Tag: GOUTAM DAS

  • ফাঁপা পরাশক্তির ভানভনিতায় সুখ

    ফাঁপা পরাশক্তির ভানভনিতায় সুখ

    গৌতম দাস

     ১৪ জুন ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3AC

     

    ক পাঁড় হিন্দুত্ববাদী সুব্রামনিয়াম স্বামী ২০২০ সালের মধ্যে ভারত পরাশক্তি হবে, বলেছিলেন ২০১২ সালে।

    ভারতের সবার আগে দরকার সম্ভবত চিকিতসা। সেটা না হলেও সবার আগে তার জানা  দরকার পরাশক্তি মানে আসলে কী! নুন্যতম কী হলে তা পরাশক্তি হবার লক্ষণ। পরাশক্তি মানে কী এনিয়ে একটা সার্ভের প্রশ্ন হলে দেখা যাবে তাতে ভারতের সন্দেহবাদিরা ছাড়া হয়ত সবাই বলবে “সামরিক শক্তি”।  পরাশক্তি হবার পুর্বশর্ত হচ্ছে অর্থনীতিতে লিডার হওয়া।  অর্থনীতি, অর্থনীতি এবং অর্থনীতিতে গ্লোবাল লিডার। আর আরেকটা কথা – এটাও ভাল করে মনে রাখা যে কোন পড়ন্ত পরাশক্তি ভারতের পিঠে হাত রাখলে তা থেকে ভারতের পরাশক্তি হয়ে যাবার কোন সম্ভাবনা নাই!  কারণ এটা পরাশক্তি হবার কোন পথই নয়।

    হেরে গেলেও হার স্বীকার করা যাবে না। পারলে মানুষের ক্ষতি করে বেড়াতে হবে। সেটাও না পারলে ঈর্ষা করতে হবে। গত কয়েক বছর ধরে, মানে মোটামুটি ২০০৫ সালের পর থেকে ভারতকে চীনের সাথে তুলনা করতেই হবে, তুলনীয় বলে দাবি করতে হবেই। আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রাখাতে সেই থেকে ভারত ফাঁপা হলেও পরাশক্তি হয়ে যাওয়ার ভান করা শুরু করেছিল।  সুব্রামনিয়াম স্বামী বিখ্যাত হার্ভার্ড এর পিএইচডি। তিনিওও ২০১২ সালে বলেছিলেন মানে দেখেছিলেন এয় ২০২০ সালের মধ্যে ভারত পরাশক্তি হয়ে যাচ্ছে। আর সেটাই এখন ঠেকেছে হাসপাতাল নাই, বেড নাই, অক্সিজেন নাই আর কোভিড লাশের সতকার নাই, নদীতে ভেসে বেড়াচ্ছে হাজার মাইল……। বীভৎস এক চিত্র!

    তবু একটা জিনিষের বিরতি নাই। তা হল, ভারতকে পরাশক্তির ভানভনিতা করে যেতেই হবে। সর্বশেষ নরেন্দ্র মোদির আমলে এসে কোভিডের সেকেন্ড ওয়েভে এসে এবার এক বিরাট ধাক্কা খেয়েছে। কারণ বীভৎস বাস্তবতা লুকানোর যোগ্য না।  কিন্তু তবু কেউ কেউ চাপাবাজি চালানোর সুখানুভবে তা বন্ধ করতে রাজি হতে চাচ্ছে না; এমনকি উদাম হয়ে গেলেও না। এর মূল কারণ আমেরিকা। তারও খায়েশ, সে ভারতকে ব্যবহার করেই, একে আরো অথর্ব করে দিয়ে হলেও এশিয়ায় চীনকে ঠেকিয়ে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারবেই, জিদ ধরেছে।

    আমেরিকারও নিজের স্টাডি রিপোর্ট যাই বলুক, তারও প্রায় একই সমস্যা। ভারত সম্পর্কে আমেরিকার আচরণ ফাঁপা ভানভনিতার হোক তবু সেটাই পছন্দ। আমেরিকার স্টাডি রিপোর্ট বলছে, সে চীনের কাছে গ্লোবাল অর্থনীতিতে ক্রমে হেরে যাচ্ছে। চীন তাকে ছাড়িয়ে যাবেই। মানে মামলাটা হলো গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা থাকা আর হেরে সরে যাওয়া- এ দুইয়ের। অন্য ভাষায় বললে, এখন গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতৃত্বে পালাবদলের কাল যেখানে পালাবদলের স্টেজে দেখা যাবে আমেরিকা সিন-আউট হয়ে যাচ্ছে আর চীন ক্রমে আসরে জেঁকে বসছে। এসব কথা আমেরিকার গ্লোবাল ট্রেন্ড রিপোর্টের। বাইরের কারো লেখার উদ্ধৃতি এটা নয়; যেখানে বলা হয়েছে এত দিন গ্লোবাল বিনিয়োগ পুঁজি পশ্চিমেই বসে থেকেছে আর সেই পশ্চিমে বিনিয়োগে বসে থেকেই বাকি সারা দুনিয়ার ওপর আমেরিকা নেতৃত্ব ও মাতব্বরি করে এসেছে। কিন্তু এখন সেই চিরপরিচিত ট্রেন্ডে বদল ঘটছে। আর তাতে  সারভাইভাল বা টিকে থাকার প্রশ্নে  আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট মানে দুনিয়াতে বিপুল সক্ষমতার বিনিয়োগ কোম্পানিগুলোর আড়ত যেখানে তারাই এখন চীনভক্ত। চীনের উত্থানে তাদের উত্থান ও সারভাইবাল মনে করে যারা, তারাও আপনি বাচলে বাপের নাম। তাই তার চোখে এখন চীনকে শক্ত হাত ও সক্ষম বলে উঠে আসছে – ব্যাপারটাতেই তাদের মূল আকর্ষণ। তাই পুঁজি এখন আমেরিকার হাত ছেড়ে চীনের হাত ধরতে ছুটছে। আর এতেই সারা পশ্চিমের পুঁজি একেবারে ঢলে পড়ে এশিয়া-মুখে ছুটে চলেছে [An historic transfer of relative wealth and economic power from West to East]। তাতে যে পশ্চিমে যুক্তরাষ্ট্র এত দিন বড় হয়েছে, কোল পেয়েছে তার প্রতি ওয়াল স্ট্রিটের কোনো মহব্বত নেই। কারণ সারভাইভাল! সে এতে মরবে না বাঁচবে- কারণ ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’- এই সম্পর্কে আছে সে।

    আরো মারাত্মক কথা হল, গ্লোবাল পুঁজির এভাবে পশ্চিম ছেড়ে পুবে-এশিয়ায় ছুটে চলা এটা সাময়িক নয়, একেবারে স্থায়ী। মানে, এটা আর নিকট ভবিষ্যতে কখনো উল্টামুখী বা ফিরে পশ্চিমমুখী হবে না। কিন্তু তবু আমেরিকার তা শোনার বা কান দেয়ার অবস্থাতেও নাই। সম্প্রতি বাইডেন সে দেশে ক্ষমতায় এসে ইউরোপকেও মিথ্যা আশায় রাজি করিয়েছেন তিনি। যদিও ইইউ-ও এতদিন চীনের সাথে আগেভাগে সম্পর্ক করতে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল। তবু এখন সেসব ফেলে বাইডেনের আশ্বাসে ফিরে তারা এখন বাইডেনের পেছনে।

    এর কারণ সম্ভবত আমেরিকার সাথে ইউরোপের সিভিলাইজেশন ও কালচারাল অর্থে নিকট আত্মীয়ের সহমর্মিতাবোধ। মাত্র পাঁচশ বছরের মধ্যে যে পশ্চিম এতদিন এশিয়াকে তার গোলাম বানিয়ে রেখেছিল আজ পশ্চিমকে সেই এশিয়ার অধীনে চীনের নেতৃত্বে চলে যেতে হবে, এটা কোনও পশ্চিমা-মনের পক্ষে গ্রহণ করা সহজ নয়। সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ এভাবে হেরে যাবে, গুটিয়ে যাবে, এশিয়ার পেছনে তাদের হাঁটতে হবে এটা তাদের কাছে সম্ভবত অকল্পনীয়।

    অথচ সোজা ভাষায় বললে, ব্যাপারটা পুঁজির সারপ্লাস একুমুলেশন [surplus accumulation] বা উদ্বৃত্ত পুঁজির পুঞ্জীভবনের অবজেকটিভ ঘটনা। এটা একেক কালপর্বে যেখানে যে ভুগোলে যত দ্রুত ঘনীভূত হবে, সে-ই ভুগোলের রাষ্ট্রই সে কালপর্বে  গ্লোবাল নেতা হবে। কারণ ব্যাপক অর্থনৈতিক তৎপরতা ঘটার সবচেয়ে ফেভারেবল পরিস্থিতি পেলে সে সেখানেই পেকে বেড়ে উঠবে যাকে এরপর কেউ ঠেকাতে পারবে না, রোধ করতে পারবে না। সেই ভুগোলটাই এখন বর্তমান কালপর্বে হল ‘চীনের নেতৃত্বে এশিয়া’।

    এভাবেই কি একইভাবে এককালে ইউরোপের বিপরীতে আমেরিকার হাতে প্রবলভাবে সারপ্লাস একুমুলেশন ঘটায়নি! আর তার ফলেই কি আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইউরোপেরও নেতা এবং গ্লোবাল নেতা হয়ে হাজির হয়ে ছিল না! এত কিছু পরিষ্কার জানা সত্ত্বেও আমেরিকার এক মরিয়া জিদ যে, সে ভারতের পিঠে হাত রেখে ছলনায় বলবে, এবার এশিয়ায় ভারত চীনের সমতুল্য? এটা অবাস্তব এবং কোনো ডাটা যা বলে না এমনই অসত্য। কিন্তু এই মিছাকথা সে ভারতকেও বিশ্বাস করিয়েছে।

    এতে আমেরিকা  যে গোড়ার মিথ্যা কথাটা তোতাপাখির মনে ঢুকিয়েছে আর তারাও  গ্রাজুয়েশন বা পিএইচডির স্কলারশীপের লোভে তোতাপাখি হয়েছে এদেরকে দিয়েই  আমেরিকা ভারতকে মিছাকথাগুলো বিশ্বাস করিয়েছে।  এরই একটা হল,  যেমন- ভারতের (১৩৭ কোটি ২০১৯ সালের) জনসংখ্যা চীনের (১৪৩ কোটি) প্রায় কাছাকাছি হতেই পারে। এর মানে তো আপনাতেই ভারতে চীনের মত ও লেবেলে অর্থনীতিতে সারপ্লাস একুমুলেশন ঘটে যাবার  দেশ হয়ে যাবে না অথবা গেছে এমন দাবি করা যাবে না। তা সত্যও নয়। কিন্তু ভারত তা বিশ্বাস করে এতদিন গিলে বসেছিল। বস্তুত বড় জনসংখ্যার দেশ হলেই হবে না।
    যেমন এর পালটা সত্যও আছে তা হল –  আমেরিকার দেশ বড় কিন্তু জনসংখ্যা এখনই মাত্র ৩৩ কোটি, আর সেকালে (১৮৮০ এর দশকে) আমেরিকা প্রথম যখন শীর্ষ সারপ্লাস একুমুলেশনের দেশ হয়েছিল তখন ওর জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৫ কোটি ( 50,189,209, in 1880)। এর সোজা অর্থ হল, বড় পপুলেশন হলে শীর্ষ সারপ্লাস একুমুলেশনের দেশ হতে কিছু সুবিধা পাওয়া যায় সত্য। কিন্তু বড় পপুলেশন না হলে তা হবেই না ব্যাপারটা তাও সত্যি না।
    মুল কথা হল এর আবার ভোক্তাবাজারটা কত বড়। আর তাতে উপযুক্ত নীতি-পলিসির কারণে এক ভাইব্রেন্ট অর্থনীতি হিসাবে তা হাজির হচ্ছে  করা যাচ্ছে কী না – এটাই মূল চাবিকাঠি ও মূল চালিকাশক্তি। চীন এটা অর্জন করতে টানা চল্লিশ বছর ব্যায় করেছিল। যেটা বেশিরভাগ মানুষই খেয়াল করে নাই।  কমিউনিস্ট চিন্তার একপেশে দৃষ্টিভঙ্গির অত্যাচারে হাতেগোনা বাদে সবাই ব্যস্ত ছিল ১৯৭০ এর দশকের “চীন তখনও সমাজতন্ত্রী” কিনা এই ভুয়া ও বেকুবি তর্কে।  মাও মারা যান ১৯৭৬ সালে। এর আগে পর্যন্ত  মাও নিজে ওসব তর্কে ইন্টারেস্টেড কেউ নন। দেং জিয়াও পিং সহ তার লক্ষ্য তখন – কমিউনিসট পার্টির নেতৃত্বে চিনে একটা ক্যাপিটালিজম সম্পন্ন হতে পারছে কীনা।  এটা তার একমাত্র ফোকাস যা থেকে আজকের চীনের উত্থান।

    মাওয়ের চীন  সেসময় চীনকে শীর্ষ সারপ্লাস একুমুলেশনের দেশ হিসাবে গড়ে তুলেছিল দুই পর্বে (১৯৭০-৯০ প্রস্তুতিপর্ব আর পরে ১৯৯০-২০১০ একশনপর্ব ) এভাবে তা অতিক্রম করেছিল।

    দুর্ভাগ্য হল ভারতের কেউ, কোন একাদেমিশিয়ান অন্তত এদিকটা ও এদিক থেকে ব্যাপারটা কখনও স্টাডি করেছেন জানা যায় না।  চীনের এদিকটা স্টাডি করতে পারলে তবেই না এটা এরপরে  ভারতের উপর প্রয়োগের প্রশ্ন আসে!  এব্যাপারে সবচেয়ে নেতিবাচক ফ্যাক্টস হল, ১৯৯০ সালের ভারতে ইকোনমিক ক্রাইসিস দেখা না দিলে ভারত হয়ত নেহেরুয়ান সমাজতন্ত্রী হয়েই থাকার চেষ্টা করত। ১৯৯০ সালের ক্রাইসিস মানে ভারত যখন প্রথম বড় “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের” ঘাটতিতে পড়েছিল। “ব্যালেন্স অব পেমেন্টে” মানে রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রার একাউন্টে  আয়-ব্যায়ে বৈষম্য মান্‌ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার যোগ্যতা হারিয়েছে বলে ব্যায় বেশি হয়েছে দেখাচ্ছে। আর এমন অবস্থা মানেই এই ঘাটতি পূরণ করে দিতে পারে একমাত্র আইএমএফ কিন্তু শর্ত থাকে যে বহু নীতি-পলিসিগত সংস্কার মানতে বাধ্য থাকতে হবে।  যেসব পর্ব বাংলাদেশ পেরিয়ে এসেছে সেই ১৯৭০ এর শেষ দশকে আর ১৯৮২ সালের সংস্কারে।

    আমাদের জন্য এখন মূলকথাটা হল, শীর্ষ সারপ্লাস একুমুলেশনের দেশ হিসাবে ভারতকে সাজানো যে বকেয়া কাজ, যে  মূল চাবিকাঠি সেটা আজও ভারতে কারও কানে ঢুকেছে এমন হগ্ন দেখা যায় নাই। এটা সবার আগে ঘটাতে পারলে তবেই চীনের লেভেলে সারপ্লাস একুমুলেশনের কথা ভাবা বা দাবি করার বাস্তবতা ভারতের জন্য তৈরি হতে পারে। কিন্তু এর আগেই সারা ভারত জুড়ে কেবল আমেরিকার প্ররোচনায়  চীনের সাথে ভারতের সমতুল্য ভেবে তুলনীয় ধরে নিয়ে কথা বলার ছড়াছডি।  যেন অর্থনীতিতে এটা করে দেখানোর মামলা নয়, বিরাট করে দেশপ্রেমের ভাব তুলতে পারলেই একাজ হয়ে যাবে।  অথচ শীর্ষ সারপ্লাস একুমুলেশনের দেশ না হলেও কাছাকাছি  কিছু যেটা ঠিকমত একবার চালু হলে- পরে একমাত্র তারপরেই সব কিছুই ঠিক চলতে পারে।

    একমাত্র এরপরেই, একপর্যায়ে এই উদ্বৃত্তের কিছু অংশ নিজ সেনাবাহিনীতে ব্যবহার বা অন্য দেশে বিপুল বিনিয়োগে খরচ (ফলে অন্য দেশের ওপর প্রভাব প্রতিপত্তি হাতে আসা) করার সামর্থ্য আসবে। এভাবে কমপক্ষে ২০ বছর চলতে পারলে সেই দেশ পরাশক্তির মর্যাদা পাওয়ার পূর্বাবস্থায় পৌঁছাতে পারে। অথচ ভারতের ভাইব্রেন্ট অর্থনীতি, ডাবল প্রবৃদ্ধি, চীনের ন্যায় সারপ্লাস একুমুলেশন- ইত্যাদি কোনো কিছুরই খবর নেই। বুঝাবুঝিটাই নাই।  অথচ ভারতকে অনবরত চীনের সাথে তুলনা করতে উসকানি দিয়ে চলেছে আমেরিকা। যেন সোনালি চাবুক হলেই জীর্ণ-শীর্ণ ঘোড়াও সবল হয়ে উঠবে।

    মোদীর গত সাত বছরে এই মিথ্যা ভ্যানিটিটাই ভারতের সাংবাদিকসহ ইন্টেলেকচুয়ালদের এমন বিশ্বাস করিয়েছেন যে, সেটা একটা মানসিক অসুখে পরিণত করেছে। এতে কেবল মোদীর যা অর্জন তা হল সবচেয়ে মডার্ন-নারী-সাংবাদিক ও ফরেনডেস্ক এডিটরও এখন মোদীর হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে নিজের চরম অগ্রহণযোগ্যতাটা প্রকাশ করতে ভুলে গিয়েছেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করেছেন ভারত নাকি একেবারে পরাশক্তি হয়ে গেছে। কাজেই এই ভারত হিন্দুত্ববাদের হলেও অসুবিধা কী! কারণ সকাল-বিকেল তাকে দেখানো হত আর সে দেখত ভারত এখন আমেরিকার সাথে ছাড়া ওঠাবসা করে না। এটা দেখে সে বিগলিত হত। কিন্তু ফাঁপা ভেতরটা কোভিডের সেকেন্ড ওয়েভের ঝড়ে তছনছ ও উদোম হয়ে যায়। বাস্তবের ভারতে বেড বা অক্সিজেন নেই, হাসপাতাল বা চিকিৎসা নেই। প্রতিদিন চার হাজার করে রোগী মরছে। মৃতের সৎকারের খবর নেই, নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। এই হল বাস্তবের ভারত!

    অসহায় মোদী এতে উপায়ন্ত না দেখে শেষে ক্ষুদ্র ভুটান বা  চিরশত্রু মনে করা সেই চীনসহ ২০টা দেশের কাছে ত্রাণসাহায্য চেয়ে হাত বাড়িয়েছেন। আর এতেই কথিত ইন্টেলেকচুয়ালদের কিছু চোখ খুলেছে যে তাঁর ভারত যদি পরাশক্তি হয় তো সে কেন ত্রাণ চাইবে? এতে সব ভেঙে উদোম হয়ে গেছে যে ভারত কোন পরাশক্তির ধারেকাছেরও কেউ নয়। যদিও এত কিছু বুঝার পরও কারো কারো আমেরিকার মিথ্যা প্রলোভনে থাকতে চাওয়া বন্ধ হয়নি। এরা কিছু তোতাপাখি যারা আমেরিকান অনুদান-স্কলারশিপ দিয়ে ডিগ্রি দিয়ে এভাবে শেষে তোতাপাখি বানানো হয়েছে।

    Hudson Institute   হাডসন ইনস্টিটিউটঃ
    ওয়াশিংটনের এক থিংকট্যাংক ও রিসার্চ সেন্টার হল ‘হাডসন ইনস্টিটিউট’। তার এক পাকিস্তানি ও এক ভারতীয় ফেলো যৌথভাবে ভারতের বা গ্লোবাল মিডিয়ায় লেখা নিয়ে হাজির হচ্ছেন ইদানিং। তেমনই এক লেখার প্রসঙ্গ ছিল সাউথ-ইস্ট এশিয়ান জোট, সার্ক [SAARC]। বলা ভাল সম্ভবত সার্ককে উদাহরণ হিসাবে ব্যবহার করতে গেছিলেন। কিন্তু নের জানাশুনার অভাবে কিছু ধরা খেয়ে গেছেন। লেখাটা ভারতের চোখে দেখে লেখা মনে হয়েছে। ওর লিড  লেখক ভারতীয় অপর্ণা পান্ডে [APARNA PANDE] আর তাতে শিরোনাম হল, ‘কোভিড বলছে ভারত যদি সার্কের দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হয় তবে চীন নিয়ে নিবে” [Covid shows if India can’t take care of SAARC, China will]।’

    এরপর ওই লেখা শুরুর বাক্যটাও বলছে, ‘কোভিড মহামারী কেবল মানব দুর্দশা বা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ই আনে না এর খারাপ স্ট্র্যাটেজিক পরিণতিও আছে। এটা দেখিয়ে দিয়েছে সাউথ এশিয়াকে নেতৃত্ব দিতে ভারত কোন সীমায় আটকে আছে! আর সেই সাথে ভারতের প্রতিবেশীদের কাছে ভারতকে নিচু দেখিয়ে চীনের ভূমিকা কত উঁচুতে”।

    In addition to causing a humanitarian and economic disaster, the Covid-19 pandemic has also had strategic consequences. It has demonstrated the limits of India’s ability to lead South Asia and raised China’s standing at India’s expense among some of its neighbors.

    এভাবে চীনের সাথে খামোখা ভারতের তুলনা করা হয়েছে এ লেখায়। এক কথায় বললে এটা সেই পুরান কথা, খামোখা চীনের পর্যায়ে তুলে ভারতের বন্দনা আর কোভিডে ভারতের ইজ্জত লুটানোতে সহানুভূতি জোগাড় করার চেষ্টা। যেমন- যে কুকুরের গায়ের চামড়া উঠে গেছে তার নাম বাঘা রাখলেও কোন ইমেজ ফিরে না। তবু অনেক মানুষ সেটাই করে যাবেন। যেন ভারতের হাতে চীনের কাছাকাছি সারপ্লাস একুমুলেশন বা উদ্বৃত্ত সম্পদ আছে, যা ভারত চাইলেই প্রতিবেশী দেশে বিনিয়োগ করতে সক্ষম। ফলে ‘কোভিডের কারণে প্রতিবেশীদের ওপর ভারতের স্ট্র্যাটেজিক প্রভাব খাটো হয়ে যাচ্ছে। না হলে চীনকে একেবারে দেখিয়ে দিত” এমন ভাব।

    তাই ওই লেখার শিরোনামে কনক্লুশনে  বলছে, “অতএব কোভিডই দেখাচ্ছে যে, এ অবস্থায় ভারত সার্ককে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হওয়ার সুযোগটা এবার চীন নিয়ে নেবে”। এগুলো আসলেই নায়িকাদের ফুটানি বা ভ্যানিটির মত কথা যেন! স্টার-ইমেজ ছাড়া নায়িকাদের সিনেমা চলে না, আমরা বুঝি। কিন্তু আমেরিকা আর কত দিন ভারতের পিঠে হাত রেখে এমন মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে যাবে?

    হোমওয়ার্ক না থাকলে যা হয়ঃ
    আসলে অসংখ্য ত্রুটিতে ভরা এই লেখা কারণ,  আগে ‘হোমওয়ার্ক’ করে নেয়া হয়নি ঠিকমত।
    প্রথমত, এই লেখকদ্বয়ের সার্ক সম্পর্কে ন্যূনতম কোনো ধারণা আছে মনে হয় না। যেমন- সাম্প্রতিকালে ভারতই ‘সার্কে পাকিস্তান আছে’ বলে সার্ককেই বাদ দিয়ে ভাগাড়ের মতো ফেলে রাখার চেষ্টা করেছে, সে খবর এদের কাছে নেই। এমনই ২০১৬ সালের শেষের এক খবর হল – বিডিনিউজ২৪ লিখেছিল, “সার্ক ভুলে বঙ্গোপসাগরভিত্তিক দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক জোট ‘বিমসটেকের’ ওপর জোর দিতে বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছেন” সাবেক এক ভারতীয় কূটনীতিক ও ভারতের ওআরএফের [ORF] ফেলো পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। অর্থাৎ বলতে চাইছেন, তাই ভারতের কাছে সার্ক আপন কোনো কিছু নয়।
    অথচ আমরা লক্ষ্য করছি সেই সার্ককেই লেখাটা ভারতের জন্য উদাহরণ হিসেবে এনেছেন।
    দ্বিতীয়ত, ফ্যাক্টস হল  চীন সার্কের মেম্বার নয়। তাহলে “ভারত না পারলে চীন পারবে” এ কথা তোলা হচ্ছে কিভাবে? এই অহেতুক কথার মানে কী?
    তৃতীয়ত, এই অঞ্চলে সার্ক  সত্যিকারের ফাংশনাল কিছু হয়ে উঠেছে, এমন ভূমিকা কখনই নিতে পারেনি। মূলত ভারত-পাকিস্তান এর মধ্যে  সবসময় দ্বিপক্ষীয় অসংখ্য ক্যাচালের ইস্যু থাকেই – যা এখানে সার্কের মধ্যে হাজির করাতে নিষেধ থাকলেও এরা পেছনের ক্যাচালের কারণে সার্কে এসেও সবকিছুতেই  নিষ্ক্রিয় থাকতে চেয়েছে  – আর এভাবে এটা সার্ককে কার্যকর হতে বাধা হয়ে কাজ করেছে। আবার এই বাধার কাজে ভারত-পাকিস্তান কারো ভূমিকাই কম ছিল তাও নয়। এসব সমস্যা সত্বেও পরেও সার্ক দেশগুলোর মধ্যে শুল্ক কমিয়ে পণ্য বিনিময় বাড়ানোর একটা চেষ্টা করা হয়েছিল যা কাজ করেনি। মূলত ভারতের পুরানা অভ্যাসের কারণে যে, একদিকে ভারত বলবে তারা শুল্ক তুলে নিয়েছে অথচ রফতানি করতে গিয়ে দেখা যাবে হয়ত এবার প্রায় সমান সমতুল্য কিছু নন-ট্যারিফ শুল্ক আরোপ করে রেখেছে ভারতই। এককথায় ভারতের সাথে কোন ধরণের বাণিজ্য সমঝোতা – গিভ এন্ড টেক – এটা অসম্ভব। কখনও এটা কাজ করে নাই। মূলত ভারতের উগ্র জাতিবাদী মোটাবুদ্ধির কারণে।

    অনেকের মনে হতে পারে আমি ভারতের বিরুদ্ধে একটু বেশি কঠোর হচ্ছি।  না তা হচ্ছি না, আমি নিশ্চিত। নিচের উদ্ধৃতিটা এখানে আলোচিত লেখার ভারতীয় লেখক অপর্ণা পান্ডে-এর এক সাক্ষাতকার থেকে উঠিয়ে আনা। যেটা তিনি ২০২০ আগষ্টে টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দিয়েছিলেন। এখানে আমরা দেখব তিনি ভারতের “বিগ পাওয়ার” বা পরাশক্তি হওয়া বলতে কী বুঝেন। যেখানে সবচেয়ে আপত্তিকর হল “এই ভারত প্রতিবেশির” উপর কী   ‘hegemon’ আচরণ করবে সে বর্ণনা দেখে। তিনি আসলে পরাশক্তি বলতে  কলোনিদখলদার শক্তি বুঝেছেন!
    “To be considered a big power, you need to be the acknowledged hegemon in your own neighborhood [South Asia] and to be recognize as a global power by your peers. Finally, you need to be willing to exercise power to protect your interests.”

     

    কঠোর ‘দেশপ্রেমী’ ‘উগ্র-জাতিবাদী’ ভারত কী করে বিদেশী পণ্য আমদানি করতে দিতে পারে? বরং এর বিনিময়ে বাংলাদেশের পুরা বাজারটা কব্জা করাই তাদের জন্য ‘দেশপ্রেম’; যার সোজা মানে হলো, ভারত কোনো ধরনের অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক রাষ্ট্রজোটের সদস্য হওয়ারই তো যোগ্য নয়। আসলে বোকা উগ্র জাতিবাদ আর গ্লোবাল বাণিজ্য পরস্পর বিরোধী!

    তবু আমরা দেখেছি ওই লেখায় লিড ভারতীয় লেখক অপর্ণা পান্ডে ভারতকে “লারজেস্ট কান্ট্রি ইন দ্য রিজিয়ন” খেতাব দিয়েছেন। আর পাকিস্তান তা মেনে নেয় নাই বলে দোষারোপ করেছেন। আবার সেকেন্ড ওয়েভে অক্সিজেনের অভাবে পড়লে ছোট দেশ ও সার্কের সদস্য ভুটান নিজের অক্সিজেন প্লান্ট থেকে প্রতিদিন ৫০ টন করে অক্সিজেন ভারতকে দিচ্ছে, এ কথাটা তিনি জ্বলুনির সাথে উল্লেখ করছেন; সেটাও এক ভারি তামাশা বটে! তাহলে তার চোখে ভারত ‘লারজেস্ট কান্ট্রি’- এটা কী অর্থে? লারজেস্ট কী জনসংখ্যায় নাকি উদ্বৃত্ত সম্পদে্র বিনিয়োগ সক্ষমতায়? নিশ্চয় জনসংখ্যাই বুঝেছেন ও বুঝিয়েছেন। কোনো দেশকে প্রভাবশালী হিসাবে ‘বড়’ বুঝায় তার কী থাকলে পরে? – এরা যেন তাই বোঝেন না। নইলে ভারত বড় কি না এখানে এই তর্ক তোলার অর্থ কী? ছোট্ট ভুটানের অক্সিজেন নিতে কষ্ট হচ্ছে- এটা তো দেখছি সংকীর্ণ পেটি মধ্যবিত্ত সুলভ ঈর্ষা!

    তার আরো মারাত্মক এক বক্তব্য হলো, তিনি এবার স্বীকার করে বলছেন, সার্কের ভেতর ভারতকে ন্যাচারাল নেতা (রিজিয়নস ন্যাচারাল লিডার) বলে পাকিস্তান স্বীকৃতি না দিতে পারার কারণেই নাকি এই জোটের সমন্বয় হয়নি কখনো।

    ভারতীয় এই নারী লেখিকার এই বক্তব্য খুবই ক্ষুদ্র মনের। তিনি আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক নিয়ে কথা কোন বলার যোগ্য তা মনে হচ্ছে না। এখানে ভারত ‘ন্যাচারাল লিডার’ মানে কী? আল্লাহ স্বয়ং দিয়েছেন? এ রকম?

    আসলে বন্ধুদের ছোট গ্রুপের বেলাতেও যেটা দেখা যায়, অনেক গ্রুপে এমন বন্ধু একজন থাকে যে বন্ধুদের বিপদে এগিয়ে যায়, উদ্ধার করতে খরচ করে এবং খরচ করা অর্থ কী করে পরে ফেরত পাবে বা আদৌ ফেরত পাবে কি না তা না জেনেই সে এটা করে। এমন দায়িত্ব নেয়ার এই স্বভাব- এটাই গ্লোবাল নেতার স্বাভাবিক স্বভাব-বৈশিষ্ট হতে হয়  এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের বেলায় একেই ‘এম্পায়ার’ বা “সাম্রাজ্যের শাসকের ইতি গুণধারী” ব্যক্তিত্ব বলা হয়। কেউ গ্লোবাল নেতা হতে চাইলে তার এই গুণ থাকা জরুরি বা অনিবার্য। এর বাইরে ন্যাচারাল লিডার বা খামোখা লিডার বলে কিছু নেই।  এছাড়া, আর কী হতে পারে?  ভারত ‘ন্যাচারাল লিডার’ কথার মানে কি কলোনি-ব্রিটিশ কী ভারতের বাপ? নেহেরু যেমন নিজেকে কলোনি “ভাইসরয়” ভাবতেন!

