক মানের দিক থেকেও এটা গুরুত্বপূর্ণ। অতএব এসব অর্জনের পূর্বশর্ত এক আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা থাকা এটাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুদ্রা নেই তো বাণিজ্য বিনিময় নেই। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুদ্রার মান, যেটাকে আমরা অনেক সময় মুদ্রার বিনিময় হার বা এক্সচেঞ্জ রেট বলি।
    নিজের ঘোষণাপত্র অনুসারে আইএমএফের ম্যান্ডেটরি কাজ হচ্ছে মূলত দুইটি। বিভিন্ন সদস্য দেশের মুদ্রার মান নিয়ন্ত্রণ এবং সদস্য রাষ্ট্রের ‘ব্যালেন্স অব পেমেন্ট’ এর দিকে নজর রাখা। কোনো রাষ্ট্রের বার্ষিক আমদানি-রফতানিতে আয়-ব্যয়ের চলতি হিসাবের খাতায় আয়ের তুলনায় ব্যয় সেটা ঘাটতি বা বাড়তির দিকে, এটাকেই ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বলা হয়। সেদিকে নজর রাখা এবং সেক্ষেত্রে ঘাটতি হলে তা মোকাবিলার জন্য ওই রাষ্ট্রকে ধার ও পরামর্শ দেয়া ইত্যাদি। এখানে লক্ষণীয় যে, নিজ রাষ্ট্র অর্থনীতি পরিচালনা করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রায় ঘাটতি ফেলালে তবেই ধার নিতে হবে। আর ধার নেয়া মানেই সঙ্গের শর্ত-পরামর্শও শুনতে হবে। নইলে নয়। মানে ঘাটতি নেই তো উটকো পরামর্শও নেই।
    আইএমএফ প্রসঙ্গে আর একটা মৌলিক দিক হল, আইএমএফের সদস্যপদ লাভ করতে চাইলে শুরুতেই চাঁদা পরিশোধ করতে হয়। এটা ঠিক, চাঁদা বলতে যা বুঝি যে, প্রদেয় চাঁদার অর্থ জমা করার পরে তা প্রতিষ্ঠানের আয় বা সম্পত্তি হয়ে যায়। আইএমএফের বেলায় এক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। বরং আইএমএফ প্রতিষ্ঠানে সব সদস্য রাষ্ট্রের নিজ নামে একটা অ্যাকাউন্ট থাকে, প্রদেয় চাঁদা ওই নিজ অ্যাকাউন্টে জমা হয়। এটা অনেকটা কোনো আমদানিকারকের মাল জেলায় জেলায় বেচার জন্য জেলা পরিবেশক হওয়ার মতই, যেন আমদানিকারকের কাছে আগে প্রদেয় ডিপোজিটেড বা জমা রাখা অর্থ। এর পরিমাণ কত তা ঠিক হবে বছরে কী পরিমাণ মালামাল নিয়ে বিক্রি করতে পারব এ আকারের অনুপাতে। এবং আগাম জমা রাখতে হবে এমন এক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ। এরপর যা মালামাল তুলেছি প্রতি তিন মাস পরপর এর বকেয়া মূল্য পরিশোধ করে দিতে হয়। আইএমএফের সদস্য ফি আগাম জমা দেয়া অনেকটা এরকমই এক ব্যবস্থা। কিন্তু এর সুবিধা কী?
    সুবিধা হলো, ওপরে যে ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বা চলতি হিসাবে ঘাটতি আয়-ব্যয়ের কথা বলছিলাম তেমন কোনো পরিস্থিতিতে ঘাটতি মেটাতে আইএমএফ ওই সদস্য রাষ্ট্রকে কতদূর ধার দেবে, তা হিসাব করা হয় এভাবে যে, আইএমএফে আমার রাষ্ট্রের অ্যাকাউন্টে জমাকৃত অর্থের ১২৫ শতাংশ পর্যন্ত।

    এই ফাঁকে একটা কথা বলার সুযোগ নেই।
    আইএমএফের তহবিলে সব সদস্য রাষ্ট্রের অ্যাকাউন্টে জমাকৃত অর্থ হিসাব করা হয় অদ্ভুত নামের এক ভার্চুয়াল (নামে আছে কিন্তু বাস্তবে নেই) মুদ্রায়। নামটা হল স্পেশাল ড্রয়িং রাইট বা এসডিআর। এজন্য আইএমএফের মুদ্রার নাম বলা হয় এসডিআর। এ মুদ্রার মান মানে, যেমন কয়টা বাংলাদেশী টাকা দিলে তা এক এসডিআরের সমান হবে, তা কীভাবে ঠিক হয়?
    প্রতিদিন আইএমএফের ওয়েবসাইটের প্রথম পাতায় দেখা যাবে ওই দিনের এসডিআর রেট দেয়া আছে। যেমন আজ ৬ ডিসেম্বর এক এসডিআর = ০.৭২৯৯৮৮ ডলার। এ হিসাবে এক এসডিআর = ১০৮.৪০ টাকা। এখন প্রতিদিনের এসডিআর রেট এটা কীভাবে হিসাব করা হয় বা সাব্যস্ত করা হয়?
    প্রতিদিনে টপ চারটা মুদ্রা আমেরিকান ডলার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরো, ব্রিটিশ পাউন্ড আর জাপানি ইয়েন – এদের বিনিময় হার বাজারে কত ছিল তা থেকে এক গড় বিনিময় হার বের করা হয়। আর সেটাকে ডলারে প্রকাশ করলেই সেটাই ওই দিনের এসডিআর রেট। অর্থাৎ এখন ওই চারটা মুদ্রার গড় বিনিময় হারই ওই দিনের এসডিআর এর মান। আর এসডিআর মান বের করতে শুধু ওই চারটা মুদ্রাকেই বেছে নেয়ার কী কারণ? কারণ, দুনিয়াতে এখন যত ব্যবসা-বাণিজ্যিক লেনদেন হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় এমন শীর্ষ চার মুদ্রা ওগুলো তাই। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লেনদেনের মুদ্রা তালিকায় সবার উপরের চার মুদ্রাগুলো তাই। আর প্রতি পাঁচ বছর পরপর মূল্যায়ন করে দেখা হয় শীর্ষ চার মুদ্রা কারা ছিল? যেমন ২০০০, ২০০৫ ও ২০১০ এভাবে। এবারের ২০১৫ সালের মূল্যায়নে এবং গত ১০ বছরের মূল্যায়নেও দেখা যাচ্ছিল চীনের মুদ্রা ইউয়ানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্রমেই বাড়ছে। এর স্বীকৃতি হিসেবে এবারের আইএমএফের নির্বাহী বোর্ড সভায় আইএমএফের টেকনিক্যাল কর্মীদের গণনা ফলের সুপারিশ এর পক্ষে শেয়ার মালিকানার নির্বাহী বোর্ড সায় দিয়েছে। তাই পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে ইউয়ানকে গ্রহণ করা হয়। এর ফলে এখন থেকে মিডিয়া রিপোর্টে আর এক টেকনিক্যাল শব্দের দেখা মিলবে ‘কারেন্সি বাস্কেট’ বা ‘বাস্কেট কারেন্সি’। উপরে বলেছিলাম, চারটি টপ আন্তর্জাতিক মুদ্রার গড় বিনিময় হারই হল ওই দিনের এসডিআর মান। তো এজন্য ওই চার আন্তর্জাতিক মুদ্রাকে আইএমএফের ‘বাস্কেট কারেন্সি’ বলে। যার ভাবটা এরকম যে, এসডিআর মুদ্রার মান নির্ধারণের জন্য একটা ঝুড়িতে থাকা টপ চারটা আন্তর্জাতিক মুদ্রাকে ওখান থেকে তুলে আনা হয়েছে। এবার ওই বাস্কেট কারেন্সিতে চীনা ইউয়ানকে অন্তর্ভুক্ত করে মর্যাদা দেয়া হলো। তবে টেকনিক্যাল রুল হল, আগামী বছর ২০১৬ সাল থেকে এটা কার্যকর হবে। অর্থাৎ আগামী বছর ১ অক্টোবর থেকে ইউয়ানসহ পাঁচ টপ মুদ্রার গড় থেকে আইএমএফের এসডিআর মান নির্ধারিত হবে। অর্থাৎ তখন থেকে প্রতিদিনের এসডিআর মান কত হবে তা সাব্যস্ত হওয়ার ক্ষেত্রে চীনা ইউয়ান একটা ফ্যাক্টর হবে।
    শুধু কী তাই? না আরও আছে। উপরে আইএমএফের সদস্য রাষ্ট্রের নিজ নামের এক অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা রাখার কথা বলেছিলাম। কত অর্থ সেখানে আগাম জমা রাখতে হবে তা নির্ভর করে আমার অর্থনীতিতে লেনদেনের সাইজ কেমন এরই এক অনুপাতিক পরিমাণ। কিন্তু এতে সাব্যস্ত হওয়া মোট পরিমাণের ৭৫ ভাগ অর্থ জমা রাখতে হয় সোনা অথবা ডলারে। আর বাকি ২৫% নিজ দেশি মুদ্রায়। এটা আইএমএফের জন্মের সময়কার ১৯৪৪ সালের নিয়ম ছিল। কিন্তু দিনকে দিন প্রতিটা সদস্য রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাইজ বেড়েই চলেছে ফলে সে অনুপাতে আইএমএফের জমা রাখা সোনা ও ডলারের পরিমাণও। কিন্তু দুনিয়াতে সোনা ও ডলার তো অফুরন্ত নয়। তাই এই সমস্যা সমাধানে ১৯৬৯ সালে বাস্কেট কারেন্সি ধারণা চালু হয়েছিল। এর ফলে নতুন সংযুক্তি আইন হল, ডলার ও সোনা ছাড়াও বাস্কেট কারেন্সিতে থাকা অন্যান্য মুদ্রাতেও আইএমএফের সদস্য চাঁদা সম্পদ রিজার্ভ রাখা যাবে। অতএব কোনো রাষ্ট্র এখন ইউয়ানেও তার জন্য ধার্য আইএমএফের সদস্য চাঁদার সম্পদ রিজার্ভ রাখতে পারবে। এর অর্থ শুধু আইএমএফে নয়, দুনিয়ার নানা রাষ্ট্র ব্যক্তি বা কোম্পানি সবাই নিশ্চিন্তে এখন থেকে স্ব-স্ব সম্পদ চীনা ইউয়ানে রূপান্তরিত করে ধরে রাখতে শুরু করবে। আইএমএফের হিসাবে ইউয়ানকে বাস্কেটে স্বীকৃতি দেয়ার আগে বাস্কেট মুদ্রাগুলো কতটা গ্লোবাল লেনদেনের মুদ্রার দখলে আছে এর হিসাবে ডলারের ভাগে ৪১.৯ শতাংশ, ইউরো ৩৭.৪ শতাংশ, পাউন্ড ১১.৩ শতাংশ আর ইয়েন ৯.৪ শতাংশ। আর আগামী বছর থেকে তা সম্ভবত হবে ডলার ৪১.৭৩ শতাংশ, ইউরো ৩০.৯৩ শতাংশ, ইউয়ান ১০.৯২ শতাংশ, পাউন্ড পাউন্ড ৮.০৯ শতাংশ আর ইয়েন ৮.৩৩ শতাংশ।
    এটা গেল কেবল শুরুতে কার কত বাজার শেয়ার দাঁড়াবে এর হিসাব। তবে আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্রায় সবাই একযোগে যে কথাগুলো বলছে যেমন, আইএমএফের স্বীকৃতি চীনের দিক থেকে ‘বিরাট রাজনৈতিক অর্জন’ এবং চীনের ওপর আস্থার প্রকাশ ও চীনের জন্য এটা ‘প্রেস্টিজিয়াস বিষয়’। এ ছাড়া মুদ্রা যেহেতু শুধু পণ্য বিনিময়েই কাজে লাগে তাই নয়। সম্পদ ধরে রাখার মুদ্রা হিসেবেও এর কদর আছে। বিশেষত যে আন্তর্জাতিক মুদ্রার মান বা হার স্থিতিশীল, বাজারের উঠতি মুদ্রা এবং আস্থার মুদ্রা সেই মুদ্রায় রূপান্তরিত করে সম্পদ রাখতে মানুষ আগ্রহী হবেই। এই বিচারে ব্লুমবার্গ ম্যাগাজিন আগাম অনুমান করে বলছে, প্রথম বছরেই ইউয়ানে সম্পদ ধরে রাখার জন্য বাজারে এক প্রবল জোয়ার উঠবে। এর ধাক্কায় আবার পণ্য বিনিময় বাজারে ইউয়ানের বাজার-শেয়ার বেড়ে যাবে। আর ততটাই ডলার বাজার হারাবে। এ রকম কিছু চেন রিয়াকশন বা চক্রাকার প্রতিক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আবার কিছু মিডিয়ার ঈর্ষা ছড়ানোর প্রপাগান্ডাও আছে। যেমন কেউ কেউ সন্দেহ বাতিকের রিপোর্ট করেছে, আইএমএফ কি আসলেই ঠিক মতো যাচাই করে দেখে বোর্ডের কাছে সুপারিশ করেছে? এ রকম। তবে খোদ আইএমএফ এ দিকটা আগেই আঁচ করতে পেরেছে বলেই মনে হয়। ইউয়ানকে স্বীকৃতি দেয়ার দিনেই আইএমএফ নিজ ওয়েব সাইটের প্রথম পাতায় ‘সহসাই যেসব প্রশ্ন উঠে’ শিরোনামে নিজেই প্রশ্নোত্তরে এসব সন্দেহ-কৌতূহলেরও বহু আগাম প্রশ্নের বাড়তি জবাব দিয়ে রেখেছে। অনেক বেশি আন্তরিক আর খোলামেলাভাবে সেসব জবাব দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আইএমএফের মতো বহুরাষ্ট্রিক প্রতিষ্ঠানের চীন ও আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থান বিরোধের বেলায় সাধারণভাবে ২০০৯ সাল থেকেই আইএমএফের ব্যুরোক্র্যাট নির্বাহীদের ভূমিকা কী হলে সঠিক হবে, সে প্রশ্নে এপর্যন্ত লক্ষ্য করা গেছে যে, তারা একেবারেই প্রফেশনাল অবস্থান নিয়েছে। রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব বা পক্ষ নিতে চাননি। সাধারণভাবে বলা যায়, ব্যক্তিনিরপেক্ষভাবে যা সত্য, যা সঠিকÑ এর পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলেছে। যেমন, আইএমএফের সংস্কারের দাবি বিষয়ে তাদের অবস্থান সংস্কারের পক্ষে। আর তাদের সুপারিশের ফাইল আমেরিকান সিনেটে গিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে। চীনা ইউয়ানকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রশ্নেও আইএমএফের ব্যুরোক্র্যাট নির্বাহীদের একই ধারাবাহিকতার অবস্থান দেখা গিয়েছে। ইউয়ানকে আমলে নিয়ে আইএমএফের সম্পদের ইউনিট গণনা আগামী বছর থেকে শুরু হবে বলা হলেও বিভিন্ন ব্যক্তি কোম্পানির ধরে রাখা সম্পদ ইউয়ানে রূপান্তর করে রাখার ঝোঁক এ বছর থেকেই শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাস্তবে কি দাঁড়ায় সেটি দেখা যাক।

    গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ ডিসেম্বর দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এবং একই প্রসঙ্গে ০৭ ডিসেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্তে ছাপা হয়েছিল। সে লেখা দুটো একসাথে মিলিয়ে আরও সংযোজন ও আবার এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল।]

  • তুরস্ক-রাশিয়া সামরিক উত্তেজনা : রাশিয়া পশ্চিমের নজর চায়

    তুরস্ক-রাশিয়া সামরিক উত্তেজনা
    রাশিয়া পশ্চিমের জোটে অন্তর্ভুক্তি, অবরোধ তুলে নেয়া ইত্যাদিতে নজর চায়

    গৌতম দাস ০৫ ডিসেম্বর ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-iw

     

    সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেছে সেই কবে পঁচিশ বছর আগে। শুধু তাই নয় ভেঙ্গে রাশিয়া নামে এমন এক ক্ষুদ্র আকার নিয়েছে যে সেই রাশিয়া এখন সব গাইগুই ছেড়ে পুঁজিতান্ত্রিক মুল ধারা বা গ্লোবাল অর্ডারের অংশ। সোভিয়েত ধারার অর্থনীতি বলতে কিছুই ওর ভিতর অবশিষ্ট নাই। কিন্তু তবু সোভিয়েত ভক্ত পুরান কমিউনিষ্টদের মাথা ঠেকিয়ে ভক্তি দিবার জায়গার অভাব হয় নাই। তারা এখনও প্রবল ভক্তি সহকারে একালের মাফিয়া রাষ্ট্র পুতিনের রাশিয়াকে পুরান সোভিয়েৎ ইউনিয়নের জায়গায় বসিয়ে ভক্তি সেবা দেয়। মাফিয়া রাশিয়ার হয়ে প্রপাগান্ডায় মেতে উঠে। এটা সত্যিই এক আশ্চর্যের বিষয়। প্রেমের আবেগের সামনে জ্ঞান বুদ্ধি বিবেচনার যে আজও অচল সেটাই বরং আবার প্রমাণিত।
    আজকের দুনিয়ার আইএস বা ইসলামী স্টেট ইস্যুটা দিনকে দিন বিশ্ব-রাজনীতিকে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলছে। ব্যাপারটি অনেকটা ‘কুইনাইন সারাবে কে’ অবস্থার মত। ম্যালেরিয়া তাড়ানোর জন্য রোগীকে কুইনাইন খাওয়ানো হয়েছিল। এতে কুইনাইনে ম্যালেরিয়া তাড়ানো গিয়েছিল কিনা, সেকথা চাপা পড়ে গিয়ে এর চেয়েও বড় ঘটনা হয়ে গিয়েছিল নতুন রোগ – কুইনাইন এ নতুন রোগ ডেকে এনেছে। তা থেকে আবার আরও অনেক নতুন নতুন রোগের বিস্তার ঘটেছে। এই অবস্থা। এভাবে সর্বশেষ জটিল ঘটনাটি হল, তুরস্কের বোমারু এফ-১৬ বিমান এক রাশিয়ান বোমারু এসইউ-৩০ বিমানকে গোলা মেরে ভূপাতিত করেছে। আগেই বলেছি, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও কমিউনিস্ট প্রগতিশীলদের চোখে রাশিয়াই এখন সেই তাদের চোখে পুরান সহানুভূতি পাবার রাষ্ট্র হিসেবে সে জায়গা নিয়েছে। সিরিয়াতে সেই রাশিয়ার বিমান হামলা শুরু হয় গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ থেকে। প্রথম এক সপ্তাহ টানা বোমাবাজি করে এরপর থেকে থেমে থেমে যেন গড়ে দিনে একটা করে এবং বেছে বেছে জায়গায় বোমা ফেলা, যেখানে ফেললে তা আসাদের রাষ্ট্র যুদ্ধকৌশলের দিক থেকে সুবিধা পায়- এভাবে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল রাশিয়া। কিন্তু রাশিয়ার নতুন যুদ্ধবিমান খুয়ানোর ঘটনাটা ২৪ নভেম্বরের। ওই দিন তুরস্কের বোমারু বিমান রাশিয়ান এক বোমারু বিমানকে গোলা মারার ঘটনাটা ঘটে। এ ঘটনাটি নিয়ে বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়া কার কী ধরনের, কে কী বলেছে এর একটা সঙ্কলন রিপোর্ট তৈরি করেছে আল জাজিরা টিভি নেটওয়ার্ক। সেই রিপোর্ট অনুসরণ করে এখানে কথা এগোব।

