Tag: CHINA

  • কিসিঞ্জার ইউক্রেন যুদ্ধ কেন দ্রুত শেষ চান?

    কিসিঞ্জার ইউক্রেন যুদ্ধ কেন দ্রুত শেষ চান?

    গৌতম দাস

    ৩০ মে ২০২২, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-47y

     

                 Henry A. Kissinger, former U.S. secretary of state, seen in 2020. (Christoph Soeder/Picture Alliance/Getty Images)

    যুদ্ধ বা কোন বড় রাজনৈতিক ততপরতার মধ্যে একাজের পক্ষে ঘটনা শুরুর পরে এতে মরাল [moral]  ও এথিক্যাল [ethical] ভিত্তি দিতে বা দাঁড় করাতে দেখা যায়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এথেকে ব্যতিক্রম নয়। তবে এখানে সবার আগে পশ্চিম বিশেষত ইউরোপ এনিয়ে সক্রিয়তা দেখাতে শুরু করে। যেমন তাদের বয়ান শুরু হবে এভাবে যে এটা একটা রাশিয়ান আগ্রাসি (aggressive) কাজ। এই শব্দাবলীর ব্যবহার করতে পারা মানে বক্তা দাবি করছে যে আমি না উনিই প্রথম আক্রমণকারি। অতএব মরাল বা ন্যায়-অন্যায়ের বিচারে এবং এথিক্যাল  নীতি-নৈতিকতার বিচারে প্রতিপক্ষ দায়ী। ইউরোপ সবার আগে চেষ্টা করে যাচ্ছে এই ভিত্তিটা দাড় করাতে যাতে এরপরে তাদের সবকাজ জায়েজ মনে হয়, সব বয়ান জায়েজ হয়ে যায়।

    কিন্তু ভ্যাটিক্যান সিটির পোপ তাদেরকে ব্যতিক্রমিভাবে ফুটা বা অকেজো করে দিয়েছেন। পোপ বলেছেন, আপনি যদি কারও বাসার সামনে গিয়ে অনবরত চিৎকার করেন ভুকেন তো একসময় বাড়ির মালিক আপনাকে পিটাতে আসবে  এবং সাথে তিনি পরিস্কার করে দেন যে ন্যাটো নিজেই রাশিয়ার দরজায় গিয়ে প্রথমে ভুকেছে[barking of NATO at the door of Russia]।  অর্থাৎ তিনি কোন ছাড় না দিয়ে একেবারে মুখে মেরেছেন। এর মানে তিনি রাশিয়ান অনুপ্রবেশ কিনা সেটা নিয়ে কথা না তুলে বরং উলটা ন্যাটোকেই উস্কানিদাতা মনে করে বলছেন, এই উস্কানির জন্যই ন্যাটো দায়ী[ NATO Provoked Russian Invasion of Ukraine]। সোজা কথায় পোপ ফ্রান্সিস পশ্চিম-কেই মরালি-এথক্যালি ডুবিয়ে ছেড়েছিল গত ০৩ মে ২০২২। । 

    এবার আক্রমণ কিসিঞ্জারেরঃhenry
    আর চলতি মে মাসের শেষের সপ্তাহে এসে এবার আক্রমণ হেনরি কিসিঞ্জারের। নিজ ঘরের ভেতর বোমা ফাটানোর মতো ঘটনাটা ঘটিয়েছেন হেনরি কিসিঞ্জার [Henry Kissenger]! হ্যাঁ সেই কিসিঞ্জার! বাংলাদেশের আম মানুষের কাছে সেই কিসিঞ্জার যার অর্থ ‘কুচক্রী’ বা ‘ষড়যন্ত্রকারী’। তবে  আওয়াম মানুষের জগতের মত একাডেমিক জগৎ-এ  খোলা মনের ভাব সরাসরি বলা যায় না, পারে না বা চলে না। ফলে কিসিঞ্জার সম্পর্ক এখানে ভদ্র ও শোভন ভাষায় সমালোচনা করতে হয়। ভাব করতে হয় একে – কূটনীতি – বলে যে যেখানে এক আরেক জগৎ আছে। আর কিসিঞ্জারের ভাষ্য সেই কূটনীতিক জগতের চোখে গ্রহণযোগ্য, বৈধ!

    ঘটনাটা হল, ইউক্রেন ইস্যুতে কিসিঞ্জার কিছু পরামর্শসুচক মন্তব্য রেখেছেন তাতে ব্যাপক হইচই পড়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইম তাতে প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়ে সম্পাদকীয় লিখেছে। কিসিঞ্জার তার বক্তব্যে বলেছেন, ‘ইউক্রেনের উচিত হবে নিজ জায়গা জমি রাশিয়ার কাছে ছেড়ে দিয়ে হলেও এ’যুদ্ধ শেষ করা Ukraine: Cede territory to make peace with Russia.।’ কিসিঞ্জার আরো মনে করেন, ‘রাশিয়াকে অপমান-অবমাননাকর অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়ার পরিণতি পশ্চিমের জন্যই’ ভালো হবে না [would have dire long-term consequences for stability in Europe.]। সাথে মনে করিয়ে দেন যে, রাশিয়া কিন্তু ইউরোপেরই অংশ, এটা যেন কোনোভাবে অস্বীকার করা বা ভুলে যাওয়া না হয়। তাই এখন তার সোজা সিদ্ধান্ত যে‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে দুই পক্ষ যে যে অবস্থায় ভ‚মিতে আগে ছিল […force Ukraine into accepting negotiations with a “status quo ante,”], সেটিকে স্থিতাবস্থার লাইন মেনে দুই পক্ষই যেন সেই সীমার মধ্যে প্রত্যেকে নিজেকে ফিরিয়ে নেয় এবং এই ভিত্তিতে চুক্তি ও এর বাস্তবায়ন করতে হবে এবং তা আগামী দুই মাসের মধ্যেই [the dividing line should be a return to the status quo ante,” ]।’

    কে এই কিসিঞ্জারঃ
    বাংলাদেশে যারা আশির দশকের পরে জন্মেছেন তাদের কাছে কম পরিচিত হয়ত এই কিসিঞ্জার। এর একটি কারণ হতে পারে এই যে, গুরুত্বপূর্ণ সরকারে পদ-পদবিতে থেকে হেনরি কিসিঞ্জারের সবচেয়ে সক্রিয়তার বছর বলতে তা ছিল আসলে ১৯৬৯-৭৭ এই সময়কালকে। তিনি মূলত আমেরিকার দুই পরপর প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও ফোর্ড এদের আমলে ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার বা NSA মানে নিরাপত্তামন্ত্রী ছিলেন. এছাড়া কখনো বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী সমতুল্য উপদেষ্টাও ছিলেন। এমনকি কখনো এ দুটো পদেই এবং একই সাথে নিয়োজিত থেকেছেন। আর সেই যুগ শেষ হলে এরপর থেকে তিনি মূলত একাডেমিক কাজ যেমন, বইপত্র  লেখা বা থিঙ্কট্যাঙ্ক উপদেষ্টা হওয়া; অথবা কোন পরিচালনা বোর্ড বা কমিশন ধরনের সংগঠনের প্রধান বা স্থায়ী উপদেষ্টা হয়ে থেকেছেন। এখনো তিনি ডিকটেশন দিয়ে বই লেখাতে পারেন।  বলা যায়, মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ বা স্টেট ডিপার্টমেন্টের আশপাশে যারাই পদচারণা করেন, তাদের চোখে তিনি এখনো নমস্য এবং তার থেকে শেখার আছে বলে তারা মনে করেন!

    কথাগুলোকে আরেকভাবে একটু আপন মনে হবে এভাবে বলা যাক! তাই সুনির্দিষ্ট করে বাংলাদেশের বেলায় ১৯৭১ সাল হল কিসিঞ্জারকে আমাদের সবচেয়ে স্মরণ ও স্মৃতিময় ঘটনাবলিতে ভরপুর হয়ে থাকার সময়! তাতে তিনি হয়ত তখন খলনায়ক! কারণ তখন তিনি এরই মধ্যে টানা (১৯৬৯-৭৫) আট বছর প্রেসিডেন্ট নিক্সনের NSA (ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার) ছিলেন। আর সেকালে তার প্রথম সবচেয়ে বড় ভুমিকাটা হল, তিনি ছিলেন প্রথম চীনা-আমেরিকান সম্পর্ক স্থাপনকারী দূত। কথাটা একটু ভেঙে বুঝতে হবে। চীনে মাওয়ের কমিউনিস্ট বিপ্লব সংঘটিত হয় ১৯৪৯ সালে। এরপর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সময়কালে নয়াচীন আর আমেরিকার মধ্যে কখনোই কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। আনুষ্ঠানিকভাবে চীন বলতে তাই আমেরিকা তাইওয়ানকে ও এর সরকারকেই বুঝত। আর এই ২২ বছরের বিচ্ছেদ ও উপেক্ষার অবসান হতে নড়াচড়া প্রথম  শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালে। যখন আমরা যুদ্ধের মধ্যে ও পাকিস্তানি আক্রমণের মুখে আশ্রয়ের সন্ধানে ভারত সীমান্ত অভিমুখে অথবা তা ক্রস করে ছুটছিলাম। আর তখনই  ৯-১১ জুলাই ১৯৭১ কিসিঞ্জার পাকিস্তান সফরে এসেছিলেন সেখান থেকে গোপনে এরপর চীন যাবেন বলে। অথাৎ পাকিস্তান সফরের আড়ালে গোপনে পাকিস্তান থেকে সেই প্রথম মাওয়ের চীন সফর করেছিলেন কিসিঞ্জার। চীনে গিয়ে নয়াচীনের চেয়ারম্যান মাও জে দং ও প্রধানমন্ত্রী চৌএন লাইয়ের সাথে বৈঠক করেছিলেন।

           Photo: Premier Zhou Enlai and National Security Advisor Henry Kissinger. জুলাই ১৯৭১

    আর গোপন সফরের নির্ধারিত হয় যে পরের বছর প্রেসিদেন্ট নিক্সন চীন সফরে যাবেন। এনিয়ে সেকালে ২৬ জুলাই ১৯৭১ এর টাইমস ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ ছিল এমন। আর একালে আমেরিকার সাউথ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা চীন-আমেরিকা ইন্সটিটিউট খোলা হয়েছে। ঐ বিশ্ববিদ্যালয় কিসিঞ্জারের সেই সফর নিয়ে ডকুমেন্টারি করেছে। এই ছবি তাদের সাইট থেকে নেয়া।

    Visual search query image.    সেকালে ২৬ জুলাই ১৯৭১ এর টাইমস ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ

    কিন্তু আমাদেরর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ একটা দিক হল,  চীন-আমেরিকা সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ নিতে গিয়েই কিসিঞ্জারের আমেরিকা ততকালে হবু বাংলাদেশের স্বার্থকেই পরিত্যক্ত করে ফেলে রেখে হেঁটে চলে গেছিল। তা কার্যত হবু বাংলাদেশের বিপক্ষে ও পাকিস্তানের সামরিক একশনের পক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান হয়ে দাড়িয়েছিল। অবশ্য যুদ্ধকালীন ও পরের রিলিফ তৎপরতা বা মানবিক সাহায্যগুলো আমেরিকা বাংলাদেশে চালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঘটনার এখানেই শেষ নয়। পরবর্তীকালে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশ ভেসে যাওয়ার পরের সেবছরের সেপ্টেম্বরে শেখ মুজিব তাঁর আমেরিকা সফরকালে কিসিঞ্জারের সাথে এই প্রথম সাক্ষাৎ করেন। ঘটনাটাকে বলা যায় সেই প্রথম শেখ মুজিব, তাজুদ্দিন এন্ড গংয়ের কমিউনিস্ট ফ্যান্টাসি মানে কথিত “কমিউনিস্ট ইকোনমি” গড়ার ফ্যান্টাসি – এই বেকুবি শখ থেকে বাংলাদেশকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনার প্রথম কার্যকর এক্ট বলা যায়।  তিনি কিসিঞ্জারের সাথে দেখা করে সহায়তা চান। বিশ্বব্যাংকের সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতির যোগসূত্র স্থাপন ও তৎপরতা শুরু বলা যায় সেটাকে। কথাটা আরেকভাবে বলা যায় যে, ১৯৭১ সালের হবু বাংলাদেশ  উপায়ন্ত না পেয়ে সোভিয়েত ব্লকে ঢুকে অন্তর্ভুক্ত হয়ে এই একমাত্র পথেই  স্বাধীন হওয়ার সুযোগ দেখেছিল ও পেয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পরে সবার হুশ ছুটে যায়। শেখ মুজিব এই ফ্যান্টাসি ভাঙতে তাজুদ্দিন এন্ড গংয়ের  হাত থেকে সবক্ষমতা কেড়ে নেন, মন্ত্রীসভা ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। ফলে সেই প্রথম কিন্তু এবার উল্টো পথে মানে বাংলাদেশের  অন্তত প্রো-সোভিয়েত ব্লকে থেকে যাওয়াটার ইতি ঘটিয়েছিলেন। শেখ মুজিবের কিসিঞ্জারের সাথে সাক্ষাৎ ও যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে যার শুরু। ‘বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে কিসিঞ্জারের মন্তব্যটা তখনকার! যদিও ১৯৭৩ সালেই বাংলাদেশ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ নিয়েছিল কিন্তু তাহলেও তা কার্যত অকার্যকর করে ফেলে রাখা ছিল। সেই সম্পর্ক কার্যকর ও চালু করে প্রথম বিশ্বব্যাংকের ঋণ-অনুদান ঋণপ্রাপ্তি ঘটতে ঘটতে ১৯৭৬ সালের প্রথমার্ধ লেগে গিয়েছিল; তত দিনে শেখ মুজিব আর নাই।  মনে করা হয়,  কিসিঞ্জার অনেক কিছুই ওকে করেছিলেন কিন্তু আবার প্রবল পপুলার হয়ে উঠতে পারেন এই শেখ মুজিবকে বেঁচে থাকতে দেন নাই। সেকালে প্রচলিত আমেরিকান ফরেন পলিসির  বিভিন্ন ( ভিনদেশে অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতা চালানোর স্বভাব )  বৈশিষ্টের কথা মনে রেখে এই অনুমান প্রচলিত আছে। এসব ঘটনার কারণে, কিসিঞ্জার বাংলাদেশ ইস্যুতে খুবই নির্ধারকভাবে জড়িত ছিলেন মনে করা হয়। আসলে গোপন তৎপরতায় কাজ করা, মিটিং বা চুক্তি করা এগুলো যেন সেকালের কোল্ডওয়ারের যুগে কিসিঞ্জারের কূটনৈতিক তৎপরতার মুখ্য বৈশিষ্ট্য!!!

    একালে জেনেভায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের চলতি সভায় কিসিঞ্জারঃ
    বর্তমানে প্রায় ৯৮-৯৯ বছর বয়সের কিসিঞ্জার, সাম্প্রতিকালের খবর, চলতি সপ্তাহেই জেনেভায় অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক সভায় ভার্চুয়াল বা অনলাইনে যুক্ত হয়ে ইউক্রেন নিয়ে তিনি ওই সব মন্তব্য করেছেন। এটা ইউক্রেন যুদ্ধের এমন একটা সময় যখন প্রায় আপসরফায় সমাপ্তির দিয়ে চলে যাওয়া রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধকে বাইডেনের আমেরিকা উসকানি দিয়ে ফের চাঙ্গা করেছেন নতুন করে অস্ত্র ও অর্থ ঢেলে চলেছেন। একাজে ৪০ বিলিয়ন ডলার কংগ্রেস-সিনেট থেকে অনুমোদন এসেছে, যাতে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রসদ ঠিক থাকে। ঠিক এমন সময়ে ইউক্রেনকে জমি-ভূমি-সীমানা ছেড়ে দিয়ে হলেও রাশিয়ার সাথে আপসে যুদ্ধবন্ধের দিকে যেতে কিসিঞ্জার জেনেভার ভরা হাটে দাবি করেছেন। কিন্তু কেন?

    আসলে, খুব পরিষ্কার করে তা বুঝিয়ে বলা হয়নি, এর পেছনের কারণ। তবে কিসিঞ্জারের কয়েকটা বিচ্ছিন্ন বাক্য পাওয়া গেছে এ নিয়ে প্রকাশিত মিডিয়া রিপোর্টে। যেমন লন্ডন টেলিগ্রাফ, নিউজউইক, ওয়াশিংটন পোস্ট বা নিউ ইয়র্ক টাইমস ধরনের মিডিয়ায় যেভাবে এ খবর রিপোর্টেড হয়েছে তা থেকে; যেসবের সারকথা, ইউক্রেনকে নিজ ভূখণ্ড ত্যাগের বিনিময়ে হলেও রাশিয়ার সাথে আপসে যুদ্ধবন্ধের চুক্তি করতে উৎসাহ দিতে হবে। কারণ কিসিঞ্জার মনে করেন কোনোভাবে এতে রাশিয়ার জন্য এটা কোনো অসম্মানজনক হার হলে তাঃ

    ১. দীর্ঘ মেয়াদে ইউরোপের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করবে । কথাটা কিসিঞ্জার বলেছেন এভাবে‘যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা বিশ্ব ইউক্রেনে রাশিয়ার যে অপমানজনক পরাজয় আশা করছে, তা দীর্ঘ মেয়াদে ইউরোপের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করবে [it could worsen Europe’s long-term stability.]। অর্থাৎ তিনি যেনতেনভাবে রাশিয়ার কোন — এই হার সেই হার- একেবারেই চান না। কারণ লংটার্মে এটা ব্যাকফায়ার করবে মানে আরো বড় ক্ষতি ডেকে আনবে বলে তিনি মনে করেন।

    ২. পরের বাক্য আরো মারাত্মক। বলছেন ‘রাশিয়া তো তোমাদের ইউরোপই’। তাই বলছেন, “পশ্চিমা বিশ্বের এ বিষয়টি উপলব্ধি করা উচিত যে, রাশিয়া ইউরোপের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই পশ্চিমের উচিত হবে না ‘তড়িঘড়ি’ কোনো সিদ্ধান্তে আসা।” পশ্চিমা বিশ্বের এই বিষয়টি উপলব্ধি করা উচিত যে—রাশিয়া ইউরোপের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

    কিন্তু এতে কিসিঞ্জারের কথাগুলো মানে  তিনি রাশিয়াকেও কি সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের প্ররোচনার চোখে দেখে মানে ‘হোয়াইট ককেশিয়ান’ রেস-জাতির ধারণার চোখে গণ্য করে কথা বললেন? যেটা ক্রমেই এখন বাইডেনেরও অব্যক্ত এজেন্ডা হিসেবে উঁকি দিয়ে হাজির হচ্ছে? এক কথায় বললে এর জবাব হল – এখানে কিসিঞ্জারের অবস্থান পুরোপুরি স্পষ্ট নয়; অর্থাৎ কেন তিনি রাশিয়াকে ‘ইউরোপেরই অংশ’ গণ্য করতে বলছেন তা স্পষ্ট করেননি। এ ছাড়া রাশিয়ানরা জাতিগত পরিচয় হিসেবে মানে রেস-জাতির বিচারে আসলে প্রধানত তারা ইস্ট স্লাভিক ট্রাইব [East Slavic Tribe] ba  স্ল্যাভ -রেসের অংশ।  অর্থাৎ ঠিক ককেশীয় নয় যদিও ফেলে আসা সোভিয়েত ইউনিয়ন হিসেবে বিবেচনা করলে সোভিয়েতের ভেতরের একটি বড় অংশই ছিল সাদা ককেশীয় রেস-জাতির। সে যাই হোক, কিসিঞ্জার এর চেয়ে বেশি কিছু স্পষ্ট করেননি।

    ৩. কিসিঞ্জারের বক্তব্যের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি আহবান জানিয়ে বলছেন যে, তারা যেন ইউক্রেনকে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ‘আগের স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কো অ্যান্টি – status quo ante]’ ফিরিয়ে আনতে আলোচনায় চাপ প্রয়োগ করে। যেটা অনেকটা ২০১৪ সালের সময়কার অবস্থান, যখন ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অংশ বলে ইউক্রেন থেকে কেটে রাশিয়া নিজের সাথে যুক্ত করে নিয়েছিল।

    এখানে কিছু পুরনো ফ্যাক্টসঃ
    এখানে কিছু কথা পরিষ্কার করে রাখা যেতে পারে। ক্রিমিয়া বিগত রূশ সম্রাট বা জারের আমল থেকেই স্বতন্ত্র রেস-জাতি অর্থে আলাদা ছিল বিবেচিত হত। যদিও ক্রিমিয়া জার সাম্রাজ্যের অধীনস্ত প্রশাসনিক অংশ হিসেবে শাসিত ছিল। কিন্তু ১৯১৭ সালে লেনিনের রাশিয়ান বিপ্লবের পরে, ১৯২২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠনকালে ক্রিমিয়া অঞ্চল প্রশাসনিকভাবে রাশিয়ান ফেডারেশনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ক্রিমিয়ার কেউ কেউ হিটলারের জার্মানিকে সাহায্য করেছিল, এই অজুহাতে নেতা স্তালিন আমলে ক্রিমিয়ার বেশির ভাগ মানুষকেই শাস্তি হিসেবে ‘ফোর্সড’ সাইবেরিয়া [জারের আমল থেকেই রাজা বা কমিউনিস্ট সরকারবিরোধী ব্যক্তিকে নির্বাসনে পাঠাতে  সেই ভুমি বা অঞ্চল হিসাবে সাইবেরিয়া ঠান্ডা বনাঞ্চলে পাঠানো হত ] পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল; মাত্র  কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অপেক্ষামান  ট্রেনে তুলে দিয়ে। পরবর্তীকালে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে তারা আবার ক্রিমিয়ায় ফিরে আসে কিন্তু প্রশাসনিক দিক থেকে ক্রিমিয়া এবার রাশিয়ার সাথে আবার যুক্ত না হয়ে ক্রিমিয়া সীমান্তের অপর পাড়ে ইউক্রেনের সাথে প্রশাসনিকভাবে যুক্ত হয়েছিল। এদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে ভেঙে গেলে রাশিয়াসহ মোট ১৫টা রাষ্ট্রে তারা আলাদা হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ার প্রভাব বাকি ১৪ নয়া রাষ্ট্রের ওপর থেকে জবরদস্তিতে হটাতে আমেরিকার নেতৃত্বে পাশ্চাত্য এক শর্টকাট ও দায়িত্বজ্ঞানহীন পথ নিয়েছিল। সেটা হল, তারা যেকোনো উপায়ে ওই ১৪ রাষ্ট্রকে ন্যাটোতে যোগদানের নীতি-পলিসিতে অগ্রসর হতে থাকে। আর এতেই রাশিয়ার নিজ ভূখণ্ড-রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দিক থেকে ব্যাপারটাকে হুমকি মনে করতে শুরু করেছিল। সব বিরোধের শুরু এখান থেকে।
    তাই একই এই কারণে ইউক্রেনের সাথে রাশিয়ার বিরোধ দেখা দিলে ২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়াকে  ইউক্রেন থেকে ফেরত নিয়ে নিজ প্রশাসনের অধীনস্ত করে নিয়েছিল। আর এরই প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকা সেই থেকে পুতিনের রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করতে এগিয়ে এসেছিল। নিজের একশনের পক্ষে সাফাই বয়ান যুক্তি শক্ত করার জন্য এটাকে রাশিয়ার ইউক্রেনের ভূমিদখলদার হিসাবে মানে জবরদখল হিসেবে উল্লেখ করতে শুরু করেছিল যেন ক্রিমিয়া তার অতীতে সবসময়ই ইউক্রেনের অংশ ছিল। অথচ মাত্র ১৯৯১ সাল থেকেই সোভিয়েত ভেঙে গেছিল বলেই রাশিয়া ক্রিমিয়াকে যে আপসে ইউক্রেনের প্রশাসনের অধীনে পরিচালিত হতে দিয়েছিল, এই ফ্যাক্টস চেপে যাওয়া হয়ে চলছে এখনও।

    ফলে এখন রাশিয়ার হাতেই ‘ক্রিমিয়াকে ছেড়ে দেয়া্র” কিসিঞ্জারের প্রস্তাব এটি ঠিক ইউক্রেনের কোন নিজস্ব ভূখণ্ড রাশিয়াকে ছেড়ে দেয়ার মত ঘটনা একেবারেই নয়। কারণ ইতিহাসে ক্রিমিয়া ইউক্রেনের অধীনস্থ অঞ্চল নয়। বরং ক্রিমিয়া ও ইউক্রেন উভয়েই কয়েক শ’ বছর ধরে রাশিয়ান জার সাম্রাজ্যের অধীনে শাসিত ও পরিচালিত ছিল। এই হিসেবে কিসিঞ্জার যেন নিজেই আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের শঠতা বয়ানের বাইরে দাঁড়াতে চাচ্ছেন। এ বিচারে পুতিনের রাশিয়ার কাছে ইউক্রেনকে ভূমি ছেড়ে দিয়ে রাশিয়ার সাথে সমঝোতা করার জন্য কিসিঞ্জারের আহবান – এটা ‘তেমন অস্বাভাবিক’ কিছু নয়। মূলকথা, ক্রিমিয়া ইউক্রেনের কোনো কোর-ভূখণ্ড বা নিজ রেস-জাতিগত ভূখন্ড তা একেবারেই নয়। এই ফ্যাক্টস যদি আমরা মনে রাখি, কেবল তাহলেই আজকের তর্কে পশ্চিমা বয়ানের অসারতার দিকটা  বুঝব।

    এখন এ ঘটনায় ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কি যেন,  দিনকে দিন এক রাজনীতিবিদ রাজনৈতিক দায়-দায়িত্ব নিয়ে কথা আচরণের পরিবর্তে অভিনেতার একটিং তাও আবার ভাঁড়ামো কমেডিয়ান হতে চাচ্ছেন বেশি। ইনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি এক মাস আগেও তিনি মিডিয়ায় নিজেই বলেছেন তিনি ইউক্রেনকে আর ন্যাটোর সদস্যপদ নিতে বা পেতে আগ্রহী নন। কারণ আমেরিকান প্ররোচনায় পড়ে – এটা ছিল  তাঁর লোভে পড়া, এটাই এখন ইউক্রেনের দুঃখের কারণ হয়েছে। তিনি খোলাখুলি স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি আমেরিকার প্ররোচনায় পড়েছিলেন ঠিকই কিন্তু তিনিও তখন আমেরিকার ওপর হতাশ সে কথাই খোলাখুলি বলেছিলেন। আর এর পরই তুরস্কের মধ্যস্থতায় রাশিয়ার সাথে জেলেনস্কি সমঝোতা এগিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু আবার সেই বাইডেন তখন অস্ত্র-অর্থের লোভ দেখাতে লাগলেন। সেই জেলেনস্কি আলোচনার টেবিল ফেলে এবার আমেরিকান উসকানি তার আবার ভালো লাগতে শুরু করেছিল। তিনি আবার ভোল বদলে ফেলেন। সেই জেলেনস্কি এখন কিসিঞ্জারের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে স্বভাবতই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
    জেলেনস্কি বলেছেন, ‘রাশিয়ার সাথে শান্তি আলোচনার পূর্বশর্ত হল –  দুই দেশই তাদের মধ্যকার আগের সীমানায় ফিরে যাবে যার সহজ অর্থ রাশিয়া ইউক্রেনের অভ্যন্তরে যা দখল করেছে তার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে যেতে হবে;’ অর্থাৎ তিনি এখন ‘বাইডেন-মুডে’ আছেন।

    আসলে কিসিঞ্জারের বক্তব্য অনেককেই প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। এদের একজন হলেন উরসুলা লেয়েন [Ursula von der Leyen]। উরসুলা বর্তমানে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলছেন, ‘যুদ্ধ কেবল ইউক্রেনের টিকে যাওয়া নয়, অথবা এটি কেবল ইউরোপীয় নিরাপত্তার ইস্যু নয়, বরং এটি সব গ্লোবাল কমিউনিটির কাজ ও দায় [……war is not only “a matter of Ukraine’s survival” or “an issue of European security” but also “a task for the entire global community.”]। একথা শুনে অনেকের কোন মহা-জ্ঞানের কথা শুনছেন মনে হলেও আসলে তা এর উলটা। যেমন তিনি এরপর দুঃখের ভঙ্গিতে বলছেন, এতে ‘পুতিনের ধ্বংসাত্মক ক্ষোভের খেলাও আছে [Vladimir Putin’s “destructive fury” ।’ আবার সম্ভাবনার দিকে তাকিয়ে যেন বলে রাখতে চাইছেন, ” রাশিয়া এক দিন হয়ত ইউরোপে তাদের বিশেষ জায়গা নিয়ে ফিরে আসবে। তা আসতেই পারে যদি সে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, আন্তর্জাতিক নিয়মশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় ফিরে আসার পথ খুঁজে নেয় – কারণ রাশিয়া তো আমাদেরই পড়শি! […Russia could one day recover its place in Europe if it “finds its way back to democracy, the rule of law and respect for the international rules-based order … because Russia is our neighbor.”]। আসলে জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদে সবাই কমবেশি আক্রান্ত!!

    একালে বাইডেনের আবির্ভাব ও সবকিছুকেই তিনি পশ্চিমাগোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠত্ব হিসেবে নিজেদের হাজির করার কায়দা শুরু করেছেন। আর এতে যারাই আমেরিকান নেতৃত্বের বা অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি – তাদের নিচা দেখানোর এই রেসিয়াল (racial) শ্রেষ্ঠত্ব শো করা যে, তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিরা হলো রেস-জাতির দিক থেকে নিচা। মানে নয়া এক ‘বাইডেন রেসিজম বা পশ্চিমা রেসিজমের প্রদর্শন শুরু হয়ে গেছে। আর তাতে মেতে ওঠে এই উরসুলা লেয়েনো ভালোই প্রভাবিত হয়েছেন দেখা যাচ্ছে। তিনি পশ্চিমের গণতন্ত্র, আইনের শাসন বা আন্তর্জাতিক নিয়ম-শৃঙ্খলা দেখানো গর্ব শুরু করে দিয়েছেন। আচ্ছা তিনি  কি জানেন তিনি কী করছেন? জানলে তিনি দেখতে [পেতেন, এই কথিত গর্ব-উপাদানের বয়স কত?

    অর্থাৎ পশ্চিমের গণতন্ত্র, আইনের শাসন বা আন্তর্জাতিক নিয়ম-শৃঙ্খলা ইত্যাদি এর বয়স মাত্র ৭৫ বছর। আর এর আগে তারা কী ছিলেন? তাদের সারা ইউরোপ ছিল পেশাদার ডাকাত!!! ডাকাত মানে তাদের রাষ্ট্রের প্রধান অর্থনীতি বলতে তা ছিল  কলোনি দখলদারের লুটেরা ডাকাত ব্যবসা!! হা তাই, একটুও বাড়ায় বলা হয় নাই। লাগাতার সাড়ে তিন শ’ বছর ধরে যাদের প্রধান ব্যবসা-অর্থনীতি ছিল জাহাজে বিনিয়োগ আর এমন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খুলে  ঐ জাহাজ নিয়ে কলোনি দখলদার লুট আর ডাকাতি করতে বেরিয়ে পড়া। এভাবেই ওসব দেশের প্রধান অর্থনীতি ছিল লুট আর ডাকাতি। অথচ তারা এখন সবাইকে আইনের শাসন শেখান! যেন এটা তাদের সভ্য জীবন ছিল, যেন  তারা  এভাবেই সেই থেকে কথিত সভ্যতায় এগিয়ে ছিলেন!!! উরশুনার উচিত হবে সবার আগে কলোনিদখলদারদের জীবন কাহিনী তার পুর্বপুরুষদের চিনে নেওয়া……

    এনিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্টের শেষে আরো কিছু কথা জুড়ে দেয়া হয়েছে,  থেকে নেয়া। তারা লিখছে, কিসিঞ্জার ইউরোপীয় লিডারদেরকে উদাত্ত আহবান জানিয়ে বলছেন – ইউরোপে রাশিয়ার ভুমিকা অবস্থানকে খাটো করে দেখানো বা, দৃষ্টিশক্তির আড়ালে ফেলা না। আর? আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাশিয়াকে চীনের সাথে কোনো স্থায়ী অ্যালায়েন্সে যেতে দিও না; এতে ইউরোপের নিজেকেই রিস্কের মধ্যে ফেলা হবে! [ ……urged European leaders to not lose sight of Russia’s place in Europe and risk the country forming a permanent alliance with China.}

    আশা করি এবার পাঠক পরিস্কার বুঝতে পাবেন যে তা হলে কিসিঞ্জার ঠিক কী চাচ্ছেন? কিসিঞ্জার বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তির মত তিনিও আসলে চীনা উত্থানে ভীত। কিন্তু তবু একটা জায়গায় তিনি বাইডেন ও ইউরোপের রাশিয়া-ঘৃণার দৃষ্টি থেকে আলাদা। সেটা হল –  চীনের ভয়ে তিনিও ভীত, কিন্তু পশ্চিমাশক্তি মানে বাইডেন ও ইউরোপ মিলে যেমন রাশিয়াকে সমানে কোপাচ্ছে, এটাকে তিনি ঠিক মনে করছেন না। কেন? কারণ তিনি মনে করেন এভাবে কোপাতে থাকলে চীন ও রাশিয়ার স্থায়ী অ্যালায়েন্স তৈরি হয়ে যাবে বা অ্যালায়েন্স করতে রাশিয়াকে ঠেলে দেয়া হয়ে যাবে, যা পশ্চিমা স্বার্থের বিরোধী হয়ে হাজির হবে। সারকথায় কিসিঞ্জার মনে করেন চীন ও রাশিয়ার স্থায়ী অ্যালায়েন্স তৈরি হতে দিলে তা আমেরিকার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।  একথাটাই তিনি ফেলো পশ্চিমাদের বুঝাতে চাইছেন।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২৮ মে  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “আবার কিসিঞ্জার! ইউক্রেন ইস্যুতে কেন?“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • গ্লোবাল অর্থনীতির মোচড় বুঝতে, জিম ও’নিল পাঠ


    যে নায়ক এখন ভিলেন হতে চায়?
    গ্লোবাল অর্থনীতির মোচড় বুঝতে, জিম ও
    ’নিল পাঠ

    গৌতম দাস

    ২৩ মে ২০২২, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-46Y

     

          Brics ‘grew more than I thought’, says Jim O’Neill 2016

    The Big Issues for 2022

    জিম ও’নিল [Jim O’Neill] মূলত যুক্তরাজ্যের [UK] এক অর্থনীতিবিদ। আমেরিকার নিউ ইয়র্ক সিটির ওয়াল স্ট্রিট পাড়ায় সবচেয়ে প্রভাবশালী এক বিনিয়োগ কোম্পানি ‘গোল্ডম্যান স্যাশে’[Goldman Sachs] আর এরই প্রধান অর্থনীতিবিদ ছিলেন তিনি; আর এর পুরা সেই সময়কালটা হল ১৯৯৫-২০১৩ সাল। তাঁর প্রসঙ্গে বৃটিশ সরকারের উপস্থাপিত এক বাইওগ্রাফিতে দেখা যাচ্ছে সেখানে লেখা আছে – Jim O’Neill worked for Goldman Sachs from 1995 until April 2013, spending most of his time there as Chief Economist.। পরে ২০১৫-১৬ সালে তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ‘প্রজেক্ট সিন্ডিকেট’ [Project Syndicate] নামে বিভিন্ন নামি-লেখকের প্রবন্ধ সংগ্রহ ও মজুদের যে ওয়েবসাইটটা আছে সেখানে ২০০৮ সাল থেকেই তিনি নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন বলে তারা জানাচ্ছে।

    গোল্ডম্যানের সাথে থাকার সময়ের তার কিছু কাজ ছিল দুনিয়ায় সবচেয়ে প্রভাব পড়া ঘটনার একটা যা, তাকে বিখ্যাত করেছিল বলে মনে করা হয়। সেই ২০০১ সালের এক নিবন্ধে তিনি প্রথম আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান হিসাবে নয়া ব্রিকসের {BRICs} ধারণা (যা থেকে পরে ব্রিকস BRICS ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়) নিয়ে আসেন। কাজের অংশ হিসেবে তিনি তখন আসলে একটা নিবন্ধ বা পেপার লিখেছিলেন যার শিরোনাম ছিল ‘বিল্ডিং বেটার গ্লোবাল ইকোনমিকস ব্রিকস’ [“Building Better Global Economic BRICs.”]। পরে সেই ধারণাটাই আরো সবিস্তার করেছিলেন ২০০৩ সালে সিরিজ আকারে লিখে। সেখানেই তিনি পরিসংখ্যানগত ফ্যাক্টস-ফিগার বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের ভিত্তিতে একটা পূর্বাভাস বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘২০৪০ সালের মধ্যে চীনা অর্থনীতি আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে’ [China’s economy could become as large as the US economy (in nominal dollar terms) by 2040]।

    সেই ও’নিল গত বছর ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর তাঁর সেই প্রথম রচনার ২০ বছর পূর্তিতে এ নিয়ে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটেই একটি কলাম লিখেছিলেন। “ব্রিকস কী আদৌ কখনও জাগবে? [Will the BRICS Ever Grow Up?] শিরোনামে।  যেখানে তার আরো কিছু আপডেট মূল্যায়ন যোগ করেছিলেন।

    যদিও তাঁর ২০০১ সালের প্রথম মুখ্য মন্তব্যটা ছিল, তিনি “রাইজিং ইকোনমিজ” [Rising Economy] দেশ বলে একটা নয়া শব্দ চালু করেছিলেন। সেকালেই দাঁড়িয়ে দেখে, শতকোটির উপরের জনসংখ্যার দুই দেশ চীন ও ভারতকে এদের অর্থনীতির গ্রোথ রেট দেখে তিনি ‘রাইজিং ইকোনমি’র দেশ বলে আলাদা এই ক্যাটাগরি চালু করেছিলেন। সার কথায় বলেছিলেন, চীনা অর্থনীতি সবাইকে ছাড়িয়ে এক নম্বর অবস্থানে যাবে। আর ভারত সেকালের এশিয়ার জাপানকেও ছাড়িয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে চলে যাওয়া আমেরিকার পরে, মানে তৃতীয় স্থানে উঠে যাবে […… India could surpass Japan to become the third-largest economy soon thereafter; ]। শুধু তা-ই নয়, তৎকাল থেকেই এক বিবেচনায় সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির ব্লক বা গ্রুপের দেশ বলতে জি-৭ [G7 group] দেশগুলোকে বুঝানো হত; সেই জি-৭ ভুক্ত (কানাডা বাদে) দেশগুলোর মোট প্রবৃদ্ধির চেয়ে একত্রে এই নয়া রাইজিং ইকোনমিগুলোর দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি যোগ করলে এটাই বেশি হবে – এই ছিল তার প্রধান দৃষ্টি-আকর্ষণী মন্তব্য!! অর্থাৎ তিনি তুলনা করছিলেন সেকালের অর্থনৈতিক অবস্থার বিচারে শীর্ষ ইকোনমিক ব্লকের সদস্য এমন সাত দেশের সাথে রাইজিং ইকোনমিগুলোর প্রবৃদ্ধি যোগফল – এটা তুলনায় ভালো ও বেশি সম্ভাবনাময় বলে দাবি উঠিয়ে!!

