Tag: GOUTAM DAS

  • বাইডেনের বগলে ভারত, “জঙ্গিনেতা” হতে চান!

    বাইডেনের বগলে ভারত, “জঙ্গিনেতা” হতে চান!

    গৌতম দাস

    ১৭ আগস্ট ২০২১, ০০:০৬
    https://wp.me/p1sCvy-3GN

     

    Xinjiang – China’s Uighur Problem

     

    এতদিন কথিত যে জঙ্গীপনা আমেরিকার চক্ষুশুল ছিল এখন প্রেসিডেন্ট  বাইডেন, বগলে ভারতকে নিয়ে কী নিজেই সেই “জঙ্গীনেতা” হতে চলেছেন? এই প্রশ্নটা ক্রমে ধেয়ে আসছে। বিভিন্ন দেশে চীনা যেকোনো বিনিয়োগ প্রকল্প বা ইকোনমিক তৎপরতার প্রতি আমেরিকা-ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বিতার চোখ দিয়ে তাকানো – এই দেখা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু  কোন ঈর্ষা বা অন্তর্ঘাতমূলক চোখ?  না, এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। শুধু তাই নয় এটা আত্মঘাতীও। মানে বোকা বোকা চোখমুখের কিছু স্টুপিড চিন্তা ছাড়া আর কীইবা বলা যায়! তবে প্রতিহিংসাপরায়ন মানসিক অসুস্থ মানুষ তো আত্মঘাতিই! অপরের যাত্রাভঙ্গ করে যেখানে যারা সুখ, অন্যকে কষ্ট দেওয়ার ভিতরের মিথ্যা-সুখ পেতে চায় আর হয়রান হয়!
    বিভিন্ন দেশে চীনা যেকোনো বিনিয়োগ প্রকল্প থাকলেই এর উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে অন্তর্ঘাতমূলক [sabotage] হামলা করা বা এমন হামলাকে সমর্থন করা [Chinese Projects in Pakistan Prove Tempting Targets for Terrorist Groups………]  – এসবই আমেরিকা ও ভারতের চীন মোকাবিলার কৌশল ও ততপরতা হয়ে উঠছে।  অথচ এটা যেকোন বিচারেই অগ্রহণযোগ্য। এমনকি তা এদুই দেশের স্টান্ডার্ডেও অগ্রহণযোগ্য।  বলাই বাহুল্য এসব আসলে দেউলিয়াত্বের লক্ষণ, নিজ দেশ-রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সক্ষমতা যখন নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছে বলে শাসকেরা অনুভব করে তখন এমন বেদিশ হবার লক্ষণ এগুলো!  সম্ভবত এটাই এর সবচেয়ে সঠিক ব্যাখ্যা!

    বুদ্ধিমানরা পড়শির উন্নতি দেখে ঈর্ষার পথে যাওয়ার আত্মঘাতী ভুলের দিকটা আগেই দেখে ফেলতে পারেন। তাই তারা এপথ পছন্দ করবেন না। এর চেয়ে পড়শির ঐ ‘উন্নতির’ সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ খুঁজে পেলে তা থেকে নিজের জন্য কোনো রাস্তা বের করতে পারেন কি না সেই চোখে তারা ঘটনাকে দেখে থাকেন। নয়তো পড়শির তৎপরতা দেখে সেখান থেকে আগ্রহ পেয়ে নিজেই পাশে তেমনই কিছু খাড়া করেন। এসবই হল গুরুত্বপুর্ণ পজিটিভ চোখ খুলে ঘটনার দিকে তাকানো ও বুঝার পথ।
    তবে আরেক বিকল্পও আছে, স্বভাবতই তা নেতি ও ঈর্ষার পথ। পড়শির উন্নতির বিরুদ্ধে সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে প্রপাগান্ডা শুরু করা আর তাতে এক রংচঙ্গা দুনিয়া বানানো আর সেটা দেখিয়ে প্রতারণা ইত্যাদি। কিন্তু এই প্রপাগান্ডা করে বেনিফিট মানে এর লক্ষ্য কী?

    সবচেয়ে বড় কথা, খোদ নিজের বেনিফিট কী? ঈর্ষায় ডুবে থাকা মনে এর খবর থাকে না। বরং বাস্তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, আমেরিকাই এমন প্রপাগান্ডা ভারতকে গিলিয়েছে। একপর্যায়ে দেখা যায়, ভারত তা মিথ্যা জেনেও বিশ্বাস করেছে। অথচ উদ্দেশ্য কী, বেনিফিট কী তবু সে খবর ভারত নেয়নি; যদিও এসব ক্ষেত্রে আমেরিকার নিজ উদ্দেশ্য নিজের কাছে স্পষ্টই থাকে যে, সে ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চায়, চীন-ভারতের গঠনমূলক বা পরস্পর নির্ভরশীল কোন সম্পর্ক যেন না খাড়ায় যায়। কারণ এমন হতে না দেয়াটাই আমেরিকার স্পষ্ট স্বার্থ। বিশেষত এশিয়ায় দু’টি বড় অর্থনীতি চীন-ভারত যেন আমেরিকার স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিজেরাই পারস্পরিক সহযোগিতার কোন আসর না বসিয়ে ফেলে।

    ভারত-আমেরিকা এমন সম্পর্ক বানানো নিয়েও হয়ত বাইরে থেকে খুব কিছু বলার নেই। কারণ সিদ্ধান্ত মানেই তো তা যার যার নিজের। এছাড়াও আর কারণ, গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের এই কালে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠেছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতার দুনিয়া। যে যেখানে স্বার্থ ঠিক বা ভুলভাবে বুঝবে সে দায় শেষবিচারে তারই। আর এটা তার নিজেই চয়েজ – তাতো বটেই।  তবু ঈর্ষার আরেক চরম অবস্থার পথ ও পর্যায় আছেঃ স্যাবোটাজ বা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা। প্রতিদ্বন্দ্বীর স্থাপনা, সম্পত্তি অথবা ব্যক্তির ওপর হামলা আর ধ্বংসাত্মক কাজে নেমে যাবার ভূমিকা নেয়া।  বাইডেন বগলে ভারতকে নিয়ে সে পথের চয়েজে যাবার ইঙ্গিত দিচ্ছেন!

    প্রথম কথা ও এককথায় বললে, এই পথ আত্মঘাতী। ঈর্ষায় অন্ধ হয়ে হতাশায় এসব কাজে জড়িয়ে  নিজেকে খুবই বুদ্ধিমান ও সফল মনে হতে পারে। কিন্তু এটা ভুল। বাস্তবত এটা হল, প্রতিদ্বন্দ্বীরা সবাই যদি সবার বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ-তৎপরতায় জড়িয়ে যায় এতে সবারই ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই। যেন শহরের সবাই সবার বিরুদ্ধে ছিনতাইকারী-লুটেরা হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতা করছে, এমনটা কল্পনা করা যায় বড় জোর বাস্তবে  তা হতে পারে না।
    যদি সাময়িক লাভের চোখে না-ই দেখি, তবে জীবন মানেই কিন্তু এক ইতিবাচক লক্ষ্যের জীবনই বুঝায়। তবে যে আসলে নিজ জীবন-তৎপরতার কোনো ভবিষ্যৎ দেখে না, হতাশ, সেই অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা, আত্মঘাতী দিকটা দেখতে পায় না। বাইডেন, বগলে ভারতকে নিয়ে কি এখন অন্তর্ঘাতমূলক কাজের ‘জঙ্গিনেতা’র মত হতে চলেছেন?

    The Karakoram Highway, also known as the China-Pakistan Friendship Highway, is part of China’s Belt and Road Initiative. Image: AFP Forum

    পাকিস্তানের সিপিইসিঃ
    ‘সিপিইসি’ প্রকল্পে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ আর কোন সীমায় থাকতে পারছে না। চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর বা সংক্ষেপে ‘সিপিইসি’[CPEC] , এটা হল পাকিস্তানে চীনের এক সর্ববৃহৎ বিনিয়োগ প্রকল্প যেখানে মোট ৬২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের পরিকল্পনা আছে। এর শুরু হয়েছে পাকিস্তানের বেলুচিস্তান জলসীমায় গোয়াদরে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে নেয়া থেকে। এরপরে বন্দরের সাথে যুক্ত ডাঙ্গা ভূখণ্ডে পাকিস্তানের চার প্রদেশকেই উত্তর-দক্ষিণ বরাবর বুকচিরে যাওয়া হাইওয়ে, এটি পাকিস্তানের উত্তরের সীমান্ত শেষ হয়ে পরে চীনের জিনজিয়াং (উইঘুর) প্রদেশের কাশগড়ে গিয়ে শেষ হয়েছে।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধে হেরে যাওয়া হিটলারের জার্মানি বা ইতালিসহ যুদ্ধবিধ্বস্ত সারা ইউরোপকে পুনর্গঠনে (রিকনস্ট্রাকশন ও ডেভেলপমেন্ট) আমেরিকা এক বিপুল অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প নিয়েছিল যা “মার্শাল প্ল্যান” নামে পরিচিত ছিল। অনেকে একালের সিপিইসি প্রকল্পকে পাকিস্তানে নেয়া চীনের ‘মার্শাল প্ল্যান’ বলেও তুলনা করে থাকে।

    তবে এ তো গেল ইতিবাচক চোখে দেখে বর্ণনা। আমেরিকা বা ভারতের স্বার্থ দেখা যারা নিজেদের কাজ মনে করবে বা এ জন্য নিয়োজিত তাদের এর চেয়ে ভিন্ন চোখে দেখাই স্বাভাবিক, অন্তত প্রতিদ্বন্দ্বীর চোখে দেখবে সেটা তো ঠিকই আছে। কিন্তু তাই বলে ‘সিপিইসি’ শব্দ বা ধারণাটা কোথাও দেখা পাওয়া মাত্রই ঈর্ষায় জ্বলে উঠতে হবে, এটা সুস্থ লক্ষণ নয়। অথচ এটা কি অপ্রয়োজনীয় নয়? কিন্তু এরপরেও এমন ভয়াবহ কিছুর দিকে পরিস্থিতিকে কেউ কেউ জেনে না জেনে টানছে।

    ‘সিপিইসি’ যদিও চীনা ঋণ-বিনিয়োগে নেয়া পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প এবং এতে ওনারশিপ, লাভালাভ ও দায়সংশ্লিষ্টতা অনুভবে রাখার জন্য সে দেশের চার প্রাদেশিক সংসদেও আলাদা আলাদা করে এই প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। তবু এই প্রকল্প পাকিস্তানের মতই প্রায় সমান ব্যবহারকারী এবং সুবিধাভোগী হল চীনও। অর্থাৎ চীন কেবল বিনিয়োগকারী নয়। সিপিইসি-এর হাইওয়ে চার প্রদেশের ওপর দিয়েই গিয়ে চীনে প্রবেশ করেছে। ফলে চীনেরসহ পাকিস্তানের সব প্রাদেশিক ভূখণ্ড থেকেই রওনা দিয়ে নিজ উতপাদিত অথবা আমদানিকৃত কাচামাল –  এমন সকল আমদানি-রফতানির পণ্য নিয়ে গভীর বন্দরে আসা যাওয়া করা সবচেয়ে সহজ। তাই সবাই এর বেনিফিসিয়ারি।

    কথাটা আরো ভালো বুঝা যাবে যদি চীনের ভূগোল মনে রাখি। চীন আসলে সাড়ে তিন দিক থেকে পাহাড়ে ঘেরা ল্যান্ডলকড এক ভূখণ্ড যার কেবল মাত্র পুব দিকেরও আবার একাংশ খোলা। এর মধ্যে পশ্চিম দিক আবার হিমালয় পর্বতমালার মতো পাহাড়ে ঘেরা যেখানে চাইলেও উচ্চতা আর দুর্গমতার কারণে যোগাযোগের রেল বা সড়ক নির্মাণ খুবই কঠিন।

    সেই আশির দশক থেকে  চীন আমেরিকান বিপুল বিনিয়োগ নিয়েই আজকের জায়গায় এসেছে, কোন সন্দেহ নাই। আমেরিকাকে বিপুল বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে চীনের অর্থনীতি আজকের জায়গায় আসতে রওনা দিয়েছিল বলা যায় সেই ১৯৭৮ সাল থেকে। পরের ৩০ বছরে ক্রমে লাগাতার ডাবল-ডিজিটের পথে উন্নতি করে সেই চীন আজকের যে চীন হয়েছে সে আসলে এখন আবার খোদ আমেরিকারই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, গ্লোবাল নেতার জায়গা নিতে চায়। তাই সেই সময়কালটাকে (১৯৭৮-২০১০) আমেরিকার দিক থেকে বলা যায়, এক দিকে বিপুল বিনিয়োগের বাজার পাওয়ার সুযোগ, সুখ ও লোভ অন্য দিকে চীনের উন্নতিতে চীন আমেরিকারই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে এই টেনশন – এমন এক মিশ্র অনুভব নিয়ে পার করতে হয়েছে।

    The Strait of Malacca

    তাই শেষের দিকে চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বীতা খোলাখুলি হয়ে ওঠেছিল। ওতএব  এই  “উন্নত- চীনের” দুর্বলতা খুঁজে সেটাকে চেপে ধরে রাখার উপায় বের করতে গিয়েছিল ওয়াশিংটন। পেয়েছিল এক ‘মালাক্কা প্রণালী’ [Strait of Malacca]। এটা হল সমুদ্রে জাহাজ চলাচল পথের এক রূট। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল আনা চীনের অনিবার্য প্রয়োজন। কিন্তু তা চীনা বন্দরে নিতে গেলে এই মালাক্কা প্রণালী পার হয়েই যেতে হবে। সেই সমুদ্রপথে মালাক্কা প্রণালী হল সিঙ্গাপুরে পৌঁছানোর আগে মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার ভূখণ্ডের মাঝখান দিয়ে গেছে এমন আধা কিলোমিটার চওড়া চিকন এক জলপথ বা প্রণালী। সমুদ্রপথে এই প্রণালীতে কয়েকটা জাহাজ আড়াআড়ি ফেলে রেখে চীনকে এই পথে চলাচলে বাধা তৈরি করা যায় ও সম্ভব, এই হল আমেরিকান পরিকল্পনা। এমন সামরিক পরিকল্পনা যে নিস্তরঙ্গ পানিতে আমেরিকাই সবার আগে এঁটেছে, সেটা আমেরিকার বিরুদ্ধে কোন কাল্পনিক অভিযোগ একেবারেই নয়।

    আমেরিকার সরকার-প্রশাসনিক ব্যবস্থায় একটা ভাল (বা কারো দিক থেকে খারাপ) রাজনীতি-চর্চা ও রেওয়াজ হল যে, আমেরিকান সরকার তার নীতি-পলিসির বহুকিছুই বা পুরোটাই গোপন রেখে দিতে পারে – দিয়ে থাকে ও দেয়। কিন্তু যে ইস্যুটা আমেরিকান সিনেট-সংসদে একবার যাচাই বা নিরীক্ষার জন্য উঠে আসা বা এসে যায় সেই ইস্যু সংশ্লিষ্ট সব তথ্য পাবলিকলি ওপেন করে দেয়া হয় বা হয়ে যায়। এমনকি তা (রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা না হলে) লাইভ টেলিকাস্টে সিনেটের ঐ ডেস্ক থেকে সরাসরি দুনিয়ার যেকোনো প্রান্তেও প্রচারিত হতে পারে, সম্ভব। ২০০৮ সালের এমনই এক সিনেট-শুনানিতে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, চীনকে বাধা দেয়ার জন্য আমেরিকাই প্রথম ‘মালাক্কা প্রণালী’ নিয়ে স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা করেছিল আর তাতে ভারতকে কাছে টেনে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে ব্যবহারের তথ্য আছে।


    এখন মালাক্কা প্রণালীর কথা এখানে আনলাম এজন্য যে, ঐ প্রণালীকেন্দ্রিক আমেরিকান যুদ্ধ কৌশলেরই পালটা চীনের জবাব এবং একটা পদক্ষেপ হল  চীনের পাকিস্তানের সাথে সিপিইসি প্রকল্প নেয়া। কারণ চীন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পারে না যে, তাকে আমেরিকা ঘিরে ধরছে, ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছে না। তাই চীন গোয়াদর বন্দর নির্মাণে আগ্রহী হয়েছিল। তবে চীনের ভুখন্ড থেকে সমুদ্রে প্রবেশের প্রধান ফটক পূর্ব দিকের বন্দরগুলো ফেলে ঠিক উল্টো দিকে চীনের পশ্চিমের সীমান্তকে সরাসরি গোয়াদর গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে যুক্ত করতেই সিপিইসি প্রকল্প নিয়েছিল। গত ২০১৩ সালে এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল আর যা ২০১৫ সালেই চীন ও পাকিস্তান দুই দেশের মধ্যে প্রকল্পের চুক্তি সই করা হয়। চীনের এই পশ্চিম সীমান্তই দুর্গম জিনজিয়াং (উইঘুর Xinjiang Uyghur Autonomous Region) প্রদেশ, যার কাশগড় পর্যন্ত সিপিইসি যোগাযোগ প্রকল্প  বিস্তৃত।


    সিপিইসি প্রকল্পে ‘
    জঙ্গি’ হামলাঃ
    খবরটা খুব সিম্পল। পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে [পুরান নাম North-West Frontier Province] একটা বাসে বিস্ফোরণ-হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯ জনই চীনের প্রকৌশলী, যারা একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করছিলেন। সিপিইসি প্রকল্পের বড় বড় অংশই হল নানা বিদ্যুৎ প্রকল্প। আর ‘প্রকল্প’ বলতে এটা আসলে চার প্রদেশে বিভিন্ন ইপিজেড ফ্যাসিলিটি যেমন- গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, বিভিন্ন শোধনাগার ইত্যাদির সুবিধা স্থাপনা গড়ে তোলা যাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়ে আসে আর ওই হাইওয়ে ও বন্দর ব্যবহার করে আমদানি-রফতানির তৎপরতা জমে ওঠে।

    কিন্তু সাবধান! এখানে বাসে হামলা বলতে কোন শহরে টাউন সার্ভিস বাসে হামলা নয়। এটা কয়েক কিলোমিটার জুড়ে এক প্রকল্প এলাকার ভেতরেই প্রকল্পের নিজেদের বাস ব্যবস্থা- বিদেশী প্রকৌশলী টেকনিক্যাল লোক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বা প্ল্যান্টের শ্রমিকদের কাজে আনা-নেয়ার বাস। এই বাসের মধ্যে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হত্যাগুলো ঘটানো হয়েছে বলে প্রাথমিক অনুমান আর তাতে বাস নদীর তীরে খাদে ফেলে দেয়া হয়েছে।

    Rescue workers and onlookers gather around a wreck after a bus plunged into a ravine following a bomb explosion, which killed 12 people including 9 Chinese workers, in Kohistan district of Khyber Pakhtunkhwa province on July 14, 2021. (Photo by STRINGER / AFP)

    এশিয়া টাইমসে পাকিস্তানের সাকিলের রিপোর্টঃ
    এফএম সাকিল [FM Shakil] হংকং থেকে প্রকাশিত ‘এশিয়া টাইমসে’ নিয়মিত লেখেন। আমেরিকান স্বার্থের পারস্পেকটিভ থেকেই তিনি সাধারণত লিখে থাকেন। যেমন – এবারেই লেখার শিরোনাম দিয়েছেন তিনি, “ইমরান সিপিইসি বিস্ফোরণ ইস্যুতে চীনের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন” । আসলে ব্যাপারটা হল, চীন স্বভাবতই এই চীনা নাগরিক হত্যায় খুবই কড়া মনোভাব নিয়েছে। চীনা তদন্তকারী স্টাফ গ্রহণে পাকিস্তান রাজি হয়েছে এবং চীন ঘটনায় ‘কেস সলভ করে’ জড়িতদের কড়া শাস্তি দিতে চীন-পাকিস্তান একসাথে কাজ করবে জানিয়েছে [China sends expert criminal investigators to Pakistan, urges severe punishment for perpetrators……]। এফএম সাকিল আরো লিখছেন, ‘পাকিস্তানের কর্মকর্তারা এ ঘটনাকে প্রথম থেকেই ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামী মুভমেন্টের (ইটিআইএম) নোংরা কাজ বলে বর্ণনা করছিলেন” [Pakistani officials have since indicated it was the dirty work of the East Turkestan Islamic Movement (ETIM), ……]।’ তা এখন বিরাট ঘটনা হিসেবে হাজির হয়ে গেছে।
    অবস্থা সামলাতে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও কড়া কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। যেমন- সিপিইসি প্রকল্প পরিচালিত হয় সিপিইসিএ [CPEC-A] নামে এক সরকারি অথরিটি বা কর্তৃপক্ষের অধীনে। গত দুবছর ধরে [ending the military’s de facto two-year control…] এই অথরিটির চেয়ারম্যান ছিলেন পাকিস্তানি সেনাপ্রধান জেনারেল বাজওয়া। অনুমান করা হয়, প্রকল্পের নিরাপত্তার দিকে গুরুত্ব দেয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার গত সপ্তাহে ইমরান এক স্বনামধন্য এক ব্যবসায়ী খালেদ মনসুর  যিনি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও যার বড় প্রকল্পের ম্যানেজমেন্ট দক্ষতা আছে, নিজের মালিকানাধীন ও সরকারি প্রজেক্ট ম্যানেজ অভিজ্ঞতা রাখেন – সেই খালেদ মনসুরকে “প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী” [SAPM] হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন, যিনি প্রধানমন্ত্রীকে সিপিইসি প্রকল্প প্রসঙ্গে সহায়তা করবেন। আর এই নিয়োগের পরপরই জেনারেল বাজওয়া নিজেই সিপিইসি অথরিটির চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে দিয়েছেন। তাই পাকিস্তানের রেওয়াজ অনুসারে, সংশ্লিষ্টদের অনুমান যে অচিরেই ব্যবসায়ী খালেদ মনসুর সিপিইসি অথরিটির চেয়ারম্যান হতে যাচ্ছেন। আর লেখক সাকিল প্রধানমন্ত্রী ইমরানের এই ব্যাপারটাকেই ক্ষুব্ধ চীনকে তার ঠাণ্ডা করার প্রয়াস বলে দেখেছেন। তবে ঘটনা আরো আছে।

    US President Donald Trump (L) listens to US Secretary of State Mike Pompeo during a Cabinet Meeting at the White House in Washington,DC. -(Photo by Brendan Smialowski / AFP)

    ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামী মুভমেন্টঃ
    ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামী মুভমেন্টের (ETIM বা ইটিআইএম); কারা এরা? ভয়েজ অব আমেরিকা জানাচ্ছে, [US Removes Anti-China Militant Group From Terror List] ২০০৩ সাল থেকে ইটিআইএম চীনা উইঘুর সশস্ত্র সংগঠন যারা আমেরিকার জঙ্গি সংগঠনের তালিকায় ছিল [Washington listed ETIM as terrorist group in 2003. ]। মানে? এটা আগে ছিল এখন নেই। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও, তিনিই এক সকালে ETIM এর নাম আমেরিকার অফিশিয়াল “জঙ্গি সংগঠনের তালিকা” থেকে কেটে দেন। ৭ নভেম্বর ২০২০ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছিল। এর আগের দিন তিনি এ ঘোষণা দিয়েছিলেন। কেন?

    ট্রাম্পের অনেক বদনাম, ‘ভদ্রলোকেরা’ তাকে দেখতে পারেন না। তিনি গাড়োল গাঁইয়া ধরনের মানুষ এবং সর্বোপরি তিনি জাতিবাদী; সে জন্যই নাকি? এটা শতভাগ মিছা কথা। এমনিতেই ডেমোক্র্যাটরা মোমের পালিশ করা মুখ নিয়ে ঘোরেন বা থাকেন; তাদের মনের কথা সহজে পড়া যায় না। এর বিপরীতে গোঁয়ার ট্রাম্প সবার সামনে ও চোখেই উন্মুক্ত ব্যক্তিত্ব। তাই তার বদনাম বেশি। তার বিপরীতে বাইডেন ‘ছুপা’। চীনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের জাতিবাদী লড়াই, চীনাপণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপের লড়াই   – এক কথায় ‘ট্রেড ওয়ারের’ বা বাণিজ্যযুদ্ধের কথা সবাই জানে। অথচ বাইডেন এখন ট্রাম্পের সেই নীতিই বাইডেন এখন অনুসরণ করে চলেন।

    ট্রাম্প সেই প্রথম বাণিজ্য যুদ্ধের ভেতর প্রথম এক “ইতর পদক্ষেপ” এনেছিলেন। সেটাই হল, চীনকে তিনি দেখতে পারেন না, শত্রু মনে করেন – সেই চীনের বিরুদ্ধেই ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ তোলার ব্যবস্থা করেন তিনি। তিনি “অসতভাবে” এই খেলা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কীভাবে?

    এতে বিপর্যয় কী ঘটে গিয়েছিল?
    চীনের সাথে ট্রাম্পের আমেরিকার  স্বার্থবিরোধ আছে, স্বাভাবিক! কিন্তু চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যবিরোধ আছে বলে কী সেই (রাজনৈতিক) স্বার্থের ভিত্তিতে ট্রাম্প ঠিক করবেন যে উইঘুরের ইটিআইএম [ETIM]  এই সশস্ত্র গ্রুপটাকে জঙ্গি বলবেন কী বলবেন না, জঙ্গী তালিকায় রাখবেন কিংবা বের করবেন?  তার মানে আগামীতে কেউ আলকায়েদার সমর্থক না হলেও সন্দেহবশত আমেরিকা তাকে টর্চার করলে এবার চীন কি তার পক্ষে কোনো মানবাধিকার গ্রুপ নিয়োগ করা শুরু করবে? অর্থাৎ কারও মানবাধিকার লঙ্ঘণ হয়েছে – একথা আমেরিকা বলবে কিনা তা নির্ভর করবে সেটা আমেরিকার শত্রুর বিরুদ্ধে যাবে কীনা; যদি যায় তাহলে আমেরিকা মানবাধিকার লঙ্ঘণ বলে হৈ চৈ তুলবে? এটা কী কোন রাস্ট্রের মানবাধিকার বোধ হতে পারে? নাকি এটা মানবাধিকার বেচা-বিক্রি এটা?

    বাইডেন এটাই শুরু করেছেনঃ
    উইঘুরের ETIM কে আমেরিকা ১৮ বছর ধরে নিজের জঙ্গী সংগঠন তালিকায় রেখেও ট্রাম্প চীনের সাথে বাণিজ্যবিরোধে ব্যবহারের জন্য এটা আর জঙ্গী নয় বলে রায় দিয়েছিলেন।  আর এই অনৈতিক সিদ্ধান্তই পরে বাইডেন পরে চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসাবে নিয়ে আসেন, কারণ ট্রাম্প মাত্র পরে আড়াই মাস ক্ষমতায় ছিলেন।
    আমেরিকা ইসলামী সশস্ত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে ‘জঙ্গি তালিকা’ বানায়। জাতিসঙ্ঘেরও এমন নিজের আলাদা একটা ‘জঙ্গি’ তালিকা আছে। তবে জন্ম থেকেই তালিকার সমস্যা হলো, টেররিজম বা জঙ্গি কাজের সংজ্ঞা কী ও কোনটা- তা আজও না পশ্চিমা কোনো দেশের কাছে, না জাতিসঙ্ঘের কাছে আছে। তবু এ নিয়ে কাজ করার মত একটা ঐকমত্য তাদের মধ্যে দেখা যেত সেকালে। যেমন  – চীন বা রাশিয়ার চোখে যারা জঙ্গি তারা পশ্চিমা অন্যান্য দেশ বা ইউএন এদের চোখেও জঙ্গি বলে তালিকায় উঠতে বড় কোনো ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। অন্যভাবে বললে, চীন বা রাশিয়া আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশের মত নয়, বরং পরিষ্কার আলাদা। তাদের স্বার্থও অনেক জায়গায় অনেক আলাদা হলেও চীন বা রাশিয়ার তালিকায় থাকা জঙ্গিদের আমেরিকা নিজ বাণিজ্য স্বার্থে নিজেদের তালিকার বাইরে রাখবেন এমন চল – এই জুয়াচুরি তখন চালু ছিল না।

    এ কারণে উইঘুর ETIM সংগঠন ২০০৩ সাল থেকেই আমেরিকার ও জাতিসঙ্ঘের জঙ্গি তালিকায় কোনো  নড়াচড়া ছাড়াই বজায় ছিল। পম্পেও যেই নামটাই তালিকাচ্যুত করেছিলেন আমেরিকার বাণিজ্যস্বার্থে, অনৈতিকভাবে।
    ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে তার বাণিজ্য লড়াইয়ের উপাদান হিসেবে কার নাম জঙ্গি তালিকায় ঢুকাবেন বা বের করবেন এমন কাজ একেবারে প্রত্যক্ষভাবেই ক্ষমতার অপব্যবহার। আর এমনটা শুরু করেন প্রথমে তিনিই। তবে সেটা গত ৭ নভেম্বর মানে ট্রাম্পের ক্ষমতা ত্যাগের মাত্র আড়াই মাস আগে। তাই ট্রাম্প এর ব্যবহারকারী হতে সময় পাননি। পরে এর প্রধান অপব্যবহারকারী প্রেসিডেন্ট হন বাইডেন।

    আরেকটা টেকনিক্যাল ও রেওয়াজের সমস্যা ছিল।
    এমনিতেই ব্যাপারটাকে আগে টেকনিক্যাল প্রবলেম মনে করা হত। যেমন – ধরা যাক বেলুচ কোনো সশস্ত্র রাজনৈতিক গ্রুপ। এই সংগঠনের ওপর নির্যাতন করে ধরা যাক, পাকিস্তান মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে – এমন অভিযোগ আনতে আমরা পাকিস্তানের বাইরের কোনো মানবাধিকার সংগঠনকে দেখিনি। বিশেষত পাকিস্তানের তালিকায় যদি ওরা সশস্ত্র ও নিষিদ্ধ সংগঠন হয়। ফলে এতদিনের রেওয়াজ ছিল, কোন গ্রুপ সশস্ত্র হলে আর মানবাধিকার গ্রুপ তার পক্ষে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে কাজ করত না।   এড়িয়ে যেত। সোজা কথা কোনো জনগোষ্ঠী বা তাদের সমর্থিত কোনো সশস্ত্র গ্রুপের পক্ষে কেউ মানবাধিকার নিয়ে দাঁড়িয়ে যেত না। বাইডেন সেই রেওয়াজ ভেঙেছেন এবং ভেঙেছেন রাষ্ট্রের বাণিজ্যস্বার্থে, চীনের সাথে পেরে উঠতে!

    অর্থাৎ আগে ভারতের আসামের উলফাকে বাংলাদেশ যদি অস্ত্র আনতে সহায়তা দিত তাহলে আর বাংলাদেশের কোন মানবাধিকার গ্রুপ  উলফার মানবাধিকার রক্ষার কথা বলে দাড়াত না।  এড়িয়ে যেত। ট্রাম্প- পম্পেও-বাইডেন এই রেওয়াজ ভেঙ্গেছে শুধু না। কার মানবাধিকার রক্ষা বলে তারা আওয়াজ তুলবে তা নির্ভর করবে সেই ইস্যুটা তুলে আমেরিকার বাণিজ্যিক লড়াইয়ে ফয়দা আছে কিনা!  যার সোজা মানে কারও মানবাধিকার আসলেই লঙ্ঘণ হয়েছে কি না তাতে কিছুই এসে যায় না!

    কেউ স্রেফ মুসলমান বলে কারণে আমেরিকা রাষ্ট্রের সন্দেহের শিকার হতে পারে।সন্দেহবশত, তাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া বা কমপক্ষে রিমান্ড সহ্য করতে হওয়া কিংবা  রেনডিশন [rendition] (অন্য দেশে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে টর্চারে কথা বের করা) ইত্যাদি অনেক কিছুই সহ্য করতে হয়েছে, এমন উদাহরণ হয়ত কম নয়। [দেখুন ওবামার রেনডিশন প্রগ্রাম প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ।]

    এখন ট্রাম্প ও বাইডেন তাদের চীনের সাথে বাণিজ্যবিরোধ আছে বলে তারা সেই রাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে ঠিক করবেন উইঘুরের ETIM জঙ্গি কি জঙ্গি নয়? তার মানে আগামীতে কেউ আলকায়েদার সমর্থক না হলেও, সন্দেহবশত তাকে টর্চার করা হলে চীন কি তার পক্ষে মানবাধিকার গ্রুপ নিয়োগ করা শুরু করবে? বাইডেন এই অনৈতিকতা চালু করেছে!

    বাইডেন এটাই শুরু করেছেন!
    তাই আগে ট্রাম্প ‘রায়’ দিলেন উইঘুর ETIM-এরা আর চীনের জঙ্গি সংগঠন নয়। আর বাইডেন এসে এরপর যোগ করলেন – চীন উইঘুরে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে চলেছে।
    অথচ বাইডেনকে মনে রাখতে হবে মানবাধিকার নিজ বাণিজ্যস্বার্থের হাতিয়ার বা টুলস নয়। এটা অপব্যবহার! হেনরি কিসিঞ্জার বাইডেনদের এই সস্তা বাণিজ্য-বুদ্ধিতে ‘মানবাধিকার’ বুঝতে বলেননি।

    শুধু তাই নয়। পম্পেও চাতুরিতে ETIM-এর নাম জঙ্গী তালিকা থেকে বাদ দিলেও তখনও জাতিসংঘের তালিকায় এটা তখনও আগের মতনই জঙ্গী সংগঠন। ফলে সেটা রক্ষার দায় তখনও আছে। একারণের চীন এই প্রসঙ্গটা তুলে তার আপত্তি জানিয়েছিল কিন্তু সেকথা শুনে নাই।

    আরো বিপজ্জনক ব্যক্তিত্ব
    তাও বাইডেন এখানে আটকে সীমাবদ্ধ থাকলেও চলত। বিদেশে চীনা প্রকল্প মানেই সেখানে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ চালাতে হবে; বা উইঘুর ETIM-কে দিয়ে সে কাজ করাতে হবে – বাইডেন এখন এমন জায়গায় চলে যাচ্ছেন! এটা কি কোনো বাণিজ্য যুদ্ধ? না কোনো মানবাধিকার রক্ষা? অথবা এটা কোনো ‘জঙ্গিবাদ’? বাইডেন কি নিজেই ভারতকে বগলে নিয়ে এই নয়া ‘জঙ্গিবাদের’ নেতা হতে চলেছেন না?

    কেন ভারতের নাম?
    বাংলাদেশের চীনা প্রকল্প মানে অন্তর্ঘাত, চীনা প্রকৌশলীর অপমৃত্যু! কিংবা ভারতীয় নাগরিক গ্রেফতার!  “সর্ষের মধ্যে ভূত আছে কি না, দেখতে হবে” – বলে বাংলাদেশের সেতুমন্ত্রীর মন্তব্য।’ এসব কিসের আলামত? এটা কী কোনো বাণিজ্যযুদ্ধ না প্রতিযোগিতা? এর মানে বাইডেন, বগলে ভারতকে নিয়ে কি এখন ‘কোন ধরনের নেতা’ হতে চলেছেন?

    ETIM-কে মানুষ খুন করতে উৎসাহ বা পথ করতে দেয়া কি একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে মানায়? নাকি এটা দেউলিয়াত্বের লক্ষণ!

    [ উইঘুরে চীনের দায়দায়ীত্বও কম নয়। সেটা সে পালন করেছে তা বলা যাবে না। নুন্যতম প্লুরাজিম বা একাধিক মত অবস্থানের পাশাপাশি থাকার কোন সুযোগ চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এখনও নাই। এটা সবসমস্যার গোড়ার সমস্যা এটা। এমনকি এটাই যেকোন সমাধান না পাবার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। তবে সে প্রসঙ্গ নিয়ে আলা্দা করে লিখতে হবে। ]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৫ আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “বাইডেন, বগলে ভারতকে নিয়ে কী হলেন?“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  •  “আফগানিস্তানে ভারত হারতে যাচ্ছে”

     “আফগানিস্তানে ভারত হারতে যাচ্ছে”

    গৌতম দাস

    ০২ আগষ্ট ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

    FP.COM   A security officer walks past a mural showing U.S. Special Representative for Afghanistan Reconciliation Zalmay Khalilzad and Taliban co-founder Mullah Abdul Ghani Baradar in Kabul on July 31, 2020. WAKIL KOHSAR/AFP VIA GETTY IMAGES

     

    [সার-স্ংক্ষেপঃ   লেখার শিরোনাম “আফগানিস্তানে ভারত হারতে যাচ্ছে” – এটা মূলত এক সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদুতের দেয়া শিরোনাম, সেখান থেকে নেওয়া।  তিনি আফগানিস্তানে ভারতের এক সাবেক রাষ্ট্রদুত,  বিবেক কাতজু [Vivek Katju]। হিন্দুস্তান টাইমসে ছাপা হওয়া তাঁর লেখা  এক কলামের শিরোনাম ছিল – India is losing out in Afghanistan ।  অর্থাৎ এই সাবেক কূটনীতিক মোদী-জয়শঙ্করের ভারতের এক করুণ পরিণতি দেখছেন।  তাঁর পুরা লেখাটাই মোদী-জয়শঙ্করের কঠোর সমালোচনা করে লেখা।
    ঠিক তেমনই আরেকজন হলেন সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম আলো তাকে নয়াদিল্লি প্রতিনিধি বলে পরিচয় করায়ে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি তিনি মোদী-জয়শঙ্কর থেকে নিজেকে দুরত্ব তৈরি করে তাদের দায় না নিয়ে এক রচনা লিখে বলেছেন –  “আফগানিস্তান হতে চলেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের কূটনৈতিক দক্ষতার কষ্টিপাথর”। অথচ প্রথম আলো তার এই দায় না নেয়া লেখাটা ছেপেছে সৌম্যর ‘মতামত কলাম” হিসাবে।  অর্থাৎ সৌম্য প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি সে হিসাবে নয়।
    মুলকথাটা হল, তালেবান ইস্যুতে মোদীর নীতি-পলিসিতে বড় গলদ দেখছেন ভারতের কূটনীতিক, একাদেমিক বা মিডিয়াকর্মিরা – তাঁরা মোদী-জয়শঙ্করদের থেকে নিজের দুরত্ব তৈরি করে কথা বলা শুরু করেছেন। তবুও মোদী-জয়শঙ্কর হুশিয়ারি দিচ্ছেন।  জয়শঙ্কর ২৯ জুলাই ভারতের রাজ্যসভায় বলেছেন, আফগানিস্তানে বলপ্রয়োগের সরকার ক্ষমতা দখল করলে (মানে তালেবানেরা ক্ষমতা দখল করলে) ভারত তা মেনে নিবে না [We would never accept any outcome which is decided by force”]। মানে স্বীকৃতি দিবে না। যদিও ভারতের স্বীকৃতির অপেক্ষায় তালিবানরা রয়েছে এমন কথা জানা যায় না। তবে ভারত সফরে আসা আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন তার কথাও ভারতের কাছাকাছি মনে হলেও, কিন্তু এক বড় ফারাকের। তিনি বলছেন সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে তালেবানদের অসুবিধা হবে। তিনি একটা শব্দ ব্যবহার করেছে “pariah” [Afghanistan to become ‘pariah state’ if Taliban seizes power: US] যার সমতুল্য বাংলা মানে হল অছ্যুত বা একঘরে হয়ে থাকা।  দেখা যাচ্ছে আমেরিকা যেখানে হুমকি নয়, অবজেকটিভলি তালেবান্দের উদ্দেশ্যে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করছেন  মুরোদহীন ভারত সেখানে হুঙ্কার দিয়ে বলছে – ভারত মেনে নিবে না। ]

     

    এশিয়ায় কূটনৈতিক দৌড়াদৌড়িঃ
    আফগানিস্তানকে ঘিরে এশিয়ায় কূটনৈতিক দৌড়াদৌড়ি চরমে উঠেছে। গ্লোবাল পাওয়ারগুলোর সবাই তো বটেই,  এমনকি মুরোদ না থাকলেও যারা আকাঙ্খী, তারাও এতে শামিল হতে চাইছে। কারণ একটাই তালেবান ইস্যু গরম হয়ে উঠছে। মানে আমেরিকার বন্ধুরা যারা গত বিশ বছর ধরে আমেরিকার পক্ষে থেকে কাবুলের পুতুল সরকারের থেকে নানান “প্রজেক্ট” বাগিয়ে গেছে। কিন্তু তাদের জন্য এখন দুঃখের দিন, হাহাকারদের দিন। বিশেষ করে ভারত তার তিন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আটকে গেছে সেই দুঃখে তালেবানদেরকে বদ-দোয়া দিয়ে যাচ্ছে – যে তালেবান সরকার টিকবে না।  এতো গেল একটা দিক। অন্যদিকটা  আরেকটু ভেঙে বললে, গত ২০ বছর হিতাহিত ভুলে আমেরিকার এই আফগানিস্তানে চালানো আক্রমণ ও দখলদারির দিন এবারের মত শেষ হবে। কিন্তু শেষ ‘কাফফারা’ দিতে হবে আরো অনেক; এবার সে ‘কাফফারা’ দেওয়ার  এক নয়া জমানায় সম্ভবত প্রবেশ করতে যাচ্ছে।

    SPUTNIKNEWS

    গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের কথা যা আজকাল অস্বীকার-কারীরাও পরোক্ষে স্বীকার না করে পারছে না যে, আমেরিকার বদলে এর জায়গায় চীনের উঠে বসার কথা বা লক্ষণ-ইঙ্গিতও ক্রমশ বেড়েই চলেছে। আমেরিকার জন্য এই শাস্তি ডেকে নেওয়ার কারণও মূলত আফগানিস্তান। কারণ আসলে এই যুদ্ধের খরচ জোগাতে গিয়েই, এতদিন সামলে চলা আমেরিকার অর্থনীতি, ২০০৭ সাল থেকেই বেসামাল হয়ে যায়। এই খরচ বেহিসাবি কারণ এই যুদ্ধ অন্তহীন এবং  এতে লোভ ও চরম অপরিকল্পনা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখানে খরচের কোনো রিটার্ন আপাতত আর আসার সম্ভাবনা নাই, এর কিছুই ফেরত আসবে না। সেটা ক্রমান্বয়ে নিশ্চিত হয়ে যাওয়াতে ২০০৮ সাল থেকেই গ্লোবাল মহামন্দা নেমে এসেছিল। আর তাতেই প্রথম সুবিধাটা যায় চীনের ঘরে যে তখন নিজ অর্থনীতির কেবল ডাবল ডিজিট জিডিপির ২০ বছরে পৌঁছাতে যাচ্ছিল। তাই আমেরিকার বদলে সে জায়গায় চীন – এই সুবিধা চীনের জন্য প্রথম উন্মুক্ত হয়েছে আফগানিস্তানে আমেরিকান হামলার পরের পিছু হটা থেকে।

    তাই ২০১৪ সালেই আমেরিকাকে প্রথম বড় সেনা প্রত্যাহার ঘটাতে হয়েছিল। কারণ আমেরিকান  অর্থমন্ত্রী বা ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের  খরচ জোগানোর অপারগতায় শেষ টাইমলাইন ছিল সেটা। তাই প্রথম সেই প্রধান সেনা প্রত্যাহার (আমেরিকাসহ ‘ন্যাটো’ ও তার বন্ধুদের সেনা) যা শুরু হয়েছিল তা এবার ২০২১ সালে বাদবাকি সমূলে প্রত্যাহার শেষ হতে প্রতিশ্রুত হয়েছে, যার টার্গেট আগস্টের শেষে। অর্থাৎ এ মাসের মধ্যেই।

    এতে  আফগানিস্তানে এতদিন আমেরিকার যা অর্থসম্পদ ক্ষতি হয়েছে তা তো হয়েছেই; কিন্তু সেটাই শেষ নয়। বরং আরেক  বিরাট সম্ভাব্য ওলটপালট সামনে অপেক্ষায়। আর তাতে আমেরিকার এর চেয়েও বড় ক্ষতির সম্ভাবনা থাকছে। গ্লোবাল ক্ষমতার পালাবদলে যে নতুন  ভারসাম্য আসন্ন, অন্তত এশিয়ার ভারসাম্য এখান থেকেই পুনর্লিখিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।

    ওদিকে এনিয়ে ভারতের অবস্থান আরও নাজুক, একেবারেই আমেরিকার মুখাপেক্ষি। তাই যদিও আপাতত মোদীর ভারত আমেরিকাকে জাপটে ধরেই থাকছে বটে; তবে পারলে বাইডেনের চেয়ে – ভারতের হিউম্যান রাইট নিয়ে প্রশ্ন না তোলা – ট্রাম্পের মত প্রেসিডেন্টই মোদীর ভারতের কাম্য।  কিন্তু এসব কিছুই ভারতের ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত। এরপরে সেই নির্বাচনে বিজেপি ফিরে জিততে না পারলে সেই ভারত পথ বদলে চীনের বন্ধু হয়ে যাবার পথে যাওয়াটাও অসম্ভব নয়। বিশেষত ইতোমধ্যেই ডুবে যাওয়া ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন আওয়াজ ইতোমধ্যেই জোরালো হচ্ছে। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে বাইডেনের সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত এবং তাতে তালেবানদের ক্ষমতায় ফিরে চলে আসার সম্ভবনা ভারতকে একেবারে অস্থির বেচাইন করে দিয়েছে।
    কারণ মূল সে ঘটনা হল তালেবান  – মানে ১৯৯৬ থেকে আমেরিকার ২০০১ সালে দখলের আগে পর্যন্ত যারা কাবুলের সরকারের ক্ষমতায় ছিল, সেই তালেবানরা। নিঃসন্দেহে সেই আর এই – তালেবানের মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা এবার আকাশ-পাতাল ফারাক দেখব বলে আশা করতে পারি।  তবুও তালেবানরা এবার “আগের মত একই তালেবান কি না” (ভারত যেমনটা আগেই প্রপাগান্ডা শুরু করে দিয়েছে) – তবু সেটা বড় ফ্যাক্টর নয়।
    কারণ মনে রাখতে হবে, ২০০১ সালে আমেরিকায় নাইন-ইলেভেনের হামলার পর পাল্টা আমেরিকা আফগানিস্তানে হামলা ও দখল করেছিল পরের মাসে ৭ অক্টোবর ২০০১ সালে। আর এরপরই  জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটোক্ষমতাসহ মোট ১৫ আসনের  সকলে সর্বসম্মতিক্রমে ১৪ নভেম্বর ২০০১, তালেবান শাসন ও সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে তারা প্রস্তাব ও ভোট দিয়েছিল।  মানে গ্লোবাল রাজনীতিতে রুলিং শাসকেরা সেসময় একেবারেই সদলে  তালেবানের বিরুদ্ধে চলে গেছিল।  অথচ  তুলনায় আজকের অবস্থা একেবারেই ভিন্ন।  এখন একই পরিষদে আমেরিকান কোনো প্রস্তাব নিয়ে যদি ভোটাভুটি হয় তবে এর বিপক্ষে  অন্তত দু’টা (চীন ও রাশিয়া) ভেটো পড়বে আর বিভক্তি ভোট তো হয়ে যাবেই। অর্থাৎ কোন প্রস্তাব পাসই হবে না। এটাই অনেক বড় ফ্যাক্টর।

