Tag: America

  • নেতাজীকে নিয়ে মোদি-মমতার বিবাদে

    নেতাজীকে নিয়ে মোদি-মমতার বিবাদে

    গৌতম দাস  ৩১ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3TZ

     

    [সার-সংক্ষেপঃ রাজনৈতিক আন্দোলনে সশস্ত্র ধারায় অথবা নিরস্ত্র গণ-আন্দোলনের ধারা হতে পারে।  কিন্তু সশস্ত্র ধারা হলেই সেটাকে উচ্চমার্গের আন্দোলন মনে করা অর্থহীন ও ভুল মাপকাঠির জ্ঞান। এর উপর যদি সে সশস্ত্রতা আবার হিটলারের ধারার যুদ্ধের ক্যাম্পের সাথে যুক্ত হয়ে করার চেষ্টা হয় অর্থাৎ যার অর্থ হল স্বাধীনতা বা ‘ফ্রিডম’ নিয়ে কথা বলা অথচ রাজনীতির ঠিক নাই। কী রাষ্ট্র তারা গড়বে সেটাও শেখানে বেখবর-ই থাকে! ভারতের নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ঠিক এরই প্রতীক।  তিনি জাপানের সামরিক সহায়তায় বৃটিশ শাসন উচ্ছেদ করতে মন-কামনা করেছিলেন যা ব্যর্থ হয়।  ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি এদেরও হিটলারের আদর্শী ও অনুসারী। আরএসএস লেবেলে হিটলারের কাজ-ততপরতা নিয়ে তাদের উচ্ছাসমূলক অবস্থান দেখা যায়। কারণ তারা চরম জাতিবাদি – এথনিক ক্লিনজিং বা এথনিক জাতিকে নির্মুল করা জায়েজ মনে করার রাজনীতি করে। যদিও এখানে আমরা দেখব, ভারতের মোদি ও মমতা দুই রাজনীতি করলেও একই ‘নেতাজীকে’ দখল নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে তারা লড়ছে।]

              Taiwan offers to open national archive to ‘rediscover legacy’ of Netaji Subhas Chandra Bose

    সুভাষচন্দ্র বসু (১৮৯৭-১৯৪৫) [Subhas Chandra Bose], বৃটিশ আমলে কলকাতার বাঙালি রাজনীতিবিদ এবং একসময়ে কংগ্রেসের সভাপতি;  যাকে কথিত পাবলিকের দেয়া খেতাব-নাম হল ‘নেতাজী’।  এখনকার কলকাতায় তাকে মূলত নেতাজী নামেই সবাই ডাকে ও পরিচিত।
    এই নেতাজী কিভাবে তিনি মারা গেছেন তা অবিশ্বাস করে এনিয়ে তাঁর কথিত “অন্তর্ধান রহস্য” বলে আলোচনা সেই পঞ্চাশের দশক থেকে প্রায়ই উঠেছে। কিন্তু একালে তৃণমূল কংগ্রেস দলের নেতা মমতা ব্যানার্জি এই নেতাজী ইস্যুকে মোদির বিরুদ্ধে মানে আরএসএস-বিজেপির হিন্দি-বলয়ের আক্রমণের বিরুদ্ধে একটা বড় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করেছেন। আর  কলকাতা বিজেপিকে কোণঠাসা করতে এটাকে হাতিয়ার করেছেন। কলকাতা বলতে এখানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রতীক হিসাবে দেখে বলা হচ্ছে এবং এই কলকাতা যা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানীও বটে।
    যদিও মমতার মূল তর্ক এখানে আসলে  – কলকাতা কী আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্ববাদের হিন্দু-বাঙালি অংশ? নাকি কলকাতার নেতা নেতাজীর বাঙালি, এই বাঙালি-হিন্দু এরা আলাদা এথনিক জাতি এবং এরা রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদের কোন অংশই নয়? এই তর্ক সামনে এনেই হিন্দুত্ব পরিচয়ের বাইরে হিন্দিবিরোধী বাঙালি-হিন্দু জাতিবাদের জোয়ার পশ্চিমবঙ্গে সফলভাবে তুলতে পেরেছিলেন তৃণমুল দলের সভাপতি মমতা বন্দোপাধ্যায়। আর তা পেরেছিলেন বলেই গত ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি-মোদিকে ঠেকিয়ে দিয়ে বিপুল বিজয়ী হয় তৃণমুল এবং তা থেকে তৃণমূলের মমতা এখন ক্রমেই মোদির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ফিগার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সম্প্রতি এক জনমত জরিপ সমীক্ষাতে মমতা কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর চেয়েও পপুলার রেটিংয়ে এগিয়ে থাকা নেতা এবং মোদির প্রতিদ্বন্দ্বি কেন্দ্রীয় রাজনীতিবিদ। ওই রিপোর্ট লিখেছে– “১৭ শতাংশ মানুষ বিরোধী দলের প্রধান মুখ হিসেবে দেখছেন মমতাকে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে দেখছেন ১১ শতাংশ”। কাজেই নেতাজী হলেন কলকাতার বাঙালি-হিন্দুর নেতা, আর হিন্দি-বলয়ের যারা এই নেতাজীকে নেতা মানে না তারাই বিজেপি – এই হল মমতার ডিফারেন্সিয়াল পয়েন্ট। আর মমতার এই “ভাগ দেখানো” বয়ানের সামনে কলকাতা বিজেপি পুরাপুরি অপ্রস্তুত ও বোকা! মূলত নেতাজী সুভাষকে নিয়ে তারা দ্বিধাগ্রস্ত; ছুড়ে ফেলবেন নাকি কোলে তুলে নিবেন তা জানেন না! কারণ এনিয়ে তাদের কেন্দ্রীয় বিজেপির থেকে কোনো দিকনির্দেশনা তারা কখনো পায়নি, সে রকম কোন ইঙ্গিত অবস্থানই নাই।

    ইন্ডিয়া টুডের জানুয়ারি সংখ্যার ‘মুড অফ দ্য নেশন’ সমীক্ষায় এই চিত্র ফুটে উঠেছে। সমীক্ষায় যোগ দেওয়া ১৭ শতাংশ মানুষ বিরোধী দলের প্রধান মুখ হিসেবে দেখছেন মমতাকে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধিকে দেখছেন ১১ শতাংশ মানুষ।

    এখন বিজেপি তার হিন্দুত্বের চোখে দেখা ভারতের নেতাজীকে কোনো নেতা মানবে কী? এর উত্তর দেয়া ছাড়া কলকাতা বিজেপিকে কলকাতার-বাংলায় “বাইরের লোক” হিসেবেই থাকতে হবে। মমতার এই ইঙ্গিতপূর্ণ বয়ান এজন্য মোদির জন্যও কণ্টকময়!

    গত তিন বছরে এনিয়ে বহু ধাক্কা খাবার পরে মোদি তাই এবার ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছেন। তিনি মমতার চ্যালেঞ্জের মুখে নিজে বাঁচতে নেতাজীকে ‘আপন” করে নেয়ার সিদ্ধান্ত-পরিকল্পনা এঁটে নিয়েছেন। গত ২৩ জানুয়ারি ছিল নেতাজী সুভাষের জন্মদিন। মোদি  ঐদিন দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে নেতাজীর হলোগ্রাম মূর্তির উদ্বোধন করেছেন। অর্থাৎ মোদিও এবার প্রতিযোগিতায় নেমে  মমতার কাছে নেতাজীর শেয়ার নিতে চাইছেন! কিন্তু এই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কে; কী তাঁর রাজনীতি?

    নেতাজী সুভাষের রাজনৈতিক জীবনঃ
    জওয়াহেরলাল নেহরু নেতাজীর চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় হলেও নেহরুর আগেই নেতাজী কংগ্রেস দলের সভাপতি হয়েছিলেন ১৯৩৮-৩৯ সালের সময়কালে। নেতাজী পড়াশোনা শেষে লন্ডন থেকে ফিরে ১৯২১ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে গান্ধীর কংগ্রেস দলে যোগ দিয়েছিলেন। যখন মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধীর বয়স ৫১ বছর। আর তখন নেতাজীর রাজনৈতিক গুরু বা মেন্টর [mentor] ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাস। এই চিত্তরঞ্জন দাস ছিলেন কলকাতার মেয়র, নামকরা ব্যারিস্টার আর এছাড়া কিছুটা আগ্রাসী জাতিবাদী। কিন্তু পরবর্তীতে গান্ধী আর নেতাজীর মধ্যে প্রায় প্রতিনিয়ত বড় রাজনৈতিক মতপার্থক্য দেখা দিতে শুরু করেছিল। তাদের মূল মতপার্থক্যকে ব্যাখ্যা করা যায় সম্ভবত এভাবে যে, গান্ধী রাজনৈতিক গণ-আন্দোলন করবেন, কিন্তু অহিংসভাবে। আর এর বিপরীতে সুভাষও রাজনৈতিক গণ-আন্দোলন করবেন কিন্তু রাজনৈতিক বলপ্রয়োগে, যতটা পরিস্থিতি অনুমোদন করে এবং সময় সুযোগ হলে সশস্ত্রভাবেও। গান্ধীর রাজনৈতিক চিন্তার চেয়ে সুভাষের রাজনীতি অনেক রেডিক্যাল এভাবেও সম্ভবত বলা যায়।
    এথেকে দীর্ঘ সময় দলের অভ্যন্তরীণ লড়াই সঙ্ঘাতে গান্ধী নেতাজীকে কোণায় বা আড়ালে ফেলে রাখার চেষ্টা করে গেছেন। আর এসবের পরিণতিতে নেতাজী দ্বিতীয়বার কংগ্রেস দলের কেন্দ্রীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৩৯ সালে ঠিকই কিন্তু গান্ধীর প্রবল বিরোধিতায় গ্রুপিংয়ের চাপে বেশি দিন টিকতে পারেননি; একপর্যায়ে সভাপতির পদ তিনি ত্যাগ করেন। এরই  আরেক পর্যায়ে ইনি কংগ্রেস দলও ত্যাগ করেন। পরে ঐ ১৯৩৯ সালেই তিনি ‘ফরওয়ার্ড ব্লক” নামে নতুন দল গড়েন। কিন্তু ওই বছরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বৃটিশদের বিরোধী জোটপক্ষ হিটলারের জার্মানি-জাপান জোটের সাথে বিশেষ করে জাপানের সহযোগিতায় ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র যুদ্ধের লড়াইয়ে নামেন। যদিও খুব বড় কোনো সফলতার ঘটনা সেটা ছিল না। এদিকে বিশ্বযুদ্ধ প্রায় শেষের কালে ১৯৪৫ সালে এক বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে বিধ্বস্থ বিমান থেকে তার শরীর আগুনে ঝলসে যায়। পরে এখনকার তাইওয়ান যার এক অংশ সেকালে জাপান কলোনি ছিল, সেখানকার এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার সমর্থকরা তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে “রহস্যজনক” বিমান হামলায় নিখোঁজ হয়ে যান ধরনের এক ফ্যান্টাসির বর্ণনায় বিশ্বাস করেন। এটাই তাদের চোখে নেতাজীর কথিত “অন্তর্ধান রহস্য”!  এই হল একেবারে সারাংশে সুভাষের জীবনী।

    কলকাতার বীর নেতাজীঃ
    কিন্তু সেই থেকে কলকাতায় ১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসন প্রত্যাহার ও কলোনি প্রশাসন গুটিয়ে চলে যাবার পরে বিশেষত কংগ্রেসবিরোধী মহলে নেতাজীকে এক বীর বানানোর তৎপরতা দেখা যায়। তারা নতুন করে গান্ধীর কংগ্রেসবিরোধী হয়ে নয়া বয়ান খাড়া করতে তৎপর হন। মূলত তরুণ ও পেটি মধ্যবিত্ত মহলে যা কথিত ‘অন্তর্ধান রহস্য’ এমন ‘রহস্যময়’; তাই নিশ্চয় আরো অনেক কিছু অজানা এ’ধরনের প্রপাগান্ডা যেটা সারবত্তায় এক গভীর কিন্তু ফাঁপা আবেগ তৈরি হয়েছিল। যদিও গান্ধী-নেহেরুরা বাংলার নেতাজীকে জায়গা দেয় নাই, মুল্যায়ন করে নাই ধরণের বঞ্চিতবোধ থেকে অভিমান গোসসা কলকাতায় সেই থেকে সবকালেই বেশ  সরব। বিশেষত তরুণদের আক্ষেপ হল, তাদের ভারত ‘স্বাধীন’ হয়েছে তারা জানছে; ‘স্বরাজ’ বা কথিত ব্রিটিশবিরোধী “স্বাধীনতার আন্দোলন” হয়েছে তাদের জানানো হচ্ছে কিন্তু বাস্তবে এটা তো টেবিলে বসে আপস আলোচনায় স্বাধীনতা পাওয়া বলেই তারা দেখছে। তাই এতে জোশ নাই!!!

    আর তাই  উত্তেজনাহীন স্বাধীনতা আন্দোলনের ঘটনা-বর্ণনার বিপরীতে এর বিরুদ্ধে তাদের সুভাষ বা নেতাজী (কলকাতায় তার সমর্থকদের দেয়া নাম) হলেন তাদের আসল সশস্ত্র যোদ্ধা – এই হল সেই বয়ান। আর যেহেতু হিন্দু-বলয়ে ভারতের প্রথম প্রতিভূ হল কংগ্রেস আর এর নেতা নেহেরু-গান্ধী যারা কলকাতার নেতাজীকে কোণঠাসা করেছিলেন, কাজেই কলকাতা বাঙালি-জাতিবাদের নেতা হিসেবে মমতা মোদিকেও দায়ী ও বিজেপিও  বাংলায়  বহিরাগত – এই ইঙ্গিত খাড়া করে চলছিলেন। আর সেটাই এবার মোদি সংশোধিত করে নিলেন।

    নেতাজীকে আমরা কী চোখে দেখবঃ
    প্রথমত কলকাতা শুরু (১৭৮৯) থেকেই আমাদেরকে গোনায় না ধরা আলাদা ভেবে এসেছে। বিশেষত পুর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ট জনগোষ্ঠি মুসলমান এরা আদৌ বাঙালি কিনা  বা বাঙালির অংশ কিনা এসব প্রশ্ন তুলেছে। তবে আমরা অবশ্যই সেকালের হিসেবে পূর্ববঙ্গ বা একালের বাংলাদেশের লোক। আমরা আমাদের মতই অবশ্যই বাঙালি, রক্ত দিয়ে স্বাধীন করে বাংলাদেশ পেয়েছি। তাহলে এখন আমরা কলকাতার ‘নেতাজী’কে কিভাবে দেখব? তৃণমূলের মমতার চোখে? নাকি কোনো প্রগতিবাদী চোখে?  এর জবাব হল – বস্তুতঃ  দুটোর কোনোটাই না। আসলে আমাদের চোখ মানে দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থ আলাদা হয়ে গেছে বহু আগে থেকেই।

    সে স্বার্থ দিয়ে চিনতে চাইলে – বাংলাদেশের মূল স্বার্থ হল, জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ, তাই বরাবর সেকালের জমিদারি ব্যবস্থা ও শাসনের বিরোধিতা ছিলাম এবং তা করে গেছি আমরা। ফলে এই সূত্রে জমিদার হিন্দুরা যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উপর মুসলমানবিরোধী ও বিদ্বেষী আধিপত্য কায়েম করে নিয়েছিল; আর মুসলমানরা বাঙালি নয় বা বাঙালি স্বীকার করত না, আজও সেসবের কালচারাল প্রভাব ও জের অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমান দেখা যায়। সেই থেকে মুসলমানবিদ্বেষের প্রচলন শুরু হয়েছিল; যে কারণে আজও প্রগতিবাদ ও মুসলমানবিদ্বেষ প্রায় সমার্থক!
    তাই আমরা দেখেছিলাম, আমাদের পূর্ববঙ্গ বা একালের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৯৪৭ সালে একমাত্র বাংলার ভাগ হওয়াই ছিল আমাদের স্বার্থ। কারণ বাংলা ভাগ ছাড়া জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ সম্ভব ছিল না। তাই বাংলা ভাগ মানেই হয়ে যায়, সেকালের পূর্ববঙ্গ বা একালের বাংলাদেশের স্বার্থ।

    এর বাইরে আমাদের জন্য অন্য কোন অপশন খোলা ছিল না। তাই ১৯০৫ অথবা ১৯৪৭ সালে দু’বারই যারাই বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেছে দেখা গেছে তারা জমিদার হিন্দুস্বার্থের লোক; প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ তাদের স্বার্থের লোক। এজন্য আমাদের স্বার্থ কী তা বুঝবার সোজা ফর্মুলা হল, যারাই ১৯০৫ অথবা ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেছে এরাই আমাদের বিরোধী জমিদার-হিন্দু স্বার্থের লোক, আর এরাই প্রগতিশীল। আর প্রগতিশীলতাই তো শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির পদত্যাগ নিয়ে আন্দোলন পর্যন্ত আমাদের বিরক্ত করে চলেছে, পিছু ছাড়েনি। যেমন দেখেন, ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলন; অতএব বাস্তব ভিসির মুখে দাড়ি থাক আর না থাক ভিসি-ব্যঙ্গ করা ছবিতে ভিসির মুখে মুসলমানি দাড়ি লাগিয়ে তারা দিবেই! আর ভিসি অবশ্যই এবার ‘তালেবান’ হয়ে যাবেন! কারণ তাদের ভিসি তো কথিত ‘প্রগতিশীলতা’র বিরোধিতা করেছেন!
    তা হলে এত কথার সাথে এখানকার প্রসঙ্গ নেতাজী সুভাষের সম্পর্ক কী? প্রথমত, একটা রেফারেন্স জানিয়ে রাখি। গত ২০১৯ সালের আমার একটা লেখার শিরোনাম ছিল- “কলকাতার ‘নেতাজী’ কেন বাংলাদেশের কেউ না“। অর্থাৎ আমাদের অবস্থানটা কী, এর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এখন দরকার এর একটা আপডেট জানা।

    পুর্ববঙ্গের স্বার্থে নেতাজী কখনও অবস্থান দেখান নাইঃ
    এটা ঠিক নেতাজীকে পুর্ববঙ্গের স্বার্থের পক্ষে কখনও অবস্থান দেখাতে হয় নাই। একটা সুবিধা তিনি পেয়েছিলেন।  আসলে নেতাজী রাজনীতিতে এসেছিলেন ১৯২১ সালে, অর্থাৎ ১৯০৫ সালে তিনি রাজনীতিতে কেউ নন, মাত্র আট বছর বয়সী তিনি। আবার কার্যত ১৯৩৯ থেকেই তিনি মূলধারা রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন বা দূরে। আর ১৯৪৭ সালের দেশ বা বাংলাভাগের আগেই মানে ১৯৪৫ সালেই তিনি মৃত। এ ছাড়া পূর্ববঙ্গের কোনো সময়ে কোনো ইস্যুতে পক্ষ-বিপক্ষে  কোনো অবস্থান তার ছিল কী, জানা যায় না। তা হলে কী দিয়ে তাকে সুনির্দিষ্টভাবে বিচার মূল্যায়ন করতে পারি?
    তার জাপানের সহায়তা নিয়ে সশস্ত্র লড়াইয়ের তাৎপর্য কী? প্রথমত ব্রিটিশবিরোধী তার সশস্ত্র তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা ছিল না, হয়ে উঠতে পারে নাই। প্রশ্নটা আর একটু এগিয়ে স্বচ্ছ করে করতে পারি এভাবে যে, ব্রিটিশ শাসকরা কলোনি ভারত ত্যাগ করে চলে যাওয়ার পেছনে নেতাজীর গঠিত সেনাবাহিনী ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এর তেমন কোনো অবদানই নেই, ছিল না।

    মূলত ঘটনা হিসেবে জাপানের সহায়তায় নেতাজীর ব্রিটিশ-ভারতের সশস্ত্র বিরোধিতা ছিল খুবই সীমিত। সেই আক্রমণ ছিল ভারতের নর্থ-ইস্টের এখনকার রাজ্য নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমায়; ব্রিটিশ-ভারতের কোহিমা সীমান্তে এক-দুইটা বর্ডার-পোস্টে আক্রমণ মাত্র। যা ঘটনা হিসেবে খুবই নগণ্য, যেখানে কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমি দখলের কথাও জানা যায় না। তাহলে?

    বৃটিশ কলোনি-শাসকেরা কখনও কলোনির নিয়ন্ত্রণ হারান নাইঃ
    এবার সাধারণভাবে বলা যাক। ভারতে ব্রিটিশ শাসন ছিল মোট প্রায় ২০০ বছর (১৭৫৭-১৯৪৭)। এসময়ের মধ্যে কখনই কলোনি শাসকরা নিয়ন্ত্রণ হারায়নি। তাদের ক্ষমতা চ্যালেঞ্জড হয়ে যায়নি। তবু তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় হামলা আক্রমণের ঘটনা হল ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ, সেটাও নিয়ন্ত্রণ হারানোর মত কোন ঘটনা হয়ে উঠতে পারে নাই। এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল আমরা এই ঘটনাকে ডাকি সিপাই বিদ্রোহ বলে – সিপাই বিপ্লব বলি না।
    বিদ্রোহ মানে হল উপস্থিত শাসন অসহ্য হয়ে গেছে তাই মানছি না বলে উত্থান। কিন্তু এর পরে কোথায় যাব সেই পরিনতি পরিকল্পনা নিয়ে কোন ভাবনা নাই, এখনও দানা বাধে নাই। অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক হুশ-জ্জান বোধ তখনও নাই। একারণে ওটা বিদ্রোহ অবশ্যই  কিন্তু পরে ক করব এই রাজনীতিক প্রস্তুতি নাই বলে তা আর কোন বিপ্লব নয়। 

    আর তাই শেষে বৃটিশ শাসক ঐ বিদ্রোহকে “ওভার-পাওয়ার” করে বিদ্রোহ দমন করে ফেলতে সক্ষম হয়। পরে বিদ্রোহীদের ওপর ভয়ার্ত নৃশংসতা ঘটিয়ে এর শেষ হয়েছিল। ফলে তাদের শাসন ফিরে নিজেকে সংহত করে নেয় যদিও সেই থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলোনি দখল শাসনের বদলে সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের শাসনাধীন হই আমরা।
    অন্যদিকে, এছাড়া ব্রিটিশ ভারতে রাজনৈতিক আন্দোলন হয়েছে ১৯০০ সালের পর থেকে কলোনি ত্যাগের আগে পর্যন্ত সময়ে।  যেখানে ১৯০০ সালের আগে অনেক বিদ্রোহই হয়েছে – ইতিহাস এর সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই ব্রিটিশ শাসকের জন্য নিয়ন্ত্রণ হারানো তো নয়ই; বেগ পেতে হয় এমন কোনো উচ্চতার আন্দোলন সেগুলোর কোনোটাই ছিল না। কাজেই নেটিভ বা ভারতীয়দের কোনো আন্দোলনের কারণে কলোনি শাসকরা অখণ্ড ভারত ছেড়ে যায়নি।  আর অখন্ড ভারতে প্রথম রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের জন্মই যেখানে ১৮৮৫ সালে। তাই কথাটাকে আরো বড় প্রেক্ষিত থেকে বললে, এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকা মহাদেশের কোনো কলোনি হয়ে থাকা দেশের স্থানীয়দের আন্দোলনের ঠেলায় কলোনি শাসকরা তাদের মুক্ত করে দিয়ে পলায়ে যায় নাই। এমন উদাহরণ জানা নাই।
    বরং আমরা চোখ আরো বড় করে তাকাতে পারি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পরে কেবল ব্রিটিশ কলোনি দখলদার নয়; এর সাথে ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন ও নেদারল্যান্ডসসহ সব কলোনি দখলদারেরাই দখলদারি ছেড়ে সব দেশকেই কলোনিমুক্ত করে দিয়ে গিয়েছিল স্বেচ্ছায়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হলো, কোনো দখলী দেশের স্থানীয় আন্দোলন-সংগ্রামের কারণেই তারা সেই কলোনি ত্যাগ করে যায়নি। কলোনি মুক্তি ঘটেছিল কার্যত স্বেচ্ছায়। অর্থাৎ মামলাটা কেবল বৃটিশদের বেলায় নয়, সকল কলোনিদখলদারেরাই স্বেচ্ছায় ছেড়ে চলে গেছিল। কিন্তু কেন?

    হ্যাঁ, একটা ‘তবে’ অবশ্যই ছিল। সেটা হলো আটলান্টিক চার্টার চুক্তি যা স্বাক্ষরিত হয়েছিল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মধ্যে ১৯৪১ সালের ১৪ আগস্টে। ওই চুক্তিকে একটা দাসখত বলা যায় যেখানে চার্চিল রুজভেল্টকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, হিটলারের পরাজয়ের ওই বিশ্বযুদ্ধে বিজয় ঘটলে দুনিয়া থেকে সব কলোনি শাসনের সমাপ্তি টানা হবে। যুদ্ধ-পরবর্তী দুনিয়াতে আর কোন কলোনি শাসন থাকবে না। আর এই শর্তেই আমেরিকা বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, নেতৃত্বে বড় ভূমিকা নেয়া যুদ্ধের খরচের বেশির ভাগ একা বয়েছিল ইত্যাদি। আর এখান থেকে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব শুরু হয়েছিল।

    কাজেই নেতাজী সুভাষও অখণ্ড ভারত বা কলকাতার বিরাট ভূমিকা রাখা কোন রাজনীতিক হতেই পারেননি, ছিলেন না।

    তবে দ্বিতীয় আরেক প্রসঙ্গঃ
    নেতাজী সুভাষ আরেক বিরাট অবিবেচক কাজ করেছিলেন। তাঁর রাজনীতির বোধ-বুদ্ধির খামতি এখানে ধরা পড়ে। তিনি আসলে প্রথমে গিয়েছিলেন জার্মানিতে, সরাসরি হিটলারের সাথে দেখা করতে। কিন্তু হিটলার এশিয়ায় তাঁর সামর্থ্য নিয়ে আসতে ছড়িয়ে পরতে চাননি। ফলে অপারগতা প্রকাশ করে তিনিই  এশিয়ায় হিটলারের র্জামানির বন্ধু ও পক্ষশক্তি  জাপানের কাছে যেতে বলেন। আর সেখান থেকেই নেতাজীর জাপানের সাথে সম্পর্কের শুরু। ‘শত্রুর শত্রু আমার মিত্র’ এই ফর্মুলা অনুসারে এটা হয়ত জায়েজ বা  অন্যায় মনে হচ্ছে না। কিন্তু আসলে এটা অন্যায় এবং বিরাট ভুল-ও। কেন?

    প্রথমত ১৯৪২ সালের পয়সা জানুয়ারি থেকেই বিশ্বযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ একদম স্বচ্ছ হয়ে যায়। এমনকি মনে রাখতে হবে ঐ পয়লা জানুয়ারি জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা করার দিন।  যারা ঘোষণা করে দিয়েছিল যুদ্ধে জিতলে সেই নতুন দুনিয়াতে সব কলোনি শাসন নিষিদ্ধ থাকবে। অথচ নেতাজী নামে কথিত নেতা সেটার খবর রাখেন নাই। তার রিডিং বা ইতিহাস-পাঠই ভুল, ডাহা মিথ্যার উপর দাঁড়ানো। তাই তিনি অবলীলায় যাচ্ছেন হিটলারের কাছে??????? যারা এর বিপরীত পক্ষ!!!

    আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান বিজয়ী হলে, নেতাজীও হয়ত বিজয়ী হতেন! কিন্তু সেই ভারত অথবা বেঙ্গলের এই বিজয়ী নেতাজী আমাদের জন্য নিজেই এক হিটলার হতেন! রোহিঙ্গাদের শাসক বার্মিজ শাসক জেনারেলরা যেমন, ঠিক সেরকম!। কেন এমন কথা বলছি? জাপানিরা ১৯৪২ সালেই বার্মাকে ব্রিটিশ কলোনি শাসন থেকে বের করে নিজের অধীনে নিয়েছিল। এই অর্থে স্বাধীন করে দিয়েছিল। অং সান সু চির বাবাসহ ত্রিশজন বার্মিজকে জাপানিজ আর্মি বিশেষ ট্রেনিং দিয়েছিল। পরে তাদের নেতৃত্বেই এক সেনাবাহিনী গড়ে দিয়েছিল জাপানিরা যারা ব্রিটিশদের হাত থেকে বার্মাকে ‘মুক্ত’ করেছিল।
    আবার লক্ষ্য করা যাক,  ভারতের এত জায়গা থাকতে নেতাজী কোহিমায় গেছিলেন কেন? সেটা এজন্য যে, কোহিমা সীমান্তের ওপারেই ছিল জাপান সমর্থিত ঐ বার্মিজ বাহিনী। তাদের সাহায্যেই নেতাজী দুই একটা বর্ডারপোস্ট সাময়িক দখল নিতে পেরেছিলেন, যা টেকেনি।

    এখন আসেন কেন এখনকার বার্মার কথা তুললাম?
    আমার একটা লেখার শিরোনাম হল, মিয়ানমার কোন রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব। সেখানে দেখিয়েছি বার্মা কোনো রাজনৈতিক রাষ্ট্রই নয়। এর মূল তাতপর্য হল যেহেতু বার্মাকে ব্রিটিশমুক্ত করে দিচ্ছে জাপানিজ আর্মি। খুবই ভালো কথা হয়ত! মনে হতে পারে। কিন্তু ঐ জাপানের নিজের রাজনীতিক ব্যবস্থা কী ধরনের? জাপান তখন সরাসরি একটা রাজতন্ত্র। তাও আবার কিছু নৃশংস জেনারেলের এক সেনাবাহিনী সহায়তায় ওটা একটা সেনা-রাজতন্ত্রী দেশ; এবং এক এশিয়ান কলোনি শাসক। পুরা কোরিয়া (তখন দুই কোরিয়া এক অখন্ড) এবং চীনের প্রায় ২৫% তখন জাপান কলোনিদখল করে রেখেছে। অর্থাৎ সোজাসাপ্টা বললে, জাপান তখন বৃটিশের মতই কলোনিদখলদার কিন্তু রাজতান্ত্রিক সাম্রাজ্য। মানে  কোনো রাজনৈতিক রাষ্ট্রই নয়; কোনো জন-রাষ্ট্র বা রিপাবলিক নয়। আর যা রিপাবলিক নয়, তা কোন রাষ্ট্রই নয় এবং রাজনৈতিকও নয়। জনগণ বা পাবলিক বলে কোন শব্দ বা ধারণা প্রচলিত নাই। আছে রাজা-আমির আর এর বিপরীতে সবাই প্রজা।

    রাজনৈতিক রাষ্ট্র হওয়ার পূর্বশর্ত হল, দেশ-রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস সেখানে থাকে জনগণ। জনস্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে বলে স্বীকার করার প্রশ্ন তখন আসে। রাজা-শাসক বলে শেখানে কেউ থাকে না। আগে জনপ্রতিনিধি হতে হয়, তবেই সে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি।

    এমনকি এখনো জাপান কোনো রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। জাপানের ফর্মাল নাম ইউনিয়ন অব জাপান। নামের সাথে কোথাও ‘রিপাবলিক’ শব্দটা নেই যদিও সেখানে নির্বাচন হয়, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকে।অর্থাৎ তারা “গণতন্ত্রী” হয়ত কিন্তু কোন জনরাষ্ট্র, জনপ্রতিনিধিশীল রিপাবলিক রাষ্ট্র সেটা এখনও নয়।  আর এ কারণে সেকালে জাপানিজদের দেয়া সব ট্রেনিংয়ে বলাই বাহুল্য কোন রাজনীতি, পাবলিক, জনস্বার্থ, পিপলস রাইট ধারণাগুলো থাকে নাই; কাজ করে নাই। এ কারণে বলেছি, সেকালের বার্মা বা কলকাতার নেতাজী এরা রাজনীতি কী তাই জানতেন না, গুরুত্ব দেন নাই। অথচ স্বাধীনতা ফ্রিডম বলে চিল্লাইতেন! একারণে  বর্তমানেও বার্মা বা মিয়ানমার কোনো রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব যারা ওর ক্ষমতায় আছে, শাসন করছে মাত্র।

    সারকথাঃ যে নিজেই এক সেনা-রাজতন্ত্রী দেশ, সেই শাসক আমাকে স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার ট্রেনিং দিতে পারেই না।

    আর  একারণেই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কোন রিপাবলিক জনরাষ্ট্র গড়ার সৈনিক ছিলেন না। “রাজনীতি” বা পাবলিক শব্দের অর্থ না বুঝা নেতাজী কেবল সশস্ত্রতা আর সাথে স্বাধীনতা ফ্রিডম বলে চিল্লাইতেন। দেশের জন্য প্রাণ দেওয়ার কথা বলে আবেগী করে তুলতেন। অতএব তার জাপানের বিজয়ের পরিণতিতে এশিয়ার দেশগুলো হত একেকটা বার্মা – নেতাজীর  সেই পরিণতি হত একটা ‘গর্ভস্রাব’।  কাজেই এই নেতাজী আমাদের কেউ নন। যার মাথায় কোনো রাষ্ট্র চিন্তা, রিপাবলিক ধারণা নেই। আছে বরং হিটলারের দাগ লাগা কিছু দায় ও চিহ্ন!

    কাজেই এই নেতাজী আমাদের কেউ নন। যার মাথায় কোনো রাষ্ট্র চিন্তা, রিপাবলিক ধারণাই নেই। আছে বরং হিটলারের দাগ লাগা কিছু দায় ও চিহ্ন!

    কিন্তু তবু সাবধান! তৃণমূলের মমতাকে মোদির সাথে তার নেতাজী নিয়ে লড়াই করতে দিতে হবে; এটা আমরা নাকচ করব না। কারণ এটা ঠিক ‘নেতাজীকে’ নিয়ে কোনো লড়াই নয়। নেতাজীর আড়ালে এটা মোদির হিন্দুত্বে ভারতের অধীনের কলকাতা নাকি বাঙালি হিন্দুর কলকাতা থাকবে, এর লড়াই এটা।  এটাই কলকাতা বা মমতার নিজস্ব লড়াই – নিজি মামলা – যেখানে আমরা কেবল কামনা করতে পারি হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মমতা বিজয়ী হোক! টিকে থাকুক!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২৯ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “মোদি-মমতার ‘নেতাজী’ বিবাদ” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক নিম্নমুখী ভাটাতে 

    ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক নিম্নমুখী ভাটাতে 

    গৌতম দাস

    ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Tp

    Capitol Hill’s Advocacy on US-India Ties: Devolution of Three Decades Of Progress

     

    ঘটনা এখানে দু’টা কিন্তু কারণ একই। বাংলাদেশ মার্কিন অবরোধের পাল্লায় পড়েছে। আর ওদিকে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক দূর থেকে দূর-অস্তে চলে যাচ্ছে। সেই সুত্রে, কোন ভারত-ঘনিষ্ট ও নির্ভরশীল কোন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্র্ককের সুযোগ ও সম্ভাবনাঢ় বাস্তবতা ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে। এখন বাংলাদেশে মার্কিন অবরোধ না হয় দেখা-বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু তা বলে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ভাটায় চলে যাবে কেন?

