Tag: CHINA

  • কোন দিকে কোথায় চলেছে

    কোন দিকে কোথায় চলেছে

    ১৭ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3SI

     

    –

    চারদিকে সব কিছু যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনের কথাই ধরা যাক। দৈনিক যুগান্তরের এক শিরোনাম বলছে, “যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তোষ, আমাদের ভুল থাকলে সংশোধনের চেষ্টা করব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী”।  আর খবরের ভিতরে, মানে বডির শুরুতেই বলা হয়েছে, “কিছু দেশের যদি বাংলাদেশের প্রতি অসন্তোষ থাকে তবে আমরা তা দূর করব। আমাদের লক্ষ্য হলো সব দেশের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করা। কোনো কারণে কিছু দেশের আমাদের প্রতি অসন্তোষ থাকতে পারে। আমরা ওই সব কারণ খুঁজে বের করব”।

    প্রথমত, এটা খুবই অসহায়ের এক বক্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সোজা মানে হল  আপনি অসহায়, নিজের উপরই আস্থা হারায়েছেন। একটা দেশের সরকার মানে অথরিটি বা কর্তা। ক্ষমতার কর্তা। তা হলে ক্ষমতার কর্তা আর অসহায়ত্ব একসাথে? সরি, এ দু’টা একসাথে যায় না। যখনই এমনটা দেখা যায় এর মানে সরকার দুর্বল হয়ে গেছে কিংবা ক্ষমতা অর্ধেক হয়ে গেছে। এটা অকল্পনীয়; কারণ এখান থেকেই এরপর উঠবে ক্ষমতাচ্যুতির আলাপ আলোচনা।

    শুধু তাই না, এর আরো অন্যদিক আছে। অন্য প্রতিদ্বন্দ্বি ও দাতা যেমন চীনও ভয় পেয়ে যাবে। সরকারের আয়ু নিয়ে সন্দেহ করবে। আর এসবের প্রথম প্রতিক্রিয়া সাধারণত হইয়ে থাকে যে সম্পর্ক মিনিমাম জায়গায় গুটিয়ে নেয়া, আর অপেক্ষা করা। কারণ বিনিয়োগ খুবই সেনসিটিভ জিনিষ। জোঁক আর নুনের সম্পর্কের মত। একবার যদি অস্থিরতার গন্ধ পায় সে সাথে সাথে নিজেকে গুটিয়ে নিবে। হাতের মুঠি বন্ধ করে দিবে। অস্থিরতা মানেই বিনিয়োগের অর্থ রিস্কের মধ্যে আটকে যাওয়া। তাই বিনিয়োগ এত সেনসেটিভ!

    দ্বিতীয়ত, সরকার কার ‘অসন্তোষের’ কথা বলছে? আমল করেছে বলে জানাচ্ছে? বলেছে, “কিছু দেশের” বা “যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তোষ”। লক্ষণীয়, এতে সরকার মানে যা সর্বময় ক্ষমতার উৎস হওয়ার কথা হলেও তার উপরে বা বাইরের এক ক্ষমতার কথা বলা হচ্ছে এখানে। এমনকি আবার যার কাছেই সরকার অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে!

    তাতে এটা পরিষ্কার সেই কথিত  “উপরের” ক্ষমতা পাওয়ারফুল এবং তা পাওয়ারফুল বলে স্বীকার করে নেয়া মোমেনের চোখেমুখে এবং কথায় তা ফুটে উঠেছে। অনেকে এটাকে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ব্যাপারের দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যায় কি না, সে চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু  সে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করা ভুল হবে। কারণ যারা সরকারের বিরুদ্ধে  সিরিয়াস মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে তারা সেসব কথার কোনোটাই বাংলাদেশের কোনো পাবলিক এমনকি কোনো গ্রুপ অব পাবলিকের দিকে তাক করে তুলে নাই। বরং আমেরিকা অভিযোগ করেছে সুনির্দিষ্ট কিছু সরকারি কর্তা আর  সংশ্লিষ্ট সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এবং গুরুত্বপূর্ণ যে, এসব অভিযোগ আবার আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধ। তবে আমেরিকা এসব অভিযুক্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং তাদের সংশ্লিষ্ট নিকট আত্মীয়রা যাতে আমেরিকান নেতৃত্বে থাকা গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ব্যবহারের সুযোগ আর না পায় এমন নিষেধাজ্ঞাই আরোপ করেছে। যেহেতু এ ব্যবস্থাটা মার্কিন ডলার-কেন্দ্রিক তাই আমেরিকার একা নিজ হাতেই কেবল এই বাড়তি সুবিধাটা আছে।

    আসলে মন্ত্রী মোমেনের বক্তব্য আমেরিকার এই সক্ষমতাটাকে বৈধ বলে মেনে কথা বলা হয়ে গেছে। যেন বাইডেনের আমেরিকা বলছে, ‘বাংলাদেশ সরকার তুমি তোমার নাগরিক যারা, এমন বেশ কিছু জনগণের অংশের বিরুদ্ধে অপরাধ করেছ। যদি তুমি বাংলাদেশের পাবলিকের সরকার হয়ে থাক তবে তোমার যেখানে উচিত ছিল তাদের অধিকার রক্ষা করা। অথচ তুমি করেছ উল্টা, তাই তুমি অপরাধী’।

    এখন একটা হতে পারত যে সরকার বুক ফুলিয়ে দাবি করত, প্রমাণ দিত যার সারকথা হত যে, আমি এসব অপরাধ করিনি। কিন্তু এখানে তা হয়নি। মন্ত্রী মোমেন বলেছেন, “আমাদের ভুল থাকলে সংশোধনের চেষ্টা করব”; “অসন্তুষ্ট দেশকে সন্তুষ্ট” করার চেষ্টা করব ইত্যাদি; অর্থাৎ একেবারেই সাবমিসিভ [submissive] বা অধস্তন করে ফেলেছেন তিনি নিজে-সহ পুরা বাংলাদেশকেই, এই হল তাঁর অবস্থান। এর মাধ্যমে সরকার নিজেও আর ‘বাইরের’ ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করছে না। আর তাতে শুধু সে অধস্তনই নয়, নিজেকে অনুগ্রহ লাভের প্রার্থী হিসেবে হাজির করেছে। আর এখান থেকেই, আমাদের সরকার নিজ জনগণের আর কোনো প্রতিনিধিই নয়, দায়িত্বপ্রাপ্ত জনঅধিকার সুরক্ষাকারীও কেউ নয়; নুন্যতম প্রতিনিধিত্বও করছে না আমাদের কেউ না – এমন হয়ে গেছে।

    বরং সরকার ব্যস্ত হয়ে গেছে কেবল নিজেকে (সরকারকে) রক্ষা এবং কেবল ওই সব সরকারি কর্তাকে কী করে রক্ষা করবে, সেই কাজে। আর এ’কাজে বাংলাদেশের সরকার নিজেই আমেরিকান সরকার-প্রশাসনের অনুগ্রহ-প্রার্থী হয়ে গেছে। অর্থাৎ এখানে প্রধান লক্ষণীয় হল, যারা সরকারের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিক, যারা গুম হয়েছেন, যাদের ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে ইত্যাদি, এরা কিন্তু এখানে কোনো প্রসঙ্গই নয়। করা হয় নাই। প্রসঙ্গটা হল, সরকার টিকানো এবং সরকার, সরকারি কর্তা ও অফিসের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কিভাবে প্রত্যাহার করে নেয়া যায়। যেন মামলাটা হল – বাংলাদেশের পাবলিক নয়, সরকারের নিজ স্বার্থ আর আমেরিকার প্রশাসনের মধ্যকার! মোমেনের বক্তব্য প্রকারান্তরে ইস্যুটাকে সেখানে নিয়ে গেছে।  যার সারার্থ হল, সরকার বলতে এখানে কিছুই নাই…। কেবল গুটি কয়েক ব্যক্তিস্বার্থবাজ লোক তারা সরকার বলে ভান করছে।

    সাধারণত কোনো নুন্যতম সৎ-ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম হল, তার বিরুদ্ধে কোনো বড় অভিযোগ উঠলে একটা কোন স্বাধীন নিরপেক্ষ আইনি কমিশন গঠন করে তাদেরকে দিয়ে তদন্ত করা এবং সত্য উদঘাটন (ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং) করা। কিন্তু এখানে কী চলছে? পুরা উল্টা। বলা হচ্ছে, কেউ মার্কিন সরকারকে “ভুল বুঝিয়েছে” কি না। যদিও মার্কিন  নিষেধাজ্ঞা আরোপের উৎস প্রথমে আমেরিকান সংসদ ও সিনেট কমিটি আর সেখান  থেকে পরে প্রেসিডেন্ট, এভাবে। তার মানে এখানে বাংলাদেশে  কোনো ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং হচ্ছে না, বসছে না এবং  হবে না। ভিকটিম বা ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকরাও এখান থেকে নুন্যতম কিছু প্রতিকারও পাবে না।

    দুই দিন আগে বিবিসি একটা রিপোর্ট করেছে, শিরোনাম “মার্কিন নিষেধাজ্ঞা : বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা বিধিনিষেধ প্রত্যাহারে কী তৎপরতা চালাচ্ছে?”। এতে বাংলাদেশ সরকারের সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক বলছেন, “নিশ্চয়ই আমেরিকা সরকারকে কনভিন্স করা হয়েছে। কাজেই যে তথ্যের ভিত্তিতে দিয়েছে, সেই তথ্য যতটুকু আছে সেটি কতটুকু সত্য কতটুকু মিথ্যা বা সঠিক কী সঠিক নয়- এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে একটা বক্তব্য যাবে”।……। “এ ছাড়া আমেরিকাতে লবিস্ট নিয়োগের একটি কালচার আছে, সেই লবিস্ট নিয়োগ করে আমেরিকান সরকারকে বোঝাতে হবে। আর ব্যক্তিদের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা সেটি প্রত্যাহার চেয়ে আমেরিকা সরকারের কাছে আপিল করতে হবে”।  অর্থাৎ তিনিও কোন ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিশন  নয়,  বাইডেন প্রশাসনের সাথে এক’টা ‘ডিল’ করার কথাই বলছেন; অর্থাৎ লক্ষণীয় মুখ্য পয়েন্ট ইন্ডিপেনডেন্ট ফ্যাক্টস যাচাই নয়, একটা লেনদেন বা ‘ডিল’ হয়ে উঠেছে সরকারের প্রধান বিবেচ্য ও করণীয়!

    এর আগে ডয়েচ ভেলেতে ছাপা হওয়া ‘আসক’ [আইন সালিসি কেন্দ্র]-এর দেয়া সংগৃহিত পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে তারা লিখেছিল,” আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কথিত ক্রসফায়ারে ২০১৬ সালে মোট ১৭৭ জন নিহত হয়েছেন। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা কমে ১৪১ জনে নেমে আসে। এর পর থেকে গতি আবার বাড়তে শুরু করে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন ও মাদকবিরোধী অভিযান ক্রসফায়ারের নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। পরের বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ৪২১ জন, যা আগের বছরের চেয়ে তিনগুণ বেশি। ২০১৯ সালেও এই ধারা অব্যাহত ছিল, ৩৬১ জনের বেশি”। নির্বাচনের আগেই এনিয়ে আপত্তি প্রতিরোধ হৈচৈ -গুলোকে দাবিয়ে দেওয়ার জন্য এটা করা হয়েছিল।
    সেই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। এখান থেকে অনুমান করলে বের হয়ে আসে যে, সরকার ক্রমেই এমন ‘হত্যা-নির্ভরশীল’ একটা সরকার হয়ে গেছে। সাধারণত যেটা দেখা যায়, একটা ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে ফেলতে পারলে সেটা সরকারের জন্য খুব কাজের হয়। কোনো সরকার একবার এতে সফল হয়ে গেলে পরে দেখা যায় এর পর থেকে সে বিরোধিতাহীন বা বাধাহীন এক সরকার হয়ে উঠতে পারে।

    তা হলে এ তথ্যাবলি আরেকটা ইঙ্গিত দেয় যে, ধরা যাক আমরা একটা উপরে কথিত মতে ‘ডিল’ যদি দেখতে পাইও এছাড়া সেই ডিল উপস্থিত সরকারকে ক্ষমতায় রেখেই যদি করতেই হয়, তবে সেই সাথে এসব ক্রসফায়ার বা গুম প্রভৃতিতে মাসে মাসে কমপক্ষে ৩৫-৪০ জনকেও “বলি” দিতে রাজি থাকতে হবেই। কারণ প্রশাসন ভয়ের সংস্কৃতি বা হত্যা-নির্ভরশীল হয়ে গেছে! এই ক্ষিধাও পূরণ করতেই হবে। নইলে সরকার টিকবে না। মানুষে মানবে না। এই প্রসঙ্গে বিবিসিকে লিখেছে, “মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ বাস্তবতায় র‌্যাবের কার্যক্রমে একটা সংস্কারের সুযোগ আছে বলেও মনে করেন সাবেক আইজিপি শহীদুল হক”।…..”সংস্কার করতে হলে বেপরোয়াভাবে যেন কিছু না হয়। সব কিছু কন্ট্রোলের মধ্যে রাখতে হবে”। …… তিনি বলেন, “আপনি গুলি করবেন এনকাউন্টার, আপনি বিপদে পড়েছেন, দুষ্কৃতকারীরা আপনাকে হামলা করছে সে ক্ষেত্রে ব্রাশফায়ার করে মানুষ মারতে থাকলে তো হবে না। আপনাকে বাঁচানোর জন্য যতটুকু করার দরকার অতটুকুই করতে হবে। এ সংস্কারটা আনতে হবে”।  তার মানে তামাশাটা হল, সাবেক এই আইজিপিও এখন একটু কম হত্যার এক সংস্কারের কথা বলছেন; অথচ তার নিজের আইজি কার্যকালে (২০১৫ সালের শুরু থেকে ২০১৮ সালের জানুয়ারি) গুম ও ক্রসফায়ারের কিছু পরিসংখ্যান উপরে দেখেছি।

    মাছ খাবো নাঃ
    বিড়াল কি মাছ খাবো না বলতে পারে? মানে যেটা স্বভাব হয়ে গেছে বা যাতে অভ্যস্ত হয়ে যায় তা কি সে ছাড়তে পারে? তাই সাবেক আইজিপির কথিত সংস্কারটাও যদি করে নেয়া হয় তবুও উপস্থিত সরকারকে তিনিও ক্ষমতায় রাখতে পারবে না। কারণ, এরা হত্যা-নির্ভরশীল সরকার হয়ে গেছে। সেটার কী হবে???

    তা সত্ত্বেও এমনকি ধরা যাক, কোনো ডিল হয়ে গেল। বিবিসির ঐ রিপোর্টে এক ইন্ডিয়ান-অরিজিন আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক প্রশান্ত পরমেশ্বরণের কথা এনেছে। তিনি বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে যেহেতু কিছু সুনির্দিষ্ট আচরণকে (তিনি বলতে চাইছেন র‍্যাবের গুম-হত্যা ক্রসফায়ার) তুলে ধরা হয়েছে, তার (এই সমস্যার) সংশোধন বা সমাধানের কথা বলেছে”। কিন্তু তিনিও একটা ডিল বা রফা করার ইঙ্গিত করেছেন। বলেছেন, “বহুমুখী পন্থায় কাজ’ করতে। ‘সুনির্দিষ্ট আচরণ’ যেগুলো নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়েছে, ‘তার সংশোধন বা সমাধান করে’ নিতে বলেছেন আগে। অথচ আমরা উপরে দেখেছি সরকার হত্যা-গুম জাতীয় কাজে অভ্যস্ত বা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা ছাড়া সরকার চালানো বা টিকানো অসম্ভব। এ ছাড়াও এমনকি আরেক মারাত্মক ইঙ্গিতে তিনি এনে বলেছেন, “এশীয় প্রশান্ত অঞ্চলে বাইডেন প্রশাসনের পররাষ্ট্র নীতির অগ্রাধিকার কী- সেখানে বাংলাদেশকে ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষ করে চীনের ব্যাপারে”।

    বাইডেন প্রশাসনের পররাষ্ট্র নীতির অগ্রাধিকার কী- এটুক বলে তিনি ফারদার কিছু খোলসা করেননি। কিন্তু আমেরিকা চাইছে কী?
    এনিয়ে যতটুকু জানা যাচ্ছে যেমন, কক্সবাজারে এয়ারপোর্ট রানওয়ে প্রকল্প যেটাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক যাত্রী ও কার্গো বিমানের ব্যবহার-উপযোগী করে গড়ে তোলার একটা প্রকল্প। বলা হয়েছে, এটাকে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের রুটে একটা হাব [hub] ও রিফুয়েলিং স্টেশন হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এতদূর পর্যন্ত এটাকে বাণিজ্যিক দিক থেকে এক উপস্থাপনই হল। বিবিসি বাংলাতেও গত ২৮ আগস্ট ২০২১ এক প্রতিবেদনে এটাকে বাণিজ্যিকভাবেই দেখানো উপস্থাপন করা হয়েছে।

    কিন্তু এখন দুর্জনরা বলছে, এই প্রকল্প চীনকে দেয়া হয়েছে এক স্ট্র্যাটেজিক (যুদ্ধকৌশলগত) কারণে। আর মালদ্বীপে চীনের যে জাহাজ চলাচলের অবজারভেটরি স্থাপনা আছে তার সাথে এটাকে সম্পর্কিত করে দেখতে হবে। অন্য দিকে এসবেরই পাল্টা বহুদিনের আমেরিকান এক আবদার হল, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে তার সপ্তম নৌবহরকে স্থায়ী নোঙর করতে দিতে হবে। এটা ঘটার বিরুদ্ধে চীনের চেয়েও ভারত এই প্রশ্নে বেশি চরম কঠোর আমেরিকাবিরোধী।
    অথচ আমেরিকার এই খায়েশকেই সম্ভবত বিশ্লেষক প্রশান্ত পরমেশ্বরণ আমেরিকার ‘পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার কী- সেখানে বাংলাদেশকে ভূমিকা রাখতে হবে’ বলে অস্পষ্ট রেখে ছেড়ে রেখে দিয়েছেন! এসব ইঙ্গিত খুবই খারাপ ও বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর! কারণ এর অর্থ হবে সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির প্রশ্নটা শেষে না পিছলে গিয়ে তা আমাদের ভূখণ্ডকে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে আমেরিকা-চীন ও ভারত তাদের নিজ নিজ স্বার্থের লড়াই শুরু করে দেয়!

    অথচ বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ হল, যে অবস্থানে এলে এই তিন দেশকে নিউট্রাল রাখা যায়; কারণ আমরা কারো যুদ্ধের পাটাতন হতে পারি না।

    কিন্তু সমীকরণ যে দিকেই মিলাই আমাদের হত্যা-নির্ভরশীল উপস্থিত সরকার মনে হচ্ছে না কাউকে সাহায্য করতে পারবে; অর্থাৎ তার নিজের টিকে থাকা – এই স্বার্থ, এটাই চতুর্থ ও মুখ্য স্বার্থ হিসেবে সবার উপরে হাজির হয়ে থাকতে চাইছে। অথচ বাস্তবতা হল, হত্যা-নির্ভরশীল সরকার-প্রশাসন সাবেক আইজির কথিত নামকাওয়াস্তে কোনো সংস্কার করতেও অক্ষমই থেকে যাবে।

    উভয় সঙ্কটঃ
    বর্তমান সরকার আসলে মারাত্মক উভয় সঙ্কটে। এখনকার উভয় সঙ্কট হল, যেকোন সরকার নিজের বিরোধী দলদেরকে তাদের জনসমাবেশের অধিকার দিতে বাধ্য। কিন্তু আমাদের সরকারের অবস্থা এমন যে  যদি সরকারবিরোধীরা মিছিল সমাবেশ করতে চায় তাতেই সে কাত! সে ভীত যে, এটা না  সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। কারণ জমে থাকা পাবলিকের ক্ষোভ তাতে উপলক্ষ করে প্রকাশ্যে বের হয়ে যদি আসে! এ অবস্থায় সে যদি তাদের মিছিল-মিটিংয়ের অধিকার মেনে নেয় তো তাকে নিজ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে বাস করতে হবে। আর যদি উল্টা নির্বিচারে আগের মত গুম-খুন ক্রসফায়ারে তা দমন করে চালাতে যায় তবে সেটা আরও বড় মার্কিন অবরোধের কারণ হতে পারে। আর এর আগেই বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে এক রক্তাক্ত রণভূমি!

    পরিণতিতে কী হচ্ছে?
    সেটাই কি কাওয়ালি অনুষ্ঠানেও হামলা? সরকার দলীয় হামলা করে চলা অবস্থায় আয়োজন কাওয়ালীর অনুষ্ঠান ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। অথচ  সরকার এখনো কার্ড দেখাতে পারেনি, প্রকাশ্যে বলতে পারে নাই যে, তারা এ হামলার পক্ষে না বিপক্ষে? এসব খারাপ লক্ষণ। তাতে সরকারের লাভ না ক্ষতি হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হল, সরকারবিরোধীরা সবাই জোটবদ্ধ হয়ে কাওয়ালির পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে। প্রথম আলো-স্টার থেকে ছোটবড় বা কড়া ইসলামিস্ট সবাই একত্রে মিলে গেছে। অথচ এমন না যে, কাওয়ালি নিয়ে তাদের আপত্তি নেই; বরং অনেকেরই বড় বড় কঠিনতম আপত্তি আছে। সেকুলার-প্রগতি অথবা ইসলামিস্ট সবারই নিজ নিজ স্টাইলে-ব্যাখ্যায় আপত্তি আছে।  অথচ ক্ষমতার তাণ্ডবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ঐক্য দেখাতে তারা সেসব আপত্তি মাটি চাপা দিয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে তারা একত্র, এই ব্রডবেজ ইউনিটি শোকরেছে তারা; এই  বিরোধীতায়  তারা জোটবদ্ধতা শো করতে চায়। অবশ্য এমনটাই হয়ে থাকে। কমন এনিমি এই বড় শত্রুবিরোধী বিরূদ্ধতা-জ্ঞান সবসময় এভাবেই কাজ করে থাকে!

    আবার হামলাকারী যারা সঞ্জিত-সাদ্দাম গং, এদের পক্ষে কথিত প্রগতিশীলতার নামে হিন্দুত্ববাদের কোনো হাইকমিশন এর পক্ষে কি?  তা হলে আমরা এরই প্রকাশ্যে অবস্থান এখানে আমরা দেখে ফেললাম? নেত্রী কি এটাই চেয়েছেন? তা এখনো স্পষ্ট করা যায়নি! মানে সরকার কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না!!! আবার ঘটনার তিন দিন পার হয়ে গেল কোনো অবস্থান না দেখানো সত্ত্বেও, তাহলে পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই, অন্যরা যা খুশি করছে ভাঙছে, তা কি? সরকার কি তা হলে কর্তৃত্ব হারিয়েছে, এমন অনেক কথা উঠছে। সরকার কিছুই না বললে এমন উলটাপালটা গুজব কানাঘুষা অর্থই তো হবে!!! এবং এটা সামনে আরো বাড়বেই!

    এমনিতেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর থেকে সরকার, অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছে। যা খুব খারাপ ইঙ্গিত! এর উপর আবার দলের ভেতরে ততোধিক যেন উপধারা বা উপস্বার্থের আবির্ভাব ঘটেছে। বেশির ভাগ নেতা কমপক্ষের দুটো স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছেন, ঘুরছেন। মুখে বলছেন একটা করছেন আরেকটা। এর মধ্যে আবার ‘আপার’ অবস্থান কোনটা  বুঝা যাচ্ছে না। এরই “আদর্শ প্রকাশ” স্থল হচ্ছে এখন নারায়ণগঞ্জের সিটি নির্বাচনে। কে যে কার পক্ষে কাজ করছেন, তাল পাওয়া যাচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ রাতে ছাত্রলীগের নেতাদের বাসায় গিয়ে হুমকি দিচ্ছে কেন? নানক শামীম ওসমানকে হুমকি দিয়ে কথা বলছে কেন ……। যেন এক পথ হারানো পরিস্থিতি!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ১৫ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “দণ্ড কার হাতে, কোথায় চলেছি”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ‘অবরোধের’ অভিমুখ, এছাড়া কোথাও অন্য আলাপ নেই

    ‘অবরোধের’ অভিমুখ, এছাড়া কোথাও অন্য আলাপ নেই

    গৌতম দাস

    ২৭ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3RC

     

         The Impact of the U.S. President on Economic Sanctions

      An exterior view of the building of US Department of the Treasury is seen on March 27, 2020 in Washington, DC. – US Treasury Secretary Steven Mnuchin on Friday pledged to quickly send cash to Americans as part of the a massive $2.2 trillion relief package aimed at rescuing the coronavirus-battered economy. (Photo by Olivier DOULIERY / AFP) (Photo by OLIVIER DOULIERY/AFP via Getty Images)

     

    চার দিকে মার্কিন  অবরোধ ছাড়া বাংলাদেশে এখন যেন কোনো আলোচনার বিষয় নাই। গত ১০ ডিসেম্বর বাইডেন প্রশাসন এক স্যাংশন বা অবরোধের তালিকা প্রকাশ করেছিল। ওই তালিকাটা প্রকাশ করার পরে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়ে আছে বাংলাদেশে। তালিকায় ভুক্ত অন্য দেশগুলো হল – উগান্ডা, উত্তর কোরিয়া, চীন, বেলারুশ, শ্রীলঙ্কা ও মেক্সিকো। এখানে আমেরিকার দিক থেকে এই অবরোধ আরোপের কারণ কী? সে কারণ বলা হয়েছে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অবরোধ আরোপ’ …“gross violations of human rights,”…। তবে বাংলাদেশসহ এই সাত দেশের যেসব সরকারি কর্মকর্তার ওপর অবরোধ আরোপ হয়েছে তারা মোট ১২ জন [designated 12 government officials ]। অথচ এই ১২ জনের মধ্যে একা বাংলাদেশেরই ছয়জন। যারা একই প্রতিষ্ঠানের র‍্যাব [RAB] থেকে। মানে আগের মহাপরিচালক বেনজির ও এখনকার বর্তমান মহাপরিচালক এবং সাথে এখনকার চলতি অতিরিক্ত মহাপরিচালক সাথে আরো সাবেক তিন অতিরিক্ত মহাপরিচালক – এভাবে মোট ছয়জন। [ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের মূল নিষেধাজ্ঞার প্রেস রিলিজে এই ছয়জনের নাম দেয়া আছে।] তাই  সম্ভবত বলা যায়  বড় চাপ অথবা ‘বড় থাবা’তে যে আমেরিকা  বাংলাদেশকে ধরেছে তা অনুমান করা যায়। এখান থেকেই বাংলাদেশের সর্বত্র চা দোকান থেকে আলিশান ড্রয়িংরুম বা ক্ষমতার করিডোরগুলোতে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়েছে  এই মার্কিন অবরোধ।

    কিন্তু এই অবস্থার কারণেই আবার বাংলাদেশের বাইরে অবরোধের প্রতিক্রিয়া কী হচ্ছে, কিভাবে পড়ছে সেদিকটা প্রায় নজর শূন্য হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের। অথচ সেটাও বাংলাদেশের দিক থেকে দুনিয়ার পরিবর্তন বুঝার জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয় মোটেও। তবু প্রথমেই বলে নেই, এখানে ‘বাংলাদেশের বাইরে’ বলতে শুধু অবরোধ তালিকায় থাকা উগান্ডা, উত্তর কোরিয়া, চীনসহ ছয় দেশের কথা বুঝাচ্ছি না। এর বাইরেরও দেশ যারা আছে, যাদের নাম তালিকায় থাকার কথা কিন্তু শেষবেলায় এসে আমেরিকা যার নাম তালিকায় রাখেনি। যেমন, এমন অন্যতম দেশ হল, ভারত।

    এই ২০০১ সাল শুরু হয়েছিল, এটা ধরে নিয়ে যে ভারত  তখন থেকে আমেরিকার ঘোরতর স্ট্র্যাটেজিক বন্ধু হয়ে গেছে। আসলে এক ভয়ঙ্কর ইসলামবিদ্বেষ [islamophobia] এক ফোবিয়া যা কোনভাবেই গ্রহনযোগ্য নয় কারণ তা ধর্মের বিরুদ্ধে অন্য এক ধর্মের এথনিক ঘৃণা ছড়ানোর হিটলারি তৎপরতা। অথচ  এটাই আবার ভারত ও আমেরিকার কমন চরম অনৈতিক ও নির্মুলের [ক্লিনজিং-এর] স্বার্থ। এমন দগদগে স্বার্থই তাদের গত শতকের বেশিরভাগ সময় জুড়ে যে সব পুরনো বিবাদ ছিল তার সব ভুলে কাছাকাছি ও নতুন বন্ধু হতে উৎসাহিত করেছিল।

    অন্যভাবে বললে আমেরিকার “ওয়ার অন টেরর”পলিসিতে বড় সমর্থক হিসেবে এশিয়ায় ভারতকে পেতে ভারত-আমেরিকা কমন ইসলামোফোবিয়ার ভিত্তিতে পরস্পর তারা নতুন বন্ধুত্ব শুরু করেছিল। আর এটা এমনই পরস্পরের পিঠ চুলকে দেয়া বন্ধুত্ব যে, মনে করা হত তাদের পরস্পরের এই ‘পার্টনারস ইন ক্রাইম’-এর বন্ধুত্ব – এটা সহসাই নষ্ট হচ্ছে না; হবে না বা ভাঙবে না।

    অনেকের মনে হতে পারে কেন আমি এটাকে ভারত-আমেরিকার  – “ইসলামোফোবিয়ার ভিত্তিতে পরস্পর তাদের নতুন বন্ধুত্ব শুরু” বলছি? একটা ছোট ঘরোয়া উদাহরণ দিব। বিভিন্ন দেশের মাইগ্রেন্ট হতে চাওয়াদের নিয়ে নিজ দেশে নাগরিকত্ব দিচ্ছে এমন দেশগুলোর মধ্যে  কানাডা অন্যতম।  আর বাংলাদেশের অনেক বাসিন্দা এমন সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রেও অন্যতম। তাতে বাংলাদেশ থেকে  হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে অনেকে এমন নাগরিকত্ব নেয়া শেষ করেও ফিরে দেশেই থেকে গেছে অথবা কানাডায় বসবাস শুরু করেছে। সম্প্রতি গত সপ্তাহে কানাডা আবার আরো চার লাখের মত নতুন মাইগ্রেন্ট নিবে বলে ঘোষণা করেছে। এমন প্রেক্ষিতেই আমাদের এই স্টোরি।
    এনিয়ে দুই উচ্চ-শিক্ষিত হিন্দু নারীর কথোপকথন যারা  বহু পুরানা কানাডায় নাগরিকত্ব নেয়া বাংলাদেশি মাইগ্রেন্ট। তারা আক্ষেপ করে বলছেন, নয়া এই আরো মাইগ্রেন্ট নেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে, তাদের দৃষ্টিতে কানাডা আর তাদের বসবাসের জন্য উপযুক্ত স্থান থাকবে না। কেন, এমন অনুমান? কারণ এতে কানাডিয়ান বাংলাদেশিদের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা ব্যাপক বেড়ে যাবে। আর তাদের অনুমানে ধরে রাখা আছেই যে  মুসলমান মাত্রই তারা “পশ্চাতপদ, আনকুথ, আনকালচার্ড” ইত্যাদি। ওরা সেই কথা চিন্তা করে এই কথা বলছেন। মানে বৃটিশ আমল থেকেই  “প্রগতিশীলতা নামে” যা তাদের মনের গভীরে প্রোথিত তা আসলে এক এথনিক ঘৃণা, এক ক্লিনজিংয়ের আকাঙ্খা, এক “হিটলারি মনোরোগ”। সেসবই এখানে নব-পরিসরে প্রকাশিত হয়েছে।
    এই কথোপকথনের পরে আরো কিছু শেষ অংশটা এখন কী ও কেমন হতে পারে সেই ছবিটা এঁকে দেয়া যাক। সেটাও কম ভয়ঙ্কর নয়। ইসলামোফোবিয়া-সহ যেকোন ফোবিয়া [phobia] বা এথনিক ঘৃণা-বিদ্বেষ আসলে কিন্তু খুবই ছোঁয়াচে। মানে কী? মানে হল তা শ্রোতার মনেও পালটা এথনিক ঘৃণা-বিদ্বেষ জাগিয়ে তুলতে পারে।  যেমন ইসলামোফোবিয়ার কমন অনুষঙ্গ বা সাথে বড় হওয়া ভাবনা হল মুসলমান নির্মুল বা ক্লিনজিংয়ের প্রবল আকাঙ্খা। কিন্তু তাতে কী সমস্যা? সমস্যাটা হল, এতে ইসলামোফোবিক দিকটা টের পেলে মুসলমানদের মনেও প্রথম প্রতিক্রিয়াটা হয় আত্মরক্ষা।  মানে, মনে আত্মরক্ষার চিন্তা আসা। যা সবচেয়ে কমন ও স্বাভাবিক!  কিন্তু এই আত্মরক্ষার উপায় বা পথ হিসাবে সে এরপর যা বেছে নেয় সেটাও আরেকটা তবে অন্যভাবে বলা আমরা-তোমরা। যেটা হল আমার ধর্মটাই শ্রেষ্ঠ।  যেটা পরিণতিতে এমন এক দুনিয়ার কল্পনা হিসাবে হাজির হয় যে দুনিয়াটাতে মুসলমান ছাড়া আর কেউ নাই। অর্থাৎ আত্মরক্ষার  বেস্ট মানে যেন এমন এক দুনিয়ার কল্পনা করা যেখানে মুসলমান ছাড়া আর কেউ না থাকে।  তাহলে এখানে সারকথাটা হল, যেকোন ফোবিয়া মাত্রই অন্যান্য অসংখ্য ফোবিয়ার জন্ম দেয়া। যেগুলো সমান মাত্রায় বিপদজনক।
    ইংরাজি এথনিক [ethnic] মানে বাংলায় আমরা একেও ‘জাতি’ বলি।  এছাড়াও ইংরাজিতে আরেক জাতি [race] আছে। বাংলায় একেও আমরা জাতি বলি। দুটার ফারাক হল, রেস মানে রক্ত বা জিন [gene] -গত বায়োলজিক্যাল ফারাক। এই অর্থে জাতিগত  মানুষে-মানুষে ফারাক বুঝায়। যুগ যুগ ধরে  নানান ধর্ম, কালচার, ভাষা, খাদ্যাভাস ইত্যাদির ভিত্তিতে  জনগোষ্ঠিগত সামাজিক ফারাক হতে দেখা যায় এটাই এথনিক-জাতিগত ফারাক।

    এখন কোন একটা রেস অথবা এথনিক জাতি যদি “অপর” জাতির উপর ঘৃণা-বিদ্বেষে চরমে উঠায় বা ‘ফোবিক’ হয়ে যায় এটাই “হিটলারি ফেনোমেনা”।   সবচেয়ে বড় কথা এক ফোবিয়া বাকি সকলের মধ্যে একই নতুন নতুন ফোবিয়ার জন্ম দেয়, ডেকে আনে।  এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল, হিটলারের “ইহুদি-ফোবিক” হয়ে যাওয়া।  আবার পরিণতিতে এথেকে ছোঁয়াচে ঘটনায় এবার ইহুদিদের মধ্যে জায়োনিস্ট আইডিয়ার ব্যাপক উদ্ভব ও জনপ্রিয়তা। জায়োনিজম তাই দুনিয়ার বাকি সব-জাতি [race and ethnic উভয় অর্থে] জনগোষ্ঠিকে প্রবলতম ঘৃণা-বিদ্বেষ করে থাকে, এমন চরম ফোবিক এক ফেনোমেনা হয়ে গেছে। সে নিজেকে বাদে বাকি সব-জাতি [race and ethnic উভয় অর্থে] জনগোষ্ঠি্র উপর আক্রমণ ও নির্মুলের আকাঙ্খাকে স্বাভাবিক মনে করে;  অর্থাৎ যেকোন “অপর” এর উপর তাদের নুন্যতম আস্থা-বিশ্বাস নাই, সব উঠে গেছে।

    কিন্তু এমন সব গাঢ় অনুমানকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে বাইডেনের অবরোধের তালিকা প্রকাশ। ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অবরোধ আরোপ’- এই ভিত্তিতে সেই তালিকা; তবে বেছে বেছে ‘কিছু দেশের’ ওপর বাইডেন প্রশাসনের অবরোধের পদক্ষেপ নিতে তাদের দেশের নাম তালিকায় রেখেছেন। বেছে বেছে কিছু দেশ বললাম এজন্য যেমন দেখেন, বাইডেন নিজের ঘোষিত নীতি ভারতের বেলায় প্রয়োগ করার মুরোদ দেখাতে পারেননি। কিভাবে সেটা?