    স্বভাবতই জিম ও’নিল এর এই কাজ, এটা কোনো গণকের ভাগ্য গণনা ছিল না। ছিল বাস্তব পরিসংখ্যানগত ফ্যাক্ট ও ফিগারের উপরে দাঁড়িয়ে করা বিশ্লেষণ। তাই ওই প্রবন্ধ সেকালে ওয়াল স্ট্রিট জগতে অর্থাৎ গ্লোবাল বিনিয়োগ পুঁজির পুঁজিবাজারের জগতে ব্যাপক আলোড়ন ও তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। এর মূল কারণ, গ্লোবাল অর্থনীতিতে কখনো এতে কম হারে প্রবৃদ্ধি হলে তা গ্লোবাল বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারের জগতে খুবই নেতি চোখে ও ব্যবসা খারাপ যাওয়ার ইঙ্গিত বলে বিবেচিত হয়। তাদের হিসাবটা সোজা;  সেটা হল যে যত ভাল বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ততই তা আরো বড় বিনিয়োগ পুঁজির জন্য বড় চাহিদার বাজারের ইঙ্গিত আর ততই তাদের ব্যবসা  ভাল ও বাড়বার সম্ভাবনা নিয়ে আসবে সেটা।
    আর এখানেই একপর্যায়ে জাতিবাদি অর্থনীতির ধারণা ব্যর্থ ও ভেঙে পড়া শুরু হয়ে যায়। কিভাবে, কেন?

    ‘ওয়াল স্ট্রিট’ বলতে এখানে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে:
    আক্ষরিক অর্থে ‘ওয়াল স্ট্রিট’ [Wall Street] বলতে  সেটা নিউ ইয়র্ক শহরের কোন একটা পাড়া-মহল্লাই মাত্র। আমাদের মতিঝিলের মত! কিন্তু এখানে এখন থেকে সেটা আর কেবল নিউ ইয়র্কের কোন একটা পাড়া-মহল্লাই নয়, বরং প্রতীকী অর্থে এটাই গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ও গ্লোবাল পুঁজিবাজারের সাধারণ স্বার্থ – এটাকেই বুঝানো হয়েছে। কারণ গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ধরণের কোম্পানির প্রধান অফিসগুলো বেশির ভাগই নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিট পাড়াতেই অবস্থিত বা শুরু হয়েছিল। অনেকটা যেমন খুবই ক্ষুদ্র-অর্থে হলেও বাংলাদেশের পুঁজি ও শেয়ারবাজার বলতে ‘মতিঝিল’ পাড়া বুঝানো যায়। অবশ্য একালে “ওয়াল স্ট্রিট” ততপরতা আর কেবল ওয়াল স্ট্রিটেই সীমাবদ্ধ নয়, তা ছাড়িয়ে এর একটা দুবাইয়ে ও আরেকটা সিঙ্গাপুরে গড়ে উঠে ইতোমধ্যেই আসর জমিয়েছে; যদিও তা ওয়াল স্ট্রিটেরই ঠিক প্রতিদ্বন্দ্বি না বরং সহযোগী হিসেবে নয়া কিছু অঞ্চলে, গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ও গ্লোবাল পুঁজিবাজারের নয়া কিছু তুলনায় ছোট কেন্দ্রভুমি হিসেবে যাত্রা শুরু করে। তাই ‘ওয়াল স্ট্রিট’ বললে এখন থেকে বুঝতে হবে এর ব্যাপকার্থে  – গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ও গ্লোবাল পুঁজিবাজারের সাধারণ স্বার্থের কথাই বলছি।

    নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের জন্ম বা যাত্রা শুরু ধরা হয় ১৭৯৪ সাল। তখনকার গভর্নর পিটার স্টাইভেসেন্টের [Then-Governor Peter Stuyvesant] এক নির্দেশে ওয়াল স্ট্রিট গড়ে উঠেছিল মূলত নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জকে কেন্দ্র করে [NYSE]। যেটার ঠিকানা ১১ নম্বর ওয়াল স্টিটে।  আর এর প্রায় শত বছর পরে ১৮৮০ এর দশকে আমেরিকান অর্থনীতি তখনকার বড় অর্থনীতি ব্রিটেনকে প্রথম ছাড়িয়ে গিয়েছিল। যে ব্রিটিশ এম্পায়ার ছিল সবচেয়ে বড় কলোনি দখলদার যার সূর্য নাকি ‘কখনো অস্ত যায় না’ বলে গর্ব করা হত। আর এরও পরবর্তীতে আরেক বিরাট ঘটনাটা হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-৪৫)। যে সময়ের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, যাকে বলা হয় আমেরিকাকে দুনিয়ার গ্লোবাল নেতা বানানোর নায়ক; সেই রুজভেল্ট ছিলেন আসলে প্রধানত ওয়াল স্ট্রিটেরই স্বার্থ মাথায় রেখে চলা প্রেসিডেন্ট। আর এভাবে চলে তিনিই প্রথম আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার স্তরে উত্তীর্ণ করেছিলেন। রাষ্ট্রের হাতে সঞ্চিত বিপুল উদ্বৃত্ত সম্পদ সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে, মূলত ওয়াল স্ট্রিটের কোর [core] স্বার্থে, তিনি আমেরিকাকে এই স্তরে উঠিয়েছিলেন। আর তাই দেখা যায় এই প্রেসিডেন্টের চার টার্মের সময়কালে তাঁর আশপাশের  প্রায় সব উপদেষ্টা-মন্ত্রী-পরামর্শদাতা বা দফতর পরিচালকরা যারা ছিলেন তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড হল যারা এর আগে ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো চালাতেন, মানে ওর (ঠিক মালিক না) পরিচালন-কর্তা বা এক্সিকিউটিভ হিসাবে কাজ করেছেন।

    এখন যে প্রশ্নটা তুলব, সেটা হল নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ কি সবসময় আমেরিকা রাষ্ট্রের স্বার্থ ছিল? হয়ে আছে বা থাকতে পেরেছে? এর জবাব খুঁজব এখন।

    জিম ও’নিল যখন ‘রাইজিং ইকোনমি’ বলে নয়া টার্মে কথা বলা শুরু করেছিলেন তখনকার চীনা অর্থনৈতিক উত্থান মানে  সেটা ডাবল ডিজিট গ্রোথের (১০% বা এর উপরের জিডিপি) প্রথম দশকটা (১৯৯০-২০০০) পার হয়ে গেছে। ও’নিল মূলত চীনের এই উত্থান দেখেই ‘রাইজিং ইকোনমি’ টার্মটা আনছেন, কারণ ভারতের অর্থনীতিতে তখনও তেমন নড়াচড়া শুরু হয়নি। তবে ভারতেরও চীনের (এখন ১৪২ কোটি 2022) মতই বিপুল জনসংখ্যার দেশ শতকোটি (এখন ১৩৮ কোটি) ছাড়িয়েছে যা। যার সোজা মানে, একটা সঠিক নীতি-পলিসি বেছে নিতে পারলে এই জনশক্তিই হয়ে উঠতে পারে সম্পদ আর তাতে বিপুল উদ্বৃত্ত ও সঞ্চিত সম্পদের এক রাষ্ট্র হতে পারে ভারত। তাই চীনকে দেখেই ভারতও সেই থেকেই হতে পারে এমন সম্ভাবনাময় গোনায় ধরা দেশ বলে গণ্য হয়ে উঠেছিল।

    পরিস্কার করে রাখি, এখানে সেসময় বলতে তা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট (২০০১-০৮) জুনিয়র বুশের শেষ আমল আর প্রেসিডেন্ট (২০০৯-১৬) ওবামা আমলের শুরু এদুই কালের এক মিলিত সময়কাল ছিল সেটা।
    সময়টা একই সাথে আরো অনেক কিছুর। যেমন আফগানিস্তানে বুশের ওয়ার অন টেররে পা আটকে গেছে তা টের পাবার সময় সেটা। মানে ২০০৫-০৬ সাল থেকেই এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তখন আর দুনিয়াটা সোভিয়েত-আমেরিকা এভাবে দুই মেরু দুনিয়া নয়। আর সেখান থেকেই এই দৃষ্টিভ্রম যে কাজেই একা আমেরিকা তখন দুনিয়াতে যা খুশি করতে পারে বাধাহীনভাবে একথায় তখন জুনিয়র বুশ এন্ড গংয়েরা ভেবেছিল – আর এটাই, তখন পরিস্কার হয়ে যায় যে এই বুঝাবুঝি ছিল ভিত্তিহীন। কারণ আমেরিকা তখন আফগানিস্তানে নিজেই এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে যেখানে বিজয় দূরে থাক যুদ্ধ-ফেলে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আশু সম্ভাবনাটুকুও নাই। মানে নিরন্তর খরচের এক অন্তহীন যুদ্ধে আটকে গেছে আমেরিকা যা থেকে কোন প্রাপ্তি বা সুফলও নাই। আর এতে খরচ জোগাতে ব্যর্থ আমেরিকান অর্থনীতি শেষে এথেকেই এক নয়া গ্লোবাল মহামন্দা্র (২০০৭-০৮) ডেকে এনেছিল বা গড়িয়ে যায়। অথচ তুলনায় তখনো চীনের প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিট না হলেও ৭-৮ শতাংশ চালিয়ে যাচ্ছিল। মহামন্দার প্রভাব পশ্চিমা দেশগুলোতে ছিল সর্বোচ্চ অথচ যেটা চীন-কেন্দ্রিক এশিয়া দেশে ততটা অনুভুত নয়!  ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করা যায় সম্ভবত এভাবেঃ এতদিনের পশ্চিমের হাতে উপেক্ষিত হয়ে থাকা এশিয়ার অর্থনীতি এবার উলটা উপেক্ষিত হয়ে থাকাটাই তো তাদের সুবিধা – মানে এশিয়ান অর্থনীতি পশ্চিমের সাথে ততটা সমন্বিত বা ইন্ট্রিগেটেড ছিল না, করা হয় নাই  বলেই পশ্চিমের মহামন্দার আঁচ এশিয়ায় কম দেখা যাচ্ছিল।

    আর এসব কিছু দেখে শেষে ওয়াল স্ট্রিট আর আমেরিকা-কেন্দ্রিক বা পশ্চিমাকেন্দ্রিক থাকতে পারেনি বা চায়নি। বিদেশে যেখানেই আয় করুক, আমেরিকাতেই তাকে উদ্বৃত্ত সম্পদ ফেরত নিতে হবে, এই বাধ্যবাধকতা এই প্রথম সে ভুলতে শুরু করেছিল। এশিয়াতেই নয়া বিনিয়োগ বাজার, তাই নয়া চাহিদার দেশ অঞ্চলকেন্দ্রিক হয়ে যায় সে!! এটাই জিম ও’নিলের পর্যবেক্ষণের মর্মার্থ বলে দাবি করা যায়!  আমেরিকান নিজস্ব সার্ভে রিপোর্টগুলোতেও তা প্রতিফলিত হতে থাকে। সার কথায়, ওয়াল স্ট্রিট আর জাতিবাদি থাকেনি, পারে নাই। গ্লোবাল স্বার্থ হয়ে উঠেছিল। রুজভেল্টের আমেরিকায় এই প্রথম ওয়াল স্ট্রিটের সাধারণ স্বার্থ আর আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ হয়ে থাকতে পারে নাই। এক ব্যাপক বিচ্ছেদ ঘটে যায়। এটা মনে করা ভুল হবে না যে এই বিচ্ছেদের ঘটনাটাই জিম ও’নিল এর পর্যবেক্ষণে ধরা পরেছিল। আবার এখানেই জিম ও’নিল যখন ‘রাইজিং ইকোনমি’ এই তত্ব আনলেন এটাই আসলে তখন ওয়ালস্টিটের আচরণের সাফাই হিসেবে ব্যবহৃত হতে থেকেছিল। এক কথায়, এই প্রথম ওয়াল স্ট্রিট আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ ফেলে চীনা ‘রাইজিং ইকোনমি’র ভেতরে নিজের ‘কোর’ মানে, গ্লোবাল বিনিয়োগের বাজার এই মৌলিক স্বার্থ খুঁজে পেয়েছিল!

    ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সংস্কারঃ
    সাথে আরও উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা ছিল ২০০৯ সালের। যেমন একটা হল,  বিশ্বব্যাংকের ঢেলে সাজানোর ঘটনা। না, সবটা বোধহয় ঠিক বললাম না। আসলে এটা হল ঘটনার কেবল বাইরের দিকটা দেখে বললে। বিশ্বব্যাংক জন্ম থেকেই এর “অভ্যন্তরীণ তথ্য উন্মুক্ত নয়” – এভাবেই গড়ে উঠেছিল। এর সম্ভাব্য দুটো কারণ আছে মনে করা হয়। এক. বিশ্বব্যাংক কাজের ধরণ অনুসারে কোন সাধারণ আম পাবলিককে সার্ভিস দেয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। তবে পাবলিকের যে রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠান আছে মূলত এর সাথে তার কারবার ও ডিলিং [dealing]। আর সেটাকেই সুযোগ হিসেবে নিয়ে এর কান্ট্রি অফিসগুলো (যেমন বাংলাদেশের বিশ্বব্যাংক অফিস) পাবলিক থেকে দূরে পাবলিক ডিলিং না করেও চলতে পারত। সাধারণ তথ্য যেমন কোন দেশের মৌলিক তথ্যাবলী বা কান্ট্রি প্রোফাইল – এ’তথ্যও উন্মুক্ত ছিল না তখন। দুই. এরই সম্ভাব্য কারণ মনে করা হয়, কোল্ডওয়ার যুগ বলে তখন ছিল  কড়া কমিউনিস্ট ভীতি। এ’ভীতির কারণে নিজেকে ঢেকেঢুকে কেবল সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বহির্বিভাগ (ERD বা এক্সটারনাল রিসোর্স ডিভিশন) আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (বাংলাদেশ ব্যাংক যেমন) সাথে যোগাযোগ রক্ষার মধ্য দিয়েই নিজ তৎপরতা চালিয়ে নিতে অসুবিধা হতো না। আগের এই ঢেকেঢুকে চলার সিদ্ধান্ত ভেঙে নিয়ে বিশ্বব্যাংক উন্মুক্ত হয়ে যায় ২০০৯ সাল থেকে। এমনকি এখন তো কান্ট্রি অফিসেরও ফেসবুক পেজ আছে যেখানে অনেক ইস্যুতে ওপেন আলোচনাও দেখতে পাওয়া যাবে। প্রশ্নোত্তর ও তথ্য সেখান থেকে পাওয়া যাবে। এ ছাড়া প্রতিটি ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের কান্ট্রি অফিসগুলো বা হেড কোয়ার্টারের বহু কিছুই এখন নানা ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি যে কেউ আম-পাবলিক নিজেই জানতে পারে। একালে ‘ডিসকাশন ব্লগও’ [discussion blog] আছে যার বুলেটিন পাওয়া বা ওয়েবে সদস্য হওয়া যায়। কিন্তু কেন এই উন্মুক্ততা? সেটাও জিম ও’নিল-এর পরোক্ষ প্রভাব। কিভাবে সেটা?

    আসলে রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর মোট প্রভাব তখন ক্রমশ জি-৭ উন্নত অর্থনীতিগুলোকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে এ’কথার গুরুত্ব তখন কেউ অস্বীকার বা ছোট করে আর দেখতে পারছিল না। এ’ছাড়া ওয়াল স্ট্রিট আপন স্বার্থেই এসব ঘটনা ও তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে এনেছে। মূল কথা, এর আরো কিছু প্রভাব ছিল মারাত্মক।

    যেমন, বিশ্বব্যাংকের প্রাকটিস বা নিয়ম হল, নিজ অর্থনীতির সাইজ-প্রভাব অনুসারে সদস্য দেশকে কম বা বেশি চাঁদা দিয়ে শুরুতে বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ নিতে হয়। আর পরে যাদের অর্থনীতির সাইজ ব্যাপক বড় কিছু হয়ে যায় ততই বাড়তি চাঁদা দিতে হয়। এখন এই চাঁদা মানে কী আবার? চাঁদা মানে, বিশ্বব্যাংক এর মালিকানা আসলে এক শেয়ার হোল্ডিং কোম্পানির মত আর সদস্য দেশগুলোর চাঁদা দেওয়াটাই আসলে সদস্য দেশের বিশ্বব্যাংকের শেয়ার কেনা হিসেবে দেখা হয়। কাজেই সদস্যদেশের অর্থনীতি যত বড় হয়ে যাবে ততই বড় শেয়ার কিনতে হবে। কিন্তু ব্যতিক্রম হল, একেবারে বড় মালিকানাগুলোর বেলায়। যেমন এখন সবচেয়ে বড় মালিকানা আমেরিকার; তা ১৬.৫৭% [অবশ্য গত ২০ বছরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এটা ১৬-১৮% এর মধ্যে নড়াচড়া করেছে]। পরে জাপান ৮.৩২%। আর এরপর ইউরোপের বড় অর্থনীতির চারটা দেশ ৪-৫ শতাংশের বেশি কেউ নয়। তুলনায় বাংলাদেশ ১ শতাংশের শতভাগের এক অংশের মত, এরকম। নিচের এই ডাটা পেয়েছি  সরাসরি বিশ্বব্যাংকের সাইট থেকে, তবে একটু পুরানা। যা কম্পাইল করা হয়েছে ২০১৯ পর্যন্ত আর প্রকাশিত ২০২০ সালে। [নিচের এই তথ্য যথেষ্ট আপডেটেড না, তবে এর চেয়ে আপডেট সংগ্রহ আমার নাগালে আসে নাই।]

    Who are the World Bank’s shareholders and
    how much capital do they own?
    • 189 member countries have subscribed to US$280
    billion of subscribed capital (paid in capital + callable
    capital)
    • The largest shareholders include the United States
    (16.57% of total subscribed capital), Japan (8.32%),
    China (4.59%), Germany (4.16%), and France and
    the United Kingdom (with 3.90% each
    source: WORLD BANK 2020

    কিন্তু বিরোধ বাধে চীন নিজের শেয়ার বাড়াতে চাইলে। চীন তার নয়া অর্থনীতির সাইজে শেয়ার মালিকানা বাড়াতে চাইলে তাতে আমেরিকা মানে তার সিনেট সেই ফাইলে অনুমোদন দেয়নি। মানে অভ্যন্তরীণভাবে বিশ্বব্যাংক টেকনিক্যালি চীনের প্রস্তাবের পক্ষে সায় দিলেও তা পাস করতে আমেরিকান মতামত চেয়ে পাঠালে সেই ফাইল আর (মূলত আমেরিকান সিনেট থেকে) ফিরে যায়নি। ফলে চীনের শেয়ার (২০১৯ পর্যন্ত) ৪.৫৯% এর নিচেই থেকে যায়। তুলনায় ভারতের শেয়ার হল ২.৯১%, এটা ভারতের সরকারি তথ্য।  

    আসলে বিশ্বব্যাংকে চীনের মালিকানা বাড়ানোর আবেদনে সাড়া না দেয়া  এটা ছিল চীনের প্রতি আমেরিকার এক অব্যক্ত মেসেজ। মানে কিছু না বলে যেটা ইঙ্গিতে বলা হয়ে যায় তা হল যে, আমি আমেরিকা বিশ্বব্যাংকের মালিকানায় চীনের শেয়ার বাড়াতে দিব না। একে নিজ নিয়ন্ত্রণেই রাখব। আমেরিকা জানত [জিম ও’নিলের ততপরতার কারণে অনুমানে] যে, চীন তাহলে নিজেই আলাদা করে বিশ্বব্যাংক খুলবে। আর সেক্ষেত্রে সম্ভাব্য সেটাই তুলনায় আমেরিকার স্বার্থের জন্য ভাল বলে আমেরিকার কাছে মনে হয়েছিল।

    আসলে ততদিনে, মানে সেই ২০০৩ সাল থেকে জিম ও’নিল যখন ‘রাইজিং ইকোনমির’ তত্ব দিচ্ছেন, সম্ভবত পরোক্ষে তিনি চীনের রাইজিং অবস্থা দেখে আগে থেকেই চীনকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন যে, চীন যেন নিজ প্রভাবাধীন (আমেরিকান প্রভাবের বিপরীতে) নয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান দুটোই গড়ে নেয়।

    পাঠককে মনে করিয়ে দেই, জিম ও’নিল-এর কথাগুলো কিন্তু আদতে ছিল ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে বলা কথা। অর্থাৎ যে কথা এখন সহজ করে বলতে পারি যে, আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিট স্বার্থ সে রাইজিং চীনা সরকারকে পরামর্শে দিয়ে বলে চলছিল যে, নিজ প্রভাবাধীন নয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান খাড়া করে নাও। অর্থাৎ সেই থেকে ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ আর জাতিবাদ আমেরিকান সীমায় থাকেনি, থাকতে চায়নি বা থাকলে নিজ অস্তিত্বের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে যেত।

    অতএব সেই থেকে ও’নিলের BRIC বা ব্রিক ধারণাটা সবল হচ্ছিল। আর ২০০৯ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সংস্কার এবং উন্মুক্ত করা আর সেই সাথে চীনকে প্রত্যাখ্যানের সেই বছরই ব্রিকস ব্যাংক [BRICS Bank] নামে চীনা প্রভাবাধীন নয়া প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়ে যায়। এখানে একটু তথ্যের কারেকশন আছে। জিম ও’নিলের প্রথম আইডিয়াটা ছিল চীন, ভারত আর সাথে রাশিয়া ও ব্রাজিলকে নিয়ে মানে তাদের দেশের নামের প্রথম অক্ষরত নিয়ে BRIC বা ব্রিক এভাবে। ২০০৯ সালে এই চার দেশ নিয়েই ব্রিক নামে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু পরের বছর দক্ষিণ আফ্রিকাকেও সাথে জুড়ে নিলে এবার নয়া নাম হয়ে যায় ব্রিকস [BRICS]।

    এখন একটা প্রশ্ন, তাহলে ব্রিকস ব্যাংক যদি এর নাম হয়  তো সেক্ষেত্রে এটা একটাই প্রতিষ্ঠান। বিপরীতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক তো প্রতিষ্ঠান হিসেবে আলাদা দুটো; যদিও তাদের সমন্বয় আছে। এমনকি কোনো দেশের বিশ্বব্যাংকের সদস্য হতে হলে সেই দেশকে আগে আইএমএফের সদস্য হতেই হয়। সেটা হয়ে থাকলে এবার বিশ্বব্যাংকের সদস্য হওয়ার সে যোগ্য হয়। তা হলে ব্রিকস ব্যাংক কার সমতুল্য, আইএমএফ না  বিশ্বব্যাংক এর? এর উত্তর হল, আসলে ব্রিকস ব্যাংকটাই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মিলিত ধারণা। আর এর ভেতরে ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ [NDB] বলে বিশ্বব্যাংক সমতুল্য আরেকটা নয়া প্রতিষ্ঠান খোলা হয়েছে।

    কিন্তু জিম ও’নিল এখন অন্য কিছু বলছেনঃ
    গত ১৭ মে ২০২২ ও’নিল আরেক কলাম লিখেছেন সেই প্রজেক্ট সিন্ডিকেট ওয়েবেই। যার শিরোনাম হলো ‘ফের গ্লোবাল মহামন্দা কী আসন্ন?’ [Another Global Recession?]  আর আমাদের প্রথম আলোও এ’লেখার একটা অনুবাদ ছাপিয়েছে।   এখানে পাঠককে আবার একটু মনে করিয়ে দেই। এখানে “এখন” মানে সুনির্দিষ্ট করে যখন বাইডেন তার নয়া ও শেষ অস্ত্র [স্যাংশন ও মানবাধিকার] নিয়ে হাজির যেটাতে জিদ আছে কিন্তু সাফাই নাই। মনের গহীনের জিদটা হল যে, দুনিয়াতে সাদা চামড়ার (সাদা ককেশীয় এথনিসিটি) শাসন চলে আসছে, যা প্রায় ৫০০ বছর [মোটামুটিভাবে ১৬০৭ সালে আমেরিকাকে (আজকের ভার্জিনিয়া রাজ্য) বৃটিশ কলোনি করা দিয়ে শুরু থেকে আজও] ধরে টিকে আছে। এটা যেভাবেই হোক বাইডেন আরো টিকিয়ে রাখবেন। চীনা অবজেকটিভ উত্থানের বিরুদ্ধে  জিদ-জবরদস্তিতে যা করা যায় এমন সবকিছু করে হলেও টিকে থাকবেন! তাতে অবজেক্টিভ বাস্তবতা ভিন্ন কিছু বললেও তিনি জিদ ধরে আড়াআড়ি বসে থাকবেন। একবার বলবেন অবরোধ আর মানবাধিকার  নামে নতুন দুটো অস্ত্র এনেছেন। এতে আর অর্থ-অস্ত্র কোনটাই আর লাগবেই না। আমেরিকা এমনিতেই ইউক্রেনসহ সবকিছুতেই জিতে যাবে। আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রায় শেষ বা আপস হতে যাওয়া অবস্থায় পৌছে গেলে এবার নয়া ৪০ বিলিয়ন ডলার অর্থ-অস্ত্র ঢেলে সেই মরা যুদ্ধকে তিনি আবার চাঙ্গা করছেন। এমনকি এতে ডেমোক্রাট-রিপাবলিক দুদলই মিলে আপোষের অর্থের অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ ডেমোক্রাট-রিপাবলিক দুদলই যে আসলে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব” জাতিবাদ বা সাদা চামড়ার শাসনের ঘোর সমর্থক তা এখানে উদাম হয়ে প্রকাশিত। কিন্তু এতে স্বভাবতই আমেরিকান জন্য বড় যুদ্ধের খরচ বাইডেন ডেকে নিয়ে আসছেন, যা বইবার অর্থনৈতিক অবস্থা আমেরিকারই নাই, এই দুইদল তা জানা সত্বেও একাজ করছে অবলীলায়!! অর্থাৎ আবার আরেক ভয়াবহ হিটলারিজম মানে এক এথিনিসিটির শ্রেষ্ঠত্ব কায়েম কিন্তু তফাত এই যে এবার জর্মান শ্রেষ্ঠত্বের বদলে সাদা ককেশীল শ্রেষ্ঠত্ব – করে হলেও তারা দুনিয়ার নেতা থেকে যাবেই। গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্ব যেন গায়ের জোর জবরদস্তি বা সামরিক শক্তি দিয়ে অর্জন করার বিষয়???

    তাই এ অবস্থায় ও’নিল নিজের এ লেখার সারাংশ শুরুতেই লিখছেন এভাবেঃ
    এককথায় ও’নিলের এই লেখা পড়লে অনুমান হবে ও’নিল তিনিও সম্ভবত দুনিয়া থেকে সাদা শাসন উঠে যাওয়ার শকুনি শোকের ফাঁদে পড়েছেন!!!
    যদিও তিনি এলেখার শুরুতেই নিজ লেখার সারাংশ করে বলছেন, “উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে আসল আয় ক্রমেই কমছে, ওদিকে চীনের দুর্বল বাইরের চেহারা আর সাথে ইউক্রেন যুদ্ধের সাথে লতিয়ে থাকে অনিশ্চয়তা এসব কিছুর মধ্যে করোনা মহামারীর ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার বদলে নিচে চলে যাওয়া দেখে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু তা সত্তে¡ও নীতিনির্ধারকদের এখনো অনেক কিছু করার সুযোগ আছে, যাতে ধাক্কাটা কাটিয়ে ওঠা যায়!

    Between falling real incomes in advanced economies, China’s weakening outlook, and the uncertainties stemming from Russia’s war in Ukraine, there is more than enough reason to worry that the post-pandemic recovery is giving way to a downturn. But there is still much that policymakers could do to mitigate the blow.

    এ বক্তব্যের তাৎপর্যপূর্ণ দিকটা হল, ও’নিল গ্লোবাল অর্থনীতি করোনা মহামারী ক্ষতি কাটিয়ে উঠার বদলে নিচের দিকে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন কিন্তু তাতে বাইডেনের বর্তমান অনুসৃত নীতি-পলিসিই যে এটা তৈরি করছে সেদিকে জিম ও’নিলের ভ্রুক্ষেপ নাই। তিনি বাইডেনের নীতিতে খারাপ ভুমিকা বা আপত্তির কিছু দেখছেন না। একেবারে বাইডেনের নামই তিউনি উচ্চারণ করেন নাই। কেন? ভাসুরের নাম? পতিত বৃটিশ অর্থনীতিকে টেনে তুলতে বাইদেনকে দরকার? তাই এখন কিছু বিপক্ষে বলা যাবে না??   আসলে সবমিলিয়ে পুরো ব্যাপারটা রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে হয়েছে এই পশ্চিমা বায়াসড অবস্থানটাই তিনি গ্রহণ করেছেন। সাধারণত পলিটিক্সের চেয়ে যার আগ্রহের বিষয় অর্থনীতি হয় তিনি যেকোনো উপায়ে অর্থনীতির অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে খাড়া অবস্থান নেন। কিন্তু এখানে তিনি ব্যতিক্রম, তা করেননি।
    আবার ধরা যাক পুতিন সবকিছুর জন্য দায়ী তবু সেক্ষেত্রে যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়ানোর দিকে আরো ঠেলে দেওয়া কী বাইডেনের নীতি-পলিসি হতে পারে? করোনা উত্তরকালে অর্থনীতির রিকভারি গুরুত্বপুর্ণ, খাদ্যের মূল্য নিচে নামানো গুরুত্বপুর্ণ নাকি পুতিনকে শায়েস্তা?

    আবার ও’নিল রাজনীতির প্রসঙ্গেই যদি ঢুকলেন তা হলে বাইডেন কেন বিনা অর্থ-অস্ত্রের যুদ্ধের কথা বলে শেষে প্রায় আপস হয়ে যাওয়া ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধকে টেনে অর্থ-অস্ত্রের যুদ্ধের মধ্যে ঢুকালেন এটাও ও’নিলের চোখে আমল পায়নি। তা হলে তিনিও কী এখানে চীনা উত্থানে সাদা শাসন হারানোর আশঙ্কার দ্বারা প্রভাবিত? অথচ তিনিই না অবলীলায় ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে মানে, পরোক্ষে রাইজিং চীনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, ফোরকাস্ট করেছিলেন এবং তার ফোরকাস্ট ২০৪০ সালে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে, যা এখন ‘২০২৮ সাল’ বলছে ইন্ডিপেনডেন্ট পরিসংখ্যান স্টাডির লোকেরা। তিনি এখন তা হলে পিছাচ্ছেন কেন? পালাচ্ছেন কেন? এখানে তিনি নিজ পুরনো অবস্থানের বদল সাদা শ্রেষ্ঠত্বের ছোঁয়ায় প্রভাবিত হয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে!!!

    আবার চীনের বর্তমান লকডাউন প্রসঙ্গে দুই রকম কথা বলছেন। এক দিকে বলছেন, ‘সেই দিক থেকে সংক্রমণ ঠেকাতে সতর্ক থাকার ব্যাপারে চীনের সমালোচনা খুব কমই করা যেতে পারে” [China can hardly be criticized for being generally cautious. ]।’ আবার বলছেন, চীন “কোভিডের বিরুদ্ধে এত কড়া অবস্থান নিবার বদলে শিথিল করলে চীনা অর্থনীতি চাঙ্গা হবে; এটা চীনের জন্য ভাল, গ্লোবালিও ভাল”!  আসলেই জিম ও’নিল কী বলছেন এগুলা????

    শেষে বলছেন তিনটা ফ্যাক্টরের কথা, আমেরিকান ফেডারল রিজার্ভসের সিদ্ধান্ত, চীনা নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত আর পুতিনের কথা। প্রথমত তিনি বাইডেনের নীতি-পলিসির উপর দুনিয়ার যেন কিছুই নির্ভর করে না, এই মিথ্যা অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। অর্থাৎ দুনিয়া উলটে গেলেও এমন অবস্থানে থেকেই তিনি কথা বলবেন বলে আগেই ঠিক করেছেন।  কারণ এই তিন ফ্যাক্ট্রের মধ্যে বাইডেনের সিদ্ধান্ত-করণীয় কোনোই ফ্যাক্টর নয়, তিনি ধরে নিয়েছেন। তাই এই তিনের একটাতেও বাইডেন ফ্যাক্টর নয়।  অথচ বাইডেন ৪০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ নিয়েছেন যেন তিনি ইউক্রেনকে অর্থ-অস্ত্র দিয়ে এই যুদ্ধ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত চালাতে পারেন। আর মরা যুদ্ধকে জাগিয়ে আরো কমপক্ষে ছয়মাস জীবিত-যুদ্ধ করে দেয়া মানেই সরাসরি অন্তত জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল আর গম বা খাদ্যের দাম কমার বদলে আরো বেড়ে যাবার সব লক্ষণ নিশ্চিত করেছেন বাইডেন। অথচ ও’নিল এখানে এসে বাইডেনের নাম উচ্চারণই করছেন না।  সোজা কথায় ও’নিল দেখা যাচ্ছে তাঁর নিজ কথা আর কাজের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। তিনি কেন সাদা শ্রেষ্ঠত্ব বা বাইডেনের নীতির সমর্থক হচ্ছেন এর কোন কারণও বলছেন না। এমনকি তিনি যে সমর্থক তা পাঠক যেন বুঝবে না বলে ধরে নিয়েছেন!

    সবচেয়ে বিস্ময়কর হল, বাইডেনের হাতে এখন আরো ছয় মাস আরামে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থ আছে। মানে, যুদ্ধকে টেনে নিয়ে যাবার অর্থনৈতিক সক্ষমতা। অথচ ও’নিল এটাকে কোনো ফ্যাক্টর মনে করছেন না!! তার এ অবস্থানের মধ্যে ওয়াল স্ট্রিটের কোনো স্বার্থ কিভাবে লুকিয়ে আছে? তিনি নিশ্চুপ!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২১ মে  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “জিম ও’নিল : যে নায়ক এখন ভিলেন!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • শ্রীলঙ্কার দুঃখের নাম ‘ডলার সভরেন বন্ড’

    শ্রীলঙ্কার দুঃখের নাম ‘ডলার সভরেন  বন্ড’

    গৌতম দাস

    ১৬ মে ২০২২, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-46k

    Sri Lanka To Default on Dollar Bonds.  GOTA GOTA YOU FAILED!  GOTA GOTA YOU FAILED!

     

    উপরের প্রথম ছবিটা বিবিসির এক ভিডিওও ক্লিপ রিপোর্ট থেকে নেয়া। যেখানে নারী বিক্ষোভকারিরা শ্লোগান তুলছে GOTA মানে “প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া – তুমি ব্যর্থ!”   শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া, তাঁর সরকার পরিচালনা বা ম্যানেজমেন্ট চরমভাবে ফেল করেছে। এক কথায় বললে তা মূলত ‘ইকোনমিক মিসম্যানেজমেন্ট’-এর কারণে। বাংলায় বলা যায়, অর্থনীতি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় মারাত্মক দ্রুটি ও ব্যর্থতা দেখা দিয়েছে এখানে। আর এতে এর ইমপ্যাক্ট মানে সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর এর যা প্রভাব সেটা কড়া মানসিক আঘাতের পর্যায়ের! কিন্তু কেন মানসিক অবস্থার দিকটা এত গুরুত্ব দিচ্ছি?

    সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন মানেই সবসময় তা একটি স্ট্রাগল; এক নিরন্তর লড়াইয়ের মধ্যে থাকে এমন জীবন। সমাজের যত নিচের বর্গে মানুষে লড়াই ততই যেন নির্মম সে লড়াই! কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে এটাই এক প্রধান ও মারাত্মক প্রসঙ্গ! কেন?