    যদিও এটা ঠিক, প্রথমটার জন্য দ্বিতীয়টা ঘটছে  ব্যাপারটা ঠিক এমন নয়। তবে, সম্পর্কিত। কিভাবে? যেমন গত ১০ ডিসেম্বরের মার্কিন অবরোধ আরোপের যে ঘোষণা সেটা কেবল বাংলাদেশের উপর না আরো অনেক দেশসহ সবার বেলাতেই সাধারণভাবে বলা হয়েছিল  এই মার্কিন অবরোধের মূল কারণ – “মানবাধিকার লঙ্ঘন”। আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেনের ভাষায়, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি আর মানবাধিকার জড়াজড়ি করে থাকা শুরু হয়েছে… [to infuse human rights into its foreign policy,] । আর তা থেকেই, হ্যাঁ সেখান থেকেই বাংলাদেশে অবরোধ আরোপ আর ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ঝুলে পড়া – এ’দুই ঘটনার পেছনের কারণ একটাই আর তা হল – (আমেরিকার ভাষ্যমতে) মানবাধিকার লঙ্ঘন। যেটা বাংলাদেশের বেলায় র‌্যাব এই প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা বিষয়টা মুখ্য, আমেরিকা সেটাই বলছে। আর ভারতের বেলায় মুখ্যত কাশ্মিরের স্বাধীনতা-স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়া, ৩৭০ ধারা বাতিলসহ জবরদস্তি কাশ্মির ভারতের মূল ভূখণ্ড বলে জুড়ে নেয়া, এই মানবাধিকার লঙ্ঘন। ঘটনা দু’টার ‘মিলের জায়গা’ এখানেই।

    ভারতে নিজস্ব ব্যবসায়ীদের অর্থে পরিচালিত একমাত্র থিংকট্যাংক ওআরএফ [ORF] বা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন। এই ওআরএফ-এর এক নিজস্ব রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল গত বছর বাইডেনের শপথ গ্রহণের পরে ২৩ এপ্রিল ২০২১। ওই রিপোর্টের শিরোনাম : হিউমান রাইটস ও মার্কিন ফরেন পলিসি : ভারত ও চীনের ওপর এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া [Human Rights and US Foreign Policy: Implications for India and China]। যার প্রথম অংশে চীনের বিরুদ্ধে উইঘুরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যতকিছু অবরোধ দেয়া হয়েছে এর তালিকা দিয়ে ভারতের জন্য তা উপভোগের, এমন ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। কিন্তু রিপোর্টের দ্বিতীয় অংশ ছিল ভারত প্রসঙ্গেঃ বলাই বাহুল্য তা ভারতের জন্য ছিল খুবই হতাশার। এমনকি সেটা প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল উপ-শিরোনামেই। সেটা এমন : ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের (বিরুদ্ধে) ক্যাপিটাল হিল-এর অ্যাডভোকেসিঃ পরিণতিতে গত তিন দশকের সম্পর্ক অগ্রগতির উল্টা-ভ্রমণ [Capitol Hill’s Advocacy on US-India Ties: Devolution of Three Decades Of Progress]।

    ‘ক্যাপিটল হিল’ বলতে আমেরিকান কংগ্রেস বা সংসদ বিল্ডিং কমপ্লেক্স বুঝানো হয় যেখানে কংগ্রেস সদস্যরা আইন প্রণয়নের জন্য বসেন বা মিলিত হয়ে থাকেন। যেখানে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বার্ষিক “স্টেট অব দা ইউনিয়নের” ভাষণও দিয়ে থাকেন। আর সেখানেই ট্রাম্প আমলের শেষের সময় থেকেই ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রসঙ্গে একের পর এক প্রস্তাব পাস হয়েছে। তা কখনো ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দু’দলই (বাই-পার্টিজান) মিলে, আবার কখনো একা ডেমোক্র্যাট সদস্যদের উদ্যোগে। ওআরএফ-এর ওই রিপোর্ট, পাস হওয়া ওমন সব প্রস্তাবের তালিকা দিয়েছে। এনিয়ে বিস্তারে যেতে আগ্রহিরা দেখতে পারেন – Table 2: Comparison of tabled resolutions on India’s abrogation of Article 370 in Kashmir]।  আর সেখান থেকেই এই রিপোর্টটা অনুসিদ্ধান্ত টেনেছে যে, বিগত ৩০ বছর ধরে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের যে ধারাবাহিক অগ্রগতি, তা এখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব প্রস্তাবের ভেতর দিয়ে উল্টা নিম্নগতি বা ভাটার পথে হাঁটা দিয়েছে। যদিও রিপোর্টটা শুরুতে আমেরিকা এতদিন ভারতকে কত কী খাতির করেছে ও গুরুত্ব দিয়েছে এ নিয়ে অজস্র প্রশংসা ও ভারতের সুখ স্মৃতির বর্ণনা দিয়েছে। এমনকি এটাও লিখেছে যে, আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও তৎপরতা বলে যা কিছু আমেরিকা করেছে তা ভারতের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে ও ফোকাসে রেখেই করা হয়েছিল। আর তা থেকেই তা আসলে এখন কত তীব্রভাবে ভেঙে গেছে, তিন দশের ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক অগ্রগতি এখন কতটা উল্টা-ভ্রমণ করছে বলে তা হতাশার, কত গভীর বেদনা-বিধুর তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ওই রিপোর্টে।

    কিন্তু পাক্কা তিন দশক বা ৩০ বছর কেন?
    দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানের কোনো ঘটনার অনেক স্মৃতি বা পুরানা গুরুত্বপূর্ণ দিক-পটভূমি হারিয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়; কাশ্মির ইস্যু যেখানে প্রায় পঁচাত্তর বছরের পুরানা ঘটনা। এদিকে ভারতের মিথ্যা প্রপাগান্ডায় অনেকের আজ মনে হতে পারে শুরু থেকেই (১৯৪৭-৪৮) কাশ্মিরিরা বোধহয় ‘সশস্ত্র’ প্রতিবাদ করা “জঙ্গি-টেরর” , ফলে তারা খারাপ লোক! অথচ এই প্রপাগান্ডা ভিত্তিহীন, একেবারে ফ্যাক্টস লুকানো বা উল্টেদেয়া কথা। অথচ মূল ঘটনা গত ১৯৮৭ সালের কাশ্মির রাজ্য নির্বাচনে পরিকল্পিত ব্যাপক কারচুপি। ঐ নির্বাচনে রাজীব গান্ধী-ফারুক আব্দুল্লাহ (মানে তখনকার কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ও কাশ্মির ন্যাশনাল কংগ্রেসের ফারুক আবদুল্লাহর দলকে জিতানোর) এদের যৌথ ও ব্যাপক কারচুপি করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকেই কেবল সাধারণ কাশ্মিরিদের সশস্ত্র আন্দোলনের শুরু হয়েছিল। কিন্তু তাদের এই কারচুপির পক্ষে গোপন ভাষ্যে সাফাই কী ছিল?
    তাদের খোড়াযুক্তি আর কানে-কানে প্রচার করা সাফাইটা ছিল যেহেতু ঐবছর মুফতি মোহম্মদ সাঈদের নেতৃত্বে কিছু ইসলামি দলের একটা জোট নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং তারা পপুলার ও জিতে যাবার প্রবল সম্ভাবনা; অতএব এদেরকে যেকোন উপায়ে ঠেকানো জায়েজ।  এককথায় বললে রাজীব-আব্দুল্লাহর অন্যায় জোট কাশ্মিরে আইনি রাজনীতি, প্রকাশ্য ও কনষ্টিটিউশনাল রাজনীতি আর থাকবে কিনা সে পরোয়া করলেন না। এনিয়ে আরেকটু বিস্তারিত লেখা এখানে আগ্রহিরা পড়তে পারেন।  তারা আইনি রাজনীতিক ব্যবস্থায় কবর দিয়ে হলেও কারচুপি করে মুফতি সাঈদের জোটকে পরাজিত দেখানোর জিদে ডুবে গেলেন।  আর তা থেকেই আর নির্বাচন নয়, সশস্ত্রভাবে আন্দোলন ও প্রতিবাদ জড়ো করতে হবে – এই রাজনৈতিক ধারা কাশ্মিরে মূল ফোকাস হয়ে উঠেছিল। আর তাতে এর বিপরীতে আস্তে আস্তে বিজেপি নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ির উত্থান ঘটেছিল। কাশ্মিরের রাজনীতির এই সশস্ত্র প্রকাশের কারণ হিসেবে তিনিই প্রথম মিথ্যা বয়ান চালু করলেন। তিনি দাবি করতে থাকলেন, ভারতের নিকৃষ্ট কারচুপির তৎপরতা নয় বরং উল্টা ‘সীমা পার কি আতঙ্কবাদ’ এই ভাষ্য নিয়ে আসেন। অর্থাৎ পাকিস্তানই এর জন্য ‘দায়ী’। তারা সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র ও জঙ্গি-টেরর ভারতের কাশ্মিরে পাঠানোর মাধ্যমেই ভাররের কাশ্মিরকে অশান্ত করা হয়েছে। এই মিথ্যা বয়ান তিনি শুরু করেছিলেন। আর আমেরিকা প্রথমে প্রচ্ছন্নভাবে পরে ২০০১ সালের পর থেকে খোলাখুলি ওয়ার অন টেররের নামে এর ভিত্তিতে ভারতের সাথে তথাকথিত জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বয়ানে গ্লোবাল জোট বেঁধে ছিল।

    সেই ১৯৮৭ সালের পর থেকে হিসাব করলে, গত তিন দশকের ভারত-আমেরিকা সেই সম্পর্কেরই এখনকার ভাটা বা নিম্নগতির শোক আর হতাশা নিয়েই ওআরএফ-এর এই রিপোর্ট। মজার কথা হল – এই বাজপেয়িকেই তিনি  নাকি এক ‘বিরাট নরম মনের মানুষ যিনি কাব্য এবং সাহিত্যচর্চাও করেন’ বলে ভারতের অনেকে প্রচার করে থাকেন। তার কবিতা নিয়ে গান রচনাও করা হয়েছে, এভাবে তার ইমেজ নির্মাণের চেষ্টাও আমরা দেখেছি। অথচ তিনি হলেন প্রথম হিন্দুত্ববাদী যিনি সেই থেকে কাশ্মিরকে অশান্ত করা ও হত্যাকাণ্ডকে সাফাই যোগানদার প্রধান নায়ক! ভারত যখন কাশ্মিরে ব্যাপক কারচুপি, এই বিরাট অনৈতিক কাজ করে আত্ম-অপরাধবোধে হতাশায় ভুগছিল তখন এই বাজপেয়িই অসৎভাবে উল্টা পাকিস্তানকে দায়ী করে ভারতীয়-মনকে আত্ম-অপরাধবোধ থেকে বের করে নিয়েছিলেন।

    বাজপেয়ি ২০০৪ সাল মে পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর ওদিকে আমেরিকাও ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক-বন্ধনের যাত্রা শুরু করেছিল এই বাজপেয়ির হাত ধরে এবং ওই একই মারাত্মক অসৎতার ওপর দাঁড়িয়ে; ব্যাপারটাকে আতঙ্কবাদ বা টেররিজমের বিরুদ্ধে তাদের ঐক্য হিসাবে দেখিয়ে। তাই ত্রিশ বছরের রেফারেন্সটা খুব হালকা কোনো দিন গণনা নয়। তবে ভারত-আমেরিকার ত্রিশ বছরের সম্পর্ক যে এবার ঢলে পড়ছে এর গুরুত্ব বাংলাদেশে ততটা টের পাওয়া না গেলেও গত বছর বাইডেনের আগমন বা শপথের সময় থেকেই তাই ভারত এ সম্পর্কে পরিষ্কার ছিল। বাইডেনের লক্ষ্য ছিল, তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা তুলে এর আড়ালে মূলত চীনকে বেকায়দায় ফেলবেন আর এভাবেই চীনের সাথে লড়বেন, এই ছিল পরিকল্পনা। আর এই সূত্রে ভারতকেও বধ করার ইচ্ছা জেগে ওঠে। কারণ এটা আমেরিকার সব দল ও প্রশাসনের কাছেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল যে, ভারতকে খাতির করে যা লুটবার তা শেষ হয়েছে। এবার এশিয়ায় আগে বাড়তে গেলে আমেরিকাকে আর মেঘের আড়ালে থাকা নয়, সরাসরি নিজে মঞ্চে হাজির হতে হবে। আর মূলত এ কারণেই ভারত-আমেরিকা সম্পর্ককে এবার আসলে ঢেলে সাজানো, নতুন রূপ দেয়ার ইচ্ছা বাইডেনের বা ভারতের ভাষায় ‘অধোগতিতে বা ভাটায়’ প্রবেশ করা। আর এখান থেকে আমেরিকার দীর্ঘদিনের সুপ্ত ইচ্ছা বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর মোতায়েন – ভারত যেটার ঘোরতর বিরোধী; যেটাকে সে তার কুঁড়েঘরের পাশে আমেরিকার সাততলা বানিয়ে সেখান থেকে ভারতের বেডরুমের দিকে নজরদারি হিসাবে দেখে থাকে – সেই সুপ্ত ইচ্ছা এবার ভারতকে উপেক্ষা করে তা বাস্তবায়নের ফেভারেবল বা  উপযুক্ত সময় হিসাবে দেখছে।

    অর্থাৎ বাইডেনের শপথের পর থেকেই ভারত জানত, ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ভাটায় প্রবেশ করে গেছে। তাই তাদের সুখের দিন, ভারতের নিজেকে ভুয়া হলেও ‘পরাশক্তি’ ভাব ধরার দিন, সেটাও এবার শেষ। এমনকি গত ৯-১০ ডিসেম্বর ২০২১ বাইডেন মানবাধিকার সম্মেলন বা ডেমোক্র্যাসি সামিট আয়োজনের দু’মাস আগে থেকেই ভারতও তৈরি হচ্ছিল। কারণ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর বা এক মাসেরও আগে থেকে ঐ সামিটের দাওয়াতি কার্ড বিলানো শুরু হয়েছিল এবং মোদিও ওই সামিটে আমন্ত্রিত হন। তবু ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের যে তাল কেটে গেছে এর সবচেয়ে ভাল প্রকাশ হল প্রথমতঃ, আমরা এখন খুজলে দেখব মোদি ওই আমেরিকান সামিটে অংশ নিয়েছিলেন কিনা আমরা বেশির ভাগ মানুষ তখন তা খেয়াল করিনি। যার মূল কারণ হল,  মোদির যোগদান তার নিজে দেশেই হাইলাইট পায়নি বা দেয়া হয়নি। ফলে বিদেশ মিডিয়াতেও তাই ঘটেছিল। অথচ ফ্যাক্টস হল মোদি ওই ডেমোক্র্যাসি সামিটে যোগ দিয়ে অনলাইনে বক্তব্য রেখেছিলেন। তবে ওটা মানবাধিকার সামিট হয়ে দাঁড়িয়েছিল মোদি যেখানে এক অনুচ্চারিত আসামি হয়ে ছিলেন!

    এসব অস্বস্তিকর সময় ও সভা মোদিকে মুখোমুখি হতে হবে; এ তো জানা কথাই ছিল। তাই এসব কিছুটা হাল্কা করতে ওর চার দিন আগে ৬ ডিসেম্বর ২০২১ মোদি রাশিয়ার পুতিনের (মাত্র পাঁচ ঘণ্টার) এক ভারত সফর আয়োজন করেছিলেন। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় তাদের কোনো তৎপরতাকে যা মানে দিতে চায় সেই ফরমায়েশ মাফিক  রিপোর্টটা পাওয়া যায় দ্য-প্রিন্টের জ্যোতি মালহোত্রার লেখায়। কিন্তু যেখানে আবার রেগুলার বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং, এটা পাওয়া যাবে ওই একই দ্যা প্রিন্টের নয়নিমা বসুর লেখায়। নয়নিমারা হল ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বিটের সেসব সাংবাদিক যাদেরকে মন্ত্রণালয় বিশ্বাস করিয়েছে যে “ভারত একটা পরাশক্তি” হয়ে গেছে। আর তারা কোন সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকুক বা না তারা এটা বিশ্বাস করা সাংবাদিক। তেমনই আরেকজন হল, দ্যা-হিন্দুর সুহাসিনী হায়দার। সে যাই হোক, গত ৬ ডিসেম্বর মালহোত্রা লিখলেন, পুতিনের সফর নাকি এক ‘ডিফাইনিং মোমেন্ট’। কিন্তু ঠিক কী কী ডিফাইন করে বা নয়া মানে দাঁড় করানোর মুহূর্ত ছিল সেটা – তা আজো কেউ বলল না বা জানে না। এর মূল কারণ, ভারতের সব মিডিয়া এমনকি ইন্ডিয়ান বিবিসিও এর মানে দেয়ার চেষ্টা করেছে যে, তারা চীনের নাম উল্লেখ করে “চীনকে মেসেজ দিচ্ছে_ বলে জানিয়েছে। অথচ ঘটনা তো এখানে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ভাটায় পড়েছে, খতম হয়ে যাচ্ছে – সেটা! তাহলে চীন এলো কোথা থেকে ও কেন?

    আসলে বাইডেনের আমেরিকার সাথে ভারতের বিশেষ খায়-খাতির আর ভারতই হল ‘ইন্দো-প্যাসিফিকের ফোকাস” বা সব কিছু ইত্যাদি বলে  বা কোয়াডের সদস্য বলে যে হামবড়া ভ্যানিটি আগে দেখাত সেটার একেবারে  সমাপ্তি ঘোষণা না হইয়ে গেলেও সব ঢিলেঢালা হয়ে যাচ্ছে; এটা আর লুকানো থাকছে না। আর সেই কথা টের পেয়ে যেন এখনভারতের পাশে আমেরিকা আর নাই – ফলে  এই ভারত আবার কোনো চীনা হামলার শিকার না হয়ে যায় – মূলত এই ভুয়া অনুমানের ওপর দাঁড়িয়েই পুতিনের সফর এটাকে ভারতের ‘চীনকে দেয়া মেসেজ’ হিসেবে দেখতে বলছে ভারতের মিডিয়া। মালহোত্রার লেখার শিরোনাম খেয়াল করেন, [Putin’s visit is a defining moment for India-Russia ties. It’s a telling message to China]।

    এরপরেও এখন অনেকের মাথায় প্রশ্ন আসতে পারে, বুঝা যাচ্ছে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এখন ভাটায় চলে গেছে। তার মানে কি এটা আবার আগামীতে কখনো জোয়ারে উঠতে পারে?
    অথবা একই প্রশ্নকে অন্য দিক থেকে হাজির করলে – যেমনঃ ভারতের কাশ্মিরের মানবাধিকার লঙ্ঘন অথবা একালের প্রায় সারা ভারতের মুসলমানদের নির্মূল করো অথবা এথনিক ক্লিনজিং করো ইত্যাদিতে আরো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে পড়ে ভারত আমেরিকার হাতে অভিযুক্ত হয়ে যাবার ভয়েই কি ভারতের দিক থেকে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া? এটাই কি একমাত্র কারণ?

    এর জবাব হলো – না, এর অন্য আরেক বিশাল কারণ আছে। সেটা হল, আগামী ২০২৪ সালের নির্বাচন!

    আগামী ২০২৪ সালে নির্বাচনে বিজেপি বা ওর হিন্দুত্ববাদই নির্মূল হয়ে যেতে পারে :
    একালের ভারতে বিজেপি-আরএসএস বা মোদি একেবারে চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া মানে হিন্দুত্ববাদ প্রথমবারের মত উৎখাত হয়ে যাবার মত অবস্থায় পড়েছিল গত বছর। গত মধ্য মার্চে ভারতে নেমে এসেছিল করোনাভাইরাস আক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় আক্রমণের ঝড়! সারা ভারত তাতে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। অক্সিজেন, বেড আর সৎকার, এসব পাওয়ার পুরাপুরি অনিশ্চয়তা – এটাই হয়ে উঠেছিল ভারতের মুখ্য পরিচয়। আর মোদি যার প্রতীকী এবং এক অসহায় প্রধানমন্ত্রী রূপ। সৌদি আরব অক্সিজেন ভরা ট্যাংকার পাঠিয়েছে কার্গো প্লেনে করে কিন্তু তা দেখাতে গিয়েও মোদির ইজ্জত যায় অবস্থা! যেন মুসলমান সৌদি আরব তো নিচা; তার সাহায্য মোদি নিয়েছে এটা কেমন দেখায়? আর তা দেখেই দ্যা-হিন্দুর সুহাসিনী হায়দার  প্রথম নিশ্চিত হয়েছিলেন যে ভারত আসলে  নিশ্চয় কোন পরাশক্তি নয়!!! নইলে সৌদি সাহায্য নিবে কেন???

    জীবিত মানুষ আর মৃত-লাশের গভীর সম্পর্কঃ
    মানুষ মারা যাবার পরে একটু সম্মানজনক সৎকারও যদি নাই জোটে তাহলে আর বেঁচে থাকতে আমি হিন্দু কি না, আমার হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠ কি না এসব গল্পে কাম কি? এসব কোনো কাজে লাগবে? এর কি কোনো জবাব আছে? আসলে এসব প্রশ্ন ছেয়ে ফেলেছিল সে সময়ের মোদির হিন্দুত্বের ভারতে!   মূল কারণ, মানুষ মূলত যেকোন মৃতব্যক্তির লাশের মধ্যে নিজেকে দেখে, দেখতে পায়, সে মরলেও তাকে কোনো অশ্রদ্ধা অসম্মান করা হবে কিনা – ব্রিজের উপর থেকে তাঁর লাশও নদীতে ফেলে দেয়া হবে কি না! বা নদীর ধারের বালিতে লাশ ফেলে পালিয়ে আসবে কি না কিংবা, নদীর পাড়ে কোনোমতে বালিচাপা দিয়ে পালাবে কি না; অথবা যা পরে ভাসেতে ভাসতে গঙ্গা নদী ধরে আরেক রাজ্যে পঁচা-গলা লাশ হিসাবে উঠবে কীনা …… ইত্যাদি। সারা ভারতের মানুষ এসব দেখে মানে নিজের সম্ভাব্য পরিণতি দেখে আঁতকে উঠেছিল!!! ভারতের মানুষেরা নিজের এই পরিণতি এই অপমান অশ্রদ্ধা দেখে ফেলেছিল। এসব কাণ্ড যেকোনো মানুষের জন্য নিজের বেলায়ও ঘটতে পারে, এই অনুমান- আর এই অনুমান নিয়েও এর পরে বেঁচে থাকা অর্থহীন! আর এসব ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন মোদি! এটা একা কোনো ভারতীয় মানুষ নয়। সারা ভারতের মানুষের কাছে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল এই জীবন, তাদের এই বেঁচে থাকা কী দরকার; এটা অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন? হিন্দুত্বের মোদি ভারতের প্রতিটা মানুষকে এমন অভিজ্ঞতা ও অনুভব এনে দিয়েছিলেন!
    মোদি এসব জানতেন যে তার সম্পর্কে মানুষের গভীর মনে অন্তঃস্থলে তিনি কী পরিচয়ে আছেন?? তিনি প্রচন্ড ভীত হয়ে পড়েন!

    সেই ঘটনাকাল ছিল মোদির দ্বিতীয় টার্মের মাত্র দ্বিতীয় বছর শেষে (২০১৯ সালের মে মাস থেকে তিনি সেকেন্ড টার্মের প্রধানমন্ত্রী)। তবু মোদি বুঝে যান, আশঙ্কিত হন যে, তার হিন্দুত্ববাদের আয়ু এবার এসব হতাশ মানুষের হাতে শেষ হয়ে যেতে পারে। তাই তখন থেকে মোদি বিজেপি-আরএসএস এদের সবার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায় – ২০২৪ সালের নির্বাচনে হবু বিপর্যয় অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদের সম্ভাব্য নির্মূল হয়ে যাওয়া- এটা যেকোনো উপায়ে ঠেকানোই তাদের বাকি তিন বছরের একমাত্র কাজ!

    কিন্তু তাতে কী? ঘুরেফিরে সব কথার শেষে যেখানে এসে ঠেকে সেই একই কথা। মুসলমান কোপাতে হবে, ইসলামবিদ্বেষ – এটাই একমাত্র ভরসা। হিন্দুত্ববাদের দিকে ভোটার ফিরানোর একমাত্র উপায়। এ কারণেই ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, বাইডেন যতই মোদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অবরোধের ভয় দেখান না কেন মোদিকে আরো বেশি করে এখন মুসলমান কোপাতেই হবে – তা কাশ্মিরে বা সারা ভারতে। এটাই তার রাজনৈতিক আয়ু লুপ্ত হওয়া ঠেকানোর একমাত্র উপায় যার সোজা মানে আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাইডেনের সাথে মোদি ভারতের সম্পর্ক আর ভাল হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই বরং আরো সঙ্ঘাতেরই সম্পর্ক হবে। অন্তত ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত!
    অবস্থা এখন এমন যে ইমরান খানের পাকিস্তান এই প্রথম এক নিজ ‘জাতীয় নিরাপত্তা পলিসি” [NSP] প্রণয়ন করেছে। যেটা আগের মত গতানুগতিক কেবল ভারতবিরোধিতার উপর দাঁড়ানো নয়। আর কেবল সরাসরি সরাসরি সামরিক নয় বরং সামগ্রিক। এটা নিয়ে ভারতের মিডিয়াও পাকিস্তানের সহবস্থানের মনোভাবে লেখা এই নীতির প্রশংসা করেছে। এছাড়া প্রফেসর আয়েশা সিদ্দিকা যিনি পাকিস্তান অরিজিন লন্ডন  SOAS এর শিক্ষক কিন্তু  যিনি তার সেনা-ঘৃণা ম্যানিয়াকের জন্য কুখ্যাত, তিনিও অংশত এই পলিসিকে খারাপ বলতে পারেন নাই। পরোক্ষে প্রসংসা করেছেন বলা যায়। কিন্তু এত কিছুর পরেও মোদি বা তার সরকার এর সুযোগে ইমরানের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল করার দিকে আগাবেন সেই সুযোগ মোদির নাই। কারণ ইমরান কেন যেকোন পাকিস্তানই তার কাছে এখন একমাত্র একটাই প্রয়োজনীয় – পাকিস্তান কোপানো মানে মুসলমান কোপানো আর তাতে ততই হিন্দুভোট নিজ বাক্সে — এই চিন্তার বাইরে যাবার অবস্থায় নাই মোদি। বরং ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আরেকবার ফেক একটা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হচ্ছে এই রচনা আর মোদি তাতে বিজয়ী এটা দেখানো যায় কী করে এটাই মোদির লক্ষ্য আর তিনি তা খুজছেন!!

    এই একই সুত্রে, কাজেই বাংলাদেশেও সরকারের সাথে ভারতপ্রীতির সম্পর্ক ঠিক যেমন আমরা আগে ২০১২ সালের পরে দেখেছিলাম, তেমন আর হওয়ার সম্ভাবনাময় নয়। অর্থাৎ মার্কিন অবরোধ হয়েছে বলে, হাসিনার ভারতপ্রীতির সম্পর্ক আগের মতই পুনরায় উত্থিত হচ্ছে না। মূল কারণ, এখনকার ভারত নিজেই বাইডেন প্রশাসনের চোখে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আসামি বলে দূরে দূরে থাকছে।  অর্থাৎ আগে ভারত-আমেরিকার স্ট্রাটেজিক বন্ধুত্ব জোরদার ছিল বলেই হাসিনা সরাসরি আমেরিকাকে এড়িয়ে ভারতের মাধ্যমে আমেরিকান চাহিদা পূরণের চেষ্টা করতে পারত। আর এতে ভারত সরকার এবং এমনকি ‘র’-এর বহু অন্যায় আবদার হাসিনাকে সহ্য করতে হত। সেসব পরিস্থিতি গত ১৬ ডিসেম্বরের পরে একেবারেই লক-আপ হয়ে গেছে। যা আর ফিরবে না। মূল কারণ, ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক দূর অস্তে চলে গেছে। এটা কোনভাবেই আর আগের সময়কালে একেবারেই নাই। আর এটা যে নাই তা সবগুলো পক্ষের কাছেই উদাম।  উপায়ন্ত না পেয়ে  ওআরএফ-এর আরেক ফেলো, সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর লেখায় তার ছাপ পড়েছে। গত ১৬ ডিসেম্বর তিনি ওআরএফ-এর সাইটে যে লেখা দিয়েছেন তাতে চীনার পাকিস্তানকেই কোপানোর চেষ্টা করে গেছেন। সাথে যেমন বলেছেন, বাংলাদেশের সাথে ভারতের “অনন্য সম্পর্কটা” চীনের কারণে “উদ্বেগজনক প্রতিবন্ধকতা” হয়ে দাড়িয়েছে। ঐ লেখার লম্বা শিরোনামটা  হলঃ “এক অনন্য সম্পর্কের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন: উদ্বেগজনক প্রতিবন্ধকতার মাঝেও ভারত এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে অংশীদারিত্ব” – এর মূল  অর্থ এটাই। আরো সোজা করে বললে পিনাক সবকিছুকে নামিয়ে এনেছেন ভারতের অস্ত্র কেনায় বাংলাদেশের আপত্তিতে।
    ঠিক যেমন ও যে কারণে ভারত কোন চীনা অস্ত্র কিনে না, কিনবেও না; সস্তা ও মাঙনা হলেও নিবে না – ঠিক একই কারণে বাংলাদেশ ভারতের অস্ত্রের গুনাগুণ নুন্যতম ভাল কোয়ালিটির হলেও অথবা তা বাংলাদেশকে মাঙনা দিলেও বাংলাদেশ নিবে না।  এটা পানির মত সরল সত্য! এটা না বুঝার কিছু নাই। কিন্তু না বুঝার ভান ধরে পিনাক রঞ্জন এখন চীনের বিরুদ্ধে কামান দেগেছেন ঐ লেখায়। আবার এনিয়ে একটা মিথ্যা বা শব্দ বদল করে নেয়া ক্যাম্পেইনও করছে অনেকে। শিরোনাম লিখেছে,   “চীনের ওপরে বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে: পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী! – এভাবে। যেটা করেছে ক্যাম্পেইন পত্রিকা আমাদের সময়। অথচ পিনাক রঞ্জনের মূল বক্তব্যে ছিল,  “চিন থেকে আমদানি করা সামরিক সরঞ্জামের উপরে বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে”। মূল লেখা ওআরএফ-এর বাংলায় সাইট থেকে দেখতে পারেন এখানে।  অর্থাৎ সাধারণভাবে সব ব্যাপারে বাংলাদেশে চীন-নির্ভরতা নাকি কেবল অস্ত্র কিনাতে এই নির্ভরতা – এই দুটাকে এক করে প্রপাগান্ডা করা হচ্ছে। পিনাক রঞ্জন এখানে কেবল “অস্ত্র কেনার” ক্ষেত্রের কথা তুলেছেন।

    তবে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ঢলে পড়া ভা ভাটায় চলে যাওয়া নিয়ে  ইতোমধ্যেই এর ছাপ পড়া শুরু হয়েছে ভারতের থিংকট্যাংকের লেখা বা রিপোর্টে। আমেরিকা ভারত থেকে অনেক দূরের কেউ – এই অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে তারা লিখছে আর সাথে আমেরিকার এশিয়ায় উপস্থিতিতে কী কী খামতি সেখানে আছে এমন মৃদু সমালোচনাও সেখানে এখন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। যেমনঃ “আমেরিকা কি অবশেষে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সঠিক ভাবে পা ফেলছে?” – এটা ওআরএফ-এর আরেক ফেলোর লেখা, এখান এমন সুর দেখা যাবে। যা অনেকটা ডিভোর্স হয়ে যাওয়া বউ/স্বামী এর সাথে সামাজিকভাবে দেখা হয়ে গেলে যেমন হয়, সেরকম! আমেরিকান থিংকট্যাংক কলামিস্ট রাইটার কুগেলমানও ব্যাপারগুলো আমল করছেন, দেখা যাচ্ছে।
    সব মিলিয়ে  নতুন করে এক ‘গ্লোবাল পোলারাইজেশন’ সাজিয়ে উঠা আসন্ন হয়ে উঠছে মনে হচ্ছে!
    আর ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে ভাটা – এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ও আরও হবে ভারতের। বাংলাদেশ তী ভারতেরই – যেন তার গ্রামের বাগানবাড়ি – এই অতি আহ্লাদ এখন শুকিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে। অনেকের অনুমান এটা শেষ হবে  ২০০৬ সালের আগের ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের যায়গায় –  “ব্যাক টু দ্যা প্যাভেলিয়ানে”!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২২ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে ভাটা, কার কাজে লাগবে”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কোন দিকে কোথায় চলেছে

    কোন দিকে কোথায় চলেছে

    ১৭ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3SI

     

    –

    চারদিকে সব কিছু যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনের কথাই ধরা যাক। দৈনিক যুগান্তরের এক শিরোনাম বলছে, “যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তোষ, আমাদের ভুল থাকলে সংশোধনের চেষ্টা করব : পররাষ্ট্রমন্ত্রী”।  আর খবরের ভিতরে, মানে বডির শুরুতেই বলা হয়েছে, “কিছু দেশের যদি বাংলাদেশের প্রতি অসন্তোষ থাকে তবে আমরা তা দূর করব। আমাদের লক্ষ্য হলো সব দেশের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করা। কোনো কারণে কিছু দেশের আমাদের প্রতি অসন্তোষ থাকতে পারে। আমরা ওই সব কারণ খুঁজে বের করব”।

    প্রথমত, এটা খুবই অসহায়ের এক বক্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সোজা মানে হল  আপনি অসহায়, নিজের উপরই আস্থা হারায়েছেন। একটা দেশের সরকার মানে অথরিটি বা কর্তা। ক্ষমতার কর্তা। তা হলে ক্ষমতার কর্তা আর অসহায়ত্ব একসাথে? সরি, এ দু’টা একসাথে যায় না। যখনই এমনটা দেখা যায় এর মানে সরকার দুর্বল হয়ে গেছে কিংবা ক্ষমতা অর্ধেক হয়ে গেছে। এটা অকল্পনীয়; কারণ এখান থেকেই এরপর উঠবে ক্ষমতাচ্যুতির আলাপ আলোচনা।

    শুধু তাই না, এর আরো অন্যদিক আছে। অন্য প্রতিদ্বন্দ্বি ও দাতা যেমন চীনও ভয় পেয়ে যাবে। সরকারের আয়ু নিয়ে সন্দেহ করবে। আর এসবের প্রথম প্রতিক্রিয়া সাধারণত হইয়ে থাকে যে সম্পর্ক মিনিমাম জায়গায় গুটিয়ে নেয়া, আর অপেক্ষা করা। কারণ বিনিয়োগ খুবই সেনসিটিভ জিনিষ। জোঁক আর নুনের সম্পর্কের মত। একবার যদি অস্থিরতার গন্ধ পায় সে সাথে সাথে নিজেকে গুটিয়ে নিবে। হাতের মুঠি বন্ধ করে দিবে। অস্থিরতা মানেই বিনিয়োগের অর্থ রিস্কের মধ্যে আটকে যাওয়া। তাই বিনিয়োগ এত সেনসেটিভ!

    দ্বিতীয়ত, সরকার কার ‘অসন্তোষের’ কথা বলছে? আমল করেছে বলে জানাচ্ছে? বলেছে, “কিছু দেশের” বা “যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তোষ”। লক্ষণীয়, এতে সরকার মানে যা সর্বময় ক্ষমতার উৎস হওয়ার কথা হলেও তার উপরে বা বাইরের এক ক্ষমতার কথা বলা হচ্ছে এখানে। এমনকি আবার যার কাছেই সরকার অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে!

    তাতে এটা পরিষ্কার সেই কথিত  “উপরের” ক্ষমতা পাওয়ারফুল এবং তা পাওয়ারফুল বলে স্বীকার করে নেয়া মোমেনের চোখেমুখে এবং কথায় তা ফুটে উঠেছে। অনেকে এটাকে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ব্যাপারের দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যায় কি না, সে চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু  সে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করা ভুল হবে। কারণ যারা সরকারের বিরুদ্ধে  সিরিয়াস মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে তারা সেসব কথার কোনোটাই বাংলাদেশের কোনো পাবলিক এমনকি কোনো গ্রুপ অব পাবলিকের দিকে তাক করে তুলে নাই। বরং আমেরিকা অভিযোগ করেছে সুনির্দিষ্ট কিছু সরকারি কর্তা আর  সংশ্লিষ্ট সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এবং গুরুত্বপূর্ণ যে, এসব অভিযোগ আবার আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধ। তবে আমেরিকা এসব অভিযুক্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং তাদের সংশ্লিষ্ট নিকট আত্মীয়রা যাতে আমেরিকান নেতৃত্বে থাকা গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ব্যবহারের সুযোগ আর না পায় এমন নিষেধাজ্ঞাই আরোপ করেছে। যেহেতু এ ব্যবস্থাটা মার্কিন ডলার-কেন্দ্রিক তাই আমেরিকার একা নিজ হাতেই কেবল এই বাড়তি সুবিধাটা আছে।

    আসলে মন্ত্রী মোমেনের বক্তব্য আমেরিকার এই সক্ষমতাটাকে বৈধ বলে মেনে কথা বলা হয়ে গেছে। যেন বাইডেনের আমেরিকা বলছে, ‘বাংলাদেশ সরকার তুমি তোমার নাগরিক যারা, এমন বেশ কিছু জনগণের অংশের বিরুদ্ধে অপরাধ করেছ। যদি তুমি বাংলাদেশের পাবলিকের সরকার হয়ে থাক তবে তোমার যেখানে উচিত ছিল তাদের অধিকার রক্ষা করা। অথচ তুমি করেছ উল্টা, তাই তুমি অপরাধী’।

    এখন একটা হতে পারত যে সরকার বুক ফুলিয়ে দাবি করত, প্রমাণ দিত যার সারকথা হত যে, আমি এসব অপরাধ করিনি। কিন্তু এখানে তা হয়নি। মন্ত্রী মোমেন বলেছেন, “আমাদের ভুল থাকলে সংশোধনের চেষ্টা করব”; “অসন্তুষ্ট দেশকে সন্তুষ্ট” করার চেষ্টা করব ইত্যাদি; অর্থাৎ একেবারেই সাবমিসিভ [submissive] বা অধস্তন করে ফেলেছেন তিনি নিজে-সহ পুরা বাংলাদেশকেই, এই হল তাঁর অবস্থান। এর মাধ্যমে সরকার নিজেও আর ‘বাইরের’ ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করছে না। আর তাতে শুধু সে অধস্তনই নয়, নিজেকে অনুগ্রহ লাভের প্রার্থী হিসেবে হাজির করেছে। আর এখান থেকেই, আমাদের সরকার নিজ জনগণের আর কোনো প্রতিনিধিই নয়, দায়িত্বপ্রাপ্ত জনঅধিকার সুরক্ষাকারীও কেউ নয়; নুন্যতম প্রতিনিধিত্বও করছে না আমাদের কেউ না – এমন হয়ে গেছে।

    বরং সরকার ব্যস্ত হয়ে গেছে কেবল নিজেকে (সরকারকে) রক্ষা এবং কেবল ওই সব সরকারি কর্তাকে কী করে রক্ষা করবে, সেই কাজে। আর এ’কাজে বাংলাদেশের সরকার নিজেই আমেরিকান সরকার-প্রশাসনের অনুগ্রহ-প্রার্থী হয়ে গেছে। অর্থাৎ এখানে প্রধান লক্ষণীয় হল, যারা সরকারের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিক, যারা গুম হয়েছেন, যাদের ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে ইত্যাদি, এরা কিন্তু এখানে কোনো প্রসঙ্গই নয়। করা হয় নাই। প্রসঙ্গটা হল, সরকার টিকানো এবং সরকার, সরকারি কর্তা ও অফিসের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কিভাবে প্রত্যাহার করে নেয়া যায়। যেন মামলাটা হল – বাংলাদেশের পাবলিক নয়, সরকারের নিজ স্বার্থ আর আমেরিকার প্রশাসনের মধ্যকার! মোমেনের বক্তব্য প্রকারান্তরে ইস্যুটাকে সেখানে নিয়ে গেছে।  যার সারার্থ হল, সরকার বলতে এখানে কিছুই নাই…। কেবল গুটি কয়েক ব্যক্তিস্বার্থবাজ লোক তারা সরকার বলে ভান করছে।

    সাধারণত কোনো নুন্যতম সৎ-ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম হল, তার বিরুদ্ধে কোনো বড় অভিযোগ উঠলে একটা কোন স্বাধীন নিরপেক্ষ আইনি কমিশন গঠন করে তাদেরকে দিয়ে তদন্ত করা এবং সত্য উদঘাটন (ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং) করা। কিন্তু এখানে কী চলছে? পুরা উল্টা। বলা হচ্ছে, কেউ মার্কিন সরকারকে “ভুল বুঝিয়েছে” কি না। যদিও মার্কিন  নিষেধাজ্ঞা আরোপের উৎস প্রথমে আমেরিকান সংসদ ও সিনেট কমিটি আর সেখান  থেকে পরে প্রেসিডেন্ট, এভাবে। তার মানে এখানে বাংলাদেশে  কোনো ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং হচ্ছে না, বসছে না এবং  হবে না। ভিকটিম বা ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকরাও এখান থেকে নুন্যতম কিছু প্রতিকারও পাবে না।

    দুই দিন আগে বিবিসি একটা রিপোর্ট করেছে, শিরোনাম “মার্কিন নিষেধাজ্ঞা : বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা বিধিনিষেধ প্রত্যাহারে কী তৎপরতা চালাচ্ছে?”। এতে বাংলাদেশ সরকারের সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক বলছেন, “নিশ্চয়ই আমেরিকা সরকারকে কনভিন্স করা হয়েছে। কাজেই যে তথ্যের ভিত্তিতে দিয়েছে, সেই তথ্য যতটুকু আছে সেটি কতটুকু সত্য কতটুকু মিথ্যা বা সঠিক কী সঠিক নয়- এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে একটা বক্তব্য যাবে”।……। “এ ছাড়া আমেরিকাতে লবিস্ট নিয়োগের একটি কালচার আছে, সেই লবিস্ট নিয়োগ করে আমেরিকান সরকারকে বোঝাতে হবে। আর ব্যক্তিদের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা সেটি প্রত্যাহার চেয়ে আমেরিকা সরকারের কাছে আপিল করতে হবে”।  অর্থাৎ তিনিও কোন ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিশন  নয়,  বাইডেন প্রশাসনের সাথে এক’টা ‘ডিল’ করার কথাই বলছেন; অর্থাৎ লক্ষণীয় মুখ্য পয়েন্ট ইন্ডিপেনডেন্ট ফ্যাক্টস যাচাই নয়, একটা লেনদেন বা ‘ডিল’ হয়ে উঠেছে সরকারের প্রধান বিবেচ্য ও করণীয়!