    ঘটনার শুরু গত ২০২০ সালে বাইডেন যখন প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা নিশ্চিত করেন। তবে এরও আগেই কিছু আমেরিকান (মুসলমান ও নন-মুসলমান) কংগ্রেস সদস্য কাশ্মিরে ভারতের মুসলমানদের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন আর সর্বোপরি কাশ্মিরের (ভারতের জন্ম থেকেই দেওয়া) স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা ক্ষুণ করে জবরদস্তিতে সারা কাশ্মিরই ভারতের মূল ভুখন্ডের অংশ বলে (২০১৯ আগস্টের ৫ তারিখে) মোদি সরকারের সংসদে ঘোষণা – এরপর থেকে ক্রমাগত কাশ্মিরের বাসিন্দাদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘন চরমে উঠেছিল বলে এসব ঘটনাকে আমলে নিয়ে এর বিরুদ্ধে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব এনেছিল। আর প্রার্থী বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হলে এই প্রস্তাবের পক্ষে পদক্ষেপ নিবেন বলে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন। আর এটাই বাইডেন-মোদির সংঘাতের সম্পর্কের ঘটনার উৎস। আর এমন ঘোষণা মোদি সরকার ভালোভাবে নেয়নি, বিপদ দেখেছিল। এই ঘোষণা থেকেই মোদির পিছটান ও আমেরিকান সম্পর্ক ছেড়ে পালানোর উপায় বের করা শুরু হয়েছিল। তাই বাইডেন বিজয়ী হওয়ার পর থেকে মোদি সরকারের অঘোষিত টেনশন শুরু হয়ে যায়।

    তবে সেই টেনশন আরো বাস্তব হয়ে উঠতে বাইডেন প্রশাসন শপথ নেয়ার পরেও ১০ মাস সময় লেগে যায়। এবার ১০ ডিসেম্বরে বাইডেন অবরোধের তালিকা প্রকাশ করেছেন। এদিকে ইতোমধ্যে মোদি সরকারের মুসলমানদের ওপর একের পর এক নির্যাতন, নিপীড়নের পাপ আর কেবল কাশ্মিরেই আটকে থাকেনি। ভারতজুড়ে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল। এছাড়া বাইডেনের সাথে বিবাদ বাড়ার আরও ঘটনা ছিল যা যোগ হয়েছে। কোন্ কোন্ দেশের নাগরিককে তার দেশের সরকার নিজ নিজ ধর্মপালনে বাধা দিচ্ছে বা ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে তা লক্ষ্যরাখা ও নোট নেয়ার জন্য আমেরিকায় এক রাষ্ট্রীয় স্বাধীন কমিশন [USCIRF] আছে যার কাজ হল সেসব লঙ্ঘনকারি সরকারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য যে প্রশাসনই আমেরিকায় ক্ষমতায় থাকে তার কাছে বার্ষিক সুপারিশ রিপোর্ট পাঠিয়ে দেয়া। এবারের ২০২১ সালের এমন রিপোর্টে ভারতকে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ক্যাটাগরির দেশ [CPC (“country of particular concern,”] হিসেবে ভারতের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়ার সুপারিশ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।

    তাই মোদি সরকারের আশঙ্কা ছিল বাইডেন ট্রাম্প প্রশাসনের মত তার ফেভারেবল সরকার নয়। যে ট্রাম্প প্রশাসন এসব রিপোর্ট উপেক্ষা করে ফেলে রেখে চলেছিল। এছাড়া চলতি ডিসেম্বরের ৯-১০ তারিখ বাইডেন ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ আহবান করেছিল আর এখান থেকে যে এই অবরোধের তালিকা প্রকাশ করা হবে তা আমেরিকার দিক থেকে আগেই ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। ফলে সেসব কথা ভারত জানা ছিল গত অক্টোবর মাস থেকে, বিশেষ করে নভেম্বরের শুরুতে প্রকাশ্যে  সামিটের দাওয়াতপত্র বিতরণ শুরু হওয়া থেকে।

    আর এখান থেকেই মোদি সরকার আমেরিকার ওপর পাল্টা চাপ সৃষ্টির কৌশল ও পদক্ষেপ নিতে জরুরী বোধ করা শুরু করেছিল। সেই পদক্ষেপ হিসাবে ভারত প্রকাশ্যেই রাশিয়ার সাথে তার ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ করতে শুরু করে। অনেকে ধারণা করত চীন ও রাশিয়া যেহেতু আমেরিকার বিরুদ্ধে তারা এক-জোট; এই অবস্থা গত ১০ বছরের বেশি ধরে বহাল রেখেছে কাজেই এর বিপরীতে চীন-ভারত প্রকাশ্য বড় শত্রুতায় আছে বলে একে পাশ কাটিয়ে ভারত-রাশিয়া ঘনিষ্ঠতা খুব একটা কার্যকর হবে না।

    আসলে ২০০১ সালে ওয়্যার অন টেরর নীতির কারণে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা শুরু হয়েছিল তাতে বলা যায় আমেরিকা ওই প্রথম রাশিয়া থেকে ভারতকে বিচ্ছিন্ন ও আলাদা করে  অনেক দূরে নিয়ে চলে যায়; যার মূল টোপ বা কারণ হল, বুশের আমেরিকা ভারতকে পরমাণু-অস্ত্রবিষয়ক টেকনোলজি ও কাঁচামাল-উপাদান সরবরাহের যেসব আইনি বা কনভেনশনের বাধা (এনপিটি NPT) ছিল তা উপেক্ষা করে সহায়তার হাত বাড়িয়েছিল। স্বভাবতই এর লোভেই ভারত তার এতদিনের জিগার- যে ভারতকে রাশিয়ান অস্ত্রে সজ্জিতকারী এত পুরনো বন্ধু, সেই রাশিয়াকে উপেক্ষা করে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক বন্ধু হওয়ার জন্য ছুটে গিয়েছিল।

    ভারতের ‘সরকারি কালচারে’ কোনটাকে তারা ‘সুখ’ বা অর্জন বলে বুঝে এর কিছু বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি বা এটিচ্যুড-ভঙ্গিমা আছে। যেমন আমেরিকা ভারতকে গুরুত্ব দিয়ে গত প্রায় ২০ বছর চলেছে কাজেই ভারত পরাশক্তি হয়ে গেছে। এমন অর্থহীন মিথ্যা হামবড়া কংগ্রেসের প্রণব মুখার্জি করে গেছে আর এখন মোদি করে যাচ্ছেন। তবে কৌওলটা হল এটা সরকার নিজে পাবলিকলি প্রচার না করে, প্রপাগান্ডা সাংবাদিকদের দিয়ে করানো! সে উদ্দশ্যে তারা সরকারের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের সাথে কাজ করে এমন  সাংবাদিকদেরকে তা বিশ্বাস করিয়েই ছেড়েছিল। এ ছাড়াও আমেরিকা যেসব ঢংয়ে ভারতকে গুরুত্ব দেয়া প্রকাশ করেছিল সেটা নিশ্চয় ভারতের জন্য খুবই সম্মানের- এই অনুমানটাই সরকারি কালচারে বর্তমান।

    যেমন প্রায়ই আমরা একটা কথা শুনব যে “২+২ ডায়ালগ”। এটা তাদের অনুমান বিচারে খুব উচ্চমার্গের ব্যাপার। এমনকি রিপোর্টের শিরোনামেও এই শব্দগুলো তারা এনেছে। কেন? কারণ এটা আমেরিকা ভারতকে অফার করেছিল। তাহলে নিশ্চয় এটা দামি কিছু না হয়ে যায়ই না……!! এবং এই কালচার চালু করেছিল। অথচ ব্যপারটা স্রেফ আর কিছুই না, আমেরিকার ভারতকে অস্ত্রবিক্রি গছানোর মাত্র কায়দা একটা। সেখানে ‘২+২’ বলতে খাঁড়া মানে, দুদেশেরই পররাষ্ট্র আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী এভাবে এখানে চারমন্ত্রীর একসাথে বসে অস্ত্র কেনাবেচার লক্ষ্যে কোন মিটিং করা। এটা এতদিন আমেরিকান স্টাইল ছিল, ভারতকে জাতে তোলার। তাই এবার পুতিনের সফরে ভারতও রাশিয়ার সাথে এক ‘২+২ ডায়ালগ’ করেছে। এর এক পরোক্ষে ‘প্রদর্শনী অর্থ’ আছে যে, আমরা আমেরিকা ছাড়াই রাশিয়ার সাথেও এমন গুরুত্বের ডায়ালগ করেছি। আর ভারত সব সময় (ভুয়া এক সুখ) অনুভব করতে চায় যে দুনিয়ার পরাশক্তিদের সাথে ভারতের ‘২+২ ডায়ালগ’ – এসব করা মানে ভারতও এতে পরাশক্তি হয়ে গেছে। এর লক্ষণ এসব!!!

    এছাড়া সাথে আরেকটা মিডিয়া কাভারেজে আমরা দেখতে পাই ওই একই দ্য-প্রিন্ট [the-print] ওয়েবপত্রিকায় যেটা লিখবেন জ্যোতি মালহোত্রা। তার লেখা পড়ে পেইড লেখা মনে হবে। ‘যেমন তেমনই’ লেখাটার শিরোনাম হল Putin’s visit is a defining moment for India-Russia ties. It’s a telling message to China। আজিব ঘটনাটা হল, এটাই নাকি “চীনকে (চোখ টাটিয়ে) বলা এক মেসেজ’। মানে অন্য লেখায় নয়নীমা বসুর লেখাটা যদি বিদেশ মন্ত্রণালয় তাকে প্রভাবিত করে লেখানো লেখা বলি তাহলে মালহোত্রার লেখাটা হল একেবারে অর্ডার দিয়ে লেখানো! কিন্তু কেন এটা ‘ডিফাইনিং মোমেন্ট’ বলা হচ্ছে এর ব্যাখ্যা নেই। আর এমন তো নয় যে, রাশিয়া ভারতের সাথে কোনো ডিফাইনিং মোমেন্ট তৈরিতে যেতে চাইছিল!  না; তা তো নয়। বরং ভারতই আমেরিকার সাথে তাকাতে রঙিন চশমা দিয়ে দুনিয়া দেখার সুযোগ নিচ্ছিল আর এটা ভারতকেই আটকে রেখেছিল রাশিয়ার কাছে ছুটে যাওয়া থেকে। তাহলে ডিফাইনিং মোমেন্টের নাগাল ভারত এতদিন পায়নি নিজের বোকামিতেই…।

    তবে এতে যেটা হয়েছে তা হল, ভারত আমেরিকা থেকে আরো অনেক দূরে চলে গেছে যেখান থেকে ফিরে আবার আমেরিকার কাছে যাওয়াটা অনেক কঠিন হয়ে গেল। অনিশ্চিতও হয়ে গেল।

    কিন্তু মোদি আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ছেড়ে রাশিয়ার সাথে ভারতের পুরান সম্পর্কটা ফিরে জাগাতে এত সিরিয়াস কেন? প্রথমত মোদি তা করতে গেছেন নিজ সরকারের স্বার্থে নয়। বরং মোদির আসন্ন সব নির্বাচনে বিজয়ের স্বার্থে। ভারতের বিরুদ্ধে বাইডেনের মানবাধিকার লঙ্ঘন বা মুসলমান দমনের অভিযোগ  বরং মোদিকে আগামি ২০২৪ সাল পর্যন্ত নির্বাচনে বেকায়দা অবস্থায় ফেলবে; এই হলো মোদির অনুমান। করোনার সেকেন্ড ওয়েভ থেকেই মোদির পাবলিক রেটিং এরপর থেকে যারপরনাই খারাপ। আর সেটাকে চাঙ্গা করতে মোদি এখন আরো বেপরোয়াভাবে মুসলমান নির্যাতন শুরু করেছেন, অন্তত ২০২৪ পর্যন্ত করে যাবেন। যেমন, ‘পাবলিক প্লেসে নামাজ পড়া যাবে না। ভোটের আগে ত্রিপুরায় মসজিদে হামলা বা কমিউনিটিতে হামলা করলে অন্য বিরোধীরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে আগিয়ে আসে নাই। এই ভয়ে যে এতে সেই বিরোধী দল হিন্দু-ভোট হারাবে”। আবার চার দিন আগে উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারে তথাকথিত কিছু সাধুদের দিয়ে (নাম তার খুব বাহারি – যতি নরসিংহানন্দ স্বরস্বতী) প্রকাশ্যে জনসভায় ঘোষণায় আহ্বান জানালেন মুসলমানদের হত্যা করার জন্য। অথচ কেউ মামলা করেনি, এই অজুহাতে পুলিশ চুপ করে বসে আছে। তাই কলকাতার মমতার দল তৃণমূলের এক উপস্থিত সদস্য বাদি হয়েছে। তিনি নির্বাচন কমিশনেও নালিশ দিয়েছেন। মোদির দলের মুখ কুলুপ! অর্থাৎ এগুলো হল, আগামী মাসে উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে আবার জিতে আসার জন্য মোদির একমাত্র  ও শেষ উপায়।
    তাই এই অবস্থায় মুসলমানের ওপর নির্যাতন বা হত্যার অভিযোগ আবার আমেরিকান মানবাধিকার লঙ্ঘনে বড় হয়ে উঠুক এটা মোদি নিতে পারবেন না। তাই আমেরিকার কাছ থেকেই ভারতের এই পলায়ন। তাতে ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থ যাই হোক সেটা সেকেন্ডারি, পরে দেখা যাবে। মোদির মূল স্বার্থ এখন নির্বাচনে বিজয়। নির্বাচনে নিজের দলকে বাঁচানো।

    তাই এই ডিসেম্বর মাসেই বাইডেনের ওপর পাল্টা চাপ তৈরি করতে মোদির ভারত এবার মরিয়া অবস্থায় রাশিয়ার পুতিনের ভারত সফর আয়োজন করেছিল। পুতিনের ভারত সফর ছিল ৬ ডিসেম্বর এবং তা কেবল পাঁচ ঘণ্টার জন্য। কিন্তু আয়োজন, আলোচনার বিষয়বস্তু প্রসঙ্গে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের প্রপাগান্ডা ছিল শিখরে।

    ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় তাদের দেশীয় মিডিয়ায় কিভাবে হাজির থাকতে চায়, এর কিছু তরিকা দেখতে পাওয়া যায়। দা-প্রিন্টের নয়নীমা বসু বলতে চান যে, ভারত আর শুধু রাশিয়ান অস্ত্রের ক্রেতা নয়। ভারত এখন অস্ত্রবিষয়ে জয়েন্টভেঞ্চারে উৎপাদক। এমনকি অস্ত্রবিষয়ক গবেষণাতেও অংশীদার হতে যাচ্ছে।

    তাহলে সারকথাটা কী?
    সারকথাটা হল, অবরোধের অভিমুখটা এখন থেকে যতই দিন যাবে ভারত ততই আমেরিকা থেকে দূরে চলে যেতে থাকবে। যার একটা পর্যায়ে ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক আর আগের জায়গায় ফেরার সব সম্ভাবনা নিঃশেষ ও লুপ্ত হয়ে যাবে। অবস্থা দ্রুতই সেদিকে যাচ্ছে। আর সেটার এখনই যে অবস্থা তাতে বাংলাদেশের উপর আমেরিকান চাপ প্রয়োগ যে হারে বাড়ছে তাতে এথেকে বাংলাদেশকে নুন্যতম রিলিফ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের কোন ভুমিকা রাখার সুযোগ এখনই প্রায় নাই। ফলে আমাদের সরকারকে সহায়তা দিবার ক্ষেত্রে বাকি থাকল কিছু পুরান কমিউনিস্ট রাষ্ট্র যারা মনে করে শ্রেণী স্বার্থের নামে রাষ্ট্রের হাতে নাগরিককে হত্যা কিংবা, গুম-খুন করার সুযোগ তো থাকতেই হবে। সেই সুত্রে,  রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্ক সেটা আবার কী? অথবা ধরেন, নাগরিক বলে কাউকে সুরক্ষার দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে? কেন? এসব তারা মানে না। তাদের রাষ্ট্র ধারণায় এসবের বালাই নাই। আছে কেবল তথাকথিত শ্রেণীস্বার্থের শ্রেণীবোধ – শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণা ইত্যাদি। আসলে এগুলো এমন সব শত বছরেরও বেশি পুরান অর্থহীন সব কমিউনিস্ট প্রলাপ!! যা রিভিউয়ের সাহস, নিজেকে সংশোধন ও পুনর্গঠনের সক্ষমতা একালে কারও মধ্যেই নাই!
    তবুও ব্যক্তিগত স্বার্থ বা আত্মরক্ষার্থে  হাসিনা সরকারের অভিমুখ দিনকে দিন সেরকম ক্যাম্পের দিকেই হবে। আবার এর উল্টাটা যে, আমেরিকান বিরাট কোন স্বার্থ আছে যেমন বঙ্গোপ্সাগরে সপ্তম নৌবহর নোঙর করানোর সুযোগ মিলবে –  এই লোভে সে কোন স্বৈর শাসকের বিরুদ্ধে খাড়া হয়ে যেতেও পারে। সেটা হয়ত পারে, হয়ত তা সে করবে হয়ত না। কিন্তু এসব স্বার্থে আমেরিকান কোন পদক্ষেপ নিবার ক্ষেত্রেও আমেরিকান সক্ষমতার মুরোদ নিঃশেষ হবার দিক যাচ্ছে আর সম্ভবত বাইডেনই হতে যাচ্ছেন তাতে শেষ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট। তাও আবার যা করার তা  আগামি বছরের মাঝামাঝির পরে তাও লোপ পেয়ে যাওয়ার অভিমুখে হাটছে!!! বিশেষত আমেরিকান – সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতিক উত্থানের ধাক্কায় –
    রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ গঠন তা সামলাতে অক্ষম হয়ে যেতে পারে, এমন স্বার্থ সংঘাত বিপুল বেগে বাড়ছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ২৫ ডিসেম্বর ২০২১ ওয়েবে  আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “অবরোধ’ ছাড়া কোথাও আলাপ নেই”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • গিভ এন্ড টেকের ‘বস্তুই’ নাই

    অবরোধ আলোচনায়ঃ

    গিভ এন্ড টেকের ‘বস্তুই’ নাই

    গৌতম দাস

    ২০ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Re

     

    Recent US sanctions On China, Bangladesh

    Bangladesh protests US sanctions against RAB

     

     

    গত ১০ ডিসেম্বর বাইডেনের আমেরিকার ট্রেজারি বিভাগ বাংলাদেশের বিশেষ প্যারামিলিটারি বাহিনী ‘র‌্যাব [RAB] এর চলতি এবং সাবেক সাত অফিসার ও খোদ প্রতিষ্ঠানটার ওপর অবরোধ বা স্যাংশন [sanction] আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এতে সাবেক র‌্যাব প্রধান ও বর্তমান আইজি পুলিশ বেনজীর আহমেদও আছেন। এদিকে সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদেরও আমেরিকান ভিসা বাতিল করে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে বলে দেশের মিডিয়ায় রিপোর্ট এসেছে।

    বাংলাদেশে আমেরিকার এই অবরোধ আরোপের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাব এখন কোথায় কতটুকু পড়বে অথবা এর প্রতিক্রিয়া কী কী, কতদূর হতে পারে অথবা সরকার টিকে থাকতে কোনো সমস্যায় পড়বে কি না – এসব নিয়ে জল্পনা-কল্পনা এখনকার সময়ের প্রধান আলোচনার বিষয়। তবে এটা বলাই বাহুল্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার যেকোনো বাহিনীর সদস্যরা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার বিষয়ে এখন অন্তত এসংক্রান্ত পুরো পরিস্থিতি ও এর অভিমুখ নিশ্চিত ঠাহর করার আগ পর্যন্ত সতর্ক হয়ে থাকতে চাইবেন।
    সবচেয়ে বড় কথা, গত ১৩ বছরে নানা অনিয়ম রেজিমে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় সেই ব্যবহারিক রেওয়াজ আবার একটু থমকে দাঁড়াতে চাইবে। “আবার” বললাম এ জন্য, যেমন গত ২০১৯ সালে ক্রসফায়ারে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ছিল  চার শতাধিক [……২০১৮-২০১৯ সালে ৪২৪ জন ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন……। ]। কিন্তু পরের বছর তা কমে এর মাত্র ১০ ভাগে নেমে এসেছিল। কারণ, কক্সবাজারে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড। অনেকের অনুমিত ব্যাখ্যাটা এরকম যে, বাহিনীতে দলাদলি বা সহমত ভেঙে যাওয়ায় রেকর্ড উল্টো হয়েছে। কাজেই এবার অবরোধের ঘটনাতেও এই শক থেকে এবার ডাটা কী আসে তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে কর্মি-জনবলের  মনোবলের ওপর প্রভাব পড়া যে খুবই সম্ভব তা সম্ভবত সরকার আমল করছে। যেমন ১০ তারিখের পর থেকে এখন পর্যন্ত সরকারের প্রধান প্রতিক্রিয়া হল একেবারে ‘ডিনাইয়াল’[denial] বা পুরোপুরি অস্বীকার করা। সম্ভত তাদের অনুমান, গুরুত্বপূর্ণ আমলা ও দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে হলে এটাই পথ।

    এই অবরোধের সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট বাইডেনের এক নির্বাহী আদেশে ইও নং ১৩৮১৮ [Executive Order (E.O.) 13818] হয়েছে এবং বাইডেন প্রশাসনের স্টেট ডিপার্টমেন্ট বা পররাষ্ট্র বিভাগসহ আরো অনেক বিভাগের মিলিত তৎপরতার সার ফলাফলে এই অবরোধ আরোপ ঘটেছে। কিন্তু সবশেষে এর পাবলিক ঘোষণাটা দেয়া হয় ট্রেজারি বিভাগ থেকে। কেন?
    কারণ বিষয়টা মূলত ফাইন্যান্সিয়াল এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বিষয়ক। আরেকটু খুলে বললে দুনিয়ায় যত বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন হয় তার ৮৫ ভাগ বা তারও বেশি হয় আমেরিকান ডলারে; যার সোজা মানে সব লেনদেনের একটা না একটা পর্যায়ে তা হতে হয় ডলারে আর এর পরেই তা কনভার্ট হয়ে নিজ নিজ দেশীয় মুদ্রায়। আর ডলারে হওয়া মানে, কোনো না কোনো স্থানীয় (যেমন ঢাকার) কোন ব্যাংকের আবার কোন এক আমেরিকান ব্যাংকে (ডলারে) যে অ্যাকাউন্ট থাকে এর মাধ্যমে তা হয়েছে। তাই ডলারে লেনদেন মানেই আমেরিকান ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমের অংশ হওয়া ও তা ব্যবহার করা। মানে ধরা যাক, বাংলাদেশে স্থানীয় ‘ন্যাশনাল ব্যাংকে’ আমার অ্যাকাউন্ট আছে। এই ব্যাংকের আবার কোনো আমেরিকান ব্যাংকে ডলার-অ্যাকাউন্ট আছে। এতে এখন মূলত আমার হয়ে সেই ডলার-অ্যাকাউন্ট কোনো লেনদেন সম্পন্ন করে দিয়ে থাকে। এখানে যদিও আমার হয়ে আমার দেশী মুদ্রার ব্যাংক অনেক লেনদেন করে দেয় বলে আমরা ডলারে লেনদেন ব্যাপারটা টের পাই না। কিন্তু যখন আমার নামে ‘অবরোধ আরোপ’ করা হবে এর অর্থ, আমার জন্য এই ‘আমেরিকান ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমকে’ ব্যবহার ও প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয় তখন থেকে।

    তাহলে কোন আমেরিকান ব্যাংক যদি আমাকে নিষিদ্ধ বা অবরোধ করার তথ্য, জেনে অথবা না জেনে আমার লেনদেনটাও সম্পন্ন করে দেয় তাহলে কী হবে? বলাই বাহুল্য, এতে এই ট্রেজারি বিভাগ সেই আমেরিকান ব্যাংককে কড়া ফাইন করবে। যেমন- ইরানের ওপর আরোপিত অবরোধে হংকং ব্যাংকের আমেরিকান শাখা এমনই এক নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে এক লেনদেন ঘটিয়ে দিয়েছিল বলে ওই ব্যাংককে ট্রেজারি বিভাগ থেকে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার ফাইন করা হয়েছিল।

    আরেকটা কথা, কেন আমেরিকার হাতেই এমন অবরোধ আরোপের ক্ষমতা দেখা যায়? দুনিয়ার অন্য কোনো দেশ বা সে দেশের মুদ্রাও কী এমন অবরোধ আরোপ  করতে পারে না? অবশ্যই করতে পারে। যেমন- চীনও পাল্টা কিছু কিছু আমেরিকান প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ওপর অবরোধ আরোপ করে দেখা যায়। কিন্তু দুইটার ফারাক হল যেহেতু চীনা মুদ্রা ইউয়ানে দুনিয়ায় লেনদেন ডলারের তুলনায় অনেক কম সেকারণ চীনা-অবরোধের প্রভাবও অনেক কম। এ ছাড়াও যাদের লেনদেন চীনের সাথেই কেবল সেখানে কেবল এর কিছু প্রভাব পড়বে।

    ওদিকে, আমেরিকা কী কারণ দেখিয়ে এই অবরোধ আরোপ করেছে? তারা দেখিয়েছে যে, বাংলাদেশের র‌্যাব ও এই প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট ওসব ব্যক্তিরা বাংলাদেশে গুরুতরভাবে ‘আইনের শাসন’ ও ‘মানবাধিকার আইন’ ভঙ্গ করেছেন। এখন আমেরিকান প্রশাসনও যদি এমন কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করে থাকে তাহলে কি আমরা অথবা অন্য কোনো দেশ একই ধরনের মানে আমেরিকার ওপর অবরোধ আরোপের পদক্ষেপ নিতে পারব? আর পারলে তা করি না কেন?

    প্রথমে বলে রাখি, এটা তো এখন আশা করি সবার কাছে পরিষ্কার যে, এই অবরোধের শাস্তি দেয়ার সাথে জাতিসংঘ বা অন্য কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা নাই। কেবল আমেরিকান প্রশাসনই এটা করেছে। তাই বলা যায়, আইনত বাংলাদেশ বা আমেরিকাবিরোধী অন্য কোনো দেশও এমনইভাবে কোন আমেরিকান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চাইলে এমন পদক্ষেপ নিতে পারবে। কিন্তু সবার আগে ব্যাপারটায় আমেরিকা আমাদের সাথে খুব তুলনীয়ই নয়, সেদিকটায় নজর দিতে হবে। কারণ আমেরিকার বিচারব্যবস্থা এখনো তাদের সমাজে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রাখে, এছাড়া তারা নিজেকেই নিজে সংশোধন করে নেয়ার  এখনো অযোগ্য হয়ে যায় নাই, বরং ক্ষমতাসম্পন্ন; যদিও এর সবই ভাল এমন আদর্শব্যবস্থা নিশ্চয় আমেরিকা নয়। তবে আমাদের দেশের বেলায় এ’ধরনের অভিযোগগুলোর গত ১৩ বছরে কোনো সুরাহা বা প্রতিকার নেই। ফলে এ জায়গায় আমরা আমেরিকার সাথে তুলনীয় নই।

    দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা আরো গুরুত্বপূর্ণ। এখনো পর্যন্ত ডলারের দেশ আমেরিকা বাদে অন্য কোনো দেশ অবরোধ অন্যকোন দেশের উপর আওরোপ করলেও এর কোন শক্ত প্রভাব নাই, এর মূল কারণ কী? মানে অন্য কোনো দেশের অবরোধের তেমন মূল্য নেই। কারণ কিছুটা উপরে বলেছি। বাকিটা হল, অবরোধ মানে, আসলে প্রতিষ্ঠিত কোন দেশের ইকোনমিক ও ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম থেকে কাউকে বের করে দেয়া। অনেকটা একঘরে করে দেয়ার মত। যদিও সেটা আমেরিকান ডলারের অবরোধ হলে তবেই সেই চাপ কার্যকর। কারণ দুনিয়ার ৮৫ ভাগেরও বেশি লেনদেন হয় এই ডলারে। আবার সবকিছুই এত বেশি পরিমাণে ডলার-মুদ্রায় কেন? এমন হওয়ার কারণ, গ্লোবাল বাণিজ্য ও লেনদেন ব্যবস্থাটার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ [IMF] হলেও এটা জন্ম (১৯৪৪) থেকেই একমাত্র আমেরিকান ডলারকেই ভিত্তি করে এটা শুরু বা কার্যকর হয়েছিল। ফলে তাতে ডলার আন্তর্জাতিক লেনদেনের একমাত্র মুদ্রা হয়ে যায়। কিন্তু তা হলেও তখনো মূলত ডলার আসলে একটা দেশের, আমেরিকার স্থানীয় মুদ্রা। অর্থাৎ আমেরিকার নিজের মুদ্রার ব্যাপারে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আমরা অন্য দেশের কেউ বাধা দিতে পারি না। আমেরিকার পড়ে-পাওয়া এই বাড়তি  সুবিধা প্রাপ্তির শুরু এখন থেকেই। এটা জানা সত্বেও এমনটাই করতে হয়েছিল।

    তাহলে আমরা ডলারকে সেকালে আন্তর্জাতিক লেনদেনের একমাত্র মুদ্রা হিসেবেও নিয়েছিলাম কেন?
    কারণ সে সময় এক আমেরিকান ডলার ছাড়া আর কোনো দেশের মুদ্রা – তার অ্যাকাউন্টে সারপ্লাস বা উদ্বৃত্ত ছিল না। এর মানে আবার কী? মানে হল, দুনিয়ার যত লোককে ডলারে পেমেন্ট দিতে হবে বা আমেরিকার কাছে পাওনা, এর চেয়ে আমেরিকা যাদের কাছে পাবে মানে তারা ডলারে আমেরিকাকে পেমেন্ট দেবে, এর পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। এই পরিস্থিতিটাকে বলা হয় (ডলার) সারপ্লাসে আছে। আবার একটা টেকনিক্যাল পয়েন্ট হলো গ্লোবাল বাণিজ্য লেনদেন ব্যবস্থা কোনো মুদ্রায় চালু করতে গেলে ওর জন্য গ্লোবাল বাণিজ্যের সেই মুদ্রাকে সারপ্লাস মুদ্রা হতে হয়। ১৯৪৪-৪৫ সালে একমাত্র মার্কিন ডলার ছিল সারপ্লাস। এ’ছাড়া বাকি ইউরোপের সব মুদ্রা ছিল মুদ্রাস্ফীতির মুদ্রা। মানে, ভল্টে রাখা সোনার চেয়ে নোট ছাপানো মুদ্রা মান-পরিমাণে বেশি। তাই সেকালে ডলার হয়ে যায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একমাত্র মুদ্রা।

    “তারা ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর তালিকাতে রেখেও ভারতের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের কোনো ঘোষণার মুরোদ দেখাতে পারেননি। উল্টো ভারতকে ‘গণতন্ত্রী রাষ্ট্র’ বলে দাওয়াত দিয়েছেন আর মোদি সেখানে বক্তৃতা দিয়েছেন। বাংলাদেশ নিয়ে আলজাজিরার রিপোর্টে অনেকে ব্লিঙ্কেনের ‘এই চাপাবাজি’র ফাঁদে পড়েছেন। দেখা গেছে, তারা ব্লিঙ্কেনের কথা বিশ্বাস করে নিয়েছেন; আগে যাচাই করেননি”

    কাজেই একা আমেরিকা সেকালে পাওয়া সুবিধার জন্য একালেও যে অবরোধ আরোপের সুবিধা নিচ্ছে তা সেকালের সবল অর্থনীতির কারণে। এই বাড়তি সুবিধা যা পেয়েছিল সেটা ওর পড়ে পাওয়া সুবিধা, যা কেবল কুড়িয়ে পাওয়া নেয়া সুবিধা যেন।

    এজন্য বেনজীর বা ওই সাতজন শুধু আমেরিকাতেই নয় বিদেশে যেকোনো সম্পত্তি কিনতে চাইলে বাধা পাবেন। আবার, তাদের আগে থেকে কোনো সম্পত্তি থেকে থাকলে টেজারি বিভাগ তা এখন বাজেয়াপ্ত করে নেবে। এ ছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, এই সাতজনের সংখ্যাটা যেকোনো সময় আমেরিকা আরো বাড়াতে পারে। এনিয়ে আমাদের সরকারি আমলা বা দলীয় নেতারা সবসময় একটা ভয়ের মধ্যে কাটাবেন, কী জানি কী হয়! যেটা সরকারি কার্যক্রম ততপরতাকে ধীর বা শিথিল করেও দিতে পারে। দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার লোক পাওয়ার অভাব দেখা দিতে পারে। সম্ভবত তাই সরকার মনোবল বাড়ানোর দিকে বড় নজর বাড়িয়েছে।

    কোনো এক প্রফেসরের পরামর্শ হল (যাকে মনে হচ্ছে পরামর্শক প্যানেলে নিযুক্তি পেয়েছেন), আমেরিকা যেহেতু লবিতে পরিচালিত এক দেশ; ফলে বাংলাদেশ সরকারের উচিত নিজের পক্ষে লবি ফার্ম নিয়োগ করা। পরে আমরা এর পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেনকে দেখতে পাই। ‘মানবজমিন’ লিখেছে – তিনি বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্র সরকারে অনেক জ্ঞানী-গুণী লোক আছেন তাদের সাথে আমাদের আলোচনা চলছে, সেটি অব্যাহত থাকবে”। অর্থাৎ সরকার যে আমেরিকান কোনো লবি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়ে সে ভিত্তিতে তৎপর হয়েছে সেটাই তিনি যেন এভাবে আমাদের জানালেন। এর ১২ ঘণ্টার মধ্যে আমরা জানলাম আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন ফোন করেছেন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে। কিন্তু কী কথা হয়েছে সুনির্দিষ্ট করে কেউ এর তেমন ব্যাখ্যা করতে পারলেন না; যদিও একটা শীতল প্রভাব অনেকের মধ্যে দেখা গেল যেনবা সরকারের ভাগ্য কী হয় সে উৎকণ্ঠা যেন এখন থেকে কেটে যাচ্ছে যাবে। কিন্তু একই সাথে সবার এটাও অনুমান এটা এত সহজে যায় না। তাহলে?

    যখন কিছুই অফার করার থাকে না, তখন আপোষ চাইলেও কী দিয়ে দেয়া নেয়া হবে?
    এবার এ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। বাস্তব বড় কঠিন। বাস্তবতাকে ঢেকে রেখে লাভ নেই বরং দুদণ্ড আবেগকে বাইরে রেখে বাস্তব চিন্তা করলেই যা জানা যায়। সেই কঠিন বাস্তবতাটা হল, আমেরিকার এই অবরোধ আরোপের পরে, “না সরকারের খুব কিছু আমেরিকাকে অফার করার আছে, না আমেরিকার খুব কিছু পাওয়ার সুযোগ আছে”। এমন কাঠামোর মধ্যে আছি আমরা দুইপক্ষ। অনেকে খুঁজে পেয়েছে কিংবা মহাসত্য কোনো কিছু দেখিয়ে দিতে পেরেছে মনে করে বলার চেষ্টা করছেন যেমন আমাদের মন্ত্রী মোমেন বলছেন, “বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে একাধিক বৈঠক হয়ে থাকে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ফোরাম হচ্ছে পররাষ্ট্র সচিবপর্যায়ে পার্টনারশিপ ডায়ালগ। এ ছাড়াও বিভিন্ন বৈঠকে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়ে থাকে। তারা যেসব বিষয়ে জানতে চায় সেটির উত্তর দেয়া হয়” ইত্যাদি।

    কূটনীতি মানে আসল কথা সরিয়ে কথার প্যাঁচাল, এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।  এখানে মোমেনের আসল স্বার্থের কথাটা ছিল, “নিষেধাজ্ঞা শিথিলে বাইডেন প্রশাসনের সাথে আলোচনা চায় ঢাকা”। এটা আসলে মুখ্য গিভ অ্যান্ড টেক। আমরা সরাসরি সে জায়গায় যাবো; এতে সময় ও জায়গা বাঁচবে।

    কথা হল, বাংলাদেশ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার দেখতে চায়। কিন্তু বাইডেন কী পেলে তা প্রত্যাহার করবেন? টু দ্য পয়েন্ট বললে এক কথায়, শেখ হাসিনা চীন থেকে সরে এলে। এখন এটা কী সরকারের পক্ষ থেকে করা সম্ভব? না, একেবারে অসম্ভব। তাহলে হাসিনা সরকার এর বদলে কী কামনা করছে? সে চাইছে বৈষয়িক অন্য একটা কিছু যেমন ‘কোনো প্রজেক্ট’ নিয়ে যেন মিটিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু সে কথায় আবার সারবস্তুটা হল, সরকারের দেয়ার মত তো এমন কিছু নেই যা পেলে বাইডেন খুশি হবেন; সব মিটিয়ে নিবেন।

    কথা হল, বাংলাদেশ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার দেখতে চায়। কিন্তু বাইডেন কী পেলে তা প্রত্যাহার করবেন? টু দ্য পয়েন্ট বললে এক কথায়, শেখ হাসিনা চীন থেকে সরে এলে। এখন এটা কী সরকারের পক্ষ থেকে করা সম্ভব? একেবারে অসম্ভব। তাহলে সরকার এর বদলে কী কামনা করছে? সে চাইছে বৈষয়িক অন্য একটা কিছু ‘কোনো প্রজেক্ট’ নিয়ে যেন মিটিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু সে কথায় আবার সারবস্তুটা হলো, সরকারের দেয়ার মতো এমন কিছু নেই যা পেলে বাইডেন খুশি হবেন; সব মিটিয়ে নেবেন।

    তবে সেই কথা বলার বাহানাতে সরকারের একটা লাভ হয়েছে যে, বাইডেন সরকারের সাথে তারা ‘গুড টার্মে’ আছে, মিথ্যা হলেও এমন একটা ছবি, এটা বাংলাদেশের পাবলিককে দেখানো গেছে।

    কথা হওয়া আর একমত হওয়া এক নয়ঃ
    আর বলা হচ্ছে, মানবাধিকার নিয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা হয়েছে। কিন্তু একমত হওয়ার সুযোগ কী আছে? অবশ্যই না। কারণ মূল সমস্যা তো মানবাধিকার মানা না মানাতে নয়। মানবাধিকারের প্রশ্ন তো লংটার্মের পালনীয় শর্ত দিয়ে সবসময় মিটিয়ে নেয়া হয়েছে। গত ২০১৩ সাল থেকে ইউপিআরের [UPR] নামে জাতিসংঘের কর্মসুচি বসলে সেখান থেকে সময় বাড়িয়েই সমস্য দূরে ঠেলা কী চলছে না? আর যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান- বয়ান হল, “বাংলাদেশের গুম-নিয়ে কোনো আইন বা করণীয় নেই। তাই বাংলাদেশে কোনো গুম নাই”।  মহা অদ্ভুত এই যুক্তি!!! আসলে এই সরকার পাবলিক রেটিংয়ের ভিত্তিতেতা নিয়ে মাথা না ঘামানো সরকার বলে আর এভাবে সুদীর্ঘ  ১৩ বছর কাটিয়ে দেওয়ার পরে এর যা ভিত্তি দাড়িয়েছে তাতে এর পক্ষে কোন ধরণের মানবাধিকার রক্ষার কমিটমেন্ট দেয়া অর্থহীন, সেই কমিটন্টে আস্থা রাখাও অর্থহীন!

    যদিও প্রকৃত সমস্যা আরো অনেক গভীরে। আমেরিকা আসলে যা চাচ্ছে হাসিনার বাংলাদেশ তা দিলে তা ধারণ-যোগ্যতা বা পাত্র তো আমেরিকার কাছে নেই। যেমন- আস্থা পাওয়া যায় বাংলাদেশের টিকা পাওয়ার সুরাহা প্রশ্নে চীনা-বিকল্প বলে কী আমেরিকার কোন মুরোদে আছে? যেখানে দুনিয়ার কোথাও আমেরিকা কোনদেশের টিকাপ্রাপ্তির সমাধান করে দিয়েছে – আমেরিকার কাছে এমন কোনো দেশের নাম আছে? বরং উল্টো, সে তো জি৭-এর সদস্য হিসাবে তাদের জাতিসঙ্ঘের ‘হু’ [WHO]কে দেয়া কমিটমেন্টের সব টিকাই দেয়নি। অথচ বাংলাদেশের সমাজে এখন যতটুকু দোকান হাটবাজার গঞ্জ যা যতটুকু যে খোলা আছে কারখানা চলছে তা তো এই চীনা টিকার প্রাপ্যতার জোরেই। ফলে এখনো বাংলাদেশের টিকাদাতা-ওস্তাদ বদলানো – আবার টিকা নেই মানেই হবে, সোজা লকআউট। টিকা নাই মানে হবে, অর্থনীতিও নাই; ডুবে যাওয়া।
    যদিও টিকা নেয়া মানে করোনা থেকে একেবারে মুক্তি এমন অবস্থায় দুনিয়া এখনও পৌঁছায়নি, তবু যতটুকু যা ব্যবসা-বাণিজ্য খোলা এবং কার্যকর, তা ঘটতে-চলতে পারছে টিকা দেয়ার জন্যই। আমেরিকার হাতে এনিয়ে চীনের বিকল্প আমাদেরকে কী দেয়ার আছে? বিশেষ করে নয়া ওমিক্রন [Omicron] ভ্যারিয়েন্টের হামলার মুখে? ওদিকে ম্যান্ডেটবিহীন নিশিথ ভোটের সরকার, এটা এখন বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প ছাড়া চলতে পারবে না। কারণ এরা পাবলিক রেটিং-এর উপর ভরসা করে চলে না, দাঁড়িয়ে নাই। ফলে উলটা এদের  কর্মীদেরকে “প্রকল্প” মানে অর্থের সংস্থান করে না দিতে পারলে তারা থাকবে কেন?  এখন বলেন,  আমেরিকা কি চীনের মত এই অবকাঠামো ফান্ড জোগাতে সক্ষম? তাহলে কিসের ভরসায় হাসিনার সরকার চীনকে ফেলে ছেড়ে আসবে? কাজেই কোনো ডিলের জায়গাটা কোথায়? ভিত্তিটা কী? বলপ্রয়োগে সরানো ছাড়া সরকারের সরে যাওয়ার জায়গা নেই!

    আবার দেখেন হাসিনার বাংলাদেশ চীন ছেড়ে আসবে কোথায়? কোয়াডে? “অসামরিক” কোয়াড কি সক্রিয়?  মানে ভারত কি এখন আমেরিকান ক্যাম্পে আছে ? সেটা এখন  না ভারত নিশ্চিত বলতে পারবে, না আমেরিকা! এই নড়বড়ে কোয়াডের কোথায় ঢুকবে হাসিনার বাংলাদেশ?

    মূল ইস্যু তো একখানেও সেই একই – মানবাধিকার! ভারতের মানবাধিকার প্রশ্নে আমেরিকার যেসব অবরোধ আরোপ করার কথা তা বাইডেনের উচ্চারণের আগেই তো ভারত ভেগে গেছে! মোদির ভারত আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দিয়েছে। বাইডেন কী হতভম্ভ নয়?  এতে এখন বিশৃঙ্খল ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক বাইডেন সোজা করবেন কী করে? ইমিডিয়েট কোনো পরিকল্পনা কী বাইডেনের কাছে?? মনে হয় না!!