    মানুষ তার জীবন-সংগ্রামের লড়াইগুলো কী হাসিমুখেই লড়তে পারে?? এটাই হচ্ছে মূখ্য প্রশ্ন! মানুষ অবশ্যই হাসিমুখেই তা লড়তের পারে কিন্তু কেবল এক শর্তে; সেটা হল এই যে, তাঁর এই লড়াকু জীবনের একটি শেষ আছে, এর অবসান আছে এবং তাহতে পারে এমন আশা আছে, ভবিষ্যৎ আছে – এই ইঙ্গিত চলতি লড়াকু জীবনে স্পষ্টভাবে থাকতে হবে। অর্থাৎ কষ্টকর জীবন-সংগ্রামে আশা আছে কোন ভবিষ্যৎ আছে কিনা? নাকি কোন শেষ নাই ফলে ভবিষ্যতই নাই – এমন নয় তো!!! একদিন এই কষ্টকর জীবন শেষ হবে এক নয়া ভোর আসবে – এটুকু দেখতে পেলেও কেবল মানুষ সব কষ্টের জীবন বাইতে রাজি থেকে যায় – না থাকলে অবশ্যই আত্মহত্যার কথা ভাববে! এমনকি চরম কষ্টের জীবন যার আরেক বটম লাইন হল, নিজ প্রজন্ম তো গেছেই – লড়তে লড়তেই এটা শেষ হয়ে যাবে দেখা যাচ্ছে; মানুষ নিজের সেই জীবন ও প্রজন্মও বাজি ধরে লড়তে লড়তেই শেষ করে ফেলতেও রাজি হয় – কিন্তু কেবল এক শর্তে। সেটা হল, এই নিজ প্রজন্ম বিলিয়ে দেয়ার বিনিময়ে হলেও যেন তার পরের প্রজন্ম থেকে, মানে নিজ সন্তানদের প্রজন্ম থেকে তাদের যেন আর অন্তত আর না খেয়ে থাকতে হয়। এই হলো সেই ন্যূনতম আশা; আর এটাকেই সে নিজ লড়াকু জীবনের ভবিষ্যৎ আছে বলে মানে। ইংরেজিতে এটাকে সাবসিস্টেন্স লেভেল [subsistence level] মানে কেবল বেঁচে থাকা ও অস্তিত্ব ধরে রাখার লড়াই হিসেবে দেখা হয়; অর্থাৎ ন্যূনতম অস্তিত্ব ধরে থাকতে পারবে, এ নিশ্চয়তা থাকতে হবে। আর অন্তত এটা ক্রমশ ভালর দিকে পরিবর্তিত হতেই হবে – এটাই সেই প্রণোদনা বা এই বোঝাবুঝির মৌলিক-বুঝ। নিম্নবর্গের মানুষকে এ নিশ্চয়তাটুকু দিতে হয়, এই আশার বাতিটুকু যেন না নিভিয়ে দেয়া হয় সে দিকে রাজনীতি ও সরকারকে খেয়াল রাখতে হয় – এটাই সাধারণ মানুষের এজীবন সমাপ্ত করে এথেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ। সেটাই  একটা ন্যূনতম বুদ্ধিমান সরকারের লক্ষণ যে এদিকটা সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল এবং বাস্তব বোধবুদ্ধিসম্পন্ন! তাই নিচের ছবিতে আমরা দেখব এই মেয়েতা বলছে আজ আমার জীবনের আর কোন কোন ভবিষ্যত নাই [……at this point I don’t see any future]। অর্থাৎ যেন আত্মহত্যার পুর্বাবস্থায় পৌছে গিয়েছে তরুণী মেয়েটা! তাঁর পুরা বক্তব্য হল,

    “As a young person may be about seven months ago, I would have said I have a future here but at this point I don’t see any future here” – নিচের ছবির তরুণী মেয়েটার বক্তব্য এটা। যারা ভিডিওও লিঙ্ক চান, এখানে খুলে দেখতে পারেন। 


    দুঃখের বিষয়, শ্রীলঙ্কান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার সরকার এই ন্যূনতম যোগ্যতা দেখাতে পারে নাই। তাই নিজেই হেরে গেছেন। আর এতে স্বভাবতই ফলাফলে শ্রীলঙ্কার সাধারণ মানুষকেও তাদের নিজ নিজ জীবন সম্পর্কে পুরোপুরি হতাশ করে দিয়েছে। বেঁচে থেকে জীবন সংগ্রামের সব স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। এ নিয়ে বিবিসির এই শিরোনাম এক টিনএজ তরুণী বলছে, ‘আমি অল্পবয়সী তবু এখন এখানে আমি আমার ভবিষ্যৎ দেখি না।’ অথবা রান্নার গ্যাসের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়ানো মানুষ হঠাৎ আর্তনাদ করে বলছে, ‘একমাত্র আল্লাহই আমাদের চাইলে বাঁচাতে পারে।’ এসবই হল – জীবনের আশার বাতি নিভিয়ে দেয়ায়  কঠিন সব খেদোক্তি!!

    এই হলো এখনকার শ্রীলঙ্কান জীবনের সাধারণ ও কঠোর বাস্তবতা! গত সোমবার ৯ মে এর সারা দিনে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে প্রকাশিত গণসন্তোষ-বিক্ষোভে এক সিটিং সরকারি এমপিসহ মোট আটজন নিহত হলেন। সিএনএনের ভাষ্যমতে, ৩৮ জন রাজনীতিবিদের বাড়ি তারা পুড়িয়ে দিয়েছে। আর স্থানীয় লাইভ টেলিভিশনে দেখা গেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে যে, ‘সরকারি দলের সংগঠিত গুণ্ডারা লাঠিসোটা আর বুলেটের অস্ত্র নিয়ে বিক্ষোভকারীদের ওপর রাজধানীর কয়েকটি স্থানে প্রথমে চড়াও হয়েছিল। সরকারের অনুমান ছিল, এসব বিক্ষোভ শক্তহাতে দমন না করে সামলালে তাদের জন্য বিপদ হবে। কিন্তু এতেই ঘটনা ঘটে উল্টা অর্থাৎ সরকার যে মানুষের জীবনের সব আশা কেড়ে নিয়েছে, এসব দিকে সরকারের খেয়াল ছিল না। আর এতেই আরো বিক্ষোভে ফেটে পড়া মানুষেরা প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারি নেতাদের বাসায় বাসায় গিয়ে হামলা করেছে। প্রধানমন্ত্রী নিজ বাসা ছেড়ে এক নৌঘাঁটিতে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। আর পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে জনগণের ক্ষোভ প্রশমনের করার চেষ্টা করেন।

    তামিল-সিংহলি দ্বন্দ্বঃ
    শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে এক বড় দীর্ঘ দিনের অসন্তোষের ইস্যু হল, দেশের প্রধান এথনিক জনগোষ্ঠী সিংহলিদের সাথে জনসংখ্যার প্রায় ১৮%  [২০১২ সালের সরকারি গণনার হিসাবে, যা বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টে তবে ১৯৮১ সালের হিসাবে যা ১৫% ছিল]। এই তামিল এথনিক জনগোষ্ঠী যাদের প্রায় ১১% শ্রীলঙ্কার স্থানিয় আর বাকিরা ভারত থেকে মাইগ্রেটেড তামিল।   স্থানীয়ভাবে তামিলেরা  মূলত শ্রীলঙ্কার উত্তরে ও পুবে বসবাস করে। মনে করা হয়, যারা মাইগ্রেটেড ব্রিটিশ আমলে এরা চাবাগান ইত্যাদিতে অগ্রসর ও দক্ষ শ্রমিক বলে তাদের ভারতের তামিলনাড় (পুরানা মাদ্রাজ) – থেকে শ্রীলঙ্কায় নিয়ে আসা হয়েছিল। আর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করলেও  তামিলনাড়–র থেকে আসা তামিলরা স্থায়ী হয়ে শ্রীলঙ্কায় থেকে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে সিংহলিদের সাথে চেয়ে তামিলদের সাথে নাগরিকবৈষম্য বেড়ে গেলে সশস্ত্র রাজনীতির এলটিটিই [LTTE] গোষ্ঠীর জন্ম হয়। কিন্তু লম্বা ২৬ বছরেও কোনো আপস-সমাধান না আসায় বা অনেকের চোখে এ আন্দোলন সশস্ত্রতাতেই থেকে যাওয়ার আগ্রহ সীমাহীন ছিল বলে এটা কোনো সমাধানের চেয়ে যেন আজীবন সঙ্ঘাত চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত তৈরি করেছিল। ফলাফলে ২০০৯ সালে শ্রীলঙ্কা সেনাবাহিনী সশস্ত্র বলপ্রয়োগে আক্রমণ শুরু করলে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ছারখার হয়ে যায়। আর সেটা ছিল মাহিন্দা রাজাপাকসের সরকারের আমল। তাই অনেক মনে করেন, সেই থেকে জাতিবাদী বীরের অহং তৈরি হয়েছিল মহেন্দ্র রাজাপাকসের পরিবারকে কেন্দ্র করে। যেমন এখন যিনি শ্রীলঙ্কা প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে তিনি পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী মহেন্দ্র-এর আপন ছোট ভাই। এই পরিবারের মহেন্দ্র-ই প্রথম প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন ২০০৯ সালে, যার বাবা কেবল একজন এমপি ছিলেন।   আর পরে এভাবে ২০১৯ সাল থেকে  নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হন মাহিন্দার ছোটভাই গোটাবায়া। আর এরপর থেকে আস্তে আস্তে তাঁর সরকারে রাজাপাকসে পরিবারের অন্তত ২০ জন সদস্য মন্ত্রী বা এমপি হয়ে নানা পদে জড়িয়ে ছিলেন। সব মিলিয়ে শ্রীলঙ্কান রাজনীতিতে রাজাপাকসে পরিবারের প্রভাব অনেক বেশি, তা অনুমান করা কঠিন নয়; যদিও এদিকটা বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবিসির এক রিপোর্টের শিরোনাম হলঃ  শ্রীলঙ্কার সঙ্কট : যুদ্ধবিজয়ী বীরেরা কী করে ভিলেন হয়ে গেলেন [Sri Lanka crisis: How war heroes became villains]??

    এখান থেকে আরেকটু অনুসিদ্ধান্ত টানা যাক। গত ৯ মে প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা গণ-বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করার পরে আগেই উঠা প্রেসিডেন্ট ও ছোট ভাই গোটাবায়ার পদত্যাগের পাবলিক ডিম্যান্ড বা দাবি এখন আরো জোরদার হয়েছে। এরই মধ্যে গোটাবায়া তাদের দলীয়, আগে পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছেন। যদিও তিনি বিরোধী দলীয়  এখন এক এমপি মাত্র ছিলেন কিন্তু তাকে রাজাপক্ষে পরিবারের ঘনিষ্ট মনে করা হয়। প্রধানমন্ত্রী হয়েই বিবিসিকে তিনি বলেছেন, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে গেছে [……PM described the Sri Lankan economy as “broken]। তাই তিনি পাবলিকের কাছে আহবান রেখেছেন “ধৈর্য ধরতে, তিনি সব কিছু ভালো জায়গায় ফিরিয়ে আনবেন” [“be patient, I will bring things back”.]”। কিন্তু তিনি কি সেই সুযোগ পাবেন?

    ওই সাক্ষাৎকারে তিনি কোনো আশা জাগাতে পারেননি। নিজেই এমন শঙ্কা ব্যক্তও করেছেন। বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক অবস্থা আবার ভালো হওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই না আরো বেশি খারাপ হয়ে যায়” […… misery and unrest is “going to get worse before it gets better”.]”। এরই প্রতিধ্বনি যেন পাবলিক ডিম্যান্ডে যে গোটাবায়াকেও পদত্যাগ করতে হবে।

    শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির বাস্তব অবস্থাটা কীঃ
    এক কথায় এর জবাব, এই অর্থনীতির এক ব্যাপক সংস্কার করতে হবে এবং কমবেশি সবাই মানেন যে, আইএমএফের [IMF] হাতেই এই সংস্কার হলেই ভাল। অনেক এটাকে নয়া ঋণ গ্রহণের সাথে পরিশোধেরও কাঠামোতে বদল আনা বলছেন। এক পেছনে মূল কারণ হল, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে (প্রধান পণ্য উৎপাদন চা-সহ) কোম্পানিগুলোর বড় একটা অংশ বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানির মালিকানায়। মানে পুরানা দিন থেকেই স্থানীয় ব্যবসায় বিদেশী নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি। সোজা কথায় এতে অর্থনীতির বৈশিষ্ঠ হবে – শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে প্রডাকটিভ ক্যাপিটালের (উতপাদক পুঁজি) চেয়ে বিনিয়োগ ক্যাপিটালের ()ইনভেস্টমেন্ট বা সুদী পুঁজির) ভুমিকা ও এর প্রভাব অনেক বেশি ও তা ডমিনেটিং হয়ে আছে। এছাড়া এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরেক বড় ফ্যাক্টর – সভরেন বন্ড [Sovereign Bond] !!

    সভরেন বন্ড কীঃ
    ইংরেজি সভরেন [sovereign] শব্দের আক্ষরিক অর্থ সার্বভৌম। কিন্তু অর্থনীতিতে সভরেন শব্দ ব্যবহার হয় একটু ভিন্ন অর্থে। এখানে সভরেন মানে ‘রাষ্ট্র নিজে গ্যারান্টি দিচ্ছে’ এ ধরনের। কিন্তু ঠিক কিসের গ্যারান্টি? সে প্রসঙ্গে যাবো।

    সাধারণত ‘বন্ড’ বলতে তা সরকারি সিল-ছাপ্পড় মারা এবং যা এক কাগুজে “নোট” [note] লিখে দেয়া ছাড়া কিছুই নয়। আর এই শব্দের মূল অর্থ একটা নোট লিখে দিয়ে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেয়া।  কিন্তু সভরেন বন্ড, একসাথে শব্দদুটা কথার মানে হল, কেউ নিজ অর্থ দিয়ে কোনো রাষ্ট্রের সভরেন বন্ড কিনতে পারে। এর বিশেষত্ব হলো এর ম্যাচুরিটি মানে পাঁচ বছরের বন্ড হলে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়া শেষে এর সুদসহ আসল অর্থটা ঐ রাষ্ট্র বন্ড ক্রেতাকে ফেরত দিবে বলে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। আর স্বভাবতই এই সভরেন বন্ডের বেলায়, এটা কোনো ব্যক্তি বা প্রাইভেট কোম্পানির ইস্যুকৃত ও বিক্রি করা কোন বন্ডে দেয়া গ্যারান্টির চেয়ে খোদ রাষ্ট্রের নিজের দেয়া গ্যারান্টির ওজন ও আস্থা পাবলিকের কাছে অনেক বেশিই হবে।

    এই বিচারে কোনো সরকারের ইস্যু করা ‘ডলার সভরেন বন্ড’ (International Sovereign Bond – ISB) মানে, বৈধ আমেরিকান ডলার খরচ করে যে বন্ড কিনতে হবে – এমন বন্ড (ইস্যু করে) ছেড়ে সরকার নিজ প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা জোগাড়ের এক সহজ উপায় বলে একালে মনে করা হয়। যদিও এটা অনেক রিস্কি একটা পদক্ষেপ। তবে এটা আমেরিকার মত বড় ও প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতির দেশের বেলায় গ্লোবাল পুঁজিবাজারে আমেরিকান সভরেন বন্ড যথেষ্ট আস্থাবাচক – এক বন্ড কেনা ও বেচার ব্যবস্থা – তা বুঝা যায়। যেমন জাপান ও চীন এদের একেক দেশ, এখন আমেরিকার এমন এক ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের সভরেন বন্ড এখনো কিনে রেখেছে। কিন্তু বলাবাহুল্য বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কার সরকার যদি অমন সভরেন বন্ড ইস্যু করে থাকে তবে তা একই মাত্রার আস্থাবাচক  বা ওজনদার হবে না।

    তবে বাস্তবে বাংলাদেশ কখনোই এমন সভরেন বন্ড ইস্যু বা চালু করেছে বলে জানা নেই যদিও চলতি সরকারের আমলেই সময়ে এমন কিছু বিক্ষিপ্ত আলোচনা উঠেছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সরকারের ইস্যু করা সভরেন বন্ড  আছে। আর শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রধান কারণ এই বন্ডের উপর প্রতিশ্রুত সুদাসল  পরিশোধে শ্রীলঙ্কা সরকারের অপারগতা। বলে, অনেক ইন্ডিপেনডেন্ট রিপোর্ট অথবা সিএনএন, বিবিসিসহ শ্রীলঙ্কার স্থানীয় মিডিয়াতেই মানা হয় যে, শ্রীলঙ্কান সভরেন বন্ডের সর্বশেষ সুদ ফেরত দেয়ার তারিখ ছিল গত ১২ এপ্রিল ২০২২।

    কিন্তু  শ্রীলঙ্কা সরকারের ইস্যু করা সভরেন বন্ড  আছে। আর শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রধান কারণ এই বন্ডের উপর দেয়া প্রতিশ্রুত সুদাসল পরিশোধে শ্রীলঙ্কান অর্থনীতির  অপারগতা!

    সরকার নিজেই বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে তারা এই অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়েছে; পারছে না – রেডি নয় বলে অপারগতা জানায়। আর তখন থেকে গ্লোবাল পুঁজি বাজারে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ও সরকার ডুবে যাচ্ছে এখবর আর লুকানো না থেকে চাউর হয়ে যায়। তবে এসব কথা কেবল গত এপ্রিল ২০২২ এর নয়। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসেও একইভাবে (ISB) এর পাওনা পরিশোধ করতে শ্রীলঙ্কা সরকার ব্যর্থ হয়েছিল। যদিও তখন শ্রীলঙ্কান অর্থনীতি যে সংকটের কথা স্বীকার করা হয় নাই।এনিয়ে তখনকার আলজাজিরার রিপোর্ট এখানে।

    The government is due to make a $36 million interest payment on a 2023 dollar bond April 18, as well as $42.2 million on a 2028 note, Bloomberg-compiled data show. A $1 billion sovereign bond was maturing July 25.

    এটা ছিল ভারতের এক মিডিয়া  বিজনেস স্টান্ডার্ড এর রিপোর্ট থেকে নেয়া কিছু অংশ।
    আর সেবার এপ্রিলের ব্যর্থতায় আরো বলা হয়েছিল জরুরি খাদ্যদ্রব্য ও ওষুধ ইত্যাদি আমদানির অর্থ না থাকাতে তারা তখনই আর নিজ বৈদেশিক মুদ্রাভাণ্ডার খালি করতে চাইছেন না। কিন্তু কার্যত এটা দাঁড়িয়ে যায় যে, সরকার একদিকে আইএসবি বন্ডের পাওনা শোধ করেনি আবার প্রয়োজনীয় জরুরি দ্রব্যাদিও সব আমদানি করতে পারেনি। ফলে জ্বালানি তেল, জ্বালানি গ্যাস ও খাদ্যশস্য এমনকি স্কুলের পড়ালেখার কাগজ ও ওষুধও পর্যাপ্ত আমদানি করতে পারেনি বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে। মুল কারণ চাহিদার তুলনায় বৈদেশিক মুদ্রা ছিল অনেক কম।  আর একবার এমন সাপ্লাইয়ের অভাবের কথা বাজারে রটে গেলে আমদানি-সাপ্লাই দ্বিগুণ করেও বাজার থিতুতে আনা যায় না। কালোবাজারি-মজুতদারি হয়ে যায় বাজারের মূল ফেনোমেনা। আর এথেকেই সেটাই শ্রীলঙ্কার সমাজ ও অর্থনীতিতে স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠার অবস্থা সৃষ্টি করেছিল।

    বৈদেশিক বন্ড বা ISB প্রসঙ্গে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা। আমাদের মত দেশে অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাংক বা চীনা বা অন্য কোনো দেশের ঋণ নেয়ার চেয়ে ISB  ইস্যু করে গ্লোবাল পুঁজিবাজার থেকে ডলার জোগাড় করা – এদুটার মধ্যে কোনটা ভাল? অথবা দুটোর ভালো-মন্দ কী? বিশেষজ্ঞরা আমাদের মত দেশের বেলায় বন্ড বা ISB ইস্যু করাকে নিরুৎসাহিত করে থাকেন, তুলনায় অবকাঠামো (বিশ্বব্যাংক বা চীনের মতো দেশ থেকে) ঋণ নেয়াকে ভাল মনে করে। এর পিছনের কারণ বলা হয়, অবকাঠামো প্রকল্প বাজেটে বরাদ্দ (ডলার মুল্যে) যেসব অর্থ অন্তত স্থানীয়ভাবে কিনতে বা ব্যয় করতে হবে; যেমন, স্থানীয় শ্রম কিনতে হবে হয়ত অথবা সিমেন্ট বা রড ধরনের কাঁচামাল ইত্যাদি ক্রয়ের জন্য বা প্রকল্পের জন্য একোয়ার [acquire] করা জমির মূল্য পরিশোধ – এসবের তুল্য সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা যা বাজেটে বরাদ্দ থাকে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়ে প্রাপ্ত  স্থানীয় মুদ্রা ওই প্রকল্প নিজ অ্যাকাউন্টে তা জমা করে নেয়। এরপর সেখান থেকে ঐ টাকা স্থনীয় ক্রয়ে ব্যয় করা হয়। এতে ব্যয়িত ঐ বৈদেশিক মুদ্রাকে রাষ্ট্রের অর্থনীতি রাষ্ট্রের  বৈদেশিক মুদ্আরা আয় হিসেবে গণ্য করার সুযোগ থাকে। আর তুলনায় বন্ড- ISB ইস্যু করে বৈদেশিক মুদ্রা জোগাড় করলে তা সুদসহ আসল এর সবটাই আবার ডলারে ফিরে পরিশোধ করতে হয়। এ কারণে বন্ড- ISB ইস্যুর চেয়ে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে প্রকল্প উৎসাহের বিষয় বলে গণ্য করা হয়। দেখা যাচ্ছে, শ্রীলঙ্কা এসব বাছবিচার বিবেচনাকে আমল না করে এগিয়ে চলতে গিয়ে বন্ড- ISB ইস্যু করা অনেক সহজ কাজ মনে করতে গিয়ে আজ বিপদে পড়েছে! এটা অবশ্যই বেপরোয়া আচরণ!

    আসলে যারা বন্ড- ISB কিনেছিলেন তাদেরকে প্রদেয় এপ্রিল ২০২২ এর কিস্তির অর্থ দিতে ব্যর্থতা ছিল সবচেয়ে বড় ঘন্টা বেজে যাওয়া যে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি বিশাল সংকটে পড়ে গেছে। অথচ এথেকে দেশকে বের করার মত পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে গোটাবায়া সরকার ছিল ততোধিক উদাসীন। যেন সরকার আরামে অপেক্ষা করছিল যেন এক মিরাকল ঘটবে আর অর্থনীতির এই মারাত্মক সংকট মুহুর্তেই সমাধান হয়ে যাবে। অথচ ব্যাপারটা মোটেই তা ছিল না। ফলে সরকার এসব সংকটকে ঠিকঠাক বুঝতে পারে নাই বা সংকটটারই গুরুত্ব আমল করতে সক্ষম ও যোগ্যতা দেখাতে পারে নাই। আর এটাই মূল ব্যর্থতা।

    সব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতিতে এথেকে উদ্ধার পেতে গেলে সেই সমাধানের ব্যাপারে ওই রাষ্ট্রের অর্থনীতির উপর গ্লোবাল বাজারের আস্থা থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি মনে করা হয়। যেমন গত ফেব্রুয়ারি থেকেই শ্রীলঙ্কান অর্থনৈতিক রেটিংয়ের ইন্ডিপেন্ডেন্ট, এমন অন্তত দু’টি প্রতিষ্ঠান শ্রীলঙ্কা সম্পর্কে খারাপ রেটিং দেয় বা রেটিং নামিয়ে দিয়েছিল। এর সোজা ফলাফল হল, বিদেশীরা এই রেটিং দেখেই কিন্তু বন্ড-ISB  বা কোনো দেশীয় প্রাইভেট কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা করতে আসে। এসব কারণে, যখন গ্লোবাল বাজার দেখে যে, একটা দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কটে ফাইনালি আইএমএফ এসে ঐ দেশকে উদ্ধারের জন্য কাজ শুরু করছে কীনা??? এটাই গ্লোবাল পুঁজি বাজারে সবার কাছে এক আস্থার চিহ্ন ছড়িয়ে দেয়। অতএব, সে কারণেই সবাই এখন তাকিয়ে আছে আইএমএফের সাথে শ্রীলঙ্কা সরকারের যে কথা-নেগোশিয়েশন চলছে গত ফেব্রুয়ারি থেকে, তা কবে এথেকে তা একটা চুক্তিতে তা পরিণতি ও সম্পন্ন হতে সমর্থ হয়!!  যার ব্যবহারিক অর্থ, শ্রীলঙ্কান অর্থনীতি উদ্ধারে আইএমএফ তার কাজ শুরু করে!

    উপরে যে সভরেন বন্ডের কথা বললাম, যা পরিশোধে শ্রীলঙ্কা সরকার এখন বিনিয়োগকারিদের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারি [defaulter] হয়ে আছে – এই অর্থ পরিশোধ করবে কী করে? কার থেকে আবার অর্থ ঋণ করে এনে? এই বাস্তবতাটা এতই কঠিন যে একমাত্র আইএমএফ-ই [IMF] হতে পারে সেই সম্ভাব্য উতস।  এক রিপোর্ট ধারণা দিচ্ছে যে শ্রীলঙ্কাকে এক্ষণি পরিশোধ করতে হবে এমন অর্থের পরিমাণ প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার [……Sri Lanka’s external debt servicing obligations were thought to be over USD 6 billion.]।  আর এত বিশাল পরিমাণ অর্থ একমাত্র  আইএমএফ-ই যোগাতে পারে এবং সবচেয়ে বড় কথা বাজারের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে!

    যদিও এসবের মধ্যে আরেক বড় জটিলতা হল, ঐ দেশের চলতি রাজনৈতিক অবস্থা দেখে বুঝাই যাচ্ছে যে, প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া, তাঁরও পদত্যাগ বিনা কোন নুন্যতম রাজনৈতিক স্থিরতা আসছে না। যার অর্থ আইএমএফ তা হলে কি পরবর্তি নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করবে? সোজা কথা, গোতাবায়া যতই নিজের পদত্যাগে দেরি করবেন ততই আইএমএফ সংস্কার কাজে নামতেই দেরি করবে! বলাবাহুল্য এর মানে শ্রীলঙ্কা আরো দীর্ঘসময় ধরে চলবে চরম বিশৃঙ্খলা!! অথচ ঘটনা সে দিকেই যাচ্ছে। একদিকে বাজারে খবর হল, নতুন শপথ নেয়া প্রধানমন্ত্রী রনিলকে গোতাবায়ার লোক মনে করা হয়। অর্থাৎ তাই দেশের মানুষেরই আস্থা নাই। ফলে এদের সবার পদত্যাগ না দেখলে নয়া রাজনৈতিক ঐক্য আনা ও সংস্কার কার্যকর করতে এগিয়ে আসা সব পিছিয়ে অনিশ্চিত হয়ে যেতে থাকবে!!!।

    চীনবিরোধী প্রপাগান্ডার কী খবরঃ
    শ্রীলঙ্কার বর্তমান অবস্থা নিয়ে যেসব সিরিয়াস মিডিয়া রিপোর্ট করছে এদের মধ্যে যেমন ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বা বিজনেস স্টান্ডার্ড ইত্যাদি আছে – সব মিলিয়ে এরা কেউই এই অর্থনৈতিক সঙ্কটের জন্য শ্রীলঙ্কা ‘চীনা ঋণের ফাঁদ’ পড়েছে বলে কোন কারণ দেখায় নাই। মানে এসব মিথ্যা তথ্যের প্রপাগান্ডা করেনি। বরং ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একটা ব্যাখ্যামূলক [Explained] রিপোর্ট করেছে। এখানে দেখেন,……Explained: What led to Sri Lanka’s economic crisis, and who’s is helping?। তাতে স্পষ্ট করে জানাচ্ছে, শ্রীলঙ্কার নেয়া মোট বৈদেশিক ঋণের (সেটা নাকি ৫১ বিলিয়ন ডলার বলে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে – Sri Lanka announces default on all of its $51 billion external debt )। কিন্তু এই কথাটা সবটা সত্য না। ৫১ বিলিয়ন ডলার – এটা সবটাই প্রতিশ্রুতি ফেল করা ঋণ যেটাক্বে ডিফল্টার (default) বলে টঝিক তা না। একটা দেশের নেয়া মোট বৈদেশিক ঋণ আর  সভরেন বন্ডের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডলার যোগাড় একই জিনিষ নয়। মূলত সভরেন বন্ড জিনিষটা ঋণ নেয়াই নয়। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বা চীন জাপান থেকে নেয়া ঋণের বেলায় সময়ে কিস্তি পরিশোধ করতে পারার পরিণতি হল – পুনরায় পরিশোধের সময় দেয়া [রিসিডিউল বা reshedule] তবে সাথে আরো কিছু কড়া শর্তে। কিন্তু ডিফল্টার করে বাজারে খবর রটিয়ে ঐদেশের রেটিং বা অর্থনীতির মান ফেলে দিয়ে নয়।  আর সভরেন বন্ডের প্রতিশ্রুতি ফেল করা অন্য জিনিষ। এখানে রিসিডিউলের কিছু নাই। যতদ্রুত সম্ভব সব পাওনা দেরির সুদ-সহ পরিশোধ করা। নইলে গ্লোবাল পুঁজি বাজারের বদনামে রেটিং আরো নিচে নেমে না দেউলিয়া ঘোষণা করে দেয়।
    কিন্তু এই ৫১ বিলিয়ন ঋণ দেখানো এটা সবটাই সভরেন বন্ডের ডিফল্টার বা প্রতিশ্রুতির অর্থ নয়। এটা শ্রীলঙ্কার পরিশোধযোগ্য মোট বৈদেশিক দায়। দায় মানেই তা ঋণ নয়। আর এই মোট ৫১ বিলিয়নের মধ্যে মাত্র ১২.৫৫ বিলিয়ন ডলারের হল সভরেন বন্ড-ISB ইস্যু করে নেয়া বৈদেশিক দায়। তাই টাইমস অব ইন্ডিয়া পরোক্ষে এমন মানে করে রেখেছে (যেটা আসলে একটা প্রপাগান্ডা) যেন এই ৫১ বিলিয়ন ডলারের পুরোটার ওপর ডিফল্টার হওয়াতেই যেন শ্রীলঙ্কার ক্রাইসিস। এ কথা সত্য নয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, বন্ডের ক্রেতার দায় মাত্র ১২.৫৫ বিলিয়ন ডলারের আর এসব বন্ড যারা কিনেছে এরা হলো প্রধানত জাপান, চীন ও এডিবি সাথে কিছু খুচরা বিনিয়োগকারী [ISBs make up the largest share of Sri Lanka’s foreign debt at $12.55 billion, with the Asian Development Bank, Japan and China among the other major lenders.]।

    এর সোজা মানে হল, চীনের কোনো ঋণ-গছিয়ে দেয়ার ফাঁদে পড়ার গল্প এটি নয়। এটা সোজাসাপ্টা বন্ড-আইএসবি ইস্যু করার বাজার থেকে অর্থ তুলে আনার বোকামি, এটাই মিস-ম্যানেজমেন্ট এবং বন্ড ক্রেতাদের কিস্তির অর্থ পরিশোধে ব্যর্থতায় বাজারে খারাপ ইমেজ আর খারাপ অর্থনীতি আর তা মিস-ম্যানেজ বা ভুল পরিচালনাজনিত সমস্যা।

    কিন্তু তবুও ভারতেরই আরেক দল মিডিয়া (যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়া ছাড়াও বাংলাদেশের প্রথম আলো বা নিউএজ যারা হয়ত না বুঝে প্রপাগান্ডার শিকার) – এরা শ্রীলঙ্কার বর্তমান সংকটকে চীনের ঋণ-গছিয়ে দেয়ার ফাঁদ বলে পুরোনা স্টাইলের প্রপাগান্ডার মধ্যে এখনো আছে ও চালিয়ে যাচ্ছে। আর এদের মিথ্যা প্রপাগান্ডার ভিত্তি এএফপির নামে চালানো এক রিপোর্ট। যে একই রিপোর্ট টাইমস অব ইন্ডিয়া,  ভারতের   এনডিটিভি,     আমাদের প্রথম আলোর অনুবাদ আর নিউ এজ সহ আরো অনেকে তুলে এনেছে। মজার কথা হল শিরোনাম এবং খবরের একই সোর্স হলেও তাতে ভিতরে বডিতে কনটেন্ট সবার এক না।   আর এদের সবার মধ্যে কেবল এনডিটিভি একটা ডিসক্লেমার জুড়ে দিয়ে শেষে জানিয়েছে (This story has not been edited by NDTV staff and is auto-generated from a syndicated feed.)।অর্থাৎ তারা কোন শব্দও এতে ঢুকায় নাই।

    এ ছাড়া একই প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে ভারতের আইপি টিভি (প্রথম কলকাতা) বা সোশ্যাল মিডিয়া টিভি অথবা ফেসবুক ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি, এসব জায়গায় গেঁথে বসা প্রপাগান্ডা ধারণাটা হল, সেই পুরানা গল্প – চীনা ঋণের কারণেই শ্রীলঙ্কা অর্থনীতির আজ এ দুর্গতি। অথচ এটা ভিত্তিহীন।
    আর সবচেয়ে বড় কথা, ওই হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্রবন্দরের মালিকই এখন আর শ্রীলঙ্কা সরকার নয়। তাই ওটা নির্মাণের ব্যয় পরিশোধের কোনো দায় বা ঋণের বোঝা শ্রীলঙ্কান সরকারের নয় ও নাই। সোজা কথায়,  এখন বন্দরের মালিক শ্রীলঙ্কা সরকার নয়। ওর মালিক এখন চীনের এক প্রাইভেট কোম্পানি যারা বন্দর চালিয়ে নিজের আয় থেকে দায় তুলে নেবে ও নিচ্ছে। ফলে ওই বন্দর নির্মাণ খাতের কোনো ঋণ শ্রীলঙ্কা সরকারকে বইতে হচ্ছে না ও নাই; ওই বালাই-ই নেই এই হলো বাস্তবতা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৪ মে  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “জীবনের ভবিষ্যৎ আছে, এ আশা কেড়ে নিতে নেই“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

     

    –

     

  • বাইডেন দুনিয়ার সবার জন্য ক্ষতিকারক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠছেন!

    ইউক্রেন-যুদ্ধকে ‘নয়া পর্যায়ে’ ঠেলে দিলেন !
    বাইডেন দুনিয়ার সবার জন্য ক্ষতিকারক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠছেন!