    তবে এর আগে কেন তুরস্ক রাশিয়ান বোমারু বিমান ভূপাতিত করল সেদিকে কিছু আলোকপাত করা যাক। বিষয়টা নিয়ে এর স্বপক্ষে অনেক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আর রাশিয়ান প্রপাান্ডা থাকলেও সিরিয়া-তুরস্কের সীমান্তে হামলা হওয়া ওই অঞ্চলের কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড তথ্যের দিকে মনোযোগ দেব। যে অঞ্চলে তুরস্ক-রাশিয়ান বোমারু বিমানে হামলা হয়েছে, অথবা বলা যায় সিরিয়ার যে অঞ্চলে রাশিয়া বিমান হামলা করতে গিয়েছিল সেটা সিরিয়া-তুরস্কের একেবারে সীমান্ত অঞ্চল। সিরিয়ার দিক থেকে তা লাটকিয়া প্রদেশ আর তুরস্কের দিক থেকে সেটা হাতায়ে প্রদেশ- এই হলো দুই প্রদেশের সীমান্ত সেটা। শুধু তাই না, ওই অঞ্চলের বসবাসকারীরা আধুনিক রাষ্ট্রের সীমানা টানার বহু ঐতিহাসিক যুগ আগে থেকেই সিরিয়ার ‘সিরিয়ান টার্কম্যান’ বা অরিজিনাল টার্কি বংশোদ্ভূত তবে সিরিয়ায় বসবাসরত বলে সিরিয়ান। অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে যেহেতু আজকের সিরিয়া বলে কোনো আলাদা রাষ্ট্র ছিল না; বরং আজকের সিরিয়া, ইরাকসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যই তুরস্কের শাসনাধীন একই অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনস্থ সীমানা অঞ্চল ছিল। ফলে আজকের সিরিয়ান তুর্কিরা তুরস্কের মূল তুর্কি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার একই অংশ ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অটোমান সুলতানের পরাজয়ের পর ওই সাম্রাজ্য ব্রিটিশ-ফরাসিরা গোপন চুক্তির কারণে ভাগাভাগিতে সিরিয়া বলে আলাদা রাষ্ট্র সীমানা টানার সময় লাটকিয়া অঞ্চল নতুন রাষ্ট্র সিরিয়ার ভাগে চলে যায়। এ হলো পুরনো ঐতিহাসিক দিক। আর একালের সংযোজিত গুরুত্বপূর্ণ আরও দুই তথ্য হলো- এক. সিরিয়ান আরব স্প্রিং বা সিরিয়ান গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই সিরিয়ান টার্কম্যানরা আসাদ সরকারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে লিপ্ত হয়েছিল এবং এখনও আছে। আর রক্ত এবং আত্মীয়তা সূত্রে তুরস্ক থেকে সব ধরনের সাহায্যপ্রাপ্তিও সেই থেকে তারা পেয়ে আসছে। তুরস্কের সরকারের দিক থেকে সরকারও নিজ টার্ক-জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক সূত্রে সিরিয়ান টার্কম্যানদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধতা নিজের সমাজের দা্বি । তথ্য দুই. এটা আমাদের প্রসঙ্গের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। লাটকীয়া অঞ্চল সিরিয়ান গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই আইএস অথবা পরবর্তীতে যারা আইএস হয়ে হাজির হচ্ছে তাদের কোনো তৎপরতা বা প্রভাব এখানে নেই, তাদের অনাগ্রহের এলাকা বা মুক্ত এলাকা।
    কিন্তু রাশিয়ান বিমান ধ্বংস হওয়ার পর রাশিয়ান বয়ানে সুনির্দিষ্ট করে কেন রাশিয়ার বিমান লাটকিয়ায় গিয়েছিল, তা কোথাও উল্লেখ করে নাই, করতে চায় না। শুধু সামগ্রিকভাবে দাবি করে চলছে যে, পুরো সিরিয়াতে তারা আইএসের ওপর বোমাবাজি করতেই গিয়েছিল। অথচ মাঠের তথ্য হলো, লাটকিয়া প্রদেশ টার্কি বংশোদ্ভূত সিরিয়ানদের সশস্ত্র প্রতিরোধ তৎপরতা সিরিয়া-তুরস্কের এক ধরনের ঘরোয়া মামলা, যার মধ্যে আইএস নেই, স্বার্থসংশ্লিষ্টতার কিছু নেই। অতএব রাশিয়া লাটকিয়াতে আইএস মারতে গিয়েছিল- এ বয়ান অচল; কারও হজম হচ্ছে না। নিঃসন্দেহে রাশিয়া ওখানে আইএস মারার উসিলায় আসাদ সরকারকে সামরিক সুবিধা দিতে আর সিরিয়ান স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ হাসিলে আসাদের পক্ষ হয়ে সিরিয়ান টার্কম্যানদের উচ্ছেদ করতে গিয়েছিল। এ কাজ করতে যাওয়ার আগে রাশিয়া স্পষ্টত যেদিকটা আমলে নেয়নি তা হল, লাটকিয়ার বাসিন্দাদের রক্ষা করার স্বার্থ তুরস্ক সরকারেরও আছে। রক্ত ও আত্মীয়তা সূত্রে সিরিয়ায় থেকে যাওয়া টার্কদের রক্ষা করতে নিজ জনগণের কাছে তুরস্ক সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
    তাহলে সার কথা দাঁড়াচ্ছে, লাটকিয়া আসলে সিরিয়া ও তুরস্কের পারস্পরিক স্বার্থে সরাসরি সংঘাতের এক ইস্যু। সিরিয়ায় সশস্ত্র গৃহযুদ্ধ সংঘাতের শুরু থেকেই লাটকিয়ার বাসিন্দাদের তুরস্ক সব সময় সিরিয়ান বিমান হামলা থেকে সুরক্ষা করে গেছে। একালে রাশিয়া আইএস মারার উসিলায় তুরস্ক-সিরিয়ার স্বার্থ সংঘাতের ইস্যুতে নিজের হাত ঢুকালে তুরস্ক একইভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াবে এবং তা-ই দাঁড়িয়েছে। ২৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের পার্লামেন্টে দেয়া ভাষণ সরাসরি সম্প্রচার করছিল আল জাজিরা টিভি। তুরস্কের নিজের এই স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানোর কারণকেই ওখানে তিনি ব্যাখ্যা করছিলেন। তবে স্বভাবতই তুরস্কের এ স্বার্থের কথা তিনি পটভূমি হিসেবে বলছিলেন। রাশিয়ান বিমান ভুপাতিত করে দেয়ার পক্ষে আইনি বা কূটনৈতিক যুক্তি হিসেবে নয়। হামলার পক্ষে তুরস্কের আইনি যুক্তি হল- রাশিয়ান বিমান তুরস্কের আকাশসীমা ভঙ্গ করে তুরস্কের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে এবং তুরস্ক বিমান বাহিনীর পাঁচ মিনিটে ১০ বার ওয়ার্নিং রেডিও মেসেজ দেয়ার পরও রাশিয়ানরা তা উপেক্ষা করেছে। তুরস্ক ওই মেসেজের অডিও মিডিয়ায় উন্মুক্ত করে দিয়েছে। আল জাজিরায় প্রচারিত মেসেজে শোনা যাচ্ছে ওই সাবধান বাণী। সেই সঙ্গে রাশিয়ান ওই বিমানের দুই পাইলটের বেঁচে যাওয়া একজন পাইলটের দাবিও আল জাজিরা আমাদের দেখিয়েছে। ওখানে তিনি দাবি করছেন, তুরস্ক থেকে কোনো ওয়ার্নিং দেয়া হয়নি।
    অবস্থাদৃষ্টে সবমিলিয়ে বললে, বয়ানের ন্যায্যতা ও গাথুনির দিক থেকে রাশিয়া পিছিয়ে পড়েছে। রাশিয়া নিজ বয়ানের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাই।

    বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রতিক্রিয়া যেটা রয়টার্স থেকে আল জাজিরা টুকে এনেছে; ওখানে দেখা যাচ্ছে, পুতিনের ভাষ্যটা যেন হার স্বীকার করা হারু পার্টির ভাষ্য। যেমন- পুতিন দাবি করছেন, বিমানটা বোমার গোলা খাওয়ার পর ওর ভাঙা অবশেষ সীমান্তে সিরিয়ার দিকে চার কিলো ভেতরে পড়েছে। অতএব আমরা সিরিয়ান সীমার ভেতরেই ছিলাম, তুরস্কের সীমানায় ঢুকিনি। – এগুলো খুবই হাস্যকর যুক্তি। কোন মীমাংসায় আসা যায় না এমন দাবি, তবে মুখ রক্ষায় কাজে লাগে এমন যুক্তিও। সাধারণত যে কোনো বোমারু বিমান এক মিনিটে কমপক্ষে ১০-১৫ কিলোমিটার পার হয়ে যায়, এছাড়া টার্কিশ আকাশ সীমায় গুলি খেয়েও কোনো বিমানের পড়ার মাটি সিরিয়া হতেও পারে। সুনির্দিষ্টভাবে এক্ষেত্রে তুরস্কও দাবি করছে, রাশিয়ান বিমান তুরস্কের আকাশে প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করেছিল এবং ১৭ সেকেন্ড ধরে ছিল। কাজেই সিরিয়া-তুরস্কের এসব সেকেন্ড-মিনিট দিয়ে মিডিয়া বয়ান কারও নিজের পক্ষে প্রমাণ হিসাবে কাজে আসবে না। বরং যে প্রশ্নে রাশিয়ানরা চুপচাপ তা হল, লাটকিয়া আইএসবিহীন অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়ান বিমান ওখানে কেন গিয়েছিল! সেখানে আমাদের জবাব খুঁজতে হবে। যুদ্ধবিমান গোলা খাওয়ার পরে পুতিন অভিমানের ভাষায় বলছেন, “বিশ্বাসঘাতকতা করে তার পিঠে ছুরি মারা হয়েছে।” এছাড়াও বলছেন, “তারা (মানে তুরস্ক) কি ন্যাটোকে আইএসের পক্ষে খেদমতে লাগাতে চায়?” পুতিনের এ দুই বয়ানের পিঠে আগাম ধরে নেয়া আছে যে, রাশিয়ান পাইলটরা যেন আইএস মারতে ওখানে গিয়েছিল আর সেই যোদ্ধা রাশিয়ার সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। অথচ রাশিয়ান পাইলটরা ওখানে কোনো আইএস মারতে গিয়েছিল, তাই তো প্রতিষ্ঠিত নয়। পুতিন আমাদের ধরে নিতে বলছেন, সিরিয়ার যে কোনো জায়গায় রাশিয়ান বিমানের যাওয়া মানেই তা শুধু আইএসের ওপর বোমা মারতে যাওয়া। অথচ রাশিয়ার ভালোভাবেই জানা থাকার কথা যে, লাটকিয়ায় সিরিয়া রাষ্ট্রের স্বার্থ আর তুরস্ক রাষ্ট্রের স্বার্থ সরাসরি মুখোমুখি সংঘাতপূর্ণ হয়ে আছে। ফলে আইএসবিহীন ওই অঞ্চলে রাশিয়া যাওয়ার অর্থই হল আসাদের পক্ষে ভারসাম্য আনতে সরাসরি তুরস্কের বিপক্ষে সামরিকভাবে দাঁড়িয়ে যাওয়া। অতএব তুরস্কের গুলি খেয়ে বিমান হারানোর রিস্ক রাশিয়া তো আগে থেকেই জেনেশুনে নিজেই নিয়েছে। এছাড়া যেদিন রাশিয়ান বিমান ভূপাতিত হয় সেদিনই রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তুরস্ক সফরের কথা ছিল, যা ঐদিনের ঘটনা প্রেক্ষিতে পরে বাতিল করা হয়। ফলে কোনো বিশেষ কারণে রাশিয়াকে যদি লাটকিয়ায় বোমারু বিমান নিয়ে যেতেই হয়, তবে তা নিয়ে ওই সম্ভাব্য সভায় তুরস্কের সাথে মুখোমুখি বসে আগেই রাশিয়ার সিদ্ধান্ত সমন্বয় করে নেয়া যেত। অথচ রাশিয়া যেন ধরেই নিয়েছিল, আইএস মারার নাম করে রাশিয়া আসাদের পক্ষে মাঠের পরিস্থিতি এনে দেবে আর কেউ কিছুই বুঝতে পারবে না!
    এ বিষয়ে ওবামার বক্তব্যের ভেতর একটা বাক্য আছে। ওবামা বলছেন, লাটকিয়ায় রাশিয়ানরা ‘মডারেটবিরোধী’ (মানে আইএস বাদে অন্য মধ্যপন্থী আসাদবিরোধীরা) বিরুদ্ধে অ্যাকশনে চলে গেছে। অর্থাৎ ওবামাও তার বক্তব্যে পুতিনকে বকা দিয়ে কথা বলেছেন।
    সেকালের কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধী আমেরিকা ও ইউরোপের মিলিত যুদ্ধজোট হল ন্যাটো বা নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন,যার জন্ম ১৯৪৯ সালে। আর তুরস্ক ওর সদস্যপদ পায় বা নেয় ১৯৫২ সালে।
    ফলে রাশিয়ান বিমানের ভূপাতিত হওয়ার পর এ ইস্যুতে সাধারণভাবে সব ন্যাটো সদস্যই তুরস্কের পক্ষে দাঁড়াতে ন্যাটোর ম্যান্ডেটের কারণে বাধ্য। তাই দেখা যায়, হামলার পরের বিশ্ব নেতাদের প্রতিক্রিয়ায় প্রথমবাক্যেই তুরস্কের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। কিন্তু পরের বাক্যে তুরস্ক ও রাশিয়ার দুই রাষ্ট্রের প্রতি আবেদন রেখেছেন যেন সামরিক টেনশন আর না বাড়ানোর ব্যাপারে দুই পক্ষ সংযত থাকে। অর্থাৎ ইঙ্গিতটা হলো, বাকি ন্যাটো সদস্যরা তুরস্কের পক্ষে দাঁড়ালেও ন্যাটোর কোনো সদস্য বিষয়টা নিয়ে আরও কোনো উত্তেজনা, কোনো সামরিক সংঘাতের দিকে যাওয়ার কথা ভাবছে না। তারা বরং মূল শত্রু আইএসের ব্যাপারে সবাই একজোট হয়ে অ্যাক্ট করতেই চাচ্ছে।
    এ ব্যাপারে সিরিয়ান সরকারের বিবৃতি স্বভাবতই রাশিয়ার পক্ষে। তবে রাশিয়ার পক্ষে এক আইনি যুক্তি সাজানোর চেষ্টা করেছে সিরিয়া। রাশিয়ার বিমান ভূপাতিত করায় তুরস্কের এ কাজকে “অ্যাক্ট অব এগ্রেশন” বলে চিহ্নিত করেছে সিরিয়া। এটা জাতিসংঘের আইনি ভাষা। অর্থ “আইন লঙ্ঘন কর হামলা করা”।
    তাই তুরস্ক সরকারের বিবৃতিতে সিরিয়ান অভিযোগের পাল্টা জবাব দেয়া হয়েছে। বলেছে, “তুরস্কের তৎপরতা (বিমান ভূপাতিত করা) অন্যের ভূমিতে বেআইনি প্রবেশ করে হামলাকারী হওয়ার মতো কাজ নয়”। এই হল, তোলা অভিযোগ আর এর বিরুদ্ধে কাটান দেওয়ার কেচাল। এসবের বাইরে, ফরাসি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য এসব পাল্টাপাল্টির বাইরে যাওয়ার চেষ্টা। কারণ তাঁর রাষ্ট্রস্বার্থ আইএস বিরোধী জোটে রাশিয়ান অন্তর্ভুক্তি দেখতে চাওয়ার তাগিদ আছে। তিনি বলছেন, (রাশিয়া-তুরস্কের মধ্যে) সামরিক উত্তেজনা আর যেন না ঘটে, সেদিকে আমাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য আইএস দমনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
    জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেলের প্রতিক্রিয়া এবং ওবামার প্রতিক্রিয়ার প্রথম অংশ এভাবে সবারই প্রতিক্রিয়ার সাধারণ দিক হল, সবাই জোর দিচ্ছেন রাশিয়া-তুরস্কের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আর না বাড়ানো এবং আইএসবিরোধী জোটে সবাইকে সামিল করা।
    সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে, নিট ক্ষতিটা হলো রাশিয়ার। রাশিয়ান এসইউ-৩০ যুদ্ধবিমান একেবারেই নতুন হাইটেক বিমান- এমন যুদ্ধবিমান রাশিয়াকে খোয়াতে হল। অথবা বলা যায়, আইএসবিরোধী পশ্চিমা জোটে অন্তর্ভুক্তি পেতে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে পশ্চিমা অবরোধের মধ্যে থাকা রাশিয়াকে যে মূল্য দিতে হল তা বোধহয় বেশ বেশি। তবু এটা রাশিয়াকে পশ্চিমের সাথে জোটে ঢুকিয়ে দেয়ার পক্ষে তা এক কদম আগাম পদক্ষেপ। রাশিয়ার কাছে এটা যথেষ্ট দামি। তবে মাঝখান থেকে রাশিয়া-তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্য বিনিময় অচল হয়ে গেছে। কারণ যুদ্ধবিমান হারিয়ে রাশিয়া তুরস্কের বিরুদ্ধে বাণিজ্য অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে। পুতিনের রাগ, ক্ষোভ তো কারও কারও ওপর পড়ে তবেই না প্রশমিত হতে হবে! তবে লাটকিয়ায় পুতিনের বেকুবি থেকে তিনি কী কোনো শিক্ষা নেবেন? দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