    এর আগে ডয়েচ ভেলেতে ছাপা হওয়া ‘আসক’ [আইন সালিসি কেন্দ্র]-এর দেয়া সংগৃহিত পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে তারা লিখেছিল,” আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কথিত ক্রসফায়ারে ২০১৬ সালে মোট ১৭৭ জন নিহত হয়েছেন। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা কমে ১৪১ জনে নেমে আসে। এর পর থেকে গতি আবার বাড়তে শুরু করে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন ও মাদকবিরোধী অভিযান ক্রসফায়ারের নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। পরের বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত ৪২১ জন, যা আগের বছরের চেয়ে তিনগুণ বেশি। ২০১৯ সালেও এই ধারা অব্যাহত ছিল, ৩৬১ জনের বেশি”। নির্বাচনের আগেই এনিয়ে আপত্তি প্রতিরোধ হৈচৈ -গুলোকে দাবিয়ে দেওয়ার জন্য এটা করা হয়েছিল।
    সেই ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। এখান থেকে অনুমান করলে বের হয়ে আসে যে, সরকার ক্রমেই এমন ‘হত্যা-নির্ভরশীল’ একটা সরকার হয়ে গেছে। সাধারণত যেটা দেখা যায়, একটা ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে ফেলতে পারলে সেটা সরকারের জন্য খুব কাজের হয়। কোনো সরকার একবার এতে সফল হয়ে গেলে পরে দেখা যায় এর পর থেকে সে বিরোধিতাহীন বা বাধাহীন এক সরকার হয়ে উঠতে পারে।

    তা হলে এ তথ্যাবলি আরেকটা ইঙ্গিত দেয় যে, ধরা যাক আমরা একটা উপরে কথিত মতে ‘ডিল’ যদি দেখতে পাইও এছাড়া সেই ডিল উপস্থিত সরকারকে ক্ষমতায় রেখেই যদি করতেই হয়, তবে সেই সাথে এসব ক্রসফায়ার বা গুম প্রভৃতিতে মাসে মাসে কমপক্ষে ৩৫-৪০ জনকেও “বলি” দিতে রাজি থাকতে হবেই। কারণ প্রশাসন ভয়ের সংস্কৃতি বা হত্যা-নির্ভরশীল হয়ে গেছে! এই ক্ষিধাও পূরণ করতেই হবে। নইলে সরকার টিকবে না। মানুষে মানবে না। এই প্রসঙ্গে বিবিসিকে লিখেছে, “মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নকেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ বাস্তবতায় র‌্যাবের কার্যক্রমে একটা সংস্কারের সুযোগ আছে বলেও মনে করেন সাবেক আইজিপি শহীদুল হক”।…..”সংস্কার করতে হলে বেপরোয়াভাবে যেন কিছু না হয়। সব কিছু কন্ট্রোলের মধ্যে রাখতে হবে”। …… তিনি বলেন, “আপনি গুলি করবেন এনকাউন্টার, আপনি বিপদে পড়েছেন, দুষ্কৃতকারীরা আপনাকে হামলা করছে সে ক্ষেত্রে ব্রাশফায়ার করে মানুষ মারতে থাকলে তো হবে না। আপনাকে বাঁচানোর জন্য যতটুকু করার দরকার অতটুকুই করতে হবে। এ সংস্কারটা আনতে হবে”।  তার মানে তামাশাটা হল, সাবেক এই আইজিপিও এখন একটু কম হত্যার এক সংস্কারের কথা বলছেন; অথচ তার নিজের আইজি কার্যকালে (২০১৫ সালের শুরু থেকে ২০১৮ সালের জানুয়ারি) গুম ও ক্রসফায়ারের কিছু পরিসংখ্যান উপরে দেখেছি।

    মাছ খাবো নাঃ
    বিড়াল কি মাছ খাবো না বলতে পারে? মানে যেটা স্বভাব হয়ে গেছে বা যাতে অভ্যস্ত হয়ে যায় তা কি সে ছাড়তে পারে? তাই সাবেক আইজিপির কথিত সংস্কারটাও যদি করে নেয়া হয় তবুও উপস্থিত সরকারকে তিনিও ক্ষমতায় রাখতে পারবে না। কারণ, এরা হত্যা-নির্ভরশীল সরকার হয়ে গেছে। সেটার কী হবে???

    তা সত্ত্বেও এমনকি ধরা যাক, কোনো ডিল হয়ে গেল। বিবিসির ঐ রিপোর্টে এক ইন্ডিয়ান-অরিজিন আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক প্রশান্ত পরমেশ্বরণের কথা এনেছে। তিনি বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে যেহেতু কিছু সুনির্দিষ্ট আচরণকে (তিনি বলতে চাইছেন র‍্যাবের গুম-হত্যা ক্রসফায়ার) তুলে ধরা হয়েছে, তার (এই সমস্যার) সংশোধন বা সমাধানের কথা বলেছে”। কিন্তু তিনিও একটা ডিল বা রফা করার ইঙ্গিত করেছেন। বলেছেন, “বহুমুখী পন্থায় কাজ’ করতে। ‘সুনির্দিষ্ট আচরণ’ যেগুলো নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়েছে, ‘তার সংশোধন বা সমাধান করে’ নিতে বলেছেন আগে। অথচ আমরা উপরে দেখেছি সরকার হত্যা-গুম জাতীয় কাজে অভ্যস্ত বা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা ছাড়া সরকার চালানো বা টিকানো অসম্ভব। এ ছাড়াও এমনকি আরেক মারাত্মক ইঙ্গিতে তিনি এনে বলেছেন, “এশীয় প্রশান্ত অঞ্চলে বাইডেন প্রশাসনের পররাষ্ট্র নীতির অগ্রাধিকার কী- সেখানে বাংলাদেশকে ভূমিকা রাখতে হবে। বিশেষ করে চীনের ব্যাপারে”।

    বাইডেন প্রশাসনের পররাষ্ট্র নীতির অগ্রাধিকার কী- এটুক বলে তিনি ফারদার কিছু খোলসা করেননি। কিন্তু আমেরিকা চাইছে কী?
    এনিয়ে যতটুকু জানা যাচ্ছে যেমন, কক্সবাজারে এয়ারপোর্ট রানওয়ে প্রকল্প যেটাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক যাত্রী ও কার্গো বিমানের ব্যবহার-উপযোগী করে গড়ে তোলার একটা প্রকল্প। বলা হয়েছে, এটাকে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের রুটে একটা হাব [hub] ও রিফুয়েলিং স্টেশন হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এতদূর পর্যন্ত এটাকে বাণিজ্যিক দিক থেকে এক উপস্থাপনই হল। বিবিসি বাংলাতেও গত ২৮ আগস্ট ২০২১ এক প্রতিবেদনে এটাকে বাণিজ্যিকভাবেই দেখানো উপস্থাপন করা হয়েছে।

    কিন্তু এখন দুর্জনরা বলছে, এই প্রকল্প চীনকে দেয়া হয়েছে এক স্ট্র্যাটেজিক (যুদ্ধকৌশলগত) কারণে। আর মালদ্বীপে চীনের যে জাহাজ চলাচলের অবজারভেটরি স্থাপনা আছে তার সাথে এটাকে সম্পর্কিত করে দেখতে হবে। অন্য দিকে এসবেরই পাল্টা বহুদিনের আমেরিকান এক আবদার হল, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে তার সপ্তম নৌবহরকে স্থায়ী নোঙর করতে দিতে হবে। এটা ঘটার বিরুদ্ধে চীনের চেয়েও ভারত এই প্রশ্নে বেশি চরম কঠোর আমেরিকাবিরোধী।
    অথচ আমেরিকার এই খায়েশকেই সম্ভবত বিশ্লেষক প্রশান্ত পরমেশ্বরণ আমেরিকার ‘পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার কী- সেখানে বাংলাদেশকে ভূমিকা রাখতে হবে’ বলে অস্পষ্ট রেখে ছেড়ে রেখে দিয়েছেন! এসব ইঙ্গিত খুবই খারাপ ও বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর! কারণ এর অর্থ হবে সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির প্রশ্নটা শেষে না পিছলে গিয়ে তা আমাদের ভূখণ্ডকে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে আমেরিকা-চীন ও ভারত তাদের নিজ নিজ স্বার্থের লড়াই শুরু করে দেয়!

    অথচ বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ হল, যে অবস্থানে এলে এই তিন দেশকে নিউট্রাল রাখা যায়; কারণ আমরা কারো যুদ্ধের পাটাতন হতে পারি না।

    কিন্তু সমীকরণ যে দিকেই মিলাই আমাদের হত্যা-নির্ভরশীল উপস্থিত সরকার মনে হচ্ছে না কাউকে সাহায্য করতে পারবে; অর্থাৎ তার নিজের টিকে থাকা – এই স্বার্থ, এটাই চতুর্থ ও মুখ্য স্বার্থ হিসেবে সবার উপরে হাজির হয়ে থাকতে চাইছে। অথচ বাস্তবতা হল, হত্যা-নির্ভরশীল সরকার-প্রশাসন সাবেক আইজির কথিত নামকাওয়াস্তে কোনো সংস্কার করতেও অক্ষমই থেকে যাবে।

    উভয় সঙ্কটঃ
    বর্তমান সরকার আসলে মারাত্মক উভয় সঙ্কটে। এখনকার উভয় সঙ্কট হল, যেকোন সরকার নিজের বিরোধী দলদেরকে তাদের জনসমাবেশের অধিকার দিতে বাধ্য। কিন্তু আমাদের সরকারের অবস্থা এমন যে  যদি সরকারবিরোধীরা মিছিল সমাবেশ করতে চায় তাতেই সে কাত! সে ভীত যে, এটা না  সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। কারণ জমে থাকা পাবলিকের ক্ষোভ তাতে উপলক্ষ করে প্রকাশ্যে বের হয়ে যদি আসে! এ অবস্থায় সে যদি তাদের মিছিল-মিটিংয়ের অধিকার মেনে নেয় তো তাকে নিজ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে বাস করতে হবে। আর যদি উল্টা নির্বিচারে আগের মত গুম-খুন ক্রসফায়ারে তা দমন করে চালাতে যায় তবে সেটা আরও বড় মার্কিন অবরোধের কারণ হতে পারে। আর এর আগেই বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে এক রক্তাক্ত রণভূমি!

    পরিণতিতে কী হচ্ছে?
    সেটাই কি কাওয়ালি অনুষ্ঠানেও হামলা? সরকার দলীয় হামলা করে চলা অবস্থায় আয়োজন কাওয়ালীর অনুষ্ঠান ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। অথচ  সরকার এখনো কার্ড দেখাতে পারেনি, প্রকাশ্যে বলতে পারে নাই যে, তারা এ হামলার পক্ষে না বিপক্ষে? এসব খারাপ লক্ষণ। তাতে সরকারের লাভ না ক্ষতি হয়েছে। অথচ বাস্তবতা হল, সরকারবিরোধীরা সবাই জোটবদ্ধ হয়ে কাওয়ালির পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে। প্রথম আলো-স্টার থেকে ছোটবড় বা কড়া ইসলামিস্ট সবাই একত্রে মিলে গেছে। অথচ এমন না যে, কাওয়ালি নিয়ে তাদের আপত্তি নেই; বরং অনেকেরই বড় বড় কঠিনতম আপত্তি আছে। সেকুলার-প্রগতি অথবা ইসলামিস্ট সবারই নিজ নিজ স্টাইলে-ব্যাখ্যায় আপত্তি আছে।  অথচ ক্ষমতার তাণ্ডবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও ঐক্য দেখাতে তারা সেসব আপত্তি মাটি চাপা দিয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে তারা একত্র, এই ব্রডবেজ ইউনিটি শোকরেছে তারা; এই  বিরোধীতায়  তারা জোটবদ্ধতা শো করতে চায়। অবশ্য এমনটাই হয়ে থাকে। কমন এনিমি এই বড় শত্রুবিরোধী বিরূদ্ধতা-জ্ঞান সবসময় এভাবেই কাজ করে থাকে!

    আবার হামলাকারী যারা সঞ্জিত-সাদ্দাম গং, এদের পক্ষে কথিত প্রগতিশীলতার নামে হিন্দুত্ববাদের কোনো হাইকমিশন এর পক্ষে কি?  তা হলে আমরা এরই প্রকাশ্যে অবস্থান এখানে আমরা দেখে ফেললাম? নেত্রী কি এটাই চেয়েছেন? তা এখনো স্পষ্ট করা যায়নি! মানে সরকার কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না!!! আবার ঘটনার তিন দিন পার হয়ে গেল কোনো অবস্থান না দেখানো সত্ত্বেও, তাহলে পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই, অন্যরা যা খুশি করছে ভাঙছে, তা কি? সরকার কি তা হলে কর্তৃত্ব হারিয়েছে, এমন অনেক কথা উঠছে। সরকার কিছুই না বললে এমন উলটাপালটা গুজব কানাঘুষা অর্থই তো হবে!!! এবং এটা সামনে আরো বাড়বেই!

    এমনিতেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর থেকে সরকার, অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছে। যা খুব খারাপ ইঙ্গিত! এর উপর আবার দলের ভেতরে ততোধিক যেন উপধারা বা উপস্বার্থের আবির্ভাব ঘটেছে। বেশির ভাগ নেতা কমপক্ষের দুটো স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করছেন, ঘুরছেন। মুখে বলছেন একটা করছেন আরেকটা। এর মধ্যে আবার ‘আপার’ অবস্থান কোনটা  বুঝা যাচ্ছে না। এরই “আদর্শ প্রকাশ” স্থল হচ্ছে এখন নারায়ণগঞ্জের সিটি নির্বাচনে। কে যে কার পক্ষে কাজ করছেন, তাল পাওয়া যাচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ রাতে ছাত্রলীগের নেতাদের বাসায় গিয়ে হুমকি দিচ্ছে কেন? নানক শামীম ওসমানকে হুমকি দিয়ে কথা বলছে কেন ……। যেন এক পথ হারানো পরিস্থিতি!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ১৫ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “দণ্ড কার হাতে, কোথায় চলেছি”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আমেরিকায় সম্পত্তি-কেনা অর্থপাচারকারীর কী হবে?

     

    আমেরিকায় সম্পত্তি-কেনা অর্থপাচারকারীর কী হবে?

    গৌতম দাস

    ১০ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Sm

     

     

    US Department of State’s Coordinator on Global Anti-Corruption Richard Nephew. 

    US vows to crack down on money laundering in homebuyers

     

    খবরটা একটু পুরনা, গত মাসের। ইস্যুটাকে গ্লোবাল অর্থপাচার- এই “দুর্নীতিরোধক” এক পদক্ষেপ বলা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে খবরটার গুরুত্ব মার্কিন অবরোধের চেয়ে কম নয়। হয়তো এর দৃঢ় প্রভাব অনেক বেশিই হবে। কিন্তু টাইমিং আর সম্ভবত আমাদের মিডিয়া এর তাৎপর্য যথাযথ টের না পাওয়ার কারণে এটা সামনে মানে উপর তলায় আসেনি। বিষয়টা আবার অবরোধ আরোপের মতোই আমেরিকান এক তৎপরতা। তফাত এই যে, অবরোধ দিয়ে বাইডেন দাবি করেছেন, এটা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে। আর এটাও বাইডেনের নেয়া পদক্ষেপ যা করাপশন বা দুর্নীতিকেন্দ্রিক। তবে তা গ্লোবাল নেচারের এবং প্রস্তুতি পর্যায়ে আছে মানে মাঠে এখনো অ্যাকটিভ হয়নি। তবে এটা বাংলাদেশের দুর্নীতি আমেরিকাকেও ছুঁয়েছে ধরনের। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই প্রসঙ্গকে আমেরিকান দলিল বা রিপোর্টে ব্যাখ্যা করা হয়েছে criminals, kleptocrats শব্দ দিয়ে। তাদের বিরুদ্ধে নেয়া পদক্ষেপ হিসেবে। কাদের বিরুদ্ধে? ‘kleptocrat’। ইংরাজি ক্লেপটোক্র্যাট শব্দটার অর্থ হল, সরকারি ক্ষমতা অপব্যবহার করে যে শাসক পাবলিক অর্থ-সম্পত্তি আত্মসাৎ করে। জন-সম্পত্তি চোর শাসক।

    এ নিয়ে রয়টার্সের করা গত মাসে একটা রিপোর্ট আছে।  এই রিপোর্টে (বাংলাদেশের মত অনেক দেশকে মাথায় রেখে) অনেক পরিকল্পনার কথা বলা আছে। কিন্তু এর দুদিন পরেই ৯-১০ ডিসেম্বরের গণতন্ত্র সামিট [Democracy Summit] – এই গুরুত্বপুর্ণ কর্মসুচির কারণে kleptocrat ধরে আনার পরিকল্পনা থেকে মিডিয়া মনোযোগ কমে যায়। তবে ঐ রিপোর্টের  প্রথম বাক্যটা হল এ’রকমঃ “বাইডেন প্রশাসন গত ৬ ডিসেম্বর শপথ নিয়েছেন যে, (বিভিন্ন) দেশের সরকারি সম্পদ চুরি-লুটকারী অপরাধী শাসক ও এমন অন্যদের তারা কড়া পদক্ষেপ নিয়ে তাদের তছনছ করে দেবেন; যারা মানিলন্ডারিং করে আনা নগদ অর্থে ঘরবাড়ি (রিয়েল স্টেট) কেনাবেচায় জড়িত এবং একাজটা আসলে (তখনকার) আগামী সপ্তাহে আহূত আমেরিকার ‘গণতন্ত্র সামিট’-এর সাথে বৃহত্তর অর্থে দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ হিসেবে সম্পর্কিত” [“The Biden administration on Monday vowed to crack down on “criminals, kleptocrats and others” paying cash for houses to launder money as part of a broader anti-corruption drive linked to this week’s U.S. Summit for Democracy.”]।

    এখন একটা উদাহরণ দিয়ে বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে ব্যাপারটা আরেকটু স্পষ্ট করা যাক। ধরা যাক, বাংলাদেশের এক মন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের জন্য সরকারি বার্ষিক বাজেটের প্রায় অর্ধেক অর্থ আত্মসাৎ করেছেন, সেই অর্থ  এবার মন্ত্রী নিজের ছেলেকে দিয়ে আমেরিকায় ট্রান্সফার করে নিয়ে গেছেন। এরপর ছেলে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছে ও ওই অর্থ দিয়ে হাউজিং প্রকল্প কিনেছে বা গড়েছে। বাইডেন সরকার বলতে চাইছে্ন “এটা মানিলন্ডারিং করে আমেরিকায় আনা অর্থ”। তাই  অর্থের কোনো বৈধ উৎস বলতে না পারা এই চক্রকে তিনি আইনের আওতায় আনবেন”। কথা সত্য। বাইডেন যা বলছেন তা যদি উনি সিরিয়াসলি বাস্তবে করে দেখান তবে এটা বাংলাদেশের সরকারের জন্য বিরাট আঘাত করা ঘটনা হবে।

    এবারের (৯-১০ ডিসেম্বরের) ‘ডেমোক্র্যাসি সামিটের’ সাথে এই দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সম্পর্কটাকে আরেকটু পিছনের পটভূমিতে বলা যাক। ঐ একই রয়টার্স রিপোর্ট আমাদের জানাচ্ছে, “বাইডেন ক্ষমতার শপথের (২০ জানুয়ারি ২০২১) পরে জুন মাসেই তাঁর সহকারীদের তিনি এ’ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন [President Joe Biden ordered officials in June to step up the fight against corruption.]। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই কাজকে তারা আমেরিকান ‘জাতীয় নিরাপত্তার কৌশলপত্রের’ অংশ করে নিয়েছিলেন। আর তাই একাজে ‘৩৮ পৃষ্ঠার এক প্রাথমিক প্রস্তাব’ তৈরি করা হয়েছিল। [সেটার পিডিএফ কপি ঐ লিঙ্কে]  যার শিরোনাম ‘দুর্নীতি রুখতে আমেরিকান জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্র’ [ Pursuant To The National Security Study Memorandum On Establishing The Fight Against Corruption As A Core United States National Security Interest]। অনলাইনে এই দলিল উন্মুক্ত করা হয় ওই ৬ ডিসেম্বরেই।

    যা চীনা ব্যাবস্থায় নাই বা দিতে পারবে না; সেটাই বাইডেনের ইস্যুঃ
    যা চীনের নাই বা দিতে পারবে না বাইডেন তাই করবেন ও এমনই নীতি-পলিসি নেবেন – এবারে বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর তিনি এই বিশেষত্বকে যেন নিজের সাইনবোর্ড করেছেন। তাই, মানবাধিকার রক্ষার নীতি ও দুর্নীতিবিরোধী নীতি এভাবে গ্লোবাল অভিযানে হাতে নেয়া আর তাতে যত বেশিসংখ্যক দেশ ও ওসব দেশের জনগণের সমর্থন তাতে শামিল না হলেও আকৃষ্ট করা- এভাবেই তিনি আগাচ্ছেন। এটাই তার চীন ঠেকানোর কায়দা!

    যদিও এনিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা অনেকটাই ভিন্ন। আমরা আগে দেখেছি দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এর আগেও অন্য আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিয়েছিলেন। আর তাতে যা তারা করবেন বলে মাঠে নামেন, তাই তারা করেন বা সফল হয়েছিলেন ব্যাপারটা এমন সত্য নয়। আমরা মনে করতে পারি আমাদের দেশের বেলায় ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের কথা বলে এই একইভাবে বাংলাদেশে আমেরিকার প্ররোচিত-সমর্থিত এক ক্ষমতা দখল হয়েছিল। ফলাফল কী হয়েছিল আপনারা সবাই কমবেশি জানেন। আর তাতে ফলাফল হল, তখনকার দুর্নীতি শত-কোটিতে গণনা করা হত বা চল ছিল। আর এখন বাংলাদেশে দুর্নীতির সেই গণনা হয় হাজার-কোটিতে; এই হল আমেরিকার দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের পরিণতি। অর্থাৎ যা আমেরিকা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিল তা করে নাই। সেদিকে ঘটনা নেয় নাই। আবার যেমন বলা হয়েছিল, আমাদের রাষ্ট্রকে ‘ওয়্যার অন টেরর’ মোকাবেলার উপযোগী ও যোগ্য করে সাজাতে নাকি ঐ ক্ষমতা দখল। কিন্তু আমরা দেখেছিলাম আমাদের রাষ্ট্রকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ আমেরিকা যা করব বলে গল্প শোনায় তা শুনতে ভালো লাগে হয়তও অনেকের। কিন্তু তা সে পূরণ না করে উল্টা নিজের বদ-উদ্দেশ্য কায়েম করে ভেগে যায়। এবং কোনো দায়দায়িত্ব নেয় না এবং কখনো নিজের আকামকে ফিরে দেখে না, ভুল বা অপরাধের মূল্যায়ন বা স্বীকার করে না। এক কথায়, এরা দায়দায়িত্ব-জ্ঞানহীন। ফলে স্বভাবতই, এখন বাইডেন প্রশাসন কী করছে ও কী বলতে চাইছে তা নিয়ে পাবলিক মনে কোনো আশাবাদ তৈরি করতে চাই না। আবার আগাম নিরুৎসাহিত বা হতাশা ছড়ানোও আমার কাজ নয়। বরং বাস্তবে যা হচ্ছে ও হবে তা যেন পাবলিক নিজেই সতর্ক থেকে চোখ-কান খুলে দেখে বুঝে নেয় এর সব রাস্তা খোলা থাকুক- এটাই ভালো!

    ৩৮ পৃষ্ঠার এক প্রাথমিক প্রস্তাবঃ
    উপরে উল্লিখিত ৩৮ পৃষ্ঠার এক প্রাথমিক প্রস্তাবে, মানে ঐ রিপোর্টের কিছু বাক্য যা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। যেমন চতুর্থ পাতায় বলা হয়েছে, “গত ৩ জুন বাইডেন বলেছেন, ‘দুর্নীতিবিরোধী লড়াইকে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ বলে বিবেচনা করতে হবে” [On June 3, 2021, President Biden established the fight against corruption as a core national security interest of the United States.”]।’ এখন মনে হতে পারে, দুর্নীতিবিরোধী কাজে তিনি ভিন রাষ্ট্রের জন্য ত্রাতা হতে চাচ্ছেন, তবে তাতে এটা খোদ আমেরিকার ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ হচ্ছে কিভাবে? তিনি বলছেন, ‘গ্লোবাল দরিদ্র-মানুষ কমিয়ে আনার কাজে লড়াই এবং উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের বিকাশ এগুলোই পরোক্ষে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করে” [“corruption threatens United States national security, economic equity, global anti poverty  and development efforts, and democracy itself….[B]y effectively preventing and countering corruption and demonstrating the advantages of transparent and accountable governance, we can secure a critical advantage for the United States and other democracies.” ]।’ [ লেখকের নোট হল, এখানে সবই ভাবানুবাদ করা হয়েছে, তাই ছোট হয়েছে অনেক সময়। যাদের আগ্রহ তারা মুল ইংরাজিটা দেখে নিতে পারেন। ]

    খুবই আদর্শবাদী কথা হয়তো এগুলো। তবু এখন এসব কথা শুনে আমরা এতটুকু বলতে পারি যে, এতে আমেরিকান নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করে বা হয় কি না তা আমরা না, আমেরিকাই সবচেয়ে ভালো বলতে পারে। তবে এটুকু আমরা বুঝি, কখনো দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নেয়া অথবা কখনো চুপ থাকার অবস্থান নেয়া – যেটাই আমেরিকা করুক তাতে ঐ সময় অবশ্যই তা আমেরিকার স্বার্থের পক্ষে যাবে অনুমান করেই আমেরিকা এমন একেকটা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। ফলে এককাট্টা কোন নীতি না রাষ্ট্রস্বার্থের ভিত্তিতেই আমেরিকা চলে – এদিকটা খেয়াল রেখেই আমেরিকার বাতচিত বুঝতে হবে বা নেয়া উচিত। নইলে হুদাই ভরসা করার কিছু নাই। যেমন  ২০০৭ সালে আমরা দেখেছিলাম আমাদের রাষ্ট্রকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল কারণ আমেরিকান বিবেচনায় ওটাই আসলে তার একান্ত স্বার্থ ছিল। যেটা এখন সম্ভবত আর তার স্বার্থ নয় যদিও ওর স্বাদ মানে আমাদের জিব পোড়ার অভিজ্ঞতা এখনো বর্তমান! যেমন সে সময়ে  ভারতকে চীন-ঠেকানো বা কনটেইনমেন্ট [containment] এর কাজে ব্যবহার করা বা এমন কাজ করিয়ে নেয়া আমেরিকার স্বার্থ ছিল। আর এই কাজের বিনিময়ের বমাল ভাগাভাগির হিসাবটা ছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া, ভারতের বাংলাদেশ থেকে করিডোর ও বাজার-সুবিধা নেয়া ইত্যাদি। অতএব এখনো এবার আমেরিকা বিনিময়ে কী উসুল করবে বা কিছু একটা চাইবার স্বার্থ নিশ্চয় আছে সেটা আগাম অনুমান করে নেয়াই সঠিক হবে। যদিও সেটা কী তা এখনো অস্পষ্ট।

    তবে আমাদের জন্য যা বুঝবার আছে তা হল, এবারের “দুর্নীতিবিরোধী লড়াইকে আমেরিকার নিজের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ বলে বিবেচনা করা’ মানে হল আমরা বুঝতে পারি যে এটা আমেরিকার দিক থেকে বেশ বড়সড় এক আমেরিকান স্বার্থ। কোনো মামুলি স্বার্থ নয়।
    দ্বিতীয়ত, ওই ৩৮ পৃষ্ঠার প্রস্তাবনায় আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। বলা হয়েছে, আমেরিকায় এই হাউজিং সেক্টরের (ওদের ভাষায় রিয়েল এস্টেট[real estate]) মোট কেনাবেচায় এক-তৃতীয়াংশ লেনদেনই হয় নাকি নগদ অর্থে [ “All-cash real estate deals, which currently account for about one-third of all U.S. home sales, according to the National Association of Realtors.”]।

    All-cash real estate deals, which currently account for about one-third of all U.S. home sales, according to the National Association of Realtors.

    এটা আমেরিকান রিয়েল এস্টেট এসোসিয়েশন থেকে পাওয়া ডাটা। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ডাটা সন্দেহ নেই। কেন?
    আসলে ‘অল-ক্যাশ রিয়েল এস্টেট ডিল’ [All-cash real estate deals] এই শব্দ কয়টার মধ্যে অনেক কথা বলা আছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে সরকারি বা জনগণের অর্থ চুরি করতে দেয়া আর সেই অর্থ-পাচারকারীরা কেন আমেরিকায় গিয়ে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় ঢুকে বা কেনাবেচায় সামিল হয় এমন আগ্রহের কারণটা এখন সবার কাছে পরিষ্কার হবে। বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া এবং স্বভাবতই তা অর্থের উৎস বলতে না-পারা অর্থ, ফলে এগুলো নগদ অর্থ থাকা অবস্থায় থেকেই রিয়েল এস্টেট প্রপাটি কিনবার জন্য সুযোগ বেশি তাই এটা আদর্শ জায়গা। এখন প্রশ্ন হল, বাইডেন কী সেই মুরোদ দেখাতে পারবেন? মুরোদ রাখেন বা কতটা পারবেন? তিনি কি আমাদের মত দেশ থেকে পাচারকারীদেরকে তাদের অর্থের উৎস দেখাতে বাধ্য করতে পারবেন এবং পাচারকারীরা তা না দেখাতে পারলে সেই প্রপার্টি যেন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট বাজেয়াপ্ত করে নিতে পারে এমন ‘প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাহী আদেশ’ কি জারি করতে পারবেন?
    স্পষ্টতই আমি সন্দেহ করছি। কেন?

    কারণ, ২০১৬ সালে ওবামা আমলে এমনই প্রায় একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এনিয়ে আরেক রয়টার্স রিপোর্ট পাবেন এখানে [U.S. targets money laundering in all-cash home sales in Miami, Manhattan]। তখন এধরণের সংশ্লিষ্ট ইন্সুরেন্স কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে এমন ‘অল-ক্যাশ বাড়িক্রেতাদের’ পরিচয় ট্রেজারি বিভাগে রিপোর্ট করতে [Treasury Department ordering title insurance companies to report the identities of people paying cash for high-end properties ]। কিন্তু তাতে তো এতদিনে অন্তত বাংলাদেশ বিরাট কিছু হৈচৈ পরে যাবার কথা ছিল। আমাদের মানুষ না চাইলেও তা জেনে যেত! কিন্তু এমন কিছু হয় নাই তা আমরা জানি। তাই,  এরপরও এই “নির্দেশ থেকে” এতে খুব বড় কোনো অগ্রগতি হয়েছে বলা যাবে না। তবে কখনও কখনও প্রায়ই আমরা একটা প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট দেখে থাকব যে, ‘গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি’ [Global Financial Integrity ] নামের এক নন-প্রফিট প্রতিষ্ঠান পাচার হওয়া বিভিন্ন দেশের অর্থের কিছু হদিস ও হিসাব প্রকাশ করেছে। যেমন, সাড়া ফেলা ‘প্যান্ডোরা পেপারস’ [Pandora Papers] (যেখানে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নওয়াজ শরীফের অর্থপাচারের তথ্য ছিল। আর এটাই তাঁর পাকিস্তানের আদালতের রায়ে শাস্তি হবার কারণ) ধরনের লিকেজ তথ্য বাইরে এসেছিল। এসব তথ্য ওই উদ্যোগের কিছু ইতিবাচক ফল মাত্র। যদিও সাধারণত ওখানে যে অর্থপাচারের তথ্য থাকে তা কোন দেশ থেকে মোট কত অর্থপাচার হয়েছে – ফোকাস সেদিকেই থাকে। তাতে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির তথ্য কমই থাকে। কিন্তু আরেকটা দিক হল যে, আবার বলা যায়, যেমন ঐ উদ্যোগ থেকে বাংলাদেশের কোনো কিছু প্রকাশ পায়নি। আমরা জানতে পারিনি। আর সবচেয়ে বড় কথা, এগুলো সুস্পষ্ট নাম ও প্রমাণও নয়। বরং অর্থপাচারের ট্রেন্ড বা অভিমুখ হল,  ২০১৬ সালের পরে বাংলাদেশ থেকে আরো বেশি করে আমেরিকাসহ বিদেশে অর্থপাচার হয়েছে বাধাহীনভাবে; আমাদের ব্যক্তিগত জানাশোনা থেকেই যা দেখা যায়। ফলে বাইডেন-ওবামাদের  আইন করা আর তা মাঠে প্রয়োগ করে অপরাধীদের ‘ন্যাংটা’ করা আসলে অনেক দূরের ঘটনা। এছাড়া যদি না এর মাঝে আবার কোনো “আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ” নামে কিছু ঢুকে বসে! আমরা তাই দেখতে চাইব সুনির্দিষ্ট কিছু।  এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল,  সেসব ব্যক্তি ও তাদের পাচারকরা অর্থ দুটোই ফেরত আনা দেখতে চাইব। কারণ, আমেরিকাকে মনে রাখতে হবে তারা “আইনগতভাবে” শব্দটা ব্যবহার করেছে – ‘kleptocrat’ বলে। যার বাংলা মানে যারা ব্যক্তিগত পাচারকারী তারা নয় বরং সুনির্দিষ্ট করে ক্ষমতাসীন শাসক যারা ‘পাবলিক মানি’  আত্মসাৎ ও পাচারকারি। বাংলাদেশের পাবলিক মানি এর হকদার বাংলাদেশের মানুষ – তাঁর ‘জনস্বার্থ’ এটা। অতএব আমেরিকান ট্রেজারি এই আইনগত কারণে উদ্ধারকরা অর্থ বাংলাদেশের ট্রেজারি হস্তান্তর করবে এটাই কাম্য! তবেই বাংলাদেশের মানুষের কাছে বাইডেনের এই-সেই ততপরতা মিনিংফুল হতে পারে! নইলে আরেকটা ১/১১ দেখার সাধ আমাদের নাই, তা সরাসরিই বলা দেয়া যায়!