    গৌতম দাস

    ০৯ মে ২০২২, ০০:০৭  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-451

       Biden   seeks $33 billion war chest to support Ukraine

    ইউক্রেনের যুদ্ধ তৃতীয় মাসে পড়েছে, আর এরই মধ্যে এই যুদ্ধ এক নব ও বৃহৎ পর্যায়ে প্রবেশের মুখে মানে, এই যুদ্ধ বাইডেন এখন আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বা কমপক্ষে আরো ছয় মাস গড়িয়ে নিতে যাচ্ছেন, তা বুঝা যাচ্ছে। অন্তত বাইডেনের নয়া পরিকল্পনা এটাই। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ-ইঙ্গিত ফুটে উঠেছে দুটা মিডিয়া রিপোর্টে। মূলত গত এপ্রিলের শুরু থেকেই এই নয়া পরিকল্পনার উদ্ভব যার প্রকাশ এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে। তবে দুটো মিডিয়া রিপোর্টের শেষেরটা নিয়েই আগে কথা বলা যাক।

    আমেরিকান অভ্যন্তরীণ এক নিউজ নেটওয়ার্ক সিএনবিসি [CNBC] ২৮ এপ্রিল জানাচ্ছে, আমেরিকান কংগ্রেসের কাছে বাইডেন ইউক্রেনে সামরিক (অস্ত্র ইত্যাদি) ও মানবিক সাহায্যের জন্য মোট আরো ৩৩ বিলিয়ন ডলার পেতে অনুমোদন চেয়েছেন [Biden to ask Congress for $33 billion to support Ukraine through September] অর্থাৎ এই রিপোর্টে এটাও পরিষ্কার করে লেখা যে, এই অর্থ দিয়ে তিনি চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতে চান! আর এর মাত্র তিন বিলিয়ন খরচ হতে পারে মানবিক সাহায্য খাতে। কিন্তু মোট অনুমোদিত অর্থের প্রায় দু-তৃতীয়াংশই মানে, প্রায় ২১ বিলিয়নই আমেরিকা খরচ করবে ইউক্রেনকে সামরিক অস্ত্র সাহায্য জোগাতে। এ ছাড়া আরো প্রায় সাড়ে আট বিলিয়ন ডলার বাইডেন খরচ করবেন ইউক্রেনের ভাঙা অর্থনীতিকে টেনে তুলতে।

    অন্য দিকে এবার আসি মিডিয়া রিপোর্টের প্রথমটায়। এই ইঙ্গিত-প্রমাণটা হল, গত মাসে ২৪ এপ্রিল বাইডেনের দুই মন্ত্রী- প্রতিরক্ষামন্ত্রী (আসলে তারা উপদেষ্টা আমাদের মন্ত্রীর সমতুল্য) লয়েড অস্টিন [Lloyd Austin ] আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন [Antony Blinken]- এরা দু’জন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে হাজির হয়ে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সাথে সাক্ষাৎ ও বৈঠক করেছেন। আর তাঁদের কিয়েভে হাজির হওয়াটাও গল্প-উপন্যাসের মত বেশ থ্রিলিং। তুরস্কের মধ্যস্থতার উদ্যোগে  রাশিয়া ইউক্রেনের সাথে গত মার্চের শেষ সপ্তাহে  দ্বিতীয় ডায়ালগে বসার সময়ে তারা রুশ সৈন্য সমাবেশ কিয়েভ অভিমুখ থেকে ডনবাস অঞ্চলে সরিয়ে নিয়েছিল।  আর এই সুযোগে দিনে পোল্যান্ডে আশ্রয় নেয়া কূটনীতিকরা  দিনে কিয়েভ এসে দিনেই ফেরত যাওয়া এভাবে  কিয়েভে হাজির হওয়া শুরু করেছিলেন। আর এরই উসিলায় লয়েড অস্টিন আর অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন প্রথমে পাশের দেশ পোল্যান্ডে (পোল্যান্ড ন্যাটো মেম্বার ও এই যুদ্ধে রাশিয়ার বিরুদ্ধে) সফরে আসেন। আর সেখান থেকে নীরবে অজ্ঞাত সফরে বের হয়ে, ট্রেনে করে কিয়েভে পৌঁছে জেলেনস্কির সাথে দেখা করেন। তবে কিয়েভে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে তার কিছুটা আমরা বুঝতে পারি এনিয়ে প্রকাশিত ২৫ এপ্রিলের রয়টার্সের রিপোর্ট থেকে যার শিরোনাম ‘ইউক্রেন সফরঃ ব্লিঙ্কেন ও অস্টিন আমেরিকান কূটনীতিকদের কিয়েভে ফিরে আসার আর সামরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি [On Ukraine visit, Blinken, Austin pledge return of U.S. diplomats, more security aid]’। যদিও ওই রিপোর্টে সামরিক সাহায্যের কথা যতটুকু ছিল তার সবগুলোই খুবই কম, কয়েক মিলিয়ন ডলারের মাত্র। আর আমেরিকান কূটনীতিকদের কিয়েভে ফিরে আসা বলতে বুঝানো হয়েছে যে গত তিন বছর ধরে কিয়েভে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়া ছিল না আর অন্যান্য আমেরিকান কূটনীতিকদের যুদ্ধেশুরুর ১৫ দিন আগে পাশের পোল্যান্ডে চলে যেতে নির্দেশ দিয়েছিল স্টেট ডিপার্টমেন্ট। তাই এখন এই ইস্যুতে নতুন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়া ও কূটনীতিকদের ইউক্রেনে ফিরে আসার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। আর সেকথাই ও’দুই  সফররত মন্ত্রী বলছিলেন।

    আসলে বাইডেনের এই ‘নয়া পর্যায়ের’ ইউক্রেন যুদ্ধ-পরিকল্পনা অনেক বড় আর গভীরের। সিএনবিসির ঐ রিপোর্টে স্পষ্ট করেই লিখছে, ‘আমেরিকান সামরিক নেতারা বলছেন, ইউক্রেনে আমেরিকান স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য দুটো। প্রথমটি হলো, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ করে সজ্জিত করা যাতে তারা ইউক্রেন থেকে রাশিয়ান সেনাদের পুরো বের করে দিয়ে সরাসরি বিজয় আনতে পারে। আর আমেরিকার দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো, রাশিয়ার সমগ্র সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয়া আর সাথে বাণিজ্যে ও অর্থনীতিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ওর অর্থনীতিকেও একেবারে ধসিয়ে দেয়া।’

    “U.S. military leaders say their strategic objectives in Ukraine are now two-fold.  The first is to arm Ukrainian forces so that they can secure an outright victory in the war by expelling Russia from Ukraine entirely.  The second is to weaken Russia’s entire power structure over the long-term by tying up its troops in a war of attrition while crippling its economy with sanctions and trade embargoes.”

    তবু আরো সহজে তা বুঝার আরেক উপায় হল অস্টিন ও ব্লিঙ্কেন – বিশেষত অস্টিনের এই পর্যায়ের এপ্রিল মাসের সব সফরগুলোকে যদি এক সাথে মিলিয়ে দেখি। আমরা শুরু করতে পারি ৮ এপ্রিল অস্টিনের অফিস পেন্টাগনের থেকে প্রকাশিত এক প্রেস বিবৃতি থেকে। ওখানে বলা হয়েছে, অস্টিন ১০ এপ্রিল থেকে ইসরাইল, জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার এবং যুক্তরাজ্য সফরে বের হচ্ছেন। কিন্তু এগুলো ছিল সবই কেবল ২২ এপ্রিল পর্যন্ত সফর তালিকা যার মধ্যে জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার ও যুক্তরাজ্য সফর সবই শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার – এগুলো ছিল আসলে প্রথমবারের মত সফর! আর এরপর? এরপর শুরু হয়েছিল নয়া পর্যায়। তারা দু’জন এবার ২৩ এপ্রিল থেকে সফর শুরু করেছিলেন যেখানে ২৩ এপ্রিল তারা এই নয়া সফরে পোল্যান্ড পৌঁছে গেছিলেন। আর সেখান থেকেই পরদিন কিন্তু ট্রেনে অজ্ঞাতযাত্রা হিসাবে ইউক্রেনের কিয়েভে চলে গেছিলেন, যার কথা উপরে বলেছি।

    এর পরই শুরু হয়েছিল আসল সফর। ইউক্রেন সফর শেষে অষ্টিন এবার একা ২৬ এপ্রিল থেকে দ্বিতীয়বার জার্মানি, বেলজিয়ামে ন্যাটোর হেড কোয়ার্টার সফর শুরু করেছিলেন। আর অস্টিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সফর ও উপস্থিতি ছিল মুখ্যত ২৬ এপ্রিল ন্যাটো-ইইউ [NATO-EU Talk] বৈঠকে। সেটা ছিল ৪০ দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের উপস্থিতিতে ইউক্রেন ইস্যুতে এক সভা। আসলে এটাই ছিল রাশিয়ার বিরুদ্ধে বাইডেনের সর্বাত্মক যুদ্ধের ডাক- এরই সভা!

    বাইডেনের এই নয়া পরিকল্পনার চাপ সংশ্লিষ্ট ওই ৪০ দেশে কত প্রচণ্ড হতে পারে তা এখান থেকে সহজেই অনুমেয়।

    খুব সম্ভবত সে কারণেই নতুন করে ইইউর দেশগুলো যেন কোনোভাবেই রাশিয়ার তেল-গ্যাস না কিনতে পারে এজন্য কমিটমেন্ট দেয়ার প্রসঙ্গ এর পরই আবার উঠে আসে; যদিও ওই যুদ্ধের ডাকের বৈঠকের এক সপ্তাহ পরই এই প্রতিশ্রুতি চাওয়া নিয়ে ইইউ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে আছে। এই প্রসঙ্গে আরো আলাপের আগে গত ২৬ এপ্রিল অস্টিনের উপস্থিতিতে ৪০ দেশের ন্যাটো-ইইউ বৈঠক নিয়ে আরো কিছু কথা বলে নেয়া যাক।

    যুদ্ধের ডাকের বৈঠকের নিউজের প্রায় সব রিপোর্টের হেড লাইন করা হয়েছে যার ভাষ্য এভাবে যে, “ইউক্রেন বিশ্বাস করে, সে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জিততে পারবে”। যেমন- ইইউ জুড়ে উপস্থিত থাকা মিডিয়া ‘পলিটিকো [POLITICO]’ এর শিরোনাম হল – “অস্টিন : আমেরিকা বিশ্বাস করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেন ‘যুদ্ধে জিততে পারে” [Austin: U.S. believes Ukraine ‘can win’ war against Russia]।” আবার ‘ইউরোনিউজ [EURONEWS]’ এর হেডলাইন হল, “সবাই বিশ্বাস করে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেন যুদ্ধে জিততে পারে’ বলেছেন আমেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী ন্যাটো-ইইউ বৈঠকে” [‘Everyone believes Ukraine can win the war,’ says US defence secretary at NATO-EU talks ]। অর্থাৎ “সবাই বিশ্বাস করে” অথবা “আমেরিকা বিশ্বাস করে” এই দুটো ভাষ্যই অস্টিন ওই বৈঠকে উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু কেন তিনি এই ‘বিশ্বাসের’ ওপর জোর দিলেন? এটাই মুখ্য!

    কারণ রাশিয়া যে, আমেরিকার সাথে টক্কর দেয়া পরাশক্তি ছিল বা আছে আর ইউক্রেন যে ১৯৯১ সালে ভেঙ্গে যাওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৫টা খণ্ডের এখন একটা খণ্ড-দেশ; আর সেই দেশ ইউক্রেন এখন রাশিয়াকে যুদ্ধে হারিয়ে দিবে – কথাটা না হাসির বিষয় হয়ে যায় তা আগাম ভেবেই মনে হচ্ছে, এখানে বিশ্বাসের উপর  জোর দেয়া হয়েছে। তবে মুখ্য বিষয়টা এখান থেকেই অনুমেয় যে, ইউক্রেনের রাশিয়াকে যুদ্ধে হারাতে গেলে আমেরিকা ও ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্যদের ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ করে প্রায় ঢেকে ফেলতে হবে – এমন অবস্থায় যেতে হবে যা আদৌ কতটা সম্ভব সেই প্রশ্ন তো আছেই!

    তার মানে আমরা এখন অন্তত ৪০টা দেশ সংশ্লিষ্ট হয়ে থাকবে – এমন এক “যুদ্ধ” প্রসঙ্গে কথা বলছি। এমন যুদ্ধের কথা শুনলেও  এদিকে অনেকে ভাবতে পারেন, আমার দেশ তো এই যুদ্ধের কেউ নয়, ফলে আমরা দূরে বসে খেলা দেখার মত যুদ্ধ উপভোগ করব। কিন্তু না; এই অনুমান দুনিয়ার সব দেশের বেলাতেই মিথ্যা হয়ে যাবে। মূল কারণ আমাদের বড় যুদ্ধের সবচেয়ে কমন ধারণা বলতে আমাদের মনে আসবে (১৯৩৯-৪৫) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়ত। তাও আবার বয়স্ক লোকদেরই এনিয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে। সমস্যা হল, সে সময়কালের জমানায় গ্লোবাল বাণিজ্য বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে; যেটা এখন উল্টা। মানে এখন সব দেশই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে এক গ্লোবাল বাণিজ্যে পরস্পরের অর্থনীতি সরাসরি, সবার সাথে সবার অর্থনীতিই সংযুক্ত হয়ে গেছে। তাই এযুগে কোন ঘটনাই আর লোকাল বা এমনকি আঞ্চলিক বলে আর কিছু অবশিষ্ট নাই। ফলে এক দেশে কোনো পণ্যের অভাব হলে দুনিয়াতে ওই পণ্যের প্রধান উৎস দেশগুলোতে প্রথমে আর পরে দুনিয়ার সব দেশেই এর প্রভাব ছড়িয়ে পরতে দেখা যায়। তাই পুরনো কোনো যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দিয়েই এবারের যুদ্ধের ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না। যেমন, কেবল তিনটি পণ্যকে যদি আলোচনায় আনি –  জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল আর গম – যা উৎপাদনের  একালে বড়  উৎস হল রাশিয়া ও ইউক্রেন (কেবল গম আর ভোজ্যতেলের বেলায়) উভয়েই। এ তিনটি পণ্যের মূল্যে গ্লোবালি ইতোমধ্যে আগুন লেগেছে; এরই মধ্যে যার মূল্য দ্বিগুণ বা এরও বেশি হওয়ার পথে। ফলে যারা চাল না, গম তাদের প্রধান খাদ্য যেমন পাকিস্তান বা ভারতের উত্তর অংশ, এরা বিশাল সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে। শুধু খাদ্যের দ্বিগুণ মুল্যবৃদ্ধির কারণেই দুনিয়াব্যাপী এক বিপর্যয় আমাদের সকলের দিকে নব পর্যায়ে যুদ্ধ শুরু হবার আগেই ধেয়ে আসতে শুরু করেছে। এথেকে আন্দাজ করা যেতে পারে গ্লোবাল অর্থনীতির হাল কী হবে অথবা কী পরিমাণ লোক অনাহারে বা খাদ্য কিনতে না পেরে মারা যাবে।
    এখন বাইডেন কি এসব সম্ভাব্য গ্লোবাল মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনাগুলোকে আমল করেছেন? সম্ভাব্য জবাব হল, তিনি এসব আমল করলে এই নয়া যুদ্ধের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। আর সবচেয়ে বড় কথা – তারা সারা পশ্চিমের সবাই এখন ইউক্রেনের ঘাড়ে চড়ে নিজেদের স্বার্থের যুদ্ধটা সেরে ফেলতে চাইছেন! কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই যুদ্ধে কি কোন একটা পক্ষ নিজেকে বিজয়ী বলে দাবি করতে পারবে? সবচেয়ে বড় কথা – বাইডেন কী  মাত্র “৩৩ বিলিয়ন ডলারের’ মধ্যে এই নয়া যুদ্ধ শেষ করতে পারবেন? এটা কি  আদৌও পারা সম্ভব?  আমেরিকা পরাশক্তির ইজ্জত হারিয়ে সদ্য – বহু কষ্টে ২০ বছরের আফগানিস্তান যুদ্ধ যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ মিলিয়ন ডলার করে খরচ হত মানে, সেই অর্থ সব ড্রেনেজ হত –  কোনমতে ইজ্জত ভুলে হলেও তা শেষ করতে পেরেছিল, সেটা কি এই বাইডেনের হাতেই ঘটে নাই? সেই বাইডেন কী করে আবার এবার ইউক্রেনের কাঁধে সওয়ার হয়ে যুদ্ধে নামতে সবাইকে উত্তেজিত করতে নামেন কী করে!!!! এটা আক্ষরিক অর্থেই ‘ট্রিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন’ বটে!

    এই পরিপ্রেক্ষিতে অনেকে বলছেন, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিজ ব্যক্তি ইমেজ বাঁচাতে অথবা দলের ইমেজ বাঁচাতে বহুবার নিজ দেশকে যুদ্ধে নিয়ে গেছেন এমন রেকর্ড আছে। এমনকি বাইডেনের মত ডেমোক্রাট, কথিত “লিবারেল ভদ্রলোক ইমেজের” ক্লিনটনেরও মনিকা লিউনেস্কি কেলেঙ্কারি মামলা থেকে মনোযোগ সরাতে ইরাকের সাদ্দামের উপর বিমান হামলা – বোমা মেরেছিলেন তিনি। তাহলে এখন বাইডেনও কি আগামি নভেম্বর মিড-টার্ম নির্বাচন যেটাতে তার দল প্রেসিডেন্টের পারফরমেন্সের জন্য শোচনীয়ভাবে হারবে বলেই সার্ভে রিপোর্ট এরই মধ্যে প্রকাশিত, সেই নির্বাচনে বিজ খারাপ ইমেজ কমাতে বা ঢাকতে মানে প্রভাব ফেলতেই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধের খরচ জোগাড় করতে গেছেন??  মানে ঐ অর্থ খরচ করতে তা আগামী নভেম্বর কেন, আরো অনেক নভেম্বর পেরিয়ে যেতে পারে – ঘটনা কি এভাবে আমেরিকার হাতছুট হয়ে যাওয়ার দিকে আরেকবার যাচ্ছে?

    আমরা যদি একটু পিছন ফিরে দেখিঃ
    আমরা যদি একটু পিছন ফিরে দেখি, বাইডেনের এ’যুদ্ধকে নয়া পর্যায়ে নেয়ার পরিকল্পনা বোঝা যাচ্ছে এপ্রিলের শুরু থেকেই। অথচ তুরস্কের উদ্যোগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তির লক্ষ্যে ডায়লগ অনেক দূর এগিয়ে গেছিল। দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ডায়লগ ঘটে যাওয়া মানে  এই যুদ্ধ একটা সমাপ্তির কাছাকাছি চলে যাওয়া এমন আশা দু’পক্ষের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল। যেমন প্রথম আলোর এক অনুবাদ রিপোর্টে যা ৩০ মার্চ প্রকাশিত, এর শিরোনাম ছিল, “ইস্তাম্বুল সংলাপ কি ইউক্রেন যুদ্ধের ‘টার্নিং পয়েন্ট’।” মানে বলতে চেয়েছে এই যুদ্ধ কী সমাপ্তির দিকে চলে যাচ্ছে!!  আবার ২৯ মে বিবিসির রিপোর্ট থেকে নেয়া অনুবাদ রিপোর্টের শিরোনাম, “ইউক্রেনের যে প্রস্তাবে নমনীয় হলো রাশিয়া”। ভিতরের একটা বাক্য ছিল এরকমঃ এক মাসের বেশি সময় ধরা চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের দিকে এটাই সবচেয়ে বড় অগ্রগতি। মস্কোর এই নমনীয় অবস্থানের পেছনে রয়েছে ইউক্রেনের প্রস্তাব”। অর্থাৎ যুদ্ধ যে সমাপ্তির দিকে তা এখানে একেবারে স্পষ্ট। এমনকি ৫ এপ্রিল রুশ বার্তা সংস্থা তাসের খবর অনুবাদ করে প্রথম আলো লিখছে, “লিখিত সমঝোতা হলেই পুতিন-জেলেনস্কি আলোচনা সম্ভবঃ পেসকভ”।

    অথচ বাইডেন প্রায় সমাপ্তি ও আপোষের দিকে চলে যাওয়া ইউক্রেন যুদ্ধকে ঐ ৫ এপ্রিলের মধ্যেই নব পর্যায়ের আরেক বৃহৎ পরিসরে ৪০টা দেশের যুদ্ধের হিসাবে ঠেলে দিলেন। সোজা কথায় যা আগে কখনও করেন নাই এবার তাই করলেন – তাঁর পরিকল্পনা এবার একেবারে এর উল্টো। তিনি এপ্রিলের শুরু থেকে নয়া উদ্যোগে যুদ্ধের পরিকল্পনা করেছেন। তাই ১০ এপ্রিল থেকেই সেই বার্তা নিয়ে অস্টিন ও ব্লিঙ্কেন ইউরোপ যুদ্ধের ডঙ্কা বাজিয়ে নেমে পড়েছেন! আর ২৬ এপ্রিলের মধ্যে ৪০ দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের সবাইকে ন্যাটো-ইইউ বৈঠকে শামিল করে ফেলেছেন। চাপের মুখে ইউরোপ রাজিও হয়েছে।

    কিছু কথা মনে করিয়ে দেইঃ
    গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ শুরু করেছিল। এর একদিন পরে জেলেনেস্কির হতাশা যে তারা একাই রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়তেছেন পাশে আমেরিকাসহ ইউরোপের কোন দেশ নাই। অর্থাৎ তিনি প্রতারিত হয়েছেন তাই বলতে চেয়েছিলেন। এর পরোক্ষ জবাবে বাইডেন বলেছিলেন আমেরিকা রাশিয়া বিরুদ্ধে ইউক্রেন বা অন্য কোন দেশের মাটিতে যুদ্ধে লড়বে না। কারণ তার যুদ্ধের অস্ত্র ছিল আসলে রাশিয়ার উপর অবরোধ আরোপ আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রাশিয়ার বিরুদ্ধে তুলে বিনা-অস্ত্রের যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া।  একই যুক্তিতে এপর্যন্ত তিনি ন্যাটোর মাধ্যমে ইয়ক্রেনে কোন অস্ত্র সরবরাহ করেন নাই। যেটা সম্প্রতিকালে শুরু হয়েছে।
    তাহলে এখন ইউক্রেনে বা ন্যাটো সদস্য পোল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনকে অস্ত্র করতে চলে তিনি আগের সব প্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে ফেললেন!!! আর তাতে এবারের সকল ততপরতাড় জন্য দায় তিনি নিজের মাথায় নিতেও বেপরোয়া হয়ে গেছেন। একারণের বলছি বাইডেন নিজ সংকীর্ণ স্বার্থে নিজ প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেলেন। সারা দুনিয়াকে একটা অনন্ত যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিলেন!!  আর ভাবছেন ৩৩ বিলিয়ন ডলারে তিনি ইউক্রেন-কে দিয়ে রাশিয়া জয় করাবেনই……। এই বাইডেন এখন সারা দুনিয়ার জন্য বিপদজনক ও দায়ীত্বজ্ঞানহীন হওয়ার পথে চলে গেছেন। তাই বাইডেন দুনিয়ার সবার জন্য ক্ষতিকারক হয়ে উঠতে চলেছেন!!

    ‘কিন্তু’ বিরাট বিরাট সব কিন্তুঃ
    ২৬ এপ্রিলের ন্যাটো-ইইউ এর ৪০ দেশের সভায় রাশিয়া থেকে তেল-গ্যাস আমদানি একেবারে বন্ধ অথবা ইইউ দেশের নিজ জ্বালানির সমস্যা নিয়ে কোনো আলোচনাই তোলা হয়নি। কিন্তু এরপর থেকে কানাঘুষা অথবা “চরম বিদ্রোহী” বা অসহ্য মনে করা দেশগুলো প্রকাশ্যে রাশিয়ান তেল-গ্যাস আমদানি বন্ধ করতে পারবে না বলে প্রেসকে জানিয়ে দেয়। যেমন ইতালি, হাঙ্গেরি বা অস্ট্রিয়া এসব দেশের এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। আর জার্মানি যে সবচেয়ে বেশি রাশিয়ান তেল-গ্যাস আমদানিতে নির্ভরশীল (প্রায় ৪২ শতাংশ); যদি সে আজ এক কথা বললে পরের দিনই নিশ্চিত থাকা যায়, সে একটা উল্টো কথা বলবে। হয়তো বলে ফেলল, আমদানি বন্ধসহ অনেক কিছু করবে, কিন্তু পরের দিন বলবে ‘যদি সব দেশ রাজি থাকে তবেঅই জর্মানি সেটা করবে। আমরা যদি এসব স্ববিরোধী রিপোর্টের একটা সারাংশ করি তবে দেখব ৩ মে এর দুটো রিপোর্টই যথেষ্ট – পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরি আঁচ করার জন্য। যেমন ৩মে এর  বিবিসির রিপোর্ট লিখেছে,  ইইউর মধ্যে এই প্রশ্নে বিভক্তি দেখা দিয়েছে [EU divided over how to step away from Russian energy]। ইংরেজি শিরোনামের অনুবাদ, ‘রাশিয়ান জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে সরে আসা হবে কবে এই প্রশ্নে ইইউ দ্বিধাবিভক্ত।’ সার কথায় এর জবাবে একদল বলছে, ২০২৭ সালের পর থেকে। প্রো-আমেরিকান অন্য গ্রুপ বলছে, চলতি বছর শেষ থেকে। আবার জার্মানি বলছে এখনই তো একেবারেই সম্ভব না। এদিকে প্রথম আলোরও ঐদিনের বাংলা  শিরোনাম – “রাশিয়ার তেল আমদানি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিভক্তি”।

    কিন্তু একই দিন মানে ৩ মে এর নিউ ইয়র্ক টাইমস একেবারে সরাসরি ভাণ্ড ফুটা করে দিয়েছে। প্রশ্নবোধক চিহ্ন লাগিয়ে এর শিরোনাম – ‘ইউরোপ কি রাশিয়ান তেল আমদানি প্রায় বন্ধ করে দেয়ার পথেঃ এরপরে কী?’ [Europe Is About to Ban Russian Oil: What’s Next?]। আসলে ভেতরে খবর এর একেবারে উল্টা; অর্থাৎ কোন প্রশ্ন নয়, একেবারে জবাব!!! কী সেটা?

    এক্সপার্টদের জবানে নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখছে- ১. এক্সপার্টরা বলেছেন রাশিয়ার সাথে ইউরোপের জ্বালানি সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন করা সম্ভব। ২. কিন্তু এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন; এ ছাড়া এ উদ্যোগ নিতে গেলে সরবরাহের অভাব ও বাড়তি মূল্যের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। ৩. আর তাতে আমরা এমন একটি অবস্থার মুখোমুখি হতে পারি যে, যেখানে ভোক্তারা এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির সাথে লড়ছে সেই তাদেরই আমরা নয়া বাড়তি বোঝার শাস্তির মধ্যেই ফেলে দিতে পারি। আর এতে শেষ ফলাফল হবে, মানুষ করোনার দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়া অর্থনীতির সঙ্কোচন থেকে উত্তরণের যে লড়াই চালাচ্ছিল, তা শেষে লাইনচ্যুত হয়ে সব মাথায় ভেঙে পড়তে পারে।’

    “Analysts say it will be possible to sever Europe’s oil ties to Russia, but the effort will take time and may lead to shortages and higher prices for gasoline, diesel, jet fuel and other products — a situation that could penalize consumers already struggling with inflation and, ultimately, derail the economic recovery from the pandemic.”

    আর এই তিন পয়েন্টের সারাংশ কথাটা হল, আমরা বাইডেনের বাঁশির পেছনে হেঁটে একটা সম্মিলিত ধ্বংসের পথে যাচ্ছি!!! কেন?

    কেন ইইউ বাইডেনের আঁচল ধরে হাটছেঃ
    সবশেষে একটা অনুমিত ধারণার কথা বলে বিদায় নিব। নতুন করে ইউক্রেন যুদ্ধে হাওয়া দেয়া, অস্ত্র পাঠানোর ঘটনায় বাইডেনের স্বার্থ না হয়  উপরে ব্যাখ্যা করলাম কিন্তু ইউরোপ মানে সারা ইইউ কেন বাইডেনের পিছনে??? ইইউ-এর নেতা দেশগুলোই বলছে রাশিয়ান তেল-গ্যাস ছাড়া এখনই তারা চলতে পারবে না, অন্তত ২০২৭ সাল পর্যন্ত এমন থাকতেই হবে এই কথা তারা নিজেরাই বলছে। তাহলে  আমেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অষ্টিন যখন ২৬ এপ্রিল, ৪০ রাষ্ট্রের ন্যাটো-ইইউ বৈঠকে বসেন তখন সেখানে ইইউ চুপ করে থাকল কেন??? অথচ আবার মিটিং শেষে বাইরে এসে এবার আবার তারা সোচ্চার তারা রাশিয়ান তেল-গ্যাস ছাড়া এখনই চলতে পারবে না – বলা হচ্ছে এনিয়ে তারা বিভক্ত?? কেন এমন??
    এরই সম্ভাব্য ব্যাখ্যা একটাই দেখতে পাই, সেকথাটাই বলব এখন!
    ইউক্রেনের যুদ্ধ আসলে এক হিসাবে গ্লোবাল নেতৃত্ব আসন্ন পালাবদলে চীন-আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতারই প্রক্সি যুদ্ধ।  গ্লোবাল নেতৃত্বে চীনা উত্থান এই অনিবার্য এবং অবজেকটিভ ঘটনাটাকে জবরদস্তিতে তবু বাইডেন যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টায় নেমেছে। এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু যে ঘটনাটা পর্দার পিছনে সেদিকে একটু আলো ফেলি।
    গত প্রায় পাঁচশ বছর এভাবে অথবা সেভাবে দুনিয়া শাসন-আধিপত্য করে আসছে সাদা ককেশিয়ান এথনিক জনগোষ্ঠি –  এবং একারণে তাদের কালচারাল আধিপত্যও শাসন করছে আমাদের সভ্যতা শিখানো সরকার বদল সবই করছে। মূলত কলোনি দখল করে তারা টিকেছিল, এই সময়কালের বেশিরভাগ সময়টা। আজ তা চ্যালেঞ্জের মুখে। কারণ এই প্রথম এশিয়ার চীন গ্লোবাল ম্নেতা হবার পথে। যার সোজা অর্থ এই প্রথম এটা সাদা শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছে।  আমাদের চেয়ে এই এথনিক সাদা গোষ্ঠি এদিকটা অনেক বেশি খেয়াল রেখেছে। এই সাদা শ্রেষ্ঠতত্ববাদ – যেটার রাজনৈতিক উপস্থিতির একালের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ডোনাল্ড ট্রাম্প; এটা যতটা না তার রিপাবলিক দল তার চেয়ে বেশি পৃষ্ঠপোষক তিনি নিজে। এরা তাই চীনা গ্লোবাল নেতৃত্বে আসায় আপত্তি নিয়ে সবচেয়ে সোচ্চার। আসলে সারা পশ্চিম জুড়ে চীনা উত্থান ইউরোপ-সহ সারা পশ্চিমা দেশ ও কালচারের মধ্যে একটা আতঙ্ক হিসাবে ছড়িয়ে গেছে, হাজির হয়েছে।
    বাইডেন কী সেই চীনা ভয় আতঙ্ক মনে করিয়ে দিয়ে বার বার ইইউ-কে নিজের নেতৃত্বের অধীনে  নিচ্ছে??
    কিন্তু সারা পশ্চিম চাইলেও তো চীনা উত্থান ঠেকাতে সক্ষম হবে না। কারণ, – যা অবজেকটিভ যা ঘুর্ণিঝড় বা ভুমিকম্পের মত ঘটনা – তা ঠেকানো সাবজেকটিভ কাজ নয়; কর্তা মানুষের সেখানে কোন ভুমিকা থাকে না। মানুষ চাইলেই ঘুর্ণিঝড় বা ভুমিকম্প ঠেকায় দিতে পারে না।  যেমন বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সাম্রাজ্য আমেরিকান উত্থান ঠেকাতে পারে নাই, নিজেই ডুবে গেছে! আমেরিকাই গ্লোবাল নেতা হয়েছে ১৯৪৫ সাল থেকে। অবজেকটিভ ঘটনা  যা ঘুর্ণিঝড় বা ভুমিকম্পের মত – এটা কোন দেশের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ইস্যুও না। তাই কারও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে তা ঠেকানোও যাবে না। এটা অবজেকটিভ সক্ষমতা অর্থাৎ, এক অর্থনৈতিক সক্ষমতার ইস্যু। ঠিক যে সক্ষমতার জোরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা হয়েছিল আমেরিকা!! প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট আর  তাঁর পিছনে ছিল সেকালেই  –  সারা ওয়াল স্ট্রিট, এই অর্থনীতিক পাওয়ার সেন্টার!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০৭ মে  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “বাইডেন দুনিয়ার সবার জন্য ক্ষতিকারক!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • যারে দেখতে পারি না অথচ, তাঁর আরো ঘনিষ্ঠ হই, কেন?

    যারে দেখতে পারি না অথচ, তাঁর আরো ঘনিষ্ঠ হই, কেন?

    গৌতম দাস
    ০১ মে ২০২২, ০০:০৮  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-444

    –

         If China’s Economy Falls, Ours Will Too

           Dependence on China shrinks the US economy in Q1

    ‘গ্লোবাল বাণিজ্য’ কথাটার মানে হল, এমন এক অবস্থা ও সিস্টেমের মধ্যে বসবাস যখন, মূলত আন্তঃরাষ্ট্রীয়ভাবে সব রাষ্ট্রের সাথে সবার এক ব্যাপক বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলাই সেই গ্লোবাল সমাজের বৈশিষ্ঠ। দুনিয়াতে বাণিজ্য নতুন না অবশ্যই। তাই অনেকের মনে হতে পারে এই গ্লোবাল বাণিজ্য তো দুনিয়াতে সব সময়ের মতই এখনও আছে। কিন্তু সরি, তবু এ’কথাটা সত্যি না। বাণিজ্য বলতে আসলে দুটো মেজর ভাগ আছেঃ এক. কোন রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে বাণিজ্য, অপরটা বা দুই. রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাণিজ্য। কেন এই ভাগের কথা বলছি? বাণিজ্য বলতে একটা আগাম-দরকারি [pre-requisite] শর্ত হল, বাণিজ্য ঘটতে হলে আগাম যার উপস্থিতি দরকার সেটা হল মুদ্রা [currency]। তাই বাণিজ্য ও মুদ্রা কার্যত সমনামীয় শব্দ। এখন মুদ্রা যে প্রচলন করত সেই অথরিটি হল সেকালের রাজা আর একালের ভাষায় রাষ্ট্র। আর কোনো দেশের মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা কেবল ঐ রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এটাকেই তাই প্রথম ধরনের বাণিজ্য বলছি।

    এখন দ্বিতীয় ধরন মানে আন্তর্জাতিক বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য যেটাকে বলে, এটা পরিপূর্ণভাবে শুরু হয়েছে মাত্র এই তো সেদিন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের গঠন ও ১৯৪৫ সালে এদের কার্যক্রম চালুর পর থেকে। মানে মাত্র ৭৭ বছর আগে থেকে। আর এখানে একই মানে কোন কোন রাষ্ট্রীয় মুদ্রা একই সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লেনদেনেরও মুদ্রা হিশাবে ব্যবহৃত হয় তবে সেক্ষেত্রে  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের দ্বারা অনুমোদিত থাকতে হয়।  তাহলে কি এর আগে (১৯৪৫ সালের আগে) গ্লোবাল বাণিজ্য বলতে কিছু ছিল না? ‘ছিল না’ বলার মতই। মানে ছিল তবে খুবই সীমিত পর্যায়ে আর সেটাও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ১৯১৪ সালে শুরু হওয়া থেকেই এই সীমিত বাণিজ্য ব্যবস্থাটাও চিরদিনের মত অকার্যকর হয়ে যায়। এছাড়া ঐ সীমিত বাণিজ্য মানে যা হারিয়ে যাওয়া সেকালের অর্থনীতির মূল তৎপরতারও ছিল খুবই তুচ্ছ এক অংশ। মূল প্রধান ধারার অর্থনীতি তা ছিল না। এছাড়া তা ছিল এক পরিবারের প্রাইভেট ব্যাংকের উদ্যোগ। রথশিল্ড ব্যাংক (Rothschild) যাকে ফ্যামিলি ব্যাঙ্কিং ডায়নেস্টি বলা হয়,  তা ইউরোপে ১৭৪৪ সাল থেকে ১৯১৪, এই সময়কালে ততপর ছিল। যদিও এনিয়ে কমিউনিস্ট প্রপাগান্ডামূলক ষড়যন্ত্রতত্বে লেখা প্রচুর ‘রহস্য’ ছড়ানো মুখরোচক আর্টিকেল অনলাইনে পাওয়া যায়। যেগুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি খুব জরুরি কিছু না।  তবু এক পারিবারিক ব্যাংকের মাধ্যমে হলেও এই সীমিত বাণিজ্যও বা  কেন এমনভাবে তা চালু ছিল? অথবা অন্যভাবে বললে সেকালের ইউরোপে ব্যাপক কোন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রায় ছিল না কেন?