    দুইঃ

    বিশ্বযুদ্ধ কোন ছেলেখেলা নয়!
    রাষ্ট্র মাত্রই ওর পরিচালনার মধ্যে নিজের পক্ষে প্রপাগান্ডা করা একটা কাজ। কিন্তু সে প্রপাগান্ডা আপনি বিশ্বাস করে বসবেন কিনা,ঐ প্রপাগান্ডাকে সত্যি মনে করে নিজের চিন্তা সে আলোকে মানে নিজেকেও সাজাবেন কী না এর দায়দায়িত্ব সম্পুর্ণ আপনার নিজের। কানাডায় রেজিষ্টার্ড অফিস নিয়ে বসা রাশিয়ার এক প্রপাগান্ডা ওয়েব সাইট আছে, “গ্লোবাল রিসার্চ” নামে। রাশিয়ান ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্টের বরাতে বা বরাত উল্লেখ করা ছাড়াই বিভিন্ন খবর ওখানে ছাপা হয়। অর্থাৎ বুঝা যায় রাশিয়ান ইন্টেলিজেন্স ডাটা ও রিপোর্টে ঐ গ্লোবাল রিসার্চের কর্তাদের একসেস বা প্রবেশাধিকার আছে। তা খারাপ কী! ওয়েষ্টার্ণ সুত্রর বরাতের বাইরে এই উছিলায় আমরা কিছু তথ্য ও ব্যাখ্যা ওখান থেকে পেতে পারি। কিন্তু সেসব তথ্য নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আমাদের অবশ্যই সাবধান হতে হবে, ‘ইন-বিটুইন দা লাইন’ নিজের মত করে পাঠ নিতে হবে কারণ ওসব তথ্যের সাথে আবার রাশিয়ান প্রপাগান্ডা-স্বার্থও মিশান আছে। ফলে টুইষ্ট আছে। সেদিকে খেয়াল রেখে তা বাদ রেখে বেছে পড়তে হবে। ঐ সাইটের টার্গেট পাঠক আপনিও হতে পারেন যদি দেশে দেশে এখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রগতিবাদী সমাজতন্ত্রীদের একজন খাতক হিসাবে আপনি নিজেকে এখনও মনে করেন। আর সেই সাথে যদি মনে করেন রাশিয়ান রাষ্ট্রের স্বার্থই আপনার স্বার্থ,মানে রাশিয়ান রাষ্ট্রের বৈদেশিক স্বার্থ-ব্যাগেজ বইবার দায় আপনি নিয়েছেন।
    তো ঐ সাইটের অনেক প্রপাগান্ডা ইস্যু ও মেটেরিয়ালের মধ্যে একটা হল “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন” এমন একটা দামামা বছরের পর বছর ধরে বাজিয়ে চলা। প্রায়ই বাংলাদেশে দেখা যায় অনেক পুরান কমিউনিষ্ট পুরান অভ্যাসে বাছবিচারহীনভাবে ঐ দামামা বাজানোতে প্রভাবিত হয়ে পড়েন। তেমনই এক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে গত ২৬ নভেম্বর দৈনিক মানবজমিনে – “মুখোমুখি তুরস্ক-রাশিয়া তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কী আসন্ন?” – এই শিরোনামে।
    দুনিয়াতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কোন দিন হতে পারে না – এমন কথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু এটা তাড়াতাড়ি হচ্ছে না কেন; হলে আমেরিকার পতন হবে ফলে এমনটা দেখতে চাওয়ার একটা প্রবল কামনা রাশিয়ার আছে। এবং সেটাও হয়ত তেমন দোষেরও কিছু নয় যতক্ষণ না এটা যুক্তিবুদ্ধি বিচারহীন ম্যানিয়াক হয়ে না চাওয়া হয়, প্রপাগান্ডার ঘ্যানর ঘ্যানর করে ফেলা না হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য রাশিয়ার বিশেষত পুতিনের রাশিয়ার সে সমস্যা প্রবল। ১৯৯১ সালের আগে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন (আজকের রাশিয়ার পুর্বসুরি) আমেরিকার সাথে পরাশক্তিগত টক্কর দিত রাশিয়ার আর সেই যৌবন নাই। অথচ আমেরিকা অটুট আছে শুধু না, ইতোমধ্যে এক মেরুর দুনিয়া ভোগ করার সুবিধা নিয়েছে। এটা যেন রাশিয়ার কিছুতেই আর সহ্য হয় না। যদিও আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়াও আর টিকছে না। সেই নেতৃত্বে বিশ্বঅর্থনৈতিক অর্ডার শৃঙ্খলা একালে ক্রমশ ভাঙছে এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু তা ঘটাবার ক্ষেত্রে রাশিয়ার কোন ভুমিকা নাই; এটা রাশিয়ার হাতে নাই – না এটা ঘটাতে, না এটা ত্বরান্বিত করতে। বরং সবচেয়ে বড় নির্ধারক ভুমিকা আছে চীনের, তবে সেটাও অবজেকটিভ। অর্থাৎ এটা চীনা নেতাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা প্রসুত নয় বরং চীনের বৈষয়িক অর্থনৈতিক অর্জন উন্নতির কারণে পরোক্ষে পড়ে পাওয়া লাভ। এটা ঠিক আমেরিকার দুনিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর উদ্দেশ্যেই করা চীনের ততপরতা নয় বরং নিজের অর্থনৈতিক উত্থানের পক্ষে কাজ করে যাওয়া চীনের কারনে যেটা পরোক্ষ অর্থে – আমেরিকার দুরবস্থা এবং বিশ্বঅর্থনৈতিক অর্ডার শৃঙ্খলার নেতৃত্ব থেকে আমেরিকার অপসারণ ও নতুন অর্ডার জন্ম আসন্ন হয়ে উঠা। এই পালাবদলটা কেমন হতে পারে তা নিয়ে ষ্টাডি, আগাম অনুমান করা বলতে পারা ইত্যাদির জন্য বারদিকে বিস্তর গবেষণা পড়ালেখা চলছে। গত অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ সংখ্যায় লন্ডন ইকোনমিস্ট পত্রিকা এবিষয়ে এক রিপোর্ট ছেপেছে। ওর সারকথা হল, দুনিয়াতে একালের পালাবদল পরিবর্তন বিষয়টার কিছুটা সমতুল্য পুরান ঘটনা হল ১৩৫ বছর আগের। সেটা হল, ১৮৮০ সালে বৃটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে আমেরিকান অর্থনীতি যখন দিনকে দিন ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। আর দুনিয়ার ব্যবসা বাণিজ্য ১৯১৩ সালের দিক আর পাউন্ড-স্টার্লিংয়ে না ঘটে বরং এর চেইয়ে বেশি আমেরিকান ডলারে হওয়া শুরু করেছিল। ইকোনমিষ্টের উদ্দেশ্য হল, সেকালের ঘটনাবলি পাঠ করে সেখান থেকে একালে কোন আগাম অনুমান করা যায় কীনা! কতটা করা যায় ইত্যাদি। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে জিনিষটা সুনির্দিষ্টভাবে নিজের মত ঠিক করা লম্বা পা ফেলে আগাচ্ছে এবং যার উপর রাশিয়ার কোন হাত নাই তা নিয়ে প্রপাগান্ডা করা যে – “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন” বলে দামামা বাজানো যে কোন সময় বুমেরাং হতে পারে। বিশেষ করে আজকের রাশিয়ান অর্থনীতি হল, মাটির নিচের তেল-গ্যাস সম্পদ বিক্রি করে জমিদারি ফিউডাল দশায় যেন ফিরে যাওয়া অর্থনীতি, যার কোন শিল্প-ইন্ডাষ্টি ভিত্তি নাই। একালে রাশিয়ার যা আছে তুলনায় সেটা উন্নত শিল্প ভিত্তির ইউরোপের কোন রাষ্ট্র দূরে থাক, দক্ষিণ কোরিয়া লেবেলেরও নয়। সার কথায় রাশিয়ার পরাশক্তি ষ্টাটাস খুবই নড়বড়ে, কোন শক্ত শিল্প অর্থনৈতিক ভিতের উপর তা দাঁড়ানো নয় বরং তেল-গ্যাস বেচা অর্থনীতি। ফলে খুব সহজেই ৪০ ডলারে নেমে যাওয়া তেলের কারণে আর এর উপরে পশ্চিমা দেশের অবরোধে রাশিয়ার অর্থনীতি আরও চরম দুর্দশায় পড়েছে, পশ্চিম এঅবস্থায় রাশিয়াকে ফেলতে পেরেছে। সারকথায় আমেরিকান অর্থনীতি দুর্বল হয়ে তার বিশ্ব-অর্থনৈতিক অর্ডারে নিজের নেতৃত্বের স্থান থেকে চ্যুত হওয়াটা বাস্তবে চীন বা অন্যান্য রাষ্ট্রের রাইজিং অর্থনৈতিক অর্জনের মধ্য দিয়ে ঘটাবার, বাস্তবে করে দেখানোর মত কাজ। এটা প্রপাগান্ডা চালিয়ে অর্জন করার মত কাজ নয়। এছাড়া শকুনের বদ-দোয়ার কারণে বেশি বেশি করে গরু মরে ভাগাড়ে আসে না। এটা তো জানা পুরান প্রবাদের কথা। ফলে বদ-দোয়া দিয়ে, কামনা করে, প্রতিহিংসা দিয়ে আমেরিকান অর্থনীতিকে দুর্বল করা যাবে না। হবে না।
    এছাড়া বারবার যে কথা বলি, কোল্ড ওয়ার (১৯৫০-৯০) কালের চল্লিশ বছরে একটা বিশ্বযুদ্ধ লেগে যাবার সম্ভাবনা যত বেশি ছিল সে তুলনায় এখন বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা ঠিক এর উলটা, অর্থাৎ আরও কম। এর মূল কারণ সেকালে বিবদমান পক্ষ রাশিয়া-আমেরিকার মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্যে পুঁজি, পণ্য বা ভাবের লেনদেন বিনিময় তেমন কিছু ছিলনা বললেই চলে। দুটা দুই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন লেনদেনহীন অর্থনীতি ছিল। সে তুলনায় আজ রাশিয়া, চীন ও আমেরিকাসহ সবাই একই গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্থনীতির বিভিন্ন অংশ; পরস্পর পরস্পরের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যে পুঁজি, পণ্য বা ভাব ইত্যাদির লেনদেনে আষ্টেপৃষ্ঠে সংশ্লিষ্ট ও একে অন্যের উপর সরাসরি নির্ভরশীল। ফলে চীনের বোমায় আমেরিকা ধবংস হয়ে গেলে সেটাতে চীনেরই ক্ষতি হয় এবং তা আমেরিকার বোমার বেলায়ও ভাইস ভারসা। অতএব একটা বিশ্বযুদ্ধ ঘটে যাবার সম্ভাবনা এখন আগের মানে কোল্ড ওয়ার সময়ের চেয়ে তুলনামূলক ভাবে কম। অবশ্য এর অর্থ আবার এমন নয় যে বিশ্বযুদ্ধ ঘটতেই পারে না। ঠিক এই জিনিষটাই প্রতিফলিত হয়েছে এই সপ্তাহে তুরস্কের ক্ষেপনাস্ত্র হামলায় রাশিয়ান বোমারু বিমান ভুপাতিত হবার পরের পরিস্থিতি। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হওয়াতে ন্যাটোর ম্যান্ডেটের বাধ্যবাধকতায় বাকী সদস্য সারা পশ্চিমাদেশ তুরস্কের পক্ষে দাড়িয়েছে ঠিকই কিন্তু সাথে যোগ করা এক নিঃশ্বাসে বলা তাদের পরের বাক্যই হল – তুরস্ক ও রাশিয়া যেন আর উত্তেজনা না বাড়ার দিকে খেয়াল রাখে; এছাড়া আইএসের বিরুদ্ধে সকলের সমন্বয় গড়ে তোলা এখনকার করণীয়। ওদিকে মানবজমিনের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, যেসব বিশ্লেষণ মেনে সে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয় ছড়াচ্ছে তা সবই রাশিয়ান উৎসের বয়ান। যা এমনকি পারমানবিক যুদ্ধ বাধাবার ইঙ্গিত হুমকিতে ভরপুর। আসলে এটা রাশিয়ার এক নতুন যুদ্ধবিমান হারিয়ে এবার ইজ্জত ইমেজ রক্ষার ততপরতা মাত্র।
    আর আমরা? অনেক তো হল, এবার আমাদের পরিপক্ক হওয়া দরকার। একালে রাশিয়ান বেকুবি, রাষ্ট্রের মাফিয়াগিরি আর রাশিয়ান স্বার্থের প্রপাগান্ডা দূরে রেখে নিজ হুশ জ্ঞানে বাস্তবতা বুঝা ও ব্যাখ্যা করতে পারার তাকত অর্জন দরকার। আমাদের সে তৌফিক হোক এই কামনায় -।

     

    [লেখাটা আর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের ২৮ নভেম্বর সংখ্যায় এবং শেষের অংশ সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকায় ০৩ ডিসেম্বর সংখ্যায় এর আগে ছাপা হয়েছিল। এখানে তা নতুন করে আরও সংযোজন ও এডিট করে সর্বশেষ এডিটেড ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল।]

     

  • কানে পানি গেছে, এবার কী সত্যিই বাঘ এসেছে!

    কানে পানি গেছে,
    এবার কি সত্যিই বাঘ এসেছে!

    গৌতম দাস
    ০১ ডিসেম্বর ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-hR

    বাংলাদেশে “আইএস এসেছে, আইএস আসে নাই” মনে হচ্ছে এই ছুপাছুপি খেলার অবসান ঘটতে শুরু করেছে। ২৮ নভেম্বর শুরুর প্রথম প্রহরে চ্যানেল আইয়ের টকশোতে এসেছিলেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত। আলোচনার এক ফাঁকে তিনি সরাসরি উপস্থাপক মতিউর রহমান চৌধুরীকে বলেই ফেললেন,”দাবিক” ম্যাগাজিনটা দেখেছেন নিশ্চয়! বলা বাহুল্য, দৈনিক মানবজমিনের মালিক সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীই সম্ভবত সবার আগে তাঁর পত্রিকায় দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্টের রিপোর্ট ছাপিয়েছিলেন। বলা যায়, “আইএস আছে” দাবির পক্ষে প্রথম স্থানীয় মিডিয়ার স্বীকারোক্তি সেটা।

    আইএসের মুখপত্র বলা হয়ে থাকে বা স্বীকৃত মাসিক ম্যাগাজিন হলো দাবিক। বিদেশী গোয়েন্দা ইনটেলিজেন্স জগতে দাবিককে আইএসের মাসিক মুখপত্র মনে করা হয়। আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো থেকেও স্বীকারোক্তি মিলা শুরু হয়েছে। ওদিকে ভারতের অবস্থান বেশ তামাশার। অথবা বলা যায়, ‘দাবিক আইএসের মুখপত্র নয়’এমন উল্টা দাবি কোনো মহল থেকেই এখনো কাউকে করতে দেখা যায়নি। বিশেষত দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্ট ছাপা হবার পর। তবে মাস খানেক আগে “আইএস বলে কিছু নাই। সব জামাত এর কাজ।” এই ভাষ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা এজেন্সীর বরাতে বহু রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়া ০৬ অক্টোবর সংখ্যা। বাংলাদেশের ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো এই রিপোর্টের বরাতে নিজ নিজ পত্রিকায় পরের দিন লেখা ছাপিয়েছে। টাইম অব ইন্ডিয়া ভারতের ইন্টেলিজেন্স সুত্রের বরাতে আমাদেরকে ‘নিশ্চিত করছে’ বলে পত্রিকাটা দাবি করেছিল যে দুই বিদেশী হত্যায় আইএসের সংশ্লিষ্টতা নেই। সেই সাথে আমাদের জানিয়েছিল বাংলাদেশ সরকারের মতোই বরং একাজের জন্য তারা জামায়াতে ইসলামিকে দায়ী মনে করে।  ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল (অব.) সৈয়দ আতা হাসনাইন দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে একটি উপস্থাপনা দেন। তারপর প্রশ্নোত্তর পর্বে উপস্থিত একজন জানতে চান, বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি আছে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, আমার মনে হয়, বাংলাদেশে বিস্তৃতভাবে আইএস নেই। ভারত ও পাকিস্তানেও একইভাবে আইএসের বিস্তৃত উপস্থিতি নেই। হাসনাইন সাহেব ন্যদের চেয়ে একটু বুদ্ধিমান দেখা যাচ্ছে। তিনি যেন অস্বীকার করলেন না তবে বিস্তৃত উপস্থিতি নাই।  অথচ এক মাসও যায়নি, মনে হচ্ছে এবার কানে পানি ঢুকেছে। হিন্দুস্থান টাইমস ২৮ নভেম্বর লিখছে, বগুড়ায় হামলার ঘটনায় আইএস-সংশ্লিষ্টতা নেই, সরকারি এই দাবিকে সন্দেহের মুখোমুখি করেছে। এছাড়া ভারতের দি হিন্দু পত্রিকা দাবিক পত্রিকায় আইএসের বক্তব্য সিরিয়াসলি নিয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে “বেঙ্গল” নামে ঢাক দেয়াটাকে। এককথায় বললে ভারতে বড় সব প্রিন্টেড মিডিয়া আইএসের উপস্থিতি প্রসঙ্গে আগের অস্বীকার অবস্থান ছেড়ে স্বীকার করে রিপোর্ট করা শুরু করেছে।
    ভারতের মিডিয়ার অবস্থান তামশার বলছি আর এক কারণে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ভারতী জৈন নামের সাংবাদিক  ০৬ অক্টোবর (যে নিউজটা প্রথম আলো অনুবাদ করে ছেপেছে পরের দিন ০৭ অক্টোবর) ভারতের জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা লিখছেন, “জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের কার্যক্রম সারা বিশ্বেই আছে। দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চরমপন্থীদের সম্পৃক্ততা আছে—এমনভাবে প্রচার চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী; যেন কাজটি করেছে আইএস। এটি করা হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। জামায়াতে ইসলামীর এর পরের পরিকল্পনা হতে পারে, এটা দেখানো যে ‘হাসিনা সরকার বাংলাদেশে বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।” অথচ ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়া গত ১৫ সেপ্টেম্বর ভারতীয় জামাতে ইসলামির আর এক রিপোর্ট ছেপেছে। এম পি প্রশান্ত নামের সাংবাদিক লিখছেন, ভারতের জামাতে ইসলাম আইএসের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামতে যাচ্ছে। “Jamaat-e-Islami to launch campaign against ISIS” – এই হল ঐ রিপোর্টের শিরোনাম। কারণ ভারতীয় জামাত মনে করে আইএস ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে।  কারণ তারা অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছে। আর আইএসের খলিফাগিরিও এক নকল কারবার”। তাহলে এই রিপোর্ট থেকে বুঝা যাচ্ছে আইএস কে জামাত কিভাবে মুল্যায়ন জানা যাচ্ছে। তাহলে ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্টের বরাতে ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়ার – “বাংলাদেশে জামাতই আইএস” এই প্রপাগান্ডার মানে কী?

    সিরিয়ার উত্তরে আলেপ্পো প্রদেশের এক শহরের নাম দাবিক। এই নামের গুরুত্ব হল, বলা হয়ে থাকে কোনো এক হাদিসে এই শহরের নামের উল্লেখ আছে যে, এই শহরে রোমান অর্থাৎ খ্রিষ্টানদের সাথে মদিনা থেকে আসা সৈন্যদের শেষ লড়াই হবে। এবং ক্রুসেডাররা পরাজিত হবে। হাদিসের মত ওল্ড স্ক্রিপ্টে এই শহরের নামের রেফারেন্স থেকে সম্ভবত সে কথা স্মরণ করে আইএসের পত্রিকার নাম দাবিক রাখা হয়েছে। এর আগে দাবিকের প্রথম সংখ্যায় তাঁরা নিজেদেরকে পরিচিত করার প্রতীকী স্লোগান হিসেবে লেখা হয়েছিল, ‘আনটিল ইট বার্নস দি ক্রুসেডর আর্মিস ইন দাবিক অর্থাৎ “প্রত্যাদেশ মোতাবেক দাবিক শহরে খ্রিষ্টান ক্রুসেডর সেনাদের পুড়িয়ে শেষ করার আগে পর্যন্ত”।
    দাবিক যে কারণেই নাম রাখা হোক না কেন আমাদের প্রসঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল এই ১২তম সংখ্যাতেই প্রথম ‘বেঙ্গল’ নাম উল্লিখিত হয়েছে। মোট ৬৫ পৃষ্ঠার এই সংখ্যায় ৩৭ নম্বর পৃষ্ঠায় কোনো এক আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির রচিত একটা লেখা ছাপা হয়েছে। আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির ওই লেখার শিরোনাম “দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল”। ঐ রিপোর্টের লক্ষণীয় ব্যাপার হল, নামের মধ্যে বাঙালি ও বেঙ্গল শব্দের বহুল ব্যবহার। বাংলাদেশকে কেন “বেঙ্গল” নামে তারা ডাকছে এর একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা বা নোট দিয়েছে। বলছে ১৯৭১ এর আগের (সম্ভবত বুঝাতে চেয়েছে বৃটিশ আমলের বাংলা) ন্যাশনালিষ্ট বাংলাকে বুঝাতে তারা “বেঙ্গল” নামটা নিয়েছে। এথেকে আমরা আবার “তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি” বলে মিলিয়ে যেন ভুল না বুঝি। তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি ধরণের মোটেও নয়। বরং যেকোন ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদে তাদের আপত্তি সেজন্য।

    যাহোক সেটা, শুধু তা-ই নয় বাংলাদেশে আইএসের এফিলিয়েশন বা স্বীকৃতি দেয়া সংগঠন হিসেবে জেএমবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। আর বিএনপি (ন্যাশনালিস্ট মুরতাদ্দিন) এবং জামায়াতকে (পার্লামেন্টারি মুরতাদ্দিন) সংগঠন আর আওয়ামী লীগকে ‘তাগুতি সরকার’ হিসেবে চিহ্নিত ও ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া জেএমবির মূল নেতা আদালতের রায়ে ফাঁসিতে মৃত্যু হওয়া শায়েখ আব্দুর রহমানকে বীর শহীদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
    এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি ভাষ্যে দাবিক ম্যাগাজিনের বক্তব্যের সত্যতা বা এর অস্তিত্ব স্বীকার করে এমন বক্তব্য দেখা যায়নি। অর্থাৎ সরকারি ভাষ্য “বাংলাদেশে কোনো আইএস জঙ্গি নেই” এই বয়ান এখনো অটুট আছে। বাংলাদেশে নিরাপত্তাবিষয়ক এক গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামান অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি থাকার পক্ষে সম্ভাবনার কথা বলে গেছেন। এমনকি কাজের ধরন হিসেবে আইএস স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের এফিলিয়েটেড হিসেবে ঘোষণা করে ওই সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ভেতর দিয়ে নিজেরা হাজির থাকে সে কথাও বলেছিলেন। দাবিকের ১২তম সংখ্যা সম্পর্কে বাংলা দৈনিক মানবজমিনের রিপোর্টের পর আমেরিকার এনবিসি টিভি নেটওয়ার্কের বরাতে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকাও এক রিপোর্ট করেছে। মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামানের বরাতে প্রথম আলো ওখানেও লিখছে যে তিনি বলেছেন,‘যেহেতু আইএসের নিজস্ব প্রকাশনায় (দাবিক) বাংলাদেশ সম্পর্কে এত বিস্তারিতভাবে লেখা হয়েছে। তাই বিষয়টি আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। যদি এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে এদের প্রতিহত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’

    বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মিথ্যাগুলো অদ্ভুত। সরকার নিজেও জানে এটা মিথ্যা, আমরাও যে জানি সরকার এটা মিথ্যা বলছে, সেটাও সরকার জানে। কিন্তু এর পরেও সরকার নিজের মিথ্যা বয়ানটাকে আঁকড়ে থাকবে। আর আমাদেরকে বলতে থাকবে‘বুঝোই তো আমার বয়ান মিথ্যা, তবু আমাকে মিথ্যা বলতে সুযোগ দাও।’ তেমনই এক বয়ান হলো, ‘এই দেশে আইএস বলে কিছু নোই।’ দাবিকের ১২তম সংখ্যা প্রকাশের পর সরকারের এই মূল বয়ানে কোনো বদল আসেনি। তবে এখন কেবল বাড়তি যে কথাগুলো সরকারি বয়ানে যোগ হয়েছে তা হলো, কখনো বলে জামায়াত বা কখনো বিএনপি এগুলো করছে। কখনো বলে জামায়াত জেএমবির নামে করছে। কখনো বলে জামায়াত আইএস নাম দিয়ে করছে। প্রথম আলোর ওই রিপোর্টেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “এ দেশে আইএস বলে কিছু নেই। ইতালীয় নাগরিক তাবেলাকে বিএনপি নেতা কাইয়ুম তার ভাইকে দিয়ে শুটার ভাড়া করে হত্যা করেছে। তাদের কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এসব ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে তারাই আইএসের নামে এসব প্রচার করছে। এসব প্রচারণাকে আমরা গুরুত্ব দিই না”। অর্থাৎ আইএস নেই এখনো সে কথা আঁকড়ে ধরে আছে। তবে বাড়তি স্বীকারোক্তি হল, এক. আইএসের নাম দিয়ে অন্যেরা কেউ করছে। দুই. জামায়াত-বিএনপি এগুলো করেছে। এ কথা ঠিক যে জামায়াত-বিএনপিকে জড়িয়ে মিথ্যা বয়ান দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের আর একধরনের উদ্দেশ্য আছে। তা হলো, সরকারবিরোধী সাংবিধানিক ধারার বিরোধী দল জামায়াত-বিএনপির ওপর দমনপীড়ন বা চলতি গণগ্রেফতারের পক্ষে এক ন্যায্যতার বয়ান খাড়া করা। ফলে “আইএস আছে” স্বীকার করে নিলে জামায়াত-বিএনপির ওপর নিপীড়নের পক্ষে বয়ানের ভিত্তি থাকে না। এমনিতেই এ বয়ান জনগণ বা খোদ সরকার কেউ বিশ্বাস করে না। সবাই বোঝে এটা সরকারের মুখরক্ষার বয়ান মাত্র।
    তবে এ কথাও সত্যি যে, কিছু টেকনিক্যাল সমস্যাও আছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতা বিষয়ে সরকার কোনো স্বীকারোক্তি বয়ান দিয়ে দিলে কতকগুলো অসুবিধা ও জটিলতা সৃষ্টি হবে যেগুলো সরকার এড়াতে চায়। যেমন, কোনো দেশে ‘সন্ত্রাসবাদী’ তৎপরতা ও উপস্থিতি আছে, এমন অফিসিয়াল স্বীকৃতি থাকলে হয়ত বিদেশী দূতাবাস বা প্রতিষ্ঠানকে কিছু রুটিন নিরাপত্তা বিষয়ক করণীয় এমন পদক্ষেপ নিতেই হবে। যেমন, অতি জরুরি স্টাফ ছাড়া বাকিদের দেশে পাঠিয়ে দেয়া, ইমারজেন্সি উন্নয়ন কর্মসূচি ছাড়া বাকি সব তৎপরতা বন্ধ করে দেয়া, স্ব স্ব দেশের যেসব নাগরিক বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারি প্রকল্পে নিয়োজিত আছে নিরাপত্তার জন্য তাদেরকে দেশে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ ও চাপ দিতে হবে ইত্যাদি। আর এরই সার প্রভাবটা পড়বে বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্যে অর্থনীতিতে। তাই সরকার এসব বিপর্যয় হয়ত এড়াতে চায়। তবে অবশ্যই এমন স্বীকারোক্তি না দেয়ার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলকে দমনের কাজে এই বয়ানকে খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার মারাত্মক বিপজ্জনক এবং অগ্রহণযোগ্য।