    এবারের আরো কিছু বৈশিষ্টঃ
    তবে এবারের মানে ৬ ডিসেম্বরের মিডিয়া যতটুকু যা হইচই করা; এর অন্যতম কারণ হল, বর্তমানে বাইডেন প্রশাসনের ট্রেজারি বা রাজস্ব বিভাগের ডেপুটি মন্ত্রী ওয়ালী আদেইমো [Wally Adeyemo]; তিনি সম্প্রতি এক আমেরিকান থিংকট্যাংক ‘ব্রুকিং ইনস্টিটিশনের’ অতিথি বক্তৃতায় কথা দেন যে, তিনি এ বিষয়ে খুব আগ্রাসীভাবে চাপ দিবেন যাতে বৈধ উৎস দেখাতে না পারা যারা আমেরিকায় নগদে বাড়ি কিনেছেন তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার কাজ ত্বরান্বিত করা হয়। তিনি অবশ্য সেখানে স্বীকার করেন যে, “উপস্থিত আইনে নগদ অর্থেই রিয়েল এস্টেট প্রপার্টি কিনতে কোনো বাধানিষেধ নেই”। সাথে এও স্বীকার করে বলেছেন, “আমাদের রিয়েল স্টেট ব্যবসা এ ধরনের চোর শাসকদের বিদেশে সম্পত্তি কিনতে সাহায্য করে নিজেরই বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে”।

    [Another of these dark corners is the real estate market. Today, certain all-cash real estate transactions are not subject to permanent anti-money laundering rules or requirements for beneficial ownership disclosure. As a result, our real estate markets are at risk of becoming a safe haven for criminals, kleptocrats, and others seeking to park corrupt profits.]
    _ Remarks by Deputy Secretary of the Treasury Wally Adeyemo on Anti-Corruption at the Brookings Institution

    তবে আমাদের জন্য বটম লাইন হল, “খাওয়ার পরে হাত না ধোয়া পর্যন্ত বিশ্বাস নাই যে, আসলেই খেতে দিবে”। অর্থাৎ আশ্বাস না, কাজে বাস্তবায়ন দেখতে চাই। ফল দেখতে চাই। যেমন তিনি ঐ বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন আইএমএফের এক হিসাব মতে, সারা দুনিয়ার সরকারগুলো অর্থপাচার-দুর্নীতির কারণে প্রতিবছর প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার (একহাজার বিলিয়ন) ট্যাক্স-রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। তাই আবার স্বপ্নও অবশ্যই দেখতে চাই। যেমন, আমেরিকায় এমন প্রেসিডেন্সিয়াল এক্সিকিউটিভ অর্ডার আর এর বাস্তবায়ন শুরু হলে তা কানাডার ওপর ছড়াবে, চাপ তৈরি করবে। অর্থাৎ আমেরিকায় কেনা সম্পত্তি কানাডায় সরিয়ে নেয়ার সুযোগ হবে না। এমনিতেই আমেরিকার সাথে কানাডার একটা আইনের ইউনিফর্মিটি রাখার চেষ্টা হয়। কানাডায় পালিয়ে থাকা আমেরিকার আসামিকে কানাডাই গ্রেফতার ও পরে প্রত্যাবর্তন করাতে পারে। এ ছাড়া খেয়াল করলে দেখা যাবে, আমেরিকার ঘোষিত (বাংলাদেশসহ অনেক দেশের ওপর) অবরোধ আরোপ, এটা ব্রিটেন ও কানাডাও সমর্থন করে [“Our actions today, particularly those in partnership with the United Kingdom and Canada, send a message that democracies around the world will act against those who abuse the power of the state to inflict suffering and repression.”]।

    এজন্য বিপরীতে যেমন দেখা যায়, মালয়েশিয়া কেন লুট ও অর্থপাচারকারীদের ‘সেকেন্ড হোম’ হতে পেরেছে? কারণ, মালয়েশিয়ার আইনে আগেই বলে দেয়া হয়েছে যে মালয়েশিয়ায় অর্থ নিয়ে প্রবেশ করলে বাড়ি-প্রপার্টি কেনাসহ নাগরিকত্ব পাবে, সহজেই। কারণ মালয়েশিয়ায় আনা অর্থের উৎস জানতে চাওয়া হবে না। আর এ ধরনের রাষ্ট্রগুলো নিজের এমন আইনের সাফাই হিসেবে বলে, তারা নিজ দেশের জন্য বিদেশী পুঁজি সংগ্রহের উপায় হিসেবে এটা করেছে। যদিও আমার দেশের সম্পদ চোরকে কেন এমন উৎসাহ ও সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে; যা প্রকারান্তরে আমাদের দেশের শাসককে লুটপাট ও অর্থপাচারে উৎসাহিত করা – এই ব্যাপারে তারা নিশ্চুপ থাকে।

    কাজেই বাংলাদেশী ‘All-cash real estate deals’ ক্রেতা, এদের নিয়ে অগ্রগতি কই?  ০৬ ডিসেম্বরের পরে এক মাসের বেশি হয়ে গেছে, স্বভাবতই আমরা অগ্রগতি জানতে চাইব। কেবল তখনই একমাত্র এসবের ওপর পাবলিকের আস্থা-বিশ্বাস অল্প করে হলেও জাগতে পারে। শুধু গল্পে কিছু হবে না। আমরা তো চোদ্দবছর আগে একবার ধোকা-খাওয়া ঘরপোড়া জনগোষ্ঠির মানুষ!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ০৮ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “অর্থপাচারকারীর কী হবে?”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ‘অবরোধের’ অভিমুখ, এছাড়া কোথাও অন্য আলাপ নেই

    ‘অবরোধের’ অভিমুখ, এছাড়া কোথাও অন্য আলাপ নেই

    গৌতম দাস

    ২৭ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3RC

     

         The Impact of the U.S. President on Economic Sanctions

      An exterior view of the building of US Department of the Treasury is seen on March 27, 2020 in Washington, DC. – US Treasury Secretary Steven Mnuchin on Friday pledged to quickly send cash to Americans as part of the a massive $2.2 trillion relief package aimed at rescuing the coronavirus-battered economy. (Photo by Olivier DOULIERY / AFP) (Photo by OLIVIER DOULIERY/AFP via Getty Images)

     

    চার দিকে মার্কিন  অবরোধ ছাড়া বাংলাদেশে এখন যেন কোনো আলোচনার বিষয় নাই। গত ১০ ডিসেম্বর বাইডেন প্রশাসন এক স্যাংশন বা অবরোধের তালিকা প্রকাশ করেছিল। ওই তালিকাটা প্রকাশ করার পরে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়ে আছে বাংলাদেশে। তালিকায় ভুক্ত অন্য দেশগুলো হল – উগান্ডা, উত্তর কোরিয়া, চীন, বেলারুশ, শ্রীলঙ্কা ও মেক্সিকো। এখানে আমেরিকার দিক থেকে এই অবরোধ আরোপের কারণ কী? সে কারণ বলা হয়েছে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অবরোধ আরোপ’ …“gross violations of human rights,”…। তবে বাংলাদেশসহ এই সাত দেশের যেসব সরকারি কর্মকর্তার ওপর অবরোধ আরোপ হয়েছে তারা মোট ১২ জন [designated 12 government officials ]। অথচ এই ১২ জনের মধ্যে একা বাংলাদেশেরই ছয়জন। যারা একই প্রতিষ্ঠানের র‍্যাব [RAB] থেকে। মানে আগের মহাপরিচালক বেনজির ও এখনকার বর্তমান মহাপরিচালক এবং সাথে এখনকার চলতি অতিরিক্ত মহাপরিচালক সাথে আরো সাবেক তিন অতিরিক্ত মহাপরিচালক – এভাবে মোট ছয়জন। [ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের মূল নিষেধাজ্ঞার প্রেস রিলিজে এই ছয়জনের নাম দেয়া আছে।] তাই  সম্ভবত বলা যায়  বড় চাপ অথবা ‘বড় থাবা’তে যে আমেরিকা  বাংলাদেশকে ধরেছে তা অনুমান করা যায়। এখান থেকেই বাংলাদেশের সর্বত্র চা দোকান থেকে আলিশান ড্রয়িংরুম বা ক্ষমতার করিডোরগুলোতে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়েছে  এই মার্কিন অবরোধ।

    কিন্তু এই অবস্থার কারণেই আবার বাংলাদেশের বাইরে অবরোধের প্রতিক্রিয়া কী হচ্ছে, কিভাবে পড়ছে সেদিকটা প্রায় নজর শূন্য হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের। অথচ সেটাও বাংলাদেশের দিক থেকে দুনিয়ার পরিবর্তন বুঝার জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয় মোটেও। তবু প্রথমেই বলে নেই, এখানে ‘বাংলাদেশের বাইরে’ বলতে শুধু অবরোধ তালিকায় থাকা উগান্ডা, উত্তর কোরিয়া, চীনসহ ছয় দেশের কথা বুঝাচ্ছি না। এর বাইরেরও দেশ যারা আছে, যাদের নাম তালিকায় থাকার কথা কিন্তু শেষবেলায় এসে আমেরিকা যার নাম তালিকায় রাখেনি। যেমন, এমন অন্যতম দেশ হল, ভারত।

    এই ২০০১ সাল শুরু হয়েছিল, এটা ধরে নিয়ে যে ভারত  তখন থেকে আমেরিকার ঘোরতর স্ট্র্যাটেজিক বন্ধু হয়ে গেছে। আসলে এক ভয়ঙ্কর ইসলামবিদ্বেষ [islamophobia] এক ফোবিয়া যা কোনভাবেই গ্রহনযোগ্য নয় কারণ তা ধর্মের বিরুদ্ধে অন্য এক ধর্মের এথনিক ঘৃণা ছড়ানোর হিটলারি তৎপরতা। অথচ  এটাই আবার ভারত ও আমেরিকার কমন চরম অনৈতিক ও নির্মুলের [ক্লিনজিং-এর] স্বার্থ। এমন দগদগে স্বার্থই তাদের গত শতকের বেশিরভাগ সময় জুড়ে যে সব পুরনো বিবাদ ছিল তার সব ভুলে কাছাকাছি ও নতুন বন্ধু হতে উৎসাহিত করেছিল।

    অন্যভাবে বললে আমেরিকার “ওয়ার অন টেরর”পলিসিতে বড় সমর্থক হিসেবে এশিয়ায় ভারতকে পেতে ভারত-আমেরিকা কমন ইসলামোফোবিয়ার ভিত্তিতে পরস্পর তারা নতুন বন্ধুত্ব শুরু করেছিল। আর এটা এমনই পরস্পরের পিঠ চুলকে দেয়া বন্ধুত্ব যে, মনে করা হত তাদের পরস্পরের এই ‘পার্টনারস ইন ক্রাইম’-এর বন্ধুত্ব – এটা সহসাই নষ্ট হচ্ছে না; হবে না বা ভাঙবে না।

    অনেকের মনে হতে পারে কেন আমি এটাকে ভারত-আমেরিকার  – “ইসলামোফোবিয়ার ভিত্তিতে পরস্পর তাদের নতুন বন্ধুত্ব শুরু” বলছি? একটা ছোট ঘরোয়া উদাহরণ দিব। বিভিন্ন দেশের মাইগ্রেন্ট হতে চাওয়াদের নিয়ে নিজ দেশে নাগরিকত্ব দিচ্ছে এমন দেশগুলোর মধ্যে  কানাডা অন্যতম।  আর বাংলাদেশের অনেক বাসিন্দা এমন সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রেও অন্যতম। তাতে বাংলাদেশ থেকে  হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে অনেকে এমন নাগরিকত্ব নেয়া শেষ করেও ফিরে দেশেই থেকে গেছে অথবা কানাডায় বসবাস শুরু করেছে। সম্প্রতি গত সপ্তাহে কানাডা আবার আরো চার লাখের মত নতুন মাইগ্রেন্ট নিবে বলে ঘোষণা করেছে। এমন প্রেক্ষিতেই আমাদের এই স্টোরি।
    এনিয়ে দুই উচ্চ-শিক্ষিত হিন্দু নারীর কথোপকথন যারা  বহু পুরানা কানাডায় নাগরিকত্ব নেয়া বাংলাদেশি মাইগ্রেন্ট। তারা আক্ষেপ করে বলছেন, নয়া এই আরো মাইগ্রেন্ট নেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে, তাদের দৃষ্টিতে কানাডা আর তাদের বসবাসের জন্য উপযুক্ত স্থান থাকবে না। কেন, এমন অনুমান? কারণ এতে কানাডিয়ান বাংলাদেশিদের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা ব্যাপক বেড়ে যাবে। আর তাদের অনুমানে ধরে রাখা আছেই যে  মুসলমান মাত্রই তারা “পশ্চাতপদ, আনকুথ, আনকালচার্ড” ইত্যাদি। ওরা সেই কথা চিন্তা করে এই কথা বলছেন। মানে বৃটিশ আমল থেকেই  “প্রগতিশীলতা নামে” যা তাদের মনের গভীরে প্রোথিত তা আসলে এক এথনিক ঘৃণা, এক ক্লিনজিংয়ের আকাঙ্খা, এক “হিটলারি মনোরোগ”। সেসবই এখানে নব-পরিসরে প্রকাশিত হয়েছে।
    এই কথোপকথনের পরে আরো কিছু শেষ অংশটা এখন কী ও কেমন হতে পারে সেই ছবিটা এঁকে দেয়া যাক। সেটাও কম ভয়ঙ্কর নয়। ইসলামোফোবিয়া-সহ যেকোন ফোবিয়া [phobia] বা এথনিক ঘৃণা-বিদ্বেষ আসলে কিন্তু খুবই ছোঁয়াচে। মানে কী? মানে হল তা শ্রোতার মনেও পালটা এথনিক ঘৃণা-বিদ্বেষ জাগিয়ে তুলতে পারে।  যেমন ইসলামোফোবিয়ার কমন অনুষঙ্গ বা সাথে বড় হওয়া ভাবনা হল মুসলমান নির্মুল বা ক্লিনজিংয়ের প্রবল আকাঙ্খা। কিন্তু তাতে কী সমস্যা? সমস্যাটা হল, এতে ইসলামোফোবিক দিকটা টের পেলে মুসলমানদের মনেও প্রথম প্রতিক্রিয়াটা হয় আত্মরক্ষা।  মানে, মনে আত্মরক্ষার চিন্তা আসা। যা সবচেয়ে কমন ও স্বাভাবিক!  কিন্তু এই আত্মরক্ষার উপায় বা পথ হিসাবে সে এরপর যা বেছে নেয় সেটাও আরেকটা তবে অন্যভাবে বলা আমরা-তোমরা। যেটা হল আমার ধর্মটাই শ্রেষ্ঠ।  যেটা পরিণতিতে এমন এক দুনিয়ার কল্পনা হিসাবে হাজির হয় যে দুনিয়াটাতে মুসলমান ছাড়া আর কেউ নাই। অর্থাৎ আত্মরক্ষার  বেস্ট মানে যেন এমন এক দুনিয়ার কল্পনা করা যেখানে মুসলমান ছাড়া আর কেউ না থাকে।  তাহলে এখানে সারকথাটা হল, যেকোন ফোবিয়া মাত্রই অন্যান্য অসংখ্য ফোবিয়ার জন্ম দেয়া। যেগুলো সমান মাত্রায় বিপদজনক।
    ইংরাজি এথনিক [ethnic] মানে বাংলায় আমরা একেও ‘জাতি’ বলি।  এছাড়াও ইংরাজিতে আরেক জাতি [race] আছে। বাংলায় একেও আমরা জাতি বলি। দুটার ফারাক হল, রেস মানে রক্ত বা জিন [gene] -গত বায়োলজিক্যাল ফারাক। এই অর্থে জাতিগত  মানুষে-মানুষে ফারাক বুঝায়। যুগ যুগ ধরে  নানান ধর্ম, কালচার, ভাষা, খাদ্যাভাস ইত্যাদির ভিত্তিতে  জনগোষ্ঠিগত সামাজিক ফারাক হতে দেখা যায় এটাই এথনিক-জাতিগত ফারাক।

    এখন কোন একটা রেস অথবা এথনিক জাতি যদি “অপর” জাতির উপর ঘৃণা-বিদ্বেষে চরমে উঠায় বা ‘ফোবিক’ হয়ে যায় এটাই “হিটলারি ফেনোমেনা”।   সবচেয়ে বড় কথা এক ফোবিয়া বাকি সকলের মধ্যে একই নতুন নতুন ফোবিয়ার জন্ম দেয়, ডেকে আনে।  এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল, হিটলারের “ইহুদি-ফোবিক” হয়ে যাওয়া।  আবার পরিণতিতে এথেকে ছোঁয়াচে ঘটনায় এবার ইহুদিদের মধ্যে জায়োনিস্ট আইডিয়ার ব্যাপক উদ্ভব ও জনপ্রিয়তা। জায়োনিজম তাই দুনিয়ার বাকি সব-জাতি [race and ethnic উভয় অর্থে] জনগোষ্ঠিকে প্রবলতম ঘৃণা-বিদ্বেষ করে থাকে, এমন চরম ফোবিক এক ফেনোমেনা হয়ে গেছে। সে নিজেকে বাদে বাকি সব-জাতি [race and ethnic উভয় অর্থে] জনগোষ্ঠি্র উপর আক্রমণ ও নির্মুলের আকাঙ্খাকে স্বাভাবিক মনে করে;  অর্থাৎ যেকোন “অপর” এর উপর তাদের নুন্যতম আস্থা-বিশ্বাস নাই, সব উঠে গেছে।

    কিন্তু এমন সব গাঢ় অনুমানকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে বাইডেনের অবরোধের তালিকা প্রকাশ। ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অবরোধ আরোপ’- এই ভিত্তিতে সেই তালিকা; তবে বেছে বেছে ‘কিছু দেশের’ ওপর বাইডেন প্রশাসনের অবরোধের পদক্ষেপ নিতে তাদের দেশের নাম তালিকায় রেখেছেন। বেছে বেছে কিছু দেশ বললাম এজন্য যেমন দেখেন, বাইডেন নিজের ঘোষিত নীতি ভারতের বেলায় প্রয়োগ করার মুরোদ দেখাতে পারেননি। কিভাবে সেটা?

    ঘটনার শুরু গত ২০২০ সালে বাইডেন যখন প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা নিশ্চিত করেন। তবে এরও আগেই কিছু আমেরিকান (মুসলমান ও নন-মুসলমান) কংগ্রেস সদস্য কাশ্মিরে ভারতের মুসলমানদের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন আর সর্বোপরি কাশ্মিরের (ভারতের জন্ম থেকেই দেওয়া) স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা ক্ষুণ করে জবরদস্তিতে সারা কাশ্মিরই ভারতের মূল ভুখন্ডের অংশ বলে (২০১৯ আগস্টের ৫ তারিখে) মোদি সরকারের সংসদে ঘোষণা – এরপর থেকে ক্রমাগত কাশ্মিরের বাসিন্দাদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘন চরমে উঠেছিল বলে এসব ঘটনাকে আমলে নিয়ে এর বিরুদ্ধে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব এনেছিল। আর প্রার্থী বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হলে এই প্রস্তাবের পক্ষে পদক্ষেপ নিবেন বলে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন। আর এটাই বাইডেন-মোদির সংঘাতের সম্পর্কের ঘটনার উৎস। আর এমন ঘোষণা মোদি সরকার ভালোভাবে নেয়নি, বিপদ দেখেছিল। এই ঘোষণা থেকেই মোদির পিছটান ও আমেরিকান সম্পর্ক ছেড়ে পালানোর উপায় বের করা শুরু হয়েছিল। তাই বাইডেন বিজয়ী হওয়ার পর থেকে মোদি সরকারের অঘোষিত টেনশন শুরু হয়ে যায়।

    তবে সেই টেনশন আরো বাস্তব হয়ে উঠতে বাইডেন প্রশাসন শপথ নেয়ার পরেও ১০ মাস সময় লেগে যায়। এবার ১০ ডিসেম্বরে বাইডেন অবরোধের তালিকা প্রকাশ করেছেন। এদিকে ইতোমধ্যে মোদি সরকারের মুসলমানদের ওপর একের পর এক নির্যাতন, নিপীড়নের পাপ আর কেবল কাশ্মিরেই আটকে থাকেনি। ভারতজুড়ে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল। এছাড়া বাইডেনের সাথে বিবাদ বাড়ার আরও ঘটনা ছিল যা যোগ হয়েছে। কোন্ কোন্ দেশের নাগরিককে তার দেশের সরকার নিজ নিজ ধর্মপালনে বাধা দিচ্ছে বা ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে তা লক্ষ্যরাখা ও নোট নেয়ার জন্য আমেরিকায় এক রাষ্ট্রীয় স্বাধীন কমিশন [USCIRF] আছে যার কাজ হল সেসব লঙ্ঘনকারি সরকারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য যে প্রশাসনই আমেরিকায় ক্ষমতায় থাকে তার কাছে বার্ষিক সুপারিশ রিপোর্ট পাঠিয়ে দেয়া। এবারের ২০২১ সালের এমন রিপোর্টে ভারতকে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ক্যাটাগরির দেশ [CPC (“country of particular concern,”] হিসেবে ভারতের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়ার সুপারিশ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।

    তাই মোদি সরকারের আশঙ্কা ছিল বাইডেন ট্রাম্প প্রশাসনের মত তার ফেভারেবল সরকার নয়। যে ট্রাম্প প্রশাসন এসব রিপোর্ট উপেক্ষা করে ফেলে রেখে চলেছিল। এছাড়া চলতি ডিসেম্বরের ৯-১০ তারিখ বাইডেন ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ আহবান করেছিল আর এখান থেকে যে এই অবরোধের তালিকা প্রকাশ করা হবে তা আমেরিকার দিক থেকে আগেই ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। ফলে সেসব কথা ভারত জানা ছিল গত অক্টোবর মাস থেকে, বিশেষ করে নভেম্বরের শুরুতে প্রকাশ্যে  সামিটের দাওয়াতপত্র বিতরণ শুরু হওয়া থেকে।

    আর এখান থেকেই মোদি সরকার আমেরিকার ওপর পাল্টা চাপ সৃষ্টির কৌশল ও পদক্ষেপ নিতে জরুরী বোধ করা শুরু করেছিল। সেই পদক্ষেপ হিসাবে ভারত প্রকাশ্যেই রাশিয়ার সাথে তার ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ করতে শুরু করে। অনেকে ধারণা করত চীন ও রাশিয়া যেহেতু আমেরিকার বিরুদ্ধে তারা এক-জোট; এই অবস্থা গত ১০ বছরের বেশি ধরে বহাল রেখেছে কাজেই এর বিপরীতে চীন-ভারত প্রকাশ্য বড় শত্রুতায় আছে বলে একে পাশ কাটিয়ে ভারত-রাশিয়া ঘনিষ্ঠতা খুব একটা কার্যকর হবে না।

    আসলে ২০০১ সালে ওয়্যার অন টেরর নীতির কারণে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা শুরু হয়েছিল তাতে বলা যায় আমেরিকা ওই প্রথম রাশিয়া থেকে ভারতকে বিচ্ছিন্ন ও আলাদা করে  অনেক দূরে নিয়ে চলে যায়; যার মূল টোপ বা কারণ হল, বুশের আমেরিকা ভারতকে পরমাণু-অস্ত্রবিষয়ক টেকনোলজি ও কাঁচামাল-উপাদান সরবরাহের যেসব আইনি বা কনভেনশনের বাধা (এনপিটি NPT) ছিল তা উপেক্ষা করে সহায়তার হাত বাড়িয়েছিল। স্বভাবতই এর লোভেই ভারত তার এতদিনের জিগার- যে ভারতকে রাশিয়ান অস্ত্রে সজ্জিতকারী এত পুরনো বন্ধু, সেই রাশিয়াকে উপেক্ষা করে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক বন্ধু হওয়ার জন্য ছুটে গিয়েছিল।

    ভারতের ‘সরকারি কালচারে’ কোনটাকে তারা ‘সুখ’ বা অর্জন বলে বুঝে এর কিছু বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি বা এটিচ্যুড-ভঙ্গিমা আছে। যেমন আমেরিকা ভারতকে গুরুত্ব দিয়ে গত প্রায় ২০ বছর চলেছে কাজেই ভারত পরাশক্তি হয়ে গেছে। এমন অর্থহীন মিথ্যা হামবড়া কংগ্রেসের প্রণব মুখার্জি করে গেছে আর এখন মোদি করে যাচ্ছেন। তবে কৌওলটা হল এটা সরকার নিজে পাবলিকলি প্রচার না করে, প্রপাগান্ডা সাংবাদিকদের দিয়ে করানো! সে উদ্দশ্যে তারা সরকারের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের সাথে কাজ করে এমন  সাংবাদিকদেরকে তা বিশ্বাস করিয়েই ছেড়েছিল। এ ছাড়াও আমেরিকা যেসব ঢংয়ে ভারতকে গুরুত্ব দেয়া প্রকাশ করেছিল সেটা নিশ্চয় ভারতের জন্য খুবই সম্মানের- এই অনুমানটাই সরকারি কালচারে বর্তমান।

    যেমন প্রায়ই আমরা একটা কথা শুনব যে “২+২ ডায়ালগ”। এটা তাদের অনুমান বিচারে খুব উচ্চমার্গের ব্যাপার। এমনকি রিপোর্টের শিরোনামেও এই শব্দগুলো তারা এনেছে। কেন? কারণ এটা আমেরিকা ভারতকে অফার করেছিল। তাহলে নিশ্চয় এটা দামি কিছু না হয়ে যায়ই না……!! এবং এই কালচার চালু করেছিল। অথচ ব্যপারটা স্রেফ আর কিছুই না, আমেরিকার ভারতকে অস্ত্রবিক্রি গছানোর মাত্র কায়দা একটা। সেখানে ‘২+২’ বলতে খাঁড়া মানে, দুদেশেরই পররাষ্ট্র আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী এভাবে এখানে চারমন্ত্রীর একসাথে বসে অস্ত্র কেনাবেচার লক্ষ্যে কোন মিটিং করা। এটা এতদিন আমেরিকান স্টাইল ছিল, ভারতকে জাতে তোলার। তাই এবার পুতিনের সফরে ভারতও রাশিয়ার সাথে এক ‘২+২ ডায়ালগ’ করেছে। এর এক পরোক্ষে ‘প্রদর্শনী অর্থ’ আছে যে, আমরা আমেরিকা ছাড়াই রাশিয়ার সাথেও এমন গুরুত্বের ডায়ালগ করেছি। আর ভারত সব সময় (ভুয়া এক সুখ) অনুভব করতে চায় যে দুনিয়ার পরাশক্তিদের সাথে ভারতের ‘২+২ ডায়ালগ’ – এসব করা মানে ভারতও এতে পরাশক্তি হয়ে গেছে। এর লক্ষণ এসব!!!

    এছাড়া সাথে আরেকটা মিডিয়া কাভারেজে আমরা দেখতে পাই ওই একই দ্য-প্রিন্ট [the-print] ওয়েবপত্রিকায় যেটা লিখবেন জ্যোতি মালহোত্রা। তার লেখা পড়ে পেইড লেখা মনে হবে। ‘যেমন তেমনই’ লেখাটার শিরোনাম হল Putin’s visit is a defining moment for India-Russia ties. It’s a telling message to China। আজিব ঘটনাটা হল, এটাই নাকি “চীনকে (চোখ টাটিয়ে) বলা এক মেসেজ’। মানে অন্য লেখায় নয়নীমা বসুর লেখাটা যদি বিদেশ মন্ত্রণালয় তাকে প্রভাবিত করে লেখানো লেখা বলি তাহলে মালহোত্রার লেখাটা হল একেবারে অর্ডার দিয়ে লেখানো! কিন্তু কেন এটা ‘ডিফাইনিং মোমেন্ট’ বলা হচ্ছে এর ব্যাখ্যা নেই। আর এমন তো নয় যে, রাশিয়া ভারতের সাথে কোনো ডিফাইনিং মোমেন্ট তৈরিতে যেতে চাইছিল!  না; তা তো নয়। বরং ভারতই আমেরিকার সাথে তাকাতে রঙিন চশমা দিয়ে দুনিয়া দেখার সুযোগ নিচ্ছিল আর এটা ভারতকেই আটকে রেখেছিল রাশিয়ার কাছে ছুটে যাওয়া থেকে। তাহলে ডিফাইনিং মোমেন্টের নাগাল ভারত এতদিন পায়নি নিজের বোকামিতেই…।

    তবে এতে যেটা হয়েছে তা হল, ভারত আমেরিকা থেকে আরো অনেক দূরে চলে গেছে যেখান থেকে ফিরে আবার আমেরিকার কাছে যাওয়াটা অনেক কঠিন হয়ে গেল। অনিশ্চিতও হয়ে গেল।

    কিন্তু মোদি আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ছেড়ে রাশিয়ার সাথে ভারতের পুরান সম্পর্কটা ফিরে জাগাতে এত সিরিয়াস কেন? প্রথমত মোদি তা করতে গেছেন নিজ সরকারের স্বার্থে নয়। বরং মোদির আসন্ন সব নির্বাচনে বিজয়ের স্বার্থে। ভারতের বিরুদ্ধে বাইডেনের মানবাধিকার লঙ্ঘন বা মুসলমান দমনের অভিযোগ  বরং মোদিকে আগামি ২০২৪ সাল পর্যন্ত নির্বাচনে বেকায়দা অবস্থায় ফেলবে; এই হলো মোদির অনুমান। করোনার সেকেন্ড ওয়েভ থেকেই মোদির পাবলিক রেটিং এরপর থেকে যারপরনাই খারাপ। আর সেটাকে চাঙ্গা করতে মোদি এখন আরো বেপরোয়াভাবে মুসলমান নির্যাতন শুরু করেছেন, অন্তত ২০২৪ পর্যন্ত করে যাবেন। যেমন, ‘পাবলিক প্লেসে নামাজ পড়া যাবে না। ভোটের আগে ত্রিপুরায় মসজিদে হামলা বা কমিউনিটিতে হামলা করলে অন্য বিরোধীরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে আগিয়ে আসে নাই। এই ভয়ে যে এতে সেই বিরোধী দল হিন্দু-ভোট হারাবে”। আবার চার দিন আগে উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারে তথাকথিত কিছু সাধুদের দিয়ে (নাম তার খুব বাহারি – যতি নরসিংহানন্দ স্বরস্বতী) প্রকাশ্যে জনসভায় ঘোষণায় আহ্বান জানালেন মুসলমানদের হত্যা করার জন্য। অথচ কেউ মামলা করেনি, এই অজুহাতে পুলিশ চুপ করে বসে আছে। তাই কলকাতার মমতার দল তৃণমূলের এক উপস্থিত সদস্য বাদি হয়েছে। তিনি নির্বাচন কমিশনেও নালিশ দিয়েছেন। মোদির দলের মুখ কুলুপ! অর্থাৎ এগুলো হল, আগামী মাসে উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে আবার জিতে আসার জন্য মোদির একমাত্র  ও শেষ উপায়।
    তাই এই অবস্থায় মুসলমানের ওপর নির্যাতন বা হত্যার অভিযোগ আবার আমেরিকান মানবাধিকার লঙ্ঘনে বড় হয়ে উঠুক এটা মোদি নিতে পারবেন না। তাই আমেরিকার কাছ থেকেই ভারতের এই পলায়ন। তাতে ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থ যাই হোক সেটা সেকেন্ডারি, পরে দেখা যাবে। মোদির মূল স্বার্থ এখন নির্বাচনে বিজয়। নির্বাচনে নিজের দলকে বাঁচানো।

    তাই এই ডিসেম্বর মাসেই বাইডেনের ওপর পাল্টা চাপ তৈরি করতে মোদির ভারত এবার মরিয়া অবস্থায় রাশিয়ার পুতিনের ভারত সফর আয়োজন করেছিল। পুতিনের ভারত সফর ছিল ৬ ডিসেম্বর এবং তা কেবল পাঁচ ঘণ্টার জন্য। কিন্তু আয়োজন, আলোচনার বিষয়বস্তু প্রসঙ্গে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের প্রপাগান্ডা ছিল শিখরে।

    ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় তাদের দেশীয় মিডিয়ায় কিভাবে হাজির থাকতে চায়, এর কিছু তরিকা দেখতে পাওয়া যায়। দা-প্রিন্টের নয়নীমা বসু বলতে চান যে, ভারত আর শুধু রাশিয়ান অস্ত্রের ক্রেতা নয়। ভারত এখন অস্ত্রবিষয়ে জয়েন্টভেঞ্চারে উৎপাদক। এমনকি অস্ত্রবিষয়ক গবেষণাতেও অংশীদার হতে যাচ্ছে।

    তাহলে সারকথাটা কী?
    সারকথাটা হল, অবরোধের অভিমুখটা এখন থেকে যতই দিন যাবে ভারত ততই আমেরিকা থেকে দূরে চলে যেতে থাকবে। যার একটা পর্যায়ে ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক আর আগের জায়গায় ফেরার সব সম্ভাবনা নিঃশেষ ও লুপ্ত হয়ে যাবে। অবস্থা দ্রুতই সেদিকে যাচ্ছে। আর সেটার এখনই যে অবস্থা তাতে বাংলাদেশের উপর আমেরিকান চাপ প্রয়োগ যে হারে বাড়ছে তাতে এথেকে বাংলাদেশকে নুন্যতম রিলিফ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের কোন ভুমিকা রাখার সুযোগ এখনই প্রায় নাই। ফলে আমাদের সরকারকে সহায়তা দিবার ক্ষেত্রে বাকি থাকল কিছু পুরান কমিউনিস্ট রাষ্ট্র যারা মনে করে শ্রেণী স্বার্থের নামে রাষ্ট্রের হাতে নাগরিককে হত্যা কিংবা, গুম-খুন করার সুযোগ তো থাকতেই হবে। সেই সুত্রে,  রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্ক সেটা আবার কী? অথবা ধরেন, নাগরিক বলে কাউকে সুরক্ষার দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে? কেন? এসব তারা মানে না। তাদের রাষ্ট্র ধারণায় এসবের বালাই নাই। আছে কেবল তথাকথিত শ্রেণীস্বার্থের শ্রেণীবোধ – শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণা ইত্যাদি। আসলে এগুলো এমন সব শত বছরেরও বেশি পুরান অর্থহীন সব কমিউনিস্ট প্রলাপ!! যা রিভিউয়ের সাহস, নিজেকে সংশোধন ও পুনর্গঠনের সক্ষমতা একালে কারও মধ্যেই নাই!
    তবুও ব্যক্তিগত স্বার্থ বা আত্মরক্ষার্থে  হাসিনা সরকারের অভিমুখ দিনকে দিন সেরকম ক্যাম্পের দিকেই হবে। আবার এর উল্টাটা যে, আমেরিকান বিরাট কোন স্বার্থ আছে যেমন বঙ্গোপ্সাগরে সপ্তম নৌবহর নোঙর করানোর সুযোগ মিলবে –  এই লোভে সে কোন স্বৈর শাসকের বিরুদ্ধে খাড়া হয়ে যেতেও পারে। সেটা হয়ত পারে, হয়ত তা সে করবে হয়ত না। কিন্তু এসব স্বার্থে আমেরিকান কোন পদক্ষেপ নিবার ক্ষেত্রেও আমেরিকান সক্ষমতার মুরোদ নিঃশেষ হবার দিক যাচ্ছে আর সম্ভবত বাইডেনই হতে যাচ্ছেন তাতে শেষ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট। তাও আবার যা করার তা  আগামি বছরের মাঝামাঝির পরে তাও লোপ পেয়ে যাওয়ার অভিমুখে হাটছে!!! বিশেষত আমেরিকান – সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতিক উত্থানের ধাক্কায় –
    রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ গঠন তা সামলাতে অক্ষম হয়ে যেতে পারে, এমন স্বার্থ সংঘাত বিপুল বেগে বাড়ছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ২৫ ডিসেম্বর ২০২১ ওয়েবে  আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “অবরোধ’ ছাড়া কোথাও আলাপ নেই”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • গিভ এন্ড টেকের ‘বস্তুই’ নাই

    অবরোধ আলোচনায়ঃ

    গিভ এন্ড টেকের ‘বস্তুই’ নাই

    গৌতম দাস

    ২০ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Re

     

    Recent US sanctions On China, Bangladesh

    Bangladesh protests US sanctions against RAB

     

     

    গত ১০ ডিসেম্বর বাইডেনের আমেরিকার ট্রেজারি বিভাগ বাংলাদেশের বিশেষ প্যারামিলিটারি বাহিনী ‘র‌্যাব [RAB] এর চলতি এবং সাবেক সাত অফিসার ও খোদ প্রতিষ্ঠানটার ওপর অবরোধ বা স্যাংশন [sanction] আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এতে সাবেক র‌্যাব প্রধান ও বর্তমান আইজি পুলিশ বেনজীর আহমেদও আছেন। এদিকে সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদেরও আমেরিকান ভিসা বাতিল করে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে বলে দেশের মিডিয়ায় রিপোর্ট এসেছে।