    উপরে যে গ্লোবাল পালাবদলের কথা তুলেছি, আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুর উপর এরই মধ্যে ছাপ পরে গেছে পুরোদস্তুর। যেমন – গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলে ইতোমধ্যেই “আমেরিকা বনাম চীন” এমন দুটো পক্ষের মধ্যে অন্য দেশগুলো কে কোন দিকে সেই পক্ষ-বিপক্ষ প্রতিদিনই আমরা আরো চোখা হয়ে উঠতে দেখছি। গ্লোবাল পালাবদলে ‘আমেরিকা বনাম চীন’ এই পক্ষ-বিপক্ষের ছাপটাই আফগানিস্তানের পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও একই মেরুকরণে পক্ষ-বিপক্ষ হয়ে পেছনে কাজ করছে। যেমন- কে কে আমেরিকার ফেলে যাওয়া পুতুল সরকারের পক্ষে আর কে কে তালেবানের (শর্ত সাপেক্ষে) প্রতি সহানুভূতিশীল – এই দুই ভাগেই প্রতিফলিত হচ্ছে প্রথমটা আমেরিকার পক্ষে আর পরেরটা ‘চীনের পক্ষ’। এদিকটাই এখন প্রধান ফ্যাক্টর।

    তবে আফগানিস্তানের এখনকার সব ঘটনার শুরু যে ২০০১ সালের আমেরিকান হামলা থেকে সেই আমেরিকার এখন প্রধান টার্গেট ও স্বার্থ হল – আফগানিস্তানে আমেরিকার সব অর্থব্যয় এবার বন্ধের ব্যবস্থা করা যা ড্রেনে পড়ছে; আর, এরপর আমেরিকান টার্গেট সেই আফগানিস্তান ফেলে পালিয়ে যাওয়া। তাই, এরপরে তালেবান আক্রমণের মুখে কাবুলের সরকার টিকে থাকতে পারবে কি না সেটা আমেরিকার কাছে সেকেন্ডারি, তার পারলে ভালো  – এরকম। যদিও আমেরিকা তা মুখে স্বীকার করছে না, ভাবে বলছে। ওদিকে আমেরিকার আরেক কোর-স্বার্থ হল, সেনা প্রত্যাহারের পরে, আল-কায়েদার মত গ্লোবাল সশস্ত্র ইসলামি গ্রুপগুলো যেন আফগানিস্তানে্র আশ্রয়ে থেকে অপারেট না করে। আর এটাই তালেবানদের সাথে ট্রাম্প ও বাইডেনের মুখ্য ডিলিং পয়েন্ট, যা অপ্রকাশ্য রাখা আছে। যদিও তালেবানেরা সেই আশ্বাসও দিয়েছে [The Taliban has also assured the US that it would not allow global terrorist groups to operate from Afghanistan.] বলে জানা যাচ্ছে।

    তিনটা আলাদা মিটিং কিন্তু প্রায় সমান্তরালেঃ
    আমেরিকান সেনা আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের সময় তেমন আর বেশি নাই, মাত্র আগস্ট মাসটাই। তাই আমরা অস্থির কূটনৈতিক ব্যস্ততা দেখছি যার মধ্য থেকে জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহের তিনটা মিটিংয়ের কথা এখানে তুলে ধরব।

    এক.
    সময়ের হিসাবে ধরলে তিন মিটিংয়ের সবশেষেরটা হল ২৮ জুলাইয়ে, ৯ সদস্যের তালেবান প্রতিনিধিদের চীন সফর ও চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ওয়াং ই-এর [Wang Yi] সাথে বৈঠক।

    আফগান তালেবানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং দোহায় তালেবানের রাজনৈতিক শাখার প্রধান মোল্লাহ আব্দুল গনি বারাদার [Mullah Abdul Ghani Baradar] বুধবার চীন সফরে গেছেন, আর সেখানে পৌঁছেই উত্তরাঞ্চলীয় তিয়ানজিং শহরে তিনি বৈঠক করেছেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সাথে।

    বলা যায় ভারত ও সমমনা যারা এতদিন আফগানিস্তানের পুতুল সরকারের হাতে গত বিশ বছর মাখন খেয়ে গেছে, তাদের জন্য চীন-তালেবান এই বৈঠক এক মহাজুলুনি তৈরি করেছে। সেই ঈর্ষা আর জলুনি কত তীব্র তা দেখা যাচ্ছে বিবিসি বাংলার নিচের এই রিপোর্টে।

    চীন-আফগানিস্তান: ঘনিষ্ঠ হচ্ছে কমিউনিস্ট চীন ও সুন্নী তালেবান, তৈরি হচ্ছে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

    এতে তালেবানদের দিক থেকে এই প্রথম আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের ‘কাউন্টার ওজন’ প্রকাশ করা মানে পাল্টা-পাল্লায় বাটখারার ভার দেখানো হল। আর তাতে চীনের পেছনে রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান, সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলো আর (হবু ছয় দেশীয় জোট দেখানোর কারণে) সম্ভবত বাংলাদেশও – তাদের সবাই যে আছে সেই অনুমান ছড়িয়ে দেয়া হল। এরই পাল্টা হিসেবে আমেরিকার বগলে এক ভারত ছাড়া আর কেউ আপাতত দৃশ্যমান নয়। আমেরিকা-ভারতের বিপরীতে তালেবানের এই বাটখারার ভার দেখানো তাৎপর্যময় অবশ্যই। এটা আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কিছু মন্তব্যে। যেমন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং বলেছেন, তালেবানরা ‘এখন আফগানিস্তানে এক গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি” [“Wang Yi pointed out, the Afghan Taliban is a crucial military and political force in Afghanistan,” ]।’ আবার রয়টার্স রিপোর্টের শিরোনাম করেছে, চীন বলছে, তালেবানদের কাছে চাওয়ার আছে যে, তারা আফগানিস্তানের শান্তি প্রতিষ্ঠায় মিলমিশ ও পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করুক!’ [China told a visiting Taliban delegation on Wednesday it expected the insurgent group to play an important role in ending Afghanistan’s war and rebuilding the country,] এই কথায় ভারতসহ সমমনাদের জলুনি উঠলেও বলার কিছু নাই। কারণ চীনের একথা সবচেয়ে ইতিবাচক এক স্টেমমেন্ট।
    এছাড়া আরেক তাতপর্যপুর্ণ দিক আছে। চীনের উইঘুরে (মানে জিনজিয়াং প্রদেশ যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা) ‘পূর্ব তুর্কিস্তান ইসলামী আন্দোলন’ [East Turkestan Islamic Movement বা সংক্ষেপে ETIM] নামে সশস্ত্র সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণে বা রুখতে তালেবানরা চীনকে সাহায্য করবে – চীন এই আশাবাদ রেখেছে। ঐ মিটিং শেষে তালেবান মুখপাত্র মোহাম্মদ নাঈম জানিয়েছেন, ‘তারা চীনকে আশ্বস্ত করেছেন, আফগান-ভূমি চীনের বিরুদ্ধে কাউকে ব্যবহার করতে তারা দেবেন না [“(The) delegation assured China that they will not allow anyone to use Afghan soil against China,” Naeem said. ]।’ তালেবানদের আরেক মিডিয়া মুখপাত্র সুহেল শাহীন অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন, চীন আফগানিস্তানের অবকাঠামো পুনর্গঠনের ‘welcome friend’  বা ‘স্বাগত-বন্ধু’;  [Taliban spokesman Suhail Shaheen says the group welcomes Chinese investments in reconstruction and would guarantee the safety of investors and workers]।
    সার কথায়, তালেবানেরা সশস্ত্র এবং অ-দায়িত্বশীল এক রাজনৈতিক শক্তি বলে পশ্চিমে ও বিশেষ করে ভারতের দিক থেকে যে প্রচার আছে বা খারাপ ইমেজ করে রাখা আছে, একালে সেসব কাটানো ও লঘু করার দিক থেকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে এই বৈঠক তালেবানদের অনেক সুবিধা দেবে, ইমেজ বাড়াবে।

    দুই.
    আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন [Antony J Blinken] ২৭-২৮ জুলাই ভারত সফর করে গেলেন। এক কথায় বললে এটা ছিল আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যু পরিস্থিতিতে বেদিশা ও একা হয়ে পড়া ভারতকে আশ্বাস দিয়ে পিঠ-চাপড়ে দেয়ার সফর।
    প্রথমত, আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুতে নরেন্দ্র মোদী তাঁর অভ্যন্তরীণ জনগণ, কূটনীতিক, একাডেমিশিয়ান ও মিডিয়াকর্মীদের কাছেই আস্থা একেবারে হারিয়েছেন। তারা লেখা শুরু করে দিয়েছেন, “আফগান প্রশ্নে দিল্লি বন্ধুহীন“। অথবা এখানে দেখেন,  Indian experts are wondering why New Delhi has been sidelined in Afghanistan. ।  আর উল্টা পাকিস্তানের ভেতরে আমেরিকা ও রাশিয়া নিজ নিজ স্বার্থের আশ্রয় খুঁজছে। ওদিকে পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার চীন তো আছেই। জয়েন্ট স্টেটমেন্ট দেখেন এখানে  [Joint Statement on Extended “Troika” on Peaceful Settlement in Afghanistan]।    মনে করা হচ্ছে, ভারতকে বাইরে রেখে মূলত এই ফ্যাক্টসগুলো মিডিয়ায় প্রচার হয়ে পড়াতে মোদি ভীত হয়ে যান। বিজেপির ধারণা, মোদীর ভারতকে ছাড়িয়ে  পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা আগামী যেকোনো ভোটে মোদীর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে। আর সেটা কাউন্টার করতেই ব্লিঙ্কেনকে এনে যেন দেখিয়ে মোদী সবাইকে আশ্বস্ত করতে চেয়েছেন। তবে এর ফল তেমন সুখকর হয়নি।

    এর অনেক কারণের মধ্যে প্রধান কারণ হল, আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুতে ভারত ও আমেরিকার স্বার্থের অনেক মিল থাকলেও কিন্তু অমিল-ভিন্নমতও কম নয়। যেমন – ব্লিঙ্কেনের ফিরে যাওয়ার আগে ভারতে মিডিয়ায় সামনে এসেছিলেন তিনি। ততক্ষণে চীন-তালেবান মিটিংয়ের রিপোর্ট মিডিয়ায় এসে গেছে। তাই, তালেবানের চীন সফরের সংক্রান্ত প্রশ্নের মুখে পড়ে এর জবাব দিতে গিয়ে ব্লিঙ্কেন প্রকারান্তরে চীনের প্রশংসা করে বসেন।

    Asked about the Taliban visit, U.S. Secretary of State Antony Blinken said in New Delhi that it was a “positive thing” if Beijing was promoting a peaceful resolution to the war and “some kind of (Afghan) government … that’s truly representative and inclusive.”

    বলেন, এই ‘সফরটা ইতিবাচক’। চীন যদি যুদ্ধাবস্থায় এক শান্তিপূর্ণ প্রস্তাব ও আফগানিস্তানে কোনো ধরনের সরকারের কথা বলে যা সত্যিই সবাইকে নিয়ে এবং প্রতিনিধিত্বমূলক তবে তা তো ইতিবাচক”। এখন ব্লিঙ্কেনের পক্ষ থেকে চীনের এই পরোক্ষ প্রশংসা তো মোদীর জন্য হজম করা খুবই মুশকিল। এই হল, আমেরিকা ও ভারতের স্বার্থের বেমিল। ওদিকে ভারতের কূটনীতিক, একাডেমিক বা মিডিয়াকর্মীর সবচেয়ে বড় অনাস্থা হলো – আফগানিস্তানে যার যার স্বার্থ আছে সে মোতাবেক সংশ্লিষ্ট এমন সবাই ইতোমধ্যে দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তালেবানদের সাথে কয়েকবার বৈঠক এবং আলোচনা, বুঝাবুঝি বা সমঝোতা করে নিয়েছে। আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ইরান মূলত কেউ বাকি নেই এদিক দিয়ে। অথচ ভারত এই পথেই নেই। এটাতে মূলত ভারতের আভ্যন্তরীণ ইন্টেলেজেন্সিয়া  তারা অসন্তুষ্ট ও হতাশ। ভারত কেবল গোপনে একবার তালেবানদের সাথে দেখা করেছে যা আবার প্রকাশ্যে অস্বীকার করে থাকে। আর পাকিস্তান তালেবানদের নাকি ভারতের বিরুদ্ধে প্রভাবিত করছে বা উসকাচ্ছে বলে ডাহা মিথ্যা এমন প্রপাগান্ডায় ভারত লিপ্ত হয়ে গেছে। অতীতে তালেবানরা কী কী খারাপ কাজ করেছে এর বর্ণনা দিয়ে ভারত এখন প্রচার শুরু করেছে। অথচ ভারতের এক মিডিয়া-মুঘল দা-প্রিন্ট পত্রিকার সম্পাদক শেখর গুপ্তা লিখেছেন ……

    “Like them or not, Taliban are a reality. India can deal with them if BJP resets its politics…”

    অর্থাৎ তিনি উলটা বিজেপি-আরএসএস কে তালেবান-বাস্তবতা মানতে বলেই থামেন নাই। উলটা পরামর্শ রেখে বলেছেন, মোদীর খোদ নিজেদের রাজনীতিই বদলে নিতে। আসলে একেবারেই কোন সঠিক পলিসিতে মোদীর ভারত নাই বলেই ভারতের কূটনীতিক, একাডেমিক বা মিডিয়াকর্মীদের প্রধান অনাস্থা। এছাড়া আরো ভেতরের খবর হল, ভারত সিদ্ধান্ত নিয়ে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ মুডে আছে।  খবরটা দিয়েছেন আফগানিস্তানে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদুত বিবেক কাতজু। লিখেছেন,

    Indian policymakers had looked at the Afghan scene dispassionately especially after the US began talking to the Taliban in Doha in 2018. What is strange is that even after the US-Taliban deal in February 2020, Indian strategists, instead of making up for lost time, continued to ignore emerging realities.
    Stranger still, Kabul-based senior political personalities, who have recently interacted with the Indian leadership, say that India continues to have a “wait and watch” approach. What they are leaving unsaid is that India has become a bystander in Afghanistan, not knowing which way to turn.
    Some analysts are railing against countries which are engaging the Taliban. They believe that these countries will pay a price for not understanding the true nature of the group.

    অর্থাৎ ভারত কোন প্রস্তুতিই নেয়নি তাই নয়। শেষের বাক্যটা বলছে তালেবানদেরকে বদ-দোয়া দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছে।  তাই আফগানিস্তান-তালেবান ইস্যুতে ভারত কোনোই প্রস্তুতি নেয়নি। কারণ ভারতের ধারণা- তালেবানরা পরাজিত হবে, হারিয়ে যাবে। আর বর্তমান সরকারই থাকবে যা আসলে অনিশ্চিত জেনেও ভারত আমেরিকার ভরসায় বসে থাকতেই চায়। কিন্তু সে দেশ থেকে সেনা প্রত্যাহারের পরেই সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে আমেরিকার চাওয়া আর ভারতের চাওয়াও তো এক নয়।

    তবে ব্লিঙ্কেনের এবারের সফর শেষের পর থেকে, ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কড়া হুমকি ও আক্রমণ শুরু করেছে। দিল্লি ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের নতুন মুখপাত্র অরিন্দম বাগচিকে দিয়ে বলিয়েছে, ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানকে জানাচ্ছে যে, সারা কাশ্মিরই ভারতের অংশ। অর্থাৎ পাকিস্তানের দখলে থাকা কাশ্মির ভারতেরই ভূমি – যেটা নাকি পাকিস্তানের দখল করে থাকা। তাই পাকিস্তান-কাশ্মিরের কিছু অংশের ওপর দিয়ে চীন-পাকিস্তানের করিডোর [CPEC] নির্মাণ করা হয়েছে সেটা ‘তথাকথিত’  করিড়োর সহ সব অবৈধ দখল ছেড়ে যেন পাকিস্তান চলে যায় সেই কড়া আহ্বান রেখেছে ভারত [“We call upon Pakistan to vacate all Indian areas under its illegal occupation,” ]।

    একই সাথে তালেবানদের চীনে গিয়ে মিটিং করার বিরুদ্ধে ভারত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে [India Thursday also reacted against Taliban leaders visiting China and meeting the country’s leaders there]। আর সবশেষে, ‘আফগানিস্তানে গায়ের জোরে কোনো সরকার কায়েমের বিরুদ্ধে’ মানে, তালেবানদের কাবুলের ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে [“Unilateral imposition of will by any party will not be democratic…..] ভারতের আপত্তির কথা জানিয়েছে। তবে এসব হুঙ্কার মোদীর ভারত মূলত তার অভ্যন্তরীণ জনমত যা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অনুমান, তাকে ফিরানোর লক্ষ্যের বলা হয়েছে বলে দেখেছেন অনেকে। কিন্তু আফগানিস্তানে ভারতের এক সাবেক রাষ্ট্রদূত ছিলেন বিবেক কাটজু; তিনি খুবই কড়াভাবে মোদি-জয়শঙ্করের নীতি পলিসিকে তুলোধোনা করে হিন্দুস্তান টাইমসে কলাম লিখেছেন।

    তিন.
    এটা হল – গত ২৫ জুলাইয়ে চীন-আমেরিকার নিজস্ব সম্পর্ক প্রসঙ্গে উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক। বাইডেন জানুয়ারিতে মার্কিন ক্ষমতায় শপথ নেয়ার পরে মার্চের ১৮-১৯ তারিখে প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে দু’পক্ষের প্রতিনিধির বৈঠক হয়েছিল যা খুবই তিক্ততা দিয়ে শেষ হয়েছিল। এবারের মিটিংটাকে এক দিক থেকে এরই পরবর্তি ও পাল্টা সফর বলে মনে করছেন অনেকে [Why Tianjin? And what’s in store in China for US envoy Wendy Sherman?]। বিশেষত আগের মিটিংটা হয়েছিল আমেরিকার রাজধানীর বাইরে দেশের উত্তরের আলাস্কা শহরে। আর এবারের আমেরিকার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরম্যানের সাথে বৈঠকটা দেয়া হয়েছিল বেজিংয়ের বাইরে তিয়ানজিং শহরে যেটা আসলে চীনা-আফগান সীমান্তের এক শহর।
    এবারের এই মিটিংয়ের সার কথা ছিল, নিজেদের মধ্যে যত মনোমালিন্যই থাকুক যুদ্ধ তারা কেউ চায় না- এ কথাটা প্রকাশ করে রাখা। যেমন- এই মিটিংয়ের পরে আমেরিকা মিডিয়াকে জানিয়েছে, তাদের সম্পর্ক খুবই ‘টাফ কম্পিটিশনের’[stiff competition]। তবে একই নিঃশ্বাসে তারা জানিয়েছে যে, ‘আমেরিকা চীনের সাথে যুদ্ধ-সঙ্ঘাত চায় না’ [Price said that in her meeting with Wang, Sherman vowed “stiff competition” with China but also stressed that the US “[did] not seek conflict” with Beijing.] এবং আমেরিকা মানবাধিকার নিয়ে কথা বলতেই থাকবে। এর পাল্টা চীন বলেছে, ‘তিনটা জিনিস দেখতে চাই আমরা।’ [three demands with the second-ranking US diplomat: the United States must not challenge or seek to subvert China’s model of governance; it must not interfere in China’s development; and it must not violate China’s sovereignty or harm its territorial integrity.] আমেরিকা আমাদের মডেলের রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে কোনো কথা বলবে না; চীনা পথের উন্নতি নিয়ে তারা কোনো কথা বলবে না। আর হংকং ও তাইওয়ান চীনের অভ্যন্তরীণ ইস্যু। ফলে আমেরিকা যেন চীনের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে, এ নিয়ে মন্তব্য করতে না আসে। তবে উভয়পক্ষই পারস্পরিক ডায়ালগ চালিয়ে যেতে চায় বলে জানায়। এক কথায়, না চাইতে কোনো যুদ্ধের শঙ্কা যেন কোনো পক্ষের মনে কাজ না করে তা আগেই মিটিয়ে রাখার মেসেজ তারা আদান-প্রদান করে রাখল।

                                        ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের  মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি

    কেন এমনটা হল?
    এর কিছুটা হদিস আমরা পাই ভারতের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচিকে দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মনের চরম ক্ষোভ উপচিয়ে প্রকাশ করা বিবৃতি থেকে। এরপর এ নিয়ে ভারতের সামরিক ইন্টেলিজেন্সিয়ার প্রতিক্রিয়া থেকে। যেমন পারভিন শাওনি [@PravinSawhney] নামে এক সাবেক মেজর যিনি একটা ‘ডিফেন্স ম্যাগাজিন’ চালান ও এর সম্পাদক। তিনি টুইট করে লিখেছেন ‘মোদি একেকটা অর্থহীন মন্তব্য করে  যুদ্ধ লাগিয়ে দেয়ার দিকে ভারতকে নিয়ে যাচছে – যা তিনি কখনো জিততেই পারবেন না, আর এই যুদ্ধ তো এড়ানোযোগ্য!’ [With each mindless remark, India is heading towards war – which it cannot win & is avoidable. ] এ ছাড়াও লিখছেন, এটা ‘মোদির দুর্ভাগ্য যে, তার টপ সামরিক জেনারেল রাওয়াত; অগ্রসর সামরিক ওয়ারফেয়ার সম্পর্কে তার কোনো জানাশোনা নেই!’ [Modi’s misfortune is have Rawat as the top military officer who knows nothing about advances in warfare!]

    শেষ দুটা পয়েন্টঃ
    আর একমাস পরে আফগানিস্তানে তালেবানদেরকে আমরা কোন ভুমিকায় দেখব? এর সম্ভাব্য দুটা অবস্থান হতে পারে। গত ২০ বছর ধরে তালিবানেরা অনেক কিছু দেখেছে, অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে যা থেকে কী করা যাবে আর কীনা – এসম্পর্কে তারা অনেক ওয়াকেবহাল অবস্থায় এখন তা আমরা অনুমান করতে পারি।।

    আমরা পছন্দ করি আর নাই করি এপর্যন্ত দুনিয়া যে জায়গা পর্যন্ত পথ-পরিক্রম করে এসেছে তাতে গ্লোবাল রাজনীতির কিছু ভ্যালুজ তারা তৈরি ও প্রতিষ্ঠা করেছে। এটা বলছি না সেগুলা সব আদর্শ অথবা দুনিয়ার সকল জনগোষ্ঠিরই স্বার্থ ও কালচারকে তা প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু তালেবানেরা যদি আউট-রাইট সেগুলোর বিরোধিতা করে নিজেদের সব ভ্যালুজ নিয়ে চলতে চায় বা প্রতিষ্ঠা করতে চায় তবে এটা আগের মতই ব্যর্থ হবে তা বলাই বাহুল্য। এটা হল কো খেলার নিয়ম বদলানোর মত সমস্যা। আপনি গ্যালারিতে বসে থেকে খেলার নিয়ম বদলাতে পারবেন না। বরং প্রথমত তাদের নিয়মেই খেলতে নামতেই হবে। এরপর খেলতে খেলতে খেলার নিয়ম বদলে দেওয়ার চেষ্টা করে যেতে হবে।

    কাজেই একটা পথ হল তালিবানেরা দুনিয়ায় উপস্থিত গ্লোবাল রাজনীতির নিয়ম – পুরান খেলার নিয়ম মেনেই খেলতে নেমে পড়া। এতে সবচেয়ে বড় পয়েন্ট হবে দায়ীত্বশীল রাষ্ট্রের আচরণ করা। বড়জোর এর সাথে নিজেদের যেসব ভ্যালুজ আছে কোথাও কোথাও এর প্রদর্শনে নেমে পড়া। তবে  আগে ইমেজ তৈরি এদিকটা খেয়াল রাখতে হবে।
    আর যেকথা মনে রাখতেই হবে তা হল,  যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের সরকারি নানান বাহিনীই কেবল থাকবে। কিন্তু  একই সাথে ঐ দেশ আবার পাশাপাশি কোন সশস্ত্র গ্রুপকেও অপারেট করতে দিতে পারে না।  এক ঘরে দুই পীর হয় না। অথরিটি একজনই বা একটাই হয়।  তবে সাবধান এসব কিছু শুরু হতে পারে আগে দেশে একটা বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখল করে নিবার পরেই। কারণ ক্ষমতা দখলের পরেই কেবল একটা কনষ্টিটিউশন আর ওর নানান নিয়ম, আইন-কানুন  তৈরি হতে পারে। এটাই হতে পারে দায়ীত্বশীল পথ। এবার এই পথের সফলতার সম্ভাবনা প্রচুর। প্রধান কারণ  এবার গ্লোবাল রাজনৈতিক শক্তির একটা সফল অংশ তালিবানের পক্ষে আছে।

    অন্যদিকে আরেকটা পথ হল, আগের (১৯৯৬-২০০১) বারের মত করে মাঠে নেমে পড়া। যারা গ্লোবাল ইসলামি রাজনীতির সমর্থক তাদের দৃষ্টিতে  হয়ত এটাই সম্ভবত সঠিক পথ। হতে পারে।  তবে এই পথটা আগের বারের মত আপাতত ব্যর্থ হবে, ছিটকে পড়বে। টিকতে পারবে না। এখন যে যেটা পথ পছন্দ করে সে তো সেই দিকটাকেই সহি পথ বলবে!
    তবু মুলকথাটা হল, আসলে আমরা যে যেই রাজনীতিই কোন দেশে করতে চাই না কেন –  একেবারেই নতুন বা পুরানা ধারা – এসব কিছুর বাইরে  মূল ফ্যাক্টর হল উপস্থিত গ্লোবাল রাজনীতিতে ও শক্তিতে যারা ক্ষমতাবান থাকে তারা আপনাকে কী চোখে দেখবে! আমরা এটা উপেক্ষা করতে পারি না!
    তবু, তালিবানেরা শেষ পর্যন্ত কোন পথ বেছে নিবে সেটা দেখার অপেক্ষা করতে হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ৩১ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “তালেবান ইস্যু ও তিন মিটিং“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নেপালে প্রধানমন্ত্রীর অলি-যুগ সমাপ্ত

    নেপালে প্রধানমন্ত্রীর অলি-যুগ সমাপ্ত

    গৌতম দাস

    ২৬ জুলাই ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

    NC President Deuba meets with UML Chair Oliকে পি অলি ও শের বাহাদুর দিউবা। ছবি সংগৃহীত

    নেপালের প্রধানমন্ত্রী খড়গ প্রসাদ অলি [Khadga Prasad Sharma Oli] বা কে পি অলি  এখন থেকে ‘সাবেক’ প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলেন। দলের বিরুদ্ধে গিয়ে  বৈধ-অবৈধ সব ধরণের পথে  নিজের প্রধানমন্ত্রীত্ব ধরে রাখতে চেষ্টা করেও তিনি এবার একেবারে ব্যর্থ হলেন।  গত ২০১৮ সালের প্রথম নেপালি পার্লামেন্টের নির্বাচনে তিনি  এবারের ক্ষমতায় এসেছিলেন।  কিন্তু এবার তার ক্ষমতা চলে গেল সংসদের সিদ্ধান্ত বা তার নিজের পদত্যাগ ইত্যাদি এসবের কোনো কারণে নয়।  তিনি নিজেকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েই বসে ছিলেন। গত ১২ জুলাই ২০২১, নেপালি সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে তিনি পদচ্যুত হয়েছেন। আর সেই সাথে আদালত নেপালি কংগ্রেসের শের বাহাদুর দিউবাকে গত ১৩ জুলাই বিকাল ৫টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিতে বলেছিলেন। দিউবা শপথ নিয়েছেন। এতে দেড়-দুই বছর ধরে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা নেপাল ও এর সরকার, নেপালি রাজনৈতিক দলগুলো অলির বিরুদ্ধে নানান অসন্তোষ ও অভিযোগ এসব কিছুর অবসান ঘটল। এ সময়ে বারবার অলির বিরুদ্ধে নিজ দল ও বিরোধীদের অভিযোগ ও অসন্তোষ জেগে উঠলেও তিনি বরং যেকোনো উপায়ে বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে হলেও ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করে গেছেন। এ সময়ে তিনি  দু-দু’বার ‘সংসদ ভেঙে দেয়া হয়েছে’ বলে প্রেসিডেন্টকে দিয়ে ঘোষণা করিয়েছেন। কিন্তু দু’বারই আদালত এই সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে দিয়েছেন। তাই আদালতের রায়ে অবৈধ ও ক্ষমতাচ্যুত হয়ে যাওয়া অলি এখন রাজধানী ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে। আর এই প্রথম দিউবা সরকার আগামী নির্বাচনের (২০২৩) আগে টানা দেড় বছর আইনগতভাবেই স্থিতিশীল ক্ষমতায় শাসন চালাতে পারবেন বলে নেপালের রাজনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা আশা দেখছেন। কিন্তু কেন এমন হল? ২০১৮ সালে দুই কমিউনিস্ট পার্টি মিলে টু-থার্ড মেজরিটিতে ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু এখন নেপালি কংগ্রেসই কিছু কমিউনিস্টের সমর্থনে সরকার গড়তে সক্ষম হল কেন?

    এক নেপালি দৈনিক কাঠমান্ডু পোস্টে শ্যাম শ্রেষ্ঠ নামে এক কমেন্টেটর যিনি বাম রাজনীতির পরিবর্তনগুলোর দিকে চোখ রাখেন তিনি কে পি অলি সম্পর্কে মূল্যায়ন করে লিখেছেন, ” ২০১৮ সালের নির্বাচনের রায়ে যে ঐতিহাসিক সুযোগ তাদের হাতে এসেছিল, অলি ক্ষমতার যথেচ্ছ অপব্যবহার করে তাকে হেলায় হারিয়ে ফেললেন। কারণ অলি এক দাম্ভিক, অর্থহীন একগুঁয়ে আর ইগো বা অহংবোধে আচ্ছন্নব্যক্তিত্ব [“Oli squandered a historic opportunity handed to him by the people because of his arrogance, stubbornness and ego,” । বোঝা যাচ্ছে, যথেষ্ট শক্ত অবজারভেশন এবং সম্ভবত তা সবচেয়ে সঠিক!

    গত ১৯৯৬ সালের আগে থেকেই অলির পুরনো রাজনৈতিক দল এক ‘কমিউনিস্ট পার্টি’ বলে পরিচিত। এর নাম কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনাইটেড মার্কসবাদী-লেনিনবাদী, UML)।  আমাদের সিপিবির মত দল হলেও কিন্তু এটা আবার নেপালের সেকালের পরিবেশে মূলত সংসদীয় ভোটে দাঁড়ানো দল। তাও নেপালে রাজতন্ত্রের আমলের (২০০৮ সালের আগের ২৪০ বছরের রাজতন্ত্র) এমন ভোটে দাঁড়ানো দলগুলো হতো রাজার দিকে মুখ চাওয়া দল; যদি রাজা তার দলকে সরকার গঠন করতে ডাকেন বা মন্ত্রিসভায় নেন তবে, সেটা হত তাদের সাফল্য; অর্থাৎ নেপাল তখন নাগরিকের হাতে ক্ষমতার রাষ্ট্র নয়, রাজার মালিকানাধীন এক রাজতান্ত্রিক নেপাল। তাই তাতে ওই সব দলের নামে কমিউনিস্ট শব্দ থাকুক কিংবা কংগ্রেস দল হোক কী-ই-বা আর আসে-যায়। আসা-যাওয়ার কোনো কারণ নেই, এমনই ঠুটা দল ছিল সেগুলো।

    কিন্তু সেকালে নেপালের রাজার সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক-ভারসাম্য এমন থাকলেও তাতে ব্যাপক ফাটল ধরে ও পরিবর্তনের সূচনা করেছিল ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে। কারণ ঐ বছর থেকে আরেক কমিউনিস্ট দল যারা ‘মাওবাদী’ নামেই বেশি পরিচিত; আনুষ্ঠানিক নাম তাদের যাই হোক না কেন, তাদের নাম নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) বা কখনো এদের নাম ছিল নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী-কেন্দ্র)। একে অনেক নাম নিতে হয়েছিল, কারণ কোনো ছোট গ্রুপ মূল দলের ভেতর অঙ্গীভূত হলেই নামের একটু পরিবর্তন করা হয়েছে, এমন।

    এভাবে মূলত মাওবাদীরাই নেপালের রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন বা ভারসাম্যে পরিবর্তন এনেছিল। অথচ অন্য সবাই যেখানে আইনি রাজনৈতিক দল, মাওবাদীরা ছিল জন্ম থেকেই সশস্ত্র দল। শুধু তা-ই নয়, এরাই ১৯৯৬ সালে জন্ম নিয়ে দাবি তুলে ছিল যে, নেপালের রাজতন্ত্র উৎখাত করে একটি রিপাবলিক মানে “গণপ্রজাতান্ত্রিক নেপাল রাষ্ট্র” কায়েম করতে হবে। এই লক্ষ্য তারা শেষে ২০০৮ সালের জুনে অর্জন করেছিল। তাদের সব রাজনৈতিক দল মিলে জোট এক গণঅভ্যুত্থানে রাজাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল।  তারা নেপালে রাজতন্ত্র উৎখাত করে আর এতে একটি রিপাবলিক মানে গণপ্রজাতান্ত্রিক নেপাল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পথ খুলে যায়। তবে এরই মধ্যে রাজার আমলের পুরনো দলগুলোর সাথে মাওবাদীসহ সবাই ২০০৬ সাল থেকেই আইনি (প্রকাশ্য গণ-আন্দোলনের দল) দল হিসেবে নিজেদের যৌথ অবস্থান প্রকাশ করে নিয়েছিল। এর ভেতর দিয়েই মাওবাদী দলের প্রধান পুষ্পকমল দাহাল-ও ক্রমেই প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেন।

    কিন্তু তবু একটা ট্র্যাজিডি নেপালের রাজনীতিকে সবসময় অস্থির করে রেখেছে। তা হল আজ পর্যন্ত নেপালের রাষ্ট্র গড়ার কাজে যতটুকু অর্জন বা অগ্রগতি হয়েছে, এতে সবচেয়ে বড় অবদান মাওবাদীদের হলেও এই দলের নির্বাচনী ভাগ্য খুবই খারাপ। নেপালে ২০০৮ ও ২০১৩ সালে দু-দু’বার কনস্টিটিউশন প্রণয়নের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে হয়েছিল। কারণ, প্রথমবার ভারতের প্ররোচনায় ও প্রভাব হস্তক্ষেপে পড়ে প্রতিনিধি সভা নির্ধারিত সময়ে কনস্টিটিউশন প্রণয়নে ব্যর্থ হয়েছিল। তাই নেপালি সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তারা দ্বিতীয়বার কনস্টিটিউশন প্রণয়নের প্রতিনিধি নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ (২০১৩) পেয়েছিলেন। পরে ২০১৫ সালে কনস্টিটিউশন রচনা সমাপ্ত ও গৃহীত হওয়ার ঘোষণা দেয়ায় ভারত প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। পরে ২০১৮ সালেই নেপালের নতুন রিপাবলিকে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এসব নির্বাচনে কখনোই মাওবাদী দল একা সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ মানে পঞ্চাশ ভাগের বেশি আসন দখল করতে পারেনি। অথচ নেপাল এত দূর আসতে যত দেশী-বিদেশী বাধা নেপাল পার হয়েছে, তাতে দাহালের ভূমিকা সবার ওপরে, বিশেষ করে অন্য দলগুলোকে সাথে নিয়ে সঙ্কট মোকাবেলার মূল অর্গানাইজার হিসেবে দাহালই ভূমিকা রেখেছেন।

    যেমন রাজা উৎখাতের পরে ২০০৮ সালের প্রথম নির্বাচনে মাওবাদীরা জিতে ২৯.২৩ শতাংশ আসন, যদিও এটা মূল তিনটি দলের মধ্যে একক সর্বোচ্চ। অন্য দুই দল নেপালি কংগ্রেস পেয়েছিল ২১.১৪ শতাংশ আর অলির দল পেয়েছিল ২০.৩৩ শতাংশ; অর্থাৎ মোট ৬০০ আসনের (সেটা প্রতিনিধি সভা ছিল তাই মোট আসন ৬০০) মধ্যে টপ তিনটা দলের আসনসংখ্যা হিসাবে ফল যথাক্রমে মাওবাদী ২০০,  নেপালি কংগ্রেস ১১০ ও অলির দল ১০৩।

    অর্থাৎ নেপালের রাজনীতিতে ২০০৮ সাল থেকেই ভোটের ফলের এই ‘ত্রিভঙ্গ অবস্থা’ মানে, তিন দলের তিন ভাগে বিভক্ত ভোট, কেউই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (বা ৫০% এর বেশি আসন) পায় না  – এ্টা ২০০৮ সাল থেকে আজো একই অবস্থা বজায় থেকেছে; যদিও ২০১৩ সালের দ্বিতীয়বারের কনস্টিটিউশন সভার প্রতিনিধি নির্বাচনে সেবার নেপালের ভোটাররা মাওবাদীদের ওপর শুধু না, সামগ্রিক রাজনীতির ওপর প্রচণ্ড আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। এর প্রতিফলনে ফল হয়েছিল নেপাল কংগ্রেস ১৯৬, অলির দল ১৭৫ আর মাওবাদী হয়ে যায় মাত্র ৮০ আসন।

    নেপালি কংগ্রেস মানে হল ট্র্যাডিশিনাল ও বয়স্কদের দল; তুলনায় মাওবাদীরা তরুণ ও বিপ্লবীদের সমর্থক ভোটারদের দল; এভাবে হয়তো ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু ভারতের প্ররোচনায় প্রথমবারের প্রতিনিধি সভা নির্ধারিত সময়ে কনস্টিটিউশন প্রণয়নে ব্যর্থ হওয়ায় মানে রাজতন্ত্র ভেঙে দেয়ার পরও নিজ রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়ে নিতে ব্যর্থতা দেখে তারা প্রচণ্ড হতাশ হয়ে যায় তরুণেরা এরই প্রতিফলন ছিল ২০১৩ সালে ফল। কিন্তু তিন দলের কেউই যে একাই পঞ্চাশ ভাগের বেশি আসন পার হতে পারেনি, সেই ধারা ২০০৮ সালের মতো এখনো বজায় আছে।
    তবে সেবার অন্য একটি বড় ইতিবাচক দিক ছিল। তা হলো দাহালের উদ্যোগে ২০১৩ সালে এই তিন দল শপথ নেয় যে, একটা কনস্টিটিউশন প্রণয়নের কাজ শেষ করা অবধি তারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে; ভারতের দিকে তাকাবেও না; যোগাযোগ সম্পর্ক করবে না। এর ফলেই ভারতকে চরমভাবে পরাস্ত করে এই তিন দল (যারা একত্রে ৭৫ ভাগ আসনধারী) ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নেপালের কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সম্পন্ন ও গৃহীত হয়েছে বলে ঘোষণা দিতে সক্ষম হয়। এটা ছিল ভারতকে পালটা জবাব দেয়া বা প্রকাশ্য বিরোধিতা ও উপেক্ষা। কারণ নেপালের এই কনস্টিটিউশন প্রণয়ন কেমন হবে তা নিয়ে ভারত দাবি, শর্ত বা চাপ দিয়ে যাচ্ছিল। বিশেষ করে ভারতের সাথে নেপালের সমতলী সীমান্ত এলাকার ‘মাধোসি ও তরাই অঞ্চলের’ মুখপাত্র সাজতে চাইছিল ভারত।

    কিন্তু নেপালের কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সম্পন্ন ও গৃহীত হয়েছে বলে ঘোষণা ভারত ঠেকাতে না পেরে শেষে ল্যান্ডলকড নেপালে যেখানে বাইরের পণ্য প্রবেশ করতে গেলে ভারতের অনুমতি ও সহযোগিতা লাগে- এরই ফিজিক্যাল বাধা তৈরি করে ভারত। তারা স্থলবন্দর বন্ধ করে দেয়। ফলে জ্বালানি তেল বা রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারসহ যা ভারতের স্থলবন্দর দিয়ে সরবরাহ করতে চুক্তিবদ্ধ ছিল, সেসবের যেকোনো পণ্যবাহী ট্রাক অবরোধ করে রাখে ভারত।

    এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়ায় নেপালের রাজনীতিক সমাজে এক ব্যাপক পোলারাইজেশন ঘটে গিয়েছিল। দল নির্বিশেষে নেপালের নাগরিকমাত্রই ভারতবিরোধী হয়ে ওঠে। এমনকি নেপালি কংগ্রেসও যাকে সবচেয়ে ভারতঘেঁষা মনে করা হয়, সেও। বাস্তবে কথাটা এমন হয়ে যায় যে, কারো বাসায় রান্না হয়নি মূলত ভারতের কারণে। কারণ ভারতীয় গ্যাস বন্ধ। যেখানে নারীদের দুর্দশা সবার উপরে। কারণ পরিবেশ রক্ষার চাপে থেকে পাহাড়ের পাতা বা কাঠ টোকানি জ্বালানিতে রান্না তাদের বহু আগেই ত্যাগ করতে হয়েছিল। আর তারা অভ্যস্ত হয়েছিল ভারতীয় সিলিন্ডার গ্যাসে। অথচ তখনকার ভারতীয় অবরোধের দিনে চাইলেই আবার সে কাঠ টোকানি আর চুলার দিনে ফেরত যাওয়া খুবই কঠিন প্রায় অসম্ভব।

    এ দিকে সে সময় কনস্টিটিউশন চালুর পরে নেপালে তিন দলীয় বোঝাবুঝি অনুসারে, সরকার গড়ার পালা এসেছিল অলির দলের। তিনি ক্ষমতায় এসেই ভারতবিরোধী প্রবল সেন্টিমেন্ট সফল ব্যবহারকারী হয়ে ওঠেন আর এতে নিজের দলের সাংগঠনিক ভিত্তি বাড়িয়ে নেন। এই একটা ক্ষেত্রে অলি আনপ্যারালাল এ তিনি পাবলিক সেন্টিমেন্ট তৈরি বা সেতা কাজে লাগানো ভাল পারেন। তাই সেসময়  হয়ে ওঠেন ভারতবিরোধী জনতার কণ্ঠস্বর। আর তিন দলই সিদ্ধান্ত নেয় এই প্রথম চীনের সাথে নেপালের যোগাযোগ সম্পর্কের। কারণ অন্তত জ্বালানিসহ পণ্য আমদানির বিকল্প উৎস নেপালের লাগবেই।

    এভাবে ছয় মাস টানা অবরোধের পরে ভারত, ওদিকে চীনের আগমন মানে যোগাযোগ সম্পর্কে টের পেয়ে অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু তত দিনে চীন নেপালে প্রবেশ সম্পন্ন করে ফেলেছিল। তখন থেকেই এক নতুন নেপাল : এখান থেকেই নেপাল একেবারেই বদলে যায়; যাকে বলা যায় নেপালের একেবারেই ভারতের হাতের বাইরে চলে যাওয়া। আর বিপরীতে চীনের প্রভাব দ্রুত বেড়েই চলে, অথচ ভারত নিজের পায়ে কুড়াল না মারলে এমন হতো না।  আর এতে চীন শুধু পণ্য সাপ্লাইয়ের বিকল্প প্রধান উৎসই নয়। এমনকি বিভিন্ন অবকাঠামোর বিনিয়োগদাতা অবশ্যই। চীনের নিজের সড়ক হাইওয়ে বা হাইস্পিড ট্রেন লাইনের সাথে (কাঠমান্ডু পর্যন্ত) প্রায় শত কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণ ও নতুন রেল পেতে দিয়ে নেপালকেও চীনের নিজের অবকাঠামোর সুবিধার হাত বাড়িয়ে দেয়। এখানেই শেষ নয়।

    তত দিনে চীন নেপালের ক্ষমতাসীন ও বাইরের দুই কমিউনিস্টদের বন্ধু হয়ে উঠেছিল। তাই কনস্টিটিউশন চালু হওয়ার পরের ২০১৮ সালের প্রথম  সংসদীয় নির্বাচন লড়তে দুই কমিউনিস্ট দল একদল হয়ে গিয়ে লড়ুক,  তাদেরকে এ’পরামর্শ দিয়েছিল চীন। আপাত সেই ফল হয় সকলের জন্য যাকে বলে “বলতি বন্ধ” মানে বিরোধী সকলেই আর নিজের কোন সম্ভাবনা নাই যেন তা ধরে নিয়েছিল। যৌথ দু’দল দু-তৃতীয়াংশ আসনে ঐ নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল। দল দুটো এক হওয়ার প্রক্রিয়ার শুরু ঘোষণা দিয়ে (আইনগতভাবে একদল না হয়েই) ওই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ফলে আইনত ওটা নির্বাচনী জোটের বিজয় ছিল। দাহাল ও অলির দল দুটোর [UML-CPN] বছর খানেকের মধ্যে এক দল হয়ে যায়। ততদিনে তাদের সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে কেপি অলি আগের মতই নতুন সরকারেরও প্রধানমন্ত্রীই থেকে যান। তবে কথা ছিল পুরানা দুই অংশের প্রধানেরা একজন দলীয় সভাপতি হলে অন্যজন প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু অলি সেটা কখনোই বাস্তবায়ন করতে রাজি হননি, নানা অজুহাতে।