    দুই.
    ইসলামি রাজনীতির পক্ষে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই কি তাকে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন বলা ঠিক হবে? এমনিতেই পশ্চিমের “টেররিজম” – এর সংজ্ঞাও কোন স্পষ্ট ভিত্তি নাই। এককথায় তা সাবজেকটিভ; আমি চাই তাই ধরনের। অনেকটা যেন আমি অমুক সংগঠনকে টেররিস্ট বলতে চাই তাই – এরকম। কিন্তু কেন বলতে চাই – এর কোন জবাব নাই,  বলব না, নিরুত্তর।  বিভিন্ন দলিলে বলা হয়েছে টেররিস্ট দল কারা এক তালিকা আছে। ঐ তালিকায় যাদের নাম আছে ওরাই টেররিষ্ট। এভাবে আসলে কোন সংজ্ঞা না দিয়েই টেররিজম কোনটা বা টেররিষ্ট কারা এর ছদ্ম ভিত্তি দাঁড় করানো হয়েছে। এটা আমেরিকান কায়দা। আবার ঠিক এই কায়দা অনুসরণ করে জাতিসংঘেরও এক নিজস্ব টেররিস্ট তালিকা ও কায়কারবার।
    তো যে কথা বলছিলাম, পশ্চিমা সংজ্ঞার দিক থেকে বিচারেও ব্যাপারটা সম্ভবত ঠিক তা নয় যে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই সে পশ্চিমের চোখে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন। বরং সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কার ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার কোথায় এই প্রশ্ন বিচারে আমরা ভিন্ন এক ভাগ-বিচার দাঁড় করতে পারি। যেমন, যেগুলো পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর যেগুলো তা নয় এমন দুইয়ের ভাগ-বিচারের মধ্যে বড় ফারাক হল, পাকিস্তানের ভূমিতে ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার আছে, এমন সংগঠন সম্পর্কে একটা অনুমান আমরা করতে পারি যে এসব সংগঠন নিজেদের এজেন্ডা যা-ই থাক, মাঝে মধ্যে পাকিস্তান সরকার বা এর গোয়েন্দা বাহিনীর দেয়া অ্যাসাইনমেন্টও সম্পন্ন না করে দিলে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ওসব সংগঠনের তৎপরতা পাকিস্তানের চলতে দেয়ার কথা নয়। যেটাকে আমরা বলতে পারি ট্যাক্স দিয়ে চলা। কারণ, সশস্ত্র সংগঠন মানেই যেকোনো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক আইনের চোখে তা বেআইনি তৎপরতাই হবে। ফলে সেই বেআইনি দিক উপেক্ষা করে কাজ করতে দিতে পারে একমাত্র সরকার বা এর কোনো এজেন্সি। কথাটা আরেকভাবে বলা যায়, সশস্ত্র ওসব সংগঠনের কোনো তৎপরতা যদি সরাসরি পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইচ্ছার সাথে সংঘাতের বিষয় হয়, তাহলে পাকিস্তান সরকার এসব সশস্ত্র সংগঠনকে নিজ ভূমিতে থেকে তৎপরতা চালাতে দিবে না। দিতে পারে না। এই বিচারে আলকায়েদা ও আইএস ছাড়া বাকি প্রায় সব সংগঠন পাকিস্তানভিত্তিক। ফলে পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর পাকিস্তানভিত্তিক নয়, এভাবে দুটো ভাগ আমরা করতে পারি।
    আবার পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোর আর এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল, এরা দুনিয়াব্যাপী তৎপরতার সংগঠন নয়। এমনকি এরা ঠিক আঞ্চলিক সংগঠনও নয়। মানে আমাদের অঞ্চলের সব রাষ্ট্রেই সংগঠনের শাখা ও তৎপরতা আছে তা নয় এবং সব সরকারের বিরুদ্ধে তৎপর এ কথাও সঠিক নয়। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রে তৎপর এবং এই অর্থে বলা যায়, বেশির ভাগই কাশ্মির ইস্যু কেন্দ্রিক সংগঠন। এটাই তাদের মূল কাজের এলাকা। তবে উপচে পড়া এফেক্ট হিসেবে বাংলাদেশেও এদের তৎপরতা থাকতে পারে। কিন্তু মূল কথা আলকায়েদা বা আইএসের সাথে সম্পর্ক বা এফিলিয়েটেড সংগঠন এরা কেউ নয়।
    তাহলে পাকিস্তানভিত্তিক আর আন্তর্জাতিক- এভাবে ভাগ দেখানোর আর এক কারণ হল, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো ৯/১১-এর আগেও হাজির ও তৎপর ছিল। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিজ নিজ স্বার্থে পরস্পরের বিরুদ্ধে এবং অপর রাষ্ট্রের ভেতর কাউন্টার ইনটেলিজেন্স বা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালানোর বহু পুরনো রেওয়াজের ধারাবাহিকতা সংগঠন। পশ্চিমা বা আমেরিকানরা যে অর্থে সন্ত্রাসবাদী বা টেরর সংগঠন বলতে বোঝে, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো এর পুরো অর্থ বহন করে না। অটল বিহারি বাজপেয়ির বিজেপি সরকার ২০০৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত  ভারতে ক্ষমতাসীন ছিল। পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোকে এরা সে সময় এক নতুন নামে ডাকত, বলত  “সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদ”। অর্থাৎ সীমান্তের অপর পাড় থেকে মানে পাকিস্তান থেকে যারা আতঙ্ক বা সন্ত্রাস ছড়াতে এসেছে। এই নাম খুবই অর্থপূর্ণ। পশ্চিম তাঁর সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদী বলতে যাদেরকে বোঝাতে চায় ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদীরা’ ঠিক সে সংগঠন এরা নয়।
    এসব বিচারে এবার স্পষ্ট করে বলা যায়, আলকায়েদা বা আইএসের সন্ত্রাসবাদ ভারত অথবা বাংলাদেশ এপর্যন্ত কখনও দেখে নাই। এর আগে কখনোই অভিজ্ঞতা নেয়া বা মোকাবেলা করতে হয়নি। মনে হচ্ছে, এবারই প্রথম করতে হবে। তাহলে এত দিন ভারতের ভোকাবুলারিতে সর্বক্ষণ যে জঙ্গিবাদের কথা শুনে এসেছি সেগুলো কী ছিল? দু’টি পয়েন্টের দিক থেকে তা ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রেওয়াজি অন্তর্ঘাতী তৎপরতা যেগুলো ছিল, আফগান যুদ্ধফেরত যোদ্ধাদের ফেরার কারণে যেটা আরো বড় মাত্রা পেয়েছিল; সেকালে নাইন ইলেভেন আমেরিকায় হামলার পর আমেরিকা ভারতের সমর্থন চাওয়াতে ভারত তার নিজ অভিজ্ঞতার ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদকে’ আমেরিকান বুঝের ‘সন্ত্রাসবাদ’ বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বলে চালানোর সুযোগ পেয়েছিল এবং নিয়েছিল। কিন্তু তবু ভারত অভ্যন্তরীণভাবে নিজস্ব মূল্যায়নে পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র তৎপরতা আর আন্তর্জাতিকভাবে আলকায়েদা ও আইএসের তৎপরতাকে পরিষ্কার আলাদা ভাগ করেই বুঝে থাকে। তবে এত দিন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সে তৎপরতায় ভারতের নিষ্ঠা আছে, অথবা বাংলাদেশে তার সিকিউরিটি স্বার্থ আছে এসব কথা ছড়িয়ে সে বাংলাদেশে নিজের পছন্দের সরকার রাখাকে জায়েজ করেছে। বিনিময়ে ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থ আদায় করা আর সবচেয়ে বড় স্বার্থ বাংলাদেশ থেকে মাগনা ট্রানজিট আদায় করা এগুলো চালু রেখেছে। আজ সম্ভবত সময় ঘনিয়েছে। কানে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতার বিপক্ষে ভারতের নড়াচড়া প্রস্তুতি নিতেই বা  করতেই হচ্ছে তাকে। আইএস তৎপরতার উপস্থিতি, হোক না তা স্থানীয় সংগঠনকে এফিলিয়েশন দেয়া তৎপরতা, এটা ভারতের পক্ষে আর কোনোভাবেই খাটো করে দেখা সম্ভব হচ্ছে না। এই জায়গায় এসে বাংলাদেশ সরকারের স্বার্থের পক্ষে ‘আইএস নেই’ সে কথা বলবার অবস্থায়  ভারত আর নেই। যদিও সর্বশেষ গত অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে দুই বিদেশী হত্যার পরেও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে তাল মিলিয়ে ও নিজের গোয়েন্দা তথ্যের সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিল আইএস নেই। একই সাথে এবার ভারতীয় মিডিয়াগুলোর ভোল বদলও লক্ষণীয়। অন্তত নিরাপত্তার প্রশ্নে এই ইস্যুতে হাসিনার বয়ান ও স্বার্থকে ভারত আর নিজের স্বার্থের সাথে মিলিয়ে দেখতে ও চলতে পারছে না।
    বলা বাহুল্য, ভারতের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ, নিরাপত্তাবিষয়ক জেনুইন কোনো হুমকি ইত্যাদি – এসবকে অন্য সব কিছুর ওপর তাকে স্থান দিতেই হয়। সবার আগে চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা।

    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে গতকাল ৩০ নভেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এরই ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আরও সংযোজন এডিট করে এখানে আজ আবার ছাপা হল।]

    সর্বশেষ এডিটঃ ০১ ডিসেম্বর, ভোর ০২ঃ৫২

  • ভারত-চীনের সাথে সম-সম্পর্ক রক্ষার মানে কী

    ভারত-চীনের সাথে সম-সম্পর্ক রক্ষার মানে কী
    গৌতম দাস
    ২৩ নভেম্বর ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-d1

    বাংলাদেশে যোগ দেয়া শ্রীলঙ্কার নতুন রাষ্ট্রদূত গত ১২ নভেম্বর বাংলাদেশের কূটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (ডিকাব) সাথে এক মতবিনিময়-বিষয়ক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে দৈনিক মানবজমিনে এক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে পরের দিন, গত ১৩ নভেম্বর। মানবজমিন লিখেছে, “ভারত ও চীনের সঙ্গে সমান সম্পর্ক রক্ষা করে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা দুই দেশ বেশি সুফল পেতে পারে” বলে মনে করেন ঢাকায় নিযুক্ত শ্রীলঙ্কান হাইকমিশনার ইয়াসোজা গুনাসেকেরা।
    রাষ্ট্রদূতের এই বাক্যের কথা আপাতভাবে খুবই সাদামাটা মনে হতে পারে; কিন্তু আসলে তা নয়। ওই বাক্যে গুরুত্বপুর্ণ শব্দ হলো, সমান বা সমান সম্পর্ক। অর্থাৎ তিনি চীন ও ভারতের সাথে শুধু সম্পর্ক রক্ষা নিয়ে কথা বলেননি, বলেছেন ‘সমান সম্পর্ক’ রাখার কথা। আর সমান সম্পর্ক রাখাটা হবে ‘বেশি সুফলের’, সে কথা তিনি বলছেন। কেন? সেটাই আজকের লেখার প্রসঙ্গ।

    গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিসরে এক বিস্তর পালাবদলের কালে
    এই শতকে দুনিয়াতে গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিসরে এক বিস্তর পালাবদল চলছে। আমেরিকার পরাশক্তিগত অবস্থান নড়বড়ে হওয়ার কথা আগেই শুনা গিয়েছিল এখন বাস্তবে ফলতে শুরু করেছে। কোনো রাষ্ট্র পরাশক্তিগত অবস্থান পায় বা দেখাতে পারে, যখন এর আগেই  অর্থনীতি শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে দেশটির অর্থনীতি প্রথম দুই বা বড়জোর তিন রাষ্ট্রের পর্যায়ে উন্নীত হয়ে গিয়ে থাকে। বলা যায়, দুনিয়ায় অর্থনীতিগত শ্রেষ্ঠত্বের অবস্থানের ওপর ভর করে কোনো রাষ্ট্র পরাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। অর্থনীতিগত অবস্থানের দিক থেকে চীন আমেরিকাকে কয়েক বছর ধরে ছাড়িয়েই যাচ্ছে বলেই আমেরিকার পরাশক্তিগত অবস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দ্বিতীয় আর এক ঘটনা হলো, বিশ্ব অর্থনীতিতে পুঁজিপ্রবাহের অভিমুখ পশ্চিম থেকে পুব দিকে এশিয়ামুখী হয়ে পড়েছে। দুনিয়ায় অর্থনৈতিক তৎপরতার মোকাম বা ভারকেন্দ্র হয়ে উঠেছে এশিয়া। এসবের মিলিত ফলাফলে এশিয়ায় আরো দুটো ইস্যু তৈরি হয়েছে। একটা আমাদের সাউথ এশিয়া অঞ্চলের ধরাধরি আর অন্যটা সাউথ চায়না সি বা চীনের প্রবেশ পথ দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চলের উত্তেজনা। এমন উত্তেজনার মূল কারণ বিশ্বে আমেরিকার পরাশক্তিগত প্রভাব কমে যাওয়া টের পেয়ে আমেরিকা নিজেই এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর কাছে নিজের সামরিক ক্ষমতাজাত সার্ভিস বিক্রির চেষ্টা করছে। সে এই বলে  এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোকে যে, চীনের নব উত্থান ও এর কোনো সম্ভাব্য খারাপ প্রভাব থেকে বাঁচতে তোমাদের সামরিক সহযোগিতা দরকার হবে। এই বরকন্দাজ হতে সার্ভিস দিতে চাই আমি। বিনিময়ে তোমরা আমার সাথে এক টিপিপি (ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে আমাকে ব্যবসায় দিবে। সাউথ চায়না সিকে কেন্দ্র করে আমেরিকার তৈরি করা দ্বন্দ্ব ও টেনশন ছড়ানোর বৈশিষ্টটা এ রকম।
    আর অন্য দ্বিতীয় বিষয়টা হল, আমাদের অঞ্চলে মানে, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলেরটা আর একটু অন্য রকম। বাড়তি আরো কিছু বৈশিষ্টের কারণে। সেটা হলো, আমেরিকা ভারতকে তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে বা পাশে আছে ধরনের ধারণা তৈরি করে  ভারত-চীনের দ্বন্দ্ব উসকে দিতে চাইছে। এটা করার সুযোগ নিতে পারছে কারণ ভারত ও চীনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দ্বন্দ্বের ইস্যু আছে। আর তা মূলত অসম সামরিক সক্ষমতার কারণে। ভারতের সামরিক সক্ষমতার ঘাটতি – যেটা আমেরিকা বিক্রি ও সরবরাহ দিবার উছিলায় সে ভারতের ঘনিষ্টতা চাইছে। আবার ভারতও সম্ভাব্য সামরিক বিরোধের কথা ভেবে আমেরিকাকে অস্ত্রের উৎস এবং বিরোধে অন্তত মধ্যস্থতাকারীর ভুমিকা নিতে পারে – এমন দরকার অনুভব করছে। এছাড়া ১৯৬২ সালের অভিজ্ঞতা ভারতের ভাল নয়। এসব মিলিয়ে সারকথায় চীন নিয়ে ভারতের ভীতি ও সন্দেহ আছে, আর আমেরিকা সেটাকেই ভালোমতো ব্যবহার ও উসকে দিয়ে রাখতে চায়। আবার চীন-ভারতের সম্পর্ক সবটাই বিরোধাত্মকতা নয়। বরং আর বিপরীত দিকে ভারত-চীনের পারস্পরিক ব্যবসায়িক সহযোগিতার প্রয়োজন এবং স্কোপ আছে। এবং সে সুযোগ পরস্পর নিচ্ছে। বাণিজ্য-ব্যবসায়ের দিক থেকে উভয়ের উভয়কে দরকার। কিন্তু আর এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আর এক দিক আছে। আমেরিকার নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে পরিচালিত চলতি অর্থনৈতিক গ্লোবাল অর্ডারটা যেটা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। BRICS ও AIIB ধরণের উদ্যোগের আবির্ভাব এর প্রমাণ। পুরানা অর্ডারটাকে ভেঙে আমেরিকার কর্তৃত্বের বাইরে এক নতুন গ্লোবাল অর্ডার দাঁড় করাতে ভারত ও চীনের একসাথে কাজ করা উভয়ের ভবিষ্যতের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ দিকটা খেয়াল করে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে ভারতের দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের দিকগুলো উদোম করে উসকানি দিয়ে প্রধান ও মুখ্য করে তোলার নীতি নিয়েছে। এসবের মিলিত প্রভাব ও ফলাফলে এশিয়া, বিশেষত আমাদের অঞ্চলে মূল তিন শক্তি আমেরিকা, ভারত ও চীন – এশিয়ায় পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ছে, টানাহিঁচড়া করছে, এশিয়ার বাদবাকি প্রত্যেকটা রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার প্রবল চেষ্টা করছে। এ অঞ্চলের প্রতিটা দেশের রাজনীতিতে এই তিন শক্তির প্রভাব তাই আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রবল। অন্য দিকে প্রতিটা দেশের ভেতরে প্রতিদ্বন্দ্বী মুল দু-তিনটা রাজনৈতিক দল থাকে, সম্পর্কের দিক থেকে এরা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। যদিও এটাই স্বাভাবিক। তবু অনেক সময় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্ব বিদেশী তিন রাজনৈতিক শক্তির দ্বন্দ্বের আলোকে সাজানো হয়ে যায়, জড়িয়ে যায়। যা হওয়া উচিত নয়। কারণ যার যার নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের দিক থেকে এমন অবস্থা মারাত্মক আত্মঘাতী।
    আমেরিকা, ভারত ও চীন এই তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের স্বার্থের লড়াই, পারস্পরিক শত্রুতা ইত্যাদি প্রত্যেকেই নিজ রাষ্ট্রস্বার্থে করছে, লড়ছে; এগুলো করারই কথা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল একটা বিষয় বাদে তা হবার কথা। তা হলো, আমেরিকার নেতৃত্বে-কর্তৃত্বে পরিচালিত চলতি অর্থনৈতিক গ্লোবাল অর্ডারটা ভেঙে নতুন গ্লোবাল অর্ডার দাঁড় করানো – এ বিষয়টায় চীন ও ভারতের কোর স্বার্থ একই।
    কিন্তু এতে আমাদের কী? এটা কী শুধুই আমেরিকা, ভারত ও চীন এই তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের নিজ নিজ স্বার্থের লড়াই যেখানে আমরা দর্শকমাত্র যার কিছুই আসে যায় না? না একেবারেই তা নয়। এটা দূরে দাঁড়িয়ে দেখা পরাশক্তিগত লড়াইয়ের মত নয়। আমাদের সুনির্দিষ্ট স্বার্থ আছে। এটাতে আমাদের মতো গরিব রাষ্ট্রসহ সবারই এখানে গভীর ও এক  কমন স্বার্থ আছে। গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময়ের চলতি বিশ্বব্যবস্থা যেটা আমেরিকার মত মোড়ল ও তার সাগরেদদের দিকে কান্নি মেরে সাজানো ও দাঁড়ানো ব্যবস্থা বলে যেটাকে আমরা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা বলে অভিযোগ করি – এরই তো ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা তৈরি হয়েছে। অল্প বিস্তর ভাঙ্গা শুরু হয়েছে। এটা পুরা ভেঙ্গে নতুন আসন্ন ব্যবস্থাটায় আমাদের জন্য কতটুকু কী রিলিফ দিবে তা তো কেউ এমনি দিবে না, আর তা বুঝে নিবার ব্যাপার ও কাজ আছে। সেজন্য আমাদের প্রথম কাজ হল, পরিবর্তনের অভিমুখ রবং কোথায় কী পরিবর্তন হতে পারে কতটুকু তা ঠিকমত বুঝে পদক্ষেপ নেয়া, নিজের অবস্থান নেয়া, দল জোট পাকানো ইত্যাদি। ফলে চীন ও ভারতসহ এই ইস্যুতে যারাই নতুন গ্লোবাল অর্ডার বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য বিনিময়ব্যবস্থা দাঁড় করানোর পক্ষে থাকবে তাদের পক্ষে থাকা আমাদের কাজ। এই ইস্যু বাদে অন্য সব বিষয়ে আমেরিকা, ভারত ও চীনের লড়াই আসলে তাদের নিজ নিজ একান্ত স্বার্থে নিজের লড়াই। আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থ তাতে নেই। অতএব সাবধান, এসব ধরনের লড়াইয়ে এই তিন শক্তির কোনো একটার পক্ষ নেয়া আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য বিপজ্জনক। বিশেষত এই তিন রাষ্ট্রের কোনো একটার কোলে ঢুকে অপর দুই অথবা কোনো একটার পক্ষে দাঁড়ানো আরো বিপজ্জনক। যেমন, চীনের কোলে বসে চীন-ভারতের বিরোধকে কাজে লাগিয়ে চীনের পক্ষ নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে চীনের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানো। অথবা ঠিক একই কাজ কিন্তু উল্টা ভাইস ভারসা – ভারতের পক্ষে জোটবদ্ধ হয়ে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। অর্থাৎ ভারত অথবা চীন কোনো একটার পক্ষ নিয়ে নিজের স্বার্থে অপরটার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো বা খেলার চেষ্টা – এটা অতিবুদ্ধিমানের গলায় দড়ির অবস্থাই তৈরি করবে।
    এ ধরনের ঘটনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাধারী দেশ হলো শ্রীলঙ্কা। সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। তার আগে আমরা খুঁজছি রাষ্ট্রদূতের ‘সমান সম্পর্ক’ কথাটার অর্থ ঠিক কী হতে পারে বা হওয়া উচিত।