    কলোনিদখল ব্যবসা যখন ইউরোপের প্রধান অর্থনীতিঃ
    এর মূল কারণ, সেকালে মানে ১৬০৭-১৯৪৫ সাল এই প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর ধরে চালু দুনিয়াটা ছিল কলোনি দখলদারদের যুগ। অর্থাৎ  আমাদের মত দেশকে কলোনিদখল করা – এই ব্যবসা যখন ইউরোপের প্রধান অর্থনীতিক ততপরতা ছিল। যদিও এটাকে এই প্রথম ইতিহাসের রাজতন্ত্র ছেড়ে “রিপাবলিক” [republic] বা জন-রাষ্ট্র গড়ার যুগ বলে প্রশংসিত। তবুও এর সবচেয়ে নেতিবাচক দিকটা হল ওমন নব-রাষ্ট্রগুলোর প্রধান অর্থনীতি বলতে তা ছিল জাহাজে বিনিয়োগ আর সেই জাহাজ বেয়ে কলোনিদখল করে বেড়ানো। সোজা ভাষায় অন্যের দেশ দখল ও তার সম্পদ লুটে নিজ দেশে আনা। মানে সে সময়কালে  স্বাধীন রাষ্ট্র বলতে ছিল ইউরোপের চার-পাঁচটা কলোনি দখলদার দেশ (বৃটিশ, ফরাসি, ডাচ, পর্তুগীজ ও স্পানিজ) আর বেশির ভাগই এদের কারো না কারো কলোনি দখল হয়ে থাকা দেশ। আর এর ব্যতিক্রম হিসাবে ছিল রাশিয়ান জার বা অটোমান সাম্রাজ্য ধরনের কিছু সাম্রাজ্য অথবা আমেরিকা (১৭৭৬ সালের  আগে পর্যন্ত ছিল কলোনি) পরে স্বাধীন দেশ। ফলে আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য বলতে বড় কিছুই ছিল না; মূল অর্থনীতিও তা ছিল না। তবে একটা বিশেষ ধরনের লেনদেন ছিল যে, দখল হয়ে থাকা কলোনি (যেমন বৃটিশ-ইন্ডিয়া) থেকে একপক্ষীয় সম্পদ পাচার  ধরণের ততপরতা; মানে বৃটিশ-ইন্ডিয়া থেকে তাদের মূল ভূখণ্ড ইংল্যান্ডে সম্পদ লুটে নিয়ে যাওয়া ধরনের। এভাবে “ওয়ান ওয়ে” সম্পদ পাচারের ততপরতা, একে ঠিক বাণিজ্য বলা মুশকিল এবং তা অর্থহীনও!! আবার যেমন বরফ আবিষ্কারের পরে বৃটিশ আমলেই, আমেরিকা থেকে জাহাজ ভরে কলকাতার এলিটদের জন্য বরফের জাহাজ আসত। এটা বৃটিশ-ইন্ডিয়ার মূল অর্থনীতির তৎপরতা ছিল না বলে একে কলোনি ইন্ডিয়ার মূল অর্থনীতির তৎপরতা মনে করা মুশকিল। তবে কলোনি সম্পর্কের কারণেই বা কোন স্বাধীন রাষ্ট্র না থাকার কারণেই মূলত সেকালে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বলতে কিছু গড়ে উঠেনি।

    তাই ১৯৪৪ সাল থেকেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম ও পরের বছর কার্যক্রম শুরু হয়েছিল নয়া কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো ও পুরানা রাষ্ট্র, সবার মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু করার জন্য; একটা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য। একদিক থেকে এটা ছিল এক বিশাল তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা যে দুনিয়াব্যাপী এক আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। এবং এমন এক দুনিয়াতে যেখানে আইনিভাবেই আর কোন দেশকে আর কলোনি করে রাখা যায় না। জাতিসংঘের আইনে ও দৃষ্টিতে তা বেআইনি ও অন্যায়।  তবু নয়া এই গড়ে উঠা বাণিজ্য ব্যবস্থা এর পণ্য বিনিময়ের সিস্টেমটা বড়লোক দেশগুলোর দিকে কান্নি মারা ভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। তাই এই বিনিময় ব্যবস্থায় বৈষম্য আছে।  তবে এটা অস্বীকার-উপেক্ষা করা ভুল হবে যে ১৯৪৫ সালের আগের কোন বাণিজ্য ব্যবস্থাই না থাকার চেয়ে এবং ইউরোপের হাতে কলোনি দখল হয়ে  না থাকার চেয়ে এমন স্বাধীন রাষ্ট্র অবশ্যই ভাল!
    কিন্তু ১৯৪৫ সালের পরও কিছু রাষ্ট্র যারা জাতিসঙ্ঘের সদস্য হলেও তবু তারা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়নি বা তাদের করা হয়নি। অন্য ভাষায় বললে, এরা মূলত তখনকার কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো, এরাই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়নি। তাই এই অপারগতার জন্য তারা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় যোগ দিবার যোগ্য হয়নি। তবে এনিয়ে আরেকটু বিস্তারে বলা দরকার।

    বাণিজ্য ও কমিউনিজমঃ
    কমিউনিজমে কী বাণিজ্য থাকে? মানে কমিউনিস্ট দেশের অর্থনীতিতে কী বাণিজ্য থাকে? মানে অনুমোদিত?? এই হল, আদি কনফিউশন! আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যও না থাকলে আভ্যন্তরীণভাবে যেকোন উতপাদিত পণ্য  বিতরণ মানে ভোক্তা পর্যন্ত তা পৌছে দিবার বিতরণ ব্যবস্থা (এটাই ট্রেড বা বাণিজ্য) বলে কী ওদেশে কিছুই নাই? আর থাকলেই বা তা কেমন?
    তবুও স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন-এই মোড়ল কমিউনিস্ট দেশ, এর প্রতিনিধি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের সময় উপস্থিত ছিলেন। বিখ্যাত ব্রেটনউড শহরের এক হোটেলে টানা ২২ দিনের সেই সম্মেলনে কিছু সোভিয়েত প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম নিয়ে আলোচনা ও দলিলপত্র খসড়া তৈরি শেষে, পরে দলিল স্বাক্ষরের সময় এবং তারও পরবর্তী সময়ে সদস্যপদের চাঁদা জমা দিয়ে সদস্য হওয়ার সময় সোভিয়েত প্রতিনিধি অনুপস্থিত ছিলেন। যদিও পরে স্টালিন বেঁচে ছিলেন ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেন সোভিয়েত ইউনিয়ন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়নি তা কাউকে জানানো হয়নি। অথবা এই নিয়ে স্টালিন কোন কারণ তুলে ধরেছেন বা লেখাও লিখেছেন বলে জানা যায় না। আবার  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবার পরে যদিও কমিউনিস্ট দেশগুলো আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হবে না – এমন একজোট হয়ে কোন দিন এধরনের কোন সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাও সত্য নয়।
    তবে এখান থেকেই একদিকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রিক গ্লোবাল অর্থনীতি ও বাণিজ্য ব্যবস্থা চালু আর অন্যদিকে এসবের বাইরে থেকে গেছিল ২০-২৫ রাষ্ট্র যারা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ নেয় নাই। যার অর্থ এই ২০-২৫ রাষ্ট্র এদের নিজেদের মধ্যেও কোন বাণিজ্য ব্যবস্থা বলতে কিছু ছিল না। প্রত্যেকেই বিচ্ছিন্ন অর্থনীতিক অস্তিত্ব হয়ে টিকে ছিল। যদিও এমন দেশগুলোকে “সোভিয়েত ব্লক” বা “কমিউনিস্ট ব্লকের” রাষ্ট্র বলার রেওয়াজ শুরু হয়েছিল। আর তা টিকে ছিল ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে না যাওয়া পর্যন্ত।
    তবে কেবল পোল্যান্ডের কথা কিছু জানা যায়। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের পরে কার্যক্রম শুরু করলে পোল্যান্ড কমিউনিস্ট ব্লকের দেশ হওয়া সত্ত্বেও সে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদের জন্য আবেদন করেছিল। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকও রাজি ছিল, অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল একদিন না একদিন সবদেশকেই একই গ্লোবাল অর্থনীতির সম্পর্কের মধ্যে  আনা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের ম্যান্ডেট। কাজেই তাঁরা পোল্যান্ডকে সদস্যপদ দিবে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পক্ষে আমেরিকান প্রশাসনের সাড়া ও সমর্থন না পাওয়াতে ব্যাপারটা ওখানেই থেমে যায়। অর্থাৎ পরে সদস্যপদ না নেয়া বা পাওয়ার সিদ্ধান্তটা আর একা সোভিয়েত ব্লকের দেশগুলোর সমস্যা থাকেনি। আমেরিকার না চাওয়াও যুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

    কিন্তু অন্য দিক থেকে বললে, কমিউনিস্ট  দেশের ব্যবহারিক চিন্তায়, বাইরের অন্যদেশের সাথে কোনো আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য – এই আইডিয়াটা নিয়ে কমিউনিস্টদের মধ্যেই মূলত অস্বস্তি ও অস্পষ্টতা ছিল গভীর এবং যা এখনো কমিউনিস্ট চিন্তায় আছে- এ কথাও আরেক কড়া সত্য। এটা অনেকটা যেন ‘কমিউনিস্ট হারাম-হালাল’-এর সমস্যা। যেমন কমিউনিস্ট চোখে খোদ বাণিজ্য জিনিসটা কি হালাল? উৎপাদন একমাত্র সরকারি মালিকানায় হতে হবে এই ছিল সেকালের কমিউনিস্ট রাস্তা। ফলে এর সাথে আবার বাণিজ্যের দরকারটা কী? এমনই ছিল মনোভাবটা। যার সারকথা হল, এসব চিন্তার মুল জায়গাটা হল কমিউনিস্ট অর্থনীতিক চিন্তায় তাদের অর্থনীতিতে “পণ্য আমদানি” বলে কোন ধারনা নাই।
    তবে এসব অস্পষ্ট কথা হয়ত সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নে নিজে অনেক বড় দেশ বলে চিন্তা করা যেত যে, দেশের প্রয়োজনীয় সব ভোগ্যপণ্যই সে নিজ দেশে উৎপাদন করে নিবে। তাই, পণ্য আমদানি হীনতার অর্থনীতি এটাই কমিউনিস্টদের বাস্তব অর্থনীতি বলে খারা করা সম্ভব হয়েছিল।   কিন্তু তুলনায় ধরা যাক বাংলাদেশের মত ছোট কোনো কমিউনিস্ট দেশ হলে তার বেলায় কী হবে?? সব প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য অথবা এমনকি কোন কাঁচামাল আমদানি তার জন্য অত্যাবশিকীয়। কারণ তার পক্ষে এসব কিছুই নিজ দেশে উতপাদন করা অথবা কম শ্রমমুল্যে তৈরি করাই অসম্ভব হবে। এছাড়াও আরেক বড় সমস্যা! তার ব্যাপক প্রয়োজনীয় হবে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ পাওয়ার। এবং সেটা অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং কারখানা নির্মাণে সরাসরি  বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) – এদুটাই ঐ কমিউনিস্ট দেশ কোনভাবেই যোগাড় করতে পারবে না। তত্সব হিশাবে দুনিয়ার প্রত্যেকটা দেশ বা অর্থনীতি নিজের প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিজেই জেনারেট ও সঞ্চয় করে থাকে। ফলে বিদেশ থেকে ঋণ আনা প্রয়োজনীয় হবার কথা না। কিন্তু শতভাগ বাস্তবতা হল, আমাদের মত সবদেশই নিজ প্রয়োজনীয়  যে থাকবে এটাও স্বাভাবিক; তার পক্ষে আমদানি বাণিজ্য ছাড়া গতি কী? এ ছাড়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য ছিল না বলে কমিউনিস্ট দেশগুলো বাণিজ্যে জড়িত হতে সুযোগ না পেয়ে ধুঁকে মরেছে। যদিও আধাখেঁচড়াভাবে কথিত বার্টার সিস্টেমের কথা বলে বছরে একবার হয়তো কোনো পণ্য ‘আমদানি’ করতে তাদের দেখা গিয়েছে। কেবল অবাস্তব জিদটাই থেকে গিয়েছে!!

    সব ব্যর্থ হয়ে গেলেও কেবল বাণিজ্যকেই পাপ গণ্য করবেন কোন কমিউনিস্ট ধর্মেঃ
    অথচ পুরা কমিউনিজমেই বাণিজ্য করা যাবে কি না, সহি বা তা সঙ্গত কি না এই অস্পষ্টতা কখনো কাটেনি। সারপ্লাস ভ্যলু বা শ্রমের চুরি যাওয়া উদ্বৃত মুল্য ফেরত এনে দিবে এমন নয়া এক অর্থনীতির তাঁরা প্রচলন করবেই। বাস্তবে এই চরমপণ এর প্রতিরুপ হল কথিত “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” যেটা কার্যত –  “সরকারি মালিকানায় এক উতপাদন ব্যবস্থা” গড়লেই নাকি সেই কাম্য সমাধান পাওয়া যাবে – কিন্তু নানান কারণে এই কল্পিত অর্থনৈতিক সিস্টেমটাই  কার্যত যেন টিকে থাকে তা কায়েম করাই যায় নাই।  ফলে কল্পিত সেই “শ্রমের চুরি যাওয়া উদ্বৃত মুল্য ফেরত এনে দিতে পারব – এমন অর্থনীতিটাই অধরা থেকে গেছে, এই হল কড়া বাস্তবতা। এতে সব ব্যর্থ হয়ে গেলেও তবু “সেই কল্পনাটা মানে সমাজতন্ত্র – সেটাই ভাল ছিল” – এই জিদটাই কেবল এখনও টিকে আছে।  কিন্তু জিদ – এটা না কল্পনায় না বাস্তবে – এর কোনই মুল্য নাই, অর্থহীন।
    এটা তো গেল সেই সমাজতন্ত্র ভাবনা যার সারকথাটা এখন হতে পারে যে “সরকারি মালিকানায় এক উতপাদন ব্যবস্থা” গড়াটাই টিকানো যায় নাই বলে এই পদ্ধতিতেও শ্রমের চুরি যাওয়া উদ্বৃত মুল্য ফেরত আনার প্রতিশ্রুতিও ব্যার্থ হয়ে গেছে। তাই এখন আবার নতুন কোন অর্থব্যবস্থা – একটা সাসটেইনেবল কিছু কি করা যায় তা নিয়ে নয়া খোজ শুরু করতে হবে। কিন্তু এতে আমাদের আলোচ্য ইস্যু যে কমিউনিস্টদের জন্য বাণিজ্য হালাল কিনা – এই অনুমান-বিশ্বাসও জড়িয়ে আছে বলে – এই প্রশ্নও অমীমাংসিত থেকে গেছে ফলে বাণিজ্য ও কমিউনিজম – এদের পারস্পরিক সম্পর্কও কমিউনিজমে অমীমাংসিত। তবে এটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন হলেও কার্যত সকলেই বাস্তবে তা মেনে নিয়েছে। তাই দেখা যাচ্ছে কমিউনিস্ট নিজেই ব্যবসা করছে, ব্যবসাদারদের বিল্ডিং ভাড়া দিয়ে সে পয়সায় দল চালাচ্ছে।   যেখানে সারা বাংলাদেশের অর্থনীতিটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ  মানে বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের  অংশ এখন। তখন আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন বা রাস্তায় ভিখারি কিংবা উন্নয়ন কনসালটেন্ট বা গবেষক কিংবা বসে বসে বই লিখছেন – ইত্যাদি যাই করেন কোন ফারাক নাই। আপনি গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থের ভাগীদার। এই ক্যাপিটালিজম আপনার মুখের ভাতের প্রতিটা গ্রাস এর যোগানদাতা। আমাদের রক্তের কণায় কণায় ক্যাপিটালিজম। তাহলে আপনি কমিউনিস্ট হন আর না হন  কেবল বাণিজ্যকেই পাপ গণ্য করবেন কোন কমিউনিস্ট ধর্মে???

    গ্লোবাল বাণিজ্যের পণ্য কেনাবেচায় অংশ নিতে গেলে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে থাকতেই হবে এটা একটা আবশ্যিক পূর্বশর্ত। তা মূলত এজন্য যে, প্রত্যেক দেশের নিজ মুদ্রার বিনিময় হার না জানলে বিদেশের কোনো পণ্য কেনাবেচায় অংশ নেয়া সম্ভব নয়। কারণ নিজ মুদ্রার বিনিময় হার না জানলে বিদেশী পণ্যের মূল্য নিজ মুদ্রায় কত, তা জানা সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংকের মুদ্রার নাম এসডিআর [SDR] যার মান প্রতিদিন এই প্রতিষ্ঠান, এক মার্কিন ডলার সমান কত এসডিআর তা প্রকাশ করে থাকে। সাধারণত তা, এক ডলার মানে ০.৭৪৩ এসডিআর – বিনিময় হার এর ‘আশপাশে’ হয়ে থাকে। আর এখান থেকেই প্রত্যেক সদস্য দেশ তার মুদ্রার মান বা তুল্য বিনিময় হার সম্পর্কে জেনে নিতে পারে। কিন্তু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য না হলে সেটাও জানা সম্ভব নয়। তাই এমন কমিউনিস্ট দেশের পক্ষে অন্যদেশের সাথে কোন বাণিজ্য করা অসম্ভব।

    কবে কার্যত কমিউনিস্ট দেশগুলোর “বাণিজ্য করা পাপ” ধারণা থেকে আপাত মুক্তি মিলেঃ
    সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্র ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায়। ভেঙে রাশিয়াসহ মোট ১৫টা আলাদা আলাদা রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে গেছে। আর এরপর এসব রাষ্ট্র সবাই নতুন রাষ্ট্র হিশাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ লাভের জন্য আবেদন করেছিল। ১৯৯২ সালের মধ্যে তারা সবাই সদস্যপদ লাভ করে, গ্লোবাল বাণিজ্যে অংশ নেবার যোগ্য হয়ে যায়। কমিউনিজম মাথায় থাক কিন্তু পাপ-মুক্তি মিলে যায় সকল কমিউনিস্ট দেশে। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রম চীন। মাও-এর চীন  সকল কমিউনিস্ট দেশের আগে অগ্রগামি যে ১৯৭৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় প্রবেশ করেছিল। কখন ও কিভাবে সেই সময় সেকথা আপাতত এখানে না বলি; অন্য কখনও বলব বা বলাই আছে!!
    ফলে বলতে গেলে, সোভিয়েত ভেঙ্গে গেলে পরে সেই প্রথম সারা দুনিয়ার সব রাষ্ট্রই একই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে যায় মানে, গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার সদস্য হয়ে যায়। অর্থাৎ ১৯৪৫ সালের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের চালু করার কার্যক্রমও যা পারে নাই তা সেই প্রথম সম্ভব হয়েছিল। এর ফলে, দুনিয়াতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের অধীনস্থ গ্লোবাল অর্থনৈতিক এক মহাগোষ্ঠীর বাইরে ‘সোভিয়েত অর্থনৈতিক ব্লক’ বলে আর কোনো দেশ থাকার অবসান ঘটেছিল।

    আগের এই ব্লক রাজনীতিতে দুই ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা রাজনীতির আরেক প্রকাশ ছিল কোল্ড ওয়ার। মানে হল আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন (গত পঞ্চাশের দশক থেকে) এদুই পরাশক্তির রেষারেষি থেকে তারা যেন সবসময় কোনো যুদ্ধাবস্থায়, এমন টেনশন দেখা যেত; অথচ বাস্তবে তারা কোনো যুদ্ধে জড়িত নয় এমন থাকলেও এই টেনশন কাজ করত। পরে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ায় এই কোল্ড ওয়ারের অবসান ঘটেছে।

    আমেরিকার নয়া অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনঃ
    কিন্তু একালে আমেরিকার নয়া প্রতিদ্বন্দ্বী চীন, যার অর্থনীতি ২০২৮-৩০ সালের মধ্যে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে বলে নানান স্বাধীন পরিসংখ্যানগত অনুমান বলছে। যেহেতু এখানেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে তাও অভ্যাসবশত অনেক অধ্যাপকেও  প্রায়ই মন্তব্য প্রকাশ করতে দেখা যায় যে, আবার কি কোল্ড ওয়ার তাহলে ফিরে আসবে? ফ্যাক্টস হল, কোল্ড ওয়ার দুনিয়াতে সত্যিকারার্থে আর ফিরে আসার কোনোই সম্ভাবনা নেই। এর একেবারেই মৌলিক কারণটা হল, এখন দুনিয়ার প্রায় সব দেশ একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ (আমরা অনেকে ব্যক্তিগতভাবে তা পছন্দ করি বা না করি) হয়ে গেছে যে ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। আর পুরনো কোল্ড ওয়ার যুগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল- ‘সোভিয়েত ব্লক’ বলে কিছু রাষ্ট্র ছিল যারা গ্লোবাল বাণিজ্যে অংশ নেয়নি বা সম্পর্কিত ছিল না। সেটাও এখন আর নাই। আর কোল্ড ওয়ার রেষারেষি সেকালে (১৯৫০-৯১) এর বাস্তবতায় দেখতে পাবার একটা বড় কারণ ছিল এমন ‘সোভিয়েত ব্লক’ বলে আলাদা অর্থনৈতিক ব্লক হিসাবে কিছু দেশের অস্তিত্ব থাকার সুযোগ তখন ছিল, তাই। একালে এই বাস্তবতাটাই আর নাই, সব লোপ পেয়ে গেছে। এখন সব রাষ্ট্রই একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ। তাই চাইলেও কোল্ড ওয়ার রেষারেষির আবহ আবার তৈরি করা সম্ভব নয়।

    তাহলে একালে এই ব্যাপারটা আমরা এখন কী বা কেমন হবে-থাকবে, নতুন করে কী দেখতে পাবো?
    উপরে এতক্ষণ ধরে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থাটা নিয়ে পাঠকের ধৈর্য চুরি করে কথাগুলো বলে গিয়েছি – এখন সিদ্ধান্ত টানতে পারব বলে।

    “এশিয়া টাইমস” [Asia Times] হংকং থেকে প্রকাশিত এক প্রভাবশালী পলিটিক্যাল ও ফাইন্যান্সিয়াল ওয়েব পত্রিকা। বলা যায় যেন এশিয়ার “ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল“।  এর গত ২৮ এপ্রিল এক রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে আমেরিকান অর্থনীতি প্রথম কোয়ার্টারে জিডিপি নেমে গেছে” [Dependence on China shrinks the US economy in Q1]।’ এর ভিতরের রিপোর্ট বলতে চাইছে, আমেরিকান অর্থনীতি চীনা পণ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার কারণে আমেরিকার জিডিপি চীনের সাথেই ওঠানামা করা শুরু করেছে। এ কারণে রিপোর্টারের মন্তব্যঃ  দুনিয়াতে আগের কোনো রেকর্ড নেই এমন এক ঘটনা এটা- দুনিয়ার প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী বা রাইভাল [rival] অর্থনীতি তারা এমনই আজব রাইভাল যে, তারা একে অপর দেশটা থেকে আমদানিতে পণ্য আনাতে নির্ভরশীল হয়ে গেছে, অথচ তারা স্ট্র্যাটেজিকভাবে রাইভ্যাল দুই দেশ যে, পারলে অপরকে মেরে ফেলে! সারকথায় এতে চীন-আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি আমেরিকার বিরুদ্ধে, চীনের পক্ষে গেছে। চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্য ঘাটতি এখন প্রায় ১৮ ট্রিলিয়ন ডলার আর এটাই আমেরিকার জিডিপি-কে নামিয়ে দিয়েছে। গত ৩০ বছরের মধ্যে ক্রমশ এই ঘটনাটা ঘটে গেছে। ট্রাম্প আমলের সাথে তুলনায় চীনাপণ্য আমদানি এখন ৬০% বেড়ে গেছে।

    তাহলে, এখানে প্রাসঙ্গিক মূল কথাটা হল, একালে কোল্ড ওয়ার উত্তর যুগে, কেউ কারও প্রধান স্ট্র্যাটেজিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ বলে তার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নাই বা করা যাবে না – বাস্তবে এমনটা দেখা যাবে না। একালে বরং রাইভালের সাথেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক হতে দেখা যাবে; তা অবশ্যই হবে। এমনকি তা সবচেয়ে গভীর নির্ভরশীলতার অর্থনৈতিক সম্পর্কে ডুবে থাকছে ও থাকবে। এখানেই একাল পুরোপুরি আলাদা!  আর এখান থেকেই জাতিবাদি অর্থনীতির বুঝা একেবারে ফেল করে, অচল হয়ে যায়। জাতবাদি বুঝের উল্টাটাই বাস্তবে দেখা যায়।  অতএব কোল্ড ওয়ারের যুগ আবার দুনিয়াতে ফিরে আসবে বলে কেউ যেন গল্প না ফাঁদে। আর সাথে জাতিবাদি অর্থনীতির বুঝ যেন আর কেউ প্রাকটিশ না করে নিজেকে যেন শাসন করে রাখে!!

    আর এটাই কমবেশি একই অবস্থা ভারত-চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের মধ্যেও। প্রথমত তারা উভয় দেশ এখন ঘোরতর এক বাণিজ্য সম্পর্কে লেপটে জড়িয়ে আছে। অথচ তারা প্রবল ও প্রধান স্ট্র্যাটেজিক রাইভ্যাল দুই দেশ। ভারত পারলে চীনকে ছিড়ে খায়!! ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখছে, ‘২০২১ সালের পরিসংখ্যান বলছে গত এক বছরে ভারতের চীনা পণ্য আমদানি বেড়েছে ৪৩%।’ এই খবরের শিরোনামটা হল, [Amid bilateral chill, India-China trade marks record surge in 2021]  অথচ চীন-ভারতের রাজনৈতিক সম্পর্ক এখন শীতলতম, ঠাণ্ডা। গত  ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর থেকে নরেন্দ্র মোদি গত কয়েক বছর ধরে চীনা আমদানি কমাবেন বলে প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইন শুরু করেছিলেন – স্বদেশ জাগরণ মঞ্চ [Swadeshi Jagran Manch] নামে আগে থেকে এক সংগঠন গড়া ছিল সেটা দিয়ে। কিন্তু ফলাফল উল্টা এবং নিজের এই দুরবস্থা দেখে মোদিও নিশ্চুপ!

    এটাই কোল্ড ওয়ার-পরবর্তী যুগের ফেনোমেনো। কারো সাথে যুদ্ধের সম্পর্ক থাকলেও সে দেশের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক, আমদানি নির্ভরশীলতার সম্পর্ক আরো জোরদার হতে পারে, একালে। সোজা কথায় জাতিবাদী অর্থনীতি বলে কোনো ধারণা এখানে ব্যর্থ শুধু নয়; জাদুঘর আর্কাইভে ফেলে রেখে দিবার বিষয় হয়ে গেছে। বাস্তবে বরং প্রায় উল্টারূপে তা  এখন হাজির হচ্ছে! তাই মোদি এ নিয়ে এখন একেবারেই চুপ!

    কিন্তু ব্রহ্ম চেলানি ততই ভোকাল!
    ব্রহ্ম চেলানি [Brahma Chellaney] – ছোট হলেও দিল্লিতে তার একটা থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান আছে; নাম সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ। প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংক বলা যায়। কিন্তু এই বাইডেনের আমলে তিনি বারে বারে বাইডেনের ওপর ক্ষেপে উঠছেন। আবার প্রচণ্ড চীনবিরোধী তিনি, আর তা কখনও একেবারে আনলাইক একাদেমিক স্বভাবে!!!  সময়ে মোদির চেয়েও বেশি ন্যাশনালিস্ট হয়ে উঠতে দেখা যায় তাকে! চীনকে তিনি ‘আগ্রাসনবাদী চীন’ [aggressor]- সবসময় তিনি এভাবে লিখেন। মানে সময়ে তিনি আমেরিকাকেও ছাড়িয়ে চীনবিরোধি হয়ে যান। এমনকি খোদ তিনিই আমেরিকার-বিরোধি হয়ে উঠেছিলেন একসময়।  তাকে প্রথম এমন ক্ষেপে উঠতে দেখা গিয়েছিল গত ২০২১ আগষ্টে বাইডেন যখন আফগানিস্তান ফেলে পালিয়ে আসেন; সব সেনা ফিরিয়ে আনেন। চেলানি পরাশক্তির এই শিয়াল ভূমিকা দেখে এটা মেনে নিতে পারেননি। তাই  বাইডেনেরই কঠোর সমালোচনা করেছিলেন আর সেটা এমনই পর্যায়ে যে  প্রায় ফিরে যেন তিনি আবার বুশের কোলে গিয়ে উঠতে চাইছেন দশা!

    সেই ব্রহ্ম চেলানি, তিনি ইদানীং আবার ক্ষুব্ধ! প্রধানত কোয়াডকে [QUAD] নিয়ে। কোয়াড-এর  চার দেশের প্রধানদের এবার সাক্ষাতে (অন লাইন বা ভার্চুয়াল নয়) সম্মেলন হচ্ছে আগামী ২৪ মে ২০২২। আর তাতে এখনই চেলানির হইচই শুনে মনে হচ্ছে যেন এবার ভারতের বদলে দক্ষিণ কোরিয়ার নাম নতুন অন্তর্ভুক্ত হবার কথা উঠেছে, তা হয়েই যাবে। সেটা হোক আর না হোক, চেলানির এবারের কলামের (প্রথম আলো যার অনুবাদ ছেপেছে – কোয়াড কি চীনকে ঠেকানোর লক্ষ্য থেকে সরে যাচ্ছে? – এই নামে) শিরোনাম। বুঝা যাচ্ছে এখানেও খুবই এগ্রেসিভ তিনি! যেমন-  আনুষ্ঠানিকভাবে চীনকে ঠেকানো যেন কোয়াডের লক্ষ্য এটা ধরে নিয়ে তিনি লিখছেন। অথচ, এটা বোধহয় কোথাও পাওয়া যাবে না।
    যা হোক, তিনি কোয়াডের চার দেশের উপরই প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত। কেন? তিনি দেখতে চান যে, এ’চার দেশের কারো সাথে চীন থেকে চীনা পণ্য-আমদানির বা বাণিজ্য সম্পর্ক বলতে কিছু নাই। অর্থাৎ মনে মনে তিনি যেন একটা কোল্ড ওয়ার আমলের সোভিয়েত-আমেরিকা সম্পর্ক দেখতে চাইছেন। এ কারণে তিনি মোদির উপরেও প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত!

    কিন্তু তাকে কে বুঝাবে, একালের গ্লোবাল পরিস্থিতিতে তিনি যেমনই একে দেখতে চান না কেন সেটা আর দেখার সুযোগই নাই; সব বদলে গেছে। অর্থাৎ উপরে লেখার শুরুতে গ্লোবাল বাণিজ্য ও এর গতিপ্রকৃতিকে প্রসঙ্গ করে অর্ধেরই বেশি পাতা খরচ করেছি – এজন্য যে এই ধারণাটা সকল পাঠকেরই খুব কাজে লাগবে। অসংখ্য  ব্রহ্ম চেলানি-রা ছড়িয়ে আছে এবং আরো গজাবে। কিন্তু তাঁরা কী বলতে চাইছেন এবং কেন এসব কথাগুলোর এখন আর বাস্তবতা নাই – সেটা সম্পর্কে পাঠকে সচেতন ও প্রস্তুত করতেই এই লেখা।  ফলে কোল্ড ওয়ার যুগের মত চেহারা-বৈশিষ্ট্য একালে আর দেখা যাবে না বা তা আর ফিরবে না। জাতিবাদী অর্থনীতিই তো লোপ পেয়ে গেছে – সেই ১৯৮০ সালের শুরু থেকেই গ্লোবাল বাণিজ্যই দুনিয়ার মুখ্য অভিমুখ হতে চেয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে গেছে। অর্থাৎ কোল্ড ওয়ার এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন জীবিত থাকতেই এই পরিবর্তন যাত্রা শুরু করেছিল। তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর থেকেই বাণিজ্য গ্লোবাল হয়ে  উঠা আর এর প্রভাব টের পাওয়া প্রবলভাবে শুরু হয়েছে। তাই একালের বৈশিষ্ট্য হল, যেকোনো দেশের স্ট্র্যাটেজিক রাইভালের সাথেও তার বাণিজ্যিক সম্পর্ক একালে অবশ্যই থাকবে। সেটা চীন হলেও তাতেও ব্যত্যয় ঘটবে না;  বরং যেন আরও ভালোভাবে থাকবে। কারণ যেসব চীনাপণ্য সবচেয়ে সস্তা তা আপনি না কিনে (আমদানি করে) তো আপনার রেহাই নেই। বরং চীনাপণ্য কিনতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবানই মনে করবেন।
    যেমন এই উদাহরণটা ভালো করে লক্ষ করেন!!!  তবে সাবধান এটা চীনের প্রশংসার ইস্যু নয় বা চীনের প্রশংসা করার জন্য লিখা মনে করলে ভুল হবে। বরং আজকের বাস্তবতাটা খেয়াল করতে ও বুঝতে হবে। ভারতে বেশির ভাগই জাপানি প্রাইভেট কার – এই গাড়ির জয়েন্ট ভেঞ্চারে গড়ে ওঠা কারখানা ভারতে আছে। কিন্তু সেই জাপানই মোদি সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে যেন চীনা স্পেয়ার্সের (যন্ত্রাংশ) ওপর বাড়তি ট্যাক্স বসানো না হয়। মানে, প্রত্যাহার করা হয়। কেন? কারণ, গাড়ির অরিজিন জাপানি আর এসেম্বল ভারতে হলেও এর স্পেয়ার্সগুলো ভারতে বসে ওর যন্ত্রাংশগুলো চীনাপণ্য আমদানি করে এনে লাগানো। কারণ চীনা স্পেয়ার্স-এর দাম আকাশপাতাল কম। সে কারণেই জাপান সরকারের নিজেরই অনুরোধ এটা মোদির কাছে। [ভারতের বোকার “জাতিবাদি অর্থনীতি বুঝ” যে অচল ও অকেজো সেটা দেখাতে ২০২০ সালের আমারই এক পুরান লেখা এখানে দেখা যেতে পারে। ]

    অর্থাৎ ব্রহ্ম চেলানির চিন্তাটা পুরনো যা ১৯৮০ সালের আগ পর্যন্ত কোনোমতে চলতে পারা “জাতিবাদী অর্থনীতির বুঝ” দিয়ে তৈরি। অথচ এই “মফস্বলি বুঝ” নিয়ে তিনি এখন দুনিয়াকে এবং কোয়াড-দেশের অর্থনীতিকেও ব্যাখ্যা করতে গেছেন। এর মানে, তিনি খোয়াবে আছেন যে, তিনি যেন ১৯৮০ সালের আগেই এখনো আছেন।

    এমনকি তিনি চীনা আরসিইপি [RCEP] জোট মানে যেটা ‘ভ্যালু অ্যাডিশন শেয়ার্ড প্রোডাক্ট’ উৎপাদনের এক নয়া জোট যেটা আসলেই এক বিরাট আগামী সম্ভাবনার জোট – এর প্রবল বিরোধিতাও করেছেন। জাতিবাদি বুঝের ভারত এতে যোগ দিতে চায়না, আঙুর ফল টক মনে করে। কিন্তু বাংলাদেশ সাহস করে এত যোগ দিবার আবেদন করেছে সঠিক ভাবেই। বহু আগে থেকেই বলে আসছি যে, স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বা ফরেন রিলেশনবিষয়ক গ্রাজুয়েট-বিশ্ববিদ্যালয় লেভেল থেকেই সিলেবাসে অর্থনীতিকেও অন্তত একটা সাবসিডিয়ারি বিষয় হিসাবে একালে রাখতেই হবে। কারণ যে কেউ অর্থনীতির কিছু না পড়লেও নিজেকে জাতিবাদী অর্থনীতির ওস্তাদ বলে হাজির করতে পারে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এখন জাতিবাদী অর্থনীতির বুঝ থেকে বহু দূরে চলে গেছে। কাজেই নতুন বাস্তবতা বুঝতে অন্তত কিছু অর্থনৈতিক নতুন ধারণা জানতেই লাগবে। অনেক স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বা ফরেন রিলেশনবিষয়ক প্রফেসরের মধ্যেও এই (জাতিবাদী অর্থনীতির বুঝ দিয়ে সব ব্যাখ্যার) ঝোঁক দেখা দিতে পারে বা এখনও থেকে যেতে পারে।

    তাই অন্তত জাতিবাদী অর্থনীতির বাস্তবতা যে আর নাই এটুকু রিয়ালাইজ করাই হবে তাদের প্রথম পাঠ! মোদির “স্বদেশ জাগরণ মঞ্চ’ তাই এখন চীনের বিরুদ্ধে নিশ্চুপ। আবার সাবধান, ব্যাপারটা চীন বলে নয়; যেকোনো দেশের সাথে হতে পারে। বিদেশী পণ্য আমদানি এখন সাধারণ ব্যাপার যখন আপনিও রফতানিকারক। এটা গ্লোবাল বাণিজ্যের যুগ!