    এ ব্যাপারে অলির ট্র্যাক রেকর্ড খুবই খারাপ। তিনি কারো সাথে চলা, ক্ষমতা শেয়ার করা, সিদ্ধান্ত শেয়ার ইত্যাদি এসব কোনো কিছু করতেই অভ্যস্ত বা আগ্রহী নন। তাই বিরোধ বাড়তে থাকে। তবে এসবের জন্য অলিই যে মুখ্যত দায়ী এর এক বিরাট প্রমাণ আছে।  দুইদল এক হয়ে চলতে শুরু করায় দেখা গেল যারা অলির অংশের অলি ছাড়া অন্যান্য নেতা ছিল তাঁরা খুবই সহজে অপর অংশ মানে দাহালের অনুসারিদের সাথে মিলে দাহালের সাথে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তুলে। আসলে এরা যখন অলির সাথে এক দলে ছিল তখন থেকে এরা অলির একচেটিয়া নেতাগিরিতে চরম বিক্ষুব্ধ ছিল। একারণে মাধব কুমার নেপাল, ঝালানাথ খানাল, বামদেব গৌতম, নারায়ন কাজি শ্রেষ্ঠ প্রমুখ নেতারা (এরা দুই পক্ষের নেতা হলেও) এখন মিলে মিশে দাহালের অনুসারি হয়ে আছেন। আর বিপরীতে অলি এখন একা। অথচ যেমন এই মাধব কুমার নেপাল ছিলেন অলির অংশে দলের ১৫ বছরের সাধারণ সম্পাদক, দুবছরের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু অলির স্বভাব হল তার একার সিদ্ধান্ত সবাইকে মানতে বাধ্য করা। ফলে কোন দলীয় ফোরাম, সেখানে আলোচনা ইত্যাদি যেন তার অভিধানে নাই।

    কিন্তু  একদিকে দলের ভিতর সংঘাত যতই বাড়ছিল ততই চীনের পরামর্শও জোরদার হচ্ছিল  যেন কোনো সঙ্ঘাত বা বিরোধ না করতে। এজন্য দাহালেরা দুবার অলিওকে প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে সবাবার উদ্যোগ  নিয়েও পিছিয়ে এসেছিলেন। আসলে চীন উদ্বিগ্ন ছিল অলি দলে একঘরে হয়ে দল ভেঙ্গে গেলে কী হবে কেবল সেদিকে।  অথচ কেউই যে তার সাথে দল করতে  বা দলে থাকতে পারবে বা এদিকটাকে খাটো করে দেখছিল।  অর্থাৎ শুরু থেকেই এটাই ছিল বিরাট সমস্যা। ফলে বড় জোড় দুই দল মিলে একটা জোট করতে পারত হয়ত যেটা অবস্থা বুঝে যারা একদল হতে চায় তারা অবস্থা ভাল বুঝলে যেন তা হতে পারে এজন্য অপেক্ষা করতে পারত।

    খুব সম্ভবত চীনের অনুমিত কমিউনিস্ট পার্টি বলতে  নিজের অভিজ্ঞতা, আর সেটা দিয়ে নেপালের কমিউনিস্ট পার্টিকে চাওয়া থাকতে পারে। তাই এখন যা হল, সেটা চীনের পরামর্শে ২০১৮ সালের বিজয়ের পরে শুরু হওয়া বিরোধটাকে টেনে আজ প্রায় তৃতীয় বছরে টেনে শেষ করা হল। তবে এত লম্বা টানাটানি যে অর্থহীন ছিল তা হয়তো চীন এখন স্বীকার করবে। আর তা ছাড়া নেপালে দুই কমিউনিস্ট দলের এক না হতে পারার বিরোধে চীনের সংশ্লিষ্টতা (চীনের দলের লোক এসে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে অথবা চীনা রাষ্ট্রদুত নেপালের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে খারাপ দেখায় এমন দীর্ঘ সময় বৈঠক করেছে কারণ, প্রেসিডেন্ট অলির দলের অনুসারি, এসব ঘটছিল) বিরাট দৃষ্টিকটুভাবে হাজির হতে শুরু করেছিল, যা চীনের পক্ষে যায়নি।

    সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী অলি নিজ দলকে (তত দিনে তা এক দল) অমান্য করেই বেপরোয়া হয়ে এককভাবে ক্ষমতায় ছিলেন,  [His unilateral style of running] । কিন্তু একা সব সিদ্ধান্তে চলা ব্যক্তিত্ব অলির সাথে থাকা তার দলের লোকজন তত দিনে তাকে ছেড়ে দাহালের পক্ষে চলে যায়। একপর্যায়ে অলি নিজের ক্ষমতার বিপদ বুঝে এবার এতদিনের প্রবল ভারতবিরোধী অলি ভারতের দ্বারস্থ হন। ভারতের ‘র’-এর প্রধানকে প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে দাওয়াত করে এনে সারা দিন মিটিং করেন। উদ্দেশ্য ছিল, নেপালি কংগ্রেসের সমর্থনে নতুন সরকার গড়া। কিন্তু তত দিনে কংগ্রেস দলের ভেতরেও উপদল থাকায় তা তত জমে ওঠেনি। বরং কমিউনিস্টদের যে অংশ নেপালি কংগ্রেসকে সমর্থন করবে, তাদের সাথেই তারা সরকার গঠন করবে সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল। কিন্তু বহু সংসদ সদস্য কেনাবেচা, এমনকি  অধ্যাদেশ জারি করে কনস্টিটিউশন বদলে নিজেকে প্রধানমন্ত্রী রাখার চেষ্টা- এসব কিছুর শেষে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট অলির এসব তৎপরতাকে অবৈধ বলে ঘোষণা দেয়ার পর এবার নেপালি কংগ্রেসের শের বাহাদুর দিউবা গত ১৩ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণের পথ খুলে যায় এবং তিনি এখন নেপালের প্রধানমন্ত্রী।

    অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে কে পি অলির রাজনৈতিক জীবন এরপর আর কোন গুরুত্ব কিছু থাকবে না। এদিকে জোর করে রাজনৈতিক ঐক্য হবে না; টিকবে না। তাতে সেটা আপনার জন্য যত দরকারিই অনুভব হোক না কেন! নেপালে কমিউনিস্ট দলদুটোর ঐক্যে থাকার পক্ষে চীনের অতিরিক্ত আগ্রহ দেখিয়ে ফেলা যে অপ্রয়োজনীয় ছিল, অনুমান করি চীন তা এখন অনুভব করবে ও শিক্ষা নেবে। দুনিয়ায় কারো জন্য কোন কিছু ঠেকে থাকে না। অলির জন্যও নয়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২৪ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “নেপালে প্রধানমন্ত্রী অলির যুগ শেষ“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • হুমায়ূন, রাজনীতি ও ‘মানবিক সম্পর্ক’

    হুমায়ূন, রাজনীতি ও ‘মানবিক সম্পর্ক’

    গৌতম দাস
    Sunday 29 July 2012
    আজ আবার প্রকাশের তারিখ ২১ জুলাই ২০২১

     

    “আমার কাছে মানবিক সম্পর্ক রাজনীতির চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় বলে মনে হয়” – হুমায়ুন আহমেদ

     

    [নতুন নোটঃ এই লেখাটা লেখা হয়েছিল হুমায়ন আহমেদের মৃত্যুর ১০ দিন পরে ২৯ জুলাই ২০১২ সালে। সন্ধ্যায় একটা আলোচনা সভায় আমার বক্তব্যের পরে সেই রাতেই এ’লেখা লিখেছিলাম।  সেটাই এখানে আবার আজ হবহু ছাপানো হল। ফলে এটা সেই ২০১২ সালের মানে নয়বছর আগের লেখা হিসাবে পড়লেই ভাল হবে।]

    হুমায়ূন ‘জনপ্রিয়’। কিন্তু এই জনপ্রিয়তাটা কিভাবে ব্যাখ্যা করব? জনপ্রিয়তার সুবিধাটা হুমায়ূনের পুঁজি হতে পেরেছে। তাকে নিয়ে বই ও মিডিয়া ব্যবসায়ী ব্যবসা করে গেছে; হুমায়ূনের মৃত্যুর ফলে মৃত হুমায়ূন নিয়েও আরও ব্যবসায়িক ফায়দা তোলার সুযোগ তৈরী হয়েছে। তার জন্য ব্যবসায়ীরা আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেটা শুরুও হয়ে গিয়েছে। হুমায়ূন কর্কট বা ক্যান্সার রোগে মারা গেছেন। ক্যান্সারে মারা যাবার কারনে যে মানবিক সহানুভূতি তৈরী হয় সেটাও ব্যবসার কাজে লাগবে। বাজার এইভাবেই কাজ করে।

    আবার এই জনপ্রিয়তা রাজনৈতিক পুঁজিও বটে।  তরুন ও মধ্যবিত্তের মধ্যে হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা এবং প্রভাবকে অতএব রাজনৈতিক পুঁজি করার  চেষ্টা চলবে তাতেও অবাক হবার কিছ্ব নাই। তার প্রবল চেষ্টা ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। এই রাজনীতির দুইটা ধারা আছে। একটা ধারা মুক্তিযুদ্ধ বেচাবিক্রি করে টিকে থাকতে চেষ্টা করেঃ বাঙালী জাতীয়তাবাদীর দলবাজি ধারা। অপরটা সুশীল ধারা। সুশীল রাজনীতিও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিশাবেই নিজেদের হাজির করে কারণ বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্যেকুলারিজমের পিঠে চড়ার আরাম আছে। এতে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বৃহৎ শক্তির স্থানীয় বরকন্দাজ হয়ে কাজ করতে সুবিধা। তাছাড়া দলবাজ জাতীয়তাবাদকে দেশের কথা বলতে হয়, জনগণের কাছে দেশের প্রতি আনুগত্য আছে কি নাই তার পরীক্ষা দিতে হয়। সুশীল রাজনীতির সেটা দরকার নাই। তাকে রক্ষা করতে হয় কর্পোরেট স্বার্থ। দেশ নয়, তার কাজ হচ্ছে পরদেশের স্বার্থ হাসিল করা। জনগণের কাছে রাজনৈতিক দলের জবাবদিহিতার জায়গা থাকলেও সুশীলদের নাই। হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর খেয়োখেয়ির বাইরে মধ্যবিত্তের উপর যে প্রভাব তৈরি করে আছে তাকে তারা সবসময়ই ব্যবহার করে এসেছে। এখন আরও জোরেসোরেই করবে।  মধ্যবিত্তকে হিলারির গ্লোবাল সুশীল প্রজেক্টের “স্মার্ট পাওয়ার এপ্রোচের” অধীনে এনে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির সাথে মিলিয়ে দেওয়া তাদের এখনকার রাজনৈতিক কাজ। নতুন ক্লাস এলায়েন্সে নতুন করে ১/১১ ধরনের রাজনীতির এক কুশন তৈরি করার প্রক্রিয়া জারি রয়েছে। হুমায়ূন তরুনদের কাছে জনপ্রিয়, কিন্তু এটাও ঠিক তাদের জন্য কোন রাজনীতি তৈরী করতে পারে না হূমায়ূন। অর্থাৎ সমাজ, রাজনীতি, রাষ্ট্র, বর্তমান দুনিয়া, এখনকার সংকট ইত্যাদি কোন বিষয়ে নিবিষ্ট ভাবে ভাববার কোন তাগিদ বা  প্রেরণা হূমায়ূন তৈরী করে না। সাহিত্য ও শিল্পকলাকে এই কাজ করতে হবে সেই দাবি আমরা করছি না। কেন হুমায়ূন সুশীল সমাজের জন্য মূল্যবান সেটা বোঝা দরকার। অন্যদিকে হুমায়ূন মোটা দাগে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বাইরে্র কেউ নয়। সুশীলদের জন্য হুমায়ূন খুবই মূল্যবান জিনিস। ফলে তাদের পত্রপত্রিকায় টেলিভিশনে জনপ্রিয়তাকে আরও হাওয়া দিয়ে ফুলিয়ে হুমায়ূনকে অতিমানব করে তোলার অক্লান্ত চেষ্টা থাকবে এটাই স্বাভাবিক।  এই চেষ্টা প্রবল ভাবেই জারি থাকবে, চলে যাবে না। এই দুই ধারার মিলের দিকটা হলো, হুমায়নের জনপ্রিয়তার বিষয়টা তাদের কাছে বুঝাবুঝির চেষ্টা বা  তার কাজ নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলার বিষয় নয় বরং হুমায়ূনকে সামনে রেখে মধ্যবিত্ত তরুণদের ওপর প্রভাব জারি রাখার প্রতিযোগিতা করছে তারা। একটি ধারা চাইছে তরুণদের ওপর তাদের দলীয় প্রভাবের বিস্তৃতি ঘটুক, অন্য ধারা চাইছে বাংলাদেশে বিরাজনীতিকরণের প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করার ক্ষেত্রে তরুণদের কাছে হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা কাজে লাগুক।


    হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর খেয়োখেয়ির বাইরে মধ্যবিত্তের উপর যে প্রভাব তৈরি করে আছে তাকে  সুশীল সমাজ সবসময়ই ব্যবহার করে এসেছে। এখন আরও জোরেসোরেই করবে।  মধ্যবিত্তকে হিলারির গ্লোবাল সুশীল প্রজেক্টের “স্মার্ট পাওয়ার এপ্রোচের” অধীনে এনে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির সাথে মিলিয়ে দেওয়া তাদের এখনকার রাজনৈতিক কাজ। নতুন ক্লাস এলায়েন্সে নতুন করে ১/১১ ধরনের রাজনীতির এক কুশন তৈরি করার প্রক্রিয়া জারি রয়েছে।


    এর বাইরে হুমায়ূনকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করবার একটা করুণ চেষ্টা বিএনপিপন্থীদের মধ্যেও লক্ষ্য করা গেছে। হুমায়ূন বিএনপি ক্ষমতাসীন থাকার সময় উপকৃত হয়েছেন সন্দেহ নাই। তিনি ‘আগুনের পরশমনি’ ছবিটি বানাতে গিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার প্রত্যক্ষ আনুকুল্য পেয়েছিলেন। কিন্তু ২০১০ সালে ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করবার যে অভিযোগ মহাজোট সরকারের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া তুলেছিলেন হুমায়ূন তাকে আক্ষরিক অর্থে ধরে নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন। আর, মৃত্যুর আগে ‘দেয়াল’ উপন্যাস লিখে তিনি দলবাজির যে-কাতারে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন সেটা বিএনপির বিরুদ্ধে। আমাদের আলোচনার জন্য এইসব প্রাসঙ্গিক নয় বলে এখন সেদিকে সময়ক্ষেপ কবার দরকার নাই।

    বরং প্রশ্ন হচ্ছে, যারা বাংলাদেশে  নিজেদের রাজনীতি সচেতন, প্রগতিশীল বা কমিউনিস্ট মনে করেন তারা হুমায়ূনকে কিভাবে দেখে এসেছেন? হুমায়ূন আহমেদের বিরুদ্ধে এদের অনেক অভিযোগের একটা হচ্ছে তিনি ‘হাল্কা’ লেখেন। এই অভিযোগটা কম করে হলেও ত্রিশ বছরের পুরানো। হুমায়ূন সাহিত্যিক হয়ে উঠবার কালে পুরা আশির দশক জুড়েই এই অভিযোগ চলেছিল। এই অভিযোগকে অন্তত এখনকার মত  পরাজিত বলা যায়। এদের অভিযোগ পাশে ফেলে মাড়িয়ে উপর দিয়ে হেঁটে নিজের সাহিত্যিক-উপন্যাসিক পরিচয়টা তিনি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন সেকালেই। আমরা মানি না মানি তখন থেকেই তিনি সাহিত্যিক-উপন্যাসিক;এটা ফ্যাক্টস। নব্বই দশকের শুরুতে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় এক মেন ষ্টোরি ছিল – শাহরিয়ার কবিরের নেয়া হুমায়ূন আহমেদের এক সুদীর্ঘ সাক্ষাতকার। পরে সেটা আলাদা বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে, বাজারে পাওয়াও যায় বলে জানি। বিচিত্রার  মুল কপি আমি এখন হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু ঐ বইয়ের ভুমিকার প্রথম বাক্যে শাহরিয়ার কবির লিখছেন, “হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হিসাবে সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রচ্ছদে এসেছিলেন সাত মাস আগে”। আর শাহরিয়ার এই ভুমিকা লিখে নীচে তারিখ লিখেছেন ১০ ফেব্রুয়ারী ১৯৯২। তার মানে বিচিত্রায় হুমায়ন ঐ প্রচ্ছদ সাক্ষাতকার হয়েছিলেন ১৯৯১ সালের আগষ্টের কোন এক সংখ্যায়। ঐ ভুমিকায় শাহরিয়ারের আরেকটি মন্তব্য-বাক্য হলো, “নিজেকে তিনি অঙ্গিকারবদ্ধ লেখক না বললেও মানুষের প্রতি গভীর মমতা তাঁর যেকোন লেখায় গভীরভাবে প্রকাশিত”। শাহরিয়ারের এই কথন থেকে বুঝা যায় যেসব কমিউনিস্ট আকাঙ্খা থেকে অভিযোগ সে আমলে উঠেছিল তা ততদিনে হুমায়ন আহমেদ পরাস্ত করতে পেরেছিলেন। তাই শাহরিয়ার তাকে “সবচেয়ে জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক” মানছেন আর কমিউনিস্ট প্রশ্ন বা বিচারবোধ থেকে তোলা ‘অঙ্গিকারবদ্ধতা” সংক্রান্ত প্রশ্নে একটা ফয়সালা নিজেই করে নিচ্ছেন। বলছেন, হুমায়ূনের লেখায় “মানুষের প্রতি গভীর মমতা” প্রকাশিত। ফলে আমরা বলতে পারি সেকালেই এসব অভিযোগকে হুমায়ূন ঠেলে ফেলে নিজের সাহিত্যিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। যদিও তাঁর মৃত্যুর পর অভিযোগটা আবার কোথাও কোথাও উঁকি মারতে দেখা যাচ্ছে।

    সত্তর-আশির দশকে সৈয়দ হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী (অথবা ওপার বাংলার মহাশ্বেতা দেবী) এদের মত উপন্যাসিকদের প্রবল প্রভাব প্রতিপত্তির মধ্যে বাংলাদেশের সাহিত্যের দিন কাটছিল। চিন্তার দিক থেকে এরা সকলেই ছিলেন কমিউনিস্ট ওরিয়েন্টেশনের লেখক। অন্যভাবে বললে, সাহিত্য-উপন্যাস কেমন হবে,কেমন হওয়া উচিত সে সম্পর্কে একটা পূর্ব নির্ধারিত কাঠামো কাজ করেছে তাদের প্রায় সকল লেখায়।  লেখার অভিমুখ ও গতিমুখ কমিউনিস্ট চিন্তার হেজমনিতে নির্ধারিত ছিল। সাহিত্যিক-উপন্যাসিকদের ঠিক কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য হতে হবে তা না, তবে কমিউনিষ্টদের সাথে ওঠাবসা, বন্ধুত্ব হওয়া  বা সোজাকথায় কমিউনিস্ট চিন্তার প্রভাব পরিমণ্ডলে থেকে চিন্তা করতে শেখা এবং সেই সাথে নিজের সাহিত্যিক গুণ-মন-ক্ষমতাটা কমিউনিষ্ট করে নিতে না পারলে সেকালে সাহিত্যিক-উপন্যাসিক হওয়া, স্বীকৃতি  জুটানো এককথায় অসম্ভব ছিল – ঐ যুগে। এটা শুধু সাহিত্যিক-উপন্যাসিক না, শিল্পের যে কোন ক্রিয়েটিভ জগতের কাজের বেলায় একথা সত্য ছিল। কমিউনিস্ট ওরিয়েন্টেশনের বাইরে থেকে যারাই শিল্প-সংস্কৃতি চর্চা করতে গিয়েছিল তারা কতল হয়ে গেছিল, কেউ নিস্তার পায়নি। এদের বিরুদ্ধে সমালোচনা করে, অভিযোগ তুলে কমিউনিস্টরা তাদের উত্থান রহিত করে দেবার ক্ষমতা রাখত। কমিউনিস্টদের দিক থেকে সবচেয়ে কমন যে অভিযোগগুলো তোলা হত তা ছিল – হাল্কা লেখা, গভীরতা নাই, জীবন ঘনিষ্ঠ নয়, মধ্যবিত্তের লেখক, সোশাল কমিটমেন্ট বা অঙ্গিকার নাই, মানুষকে সংগ্রাম করতে শেখায় না, কোন আদর্শ নাই, চরিত্রগুলো বাস্তব না ইত্যাদি। তো এরকমের এক পরিস্থিতির মধ্যে হুমায়ূন আহমেদের আবির্ভাব ঘটেছিল।

    এই যে ছকবাঁধা কিছু পূর্বানুমান মাথায় নিয়ে সাহিত্য বিচারের মানদণ্ড তাকে আমরা আদৌ ‘কমিউনিস্ট’ বলব কিনা তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। মার্কস, এমনকি লেনিনেরও সাহিত্য বিচারের পদ্ধতির সঙ্গে এই ধরনের ছককাটা ধারণার বিবাদ আছে। তবে ‘প্রগতিশীল’ সাহিত্য বিচারের মানদণ্ড হিশাবে বাংলাদেশে কমবেশী যা বদ্ধমূল হয়ে হাজির ছিল তার মধ্যেই হুমায়ূনকে নিজের জায়গা করে নিতে হয়েছে।


    ছকবাঁধা কিছু পূর্বানুমান মাথায় নিয়ে সাহিত্য বিচারের মানদণ্ড তাকে আমরা আদৌ ‘কমিউনিস্ট’ বলব কিনা তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। মার্কস, এমনকি লেনিনেরও সাহিত্য বিচারের পদ্ধতির সঙ্গে এই ধরনের ছককাটা ধারণার বিবাদ আছে। তবে ‘প্রগতিশীল’ সাহিত্য বিচারের মানদণ্ড হিশাবে বাংলাদেশে কমবেশী যা বদ্ধমূল হয়ে হাজির ছিল তার মধ্যেই হুমায়ূনকে নিজের জায়গা করে নিতে হয়েছে।


    অর্থাৎ হমায়ূন এই ছকবাঁধা সাহিত্যের ধারণাকে পরাজিত করতে পেরেছিলেন। হুমায়ূনের আগে হুমায়ূনের  মত যাদের চিন্তার কমিউনিস্ট ওরিয়েন্টেশন ঘটে নাই, ছিল না, যারা বশ্যতা মানে নাই – তাদের সবাইকে সাহিত্যে গৌণ জ্ঞান করা –সদর্পে তাদের সব সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনাশ করে দেওয়া অসম্ভব ছিল না; কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব হয় নি। ‘নন্দিত নরকে’ হুমায়ূনের প্রথম উপন্যাস হলেও প্রকাশের শুরুতে এটা তেমন খ্যাতি লাভ করে নি। পাঠকদের চোখ পড়ে নি। সাহিত্য আলোচনায় আসেনি। অনেকটা এরকম যে অনেকেই একটা উপন্যাস লিখেছেন, এটাও তেমন।  পরে সেইসব হারিয়ে গেছে বা চাপা পড়ে গেছে, এরও এই দশা ঘটবে – ‘নন্দিত নরক’ উপন্যাস এর বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায় নি।  কিন্তু পর পর কয়েক বছর বইমেলায় হুমায়নের নতুন উপন্যাস আসা বুঝিয়ে দিল, হুমায়ূন লিখতে এসেছেন। বই প্রকাশও আগের চেয়েও আরও চালু ও লাভজনক ব্যবসা হয়ে উঠতে শুরু করে হুমায়ূনের হাত ধরেই।

    ভাল বিক্রি হওয়া বা সাধারণ পাঠকদের মন জয় করাকেই  সাহিত্যের প্রধান গুণ আকারে স্বীকার না করার পেছনে নানান সাহিত্যিক ও নান্দনিক যুক্তি থাকতেই পারে। এমন কি সেটা আদৌ কোন সাহিত্যিক গুণ কিনা তা নিয়েও বিস্তর কথা খরচ হতে পারে। কিন্তু ভাল সাহিত্য মানে বাজার না পাওয়া অর্থাৎ পাঠক না পাওয়া, তার কোন যুক্তি নাই। থাকতেও পারে না। বাজার ব্যবস্থায় বইয়ের বিপণন কিভাবে সাহিত্য ও সাহিত্যিককে বদলায়, কিভাবে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা সাহিত্যের আঙ্গিক ও মর্মবস্তুর মধ্যে মৌলিক রূপান্তর ঘটায় ও নিরন্তর ঘটাতে থাক্‌ সেই সবের বিচার ও বিশ্লেষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু জনপ্রিয় সাহিত্য  সাহিত্যের মানদণ্ডের বিচারে সর্বদাই নিম্ন মানের হবে এই বদ্ধমূল ধারণার কোন ভিত্তি নাই। জনপ্রিয় লেখা বাজারের মন জুগিয়ে তৈয়ার হয়, ঠিক, কিন্তু বাজার কোন বিমূর্ত ব্যপার নয়। জনপ্রিয় হওয়া মানে একই সঙ্গে ভোক্তা বা পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া। পাঠকের কোন না কোন চাহিদা মেটানো, পাঠকের কাছে পৌঁছানো। সে চাহিদা সাহিত্যের নাকি অন্য কিছুর তার বিচারের দরকার আছে। কিন্তু সেটা সাহিত্যের চাহিদা মেটায় না সেটা ঢালাও ভাবে দাবি করা কঠিন।

    পাঠক তৈরীর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে বাজার। কিন্তু সাহিত্য নিজেও নিজের শক্তি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে পাঠক তৈরীর প্রক্রিয়া জারি রাখে। বাজার ব্যবস্থার মধ্যে সাহিত্য তার নিজের গুণে কিভাবে পাঠক তৈরী করে এবং ওর মধ্য দিয়ে সাহিত্য কিভাবে নিজের জগৎ তৈরী করতে সফল বা ব্যর্থ হয় সেই সব দিকে নজর রাখা জরুরী।  হুমায়ূন সেই দিকে আমাদের নজর ফেরাতে বাধ্য করে। হুমায়ূনের বই ভাল বিক্রি হওয়ার অর্থ পাঠকদের সঙ্গে হুমায়ূন একটা সম্পর্ক তৈরী করেছে তারই জানান  দেওয়া। সাহিত্য সম্পর্কে ছক বাঁধা সমালোচনা এড়িয়ে সরাসরি পাঠকের সাথে হুমায়ূনের সম্পর্ক ঘটে গিয়েছিল। যখন পত্রিকার সাহিত্যের পাতায় এই সম্পর্ক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে যায় তখন হুমায়নের বিরুদ্ধে ছক বাঁধা সমালোচনাগুলোও সরব হতে থাকে।এক পর্যায়ে হুমায়ন আর সাহিত্য পাতার সাংবাদিকের সাথে কোন কথা বলা বা সাক্ষাতকার দিতেন না। একেবারে দায়ে পড়ে গেলে তিনি অভিযোগ পাশ কাটানোর জন্য অভিযোগ মেনে নিতেন। যেমন বলতেন, হ্যাঁ, আমি মধ্যবিত্তের লেখক, এই জীবনটাই আমার দেখা জানা আছে, তো আর কি করব সেটাই লিখি – এমন। এইসব প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে মনযোগ দিয়ে নিজেকে লেখায় তুলে ধরা আর পাঠকের সাথে, বিশেষত অল্প পড়া সাহিত্যে নবীন তরুণ পাঠকদের সঙ্গে, সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তোলা ছিল তাঁর কৌশল বা লড়াইয়ের পথ। হুমায়ূনের উপন্যাসের খ্যাতি,কিম্বা সাহিত্য সম্পর্কে ছক বাঁধা ওরিয়েন্টেশন বাইরে থেকেও গ্রহণযোগ্যতা পাবার ফলে হুমায়ূনের সামাজিক স্বীকৃতি অনেকের জন্যই বিড়ম্বনার কারন হয়ে উঠল। বিশেষত যারা নিজেদের উন্নাসিক নন্দনতত্ত্বের উঁচুতলা থেকে কিম্বা প্রগতিশীল বা কমিউনিস্ট নীতিনৈতিকতা রক্ষার দায়ে হুমায়ূনকে গ্রহন করতে পারছিলেন না । এই দিক থেকে শাহরিয়ার কবিরের সাক্ষাতকারকে এদের পক্ষ থেকে সর্বশেষ কামড় বলতে পারি আমরা। জনপ্রিয় সাহিত্যবিরোধী উঁচু মানের সাহিত্যওয়ালা কিম্বা কমিউনিস্ট নীতিবাদীদের তরফে  শাহরিয়ার কবির ছিলেন অভিযোগকর্তা বা প্রশ্নকর্তা। ঐ সাক্ষাতকারটা বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসের জন্য এই দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদের আবির্ভাব এক ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্ট যিনি নিজে চিন্তায় কমিউনিস্ট বা বামপন্থী নন, ওরিয়েন্টেশন তার নাই। সামাজিক স্বীকৃতির জন্য কারও কাছে তাকে আনুগত্য স্বীকার করতে হয় নি। ছক বাঁধা সাহিত্য বিচারের বৃত্ত স্রেফ জনপ্রিয়তা দিয়ে ভেঙ্গে নিজের জন্য সাহিত্যিক হিশাবে সামাজিক স্বীকৃতি আদায় করে টিকে গিয়েছিলেন।

    মহৎ সাহিত্যের স্বাদ নেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাঠক সমাজ উপযুক্ত কিনা সেই কূটতর্ক করা যেতে পারে। তবে বলে রাখা দরকার প্রগতিশীল সাহিত্য সংক্রান্ত ছকবাঁধা বৃত্ত যে হুমায়ূনই প্রথম ভেঙ্গেছিলেন তা নয়, বরং আরও গভীর অর্থে ভাঙচুর করেছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। কিন্তু ইলিয়াস চিন্তা চেতনায় তো বটেই, তার সাহিত্য জীবনের শুরু থেকেই বামপন্থীদের কুক্ষিগত হয়ে রয়েছেন, এখনও একটা সামাজিক-রাজনৈতিক বৃত্তের মধ্যে তাকে আটকে রাখার চেষ্টা রয়েছে। তাছাড়া ইলিয়াসের সাহিত্য কর্মের স্বাদ নেবার জন্য পাঠকের একটি সাহিত্যিক প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। ফলে বাংলাদেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার কারনে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও অর্জন সম্পর্কে অনভিজ্ঞ তরুন পাঠকদের মন ইলিয়াসের পক্ষে জয় করা সম্ভব ছিল না।   তুলনায় হুমায়ূন সম্পর্কে এককথায় বললে বলা যায় হুমায়ূন  রাজনৈতিক নন বা রাজনীতি বুঝনেওয়ালা লোকও হতে যান নি,নিজের কাজের রাজনৈতিক-দার্শনিক তাৎপর্য বোঝাকে তিনি তার দায় বা কর্তব্য হিসাবে নেননি। কেবল উপন্যাসিক বা শিল্পকলার লোক হিসাবেই থাকতে চেয়েছিলেন এবং শেষ অবধি তাই ছিলেন।


    হুমায়ূনের উপন্যাসের খ্যাতি,কিম্বা সাহিত্য সম্পর্কে ছক বাঁধা ওরিয়েন্টেশন বাইরে থেকেও গ্রহণযোগ্যতা পাবার ফলে হুমায়ূনের সামাজিক স্বীকৃতি অনেকের জন্যই বিড়ম্বনার কারন হয়ে উঠল। বিশেষত যারা নিজেদের উন্নাসিক নন্দনতত্ত্বের উঁচুতলা থেকে কিম্বা প্রগতিশীল বা কমিউনিস্ট নীতিনৈতিকতা রক্ষার দায়ে হুমায়ূনকে গ্রহন করতে পারছিলেন না । এই দিক থেকে শাহরিয়ার কবিরের সাক্ষাতকারকে এদের পক্ষ থেকে সর্বশেষ কামড় বলতে পারি আমরা। জনপ্রিয় সাহিত্যবিরোধী উঁচু মানের সাহিত্যওয়ালা কিম্বা কমিউনিস্ট নীতিবাদীদের তরফে  শাহরিয়ার কবির ছিলেন অভিযোগকর্তা বা প্রশ্নকর্তা।


    দার্শনিক-রাজনৈতিক বিষয়াবিষয়ের প্রতি হুমায়ূনের  মনোভাব বোঝার জন্য সম্প্রতি প্রকাশিত তার এক পুরানা এক সাক্ষাতকার বা কথোপকথনের আশ্রয় নেব।  প্রকাশিত এই লেখা থেকে আমরা জেনেছি গত বছর ২২ মে ২০১১ এটা নেয়া হয়েছে, http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-07-27/news/277119 । সেখান থেকে কিছু অংশ তুলে আনছি,

    প্রশ্ন: লাতিন আমেরিকার মতো ভাবা যায়? লাতিন আমেরিকার লেখকেরা একটা চরিত্র খাড়া করে প্রতীকী উপস্থাপনের দিকে চলে যান। মানে, সরাসরি কথাটা না বলে, রূপকের মধ্য দিয়ে বলা। যেমন, মার্কেস লিখেছেন অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক। মানে, ওই সময়টাকে ঠিকই ধরেছেন উনি। কিন্তু চরিত্রগুলো তাঁর মতো করে বদলে নিচ্ছেন। আপনার হাত দিয়ে এ ধরনের একটা কাজ কি হতে পারত না?

    হুমায়ূন: হ্যাঁ, নানাভাবেই ভাবা যায়। কিন্তু এতে যথার্থতার একটা সমস্যা থেকে যায়। যিনি যখনই কিছু বলছেন বা লিখছেন, তাঁর রাজনৈতিক পছন্দের বাইরে সাধারণত যেতে পারেন না। মার্কেসও পারেননি।

    হুমায়ুনের মুখ্য বক্তব্য আমি বোল্ড করেছি। সার কথা হলো, হুমায়ূন কোন একটা দার্শনিক-রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সেই রাজনৈতিক পছন্দের পক্ষে কলম নিয়ে বসতে চান না। এটাকে তিনি লেখকের জন্য সমস্যা মনে করেন। অনেকের মনে হতে পারে এটা তার এন্টি-পলিটিক্যাল বা এপলিটিক্যাল অবস্থান। আমার মনে হয় আমরা এটা ভিন্ন দিক থেকে দেখতে পারি। সেকাজে পরের প্রশ্নোত্তরে যাই।

    প্রশ্ন: আপনার রাজনীতির ব্যাপারে অনাগ্রহ, রাজনৈতিক লেখালেখিতে খুব সরব না, এর কি কোনো বিশেষ কারণ আছে?
    হুমায়ূন: আসলে, আমার দেখা প্রথম মানুষ তো আমার বাবা। উনি ইত্তেফাক-এর নাম দিছিলেন মিথ্যা-ফাঁক।
    প্রশ্ন: আপনার ওপর বাবার যতটা প্রভাব, মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর কিন্তু প্রভাব ততটা না।
    হুমায়ূন: সে তো বাবাকে কম দিন দেখেছে, এটা একটা কারণ হতে পারে। তবে আমার কাছে মানবিক সম্পর্ক রাজনীতির চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় বলে মনে হয়।

    এই কথোপকথনে প্রশ্নকর্তা এবং সেই সুত্রে হুমায়ন নিজে রাজনীতি বলতে দলীয় রাজনীতি বুঝেছেন।  সাহিত্যের পিছনে বা আড়ালে, সাহিত্যিকের সচেতনে অথবা অসচেতনে জীবন-জগতের যে রাজনৈতিক অর্থ, অবস্থান বুঝাবুঝি থাকে –  বা জীবন মাত্রই যে কারণে রাজনৈতিক এই কথোপকথনে তার কোন উপলব্ধি নাই। ইত্তেফাক বিষয়ক আলাপটা পুরাপুরি অরাজনৈতিক এবং বিপজ্জনক।  তবে  নজর দিতে বলব আমার করা বোল্ড অংশটাতে। এখানে হুমায়ূনের কাছে রাজনীতির এন্টিথিসিস হলো মানবিক সম্পর্ক। তিনি কোন দার্শনিক-রাজনৈতিক তত্ত্ব থেকে যাত্রা শুরু করে সাহিত্যে তা ট্রান্সলেট করতেও চান না, বাস্তবে তা পরখ করতেও চাইছেন না।  বরং লেখক হিশাবে মানুষ ও মানুষের নানান সম্পর্ক দেখবার প্রখর ক্ষমতা ব্যবহার তার লেখার বিষয় বানাতে চান। তিনি যেভাবে দেখছেন সেখান থেকে  কোন রাজনীতি তৈরী হবে কিনা,  ওর মধ্য দিয়ে কোন তত্ত্ব দাঁড়াবে কিনা সেই সব বিষয়ে তাঁর কোন মাথাব্যাথা নাই। তিনি তার মতো করে দেখছেন, দেখে যেতে চাইছেন। কী দেখলেন বা কিভাবে দেখলেন সেটা পাঠকের ওপর ছেড়ে দেবার তিনি পক্ষপাতী। তার এই রাজনৈতিক নির্লিপ্ততাকে রাজনীতি বিরোধী বলা যাবে কিনা সেটা তর্ক সাপেক্ষ, তবে  মানবিক সম্পর্ক যেহেতু তার অনুসন্ধানের বিষয় বিষয়, তাই মানুষের মন তার লেখার বিষয় হয়ে উঠেছে।

    বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও অর্জনের বিচারে হুমায়ূন কোথায় স্থান পাবেন সেটা বিচার করবার আলোচনা এটা নয়। এই বিষয়ে এতো তাড়াতাড়ি কিছু বলা সমীচিন নয়। হুমায়ূন আমাদের সহজ সরল ভাবে গল্প বলতে চেয়েছেন, যাতে গল্পগুলো আমাদের মনে দাগ কাটে। যেন আমাদের ভাল লাগে এবং  হুমায়ূনের মুখে আরও গল্প শুনতে আমরা আগ্রহী হয়ে উঠি। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও অর্জনের দিক থেকে তার গল্প বলার বিষয় ও ধরণ নতুন কোন সাহিত্যিক ঘটনা ঘটাতে সক্ষম হয়েছে কিনা সেটা বিচারের সময় এখনও আসে নি। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের তাৎপর্যপূর্ণ সামাজিক ঘটনা, যাকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে আমাদের নিজেদেরকেই হয়তো আমরা নতুন ভাবে চিনতে পারব। অতএব তাকে আরও ঘনিষ্ট ভাবে ও মনোযোগের সঙ্গে বোঝা ও ব্যাখ্যার দরকার আছে। তাঁর জনপ্রিয়তার কথা বলতে গিয়ে নাক উঁচু করে রাখা সাহিত্যক উন্নাসিকতার চর্চা ভুল হবে। হুমায়ুন সমাজের স্বতঃস্ফুর্ত চিন্তা হয়েই থাকতে চেয়েছেন। বলছেন, “লেখাটা কীভাবে তৈরি হয় আমি সেটার ব্যাখা করতে পারবো না। তৈরি হবার পদ্ধতিটি আমি নিজেও পরিষ্কারভাবে জানি না” [ভোরের কাগজ সাজ্জাদ শরীফ ও ব্রাত্য রাইসুর সাথে কথোপকথন, মার্চ ১৯৯৪]।  সেই প্রক্রিয়াটা হুমায়নকে বুঝতে গয়ে আমরা ঠিকমত বুঝতে পারছি কিনা সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

    হুমায়ূন তাঁর লেখার সাবজেক্ট-ম্যাটার বা ফোকাস হিসাবে হাজির করেছেন মানুষের মন। ফলে গল্প বলার ধরণটাও আলাদা এবং নতুন। ছক বাঁধা কমিউনিস্ট চিন্তা কাঠামো যেখানে “শ্রেণী সংগ্রাম”কে লেখার সাবজেক্ট ম্যাটার করতে নির্দেশ করে সেখানে হুমায়ুন হাজির হচ্ছেন মানুষের মন নিয়ে। রাজনীতির বিপরীতে নিজস্ব অস্বস্তির তাড়ায় হুমায়ূন ‘মানবিক সম্পর্ক” তালাশ করে ফিরেছেন, তার গল্প লিখছেন। “শ্রেণী সংগ্রাম” এর সাহিত্য করতে গিয়ে এক আদর্শবাদী নায়ক কে কেন্দ্র করে গল্পের বাদ বাকি চরিত্র সাজাতেই হয়; আর ভিলেন সহ সেসব চরিত্রের ততটুকুই ভুমিকা থাকে ঠিক যতটুকু বা যেভাবে হলে আদর্শ নায়ক চরিত্র ফুটিয়ে তুলে ধরতে দরকার। আর এতে গল্প বলার একটা একঘেয়ে প্যাটার্ন তৈরি হয়ে যায়। এভাবে গল্প লেখার আরও নানান সমস্যা আছে; যেমন, বাস্তব রক্ত-মাংসের মানুষ তো বাস্তবই, আদর্শের বিপরীতে সে দোষেগুণে মানুষ। “শ্রেণী সংগ্রাম” এর সাহিত্য এমন হয় যে সে নায়ক না, একেবারে বিপ্লবী নায়ক হয়ে ওঠে। উপরে আবার ন্যাংটা করে শ্রেণীদ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক সংগ্রাম ইত্যাদি দেখাতে হয়।


    হুমায়ূন তাঁর লেখার সাবজেক্ট-ম্যাটার বা ফোকাস হিসাবে হাজির করেছেন মানুষের মন। ফলে গল্প বলার ধরণটাও আলাদা এবং নতুন। ছক বাঁধা কমিউনিস্ট চিন্তা কাঠামো যেখানে “শ্রেণী সংগ্রাম”কে লেখার সাবজেক্ট ম্যাটার করতে নির্দেশ করে সেখানে হুমায়ুন হাজির হচ্ছেন মানুষের মন নিয়ে। রাজনীতির বিপরীতে নিজস্ব অস্বস্তির তাড়ায় হুমায়ূন ‘মানবিক সম্পর্ক” তালাশ করে ফিরেছেন, তার গল্প লিখছেন।


    কিন্তু বাস্তব জীবন দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় আর  শ্রেণী সংগ্রাম  নানান পর্দার আড়ালের নিচে থাকে, ঘটে চলে। বাইরে থেকে দেখলে যাকে জীবনের দৈনন্দিন আটপৌরে ঘটনা মনে হয়। তবে যে দেখতে জানে সে সাত পরতের পর্দার আড়ালের শ্রেণী সংগ্রামের দিকটাও বুঝতে পারে। বাস্তব জীবনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত বেশির ভাগ সময়েই ধনী-গরীবের শ্রেণী সংগ্রামের মত সরল সোজাসাপ্টা নয় বরং জটিল। এমনকি তা দুটো ন্যায়বোধের লড়াই হতে পারে, দুটো ভ্যলু বা মুল্যবোধের লড়াই হতে পারে যেটাকে ছকে বাঁধা শ্রেণী সংগ্রাম হিসাবে দেখানোর কোন মানে হয় না। আবার গরীব মানুষ মানেই সৎ নয়, বা তাকেই নায়ক বানাতে হবে এমন কোন মানে নাই। মানুষের লোভ, হিংসা, শঠতা উদারতা এইসব দোষ বা গুণ আছে। এমনকি আবার মানবিক মানুষ হবার আকুতি, প্রেমের আকুতি সবই থাকে। এবং শ্রেণী নির্বিশেষেই তা থাকে।  মানুষের জীবন যত জটিল একে সরল ধনী-গরীবের শ্রেণী সংগ্রামের মত করে রিডিউস করে হাজির করা যায় না। করা হলে বরং এক মেকি ক্যাম্পেইন ম্যাসেজ তৈরি করে। অন্যদিকে, মানুষের মন যদি সাহিত্যের বিষয় হয়  তবে  সেই সাহিত্যে মানুষের, সব শ্রেণীর মানুষেরই — দোষগুণ ভালমন্দ ইত্যাদি সব কিছুরই ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া তাতে ধরা পড়বার কথা। সবই সেখানে ধরা পড়ে। সবচেয়ে বড় কথা প্রতিটা চরিত্রের মন নিজেই এক গুরুত্বপুর্ণ চরিত্রের মধ্যস্থতায় হাজির হতে পারে। প্রতিটা ধরণের মানুষকে নিয়েই বাস্তবে  নাড়াচাড়া করা যায়। এতে গল্প বলার ধরণ বদলে যায়। যেভাবেই গল্প বলা হোক তা পরিচিত বাস্তব জীবন মনে হয়। আবার ব্যাকগ্রাউন্ডে বাস্তব জীবনের দ্বন্দ্ব সংঘাতও ছায়া হয়ে লুকিয়ে থাকে। মানবিক সম্পর্কের তালাশে থাকার কারণ মানবিক সমাজের একটা আকুতি লক্ষ্য হিসাবে না চাইতেও থেকে যায়। পাঠক দর্শকের সাথে সহজেই একটা কমিউনিকেশন তৈরি করে ফেলে। আমার বিচারে হুমায়ুনের মানবিক সম্পর্কের তালাশ বা মানুষের মনের খবরের কারবারি হওয়া এই দিকটাই সম্ভবত তার জনপ্রিয় হবার কারণ। ইতিহাস মাত্রই যদি শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস হয়ে থাকে তবে মধ্যবিত্তের সুখ দুঃখের ভালমন্দের মনের কাহিনী যেভাবেই লেখা হোক না কেন তার ভিতরেও শ্রেণী সংগ্রাম লুকিয়ে থাকারই কথা। হুমায়ুন আহমেদ চাইলেও তো তা বাদ দিয়ে কিছু লেখা সম্ভব না। তবে এটা অভিযোগ হতে পারে যে সেটা খোলে আম সরল ধনী-গরীবের শ্রেণী সংগ্রামের মত না। সেক্ষেত্রে একথার জবাব দিতে হবে, রক্ত-মাংসের বাস্তব জীবনের সবকিছুকে সরল ধনী-গরীবের শ্রেণী সংগ্রাম হিসাবে রিডিউস করা সম্ভব কি না? আবার সম্ভব হলেও তা করা জরুরি কি না? সেই পুরানা তর্কে আমাদের ফিরে যেতে হবে যে শ্রেণি সংগ্রাম ধারণ করা সাহিত্য বুঝতে কি আমরা রাজনৈতিক দলের প্রচারপত্র বুঝব?  যদি আমরা তা না চাই সেক্ষেত্রে  ‘আমার কাছে মানবিক সম্পর্ক রাজনীতির চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় বলে মনে হয় ‘ হুমায়ূনের এই বক্তব্য আমাদের জন্য টার্নিং পয়েন্ট। এটা আমাদের মানতে হবে।

    সবমিলিয়ে বলা যায় সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে একটা ছক বাঁধা প্রত্যাশা আমাদের উপর চেপে বসে আছে। এটা আমাদের সাহিত্যের এক বিশেষ বিচার ধারা তৈরি করেছে। যার কারনে শুধু হুমায়ূনই নয়, বরং বাংলা সাহিত্যের আরেক সাম্প্রতিক দিকপাল আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে বুঝতেও বাধা তৈরি হয়ে আছে। আমার দাবি হুমায়ূন এই ছক বাঁধা চিন্তা থেকে আমাদের মুক্ত করতে কাজে আসবে। এই সমাজেই হুমায়ুনের সাহিত্যিক আবির্ভাব। এই সোশাল ফেনোমেনা কে যদি আমরা বুঝতে চাই তবে আমাদের সাহিত্য আকাঙ্খা ও সাহিত্যের  বিচারবোধ কী সমস্যা তৈরি করে তা আমরা খানিক বুঝতে পারব।

    হুমায়ুন আহমেদ এর জীবনের শেষ ১৫-২০ বছরের দিকে কিছু আলোকপাত করে শেষ করব। হুমায়ূন কি তার শেষ জীবনে মানবিক সম্পর্ক রাজনীতির চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয়  করে রাখতে পেরেছিলেন? এর সোজা জবাব, না, পারেননি একেবারেই না। নিজের কথায় তিনি অটল থাকতে পারেননি। এমনকি ২০১১ সালেও যখন তিনি একথা বলছেন তখনও না। কথাটাকে বোধহয় এভাবে বলা যায়, আমাদের কেউ কেউ তাঁর জীবনের শেষ ১৫-২০ বছরে তাকে সেভাবে থাকতে দেইনি। লোভ দেখিয়েছি। তিনি লোভে পড়েছেন। যারা এককালে হুমায়ূনের  খ্যাতি,সাহিত্য সম্পর্কে ছক বাঁধা চিন্তার বাইরে বসবাসের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন, শাসনের আঙ্গুল দেখিয়েছেন তাদেরই এক অংশ তাঁর জীবনের শেষ ১৫-২০ বছরে তাঁকে “বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের” নির্মাতা হিসাবে পেতে পরিবেশ আবহের চাপে ও লোভে তাকে প্রলুব্ধ করেছে। মানেটা দাঁড়িয়েছে এক সময় হুমায়ূন রাজনৈতিক নন এই ছিল মুল অভিযোগ। আবার সেই হুমায়ূনকেই  এযুগের “বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের” রাজনীতিতে তাঁকে খতনা দিয়ে আগলে রাখার চেষ্টা হতে দেখছি। এই ক্ষেত্রে প্রথম আলো আর চ্যানেল আইয়ের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এবার কিন্তু হুমায়ূন  উল্টা মানবিক সম্পর্কের চেয়ে এই রাজনীতি বেশি উপভোগ করছেন।  ততই আশির দশকের হুমায়ূন আহমেদ আর তিনি নন। নিজেই নিজেকে ত্যাগ করেছেন। কিন্তু তাতে সব রক্ষা হয় নাই। উপন্যাসিক হুমায়ূন এই রাজনীতির ধামাধরা হতে গিয়ে দলবাজির সর্বস্বতার পড়ে তার এই সময়ের লেখালিখিতে নিজের সব শিল্পগুণ ও বিশেষত্ব খুইয়েছেন। শেষ উপন্যাস “দেয়াল’ লিখতে গিয়ে বুঝেছেন কি না জানি না, কিন্তু ঘটনা তাই ঘটেছে। তিনি বুঝতেই পারেননি যে “বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের” দলবাজরা তাদের বয়ানে তাকে উপন্যাস লেখানোর জন্য কোর্টকাচারি পর্যন্ত করবে। তারা কেবল তাকে হাতকড়া পড়ায়নি, জেলের ভাত খাওয়ায় নি। তার ‘দেয়াল’ উপন্যাস আজও প্রকাশিত হয়নি। আর তিনি মরবার আগে অসুস্থ অবস্থায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মনোযোগ সহকারে কোর্টের পেপারবুক পড়েছেন, আর এর তারিফ করেছেন। বলা যায়, এই শেষ ১৫-২০ বছর এক ডিজেনারেটেড হুমায়ূন আহমেদকে দেখে আমরা ভীত হয়েছিলাম। আর এর শেষ পরিণতি — আদালতের হুকুমেই উপন্যাসিক হুমায়ূনের যা অবশিষ্ট ছিল তার মৃত্যু ঘটেছে, বলা যায়। এই শেষাবশেষের তিরোধানের মধ্য দিয়ে তাঁর সত্যিকারের অবদান নিয়ে ভাববার সুযোগ তৈরী করে গিয়েছেন তিনি। তাকে নিয়ে আবেগ, উচ্ছ্বাস ও দলবাজির আড়ম্বর কমলে সেই কাজ শুরু হবে, আশা করা যায়।

    [এই লেখাটা  গত ২৯ জুলাই  ২০১২ সালে,  ‘চিন্তা’  – এই ওয়েব পত্রিকায়  এই একই নামে  হুমায়ূন, রাজনীতি ও ‘মানবিক সম্পর্ক’    এই শিরোনামেই  ছাপা হয়েছিল।
    আজ এখানে কোন পরিবর্তন ছাড়াই আবার তা এখানে ছাপা হল।  ]

     

  • চীন দক্ষিণ এশিয়ায় গুছিয়ে বসতে কত দূরে

    চীন দক্ষিণ এশিয়ায় গুছিয়ে বসতে কত দূরে

    গৌতম দাস

    ১৯ জুলাই ২০২১, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3E6

    …a bilateral meeting in the Uzbek capital of Tashkent on the sideline. PICTURE SOURCE

    [সার সংক্ষেপঃ  দক্ষিণ এশিয়ায় গুছিয়ে এক “ও-সার্কেল” তৈরি করে এবার সম্ভবত ঘিরে বসতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে চীন। আর একাজে পাঁচ রাষ্ট্রের মধ্যে চীন সবচেয়ে কাছে পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকারকে।  আর এর প্রতিক্রিয়ায়, গ্লোবাল  সম্ভাব্য ঘটনার কেন্দ্র ‘সাউথ চায়না সি’ নয়, বঙ্গোপসাগর হয়ে উঠার সম্ভাবনা বেড়ে গেল!   এতে আমাদের আঙিনা কী যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠবে?  সেটা যাই হোক, ঘটনা যুদ্ধের দিকে যদি যায়ও সেই সম্ভাব্য যুদ্ধ হতে পারে  – ১। যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে কারো পলায়ন, ২। বলল যুদ্ধ করবে কিন্তু পৌছে গেল সবচেয়ে বড় এক আপোষে এমন হতে পারে ৩। অথবা বোকার মত যুদ্ধ কী তা বুঝাবুঝির আগেই সত্যিকার যুদ্ধ লাগিয়ে ফেলল। ৪। যুদ্ধের প্রশ্নে বাইডেন নিজেকে  ট্রাম্পের চেয়েও  যেন  নাদান প্রমাণ করতেই চাইছে।  হয়ত সেকারণেই  জাপান বাইডেনকে  ভুলপাঠ করেই পা ফেলছে। এভাবেই “বোকার যুদ্ধটা” অপ্রস্তুতে হঠাত শুরু হয়ে যেতেও পারে।
    আমার এই কথাগুলো বুঝবার সবচেয়ে ভাল তুল্য আর প্রতীকী ইঙ্গিত হল  – টিকা! মানে আগামি মাসের মধ্যে বাংলাদেশ কীভাবে নুন্যতম দুই কোটি টিকার সংগ্রহ পেতে যাচ্ছে সেদিকে তাকালেই বুঝা যাবে!]