    কী কী নির্ণায়ক মেনে চললে সেটা ‘সমান সম্পর্ক’ কথাটার অর্থ হবে :
    ০১. আমেরিকা, ভারত ও চীন – কোনো এক রাষ্ট্র অন্য দুইয়ের যে কারো উপর বাড়তি সামরিক স্ট্র্যাটেজিক সুবিধা পায়, এমন কাজে সহযোগিতা করার বিষয়কে বাংলাদেশের জন্য হারাম জ্ঞান করতে হবে।
    ০২. তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে অবশ্যই গভীরে নেয়া যাবে। কেবল কাউকে একচেটিয়া, বিশেষ করে অন্যকে বঞ্চিত করে একচেটিয়া বাণিজ্যিক সম্পর্ক করা বা দেয়া যাবে না।
    ০৩. এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় মাপকাঠি হিসেবে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি সিদ্ধান্তের মুখ্য বিষয় অবশ্যই নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ হতে হবে। এদিক থেকে তাকিয়ে কাজ করলেই তখন আর কোনো সিদ্ধান্তকে ‘কারো বিরুদ্ধে কাউকে বাড়তি সুবিধা’ দেয়ার জন্য করা হচ্ছে এমন হবে না। কেউ আঙুল তুলতেও পারব না।
    ০৪. এই তিন রাষ্ট্রের কোনো একটার সামরিক স্বার্থকে বাংলাদেশের সাথে করা ওর বাণিজ্যের সম্পর্ক আলাপ ডিলের ভেতর আনা যাবে না। সযত্নে দূরে রাখতে হবে। যেমন গভীর সমুদ্রবন্দর এটা একমাত্র বাণিজ্যিক বিষয়, পারস্পরিক একমাত্র বাণিজ্য সহযোগিতার বিষয় হিসেবে আসতে হবে। এর ভেতর কোনো ধরনের ইস্যু যেমন, সামরিক বিষয় আনা যাবে না। মিলানো যাবে না, হারাম জ্ঞান করতে হবে। বন্দর প্রজেক্টকে পরবর্তিতে কখনও প্রয়োজনে বা সময়েও সামরিক ব্যবহার করা যাবে না এই সুযোগ আগে থেকেই মুখবন্ধেই ঘোষণা দিয়ে নাকচ করে রাখতে হবে।
    ০৫. তিন রাষ্ট্রের কারো সাথে এমন কোনো সম্পর্কে যাওয়া যাবে না, যেটা দেশের নয় বরং ক্ষমতাসীন নিজ দলকে ক্ষমতা রাখতে সুবিধা পাওয়ার জন্য করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলকে মনে রাখতে হবে – কারণ এর অর্থ হবে, নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী দলকেও একই কাজ করতে উসকানি দেয়া ও আগাম নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট দিয়ে রাখা।
    ০৬. এই তিন রাষ্ট্রের যেকোন কারো কাছ থেকেই যেকোনো সামরিক হার্ডওয়ার অবশ্যই কেনা যাবে; কিন্তু কোনো সামরিক সহযোগিতা চুক্তি, যেটা বিশেষত অন্য দুইয়ের যেকোনো এক অথবা দুটোরই বিরুদ্ধে তৎপরতা মনে হয় এমনটতে জড়ানো যাবে না। যেমন, চীনা সাবমেরিন বা আমেরিকান হার্ডওয়ার বা পুরান নেভি আইটেম কেনা, বা অল্প দামে পাওয়া ঠিক আছে। কিন্তু এর বদলে অন্য দুই যে কোন রাষ্ট্রের সাথে কোন সামরিক সহযোগিতা চুক্তি বিশেষত যেটা এই তিনের অন্য যেকোন রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে যায় তা করা যাবে না।
    ০৭. কোনো “প্রতিহিংসায়” তিনের কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, পথ চলা বা পরিচালিত হওয়া যাবে না। তাতে অতীতে ওই রাষ্ট্র আমাদের নিজ দেশেরই কোনো এক রাজনৈতিক দলের সাথে বিশেষ খাতিরের সম্পর্ক রক্ষা করে থাকুক না কেন। এর কারণ, আমাদের কোথাও না কোথাও ফুলস্টপ বলতে হবে। কেয়ামত সে কেয়ামত সেটা চলতে দেয়া যাবে না। কারণ প্রতিহিংসার সূত্রে আবার ভবিষ্যতে এই তিনের আর এক রাষ্ট্রকে কোনো বিশেষ ফেবার দেয়া অথবা বঞ্চিত কোনোটাই দিতে করতে শুরু হতে দেয়া যাবে না। যেমন ভারতের এখনকার ভূমিকার জন্য প্রতিহিংসা করা যাবে না। ভারত অথবা চীনকে শাস্তি দেয়ার জন্য আমেরিকার সাথে কোনো সামরিক সহযোগিতায় জড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

    ওপরের এই সাতটা পয়েন্ট দিয়ে যা বলতে চাচ্ছি তা হল পুরা বিষয়টা বুঝিয়ে বলার সুবিধার জন্য কেবল। এটা অবশ্যই এই সাত পয়েন্টই সব কথা বা শেষ কথা, তা মনে করে নেয়া ভুল হবে।

    ঘটনার ব্যকগ্রাউন্ড শ্রীলঙ্কা
    শ্রীলঙ্কার পরপর দু’বারের বিগত সরকারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রাজা পাকসে। তার ক্ষমতায় আসার ঠিক আগে কয়েক যুগ ধরে চলে আসা শ্রীলঙ্কার তামিল বিদ্রোহকে তাঁর কালে প্রথম বলপ্রয়োগে দমন ও বিদ্রোহী সশস্ত্র গ্রুপকে সমূলে উৎখাত করে দেয়া হয়েছিল। এ কাজে চীনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা ছিল। জাতিসংঘে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ও এসংক্রান্ত চাপ সামলাতে ভূমিকা রেখেছিল দেশটি। ফলে বিদ্রোহ দমন-উত্তর পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কার পাকসের সরকারকে চাপ সামলানোর দিক থেকে চীনের খুবই উল্লেখযোগ্য সহযোগিতার ভূমিকা ছিল। এ ছাড়া আবার ঐ আমলে চীনের বিপুল বিনিয়োগও শ্রীলঙ্কায় এসেছিল। আর সর্বশেষ চীনের দুই সাবমেরিনের বহর তিনি শ্রীলঙ্কার বন্দরে নোঙর করতে দিয়েছিলেন। কী বয়ানে কী সম্পর্কে চীনা সাবমেরিন এসেছিল, তা সাধারণ্যে যথেষ্ট স্পষ্ট জানা না গেলেও ভারতের সরকারের ও মিডিয়ায় এর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল প্রবল। কারণ টেনশন কমিয়ে দূরে রাখার জন্য অনেক সময় ‘শুভেচ্ছা সফরেও’ নৌজাহাজ আমেরিকারটা চীনে অথবা চীনেরটা আমেরিকায় যায়। এমনকি আবার ‘যৌথ সামরিক মহড়াও’ হতে দেখা যায়।

    মুক্তামালায় ঘিরে ধরার গল্প
    এছাড়া  এ প্রসঙ্গে আর এক কথা বলা ভালো। বিগত ২০০৫ সালে বুশের আমলে ভারত-আমেরিকার বিশেষ সম্পর্ক শুরু হয়। এমনটা শুরু হওয়ার আগে ভারত সরকারের সামরিক, স্ট্র্যাটেজিক, নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলোয় থিংক ট্যাংক বা এমন বিষয়ে গবেষণা খাতের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ভারত সরকারি বিনিয়োগ খুবই কম ছিল। এরই অবসান ঘটেছিল, সামরিকসহ বহুবিধ খাতে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতা চুক্তির যুগ ২০০৫ সালে শুরু হলে থিংক ট্যাংক বা গবেষণা খাতেও আমেরিকা সহযোগিতা দেবে এমন চুক্তি হয়। ফলে প্রতিষ্ঠান গড়তে সহযোগিতা দেবে বা আমেরিকান থিংক ট্যাংক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ভারতীয় শাখা খুলবে, আমেরিকান পিএইচডি স্কলারশীপে বা কাজের খরচ যোগাতে স্কলারশিপে যৌথ গবেষণার কাজ করবে,   ইত্যাদি নানা কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। এতে আসল যে ঘটনাটা ঘটে যায় তা হল, আমেরিকান থিংক ট্যাংক-গুলোর বয়ান, দৃষ্টিভঙ্গি এরপর থেকে ভারতীয় ইনটেলেক্টদেরও বয়ান দৃষ্টিভঙ্গি হতে শুরু করে যায়। বিশেষত আমেরিকার চীনবিরোধী বা ক্যাম্পেইনমূলক যেসব প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোর বয়ান ভারতে ভালোমতো ছড়িয়ে পড়েছিল। আর সেসব বয়ানগুলোই আবার এদের লেখা কলাম বা বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য সুত্রে ভারতীয় মিডিয়াতে ছেয়ে ফেলে। যেমন চীন নাকি গভীর সমুদ্রবন্দর বানিয়ে ভারতকে চার দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। অথবা চীন ভারতকে সামরিক দিক থেকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা নিয়েছে। লাফলে ভারতীয় মিডিয়ার কল্যাণে এগুলো অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ও পপুলার প্রপাগান্ডা এবং একচেটিয়া বয়ান হয়ে দাঁড়ায়। যদিও এই প্রপাগান্ডা বয়ানের দুর্বল দিক হল, যেন গভীর সমুদ্রবন্দর বানানো বিষয়টা সামরিক উদ্দেশ্যেই একমাত্র হয়, এটা ধরে নেয়া হয়েছে। অথচ বন্দর বানানোর প্রধান উদ্দেশ্য অবশ্যই হতেই হয় বাণিজ্য। বাণিজ্য উদ্দেশ্য সাধিত হবার পরে পড়ে পাওয়া সুবিধা হিসাবে সামরিক কাজে এর ব্যবহার এটা অপ্সহনাল ব্যাপার। কখনই মুল উদ্দেশ্য হয় না। কারণ একমাত্র বাণিজ্যিক আয় দিয়েই কোন বন্দর বানানোর কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিপুল খরচ তুলে আনা সম্ভব। সে জন্য বাণিজ্যই একমাত্র ও  মুখ্য উদ্দেশ্য হতে বাধ্য। যদিও এরপর বন্দর মালিক রাষ্ট্রের অভিপ্রায় থাকলে এর দ্বৈত ব্যবহার হিসেবে সামরিক কাজে তা ব্যবহার হতে পারে। কিন্তু যদি বলা হয় কেবল ভারতকে ঘিরে ফেলার উদ্দেশ্যেই এই গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো করা হচ্ছে, তবে তা সত্যের অপলাপ এবং প্রপাগান্ডাই হবে। এ ছাড়া মুক্তোর মালা বা ঘিরে ফেলা বলতে যে ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে, সেটাও কতটা সত্যি তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
    এপর্যন্ত পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় দুটো গভীর সমুদ্রবন্দর হয়েছে, তাতেই মুক্তোর মালা বা ঘিরে ফেলা বয়ান শুরু হয়। বাংলাদেশের সোনাদিয়া তখনো আলাপে আসেনি।বা এখনও বাস্তবায়নের আলাপ নাই। কিন্তু এই প্রপাগান্ডায় যে ফ্যাক্টসকে পরিকল্পিতভাবে আড়াল করা হয় তা হল, চীনের উত্তরপুর্ব দিক ছাড়া বাকি তিন দিকের ভুখন্ড ল্যান্ড লকড – ভুবেষ্টিত। সমুদ্রে বের হবার পথ নাই। বিশেষ করে চীনের পুরা দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পুর্ব দিক পাহাড় পর্বতে অগম্য। তবে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পুর্ব সীমান্ত পুরাপুরিভাবে ল্যান্ড লকড হলেও তা ছুটাবার কিছু সুযোগ আছে। যদিও ওসব দিক দিয়ে কোন সমুদ্রে বের হওয়ার উপায় নেই, কিন্তু চীনের পশ্চিম, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব (কুনমিং) অঞ্চলের মানুষকে পুরা চীনের সাথে সমানতালের বিকাশে আনতে চাইলে চীনকে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশকে বন্দর বানিয়ে দিয়ে ওই বন্দর নিজেরও বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্রেতা হিসেবে হাজির হলে তা উভয় দেশেরই লাভ হতে পারে। যার মূল কারণ চীনও ওসব বন্দরের ব্যবহারকারি হবে বলে এই অর্থে বিনিয়োগ পরিকল্পনার খরচ তুলে আনা ভায়াবল হয়, তাই। অন্য দিকে চীনেরও ল্যান্ড লকড দশা ঘোচে। অর্থাৎ মুক্তোমালার গল্প থুয়েও আমরা এর ভিন্ন ও আর এক বয়ান পেতে পারি। অর্থাৎ পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও সম্ভাব্য বাংলাদেশ এই তিন দেশ যদি বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগ চীনকে দেয় তবে সবারই বাণিজ্যিক লাভ হয়। তাই চীনের ল্যান্ড-লকড দশার দিকে নজর না দিয়ে কেবল ভারতকে ঘিরে ধরার জন্য এই বন্দর নির্মাণ করছে এই বয়ান খুবই নিম্নমানের প্রপাগান্ডা। এখন এই তিন দেশ যদি বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগের উপরে চীনকে সামরিক ব্যবহারের সুযোগ খুলে তখন ভারতের প্রপাগান্ডা অর্থপুর্ণ হতে পারে। আপাতত এবিষয়ে  কোন সামরিক সহযোগিতা চুক্তির ছায়া চিহ্নও নাই।

    গল্পের বিকল্প ও বুদ্ধিমান হওয়া
    তবু ভারতের মনে সন্দেহ আছে এটা বাস্তবতা। এই আলোকে ভারত বুদ্ধিমানভাবে ইতিবাচক হতে পারে। যেমন এসব বন্দর ব্যবহারের চুক্তি যেন অ-সামরিক থেকে যায় এই স্বার্থকে লবি বা পারশু করা। বিশেষত ভারতও ওসব বন্দর ব্যবহারকারি হয়ে নাম লিখানো সবচেয়ে ভাল। সেক্ষেত্রে ঐ বন্দর “কেবল বাণিজ্যিক কাজেই” ব্যবহারকারি সকলে ব্যবহার করবে একথা মুখবন্ধ ঘোষণায় অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া সহজ। যেমন  বাংলাদেশের বেলায় তো এটাই সহজ পথ।
    বিশেষ করে যেমন, বাংলাদেশে কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর যদি হয়, তবে বাস্তবতই এর ব্যবহারকারী হবে চীন ও ভারত উভয়েই। কারণ এরা উভয়েই – চীনের বেলায় ওর দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব অংশ (কুনমিং) এবং ভারতের বেলায় ওর পুরা সাতভাই পূর্ব দিক ল্যান্ড লকড। কারণ এখানেও আবার বন্দরের ব্যবহারকারী বেশি হবে বলে বন্দর বানানোর বিনিয়োগ খরচ তুলে আনার সম্ভাব্যতা সম্ভাব্য এই বন্দরের সবচেয়ে ভালো এবং কম সময়ে ঘটবে। আর সে জন্য এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, বাংলাদেশকে আগেই ঘোষণা করে বলতে হবে এবং বলা সম্ভব যে বিদেশীদের এই বন্দরের সামরিক ব্যবহার নিষিদ্ধ। কারণ যে বন্দরের সম্ভাব্য ব্যবহারকারী চীন ও ভারত উভয়েই, সেখানে একমাত্র আগেই নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়ে তবেই এই প্রকল্প নেয়ার পথে আগানো সম্ভব।

    যা-ই হোক, আমাদের শ্রীলঙ্কা প্রসঙ্গে ফিরে যাই।  শ্রীলঙ্কার হাম্বনটোটা গভীর সমুদ্রবন্দর এমনিতেই অনেক আগে থেকেই ‘মুক্তামালায় ঘিরে ধরার’ প্রপাগান্ডার শিকার। এর ওপর আবার শ্রীলঙ্কায় চীনা সাবমেরিন আসাটা, বোঝা যায় এটা যথেষ্ট সেনসিটিভিটি বা সতর্কতার সাথে করা হয়নি, তা আজ বলাই বাহুল্য। এর ফলাফল হয়েছিল মারাত্মক। শ্রীলঙ্কার গত নির্বাচনে রাজাপাকসেকে সরাতে ভারতের বিশেষ হস্তক্ষেপ তৎপরতার অভিযোগ পাকসে ক্যাম্প থেকে উঠেছিল। শ্রীলঙ্কায় পরপর দু’বার নির্বাচন ঘটিয়ে পাকসের বিপরীত ক্যাম্প ‘চীনের সে বাড়তি প্রভাব’ দূর করেছে। আপাতত নতুন সরকার থিতু হয়েছে। সেসবের বিস্তারে এখানে না গিয়েও বলা যায়, রাজা পাকসের অতিরিক্ত চীনের দিকে ঢুকে যাওয়ার অভিযোগ কমবেশি সত্য। এই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেই শ্রীলঙ্কার নতুন রাষ্ট্রদূত সম্ভবত বলেছেন, ‘ভারত ও চীনের সাথে সমান সম্পর্ক রক্ষা করে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা দুই দেশ বেশি সুফল পেতে পারে।’
    আবার সমান সম্পর্ক বলতে এক ধরণের ভারসাম্যমূলক এক সম্পর্কের কথা তিনি বলছেন। কিন্তু এখানে সমান মানে ‘সমান দূরে’ ঠিক তা নয়। আবার ভারসাম্য বলতেও লাঠির এক দিকে চীনকে, অন্য দিকে ভারতকে বেঁধে কাঁধে নেয়ার ভারসাম্য ঠিক তাও নয়। বরং ওপরে যে সাতটি পয়েন্ট উল্লেখ করেছি সে আলোকে এটা বোঝা যেতে পারে। যার সারকথা হলো, বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কাকে ভারত-চীনের দ্বন্দ্ব অবিশ্বাস ও সন্দেহের ভেতরে, ওর অংশ হওয়া যাবে না। এটা ভুল হবে। এই অর্থে এটা সমান সম্পর্ক বা ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক।

    সতর্কতা
    এ ছাড়া মনে রাখতে হবে, এ কালের যেকোনো দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সম্পর্ক সব সময় বিশেষ। েই অর্থে যে, তা কোনভাবেই আর আগের দিনের (১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার আগের) মত নয়। কোনোভাবেই তা রাশিয়া-আমেরিকার কোল্ড ওয়ারের কালের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝার চেষ্টা করা যাবে না, গেলে ভুল হবে। স্পষ্টতই কারণ এখানে চীন-ভারতের দ্বন্দ্বের কথা যেমন বলা হচ্ছে ঠিক, তেমনই সেই চীনের সাথেই আবার মোদি সরকারের আমলে ভারতের ২০ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছে, কাজ চলছে। চীন-ভারত উভয় পক্ষের বাণিজ্যের বাজার ৭০ বিলিয়ন ডলারের কম নয়। এ দিকগুলো মনে রেখে ভারত-চীন সম্পর্ক বুঝতে হবে।

    অস্থির উথালপাথাল সময়ে বুদ্ধিমান প্রুডেন্ট হওয়াই একমাত্র ভরসা।

    [এই লেখাটার আগের ভার্সান দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। সেটা আরও পরিবর্তন, সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল]

  • ১. ল্যাণ্ড-লকড নেপালঃ অতীত ও বর্তমানের ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতা

    ১. ল্যাণ্ড-লকড নেপালঃ অতীত ও বর্তমানের ঔপনিবেশিক ধারাবাহিকতা
     গৌতম দাস
    http://wp.me/p1sCvy-cO