    কূটনীতিতে একটা বড় অংশ থাকে বাকচাতুরি, এজন্য কূটনীতির ভাষাই আলাদা; কিন্তু তাই বলে সাবধান এতে সবটাই চাতুরি তা অবশ্যই নয়।  কিন্তু ব্লিঙ্কেন ভেবেছেন এটা শতভাগ চাপাবাজির খেলা। ডেমোক্র্যাসি সামিটসহ গত ৯ ডিসেম্বর থেকে বাইডেন কোথাও বলেননি যে, এখন থেকে মানবাধিকার – তার সরকার-প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হবে। একথা বলতে চাইলে যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে তা প্রকাশ করতে হয় তা করেছেন? কেউ জানে না!

    অথচ বাইডেনের পররষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন এখন এশিয়ায় আসিয়ান দেশ সফরে, ইন্দোনেশিয়ার পরে মালয়েশিয়ায় সফর শেষ প্রায়। [যদিও বাকি প্রোগ্রাম গুটিয়ে তিনি ফেরত চলে যাবেন কারণ দলে একজনের করোনা-পজিটিভ ধরা পড়েছে।]  কিন্তু তিনি প্রতিদিন চাপা মারছেন, মানবাধিকার নাকি তাদের সরকার-প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে!!! ভয়েস অব আমেরিকার এক রিপোর্টে বলা হয়েছে তারা বিদেশনীতিতে মানবাধিকারকে ঢুকিয়ে (ইনফিউজ) নিচ্ছে [……to infuse human rights into its foreign policy…]। কিন্তু এটা ব্লিঙ্কেনের নিজের ভাষ্য নয়, রিপোর্টার নিজে যা বুঝেছে বলে তার কাছে মনে হয়েছে সেই ভাষ্য।  মানে  এই বাক্য ব্লিঙ্কেনের নয়, নিজের বক্তব্য বলছেন রিপোর্টার। তবে আরেক জায়গায় বলেছে, আমরা মানবাধিকারকে বিদেশনীতির কেন্দ্রে নিচ্ছি [……We are determined to put human rights at the center of our foreign policy……]। এই বাক্য ব্লিঙ্কেনের বলা হয়েছে, উপরে কোটেশন চিহ্ন দেয়া আছে!!  এরপরেও এটা মেনে নেওয়ার বিরাট সমস্যা আছে। কারণ এই প্যারাগ্রাফেরই শেষ শব্দগুলো হল,  ……promote accountability for human rights violations and abuses, no matter where they occur । কিন্তু এই ‘নো ম্যাটার হয়ার দে অকার’ কথাগুলো  বিশ্বাস-অযোগ্য। কারণ, ব্লিঙ্কেনের দাবির মানে হল যে ……মানবাধিকার লঙ্ঘন “যেখানেই হোক না কেন” তারা সক্রিয় হবেন – এই কথাটাই তো মিছা! কেন?
    এসব শুনে বা পড়ে মনে হতে পারে যে, বাইডেন-ব্লিঙ্কেন খুবই সিরিয়াস এবং একটা নীতিগত অবস্থান নিয়ে তারা মানবাধিকার বাস্তবায়নে এগিয়ে এসেছেন। ফলে এবার আর তারা  কে কোন দেশ বা কোন ‘কৌশলগত বন্ধু’ তা দেখবেন না। দেখবেন মানবাধিকারের নীতি কে মানেননি; আর তার ওপর তারা কঠোর হবেন।

    তাই কী?
    না, এটাই সর্ব্বৃহৎ চাপাবাজি। কারণ তারা ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর  আমেরিকার অবরোপ আরো  সম্ভাব্য  তালিকাতে রেখেও সেই  ভারতের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের কোনো ঘোষণার মুরোদ দেখাতে পারেননি। উল্টো ভারতকে ‘গণতন্ত্রী রাষ্ট্র’ বলে সার্টিফিকেট-সহ দাওয়াত দিয়েছেন আর মোদি সেখানে ‘বক্তৃতা’ দিয়েছেন। বাংলাদেশ নিয়ে আলজাজিরার রিপোর্টে অনেকে ব্লিঙ্কেনের ‘এই চাপাবাজি’র ফাঁদে পড়েছেন। যেমন সেখানে  এক রিসার্চ ফেলোর বরাতে বলা হয়েছে…told Al Jazeera the US sanctions show that the Biden administration has made a “significant policy shift” not only over Bangladesh, but in the US foreign policy in general,……। অর্থাৎ এটা নাকি বাইডেনের আমেরিকার পলিসি শিফট ঘটে গেছে।
    তাহলে ভারত তো আমেরিকার অবরোধ আরোপের  সম্ভাব্য  তালিকার দেশ – তবু কেন অবরোধ নাই? কাশ্মীর ইস্যুতে, সারা ভারতে মুসলমান নিপীড়ন ধর্মীয় স্বাধীতায় হস্তক্ষেপ মসজিদ ভেঙ্গে বা আগুন দেয়া পাবলিক নামাজে বাধা দেওয়া ইত্যাদিতে সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান  থেকে বাইডেনকে অবরোধ দেয়ার সুপারিশ দেয়া ছিল ; এছাড়া সর্বশেষ ভারতের খৃশ্চানদের উপরেও তাদের চার্চে হামলায় এবার ক্রিসমাস পালন না করার সিদ্ধান্তের কথা শোনা যাচ্ছে – হিন্দু ছাড়া অন্য কোন ভারতীয় ধর্মপালন করতে পারবে না যেন, এমন অবস্থা দাড়িয়েছে। এই জলন্ত তথ্যগুলো পাশে রেখে যেখানে ভারতের উপর আমেরিকার কোন অবরোধ নাই এটা সত্বেও আমেরিকা  “significant policy shift” করেছে এমন দাবি কিভাবে করা যায়?  অর্থাৎ  এখানে কার্যত
    দেখা গেছে, এরা ব্লিঙ্কেনের কথা বিশ্বাস করে নিয়েছেন; চোখ খুলে আগে বাস্তবে যাচাই করেননি।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ১৮ ডিসেম্বর ২০২১ ওয়েবে  আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “লেনদেনের ‘বস্তুই’ নাই”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ নিবে না

     চীন-ভারত সংঘাতে

    বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ নিবে না

    গৌতম দাস

    ০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3PL

    _

    [সার-সংক্ষেপঃ   চীন-ভারত সামরিক সংঘাত আসন্ন কোন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কার পক্ষ নিবে? চীন না ভারতের পক্ষে? নাকি নিজেরই একটা পক্ষে? সম্প্রতিকালে এসব নিয়ে ‘অনুমিত’ দৃশ্যকল্প এঁকে নিয়ে এর আলাপ তুঙ্গে নিয়েছে মূলত ভারত। আর তাতে ভারতের মন রক্ষার্থে সাথে তাল দেয়া শুরু করেছে আমেরিকাও। এনিয়ে এদিক সেদিক, কার মনে কী আছে তা নামে-বেনামে এমন প্রচুর লেখা ছাপা হচ্ছে। আমেরিকা যদিও ভাব ধরেছে যে সে ভারতকে সাপোর্ট করতে নাকি এই প্রসঙ্গে প্রবেশ করে নাই। আমেরিকা বরং নাকি “ভারতের চোখ দিয়ে বাংলাদেশ দেখা” ছেড়ে দিতে বাংলাদেশকে ভারত থেকে আলাদা নিজের এক পররাষ্ট্র ডেস্ক সাজিয়েছে যেখান  থেকে এখন বাংলাদেশ ইস্যু দেখাশুনা করার পরিকল্পনা নিয়েছে – এসব চাপাবাজি-মূলক বক্তব্য এক সাক্ষাতকারে প্রকাশ করেছে। অথচ ফরেন পলিসি পত্রিকার এই আর্টিকেল উলটা সাক্ষ্য দেয় যে খাসিলত বদলায় নাই, বদলাবেও না।
    কিন্তু এসময়ে হঠাত চীন-ভারত সংঘাতের কথা উঠছে কেন? এটা আমেরিকা বা ভারত স্পষ্ট উচ্চারণ না করে এড়িয়ে যাচ্ছে যদিও তা করা হচ্ছে “যেন সংঘাত আসন্ন” এমনটা (given) ধরে নিয়ে। তবে ভারত পরোক্ষে এক আর্টিকেল ছাপিয়ে তা বলেছে। সেখানেও আগাম (given) ধরে নেয়া ঘটনাটা হল ভারত তো জীবনেও তিস্তার পানি দিবে না ফলে এক চীনা তিস্তা প্রকল্প যেহেতু বাংলাদেশ ভাবছে; তা ভাববেই স্বাভাবিক। সেটা হলে এর উলটা প্রভাবে ভারত কী কী হারাবে তা নিয়ে এক এজেন্সি রিপোর্ট ছাপিয়েছিল আমেরিকার ভোয়া বাংলায় মতিউর রহমান চৌধুরী। যেখানে ভারতের পক্ষে এক “ছায়া-ব্যক্তিত্ব”  অংশ নিয়েছিল। যেখানে বেপরোয়া ভয়াবহ সব কথা লেখা হয়েছে। যেমন, বাংলাদেশকে ভারতের সাথে চুক্তি করতে হবে যাতে চীন-ভারত যুদ্ধের সময় ভারত বাংলাদেশের উপর দিয়ে সামরিক যান চলাচল করতে পারে। যেমন লিখেছে – “… বাংলাদেশের সাথে একটি চুক্তি সই করা, যে চুক্তিবলে সংঘর্ষের সময় সামরিক, বেসামরিক এবং ট্রাফিক ক্যারি করা যাবে”। মানে এক ন্যাংটা খোকার মামা বাড়ির আলাপ আর কাকে বলে!!!
    এমন এসব এজেন্সী ততপরতায় বাংলাদেশ ভরে গেছে। ডেইলি স্টার এমন  আরেক রিপোর্ট এখানে। এক পুরানা এজেন্ট সিপিডি (CPD) এবার ভারতের আরআইএস (RIS) নামের এক ছুপা থিঙ্কট্যাংকের সাথে যৌথ সেমিনার করেছে ঢাকায়।  ছুপা এজন্য যে এরা একদিকে দাবি করছে তারা স্বাধীন থিঙ্কট্যাংক প্রতিষ্ঠান। অথচ এর পরিচালনা পরিষদ বা গভর্ণিং বডিতে দেখা যাচ্ছে  ভারত সরকারের পাঁচ মন্ত্রণালয়ের সচিব (পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, অর্থনীতি ইত্যাদি) এবং সাথে আর এছাড়াও আরএসএস নেতা ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ডিরেকটরেই পরিপুর্ণ।  আর এমন RIS এই প্রতিষ্ঠানের সাথে CPD যৌথভাবে বাংলাদেশের ৫০ বছর পালন করেছে ঢাকায়! কী করে?? সিপিডির রেহমান সোবহান ভারতকে করিডোর দেওয়ার পক্ষের এজেন্সীর হয়ে ২০০৭ সাল থেকে সোচ্চার এবং বিরোধীতাকারীদের মুর্খ ও অশিক্ষিত বলেছিলেন তিনি। আবার এখন   ভারতের রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশ সফর নিয়ে কিছু লোক অতি উতসাহে আলোড়ন তোলার চেষ্টা হচ্ছে কিন্তু তা অনাগ্রহে গণবিচ্ছিন্ন আড়ম্বরেই আটকে থেকে যাচ্ছে।

    আসলে সিপিডি  এমনই ভারত অনুগত যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ নিয়ে কথা উঠায় কিন্তু সারা ভারতে গত আট বছর ধরে একটা প্রবল হিন্দুত্ববাদের যোয়াড় বইতেছে আর ভারতের এই বন্ধু হওয়া সত্বেও বাইডেন এই প্রসঙ্গে কথা তোলা ছাড়ে নাই। অথচ আমাদের সেকুলার রেহমান সোবহান সাহেব মুখে কুলুপ দিয়েছেন; কি জানি মহাজন রাগ করে নাকি!!  এমন যতই আনুগত্য [subordination] বা অধীনস্ততা দেখাক এথেকে ভারত কোন কিছু অর্জন করতে পারবে না।

    তবু নিশ্চিত বলা যায় যত  প্রচেষ্টাই নেয়া হোক, চীন-ভারতের কোন কল্পিত যুদ্ধে বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ নিবে না। এর কোন সুযোগই আর নাই। বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ তো নিবেই না এডিশনালি সাথে বাংলাদেশের নিজের সার্বভৌম বুঝের কোন অবস্থানও থাকতে পারে।  এমনকি তা হাসিনার নেতৃত্বের বাংলাদেশেও না।  মনে রাখা যেতে পারে, কোন শর্তে বা চাপে ফেলেও বাংলাদেশকে কোনদিকে নেওয়ার দিন শেষ, সেই পরিস্থিতিটাই লুপ্ত  হয়ে গেছে। এটা ভারত যত তাড়াতাড়ি  বুঝবে ততই সেটা ভারতের জন্য মঙ্গল হবে। তবে এর আগে নানা গণবিচ্ছিন্ন আড়ম্বর অথবা বহু চাটুকার বা এজেন্টদের ততপরতা  আমরা চলতে দেখব অবশ্যই। আর হাইকমিশনকেও আমাদের মিডিয়া কিনার জন্য আরো বহুদিন ফান্ড ঢেলে যেতে দেখব। ]

    DON’T LOOK AT BANGLADESH WITH INDIAN PRISM : USA MEDIA

     

     

    ‘ফরেন পলিসি’ (Foreign Policy Magazine), ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই আমেরিকান পত্রিকা; দীর্ঘ দিন ধরে এটা মূলত ডিপ্লোমেসি ও রাজনীতিক ইস্যু নিয়ে চর্চার এক ম্যাগাজিন। আর বলাবাহুল্য, এ’কাজ তারা আমেরিকান স্বার্থের দিক থেকে তাকিয়ে করে থাকে। আর বাইডেন ক্ষমতায় আসার আগে এই ম্যাগাজিনের অনুসৃত লাইন যাই থাক, চলতি বছর থেকে এটা এখন বাইডেনের বড় ‘একটিভ সাপোর্টিং’ পত্রিকা; বিশেষ করে সাউথ এশিয়ার জন্য আর তা কাভার করার দিক থেকে। মাইকেল কুগেলম্যান [Michael Kugelman] ‘উড্রো উইলসন সেন্টার’ [Wilson Center] এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ডেপুটি প্রোগাম ডিরেক্টর ও সিনিয়র ফেলো। তিনি এখন ফরেন পলিসি পত্রিকায় নিয়মিত এক সাপ্তাহিক ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফ’ লেখার তত্ত্বাবধান ও প্রকাশ করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত যেটা আসলে বাইডেনের সাউথ এশিয়া নীতির ছাপে ও পক্ষে এই অঞ্চলের বার্নিং ইস্যুগুলোতে তাদের অবস্থান মেলে ধরে। আর তাতে এ অঞ্চলের খুঁটিনাটি ইস্যুতে বাইডেন প্রশাসনের মনোভাব সম্পর্কেও কিছু  আঁচ পাওয়া যায়। এছাড়া অনেক সময় এ’অঞ্চলের মিডিয়াগুলো কী লিখেছে তার ছোটখাটো রিভিউও দেখতে পাওয়া যায় এই ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফে’। অর্থাৎ বাইডেনের পক্ষেরই যেন এটি একটা আলাদা ভার্সন কিন্তু যারা বাইডেন প্রশাসনের সাথে অ-সরকারিভাবে ও ইনফরমালি যুক্ত।

    বুড়া সিংহ আমেরিকাঃ
    এদিকে চলতি শতক থেকে প্রায়ই আমেরিকান প্রশাসনকে অনেকে ‘বুড়া সিংহ’ বলে থাকে। টানা পঁচাত্তর বছর ধরে আমেরিকা দুনিয়াকে ভালো-মন্দ যাই হোক একভাবে দাবড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। কিন্তু তার সেসব বহু সক্ষমতাই আজ গত হয়েছে; সোজা নাই হয়ে গেছে; বিগত যৌবন হয়ে গেছে। ফলে যেন এটা এখনো সিংহ বটে তবে চামড়া ঢলে পড়া বুড়া সিংহ হয়ে গেছে।

    গত ১৯৪৫ সালকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে একটা ভাল ‘জংশনের বছর’ বলা যায়। এই জংশন হল, এক দিকে  বিশ্বযুদ্ধে দুনিয়ায় ভেঙে পড়া পুরনো অসংলগ্ন [discrete] রাজনৈতিক অর্ডার মানে যেটুকু রাজনৈতিক সিস্টেম ছিল তা ভেঙ্গে, পরে ওর অবশিষ্ট নিয়ম শৃঙ্খলাগুলো ক্রমেই সে ত্যাগ করছে আর অন্যদিকে নতুন এক অর্ডারে এক সুষম সংগঠিত ও গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমে দুনিয়া পুনর্গঠিত করে  নিজে চলতে শুরু করার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। নতুন সেই গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমে এর  গ্লোবাল ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার বা এই নয়াবিধি ‘ব্যবস্থা’ শুরু হচ্ছে মূলত জাতিসঙ্ঘকে কেন্দ্রে রেখে [এটাই প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের ড্রিম]  এবং অন্তত তিনটা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে নিয়ে। এই বিগত অর্ডারটাকে যদি বলি কলোনি যুগ বা কলোনি ক্যাপিটালিজমের কাল তবে, নতুন যা সেসময়ে গড়ে উঠছে তা আমেরিকান নেতৃত্বে এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম।  যদিও সোভিয়েত কমিউনিজম, যা তখন ইতোমধ্যে ২৮ বছর বয়স্ক, সে এটা সরাসরি স্বীকার করতে চায়নি। কেবল জাতিসঙ্ঘ গঠনের সময়ে নিজের ভেটো সদস্যপদটা ঠিকঠাক থাকে তা বুঝে নিয়ে বাকি ব্যাপারে  প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে তালে তাল দিয়ে গেছে। অর্থাৎ   আমেরিকা যা করে করুক, পরোক্ষে এভাবে মেনে নিয়েছিল। আর অন্য দিকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যাপক কোন বাণিজ্য যেটা ১৯৪৫ এর আগের দুনিয়ায় যা কোনদিন ছিল না  তা এবার পূরণে এক বিশাল গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা চালু করতে বা তার নিয়ন্ত্রক বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এদের জন্ম দেয়া হোক;  আর  তা আমেরিকা গড়ে তুলুক এটাই ইউরোপ মনেপ্রাণে চেয়ে ও সাপোর্ট করে গেছিল। তাই আমেরিকা এভাবে এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম চালু করে নিতে পেরেছিল।
    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক জন্মের টানা ২২ দিনের জন্মসভার হোটেলে বসবাসে সোভিয়েত ইউনিয়নও আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত থেকেছিল; অংশ নিয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৫ সাল থেকে এর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা শুরু হয়ে গেলে তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আর চাঁদা দিয়ে সদস্যপদ নেয় নাই বা নিতে আসে নাই। আবার কোনো বাধাও দেয়নি। কেন কী হয়েছিল, কেন সোভিয়েত ইউনিয়নের এমন সিদ্ধান্ত তা প্রকাশ্যে, স্টালিন তখনো জীবিত ও ক্ষমতাসীন- তা সত্ত্বেও কোথাও তিনি তা জানাননি। লিখিত কিচ্ছু নেই। তবে আমেরিকা তার নয়া গ্লোবাল অর্ডার নিয়ে  ঠিকই এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই থেকে টানা পঁচাত্তর বছর পরে আমেরিকা এখন এক বুড়া সিংহ যার যৌবন কেটেছে ‘রুস্তমি’ করে। যখন সে কোন কিছু চেয়েছে জানলেই তখন অনেক কিছু হয়ে যেত। সেসব দিন আর নাই। এর বড় কারণ এখন আমেরিকা কাউকে দুর্নীতির  অজুহাতে ধরে অনুগত করতে বেকায়দায় ফেললে এটাই সুযোগ হয়ে উঠে – এই সুযোগে চীন বিপুল অনকাঠামো নিয়ে সে দেশে প্রবেশ করে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকই একমাত্র ও একচেটিয়া বিকল্পহীন সেসব দিন আর নাই। ওদিকে ইতোমধ্যে আমেরিকান আমাদের মত দেশকে অবকাঠামো বিনিয়োগ দিবে সেই সক্ষমতাও শুকিয়ে আসে।

    চলতি শতক বা দুই হাজার সাল থেকে আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা যে ঢলে পড়ছে তা আর লুকিয়ে রাখা যায়নি। বিশেষ করে আফগানিস্তানে ফলহীন যুদ্ধে একতরফা অর্থ ঢালার পর থেকে আরো মারাত্মকভাবে। আর এর বিপরীতে চীনের উত্থান এবং সমৃদ্ধ ও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে চীন সেই নেতৃত্বের জায়গা নিতে উঠে আসা, সেটাও স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল।
    মজার কথা হলো, ওবামা আমল (২০০৯-২০১৬) পর্যন্ত যত প্রেসিডেন্ট তারা কেউ স্বীকার করেননি যে, চীন উঠে আসছে, আমেরিকা বুড়া সিংহ হচ্ছে। এই বাস্তব সত্য স্বীকার না করাটাই যেন আমেরিকান সব প্রশাসনের অফিসিয়াল অবস্থান। একমাত্র কিছু ব্যতিক্রম দেখা যায় জিবিগনিউ ব্রেজনিস্কি যিনি চীন-আমেরিকা সম্পর্ককে প্রথম (১৯৭৮) পারস্পরিক স্বীকৃতির রূপ দিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলেন, তার বেলায়। যখন তিনি ছিলেন (১৯৭৭-৮১) প্রেসিডেন্ট কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (NSA)। তিনি খোলাখুলি চীনা উত্থান প্রসঙ্গে নিজের বইয়ে লিখেছেন। এমনকি ওবামাও আমেরিকান নেতৃত্ব আরো বজায় থাকবে কি না এ নিয়ে সেকালেই যেসব প্রশ্ন উঠে গেছিল তা তিনি মানেন না দেখাতে উলটা দাবি করে বেড়াতেন যে, আমেরিকাই আরো বহুদিন গ্লোবাল নেতৃত্বে থেকে যাবে।

    কিন্তু কেন এখানে চীনের গ্লোবাল নেতৃত্বে উত্থান বা আমেরিকান বুড়া সিংহ হয়ে যাওয়ার স্বীকার-অস্বীকার নিয়ে কথা তুলছি?
    কারণ উপরে উল্লিখিত ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনে এবারের ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফে’ কুগেলম্যানের সাথে যৌথভাবে লেখা একটি আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। ওতে সহলেখকের নাম আনু আনোয়ার [Anu Anwar], জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির যিনি পিএইচডি প্রার্থী। আর ঐ লেখার শিরোনাম হল “আমেরিকার বাংলাদেশকে নিয়ে বাজি ধরা উচিত” [America Should Bet on Bangladesh]। আর উল্লেখ্য যে এ’লেখায় চীনের চেয়ে আমেরিকা অক্ষম হয়ে পড়েছে এর স্বীকারোক্তি করা হয়েছে। সেসব প্রসঙ্গে ঢুকব এখন।

     কিন্তু লেখার প্রসঙ্গ কেন এমন?
    গত মাসে, মানে নভেম্বরের মাঝমাঝি এক আমেরিকান ডেপুটি সহকারী মন্ত্রী (সাউথ এশিয়া) কেলি কেইডারলিং [Kelly Keiderling] বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন কোনো এক বহুরাষ্ট্রীয় সভায় যোগ দিতে। ফিরে যাওয়ার আগে তিনি ডেইলি স্টারকে এক সাক্ষাৎকার দেন যার প্রসঙ্গ হল – তিনি দাবি করেন, আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টে বাংলাদেশ আলাদা গুরুত্ব লাভ করেছে, যে কারণে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এখন থেকে আর ভারতের সাথে একই ডেস্ক থেকে দেখাশোনা করা হবে না। এতে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল যে, বাংলাদেশকে আর ‘ভারতের চোখ দিয়ে’  দেখা আমেরিকা  বন্ধ করেছে। তাই কুগেলম্যান ও আনু আনোয়ারের যৌথ লেখাটা হল, সেই বক্তব্যের গুরুত্ব আরো বিস্তারিত একটা সাফাইয়ে তুলে ধরা।
    ওই যৌথ লেখা নিয়ে কোন সেন্সিবল বাংলাদেশের যে প্রতিক্রিয়া হবে সবার আগে তা শিরোনাম আকারে বলে রাখি। বাস্তবে ফরেন পলিসির এই আর্টিকেল ভারতের চোখ দিয়ে আমেরিকার দেখার অভ্যাস ত্যাগ করা দূরে থাক, বরং আরো পোক্তভাবে ভারতের তথাকথিত নিরাপত্তাস্বার্থের চোখ দিয়েই বাংলাদেশকে দেখেছে। মানে ভারতের তথাকথিত নিরাপত্তাস্বার্থ বাংলাদেশ কতটা দেখবে অথবা না, সেই আলোচনাই ওখানে করা হয়েছে।

    আগাম অনুমান  
    কোন লেখা শুরু করার আগে লেখকের কিছু আগাম অনুমান সেখানে থেকে থাকে। সেই অনুমানটা আমরা এখানে দেখব। যেমন আনুদের লেখাটা সে অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে আছে তা এখানে আমরা পাব। আনু লিখছেন, “ভবিষ্যতের কোনো সঙ্কটে বাংলাদেশ যদি চীন অথবা ভারত কোনোটার পক্ষ নিতে হয় অথবা  কোনো নিজস্ব ভূমিকায় হাজির হয়, তা সামরিক অথবা কূটনীতিক যাই হোক না কেন, তাহলে তা এঅঞ্চল বিপদে পড়ার মত ভূরাজনৈতিক পরিণতি ডেকে আনবে [If Bangladesh were to take the side of China or India, or to exert any role, whether diplomatic or military, in future crises, there would be considerable geopolitical consequences for the region. অর্থাৎ মূলকথা বাংলাদেশের নিজের ভুমিকা নেওয়াটাই ভারতের জন্য হবে মারাত্মক – এটাই তিনি বলতে চাইছেন।

    “If Bangladesh were to take the side of China or India, or to exert any role, whether diplomatic or military, in future crises, there would be considerable geopolitical consequences for the region.”

    এখানে একটি কথা বলে রাখি। এ লেখাটায় জিও-পলিটিক্যাল [geopolitical] এই অস্বচ্ছ শব্দটা যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে একেবারে বিরক্তির পর্যায়ে।  এমনিতেই যারা ‘জিও-পলিটিক্স’ শব্দ ব্যবহার করেন তাদের ওপর ভীষণ বিরক্তি লাগে। মনে হয় এসব মানুষের যখন কোনো কিছু বুঝতে বা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিজের ক্ষমতা টের দেয়, তখন এরা সোজা সেখানে জিও-পলিটিক্স শব্দটা ব্যবহার করে পার পেতে চায়। ফলে এক অর্থহীনতা তৈরি করে। অথচ তারা কোথাও কোন রাষ্ট্রের (কূটনৈতিক) সিদ্ধান্তগুলো বা ততপরতার কারণে যখন  তার স্থানীয় পড়শি রাষ্ট্রের উপরে এর প্রভাব পড়া শুধু নয়, তাতে শুধু আঞ্চলিকও নয় একেবারে গ্লোবাল পর্যায়েও প্রভাব পড়ে – এরা সেই গ্লোবাল প্রভাব কথাটাকে বুঝতে বুঝাতে না পেরে সম্ভবত সেটাকে “জিও-পলিটিক্স” বলে চালাতে চেয়ে থাকে।
    এর পেছনের মূল কারণ দুনিয়ায় ক্রমেই গ্লোবাল হয়ে ওঠা অর্থনীতি। এতে সব কিছুই এখন গ্লোবাল; মানে কোনো কিছুই আর স্থানীয় থাকছে না যেহেতু বাণিজ্য এখন গ্লোব-জুড়ে মানে গ্লোবাল হয়ে উঠেছে; ফলে পণ্য-বিনিময়ও গ্লোবাল রূপ নিয়েছে। তাই একটি ভূগোলে (জিও) কিছু একটা ঘটলে এর প্রভাব-পরিণতি স্থানীয় থাকছে না, বরং স্বতঃই তা গ্লোবাল হয়ে উঠছে।

    ঠিক আছে, তাহলে লেখক এখন কী নিয়ে উদ্বিগ্ন? বাংলাদেশের সামর্থ্যবান হয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন?  সেটাই বা কেন? কারণ প্রধান প্রশ্ন, তা হলে এর মধ্যে আমেরিকান স্বার্থটা কী? বাংলাদেশ সামর্থবান হলে যদি ভারতের ক্ষতি হয়ে যায় তার মধ্যে আমেরিকান স্বার্থটা কী? এবং কোথায়?

    আসলে এখানে আমেরিকার সরাসরি কোনো স্বার্থ নেই। স্বার্থটা মূলত ভারতের আর এটিই আমেরিকার উদ্বেগের কারণ। এই হলো আমেরিকার ধরে নেয়া অনুমান বা নিজের স্বার্থসংক্রান্ত বুঝ। মানে আবার বোঝা যাচ্ছে তা হলে, আমেরিকার বাংলাদেশের জন্যও কোনো উদ্বেগ নেই।

    নিজের নয়, কিন্তু ভারতের স্বার্থ নিয়ে আমেরিকা উদ্বিগ্ন কেন? জবাব হল, আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে যা কিছু ভারতীয় স্বার্থ, এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন।

    তাহলে দাঁড়াল যে, এই আর্টিকেলটা বাংলাদেশ নিয়ে মনে হলেও আসলে এটা ভারতের স্বার্থরক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন আমেরিকার পক্ষে লেখা এক আর্টিকেল। তার মানে, সেই একই পুরান কথাটাই হল যে, এখানেও আসলে আমেরিকার ভারতীয় প্রিজমের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশকে দেখছে – সেই পুরনো অভ্যাসের ধারাবাহিকতা। সেই ২০০৭ সাল থেকে চলে আসা আমেরিকার পুরনো কায়দাটাই।
    তা হলে যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, ‘বাংলাদেশ যদি চীন অথবা ভারত কোনোটার পক্ষ নেয় মানে নিজের কোনো ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়,…তো খারাপ ভূরাজনৈতিক পরিণতি ডেকে আনবে’  – এর মধ্যে সারকথাটা হল, বাংলাদেশ যদি চীনের পক্ষ নেয় বা আরও নিজের কোনো ভূমিকা নিয়ে হাজির হয় – এসব ক্ষেত্রে এক উদ্বিগ্ন আমেরিকাকে আমরা দেখতে পাচ্ছি।

    অথচ কথাটা একেবারেই সোজা।  চীন-ভারত দ্বন্দ্বের ইস্যুতে এমন দুটোর মধ্যে বাংলাদেশ ঠিক কী করবে তা যাই করুক সেটা তো বাংলাদেশের একান্ত সিদ্ধান্ত এবং স্বভাবতই বাংলাদেশ চাইবে তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিজের কাছে রেখে দিতে। এমনিতেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সঠিক অবস্থান হবে কোন দুপক্ষের বিবাদে কোনই পক্ষ না নেয়া; এ বিষয়ে তাদের উভয় থেকে দূরে থাকা।

    আর এখানে আবার আমেরিকা চাচ্ছে আমরা যেন ভারতের পক্ষে থাকি, যেটা অ্যাবসার্ড ও অলীক। আর সেটা কোন ভারত বা কোন আমেরিকা? যে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে?  আহা রে কিউট বাবুটা! সত্যি এ এক অদ্ভুত আবদার!

    এ ছাড়া এই প্রসঙ্গে আরেকটা মজার দৃশ্যপট পরীক্ষা করা যাক। আসলেই কি চীন-ভারত কোনো সঙ্ঘাতে খোদ আমেরিকাই ভারতের পক্ষে দাঁড়াবে? যুদ্ধ করবে? সত্যি?  এটা তো সুখে কান্না চলে আসার মত বেবি!  আচ্ছা, দুই বছর আগে লাদাখে চীন-ভারত সীমান্ত সঙ্ঘাতে কমপক্ষে ২০ ভারতীয় সৈন্য নিহত ও বহু আহত হয়েছিল (যখনিকার ভারতীয় সৈন্যদের কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বা কান্নার দৃশ্যের ভিডিও নেটে প্রায়ই প্রকাশিত হতে দেখি আমরা), সেই উত্তেজনার সময়েও কি আমেরিকা ভারতের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল? প্রশ্নই আসে না। আমেরিকা আসেনি। এমনকি আমেরিকার পক্ষ থেকে ভারতকে কোন সান্ত্বনাবাণী দানের কথাও আমরা জানি না। তাহলে? আমেরিকা আসলে কার পক্ষে? আর আমরা কোন পক্ষ নিব তা নিয়ে আমেরিকা উদ্বিগ্ন হওয়া কী সাজে???  টু উ উ মাচ!

    এ নিয়ে ইদানীংকালের প্রশাসন, বাইডেন প্রশাসনের দুর্গতি আরো ভয়াবহ। একালের এই আমেরিকা এখন সব ব্যাপারে আসলে লিম্ব মানে ঝুলে থাকে, কোনো পরিস্থিতিতে কোন  দিকে নড়ে না। যেমন আমেরিকান (Countering America’s Adversaries Through Sanctions Act) বা CAATSA আইনে কেউ রাশিয়ান এস-৪০০ মিসাইল কিনলে সেই রাষ্ট্রের উপর আমেরিকান অবরোধ আরোপ হবে। সে বিচারে এমন মিসাইল কেনায় ভারতের উপরে অবরোধ আরোপ হয়ে যাবার কথা। কিন্তু তা কী স্টাটাস অবস্থায় আছে কেউ ঠিক জানে না- ব্যাপারটা ‘লিম্ব’ হয়ে ঝুলে আছে।
    আবার ওদিকে তাইওয়ান নিয়ে অযথা খোঁচাখুঁচি ব্যাপারটা আবারো একেবারে ছেচড়ামোর পর্যায়ে নেয়া হয়েছে। “এক চীননীতি” [One china policy] মানে হল তাইওয়ান আলাদা দেশ নয়;  বরং একই চীনা ভূখণ্ডের অংশ – এটা কোন রাষ্ট্র না মানলে সে রাষ্ট্রের সাথে চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক করে না। সেই বিচারে ১৯৭১-৭৭ সাল পর্যন্ত নানান ইস্যুতে দীর্ঘ আপস আলোচনার পরে আমেরিকার এক চীননীতি মেনে নিয়েই চীন-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ১৯৭৮ সালের শুরু থেকে।
    এভাবেই দীর্ঘ পথ চলার পরে  ট্রাম্পের আমলে এসে তিনিই প্রথম এক চীননীতি মানি-মানি না টাইপের লিম্ব তৈরি  করেন। । শেষে এবছর গত  অক্টোবর মাসে এসে চীন তাইওয়ান ইস্যুতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করলে বাইডেন এবার তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুলেভানিকে দ্রুত চীনের সাথে বৈঠকে বসেই সোজা ১৯৭৮ সালের এক চীননীতিটাই বাইডেনের আমেরিকা এখনো বজায় রেখেছে বলে ঘোষণা দিয়ে দিলেন। এভাবে চীনের সব ক্ষোভ মিটিয়ে দিলেন। কিন্তু আবার গত দুই সপ্তাহ ধরে পুরানা চুলকানি! বাইডেন তার ‘গণতন্ত্র সম্মেলনে’ এবার তাইওয়ানকেও রাষ্ট্র হিসেবে দাওয়াত করেছেন।  অথচ তাইওয়ান জাতিসংঘের সদস্য নয় ঐ ১৯৭১ সাল থেকে। যখন থেকে সেটা কেড়ে নিয়ে মাওয়ের চীনকে আসল চীন বলে ভেটোসহ ঐ সদস্যের হকদার বলে মানা হয়েছিল। তাই মূল চীনাভুখন্ডের একচীন নীতি জাতিসংঘের চোখেও ভ্যালিড। এটা স্রেফ কোন গোয়ার্তুমি নয়। )  তাই আবার খামোখা টেনশন! অর্থাৎ এ কালের  বুড়া সিংহ  আমেরিকা  যে মুরোদ হারাচ্ছে তার আরেক প্রমাণ হল এসব ছেচরামো। এরই আরেক প্রকাশ হল, সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বারবার ঝুলে থাকতে সবচেয়ে ভালো পারে!

    বাংলাদেশ কেন চীনের বিনিয়োগ পাওয়ার দিকে ঝুঁকেছে তা বর্ণনা করতে গিয়ে আনু নিজেই বলছেন, “চীনের অল্প সময়ের ভেতর বিপুল বিনিয়োগ সমাবেশ ঘটানো বা জোগাড়ের ক্ষমতা এবং তাও আবার তুলনামূলক অল্প কিছু শর্তে। যেটা নয়াদিল্লি তো বটেই ওয়াশিংটনেরও কম্ম নয়, তাদের এমন মুরোদ নেই” [Bangladesh, like many countries housing BRI investments, is attracted to Beijing’s ability to quickly deploy large amounts of capital with relatively few conditions. This is not something that New Delhi—or, for that matter, Washington—is able to do.]”।

    “Bangladesh, like many countries housing BRI investments, is attracted to Beijing’s ability to quickly deploy large amounts of capital with relatively few conditions. This is not something that New Delhi—or, for that matter, Washington—is able to do.”

    আমার মনে হয়, লেখক আনু আনোয়ারের  এত খোলাখুলিভাবে চীনের চেয়ে আমেরিকার অক্ষমতার কথা এই কঠিন সত্যকে প্রকাশ করা, কোনো আমেরিকান লেখায় আগে আসেনি। এ্ইটা বুড়া সিংহের নিজেকে বুড়া হিসাবে  এক আপন স্বীকারোক্তি!

    তবু লেখক এখানেই থামেননি। পরামর্শ দিয়েছেন আমেরিকাকে আবার তার যৌবন কালের মতো নয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনতে [By funnelling more investments into Bangladesh……]। কারণ একথাটা অবাস্তব তিনি জানেন। কিন্তু এটা বলা ছাড়া তার লেখাটাই দাড়ায় না, অর্থহীন হয়ে দাড়ায়।  সবাই জানে, আমেরিকার সে ‘ব্যবসা’ মানে যোগ্যতা চলে গেছে বহু বছর আগেই। তবু ‘গপ্প ফলিয়ে বেড়ানো’ আমেরিকা ত্যাগ করেনি। গত জি-৭’ বৈঠকে সবাইকে সাথে নিয়ে তারা নতুন উদ্যোগে অবকাঠামো বিনিয়োগ আনবেন, যেটা নাকি আবার চীনা বেল্ট-রোডেরও প্রতিদ্বন্দ্বী হবে। কিন্তু এসবই গল্প যা এখন পর্যন্ত কোনো রকমের বাস্তব প্রকল্প হিসেবে শোনা যায়নি। তাই শেষে আনু নিজেই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, ‘চীনের মতো দ্রুত আর বিশাল বিনিয়োগ সমাবেশ ঘটানোর মুরোদ আমেরিকার নেই”।

    তাই সারকথায় ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের এই আর্টিকেলটা লেখা অথবা বাংলাদেশের আলাদা ডেস্কের কথা বলে লোভ দেখানো  – এসবই আসলে লিপ সার্ভিস বা কথার কথা। সিংহ বুড়া হয়ে গেলে তারা আর কী করে?  তবু তাদেরকে এসব চাপাবাজি করে যেতেই হয়। তাই এসব করেই চীনের বিরুদ্ধে “ভারত নাকি পরাশক্তি” একথা বলেই পরিচয় করিয়ে দিতে হয় আমেরিকাকে।

    খামোখা কূটনৈতিক শোডাউনঃ
    গত মাসের শেষ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এদিকে আরেক চাপাবাজি চলবে, একই কারণে। মানে ফরেন পলিসির আর্টিকেলের সাথে ঢাকায় ভারতের কূটনৈতিক নড়াচড়া সম্পর্কিত ঘটনা ততপরতার কথা বলছি। যেমন, দোরাইস্বামীর প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ, বিদেশ সচিব হর্ষবর্ধনের ৭ ডিসেম্বরে ঢাকা সফর  –  আর এসবই আগামী ১৬ ডিসেম্বর ভারতের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর উপলক্ষে।

    “বাংলাদেশ ভারতের সৃষ্টি, ভারতেরই ফসল, কাজেই বাংলাদেশ ভারতের প্রভাব বলয়ের বাইরে যায় কী করে” – ভারত যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো কথা উচ্চারণ করে তখন অলক্ষ্যে এ খামোখা বয়ানটাই তার কূটনীতিকরা তাই মনে মনে আওড়াতে থাকেন। অতএব চীন-ভারতের কোনো সঙ্ঘাতে বাংলাদেশ তো ভারতেরই, ভারতের প্রভাব বলয়ের জবাইযোগ্য এক নধর খাসি যেন!  কাজেই বাংলাদেশ আর যাবে কোথায়! এই দুই সপ্তাহ ধরে ভারতীয় স্বার্থগুলো এসব বয়ানেরই জপ করতে থাকবে।

    কিন্তু তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল, মানে কোন রিটার্ন কী আসবে? না, আসবে না। বরং ফলাফল একদম হবে শূন্য। এমনকি বর্তমান  হাসিনার বাংলাদেশও ভারতের পক্ষে যাবে না, মুভ করার সে সুযোগটুকুও নেই। বাস্তবতা এমনই। কিন্তু তাই বলে সে বাস্তবতার কথা আবার সরকারের দিক থেকে ভারতের কাছে মুখে উচ্চারণও করা হবে না। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ঢাকা সফর উপলক্ষে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিডিয়াকে বলছেন, “আমি ঢাকায় থাকলে তার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ হতে পারে”। কাজেই কী পরিমাণ প্রাণহীনভাবে এ’দুই সপ্তাহ কাটবে, এখান থেকে অনুমেয়; অর্থাৎ কেবল মুখেই বলা হবে না যে, বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে নেই। আর কার্যত এটা ভারতেরও পরিস্কার করেই অজানা নয়। তা হলে ভারত চীনের কাছে তার ‘হবু ও কথিত’ শিলিগুড়ি করিডোর অথবা সাত রাজ্য হারানোর কথা যে লেখক আনু তুলেছেন, তার কী হবে?