    বাংলাদেশে আমেরিকার এই অবরোধ আরোপের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাব এখন কোথায় কতটুকু পড়বে অথবা এর প্রতিক্রিয়া কী কী, কতদূর হতে পারে অথবা সরকার টিকে থাকতে কোনো সমস্যায় পড়বে কি না – এসব নিয়ে জল্পনা-কল্পনা এখনকার সময়ের প্রধান আলোচনার বিষয়। তবে এটা বলাই বাহুল্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার যেকোনো বাহিনীর সদস্যরা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার বিষয়ে এখন অন্তত এসংক্রান্ত পুরো পরিস্থিতি ও এর অভিমুখ নিশ্চিত ঠাহর করার আগ পর্যন্ত সতর্ক হয়ে থাকতে চাইবেন।
    সবচেয়ে বড় কথা, গত ১৩ বছরে নানা অনিয়ম রেজিমে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় সেই ব্যবহারিক রেওয়াজ আবার একটু থমকে দাঁড়াতে চাইবে। “আবার” বললাম এ জন্য, যেমন গত ২০১৯ সালে ক্রসফায়ারে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ছিল  চার শতাধিক [……২০১৮-২০১৯ সালে ৪২৪ জন ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন……। ]। কিন্তু পরের বছর তা কমে এর মাত্র ১০ ভাগে নেমে এসেছিল। কারণ, কক্সবাজারে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড। অনেকের অনুমিত ব্যাখ্যাটা এরকম যে, বাহিনীতে দলাদলি বা সহমত ভেঙে যাওয়ায় রেকর্ড উল্টো হয়েছে। কাজেই এবার অবরোধের ঘটনাতেও এই শক থেকে এবার ডাটা কী আসে তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে কর্মি-জনবলের  মনোবলের ওপর প্রভাব পড়া যে খুবই সম্ভব তা সম্ভবত সরকার আমল করছে। যেমন ১০ তারিখের পর থেকে এখন পর্যন্ত সরকারের প্রধান প্রতিক্রিয়া হল একেবারে ‘ডিনাইয়াল’[denial] বা পুরোপুরি অস্বীকার করা। সম্ভত তাদের অনুমান, গুরুত্বপূর্ণ আমলা ও দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে হলে এটাই পথ।

    এই অবরোধের সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট বাইডেনের এক নির্বাহী আদেশে ইও নং ১৩৮১৮ [Executive Order (E.O.) 13818] হয়েছে এবং বাইডেন প্রশাসনের স্টেট ডিপার্টমেন্ট বা পররাষ্ট্র বিভাগসহ আরো অনেক বিভাগের মিলিত তৎপরতার সার ফলাফলে এই অবরোধ আরোপ ঘটেছে। কিন্তু সবশেষে এর পাবলিক ঘোষণাটা দেয়া হয় ট্রেজারি বিভাগ থেকে। কেন?
    কারণ বিষয়টা মূলত ফাইন্যান্সিয়াল এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বিষয়ক। আরেকটু খুলে বললে দুনিয়ায় যত বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন হয় তার ৮৫ ভাগ বা তারও বেশি হয় আমেরিকান ডলারে; যার সোজা মানে সব লেনদেনের একটা না একটা পর্যায়ে তা হতে হয় ডলারে আর এর পরেই তা কনভার্ট হয়ে নিজ নিজ দেশীয় মুদ্রায়। আর ডলারে হওয়া মানে, কোনো না কোনো স্থানীয় (যেমন ঢাকার) কোন ব্যাংকের আবার কোন এক আমেরিকান ব্যাংকে (ডলারে) যে অ্যাকাউন্ট থাকে এর মাধ্যমে তা হয়েছে। তাই ডলারে লেনদেন মানেই আমেরিকান ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমের অংশ হওয়া ও তা ব্যবহার করা। মানে ধরা যাক, বাংলাদেশে স্থানীয় ‘ন্যাশনাল ব্যাংকে’ আমার অ্যাকাউন্ট আছে। এই ব্যাংকের আবার কোনো আমেরিকান ব্যাংকে ডলার-অ্যাকাউন্ট আছে। এতে এখন মূলত আমার হয়ে সেই ডলার-অ্যাকাউন্ট কোনো লেনদেন সম্পন্ন করে দিয়ে থাকে। এখানে যদিও আমার হয়ে আমার দেশী মুদ্রার ব্যাংক অনেক লেনদেন করে দেয় বলে আমরা ডলারে লেনদেন ব্যাপারটা টের পাই না। কিন্তু যখন আমার নামে ‘অবরোধ আরোপ’ করা হবে এর অর্থ, আমার জন্য এই ‘আমেরিকান ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমকে’ ব্যবহার ও প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয় তখন থেকে।

    তাহলে কোন আমেরিকান ব্যাংক যদি আমাকে নিষিদ্ধ বা অবরোধ করার তথ্য, জেনে অথবা না জেনে আমার লেনদেনটাও সম্পন্ন করে দেয় তাহলে কী হবে? বলাই বাহুল্য, এতে এই ট্রেজারি বিভাগ সেই আমেরিকান ব্যাংককে কড়া ফাইন করবে। যেমন- ইরানের ওপর আরোপিত অবরোধে হংকং ব্যাংকের আমেরিকান শাখা এমনই এক নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে এক লেনদেন ঘটিয়ে দিয়েছিল বলে ওই ব্যাংককে ট্রেজারি বিভাগ থেকে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার ফাইন করা হয়েছিল।

    আরেকটা কথা, কেন আমেরিকার হাতেই এমন অবরোধ আরোপের ক্ষমতা দেখা যায়? দুনিয়ার অন্য কোনো দেশ বা সে দেশের মুদ্রাও কী এমন অবরোধ আরোপ  করতে পারে না? অবশ্যই করতে পারে। যেমন- চীনও পাল্টা কিছু কিছু আমেরিকান প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ওপর অবরোধ আরোপ করে দেখা যায়। কিন্তু দুইটার ফারাক হল যেহেতু চীনা মুদ্রা ইউয়ানে দুনিয়ায় লেনদেন ডলারের তুলনায় অনেক কম সেকারণ চীনা-অবরোধের প্রভাবও অনেক কম। এ ছাড়াও যাদের লেনদেন চীনের সাথেই কেবল সেখানে কেবল এর কিছু প্রভাব পড়বে।

    ওদিকে, আমেরিকা কী কারণ দেখিয়ে এই অবরোধ আরোপ করেছে? তারা দেখিয়েছে যে, বাংলাদেশের র‌্যাব ও এই প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট ওসব ব্যক্তিরা বাংলাদেশে গুরুতরভাবে ‘আইনের শাসন’ ও ‘মানবাধিকার আইন’ ভঙ্গ করেছেন। এখন আমেরিকান প্রশাসনও যদি এমন কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করে থাকে তাহলে কি আমরা অথবা অন্য কোনো দেশ একই ধরনের মানে আমেরিকার ওপর অবরোধ আরোপের পদক্ষেপ নিতে পারব? আর পারলে তা করি না কেন?

    প্রথমে বলে রাখি, এটা তো এখন আশা করি সবার কাছে পরিষ্কার যে, এই অবরোধের শাস্তি দেয়ার সাথে জাতিসংঘ বা অন্য কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা নাই। কেবল আমেরিকান প্রশাসনই এটা করেছে। তাই বলা যায়, আইনত বাংলাদেশ বা আমেরিকাবিরোধী অন্য কোনো দেশও এমনইভাবে কোন আমেরিকান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চাইলে এমন পদক্ষেপ নিতে পারবে। কিন্তু সবার আগে ব্যাপারটায় আমেরিকা আমাদের সাথে খুব তুলনীয়ই নয়, সেদিকটায় নজর দিতে হবে। কারণ আমেরিকার বিচারব্যবস্থা এখনো তাদের সমাজে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রাখে, এছাড়া তারা নিজেকেই নিজে সংশোধন করে নেয়ার  এখনো অযোগ্য হয়ে যায় নাই, বরং ক্ষমতাসম্পন্ন; যদিও এর সবই ভাল এমন আদর্শব্যবস্থা নিশ্চয় আমেরিকা নয়। তবে আমাদের দেশের বেলায় এ’ধরনের অভিযোগগুলোর গত ১৩ বছরে কোনো সুরাহা বা প্রতিকার নেই। ফলে এ জায়গায় আমরা আমেরিকার সাথে তুলনীয় নই।

    দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা আরো গুরুত্বপূর্ণ। এখনো পর্যন্ত ডলারের দেশ আমেরিকা বাদে অন্য কোনো দেশ অবরোধ অন্যকোন দেশের উপর আওরোপ করলেও এর কোন শক্ত প্রভাব নাই, এর মূল কারণ কী? মানে অন্য কোনো দেশের অবরোধের তেমন মূল্য নেই। কারণ কিছুটা উপরে বলেছি। বাকিটা হল, অবরোধ মানে, আসলে প্রতিষ্ঠিত কোন দেশের ইকোনমিক ও ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম থেকে কাউকে বের করে দেয়া। অনেকটা একঘরে করে দেয়ার মত। যদিও সেটা আমেরিকান ডলারের অবরোধ হলে তবেই সেই চাপ কার্যকর। কারণ দুনিয়ার ৮৫ ভাগেরও বেশি লেনদেন হয় এই ডলারে। আবার সবকিছুই এত বেশি পরিমাণে ডলার-মুদ্রায় কেন? এমন হওয়ার কারণ, গ্লোবাল বাণিজ্য ও লেনদেন ব্যবস্থাটার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ [IMF] হলেও এটা জন্ম (১৯৪৪) থেকেই একমাত্র আমেরিকান ডলারকেই ভিত্তি করে এটা শুরু বা কার্যকর হয়েছিল। ফলে তাতে ডলার আন্তর্জাতিক লেনদেনের একমাত্র মুদ্রা হয়ে যায়। কিন্তু তা হলেও তখনো মূলত ডলার আসলে একটা দেশের, আমেরিকার স্থানীয় মুদ্রা। অর্থাৎ আমেরিকার নিজের মুদ্রার ব্যাপারে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আমরা অন্য দেশের কেউ বাধা দিতে পারি না। আমেরিকার পড়ে-পাওয়া এই বাড়তি  সুবিধা প্রাপ্তির শুরু এখন থেকেই। এটা জানা সত্বেও এমনটাই করতে হয়েছিল।

    তাহলে আমরা ডলারকে সেকালে আন্তর্জাতিক লেনদেনের একমাত্র মুদ্রা হিসেবেও নিয়েছিলাম কেন?
    কারণ সে সময় এক আমেরিকান ডলার ছাড়া আর কোনো দেশের মুদ্রা – তার অ্যাকাউন্টে সারপ্লাস বা উদ্বৃত্ত ছিল না। এর মানে আবার কী? মানে হল, দুনিয়ার যত লোককে ডলারে পেমেন্ট দিতে হবে বা আমেরিকার কাছে পাওনা, এর চেয়ে আমেরিকা যাদের কাছে পাবে মানে তারা ডলারে আমেরিকাকে পেমেন্ট দেবে, এর পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। এই পরিস্থিতিটাকে বলা হয় (ডলার) সারপ্লাসে আছে। আবার একটা টেকনিক্যাল পয়েন্ট হলো গ্লোবাল বাণিজ্য লেনদেন ব্যবস্থা কোনো মুদ্রায় চালু করতে গেলে ওর জন্য গ্লোবাল বাণিজ্যের সেই মুদ্রাকে সারপ্লাস মুদ্রা হতে হয়। ১৯৪৪-৪৫ সালে একমাত্র মার্কিন ডলার ছিল সারপ্লাস। এ’ছাড়া বাকি ইউরোপের সব মুদ্রা ছিল মুদ্রাস্ফীতির মুদ্রা। মানে, ভল্টে রাখা সোনার চেয়ে নোট ছাপানো মুদ্রা মান-পরিমাণে বেশি। তাই সেকালে ডলার হয়ে যায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একমাত্র মুদ্রা।

    “তারা ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর তালিকাতে রেখেও ভারতের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের কোনো ঘোষণার মুরোদ দেখাতে পারেননি। উল্টো ভারতকে ‘গণতন্ত্রী রাষ্ট্র’ বলে দাওয়াত দিয়েছেন আর মোদি সেখানে বক্তৃতা দিয়েছেন। বাংলাদেশ নিয়ে আলজাজিরার রিপোর্টে অনেকে ব্লিঙ্কেনের ‘এই চাপাবাজি’র ফাঁদে পড়েছেন। দেখা গেছে, তারা ব্লিঙ্কেনের কথা বিশ্বাস করে নিয়েছেন; আগে যাচাই করেননি”

    কাজেই একা আমেরিকা সেকালে পাওয়া সুবিধার জন্য একালেও যে অবরোধ আরোপের সুবিধা নিচ্ছে তা সেকালের সবল অর্থনীতির কারণে। এই বাড়তি সুবিধা যা পেয়েছিল সেটা ওর পড়ে পাওয়া সুবিধা, যা কেবল কুড়িয়ে পাওয়া নেয়া সুবিধা যেন।

    এজন্য বেনজীর বা ওই সাতজন শুধু আমেরিকাতেই নয় বিদেশে যেকোনো সম্পত্তি কিনতে চাইলে বাধা পাবেন। আবার, তাদের আগে থেকে কোনো সম্পত্তি থেকে থাকলে টেজারি বিভাগ তা এখন বাজেয়াপ্ত করে নেবে। এ ছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, এই সাতজনের সংখ্যাটা যেকোনো সময় আমেরিকা আরো বাড়াতে পারে। এনিয়ে আমাদের সরকারি আমলা বা দলীয় নেতারা সবসময় একটা ভয়ের মধ্যে কাটাবেন, কী জানি কী হয়! যেটা সরকারি কার্যক্রম ততপরতাকে ধীর বা শিথিল করেও দিতে পারে। দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার লোক পাওয়ার অভাব দেখা দিতে পারে। সম্ভবত তাই সরকার মনোবল বাড়ানোর দিকে বড় নজর বাড়িয়েছে।

    কোনো এক প্রফেসরের পরামর্শ হল (যাকে মনে হচ্ছে পরামর্শক প্যানেলে নিযুক্তি পেয়েছেন), আমেরিকা যেহেতু লবিতে পরিচালিত এক দেশ; ফলে বাংলাদেশ সরকারের উচিত নিজের পক্ষে লবি ফার্ম নিয়োগ করা। পরে আমরা এর পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেনকে দেখতে পাই। ‘মানবজমিন’ লিখেছে – তিনি বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্র সরকারে অনেক জ্ঞানী-গুণী লোক আছেন তাদের সাথে আমাদের আলোচনা চলছে, সেটি অব্যাহত থাকবে”। অর্থাৎ সরকার যে আমেরিকান কোনো লবি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়ে সে ভিত্তিতে তৎপর হয়েছে সেটাই তিনি যেন এভাবে আমাদের জানালেন। এর ১২ ঘণ্টার মধ্যে আমরা জানলাম আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন ফোন করেছেন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে। কিন্তু কী কথা হয়েছে সুনির্দিষ্ট করে কেউ এর তেমন ব্যাখ্যা করতে পারলেন না; যদিও একটা শীতল প্রভাব অনেকের মধ্যে দেখা গেল যেনবা সরকারের ভাগ্য কী হয় সে উৎকণ্ঠা যেন এখন থেকে কেটে যাচ্ছে যাবে। কিন্তু একই সাথে সবার এটাও অনুমান এটা এত সহজে যায় না। তাহলে?

    যখন কিছুই অফার করার থাকে না, তখন আপোষ চাইলেও কী দিয়ে দেয়া নেয়া হবে?
    এবার এ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। বাস্তব বড় কঠিন। বাস্তবতাকে ঢেকে রেখে লাভ নেই বরং দুদণ্ড আবেগকে বাইরে রেখে বাস্তব চিন্তা করলেই যা জানা যায়। সেই কঠিন বাস্তবতাটা হল, আমেরিকার এই অবরোধ আরোপের পরে, “না সরকারের খুব কিছু আমেরিকাকে অফার করার আছে, না আমেরিকার খুব কিছু পাওয়ার সুযোগ আছে”। এমন কাঠামোর মধ্যে আছি আমরা দুইপক্ষ। অনেকে খুঁজে পেয়েছে কিংবা মহাসত্য কোনো কিছু দেখিয়ে দিতে পেরেছে মনে করে বলার চেষ্টা করছেন যেমন আমাদের মন্ত্রী মোমেন বলছেন, “বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে একাধিক বৈঠক হয়ে থাকে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ফোরাম হচ্ছে পররাষ্ট্র সচিবপর্যায়ে পার্টনারশিপ ডায়ালগ। এ ছাড়াও বিভিন্ন বৈঠকে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়ে থাকে। তারা যেসব বিষয়ে জানতে চায় সেটির উত্তর দেয়া হয়” ইত্যাদি।

    কূটনীতি মানে আসল কথা সরিয়ে কথার প্যাঁচাল, এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।  এখানে মোমেনের আসল স্বার্থের কথাটা ছিল, “নিষেধাজ্ঞা শিথিলে বাইডেন প্রশাসনের সাথে আলোচনা চায় ঢাকা”। এটা আসলে মুখ্য গিভ অ্যান্ড টেক। আমরা সরাসরি সে জায়গায় যাবো; এতে সময় ও জায়গা বাঁচবে।

    কথা হল, বাংলাদেশ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার দেখতে চায়। কিন্তু বাইডেন কী পেলে তা প্রত্যাহার করবেন? টু দ্য পয়েন্ট বললে এক কথায়, শেখ হাসিনা চীন থেকে সরে এলে। এখন এটা কী সরকারের পক্ষ থেকে করা সম্ভব? না, একেবারে অসম্ভব। তাহলে হাসিনা সরকার এর বদলে কী কামনা করছে? সে চাইছে বৈষয়িক অন্য একটা কিছু যেমন ‘কোনো প্রজেক্ট’ নিয়ে যেন মিটিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু সে কথায় আবার সারবস্তুটা হল, সরকারের দেয়ার মত তো এমন কিছু নেই যা পেলে বাইডেন খুশি হবেন; সব মিটিয়ে নিবেন।

    কথা হল, বাংলাদেশ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার দেখতে চায়। কিন্তু বাইডেন কী পেলে তা প্রত্যাহার করবেন? টু দ্য পয়েন্ট বললে এক কথায়, শেখ হাসিনা চীন থেকে সরে এলে। এখন এটা কী সরকারের পক্ষ থেকে করা সম্ভব? একেবারে অসম্ভব। তাহলে সরকার এর বদলে কী কামনা করছে? সে চাইছে বৈষয়িক অন্য একটা কিছু ‘কোনো প্রজেক্ট’ নিয়ে যেন মিটিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু সে কথায় আবার সারবস্তুটা হলো, সরকারের দেয়ার মতো এমন কিছু নেই যা পেলে বাইডেন খুশি হবেন; সব মিটিয়ে নেবেন।

    তবে সেই কথা বলার বাহানাতে সরকারের একটা লাভ হয়েছে যে, বাইডেন সরকারের সাথে তারা ‘গুড টার্মে’ আছে, মিথ্যা হলেও এমন একটা ছবি, এটা বাংলাদেশের পাবলিককে দেখানো গেছে।

    কথা হওয়া আর একমত হওয়া এক নয়ঃ
    আর বলা হচ্ছে, মানবাধিকার নিয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা হয়েছে। কিন্তু একমত হওয়ার সুযোগ কী আছে? অবশ্যই না। কারণ মূল সমস্যা তো মানবাধিকার মানা না মানাতে নয়। মানবাধিকারের প্রশ্ন তো লংটার্মের পালনীয় শর্ত দিয়ে সবসময় মিটিয়ে নেয়া হয়েছে। গত ২০১৩ সাল থেকে ইউপিআরের [UPR] নামে জাতিসংঘের কর্মসুচি বসলে সেখান থেকে সময় বাড়িয়েই সমস্য দূরে ঠেলা কী চলছে না? আর যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান- বয়ান হল, “বাংলাদেশের গুম-নিয়ে কোনো আইন বা করণীয় নেই। তাই বাংলাদেশে কোনো গুম নাই”।  মহা অদ্ভুত এই যুক্তি!!! আসলে এই সরকার পাবলিক রেটিংয়ের ভিত্তিতেতা নিয়ে মাথা না ঘামানো সরকার বলে আর এভাবে সুদীর্ঘ  ১৩ বছর কাটিয়ে দেওয়ার পরে এর যা ভিত্তি দাড়িয়েছে তাতে এর পক্ষে কোন ধরণের মানবাধিকার রক্ষার কমিটমেন্ট দেয়া অর্থহীন, সেই কমিটন্টে আস্থা রাখাও অর্থহীন!

    যদিও প্রকৃত সমস্যা আরো অনেক গভীরে। আমেরিকা আসলে যা চাচ্ছে হাসিনার বাংলাদেশ তা দিলে তা ধারণ-যোগ্যতা বা পাত্র তো আমেরিকার কাছে নেই। যেমন- আস্থা পাওয়া যায় বাংলাদেশের টিকা পাওয়ার সুরাহা প্রশ্নে চীনা-বিকল্প বলে কী আমেরিকার কোন মুরোদে আছে? যেখানে দুনিয়ার কোথাও আমেরিকা কোনদেশের টিকাপ্রাপ্তির সমাধান করে দিয়েছে – আমেরিকার কাছে এমন কোনো দেশের নাম আছে? বরং উল্টো, সে তো জি৭-এর সদস্য হিসাবে তাদের জাতিসঙ্ঘের ‘হু’ [WHO]কে দেয়া কমিটমেন্টের সব টিকাই দেয়নি। অথচ বাংলাদেশের সমাজে এখন যতটুকু দোকান হাটবাজার গঞ্জ যা যতটুকু যে খোলা আছে কারখানা চলছে তা তো এই চীনা টিকার প্রাপ্যতার জোরেই। ফলে এখনো বাংলাদেশের টিকাদাতা-ওস্তাদ বদলানো – আবার টিকা নেই মানেই হবে, সোজা লকআউট। টিকা নাই মানে হবে, অর্থনীতিও নাই; ডুবে যাওয়া।
    যদিও টিকা নেয়া মানে করোনা থেকে একেবারে মুক্তি এমন অবস্থায় দুনিয়া এখনও পৌঁছায়নি, তবু যতটুকু যা ব্যবসা-বাণিজ্য খোলা এবং কার্যকর, তা ঘটতে-চলতে পারছে টিকা দেয়ার জন্যই। আমেরিকার হাতে এনিয়ে চীনের বিকল্প আমাদেরকে কী দেয়ার আছে? বিশেষ করে নয়া ওমিক্রন [Omicron] ভ্যারিয়েন্টের হামলার মুখে? ওদিকে ম্যান্ডেটবিহীন নিশিথ ভোটের সরকার, এটা এখন বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প ছাড়া চলতে পারবে না। কারণ এরা পাবলিক রেটিং-এর উপর ভরসা করে চলে না, দাঁড়িয়ে নাই। ফলে উলটা এদের  কর্মীদেরকে “প্রকল্প” মানে অর্থের সংস্থান করে না দিতে পারলে তারা থাকবে কেন?  এখন বলেন,  আমেরিকা কি চীনের মত এই অবকাঠামো ফান্ড জোগাতে সক্ষম? তাহলে কিসের ভরসায় হাসিনার সরকার চীনকে ফেলে ছেড়ে আসবে? কাজেই কোনো ডিলের জায়গাটা কোথায়? ভিত্তিটা কী? বলপ্রয়োগে সরানো ছাড়া সরকারের সরে যাওয়ার জায়গা নেই!

    আবার দেখেন হাসিনার বাংলাদেশ চীন ছেড়ে আসবে কোথায়? কোয়াডে? “অসামরিক” কোয়াড কি সক্রিয়?  মানে ভারত কি এখন আমেরিকান ক্যাম্পে আছে ? সেটা এখন  না ভারত নিশ্চিত বলতে পারবে, না আমেরিকা! এই নড়বড়ে কোয়াডের কোথায় ঢুকবে হাসিনার বাংলাদেশ?

    মূল ইস্যু তো একখানেও সেই একই – মানবাধিকার! ভারতের মানবাধিকার প্রশ্নে আমেরিকার যেসব অবরোধ আরোপ করার কথা তা বাইডেনের উচ্চারণের আগেই তো ভারত ভেগে গেছে! মোদির ভারত আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দিয়েছে। বাইডেন কী হতভম্ভ নয়?  এতে এখন বিশৃঙ্খল ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক বাইডেন সোজা করবেন কী করে? ইমিডিয়েট কোনো পরিকল্পনা কী বাইডেনের কাছে?? মনে হয় না!!

    কূটনীতিতে একটা বড় অংশ থাকে বাকচাতুরি, এজন্য কূটনীতির ভাষাই আলাদা; কিন্তু তাই বলে সাবধান এতে সবটাই চাতুরি তা অবশ্যই নয়।  কিন্তু ব্লিঙ্কেন ভেবেছেন এটা শতভাগ চাপাবাজির খেলা। ডেমোক্র্যাসি সামিটসহ গত ৯ ডিসেম্বর থেকে বাইডেন কোথাও বলেননি যে, এখন থেকে মানবাধিকার – তার সরকার-প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হবে। একথা বলতে চাইলে যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে তা প্রকাশ করতে হয় তা করেছেন? কেউ জানে না!

    অথচ বাইডেনের পররষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন এখন এশিয়ায় আসিয়ান দেশ সফরে, ইন্দোনেশিয়ার পরে মালয়েশিয়ায় সফর শেষ প্রায়। [যদিও বাকি প্রোগ্রাম গুটিয়ে তিনি ফেরত চলে যাবেন কারণ দলে একজনের করোনা-পজিটিভ ধরা পড়েছে।]  কিন্তু তিনি প্রতিদিন চাপা মারছেন, মানবাধিকার নাকি তাদের সরকার-প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে!!! ভয়েস অব আমেরিকার এক রিপোর্টে বলা হয়েছে তারা বিদেশনীতিতে মানবাধিকারকে ঢুকিয়ে (ইনফিউজ) নিচ্ছে [……to infuse human rights into its foreign policy…]। কিন্তু এটা ব্লিঙ্কেনের নিজের ভাষ্য নয়, রিপোর্টার নিজে যা বুঝেছে বলে তার কাছে মনে হয়েছে সেই ভাষ্য।  মানে  এই বাক্য ব্লিঙ্কেনের নয়, নিজের বক্তব্য বলছেন রিপোর্টার। তবে আরেক জায়গায় বলেছে, আমরা মানবাধিকারকে বিদেশনীতির কেন্দ্রে নিচ্ছি [……We are determined to put human rights at the center of our foreign policy……]। এই বাক্য ব্লিঙ্কেনের বলা হয়েছে, উপরে কোটেশন চিহ্ন দেয়া আছে!!  এরপরেও এটা মেনে নেওয়ার বিরাট সমস্যা আছে। কারণ এই প্যারাগ্রাফেরই শেষ শব্দগুলো হল,  ……promote accountability for human rights violations and abuses, no matter where they occur । কিন্তু এই ‘নো ম্যাটার হয়ার দে অকার’ কথাগুলো  বিশ্বাস-অযোগ্য। কারণ, ব্লিঙ্কেনের দাবির মানে হল যে ……মানবাধিকার লঙ্ঘন “যেখানেই হোক না কেন” তারা সক্রিয় হবেন – এই কথাটাই তো মিছা! কেন?
    এসব শুনে বা পড়ে মনে হতে পারে যে, বাইডেন-ব্লিঙ্কেন খুবই সিরিয়াস এবং একটা নীতিগত অবস্থান নিয়ে তারা মানবাধিকার বাস্তবায়নে এগিয়ে এসেছেন। ফলে এবার আর তারা  কে কোন দেশ বা কোন ‘কৌশলগত বন্ধু’ তা দেখবেন না। দেখবেন মানবাধিকারের নীতি কে মানেননি; আর তার ওপর তারা কঠোর হবেন।

    তাই কী?
    না, এটাই সর্ব্বৃহৎ চাপাবাজি। কারণ তারা ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর  আমেরিকার অবরোপ আরো  সম্ভাব্য  তালিকাতে রেখেও সেই  ভারতের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের কোনো ঘোষণার মুরোদ দেখাতে পারেননি। উল্টো ভারতকে ‘গণতন্ত্রী রাষ্ট্র’ বলে সার্টিফিকেট-সহ দাওয়াত দিয়েছেন আর মোদি সেখানে ‘বক্তৃতা’ দিয়েছেন। বাংলাদেশ নিয়ে আলজাজিরার রিপোর্টে অনেকে ব্লিঙ্কেনের ‘এই চাপাবাজি’র ফাঁদে পড়েছেন। যেমন সেখানে  এক রিসার্চ ফেলোর বরাতে বলা হয়েছে…told Al Jazeera the US sanctions show that the Biden administration has made a “significant policy shift” not only over Bangladesh, but in the US foreign policy in general,……। অর্থাৎ এটা নাকি বাইডেনের আমেরিকার পলিসি শিফট ঘটে গেছে।
    তাহলে ভারত তো আমেরিকার অবরোধ আরোপের  সম্ভাব্য  তালিকার দেশ – তবু কেন অবরোধ নাই? কাশ্মীর ইস্যুতে, সারা ভারতে মুসলমান নিপীড়ন ধর্মীয় স্বাধীতায় হস্তক্ষেপ মসজিদ ভেঙ্গে বা আগুন দেয়া পাবলিক নামাজে বাধা দেওয়া ইত্যাদিতে সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান  থেকে বাইডেনকে অবরোধ দেয়ার সুপারিশ দেয়া ছিল ; এছাড়া সর্বশেষ ভারতের খৃশ্চানদের উপরেও তাদের চার্চে হামলায় এবার ক্রিসমাস পালন না করার সিদ্ধান্তের কথা শোনা যাচ্ছে – হিন্দু ছাড়া অন্য কোন ভারতীয় ধর্মপালন করতে পারবে না যেন, এমন অবস্থা দাড়িয়েছে। এই জলন্ত তথ্যগুলো পাশে রেখে যেখানে ভারতের উপর আমেরিকার কোন অবরোধ নাই এটা সত্বেও আমেরিকা  “significant policy shift” করেছে এমন দাবি কিভাবে করা যায়?  অর্থাৎ  এখানে কার্যত
    দেখা গেছে, এরা ব্লিঙ্কেনের কথা বিশ্বাস করে নিয়েছেন; চোখ খুলে আগে বাস্তবে যাচাই করেননি।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ১৮ ডিসেম্বর ২০২১ ওয়েবে  আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “লেনদেনের ‘বস্তুই’ নাই”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • অন্ধকারের প্রদীপ নয়, আরো অন্ধকারে ফেলতে পারে

    বাইডেনের অবরোধঃ
    অন্ধকারের প্রদীপ নয়, আরো অন্ধকারে ফেলতে পারে

    ১৪ ডিসেম্বর ২০২১   ১৭ঃ১৮ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3R1

       US President Joe Biden’s Summit for Democracy

     

    ঘোর ঘনঘটা। অন্ধকার ছেয়ে আসছে!
    যদিও এই অন্ধকার মানে এটা নয় যে এখন বাইডেন হাতে আলোর প্রদীপ আছে অথবা হাতে প্রদীপ নিয়ে তিনি মঞ্চে আসছেনই! না ব্যাপারটা একেবারেই এবার ২০০৭ সালের মত এত সরল নয়। বরং উল্টা-পালটা বহু কিছুরই সম্ভাবনা। সবচেয়ে বড় কথা এক প্রচন্ড বিশৃঙ্খলা আর গভীর অনিশ্চয়তা ছেয়ে আসতে যাচ্ছে! সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর সে “আমেরিকান অথরিটি” আর নাই। অথচ ভিত্তিমূলক গ্লোবাল রাজনৈতিক ধারণাগুলোতে একমত নাই। যেটুকু গত ৭৫ বছরে তোইরি হয়েছিল তা সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থে আমেরিকা অপব্যবহার করাতে সবকিছু এখন অন্ধকারে। সারকথায় পুরান ওস্তাদের অথরিটি দুর্বল এমনকি চ্যালেঞ্জড হয়ে যাচ্ছে অথচ  ভিত্তিমূলক গ্লোবাল রাজনৈতিক ধারণাগুলোতে যেটুকু ঐক্যমত্য ছিল তাই ভেঙ্গে পড়তেছে। ইউক্রেন নিয়ে হুঙ্কার পালটা হুঙ্কার এর প্রমাণ। তবে আমাদের প্রসঙ্গ বাইডেনের অবরোধ আরোপ।

    বাইডেন বাংলাদেশের উপর অবরোধ আরোপ করেছেন। আর এটা ২০০৭ নয়, ২০২১ সাল। যখন আমেরিকার গ্লোবাল কর্তৃত্ব ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে গেছে; অর্থাৎ সিংহ এবার আরও বুড়া ও বেশি উত্থান-রহিত হয়ে গেছে। অথচ বাইডেন সেদিকটা আমল না করে উলটা বুড়া সিংহ আমেরিকাকে ওভার স্ট্রেস মানে আরও ভারের বোঝা চাপিয়ে দিলেন এই অবরোধ আরোপ করে। আর তাতে এটা মোটেই অসম্ভব নয় যে এতে বুড়া সিংহের ঘারে সবকিছু হুরমুর করে ভেঙ্গেচুড়ে পড়ল। ফলাফল  আরো এক গভীর নিম্নচাপ!
    উপরে এসব কথার অর্থ আবার কোনমতেই এটা নয় যে এখানে আমাদের সরকার সেফ থাকবে এমন কোন ইঙ্গিত দিচ্ছি। সেটা নয় তবে বহুকিছুই অনিশ্চিত বলছি ফলে স্বভাবতই এর মধ্যে সরকারের টিকে যাওয়াটাও অনিশ্চয়তা থেকে বাইরে থাকবে কী করে! মোট কথা যাদের হাতে যা কিছু নিয়ন্ত্রিত থাকতে দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম সেসব সম্ভবত আর তেমন থাকছে না।  ফলে সবার আগে ভেঙ্গে পড়তে যাচ্ছে পুরাতন ভারসাম্যটা।

    তবে একটা সারকথা একেবারে আঙুলে গুনে আমরা মনে রাখতে পারি যে, এবারের কথিত “ডেমোক্রেসি সামিট” বা সেখান থেকে ঘোষিত অবরোধের নিষেধাজ্ঞার তালিকা প্রকাশের পর থেকে দুনিয়াটা আর আগের মত নাই, আগের জায়গায় তা আর স্থির নাই হয়ে গেছে। যদিও ক্রমশ ঘটনা গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন ঘটনায় সেদিকেই যাচ্ছিল। তাতে বাইডেনের সামিট আর নিষেধাজ্ঞা হল এসবের ‘ফাইনাল এলার্ম’ বাজানো।
    কিন্তু মজার কথাটা হল যদি প্রশ্ন জাগে বাইডেন কী জানতেন যে তিনি একটা “ফাইনাল এলার্ম” বাজিয়ে দিচ্ছেন! এর জবাবটা হবে খুব সম্ভবত না। তিনি বরং আমেরিকান সক্ষমতা আগের মত আছে মনে করে স্বাভাবিক মনে করেই একাজ করেছেন। হয়ত এখন ক্রমশ বুঝতেছেন বা বুঝবেন। এর একটা লক্ষণ হল থিঙ্কট্যাংক ফেলো কুগেলম্যান এর মন্তব্য যেটা প্রথম আলোতে অনুবাদে ছাপা হয়েছে। আর যার শিরোনাম “এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য খারাপও হতে পারে”। অর্থাৎ তিনি আমেরিকার জন্য খারাপ কথাগুলো সবটা উচ্চারণ করলেন না। কেবল কিছু ইঙ্গিত দিলেন।

    দুনিয়ার পুরানা পোলারাইজেশন ভেঙ্গে গেছেঃ
    আসলে আমাদের বেশির ভাগের অলক্ষ্যেই দুনিয়ার পুরানা পোলারাইজেশন ভেঙ্গে গেছে।  পোলারাইজেশন বা বাংলায় মেরুকরণ মানে কে কার দলে বা পক্ষে; সেই পক্ষা-পক্ষির ব্যাপারটা বাইডেনের সামিট আর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগে যেভাবে সাজানো থেকে কাজ করত তা ভেঙ্গে গেছে। যেমন ভারতের কথাই যদি ধরি, বাইডেনের সামিট আর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগের দিনে,  ভারত আমেরিকার খুবই ঘনিষ্ট একথা মানতে কারও অসুবিধা হত না। এমনকি অকাসের না হোক অন্তত কোয়াডের প্রসঙ্গ উঠলে ভারত অবশ্যই চীনবিরোধী প্রথম সারির আমেরিকা ঘনিষ্ট, তা বলা যেত।  কিন্তু এখন এটা পুরাটাই আবছা অস্পষ্ট!  কিন্তু  এটাকে “বদলে গেছে” না বলে ভেঙ্গে গেছে বললাম কেন? বললাম এজন্য যে ভাঙ্গার পরে এটা এখন কোনদিকে যাবে থিতু হবে সেই নিশ্চয়তা এখানে এখনও নাই। এজন্যই বলছি পরিস্থিতি খুবই অনিশ্চিত।

    যেমন এখন দশাটা এমন যে না চাইতেও একটা আপনাআপনি বা অবজেকটিভ পোলারাইজেশন এখানে তৈরি হয়ে আছে। তা হল, কে কে এখন বাইডেনের ‘ডেমোক্রেসি সামিট’ বা কথিত গণতন্ত্রের ছড়ি ঘুরানোর পক্ষে আর কে নয়।  তাতে একেবারেই একা বাইডেন একদিকে এমনকি ইউরোপও সেখানে বাইডেনের সাথে নয়, সম্ভবত এর মধ্যে বিপদ আঁচ করে দূরে থাকতে চাইছে। আর অন্যদিকে, শুধু চীন না, এখনকার গুরুত্বপুর্ণরা হল  রাশিয়া, চীন এবং ভারত ইত্যাদি। হা ভারত!  এবং এই নব সংযোজন ভারত এটা ১৩৫ কোটির দেশ তবে মোদির ভারত।  অথচ গত টানা বিশ বছর ধরে আগে কখনও দেখা যায় নাই এমনভাবে আমেরিকা-ভারত গাঁটছাড়া বেধে চলে আসছিল। সবাই এটাই জানত তারা ঘনিষ্ট বন্ধু – যেহেতু ভারত আমেরিকার চীন ঠেকানো [containment] এর বন্ধু অতএব এই সম্পর্ক এক লম্বা পথ হাটবে; অবশ্যই সহসা ভাঙবে না। এটাই ছিল সবার অনুমান!
    কিন্তু না। সবাইকে হতাশ করে দিয়ে এবার এক পুরান সত্যঃ রাষ্ট্র মানেই তা কেবল একান্তই নিজ নিজ স্বার্থ – সে কথাটাই ভেসে সামনে এলো। সেকথার ভাষ্যটা অনেকে এভাবে ঠাট্টা করে বলছেন, ভারত ‘বাবা’ বদলিয়েছে। আমেরিকার বদলে ভারতের বাবা এখন রাশিয়া। গত সপ্তাহে ৬ ডিসেম্বর রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট পুতিন ভারত সফরে এসেছিলেন। আর সেটাকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় প্রচন্ড হাইপ তুলে প্রপাগান্ডা করেছে [এটা নাকি ডিফাইনিং মোমেন্ট] যাতে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের নজরে পরে এই এলান। স্বভাবতই এর প্রধান টার্গেট শ্রোতা হোক বাইডেনের আমেরিকা এই ছিল ভারতের আকাঙ্খা! আর এসব প্রচন্ড হাইপ তোলা এটাকেই অনেকে ভারতের বাবা বদল বলছেন!