    তবে বড় জোর অপর্ণা পান্ডের এমন কথা এক ‘উগ্র দেশপ্রেম’ হতে পারে। যেটার আবেগী মূল্য কিছু থাকলেও সেটার অবস্থান কিন্তু কেবল তাঁর দেশের ভেতরেই থাকতে পারে। আর বাইরের লোকেরা শুনলে এটাকে গাধামি মনে করে বিরক্ত হবে।

    আসল কথাটা হল, নেপাল বা ভুটান ল্যান্ডলকড দেশ বলে এ থেকে দুধ দোয়ানোর মতো করে এখনো নিয়মিত সুবিধা বের করে আসছে ভারত। যেমন- নেপাল বা ভুটান বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে চাইলে আগে কোনো ভারতীয় কোম্পানিকে কমিশন বুঝিয়ে দিয়ে এরপর কেবল ওই ভারতীয় কোম্পানির মাধ্যমে তা বিক্রি করতে হবে। এর অর্থ হল, ‘সাম্রাজ্যের শাসকের ইতিগুণ’ জিনিসটা প্রসঙ্গে ভারতের বোঝাবুঝি একেবারেই শুণ্য। এটাকেই ‘স্মল’ চিন্তা বলে। এটা কোন উদারতাবাদ প্রাকটিস করা নয়।  বরং বড় করে অন্যকে সুবিধা দেয়া যাতে বড় করে প্রতিদান সুবিধা ফেরত পাওয়া যায়। ভারত এটা বুঝবে না! উগ্র দেশপ্রেমিকতা  আর স্বল্পবুদ্ধির জাতিবাদ এসব বুঝের বাইরে……।

    না এটাকে ‘দাতা মহসীন’ হতেও বলা হচ্ছে না। একটা ‘ফেয়ার ডিল’, একটা ন্যায্য সম্পর্কের কথা বলা হচ্ছে; যেখানে এতে এম্পায়ারের কোনো ফাইন্যান্সিয়াল লস হলে সেটার দায় ভাগ করে নেয়া যেতে পারে। আর এতে এম্পায়ারের কোনো লস হলেও যেহেতু এতে তার স্বাভাবিক প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়বে, এটাই তার পক্ষে নন-ফাইন্যান্সিয়াল রিটার্ন ফেরত পাওয়া হবে। আসলে কারো গ্লোবাল নেতার ভূমিকায় হাজির হওয়া এতই সহজ নয় বা একপক্ষীয় কোন সুখের নয়। এভাবে দেখতে চাইলে দেখার সুযোগ অবশ্যই আছে।

    ঐ লেখায় শেষে খুবই দৃষ্টিকটু ও ঈর্ষাকাতর এক মন্তব্য করা হয়েছে। বলা হয়েছে, “কোভিডের এই এমারজেন্সির কালে নগদ অর্থ ঢালার ক্ষতিকর ক্ষমতার চীন (cash-flush malign power) তার প্রভাব বাড়িয়ে নেয়ার সুযোগ পেয়ে যাবে”-[ during an emergency, a cash-flush malign power like China gets an opportunity to expand its influence]।

    ভারতের জন্য দিল্লি আসলেই দু-র-অ-স্ত। অন্তত ঈর্ষা দিয়ে এসবের কিছুই অর্জন করা যায় না! আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রেখেছে বলেই ভারত তার সব অক্ষমতার বন্ধ্যাত্ব ছাড়িয়ে সক্ষম হয়ে যাবে না। আমেরিকা তা করতেও পারে না, করবে না। কারণ ওদিকে আবার রাষ্ট্র মানেই নিজ একান্ত স্বার্থ এবং সেটাই সবার আগে মানে প্রায়োরিটি। আর সক্ষমতা? সেটা তো সবার নিজেরটা নিজেই অর্জন করে নেয়ার জিনিস! কাজেই……।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১২ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “যখন ফাঁপা পরাশক্তির ভান করাতেই সুখ“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত, নেহরুয়ান খাটোচিন্তার ফসল

    কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত, নেহরুয়ান খাটোচিন্তার ফসল

    গৌতম দাস

    ০৭ জুন ২০২১, ২০:০৭, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3zY

    Modi Vs Mamota in the light of Center Vs State conflict

    নেহরুভিয়ান বা নেহেরু স্টাইলের ভারত গড়তে গিয়ে এটা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর এক গুপ্ত-হস্তক্ষেপের রাষ্ট্র। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন করে ভারত-রাষ্ট্রের এসব গুপ্ত-হস্তক্ষেপ ব্যবস্থাদি এখন আবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে। কলকাতায় রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়েছে গত ২ মে, মানে এক মাসেরও আগে এবং তাতে তৃণমূল কংগ্রেস দলের মমতা তৃতীয়বারের মতো জয়লাভ করেছেন। মানে আবার মমতা ব্যানার্জি সরকার গড়বেন এবং গড়েছেনও। অথচ এই নির্বাচনে প্রচণ্ড মিথ্যা আশ্বাস জড়ো করে ফেলা হয়েছিল যে, মোদীর বিজেপি বিজয়ী হচ্ছেই; এই প্রপাগান্ডা এখন আত্মঘাতী অবস্থায়। তাই বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের মানসিক জোর ধরে রাখার জন্য, মিথ্যা উচ্ছ্বাস জীবিত রাখতে গিয়ে প্রতি পদে পদে এখন “কেন্দ্র বনাম রাজ্য” – এভাবে মোদী-মমতা মুখোমুখি সংঘাত জোরদার করে তুলতে চাইছেন মোদী।

    ভারতের কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতঃ
    কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত ভারতের জন্মের সমান বয়সী এক মারাত্মক ক্ষত। এটা মূলত নেহেরু-স্টাইলে চিন্তার পরিণতি।  এই চিন্তার মূল বৈশিষ্ট হল, কলোনিদখলদার বৃটিশেরা ভারত ছেড়ে চলে গেলেও (তাদের শাসনের প্রধান রাজ/রানীর প্রতিনিধিকে ভাইসরয় বলা হত)  নেহেরু নিজেকে এক “ভাইসরয়-ই” মনে করতেন।  যা তাঁর কাজ ও ততপরতার মধ্যে বিশেষত খোদ ভারত-রাষ্ট্র কাঠামোটাই এর সবচেয়ে বড় স্পষ্ট প্রমাণ।  অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পরের ভারতের জনগণের সাথে নেহেরু নিজের সম্পর্কটা কী এই প্রশ্নে নিজেকে এক কলোনিদখলদারের মত করেই ভবেবে নিয়ে দেখেছেন।  অর্থাৎ “জনপ্রতিনিধি” শব্দ ও এই মৌলিক ধারণাটাই তিনি আমল করতে চান নাই। ফলে একটা “রিপাবলিক” রাষ্ট্রের মূলকথাটাই তাঁর কখনই জানা হয়ে উঠে নাই। বিপরীতে তার ত্রুটিপুর্ণ চিন্তার মৌলিক দিকটা হল, হবু ভারত-রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতা কথিত এক কেন্দ্রের নামে ও এর হাতে কুক্ষিগত করা যায় কী করে সেদিকে সচেষ্ট থেকেই কলোনি-উত্তর ভারতের জন্ম দিয়েছেন; কনষ্টিটিউশন লিখিয়েছেন। এটাকেই আমরা নেহেরুভিয়ান চিন্তা বা নেহেরু-স্টাইলে চিন্তা বলছি। যাকে প্রতীকীভাবে সময়ে নেহেরুর “ভাইসরয়”-চিন্তাও বলেছি।
    কাজেই কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত – এটা আসলে ভারতের রাষ্ট্রগঠনের জন্মগত এক মারাত্মক ত্রুটি। ফলে এককথায় (ফেডারল এক ভারত করে)  এর পুনর্জন্ম বা ভেঙ্গে-গড়া যার একমাত্র সমাধান।  কিন্তু ভারত-রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলে সেটা আবার পুনঃর্গঠনের মুরোদ যদি ভারতের রাজনীতিবিদ-ইন্টেলেজেন্সিয়ার থাকে (যার আলামত এখন পর্যন্ত নাই) তবেই এ’থেকে ভারত মুক্ত হতে পারবে না তা বলাই বাহুল্য। নইলে আস্তে আস্তে এটা ব্ল্যাক-হোলের গর্তে হারিয়ে যাবার মত এক ঘটনা হবে। মানে এককালের যুগশ্লোভিয়া, চেকোশ্লোভিয়া অথবা খোদ সোভিয়েত ইউনিয়ন বলে রাষ্ট্র থাকলেও তাদের ভেঙ্গে যাওয়া বা আজ নাই হয়ে যাবার মত আরেক ঘটনা হবে এটা। কথিত একটা কেন্দ্রের নামে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চাইলে পরিণতি এটাই তো হবার কথা!

    এ অবস্থায় আরেকটু ভেঙ্গে বললে ভারত-রাষ্ট্রে কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদ, এই জিনিসটা কী আসলে? যদিও এই প্রশ্নটাই এখন মোদীর কারণে সর্বত্র সরব হয়ে উঠেছে। এখন যেটা মোদী-মমতা বলা হচ্ছে এটাই কয়েক বছর আগে উঠেছিল রাজ্য-দিল্লিতে, মোদী-কেজরিলাল নামে।  আর তা এবার কলকাতা ছাড়িয়ে ভারতের অন্য রাজ্যগুলোতেও ক্রমে ছড়াচ্ছে। সবাই কান-খাড়া করে উঠতে চাইছে।

    ফেডারেল মানে কী বুঝবঃ
    ফেডারেল [Federal] শব্দটা ইংরেজি। এর একটা বাংলা অনেকে করে থাকেন ‘যুক্তরাষ্ট্রীয়’ বলে। যেমন অনেকে লিখেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইংরাজি United States of America (USA) এর বাংলা হিসাবে।  ফেডারেল রাষ্ট্র ধারণাটা যদি রাষ্ট্র-সম্পর্কিত কোনো বিষয়ের মধ্যে সীমিত থাকে তাহলে হয়ত এমন বাংলা দিয়ে চলতে পারে হয়ত। যদিও এটা ভাল বাংলা নয়। কারণ ফেডারেল শব্দের সাধারণ অর্থ হল, স্বাধীন ও সমতুল্যদের মধ্যে এবং তাদের নিয়ে গড়া এক  এসোসিয়েশন। যেমন স্বাধীন ফুটবল ক্লাবগুলোকে নিয়ে গড়া এক ফুটবলের ফেডারেল এসোসিয়েশন বা ফেডারেশন। অথবা স্বাধীন গার্মেন্টস ট্রেড ইউনিয়নগুলোর এক ফেডারেশন। অথবা সবধরনের স্বাধীন ট্রেডের  এসোসিয়েশনগুলোরও আবার এক ফেডারেশন। লক্ষ্য করেন, এখানে কিন্তু ফেডারেশন বা ফেডারেল ধারণার ব্যবহার কোনো রাষ্ট্র-বিষয়ক ব্যাপারে নয়। তাই ‘যুক্তরাষ্ট্রীয় শব্দটা এখানে কোনোভাবেই যুতসই তো নয়ই; সোজা কথা তা খাটবে না, অচল। তাই এ লেখায় ফেডারেল শব্দের কোনো বাংলা না করেই তা সরাসরি ব্যবহার করব।

    আর ফেডারল শব্দটা আমাদের মানুষের কাছে তাদের নজর ও নাগালে এসেছিল অন্তত দুবার। প্রথমবার ১৯২৮ সালে যখন মুসলিম লীর নেতা জিন্নাহ নেহেরুকে আগামি ভারত (যেটা এখন ভারত ও পাকিস্তান হয়ে গেছে)  স্বায়ত্বশাসিত রাজ্যগুলোর একটা ফেডারল ভারত করা হোক বলে প্রস্তাব করেছিলেন। আর স্বভাবতই আমরা উপরে দেখেছি নেহেরু-স্টাইল ছিল ঠিক এর উলটা, তাই তা প্রত্যাখ্যাত বা পত্রপাঠ বিদায় হয়েছিল। আর দ্বিতীয়বার আমরা শুনেছিলাম ১৯৭১ সালে যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বদলে খন্দকার মোস্তাক পাকিস্তানের সঙ্গে এক কন-ফেডারেশন গড়তে চেয়েছিলেন বা সে লক্ষ্যে কিছু চেষ্টা করেছিলেন।

    তাহলে এখন কেবল রাষ্ট্র-সম্পর্কিত কোনো ধারণা হিসেবে যদি বলি, এটা একটা ‘ফেডারেল রাষ্ট্র’ বলতে যেমন বললাম, আমেরিকা একটা ফেডারেল রাষ্ট্র, তাহলে কী বুঝব?

    সে ক্ষেত্রে এর অর্থ হল, এটা ৫০টা স্বাধীন ও সমতুল্য স্টেটের সমর্থনে গঠিত একটা ফেডারেল রাষ্ট্র অবশ্যই; তবে ফেডারেল রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার আগেই সেগুলো স্বাধীন রাজ্য ছিল এবং আছে বলে তাদের নিয়ে গঠিত এই বিশেষ ধরনের এসোসিয়েশন বা রাষ্ট্রটাকে ফেডারেল রাষ্ট্র বলা হচ্ছে।

    তাহলে এখন এক সম্পূরক প্রশ্ন তোলা যাক। তাই, ভারতও কী একটা ফেডারেল রাষ্ট্র? কারণ ভারতেও তো বর্তমানে ২৮টা ছোট-বড় রাজ্য আছে বা নিয়ে গঠিত?

    না, একেবারেই তা নয়। ভারত কোনো ফেডারেল রাষ্ট্র নয়; যদিও কেন নয় তা যথেষ্ট না জেনে বুঝেই অনেকে পত্রিকা রিপোর্টে ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্যের বিরোধের ইস্যু হলেই তাকে ‘ফেডারেল’ সমস্যা বলে যেচে নিজের জ্ঞানবুদ্ধি জাহির করতে চায় অনেক রিপোর্টার। মানে শব্দটা তারা শুনেছে যেন সেটা বুঝাতে চায়। কিন্তু কথাটা সবচেয়ে বেখেয়ালে বলে ফেললেও ভারত কোনোভাবেই ‘ফেডারেল রাষ্ট্র’ নয়। আর মূলকথাটা হল, একটা রাষ্ট্রের ভিতরে  অনেকগুলো প্রদেশ বা রাজ্য থাকা মানেই সেটা একটা ফেডারল রাষ্ট্র – এই অনুমান একেবারেই ভিত্তিহীন ও বাজে কথা।

    কিন্তু কেন? ফেডারল বুঝতে এত কঠোর সীমারেখা টানছি কেন?
    ফেডারল কথাটা আমরা বুঝতে পারি আমেরিকার জন্মের ইতিহাস দিয়ে এবং সম্ভবত তাতে সবটা সহজে বোঝা যাবে। খুব অল্প কথায় বললে আজকের “ফেডারেল আমেরিকা রাষ্ট্র” এটা ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই জন্ম নিয়েছিল। আজ পর্যন্ত এটাই দুনিয়াতে ফেডারল রাষ্ট্রের সবচেয়ে ভাল উদাহরণ।  আর এর আগের (১৭৭৬ সালের আগের) কলোনিয়াল আমেরিকা [American colonies] বলতে তা ব্রিটিশসহ ইউরোপের বহু রাষ্ট্রেরই  কলোনিদখল ব্যবসায়ী কোম্পানির মালিকানাধীন ছোট ছোট কলোনি বা দখলকৃত ভূমি হিসেবে ছিল। আর ঐ দখলকৃত ভূমিগুলো আবার ব্রিটিশসহ নানান ইউরোপীয় দখলদাররা নিজ নিজ দেশ থেকে ‘বিনা পয়সায় জমি দেয়া হবে, শুরুর বিনিয়োগ দেয়া হবে’ ইত্যাদি নানা প্রলোভনের কথা বলে গরিব ইউরোপীয় বাসিন্দাদের মাইগ্রেট করে জাহাজে ভরে ভরে এককালে আমেরিকায় এনেছিল।

    এসব গরিব ইউরোপীয় বাসিন্দারাই জমি পাওয়ার লোভে মাইগ্রেট করে আমেরিকায় এসেছিল।  এরপর এরাই স্থানীয় আদি বা নেটিভ বাসিন্দাদেরকে (‘রেড ইন্ডিয়ান’ বলে এরা ডাকত যাদের) খেদিয়ে দিয়েছিল, কখনো মেরে ফেলা হয়েছিল অথবা আরো গহিন বন জঙ্গলে পালাতে বাধ্য করা হয়েছিল। আর এভাবেই সাদা চামড়ার কলোনি মালিকরা সাদা ইউরোপীয় গরীব মাইগ্রেন্টদের এনে বসতি স্থাপনে বিভিন্ন ছোট শহর বা রাজের আমেরিকা কলোনি স্থাপন সম্পন্ন করেছিল। এই প্রথম পর্বের পরে মালিকরা এরপর সেখানে নিয়ে আসে আফ্রিকানদেরকে ‘কালো দাস’ নামে, একইভাবে মাইগ্রেট করিয়ে। তফাত খালি এরা পায়ে শিকল পরানো দাস হিসেবে এসেছিল এবং তা আফ্রিকা থেকে। আর এই দাসদেরকেই পরিচালনা করত সাদা মাইগ্রেন্টরা তবে সাদা মালিকদের পক্ষ থেকে। আর রাশিয়ান সোভিয়েত শ্রমশিবিরের চেয়েও ভয়াবহভাবে শিকলে বাঁধা দাসশ্রমিক হিসেবে। তবু যতই দিন গেছে, আর কালো মানুষেরা যত “পোষ” মেনেছে, ততই শিকল আলগা করে দিয়েছে শাসকেরা।

    ওদিকে ব্রিটিশরা ভারতে কলোনি দখল ও শাসন শুরু করেছিল – আমেরিকার কলোনিমুক্ত বা স্বাধীন হওয়ার মাত্র কুড়ি বছর আগেই। ব্রিটিশরা ভারতীয়দের পায়ে শিকল না দিলেও কলোনির হুকুম ও বাধ্যবাধকতার ভেতরে রেখেছিল যা আমাদের প্রায়ই অসহ্য হয়ে উঠলে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটত। কিন্তু আমেরিকার বেলায় নানান শহর ও রাজ্যের সাদা মাইগ্রেন্টরাই এক সময় তাদেরই মাস্টার বা সাদা মালিকদের শাসনের বিরুদ্ধে শুধু বিদ্রোহ নয় একবারে বিপ্লব – মানে পাল্টা ক্ষমতা দখল করে বসেছিল। এটাই আমেরিকান কলোনিতে ‘নয়া আমেরিকান বিপ্লব’ [American Revolution] নামে পরিচিত, যার সময়কাল ১৭৭৬ সালের আশপাশের সময়। সোজা কথা, ব্রিটেনে বসে কলোনি ব্যবসায়ী মালিকরা আমেরিকায় তাদের নানা শহর বা রাজ্যের কলোনিগুলো সাদা ইউরোপীয় মাইগ্রেন্টদের দিয়ে পরিচালনা করবে, এই সুযোগেরই পরিসমাপ্তি ঘটেছিল এতে। এরপর স্বাধীন সেসব শহর ও কোথাও পুরা রাজ্যটাই স্বাধীন হয়ে যায়। এবং এবার তারা একত্রে হওয়ার জন্য সম্মিলিত হয়ে বসেছিল; যেটাকে তারা আমেরিকা মহাদেশীয় সম্মেলন (আমেরিকান কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস ১৭৭৫) নামে ডাকে। Continental-Congress  বসা ছিল খুবই তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা। এরপর পরের বছর ১৭৭৬ সালে এক ফেডারেল আমেরিকা রাষ্ট্রে তারা সম্মিলিতভাবে গঠিত হয় ও এর স্বাধীনতার ঘোষণা [Declaration of Independence (1776)] দেয়।

    ফেডারল ধারণা বুঝবার জন্য এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ও লক্ষণীয় যে, এখানে শহর বা রাজ্যগুলো আগে স্বাধীন ও কলোনিমুক্ত হয়েছিল। এরপরে  এই স্বাধীন রাজ্যগুলো একটা রাষ্ট্রে ফেডারেটেড [Federated] ভাবে একত্র হতে এসেছিল। এটাই ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই জন্মের ঘোষণা দেয়া আজকের ফেডারেল আমেরিকা রাষ্ট্র ও এর বৈশিষ্ট্য। তবে আজকের ৫০ রাজ্যের আমেরিকা যা আমরা দেখছি তা অবশ্য শুরুতে এমন ছিল না। শুরুতে মাত্র ১৩টা স্বাধীন রাজ্য কনফেডারেশনে এ ফেডারেল রাষ্ট্র গড়তে সম্মতি দিয়েছিল। কেন? কারণ সদ্য স্বাধীন কলোনিমুক্ত রাজ্যগুলোর  সবার মনে ভয় ছিল নতুন এই ফেডারেল রাষ্ট্র গড়তে গিয়ে আবার আগের মত কোনো রাজ্য আরেক রাজ্যের ওপর কলোনির মতো আচরণ শুরু করে কি না – সেটাই সবাই আগে নিশ্চিত হতে চেয়েছিল। তাই দ্বিধা ও দেরি। যেমন শুরুতে ফেডারল আমেরিকার কোন একক কারেন্সি বা ডলার মুদ্রা ছিল না। এমনকি এক রাজ্যের মুদ্রা আরেক রাজ্যে চলত না। প্রত্যেক রাজ্যে প্রত্যেক ব্যাংকের আলাদা আলাদা ছাপানো কারেন্সি ছিল। প্রথম স রাজ্যীর সব ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটা কো-অর্ডিনেশনের জন্য ফেডারল রিজার্ভ ব্যাংক (একালের তুলনীয় আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংক ) গঠন করা হয়েছিল এই ১৯১৩ সালে।  এরপর ১৯১৫ সালে প্রথম ফেড-এর ইস্যুকৃত বাজারে আসে। তাই তা কেবল ৫,১০ আর ২০ ডলারের। তাই ধীরে ধীরে যত আস্থা এসেছে ততই ফেডারল আইনকানুন কী তৈরি হচ্ছে সেগুলো এবং গঠনতন্ত্র কী রাখা হচ্ছে, কাঠামো কী ইত্যাদি দেখে আর কিছুটা প্র্যাকটিসে নিশ্চিত হওয়ার পরে ১৩ রাজ্য থেকে সেটা আজ ৫০ রাজ্যের আমেরিকা উঠে এসেছে। কাজেই ফেডারল ধারণার গোড়ার ধারণা হল, আগে নিজে স্বাধীন থাকা পরে ফেডারল বা এক ফেডারেশনের ছাতার নিচে আসা। নইলে বের হয়ে যেন যেতে পারে – এমন সুযোগ ও বের হয়ে যাবার রাস্তা খুলে রাখা থাকা চাই।

    নেহেরুর কেন্দ্র-রাজ্যের ভারতঃ
    তাহলে এখন আসেন ১৯৪৭ সালে, নেহরুর গঠিত ভারত সেও তো এমন ২৮-২৯টা রাজ্যে এবং এরা কি প্রত্যেকে স্বাধীন ও কলোনিমুক্ত রাজ্য ছিল? না, একেবারেই নয়। বরং কথিত ভারত বলে একটা বিরাট ভূখণ্ড ছিল বলে ধরে নেয়া হয়েছিল আর যেটাই ব্রিটিশ শেষ ভাইসরয় (রানীর প্রতিনিধি) মাউন্টব্যাটেন নেহরুর হাতে ১৫ আগষ্ট তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলো কোন কোন ভূখণ্ড? এক কথায় বললে, কেবল যেগুলোর প্রশাসন ব্রিটিশদের হাতে তৈরি ও পরিচালিত হত। অর্থাৎ তিন প্রেসিডেন্সি (বেঙ্গল, মাদ্রাজ ও বোম্বাই) ও প্রায় ১৮টা প্রদেশ। আর এর বাইরে ছোটবড় মিলিয়ে ৫৫০ এরও বেশি করদ রাজার রাজ্য ছিল। কিন্তু এগুলো নেহরুকে হস্তান্তরের প্রশ্নই ছিল না।

    কারণ এগুলো ছিল ব্রিটিশ শাসনক্ষমতার অধীনস্থ এবং শর্ত সাপেক্ষ মানে, রাজারা বৃটিশ শাসনক্ষমতার সাথে তাদের আদায়কৃত রাজস্বের একাংশ শেয়ার করতেন। কাজেই ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে গেলে ওসব করদ রাজ্য তখন থেকে আবার ফিরে স্বাধীন রাজার রাজ্য হয়ে যায়। আর তাতে, নেহরুর কাছে করদ রাজ্যগুলোকে আর হস্তান্তরের কোনো আইনি অধিকার ব্রিটিশ শাসকের ছিল না।

    কাজেই নেহরু যে দুশ্চিন্তায় ‘পাগল’ ছিলেন তা হল, প্রেসিডেন্সি, প্রদেশ ও পুরানা করদ রাজ – এদের সবগুলোকে পিটিয়ে জবরদস্তি করে হলেও, সেনাবাহিনী পাঠিয়ে হলেও – কথিত এক ভারত রাষ্ট্রের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া যায় কী করে! এই হলো জন্মের সময়কালের নেহরুর ভারত। সে কারণে নেহরুর নিজের ভারতের রাজ্যগুলোর জনগণের প্রতি অ্যাটিচ্যুড যেন ভারত কলোনিমুক্ত হলেও তিনি তখনও এক কলোনি ভাইসরয়! যেন নিজেই রাজা বা রানী অথবা প্রধান রাজ-প্রতিনিধি।

    অর্থাৎ উল্টা করে বললে ২৮-২৯ টা রাজ্যে এরা যতই স্বাধীন ততই তা নেহরুর মাথা ব্যথার কারণ। সার কথায়, আমেরিকার মত স্বাধীন রাজ্যগুলো স্বেচ্ছায় যুক্ত হচ্ছে, এমন কোনো ভারত-রাষ্ট্রে তারা সংযুক্ত হয়নি। আর আসলে যে কনসেপ্টটা কাজ করেছে সেখানে যে, মাউন্টব্যাটেন নেহরুকে ভারত বলে কিছু একটা দিয়ে গেছেন; অতএব সে কারণেই ভারতের রাজ্যগুলো স্বাধীন নয়, এমনকি পুরানা করদ রাজ্যগুলোও স্বাধীন নয়  – জবরদস্তিতে করার এই অনুমানটাই বাস্তবায়ন করেছেন নেহরু। আর সেকালে ভারত রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে এভাবে। এই রাষ্ট্র তাই নিজেই নিজেকে কখনো অন্তত কনষ্টিটিউশনে  “ফেডারেল” বলে ব্যাখ্যা করতে বা তুলে ধরতে যায় নাই। তাহলে ভারত কী? এই হলো ভুতুড়ে ভারত ও তার জন্ম!

    এখন এই ভূতুড়ে ভারতটা কে? অনেক সময় মনে হবে এটা বোধহয় ‘উত্তর প্রদেশ’ রাজ্য। কেন? কারণ এর এলাহাবাদ শহরে নেহরুরা বাস করতেন। তার বাবা মতিলাল নেহেরু ওকালতি প্র্যাকটিস করতে কাছের বড় শহর হিসেবে (কাশ্মিরি ব্রাহ্মণ তিনি) এলাহাবাদে এসেছিলেন।

    [ইলাহাবাদের শহরের সব পুরানা চিহ্ন শেষ করে দিলেও এখনও এটা বড় শহর। যদিও এর নাম বদলে “প্রয়াগরাজ” [Prayagraj] রাখা হয়েছে মোদীর দলের হাতে ২০১৮ সালে।  কিন্তু এখনও উত্তর প্রদেশ রাজ্যের সর্বোচ্চ কোর্ট, হাইকোর্টটা  “এলাহাবাদ হাইকোর্ট” নামেই ইলাহাবাদ শহরে থেকেই গেছে।]

    এখন তাহলে এই উত্তর প্রদেশ নামক এই রাজ্য কী ভারতের বাকি সব রাজ্যের ওপর শাসনকর্তৃত্বের কর্তা? কিন্তু সে ক্ষেত্রেও এই শাসনের ভিত্তি কী, ক্ষমতার উৎস কী,  সে প্রশ্ন থাকবে। যার উত্তর কেউ জানে না। তাই এটা ভূতুড়ে! তাহলে কি এটা সেই ইঙ্গিত যে, উত্তরপ্রদেশ মানে এক আর্য-শাসন বুঝতে হবে? তাহলে আর সেটা সবাই মানলেও বাংলা বা দ্রাবিড়ীয়রা তা মানতে বাধ্য কেন?

    এসব প্রশ্নের কোনো দিনই কোনো সমাধান হয়নি। উল্টা উত্তর প্রদেশ বা হিন্দিবেল্ট কেন্দ্রিক ভূতুড়ে এক ক্ষমতা, এরই নাম হয়ে গেছে “কেন্দ্র”। কনস্টিটিউশনেই আবার কখনো একে ‘ইউনিয়ন’ বলা হয়েছে বটে বিশেষত জুডিশিয়ারি অংশে। কিন্তু এটা কাদের ইউনিয়ন? ইউনিয়নে যুক্ত হওয়ার আগে কি তারা স্বাধীন ছিল?  নাকি ভারত বলে এক ভাববাচক আগাম ভুতুড়ে ধারণাই ছিল মাত্র? তাহলে কারা এক জায়গায় জড়ো বা ইউনিয়নে যুক্ত হচ্ছে? এসবের কোনো জবাব কোথাও নেই। বরং আগেই বলেছি সারা ভূখণ্ডকে ভারত নামের মধ্যে ধরে রাখবেন কী করে, কিসের আঠা লাগিয়ে, এটা ছিল বরং নেহরুর দুশ্চিন্তা। এই ‘আঠা’টারই হল হিন্দুত্ব। যদিও নেহরু ও গান্ধী বুদ্ধিমান, তাই তারা এ কথাটা প্রকাশ্যে কোথায় লিখে বলতে চাননি। আর সে কারণেই সম্ভবত এই কথিত কেন্দ্র এই ভারত, সেটা কথিত ‘সেকুলার’ কি না তাও নেহরু ও গান্ধী রা কোথাও লিখে রাখেননি। ইন্দিরা গান্ধী কেবল ১৯৭৬ সালে এসে “বাংলাদেশের কারণে” তা লিখিয়েছিলেন।

    তবে ভারত মানে উত্তর প্রদেশ কিংবা আর্য-শাসন এসব চিন্তা যে নেহেরুর মাথায় কাজ করত এটা অমূলক নয়। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ১৯৬২ সালের কিছু ঘটনা। সেটা হল, সারা ভারতে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা ও অফিসিয়াল ভাষা করতে হবে বলে এক সিদ্ধান্ত নেহেরুর সরকার বাস্তবায়ন করতে গেছিলেন।  নেহেরুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রথম প্রতিবাদ বিক্ষোভ বলা হয় এটাকে যা দ্রাবিড়িয়ান রাজ্য থেকে শুরু হয়েছিল। এবং প্রধানত তামিলনারু থেকে। দ্রাবিড়িয়ান রাজ্য বলা হয়, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গনা, কর্ণাটক, তামিলনারু, কেরালা – এদেরকে। এর দুবছর পরেই নেহেরু মারা যান। আর তিনি বেচে থাকতেই এবং পরের প্রধানমন্ত্রী এই ইস্যুতে আপোষ করে মিটিয়ে নেন।   আর সেই থেকে ভারতে রাষ্ট্রভাষা বলেই কিছু নাই (এটাই সুপ্রীমকোর্টেরও রায়) তবে অফিসিয়াল ভাষা আছে যদিও সেখানে হিন্দির পাশাপাশি ইংরাজিও যুক্ত করে নেয়া হয়। আসলে এটাই ছিল কম্প্রোমাইজ ফর্মুলা।  কিন্তু এখান থেকে এটা পরিস্কার যে কেন্দ্র মানে “আর্য-শাসন” (যেখান থেকে হিন্দি-প্রীতি) ধরণের ধারণায় নেহেরু ভুগতেন।  অনেকে মনে করেন নেহেরুর জীবনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা  ও চ্যালেঞ্জ ঘটেছিল প্রায় একই সময়ে ১৯৬২ সালে।  প্রথমটা আর্যশাসন সংক্রান্ত সারাভারত হিন্দিভাষা চালু করতে গিয়ে ধাক্কা খাওয়া। আর দ্বিতীয়টা হল ১৯৬২ সালে চীনের ভারত আক্রমণ।  আর এই দুই ঘটনার শোকেই তিনি ব্রেনস্ট্রোক করেছিলেন বলে অনেকের বিশ্বাস আর এই ধারণা যে এতে তিনি এই প্রথম নিজের উপর আস্থা হারিয়েছিলেন। আর এর দুবছরের মধ্যে তিনি মারা যান।

    আমরা তাহলে এখন আরো ফোকাসে আসি। সেটা হলো, নেহরুর ভারত তাহলে ফেডারেল দূরে থাক, এটা বরং “কেন্দ্র” নামে ভূতুড়ে ক্ষমতার অধীনস্থতায় থাকা সব রাজ্যগুলোতে, যেখানে মূলকথাটা হল, বহুবিধ জায়গা ও সুযোগ রেখে দেয়া যাতে কেন্দ্র রাজ্যের ওপর চাইলেই হস্তক্ষেপ করতেই পারে। রাজ্যের  সর্ববিধ শাসন প্রশাসনকে ওভাররুল করে  “কেন্দ্র” নামে এক কর্তৃত্বের অধীনে সব তুলে নিতে পারে।

    যেমন গভর্নর ব্যবস্থা, এটা করাই হয়েছে যেন যেকোনো সময় “কেন্দ্র” রাজ্যসরকারকে বাতিল করে এর পরিচালনা নিজের হাতে উঠিয়ে নিয়ে আসতে পারে। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতি খারাপ – এই বলে গভর্নর রিপোর্ট দিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে পারেন। তাই আসলে গভর্নর মূলত কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপের হাতিয়ার। একইভাবে বাজেট বরাদ্দ নিয়ন্ত্রণ অথবা প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতিরোধ ইত্যাদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থ নেয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রের একক নিয়ন্ত্রণে, মানে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতায় রাখা হয়েছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবহার-অপব্যবহার করে [যেমন মমতার] রাজ্য সরকারের উপর প্রধানমন্ত্রীর [মোদীর] হস্তক্ষেপের সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে। আসলে এভাবেই হস্তক্ষেপের মেকানিজম যেন তথাকথিত ভূতুড়ে কেন্দ্রের হাতে থাকে এমন সুযোগ রেখেই সেকালে কনস্টিটিউশন লেখা হয়েছিল; যাতে নেহরু নিজ হাতে সব নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারেন।

    আবার এ হস্তক্ষেপগুলো আগাম কোন লিখে রাখা ‘রুল বুক’ (বা চাইলে তা সংসদে পাশ করে নিয়ে রাখা) মেনে চলা হোক, তা সেভাবে রাখাই হয়নি। বরং রাখা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তি বা সাবজেকটিভ ইচ্ছার উপর। কাজেই রাজ্যকে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিইচ্ছার অধীন হতে হবে রাজ্যকে, সোজা কথায় ‘তেল মারতে হবে’। এমনিতেই রুল বুক বা প্রশাসনের বিজনেস রুল বুকের অধীনে না থাকা কোনো ক্ষমতা মানেই তা ভয়াবহ  এক দানবীয় হতে বাধ্য। কারণ কোন “রুলবুকের” অধীনে লিখিত এই না থাকার মানেই হলো চরম অরাজকতা। কারণ  কেউ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হলেই তার ক্ষমতার প্রয়োগের  ব্যাপারটাকে  তার ব্যক্তিখেয়ালের হাতে কোনোভাবেই ছেড়ে দেয়াই যায় না। রুল বুকের স্ট্যান্ডিং গাইডলাইন অবশ্যই থাকতে হবে। অথচ তা নেই, রাখা হয়েছে সাবজেক্টটিভলি বা অবাধ ব্যক্তি খেয়ালে।

    মোদী-মমতা বা কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদঃ
    এবারের রাজ্য নির্বাচনে দলের হারার পর মোদীর আচরণ ও তৎপরতা বলছে তিনি মমতার সাথে সঙ্ঘাতেই থাকতে চান। অনেকটা যেন তিনি বলতে চান, নেহেরু মহাশয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে এসব অবাধ হস্তক্ষেপের বহুবিধ সুবিধা দিয়ে গেছেন।  ফলে কংগ্রেস তাকে কিছু বলতে পারবে না। কাজেই তিনি সেসব সুবিধা বিজেপি দলের স্বার্থে ব্যবহার করবেন না কেন?   যেমন সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় পরবর্তি পরিস্থতিকে তদারকির উছিলা করে মোদী মমতার সাথে এক মিটিংয়ে বসতে চান বলে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। কিন্তু মোদীর ইচ্ছা সেখানে তিনি রাজ্য বিরোধীদলের নেতা হিসেবে তার দলের লোককেও উপস্থিত রাখবেন এবং এতে সম্ভবত দলীয় কর্মীদের দেখাবেন যে কলকাতার বিরোধী নেতাও অনেক ক্ষমতা রাখেন। এখন এই প্রসঙ্গে মমতার দাবি, মোদী এই ব্যাপারটা একা ঠিক করতে পারেন না যে, রাজ্য থেকে সচিব ও প্রশাসনিক স্টাফসহ সাথে আর কোন কোন জনপ্রতিনিধি তাদের দুজনের সভায় উপস্থিত থাকবেন। আর এসব বিধি বা কনস্টিটিউশনে নেই বলে দাবি করেছেন মমতা।

    এমনিতেই এটা দৃষ্টিকটু যে প্রধানমন্ত্রী ব্যুরোক্র্যাট আর মুখ্যমন্ত্রীর মতো জনপ্রতিনিধিকে একই প্রটোকলে ট্রিট করছেন। এর উপর সবখানেই মোদীর এটা প্রদর্শনের ইচ্ছা যে, মুখ্যমন্ত্রী যেন প্রধানমন্ত্রীর এক অধীনস্থ প্রশাসনিক স্টাফ! এমনিতেই নেহরু কথিত কেন্দ্রের হস্তক্ষেপের বহুবিধ সুযোগ রেখে দিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক সাজিয়ে গেছেন। কারণ তার অযথা ভয় থেকে অযাচিত ক্ষমতার চর্চা যে রাজ্য যদি কেন্দ্রের কথা না শুনে; তাই সবসময় রাজ্যকে দাবড়ে রাখার সব মেকানিজম, দ্বৈত ক্ষমতাকর্তৃত্ব-ব্যবস্থা- এসবই হবে এর হাতিয়ার। এর উপর মোদী নিজেই মমতাকে একটা শিক্ষা দিয়ে অধীনস্থতায় আসতে বাধ্য করতে চাচ্ছেন। তাই সব মিলিয়ে এটা ভয়াবহ।

    এখন মমতা ওই সভায় রাজ্যের প্রধান সচিবকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ইচ্ছা করেই সম্ভবত কেবল মোদীর সাথে সাক্ষাৎ করেই, কোনো মিটিং না করেই ফিরে চলে আসেন। শুধু তাই নয়, নিজ রাজ্যের মুখ্যসচিবকেও সাথে নিয়ে  মোদীর মিটিং বর্জন করে চলে আসেন।

    স্বভাবতই এটা মোদির জন্য অপমানবোধের। তিনি মুখ্যসচিবকে শোকজ করেন এবং দিল্লিতে এসে রিপোর্ট করতে বলেন। কিন্তু মুখ্যসচিব এর জবাবে লিখেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে মানে কথা শুনেই মোদীর ওই সভায় থাকতে পারেন নাই। অর্থাৎ তিনি যেন বলছেন, আমিও কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারী অবশ্যই। কিন্তু আমার বর্তমান রিপোর্টিং জনপ্রতিনিধি হলেন মুখ্যমন্ত্রী; প্রধানমন্ত্রী নন। কাজেই মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশকেই তাকে ফলো করতে হয়েছে। অর্থাৎ এটাও আসলে এক দ্বৈত ক্ষমতা ব্যবস্থার পরিণতি এবং তা ব্যুরোক্র্যাসিতে।

    এতে যে নতুন জিনিষটা সামনে এসেছে তা হল, এতদিন মনে করা হত কেন্দ্র-রাজ্য বিবাদের ইস্যুটা বোধহয় কেবল রাজনৈতিক। ফলে রাজনৈতিক নেতাদের কেবল এতে সংশ্লিষ্ট হবেন বা সাফার করবেন। কিন্তু না। এবার প্রমাণ হল যে বুরোক্রাসির সব অফিসারেরাও (ভারতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের ) এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট হবেনই এবং তাদেরকে পক্ষও নিতে হবেই। আসলে এভাবে একসময় সারা ভারতই অনুভব করবে যে সকলের সরাসরি স্বার্থ জড়িয়ে আছে এই ইস্যুতে। দেখা যাচ্ছে বুরোক্রাসিও এখন এই তর্কে পক্ষ নিচ্ছেন। যদিও এখনও অনেকেই রাষ্ট্রগঠন ব্যাপারটা বুঝেন না বলে ভেবেছেন ভারতের এই দুঃখ বোধহয় বুরোক্রাসির সীমাবদ্ধতা। শ্যাম সরণ একজন অবসরে যাওয়া ক্যাডার কূটনীতিক ও সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা। তাঁর ভাবনায় এই সংঘাতের পলিটিক্যাল ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতাটা দেখতে চান নাই  বা তার চোখেই পরে নাই হয়ত। তাই তিনি এটাকে বুরোক্রাসির রিফর্ম করেই রাজনৈতিক চিন্তা বা রাষ্ট্রগঠন-বিষয়ক রাজনীতিবিদদের চিন্তার ঘাটতির  সমাধান করে ফেলবেন ভেবেছেন। যা একটা ফলস অনুমান।

    এমনিতেই সবখানে জাতিবাদ বিশেষ করে জাতিগত-শ্রেষ্ঠত্ববাদের তোড়ে ভারত ডুবছে। এর ওপর তাদের আরেক ভ্যানিটি হল, ভারতের ব্যুরোক্র্যাসি নাকি ‘স্টিলের তৈরি’, [Anarchy, dents Sardar Patel’s IAS steel frame’ ] তাই এটা এতই শক্ত। আর এর ক্রেডিট হল নাকি সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের যিনি এর প্রণেতা, মন্ত্রী। প্যাটেল, তিনি মহাত্মা গান্ধীর মতই এক গুজরাটি লোক ও বাসিন্দা। তাই মোদী গুজরাটে তার রেকর্ড উঁচু (৫৯৭ ফুট) এক স্ট্যাচু বানিয়ে নিজেই আরো বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। আর সেই প্যাটেল হলেন আবার নেহরুর সব আকাম বা জবরদস্তি ঘটানো যে কোনো কাজের ডানহাত। যেমন ১৯৪৭ সালে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে করদ রাজাদের ভারতে অন্তর্ভুক্ত হতে বাধ্য করার নেতা তিনি ছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে।

    এখন বাস্তবে এই স্টিলের ব্যুরোক্র্যাসির যে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা চর্চার দিক থেকে মূলত এক দ্বৈত শাসনব্যবস্থা আর সেটাই ভেঙে পড়তে যাচ্ছে তা বুঝতে পারা বা বিপদ অনুভব করার কেউ আছেন এমন দেখা যাচ্ছে না।

    কাজেই এভাবে চললে মোদীর টার্ম শেষ হতে হতে ২০২৪ সাল নাগাদ নেহরুর ছাপ মারা এই ভারত মানে, এই নেহরুভিয়ান ভারতরাষ্ট্র তার জন্মদুর্বলতায় ক্রমেই আরো কয়েক ধাপ ভাঙনের দিকেই এগিয়ে যাবে। এর সোজা প্রকাশ আমরা দেখতে পাবো পরবর্তীতে কথিত কেন্দ্রীয় সরকার গঠনে। আমরা হয়ত দেখব, কোনো সর্বভারতীয় দল যেমন কংগ্রেস বা বিজেপি – এরা আর কেন্দ্রে সরকার গড়তে পারছে না।  আঞ্চলিক দলের কোয়ালিশনই একমাত্র ভরসা হিসেবে উঠে আসার সম্ভাবনাই বড় হবে।

    এটাই রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার পূর্বাভাস। এমনিতে রাষ্ট্র ভেঙে পড়া মানেই তা খারাপ, তা কিন্তু নয়। কারণ গড়তে গেলে তো আগে তা ভাঙতেই হবে। কিন্তু এটাই বিরাট বিপদের হবে যখন ভাঙার পরে গড়বেন কিভাবে, কী গড়তে চান, এ নিয়ে আপনি একেবারেই অপ্রস্তুত ও পরিকল্পনাহীন! সারা ভারতের দশা আবার এটাই বলে মনে হয়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ৫ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “নেহরুভিয়ান এক গুপ্ত-হস্তক্ষেপের রাষ্ট্র“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মুচকুন্দ দুবে দুকূল হারানো এক “বেচারা”!