    আমেরিকান থিংকট্যাংকের দিগগজেরা আর কথিত ‘পরাশক্তি’ ভারত কী করে নিজেদের রক্ষা করবে, তা তো তাদেরই বিষয়। সাধারণভাবে বললে, এটা তাদের জবরদস্তিতে তোলা ইস্যুতে  খানিক এক ভীষণ উত্তেজনা মাত্র। আর বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন কোন মানুষ এর ভেতরে নিজেকে সংশ্লিষ্ট করে না। তাই সাধারণ মানুষের কাছে এটা মৃত এক ভারতীয় উদ্বেগ যাকে চাবুক মেরে জাগানোর চেষ্টা দেখছি আমরা। এমনকি যার শেখ হাসিনা সরকারের কাছেও কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। সত্য নয়।

    তবুও ঢাকায় দুই সপ্তাহ ধরে নয়াদিল্লি-ঢাকা কত কাছাকাছি, কত নিকটাত্মীয় ও বাংলাদেশ ভারতের প্রভাবাধীন তা প্রদর্শনের এ ধরনের কিছু ইমেজ ফাঁপা ডেকোরেটেড উত্তেজনা তৈরি করা হতে দেখব অবশ্যই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  গত  ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে যাবে না”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কেলি কেইডারলিং-কে জানতে হবে, বাংলাদেশে আমেরিকা বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে!

    কেলি কেইডারলিং-কে জানতে হবেঃ
    বাংলাদেশে আমেরিকা বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে!
    গৌতম দাস
    ২৬ নভেম্বর ২০২১
                                  Ambassador Kelly Keiderling
    আমেরিকান এক কূটনীতিক ও উপ-মন্ত্রী কেলি কেইডারলিং [Kelly Keiderling] বাংলাদেশে এসেছিলেন তাঁর অফিসিয়াল সফরে।  তবে সেটা এক বহুরাষ্ট্রীয় সম্মেলনে [Indian Ocean Rim Association ministerial meeting – IORA] , ঠিক বাংলাদেশের সাথে নয়। অর্থাৎ তাই সম্ভবত সরকারের উপদেষ্টা হিসাবে কেবল এক সালমন এফ রহমানের সাথে সাক্ষাতের কথা দেখেছি।  যাবার আগে তিনি ডেইলি স্টারের সাথে কিছু কথা বলেন, যা নিয়ে একটা রিপোর্ট ছাপা হয়েছে গত ২১ নভেম্বর। এই কেলি কেইডারলিং আসলে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া (বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা এই পাঁচ দেশ) বিষয়ক ব্যুরোর ডেপুটি অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি, যা আমাদের উপমন্ত্রী তুল্য।
    কেলির যে কথার উপর জোর দিয়ে এই সাক্ষাতকার তা হল – তিনি বলছেন, “সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার বাকী ৫টি দেশ থেকে ভারতকে আলাদা করতে বাইডেন প্রশাসন স্টেট ডিপার্টমেন্টে আমলাতান্ত্রিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে”। তিনি আরও বলেছেন, “অর্থনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ে” বাংলাদেশের আমেরিকার কাছে গুরুত্ব বেড়েছে। আর এই “ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ সম্পর্কে পুরনো ধারণা থেকে সরে আসছে যুক্তরাষ্ট্র”।
    সোজা করে বললে আগে দক্ষিণ এশিয়ার একই ডেস্কের মাধ্যমে ভারতসহ আরও পাঁচ দেশ বিষয়ক আমেরিকান স্বার্থ একসাথে দেখাশুনা করা হত। আর এখন এই “পাঁচ দেশকে ভারত থেকে আলাদা ডেস্কে নিয়ে, ভারতের নিচে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলা থেকে এদের মুক্ত’ করা হয়েছে। একথাই তিনি জানালেন।
    আর সমস্যা হয়েছে এখান থেকে। কেন?
    অনেকে এটাকে পড়েছে এভাবে যে এতে আমেরিকা ‘বাংলাদেশকে ভারতের চোখ দিয়ে দেখা থেকে’ আমাদের নিজেকে মুক্ত হয়েছে বলে।
    সরি, এটা একেবারেই ভুল রিডিং!
    বরং প্রধান ও প্রথম কথা হল, আমেরিকা বাংলাদেশে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। অন্তত, ২০০৭ সালের শুরু থেকেই। কাজেই বাংলাদেশে ‘আমেরিকান মূল সংকট বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকার’।
    কথা অনেকঃ
    ১। কেন ২০০৭ সালে ক্ষমতা দখলঃ
    কেন এই ক্ষমতা দখল করানো হয়েছিল এর কোন ‘গ্রহনযোগ্য’ ব্যাখ্যাও আমেরিকা আমাদেরকে দেয় নাই। হয়ত নিমরাজি ভাবে মেনে নেয়া যেত যদি ফলাফল খুবই প্রয়োজনীয় ও কাজের বা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ লাভজনক মনে হত। যার কোনটাই হয় নাই, তা ছিলও না। শুধু তাই না বরং মানুষ মনে করে, আজকের সরকারের বিরুদ্ধে যা কিছু মুখ্য বড় বড় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এর ভিত্তি তৈরি হয়েছে সেসময়ে। যেভাবে সরকারকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল আর পরে বিরোধিদের দমনকে ও করার পদ্ধতিকে উতসাহ ও অনুমোদন দেয়া হয়ে এসেছে। এব্যাা্পারে শক্ত শব্দে বলব, প্রধান আসামি বেপরোয়া আমেরিকা! জঙ্গিদমন, চোরাচালানি দমন, মাদক পাচারকারি দমন ইত্যাদি এসবের উসিলায় রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করতে দেয়া হয়েছে।
    ২। বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছেঃ
    আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর’ এই একান্ত উদ্দেশ্য হাসিলের পক্ষে ভারত কাজ করে দিবে। আর এর বিনিময় পাওনা মিটাতে ভেট হিসাবে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। কেন? এর দায় কে নিবে? আর কেন এই আমেরিকাকে বাংলাদেশ আবার বিশ্বাস করবে?
    আমেরিকা তুল্যহীন গ্লোবাল শক্তি ছিল। ছিল বলেছি। সেই শক্তি সে দায়িত্বজ্ঞানহীন বেপরোয়াভাবে ব্যবহার করেছে। এটা এতই বেপরোয়া যে এভাবে অপব্যবহার করে আমেরিকার নিজের কী লাভ হয়েছে হচ্ছে কিনা তাও যাচাই করা হয় নাই। এর কোন মুল্যায়ন আজ এক দশক পেরোলেও তা কোথাও দেখা যায় নাই। কে দায়ী, কী জবাবদীহিতা এর – এসবের কোন বালাই নাই।
    ৩। তাহলে আমেরিকা যদি এমন বেপরোয়া যা খুশি করতে থাকে তাকে বাংলাদেশের জনগণ নুন্যতম আস্থা-বিশ্বাস রাখবে কেন?
    এই শতকে চীনা উত্থান প্রসঙ্গে আমেরিকার সরকারি [DNI বা Office of the Director of National Intelligence] স্টাডি গবেষণা রিপোর্ট গত ২০০৮ সাল থেকে প্রতি পাঁচবছরে যতগুলা Global_Trends_Final_Report প্রকাশিত হয়েছে – এর এমনকি যা ২০০৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বের হয়েছে তাতে কোথাও এমন পরামর্শ নাই যে
    ক. চীন ঠেকানো, মানে চীনের এই অর্থনৈতিক উত্থান ঠেকানো আদৌ সম্ভব। বরং irreversible মানে কখনও তা পুর্বের জায়গায় ফিরবে না – বলা হয়েছে।
    খ. ভারতকে চীন ঠেকানোর ঠিকা দিলে আমেরিকার কোন লাভ হবে, বাস্তবতা বদলাবে।
    গ. সর্বশেষ 2040 Global_Trends_Final_Report যা ২০২১ সালে প্রকাশিত সেখানেও এমন পরামর্শের কথা জানা যায় না।
    ৪। অযোগ্য আমেরিকান প্রশাসনঃ
    গত ২০১২ সালে আমরা দেখেছিলাম আমেরিকার বিশ্বব্যাংকের দিয়ে পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলা দায়ের। কিন্তু কোন কিছু আদালতে প্রমাণ হবার আগেই ২০১৭ সালে সেই মামলা বিশ্বব্যাংক আদালত থেকেই প্রত্যাহার করে নেয়। প্রশ্ন হল এই কাজ কে করেছিল? এত কাঁচা কাজ? দুর্বল ইমান?  এর মানে তো আমেরিকান উদ্দেশ্যই প্রশ্নের সম্মুখীন! মামলার যদি মেরিট-ই না থাকে সে মামলা কেন করতে যাওয়া? এ তো এক অযোগ্য আমেরিকান প্রশাসন!
    এতে ফলাফল এই যে চীন তো এরই অপেক্ষায় ছিল যে অবকাঠামো ঋণ নিয়ে সে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প হয়ে বাংলাদেশের মত সব দেশেই ঢুকবে। চীন সেই সুযোগ পেয়েছে ও নিয়েছে।  তবু বাংলাদেশ ঢুকতে একটু সময় লেগেছে। গত ২০১৬ সালে চীনের মহাপ্রবেশ ঘটে যায়। যোগ্য হিসাবেই। তবে এতে আগে হত অন্তত টেন্ডারে কাজ, এখন কিছুর বালাই নাই। এই আর কী? তাহলে একোন আমেরিকা দুনিয়ায় একালে হাজির এবং সে আবার বাংলাদেশে উত্থিত হতে চাচ্ছে?
    ৫। বাংলাদেশের জন্য আজ সবচেয়ে চরম ক্ষতিকর ঘটনাঃ
    বাংলাদেশের জন্য আজ সবচেয়ে চরম ক্ষতিকর ঘটনা যেটা আমেরিকা ঘটিয়েছে বা আমেরিকার কারণে ঘটেছে তা হল ভারতের হাতে বাংলাদেশকে তুলে দেওয়া এবং ওর পরের যাবতীয় পরিণতি। যা বাংলাদেশ এখনও চরমভাবে ভুগতেছে। গণভবনে কোন রুম বাকি নাই যেখানে সঙ্গোপনে কোন সভা করা যায়, এই হল দুর্গতির সর্বশেষ। ভারতকে ছাড়তে ছাড়লেও কম্বল ছাড়ে না।
    এর প্রধানতম দায় এক চরম দায়ীত্বজ্ঞানহীন বেপরোয়া আমেরিকার। যে মনে করে সে সব কিছু করতে পারে। মানুষের রাষ্ট্র এখান থেকেই বিপদ্গামি হয় যখন সে ভাবতে শুরু করে সে সব পারে। প্রকৃতিগত বা অবজেকটিভ বাধা-নিষেধ যাকে কমন মানুষের ভাষায় আল্লাহর বাধা নিষেধও বলে এমন কোনকিছুকেও যে আর পরোয়া করে না – এর ধ্বংস তো অনিবার্য!
    সেই আমেরিকা নাকি আবার উঠে দাড়াতে ফিরে আসতে চাইছে? এর কী কোন আপিল আছে না থাকতে পারে? সময় থাকলে আমেরিকান নেতারা দুদন্ড ভেবে দেখতে পারেন।
    ৬। আমেরিকা এখনও ভারতকে বগলে নিয়েই এশিয়াতে দাঁড়িয়ে আছে। অন্তত পাশে ভারত নিজের পায়ে দাঁড়ায় আছে, আমেরিকা এটাও পারে নাই। এমন দুরত্বের ইঙ্গিতও কোথাও দেয় নাই। তাহলে কেন বিশ্বাস করব? কোন আমেরিকাকে বিশ্বাস করব? আমেরেইকার স্ট্রাটেজিক বন্ধু হিসাবে ভারত থাকতেই পারে। কিন্তু এটা তো বাংলাদেশকে ভারতের হাতে বন্ধক দেয়া আমেরিকা! এমন ভারত-আমেরিকান সম্পর্কের বিনাশ ও ধবংস তো যেকোন ট্রু (true) বাংলাদেশি সবার নুন্যতম কাম্য।

    উপসংহারঃ

    কাজেই আমেরিকা বাংলাদেশকে আলাদা ডেস্কে দিয়েছে কিনা হু কেয়ারস? আগে বাংলাদেশের প্রায় নব্বইভাগ মানুষের মনের খবর নেন। কেন এটা একালে এত ভারতবিরোধী? এটা সেই দেশভাগের বিরোধিতা একেবারেই নয়। এটা তো ২০০৭ সালের আগে কখন এমন পর্যায়ের ছিল না। কেন ২০০৭ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে এমন হল? ২০১৪ সালের আগে তো মোদির হিন্দুত্ববাদ ছিল না!
    লক্ষ্য করবেন আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের দিক থেকে কথাগুলো তুলি নাই। তাহলে?
    আসলে আমেরিকারই জবাবদীহিতা নাই। তাই সে চরম দায়ীত্বজ্ঞানহীন বেপরোয়া। আমেরিকানদের এদিকটাই মুখ্য করে বলেছি এটাই এর ধবংসের কারণ হবে, যদিনা এর আগে নিজেকে সংশোধন, নিজের প্রায়শ্চিত্ত শেষ করতে সুযোগ পায় বা নিতে পারে।
    চীনা উত্থান হয়েছে – সেটা ঠিক আছে। কিন্তু আমেরিকান গ্রহণযোগ্যতা তাই বলে কেন থাকবে না? যদিনা সে বেপরোয়া হয়!

    সাহস থাকলে আমেরিকা নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে পারে কেন মুসলমানেরা এমন পর্যায়ের আমেরিকাবিরোধী!

    বাংলাদেশে আমেরিকা বিশ্বাযোগ্যতার সংকটে! এটাই মূলকথা।
  • এক মফস্বলী জেনারেল

    এক মফস্বলী জেনারেল

    গৌতম দাস

    ০৮ নভেম্বর ২০২১, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Nt

     

    –China Attempting To Reduce India’s Influence In Myanmar, Sea: Bipin Rawat

     

    ভারতের জেনারেল বিপিন রাওয়াত [General Bipin Rawat], তার পদবি হল চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ, সিডিএস বা CDS; যা ভারতের তিন বাহিনী প্রধানদেরও উপরের এক পদ ও পদবি। এই পদটি সম্প্রতি তৈরি করা হয়েছে। জেনারেল রাওয়াত ভারতের যখন (২০১৭-১৯) আর্মি চীফ ছিলেন তখন এটা মোদির হাতে তৈরি হচ্ছিল।  বলা যায় আর্মিকে হিন্দুত্ববাদ ও আরএসএসের আলোতে ছাপ দিয়ে সাজানোর প্রথম পদক্ষেপ এটা।  তাই এই পদ সৃষ্টি হলে এর প্রথম পদাধিকারী হয়েছেন ততদিনে অবসর নেয়া ভারতের আর্মি চিফ এই জেনারেল বিপিন রাওয়াত। আর ওর শুরু, গত ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে।

    তিনি সম্প্রতি আসাম সফরে গিয়েছিলেন; গত ২০ অক্টোবর এক অভ্যন্তরীণ সভা-সেমিনারে বক্তৃতা দিতে। ঘটনা হল – আসাম পুলিশের এক অনুষ্ঠান ছিল সেটা। সভাটা হল – “প্রথম রবিকান্ত সিং মেমোরিয়াল লেকচার সিরিজ” যা আয়োজিত হয়েছিল ভারতের আইপিএস অফিসার ও পুলিশের এসপি রবিকান্ত সিং স্মরণে। তিনি আসামে তাঁর কাজের জেলা তিনসুকিয়ায় বিচ্ছিন্নতাবিরোধী তৎপরতা দমনের দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র দল ‘উলফা’র হাতে তিনি খুন হয়ে যান। এসবই তাই আসামের আভ্যন্তরীণ ঘটনা।

    জেনারেল রাওয়াত ছিলেন সেই স্মরণসভার প্রধান বক্তা। পুরো অনুষ্ঠানে এক তিনি ছাড়া বাকি সবাই ছিলেন সিভিলিয়ান। আর সাথে বক্তৃতার স্টেজে দেখা যাচ্ছে পেছনের টাঙানো ব্যানারে বাংলাদেশে বর্তমান ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দোরাইস্বামীর নাম, মানে তিনিও সেখানে বক্তা ছিলেন।

    যে উদ্দেশ্যে এই অনুষ্ঠান, তার সাথে ওর দুই প্রধান বক্তা এবং প্রধান বক্তার বক্তব্যের বিষয় ইত্যাদি এসবগুলোর সাথে সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন। বরং দেখা গেছে, খামোখা কোথা থেকে বাংলাদেশ সেখানে আলোচনায় এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেউ না হয়েও। কেন?

    কেন বাংলাদেশঃ
    “Assam at crossroads: Geopolitical events its Geographical events in its neighbourhood impacting North East India” – এই ছিল সভায় আলোচ্য বিষয়। বাংলা করলে হয়, নর্থ-ইস্ট ইন্ডিয়ার পড়শি দেশের জিও-পলিটিক্যাল ঘটনায় আসাম বড় বিপদে আছে, এরকম।

    সেখান থেকে  বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট মূল কথাগুলো তুলে আনলে, জেনারেল রাওয়াত বলছেন, ” মিয়ানমার, বাংলাদেশে চীন হানা দিচ্ছে এবং তা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে (আর নট ইন ইন্ডিয়াস ইন্টারেস্ট’)। আরো বলছেন, “আমাদের সাউথইস্ট এশিয়া ও ভারত মহাসাগরে চীন ঢুকে পড়ছে তার বেল্ট রোড প্রজেক্ট দিয়ে। সম্প্রতি আমরা দেখছি একটা ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে চীন এই অঞ্চলে আসছে”।

    এখানে বক্তব্যগুলো নেয়া হয়েছে হিন্দুস্তান টাইমস, আসামের নিউজ-লাইফটিভি ও স্ক্রল (Scroll)ওয়েব ভারতীয় পত্রিকা থেকে। এছাড়া এখানে আলাদা করে বাংলাদেশের বণিকবার্তা পত্রিকার নাম ও রিপোর্টের কথা উল্লেখ করতেই হয়। বিশেষত ভারতীয়  নিউজ বাংলাদেশে স্থানীয় বাংলা পত্রিকায় কী করে রিপোর্টিং করতে হয় এর অনুকরণীয় উদাহরণ হিসাবে। বাংলাদেশের অনেক মিডিয়া যেখানে বিপরীতে এটাকে ভারতীয় প্রপাগান্ডা করে অর্থ আয়ের উপায় হিসাবে নিয়েছে। তারা  “পছন্দের” ভারতীয় পত্রিকা বা ‘র’ এসাইন্ড নিউজের বাংলায় অনুবাদ করে বা অনুবাদের নামে যা খুশি লিখে ছাপিয়ে থাকে।  ঢাকার এমন অন্য বাংলা সব মিডিয়ার জন্য বণিকবার্তা এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত; যদি কেউ ভাল হতে চায় অনুসরণ করতে পারে।

    উপরে তুলে আনা জেনারেল রাওয়াতের কথায় ফিরে যাই, তার প্রথম বাক্য  ” মিয়ানমার, বাংলাদেশে চীন হানা দিচ্ছে এবং তা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে” – এই  বাক্যতেই তার কথা মিললো না।  যেমন চীন বাংলাদেশে ‘হানা’ দিচ্ছে, এই হানা দেওয়ার মানে কী?  চীন বাংলাদেশের কীভাবে হামলা দিয়েছে? কোন সামরিক হামলা করেছে নাকি? তা অবশ্যই না।  এছাড়া চীন বাংলাদেশে হানা দিলে বাংলাদেশ কি তাতে আপত্তি জানিয়েছে কারও কাছে নাকি? তা তো না।  এমনকি সে কথা কিন্তু রাওয়াতও আমাদের জানাচ্ছেন না। তাহলে?

    অথচ – এক. রাওয়াত নিজেই বলছেন, চীন অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। তার মানে ব্যাপারটা বাণিজ্যিক। তাহলে এটাকে রাওয়াত হানা দেওয়া [foray] বলছেন কেন?  মানে সাথে একটা সামরিক  ভাব-ইঙ্গিত তুলছেন কেন? এটা একে বাণিজ্যিক জিনিস তার ওপর ‘অবকাঠামো বিনিয়োগ’ কোনো বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নয় – ফলে গ্রহিতা দেশের জন্য খুবই কাম্য; যা  বাংলাদেশকে  দেওয়ার ভারতের  মুরোদ নেই, এখনো হয়নি। বরং পারলে এই বিনিয়োগ ভারত-ই চীনের কাছ থেকে নেয়। তাহলে রাওয়াত এটাকে চীনের বাংলাদেশে ‘হানা দেয়া’ বলছেন কেন? অবকাঠামো বিনিয়োগ দেয়া কী করে ‘হানা’ দেয়া হয়? সেটাও কি ঈর্ষায় বলা কথা? সে জন্য?  নাকি সম্ভবত  রাওয়াত কি সামরিক তৎপরতা আর অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে আসা – এ দুয়ের ফারাকই বুঝেন না? একটা বাণিজ্যিক তৎপরতাকে যদি তিনি সামরিক হানা দেয়া বলেন, বুঝেন, তাহলে বলতেই হয় চার স্টার জেনারেল হলে হবে কী তিনি এখনো এক “মফস্বলের লোকই’ রয়ে গেছেন।  মানসিক বৃদ্ধি-বিকাশ কিছুই ঘটেনাই।  মফস্বলিয়া মানে শহরায়ন হয় নাই। জ্ঞানবুদ্ধি, মুল্যাবোধে অপুষ্ট থেকে গেছে যার।  ভারতের মডার্নাইজেশন, এডুকেশন ধারা যথেষ্ট বিকশিত ফলে ওর সামরিক মান তো খারাপ মনে করার কিছু নাই। তাহলে জেনারেল রাওয়াতের বেলায় এমন কেন সে এক প্রশ্ন বটে। তবে আপাতত এটুকু বলা যায় – এটা কোন সামরিক জেনারেলের নুন্যতম স্ট্যান্ডার্ড নয়।

    আর এর মানে দাঁড়ালো জেনারেল বিপিন তো চীনের বিরুদ্ধে তার অভিযোগটা কী তাই তো প্রতিষ্ঠা করতে পারলেন না। চীনের বাংলাদেশে বাণিজ্যিক প্রভাব বাড়ানোর মুরোদ যদি থাকে ও প্রয়োগ হয় তা নিয়ে ভারতের কিছুর বলার নাই। আর যেকোন দেশ তা করবেই এবং তা বৈধ। তবে বড় জোর রাওয়াতের এনিয়ে ঈর্ষা হওয়া জায়েজ। কিন্তু তবু এই ঈর্ষা হতে হবে গোপনে বা মনে মনে অথবা আভ্যন্তরীণ গোপন নন-পাবলিক দলিলে।  কারণ, প্রকাশ্যে ঈর্ষা দেখানো  ভাল আদব ও রুচির পরিচয় নয়। তবে সবচেয়ে ভাল হবে চীনের যোগ্য প্রতিযোগী হয়ে আরো বড় বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশের দরজা খটখটানো।আর এই মুরোদ না থাকলে ভারতের চেপে যাওয়াই ভাল! নয় কী? দেখা যাচ্ছে জেনারেল বিপিন যেন জিদ করেছেন  যে তাঁর এই বোকা ব্যবহার আমাদের সামনে বের করবেনই!

    এমন মন্তব্য করেও কেন জেনারেল বিপিন রাওয়াত এমন বোকা বোকা ব্যবহার করতে পারেন আর সেটা কেন কেমন হল এর সম্ভাব্য কারণ খুঁজতে গিয়ে মনে হল, এটা এমনি এমনি সম্ভবত বুঝা যাবে না। তার ‘ভারতীয় মনগঠনে’ প্রবেশ করতে হবে।  একাজে আগে কিছু কথা আগাম ধরে নিতে হবে যেটা সম্ভবত তাঁর মনে ধরে নেয়া আছে। বছর কয়েক আগে ভারতের এক মিডিয়ায় দেখেছিলাম এক অনুমান যে, সারা দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই ফলে বাংলাদেশের উপরেও, মানে যেন বাংলাদেশ ভারতের তালুকদারির অধীনে আছে। নিশ্চিতভাবে ধরে নেওয়া এই অনুমানের উপর তারা লিখছিলেন। অনেক ভারতীয় মিডিয়ায় সেকালে দেখেছিলাম লেখা হয়েছে একইভাবে ও অভিযোগে যে, চীন সাউথ এশিয়ায় বিনিয়োগ নিয়ে ঢুকে পড়ছে। আর তাতে বাংলাদেশসহ সাউথ এশিয়া নাকি ভারতের বাগানবাড়ি – এটা আগাম ধরে নিতেই হবে। আর বাগানবাড়ি মানে মূল বাড়ির পেছনের যেমন বাড়ির মালিকের বাগানবাড়ি থাকে, বাংলাদেশ হলো ভারতের সেই বাগানবাড়ির অংশ। বাংলাদেশে মানে ভারতের সেই কথিত বাগানবাড়িতে চীন বিনিয়োগ নিয়ে এসে ঢুকে গিয়েছে।

    কেন ধারণাটা আমদানি করতে হল?
    কারণ এই উটকো ধারণাটা ছাড়া চীনের সাউথইস্ট এশিয়ায় বিনিয়োগ নিয়ে আসা- এটাকে নেগেটিভ বা খারাপ কাজ বলা যাচ্ছে না।  এটা ভারতের স্বার্থের বিরোধী কাজ তাও বলা যাচ্ছে না। অথচ এতে বেকুবিটা হল –  বাংলাদেশ কী করে ভারতকে বাগানবাড়ি হল? কে দিয়েছে, ও কীভাবে? এর সাফাই কে দিবে সে খবর নেই। কিন্তু এটা আগাম ধরে নেওয়া আছে।
    এখন বাংলাদেশ যদি ভারতের বাগানবাড়ির অংশ হয় তাহলে চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ ( রাওয়াত নিজেই বলছেন, ……a tremendous influx of Chinese investments to build community projects and infrastructure.) নিয়ে বাংলাদেশে আসা মানে চীনের ভারতের বাগানবাড়িতে আসাই হয় – আর সেই সুত্রে, তা তো চীনের বাংলাদেশে হানা দিয়ে আসাই হয় – তাতে বিপিন রাওয়াত বলতেই পারেন! নাকি?
    এ ছাড়া দুই নম্বর পয়েন্ট হল – রাওয়াত বলেছেন, “বাংলাদেশ অনেক চীনা অস্ত্র কেনে”। (…… countries have been the largest recipients of military-grade weapons from the Chinese)।
    হ্যা, তো কিনে! কিন্তু তাতে কী হয়েছে? বাংলাদেশের অস্ত্র কেনা কী বেআইনি? না কি?  ভারতও কী আমেরিকা, রাশিয়া বা ফ্রান্স, ইংল্যান্ড থেকে ‘মিলিটারি গ্রেড’ অস্ত্র কিনে না? আর এমন ক্রয়ের আগে কি ভারত প্রতিবেশী বাংলাদেশের অনুমতি নেয়? না। তাহলে  রাওয়াতের মনে এতে কী সন্দেহ জাগে তাতে আমাদের কী? আর অনেককে নিয়ে অনেকেরই নানা সন্দেহ থাকতেই পারে যা নিজ নিজ বাহিনীর অভ্যন্তরে কৌশলপত্রে থাকে ও এর অংশ হয়। তো  থাক  সেসব কথা। কিন্তু আসামের ঐ প্রকাশ্য সভায় তা উগরানোকেন? এটা কী কোন বুদ্ধিমানের কাজ? মানে এসব কী তাহলে বাংলাদেশকে শুনানো, ভয় দেখানোর জন্য?

    দিন সব একই রকম থাকেনা, বদলায়। তাই একালে বিপিন রাওয়াতের এসব ছেড়ে দেয়া উচিত। আগের এক লেখায় বলেছিলাম বোকা মানুষ জেনে না জেনে নিজেই নিজের শত্রু জন্ম দেয়, শত্রু খাড়া করে এবং শত্রুর মধ্যে বিশেষ সব আকার-বৈশিষ্ট্য তাতে এঁকে দেয়। আবার পরে এই মানুষই কান্নাকাটি করে যে, আমার শত্রু এমন কেন হলো! কাজেই রাওয়াতের বুদ্ধিমান হওয়া উচিত, এসব ‘কইরেন না।’ বাংলাদেশকে ভারতের শত্রুর আকার-বৈশিষ্ট দিয়েন না, নিজের খাতিরে।  ভারত চাইলে অবশ্যই এসব কাল্পনিক শত্রু কল্পনায় এঁকে চলতে পারে। এতে এক পর্যায়ে ভারত বাংলাদেশকে চীনের কোলে আশ্রয় নিতে ঠেলে দিতেও পারে। কেননা, অকারণে ও অত্যধিক অসহনীয় চাপ সৃষ্টি হলে যে কেউই নিরাপত্তার জন্য ছোটাছুটি করবেই। তাতে উপায়ন্তর না পেলে সে চীনকে বা যে কাউকে শক্তিশালী ও ভারতবিরোধী পাবে তাকেই ডেকে আনবে। এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই বলছিলাম ঠেলেন না!  কাজেই বাংলাদেশ ভারতের  কেমন শত্রু হবে সেটা নির্ধারণ বা নির্বাচনও ভারতের হাতেই আছে, রয়েই গেছে – এটা খেয়াল রেখেন।

    ভারতের আরো করণীয় কী?
    করণীয় হল – ১. আমরাও ব্রিটিশদের কলোনি ছিলাম যা থেকে ১৯৪৭ সালে মুক্তি পেয়েছি। কাজেই এরপর আমরা কোনোভাবেই ভারতের বাগানবাড়ি নই। সারা সাউথ এশিয়াও নয়। কথাগুলো ভারতের লিখে মনে রাখা উচিত। এছাড়াও লাস্ট ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন কখনোই নেহরুকে পরবর্তী ভাইসরয় করে দিয়ে যাননি। কারণ মাউন্টব্যাটেনই সর্বশেষ। কাজেই নেহেরুর মত  মিথ্যা কল্পনায় স্বপ্ন দেখা বন্ধ করেন। রাওয়াতের মত সবাই বন্ধ করেন যে, বাংলাদেশ ভারতের বাগানবাড়ি আর চীন সেখানে ‘হানা দিতে’ এসেছে।

    বাংলাদেশ ভারতের তালুকদারি নয়। ইঙ্গিতেও এটা সত্যি না, ভুল। তাই, প্রথমে মিথ্যা স্বপ্নের গল্প বা মিথ থেকে বের হয়ে আসেন। আর জেনে রাখেন, আপনারা আমাদের চাপাচাপিতে ভয় না দেখালে, পুশ না করলে, বাধ্য না করলে (আমরা জানি চীন-ভারত সামরিক সমস্যা বিতর্ক-বিরোধ আছে; তবে) আমরা সেই সামরিক বিরোধে কখনো কোনো পক্ষ নিব না। কারণ ওতে আমাদের ক্ষতি ছাড়া কোনো স্বার্থ নেই। এটা চীন বা কারো কোনো হবু প্ররোচনা বাংলাদেশের ওপর আসার আগে থেকেই আমরা নিশ্চিত, আমাদের স্বার্থ নেই। আর সস্তা বলে চীনের থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করি আমরা, সেটা এক জিনিস। কিন্তু এর মানে কোনো বিরোধে চীনের পক্ষে দাঁড়াতে হবে এমন মুচলেকা কোথাও দেইনি আমরা। এখন বাকিটা হলো বুদ্ধিমান ভারতের হাতে ও উপরে।

    কাজেই “আসাম নাকি ক্রসরোডে পড়েছে” – এটা আমাদের জানার কথা নয়। আমাদের কনসার্ণ না।  তাই যদি পড়েও থাকে এর মধ্যে বাংলাদেশ কেউ না এবং নেই। সবটাই আপনারা ভাইসরয় বা বাংলাদেশ আপনাদের তালুক এই- জাতের অসার কল্পনাপ্রসূত চিন্তার সমস্যা। আর নয়তো তা ভারত-চীনের কোনো সামরিক, ভৌগোলিক বা স্ট্র্যাটেজিক বিরোধ যার কোনোটার অংশ আমরা নই। তবে এই অজুহাতে আবার ২০০৮ সালের মত বাংলাদেশের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে চান? কে বসবে ঠিক করে দিতে চান? পরের ১২ বছরের জন্য কাউকে বসাতে চান? আসেন চেষ্টা করে দেখেন! তবে মনে রেখেন, কোনো ঘটনা দুনিয়ায় একই রকমভাবে দু’বার ঘটে না! কেবল আবার বলব, নিজের শত্রু কেমন হবে মানুষ নিজেই এর আকার-বৈশিষ্ট্যদাতা!

    সত্যি কথা সরাসরি বললে, বিপিন রাওয়াতের কথার আসলে মানে হয় না। প্রথমত বাণিজ্যিক আর সামরিক তৎপরতা বা স্বার্থের ফারাক তিনি পরিষ্কার বুঝেন ও মনে রাখেন বলে আর মনে হয় না।। যেমন ধরেন – আমরা কি বলতে পারি যে, আমার ছেলে কেবল ম্যাট্রিক দিলো তাই পড়শির ছেলে  বুয়েটের পরীক্ষায় টিকে চান্স পাওয়াতে এটা আমার পরিবারের স্বার্থবিরোধী কাজ ও ঘটনা হয়েছে? পড়শির কোন সমৃদ্ধি মানে কী তা আমার স্বার্থবিরোধী? এভাবে বলা যায়? সেক্ষেত্রে, এটা বড়জোর হিংসার কথা, তাও আবার বেকুবি হিংসা কথা হবে!

    অথচ রাওয়াতই বলছেন, “চীন তার বেল্ট রোড প্রজেক্ট দিয়ে সাউথ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরে ঢুকে পড়ছে” সম্প্রতি আমরা দেখছি “একটা ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে চীন এই অঞ্চলে আসছে”।  মানে  রাওয়াতের কথাতেই এটা পরিষ্কার যে, এর পুরোটাই বাণিজ্যিক ও অবকাঠামো বিনিয়োগ, সামরিক নয়। কাজেই এটা ভারতের স্বার্থ কি না, এতে ভারতের স্বার্থ আছে কি না ইত্যাদি প্রশ্ন তোলারই তো মানে হয় না, বোকামি। পড়শির ঘরে মেলা বাজার-সওদা আসলে এটা আমার স্বার্থে না, একথা বললে কী মানে হয়? তখন রাওয়াতকে বলতেই হয় যে, হ্যাঁ, অবশ্যই এসব বাজার-সওদা আপনাদের জন্য নয়, কাজেই এটি ভারতের স্বার্থ নয়। কিন্তু সে জন্য কান্নাকাটি করা যায় না, অভিযোগ করা যায় না, কেবল এ ঘটনা আপনাদের স্বার্থবিরোধী বলে চিৎকার করলে আপনাদের পাগলাগারদে পাঠানোই বাকি থাকে!

    জেনারেল বিপিন রাওয়াত, আপনাকে আবার মনে করিয়ে দেই। ভারতের নীতি আসলে – ‘আমরা ভালো প্রতিশ্রুতিশীল পার্টনার হতে পারব না’- এটাই যেন হয়ে আছে। বরং কে কত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে পারে, ঠকাতে পারে এরই দক্ষতা দেখানোকেই আপনারা যোগ্যতা মনে করে আসছেন। ভারত বড় দেশ, ১৩৫ কোটির দেশ, তাই ভারতের এসব ‘জুয়াচুরি’ পড়শিরা যেন মানতে বাধ্যই থেকে যাবে। আর এই পরিস্থিতিতে এখন আপনাদের পড়শি দেশে আপনাদের কথিত বাগানবাড়িতে চীন কেন আসবে – আপনারা সেই দুশ্চিন্তায় থাকলে আমাদের কী করার আছে? এটি আপনাদেরই সম্ভবত মানসিক সমস্যা।

    বৃহত্তর দিকটা দেখিঃ
    ব্যাপার হল, ভারত বাংলাদেশের আইনিভাবে প্রাপ্য ৫৪ নদীর পানিতে আমাদের ভাগ লুটে খাচ্ছে – এটা কি এভাবেই চলতে পারে মনে করেন? কখনোই নয়। ভারত নাকি দক্ষিণ চীন সাগরে সবার অবাধ চলাচলের নেভিগেশনের রাইট চায়? সে জন্য চীনবিরোধী কোয়াড জোট বেঁধেছে। তাহলে আমাদের পানির রাইট দিতে চায় না, জন্ম থেকে পানি আটকে রেখেছেন কেন? যদি বলেন আপনাদের গায়ে বল আছে তাই দিবেন না। এর মানে বুঝেন?  আসলে বলছেন, আমাদেরকে ঠেলছেন যে, ভারতের চেয়ে বড় বা বেশি গায়ের বল নিয়ে আসো। তাহলে এসে নিয়ে যেও। অর্থাৎ বলশালী ভারতবিরোধী দেশের কাছে যেতে বলছেন? বুঝে বলেন কিন্তু!

    বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার সময় আগে থেকেই ভারতের দুই শর্ত হল যে, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বিনা পয়সায় আসামের জন্য সব ধরনের করিডোর নিবেন। দিতে হবে। এমনকি রাস্তা বা অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয়ও বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপাতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। আর সেটা আড়াল করতে শর্ত হল, বিনিময়ে ভারত ছিটমহল লেনদেন সম্পন্ন করবে, যেটা শেখ মুজিবকে আনুষ্ঠানিক কথা দিয়ে বাংলাদেশের দিক থেকে বেরুবাড়ি হস্তান্তরের পরও ভারত আমাদেরটা তখনো দেয়নি। সেটাই এবার দেয়ার কথা। এটা কিন্তু দয়া নয়, আমাদের পাওনা। পাওনাটা আটকে রেখেছিলেন। কাজেই এটা তো করিডোর দেয়ার বিনিময়যোগ্য কিছু নয়। তাই আসলে এটাও ছেলেভুলানি!

    আর দ্বিতীয় শর্তটা ছিল তিস্তা নদীর পানি। যা ভারত আজও দেয়নি, কখনো দিবে না বলে বুঝা  হয়ে গেছে। ভারতেরই কেউ নাকি বাংলাদেশকে পানি দিতে দেয়নি – এ কথা যদি ভারত বলে তার মানে হবে ভারতেরই কথিত ‘কেন্দ্র’- এর সার্বভৌম মুরোদ নেই। এমন যদি ‘মাজাভাঙা’ হয় তাহলে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ভারত করে কেন, কী করেই বা করে যা পালন করার মুরোদ নেই? নাকি অজুহাত খাড়া করতে এমন চুক্তি করে?