    তাসখন্দ থেকে ঘটনা শুরু হচ্ছে কেনঃ
    মধ্য এশিয়ায় দেশ উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দ। এই তাসখন্দে গত ১৫-১৬ জুলাই এক বিশাল সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। সম্মেলনের নেপথ্যে ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর সামনে তাসখন্দ; যারা চেয়েছিল এশিয়ায় আফগানিস্তানের পরিবর্তনকে সামনে রেখে একটা আঞ্চলিক সম্মেলন। ‘মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া : আঞ্চলিক যোগাযোগ, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক দুই দিনের এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন গত বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে, এতে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি আর বাংলাদেশ, ভারত, রাশিয়া ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আর ইইউ প্রতিনিধি মিলিয়ে [According to EURACTIV, the EU foreign affairs chief Josep Borrell will lead a strong delegation.] প্রায় ৪০ দেশের প্রতিনিধি এতে অংশ নিয়ে ছিলেন। আমেরিকার নিচু লেভেলের প্রতিনিধিও এতে উপস্থিত ছিলেন [US representatives at a lower level]। কিন্তু মিটিংয়ের আসল গুরুত্ব অন্তত আমাদের দিক থেকে তা সরে যায় অন্য দিকে –  তাসখন্দ-এর মূল বৈঠক ফেলে ওর সাইডলাইন বৈঠকে।

    কিন্তু  মূল বৈঠক নয়, সাইড লাইনের আলাপই যেন মুখ্যঃ
    কিন্তু এসব কিছুকে ছাপিয়ে দেশের মিডিয়ায় যা হেডলাইন সে দিক তাকিয়ে যদি বলি তা হল – ঐ সম্মেলনের সাইড লাইনে ছিল আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে একই দিনে বৈঠকের খবর। যেমন কেউ শিরোনাম করেছেন,  “একই দিনে ভারত-চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে মোমেন”।
    সাইড লাইনের আলাপই মুখ্য – এমন হওয়ার পেছনে অন্য কারণও ছিল। যেমন, কয়েক দিন ধরে দেশে আরেকটা খবর খুব আলোচ্য হয়ে উঠেছিল। বাংলা ভয়েজ অফ আমেরিকায় ছাপানো এক রিপোর্ট  – “বিকল্প সার্ক গঠন করতে উৎসাহী চীন” অথবা টাইমস অব ইন্ডিয়ার তাদের ঈর্ষায় চোখ টাটানো ও আক্ষেপ করা নিউজ : “চীনা-সাউথ এশিয়ান টিকা কূটনীতির জোটের পরে চীন এখন  দারিদ্র্য দূরীকরণের ‘উন্নয়ন কেন্দ্র’ আনতে চায় [After vaxplomacy in Indian neighborhood, China now brings in development Centre]”। উপরের এ’দুই রিপোর্টে এরা আকার-ইঙ্গিতে বলেছে যে, চীনের নেতৃত্বে ভারতকে বাদ রেখে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও আফগানিস্তানকে নিয়ে এ’জোট [এক ছয় দেশীয় জোট] হতে যাচ্ছে, যাকে কেউ এটাকে চীনের “উন্নয়ন সেন্টার” গঠন করা বলছেন।

    কোন বাণিজ্য জোট সফল হবার কিছু সুত্রঃ 
    এমনিতে বিভিন্ন সময় দুনিয়াতে নানান আঞ্চলিক জোট গঠন হতে আমরা দেখে থাকি। সেসবের মধ্যে বাস্তবে খুবই সক্রিয় ও সচল হতে দেখা যায় অল্প কিছু উদ্যোগকেই; বিশেষ করে যেখানে কিছু গঠন-শর্ত মেনে চলা হয়। যেমন জোটে একটা বড় অর্থনীতির দেশ, সাথে অন্যান্যদেরকে যার একটা ভালই বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা থাকে – অন্তত এমন একটা দেশ থাকতে হয়। আর আগাম মেনে নিতে হয় যে,  সদস্য দেশগুলো এ’জোটে যোগ দিবে তখনই, যখন ছোট-বড় সদস্য  প্রত্যেকেরই বাণিজ্যিক লাভালাভের দিকটি খেয়াল রেখে তা সাজানো হবে। আর এমনটা বাস্তব করতে পারার কমন ফর্মুলা হল – বড় অর্থনীতির দেশ বলতে ধরা যাক চীন, যার অন্যকে শেয়ার দেয়ার মতো নিজের বড় বাজার (জনসংখ্যা ১৪৩ কোটি) আছে আর সাথে আছে অন্যকে বিপুল বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা; অবকাঠামো আর ‘ডাইরেক্ট বিদেশী [FDI] শিল্প বিনিয়োগ’- দু’টাই। ফলে শুরুতে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ছোট অর্থনীতির সদস্য দেশগুলো মুখ্যত চীনে রফতানির সুযোগ পাবে, সাথে চীনা বিনিয়োগও পাবে। এতে পরের দিকে ক্রমেই হাই-এন্ড বা হাইটেকের পণ্য চীন থেকে আমদানি আর লো-এন্ড বা লো-টেক পণ্য চীনে রফতানি এই ভিত্তিতে ওই জোটের মধ্যে খুবই সক্রিয় একটি উভয়মুখী বাণিজ্য চালু হতে দেখা যেতে পারে।

    এসব পরিকল্পনামাফিক চললে, মূলকথা- সবারই এতে কিছু লাভের দিক থাকতে হবে, যে দিকটা গুরুত্বপুর্ণভাবে খেয়াল রাখতে হবে; মানে সুযোগ পেলে অল্পতেই অন্যের বিরুদ্ধে ‘লোভী’ হয়ে ওঠা যাবে না; লং টার্ম ভাবতে হবে। চীনারা এটাকেই “উইন-উইন” সিচুয়েশন বলে বুঝায়ে থাকে। আর তা হলেই এটা মূলত এক গ্লোবাল বাণিজ্যের আঞ্চলিক রূপ বা ভার্সন হয়ে উঠতে পারে। ফলে এখানে অন্যকে বাজার যেমন ছাড়তে হবে, তেমনি আবার অন্যের বাজারে ঢোকার সুযোগও নেয়া যাবে। এককথায় সবাইকেই নিজ নিজ বাজার অন্যের সাথে শেয়ার করতে রেডি থাকতে হবে। তাই নিয়মিত নিজেদের মধ্যে  প্রচুর কথা বলতে হবে, বলার ব্যবস্থা রাখতে হবে, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ম্যানেজমেন্ট ক্ষমতার নানান টেকনিক্যাল কমিটি ও উপযুক্ত প্রফেশনাল লোকজন থাকতে হবে, যাতে সদস্য-দেশ দুইয়ের পরস্পরের সংঘাতপুর্ণ স্বার্থ উদয় হলে এর  সুবিধা-অসুবিধার সমাধান করে দেয়ার রাস্তা বের করার যোগ্যতা থাকতে হবে। কোনোভাবে কোথাও একপক্ষীয় লাভের কথা ভেবে থাকলে এমন জোট দাঁড়াবেই না। আর বলাবাহুল্য, “জাতিবাদী রক্ষণশীল” অর্থনীতির কোনো দেশ এর সদস্য থাকতে পারবে না।  মনে রাখতে হবে  জাতিবাদী অর্থনীতি আর (আঞ্চলিক বা গ্লোবাল) বাণিজ্য জোটের ধারণা পরস্পরবিরোধী।  মানে “আমার দেশ যা যা পণ্য ভোগ-ব্যবহার করে এমন সব ভোগ্যপণ্য আমি নিজেই উৎপাদন করে নিব” অথবা “বিদেশী পণ্য হারাম” ধরনের জাতবাদী চিন্তা এখানে মনের গোপনে পুষে রাখাও নিষিদ্ধ। বরং বাজার দিব আর বাজার নিব এটাই হবে এর নীতি।

    গ্লোবাল বা আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটে জাতিবাদি অর্থনীতি অচলঃ
    ভারত অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিজ বাজার সংরক্ষণবাদী এমন পুরনো চিন্তার এক কট্টর জাতিবাদী দেশ। জাতিবাদ মানে যেমন হিন্দুত্ববাদ দিয়ে রাজনীতি করা খুব  আরামের।  এতে মানুষের সেন্টিমেন্ট আবেগকে কচলিয়ে উন্মত্ত করে তার ভোটটা নিজের বাক্সে ঢুকানো যায় বলে  জাতিবাদ ক্ষতিকর তা বুঝলেও কেউ ছাড়তে চায় না। হিন্দুত্ববাদ ধরনের সব  ধর্মীয় জাতিবাদের এত ছড়াছড়ি একারণে।  আসলে একারণেই  সব জাতিবাদী চিন্তাই বলতে চায়, “আমি কোনো বাণিজ্য জোটে বিশ্বাসী নই”। কিন্তু আবার ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারও বেশ বড় (১৩০ কোটির), তাই ভারত নিজের এই ১৩০ কোটির বাজারের লোভ দেখিয়ে সে কোন বাণিজ্য জোটের ভিতর দামি ও আকর্ষণীয় সদস্য হয়ে ঢুকতে চেয়ে থাকে। আর ভেতরে ঢুকে সে চেষ্টা করতে থাকে কেবল অন্যদের থেকে বাজার সুবিধা নিয়ে চলবে – এই হল ভারতের আদিম খাসলত। এ’কারণে ভারত যে জোটে থাকে সে জোট ক্রমেই নিষ্ক্রিয় হবেই। এর বিপরীতে এখনকার চীন বিকশিত বলে এর অন্যকে দেয়ার মতো সুবিধা ও সক্ষমতা বেশি।  কিন্তু সাবধান, এটাকে চীন ভাল আর ভারত খারাপ  বলে চালায় দেয়া বিরাট ভুল হবে।  এমনকি  চীনের উদারতা বলে বুঝাও ভুল হবে, বরং এটা চীনের অর্থনীতির শক্তি ও সক্ষমতা  এখন হয়েছে তাই সে দিতে পারে – এভাবে অবজেকটিভ ভাবে বুঝতে হবে। কালকে চীন এমন নাও থাকতে পারে। চীন মানেই সে ভাল দেশ – এটা খুবই ভিত্তিহীন ও ভুল পদ্ধতির চিন্তা।  চীনের অর্থনীতির উত্থানটা এখন এই লেভেলে উঠেছে যে ওর পক্ষে এখন অন্য পার্টনারদের দিকেও তাকালেই সেটাই হবে চীনের সমৃদ্ধির সঠিক পথ। তাই সে অবলীলায় আমাদের মত দেশকে বাজার ছাড় দিতে পারে, বিনিয়োগও দিতে পারে।

    এছাড়া আরেক নতুন আইডিয়া, ভ্যালু-অ্যাডিশন শেয়ার প্রডাক্টও – মানে জোটের সব সদস্যই একটা পণ্য উতপাদনে কিছু না কিছু শ্রম জোগাবে – এমন শেয়ার করা ভ্যালু বা শ্রমে উৎপাদিত পণ্য- এমন উৎপাদন সম্পর্কও চালু করতে চীন সক্ষম। আর চীনের সে অফারের সুবিধা নিয়ে সবাই বাজারে প্রবেশ করতে চাইলে তাতে চীনসহ সবারই লাভ বলে তা দিতে আগ্রহী হয়। RECP  সে ধরণের এক জোট।

    টাইমস অব ইন্ডিয়া তার রিপোর্টে – চীনের বর্তমান এই  ছয়-দেশীয় জোট বা ‘উন্নয়ন কেন্দ্র’ গঠনের ব্যাপারটাকে  মুখস্তের মত পাল্টা  – ‘ভারতের সবই ভাল বা আমরাই শ্রেষ্ঠ বা আমরা বিরাট কিছু’- টাইপের মন্তব্য ঢুকিয়েছে তাদের রিপোর্টে। যেমন সে লিখেছে “এ অঞ্চলে ভারতীয় আধিপত্য [to challenge ‘Indian dominance’ in the region] আছে”। চীন সেটা নষ্ট করতেই এ’কাজে এসেছে। এ’ছাড়া আরো বলেছে, ভারত এই ছয় দেশের সবার সাথে আগে থেকেই ‘টপ উন্নয়ন পার্টনার হয়েই আছে’ [However, India remains top development partner for Bangladesh, Bhutan, Nepal and Sri Lanka and has extended grants and soft loans for various projects……] ফলে ভারত তাদেরকে ‘বিপুল অনুদান’ তো বটেই সাথে অবকাঠামো ‘সফট লোনও’ নাকি দিয়ে থাকে।  তা থাক। আসলে এরা এমনই স্বপ্নের পোলাও খাওয়া লোক, এরা খেতে থাকুক অসুবিধা কী!

    কিন্তু বাস্তবত ভারতের না নিজ বাজার ছাড় দেয়ার সক্ষমতা আছে, না পার্টনারদেরকে অবকাঠামো ঋণ বা বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা। বরং বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, ভারত আমেরিকার কোলে চড়ে বসে ওয়্যার অন টেররের উছিলায় আর সর্বোপরি, আমেরিকার ‘চায়না ঠেকানো’ ঠিকা নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। কব্জায় নিয়েছে। আমেরিকা  ১/১১ এ আমাদেরকে দখলে নিয়ে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল, তাই। এটা ভারতের নিজের কোন ক্রেডিট নয়, তার অর্থনীতির কোন উন্নতি বা সক্ষমতা বেড়ে যাবার কারণে ভারত আমাদেরকে এমন কব্জায় নিতে পারে নাই। আর এই সুযোগে সে বিনা পয়সায় বাংলাদেশ থেকে সমস্ত করিডোর  সুবিধা নিয়ে তা ভোগ করা শুরু করেছে। ‘সমস্ত করিডোর’ বলতে মাটির নিচে পাইপ লাইনে, মাটির উপরে সড়কপথে, আকাশে ও পানিপথ ও বন্দরে, সব কিছুতে এবং তা বিনা পয়সায়। এই হলো বাস্তবতা।

    তবে এবারের এক কোভিডের ‘দ্বিতীয় ঢেউ’য়ে সে যে কী পরিমাণে অক্ষম ও উদাম, তা  একেবারে উন্মোচিত হয়ে গেছে। নিজ মানুষদের সবার জন্য টিকা উৎপাদন ক্ষমতাই যার নাই, বা টিকা কিনবার অর্থের সংস্থান ক্ষমতা নেই, সে বাংলাদেশেসহ সারা দক্ষিণ এশিয়ায় টিকা সরবরাহকারী টিকা কূটনীতিক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর আর নিজের  সক্ষম দাবি করে এসেছে। আর এখন খোদ আমেরিকার কাছে ভিক্ষার  হাত পেতেছে।  গত দুমাসেই জয়শঙ্করের প্রায় সপ্তাহবাপী আমেরিকার সফর থেকে নিট লাভালাভ হল – ভিক্ষা অনুদানে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের ফ্রি টিকা ও স্বাস্থ্য উপকরণ লাভ করেছে ভারত।

    টাইমস অব ইন্ডিয়ার বাংলাদেশবিরোধী রিপোর্ট নিয়মিত লিখে চলেছেন এর রিপোর্টার দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী। আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি নাকি ওই পত্রিকার ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর, এটা তার দাবি। যদিও তার লেখার কোয়ালিটি তা বলে না। যা হোক, এর আগে তখনো  বেক্সিমকো কোম্পানির প্ররোচনা প্রলোভনে পা দিয়ে ভারতে উৎপাদিত অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কেনার কমিশনের লোভ  সরকারকে দেখানো শুরু হয়নি – কিন্তু সেসময় আমরা চীনা টিকার তৃতীয় পর্যায়ের টেস্টে অংশগ্রহণের অফার পেয়েছি আর ঐ টেস্ট সফল হলে যার বিনিময়ে আমরা নিজেরাও টিকা উৎপাদনের লাইসেন্স পাবো। সে সময় এই দীপাঞ্জন লিখেছিলেন ‘চীন বাংলাদেশকে গিনিপিগ বানাতে চায় বলে ওই টিকা নিয়ে আসছে [China in a startling move plans to use the population of Bangladesh as ‘guinea pigs’ to conduct Phase III trials of its Covid vaccine.]।’ অথচ এর কোন প্রমাণ বা কেন তিনি গিনিপিগ বলছেন এর কোন সাফাই দেন নাই। আসলে  টিকা পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রথম দুই পর্যায় হল ওর আসল পরীক্ষা। ঐ দু’টা পার হওয়ার পরই মাস পাবলিকের উপর র‌্যানডম ব্যবহার বা গ্রহণকারীদের ওপর এর প্রয়োগ প্রতিক্রিয়া জানার ও প্রয়োজনীয় কারেকশনের জন্য তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার স্তরে যাওয়া হয়। অর্থাৎ তথ্য-প্রমাণ কিছু না হাজির করে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করাই দীপাঞ্জনদের ‘যোগ্যতা’, যেটা জার্নালিজমই নয়। অথচ তারা সে কাজই করে চলেছেন।

    তবুও চীন ঠিক কী করতে চায় তা অনেক অস্পষ্টঃ
    গত এপ্রিলে দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশ– বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও আফগানিস্তান আর সাথে চীনসহ মোট ছয়টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই প্রথম এই জোট গঠনের ধারণাটি তুলে ধরেন।
    From REUTERS news:
    – China hosts video-conference with 5 South Asian nations
    – India was invited to meet, China says, but didn’t attend
    – India-China tensions high over Himalayan border dispute

    এটা সেই সময়, বিশেষ করে ভারত যখন টাকা নিয়েও আমাদের দেশের পাওনা টিকা দেয়া বন্ধ করে দিল আর অতিকষ্টে হাসিনা সরকার ফিরে চীনকে আমাদের টিকা সরবরাহের উৎস হতে রাজি করাতে পেরেছিল তখনই চীন এই জোটের ধারণাটা হাজির করেছিল। বলেছিল, চীন দক্ষিণ এশিয়ায় একটি কমন টিকা স্টোরেজ গঠন করতে চায়, যেখান থেকে এ অঞ্চলে সবাই টিকা সংগ্রহ করতে পারবে। তাই আরো এগিয়ে পরে গত এপ্রিলে একে জোটের ধারণা দেয় চীন। এখন সেই ধারণাকে আরেকটু বিস্তার করে বলা হয়েছে, ‘চায়না-সাউথ এশিয়ান কান্ট্রিজ প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন অ্যান্ড কো-অপারেটিভ ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’ (China-South Asian Countries Poverty Alleviation and Co-operative Development Center) তারা গড়তে চায়।

    কিন্তু এই নামের মধ্যেই – এখানে তিনটি শব্দ আছে – প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন, কো-অপারেটিভ আর, ডেভেলপমেন্ট সেন্টার;  আর এই তিন শব্দ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটার যে বৈশিষ্ট্য ব্যক্ত করেছে; তাতে এটা আর যে কোনো বাণিজ্য জোট নয়, তাই-ই এটা বলছে। যদিও মতিউর রহমান চৌধুরী বাংলা-ভোয়া-তে প্রথম বাক্যে লিখেছেন এভাবে, “অবিকল সার্ক নয়। তবে এর আদলে ‘বিকল্প সার্ক’ গঠন করতে যাচ্ছে চীন। এতে ভারত ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ থাকবে”। তাঁর এসব কথার সাথে চীনের কথার বা প্রতিষ্ঠানটার নামেরই মিল নাই।

    কারণ ওই তিন শব্দের মাঝের “কো-অপারেটিভ” শব্দটা যদি ধরি  – এটা এক আদি কমিউনিস্টদের শব্দ; তবে চীন এটা কমিউনিস্ট হিসাবে আনে নাই। এনেছে সম্ভবত ‘সদস্যদের সবার’ বা চীনের একার স্বার্থের এই সংগঠন নয়, এটা সকলের, সবাই সহযোগিতায় বুঝাতে কো-অপারেটিভ বা সমবায়িক শব্দটা এনেছে। কিন্তু এটি খুবই অপ্রয়োজনীয়। ঠিক যে কারণে কিছু রাষ্ট্রের বাণিজ্য জোটের নামে সাথে দুনিয়ার কোথাও কো-অপারেটিভ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি, হয় না।  বিভিন্ন  স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের মানেই যেখানে সবাই সমান মর্যাদার, সে কারণে এখানে আর কো-অপারেটিভ  – খুবই বেমানান ও অপ্রয়োজনীয় শব্দ।

    ওদিকে বাকি যে দুই শব্দ “প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন” (দারিদ্র্য দূরীকরণ) ও “ডেভেলপমেন্ট সেন্টার” – এ দুই শব্দ নিজেই পরিষ্কার বলছে এরা  উন্নয়নবাচক বা সম্পর্কিত ধারণা। কিন্তু “উন্নয়ন” মানে কী?

    উন্নয়ন বা ইংরেজিতে ডেভেলপমেন্ট – এগুলো আমেরিকার দিক থেকে চালু করা, যেন প্রায় প্যাটেন্ট করা শব্দ। আমেরিকার হাতেই এই কনসেপ্টের জন্ম এবং এর ব্যবহার শুরু ও এখনো চালু রয়েছে। আমেরিকার হাতে নাহয় বুঝলাম; কিন্তু কবে থেকে? যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অথবা আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের দুনিয়া শুরুর আগে “উন্নয়ন” বলে কোনো শব্দ ও ধারণা ছিল না। মানে তা অন্য অর্থে ব্যবহৃত হত, আমেরিকার দেয়া অর্থে নয়।

    আসলে ডেভেলপমেন্ট – এই পুরো পরিভাষার আসল অর্থ হল  বা পুরা শব্দটা হল – ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট। বাংলায়, অবকাঠামো উন্নয়ন। এখন এটা অনেক বড় শব্দ বলে সংক্ষেপে শুধু ‘উন্নয়ন’ বলা শুরু করেছিল আমেরিকা। তা হলে এর আসল ও গুরুত্বের শব্দটা হল – অবকাঠামো, ফলে সেখান থেকেই অবকাঠামোর উন্নতি। কিন্তু তাহলে আবার,  ‘অবকাঠামো’ মানেই বা কী?

    এখন আমরা এবার অন্যদিক থেকে আগাই।  এদিকে, ‘বিনিয়োগ’ মানে পুঁজি বিনিয়োগ কথাটা ক্যাপিটালিজমের ধারণার সমান পুরনো। কারখানা বা ব্যবসা শুরু করতে গেলে অর্থ বা পুঁজি বিনিয়োগ লাগবেই। তবে ১৯৪৪ সালে, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান দুটা জন্মের সময়ে বিনিয়োগ ধারণা ও শব্দটাকেই দুই ভাগ করে নেয়া হয়েছিল। একটি প্রি-বিনিয়োগ আর অন্যটি সাধারণ (যেমন- আগে বলতাম সেই) বিনিয়োগ। প্রি-বিনিয়োগ মানে বোঝাই যাচ্ছে, মূল বিনিয়োগেরও আগেই আরেক ধরণের বিনিয়োগ এটা। মানে কারখানা বা ব্যবসায় মূল বিনিয়োগ শুরু করার আগে ‘বিনিয়োগ পরিবেশ’ সৃষ্টির জন্য আরেকটা ধরণের বিনিয়োগ করা এটা। যেমন, যেখানে কারখানা-বিনিয়োগ এসে বসবে সেই দেশ-স্থান-শহরের ভূখণ্ডটার জলাভুমি থেকে শুরুর নানার কাজ – মাটি ফেলা বা ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির সুব্যবস্থা, রাস্তাঘাট, এয়ারপোর্ট, বন্দর পর্যন্ত এবার সাথে, দক্ষ প্রশাসন ইত্যাদি যদি সেখানে না থাকে, তবে বিনিয়োগকারী সেখানে আসবে না। পুঁজি সেখান থেকে চলে যাবে। তাই যে ভূখন্ডের প্রধানমন্ত্রী/মেয়র বুদ্ধিমান শাসক তিনি কিন্তু এসব ব্যবস্থা আগেই করে ফেলেছেন।  কারণ, বিনিয়োগ না আসলে মানে নতুন নতুন কাজ সৃষ্টি না হলে দেশের লোক না খেয়ে মরবে। এটা তো বুদ্ধিমান  শাসক হতে দিতে পারেন না। এজন্য এগুলো প্রি-বিনিয়োগ বলছি আর এটা অবকাঠামো তৈরিতে বলে যেটাকে  এজন্য অবকাঠামো-বিনিয়োগ বলে। তবে এক্ষেত্রে গুরুত্বপুর্ণ মূল কথা হল, অবকাঠামো-বিনিয়োগে সুদের হার সবচেয়ে কম, প্রায় ‘নাই’ করে রাখতে হবে, যাতে পরে কারখানা বিনিয়োগের ফলে উতপাদিত পণ্যের উপরে মানে এই মূল বিনিয়োগের উতপাদিত ফিনিস প্রোডাক্টের মুল্যের উপর  এর চাপ-প্রভাব খুবই কম হয়। ফিনিসড প্রডাক্টের বিক্রি মূল্য যেন কম থাকে।

    তাহলে  অবকাঠামো-বিনিয়োগের পুঁজি্র সুদ হার কম  রাখতেই হয়। এমন – এটারই বিলিয়ন ডলার ধার দেয়ারই  উপযুক্ত সংগঠন হল বিশ্বব্যাংক। ১৯৪৪ সালে জন্ম নেয়া বিশ্বব্যাংক, এই নামটা এটা সংক্ষিপ্ত করে নেয়া নাম। মূল নাম IBRD (International Bank for Reconstruction & Development ); ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রিকনস্ট্র্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট  – এর উদ্দেশ্য কম সুদে বা ‘না’ সুদে অবকাঠামো গড়তে লোন দেয়া যাতে এরপর সহজেই ঐ দেশে স্থানীয় বা বিদেশি বাণিজ্যিক (কারখানা) বিনিয়োগ এসে হাজির হতে পারে।

    আবার, অবকাঠামো বিনিয়োগও দুই ধরনের হয় – ফিজিক্যাল ও হিউম্যান।  ফিজিক্যাল মানে বস্তুগত অবকাঠামো। যেমন উপরে যেটা বলেছি মানে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তাঘাট সুব্যবস্থা প্রভৃতি। অন্যটা হল – হিউম্যান বা শ্রমের অবকাঠামো। সাধারণত কারখানা খুললে যেন ভালো এডুকেটেড স্কিলড লেবার বা নন-এডুকেটেড স্বাস্থ্যবান শ্রমিক পাওয়া যায়। তাই সাধারণত শিক্ষা আর ন্যূনতম স্বাস্থ্য ও সামাজিক খাতে এভাবে দুই খাতে অবকাঠামো ব্যয়টা মূলত করা হয়। দুনিয়াতে ১৯৪৪ সালের আগে এই “অবকাঠামো উন্নয়ন” বলে কোনো ধারণাই ছিল না; অর্থাৎ কলোনি আমলে “অবকাঠামো” বলতে কোন ধারণা কাজ করত না। আর একালে অবকাঠামো বলে যাকিছু করা হয়েছে এর ভালো-মন্দসহ যা কিছু দুনিয়াতে হয়েছে, এর (ইতি- বা নেতি-) দায় সবটাই গ্লোবাল নেতা আমেরিকার।

    তবে এখন দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতার পালাবদলের এই কালে চীন কি কেবল আমেরিকাকে কপি করবে? নাকি আমেরিকার উন্নয়নের চেয়ে খারাপ কিছু অবশ্যই না, বেটার কিছু কনসেপ্ট  নতুন আনবে? অথবা আগেরগুলোর  সাথে আরও সংশোধিত নতুন কিছু আসবে?’ এটাই আমরা নিশ্চিত হতে চাই। চীন কি যথেষ্ট চিন্তা করে “প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন” বা ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, শব্দগুলো ব্যবহার করেছে? আমরা জানি না।

    আরো বড় প্রশ্নঃ
    তাহলে চীনের নতুন এই ছয় রাষ্ট্রীয় ‘ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’- আমরা এখন অন্তত এটুকু নিশ্চিত যে, এটা মতিউর রহমান চৌধুরী যেভাবে কল্পনা করেছেন… ‘অবিকল সার্ক নয়, তবে এর আদলে বিকল্প সার্ক’- এ কথাটি ভিত্তিহীন। কারণ আমাদের বাস্তবের সার্ক ধরনের সংগঠন তো আসলে তা এক রাষ্ট্রজোট-ই।  মানে কোনো অবকাঠামো-দাতা প্রতিষ্ঠান যেমন বিশ্বব্যাংক সেটা, তা নয়। বিশ্বব্যাংক তো কোনো রাষ্ট্রজোট নয়। তা হলে সমস্যা ঠিক কোথায়? খুব সম্ভবত সমস্যাটি চীনের নীতিনির্ধারকদের মাথায়; সেখানে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে বা ইচ্ছা করেই রেখে দেয়া হয়েছে।  অর্থাৎ এখনই স্পষ্ট করতে তারা চাচ্ছে না; সময় হয় নাই। ফলে আপাতত ব্যাপারটা তাই দেখতে অনেকটা বাঘের মত হায়েনা চাওয়া ধরণের হয়ে আছে!

    তবুও চীনারা কী আসলে এশিয়ায় কোয়াডের মত কিছু চাচ্ছে? যেটা বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বী? প্রথমত, সেটা বুঝাতে  হলে প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন, কো-অপারেটিভ, ডেভেলপমেন্ট সেন্টার ধরণের শব্দের ব্যবহার চীনকে আগে ত্যাগ করতে হবে।  তবে আমরা সবাই আগেই নিশ্চিত থাকতে পারি, সবার ওপরে কোয়াডের বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বি কিছু পেতে চাইলে তা প্রকাশ হয়ে গেলেই এই পাঁচ রাষ্ট্র সাথে সাথে ভেগে যাবে। কারণ তেমন জোট মানেই এটা সামরিক চরিত্রের দিকে টার্ন নেবে। আর এ মুহূর্তে আমেরিকা-চীনসহ কারোই যুদ্ধের প্রতি আগ্রহ জাগা বা জাগানোর কথা না; যদি না বাইডেন জেনে বা না জেনে কোনো বোকামি করেন।

    আবার চীন যদি আসলেই একটি বিকল্প সার্ক টাইপের জোট চায়, তবে প্রভার্টি অ্যালিভিয়েশন, কো-অপারেটিভ, ডেভেলপমেন্ট সেন্টার এসব শব্দ ফেলে দিতে হবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভারত বা অমুক রাষ্ট্রকে নেয়া যাবে না- এটি বলাই যাবে না। এমনকি দাওয়াতপত্রও ভারতকে পাঠাতে হবে। যদিও উপরের রিপোর্টে আমরা দেখেছে ভারত ইনভাইটেড ছিল। কিন্তু নিজেই সাড়া দেয় নাই। আবার ভারত এলেও চীনের তাতে লাভ, আবার না হলেও আরেক ধরণের লাভ। কাজেই আগাম কে আসতে পারবে না, এভাবে কথা বলার কোনোই প্রয়োজন নাই, তা শোভনও না। তবে চীনের উপর দাওয়াত না করার দায় হবু গ্লোবাল নেতা হিসাবে নেয়া ভাল উদাহরণ নয়।

    শেষে তাইওয়ান ইস্যুতে কিছু কথাঃ
    জাপান বার্ষিক ডিফেন্স রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে আর তাতে জাপানের উপ-প্রধানমন্ত্রী [Deputy Prime Minister Taro Aso]  বলে ফেলেছেন যে “জাপানের আমেরিকার সাথে মিলে তাইওয়ানকে রক্ষা করতে যাওয়া উচিত”।  বলাই বাহুল্য এটা উত্তেজনা ছড়িয়েছে। পরে তিনি পালটা ব্যাখ্যা দিয়ে উত্তেজনার পারদ নামাতে চেয়েছেন। কিন্তু মূলকথা, আমেরিকা বা জাপান সকলেই এক চীন নীতি মেনে নিয়েই  চীনের সাথে সম্পর্ক শুরু করেছিলেন। ফলে ডায়লগের বাইরে “পাশে দাঁড়ানো” টাইপের কথা বলা তাদের কথা নয় এটা মারাত্মকভাবে গ্লোবাল স্থিতি ভেঙ্গে ফেলবে। চীনেরও বলপ্রয়োগ ভিন্ন অন্য সবকিছুতে তাইওয়ান ইস্যু সমাধানের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা উচিত। এখন কে এসব শুরু করেছে জাপানের মন্ত্রীরা নাকি বাইডেনের আগ্রহে  সেটা যাই হোক, সারকথাটা হল যেখানে যুদ্ধের উস্কানি সবার সামলে চলা উচিত সেখানে উস্কানি তোলা হচ্ছে।
    শেষে একটা রেফারেন্স দিয়ে শেষ করব।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সবাই জানেন পক্ষ দুইটা ছিল হিটলার-মুসোলিনি-জাপানের তেজো ও তাদের বন্ধুরা একদিকে। অন্যদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে ইউরোপের বাকি সবাই। যুদ্ধে আমেরিকার মিত্র বাহিনীর বিজয়ের পরে দুপক্ষের বহুদেশেই খাদাভাব-দুর্ভিক্ষ দেয়া দিয়েছিল। এরমধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অবস্থা ছিল মুসোলিনির ইটালিতে। কিন্তু পক্ষ-বিপক্ষে যে যেদিকেই থাক  একমাত্র সক্ষম আমেরিকা সকলকেই সাহায্য এবং পুনর্বাসন দিয়েছিল। ইটালিবাসিও আগে থেকেই লাজলজ্জা ভুলে প্রকাশ্যে সাহায্য কামনা জানিয়েছিল।

    যুদ্ধের সোজা অর্থ হল, সম্পদ ও রিসোর্সের সরাসরি ধবংস ও অপচয়। আবার খাদাভাব-দুর্ভিক্ষ মানে মানুষ আর মানুষের মর্যাদায় থাকে না! তাই যুদ্ধ শেষে যার সামর্থ থাকে সেই বাকি সবাইকে পক্ষবিভেদ ভুলে সকলকেই খাওয়ায় আবার পুনর্বাসনের অর্থ যোগানোর সক্ষমতাও দেখায়।  কাজেই একালেও দায়দায়িত্ব ভুলে যুদ্ধের পক্ষে পরিস্থিতিকে ঠেলে দোয়ার আগে আমাদের এসব পুরান কথা স্মরণ থাকবেনা কেন?

    আপাতত এখানেই ইতি টানছি। তবে চীনকে অবশ্যই ভেবে পরিষ্কার করে বলতে পারতেই হবে যে, সে স্পষ্ট করে কী চায়? আর এবারের তাসখন্দ  সাক্ষাতে চীন বাংলাদেশকে এক বড় স্তরের আস্থায় নিয়ে রেখেছে দেখা যাচ্ছে, এটা তাৎপর্যপূর্ণ। এই সাক্ষাতটাকে আগামি দিনে দেখা হবে একটা টার্নিং পয়েন্ট হিসাবে।  তবে সেটা চীন-বাংলাদেশের সম্পর্কের দিকের চেয়েও বড় কিছু। আগামি দিনে বাংলাদেশে যা যা ঘটবে  সেসবের প্রেক্ষিতে এটাকে টার্নিং পয়েন্ট বলে দেখা হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৭ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “চীন দক্ষিণ এশিয়ায় কী চায়“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মোহন ভাগবতের হিন্দুত্বে ঢিলা দিবার ভান

    মোহন ভাগবতের হিন্দুত্বে ঢিলা দিবার ভান

    গৌতম দাস

    ১২ জুলাই ২০২১, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Di

                          মোহন ভাগবত

    RSS chief Mohan Bhagwat calls for uniting Hindu society RSS chief Mohan Bhagwat at Manthan meet

    মোহন ভাগবত হলেন আরএসএসের প্রধান। আরএসএস  হল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গুরু সংগঠন। “রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ” [RSS] নামেরই সংক্ষিপ্ত রূপ হল আরএসএস।  ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপির মূল “আইডিয়ার” ধারক মানে আদর্শ দেয়ার সংগঠন হল আরএসএস। তবে তাদের মূল আইডিয়া সাধারণ মানুষের কাছে অনেক ‘তিতা’ লাগতে পারে বা কট্টর মনে হতে পারে। তাই উপরে চিনির প্রলেপ দেয়া এদেরই “নরম” গণ-সংগঠনের নাম বিজেপি।

    আরএসএস-এর বৈশিষ্ট্যঃ
    আরএসএস কেমন বৈশিষ্ট্যের সংগঠন? এটা সামাজিক তবে ধর্মতত্বীয় সংগঠন। হিন্দুত্ববাদ, এই ধর্মীয় আইডিয়া ভারতের সমাজে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে এই সংগঠনের জন্ম। কিন্তু আরএসএস জানে, তার একাজে রাজনৈতিক ক্ষমতাও দরকার। তাই নিজের অধীনস্থ এক রাজনৈতিক দল যার নাম ভারতীয় জনতা পার্টি বা সংক্ষেপে বিজেপি, এই নামে একটা দল রেজিস্ট্রেশন করে নিয়েছে। তবে আইনি কারণে প্রকাশ্যে আরএসএস দাবি করতে পারে না যে, বিজেপি তার অঙ্গ-সংগঠন বা অধীনস্থ দল। তাই তারা বলে থাকে যে, কিছু আরএসএস-সদস্যকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বিজেপি নামে রাজনৈতিক দল খুলে সেটা আরএসএসের আইডিয়াতে পরিচালিত করতে। তাই এরা নন-আরএসএস এমন যে কাউকেও বিজেপিতে নিতে পারবে। অর্থাৎ আরএসএসের অনেক কাজ বিজেপির জন্য পালনীয় নয়, বিজেপিতে তা ছাড় দেয়া যাবে। বাজপেয়ি বা মোদী এরা সবাই আসলে আরএসএসের “প্রচারক” সদস্য ছিলেন বা আছেন। প্রচারক, মানে দলের ‘ফুল টাইমার’ বা সার্বক্ষণিক কর্মি,  যারা দলীয় ভাতায় চলেন।

    কেন মোহন ভাগবতঃ
    কিন্তু কেন মোহন ভাগবতের নাম তুললাম? সম্প্রতি (৪ জুলাই) তিনি এক সভায় গুরুত্বপুর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। মুসলমান কোপানো যেসব কাজের জন্য মোদী বা বিজেপির কুখ্যাতি বা যেটা তাদের মূল পরিচিতি, ভাগবত ঐ সভার বক্তব্যে  ঠিক তার উল্টা কথা বলেছেন। যেমন মিডিয়াতে তার ঐ বক্তব্য-রিপোর্টের শিরোনাম – যেমন, আনন্দবাজার লিখেছে, “যিনি বলবেন মুসলিমরা ভারতে থাকবেন না, তিনি হিন্দু নন, বললেন আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত”। আবার ঐ রিপোর্টের ভেতরে কথা, তিনি বলেছেন, “যে বা যারা গো-রক্ষার দোহাই দিয়ে গণরোষ তৈরি করে কাউকে কাউকে আক্রমণ করছেন, তারাও হিন্দুত্বের বিরোধী”। আবার বলেছেন, …“মনে রাখতে হবে ভারতের হিন্দু, মুসলমান একই (ডিএনএ বা DNA) উৎস থেকে এসেছেন”। এ ছাড়াও আছে, …”গরু একটি পবিত্র প্রাণী। কিন্তু গো-রক্ষার কারণে যারা গণরোষ তৈরি করে অন্যকে আক্রমণ করছেন, তারা হিন্দুত্ব থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন। আইন আইনের পথেই চলবে”।  অথবা, ‘‘আমরা গণতন্ত্রে বাস করি। এখানে হিন্দু বা মুসলিম, কারওরই প্রাধান্য থাকতে পারে না। এখানে প্রাধান্য পাবে শুধু ভারতীয়রা……”।

    “We are in a democracy. There can’t be a dominance of Hindus or Muslims. There can only be the dominance of Indians.”
    “…cow was a holy animal for Hindus, but those involved in lynching were “going against Hindutva”, according to The Times of India. “Law should take its own course against them without any partiality,”
    “Hindu-Muslim unity is misleading as they are not different, but one,” he said, according to PTI. “DNA of all Indians are same, irrespective of religion”
    …urged muslims not to get “trapped in the cycle of fear” that Islam is in danger in India.