    মুচকুন্দ দুবে দুকূল হারানো এক “বেচারা”!

    গৌতম দাস
    ৩১ মে ২০২১, ২০:০৫ সোমবার

    Muchkund-Dubey

    বিবিসি বাংলা গতকালকে একটা রিপোর্ট করেছে “প্রেসিডেন্ট জিয়া ভারতকে গ্যাস বেচতেও রাজি হয়ে গিয়েছিলেন: ভারতীয় কূটনীতিক” – এই শিরোনামে। গত কয়েকদিন ধরে “ঢাকা-দিল্লির বন্ধুত্বপুর্ণ সম্পর্কে ফাটল বাড়ছে’ টাইপের নিউজ – অনেক মিডিয়ায় হতে দেখা গেছে। এমনিতেই গত ২০১৮ সালের প্রথমদিকের সময় থেকে “ভারতকে যেটা দিয়েছি তারা তা সারা জীবন মনে রাখবে’ বলে হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার পর থেকে স্বামী-স্ত্রী বা বন্ধুত্বের সম্পর্কে ফাটলের যে সন্দেহ শুরু হয়েছিল তা আর কখন মিটে নাই। যদিও তা কখনও প্রবল হয়েছে কখনও ভাটার টানে আছে মনে হয়েছে।

    কিন্তু বিবিসির এই নিউজটা সম্ভবত একটা চিহ্ন যে, এবার সত্যিই আমাদের আপা এই বিরাট ভারতকে কয়েকটা চড়-থাপ্পড় না হলেও একটা বড় দাগা বা ধাক্কা দিয়েছেন মনে হচ্ছে। আর এরই চিহ্ন হল সর্বশেষ বিবিসির এই নিউজ।  বর্তমান দিলীপ ঘোষের আগে বিজেপি-আরএসএসের তহবিল আগলে কলকাতায় বসে থাকতেন তথাগত রায়। তাঁর আমল থেকে লক্ষ্য করা গেছিল বিবিসির এই শুভজ্যোতি ঘোষ রিপোর্টকে। যা পড়ে মনে হত তিনি বিবিসি না, আরএসএসের কোন ক্যাডার হয়ে বিবিসিতে লিখেছেন সেটা। পরবর্তিতে তথাগত রায়কে নর্থ-ইস্ট রাজ্যের গভর্ণর করে সরিয়ে নিলে শুভজ্যোতি ঘোষ এর অত্যাচার থেকে পাঠকেরা সে যাত্রায় রক্ষা পেয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে সেদিন আবার ফিরে এসেছে। এবং খুব সম্ভবত শুভজ্যোতি ঘোষের এবারের এসাইনমেন্ট আর স্থানীয় নেতা হিসাবে নয়,বিজেপির কেন্দ্র বা সরকার থেকে উতসারিত। অতএব বিবিসির প্রশাসক / সম্পাদক বলে সংশ্লিষ্ট যারা আছেন তাদের সচেতন হবার এটা হাই-টাইম যে বাংলাদেশের আম-পাবলিক থেকে বিবিসির বিচ্ছিন্ন হওয়া বা দূরে চলে যাওয়া এসব ঘটা শুরু হয় সাধারণত এখান থেকেই।

    কূটনীতিক মুচকুন্দ দুবে জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার শেষ জমানায় (১৯৭৯-৮২) ঢাকায় ভারতের রাষ্ট্রদুত ছিলেন। আর পরে ১৯৯০-৯১ সালের দিক ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হয়েছিলেন, এরপরে অবসরে যান। এছাড়া বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক নিয়ে প্রায়ই মিডিয়াগুলো যাদের মন্তব্য তাতে সংযোজন করে রিপোর্ট পুর্ণ করে থাকেন দুবে তাদের একজন। আবার ভারতের যারা ঢাকায় যোগাযোগ-সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপুর্ণ সেন্টার হিসাবে প্রথম আলোকে গোনায় শীর্ষে রাখেন মুচকুন্দ দুবে তাদের একজন। বছর দেড়েক আগে রেহমান সোবহানকে সাথে নিয়ে তাঁকে প্রথম আলোর অফিস ঘুরতে আসতে দেখেছিলাম আমরা। কিন্তু কখনই তাঁকে বিজেপি-আরএসএসের ধব্জা বহনকারী মনে হয় নাই; আর এবার তার চেয়েও নিকৃষ্ট কিছু মনে হয়েছে।

    বিবিসির উল্লেখিত ঐ নিউজের একটা অংশ এমনঃ
    “মি. দুবে বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ‘বাস্তববাদী জিয়াউর রহমানকে ভারতও কিন্তু বিশ্বাস করত’।
    ‘পরের দিকে ভারত সরকার মনে করতো তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেছিলেন। কিন্তু জিয়া কোনওদিন তা করেননি বলেই ভারতের ধারণা ছিল।”

    ক্যাডার কুটনীতিক দুবের বয়স এখন ৮৭ বছরের কম নয়। এখন এই বয়সে কেউ যদি তাকে কূটনীতির ভাষা শিখাতে আসে সেটা দুবের জন্যই উপাদেয় হবে না বলাই বাহুল্য। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি ভাষা ব্যবহারে তিনি কত নিচে নামতে পারেন; নেমে একেবারে তলিয়ে যাচ্ছেন। তিনি অভিযোগ করছেন “খালেদা জিয়া পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেছিলেন”, তাই তিনি খারাপ বা ভারত তাকে বিশ্বাস করত না ইত্যাদি। মিঃ দুবে খালেদা জিয়াকে অপছন্দ করতেই পারেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে তিনি সে সময়কালের এক প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে কথা বলছেন। খালেদা জিয়া কেন পাকিস্তান সরকার নয়,প্রধানমন্ত্রী নয়, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রী অথবা রাষ্ট্রদুত নয়……দুবে বলছেন,খালেদা জিয়া পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেছিলেন।

    ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কোন কূটনীতিক কী বলবেন যে “হাসিনা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেছিলেন” – এটাই হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ!নাকি শুধু এটা বলাই যথেষ্টের চেয়েও বেশি হবে যে যদি তিনি বলেন হাসিনা “ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেছিলেন”। এটাই কী কোন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্মানের সাথে তুলে ধরার উপযুক্ত পথ নয়? মিঃ দুবে আপনি খালেদা জিয়াকে অপমান করতে চাইছেন কেন?

    তাহলে মিঃ দুবে, খালেদা জিয়াকে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার পর্যায়ের প্রটোকলে নামাচ্ছেন। কেন? নাকি তাঁকে নিচা দেখাতেই হবে এটাই আপনার এসাইনমেন্ট? তাই কী?
    এতে একজন সাবেক কূটনীতিক হিসাবে কুটনীতিক দুবের কী সম্মান বেড়েছে? নাকি তিনি মরিয়া, অর্থকষ্টে আছেন কী? এত নিচে নিজেকে নামান কীভাবে?

    দুবে-রা এমন ডেসপারেট হয়ে উঠছেন কেন? সেজন্য এখন মনে হচ্ছে হাসিনার বাংলাদেশ ভারতকে আসলেই বড় ধাক্কা দিয়েছে। কাদায় ফেলে দিয়েছেন! সেজন্যই কী মোদীর সরকার শুভজ্যোতি ঘোষ, বিবিসি আর মিঃ দুবে ইত্যাদি যাদেরকেই পেয়েছেন সবাইকে খেপ মারতে কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন হাসিনার মন পাওয়া বা মন গলানোর জন্য? ভেবেছে জিয়া ও খালেদা জিয়া কত খারাপ সে বন্দনাগুলো তুলে ধরলে হাসিনার মন পাবে ভারত? এদেরকে আর কী বলব? বেচারা!

    কোন কাজ করতে গেলে আগে কিছু হোমওয়ার্ক করে নিতে জানতে হয়। মিঃ দুবে এসবেরও যোগ্য নয়। গত ২০০১ সালের নির্বাচনের পরে অনেক সময়ই হাসিনা আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক “কথার লড়াইয়ে” অভিযোগ করা শুরু করেছিলেন যে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানেরা (মানে খালেদা জিয়া বা বিএনপি) ভারতকে গ্যাস বিক্রি করতে মুচলেকার বিনিময়ে ক্ষমতায় এসেছেন। আর সেই থেকে হাসিনা প্রায়ই এমন অভিযোগ করে থাকেন। কিন্তু মিঃ দুবে মনে হচ্ছে একেবারেই বেখবর আছেন। এই খবরটাই রাখেন নাই। এখন বলেন, মিঃ দুবে আপনি একই মুরগি কয়বার জবহ দিবেন? নাকি দেওয়া যায়? হাসিনা বলে আসছেন এটা খালেদা জিয়া আর আপনি এখন দাবি করছেন এটা জিয়াউর রহমান! কী তামশা!
    আবার মিঃ দুবের খেয়াল রাখা উচিত হাসিনার অভিযোগটা ছিল উলটা ভারত ও আমেরিকার উপরে।শিরোনামটাই লক্ষ্য করেন। হাসিনা বলেছিলেন,  আ.লীগকে হারাতে একজোট হয়েছিল ভারত-যুক্তরাষ্ট্র।  কাজেই মিঃ দুবে এখন কোথায় পালাবেন? এজন্যই বলছিলাম হোমওয়ার্ক না করে কোন কুটনীতিক দূরে থাকে কোন বুদ্ধিমান মানুষই কাজে নামে না।  মিঃ দুবে এখন বলেন যে অভিযোগ আপনার দেশের বিরুদ্ধে হাসিনা তুলেছেন সেই অভিযোগ এখন খোদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার বিরুদ্ধে আপনিও তুলতেছেন!  এজন্যই আপনি বেচারা হবেন!

    আগে বাংলাদেশের বেড়ে উঠার ইতিহাস জেনে নেনঃ
    আর মিঃ দুবে আপনি দু-এক বছর রাষ্ট্রদুত থাকলেও সত্তরের দশকের বাংলাদেশ সম্পর্কে ওর সমসাময়িক পটভুমি সম্পর্কে আপনার নুন্যতম ধারণাও নাই। প্রথমত সে সময়ে গ্যাস যে বিদেশে বেচা যায় সেটাই রাজনীতির পাড়ায় জানা ছিল না। আর ওদিকে আমাদের গ্যাসের চাহিদা ছিল খুবই কম আর আমরা তখন ডাঙ্গা মাটির নিচের গ্যাসই ব্যবহার করে কখন তা শেষ হতে পারে তা আমাদের মনে হত না। কারণ এরশাদের আমলে বিশ্বব্যাংকের সংস্কারের ফলেই আমাদের অর্থনীতির আকার প্রথম বড় হয়। তাই গ্যাসের চাহিদা বাড়ে, একমাত্র তখনই উপকুলে সাঙ্গুর গ্যাস তুলবার প্রসঙ্গ প্রথম সামনে আসে।

    আর সবচেয়ে বড় কথা ১৯৮০ এর দশকের আগে মানে এরশাদের ক্ষমতাদখল নিবার আগের রাজনৈতিক পরিবেশ আর পরের মধ্যে ্প্রথম আমরা আকাশ-পাতাল ফারাক হয়ে যেতে দেখি। সাধারণভাবে সেকালের রাজনীতিতে আর বিশেষ করে ছাত্র রাজনীতিতে অসততা বা কোন আদর্শ মেনে না চলার ঝোঁক – এমন দেখতে পাওয়া সম্ভব ছিল না। রাজনীতি তখনও সমাজে অনেক পবিত্র জ্ঞান আর মর্যাদা পেত। সেটা খুব সম্ভবত একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের অল্প-পরবর্তিকালের কারণে। আর এটাকেই পরিকল্পিতভাবে এরশাদকে ভাঙতে হয় কারণ তিনি প্রথমত সামরিক সরকার বলে গণবিচ্ছিন্ন ছিলেন। আবার এর চেয়েও বড় কথা বিশ্বব্যাংকও চায় নাই তার নেতৃত্বের ঐ অর্থনৈতিক সংস্কারে “পাবলিক সংশ্লিষ্ট” হোক – এসব মিলিয়ে নিজেকে সারভাইভ করাতেই শাসক এরশাদ অর্থলাভের লোভে বা বিনিময়ে ছাত্র রাজনীতির সুচনা করেন। এছাড়া এসব থেকেই দুর্নীতি ক্রমশ সমাজে চোখে পড়ার মত জেঁকে বসতে থাকে। আর এর আরেক সবচেয়ে বড় কারণ খারাপ আমলারা আর “নির্বাচিতদের জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা দেও” – এনজিও-সুশীলেরা এই ভুয়া অবুঝ শ্লোগানটা ভুল ভাবে দেওয়ায় বিশেষ করে “পারটিসিপেটরি গণতন্ত্র” নামে সোনার পাথরের বাটি বুঝের ততপরতায় পুরা প্রশাসনকে দুর্নীতিতে ভরপুর করে তোলা হয়েছিল।

    কাজেই ৭৯-৮০ সালের জিয়ার যুগে বাংলাদেশের রাজনীতি পকেট ভর্তি করার কালে প্রবেশই করে নাই। আবার তখন কমিউনিস্টরাও সমাজে যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিল, বিশেষত নৈতিক রাজনীতির ব্যাপারে। আর তাতে সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক কমান্ডে কমিউনিস্ট কতৃত্ব তখনও খুবই শক্তিশালী ছিল। বলা যায় ১৯৮৫ সালের পর থেকে এটা হেরে-ম্লান হয়ে যেতে শুরু করেছিল।

    আবার মূল কথা যারা জিয়াউর রহমানের রাজনীতির ও শাসনকালের বহু দোষত্রুটি থাকতেই পারে। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে নুন্যতম যিনি জানেন না তারা জিয়া সম্পর্কে এসব লুজ-টক অবলীলায় বলতে পারেন। এর পিছনের মূল কারণ সম্ভবত, তখনও বাংলাদেশে সমাজে বৃটিশ আমল থেকে কাজ করে আসা ভ্যালুজ যা রাষ্ট্র সরকারে পাবলিক স্বার্থ প্রসঙ্গে সেই মূল্যবোধ তখনও যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। বড় ভাবে ভেঙ্গে পরে নাই। আমলারা অদক্ষ হতে পারে কিন্তু কিছু মূল্যবোধ তাদের উপর তখনও কাজ করত। জিয়াউর রহমানকে আমরা  “সেই মুল্যবোধের আদর্শ রাজ-কর্মচারি” টাইপ ভাবতে পারি বা বলতে পারি। এটাকেই এরশাদের হাতে প্রশাসনিক সংস্কারের নামে আর পারটিসিপেটরির নামে পুরাপুরি দুর্নিতিতে ডুবিয়ে দেওয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল। বাস্তবে তাই কাগজ কলমে প্রশাসনিক বিজনেস রুল বদলে যায় পুরা আশির দশকের মধ্যেই। আর এর সবর্ত্র প্রয়োগে দুর্নীতি ছড়ায় ৯১ সালের পরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্বে ও প্রশাসন ও রাজনীতিকের যৌথ উদ্যোগে। মূল কারণ, কেউ নির্বাচিত হলেই যেন সব মাফ তিনি সব দুর্নীতির নায়ক হতে পারেন, সরকারের স্টান্ডিং রুল বলে কিছু থাকার আর দরকার নাই। সেগুলো নাকি আমলাতন্ত্র। আমলাতন্ত্র অরিজিনালি একটা পজিটিভ শব্দ সেটাই এসব পেটিমধ্যবিত্ত কমিউনিষ্ট জানে নাই – এদিকটা অর্ধশিক্ষিত সুশীলেরা কেউ বুঝে নাই।

    কাজেই প্রেসিডেন্ট  জিয়া সম্পর্কে মিঃ দুবে যা বলেছেন এসব হাল্কা প্রপাগান্ডা এগুলো কোন সাবেক কূটনীতিকের বক্তব্য বলে ভাবা কঠিন। আবার সেগুলো এমন উদ্দেশ্যমূলক গীবত যে মনে হয় না যে সরকারও সেটা গ্রহণে আগ্রহ দেখাবে বা তার আকাজে লাগবে।

    ওদিকে জিয়ার আমলের ভারতের সঙ্গে হওয়া বিভিন্ন চুক্তি প্রসঙ্গেঃ নেহেরুর কংগ্রেস মূলত একটা কলোনিদখলদারি মনোভাবের দল ও সরকার ছিল। এর মূল কারণ সম্ভবত নেহেরুর ভয় যে দাবড়ে রেখে শাসন করলেই একমাত্র পাবলিককে একসাথে ধরে যাখা যায়। নইলে ভারতের ২৮/২৯ রাজ্যকে একসাথে ভারতে ধরে রাখা যাবে না। ভারত ভেঙ্গে যাবে। এই ছিল নেহেরুর সবচেয়ে করুণ রাজনৈতিক অনুমান বা বিশ্বাস। আর ততই তিনি ছিলেন সমকালীন আন্তর্জাতিক আইন, নীতি কনভেনশন সম্পর্কে অজ্ঞ। তাই নেহেরুর ভারত কখনই পড়শি কাউকে তার ন্যায্য আইনগত পাওনা দেয় নাই। ইতিবাচক ডিল করা যায় কিভাবে তাই তিনি জানতেন না। ডিল বলতে কেবল রাজা-প্রজার ডিলই বুঝতেন। সেকারণেই ভাটির দেশ হিসাবে আমাদের ন্যায্য পাওনার পানি, সেটা আমরা দুবারই পেয়েছি বিশেষত যখন কংগ্রেস সরকারে ছিল না। জিয়ার আমলটা ছিল মোরারজি দেশাইয়ের আমল,তাই পানি পেয়েছিলাম। এটাই মূল সুত্র। কাজেই মিঃ দুবের মনে করার কোন কারণ নাই যে আমরা ভারত সম্পর্কে বুঝা জানাশুনা রাখি না।

    আর গ্যাস নিয়ে আরেকটা আসল কথা বলা যাক। বাংলাদেশে কখনই এমন প্রমাণিত গ্যাস রিজার্ভ ছিল না যা নিয়ে রপ্তানির কথা ভাবা যায়। এই হল বটম অব দা ফ্যাক্টস। এখন ধরা যাক জিয়া এবং খালেদা দুজনই খালি গ্যাস বিক্রি করে দিতে চান এমন খারাপ মানুষ ছিলেন। কিন্তু এখন প্রশ্ন হল, তাহলে ভারত সেসব কথা বিশ্বাস করেছিল কেন? তার মানে ভারতের নিজের ইন্টেলিজেন্স ছিল না? সে জানতই না যে বাংলাদেশের রিজার্ভের অবস্থা কী? তাহলে এই ভারত লইয়া দুবে-রা কী করিবে? কতদুর যাইবে?

    তবে আগামিতে ভারতের পররাষ্ট্র বা গোয়েন্দা বিভাগ মিঃ দুবেদেরকে দিয়ে ঠিক এর উলটা কথা বলাতেও পারে যে, “হাসিনাকে ভারত সরকার কখনও বিশ্বাস করে নাই”। সেটা কী খুব অমূলক হবে? মনে হচ্ছে না! তবে সেটা অন্য আরেকটা মি.দুবে নিয়ে এসে এরপর তাকে দিয়ে বলাতে পারে। ভারত-বাংলাদেশের “সম্পর্কে ফাটল দেখা” দেক আর নাই দেক, সবকিছু হঠাত চিতপট হয়ে উলটে যাওয়া মোটেও অবিশ্বাস্য নয়। কারণ, সময়টাই অস্থির…।

    তবে মিঃ দুবে, আপনার এই ভুয়া সাফাই বা খালেদা জিয়াকে নিয়ে অশোভন কটু কথা বলা, এর ফল একদিন তাকে ভোগ করতে হতে পারে। সেদিন এটা তিনিসহ পুরা ভারতেরই বিরুদ্ধে চলে যাবে। কোন পেশাদার কূটনীতিক তাই এমন আচরণ কখনও করেন। রাষ্ট্রস্বার্থ মূলত খুবই ডেলিকেট জিনিষ। কূটনীতিক আচরণ তাই ঠাট্টা নয়। মানানসই কূটনীতিক আচরণের ব্যাপারে তাদেরকে সেকারণে সবসময় সতর্ক থাকতেই হয়। তবে জিয়া বা খালেদার বিরুদ্ধে বলতে পেরেছেন বলেই হাসিনা তাঁদেরকে পছন্দ করবেন এই অনুমানের ভিত্তি নাই। মিঃ দুবে সেক্ষেত্রে দুকূল হারানো এক “বেচারা” হয়ে যেতে পারেন!

     

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    ৩১ মে ২০২১
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধিতা কেন করতে হবেই

    ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধিতা কেন করতে হবেই

    গৌতম দাস

    ৩১ মে ২০২১, ০০:০৫  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3zf

     

    Pro-Palestinian protesters seen on O’Connell Street, Dublin, 

    কেন আমরা ইসরাইলের বিরোধিতা করি এবং করে যাবো? বাংলাদেশে আমাদের প্রায় নব্বই ভাগ জনগোষ্ঠি মুসলমান আর ফিলিস্তিনিরাও মুসলমান। তাই আমাদের মুসলমান নাগরিকেরা ধর্মীয় দায়িত্ব অনুভব করে যে ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানোর।  আর তাই ফিলিস্তিনিদেরই ঘাড়ের ওপর বসে তাদেরকে বঞ্চিত করে কেবল ইহুদিদের জন্য বানানো জুলুমবাজ ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা – এই হল আমাদের সাধারণ মানুষের ধর্মতাত্ত্বিক বোধ ও কর্তব্য। ফিলিস্তিনিদের লড়াই সংগ্রাম সমর্থন করে যাওয়া আমাদের কাজ। এটা ধর্মতাত্বিক দিক থেকে খুবই শক্ত এক পদক্ষেপ ও শক্ত আর্গুমেন্টও এবং সবার উপরে এটা ফিলিস্তিনিদের পক্ষে এক ব্যাপক জনসমর্থন জোগানোর দিক থেকে খুবই কার্যকর উপায়!

    কিন্তু তবু অন্যান্য দিকেরও তৎপরতা এবং পালটা শক্ত বয়ান ও পয়েন্ট আমাদের দরকার আছে। কারণ এটা কলোনি যুগ পেরিয়ে অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রের যুগ এবং গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা বলতে যা আমরা সামনে দেখি তা এক অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাই – এমন এক গ্লোবাল সময়ে আমরা বসবাস করছি। এর কেন্দ্রে আছে কলোনিমুক্ত রাষ্ট্রগুলোর এক প্রভাবশালী অ্যাসোসিয়েশন, নাম তার ‘জাতিসঙ্ঘ’। জাতিসঙ্ঘের অনেক দুর্বলতা, অক্ষমতা ও অকর্মণ্যতা এবং সর্বোপরি, ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ার সমস্যা সবই আছে, কথা সত্য। কিন্তু এসব সত্ত্বেও জাতিসঙ্ঘই কমান্ড করে বলে দিতে পারে, কাউকে কলোনি দখল করে শাসন করা অবৈধ। সাদ্দাম-পরবর্তী ইরাককে বুশের দখল করে নেয়া তাই জাতিসঙ্ঘের চোখে ‘অবৈধ দখল’ ছিল এবং কফি আনান তা পাবলিকলি ঘোষণা করে বলে দিয়েছিলেন।
    আবার, ১৯৪৭ সালে কাশ্মিরের রাজাও কাশ্মির ভারতের সঙ্গে যুক্ত ও বিলীন হতে চায় বলে কাগজে সই করেছিলেন। কিন্তু জাতিসঙ্ঘ তা মানে নাই, অবৈধ মনে করেছিল। কারণ জাতিসংঘের জন্ম ম্যান্ডেট মনে করে, কাশ্মিরের পক্ষে এই সিদ্ধান্ত নেয়ার একমাত্র বৈধ অধিকারী কাশ্মির-ভূখণ্ডের বাসিন্দা জনগণ, ফলে গণভোট করে তাদের রায় জেনে নিয়ে তা অনুসরণ করতে হবে। অতএব, আধুনিক রাষ্ট্র ও এর কাঠামোগুলোর গুরুত্বও বুঝতে হবে।
    আবার ধরা যাক হয়ত, আপনার মাথায় রাষ্ট্র বিষয়ে অনেক ভারী তত্ত্বকথা আছে বলে আপনি মনে করেন। কিন্তু দয়া করা উপস্থিত আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাটার কোনো অর্জন নেই, কিছু হয় নাই, কিচ্ছু না, বলে এর বিরুদ্ধে কামান দাগার কাজ হাতে নেবেন না। এটা অপ্রয়োজনীয়। আপনি নতুন যা করতে চান, যে নতুন ক্ষমতা কায়েম করতে চান তা করুন- সেজন্য এখন তা নিয়ে প্রচার, বুঝানো, হেদায়েত সব করতে থাকুন আর সে কাজে জাতিসঙ্ঘসহ এই আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাটা আপনার পক্ষে যতটা সম্ভব ব্যবহার করেই তা করতে থাকুন। পরে নিজে ক্ষমতাবান হয়ে গেলে পুরান সবকিছু বদলে ফেলতে এরা কেউ বাধা হবে না। সোজা কথা বর্তমানের অর্জনকে ফেলে দিয়ে পায়ে মাড়িয়ে এগিয়ে যেতে চাইবেন না। বরং বলতে পারেন, এটা যথেষ্ট অর্জন হয়নি। আরোঅনেক কিছু করতে হবে। কিন্তু দয়া করে এটা বলবেন না যে, এটা কোনই অর্জন নয়।

    এখন আসুন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা মোতাবেকই ইসরাইল রাষ্ট্র কেন ভেঙে দেয়া উচিত – সেসব বুঝে নেয়ার চেষ্টা করি। মনে রাখতে হবে, ইসরাইল টিকে আছে (যেভাবেই হোক) মূলত নিজের পক্ষে এক গ্লোবাল সমর্থন জোগাড় করতে সক্ষম হয়ে আছে বলে। কাজেই আমাদেরও ঐ গ্লোবাল সমর্থন ভাঙতে হবে, আর পালটা সমর্থন যোগাড় করতে হবে। কখন ও কিভাবে? আমেরিকার নেতৃত্বের এই গ্লোবাল সমর্থকদের দুর্বলতার জায়গায় আঘাত করতে হবে যখন এরা নিজেই দুর্বল থাকবে। আর সেক্ষেত্রে ঠিক তার দুর্বলতার জায়গাটা হল – আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার চোখেই ইসরাইল অন্যায্য রাষ্ট্র – এই কথা সর্বত্র তুলে ধরতে হবে এবং এমন এক সময়ে যখন আমেরিকা নিজেই তার গ্লোবাল নেতৃত্ব ধরে রাখার ক্ষেত্রে হিমশিম বেকায়দায়। ফলে গ্লোবাল নতুন মেরুকরণ দুনিয়াজুড়ে আসন্ন হয়ে উঠছে যখন তখনই সে কাজের সবচেয়ে ভালো সময়।

    আধুনিক রাষ্ট্রের কী কী বৈশিষ্ট্য ইসরাইল লঙ্ঘন করেঃ
    আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রকে বলতে এক রিপাবলিকই বুঝায় আর তাকে  রিপাবলিকই হতে হয়। রিপাবলিক মানে যেখানে ক্ষমতার উৎস জনগণ। অর্থাৎ এর পাল্টা হল রাজা-সম্রাটের দেশ মানে কোনো রাজতান্ত্রিক শাসন তা নয়। তাহলে জাতিসঙ্ঘ রাজতান্ত্রিক দেশকে কি সদস্যপদ দেয় না? দেয়, অবশ্যই দেয়। কিন্তু যখনই কোনো রাজার দেশের রাজক্ষমতা কখনো ওর নিজ জনগণের চোখে টালমাটাল বা চ্যালেঞ্জ হয়ে যায় তখনই কেবল জাতিসঙ্ঘ ওকে টেকনিক্যাল সহায়তা করে যাতে সে নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্র হয়ে উঠে এমন সাহায্য করে। তবে সাবধান, যত দিন তা বাদশাহর দেশ থাকে তত দিন আবার তাকে বদলাবার কাজ জাতিসঙ্ঘের নয়। সেকাজ ওর আভ্যন্তরীণ জনগণের।  তাই রিপাবলিক রাষ্ট্র না হয়েও কোনো রাজশাসন জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ পেতে পারে। তবে রাজশাসনকেও রিপাবলিক সদস্য রাষ্ট্রের জন্য জাতিসঙ্ঘের সব আইন, নিয়ম ও কনভেনশন এবং মানবাধিকারসহ যা কিছু আছে সেগুলো মেনে চলতে প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। এই কারণেই দুবাইয়ের প্রিন্সেস লতিফাকে নিয়ে জাতিসঙ্ঘ তাঁর “অধিকার লঙ্ঘনের” জন্য বাদশা-আমীরদের সমালোচনা করছে ও উদ্বেগ জানাতে পারছে।

    অন্য দিকে আবার ঠিক বাদশাহদের মতই কমিউনিস্টরাও মনে করেন, অভ্যন্তরীণভাবে নিজ দেশে ‘হিউম্যান রাইট’ বজায় রাখা তাদের রাজনীতি নয়, এজেন্ডা বা পালনীয় নয়। তবে এমন রাষ্ট্রগুলোর কৌশল হয় (এটা অবশ্য স্বৈরাচারীদেরও কৌশল) সে কথা পাবলিকলি স্বীকার করে না-বলা।  আর  তবুও অমন পরিস্থিতিগুলোতে সরাসরি জাতিসঙ্ঘের ‘হিউম্যান রাইট’ মানি না তা অবশ্যই তারা কোথাও বলে না। বরং কৌশলগতভাবে এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে চলে, যতদূর পারে।

     সেকালে  ইউরোপের ইহুদিরা কেন জায়নিস্ট রাষ্ট্রই চেয়েছিল?
    বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিদ্বেষ ও নৃশংসতার পর এর বিরুদ্ধে কেন মূলত জার্মান ইহুদিরা একটা “জায়নিস্ট” রাষ্ট্র গড়াকে তাদের জন্য রক্ষাকবজ বলে সাব্যস্ত করেছিল? মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আচরণ ও ব্যবহার বড় অদ্ভুত। যেমন, বর্ণবাদিতার চরম অত্যাচার যে সয়েছে তাকে-ই আবার আমরা পাল্টা প্রতিহিংসায় সেই একই বর্ণবাদী হয়ে উঠতে দেখি! এখানে তাদের কাম্য ‘জায়নিস্ট রাষ্ট্র’ মানে কী তা গুরুত্ব দিয়ে আমাদের বুঝতে হবে। এর মানে হল, এটা ‘কেবল ইহুদিদের’ রক্ষার জন্যই একটা রাষ্ট্র হতে হবে। এই ছিল সেকালে তাদের প্রবল বিশ্বাস ও অনুমান। তাদের সেই অনুমানের ভিত্তি থাকুক আর না।