     [এখানে তুলে আনা আমারই লেখা  আগে ১১ অক্টোবর ২০১৫ ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায়। এখানে হুবহু কাট পেস্ট করে তুলে আনা হয়েছে – কপি সংরক্ষণের জন্য আর আমার এখানের পাঠকদেরকেও জানানোর জন্য। ]

    নেপালি জনগণের নতুন গঠতন্ত্র প্রণয়ন এবং গঠনতান্ত্রিক সভায় তা অনুমোদন ও গ্রহণ নেপালের প্রতি বাংলাদেশে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নেপালের জনগণ সম্পর্কে জানা এবং বোঝা বাংলাদেশের জন্য জরুরী। লেখা কোথা থেকে শুরু করতে হবে সে এক জটিল বিষয়। নেপাল প্রসঙ্গের ডাইমেনশন অনেক। অনেক দিক থেকে প্রসঙ্গ তুলে কথা বলতে হবে। আবার সব মিলিয়ে এক সামগ্রিক অর্থপুর্ণ চিত্র সাজিয়ে তোলা দরকার। কোন বিষয়ের পরে কোন বিষয় কতোটুকু আসবে সেটাও গুরুত্বপুর্ণ। সেসব নিয়ে তথ্য জোগাড় করা, চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্তে আসা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। সর্বোপরি কিভাবে আনলে তা সহজে বাংলাদেশের পাঠকের বোধগম্যতায় আনা যাবে সেই বিষয়েও ভাবনার দরকার আছে। নেপাল নিয়ে বিভিন্ন বিষয় ধরে ধরে আলোচনা এখানে আলাদা আলাদা কিস্তি হিসাবে পেশ করা হচ্ছে।

    নেপালের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সরাসরি তার ভূগোল অর্থাৎ ল্যান্ডলক হবার সঙ্গে জড়িত। ল্যান্ড-লকড হবার কারনেই নেপাল পড়শি রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে এক প্রকার অদৃশ্য অথচ ব্যবহারিক-বাস্তবিক অর্থেই কলোনী বা ঔপনিবেশিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। নেপালের জনগণের লড়াই সে কারণে নেপালের ভৌগলিক অবস্থান দ্বারা নির্ধারিত ঔপনিবেশিক সম্পর্ক থেকে মুক্তির লড়াই — অসম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক থেকে মুক্ত হতে চাওয়ার আদর্শ উদাহরণ।

    জাতিসংঘের অধীনে এমন রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষার পক্ষে আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশন প্রণয়ন ও কর্মসুচী গ্রহণের উদ্যোগ চলছে। জাতিসংঘের আঙ্কটার্ড এর অধীনে নিবন্ধিত এমন ল্যান্ডলক রাষ্ট্রের সংখ্যা ৩১ টা। আঙ্কটার্ডের অধীনে ২০১৪-২৪ সালের মধ্যে অর্জন করতে হবে এমন কিছু প্রোগ্রাম আছে। নেপাল ইতোমধ্যেই ঐ কর্মসুচী নেপালে বাস্তবায়নের দাবী তুলেছে, আন্তর্জাতিক সংগঠনের দৃষ্ট আকর্ষণ করেছে।

    নেপাল ও ভারতের বিরোধ বৃটিশ কলোনী মাস্টার ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমল থেকে। আর এর উৎস হচ্ছে নেপাল ‘ল্যান্ডলক’। ভূমিবেষ্টিত। ফলে অন্য দেশের ভিতর দিয়ে যাওয়া ছাড়া সরাসরি সমুদ্রে বা সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের কোন উপায় তার নাই। তাই ল্যান্ড লক কথাটার সহজ অর্থ হচ্ছে যে দেশের সমুদ্র বন্দর নাই। এই বাস্তবতায় থেকে মুক্তি চাওয়া থেকেই ভারতের সঙ্গে নেপালের সংঘাতের সূত্রপাত। ভূগোল কিভাবে রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের নির্ণায়ক হয়ে ওঠে নেপাল তার ভাল একটি নজির। ফলে ভারত যতই অসংখ্য রাজার রাষ্ট্রের বদলে সংগঠিত একক কোন কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে বড় রাষ্ট্র হয়ে হাজির হয়েছে ততই সেই একক ভারত নেপালকে ল্যান্ডলক দেশ হিসাবে হাজির করেছে। আর নেপালকে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে দেবার বিনিময়ে নিজের ‘করদ’ রাজ্যে পরিণত করে রাখার সুযোগ বেড়েছে, বা রাখা সহজ হয়েছে। মোগল আমলে অবশ্য এমন সমস্যার কথা জানা যায় না।

    ভারত ১৭৫৭ সালে বৃটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর অধীনে দখল ও গোলাম হয়ে যাবার পর থেকে এর প্রভাব নেপালের উপর হয় মারাত্মক। নেপাল ও বৃটিশদের (ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর) যুদ্ধ যা এংলো-নেপালিজ যুদ্ধ নামে খ্যাত তা চলেছিল ১৮১৪-১৬ সাল, দুবছর ধরে। যুদ্ধের ফলাফল কোম্পানীর পক্ষে যায়। ফলে এই যুদ্ধ শেষে বাস্তবে করদ রাজ্যের মত বৃটিশদের সাথে চুক্তির কিছু শর্ত সাপেক্ষে নেপালকে সীমিত স্বাধীনতা মেনে নিতে হয়। এই চুক্তির নাম সুগৌলি চুক্তি ১৮১৬ (Treaty of Sugauli)। এটা নেপালকে “ভাগ করে নেয়ার চুক্তি” বলেও পরিচিত। কারণ ঐ চুক্তি অনুসারে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নেপালের ভুমি — বিশেষত যেগুলো কোম্পানীর চোখে ষ্ট্রাট্রজিক গুরুত্বসম্পন্ন বলে মনে করা হয়েছিল সে ভুমিগুলো বৃটিশ-ভারতের সাথে রেখে দেওয়া হয়। যেমন দার্জিলিং, সিকিম, পুরানা কুমাউন রাজত্ব, গোড়য়াল রাজত্ব, আজকের উত্তর ভারতের মিথিলা, নৈনিতাল এবং আজকের নেপালের হটস্পট দক্ষিণে সমতলী তরাই এলাকার বেশীর ভাগ অংশ – নেপালের এইসব এলাকা।

    Sanguli

    এছাড়া নেপালের গোর্খা অঞ্চল থেকে কোম্পানী নিজের সেনাবাহিনীর জন্য অবাধে জনবল সংগ্রহ করতে পারবে, কোম্পানী ছাড়া আর কোন পশ্চিমা নাগরিকের নেপালে আনাগোনা্র উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় – এগুলো শর্তও ছিল।

    বৃটিশ কোম্পানীর প্রবল ক্ষমতা ও আধিপত্যের মুখে নেপালের রাজা তোষামোদীর ছলে বৃটিশ নীতি সমর্থন করে তাদের খুশি করার বিনিময়ে নিজের কাজ উদ্ধার করার রাস্তা ধরেছিল। ফলে পরবর্তিতে ১৮৫৭ সালে বৃটিশ-ভারতে সিপাহী বিদ্রোহের সময় নেপালের রাজা কোম্পানীর পক্ষে অবস্থান নেয়। বিদ্রোহ দমন শেষে এতে খুশি হয়ে বৃটিশ কোম্পানী (ততদিনেবৃটিশ-রাজ শাসক সরাসরি কোম্পানী অধিগ্রহণ করে নেয়) নেপালের পুরা এক তৃতীয়াংশ ফেরত নেয়, তবে ব্যাঙ্কে, বারদিয়া, কাইলালি, কাঞ্চনপুর এসব আগের নেপালের জেলা ও এভাবে তড়াই সহ কিছু অঞ্চল নেপালী রাজাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। তা সত্ত্বেও সিকিম এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।

    এভাবে পরবর্তিতে ১৯২১ সালে আরও কিছু ছাড় আদায়ের পরিস্থিতির উদয় হয়। মূলত সেটা ঘটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ সরকারকে নেপালের রাজার দেয়া সমর্থন ও সার্ভিসের কারণে। ফলশ্রুতিতে ১৯২৩ সালে “নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯২৩” স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি আগের সুগৌলি চুক্তিকে প্রতিস্থাপিত অর্থে বাতিল করছে বলে লেখা হয়েছিল। সাত দফার এই চুক্তিতে প্রথমেই নেপালকে স্বাধীন দেশ বলে মেনে নেওয়া হয়। বৃটিশদের সাথে আগের সমস্ত চুক্তির বন্ধন থেকে মুক্ত করে দেয়া হয়। অর্থাৎ এখন থেকে একমাত্র চুক্তির বাঁধন ১৯২৩ সালের চুক্তি। এর দ্বিতীয় দফা বলছে, বৃটিশ-ভারতের স্বার্থহানি ঘটে এমন অবস্থা দেখা দিলে তা আগাম বৃটিশদেরকে নেপাল জানাবে যাতে এথেকে কোন সংঘাত বা ভুল বুঝাবুঝি তৈরি না হয়। একে অপরের নিরাপত্তার দিক খেয়াল রেখে অন্যের ভুমি ব্যবহার করবে। অর্থাৎ নেপালের আলাদা স্বাধীন কোন নিরাপত্তা নীতি থাকতে পারবে না। নেপাল ভারতের ভিতর দিয়ে অস্ত্রশস্ত্রসহ যে কোন মালামাল আমদানী করতে পারবে – যতক্ষণ বৃটিশ-ভারত মনে করবে নেপালের আচরণ বন্ধুত্বপুর্ণ এবং ভারতের জন্য তা হুমকি নয়। মালামাল আমদানিতে ভারতের বন্দর ব্যবহারের সময় ভারত সরকার আবার এর উপর কোন শুল্ক আরোপ করবে না, অবাধে কেবল বন্দর ফি দিয়ে নেপাল যে কোন পণ্য আমদানি করতে পারবে। এই ছিল চুক্তির সারকথামূলক দিক।

    অর্থাৎ ১৯২৩ সালের এই চুক্তিতে দেখা যাচ্ছে ইতোমধ্যে বৃটিশ স্বার্থের পক্ষে সবসময় নেপালের রাজার অবস্থান নেয়া এবং সার্ভিস খেদমতে সন্তুষ্টি হবার পরই এবার ল্যান্ডলক নেপালের স্বার্থের ব্যাপারে কি করা যায় এটা এখানে এবারের চুক্তিতে মুখ্য হয়ে ভেসে উঠতে পেরেছে। এই চুক্তির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট হল – আগের দিনের করদ রাজ্য বা প্রিন্সলি ষ্ট্রেটের ধরণটা হত – প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয় দুটাকেই বৃটিশ কলোনী মাস্টারের হাতে ছেড়ে দেওয়া; আর সাথে কিছু রাজস্ব শেয়ার করা। এই দুটো করলে তবেই বৃটিশ আমলে করদ রাজ্যের রাজা হয়ে থেকে যাওয়া যেত। কিন্তু ল্যান্ডলক নেপালের রাজার বেলায় বৃটিশরা যে ফর্মুলা অনুসরণ করেছিল তা হল, সাধারণভাবে “মাস্টারের সন্তুষ্টি” সাপেক্ষে রাজার দেশ সবই করতে পারবে। এভাবে বলার সুবিধা হল, অসন্তুষ্টির [এই আবছা অস্পষ্ট গ্রে এরিয়ার সুযোগে] কথা বলে যে কোন প্রদত্ত সুবিধাই যে কোন সময় প্রত্যাহার করে নেয়া যায়।

    সামগ্রিকভাবে এভাবেই নেপাল বৃটিশ মুখাপেক্ষি থেকে যায়। অন্যদিকে আবার বৃটিশ-ভারতের ভুমি ব্যবহার করে নেপালের বাইরের সাথে সব ধরণের যোগাযোগের অধিকার বৃটিশ কলোনী মাস্টার নিজে একেবারে যেচে না চাইতেই চুক্তিতে উন্মুক্ত করে রেখেছিল। বৃটিশদের এতে সুবিধা হল, বিনিময়ে নেপালের সর্বত্র ভারতের বিচরণের সুযোগ অবধারিত হয়ে যায়। অথচ নেপালের দিক থেকে দেখলে ভারতে প্রবেশ এবং ব্যবহারের সব সুবিধা থাকা নেপালের রাষ্ট্রস্বার্থ হিসাবে জরুরি না হলেও এবং নিজের পক্ষে তা কাজে লাগাতে অক্ষম হলেও তা তাকে নিয়েছি বলতে হচ্ছে। কিন্তু সমতুল্য সুযোগ ভারতকে দিতে হচ্ছে। এই সুযোগে ভারতের একচেটিয়া বাজারে পরিণত হওয়া ছাড়া নেপালের আর কোন গতি থাকছে না।

    দুনিয়ায় এখন জাতিসংঘ আছে, এই কালে কোন রাষ্ট্রকে কলোনী করে রাখা কোন দখলদারের পক্ষে খুব আরামের বা সুখকর অনুভুতি নয়। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ব্যাপারটা এমনকি ন্যায্য বলেও এক ধরণের সম্মতি পেতে দেখা যেত। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের কলোনী যুগের বিচারে ১৯২৩ সালের চুক্তিটা নেপালের আগের যে কোন চুক্তির চেয়ে্ তুলনায় কাম্য ছিল। কিন্তু এখনকার বিচারে এটা একেবারেই কাম্য নয়।

    ঐ চুক্তিতে কবে এর কার্যকারিতা শেষ হবে এমন তারিখ উল্লেখ করা ছিল ৩১ জুলাই ১৯৫০। বৃটিশরা ১৯৪৭ সালে ভারত ছেড়ে চলে গেলে স্বভাবতই চুক্তির আইনী দায় এবং দায়িত্বের মালিক হয় নেহেরুর ভারত। কিন্তু নেহেরুর গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত নিজের জন্য কলোনীতন্ত্র উৎখাত হয়ে যাবার ষোল আনা সুবিধা নিলেন। কিন্তু নেপালের বেলায় সেটা হতে দিলেন না। নেপালের কলোনী মাস্টার হিসাবে বৃটিশের জায়গায় নেহেরুর ভারতকে বসিয়ে নিলেন। ফলে বৃটিশ কলোনী নেপালের সাথে চুক্তির ক্ষেত্রে যে নীতিগত দিক অনুসরণ করেছিল সবজায়গায় সেটাই হুবহু নীতি নেহেরুর ভারত অনুসরণ করেছিল। নেপালকে গণপ্রজাতন্ত্রী-ভারতের কলোনী করে রাখার কোন সুযোগ নেহেরু হারাতে চান নাই। তাই পুরাণ চুক্তির নীতিগত আদলে নতুন করে “১৯৫০ জুলাইতে ভারত-নেপাল তথাকথিত মৈত্রী ও বন্ধুত্ব চুক্তি” করা হয়। এবার চুক্তিতে দশটা পয়েন্ট। কিন্তু সার কথা হল একই – সন্তুষ্টি বা ভারতের নিরাপত্তার কথা তুলে নেপালকে ভারতের মুখাপেক্ষি করে রাখা। যেদিকটা মাথায় রেখে চুক্তির খসড়া করা হয়েছে তা হল, নেপালের কোন স্বাধীন পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা বা অর্থনীতি – এককথায় কোন স্বাধীন নীতিই যেন সম্ভব না হয়। নেপাল যেন ভারতের মুঠো থেকে বেরিয়ে না যায় – যেটা কলোনি আমলে করদ রাজ্যের বেলায় অনুসরণ করা হত। মোটাদাগে বললে, ১৯৫০ সালের চুক্তি পুরানা ১৯২৩ সালের চুক্তিরই প্রতিচ্ছবি। কেবল “বৃটিশ” এই শব্দের জায়গায় যেন ভারত বসানো। প্রথম পাঁচ দফাও প্রায় হুবহু এক। নেপাল বাইরে থেকে অস্ত্র ও যুদ্ধের মালামালসহ যেকোন মালামাল আনার অনুমতি প্রসঙ্গে পুরান চুক্তিতে বৃটিশ “সন্তুষ্টির” কথা বলা হয়েছিল। এখানে কায়দা করে বলা হয়েছে সবই আনতে পারবে। কিন্তু কি ব্যবস্থাপনায় তা আনতে পারবে তা চুক্তিতে স্পষ্ট বলা নাই। সে প্রসঙ্গে বলা হয়েছে সেটা চুক্তির বাইরে প্রত্যেক কেস ভিত্তিতে দুই দেশ বসে ঠিক করবে। অর্থাৎ এখানে এটা আরও অনিশ্চিত করে রাখা হয়েছে। কোন সাধারণ নীতি এখানে লিখিত না থাকায় সাধারণভাবে অনুসরণযোগ্য কোন নীতি না লিখে রাখার সুযোগ এখানে নেওয়া হয়েছে; ভারতের সঙ্গে নতুন চুক্তি আগের চুক্তির বৃটিশ “সন্তুষ্টির” চেয়েও বড় বাপ হয়ে আছে।

    অথচ মূল কথা হল, নেপালের মূলত দরকার সমুদ্র বন্দরে প্রবেশাধিকার এবং সে বন্দর থেকে নিজের ভুসীমান্ত পর্যন্ত সে মালামাল নিয়ে আসা বা পাঠানোর অধিকার। অথচ চুক্তিতে তাকে দেয়া হয়েছে – ভারতে বসবাস, সেখানে সম্পত্তি কেনা, ব্যবসা করা ইত্যাদির অবাধ অধিকার – এগুলো নেপাল চায় নাই, তার জন্য জরুরিও নয়। এগুলো নেপাল কাজে লাগাতে না পারলেও বা কাজে না লাগলেও নেপালকে দেয়া হয়েছে। ভ্রত চেয়েছে এগুলো চুক্তির কাগজে লেখা থাকুক। তাহলে পালটা বিনিময় অধিকার হিসাবে নেপালকে ভারতীয়দের জন্যও এসব সুবিধাগুলো উন্মুক্ত অবারিত করে দিতে হবে। আর কে না জানে ভারতের অর্থনীতির সাইজ সক্ষমতা অগ্রগতির তুলনায় নেপালের অর্থনীতি নস্যি। ফলে উন্মুক্ত নেপালে পাওয়া সুযোগ ভারতীয়দের নেয়ার সক্ষমতা নেপালকে সমান সুযোগ ভারতে দিলেও এর সুবিধার নেপালীরা নিতে সক্ষম নয়, পারবে না। পাল্লা ভারতের দিকেই যাবে। ফলে ভারতের অর্থনীতির অধিনস্ত হয়ে ভারতের অনুগ্রহের অর্থনীতি হওয়াই নিবার্য ভাবেই নেপালের ভাগ্য হবে।

    এছাড়া ওদিকে দফা নম্বর ছয় নেপালের জন্য ভয়ঙ্কর। বলা হচ্ছে ভারতীয়দেরকে নেপালে ব্যবসা করার জন্য নেপালীদের মতই সমান “ন্যাশনাল ট্রিটমেন্ট” দিতে হবে। যেমন কোন ব্যবসায় ব্যাংক নেপালী ব্যবসায়ীকে ঋণ দিলে একই সুবিধা ভারতীয় ব্যবসায়ীকেও দিতে হবে। স্বভাবতই এর পালটা নেপালীরা একই সুবিধা ভারতে পেলেও এই বিনিময় সুবিধা নেপালীরা কাজে লাগাতে সক্ষমই নয় এখনও। ফলে সমান “ন্যাশনাল ট্রিটমেন্ট” বিষয়টা নেপালীদের বিরুদ্ধেই যাবে। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা এই “ন্যাশনাল ট্রিটমেন্ট” বিনিময় করা তো নেপালের উদ্দেশ্য বা দরকার ছিল না। নেপালের দরকার নিজেকে ল্যান্ডলক মুক্ত করা।

    ভারতের ভিতর দিয়ে নেপালের সমুদ্র বন্দরে প্রবেশাধিকারের সমতুল্য সুবিধার বিপরীত হতে পারে নেপালের ভিতর দিয়ে ভারত কোথায় যেতে চাইলে একই সুযোগ। কেবল ততটুকু। যদিও স্বভাবতই ভারত তখন প্রশ্ন তুলবে ঐ সুবিধা ভারতের জন্য জরুরি নয়। তবে ভারত যদি এই যুক্তি দিতে চায় যে নেপালকে অবাধে প্রবেশ ও যাতায়াতের সুবিধা দিবার মোট বিনিময়মুল্য হল সারা নেপালকে ভারতের কাছে বন্ধক থাকতে হবে – এটাও খারাপ হয় না। কারণ নেপালকে প্রবেশাধিকার দিলে ভারত এখানে নেপালে নিজের ব্যবসায়িক সুবিধা হারায়। তাই এসব কিছু এর কাফফারা। এটা খুবই ভাল কথা। তাহলে স্বভাবতই বাংলাদেশের কাছে থেকে ট্রানজিট আদায়ের সময়ও তো ভারতের এই নীতিই আমাদের অনুসরণ করা উচিত। ভারত কি সেক্ষেত্রে রাজি হবে? অর্থাৎ নেপালকে চাপে ফেলে নিজের আজ্ঞাবহ রাজ্যই বানিয়ে রাখতে চায় ভারত – ঠিক তেমন?