    তাহলে এখন কেন বাংলাদেশ আপনাকে যোগ্য পার্টনার মনে করবে? আবার দেখুন, গত পঁচাত্তর বছর ধরে এমন বড়ভাইয়ের ভয় দেখিয়ে ভারত চলে আসছে। তাহলে এখন, চীন কেন পড়শিদের দেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসে, এ নিয়ে আপনাদের জ্বলুনি দেখেই তো বোঝা যাচ্ছে, ভারতের হাত ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে সব নিয়ন্ত্রণ? তাহলে আপনাদের কথিত প্রভাব এখন কোথায়? কাজেই সাবধান হওয়া উচিত! কী চাচ্ছেন, মানে কিভাবে আপনার হবু শত্রুর আকার আমাদেরকে দিচ্ছেন – এ দুটি বুঝেই  কথা আগাবেন আশা করি। এটা মনে রেখে সিদ্ধান্ত নেবেন।

    বিপিন রাওয়াত কে?
    ২০১৭ সালের শুরু থেকে জেনারেল বিপিন রাওয়াত ভারতের আর্মি চিফের দায়িত্বে এসেছিলেন। সেই থেকে জেনারেল রাওয়াত সম্পর্কে বাংলাদেশের মনোভাব কেমন তার এক সারসংক্ষেপে জানা যেতে পারে।

    ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত তিন বছর রাওয়াত ছিলেন ভারতের সেনাপ্রধান। তিনি তিন বছরের আর্মি চিফের পোস্টে আসীন ছিলেন রুটিনভাবেই। তবে সে সময়ই নতুন পদ সিডিএস সৃষ্টি করা হয় এক বিশেষ উদ্দেশ্যে। এই পদ ভারতের তিন বাহিনী প্রধানদের উপরের পদ হলেও এটা শুরু থেকেই পোশাকী মানে উর্দি বা সামরিক পদ ছিল। কিন্তু এটা ঠিক, তিন বাহিনী প্রধানদের উপরের আগের যে যারা যেখানে সরকারি পদ যা একেবারে প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত যার যা দায়িত্ব কর্তব্য ও কমান্ড যা ছিল সিডিএস [CDS] পদ সৃষ্টির পরেও, আগের সে কাঠামোতে কোনো বদল আনা হয়নি।
    আনুষ্ঠানিকভাবে তাই যা আগে বলা হয়েছিল, চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ বা সিডিএস পদ তৈরির পরও তাতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। এর সোজা মানে, সিডিএস তিন বাহিনী প্রধান আবার বাইরের কাউকেও কমান্ড করতে পারবেন না। আনুষ্ঠানিকভাবে সিডিএসের কাজ হল তিন বাহিনী প্রধানের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করা। আর সাথে কোথাও কোথাও আকার-ইঙ্গিতে বলা হয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথেও সমন্বয় করা।

    একারণে, এটাই অনুমান আকারে ভারতে প্রচলিত আছে যে, আরএসএস-মোদি ভারতের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও হিন্দুত্বের ছাপ দিতে চায়। একারণেই এই নতুন পদ তৈরি করা হয়েছে। বাইরের চোখে যা একটা কথিত কো-অর্ডিনেশন।

    জেনারেল বিপিন রাওয়াত আর্মি চিফ থাকার সময় থেকেই প্রধানমন্ত্রী মোদির সাথে যেন তিনি বিজেপি কর্মী এমন আচরণ ও তাল দেয়া শুরু করেছিলেন; যার প্রথম বড় অ্যাসাইনমেন্ট বলে মনে করা হয় ২০১৯ মার্চ-মে মাসের নির্বাচনের ঠিক আগেই পাকিস্তান হামলার ভনিতা সাজানো। বিজেপি ও মোদি চেয়েছিলেন পাকিস্তানে সাজানো হামলা ও এভাবে প্রতিশোধ নেয়ার জোশ তোলা। তাতে যেন মোদির নেতৃত্বে বীরত্বের সাথে প্রতিশোধ নিয়ে আসা হয়েছে- এই জোশ তুলে হিন্দু ভোটার পোলারাইজেশন ঘটানো ও তা বিজেপির বাক্সে জড়ো করা। অর্থাৎ মেসেজটা হলো, অ্যান্টি পাকিস্তান মানে অ্যান্টি মুসলমান মানে এবার হিন্দুরা জোটবদ্ধ হয়ে একমাত্র মোদির দলকে ভোট দাও এই ছিল ২০১৯ নির্বাচনের স্লোগান সূত্র। এখন বিজেপির ওই ভোট রাজনৈতিক প্রোগ্রামে আর্মি কেন আসতে বা সায় দিতে রাজি হবে, এটাই নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল এই রাওয়াতের।

    এ কারণে, পাকিস্তানি বিরাট ঘাঁটিতে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করা হয়েছে বলে ভারতীয়রা সাফল্য দাবি করলে পরে ইমরান খান কূটনীতিকদের স্বচক্ষে সেই হামলাস্থলে নিয়ে গিয়ে দেখান, একটা মরা পাখি ছাড়া সেখানে কোনো প্রাণী আহত-নিহত কিছু নেই। তবে মাটিতে বোমা ফেলায় গর্ত হয়েছে অনেক, এর সচিত্র বর্ণনা তারা দেখিয়েছিল। কিন্তু তত দিনে ভারতের নির্বাচন সমাপ্ত হয়ে যায়। ফলে এর কোনো প্রভাব সেখানে ছিল না।

    এর অনেক আগে অবশ্য বিপিন রাওয়াত যে আনুগত্য প্রদর্শনে সম্মতি জানিয়েছেন তাও পরীক্ষা করে নেয়া হয়েছিল। অনেকের মনে থাকতে পারে ঘটনাটা। কাশ্মিরের এক তরুণ কথিত সন্দেহভাজন জঙ্গি। তাকে ভারতীয় আর্মি তাদের এক জিপ গাড়ির বনেটের উপরে সামনে বসিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধেছে। এরপর সেই গাড়ি নিয়ে সারা শহর ঘুরানো হয়েছে। এই নৃশংস অমানবিক কায়দায় এবং আইনবহির্ভূত অবস্থায় তাকে বসিয়ে সারা শহরে ফুল স্পিডে গাড়ি চালানো হয়েছিল। এটা মিডিয়ায় রিপোর্ট হওয়ার পর হইচই উঠেছিল। আর সামরিক কর্তারা সাফাই দিয়েছিলেন, বন্দীর বন্ধুদের ভয় দেখাতেই নাকি এমন করা হয়েছিল। অথচ বন্দীর সাথে এই আচরণ বেআইনি। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আর্মি চিফ বিপিন রাওয়াত সে সময় এর স্বপক্ষে সাফাই দিয়েছিলেন। এর আগে ভারতের কোন আর্মি চীফ এমন দলবাজ হতে দেখা যায় নাই। নিজের পেশার প্রতিওই অনুরক্ত থেকে কাজ করেছেন। অনুমান করা হয়, মোদি এভাবেই তাকে পরীক্ষা করে নিয়েছিলেন। মনে করা হয়, এটাই তার হিন্দুত্ববাদী-রাজনীতির পক্ষে প্রথম অ্যাক্ট ও অফার, ফলে তা এক অন্তর্ভুক্তি ও সম্মতি। কারণ, একই সময় মুম্বাইয়ের কিছু অভিনেতাও বিজেপিতে রিক্রুট করা হয়েছিল। সাধারণভাবে অভিনেতাদের কাছে ব্যাপারটা টাকা নিয়ে অভিনয়ের মতোই রাজনৈতিক অভিনয় করে দেয়া। এমন অভিনেতাদের অনেকের মধ্যে ছিলেন সস্ত্রীক অনুপম খের, পরেশ রাওয়াল, কঙ্গনা রানাউত ইত্যাদি। পরেশ রাওয়ালসহ অনেকেই জিপে বেঁধে ঘুরানোর ওই ঘটনায় বিপিন রাওয়াতদের পক্ষে প্রপাগান্ডামূলক পাবলিক আর্গুমেন্ট দিয়েছিলেন।

    তাই জেনারেল বিপিন রাওয়াত এখনো যা করছেন তা এক আরএসএস ক্যাডারেরই তৎপরতা যেন। আর এতে আমরা দেখলাম, আরেক ক্যাডার বিপিন রাওয়াত  আসামে কী করলেন!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৬ নভেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “এক জেনারেল “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • ভারতের নিজেকে বিশেষ প্রিয়া দাবি, আমেরিকার অসহায়ত্ব

    ভারতের নিজেকে বিশেষ প্রিয়া দাবি, আমেরিকার অসহায়ত্ব

    গৌতম দাস

    ১১ অক্টোবর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3L8 

     

    State-Dept-No-2-to-visit-Pakistan-India-after-Taliban-takeover

    –
    সার-সংক্ষেপঃ ছবিতে মাঝখানে আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা আমেরিকান ডেপুটে সেক্রেটারি অব স্টেট ওয়েন্ডি শেরমান যার দুপাশে দুজন, বায়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আর ডানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী। ওয়েন্ডি ভারত-পাকিস্তান সফরে এসেছিলেন, বিশেষত আফগানিস্তান ইস্যু নিয়ে কথা বলতে। তাতে প্রথমে ভারত, পরে পাকিস্তানে গিয়ে এই ইস্যুতে কথা বলার পরে শেষে আমেরিকান সেনা প্রত্যাহারের পরে এই প্রথম ওয়েন্ডি সরাসরি আফগানিস্তান সফরে চলে গেছেন যখন আমেরিকা একা নয় দুনিয়ার কোন রাষ্ট্রই তা-লে-বা-ন সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেন নাই। আবার তাদের নয়া সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথগ্রহণও যখন ঘটে নাই, এমন সময় এটা।  তাই তা-লে-বা-ন-দের জন্য এটা মর্যাদার ও  আনন্দের যে খোদ আমেরিকা  আনুষ্ঠানিক  স্বীকৃতিদান সম্পন্ন না হলেও ওয়েন্ডি আফগানিস্তানে আসার তাগিদ বোধ করেছেন ও কথা বলেছেন। কিন্তু ভারত থেকে পাকিস্তান রওনা দিবার আগে, ভারত নিজেকে আমেরিকার “বিশেষ প্রিয়া” যেন এই গুরুত্ব দাবি করে বসেছিল। কী করে? যখন সে জানতে পারে ওয়েন্ডি ফেরার সময় পাকিস্তান যাচ্ছেন, তখন এটাকে দেখেছিল ভারত-পাকিস্তানকে এক পাল্লায় মাপা মানে সমান গুরুত্ব দেওয়ার বিরুদ্ধে অনুযোগ করেছিল। শব্দটা হল, হাইফেনেশন মানে ভারত-পাকিস্তান মাঝখানে একটা ড্যাশ দিয়ে লেখা। স্বভাবতই এটার কো গুরুত্ব দেন নাই ওয়েন্ডি। আসলে এসম্পর্কেও একুটাই শব্দ প্রয়োগ করার আছে  “ফাজলামো” করে ভারত নিজেকে নিচে নামাচ্ছে! অপ্রয়োজনীয়!]

     

    কোনো রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসাবে একজন প্রধানমন্ত্রী কোনো প্রিন্টেড পত্রিকায় নিজের রাষ্ট্র-সরকারের মনোভাব-অনুভব নিয়ে কলাম লিখবেন তা সাধারণত আমরা দেখতে অভ্যস্ত নই। তবে তাই বলে তিনি লিখতে পারবেন না, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। বরং এমন সরাসরি লেখার ভেতর দিয়ে একধরনের স্বচ্ছতা আর অনেককে বা অনেক ইস্যুকে কিভাবে তিনি দেখেন, দেখতে চান তা নিয়ে আর কোনো লুকোছাপা গোপন ডিলিং নয়, এর বদলে ইস্যুটাকে ওপেনহ্যান্ড ডিলিং করার সাহস দেখানো যায়, অবশ্যই।

    তেমনি একটা কাজ করেছেন পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তিনি আমেরিকার “ওয়াশিংটন পোস্ট” পত্রিকায় একটা মতামত কলাম লিখেছেন গত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। বলাবাহুল্য, তাতে প্রসঙ্গ হলো, এ সময়ের মুখ্য ইস্যু আফগানিস্তান এবং ২০ বছরের দখলমুক্তিতে একজন ‘গুরুত্বপূর্ণ’ পাকিস্তানির ফিলিং ও মূল্যায়ন। আর তার শিরোনাম হলঃ [Imran Khan: Don’t blame Pakistan for the outcome of the war in Afghanistan]।

    সেকালের পাকিস্তান আমলের এক পশতুন এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ার একরামুল্লাহ খান; এমন বাবার অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট ছেলেই হল ইমরান খান। প্রচলিত অর্থে ইমরান রাজনীতিবিদ নন, মূলত আন্তর্জাতিক লেভেলের ক্রিকেট প্লেয়ার বা দলের ক্যাপ্টেন। সেখান থেকে রিটায়ারমেন্টের পরে যেমনটা হয় আমরা দেখি, তিনি জীবন উপভোগকারী; কেউ কেউ যার ভেতর প্লেবয় ইমেজও খুঁজে পান। এরপরও তিনি সরাসরি রাজনীতিক হতে যাননি, বরং তার আগে সামাজিক চ্যারিটি বা দাতব্যমূলক কাজে নেমে গিয়েছিলেন; একেবারে এক ক্যান্সার হাসপাতাল গড়ার কাজে। এরই মধ্যে একবার হঠাৎ তিনি ১৯৯৬ সালে এক নয়া রাজনীতিক দল খুলে বসেন, নাম তেহরিক-ই-ইনসাফ। বাংলা করলে অর্থ হয় ‘ইনসাফের জন্য আন্দোলন’। দলের সংক্ষিপ্ত নাম পিটিআই [PTI] (পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ)।

    আমেরিকা গত ৪০ বছর ধরে পাকিস্তানকে প্রথম নিজের পছন্দের ইসলামে সাজিয়েছে আর  যেভাবে খুশি পাকিস্তানকে ব্যবহার করেছেঃ
    আফগানিস্তান থেকে ২০ বছরের দখলদারিত্ব সম্প্রতি শেষ টেনেছে আমেরিকা। তবে এই ২০ বছরেরও আগের (গত শতকে) ২০ বছরের ইতিহাসও কম লম্বা ছিল না। বলা যায় ১৯৭৯ সালের ১ এপ্রিলের ইরান বিপ্লব ছিল এর সুইচ-অন বা স্টার্টিং ঘটনা। ইরান এক নয়া ‘ইসলামী রিপাবলিক’ বলে নিজেকে ঘোষণা করেছিল সেদিন। ইরানের ঐ “খোমেনি বিপ্লবের” সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হল, এই প্রথম ১৯০১ সাল থেকে ইরানের তেল চুষে খাওয়া ব্রিটিশ কোম্পানি আর পরে (১৯৫৩ সাল থেকে) আমেরিকান নেতৃত্বে ব্রিটেনসহ পশ্চিমা পাঁচ তেল কোম্পানির যৌথ লুটপাট বন্ধ ও উতখাত করতে সক্ষম হয় তারা। ইরান এখান থেকেই তাদের গুটিয়ে চলে যাওয়ার শেষ দিন ঘোষণা করতে পেরেছিল।
    কিন্তু তাতে আরেক নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয় ভীত সোভিয়েত ইউনিয়নের মনে। তার দুশ্চিন্তা হল সেন্ট্রাল এশিয়া নিয়ে। সেন্টাল এশিয়া বলতে যা এখন আলাদা পাঁচ দেশ, আর যাদের নামের শেষে ‘স্তান’ আছে যেমন কাজাখস্তান, কিরঘিজিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তান; এরা। গত (১৭২১-১৯১৭) রাশিয়ান জার-সম্রাটের আমল জুড়ে সেন্ট্রাল এশিয়া রাশিয়ার দখলে ছিল; আবার পরেও লেনিন-স্টালিনের  বিপ্লব বা আমল থেকে তাঁরাও এদের নিয়েই সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়ে নিয়েছিল। পিছনের মূল কারণ, সেন্ট্রাল এশিয়ার জনগোষ্ঠী এরা একেবারে গোড়ায় এথনিক জনগোষ্ঠি হিসাবে হল চীনা-মঙ্গোলয়েড। তারা চীনের তাং রাজার [Tang dynasty (618–907 CE)] অধীনে ছিল। কিন্তু  আব্বাসীয় ডাইনেস্টির আমল (৭৫০-১২৫৮) এই তাং রাজা পরাজিত হয়ে যায়। আর তাতে বাসিন্দারা তখন থেকে মুসলমান বা ইসলাম অনুসারী হয়েছিল। ফলে ইরানের খোমেনি বিপ্লবের পরে ইরানের পড়শি এরা না “বিপ্লবী” প্রভাবে পড়ে যায় আর তাতে না তারা তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে বের হয়ে স্বাধীন হয়ে যায়। এই ভয়ে কমিউনিস্ট সোভিয়েতরা ইরান আর সেন্ট্রাল এশিয়ার মাঝখানে এক প্রাচীরতুল্য বাফার স্টেট হিসেবে অবস্থানে থাকা আফগানিস্তানকে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভ সামরিকভাবে দখলে নিয়ে নিয়েছিলেন ওই বছরই, ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৯।  যার কাভার দেয়া হয়েছিল যে  আফগান কমিউনিস্ট পার্টি নাকি আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখল করে ব্রেজনেভ-এর দেশকে ডেকে নিয়ে এসেছে।  কিন্তু এতে হিতে বিপরীত ঘটে যায়।

    সেটা স্নায়ুযুদ্ধের আমল; ফলে সোভিয়েত “আগ্রাসনের” বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যেতে আমেরিকা ফরজ জ্ঞান করে পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করেছিল। বলা যায় পাকিস্তানকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেধে চরম অপব্যবহারটা করতে শুরু করেছিল।  এতে পাকিস্তানকে “আমেরিকান স্বার্থে ইসলামী” করে সাজিয়ে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে ‘মুজাহিদিন’ আন্দোলন শুরু করেছিল আমেরিকা। এতে পাকিস্তান নিজের স্বার্থের নিজের জন্য আর দেশ-রাষ্ট্র থাকেনি। পাকিস্তান হয়ে যায় একদিকে সিআইএর ঘাঁটি ও তৎপরতার কেন্দ্র; অন্যদিকে আফগান রিফুইজিদের আশ্রয় আর আফগান মুজাহিদিন যোদ্ধাদের সুরক্ষার দেশ যাতে, তারা সোভিয়েত উৎখাতে তারা লড়তে পারে – এমনই এক লঞ্চিং প্যাড বা ভুমি হয় পাকিস্তান। শেষে ১৯৮৯ সালে ফেব্রুয়ারিতে সোভিয়েত বাহিনী হেরে যায়।  হার স্বীকার করে সোভিয়েত বাহিনী চোখের জলে কাবুল ত্যাগ করেছিল, ঠিক যেমন গত ১৫ আগস্ট ২০২১ আমেরিকা কাবুল ত্যাগ করেছে।

    ফিরে আসি একালে। “ওয়াশিংটন পোস্টে” ইমরানের ওই মতামত-কলামের মুখ্য তাৎপর্য হল তিনি আমেরিকাসহ পশ্চিমা মন ঠিকমত পড়তে পেরেছেন বলে তাদের ওপর ঠিকমত সওয়ার হয়ে এলেখাটা লিখতে পেরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, আমেরিকা কিভাবে সেই ১৯৭৯ সাল থেকে একেবারে একান্ত নিজস্ব স্বার্থে বারবার পাকিস্তানকে ব্যবহার করে গেছে। যদিও সেটা বলার চেয়ে ‘ব্যবহৃত হতে পাকিস্তানকে বাধ্য করেছে’ বলা সঠিক হবে। পশ্চিমা মন পড়ে তাদের মনের ভাষায় কথা বলাতেই ইমরানের এ’লেখা আকর্ষণীয় হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের প্রপাগান্ডাসহ পশ্চিমা মন যারা ওয়ার অন টেররের প্রপাগান্ডায় “মুসলমান মানেই সন্ত্রাসবাদী”- এব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠায় ২০ বছর ধরে কসরত করে গেছেন; এদের মুখের উপরই ইমরান এক কড়া জবাব দিয়েছেন। কারণ পাকিস্তান শুধু এই শতকের ২০ বছর নয়, গত শতকেরও ২০ বছর ধরে আমেরিকার স্বার্থে বলি হয়ে গেছে বারবার। যেন আমেরিকা নয় (তার স্বার্থ বা নীতি নয়), পাকিস্তানই ‘সন্ত্রাসবাদ’ আবিষ্কার করেছে আর চর্চা করে গেছে।

    জেনারেল জিয়াউল হক পাকিস্তানে সামরিক ক্ষমতা দখল করেছিলেন ১৯৭৭ সাল থেকে। এই জিয়াউল হক, আমেরিকা তাঁর ঘাড়ে সওয়ার হয়েই সোভিয়েত তাড়ানোর কৌশল হিসেবে এক ইসলাম প্রচার শুরু করেছিলেন। আর তাতেই পাকিস্তানকে আরো কথিত ইসলামী করে গড়ে তুলতে পুরনো বৃটিশ আমলের পেনাল কোডের ২৯৫ ধারাকে নতুন করে ব্লাসফেমি আইন বলে একে ঢেলে সাজিয়ে প্রচারে আনা হয়েছিল। আর ওদিকে নতুন নতুন মাদরাসা খোলার জন্য অঢেল অর্থ দেয়ার এক কর্মসূচির পুরোটাই আমেরিকান কর্মসুচী ছিল যা সোভিয়েত তাড়ানোর  আমেরিকান ততপরতার অংশ। সৌদি আরব ও কিছু বিশেষ পাকিস্তানি মাওলানার তত্ত্বাবধানে তা বাস্তবায়িত হয়েছিল। অথচ এখন মুসলমান মানেই জঙ্গি আর পাকিস্তান তাদের আঁতুরঘর যেন- এটাই আমেরিকান থিংকট্যাংকের প্রধান বয়ান ও অভিযোগ। আর এখান থেকেই ভারতের কথিত জঙ্গিবাদের বয়ানও শুরু হয় [সাথে অবশ্য ভারতীয় কাশ্মীরের ভোটচুরি করে এই ব্যবস্থা অকেজো করে দেওয়ায় দায়ী]। বাংলাদেশেও এরা বলে, কথিত পশ্চাৎপদ বলে মুসলমানরা নাকি ব্লাসফেমি আইন চায়, মাদরাসাগুলো হলো জঙ্গি গড়ার আস্তানা প্রভৃতি প্রপাগান্ডা। ভারতকে সাথে নিয়ে প্রেসিডেন্ট বুশ-ব্লেয়ার  আর আমেরিকান থিংকট্যাংকের এই যে বয়ান, একেই ইমরান খান চ্যালেঞ্জ করেছেন, ঐ লেখায়।

    কেন এসময়ে তিনি করতে গেলেন?
    সাম্প্রতিককালে আফগান সেনা প্রত্যাহার-উত্তরকালে আমেরিকান কংগ্রেসে (সংসদে) এনিয়ে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে শুনানি চলেছিল। আমেরিকা লবিংয়ের দেশ, লবিং করার কাজ বৈধ।  কংগ্রেস সদস্যের কাছে  খাতির জমিয়ে লবিং করে দিবে বলে কারো কাছে থেকে অর্থ নিতেও সমস্যা নেই। কেবল বিচার মন্ত্রণালয়ে রাখা একটি ফরম পূরণ করে রাখতে হবে। তা করার সময় স্ব-উদ্যোগে অর্থ নেওয়ার কথা আগাম তা উল্লেখ করে আসতে হবে। তবে এই লিখে স্বীকার করে নেয়া কোনোই অপরাধ নয়। তাই কোনো সমস্যা নেই। তবে ভবিষ্যতে এ কাজের ভেতরে অন্য কোনো আইনভঙ্গ করার বিষয় যুক্ত বলে প্রমাণিত হলে তখন সেই আইন ভঙ্গের কারণে এটা অপরাধ হতে পারে। নইলে না। এই কংগ্রেস বা সিনেটরদের লবিংয়ে ভারত লবিং খুবই শক্ত। কারণ তারা মেরিকান ব্যবসায়ীদেরকে নানান ব্যবসা দিয়ে কংগ্রেস্ম্যানদের সাথে সম্পর্ক গড়ে নিয়েছে। ফলে ভারতও এদের দিয়ে এই শুনানিতে পাকিস্তানের ওপর সব দায় চাপিয়ে বাইডেনকে মুক্ত করতে লেগে পড়েছে। আর এ কারণেই ইমরান নিজের হাতে ও নামে মতামত কলাম লিখেছেন।

    ইমরানের ওই লেখায় প্রথম প্যারাটা এরকমঃ “সাম্প্রতিককালের কংগ্রেসনাল শুনানি দেখে আমি আসলেই বিস্মিত হয়েছি। গত দিনগুলোতে (প্রায় ৪০ বছর, ইমরান কম করে কেবল চলতি শতকেরটা ধরে দুই দশক বলেছেন) আমেরিকার সহযোগী দেশ হিসেবে পাকিস্তানিরা আমেরিকার ওয়ার অন টেরর কর্মসূচিতে যে আত্মত্যাগ করেছে, এর কোনো উল্লেখ নেই দেখে বিস্মিত হয়েছি। অথচ এর বদলে আমরা দেখছি  আমেরিকার যেসব ক্ষতি হয়েছে, এই শুনানিতে এর কারণে আমাদেরকে দায়ী করা হয়েছে”।

    “Watching the recent Congressional hearings on Afghanistan, I was surprised to see that no mention was made of Pakistan’s sacrifices as a U.S. ally in the war on terror for more than two decades. Instead, we were blamed for America’s loss.” – Imran Khan

    অথচ “আমি বারবার বলে এসেছি আফগানিস্তানে বিজয়-সম্ভব-নয় [unwinnable], এটা এমন একটি যুদ্ধ। আফগানরা এমন এক লড়াকু জাতি, যারা কখনো নিজ ভূমিতে বিদেশী উপস্থিতি সহ্য করেনি। এমনকি সেই বিদেশী পাকিস্তান হলেও এই বাস্তবতা বদল হবে না”। এরপর ইমরান ওই সব বিগত বছর পাকিস্তানের কী কী ক্ষতি হয়েছে, আত্মত্যাগ করেছে, এসবের পরিসংখ্যানগত লম্বা বর্ণনা সাথে জুড়ে দেন।

    এসবের বর্ণনাযুক্ত বয়ান পাঠকরা ঐ  মতামতকলাম থেকে নিয়ে অনুবাদ করে ছড়িয়ে দিতে পারে। ঘটনাচক্রে প্রথম এ’ব্যাপারটা  আমার নিজের নজরে এসেছিল পাকিস্তানের ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে। আমার হাতে আসে ইমরানের দলের ঘোষিত মেনিফেস্টো, যা সম্ভবত ২০১৬ সালে তৈরি করা; কারণ তাতে ওবামা আমলে ব্যাপক ড্রোন বোমা হামলা ঘটনার পরিসংখ্যান দিয়ে নিন্দা জানানো হয়েছিল। আমি ওবাক হয়েছিলাম এ জন্য যে, এই প্রথম আমেরিকান ওয়ার অন টেররকে একেবারে ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত থেকে মানে পাকিস্তানকে কিভাবে বাধ্য করা হয়েছে আর এতে পাকিস্তানের স্বার্থে কিভাবে বিঘ্ন হয়েছে – এই বয়ান দাঁড় করানো হয়েছে।

    কিছু ব্যক্তি অভিজ্ঞতাঃ
    গত ২০১৩ সালের দিকে বিদেশে মানবাধিকার ইস্যুতে এক প্রোগ্রামে অংশ নেয়ায় অনেক দিন পর কিছু পাকিস্তানি নারী-পুরুষের সান্নিধ্যে সাথে দু-তিন দিনের সেশনে কাটাতে হয়েছিল। ফলে সেসময় একালের পাকিস্তানের তরুণ-যুবাদের সম্পর্কে নতুন অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়েছিল। এমনিতে ২০১১ সাল পর্যন্ত বিদেশী চাকরি সূত্রে অনেক পাকিস্তানি আমার কলিগ ছিলেন, কখনো বাসা পাওয়ার সমস্যায় তাদের সাথে একই বাসায় বসবাস বা শেয়ার করেছি; স্বভাবতই অফিসরুমও শেয়ার করেছি।  বিশেষত সেটা আফ্রিকা বলে আমরা এশিয়ান পাকিস্তানি, আফগানি, ভারতীয় বা ভুটানিরা যেন আপন আত্মীয় হয়ে গেছিলাম।  দে্শিভাইয়েরা তো আছেই, সাথে ভারতীয় ব্যাটেলিয়ন আর বিশেষত পাকিস্তানি ব্যাটেলিয়ান অফিসারেরা; কারণ তারা  মাসে অন্তত দুদিন আসত আর খুব খাওয়াদাওয়া হত।  তবু পাকিস্তানের তারুণ্যে এসব লেটেস্ট পরিবর্তন তখনো তেমন জানা হয়নি। তবে ২০১৩ সাল থেকে আলজাজিরার কিছু রিপোর্ট থেকে প্রথম টের পাই আমাদের চেনা সেই পুরনো রক্ষণশীল পাকিস্তান বদলে যাচ্ছে। তরুণ বা নয়া প্রজন্ম আগের আমেরিকান বয়ানে আর আগ্রহী নয়। খুঁড়িয়ে হলেও পাকিস্তানে এক নয়া প্রজন্ম, এক নয়া এডুকেটেড মধ্যবিত্ত একালে হাজির হয়ে গেছে। আমার রিডিং ও অনুমান এই নয়া প্রজন্ম পাকিস্তানকে বদলে দিচ্ছে।  পাকিস্তানের জন্য তারাই সম্ভবত আগামী দিনের বিরাট ভরসা! যেমন আসলে আর কত? – দোষ মূলত আমেরিকার অথচ দেশ-বিদেশে প্রপাগান্ডা চলছে যে সব দোষ পাকিস্তানের, আর পাকিস্তানই জঙ্গি ইত্যাদি বয়ান শুনতে শুনতে তারা হতাশ ও বিরক্ত। ফলে আমার মনে হত ইমরান আগামিতে তাদের সম্ভাব্য নেতা হবেন হয়ত। আর এরই কিছু ২০১৩ সালের শেষের নির্বাচনে এর কিছু আলামত দেখেছিলাম। আর ২০১৮ সালের নির্বাচনে এসে এর সরাসরি ফল দেখলাম।

    পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বদলঃ
    ইমরানের সাথে তুলনা করলে অপর দুই দল ও নেতা ভুট্টো বা নওয়াজ শরিফের দল, এদের ব্যর্থতা হল – তারাও নিঃসন্দেহে প্রচণ্ডভাবে যা-ইচ্ছা তাই ভাবের আমেরিকান চাপ সয়েছেন আর পাকিস্তানের উপরেই ড্রোন-বোমাবাজিসহ যা ইচ্ছা আমেরিকা করতে চায়, তা সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তারা এখান থেকে বের হওয়ার পথ না খুঁজে বরং সে সময়-সুযোগটাতে আমেরিকার নামে দোষ চাপিয়ে রাষ্ট্রীয়-সম্পদ নিজের নামে দখল বাড়ানো  ও লুটের দিকে কাজে লাগাতে গেছেন। এটা অকল্পনীয় যে, আমাদের মত দেশের কোন নেতা দুই বিলিয়ন ডলার সম্পদ গড়েছেন। দুই বিলিয়ন কী ব্যক্তির একাউন্ট বা পকেটে থাকার মত অর্থ? অথচ এটাই পাকিস্তানে হয়েছে।
    আর ওদিকে সেনাবাহিনীও প্রচণ্ডভাবে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েছিল বিশেষ করে ট্রাম্প আমলের শুরু থেকেই।  ট্রাম্পের লক্ষ্য ছিল আফগানিস্তানে প্রতিদিন গড়ে আমেরিকাকে নিয়মিত ৩০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় থেকে আমেরিকায় নিজ প্রশাসনকে বাঁচানো; কিন্তু তিনিও  পাকিস্তানকে এমনকি পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে দায়ী বলে মনে করে তাতে ভারতকে সাথে নিয়ে প্ররোচনায় তার প্রপাগান্ডা শুরু করতে থাকেন।
    গত ২১ নভেম্বর ২০১৮ ট্রাম্প বলেন,  “ওরা (মানে পাকিস্তান) আমাদেরকে সাহ্যায্য করতে কিছু করে নাই” – আর এই অজুহাতে তিনি মোট প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার সাহায্য প্রত্যাহার করেছিলেন [“Done Nothing To Help Us”: Trump On Stopping $1.3 Billion Aid To Pakistan]। এই প্রপাগান্ডা নিউজটা ভারতের। তবে সবচেয়ে বড় হৈচৈ পড়েছিল যে খবরে সেটা হল, ৩০০ মিলিয়ন ডলার যা Coalition Support Funds  হিসাবে যা পাক-আর্মিকে দেয়ার কথা তা প্রত্যাহার করে নেওয়ায়।  কিন্তু আমেরিকান [VOX News] ভক্স নিউজ জানায় ঘটনা কিছু অন্য। তারা লেখেছিল,  It’s all part of a broader strategy to have Pakistan help defeat regional militants — but it’s unclear if the strategy is working. কিন্তু এই কৌশল কেন নেয়া হয়েছে তা অস্পষ্ট।

    ফলে সারকথায় ট্রাম্প পাকিস্তানকে আরো ঠেকিয়ে ধরেছিলেন। কারণ ডলার আয়ের অভাব তখন এমনিতেই পাকিস্তানের অর্থনীতিতে ছেয়ে বসেছিল। যদিও তাতে  ততদিনে ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত সেনাবাহিনী আমেরিকান “অস্পষ্ট” অভিযোগ নিয়ে ট্রাম্পকে আর তোয়াজ করতে যায় নাই, সম্পর্ক এতই নিচে নেমে গেছিল। ফলে আর আমেরিকাকে আবার আপার হ্যান্ডে যাবার সুযোগ দেয় নাই বা আসে নাই। ফলে তখন থেকেই রাজনীতিবিদদেরও আগে পাকিস্তান সেনারা নতুন বন্ধু খুজতে গিয়ে চীনের কোলে গিয়ে উঠেছিল। চীনের সাথে তাদের সম্পর্ক বহু আগের কমপক্ষে ১৯৬৮ সাল থেকে, তা আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু তা সত্বেও পাকিস্তানের কাছে আমেরিকা গুরুত্ব বা ঘণিষ্ঠতা চীনেওরও উপরে।  ফলে ভারত যতই প্রপাগান্ডা করুক প্রথমত চীন নয়, পাকিস্তানের কাছে আমেরিকা গুরুত্ব বা ঘনিষ্ঠতা ছিল চীনের চেয়েও উপরের।  আর দুইঃ আমেরিকাই পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক একেবারেই দুর্বল করে ফেলেছিল।  বাধ্য হয়েও সে চীনকেই নিজ সম্পর্কের শীর্ষে নিয়েছিল। আসলে আফগানিস্তানে খরচ ও ব্যর্থতায় ডুবে আমেরিকার বেপরোয়া আচরণই সব সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়। একেবারে ভাঙ্গে নাই, কিন্তু মর্ম দুর্বল হয়ে গেছে স্থায়ীভাবে।
    শেষে, ২০১৮ সালের শেষ থেকে ট্রাম্প বুঝতে পারেন, তাঁর এই মিথ্যা কৌশল অকাজের; এটা তাঁর নিজের স্বার্থের পক্ষেই কাজ করবে না।  মুল কারণ, আমেরিকাকে  আফগানিস্তান ফেলে বের হতে যেতে গেলে – কোন পুতুল গণি সরকার তাকে সাহায্য করতে পারবে না। আমেরিকার একমাত্র পথ ও ভরসা যদি তারা তালেবানদের সাথে একটি চুক্তি করতে পারে। কারণ যুদ্ধের ময়দান পরিত্যাক্ত ফেলে কারো ভেগে যাওয়ার পরিকল্পনার মানে হল পালানোর সময় কেউ আক্রমণ করলে সে্টা থেকে কাভার মানে ঐ হবু আক্রমণ থেকে আমেরিকাকে রক্ষা করবে কে? এর ব্যবস্থা করতেই – টানা বিশ বছর যে তালেবান যোদ্ধাদের সাথে আমেরিকা যুদ্ধ করল  ট্রাম্প  বুঝে যান যে এই তালেবান যোদ্ধাদের সাথেই তাকে চুক্তিতে আসতে হবে। কিন্তু এই সমস্যা আরো জটিল কারণ ট্রাম্প টের পেলেন যে, পাকিস্তানই একমাত্র দেশ যে  আমেরিকানদের সাথে একটা চুক্তি করতে তালেবানদেরকে রাজি করাতে আমেরিকাকে সাহায্য করতে পারে।

    তাই ট্রাম্প তালেবানদের সাথে আপসনামা রচনায় তাঁর বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে এক আফগান অরিজিন আমেরিকান ডিপ্লোমাট [Zalmay M. Khalilzad] জালমে খলিলজাদকে নিযুক্ত করার পরই ট্রাম্প পাকিস্তানের সাথে দ্রুত সব  বিবাদ মিটিয়ে ফেলেন। তবে ২০১৮ সালে ইমরান প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলে তালেবান আলোচনা গতি পায় যদিও;  কিন্তু ততদিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমেরিকা থেকে বহু দূরে সরে গেছে। বলা যায়  মূলত গত প্রায় বিশ বছরের গভীর সামরিক সম্পর্ক, নির্ভরশীলতার  সম্পর্ক পাকিস্তান সেনাবাহিনী অনেকটাই গুটিয়ে ফেলেছিল।  আর ততই চীনের সাথে সম্পর্ক গভীর করে নিতে এগিয়ে যায়।  খুব সম্ভবত এটাই পাকিস্তান সেনা প্রশাসনের ইমরানের দলের সাথে  নয়া এক ওয়ার্কিং রিলেশন গড়ে তুলার ভিত্তি হয়ে যায়। যেটা একেবারেই মাঠে কার্যকর হয়ে যায় ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে।

    আমেরিকা যে সারাজীবন একান্ত নিজের স্বার্থে পাকিস্তান ব্যবহার করে গেছে অথচ এর সব আবর্জনার ও দায় উলটা পাকিস্তানের উপর ঢেলেছে – আর এর বিপরীতে ইমরানের দলের নয়া বয়ান পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে শুধু ছুঁয়ে যায় তাই না,  হুঁশের এই বয়ান পাকিস্তানে সবচেয়ে কার্যকর এক নয়াপথ হিসাবে হাজির হয়েছিল।  আসলে  অতি-নির্ভরশীলতা ত্যাগ না করলে, কষ্ট না করলে স্বাধীনতা ভোগের যোগ্য হওয়া যায় না – সেটাই ঘটেছিল।  আর তা পেরেছিল বলেই তারা ইমরানের সাথে সম্পর্ক গড়ে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। বরং এখন উলটা পাকিস্তানের ওপর আমেরিকান নির্ভরশীলতা এখনো বর্তমান। আফগানবিষয়ক বা ইরান ও সেন্ট্রাল এশিয়ার ওই অঞ্চলে আমেরিকার সব ধরনের স্বার্থের জন্যই আমেরিকার পাকিস্তানকে দরকার। এ কারণে ভারত যতই চেষ্টা করুক, মার্কিন কংগ্রেসকে দিয়ে পাকিস্তানবিরোধী চাপ সৃষ্টি করবে ইত্যাদি যাই করুক; কিন্তু বাইডেন প্রশাসন জানে পাকিস্তানকে তার কেন দরকার।

    ওদিকে ভারতের হাহাকারঃ
    এরই মধ্যে দোহায় (২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০) দেড় বছর আগের আমেরিকান-তালেবান চুক্তিতে ভারত কী কী হারিয়েছে বা কী কী নেই, তাদেরকে জানানো হয়নি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ভারত এখন আপত্তি তোলা শুরু করেছে। কোথায় আর এখন কেন?