    এমনিতেই বাইডেনের প্রেসিডেন্ট জিতে যাওয়া মোদির জন্য কাম্য ছিল না। তা অপ্রকাশ্য ছিল না। মূল কারণ, বাইডেন নিজ নির্বাচনের এক ক্যাম্পেইন-করণীয় বানিয়েছিলেন কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘন ইস্যুকে। বলেছিলেন তিনি এই ইস্যুতে প্রশ্ন  তুলবেন। তাই মোদির দিক থেকে তার অপছন্দের কিছুই লুকানো ছিল না বা ক্ষমতায় এলে পরে দেখা যাবে – এমন ইস্যু ছিল না। তাই মোদি নিজ অবস্থান ভেবে রেখেছিলেন যে বাইডেনের কাছাকাছি মুখোমুখি না হবার বা এড়িয়ে চলার। আর কামনা করতেন, চীন-আমেরিকার ট্রেড সংঘাত তীব্র হোক যাতে কাস্মীর ইস্যু নিয়ে তিনি এর আড়ালে প্রথম দুয়েক বছর কাটাতে পারেন। কিন্তু এমন কামনা পূরণ করনে-ওয়ালার কাছে ভিত্তি পায় নাই।

    অন্যদিকে আরও জটিল সমস্যা। বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতা মানে নাগরিকের ধর্মপালনের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হলে তা বিস্তারে নোট  করা আর তা নিয়ে মামলা সাজানোর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আমেরিকায় এক স্বাধীন কমিশন আছে। যারা আমেরিকান প্রেসিডেন্টের কাছে বার্ষিক রিপোর্ট পাঠায়। এর নাম USCIRF (United States Commission on International Religious Freedom)।

    ভারত সম্পর্কে এই প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট খুবই খারাপ। এমন খারাপদেরকে তারা সিপিসি ক্যাটাগরিতে ফেলে চিহ্নিত করে থাকে। “কান্টি অফ পার্টিকুলার কনগার্ণ (CPC) বা “বিশেষ উদ্বেগজনক দেশ’ এই ক্যাটাগরিতে। ভারতে মুসলমানদের উপরে নিপীড়ন প্রশ্নে ভারত এখন সিপিসি তালিকার দেশ। গত কয়েকমাসে মোদির সরকারের উপর এবার যুক্ত হয়েছে চার্চেও হামলার অভিযোগ।

    অতএব এ’দুই উদ্বেগের বিচারে বাইডেনের কথিত “ডেমোক্রেসি সামিট” এর দিন যত ঘনায়ে আসছিল তাতে বাইডেন এবার ভারতের উপর কোন অবরোধ আরোপ দিতে পারে এই ছিল মোদি সরকারের অনুমান। কারণ ২০২১ সালের সিপিসি রিপোর্টে এটাই সুপারিশ করা ছিল। যেটা ট্রাম্পের আমল থেকেই এমন রিপোর্টগুলো উপেক্ষা করে চলছিল।  আবার মোদির দিক থেকে দেখলে এই ধর্মীয় নিপীড়নই তার শেষ ভরসা। মোদির ধারণা আগামি বছর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে তাতে পাবলিক রেটিং খারাপ অবস্থাতেও তার জিতে আসবার একমাত্র উপায়। ফর্মুলা সেই পুরানা; গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীত্বের আমল থেকে গত আট বছরের মোদির প্রধানমন্ত্রীত্ব পর্যন্ত যে – যত মুসলমান নিপীড়ন ততই ভোটার পোলারাইজেশন এবং ততই বেশির ভাগ হিন্দুভোটার মোদির দলের বাক্সে। এই অনুমানে যে মোদি হল বাঘের বাচ্চা যে অন্য ধর্মের লোকেদের দাবড়িয়ে বেড়াতে সক্ষম; “হিন্দুধর্মই শ্রেষ্ঠ যা ধরে রাখার নায়ক মোদি”! কাজেই মোদির পক্ষে মুসলমান কোপানো একটু আপাতত কমানোও অসম্ভব! কাজেই মোদির পক্ষে বাইডেনের অবরোধ নিয়ে ভাববার সুযোগ নাই।

    আবার অবরোধের ঘটনার এখানেই শেষ নয়। আরো আছে। অন্যের (আমেরিকান) বোমারু বিমান ঠেকানোর মিসাইল রাশিয়ার তৈরি S-400 । কিন্তু এই মিসাইল ক্রয়কারি রাষ্ট্রকে ঠেকাতে বা এক ধরণের অপরাধী বলে চিহ্নিত করার আইন আমেরিকা সাজিয়েছে যার নাম (Countering America’s Adversaries Through Sanctions Act,  CAATSA) ।  অর্থাৎ যে রাশিয়ান এই মিশাইল কিনবে সে আমেরিকার ঘোষিত শত্রু হবে তাই তার উপর আমেরিকান অবরোধ আরোপ করা হবে। ভারতের এমন ক্রয়াদেশের পাবার পরে রাশিয়ান মিসাইল পাঠানো রাশিয়া শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু এখনও বাইডেন অবরোধ দিবেন নাকি ভারতকে এই আইন থেকে ছাড় দিবেন এসবের কোনটাই এখনও ঘোষণা করেন নাই। অর্থাৎ সব এখনও বকেয়া বা পেন্ডিং হয়ে পড়ে আছে।

    এবার বাস্তবে কী ঘটেছে? এরই মধ্যে এবার বাইডেনের ডেমোক্রেসি সামিটে ভারত গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় দাওয়াত প্রাপ্ত দল ছিল। কিন্তু ঐ সামিট থেকে যেসব দেশের উপর অবরোধ আরোপ করা হয়েছে সে তালিকায় ভারত নাই। এককথায় ভারতের উপরে আমেরিকার কোন অবরোধই আরোপ করা হয় নাই।

    আসলে এর মানে, উলটা বাইডেনই মোদির ভারতের হাতে বাঘবন্দি হয়ে গেছেন যেন। কেন এমন হল?

    কারণ মোদির উলটা চাল, তিনি পুতিনকে ভারতে ডেকে এনেছেন, প্রতিরক্ষা বিষয়ক নানা কথা আর সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য জয়েন্ট ভেনচার নিয়ে আলাপ করেছেন। আর তাতেই বাইডেনের যেন বলতি বন্ধ!  ভারত এরপরে আর বাইডেনের চীন ঠেকানোর কাজে নাই লাগুক তবু ১৩৫ কোটি জনসংখ্যার ভারতীয় বাজার যার লোভ দেখিয়ে ভারত সবসময় তার অপনেন্টকে এভাবেই শায়েস্তা করেছে। এটাই আরেকবার প্রমাণ করেছে যে পচাত্তর বছর আগের যে আমেরিকা ছিল, বাইডেনের আমেরিকা সেটা আর নয়। বাইডেনের আমেরিকাই উলটা ভারতের কাছে কেঁচো হয়েছে – নত হয়েছে, অকেজো হয়ে গেছে। অন্তত এখন আমরা এটাই দেখছি!

    তাই বাইডেন ভারতকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সার্টিফিকেট দিয়ে দাওয়াত করেছেন আর যত পেন্ডিং অবরোধ-করার কথা ছিল এর একটাও প্রকাশ করতে পারেন নাই উলটা সবগুলোকে নিজের মুখের মধ্যে আটকে রেখে তা নিজেকেই  গিলে খেতে হয়েছে – এটা কোন আমেরিকা???

    ফলাফল কী? এর নেতি ফলাফলও আছে। আগে হলে আমেরিকান চাপে মোদির ভারত ইসলামবিদ্বেষ কিছুটা আড়াল করে হয়ত সরাসরি ইসলাম কোপানো অন্তত কিছুদিন বন্ধ রাখত।  যেমন বেশিদিন আগের কথা নয়। মোদির ক্ষমতায় আসার পরের বছর (২০১৫) ওবামা ভারত সফরে এসে (সেসময় মুসলমান ও খ্রীশ্চান নিপীড়ন, চার্চে হামলা শুরু হয়েছিল) মোদিকে চাপ দেওয়াতে শেষে মোদি বিজেপির নীতি-রাজনীতি আর তার সরকারের নীতি আলাদা বলে ঘোষণা করেছিলেন। সরকারের নীতি হিসাবে সব ধর্মাবলম্বির ধর্মপালনের স্বাধীনতাকে মোদি স্বীকার করে প্রটেক করার দায় কবুল নিয়েছিলেন। দিল্লির এক চার্চের বার্ষিক অনুষ্ঠানে গিয়ে এসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। [আগ্রহিরা এই প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত জানতে আমার পুরামা ২০১৫ সালের মে মাসের এই আর্টিকেলটা পড়তে পারেন। ওখানে সেকালে চার্চের অনুষ্ঠানে দেয়া মোদির ভাষণটাও সংযোজিত আছে।]  অথচ এবার উলটা, ভারতই বাইডেনকে চ্যালেঞ্জ করে গেল! আমেরিকা কিভাবে ক্রমশ কর্তৃত্ব হারাচ্ছে এর এক জলজ্যান্ত প্রমাণ এটা।

    রাজনাথের কারিগরিঃ
    এদিকে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং গত ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বের ৫০ বছর স্মরণে এক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল, সেখানে ছিলেন। এতদিন এধরণের অনুষ্ঠানে ভারত বড়জোর দাবি করত যে তারা বাংলাদেশে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। কিন্তু এবার তিনি দাবি করেন ভারত বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছে।  আবার দেখা যাচ্ছে, ভারতের এক নামী সম্পাদক- কলামিস্ট লিখেছেন বাংলাদেশে আমেরিকান অবরোধে ভারতের নিশ্চুপ থাকার বিরুদ্ধে। সব মিলিয়ে অনেকেরই অনুমান-কল্পনা হল আবার কী তাহলে  আমেরিকার হাত থেকে প্রটেকশন পেতে বা হুজুর ধরতে মোদী-হাসিনা গভীর সম্পর্ক হতে যাচ্ছে, তাই কী ?
    দিন সবসময় একরকম থাকে না। না, এটা এখন বাস্তবতাতেই অসম্ভব। ভারতের সাথে হাসিনা সরকারের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের কথা অবশ্যই আমরা কেউ বলছি না। ফলে কথাটা হচ্ছে রুটিন কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যের। এমন রুটিন সম্পর্কের (আমরা ১৯৭১ সালে এটা সেটা ছিলাম টাইপের) বাইরে অন্য কোনদিকে এখন আর আগাবার সম্ভাবনা নাই। আর এদিকে হাসিনা সরকার কখনও যদি ফেল না করে তাহলে চীনের সাথে তার সম্পর্ক একটুও ঢিলা হবার কোন সম্ভাবনা নাই।
    তবে সরকারের জন্য এখনকার চ্যালেঞ্জ হল – অবরোধ আরোপের ফলে আমলা আর দলীয় কর্মি-নেতাদের যাদের সক্রিয়তা সরকার টিকাতে ম্যাটার করে এদের মনোবল নিঃসন্দেহে চাপ খাবে – সেটা কতদুর সামলাতে পারে তা দেখতে হবে।  অবরোধের পাল্লায় পড়া যাবে না যা “অর্জন” তা সামলাতে হবে – তাদের এই পালাই পালাই মনোভাব ডমিনেট করবে।  সরকারের পাবলিক রেটিং থাকলেই একমাত্র যা দিয়ে এমন চাপ মোকাবিলা সহজেই সম্ভব হত হয়ত।
    আপাতত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে!

  • বাইডেনের “কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন”

    বাইডেনের “কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন”

    গৌতম দাস

    ১৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3QG

     

       US  Democracy Summit 9-10 Dec 2021

    “Summit for democracy an ‘anti-China ideological clique’”

    গত ৯-১০ ডিসেম্বর ২০২১, প্রেসিডেন্ট বাইডেন আয়োজিত “ডেমোক্র্যাসি সামিট” [Democracy Summit] সমাপ্ত হয়েছে। যদিও করোনার কথা ভেবে এটা অন-লাইন বা ভার্চুয়াল সামিট ছিল। রয়টারের তথ্য মতে ১০০ এরও বেশি দেশ এখানে অংশ নিয়েছিল।  বাইডেন একে নাম দিয়েছিল  “ডেমোক্র্যাসি সামিট”। যেটা আসলে কার্যত   স্ট্রাটেজিক “ডেমোক্র্যাসি সামিট” বা একে বাংলায় বললে এটা হয়ে যায় “কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন”। কিন্তু কৌশলগত কেন? এর মানে কী? 

    ছলনার কৌশলঃ
    বাইডেনের মূল সংকট হল কোন মানদন্ড ছাড়া তিনি ডেমোক্রাসি শব্দটা এস্তেমাল করতে চান।
    আর এভাবে আমাদের মত অনেক দেশেই আমেরিকা  অবরোধ আরোপ করতে চান এবং বিশেষ করে চীনের উপরে অবরোধ আরোপ না হলেও অন্তত বিব্রত করতে চান। কিন্তু কাজটা তিনি করেছেন বা তার করার পথটা অসৎ। যেমন ঘটনা হল আমাদের মত সেসব দেশ এমনকি চীনেও উপযুক্ত ও স্পষ্ট “জন-প্রতিনিধিত্বশীল” রাষ্ট্র থাকা বা না-থাকার ঘাটতি আছে। কিন্তু আমেরিকা  কোন মানদন্ড কাউকে
    ডেমোক্রাসির রাষ্ট্র  বলে দাওয়াত দিচ্ছেন বা কাউকে বাদ দিচ্ছেন তা প্রতকাশ করে নাই। ফলে সামিটে দাওয়াত দিয়েছে মূলত বাইডেনের আমেরিকার এখনকার সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থের ভিত্তিতে। এটাই সেই বড় অসততা!  এটা হতে নুন্যতম আমেরিকা বা অন্যকোন দেশের রাষ্ট্রস্বার্থের উর্ধে, তা পরোয়া না করে। এবং ইন্ডিপেন্ডন্ট মানদন্ডে।  আমেরিকা যে তা মেনে করে নাই এর বড় প্রমাণ হল আমেরিকা কোথাও তার মানদন্ড প্রকাশ করে নাই। ফলে এটা অস্বচ্ছ আর তাই অসততা হয়েছে। একারণে সামিটের গায়ে কালি লেগে গেছে।

    আমাদের দেশে ‘কৌশল করা’ শব্দের একটা অর্থ হল ছলনা করা। ফলে কৌশলের সোজা কমন মানুষের বুঝ হল যে কেউ যখন যা বলবে তা করবে না বা করবে আরেকটা – এটাই কৌশল। ঠিক এ’অর্থেই বাইডেনের আমেরিকা এক “ডেমোক্র্যাসি সামিট” ডেকেছিলেন। এর অর্থ হল আমেরিকা যাকে যাকে “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” মনে করে তারাই এই সম্মেলনে দাওয়াত পেয়েছিলেন। কিন্তু তবু কথা বা কিন্তু আরও আছে।  আমেরিকার এই মনে করাটা হয়ত আগে আমেরিকা ‘মনে করত’ হলেও হবে না। এখনকার বাইডেন সরকারের নিজ লাভালাভের মানদণ্ড দিয়ে যদি বলেন তা হলেই কেবল সেটা “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” বলে মানা হবে। 

    এক কথায় বললে, বাইডেনের ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ এতই দেউলিয়া যে, এর ‘ডেমোক্র্যাসি’ ধারণার কোনো সংজ্ঞায় যাওয়ার মুরোদ নেই। তাই দেয়া হয়নি বা কাজ করে না। কোনো ক্রাইটেরিয়াই নেই। কী কী থাকলে ‘ডেমোক্র্যাসি’ মানা হবে তাও জানা যায় না। তারা বলতে পারেন না। যেন এটা কেবল বাইডেন প্রশাসনের স্বার্থের খেয়াল যে, তারা কাকে কাকে ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ মনে করবে।

    কেন এটা এমন হয়ে গেলঃ
    এমনিতেই বাইডেনের সমস্যা দাড়িয়েছিল কাকে ডাকবেন আর কাকে না। বা অন্যভাবে বললে, কারা “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” তা বলতে না পারলে ডাকবেন কী করে? অথবা কোন রাষ্ট্রকে ডেকে বসা মানে তো হয়ে যাবে বাইডেন তাহলে ঐ রাষ্ট্রকে তাহলে আপনাতেই বাই ডিফল্ট [by default] গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মনে করছেন। এছাড়া বাইডেনের মনে আরো এক বড় “চোরামি” তো কাজ করছেই যে তিনি চীনকে বিব্রত করবেন কোপাবেন!  

    তাই সব মিলিয়ে খুব সহজ সেই একই পন্থা অনুসরণ করেছেন!। তা হল যেমন, কোনো ঘটনাকে তারা ‘টেররিজম’ বলবেন বা বলেন? এরও কোনো সংজ্ঞা বা মানদণ্ড এখনো নেই। কখনো দেয়া হয়নি। এভাবেই চলছে। আর আছে এর বদলে তাদের একটা তালিকা। ওই তালিকায় যেসব রাষ্ট্রের নাম আছে সেটাই তখন থেকে টেরর বা জঙ্গি রাষ্ট্র। এই হল অসততার স্টাইলটা। বুশের আমল থেকে এ ব্যবস্থা চালু আছে আমেরিকায় এবং তা এখনো বহাল করে রাখা আছে। এমনকি জাতিসঙ্ঘেরও টেরর রাষ্ট্রের কোনো সংজ্ঞা বা ক্রাইটেরিয়া নেই। সেখানেও একই পদ্ধতি। এগুলোকেই বলা যায় ‘মাতবর’ রাষ্ট্রগুলোর বৈষয়িক মানে বিষয়-আশয়ের স্বার্থের ভিত্তিতে ওই তালিকায় নাম ঢুকানো বা বের করা।
    কাজেই এটা পরিষ্কার, বাইডেন প্রশাসনের চেয়ে বড় মানবাধিকারের দোকানদার ও স্বার্থবাজ আর কেউ নেই। আমাদের ব্যবহারিক অসুবিধা এবং কঠিন সমস্যাটা হল, ক্ষমতাবান প্রধান রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন ছাড়া হিউম্যান রাইট লঙ্ঘনের ইস্যুতে সেই লঙ্ঘনকারী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে  কোনো পদক্ষেপ আসার কোনো সুযোগই নেই। একমাত্র এখন এক বিকল্প হল যতটুকু যা সম্ভব তা হল, বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনমতের চাপ কোন ইস্যুতে যদি তৈরি করা যায়। কিন্তু প্রতিটি রাষ্ট্রের বেলায় এমন গ্লোবাল জনমত তৈরি প্রায় অসম্ভব। তবুও আমাদের লড়তেই হবে, এটা বটম লাইন। এ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

    থিঙ্কট্যাংক ফেলো এরা কী বলেনঃ
    গত লেখায় আমেরিকান “ফরেন পলিসি” পত্রিকায় মাইকেন কুগেলম্যানের নিয়মিত ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফিং’-এর কথা বলেছিলাম। এটা সাপ্তাহিক ব্রিফিং বা কলামের মত। চলতি এই সপ্তাহে সেই কুগেলম্যানও বাইডেনের ‘ডেমোক্র্যাসি সামিটকে’ ইস্যুতে সম্ভবত সরাসরি সমর্থক হওয়াটার বিপদ বুঝেছেন। তাই তিনি কিছুটা সমালোচক হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেছেন। তিনি আগেই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, ‘ডেমোক্র্যাসি সামিটে’ দাওয়াতি কারা হবেন এ নিয়ে কোনো সংজ্ঞা বা মানদণ্ড এখানে নেই। তিনি লিখছেন তালিকায় নাম থাকা না থাকা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে আর এতে এই অনুমান তৈরি হয়েছে যে, বাইডেন প্রশাসন ‘অযোগ্য দাওয়াত-দাতা’ […controversy over the list of participating countries, coupled with the perception that the United States is an unfit host……]। কুগেলম্যানের ভাষায় ‘আনফিট হোস্ট’ এবং তিনি বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার নিমন্ত্রিত দেশের তালিকা দেখে বোঝা গেছে, এই সামিটে দাওয়াত পাওয়ার যোগ্যতা বা একমাত্র মানদণ্ড ডেমোক্র্যাটিক পারফরম্যান্স ছিল না; এটি প্রমাণিত। মানে, অন্য অনেক কিছু ছিল। কুগেলম্যান এমনকি ব্রিটিশ ফ্রিডম হাউজের র‌্যাংকিংয়ের সাথে তুলনা নিয়ে এসে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, বাইডেন কোনো মানদণ্ডই মানেননি, এখানে অনুসরণ করেননি।

    “The Biden administration’s Summit for Democracy, hosted virtually today and Friday, comes at a moment of global democratic backsliding. However, controversy over the list of participating countries, coupled with the perception that the United States is an unfit host, has accompanied the event. The South Asian invitees prove democratic performance isn’t the sole criterion for a seat at the summit.” – ,

    এবার তিনি সরাসরি লিখেছেন, আসলে এশিয়ার যেসব দেশের নাম তালিকায় রাখলে ‘আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ হাসিল হয়’ (বেস্ট সার্ভ ইটস কারেন্ট ইন্টারেস্ট) সেসব দেশের নামই ওখানে রাখা হয়েছে; অর্থাৎ বাইডেনের তালিকার গরমিলের বোঝা এতই ভারী যে, তিনি সোজা এর দায়দায়িত্ব নেননি; ঝেড়ে ফেলে দিয়েছেন। উল্টো নিজেই সমালোচকদের দলে ভিড়ে গেছেন।

    থিংকট্যাংক ফেলোঃ
    এখন আরেকজনের নাম করব তিনিও মাইকেল কুগেলম্যানের মতোই থিংকট্যাংক ফেলো- আলী রিয়াজ; তিনি কিন্তু একেবারে ‘ধরাশায়ী’ হয়ে গেছেন। সম্ভবত তিনি ভেবেছেন থিংকট্যাংকের সিনিয়র বা জুনিয়র ফেলো হওয়ার কাজটা হল – উপস্থিত আমেরিকান প্রশাসনের পক্ষে সাফাই দেয়া। এমন ভাবাটা এশিয়ান অরিজিন মানুষের সমস্যা কি না, জানি না। আলী রিয়াজ ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ ইস্যুতে কুগেলম্যানের উল্টো অবস্থানে গিয়ে বাংলাদেশের মানবজমিন পত্রিকায়  [বাইডেনের গণতন্ত্র সম্মেলন আলী রীয়াজের মূল্যায়ন] বিরাট এক সাক্ষাৎকারে বাইডেনের পক্ষে ব্যাপকভাবে সাফাই জোগানোর চেষ্টা করেছেন।

    বলাবাহুল্য, সাফাইটা দাঁড়ায়নি। কারণ, সম্ভবত কতটা উজানে বাওয়া যায় তারও তো কিছু সীমা থাকে! কারণ বাইডেনের রাষ্ট্রস্বার্থের খেয়ালে যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে তার স্বপক্ষে সাফাই তিনি কোথা থেকে আনবেন?

    এমনকি বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কী? গত ২০০৭ সালে এই একই কথিত ‘গণতন্ত্র’, মানবাধিকার আর দুর্নীতিবিরোধী কথা বলে আমেরিকান গণতন্ত্রী যারা  ‘তাদের’ আগমন ঘটেছিল। কিন্তু বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া ছিল এর পরিণতি! এটা কে অস্বীকার করতে পারবে? তা হলে আলী রিয়াজ আজ কোথা থেকে কী আর সাফাই আনবেন? কী সাফাই দেবেন? এরা গণতন্ত্রী???

    তাই বাইডেনের ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন আসলে হয়ে গেছে কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’ সম্মেলন; অর্থাৎ কৌশলগত; মানে যা বলে তা করে না; করে আরেকটি। ছলনা করে। নানান নখরাও করে। কেন? ইংরেজি স্ট্রাটেজিক শব্দটার বাংলা করা হয় কৌশলগত বা কৌশলী। তাই আমরা দেখেছি আলী রিয়াজের মানবজমিনে দেয়া বক্তব্যে তিনি উপায়ন্ত না পেয়ে নিজের ইজ্জত ঢাকতে শেষে এই ‘স্ট্রাটেজিক” শব্দটা এনেছেন। অর্থাৎ তিনি সংজ্ঞাহীনতা বা মানদন্ড না থাকার সব অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েই যেন বলেছেন, ‘পাকিস্তান ও ভারতকে আমন্ত্রণ জানানোর কতগুলো কৌশলগত কারণ রয়েছে। শুধু যে গণতান্ত্রিক বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছে, তা নয়। এর কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে এ অঞ্চলে ও অন্যান্য অঞ্চলে তার কৌশলগত যে নীতি আছে, সে দিকে গুরুত্ব দিতে হয়েছে। এ কথা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতকে এখন আর আমরা কোনো অবস্থাতেই ‘গণতান্ত্রিক দেশ’ বলতে পারব না।’

    “পাকিস্তান এবং ভারতকে আমন্ত্রণ জানানোর কতগুলো কৌশলগত কারণ রয়েছে। শুধু যে গণতান্ত্রিক বিবেচনাই প্রাধান্য পেয়েছে সেটি নয়? এর কারণ যুক্তরাষ্ট্রকে এই অঞ্চলে এবং অন্যান্য অঞ্চলে তার কৌশলগত যে নীতি আছে সেদিকে গুরুত্ব দিতে হয়েছে। একথা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারতকে এখন আর আমরা কোনো অবস্থাতেই গণতান্ত্রিক দেশ বলতে পারবো না” – আলী রীয়াজের মূল্যায়ন মানবজমিন

    এখানে তিনি পুরো সারেন্ডার করেছেন; অর্থাৎ তার গণতন্ত্র এখন আর বিশেষণ ছাড়া শুধু গণতন্ত্র নয়। এর বিশেষণ এখন ‘কৌশলগত’ এই শব্দটা সামনে জুড়ে দিয়ে। তবুও সাফাই দেয়ার চেষ্টা বন্ধ করেননি। তাই এবার কৌশলগত শব্দের আমদানি। অথচ কে না জানে যা কৌশলগত তা আর কোনো ক্রাইটেরিয়া বা মাপকাঠি নয়। এটা একান্তই বাইডেনের আমেরিকার নগদ লাভালাভের স্বার্থ!

    ইমরানের রসিক জবাবঃ
    তবে আমেরিকান দাওয়াত মানে গণতন্ত্রের সার্টিফিকেট বেচা বিক্রিটার মধ্যে এক চরম তামাশা ঘটিয়ে দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তিনি এই দাওয়াতে যেতে অপারগতা (decline) জানিয়েছেন [Pakistan declines US democracy summit invitation]। সাথে বলেছেন, তারা চীন-আমেরিকা এমন দলাদলি বা ব্লক ভাগাভাগিতে পড়তে চান না! [We don’t want to enter bloc politics: PM] বলাই বাহুল্য এ’এক ইমরানের ভাল “স্মার্ট মুভ”।

    যা হোক, মনে হচ্ছে আলী রিয়াজ কুগেলম্যানের কাছে জেনে নিতে পারতেন যে, থিংকট্যাংক ফেলোর চাকরি নেয়া মানেই আমেরিকান প্রশাসনের সিদ্ধান্তের দায় নিয়ে ‘পক্ষে’ লিখতেই হবে তা নয়। দায় না নিয়েও এবং সাথে সমালোচনা করে বা নিদেনপক্ষে অন্যরা কী সমালোচনা করেছে তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেও সেসব উল্লেখ করে কথা বলা সম্ভব।

    তবে আলী রিয়াজের লম্বা সাক্ষাতকারে সমস্যা হয়তো অন্যখানে এবং তা আরো জটিল হয়ে গেছে; মুল কারণ সম্ভবত আলী রিয়াজ অহেতুক কমিউনিস্ট ও নন-কমিউনিস্ট ভাষ্যের বিতর্কে ঢুকে গেছেন। একালে কোনো রাষ্ট্র আর কমিউনিস্ট কি না, এটা কোনো ফ্যাক্টর বা ইস্যুই নয়।  যেমন স্বৈরাচার বা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র হতে গেলে তাকে কমিউনিস্ট হতে হবে, তা তো নয়। মোদির হিন্দুত্ববাদ নিশ্চয়ই কমিউনিজম নয় বা এই দোষে দুষ্ট নয়। আবার আজ পুতিনের রাশিয়া নিজেও দাবি করে না যে, সে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। এছাড়া একালে ব্যতিক্রম বাদে প্রায় সব রাষ্ট্রই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সক্রিয় সদস্য হয়ে গেছে; কারণ এই সক্রিয় সদস্যপদ না থাকলে রাষ্ট্রের বৈদেশিক বাণিজ্য সুবিধা থাকে না। আর না থাকলে মানুষকে কাজ দেয়া খাবারসহ দেয়া এসব রাষ্ট্র চালানোই মুশকিল, একালে প্রায় অসম্ভব। এই মাপকাঠিতে চীন-রাশিয়া সবাই আর কমিউনিস্ট কি না সে প্রশ্ন তোলা এমন কমিউনিস্ট কে আছেন? অন্তত কমিনিস্টদের নিজের এই মাপকাঠি অনুসারে!  আর চীনের ক্ষেত্রে এমন প্রশ্ন তো আরো অচল। কারণ আমেরিকা ক্রমশ আরো দুর্বল হচ্ছে এভাবে সব সক্ষমতা হারিয়ে ফেললে তাকে সরিয়ে চীন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বা অর্থনীতির নেতার আসনে বসতে যাচ্ছে। কাজেই সে কমিউনিস্ট কি না, এটা নিয়ে আর কী করবেন? অবশ্য অভ্যন্তরীণভাবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি পুরনো বক্তব্যের সাফাইয়ের ওপরই চলে এবং কমিউনিজম-২ বলে কিছু একটা করার ভাবনা আছে, এ কথা ভাবছে।

    কাজেই আলী রিয়াজ যেমন লিখছেন, “সারা বিশ্বের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে দুটো আদর্শিক অবস্থান তৈরি হয়েছে যার একটির প্রতিনিধিত্ব করে যুক্তরাষ্ট্র। অপরটির প্রতিনিধিত্ব করে চীন ও (বলা যায়) রাশিয়া”  – এগুলো একেবারেই ভুয়া কথাবার্তা এবং অচল মুখস্থ কথাবার্তা। একালে এটা আর কোন বুদ্ধিমানের পর্যবেক্ষণ বা মিনিংফুল অবজারভেশন হয়নি। তবে ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’কে কমিউনিজমের বুদ্ধি বা ক্রাইটেরিয়া দিয়ে সাফাই ব্যাখ্যা দেয়া আসলেই বেশ অভিনব। তা হলে চীন যখন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতা হবে (ইতোমধ্যেই অনেকদুর আগিয়েছে), তখন কথিত ‘আদর্শিক অবস্থান’ জিনিসটা কোথায় থাকবে?

    আসলে আমাদের ভেবে কথা বলতে হবে। পুরনো কমিউনিজম কী শিখিয়েছে তাই শেষ কথা বা সবচেয়ে জ্ঞানের কথা মেনে নেয়াটাই তো ভিত্তিহীন এবং তা অবাস্তব, ননপ্র্যাকটিক্যাল। পুরান কথা আকড়ে ধরা নয়, বরং পর্যালোচনা, নিরন্ত্রর পর্যালোচনাই তো রাস্তা!

    কথা আরো আছে। এই যে গণতন্ত্র শব্দটা আমেরিকা চালু করল মডার্ন রাষ্ট্র সম্পর্কে এটা তো মূল শব্দ বা ধারণা কোনটাও নয়। মূল ধারণামূলক শব্দটা হল ‘রিপাবলিক’ [republic] বা মডার্ন রিপাবলিক। অথচ এই ধারণাটাই ছুড়ে ফেলে দিয়ে আমেরিকা কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে গিয়ে শব্দটি বদলে আনা হল নতুন শব্দ ‘গণতন্ত্র’। এর পেছনের মূল কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীন  – এ’দুই রাষ্ট্রই তাদের স্ব স্ব  বিপ্লবের পরে নতুন রাষ্ট্রের নামের মধ্যে এই “রিপাবলিক” শব্দটা রেখেছিল। ইউএসএসআর (USSR) এই নামের মধ্যে ‘আর’ মানে রিপাবলিক। ওদিকে চীনের আনুষ্ঠানিক নাম পিআরসি (PRC) বা পিপলস রিপাবলিক অব চায়না। অর্থাৎ এখানেও ‘রিপাবলিক’ শব্দ হাজির। তাই আমেরিকার পক্ষে  কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো রিপাবলিক নয়, তা বলা সম্ভব হচ্ছিল না; যদিও তাদের ক্ষমতা কাঠামোতে সমস্যা আছে। তাই আবার সেই আমেরিকান কৌশল খাটানো বা স্ট্রাটেজি!