    মোহন ভাগবত লিঞ্চিং [lynching] নিয়ে কথা বলছেনঃ
    মোহন ভাগবত এমনকি লিঞ্চিং বা কথিত গণপিটুনিতে মৃত্যু মানে দলবদ্ধভাবে রাস্তায় মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যার যেসব ঘটনা এতদিন মোদির আমলে ঘটে এসেছে সে সবের দায় অস্বীকার করে পুরা উল্টা কথা বলছেন। অথচ দুইবছর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘‘গণপিটুনি পাশ্চাত্যের ভাবনা। ভারতীয় ঐতিহ্যে এই শব্দ নেই। এর উৎস অন্য একটি ধর্মীয় গ্রন্থ। এই শব্দ ভারতের উপর চাপিয়ে দেবেন না।’’ এভাবে  তখন তিনিই পরোক্ষে এর দায় অস্বীকার করার চেষ্টা করতে চেয়েছিলেন।
    অথচ এখন বলছেন, “যারা লিঞ্চিংয়ে জড়িত তারা হিন্দুত্ববিরোধী লোক”। অথচ প্রধানমন্ত্রী মোদি নিজেই গরু রক্ষার রক্ষক সেজেছিলেন। আর এই রক্ষার নামে, গরু হাটে বেচাকেনা, গরু মাংস হিসেবে বিক্রি, দুধের ব্যবসার জন্য গরু পালা কেনাবেচা, ফ্রিজে গরুর মাংস রাখা ইত্যাদি সবকিছুর বিরুদ্ধে আইন করতে গেছিলেন। প্রথমে আলাদা আলাদা কয়েকটা রাজ্যে আইন করেছিলেন, পরে কেন্দ্র সরকারের হয়ে আইন করেছিলেন। কিন্তু আইন চালুর একপর্যায়ে সুপ্রিমকোর্টের শুনানিতে জাজের প্রশ্নের সদুত্তর না দিতে পেরে শেষে পিছু হটে ‘আপাতত’ স্থগিত বলে ঘোষণা দিয়ে সরে এসেছিলেন সেই গোরক্ষা আইন থেকে। অথচ আজ মোহন ভাগবত সব দায় অস্বীকার করে বলছেন, “লিঞ্চিংয়ে জড়িতরা হিন্দুত্ববিরোধী লোক”। তাহলে কি তিনি বলতে চাইছেন মোদি সরকারটাই হিন্দুত্ববিরোধী? না ঠিক তা নয়। তাই তিনি এবার আরেক গল্প জুড়ে দিয়ে দাবি করছেন, ওসব  নাকি ছিল সব মিথ্যা মামলা! [Though at times, some false cases of lynching have been registered against people, Bhagwat said.]।

    তবে এবার এখানে একটা মজার ঘটনা ঘটেছে। লিঞ্চিংয়ের প্রসঙ্গ তুলতে গিয়ে ভাগবত কিন্তু স্বীকার করে ফেলেছেন বা করে নিয়েছেন যে, মোদী ও তাঁর দলই আসলে একটা এমন লিঞ্চিং উন্মাদনা তৈরি করেছিলেন। কথাটা বলছি এজন্য যে ব্যাপকভাবে এমন লিঞ্চিংয়ের ঘটনা ‘অন ক্যামেরা’ মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লেও [তাবরেজ আনসারিকে লিঞ্চিংয়ে হত্যা দেখুন “Our Dear Jharkhand Now Known As ‘Lynchistan’ In Country”: Brinda Karat] ঐ মামলায়  মোদী সরকারের এক সংখ্যালঘু মন্ত্রী আছেন; তিনি তাকে দিয়ে এসব ঘটনায় মন্ত্রী হিসেবে এক বিবৃতি দিয়েছিলেন যে, এমন ঘটনাগুলোর কথা সরকারের জানা নাই, এগুলো সব গুজব”।

    ওদিকে আরো ছিল। যেমন রাস্তায় যেকোনো মুসলমান নাগরিককে ধরে তাকে ‘জয়শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা এবং ক্রমাগত নির্যাতন করা যেমন বুকের খাঁচার ওপর উঠে দাঁড়ানো ইত্যাদি ধরনের অজস্র টর্চার- এসব ভিডিও ক্লিপ আমরা দেখেছি।

    আবার কলকাতার সর্বশেষ আরেক রূপ দেখেছি। জেলা শহরের শিক্ষকরা কলকাতায় অফিসের কাজে এসে, তারা মুসলমান বলে তাই তাঁরা শহরের হোটেলে থাকতে পারবে না, রেস্টুরেন্টে খেতে পারবে না বলে কথিত “পাড়া কমিউনিটির নামে” আপত্তি তুলে তাদের বের করে দেয়া হয়েছে।

    আরো ভয়ঙ্কর এক ঘটনা ছিল। তাবলিগ মারকাজে যোগ দিতে আসা প্রথমবারের লকডাউনে শহরে আটকা পড়া মুসলমানদের নিয়ে। বিজেপি মিডিয়া সেলের প্রধান এটাকে প্রসঙ্গ করে প্রপাগান্ডা ছড়ায় যে, মুসলমানরা অসভ্য, এরা খেতে জানে না, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা জানে না। হাতের আঙুল দিয়ে উঠিয়ে চেটে চেটে এরা খায়”। অর্থাৎ এটা নাকি মুসলমানদের নিচা কালচারের কাজ ও প্রমাণ। এভাবে মুসলমানদের নিয়ে নেতি ‘চিত্র’ একে সেবার এরা ছড়িয়েছিল যে, একারণেই নাকি ভারতে করোনাভাইরাস ছড়ানোর জন্য দায়ী এই নিচা কালচারের মুসলমানরা। চরম ঘৃণা ছড়িয়ে হিন্দু সমাজকে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য ওই সেলে কিছুই করতে বাকি রাখে নাই। অথচ এখন মোহন ভাগবত বলছেন, ভারতের হিন্দু-মুসলমান তারা সব এক। শুধু ‘একই’ না, তাদের ডিএনএ (মানুষের শরীরের মৌলিক কণা বা জিনগত বৈশিষ্ট্য) এরা একই। অর্থাৎ ইংরেজি রেস অর্থে ভারতের হিন্দু-মুসলমানের জাতিগত বৈশিষ্ট্যও নাকি একেবারেই এক। কী সাঙ্ঘাতিক? একেবারে উল্টা ‘ফতোয়া’!

    এদিকে মোহন ভাগবতের এই বক্তব্য প্রসঙ্গে, ভারতের মুসলমানদের মধ্যে মিশ্র-প্রতিক্রিয়া হয়েছে বলে দ্য হিন্দু পত্রিকা লিখেছে। পত্রিকাটার নিজস্ব মন্তব্য হল, সমাজের বেশির ভাগেরই ধারণা, বদলে যাওয়া গ্লোবাল রাজনীতিতে আরএসএস তার ইমেজ বদলে খাপ খাইয়ে নিতে এটা করছে বলে মনে করছে [However, most of them saw it as an attempt to reshape the RSS’s image according to changing global politics.]। 

    ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় হায়দ্রাবাদের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ফয়জান মুস্তফা [Faizan Mustafa], কলাম লিখেছেন। তার পুরা লেখাটা “সবাই লিবারেল বা উদারনৈতিক হয়ে গেলেই তো হয়” ধরনের; মানে হিন্দুত্বের চাপের মধ্যে থাকা এতদিনের কলকাতার মুসলমানদের অবস্থার মত। যার সার কথা হল, হিন্দুত্বের আধিপত্যটাকেই আপন বলে মেনে নিতে এরা সাজেশন দেন। কারণ, তাহলে বিনিময়ে ওরা হিন্দুত্বের সমাজে থাকতে পারবে –  তাতে ওরা স্কুলে ঢুকতে দিবে, এক বেঞ্চে বসতে দিবে, পাস করে ডিগ্রি পেলে একই অফিসে কলিগ বলে দু-এক্টা চাকরি ছুড়েও দিতে পারে ইত্যাদি। অতএব, এটাকেই মুসলমানেরা নিজেদের ‘লিবারেল’ জীবনযাপন বলে চালিয়ে দেক, এটাই এদের মন বাসনা! যেন বলতে চায় বিরোধ করে আর কতদুর কী হবে!

    আসলে ফয়জান মুস্তফার লেখার শিরোনামটাই এমন অনেক কথা বলে দেয়। যেমন তার লেখার শিরোনাম হল, ‘মোহন ভাগবতের সাম্প্রতিক মন্তব্যটা কি হিন্দুত্ববাদের নরম ধারার ইঙ্গিত?’ [Are Mohan Bhagwat’s recent remarks a sign of moderation in Hindutva?]

    নিঃসন্দেহে এগুলো খুবই হতাশার কথা। কারণ যেখানে খাড়া কথাটা হল – কারো ধর্মীয় মতবাদের নরম বা গরম রূপ বা ধারার কোনোটা নিয়েই আমাদের রাষ্ট্র সাজানো যায় না।  কারণ রাষ্ট্র গঠন বা সাজানোর কাজে কম্প্রোমাইজ বলে করার কিছুই নাই, সুযোগ নাই। কারণ মূল কথা, নাগরিক যেই হোক তারসহ সবার নাগরিক অধিকার সমানই হতে হবে। কোনো উসিলায় কেউ ‘বেশি অধিকারী’ হতে পারে না। যেমন আমরা সংখ্যায় বেশি বা আমার ধর্মটা বেশি ভালো বা আমি সমতলী তাই পাহাড়িদের চেয়ে আমি এগিয়ে অথবা আমি বাঙালি ইত্যাদি কোন অজুহাতেই কারো অধিকার কম কারো বেশি এটা হতে পারবে না।

    কাজেই মোহন ভাগবত হিন্দুত্ববাদটাকে এবার নরম করে হাজির করেছেন কিনা – এটা কোন আলাপই হতে পারে না। তাই এটা মুসলমানদেরসহ কারো গ্রহণযোগ্য হবে – সরি, আমরা খুবই সরি; এটা হতেই পারে না। বিশেষ করে নরম অথবা গরম যাই হোক এটা মূলত হিন্দুত্ববাদ এদিকটা নজর করতেই হবে। এই হলো সার কথা। তবে ফয়জন সাহেব হয়ত বাস্তবের সমাজে হিন্দুত্বের প্রবল চাপের মধ্যে টিকে ও বেঁচে থাকতে চেয়ে কৌশলগতভাবে এমন লিখতে গিয়েছেন। কিন্তু তবু মোহন ভাগবতের প্রশংসা করতে যাওয়ার কৌশল নেয়াটা তার ঠিক হয়নি। [The RSS chief deserves appreciation for repeatedly saying that Muslims are equal citizens of this country.] তিনি তাকে স্বাধীনচেতা ও অন্য কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদীদের তুলনায় ভালো বলে সার্টিফিকেট দিয়েছেন। সেজন্যই নাকি মোহন ভাগবত হিন্দুত্ববাদের এসব অন্যায়কে অন্যয় বলতে পেরেছেন- এমন মন্তব্য করেছেন। [He speaks his mind and that, too, without any fear of retaliation from the extreme Hindu right. ]

    আসলে ফয়জন মোস্তফা সাহেব এখানে বাস্তবতার চাপে সম্ভবত চরম আর সহনশীল বলে দুটো হিন্দুত্ববাদ আছে এ কথা বলছেন। তবু এভাবে কথা বলাও আসলে কৌশলগতভাবেও ভুল পথ। তবে তিনি প্রশ্ন তুলে একটা শেষ বাক্য লিখেছেন খুবই মারাত্মক।   লিখেছেন, ‘রাজা রামমোহন রায়ের কথিত হিন্দু রেনেসাঁ কি আসলে বেদ ও উপনিষদে আবার ফেরত যাওয়ার তাগিদ ও আহ্বান নয়? Was not Raja Ram Mohan Roy’s Hindu renaissance all about going back to the Vedas and Upanishads? তার লেখার শেষের এই অল্প কটা শব্দের বাক্য কয়টা আসলে তার মনের কথা – যা তিনি বাইরে না এনে পারেননি। এ জন্য তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।

    কেন এই সময় মোহন ভাগবতের পিছু হটতে চাইলেন?
    নিঃসন্দেহে এটা আরএসএস-বিজেপিরই পিছু হটা; তাতে এটা গরম থেকে নরমে অথবা আগের হিন্দুত্ববাদই তাতেও কিছু যায় আসে না। তবে সেটা এবার লিবারেল করে হাজির করা হয়ত – সেটা যাই হোক না কেন, এটা পিছু হটাই। কিন্তু কেন? আর এখন কেন? এর সম্ভাব্য দু’টি কারণ বলব।

    এক. মোদি সরকারের অবস্থা ভালো নয় বলে সেটা আরএসএস-বিজেপি অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে এসেছে। এর মূল বিষয় অর্থনৈতিক দুরবস্থা। মনে রাখতে হবে, করোনা এবং দ্বিতীয় ঢেউ অবশ্যই  অর্থনীতির দুরবস্তায় বড় ফ্যাক্টর। কিন্তু যারা ভারতের অর্থনীতি মনিটর করে আসছেন তারা মানেন, করোনা ফ্যাক্টর হওয়ার বহু আগে থেকেই ভারতের অর্থনীতি দুর্বলতা দেখিয়ে আসছিল। আর সেটাই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসার পরও। তবে এবার ফাইনালি মোদী ধরা খেয়েছেন কারণ তিনি উত্তরাখন্ড রাজ্যে কুম্ভমেলায় গঙ্গাস্নানের আয়োজন আর কয়েকটা  রাজ্য নির্বাচনের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার কারণে  অতিরিক্ত রোগীতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা (অক্সিজেন, বেড বা সৎকার ইত্যাদি নিয়ে হাহাকার) ভেঙ্গে পড়ায় সবকিছুতে মোদি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। সহসাই আর এই অর্থনীতিতে রিকভারি হচ্ছে না। কারণ এখন  মুখ্যত প্রথম এক বছর যাবে করোনা থেকে রিকভারি করতে; এরপরে অর্থনীতি চাঙ্গা করতে মনোযোগ দেয়ার সময় আসতে পারে। আর ইতোমধ্যেই সরকারি ফান্ডে অর্থের সঙ্কট চারিদিকে উকি দিচ্ছে। যেমন জ্বালানি তেলের উপর ট্যাক্স বসিয়ে দ্রুত রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সঙ্কটের এটা একটা খুবই খারাপ চিহ্ন। কারণ এটা আত্মঘাতি। কারণ তেলের দাম বাড়ানোর ইমপ্যাক্ট যেকোন উতপাদিত পণ্য ও সেবার উপরে বড় করে পড়ে। এক লিটার ডিজেল বাংলাদেশে ৬৫ টাকা আর ভারতে (বাংলাদেশি টাকায় কনভার্ট করে) ৮১ টাকা।

    ইন্ডিয়ান হামবড়ার ফেরত মারঃ
    এছাড়া সব কিছুতে অপ্রয়োজনে মিথ্যা হামবড়া দেখানো ভারতের এক পুরনো স্বভাব। তবে অনেক হামবড়া দেখানোর ক্ষেত্রে বাইরের মানুষ পরে জেনে যায় ওই অংশটা লোক দেখানো ছিল তবে তাতে হয়ত তেমন ক্ষতি হয় না। কিন্তু ভারত ‘টিকা কূটনীতির বড় প্লেয়ার’ এই মিথ্যা হামবড়া ভাব এবার ভারতকে একেবারে ফুটা করে ছেড়ে দিয়েছে। খোদ ভারতই এখন সারা দুনিয়া থেকে নিজের জন্য টিকা সংগ্রহে নাকাল হয়ে পড়েছে। কারণ সুপ্রিম কোর্ট একেবারে চেপে ধরেছে এর সত্যিকার অবস্থা জানাতে বলছে। এতেও ভারতের যোগ্য সবার জন্য টিকা দেয়া শেষ করতে ক’বছর লাগবে সেটাই এখনো অনিশ্চিত।
    এর পরে আরো বড় সমস্যা আছে। এখন টিকার বড় অংশ বাইরে থেকে আনতে হচ্ছে বলে এই টিকার মূল্য (আগে স্থানীয় টিকা ছিল ১৫০ রুপী, এখন তা হাজার রুপীর মত) জোগাড় করতে আর সাধারণভাবে ‘স্বাস্থ্য খাতের’ অর্থ পেতে ভারত এখন লাজলজ্জা ভুলে তৃতীয় বিশ্বের গরীরদেশ সেজেছে।  আসলেই সে গরীব দেশ হয়েও নিজের হামবড়া দেখাচ্ছিল যে সে টিকা কূটনীতিতে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী। আর এখন সেসব ফাঁপা ইমেজ ভুলে, পশ্চিমের দাতা অনুদান চক্রের কাছে খোলাখুলি হাত পেতে “লাইনে দাড়িয়ে গেছে”। জয়শঙ্কর আমেরিকার মন পেতে হয়রান সময় পার করছে। এক কথায়, ভারত এখন টিকা পেতে আর হাসপাতালের খরচ চাইতে  এখন দাতব্যের সন্ধানে নেমেছে। তাকে লিল্লাহ-য় এখন এসব পেতেই হবে। কারণ এখন লোকলজ্জার সময় নেই। কেন?
    এক কথায়, যতই ভারত তার নাগরিকদের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা পেতে দেরি করবে ততই অর্থনীতি ন্যূনতম স্বাভাবিক হতে তা পিছাতে থাকবে। আর তাতে, ততদিন অর্থনৈতিক রিকভারির প্রসঙ্গে কথা আসতে পারবে না। টিকাদান শেষ না হলে অর্থনীতি, মানে ন্যূনতম অবাধে মানুষের মুভমেন্টই শুরু হবে না। করা যাবে না। আর এর ভেতরে আবার যদি করোনার তৃতীয় কী চতুর্থ ঢেউ হানা দেয় তো সব শেষ। এজন্যই সব দেশের জন্যই টিকাদান সবার আগে শেষ করা একেবারেই মুখ্য কাজ। অথচ মোদীর জন্য একাজটাই এখনো অনিশ্চিত হয়ে আছে।

    এদিকে, ইতোমধ্যে ভারতের জন্য এক মহাবিপর্যয় এবং ইজ্জতের সওয়াল উঠে এসেছে।  যার শুরুটা করেছিল লন্ডনের ফাইনান্সিয়াল টাইমস ম্যাগাজিন। তারা এক বিস্তারিত রিপোর্টে ভারতের অর্থনীতি থেকে দেখিয়ে রিপোর্ট করে যার শিরোনাম হলো,  “India’s Covid calamity exposes weakest link in US-led ‘Quad’ alliance”। মানে হল, ভারতের কোভিড বিপর্যয় (মানে কোভিডের সেকেন্ড ঢেঊয়ে মোদী প্রশাসনের ভেঙ্গে পড়া) আমাদেরকে খুলে দেখিয়ে দিয়েছে যে আমেরিকান নেতৃত্বের কোয়াডে ভারত একটা দুর্বল শক্তি, একটা মারাত্মক ফুটা (উইক লিঙ্ক)। কোয়াড মানে আমেরিকা, জাপান অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের এক আন্তর্জাতিক জোট।  অর্থাৎ যেন বলতে চেয়েছে এই জোটের মধ্যে ভারত দুর্বল বলে সে কম্পটেবল বা বাকি সবার সাথে তুলনীয় দেশ নয়; ফলে সে বাকি সবাইকে ডুবাবে। অর্থাৎ আবার সেই খামোখা হামবড়া দেখানোর পরিণতি।

    আমাদের দিনাজপুরের এক আঞ্চলিক প্রবচন – “দই ফেলে  ভেলটাঙগা!”। মানে, দই এমন একটা জিনিষ যা একবার মাটিতে পরে গেলে তা আর উঠায়ে নেয়া যায় না। তাই দই হাত থেকে পরে গেলে এবার আর নিজের বোকা উলটানো ঠোট দেখায়ে নিজের বেকুবি প্রকাশ করা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না।  কাজেই সাবধান!  মানে আমাদের এই কনটেক্সটেঃ  চাপাবাজি করতে গিয়ে আজ মোদীর এই দশা। তাই সব জিনিষ নিয়ে চাপাবাজি করতে হয় না।

    ভারত টিকার কারখানা বাড়ানোর জন্য আমাদের থেকে আগাম অর্থ নিয়েও শেষে টিকা দেয় নাই। অনেকের কাছে মনে হতে পারে ব্যাপারটা একেবারেই লোকাল আঞ্চলিক। মানে স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের মধ্যেকার রাগারাগি। তাই সবাই ভেবেছিল এই কেলেঙ্কারি ঘরের ভিতরেই থাকবে।  না একেবারেই না। এটা গ্লোবাল। আর এই অভিযোগে ভারত কোয়াড জোটে থাকার অযোগ্য, এখন এই প্রশ্ন উঠে গেছে। কেন?

    বাইডেন ক্ষমতায় এসেই দেড় মাসের মধ্যে প্রথম কোয়াড  মিটিং (অন লাইনে) ডেকে বসেছিলেন ১২ মার্চ ২০২১। উদ্দেশ্য ছিল নিজদেশের জন্য টিকার হাল করা আর সাথে সারা দুনিয়ায় জন্য কিছু টিকার মজুদ যোগাড় হাতে নিয়ে টিকা কুটনীতিতে চীনের মোকাবিলায় নামা যায় কিনা সে সম্ভাবনা যাচাই করা।  কিন্তু সেখানেও মোদীর সেই হামবড়া সবকিছুকে ছাপিয়ে উঠেছিল। বাইডেনের ইচ্ছা ছিল না আগেই টিকা বিলি করা নিয়ে এখনই চীনের সাথে মাসল দেখিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ার। তিনি কেবল সম্ভাবনা কী তা জানতে চাচ্ছিলেন আর তার মূল টার্গেট ছিল আমেরিকার জন্য টিকা সংগ্রহ।  কিন্তু ভারত দাবি করতে থাকে যে সে সারা দুনিয়ার জন্য টিকার মজুদ নিয়ে চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে দাড়াতে পারে। এমন উতপাদন সক্ষমতা তার আছে। কেবল, বিনিয়োগ ক্ষমতা নাই বলে সে পারছে না। আমেরিকা বিনিয়োগে সাহায্য করলে সে টিকা কূটনীতিতে চীনকে দেখিয়ে দিতে পারে।  বাইডেন জাপানকে এসব কথা চিন্তা করেই আগাম কথা বলে এসেছিলেন যে জাপান সেই বিনিয়োগ দিবে। এভাবে ভারতের হামবড়ার চোটে শেষ পর্যন্ত রেজুলেশন দিয়ে মিটিং শেষ করতে হয় যে তারা চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় নামবে।

    এখন বাংলাদেশকে প্রতিশ্রুত টিকা না দিবার খবর সবাই জেনে যায়। তাই ফাইনান্সিয়াল টাইমস এখন এঘটনাকে ভারতের আসল মুরোদের উদাহরণ হিসাবে হাজির করেছে। আর বলছে যার প্রতিশ্রুত টিকা দিবার মুরোদ নাই এমনকি নিজদেশের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা উতপাদনেরই মুরোদ নাই – তাকে বাইরে থেকে টিকা সংগ্রহে নামতে হয়েছে – সে কেন ঐ হামবড়া দেখায়ছিল? চীনের সাথে টিকা কূটনীতির প্রতিযোগিতায় নামা দূরে থাক সে তো নিজের টিকাই বানাতে পারে নাই। ভারতের সামগ্রিক টিকা উতপাদন ক্ষমতা ভারতের নিজের জন্যই যথেষ্ট নয়। এর সবসচেয়ে ভাল প্রমাণ হল, ভারত ইতোমধ্যেই টিকা আমদানি শুরু করে দিয়েছে। তাহলে সে চীনের সাথে প্রতিযোগিতা টিকা কূনীতি এসব বলে আমেরিকার কাছে মিথ্যা হামবড়া  করতে গেছিল কেন।

    আবার ভারতের নিজের স্বাস্থ্য  ব্যবস্থাই যার এত দুর্বল যে এটা ভেঙ্গে পড়েছে – এটা তো একটা চিহ্ন যে, রাষ্ট্র হিসাবে এর সক্ষমতা দক্ষতা কেমন কী কোন স্তরের। কাজেই সে প্রতিযোগিতায় আসবারই তো যোগ্য নয়!

    ভারত টিকে আছে “কঠিন উগ্র জাতিবাদী দেশপ্রেমের” ফুটানি দিয়ে। স্বভাবতই এসব কথা তাদের হজম করা কঠিন। তাই তাদের যুক্তি একটাই যে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ এসে গেল তাই নাহলে চীন-আমেরিকাকে দেখিয়ে দিত।  এটা মিথ্যা কথা, কোন জবাবই নয় এটা। একই কথা বাংলাদেশকে টিকা না দিয়ে আমাদেরকেও দিয়েছিল। কারণ মূল প্রশ্ন হল, ভারতের টিকা উতপাদনের মোট সক্ষমতা যোগ করলেও তা শুধু ভারতের জন্যই যথেষ্ট নয়। কাজেই সে সারা দুনিয়ার জন্য টিকা উতপাদনকারী এই দাবিই তো ভুয়া। টিকা কূটনীতিতে সে নামতে চায় এই কথা তার উচ্চারণই তো হারাম! তাতে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ কোনদিন না আসলেও ভারত এই সমস্যাতে পড়তই!  এছাড়া ভারতের ১৮ বছরের উপরের সবাইকে টিকা দিতে গেলে ভারত কী পাচবছর লাগিয়ে তা নিজে উতপাদন করবে – এমন সুযোগ তো কোভিড দিবেই না! আর এই পাচবছর কী ভারতের অর্থনীতি সচল হলে অপেক্ষা করে বসে থাকবে? তবু ভারতের পালটা যুক্তিগুলো এমনই দেশপ্রেমে ভরা! কাজেই পালটা যুক্তিগুলো এমন খামোখা হামবড়ায় ভরা! এখানে তার কয়েকটা তুলে দিলাম যেমন এক,  দুই,    তিন । এককথায় এগুলো মুখরক্ষামূলক এমন দাবি যে কারও সাহায্য ছাড়াই ভারত চীনের মোকাবিলা করে চলেছে লাদাখে, এরকম। অথচ এই দাবিটাও ভুয়া। কারণ ভারত কম্প্রোমাইজ করেছে চীনের কাছে ভুমি মালিকানা ছেড়ে দিয়ে আর দুই, ভারতের সরকার বা রাজনীতিক আর বাহিনীর লোকেরা নিজেদের মধ্যে স্বীকার করে নিয়েছে যে ভারত সামরিক শক্তি যথেষ্ট নয় তাই এই আপোষই জায়েজ! কাজেই চাপাবাজিতে হামবড়া করে চলতে চাইলে একসময় না একসময় হাত থেকে দই ফেলে দেওয়ার দেওয়ার বেকুবিতে পড়তেই হবে!

     মোহন ভাগবতের পিছু হটার দ্বিতীয় কারণঃ  এই কারণটা হল, আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার ফেরত চলে যাওয়া। ভারতের ওপর এর সোজা প্রভাব হল, এতদিন আমেরিকার আড়ালে থেকে ভারত জঙ্গিবাদ বিরোধিতার নামে ইসলামোফোবিক, ইসলামবিদ্বেষী সব ঘৃণা জাগিয়ে সারা ভারত এবং প্রতিবেশীদের ওপর হিন্দুত্ববাদের ছড়ি ঘুড়িয়ে চলছিল। কিন্তু এখন আমেরিকা নেই (মানে প্রত্যাহার) তো ভারসাম্য নেই, ভেঙে গেছে। সশস্ত্র ইসলামী রাজনৈতিক গ্রুপ প্রায় সবাই এতে মুক্ত হয়ে ভারসাম্য ভেঙে পড়তে শুরু করবে বা ভেঙ্গে গেছে বলে তাদের সবার সাথে এখন আমেরিকা তো নাই,  ভারতকে নিজেই নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য এদের মোকাবেলা করতে হবে। এ কারণে ভারতের কাশ্মির রক্ষা হুমকির মুখে পড়বে। অথচ গত দু’বছর ধরে কাশ্মিরে কেবল রাজনৈতিক তৎপরতা নয়, সাধারণ অর্থনৈতিক তৎপরতাও স্তব্ধ করে ফেলে রাখা হয়েছিল। মোদির ‘হামবড়া’ ছিল এই যে হিন্দুত্ববাদের জোশ তুলে কাশ্মিরকে দখল করে রাখা সম্ভব ছিল, ভারতের স্বাধীনতার সেকালে। সেটাই সে নাকি এখন করে ভারতের  কাশ্মীর বিজয় (৫ আগষ্ট ২০১৯) ঘটিয়েছিল।

    অথচ এখন উল্টা ভারতীয় কাশ্মির রক্ষা ধরে রাখাটাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে শুরু করেছে। কাশ্মিরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরাটাই সশস্ত্রমুখী হয়ে ওঠার সম্ভাবনায় কাপছে! অবস্থা আঁচ করে আমেরিকার পরামর্শে মোদি দ্রুত আপস করার পথ খুঁজছেন কিন্তু তা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কাশ্মীরের আইনি রাজনীতিক যেগুলা ছিল তাদেরকে মোদী এতদিন ঘরে বন্দি করে রেখেছিল। আজ সবাইওকে তোয়াজ করে ডেকে নিয়ে মোদী নিজ বাসভবনে মিটিং করেছেন। ওদিকে  ওই অঞ্চলের ইরান বা পাকিস্তানের সহযোগিতা এমনকি কিছু পরামর্শ পাওয়ারও পথ রাখেননি মোদী। কারণ যেমন ট্রাম্পকে খুশি করতে গিয়ে অবিবেচক ভারতের ভারত-ইরান সম্পর্ক হাতছাড়া হয়ে ভেঙে গেছে। আর ওদিকে পাকিস্তানবিরোধী অভ্যন্তরীণ হিন্দুত্ববাদী জজবা তুলে হিন্দু মেরুকরণে ভোট সাজতে গিয়েছেন তিনি সবসময়। আর এতে এখন পাকিস্তানের ইমরানের কোন সহযোগিতা পাওয়ার পথও তিনি নিজেই বন্ধ করে রেখে গেছেন। কিন্তু এখন বাইডেনকে খুশি করতে এমন বক্তব্য আপাতত তাকেই দিতেই হচ্ছে।

    অতএব, থুতু ফেলে সেই থুতু গেলা। হিন্দুত্ববাদের নরম ভার্সানকেই মোহন ভাগবতের বাইরে নিয়ে আসা! কিন্তু এতে ভরসা? না একেবারেই অনিশ্চিত সেটা! কেন?

    কারণ আগামি বছরের শুরুতেই তিনটা গুরুত্বপুর্ণ রাজ্য নির্বাচন উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব আর উত্তরাখন্ড। এর মধ্যে  উত্তর প্রদেশ সবচেয়ে বড় রাজ্য ফলে খুবই গুরুত্বপুর্ণ। কিন্তু আগের মতই মুসলমান কোপানো ছাড়া কখনই মোদী সেখানে ভয় দেখিয়ে নিজের বাক্স ভরতে পারে নাই। কাজেই এবার আরো না পারার সম্ভাবনা। অতএব আবার সেই  জয় শ্রীরাম বলানো কিংবা ‘ফ্রিজে মাংস রাখার’ অজুহাত ধরণের নির্যাতন বা কুপিয়ে হত্যার দিন আবার ফিরে আসার সম্ভাবনাই প্রবল!

    পঞ্চাশের দশকের ভারতের হিন্দি সিনেমার বিখ্যাত নায়ক দিলীপ কুমার যার আসল নাম ইউসুফ খান; তিনি গত সপ্তাহে বার্ধ্যক্কে  মারা যান। কিন্তু তাকে নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের সোশাল মিডিয়ায় যে  গালাগালি অপমান এসবই প্রমাণ করে মোহন ভাগবত কিছুই বদলান নাই। বদলাতেই চান এমন কোথাও কোন প্রমাণই এখনও নাই। সবই আসলে আইওয়াশ আর নয়ত চাপাবাজি!

    ভারত আসলে মোহন ভাগবতের খাঁকি হাফপ্যান্টের নিচে চাপা পড়ে গেছে। আর এই খাকি আবার হের হিটলারের ভলিনটিয়ার বাহিনীর সিম্বলিক পোষাক! কাজেই……

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১০ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “মোহন ভাগবত পিছু হটছেন কেন“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • প্রতিক্রিয়াঃ  চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শতবার্ষিকীতে 

    প্রতিক্রিয়াঃ  চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শতবার্ষিকীতে 

    গৌতম দাস

    ০৫ জুলাই ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3CM

     

    Celebrations for CPC’s centenary

    গত পয়লা জুলাই ২০২১, এদিন ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। অর্থাৎ পার্টির বয়স এখন ১০০ বছর পার হল। আর এসময়ের মধ্যে এর  অন্তত দুটা বড় সাফল্য হল, পার্টি জন্ম নেয়ার ২৮ বছরের মধ্যেই চীনে বিপ্লব সম্পন্ন ও ক্ষমতা দখল করে আসীন হয়ে যাওয়া। আর দ্বিতীয়টা হল, চীন ইতোমধ্যেই গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা হওয়ার পথে। গ্লোবাল অর্থনীতি নিয়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্টাডি রিপোর্টের পূর্বাভাস হল, আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হয়ে উঠতে যাচ্ছে [Chinese economy to overtake US ‘by 2028’ due to Covid…]।

    China will overtake the US to become the world’s largest economy by 2028, five years earlier than previously forecast, a report says.

    নিচে বৃটেনের এক লিডিং গবেষণা ও পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান কোম্পানি, CEBR ; তাদের এক তুলনামূলক গ্রাফ রিপোর্ট যা বিবিসি ছাপিয়েছে সেখান থেকে নেওয়া।

    US and Chinese economies 2010-2035. Gross domestic product in $US trillions (constant prices). Chart shows Chinese and US economic output over time with China overtaking the US around 2028 .

    এমনিতেই সাফল্য নিয়ে শত বছর পার হওয়া রাজনৈতিক দল হতে পারা খুব কম ক্ষেত্রে এমনটা ঘটে থাকে। যেমন ১৯১৭ সালে রাশিয়ায়, দুনিয়ার প্রথম কমিউনিস্ট ক্ষমতা দখলকারী  পার্টি হল লেনিনের (সোভিয়েত) রুশ কমিউনিস্ট পার্টি। কিন্তু ১৯৯১ এর আগস্টে এর সবকিছু শেষ হয়ে যায়, সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্রই ভেঙে পড়ে, এতে সরকারীভাবে বিলুপ্ত  ঘোষণা করে দেয়া হয়েছিল। এরপরে সেই থেকে এখনও তা রাশিয়াসহ মোট ১৫টি আলাদা রাষ্ট্রে  বিভক্ত হয়ে যায় । এই বিচারে চীনা পার্টির সাফল্য অনেক বেশি অবশ্যই।

    আবার ওদিকে,  কমিউনিস্ট বা সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্র বলতে যারা নিজেদের কমিউনিস্ট মনে করে এরা নিজেরা এবং দুনিয়ার বেশির ভাগ তাদের সহমর্মী চিন্তার মানুষেরা মনে করে যে, সেখানে সামাজিক উতপাদনের সমস্ত  “মালিকানা ব্যবস্থা সরকারি” কী না- এটাকেই তাঁরা মূল নির্ধারক মাপকাঠি  মনে করে আর এই ভিত্তিতেই তাঁরা কথা বলে থাকে। কিন্তু বাস্তবত দেখা যায়, ‘মালিকানা ব্যবস্থা সরকারি’ রেখে একটা সচল অর্থনীতি  হাজির রাখতে হিমশিম খাওয়ার পরে তারা এটাকে এক বড় বাধা হিসেবে আগে অনুভব করেছিল, আর তাতে সেটাই প্রথম ভাঙনের সুর বাজছে তারা টের পেয়েছিল । সে কারণে সংস্কারের প্রশ্নটা আমল করা হয়েছিল। সেখান থেকেই তত্ব ও কাজে একটা সংস্কার বা রিফর্ম করে নেয়ার চিন্তা আসে যাতে সংস্কার করে একটা সচল কার্যকর অর্থনীতি লাভ করার পথে যাওয়া যায়। এই প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়ন কার্যত ‘সংস্কারের পথে’ যাওয়ার সুযোগ নিতে পেরেছিল একেবারেই শেষের দিকে; মানে মাত্র ১৯৮৫ সালে মিখাইল গর্বাচেভ প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরে। বা বলা যায় লিওনিদ ব্রেজনেভের মৃত্যু বা তার শাসনযুগ ১৯৮২ সালে শেষ হওয়ার পর থেকে। কিন্তু বলতে গেলে অচিরেই গর্বাচেভ বড় সংস্কার কিছু শুরু করার আগেই পুরান সোভিয়েত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ একেবারেই হারিয়ে ফেলেছিলেন। ফলে ১৯৯১ সালের আগষ্টে  গর্বাচেভকেই নিজের মুখে সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘোষণা দিতে হয়েছিল।

    তুলনার চীনা পার্টি ‘সংস্কারের পথে’ নেমে যায় ক্ষমতা দখলের মাত্র ১০ বছরের মধ্যে; ১৯৪৯ সালে ক্ষমতা দখলের পরে ১৯৫৮ সাল থেকে। অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের চেয়ে অনেক অনেক আগে; যদিও কৌশলগত কারণে, চীনা নেতা মাও এই সংস্কারকে বাইরে  নাম-পরিচিতি দিয়েছিলেন “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” বলে।  আর এর ব্যাখ্যাটা ছিল এরকম যে  – তাদের পার্টির নেতারা মন-মানসিকতায় বুর্জোয়া হয়ে যাচ্ছেন তাই নেতা বদলের এক উলটপালট বা ঢেলে সাজাচ্ছেন তিনি। অনেক ক্রিটিক বলে থাকেন,  সরাসরি বললে তিনি আসলে করতে চাইছিলেন – চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম আগে, পরে ‘সমাজতন্ত্র’।

    তবে লক্ষ্যণীয় যে এবারের শতবার্ষিকী পালনের বক্তৃতায় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন [যেভাবে বাংলা বিবিসি রিপোর্ট করেছে সেই ভাষায়],“একমাত্র সমাজতন্ত্র চীনকে রক্ষা করতে পারবে, এবং চীনা ধাঁচের সমাজতন্ত্রই পারবে চীনের উন্নয়ন ঘটাতে,” [ Only socialism can save China, and only socialism with Chinese characteristics can develop China,”]।

    এতে এর মানে দাড়ালো, ১। চীন এখনও মনে করে এটা তাদের পার্টি “সমাজতন্ত্রই” করতেছে। ২। তবে সমাজতন্ত্র বলতে তা অন্যকারো ধারণার সমাজতন্ত্র নয়। তাদের পার্টি যেটাকে “চীনা বৈশিষ্ঠের সমাজতন্ত্র” বলে মনে করে এটা সেই অর্থের  সমাজতন্ত্র। ৩। উপরের দুই সুত্র থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারি যে অন্যকারো সমাজতন্ত্র বুঝাবুঝির বিচারে বা মাপকাঠিতে চীনে সমাজতন্ত্র হয় নাই এমন সিদ্ধান্তেও আসতে পারে। যেটা চীন আবার আমল করবে না।

    আমরা আবার চীন ও সোভিয়েত সংস্কারের একটা তুলনামুলক আলোচনায় ফিরে যাই।  সোভিয়েতের তুলনায় চীনারা তাদের সংস্কার  অনেক পরিকল্পিতভাবে করার সুযোগ পেয়েছিল; মানে একটা পরিকল্পনামাফিক আগাতে পেরেছিল।  সেটা আবার এই অর্থেও যে,  সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে যেমন  সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে আগিয়ে যাবার মুহুর্তেই সোভিয়েত রাষ্ট্রের ক্ষমতা হাত থেকে ছুটে বের হয়ে গেছিল। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে তারা এমনটা হতে দেয় নাই। মানে যাতে না হয়ে যায় সেদিকটা সামলাতে তারা সক্ষম হয়েছিল। যদিও চীনকে একাজে বহু চরাই-উৎরাইয়ের ধাক্কা তাকে কম সামলাতে হয়নি। এভাবে টানা ১০ বছরের মধ্যে নেতৃত্ব ও চিন্তায় বদলের মূলকাজটা শেষ করে মাও সেতুং পার্টির গঠন কাঠামো ও নেতৃত্ব একেবারে ওপর থেকে নিচে পর্যন্ত ‘সংস্কারি চিন্তায়’ বদলে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।  যার ফসল আজকের চীন!

    এমন চিন্তায় সংস্কার করতে মাওয়ের সফলতা ও ক্ষমতায় টিকে যাওয়ার পেছনে প্রধান সাফল্যের কারণ  সম্ভবত – মাওয়ের উপর পার্টি ও জনগণের আস্থা ঢিলা হওয়ার আগেই তিনি সংস্কারের উদ্যোগ  নিতে এবং তা শুরু ও শেষ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তুলনায় সোভিয়েতের ক্ষেত্রে তারা সংস্কার করতে গেছেন একেবারের তাদের ক্ষমতা যুগের শেষের দিকে যখন  পার্টি ভেঙ্গে পড়ার খুব কাছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, সংস্কার কাজটা শুরুতেই শুরু না কড়ায় ততদিনে খোদ পার্টি ইতোমধ্যে  বহুবিধ অনাস্থার সংকটে পড়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে যেসব রাষ্ট্র বা ভুখন্ড এতদিন সেই ১৯২২ সাল থেকে সোভিয়েত রাষত্রের ভিতরে জুড়ে নেওয়া হচ্ছিল মূলত তারাই তখন বের হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার জন্য গর্বাচেভের উপর  প্রবল চাপ তৈরি করতে সক্ষম হয়ে গেছিল।

    তবে চীনের ক্ষেত্রে আরেক বাড়তি সংকট ছিল। চীনের মাও সংস্কার শুরু করলে তাতে  আবার ওই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন যেন আবার অসন্তুষ্ট হয়ে সৈন্য পাঠিয়ে মাওকে ক্ষমতাচ্যুত করে না ফেলে এবং তা অভ্যন্তরীণ কোনো চীনা নেতার সহযোগিতায়- সেদিকটা নিশ্চিত করতে আগেই সোভিয়েত পার্টির সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে নিয়েছিলেন মাও। শুধু তাই নয়। এর কারণ হিসেবে, সোভিয়েত ইউনিয়নই  আমেরিকার মতই “আরেক সাম্রাজ্যবাদ” হয়ে গেছে বলে ব্যাখ্যা ও প্রচার করতে শুরু করেছিলেন তিনি। সোভিয়েত এর আগে সেকালের অন্য  কমিউনিস্ট দেশে [রোমানিয়া (১৯৪৪) ও চেকোশ্লোভাকিয়ায় (১৯৬৮) ] এমন জবর দখলদারি কাজ করেছিল। ঠিক একইভাবে যেমনটা পরে অকমিউনিস্ট  আফগানিস্তানে (১৯৭৯ ডিসেম্বরে) করা হয়েছিল ১৯৭৯ সালে, মূলত ইরানি বিপ্লবের ভয়ে। এগুলো বুঝতে পারলে বুঝা যাবে মাও সাবধানতা কেন নিয়েছিলেন!