    জয়শংকর বলেছেন, দোহা চুক্তির বহু বিষয় নিয়ে ভারতকে অন্ধকারে রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্রঃ
    গত ৩০ সেপ্টেম্বর ছিল ওয়াশিংটনে ভারত-আমেরিকা ‘কৌশলগত পার্টনার’ ফোরামের চতুর্থ বৈঠক [US-India Strategic Partnership Forum (USISPF)] । যদিও হিন্দুস্তান টাইমসের নিউজটা জয়শঙ্করের  ভনেকটা ঘুরিয়ে বলা ভাষ্যটা। বলা সেই ভাষ্যটা এরকম, ট্রাম্প-তালেবান কথা চালাচালির অনেকগুলো থেকেই ভারত বাইরে পড়ে গেছিল ‘India wasn’t fully in the loop on US-Taliban deal’: Jaishankar explains concerns]।
    সেখানে ভারতে আমেরিকার এক সাবেক রাষ্ট্রদূত ফ্রাংক জি উইজনারের প্রশ্নে এসব মতভিন্নতা বাইরে চলে আসে [During the question and answer session, former US ambassador to India Frank G. Wisner quizzed him on the “dramatic” developments in India.]। ফলে যদিইও সেটা ভারত-আমেরিকার দুই সরকারি বৈঠক নয়। তবু উইজনারের প্রশ্নের জবাবে নিজের অনুযোগ জয়শঙ্করকে সেখানে হাজির করতেই হয়েছিল।  সেখানে ভারতের ক্ষোভ হল – “ভারতকে জানানো হয়েছিল যে, এক ইনক্লুসিভ সরকার হবে (ভারতের কাছে এর ব্যাখ্যা সম্ভবত, গণি সরকারেরও প্রতিনিধি তালেবান সরকারে থাকবেন)। এ ছাড়া নারীদের কী হবে? আর সর্বোপরি ভারতের প্রশ্ন, তালেবানের আমলে কি ভারতীয় কাশ্মিরের মুসলমানরা তালেবান সহায়তা পাবে?” তবে কথাটা অন্য ভাষ্যটা হল, যেমন বলা হচ্ছে যে, তালেবানের মাটি কি অন্য দেশে সন্ত্রাস চালানোর কাজে ব্যবহৃত হবে? কিন্তু এই একই প্রশ্নের অন্য দিক আছে, আগে যেভাবে গনি সরকারের আমলে আফগান মাটি ব্যবহার করে ভারত-আমেরিকার সমর্থনে  চীন ও পাকিস্তানে  অন্তর্ঘাতমূলক
    আক্রমণ চলত, প্রজেক্টে হামলা চলত, চীনা প্রকৌশলী নিহত হতেন, সেসবের কী হবে? অর্থাৎ সেই একই গান?  ভারত-আমেরিকার সমর্থনে যে চীন ও পাকিস্তানেও সন্ত্রাসী আক্রমণ চলছে তা নিয়ে তিনি চুপচাপ।  তবে ওই স্ট্র্যাটেজিক সভা শেষ হয়েছে ভারতের এ মর্মে অসন্তোষে যে, আংশিকভাবেই গনি সরকারের আমলের কোনো সুযোগ-সুবিধা ফেরত আসছে না কেন!

    এব্যাপারে আমেরিকান ব্যাখ্যা হল, আমরা ৩০ আগস্টের আগেই সব অস্ত্র ও রসদ নিয়ে ফিরে চলে আসব, কোনো কিছু আর আফগানিস্তানে ব্যবহার করব না – চুক্তিতে এমন কথা ঢুকিয়েই আমরা বিপদে পড়ে গেছিলাম।। চুক্তির এই ফেরে পড়েও তালেবানরা চুক্তির কোনো অংশ বাস্তবায়ন না করলেও আমরা চিপায় পড়ে গেছি। মানে এখন কিছুই করার নেই, ‘মাফ চাই’ ধরনের।

    আর ভারতের ততই গোসসা। এতদিন কংগ্রেসের শুনানি চলাবস্থায় বাইডেন প্রশাসন পাকিস্তানের সাথে তাদের অনেক কথা বলা দরকার হলেও তা করতে যাননি। অবশেষে আমেরিকান উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরমানের ভারত সফরে গত ৬ অক্টোবর ফরমালি ভারতের গোসসা শোনা হয়। ভারত এবার সুযোগ পেয়ে আফগান হাক্কানি নেটওয়ার্কের আর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের আপত্তি জানিয়েছে। দ্যাপ্রিন্টের নয়নিমা বসু তার আর্টিকেলের শিরোনাম করেন “India raises concerns over Haqqanis, ISI in Afghanistan with visiting US Deputy Secy of State”]। এই আর্টিকেল পাকিস্তানের মুন্ডপাত করা ভারতের আভ্যন্তরীণ দেশপ্রেমিক জনগণ তা পছন্দ করতে পারে। কিন্তু একাজ নিঃস্ফলা।

    ট্রাম্প কি জানতেন না যে তালেবান বলতে তাদের সাথে হাক্কানি গ্রুপও থাকবে?
    এ বিষয়ে আসলে কিছু কড়া কথা বলতেই হয়। বিয়ে ফুরিয়ে যাওয়ার পর বাজনা বাজাতে দেখলে মানুষের বিরক্তই লাগবে। ট্রাম্প কি জানতেন না যে তালেবান বলতে তাদের সাথে হাক্কানি গ্রুপও থাকবে?  এমনকি ট্রাম্পের জানা না  থাকলেও নিজে থেকেই হাক্কানি গ্রুপ প্রসঙ্গে আগাম তাদের আপত্তির কথা বরে রাখা যেত। যা তিনি বলেন নাই। তা তিনি বলে নেননি কেন? এফবিআই কিংবা ইউএনের খাতায় হাক্কানি নেতা সিরাজুদ্দিনের মোস্ট ওয়ান্টেড হিসেবে নাম আছে তো! তাতে কী?  কারণ, ট্রাম্প যখন দোহা চুক্তি করেই ফেলেছেন যেখানে সিরাজুদ্দিন বা ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ নেতাদের সম্পর্কে কী হবে এ নিয়ে আমেরিকার কোনো আপত্তি করে রাখা হয় নাই। তাহলে সিরাজুদ্দিন বা হাক্কানি প্রসঙ্গে এখন আমেরিকানদের কিছুই বলার নাই। আবার থাকলেও আমেরিকার কিছু করর থাকত না। কেন?  আমেরিকানদের পক্ষে কিছু লেখা থাকলেই তা বাস্তবায়নে তালেবানদের বাধ্য করার জন্য আমেরিকার হাতে কোনো উপায় রাখা হয়নি। তার সব উপায় ও অস্ত্র ৩০ আগষ্টের পরে প্রতাহার করে নিয়ে যেতে বাধ্য ছিল আর আমেরিকানেরা তাই করেছে। কাজেই হাত ধুয়ে ফেলা ছাড়া আমেরিকার কী করার আছে এখন! – এর সোজা অর্থ, এখন এসব ফালতু আলাপ। এখন আমেরিকা চুক্তি করেছে মানেই তারা তালেবানদের সরকারে থাকতে পরোক্ষে হলেও অ্যাপ্রুভাল দিয়ে দিয়েছে। কাজেই ভারতের এখন এখানে সেখানে হাক্কানিদের “তালিকায় নাম আছে’, তালেবান সরকারে হাক্কানিরা আছে – বলে এসব নিয়ে কিছু দিনের প্রপাগান্ডা ছাড়া আর কোনো মূল্যই নেই।

    আর পাকিস্তান নিয়ে নালিশের ব্যাপারে মার্কিন উপপররাষ্ট্র-মন্ত্রী শেরমান ওয়েন্ডি ভারতকে বহু কিছু বলে দিয়েছেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, তিনি বলছেন তা হল, সেই রাধাও নেই আর তার নাচের মন-মর্জিও নেই। মানে ওই সব বাদ দিতে হবে। তিনি সোজা করে বলেছেন, দেখুন  সেই আফগানিস্তান আর নাই এটাতো একুশ শতক আর গত ২০ বছরে অনেক কিছুই বদলে গেছে [we live in the 21st century and that things have changed over the last 20 years. ]। এখন যতটুকু যা হতে পারে তা হলো, আমরা সবাই (ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটি) যদি এক থাকতে পারি, একসাথে চেপে ধরতে পারি তা হলে কিছু হতে পারে। এরপর তিনি সরাসরি স্বীকার করে নেন যে, ‘সেই আফগানিস্তান আর নেই যেমনটি কেউ কেউ চাচ্ছে।’ মানে কথা সোজা, ও দিন গত, আমাদের সেই মুরোদও আর নেই। কাজেই বিরক্ত কইরেন না…।’

    “And I think what I hope is that everyone engaged with the Taliban, I have no problem, and the United States has no problem with people engaging with the Taliban, and telling them what needs to happen, that we live in the 21st century and that things have changed over the last 20 years. It is not the Afghanistan that they want to, and that it will be very hard to try to go all the way backwards and the international community has to stand as one,”

    শেষে ভারত বোবা হয়ে গিয়ে আর কিছু না পেয়ে এবার শেরমানকে চেপে ধরেছে। কেন? কী নিয়ে? কারণ ততক্ষণে আপনাতেই প্রকাশ পেয়েছে যে, তিনি ভারত থেকে পাকিস্তান যাচ্ছেন। এখন ভারতীয় ছেচড়ামো শুরু হয়েছে, আপনারা তা হলে ভারত-পাকিস্তানকে এক পাল্লায় মাপছেন? এটি বলে ‘সে কী কান্না’! মানে ভারত বলতে চাচ্ছে আমরা তো পাকিস্তানের চেয়ে উঁচু জাতের ছিলাম তোমার কাছে। আর তার কী হলো?  কথাটা ইংরাজিতে তারা বলে বলে হাইফেনেটেড করা। মানে ভারত-পাকিস্তান শব্দ দুটো মাঝখানে একটা ড্যাশ দিয়ে লেখা!

    এখন সমস্যা হলো, এই কান্না দেখেও আমেরিকার হাতে কিছুই করার নেই! তবে একটি সান্তনা বাক্য দিয়েছেন ওয়েন্ডি, বলেছেনঃ বিশ্বাস করো বেশি মিশব না, খালি অল্প একটু করে মিশব [It’s for a very specific and narrow purpose]!

    তবে ভারতকে এখন ভান করেই যেতেই হবে যে, আমেরিকার কাছে অনেকের চেয়ে দামি সে!
    তবু খুশি থাকুক, এ আমাদের কামনা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৯ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “ভারতের গোসসা, আমেরিকার অসহায়ত্ব“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • অকেজো না, চীন-ভীতিতে ভারত এখন সার্ক বিলুপ্তি চায়

     অকেজো না, চীন-ভীতিতে ভারত এখন সার্ক বিলুপ্তি চায়

    গৌতম দাস

    ০৭ অক্টোবর ২০২১, ০৭:৫৬ পিএম

    https://wp.me/p1sCvy-3KC

     

     

    গত পনেরো আগস্ট ছিল এক আজব ঘটনার দিন। বিগত ২০ বছর ধরে  (তখন থেকে) এক মেরুর দুনিয়ায় মহাপরাক্রমশালী আমেরিকা, আফগানিস্তানে এক পুতুল সরকার গঠন করে শাসন করে আসছিল। প্রথমে কারজাই পরে গণি সরকার এভাবে। কিন্তু এবছর, যার প্রটেকশনে সেই পুতুল সরকার  ক্ষমতায় ছিল সেই আমেরিকা নিজেকে আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। আর তাতে, ‘”তালেবানেরা কাবুল দখলে আসছে’ এই আওয়াজ শুনেই গনি সরকার শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। আর সত্যিই তালেবান যোদ্ধারা শহর দখল করে এবং ক্ষমতা নিয়ে নিয়েছিল ঐ ১৫ আগস্ট ২০২১।

    আসলে কোন সরকার যখন তাকে উৎখাত করতে কেউ এগিয়ে আসছে শুনে নিজ রাজধানী ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং তার সেনাবাহিনীও কোনও প্রতিরোধে এগিয়ে আসে না, এটাই আসলে মুরোদহীন সরকারের উদাহরণ। কারণ, যার নিজেকে রক্ষার মুরোদ নাই সেটা তো কোন সরকারই নয়!

    সরকারের বৈধতার প্রথম ধাপ হল মুরোদ, যে মুরোদের খাঁড়া অর্থ গায়ের জোর, নিজেকে রক্ষার সক্ষমতা। এরপরের ধাপ হল, জনসমর্থনে ঐ সরকারের পক্ষে জন-অনুমোদন নেয়া। তবেই সেটা পুরাপুরি এক বৈধ সরকার হয়। যদিও এরপরেও আরেকটা ধাপ থেকে যায় যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি বা জাতিসংঘের স্বীকৃতি। তবে সে পর্যায়ে যাবার আগেই, আশরাফ গনি সরকারের নিজেকে রক্ষার মুরোদ ছিল না, এই হলো গোড়ার সমস্যা।

    ট্রাম্পের আমলে এসে আমেরিকা আফগানিস্তান ‘ফেলে’ পালাতে চাচ্ছিল। তাই আফগানিস্তান থেকে পালানোর জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই (আপন ঘোষিত শত্রু) তালেবান গোষ্ঠির সাথেই এক আপোষনামা রচনার চেষ্টা করেছিল। আর তাতে সফল হলে এক চুক্তি সই করেছিলেন গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০। কিন্তু ট্রাম্প এই চুক্তি করেছিলেন গনি সরকারকে উপেক্ষা করে, তাকে এই চুক্তির কোনও পক্ষই না করেই। কারণ  আফগান পুতুল সরকারকে এর মধ্যে আনা যাবে – এটাই ছিল তালেবানের ট্রাম্পকে দেয়া পুর্বশর্ত। আর অসহায় ট্রাম্প নিরুপায় হলে এই শর্ত মেনেই চুক্তিটা করেছিল।

    এই যে গনি সরকারকে উপেক্ষা করে তালেবানের সাথে চুক্তি সই করা – আসলে সেদিন থেকে এর সোজা মানে হয়ে গিয়েছিল; আমেরিকান প্রটেকশনে তারা আর পুতুল সরকারও থাকে না। সরাসরি বললে, বাস্তবত ওইদিন থেকে গনি সরকারকে আমেরিকাও আর কোন সরকার মানতে অস্বীকার ঘোষণা করে দিয়েছিল। যদিও এরপর থেকে কেউ গনি সরকারকে ঠেলে ফেলে দেয়া বা চ্যালেঞ্জ দেয়নি বলে বাইরে থেকে দেখে এটাকে আগের মতনই  এক সরকার মনে করেছিল। আর নিজস্বার্থ এই মোহে ছিল ভারত সরকারও।

    যদিও বাস্তবতা ছিল ট্রাম্প গনি সরকারকে এতিম করে ছেড়ে দিয়েছিল, কর্তৃত্ব কেড়ে নিয়েছিল। গনি সরকারকে সাথে না রেখে কেবল তালেবানের সাথে চুক্তি করার মানেই তো হল ট্রাম্প স্বীকার করে নিয়েছিলেন গনি সরকার বলে কেউ নাই, তালেবান যোদ্ধারাই আফগান ক্ষমতার একমাত্র হকদার। অথচ ১৫ আগস্ট কাবুলে তালেবান যোদ্ধাদের প্রবেশের পরে  সবাই এমন ভান করতে থাকল যেন ঐদিনই বোধহয় প্রথম গনি সরকার ক্ষমতাচ্যুত হল আর তালেবান ক্ষমতা পেল। এজন্য বলছি ১৫ আগস্ট হল এক আজব দিন! ভান আর ভনিতার দিন!

    এখন ভান করাদের মধ্যে ভারত সরকারকে আমরা শীর্ষে রাখতে পারি। কেন? কারণ তারাও আমেরিকান ক্ষমতার দিকে চেয়ে থাকা বা আমেরিকার আড়ালে মুখ লুকিয়ে রাখা পার্টি। অথচ এখন তারাও নিরুপায়। অতএব তারা ভান করছে বা মনে করছে যে গনি সরকারই “বৈধ সরকার”। তবে আমেরিকান ক্ষমতার আড়ালে বসে আফগানিস্তান থেকে যারা ব্যবসা আর প্রজেক্ট লুটছিল ভারত সরকার তাদের অন্যতম বলেই এই মিথ্যাকথার আড়ালে মুখ লুকানো ছাড়া এখন আর উপায় কী?

    কিন্তু আবার সাবধান! এখন সব অর্থেই কার্যত ‘গনি সরকার’ বলে আর কেউ নাই। কিন্তু এর মানে কি তাহলে আপনাতেই তালেবান বৈধ সরকার? অন্তত আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশের বা জাতিসংঘের মেনে নেয়া অর্থে? অবশ্যই না। যদিও কার্যত তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায়।

    আর নিজেদেরকে বৈধ সরকার বলে খুঁটি গাড়তে বা অনুমোদন যোগাড় করতে যেসব বাধা তালেবানের সামনে এর তালিকাটাও ছোট না। যেমন-

    একঃ তালেবানেরা এখনও নিজেরাই ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক শপথ নিতে পারে নাই; শপথের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে দেখাতে পারে নাই।

    দুইঃ সেই আনুষ্ঠানিকতায় আবার কাদের দাওয়াত দিবে, এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হল – দাওয়াত দিলেই সে দাওয়াতি আসবে এর নিশ্চয়তা এখনো নাই বলেই মনে হচ্ছে।

    তিনঃ দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় তাদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ আছে এমন সত্য-মিথ্য অনুমান ছড়িয়েছে যেটা তাদের পক্ষে যাচ্ছে না। আর, ওদিকে শপথ অনুষ্ঠানও হতে দেখাতে পারছেনা বলে সেই অভ্যন্তরীণ আন্তঃ বিভেদের অনুমানই আরও পোক্ত হয়ে চলছে।

    চারঃ সর্বশেষ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো বা না-ভেটোসদস্য সবাই মিলে মোট ১৫ সদস্যের সমর্থনে জাতিসংঘের পাশ হওয়া এক প্রস্তাব যা আহবান রেখেছে,  আফগানিস্তানের সব পক্ষকে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ইনক্লুসিভ[inclusive] ও মানবাধিকার রক্ষার পক্ষের এক সরকার গড়তে। এনিয়ে বিস্তারে আমার আগের লেখা এখানে।

    পাঁচঃ  অর্থাৎ চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, বৃটেন ও ফ্রান্স – এই পাঁচ পরস্পরের স্বার্থবিরোধী ভেটোসদস্য একসাথে এই প্রস্তাবের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, যা খুব কম ঘটে থাকে, রেয়ার। আর বলা বাহুল্য এটা তাই তালেবানের  উপর খুবই শক্ত চাপ।

    ছয়ঃ আমাদের অনেকের ধারণা, কোন দেশে আমরা মুরোদে কুলালে যেমন ইচ্ছা তেমন কোনও সরকার গঠন করে বসতেই পারি, আর যেন যেমন ইচ্ছা তা চলতে চালাতেও পারি, আমারটাই ভাল, আমার ধর্মটাই বা শ্রেষ্ঠ মনে ঠাউরে সেই যুক্তিতে। কিন্তু এই অনুমান ভুল ও ভিত্তিহীন। একটা সমাজেও আমরা এভাবে টিকতে বা থাকতে পারব না। এছাড়া এটা উল্টা আমাদেরকেই একঘরে করে ফেলতে পারে। ফলে এমন চিন্তার কারণেও এনিয়ে একটা স্থবিরতা চলছে।

    সাত) মূল সমস্যা, তালেবান এক আমিরাত (আমীরের) সরকার-  অর্থাৎ আমিরাতে আফগান সরকার চাইছে। যদিও তারা জনপ্রতিনিধির সরকার না রাজা হবেন তা স্পষ্ট করতে পারছেন না। যদিও ঝোঁক রাজা বা আমীর হবার। [যদিও আমীর হলে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দেবে না।]
    এই প্রসঙ্গ শেষ করার আগে  উপরের ছয় নম্বর পয়েন্টে যেটা ভুল অনুমান বলেছি সেটা কেন তা এখন নিচে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নিব।

    ঐ অনুমিত যুক্তি ভুল কেন?
    সমাজ মানেই আসলে পণ্য বিনিময়ের সমাজ। এই বিনিময় মানে আপনি যা উতপাদন করেছেন তা অন্য উতপাদকে দেওয়ার বিনিময়ে সেই উতপাদকের পণ্য পাওয়া-নেয়া ও ভোগ করা। এভাবে পরস্পর সকলে মিলেই এক পণ্য-বিনিময় সম্পর্কে জড়ানো এটাই সমাজ। তাহলে সমাজ মানেই সেখানে পণ্য-বিনিময় আছে। আর এই পণ্য-বিনিময়ের ভিত্তিতে আমরা সমাজ হয়ে থাকি।
    এখন একটা নতুন কথা বলি।  এই যে আমরা পরস্পরের সাথে পণ্য বিনিময় করতে রাজি হই বা জড়াই – এই বিশেষ কাজেরই আরেক অর্থ-তাতপর্য আছে।  যেমন মাইগ্রেশন [migration] মানে গ্রাম ছেড়ে কাজের খোঁজে কাছাকাছি শহর বা রাজধানীর দিকে বসবাসের জন্য রওনা দেয়া, এটাই মাইগ্রেশন।   এখন গরীব বা নদীভাঙনে পড়া লোক যখন কাছের কোন সমৃদ্ধ শহর বা রাজধানিতে প্রবেশ করে  তখন ঐ সমাজে সে বাইরের আর নতুন লোক। এমনকি হতে পারে সে হাতে কোন অর্থও নাই। তাহলে বিনিময় করবে কী করে?  আর বিনিময় না হওয়া মানে কিন্তু নতুন বা মাইগ্রেটেড হয়ে আসা লোকটা যে ঐ নতুন শহরে আছে এর অস্তিত্ব স্বীকৃত না হওয়া।  তাহলে কী হয় তখন?  কান খাড়া করে শুনেন তা হল, আমাদের সমাজে সাধারণত যা ঘটে,  কেউ নতুন আগত লোকটার কাহিনী শুনে তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে।  এভাবে এখন সম্পর্ক শুরু হবে। একজন সাহায্য করবে বা দিবে (ঠিক কোন সচেতন বিনিময়ে না হলেও) স্বেচ্ছায় আর গ্রহিতা লোকটাও স্বেচ্ছায় সবার জন্য দোয়া করবে। আর সারকথায় এভাবে পরস্পরকে সমাজে স্বীকার করে নিবে। এভাবেই আমাদের অলক্ষ্যে আমরা সমাজে পরস্পরের অস্তিত্ব স্বীকার করে নেই। তাহলে সমাজ মানে পণ্য বিনিময় সম্পর্ক। আর এমন বিনিময়ের ভিতর দিয়ে পরস্পরকে স্বীকার করে নেয়া। এ যেন স্বীকার করে নেয়া যে, হ্যা, তুমিও কিছু উতপাদন বা তৈরি করেছো মেনে নিলাম। এমনকি সময়ে বিনা বস্তুগত বিনিময়, সামাজিক দায় মিটাতে অন্যকে সাহায্য করা আর সর্বপরি সবার জন্য নিঃস্বার্থ দোয়া করা। এভাবেই সম্পর্ক তৈরি করা জড়ানো আর এর ভিতরেই মানুষের বসবাস। আর ঠিক এর উল্টাটাই হল কাউকে একঘরে করে।
    তাই কোন জনগোষ্ঠি নতুন করে রাষ্ট্র-সরকার মানে নতুন করে পারস্পরিক স্বীকৃতির আসর বসানো। আর এটারই সবচেয়ে বড় রূপ হল বৈদেশিক বাণিজ্য বিনিময় সম্পর্কে জড়ানো। আর এর ট্রেন্ডটা হল, যতই দিন যাচ্ছে আমরা ততই আমরা চিনা-জানা তেমন নাই এমন দেশ-ভুমির মানুষের সাথে গভীর বিনিময় সম্পর্কে আমরা জড়িয়ে যাচ্ছি, নিজের স্বার্থেই।  তাই শুরু থেকেই যেমন ইচ্ছা তেমন করে চলতে চালাতেও পারি অবশ্যই তবে এটা আইডিয়েল [ideal]। মানে হল এটা  যতটা কল্পনার ততটাই তা বাস্তবে সুবিধার না, আর তা বাস্তবায়ন অযোগ্য এমন কল্পনা।
    সবশেষে, সার্ক নিয়ে কিছু কথা বলে শেষ করব।

    সার্ক [SAARC]:
     এতদিন ভারত পাকিস্তানের ভয়ে সার্ককে অকেজো করে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন তার ভয় এই অবস্থায় যদি ভারতকেই বাদ দিয়ে চীন সার্কে ঢুকে যায় আর সার্ককেই কার্যকর করে ফেলে! তাই ভারত এখন সার্ককেই বিলুপ্ত করে দিতে চায়। তাই এখন প্রকৃত বাস্তবতাটা হল সার্ক নিয়ে ভারত যেদিকেই যাক, চীনেরই লাভ আর ভারতের ক্ষতিই হবে। মূল কারণ, ভারত চীনের সাথে তুলনাযোগ্যই নয়, কমপেটিবল নয়।
    সার্ক এই জোট নিয়ে কথা-আলোচনা যত দিন যাচ্ছে ততই কমে নাই হয়ে যাচ্ছে। অল্পকথায় একেবারেই এর মূল কারণ, ২০০১ সাল থেকে দুনিয়া নতুন অভিমুখ বা ঝোঁকে বইতে শুরু করানো হয়েছিল তাই।  ভারত বা আমেরিকার মত দেশের ভাষায় বললে এটাকে তারা শব্দে আকারে বলবে  “সন্ত্রাসবাদ” বা “ওয়ার অন টেরর”।  আসলে এসব দেশগুলো ভেবেছিল, “ওয়ার অন টেরর” এর নামে  “ইসলাম কোপানো” শুরু করলে তারা নিজেদের অপরাধ আড়ালে ফেলে দুনিয়াটাকে নিজের মত করে সাজিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু আজ ২০ বছর পরের অভিজ্ঞতা বলছে সেটা ঘটেই নাই। উলটা সময়টা এখন ভারত ও আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের এখন কাফফারা দিবার সময়। কারণ তারা সমুলে হেরে  গেছে। আর আফগানিস্তান থেকে সেনা গুটিয়ে চলে আসা এর জলজ্যান্ত নমুনা।  এছাড়া  নতুন নতুন ক্ষত ও বিরোধ তৈরি করেছে তারা, সেসবের জন্য নতুন কাফফারা দিতে হবে। আর সবার উপরে এদের সবার সব ধরণের সক্ষমতাই এই প্রশ্নের সম্মুখীন ও পড়তির দিকে। তাই বুদ্ধিমানেরা কেউ কেউ আগেই পুণঃমুল্যায়নে বসে গেছে। কিন্তু না চাইতে যেসব নতুন ক্ষত তৈরি করেছে তার কী হবে?
    কথাটা বোধহয় এভাবে বলা যায়।  আগেই বলেছি এখানে “ইসলাম কোপানো” আর এর সুযোগ নেয়াটা দিয়ে শুরু হয়েছিল। ভাবা হয়েছিল ইসলামি সমাজগুলোকে অস্বীকৃত আর চাপে মার্জিনালাইজ করে রাখলেই তারা জিতে যেতে পারবে। কিন্তু ২০ বছর পর দেখা যাচ্ছে ফল হয়েছে উলটা। আর তাতে দুটা ধারা তৈরি হয়েছে। একটা হল, গোণায় ধরা আর আপন করে নেয়া। পুর্ণ মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়ে সসম্মানে পাশে রাখা, পারস্পরিক সম-মর্যাদার গ্লোবাল সমাজ গড়ার পথে রওনা দেয়া। আর এর বিপরীতে আরেক ধারা হল, আমরা শ্রেষ্ঠ, এককালে সব আমাদেরই ছিল। তাই, ইসলামের নেতৃত্বে আগে আমাদের নয়া কিছু রাষ্ট্র গড়ে তোলা এরপর এর অধীনে দুনিয়াকে ঢেলে সাজানো।
    তবে ২০০১ সালের মূল পরিবর্তনের কৌশলগত কারণে আমেরিকা ভারতকে তোয়াজ করে একে চীনের বিরুদ্ধে খারা করেছে শুধু তাই না। পালটা পাকিস্তানকেই আমেরিকা নিজ সন্ত্রাসী হামলার লঞ্চিং প্যাড হিসাবে ব্যবহার করেছে আবার পাকিস্তানকেই সন্ত্রাসবাদী বলে দোষী দাবি করেছে। এই সুযোগে ভারত পাকিস্তানের চেয়ে ক্ষমতায় উপরে এক সাধু রাষ্ট্রের ইমেজে বসার চেষ্টা করেছে। ফলে সেই থেকে এর প্রভাবে সার্কের ভিতরে ভারত আর পাকিস্তানকে নিজের সমান গণ্য করতে চায় নাই।  এটাই সার্কের অকার্যকর হয়ে পড়ার মূল কারণ।  সারকথায় সার্ক অকার্যকর হবার মুল কারণ  আমেরিকার নীতি। পাকিস্তানকে কোপের মধ্যে রাখা আর বিপরীতে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ভারতের তোয়াজে রাখা।
    এতে ভারত চেয়েছে সার্ক থেকে পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে বাকিদেরকে নিয়ে নতুন জোট করা। সাথে অন্য নতুন কাউকে ঢুকানো। এতে ১৯৯৭ সালে গড়া সেটার নাম বিমসটেক [BIMSTEC] বা বে অফ বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ, একেই ভারত সার্কের বিকল্প হিসাবে পুশ করতে শুরু করেছে। আসলে ২০০১ সাল থেকে “সন্ত্রাসবাদ বিরোধিতার” আড়ালে, মার্কিন সমর্থনে ভারতের মুসলমান ও পাকিস্তানবিদ্বেষ চরমে উঠাতে ভারত আর সার্ক টিকাতেই চায় নাই। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ, নয়াদিল্লিতে সরকারি আমন্ত্রণে ২০১৬ সালে ভারত সফররত একদল বাংলাদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপচারিতায় সাবেক রাষ্ট্রদুত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী [বর্তমানে ঠিঙ্কট্যাঙ্ক ORF ফেলো] খোলাখুলি বলেই ফেলেছিলেন, [দেখুন সার্ক ভুলে যেতে বললেন পিনাক রঞ্জন;] আর ‘বিমসটেক জোটের’ ওপর বাংলাদেশ জোর দিক।
    কিন্তু ২০২১ সালে এসে আবার ভারত পল্টি দিচ্ছে।  এবার বলছে সার্ক আর অকেজো করে রাখা না, সার্কের বিলুপ্তি দরকার। কেন? ভারতের ভয় সার্ক অকেজো করে ফেলে রাখলে সার্কে ঢুকে চীন না সার্ক নিয়ে চলে যায়!  কিন্তু কাজটা সে করতে গেছে আফগানিস্তান প্রসঙ্গে নিউইয়র্কে সার্কের এক সভাকে কেন্দ্র করে।

    আফগানিস্তানকে নিয়ে সার্ক বৈঠকে হতে গিয়েঃ
    গত ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের বার্ষিক  সাধারণ পরিষদ বৈঠকের সাইড লাইনে। আফগানিস্তানকে সার্কে সর্বশেষ যুক্ত সদস্য রাষ্ট্র হিসাবে নেয়া হয়েছিল আগেই। সংশ্লিষ্ট নেতারা সার্কের একটি বৈঠক করতে চেয়েছিলেন ঐ সাইড লাইনে। কিন্তু তা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি মূলত আফগানিস্তানকে সেখানে ডাকা হবে কি না বা হলে কীভাবে এনিয়ে অমীমাংসিত বিতর্কের কারণে।

    এমনিতেই গত ১৫ আগস্টের পরে ভারত আফগানিস্তান ইস্যুতে একা হয়ে এক আজিব অবস্থান নিয়েছে। তা হল অনেকটা যেন “আমাকে আগের গনি সরকার ফিরে এনে দাও। আমি এর অন্য কমকিছু হলে মানব না’- টাইপের।  সম্ভবত এর মূল কারণ এতদিন ভারত যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার আড়ালে থেকে আফগান ইস্যুতে অবাধ বিচরণ ও সুবিধা খেয়েছে। আর এখন ঠিক উল্টা যুক্তরাষ্ট্রও কারও দিকে না কেবল নিজের একক  স্বার্থের দিক চেয়ে চলার কারণে ভারত একা বোধকরা এক এতিম যেন! তাই সার্কের ঐ হবু মিটিংয়ে ভারতের অবস্থান ছিল, আগের নাই হয়ে যাওয়া গনি সরকারেরই প্রতিনিধিত্ব আনতে হবে। তবে, ভারতের ব্যাখ্যা পাকিস্তান বরং তালেবানদেরকে ঐ আফগান প্রতিনিধিত্বের আসনে বসাতে চেয়েছে, তাই সব ভন্ডুল হয়ে গেছে। সারকথায় ওই বিতর্কে পড়ে, সার্কের সভা বসতেই পারেনি; বাতিল হয়ে গেছে।

    কিন্তু ভারতের মিডিয়া এ নিয়ে অস্থির অধৈর্য হয়ে উঠেছে। যেমন দ্যা প্রিন্ট পত্রিকায় জ্যোতি মালহোত্রার এক লেখা। [অনুমান করা হয় এটা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে লেখানো।] তারা নিজেরাই এর সারাংশ সেখানে করেছে এভাবে: “চীন আর সার্ক রুমের মধ্যে ঢুকে পড়া হাতি নয়। বরং সে ওর পুরা ঘরবাড়িই দখল নিয়ে বসেছে। ভারতের বরং উচিত হবে তার পড়শিদের ছেড়েছুড়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইউকে, রাশিয়া প্রভৃতি অগ্রসর দেশ ও কোয়াডের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া” ।

    China is no longer the elephant in the SAARC room, it occupies the entire zoo. India would rather jump over its neighbourhood and build ties with US, France, UK, Russia, and the Quad.

    এসব কিছু আসলে ২০০১ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের এলায়েন্স গড়ে তোলা, যার ভিত্তি হল কথিত ‘সন্ত্রাসবাদ’ ইস্যু। আর এতে এর নামে ভারতের অদ্ভুত এক মুসলমানবিদ্বেষী মন আর সেই মনের তৈরি করা ঘৃণা হাজির হয়েছে! যুক্তরাষ্ট্রও প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে ভারতের এই আচরণ সমর্থন করে গেছে আর আজ এরই পরিণতি দেখছে সবাই।
    আসলে একালের আফগান থেকে নিজেকে প্রত্যাহারের পরে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সাথে তার গত ২০ বছরের সম্পর্ককে পুনঃমুল্যায়নে ঢেলে সাজিয়ে নেয়া শুরু করাতে ভারতের এই দিশাহীন প্রতিক্রিয়া।
    বাংলাদেশেরও কিছু মিডিয়ার এখন লক্ষ্য ভারতের এই দিশাহীন প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে লেখা ছেপে নিজের ভাগ্য গুছানো। যেমন মানবজমিনের এক লেখার শিরোনাম “আফগান সংকট খাদের কিনারায় সার্ক”।

    এটা প্রমাণ করে ভারতের বিদ্বেষী আচরণ কোন মাত্রা ছুঁয়েছে। একালে এর উপর যুক্ত হয়েছে আমেরিকা আর আগের মতো ভারতকে সমর্থন করতে পারছে না, সম্পর্ক আর আগের মতো নাই। আমেরিকা নিজের স্বার্থ নিয়েই ডুবে আছে। আর সে ভিত্তিতেই ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক ঢেলে সাজাতে চাইছে। আর এতেই ভারতের প্রতিক্রিয়া হয়ে উঠছে অনিয়ন্ত্রিত ও ভয়াবহ!

    চীন থাকলে ভারত-পাকিস্তান কোনই সমস্যা নাই, কেন এমন??
    কথাটা আসলেই সত্য, অকাট্যভাবে প্রমাণিত। আমেরিকাই ভারতকে তোয়াজ করে গাছে তুলে তার পাকিস্তান-চুলকানি বা সময়ে চীন চুলকানি তৈরি করেছে। সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানেইজেশন [SCO] মূলত চীনের নেতৃত্বে এক জোট। এর উপর সাথে আছে পুতিনের রাশিয়া। এবং সেন্ট্রাল এশিয়ার কিছু দেশ।  সম্প্রতি এই জোটে  ভারত ও পাকিস্তান দুদেশকেই অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, আফগান বা তালেবান নিয়ে অস্থিরতা এই সময়ে  SCO তে ভারত ও পাকিস্তান একসাথে সুন্দ্রভাবে মিটিংয়েও বসেছিল। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব হল?  এখানেই শেষ না।  পাকিস্তানে যাচ্ছে ভারত! কেন? এই SCO এর পক্ষ থেকে এক সন্ত্রাসবিরোধী ট্রেনিংয়ে অংশ নিতে। না আপনারা ভুল শুনেন নাই। আচ্ছা, ভারতের বিশ্বস্ত মিডিয়া ভোরের কাগজের রিপোর্টের লিঙ্কটা দিচ্ছি দেখেন যার শিরোনামঃ পাকিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী মহড়ায় যাচ্ছে ভারত।  অথবা ভারতের জি-নিউজের খবর শিরোনাম “পাকিস্তানের মাটিতে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে ভারতীয় সেনা, এবার সঙ্গী চিনও”। এর অর্থ কী ?
    অর্থ একটাই। আমেরিকাই ভারতকে বিগড়েছে, উস্কানি দিয়ে গেছে। যে কারণে চীনের নেতৃত্বে থাকলে ভারত ঠিক থাকে এবং ভারত-পাকিস্তান একসাথে কাজ করতে পারে, অবলীলায়।
    ঠিক একই সময়ে যখন আমেরিকার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়েন্ডি শেরমান এখন ভারত সফরে আছেন।  আর ভারত শেরমানের কাছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নালিশ দিচ্ছে পাকিস্তানকে শায়েস্তা করা, কনট্রোল করার জন্য; [ India Wednesday raised concerns over … Haqqani Network in Afghanistan along with the active role being played by Pakistan there…]। আর জবাবে শেরমান বলছেন, আফগান ইস্যুতে আমরা ভারত-আমেরিকা এক দেহ এক প্রাণ; US-India ‘one mind, one approach’ on Afghan-related issues. কেন? মনের দুঃখে দ্যা প্রিন্ট পত্রিকায় জ্যোতি মালহোত্রা যেন “পড়শিদের ছেড়েছুড়ে দিয়ে”  বনবাসে চলে যেতে চেয়েছেন!
    অথচ এটা অপ্রয়োজনীয়! চীন ইতোমধ্যেই বাংলাদেশকে পাশে নিয়ে এক ওয়ার্কিং জোট গড়ে নিয়েছেন। আপাতত যেখানে বাংলাদেশ হল ওয়ার হাউজ! আপাতত টিকার ওয়ার হাউজ!


    লেখক : 
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৬ অক্টোবর ২০২১, সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকার ওয়েবে ও প্রিন্টে   “সার্ক এখন কারও না“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    সাপ্তাহিক দেশকালে  ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারতকে আমেরিকান ছেঁকা; অভিমান! না ডিভোর্স!

    ভারতকে আমেরিকান ছেঁকা; অভিমান! না ডিভোর্স!