    রিপাবলিক শব্দটি ফেলে দিয়ে প্রমিনেন্ট করা হলো নতুন শব্দ ‘গণতন্ত্র’কে। আর তাতে সবচেয়ে জোর দেয়া হল, যা কমিউনিস্ট দেশে নেই বা দুর্বল অপুষ্ট; এর একটা যেমন ভোট বা নির্বাচন। যার মূল এবং মৌলিক ধারণাটা হল জনপ্রতিনিধিত্ব। অথচ আমেরিকান কথিত “গণতন্ত্রের” ধারণায় জনপ্রতিনিধিত্ব ধারণাটার গুরুত্বই নেই।  সামনে আনা হয় না। ভোট মানেই গণতন্ত্র আর এই ভোটের ধারণার নিচে চাপা দিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে।  আবার ওদিকে যেমন বাক-ব্যক্তির স্বাধীনতা; অর্থাৎ যেসব শব্দ উচ্চারণ করলে কমিউনিস্টরা বিব্রত হবে সেসব শব্দকে সামনে আনা হয়েছে। এতে গ্লোবাল আইডিয়ার লড়াইয়ে আমেরিকা মাইলেজ পেয়েছে, সন্দেহ নেই বিশেষ করে কোল্ড ওয়্যারের আমলে। কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে রাষ্ট্রবিষয়ক ধারণাগুলো বোঝাবুঝিতে, রাজনীতির বোঝাবুঝির ক্ষেত্রে। রাজনীতি বা রাষ্ট্র মানে তা নেমে এসেছে ভোটাভুটিতে। এ ছাড়া সবচেয়ে ক্ষতি করেছে রাষ্ট্রবিষয়ক ধারণার বিকাশ ঘটতে না দিয়েও এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটানো হয়ে গেছে।

    যেমন কেন রিপাবলিক ধারণাটা? এটি যে মনার্কি[monarchy] বা রাজতন্ত্রের বিপরীতে রাজতন্ত্রের পেট চিরে একটি নতুন ধারণা বা সমাধান তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে – আমেরিকার এই গণতন্ত্র শব্দটি এনে। যেমন আরো গুরুত্বপুর্ণ একটা দিক হল, ব্যক্তি মানুষের উন্মেষ, এর ইতি ও নেতি দিক, পারসোনাল লিবার্টি, রাইট টু লাইভ, বেঁচে থাকার বা জীবনের অধিকার এমনকি খোদ রাজনীতি বা রাজনৈতিকতা শব্দটার অর্থ কী? এসব কিছুকে আড়ালে ফেলা শুধু নয়, কবরে মাটিচাপা দেয়া হয়ে গেছে। আর সব কিছুকে নামিয়ে আনা হয়েছে ‘গণতন্ত্র’ আর ভোটাভুটিতে। কোল্ড ওয়্যারের যুগের এই আমেরিকা-সোভিয়েত এই ব্লক রাজনীতির ধারণার আড়ালে। অথচ আজো এসব বাজে তর্ক- আমেরিকা-সোভিয়েত ঠাণ্ডা যুদ্ধে কার পক্ষে মাইলেজ আসবে- সেসব নিজ অযোগ্যতাতেই এখন আপনাআপনিই ক্ষয়ে লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। কারণ প্রশ্নটা আমেরিকা না সোভিয়েত- কে ভালো এর তর্ক একেবারেই নয়। কারণ আমাদের জানতে ও চিনতে হতো ও হবে রাষ্ট্রকে। নিজের রাষ্ট্র ও সমাজকে গড়তে। আমরা আমেরিকা না সোভিয়েত রাষ্ট্রের সমর্থক হব মামলাটা সেটা নিয়ে কখনই নয়।

    তবে আমেরিকার সমালোচনা করা হচ্ছে মানে চীনা বা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র আদর্শস্থানীয় তা নিশ্চয়ই  নয়। কমিউনিস্টদেরও বয়স মানে রাষ্ট্র অভিজ্ঞতাও শত বছর হয়ে গেল। লেনিনের প্রথম গনভোটে পরাজিত বা অভিজ্ঞতা সুখকর হয় নাই বলে জন-প্রতিনিধিত্ব ধারণার বাস্তবায়ন নিয়ে আর ভাবা যাবে না এর কোন মানে নাই। এছাড়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল দিকটা নিয়েও চীনকে ভাবতেই হবে। চীন নিজে আভ্যন্তরীণভাবে আজ ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রিত আছে থাকছে সেটা হতেই পারে। কিন্তু কাল নাও থাকতে পারে! মানুষের বাস্তবায়নযোগ্য আকাঙ্খায় লাগাম পরিয়ে রাখা যায় না। এছাড়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল বলেও আলাদা কিছু আছে ;  কিন্তু গ্লোবাল নেতৃত্বের দৃশ্যপটের আস্থা অর্জনও কম জরুরী। এদিকগুলো ছাড়া চীনের কেবল গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হওয়াটা আদৌও কতটা সম্ভব অথবা কতটা সুখকর অভিজ্ঞতা ও সফল বা শান্তিপুর্ণ থাকবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়। কাজেই আমাদেরটাও  “আমাদের মত গণতন্ত্র” – এটা মুখরক্ষায় বা সার্বভৌমত্বের অজুহাতে বলা যায় হয়ত কিন্তু অর্থ হয় না।  আর অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিতসা-বাসস্থান এসব মানুষের ভোগ-সংশ্লিষ্ট ফলে বৈষয়িক বিষয়গুলোকে ১৯৬৬ সালে কোনমতে জোড়াতালিতে জাতিসঙ্ঘের দলিলে কমিউনিস্ট মানবাধিকার বলে তালিকাবদ্ধ করা হয়েছে বটে। কিন্তু সরি, এই পাঁচটার একটাও “রাজনৈতিক” ধারণাই নয় বৈষয়িক-ভোগের ধারণা – যা রাজনৈতিক নয়। ফলে যা “রাজনৈতিক” ধারণা নয় তা “অধিকার” হবে কী করে? সবার আগে “রাজনীতি” শব্দের অর্থ ধরতে পারতে হবে। মানুষ কেবল ভোগী এক মেশিন তো নয়। সে আপাদমস্তক পলিটিক্যাল। এসব কথার অর্থ বুঝতে হবে। এর উপর আবার মানুষের স্পিরিচুয়াল আকাঙ্খা আছে। তাকেও জায়গা করে দিতে হবে।  এসব ছোটখাট বিষয় নয় বরং গভীর দর্শনের বিষয়। মানুষকে অনেক দূর যেতে হবে, আবার অনেক কিছু বাকি! ওদিকে কমিউনিস্ট অর্জনও নিশ্চয় অনেক। কিন্তু সব শেষ নয় অবশ্যই। বহু সংস্কারই বাকি! 

     আমাদের আগের প্রসঙ্গে ফিরি। একালে এসে কে কমিউনিস্ট আর কে মেন-স্ট্রিম এসব কোল্ডওয়ারের ভাগাভাগি কমে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে নাই-ই। তবু অনেকের জন্য সম্ভবত এটা কষ্টসাধ্য যে, একটা মনার্কি সিস্টেমের বিপরীতে রিপাবলিক-কে বুঝতে হবে এবং তুলনা করে। এছাড়াও এটা না বুঝলে জানা যাবে না যে, রাজতন্ত্রে ব্যক্তি-মানুষ বলে কিছু নেই। ছিল না কেন? ধারণাটাই নেই, তখনও উন্মেষ ঘটে নাই তাই।  আমেরিকা কী করে ‘লিবার্টির’ আমেরিকা হয়ে উঠেছে; আমেরিকান হিস্ট্রি গুরুত্বপুর্ণ সেই ইতিহাসে কমিউনিস্টদের আগ্রহ নেই। আগ্রহ হল, আমেরিকা কী করে ‘গণতন্ত্র’ নামে একটি ধাপ্পাবাজির প্রচারক হয়েছে অথবা এটা দিয়ে সোভিয়েতকে হারিয়েছে, সেখানে।

    ইতিহাসে এক গোত্র বা ট্রাইবাল [tribal] সমাজ পেরিয়ে অনেক পরে ব্যক্তি মানুষের উন্মেষ হয়েছে তাও আবার রাজতন্ত্রের যুগের শেষপ্রান্তে এসে। তাও তাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তির উন্মেষের খবর হয়নি, জানা হয়নি অনেক সমাজে। যেমন যেকারণে আমেরিকা তালেবানদের পশ্চাৎপদ বলে সুযোগ নেয় কিংবা এই সুযোগে ইসলাম পশ্চাৎপদ বলে প্রপাগান্ডা করতে ভালোবাসে। আর এসব বলাবলিকে কাজে লাগাতে চায় এভাবে যে, ওরা পশ্চাৎপদ; কাজেই তালেবানদের এখন আমেরিকান আধিপত্য মেনে নিতে হবে, কায়েমের কাজে লাগতে হবে। অথচ নিজেরা যে কথিত ‘গণতন্ত্রের’ প্রচারে লেগে আছে যেটা স্রেফ ভোটাভুটি আর আমেরিকার তাতে স্বীকৃতি। অথচ এসবের বিপরীতে আমাদের দরকার নিজ রাজনীতি ও রাষ্ট্রধারণার বিকাশ, নিজ রাষ্ট্র গড়ে তোলা। ট্রাইবাল সমাজের অভ্যাস রীতি কেন ব্যক্তি-উন্মেষ হয়ে যাওয়া সমাজে খাটবে না সেটা আগে উপলব্দি করা।

    একালের আমেরিকা আরো ভয়ঙ্কর। একটা উদাহরণ দিব, বাকিটা সবাই বুঝবে। ইটিআইএম- ইস্টার্ন টার্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট (ETIM)। নাম শুনে অনেকের বুঝতে কষ্ট হতে পারে, তাই চিনিয়ে দেই। এরাই হলো চীনা উইঘুরের সশস্ত্র সংগঠন। এই সংগঠন সম্পর্কে এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাংকের তথ্য-ভাষ্য এখানে।  এই সশস্ত্রতা, এদের এখনকার বসবাস ও তৎপরতা আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়ে।

    বুশের আমল থেকেই এরা টেরর বা সন্ত্রাসের দল হিসেবে আমেরিকান ও ইউএনের লিস্টে তালিকাভুক্ত। কিন্তু তা এখন ‘ছিল’ বলতে হচ্ছে; কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প তো খুবই বুদ্ধিমান ও ধূর্ত করিৎকর্মা। তিনিই এই ইটিআইএম দলকে নিজ সন্ত্রাসবাদের তালিকা থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন।  অথচ ২০০২ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তান, কিরঘিজস্তান, আমেরিকা ও চীন  [Afghanistan, Kyrgyzstan, the United States, and China] এদের সবার আবেদনে জাতিসংঘ এই সংগঠনকে তালিকাভুক্ত করেছিল। এনিয়ে আমেরিকান ট্রেজারি ডিপার্ট্মেন্টের এই বিবৃতি এখানে।  তাহলে ট্রাম্পের উদ্দেশ্য কী? খুবই ‘মহৎ’! আর ইটিআইএম এখন কী নিয়ে ব্যস্ত ও কোথায়?

    পাকিস্তানে চীনা অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের শেষ নেই। তেমনই এক প্রকল্পের এলাকায় ভেতরের ঘটনা। প্রকল্প কম্পাউন্ডের ভিতরে সেটাও কয়েক মাইল বলে তাদের অভ্যন্তরীণ নিজস্ব বাস সার্ভিস চালু করা আছে, যা দিয়ে ইঞ্জিনিয়ার থেকে শ্রমিক বা যেকোনো কর্মী চলাচল করে থাকে। তেমনই এক বাসে বোমা বেঁধে রেখে তা দিয়ে হামলা পরিচালনা করে ইটিআইএম। আর এতে ঐ বাস পাশের নদীর তীরে বা খাদে পড়ে যায়। এতে ১৩ জন চীনা ইঞ্জিনিয়ার মারা যান। আর এ হামলার নায়ক ইটিআইএম এর এক কর্মী।

    ট্রাম্পের তালিকামুক্তি কেন তা আমরা নিশ্চয় বুঝলাম। এখানে এনিয়ে একটা ইন্ডিয়ান রিপোর্ট আছে। কিন্তু খেয়াল করতে হবে; তা হলে এটা কি চীনের সাথে আমেরিকার স্বার্থবিরোধ লড়বার ‘গণতান্ত্রিক’ পদ্ধতি! কী তামাসা!  না, তাই বলে এটা ভাবার কারণ নেই যে, বাইডেন এসব থেকে দূরে।  অথবা ট্রাম্প একমাত্র গণতন্ত্রী, আর বাইডেন তা নয়!   ট্রাম্প এই তালিকামুক্তি দিয়েছিলেন ক্ষমতা ছাড়ার অল্প আগ দিয়ে। মানে হল, এর পুরো ‘লাভালাভ’ ও পারফরম্যান্স সব ক্রেডিট এবং বাকি অনুমোদন বাইডেনের নামে।

    এরপরে আরো ঘটনা হল,  তালেবানরা গত আগস্টে কাবুলে ক্ষমতা দখলের আগে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে তাদের নেতারা এক সাক্ষাৎ করেছিল। ওই মিটিং শেষে তালেবানরা প্রকাশ্যেই মিডিয়াকে জানিয়েছিল, এমন সশস্ত্র গ্রুপগুলো যারা আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়ে অন্য দেশে সশস্ত্র তৎপরতা চালাচ্ছে তাদের আর আশ্রয় দেয়া হবে না”। আমরা অনেকেই জানি এখনকার আফগানিস্তানে আইএস (কে) বা খোরাসান গ্রুপ যারা তালেবানদের চেয়েও আরো রেডিক্যাল ও আলাদা, তাদের কামনা তালেবানরা যেন বিফল ও পরাজিত হয়, তারা অপেক্ষা করছে। এদিকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ঐ সাক্ষাতের পরে ইটিআইএম (ETIM) এরপর থেকে অবাধে আফগানিস্তানে চলাচল সীমিত করে ফেলে শুধু না তারা ঐ আইএস (কে) এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রটেকশনে থেকে তৎপরতা চালু রেখেছে। এরই এক ততপরতা ছিল পাকিস্তানের ঐ চীনা প্রকল্পে হামলা।
    চীন-আমেরিকার স্বার্থবিরোধ থাকতেই পারে; থাকা খুবই স্বাভাভবিক!। কিন্তু সেই বিরোধে আপার-হ্যান্ড পেতে ইসলামী সশস্ত্র গ্রুপকে লেলিয়ে দিতে হবে, ব্যবহার করা হবে? এটা কোন গণতন্ত্র?  

    তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল, বাইডেনের ‘গণতন্ত্র’ – এই বুলির মূল কথা কী?

    যেটা আমেরিকার সংকীর্ণ রাষ্ট্রস্বার্থ, সেটাই গণতন্ত্র!

    তা হলে বাইডেনের এই ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ কী বস্তু? আলী রিয়াজ আমাদের গণতন্ত্রের ‘দুটো আদর্শিক অবস্থান তৈরি’ শিখিয়েছেন। আমরা নিশ্চয় এখন এর মর্মবস্তু বুঝতে পেরেছি। আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থটাই হল আমেরিকান ‘গণতন্ত্রের আদর্শ’।

    তা হলে আমাদের বাংলাদেশের সরকার সে তো অবশ্যই নিপীড়ক; গুম-খুন থেকে পায়ে গুলি, নিশীথ ভোট ইত্যাদি সকল ইস্যুতেই তের বিরুদ্ধে  অভিযোগের এখানে শেষ নেই। আমরা সবাই এসব নিয়েই আছি, নিরন্তর ভুগছি।

    এখন এতে আমেরিকা যদি আগ্রহ নেয় তার মানে যেটা ‘আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ সেটাই গণতন্ত্র!’ চলবে এখানে? এই সূত্র অনুসারে এগিয়ে আসে তা হলে আমাদের এখন খোঁজ নিতেই হয় যে এখানে আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থটা মানে গণতন্ত্রটা ঠিক কী? আর তা এবার কী মুল্যে?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ১১ ডিসেম্বর ২০২১ ওয়েবে  আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “কৌশলগত ‘গণতন্ত্র’সম্মেলন”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে

    গৌতম দাস

    প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২১ ২০ঃ২৩ পিএম

    https://wp.me/p1sCvy-3Qi

     

    The War That Changed The Course of History | The First World War

    ইতিহাস পড়ার অনেক পদ্ধতিই হতে পারে। এর মধ্যে একটা উল্লেখ করা যায় যেমন, কোন বিষয়ের আগে-পরের তুলনা করে বা এদুই সময়ের পার্থক্য জেনে পড়া। এভাবে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে আর পরে – এর মধ্যে পার্থক্য কী দেখা দিয়েছিল? আগে কী কী ছিল, যা পরে পরে আর থাকে নাই – এমনই বিষয়ে কিছু কথা বলব।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালটা হল ১৯১৪-১৮ সাল। সেসময়ের দুনিয়ায় বাণিজ্য ব্যবস্থা কেমন ও তা কতদূর বিকশিত হয়েছিল; এ ছাড়া বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পড়ে এর হাল কী হয়েছিল? মুলত এখানে সেই বাণিজ্যের দিকটা ফোকাস করে আগাবো।  এ’নিয়ে সবার আগের কথাটা হল, ১৯১৪ সালের আগে পর্যন্ত মানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগের জমানায়  গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের কথা যদি বলি, এটা নিজেই তেমন কিছুই বিকশিত ছিল না। কেন? এবং কী দেখে বুঝলাম?

    প্রথমত,  বিশ্বযুদ্ধের আগের পরিস্থিতিতেই এটা সারা ইউরোপের সমস্যা। কথাটা আরেকটু ভেঙ্গে বললে, গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বলতে বুঝাচ্ছি, দুনিয়াজুড়ে ছোট-বড় যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কোন বাণিজ্য বা পণ্য লেনদেন বিনিময় কিছু ছিল কী না?  জবাব হল, তেমন কিছু ছিলই না। এই না থাকার প্রধান কারণ প্রথমত ও প্রধানত যা ছিল তা হল যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন ছিল না।  আমরা কিন্তু যোগাযোগ বলতে সবকিছুকে বুঝাই। যেমন পথঘাট মানে আকাশ, সড়ক রেল এবং  সব ধরণের জলপথ। আবার আরেক যোগাযোগ মানে হল, কথা বলা। মানে হল, সরাসরি দেখা করে কথা বলা থেকে টেলিগ্রাফ, ফোন থেকে একালের ইমেল থেকে ফেসবুক ইত্যাদি সব। এছাড়া আরেকটা আগাম কথা বলাই হয় নাই – তা হল ভাষা। পরস্পরকে বুঝা আর বুঝানোর মত কমন ভাষা বা জানা ভাষা থেকে কত দূরে ছিল, এটা এক বড় পয়েন্ট। আবার, আমরা জাস্ট চিন্তা করেন এখন বাংলাদেশে এক যোগাযোগ বলতে – সড়ক, সেতু, রেল, বিমান নৌ ইত্যাদি থেকে টিএন্ডটি বা আইসিটি ইত্যাদি সব মন্ত্রণালয়কেই বুঝাবে।  তাই মূল কথাটা হল, সেকালে এক মহাদেশের সাথে অন্য মহাদেশের কোন ধরণের যোগাযোগই ছিল না। এইটা হল বেজ ফ্যাক্টস। তাহলে যোগাযোগটা কে প্রথম ঘটালো? আর এখানে যে “সেকালে” বলছি এই সেকালে বলতে কোন সময় বা কোন বছর-কালের কথা এটা?

    সরাসরি প্রথম কথাটা আগে বলেও নেই। পরে তা ব্যাখ্যা করে বলি। সেকথাটা হল, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের বা আসলে মহাদেশের সাথে মহাদেশের যোগাযোগটা সর্বপ্রথম ও একমাত্র ঘটতে পেরেছিল কলোনি দখলদারদের হাতে। যতটুকু যা প্রথমে ঘটেছিল তা তাদের  অন্যদেশ দখল করে তা লুটতে বেরিয়ে পড়া ও সম্পদ লুটে নিজ দেশে ফিরে আসা এই ছিল কাজ বা লক্ষ্য। আর এটা করাই হত একটা কোম্পানি খুলে ব্যবসা হিসাবে। একাজ প্রথম শুরু করেছিল  ইউরোপের কিছু রাষ্ট্র। আর তাদের কলোনি দখলের স্বার্থেই এই নেতি কাজের সুত্রেই তাদেরই প্রয়োজন মিটাতে গিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। সোজাকথা, এর আগের দুনিয়ায় এই লুটেরাদের দাঁড় করানো যোগাযোগ ব্যবস্থাটাও ছিল না।
    কাজেই কলোনি শাসক মানে ব্যবসায়ী  মালিক যিনি মানে আমাদের বেলায় যেমন বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এরা তাদের কলোনি লুটের স্বার্থের যেটুক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়েছিলেন তা খুব খারাপ তা বলা যাবে। কিন্তু সেটুকুও কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিস্তারে কাজে লাগে নাই। কেন?
    কারণ,  কলোনি লুটেরা স্বার্থ আর বাণিজ্য স্বার্থ এক জিনিষ নয়। এনিয়ে আরও বিস্তারিত পরে আসছি।

    তাই গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য কেন চালু হয় নাই সেটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরে বলে কথা নয়। কারণ, কলোনি লুটের কাজ ও স্বার্থ  এটা বাণিজ্য করতে আসাই নয়। মূলত একারণের যতদিন কলোনি অর্থনীতি টিকে ছিল (১৯৪৫ সাল পর্যন্ত) ততদিন  গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য তেমন বিকশিত কিছু ছিল না। তাতে সেটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই হোক বা পরে।
    তাই এটা ঠিক বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরে বলে নয়। বরং আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য নিজেই ছিল অবিকশিত ও বাধাগ্রস্থ। এই বাধার পেছনের মূল কারণ বলেছি ‘কলোনি ব্যবস্থা’। অর্থাৎ ইউরোপজুড়ে একটা ক্যাপিটালিজম বিকশিত হয়েছিল ঠিকই; আর এর সময়কাল ধরতে পারি মোটামুটি ১৬০৭ -১৯৪৫, এই প্রায় সাড়ে তিনশ বছর। কিন্তু তা  অবশ্যই এক ‘কলোনি ক্যাপিটালিজম’। এটা কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণভাবে বিকশিত ক্যাপিটালিজম নয়, এমন কি তা বিদেশের সঙ্গে ব্যবসা করেও অর্জন করা নয়। এটা এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে কলোনি দখল করে সেই বেপরোয়া লুটে ইউরোপে এনে জড়ো করা সম্পদ সংগ্রহে হাজির করা এরই এক প্রায় একমুখি এক  ‘কলোনি ক্যাপিটালিজম’।  এজন্য বলছি, আমরা যদি ১৬০৭ সালের পর থেকে বিচার করি মানে যখন থেকে সংগঠিত কলোনি দখল ব্যবসা একেবারে কোম্পানি খুলে তাতে আমাদের বেলায় বৃটেনে বিনিয়োগ ঢেলে অর্থনীতির প্রধান খাত হিসেবে শুরু হয়েছিল তখন থেকে পরের প্রায় সাড়ে তিনশ বছর এই সময়কালকে কলোনি যুগ বলতে পারি।
    তবু আবার এ’সময়ের শুরুতে ধরে নেওয়া যায় যে, কোয়ালিটি স্টিল ও যুদ্ধজাহাজ তৈরির জ্ঞানবুদ্ধি আবিষ্কার ততদিনে চালু ও সহজপ্রাপ্য হয়ে গেছে। এককথায় ততদিনে ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী বিনিয়োগের ব্যবস্থা দাঁড়িয়েও গেছে জাহাজ বহর কিনে চারদিকে কলোনি দখল করতে বেরিয়ে পড়া।

    পরের তিন-সাড়ে তিনশ’ বছর ইউরোপ এইভাবেই কলোনি দখল ব্যবসায় লিপ্ত থেকেই কাটিয়েছিল। তবে তাতে এমন দখলদার কোম্পানিগুলোর পরস্পরের মধ্যে লড়াই প্রতিযোগিতার ফলে কেবল যতটুকু যা পরিবর্তন এসেছিল। যেমন প্রথমত, কোম্পানিগুলোর লড়াই ও প্রতিযোগিতা আর শেষে তা আর কোম্পানিগুলোর মধ্যে না থেকে সংশ্লিষ্ট দেশের মধ্যে লড়াই ও প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর তাতে একেকটা কলোনি লুটেরা কোম্পানি বা তার নিজ দেশ একেকটা মহাদেশে শক্তিশালী ফোকাস করে নিজেকে গড়ে নিয়েছিল। যেমন প্রথমে ইউরোপের কলোনি দখলদার দেশের সংখ্যা সীমিত হয়ে যায় কেবল ইংলিশ, ফ্রেঞ্চ, ডাচ, পর্তুগিজ ও স্প্যানিস এই পাঁচ রাষ্ট্রের মধ্যে। তাও আবার তাদের লড়াই ও প্রতিযোগিতায়ও নিজেরা তারা  মহাদেশে ভাগ হয়ে যায়। যেমন, পর্তুগিজ ও স্প্যানিস কলোনি দখলদার কোম্পানি নিজেদের নিবদ্ধ করে কেবল ল্যাটিন আমেরিকা এই মহাদেশের মধ্যে। আর এদিকে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে ব্রিটিশ আর ফরাসি কলোনি দখলদার কোম্পানিগুলো নিজেদের নিবদ্ধ করেছিল। আর ডাচ কোম্পানি নিজেদের জড়ো করেছিল ইস্ট এশিয়ায় যেমন ফিলিপাইন বা ছোট কোন দ্বীপে।

    এজন্যই বলেছি,  কলোনি দখলদারী যুগ শুরু হবার আগে, মানে মোটামুটি ১৬০৭ সালের আগের দুনিয়ায় দেশ-রাষ্ট্রগুলো পরস্পর পরস্পরকে তেমন চিনত না। অন্য ভাষায় বললে, মূলত যোগাযোগ ছিল না। ফলে বিনিময় বাণিজ্য-সম্পর্ক অনেক দূরের কথা ছিল। ফলে কলোনি দখলদারী শুরু হলে এর মাধ্যমে এই প্রথম তাদের মধ্যে যোগাযোগ ঘটে তবে সেটা এক কলোনি-সম্পর্ক, এটাই তৈরি হয়। এটা ঠিক বাণিজ্য সম্পর্ক একেবারেই নয়। যেমন আজকের দিনের মত (১৯৪৫ সালের পরে) আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বলতে যা বুঝায়, সেটা কখনই তৈরি হয়নি।
    এর পিছনের মূল কারণ বলেছি, সম্পর্কটা যেখানে লুটের সেখানে দেশ-রাষ্ট্রের পরস্পরের মধ্যে কোনো আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্পর্ক হতে পারে না। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটা এক পক্ষীয়। আর যেটা হল, কলোনিকৃত দেশ থেকে সম্পদ ও পুঁজি-পণ্য পাচার (উদ্বৃত্ত সঞ্চয় বা সারপ্লাস পাচার)। ফলে এটা ঠিক বাণিজ্য না, তবে সম্পদ পাচারের সম্পর্ক।

    কমিউনিস্ট চোখঃ
    এখানে আরো একটা মজার অবজারভেশনের কথা বলা যায়। কোনো কমিউনিস্ট চোখ কখনো বাণিজ্য নিয়ে বুঝাবুঝিতে আগ্রহী নয়। বরং যা নিয়ে সে আগ্রহী তা হল, উদ্বৃত্ত সঞ্চয় বা সারপ্লাস পাচার নিয়ে। তাই আসলে সে নিশ্চিতভাবে বলতেও পারে না যে বাণিজ্য করা কী হারাম, না হালাল বলবে। ব্যবসা বা মুনাফা করা নিয়েও তাদের একই দ্বিধা। তবে মুনাফা নিয়ে সম্ভবত তারা প্রায় নিশ্চিত যে, এটা প্রায় সারপ্লাস চুরি করার মত। তাই এটাকে তাদের চোখে হারাম বা অগ্রহযোগ্য মানতে দেখা যায়। তাই শেষ বিচারে সামগ্রিকভাবে বাণিজ্য জিনিসটা তাদের চোখে অননুমোদিত বা অনাগ্রহের বিষয় হয়ে আজও থেকে গেছে। অথচ দেশ-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্য মানেই তো পণ্য বিনিময় লেনদেন এবং সব ধরনের বিনিময় ভাষা, ভাব-ভালোবাসাসহ সবকিছুর বিনিময়ের শুরু এখান থেকেই। আর সর্বোপরি এটাই সবচেয়ে দক্ষ, মানে কম শ্রম খাটিয়ে নানান পণ্য পাবার পথের উপযুক্ত ও একমাত্র উপায়; কিন্তু বাণিজ্য নিয়ে নিশ্চুপ থাকলে এর কোনো সম্ভাবনা নাই। তবে সার কথাটা হল, কলোনি যুগের প্রায় সাড়ে ৩০০ বছরে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্পর্ক তাই দুনিয়ায় তেমন বিস্তৃত হতে পারে নাই, মূলত সেটা কলোনি যুগ বা একপক্ষীয় সম্পর্কের কারণে। তবুও একটা খুবই সীমিত পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য চালু ছিল। যদিও তা আবার কেবল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত কার্যকর ছিল। আমরা এখন সেপ্রসঙ্গে যাব।

    কিন্তু কীভাবে তা বোঝা গেল যে “খুবই সীমিত পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য” চালু ছিল? এর ভালো প্রমাণ আছে কী?
    হ্যাঁ আছে। ‘রথশিল্ড ব্যাংক’ [Rothschild bank]। এটা মূলত জার্মানির এক পারিবারিক মালিকানাধীন ব্যাংক, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ময়োর আমশেল রথশিল্ড (Mayer Amschel Rothschild) যার জীবনকাল (১৭৪৪-১৮১২)। তিনি ইউরোপের অন্তত পাঁচ বড় শহরে তার সন্তানদের দিয়ে ব্যাংকের শাখা খুলে পুরা ব্যবসাটা পরিচালিত করতেন। আর জর্মানিতে নিজে বসে সেগুলোর সমন্বয় করে আসলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন  এক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা। মানে ইউরোপের একমাত্র প্রধান মুদ্রাগুলোর মধ্যে এক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা; কিন্তু সীমিত পণ্য-বিনিময় বা সীমিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু থাকার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?

    মূল সম্পর্কটা হলো, আসলে মুদ্রা মানেই কোনো না কোনো দেশ-রাষ্ট্রেরই মুদ্রা। দেশের ভেতরে বিনিময় ওই একই মুদ্রার মাধ্যমে ঘটে থাকে, আর তা সহজও; কিন্তু আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিনিময় হতে হলে তা কোনো এক দেশীয় মুদ্রায় করা সম্ভব না। সেক্ষেত্রে সবার আগে আন্তঃরাষ্ট্র মুদ্রাগুলোর মধ্যে ‘বিনিময় যোগ্যতা’ থাকতে হয়। আর বিনিময় যোগ্য হওয়া মানে সবার আগে তাদের ‘বিনিময় হার’ জানতে হয়; বা বলা যায় সাব্যস্ত হতে হয়। যার সোজা মানে হলো, কেউ বিনিময় হার সাব্যস্ত করে দিতেই পারে, কিন্তু তিনি বিশ্বাসযোগ্য ও আস্থার হতে হবে। তবেই তা কাযর্কর ও এর এই বিনিময় হার অর্থপুর্ণ হবে!

    ঠিক যেমন মুদ্রা মানেই আসলে আস্থা, বিশ্বাস। যেমন আমাকে কেউ একটা ১০০ টাকার নোট দিলে, যদি আমি নিশ্চিত হই সেই নোটটা এরপরে অন্যকে দিলেও অনায়াসে এটাকে ১০০ টাকার নোট বলে সে গ্রহণ করবে- তবেই আমি তা নিব। ঠিক যেমন যদি রটে যায় যে একশ টাকার নোট ব্যাপক নকল হচ্ছে, তাহলে ব্যাংক থেকে আসা নয়া নোটও বাজারের কেউ আর নিতে চাইবে না বা দ্বিধা করবে।

    সেকালে ইউরোপের এই আস্থাভাজন বিশ্বস্ত লোকটাই হয়ে উঠেছিলেন আমশেল রথশিল্ড। প্রতিদিন সকালে তিনি ওই দিনের ইউরোপের প্রধান মুদ্রাগুলোর বিনিময় হার টানিয়ে দিতেন। কিন্তু সেটা কী কাজে লাগত? কেউ ধরা যাক জার্মানি থেকে ইংল্যান্ডে এসে কোনো পণ্য কিনে তার দেশে গিয়ে বিক্রির ব্যবসায়ী। তাহলে তিনি বিনিময় হার জেনে সেই পণ্যের পাউন্ডে দামের তুল্য পরিমাণ জার্মান মার্ক পরিশোধ করে কিনতে পারতেন। তবে রথশিল্ড ব্যাংকের কারণে একমাত্র বিনিময় হার জানা থাকাতেই এই বিনিময় সহজেই সম্ভব হত।

    কিন্তু রথশিল্ড নিজে জানতেন কীভাবে যে আজকের বিনিময় হার কী রাখতে হবে? তার পদ্ধতি ছিল সোজা। সেকালে যেকোন দেশের মুদ্রা বলতে যে পরিমাণ কাগুজে নোট ছাপা হবে তা ছাপার আগে সমমান পরিমাণ সোনা ভল্টে জমা রাখা হত। যাতে সত্যি সত্যিও নোটের বাহক চাইলে সমপরিমাণ আসল সোনা তাকে দিয়ে দেয়া যায়।  কথা আরো আছে। সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক বলতে ধারণাটা আসে ১৯৪৫ সালের পর থেকে।  ফলে ব্যাংক ব্যবসা করত একমাত্র প্রাইভেট কোম্পানী। ব্যবসায়ীরা সরকারকে কখনও বাজার ব্যবস্থায় ঢুকতে দেয় নাই বা দেওয়ার সাফাই খুজে পায় নাই।  এসবই শুরু হয়েছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থা চালু বিশেষ করে প্রত্যেক সদস্য দেশে একটা করে কেন্দ্রীয় ব্যংক থাকার প্রয়োজন মিটাতে গিয়ে।  যেমন ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ব্যাংক অব ইংল্যান্ড” এক প্রাইভেট ব্যাংক ছিল। একে ইংল্যান্ডের কেন্দ্রিয় ব্যাংক করতেই সরকার এই প্রথম এই ব্যাংককেওধিগ্রহণ বা মালিকানা নিয়ে নিয়েছিল। এর আগে সরকারের অনুমতি নিয়েই ওই ব্যাংক মুদ্রা ছাপাত। ফলে চাহিবামাত্র সোনা ফিরিয়ে দিবার দায় ছিল ঐ ব্যাংকের। এজন্য ঐ মুদ্রাব্যবস্থাকে বলা হত, “গোল্ড ব্যাকড মানি”। অর্থাৎ যে ব্যাংক কাগুজে নোট বা মুদ্রা ছাপাবে সেইই কোন মুদ্রার হোল্ডার বা ধারক মালিক তিনি সোনা ফেরত চাইলে তাঁকে তা দিতে বাধ্য থাকত।
    যেকথা বলছিলাম, মুদ্রা গোলড় ব্যাকড মুদ্রা হত বলে দেশের সোনার প্রবেশ বা বের হয়ে যাওয়া এর একাউন্টিং ভিত্তিক ছিল এই মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ ব্যবস্থা।  তাই   প্রতিদিন সকালে তিনি খবর নিতেন গত দিনে ধরা যাক পাউন্ডে মোট কেনার চেয়ে বিক্রি কত কম/বেশি হয়েছে। বিক্রি বেশি হওয়ার অর্থ হলো, তাহলে অন্য দেশের বেশি সোনা ইংল্যান্ডে এসে ঢুকেছে। তাই এটা পরদিন সমান করতে গেলে  যার অর্থ বিক্রি কমাতে হবে। বিক্রি কমানো মানে অন্যদেশের কম সোনা এসে ইংল্যান্ডে আগের দিনের চেয়ে কম ঢুকা। অর্থাৎ এটাই ছিল তার পরদিন হার সমান করার উপায়। এখন কতটা কমাবেন বা বাড়াবেন এটা অভিজ্ঞতা দিয়ে নির্ধারণ করে নিতেন। আর তাঁর পাঁচ ছেলের কাজ ছিল ওসব দেশের মুদ্রার হার নিয়ে একই খবরা খবর পিতার সঙ্গে দেয়া-নেয়া করা। এভাবে একটা আস্থা-বিশ্বাসের ওপর মানে রথশিল্ডের ভরসায় সীমিত আকারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সেকালে চালু ছিল।

    কিন্তু ১৯১৪ সালে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে পর থেকে এই ব্যবস্থাটাও আর টিকে থাকতে পারেনি। যদিও পেছনের মূলকারণ যুদ্ধ-বিশৃঙ্খলা ঠিক তা নয়। মূল কারণ, মুদ্রাস্ফীতি। অর্থাৎ যুদ্ধে খরচ যোগাতে বা মিটাতে গিয়ে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করেছিল। যে কারণে, নিজ দেশেই সোনা ভল্টে রেখে সমপরিমাণ নোট ছাপানোর রেওয়াজ বজায় থাকেনি, মানে ‘গোল্ড ব্যাকড কারেন্সি’ বলে য়াসলে কিছু বজায় না থাকা শুরু হয়েছিল।  পরিণতিতে ‘গোল্ড ব্যাকড কারেন্সি’ ব্যবস্থার ওপর দাঁড়ানো মুদ্রা বিনিময় হার নির্ণয়ের রথশিল্ডের ব্যবস্থাটাও আস্থা-বিশ্বাস হারিয়ে অকেজো হয়ে গেছিল। আমরা মনে রাখতে পারি  মুদ্রাস্ফোত শব্দটার খাস মানে হল  সোনা আগাম ভল্টে না রেখে মুদ্রা ছাপানো। যুদ্ধের খরচ মিটাতে ইউরোপের সব মাতবর দেশই এভাবে মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়ে ছিল। এরই ফাইনাল প্রতিক্রিয়া হল আমেরিকার। ১৯৩৩ সালের ২০ জানুয়ারি এফডিআর [Franklin Delano Roosevelt ] বা  প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট প্রথমবার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেন। শপথের পরেই তার প্রথম সিদ্ধান্ত ছিল ডলারের মুদ্রাস্ফীতি ঘটানো। তার যুক্তি ছিল সারা ইউরোপ ঘটিয়েছে তাই তাদের সাথে সমান করতে তার এই সিদ্ধান্ত।  তিনি আগের এক আউন্স সোনার দাম ছিল ২৫ মার্কিন ডলার। তা বাড়িয়ে তিনি করেন ৩৫ ডলার। পরে ১৯৪৫ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থা চালু করার সমও গোল্ড ব্যকড কারেন্সি ব্যবস্থা চালু ছিল আর ১ আউন্স সোনা ৩৫ ডলারের এই রেটই বজায় ছিল।  দুনিয়ায় গোল্ড ব্যকড কারেন্সি ব্যবস্থা ভেঙ্গে যায় আসলে ১৯৫৮ সালে যা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থায় প্রয়োগ করে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থাকে পুণঃজন্ম দেয়া হয় ১৯৭৩ সালে। সে প্রসঙ্গ আলাদা, তাই এখানেই ইতি।
    ১৯১৪ সালে বিশ্বযুদ্দ্ধধে যে রথশিল্ডের ব্যবস্থা ভেঙ্গে যায় তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও এটা আর কখনো ফিরে কার্যকর হতে পারেনি। বরং কলোনি ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ায় আর ইউরোপের প্রবল অনুরোধে আমেরিকার নেতৃত্বে রথশিল্ডের কাজটিই আরও ব্যাপকভাবে করতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান গড়ে নেওয়া হয় ব্রেটেনহুড সম্মেলনে ১৯৪৪ সালে। দুনিয়ায় ব্যাপকভাবে গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের শুরু হয় তখন থেকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে কেন্দ্র করে।

    লেখক- রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকার  ০৪ ডিসেম্বর ২০২১ ওয়েবে  আর  ০২ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে প্রিন্টে   “প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরের ফারাক”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ নিবে না