    তাই যাকে পছন্দ করেন না তার সাথেই সবচেয়ে বেশি বাণিজ্যিক সম্পর্ক; ফলে রাজনীতিক সম্পর্ক শীতল থাকলেও বাণিজ্যিক  ঘনিষ্ঠতাই এখান খুবই স্বাভাবিক!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৯ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “যারে দেখতে পারি না তার আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে যাই, কেন? “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাংলাদেশে চাপ বাড়ার সম্ভাবনা – ইউক্রেনের পরে বাইডেন পাকিস্তানেও হেরে গেল

    বাংলাদেশে চাপ বাড়ার সম্ভাবনা
    ইউক্রেনের পরে বাইডেন পাকিস্তানেও হেরে গেল

    গৌতম দাস
    ৪ এপ্রিল ২০২২  ১৫ঃ১৯ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-415

    _         Another failure for Biden, Messing up, Biden-style

    এলেখার প্রসঙ্গ পাকিস্তান লেটেস্ট পরিস্থিতি। কিন্তু শুরুতে এর বৃহত্তর বা গ্লোবাল দিক যার মধ্যে -পাকিস্তান একটা রঙ্গমঞ্চ- সেই বৃহত্তর দিকটা একটু আগে ঘুরে আসব।
    ইউক্রেনের পর এবার পাকিস্তানেও বাইডেন হারলেন। ইউক্রেনের কথা কেন?  ফরেন এফেয়ার্স  (ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের কথা বলছি না)  [Foreign Affairs Magazine] মূলত আমেরিকান পাওয়ার এলিট তাদের সার্কেলকে ইনফর্ম রাখার এক  ত্রৈমাসিক। যেমন ধরেন যেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় হিলারি ক্লিনটনের আর্টিকেল ছাপা হয়। কিন্তু আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স [DNI, Office of the Director of  National Intelligence] ] এর সার্ভে রিপোর্ট যা চার বছর পর পর নিয়মিত বের হয় – তাতে বলা হয়েছে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের গ্লোবাল ট্রেন্ড হল ক্যাপিটাল মুভমেন্ট পশ্চিম থেকে নিরন্তর পুবে প্রবাহিত হওয়া শুরু করেছে। এবং এই প্রবাহ  ই-রিভার্সিবল [irreverseble]। মানে বাংলায়, তা আর কখন উলটা বাইবে না, আগামি কোন একদিন আবার পুব থেকে পশ্চিমা দেশে ফিরবে না।  অতএব উপায়ন্ত না দেখে এমন সব পশ্চিমা পত্রিকায় নয়া দুটা অভিমুখ তৈরি হয়েছে। এক হল তাঁরা সাপ্তাহিক-ত্রৈমাসিক রেখেও পাশাপাশি একটা ওয়েব ডেইলি ভার্সানও চালু করেছে।  আর দ্বিতীয়ত তাঁদের ফোকাস আর আগের মত পশ্চিমের পাঠকই নয়। বরং পুবের পাঠক-লেখক যারা পুবের (এশিয়ার) জনমত তৈরি ও প্রভাবিত করে থাকে তাদেরকে টার্গেট করে পরিচালিত করা শুরু করেছে।

    সম্ভবত সেকারণেই ফরেন এফেয়ার্স  এর ৩০ মার্চ এই রিপোর্টের মুল্যায়ন বাইডেনের আমেরিকা ইউক্রেনে মস্কোকে “ঠেকাতে গিয়ে পরিস্কারভাবে ফেল করেছে” [… deterrence clearly failed] । গ্লোবাল নেতৃত্ব পর্যায়ে কী ফাঁপা হামবড়ার কোন জায়গা আছে, না থাকতে পারে? বাইডেনের দুই অস্ত্র অবরোধ আরোপ আর মানবাধিকারের অভিযোগ এদুটা দ্যেই তিনি বিনা অস্ত্রে আর বিনা পোয়সায় সবখানে চীন (সাথে রাশিয়া)কে ঠেকায় দিয়ে আসতে পারবেন। এটাই নাকি ট্রাম্পের উপর বাইডেনের শ্রেষ্ঠত্ব।  এরই প্রথম পরীক্ষার মাঠ ছিল ইউক্রেন। এখন ফরেন এফেয়ার্স বলছে বাইডেন,  ক্লিয়ারলি ফেইলড।  তাই এই ম্যাগাজিনের সাজেশন আমেরিকার উচিত রাশিয়ার সাথে আপোষ করে নেওয়া [Compromising With Putin May Be America’s Best Option]।

    তা না হয় হল, কিন্তু ব্যাপারটা এখানেই শেষ হবে না।  কারণ আমেরিকান রাজনীতিতে এবারের মিড টার্ম বিশেষ তাতপর্যপুর্ণ।  মিড টার্ম মানে এখানে ঠিক গত ২০২০ সালের এই নভেম্বরেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত বাইডেন জিতেছিলেন। আর এবার প্রসিডেন্টের চার বছর ট্রার্মের মাঝে দুবছরের মাথায় আমেরিকান সসদ ও সেনেটের নির্বাচন হবে। তবে সব আসনে না, এক-তৃতীয়াংশ আসনে।  তাই এটা প্রেসিডেন্টের মিড টার্ম হলেও তার কোন নির্বাচন হবে না, হবে তার দলের প্রতিনিধিদের।  অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের দলকে পাবলিকের মুখোমুখি হতে হবে। আর সেখানেই প্রেসিডেন্টের পারফরমেন্স মানেই তা দলের পারফরমেন্স হিশাবে বিচার-পরীক্ষার মুখোমুখি হবে। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট তার শাসনের দুরবছর সমাপ্তিতে এক পরোক্ষ মুল্যায়নের মুখোমুখি হবেন, সামনের নভেম্বরে।
    আর এখানেই টাম্প ও রিপাবলিকান দল বাইডেনকে তুলাধুনা করবেন – বিশেষত ইউক্রেন নিয়ে তার অবরোধ আর মানবাধিকার অস্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে।
    অতএব এর আগেই বাইডেনকে তার এদুই অস্ত্র অন্য এক-দুইটা দেশেও প্রয়োগ করে তাতে ফল পেতে হবে। তাহলে হয়ত আগামি নভেম্বরে তার ইজ্জত কিছুটা ফিরতে পারে। এই বিচারে পাকিস্তান, বাংলাদেশ বা মায়ানমার এরা হয়ে উঠতে পারে সেই “অন্য দেশ” যেখানে বাইডেন তাঁর দুই অস্ত্র প্রয়োগে মরিয়া হয়ে উঠার সম্ভাবনা এখন প্রবল হল।

    পাকিস্তানে দাড়ালোটা কী?
    ইউক্রেনের মত আপাতত পাকিস্তানেও বাইডেন হেরে গেলেন। কিভাবে?
    মোটা দাগে পাকিস্তানে স্বার্থ বা পক্ষ চারটা। বাইরে থেকে তা যদিও দুইটা – ইমরান ও তার বিপক্ষ মনে হবে। কিন্তু না; কার্যত এখানে সক্রিয় পক্ষ হল চারটা; – ইমরান, বিরোধীজোট, সেনাপ্রধান বাজওয়া আর বাইডেনের আমেরিকা। আর প্রকাশ্যে যে দ্বন্দ্ব বা ইস্যুকে  সামনে রেখে এই লড়াই তা হল সংসদে অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষ-বিপক্ষে ভোটাভুটি।

    এবার বল গড়ানো শুরু হয়েছিল বিরোধী জোটের সেকেন্ড টাইম ইমরানের সরকার ফেলানোর উদ্যোগ থেকে। বিরোধী জোট মানে নওয়াজ পরিবার, ভুট্টো পরিবার আর মাওলানা ফজলুর। ইনিওই এখন পাখতন প্রদেশ ইমরানের কাছে হেরে এককথায় বললে মোস্ট এন্ড ডেসপারেট করাপ্ট কিছু লোক যারা হল গত বিশবছরে আমেরিকার ওয়ার অন টেররের ফ্যান্টাসি আর তারাই একক পরাশক্তি এটা দেখাতে গিয়ে যেভাবে আজ দেউলিয়া অবস্থায় এই সময়কালে পাকিস্তানের রাজনৈতিক শক্তি বলে যেসব প্রডাক্ট মানে “আবর্জনা” তৈরি করেছিল তারাই। যাদের কাজই ছিল আমেরিকার জন্য সমর্থন তৈরি করে হাতিয়ার হওয়া আর বিনিময়ে দুইহাতে পয়সা লুটে নেওয়া। যাদের স্টেক হল বিলিয়ন ডলারের। যাদের মধ্যে নওয়াজ সবচেয়ে উচ্চমার্গের ফলে তিনি পানামা ফাইলসে নাম লেখানোর গৌরবান্বিত এবং পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে সাজাপ্রাপ্ত, জরিমানা আর রাজনীতি নিষিদ্ধ ব্যক্তিত্ব।
    বাইডেন এদের ঘাড়ে চড়েই ইমরান স্বাঢীন পররাষ্ট্রনীতি বলে রশিয়ায় ডানা মেলে উড়ান দেওয়ার ডানা ছাটতে নেমে পরেছিল। যদিও এই জোট আর বাইডেনের এবারের লক্ষ্য চাওয়া-পাওয়ায় ভিন্নতা ছিল। জোট চেয়েছিল ক্ষমতা যাতে তাদের চোর ইমেজ কাটে, শাস্তি  ফাইন বা নিষেধাজ্ঞা মুছে যায়, ইমরানকে যেকোন ভাবে শাস্তি দিয়ে দেখাতে পারে তাঁরা ততটা চোর না, এটা ইমরানের কারসাজি ইত্যাদি।  ভুট্টো পরিবারের ১০% ইমেজ লঘু হয়, মাওলানার অনৈতিক ইমেজ মুছে যায় ইত্যাদি।  কিন্তু বাইডেনের লখ্য ছিল ওয়ার অন টেররের ক্ষত ও ক্ষতি কমানো। সুনির্দিষ্ট করে পাকিস্তানে সামরিক ঘাটী করে আফগানিস্তানে নতুন করে প্রভাব তৈরি করে যেটা ইমরান সরাসরি প্রত্যাখান করে দিয়েছে আগে। এককথায় চীনকে চ্ছাপিয়ে যতটা সম্ভব নিজের পুরানা প্রভাব ফিরিয়ে আনে। সেকারণে সেনাবাহিনী ও ইমরানসহ সব রাজনৈতিক শক্তিকেই নিজ অধীনস্ততার বলয়ে আনা।   যাতে চীনের জন্য কোন পা রাখার জায়গা না থাকে।  এখানেই  বিরোধী জোটের সাথে বাইডেনের লক্ষ্যের ফারাক।

    একারণেই সংসদে আনাস্থা ভোটাভুটিতে ইমরান যেন পরাস্ত হয়ে যায় এর আয়োজন সমাপ্ত হয়েছে মনে করার পরে আমেরিকা বাজওয়াকে দিয়ে ইমরানের কাছে সংসদ ভেঙ্গে দেবার প্রস্তাব পাঠিয়েছিল।  পায় প্রকাশ্যেই সবাই দেখেছিল ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় বাজওয়া ইমরানের সাথে দেখা করতে গেছেন।  মজার দিকটা হল, বিরোধী জোট অখুশি হয়েছে কিন্তু প্রকাশ করে নাই। ইমরানও বুদ্ধিমান হয়েছে – হা-না কিছু না বলে ধৈর্য ধরে শুনেছে। তবে সবচেয়ে খুশি হয়েছিল জেনারেল বাজওয়া।

    কারণ এই প্রথম তার আলাদা স্বার্থ আলাদা প্লেয়ার যে তিনি আরেক টার্ম প্রধান থাকার খায়েস – স্পষ্ট হয়েছিল।  একারণে তিনি ঐ সভায় নিজেকে ইমরান সরকারের সেনাপ্রধান নয় বরং বাইডেনের পক্ষের দুত যেন –  এভাবে হাজির করেছিলেন। যেন অনেকটা বাইডেন-ইমরান দ্বন্দ্বে মধ্যস্ততাকারিও – তবে এই শর্তে যে তার টার্ম বাড়ানোতে উভয়ে তাঁরা সম্মতি দিবে। এতে তিনি এতই বেপরোয়া ও আদব-লেহাজ বিহীন এক ব্যক্তি হিশাবে উপস্থাপন করেন যে এই লোক কোন সেনাপ্রধান দূরে থাক বাসার দাড়োয়ানও যতটা নিজ মর্যাদা রাখতে সচেতন চেষ্টা করে উনার সেটুকুও যে নাই, উনি সেই হুশ হারায় ফেলেছেন।
    তিনি পরের দুইদিন ধরে লাগাতর বলা শুরু করেন ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এছাড়া রাশিয়ান ‘আগ্রাসন ক্ষমার অযোগ্য’।  মানে যে কথা বাইডেন বলেও প্রতিষ্ঠা করতে হিমসিম উনি সেকথা বলছেন এক তাও আবার নেহায়তই এক সেনাপ্রধান।  সারা দুনিয়ার আর কোন সেনাপ্রধান এমন কথা বলে নাই। ইইউ এর ২৭ দেশে নিশ্চয় ২৭ সেনাপ্রধান জীবিত আছেন। ইউক্রেন ইস্যুতে তাদের স্বার্থ তো প্রত্যক্ষ। অথচ মিডিয়ায় তাঁরা রাজনৈতিক বক্তব্যে হাজির নন। কারণ বাজওয়াকে আরেক টার্ম চাকরি পেতে হবে, এতই দুখি আর গরিব তিনি…যে চাইতেও জানেন না।

    তিনি এটুকুও বুঝেন নাই তার এই সমর্থন বাইডেনেরও কাজে আসবে না।  কারণ, ইমরানের বিজয় ডঙ্কা  ঘোষিত হয়ে গেছে যখন তিনি পাকিস্তানের জাতীট নিরাপত্তা কমিটি (এনএসসি) সভায় উপস্থিত থেকেছেন। এবং বাজওয়াসহ সিভিল-মিলিটারি প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানে আমেরিকার হস্তক্ষেপের জন্য কথিত সেই চিঠি বা পাকিস্তানী রাষ্টদুতকে দেয়া হুমকির নিন্দা জানিয়ে পাকিস্তান সরকার সেই সভা থেকেই পালটা  আমেরিকাকে প্রতিবাদী নোট পাঠিয়ে দিয়েছে।   যে জেনারেল আমেরিকাকে  প্রতিবাদী নোট পাঠানোর পক্ষ হয়ে যায় সে এর পরে আর কীভাবে আমেরিকাকে খেদ্মত করবে!!!

    এককথায় এদিন ইমরানের কাছে বাকী তিন পক্ষই (বিরোধীজোট, সেনাপ্রধান বাজওয়া আর বাইডেনের আমেরিকা) পরাজিত হয়ে গেছে।
    এখন ইমরান তার শেষ ট্রার্ম কার্ড শো করে দিয়েছেন।  তিনি সংসদ ভেঙ্গে এখন নতুন নির্বাচনের দিকে পরিস্থিতি ঠেলে দিয়েছেন। এটাকে অনেকে মনে করতে পারে যে ইমরান আমেরিকান প্রস্তাব-ই গ্রহণ করেছে। না, এটা ভুল অনুমান হবে।  দুটাই সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হলেও দুটার অর্থ ও তাতপর্য আলাদা। এক হলে আমরা দেখতাম আমেরিকা ও বাজওয়ার মুখ্য ভুমিকা। আর সবচেয়ে বড় কথা আমরা বিরোধী জোটের এখন আদালতে দৌড়াদৌড়ি  ্দেখতাম না।
    এতে পাকিস্তানে আমেরিকান অবস্থান আবার বিরোধী জোটের পিছনে বা নিচে। যার অর্থ আমেরিকা পাকিস্তানেও হেরে গেছে।

    এখান থেকে অন্য এক ইঙ্গিতঃ
    যার সোজা অর্থ বাংলাদেশে বাইডেন এখন আরো সক্রিয় হবেন। তাকে তাঁর দুই অস্ত্র – অবরোধ আর মানবাধিকার – যে খুবই কার্যকর অস্ত্র এটা তাকে দেখাতে, প্রতিষ্ঠা করতেই হবে।  অতএব বাংলাদেশ হয়ে উঠল সম্ভাব্য বাইডেন সবচেয়ে সক্রিয়তা আর চাপের মুখে থাকা দেশ!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • পাকিস্তানে  আমেরিকান হস্তক্ষেপ!

    পাকিস্তানে  আমেরিকান হস্তক্ষেপ!
    গৌতম দাস

    ১ এপ্রিল ২০২২   সময় ০০ঃ০৬ শুক্রবার

    https://wp.me/p1sCvy-3ZZ

     

     

    দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার দায়িত্বে থাকা এক আমেরিকা উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানের এক রাষ্ট্রদুতকে হুমকি দেয়া এক চিঠিতে লিখেছে যে ইমরানের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাব পাশ না হলে পাকিস্তানকে নাকি চরম পরিণতি ভোগ করতে হবে [ …wherein Pakistan was warned of “grave consequences” if the no-trust motion failed.]। এই চিঠিকে কেন্দ্র করে এটা পাকিস্তানের রাজনীতি ও ক্ষমতায় আমেরিকা সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে বলে অভিযোগে তোলপাড়। এবং এখন খুব সম্ভবত আগামি ৩ এপ্রিলে পাকিস্তানে সংসদে অনাস্থা ভোটে ইমরানকে পরাজিতই হতে দেখব আমরা।
    আসলে এটা কেবল পাকিস্তান নয়। আমাদের ধারণা সবাই পাকিস্তানের জায়গায় নিজ নিজ দেশ-রাষ্ট্রকে বসিয়ে ব্যাপারটা ভাবতেছে। তাই এই পাকিস্তান ইস্যু গুরুত্বপুর্ণ।

    এনিয়ে আমার এক ফেসবুক স্টাটাসে আলোচনায় এক পাঠক একটা প্রশ্ন রাখেন। নিচে সেই প্রশ্নটা তুলে ধরা হল। আর এরপরে এনিয়ে আমার জবাবও সাথে দেয়া হল।

     

    প্রশ্নঃ  চীন কেনো হাত গুটিয়ে বসে থাকে বিভিন্ন দেশে এরকম অবস্থায়? চীনের তো বিশাল বিনিয়োগ ও কৌশলগত স্বার্থ আছে। চীন তাহলে কিভাবে বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকার সঙ্গে পেরে উঠবে? এছাড়া কোন দেশের সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে এরকম বিপদে পরলে, চীনের পক্ষ থেকে যদি যথাযথ সাহায্য না পায় তাহলে কে যাবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে।

     

    আমার উদাহরণসহ একটু বড় জবাবঃ 
    সব স্বার্থ-সংঘাতকেই সামরিক সংঘাত মনে করা খুবই বড় ভুল বিচার। অথবা একে সামরিক দিক থেকে দেখা-নেওয়া বা ঠেলে দেওয়া ঠিক না; বুদ্ধিমানের কাজও না। কারণ এর চেয়েও সহজ পথ আছে।
    এছাড়া সবার আগে চীন-আমেরিকার স্বার্থ-সংঘাতটাকে বুঝতে হবে। মূলত এর ধরণটাকে বুঝতে হবে। এখন গ্লোবাল নেতৃত্বে থাকে আমেরিকা, এর নেতৃত্ব এখন চ্যালেঞ্জড হয়ে গেছে।  চীনা উত্থান আমেরিকাকে তাড়া করে ফিরছে।  তাই এর নানা ধরণের ছাপ ও প্রকাশ ঘটছে চারদিকে বিশেষত এশিয়াতেই যা বেশি এবং সবদেশেই কমবেশি।  ফলে আমাদের মত দেশে একেকজন ইমরান – প্রো চীন অথবা প্রো আমেরিকান এই টানাটানি চাপের মধ্যে পড়বেই। তাতে আপনি ইমরান অথবা হাসিনা  প্রো চীন অথবা প্রো আমেরিকান যেই হন!
    এখন আপনি প্রশ্নকর্তা  আশা করছেন আমেরিকান ন্যায় অথবা অন্যায় চাপের মুখে চীন কেন পাকিস্তানের ইমরাঙ্কে  রক্ষা করতে এগিয়ে আসছে না – এই হল আপনার প্রশ্ন!
    এনিয়ে আগে বাংলাদেশেরই একটা উদাহরণ দিব। পরে আবার কিছু তত্ব কথায় আসব।

    ঘটনাটা বাংলাদেশের টিকা প্রাপ্তি নিয়েঃ
    তখনও  দুনিয়াতে  চীনা উতপাদিত কোন টিকাই বাজারে আসে নাই।  এমনকি পশ্চিমা ফাইজার বা মর্ডানাও নয়। বরং চীনা টিকারই (Sinovac) তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা শুরু হবে যা সফল হলে পরে টিকার বাণিজ্যিক উতপাদন শুরু হবে। চীন বাংলাদেশকে এই থার্ড ফেজে ঐ প্রক্রিয়াতে যুক্ত হতে অফার দিয়েছিল। থার্ড ফেজ মানে আগের মূল দুই গুরুত্বপুর্ণ ফেজ-এর পরীক্ষানিরীক্ষা সফল হয়ে গেছে। তাই এবার বাজারে ছাড়ার আগে একটু দেখে নেয়া যে (বাংলাদেশেও) এই টিকা পুশ করলে ব্যবহারিক পর্যায়ে ছোটখাট হলেও খারাপ প্রতিক্রিয়া হয় কিনা বা হলে আগেই তা এড়ানো যায় কীনা ইত্যাদি এসব ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্যই এই থার্ড ফেজ। যার অর্থ চীন এই পরীক্ষামূলক টিকা বাংলাদেশ কেবল নির্বাচিত কিছু হেলথ-স্টাফদেরকে দেয়া হবে আর তাদেরকে গভীর পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। যেহেতু এটা তখনও পরীক্ষামূলক তাই। আর বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবি হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল চীনা টিকার এক শেষ ফেজে টেকনিক্যাল সহায়তা করার।  বাংলাদেশকে দেয়া ঐ অফারে বলা হয়েছিল এই পরীক্ষা সফল হলে কয়েক লাখ ফাইনালি উতপাদিত টিকা  আমাদের দেয়া হবে বিনা খরচায় আর সাথে  লাইসেন্স ও সহায়তা দেয়া হবে যাতে নিজেরাই আমরা দেশে প্রডাকশনে যেতে পারি  একটা বড় খরচ ও সামর্থ ছাড়াই।
    কিন্তু ভারত পুরা ব্যাপারটা ভন্ডুল করতে নগদ “কমিশনের” লোভ দেখিয়ে সরকারকে অন্যদিকে নিয়ে যায়। বাংলাদেশই ভারতে আগাম অর্থ দিয়ে ওদের ফ্যাক্টরির উতপাদন
    ক্ষমতা বাড়িয়ে দিবে আর তাতে উতপাদিত টিকা আর কমিশন দুটাই ভোগ করবে। আর তা করতে মাঝখানে সরকার-প্রিয় বাংলাদেশের প্রাইভেট কোম্পানির মাধ্যমে ভারতের সাথে চুক্তি করা হয়।  আর এতে মন্ত্রণালয় অতি খুশিতে থাকায় চীনের সাথে টিকার (থার্ড ফেজ) ফর্মাল চুক্তির সম্মতি স্বাক্ষরের সময়সীমা মিস করে যায়। পরে দেরিতে হলেও সেসব পত্র দিতে যোগাযোগ করলে চীনের দিক থেকে জানানো হয় যে যে তাদের টিকা উতপাদন কোম্পানি (ওটা চীনা প্রাইভেট কোম্পানির টিকা পরীক্ষা ছিল) আমাদের সময়সীমা মিস করাতে ঐ অফার অন্য দেশকে দিয়ে দিয়েছে (সম্ভবত ইন্দোনেশিয়া)। ফলে এখন আর কী করা যায় এনিয়ে এক প্রাথমিক আলাপে বলা হয় ফান্ডই প্রধান সমস্যা।  এখন নতুন করে ফান্ড যোগাড় করতে সময় লাগবে। আপনারাও দেখেন আমরাও দেখি ফান্ড কোথা থেকে যোগাড় করা যায়। এককথায় ব্যাপারটা অনিশ্চিত হয়ে যায়।
    এখন এনিয়ে বাংলাদেশ খবর ছড়িয়ে পড়লে এটা বিব্রতকর হবে কারণ তখনও আমাদের টিকা কোথা থেকে আসবে তা একেবারেই অনিশ্চিত ছিল। তাই অনুমান করা হয় এথেকে রক্ষা পেতে ভারতের সাথে মিলে একটা গল্প সাজানো হয়। ভারতের রয়টার্সের রুমা পাল আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করেন চীনারা অর্থ চেয়েছে এজন্যই বাংলাদেশ-চীন টিকা ডিল ভেঙ্গে গেছে?
    আমাদের মন্ত্রী সায় দিয়ে বলে হা সেজন্যই। এরপর তারা আইসিডিডিআরবি-কেও জিজ্ঞাসা করে কেন টিকা-সম্পর্ক কাজ করছে না? কিন্তু এনিয়ে আইসিডিডিআরবি কোন মন্তব্য করতে রাজি হয় নাই। এরপর ঢাকার চীনা এমব্যাশি কেও একই প্রশ্ন করেছিল কিন্তু তাদেরও জবাব ‘নো কমান্টস’।
    আমাদের অঞ্চলে  আমেরিকান ফান্ডেড ও নিয়ন্ত্রিত আরেক মিডিয়া আছে “বেনার নিউজ” নামে। তারাও এনিয়ে রিপোর্টের ফাইন্ডিংসও প্রায় একই রকম।

    অর্থাৎ এসব প্রশ্নের জবাবে চীন চাইলে প্রতিবাদ করে আসল ঘটনা ফাঁস করে দিলে আমাদের সরকার বিব্রত হয়ে যেত। কিন্তু চীনা অবস্থান ছিল মিডিয়া এড়িয়ে যাওয়া। কেবল সবুর করা ধৈর্য ধরা আর এতে মেওয়া মিলবে তা বিশ্বাস করা। ঘটেছিলও তাই।

    ভারতীয় টিকা আমরা নিতে শুরু করার কয়েক মাসের মধ্যে করোনা সেকেন্ডে ভ্যারিয়েন্ট বা ঢেউয়ে ভারত বিপর্যস্ত হয়ে যায়। দাবি উঠে বাংলাদেশকে টিকা বন্ধ করার যদিও আমরা আগাম বিনিয়োগ করে কারখানার সক্ষমতা বাড়িয়ে টিকা পাবার চুক্তি করেছিলাম। কিন্তু ভারত সরকার আর টিকা দিতে পারে নাই, বন্ধ করে দিয়েছিল। ততদিনে দুনিয়ায় টিকা পুর্ণ আবিস্কৃত আর প্রত্যেক দেশই কোথা থেকে নিজের প্রয়োজনীয় টিকা পাবে তা চুক্তিবদ্ধ হয়ে রয়েছিল। কেবল আমরা বাদে। ফলে সরকারের এতা বলার সুযোগ ছিল না যে টিকা আবিস্কৃত-ই হয় নাই।  তাই উপায়ন্ত না পেয়ে সরকার চীনের হাত-পায়ে ধরা শুরু করেছিল।
    সংক্ষেপে বললে এতে ফলাফল হল, চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থে অনেক ছাড় আমাদের দিতে হয়েছে যদিও বিনিময়ে আমরা এখন প্রয়োজনীয় টিকা যতটা পুশ করতে সক্ষম এর সবটা পাচ্ছি চীন থেকে আর তা সম্ভবত এখন ফ্রি। সাথে আমাদের একটা প্রাইভেট ওষুধ কোম্পানিকে টিকা উতপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা হচ্ছে চীনা সহায়তায়।

    তাহলে কী দাড়ালো?
    কুটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মনোমালিন্য হলেই লাঠি-বন্ধুক বের করা চলে না। এর সবচেয়ে বড় কারণ, সব সম্পর্কই সামরিকভাবে কে কত বড় বা সক্ষম তা দিয়ে সাব্যস্ত হয় না, তা নয়ও তাই।
    বিশেষ করে চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব টা সামরিক নয়। আমেরিকার অর্থনৈতিক হাল চীনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে, একেবারেই তুলনীয় নয়। কিন্তু সামরিক দিক দিয়ে আমেরিকা এখনও ছয়গুণ বেশি সক্ষম। আমেরিকার গ্লোবাল প্রভাব এখনও কম নয়। যদিও দ্রুতই তা কমছে।

    কাজেই আমেরিকার উদ্বৃত্ব সম্পদ না থাকার সমস্যাটা, অন্যদেশকে অর্থ-বিনিয়োগ-অনুদান দিবার অযোগ্যতাটা  এসবগুলো আমেরিকার বাড়তি সামরিক সক্ষমতা দিয়ে পূরণীয় নয়। কাজেই মূল সামর্থটা উদ্বৃত্ব সম্পদ কার কেমন আছে!

  • বাইডেনের আমেরিকা কী ইউরোপকে হারাবে!

    বাইডেনের আমেরিকা কী ইউরোপকে হারাবে!

    গৌতম দাস

    ২৮ মার্চ ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Zm

    US President Joe Biden Asks US Citizens To Leave Ukraine As Talks Between UK, Russia Fail

    জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে দুদিন আগে গত ২৪ মার্চ ইউক্রেন-বিষয়ক এক প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে ভোটাভুটি হয়েছে। আর বাংলাদেশ তাতে পক্ষে ভোট দিয়েছে; অর্থাৎ আগের ভোটাভুটিগুলোর চেয়ে এটা ব্যতিক্রম; যদিও এনিয়ে অনেক পত্রিকার রিপোর্টিংয়ে ভুল ইঙ্গিতে খবরটা উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমন ‘প্রথম আলো’র শিরোনাম হল – “জাতিসঙ্ঘে ইউক্রেনের পক্ষে ভোট দিলো বাংলাদেশ”। আর ফ্যাক্টস হল  – এটি ঠিক ইউক্রেনের পক্ষের বা বিপক্ষের কোনো ভোটাভুটিই ছিল না। তাহলে কী ছিল? সাধারণ পরিষদে একটা প্রস্তাব তোলা হয়েছিল এই বলে যে, ইউক্রেনের ‘সিভিলিয়ান সুরক্ষা আর মানবিক সাহায্যের প্রবেশের দাবি’ [demanded civilian protection and humanitarian access ] করা হচ্ছে। আর সেখানে এই প্রস্তাবের প্রস্তাবক ছিল ফ্রান্স, মেক্সিকো, ইউক্রেনের সাথে মিলে মোট ৯০টা দেশ। আর সুনির্দিষ্ট করে যেকোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের বেলায় যেমনটা হয়ে থাকে যে, সিভিলিয়ান ক্ষতিগ্রস্ত যেন না হয় আর মানবিক সাহায্য চলাচলে যেন সুযোগ করে দেয়া হয় – এটা তেমনই অধিকার দাবি করে করা এক প্রস্তাব। কাজেই বাংলাদেশ এর পক্ষে ভোট দিয়েছে। আর এমন দাবি যেকোনো যুদ্ধে সব পক্ষই মেনে চলতে বাধ্য হতে হয়, কেননা এটা জাতিসঙ্ঘেরই এক সাধারণ অবস্থান। ফলে এটা ঠিক সরাসরি ‘ইউক্রেনের পক্ষে ভোটদান’ হয়েছে বলে দেখতে হবে – নট নেসেসারিলি [not necessarily]; অর্থাৎ এটা অনিবার্য নয়। তবে পরোক্ষে এই ভোটদানের সুফল ইউক্রেনের পক্ষে যেতে পারে, অবশ্যই।

    আসলে নিউজ রিপোর্টিংয়ের শিরোনাম বিতর্কিত না রাখতে চাইলে শুধু বললেই হত যে, বাংলাদেশ ‘ইউক্রেন-বিষয়ক একটি প্রস্তাবের পক্ষে’ ভোট দিয়েছে। আর বলাই বাহুল্য, ‘ইউক্রেন-বিষয়ক একটা প্রস্তাবের পক্ষে’ ভোট আর “ইউক্রেনের পক্ষে” ভোট – এদুটা কোনোভাবেই একই কথা নয়। ফলে অযথাই এখানে টুইস্ট করা হয়েছে – বাংলাদেশ ‘ইউক্রেনের পক্ষে’ ভোট দিয়েছে। তবে এখান থেকে আরেক অনুষঙ্গীয় প্রসঙ্গ – অনেকে বলছেন, বাংলাদেশ অবস্থান বদলিয়েছে। মানে আগে বিপক্ষে ভোট দিলেও এবার পক্ষে ভোট দিয়েছে। তাই কি? না, ঠিক তাও না।

    যেমন – ধরা যাক কোনো সাংবাদিক আগামী কোনো সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এনিয়ে প্রশ্ন করে জানতে চাইলেন, বাংলাদেশ অবস্থান বদল করল কি না বা কেন করল? সেক্ষেত্রে কি পক্ষে ভোটদানের কারণে মন্ত্রীকে স্বীকার করে নিতেই হবে যে, তার সরকার অবস্থান বদল করেছে?

    সরি, ব্যাপারটা এমন হবে না, কারণ ব্যাপারটা তাই নয়। কারণ মন্ত্রী (সম্ভবত) বলবেন, ‘আসলে হয় রাশিয়া না হলে ইউক্রেনের পক্ষ-বিপক্ষে ভোট দিতেই হবে – প্রস্তাবটাই এমন ছিল না। বাংলাদেশ পক্ষে ভোট দিয়েছে মানে বাংলাদেশ “সিভিলিয়ান সুরক্ষা’ আর ‘মানবিক সাহায্য অবাধ প্রবেশের’ পক্ষে ভোট দিয়েছে। সুনির্দিষ্ট কোনো দেশের পক্ষে-বিপক্ষে নয়”। কিন্তু এরপরেও কেউ যদি জানতে চান, এই অবস্থানের জন্য বাইডেনের আমেরিকা কি একটু খুশি হবে? এর জবাব হবে – অবশ্যই খুশি হবে! তবে এটা পরোক্ষে খুশি করা, তা-ও খেয়াল রাখতে হবে।

    ইউক্রেনের সর্বশেষ অবস্থা কীঃ
    ইউক্রেনে যুদ্ধের সর্বশেষ অবস্থা হল, এটা ইউক্রেনের দিক থেকে বললে – এটা তাদের আরো অধৈর্য হয়ে উঠা এবং বাইডেনের হাত প্রায় ছেড়ে কালকেই রাশিয়ার সাথে বসে সব মিটমাট করে নেয়ার আকুতি তুলে ধরা এক অবস্থায় পৌছে থাকা। যদিও বাইডেন বা পশ্চিমা শক্তির সেদিকে মনোযোগ নেই। আর রাশিয়ার দিক থেকে এটা এক হঠাৎ ঝিমিয়ে পড়া অবস্থায় পড়েছে। যেটা একধরণের ‘স্ট্যাটাস কো’[status quo] মানে, যে যে অবস্থায় আছে সেখানেই আটকে থাকার একটা চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ দু’সপ্তাহ আগের অবস্থার সাথে যদি তুলনা করি, বিশেষ করে আমেরিকার ‘এবিসি নিউজ’ টিভির সাথে ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি যেখানে নিজ দেশের ভাষায় সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন তার কথা বলছি। এনিয়ে আমার লেখা এখানে । ঐ সাক্ষাৎকারের বক্তব্যের অভিমুখ যা ছিল তাতে এতদিন ইউক্রেন পরিস্থিতিতে একেবারে রাশিয়ান সেনা প্রত্যাহার না হলেও অন্তত লম্বা যুদ্ধবিরতি আর পুতিন-জেলেনস্কি দু’পক্ষকে সরাসরি ডায়ালগে বসতে দেখতে পেতাম। কারণ ওই সাক্ষাৎকার প্রচারের পরের দিন অন্তত দু’বার রাশিয়ান সরকারের পক্ষ থেকে ইউক্রেনের অবস্থান ইতিবাচক বলে বর্ণনা করা হয়েছিল। মানে জেলেনস্কির সাক্ষাৎকার রাশিয়া ইতিবাচকভাবে নিয়েছে – এর স্বীকৃতি বলে ধরে নিতে পারি। তাহলে আবার এখন সব ঝিমিয়ে পড়া অবস্থায় বা স্ট্যাটাস কো – এমন বলছি কেন? কারণ এর পরে কোনো অগ্রগতি নেই – মানে এর কোনো ‘পরবর্তী’ নাই।

    এমনকি ওই একই সময় রাশিয়ার তেল-গ্যাস না কিনে ইউরোপের কোনো বিকল্প নাই। ফলে তারা রাশিয়ান গ্যাস কিনবে বলে অন্তত তিনটি দেশ – ফ্রান্স, জর্মানি ও নেদারল্যান্ডসের প্রকাশ্য বক্তব্য দেখেছিলাম। অথচ সেসব বক্তব্যেরও আর কোনো ফলোআপ পরে আর দেখা যায়নি। বরং সর্বশেষ অবস্থান দেখা যাচ্ছে বাইডেনের এবং তা এখন সম্পূর্ণ বিপরীত। এবিসি নিউজের সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে বলেছিলাম এর মধ্যে জেলেনস্কির কূটনৈতিক ডায়ালগের মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার আগ্রহ আছে। কিন্তু তাতে সবার আগে বাইডেন ও জেলেনস্কির, এ দুই প্রেসিডেন্টের ইমেজ বাঁচানোটাই ছিল মুখ্য ইস্যু। সেটা নিশ্চিত হলে তবেই ওই যুদ্ধ সমাপ্তি ও ডিপ্লোম্যাটিক আলোচনা শুরু হতে পারে – এই ছিল আমেরিকান পরিকল্পনা।

    কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, হিসাবে এতে সব ঠিকঠাক থাকলেও বাইডেন সম্ভবত দেখছেন, এতে তার ইমেজ বাঁচানো যাচ্ছে না। কারণ এখন যদি বিনাযুদ্ধে ও কূটনৈতিক আলোচনাতেই যুদ্ধ শেষ করা যায় তাহলে যুদ্ধটা শুরু করার দরকার কী ছিল? সে প্রশ্ন কেউ না তুললেও বাতাসে তা হাজির হবেই। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, জেলেনস্কি এবিসি নিউজকে ইতোমধ্যেই বলে ফেলেছেন, তার আর ন্যাটোর কোনো সদস্য হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নেই। ব্যাপারটি অনেকটা শখ মিটে যাওয়ার মতো হয়ে গেছে। আর তিনি বলছেন, ইতোমধ্যেই তিনি ‘এই আকাঙ্ক্ষার প্রশ্নে নিজেকে কুল ডাউন করতে পেরেছেন। আর বুঝেছেন যে, ন্যাটো ইউক্রেনকে সদস্য হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়।’ আর এ পরিস্থিতিটাকেই বাইডেন নিজের জন্য পরাজয় হিসেবে দেখছেন!

    বাইডেন এখন ইউরোপেঃ
    অতএব, বাইডেন ইউরোপ সফরে এসেছেন। অর্থাৎ জেলেনস্কি কিভাবে কত দ্রুত  রাশিয়ার সাথে আপোষ ডিল শেষ করতে চাইছেন অথবা সাদা চামড়ার ইউক্রেনীয় শরণার্থীরা কত দ্রুত ঘরে ফিরতে চাইছেন – সেগুলো নয়, বাইডেনের চাওয়া এখানে ডমিনেট করবেই, এমন দশায় এখন সংশ্লিষ্ট সকলে। তাই গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ইইউ হেড কোয়ার্টার-ব্রাসেলসে বসে বাইডেন বৈঠক করে গেছেন যার মূল বিষয় ইইউ সদস্যদের রাশিয়ান গ্যাসের বিকল্পের সন্ধান দেয়া শুধু নয়, একেবারে ব্যবস্থা করে দেয়া। বাইডেন বলতে চাইছেন রাশিয়ার তেল-গ্যাসে বিশেষত গ্যাসের উপর ইউরোপের নির্ভরতার সমাপ্তি তিনি নাকি ঘটাবেনই!