    গৌতম দাস

     ০৪ অক্টোবর ২০২১, ০০ঃ০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3K4

     

     

    “U.S.-India Relationship Is the Quad’s Litmus Test”

     

    কেবল আমেরিকার আফগানিস্তান দখলের ক্ষেত্রেই নয় “ঘটনার ২০ বছর” কথাটা ভারত-আমেরিকার “বিশেষ সম্পর্কের” ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হচ্ছে। সেও বিশেষ সম্পর্কের একটা বড় অংশ জুড়ে দাড়িয়েছিল কোয়াড [QUAD]; যা আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারত এই চার দেশীয় এক জোট। আমেরিকা-ভারতের গত ২০ বছরের সেই “বিশেষ সম্পর্ক” এবার হেলে পড়েছে মনে হচ্ছে। তাই আপাতত আমেরিকার উপরে ভারতের ক্ষোভ, অভিযোগ আর অভিমানের প্রকাশ দিয়ে বুঝাচ্ছে। বিশেষ করে গত ২৪ সেপ্টেম্বরের পরের ঘটনাবলীতে। কেন?
    আসলে ভারতের খুবই গর্বের ‘কোয়াড’ নিয়ে কথা বলছি। এত দিন কোয়াড এর উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বললে মানে হত যেন আপনি দুনিয়ার কথিত ‘বেস্ট ডেমোক্র্যাটিক” রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে কথা বলছেন। আর তাতে আমরা ভাবতাম তারা তারা মিলেই বেষ্ট হয়ে থাকুক আমাদের অসুবিধা নাই। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘণ নিয়ে প্রশ্ন জানিয়েছে সেটা আমরা অনেকেই জানি। আর নতুন ঘটনা হল, ভারতের এক প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব উলটা আমেরিকার দিকে আঙুল তুলে বলছে, আমেরিকার গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে […there are serious questions about the strength and performance of democracy in the US, highlighted by what happened in January 2021]
    তবে খুব সাবধান! কারণ এটা এতদিনে কেন? কারণ, আমেরিকা কোয়াডকে কেন্দ্র করে বুঝিয়ে দিয়েছে যে ভারত আমেরিকার কাছে (মানে খোদ কোয়াড-ই) এত গুরুত্বের কিছু না। তাই সে ভারতকে ছেড়ে অষ্ট্রেলিয়াকে কাছে টেনে কোয়াডের বদলে নতুন এবং সামরিক এক জোট খুলেছে। আমেরিকার এই “অবজ্ঞা” ও “তুচ্ছজ্ঞান” ভারতের ভিতরে মূল আলোচ্য বিষয়। ভারতের ভিতরের যারা এতদিন আমেরিকান পয়সায় থিঙ্কট্যাংক খুলে আঁতলামি করত আর গল্পে রাজা-উজির মারত তারা এখন ভারতেই কোনঠাসা  আর নাইলে  উলটা গান ধরেছে।  এককথায় এটাকেই বলে প্রেমে ছেঁকা খাওয়া – ভারতকে দেয়া “আমেরিকান ডিচ” (ditch)।  তাতেও শেষ না। ওদিকে,  এখন খোদ লন্ডন ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিনে তার আর্টিকেলের শিরোনাম “কোয়াডের কাজটা কী” [What is the point of the Quad]?

    গত ২৪ সেপ্টেম্বর ছিল হোয়াইট হাউজে কোয়াডের চার নেতার এই প্রথম মুখোমুখি কোন মিটিং করতে বসার দিন। আগের লেখায় বলেছিলাম, এটাই প্রথম মুখোমুখি মিটিং; তবে এটাই শেষ মিটিংও হতে পারে। আর এখন ওই মিটিং শেষে যত দিন যাচ্ছে তাতে  আমেরিকার উপর ভারতের গোসসা আর চেপে রাখা থাকছে না; বরং নানান ক্ষোভ ও অভিমান ততই সামনে আসছে। তবে সম্পর্কটা আপাতত কেউই ভেঙে দিচ্ছে না। যদিও অকার্যকর ফেলে রাখার ঝোঁকটাই বেশি। কেন?

    ছোট্ট জবাব হল, স্বামী সতীন নিয়ে এলে যা হয়! মানে হল, আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়াকে পরমাণু চালিত সাবমেরিনে সজ্জিত করতে ইংল্যান্ডকে সাথে নিয়ে “অকাস” (AUKUS) [ভিন্ন উচ্চারণে অনেকে “আউকাস” বলছে] নামে এক ত্রিদেশীয় নয়া জোট ঘোষণা করেছে; অর্থাৎ  মোট চার সদস্যের কোয়াড অথচ এর দুই সদস্য মিলে আবার বাড়তি যুক্তরাজ্যকে সাথে নিয়ে নতুন আরেক জোট গড়ার ঘোষণা করেছে। আর এবার আগেভাগেই ঘোষণা করে দিয়েছে এটা ‘সামরিক জোট’। এতে যেন আমেরিকার এক প্রকাশ্য ইঙ্গিত যে, আমরা সামরিক সম্পর্কে আসতে ভারতের জন্য অনেক  অপেক্ষা করেছি, আর না। অথবা এটা যেন বাইডেন বলছেন, “এখন তোমরা ভেবে দেখো, এই সামরিক জোটে যুক্ত হবে কি না, না হলে রাস্তা মাপো! আর এ নিয়ে কার্ড শো করো, তোমাদের মনে কী আছে ঝেড়ে কাশো। সেটি দেখতেই তো ২৪ তারিখে মিটিং ডেকেছি- এখানে মুখোমুখি হও!”
    এখানে এই ভাষ্যটা নিঃসন্দেহে  অনুমান-কল্পনা করে লেখা। কিন্তু বাস্তবে ঘটনাটা প্রায় এমনই ঘটেছে। নরেন্দ্র মোদীর হোয়াইট হাউজ রওনা হওয়ার দুই দিন আগে ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রীংলা যে প্রেস ব্রিফিং করেন, সেখানেই সুনির্দিষ্ট করে তিনি বলেছিলেন, কোয়াড অথবা মোদির কোয়াড মিটিংয়ে যোগ দিতে হোয়াইট হাউজে যাওয়ার সাথে ত্রিদেশীয় নয়া জোট অকাসের কোনো সম্পর্ক নেই; [No link between AUKUS and Quad, says India]।  এটা ছিল  ‘দ্য হিন্দু’ এর এনিয়ে ২১ সেপ্টেম্বরে বিস্তারিত এক রিপোর্টের শিরোনাম। লিখেছে, ভারতের পররাষ্ট্র  সচিব বলেছেন, ‘আমরা এই নয়া জোটের কেউ নই। আমাদের চোখে কোয়াডের সাথে এই নয়া জোটের কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। অথবা কোয়াডের তৎপরতার উপর এর কোনো প্রভাব বা সম্পর্ক নাই।’

    “We are not party to this alliance. From our perspective, this is neither relevant to the Quad, nor will it have any impact on its functioning,”  – Mr. Shringla told journalists at a briefing on the Prime Minister’s visit.

    কিন্তু শ্রীংলার এসব কথাতে মিডিয়ার কৌতুহল মিটেনি। তাই তারা আরো প্রশ্ন করেন তাহলে মোদীর এই হোয়াইট হাউজ সফর কি নয়া জোটের প্রভাবের নিচে গুরুত্ব হারিয়ে চাপা পড়ে যাবে? অন্য এক সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেন, কোয়াড কি এখন থেকে তা হলে ‘নরম-সরম’ ধরনের ইস্যুতে নিজেকে নামিয়ে নেবে? শ্রীংলাকে তাই আবার এ নিয়ে মুখ খুলতেই হয় যদিও তাতে বিপদ আরো বেড়ে যায়, কমেনি।

    if the Mr Modi’s meetings and the Quad summit would be impacted or overshadowed by the big U.S.-Australian defence partnership, Mr. Shringla said the two events were not linked and also denied that the new partnership would mean that the Quad would only deal with “softer issues”

    তিনি বলেন, “নয়াজোট একটি সামরিক জোট। আর কোয়াড আলাদা লক্ষ্য নিয়ে আলাদা কিছু দেশের গ্রুপ। তবে কোয়াডের চার সদস্য দেশ আবার মালাবার এক্সারসাইজ নামে আরেক সমমনাদের কাজের জোট, যারা প্রায়ই মূলত একসাথে যৌথ নৌমহড়ার আয়োজন করে থাকে। কিন্তু  ‘মালাবার নৌমহড়া গ্রুপের’ সাথে কোয়াডের কোনো সম্পর্ক নেই”- শ্রীংলা বলেন।

    And in the same sentiment Malabar exercises (maritime exercises involving Australia, India, Japan, U.S.) are those that are done between different nations but has nothing to do with Quad,” Mr. Shringla said.

    কিন্তু আমাদের কাছে এটি কৌতুকের যে, এখন ভারত কোনো সামরিক তৎপরতা বা সামরিক জোটের সাথে নেই বলে এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চাচ্ছে; অথচ যতবারই ওসব নৌমহড়া হয়েছে মিডিয়া রিপোর্টে সবসময় তা কোয়াডের নামে হচ্ছে বলেই রিপোর্টেড হয়েছে। কিন্তু ভারতসহ কেউ এর বিরুদ্ধে কোনো সংশোধনী বা আপত্তি করেনি। তাই আগের লেখায় বলেছিলাম এটাই ভারতের “মাংস না খাওয়া নিরামিশাসী থাকতেই চান কিন্তু মাংসের ঝোল খাবার লোভ-শখ ষোল আনা!”।  আর তাই যেন এবার বাইডেন এবার কোয়াডের মিটিং দিয়েছেন একেবারে হোয়াইট হাউজে যেন ভারত প্রত্যক্ষভাবে আমেরিকার সাথে সামরিক জোট করতে রাজি কিনা তা এবারই খোলাখুলি জানাতে বাধ্য হয়। যেটা এবার ভারত জানাতে বাধ্য হয়েছে যে সে নাই। অর্থাৎ আর আমেরিকার সাথে খাতিরের ভাব, ভান ও ভনিতার দিন নাই, শেষ। তাই, হোয়াইট হাউস এই কোয়াড সভা উপলক্ষ্যে এক ফ্যাক্টশীট প্রকাশ করেছে [Fact Sheet: Quad Leaders’ Summit] স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে, যা তাদের থিঙ্কট্যাংক ব্যক্তিত্বরাই সমালোচনা করে বলছেন, এতে এক কোভিডের টিকা প্রোগ্রাম নিয়েই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলা হয়েছে। যা আসলে ইতোমধ্যেই ব্যর্থ হয়েছে। ভারত জাপানের বিনিয়োগ নিয়ে অন্যকে টিকা সরবরাই করবে কী যেখানে ভারতের নিজ জনগোষ্ঠির জন্য প্রয়োজনীয় যা টিকা তা উতপাদনের ক্যাপাসিটিই নাই। আর নাই বলেই শেষে বাস্তবত ভারতকে বিদেশে থেক্লে টিকা আমদানি করে পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছে। তার মানে নতুন করে কোয়াড বেচে আছে দেখাতে চেয়েই কোয়াডের কেবল কোভিড প্রোগ্রামের কথা বলা হয়েছে পুরা সাত পৃষ্ঠা ধরে। যা ইতোমধ্যেই কোয়াডের ব্যর্থ এরিয়া।
    অর্থাৎ কোয়াড যে নাই হয়ে গেছে গত ২৪ সেপ্টেম্বরে এটাই চারদেশ মিলে পরোক্ষে স্বীকার করে নিয়েছে। আর ঠিক একথাটাই নিউইয়র্ক সিটি কলেজের এক প্রফেসর আমেরিকারই “ফরেন পলিসি’ পত্রিকায় গত জুন মাসে আর্টিকেল লিখে বলেছিলেন। লেখার শিরোনাম ছিল কোয়াড এক মিথ্যা-মায়ার নাম’ [The Quad Is a Delusion]। বলেছিলেন এই জোট “আমেরিকাকে চীনের বিপরীতে কোন বাড়তি সুবিধা এনে দিবে না”।

    ভারতের রাজনীতিকেরা কী জানতেন না, কোয়াড বা আমেরিকা তাদেরকে রক্ষা করবে নাঃ
    অভ্যন্তরীণভাবে ভারতের শাসক-নেতাদের মনে এটা পরিষ্কার না থাকার কারণ নেই যে, কোনো যুদ্ধে জড়ানোর মূল বিপদ হল যে, এটা যুদ্ধের খরচের বোঝা চাপিয়ে নিজ খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থাকে আরো খারাপ করে ফেলা। ফলে পাকিস্তানের ইস্যু ছাড়া কোনো যুদ্ধে না জড়ানোই অন্য সব দেশের মতো ভারতীয় মনের সাধারণ অবস্থান। কিন্তু এ দেশের নাম ভারত যার আরেক নাম হওয়া উচিত ‘ভান ও ভণিতা’র দেশ। ভান-ভনিতা করে চলে এদের জনগোষ্ঠিগত বৈশিষ্ঠের আকার ধারণ করে বসে গেছে। এরা জীবিনের কঠিন বাস্তবতাগুলোকে কখনো প্রকাশ পেতে দেবে না; বরং যা সে নয় তাই সে ‘শো’ করবে, যেটাকে আমরা শো-আপ করা বলি।
    ভারত শো-আপ করা ছাড়া কিছুই করতে পারে না, চলতে পারে না। এটা নেহরু কংগ্রেসের ভারতের প্রথম প্রায় পাঁচ দশক ধরে চলা তথাকথিত কমিউনিস্ট অর্থনীতির (বিদেশের বিনিয়োগ নেয়া যাবে না) পরিণতি; এমন  এক কালচারাল বৈশিষ্ঠ হয়ে গেছে। গ্রামের মানুষ উন্মুখ হয়ে কাজের খোঁজে শহরে-রাজধানীতে এসে থাকে  এটা দুনিয়াতে খুবই কমন ফেনোমেনা। কিন্তু নেহরুর ভারতের ক্ষেত্রে  কাজে নয়া পেশা, কাজের আশায় শহরে ভীড় করেছিল এমন  চার প্রজন্ম পার হয়ে গেলেও নেহেরুর কমিউনিস্ট অর্থনীতি তাদের বস্তিবাস অথবা জীবনমানের নিম্ন ও স্থবির দশায় কোনো পরিবর্তন আনতে পারে নাই। খারাপ অর্থনীতিতে কাজের অভাবে পড়ে চরম দুঃখ-দুর্দশাগুলোর প্রকাশ মাপক অনেক ধরনের হয়ে থাকে। এর একটি হলো মধ্যবিত্তের উত্থান-পরিবর্তনগুলোকে স্টাডি করে সেটা বোঝার চেষ্টা অনেক পুরনো হলেও ভারতের এই মাপকে ভারতের চার প্রজন্মের খবর এখানে খুবই করুণ। বাংলাদেশের সাথে যদি তুলনা করা হয়,  আমাদের বেলায় আমাদেরকে শুরুই করতে হয়েছিল অনেক দেরিতে অন্যদের (দেশভাগের আগের ভারত আর পরের পশ্চিম পাকিস্তান) পেট ভরার পরে, স্থায়ী সম্পদগুলো সবই তাদের পকেতে থেকে গেছিল, আমাদের শুরু একাত্তরের পরে। তবু এখানে দেখব আমাদের মধ্যবিত্তের ফর্মেশন সবার চেয়ে আলাদা। ভারেতের চেয়ে তো বটেই, একেবারেই আলাদা। আমাদের বেলায়, কোনো প্রথম প্রজন্ম যদি ঢাকায় এসে বাসের হেলপার হয়, তবে পরের প্রজন্মের কর্তা বাস ড্রাইভার হয়ে হাজির হতে দেখা যেতে পারে। আর এখানে সবচেয়ে চোখে পড়ার মত ও তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা হল, একালে বাস ড্রাইভারের মেয়ে কলেজে পড়ে!  আমাদের এখানে কোন মানুষ বা তার পরিবার যারা গ্রাম থেকে শহরে ধাবমান এরা চার প্রজন্ম ধরে একই স্তরের জীবনমানে আছে দেখা যাবে না – ট্রেন্ড টা এরকম।

    এখন ভারতের বেলায় যেটা ঘটে আসছে তা হল এক লম্বা সময় ধরে একই নিম্নআয়ের জীবনমান ধরে ওর মধ্যেই আটকে থাকতে বাধ্য হলে তখন একটা সময়ে এর কালচারাল প্রভাব হয় মারাত্মক। যেমন – স্বল্প আয়ের পরিবার বলে, এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার রান্নার তেল কিনে একেকবার আধাছটাক করে। তবে তা নিয়ে কথা বলার কিছু নেই। কিন্তু সে সেটা কী করতে কিনে এটা গুরুত্বপুর্ণ। সে কিনবে পকেটে করে শিশি নিয়ে গিয়ে। কেন? কেউ যখন তা কিনে বাসায় ফিরবে, তা যেন পড়শি পরিবারের কেউ দেখে না ফেলে যে এত অল্প করে তেল কিনে। যার মানে তার অর্থনৈতিক অবস্থার আসল লেভেল কোনটা। কেন এমন হয়?
    কিন্তু  তাঁর পড়শিও কি তার মত একই লেবেলের অর্থনৈতিক জীবনমানের মানুষ নয়? অবশ্যই। আসলে তারা নানা সামাজিক আসরে ওসব পড়শিরা পরস্পর পরস্পরের কাছে ভান-ভণিতায় শো করে গেছে ও যায়। তারা সবাই ভনিতা করে দেখাতে চায় যে তাদের জীবনমান অনেক ভালো বা উঁচু। আর এমন করে দেখানোতে সবচেয়ে বিপজ্জনক ‘শো-আপ’ হল যখন তারা পরস্পরকে শো-আপ করে এই বলে যে, তাদের জীবন নিয়ে তারা খুবই খুশি, খুব ভালো, সুখে আছে তারা। সে কারণে এই মিথ্যা শো-আপটার সাথে আধাছটাক তেল কিনে আনাটা যায় না, মিলে না বলেই সে পকেটে শিশি ঢুকায়! সব ঢেকেঢুকে ভণিতা করতে চায়। অথচ যেটা সবাই জানে আর যেটা পড়শি সবারই কমন অবস্থা সে্টা নিয়ে আবার একে অপরের কাছ থেকে লুকানোর চেষ্টার কী আছে? কিন্তু এথেকে সম্ভবত গভীর ক্ষতের দিকটা হল, এখন এই যে শো-আপ এটি সম্ভবত মধ্যবিত্তের একটি ‘জাতীয় কালচারে’ পরিণত হয়ে গেছে। ফরমাল স্টাডি করলে আর এরকম অনেক লক্ষণও নিশ্চিয় পাওয়া যাবে! তাই, যেন এই হল ভান-ভনিতার ভারত!  এটাই সম্ভবত ভারতেরই আরেকটা দিক-বৈশিষ্ঠ;  – নেহেরু-ইয়ান ভারতের কমিউনিস্ট ইকোনমির স্থায়ী ছাপ বৈশিষ্ঠ।

    এর কী কোনই পরিবর্তন নাই?
    অবশ্যই হয়েছে খানিক আর্ধেক, তবে যা একবার কালচারে ঢুকে যায় তা সহসা বের হয় না। ভারতের ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর গান্ধী পরিবারের বাইরে নরসীমা রাও প্রথম ও নতুন প্রধানমন্ত্রী হন। আর তারই অর্থমন্ত্রী হন মনমোহন সিং। কিন্তু ততদিনে আগের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী  (শ্রীলংকার এলটিটি ইস্যুতে তাদের হাতে খুন হয়েছিলেন তিনি) মৃত্যুর অনেক আগে তিনি জেনে গিয়েছিলেন, দাদামশাই নেহরু গ্রেটেস্ট কমিউনিস্ট আকামটা কী করেছিলেন; কারণ এর আগেই মনমোহন অনেক দিন সেন্ট্রাল  ব্যাংকের গভর্নরসহ ভারত সরকারের নানা অর্থনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ সব পজিশনের দায়িত্বে তিনি ছিলেন এবং প্রধানমন্ত্রী রাজীবকে সমস্যার গোড়া বুঝানোর সুযোগ নিয়েছিলেন। যাতে, নেহরুর কথিত কমিউনিস্ট অর্থনীতির কাঠামোটা ফেলে এর সংস্কারই একমাত্র সমাধান এতে তিনি রাজি হন। এরই মধ্যে ১৯৯০ সালে ভারত “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতির মুখে পড়ে যায়। ফলে আইএমএফ লোনের দ্বারস্থ হয়ে মুক্তেতি খুজতে নামতেই হয়। কমিউনিস্ট অর্থনীতির বেকুবিপনা আর অচলতা উদোম হয়ে যায়। এ কারণে পরের বছর নতুন সরকারে  ড. মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী হয়ে সংস্কার শুরু করেছিলেন সহজেই, প্রায় বিনা বিতর্কে।
    এদিকে পরবর্তীতে নতুন শতকে, তত দিনে চীনেরও অর্থনীতি ভালভাবেই ডাবল ডিজিট গ্রোথে প্রবেশ করেছে। ফলে “ডেভেলপড” অর্থনীতির উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোর বাইরে “রাইজিং ইকোনমির’ দেশ বলে নয়া টার্ম চালু হয়। দুনিয়ার বড় জনসংখ্যার দেশ হিসেবে চীন (১৩৯ কোটি) সবার উপরে আর তার পেছনে ভারত (১৩৫ কোটি)। এমন জনসংখ্যা বেশির দেশে অর্থনীতি খারাপ থাকলে ওদেশের লোক কম ভোগ করলেও অর্থনীতিটা সাইজে বড় গ্রুপে গিয়ে পড়ে। চীনের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটাও  তাই-ই। তবে ততদিনে চীন শুধু জনসংখ্যাতেই বড় নয়; আবার অর্থনৈতিক সামর্থ্য অর্থে বড় উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের দেশ হয়ে দাঁড়িয়ে গেছিল [যেটা চীনের বিনিয়োগ সক্ষমতার উৎস]। চীনের সাথে ভারতের কেবল ফারাকটা ছিল যে, জনসংখ্যাতেও ভারত বড় অবশ্যই তবে চীনের মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্য অর্থে বড় উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের দেশ ভারত তখনো নয়। তখনো নয়। এটাই আবার বিশাল ফারাক টেনে দিয়েছে কারণ চীনের বিনিয়োগ সক্ষমতা আছে বলে সেই-ই গ্লোবাল নেতা হতে পারবে। ভারত নয়। সুতরাং বড় জনসংখ্যাই সবকিছু না। কিন্তু পটেনশিয়াল দেশ মাত্র। কিন্তু ওদেশের সরকারের কোনো লোভী বা ওভার-এস্টিমেটেড সিদ্ধান্ত দেশের সব সম্ভাবনা শেষ করে দিতে পারে। তবে সে যাই হোক  ঐ সময়ই এই “রাইজিং ইকোনমি” টার্মটা চালু হলে ব্যাপারটা আমেরিকার নজরে আসে।

    এমনিতেই নাইন-ইলেভেনের হামলার পাল্টা, আফগানিস্তানে আমেরিকার হামলার পক্ষে বিভিন্ন দেশের সমর্থন নিতে গিয়ে ২০০২ সালের মধ্যে কথিত “সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে” ভারত ও আমেরিকা, তাদের মধ্যে আঁতাত হয়ে যায়। ইসলামবিদ্বেষীভাবে কাদের ও কিভাবে সন্ত্রাসী বলবে, তা ঠিক হয়। আর সাথে “রাইজিং ইকোনমি” বিষয়ে ভারতের সাথে কাজ করার গ্রাউন্ড তৈরি করাও শুরু হয়েছিল। এখান থেকেই এশিয়ার দুই রাইজিং অর্থনীতির দু’টা দেশ চীন ও ভারতকে একসাথে মোকাবেলা করতে না গিয়ে, বরং একটাকে আরেকটার বিরুদ্ধে খাড়া করতে ভারতকে প্রলোভন ও প্রশ্রয়ের পিঠে হাত রাখার পরিকল্পনা করেছিল আমেরিকা। এখান থেকেই ভারতের পিঠে হাত রেখে ‘চীন ঠেকানোর’ পরিকল্পনা ও তৎপরতার শুরু। আর তাতেই তারা লোভী করে তুলেছিল ভারতকে, য়ার এতে ভারতের মাথা ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়ে যায়।

    সাধারণভাবে বললে, একাজটাকে বলে ভারতের ইন্টেলেজেনশিয়ার (একাদেমিক প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশুনা, চিন্তাচর্চায় জড়িত যে জনসংখ্যার অংশ) উপরে চিন্তায় প্রভাব-দখল নেয়া।   একাজটা আমেরিকা করেছিল কিছু আমেরিকান থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে, কিন্তু কয়েকভাবে। ভারতে  আমেরিকান ওসব থিংকট্যাংকের এক্সটেন্ডেড শাখা খুলে অথবা প্রতিষ্ঠান বা এনজিও খুলতে ফান্ড দিয়ে এবং এক চীনবিরোধী ক্যাম্পেইন দিয়ে একাদেমিক পেশায় জড়িত এমন এবং এছাড়াও হায়ার স্টাডিতে আগ্রহীদের তাদের প্রলুব্ধ করে। আর দ্বিতীয়টি হল, স্কলারশিপ বিতরণ। হায়ার স্টাডিজে আকাঙ্খীদের (মাস্টার্স বা পিএইচডি) স্টুডেন্টদের স্কলারশিপ দিয়ে আমেরিকার চীনবিরোধী বয়ানের অংশ করে নেয়াটা এর লক্ষ্য; যাতে তারা বিশ্বাস করতে ও প্রচারণা করতে উৎসাহী হয়ে ওঠে। ( এবারের  হোয়াইট হাউজ কোয়াড মিটিংয়ে বাইডেন আবার এমন এক স্কলারশিপ চালুর ঘোষণা দিয়েছেন।) এ বিষয়ে প্রথম কথাবার্তা শুরু হয়েছিল ২০০৪ সাল থেকেই, মনমোহন সিং প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হলে। আর পরে চুক্তি হয়েছিল ২০০৬ সালে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশের ভারত সফরকালে।  ভারতে সেই প্রথম থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান দেখতে পাওয়া শুরু হয়েছিল। তবে করুণ ব্যাপারটা হল,   সে সময় ভারতের নীতি নির্ধারকেরা ব্যাপারটাকে দেখেছিল এভাবে যে নিজেকে আর থিংকট্যাংক খুলতে পয়সা খরচ করতে হলো না, এমনই সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে। এছাড়া আরও দিকটা হল, আমেরিকার কাছে গুরুত্ব পাওয়ায় নিজে বিরাট কিছু দামি হয়ে গেছে বলে ওভার-এস্টিমেশন;  অর্থাৎ ফিরে  সম্ভবত সেই ভান-ভনিতার দিন এতে আরো জেঁকে বসেছিল মনে করা যেতে পারে।

    আসলে সেকালের ভারতে থিংকট্যাংক বলতে সামরিক বাহিনীই নিজ বাজেট থেকে অর্থ নিয়ে আর সেনা এক্সটেনডেড প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমিতভাবে চালানো কিছু স্টাফ দিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান খাড়া করে রেখেছিল। বাজেট স্বল্পতা থাকলে  একটা প্রতিষ্ঠান যেমন হয় তাই। আমেরিকান বয়ান ভারতে প্রবেশ করেছিল এভাবেই এর  সুযোগ নিয়ে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হল, একটা বয়ানে এসবের সমন্বয়ের নিয়ম স্ট্রাকচার তারা চালু করেছিল তখন থেকে। সেটা সম্ভব হয়েছিল যেসব কারণে যেমন, এরপর থেকে ভারতে থিংকট্যাংক জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সবাই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত হয় কারণ সেটাই ছিল  নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান; কারণ থিংকট্যাংকগুলোর প্রতিটি প্রোগ্রাম এই মন্ত্রণালয়েরই অনুমোদন ও পূর্বানুমতিপ্রাপ্ত। ফলে সমন্বিত। আর থিংকট্যাংক জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বলতে তখন দেখা যেওত যেমন সরাসরি সরকারি,  অথবা একমাত্র (ব্যবসায়ীদের দেয়া দাতব্য অনুদানে চলা) ওআরএফ [ORF] আর এবার এসবের সাথে আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা বা ফান্ডে চলে এরা এবং ভারতীয় ব্যক্তিত্ব যারা আমেরিকান থিংকট্যাংকের ফেলো [fellow] হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত এমন যারা আমেরিকায় বা ভারতেই থাকেন। এতে ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রণালয় ও আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্ট (আমেরিকান থিংকট্যাংকসহ) যেটা সমন্বিত অবস্থান একেক সময়ে নেয়, সেটাই সংশ্লিষ্ট সবার উপর কার্যকর হয়, তাই সবার কমন অবস্থানের গাইড লাইন হয়। তবে ট্রাম্প আমলে এসে তার “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিতে এসব স্কলারশিপ এবং এনজিও ফান্ড সব বন্ধ বা খুবই সীমিত হয়ে যায়। তবুও আমেরিকা্নর নিজের থিংকট্যাংকঅগুলোর তৎপরতা খুবই সক্রিয় থেকেই গেছিল মূলত মন্ত্রী জয়শঙ্করের কারণে, যাকে আড়ালে ভারতের সবচেয়ে বড় আমেরিকান থিংকট্যাংকের এজেন্ট বলেন অনেকে। ওদিকে আমেরিকান স্বার্থে স্কলারশিপের ভারতে বসে মূল অনুমোদনদাতা ভারতীয় যে মূলত আমেরিকানদের প্রধান লোক সে তখন থেকে ভারত ছেড়ে সিঙ্গাপুরে গিয়ে চাকরি নিয়ে আছেন। তখন থেকে ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংক তৎপরতা কিছুটা ঝিমিয়ে ছিল। বাইডেন সম্ভবত চাচ্ছেন সেটিকে সবার আগে আবার চালু রাখতে। এই ব্যাপারটা এমন বিস্তৃত বলার পিছনের কারণ এটাই। কোয়াড নাই ঠিক তা হবে না সম্ভবত তবে, গুটিয়ে যাচ্ছে এর সব লক্ষণ এভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কিন্তু বাইডেনের এখনও দরকার ভারতের চিন্তাশীল কর্তাদের চিন্তার উপর প্রভাব। তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারার সক্ষমতা যাতে আমেরিকার চীনবিরোধী বয়ানের নিচে তারা চাপা থাকে।

    এই অংশটা এত বিস্তারিত বললাম আর এক এজন্য যে, এবারের মোদীর হোয়াইট হাউজ সফর শেষে অথবা বলা যায়  – এবার কোয়াড-এরই এক সতীন প্রতিষ্ঠান অকাস [AUKUS] খাড়া হওয়াতে, উপেক্ষিত বোধ করা ভারতের ক্ষোভ-অভিমান যা ক্রমেই বের হয়েই চলেছে তাতে মনে হচ্ছে, এবারই প্রথম আমেরিকান বয়ান ভারতের আবার নীরবে খেতে, মেনে চলতে ভারত কেউ কেউ আপত্তি তুলবে; যেটা আবার হয়ত আর্থিক সুযোগ সুবিধা পেলে চুপ করে যাবে।  অর্থাৎ সেটা যেভাবেই নতুন রূপ নেক না কেন – এটাই হবে আফগানিস্তানে তালেবানে উত্থানের বাইরে আরেক প্রায় ২০ বছরের ঘটনার পরিসমাপ্তি। এর পুরনো ‘সেটিংসের’ এবার ভেঙে পড়ার ঘটনা হবে এটা। এককথায় এটাই ভারত-আমেরিকার এত দিনের থিংকট্যাংক সম্পর্কে  বদল। তা একেবারে ভেঙ্গে যদি নাও পড়ে এতে মোচড় আসার মত তা বদলে যেতে বাধ্য।

    এমন কোথায় কোথায় এখন ভারতের আঘাত লাগবে এর একটি তালিকা (না আমার করা নয়)  পাওয়া যায় – হর্ষ ভি পন্থ [Harsh V. Pant] -এর লেখা থেকে। পন্থ মূলত লন্ডন কিংস কলেজের অধ্যাপক। কিন্তু  ভারতে সক্রিয় সবচেয়ে বড় থিংকট্যাংক ওআরএফ [ORF] বা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের তিনি ডিরেক্টরও।  আর তিনি এবার তাঁর লেখাটা ছাপতে দিয়েছেন আমেরিকান ম্যাগাজিন ‘ফরেন পলিসি’-তে।

    ফরেন পলিসি (আমেরিকান এলিটদের পত্রিকা ফরেন অ্যাফেয়ার্স নয়। দু’টিই কাছাকাছি নামের বলে ভুল বোঝা থেকে সতর্ক করতে একথা বলছি। এই পত্রিকার পজিশন আগে যাই থাক না কেন, বাইডেন ক্ষমতায় আসার পরে এই পত্রিকাটা এখন বিশেষভাবে বাইডেন-অ্যাসাইন্ড এক পত্রিকা। সাধারণভাবে পত্রিকাটা বাইডেনের অঘোষিত এক পাবলিক মুখপাত্রের মত তার সব পলিসির পক্ষে প্রচার করতে তো দেখাই যায়, এটাই এর অবস্থান। এছাড়াও  বিশেষত আরেকটা দিক হল,  আমেরিকান প্রফেসর কুগেলম্যান [Michael Kugelman]; তিনি আসলে  Deputy Director of the Asia Program  at the Wilson Center] এটা একটা প্রভাবশালী আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক। তাঁকে এখানে হায়ার বা নিয়োগ করা হয়েছে। আর তাঁকে কেন্দ্র করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাইডেনের নীতি-পলিসির পরিপ্রেক্ষিতে প্রতি সপ্তাহে [ এশিয়ার দেশগুলোতে বাইডেনের স্বার্ত্থ সংশ্লিষ্ট] চার-পাঁচটি দেশে কী ঘটছে বা বাইডেন কী ঘটাতে যাচ্ছেন তা নিয়ে সরাসরি কুগেলম্যানের (চার-পাঁচ পাতা, ২০০০ অক্ষরের) মন্তব্য এ পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। যার শিরোনাম weekly South Asia Brief। উল্টো করে বললে এতে – কুগেলম্যানের মন্তব্য থেকে বাইডেনের মনোভাবের কিছু হদিস মিলা সম্ভব।
    এই ফরেন পলিসি পত্রিকাতেই হর্ষ পন্থের ভারতের ক্ষোভের তালিকাসমৃদ্ধ লেখাটার [শিরোনামঃ- The U.S.-India Relationship Is the Quad’s Litmus Test ] ছাপা হয়েছে। এই আক্রমণাত্মক শিরোনামের ভাবানুবাদ টা হবে এমন – “ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের টিকে যাওয়া এই কোয়াড টিকে কি না তার ভাগ্য পরীক্ষা”। এছাড়া এলেখায় তিনি এশিয়ায় আমেরিকা তার বিদেশনীতি বদলে ফেলেছে বলে আমেরিকাকে অভিযুক্ত করেছেন [……as the United States makes a foreign-policy shift in Asia. ]। এমনকি খুবই কড়াভাবে ভারত-আমেরিকা বিরোধের কথা উল্লেখ করে আবার- এটিকে ‘কনফ্লিক্টিং অব প্রায়োরিটি’ ক্যাটাগরিতে ফেলেছেন। ব্যাপারটা অনেকটা একবার ছেড়ে দিয়েছেন বলে হুমকি ও ভাব করে আবার ধরে রাখছেন – এমন।

    India has a vital role to play in each area, but it also has many unresolved differences with the United States, such as their vaccine supply chain issues, approaches to climate policy, and conflicting priorities regarding Taiwan and Pakistan.

    অর্থাৎ নাম ধরেই বলেছেন, “ভারতের প্রায়োরিটি পাকিস্তান”। প্রথমত তিনি স্বীকার করছেন ভারত আমেরিকা বিরোধের পর্যায়ে চলে গেছে। কিন্তু আবার তিনি বিরোধ বলেও এবার তা লঘু করে দেখাতে বলছেন এটা নাকি “conflicting priorities” – কে কোনটা আগে চায় এনিয়ে বিরোধ-বিভক্তি আছে।  কিন্তু এটা তো  কোনটা আগে চায় এর বিরোধ নয় বরং কে কোনটা চায় তার বিরোধ – যেখানে আগে পড়ে বলে কিছু নাই।  মানে বলতে চাইছেন, বাইডেন ভারতের ইচ্ছা-আকাঙ্খার  পক্ষে, ( প্রধানত তালেবান ইস্যুতে) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চাপ দিচ্ছে না।  ভারতের দাবি অনুসারে কাজ করছেই না। আর বিপরীতে  “আমেরিকান প্রায়োরিটি নাকি তাইওয়ান” – মানে ভারত তাইওয়ানের পক্ষে সামরিকভাবে নামতে আমেরিকার নয়া সামরিক জোটে যাচ্ছে না।

    হর্ষ পন্থ স্বীকার করছেন, কোয়াডে ভারত আমেরিকা বিরোধের পর্যায়ে চলে গেছে। কিন্তু আবার তিনি বিরোধ বলেও এবার তা লঘু করে দেখাতে বলছেন এটা নাকি “conflicting priorities” – কে কোনটা আগে চায় এনিয়ে বিরোধ-বিভক্তি আছে।  কিন্তু এটা তো  কোনটা আগে চায় এর বিরোধ নয় বরং কে কোনটা চায় তার বিরোধ – আগে পড়ে বলে কিছু নাই।  মানে বলতে চাইছেন, বাইডেন ভারতের ইচ্ছা-আকাঙ্খার  পক্ষে, ( প্রধানত তালেবান ইস্যুতে) পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চাপ দিচ্ছে না।  ভারতের দাবি অনুসারে কাজ করছেই না। আর বিপরীতে  “আমেরিকান প্রায়োরিটি নাকি তাইওয়ান” – মানে ভারত তাইওয়ানের পক্ষে সামরিকভাবে নামতে আমেরিকার নয়া সামরিক জোটে যাচ্ছে না।

    পন্থের কথাটি জমেনি বা অর্থ হয়নি। অনেকটা জোর করে মিলিয়ে বলা। আগে-পড়ে বলে কিছু না থাকলেও সেটা দাবি করা। পন্থ কামনা করছেন, আসলে পাকিস্তানের কথা, ঠিক যেভাবে গত প্রায় বিশ বছর ধরে সন্ত্রাসবাদের  অসৎ বয়ান ঠিক রাখার স্বার্থে  ভারতকে তোষামোদ আর পাকিস্তানকে চাপের মধ্যে রেখে গেছে – সেটাই, সেই সুখের দিন ভারত ফেরত চাইতেছে। কিন্তু বাস্তবতা হল  তালেবান ইস্যু কি কেবল ভারত-পাকিস্তান ইস্যু? তা তো কখনো নয়, কারণ এতে খোদ বাইডেনের আমেরিকার স্বার্থই (এবং সক্ষমতাও) তো সবার চেয়ে বড়। আর বাইডেনকে অন্তত  সেনা ফিরিয়ে নিয়ে আমেরিকার প্রতিদিনের ৩০০ মিলিয়ন ডলার বাঁচাতেই হত। সেটা পরোয়া না করে বাইডেন কেবল ভারতের ইচ্ছার পক্ষে কাজ করবে  এটা আশা করাটাই যে করে তারই সমস্যা! এটা না বুঝার তো কিছু নেই। কিন্তু পন্কেথ বা ভারত এভাবে ভাবে কেন? কেন এমন করছে? এটাই, এই যে সবসময় এই ওভার-এস্টিমেশন, বড় মনে করে — মুই কী হনু রে — যে আমি অনেক দামী এই ফুটা দেমাগ ইত্যাদি – এটাকেই তো ভান-ভনিতার ভারত বলেছি! অতএব, ভারত এখন যত দাম মানে অহেতুক যতই দাম দেখাবে ততই এই দুরত্ব বাড়তে থাকবে যা শেষ পর্যন্ত খুবই খারাপ জায়গায় – উইঘুরের মত, এই আমেরিকাই ঘুরে গিয়ে ভারতের কাশ্মীর ইস্যুতে আচরণ, মানবাধিকার নিয়ে ভীষণ চাপে ফেলতে পারে!  এসব দিক নিয়ে ভারতের ভিতরেই বুদ্ধিমানেরা ইনার আলোচনা শুরু করেছে!