    তবে  “সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ” এমন শব্দাবলিতে (এখন সাবেক) সোভিয়েত ইউনিয়নের গায়ে দাগ লাগিয়ে দেওয়ার কারণ হল  – আমেরিকাকে কমিউনিস্টরা “সাম্রাজ্যবাদ” বলে থাকে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নকেও তা বলতে চাইলে এর অসুবিধা হল, অন্তত মালিকানা প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়নের সবকিছুই রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকায়, যা আমেরিকার মত একেবারেই  নয়। তাই মাওয়ের চীনের চোখে, এই সোভিয়েত ইউনিয়ন হল ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী’ রাষ্ট্র। আর মাও এই মূল্যায়ন চালু করেছিলেন। এই বয়ান বা নামকরণ – এটা বাংলাদেশের চীনা কমিউনিস্টদের মধ্যে আশির দশকজুড়ে সক্রিয়ভাবে চালু ছিল। নব্বই দশক থেকে এটা ঝিমিয়ে পড়তে শুরু করতে করতে এখন আর এই ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী’ মূল্যায়ন করতে কাউকে দেখা যায় না, দেয়াল-লিখনেও না। এর বড় কারণ ১৯৯১ আগষ্ট থেকে সোভিয়েত রাষ্টটাই বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছিল।

    আবার চীনের বাইরের দেশে যেমন- বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের মধ্যে, সম্পদ বা উৎপাদন রাষ্ট্রীয় মালিকানাতে আছে বা চলছে কি না  – যদি চলে তবে এটাই সমাজতন্ত্র বা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র – এই ‘প্রধান নির্ণায়ক চিহ্ন’ হয়ে আজো থাকতে দেখা যায়।  যদিও এর বাইরেও ব্যতিক্রম অনেক রূপই থাকতে পারে, কিন্তু এটাই প্রধান ধারা। এই ধারার ভেতরে যারা পড়েন তাদের মুখ্য অনুমান যে – রাষ্ট্রীয় মালিকানাই সমাজতন্ত্র বা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। তবে একটা ডিসক্লেমার হল, এসবের সঠিক-বেঠিকতা নিয়ে আমি এখানে কথা বলছি না, সেটা আমার বক্তব্যও নয়। এর বাইরে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন ব্যাখ্যা আছে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কাউকে নাকচ করা বা কাউকে সঠিক /বেঠিক বলার কোনোই উদ্দেশ্য এখানে নাই।

    তবে সাধারণভাবে এখন বাংলাদেশে যে প্রধান ধারণা বিরাজ করে বলে আমার অনুমান তা হল, এদের অনুমান বা অবস্থান হল, ১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যুর পরে চীন আর কমিউনিস্ট বা সমাজতন্ত্রী দেশ নয়। যদিও মনে রাখতে হবে যে,  চীন আর কমিউনিস্ট বা সমাজতন্ত্রী হোক আর না হোক, চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে চলেছে, এটা আরেক বাস্তবতা। আমি এই বাস্তবতা নিয়েই মূলত লিখছি।

    চীন কিভাবে বদলে আজকের জায়গায় এলোঃ
    পরে ১৯৬৮-৭৭ চীনের এই সময়কালকে বলা যায় চীনের নিজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, জাতিসঙ্ঘের ভেটোক্ষমতাসহ সদস্যপদ ফেরত পাওয়া নিশ্চিত করা আর বিনিময়ে মূলত আমেরিকাসহ বিদেশী পণ্য ও বিনিয়োগ পুঁজির চীনে প্রবেশের ব্যবস্থাদি চূড়ান্ত করতেই ব্যয় হয়ে যায়। ১৯৭৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকা তারা পরস্পরকে স্বীকৃতি দান শেষে এর প্রকাশ হিসেবে দুই দেশই অপরের রাজধানীতে অ্যাম্বাসির কার্যক্রম চালু করেছিল। এরপর থেকে চীন হয়ে উঠে আমেরিকার জন্য বিনিয়োগের স্বর্গ। তবে সাবধানতা হিসেবে আমেরিকার কারা আগে চীনে বিনিয়োগ নিয়ে যাবেন এর ক্রাইটেরিয়া হিসেবে, বহু আগে থেকেই যেসব চীনা অরিজিন ব্যবসায়ী আমেরিকায় আসন গেড়ে বাস করছিলেন চীন তাদেরই প্রায়োরিটি দিয়েছিল। কারণ এই বিনিয়োগ নিবার ভালো-মন্দের দিকগুলো বুঝে আইন-কানুন ও রেওয়াজ (গুড প্র্যাকটিস) চূড়ান্ত করার গুরুত্বপুর্ণ দিকের কাজ তখনও বাকি ছিল। এভাবেই চীন-আমেরিকা সম্পর্ককে ব্যবহারিক আইন-কানুন ও গুড প্র্যাকটিসে হাজির দেখা শেষ করতে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত লেগেছিল। এর পরেই কেবল ২০ বছর ধরে (১৯৯১-২০১০) টানা ভাইব্রেন্ট ডাবল ডিজিটের চীনা অর্থনীতির সূচনা হয়েছিল। অবশ্য শেষের দিকে মানে ২০০৮ সালের গ্লোবাল মহামন্দার কারণে তা কিছুটা ঝুলে গিয়েছিল।

    চীন ও বিশ্বব্যাংকের সম্পর্কঃ
    এখানে চীনের সেকালে এসব পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের কিছু অবজারভেশন এখানে তুলে আনা যেতে পারে। যেটা বিশ্বব্যাংকের এক সাইট থেকে নেয়া।  যেমন, বিশ্বব্যাংকের সাথে চীনের ব্যবহারিক সম্পর্ক শুরু হয় ১৯৭৮ সালের শুরুতে আভ্যন্তরীন সংস্কার শেষ করার পরে ১৯৮০ সাল থেকে। বিশ্বব্যাংক বলছে চীন তখন সম্পর্ক শুরু করেছিল বিশ্বব্যাংকের আইডিএ [IDA] লোন গ্রহিতা সদস্য হিসাবে। IDA মানে হল International Development Association, যেটা আসলে ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে,  বিশ্বব্যাংকের সদস্য দেশের লোন পাবার যোগ্যতা তা বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা থাকে; এরই সবচেয়ে নিচের ক্যাটাগরি যা গরীব দেশের জন্য এটাই IDA লোন। এর নিচেও আরেকটা ক্যাটাগরি আছে সেটা হল যারা কোন লোন নিলে তা ফেরত (সুদ বা আসল কোনটাই) দিবার যোগ্যতাও রাখে না  বা তৈরি হয়নাই তাদের ক্যাটাগরি। অর্থাৎ এদেরকে তাই গ্রান্ট বা অনুদান ক্যাটাগরির গ্রাহক বলা হয়। এদেরকে অনুদান দিয়ে অবস্থা একটু ভাল করে পরের ধাপ  IDA এর লোন পাবার যোগ্য করা হয়। IDA, এই ক্যাটাগরিতে  ১.০% এর নিচে (০.৭৫%) সুদসহ আসল খুবই লম্বা প্রায় ৪০ বছর ধরে সময় নিয়ে ফেরত দিবার সুযোগ দেয়া হয়। তবু এটা আসলে সুদ না, বলা যায় বিশ্বব্যাংকের স্থানীয় অফিস চালানোর খরচ তুলে আনা। বাংলাদেশ ১৯৭৬ সালে লোন গ্রহিতা হওয়ার শুরু থেকেই এই ক্যাটাগরিতে ছিল। তবে একই সাথে অনুদানও পেয়েছে। সম্ভবত এখনও “সেফটি নেট” কর্মসুচিতে অনুদান এখনও পাশাপাশি চালু আছে।  চীনও IDA, এই ক্যাটাগরি থেকেই ১৯৮০ সালে যাত্রা শুরু করেছিল। ব্যাংকের ভাষায় IDA হল … fund for the poorest। কিন্তু চীন অচিরেই বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এরপরের ক্যাটাগরি হল – “লোয়ার মিডিয়াম বা মধ্যম আয়ের দেশের” ক্যাটাগরি যেখানে সুদের হার ২% [Lower mid $1,036 and $4,045]। বাংলাদেশে এখন এই ক্যাটাগরিতে। আর চীন ১৯৯৭ সালের এসব অতিক্রম করে চলে যায়। আর ২০০৭ সাল থেকে উলটা ঋণদাতা বা ডোনার দেশ হিসাবে হাজির হয়েছিল। এতে চীনের ১৯৮০ সাল থেকে গড়ে প্রতিবছর জিডিপি বেড়েছিল ১০%  করে। বলাই বাহুল্য এটা খুবই উঁচু পর্যায়ের রাইজিং ইকোনমির দেশের বেলায় ঘটে থাকে। এভাবে ২০০৭ সালের মধ্যে চীন তার জনগোষ্ঠির ৮০ কোটি (বর্তমান জনসংখ্যা ১৪০ কোটি) লোককে প্রভার্টি বা দরিদ্র স্টেজ থেকে উঠিয়ে এনেছিল। উপরের এই তথ্যগুলো এই লিঙ্ক থেকে নেওয়া। আর বিশ্বব্যাংকের সাথে চীনের পার্টনার সম্পর্ক করার ত্রিশ বছরের মধ্যেই ২০১০ সালে চীন বিশ্বব্যাংকের তৃতীয় বড় মালিক হয়ে উঠেছিল। চীনের এর উপরের মালিক হতে আমেরিকা নাকচ করাতেই মূলত চীন নিজে আলাদা বিশ্বব্যাংক-তুল্য ব্যাংক [AIIB] ও BRICS ব্যাংক গড়ার দিকে রওয়া দেয়।

    তবুও এখনো পুরান কমিউনিস্ট ধারার অনেকেই চীনের এই গ্লোবালি রাইজিং অর্থনীতি, এটা ‘কিছুই হয় নাই’ বলে নাকচ করতেই পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে কী ভিত্তিতে তিনি তা বলছেন, তা বুঝার জন্য সেদিকে মনোযোগ দেয়া যেতে পারে। কারণ চীন সম্পর্কে আমাদের সিদ্ধান্তের ফারাক হতেই পারে। তবে এই ফারাকগুলো মূলত কী ভিত্তিতে কথা বলছি মানে কোন কাঠিতে মাপছি, এগুলো আসলে সেই মাপকাঠির ফারাক। এটা বুঝলে বা জানতে পারলেও অনেক লাভ।
    এ দিকে দেখা যাচ্ছে এবার বিবিসি জানাচ্ছে, ‘একমাত্র সমাজতন্ত্র চীনকে রক্ষা করতে পারবে এবং চীনা ধাঁচের সমাজতন্ত্রই পারবে চীনের উন্নয়ন ঘটাতে” – চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নাকি শতবার্ষিকী পালনে এমন  বক্তব্য দিয়েছেন।
    যদিও এখনও চীনে এটা সমাজতন্ত্র হয়েছে কিংবা হয়নি- এ নিয়ে কাউকে কাউকে আমরা বিতর্ক করতে দেখতে পারি। কিন্তু তাতে চীনের গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হওয়ার অভিমুখ বদলাচ্ছে না।

    শতবার্ষিকীতে চীনের বাইরের দেশের প্রতিক্রিয়াগুলোঃ
    এবারের এই বার্ষিকী যতটা না চীনের অভ্যন্তরীণ এর চেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া বিদেশের এবং তা এমনকি চীনের বন্ধু-শত্রু, অথবা চীনের প্রতি ঈর্ষাধারী কিংবা কৌশলগত কারণে যারা পছন্দ বা উচ্ছ্বাস-প্রকাশকারী নির্বিশেষে সবার মধ্যেই প্রতিক্রিয়া হতে দেখা গেছে।

    এসবের মধ্যে পশ্চিমের মিডিয়া রিপোর্ট আর তাতে প্রকাশিত মন্তব্য ও অ্যানালাইসিসে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়াগুলো লক্ষণীয়। এসব লেখায় এবারই প্রথম দেখা গেল, চীন যে নিজেকে এখনো কমিউনিস্ট বলে দাবি করে একথা এরা মেনেই নিয়েছে। সেটা এই অর্থে যে এনিয়ে কোন বিরূপতার এবার আমরা দেখি নাই। আর এই ‘কমিউনিস্ট নামে রেখেই’ চীনের উঠে আসা সাফল্য বা চ্যালেঞ্জ পশ্চিমের সাথে চীন বরাবর বা সমান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং যা পশ্চিমকে ছাড়িয়েও যেতে পারে, যেন তারা মেনে নিচ্ছে। কোনো প্রশ্ন তোলেনি তারা। এমনকি চলতি একুশ শতকের শুরু থেকে প্রথম ১৫ বছরও আমরা দেখেছিলাম চীন পশ্চিমের সাথে কম্পাটেবল বা তুলনীয় নয় বলে আমেরিকা সরকারি আপত্তি তুলছে। ওবামা আমলেও প্রায়ই এমন দাবি উঠতে দেখেছি আমরা। তাদের দাবি, চীন নিজের ‘মুদ্রার মান’ কমিয়ে রেখে সাফ। যদিও ২০০৮ সালের মন্দায় পরের বছরগুলো অন্তত একদশক জুড়ে জাপান তার ইয়েনের ‘মুদ্রার মান’ কমিয়ে রেখে চলেছিল। এক ডলার সমান ৯২-১০৮ ইয়েন এভাবে ভ্যারি করেছিল।  কিন্তু আমেরিকাকে আপত্তি তুলতে দেখা যায়নি।

    এখানে আমাদের পাঠকের অনেকের কাছে মুদ্রার মান কমে যাওয়ার ব্যাপারটা পরিষ্কার নয় হয়ত। তাই কিছু সংক্ষিপ্ত ধারণা দিয়ে নিব। যদিও ভারতের জাতিবাদী রাজনীতির চোখে, ডলারের তুলনায় রুপির মান কমে যাওয়া (মানে বেশি রুপী দিতে হওয়া) দেশবিরোধী কাজ বা ঘটনা মনে করা হয়। অর্থাৎ ভারতের সরকার ও জনগণ সবার চোখেই এটা ভারত স্বার্থবিরোধী নেতিবাচক কাজ। কিন্তু এখানে আমরা দেখেছি আমেরিকা চীনকে অভিযুক্ত করছে যে, ইউয়ানের মুদ্রামান চীন ইচ্ছা করে কমিয়ে রেখেছে আর এটা অন্যায় কাজ বলে আমেরিকা দাবি করে যাচ্ছে। এমন হচ্ছে কেন? আর এর মানে কী তাহলে?

    কারণ এটা গ্লোবাল বাণিজ্যের যুগ। মানে এটা আর তথাকথিত জাতিবাদী উৎপাদন বা জাতিবাদী অর্থনীতির যুগ নয়। অর্থাৎ যখন কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ ভোক্তাদের দিকে তাকিয়ে উৎপাদনের চেয়ে রফতানির জন্য উৎপাদন অর্থনীতিই দেশের প্রধান অর্থনৈতিক তৎপরতা হয়ে ওঠে – সেটা দেখে বুঝা যায় এটাই গ্লোবাল বাণিজ্যের যুগ। এক কথায়, দেশীয় ভোক্তার জন্য উৎপাদনের তুলনায় রফতানির জন্য উৎপাদন তুলনায় বেশি সুবিধা ও মনোযোগপ্রাপ্ত সেক্টর হয় যখন। আর এ ক্ষেত্রে মুদ্রা মান কম করে রাখা বা আপনাতেই যদি কমে যাওয়া ঘটে কখনো তবে তা রফতানিকারক দেশের জন্য বেশি লাভ ও সুবিধাজনক হয় সাধারণত। কিভাবে?

    মুদ্রা মান কমে যাওয়া মানে যেমন (ধরা যাক) আগে, বাংলাদেশ থেকে এক ডলারে  একটা শার্ট কিনতে পাওয়া যেত এমন হলেও এখন দেড় ডলারে দুইটা পাওয়া যাবে এরকম হয়েছে। স্বভাবতই এখন বিক্রেতা হিসাবে আমরা  কম মূল্য পাব। কিন্তু এতে আবার বিক্রির পরিমাণ বেড়ে যাবে। কারণ এখন প্রতিদ্বন্দ্বি ভিয়েতনামের ক্রেতারা কম দামের সুবিধা নিতে বাংলাদেশমুখী হবে। এতে বিক্রি বেশি হওয়াতে মুদ্রামান হারানোর লস কাভার হওয়ার পরও আমাদের বেশি লাভ হতে পারে। অর্থাৎ সময়ে নিজ মুদ্রার মান কমা, এটা নিজের জন্যই ইতিবাচক হতে পারে। আর ভারতের চিন্তাটা কুপমন্ডুক ও পুরানা (যখন রফতানির জন্য উৎপাদনের যুগ আসে নাই ) কথিত ‘দেশপ্রেমিক’ চিন্তা।

    ভারতের প্রতিক্রিয়াঃ
    পয়লা জুলাইয়ের ভারতের ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকা জানাচ্ছে এ বিষয়ে। বলছে, “কংগ্রেস বা বিজেপি এই দল দুটার কেউ চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে জন্ম-শতবর্ষ পার করানোতে কোনো শুভেচ্ছাও জানায়নি। তবে এক কমিউনিস্ট দল, সিপিএম জানিয়েছে”। আর কংগ্রেসের এক সিনিয়র নেতা এনিয়ে বলেছেন, “বর্তমান রাজনৈতিক আবহ আমাদের দুই পার্টির মধ্যে রাজনৈতিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের উপযোগী নয়”। আসলে তিনি সম্ভবত বলতে চাইছেন লাদাখে চীন-ভারত সীমান্ত উত্তেজনার কথা। গত বছর সেখানে অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা চীনাদের হাতে নিহত হয়েছেন। সে ঘটনাটাকে পাশে সরিয়ে রেখে সৌজন্য দেখাতে গেলে তাতে কংগ্রেস বা বিজেপি যেই দেখাতে যাক অপর দল তাতে ‘মাইলেজ’ নিতে অপরের বিরুদ্ধে পাবলিক সেন্টিমেন্ট উসকে সুবিধা নিতে চাইতে যাবে বলে তারা একে অপরের ভয়ে ভীত। তাই তারা দুই-পার্টি কেউ শুভেচ্ছা জানানোর ধারে কাছে যায়নি। যদিও এটা খুব ভাল যুক্তি বা অজুহাত তা মানা যাচ্ছে না। যেমন এক ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে ভারত ৯১% নির্ভরশীল। তা তো ঠিকই তবু চলছেই। আবার ভারতের মোবাইলের বাজারে সবগুলো ব্যান্ডই মূলত কোন না কোন চাইনিজ। তরুণেরা চীনা মোবাইল ব্যবহার ছাড়ার চিন্তা করছে এমনটাই গত দুবছরে কখনই শোনা যায় নাই। আর সামগ্রিকভাবে চীনা পণ্য আমদানি এসময়ে বেড়েছে বই কমে নাই। তাই এই সাফাই দুর্বল অবশ্যই। যদিও শেষ বিচারে এটা যার যার পারশেপশন নিয়ে আর কিছু বলার থাকে না!

    ওদিকে,  সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির চীনা পার্টিকে লিখিত শুভেচ্ছা দেয়ার কথা পত্রিকাটা আমাদের জানাচ্ছে। এই লিখিত শুভেচ্ছাকে বলা যায় – ইয়েচুরি নিজেও কমিউনিস্ট এবং তাদের কমিউনিস্ট পার্টির দিক থেকে এটা আলাপ ও খাতিরমূলক শুভেচ্ছা এটা – তাই তিনি বুঝাতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, “চীন কিভাবে নিজের ভুল চিহ্নিত ও সংশোধন করে তার পলিসিগুলো দাঁড় করিয়েছে গত শতক এর সাক্ষী হয়ে থাকবে”। ‘সিপিএম গুরুত্ব দিয়ে যেতে চায় যে, “মার্কসবাদ-লেনিনবাদ এক সৃষ্টিশীল বিজ্ঞান। এটা শ্রেষ্ঠ ডগমাবিরোধী। তাই এটাকে কখনো কোনো আগাম সেট করা ফর্মুলা হিসেবে হাজির করা যাবে না”।  আবার তিনি বলছেন, “যদিও এক সৃষ্টিশীল বিজ্ঞান হওয়া সত্বেও এটা সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সাথে খাপখাইয়ে নেয়ার সময় বিপ্লবী প্রিন্সিপল ও মুক্তিলাভের উদ্দেশ্য শক্ত করে আকড়ে থাকে”। তিনি লেনিনের উদ্ধৃতি দিয়ে আরো বলেন, “সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ ডায়লেক্টিক্সের জীবন্ত সারকথা”। এছাড়া ইয়েচুরি,  চীন যেভাবে করোনা মহামারীর সামলিয়েছে এর ভূয়সী প্রশংসা করেন।

    কথাটা এত দীর্ঘ করার মূলকথা হল, সিপিএম চীনের ‘বিস্তারিত সংস্কারের’ (১৯৫৮ সাল থেকে সম্ভবত সবই) সব কিছুকেই অনুমোদন দেয়, তাই ইয়েচুরি জানিয়ে রাখার সুযোগ নিয়েছেন। তবে এই কমিউনিস্টের বিজ্ঞানবাদীতা খুবই দৃষ্টিকটু এবং পুরান কমিউনিস্টের নিচু চিন্তা পদ্ধতির লক্ষণ।

    এর মধ্যে বড় বিপজ্জনক হল, বর্তমান ভারতের পরিস্থিতি হিন্দুত্ববাদী ভোটের জমানার। ভোটের সময় সিপিএম এই কমিউনিস্টেরা হিন্দুত্ববাদের  বিরোধিতার চেয়ে কিভাবে এর সাথে খাপখাইয়ে চললে কিছু ভোট বা ভোট পলিটিক্সে লাভ হবে সেটাই সিপিএম করে থাকে। এমনকি তৃণমূলকে হারাতে সে বিজেপির কোলে উঠে বিজেপি দলকে জিতাতে কাজ করতে দ্বিধা করে না। তাই এখন এমন বক্তব্য তাদের দলের বিরুদ্ধেই যেতে পারে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৩ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শতবার্ষিকী“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কাশ্মীরে ফেল হিন্দুত্ববাদ, মোদীর দায় হয়ে উঠবে

    কাশ্মীরে ফেল হিন্দুত্ববাদ, মোদীর দায় হয়ে উঠবে
    মারবে আফগানিস্তানে লাশ পড়বে ভারতের কাশ্মীরে!

    গৌতম দাস

    ২৯ জুন ২০২১, ০০:০৬ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Ca

    Imageমোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    [সারকথাঃ  “মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে”
    গতমাসে কলকাতায় রাজ্য নির্বাচনে এককালের নকশাল পরে অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী বুড়া বয়সে ছেলেকে বাচাতে বিজেপিতে জয়েন করেছিলেন।  তাতে ঢলে পরা যৌবনের জোশ জজবা আনতে  এই ফাঁপা ডায়লগ চালু  করেছিলেন   “মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে”। তো মোদীর এখন সেই দশা! আফগানিস্তান থেকে বাইডেনের অ্যামেরিকা ফিরে যাচ্ছে নিশ্চিত, তা বুঝে মোদী টের পেয়ে গেছেন যে তার হিন্দুত্ববাদের চরম ক্রাইসিসটা এখন আফগানিস্তানে নয়, কারণ  লাশ পড়বে এখন কাশ্মীরে! ভারত এবার কাশ্মীর ধরে রাখতে পারবে কীনা সেই সঙ্কট আসন্ন! তাই আজকের আসল শিরোনামটা হওয়া উচিত ছিল সম্ভবত   “মারবে আফগানিস্তানে লাশ পড়বে ভারতের কাশ্মীরে!  
    বিজেপি-আরএসএস এতদিন মনে করে এসেছে যে কংগ্রেস ও নেহেরু হিন্দু-শ্রেষ্ঠ জাতিবাদে বিশ্বাস করে ঠিকই কিন্তু এদের ঈমান খুবই দুর্বল। জোর খাটাতে জানে না। তাই এরা হিন্দুত্ববাদের উদগ্র ও  নৃশংস-ক্ষমতার দিকটা পুরা ব্যবহারে নিতে পারেন নাই কখনও। একারণেই একচেটিয়া এক হিন্দু ভোট মেরুকরণের এর ব্যাপক সক্ষমতাটা ব্যবহার করতে পারে নাই। এখানেই বিজেপি কংগ্রেসের চেয়ে আগিয়ে ও শ্রেষ্ঠত্ব। আর তা থেকে ভারত রাষ্ট্রের অনেক অক্ষমতার মতই কংগ্রেস কাশ্মীরকেও ভারত নিজের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারে নাই। এতে নেহেরুর সবসময় পা-কাঁপেছে। বিজেপির চোখে এর বড় প্রমাণ হল, ভারতের কনষ্টিটিউশনে ৩৭০ ধারা যোগ করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ও স্বায়ত্বশাসনের রাজ্য বলে স্বীকার করে এরপর কাশ্মীরের উপর ভারতকে অধিকার নিয়েছিলেন।
    বিপরীতে মোদীর বিজেপি-আরএসএস মনে করে এসেছে তারাই হিন্দুত্ববাদের পুর্ণ ঈমানদার। কিন্তু কখনই ক্ষমতায় যেতে পারে নাই বলে আগে এই ঈমান ব্যবহারে নিতে পারে নাই, সবাই সাফার করেছে। তাই মোদীর সেকেন্ড টার্ম ২০১৯ সালের মে মাসে শুরু হবার পর  এবার তারা হিন্দুত্ববাদের শক্তি সক্ষমতা ও মাহাত্ব প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।  তিন মাসের মধ্যে, ৫ আগষ্ট ২০১৯ সালে মোদী-অমিত ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা করে কাশ্মীরকে ভারতের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে বলে মনে করতে থাকে। শুধু তাই না কাশ্মীর কোন রাজ্যই নয় সরাসরি কেন্দ্রের অধীনস্ত মানে মোদী-অমিতের অধীনস্ত প্রত্যক্ষ শাসনের ভুখন্ড করে নিয়েছিল।  এককথাট এটাকেই “কলোনি দখল” বলে। কারণ এতে কাশ্মীরের বাসিন্দাদের কোন মতামত শুনার কোন জায়গা বা ব্যবস্থাই রাখা হয় নাই। এভাবেই চলছিল এতদিন!
    কিন্তু এভাবেই মাত্র দুবছরো চলতে পারে নাই। হঠাত গত ২৪ জুন মোদী কাশ্মীরের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সাথে দিল্লিতে নিজ বাড়িতে এক বৈঠকে বসেছিলেন। সেখানে মোদী বলেছেন, অচিরেই সময় মত কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদা ফেরত দিতে তিনি তিনি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে চান। অনেকে বলছেন, মোদীর এই পশ্চাদ অপসারণ বাইডেনের পরামর্শ বা চাপ। এমনিতেই কাশ্মীর নিয়ে ভারত বাইডেনের সঙ্গে হাটতে পারছিলেন। মোদীর ভয় কাজ করত কখন বাইডেন কাশ্মীর প্রসঙ্গ তুলে বসেন।
    কিন্তু ইতোমধ্যেই মোদীর এই পদক্ষেপ প্রমাণ করেছে যে অন্তত কাশ্মীরে “হিন্দুত্ববাদ” ব্যর্থ ও পরাজিত।  হিন্দুত্ববাদের সিদ্ধান্তকে ফেলে মোদীর কাছে এখন বাইডেনের পরামর্শ শিরোধার্য। মানে প্রকারন্তরে মোদীকে বলতে হচ্ছে  – কাশ্মীরকে ভারতের জবরদখল ব্যর্থ। কেন? কারণ মোদী স্বীকার করে নিলেন  কাশ্মীর কার ও তা পরিচালিত হবে কীভাবে এই ব্যাপারে কাশ্মীরী বাসিন্দারাই আসল অথরিটি। তাদের সাথে কথা বলেই যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতে হিন্দুত্ববাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন জায়গা নাই। তাই কাশ্মীরের আইনি রাজনৈতিক দল যারা তাদের সাথেই মোদীকে কথা বলতে বসতে হল।
    আফগানিস্তানে আমেরিকায় পরাজয় বাকি সব পরাজয়ের ভাগ্যলিখন হতে যাচ্ছে।  সেকারণে বলেছি হিন্দুত্ববাদ ক্রমশ মোদীর জন্য দায় উঠবে।  মোদীকে এখন হিন্দুত্ববাদের জন্য কাফফারা দিতে পারতে হবে। কেন?
    লক্ষণীয় যে মোদীর সাথে কাশ্মীরের প্রায় সব আইনি রাজনৈতিক দলের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। তারা প্রায় ১৪ জন সিনিয়র মোস্ট নেতারা তাতে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু একটা দল বাদে। সে দলটার নাম বিজেপি।  বিজেপির প্রতিনিধি থাকলে ঐ ১৪ জনের কেউ আসত না। তাই এই ব্যবস্থা। অর্থাৎ মোদীর হিন্দুত্ববাদ করার এক কাফফারা মোদী ইতোমধ্যেই চুকালেন!]

    মোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    মোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    শুরুর কথাঃ
    আমেরিকা এ বছরই আগামী নাইন-ইলেভেনের মানে ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও জানিয়েছে এবং সে মোতাবেক সিরিয়াস প্রস্তুতি নিচ্ছে।

    কেউ মানতে চায়নি, কে আর মানতে চায় সাজানো বাগান ফেলে একদিন চলে যেতে হবে? না, দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার কথা বলছি না। বলছি, এত দিন মানে গত ৭৫ বছরের দুনিয়া বলতে যেটা ছিল আমেরিকান ইচ্ছায় সাজানো একটা দুনিয়া, আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের সেই দুনিয়া, তার কথাই বলছি। এরই অবসান হতে চলেছে। আর আপনি সেই সাজানো আমেরিকান দুনিয়াতেই থাকতে বাধ্য ছিলেন। আবার বিপরীতে যারা ছিল সেই আমেরিকার সভাসদ মানে আমেরিকার শাসন-সভায় একটা আসন পাওয়া দেশ যেমন ধরেন “ভারত” – তাহলে সেই ভারত কেন বিশ্বাস করতে চাইবে যে, আমেরিকার সাজানো দুনিয়া, ভারতের প্রিয় সেই দুনিয়াটা ক্রমেই শেষ হতে যাচ্ছে, একদিন আর থাকবে না!

    কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেটাই ঘটতে এবার সব নড়েচড়ে উঠেছে। এর যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে সম্ভবত আফগানিস্তান থেকে। কলকাতার ভাষাতেই যদি বলি ‘আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সব গুটিয়ে ছেড়ে যাওয়া নিয়ে ভারতের কপালে এবার বড় ভাঁজ পড়েছে।’ কেন? ভাঁজ পড়ার কী আছে?

    দাবুদ মোরাদিয়ান (Davood Moradian) একজন তাজিক বংশোদ্ভূত আফগান ও হেরাত প্রদেশের বাসিন্দা। [তার নাম বাংলায় ঠিকমত উচ্চারণ করলাম কি না জানি না। কারণ এটা আফগান এবং বিশেষ এথনিক নাম। তাই আগেই মাফ চেয়ে রাখলাম।] একাডেমিকভাবে তিনি ইউকে মানে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ও স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি। কাজ হিসেবে তিনি বর্তমান কাবুল সরকারের পররাষ্ট্র বিভাগের পরামর্শদাতা ও এক থিংকট্যাংকের আফগান শাখার ডিরেক্টর। তিনি সম্প্রতি এক প্রবন্ধ লিখেছেন, যা ছাপা হয়েছে ভারতের ‘দ্য প্রিন্ট’ পত্রিকায়। সেই শিরোনামটা বাংলায় বললে হয়, “আফগানিস্তানের সাথে জড়িয়ে থাকবে কি থাকবে না তা ভারতের জন্য কোনো সহজ প্রশ্ন নয়”। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা, তার লেখার ভিতরের একটা বাক্য আবার এ রকম – ‘আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে পালিয়ে যাওয়া এখন নয়াদিল্লির জন্য একটা পলিসি অপশন তো বটেই; ঠিক যেমন ১৯৬২ সালের মত, চীনের সাথে যুদ্ধের পরে ভারত তিব্বতের লাসায় থাকা ভারতের কনস্যুলেট জেনারেল অফিস গুটিয়ে নিয়েছিল। ভারত অবশ্য আগে ইতোমধ্যেই আফগানিস্তানের হেরাত ও জালালাবাদে ভারতের দুই আফগান কনসুলেট অফিস গুটিয়ে নিয়েছে”।

    কিন্তু মজার কথা হল, দ্য প্রিন্ট পত্রিকা লেখার সারাংশ হিসেবে এই প্রথম বাক্যটা- “আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে চলে যাওয়া নয়াদিল্লির জন্য একটা পলিসি অপশন তো বটেই; ঠিক যেমন ১৯৬২ সালের মত” – এতটুকুই তুলে নিয়ে সেঁটে দিয়ে রেখেছে।

    আমেরিকায় নাইন-ইলেভেন হামলার এক মাসের মধ্যে ততকালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ পালটা প্রতিশোধে আফগানিস্তানে সামরিক হামলা চালিয়ে সরকার ও প্রশাসন নিজ দখল নিয়েছিলেন। সে সময়ই আমেরিকার বিদগ্ধজন আপত্তি তুলে বলেছিলেন, এটা অপ্রয়োজনীয় ও বাড়াবাড়ি। মশা মারতে কেউ কামান বের করলে তার উদ্দেশ্য খারাপ বলতেই হয়। কিন্তু আফগানিস্তানে সামরিক হামলা করে ফেলার পরে আমেরিকার জন্য এই হামলার পক্ষে বিশ্ব-জনমত জড়ো করা আর এই হামলাকে সমর্থক রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়ানোর ছাড়া অন্য কিছু করার সুযোগ ছিল না। গ্লোবাল ডিপ্লোম্যাসিতে ভিন্ন কিছু করার আর সুযোগ ছিল না। সেই সূত্রে এশিয়ায় এক বড় জনসংখ্যার রাষ্ট্র ভারতল এর সমর্থন আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর এখান থেকেই ভারতও নিজেকে উল্টা এক ভিক্টিম বা ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি হিসেবে সাজিয়ে আমেরিকার কাছ থেকে সহানুভূতি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

    আর এখান থেকেই কথিত জঙ্গিবাদ বা টেররিজমের ব্যাখ্যা ও যুদ্ধ প্রসঙ্গে ভারত-আমেরিকার এক ‘আনহোলি অ্যালায়েন্সের’ [Unholy Alliance বা অশুভ বন্ধুত্বের] যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু যা এখন থেকে ক্রমেই অন্তত খোদ ভারতের বিপক্ষে তো যাবেই মনে হচ্ছে! কেন?

    আমেরিকায়  নাইন- ইলেভেনের হামলা ও প্রতিক্রিয়ায় আফগানিস্তানে আমেরিকার পালটা হামলা ও দখল এসব তো ছিল অ্যামেরিকা বা আফগানিস্তানের ভিতরের ঘটনা। কাজেই এর সাথে ভারতের নিজেকে ভিক্টিম মনে করার কী হল?

    সেকালে ভারতের দিক থেকে কথিত জঙ্গিবাদ বা টেররিজম নিয়ে যে ব্যাখ্যা বয়ান ও সাফাই দেয়া হত তাতে, বিরাট এক মিথ্যা কথা ছিল।  ‘সবচেয়ে বড় সেই ‘মিথ্যা ঘটনাটা” হল –  কংগ্রেসের ১৯৮৭ সালের ভারতীয় কাশ্মিরের রাজ্য নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি করেছিল। এই ব্যাপক কারচুপি থেকেই কাশ্মিরের রাজনীতি  ক্ষুব্ধ  জনগণের মন উঠে যায়। আর তাতে  এরপর কাশ্মীরের “সশস্ত্র পথ” জন-সমর্থন পেয়ে সংঘাতের রাস্তায়  রওনা দিয়েছিল।  কেন কোন দেশের রাজনীতি সশস্ত্র সংঘাতের পথে রওনা দেয় –    ভারতের দেশে-বিদেশে এনিয়ে অনেক রিপোর্ট প্রকাশিত আছে। এমনকি এপ্রসঙ্গে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক গবেষণায় প্রাপ্ত অনেক রিপোর্টও পাওয়া যায় যেখানে বলা সারকথা ছিল, “কোনো দেশের জনপ্রতিনিধিত্ব বা প্রতিনিধি নেতা নির্বাচন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করার বিপদ কী, কেন একাজ করলে এরপর পরিস্থিতি সশস্ত্র রাজনীতির পথে চলে যায় এর ‘ক্লাসিক উদাহরণ হল’ ১৯৮৭ সালের ২৩ মার্চের কাশ্মিরের নির্বাচনের ব্যাপক কারচুপি।’’ অর্থাৎ পাবলিককে তার কথা বলা বা তার মতামত প্রকাশের পথ বন্ধ করে দিলে, প্রকাশিত হতে না দিলে, নির্বাচিত হতে না দিলে- দমবন্ধ সেই পরিস্থিতিই এরপর  একে সশস্ত্র পথে যেতে আহ্বান রাখলে সে সহজেই সে পথ সমর্থন করে এগোবেই।

    কাশ্মির প্রসঙ্গে  শুরু থেকেই নেহরুর অপরাধের শেষ নেই। প্রধানতম অপরাধ, তিনি জাতিসঙ্ঘের রিকমেন্ডেশনে “গণভোটের” পথে যাননি। তবু চক্ষুলজ্জায় তিনি ভারতের কনস্টিটিউশনে লিখার সময়ে তাতে এক ৩৭০ ধারা যুক্ত করে কাশ্মিরকে ‘বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদার রাজ্য’ হিসেবে ভারতের মধ্যে যুক্ত করে নেয়াটাকে জাস্টিফাই করতে চেয়েছিলেন; যদিও সেসব বিশেষ মর্যাদাও পরবর্তি বছরগুলো  কিছুদিন পরপর একটা করে খুলে নেয়া হয়েছিল। তবু রাজ্য নির্বাচনী ব্যবস্থাটা কোনোমতে টিকে ছিল। আর সেটাও ১৯৮৭ সালের মার্চে শেষ করে দেয়াতেই কাশ্মির সশস্ত্র পথে চলে যায়। সরকারি হিসাবে কাশ্মিরের সশস্ত্র পথে যাত্রা জুলাই ১৯৮৮ সাল থেকে বলা হয়ে থাকে।

    ভারতের ক্যারাভান ম্যাগাজিনকে ধরা হয় হাতেগোনা ‘নিরপেক্ষ ও পেশাদার জার্নালিজমের অন্যতম এক উদ্যোগ’ হিসেবে। গত ২০১৬ সালের তাদের প্রকাশিত এক রিপোর্টে  [শিরোনাম ছিল How Mufti Mohammad Sayeed Shaped the 1987 Elections in Kashmir]  – এই প্রসঙ্গগুলোই বিস্তারে তুলে এনে এক রিপোর্ট করা হয়েছিল। খুবই সংক্ষেপে বললে পেছনের সেই কাহিনীটা হল – রাজীব গান্ধী ও ফারুক আবদুল্লাহর মধ্যে নাকি বন্ধুত্ব খুবই মারাত্মক সলিড ছিল। বাস্তবত ফারুক আবদুল্লাহর বাবা শেখ আবদুল্লাহ ছিলেন মূলত নেহরুর এক কাশ্মিরি প্রডাক্ট বলা যায়। কংগ্রেসের “নেহরুর কাশ্মিরি ভার্সন”। যে কাজ নেহরু নিজে করতে পারতেন না সেটা তিনি অনায়াসেই শেখ আবদুল্লাহকে দিয়ে করিয়ে নিতে পারতেন, এতটাই অনুগত ছিলেন শেখ আবদুল্লাহ। আসলে কাশ্মিরের রাজা হরি সিং ও তাঁর প্রশাসনিক চিফ সেক্রেটারিকে [Narasimha Ayyangar Gopalaswami] মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে নেহরুর হাতিয়ার হয়ে থাকতেন এই ফারুক আবদুল্লাহ। ফলে রাজীব গান্ধী ও ফারুক আবদুল্লাহর মধ্যকার ‘সলিড বন্ধুত্ব’ বুঝতে আমাদের কষ্ট করতে হয় না। কিন্তু কত দূর এর সীমা? নির্বাচনে জবরদস্তি করে বন্ধুকেই জিতিয়ে এনে দেখাতেই হবে? বন্ধুত্ব কত গভীর? এত দূর?

    ‘ক্যারাভান’ বলছে ওই বন্ধুত্বের মাঝেই বাধা হয়ে [Gandhi and Abdullah’s friendship came in the way of Sayeed’s ambition to become chief minister] এসে গিয়েছিলেন  কাশ্মীরের আরেক নেতা মুফতি সাঈদ। যিনি আসলে ভারতীয় কাশ্মিরের কয়েকটা ইসলামী দলের অ্যালায়েন্সে গড়া এক দলের মূল নেতা, যে দলের নাম মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট [Muslim United Front (MUF)]। কারণ তিনি জিতে যাচ্ছিলেন ওই নির্বাচনে।

    আমাদের বর্তমান লেখার প্রসঙ্গ তো আফগানিস্তান; সেখানে এর মধ্যে কাশ্মির প্রসঙ্গ ঢুকে গেল কোথা থেকে? আসলে,  উপরে কথা বলছিলাম ভারতের নিজেকে এক ভিক্টিম বা ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি হিসেবে সাজিয়ে বুশের ওয়ার অন টেররের প্রোগ্রামে ঢুকে পড়া আর সহানুভূতি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কথা। ১৯৮৭ সালের ওই নির্বাচনী কারচুপি যা থেকে পরে ১৯৮৮ সাল থেকে ভারতীয় কাশ্মিরের রাজনীতি সশস্ত্র পথে যাত্রা করেছিল, কংগ্রেস ও পরে বাজপেয়ীর বিজেপি কাশ্মীরের নির্বাচনী ব্যাপক  কারচুপির এই ঘটনা লুকিয়ে উলটা – কাশ্মিরের সশস্ত্রতার উতস নাকি  ‘সীমা পারকে আতঙ্কবাদ’ বা পাকিস্তান থেকে আসা টেররিজম বলে পাল্টা মিথ্যা বয়ান খাড়া করেছিল; যাতে অর্থ হয়ে যায়, সীমা পার মানে পাকিস্তান থেকে বা পাকিস্তানি কাশ্মির থেকে আতঙ্কবাদ বা জঙ্গিদের আসার কারণেই নাকি ভারতের কাশ্মিরের রাজনীতিতে সশস্ত্রতার সমস্যা শুরু হয়েছিল। আর সর্বশেষে আফগানিস্তানে বুশের দখলি হামলার পরে বুশ-বাজপেয়ী একমত হয়ে যান যে, তারা “একই সন্ত্রাসবাদের” শিকার হয়েছেন। আসলে ভারত নাকি আগে থেকেই ইসলামী জঙ্গি সন্ত্রাসবাদের শিকার (নির্বাচনী কারচুপির প্রতিক্রিয়া নয়)- এ কথাটা বুশের আমেরিকা থেকে স্বীকার করিয়ে নেয়ার বিনিময়েই ভারত স্বীকৃতি দিয়েছিল যে, আমেরিকাও ‘একই সন্ত্রাসবাদের’ শিকার। অতএব ওয়ার অন টেরর-ই সবার উপরের সত্য এবং ভারত-আমেরিকা তাই দু’জনে দু’জনার। আর সেই থেকে উল্টা আফগানিস্তান ইস্যুতে ভারতও [তারা নাকি টেররবিরোধী]  বিরাট এক   আমেরিকান পার্টনার হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

    আবার আমেরিকার আফগানিস্তানে বোমা ফেলতে, হামলা চালাতে গেলে পাশের দেশে একটা সামরিক ঘাঁটি তো খুবই দরকার হয় যাতে সেদেশ থেকে মানে পাকিস্তানকেই আমেরিকার  লঞ্চিং প্যাড হিসেবে – ঐ পাকিস্তানকেই আমেরিকার দরকার। অতএব এই যুদ্ধে আমেরিকার পক্ষে পাকিস্তানকে শামিল থাকতেই বাধ্য করা হয়েছিল। নইলে পাকিস্তানকেই আমেরিকার বোমা হামলা খেয়ে পুরান প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী [Deputy Secretary of State during President George W. Bush] পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফকে ফোনে হুমকি দিয়ে রাজি করিয়েছিলেন। সে কথা প্রেসিডেন্ট  মোশাররফ ‘ইন দা লাইন অন ফায়ার’ বইয়ে উল্লেখ করে রেখেছেন। আর এখান থেকেই আমেরিকা সবসময় উল্টা ভারতকে দিয়ে পাল্টা অভিযোগ তুলিয়ে গেছে যে, খোদ পাকিস্তানই এক সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র। সেজন্যই চারতের কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ এসেছে। অর্থাৎ ভারতকে আমেরিকা ব্যবহার করেছে পাকিস্তানের উপর চাপ রাখতে।

    আসলে দিন সবারই একদিন আসে! তাহলে এটা কি সেই বিশেষ মুহূর্ত? দিন বদলানোর দিন? দিন সবারই একদিন আসে!  মেরা দিন ভি আয়েগা একদিন!  সেরকম? কেন এমন বলছি?

    সর্বশেষ এক্সিওস [AXIOS] ম্যাগাজিনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাক্ষাৎকার (যেটা বহুল প্রচার করা হয়েছে বাংলায়; প্রথম আলোতে অনুবাদও হয়েছে) এর কথা ধরি তবে বুঝা যায় – ইমরানই আমেরিকার শেষ ভরসা- এই মনে করে বাইডেন প্রশাসন তাঁকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। কিন্তু ইমরান ততই শক্ত করে বলছেন, পাকিস্তানে আমেরিকার কোনো ঘাঁটি করতে তিনি দেবেন না। ওদিকে তালেবানেরাও আমেরিকার সবচেয়ে ছোট কোনো সামরিক স্থাপনাও আগেই নাকচ করে দিয়েছে।

    Pakistan will not allow the CIA or U.S. special forces to base themselves inside his country ever again, he told Axios.

    এর সোজা অর্থ আমেরিকা তাহলে কোথায় যাবে? তাহলে আলকায়েদা বা অন্যান্য ছোট বা বড় সশস্ত্র গ্রুপ যারা এত দিন আমেরিকান নানা ধরণের বোমা হামলা ড্রোন হামলা খেয়েও চুপ ছিল, চেপে থাকা এদের সাথে আমেরিকার যে সম্পর্ক ও ক্ষমতার সাপ্রেসড  ভারসাম্য এত দিন ছিল, এর কী হবে? সেটা তো আর আগের ভারসাম্যে থাকবে না। সব ঢলে পড়তে বাধ্য! এটাই এখন দিন কে দিন প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে চাইবেই! এবং এটাই হয়ে উঠতে পারে প্রেশার কুকারের ঢাকনা খুলে যাবার ঘটনা! আর তা হবে আফগানিস্তান থেকে কাশ্মীরসহ সবদিকে! এটাই মোদীর কাশ্মীরসহ এমনকি গত সাত বছরে মোদীর হিন্দুত্ববাদ ও এর সব পাপ সবকিছু উপড়ে ফেলে দিতে চাইতে পারে! অবস্থা এমন হবারও সম্ভাবনা যে মোদী বলতে পারেন – আমি হিন্দুত্ববাদ ত্যাগ করছি আমাকে ক্ষমতাচ্যুত করো না!

    বাস্তবতা হল, সময় এখন আমেরিকার পক্ষেও না! আমেরিকার সাথে আর কেউ নতুন করে গাঁটছড়া বাঁধা দূরে থাক কোনো সম্পর্কই রাখতে চাইছে না।  পাকিস্তান বা তালেবানদের  আমেরিকার প্রতি অনাগ্রহ ও তুচ্ছাতিতুচ্ছ করার মনোভাব – আমেরিকার জন্য খুবই খারাপ ইঙ্গিত! এটাই প্রমাণ করে, আমেরিকার গ্লোবাল নেতা বা পরাশক্তি থাকার দিন আজ কোথায় ঠেকেছে। অতএব এমন আমেরিকার আড়ালে থেকে যে ভারত আমেরিকাকে সার্ভিস দিয়ে গত ২০ বছর মাখন খেয়ে গেছে, এর এখন কী হবে?

    এ অবস্থায়, আফগান ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার অবস্থান এখন যার যার নিজেকে বাঁচাও, নিজে বাঁচলে বাপের নাম! খুব সম্ভবত, আমেরিকার সাথে আগের মত গাঁটছাড়ায় থাকলেই হয়ত ভারতের বিপদ বেশি বলে ভারতের রিডিং। দিন এখন ভারতের পক্ষে আর নয়! আবার তাহলে ভারত কি এখন একেবারেই সবদিক থেকে হাত গুটিয়ে নিবে, এই ইস্যুতে অন্তত আমেরিকা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন না করলের এক দুরত্ব রচনা করবে? সেটা ভারত বাস্তবায়ন করতে পারলে হয়ত এখন বেঁচেই যেত! এ কথার মানে কী? এর বাস্তবায়নও ভারতের হাতে আর নেই, তাই কী? হ্যাঁ, ঠিক তাই। কেন?