    ফলে স্বভাবতই কেবল ইহুদিদেরই সব ধরনের বাড়তি বা বিশেষ সুবিধা দেয়ার রাষ্ট্র এটাকে হতেই হবে। এই ছিল তাদের দাবি।   এর পক্ষে সাফাই হল, যেহেতু ইহুদিরা এতবড় এক ভিক্টিম তাই  তাদেরকেই বিশেষ সুবিধা দিতেই হবে। আর এখান থেকেই এক মিথ্যা দাবি তারা করে যে, এই জায়নিস্ট রাষ্ট্র এসব সুবিধাদির না পেয়ে থাকলে ইহুদিরা দুনিয়াতে আর কোথাও সুরক্ষিত হবে না, শান্তি পাবে না। অথচ এই দাবি শুধু ভিত্তিহীনই না এটা সম্পুর্ণ অর্থহীন।

    প্রথমত, এটা আসলে একটা মানসিক ট্রমা [trauma] বা আঘাতপ্রাপ্ত মানুষের বক্তব্য। যখন অসুস্থ মানুষটা এমন স্তরে  থাকে তখনকার বক্তব্য। এটা এক ধরনের ট্রমা যা মানুষকে সবসময় নিরাপত্তার অভাববোধে পাগল করে তোলে। আর প্রথমে যা ছিল তাদের নিরাপত্তার অভাববোধে জন্ম নেয়া ট্রমা, পরে সময়ে এর কিছু থিতু হলে সম্ভবত এটাই রূপান্তরিত হয়ে যায় প্রতিহিংসা-স্পৃহায়। সেসময়ের এমন হিটলারি নৃশংসতার পরে সব মানুষের মনেই কমবেশি প্রতিহিংসা-স্পৃহা জেগে ওঠা হয়ত অস্বাভাবিক নয় যদিনা কেউ পরে  কোন সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট বা এক্সসারসাইজের ভেতর  দিয়ে না গিয়ে থাকে; বা আগাম ব্যবস্থা না নেয় এই বলে ও মেনে যে, সে-ই আবার ফিরে কোনো প্রতিহিংসা করতে পারে না, কারণ এটা তাকেও  আরো অসুস্থ বানিয়ে ছাড়বে।

    জায়নিস্ট এক রাষ্ট্রের কল্পনা ও দাবি তাই আসলে অনিরাপত্তা-বোধজনিত ট্রমা থেকে। কারণ কোনো আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কল্পনা ও করণীয় মানেই এর প্রধান কাজ হল, ওদেশের সব নাগরিককে নিরাপত্তা দেয়া। কাজেই ঐ রাষ্ট্রে আলাদা করে জায়নিস্টদের  বিশেষ সুবিধা দেয়া ধরণের  রাষ্ট্রের স্বপ্ন-কামনা, এটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু জায়নিজম বলতে চাচ্ছে সে এতে সন্তুষ্ট নয়; কারণ সে ট্রমাগ্রস্ত; তাই কেবল এই ট্রমাগ্রস্ত ইহুদিদের জন্য আলাদা করে নিরাপত্তাবোধ দেয়ার রাষ্ট্র, এক জায়নিস্ট রাষ্ট্রই, একমাত্র এতেই তাদের আস্থা। তাই এটাই গড়তে হবে।

    তাহলে তাদেরকে বিশেষ সুবিধার একটা রাষ্ট্র গড়তে দিলে অসুবিধা কী?
    অসুবিধা এক. তাদের ট্রমাগ্রস্ততা কাটানোর জন্য সর্বোত্তম উপায় কি একটা সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্টের দুনিয়া সেরা কোন হাসপাতালে তাদেরকে নেয়া? নাকি, একটা ইহুদিবাদী কথিত বিশেষ সুবিধার রাষ্ট্র  গড়তে দেয়া? আশা করি পাঠকেরা বুঝেছেন, এখানে ট্রমাগ্রস্ততার চিকিৎসা একটা ভাল হাসপাতালই দরকার। কোনো জায়নিস্ট রাষ্ট্র নয়। কারণ সমস্যাটা  মানসিক অসুস্থতা, তাই প্রয়োজন ওর জন্য ট্রিটমেন্ট।

    অসুবিধা দুই. জায়নিস্টদেরকে দেয়া বিশেষ সুবিধার রাষ্ট্রনির্মাণের কল্পনা আসলে নিজেই  আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার  বিরুদ্ধ চিন্তা! এটা মৌলিকভাবে বিরোধী। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক অবস্থান বা শর্ত হল, তাকে নাগরিকদের মধ্যে “রাজনৈতিক সাম্য” নিশ্চিত করতেই হয়। রাজনৈতিক অধিকারে সাম্য, যা কোনরকম বৈষম্যহীন এক সাম্য। এখানে কাউকে বিশেষসুবিধা দেয়ার কথাটা আনা মাত্রই তা আর আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার থাকে না; মৌলিকভাবে বিরোধী হয়ে যায়। বরং আপনি নিজের গড়া যেকোন রাষ্ট্রে নিশ্চিত নিরাপত্তা অবশ্যই পেতে পারেন, যদি আপনার রাষ্ট্র ব্যতিক্রমহীনভাবে সবারই নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। আর এতাই রাষ্ট্রের অন্যতম কাজ। কিন্তু আপনি চাচ্ছেন যে – না, আমাকে বিশেষ নিরাপত্তা দিতে হবে কারণ আমি ভিক্টিম। এই হল জায়নবাদিতা – এই অসুস্থ চিন্তার সমস্যার শুরু। আর এর ভিক্টিমহুড তৎপরতা মানে আমি এখন ভিক্টিম বলে ভিক্টিমের প্রতি সমাজের যে সহানুভূতি তৈরি হয় সেইটা বেচে ভিক্টিম এখন খেতে চায়! এটাকেই বলে ‘ভিক্টিমহুড’। অর্থাৎ, বাড়তি সুবিধা নিতে চায়। অন্যকে মারবে-ধরবে এমন যা খুশি করবে এটা চায়…।

    অতএব এখান থেকেই আসছে ইহুদিদের জন্য বিশেষ বাড়তি সুবিধা পাবার ইহুদিবাদী রাষ্ট্র, অথবা হিন্দুত্বের জন্য বিশেষ সুবিধার হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র অথবা এ রকম যেকোনো ধর্মের তা হতে পারে।  আবার ধর্ম ছাড়াও তা হতে পারে। যেমন- বাঙালি জাতিবাদীদের জন্য বিশেষ সুবিধার বাঙালিবাদী রাষ্ট্র। এরা হয়ত দাবি করবে যে সে নিজের জন্য নিরঙ্কুশ এক ক্ষমতা চায়, কম করে দুই যুগ বা বিয়াল্লিশ সাল পর্যন্ত ধরে ক্ষমতায় থাকতে চায়।

    অসুবিধা তিন. জায়নবাদী চিন্তার আরেক বৈশিষ্ট্য হল, সে সর্বজনীনতাকে ভয় পায়, কারণ ভিক্টিমহুডের অজুহাতে ‘বিশেষ’ সুবিধা চায়।  আর বিশেষ বাড়তি সুবিধার উল্টাটা হল সার্বজনীনতা।  কাজেই আপাতত যে ইসরাইলের রাষ্ট্রসীমা আর ওর ভেতরেই যে অরিজিনাল আরব মুসলমানেরা বাস করছে যাদের বের করে দেয়া যায় নাই, তবে তাঁদের জমিসম্পত্তি দখল করে সরকারি পয়সায় সেখানে হাইরাইজ বানিয়ে এরপর তা নিজেরা ভাগ করে খেতে চাওয়ার “ভিক্টিমহুড” বা বাড়তি সুবিধা এটা। কাজেই সর্বজনীন আইন থাকলে তো ঐ আরব মুসলমানেরা ইসরায়েলের ভিতরে বসবাস করলেও জমি হারাবে না। কাজেই ভিক্টিমহুডের আওয়াজে ‘বাড়তি সুবিধা’ নেয়া মানেই হল, অন্যেরটা কেড়েও নেয়া এবং তাদেরকে এক বিচারহীনতায় দিন যাপনে ঠেলে দেওয়া। এ ছাড়া আরো আছে, একইভাবে ইসরাইলের রাষ্ট্রসীমার বাইরেও যেসব ফিলিস্তিনি ভূমি আছে সেগুলোও একইভাবে দখল করা এবং তা একেবারে গায়ের জোরে। এরও সাফাই সেই একই ভিক্টিমহুড, জায়নিস্ট রাষ্ট্রের বাড়তি সুযোগ…।

    আর এটাকেই বলে ‘কলোনি দখল’। সোজা ভাষায় ইসরাইলই একালে মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর দুনিয়াতে যে যাত্রা শুধু করেছিল কলোনি দখল অবৈধ এই আন্তর্জাতিক আইন রীতির ভিত্তিতে – সেই দুনিয়াটাতেই আবার  কলোনি দখলের ব্যবসা, করে খাওয়ার বুদ্ধি আবার শুরু করে দিয়েছে এই জায়নিজম। কেন এভাবে বললাম?

    কারণ আজও বেশির ভাগ মানুষ এমনকি একাদেমিক মানুষও – জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি ও এর ইতিহাস একেবারেই জানে না। ন্যূনতমটাও জানে না। এর জন্য প্রধানত দায়ী তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল যিনি আমাদের ‘কলোনি মালিক’ ছিলেন। তিনি চান নাই যে আমেরিকার কাছে তাঁর নাকেখত দেবার ইতিহাস ও এই  দুর্বলতার কথা জনে জনে জানুক। আর দ্বিতীয়ত দায়ী নেহরুর মত রাজনীতিবিদেরা যারা নিজেরাই এসব ইতিহাস জানেন না, যার অজস্র প্রমাণ দেয়া যায়। যেমন সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল, কাশ্মীর ইস্যুটাকে  জাতিসংঘের নজরে নিয়ে গেছিলেন তিনিই। ভেবেছিলেন রাজা হরি সিং এর ভারতের সাথে যুক্ত ও বিলীন হবার  চিঠি (একসেশন ইন্সট্রুমেন্ট বা মনবাসনা) তার কাছে আছে অতএব জাতিসংঘ নিশ্চয় তার পক্ষে রায় দিবে! এর মানেই হল  জাতিসংঘের জন্মভিত্তি-মূলক বক্তব্য ও অবস্থান নেহেরুও জানেন না, কখনও খবর নেন নাই।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেলট ১৯৪১ সালের আগস্ট পর্যন্ত কোনো পক্ষকেই সমর্থন না করে যুদ্ধের বাইরে নিজ যুক্তরাষ্ট্রকে রেখেছিলেন। কারণ তিনি চেয়েছিলেন সারা দুনিয়াকে কলোনি করে রাখা ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোকে এই যুদ্ধ শেষে কলোনি দখল যুগের অবসান ঘটাতেই হবে। তারা ঘটাবেন –  এই প্রতিশ্রুতি দিলেই কেবল আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসাবে তিনি তাদের পক্ষে হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবেন।

    এই শর্তে প্রথম যিনি এগিয়ে আসেন তিনি হলেন তখনকার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল; কারণ নইলে হিটলারের কাছে হেরে ও পাল্টা দখল হয়ে যেত তার দেশ-ভূমি। তাই ১৪ আগস্ট ১৯৪১ সালে চার্চিল ও রুজভেল্ট আট দফার এক চুক্তি [Atlantic charter] স্বাক্ষর করেছিলেন ; যার প্রথম দফাটাই হল – তারা দুই রাষ্ট্র প্রতিজ্ঞা করছে যে তারা নিজ নিজ মূল ভূখণ্ডের বাইরে কোনো ভূমি দখলে আর যাবে না। এটাই পরে হয়ে যায় কলোনিয়াল-দখল অবৈধ একথার ভিত্তি। কারণ এই চুক্তিটাই পরে আরো দুই রাষ্ট্র স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন আর চিয়াং কাইশেকের চীন (মাওয়ের চীনের আগের রূপ) – এভাবে চার রাষ্ট্র মিলে আবার একসাথে স্বাক্ষরিত হয় ১ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে। আর এটাকেই বলা হয় জাতিসঙ্ঘের ‘জন্ম ঘোষণা’ বা ভিত্তি। একই দিনে আরো প্রায় ২৬টা দেশও এতে স্বাক্ষর করেছিল। আর ওই দিনই আমেরিকা হিটলারের জোটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল এবং হিটলারের জোটসঙ্গী জাপানে আক্রমণ চালিয়েছিল। সেই থেকে এজন্য কলোনি দখল নিষিদ্ধ আর এটাই জাতিসঙ্ঘের প্রতীক। কাজেই জাতিসঙ্ঘের সদস্য থাকতে চাইলে ইসরাইল জায়নিস্ট হতে পারবে না। কারণ জায়নিজম মানেই হল বাড়তি সুবিধা, গায়ের জোরে অন্যের ঘরবাড়ি দখল আর এসবই এক ভিক্টিমহুডের সহানুভুতি উসিলা ও আড়ালে। এককথায় ইসরাইল নতুন করে কলোনি দখল শুরু করেছে।  অবশ্য এসব ছাড়াও অন্যের ভূমি দখলের কারণে ইতোমধ্যেই ইসরাইলের বিরুদ্ধেই নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া রেজুলেশন আছে।

    অসুবিধা চার. লক্ষ করলে দেখা যাবে যারাই জায়নিস্ট বা হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র কায়েম করেছে বা করতে চায় তারা নেশন-স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র ধারণার অনুসারী। জাতিরাষ্ট্র হল প্রথম যুগের আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা এ বিষয়ের মুখ্যচিন্তা। যেমন – আগের রাজতন্ত্র ভেঙে রিপাবলিক গড়তে চাওয়া ইউরোপীয় চিন্তা বাস্তবায়নের শুরু বলা যায় ১৬৪৯ সালের ইংলিশ (ক্রমওয়েলের) রেভিলিউশনকে। এই নতুন রিপাবলিক ধারাই নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে থিতু হয়েছিল আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ইউরোপ হিসাবে আর পরে তা চলেছিল ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। সে সময়ের (১৬০৭-১৯৪৫) ইউরোপীয় বিপ্লবে স্থাপিত নতুন রাষ্ট্রগুলোই রিপাবলিক বা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার শুরু বলা যায়। অর্থাৎ রাজা নয়, জনপ্রতিনিধিরাই ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন এমন রিপাবলিক সেগুলো।

    তবু এরা সবগুলোই ছিল ‘জাতিরাষ্ট্র’ (নেশন-স্টেট বা Nation State) ধরনের রিপাবলিক। মানে আমরা প্রত্যেকে নাগরিক কি না, রাষ্ট্রে আমাদের রাজনৈতিক সাম্য থাকবে কি না, বৈষম্যহীন অধিকার থাকবে কি না- এসব সেখানে উহ্য থাকে এমন রাষ্ট্র। এর বদলে আমরা একটা ‘জাতি’ এই উদগ্র ধারণার প্রাবল্য যেখানে প্রচণ্ড। এই ধারণারই সবচেয়ে বিকশিত ফসল হলো হিটলারের নাৎসিবাদ। এককথায় বললে এই রূপটা ছিল কলোনিদখলের অর্থনীতির সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ রাষ্ট্র-রূপ। মূল কারণ, কম্পাস আর বারুদ আবিস্কারের পরের ইউরোপের প্রধান ব্যবসা ছিল বড় জাহাজ কিনে যুদ্ধ সাজিয়ে কলোনিদখলে বেরিয়ে পড়া।  তেমনই (১৬০০ সালের) এক বড় কোম্পানির নাম হল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যা ভারতে এসেছিল। ইংল্যান্ডে এরই রাজনৈতিক রূপ হল নেশন স্টেট।

    আর আধুনিক রাষ্ট্রের জাতিরাষ্ট্ররূপে এই আদি ধারায় তিনশ’ বছর পরে তা থেকে হিটলারের উত্থান দেখে এর সব  দায়দায়িত্ব ত্যাগ করে বাকিরা নিজ নিজ রাষ্ট্র আমূলে বদলে নেয়। সারা ইউরোপ ১৯৫৩ সালে ৪৭ রাষ্ট্রের এক সম্মেলনের (Council of Europe) মাধ্যমে সবার নিজ রাষ্ট্রভিত্তি বদল করে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নেয়া হয়। সেই থেকে ইউরোপে ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণাটা পরিত্যাজ্য ও ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের এদিকে নেহরুর ভারতসহ বাংলাদেশ এখনো জাতিরাষ্ট্র। এই ধারাতেই জায়নবাদী ইসরাইলও এক জাতিরাষ্ট্র। মূল কারণ উগ্র জাতিবাদী চিন্তা ভালো খোলে ‘জাতিরাষ্ট্র’ এর মধ্যে। আমরা এক ওমুক গর্বের ধর্মীয় বা ভাষার বা জাত-এথিনিসিটির “জাতি” বলে গালগল্প, মিথ্যা শ্রেষ্ঠত্ববোধের সুপ্রীমিস্ট আবেগী সুড়সুড়ি তুলতে পারা যায় সহজেই।  অথচ আমাদের সবার জন্যই এটা ত্যাগ করার সময় পেরিয়ে গেছে সেই পঞ্চাশের দশকেই।

    ইদানিংকালের কিছু মারাত্মক লক্ষণঃ
    ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্মের সময়ে যারা কিশোর বা টিনএজে ছিল তাদেরই সন্তান পেরিয়ে টিনএজ নাতিদের কাল এটা।  ফলে এমনিতেই কেন ইসরায়েল রাষ্ট্র অগ্রহণযোগ্য তা যথেষ্ট স্পষ্ট ছিলনা। ফলে এটা কমিউনিস্টদের সমর্থনের আরব জাতিয়তাবাদ ও হাল্কা ইসলামের কারণে আমরা বুঝতাম যে আমাদের ফিলিস্তিনিদের পক্ষে থাকতে হবে। রাষ্ট্র হিসাবে ইস্রায়েলের মারাত্মক ত্রুটি কী তা চর্চা হতে দেখা যায় নাই কোথাও। অতেব একালে টিনএজ নাতিদের কালে স্রেটা আরও কত দুরবস্তায় যাবে তা অনুমেয়। আমাদের পাসপোর্টে  ইসরায়েলে  যাওয়া যাবে কিনা সেটা ঢাকায় এখন বড় আলোচনার বিষয়। আর ততই ইসরায়েল যাওয়াটাই ঠিক হবে কিনা, ন্যায়-অন্যায়বোধে উচিত হবে কিনা – সেদিকটা ততই ম্লান হয়ে আছে দেখা যাচ্ছে। গত সপ্তাহে এক টকশোতে অংশগ্রহণকারি ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ অধ্যাপকের বক্তব্য ছিল খুবই বিপদজনক। তবে উপরে যা বলেছিল এর ভাল উদাহরণ। তিনি বলছিলেন ইসরায়েল দেশ ঘুরে ফিরে আমাদের দেখার জন্য আমাদের পাসপোর্ট উন্মুক্ত করে দেয়া উচিত। বলা বাহুল্য তা কেউ বিরোরোধিতা করেন নাই, তবে সামাজিক অস্বস্তির কথা খেয়াল রেখে কেউ প্রশংসায় করেন নাই।  আমরা বুঝলাম অধ্যাপক পদ বাগিয়ে ফেললেও জ্জানবুদ্ধি পাকে নাই।  কৌতুহলি টিনএজ পেরিয়ে আমাদেরকে ন্যায়-অন্যায়বোধের শিক্ষা নিতে হয় সেদিকে তিনি বড় হন নাই।

    কুখ্যাত আব্রাহাম একর্ড-এর চাতুরিঃ
    আমার গতবারের লেখায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প- প্রধানমন্ত্রী নেতানেয়াহুর কুখ্যাত আব্রাহাম একর্ড [Abraham Accords ] বা চুক্তির কথা বলেছিলাম। যেটা আসলে ফিলিস্তনিদের স্বার্থ উপেক্ষা করে আরব বাদশা দেশগুলোর সাথে ইসরায়েলের স্বীকৃতি ও সম্পর্ককে কথিত স্বাভাবিকীকরণ উদ্যোগ। তবে আরেকটু বেশি দিকটায় তাকালে দেখা যাবে এটা আসলে চীনের উত্থানে মধ্যপ্রাচ্যের ভারসাম্য বদলে যেমন ইরানের উত্থান ঘটার সম্ভাবনা সেই কারণে ট্রাম্প-নেতানেয়াহু এবং বাদশা এরা সকলেই ভীত। তাই এরই একজোটবদ্ধতার প্রতিক্রিয়া এটা।
    কিন্তু আমাদের এখনকার প্রসঙ্গ এটা নিয়ে ঠিক আপত্তি তোলা নয়, অন্যকিছু। এমনকি এই চুক্তি বাস্তবায়ন হলে কী হবে তাও না। বরং খুবই সহজ। এখানে যে চুক্তিটা স্বাক্ষরিত হয়েছে কোন পয়েন্টে সেই চুক্তিটা কেন গ্রহণযোগ্য নয়, করা যাবে না – সেটা আপনাদেরকে দেখানো।  সেখান থেকেই জানা যাবে ইসরায়েল রাষ্ট্র ও ইহুদীবাদ চিন্তার বিরুদ্ধে আমাদের মুল আপত্তিটা কী!

    The Abraham Accords Declaration:
    We, the undersigned, recognize the importance of maintaining and strengthening peace in the Middle East and around the world based on mutual understanding and coexistence, as well as respect for human dignity and freedom, including religious freedom.
    We encourage efforts to promote interfaith and intercultural dialogue to advance a culture of peace among the three Abrahamic religions and all humanity.
    We believe that the best way to address challenges is through cooperation and dialogue and that developing friendly relations among States advances the interests of lasting peace in the Middle East and around the world.
    We seek tolerance and respect for every person in order to make this world a place where all can enjoy a life of dignity and hope, no matter their race, faith or ethnicity.
    We support science, art, medicine, and commerce to inspire humankind, maximize human potential and bring nations closer together.
    We seek to end radicalization and conflict to provide all children a better future.
    We pursue a vision of peace, security, and prosperity in the Middle East and around the world.
    In this spirit, we warmly welcome and are encouraged by the progress already made in establishing diplomatic relations between Israel and its neighbors in the region under the principles of the Abraham Accords. We are encouraged by the ongoing efforts to consolidate and expand such friendly relations based on shared interests and a shared commitment to a better future.

    উপরের এই চুক্তিতে কেন আরব-ইসরায়েলি বন্ধুত্ব দরকার এর জন্য আবেগী প্রচুর শব্দ ও বাক্য এখানে আছে। এমন কী আব্রাহামিক সুত্রে আরব-ইসরায়ল কেন ভাই বা বন্ধু  সেকথা তুলে আবেগ তৈরি করতে সেটাকেই এই চুক্তির শিরোনাম বানায় ফেলা হয়েছে। একেবারে আবেগে কেন্দে ফেলার অবস্থা!  এই চুক্তি  মাত্র ২৪০ শব্দে তৈরি। আর চুক্তিতে এমন যেসব ভারী শব্দ আছে সেগুলোর নমুনা হল যেমন  ………for human dignity and freedom …… including religious freedom.  all humanity   cooperation and dialogue……… friendly relations   ………no matter their race, faith or ethnicity.  support science, art, medicine, and commerce to inspire humankind ………  a vision of peace, security, and prosperity ………এমনকি শেষে সশস্ত্রতার ও সংঘাত বিরোধিতার কথা আছে। অর্থাত …… to end radicalization and conflict – এমন সবকিছুর রেফারেন্স আছে।  বলা যায় দুনিয়ার সব ভাল কথার কিছু বাদ নাই।

    কিন্তু যা নাই তা হল রাজনৈতিক সাম্য, অধিকারের সাম্যতার কোন কথা নাই। কেন নাই?

    কারণ, এটা স্বীকার করে নিলে জায়নিজম আর থাকে না, ইহুদি-ফিলিস্তিনির মধ্যে রাজনৈতিক সাম্যে অধিকারে সমান হয়ে যায়। আর এমন সমান হয়ে গেলে আর ইহুদির জন্য বাড়তি সুবিধা, শ্রেষ্ঠত্ববাদ কিংবা পক্ষপাতিত্বের বিচার ব্যবস্থা ইত্যাদি সবই অচল হয়ে যায়। ভিক্টিমহুড বিক্রি করা খাওয়ার সুযোগ থাকে না।  অথচ এভাবেই রাজনৈতিক অসাম্য রেখেই  জায়নিজম টিকে থাকতে চায়। আর ভাব ধরে ইহুদিবাদীরা সকলের সাথের সম্পর্ক চায়, মিলেজুলে থাকতে চায়। যেন মনে হয় ফিলিস্তিনিরাই সব গল্ডগোলে উতস, অশান্তি করা মানুষ তারা, যারা কেবল  সশস্ত্রতা চায়। অতএব ফিলিস্তিনিরাই জঙ্গী ও টেরর………।

    সবশেষে তামাশার দিকটা হল, যে ইউরোপীয় ইহুদিরা হিটলারি নাৎসিবাদের শিকার হয়েছিল তারাই এরপরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সওয়ার হয়ে শুধু নয়, সেই হিটলারকেই কপি করে জায়নবাদিতা চর্চায় ইসরাইল রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে।
    আমরা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিচারেও ইসরাইলের বিরোধিতা করে যাবো কারণ, এই জায়নবাদী রাষ্ট্র আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ন্যূনতম শর্তও পূরণ করেনি। এই রাষ্ট্র নাগরিক বৈষম্যপূর্ণ, রাজনৈতিক অসাম্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা, পক্ষপাতমূলক বিচারব্যবস্থার, সর্বোপরি কলোনি দখল করা ফিরিয়ে আনতে চাওয়া রাষ্ট্র। কাজেই এখানে এসে জায়নিজম=ইসরায়েল এর বিরোধিতা স্রেফ কোনো মুসলিম ইস্যু বলে সীমাবদ্ধ তা আর নয়। এটা যারা দুনিয়ায় রাজনৈতিক সাম্যের প্রতিষ্ঠা দেখতে চান তাদের সবার ইস্যু!
    জায়নিজমের বৈষম্যের প্রতিকার হওয়ার আগে পর্যন্ত ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধিতা তাই আমরা করি এবং করে যাবো!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ২৯ মে  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “কেন ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধিতা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাংলাদেশের পাসপোর্টঃ বাইডেনের গাজা কারেকশন

    বাংলাদেশের পাসপোর্টঃ
    বাইডেনের গাজা কারেকশন ও প্রায়োরিটির প্রেক্ষিতে

    গৌতম দাস

    ২৬ মে ২০২১, ২১:৪৮  বুধবার

    https://wp.me/p1sCvy-3yF

    US President Joe Biden speaks with Representative Rashida Taib (D-Mich), and Representative Debbie Dingell (D-Mich)(R), as he arrives at Detroit, Metropolitan Wayne County Airport in Detroit, Michigan on May 18, 2021. (AFP)

    বাংলাদেশ কী ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে? এটা এখন বাংলাদেশে সর্বত্র আলোচনার বিষয়। আলোচনা যেভাবে হচ্ছে, তাকে খারাপ সংবাদই বলতে হয়। আর  বিষয়ের ঠিক এদিকটাই  আমল করতে সরকার মারাত্মক ভুল করছে।

    বাংলাদেশে এই ইস্যুতে প্রথম নিউজ করে ‘শেয়ার বিজ’ এই ফাইন্যান্সিয়াল নিউজ পত্রিকা। এটি তাদের ক্রেডিট অবশ্যই। কিন্তু একইসাথে ডিসক্রেডিটও। কেন? কারণ এ ইস্যুটায় প্রধান খবর জড়িয়ে আছে মুখ্যত দুটি আলাদা বাক্য। এক, নতুন পাসপোর্টে “এক্সসেপ্ট ইসরাইল” শব্দ দুটা লেখা নাই। আর দ্বিতীয় বাক্যটা হল, নতুন ই-পাসপোর্টে লেখা রয়েছে “দিস ই-পাসপোর্ট ইজ ভ্যালিড ফর অল কান্ট্রিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড”।  মানে যার বাংলা করলে হয় – এই ই-পাসপোর্ট দুনিয়ার সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ”।
    এখন এনিয়ে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যাখ্যা যেটা তারা সাথে ছেপেছে সেখানে আছে, “… তবে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে আমরা পাসপোর্টে এক্সসেপ্ট ইসরাইল শব্দ দুটি তুলে দিচ্ছি”। এভাবে ব্যাখ্যা ছাপাটা বিভ্রান্তিকর কাজ হয়েছে। বিশ্বাসযোগ্য তো হয়ইনি। কারণ এখন ‘এক্সসেপ্ট ইসরাইল’ শব্দ দুটি বাদ দেয়াতে অবশিষ্ট বাক্যটা হয়ে গেছে ‘এই পাসপোর্ট দুনিয়ার সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ’ – অথচ এটা নিয়ে সরাসরি কোনো প্রশ্ন করে মন্ত্রীকে সচেতন করে দেয়া যে সেক্ষেত্রে – এখন কথা রয়ে গেছে তাহলে এভাবে যে, “এই পাসপোর্ট দুনিয়ার সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ” –  মন্ত্রী কী তাই বুঝাতে চেয়েছেন? এই কথাটাতে মন্ত্রী প্রতিক্রিয়া জানা দরকার ছিল। কিন্তু শেয়ার বিজ বা অন্য কোনো মিডিয়ার দিক থেকে এই প্রশ্নটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে করা হয়নি। আসলে সাংবাদিকেরাই যেন চেয়েছে যে মন্ত্রীরা যেমন দাবি করছেন যে তাঁরা কেবল দুটা শব্দ তুলে নিয়েছেন। ব্যাপারটা তা নয়। কথা ঠিক যে তাঁরা কেবল দুটা শব্দই তুলে নিয়েছে। কিন্তু তাতে বাকি বাক্যের অর্থ একই থাকে নাই।    একথা বলতেই হচ্ছে যে এতে থেকে যাওয়া বাকি শব্দ যে  – “এই ই-পাসপোর্ট সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ’ কথাটার সোজা মানে হয়ে গিয়েছে যে বাংলাদেশীদের জন্য ইসরাইল ভ্রমণও বৈধ। অথচ এটাই হলো সবচেয়ে বিপজ্জনক বক্তব্য।

    আরো টু দা পয়েন্টে বললে এখন মানে হয়েছে, বাংলাদেশের ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত আছে, না নেই – সেটা যাই থাক – আমাদের পাশপোর্টে ইসরাইল ভ্রমণও আমাদের জন্য বৈধ হতে পারে।  এ কথাটাই আমাদের পাসপোর্ট এখন বলছে।

    অতএব,  ‘ইসরাইল ব্যতীত’ শব্দ দুটা এখন নেই – তাতে আসলে কী হয়েছে, তা বুঝতে হবে। এখন স্পষ্ট করে বলা হয়ে গেছে যে আমাদের পাসপোর্ট ‘সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ’- এটাই মুখ্য স্টেটমেন্ট। সব দেশ ভ্রমণ বৈধ হওয়ার অর্থ হল ইসরাইল সফরও বৈধ। তাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন মুখে যতই ব্যাখ্যা দেন না কেন যে – ‘এই পরিবর্তনে ইসরাইলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক পরিবর্তনের কিছু নেই’ অথবা ‘আমরা তো ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিই না’ – তাতে কিছুই হেরফের হবে না। এর মূল কারণ, মোমেনের এই বাড়তি ব্যাখ্যার ‘আইনি ভিত্তি নেই’ বা এটা সরকারের ‘আইনি অবস্থান’ নয়।  কারণ, ‘সব দেশ ভ্রমণের জন্য বৈধ’– এটাই পাসপোর্টে লেখাগুলো অনুসারে পাশপোর্ট অফিসের আইনগত অবস্থান।

    কেন এমন হলোঃ
    এখন আসি, কেন এমন হল বা সরকার এমন সিদ্ধান্ত কেন নিতে গেল? সেটা নিয়ে কথা বলার আগে আরেকটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার। পাসপোর্টে পরিবর্তনের এই প্রস্তাব সরকারের নীতিনির্ধারণী ব্যক্তির কাছে যে-ই নিয়ে এসেছেন আর তা যতই লোভনীয় করে লাভালাভ দেখিয়ে তিনি পেশ করে থাকেন না কেন এটা সরকারের জন্য নীতিনির্ধারকদের নেয়া এক আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত হয়েছে। বরং সরকারের উচিত ছিল দুনিয়ার কোন কর্নার থেকে এই প্রস্তাব-উদ্যোগটা উঠেছে বা এসেছে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে খোঁজ নেয়া, আর সে সম্পর্কে আগে এর পুরা পটভুমিটা সম্পর্কে ওয়াকেবহাল হওয়া। সরকার খুব সম্ভবত যথেষ্টভাবে ওই কাজটা না করে ‘এমন দুই শব্দ’ তুলে দিলে সরকারের কী কী লাভালাভ হবে – এর মধ্যেই বুঁদ হয়ে থেকে সিদ্ধান্তটা নিতে গেছে। সব বিপর্যয় ঘটেছে সেখান থেকে।

    বলা হচ্ছে আমাদের সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে ছয় মাস আগে। হা মোটা মুটি ব্যাপারটা তাই। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা সেই আগের পরিস্থিতিটাও এখন আর বজায় নাই। অনেক কিছুই এখন বদলে গেছে। বিশেষ করে সদ্য ১১ দিনের গাজায় ইসরাইলি হামলাকে কেন্দ্র করে।

    ঘটনাটা তাই শেষের দিক থেকে যদি বলি, এটা এক গভীর গোপন পরিকল্পনা যা রচিত হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে আর তা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে বুদ্ধি করে। আসলে এই পুরো বিষয়টাই নেতানিয়াহুর উদ্যোগে করা এক জায়নিস্ট পরিকল্পনা।

    এখানে ইহুদিবাদী বা জায়নিস্ট [Zionist] শব্দের অর্থ যা বুঝতে হবে তা হল ১. জায়নিস্ট রাষ্ট্র মানে এটা কেবল ইহুদিদের জন্য একক ও  বিশেষ সুবিধার রাষ্ট্র, ২. সেখানে অন্য কেউ যদি নাগরিক থাকেও সে ইহুদিদের সাথে সমান অধিকারের নাগরিক নয়। ৩. এই জায়নিস্ট রাষ্ট্রের কোন ইহুদি সদস্য যদি অন্য নাগরিকের জায়গা-জমি সম্পত্তি দখল করে সেক্ষেত্রে জায়নিস্ট রাষ্ট্র সেটাকে শুধু বৈধ মনেই করবে তাই নয়; উলটা ঐ দখলদারদেরকে সব ধরণের সহায়তা দিবে। ৪. এমনকি জায়নিস্ট রাষ্ট্র প্রয়োজন মনে করলে যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে ঐ দখলদারদের রক্ষা করবে। আর একাজকে তাদের আত্মরক্ষার অধিকার বলে চালিয়ে দিতে চাইবে। ৫. যেহেতু তারা হিটলারের নৃশংসতার ভিক্টিম অতএব কেবল তাদের বেলায় এসব কিছু করা জায়েজ আছে।  ভিক্টিমহুড – এই বোধের জন্য এই মনকষ্টের জন্য এখন উলটা তাদের এই হিটলারবাদি আচরণ দুনিয়াকেই সহ্য করে নিতে হবে।  ৬. আর সর্বশেষটা হল, যদি আপনি জায়নিস্ট রাষ্ট্রের এসব কাজ ও ততপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন তাহলে এই রাষ্ট্র উলটা আপনার বিরুদ্ধেই অভিযোগ তুলবে যে  আপনি এন্টি-সেমেটিক। আপনি ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছেন! এর আবার মানে কী আর সেটা কী করে? মানে হল, সেমেটিক=ইহুদি, এই সমীকরণ অনুসারে আপনি ইহুদিদেরকে ইহুদি বলে নিচা দেখিয়েছেন, ঘৃণা করেছেন ছড়িয়েছেন, তুচ্ছ করে দেখিয়েছেন ঠিক যেমন এসব করে জর্মানির হিটলার সেদেশের ইহুদি নাগরিকদেরকে বিভিন্ন নির্যাতন ও পুড়িয়ে মেরে ফেলার আগে করেছিল। তাই তাঁরা এখন জায়নিস্ট (হিটলারের কপি) হবেন বলে আবদার।  সবমিলিয়ে এই হল জায়নিস্ট আচরণ ও তাদের সচেতন মনোবৈকল্য চর্চা।