    আর এতে ‘ত্রাতা’ বাইডেন যা করতে চাইছেন তা যেন উচ্ছ্বাস দেখিয়েই হাজির করতে হবে। তাতে এটা যে, আসলে প্রপাগান্ডা তা লুকিয়ে কাজটা করতে চাইলেও লুকানো থাকেনি। বিবিসি বাংলা আর আমাদের ‘প্রথম আলো’ সেই উচ্ছ্বাস তৈরি করতে তেমন করেই শিরোনাম সাজিয়েছে। “রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধঃ রাশিয়ার বদলে এখন থেকে ইউরোপের গ্যাস আসবে আমেরিকা থেকে” – এই হল বিবিসি বাংলার শিরোনাম। আর তা দেখে সব বিচার-বিবেচনা ভুলে প্রথম আলোর শিরোনাম – ‘রাশিয়াকে হটাতে ইউরোপে গ্যাস দেবে যুক্তরাষ্ট্র’। প্রপাগান্ডায় আরো সরস দেখাতেই যেন ‘হটাতে’ শব্দটার ব্যবহার। শুনলে মনে হবে – হ্যাঁ, এবার ‘ঘ্যাগের ওষুধ’ পাওয়া গেছে! বিবিসি লিখেছে,  “প্রেসিডেন্ট বাইডেনের উপস্থিতিতে ব্রাসেলসে শুক্রবার হওয়া এক চুক্তির আওতায় এবছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়নকে অতিরিক্ত ১৫০০ কোটি ঘন মিটার এলএনজি বা তরলীকৃত গ্যাস সরবরাহ করবে। এ বছরের মধ্যে রুশ গ্যাসের ওপর নির্ভরতা দুই -তৃতীয়াংশ কমানোর টার্গেট নিয়েছে ইইউ”।

    কিন্তু ব্যাপারটা আসলেই কি তাই?
    জবাব হল – না, ঠিক তা নয়। বিবিসি বাংলার রিপোর্টের ভেতরেই তা নিয়ে খোলাসা করে কথা বলা হয়েছে। যেমন – ‘যুক্তরাষ্ট্র কি ইউরোপের চাহিদা মেটাতে পারবে? “রুশ জ্বালানির ও পর নির্ভরতা পুরোপুরি ঘোচানো কতটা সহজ হবে ইউরোপের জন্য? আমেরিকার ওপর কতটা ভরসা তারা করতে পারে?  নিজেই এই প্রশ্নটা তুলে বিবিসি বাংলা নিজেই উত্তরটা দিয়ে দিয়েছে। বলেছে, “বিবিসি নিউজের অনলাইন ইউরোপ এডিটর পল কিরবি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। তিনি তুলে ধরেন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একটি বড় চুক্তির ঘোষণা কিছু সময় আগে জানা গেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ব্যাপক বাড়ালেও, ইইউভুক্ত ২৭টি রাষ্ট্রের জন্য এটি সামান্য মাত্র।’ অর্থাৎ বাইডেনের কথায় বাকচাতুরী আছে।

    “বিবিসির সংবাদদাতা পল কারবি বলছেন, ইইউ-এর ২৭টি দেশকে তাদের গ্যাসের চাহিদা মেটাতে আমেরিকার বাইরে অন্যান্য উৎপাদনকারী দেশের দিকেও তাকাতে হবে।” – বিবিসি বাংলা

    এদিকে বাইডেনের ইউরোপ সফর নিয়ে ইংরেজি বিবিসি আরেকটা রিপোর্ট করেছে ‘পাঁচ চ্যালেঞ্জ’ [Ukraine war: Five challenges for Biden in Europe] শিরোনামে এবং বলতে গেলে তা খুবই খারাপ রিপোর্ট না হলেও বাইডেনের জন্য কঠিন বাধাগুলোই তুলে আনা হয়েছে সেখানে। যেমন, প্রথম চ্যালেঞ্জটা বলা হয়েছে “ঐক্য দেখানো”। মানে হল – ইউরোপের সাথে আমেরিকা যে ঐক্যবদ্ধ আছে তা দেখাতে হবে। অথচ ওখানেই বলা হয়েছে “যেখানে যত দিন যাচ্ছে ততই অনৈক্যের সম্ভাবনা বাড়ছে”।
    আসলে বড় অনৈক্যই প্রকাশিত হয়ে গেছে। অথচ তেল-গ্যাস নিয়ে যতই আমেরিকা বিকল্প আছে বলে এটা-সেটা দেখাক না কেন, কথার মধ্যে বড় ফাঁক আছে। আর তা সামলাতে না পেরেই তো অনেক আগেই ইইউ নেতারা বিশেষত জার্মানির সোজা কথা – “অন্তত ২০২৭ সালের আগে রাশিয়ার ওপর থেকে জ্বালানি-নির্ভরতা কমানোর সুযোগ নেই”। আর এ নিয়ে তবু বিবিসি বাংলা নিউজ প্রপাগান্ডার লাইন ধরেছে। এই প্রথমত বিবিসি বাংলার খবরে সুনির্দিষ্ট করে প্রকাশিত হয়েছে যে, ‘জার্মানি ও ইউরোপের আরো কয়েকটি দেশের আপত্তির মুখে, রুশ তেল ও গ্যাস এখনো এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে। কারণ রুশ জ্বালানির ওপর, বিশেষ করে গ্যাসের ওপর, তাদের নির্ভরতা”। অর্থাৎ ইউরোপের রাশিয়ান তেল-গ্যাস ক্রয়কে এখনো নিষেধাজ্ঞার বাইরেই রাখা আছে এবং বিবিসি আরো জানিয়েছে, জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলৎস বুধবারও বলেছেন, “রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলে ইউরোপ অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়বে”। এ ছাড়া রয়টার্স আরো সোজাসাপ্টা করে কথাটা এক এক্সপার্ট অ্যানালিস্টের বরাতে বলে দিয়েছে। লিখেছে, ‘সাধারণত একটি নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা চালু হতে দুই-তিন বছর লাগে। অতএব এই ডিলটা সম্ভবত উপস্থিত চালু সাপ্লাইকে নতুন দিকে নিয়ে যাওয়া যতটা না, এটা নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করার কথা বলেছে।’

    ইইউ এর স্ববিরোধী অবস্থানঃ
    ইইউ আমেরিকার সাথে তালে নাচতে চায় আবার রাশিয়ান গ্যাস জ্বালিয়ে ইউরোপের ঠান্ডায় নিজের ঘরগরম রাখতে চায়।  এই হল মূল স্ববিরোধ বা দু-মুখো অবস্থান। রাশিয়ার উপরে আমেরিকান ডলার অবরোধের সীমা-পরিসীমা নাই। ইউক্রেনে রাশিয়ার হামিলার একদিন আগে থেকেই এর শুরু হয়েছিল। আর ইইউ-ও আমেরিকার এই অব্রোধ অনুসরণ করে তাদের ইউরো- অবরোধের ঘোষণা করেছিল। যার সোজা অর্থ রাশিয়া ইইউ-সহ কোন দেশের ক্রেতার সাথে  ইউরোতে কেনাবেচা করতে পারবে না।
    তাহলে এখন এই শর্ত অনুসারে ইউরোপ রাশিয়ান গ্যাসও কিনতে পারে না।  কিন্তু এই ক্ষেত্রে এসে ইইউ মোচড়ামুচড়ি শুরু করেছে। তাদের দাবি ও তারা বলতে চায় গ্যাসের উপর ইউরো অবরোধ কার্যকর নয়।  তারা কার্যকর করে নাই। আর এখানেই রাশিয়ার সাথে ইইউ-এর ব্যাখ্যা-বিতর্কের শুরু। রাশিয়া সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে যারা অবন্ধুসুলভ-দেশ [unfriendly] তারা গ্যাস কিনতে চাইলে তাদেরকে তা রাশিয়ার মুদ্রায় রুবলে কিনতে হবে। যেমন জর্মানি যারা প্রায় ৫৫% রাশিয়ান গ্যাসের উপর নির্ভরশীল কিন্তু তারাই আবার ইইউ-এর সদস্য হিশাবে রাশিয়ার উপর ইউরো অবরোধ আরোপকারি অবশ্যই। তারা  কেবল নিজেদের সুবিধার্থে  গ্যাস কেনার বেলায় অবরোধ নাই (মানে বাকি সবকিছু ইউরোতে কেনাকাটাতে  অবরোধ আছে) বলছে।  যার মানে হল রাশিয়া গ্যাস বেচে যে ইউরো পাবে তা দিয়ে সে ইউরোপের অন্য কোন পণ্যও কিনতে পারবে না। বলাই বাহুল্য এটা তো এক অর্থহীন ও অসম খামখেয়ালি অবদার হয়ে গেল!
    তাই স্বভাবতই পুতিনকে বলতে হয়েছে সেক্ষেত্রে জর্মানির মত বন্ধু-নয় দেশকে রুবলে গ্যাস কিনতে হবে। ফলে এটা বলা যায় যে পুতিনকে একন কথা বলতে ইইউ-ই বাধ্য করছে বা ডেকে এনেছে। এনিয়ে রয়টার্স এক রিপোর্ট করেছে যাতে রাশিয়ান গ্যাস কিনে ও নির্ভরশীল এমন প্রায় সব দেশের প্রতিক্রিয়া তুলে আনা হয়েছে।  স্বভাবতই  এতে দেখা যাচ্ছে ক্রেতারা বিপদে পড়েছে। তারা কেউ কেউ এটা গ্যাস কিনার চুক্তিতে নাই – এমন বক্তব্য দিয়েছে।  এর উপর আবার আরেক বিপদ হল যে গ্লোবাল মার্কেটে গ্যাসের দাম কমপক্ষে ৩০% বেড়ে গেছে। মানে হল ভোক্তা দেশকে এখন বেশিদামে কিনতে হবে। অবস্থাটা এককথায় বললে, ভোক্তা দেশে গ্যাস সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে উঠার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।  আবার মনে রাখতে হবে গ্যাসের সাপ্লাইয়ের বেলায় যেকোন বিকল্প উৎস যোগাড় হয়ে গেলেও অবকাঠামো নির্মাণ শেষে তা চালু করে থিতু হতে গেলে কমপক্ষে ২-৩ বছর সময় লেগে যায়। অর্থাৎ আরামে ইউরোপে বসবাস আর আরামে থাকছে না…!
    ওদিকে তেলের দামের যদি তাকাই। এর আগে ৮০ ডলারে ব্যারেল দামে রাখাই দুনিয়া হিমশিম খাচ্ছিল। সেটা এখন হয়েছে ১২০ ডলার প্রায়।  এর সোজা মানে হল সারা দুনিয়ায় সরকারগুলো বিপদে এক হৈচৈ অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে আমাদের মত দেশ ও এর গরীব পাবলিক এরা খাদ্য কিনতেও সঙ্কটে পড়বে। এর জন্য কে দায়ী হবে? বলাই বাহুল্য ডলার অবরোধ।
    সারা দুনিয়াকে এভাবে অস্থির ও অনিশ্চিত রেখে বাইডেন কী কামাইতে চাইতেছেন?? কী ইমেজ রক্ষা করবেন তিনি??
    ইউরোপের সরকারগুলো কিভাবে  তাদের বাইডেনকে অনুসরণের পক্ষে কী সাফাই দিবেন? আর তা কেন ও কিভাবে তাদের আমজনতার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে??

    ইউরোপে বাইডেনের আরেক গন্তব্যস্থল হল পোল্যান্ডঃ
    এছাড়া ইউরোপ সফরে বাইডেনের আরেক গন্তব্যস্থল হল পোল্যান্ড। হ্যাঁ, সেই পোল্যান্ড যে এখন ২০ লাখ ইউক্রেনীয় রিফিউজি নিয়ে পেরেশান। বলা হচ্ছে – ‘সেটা নাকি এখন তার ছোট অর্থনীতিকেই ভেঙে ফেলতে উদ্যত” […refugees has put a considerable financial and logistical burdens on Poland and, if not handled competently, could ultimately lead to social unrest and economic instability.]।    কিন্তু এই পোল্যান্ড ও পাশেই রোমানিয়া – এরা এখন ন্যাটোর সদস্য যারা আগে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বাফার রাষ্ট্র। মানে কলোনিদখলদার পশ্চিম-ইউরোপ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য মাঝের বাফার রাষ্ট্র। যেটা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে। বলেছেন, ২০১৪ সালের পরপরই এরা ন্যাটোর সদস্য হয়ে গেছে অথচ তখন রাশিয়া কিছু বলেনি, তাহলে এখন কেন পুতিন ইউক্রেনের বেলায় এত আপত্তি করছেন? অথচ জবাবটা খুবই সহজ। আপনি তখনই বাধা দেন যখন আপনার সামর্থ্য-মুরোদ সংগৃহীত হয়েছে বলে আপনার মনে হয়। এটা তো পানির মতই স্বচ্ছ কথা, নয় কী?  যেমন – ২০১৪ সালের রাশিয়া ছিল আমেরিকার দিক থেকে কঠোর অবরোধ আরোপের বছর আর সেটাই আবার চীনের সাথে রাশিয়ার নয়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুরুর বছর। যেটা চীন-ইরানের বেলায় তাদের ২৫ বছর তেল-গ্যাস সরবরাহের বিনিময়ে চীনের বিনিয়োগ পাওয়ার চুক্তি সেি চুক্টাতির মডেল রূপটা আসলে সর্বপ্রথম তৈরি হয়েছিল চীন ও রাশিয়ার মধ্যে। তাই পুতিনের রাশিয়া ডলারশূন্য হয়েও বা ডলার থেকে বের করে দিলেও রাশিয়া পরে অর্থনৈতিকভাবে টিকে গিয়েছিল চীনের সাথে ঐ অর্থনৈতিক চুক্তির কারণে।  সোজা কথায়, ২০১৪ আর ২০২২ সালের পুতিনের রাশিয়া একই অর্থনৈতিক অবস্থায় নেই। এ কারণেই ২০১৪ সালে পোল্যান্ড-রোমানিয়াকে কিছু বলতে না পারলেও এখন ইউক্রেনের বেলায় পুতিন সোচ্চার। এসময় রাশিয়া চীনের সাথে অনেক ঘনিষ্ট এবং সর্বোপরি আমেরিকা এখন অনেক বেশি গ্লোবাল কনট্রোল ও প্রভাব হারিয়েছে। তাই এটাই পুতিনের জন্য ফেবারেবল সময়!
    যে কথা বলছিলাম, বাইডেনের আরেক গন্তব্যস্থল পোল্যান্ড কেন? আসলে আগেই বলেছি, বাইডেন ইউক্রেন ইস্যুতে  নিজে বা ন্যাটোকে রাশিয়ার বিরিদ্ধে যুদ্ধে যাবে না ফলে এমন কিছু না করেই মিথ্যা আশ্বাসে জেলেনস্কিকে যুদ্ধে নামিয়েছেন। জেলেনেস্কি বারবার এই অভিযোগ তোলাতে তা সবাই জানে। তাই বাইডেন হয়ত এই অভিযোগে নিজ দেশেই  ধোলাই হয়ে যাওয়ার ভয় করছেন। আগামি নভেম্বরের মিড টার্ম এমনিতেই বাইডেন ও দলের অবস্থা খারাপ। এর উপর অনুমান করা যায় সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ও ট্রাম্প বাইডেনের এই বোকা পারফর্মেন্স নিয়ে তাকে ধোলাই করতে ছাড়ার কোণ কারণই নাই।   মূলত এ জন্যই সম্ভবত রাশিয়া-ইউক্রেন আপস আলোচনা শুরু করতে মরিয়া জেলেনস্কি প্রতিদিন সকালে উদাত্ত আহ্বান জানালেও তা ঘটছে না। আর এসব অপবাদ ঘুচাতেই বাইডেন ইউক্রেনকে দূর থেকে কিছু অস্ত্র ছুড়ে দিতে চান। কিন্তু পুতিন হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন – পড়শি কোনো রাষ্ট্র এমন অস্ত্র ‘পৌঁছে দেয়ার কাজ করলে’ সে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক কাজ করেছে বলে তিনি গণ্য করবেন। তাই বাইডেন নিজে সফর করে হয়ত পোল্যান্ডকে সাহসী করে তুলে পোল্যান্ডকে দিয়েই কাজটা করাতে চাইছেন; এটাই মুখ্য কারণ। পুতিনও এসব ডেভেলবমেন্ট আর বাইডেনের মতিগতি বুঝার জন্যই থমকে দাড়িয়েছেন। জেলেনেস্কির আপোহ আলোচনার দাওয়াত গা করছেন না।  এককথায় বাইডেনের ইমেজ রক্ষা করতে গিয়ে সবাই একটা স্টেলমেটে আটকে গেছে। কঠিন বাস্তবতাটা হল, কেউ-ই আমেরিকায় বাইডেনের ইমেজ রক্ষা করতে পারবে না। এই অবস্থা বড় সময় ধরে থাকলে বাইডেনের পক্ষের ইউরোপ-সহ দেশগুলোর তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করা যায় না। কারণ নিজ নিজ দেশের স্বার্থ আর  নিজে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার উপরে আর কোন স্বার্থ বলে কিছু কখনও থাকতে পারে না – এই বট্ম লাইন সবাইকে মানতেই হয়!

    শেষ পেরেক, ডলারের বদলে চীনা ইউয়ানঃ
    আর সবশেষে, চীন গভীর মনোযোগে ডলারের বিকল্প হিসেবে চীনা মুদ্রা ইউয়ানকে দাঁড় করাতে চাইছে। এনিয়ে ব্যাপক ততপরতা শুরু করে দিয়েছে। সম্প্রতিকালের চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ঈ-এর দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সফরের উদ্দেশ্য এটাই। এমনকি  দুবছর পরে তিনি এবার ভারতও সফর করেছেন।  আসলে এটা ২০১৫ সাল থেকেই রাশিয়াকে সাথে নিয়ে শুরু করা এক চীনা পরিকল্পনা। আর ২০১৫ সাল থেকে এ জন্য যে, ওই বছরই আইএমএফ ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। মানে দুনিয়ার যে কোন মানুষ তখন থেকে ইউয়ানে সম্পদ ধরে রাখতে পারবে ও তার আন্তর্জাতিক অর্থদায় ইউয়ানে শোধ করতে পারবে। কারণ চীনা ইউয়ান আইএমএফের সব শর্তই তখন থেকে পূরণ করেছিল। ফলে অন্য চারটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা – ডলার, পাউন্ড, ইউরো ও ইয়েনের সাথে পঞ্চম সমতুল্য মুদ্রা হিসেবে ইউয়ান [অনেকে একে রেনবি renminbi (RMB) বলে] স্বীকৃতি পেয়েছিল। কিন্তু ইউয়ানের সেই ধীরগতি ও বিকাশকেই চীন এখন ত্বরান্বিত করতে চাইছে মাত্র। তখনই বলা হয়েছিল যে, চীন সৌদি আরব থেকে বছরে যা তেল কিনে তা ইউয়ানে পরিশোধ করতে পারলেই ইউয়ান অনেক আগেই বিশ্বাস ও আস্থাযোগ্য এক প্রধান আন্তর্জাতিক মুদ্রা হয়ে যেতে পারে। স্বভাবতই এতে এটা বাইডেনের পাগলা পুতিনকে সাঁকো না নাড়ানোর মত কথা মনে করিয়ে দেয়া হয়ে যেতে পারে।  এতে এখন পর্যন্ত সবদেশের যে ঝোঁক অভিমুখ তা হল ডলারের পাশাপাশি সবাই ইউয়ানে গ্লোবাল বাণিজ্য করার সুযোগ খুলে রাখার পক্ষপাতি। তাই এটাই ইউয়ানকে স্বাগত জানিয়ে রাখার মত একটা ঘটনা হয়ে গেছে। এককথায়, কিছু হলেই “ডলার অবরোধ” আরোপ – এটা অতি বাড়াবাড়ি ও অপব্যবহার হিশাবে দেখতে শুরু করে দিয়েছে গ্লোবাল পুঁজি বাজার। কারণ সবারই দরকার সম্পদ ধরে রাখার মত এক স্থিতিশীল মুদ্রা।   আগামি ইতিহাস একে বাইডেনের এক বড় ভুল বলে চিহ্নিত করবে যে তিনি গ্লোবাল বাজারে “মুদ্রা অনিশ্চয়তা” এনেছিলেন।
    আর সামনের নভেম্বরের মিডটার্ম থেকে ২০২৪ সালের নির্বাচন পর্যন্ত এসব কথা তুলেই প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রাম্প বাইডেনের পাবলিক রেটিং আরো নিচে নামানোর চেষ্টা করে যাবেন, বলাই বাহুল্য! এই ভয় বাইডেনকে তাড়া করছে – ইউরোপে দৌড়াদৌড়ি করছেন তিনি! কিন্তু এসব কিছু করে কী ইইউ-কে সাথে অবরোধের পলিসিতে ধরে রাখতে পারবেন??  নাকি ইউরোপও ডলারের সাথে ভেসে যাবে? প্রকাশিত ইঙ্গিতগুলো ভাল না!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২৬ মার্চ  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ বাইডেন কি ইউরোপকে হারাবেন!“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কী ডলারের বিকল্প এনেই ছাড়বে

    রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কী ডলারের বিকল্প এনেই ছাড়বে

    ০৭ মার্চ ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Xx

     WHY GOLD? –  Gold rises 2% on fear of Russia-Ukraine war

    সারা দুনিয়াই এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে, একভাবে না একভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে গেছে। এবং বলাবাহুল্য তা পক্ষে অথবা বিপক্ষে। আবার এই যে কথাটা বললাম সেটাও নতুন কথা নয়। কেবল ফারাক হয়ত এতটুকুই যে, অন্যরা আমার মত করে নয় তারা তাদের মত করে অন্যভাবে বুঝে বলেছে।

    তা হলে নতুন যে কথাটা এখন বলতে যাচ্ছি সেটা হল, গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল এতে আরো আসন্ন হতে গতিপ্রাপ্ত  হয়ে যেতে পারে। এ কথা আমি ২০১৪ সাল থেকে নিশ্চিত করে বলে আসছি। আসন্ন সেই গ্লোবাল নেতৃত্বে বদলের দিকে একটা গ্রেট লিপ [great leap] বা বড় পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার নতুন ঘটনাটাই হল ‘রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ’  – তবে এটা ঘটনার একদিক। মানে বাইরের দিক থেকে দেখে এটাকে  কেবল ‘রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ’ -ই মনে হচ্ছে।  অর্থাৎ  বড় পদক্ষেপে বদলের বাইরে দিকটাই মানুষ দেখছে ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ’ হিসেবে। আসলে গ্লোবাল নেতৃত্বের নেতাদেশ বদল মানে – আমেরিকা নেতৃত্ব হারানো আর চীনের উত্থান ঘটা, এটাই ধেয়ে আসছে। আর আমেরিকা নেতৃত্ব হারাচ্ছে – এ ঘটনাটাকে মুখে বলা তা মোটেই ব্যক্তির ইচ্ছা না। এমনকি সে চীনকে বেশি পছন্দ করে কি না তাতেও কিছু এসে যায় না। এটা এক ব্যক্তি-ইচ্ছা-নিরপেক্ষ বাস্তবতা – এমন এক অবজেকটিভিটি। তাই তা সিরিয়াসভাবে আমল করার বিষয়।

    সাম্রাজ্যের ইতিবাচক ভূমিকাঃ
    এম্পায়ার [empire] বা বাংলায় ‘সাম্রাজ্য’ শব্দটা অনুসরণ করা যাক। বহু পুরনো এই শব্দ, দুনিয়া যখন শাসন বলতে কেবল রাজার শাসন বা রাজতন্ত্র বুঝত, সে আমলের। তখনকারই আরেক প্রায় সমান্তরাল শব্দ হল এই সম্রাট বা সম্রাটের সাম্রাজ্য। পরবর্তিতে সম্রাটের শাসন পর্ব বা যুগ শেষ হবার পরে ইউরোপে, অন্যের দেশ দখলদার – এটাই যেসব দেশের প্রধান পেশা ও ব্যবসা, পরিচয়, এমন সবচেয়ে বড় পাঁচ রাষ্ট্র হল – ব্রিটেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল ও স্পেন – যারা সবাই ‘সাম্রাজ্য’ (যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য) বলেই পরিচিত ছিল। এমনকি তারা ১৬০০ সালের পরে এরা ততদিনে রিপাবলিক জাতি-রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে উঠে গেলেও।
    আমাদের জন্য এখনকার প্রাসঙ্গিক কথাটা হল,  কোনকিছুকে রাজ্য আর সাম্রাজ্য বলে ডাকার ক্ষেত্রে একটা বড় ফারাক হল, ছোট হলে রাজ্য আর বড় হলে সাম্রাজ্য এমন একটা চিন্তা অবশ্যই কাজ করত; যদিও এদের মূল ফারাকটা আরো গভীরে। যেমন ধরেন, রাজা আর সম্রাট উভয়ে খাজনা তুলে খায় এটা কমন। কিন্তু দুটোর ফারাক বা বড় অমিলের দিকটা হল, রাজা খাজনা নেয়ার বিনিময়ে প্রজাকে কিছু দিতে সে বাধ্য নয় অথবা শাসন-সম্পর্ক চর্চায় সেটা ছিল না। যেমন দুনিয়ার যত রাজা ছিল তাদের এসব অর্থ আদায় হত যেসব নাম দিয়ে সেগুলো লক্ষ্য করা যাক। প্রথমত বলে রাখি এদের নানা নাম থাকলেও এখানে কমন নাম আকারে, সব কিছুকেই ‘খাজনা বলছি’। যেমন,  আমাদের পাহাড়ি এলাকায় রাজতন্ত্র অকেজো হয়ে গেলেও এখানে খাজনা আদায় হত ‘পুণ্যাহ’ এই নামে; এখনও এই নামে অনুষ্ঠানটা চালু আছে দেখা যায়। অর্থাৎ এখনো পাহাড়ি প্রজাদের [বাংলাদেশ রাষ্ট্র হয়ে গেছে বলে এই বিচারে পাহাড়িরা নাগরিক হয়ে গেলেও পুরানা রাজার বিচারে তারা প্রজা-ই ] থেকে তাদের রাজা অর্থ আদায় করতে পারুক আর না পারুক, সেই ‘পুণ্যাহ’ কালেকশন ও অনুষ্ঠানের স্মৃতি অন্তত রাজারা জারি রাখতে চান। রাজ-প্রশাসন বলে তেমন কিছু না থাকলেও তাদের সাংস্কৃতিক পরিসরে রাজার অনুভূতি থাকুক, এই চাওয়াকে কার্যকর রাখা হয় এ ঘটনায়। এখন এই শব্দটা পরীক্ষা করা যাক; এটা এক ধর্মতাত্বিক ইঙ্গিতমূলক শব্দ যা দিয়ে যেন বলতে চায় ‘খাজনা দেয়া পুণ্যের কাজ’। আর সারকথায় বলা যে, বস্তুগত লাভালাভের দিক থেকে কথাটার সোজা অর্থ হল, খাজনা দিলেও প্রজারা বিনিময়ে কিছু পাবে না।

    এসব ক্ষেত্রে এমনই আরেকটা শব্দে খাজনা তোলার রেওয়াজ ছিল  – ইংরেজিতে ‘ট্রিবিউট’ [tribute] শব্দে, যার একটা বাংলা করা যায় ‘শ্রদ্ধা’ জানানো। মানে হল যেমন, ভিজিটিং আওয়ারেই রাজাকে ভিজিট করতে গেছেন কিন্তু সেটাকে বলতে হবে – শ্রদ্ধা জানাতে গেছেন। এখানেই শেষ না। আপনি যে শ্রদ্ধা জানাতে গেছেন তা শুধু ‘ভাব-ভঙ্গিতে বুঝালে হবে না। পারিষদেরা বুঝবে কী করে যে রাজাকে আপনি শ্রদ্ধা-সালাম জানাতে গেছেন? সে জন্য আপনাকে নগদ অর্থ (অথবা জমির ফসল) দিতে হবে। দিলে পরে সেটাতে আপনার সালাম জানানোর ইচ্ছা প্রকাশিত হয়েছে, ধরা হবে। না, আমাদের বাংলা ভাষা বা সমাজেও দেখেন। সেখানে এটা এখনো তা আরেকভাবে চালু আছে। যেমন, কোন মার্কেটের দোকান ভাড়া নিতে গেছেন। মার্কেট মালিক বলছে ভাড়া মাসে তিন হাজার কিন্তু সাথে ‘সালামি’ দিতে হবে পাঁচ লাখ। এই সালামিটাই ইংরেজিতে ট্রিবিউট। সারকথায় রাজা মানে যারা সালামি, ট্রিবিউট, পুণ্যাহ ইত্যাদি নানান নামে খাজনা খায়। আর গুরুত্বপুর্ণ হল, বিনিময়ে রাজা প্রজাকে কিছু দেয় না। অথবা দিতে হবে এমন কোন অর্থ-ইঙ্গিত ওসব শব্দে থাকে না।

    রাজা-সম্রাটের ফারাকঃ
    আর ঠিক এ জায়গাটা হল রাজা-সম্রাটের ফারাক। যেমন সম্রাটের ক্ষেত্রেও,  সারকথায় সম্রাটও সালামি, ট্রিবিউট, পুণ্যাহ ইত্যাদি যা আছে সব নেয়। কিন্তু একই সাথে প্রজাদের জন্য অনেক সামাজিক দায়-কর্তব্য সে নেয়। কেমন সেটা? গঞ্জ-হাট-বাজার অনেক পুরনো জিনিস। সেকালে যে সম্রাট সে হয়ত এমন কমন জায়গার বাজারটা পাকা করার দায় নিবে, বর্ষাকালে খুব কষ্ট হয় তাই। এছাড়া বণিকদের হাটে আসা-যাওয়া চলাচলের নিরাপত্তা দিবে; সে জন্য পাইক-পেয়াদা নিয়োগ দিবে। এক কথায় কমন গুড [common good] মানে সবার কাজে লাগে, এমন কাজকর্মে সম্রাট মনোযোগ দিবে। সম্রাট জানে, এতে হাটবাজারে ব্যবসাটা ভালো জমলে খাজনা-আয় আপোষেই ভাল হবে। তার ভাবনা হল, এসব মিউনিসিপাল বা সিভিক [civic] সার্ভিস বাড়িয়ে দিয়ে যদি এবার খাজনা একটু বেশি চাই হাটের মানুষ তাও দেবে। এই হল সাম্রাজ্য ব্যবস্থা শুরুর গুরুত্বপূর্ণ দিক। এটাই ‘সাম্রাজ্য’ ধারণা ও শব্দটার বড় কিছু ইতিবাচক দিক; আর যদিও সাম্রাজ্যের বড় বড় অনেক খারাপ দিক দিয়েই মানুষ ধারণাটাকে চিনে থাকে।

    উপরে সাধারণভাবে যেকোন সাম্রাজ্যের বেলায় কথাগুলো প্রযোজ্য এমন অনুমানে কথাগুলো বলা। তবে আমাদের সাবধান হতে হবে ১৯৪৫ সালের আগের (১৬০০-১৯৪৫) সাড়ে তিন শ’ বছরের ইউরোপ নিয়ে; এ সময়ের তাদের দেশের সাম্রাজ্য শব্দটার অর্থ আমাদের মত এশিয়ান দেশের অভিজ্ঞতায় পুরাটাই নেতিবাচক ছিল; কারণ সাম্রাজ্য তৎপরতা বলতে তখন এর একটাই অর্থ, যারা কলোনি দখল ও শাসন করে। সাম্রাজ্য মানেই অন্যের দেশকে কলোনি দখল – এই দিকটা অনেক ভারী ও প্রধান ছিল।

    তবে ১৯৪৫ সালের পরে আমরা প্রথম দেখলাম এক নতুন ধরনের আমেরিকা শুধু না, সেটা একটা কলোনিমুক্ত দুনিয়াও বটে। তবে না এটা আবার কোন সম্রাটের রাজতন্ত্র ছিল বরং ছিল নাগরিকের ক্ষমতায় নির্বাচিত এক আমেরিকান রিপাবলিক। ফলে সেই অর্থে এখানে কোনো আমেরিকান সম্রাট থাকে নাই। কিন্তু এই আমেরিকার হাতেই তবু ১৯৪৫ সালের পরে – সেই প্রথম দুনিয়াতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তার নেতৃত্বে এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক ব্যবস্থা ও শৃঙ্খলা তৈরি করা হয়েছিল বলে বুঝা যেতে পারে; এবং এর খারাপ-ভালো সব দিকসহ-ই। কমিউনিস্টরা এই আমেরিকান কর্তৃত্বকে বিশেষ করে ১৯৫৩ সালের পরের আমেরিকাকে ‘আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ’ বলে থাকে এবং তা বলার পক্ষে এমন আমেরিকান ভূমিকাও আছে; যেমন সিআইএ পাঠিয়ে কোনো দেশে ক্ষমতা দখল ও সরকার বদল এবং তা বিশেষত প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের উদ্দেশ্যে। কিন্তু একই সাথে এই আমেরিকার এম্পায়ার রোলও আছে। যেটাকে আগে সাম্রাজ্যের ব্যতিক্রমী ইতি ভূমিকা বলেছি, তেমন এক ধারাবাহিকতা যেন, যেটা আমেরিকা একালেও পালন করেছে। কিভাবে?