    ভারতের মানে, সুনির্দিষ্ট করে এটা মোদির জন্য একেবারে বিজেপি-আরএসএস গোষ্ঠী ও তার হিন্দুত্ববাদের পাপ। তার ৫ আগস্ট ২০১৯ সালের ঐ ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মিরকে একেবারে গায়ের জোরের ভিত্তিতে মানে ‘আইনগতভাবেই এর সংজ্ঞা দখলদার’ সেই হিসেবে পুরো কাশ্মিরই দখল করে ভারতের অংশ বলে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করে  ফেলেছিল। কারণ ঐ দিন ভারতীয় সংসদে অমিত শাহ পাকিস্তান ও চীনের কাশ্মির অংশও ভারতের বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন হিন্দুত্ববাদের প্রবল জোশে। বিজেপি-আরএসএস বলতে চেয়েছিল ১৯৪৭ পরবর্তি বছরগুলোতে তারা ভারতের ক্ষমতায় আসীন থাকলে  এই ২০১৯ সালের মত করে – সারা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিত এবং নেহেরুর তা করা উচিত ছিল।  নেহেরুর কার্ট দুর্বল, হিন্দুত্বের জোশ ব্যবহারের মোদী-অমিতের মত যোগ্য নয় বলে তারা সেসময় এটা করতে পারে নাই।  সেই থেকে কাশ্মির ভারতের প্রত্যক্ষ অঙ্গ ভুখন্ড বলে মোদী সরকার হাতে বিবেচিত শুধু নয় কাশ্মীর আর প্রশাসনিক স্টাটাস হিসাবে ভারতের কোনো রাজ্যের মর্যাদাতেও নেই –  এখনো ঘোষিত হয়ে আছে ।

    অথচ প্রধানমন্ত্রী মোদির কানে এখন পানি ঢুকেছে মনে হচ্ছে! তিনি টের পেয়েছেন আমেরিকার আফগানিস্তান দখলের আগামী ২০তম বার্ষিকীতে আমেরিকা আফগান ছেড়ে একেবারে চলে গেলে, এর পরে সংশ্লিষ্ট যেসব গোপন ও সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতার ছড়িয়ে পরার সম্ভাবনা, এটাই জাতিইসংঘের আশঙ্কা [আফগানিস্তানে তালেবানের অগ্রযাত্রায় শঙ্কিত জাতিসংঘ]  এদের বিরুদ্ধে ভারত একেবারেই ডিফেন্সলেস।  এটা আবার ভারতীয় কাশ্মিরকে বড় সশস্ত্রতার পথে যেতে উসকে তুলতে পারে। মূল কারণ গত দুই বছরের মোদি সরকারের সাপ্রেশন ও এর প্রতিক্রিয়া!

    এদিকে ইতোমধ্যেই ভারতের দিক থেকে উদ্বেগজনক খবর হল, ইতোমধ্যে গত ২৭ জুন ভোর-রাতে ভারতের সামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলার খবর এসেছে।  অনেকে এটাকে কী পরিস্থিতি সামনে অপেক্ষা করছে এর ইঙ্গিত বলছেন।

    তাহলে ভারতের দিক থেকে দাঁড়াল, এক দিকে সেই আমেরিকার  মুরোদ আর নেই, আবার মোদি ইমরানের পাকিস্তানের সাথেও এত দিন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে, উল্টা বোমা হামলার নাটক করেছে চরমে। সরাসরি প্রচার করেছে ‘পাকিস্তান ঘৃণা’। আর এসব ঘৃণা-বিক্রি করে হিন্দুত্বের জিগির জাগিয়েছে আর তা দিয়ে নির্বাচনে হিন্দুভোট মেরুকরণ করেছে। অথচ এতদিনের পাকিস্তানের আগের দুই শাসক দল ও নেতাদের তুলনায় সবচেয়ে বিচারবিদ্ধিসম্পন্ন নেতা হলেন ইমরান খান। কারণ তিনি পেটি-পকেট স্বার্থ দিয়ে চলেন না। যার লঙ-টার্ম ভিশন এবং নয়া এপ্রোচ আছে। অথচ মোদী এসবের এক তিলও সুবিধা ভারতের স্বার্থ নিতে পারলেন না। কারণ, মোদীকে পাকিস্তান বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে তিনি বীর এই মেরু করণ জোয়ার তুলে ভোটে জিততে হবে, তাই মোদীর এই সংকীর্ণ স্বার্থের নিচে ভারতের সামগ্রিক স্বার্থ চাপা পড়ে গেছে ও আছে। একারণে,  ইমরানের পাকিস্তানের সাথে ন্যূনতম আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক মোদী করতে বা দেখাতে চায়নি। কারণ চরম মুসলমান বিরোধী ঘৃণা জাগানো- এটাই তো মোদির জন্য ভোটে হিন্দু ভোট মেরুকরণের একমাত্র কৌশল। কাজেই পাকিস্তানের সাহায্য চেয়ে একবার হাত বাড়িয়ে বসলে কী ডায়লগে গেলে এরপর মোদির নির্বাচনে জেতার বয়ানের কী হবে?

    অতএব মোদী এখন অস্থিরঃ 
    অতএব মোদী এখন অস্থির; তার খারাপ দিনগুলো সামনে সম্ভবত আসন্ন। এই আশঙ্কায় তিনি অস্থির। এমনকি ইতোমধ্যে মোদি উল্টা রাস্তা ধরতে চাইতেছেন মানে তিনি হিন্দুত্ববাদ একেবারে ত্যাগ না করলেও যদি একটু ঢিলা করে দেন তাহলে কী পরিস্থিতি কিছুটা নিজ নিয়ন্ত্রণ ফিরবে? ইতোমধ্যেই তিনি এই ইঙ্গিত কাশ্মীরের রাজনীতিতে শো করে দিয়েছেন। আর এতেই তিনি নিজ কাশ্মিরের ব্যাপারে কত উদ্বিগ্ন; তা প্রকাশিত হয়ে গেছে। তিনি পরিষ্কার করেই কাশ্মিরি রাজনীতিবিদদের সাথে একটা বৈঠক করে ফেলেছেন। মোদী দিল্লিতে তার সরকারি বাসায় মিটিং আয়োজন করে ফেলেছেন।  যার একেবারে মূল উদ্দেশ্য হল, তিনি আবার কাশ্মীরে নির্বাচনি রাজনোইতিক ততপরতা ফেরত আনতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন – এই ম্যাসেজটা ছড়িয়ে দেয়া। কেন?  কারণ কাশ্মীর যে এখন নয়া তালেবান প্রভাবের আফগানিস্তানের কারণে সসগস্ত্র রাজনীতির পথে জোরদার হয়ে যাচ্ছে এটা মোদী স্বীকার করে নিচ্ছেন।  আর এবার সেই সশস্ত্র ধারাকে ফিরাতে ্মোদীর এক অসহায় পদক্ষেপের নাম হল এই বৈঠক।      কাশ্মির আবার রাজ্য স্ট্যাটাস ফেরত পেতে পারে মানে সারকথায় তিনি হয়তো আর কঠোর দমননীতি নয়, আবার নির্বাচনী জানালা খুলতে চাচ্ছেন যদি পোষায়, এমন ইঙ্গিত দিতে চাচ্ছেন!

    কিন্তু মূলকথা, ভারত আফগানিস্তান থেকে নিজেকে একেবারেই প্রত্যাহার করে নিলেই কি ভারতের কাশ্মির মোদির নিয়ন্ত্রণে থাকবে? সোজা জবাব হল, এর ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকুও নেই। হিন্দুত্ববাদের এমনই মহিমা। ভারতের কাছে এখন শুধু বাইডেনের আমেরিকাই নয়, ক্রমেই খোদ হিন্দুত্ববাদই এক লায়াবিলিটি হয়ে উঠতে চাইছে যেন।

    অতএব আফগানিস্তান ইস্যুতে ভারতের জন্য কোনো অবস্থানই আশাপ্রদ নয়। সে কারণে সম্ভবত আফগান অ্যাকাডেমিক মিঃ দাবুদ মোরাদিয়ান এভাবে বলেছেন। ভারতের জন্য ন্যূনতম নিশ্চয়তাও কোথাও নেই। আবার ইরানের সাথে ভারতের সম্পর্কও খুবই খারাপ মাত্রায়। ইরানকে চরম অপমানজনক অবস্থায় ফেলার পরে আমেরিকার কথা শোনা ভারত আর ইরানের সাথে সম্পর্ক রাখতে চায়নি, ছুড়ে ফেলেছে। আজ এখন ভারতেরই মুখ নেই যে, ইরানের সাথে আবার কথা বলে আফগান ইস্যুতে কিছু পরামর্শ নেয় অথবা ওই অঞ্চলে ভারতের কোথাও পা দেয়ার জায়গা অন্তত ফেরত পায়। মনে হচ্ছে, কূটনৈতিক সব ইস্যুতে মোদির এখন সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে হাজির হবে এত দিনের হিন্দুত্ববাদী পদক্ষেপগুলো!

    ওদিকে আমেরিকা এখনো আশা করে আছে যে, অন্তত গোপন ঘাঁটি বা গোপন তৎপরতা চালানোর মতো কিছু জায়গা ইমরানের পাকিস্তান আমেরিকাকে দেবে!

    সত্যি দুনিয়া বড়ই অদ্ভুত জায়গা! কখন যে কার দিন আসে। সে কারণেই সম্ভবত দুঃখের দিনের ভিতরে সবাই শান্ত্বনায় বলে ওঠে- হামারা দিন ভি আয়েগা! সব জুলুম বে-ইনসাফের বিচারের দিন হয়ে যায় যেন সেটা! মসানুষ এমন ভরসাতেই তো এখনও বাঁচে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৭ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “হিন্দুত্ববাদই কি মোদির প্রধান শত্রু হবে?“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মিনিংফুল হিউম্যান রাইটও যুদ্ধের খরচের মত জরুরি 

    মিনিংফুল হিউম্যান রাইটও যুদ্ধের খরচের মত জরুরি 

    গৌতম দাস

    ২৬  জুন ২০২১, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3BI

     

    –

    (গত সংখ্যার পরে শেষ পর্ব, বাইডেন জি৭ ইস্যুতে।)

    কলোনিদখলদারি (মোটামুটি ১৫০০-১৯৪৫) ব্যবসার যুগেই শেষের দিকে ১৮৮০ এর দশকে  আমেরিকা উদ্বৃত্ত সঞ্চিত সম্পদের জোরে বড় অর্থনীতি হিসেবে কলোনি দখলদারদের সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছিল। তবে এক ঝাপটায় আমেরিকা সাথে  নেতা হয়নি। আর কারও নেতা হওয়া বা দুনিয়াতে অর্থনীতিতে কেউ নেতা হওয়া এসব বিষয়গুলো তখনও শুরুই হয় নাই। মূল কারণ গ্লোবাল পণ্যবিনিময় বাণিজ্য দূরে থাক দুটা কলোনি মালিক দেশের মধ্যে বিস্তর পণ্য বিনিময় বা অর্থনৈতিক নীর্ভরশীলতা বিষয়টাই তখনও সুনিয়াতে হাজির হয় নাই।  তাই সব মিলিয়ে  আমেরিকাকে  আরো প্রায় ৫০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সেটাই  দুই দুটা বিশ্বযুদ্ধের কাল।  মূল কারণ দুনিয়া তখনও মূল একটিভিটি বলতে  কলোনি দখলের রামরাজত্বে মজেছিল, যার অবসান ঘটানো আগে  করে নেওয়ার দরকার ছিল আমেরিকার জন্য।
    প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮) ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) দুনিয়ার কলোনি দখলদার শক্তিগুলা যারা দুনিয়ার ওপর একচ্ছত্র খবরদারি চালিয়ে বেড়াত তারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই (২০১৪) সবাই এক এক করে দেউলিয়া হয়ে গেছিল, মূলত যুদ্ধের খরচসামলাতে ফেল করাতে। আর এরই সবচেয়ে বড় চিহ্ন হল রথশিল্ড ব্যাংক [Rothschild Bank]  যেটা মূলত এবং একমাত্র সেকালের মুদ্রা কনভার্ট বা বিনিময় করে দিবার ব্যবসায়ে ছিল; এর বন্ধ হয়ে যাওয়া।  কারণ এই ব্যাংকটা কার্যকর ছিল সে সুত্রের ভিত্তিতে তা হল, ব্যাংকের ভল্টে সমতুল্য মানের সোনা রেখে কাগুজে মুদ্রা ছাপানোর ব্যবস্থা তখন ওসব দেশে চালু আছে।  এটা চালু থাকলে ঐ ব্যাংকের কাছে কোন দেশের পণ্য আমদানি / রফতানির হিসাব রাখা মানে ঐদেশে সোনা এসে ঢুকেছে বা বেরিয়ে গেছে কতটা তা জানায় বিশ্বাসযোগ্য উপায়।  কিন্তু যুদ্ধের সময়  সোনাজমা না রেখে মুদ্রা ছাপানোর সস্তা পথে যুদ্ধের খরচ সামলাতে যাওয়াতে এইবার মুদ্রার মানের (অবমূল্যায়ন) ঢলে পড়ে যাওয়ায় রথশিল্ডের ব্যাবসা বন্ধ রাখতে হয়।

    প্রথম আমেরিকান ঋণগ্রহিতা ইউরোপঃ
    ফলে এইবার কলোনিমালিক ইউরোপের দেশগুলোর  কাছে ঋণ পাবার একমাত্র বিকল্প মনে হয় আমেরিকাকে। তবে মূলত এই ট্রেন্ড শুরু হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯১৮ সালের পর থেকে। আর আমেরিকান থেকে বলতে আমেরিকান প্রাইভেট ব্যাংক থেকে রাষ্ট্রগুলো যেমন বৃটেন সরকার এবং ব্যবসায়ীরাও – এরা  ঋণ পাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল।  যদিও এনিয়ে আবার আমেরিকায় আভ্যন্তরীণভাবে মারাত্মক রাজনৈতিক বিতর্ক ও বিভক্তি শুরু হয়েছিল যে আদৌও ইউরোপকে  ঋণ দিতে যাওয়া ঠিক কিনা। কারণ এতে ক্রমশ ইউরোপের যুদ্ধে খোদ আমেরিকাই সামিল হয়ে পড়ে যেতে পারে। এটাই সেকালের আমেরিকার  বিচ্ছিন্নপন্থি বনাম আন্তুর্জাতিক-পন্থি বিতর্ক  [America’s isolationist Vs internationalist debate] বলে পরিচিত। এই বিতর্ক ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত গড়িয়েছিল। যারা এনিয়ে বিস্তারে বুঝতে চান তারা রুজভেল্টের Cash & Carry Law 1939 এবং এবং সাথে এই আইনের আগের সব ভার্সান। আর সবমিলিয়ে – Neutrality Act of 1939, Lend-Lease সহ বহুকিছুর ভিতরে ঢুকতে পারেন বা ঢুকতে হবে।

    ওদিকে ১৯৩২ সালের পর থেকে হিটলারের উত্থান শুরু হয়েছিল। এতে ক্রমশ নেতা হিটলার সাথে মুসোলিনির ইতালি আর মার্শাল তেজো জাপানসহ অন্যদের মিলে গ্রুপ বড় হতে থাকে। কিন্তু এই গ্রুপের ঋণ বা বাজেট সংকটের কথা জানা যায় না।  ফলে একদিকে হিটলার ও তার সঙ্গিদের গ্রুপ  আর অন্যদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে বাকিরা এভাবে এক পোলারাইজেশন ঘটতে পেরেছিল।  আর মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খরচ বইবার ক্ষেত্রে আমেরিকান সক্ষম অর্থনীতি ও বিপুল উদ্বৃত্ত সঞ্চিত সম্পদের জোরে্র সক্ষমতার বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি আমেরিকার নেতৃত্বে আসে আর এই অংশই যার সেকালের ডাকনাম এলায়েড ফোর্স বা মিত্রশক্তিই যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল।
    কিন্তু  এই যুদ্ধের আসল ফ্যাক্টর যে যুদ্ধে  আমেরিকান সক্ষমতার পোলারাইজেশন এবং তা এমন কেন হয়েছিল ও কিসের ভিত্তিতে; এসব কিছু আমাদেরকে  মানে বৃটিশ-ভারতের আমাদেরকে পরিষ্কার জানতে দেয়া হয়নি। তাই দুটো শক্তি বৃটিশ ও সোভিয়েত ইউনিয়ন – এরা  ঘটনা যেভাবে ব্যাখ্যা করে দিয়েছিল আমরা খাপছাড়াভাবে তাই জানতাম।
    এরই একটা হল, ব্রিটিশ বা ইউরোপীয়রা  যেন এদের মত “ভাল মানুষদের” নেতৃত্বে মানে প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের নেতৃত্বে তাঁরা বিপরীতে খারাপ মানুষ হিটলার আর তার বন্ধুদেরকে  চার্চিল  পরাজিত করেছিল। এই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গল্প। এছাড়া ওদিকে আরেক ব্যাখ্যা চালু ছিল কলোনি-ভারতের কমিউনিস্টদেরও। এটিও আরেক ভালভালাইয়া; মানে চার দিকে সব খালি ভাল আর ভাল। ভাল মানুষ সোভিয়েত ইউনিয়নের স্টালিনের হাতে জর্মানির হিটলারের পরাজয় ঘটেছিল। তিনি ভাল লড়েছিলেন বলেই হিটলার পরাজিত হয়েছিলেন। কাজেই সব ক্রেডিট কমিউনিস্টদের, এটাই নাকি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল গল্প।  যেমন এই গল্পের প্রভাব এতই মারাত্মক যে এখনো অনেক বিশ্ববিদ্যালয় পাশ কমিউনিস্ট – এখন এনজিও নেতা  মনে করে – পড়তি গ্লোবাল নেতা আমেরিকা নয়, এটা ইউকের বৃটিশেরা। এককথায় বৃটিশেরা আমেরিকার চেয়ে অর্থনীতির শক্তিতে সেরা। যাক, সেসব কথা। তবু  আমরা খুবই সরি, স্টালিন বা চার্চিল  বা তাদের সমর্থকদের একটারও বয়ানের ভিত্তি নাই। কারণ এদের বয়ানে বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস – আমাদেরকে  যুদ্ধের পোলারাইজেশনে মুখ্য ফ্যাক্টর কী ছিল তা বলতে পারে না। কেন?

    প্রধান ধারা হিসাবে আমরা  চার্চিলকে দিয়ে বিশ্বযুদ্ধ বুঝতে গেছিলাম আর সেটা এজন্য যে তারাই তো আমাদের কলোনি মালিক।  আর তাই একমাত্র তাদের মাধ্যমেই তো সব তথ্য ও উতস। আমাদের ইউরোপকে চিনি-মানি আর বুঝাবুঝি ঘটেছিল। তারাই আমাদের প্রভু ছিল। ইউরোপের ভাষাগুলোর মধ্যে একমাত্র ইংরেজিই আমাদের এলিটরা বুঝত আর তারা কেবল ব্রিটিশ মিডিয়া পড়ে সেখান থেকে এগুলো অনুবাদ করত। এভাবে গ্লোবাল কাহিনীর যতটুকু বাংলার নাগালে আসত তা দিয়েই কেবল আমরা বিশ্বযুদ্ধ যতটুকু যা বুঝতাম। তাই আমেরিকা বলে কোনো দেশ আছে কি না বা কেমন তারা সেটাই তো তখনও আমরা ঠিকমত বুঝতাম না; অর্থাৎ চার্চিলের চোখ দিয়েই নিরুপায় আমরা  দ্বিতীয়  বিশ্বযুদ্ধ বুঝেছিলাম। তাই আমাদের চোখ এই বীর চার্চিল যে আমেরিকার কাছে দাসখত দিয়েছে সেটা আমাদের চিন্তারও বাইরে ছিল। স্টালিনের সোভিয়েত দেশকেও যে অ্যামেরিকা যুদ্ধের খরচ ধার দিতে পারে এসব আমাদের কমিউনিস্ট মনে চিন্তার অতীত।  স্টালিনসহ বিপ্লবীদের চোখে কলোনি বা উপনিবেশ তো উঠেই নাই। তাই তো সেটা এখনও কমিউনিস্টদের চোখে “নয়া-উপনিবেশবাদ”।  যার মানে কী একমাত্র স্টালিনই জানে…।  যেখানে একালে আমাদের হাসিনাই বাইডেনকে চোখ উলটে তাকাতে পারে এটা সম্ভব (যদিও  হাসিনার ক্ষমতার স্বৈরাচারি বলতে পারেন তবু সে স্বাধীন আর এরপরেও এখনও তাঁর বড় বড় সীমাবদ্ধতা আছে )  – সেখানে দুনিয়াটা এখনও নয়া উপনিবেশের দুনিয়ায় আমরা আছে এই কথার অর্থ কী?

    অথচ হার্ডকোর সত্যটা এই যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমাদের মত কলোনি হয়ে থাকা দেশগুলো আর ইউরোপের কারো না কারো কলোনি  হয়ে শাসনে থাকবে কি না- এটাই ফয়সালা করে দিয়েছিল। কঠিন সত্যটা ছিল, চার্চিল আমাদের ত্রাতা বা মুক্তিদাতা ছিলেন না। কলোনি থেকে মুক্তি –  আমাদের আসল মুক্তিদাতা ছিল আমেরিকা, তাতে আমরা যতই তখন বা আজও আমেরিকাকে ঘৃণা বা অপছন্দ করি না কেন। এটাই ফ্যাক্টস।  যদিও তা আমেরিকার নিজ স্বার্থেই ঘটতে পেরেছিল। কীভাবে?

    আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট দুনিয়ার সব কলোনি দখলদার চার্চিলসহ সব কুতুবকে দাসখত দিতে বাধ্য করেছিল যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজয়ে শেষ হলে পরে তাদের সবাইকে দুনিয়া থেকে কলোনি ব্যবস্থা উঠিয়ে ফেলে দিতেই হবে। কেন? যাতে দুনিয়া কলোনিমুক্ত প্রায় শ দুয়েক স্বাধীন রাষ্ট্রের এক দুনিয়া হয়।  আসলে মূল কথাটা হল, আমাদের স্বার্থের দিক থেকে দেখলে চার্চিলও আসলে আমাদের জন্য ভিলেন ও এনিমি ছিল। কিন্তু হিটলারের মারের মুখে নিজের যুদ্ধের খরচ চালানোর মুরোদ ছিল না বলে সারা ইউরোপ আমেরিকান ঐ শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। অতএব যুদ্ধ শেষে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন-আমেরিকায় ১৯৬৫ সালের মধ্যে সবচেয়ে অসংখ্য দেশের কলোনিমুক্তি ঘটে গিয়েছিল। সর্বশেষটা দক্ষিণ আফ্রিকা ১৯৯৪ সালে। আর বলাই বাহুল্য ভারত বা পাকিস্তান কলোনিমুক্ত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে।

    অখণ্ড ভারতের দিক থেকে দেখলে বিশ্বযুদ্ধের এটাই ছিল আসল বিশ্ব-ইতিহাস, আমাদের কলোনিমুক্তির ইতিহাস। গ্লোবাল ইতিহাসের দিক থেকে বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আসল ও একচ্ছত্র নেতৃত্ব ছিল আমেরিকার হাতে আর তাই স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধশেষে প্রথম “গ্লোবাল অর্থনীতি” বলে কোন কিছুর নেতা হয়েছিল আমেরিকা। আর এই ইতিহাস জানার একমাত্র পথ হল সরাসরি  আমেরিকান হিস্ট্রি পড়া। তবে এখন ইন্টারনেটের কল্যাণে আমেরিকা নিজেই সেসব ডকুমেন্ট অনলাইনে দিয়ে রেখেছে। তাই যে কেউ চাইলে আর পড়তে জানলে নিজেই জেনে নিতে পারে।

    এখন এই আমেরিকান নেতৃত্ব মানে কী? এর মানে আর আবছা রেখে লাভ নেই, যা স্টালিন বা চার্চিল আমাদেরকে সেকালে জানতে দেয়নি (কারণ তা নিজেদের অযোগ্যতা বিবেচিত হতে পারে) তা হল, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের নেতৃত্বে গঠিত মিত্রবাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে খরচের বড় অংশটি একাই [মোট ২৭০ বিলিয়ন ডলার আর একে ৫১গুণ করলে আজকের ডলার হবে] বহন করেছিল আমেরিকা। মানে ইউরোপ এমনি এমনি আমেরিকান নেতাগিরি মেনে নেয়নি।

    এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে আরেক যে ব্যাখ্যা- আমাদের দেশের রাজনীতি ভাল  বুঝে এমন ভাব ধরে থাকা কমিউনিস্টদের মুখ থেকে যা জানি, সেটিও আসলে সোভিয়েত ভাষ্য। আর সেখানেও যুদ্ধের বড় খরচদাতা ঐ এক ও অদ্বিতীয় আমেরিকা হলেও কমিউনিস্টদের ইতিহাস ভাষ্যে সেটাও এড়িয়ে যাওয়া হয়ে এসেছে।

    তবে অন্যদিকের ফ্যাক্টস হল, আমেরিকাও দাসখত বা ‘সহযোগিতা’ চুক্তিতে স্তালিন বা চার্চিলকে অপমানজনকভাবে শামিল হতে বাধ্য করেননি। এসব চুক্তিতে অপরপক্ষ হিসেবে প্রথম ও একক স্বাক্ষরদাতা ছিলেন চার্চিল আর সেটার নাম আটলান্টিক চুক্তি, ১৪ আগস্ট ১৯৪১। আর পরে সেই ড্রাফটটাই কিন্তু এবার চার রাষ্ট্র  – ব্রিটেন, আমেরিকা চীন ও সোভিয়েত মিলে আবার স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে। তবে এবার ওই চুক্তির নাম দেয়া হয়েছিল “জাতিসঙ্ঘের জন্ম ঘোষণায়” স্বাক্ষর এই নামের আড়ালে। সাথে একই দিনে আরো ২৬ দেশ ঐ একই ডকুমেন্টে প্রতি-স্বাক্ষর করেছিল। এটাই আমেরিকার নেতৃত্বে হিটলারবিরোধী জোটের মুলভিত্তি দলিল। কিন্তু তবু কোথাও “কলোনি শাসন ছেড়ে দিতে চলে যেতে হবে” – এই ভাষায় বা শব্দ কোথাও নেই। তবে  কথাটা ঘুরিয়ে বলা হয়েছে – “যেকোনো ভূখণ্ডের বাসিন্দারাই একমাত্র নির্ধারক হবে যে ওই ভূখণ্ডের শাসন কিভাবে চলবে; অর্থাৎ কলোনি করা নিষিদ্ধ হলেও তা এই ভাষায় বলা হয়ে আছে।

    এ’প্রসঙ্গকথা এবার গুছিয়ে সম্পর্ক-দেখিয়ে দিয়ে বলে শেষ করা যাক। তা হলে আমেরিকা কিভাবে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল সেটা আমাদের মতো দেশের কোন এলিট বা কুতুবরা কেউ সেকালে বা একালে জানতেন বা টের পেয়েছিল তা মনে হয় না। এর কাহিনী বা ঘটনার দিক এটাই। আর এটাই এখন আমাদের জন্য খুব প্রাসঙ্গিক।

    কারণ গত ১১-১৬ জুন ২০২১ সাল জুড়ে বাইডেন জি-৭ আর ন্যাটোর মিটিংয়ে গিয়ে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উসকানি বা হুমকি তুলেছিলেন। অথচ আসল কথাটা এই যুদ্ধের খরচ কে দেবে সেটা নিয়ে অন্তত প্রকাশ্যে কিছুই  বলেননি। আর আমরা উপরে দেখলাম যুদ্ধের খরচই যুদ্ধের হুমকি বা যুদ্ধ যেই করুক এর মুখ্য ও নির্ধারক  বিষয়।  আর এই খরচ  সেকালে ঐ পরিস্থিতিতে একমাত্র বহন করতে সক্ষম ছিল রুজভেল্টের আমেরিকা। তাই ইউরোপ হিটলারের হাতে দখল ও বিলীন হওয়ার বদলে আমেরিকান নেতৃত্বকেই মেনে ওর অধীনে পরিচালিত হওয়াটাকেই বেটার বিকল্প বোধ করেছিল সকলে। তাহলে একালে বাইডেনের স্বপ্ন্বের যুদ্ধ ও এই যুদ্ধের খরচ বইবার মত দাতাটা কে হবে?  এই ভাসুর বা স্বপ্নে দেখা দাতার নাম জানান না দিলে বাইডেনের হুঙ্কারের অর্থ কী?

    কেন আমেরিকার জন্য বিশ্বযুদ্ধ-২ এর নেতা হওয়া এত জরুরি ছিলঃ
    তবে কথা আরেকুটু আছে।  আমেরিকা এমনি ওমনি যুদ্ধে সবার নেতা হতে নিশ্চয় চায় নাই। কিন্তু সেটা কী?  তা হলে? আমেরিকার স্বার্থ শুধু গ্লোবাল নেতা হওয়া ছিল তা নয়, মূলত তার হাতে জমা থাকা বিপুল সারপ্লাস বা উদ্বৃত্ত সম্পদ তখন বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ হয়ে উঠেছিল, অথচ ঋণ-খাতক বা গ্রহিতা দেশ আমেরিকা খুজে পাচ্ছিল না।  কারণ দুনিয়া তখন  কলোনিদখল হয়ে থাকা দুনিয়া। আর ১৯০৫ সালের এই হিসাবে দুনিয়ার কলোনি হতে  বাকি আছে এমন ভুমি বা কোন দেশ আর  খালি ছিল না। ফলে এটা ছিল আমেরিকান   স্বার্থ যে সে দুনিয়াকে এক কলোনি দখল বা শাসন মুক্ত এক স্বাধীন দেশের দুনিয়া হিসাবে যেন দেখতে পায়। যাতে স্বাধীন কলোনিমুক্ত দেশগুলো –  এরা সবাই তখন আমেরিকার ঋণের সরাসরি অথবা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে খাতক হতে পারে। যাতে আমেরিকা এসব স্বাধীনমুক্ত দেশকে আমেরিকান ঋণের খাতক হিসেবে পেয়ে যায়।
    কাজেই একালে বাইডেনের ভাবি যুদ্ধের খরচের সংস্থান না করে চীনকে যুদ্ধের হুমকি দেখানো এগুলোকে কী বলা যায়? এর মানে কি আমেরিকা-চীনের ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ নামে যে বিরোধ প্রকাশ্যে বাজারে হাজির আছে, তা বাইডেন এখন যুদ্ধের মাধ্যমে সমাধান করতে চাইছেন? হ্যাঁ তাই। সে জন্যই এটাকে ছেলেমানুষি চিন্তা বলছি। কারণ এক তো খরচের ব্যাপার আছে; সেটি ছাড়াও চীনের সাথে আমেরিকান বিরোধ মূলত হাতে থাকা উদ্বৃত্ত সম্পদ না থাকা থেকে উদ্ভূত বিরোধ  – এমন বিরোধকে বাইডেন যুদ্ধে গিয়ে সেটাকে নিজের পক্ষে জিতে আনবেন কী করে?

    যেমন ধরা যাক, যুদ্ধ একটা হল আর আমেরিকা তাতে জিতেও গেল। কিন্তু তার পরে এতে কি আমেরিকার হাতে যথেষ্ট ‘সঞ্চিত উদ্বৃত্ত সম্পদ’ না থাকার সঙ্কট, যেটা এখনই প্রকট হয়ে আছেও তা আমেরিকার কেটে যাবে?  আর এই বিপুল সম্পদটা আসবে কোথা থেকে? কিভাবে?

    আসলে তখনো দুনিয়ায় সম্ভাব্য একমাত্র উদ্বৃত্ত সম্পদের উৎস দেশ হয়ে থাকবে এই চীনই। আর সেই চীনের কাছে হাত পেতে আমেরিকা তার জনগণকে খাওয়াবে, দুনিয়া রুল করবে – এমন কল্পনা এবসার্ড বলারও সুযোগ দেখি না। এ জন্য বলেছি, হাতে বিপুল সঞ্চিত সম্পদ থাকা না থাকার সঙ্কট এটাই মূল সংকট – অথচ এই সংকট  কী যুদ্ধে জিতেও কেটে যাওয়ার বিষয়???

    তা হলে অথর্ব ন্যাটোকে সামনে আনা কেন?
    বাইডেন ন্যাটোকে সামনে রেখে হুমকিটা দিয়েছেন। ন্যাটোকে দিয়ে তিনি আর্টিকেল পাঁচ চালু করার সামরিক ইঙ্গিত দিয়েছেন। আবার হাসির এক কথা হল, চীন-রাশিয়া নাকি পারমাণবিক অস্ত্রে আমেরিকা ও তার বন্ধুদের সমান হয়ে যাচ্ছে। আর  ন্যাটো সেক্রেটারি এটাকে আমেরিকার জন্য হুমকি দেখছেন। আচ্ছা খোদ পারমাণবিক অস্ত্রই যেখানে সবার জন্যই হুমকি, সে্টা  আপনার বন্ধু বা শত্রু   যার হাতেই থাকুক; সেখানে ওরা আমার সমান হয়ে যাচ্ছে কেন  – এটা কী নাকিকান্নাময় যুদ্ধের অজুহাত তোলা নয়!

    কিন্তু  ন্যাটো নিয়ে ঘরের কথাটা হল – সেই ওবামা আমল থেকে, চাক হেগেল [Chuck Hagel] যখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী (২০১৩-১৫), তখন থেকেই ন্যাটো যে একটি খরচের ডিব্বা, আর সেই খরচের বেশির ভাগ (প্রায় ৯৫ শতাংশ) কেন আমেরিকা একা বইবে- এসব প্রশ্ন আর অজুহাত তুলে কি চাক হেগেল সেকালেই ইউরোপকে খরচের দায় নেয়না ওথচ বড় কথা বলে – এই বলে অপমান করেনি?   ট্রাম্পও তো একই প্রশ্ন তুলেছিলেন।  ইউরোপকে খরচের দায় নিতে হবে বলে হুমকি দিয়েছিল। আরো এগিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, একালে ন্যাটো একটি অপ্রয়োজনীয় সংগঠন। আফগানিস্তানের পর ন্যাটোর আর দুনিয়ায় কোনো ভূমিকা নেই। বিশেষ করে জঙ্গিবাদ কমে আসছে তাই – ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এমন সব ঘোষণা দেয়নি কি? এমনকি তিনি ইউরোপে (জার্মানিতে) ও জাপানে সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে এখনো আমেরিকান সৈন্যের সামরিক ব্যারাক মেনটেন করে যাওয়ার খরচ এবার থেকে ইউরোপকে দিতে হবে বলে ট্রাম্প দাবি করেননি?
    তাহলে সেসব প্রশ্নের সদুত্তর কী? উঠে থাকা এসব প্রশ্ন যা ন্যাটোর ভবিষ্যতই এলোমেলো করে রেখেছে সেসব পাশ কাটিয়ে বাইডেন কতদুর কোথায় যেতে পারবেন?  বাইডেনের কাছে এসব খরচের ব্যয়ভার প্রসঙ্গে সমাধান কী আছে? অর্থাৎ খরচ বইবার প্রশ্নে ন্যাটো এখন একটি পর্যদুস্ত সংগঠন হয়ে আছে! অথচ এসব নিয়ে কোনো কথা না বলে, এক দিনের ন্যাটো বৈঠকে গিয়ে চীনকে হুমকি দিয়ে এলেন বাইডেন! এটি কি তামাশা না ছেলেখেলা?

    Bantonglaoatang

    অভ্যন্তরীণ ভিন্নমতের বিতর্কও আছে গভীরেঃ
    তবে মনে হচ্ছে, ইউরোপের সবাই এখনো বোকা ধামাধরা নেতাদের দেশ হয়ে যায়নি। তাই খোদ সিএনএন খবর দিচ্ছে কানাডা বাদে ইতোমধ্যেই জি-৭ এর বাকি নেতাদের মধ্যে বাইডেনের চীনের প্রতি আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়ে অস্বস্তি ও আপত্তি দেখা দিয়েছে। গরম তর্ক-বিতর্কও হয়েছে। এতে সবচেয়ে বড় অস্বস্তি প্রকাশ করেছে ইতালি। এ নিয়ে চীনা ব্যাখ্যা হল, ইতালিই ইইউর প্রথম দেশ যে চীনের বেল্ট-রোডে প্রকাশ্যে অংশ নিয়েছে।  উপরের কার্টুনটা আমি নিয়েছি চীনা গ্লোবাল টাইমস ম্যাগাজিনের এক আর্টিকেল থেকে। ঐ আর্টিকেলে কার্টুনের চরিত্রগুলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে ইটালিকে কুমড়া নাম দেয়া হয়েছে যার আবার “শার্প টাং” মানে কাউকে কিছু বলতে যার মুখে কিছু আটকায় না এমন নির্দয়ভাবে ক্রিটিক্যাল। সেই ইটালি সম্পর্কে যা বলা হয়েছে,   The grey wolf image shows Italy, the first European country that joined China’s Belt and Road Initiative (BRI), is reluctant to collaborate with the US in suppressing China, commented “sharp-tongued pumpkin.” 

    তবে সামগ্রিকভাবে বললে, চীনের বিরুদ্ধে কামান দাগানো যৌথ বিবৃতি ধরনের কাগজে চীনকে কী ভাষায় কতটা অভিযুক্ত করছে মূলত এই প্রশ্নেই ভিন্নতাগুলো দেখা দিয়েছে। স্বভাবতই সবচেয়ে শক্ত ভাষায় বাইডেন ওই সব ড্রাফট দেখতে চাচ্ছেন। কিন্তু কেউই চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত যাতে না হয় ততটুকুতেই থাকতে চায়। যেমন জাপান টাইমস, যৌথ বিবৃতি ড্রাফট করতে গিয়ে বড় মতভেদের কথা তুলে ধরেছে। বিশেষ করে মানবাধিকার প্রসঙ্গে চীনকে কতটা সমালোচনা করা হবে সে বিষয়ে [G7 …….to counter Chinese influence in the world may prove a daunting challenge… ]।

    এ দিকে ভয়েস অব আমেরিকা লিখেছে, [G-7 Split on Biden’s Anti-China Push]। ইতালি জার্মানি আর ইইউ প্রতিনিধিকে দেখা গেছে, চীনের বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য দিতে এরা অনিচ্ছুক; বরং সহযোগিতামূলক সম্পর্কের মধ্যে থাকতে আগ্রহী। আবার এসব প্রশ্নে কানাডা, ফ্রান্স, ব্রিটেন আর আমেরিকা নিজে এভাবে এরা চারজন আবার চার মাত্রায় চীনের বিরোধিতা করতে চায়। আর জাপান যে কোন দিকে অবস্থান নেবে, তা সে সবচেয়ে অনিশ্চিত।

    “There were some interesting discussions and a little bit of a differentiation of opinion,” said a senior Biden administration official……Italy, Germany, and the European Union appear reluctant to take as tough a stance on China, and instead would rather focus on the “cooperative nature of the relationship.” …… The U.S., Britain, Canada, and France, on the other hand, want to be more “action-oriented” to different degrees. Japan appears to be the most ambivalent of the group.

    সিএনএন লিখছে, এক আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট তাদেরকে জানিয়েছেন, বিশেষ করে ইতালি ও জার্মানি খুবই অস্বস্তিতে ছিল বিবৃতির ভাষা নিয়ে [….US officials said Italy and Germany were uneasy with potential communique language that China might view as provocative. ]। যেন চীন এটিকে কোনোভাবেই উসকানিমূলক হিসেবে না দেখে। চ্যান্সেলর মার্কেল তো বলেই বসেছিলেন যে, চীন আমাদের প্রতিদ্ব›দ্বী বটে কিন্তু আবার অনেক ইস্যুতে আমাদের পার্টনারও তো বটে [Angela Merkel said that “China is our rival in many questions but also our partner in many aspects.” ]। ফরাসি নেতা ম্যাক্রোঁও যোগ করেছেন, জি-৭ কে তো ওই চীনের সাথেই আবার জলবায়ু, বাণিজ্য, উন্নয়ন ও অন্য অনেক ইস্যুতে ভিন্নমত থাকলেও একসাথে কাজ করতে হবে। তাই তিনি পরিষ্কার করে রাখার পক্ষে যে, তাদের জি-৭ কখনো চীনবিরোধী কোনো ক্লাব হতে পারে না. “I will be very clear: The G7 is not a club hostile to China,” the French President said।

    সারকথায়, ভেতরে বড় মাত্রায় বাইডেন বিরোধিতা বজায় আছে। তবে সবচেয়ে মজার অবস্থানে ভারত। ভারতের মিডিয়াই ভেতরের বিরোধের খবরগুলো বড় করে সামনে এনেছে। যেমন হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে, জি৭ লিডারেরা কত শক্ত করে চীনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাবে এনিয়েই তাদের মধ্যে বড় তর্কবিতর্কটা শুরু হয়েছিল। [The leaders of Group of Seven (G7) debated how strongly they should respond to China’s growing clout around the world and alleged forced labour practices in the Xinjiang region.] আর উইঘুর ইস্যুতে আরো মারাত্মক কথা বলেছে ঐ একই রিপোর্টে, ……there was no immediate consensus on how forcefully they should call out Beijing over the alleged human rights abuses। অর্থাৎ কত জোর দিয়ে উইঘুর ইস্যুতে অভিযোগ তুলবে তা নিয়ে এখনি নেতসাদের মধ্যে ঐক্যমত নাই। কিন্তু কেন এমন লিখল, কারণ, ভারতই চায় না এটা। কারণ সেক্ষেত্রে এখানে কাশ্মীরের প্রসঙ্গ না চলে আসে। এছাড়া চীনের নেজেরই লিক হয়ে যাওয়া রিপোর্ট রেফার করে হিন্দুস্তান টাইমস লিখছে ঐ চীনা রিপোর্টে “struggle against terrorism, infiltration and separatism.” চীন লিখেছে তারা (উইঘুরের) সন্ত্রাসবাদ, অনুপ্রবেশ ও বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে তাদের লড়তে হচ্ছে। মনে হচ্ছে একথাগুলো ভারতের মনে দাগ ফেলেছে।

    এছাড়া আরেক নিরপেক্ষ মিডিয়া ওয়াইর [WIRE]  লিখেছে,  ন্যাটো মিটিংয়ে একসময় এমন উত্তপ্ত ভাষায় বাইডেনের সাথে ইউরোপীয়দের বিতর্ক শুরু হয়েছিল যে কমিউনিকেশন সুইচ অব করে রাখতে হয়েছিল, যাতে বাইরে মিডিয়ার কাছে তা না পৌঁছায়। আবার আরেক ভারতীয় মিডিয়া খবর দিয়েছে, মানবাধিকার প্রসঙ্গে বিবৃতিতে কিছু অবস্থান প্রসঙ্গে খোদ ভারতেরই অস্বস্তি দেখা দিতেছে। তবে অভ্যন্তরীণভাবে সবচেয়ে বড় অস্বস্তির প্রশ্ন ছিল, উইঘুর বা ফোর্সড লেবার ইস্যুতে কতটা চাপ দিয়ে তা বলা হবে, এ নিয়ে বিতর্ক।

     বাংলাদেশের প্রসঙ্গঃ
    এসব প্রসঙ্গে বাংলাদেশেরও বলার আছে। প্রথমত, বাইডেন আমাদেরকে যে পটেনশিয়াল বিপদের মধ্যে হাজির করে ফেলেছেন তা হল, সত্যিই যদি তিনি চীন-আমেরিকার বাণিজ্য-বিরোধকে যুদ্ধের দিকে ঘুরিয়ে দেন বা টেনে নিয়ে যান, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমি হয়ে উঠতে পারে তাদের দুই দেশের যুদ্ধের রণভুমি। এছাড়া অনেকের মনে আশা যে বাংলাদেশে কেমন ধরনের সরকার থাকবে বা কে থাকবে- এ প্রশ্নে বাইডেন তাদেরকে সাহায্য করবে বা তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করবে। যেমন করেছিল ১/১১ এর সময়ে। কিন্তু সে আশায় কী আমরা বাংলাদেশকে চীন-আমেরিকার রণক্ষেত্র হিসেবে দেখতে চাইতে পারি? এমন আশার কোন মানে হয় না। এরা বাংলাদেশের হত্যাকারী।  ঠিক যেমন ১/১১ পরিণতি হয়েছিল আমাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।  যার ফলে আজ প্রায় ১৪ বছর হয়ে গেল আমরা ভোগ করছি কিন্তু বের হতে পারি নাই।  আমরা আমেরিকার স্বার্থের ওই যুদ্ধের বলি হতে পারি না। যেমন ভাবে বার্মা নিয়েও তাদের স্বার্থের লড়াইয়ের কোনো অংশ হয়ে যেতে পারি না। এ ব্যাপারে আমাদের দেশেও নানা পক্ষ আছে স্বাভাবিক। তাদের সবার প্রতি পরামর্শ থাকবে আমরা যাই করি আমরা কারো হাতিয়ারে যেন পরিণত না হই। একবার হওয়াতেই আমাদের শিক্ষা হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত।  বিশেষত বাংলাদেশকেই না তাদের বার্মা-বিবাদের রণক্ষেত্রে বানিয়ে ফেলি সেটা আমাদের খেয়াল রাখতেই হবে।

    আর উইঘুর বা মানবাধিকার প্রশ্নে স্বাভাবিকভাবে আমাদের অবস্থানটা হবে সবাইকেই হিউম্যান রাইট কমপ্লায়েন্স অবস্থানে যেতে হবে। আমরা কি উইঘুরে সত্যি মানবাধিকারের বাস্তবায়ন দেখতে চাই? নাকি এ নিয়ে চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ নিতে চাই, যাতে সেটি আমেরিকার বাণিজ্য সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হয়? এ দুয়ের মধ্যে ঠিক কোনটা চায় তা আমেরিকাকে স্পষ্ট করতে হবে।

    কথিত ডেমোক্র্যাসি বনাম অটোক্র্যাটঃ
    এবার দাবি করা হচ্ছে, এবারের জি-৭ মিটিং নাকি কথিত ডেমোক্র্যাসি বনাম অটোক্র্যাটের লড়াই। আচ্ছা এই জি-৭ এটি কী এককালে জি-৮ করে নেয়া হয়নি? রাশিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে নিয়ে। পরে যদিও ইউক্রেন-ক্রিমিয়া প্রশ্নে এক বিবাদে ২০০৭ সালে আবার রাশিয়াকে বের করে দেয়া হয়েছিল এবং সেই থেকে রাশিয়ার ওপর আমেরিকান অবরোধ আরোপ হয়ে আছে আজও। তা হলে সেসব সময় রাশিয়া যখন ভেতরে ছিল, তখন সবাই জি-৮ এর সবাই ডেমোক্র্যাসির লোক হয়ে গেছিল?  তার মানে রাশিয়া ভিতরে থাকলে জি হল ডেমোক্রেসির উদাহরণ আর তারা বের করে দিলে  রাশিয়াই হয় অটোক্রাসি! হায়রে ডেমোক্র্যাসি!