    আগে যেকথা বলছিলাম নেতানিয়াহু  তিনি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রাজি করানোর কাজটা করে নিয়েছিলেন ট্রাম্পের জামাই কুজনারের [ Jared Corey Kushner]  তিনিও সেমেটিক=ইহুদি তবে আমেরিকান] মাধ্যমে ট্রাম্পকে কব্জা করে। এদিকে আরবদের দিক থেকে একাজে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এমন দুই প্রধান হলেন দুবাই ও সৌদির দুই প্রভাবশালী যুবরাজ। আনুষ্ঠানিকভাবে এই অসৎ পরিকল্পনাটার নাম হল ‘আব্রাহাম চুক্তি’ [আব্রাহাম একর্ড বা The Abraham Accords । এটি অবয়ব পায় হোয়াইট হাউজে বসে ট্রাম্প, নেতানিয়াহু আর সাথে দুবাইয়ের ও বাহারাইনের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী- এই চারজনের এক চুক্তি স্বাক্ষরে। এটা ঘটেছিল ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর।
    অনেকের মনে হতে পারে এসব কী সত্যি নাকি আমার “মনে হয়” টাইপের কিছু? যেহেতু আমি হয়ত ইহুদি দেখতে পারি না সেজন্য? তাই কী? কারণ কঠিন সত্যি অনেক সময় বিশ্বাস হতে চায় না।

    আজকাল আবার অনেকে আছেন যারা নিজেরাই মনে মনে মানেন সে তার তত জানাশুনা নাই কিন্তু আবার সেজন্য কেমনে ফস করে   জিজ্ঞাসা করে যে একথা যে সত্যি এর প্রমাণ কী? এমন সবার জন্য কাজটা সহজ আর স্বাধীন করে দেই। The Abraham Accords 2020 – এই কথা কয়টা এখান থেকে কপি করে গুগলে গিয়ে পেস্ট করে সার্চ দেন। এতটুকুই যথেষ্ট হবে। এবার যা ফল পাবেন তা হল – না হলেও ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০ দিনের  শ’খানেকবিভিন্ন দেশের ইংরাজি দৈনিকের এই চুক্তি করা বিষয়ক খবরের লিঙ্ক। আর এরই ভিতর একটা লিঙ্ক পাবেন আমেরিকান সরকারি দলিল।  এর শিরোনাম হবে The Abraham Accords Declaration আর চিনবেন কী করে যে এটা আমেরিকার? দেখবেন লিঙ্কে লেখা আছে  state.gov – এই কথা কয়টা। আর এটাই অরিজিনাল চুক্তির কপিটা। ওখানেই সাথে পিডিএফ কপিও নামিতে নিতে পারবেন।
    আবুধাবি থেকে প্রকাশিত একটা দৈনিক দ্যা ন্যাশনাল, এদের করা ঐদিনের একটা রিপোর্ট হল যে কে কে উপস্থিত ছিল [ Who attended the Abraham Accord signing] । আবার আমেরিকার বোস্টনভিত্তিক দ্যা আটল্যান্টিক[The Atlantic] এর সম্পাদক  পরের দিন ১৬ সেপ্টেম্বর নিজেই এক আর্টিকেল লিখেছিলেন এই চুক্তিতে কার লাভ কার ক্ষতি বিষয়ে শিরোনাম দিয়েছিলেন – Iran and the Palestinians Lose Out in the Abraham Accords.। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, এটা কোন শান্তি চুক্তিওও হয় নাই। কারণ দুবাই বা বাহারাইন কখনই ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধ করে নাই। আবার তিনি বলছেন, এর পিছনে সৌদি আরব আছে এর বড় প্রমাণ হল বাহারাইনের উপস্থিতি। বলেছেন সৌদি যুবরাজ, Bin Salman, without whom these Gulf states, Bahrain in particular, would not dare make such a bold and public move,…।

    আসলে এই চুক্তিকে আব্রাহাম চুক্তি বলার উদেশ্য হল মনোথিওজমের জনক আব্রাহামের নামে নিয়ে একটা জাঁকজমক আবহ তৈরি করা।  অথচ এর আসল উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনিদেরকেই কোণঠাসা ও উপেক্ষা করে জায়নিস্ট আর মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহরা এক হয়ে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধেই একসাথে কাজ করা। ফলে এটাকেই তারা “আব্রাহাম চুক্তি” বলে চালাতে চেয়েছেন। এছাড়া যদিও এখানে স্বাক্ষরকারিদের মধ্যে আমেরিকা মানে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও আছেন কিন্তু তিনি আসলে ঠিক কোন পক্ষ নন;  বড় জোড় মধ্যস্থতাকারি। অথচ সেখানেও জোড়াতালি দেয়া হয়েছে। কারণ আসল সংঘাত জায়নিস্টেরা তৈরি করে রেখেছে তো প্যালেস্টাইনিদের সাথে। অথচ প্যালেস্টাইনিরা এই চুক্তির কোন পক্ষই নয়।

    তবে ছয় মাস আগের পরিস্থিতি এখন নেইঃ
    ২০২০ সালের আমেরিকান নির্বাচনের দুমাস আগে করা ঐ চুক্তি এখন ট্রাম্প পেরিয়ে বাইডেনের আমলে পৌঁছেছে। কিন্তু বাইডেন এত দিন এই চুক্তিতে যে যালেস্টাইনিদের উপর চাপ সৃষ্টি ও বঞ্চিত করা হয়ে আছে সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে ফেলে রেখেছিলেন। এর বাস্তব অর্থ হয়েছিল যে বাইডেনও যেন ট্রাম্পের অনুসারি।

    কিন্তু এবারের গাজায় ইসরায়েলি হামলায় বাইডেনের চোখ খুলেছে; তিনি  ইতোমধ্যেই তাঁর কাজের প্রায়োরিটি বদল নিয়েছেন। এখন তিনি ওই চুক্তির কারণে যেসব ক্ষতি হয়ে গেছে বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে ওইসবের ক্ষত সারাতে উঠে পড়ে লেগেছেন। সে কাজেরই এক প্রধান অংশ ছিল এবারের গাজায় ইসরাইলি হামলায় ইসরাইলকে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য করা। তাছাড়া আমেরিকার আগের প্রতিশ্রুত যেসব ত্রাণ ও পুনর্বাসনের তহবিল আমেরিকা গাজায় দিত, যার পুরোটাই ট্রাম্প বন্ধ করে দিয়েছিলেন, সেসব আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছেন বাইডেন। আর মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পর্কগুলো যা ট্রাম্পের কথিত আব্রাহাম চুক্তির কারণে এলোমেলো হয়ে গেছিল – সেগুলোকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনার জন্য সেক্রেটারি অব স্টেট বিল্কেনের এক লম্বা সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

    আর বাইডেনের এই নতুন অবস্থানে আসা বা আমেরিকাকে হুঁশে ফিরিয়ে আনার কাজটি মূলত কারা করলেন? এনিয়ে বিবিসি বাংলাতে এক বিশেষ করা হয়েছে যার শিরোনাম, “ইসরায়েল ফিলিস্তিন প্রশ্নে আমেরিকায় ডেমোক্র্যাট শিবিরে গভীর পরিবর্তন“। তাতে বলা হচ্ছে, এরা হলেন ডেমোক্র্যাট দলের মধ্যে নতুন যারা তুলনামূলক তাদের ভাষায় ‘প্রগ্রেসিভ’ (আমেরিকান অর্থে প্রগ্রেসিভ যারা রক্ষণশীলের উল্টা, আমাদের মতো দেশের অর্থে প্রগেসিভ মানে কমিউনিস্ট তারা নন)। বিবিসির উপরে উল্লেখিত এই রিপোর্টের ভাষায়,……

    “কিন্তু কংগ্রেসের ভেতর দিনকে দিন বৈচিত্র্য আসছে, আর সেই সাথে ইসরায়েলের প্রশ্নে আমেরিকার প্রচলিত নীতি চাপের মধ্যে পড়েছে।
    জরিপ সংস্থা পিউ ফাউন্ডেশন স্টাডি বলছে ২০২১ সালের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ এবং সেনেটে নির্বাচিত সদস্যদের ২৩ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ, হিসপানিক, এশীয় এবং আদি আমেরিকান বংশোদ্ভূত । এটি একটি রেকর্ড। বিশ বছর আগে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১১ শতাংশ। ১৯৪৫ সালে ছিল মাত্র ১ শতাংশ”।

    এরা আসলে বাকি ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় ফিলিস্তিনিদের পক্ষে বেশি প্রো-অ্যাকটিভ। আর এদের প্রতিনিধি বলতে তিন নারীর কথা বেশি সামনে এসেছে।  বার্তা সংস্থা রয়টার্স এর ভাষায়, “এরাই সেই প্রগ্রেসিভ ডেমোক্রাটস যারা বাইডেনকে গত প্রেসিডেন্ট  নির্বাচনে জিততে শুধু সাহায্য করেছিল তাই না, বাইডেন নমিনেশনও পেয়েছিলেন এদের শক্ত  সমর্থনের জন্য …progressive Democrats, a group that helped Biden win the Democratic nomination and the presidency……]।

    বিবিসি লিখেছে, কংগ্রেসে তরুণ, প্রগতিশীল কয়েকজন সদস্যের একটি জোট – যেটি স্কোয়াড নামে পরিচিতি পেয়েছে -, তার মধ্যে রয়েছেন মিশিগান থেকে নির্বাচিত ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত রাশিদা তালিব এবং মিনেসোটা থেকে নির্বাচিত সোমালিয়ান বংশোদ্ভূত ইলহান ওমর।]

    এদের একজনের সাথে বাইডেন-কমলা বিমানে উঠার আগে টারম্যাকে আন্তরিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু আলাপ করছেন, এমন একটা ছবি অনেক জায়গায় ঘুরছে।

    মূল কথাটা হল, এনিয়ে রয়টার্সের একমাত্র এক এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট ছাপা হয়েছে গত ২১ মে। সেখানে বহু প্রসঙ্গে ডিটেইলড বর্ণনা আছে। যার শিরোনাম হলো, গাজা কনফ্লিক্ট ফোর্সেস রিঅর্ডারিং অব বাইডেন’স পলিসি প্রায়োরিটিস প্রশ্নে ব্যাখ্যা [Analysis: Gaza conflict forces reordering of Biden’s policy priorities]। এককথায় বললে, বাইডেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর শয়তানি পরিকল্পনার ‘আব্রাহাম একর্ড’ ভেঙে আমেরিকাকে বের করে আনতে সচেষ্ট হয়েছেন।

    কিন্তু এর সাথে আমাদের পাসপোর্ট ইস্যুর কী সম্পর্ক?
    হ্যাঁ, সেটাই সবচেয়ে মজার। আব্রাহাম একর্ড ২০২০ সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরের পরে ঐ সময় এর বাস্তবায়নের দায় পড়ে মূলত দুই যুবরাজের (দুবাই, সৌদি) উপর। এই চুক্তিতে দৃশ্যত সৌদি আরব নেই। কিন্তু পশ্চাদ-পটভূমিতে সর্বত্র আছে। এনিয়ে আটল্যান্টিকের আরেক রিপোর্ট Why the UAE Made Peace With Israel দেখা যেতে পারে। এছাড়া ঐ চুক্তিস্বক্ষরের সময় আরও পাইপলাইনে ছিল (আছে বলতে পারছি না) আরো দুই দেশ ওমান, সুদান ইত্যাদি।

    আব্রাহাম একর্ড করার মূল লক্ষ্য কী ছিলঃ
    কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। প্রশ্ন হলো, এই আব্রাহাম একর্ড কেন তারা করেছিলেন? কেন পক্ষগুলো এর দরকার অনুভব করেছিল? সেটাই মূল ঘটনার আরেকটা দিক। ওই মূল ঘটনা হলো, ইরান; মানে চীন-ইরান ২৫ বছরের চুক্তি বাস্তবে হাজির হওয়া। আর এর বিরুদ্ধেই জায়নিস্ট আর মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহরা মিলে এক হয়ে কাজ করা জোট পাকানো আর একারণেই রিপাবলিকান ট্রাম্প তাতে মদদ নিয়েছিলেন। বলাই বাহুল্য,  ইরানের এই নব উত্থানে ইসরাইল ভীত। আবার জিসিসির বাদশাহ-দেশগুলো মধ্যে সম্ভবত কাতার ছাড়া সব বাদশাহ-রাষ্ট্র ও বিশেষ করে দুই যুবরাজের (দুবাই, সৌদি) – তারাও ভীত। এখানে ইসরাইলের ভয় হল যে এই (চীনের বলে বলিয়ান) ইরান এখন আরো বড় ক্ষমতা ও প্রভাব নিয়ে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দাঁড়াবে। হামাস-হিজবুল্লাহ এর সাহায্যে। এছাড়া আমেরিকার সাথে পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান আর ফিরে কোন চুক্তিতে বাধা পড়তেও সম্ভবত চাইবে না। এগুলোই ইসরাইলের মাথা খারাপ করে দেয়া তাদের মূল শঙ্কা।

    ওদিকে ইরানের প্রভাব যেভাবে বেড়ে যাচ্ছে আর তাতে সে মধ্যপ্রাচ্যে কোন বাদশাগিরিই আর রাখবে না – এই অবস্থান নিতে পারে এই হল  জিসিসির [GCC] বাদশা-আমীরদের মূল শঙ্কা। আর চীন গ্লোবাল নেতা হয়ে গেলে, তাতে আমেরিকান প্রভাবের পতন ঘটবে, আর তাতে মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমান সৌদিদের মুখ্য ভূমিকাটা নিয়ে বসবে ইরান। এটাও তাদের শঙ্কা। একারণে, নেতানিয়াহু জামাই কুজনারের মাধ্যমে শ্বশুর ট্রাম্প (ও তার দল রিপাবলিকানদের) কব্জা করে আমেরিকান মধ্যস্থতায় এই আব্রাহাম একর্ড করে নিয়েছিলেন তারা সকলে মিলে যেন এই চুক্তি একটা তাদের জন্য প্রতিরক্ষা। তা আসলে ইরান-চীনবিরোধী এবং ইরানি উত্থানে ভীত আরব বাদশাহ আর ইসরাইলিদের কমন এনিমি ইরানের বিরুদ্ধে তাদের জোট। অতএব এই যুবরাজদের চোখে ভরসা হয়ে দেখা দিয়েছিল  ইসরাইল। তাদের ভীত মনের অনুমানে, ইসরাইলই একমাত্র তাদেরকে ইরানের হাত থেকে বাঁচাতে পারে। এই মনোভাবটা টের পেয়েই নেতানেয়াহু “আব্রাহাম একর্ড” পরিকল্পনা নিয়ে আগানো শুরু করেছিল।

    একারণে আবার আব্রাহাম অ্যাকর্ডের বাস্তবায়ন মানে ইসরাইল দাবি করেছিল  যে তাহলে  যুবরাজ-দ্বয়ের কাজ হল, তারা মুসলমানপ্রধান রাষ্ট্রগুলো থেকে ইসরাইলকে স্বীকৃতি এনে দিক। আর ওই কাজে যুবরাজের অন্য অনেকের মত পাকিস্তানের (এবং বাংলাদেশও) ওপরে চাপ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ইমরান যেকোনো মূল্যে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে বসে। আর তাতে দুবাই পাল্টা ব্যবস্থায় সমস্ত পাকিস্তানি (মূলত মাইগ্রেন্ট লেবারদেরকে) দুবাই থেকে বের করে দেয় বা প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু করোনা আমল বলেও অনেকে ধরে নেয়, এটা বোধহয় করোনা-পদক্ষেপের কারণে হচ্ছে। যেমন এই রিপোর্টে কারণ কী তা ব্যাখ্যা দেয়া বা উল্লেখ করা হয় নাই। এই প্রসঙ্গে সৌদি আচরণের রিপোর্ট এখানে ।  আর এনিয়ে ভারতের খুশি লক্ষ্য করেন এখানে।মজার কথা হল, বাংলাদেশের নাম ওই সময় দুবাইয়ের নিষেধাজ্ঞা তালিকায় উঠেনি। এখান থেকেই অনুমান যে আমরা স্বীকৃতি দেয়ার অনুরোধকে পালটে নিয়ে আপাতত – এভাবে পাসপোর্টে ‘ইসরাইল ব্যতীত’ পর্যন্ত শব্দগুলো উঠিয়ে দিতে রাজি হয়েছিলাম। বলাই বাহুল্য, এটা ভাল সিদ্ধান্ত হয়নি যা এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে।

    তবে এই প্রসঙ্গে এখন সুনির্দিষ্ট করে বলা যায়, সরকারের উচিত হবে অবিলম্বে পাসপোর্ট ইস্যুতে সব সিদ্ধান্ত স্থগিত করে পুর্বাবস্থায় ফিরে রেখে দেয়া আর পুরো ইস্যুটা যেসব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল তা এক কমিটি করে রিভিউ করতে বসানো। মনে রাখতে হবে এখনকার বাইডেন, তিনিই যেখানে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর অবস্থানে থাকতে চাইছেন না। নিজের প্রায়োরিটি বদলে ফেলার পথে রওনা দিয়েছেন তাহলে অন্ততপক্ষে এই সুযোগে আমরাও আমাদের ভুল সংশোধন করে নিতে পারি।

    এছাড়া আরো দিক আছে। ইতোমধ্যে দুবাইয়ের সাথে চীনের সম্পর্ক কিছু উন্নতি হয়েছে বলতে হবে। আর এর প্রকাশ হল দুবাই করোনা টিকা ইস্যুতে পুরোপুরি চীনা টিকা-নির্ভর। সম্ভবত এটাতে তাদের কথা বলার পথ খুলেছে।

    আবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে নীতির পক্ষে আমাদের দাড়াতে হবে তা হল, ইরানের পিছনে চীনের সমর্থন আছে বলে এই নতুন ইরান সে আর যাই করুক মধ্যপ্রাচ্যে বাদশাদের রাষ্ট্র-এর ওপর হস্তক্ষেপ করবে, বা-হাত ঢুকাবে, সরকার বদলাবে কী রাষ্ট্রপদ্ধতি বদলে দিবে – এটা একেবারেই কাম্য নয় ও অগ্রহণযোগ্য। এটা হতে পারে না। দুবাই বা সৌদি আরবে আভ্যন্তরীণভাবে সরকারে কে বসবে রা সরকার পদ্ধতি কী হবে তা একমাত্র তার অভ্যন্তরীণ জনগণই নির্ধারণ করবে – এই নীতির বাইরে আমরা কেউ যেতে পারি না। আমরা ওয়ার অন টেররের জুনিয়র বুশ হয়ে যেতে পারি না।

    কাজেই দুবাইয়ের সাথে চীনের কত দূর কী আলাপ হয়েছে আমরা জানি না। তবে দুবাই অন্তত এখন অনেক আশ্বস্ত তাই আমরা লক্ষ্য করছি। কারণ অন্তত  ইসরাইলকে ত্রাতা জ্ঞান করার আগের  দুবাই অনেকটাই এখন শীতল বলে মনে হয়।

    তবে চীনকেও অবশ্যই নীতিগত অবস্থানে শক্ত হতে হবে, আর চীন-ইরান চুক্তি হয়েছে বলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আরেক বিশৃঙ্খলা কাম্য নয়। তা চীনেরও পক্ষে যাবে না। একমাত্র নীতিগত অবস্থান ধরে দাঁড়ানোই চীন দায়িত্ববান গ্লোবাল নেতার ভূমিকায় স্বাগত লাভ করতে পারে।

    সারকথায় আমাদের পাসপোর্ট ইস্যুতে আরো বড় ক্ষতি হয়ে যাবার আগেই অবিলম্বে সিদ্ধান্ত স্থগিত ও রিভিউয়ের অবস্থানে চলে যাওয়াই কাম্য। এটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। সারা জীবন আমরা ফিলিস্তিনের পক্ষে থেকে এখন তাদের হাত ন্যূনতম শিথিল করার কোনো অর্থ নেই, এটা হতেই পারে না! আশা করি, আমাদের সরকার  বদলাবার সুযোগটা নিবেন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৫ মে  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে    “বাংলাদেশের পাসপোর্ট : প্রেক্ষাপট বাইডেনের প্রায়োরিটি” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • জায়নবাদ ‘এন্টি-সেমেটিক’ বলে ভয় দেখায়

    জায়নবাদ ‘এন্টি-সেমেটিক’ বলে ভয় দেখায়

    গৌতম দাস

     ২৪ মে ২০২১, ০০:০৫  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3yk

     

    Roarmedia

    কারো দিন একই রকম যায় না। দিন বদলায়। তবু দেখা যায়, ন্যায়-অন্যায় ইনসাফবোধ ভুলে গিয়ে কেউ কেউ সাময়িক সুখে বুঁদ হয়ে থাকতে চায়। আবার জুলুম করার সুযোগ পেলে সেটাকেও চিরদিনের মনে করে বসে। যে কারণেই সম্ভবত ওই প্রবাদ যে, ‘মানুষ সুখ পেয়ে আল্লাহ’ ভুলে যায়। ১৯৪৮ সালে ১৪ মে ইসরাইল তার জন্ম থেকে নিয়মিত ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা, হত্যা আর চরম নিষ্ঠুরতা দেখিয়ে যাচ্ছে। আর প্রত্যেকবার নতুন হামলার পেছনে অন্যান্য ঘটনা বা ইস্যুর সাথে নতুন করে কোথাও না কোথাও ভূমি দখলের উপাদানও সংশ্লিষ্ট থাকেই। যেমন- অন্য কিছুর সাথে এবার সংশ্লিষ্ট ছিল ‘শেখ জাররাহ’ এলাকার ফিলিস্তিনিদের উৎখাত করে নতুন করে তাদের ভূমি জবরদখল।

    এবারের সঙ্ঘাতের মাঝামাঝি সময়ে  লিখেছিলাম, “ফিলিস্তিনিদেরও দিন বদলাবেই“। জুলুম চিরস্থায়ী হতে পারে না। কথাটা বলেছিলাম অবশ্যই ‘স্পিরিচুয়াল’ অর্থে। কারণ মনে হয়েছিল, সময়ে স্পিরিচুয়ালিটিই মানুষকে যৌথভাবে দ্রুত ন্যায়ের পক্ষে শক্তি ও সাহস নিয়ে উঠে দাঁড়াতে উপযুক্ত উপায় হয়ে দাঁড়ায়। অতএব, আমারও তাই করা উচিত। সে কারণে স্পিরিচুয়াল অর্থে এমন কয়েকটা বাক্যের একটা প্যারাগ্রাফ কখনো আগে লিখিনি, এমন হলেও তা করেছি। যদিও ওখানে পরে ‘বস্তুগত’ অর্থে মানে, ‘আধুনিক’ অর্থে রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করেও দেখিয়েছিলাম, কেন ইসরাইল হেরে যাবেই।

    ইসরাইল হারবেই আর দিন বদলে যাবেই:
    কেন ইসরাইল হারবে আর দিন বদলে যাবেই? কারণ আমেরিকা গ্লোবাল নেতৃত্ব হারাচ্ছে ক্রমশ চীনের কাছে। আমেরিকান স্টাডি-গবেষণা রিপোর্টও বলছে যে এটা আসন্ন। এ সংক্রান্ত যে প্রথম রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ সালে। তাদের ভাষায় ‘গ্লোবাল নেতৃত্ব পশ্চিম থেকে পুবে এশিয়ায় চলে যাচ্ছে এবং তা স্থায়ীভাবেই।

    আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের পতনের পূর্বাভাস দেয়া শুরু তখন থেকে আর তা তাদের নিজেদেরই স্টাডি রিপোর্টে। এ বছরও একই মূল পূর্বাভাস দিয়েছে। কিন্তু মজার কথা, পরে ২০১১ সালেও ওবামা আয়ারল্যান্ড সফরে পূর্বপুরুষের ঘরবাড়ি দেখতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে, টাউনহল পাবলিক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, আমরাই (পশ্চিমারা) দুনিয়াকে শাসন করে যাবো – মিথ্যা হলেও এমন আশ্বাস দিয়ে তিনি বক্তৃতা করেছিলেন।

    তবে প্রাসঙ্গিক কথাটা হল, নিয়মিত অত্যাচারী আর ভূমি দখলকারী ইসরাইলকেই এই আমেরিকা সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে; তাতে ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান যে দলের প্রেসিডেন্টই ক্ষমতায় থাকুন। গত ১৯৪৮ সালে ইসরাইলের জন্ম ও জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ প্রাপ্তিসহ সব কিছুতে স্বীকৃতি আদায় করে নেয়া হয়েছিল প্রধানত আমেরিকার কারণে, যখন সে ইতোমধ্যেই গ্লোবাল নেতা।  এবং  রুজভেল্টের উপযুক্ত উত্তরসুরী উদার ইমেজের হ্যারি ট্রুম্যান  সেসময়ের প্রেসিডেন্ট আর যার সবচেয়ে কালো কাজ ছিল এটা।। আর সেই থেকে আমেরিকান প্রেসিডেন্টেরা নিয়মিতভাবে ইসরায়েল সমর্থন করে যাচ্ছে – যে অন্যের ঘরবাড়ি লুট ও হত্যাকারী, তারই আবার ‘আত্মরক্ষার অধিকার’- এই নির্লজ্জ কথার ওপর দাঁড়িয়ে আমেরিকা ইসরাইলের পক্ষে সাফাই জোগাড় করে গেছে ও যাচ্ছে।

    অতএব, একালে গ্লোবাল নেতৃত্ব অবস্থান থেকে আমেরিকার পতন এঘটনার অন্যতম মানেই ইসরাইলের পতন। মানে জায়নবাদী ইসরাইল রাষ্ট্রের পতন বা ভেঙে পড়া। বলাই বাহুল্য, এতেই ফিলিস্তিনিদের জীবনের ওপর জুলুমের-অবসান ঘটবে। প্রায় নিয়মিত নির্যাতন অত্যাচার আর ভূমি দখল হয়ে যাওয়ার অবসানের দিন ফিরে পেতে পারে ফিলিস্তিনিরা।

    এদিকে ইতোমধ্যে এবারের সঙ্ঘাতের পর আপাতত এক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, এর পর থেকেই আরেক তথ্য বিশ্লেষণে গ্লোবাল মিডিয়া উপচে উঠেছে। আর তাতে এর চেয়েও বেশি খুশির খবর হলো, এবারের সঙ্ঘাত ও আত্মত্যাগ থেকে বিনিময়ে বেশ কিছু ইতিবাচক উন্নতির কথা শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে যেটা বলেছিলাম, চীনের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে খুব নির্ধারক হবে।

    চীনের নির্ধারক ভুমিকার ছায়া উঠে আসছেঃ
    জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ [UN Security Council], রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে জাতিসঙ্ঘের সর্বোচ্চ ফোরাম। এর মোট ১৫ সদস্যের মধ্যে পাঁচ স্থায়ী ও ১০ অস্থায়ী। মানে, অস্থায়ীরা দুই বছরের রোটেশনাল যা পাঁচ মহাদেশ থেকে ঘুরে ঘুরে বাকি জাতিসঙ্ঘ সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচিতদের নেয়া হয়। কিন্তু তাদের ১৫ সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা সবাই এক মাস করে ঘুরে ঘুরে এই পরিষদের সভাপতিত্ব করেন, এভাবেই এটা চলে। সেই বিচারে, চীন এবারের মে মাসের সভাপতি। না, সভাপতি হয়েছে বলে তাতে বিশেষ উত্তেজনা অনুভব করার কিছু নেই। কারণ সভাপতি হিসেবে (চীনা স্থায়ী প্রতিনিধি অথবা বিশেষ পরিস্থিতিতে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থিত থাকলে) তিনি কী বলবেন, তা আগেই স্ক্রিপ্ট করে এবং প্রয়োজনীয় সময় বরাদ্দসহ সবকিছুই সব সদস্য মিলে আগাম নির্ধারিত করে রেখে থাকেন। তবে কেবল নিজ দেশের অবস্থান তুলে ধরার জন্য আলাদা যে, সবার সমান বরাদ্দ সময় তখন প্রত্যেকে নিজের কথা বলতে পারেন; যার যা কারিশমা তা কেবল তখনই।

    চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী [Wang Yi] এবার নিজে উপস্থিত ছিলেন। তিনি উপস্থিত থেকে এবার দু’টি প্রসঙ্গে আমেরিকানদের খুবই কঠিন দুরবস্থায় ফেলেছিলেন। প্রথমত, পরিষদের সদস্যদের যৌথবিবৃতি পাস করাতে চেয়েছিল চীন যেটা হলে, ইসরাইলের নিন্দা থাকত তাই আমেরিকা এতে ভেটো দেয়। কারণ গ্লোবাল পাবলিক সেন্টিমেন্ট এখন প্রধানত আমেরিকার বিপক্ষে ছিল। তার ওপর আবার এমন সময়ই ইসরাইলকে অস্ত্র বিক্রির পক্ষে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন।
    দ্বিতীয়ত, চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজের প্রস্তাব ও অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে তার দু’টা বাক্য আমেরিকা তো বটেই, ইসরাইলকেই খুবই বেকায়দায় ফেলেছিল। সেটাতে চীনা ভাষ্য ছিল, “টু-স্টেট সলিউশনের[two-state solution]” এর মাধ্যমে এক শান্তিপূর্ণ সমাধানে যেতে হবে। যার সোজা ব্যবহারিক মানে হল – বর্তমান ইসরাইল স্টেট, এটা তো ঘোষিত এক জায়নিস্ট (Zionist বা ইহুদিবাদী ) স্টেট; এই জায়নিস্ট রাষ্ট্র ভেঙে দিয়ে দু’টি সম-অধিকারভিত্তিক আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম দিতে হবে। মানে কেবল ইহুদিদের জন্য একটা রাষ্ট্র (তাতে অন্যদের দুর্দশার শেষ নেই) রয়েছে যা চরম বৈষম্যমূলকভাবে তৈরি হয়েছে। কারণ অন্য কোনো ধর্মের লোকের উপরে ইহুদি নাগরিকের বিশেষ সুবিধা বা কথিত ‘অধিকার’ দিয়ে তৈরি করা এটা। এ ছাড়া অনবরত এটা ফিলিস্তিনিদের জায়গাজমি দখল করে তাতে সরকারি অনুদানে আবাসিক এলাকা বানিয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে বা অভ্যন্তর থেকেই ইহুদি হলেই তাকে ঐ বাড়ি বরাদ্দ দেয়া – এভাবে জবরদস্তি বসতি গড়ে তোলা চলছেই। অথচ ইসরাইল জায়নিস্ট রাষ্ট্র এভাবে ভূমি দখলের অথবা, রাষ্ট্রের আয়তন বৃদ্ধির বিরুদ্ধে তো নয়ই বরং পক্ষে ও প্রত্যক্ষ সহায়ক। আর তাদের এ দানবীয় কাজের পক্ষে সাফাই হল, বিভিন্ন ধর্মীয় স্ক্রিপ্ট ও সেটা নিয়ে ‘রাব্বি’দের ইচ্ছামতো ব্যাখ্যা যে, একটা জায়নবাদী রাষ্ট্র গড়তেই হবে। সেটা নাকি এখানে বা ওখানে লেখা আছে! এমনিতেই কোনো ইচ্ছা মত  পুরান স্ক্রিপ্টের তাফসির জমির আইনি দলিলের উৎস হতে পারে না। এটা ভয়ঙ্কর!

    তাই চীনের সরাসরি টু-স্টেট সলিউশনের কথা তোলার মানে হল, প্রথমত এটা বর্তমান ইহুদিবাদী রাষ্ট্রের ভেঙে দেয়ার প্রস্তাব। ফলে তা ইহুদিবাদ ধারণার বিরুদ্ধেই সরাসরি আঘাত। এ ছাড়া অন্যের হক মেরে এনে সেটা ইহুদিদের দেয়ার এই বিশেষ ও চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্র – ইহুদিবাদের প্রাণভোমরাকেই বিনাশ করে দেয়া হবে এতে। দেখা গেছে, যে লোকটা ইহুদি ধর্ম বা তা পালন নিয়েও সিরিয়াস নয়; অথচ সেও কিন্তু এই ইহুদিবাদ বা জায়নিস্ট রাষ্ট্রটাকেই টিকিয়ে রাখার প্রবলভাবে পক্ষে।

    বলাই বাহুল্য এটা সবার চোখে পড়বেইঃ
    বাইডেনের দেয়া ইসরায়েলকে প্রশ্রয়ের বিপরীতে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর Wang Yi এর অবস্থান……
    “especially Israel.” Wang elaborated that “in particular, Israel should exercise restraint, and … put an end to violence, threats, and provocations against Muslims, and maintain and respect the historical status quo of the holy sights in Jerusalem.”

    এ ছাড়া চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আরেকটা বক্তব্য জায়নিস্টদের মনে খুবই চোট দিয়েছে বা বলা উচিত, তাদের ভীত করেছে। তা হল, বক্তব্যের শুরুতেই তার প্রথম বাক্য হল, “ফিলিস্তিন প্রশ্ন হল, সারা মধ্যপ্রাচ্যের সব সমস্যার মূল ইস্যু” [“the Palestinian question has always been the core of the Middle East issue.”]।

    আর এ কথাতেই বহু সাধারণ ইহুদিবাদীও বিরাট বিপদ দেখেছেন। কেন? তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান সমস্যা নাকি ‘শিয়া-সুন্নি বিরোধ’। যেমন- সৌদি আরব আর ইরান ঝগড়া [cold war between Iran and Saudi Arabia]। আসলে তারা চাচ্ছেন, মুসলমানদের মধ্যকার স্বাভাবিক ভিন্নতাগুলোকে যত প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখানো যাবে ততই এ কারণে নিজেদের – এক দগদ্গে ঘায়ের মত – জায়নিস্ট রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের নজর তত কম যাবে। গত দু’দিনে এমন যত লেখা পড়েছি, তাতে এই ব্যক্তির লেখাটাই তুলনায় সবচেয়ে নরম ভাষায় লেখা। উনার নাম DALE ALUF। এই লেখার বেশিরভাগ উদ্ধৃতি তার লেখা থেকে নিয়েছি।  অথচ তার লেখাটাই প্রবল জাতশ্রেষ্ঠত্ববাদী আর রেসিজমে ভরপুর।

    যেমন- তাঁর আরো বক্তব্যে আছে যেমন, আমেরিকা যে মধ্যপ্রাচ্যে আরব স্প্রিংয়ের আন্দোলন চালিয়েছিল (বুঝাচ্ছেন বিশেষত মিসর, তিউনিশিয়ায়) সেটা আরো চালানো উচিত[Arab spring of 2011 had more to do with the internal social and political issues…]। কেন? কারণ সেটাই নাকি মধ্যপ্রাচ্যের ‘মূল’ সমস্যা। কী সেটা? তারা নরম ভাষায় ইঙ্গিতে বুঝাচ্ছেন, মুসলমানরা হলো জঙ্গি, এরা খালি মানুষ মারে। এ জন্যই নাকি আমেরিকা ‘আরব স্প্র্রিং’ শিখিয়ে তাদের শান্তির পথে এনেছিল [……that slipped into chaos than it did with the Israel-Palestine conflict…….]”। অথচ পাঠক লক্ষ্য করুন, এই ভাষ্যের মাধ্যমে লেখক যে ভরপুর বিদ্বেষে মুসলমানরা সব “জঙ্গি” বলতেছেন ফলে এরা “নিচা” – এই ধরে নেয়া নিচু-মানুষ বলে ঘৃণা ছড়িয়ে ফেলছেন, সেদিকে খবরই নেই।

    সোজা কথা হল, কোন জনগোষ্ঠিকে নিজেদের মুক্তির জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা পেতে হলে তাদের সশস্ত্রতাই একমাত্র উপায়।  তাই ক্ষমতা=সশস্ত্রতা। কাজেই এর উপর পর্দা টেনে দিয়ে লুকানোর কিছু নাই।  আমরাও তাই-ই করেছিলাম। ১৯০৫ সালে জমিদার-হিন্দুরা বৃটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্রভাবেই খুনাখুনি শুরু করেছিল। এটা নাকি ছিল বিপ্লবীপনা! কিন্তু এমন বিপ্লবীপনা মুসলমানেরা করলে তা ‘জঙ্গী’। এই ভাষাবদলটা লক্ষণীয়! প্যালেস্টাইনিরা নাকি জঙ্গী।  এই হল জায়নবাদীসহ সব ধরনের জাতবাদী, জাতশ্রেষ্ঠত্ববাদীর সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং কমন ‘অসুখ’ ও অসুস্থতা।

    লক্ষ করেন হাতে অস্ত্র ধরা মানেই জঙ্গি – তা-ও চরম নেতিবাচক ও খারাপ জাতের লোক তারা! এই হল তাদের বিদ্বেষের মূল কথা। এর মানে, বাংলাদেশে আমরা খুবই খারাপ লোক ও খারাপ জাতের মানুষ তাহলে। কারণ আমরা তো একাত্তরে অস্ত্র হাতে নিয়েই যুদ্ধ করেছিলাম! সূক্ষ্মভাবে খেয়াল না করলে মুসলমানবিদ্বেষী বা জাতশ্রেষ্ঠত্ববাদীদের কারবার ধরতে পারা খুব কঠিন।

    “দুনিয়ার এই শিক্ষা
    নেয়া পরিবর্তনটা সম্পর্কে একেবারেই বেখবর আরেকটা
    বড় রাষ্ট্র- ভারত। সম্ভবত সে কারণেই কংগ্রেসের ‘ছুপা’
    হিন্দু নেশন-স্টেট পরে মোদির জন্য হিন্দুত্ববাদী ভারত,
    এই নেশন স্টেট হওয়ার জন্য উপযোগী হয়ে উঠেছে।
    এখন আসন্ন চীনা নতুন নেতৃত্বের দুনিয়া কি
    জায়নবাদসহ সব শ্রেষ্ঠত্ববাদকে কবর
    দিতে পারবে?”