    সেকালে সম্রাট যেমন রাজার চেয়ে এগিয়ে গিয়ে বসে বসে চাঁদা-খাজনা খাওয়া নয় – প্রজাদের সার্ভিস দেয়ার কাঠামোতে হাজির ছিল এবং এই বিনিময়ের মাধ্যমে একটা রাজ্য-প্রশাসন বা সাম্রাজ্য খাড়া করে ফেলা যার মুখ্য অবদান; ঠিক তেমনি ১৯৪৫ সালের পরে, আমেরিকা এক ইতি-এম্পায়ার ভূমিকাও নিয়েছিল। কারণ এক নয়া গ্লোবাল সিস্টেম সে গড়ে তুলতে চেয়েছিল।
    যার পিছনের কারণ গ্লোবাল সিস্টেমের নেতা হতে গেলে পজিটিভ এম্পায়ারের দায়-ভূমিকা যা থাকে সেটাও পালন করতে হয় এবং তা করে বলেই তো সে গ্লোবাল নেতা।  উদাহরণ, যেমন চলতি শতকের শুরু থেকেই, ব্যাপারটাকে ভাল / মন্দ যা বলেই দেখি,  আমেরিকা রাষ্ট্র  নিজে চলতে গিয়ে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি এই বেকায়দায় পড়ে সভরেন-লোন নিয়ে চলতে শুরু করেছিল আর তা, এখনও। সভরেন লোন [sovereign loan] মানে এখানে খোদ রাষ্ট্রকেই বন্ধক রেখে গ্লোবাল পুঁজিবাজার থেকে ঋণ নেয়া, আর এভাবেই ঋণ করে খরচ চালানো একটা দেশ আমেরিকা। আর সে-জন্য প্রায়ই আমেরিকাকে নিজ সংসদ থেকে নতুন লোন নেবার অনুমতি নিতে বা লিমিটটা বাড়িয়ে নিতে হয়। আর এনিয়ে প্রতিবারেই এক-দুই সপ্তাহের নাকানি-চুবানি খায় আমেরিকান প্রেসিডেন্টের। একবার ওবামা আমলে প্রেসিডেন্টের এমন নাকানি-চুবানি চলছিল কিন্তু এরই ভিতর ডব্লিউএফপি WFP (বিশ্ব খাদ্য সংস্থা – জাতিসঙ্ঘের খাদ্য সহায়তা-বিতরণ প্রতিষ্ঠান)-কে দেয়া তার রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য ওবামা এক শ’ মিলিয়ন ডলার ফান্ড রিলিজ করছেন। কারণ, ডব্লিউএফপি এই ফান্ড ব্যবহার করেই সোমালিয়ায় ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাদ্য পাঠানোর অপেক্ষায় ছিল। অথচ তখন আমেরিকার নিজ-বাজেটে অর্থ বরাদ্দ নেই বলে যারা বিভিন্ন সেক্টরে দিন-ভিত্তিতে স্যালারি পান এমন আমেরিকার  সরকারি কর্মচারীদের ‘কাজ নাই’ বলে বাসায় রেখে দিতে হয়েছিল।

    অর্থাৎ, নিজের অবস্থা যাই হোক, ডব্লিউএফপি-কে প্রতিশ্রুত অনুদানের ফান্ড আগে রিলিজ করতে হবে – এই হলো গ্লোবাল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এক ব্যবস্থায় গ্লোবাল নেতার ইতিবাচক দায়-ভূমিকা তাকে অগ্রাধিকারে পুরণ করতেই হয়েছে; যা পুরনো স্টাইলে বললে এটা ‘এম্পায়ারের ইতি-দায়’ বলা যায়। আমি অনেকবার লিখেছি, কোনো রাষ্ট্র গ্লোবাল নেতা হতে হলে এর একনম্বর শর্ত হল তার অর্থনীতিকে অবশ্যই উদ্বৃত্ত অর্থনীতি হতে হবে, মানে ভাল পরিমাণে সারপ্লাস বা উদ্বৃত্তের সম্পদ থাকতে হবে। এমন হতে হবে, যাতে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে নয়া অবকাঠামোগত খাতে স্বল্পসুদে ঋণ পাবার যে চাহিদা আছে তা নেতা দেশকে পূরণের যোগ্যতা সামর্থ্য থাকতেই হবে। যে যোগ্যতার জন্যই সে পজিটিভ এম্পায়ার, ফলে সে গ্লোবাল নেতা।

    গ্লোবাল ইকোনমিতে আরও ভাল একটি উদাহরণে যাওয়া যাক; গ্লোবাল ইকোনমি ও চলতি করোনা ভাইরাস প্রসঙ্গে। গ্লোবাল ইকোনমি কখনও ফেল করলে, খারাপ অবস্থায় পতিত হলে এটা কোনো খুশির খবর নয়। আমরা দুর্ভিক্ষ দেখেছি। “সারপ্লাস ভ্যালু চোরেরা” এবার ‘ধরা খাইবে’ যুক্তিতেও তাই এটা খুশি হওয়ার বিষয় নয়। দুর্ভিক্ষ বা জীবনের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ না হওয়ায় তা-জনিত কোন মানুষের মৃত্যু কাম্য বিষয় নয়। তাই গ্লোবাল ইকোনমিকে পতিত বা ফেল করে যাওয়া থেকে বাঁচানোর ক্ষেত্রে গ্লোবাল নেতার এক বিরাট দায়-ভূমিকা আছে থাকে, মানুষ ও বিশ্ব তা আশাও করে।

    গ্লোবাল নেতার কী করার আছে এখানে?
    করোনার টিকার পূর্ণ ডোজ নিলে আর করোনা হবে না অথবা শতভাগ করোনামুক্তি মিলবে, টিকা উৎপাদকেরাও কখনো এমন কথা দাবি করে না। তাহলে টিকা নিয়ে এত কী হৈচৈ, কাজ? কোনো “লকডাউন’ বা সব অর্থনৈতিক তৎপরতা বন্ধ যেটা প্রায়ই করতে দেখা যায় এর  বিরুদ্ধে আবার যদি মানুষ উঠে দাঁড়াতে চায়, আর এতে ন্যূনতম অর্থনৈতিক তৎপরতা যদি চালু করতে চায় তাহলে মানুষের হাতের নাগালে আছে আর যা কিছু পরিমাণ প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যা কিছুটা কাজ করে এমন একমাত্র উপায় হল টিকা – পাবলিককে টিকা দিয়ে নেয়া। যত দ্রুত দেশের বেশির ভাগ যোগ্য নাগরিককে তা দেয়া যায়। তাহলে এর অর্থ দাঁড়াল যে, গ্লোবাল অর্থনীতিকে যদি ফিরে দাঁড়াতে হয়- যতটা সম্ভব ফিরে উঠে দাঁড়ানোর ব্যাপারটা সে ক্ষেত্রে নির্ভর করে মানুষের কাছে টিকার প্রাপ্যতা, টিকা কিনবার ফান্ড যোগান দেয়া আর ম্যানেজমেন্ট – যাতে সুষ্ঠুভাবে টিকা দেয়ার কাজটা সুচারুভাবে করা যাবে বা গেছে কি না এর ওপর। অর্থাৎ টিকা ধনন্তরী না হলেও বন্ধ অর্থনীতি থেকে বের হবার হাতের নাগালে থাকে আপাতত এমন একমাত্র উপায় হল টিকা। আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতায় তাই দেখা যাচ্ছে।  আর এখানে গ্লোবাল নেতার বিরাট ভূমিকাটা হল, এখানেই এই তিন কাজে বিনিয়োগ জুটিয়ে আনা। কারণ টিকা উৎপাদন বা ক্রয়ে সামর্থ্যহীন অথবা লাইসেন্স দিলেও যে উৎপাদন করতে পারবে না; এমনকি টিকা শুধু পৌঁছে দিলেও হবে না; তা ঠিকমতো পুশ করার ম্যানেজমেন্টেও সহায়তা লাগবে এমন গরিব দেশ কম নয়, বরং এরাই সংখ্যায় বেশি। এ ছাড়া বড়লোক দেশগুলো নিজে সবাই টিকা নেয়ার পরও আরো দ্বিগুণ টিকা মজুদ করে রেখেছিল তাতেও “নয়া” করোনার বিস্তার ঠেকেনি। এমনকি এভাবে রেখে তারাও “নয়া” করোনার হাত থেকে বাঁচবে না। কারণ আফ্রিকায় টিকা না দিলে সেখান থেকেই এই ভাইরাস আরো ভয়ঙ্করভাবে নতুন ভ্যারিয়েন্ট বা নতুন রূপ নিয়ে আবার সারা দুনিয়াতে ছেয়ে যাবে। আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাই বলছে, আমরা ওমিক্রনে এসে ঠেকেছি।

    তা হলে এখন বিচার করা যাক আমেরিকা বা চীন কে কতটা এ জায়গাটায় গ্লোবাল ভূমিকা দেখিয়েছে; বিনিয়োগ করেছে? আফ্রিকার সব বয়সের মিলিয়ে মোট জনসংখ্যা ১.২ বিলিয়নের মত। চীন একাই আফ্রিকাতে এক বিলিয়ন টিকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণের চেষ্টায় রত হয়েছে। আর আমেরিকার একা নিজ প্রোগ্রামের কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না। বড়লোক দেশের জোট জি-৭ হিসেবে- ডব্লিউএইচও বা (হু WHO)-এর কাছে এদের সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি ছিল এক বিলিয়ন ডোজের যা তারা এখনো টার্গেটের ধারে কাছে নাই বলে অভিযোগ। তবে WHO-কে দেয়া ওই মজুদ থেকেই (আমেরিকার অনুরোধে) হু আমাদের দেশে যত যা মডার্না ফাইজার টিকা সরবরাহকারী। আর ঢাকার একাংশসহ সারা দেশের জন্য এখনকার টিকার একমাত্র সরবরাহকারী চীন। আর আমার জানা মতে, চীনের এখনকার টিকাগুলো একেবারে বিনাপয়সায় আমাদের দেয়া। এ ছাড়াও অল্প কিছু টিকা জাপান থেকে এসেছে, আমেরিকা-ভারতের মুখরক্ষা করতে। কারণ টিকা-ইস্যুতে কোয়াডের ভিতরেই ক্যাচাল, মনোমালিন্য, অভিযোগের শেষ নাই। আর বড়কথাটা হল, বাইডেনের আমেরিকাই কোয়াডে টিকার জন্য অর্থ দেয় নাই, দিয়েছে জাপান। টিকার গ্লোবাল দায়-ভুমিকায় আমেরিকা নাই নয়ত পিছিয়ে। আবার সেকালেই ভারতের অভিযোগ তাকে কোন অনুদানের অর্থ  দেয় নাই। আর টিকার কাঁচামাল পেতে  আমেরিকা বাধা দিয়েছে।

    অর্থাৎ টিকা প্রশ্নে এরই মধ্যে গ্লোবাল ভূমিকা দেখাতে এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে, আমেরিকার চেয়ে চীন অনেক বেশি গ্লোবাল নেতার ভূমিকা নিয়ে নিয়েছে। করোনা গত ২০১৯ সালের শেষের দিক থেকে বিশ্ব ছেয়ে ফেলা শুরু করেছিল। আর ২০২০ সালে ছিল ওর প্রথম ভয়ঙ্কর প্রকোপ। অথচ আমেরিকার মতো দেশের প্রেসিডেন্ট এটা আদৌ কোনো সিরিয়াস ভাইরাস নাকি সাধারণ সর্দি-কাশি এসব নিয়ে মশকরায় দিন কাটিয়েছেন। মজার কথা হল, যড়যন্ত্র-তত্ত্ব বিশ্বাসী কিছু কমিউনিস্টরা বলে থাকেন, করোনার আবির্ভাব নাকি বিল গেটসের ‘জীবাণুযুদ্ধের ষড়যন্ত্র’। আর এনিয়ে খোদ ট্রাম্পের অবস্থানও এর কাছাকাছিই ছিল, যেটা আবার এখন পুরোই উদাম। সর্বশেষ কানাডায় ট্রাক ড্রাইভারদের দিয়ে ভ্যাকসিনবিরোধী আন্দোলনে এসে দেখা গেল ইউরোপের যড়যন্ত্র-তত্ত্ব বিশ্বাসী কমিউনিস্ট আর আমেরিকা-কানাডার কনজারভেটিভ বা হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট এরা দু’পক্ষই ভ্যাকসিনবিরোধিতার প্রশ্নে একাকার। দুনিয়াতে এমন ঐক্য সম্ভবত এই প্রথম; সত্যিই বিরল! সবশেষে কানাডার আদালত তাদের এই কথিত আন্দোলনকারীদের ইজ্জত-সম্মান বাঁছিয়েছেন, আদালত আন্দোলনকে অবৈধ ঘোষণা করে সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে।

    আমেরিকার গ্লোবাল নেতাগিরির দিন যে ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে তা নিয়ে বাইডেনের পূর্বসূরি ট্রাম্প বা তার দল-গোষ্ঠীর অবস্থান। ট্রাম্প বলতে চাচ্ছিলেন যে, আমেরিকার জন্য তার আমলে গ্লোবাল দায়-দায়িত্ব নেয়া বিশাল ভারী হয়ে উঠেছে। অতএব ভানুর কৌতুকের মত, “তাহলে যুদ্ধেই যাবো না”; অর্থাৎ আমেরিকা আর ইকোনমিক গ্লোবালাইজেশন এবং আমেরিকান গ্লোবাল রোল এর কোনোটাতেই আর থাকবে না। তাই সম্ভবত টিকা নিয়ে ফাজলামির রাস্তা নিছিলেন তিনি। এ ছাড়া আরো যেমন – ট্রাম্প ন্যাটো ভেঙে দিতে চান; এছাড়া এটা রাখার দরকার কী – ইউরোপ কোন খরচের দায় নেয় না ধরণের যুক্তি তুলেছিলেন। আর ১৯৪৫ সাল থেকে জার্মানি-জাপানে মার্কিন সেনা ও ব্যারাক আছে; আর একালের আফগানিস্তান থেকেও সব সেনা ফিরিয়ে আনতে চান, অবস্থান নিয়েছিলেন। এসবই ছিল গ্লোবাল নেতৃত্ব ছাড়তে চান এর ইঙ্গিত-ততপরতা। আর সবশেষে ৬ জানুয়ারি ২০২১ ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের’ হাতে সংসদ ভবন আক্রমণকে সমর্থন করেন। বলা যায় করিয়েছিলেন ও এর বিল্ডিংয়ের মাথায় উঠে নৃত্য করান। তাহলে এই হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট কারা, কী তাদের পরিচয় ও চাওয়া, আর কেন ট্রাম্প তাদের সমর্থন করেন বা নেন?

    সব প্রশ্নের জবাব একখানেঃ
    সব প্রশ্নের জবাবের মাথা একখানে – চীনের কাছে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব, অভ্যন্তরীণ বাজার ও অর্থনীতি সবকিছু ক্রমশ হারানোতে আমেরিকান সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ থেকে উঠা বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ার একটা হল হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট হয়ে যাওয়া বা এর সমর্থক হয়ে যাওয়া। এরা বলতে চায় আমেরিকা অর্থনীতির পিছিয়ে পড়া, ডুবে যাওয়া, কাজ-ব্যবসা হারানো, সচ্ছলতা কমে যাওয়া – এসব কিছুর কারণ একটাই। তা হচ্ছে, আমেরিকা হল সাদা ককেশীয় নীল-চোখের মানুষের দেশ। কিন্তু সেখানে আজ কালো আর বাদামি সারা দুনিয়ার মানুষে ভরে গেছে। আর এরা আমেরিকায় ছেয়ে বসে যাওয়াতেই এদের ভারে তাদেরই কাজ না পাওয়া বা সম্পদ ভাগাভাগিতে সঙ্কট এসেছে। অতএব তাদের বয়ানের সারকথাটা হল –  আমরা সাদারাই শ্রেষ্ঠ ছিলাম; এখন সেই পুরানা জমানাটাই ফেরত আনতে হবে। কাজেই দুনিয়াতে আমাদের গ্লোবাল দায়-দায়িত্ব নেওয়ার কাজ কী? আমাদের তা নিতে হবে কেন? এসবের অর্থে এরা বুঝুক না বুঝুক, যা তারা দাবি করছে এর বাস্তবায়ন-যোগ্যতা দুনিয়ায় থাকুক না থাকুক এরা এক এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থানে ঢুকে পড়েছে। আর এখানেই কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্রবাদীদের সাথে অজান্তেই তাদের অবস্থানগত মিল হয়ে গেছে। অথচ এরা খবর নেয় নাই যে, তাদের আমেরিকাই গত পঁচাত্তর বছর ধরে সারা দুনিয়াকে গ্লোবাল বাণিজ্যের গ্লোবালাইজেশনে টেনে নিয়ে গেছে। এখন খিচুড়ি একবার রান্না হয়ে গেলে কি আর চাল-ডাল আলাদা করা যায়? সেই অবস্থা! তেমনি এক বেচারা অবস্থায় এরা ও তাদের আমেরিকা! এছাড়া আবার গত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রধান সমর্থক এই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরাই। মাঠের বিচারে এরাই মূল ফাইটার।

    তা হলে গ্লোবাল কর্তৃত্ব হারাতে থাকা আমেরিকার অর্থনৈতিক এলোমেলো দুর্দশা দেখে থেকে এর একটা প্রতিক্রিয়া যদি হয় ট্রাম্প, তাহলে এরই আরেক প্রতিক্রিয়া (মুদ্রার অপরদিক) হল বাইডেন। বাইডেন বলতে চাইলেন তিনি অনেক বোঝেন – কাজেই তাদের প্রাণের আমেরিকা হারতে, হারাতে পারে না। কারণ তিনি জানেন আমেরিকার হাতে চীন-রাশিয়াসহ যে কেউ দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার মত দুই মারাত্মক অস্ত্র আছে, যেটার কথা অন্যরা বুঝেইনি। এর একটা হল, বেয়ারা যারা এমন রাষ্ট্র ও ব্যক্তির উপর  অর্থনৈতিক অবরোধ (sanction) আরোপ আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরা। এ দুটো ব্যবহার করলেই আমেরিকাকে আর কারো কাছে গ্লোবাল নেতৃত্ব হারাতে হবে না। আর এ’কাজটারই এক ব্যবহারিক রূপ-পদ্ধতি বিষয়ক ঘটনা হল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যেমন, রাশিয়া যখন ইউক্রেন আক্রমণের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে কিন্তু একশনে যায়নি তখনই আমেরিকান প্রতিক্রিয়া হল, রাশিয়ার উপর স্যাংশন আরোপ। অর্থাৎ বাইডেন যে অনুমানের উপরে চলতে চাইছেন তা হল, আমেরিকা রাশিয়ার সাথে কোনো  প্রত্যক্ষ যুদ্ধে যাবে না; আর সে অনুযায়ী তিনি (যুদ্ধের খরচ দিবার ফলে এর সব নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আছে বলে) বলিয়েছেন,  ন্যাটো কোনো “নো ফ্লাই জোন আরোপ করবে না”। মানে ন্যাটোও যুদ্ধে জড়াবে না। তবু কেবল অবরোধ আরোপ করেই নাকি বাইডেন সব দিকে জিতে আসবেন। কেন তা ঘটবে? কারণ, তিনি মহা-অস্ত্র “অবরোধ” তা ব্যবহার করে দিয়েছেন! আর এতে মনে হচ্ছে বাইডেন “অবরোধ” নামের সোনার ডিম দেয়া হাঁসের পেট কেটে সব ডিম বের করার পথে রওনা দিয়েছেন! তাই এনিয়ে নিচে এক প্রফেসরের বক্তব্য শুনে শেষ করব।

    সব কিছুতেই একই অবরোধ-নির্ভরতার অর্থ কী?
    হংকং থেকে পরিচালিত  গ্লোবাল পুঁজিবাজার অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের এক পত্রিকা “এশিয়া টাইমস”(Asia Times)। তারা অবরোধকে প্রসঙ্গ করে প্রধান এক রিপোর্ট করেছে। আর সেখানে এক্সপার্ট হিসেবে কথা বলেছেন আইএমএফের এক সাবেক চিফ ইকোনমিস্ট কেনেথ রগঅফ (Kenneth Rogoff); যিনি বর্তমানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরও। তার শেষ কথাটা দিয়েই শুরু করিঃ

    এমনিতেই আমেরিকা যেকোনো স্যাংশন আরোপ বলে যা করছে এর পেছনে আইএমএফের কোনোই অনুমোদন নেই। তবু এমন এই অতিমাত্রায় স্যাংশন বা অবরোধের ব্যবহার যা আমেরিকা করছে এর পরিণতিতে কী হবে তা নিয়েই এই প্রফেসর বলছেনঃ “স্যাংশন অস্ত্রের ব্যবহারের ফলে ডলার-মুক্ত (ডি-ডলারাইজড) এক দুনিয়া হয়ে যাবার পথে হাটা এটা, সেই প্রক্রিয়ার দিকে যাওয়া এখন ব্যাপক গতি লাভ করবে। আর সেটাই ডলার আধিপত্যের কবর খোঁড়ার মতো সমতুল্য এক ঘটনা হবে” (the frequent use of the financial sanctions weapon will accelerate the process of de-dollarisation of the world, which is tantamount to digging a grave for dollar hegemony.)”।

    কেন এমন হবে এর আরও কিছু মুল্যবান বেজ ফ্যাক্টস তিনি তুলে এনেছেন। তিনি বলতে চাইছেন, স্যাংশনের ব্যাপারটা আর কেবল রাশিয়ার বেলায় সীমাবদ্ধ নাই। স্যাংশন   মানে এখন কেউ যেদেশ আমেরিকার কথা শুনে নাই বা নীতির বিরোধী, এমন সবার বেলায় ঘাড়ের উপর ঝুলানো এক তলোয়ার হয়ে ঝুলতে শুরু করেছে। কাজেই চীনও এখন এর আওতায়; তাতে সে আগামিতে তাইওয়ান আক্রমণ করতে যাক অথব না যাক কোন ফারাক নাই। আর এটাই চীনকে এখন বাইডেন আমেরিকান ডলারের বিকল্প – এখনই খুঁজে বের করতে বাধ্য করে দিয়েছে। কেন? এখনই কেন?

    For the United States, the frequent use of the financial sanctions weapon will accelerate the process of de-dollarisation of the world, which is tantamount to digging a grave for dollar hegemony.”

    প্রফেসর রগঅফ হিসাব দিচ্ছেনঃ এক) “আজ যে ডলার আধিপত্যের গ্লোবাল অর্থনীতির দুনিয়ায় আমরা আছি, আপনারা যদি এর একটু দুরের ভবিষ্যতের ছবিতে তাকান – বিশ্বাস করেন চীনও এমনই ভবিষ্যতের দিকে তাকাবেই। কারণ তার আছে তিন ট্রিলিয়ন (৩০০০ বিলিয়ন) ডলারের রিজার্ভ যা রাখা আছে আমেরিকার রিজার্ভ ব্যাংকে”। দুই) আমেরিকান ট্রেজারির দুই বিলিয়ন ডলারের সিকিউরিটি বন্ড কেনা আছে চীনের। এখন কোন কারণে আমেরিকা চীনের উপরও কোন অবরোধ দিলে রশিয়ার মত চীনেরও এসব অর্থ আটকে যাবে। তাই প্রফেসর বলছেন এজন্য রাশিয়ার উপর অবরোধ আরোপ দেখে চীনেরও ক্ষুব্ধ-বিরক্ত হওয়াই নয়; এর চেয়েও বড় প্রতিক্রিয়া হবার কথা সেটা বা সেগুলো কী?

    যেকোন রাষ্ট্রের জন্য উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ ধরে রাখার সমস্যাঃ
    বাইডেনের স্যংশন আরোপ এককথায় এতে স্যংশনকে  অতিব্যবহার ফলে তা অপব্যবহারের স্তরে চলে গেছে। শুধু তাই না, যেকোন রাষ্ট্রের জন্য তার উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ ধরে রাখাকে উপায়হীন স্তরে নিয়ে ফেলেছে। বাইডেনের অবরোধ আরোপের সিদ্ধান্তের অর্থ  এখন হয়ে দাড়িয়েছে যে, প্রায় সব ব্যাপারে আমেরিকার ইচ্ছা ও স্বার্থের সাথে একমত থাকা বা তাল মিলিয়ে চলতে না চাইলে সব রাষ্ট্রেরই উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ ডলারে তা সংরক্ষণ হারাম করে দিবেন তিনি।  তাহলে এখন চীন তাইওয়ানের উপর আক্রমণ করুক বা না-করুক চীনের সমস্ত উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ সংরক্ষণ এখন হুমকির মুখে। এই ব্যাপারটার দিকেই প্রফেসর মনোযোগ আনছেন।
    অনেকের মনে হতে পারে তাহলে তো বাইডেনের আমেরিকা এখন খুবই শক্তিশালী দেশ! তাই কী? এর জবাবটা হবে হ্যা এবং না। অর্থাৎ সাময়িক ভাবে হ্যা আর একটু আগামিতে  দৃষ্টি ফেললে দেখা যাবে তারা আমেরিকার ডলারের আধিপত্য ভেঙ্গে নয়া বিকল্প বের করে ফেলার পথেই। ফলে আমেরিকা তখন আর শক্তিশালী থাকবে না, বরং কোণঠাসা হয়ে পড়বে।
    তাই প্রফেসর সমস্যাটা আমাদের বুঝাতে গিয়ে আবার বলছেন, “সোনা অবশ্যই সম্পদ ধরে রাখার এক ভাল বিকল্প  উপায়। কিন্তু এর সমস্যা হল, দুনিয়ার সবদেশের ব্যাঙ্ক রিজার্ভে যে পরিমণ সোনা রাখা আছে ডলারে এর মোট মুল্য হবে ২.৩ ট্রিলিয়ন। কিন্তু এক চীনের হাতে  যে বৈদেশিক মুদ্রা  মজুদ আছে এর পরিমাণ ৩.২ ট্রিলিয়ন।

    Gold is an alternative but China’s $3.2 trillion of foreign exchange reserves is greater than the $2.3 trillion value of all the world’s central bank gold reserves.

    মানে তিনি বলতে চাইছেন এতে সোনারই অভাব পড়বে। তত সোনা বিভিন্ন  দেশের মোট রিজার্ভেও নাই। ফলে  বাইডেন দুনিয়াতে রাষ্ট্রগুলো উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ রাখার যে ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছিল তাকেই ভালনারেবল বা নড়বড়ে করে দিয়েছেন। আর এটা বলাই বাহুল্য দুনিয়া যেহেতু উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ রাখার ব্যবস্থপনাকে নড়বড়ে করে রাখা সহ্য করবে না, মানে আমেরিকান খামখেয়ালিপনা বা সকলকে জিম্মি করে রাখা সহ্য করতে পারে না অতএব দুনিয়া একটা “ডলার বিকল্প” ব্যবস্থা গড়ে তুলবেই – এটাকেই প্রফেসর বলছে এক ডলার-মুক্ত বিশ্ব হবে সেটা!!!  আর এটাকেই সম্ভবত আমরা বলি আম-ছালা দুটাই হারানো দশা!!!
    আশা করি এখন পাঠক ধরতে পারবেন কেন সোনা? কেন সোনার দাম বাড়ছে? এখন অনেক মিডিয়ায় পাবেন আমেরিকান ডলার লেনদেন ব্যবস্থার SWIFT Code – এর বিকল্প  হিশাবে কেবল শুরু করা চীনের CIPS (Cross-Border Interbank Payment System) এর কথা কেন উঠতে শুরু করেছে!

    [একটা সতর্কতাঃ অনেকে দেখা যাচ্ছে ভুল বুঝছেন তাই একটা আগাম সতর্কতা যে এটা আমেরিকার বিপক্ষে আর রাশিয়ার (মানের চীনেরও) পক্ষ নিয়ে – এভাবে তৈরি কোন লেখা নয়। এই চোখে দেখা ভুল হবে। এখানে আমার কাজ হল এভেলাবেল ফ্যাক্টস বিশ্লেষণ করে দেখানো। এমন চাপা পড়া দিকগুলোকে সামনে এনে দেয়া। আর গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় এর প্রভাব পরিণতি কী হতে পারে তা বলা বা সে ধারণা নিয়ে কথা বলা।  আশা করি পাঠক “পক্ষ-বিপক্ষের” মধ্যে আটকে থাকবেন না! ]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০৫ মার্চ  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যার বাইরের রূপ“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মোমেন এটা কী করলেন?

    মোমেন এটা কী করলেন?

    গৌতম দাস

    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২

    গত দু-একদিন ধরে একটা ভিডিও ক্লিপ ফেসবুক মাতিয়ে বেড়াচ্ছে, সেখানে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন কিছু বক্তব্য রাখছেন। এই ধরণের ছবি বা ক্লিপে মোমেনকে দেখে আমাদের কারই ভাল লাগে নাই। আভ্যন্তরীণ ভাবে সরকার বিতর্কিত হতে পারে কিন্তু মোমেন বিদেশে বাংলাদেশের ইমেজের -প্রতিরূপই থাকেন! ফলে আমাদের সবার জন্যই এটা ম্যাটার করে! এঘটনায় সরকারের মানে বাংলাদেশের ইমেজ আরও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
    বাংলাদেশের মানুষের কাছে এটা মোটেই সুখকর চিত্র নয় যে তাদেরকে প্রতিনিধিত্বের নামে কেউ বিদেশিদের একাংশের কাছে কাকুতি-মিনতি করছে…!! তাও আবার সেটা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে – যেখানে বডি ল্যাঙুয়েজ আর ঘটনা ল্যাঙ্গুয়েজ আর পুরা সেটের সেটিংটা হল যে জয়শঙ্কর স্টেজে ডায়াসে আর মোমেন আমজনতা স্তরে নিচে……। আর জয়সঙ্কর আমাদেরকে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছে …… বাহ বাহ কি দৃশ্য!
    আসলে ওটা ছিল মোমেনের মুরোদ দেখানোর বেস্ট সুযোগ। জয়শঙ্করের আপত্তি হল চীনা বিনিয়োগ আমরা কেন নিয়েছি। আর চীনা বিনিয়োগ নেয়া মানেই –  তার চোখে, এমন এয়ারপোর্ট বানানো যেখানে কোন বিমান ল্যান্ড করে নাই ইত্যাদি।
    আর এখানেই মোমেনের জিজ্ঞাসা করা দরকার ছিল ভারত আমাদের বিআরটিসি-কে লোন (কথিত লাইন অব ক্রেডিট)  দিয়ে ডুবিয়ে দিয়েছে কেন? গত তের বছর ধরে বিআরটিসি এক অলাভজনক গলার কাটা, সরকারি রাজস্ব থেকে উলটা ভর্তুকি দিয়ে এটা টিকিয়ে রাখত্বে হয়েছে। কারণ সর্বশেষ ভারতের লিল্যান্ড-সহ নিজ  অচল গাড়ি কোম্পানিগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ভারত সরকার প্রায় দুশ কোটি টাকা ওসব কোম্পানিগুলোকে পরিশোধ করে দেয়। আর এখন ঐ কোম্পানিগুলোর অবিক্রিত গাড়িগুলো কোন দাম যাচাই ছাড়া ইচ্ছামত দামে আমাদেরকে কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। আর ঐ দুশকোটির টাকার (এর আগেও দফায় দফায় এই) ঋণ ও এর সুদ বইতে দায় চাপিয়েছে আমাদের উপর, এটাই লাইন অন ক্রেডিট কথার মানে।
    তাহলে অলাভজনক এয়ারপোর্ট প্রকল্প ঋণের মত আমাদের অলাভজনক বিআরটিসি কোম্পানিকে ডুবিয়ে দেওয়ার কাজটা কী জয়শঙ্কর সাহেব করেন নাই???
    মোমেনের উচিত ছিল এই জবাবদিহিতা জয়শঙ্করের কাছে চাওয়া…। এটা হতে পারত স্মার্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মত কাজ।এছাড়া একই রকম যেসব চীনা বিনিয়োগ ভারত নিয়েছে মোদির প্রথম পাঁচ বছরে সেসব প্রকল্পের তথ্য ভারত ওয়েব সাইট থেকে সরিয়ে রেখেছে কেন? ভারতে চীনা বিনিয়োগের তথ্য আগে জয়শঙ্করের উচিত পাবলিক করে দেয়া। এরপর অলাভজনক এয়ারপোর্ট প্রকল্প ঋণের গল্প আমরা শুনতে রাজি হব। এটাই সমান সমান হতে পারে তাই না!!!!
    মোমেন কোন অনুষ্ঠানে গিয়ে আপনাকে সাধারণ্যে বসতে হতেই পারে, এড়ানো যায়না এমন স্তরে বা পরিস্থিতিতে। কিন্তু সেক্ষেত্রে তাই বলে সেটাকে আরও কোন রাজ-সভাসদের অর্থ তৈরি করতে পারেন না – যেখানে আপনাকে অনুগ্রহপ্রার্থি প্রজা মনে হয় এমন পরিস্থিতি নিজেকে নিচা দেখানোর বা নিচে ফেলার তো দরকার নাই! নাকি???
    ওখানে ভুলে যাওয়া হয়েছে যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন আপনি ওখানে ব্যক্তি মোমেন নন। আপনি সেখানে অবশ্যই সব রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সাথে সমান মর্যাদার আরেক ও নিজ রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। কিন্তু মোমেনের বক্তব্য দেয়া আর প্রশ্ন করার মধ্যে সেটাই অনুপস্থিত ছিল। যেন ব্যক্তি মোমেন কিছু বাকা প্রশ্ন করতে চাইছেন, মান-অপমানের কথা ভুলে।
    ঘটনা হল বাংলাদেশ চীনের সাথে গভীর সম্পর্ক গিয়ে নিজেকে জড়িয়েছে। সুনির্দিষ্ট এখনকার বাংলাদেশ সরকার সঠিক বা বেঠিক যেভাবেই হোক তা করেছে। কিন্তু সেজন্য আমরা কারও কাছে জবাবদিহিতা করতে যাব কেন?? আমরা তা করতে যেতে পারি না! সেজন্য মোমেন ইন্ডিয়ার মাধ্যমে প্রায় সত্তরটা দেশের কোন সভায় গিয়ে জবাবদিহিতা করতে যাবেে কেন? তাও কার্যত ভারতের জয়শঙ্করের মাধ্যমে???
    মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্স বা এমএসসি [MSC], ১৯৬৩ সালে জন্ম নেয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পরিস্থিতিতে গ্লোবাল সিকিউরিটি প্রসঙ্গে ডায়লগের একটা জোট। ওর নিজ ভাষ্য অনুসারে তা ট্রান্স-আটলান্টিক মানে আটল্যান্টিকের দুইপাড়ে মানে আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপ-কে নিয়ে করা এক জোট।
    এখন কোন যুক্তিতেই আমরা ট্রান্স-আটলান্টিক ভূগোলের কেউ নই। অথবা কোন বড় অর্থনৈতিক স্বার্থ বা অর্থনীতির কেউ হই নাই। তাহলে আমরা এমএসসি তে গেছি কেন?? কোন সুখে?? আমাদের কোন স্বার্থই এখনও নাই, হয় নাই যে ওমন সভায় যাওয়া যখন প্রয়োজনীয় হয়েছে!! একমাত্র যদি আমাদের অপমানিত হবার সাধ না হয়ে থাকে! অথচ কার সামনে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে ক্ষমতা রক্ষার বন্দোবস্ত কখনও দুনিয়াতে কেউ অর্জন করতে পারে নাই।
    এই হল সরকারের প্রথম মারাত্মক অসংগত আচরণ!
    ফলে যেন নিচা হবার জন্য ওখানে মোমেন গিয়েছেন!
    ঘটনা হল, ঐ এমএসসি সংগঠন জন্ম থেকেই কোল্ড ওয়ার যুগে এন্টি-সোভিয়েত এক ডায়লগের জোট। কিন্তু একালে সেসব হারিয়ে তা এখন কার্যত এক চীন-বিরোধী টান্স-আটল্যান্টিক জোট হয়েছে। তাও আবার এখন এমন এক সময়ে যখন ইইউ বাইডেনের সাথে আর এক সুরে নাচবে না, স্টেপ মিলাবে না – সেটাই এখন সবখানে একেবারেই স্পষ্ট। যেমন ইউক্রেন ইস্যুতে ইউরোপ বাইডেনের সাথে হাত ধরে হাটছে না, পা ফেলছে না…।
    তাহলে সেরকম একটা জোটের সভায় গিয়েই হাসিনাকে তার চীনের সাথে সম্পর্কের গভীরে যাওয়াটা উচিত-অনুচিত যাই হোক, কেন তাকে তার সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গাইতে ঐ সভায় যেতে হবে?? আর জয়শঙ্করের কাছে কেন? সে কে??
    কোয়াড জোট – তা অবকাঠামোর জন্য স্বল্পসুদের ঋণ দিবার সংগঠন নয় – এর সে মুরোদও নাই এটা তেমন জোটও নয়। সারা দুনিয়া এটা জানে। তাহলে কোয়াড এমন ঋণ দিতে পারলে তবেই আমরা কোয়াডে যাব অথবা চীন এমন ঋণ দিতে পারে কেবল এজন্যই আমরা চীনের কাছে গিয়েছি – এসব বয়ান তুলে ধরতে মিউনিখ যাওয়া কেন? আর অপমানিত হওয়া কেন? দুনিয়া সম্পর্কে আমরা কী এতই বেখবর??
    প্রথমত ভুল অথবা সঠিক দিদ্ধান্ত আমরা যেটাই নেই না কেন কারও কাছে জবাবদিহিতার সম্পর্ক আমাদের হতেই পারে না। এর মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করার মত কোন কাজ কোন ঘটনাই থাকতে পারে না। অপমানিত হওয়া ছাড়া। আর সেটাই মোমেন করেছেন, যেকোন সম্ভবত কোন উপদেষ্টা, কারও বোকামি নির্দেশে।
    কোয়াডের কথাই যদি এসময় মাথায় থাকে তাহলে এর বাস্তবতাটা হল এখন ইউরোপ-আমেরিকা একই চোখে ঘটনা দেখছে না। এমনকি কোয়াডের চার দেশই একই তালে নাই। অকাস সামরিক জোট গঠনই এর প্রমাণ। আবার পরিণতিতে অকাস (AUKUS) বা কোয়াড (QUAD) দুটাই স্থবির। বরং আমেরিকার বাংলাদেশে অবরোধ দেওয়ার গ্লোবাল পলিটিক্যাল সোজা মানেটা হল বাইডেনের কাছে অকাস বা কোয়াড কোনটাই আর ফোকাসে নাই। তার ফোকাস এখন বঙ্গোপসাগর- সেভেন ফ্লিট ইত্যাদি এসব। আর বঙ্গোপসাগর- সেভেন ফ্লিট মানেই ভারতের সাথে আমেরিকার জন্মের সর্ববৃহত স্বার্থ-সংঘাত হবে সেটা।
    আবার খোদ ভারত-ই কী এখন কোন জোটে কারও সাথে আছে?? আজ বাইডেন তো কাল পুতিন – এই অবস্থায় চলে গেছে ভারত; পা কাঁপছে। ওদিকে পুতিনও ভারতের উপর ভরসা করে বসে নাই। তাহলে পুতিনের পাকিস্তানের ইমরানের সাথে ঘনিষ্ঠতার নয়া যুগ শুরু করত না। ইমরানের সাম্প্রতিক রাশিয়া সফর ইঙ্গিত করে যে পাকিস্তানের জন্মের পরে এই প্রথম সে মেরু বদল করছে। যার মানে পুতিনের কাছে ভারতের চেয়ে পাকিস্তান বেশি গুরুত্বপুর্ণ এখন। তাহলে এই পরিস্থিতিতে ভারতকেই পুতিনের কাছে যেতে হবে নিজ তাগিদেই, সব অপমান বা তুচ্ছ হবার কথা জেনেই।
    তাহলে মোমেন কোন ভারতের কাছে যাচ্ছে, নিজ চীনের সাথে সম্পর্ক এর সাফাই দিতে যাচ্ছে কেন? হাসিনার সরকারের ভারতের কাছে ঠেকা টা কোথায়? কে ভারত? কোন ভারতের কাছে সে যাচ্ছে??
    এক হতে পারে যদি সরকার পরে যায় তো কর্মিদের আশ্রয়স্থল হতে পারে এমন কাজে লাগা ছাড়া এই “একাকী” হয়ে পড়া ভারত হাসিনার কেউ না। কোন কাজে লাগবে না। এটা হতেই পারে ভারতের মাধ্যমে আমেরিকা চলতি সরকারকে এককালে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। কি সেই কৃত্যজ্ঞতা তো ২০১৪ সাল থেকে মিটে গেছে।
    কেউ কার কাছে সাফাই দিয়ে ক্ষমতায় থাকা যায়নি, যাবে না।
    আর মোমেন সাহেব কোন মিটিংয়ে যাবার আগে ঐ হবু মিটিংয়ের ফরমাট আগে জেনে নিয়ে তবেই তার যাওয়া উচিত। আপনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আপনাকে মাটিতে রেখে ডায়াসেে বসবে ভারতের জয়শঙ্কর – এই ফরমাট কখনও গ্রহণযোগ্য নয়। যেকোন ধরণের বাংলাদেশের সরকারের জন্যই এটা ইজ্জতের প্রশ্ন।
    প্রটোকল প্রটোকল বলে চেচিয়ে লাভ নাই, প্রটোকল আগে বুঝতে হবে। কোন প্রটোকল চিন্তায় মোমেন সাহেব মিউনেখ গেছিলেন?? এখানে হাসিনার লাভালাভের চিন্তায় তিনি কিছুই হাসিল করতে পারেন নাই, উলটা তিনি বাংলাদেশের মান-সম্মান ডুবিয়ে দিয়ে এসেচেন।

    সবশেষ হাসিনা সরকারের কী হবে এটা এখন অবজেক্টিভ বাস্তবতায় নির্ধারিত হবে। সাবজেক্টিভ কর্তা হিসাবে হাসিনা তাতে হাত ঢুকায়ে কিছুই আগাবে না – এমন শত মিউনিখ মিটিং সরকারকে রক্ষা করতে পারবে না! লাভের লাভ হবে অপমানিত হয়ে ফিরে আসা…! আর সেটাও সরকারের বিরুদ্ধেই যাবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com[লেখাটার প্রথম ভার্সান আজ (২২ফেব্রু ২০২২) সকালের সরাসরি আমার ফেসবুকে দেয়া হয়েছিল।
    পরে তা আরও আপডেট করে, আমার এই ওয়েব সাইটে দেয়া হয়েছে। আর সেই ভার্সান টাই ফিরে লোড করা হল  আজই আমার ফেসবুকে এখনই সকাল ১১ঃ৩৪ এ।
    এই আপডেটে অনেক নতুন তথ্য সংযোজন করা হয়েছে।]