    আবার  প্রনবল আমানবিকভাবে ইয়েমেন তছনছ করতে সৌদিদেরকে   আমেরিকান সমর্থন এটিও কি ডেমোক্র্যাসির তাণ্ডব অথবা ওদিকে দেখেন, দুই দিন পরে পরে নিয়মিত গাজায় ইসরাইলি হামলা এটাই বা কোন ডেমোক্র্যাসি? আমেরিকার এসব “ডেমোক্র্যাসি-বিক্রির” বক্তব্য আসলে  আমাদে্র  জন্য এক চরম বিরক্তিকর জায়গায় পৌঁছেছে।

    তবে চীনের প্রসঙ্গেও অন্তত দুটো কথা বলার আছে। বিশেষ করে বাইডেনের সমালোচনা করছি বলে ভুল বোঝার সুযোগ নেই। হিউম্যান রাইট ইস্যুটা জাতিসঙ্ঘের জন্মের সময় ও পরে ১৯৪৮ সালের সম্মেলনে উঠলেও এর অগ্রগতি খুবই হতাশজনক। অথচ এরই মধ্যে গ্লোবাল অর্থনীতির নেতৃত্বে বদলের সময়কাল আসন্ন। এত দিন কমিউনিস্টদের রাজনীতি ও তাদের দেশ যেভাবেই চলুক, এখনকার প্রশ্ন আলাদা।

    অন্তত গ্লোবাল নেতা হওয়ার স্বার্থে  মানবাধিকার  রক্ষা প্রসঙ্গে চীনের ন্যূনতম একটি অবস্থান গ্রহণ পূর্বশর্ত। নইলে প্রতি পদে এই ইস্যুতে সঙ্ঘাতে গ্লোবাল সব কাজ বাধাগ্রস্ত হতে থাকবে। চীনকেই অযথা বিব্রত হতে হবে প্রায়ই।  চীন নিশ্চিত থাকতে পারে হিউম্যান রাইট ইস্যুতে ন্যূনতম একটি অবস্থান ছাড়া চীনের নেতা থাকা খুবই কঠিন হবে। ফেলও করতে পারে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৪ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “যুদ্ধের খরচ জরুরি, হিউম্যান রাইটও“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাইডেনকে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের খরচ দিবে কে?

    বাইডেনকে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের খরচ দিবে কে?

    গৌতম দাস

    ২১ জুন ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3B4

     

    G7 summit Cornwall, UK. – 11-13 June

    জো বাইডেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার শপথ নেয়ার চার মাসের মাথায়  চীনের বিরুদ্ধে জি-৭ জোট (১১-১৩ জুন বৃটেনে G7 summit Cornwall ) আর ন্যাটোকে (১৬ জুন সামিট) দিয়ে আসলে যুদ্ধের হুমকি দিয়েছেন।  বিশেষ করে ন্যাটোর জন্ম ম্যান্ডেটের আর্টিকেল ফাইভ এর রেফারেন্স তুলেছেন যা আসলে একেবারেই যুদ্ধ ও আক্রান্ত সংক্রান্ত। মানে ন্যাটোর ৩০ রাষ্ট্রের কেউ আক্রান্ত হলে বাকি সবাই তা নিজের উপর আক্রান্ত মনে করতে বাধ্য।  অথচ দুনিয়াতে কোথাও কোন যুদ্ধের ইঙ্গিত না থাকলেও  প্রথম আগ বাড়িয়ে যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে বাইডেন কথা বলে গেলেন।  এটা চরমভাবে অযাচিত। এটা দায়ীত্বজ্ঞান সম্পন্ন নয় অবশ্যই।  সব চেয়ে ট্র্যাজিক ব্যাপারটা হল,  বৈষয়িক উন্নয়নজনিত চীনের গ্লোবাল প্রভাব বৃদ্ধিকে বাইডেন যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে মোকাবিলা করতে চাইলেন!  এটা কী দুটা সমতুল্য ফেনোমেনা? না ফিট করে? না অর্জনযোগ্য?

    আর  এতে ক্ষুব্ধ চীন বলেছে, “কয়েকটি ছোট দেশের জোট দুনিয়ার ভাগ্য নির্ধারণ করার দিন শেষ” [সেই দিন অনেক আগেই শেষ: জি–৭–কে চীন  – প্রথম আলো]।
    [Before the G7 criticism emerged, China pointedly cautioned G7 leaders that the days when “small” groups of countries decided the fate of the world were long gone.]

    তবে বাইডেনের ওই সব কথাবার্তা একেবারেই অপ্রস্তুত থেকে বলা। কারণ ঠিক কোথায় কিভাবে তিনি পৌঁছাতে চান, তাতে আমেরিকার লাভ কী? অথবা বলা যায় সেটি সম্ভব কি না, আমেরিকার সেই মুরোদ এখনো আছে কি না, এসব নিয়ে হোমওয়ার্ক যথেষ্ট করেছেন কি না, এসব প্রশ্নের জবাব বাইডেনের সাথে আছে, তা তার পদক্ষেপের মধ্যে ছাপ বা প্রমাণ নেই।

    যেমন, বাইডেন আজ ন্যাটোর হুমকি দিতেছেন? অথচ তার কী মনে নেই, কেন ওবামা ইরানের সাথে ২০১৫ সালে আপস করেছিলেন? ইরানের উপর ১৯৭৯ সাল থেকে আরোপিত নানা অবরোধ ওবামা তুলে নিয়েছিলেন আর, ‘P5+1’ [ইউরোপের সাথে মিলে আর জাতিসংঘকে সংশ্লিষ্ট রেখে] এর পারমাণবিক চুক্তি করেছিলেন – কেন? কারণ ইরাকে আইএসের নতুন তৎপরতা ও দখলদারি শুরু হলেও তাতে আমেরিকার খরচ বইবার মুরোদ ছিল না বলে সে আবার ইরাকে সৈন্য পাঠাতে পারছিল না। আর ইরাকে আই এস দমনের কাজটাই ইরানি সেনাবাহিনী করে দিবে বলে এর বিনিময়ে তিনি আপস করেছিলেন, পারমানবিক চুক্তি করেছিলেন। ইরানের উপর অবরোধের অবসান করেছিলেন। কাজেই এখন ন্যাটোকে দিয়ে চীন-রাশিয়াকে হুমকি দিবার আগে বাইডেনের উচিত ছিল তিনি  এমন যুদ্ধ হলে এখন এর ব্যয়ভার বইতে সক্ষম কেন ও কিভাবে সেটা আগে দেখানো। এটাই হত সবচেয়ে স্বাভাবিক আর তা না দেখানোতে তাঁর  উপস্থিতিতে ন্যাটোর দেয়া বিবৃতিতে এই হুমকি একটা ফাঁকা হুমকি হিসাবে হাজির হবেই। এসব ফাঁকা বুলি ছেড়ে কী লাভ? আমেরিকা কী মানুষের হাসাহাসির পাত্র হতে পণ করেছে?

    নরম-হালকা ভাষায় বললে এটা চীন-আমেরিকার বাণিজ্য বিরোধ বা বড় জোর বাণিজ্যযুদ্ধ বলা শুরু হয়েছিল, যা চলে আসছে কেবল ট্রাম্প আমল থেকে এ পর্যন্ত। কারণ ওবামা আমল পর্যন্ত এটা বিরোধ বা বাণিজ্যযুদ্ধ হিসেবেও দেখা দিতে দেয়া হয়নি। তবে ওবামা পরপর দুবারই (২০০৯ ও ২০১৩ সালে ) প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর চীন সফরে গেছেন আর চীন তাকে একগাদা বাণিজ্য সুবিধা হাতে ধরিয়ে দিয়েছে আর তা দিয়েই সেটা আর কখনো বিরোধ বা কোনো বাণিজ্যযুদ্ধ হিসেবেও হাজির হয়নি। এমনকি ট্রাম্পের প্রথম বছরেও (২০১৭) তিনি এমনই ভাবে সফরে গিয়ে আরো বাণিজ্য সুবিধা নিয়ে ফিরেছিলেন। এমনকি সেবছর কোয়াডকে [QUAD] জন্ম দিয়েও সে ঘটনাকে লঘু-বিষয়  করে রেখেছিলেন। একসাথে সদস্যরা সবাই মিলে একটা বিবৃতি দিতে পারেন নাই ও দেন নাই। কিন্তু পরের বছর (২০১৮) থেকে আর ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ টার্মটা ব্যবহার না করে পারেনি। তাহলে এটা কী ব্যক্তি ট্রাম্পের জাতিবাদী ভাব নিয়ে আগানোর সমস্যা, নাকি এটি অনিবার্য ছিল? জবাব হল, এটি অবশ্যই অনিবার্য ছিল। তবে ট্রাম্পের বোকা আমেরিকান জাতিবাদ এ্টাকে সহজ করবে মনে করে করতে গিয়ে ব্যাপারটাকে আরও জটিল করে তুলেছিলেন।

    ১৯৬৯ সাল থেকে নিক্সন-কিসিঞ্জারও জানতেনঃ
    আসলে এটা যে অনিবার্য তা ১৯৭০-৭১ সাল থেকে নিক্সন-কিসিঞ্জারও জানতেন।  আসলে এটা আরো আগে ১৯৬৯ সাল থেকে যখন,  চীন-আমেরিকা  পরস্পরকে স্বীকৃতি না-দেয়া এক দশা-অবস্থা থেকে আজকের এই গভীর সম্পর্ক  পাতানো-পৌছানোর লক্ষ্যে সেকালে  পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আয়ুব খানের মাধ্যমে  প্রথম চীন-আমেরিকা  উভয়ের কাছে পরস্পরের প্রস্তাব ও মনোভাব পৌছে দিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তিতে  তা পেকে উঠলে সেটা হল আমরা যখন  ১৯৭১ সালে রিফুজি হয়ে ভারতে আশ্রয় খুঁজছি সেই একাত্তরের জুলাইয়ে হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তান সফরের নামে প্রথম গোপনে চীন সফরে গিয়েছিলেন।  তিনিই নিক্সনের সফরের বন্দোবস্ত করে আসেন। ফলে মাওয়ের বিপ্লবের চীন সফরে যাওয়া প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট হলেন নিক্সন। তিনি ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে চীন সফরে যান। আর সেই থেকে সেকালের বিনিয়োগ-খরায় থাকা চীনে বিনিয়োগ নিয়ে হামলে পড়ার সুযোগ পেয়ে আমেরিকার বিনিয়োগপাড়া ওয়ালস্ট্রিট হয়েছিল সবচেয়ে খুশি।

    কিন্তু সে দিনও ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ সবাই জানতেন এই সুখ সাময়িক। কারণ এতে একদিন চীনই বড় হয়ে এই আমেরিকাকেই চ্যালেঞ্জ জানাবে। কিন্তু সেসব ভুলে বিনিয়োগ গ্রাহক চীনের বিশাল বাজার তাৎক্ষণিকভাবে আমেরিকাকে বিশাল লাভালাভ রিলিফ দেবে, কত কী পাওয়া যাবে – এটিই ছিল মুখ্য বিবেচনা।

    মনে রাখতে হবে, ক্যাপিটালিজমের আদি এবং অনিবার্য স্ববিরোধ হল, সে নিজেই ক্রমেই নিজ বাজার সঙ্কুচিত করবেই। তাতে আবার একসময় নতুন বাজার পাওয়ার সঙ্কটে পুরনো মালিকরা দিশেহারা হবেন আর নতুন উত্থিত মালিক তাকে চ্যালেঞ্জ করবেনই। তাই বলছি, সেই ১৯৭২ সাল থেকেই সবাই জানত আজকের এদিন আসবেই। এমনকি এখনকার ওয়ালস্ট্রিটের লিডার (গোল্ডম্যান স্যাক্সে) সহ বুদ্ধিমানেরা তাই ইতোমধ্যেই আমেরিকান রাষ্ট্র-ভক্তি ছেড়ে চীনা রাষ্ট্রের ভক্ত-পরামর্শক হয়ে গেছেন।

    বাইডেন এবারের জি-৭ মানে ধনী সাত দেশের এক ক্লাবের বৈঠকে যোগ দিতে আয়োজনস্থল ব্রিটেনের কর্নওয়ালে গিয়েছিলেন।  কিন্তু সেকালের জি৭ আর  সত্যিকারভাবে তেমন ধনীদেশ নয়। আজ তাদের চেয়েও ধনীদেশ জি৭ এর বাইরেও আছে। আসলে  জি-৭ হল সেকালের গ্লোবাল নেতা আমেরিকার একক সিদ্ধান্তগুলো ইউরোপের সাথে সমন্বয় করে নেয়ার লক্ষ্যে এক সভা যাতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকসহ গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলোতে এক স্বরে পশ্চিমাদেশগুলো যেন কথা বলে বাকি রাষ্ট্রের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে পারে।

    আমেরিকার কাগুজে ডলার ছাপানো শুরু বা গোল্ড ক্রাইসিস ১৯৬৮ঃ
    আসলে এটা ছিল সেকালের আমেরিকার ইউরোপ তোষণ বা ক্ষুব্ধ ইউরোপকে তেল মারা। কেন? কারণ আমেরিকা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল। ব্যাপারটার আনুষ্ঠানিক দিক থেকেই যদি বলি ১৮ মার্চ ১৯৬৮ আমেরিকান কংগ্রেস একটা আইন পাস করেছিল যে ডলার ছাপতে গেলে আগে সম-পরিমাণ সোনা ফেড-এর ভল্টে রিজার্ভ রাখতে হবে [Gold backed currency] এই শর্ত প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। আর এতেই লন্ডনের সোনার বাজারে হাহাকার পড়ে যায়।  অর্থাৎ আইওএমএফ-বিশ্বব্যাংক জন্মের সময় ডলার Gold backed currency থাকবে। তাই এর ফিক্সড বিনিময়মুল্য ছিল যে এক আউন্স সোনা সমান ৩৫ ইউএস ডলার।   গ্লোবাল বাণিজ্যের এই মৌলিক বুঝাবুঝি  এতে ভেঙ্গে পড়েছিল। আর সত্যিকারভাবে কার্যত বেশি কাগুজে ডলার ছাপানো শুরু করেছিল ১৯৫৬ সাল থেকে যেটা ১৯৬৮ সালে এসে আমেরিকান কংগ্রেস এই অন্যায় কাজের স্বীকৃতি দিয়েছিল।

    আর তা থেকে ক্ষুব্ধ ইউরোপকে ঠান্ডা করতে আমেরিকা এই প্রথম নিজের নেয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে তা ইউরোপের সাথে শেয়ার করতে সম্মত হয়ে ১৯৭৩ সালে জি-৭ গ্রুপের জন্ম দিয়েছিল । কারণ কাগুজে ডলার ছাপানোতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে পুণজন্ম দিয়ে ম্যান্ডেট আমার লিখে নেয়া ছাড়া উপায়  ছিল না। কারণ এদের ম্যান্ডেট লেখা হয়েছিল ডলার – Gold backed currency এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে। তাই ঐ ১৯৭৩ সাল থেকেই জি৭ এর জন্ম। তবুওও জন্মের পর থেকে এভাবে জি-৭ নামে বসাবসির ব্যাপারটা একেবারেই ইনফরমাল। মানে হল যেমন, বিশ্বব্যাংকের উপরে কোনো ফরমাল মাতব্বরি প্রতিষ্ঠান জি-৭ নয়।

    এভাবে সত্তরের দশক থেকে জি-৭ এর শীর্ষ বৈঠক ব্যবস্থা চলে এলেও এবারই প্রথম চীনকে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের যেন এনিমি করে দেখেই কিছু কথা বলেছে; এমনকি গত ২০১৮ সালের সম্মেলনেও তারা চীন অথবা অন্য কারও নাম উল্লেখ করেনি [Although senior U.S. officials highlighted the references to Beijing, noting that “China wasn’t even explicitly mentioned” in the 2018 G7 communique despite]।

    জি-৭ ফ্যাক্টসশিট -FACT SHEET: President’s WHITE HOUSE
    এবারের জি-৭ বৈঠক উপলক্ষে হোয়াইট হাউজ থেকে এক ফ্যাক্টসশিট বুলেটিন বের হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘বাইডেন চীনের সাথে কৌশলগত প্রতিযোগিতা’ […to discuss strategic competition with China ] প্রসঙ্গে এখানে জি-৭ বৈঠকে নেতাদের সাথে আলোচনা করেছেন। অর্থাৎ চীনের নাম নিয়েই কথাটা তিনি বলেছেন। আবার দ্বিতীয়ত তিনি চীনকে ঠিক শত্রু দেশ বলেননি; বলেছেন যার সাথে তার “কৌশলগত প্রতিযোগিতা” [strategic competition] আছে, এভাবে মোলায়েম করে বলেছেন। অর্থাৎ এবার স্বীকার করে নিলেন চীনের সাথে আমেরিকার কৌশলগত প্রতিযোগিতার সম্পর্ক আছে। কিন্তু সে কথা এবারই প্রথম বলা হল কেন?
    আগেই বলেছি, ১৯৭২ সাল থেকে চীন তো আমেরিকার কাছে খুবই আদরের দেশ ছিল। কারণ চীন ছিল সবচেয়ে বড় জনসংখ্যার বড় এক “ঋণ খাতক” দেশ। আর সেই সাথে আমেরিকার হাইটেক পণ্যের আমদানি দেশ। কিন্তু সেই চীনই ২০১০ সালের পর থেকে হয়ে যায় সরাসরি আমেরিকার বাণিজ্যবিরোধের দেশ আর আমেরিকার গ্লোবাল নেতা থাকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি ও চ্যালেঞ্জার। যেখান থেকে আজ চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতৃত্ব আগামীতে আমেরিকা্র থেকে কেড়ে নিতে চায় যে সেই দেশ। তাই এই প্রথম লজ্জার মাথা খেয়ে বাইডেন স্বীকার করেছেন যে, চীন আমেরিকার সাথে কৌশলগত প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্কে আছে। ফলে সরাসরি না হলেও নাম উল্লেখ করে স্বীকার করে নিলেন চীনের কাছে আমেরিকা নেতৃত্ব হারাতে যাচ্ছে, তাই ‘কৌশলগত প্রতিযোগী’।

    এখন প্রশ্ন হলো আমেরিকা প্রতিযোগিতা করার যোগ্য কী? কতটা? জবাব হলো, না একেবারেই  যোগ্য নয়। কারণ আমেরিকা চীনের কাছে হেরে যাবে। ঠিক যেমন এককালে ব্রিটেনও আমেরিকার কাছে হেরে গিয়েছিল। কারণ বিষয়গুলো অবজেকটিভ ফেনোমেনা বা ঘটনা। ক্যাপিটালিজমের কপাল বা পরিণতিই এমন!  যেমন এখন পশ্চিমা একাদেমিকদেরই পুর্বাভাস হল ২০২৮ সালের মধ্যেই চীন আমেরিকান অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে গ্লোবালি বড় অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে।

    এককালে আমেরিকায় কলোনি দখলকারী ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা  যেসব গরিব ব্রিটেনবাসীকে বিনা পয়সায় জাহাজ ভরে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল সেখানে চাষাবাদের জমি ও সিড-মানি [seed money] দেয়ার লোভ দেখিয়ে – পরে ১৭৭৬ সালে ঐ গরিব ও চাষাবাদ করে খাওয়া লোকেরাই কলোনি দখলকারী ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের সশস্ত্রভাবে উৎখাত করে নিজেদের আমেরিকাকে স্বাধীন ঘোষণা করেছিল। এরও পরে ১৮৮২ সালের পর থেকে আমেরিকা ক্যাপিটাল একুমুলেশনের [surplus accumulation] বা উদ্বৃত্ত সঞ্চিত সম্পদের দিক থেকে ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এথেকেই পরে ১৯৪৫ সালে মহাযুদ্ধ শেষে আমেরিকাই গ্লোবাল নেতা হয়ে যায়। ঠিক যেন একইভাবে এখনকার পূর্বাভাস হল, ২০২৮ সালে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ হয়ে যাচ্ছে। আর এটাই হবে চীনের গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠতে আরও বড় একধাপ আগানো।

    অথচ ক্ষমতায় এসে এখন বাইডেন যে সিদ্ধান্ত নিলেন সেটা এক অবাস্তব স্বপ্ন-কল্পনার দিকে যাত্রা। সে্টা হল, আমেরিকা নাকি আবার দুনিয়াকে শাসন করেই যাবে [……glad America is back]। সে জন্যই গত নির্বাচনের সময় থেকে এবং জিতার পরও এখন তার স্লোগান হল ‘আমেরিকা ইজ ব্যাক’। না এটা আমেরিকার (নেতাগিরিতে) ফেরত আসা নয়, বরং বাইডেন মানে ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় ফিরে এসেছেন, মাত্র। আমেরিকা নয়। এভাবেই বলেছেন সিএনএন বা ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট ফরিদ জাকারিয়া। কারণ তিনিও বিশ্বাস করেন নাই। লিখেছেন, Under Biden, American diplomacy is back. But America isn’t. । অতএব, সোজাসাপ্টা বললে বাইডেন মিথ্যা আশ্বাসের স্লোগান দিচ্ছেন।

    তা হলে তিনি সঠিক কী করতে পারতেন? বাইডেনের নেতৃত্বে আমেরিকা চীনকে নেতা মেনে নিতে প্রস্তুত হয়ে নিজের অবস্থান যতটা সম্ভব ভালো ও উঁচুতে ধরে রাখার চেষ্টা করে যেতেন অর্থাৎ পরিস্থিতিকে অন্তত খামোখা যুদ্ধ-সঙ্ঘাতের দিকে ঠেলে দেয়া নয়। কারণ পরিস্থিতিকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়ার মানে হবে, স্বাভাবিক অবস্থায় যদি আমেরিকার দ্বিতীয় অবস্থানে থাকার সুযোগ থাকে তবে সেটাকেই নষ্ট বা নড়বড়ে করে ফেলা হয়ে যেতে পারে।

    NATO Secretary General Jens Stoltenberg

    বাইডেনের উপস্থিতিতে ন্যাটো, বুড়া হাড়ে জওয়ানিঃ
    কিন্তু কেন আমরা যুদ্ধের কথা তুলছি? বাইডেন তো কেবল চীনের সাথে “স্ট্রাটেজিক প্রতিযোগিতার” কথা বলেছেন, যুদ্ধের কথা তো বলেননি!

    হ্যাঁ,  জি৭-এর বেলায় এটুকু আপাত-সত্য হলেও বাইডেন আরেক কিছু বড় আকাম করেছেন। যেমন একই নিঃশ্বাসে তিনি প্রায় নাই (ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রায় ঘোষণাই করে দিয়েছিলেন ন্যাটোর প্রয়োজন ফুরিয়েছে) হতে যাওয়া ন্যাটোর (সেক্রেটারির) সাথে মিটিং করেছেন; জি-৭ এর সভা শেষের এক দিন পরে। আর সেখান থেকেই যুদ্ধের উসকানিমূলক কথা বা হুমকি দিয়েছেন। এমনিতেই এটি ছিল বাইডেনের ‘এক ঢিলে অনেক পাখি মারা’র সফর। কারণ তিনি ব্রাসেলসে গিয়ে ইইউ-আমেরিকার শীর্ষ বৈঠকও করে নিয়েছেন আগের দিন। পরের দিন ন্যাটোতে তিনি হাজির। আসলে একদিকে জি-৭, ন্যাটো বা ইইউর সাথে বৈঠক মানে হলো, মূল টপ সাত-দশ রাষ্ট্রনেতার সাথে তিন ফোরামেই বসা মিটিং। একই লোক অথচ ফোরামগুলো ভিন্ন।
    ফলে জি-৭ এর বৈঠক থেকেই সব কিছুতে আলোচনার মুলইস্যু হল চীন। আবার বাইডেন ন্যাটোতে এলে ন্যাটোর দেয়া বিবৃতি লিখছে যে, ‘চীনের উচ্চাকাঙ্খা  ও চাপানো আচরণ তাদের অ্যালায়েন্সের নিরাপত্তাকে সিস্টেমেটিক চ্যালেঞ্জ (systemic challenges) করছে বিশেষত তাদের আন্তর্জাতিক নিয়ম আইনের প্রতি অনুগত থাকার বিরুদ্ধে” ।
    “China’s stated ambitions and assertive behaviour present systemic challenges to the rules-based international order and to areas relevant to alliance security,” the statement said. ……  “rapidly expanding its nuclear arsenal, with more warheads and a large number of sophisticated, sophisticated delivery systems”, as well as its military cooperation with Russia and its “use of misinformation”.
    এ ছাড়া ন্যাটোর আরো অভিযোগ হল, চীন-রাশিয়া মিলে কেবল পারমাণবিক অস্ত্রের ঢিবি বানাচ্ছে। অর্থাৎ সার কথায় বাইডেন চীনের সাথে আমেরিকার বিরোধকে সামরিকভাবে লড়ার দিকে ঠেলে দিতে চান এই পরিষ্কার ইঙ্গিত এখানে আছে। আর ন্যাটো এই প্রথম যে অজুহাতে ইন্দো-প্যাসিফিক বা কোয়াড জোট গড়া হয়েছিল তা এখন বাইডেনের উপস্থিতির সভা থেকে সেটা ন্যাটোরও অজুহাত হয়ে গেল।  কী সেটা?

    বাইডেন ও তাঁর বন্ধুদের rules-based international order, এই কথার মানে কীঃ
    ঘটনা হল, আপনি যদি কারো বাসার প্রধান প্রবেশমুখ কোন অজুহাতে বাধা বা ব্লক খাড়া করতে যান তবে সেটা আপনার আইনি বা বেআইনি যে যুক্তিতেই হোক তাতে ঐ বাড়িওয়ালা আপনার ততপরতাকেই উলটা উৎখাত করবেই।  ভৌগলিকভাবে চীনের কেবল উত্তর-পূর্ব দিকটাই সমুদ্রের দিকে খোলা। বাকি সাড়ে তিন দিকে এটি একেবারেই ল্যান্ডলকড এবং উত্তর ও পশ্চিম দিকটাতো পুরাপুরি  হিমালয়-সহ অন্যান্য পর্বতমালায় ঘেরা। এখন আমেরিকার সিনেটের পেশ করা লিখিত পরিকল্পনায় দেখা গেছে  মালাক্কা প্রণালী বন্ধ করে দিয়ে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধকৌশল্গত পরিকল্পনা পেশ করা হয়েছিল।

     

    ম্যাপে দেখা যাবে মালাক্কা প্রণালী [Strait of Malacca]  হল আরব সাগর থেকে তেল নিয়ে চীনের সমুদ্র উপকুলে পৌছাবার পথে  এই প্রণালী হল এক চিকন পথ, যাকে প্রণালি বা Strait বলা হয় আর যা ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার ভুমি দিয়ে দুদিক থেকে ঘিরে ধরা।  এই প্রণালিতে কোন একটা জাহাজ আড়াআড়ি করে ফেলে রাখলেই এই পথে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়া যায়। তাই আমেরিকান যুদ্ধকৌশলে খুবই পেয়ারের জায়গা মনে করা হয় মালাক্কা প্রণালীকে।

     

    আবার চীনে সমুদ্রপথের একমাত্র প্রবেশমুখের চার দিকে প্রায় ১০টি দেশের সাথে সামুদ্রিক সীমানা আছে। আর বলাই বাহুল্য তা আন-ডিমার্কেটেড। জাতিসঙ্ঘের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান [UNCLOS, United Nations Convention on Law of Sea ] আছে যারা এসব বিরোধ মীমাংসার সালিস করে দেয়। তবে এটি আমাদের রাষ্ট্রের আদালত বা জুডিশিয়ারি ব্যবস্থা নয়। এটা আসলে আরবিট্রেশন অর্থাৎ যেটাকে আমরা গ্রামের সালিসি বা আপসে মীমাংসা বৈঠক বলি, এটা তাই। যেমন মিল মিশে ভাগবাটোয়ারা করে দেয়া তাই এখানে কে অপরাধী তা খুঁজা বা শাস্তি দিবার ব্যাপার নাই।  যেমন এখানে দুই পক্ষেরই বিচারক নিয়োগ দেয়ার সুযোগও থাকে।

    এখন এই আনক্লসের সালিস আদালতে কেবল চীন-ফিলিপাইনের সমুদ্র সীমানাবিরোধের কেসটাই উঠেছিল। তাতে এই জাপানি বিচারকের ব্যাপারে আপত্তি তুলে, তাকে বদল করে অন্য বিচারক দেয়ার আবেদন করেছিল চীন, যা মানা হয়নি। তাই ক্ষুব্ধ চীন সেই থেকে বিচার কার্যক্রম থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়। আর এতে ব্যাপারটা আর আপস সালিসি না হয়ে (অর্থাৎ বিচারক বদলে না দিয়ে) রাষ্ট্রের আদালতের ভূমিকাই যেন হয়েছিল। আর সেই রায় দেয়া হয়েছিল ফিলিপাইনের পক্ষে। স্বভাবতই চীন সেই রায় মানেনি। আর সেই থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক বা কোয়াড জোট গড়ে আমেরিকান প্রপাগান্ডা শুরু হয় যে, আন্তর্জাতিক আইন না-মানা দেশ হল চীন। আমেরিকা ও বন্ধুদের প্রপাগান্ডার ভাষায় চীন হল, rules-based international order না মানার দেশ আর তারা সকলে হল আইন ও গণতন্ত্র চুইয়ে পড়ার দেশ।  অথচ শুরু থেকেই এটি ছিল গায়ে পড়ে চীনের প্রবেশপথে বাধা তৈরির জন্য আমেরিকার কৌশল যে কথা ওই সিনেট রিপোর্টে লেখা আছে। এই জন্যই বলেছি দুনিয়ার চোখে চীনের পক্ষে যায় কোন আইন থাকুক আর নাই থাকুক নিজের প্রবেশপথ খোলা রাখতে চীন সকল বাধা সবকিছুকে উপড়ে ফেলবেই। একই ঘটনার উদাহরণ আমেরিকার বেলাতেও ঘটেছে। কেন আমেরিকা ক্যারিবিয়ান সাগর নিজ প্রভাবে রেখেছিল সে কাহিনী পড়ে দেখতে পারি। “আমেরিকান ক্যারিবিয়ান লজিক” নামে প্রবন্ধ আগ্রহী পাঠকেরা খুজে দেখতে পারেন।
    চীনের দিক থেকে ঐ মালাক্কা প্রণালী হয়ে চীনের একমাত্র উত্তর-পূর্ব সমুদ্র প্রবেশপথেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনের সব জ্বালানি আসে। তাই এই পথ ও এরও বিকল্প নানা পোর্টও চীন খুঁজবে, না থাকলে চীন তা বানিয়ে নিতে চাইবে বিনিয়োগ করবে, সেটাই স্বাভাবিক। সে কারণে পাকিস্তান, বাংলাদেশ (প্রস্তাবিত), মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কায় গভীর সমুদ্রবন্দর বানানো্র আগ্রহ চীনের নিজের স্বার্থেই  এই আলোকেই চীন জরুরি মনে করে। অথচ এসব দেশে চীন বন্দর বানাতে গেলে এবার ভারতকে দিয়ে আমেরিকা কান্নার রোল উঠাবে যে, “আমাকে চীন চার দিকে ‘মুক্তামালা’র মতো ঘিরে ফেলল!” এজন্য ভারতে মুক্তমালা বা String Of Pearls’ বলে কান্নার রোল একটা খুবই ফলস তবে মারাত্মক মিথ্যা দেশপ্রেমের জিগির জাগানিয়া (অরিজিনালি আমেরিকান) প্রপাগান্ডা।  এর সোজা মানে চোর উল্টো পুলিশ ডাকে!  যাহোক, এগুলো ছাড়াও এমনকি থাইল্যান্ডের ভূখণ্ড কেটে সুয়েজ খালের মতো আরেকটা মালাক্কা বাইপাস তৈরির আলাপ চলছে চীনের থাইল্যান্ডের সাথে।

    ওবামার পিভোট ফেল করা থেকে কী বাইডেন শিক্ষা নিবেন নাঃ
    ভৌগলিকভাবে আমেরিকা দেশের ভূখণ্ডগত অবস্থান এশিয়াতে নয়। তা হলে ইন্দো-প্যাসিফিক বা কোয়াডে আমেরিকার এই নেতাগিরি করতে আসা কেন? আমেরিকা বলবে আমার বন্ধুরাষ্ট্রগুলা এখানে আছে তাদের রক্ষা করতে। এই অজুহাতও না হয় মেনে নেয়া যাক।
    এখন প্রেসিডেন্ট ওবামা ছিলেন সেই লোক যিনি এশিয়া পিভোট (PIVOT) পলিসি [ “Pivot to East Asia”] চালু করতে গিয়েছিলেন ২০১১ সালে এবং শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হন। কিন্তু কী ছিল সেটা?
    উপরে যেটা বলেছিলাম চীনের প্রবেশপথের দুই দিকেসহ চার দিকে প্রায় ১০টি দেশ আছে (যাদের বেশির ভাগই আবার আসিয়ান, ASEAN জোটের সদস্য) এবং যাদের সাথে চীনের সমুদ্রসীমা মীমাংসিত নয়। আমেরিকার সব প্রশাসনের খুবই মন-কামনা যে, সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ এরা সবাই চীনের সাথে সামরিক বিরোধে ঘুড়িয়ে দেক, যুদ্ধে জড়াক। আর তাতে আমেরিকা তাদের সবাইকে নিজের কোলে বা কোনো জোটে তুলে নিয়ে এবার তাদের পক্ষ হয়ে চীনের সাথে বিরোধে আমেরিকা সামরিক নেতা হিসেবে হাজির হোক। এটিই ছিল ওবামার আমেরিকার দিবাস্বপ্ন বা আমেরিকার পিভোট বা ভরকেন্দ্র-ভূমিকা; চীনের বিরুদ্ধে এক আলগা মাতবর হতে চাওয়ার আমেরিকা।
    আলগা বললাম কেন? বললাম এ জন্য যে, বাস্তবে অমন প্রায় ১০ দেশের কেউ আমেরিকার প্ররোচনায় পা দেয়নি। তাদের অবস্থান খুবই বুদ্ধিমানের। সেটি হল, তারা মনে করে, চীনের সাথে সমুদ্রসীমা অমীমাংসিত বলে বিতর্ক আছে সত্য। কিন্তু সে জন্য আমেরিকার সামরিক জোটে যাওয়া খুবই বিপজ্জনক এবং মূলত অপ্রয়োজনীয়। তারা মনে করে, চীন বিরোধিতার স্বার্থে আমেরিকার কোলে উঠে বসার মানে হয় না। আবার এখনই আমেরিকার কোলে না উঠলে বিশাল ক্ষতি হবে তা তো না। যেমন সমুদ্রবিরোধে চীনের সাথে এখনই আপসে যেতে হবে তাও না। কারণ এখন এটা ফেলে রাখলে চীনের পালটা তাদের দাবির কোনটাই তো তামাদি হয়ে যাবে না। দাবি লোপাট হবে না।
    আবার ওই ১০ দেশের কমবেশি সবার বাণিজ্য স্বার্থের দিক থেকে চীন তাদের কাম্য। কারণ চীন অবকাঠামো-ঋণ দেয়ার যোগ্য এমন উত্থিত দেশ। এ ছাড়া তাদের  কোন কোন পণ্যের চীনে রফতানির বাজার পাওয়াও সম্ভব। কাজেই এসব স্বার্থকে মেরে ফেলাও তো বোকামি। একারণে ওই সব দেশের (এমনকি চীনের বিরুদ্ধে আনক্লসে  জিতে যাওয়া ফিলিপাইনও) কেউ আমেরিকার কোলে ওঠেনি। উল্টো চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি সাম্প্রতিককালের ইন্দোনেশিয়া যার সাথে চীনের ঠিক সমুদ্রসীমা বিতর্ক নেই, তবে জেলেদের মাছ ধরার রাইট নিয়ে বিরোধ আছে, সেও এই টিকা পাওয়ার কালে চীনা টিকার টেস্টে অংশগ্রহণ ও টিকা কেনার সম্পর্কে জড়িয়েছে। আর প্রকাশ্যে বলছে, দুটো আলাদা ইস্যু, আমরা আমাদের মাছ ধরার রাইট ছাড়িনি।
    এক কথায় বললে এটা ওবামার পিভোট শুধু পাত্তা না পাওয়া নয়, এশিয়াতেই আমেরিকার পা ফেলার জায়গাও কেউ দিতে বা কোন যুদ্ধে জড়াতে কেউ রাজি না হওয়া। এমনকি নিউজিল্যান্ডও না। তবেঁ অষ্ট্রেলিয়া হা। কারণ সে ফেঁসে গেছে। গত ২০১৬ সালে আমেরিকা অষ্ট্রলিয়ায় এক সামরিক ঘাটি চালু করেছে। বোকারা ভেবেছিল তারা বিরাট আগায় থাকবে। এখন আমেরিকার সাথে বিশেষ বা ঘনিষ্ট সম্পর্কই হয়েছে কাল।
    এই ব্যর্থ পিভোটের পটভুমি যদি বিবেচনায় রাখি তাহলে, এখন ওবামার আমেরিকার এত বড় ব্যর্থতার পরও বাইডেন একই ফর্মুলা নিয়ে আবার েখন এসেছেন কেন? যারা কেউ পিভোটে যোগ দেয়নি তারা কেন আবার ইন্দো-প্যাসিফিক বা কোভিডে যোগ দেবে সক্রিয় হবে বলে বাইডেনের আশাবাদের ভিত্তি কোথায়? তাহলে কিসের ভরসায় তিনি জি-৭ বা ন্যাটোকে দিয়ে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দিতে ও ঢোল বাজাতে এলেন? আর এটা আমেরিকার কোথায় ফেরত আসা? যুদ্ধের কোন শ্বশানে?
    চীনের সাথে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব নেয়া বা দেয়া নিয়ে বিরোধ আছে, যাকে ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ বলা হচ্ছে। কিন্তু সেটাকে ফয়সালার জন্য বাইডেন এটাকে একমাত্র যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েই সমাধান খুজতে হবে কেন?  আর এতে এশিয়ার দেশগুলো আমেরিকার পক্ষে যুদ্ধে যেতে পোলারাইজড হতে যাবে কেন? ইতোমধ্যেই এটি পরীক্ষিত যে তারা কেউ যাবে না এবং পিভোট প্রকল্প আজ মৃত!

    তা হলে এবার ইউরোপ অনেক সাড়া দিচ্ছে বা দিবে তা বাইডেনের মনে করবেন; সেটা কেন? খুব সম্ভবত এটা এক ‘সাদা’- শ্রেষ্ঠত্ববাদী [white Supremist] শঙ্কা ও তা থেকে ইউরোপের সাথে একাত্মবোধ।  এ ভয়টাই  বাইডেন ইউরোপে বিক্রি করেছেন। কথাটাকে প্রতীকীভাবে অনেক সময় বলা হয়, এশিয়া বা চীন গ্লোবাল নেতৃত্বে শক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার মানে কী? মানে হল, হয়ত আমরা দেখব, গুলিস্তানের কামানের পাশ দিয়ে সাদা পশ্চিমা তরুণরা ক্লান্ত হলে ফাইল হাতে হেঁটে বেড়াচ্ছে, চাকরি খুঁজছে। ঠিক যেমন এখন আমেরিকার কুইন্সে বা পশ্চিমের কোন শহরের বাঙালি পাড়ায় আমরা ভিড় করি- কখনো চাকরি কখনো স্কলারশিপের লোভে! এ ভয়টাই বাইডেন ইউরোপে বিক্রি করেছেন সম্ভবত। যে চীনের গ্লোবাল নেতা হওয়া মানে  পশ্চিমের তরুণদের ফাইল বগলে করে এশিয়ার রাস্তায় ঘুরে ফেরা। এসব চিত্রকল্পের ইমেজ তুলে ধরলে ইউরোপের নেতাদের ভীতি দ্বিগুণ হওয়াটাই স্বাভাবিক। হয়ত এভাবেই কিছু বলে তিনি নিজের পেছনে ইউরোপকে জড়ো করেছেন যে, দেখি না চীনের নেতা হয়ে যাওয়াকে ১০ বছর ঠেকিয়ে রাখতে পারি কি না!

    চিত্রকল্পগুলো একেবারেই অবাস্তব তাও অবশ্য নয়।  যেমন ইতোমধ্যেই পশ্চিমের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফান্ডের সংকট আর হাহাকার ওদিকে বিপরীতে পালটা চীনের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপ পবার সম্ভাবনা এখন বাড়তি বা রাইজিং।

    বিল্ড ব্যাক বেটার ওয়ার্ল্ড (B3W)
    বাইডেন জি-৭ বৈঠকে শুধু চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উসকানি তুলেছেন তাই নয়, সাথে আরেক চালচুলাহীন কর্মসূচি চালুর ঘোষণা করেছেন। সেটার কথা বিনা তুলনায় বললে বুঝতে কষ্ট হবে। বলতে হবে এটা চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগের [BRI] বিকল্প এক বাইডেন জোটের কর্মসূচি। এর নাম দেয়া হয়েছে- ‘বিল্ড ব্যাক বেটার ওয়ার্ল্ড (B3W)’। প্রথম তিনটি শব্দ ইংরেজি ‘B’ দিয়ে বলে B3 আর পরে ওয়ার্ল্ডের W। এ কারণে সংক্ষিপ্ত B3W। এক কথায় বললে,  বেল্ট-রোড ধরণের বিনিয়োগ অবকাঠামো গড়ার খাতের ঋণ বিতরণের উদ্যোগ, তবে এর ঋণের পরিমাণ বিশাল হতে হয়। কিন্তু B3W এর কি   বিশাল পরিমাণের ঋণ বিতরণের মুরোদ আছে?
    আমেরিকার এই দিন শেষের বেলায়? এখানে আমেরিকান বিনিয়োগ বলতে বিশ্বব্যাংক বা এডিবির মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্মকালে যা চাঁদা / বিনিয়োগ আমেরিকা দিয়েছিল। একালে সেসব বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ আবার নতুন করেও হবে মনে হয় না। তবেঁ ইউএসএইডের [USAID] মত সরকারি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যে দ্বিপাক্ষিক বিতরণের অর্থ কমা-বাড়ার তাতপর্য তেমন নয় এর স্বল্প পরিমাণের কারণে।  আবার তুলনায় চীনের এমন এনজিও বা ইউএসএইড টাইপের উন্নয়ন এর চিন্তায় এখনও প্রবেশই করে নাই।  নট নেসেসারিলি আমেরিকার মতন (সামাজিক অবকাঠামোর ) উন্নয়নের শ্লোগান চীনকেও নিতে হবে। ফলে এখানে চীনের সাথে তুলনার সুযোগ এখনও নাই।  তবে B3W  প্রসঙ্গে  বাইডেন আশাবাদ রেখেছেন ব্যবসায়ীদের তারা মটিভেট করে এখানে বিনিয়োগে আনবেন!  বাণিজ্যিক বিনিয়োগকে (যার কাছে সুদ লোভনীয় হতেই হবে)  অবকাঠামো বিনিয়োগে (এর অর্থ প্রায় বিনা সুদে) নিয়ে আসাই কঠিন। তবু যেটুকু সম্ভব হয়েছিল তা জন্মের সময়ই, এককালে।  কিন্তু এমনিতেই  বেল্ট-রোডের বিনিয়োগ পরিমাণের দিক থেকে এত বড় যে তা বিশ্বব্যাংকই এর সাথে তুলনীয় নয়। তাই এটা কল্পকাহিনী হয়ে হাজির হবার সম্তুভাবনাই বেশি। তাই বাইডেনের পরামর্শকদের উচিত হবে সম্ভবত, বিশ্বব্যাংকের জন্য ফান্ড তুলতে ওর জন্মের সময় ওয়াল স্টিট পাড়ায় মিটিংয়ের পর মিটিং করে বাণিজ্যিক বিনিয়োগ কোম্পানিকে কি কী লোভ দেখিয়ে বুঝিয়ে রাজি করতে  কী কষ্ট করতে হয়েছিল তা স্মরণ করা।
    এবার এই প্রসঙ্গে চীন কিভাবে বেল্ট-রোডের ফান্ড যোগাড় করেছিল? চীন একালে বিপুল সারপ্লাস একুমুলেশনের দেশ। সেই সরকারি ফান্ডটাই পরে কোথায় কোথায় লাগানো যায় সেই বুদ্ধি করতেই প্রসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মাথায় কেউ বুদ্ধি দিয়েছিল বলেই তিনি ২০১৩ সাল থেকে বেল্ট-রোডের জন্ম দিয়েছিলেন। এখন একটা হল অনিশ্চিত আর ফকিরি চাঁদা তোলা এক ফান্ডমাত্র – সে কী করে চীনা সরকারি বিপুল সারপ্লাসের সাথে প্রতিযোগিতা করবে? আমেরিকার হাতে বিপুল সারপ্লাস সম্পদ সঞ্চিত হচ্ছে, সেই আমেরিকা কবেই মরে গেছে। সেই বুড়া বাঘকে এখন নয়া চাবুক দিয়ে চাবকালেই কি সে বাঘ তরুণ হয়ে চীনের সমতুল্য বা প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারবে? না সম্ভব? এগুলো কি স্বপ্ন কল্পনার গল্প দিয়ে পূরণ হওয়ার মতো কাজ? আর ওদিকে এমনিতেই অবকাঠামো বিনিয়োগে জাপানি ঋণের সুদের হার সবার চেয়ে বেশি ফলে এখানেও তা কমপিটিটিভ হওয়া মুশকিল!

    আবার মনে করিয়ে দেই। বেল্ট-রোডের বেলায় আমেরিকা বগলে ইন্ডিয়াকে নিয়ে প্রপাগান্ডা চালিয়েছিল এটি নাকি ঋণগ্রহিতা
    রাষ্ট্রকে ঋণগ্রস্ত করে দিয়ে সে দেশের সম্পদের মালিকানা চীনের নিয়ে নেয়ার ব্যবসা। তা হলে এখন বাইডেন B3W করতে চাচ্ছেন কেন? একই ঋণব্যবসা করতে? এর জবাব কী দেবেন বাইডেন?

    আরেকটা লেটেস্ট তথ্য হল, এদিকে আফ্রিকায় চীনা এমন বিনিয়োগ নিয়ে যারা এতদিন প্রপাগান্ডা চালিয়েছিল তাদের আজকাল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ এক নয়া সার্ভে রিপোর্টে যা ছাপা হয়েছে জাপানি ফান্ডেড মিডিয়া ডিপ্লোম্যাটে আফ্রিকায় চীনা সাকসেস নিয়ে গবেষণা রিপোর্ট বের হয়েছে। সেখানে শিরোনামে সারকথাটা হল, New research shows Chinese loans provide a significant boost ।

    শেষ কথা হল, বাস্তব বিনিয়োগ আর গল্প আসলে এক কথা নয়। ‘ট্যাকার মুরোদ’ থাকা লাগে চাচা!

    [অসমাপ্ত, বাকি কথা পরের আরেক শেষ পর্বে]
    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৯ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “বাইডেনের ন্যাটো-যুদ্ধের খরচ দেবে কে?“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]