    এক কথায় বললে, চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের ঐ দুই পয়েন্টে, এতে জায়নবাদী মন ভীষণ বিপদ দেখেছে ও ভয় পেয়েছে। কারণ জন্ম থেকেই জায়নবাদকে ভিত্তি করে তৈরি করা ইসরাইলকে আমেরিকা সুরক্ষা দিয়ে গেছে। কখনোই জায়নবাদের গায়ে ফুলের টোকাও লাগতে দেয়নি। অথচ আমেরিকার দিন গিয়ে চীন উঠে আসছে ক্রমশ; যাতে, আমেরিকান কর্তৃত্ব যা এতদিন জায়নবাদকে প্রটেক্ট করে রেখেছিল, তা নিজেই ভেঙে পড়ছে। আর এতেও জায়নবাদ বা ইহুদিবাদ প্রমাদ গোনা শুরু করেছে। এ জন্যই তারা চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য পছন্দ করেননি।

    কিন্তু সাবধান! এতক্ষণ বর্ণনা যেভাবে করা হয়েছে তাতে কি চীন আমাদের ত্রাতা, তাই চীনকে আমাদের ‘দেবতার আসনে’ বসাতে হবে? দয়া করে এই অর্থ করে কেউ আত্মঘাতী হবেন না। তাহলে, কিভাবে দেখব?

    অবশ্যই চীনের এই অবস্থান ফিলিস্তিনিদের পক্ষে এবং তা খুবই জরুরি আর তা তাদের জন্য এক বিরাট সুবাতাস আনার ইঙ্গিত। কিন্তু কোনোভাবেই এটা চীনের ফিলিস্তিনি ভালোবাসা অথবা চীন মহান, চীন অমুক তমুক বিশাল বীর- না। এসব করা অপ্রয়োজনীয়।অকারণ, এটা চীনের নিজের স্বার্থেই এটা তার অবস্থান; আর তা ফিলিস্তিনিদের পক্ষে। এখানে ফিলিস্তিনিরা মজলুম না কোনো জুলুমবাজ সে বিচারের ভিত্তিতে এখানে চীন অবস্থান নিতে হয় নাই।

    ব্যাপারটা হল, আমেরিকা বনাম চীন, এই গ্লোবাল পুরান আর নতুন নেতার দ্বন্দ্বে চীন নিজের অবস্থান নিলে তাতে চীনের নিজেকে স্বাভাবিকভাবে দেখাতে হবে যে সে আমেরিকার চেয়ে বেটার।  আর এটা কী কোন নতুন কথা যে আমেরিকার বিরোধীদের সাথেই তো চীনের হাত মিলবে! আর এতে এতদিন ধরে যারা চাপা পড়ে থাকা সব কণ্ঠ ও জনগোষ্ঠী এই প্রথম ৭৫ বছর পরে তারা নতুন সম্ভাব্য পরিস্থিতির কারণে সুযোগ পাবেই, পরিস্থিতিটা সে চাক বা নাচেয়ে থাকুক – না চাইলেও তার পক্ষেই আসবে। আর এই সুযোগ তাকে বুদ্ধিমানের মতো উঠিয়ে নিতে হবে।

    কিন্তু তাই বলে চীন কি এতই খারাপ অথবা চীনের কোন ক্রেডিট নাই? যার কোনো ইতিবাচক নৈতিক অবস্থান একেবারেই নেই? না, এমন বলাটাও বিরাট অবিচার হবে। এখানে যে ইহুদি টেকনিক্যাল এক্সপার্ট DALE ALUF – তাঁর এক লেখার বরাতে অনেক কথা বলেছি, তিনি আসলে চীনের সাথে কাজ করা একজন টেকনিক্যাল এক্সপার্ট। তিনি সাক্ষ্য দিয়ে লিখছেন, “ইসরাইল মাওয়ের বিপ্লবের আগেই, ১৯৪৮ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েছে। তাই সে আগের চিয়াং কাইশেকের চীনকে এবং পরে আবার মাও সেতুংয়ের বিপ্লবের (১৯৪৯) চীনকেও স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু তাতেও মাওসেতুং  ইসরাইলকে পালটা স্বীকৃতি দেননি। বরং সোভিয়েত সহায়তায় ইসরাইল বিরোধী যে আরব জোট তৈরি করা হয়েছিল সেসময় তাদেরকেই সাহায্য সমর্থন দিয়ে গেছেন। তবে, ১৯৯২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরই কেবল চীন ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তাও এর কারণ ঐ এক্সপার্ট ব্যাখ্যা করছেন। তিনি বলছেন, ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির পরে, আর সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট সিনিয়র বুশ (১৯৮৯-৯৩) ১৯৯১ সালে ‘মাদ্রিদ সম্মেলন’ [The Madrid Conference, 1991] ডেকেছিলেন আরব-ইসরাইলের জন্য এবং ফিলিস্তিনি নেতাদেরকেও দাওয়াত দিয়ে সবাইকে হাতমিলিয়ে দেয়ার জন্য। মূলত এই কারণেই চীনের এর পরে ইসরাইলকে আর স্বীকৃতি না দিয়ে আটকে রাখা – একাজের পক্ষে চীনের হাতে কোনো কারণ ছিল না। তবে এরপরে আজও দুই দেশের সম্পর্ক কেবল অর্থনীতির ভেতরেই সীমাবদ্ধ, কোনো রাজনৈতিক দিকে যা গড়ায়নি। এমনকি ইসরাইল চীনের “বেল্ট-রোড প্রোগ্রামের” সদস্য হলেও নয়। অর্থাৎ সার কথায়, তার ঐ  লেখাটাকে বলা যায়  চীনকে বুঝিয়ে বলা ধরনের পারসুয়েসিভ। যদিও তার জায়নিস্ট রেসিজমের ইসলামবিদ্বেষ তিনি না আনলে তা অনেক ভাল হত!

    CGTN-এ কথোপকথনঃ
    উপরে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের দুটা পয়েন্ট উল্লেখ করে দেখিয়েছি; যা জায়নিস্টদের আঘাত করেছে। কিন্তু এসবের চেয়েও আরেক বড় আঘাতের আরেক পয়েন্ট তৈরি হয়েছিল যেটা তৈরি হয়েছিল চীনের সরকারি সিসিটিভি চ্যানেলের অধীনে পরিচালিত আরেক সরকারি টিভি নেটওয়ার্ক ‘সিজিটিএন’ [CGTN] টিভিতে। সেখানে এঙ্কর এক ব্যক্তির সাথে তার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন। আমার করা সেটার বাংলা অনুবাদ অংশটা নিচে দিচ্ছি। তবে আমি বাংলা করছি ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় ছাপা হওয়া ভাষ্যটা থেকে।

    “গত ১৮ মে সিজিটিএন টিভিতে প্রচারের হোস্ট ছিলেন ঝেং জুনফেং। তিনি প্রশ্ন করেন, ইসরাইলকে আমেরিকার সমর্থন করে যাওয়া, এটা কি সত্যিকারের (পশ্চিমা) গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চার উপরে দাঁড়ানো- বিষয়টাকে প্রশ্ন করে এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, আমেরিকার প্রো-ইসরাইলি এই পলিসি আসলে তৈরি হয়েছে ধনী আমেরিকান ইহুদিদের প্রভাবে এবং আমেরিকার বিদেশনীতি যারা তৈরি করেন তাদের ওপর ইহুদি লবির প্রভাবে”। এরপরে ঝেং আরো স্পষ্ট করে ইংরাজিতে বলেন, “আমেরিকার ফাইন্যান্স ও ইন্টারনেট সেক্টর ইহুদি আধিপত্যে আছে”। তাই অনেকে বলেন, শক্তিশালী লবি এখানে আছে, ‘এটা সম্ভব’!”

    এই হলো মোটামুটি মূল কথাগুলো। কিন্তু এতেই পিকিংয়ে ইসরাইলি দূতাবাস এবং ভারতসহ বহু দেশের পত্রিকা যারা ইসরাইলকে ফেভার করে বা ব্যবসায়িক সম্পর্কে লিপ্ত এমন দেশের বিভিন্ন মিডিয়া চীনকে ‘অ্যান্টি সেমেটিক’ বলে নিন্দার ঝড় তুলে ফেলেছিল।

    অ্যান্টি সেমেটিক মানে কীঃ
    এখন অ্যান্টি সেমেটিক মানে কী? প্রথমত এই শব্দটা তৈরিই হয়েছে জায়নিস্ট বিশেষ চোখ দিয়ে দেখে তৈরি কিছু শব্দ থেকে। আক্ষরিক অর্থে সেমেটিক মানে আভিধানিক অর্থে, হিব্রু, আরবি, আরামিক, আমহারিক ইত্যাদি ভাষা অথবা এই ভাষাগুলোর সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর কালচার – একে সেমেটিক ভাষা বা সেমেটিক কালচার বলা হয়। আরেক অর্থে বাইবেলে যেসব ভাষা বা কালচারের রেফারেন্স বা উল্লেখ আছে বা পাওয়া যায়, ‘সেমেটিক’ বলতে সে সবই বুঝায়।

    কিন্তু এটা তো সেমেটিক শব্দের সাধারণ অর্থ। তবে এটাকেই জায়নবাদীরা আরেক বিশেষ মানে দিয়েছে শুধু তাই না সেটা আর সবাইকে সেই মানে মানতে বাধ্য করতে চায়। তাদের সে মূলকথা হল, যেন আমি ভিকটিম; অতএব আমাকে বিশেষ খাতির করো। এই দাবি করা।

    আমেরিকান সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা মোদির হিন্দুত্ববাদ যেমন- এ রকম এরা সবাই বাদে সবাই জার্মানির হিটলারকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় জাতিবাদী, শ্রেষ্ঠত্ববাদী, রেসিজমের নায়ক মনে করে। কারণ তিনি জার্মান নীল চোখের আর্য জাতির শ্রেষ্ঠত্ববাদের অধীনে সবাইকে নিতে চেয়েছিলেন। আর এতে সবচেয়ে বেশি হিংসা ও আর ঘৃণার চর্চা তিনি করেছেন জার্মানি ইহুদিদের ওপর। গ্যাসচেম্বারে ঢুকিয়ে পুড়িয়ে মারাসহ সম্ভবত সব ধরণের নৃশংসতা, গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করাসহ সব।

    এছাড়া বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের যেসব দেশে ইহুদিরা বাস করত সেসব দেশে হিটলার বা তার যুদ্ধজোট লড়তে গেলে সেখানেই ইহুদিরা নৃশংসভাবে খুন হয়ে গেছে। তাই এতে এক বড় স্বাভাবিক  প্রতিক্রিয়া হল, আমরা ভিকটিম।  কিন্তু পরবর্তিতে এই দাবি বা এই সহানুভূতিকে অস্ত্র হিসেবে পাল্টা সবার উপর ব্যবহারের প্রচেষ্টা হয়েছে। এই হল ভিকটিমহুড।  মানে তৈরি সহানুভুতিকে বিক্রি করে সুবিধা আদায় – ফয়দা বের করা।

    কিন্তু  জায়নবাদের ক্ষেত্রে এরই পরিণতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। হিটলার যে কারণে শ্রেষ্ঠত্ববাদী বিভিন্ন দেশের ইহুদিরা ইসরাইলে জড়ো হয়ে সেটাই এবার তারা রপ্ত করেছে, এটাই জায়নবাদিতা।

    তবে এটা অরিজিনালি সরাসরি হিটলারকে কপি করতে তারা গিয়েছিল ঠিক তা নয়।  বরং যখন তারা আবার উঠে দাঁড়ানোর জন্য বর্তমান রাষ্ট্রে জড়ো হয় – এবার তারা ভিকটিম, এই সহানুভূতি বিক্রি করে দাঁড়াতে চাইল তখনই সেটাই আরো ভয়াবহ এক হিটলারি চিন্তা – এই প্রতিহিংসাটাই তাদেরকে পেয়ে বসেছিল। এই পা পিছলানো তাদের সীমাহীন ক্ষতি করেছে। কামনা করব তারা এটা দ্রুত রিয়েলাইজ করবে। দুনিয়াকে মুক্তি দিবে!

    তাদের পা পিছলানো কাজের মূল দিকটা হল, এই ভুল ভাবনা যে  আবার উঠে দাঁড়াতে চাইলে তাদেরকে- ১. ভিকটিমহুড বিক্রি করতে জানতে হবে; ২. অন্য সব জাতি-জনগোষ্ঠীর ওপরে চড়ে তাদের শাসন মানাতে হবে, কারণ তারা ভিকটিম।
    আরো আছে। এবার এর সাথে তাদের প্রত্যেকের মনে চাপা পড়ে থাকা হিটলারি নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার আগ্রহ যা বিভিন্ন সময় জেগেছিল সেসবকে তারা প্রশ্রয় দেয়া শুরু করেছিল। ব্যতিক্রম বা সচেতন যারা তাদের কথা বাদ দিলে মূলত তারাই জায়নবাদী – যারা হিটলারের আরেক কপি যা অবচেতনে তারা হয়ে উঠেছিল প্রতিহিংসার নেশায়। তারা জানত এটা খারাপ কাজ ভুল রাস্তা। কিন্তু তবু মনকে তারা সান্ত্বনা দিয়েছিল সম্ভবত এই বলে যে বিরূপ দুনিয়ায় আবার টিকে, বেঁচে উঠতে গেলে তাদের এমন নিষ্ঠুর আরেক -হিটলার কপি হয়ে উঠতে হবেই। তাই কী করা… আর সে কারণে যে  হিটলারিজমের শিকার ইহুদিদের প্রতি  সহানুভূতি দেখাতে আসবে তাকেও তারা বধ করবে, শিকার বানিয়ে ফেলবে।

    এ কারণে তাদের কেউ যদি ইহুদি বলে (যেমন মুসলমানকে কেউ বা সে নিজেও অবলীলায় ‘মুসলমান’ বলেই ডাকে) তবে সে ক্ষেত্রে সে মনে করবে যে, এটা হিটলার মনোভাব যেভাবে তিনি তাদের ‘ঘৃণার মুডে’ ইহুদি বলে ডেকেছিল, এটা তাই। কাজেই একালে হলেও তারাও ইহুদিদেরকে ‘নীচা’ দেখানো লোক। অথচ ব্যাপারটা মোটেও তা নয়।  কিন্তু কী অভিযোগ দেবে, যে ওরা আমাকে “ইহুদি” বলেছে? না এটা ভালো জমবে না। তাই এক অদ্ভুত শব্দ চালু করে যে, আমাকে ‘সেমেটিক’ বলেছে। যেখানে তাদের বানানো বিশেষ অর্থ সেমেটিক=ইহুদি এবং তা খুবই নিচা অর্থ তা বুঝতে হবে।

    এখন যদিও সেমেটিক কোনো খারাপ বা নেতিবাচক শব্দই নয়। আর সেমেটিক বলতে আরবদেরও তো বুঝায়। ইথিওপিয়ান আমহারা প্রদেশের আমহারিক, এদেরকেও বুঝায়। কেবল ইহুদিদের একচেটিয়া নয়। তবু এটাই জিদ করে মানে যে, ইহুদি = সেমেটিক, আর সেমেটিক মানে যেন কেবল ইহুদিদের জন্য এই অর্থ চালু করা হয়েছে। এটাই আসলে যে সহানুভূতি দেখাতে আসবে তাকেও তারা অভিযুক্ত করার কৌশল চালু করে। আর সাফাইটা হলো, তাদের বাঁচতে হবে তো! অন্য কেউ তো তাদের দেখবে না।

    তাহলে বলতে হয়, হিটলার তো মুসলমান ছিল না, দুরতম অর্থও নাই। অথচ ইউরোপ বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে ইহুদিদেরকে কৌশলে মুসলমানদের ওপর ডাম্প করে দিলে তখন নিস্পেষিত ইহুদিরা বুঝে যায় এই মুসলমানেরা কোনভাবেই দায়ী না হলেও মুসলমানদের দাবড়েই তাদের নিজেকে টিকে থাকতে হবে। ফলে একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুনিয়ায় হিটলারি চিন্তা লোপ করতে  এবং তা রোধ করতে দুনিয়ায় অনেক আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশন তৈরি করা হয়েছে। অথচ  ততই যেন জায়নবাদী চিন্তা পাল্লা দিয়ে তারা পুরানা হিটলারি শ্রেষ্ঠত্ববাদ চুন্তাকেই আঁকড়ে ধরে উঠে দাঁড়াতে চেয়েছে।

    সবচেয়ে খারাপ কাজটা হল, জায়নবাদ বুঝেই নাই যে, সারা ইউরোপ এক হিটলারের কারণে তা যেন ফিরে নিজ নিজ দেশে কোথায় না জাগে, তাই তারা পুরানা তাদের সবদেশের ‘নেশন স্টেট’-এর কাঠামো ভেঙে দিয়ে, অধিকারভিত্তিক নতুন রাষ্ট্র গড়ে নিয়েছিল, একসাথে এক সম্মেলনের [Council of Europe] মাধ্যমে ১৯৫৩ সালে। অথচ দুনিয়ার এই শিক্ষা নেয়া পরিবর্তনটা সম্পর্কে একেবারেই বেখবর আরেকটা বড় রাষ্ট্র হল ভারত। সম্ভবত সে কারণেই কংগ্রেসের ‘ছুপা’ হিন্দু নেশন-স্টেট পরে মোদীর জন্য হিন্দুত্ববাদী ভারত, এটা এমন এই নেশন স্টেট হওয়ার জন্যই আরো উপযোগী হয়ে উঠেছে। এখন আসন্ন চীনা নতুন নেতৃত্বের দুনিয়া কি জায়নবাদসহ সব শ্রেষ্ঠত্ববাদকে কবর দিতে পারবে?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২২ মে  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “‘সেমেটিক’ বলে ভয় দেখানো জায়নবাদ” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে আর  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • প্রথম আলোর এমেরিকার গ্লোবাল ভুমিকা বুঝবার তরিকা

    প্রথম আলোর এমেরিকার গ্লোবাল ভুমিকা বুঝবার তরিকা

    গৌতম দাস

    ১৯ মে ২০২১

    https://wp.me/p1sCvy-3y8

    সোমবার ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলারের সঙ্গে বৈঠকে টিকা নিয়ে আলোচনা করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম ছবি: পিআইডি

     

    “গ্লোবাল এম্পায়ারঃ কোয়াড বা টিকার ভালো-মন্দ বিচার” – এই শিরোনামে আমি আমার গত লেখায় – “এম্পায়ার” [empire] বলে একটা ধারণা এনেছিলাম। পাঠকের বুঝাবুঝিতে তা ছুতে কতদুর পেরেছি জানি না। তবে ধারণাটা গুরুত্বপুর্ণ। বিশেষ করে ২০১৪ সাল থেকে আমি আমার প্রায় সব লেখাতেই “গ্লোবাল নেতা” বলে একটা ধারণা ব্যবহার করেছি। তা বুঝাতে কখনও “গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা” বা কখনও “গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতা” বলে শব্দ ব্যবহার করেছি। “গ্লোবাল এম্পায়ার” ধারণাটা সেই সংশ্লিষ্ট তবে আরেক অফসুট ধারণা।

    নিউইয়র্ক থেকে পাঠানো প্রথম আলো গত পরশু একটা রিপোর্ট ছেপেছে শিরোনাম, “টিকা কূটনীতিতে পিছিয়ে যুক্তরাষ্ট্র”। আসেন একটু সে খবর পাঠ করতেও শিখি।

    রিপোর্ট শুরুতেই কয়েকটা বাক্য লিখেছে, “টিকায় সহযোগিতার মাধ্যমে রাশিয়া ও চীন আন্তরাষ্ট্র সম্পর্কের উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আর বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে টিকা সরবরাহ নিয়ে মার্কিন সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ফলে কূটনৈতিক মহলে হতাশা বিরাজ করছে।
    ৪৮টির বেশি দেশ টিকা পেতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জরুরি আবেদন জানিয়েছে। বাইডেন প্রশাসন কীভাবে টিকা সরবরাহ করবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি”।

    আসলে এটাই সাত কথার এক কথা যে আমেরিকা আর “গ্লোবাল এম্পায়ার” নাই, ঢলে পড়ছে। মূলত সেকারণেই কারও টিকার চাহিদা মিটানোতে দান-অনুদান দেয়া দূরে থাক একটা সেন্টাল ম্যানেজমেন্টে স্বল্প আয়ের দেশগুলোর টিকা পাবার ব্যবস্থা করার মুরোদও বাইডেনের নাই, তাই তিনি লেস বা নট ইন্টারেস্টেড।  এখন উলটা করে বললে, এই সেন্টাল ম্যানেজমেন্টে স্বল্প আয়ের দেশগুলোর টিকা পাবার ব্যবস্থা করার মুরোদ যার থাকে সেই ঐকালের ‘গ্লোবাল এম্পায়ার’। অর্থাৎ মূলত এক গ্লোবাল বাণিজ্য (বাণিজ্য মানেই সেই সুত্রে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, স্ট্রাটেজিক সবকিছু) ব্যবস্থাপনার যিনি নেতা তারই বেনোভোলেন্ট (গরীব প্রজা দেখেশুনে রাখার মত) বা লিল্লাহ-দাতব্য কাজ এগুলো। এটাকেই আমি বলেছি, ইতিবাচক এম্পায়ার ভুমিকা।

    আরেকটা উদাহরণ দেই। গত পরশু ঢাকার আমেরিকান রাষ্টদুত আমাদের প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। মূলত রোহিঙ্গা ইস্যুতে অ্যামেরিকার যা বার্ষিক চাঁদাদান করার কথা সেই প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের ফরেন মিনিস্ট্রির ফেসবুক পেজ থেকে জানা যাচ্ছে রাষ্ট্রদুত মিলার জানিয়েছেন্‌, “He also informed that the US Government is exploring the possibilities to produce US vaccines in Bangladeshi pharmaceutical companies”.

    নিঃসন্দেহে খুবই ক্যালকুলেটিভ কথাবার্তা। মানে আমেরিকান প্রাইভেট টিকা উতপাদক কোম্পানির সাথে ্কথা বলে দেখবেন, বাংলাদেশে টিকা উতপাদন নিয়ে কথা বলায় দেয়া যায় কিনা। আবার আসলে ঠিক সেটাও না বরং এর সম্ভাবনা যাচাই করে দেখবেন তিনি।

    যদিও এখানে বলে রাখা ভাল আমেরিকান টিকা – এদের দাম ২০ থেকে ৩৩ ডলারের মধ্যে। আর সংরক্ষণ তাপমাত্রা (-১৫) থেকে (-৮০) ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে। যেখানে গরিব গোত্রের টিকাগুলোর প্রায় সবই ৪ ডলারের নিচে আর সংরক্ষণ তাপমাত্রা ২-৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। ফলে যেখানে নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতা বিচারে বাংলাদেশে টিকা বিতরণ করতে হবে বিনা পয়সায় সেখানে ৪ ডলারের উপর প্রতিটা ডলারের মুল্যের পীড়ন সইতে সরকারের অবস্থা খারাপ হবে তা বলাই বাহুল্য। আর ঐ তাপমাত্রায় টিকা সংরক্ষণ যখন দেশের তাপমাত্রা এখন ৪০ ডিগ্রী ছুতে চায় তখন ঐ টিকা বহন করে গ্রাম-মফস্বলে ঘুরে বেড়ানো এটা প্রায় অবাস্তব।

    তবু এটাকে একটা বিরাট সম্ভাবনা যেন এই ভাব ধরে মিলারের ঐদুই কথা নিয়ে প্রথম আলো একটা রিপোর্ট করেছে, “যুক্তরাষ্ট্রের টিকা নিয়ে ‘দু–এক দিনের মধ্যে’ জবাব আসছে”। অর্থাত যেন এই এলো বলে আর চিন্তা নাই। অথচ টিকা আসবে না, কথা আগানো সম্ভব কিনা সেই খবর আসবে।

    গত প্রায় ১৫ বছর ধরে দেখা যাচ্ছে আমেরিকান ফরেন পলিসির এজেন্ট অবস্থান নিয়ে চলতে চাইছে প্রথম আলো।  এখন কেউ এমন নিতে চাইলে আর আমাদের কী করার আছে। ফলে টিকা ইস্যুতে প্রথম আলোর এমন অবস্থান হয়ত অসংগত না, হবেই। কিন্তু নিশ্চয় জবরদস্তিতে আমেরিকাকে একটা বিকল্প উতস বলে চালায় দেয়া এটা কোন কাজের কথা নয়। যা সম্ভব নয়, অবাস্তব এবং আমেরিকাও ইঙ্গিত দিচ্ছে না আগ্রহী নয় তা নিয়ে আগাম আশাবাদ তৈরি করা কী ঠিক! এই বিবেচনাবোধের অভাব লক্ষ্য করছি যেন এখানে আমরা।

    এখন কথা আসলে আরেকটু আগায়ে যেতে পারি আমরা।
    প্রথম আলোর নিউইয়র্কের রিপোর্টারের সিদ্ধান্ত হল, “আমেরিকা টিকা কূটনীতিতেই পিছিয়ে” পড়েছে। মানে আর  তারা এম্পায়ার নাই। লিখেছে, “শুধু বাংলাদেশই না আরো প্রায় ৪৮ টা রাষ্ট্রের অবস্থা এরকম যাদের আমেরিকা হতাশ করেছে”।  বলেছে, যেখানে “রাশিয়া ও চীন আন্তরাষ্ট্র সম্পর্কের উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে”।

    এই কথাগুলো বুঝবার জন্য যথেষ্ট যদি আপনি মানে করতে জানেন। এগুলোই আসলে গ্লোবাল এম্পায়ার ভুমিকা কী তা নিয়ে কথা বলা। এদিকে যেমন আমরা আমেরিকার গ্লোবাল অযোগ্যতা অপারগতা তৈরি হতে ও হেরে যেতে দেখছি। আর  পালটা চীন যে (এটা কেবল টিকা উতপাদনের ক্ষেত্রে) রাশিয়াকে সাথে নিয়ে গ্লোবাল এম্পায়ার ভুমিকায় তৈরি হওয়া গ্যাপটা পূরণ করতে ধেয়ে আসছে, নিজেকে তৈরি করে নিয়ে – এই হল গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদল।

    গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদল মানেই তাই গ্লোবাল এম্পায়ারের ভুমিকাতেও পালাবদল ঘটে যাওয়া। একদিকে ক্রমশ অপারগ আমেরিকা আর অন্যদিকে উত্থিত ও তৈরি চীন, এই ফেনোমেনা।

    এখানে প্রথম আলো চীন না আমেরিকা কাকে পছন্দ করে এটা সেই বিষয়ই না একেবারেই। বরং যে যোগ্য মুরোদ আছে সেই উঠে আসতেছে, এটাই অবজেকটিভ ঘটনা।

    অর্থাৎ প্রথম আলো আমেরিকান এজেন্সি নিবে কেন কারণ সে তাকে ভালবাসে। অর্থাৎ বুদ্ধি খাটিয়ে বুঝে নেয়া সিদ্ধান্ত না এটা। একটা অবজেকটিভ ফেনমেনাকে আমল করে নেয়া নয়।কর্তা হিসাবে তার ভাল লেগেছে তাই।

    এমনকি নিউইয়র্কের ইর্বাহীম চৌধুরি যা বুঝে খবরটা দিয়েছেন। পরিস্কার করে বলছেন যে আমেরিকা “টিকা কূটনীতিতেই” নাই। এই টিকা কূটনীতি এটা যদিও ভুল শব্দ। কিন্তু এরই আসল অর্থ হল, গ্লোবাল এম্পায়রের ভুমিকা পালন করে যাওয়ার মুরোদ। ইর্বাহীম বাস্তবতা দেখে যে রায় দিচ্ছে  প্রথম আলোই সেই রিপোর্ট ছেপে দিচ্ছে কিন্তু নিজেই এর অর্থ তাতপর্য বুঝতে পারছে না। এই হল প্রথম আলোর বুঝার মুরোদের সমস্যা বা শর্টেজ। এজন্যই আমেরিকা সম্পর্কে তার সিদ্ধান্ত ভালবাসা দিয়ে, বুদ্ধি-চিন্তার যেখানে ভুমিকা নাই।
    অর্থাৎ গ্লোবাল এম্পায়ার বুঝলে অনেক কিছু বুঝা সহজ হয়ে যায়।

    আর এখানেই পরিস্কার কেন চীনা টিকা আমাদের গন্তব্য হয়ে যাচ্ছে।  আমাদের দেশে টিকা উতপাদনের ব্যবস্থা করে দেয়া চীনের জন্য  সেটা বিনিয়োগ ও টেকনিক্যালিটি সহ সব অর্থেই – এই ভুমিকা নেওয়ার জন্য সে তৈরি। এজন্য চীন আসন্ন গ্লোবাল এম্পায়ার!

  • ডেস্ক রিপোর্টিংয়ের নামে

    ডেস্ক রিপোর্টিংয়ের নামে

    গৌতম দাস
    ১২ মে ২০২১ ভোর ৪:৫০

    https://wp.me/p1sCvy-3xm

     

    প্রথম আলোর মতিভাইয়েরও তাল রাখা কঠিন হয়ে যাবে। এভাবে হবে না। হুশ-জ্ঞান ওয়ালা কিছুলোক অন্তত লাগবে। এমনিতেই বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো প্রায়শই দিকভ্রান্ত থাকে ফলে যার যেটুক সামর্থ আছে সেটুকুও নিয়েই তারা  বাংলাদেশের  মানুষের কাজে নিজেদেরকে লাগাতে পারে না। প্রথম আলোরও যেটুকু দক্ষতা ছিল তা  উপযুক্ত দিক-নির্দেশনার অভাবে মৃত অতৃপ্ত আত্মার মত ‘ভটক রাহা হ্যায়’ মানে বেঘোরে ঘুরে মরছে যেন!

    যেমন আমাদের বাংলা মিডিয়ায় /পত্রিকায় বিদেশি খবর ছাপা হওয়া মানেই একটা ত্রাস যেন। মিডিয়ার বেদিশ কর্মিগুলা নিরুপায় হয়ে এক জবরদস্ত সুবিধা তাঁরা বানিয়েছে, “ডেক্স রিপোর্ট” নাম দিয়ে। মানে কারখানাটার নাম ‘ডেক্স’ যেখানে সব কিছু বানানো যায় অথচ মেটেরিয়াল বিদেশি পত্রিকার। আর মূখ্যত যেখানে ভুলে যাওয়া হয়েছে যে এটাও তো একটা জার্নালিজমের নামেই চলছে!

    বাংলাদেশে প্রো-আমেরিকান মিডিয়া কম নাই। এর সাথে প্রো-চাইনিজও থাকুক কিংবা প্রো-ইন্ডিয়ান তাও থাকুক! কী আর করা যেখানে মিডিয়াটা চলে মালিকদের অন্য ব্যবসার আয়ের টাকার উপরে!  কিন্তু সে থাকারও তো একটা নিয়ম থাকতে হবে! মানে কিভাবে তারা থাকবে সেটা মুল প্রশ্ন এড়ানো যাবে না। এমনিতেই বাংলাদেশের মিডিয়ায় বিদেশি পত্রিকা থেকে তুলে আনা নিউজ প্রায় নিজের ভাষ্য বলে ছাপিয়ে দেয়ার রেওয়াজ শুরু হয়েছে, যেন তারা নিজেরাই সেগুলার মুল রিপোর্টার বা ফাস্ট রিপোর্টার। এরপর আরো আছে। “ডেক্স রিপোর্ট” মানেই তা প্রথমত কোন রেফারেন্সই ছাড়াই রিপোর্ট করার মহোতসব। “ডেক্স রিপোর্ট” এর নামে প্রথম যে এটা চালু করেছিল তার ছবি বাধিয়ে রাখা উচিত। তিনি এর একেবারেই পথ প্রদর্শক!

    এছাড়াও এরপর কখনও যদি দয়া করে কখনও তাঁরা এক কোনায় লিখে যে অমুক বিদেশি ও ইংরাজি পত্রিকায় সেখবরটা দেখেছে ধরা যাক শিনহুয়া, তবু ওখানেই শেষ। সেটা কবেকার পত্রিকা, রিপোর্টের শিরোনাম কি ছিল, লেখক-রিপোর্টারের সম্পর্কে কোন বাড়তি তথ্য ইত্যাদি তা কিছুই সাথে দিবার বলার রেওয়াজ তাদের নাই। এদিকে আবার রেফারেন্স মানে যে উলটা কমা দিয়ে সুনির্দিষ্ট করে দিতে হয় কোন শব্দগুলো ওখানে বিদেশি বা অন্য পত্রিকার! না এরা মনে হয় উলটা কমার ব্যবহারই জানে না। অবস্থা এতই শোচনীয় যেটা আসলে ‘যা ইচ্চছা তাই’ করার এক জগত যেন।

    অথচ দেশের ভিতরের ঘটনাবলিতে তাদেরই নিজস্ব নিউজ রিপোর্টিং যথেষ্ট স্টান্ডার্ড। যার মানে হল, তারা এই বেপরোয়া হওয়াটাকে  সুবিধা হিসাবে নেন, যেন কা্রো হয়ে প্রপাগান্ডা করে দিবেন এরই কাজ এটা!  আর সবচেয়ে বড় কথা “ডেস্ক রিপোর্ট” এই সেকশন কীভাবে চলবে এর স্টান্ডার্ড  বা কী নীতিতে চলবে এর মা-বাপ বলে কিছু থাকতে নাই যেন।

    তাই মনে হয় এটা বলার সময় পার হয়েছে, যে অনেক হয়েছে প্লিজ এবার একটু দায়ীত্ববান হন। এই বেপরোয়া, খামখেয়ালিপনা আত্মঘাতি! আসলে সমস্যাটা হল, ধরেন আপনি প্রো-আমেরিকান হয়ে থাকতে চান। সেটা হয়ত খুব সমস্যা না। কিন্তু সমস্যা হল, বুঝবেন কেমনে কী করলে সেটা প্রো-আমেরিকান হবে, নাকি না বুঝার কারণে নিজেই নিজের মাথার উপরেই বোমা মারবেন? মূল সমস্যাটা এখানে!