    ক্ষুব্ধ ভারতের চেয়েও বাইডেনের এখনকার বড়  মাথাব্যথা হল চীনের সাথে আপোষে বসাঃ
    এদিকে আমেরিকার চিন্তার জন্য কেবল ভারতের ক্ষোভই ‘একমাত্র’ নয়। এর থেকেও নিঃসন্দেহে  এখনকার বড় বাইডেনের মাথাব্যথা হল চীন। না নতুন করে আমেরিকা-চীনের কোন বিরোধ এটা নয়; বরং তা থেকে ছুটবার আলো এটা। আসলে এটা চীনের সাথে আমেরিকার ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ যেটা ট্রাম্প শুরু করে দিয়ে গিয়েছিলেন এবং তা থেকে সব ধরনের যুদ্ধ লেগে যাওয়ার উপক্রম বা সম্ভাবনা। আর ক্ষমতা ত্যাগের আগে ট্রাম্প বড়াই করে বলে গিয়েছিলেন যে, তার দেখানো পথই বাইডেনকে অনুসরণ করে যেতে হবে। কারণ এমন ‘শক্ত বাঁধন’ তিনি দিয়ে যাচ্ছেন।

    আমরা (অন্তত আমি নিজে) অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, বাইডেনের শপথের পরে বোকা হয়ে এই ইস্যুতে ট্রাম্পকেই অনুসরণের নীতি অনুসরণ করতে গেলেন। আর তাতে চীনের সাথে আলোচনার ‘আলাস্কা বৈঠকে’ই সব শেষে, এমনকি মারামারি লাগার অবস্থা। সেই থেকে বাণিজ্য যুদ্ধ বা আলোচনা একেবারেই বন্ধ হয়েছিল। কিন্তু বন্ধ থাকলে যা হয়, চীন-আমেরিকা যত ধরনের শত্রুতা সম্ভব তা ক্রমশ ডালপালা মেলতে শুরু করেছিল।

    গত মাস থেকেই পরিস্কার বাইডেনের অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতির চাপের মুখে। এনিয়ে আমার আগের লেখা দেখতে পারেন এখানে।  আর তিন ডজন ব্যবসায়ী ফেডারেশন কর্তৃক বাইডেনকে লিখিত অনুরোধ যে, চীনের সাথে বাণিজ্য আলাপে চীনা পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক সরাতে যেন দ্রুত  চীনের সাথে আলোচনা শুরু করা হয়।এছাড়াও,   মিডটার্ম নির্বাচনে নিজ ডেমোক্র্যাট দল হারবে এই পূর্বাভাস দেখে [এই সব প্রসঙ্গ আমার আগের লেখার বিস্তারিত আছে] বাইডেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে ফোনে কথা বলেন। অনেকে বলছেন এতে শি জিনপিং শর্ত দিয়েছেন; অনেকে বলছেন, তিনি আবার বাণিজ্য আলোচনা করতেই চাননি।

    আর বাস্তবে আমরা দেখছি আলোচনা ফের শুরু করার পরিবেশ সৃষ্টির নামে বাইডেন চীনের বিরুদ্ধে- উইঘুরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বয়ান ঘুরে যাওয়ার ইঙ্গিত, হংকং বা তাইওয়ান ইস্যুতে চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার মানবাধিকার লঙ্ঘণের অভিযোগ ঢিলা করা,  হুয়াওয়ে ফোনের সিএফওকে ‘মেঙ’ -কে তিন বছর ধরে কানাডায় আটকে রাখার পরে বন্দিবিনিময়ে তাকে ছেড়ে দেয়াসহ  আপোষনামার বা পরিবেশ সৃষ্টির তালিকাটা অনেক লম্বা মনে হচ্ছে।  সব কিছু শুরু হয়েছে। তা হলে হুয়াওয়ের ফাইভ-জি টেকনোলজিতে অবরোধও কি তুলে নেয়া হবে; চীনে পশ্চিমা মাইক্রোচিপস বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞাও কি? এটা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে? মনে হচ্ছে ন্যাংটা করে ফেলবে বাইডেনকে। কারণ, তার বিপদটা ঘরেই। বাইডেন খারাপ অবস্থা হল  মিডটার্ম  নির্বাচনে ও অর্থনীতিতে!

    মূল্কথাটা হল, প্রেসিডেন্ট শি, আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আমেরিকার  দিক থেকে  যা কমানো সম্ভব এমন বাহ্যিক টেনশনগুলো কমানোর মত পদক্ষেপগুলো নিতে বলেছে। বাইডেনও এই সারকথাটাই মিডিয়ায় জানিয়েছে। তাই বলে এর লিস্ট কত বড় বা তাতে কী থাকবে তাকিছু বাইডেন বলেন নাই।

    তবে বাইডেন-শি এর আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির নামে এখনই এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের লিস্ট যত লম্বা হবে ততই আমেরিকার উপর ভারতের ক্ষোভ  আরো বাড়বে বলেই অনুমান! কারণ বাইডেন ক্ষমতার শপথ নেয়ার পর থেকেই ভীত মোদীর কামনা ছিল চীন-আমেরিকা সম্পর্ক যত তিতা হবে, তা মোদীর জন্য ভালো। কারণ যাতে সেই তিতা সম্পর্কের আড়ালে কমলা হ্যারিসের মুখ দিয়ে তোলা বাইডেনের ভারতের বিরুদ্ধেও মানবাধিকারের খারাপ রেকর্ডটা (কাশ্মিরের স্ট্যাটাস, ভারতজুড়ে মুসলমান নিপীড়ন ও মুসলমানবিদ্বেষ প্রভৃতি) চাপা পড়ে যায়।

    দুনিয়া আসলেই আর আগের মতো সব সম্পর্কে থাকছে না।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ০২ অক্টোবর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “কোয়াডে ভারত-আমেরিকা অভিমান!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • রাজা না জনপ্রতিনিধি? কী হতে চান?

    আফগানিস্তান ও জনপ্রতিনিধিত্বঃ

    রাজা না জনপ্রতিনিধি? কী হতে চান?

    গৌতম দাস

    ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3JQ

     

    গত সপ্তাহের শুক্রবার জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে নয়া আফগান শাসক তা=লে=বা=নদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এক প্রস্তাব পাস হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘‘আফগানিস্তানের জন্য এক ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার’ গঠন দরকার” (Ta-lib-an rulers need to establish an inclusive government )। অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার বলতে অবশ্য অনেকে অনুমানে অনেক কিছু মনে করে থাকে। যেমন অনেকে মনে করে, এটা বোধহয় শয়তান পশ্চিমা বা আমেরিকানরা বলছে যে, আগের কারজাই বা গণি সরকারের লোকদের সাথে নিয়ে সরকার গঠন করতে বলা হচ্ছে। ভারতও হয়তো মনে করছে, এতে তার পছন্দের এক আফগান সরকার আবার আসবে। কিন্তু এটা ঠিক তা নয়। এমনিতেই মোদ্দাকথা বুঝানো হচ্ছে এমন এক সরকার গঠন করা দরকার যেন সেখানে জনগোষ্ঠীর সব ধরনের মানুষের প্রতিনিধিত্বই থাকে যাকে অন্তর্ভুক্ত করে তা গঠিত হয়। জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্ত অবশ্য পুরানা যেটা ট্রায়কা+ বলে একটা কমিটি গঠনের সময়ও উঠেছিল। যা নিয়ে আমার আগের রচনা আগ্রহিরা এখানে দেখে নিতে পারেন।

    এখানে ‘সব ধরনের মানুষের প্রতিনিধিত্ব’ বলতে যেমন ওই দেশের সব অঞ্চলের লোক (দেশে কয়েকটা ভাষা বা কালচার প্রচলিত থাকলে), সব ভাষাভাষী ও কালচারের লোক, (যেমন প্রায় সবাই বাঙালি হলেও ধরা যাক কেউ কেউ বিহারি অথবা মনিপুরী ইত্যাদি যাদেরকে আলাদা ‘এথনিক’ জনগোষ্ঠী বলে এরা একেকটা কয়েক লাখের বেশি নয় হয়তো, এমন হলে) সব এথনিক জাতিগোষ্ঠীর লোক, আবার (আফগানিস্তানে যেমন হাজারা-রা এমন হলে) পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর লোক, সব ধর্মের লোক, (সমাজের নারী-পুরুষ এমন বিভক্তি আছে তাই) পুরুষরা তো থাকবেই সাথে নারীদেরও প্রতিনিধিত্বের লোক, দেশে পাহাড়ি-সমতলী বলে আলাদা বা বিভক্তি কিছু থাকলে সব ভুগোলের লোক – এভাবে ঐ দেশের মানুষের মধ্যে যত ভাগ-বিভক্তি আছে তার সব অংশের প্রতিনিধিত্ব নতুন রাষ্ট্র ও সরকারে থাকতে হবে। এটা বুঝাই সঠিক হবে। এ ছাড়া আরো আছে, সুনির্দিষ্টভাবে অন্য ধর্মীয় বা অন্য মতবাদের লোক বলে কেউ থাকলে তাদের বাদ দেয়া যাবে না।

    একটা ছোট উদাহরণ দেয়া যাক; ২০১৫ সালে নেপাল হল নবগঠিত করে নেয়া এক রাষ্ট্র। এখন থিতু হয়ে গেছে বলে এর মোট জনপ্রতিনিধি বা এমপির সংখ্যা ২৭৫ যারা নেপালের মোট প্রায় তিন কোটি জনসংখ্যাকে প্রতিনিধিত্ব করেন। কিন্তু এর কনস্টিটিউশন গঠনের সময় তাতে মোট জনপ্রতিনিধি আরো বাড়িয়ে করা হয়েছিল ছয় শতাধিক। কারণ নেপাল মূলত পাহাড়ি ও প্রাচীন বলে ভিতরে জনগোষ্ঠীর এথনিসিটি অনেক ভাগে বিভক্ত। তাই সেখানে কনস্টিটিউশন যা একবারই বানানো হয় ফলে তাতে জনগণের সব অংশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রতিনিধির সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল।

    এসময়ের কাজটাকে আসলে বলা হয়, সমাজের সবার পলিটিক্যাল হয়ে ওঠা; সবাইকে নিয়ে এক পলিটিক্যাল কমিউনিটি বা পলিটি (Polity) গড়ে নেয়ার সদর রাস্তা। আর এর নীতি একটাই – প্রত্যেককে বলতে দিতে হবে, তাকে শোনা হতে হবে, মার্জিনালাইজ করে ফেলে রাখা হবে না। আরেকভাবে দেখলে এটাই একটা কনস্টিটিউশন রচনায় পৌঁছানো উপায় যেখানে সমাজের সবার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছিল। ফলে এটা ঠিক একটা নারী-মন্ত্রী রাখা না রাখায় সীমাবদ্ধ রেখে পরিস্থিতি মুল্যায়ন করা নয়। তালেবানরা খারাপ না ভালো বলে ফতোয়া দেয়াও নয়।

    নেপালের বেলায় পরে রেগুলার সংসদীয় এমপি নির্বাচনের সময় প্রতি এক-সোয়া লাখ ভোটার পিছু একেকটা কনস্টিটিউয়েন্সি নির্ধারণ করে নেয়া হয়েছিল। এমন ছবিটাই আফগানিস্তানেও আঁকতে পারলে খারাপ হতো না – “এটাই ইনক্লুসিভনেস”। আবার ইনক্লুসিভ মানে সবাইকেই এখনকার অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রিসভায় জায়গা দেয়াও না। মূলত ওই কনস্টিটিউশন রচনার সভায় সবারই উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। আর পরে নির্বাচন-ভোট হলে যারা সকলেই অংশ নিবে কিন্তু সবাই তো ক্ষমতায় আসবে না কিন্তু  তারাও বস্তুত ঐ সরকারে ইনক্লুসিভ বলে বুঝতে হবে অবশ্যই। ফলে জাতিসংঘের ওই ইনক্লুসিভ সংক্রান্ত প্রস্তাবের ব্যাপ্তি অনেক দূর, এমন মনে করার সুযোগ আছে।

    তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ইংরেজিতে শব্দটা হল ইনক্লুসিভ (Inclusive), যার সোজা মানে হল সমাজের সব অংশের প্রতিনিধি সেখানে থাকতে হবে তাতে প্রভাবশালী গোষ্ঠীদের চোখে অনেককেই তাদের পছন্দের না হলেও। উল্টা করে বললে সমাজের কোনো অংশ আগে থেকে মার্জিনালাইজড বলে, কোণঠাসা বলে অথবা গরিব ও ক্ষমতাহীন বলে এই সুযোগে তাদের বাদ দেয়ার সুযোগ নিতে যাবে না – এই হল ‘প্রতিনিধিত্ব’ কথার মূল মেসেজ।

    কথা আরো কিছু আছে। একটা দেশে মানুষের মধ্যে অনেক ধরনের ভাগাভাগি থাকে যার মধ্যে জেন্ডার বা নারী-পুরুষ বিষয়ক বিভক্তিটা সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। কেন? কারণ একটা সমাজে সাধারণত দেখা যায় যে নারী-পুরুষ প্রত্যেকেই প্রায় ৫০ ভাগাভাগির মতো হয়। ব্যাপারটা অনেকে হয়ত খেয়াল করে দেখেন নাই। যেমন, বাংলাদেশের নারী-পুরুষের হার (৪৯.৪-৫০.৬), আমেরিকায় এটা (৪৮.৯ – ৫১.১), ইউকে তে (৪৯-৫১) অর্থাৎ সার কথাটা হল, বিশেষ ব্যতিক্রম না থাকলে সবদেশেই নারী-পুরুষ সংখ্যায় প্রায় সমান সমান হয়ে থাকে। তাহলে এর মানে হল, রাষ্ট্র-সরকারে শুধুই পুরুষ আর পুরুষকে দিয়ে সব প্রতিনিধিত্ব করানো ও থাকার মানে, বাকি ৫০ ভাগ যারা নারী নাগরিক তাদের আমরা অ-প্রতিনিধিত্বে বাইরে রেখে দিচ্ছি এবং  আফগানিস্তানের মত রাষ্ট্রে এই ক্ষতিটাই হচ্ছে। অর্থাত, আমাদের এখানে আলাপের প্রসঙ্গ কিন্তু জনপ্রতিনিধিত্ব, মানে কি উপায়ে আমরা রাষ্ট্র-সরকারে একটা দেশ-সমাজের সব অংশ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারি। যাতে সেটাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র-সরকার বলতে পারি।

    তবে এখানে আরেকটি সত্যও বলে রাখা দরকার। ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তায় নারীদেরকে কিভাবে প্রতিনিধিত্ব দেয়া হবে আদৌ হবে কি না, এই বিতর্ক শেষ হয়নি। সব দেশে তাই এক রূপ নয়। বরং এটা তাদের চিন্তায় এক দুর্বল জায়গা হয়ে আছে। আর এর সুযোগ নিয়ে আমেরিকা গত ২০ বছর ধরে জাতিসঙ্ঘের চোখেই আফগানিস্তান  অবৈধভাবে দখল করে রেখেছিল। অথচ এই অপরাধটা ঢাকতে আমেরিকা উলটা এমন বয়ান দিয়ে এসেছে  যেন অবৈধভাবে আফগানিস্তানে সম্পদ লুটতে না, বরং আফগান নারীদের মুক্ত করতেই যেন তারা আফগান দেশটা দখল করেছিল। আমেরিকার এই লজ্জাজনক তৎপরতা বাংলাদেশ পর্যন্ত গড়িয়েছিল। গত ২০০৭ সালে আমেরিকা প্রকারান্তরে আমাদেরও ‘দখল’ করলে ঐ ‘এক-এগারো’র সরকার গড়া হয়েছিল আর তা ছিল মঈন-ফখরুদ্দীনের কথিত সিভিল-মিলিটারি সরকার।

    ওদিকে কমিউনিস্ট সিপিবির নারী সংগঠন “বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ” পাকিস্তান আমলে জন্ম এমন পুরোনা সংগঠন। সারা জীবনে তাদের বার্ষিক সম্মেলনে তারা কখনো শেখ মুজিবকেও প্রধান অতিথি করতে পারেনি। সম্ভবত তাদের মাপকাঠিতে তিনি “গুরুত্বপুর্ণ যথেষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব” মনে হওয়ার মাপকাঠি পেরোতে পারেননি। অথচ মহিলা পরিষদ ২০০৭ সালেই ফখরুদ্দীনকে মহিলা পরিষদের সম্মেলনের প্রধান অতিথি করেছিলেন; যে ফখরুদ্দীন আসলে ছিল অবৈধ ক্ষমতাধর ও ‘ছুপা’ আমেরিকান দখলদারের প্রতিনিধি। আর ঐ সম্মেলনে তিনি সংবর্ধিত হয়েছিলেন আমেরিকা আফগানিস্তানে নারীমুক্তি ঘটিয়ে ‘কত কিছু করেছে’- এর নায়ক বলে ও সেই প্রশংসায়। কেন? কারণ, ‘বুশ-বাবাজি’ ২০০১ সাল থেকে মুসলমান কুপায় হাত পাকিয়েছেন আর তা দেখে বাংলাদেশের কথিত কমিউনিস্ট যারা আসলে ‘হিন্দু-জমিদার’ স্বার্থের প্রতিনিধি, এরা এইবার আহ্বাদিত হয়ে বুশের কোলে উঠে যাবার সুবিধা নিতে। অথচ কেউ যদি কমিউনিস্টই হয় তো সেই আবার বুশের কোলে উঠে যায় কেমনে? এরই নমুনা ছিল ফখরুদ্দীনের ওই প্রধান অতিথি হওয়া। একইভাবে তালেবানরা এবার ক্ষমতায় আসায় সবদিক দিয়ে এতিম হওয়া ভারতও এখন প্রধান অভিযোগ বানিয়েছে আফগানিস্তানের নারীদের দুরবস্থাকে। এরা এতই মরিয়া যে, পাকিস্তানে আফগান দূতাবাসের সামনে জনা পঞ্চাশ নারী সমাবেশ ঘটিয়ে আফগান নারীদের জন্য সংহতি জানানোর ব্যবস্থা করেছে। অর্থাৎ আমেরিকার মত ভারতও আফগান নারীমুক্তির মহান ‘দূত’ হওয়ার রাস্তা ধরেছে; যদিও আমরা সবাই জানি তারাই তাদেরও দেশের নারীদের কিভাবে রাখেন।

    তবে নারী ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের ইসলামী রাজনীতি নিজের দুর্বলতায় ভুগতে না চাইলে তাদেরও কিছু স্পষ্ট অবস্থান নিয়ে থাকতেই হবে। একালের রাষ্ট্র-সরকারে নারীদের প্রতিনিধিত্ব কিভাবে নিশ্চিত করবেন তা আর উপেক্ষা করে যাওয়ার মতো ইস্যু নয়। কারণ নারীরা যেকোনো দেশের প্রায় ৫০ ভাগ জনগোষ্ঠি। এই নারী নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব তারা কিভাবে নিশ্চিত করবেন, এর সদুত্তর একটা লাগবেই। ঠিক এ কারণেই নিরাপত্তা পরিষদের ওই পুরো প্রস্তাব যা ১৫ সদস্যের সবাই ওর পক্ষে ভোট দিয়েছে। সেটা বলেছে – এক অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার লাগবে যারা নারীদের ‘পূর্ণ, সমান ও অর্থপূর্ণভাবে নারী অংশগ্রহণ ও মানবাধিকার রক্ষা নিশ্চিত করবে।’

    “Taliban rulers need to establish an inclusive government that has “the full, equal and meaningful participation of women” and upholds human rights.”

    উপরে যা নিয়ে কথা বলেছি ওখানে মুখ্য প্রসঙ্গ হল আসলে প্রতিনিধিত্ব (representation); যদিও অনেকের মনে হতে পারে বোধহয় রাষ্ট্র-সরকার নিয়েই কথা বললাম। আসলে কথা বললাম ‘রাষ্ট্র-সরকারে বাসিন্দাদের প্রতিনিধিত্ব কিভাবে নিশ্চিত করা হবে’ তাই নিয়ে এবং একালে এটাই হতে বাধ্য।

    ১৯৪৫ সালের পরে এক নয়া যুগঃ
    পুরনো দিন আর কত থাকে, সব ‘নাই’ হয়ে গেছে, বিশেষ করে ১৯৪৫ সালের পর থেকে মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। এর আগে একদিকে রাজ-রাজড়া, সুলতান, আমির, বাদশাহ ইত্যাদির নানান নামে রাজতন্ত্রের শাসন এবং অন্য দিকে সর্বোপরি ইউরোপের ব্রিটিশ-ফরাসিদের কলোনি দখল হয়ে থাকা (যেমন বৃটিশ-ইন্ডিয়া) – এসব কিছুরই স্বর্ণযুগ ছিল সেটা, এভাবে এক অবাধ লুণ্ঠনের ক্ষমতা চর্চার যুগ ছিল সেটা। আর এসব কিছুরই সমাপ্তি ঘোষিত হয়ে গেছিল ১৯৪৫ সালে জাতিসঙ্ঘ জন্ম ও কার্যকারিতা দেয়ার পর থেকে। তাতে আপনি জাতিসঙ্ঘের যত কিছু অযোগ্যতা বা অসম্পূর্ণতা দেখান না কেন অথবা জাতিসঙ্ঘ অপছন্দ করেন না কেন! ঘটনা হল, আমরা কেউ আর চাইলেও ১৯৪৫ সালের আগে্র কালে ফিরতে পারব না। এমনকি যারা চাইব বা কামনা করব তাদের জন্যই এটা এখন আত্মঘাতী হতে পারে!

    জাতিসঙ্ঘ যে জন্মভিত্তিমূলক বক্তব্য বা বাণীর উপরে দাঁড়িয়ে আছে তা হলো, যেকোনো দেশ-ভুখণ্ড কার কথায় চলবে, কার কথা চূড়ান্ত ও একমাত্র বৈধ বলে মানা হবে? এই প্রশ্নের জবাব হল, ওই ভুখণ্ডের সংশ্লিষ্ট বাসিন্দাদের কমন ইচ্ছা বা সম্মিলিত ম্যান্ডেট কী এর উপরে। আর এটা তো বলাই বাহুল্য, আম-বাসিন্দারা কোনো এক রাজার শাসন চাইবে নাকি নিজেরাই নিজেদের শাসন করবে এমন প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের শাসন চাইবে – এই দুইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়টাই চাইবে। অর্থাৎ নানা নামে বলা ও চালানো রাজতন্ত্রের দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে এখন থেকে। এ কারণে প্রতিনিধিত্ব, জনগণ, নাগরিক বা পাবলিকের সরকার এসব শব্দ ছাড়া দুনিয়া এখন অচল।

    তাহলে রাজনীতি, কবে থেকে?
    পাঠক সবাইকে খেয়াল করতে অনুরোধ করব, ‘রাজনীতি’ শব্দটা কবে প্রথম শুনেছেন? হদিস করেন। বা আপনার দাদা কবে প্রথম শুনেছিলেন? ব্রিটিশ কলোনি দখলের আগে মানে মোগল সাম্রাজ্য (রাজতন্ত্রের বড় ভার্সন হল সাম্রাজ্য) শাসনের আমলে “রাজনীতি” শব্দটি ছিল না। কেন? রাজার দেশে ‘রাজনীতি’ বলে কিছু থাকে না কেন? রাজনৈতিক দল থাকে না কেন? তাহলে ‘রাজনীতি’ মানে আসলে কী?
    এ কারণে লক্ষ করলে বা খুঁজলে পাবেন, রাজার শাসনের বিরুদ্ধে বা বিপরীতে জনগণ বা পাবলিকের শাসন এই ধারণা শুরু বা চালু হয়েছে ‘রাজনীতি চর্চা’ শুরু হওয়া থেকে; ব্যক্তির নিজেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গণ্য করা থেকে। তাই কোনো রাজা নয়, দেশ-রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষমতার উৎস জনগণ – এটাই সেই ভিত্তি অনুমান। জনগণই তার প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমেই একমাত্র রাষ্ট্র-সরকার পরিচালনা করতে পারে। বাকি সব কিছুই এই শাসন পরিচালনেরই উপর ঘটানো নানান বিকৃতি।

    কাজেই একালে ১৯৪৫ সালের পরে দুনিয়াতে ‘ইসলামী রাজনীতি’কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সে কোন দিকে যাবে? রাজতন্ত্র নাকি পাবলিকের শাসন? এমনকি তা  একটা “এলিট শাসনের” আড়ালে রাজতন্ত্র হলেও হবে না। যেমন যেটা তালেবানরা প্রস্তাব করে এখন ক্ষমতায় আছে এটি কার্যত একটি ‘এলিট শাসনব্যবস্থা’ হবে যাদের কেউ নির্বাচিত করেনি। অর্থাৎ আফগান পাবলিকের সাথে তালেবানদের কী সম্পর্ক তা কেউ জানে না।এর ব্যাখ্যা বা বর্ণনা করতে কেউ চায় না। আবেগী থাকতে চায়। আবার তালেবানদের তাদের চোখে এই শাসনের নাম “আফগানিস্তান আমিরাত”। মানে এক আমিরের শাসন, তাই তো নাকি? এ বিষয়ে স্পষ্টতা আনতেই হবে।

    আবার বিপরীতে যদি পাবলিকের শাসন, জনমতের শাসন, জনগণের অনুমোদন নিয়ে একটা শাসনব্যবস্থা তৈরি করতে চান সেটাও আগে যথেষ্ট বুঝেসুঝে বলতে হবে। যদি তালেবানরা এই পথে যায় তবে এক্ষেত্রে এই প্রথম এর মানে হবে তালেবানরা ‘রাজনীতিতে’ প্রবেশ করল। পাবলিক বা জনগণ আছে এর স্বীকৃতি কোনো শাসক করলে তবেই একমাত্র রাজনীতি শব্দটি তাদের জন্যও ব্যবহারযোগ্যতা লাভ করবে।
    এমনিতেই শাসনের বহু ধরন হতে পারে। কিন্তু শাসন বা শাসক থাকলেই সেখানে রাজনীতি নাও থাকতে পারে। সৌদি আরবে শাসক আছে অবশ্যই কিন্তু তাই বলে সেখানে কিন্তু রাজনীতি নাই, দল নাই। কারণ পাবলিক, নাগরিক বা জনগণের অনুমোদন কিংবা প্রতিনিধিত্ব এসব ধারণার তখনই দরকার পড়ে যখন সে দেশের শাসক আর রাজা নয়, ব্যবস্থাটা আর  রাজতন্ত্র নয়। যখন শাসক ও সরকার নিজেই স্বীকার করে বলে  যে সে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেশের নাগরিকরা তাকেই ক্ষমতা দিয়েছে।

    তাহলে কথাটি এভাবে বলা যায়, তালেবানের শাসনের নাম যদি হয় “আফগানিস্তান আমিরাত” – তাহলে সেক্ষেত্রে এটা আর কোনো ধরনেরই ইসলামী রাজনীতি নয়। কারণ তখন সেটা আর কোনো রাজনীতিই নয়। রাজনীতি মানেই তা রিপাবলিক; মানে জনগণের ক্ষমতা ও গণশাসন ক্ষমতার রাজনীতি। আফগানিস্তান আমিরাত হলে সেক্ষেত্রে, তাই ‘রাজনীতি’ শব্দটি; আনফিট মানে অমানানসই ও অপ্রয়োজনীয় শব্দ। যদিও তখন এটাকে এক ধরনের ইসলামী শাসন বলা যেতে পারে। আর উল্টাভাবে বললে কোনো আমিরাত কখনোই পাবলিকের শাসন নয়। আমিরাত (সংযুক্ত আরব আমিরাতের দৃষ্টান্ত) কোনো জনশাসন ব্যবস্থা নয়। না রাজনীতি, না পাবলিক, না জনপ্রতিনিধি ইত্যাদি কোনো ধারণার অস্তিত্ব সেখানে থাকে না। বরং থাকে ও আছে আমিরের শাসন। মজার কথা হল, এখানকার দুবাই এর আমির তার কন্যা রাজকুমারীকে ঘরে বন্দী করে রেখেছেন বলে তিনি  বেঁচে আছেন কিনা এর নিন্দা করে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সংগঠন উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দেন। কেন? এই বিষয়গুলোর পরিষ্কার বোঝাবুঝি রেখে “ইসলামী রাজনীতি” নিয়ে কোনো কথা বললে তবেই তা অর্থপূর্ণ হতে পারে।

    এখন পথ বা রাস্তা একেবারেই সোজাঃ
    তালেবানরা যদি মনে করে তারা এক আমিরাত-ই গড়বে, তাহলে এর অর্থ হবে তারা ১৯৪৫ সালেরও আগের দুনিয়াতে ফিরে ও থেকে যেতে চাইছে। তা চাইতেই পারে অবশ্যই। তবে সে ক্ষেত্রে তাদের জন্য জাতিসঙ্ঘ আর কোনো প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান নয়। জাতিসংঘের সদস্যপদ আর তাদের জন্য আগ্রহের বস্তু নয়।
    এছাড়া আর তাতে ব্যবহারিক দিকগুলো কী কী হবে?  প্রথমত যেমন, একালে রাষ্ট্রগুলো একে অপরের কাছে পণ্য বেচাবিক্রি করে মানে পণ্য দেয়া-নেয়া বা বিনিময় করে বেঁচে থাকে, নিজ নিজ অর্থনীতি টিকিয়ে রাখে। এক কথায়, এক গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় সদস্য ও সংযুক্ত হয়ে নেয় রাষ্ট্রগুলো সবার আগে। কিন্তু, তালেবানরা আফগানিস্তানে এমন সুযোগ নিতে পারবে না। মানে তালেবানরা না কিছু অন্য দেশ থেকে কিনতে পারবে, না বেচতে পারবে! কারণ সে তো জাতিসঙ্ঘেই থাকবে না।  ফলে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারবে না। নিজেই যেন নিজেকে একঘরে করা হবে। দ্বিতীয়ত, যেমন দুনিয়ায় বহু গরিব অর্থনীতির রাষ্ট্র নিজের অর্থনৈতিক অবস্থা অনুসারে, জাতিসঙ্ঘ-আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক মিলে যে ‘গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা’ একটা আছে এর মাধ্যমে তার দেশের গরিব মানুষ খাদ্য, চিকিৎসা ধরনের বেশ কিছু বিষয়ে সাহায্য পায়। আর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের যতই খারাপ দিক থাক আপনার চোখে লাগুক এটা এখন এত অর্গানাইজড একটা ব্যবস্থা যে এটা এখন গরিব দেশের মানুষের জন্য তাদের হকের মত হয়ে গেছে। এখন এরই সাহায্য ব্যবস্থার উপরে টিকে আছে আফগানিস্তানের শিশুদের এক বিরাট অংশ। এ ছাড়া গর্ভবতী মহিলা ও শিশুদের জন্য সহায়তা এবং কিছু স্কুল এই সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তালেবানেরা জাতিসংঘের বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নিলে আফগানিস্তানে এই সাহায্য পাবার  ব্যবস্থাটা তখন থেকে নড়বড়ে হতে থাকবে। বর্তমানে অবশ্য তালেবানরা কী করবে তা উহ্য রেখে দেয়াতে জাতিসঙ্ঘ তাতে কোনো স্বীকৃতি দেয়নি। আবার সে জন্য সব সাহায্য স্থগিত করে দিলে আফগান গরিবরা সবচেয়ে কষ্টে পড়বে বিবেচনায় মানবিক কারণে সাহায্য অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই মাসেই দাতারা যারা বেশির ভাগই পশ্চিমা দেশ। ভারতও নিজেকে বিরাট মহান দেশ হিসাবে দেখাতে ঐ দাতাদের সভার আগে বক্তৃতা মেরেছে।  আসলে আফগানিস্তানের যত সম্পদই থাক চরম অব্যবস্থার সরকারে অদক্ষতা দুর্নীতিতে ডুবে এটা এখন লাগাতরভাবে বিদেশি  সাহায্য ও অনুদানে চলা একটি দেশ। প্রতি বছর এর বাজেট রচনা করতে বিদেশী প্রতিশ্রুতি ও সাহায্য [Taliban thanks international community for aid pledges] লাগে; তবেই তা রচনা করা যায়; বর্তমান আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুত্তাকির বয়ানে সেটি স্পষ্ট। কিন্তু তালেবানরা জাতিসঙ্ঘের বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নিলে এ দিকটিও তখন অনিশ্চিত হয়ে যাবে। কল্পনা ও ফ্যান্টাসিতে অনেক বিল্পবের স্বপ্ন দেখা যায়। কমিউনিস্টেরাও এথেকে বাইরে ছিল না। কিন্তু বাস্তবে একটা সরকার পরিচালনা সম্পুর্ণ অন্য জিনিষ। কারণ এটা আর কল্পনার হাতিঘোড়া মারা নয়। বাস্তবে করে দেখানো, অর্জন করে দেখানোর বিষয়। এথিক্যাল কিছু বাণী দিয়ে একটা অব্যবস্থাকে সুব্যবস্থায় আনা যায় না। সুব্যবস্থাই খাড়া করতে হয়। গ্লোবাল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যা আছে একে ব্যবহার করে একটা নুন্যতম সুব্যবস্থার গড়ার লড়াই এটা। তাই বন্ধুকের লড়াইয়ের চেয়ে কঠিন এটা। প্রতিটা আফগান মা ও শিশুকে অব্যবস্থার শিকার হতে বাচানোর লড়াই এটা।

    তাই আসলে খোলাখুলি স্পষ্ট ভাষায় বললে, তালেবানরা এখন ক্ষমতায় আসার পর তাদের মূল সমস্যা জাতিসঙ্ঘ নয়। মূল সমস্যা আফগানিস্তান মূলত এক ট্রাইবাল সমাজ। এই ট্রাইবাল অতীত ভেঙ্গে সে এখনও বের হয়ে আসতে পারে নাই। তাই তারা এক ট্রাইবাল অর্থনীতিতে যার মানে ট্রাইবাল জীবনযাপন। অচল প্রায় স্থবির এক ব্যবস্থা। একে ভাঙতে হবে। নতুন উতপাদন ও এক ব্যাপক বেচা-কেনা বিনিময় ব্যবস্থায় প্রবেশ করতেই হবে; বিনিয়োগ আনতে হবে। বিনিয়োগদাতারাও আগ্রহী। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে থিতু ব্যবস্থা দেখাতে না পারলে কেউ আগাবে না। আর এখানেই তালেবানদের মুনশিয়ানা দেখাতে হবে। নিজের সম্ভাবনা নিজেদের বুঝতে হবে। বাণিজ্যসম্পর্ক সবার সাথেই  করতে তাদের প্রস্তুত হতে হবে; এবং তা প্রতিযোগিতামূলকভাবে। এমনকি তা শুধু মাত্র চীন-রাশিয়ার সাথেই নয়, আমেরিকানদের সাথেও। কিন্তু সবার আগে  সুনির্দিষ্ট ও একই পলিসি ও নিয়মনীতির ভিত্তিতে। যা সবার আগে তৈরি করে নিতে হবে। নইলে টেন্ডার, কাজ দেয়া-নেয়ার মধ্যে, বিদেশীরা তালেবানদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগিয়ে  বাড়িয়ে সব বিশৃঙ্খল করে ফেলবে। নিজেদের মধ্যে মারামারি লেগে যাবে!

    মূল কথাটা হল – তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত ও বিচক্ষণতায় তারা হয় হিরো না হয় জিরো হয়ে যেতে পারে। উল্টা বললে, যেকোনো ইসলামিজমের ‘ফ্যান্টাসি’ তাদের পাতালে নিতে পারে। তাই এখনো ঝোঁক ভেসে উঠতে দেখা যাচ্ছে যে, কড়া শাস্তিমূলক কড়া শাসন হবে তালেবানদের ব্র্যান্ড – সরি, না। এটা ফ্যান্টাসি হবে। মানুষের সামাজিক অর্থনৈতিক জীবনকে কঠিন করে দিচ্ছে কি না, অদক্ষ করে দিচ্ছে কি না ইত্যাদি সেদিকে খেয়াল করতে হবে; এসব ব্যবহারিক দিকের সাফল্য হতে পারে তাদের ব্র্যান্ড।

    জাতিসঙ্ঘ প্রসঙ্গে বাকি কথাগুলো অর্থাৎ গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থা যেটি আছে এর বহু অযোগ্যতা এবং আপনার জন্য বোঝা বা বিরুদ্ধবাদী আচরণের মনে হয় ইত্যাদি সব নেতি দিক আছে আপনি দেখতে পান, কথা সত্য। তা সত্বেও এটা এক বারো মুরুব্বির ন্যূনতম ফাংশনাল ব্যবস্থা। তাই এটা উপেক্ষা করা খুবই কঠিন। তবু তা যদি করেন তবে হয়ত  এর জন্য কড়া মাশুল দিতে রাজি থাকতে হবে।

    আবার বিপরীতে এতে আফগানিস্তানকে ছাড়া বাকি দুনিয়া তার গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থাসহ কি ভালো থাকবে? বা খুশি হবে? তাও না। এখনই সবচেয়ে নিশ্চিত যেটা তা হল , সেক্ষেত্রে আফগান-পড়শি প্রত্যেকটা দেশ “সশস্ত্র ইসলামী তৎপরতা” মোকাবেলার বিরাট সঙ্কটে পড়বে।

    সর্বশেষ, জাতিসঙ্ঘের পাঁচ ভেটো ক্ষমতার রাষ্ট্র একমত হওয়া খুবই দুর্লভ মানে কম দেখা যাওয়া ঘটনা। আবার বিপরীতে তাদের ভেটো ক্ষমতার যেকোনো এক দেশের একটা না-ভোট মানে জাতিসঙ্ঘের সে প্রস্তাবই নাকচ। তাই এখানে আলোচ্য বিষয় এটা পাঁচ ভেটো ক্ষমতাধরদের এক সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। এর সোজা অর্থ, যে দেশের বিরুদ্ধে এই সিদ্ধান্ত সে দেশের জন্য এটা শনির দশা। আন্তর্জাতিক পলিটিক্যাল ইকোনমিক সব ব্যবস্থা এখন ঐ দেশের (মানে আফগানিস্তানের) বিরুদ্ধে যাবে এর ইঙ্গিত দিচ্ছে তা বলা যায়। আর আফগানিস্তানের জন্য সময় কম অবস্থা। তাই একটা আকার ইঙ্গিতের মেসেজ এখানে বলে রাখি। যেকোনো দেশের জন্য এটি বিরাট বোকামি যে, সে এই পাঁচ ভেটো ক্ষমতার কোন সর্বসম্মত সিদ্ধান্তকে একমতে থাকতে দেয়া। এদের বিভক্তিই আফগানদের জন্য বাচোয়া। তাই এমন অবস্থা তালেবানদের জন্য ভুল যা পাঁচ ভেটো ক্ষমতাকে কোন সর্বসম্মত সিদ্ধান্ন্ততে আনে।

    তাও আবার এখন যখন আমেরিকার পাশে চীনও বিরাট প্রভাবশালী অর্থনীতি এবং তার সাথে রাশিয়া আছে মানে তালেবানরা যদি ব্যবহার করতে জানে তবে দুই ভেটো সদস্যকে তার পক্ষে রাখতে পারে। কাজেই বুদ্ধিমানরা দুই ভেটো সদস্য তার পক্ষে থাকে এভাবে পা ফেলবে। মানে জাতিসঙ্ঘকে অসুবিধা বা বিরোধিতা অস্বস্তির প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে একে নিজের পক্ষে ব্যবহারের মত করে সাজানোর জন্য যোগ্য প্রতিষ্ঠান করে দেখতে হবে, কাজে লাগাতে হবে।
    দুনিয়ার কিছু আপনার পক্ষের প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকে না, করে নিতে হয় যতটা সম্ভব।

    শেষ কথা, তালেবানরা কি আফগানদের জনপ্রতিনিধি? নাকি রাজা হতে চায়?  এনিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া কী তাদের জন্য এতই কঠিন? 
    যা কিছু অতীতে কোন ইসলামি সমাজে প্রচলিত ছিল তাই শ্রেষ্ঠ – এই বিচারকাঠি সবল নয়। তাই তালেবানদের জন্য অনুকরণীয় তা নাও হতে পারে। দরকার আসলে শক্ত বিচার-বিবেচনাবোধ, বাস্তবতাবোধ এবং এসবের স্পষ্ট গাইডলাইন। কোনটা কাজ করবে না ফল দিবে না সেটা আগেই দেখতে পেয়ে যাওয়া এমন হতে হবে। নইলে তালেবানেরা অচল হয়ে যাবে। অনেক কিছুই অতীতে স্পষ্ট ছিল না; পরে হয়েছে এমন তো হতেই পারে! ব্যক্তির উন্মেষের দিক বুঝতে হবে, আবার সময়ে লাগামও টেনে দিতে হবে। কোনটা ট্রাইবাল সমাজ  আর কোনটা ব্যক্তি সমাজ এর ফারাক কী আর এর লক্ষণ কোনটা তা বুঝে ফেলতে হবে। সে ভিত্তিতে গ্রহণ-বর্জনের দিক আছে তা আমল করতে হবে।
    কাজেই  রাজা না জনপ্রতিনিধি হবেন – (দুটো রাস্তা কিন্তু পরিস্কার আলাদা) এই সিদ্ধান্ত তালেবানদের সবার আগে নিতেই হবে , পারলে এখনই ঘোষণা দিতে হবে! আর এই এক ঘোষণাতেই বাকি সব সমস্যার হাল করার রাস্তা খুলে যাবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২৫ সেপ্টেম্বর আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “আফগানিস্তান ও জনপ্রতিনিধিত্ব“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]