    হাসিনার আমলে ভারতের সাথে চুক্তিতে যেমন ট্রানজিটের বেলায় অহেতুক ভারতকে দেয়া সুবিধার বিপরীতে রেসিপ্রোকাল সাম্যের উছিলায় বাংলাদেশকেও সুবিধা দেয়ার কথা লেখা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের কাছে সেসব সুবিধা নিজের কাজে লাগানোর সুবিধা নয় মোটেও।

    এসব বিষয়গুলো নিয়েই মাওবাদীদের ৪০ দফায় প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে যে ৪০ দফা দাবিতে তারা সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেছিল সেখানে এসব প্রশ্ন তুলে ১৯৫০ সালের চুক্তি বাতিলের কথা লেখা আছে। এছাড়া মাওবাদীরা ভারতকে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে প্রধান শত্রু মনে করে। ভারতকে সামন্ততন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদের দোসর বলে আখ্যায়িত করেছিল।

    এদিক থেকে দেখলে নেপালের জনগণের সব সংগ্রামের সারকথা ল্যান্ডলক দেশ হবার অভিশাপের কারণে ভারতের আধিপত্য থেকে মুক্তির উপায় খুজে ফেরা। অমীমাংসিত সেই লড়াইয়ের ছায়াতেই নেপালের উপর ভারতের চলতি অবরোধ আরোপ এবং তা নেপালের জনগণের মেনে না নেওয়ার সংগ্রাম। ফলে একদিক থেকে যেটাকে রাজতন্ত্র উৎখাতের সংগ্রাম বলে মনে হয় সেটাই আবার অন্যদিক থেকে ভারতের আধিপত্য থেকে মুক্তির সংগ্রাম।

    মাওবাদীরা ২০০৮ সালে প্রথম সরকার গঠন করার পরে এবিষয়ে একই মুল্যায়নে ও অবস্থানে থাকতে পারে নাই। দল তিনভাগ হয়ে গিয়েছে। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

    ২. নেপালি মাওবাদ ও গণরাজনৈতিক পরিসর নির্মানের চ্যালেঞ্জ
    গৌতম দাস

    [এখানে তুলে আনা আমারই লেখা  আগে ১১ অক্টোবর ২০১৫ ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায়। এখানে হুবহু কাট পেস্ট করে তুলে আনা হয়েছে – কপি সংরক্ষণের জন্য আর আমার এখানের পাঠকদেরকেও জানানোর জন্য। ]

    নেপালে রাজতন্ত্রের পতন ও উৎখাতের ঘটনা ২০০৬ সালের এপ্রিল মাস থেকে শুরু। প্রথম চোটে রাষ্ট্রের  সেনাবাহিনী ও পুলিশকে রাজার অধীনস্থতা ও নির্দেশে পরিচালিত হবার আইন বাতিল করে তাদেরকে জাতীয় সংসদ, অর্থাৎ জনগণের অধীনে আনা হয়। এটা ছিল এর আগে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে চলা ইউনাইটেড কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (UCPN) বা যারা পপুলারলি মাওবাদী (Maoist) বলে পরিচিত তাদের সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগ্রামের ফসল।

    নেপালের মাওবাদীরা  ১৯৯৬ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে নেপালের তৎকালীন সরকারের কাছে ৪০ দফা দাবীনামা পেশ করে। সরকারকে তারা জানিয়েছিল, যদি এই দাবি মেনে না নেওয়া হয়, অর্থাৎ  আগামি দুসপ্তাহের মধ্যে  দাবি না মেনে নেবার  ইঙ্গিত দেখলে  সেক্ষেত্রে উপস্থিত রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নিতে আমরা বাধ্য হব”। লিখিত এই পত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন তৎকালীন মাওবাদী পার্টির দ্বিতীয় নেতা বাবুরাম ভট্টরায়। তিনি ছিলেন মূলত  মাওবাদী সহ কয়েকটি ছোট দলের জোট “ইউনাইটেড পিপলস ফ্রন্ট” এর তৎকালীন চেয়ারম্যান। আর তখন মাওবাদী পার্টির চেয়ারম্যান হলেন পুস্পকমল দাহাল, দলে যার পরিচিতি  নাম ‘প্রচণ্ড’।

    সুতরাং নেপালে রাজতন্ত্রের উৎখাত এক সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিণতি। লেনিনের ধ্রুপদি গণতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারণার আলোকে  নেপালের রাজনীতিতে কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলি – অর্থাৎ রাষ্ট্রগঠনের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সভায় নেপালের জন্য একটি গঠনতন্ত্র প্রণয়নের ধারণা নিয়ে আসেন মাওবাদীরা। সশস্ত্র সংগ্রামের সফলতার এক পর্যায়ে কিভাবে বিপ্লবী অর্জনকে রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণের রাজনীতিতে রূপান্তর করতে হয় নেপালের মাওবাদ সেই দিক থেকে বিপ্লবী রাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নজির। এখানেই নেপালের মাওবাদের বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও সঠিক সময়ে কৌশলে আগু-পিছু করে নেয়ার দিক থেকেও মাওবাদীরা বিভিন্ন সময় খুব ফলপ্রসূ নীতি পদক্ষেপ নিতে সক্ষমতা দেখিয়েছে। 

    যেমন ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে “আর্মড পুলিশ ফোর্সের” আইজিকে এক মাওবাদী অপারেশনে হত্যা করা হয়। নেপালের আর্মড পুলিশ ফোর্স আমাদের র‍্যাব এর সমগোত্রীয়। মাওবাদীদের দমনে এটা আলাদা করে গঠন করা হয়েছিল ২০০১ সালের জানুয়ারিতে। কিন্তু এর পরেও পরিস্থিতির উপর মাওবাদীদের নিয়ন্ত্রণ বহাল ছিল। দেখা যায় এঘটনা সত্ত্বেও পরে মে মাসে সরকারের সাথে সাময়িক অস্ত্রবিরতিতে তারা আসতে পারছে। অস্ত্রবিরতির কোড অব কনডাক্ট সম্পন্ন করতে পারছে। আবার খুব সফলতার সাথে তারা ঠিক সময়ে একতরফাভাবে অস্ত্রবিরতি ভেঙেও দিয়েছে, অর্থাৎ ক্ষমতাসীনদের শক্তি প্রদর্শন ও সমঝোতার দুই নীতিই কাংখিত রাজনৈতিক ফলাফল আদায় করে নেবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছে। সমরক্ষেত্র ও রাজনীতির ক্ষেত্র দুই ক্ষেত্রেই লড়াই চালিয়েযেতে পেরেছে।  তারপরও নেপালের মাওবাদ সম্পর্কে বিস্তর সমালোচনা-পর্যালোচনা হতে পারে। তাদের সফলতা-ব্যর্থতার খতিয়ান নেওয়া দরকার। তবে এখানে আমরা তার সফলতার মধ্য দিয়ে যে বৈশিষ্ট্যসূচক দিক ফুটে উঠেছে সেই দিকেই নজর দেবো। এর কারণ নেপালের জনগণের লড়াই সংগ্রাম থেকে শিক্ষণীয় সারবস্তু বের করে আনাই আমাদের প্রাথমিক কাজ।

    মাওবাদীদের দাবিনামার মূল সুর ছিল নেপালের রাজনৈতিক সংকটে নেপালের করণীয় নির্ধারণ এবং সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি নেপালের সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে একমতে আনা। রাজতন্ত্র উৎখাতের জন্য করণীয় নির্ধারণের ব্যাপারে সকল পক্ষকে একটি সর্ব সম্মত সাধারণ অবস্থানে নিয়ে আসা। বলাবাহুল্য বিপ্লব ও উদার গণতন্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে মাওবাদীদের মধ্যে তর্ক ছিল না তা নয়, এছাড়া দিল্লীর সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নেও বিরোধ ছিল। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে সশস্ত্র সংগ্রামের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণের ধারণাই শেষাবধি প্রাধান্য পেয়েছিল। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করবার কৃতিত্ব মাওবাদীদের। তাই নতুন কনস্টিটিউশান বা গঠনতন্ত্র  প্রণয়নের প্রসঙ্গ শুরু হয়েছিল রাজতন্ত্র উৎখাতের সঙ্গে সঙ্গেই। আবার নেপালে প্রথম কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলি বা  নির্বাচিত গঠনতন্ত্র প্রণয়ন সভা (বা সংবিধান সভা) গঠিত হয় ২০০৮ সালে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই সভা একটা কনস্টিটিউশন বা রাষ্ট্রগঠনের প্রশ্নকে কোন গঠনতান্ত্রিক দলিলে রূপ দিতে পারে নি।  সকলকে নিয়ে এমন কোন ঐক্যের স্তরে পৌছাতে পারে নি, যাতে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে নেপালের শক্তিশালী আবির্ভাব ঘটতে পারে।  কিন্তু খুবই ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসাবে নেপাল আবার  দ্বিতীয়বার নতুন করে সংবিধান সভার নির্বাচন করতে সক্ষম হয় ২০১৪ সালে। এই হিসাবে  ইতিহাসের সাত বছর পর দ্বিতীয় গঠনতন্ত্র প্রণয়ন সভায়  নেপালে নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন এবং গঠনতান্ত্রিক সভায় তা অনুমোদন ও গ্রহণের ঘোষণা এসেছে।

    বিগত ২০০৬ সালে রাজতন্ত্রকে নড়বড়ে করে দেবার পর থেকে পুরানা  রাজতন্ত্রের খুঁটি বর্গা ভেঙ্গে পড়েছিল ঠিকই কিন্তু  নতুন করে নেপাল রাষ্ট্র গঠন সম্পন্ন হচ্ছিল না। ফলে দেশে স্থিতিশীলতা আসছিল না, এখন অন্তত কনস্টিটিউশনাল রাষ্ট্র বলে ঘোষণা ও দাবি করার জায়গায় নেপাল পৌঁছাতে পারল। যদিও অমীমাংসিত কিছু বিষয় নতুন চেহারা ধারণ করে হাজির রয়েছে এবং ভারত সীমান্ত সংলগ্ন ত্বরাই  অঞ্চলের মাধেসি ও থারুদের নিয়ে সংকট রয়েছে।  তবু গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ নেপালের  গঠনতন্ত্র প্রণয়ন সভায় নতুন গঠনতন্ত্র গৃহীত হয়েছে বলে যে প্রোক্লেমেশন জারি হয়েছে তা নিঃসন্দেহে নেপালের জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

    নেপাল নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ‘কনস্টিটিউশন’, ‘গঠনতন্ত্র’, ‘রাষ্ট্র গঠন’, ‘কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলি’ বা‘রাষ্ট্রগঠন’  ইত্যাদি শব্দগুলো বারে বারে এসেছে। বিপ্লবী রাজনীতি সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণা হচ্ছে বিপ্লব একান্তই সশস্ত্র বল প্রয়োগের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের ব্যাপার মাত্র। ফলে মাওবাদী কমিউনিস্টরা সশস্ত্র সংগ্রামের এক পর্যায়ে সমাজের অন্যান্য ক্ষমতাশালী শ্রেণি ও শক্তির সঙ্গে মৈত্রী রচনায় মধ্য দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র প্রণয়ন প্রক্রিয়ার শুরু করবে, সেটা বাংলাদেশে আমরা সাধারণত চিন্তা করতে পারি না। এর ফলে বাংলাদেশের বহু বিপ্লবী তরুণে জীবন বিসর্জন দেবার পরেও বাস্তবিক রাজনীতি দূরের কথা ধারণাগত ক্ষেত্রগুলোতেও আমরা অগ্রসর হতে পারি নি। অথচ বিপ্লবের স্তর অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট ভাবে কী ধরনের রাষ্ট্র গঠন কর্তব্য তা সবসময়ই ধ্রুপদী  বিপ্লবী রাজনীতির নীতি ও কৌশলগত তর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। বাংলাদেশে ‘বিপ্লব’ সম্পর্কে আমাদের মধ্যে যে ধরণের অনুমান কাজ করে সেই বুঝের জায়গা থেকে নেপালে মাওবাদীদের কৃতিত্বের দিকটি বোঝা যাবে না। সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অন্যান্য শ্রেণি ও শক্তির সঙ্গে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক মৈত্রী রচনায় সাফল্য দক্ষিণ এশিয়ার জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। মাওবাদীদের সম্পর্কে ভিন্ন সমালোচনা বা পর্যালোচনা থাকলেও এই দিকটার প্রতি আমাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

    বাংলাদেশে  বিপ্লবী চিন্তায় রেওয়াজে ‘কনস্টিটিউশান’ বিষয়টা যেন বা “বুর্জোয়াদের” বিষয় এমনই মনে করা হয়।  এনিয়ে কোন আলোচনাই প্রায় হয় না।  যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ন অথবা নয়াচীনের বিপ্লব নিয়ে সারা দুনিয়ার বিপ্লবীদের উচ্ছ্বাস থাকলেও এই দুই বিপ্লবে ক্ষমতা দখলের পরে “কনস্টিটিউশন” বা “রাষ্ট্রগঠন” বলে কোন পর্যায় তাদের ছিল কি না আমরা তা খুব কমই খুঁজতে যাই। পুরানা  ট্রাডিশনাল  বিপ্লবী চিন্তায় কোন বিপ্লবী রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা দখলের পরে রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র তৈরির বিষয়ের উপর জোর দেয়া, গঠনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠনতন্ত্র প্রণয়ণ প্রক্রিয়া সফল ভাবে  সম্পন্ন করার কর্তব্য গুরুত্ব পায় না। এককথায় পুরানা রাজতন্ত্র বা অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জায়গায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন গুরুত্বপুর্ণ কর্তব্য ও করণীয় হয়ে ওঠে না।  বরং এগুলোকে সবসময়ই খুবই অপ্রয়োজনীয় “বুর্জোয়া” কাজ মনে করা হয়েছে। একারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন অথবা নয়াচীন রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশান তৈরির বিষয় ইতিহাসের তেমন কোন গুরুত্বপুর্ণ অধ্যায় বলে বাংলাদেশের বিপ্লদের কাছে বিবেচিত ছিল না। একারণে আমরা আশির দশকে বিপ্লবী বয়সে রাশিয়া বা চীনের অনেক বিপ্লবের ইতিহাস পড়েছি; মুখস্থ না করলেও অনেক কিছু নাড়াচাড়া করেছি, কিন্তু এই দুই বিপ্লবী রাষ্ট্রের “কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস”  বলে আদৌ কিছু ছিল কিনা আমরা তা খতিয়ে দেখি নি। কোন তাগিদও বোধ করি নি। বা থাকলেও নিষ্ঠার সঙ্গে তা জানবার বা বুঝবার অধ্যবসায় চর্চা করি নি।

    গঠনতন্ত্র প্রণয়ন উল্লেখযোগ্য কোন ইতিহাস বা ঘটনা বলেও মনে করা হয় না, কোন সামাজিক অথবা রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্কের ভিতর দিয়েও গঠনতন্ত্র প্রণয়নের সঙ্গে একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠির মুর্ত ভাবে হাজির হবার প্রশ্ন জড়িত সেটাও বাংলাদেরশের বিপ্লবী রাজনীতির ডিসকোর্সে দেখা যায় না।  বরং কনস্টটিউশনালিজম বা গঠনতন্ত্রকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বিষয়টাকে নিছকই “বুর্জোয়া” বা আজাইরা কচকচানি বলে নাক সিটকানোর চর্চা বাংলাদেশে আশির দশক অবধি প্রবল ও প্রকট ভাবেই ছিল। এখনও আমরা অনেক এভাবেই  ভাবতে অভ্যস্ত রয়ে গিয়েছি।  তবে পরবর্তিতে রাষ্ট্র বিষয়ক ধারণা গুলো আরও পরিস্কার  ও পুষ্ট হওয়াতে আগে সেসব যে ভুল হয়েছিল তা একালে বিপ্লবী চিন্তা ও চর্চায় অনেক পরিষ্কার হয়েছে। ফলে একালে সশস্ত্র গণযুদ্ধ এবং সেই সংগ্রামের একটি পর্যায়ে সমাজের অন্যন্য গণতান্ত্রিক শ্রেণি ও শক্তির সঙ্গে মৈত্রী ও গণ অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে পুরানা রাষ্ট্রের পতন ঘটিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য গঠনতন্ত্র সভা আহ্বান এবং নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়নের মধ্য দিয়ে নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন – এই ধাপগুলোর প্রয়জনীয়তা ও অনিবার্যতা অনেক পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন। অর্থাৎ রাষ্ট্রের বৈপ্লবিক গণতান্ত্রিক রূপান্তর কথাটার ব্যবহারিক অর্থ আগের তুলনায় বিপ্লবীদের কাছে অনেক স্বচ্ছ। গণ-অভুত্থানের মধ্য দিয়ে কোন বিপ্লবী রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে তার পরের পদক্ষেপ হিসাবে ‘কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস’ বা গঠনতন্ত্র প্রণয়নের কাজ শুরু করার গুরুত্ব অপরিসীম ।  নেপাল তাই নতুন দিনের বিপ্লবের উদাহরণ। এই দিক থেকে বাংলাদেশের বিপ্লবী রাজনীতির ভবিষ্যতের দিক থেকে আমাদের হাতের কাছের নেপাল নতুন, কিন্তু খুবই ভাল  উদাহরণ হয়ে উঠেছে,  যা আরও  খুঁটিয়ে দেখা, বোঝা ও বিচার করার সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে।  

    নেপালের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে ২০০৬ সালের ৬ এপ্রিল খুবই তাৎপর্যপুর্ণ। এদিন রাজার ক্ষমতার বিরুদ্ধে মাওবাদীরা সহ সব রাজনৈতিক দল  সারা নেপালবাসীর এক গ্রান্ড এলায়েন্স গঠন ও রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে সক্ষম হয়। বলাবাহুল্য পরিণতিতে সেটাই রাজার পরাজয়ের কাল হয়ে ওঠে।

    কিন্তু এমন মৈত্রী গঠিত হবার পিছনের পটভুমির খবর আমাদের নিতে হবে। মাওবাদীদের সশস্ত্র আন্দোলন নেপালের রাজনীতিতে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠতে এবং  নির্ধারক ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে অনেক সময় লাগে। আগেই বলেছি সশস্ত্র সংগ্রামের পথ শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। নেপালে ২০০২ সালের অক্টোবরের আগে নেপালে ক্ষমতার ভাগিদার বা স্টেক হোল্ডাররা হল এরকমঃ  এক. রাজতন্ত্রী রাজনীতির সমর্থকরা সহ খোদ রাজা। দুই. রাজতন্ত্রী কিন্তু কনস্টিটিউশন মেনে চলা আইনী দলগুলো (মাওবাদীরা বাদে মূলত নেপালি কংগ্রেস, ওর ভাঙা দলছুট অংশ এবং সিপিএন(ইউএমএল – যারা ভারতের সিপিআই, সিপিএমের নেপাল ভার্সন) ও ছোটখাট নানান কমিউনিস্ট বা লিবারেল দল। সবমিলিয়ে এমন মোট ৭টা দল । তিন. কস্টিটিউশানাল রাজতন্ত্র উচ্ছেদের লক্ষ্যে সশস্ত্র মাওবাদী দল; চার. ল্যান্ডলকড নেপালের উপর ছড়ি ঘুরানো ভারত। আর ৫. আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমাস্বার্থ। – এভাবে পাঁচটা পক্ষ।

    দেখা যায় ২০০৫ সালের প্রথমার্ধের আগে পর্যন্ত এই পাঁচ পক্ষের চার পক্ষই একদিকে এবং মাওবাদীর বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ থাকতে পেরেছিল।  উপযুক্ত কৌশল ব্যবহার করে ঐ চার  পক্ষীয় জোটে ভাঙন আনা, তাদের একসাথে কাজ করা অসম্ভব করে তোলা এবং মাওবাদী  রণকৌশলের মধ্য দিয়ে সফল ভাবে মৈত্রী স্থাপনের রাজনৈতিক শর্ত তৈরি করা সেই সময় সহজ ছিল না। সর্বোপরি একমাত্র দায়িত্ববান সম্ভাবনার যে রাস্তা মাওবাদীরা খুঁজে নিতে সক্ষম হয়। সে রাস্তার কথা যে মাওবাদীরা প্রস্তাব করতে পারে এবং দায়িত্ব নিয়ে তারা করেছেও বটে তা প্রশংসার যোগ্য। মাওবাদীদের রাজনৈতিক কৌশলের কারনে রাজার পক্ষের বাকী  তিন পক্ষই রাজার হাত ছেড়ে দিয়ে মাওবাদীদের সাথে অগ্রসর হতে বাধ্য হয়েছিল। বা বলা যায়, মাওবাদীদের সঙ্গে থাকাটাই রাজনোইতিক দিক থেকে ব্যাটার অপশান মনে করেছিল।  ২০০৫ সালের প্রথমার্ধের পরে অনানুষ্ঠানিকভাবে, পরে ডিসেম্বর ২০০৫ সালে  ১২ দফা ঐক্যমতের দাবীনামা — যেটা পরবর্তিতে ২০০৬ সালের এপ্রিলে রাজার বিরুদ্ধে গ্রান্ড এলায়েন্সের পিছনের পটভুমি হিসাবে কাজ করেছে – মাওবাদীদের ক্রম বিজয় সুস্পষ্ট হতে শুরু করে।  দেখা যায় মোট পাঁচ পক্ষের রাজা ও মাওবাদী ছাড়া মোট তিন পক্ষ ২০০৫ সালের আগে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে রাজার পক্ষেই থেকেছিল। আর ২০০৫ সালের পরে মাওবাদীদের পক্ষে আর রাজার বিপক্ষে চলে যেতে বাধ্য হয়। কথিত এই তিন পক্ষ হল, ভারত, আমেরিকা এবং রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলো (নেপাল কংগ্রেস ও ভা্রতের সিপিআই, সিপিএমের মত নেপালী কমিউনিস্ট)। এদেরকে মাওবাদীরা নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রতি আস্থায় আনতে সক্ষম হল কেন? এই প্রশ্নটি ব্যাখ্যা করা যাক।