    ভারতের এক কথিত থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো (নাকি মালিক) হলেন ব্রহ্ম চেলানি। ভারতে তার দোকানের নামটা তার লেখার শেষে পরিচয়ে দেওয়া আছে এভাবে – নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বিষয়ের অধ্যাপক। আজকাল গ্লোবাল অর্থনীতিক নেতৃত্বের পালাবদলের যুগ, আমেরিকানেরা তাই আরো বেশি করে সংগঠিত হয়ে কাজ করার চেষ্টা করে থাকে। অনেকে আবার উতসাহি হয়ে আমেরিকানদেরকে একাজে সাহায্য করে থাকে। তেমনই এক উদ্যোগ হল “প্রজেক্ট সিন্ডিকেট“, মানে কলাম-মতামত লেখা শেয়ার করে অনেকগুলো পত্রিকায় ছাপানোর সুযোগ করে দেওয়া। এখন প্রথম আলোই দেখা যায় অনেক সময়  প্রজেক্ট সিন্ডিকেট এর লেখা অনুবাদ করে ছাপে। আর তা থেকেও “ডেক্স রিপোর্ট” ঘটিত বিশৃঙ্খলা বা আত্মঘাতি হওয়া কম নয়!

    যেমন “ডেক্স রিপোর্ট” সেকশনের জন্য লেখা বাছাই এক বিরাট ধাপ। যে ইংরাজি কোন পত্রিকার কোন লেখাটা অনুবাদ করতে দেওয়া হবে! যেমন প্রজেক্ট সিন্ডিকেট বা যেকোন বিদেশি পত্রিকার কোন লেখা অনুবাদ করতে হবে এটা কে বাছাই করবে। কারণ সারাদিনে যত বিদেশি লেখা প্রকাশিত হয় বা হাতে লাগে তার সবগুলো তো ছাপা যাবে না। ফলে অনুবাদ করার মানে হবে না।  আবার সেসব লেখা নিজ পত্রিকার যে লাইনে আর্গুমেন্ট করে সেই তালের সাথে যায় এমন হতে হবে।  লেখা বাছাই ব্যাপারটা  তাই খুব এক্সপার্ট কাজ। এরপরেও ধরা যাক আপনি ভাবলেন এটা “নাম জমা দিবার” এক পদ্ধতিতে সেরে ফেলবেন। সেটা এভাবে যে ‘ডেস্ক ইনচার্জ’কে নাম জমার এক চিরকুট ধরায় দিবার ব্যবস্থা করলেন। যে এই চিরকুটের নামের লেখা হলে ছাপবেন, এই হল কন্ট্রোল সিস্টেম। কিন্তু না, এটাও কাজ করবে না!

    আগেই বলেছি পালাবদলের কাল এটা। তাই আমেরিকা গত প্রায় ২০বছর ধরে নিয়মিত অর্থ ঢেলেছে ইন্ডিয়ান একাদেমিক জগতের এক অংশের (থিঙ্কট্যাংক) উপর নিয়ন্ত্রণ নিতে। যাতে সে চীন ঠেকানোর [China containment] কাজে ভারতকে ব্যবহার করতে পারে। যার কেন্দ্র আছে আমেরিকান কিছু থিঙ্কট্যাঙ্ক যারা নিজেদের সংগঠনের ভারতে এক্সটেনশন শুধু না, তাদেরকে দিয়ে ভারতের কিছু গ্রাজুয়েটদের ধরে পশ্চিমে মাস্টার্স বা পিএইচডি করতেও পাঠানোর মাধ্যমে তাদেরকে আমেরিকান পলিসির প্রবক্তা বানানো। তেমনই এক ছোট দোকান চালিয়ে থাকেন ব্রহ্ম চেলানি। দোকান ছোট আবার ফান্ড যোগাড়ের কম্পিটিশন য়াছে এলাইনে। ফলে চটকদারি হিন্দুত্বের লাইনে কড়া প্রো-আমেরিকান অবস্থানে চীনবিরোধী এক ভারতের সরকারি অবস্থান খাড়া করা নিয়ে তিনি অনেক কষ্টে নিজের দোকান টিকিয়ে রাখেন  ব্রহ্ম চেলানি। তবু যেভাবেই হোক “প্রজেক্ট সিন্ডিকেট”  হয়ে প্রথম আলোর “ডেস্ক” পর্যন্ত তিনি পৌছে গেছেন। নেটওয়ার্ক তাকে হেল্প করেছে। কিন্তু প্রথম আলোর ম্যানেজমেন্ট সমস্যা তাতে একেবারেই যায় নাই। বরং সবই কপাল খারাপ।

    মোদী মহাশয় হিন্দুত্বের রাজনীতি দিয়ে ছেয়ে ভারত তোলপাড় করে ফেলতেছিলেন গত সাতবছর ধরে, তা ভারতের প্রথম সারির কোন ইংরাজি দৈনিকের ফরেন এফেয়ার্স এডিটরের অজানা থাকার কিছু নাই। তিনি আবার হিন্দু হয়ে প্রেমের টানে মুসলমান বিয়ে করেছেন। অথচ যার বাবা আবার বিজেপির জাঁদরেল এক নেতা-এমপি। তাই যেন  তিনি আবার সকাল-বিকাল মুসলমান-বাংলাদেশকে দখল করে নিবার হুমকি দিয়ে থাকেন এমন অবস্থা। এহেন সম্পাদকের তাই বাপ থেকে দূরে গিয়ে কথিত সেকুলারজমই ভরসা করবেন এমনই হবার কথা হয়েছেও। কিন্তু কাহিনী হল সেই ফরেন এফেয়ার্স এডিটর – সেই সম্পাদকই আমরা দেখছি তিনি আবার প্রচন্ড মোদী সরকারের ও তাঁর ফরেন পলিসির ভক্ত। কেন? ব্যাপারটা এমন জটিল কেন?

    খুব সোজা। মোদী হিন্দুত্ব করুক বা যা খুশী সেটা সম্পাদকের চোখে সমস্যা না। কারণ মোদীর রাজনীতি যত নোংরা হিন্দুত্বই হোক মোদী নিজের এক ইমেজ খাড়া করতে পেরেছেন এই সম্পাদকের কাছে যে তিনি ভারতকে নাকি  এই এক সুপারপাওয়ার প্রায় বানাইয়েই ফেলেছেন। আবার মোদীর কিছুটা শুবিধা হল সম্পাদকেরা পরাশক্তি কী অথবা তা ভাল চিনেন তাও না। কাজেই সম্পাদকেরা যদি তার হিন্দুত্বের উপেক্ষা করে দেশপ্রেমে গদ্গদ হয়ে মোদীকে সাহায্য না করেন তাহলে মোদী সফল হবেন কী করে?  মোদীর এই ভাষ্য ওমন সম্পাদকেরা খুবই পছন্দ করেছেন! অতএব  বাপেরবিরোধী এমন সম্পাদক যে আবার মোদীভক্ত!  – এই কম্বিনেশন ঘটতে পেরেছে।

    কিন্তু তারও কপাল খারাপ!  কারণ, কুম্ভমেলা করে মোদী এখন করোনার সেকেন্ড ওয়েভে সবাইকে নিয়ে মাখায় ফেলেছেন, এখন ধরাশায়ী। তাঁর পরাশক্তি ভারতের গল্প এখন থার্ল্ড ওয়ার্ল্ডের ভারতে নেমে গেছে। ফলে সম্পাদকেরাও স্বপ্নভেঙ্গে হতাশ!

    এদিকে কান্ড ঘটেছে একটা।  আমেরিকান চেম্বার অফ কমার্স বিপদ গুনেছে। ব্লিঙ্কেনের উপ্সথিতিতে তাদের অনুমান-সিদ্ধান্ত যে ভারতের ইকোনমিতে একেবারে ধবস আসন্ন। কাজেই আগামি জুলাইয়ে ফার্স্ট কোয়ার্টারে সেটা সবাই জেনে যাবে। এর ফলে গ্লোবাল ইকোনমিতে বা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে খবর হয়ে যাবে। আর যা থেকে আমেরিকান ইকোনমিতে। কাজেই  ইীনিয়ে আগাম কী ব্যবস্থা নেয়া যায় তা আলোচনার মিটিং ছিল সেটা। না এটা সেই “কান্ড” নয়।

    কান্ডটা হল, সিএনএনের এক নারী সাংবাদিক মোদী-যোগীর উত্তরপ্রদেশের এক হাসপাতালের অব্যবস্থতায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব আর অভাব, মানুষের শেষ প্রাণবায়ু কিভাবে বের হয়ে যাচ্ছে এরই এক প্রামাণ্য সচিত্র প্রতিবেদন হয়ে দাড়িয়েছে যা তিনি নিয়েছেন  সেটা। দেখা যাচ্ছে যেটা ইউটিউব-ফেসবুক ছেয়ে ফেলেছে। কারণ এটা আমেরিকান চেম্বারের অবস্থানকে  আরও শক্ত বা কোরাবোরেট করেছে ও সচিত্রভাবে। শুধু তাই নয় এর ইমিডিয়েট এফেক্ট হবে আরো আগাম আমেরিকান সব ব্যবসা-পুঁজি দ্রুত ভারত থেকে প্রত্যাহার। কারণ মূল ভয় এখানে, যেকোন দিন মোদী সরকারের পতন ঘোষিত হতে পারে। তাই এর আগেই সব প্রত্যাহার, পালাও পালাও রব!

    কিন্তু সেই ব্রহ্ম চেলানি এবার আবার মাঠে নেমেছেন ঠিকই কিন্তু কলম ধরেছেন উলটা করে। তিনি এখন পশ্চিমা সমাজের সমালোচক এই বলে  যে তারা ভিকটিম ভারতের প্রতি সংবেদনশীল না। মানে কেন সিএনএনের ঐ  নারী সাংবাদিক ভিডিওও ক্লিপ প্রচার করল! অর্থাৎ তিনি এখন ভারতে আমেরিকান ব্যাবসা বা স্বার্থের এজেন্ট না। তিনি এখন হিন্দুত্বের দেশপ্রেমিক হয়ে মোদী সরকারের পক্ষে, বিদেশের বিরুদ্ধে স্বদেশী।

    কিন্তু এতে প্রথম আলোর কী জটিলতায় পড়েছে? প্রথমত আমরা স্পষ্ট না সেবুঝেছেই যে সে জটিলতায় পড়েছে। কারণ  চেলানি তার ঐ লেখা ছাপিয়েছে আমেরিকান স্বার্থের বিরুদ্ধে আমেরিকাকে ফেলে মোদীর পক্ষে দাঁড়িয়ে গিয়ে। কিন্তু সে যে আমেরিকান গ্লোবাল লাইনের যে ব্রহ্ম চেলানি ছিল তা সে নয়। অথচ প্রথম আলোতে ব্রহ্ম চেলানির লেখা অনুবাদ করে ছাপে তিনি তো আমেরিকান গ্লোবাল লাইনের ব্রহ্ম চেলানি।

    তাহলে ডেস্ক রিপোর্টিং চালানোর সমস্যা কোথায় এর কিছুটা আমরা এখানে দেখলাম।  কিন্তু কথা আরো আছে। ভারতের ভিতরেই আবার অন্য মিডিয়াগুলো সবাই কী সিএনএনের অথবা ঐ  নারী সাংবাদিকেরা বিরুদ্ধে হিন্দুত্বের দেশপ্রেমে মজে থেকে রিপোর্ট করে যাচ্ছে?

    একেবারেই না। ভারতের আরেক টপ মিডিয়া “দ্যাপ্রিন্ট”। তার এক রিপোর্টের শিরোনাম হল – “না ওয়েস্টার্ণ মিডিয়া ভারতের কোভিড নিয়ে পক্ষপাতের রিপোর্ট করে নাই। কেন, এখানে দেখুন” [No, the Western media isn’t biased in reporting Indian Covid. Here’s why]  ০৯মে ২০২১ দ্যাপ্রিন্ট। অন্তত শিরোনাম থেকেই প্রথম আলোর বুঝা উচিত সে কী ভুল করেছে। কিভাবে তার মুখে মাটি গেছে!

    এছাড়া আরো পথ ছিল যদি ধরে নেই, লেখা বাছাইটা প্রথম আলো গুরুত্বপুর্ণ মনে করে। তবে সেই বিচারে তারা একা চেলানির বায়াসড লেখা না। উপরে দ্যাপ্রিন্টের লেখাটার অনুবাদ করেও ছাপতে পারত!

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • ভারত নাকি সুপারপাওয়ার, এখন তৃতীয় বিশ্বে

    ভারত নাকি সুপারপাওয়ার, এখন তৃতীয় বিশ্বে

    গৌতম দাস

    ১০ মে ২০২১, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3wM

     

     

    India not really a Superpower

    গত ২ মে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি কলকাতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস দলের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। বিজেপির ৭৭ আসনের বিপরীতে তৃণমূল ২১৩ আসন পেয়ে বিধানসভায় জিতেছে। কিন্তু আরএসএস-বিজেপি ব্যাপারটাকে যেন ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট ও সরকারের নির্বাচনের মত পর্যায়ের  বিশাল গুরুত্বের বানিয়ে ছেড়েছিল। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতায় থাকায় বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারি প্রশাসনকে দুমড়ে মুচড়ে কিভাবে সেই ক্ষমতাকে এক রাজ্যের নির্বাচনে চরম অপব্যবহার করতে গিয়ে হারতে পারে এরই নজির হয়ে থাকবে এই নির্বাচন!

    মোদীর কাছে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন কেন গুরুত্বেরঃ
    আরএসএস-বিজেপি এই রাজ্য নির্বাচনকে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা এবং এতে সম্ভবত সর্বোচ্চ অর্থকড়ি ও সময় ঢালার পেছনের কারণ কী?  যেমন একমাসেরও বেশি সময় ধরে  আটপর্ব এইনির্বাচনের শ্লট বানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আর কোথাও আট পর্বে তা হয় নাই। আবার আটপর্ব যে অপ্রয়োজনীয় ছিল এর প্রমাণ কমিশন অজান্তে নিজেই তুলে ধরেছে। পাঁচপর্ব নির্বাচনের পর কোভিড ভাইরাসের প্রভাব বেড়ে যাওয়াতে কমিশন সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছিল। সেখানে বাকি সবভোট একদিনে নিয়ে সব শেষ করার জন্য মমতা প্রস্তাব দিলে  কমিশন টেকনিক্যাল আপত্তির কথা তুলে তা নাকচ করেছিল।  তা হল, একদিনে ভোট নিতে গেলে মোট যে পরিমাণ ফোর্স লাগবে তা এখন সংগ্রহ করার সময় নাই। তাদের এই কথায় প্রমাণিত যে এত মাস জুড়ে নির্বাচন আয়োজনের দরকার ছিল না। কেবল সময় থাকতে ফোর্স সংগ্রহ করলেই হত। তাহলে  নির্বাচনের মাঝের দিনের গ্যাপ এত বেশি রাখা হয়েছিল ইচ্ছা করেই। আর এই “খেয়ালি” ইচ্ছাটা কার খেয়ালে?  এটাই এখন স্পষ্ট এক রাজ্যের নির্বাচনে  মোদী  নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করে রেকর্ড গড়েছেন। যাতে তিনি একমাসের মধ্যে মোট ১৮ দিন কলকাতায় সভা করতে পারেন এবং তা করেছেন। এটাই ক্ষমতার অপব্যবহার আর পশ্চিমবঙ্গের  এবারের  নির্বাচনকে আরএসএস-বিজেপি  কী মাত্রার গুরুত্ব দিয়েছে তার প্রমাণ। তাহলে কথা সোজা, দেখা গেল এবার ‘কলকাতা দখলকে’ আরএসএস-বিজেপি মাত্রারিক্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু সেটাই বা কেন?

    সবাই রাম-পুজারী হিন্দু না, বিজেপির দরকার একই হিন্দুঃ
    ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক দিক থেকে বললে ভারত মানে বৃহত্তর উত্তরপ্রদেশের হিন্দু ভারত- এমন ভাবনার আধিপত্য চলে আসছে।  ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার উপর ভারতের জন্ম থেকেই এই আধিপত্য সবসময় ক্রিয়াশীল থেকে আসছে।  আর তাই এর সাথে দক্ষিণ ভারতের বিরোধের কথা আমরা অনেকে কম-বেশি শুনেছি। দক্ষিণ ভারত হিন্দি জানলে বুঝলেও হিন্দি ব্যবহার করে না চল নাই – একথাও আমরা শুনেছি।
    হায়দরাবাদের (বা অন্ধ্রের) পরে তেলেঙ্গানা থেকে কর্নাটক, তামিলনাড়ু হয়ে কেরালা পর্যন্ত এই দক্ষিণী অঞ্চল একে ভারতের ভাষায় দাক্ষিণাত্য (ডেকান বা Deccan) বলা হয়।  দক্ষিণদিক কথার সংস্কৃত উচ্চারণ ‘দাক্ষিণাত্য’ আর এই খটমটে শব্দ বৃটিশেরা ইংরেজিতে সহজে উচ্চারণ করতে গিয়ে ‘ডেকান’ বানিয়ে ফেলেছে। ভাষার দিক থেকে এই অঞ্চলের চারটা ভাষাকে একসাথে একে দ্রাবিড়ীয় ভাষার অঞ্চল বলে। এটাই হিন্দিবিরোধী ও আর্যবিরোধী দ্রাবিড় সমাজ অঞ্চল। আসলে দাক্ষিণাত্য বলতে বুঝায়, ভারতের দক্ষিণের পুর্ব ও পশ্চিম উপকুল এবং এক বিস্তৃর্ণ উচু মালভুমি ও পর্বতমালা (plateau and mountain ranges) যার সর্বোচ্চটা আনাইমুদি (২৬৯৫ মিটার), এভাবে এই পুরা অঞ্চলকে।  আর এই বিস্তৃর্ণ মালভুমি ও পর্বতমালা এলাকা টপকাতে পারে নাই বলেই উত্তরের আর্য আক্রমণ ও সম্ভাব্যদখল থেকে দক্ষিণ বেঁচে যায়। প্রাচীনকালের সেই লড়াই প্রতিরোধ এবং এর ফলাফল এখনও সক্রিয় ও কার্যকর ফলে ঐতিহাসিক গুরুত্বের। ফলে দক্ষিণ-ভারতের হিন্দি না-বলা এটা শ্রেফ শখ বা কারও খেয়াল মোটেও নয়।
    এছাড়া আরও আছে।  যেমন, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনের পর থেকেই এই দ্রাবিড় সমাজ “ব্রাহ্মণ তাদের সমাজে অপ্রয়োজনীয়” বলে এক সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন করেছিল। ব্রাহ্মণ ছাড়াও বিয়ে করা যাবে বলে আইনও তৈরি করেছিল, যা এখনো চালু আছে। এরই উত্তরসুরি আঞ্চলিক ডিএমকে ও আন্না-ডিএমকে দল। ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার আন্দোলনও করেছিল এই রাজ্যগুলো যার কেন্দ্র ছিল তামিলনারু। [আগ্রহিরা  E V Ramaswami (EVR or “Periyar”) এই ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্ট যেকোন ইতিহাস পড়তে পারেন।] এছাড়াও ১৯৬২ সালে হিন্দিভাষা চাপানোবিরোধী আন্দোলনে জীবন দিয়ে রুখে দেয়ার কারণে আজও ভারতের সুপ্রীম কোর্টের ব্যাখ্যায় ভারতের কনষ্টিটিউশনে উল্লেখিত কোনো “রাষ্ট্রভাষা” নেই – এমন করে রাখা হয়েছে। তবে সরকারি দাপ্তরিক ভাষা আছে আর তা হিন্দি (ঠিক হিন্দি নয় হিন্দুস্থানি) এবং ইংরাজি।  আর্য-হিন্দির আগ্রাসন দক্ষিণে এমন প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। আর একইভাবে  একই রকম আর্য-হিন্দির আগ্রাসন  প্রতিরোধ পেয়েছিল বিহার পেরিয়ে বাংলায় প্রবেশমুখে। তাই বাংলাভাষা টিকে যায়, যদিও প্রাচীন বাংলা অঞ্চলের সেই প্রতিরোধ ভারতের দক্ষিণের মত পর্যায়ের প্রবল ছিল না বলে এর প্রচারও কম হয়েছে। এসব প্রতিরোধের চিহ্ন হয়েই এবং সে কারণে এখনও ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয় বৈশিষ্ট বলতে মেজর তিনটা ধারা দেখতে পাওয়া যাবেই – উওর, দক্ষিণ ও পুর্ব  ধারা বা ঘরানার সঙ্গীত ও নৃত্যধারায়।  অবশ্যই এগুলো এথনোলজি  অর্থে [ethnological] ভারতীয় জাতিবৈশিষ্ঠের ভিতরের মৌলিক ভিন্নতা।  এই ভিন্নতা বলতে আলাদা আলাদা ভাষা, খাদ্যাভাস ইত্যাদিতে এথনিক-ধরণের ভিন্নতাগুলো তো  বটেই এছাড়া আরও ভালভাবে  এই ভিন্নতা  সাংস্কৃতিকভাবেও ধরা যায় যেমন নাচ-গানে, বাদ্যযন্ত্রে, ঘরানায় স্পষ্ট সাংস্কৃতিক ট্রেডিশনের ভিন্নতায়।  তাই এককথায় বললে, তামিলনারুর মত কলকাতাও আর্য-হিন্দিবিরোধী আরেক হাব। এজন্য পশ্চিমবাংলা আরএসএস-বিজেপির আরেক মাথা ব্যাথা।  মূল কারণ আগেও বলেছি বিজেপির রাজনৈতিক এজেন্ডা হল ভারতের রাজ্যগুলোতে এথনোলজি-সাংস্কৃতিক অর্থে তারা ভিন্ন ভিন্ন হিন্দু। বিজেপি সেগুলোর উপর এক রাম-পুজারী হিন্দুত্ব চাপিয়ে দিয়ে সবাইকে বেধে এক হিন্দুত্বের জাতিরাষ্ট্র কায়েম করতে চায়।  হিন্দুত্ববাদের আরএসএস-বিজেপি এবার কলকাতায় রাজ্য নির্বাচনে সেই ‘বাংলা’কে বিজয় মানে, জবরদস্তিতে উপর থেকে এক ইউনিফর্ম হিন্দুত্ব চাপানোর খেয়ালে কলকাতায় এসেছিল। এবং পরাজিত হয়ে গেল। বিজেপির যে হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্বের জাতিবাদ – এটা তারা সারা ভারতে কায়েম করতে চায়। অর্থাৎ এখনকার ভারতের ২৮ রাজ্যের মোট ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠী সনাতন ধর্মাবলম্বী বলা হলেও এরা সাংস্কৃতিক-এথিনিক অর্থে সবাই একই ধরনের হিন্দু নয়। কিন্তু বিজেপির ভাষায় বললে, তারা ভারতের সব রাজ্যের হিন্দুকে “রামের অনুসারী” হিন্দু বানাতে চায়, এমন এক পরিচয়ে বাঁধতে চায়। যাতে এর ফলে ভারত এক হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠত্বের জাতিরাষ্ট্র হয়।

    Supremacist বা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতাঃ
    সারা দুনিয়ায় আমিই সুপ্রীম বা শ্রেষ্ঠ এমন শ্রেষ্ঠত্ববাদি [Supremacist] – এই চিন্তার প্রাবল্য জেগে উঠা দেখেছিলাম আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে জর্মান, ইটালি ও জাপানের মধ্যে যার প্রধান ভোকাল নেতা ছিলেন হিটলার।  আমার জাতটা শ্রেষ্ঠ এই জাতগর্ব বা রেসিজম [Racism] – এই হল সমস্যা ও সংঘাতের শুরুর ভাষ্য বা মিথ্যা সাফাই।  কারণ এরপরেই বলা হবে যে আমিই শ্রেষ্ঠ অতএব তাই আমার কথা তোমাকে শুনে চলতে হবে, আমার অধীনতা মানতে হবে, আমি তোমাকে পুড়িয়ে মারব, গ্যাস চেম্বার করব, তোমাকে কলোনিদখল করব ইত্যাদি। অনেক সময় আবার এই জাত বলতে নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব যেটা হিন্দু বা মুসলমান বা অন্যকোনটা হতে পারে অথবা ‘গায়ের রং’ যেমন হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার – ইত্যাদি হয়ে পারে। এগুলো আমরা কমবেশি দেখেছি বা পরিচিত।
    কিন্তু সাবধান – কেউ হিন্দু মানেই সে রেসিস্ট বা শ্রেষ্ঠত্ববাদি (হিন্দুত্ববাদী) হবেই এমন নিশ্চিত ধরে নেয়াটা খুবই ভুল হবে। কারণ নাও হতে পারে। েকইভাবে, কেউ মুসলমান মানেই সে রেসিস্ট নাও হতে পারে। পাকিস্তানি পাঞ্জাবী মানেই সেও ব্যক্তি হিসাবে রেসিস্ট নাও হতে পারে। উলটা আমি বাঙালি জাতিবাদি এই ভাব ধরে যখন পাকিস্তানিদের “পাকি” বলে ডাকব – এটাই রেসিজম হবে। তাহলে মূল কথাটা হল কেউ কী করে নিজেকে  প্রেজেন্ট বা হাজির করছি, কী দাবি করছি;  বিশেষ করে দলবদ্ধ হয়ে বা রাজনৈতিক দিক থেকে  – এর উপরই নির্ভর করবে  কেউ  শ্রেষ্ঠত্ববাদি বা রেসিস্ট কিনা।  এই বিচারে  আরএসএস-বিজেপির হিন্দুজাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা রেসিজমের দল যারা এখন ভারতে ক্ষমতায়।  আর লক্ষ্য করেন, চেক করে দেখেন সেখানে শ্রেষ্ঠত্ব – আমিই শ্রেষ্ঠ, আমারটাই শ্রেষ্ঠ ইত্যাদি ধরণের ভাব বা ধারণা আছে কি না? যদি থাকে তবে অন্যকে নিন্দা করার আগে নিজেকে সংশোধন করে নেন। অনেক সময় আমরা না-বুঝে, না খেয়াল করে অসচেতনে অনেক কিছু করে বসি।

    আবার আরেক চিহ্ন হল,  রেসিজমের মধ্যে –  শ্রেষ্ঠত্ব, মহান বা বেস্ট এসব শব্দ বা ধারণা থাকবেই। ফলে এখান থেকে বের হতে হবে বা এড়িয়ে থাকতে হবে আমাদের।  বিশ্বযুদ্ধের পরে জাতিসংঘের জন্মের ভিতর দিয়ে এই প্রথম আইডিয়া বা  বয়ান হিসাবে শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা রেসিজমকে ক্রিমিনাল অপরাধ মনে করা হইয়েছে আর তা বলা বাহুল্যই  নিন্দনীয় করা হয়েছে। কিন্তু তবু ব্যবহারিক চর্চায় মনের কোণায় ছোট রূপে হলেও তা এখনও থেকে গেছে শুধু না, তা আরো  প্রকাশ্য হবার চেষ্টা অনেক প্রবল হয়েছে। যার পিছনের মূল কারণ মনে করা হয় যে সময়টা এখন  -“গ্লোবাল সিস্টেমে নেতৃত্বে পালাবদলের”।  সারা দুনিয়া এতদিন বেশিরভাগ সময়েই বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবেই জনবসতি বা সিভিলাইজেশনগুলো শাসিত ও পরিচালিত হয়ে এসেছে। কেবল শেষ প্রায় পাঁচশ বছর বলা যায় কলোনিদখল সুত্রে দুনিয়া পশ্চিমের সিভিলাইজেশনের অধীনে সংগঠিতভাবে অধীনস্ততা চলে গেছিল।  এরই ভিতর আবার য়ারও শেষের ইমিডিয়েট ৭৫ বছর তা দুনিয়ার আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বে কেটেছে। আর এটাতেই পালাবদল আসন্ন হয়ে উঠেছে। কিন্তু এতে  বদল অনিবার্য জেনেও পুরানা শাসনের সুখ যাদের ছাড়তে ও নতুনকে মেনে নিতে ইচ্ছা করছে না এদেরই একটা অংশ এক সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ আকড়ে উঠে দাড়াতে চাইছে। পুরানা গল্পের উস্কানি  – যে আমাদের কতকিছুতে শ্রেষ্ঠত্ব ছিল – এই কথিত অতীত মহান, গ্রেট, বেস্ট এসব শব্দ দিয়ে – এক শ্রেষ্ঠত্ববাদ খাড়া করার জন্য তারা প্রাণপণ চেষ্টা শুরু করেছে। যদিও তারা জানে কারণ আমেরিকান সরকারি গবেষণার সবগুলো ফাইন্ডিংসই (২০০৮ থেকে সর্বশেষ ২০২১ সালেরটা) তাদের জানিয়েছে এই পালাবদল অনিবার্য অবশ্যই কিছুই তারা ঠেকাতে পারবে না কারণ এই পরিবর্তন অবজেকটিভলি নির্ধারিত। সাবজেক্ট বা মানুষের নিয়ন্ত্রণে আর নয়।  কিন্তু তবু মরিয়া হয়ে সাময়িক বিশৃঙ্খলা তৈরিতে কেউ কেউ এগিয়ে আসা বন্ধ করে নাই।

    কেন বিজেপির হিন্দুত্ব বা এক হিন্দু-ভারতের কথিত এক জাতিরাষ্ট্র গড়তে ব্যর্থ হবে?
    এর মূল ব্যবহারিক সমস্যাটা হল,  ভারতের সব রাজ্যের বাসিন্দারা শ্রীরামকে তাদের প্রধান দেবতা মানে না বা তাকে ঘিরে প্রধান দেবতাপূজা বা প্রধান উৎসব উদযাপন করে না। যদিও আবার শ্রীরামকে তারা অমান্য করে ঠিক তাও নয়। অর্থাৎ প্রায় সব রাজ্যেই তাদের নিজস্ব ‘প্রধান দেবতা’ ও সে অনুযায়ী এক প্রধান বার্ষিক উৎসবও আছে। ফলে বাংলায় দুর্গা বনাম রামের একটা প্রধান ভিন্নতা আছে এবং এটা প্রধান বাস্তবতা। শুধু তাই নয়, মনে রাখতে হবে, এটা অন্য কারো দেবতাকে অমান্য করা এর মূল বিষয় নয়। কিন্তু নিজ ভাষা, নিজ শিল্পকলা, নিজ গাথাগল্প সাংস্কৃতিক এ ট্র্যাডিশনে অন্য কোনো রাজ্যের, ন্যূনতম অন্যের হস্তক্ষেপ বা আধিপত্য অথবা ডিকটেট, সামান্য চুল পর্যন্ত কোনো বদল আনা এরা একে অন্যের বেলায় বরদাশত করতেই পারবে না। কারণ এভাবেই তো ভারতে একেকটা রাজ্য স্ব স্ব ভিন্নতা নিয়ে হাজির ও ঐক্য হয়ে হাজির আছে। এভাবেই এরা একেকটা  ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’ অর্থে ভিন্ন ভিন্ন জাতি। যেমন, বাঙালি, উড়িয়া, গুজরাতি, মারাঠি রাজস্থানী  ইত্যাদি এরা ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’ জাতি। ঠিক যেমন কলকাতার বাঙালি ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’  জাতিবোধ নিয়ে তারা সবসময় নিজের মতো হয়ে থাকতে ও উঠতে চাইবে। অথচ সবাই মূলত হিন্দু হলেও এই কালচারাল গভীর ভিন্নতা এটাই বার বার বলছে   আরএসএস-বিজেপির রাজনীতি ভুল ও অকেজো অবাস্তব বলে তা ব্যর্থ হবেই। আর সবচেয়ে বড় কথা এটা অপ্রয়োজনীয়।
    কিন্তু  তবু আরএসএস-বিজেপি  হিন্দুত্বভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের ভারত গড়ার জিদে আটকে থাকা দল, তারা এমন ভারত গড়ে নিজ একক রাজনীতি ও নিয়ন্ত্রণে ভারতকে আনবেই এই জিদের প্রচেষ্টার দল। তাই আরএসএস-বিজেপি বলা যায়, এই রাজ্য নির্বাচনকে এই প্রথম নিয়েছিল দুর্গার ওপর রামের আধিপত্য কায়েম করা যায় কি না এর উদ্যোগ হিসেবে। সেক্ষেত্রে মমতার দলের বিজয়ের তাৎপর্য হল, বাংলা তার দুর্গা আঁকড়ে ধরে বিজেপির হিন্দুত্ব এবং তার রাজনৈতিক ‘রামকে’ পরাজিত করল। এই অর্থে পুরনো আর্য-বাংলা ঐতিহাসিক লড়াইটা আবার বাংলা জিতে রিনিউ করে নিলো।

    এ জন্যই এই নির্বাচন নিয়ে কলকাতার বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নির্বাচনে কেবল তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরাই তৃণমূলকে ভোট দেননি। অর্থাৎ তৃণমুলের  হিন্দু-মুসলমান সমর্থকেরা  মিলেই কেবল তৃণমূলকে ভোট দেননি। এর সাথে আরো আছে বাঙালি অর্থে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট; এমনকি বিজেপির সমর্থকদের একটা বড় অংশ যারা নিজ দল ছেড়ে মমতাকে মানে ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’ বাঙালির পক্ষে ভোট দিয়েছে। এই বিশ্লেষকদের দাবি এটা হয়েছে বলেই মমতার পক্ষে মোট প্রায় ৪৮.৫% ভোট পড়েছে দেখা যাচ্ছে। যেমন আনন্দবাজার লিখেছে, “দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন প্রাপ্তি এবং ভোট শতাংশের হিসেব কষে নির্বাচনী বিশ্লেষকদের একাংশের ব্যাখ্যা, বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-রও একটা অংশের সমর্থন গিয়েছে মমতার ঝুলিতে”।
    এবারের নির্বাচন তাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিজেপির হিন্দুত্বের আধিপত্যের কাছে নত না হওয়া বরং, হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র গড়ার প্রপাগান্ডায় কলকাতার বাঙালিদের সেই পাল্লায় না পড়া। তারা নিজ বাংলা এথনিসিটির অর্থে জাতি রক্ষার লড়াইয়ে রাজনৈতিক শ্রীরামকে পরাজিত করতে এগিয়ে এসেছিল। এই অর্থে বাংলার সাথে লেপ্টে লেগে থেকেছে, তাকে ছেড়ে যেতে রাজি হয়নি। অথচ ব্যাপারটা হলো, বিজেপির ভাষ্যের এক আর্য-হিন্দির রাজনৈতিক ‘রাম’-এর ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র; এ নিয়ে জোরাজুরি করাতেই মমতার জন্য অনেক কিছুই সহজ হয়ে যায় রাজনৈতিক ‘রাম’কে হারানো।

    কিন্তু একারণেই আবার অনেকেই আশঙ্কা করছেন এখন; অনেকে বলছেন এটাই বিজেপির হামলার শেষ নয়। আরএসএস-বিজেপির স্টাইল এভাবে হার স্বীকার করে নেয় না। প্রতিশোধ নিতে তারা ফিরে আসে। সাধারণত এরপর আসে মুসলমান হত্যা-নিপীড়নের হুজুগ নিয়ে। মুসলমান নির্যাতন, দাঙ্গা হত্যা নিপীড়ন করা খুবই সহজ – এই সুযোগ নিয়ে তারা কৌশল সাজিয়ে আসে। কারণ দেখা যায়, আরএসএস-বিজেপির একটা স্থির ধারণা হল যে, ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গায় এক চরম মার-হত্যা-নিপীড়ন দাঙ্গা ঘটানো- এই ‘ভয়ের রাজনীতি’ কায়েম করা তাদের হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের জিগির তোলার উস্কানি ও সাংগঠনিক শ্রীবৃদ্ধির প্রধান অস্ত্র ও উপায়। এটা তারা বিশ্বাস করে থাকে। তাই যখনই ভোটে পরাজয় হয় তখনই তারা এ কৌশলের কথা চিন্তা করে। কারণ নিজেদের পরাজয়ের হতাশাকে তারা প্রতিহিংসা দিয়ে পূরণ করে এগোনোকেই সঠিক কৌশল মনে করে।

    ঠিক যেমন সর্বশেষ দিল্লির রাজ্য নির্বাচনে সেটাই আমরা দেখেছিলাম। সে সময় নাগরিকত্ব ইস্যুতে দিল্লির নির্বাচনে মুসলমানরা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টিকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করলে এরপরে দিল্লিতে মুসলমান পাড়াগুলোতে পরিকল্পিতভাবে দাঙ্গা ও হত্যা, তথা ম্যাসাকার হয়েছিল। দিল্লির কোর্ট-হাইকোর্ট আজো সেসব মামলায় কোনো প্রতিকার করতে পারেনি। অথচ মূল নেতা ‘মিশ্র’ সব ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন। বাংলায় মমতার বিজয়ের পরে এ হামলা হবেই এমন বলার কোন মানে নাই; তবে এটা হবেই না – তা বলাও অবশ্যই ভুল। বরং সব দিকে সচেতন ও সোচ্চার থাকাই সঠিক কাজ।
    কিন্তু বাংলাদেশে একটি ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে ‘কেন্দ্রীয় শাসনের হস্তক্ষেপ’ চেয়ে চার-পাঁচজনের একটা গ্রুপকে মানববন্ধন নামে দাড়াতে দেখছি আমরা। অনেকটা ‘হিন্দুদের জন্য হিন্দুরা’- টাইপের যুক্তিতে এসব আজব দাবি; যেখানে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বাংলাদেশের কেউ কোনো পক্ষের নয়। তাই কলকাতার আরএসএস-বিজেপি ঢাকায় এসে ব্যানার নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে দাঁড়ানো – এগুলো অবশ্যই কোনো ভালো লক্ষণ নয়। ফলে অবিলম্বে সরকারের এ বিষয়ে সতর্কতা, পদক্ষেপ নেয়া ও নজর দেয়া উচিত। কারণ সবশেষে এরা সবাই সংখ্যালঘু অজুহাতে ভিকটিম সেজে নিজেদের সব আকাম কাজের দায় চাপাবে আমাদের সরকারের উপরেই!

    পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের অভিনন্দনঃ
    এদিকে আমাদের প্রথম আলোর দিল্লি সংবাদদাতা সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জয়ের পর দলনেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাঠানো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের অভিনন্দন বার্তা যথেষ্ট আগ্রহ সঞ্চার করেছে। কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, মোমেনের ওই চিঠি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও শাসক দলের অনুসৃত নীতির বিরুদ্ধেও এক প্রচ্ছন্ন বার্তা”। কিন্তু তিনি লিখেছেন এই প্রথম নাকি ভারতে “রাজ্যের নির্বাচনকে ‘ধর্মীয় আধারে’ করার চেষ্টা হয়েছিল। বিজেপি নেতারা ভোট প্রচারে নাকি সরাসরি ‘বিভাজনের নীতিকে’ প্রাধান্য দিয়েছেন”।
    সরি, আপনার দাবি গ্রহণ করতে পারলাম না। প্রথমত, ‘বিভাজনের নীতিকে’ প্রাধান্য দেয়া অথবা ‘ধর্মীয় আধারে’ ভারতের রাজ্য নির্বাচন বিজেপির এটিই প্রথম নয়। কলকাতা তো বটেই এমনকি রাজস্থানের নির্বাচনেও বাংলাদেশের মুসলমানদের ভারতে অনুপ্রবেশের ভুয়া অভিযোগ তুলে ‘তেলাপোকা’ বলা হয়েছে। আজ হঠাৎ করে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পাওয়ার মত অনুভব হতে পারে কারও; তবু এসব একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। বিজেপি কখনো কি লুকিয়েছে যে, সে প্রায়ই মুসলমানদের জন্য দাঙ্গা ও হত্যার আজাব হয়ে আসে না? তার দলের রাজনীতিই তো হল , হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ব বা হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠা এবং ভারতের রাজ্যগুলোর সবাই প্রধান জনগোষ্ঠী হিসেবে সনাতন হিন্দু বলে পরিচিত হলেও বিজেপিসহ যেকোনো শ্রেষ্ঠত্ববাদী দলের এই কমন ফিচার হয় যে, তারা এক একক পরিচয়ে সবাইকে বাঁধতে চাইবেই – এক জাতশ্রেষ্ঠত্ব কায়েম করার চেষ্টা করবেই। যা এক পন্ডশ্রম যদিও! বিজেপি তো এগুলো লুকায় না! কিন্তু যাদের এসব নজরদারি করার কথা সেই নির্বাচন কমিশন বা ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এখানে নজর দিতে রাজি নয়। অথচ ধর্মীয় আধারে বা বিভাজনের নীতিতে ভোট চাওয়া – এটা বিজেপির জন্য দল নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার মত কৃত অপরাধ, তবু  তা তারা করেই চলছে, অবলীলায়। এখন এসব রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের পরিচালকেরা খোদ নিজেদেরই যদি নিজেদের ভারতের নাগরিক নয়, হিন্দু হিসেবে আবিষ্কার ও গর্ব করে থাকেন ও চলেন তবে ভারতের কনস্টিটিউশনে কী লেখা থাকল তাতে কিছুই আসবে যাবে না। উল্লিখিত ব্যক্তিদের মত সাংবাদিকের চোখেও এগুলো কোনো বড় সমস্যা হিসেবে ধরা পড়বেও না।

    উনি আরো লিখেছেন, কলকাতার “ভোটে বিজেপির বিপর্যয় ও তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জয়ের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাঠানো অভিনন্দন বার্তায় সেই স্বস্তির ছোঁয়া স্পষ্টতই পরিলক্ষিত। সেটাই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্তরে আগ্রহ জাগিয়েছে”।
    তাঁর এ’কথাতে বলা যায়, সেটা কলকাতায় যা হয় হোক কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন এ ছাড়া আর কী বলতে পারতেন? তবে তার অবশ্যই ভারতের কাছ থেকে কোনো কিছু আশা করার মত বোকামি করার কিছু নেই! আবার এতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রটোকলের যে ব্যত্যয় নেই তা তো কূটিল কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেছেন আর নিজেই সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন যে, ‘মোমেনের অভিনন্দন বার্তা কূটনৈতিক প্রটোকলের দিক থেকে নিখুঁত”। কাজেই এনিয়ে আমাদের কী আর বলার আছে!

    মোদির বিজেপি ভারতে ক্ষমতাসীন আছে ও নির্বাচন করে যাচ্ছে সাত বছরের বেশি ধরে। তিনি যে ‘এক শ্রীরামের নামে’ [শুধু হিন্দু হলে হবে না] এমন এক পরিচয়ে ভারতের সব রাজ্যের হিন্দুকে নিয়ে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র কায়েম করতে চান সেই মেরুকরণের চেষ্টা তিনি সবসময় করে চলেছেন। কিন্তু সাত বছর ধরে, দেব মুখার্জির মত অনেকেই ব্যাপারটাকে প্রশ্রয়ের চোখেই দেখে এসেছেন।

    বরং এমন ভারতের সাংবাদিক, কূটনীতিক বা একাডেমিশিয়ানের বিরাট কুল – তাদের চোখে  মোদী এখন ‘বিরাট সফল নেতা’। কারণ এদের চোখে তিনি নাকি ভারতকে এক “পরাশক্তির প্রায় কাছাকাছি’ পর্যায়ে নিয়ে গেছেন বলে অনেকেই মনে করছেন। তাই সেই মোদী বাঙালির দুর্গার উপর ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদী’ চাপালেন কি না বা কোনো ‘ধর্মীয় বিভাজন’ টেনে ভোটের জোশ তৈরি করলেন কি না তাতে তাদের কী আসে যায়! বরং মোদী বলতে চেয়েছেন – ন্যায়-অন্যায় ইনসাফ বোধ এসব কোনো ভিত্তি নয়। বরং অন্যায়কারী হিন্দু হলেই সে আপনার ভাই, তার পাশে দাঁড়াতে হবে। এই হলো মোদীর আরএসএস-বিজেপির রাজনীতির ভিত্তি।
    এতে মোদীর এই রাজনীতিতে যদি কলকাতায় একটি দাঙ্গা ও হত্যাযজ্ঞের আয়োজন করে ফেলতে পারে , তাতে বাংলাদেশের হিন্দুদের কোন স্বার্থটা উদ্ধার পাবে? নিজেকে রক্ষা পারবে কেন? কার দয়ায়? না, এ নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই। চিন্তা করতেই রাজি না। এছাড়া কোনো কেন্দ্র থেকে কোনো মোদি কি তাদের বাঁচাতে আসবেন? আর আমাদের সরকার এ-কোন মোদীর ভারতকে করিডোরসহ অসংখ্য সুযোগ সুবিধা খুলে দিবে যে কলকাতায় একটা দাঙ্গা ও হত্যার আয়োজন করতে চায়?

    অতএব যেখানে বসে যে যা বলছেন তা চিন্তা করে দায়-দায়িত্ব নিয়েই মুখ খুলবেন – এটাই আমরা সকলকেই আগাম সতর্ক করতে পারি!

    বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো এবং বাংলাদেশ পর্যবেক্ষক শ্রীরাধা দত্ত। যতটুকু শুনেছি এটা  আরএসএস-বিজেপির দল ও চিন্তা প্রভাবিত একটি থিংকট্যাংক। সেখানকার শ্রীরাধা বলছেন, ‘ভারতের অঙ্গরাজ্য হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের এক আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিই প্রধান বিবেচ্য।”
    এসব মুখস্থ আপ্তবাক্য বা কথার কথা ভারতে অনেক লেখা হয়েছে। তাই এসব শুনলে আমাদের অস্বস্তি লাগে। পারলে বিজেপির ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদ’ অথবা ‘ধর্মীয় বিভাজন’ রাজনীতি- এর বিরুদ্ধে লিখে দেখান। পারলে পক্ষেও লিখতে পারেন। কিন্তু চুপ থাকবেন না। এ সময় লিপ সার্ভিস দিয়ে পরিবর্তন আসবে না যদিও বাংলাদেশে আমরা আপনাদের উপর আশা রাখি না। আপনাদের মোদীর ভারতরাষ্ট্র ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদ’ থেকে ‘ধর্মীয় বিভাজন’-এর রাজনীতি করে যাবে আর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সব আশা জিইয়ে রাখবেন এটা আর কত চলবে? বা চলতে পারে?  না, চলতে পারে না। এসব বুঝা কী খুব কঠিন!

    ‘পরাশক্তি’ ভারতঃ
    এখন ভারতের সাংবাদিক, কূটনীতিক বা একাডেমিশিয়ানের এক বিরাট দল সব প্রসঙ্গ ছেড়ে এমন প্রচন্ড মোদীভক্ত হয়ে উঠেছেন যে দেখার মত! কেন? তারা কিভাবে মোদীভক্ত হয়েছেন? তাতেই বাকি সবাই নিজে নিজেই বুঝে যাবেন।
    ভারতের এখন বিভিন্ন রাজ্যে করোনা মহামারীতে রোগীদের অক্সিজেনের অভাবে বহু লোকের প্রাণ যাচ্ছে। এছাড়া সরঞ্জাম বেড এমনকি মৃত সতকারে শ্বশানেও পর্যাপ্ত  জায়গা পাওয়ায়ো কঠিন হয়েছে। অর্থাৎ মোদী যে ‘সরকার চালাতে’ গিয়ে একেবারেই ব্যর্থ হয়ে গেছেন – এখানে এসে তা আর কারো থেকে তিনি লুকিয়ে রাখতে পারেননি। এ ব্যাপারটাকে ‘সরকার চালাতে’ না বলে ফরমাল ভাষায় বলা হয় ম্যানেজমেন্ট ফেইলিওর; যার চেয়ে দুনিয়ায় আর বড় ফেল বা পরাজয় নেই।

    ভারতে গত ১৬ বছরের এক ভ্যানিটি বা অহমিকা ভারতের আমলা-রাজনীতিবিদরা চালু করে রেখেছিলেন যে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও বিদেশী সাময়িক সাহায্যও নেয়া যাবে না। কিন্তু কেন কংগ্রেস-বিজেপিসহ সব আমলা-রাজনীতিবিদ সাহায্য না নেয়ার এমন জিদ করেছিলেন? মিলিয়ে দেখুন, ১৬ বছর মানে হলো ২০০৫ সাল থেকে। তার সোজা মানে হলো, বুশের আমলে ভারত যখন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার থেকে ‘চীন ঠেকানোর’ ঠিকা পেয়েছিল, সে সময়ের সিদ্ধান্ত এটা। বাংলাদেশকে অ্যামেরিকার ভারতের হাতে  তুলে দিবার সিদ্ধান্তও এর একটু পরে ঘটেছিল। কিন্তু ভারত সিদ্ধান্ত নেয়, এ সুযোগে নিজেকে এক ‘পরাশক্তি’ হিসেবে অসত্য হলেও তুলে ধরবে, দেখাবে। তাই তারা ১৬ বছর আগে মুরোদে না কুলালেও দুর্যোগেও বিদেশী সাময়িক সাহায্য নেয়া নিষিদ্ধ করেছিল।
    তা হলে এখন সে কথা কেন তুলছি?

    কারণ অক্সিজেন সঙ্কটের শুরুতেই মোদি আর (সাহায্য না নেয়ার) ‘ফুটানিকা ডিব্বা’টা বহন করতে রাজি হননি কিংবা বলা ভালো এটাই তা ত্যাগের মোক্ষম সময় যে এই সুযোগে তিনি ভ্যানিটি ছেড়ে পালিয়ে বাঁচার সুযোগ নিয়ে ফেলেন। সে কারণের যেন মোদী এবার মোট ২০টি দেশের কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণ করেন, যার মধ্যে চীন আছে। এমনকি ক্ষুদ্র ভুটানও।

    আর এতেই তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে সাংবাদিক-ইন্টেলেকচুয়ালরা। এ নিয়ে তাদের মনোভাব সবচেয়ে ভালো পাঠ করা যায় দ্যা প্রিন্টে ছাপা এক আর্টিকেলে। ওর শিরোনামটাই তাদের চিন্তা পাঠ করার জন্য যথেষ্ট। ওই আর্টিকেলের শিরোনাম হল, ‘ভারত কি তৃতীয় বিশ্ব হয়ে ফেরত গেল? মশকরাটা হল, আমাদের পরাশক্তির আকাঙ্খাটা এভাবে কোভিডের হাতে পড়ে ন্যাংটা হয়ে গেল”  [Is India back to being ‘Third World’? Irony of an aspiring superpower exposed by Covid crisis]।

    একই মনোভাব ‘দ্যাহিন্দু’র সুহাসিনী হায়দারের। তিনি প্রায় চ্যালেঞ্জের মত মোদিকে লিখেছেন তিনি কেন বিদেশী সাহায্য নিতে গেলেন? [Why has India accepted foreign aid after 17 years?]  এভাবে লিডিং সাংবাদিককুলের মধ্যে হতাশার ছায়া নেমে আসতে দেখছি আমরা।

    মূল কথাটা হলো, মোদীর ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদ’ থেকে ‘ধর্মীয় বিভাজন’- এসব দিকের জন্য তারা মোদীকে কাঁধে বসিয়ে তুলে ধরতে কোনোই শরম বোধ করেন না। কারণ এই হিন্দুত্বের মোদী তাদের মিথ্যা হলেও পরাশক্তির স্বাদ চাটিয়েছে বলে মনে করে তাঁরা। এখন মোদী সেই মিথ্যা গর্ব বা ভ্যানিটিটা কেড়ে ফেলে দেয়ায়ই তাদের এত হইচই।

    কাজেই হিন্দুত্ব কলকাতায় মার খেয়ে গেল কি না আর তাতে দিল্লির মত কলকাতার মুসলমান মারার উৎসব আসন্ন কি না!  না, এগুলো তাদের অ্যান্টেনার নজরে আসার যোগ্য হয়নি। এই জয় শ্রীরামের জয়জয়কার থেকে ভারতকে কে বাঁচাবে?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৮ মে  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “ভারত এখন তৃতীয় বিশ্ব ” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে,  পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • মমতার উত্থান ও মোদীর হিন্দুত্বের পরাজয়ের তাতপর্য

    মমতার উত্থান ও মোদীর হিন্দুত্বের পরাজয়ের তাতপর্য

    গৌতম দাস

    ০৪ মে ২০২১, ০০:০৩ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3we

     

    ভারতের পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল যার মধ্যে আবার দুই রাজ্য হল আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ, যারা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব আর পশ্চিম সীমানাজুড়ে। এর মানে হল গত পুরা মে মাসে আমাদের হিন্দুত্বের প্রবল প্রপাগান্ডার ভেতরে বসবাস করতে হয়েছিল। তবে এই নির্বাচন শেষে গণনা ও সব ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে, পাঁচ রাজ্যের একই সাথে ২ মে সকাল থেকে। যা এখন প্রায় সব রাজ্যে রাজ্যের পুর্ণফল প্রকাশিত।
    আর  গতকাল ২মে দুপুর তিনটা নাগাদ পরিস্কার হয়ে যায় যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ক্ষমতাসীন তৃণমুল কংগ্রেস দল মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে এককভাবে দুশ-এর বেশি আসন নিয়ে আবার ক্ষমতায় ফিরতেছে।  সর্বশেষ সোমবার রাত সাড়ে সাতটায়, তৃণমূল ২১৩ আর বিজেপি ৭৭ আসন এভাবে আনন্দবাজার ফলাফল দেখাচ্ছে। এদিকে মমতার নিজের নন্দীগ্রাম আসনে তিনি হেরেছেন বলা হচ্ছে। যা তিনি আপাতত মেনে নিয়েছেন তবে আপত্তিসহ এবং তিনি সুপ্রীমকোর্ট পর্যন্ত যাবেন সে হুশিয়ারি দিয়েছেন। এদিকে মমতা আজ সন্ধ্যায়  বলছেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আগামি বুধবার শপথ নেবেন। রাজ্যের প্রাদেশিক সংসদ মানে বিধানসভায় বিজয়ী সদস্য না হলেও ছয় মাস পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী থাকা যায় অস্থায়ীভিত্তিতে। আর যেখানে ঐ ছয়মাসের মধ্যে কোন আসন খালি হলে (মানে  দলের কাউকে পদত্যাগ করিয়ে খালি করে নিয়ে) সেই উপ-নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে এলেই স্থায়ী ও রেগুলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া যায়।
    ওদিকে ৩মে বিকাল পাঁচটায় খবর ছিল, মমতা সাংবাদিক বক্তৃতায় জানিয়েছেন মোট বিজয়ী আসন হতে যাচ্ছে সম্ভবত ২২১। মানে এমন আসন সংখ্যা বা এর কাছাকাছি দেখতে চাওয়া মমতার অনুমান।

    এই ফলাফলের তাতপর্যঃ
    আমাদের সাধারণ মন্তব্য এককথায় বললে সেটা হবেঃ  সারা ভারত না হোক, এটা হল – অন্তত পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদের পরাজয় এবং আরএসএস- বিজেপির হিন্দুত্বকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পাবলিক প্রত্যাখ্যান।  কিন্তু কেন এমন হল এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চারদিক থেকে শুরু হয়ে গেছে, যা হওয়াই স্বাভাবিক। কলকাতার আনন্দবাজার এমনই একটা ভারতীয় বিশ্লেষণ তুলে এনেছে দেখা যাচ্ছে  যা ঠিক তার নিজের নয় তবে সংগৃহীত। নিচে সেটাই এখানে হবহু তুলে  দিচ্ছিঃ
    তৃণমুল দলের “দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন প্রাপ্তি এবং ভোট শতাংশের [এখন পর্যন্ত যা প্রায় ৪৮%] হিসেব কষে নির্বাচনী বিশ্লেষকদের একাংশের ব্যাখ্যা, বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-রও একটা অংশের সমর্থন গিয়েছে মমতার ঝুলিতে। বিজেপি যখন রাজ্যে ধর্মীয় মেরুকরণের প্রচার চালাচ্ছে, মমতা তখন মধ্যবিত্ত, মহিলা এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের একত্রিত করে ফেলেছেন বলেই বিশ্লেষকদের একাংশের মত। তা না হলে এই জয় এবং ভোট শতাংশ তৃণমূলের ঝুলিতে আসা সম্ভব নয় বলেই তাঁদের ধারণা। কারণ, তৃণমূলের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভোট শতাংশপ্রাপ্তি এ বারই”।

    এখানে বিশ্লেষক বলতে যারা বুথফেরত ভোটারদের সাথে কথা বলে একটা জরিপকাজ সমাপ্ত করে থাকেন আর সেই ফলাফলের বিশ্লেষণ হাজির করেন – এনিয়ে তারা পেশাদার কাজ করেন। উপরে তাদের সারকথা হল, মমতার দল কেবল তার রেগুলার সমর্থক ভোটারদেরই ভোট পান নাই। সেটা ছাপিয়েও তিনি অবশ্যই যারা বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-রও একটা অংশের ভোটার এদের অনেকেরও ভোট পেয়েছেন।  কেন পেলেন আর কেন তারা এমন কথা বলছেন কিসের ভিত্তিতে? কারণ তাদের ভিত্তি হল, এমনটা হয়েছে বলেই মমতার দল  এত ভোট (এখনই এটা প্রায় ৪৮% যা গণনার শেষপর্যন্ত ৫০% এর কাছে যাবে বলে অনুমান ) ও আসন পেয়েছেন।

    অনেকে জানেন শুধু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনেই  মোট মুসলমান ভোটার প্রায় ২৭-২৮% হয়ে থাকে। আর এর মধ্যের আবার  বড় অংশটাই ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে তৃণমুল একাই পেয়ে আসছে। তাহলে  মমতার দলের বাক্সে এখনকার সম্ভাব্য  মোট ৫০% ভোটপ্রাপ্তি হতে যাচ্ছে একথার  মানে হল –  মমতা নিজ দল ও সমর্থকদের ভোট ছাড়াও প্রায় সব ধর্মের সমান সংখ্যক সমর্থক ভোটারদের ভোটও মমতার দল যোগাড় করতে এবার সক্ষম হয়েছে।  আর এতেই  মমতা ও তার দল হল পশ্চিমবঙ্গে ধর্ম নির্বিশেষে সেই প্রতীক যারা একটা কমন ধারা, তৃণমুল দলে ভিতর “যাদের ইচ্ছা” সমবেত হয়ে – এমন একটা “মেজরিটি ম্যান্ডেট” তৈরি করেছে। আর মমতা হলেন যে ম্যান্ডেটের বাহক নেতা। তাহলে কী কারণে মমতা নিজ দল ও সমর্থকদের বাইরের ভোটারদেরও টানতে পারলেন?

    অন্যদিকে আরও প্রশ্ন, তাহলে তৃণমুলের নিজে বিজয়ের মধ্য দিয়ে ঠিক কাদেরকে  প্রত্যাখান করলেন? আর কীইবা এই বিজয়ের তাতপর্য?

    ঠিক অখন্ড ভারত না,  আজকের রাজনৈতিক ইন্ডিয়া, এই রাষ্ট্র ২৮ রাজ্যের সমাহার।  কালচারাল দিক থেকে বললে ভারতের মেজরিটি বা ৮০ ভাগ নাগরিক সনাতন ধর্ম অনুসরণ করে থাকেন। কিন্তু তবুও কোন একক “দেবতার” (মানে সবাই একই দেবতার) অনুসারি-পুজারি তারা নয়। বরং রাজ্য-ভিত্তিতে দেখা যায় তাদের  একেক আঞ্চলের আলাদা ‘প্রধান দেবতার পুজার” প্রচলন আছে। এমনকি সেই দেবতার পুজা উতসবকে ঘিরেই আলাদা আলাদা বার্ষিক প্রধান ধর্মীয় উতসব ঐ রাজ্যে পালিত হয়।  অর্থাৎ কলকাতার মত সব রাজ্যে বা সবার প্রধান উতসব ‘দুর্গাপুজা” নয়। কিন্তু এটার সুবিধা-অসুবিধা কী? এটা নিয়ে কথা বলছি কেন?
    কারণ আর কারোই তেমন কোন অসুবিধা না হলেও,  আরএসএস- বিজেপির এতে বিরাট অসুবিধা। কেন? কারণ এরা  যারা রাজনৈতিক এক “হিন্দুত্ব নির্মাণ” করতে চায়, এজেন্ডা নিয়েছে  এবং “হিন্দুত্বের এক জাতিরাষ্ট্র” খাড়া করা ইমাজিন করে; এই নামে ভারতীয়দের সকলকে বাধতে চায় তাদের এমন ২৭ রকম রাজ্য বা  হিন্দুত্ব হলে চলে না।

    তাদের দরকার একটাই রকমের হিন্দুত্ব, প্রাকটিস। তাই আরএসএস- বিজেপির রাজনৈতিক স্ট্রাটেজি ও ব্যাখ্যা হল, ভারতের উত্তরের ওপারে (কথিত আছে ইউরোপ বা জার্মান এরিয়ান থেকে আসা ধারা) সেখান থেকে এসেছে সেই এরিয়ান রেস যা ভারতের আর্য প্রজাতি বলে দাবি করে তারা। আর এমন দাবি করলে সুবিধা হল তাতে সবাই একই উৎসের বলে এই অজুহাতে সকলকে এক সুতায় বাধা যায়, সহজেই। যদিও এই ভারতেই আবার মোট তেত্রিশ কোটি দেবতার বয়ানও বিদ্যমান। আর বড় কঠিন বাস্তবতা হল,  আলাদা আলাদা রাজ্যে প্রধান উতসবের ভিন্নতা – এসবই  আরএসএস- বিজেপি র রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পক্ষে মানে কোন একক হিন্দুত্ব তৈরির পক্ষে সায় দেয় না।  যেখানে এমনকি কালচারালি ভাষার ভিন্নতায় প্রত্যেক রাজ্য ভিন্ন। সেটা তো বটেই এছাড়া আবার যেমন কালচারাল  গান-নাচের বৈশিষ্ঠে তা  মৌলিকভাবেই আলাদা আলাদা ঘরানার। একেবারে বাদ্যযন্ত্রগুলোই আলাদা, রাগ আলাদা স্ব স্ব বৈশিষ্ঠের মহিমায় মহিমান্বিত। যা স্বভাবতই  কোন রাজ্য পরশি কারও তারা অস্বীকার বা অভারল্যাপ হওয়া বা আড়ালে পড়ে যাওয়ার ব্যাপারে খুবই সেনসেটিভ।  এককথায় তারা আঞ্চলিকতার বৈশিষ্ঠে ভরপুর এবং সেদিক থেকেই আলাদা। আর তাতে অন্তত কম করে হলেও মূল তিনটা ভাগে যা ভাগ করা যায়।

    কিন্তু  অন্যদের উপরে উত্তরভারত কেন্দ্রিক আর্য চিন্তাচর্চার জীবন ধারার প্রভাব  প্রাচীনকালে অখন্ড ভারতের আমল থেকে এই উত্তরের  অগ্রযাত্রা ছেয়ে বসলেও ভারতেরই   দুঅঞ্চলে বা জায়গায় প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। যে প্রতিরোধ সে আর পাড় হতে পারে নাই। এক হল দাক্ষিণার্তে [Decan] “দ্রাবিড়ীয়” [Dravidian] প্রতিরোধ আর এদিকে তাদেরই আরেক ধারার মারাঠা-বিহার পেরিয়ে আরো পুবে “বাংলার” প্রবেশমুখে প্রতিরোধ। এি প্রতিরোধ টিকে যাওয়া তাদের আগে থেকে চলে আসা  ভিন্নতার রূপবৈশিষ্ঠের ছাপটাই তাই প্রবল্ভাবে এখনও গান-নাচের ক্লাসিকাল চর্চাতেও স্পষ্ট। ভাষা তো আছেই। কিন্তু এসব ন্যাচারাল হিস্টোরিক্যাল অমিল-বেমিলগুলোকেই আরএসএস- বিজেপি  জবরদস্তিতে অস্বীকার করে এক দাবি করতে চায়, এক বলে দেখাতে চায়। আসলে চায় কথিত এক আর্য-চিন্তা (যা আসলে আরএসএস- বিজেপি এর) এরই আধিপত্য।

    দুনিয়ার সব (ভিতরে ভিতরে বা বাইরেও) জাতিবাদী বা জাতি-রাষ্ট্রবাদীরাই এই একই ভুল করে। এমন পথেই যায়। তারা সবাইকে এক ভাষায় কথা বলাতে চায়, নয়ত একই কালচারে বা একই ধর্মে বা একই দেবতায়। তাদের একেবারেই ভিত্তিহীন কিন্তু তবু দৃঢ় বিশ্বাস এভাবেই মানুষকে নাকি কেবল এক রাষ্ট্রে ধরে রাখা যায় – এক জাতি-রাষ্ট্রে। অথচ দেখা যায় এর বিপরীতে আমেরিকার বয়স আড়াইশ বছর আর সে জাতি-রাষ্টর  নয়।  বরং এটাই এক প্রথম ও সবল এক ফেডারল রাষ্ট্র। যা পঞ্চাশটা বড় বড় সাইজের রাষ্ট্রের ভিন্নতার সমাহার। কাজেই আগের সব জাতি-রাষ্ট্র পরিশেষে যেমন ফেল করেছে ভেঙ্গে গিয়েছে ; আরএসএস- বিজেপি র একই আর্য-হিন্দুত্বে (রামকে প্রতীক করে) এক হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা এটাও প্রত্যাখ্যাত হবে। প্রায় কাছাকাছি সমস্যা কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের। যখন ১৯৯২ সালে ভেঙ্গে ১৫ টুকরা হল তাতে বুঝা গেল কী জবরদস্তি না চলেছিল। যেমন একটা জবরদস্তি হল, সবাইকে রুশ ভাষা শিখানো।

    এমনিতেই বেশীরভাগ  দেশি-বিদেশি মানুষ আরএসএস- বিজেপির  এক হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা এমন প্রজেক্টের কথা জানে না, ধরতেই পারে না।  বিজেপি তাদের চোখে এক আম রাজনৈতিক দলই মনে হয় তাদের কাছে। কলকাতায় কংগ্রেস বা নানা ধরণের বাম যখন একে একে ভেসে গেছে আর একই সাথে আরএসএস- বিজেপির হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনায় প্রবল অর্থ ও রিসোর্স খরচ করে হিন্দুত্বের রাজনীতি সব ছেয়ে ফেলতে সে যখন মরিয়া – এমন সব রাজনীতিকেই এবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিনে রুখে দিয়েছেন একা মমতা।  কেন একা মমতা বলছি? কারণ মমতার বিশ্বস্ত কমরেডদেরকে যখন বিজেপি প্রলোভন দেখিয়ে কেড়ে নিয়ে গেছে ফলে তৃণমুল – সেই দল মানে আক্ষরিক অর্থেই একা মমতা হয়ে গেছে।  একটা তথ্য দেখেন অনেক অর্থ তাতপর্য বুঝা যাবে তাতে। এই নির্বাচনে এবার একা মোদী এক মাসেই ২২ বার এসে জনসভা করেছেন।  মানে প্রায় প্রতিদিন একটার কিছু কম। এথেকে বুঝা যায় কলকাতার এই নির্বাচন মোদী ওতার দলের কাছে কী! সেই নির্বাচনে মমতা এদের সবাইকে পরাজিত করে দিয়েছেন।
    কিন্তু প্রশ্ন হল, মমতা তাহলে তিনি হারালেন কাকে? তিনি হারিয়েছেন উতখাত ও প্রত্যাখান করেছেন – মূলত আরএসএস- বিজেপিকে সাথে তাদের যে হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা আছে সেটাকেও। যেটা গত সাত বছরে ক্রমশ ধেয়ে আসছিল, ছেয়ে বসছিল। কোথাও তেমন কোন শক্ত প্রতিরোধ কেউ তৈরি করতে পারে নাই।  এমনকি দ্রাবিড়িয় এলাকায় অন্তত কোয়ালিশনে হলেও বিজেপি থাকার চেষ্টা করে গেছিল। এজন্যই এটা শ্রেফ একটা তৃণমুল দলের না, একজন মমতার বিজয় নয়। এটা ভারত রাষ্ট্রকে হিন্দুত্বের নামে হিটলারের মত এক তান্ডবের হাত থেকে প্রাথমিকভাবে রক্ষা করা।

    যারা মমতার তিন তারিখে বিকেলের কালিঘাটে তার বাড়ির পাশের সাংবাদিক সম্মেলন দেখেছেন (ফেসবুকে ক্লিপে দেখেছি আমি) তারা খেয়াল করবেন মমতাও এবিষয়ে সেখানে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন এই বিজয় ভারতের জনগণকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কী থেকে? এক উদগ্র হিন্দুত্ব, এক হিন্দুত্বের রাষ্ট্র, সবাই একই এক  টাইট  ইউনিফর্ম-এ – এমনই কিন্তু নতুন করে আরেক নীলচোখের আরিয়ান উগ্র জাতিবাদ, আরেক জার্মান হিটলারের উত্থান হতে চাচ্ছে যেন ! – এসব কিছু থেকে ভারতকে বাঁচিয়ে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, মমতা তাই এই জনগণকে বারবার সালাম আর থ্যাঙ্কস দিচ্ছিলেন। বিপরীতে মমতা বলতে চাচ্ছিলেন সবাইকে একই রকম হিন্দু [আরএসএস- বিজেপির হিন্দু] হতে হবে কেন?

    অথচ ভিন্নতার ঐক্যের হিন্দু হলে অসুবিধা কী? সবাইকে ইউনিফর্ম হিন্দু হতে হবে কেন?  আর জবরদস্তি কেন? এছাড়া হিন্দু ছাড়াও তো অন্যধর্মের নাগরিক আছে, অনেক হিন্দু আরএসএস- বিজেপির হিন্দু নাও হতে চাইতে পারেন, এমনকি কোন রাজনৈতিক হিন্দু হতেই নাও চাইতে পারেন! তারা কোথায় যাবে? অথচ সকলকে নিয়েই এক রাজনৈতিক সাম্যে –  এমন বৈচিত্রগুলোর ঐক্যের এক ভারতীয় নাগরিক হলে হতে চাইলে পারবে না কেন?

    রাজনৈতিক সাম্য মানে নাগরিক হিসাবে সবাই সমান, সম অধিকারে সমান। ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ, গায়ের রং, সমতলি-পাহাড়ি সব ধরণের পরিচয় নির্বিশেষে সমান অধিক্কারের নাগরিক – এই ভিত্তিতে ঢেলে সাজাতে হবে রাষ্ট্রকে। এটাই জাতি-রাষ্ট্রের বিপরীতে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র। সব ভিন্নতাগুলোর ঐক্য গড়ার প্রাথমিক ভিত্তি।

    এদিকে কোভিড সমস্যা মোকাবিলা করতে গয়ে মোদী প্রশাসনের ম্যানেজমেন্ট ব্যর্থতা, এই পটভুমিতে ভারতকে নতুন দিশা আর ঐক্যের পথ দেখানোর সুযোগ ……

    এসব দিকগুলাই হল, তৃণমুলের টানা তৃতীয় বা এবারের বিজয়ের গভীর তাতপর্য।

    গৌতম দাস
    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    ০৪ মে ২০২১