     চীন-ভারত সংঘাতে

    বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ নিবে না

    গৌতম দাস

    ০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3PL

    _

    [সার-সংক্ষেপঃ   চীন-ভারত সামরিক সংঘাত আসন্ন কোন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কার পক্ষ নিবে? চীন না ভারতের পক্ষে? নাকি নিজেরই একটা পক্ষে? সম্প্রতিকালে এসব নিয়ে ‘অনুমিত’ দৃশ্যকল্প এঁকে নিয়ে এর আলাপ তুঙ্গে নিয়েছে মূলত ভারত। আর তাতে ভারতের মন রক্ষার্থে সাথে তাল দেয়া শুরু করেছে আমেরিকাও। এনিয়ে এদিক সেদিক, কার মনে কী আছে তা নামে-বেনামে এমন প্রচুর লেখা ছাপা হচ্ছে। আমেরিকা যদিও ভাব ধরেছে যে সে ভারতকে সাপোর্ট করতে নাকি এই প্রসঙ্গে প্রবেশ করে নাই। আমেরিকা বরং নাকি “ভারতের চোখ দিয়ে বাংলাদেশ দেখা” ছেড়ে দিতে বাংলাদেশকে ভারত থেকে আলাদা নিজের এক পররাষ্ট্র ডেস্ক সাজিয়েছে যেখান  থেকে এখন বাংলাদেশ ইস্যু দেখাশুনা করার পরিকল্পনা নিয়েছে – এসব চাপাবাজি-মূলক বক্তব্য এক সাক্ষাতকারে প্রকাশ করেছে। অথচ ফরেন পলিসি পত্রিকার এই আর্টিকেল উলটা সাক্ষ্য দেয় যে খাসিলত বদলায় নাই, বদলাবেও না।
    কিন্তু এসময়ে হঠাত চীন-ভারত সংঘাতের কথা উঠছে কেন? এটা আমেরিকা বা ভারত স্পষ্ট উচ্চারণ না করে এড়িয়ে যাচ্ছে যদিও তা করা হচ্ছে “যেন সংঘাত আসন্ন” এমনটা (given) ধরে নিয়ে। তবে ভারত পরোক্ষে এক আর্টিকেল ছাপিয়ে তা বলেছে। সেখানেও আগাম (given) ধরে নেয়া ঘটনাটা হল ভারত তো জীবনেও তিস্তার পানি দিবে না ফলে এক চীনা তিস্তা প্রকল্প যেহেতু বাংলাদেশ ভাবছে; তা ভাববেই স্বাভাবিক। সেটা হলে এর উলটা প্রভাবে ভারত কী কী হারাবে তা নিয়ে এক এজেন্সি রিপোর্ট ছাপিয়েছিল আমেরিকার ভোয়া বাংলায় মতিউর রহমান চৌধুরী। যেখানে ভারতের পক্ষে এক “ছায়া-ব্যক্তিত্ব”  অংশ নিয়েছিল। যেখানে বেপরোয়া ভয়াবহ সব কথা লেখা হয়েছে। যেমন, বাংলাদেশকে ভারতের সাথে চুক্তি করতে হবে যাতে চীন-ভারত যুদ্ধের সময় ভারত বাংলাদেশের উপর দিয়ে সামরিক যান চলাচল করতে পারে। যেমন লিখেছে – “… বাংলাদেশের সাথে একটি চুক্তি সই করা, যে চুক্তিবলে সংঘর্ষের সময় সামরিক, বেসামরিক এবং ট্রাফিক ক্যারি করা যাবে”। মানে এক ন্যাংটা খোকার মামা বাড়ির আলাপ আর কাকে বলে!!!
    এমন এসব এজেন্সী ততপরতায় বাংলাদেশ ভরে গেছে। ডেইলি স্টার এমন  আরেক রিপোর্ট এখানে। এক পুরানা এজেন্ট সিপিডি (CPD) এবার ভারতের আরআইএস (RIS) নামের এক ছুপা থিঙ্কট্যাংকের সাথে যৌথ সেমিনার করেছে ঢাকায়।  ছুপা এজন্য যে এরা একদিকে দাবি করছে তারা স্বাধীন থিঙ্কট্যাংক প্রতিষ্ঠান। অথচ এর পরিচালনা পরিষদ বা গভর্ণিং বডিতে দেখা যাচ্ছে  ভারত সরকারের পাঁচ মন্ত্রণালয়ের সচিব (পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, অর্থনীতি ইত্যাদি) এবং সাথে আর এছাড়াও আরএসএস নেতা ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ডিরেকটরেই পরিপুর্ণ।  আর এমন RIS এই প্রতিষ্ঠানের সাথে CPD যৌথভাবে বাংলাদেশের ৫০ বছর পালন করেছে ঢাকায়! কী করে?? সিপিডির রেহমান সোবহান ভারতকে করিডোর দেওয়ার পক্ষের এজেন্সীর হয়ে ২০০৭ সাল থেকে সোচ্চার এবং বিরোধীতাকারীদের মুর্খ ও অশিক্ষিত বলেছিলেন তিনি। আবার এখন   ভারতের রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশ সফর নিয়ে কিছু লোক অতি উতসাহে আলোড়ন তোলার চেষ্টা হচ্ছে কিন্তু তা অনাগ্রহে গণবিচ্ছিন্ন আড়ম্বরেই আটকে থেকে যাচ্ছে।

    আসলে সিপিডি  এমনই ভারত অনুগত যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ নিয়ে কথা উঠায় কিন্তু সারা ভারতে গত আট বছর ধরে একটা প্রবল হিন্দুত্ববাদের যোয়াড় বইতেছে আর ভারতের এই বন্ধু হওয়া সত্বেও বাইডেন এই প্রসঙ্গে কথা তোলা ছাড়ে নাই। অথচ আমাদের সেকুলার রেহমান সোবহান সাহেব মুখে কুলুপ দিয়েছেন; কি জানি মহাজন রাগ করে নাকি!!  এমন যতই আনুগত্য [subordination] বা অধীনস্ততা দেখাক এথেকে ভারত কোন কিছু অর্জন করতে পারবে না।

    তবু নিশ্চিত বলা যায় যত  প্রচেষ্টাই নেয়া হোক, চীন-ভারতের কোন কল্পিত যুদ্ধে বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ নিবে না। এর কোন সুযোগই আর নাই। বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ তো নিবেই না এডিশনালি সাথে বাংলাদেশের নিজের সার্বভৌম বুঝের কোন অবস্থানও থাকতে পারে।  এমনকি তা হাসিনার নেতৃত্বের বাংলাদেশেও না।  মনে রাখা যেতে পারে, কোন শর্তে বা চাপে ফেলেও বাংলাদেশকে কোনদিকে নেওয়ার দিন শেষ, সেই পরিস্থিতিটাই লুপ্ত  হয়ে গেছে। এটা ভারত যত তাড়াতাড়ি  বুঝবে ততই সেটা ভারতের জন্য মঙ্গল হবে। তবে এর আগে নানা গণবিচ্ছিন্ন আড়ম্বর অথবা বহু চাটুকার বা এজেন্টদের ততপরতা  আমরা চলতে দেখব অবশ্যই। আর হাইকমিশনকেও আমাদের মিডিয়া কিনার জন্য আরো বহুদিন ফান্ড ঢেলে যেতে দেখব। ]

    DON’T LOOK AT BANGLADESH WITH INDIAN PRISM : USA MEDIA

     

     

    ‘ফরেন পলিসি’ (Foreign Policy Magazine), ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই আমেরিকান পত্রিকা; দীর্ঘ দিন ধরে এটা মূলত ডিপ্লোমেসি ও রাজনীতিক ইস্যু নিয়ে চর্চার এক ম্যাগাজিন। আর বলাবাহুল্য, এ’কাজ তারা আমেরিকান স্বার্থের দিক থেকে তাকিয়ে করে থাকে। আর বাইডেন ক্ষমতায় আসার আগে এই ম্যাগাজিনের অনুসৃত লাইন যাই থাক, চলতি বছর থেকে এটা এখন বাইডেনের বড় ‘একটিভ সাপোর্টিং’ পত্রিকা; বিশেষ করে সাউথ এশিয়ার জন্য আর তা কাভার করার দিক থেকে। মাইকেল কুগেলম্যান [Michael Kugelman] ‘উড্রো উইলসন সেন্টার’ [Wilson Center] এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ডেপুটি প্রোগাম ডিরেক্টর ও সিনিয়র ফেলো। তিনি এখন ফরেন পলিসি পত্রিকায় নিয়মিত এক সাপ্তাহিক ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফ’ লেখার তত্ত্বাবধান ও প্রকাশ করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত যেটা আসলে বাইডেনের সাউথ এশিয়া নীতির ছাপে ও পক্ষে এই অঞ্চলের বার্নিং ইস্যুগুলোতে তাদের অবস্থান মেলে ধরে। আর তাতে এ অঞ্চলের খুঁটিনাটি ইস্যুতে বাইডেন প্রশাসনের মনোভাব সম্পর্কেও কিছু  আঁচ পাওয়া যায়। এছাড়া অনেক সময় এ’অঞ্চলের মিডিয়াগুলো কী লিখেছে তার ছোটখাটো রিভিউও দেখতে পাওয়া যায় এই ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফে’। অর্থাৎ বাইডেনের পক্ষেরই যেন এটি একটা আলাদা ভার্সন কিন্তু যারা বাইডেন প্রশাসনের সাথে অ-সরকারিভাবে ও ইনফরমালি যুক্ত।

    বুড়া সিংহ আমেরিকাঃ
    এদিকে চলতি শতক থেকে প্রায়ই আমেরিকান প্রশাসনকে অনেকে ‘বুড়া সিংহ’ বলে থাকে। টানা পঁচাত্তর বছর ধরে আমেরিকা দুনিয়াকে ভালো-মন্দ যাই হোক একভাবে দাবড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। কিন্তু তার সেসব বহু সক্ষমতাই আজ গত হয়েছে; সোজা নাই হয়ে গেছে; বিগত যৌবন হয়ে গেছে। ফলে যেন এটা এখনো সিংহ বটে তবে চামড়া ঢলে পড়া বুড়া সিংহ হয়ে গেছে।

    গত ১৯৪৫ সালকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে একটা ভাল ‘জংশনের বছর’ বলা যায়। এই জংশন হল, এক দিকে  বিশ্বযুদ্ধে দুনিয়ায় ভেঙে পড়া পুরনো অসংলগ্ন [discrete] রাজনৈতিক অর্ডার মানে যেটুকু রাজনৈতিক সিস্টেম ছিল তা ভেঙ্গে, পরে ওর অবশিষ্ট নিয়ম শৃঙ্খলাগুলো ক্রমেই সে ত্যাগ করছে আর অন্যদিকে নতুন এক অর্ডারে এক সুষম সংগঠিত ও গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমে দুনিয়া পুনর্গঠিত করে  নিজে চলতে শুরু করার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। নতুন সেই গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমে এর  গ্লোবাল ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার বা এই নয়াবিধি ‘ব্যবস্থা’ শুরু হচ্ছে মূলত জাতিসঙ্ঘকে কেন্দ্রে রেখে [এটাই প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের ড্রিম]  এবং অন্তত তিনটা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে নিয়ে। এই বিগত অর্ডারটাকে যদি বলি কলোনি যুগ বা কলোনি ক্যাপিটালিজমের কাল তবে, নতুন যা সেসময়ে গড়ে উঠছে তা আমেরিকান নেতৃত্বে এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম।  যদিও সোভিয়েত কমিউনিজম, যা তখন ইতোমধ্যে ২৮ বছর বয়স্ক, সে এটা সরাসরি স্বীকার করতে চায়নি। কেবল জাতিসঙ্ঘ গঠনের সময়ে নিজের ভেটো সদস্যপদটা ঠিকঠাক থাকে তা বুঝে নিয়ে বাকি ব্যাপারে  প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে তালে তাল দিয়ে গেছে। অর্থাৎ   আমেরিকা যা করে করুক, পরোক্ষে এভাবে মেনে নিয়েছিল। আর অন্য দিকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যাপক কোন বাণিজ্য যেটা ১৯৪৫ এর আগের দুনিয়ায় যা কোনদিন ছিল না  তা এবার পূরণে এক বিশাল গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা চালু করতে বা তার নিয়ন্ত্রক বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এদের জন্ম দেয়া হোক;  আর  তা আমেরিকা গড়ে তুলুক এটাই ইউরোপ মনেপ্রাণে চেয়ে ও সাপোর্ট করে গেছিল। তাই আমেরিকা এভাবে এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম চালু করে নিতে পেরেছিল।
    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক জন্মের টানা ২২ দিনের জন্মসভার হোটেলে বসবাসে সোভিয়েত ইউনিয়নও আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত থেকেছিল; অংশ নিয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৫ সাল থেকে এর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা শুরু হয়ে গেলে তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আর চাঁদা দিয়ে সদস্যপদ নেয় নাই বা নিতে আসে নাই। আবার কোনো বাধাও দেয়নি। কেন কী হয়েছিল, কেন সোভিয়েত ইউনিয়নের এমন সিদ্ধান্ত তা প্রকাশ্যে, স্টালিন তখনো জীবিত ও ক্ষমতাসীন- তা সত্ত্বেও কোথাও তিনি তা জানাননি। লিখিত কিচ্ছু নেই। তবে আমেরিকা তার নয়া গ্লোবাল অর্ডার নিয়ে  ঠিকই এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই থেকে টানা পঁচাত্তর বছর পরে আমেরিকা এখন এক বুড়া সিংহ যার যৌবন কেটেছে ‘রুস্তমি’ করে। যখন সে কোন কিছু চেয়েছে জানলেই তখন অনেক কিছু হয়ে যেত। সেসব দিন আর নাই। এর বড় কারণ এখন আমেরিকা কাউকে দুর্নীতির  অজুহাতে ধরে অনুগত করতে বেকায়দায় ফেললে এটাই সুযোগ হয়ে উঠে – এই সুযোগে চীন বিপুল অনকাঠামো নিয়ে সে দেশে প্রবেশ করে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকই একমাত্র ও একচেটিয়া বিকল্পহীন সেসব দিন আর নাই। ওদিকে ইতোমধ্যে আমেরিকান আমাদের মত দেশকে অবকাঠামো বিনিয়োগ দিবে সেই সক্ষমতাও শুকিয়ে আসে।

    চলতি শতক বা দুই হাজার সাল থেকে আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা যে ঢলে পড়ছে তা আর লুকিয়ে রাখা যায়নি। বিশেষ করে আফগানিস্তানে ফলহীন যুদ্ধে একতরফা অর্থ ঢালার পর থেকে আরো মারাত্মকভাবে। আর এর বিপরীতে চীনের উত্থান এবং সমৃদ্ধ ও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে চীন সেই নেতৃত্বের জায়গা নিতে উঠে আসা, সেটাও স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল।
    মজার কথা হলো, ওবামা আমল (২০০৯-২০১৬) পর্যন্ত যত প্রেসিডেন্ট তারা কেউ স্বীকার করেননি যে, চীন উঠে আসছে, আমেরিকা বুড়া সিংহ হচ্ছে। এই বাস্তব সত্য স্বীকার না করাটাই যেন আমেরিকান সব প্রশাসনের অফিসিয়াল অবস্থান। একমাত্র কিছু ব্যতিক্রম দেখা যায় জিবিগনিউ ব্রেজনিস্কি যিনি চীন-আমেরিকা সম্পর্ককে প্রথম (১৯৭৮) পারস্পরিক স্বীকৃতির রূপ দিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলেন, তার বেলায়। যখন তিনি ছিলেন (১৯৭৭-৮১) প্রেসিডেন্ট কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (NSA)। তিনি খোলাখুলি চীনা উত্থান প্রসঙ্গে নিজের বইয়ে লিখেছেন। এমনকি ওবামাও আমেরিকান নেতৃত্ব আরো বজায় থাকবে কি না এ নিয়ে সেকালেই যেসব প্রশ্ন উঠে গেছিল তা তিনি মানেন না দেখাতে উলটা দাবি করে বেড়াতেন যে, আমেরিকাই আরো বহুদিন গ্লোবাল নেতৃত্বে থেকে যাবে।

    কিন্তু কেন এখানে চীনের গ্লোবাল নেতৃত্বে উত্থান বা আমেরিকান বুড়া সিংহ হয়ে যাওয়ার স্বীকার-অস্বীকার নিয়ে কথা তুলছি?
    কারণ উপরে উল্লিখিত ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনে এবারের ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফে’ কুগেলম্যানের সাথে যৌথভাবে লেখা একটি আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। ওতে সহলেখকের নাম আনু আনোয়ার [Anu Anwar], জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির যিনি পিএইচডি প্রার্থী। আর ঐ লেখার শিরোনাম হল “আমেরিকার বাংলাদেশকে নিয়ে বাজি ধরা উচিত” [America Should Bet on Bangladesh]। আর উল্লেখ্য যে এ’লেখায় চীনের চেয়ে আমেরিকা অক্ষম হয়ে পড়েছে এর স্বীকারোক্তি করা হয়েছে। সেসব প্রসঙ্গে ঢুকব এখন।

     কিন্তু লেখার প্রসঙ্গ কেন এমন?
    গত মাসে, মানে নভেম্বরের মাঝমাঝি এক আমেরিকান ডেপুটি সহকারী মন্ত্রী (সাউথ এশিয়া) কেলি কেইডারলিং [Kelly Keiderling] বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন কোনো এক বহুরাষ্ট্রীয় সভায় যোগ দিতে। ফিরে যাওয়ার আগে তিনি ডেইলি স্টারকে এক সাক্ষাৎকার দেন যার প্রসঙ্গ হল – তিনি দাবি করেন, আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টে বাংলাদেশ আলাদা গুরুত্ব লাভ করেছে, যে কারণে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এখন থেকে আর ভারতের সাথে একই ডেস্ক থেকে দেখাশোনা করা হবে না। এতে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল যে, বাংলাদেশকে আর ‘ভারতের চোখ দিয়ে’  দেখা আমেরিকা  বন্ধ করেছে। তাই কুগেলম্যান ও আনু আনোয়ারের যৌথ লেখাটা হল, সেই বক্তব্যের গুরুত্ব আরো বিস্তারিত একটা সাফাইয়ে তুলে ধরা।
    ওই যৌথ লেখা নিয়ে কোন সেন্সিবল বাংলাদেশের যে প্রতিক্রিয়া হবে সবার আগে তা শিরোনাম আকারে বলে রাখি। বাস্তবে ফরেন পলিসির এই আর্টিকেল ভারতের চোখ দিয়ে আমেরিকার দেখার অভ্যাস ত্যাগ করা দূরে থাক, বরং আরো পোক্তভাবে ভারতের তথাকথিত নিরাপত্তাস্বার্থের চোখ দিয়েই বাংলাদেশকে দেখেছে। মানে ভারতের তথাকথিত নিরাপত্তাস্বার্থ বাংলাদেশ কতটা দেখবে অথবা না, সেই আলোচনাই ওখানে করা হয়েছে।

    আগাম অনুমান  
    কোন লেখা শুরু করার আগে লেখকের কিছু আগাম অনুমান সেখানে থেকে থাকে। সেই অনুমানটা আমরা এখানে দেখব। যেমন আনুদের লেখাটা সে অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে আছে তা এখানে আমরা পাব। আনু লিখছেন, “ভবিষ্যতের কোনো সঙ্কটে বাংলাদেশ যদি চীন অথবা ভারত কোনোটার পক্ষ নিতে হয় অথবা  কোনো নিজস্ব ভূমিকায় হাজির হয়, তা সামরিক অথবা কূটনীতিক যাই হোক না কেন, তাহলে তা এঅঞ্চল বিপদে পড়ার মত ভূরাজনৈতিক পরিণতি ডেকে আনবে [If Bangladesh were to take the side of China or India, or to exert any role, whether diplomatic or military, in future crises, there would be considerable geopolitical consequences for the region. অর্থাৎ মূলকথা বাংলাদেশের নিজের ভুমিকা নেওয়াটাই ভারতের জন্য হবে মারাত্মক – এটাই তিনি বলতে চাইছেন।

    “If Bangladesh were to take the side of China or India, or to exert any role, whether diplomatic or military, in future crises, there would be considerable geopolitical consequences for the region.”

    এখানে একটি কথা বলে রাখি। এ লেখাটায় জিও-পলিটিক্যাল [geopolitical] এই অস্বচ্ছ শব্দটা যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে একেবারে বিরক্তির পর্যায়ে।  এমনিতেই যারা ‘জিও-পলিটিক্স’ শব্দ ব্যবহার করেন তাদের ওপর ভীষণ বিরক্তি লাগে। মনে হয় এসব মানুষের যখন কোনো কিছু বুঝতে বা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিজের ক্ষমতা টের দেয়, তখন এরা সোজা সেখানে জিও-পলিটিক্স শব্দটা ব্যবহার করে পার পেতে চায়। ফলে এক অর্থহীনতা তৈরি করে। অথচ তারা কোথাও কোন রাষ্ট্রের (কূটনৈতিক) সিদ্ধান্তগুলো বা ততপরতার কারণে যখন  তার স্থানীয় পড়শি রাষ্ট্রের উপরে এর প্রভাব পড়া শুধু নয়, তাতে শুধু আঞ্চলিকও নয় একেবারে গ্লোবাল পর্যায়েও প্রভাব পড়ে – এরা সেই গ্লোবাল প্রভাব কথাটাকে বুঝতে বুঝাতে না পেরে সম্ভবত সেটাকে “জিও-পলিটিক্স” বলে চালাতে চেয়ে থাকে।
    এর পেছনের মূল কারণ দুনিয়ায় ক্রমেই গ্লোবাল হয়ে ওঠা অর্থনীতি। এতে সব কিছুই এখন গ্লোবাল; মানে কোনো কিছুই আর স্থানীয় থাকছে না যেহেতু বাণিজ্য এখন গ্লোব-জুড়ে মানে গ্লোবাল হয়ে উঠেছে; ফলে পণ্য-বিনিময়ও গ্লোবাল রূপ নিয়েছে। তাই একটি ভূগোলে (জিও) কিছু একটা ঘটলে এর প্রভাব-পরিণতি স্থানীয় থাকছে না, বরং স্বতঃই তা গ্লোবাল হয়ে উঠছে।

    ঠিক আছে, তাহলে লেখক এখন কী নিয়ে উদ্বিগ্ন? বাংলাদেশের সামর্থ্যবান হয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন?  সেটাই বা কেন? কারণ প্রধান প্রশ্ন, তা হলে এর মধ্যে আমেরিকান স্বার্থটা কী? বাংলাদেশ সামর্থবান হলে যদি ভারতের ক্ষতি হয়ে যায় তার মধ্যে আমেরিকান স্বার্থটা কী? এবং কোথায়?

    আসলে এখানে আমেরিকার সরাসরি কোনো স্বার্থ নেই। স্বার্থটা মূলত ভারতের আর এটিই আমেরিকার উদ্বেগের কারণ। এই হলো আমেরিকার ধরে নেয়া অনুমান বা নিজের স্বার্থসংক্রান্ত বুঝ। মানে আবার বোঝা যাচ্ছে তা হলে, আমেরিকার বাংলাদেশের জন্যও কোনো উদ্বেগ নেই।

    নিজের নয়, কিন্তু ভারতের স্বার্থ নিয়ে আমেরিকা উদ্বিগ্ন কেন? জবাব হল, আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে যা কিছু ভারতীয় স্বার্থ, এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন।

    তাহলে দাঁড়াল যে, এই আর্টিকেলটা বাংলাদেশ নিয়ে মনে হলেও আসলে এটা ভারতের স্বার্থরক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন আমেরিকার পক্ষে লেখা এক আর্টিকেল। তার মানে, সেই একই পুরান কথাটাই হল যে, এখানেও আসলে আমেরিকার ভারতীয় প্রিজমের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশকে দেখছে – সেই পুরনো অভ্যাসের ধারাবাহিকতা। সেই ২০০৭ সাল থেকে চলে আসা আমেরিকার পুরনো কায়দাটাই।
    তা হলে যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, ‘বাংলাদেশ যদি চীন অথবা ভারত কোনোটার পক্ষ নেয় মানে নিজের কোনো ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়,…তো খারাপ ভূরাজনৈতিক পরিণতি ডেকে আনবে’  – এর মধ্যে সারকথাটা হল, বাংলাদেশ যদি চীনের পক্ষ নেয় বা আরও নিজের কোনো ভূমিকা নিয়ে হাজির হয় – এসব ক্ষেত্রে এক উদ্বিগ্ন আমেরিকাকে আমরা দেখতে পাচ্ছি।

    অথচ কথাটা একেবারেই সোজা।  চীন-ভারত দ্বন্দ্বের ইস্যুতে এমন দুটোর মধ্যে বাংলাদেশ ঠিক কী করবে তা যাই করুক সেটা তো বাংলাদেশের একান্ত সিদ্ধান্ত এবং স্বভাবতই বাংলাদেশ চাইবে তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিজের কাছে রেখে দিতে। এমনিতেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সঠিক অবস্থান হবে কোন দুপক্ষের বিবাদে কোনই পক্ষ না নেয়া; এ বিষয়ে তাদের উভয় থেকে দূরে থাকা।

    আর এখানে আবার আমেরিকা চাচ্ছে আমরা যেন ভারতের পক্ষে থাকি, যেটা অ্যাবসার্ড ও অলীক। আর সেটা কোন ভারত বা কোন আমেরিকা? যে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে?  আহা রে কিউট বাবুটা! সত্যি এ এক অদ্ভুত আবদার!

    এ ছাড়া এই প্রসঙ্গে আরেকটা মজার দৃশ্যপট পরীক্ষা করা যাক। আসলেই কি চীন-ভারত কোনো সঙ্ঘাতে খোদ আমেরিকাই ভারতের পক্ষে দাঁড়াবে? যুদ্ধ করবে? সত্যি?  এটা তো সুখে কান্না চলে আসার মত বেবি!  আচ্ছা, দুই বছর আগে লাদাখে চীন-ভারত সীমান্ত সঙ্ঘাতে কমপক্ষে ২০ ভারতীয় সৈন্য নিহত ও বহু আহত হয়েছিল (যখনিকার ভারতীয় সৈন্যদের কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বা কান্নার দৃশ্যের ভিডিও নেটে প্রায়ই প্রকাশিত হতে দেখি আমরা), সেই উত্তেজনার সময়েও কি আমেরিকা ভারতের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল? প্রশ্নই আসে না। আমেরিকা আসেনি। এমনকি আমেরিকার পক্ষ থেকে ভারতকে কোন সান্ত্বনাবাণী দানের কথাও আমরা জানি না। তাহলে? আমেরিকা আসলে কার পক্ষে? আর আমরা কোন পক্ষ নিব তা নিয়ে আমেরিকা উদ্বিগ্ন হওয়া কী সাজে???  টু উ উ মাচ!

    এ নিয়ে ইদানীংকালের প্রশাসন, বাইডেন প্রশাসনের দুর্গতি আরো ভয়াবহ। একালের এই আমেরিকা এখন সব ব্যাপারে আসলে লিম্ব মানে ঝুলে থাকে, কোনো পরিস্থিতিতে কোন  দিকে নড়ে না। যেমন আমেরিকান (Countering America’s Adversaries Through Sanctions Act) বা CAATSA আইনে কেউ রাশিয়ান এস-৪০০ মিসাইল কিনলে সেই রাষ্ট্রের উপর আমেরিকান অবরোধ আরোপ হবে। সে বিচারে এমন মিসাইল কেনায় ভারতের উপরে অবরোধ আরোপ হয়ে যাবার কথা। কিন্তু তা কী স্টাটাস অবস্থায় আছে কেউ ঠিক জানে না- ব্যাপারটা ‘লিম্ব’ হয়ে ঝুলে আছে।
    আবার ওদিকে তাইওয়ান নিয়ে অযথা খোঁচাখুঁচি ব্যাপারটা আবারো একেবারে ছেচড়ামোর পর্যায়ে নেয়া হয়েছে। “এক চীননীতি” [One china policy] মানে হল তাইওয়ান আলাদা দেশ নয়;  বরং একই চীনা ভূখণ্ডের অংশ – এটা কোন রাষ্ট্র না মানলে সে রাষ্ট্রের সাথে চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক করে না। সেই বিচারে ১৯৭১-৭৭ সাল পর্যন্ত নানান ইস্যুতে দীর্ঘ আপস আলোচনার পরে আমেরিকার এক চীননীতি মেনে নিয়েই চীন-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ১৯৭৮ সালের শুরু থেকে।
    এভাবেই দীর্ঘ পথ চলার পরে  ট্রাম্পের আমলে এসে তিনিই প্রথম এক চীননীতি মানি-মানি না টাইপের লিম্ব তৈরি  করেন। । শেষে এবছর গত  অক্টোবর মাসে এসে চীন তাইওয়ান ইস্যুতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করলে বাইডেন এবার তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুলেভানিকে দ্রুত চীনের সাথে বৈঠকে বসেই সোজা ১৯৭৮ সালের এক চীননীতিটাই বাইডেনের আমেরিকা এখনো বজায় রেখেছে বলে ঘোষণা দিয়ে দিলেন। এভাবে চীনের সব ক্ষোভ মিটিয়ে দিলেন। কিন্তু আবার গত দুই সপ্তাহ ধরে পুরানা চুলকানি! বাইডেন তার ‘গণতন্ত্র সম্মেলনে’ এবার তাইওয়ানকেও রাষ্ট্র হিসেবে দাওয়াত করেছেন।  অথচ তাইওয়ান জাতিসংঘের সদস্য নয় ঐ ১৯৭১ সাল থেকে। যখন থেকে সেটা কেড়ে নিয়ে মাওয়ের চীনকে আসল চীন বলে ভেটোসহ ঐ সদস্যের হকদার বলে মানা হয়েছিল। তাই মূল চীনাভুখন্ডের একচীন নীতি জাতিসংঘের চোখেও ভ্যালিড। এটা স্রেফ কোন গোয়ার্তুমি নয়। )  তাই আবার খামোখা টেনশন! অর্থাৎ এ কালের  বুড়া সিংহ  আমেরিকা  যে মুরোদ হারাচ্ছে তার আরেক প্রমাণ হল এসব ছেচরামো। এরই আরেক প্রকাশ হল, সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বারবার ঝুলে থাকতে সবচেয়ে ভালো পারে!

    বাংলাদেশ কেন চীনের বিনিয়োগ পাওয়ার দিকে ঝুঁকেছে তা বর্ণনা করতে গিয়ে আনু নিজেই বলছেন, “চীনের অল্প সময়ের ভেতর বিপুল বিনিয়োগ সমাবেশ ঘটানো বা জোগাড়ের ক্ষমতা এবং তাও আবার তুলনামূলক অল্প কিছু শর্তে। যেটা নয়াদিল্লি তো বটেই ওয়াশিংটনেরও কম্ম নয়, তাদের এমন মুরোদ নেই” [Bangladesh, like many countries housing BRI investments, is attracted to Beijing’s ability to quickly deploy large amounts of capital with relatively few conditions. This is not something that New Delhi—or, for that matter, Washington—is able to do.]”।

    “Bangladesh, like many countries housing BRI investments, is attracted to Beijing’s ability to quickly deploy large amounts of capital with relatively few conditions. This is not something that New Delhi—or, for that matter, Washington—is able to do.”

    আমার মনে হয়, লেখক আনু আনোয়ারের  এত খোলাখুলিভাবে চীনের চেয়ে আমেরিকার অক্ষমতার কথা এই কঠিন সত্যকে প্রকাশ করা, কোনো আমেরিকান লেখায় আগে আসেনি। এ্ইটা বুড়া সিংহের নিজেকে বুড়া হিসাবে  এক আপন স্বীকারোক্তি!

    তবু লেখক এখানেই থামেননি। পরামর্শ দিয়েছেন আমেরিকাকে আবার তার যৌবন কালের মতো নয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনতে [By funnelling more investments into Bangladesh……]। কারণ একথাটা অবাস্তব তিনি জানেন। কিন্তু এটা বলা ছাড়া তার লেখাটাই দাড়ায় না, অর্থহীন হয়ে দাড়ায়।  সবাই জানে, আমেরিকার সে ‘ব্যবসা’ মানে যোগ্যতা চলে গেছে বহু বছর আগেই। তবু ‘গপ্প ফলিয়ে বেড়ানো’ আমেরিকা ত্যাগ করেনি। গত জি-৭’ বৈঠকে সবাইকে সাথে নিয়ে তারা নতুন উদ্যোগে অবকাঠামো বিনিয়োগ আনবেন, যেটা নাকি আবার চীনা বেল্ট-রোডেরও প্রতিদ্বন্দ্বী হবে। কিন্তু এসবই গল্প যা এখন পর্যন্ত কোনো রকমের বাস্তব প্রকল্প হিসেবে শোনা যায়নি। তাই শেষে আনু নিজেই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, ‘চীনের মতো দ্রুত আর বিশাল বিনিয়োগ সমাবেশ ঘটানোর মুরোদ আমেরিকার নেই”।

    তাই সারকথায় ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের এই আর্টিকেলটা লেখা অথবা বাংলাদেশের আলাদা ডেস্কের কথা বলে লোভ দেখানো  – এসবই আসলে লিপ সার্ভিস বা কথার কথা। সিংহ বুড়া হয়ে গেলে তারা আর কী করে?  তবু তাদেরকে এসব চাপাবাজি করে যেতেই হয়। তাই এসব করেই চীনের বিরুদ্ধে “ভারত নাকি পরাশক্তি” একথা বলেই পরিচয় করিয়ে দিতে হয় আমেরিকাকে।

    খামোখা কূটনৈতিক শোডাউনঃ
    গত মাসের শেষ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এদিকে আরেক চাপাবাজি চলবে, একই কারণে। মানে ফরেন পলিসির আর্টিকেলের সাথে ঢাকায় ভারতের কূটনৈতিক নড়াচড়া সম্পর্কিত ঘটনা ততপরতার কথা বলছি। যেমন, দোরাইস্বামীর প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ, বিদেশ সচিব হর্ষবর্ধনের ৭ ডিসেম্বরে ঢাকা সফর  –  আর এসবই আগামী ১৬ ডিসেম্বর ভারতের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর উপলক্ষে।

    “বাংলাদেশ ভারতের সৃষ্টি, ভারতেরই ফসল, কাজেই বাংলাদেশ ভারতের প্রভাব বলয়ের বাইরে যায় কী করে” – ভারত যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো কথা উচ্চারণ করে তখন অলক্ষ্যে এ খামোখা বয়ানটাই তার কূটনীতিকরা তাই মনে মনে আওড়াতে থাকেন। অতএব চীন-ভারতের কোনো সঙ্ঘাতে বাংলাদেশ তো ভারতেরই, ভারতের প্রভাব বলয়ের জবাইযোগ্য এক নধর খাসি যেন!  কাজেই বাংলাদেশ আর যাবে কোথায়! এই দুই সপ্তাহ ধরে ভারতীয় স্বার্থগুলো এসব বয়ানেরই জপ করতে থাকবে।

    কিন্তু তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল, মানে কোন রিটার্ন কী আসবে? না, আসবে না। বরং ফলাফল একদম হবে শূন্য। এমনকি বর্তমান  হাসিনার বাংলাদেশও ভারতের পক্ষে যাবে না, মুভ করার সে সুযোগটুকুও নেই। বাস্তবতা এমনই। কিন্তু তাই বলে সে বাস্তবতার কথা আবার সরকারের দিক থেকে ভারতের কাছে মুখে উচ্চারণও করা হবে না। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ঢাকা সফর উপলক্ষে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিডিয়াকে বলছেন, “আমি ঢাকায় থাকলে তার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ হতে পারে”। কাজেই কী পরিমাণ প্রাণহীনভাবে এ’দুই সপ্তাহ কাটবে, এখান থেকে অনুমেয়; অর্থাৎ কেবল মুখেই বলা হবে না যে, বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে নেই। আর কার্যত এটা ভারতেরও পরিস্কার করেই অজানা নয়। তা হলে ভারত চীনের কাছে তার ‘হবু ও কথিত’ শিলিগুড়ি করিডোর অথবা সাত রাজ্য হারানোর কথা যে লেখক আনু তুলেছেন, তার কী হবে?

    আমেরিকান থিংকট্যাংকের দিগগজেরা আর কথিত ‘পরাশক্তি’ ভারত কী করে নিজেদের রক্ষা করবে, তা তো তাদেরই বিষয়। সাধারণভাবে বললে, এটা তাদের জবরদস্তিতে তোলা ইস্যুতে  খানিক এক ভীষণ উত্তেজনা মাত্র। আর বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন কোন মানুষ এর ভেতরে নিজেকে সংশ্লিষ্ট করে না। তাই সাধারণ মানুষের কাছে এটা মৃত এক ভারতীয় উদ্বেগ যাকে চাবুক মেরে জাগানোর চেষ্টা দেখছি আমরা। এমনকি যার শেখ হাসিনা সরকারের কাছেও কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। সত্য নয়।

    তবুও ঢাকায় দুই সপ্তাহ ধরে নয়াদিল্লি-ঢাকা কত কাছাকাছি, কত নিকটাত্মীয় ও বাংলাদেশ ভারতের প্রভাবাধীন তা প্রদর্শনের এ ধরনের কিছু ইমেজ ফাঁপা ডেকোরেটেড উত্তেজনা তৈরি করা হতে দেখব অবশ্যই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  গত  ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে যাবে না”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]