    সশস্ত্র মাওবাদী বলতে প্রচলিত ধারণা বা ছবিটা হল ১. যারা কবে সশস্ত্রতা শেষ করবে তার কোন দিন ঠিকানা তাদের নিজেরই জানা নাই। চিন্তাও করে না; ২. সশস্ত্রতার কৌশল  কাজ করুক, ফল দিক আর নাই দেক,  কৌশল আগে পিছে করার কোন ইচ্ছা যাদের নাই, কিম্বা থাকলেও কিভাবে সেটা সম্ভব যা তাদের জানা নাই; ৩. রাজনৈতিক লড়াই শেষে কোন স্থিতিশীল রাষ্ট্রগঠন, দেশের অর্থনীতিকে স্বাভাবিক করে আনার লক্ষ্যে বাস্তব কৌশল নিতে যারা জানে না;  ৪. “বুর্জোয়া, পুজিবাদী” নির্বিশেষে সকলের সাথে রাজনৈতি পরিসর নির্মাণের খাতিরে কথা বলতে ও ডায়লগ করতে জানে না, ইচ্ছুক নয় এবং দরকারিও মনে করে না;  ৫.  তাদের রাজনীতির ভিতর সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থ তুলনামূলকভাবে অন্যদের চেয়েও সবচেয়ে ভাল ভাবে অন্তর্ভূক্ত এবং একমাত্র তাদের নেতৃত্বেই সেই স্বার্থ  রক্ষিত হতে পারে বলে যারা দেখাতে পারে না; ৬. সর্বোপরি সকলকে সাথে নিয়ে  রাষ্ট্রগঠন, কনষ্টিটিউশন প্রণয়ন এবং বহুবিধ দলের সাথে ইনক্লুসিভভাবে কাজ করার পরিকল্পনা এবং মানুষের মন জয় করে মানুষকে বদলানোর কাজ করতে যারা জানে না। সশস্ত্র মাওবাদী কিম্বা যে কোন সশস্ত্র শ্রেণি সংগ্রামে বিশ্বাসী রাজনীতি সম্পর্কে এটাই মানুষের বদ্ধমূল ধারণা। মাওবাদীরা নেপালে এই ছকবাঁধা বদ্ধমূল  ধারণা ভেঙ্গে ইতিবাচক সম্ভাবনার দল হিসাবে নিজেদের হাজির করতে সক্ষম হয়েছিল।

    নেপালের রাজনীতিতে মাওবাদীদের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারত, আমেরিকা এবং রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলো  দিনকে দিন রাজার সাথে একসাথে ঐক্য বজায় রেখে টিকে থাকা অসম্ভব দেখছিল। এই তিন পক্ষের সঙ্গে রাজার সম্পর্ক দূরবর্তী হয়ে উঠছিল। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ হোল যখন তারা টের পেল মাওবাদী হলেও  নেপালের মাওবাদী ভিন্ন রকম। সশস্ত্র রাজনৈতিক দল সম্পর্কে যে প্রথাগত ধারণা রয়েছে নেপালি মাওবাদীরা সেই রকম নয়। বিশেষ করে সশস্ত্র রাজনীতি প্রসঙ্গে তাদের অবস্থান হল এই যে, তারা বাধ্য হয়ে সশস্ত্র হয়েছে, রাজতন্ত্রের বদলে রিপাবলিক বা জনরাষ্ট্র গড়তে রাজি হলেই তারা স্থিতিশীল রাষ্ট্রগঠন, দেশের অর্থনীতিকে স্বাভাবিক করে আনা, সশস্ত্রতা শেষ করে নিজেদেরকে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা –  সব কিছুতেই তারা আগ্রহী। তারা যে জনরাষ্ট্রীয় বা গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্রের জন্য একনিষ্ঠভাবে লড়ছে এবং বহুদলের ইনক্লুসিভ রাজনীতিতে  তাদের কোন আপত্তি নাই — এসব জানার পর ভারত, আমেরিকা ও রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলোর কাছে মাওবাদীরা নমস্য না হোক –কথা না বলা বা সংলাপ  না করবার কোন কারণ থাকে নি। আমেরিকার দিক থেকে ২০০৫-৬ সালে ওয়ার অন টেররে ব্যতিব্যস্ত থাকার সময় এটা ছিল হাতে চাঁদ পাবার মত। নইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে  ইসলামি ছাড়াও এই অঞ্চলে মাওবাদীদের দমন করবার জন্য আরেকটি ফ্রন্ট খুলবার ঝুঁকি নিতে হত।

    মাওবাদীদের সশস্ত্র আন্দোলন নেপালের রাজনীতিতে গুরুত্বপুর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারক ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে সময় লেগেছিল ।  ২০০২ সালের অক্টোবরের আগে মাওবাদী এমন ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে নাই যে তাদের বাদে বাকী ভাগীদারেরা একজোট হয়ে কাজ করার সক্ষমতাকে অসম্ভব করে তুলতে পারে। অবশ্য সেসময় এক সুবিধা ছিল যে আর্মিকে মাওবাদী মোকাবোলায় নামানো হয় নাই। রেগুলার পুলিশ আর নতুন বানিয়ে নেয়া রক্ষীবাহিনীর মত প্যারামিলিটারি ‘আর্মড পুলিশ ফোর্স’ দিয়ে মাওবাদীদের মোকাবেলা করা হত। ভারত আর আমেরিকার সহযোগিতা ও উৎসাহে, আর রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলের সহযোগিতায় রাজা সহজেই চলতে পেরেছিল। কিন্তু দিনকে দিন মাওবাদীদের আক্রমণের সক্ষমতা বাড়তে থাকায়  ক্ষমতাসীনদের প্রত্যেক পক্ষই  মনে করতে থাকে যে সুনির্দিষ্ট ভাবে তাদের পরামর্শ যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে মেনে না চলার কারণে  ব্যার্থতা বাড়ছে। ফলে প্রত্যেকেই অপরের উপর অধৈর্য হয়ে উঠেছিল।

    ২০০১ সালের জুন ১ তারিখে রাজপরিবারে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে পারস্পরিক খুনাখুনি শেষে রাজা জ্ঞানেন্দ্র ক্ষমতা দখল করেন। তিনি নেপালী কংগ্রেসের কৈরালার বদলে একই দলের শের বাহাদুর দুবেকে প্রধানমন্ত্রী করেন। ২০০১ সালের ২৬ নভেম্বর, নতুন রাজা জ্ঞানেন্দ্র দেশ জুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন আর মাওবাদী মোকাবোলায় সারা দেশে আর্মি নামিয়ে দেন। ২০০২সালের শুরুতে আমেরিকা ১২ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেয় সেনা ট্রেনিং ও অস্ত্র সাহায্যের জন্য। মে মাসে আর্মি প্রথমবারের মত মাওবাদী চেয়ারম্যান পুস্পকমল দাহালসহ চার নেতার ছবি প্রচার করে। ২২ মে তারিখে নতুন প্রধানমন্ত্রী দুবে সংসদ ভেঙ্গে দেন যাতে বিরোধীরা সেখানে রাজার বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় না তুলতে পারেন। এককথায় বললে, এই প্রথম নতুন রাজার সাথে রাজতন্ত্রী কনষ্টিটিউশনাল দলগুলোর বিরোধ শুরু হয়। রাজা একেকবার একেক সেটকে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বানিয়ে অপরের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে থাকেন। এভাবে পরের দুবছর দুমাসে ৪টা সরকার গঠন করেন আর ভেঙ্গে দেন। তবে সবচেয়ে বড় ঘটনা হল ২০০২ সালের ৪ অক্টোবর। রাজা এদিন প্রথম রাষ্ট্রের নির্বাহি ক্ষমতাও নিজের হাতে নেন। ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে মাওবাদীদের দিক থেকে বিরাট সাফল্যের ঘটনা হল,  আর্মড পুলিশ ফোর্স এর আইজিকে হত্যা করা। মাঝের বছরগুলোতে প্রায় সময়ই মাওবাদীরা ডাক দিয়ে একক যুদ্ধবিরতি পালন করেছে, এক বা তিন মাসের জন্য। মূলত এগুলো তারা করেছে কৌশলের আগাপিছু করা, কি কারণে তাদের সশস্ত্র সংগ্রাম সেকথা জনগণকে মনে করিয়ে দেয়া, পপুলার করা। সার কথায় মনে করিয়ে দেয়া যে তারা অস্ত্র-পাগল কেউ নয়, তাদের হাতে অস্ত্র শেষ উপায় মাত্র। রাজতন্ত্র উচ্ছেদ এবং রিপাবলিকান জনগণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র  প্রণয়নের ঘোষণা দিলেই তারা অস্ত্র ত্যাগের ঘোষণা দিবে। তেমনই এক যুদ্ধবিরিতি ঐ ২০০২ সালের  আর্মড পুলিশ ফোর্স এর আইজিকে হত্যা করার পরও দেয়া হয়েছিল। কি করে যুদ্ধবিরতি পালিত হবে এর কিছু আচরণবিধিও নির্ধারিত ও স্বাক্ষর হয়েছিল মে মাসে। কিন্তু আগস্ট মাসে এসে মাওবাদী হুমকি দিয়ে জানায় যে তাদের দাবীর ব্যাপারে কোন সাড়া শব্দ না পাওয়াতে তারা একশনে ফিরে যাবে।  ২০০৩ সালের শেষাশেষি এসে দেখা যায়, ততদিনে রাজার সাথে  রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলোর বিরোধ চরমে উঠেছে। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছেন না। আমেরিকান সেক্রেটারি অব ষ্টেট ক্রিস্টিনা রাকা নেপালে এসেছিলেন  ২০ ডিসেম্বর ২০০৩, বিরোধ মিটাতে কিছু করা যায় কিনা শেষ চেষ্টা করতে। নেপালের ইংরাজী দৈনিক কাটমান্ডু পোষ্টের ২১ ডিসেম্বর সংখ্যার চারটা রিপোর্টের শিরোনাম হল,

    ১। Anti-king remarks intolerable: Lohani, ২। Rocca mum over US support to parties, ৩। Crisis resolution need of hour: Nepal, ৪। Exchange of intelligence required to hook Maoist leaders: Indian envoy,

    প্রথমটার লোহানী হলেন রাজার আজ্ঞাবহ এক্টিং প্রধানমন্ত্রী, প্রকাশ লোহানী। তিনি একাধারে পররাষ্ট্রমন্ত্রীও। তিনি একথা বলছেন কারণ ততদিনে রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলোর ছাত্র সংগঠনগুলোও রাজাকে হাসি তামাশার পাত্র বানানো শুরু করে দিয়েছে। দ্বিতীয় খবরটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ, আমেরিকান এসিট্যান্ট সেক্রেটারি অব স্টেট ক্রিশ্চিনা রাকা এসে বিরোধ মিটাতে গিয়ে হয়রান হয়ে গেছেন। পত্রিকার রিপোর্ট বলছে এই সত্যিকার দিকটা লুকিয়ে নেপালি কংগ্রেস ও সিপিএন(ইউএমএল) মুখে বলছেন,“পরাশক্তিগুলো রাজা ও তাদের দলগুলোর ইউনিটি দেখতে চায়, গণতন্ত্রের ব্যাপারে আমেরিকা ইতিবাচক”। ওদিকে আসলে এই দল দুটো রাকাকে চেপে ধরেছে রাজার বিরুদ্ধে অজস্র অভিযোগের বাক্স খুলে। আর জবাবে হয়রান হয়ে রাকা বলছে বিশ্বাস করেন আমি মনে করি রাজা ইতিবাচক, কিন্তু সব কথা ডিপলোমেটিক কারণে আমি বলতে পারছি না। এই জবাবটা রাকা দিচ্ছেন সিপিএন(ইউএমএল) উপনেতা এন অলিকে। অলি বর্তমানে এই নেপালি সিপিএম দলের প্রধান নেতা।

    আসলে পরবর্তিকালে দেখা যাচ্ছে রাকার এই সফরটা ছিল মাওবাদী বিরোধী রাজতন্ত্রীর পক্ষে ভারত-আমেরিকাসহ চার  স্টেক হোল্ডারের সর্বশেষ জোটবদ্ধ অবস্থান। কিন্তু এরপরেই পাশার দান উলটে যায়। প্রত্যেকে এরপর রাজার হাত ছেড়ে দিয়ে,  রাজাকে ত্যাগ করে, কত দ্রুত মাওবাদীদের  হাত ধরা যায়, সেই এলায়েন্স খুজতে শুরু করেছিল। রাকা ঐ সফরে এরপর পালটা রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলোকে আক্রমণ করে বলেছিল আপনাদের মধ্যে ঐক্য নাই বলেই তো  সব সমস্যা। শুধু তাই নয় উলটা রাকার  চলে যাবার পরে  রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলো যেন রাজার সাথে বিরোধে জড়িয়ে না পড়ে সেটা নিশ্চিত করবার শেষ চেষ্টা রাকা করেছিলেন। তাই রাকা মনে করিয়ে দিতে বলেছিলেন, “কারণ, তাদের বিরোধ তো আসলে কমন শত্রু মাওবাদী  বিরুদ্ধে”।    রাকার এই সফরের পর থেকেই ক্রমশ  আমেরিকার উলটা দিকে অবস্থান নেয়া শুরু হয়।

    সেসময়ের ভারতীয় অবস্থান নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। ভারত সেসময় আমেরিকার সাথে রাজার পক্ষে। দিল্লি সরাসরি চেয়ারম্যান পুস্পদাহাল  ও দ্বিতীয় নেতা বাবুরাম ভট্টরায়কে গ্রেফতার করার প্রয়োজনের কথা তুলে নেপালি ইনটেলিজেন্সের উপর নিজেদের প্রভাব বাড়াবার চেষ্টা করছে। পত্রিকা রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতের রাষ্ট্রদুত শ্যামশরণ বলেছেন, চেয়ারম্যান পুস্পদাহাল  ও দ্বিতীয় নেতা বাবুরাম ভট্টরায়কে ধরার জন্য ইনটেলিজেন্স তথ্য বিনিময় দরকার। বলছেন সেজন্য দুদেশের মধ্যে গোপন তথ্য বিনিময় ও আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা দরকার। মাওবাদীদেরকে তিনি দুদেশের শত্রু হিসাবে উল্লেখ করেন। তরুণ জার্নালিস্টদের এক সভায় তিনি এসব কথা বলছিলেন।  ২১ ডিসেম্বর ২০০৩ এই দিনের পত্রিকার খবর বিস্তারিত  বললাম কারণ এরপরের ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারীর আগে পর্যন্ত প্রায় এক বছরে রাজার পক্ষে ধামাধরা রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে লাগিয়ে একেকবার একএকজনকে প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী করে কাজে লাগানোর সব সুযোগ নিঃশেষ করে ফেলে। এরপর পয়লা ফেব্রুয়ারী ২০০৫ সালে রাজা নিজেই নিজেকে  নির্বাহি ক্ষমতায় বসান। এবং জরুরি অবস্থা জারি করেন। এতে একটা জিনিষ পরিস্কার হয়, তাহল নেপালী কংগ্রেস বা কমিউনিস্ট সিপিএন-ইউএমএলের মত রাজতন্ত্রী দলগুলোর পক্ষে রাজা জ্ঞানেন্দ্রের চামচা হয়ে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী হবার যে শেষ সুযোগ ছিল সেটাও আর থাকল না। কারণ রাজা নিজেই এবার প্রধান নির্বাহী হয়ে গেছেন। অন্যদিক থেকে বললে, রাজার এই সিদ্ধান্ত রাজতন্ত্রী দলগুলোকে কনস্টিটিউশনাল নিয়মতান্ত্রিক দল হিসাবে ফাংশনাল  থাকার শর্ত ও সুযোগ নাই করে দিলেন। ফলে রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়ে যায়। ফলে ভারত এবং আমেরিকার পক্ষে আর রাজার পক্ষে সমর্থন টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে ওঠে। অন্যদিকে তুলনায় মাওবাদীরা নিজেদেরকে সকলের কাছে ব্যবহারিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে অবস্থান পরিস্কার করে ফেলে। এতে মাওবাদীদের সাথে রাজতন্ত্রী কনস্টিটিউশনাল দলগুলোর এলায়েন্সের কমন পয়েন্টগুলো কি হতে পারে তা স্পস্ট হয়ে যায়। এই দুই ধরণের রাজনীতির মধ্যে পুরা নিগোশিয়েশনটা কোথায় কোন পয়েন্টে হয়েছে এর সবচেয়ে প্রামাণ্য দলিল হল, এদের পারস্পরিক বুঝাবুঝির কমন দলিল – ১২ পয়েন্ট মতৈক্য। বিশেষত ওর দ্বিতীয় পয়েন্ট পড়লেই জানা যায়। সেখানে বলা হয়েছে —

    “মাঠে সক্রিয় সাত বিরোধী দলীয় জোট [মাওবাদী বাদে এতদিন যারা রাজতন্ত্রী সাংবিধানিক আইনী রাজনৈতিক দল হিসাবে কাজ করত] সর্বশেষ পার্লামেন্টকে যাকে রাজা বাতিল বলে ঘোষণা করেছে তাকে আবার কার্যকর করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এবং এই সিদ্ধান্ত অর্থাৎ পার্লামেন্ট চালু হলে তা যেসব কাজ করবে তা হল, সর্বদলীয় সরকার গঠন, মাওবাদীদের সাথে ডায়লগ করে তাআদের সাথে নিয়ে একটা কনষ্টিটুয়েন্ট এসেম্বলির (রাষ্ট্র গঠন সভা) নির্বাচনের পথে অগ্রসর হওয়া। তারা মনে করে এটাই বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাত শেষ করে বেরিয়ে আসা এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার একমাত্র পথ। মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি কথা দিয়েছে দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে নিয়ে এক জাতীয় রাজনৈতিক কনভেনশন আয়োজন করবে।  সেই সভা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিভাবে হবে সে  বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে, কনস্টিটুয়েন্ট এসেম্বলির (রাষ্ট্র গঠন সভার) সদস্য কারা হবেন তা নির্ধারণের নির্বাচন আয়োজন করবে যাতে আমাদের সকলের সম্মতিতে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করা যায়। সাত দলীয় জোট এবং সিপিএন-মাওবাদী দল এক ডায়লগে বসবে এবং পদ্ধতিগত দিকগুলো নিয়ে ঐক্যমতের পথ খুঁজে বের করবে। এই লক্ষ্য অর্জনে জনগণের ক্ষমতাই একমাত্র বিকল্প – বলে সকলে একমত হয়েছে”। [১২ দফা ঐক্যমতের দ্বিতীয় দফার হুবহু অনুবাদ]

    সারমর্মে আমরা বলতে পারি নেপালের মাওবাদ থেকে শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে সশস্ত্র সংগ্রাম বিপ্লবী রাজনীতির নীতিগত দিক নয়, কৌশলগত দিক, তা নেপালের মাওবাদীরা দেখাতে পেরেছে। অর্থাৎ যা শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক ভাবে অর্জন সম্ভব সেই ভাবে তা অর্জনের কৌশল অবলম্বনে তাদের যেমন সায় আছে, আবার সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে সশস্ত্র যুদ্ধে তা আদায় করে নিতে মাওবাদীরা পিছপা নয়। তারা দেখাতে পেরেছে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে জয়ী হতে হলে রাজতন্ত্র বিরোধী সমাজের সকলকে ঐক্যবদ্ধ করা দরকার এবং নেপালি জনগণের সার্বভৌমত্ব কায়েম করবার পূর্বশর্ত হচ্ছে একটি জনপরিসর বা গণ মানুষের রাজনৈতিক ক্ষেত্র গড়ে তোলা যার মধ্য দিয়ে জনগণ তাদের দাবি দাওয়া প্রকাশ ও রাজনৈতিক বিষয়ে জানাজানির ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পায়। নেপালের বাস্তবতায় যতোটুকু সাফল্য অর্জন সম্ভব, বলা যায় তার চেয়ে অধিক সাফল্যই তারা অর্জন করেছে। আগামি দিনে নেপালের রাজনীতিতে মাওবাদীরা প্রধান দল হিসাবে থাকবে কিনা কিম্বা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কিনা তা দিয়ে মাওবাদীদের সফলতা ব্যর্থতার খতিয়ান টানা যাবে না। আজ নেপাল যেখানে এসেছে – ১. রাজতন্ত্র থেকে নেপালকে জনরাষ্ট্রে (Republic) রূপান্তরের সাফল্য, ২.স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নেপালি জনগণের মধ্যে ঐক্য, ৩. ল্যাণ্ড-লকড হবার কারনে ভারত যে ঔপনিবেশিক সুবিধা পাচ্ছে ও আদায় করে নিচ্ছে তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং সর্বোপরি জনগণের মধ্যে বিপ্লবী দীক্ষা ও চেতনার সম্প্রসারণ – ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রে মাওবাদিরা নির্ধারক ভূমিকা রেখেছে। এব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই।