Tag: America

  • চীন-ইন্ডিয়া সম্পর্ক কী ঘনিষ্টতা দিকে; এর কী কোন ভবিষ্যত আছে?

    চীন-ইন্ডিয়া সম্পর্ক কী ঘনিষ্টতা দিকে? এর কী কোন ভবিষ্যত আছে?
    গৌতম দাস
    ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫   রাত ২৩ঃ ৪৩
    https://wp.me/p1sCvy-6wP

     

    A united front at Beijing’s massive military parade as Xi, Putin and Kim meet for first time

     

    শেষের কথাটা আগেই যদি বলি তবে এই শিরোনাম-প্রশ্নের ছোট জবাব হল, না। সম্পর্ককে গভীর ঘনিষ্ঠতা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া মোদির ইন্ডিয়ার পক্ষে সম্ভব হবে না। এত পিছনের মূল কারণ, ইন্ডিয়ার নিজ দোদুল্যমানতা। আসলে বলতে গেলে ইন্ডিয়া এমনই। যেমন তারা বলে বা মনে করে থাকে (সেই ২০১৩ সাল থেকে) যে চীন আর আমেরিকার মাঝে দোল খেয়ে কখনও চীন আর কখনও আমেরিকা এভাবে ভাব ধরে এদের দুদিক থেকেই মাখন খেয়ে যাওয়াই হবে ইন্ডিয়ার কৌশলগত নীতি। এটা তো তাদের ২০১৩ সালের সিদ্ধান্ত, যখন ইন্ডিয়া চীনে অনুষ্ঠিত প্রথম বেল্ট-রোড সম্মেলনে দাওয়াত পেয়েছিল, কিন্তু অংশ না নিয়ে নিজেদের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল; তখন থেকেই ইন্ডিয়া এরকমই দায়দায়িত্বহীন সুবিধা চোষা! ঠিক এ কারণেই এখনকার ট্রাম্পের শুল্ক-বোঝায় পর্যুদস্ত ও মার খাওয়া ইন্ডিয়া এতকিছুতে নাস্তানাবুদ হয়েও আবার ইতোমধ্যেই ওই ট্রাম্পের কোলেই ফিরে গিয়ে আবার আশ্রয় খোঁজা শুরু করেছে; আর তাতে বলাই বাহুল্য, এতে এই ইন্ডিয়া এখন চীনের আস্থা অর্জন পর্যন্তই উঠতে পারছে না, পারবে না।

    এবার আস্তে আস্তে ঘটনাবলির ভিতরে প্রবেশ করা যাক। এটা একদম ঠিক যে এখন চীন- ইন্ডিয়া সম্পর্ক-ঘনিষ্ঠতা নিয়ে মিডিয়ায় আলোচনা তুঙ্গে। এর একটা অন্যতম কারণ হল, ঠিক এখনই এবারের বার্ষিক SCO এসসিও (সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন) সম্মেলনের সময়কাল এটা। ফলে  ট্রাম্পের আমেরিকার  সদ্য ছুড়ে ফেলে দেওয়া মোদির ইন্ডিয়াকে, একেও চীন এবারের এসসিও-তে আন্তরিকভাবেই দাওয়াত দিয়ে কাছে ডেকে নিয়েছিল।

    পাশাপাশি সেই সঙ্গে এই ট্রাম্পও প্রায় সব দেশের ওপর কঠোর শুল্কনীতি প্রয়োগ করেছেন। শুরুতে তা চীনের ওপর ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি চীনকে শুল্ক-আরোপ করে পর্যুদস্ত করে ফেলার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু তাতে বাস্তবে ফলাফল উল্টা আসায় আর সঙ্গে আমেরিকার নিজস্ব সরকারি বন্ড বিক্রির ক্রেতা সংকট বা বাজারে ক্রেতা উধাও হওয়া শুরু হতেই ট্রাম্পকে পিছে হটতে হয়। তিনি বাধ্য হয়ে গত জুন মাসেই অনেক ইস্যুতে সরাসরি চীনের সঙ্গে এক ধরনের আপস করে ফেলেন।

    অনুমান করা যায়, এ ঘটনা থেকেই চীন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবারের এসসিও সম্মেলনটি বিরাট জাঁকজমকপূর্ণ এক সামরিক শো-আপ করে করবেন!


    SCO তে এবার সামরিক শো-আপ কেনঃ
    অনেকেই খেয়াল করেছেন যে এই সামরিক শো-আপে সম্ভবত ২৬ দেশের প্রধান ব্যক্তিত্বদের (রাষ্ট্রপ্রধান নয়ত প্রধান নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী অথবা ন্যূনপক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের) একটি দলকে সঙ্গে নিয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি হেঁটে যাচ্ছেন, যার দুপাশে হাঁটছেন একদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন আর অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম-জং-উন!

    এসবের মধ্যে আরেক বৈশিষ্ট্য ছিল প্রেসিডেন্ট শির ‘পোশাক’। তিনি পরেছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির বিশেষ ড্রেস, যেটা মাও – কেই সবসময় পরতে দেখা যেত। প্রেসিডেন্ট শি একালে নিয়মিত নরমাল পোশাক পরলেও সেদিন ছিলেন একেবারেই পার্টি ড্রেস-কোডে সজ্জিত! এসব থেকেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল, বিশেষ ‘অর্থ ও প্রতীকের’ মাধ্যমে এবারের এসসিও সম্মেলন পালন করার পরিকল্পনা নিয়েছিল চীন।

    গত বিশ বছর চীন সামরিক দিক থেকে কী কী খাতে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করে নিজেকে সজ্জিত করে চলছিল তা জনসমক্ষে আনেনি; এদিনটা ছিল আসলে সেটারই প্রদর্শনী ও মহড়া। যে মহড়ায় আবার বেশির ভাগ অস্ত্র-সরঞ্জামই হলো নিউক্লিয়ার এনার্জি-সংশ্লিষ্ট!

    এখানে একটা কথা আশা করি অতি-উক্তি হবে না যে, এর ফলে এসসিও পারমাণবিক অস্ত্রের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছিল ওদিনে। কিন্তু এমন কেন? বিশেষ করে অনেকেরই অজানা হয়ত যে চীন-চীন সাগর/দুই কোরিয়ার উপকূল এলাকাকে অ-পারমাণবিক জোন হিসাবে ঘোষণা করা যায় কিনা এরই একক প্রস্তাবক হল চীন নিজেই!

    তাহলে এখানে এমন চীনা আচরণের ব্যাখ্যা কীঃ
    মনে রাখতে হবে, কোনো রাষ্ট্রের অন্য রাষ্ট্রের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ (যেখানে গ্লোবাল অর্থনীতির নয়া একালের অভিমুখ হল শুল্ক কমানো, ৮ শতাংশের মধ্যে রাখা) মানেই এটা হল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য যেটা আসলে গ্লোবাল বাণিজ্যের বিকাশ মেন-স্ট্রিম অভিমুখ সেটাকে পাথর চাপা দিয়ে গ্লোবাল বাণিজ্যের আমদানি-রপ্তানির পিঠে সরাসরি ছুরিকাঘাত! যেটা অর্থনৈতিক সংরক্ষণবাদিতা বা অর্থনৈতিক উগ্র-জাতীয়বাদিতা! সর্বোপরি এটা আত্মঘাতী! গত ১৯৮০ সাল থেকে পথচলা শুরু এই বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থায় এখন আর পিছনের দিকে ফেরা বা যেটা অর্থনৈতিক উগ্র-জাতীয়বাদিতা সেদিকে গন্তব্য ঠাউরানোর আর সুযোগ নেই। এতে সবার আগে নিজ রাষ্ট্রের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবচেয়ে বেশি!

    ট্রাম্পের বাড়তি শুল্কনীতির খাঁড়া – প্রত্যক্ষ অর্থ এটাই! যদিও ট্রাম্প ভাবছেন, আমেরিকাকে ছাড়িয়ে শীর্ষ উদ্বৃত্ত অর্থনীতির দেশ হিসাবে উঠে আসা চীনের অগ্রগতি এভাবেই তিনি ঠেকায় দিতে পারবেন! অথচ তিনি খেয়াল করছেন না, আমেরিকার পিছিয়ে পড়া বা একঘরে হয়ে যাওয়ার পথেই হাঁটছেন তিনি!

    আর এ থেকে চীনের অনুমিত ভয় হল, ট্রাম্প হেরে গিয়ে শেষে পাগলামি করে না  যুদ্ধ লাগিয়ে দেন; অথবা ব্যর্থতা ঢাকার অন্য কোন ব্যর্থ চেষ্টা!

    ফলে আমার অনুমান পাগলা ট্রাম্প যেন সেদিকে যেতে প্ররোচিত না হয়ে যান, তাই আগেই চীন নিজ সামরিক প্রস্তুতির প্রদর্শন করে রাখলেন। বিশেষ করে চীন যেন বোঝাতে চাইল, সামরিক দিক দিয়ে ট্রাম্প ও তার সহচররা পরিচালিত হতে যেন উৎসাহী না হয়ে যায়। আর সেটারই একটা কসরত – এক ইনডাইরেক্ট ফ্রি কিক – যেন মেরে রাখল চীন! যেমন প্রেসিডেন্ট শি নিজের দুপাশে রাশিয়া আর উত্তর কোরিয়া নিয়ে দলবদ্ধ হাঁটার প্রতীকী অর্থ আমার কাছে এমনই মনে হয়েছে। যারা দুদেশ মূলত পারমাণবিক দিক থেকে খুবই সামরিক সজ্জিত!

    এক কথায় এর প্রতীকী সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হল, পাগলা ট্রাম্পকে ডিসকারেজ (নিরুৎসাহিতার প্রভাব) করে ফেলা!

    এবার এই আলোচনার দ্বিতীয় অংশঃ
    অথচ চীন সেই সম্মেলনে ভারতকেও আদর করে ডেকেছিল আর তাতে গলে গিয়ে দীর্ঘ সাত বছর পরে এই ওছিলায় খোদ মোদি এবার চীন সফরে গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট শির ওই দলবদ্ধভাবে প্রতীকী হাঁটার মিছিলে শির আশপাশে মোদির স্থান হয়নি।

    বরং বিপরীত পর্দার কথা আমরা এখন জেনে গেছি। আমরা দেখেছিলাম মোদির বাণিজ্যমন্ত্রী পীযুষ গোয়েলকে! কী করেছেন তিনি?

    নভেম্বরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি, ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী

    তিনি আমাদের জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সঙ্গেই ইন্ডিয়ার শুল্ক আলাপ নাকি এখনো চলছে। আর তিনি আশা করছেন, মোদির ইন্ডিয়া আবার সেই ট্রাম্পের কোলেই মুখ গোঁজার পরিকল্পনা করছে। আর তাতে তিনি দাবি করেছেন, নভেম্বরের মধ্যেই আমেরিকার সঙ্গেই আবার একটা রফায় পৌঁছাতে পারবেন!

    এই হলো ভারতের মোদি! তিনি ট্রাম্পের কোলে উঠে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে চীনের কাছে সুবিধা চাইবেন, আবার পরক্ষণেই চীনের কোলে উঠে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে ট্রাম্পের কাছে সুবিধা ভিক্ষা করবেন। এভাবেই তিনি এখনো চলতে চান, এটাই আসল ইন্ডিয়া! গত ২ সেপ্টেম্বর ভারতের ‘ফরচুন ইন্ডিয়া’ পত্রিকার রিপোর্টের শিরোনাম পীযুষ গোয়েল আশা করছেন, আগামী দুমাস নভেম্বরের মধ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে একটা রফাতে নয়া শুল্ক-চুক্তিতে পৌঁছানো যাবে!

    কিন্তু বাস্তবতা কি তাই হবে? মনে হচ্ছে না। মূল কারণ এটা ২০১৩ সাল নয়, ২০২৫ সাল! চীন-আমেরিকা দুদিক থেকেই সেকালের মতো মাখন খেয়ে ভারত উপরে উঠে যাবে – সেই তত্ত্ব, এখন আর এত সহজে খাটবে না। এটারই প্রথম প্রতিফলন হল,

    মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রীর ‘ভারত দুই মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ক্ষমা চাইবে’

    আর দ্বিতীয়তঃ
    প্রেসিডেন্ট শি দুপাশে পুতিন আর কিমকে নিয়ে হাঁটছেন অথচ আশপাশে মোদির কোনো ছায়াও দেখা যাচ্ছে না- এই প্রতীকী দৃশ্যে!

     

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ   ১১  সেপ্টেম্বর ২০২৫    রাত ১১ঃ ৫৪

    [এই লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সানে ছাপা হয়েছিল দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় আমারই লেখা এক কলাম হিসাবে, গত ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫।  আজ এখানে সে লেখাটারই  আরেক বর্ধিত এক নয়া এডিটেড ভার্সান এখানে আমার নিজ সাইটে ছাপা হল। বলাই বাহুল্য এখানে শিরোনামটাই শুধু নতুন নয় বরং এমন অনেক প্রসঙ্গই নয়া এখানে যোগ করা হয়েছে যেটা পত্রিকার ভার্সানে ছিল না। আসলে পত্রিকার কলাম ভার্সান মানে যেটা যুগান্তরের এডিটরিয়াল পলিসি সঠিক মনে করে সেই ভার্সান; এভাবে দেখাটাই সঠিক হবে। আর তুলনায় এটা আমার নিজ পরিবর্ধিত-এডিটেড ভার্সান মনে করলেই সঠিক হবে বলে আমার বিশ্বাস! ]

  • সংক্ষেপে কিছু খাড়া কথা

    সংক্ষেপে কিছু খাড়া কথা
    গৌতম দাস
    ০৭ আগষ্ট ২০২৫   দুপুর ১ঃ ৪৬
    https://wp.me/p1sCvy-6v7

     

    অধ্যাপক ইউনূসের সাথে তারেক রহমানের বৈঠক হয় লন্ডনে – ছবি বিবিসি থেকে নেয়া

     

    ইউনুস সাব  ৫ আগষ্ট বর্ষপুর্তি পালন করেছেন, বৃষ্টিতে ভিজে অনুষ্ঠান করে। ঐরাতেই টিভিতে এক ভাষণও দিয়েছেন। যেখানে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রমজানের আগেই নির্বাচন হবে ঘোষণা করেছেন।
    এগুলো হল বাইরে দেখতে পাওয়া কথা।  আর ভিতরে?

    এটা পরিস্কার যে একাজগুলো করতে তিনি বিএনপির তারেককে সবচেয়ে বেশি আদর করেছেন কোলে নিয়েছেন। কেন? কারণ এভাবেই তিনি নিজ একক রচিত ‘জুলাই সনদ’ ঘোষণা এবং সাথে ‘জুলাই ঘোষণা’ করতে গিয়ে তিনি এটাকেই উপায় হিসাবে ব্যবহার করেছেন। মানে এই  কথিত – সনদ বা ঘোষণা – কোনটাই তার পক্ষে এটা ছাড়া সম্ভব হচ্ছিল না। মুল সমস্যাটা হল, মূল তিন-চারটা দলকেও তিনি ডেকে নিলেই এদের সব আলাদা আলাদা অবস্থান-গুলো বাইরে চলে আসত; ফলে ভাব নিয়েছেন এটা তিনি নিজের ক্ষমতায় করলেন। কিন্তু আসলে?
    আসলে তিনি (১) তারেককে দুবছরের সময় ঘুষ দিয়েছেন। মানে ‘জুলাই ঘোষণা’ বলে যা তিনি -কথিত সংস্কার- রচিত করেছেন তা এখনই মানে কোন নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই আইনী ভিত্তি দিতে হবেই না। যার সোজা মানে আগে আইনি ভিত্তি পরে সেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান, এমনটা করতে হবে না।  অর্থাৎ এগুলোর কোন কনষ্টিটিউশনাল ভিত্তি এখনই দিতে হবে না। আগে নির্বাচন হয়ে যাবে হাওয়ার উপর দাঁড়িয়ে  মানে কোন আইনি ভিত্তি ছাড়া আর পরে যেই ক্ষমতায় আসবে সে পরে এটা সংসদে পাশ করে নিবে। এর আবার সোজা মানে হল, নয়া ক্ষমতাসীন দল সেটা না করলে বা ইচ্ছা-মনমত বদল করে নিয়ে করলেও চলবে! এটাকেই আমি দুবছর তারেককে ঘুষ দেয়া বলছি।

    তবে পাঠকেরা সাবধান!   
    উপরের উল্লেখ করা ইউনুসের বক্তৃতায়, দুইটা জিনিষ অস্পষ্ট বা ফাঁক রাখা আছে। আপনারা ধরে নিয়েছেন সেটা আপনারা যা বুঝেছেন তাই-ই লেখা আছে। কিন্তু না! যেমন ইউনুসের টিভিতে দেয়া স্পিচ যেটা অনেক পত্রিকাই টেক্সট করে ছাপিয়েছে সেখানে নির্বাচন হবে একথা বলা হয়েছে সব জায়গায় কিন্তু কোন নির্বাচন? প্রেসিডেন্সিয়াল শাসনের প্রেসিডেন্ট (যেমন জিয়ার প্রেসিডেন্ট হওয়ার নির্বাচন, যেটা হয়েছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ১৯৭৮, ৩ জুন ১৯৭৮ সালে) নির্বাচন নাকি জাতীয় সংসদ এর নির্বাচন সেটা স্পষ্ট করা নাই। জিয়ার আমলে আগে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ১৯৭৮ হয়েছিল  আর পরে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৭৯, বাংলাদেশে ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত হয়।
    আর, দ্বিতীয় অস্পষ্ট বা ফাঁক রাখা ইস্যুটা হল, তাহলে নির্বাচন হচ্ছে ইউনুস সরকারের অধীনে! তাই কী? অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আদালতের দ্বারা জীবিত (ও অস্পষ্ট) হয়ে  থাকলেও এর কথা আর কেউ এখন তুলছে না। এই এখন মানে? এখন মানে হল, ৫ আগষ্ট্রের ইউনুসের ভাষনের পরে।

    ইতোমধ্যে আগেই আমি বলেছিল্লাম ইউনুস (নির্বাহী ক্ষমতার প্রেসিডেন্ট, প্রেসিডেন্ট জিয়ার মত) প্রেসিডেন্ট হতে চান! এমনকি সাথে এনসিপির কেউ কেউ তার সাথে মন্ত্রী থাকতে চান সেকথাও উল্লেখ করেছিলেন!
    এখন যেটা বিস্ময়কর তা হল, এনসিপি ইউনুসের ৫ আগষ্ট্রের টিভি স্পিচকে স্বাগত জানিয়েছে, বিচ্ছিন্নভাবে। তবে গতকাল ৬ আগষ্ট সেক্রেটারি আখতার হোসেন যে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তাতেও এমন কথা নাই যে আগে কনষ্টিটিউশনাল  আইনি ভিত্তি পরে সেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান – এভাবে পরিস্কার করে কিছু বলা হয় নাই। তবে ঐক্যমত্য কমিশনে যা যা নিয়ে ঐক্যমত হয়েছে তা বাস্তবায়ন এর নিশ্চয়তা কোথায় ও কীভাবে হবে এনিয়ে সাধারণ প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আবার তাদের দল নয়া কনষ্টিটিউশন চাওয়ার দল সেটাই কেবল উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ না কনষ্টিটিউশন না হলে অথবা সংস্কার শেষ হওয়া ও এর আইনি ভিত্তি না থাকলে এনসিপি নির্বাচনে যাবে এমন সোজাসাপ্টা কিছুই সেখানে বলা হয় নাই।   মানে এর এমন মানে করা সম্ভব যে আরেকবার বলিলেই খাইব!  শেষ পর্যন্ত সামনে যাই ঘটুক (আগাম নিশ্চয়তা কিছু পেলে!) আমরা কথিত ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচনে অংশ নিবই!!! – এমন অর্থ বের করার সুযোগ রেখে দেয়া আছে – জেনে বা না জেনে!
    আর জামায়াতঃ জামায়াতই প্রথম থেকে নির্বাচনের সময়ের তত্বাবধায়ক সরকারের আইনি ভিত্তি না থাকলে “মানবেন না” তা অনেক স্পষ্ট করে বলেছিল।  আর এখন মানে ইউনুসের বক্তৃতার পরে অতটা জোর দিয়ে বলছেন না; যদিও বলেছেন এমনকি নরম করে হলেও না হলে আন্দোলনে যাবেন তা উল্লেখ করেছেন।

    “পিআর পদ্ধতি ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলেও জানান তাহের।…..
    সংস্কার, গণহত্যার বিচার ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশার কথা জানান আবদুল্লাহ মো. তাহের। তিনি বলেন,
    দাবি না মেনে নির্বাচন দিলে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে জামায়াত।”

    আর হাত পাখা ইসলামি আন্দোলন তাদের প্রতিক্রিয়া পাওয়া একটা ভিডিও ক্লিপ পাওয়া যাচ্ছে। তাতে দেখা যায় তাদের ডাকে নাই, মানে ইউনুস একা একাই সব ঘোষণা করেছেন এনিয়ে তাদের আপত্তি আছে ইত্যাদি।

    তাহলে যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, ইউনুস সাব বুঝেছিলেন যে ঐক্যমত্য কমিশনে কিছুই ঐক্যমত হবেই না। এর চেয়ে কাউকে দুবছরের ঘুষ দিয়ে কাউকে অন্য কিছু বা এককথায় পক্ষগুলোর সাথে আলাদা আলাদা একটা ডিল করে এগিয়ে যেতে হবে। এবং এভাবেই তিনি এপর্যস্নত আগষ্ট পার হয়ে চলেছেন।

    তাহলে কী তিনি সব সমাধান করে ফেললেন?
    এমন বাক্যে জটিলতা টা হল, কোন নির্বাচন হচ্ছে তাহলে ইউনুসকে প্রেসিডেন্ট না তারেককে প্রধানমন্ত্রী? নাকি এর মানে ইউনুস প্রেসিডেন্ট আর তারেক ছোটভাই এমন নয়ত????? এর পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায় না। যদিও তারেকের সাথে পশ্চিমা দেশের কূটনীতিকেরা লন্ডন উড়ে গিয়ে দেখা করছেন – এমন খবরে বিএনপি সমর্থকেরা উতফুল্ল হয়ে উঠেছে! এদিকটা এখনই একেবারেই পরিস্কার নয়। আরো সময় লাগবে!

    কিন্তু একটা গভীরতম কাঁটা মানে একটা পক্ষ এখনও উপরের আলোচনার বাইরেঃ
    সেটা হল আর্মি!
    যতদুর জানা যায় ওয়াকারের মূল সমস্যা বা ব্যক্তিগত স্বার্থ হল, ১৪০০+ মৃত্যুর মুল হুকুমদাতা হাসিনার প্রথম বাস্তবায়ক (বা সেনাদেরকে প্রধান কমান্ড রেস্পনসিবিলিটির দায়) হিসাবে বিচার; যেটা আবার জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের পাঠানো সংশ্লিষ্টদের তালিকা ও বিচারের অনুরোধ এবং বিচার শেষে রিপোর্ট পাঠানোর আদেশ / অনুরোধ / পরামর্শ! এখান থেকে মুক্ত হওয়া খুবই কঠিন। যদিও কথিত ধারণা এখন চলছে যে ইউনুসের আকাঙ্খার নির্বাচন টা সমাপ্ত করে দিতে পারলে ওয়াকারকে স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে তিনি সম্ভবত আমেরিকায় তাঁর মেয়ের কাছে চলে যেতে দিবেন!  কিন্তু নিশ্চয়তা?  সেটা এক আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে একেবারেই নাই! কারণ, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক অনেক ধরনের ফ্যাক্টর এখানে জড়িত!
    এদিকে তাঁর সঙ্গিসাথীরা মানে ৪৫০ জনের বাকীরা? বিশেষ করে এই গ্রুপের লিডার সিনিয়ার আর্মিরা? এদের ভাগ্য কী হবে সেক্ষেত্রে?  এনিয়ে ইউনুসের কোন ভাবনা / পরিকল্পনা আছে জানা যায় না। সম্ভবত তা নাই!   তাহলে তাঁরা নিউট্রাল বা স্থির হবে কী প্রকারে???? যদিও মুরোদের কথা এদিক থেকে ভাবলে যতটুকু জানা যায় এরা বিদ্রোহ করা বা একটা ক্যাওয়াজ গন্ডগোল লাগাতে পারবে হয়ত কিন্তু সফলতার কোন সম্ভাবনা নাই! এদের অনেকে আবার এখনও ইন্ডিয়ার সাথে সম্পর্কিত; সেকারণে অনেকে মনে করে ইউনুসের পরিকল্পনায় ইন্ডিয়ার ভাগে কিছুই যদি না আসে তবে এসব কথিত বিদ্রোহিরা নিজেদের শক্তিশালী অনুভব করতে পারে। কিন্তু আসল কথাটা যদিও  শক্তিশালী অনুভব আর বাস্তবে শক্তিশালী হওয়া এদুটো এক কথা না!  বরং আকাশ-পাতালের ফারাক!
    যাহোক, সারকথাটা হল, এটা একটা ফ্যাক্টর!
    এখন এই সুত্রে আরেক অংশ মানে ওয়াকার-বিরোধী, এরাও আরো বড় ফ্যাক্টর। কিন্তু আমার জানা মতে এদের অবস্থান মনোচাব কনসার্ণ বা বক্তব্য নিয়ে ইউনুস আমল করেছেন বা করছেন তা আমার জানা নাই। বরং তিনি ধরেই নিয়েছেন যেন ওরা তো আছেই তাঁকে সমর্থন দিয়ে যাবে মানে তিনি যা করবেন তাতেই!!!!!
    কিন্তু এই অনুমান একেবারেই ভিত্তিহীন!  সারকথায় বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায়, আমেরিকা তাও আবার সেয়ান পাগলা ট্রাম্পের আমেরিকা বাংলাদেশকে যেভাবে দেখতে ছাইবে সাজাতে চাইবে  সেদিন আর নাই। আমেরিকা আমাদেরকে ইন্ডিয়ার হাতে তুলে দিয়েছিল যাতে ইন্ডিয়া আমাদেরকে নিয়ে যা খুশি করতে পারে। সেদিনও নাই, আমেরিকার সে মুরোদও নাই। সর্বোপরি আমেরিকার সেই আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে অপমান আমরা ভুলবো না শুধু তাই নয় বরং সেই সুত্রে তৈরি হওয়া ইন্ডিয়ান দানব হাসিনার ফ্যাসিজমের উত্থান ঘটেছিল। আর সেই ইন্ডিয়াসহ সেই দানবকে আমরা উপড়ে ফেলে দিয়েছি। ফলে আবার সেই আমেরিকার কোলে এবার সরাসরি বাংলাদেশকে তুলে দিবার চেষ্টা হলে ইউনুসের দশা-পরিণতি হবে হাসিনার চেয়েও খারাপ! তা বলাই বাহুল্য! একথাটা ইউনুস সাবকে মনে রাখতে হবে!!!! যদিও ইদানিং তার মুভমেন্টে এর ঘাটতি দেখছি আমরা!

    এবার হেড লাইনে সারকথাঃ
    ১। ফেব্রুয়ারিতে কী নির্বাচন হবে? আমরা তো এখনও নিশ্চিত জানি না সেটা কিসের নির্বাচন –  নির্বাহি প্রেসিডেন্টের নাকি জাতীয় সংসদের? সেটা এখনও কেউ জানে না। ফলে অনিশ্চিত!
    ২। আমেরিকা রাষ্ট্রদুত ট্রেসি লন্ডনে তারেককে বুঝাতে গিয়েছিল ইউনুসের হয়ে, সেটা এই বলে যে তারেক যেন ইউনুস সাবের সাথে “ক্ষমতার ছোট ভাই” হয়ে থাকে; কিন্তু সেটা কী তারেক রাজি হবে, পালন করতে? তাই এটাও অনিশ্চিত!
    ৩।  ইউনুস সাবের বাংলাদেশকে একচেটিয়া আমেরিকার কাছে বন্ধক রাখার চেষ্টা কী তিনি সংবরণ করবেন? থামবেন? এটাও অনিশ্চিত! যদিও আরও একটু বাড়লে তিনি উতখাত হওয়ার রিস্ক নিবেন তা বলা যায়!
    ৪। উনি নির্বাহি প্রেসিডেন্ট হতে হলে আইনি ভিত্তি কোথায় পাবেন? যেখানে এখনও কথিত ফেব্রুয়ারী নির্বাচনেরই কোন আইনি ভিত্তি নাই এবং তা অনিশ্চিত?
    ৫। এতদিন পর্যন্ত ইউনুস সাব ‘আর্মি ফ্যাক্টরকে’  উপেক্ষা বা আন্ডার-এস্টিমেট করে চলছেন বলে আমার বুঝাবুঝি! অথচ একচেটিয়াভাবে না আমেরিকা, না চীন এর কোলে উঠানো যাবে না। যারাই বাংলাদেশকে উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টাকরতে যাবেন এমন চেষ্টা কে “আর্মি ফ্যাক্টর” প্রতিহত করবেই নিজ স্বার্থে – এটা ইউনুস সাবের বুঝতে পারা উচিত! আর এবিষয়ে সেটা যদি ইন্ডিয়া হয় তো এনিয়ে আর্মির অবস্থান হাসিনাকে উপড়ে ফেলা দেখে যে কারো আগেই বুঝে যাওয়া উচিত! এসব কারণে, যেকোন সময় ইউনুস সাবের ভুলে বা সীমা ছাড়ালে তিনি নিজে ক্ষমতাকে অনিশ্চিত  করে ফেলতে পারেন!

    তাই,  কথিত ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হচ্ছে কিনা-সহ আমাদের জন্য সামনের দিনগুলো সবই অনিশ্চিত!

     

     

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ   ০৭ আগষ্ট, ২০২৫    রাত ০৮ঃ৪৮
     

     

     

     

     

  • সম্প্রতি বদরুদ্দিন উমর সাহেব ছাত্রদের আন্দোলন প্রসঙ্গে

    সম্প্রতি বদরুদ্দিন উমর সাহেব ছাত্রদের আন্দোলন প্রসঙ্গে
    গৌতম দাস
    ২৫ এপ্রিল ২০২৫
    https://wp.me/p1sCvy-6qi

     

     

     

     

    [বদরুদ্দিন উমর আমাদের প্রবীন রাজনীতিবিদের মধ্যে অন্যতম যাকে আলাদা করে চেনা যায়।  এখন ৯৪ বছরের উর্ধে তাঁর বয়স। ৫ আগষ্ট-উত্তর মানে, হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি উত্তরকালের এসময়ে, গত দুদিন আগে ২২ এপ্রিল ২০২৫ তার এক সাক্ষাৎকার ছেপেছে প্রথম আলো। সেখানে পরিচিতি অংশে লিখেছে, …”বদরুদ্দীন উমর লেখক-গবেষক ও বামপন্থী রাজনীতিক। ১৯৬১ সালে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে পিপিই ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন এবং ১৯৬৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন”……”তিনি (উমর সাহেব প্রথম আলোতে) কথা বলেন চলতি আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ, ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়া নতুন দল, অন্তর্বর্তী সরকারের করণীয় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে“। আমি প্রথম আলোর সেই পরিচিতিটাই এখানে তুলে দিলাম। এই পরিচয়টা সম্ভবত উইকিপিডিয়া থেকে নেয়া। সেখানেই উমর সাহেবের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে লেখা রয়েছে যে তিনি “একজন বাংলাদেশি মার্কসবাদী–লেনিনবাদী তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক সক্রিয়তাবাদী, ইতিহাসবিদ, লেখক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) (উমর)-এর নেতা”। আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে তবে উমর সাহেব হলেন ষাটের দশকে প্রথম্ভাগে (১৯৬৪) বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলন মস্কো-পিকিংয়ে ভাগ হয়ে গেলে তিনি পিকিং ধারার অংশে পড়েন। যেটা আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে মো. তোয়াহা গ্রুপের অংশের আর সেটাও তিনি সম্ভবত ত্যাগ করে নিজের ধারা গড়েন ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময়কালের ভিতরেই। পেশা এবং কর্মততপরতা দিক থেকে দেখলে তিনি মূলত একাদেমিক রাজনীতিবিদ। বাংলাদেশে প্রকাশিত ইতিহাস-বিষয়ক বই-পুস্তকের একটা বড় অংশ জুড়ে তাই তাঁরই রচনা।  এখন যাদের বয়েস ২০ বছরের উপরে সেই প্রজন্মের কাছে তাঁর নুন্যতম কিছু পরিচয় করিয়ে দিতে আমার লেখার প্রসঙ্গে প্রবেশের আগে খুবই অল্প কিছু কথা লিখলাম।]

    আমার বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে পড়াশুনা শুরু হয়েছিল ১৯৭৯ সালে তখনকার প্রকাশনা জগতে পাওয়া তার লেখা বই পাঠের মধ্য দিয়ে।  আগেই বলেছি প্রথম আলোতে এই সাক্ষাতকারে তিনি চলতি আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ, ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়া নতুন দল, অন্তর্বর্তী সরকারের করণীয় ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলেছেন।  তার সেসব কথা বলায় আরেক রেলেভেন্সি বা গভীর সংশ্লিষ্টতা দিকটা হল, হাসিনার উন্মাদপ্রায় হয়ে নিজ কথিত বাবার ইতিহাস জোর করে লিখবার একটা গভীর ঝোঁক ছিল যা থেকে তৈরি বিশৃঙ্খলায় আমরা সকলেই অস্বস্তি অনুভব করেছি। যেমন  তা্র একটা হল যেমন, অপ্রয়োজনীয়ভাবে ভাষা আন্দোলনও শেখ মুজিবই করেছেন বলে হাসিনার দাবি ও সেভাবে নয়া ইতিহাস রচনার চেষ্টা। যেটা সেসময়ের ঘটনাবলী নিয়ে প্রত্যক্ষ গবেষক হিসাবে সেই অথরিটিতে উমর সাহেব নিয়মিতভাবে হাসিনার দাবির বিরোধিতা ও নাকচ করে গেছেন সাহসের সঙ্গে!  তাই অনুমান করি হাসিনা উতখাতের পরে এটা তারও একটা অর্জন তো বটেই। অন্তত সেই উতপাত তাঁকে বা আমাদেরকে আর মুখোমুখি হতে হবে না এটাই শান্তি!

    রাজনৈতিক ইতিহাসের বয়ানে পরিভাষাঃ
    প্রত্যেক দেশেই রাজনৈতিক ইতিহাস বিশেষ করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের লিখিত ইতিহাসের বয়ান ভাষ্যে শব্দ বা পরিভাষা [Terminology] তৈরি হয়ে যায় যেটার সহসা বদল হয় না। যদিও লম্বা সময় পরে  নয়া পরিভাষা তৈরি হয়েও যেতে পারে’ বাংলাদেশে হয়েছেও বলে আমার ধারণা। যেমন আমার কথাই যদি বলি উমর সাহেবদের প্রজন্ম আমার চেয়েও কমপক্ষে ৩০ বছরের সিনিয়র; কিন্তু আমি তাদের প্রজন্মের পরিভাষা সম্পর্কে পরিচিত যদিও এই আমি আবার পরবর্তি প্রজন্মের পরিভাষা সম্পর্কেও পরিচিত।  যেমন একটা উদাহরণ যদি দেই উমর সাহেবের প্রজন্ম – ব্যবহার করতে ভালবাসেন – “সামাজিক বিপ্লব” শব্দটা। মানে বিপ্লব মানেই একে সামাজিক [social] বিপ্লব বলে তাঁরা ব্যতিক্রমহীনভাবে লিখে থাকেন। আর একালে আমাদের ধারণা, বিপ্লব বলতে তা তো আসলে এসেনসিয়ালি পলিটিক্যাল রেভেলিউশনই (রাজনৈতিক বিপ্লবই)। যদিও যেকোন রাজনৈতিক বিপ্লবই এরপরে এর প্রভাবে পরে আনুসাঙ্গিক আরো অন্যান্য সামাজিক নানা বিপ্লবও ঘটাবে অবশ্যই!

    এখানে আম পাঠকের জন্যও একটু জানায় রাখি যে বিপ্লব বলতে ঠিক কী বুঝব? আমার বুঝাবুঝিতে বললে প্রথম মনোযোগ জড়ো করতে হবে যেখানে তা হল, ইভোলিউশন [evolution] আর রিভোলিউশন[revolution] সম্পর্কে। প্রথমটা মানে হল, কর্তা মানুষ [subjective] যা করে নাই; মানে, প্রাকৃতিকভাবে বা নেচারালি যা ঘটেছে। এই অর্থে এটা অবজেক্টিভলি [objectively] ঘটা ঘটনাও বলা যেতে পারে। দুনিয়ার সব প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ঘটনাবলী ঘুর্ণঝড়, জলোচ্ছাস, ভুমিকম্প এর মত ঘটনাবলী যেগুলা ওসবই  ইভোলিউশন এর ঘটনা বলা যায়। আর এর বিপরীতে কর্তা মানুষ যেসব পরিবর্তনকে আর প্রাকৃতিক থাকতে দেয় নাই, ঘটনায় মানুষ-কর্তা সক্রিয় হাত ঢুকিয়ে পরিবর্তনে প্রভাব ঘটিয়েছে, নতুন মাত্রা দিয়েছে, জোর খাটিয়ে সুনির্দিষ্ট ডিরেকশনে পাঠিয়েছে, পুরানা অভিজ্ঞতায় জেনে-বুঝে যা বুঝেছে ঘটিয়েছে – এটাই হল রিভোলিউশন। তাই রিভোলিউশন মানেই যেখানে সচেতন কর্তা মানুষ হাজির আছে। আর তিনিই বিপ্লবী তা, বলাই বাহুল্য!

    এরপর আরেকটা পরিভাষাঃ পলিটিক্যাল বা পলিটিক্স মানে কী? ঠিক কী বুঝব?
    মানুষ হিসাবে আমরা অনেক কিছু করি, বিশেষত পরিচয় দেই বা পুর্বনির্ধারিত কারণ বা পরিচয়-বৈশিষ্টগত কারণে তা করে থাকি। যেমন, আমাদের প্রজাতিগত বা রেস [race] পরিচয় য়াছে অথবা পরবর্তি ইতিহাসে মানে মানুষের প্রথম কৃষিকাজ শিখে ফেলার পরের কোন ভুপ্রাকৃতিক-অঞ্চলে স্থির হয়ে বসবাস শুরুর পরের হাজার বছরের মধ্যে আমাদের একটা নয়া এথনিক-ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক স্থায়ী পরিচয়-বৈশিষ্ট লাভ করা হয়ে যায়। মজার কথা হল এই পরিচয় বা বৈশিষ্টগুলো মানুষের জন্মের আগেই নির্ধারিত হয়ে থাকে। মানে যেমন আমি মুসলমান বা বাঙালি হব কিনা এটা আমি ঠিক করি নাই, চয়েজ করি নাই, এতে আমার কোনই ভুমিকা নাই, ছিল না। বরং আমি যে ঘরে জন্ম নিয়েছি, যে পিতামাতার ঘরে ও তাদের রক্ত বা ডিএনএ-তে আর তাদের যে এথনিক পরিচয়ের মধ্যের আমার জন্ম – এতে আমার জন্মের পরে আমার রেসিয়াল-এথনিক-ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সব পরিচয় কী দাঁড়াবে তা এসবের মধ্য দিয়ে আমার জন্মের আগেই ঠিক হয়ে গেছে।  সবচেয়ে বড়কথা এতে আমার নিজের কোন সক্রিয় ভুমিকা নাই, ছিল না।
    আর ঠিকএর বিপরীতে পলিটিক্স, পলিটিক্যাল বা রাজনৈতিক পরিচয় হল সেটা যেটা আমি নিজেই এবং সচেতনে জেনে-বুঝে কোথায় যাব বা পৌছাবো তা জেনেই তৈরি করেছি। মানুষের  জন্মের থেকে নির্ধারিত রেসিয়াল বা এথনিক বৈশিষ্টকে যদি বলি গিভেন [ GIVEN বা আগে থেকেই দেয়া আছে] বৈশিষ্ট-পরিচয় তাহলে এর বিপরীতে, পলিটিক্যাল বৈশিষ্ট মানে হল যা মানুষ নিজেই এবং সচেতন [conciousness] ও সক্রিয় [active] ভাবে নিজেই নিজেকে নির্মাণ করে নেয়  – গিভেন যা আছে তা আছে এর বাইরে; কিন্তু এসবের উপর ভরসা না করে।  বা তার প্রভাবের কারণে নয় নিজ সক্রিয়তায় মানুষ যা নির্মাণ করে সেটাই মানুষের পলিটিক্যাল বৈশিষ্ট। আর মানুষের পলিটিক্যাল বৈশিষ্ট মানেই তাই  মানুষের নিজ পলিটিক্যাল বৈশিষ্ট। নিজে নির্মিত।  এবং মানুষের পলিটিক্যাল এক্টিভিটি এটাই পলিটিক্স বা রাজনীতি।  রাজনৈতিক ততপরতা।

    এই ফাঁকে সুযোগ নেই একটু। তাহলে পলিটি [polity] কী?
    এর সোজা অর্থ পলিটিক্যাল কমিউনিটি।মানে? মানে হল, একটা পলিটিক্যাল কমিউনিটি গড়ে নিজেদের পলিটিপ্রকাশ করা করে নিতে পারি আমরা।  অনেকে অবশ্য এই পলিটি শব্দের [polity] বাংলা করে রাজনৈতিকতা।
    সেটা আবার কেমন?
    যেমন,  পলিটিক্স মানে আবার কিন্তু আইডিয়া [idea]। অনেকে এটাকে সিরিয়াস অর্থে “ভাব বা গভীর ভাব” বলে। মানে এটা আবার “ভাব দেখানো” নয় কিন্তু।  আমি এরচেয়ে বরং আরেকটা ভাল বাংলা শব্দ আছে; যা ব্যবহারে অনেকেই সাহস করে না, নিশ্চিত না বলে সে শব্দটা হল “চিন্তা”। ইংরাজিতে আইডিয়া মানে হল চিন্তা। অর্থাৎ ফিলসফি-ক্যালী বা দার্শনিক অর্থের দিক থেকে,  পলিটিক্স মানে হল “চিন্তা“।

    তা হলে এবার পলিটি বা রাজনৈতিক কমিউনিটি গড়া বা হয়ে উঠা বলতে ঠিক কী বুঝব?
    বুঝব যেঃ রাজনীতি বা পলিটিক্স – এই কাজ একা করা যায় না। রাজনৈতিক বৈশিষ্টের অধিকারীরা ( আমাদের সব গিভেন বৈশিষ্ট পাশে ফেলে রেখে) আমরা একা একাজ করতে পারি না। সমাজ বা কমিউনিটিতে চর্চা করে হতে হয়।  এখন সারা সমাজে যখন সচেতন ও সক্রিয় মানুষেরা  ততপরতায়  চর্চায় (সব ‘গিভেন’ বৈশিষ্ট পিছনে ফেলে রেখে) এক পলিটিক্যাল কমিউনিটিতে নিজেদের হাজির করে ফেলতে সক্ষম হয় – এটাই পলিটি কায়েম করা বা হয়ে উঠা।

    কিন্তু এখন এই পলিটি কোন কাজে লাগে? খায় না মাথায় দেয়? এর দরকারটা কি?
    উলটা করে জবাব দিবার সুযোগ নিব। রাষ্ট্র মানে আসলে জনগণের রাষ্ট্র মানেই, রিপাবলিক রাষ্ট্র [কিন্তু এটা কমিউনিস্ট চিন্তা-পরিক্রমার বাইরের ঘটনা]। এই রাষ্ট্রচিন্তার স্ফুরণ – গ্লোবাল ইতিহাসে দেখলে, এটা মানুষের মধ্যে এসেছিল ১৬৫০ সালের দিকে বা এরপরে এবং ইউরোপে (আমেরিকাতেও নয়)। আর এটা নিজেকে নুন্যতম পরিশুদ্ধ, অসংলগ্নতা কাটিয়ে আর সৎ বা ন্যয়সম্মত -উপস্থাপনে হাজির হতে হতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৪৫) পার হয়ে যায়। সে যাই হোক, এমন রিপাবলিক রাষ্ট্র মানেই সেখানে আবার কনষ্টিটিউশন বলে কিছু একটা থাকতেই হবে। এখন  কনষ্টিটিউশন [constitution]  শব্দের রুট শব্দটা হল কনষ্টিটিউট [constitute]। এর বাংলা করতে পারি গঠন– নিজেদেরকে গঠন করা – গঠিত করে নেয়া – এটাই সংগঠিত [organise] করে নেয়া অর্থে।  আর এটাই পলিটি বা পলিটিক্যাল কমিউনিটিতে নিজেদের গঠন বা কনস্টিটিউট করে নেয়া। যার আউটকাম বা ফলাফল হল একটা কনষ্টিটিউশন এর জন্ম দেয়া। এটা এক অর্থে পলিটি বা পলিটিক্যাল কমিউনিটির পরস্পরের সাথে চুক্তি বা বোঝাপড়া (আন্ডারস্টান্ডিং) প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া যেমন এই যে আমরা এই এই জিনিষ মানুষের অধিকার মনে করি এবং আমরা সেটা রক্ষার্থে পরস্পর পরস্পরের পাশে এসে দাড়াবোই; এরকম। তাহলে সারকথায় একটা জনগণের রাষ্ট্র তখন কায়েম হবে ও কাজ করতে পারবে যখন ওর পিছনে একটা পলিটিবা পলিটিক্যাল কমিউনিটি আগেই গড়ে নিয়ে খাড়া হয়ে আছে।  তাই ঐ রাষ্ট্রে আমাদেরকে কনষ্টিটিউট বা গঠন করামানে সেটাই একটা কনষ্টিটিউশন জন্ম দিয়ে ফেলা  –  এভাবে এগুলা সব আসলে একই কথা।

    এখন আসবো প্রাসঙ্গিকতার প্রশ্নঃ
    উপরে লেখার শিরোনাম বলছে এটা বদরুদ্দিন উমরের সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে কোন রচনা; তাহলে সেসব কোথায়? আর এতক্ষণ যা লিখলাম সেসবের সাথে এর সম্পর্ক কী?

    সেদিকে এখন যাব। তবে সবার আগে বদরুদ্দিন উমর সাহেব কে গভীর সম্মান, শ্রদ্ধা ও সালাম জানিয়ে শুরু করতে চাই। তিনি আমাদের মুরুব্বি, আমাদের অগ্রজ – আমার থেকেও যদি বিচার করি তাহলেও তিনি আমার চেয়ে ৩০ বছরের পুর্ব-প্রজন্ম! ফলে তার দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে গিয়ে একালে বসে ভিন্নভাবে দেখে কিছু কথা এখানে তুলবো এই ভরসা যে তিনি আমাকে পাশে এক ভিন্ন একালের দৃষ্টিভঙ্গি বলে জায়গা দিবেন, বেয়াদবি নিবেন না।

    যেমন ধরেন,  উমর সাহেব এই সাক্ষাতকারে প্রথমেই বলছেন, “…… এই যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে, এটা তো কোনো সামাজিক বিপ্লব নয়, যদিও এর মধ্য দিয়ে একটা বড় পরিবর্তন হয়েছে”।
    পাঠক লক্ষ্য করবেন এই সামাজিক বিপ্লব বলা – [মানে রাজনৈতিক বিপ্লব না বলে, এটা তাদের প্রজন্মের কথা বলার রেওয়াজ। তাঁরা ব্যতিক্রমহীনভাবে বিপ্লব মানেই সেটাকে সামাজিক বিপ্লব বলে লিখে থাকেন।] আর একালে আমাদের ধারণা, বিপ্লব বলতে তা তো আসলে এসেনসিয়ালি পলিটিক্যাল রেভেলিউশনই (রাজনৈতিক বিপ্লবই)। যদিও যেকোন রাজনৈতিক বিপ্লবই এরপরে এর প্রভাবে প্রায় সবখানেই এর আনুসাঙ্গিক সামাজিক নানান দিকে বিপ্লবও ঘটাবে, অবশ্যই। আর সেসব থেকে এটা সামাজিক বিপ্লবও ঘটেছে পরে তা বলা যাবে। তবে প্রথমে যেটা ঘটবে বা ঘটে থাকে সেটা রাজনৈতিক বিপ্লব। তবু উনারা ব্যাপারটাকে  সামাজিক বিপ্লব এভারেই বলে থাকেন। আসলে এটা হল তাদের আকাঙ্খায় যেটা কমিউনিস্ট বিপ্লব সেটাই বুঝাতে চান। বা তা না হলেও একটা প্রগতিশীল বিপ্লব এমন কিছু একটা। আর সেই তুলনায় আগষ্ট ২০২৪ সালে হাসিনার উতখাত এটা তার বিপ্লব বলে যে আকাঙ্খার নামকরণ এর  ধারেকাছের কিছু নয় বলেই তারা মনে করে থাকেন। তবে তিনি খুবই পরিস্কার নিজের আকাঙ্খা মত তা না হলেও এটাকে তিনি অর্জন মানেন।  তাই কোন কার্পন্য না করে তিনি বলছেন, .“…..একটা নিষ্ঠুর ফ্যাসিস্ট সরকার অক্টোপাসের মতো দেশকে আঁকড়ে ধরেছিল, সেটা উৎখাত হয়েছে। এই অভ্যুত্থানের এটা একটা খুব বড় অর্জন”।

    আবার এরপরের প্যারায় নিজের আকাঙ্খার দিকে নজর ফিরাচ্ছেন। বলছেন, “…কিন্তু এই সংগ্রামের তো কোনো শ্রেণি–পরিচয় নেই, এটা কোনো শ্রেণি–সংগ্রাম ছিল না। একটা রিগ্রেসিভ (নিপীড়নমূলক) সরকারকে ফেলে দিয়েছে এই অভ্যুত্থান। যারা ফেলে দিয়েছে, তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল না। যারা এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই ছাত্রদের মধ্যে তত্ত্বগত বোঝাপড়া খুব একটা আছে, সেটাও দেখা যাচ্ছে না”।

    আসলে তিনি বলতে চাইছেন, ছাত্রদের মাথায় কমিউনিস্ট চিন্তা নাই। এখানে বলে রাখি, উমর সাহেবদের প্রজন্ম  বিপ্লব মানে তাদের সামাজিক বিপ্লব মানেই কিন্তু তা কমিউনিস্ট বিপ্লব! এভাবে একমাত্র বলে বুঝে থাকেন।  তাও আবার সেটা শ্রেণী সংগ্রামের হতে হবে, রাজনৈতিক (কমিউনিস্ট) তাত্বিক ভিত্তির হতেই হবে। এছাড়াও – এতে  শ্রেণীর পরিচয় থাকতে হবে ইত্যাদি।
    আসলে এগুলো হচ্ছে তাদের মাথায় গেথে বসে থাকা একটা বিপ্লবী ছক বা ইমেজ, যেটা একটা ইমাজিনেশন বা স্বপ্ন-কল্পনার মত। যেটা প্রায় তাঁর বয়সের সমান বয়সী এক কল্পনা মাত্র! এজন্য এটা এক কল্পিত আকাঙ্খা! তবে একটা কথা এখানে নিশ্চিত করেই বলা যায় এটা বিপ্লবের এক আইডিয়েল [ideal] চিন্তা। আইডিয়েল মানে যেটা রিয়েল [real] নয়, রক্তমাংসের বাস্তব মানুষের মত বাস্তব নয়; এই অর্থে। যেটা অবশ্য আইডিয়েল বনাম রিয়েল এর ফারাক জানা  থেকে বুঝতে হবে।

    কিন্তু সেই প্রজন্মের কমিউনিস্ট চিন্তা কেন এমন আইডিয়েল হলঃ
    এর প্রথম কারণ হল যা কিছুই ১৯৪৫ সালের আগের উতপত্তি হওয়া চিন্তা, তা এমনই হবে। হতে বাধ্য।  কারণ, জাতিসংঘের মত গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার বা গ্লোবাল অর্ডার শৃঙ্খলা বলে কিছু  এর আগের কালে জন্মায় নাই। যে কোন যুদ্ধ, আভ্যন্তরীণ ক্ষমতার যুদ্ধ বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় তা যেটাই হোক সে যুদ্ধ কোন আন্তর্জাতিক নিয়ম-আইন মেনে হতে হবে এমন কোন গ্লোবাল অথরিটি (জাতিসংঘের মত) এর আগে ছিল না; জন্মই হয় নাই। এমনকি রেডক্রস ধরনের প্রতিষ্ঠানও ছিল না। যুদ্ধবন্দী বলে কোন ধারণা নাই, যুদ্ধেও পালনীয় আইন বলে কিছু ছিল না। আর সবচেয়ে বড় কথা হিউম্যান রাইট বলেও কোন ধারণা বা প্রতিষ্ঠানই তখন ছিল না। জন্ম হয় নাই।
    এখন মজাটা হচ্ছে, একালে এসেও কমিউনিস্ট চিন্তায় মানবাধিকার বলে কিছু নাই; যেটা [জাতিসংঘের (১৯৪৫) জন্ম,] আর (১৯৪৮ সালে) হিউম্যান রাইট চার্টার এর জন্ম হয়ে গেলেও কমিউনিস্টেরা নির্বিকার; তারা  এটা গ্রহণ-বর্জন কিছুই করবে না। অংশও নিবে না। বেশি জোড়াজুড়ি করাতে ১৯৬৬ সালে এসে জাতিসংঘের ফ্রেমে তারা হিউম্যান রাইটের এক নতুন কমিউনিস্ট সংজ্ঞা দিয়ে বসে যে অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিতসা ও বাসস্থান হল নাকি মানবাধিকার????  অধিকার শব্দটাই যে একটা রাজনৈতিক ধারণা;  আর সেই সাথে রাজনৈতিক ধারণা আর অর্থনৈতিক ধারণা বলে যে দুটা মোটা  ক্যাটাগরি খেয়াল রেখা কথা বলতে বা চিন্তা করতে হবে সেটা কমিউনিস্টেরা এখনও আমল করতে রাজি হয় নাই, নিজেরাও আমল করতে শিখে নাই। মূলকথা বৈষয়িক মানুষ আর রাজনৈতিক মানুষ এদু্টা যে শার্প আলাদা বুঝ তা এরা আমল করতে পারে না এখনও!

    খেয়াল করলে দেখব, অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিতসা ও বাসস্থান এগুলা মানুষের বৈষয়িক চাহিদা। এগুলা বৈষয়িক চাহিদা মাত্র। তাহলে পলিটিক্যাল মানে কী? আর অধিকার মানেই তো সেটা পলিটিক্যাল ধারণা পলিটিক্যাল চাহিদা সেদিকে বুঝতে যেতে হবে। না, এগুলো মার্কস তো নয়ই লেলিনের আমলেও এগুলো আমলযোগ্য ধারনা হতে পারে নাই। এর উপরে দুইটা আরো বড় বড় প্রবলেম বা বাধা আছে। এক. শ্রেণীবোধের ধারণায় বিশেষ করে শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণায়। শ্রেণী বুঝ দিয়ে সমাজ ব্যাখ্যা করেন তত্ব সাজান বড় সমস্যা হবে না হয়ত চলবে কোনভাবে। কিন্তু যখনও কমিউনিস্ট বুঝ থেকে শ্রেণীর একনায়কত্বের রাষ্ট্র বানাতে যাবেন মানে শ্রমিক শ্রেণী ক্ষমতায় গেলে অন্য সকল শ্রেণীকে (আবার যাকে ইচ্ছা তাকে অপর সব শ্রেণী আপনার শত্রু শ্রেণী ঘোষণা করে দিতে পারবেন) গুম-খুন অপহরণ ইত্যাদি সবকিছু করতে পারবেন তখন সব শেষ।  [এখনও কমিউনিস্ট চীন যেমন সিটিং প্রতিরক্ষামন্ত্রী বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে গুম করে রেখে দিয়েছে।] ঠিক যেমন মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে, বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীরা  নেতা মানে ক্ষমতায় থাকা হাসিনা যেমন কাজেই তিনি যাকে রাজাকার (বা জঙ্গী) ট্যাগ দিবেন তাকেই তিনি  গুম-খুন অপহরণ ইত্যাদি সবকিছু করতে পারবেন। এটাই তো ছিল ১৫ বছরের হাসিনার [চেতনা] শ্রেণীর রাষ্ট্র!!!!
    সোজা কথায় বললে, কমিউনিস্টেরা এখনও অধিকার শব্দটা নিয়ে কী করবে না করবে জানে না। ফলে তাদের রাষ্ট্র ধারণায়, সকল শ্রেণীর (নাগরিক) অধিকার বলে কিছু থাকে না। বরং সুনির্দিষ্ট কেবল ক্ষমতাসীন শ্রেণীরই যাখুশি অধিকার থাকে ?
    এর উপর আবার শ্রমিক শ্রেণী বা এর নামে যারা ক্ষমতায় থাকবে তারা কী কী করতে পারবে, কাকে কাকে বুর্জয়া বলতে পারবে তার কোন নির্ণায়ক কী কোথাও লেখা থাকবে? বিচার বিভাগ বলে কিছু থাকবে? কনষ্টিটিউশন বলে কী কিছু থাকবে? কোন কমিউনিস্টই তা জানে না। কেউ বুর্জোয়া কিনা তা কে কীভাবে সাব্যস্ত করবে???
    আসলে সমস্যা হল, খোদ মার্কসের মাথাতেই রিপাবলিক বলে কোন ধারণা ছিল না। তার শ্রেণীবোধের তলে সব ঢাকা পরে গেছিল। এছাড়াও বাস্তবত ১৯১৬ সালের পরে আর কোন তাত্বিক লেখা বা বইই নাই। লেনিন মারা গেছে ১৯২৪ জানুয়ারিতে। ফলে যা কিছু ইস্যু এরপরে এনিয়ে কমিউনিস্টেরা বিভ্রান্ত। সাথে এর আগের যা কিছু (চিন্তাগত) খামতি ছিল তা সহ!

    কমিউনিস্ট চিন্তা আরেক বিশাল গ্যাপ হল, ক্ষমতা ধারণা। মানে রাষ্ট্রক্ষমতা ধারণা।

    কথাগুলো বললাম এজন্য যে  হাসিনা উতখাতে যে পালটা ক্ষমতাকে জন্মাতে ও কাজে সফল হতে হয়েছে- সেটা তো সবাই বুঝতে পারে যেটা সেনাবাহিনীর ভিতর থেকে এসেছে। তবু মানুষ ভাবতে ভালবাসে সে ছাত্র-জনতাই সব করেছে! যেটা উমর সাহেব তার দৃষ্টিকোন থেকে  প্রশ্ন তুলছেন, সেই ছাত্রদের শ্রেণী পরিচয় কী?  বলেছেন, তাদের তো শ্রেণি–পরিচয় নেই,  (অতএব) এটা কোনো শ্রেণি–সংগ্রাম ছিল না।
    উমর সাহেব এর শ্রেণীবোধের চিন্তার বিচারে – “তাদের তো শ্রেণি–পরিচয় নেই” বললে আমরা বুঝতে পারি ১৯৪৫ সালের আগের চিন্তায় বা পরে আর কখনও শান না দেয়া চিন্তায় তিনি ঠিক কী বলছেন তা বুঝা যায়।
    কিন্তু  যখন বলছেন, জুলাই-আগষ্ট ২০২৪ এটা কোনো শ্রেণি–সংগ্রাম ছিল না – এখানে এসে বিনীতভাবে বলতে চাই এটা বোধহয় তার অসতর্ক মন্তব্য!
    কারণ তাহলে “আজ পর্যন্ত দুনিয়ার সব ইতিহাস শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস” – কার্লমার্কসের একথার অর্থ থাকে না। মানে কার্ল মার্কসের জন্ম হওয়ার আগের ইতিহাসও তো শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস – এটা তাহলে কেমনে হবে?? সেই প্রশ্ন উঠবে।

    যা হোক এসব খুচরা তর্ক থাক। সমস্যার কথা বলি। একালে আমাদের আর্মি সহ রাস্তায় আন্দোলনকারীদেরসহ সবাইকে হাসিনা উতখাতের লড়াইয়েও হিউম্যান রাইট ইস্যুটা কীভাবে সক্রিয় ছিল তা খেয়াল রাখতে হয়। নইলে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড় আমরা করতে ব্যর্থ হতাম। যা একালের যেকোন পরিবর্তনে একটা বড় বিবেচনা। আমাদের আর্মির বেলায় এটা তো আরো মারাত্মক! জাতিসংঘের মানবাধিকার না মানলে তারা আমাদের আর্মিকে মিশনে অংশগ্রহণ থেকে বের করে দিবে – যেটা আসলে এক বিরাট ফাইন্যান্সিয়াল বোঝা হয়ে আমাদের সামনে হাজির হত তাহলে। ফলে ক্ষতিও। কারণ, আমাদের গরীবী পেমেন্ট পাওয়া সাধারণ সৈনিকদের কাছে তাদের মিশন বন্ধ হলে তাদের জীবনের সব আশার প্রদীপ নিভে যাবে। ফলে ইউএন এর কথা খেয়ার রেখে হাসিনা উতখাতে তাদের অংশ নিতে হয়েছে। আবার বিজয়ের পরে তাদেরকে কোন ক্রেডিটই দেয়া যাচ্ছে না। সবই ছাত্র-জনতা বলে এর আড়ালে রেখে দিতেই হচ্ছে।

    এসব দিকগুলো উমর সাহেবদের ইমাজিনেশনের যে বিপ্লব ধারণা যেটাকে আমি আইডিয়াল ধারণা বলছি যেটা একালে ২০২৪ সালে এসেও এটাকে রিয়েল ধারণা নয় বলছি। একালে আন্তর্জাতিক নানান প্রতিষ্ঠান সুবিধা-অসুবিধা দুটাই মারাত্মক! কাজেই বিপ্লব নিয়ে আবার সেটা আইডিয়েল না, রিয়েল ধারণায় ইমাজিনেশন করতে হবে। এককথায় চিন্তার বিভিউ। পুনঃর্গঠন লাগবে। নয় কী!

    আর এই সাক্ষাৎকারটা ছিল অনেক ছোটই। তবু এই ছোট পরিসরে সবচেয়ে কম ব্যবহৃত শব্দ হল, রাজনৈতিক বা পলিটিক্যাল শব্দটা! কিন্তু কেন? কেন সামাজিক বিপ্লব বলছেন রাজনৈতিক বিপ্লব বলছেন না কেন? এটা আমাদেরকে ভাবতে হবে, আগামী প্রজন্মের জন্য চিন্তার এসব দিকের এক ব্যাপক রিভিউ লাগবে।

    সবকিছুতেই শ্রমিক-কৃষক দিয়েই বুঝতে হবে কেনঃ
    উমর সাহেব বলছেন, “কোটার বিরুদ্ধে বৈষম্য না হয় বুঝলাম, সামাজিক বৈষম্য বলতে তারা কী বোঝে? তাদের এখন পর্যন্ত দেশের কৃষক, শ্রমিকের পক্ষে কোনো কথা বলতে শুনিনি”। আসলে সত্যিটা হল, এই ছাত্রদের তো কোন পার্টি পরিচয়ই তো ছিল না। তারা প্রথম পার্টি খুলেছে এই বছর ফেব্রুয়ারি মাসে হাসিনা উতখাতের পরে। আর তাদেরকে কৃষক, শ্রমিকের পক্ষে কথা বলতে দেখতে চাচ্ছেন উমর সাহেব! এর মানে এরা কমিউনিস্ট নাহলে তিন তাদের গোনায় ধরতে পারছেন না!
    আচ্ছা যারা কৃষক, শ্রমিকের পক্ষের বলে – কথা বলতে জানে তারাও কেউ কী বলেছে আমার জানা নাই। যদিও অনেক কমিউনিস্টই দাবি করছে তারা জুলাই বিপ্লবে ভুমিকা রেখেছিল।
    আবার ধরেন বাংলাদেশে যথেষ্ট বিকশিত শ্রমিক মানে বিস্তৃত কারখানা এখনও নাই। তখন কী করব আমরা?

    কথা আরো আছে মারাত্মক!
    আমরা কী খেয়াল করেছি যে আমাদের গার্মেন্ট শিল্প আছে সেখানে ট্রেড ইউনিয়ন কেমন? কেমনে চলছে সেগুলো?
    বইয়ের ভাষায় আমাদের ধারণা হল, গার্মেন্টসে মালিকও আছে শ্রমিকও আছে। তাহলে এটা মালিক শ্রমিকের দ্বন্দ্ব আর আমাদেরকে শ্রমিকের পক্ষে থাকতে হবে। কিন্তু তাই কী বাস্তবতা???

    তাহল একর্ড [accord] গ্রুপ এরা করাঃ
    আমরা কী জানি সেখানে একর্ড বলে একটা বিদেশি বায়ার্স [buyers’] গ্রুপ আছে। আর ট্রেড ইউনিয়ন গুলার সাথে তাদের ব্যাপক খাতির! কেন এমন?
    বায়ার্স গ্রুপ মানে হল যাদেরকে  (স্থানীয়) মালিক মনে করেছি তারাই মালিক নয়। বায়ার্সরাই হল মালিকের উপরে আসল মালিক? তাহলে শ্রমিকদের সাথে তাদের খাতির হবে কেন?

    কাজেই এই বাস্তবতাকে এড়িয়ে ক্লাসিক ধারনা বা মুখস্ত ধারণার – শ্রমিক-কৃষকের কথা বলে যেতে হবে – এটা কতটুকু সঠিক হবে? আবার সেই শ্রমিকের পক্ষে থাকার মানে? এই  বাস্তবতায় এটা কী????
    এথেকে একটা জিনিষ পরিস্কার যে  ক্লাসিক ধারনা বা মুখস্ত ধারণার শ্রমিক-কৃষকের কথা বলা সম্ভবই নয়। বাস্তবের শ্রমিক-কৃষক অন্য জিনিষ!  ফলে এখানেই ক্লাসিক ধারনা বা মুখস্ত ধারণার -শ্রমিক-কৃষক- বলার যে চল সেই কমিউনিস্ট চিন্তারও রিভিউ লাগবে। এর আগে শ্রমিক-কৃষক শ্রেণির পক্ষে কথা বলতে হতেই হবে বলে বা এদিয়ে কিছুই বুঝা যাবে না।

    উপরে যে বক্তব্যের কার্ডটা দেখছেন সেটা প্রথম আলোর উমর সাহেবের সাক্ষাতকারে দেয়া আছে, সেখান থেকে নিয়েছে। এই কার্ডে উমর সাহেবের তিন নম্বর পয়েন্ট টা অস্বস্তিকর! দেখেন, খোদ কমিউনিস্টেরা কী কনষ্টিটিউশন / সংবিধানকে জরুরি কিছু মনে করে? কাজের জিনিষ মনে করে? করে না।
    এমনিতেই কমিউনিস্টদের চিন্তায় পার্টি আর রাষ্ট্র বলে দুটা আলাদা কিছু নয়। এছাড়াও মূলত রিপাবলিক ধারণাটাই মার্কসের ধারনায় নাই। শ্রেণী ধারণা দিয়ে বদলে ফেলেছেন, অপ্রয়োজনীয় করে ফেলেছেন তিনি। কাজেই উমর সাহেবের মুখে  কনষ্টিটিউশন / সংবিধান নিয়ে কথা তোলা এটা কীভাবে দেখব জানি না; অর্থই বা কী হবে?

    আবার কার্ডের প্রথম পয়েন্ট তিনি বলছেন, “কোটার বৈষম্য আর সামাজিক বৈষম্য তো এক জিনিষ নয়”।
    এখানে ভুল বুঝা হচ্ছে মানে মারাত্মক ভুল বুঝা আছে। উমর সাহেব আসলে সামাজিক বৈষম্য বলতে একটা কথাই বুঝেন আর সেটা তিনি মিন করছেন অর্থনৈতিক বৈষম্য। এর বাইরে বৈষম্য  বলে আর কিছু নাই। এধারণাটাও ভুল বলে আমার ধারণা। আসলে বৈষম্য শব্দতার তাতপর্য এখানে (তাতে সেটা কোটা বা সামাজিক বৈষম্য যেটাই বলেন) এটা একটা পলিটিক্যাল শব্দ। অধিকার ভিত্তিক শব্দ বলেও বুঝতে পারেন। কিন্তু ওদিকে রাজনৈতিক বা অধিকার শব্দ কমিউনিস্ট ডিকশনারিতে আবার নাই। এটাই মূল সমস্যা। আর পলিটিক্যাল বৈষম্য বা অধিকারে বৈষম্য করা অপরাধ তা হলেও এটা কমিউনিস্ট এন্টেনায় ধরা পড়বে না।
    সারকথাটা হচ্ছে, ক্লাসিক বা মুখস্ত কমিউনিস্ট ভোকাবুলারি দিয়ে এযুগে কাউকে মুল্যায়ন করা অর্থহীন; যদি না আগেই আমরা ১৯৪৫ সালের আগের ধারণাওগুলোকে নিয়ে ব্যাপক রিভিউ করতে আগেই না বসি। আর পলিটিক্স শব্দের অর্থ তাতপর্য বুঝলে অর্থনৈতিক ক্যাটাগরি দিয়ে কমিউনিস্ট ভাব প্রকাশের ভুল আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব।

    সবশেহ উমর সাহেব নিজ ক্লাসিক ধারণা বিবেচনার দ্রুত নির্বাচন দিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। আর সেটাকে কাজে লাগাতে উঠে ততপর হয়ে গেছে প্রথম আলো। তারা উমর সাহেবের কথাকে বিএনপি র এখনই নির্বাচিন দাবি – এর সাথে যেন উমর সাহেবও একই কথা বলছেন এই ভাব তৈরি করে নির্বাচন কথাটাকে হাইলাইট করে দিয়েছে!

    আপাতত এতটুকু!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com


    সবশেষ আপডেটঃ  ,   এপ্রিল ২০২৫

  • জ্যাক সুলিভান এর ভারত সফর; আমাদের শঙ্কা, কানও খাড়া

    জ্যাক সুলিভান এর ভারত সফর; আমাদের শঙ্কা, কানও খাড়া
    গৌতম দাস
    ০৬ জানুয়ারি ২০২৫     সকাল ১১ঃ ৪৮
    https://wp.me/p1sCvy-69K

    Sullivan & Doval

     

    জ্যাক সুলিভান [Jake Sullivan] , চলতি বাইডেন প্রশাসনের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এডভাইজার [NSA]; যারা আর দুসপ্তাহ ক্ষমতায় আছেন।
    সুলিভান বর্তমানে ইন্ডিয়া সফরে আছেন তার ৫-৬ জানুয়ারি ২০২৫ সফর কর্মসুচিতে। প্রশ্ন উঠেছে ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র দুসপ্তাহ আগে কেন তিনি ইন্ডিয়া সফরে?

    আমাদের শঙ্কা, কানও খাড়াঃ 
    ইন্ডিয়া-আমেরিকার যে কোন ছোট বা বড় মাখামাখিতে তা সবচেয়ে রুটিন কোন সফর হলেও বাংলাদেশে আমরা কান খাড়া রাখি! আপনাতেই!  কারণ গত ১৬ বছর আমাদেরকে অত্যাচার নির্যাতন, স্বার্থ-অর্থ লুট, বাজার দখল, বিনা পয়সার করিডোর, জঙ্গি নাটক সাজানো; এমনকি বাংলাদেশ রাষ্ট্র বলতে কার্যত যেসব প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের প্রতীক এমন সেনাসহ সব ধরনের প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি কী নাই যা ইন্ডিয়া ধ্বংস করে দেয় নাই – এসব আমরা দেখেছি। আর ইন্ডিয়া তা করে যেতে পেরেছে কারণ আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল এককালে, সেই ২০০৭ সাল থেকে। যদিও এতে পরে ভাটা পরেছে আমেরিকার দিক থেকে, ২০১৬ সালের পর থেকে; মানে, এতে ইন্ডিয়ান আগ্রাসী-পনা কমিয়েছে  হয়ত, যদিও ট্রাম্পের আগের আমলে তা ছেড়ে দেয় নাই। মূল আধিপত্য ইন্ডিয়া কখনও বাংলাদেশের উপর থেকে সরে নাই।  এমনকি ট্রাম্পের পরে বাইডেন প্রশাসন এসে ভাব ধরেছিল তিন বছর ধরে যেন সে হাসিনার ফ্যাসিজম ভাঙতেই স্যাংশন-মানবাধিকারের অস্ত্র ব্যবহার করতেই এসেছে। মানে যাতে এর ফলে বাংলাদেশের মানুষেরা একটা নুন্যতম রাজনৈতিক অধিকার পায়, আমাদের বিরোধীদল রাজনীতির মাঠে বের হতে পারে। আর এই তিন বছর হাসিনা যতটা পারে নিজের ফ্যাসিজমে অটুট থাকার চেষ্টা করে গেছে ইন্ডিয়ার নিরন্তর সমর্থন -সহায়তায়। আর সেই সাথে প্রায় এই তিন বছর (২০২১-২৩) ইন্ডিয়া এই বলে বাইডেন প্রশাসনের কানভাড়ি করে গেছে যে আগের মতই ইন্ডিয়ার মাথায় আমেরিকান হাত থাকলে বিনিময়ে হাসিনা এবার আরও ভালভাবে আমেরিকাকে সেবা দিবে!
    কিন্তু হায়! শেষে তাতেও বাইডেনের আমেরিকা প্রতারণা করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে  ল্যু-বাইডেন চক্রের নাম ইতিহাসে প্রতারক চক্র হিসাবেই লেখা হয়ে গেছে। মধ্য ২০২৩ সাল থেকে ইন্ডিয়া- ল্যু-বাইডেন চক্র আবার সঙ্গোপনে একজোট ও সক্রিয় হয়, একেবারে ভাই-ভাই!  তাতে হাসিনাকে ক্ষমতাসীন করতে ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচন করতেও সহায়তার এক নয়া ডালি খুলে বসেছিল এই চক্র।

    সব থিওলজিক্যাল “কিতাব” সেখানে  দাজ্জাল বা অনুরূপ দানবের উত্থান ও পরিণতির বর্ণনা আছে যা আসলে দুনিয়ার সাধারণ বা আম-মানুষযারা সারা জীবনে এতশত নির্যাতনের পরেও আত্মহত্যা না করে কষ্ট সহ্য করে হলেও বেঁচে থাকে – কেন? কারণ তাঁদের বাঁচার সাহস ও অনুপ্রেরণা যোগানদার হল এসব দাজ্জালের গল্পকথা! এটাই সাহস যুগিয়ে গেছে সারা জীবন! আর এসব কথার মূল ধারণাটা হল, একদিন না একদিন ডিভাইন-বিচারের দিন আসবে –  অথবা এই দুনিয়াতেই হয়ত আল্লাহ বিচার করে দিবেন; সব দাজ্জাল বা হাসিনার ফ্যাসিজম পরিণতির দিনে পৌছাবে তাতে  – দুনিয়ায় যত অত্যাচারই আসুক এই আশার আলো জাগিয়ে রেখে গেছে এসব মেটাফোরিক্যাল গল্পকথা!  একারণে, এসব সব থিওলজি-কেই বুকভরা শ্রদ্ধা ও সালাম জানাই!

    আর তাতে আমরা সেসময় দেখলাম হাসিনা ৭ জানুয়ারি ইলেকশন ক্য্যারিকেচার করে ফেলেছে  আর সাথে বাইডেনও নির্লজ্জ পল্টি মেরে সেই হাসিনার সাথেই তারা একসাথে কাজ করবে বলে চিঠি পাঠিয়েছিল পিটার হাসের হাত দিয়ে। কিন্তু হায় হায়! দাজ্জাল বা  ভণ্ড মসিহ সাজে যে চরিত্র – এদের দিন ফুরিয়ে এলে বা  হয়ে গেলে কোনকিছুই তা ঠেকাতে পারে না! তাই হাসিনা পলাতক ফ্যাসিস্ট হয়ে যান! আর বাইডেন মুখ লুকিয়েছিল!  আর ইন্ডিয়া????
    সেই থেকে আজও মোদির ইন্ডিয়া পাগলপ্রায় অবস্থায়! কোনকিছুই মানতে পারছে না! ইউনুস এই নাম বা এই সরকার এখন সারা ইন্ডিয়াতে একটা ত্রাস; একটা শত্রু বা এনিমির নাম হয়ে দাড়িয়েছে! আসলে এখানে ইউনুস মানে কি?

    আসলে এখানে ইউনুস মানে কি?
    এখানে ইউনুস মানে হল  যে এক দাজ্জাল প্রতিরোধের প্রতীক; এই দাজ্জাল প্রতিরোধকারী আমরা বাংলাদেশ; এখানে যাদের প্রতীকী নাম হল ইউনুস!!  ইন্ডিয়ান আধিপত্যের বিরুদ্ধে  মানে এই দাজ্জালের বিরুদ্ধে আমাদের সম্মিলিত উঠে দাঁড়ানো আমরা বাংলাদেশের আম-জনগণ! মোদির ইন্ডিয়া – বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের কাহিনী বলে বলে এখন ক্লান্ত; মিথ্যা বাঘ আসছে এই গল্প বলা রাখাল বালক হল মোদি! তিনি হিন্দু নির্যাতনের বানানো কাহিনী  দুনিয়াকে বিশ্বাস করাতে পারেন নাই; আবার ওদিকে চিন্ময়-ইসকন এখন খুনের আসামি হয়ে জেলে! আর এদিকে চিন্ময়ের সাগরেদ যারা আমাদেরকে চিন্ময়ের সাথে তাঁর অস্বস্তিকর মেলামেশা-গলাগলি দেখিয়েছিল – তা ইতিহাস হয়ে থাকবে! কেউ ছাড়া পাবে না! ফলে এই  মোদির-ইন্ডিয়া এখন একেবারেই অসহায়; সবগুলো চালই তাদের ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে ইন্ডিয়ান মিডিয়ার চোখে, বাংলাদেশে তাদের চোখে একনম্বর ভিলেন হল ইউনুস এই নামটা!  যেমন ধরেন বাংলাদেশ থেকে ৫০ জন জেলা জজ পর্যায়ের ব্যক্তি (সম্ভবত এটা ছিল সেকেন্ড ব্যাচ। হাসিনার আমলে, গত ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ইন্ডিয়ার প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড় এর বাংলাদেশ সফর থেকে এর শুরু। বাংলাদেশের বিচারকদেরকে সফরের লোভ দেখিয়ে হিন্দুত্ববাদ-বয়ানের পক্ষে মস্তক ধোলাই এর এক কর্মসুচি ছিল এটা); এদের ইন্ডিয়া সফরে যাওয়া প্রায় ফাইনাল ছিল কিন্তু তা গতকাল বাতিল করা হয়েছে।  তাই এই ক্ষোভে কলকাতার আনন্দবাজারের শিরোনাম দেখেন, “ভারতের খরচেই ভারতে এসে প্রশিক্ষণের কথা ছিল বাংলাদেশি বিচারকদের, আটকাল ইউনূস সরকার”। মানে ইউনুস এই নামটাই ইন্ডিয়ার কাছে এখন এক ত্রাসের নাম; যা সবকিছু আটকে দেয়!!!  মানে ইন্ডিয়ান আধিপত্য রুখে দিবার এক কর্তা এমন নাম-বাচক শব্দ এটা!

    এমন পরিস্থিতিতে  জ্যাক সুলিভান ইন্ডিয়া সফরেঃ
    এমন পরিস্থিতি বলতে – এর মানে কী? এর অর্থ এখানে বুঝতে হবে মোদির ভারত যখন ভাটিতে চলছে বা পশ্চাদ-অপসারণে। যেমন ধরেন, এবার তাদের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বাংলাদেশ সফরে আসার মূল পরিকল্পনাটা ছিল বাংলাদেশকে ভয় দেখিয়ে কব্জা করার শেষ চেষ্টা। কারণ, গুম-খুন-আয়নাঘর কান্ডে শুধু হাসিনা না সাথে মোদি-ইন্ডিয়াও জড়িত এই প্রমাণ সংগৃহিত হয়ে গেছে। এবং সেই প্রাথমিক রিপোর্ট ইউনুস সরকারের কাছেও আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর করা হয়ে গেছে যা মিডিয়া রিপোর্টও এভেলএবল! ফলে অনুমান করা যায় সেসব দলিল এখন জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের অফিসের দিকে রওনা হবে বা দৌড়াচ্ছে!!!! যেখানে এমনকি বিএনপির নেতা যারা অপহরণ-গুম হয়েছিল তাদেরকেও মোদির র-বাহিনী ম্যানেজ করে ফেলেছে।  বা তারাই এখন বিএনপিতে র-এর স্বার্থ-ইচ্ছার ক্যারিয়ার!  ফলে এটা মোদি-ইন্ডিয়ার জন্য এক বিরাট কেলেঙ্কারির ঘটনা হিসাবে আসতেছে! আর এর সাথে আরও ছিল ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকান্ড নয়া তদন্ত কমিশন। এদুটাই যেন বাংলাদেশ খাতা-বন্ধ করে রাখে মুলত এনিয়েই আবদার বা দরকষাকষি করতে এসেছিলেন বিক্রম মিশ্রি! কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিশ্রির সফর-উত্তর বাংলাদেশ এসব দালালি-প্রলোভন বা ভয় দেখানি অতিক্রম করে গেছে!!!  নিজেদের সংহত করে ফেলেছে যার সোজা মানে ইন্ডিয়ান হেজমনি-বিরোধীরা এখন আবার ফিরে সংহত হয়ে গেছে। ফলে ইন্ডিয়ার চোখে সবকিছু নষ্টের গোড়া এখন একটাই নাম ইউনুস সরকার!!

    তাহলে আবার সেই পুরানা প্রশ্ন, তাহলে জ্যাক সুলিভান ইন্ডিয়া সফরের অর্থ – আমাদের জন্য এর অর্থ কী? কোন বিপদের কী?
    একটা ক্লু দিয়ে শুরু করি। সুলিভানের এবারের ইন্ডিয়া সফরে র সাথে তিনি বাংলাদেশও ঘুরতে আসেন নাই; এমন সিডিউল-পরিকল্পনাও নাই; যেটা এর আগে ল্যু-বাইডেন জমানার এর তিন বছরে বেশিরভাগ সময় ঘটেছে। এর বদলে এখন বরং আলাদা করে ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ মানে দুসপ্তাহ আগেই ইউনূসের সঙ্গে সুলিভানের ফোনালাপ হয়েছে একটা। এটা সিগনাল দেয় যে আমেরিকার ইন্ডিয়ান ডেস্ক বা  এর কায়-কারবার কার্যতই বাংলাদেশ ডেস্ক থেকে আলাদা। নাইলে আমরা দেখতাম ইন্ডিয়া থেকে সুলেভান বাংলাদেশও ঘুরে যাচ্ছেন।

    এছাড়া আরেকটা কড়া কথা বলব। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ইউনুসের (জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বার্ষিক বক্তৃতার সফর এর সুযোগে) প্রথম এবং মুখ্যত ইউনুস সরকারের নীতি (আমেরিকা প্রসঙ্গে নীতি কী) তা মুখোমুখি বসে আলাপ করার সুযোগ পেয়েছিল আমেরিকা!
    কোন আমেরিকা????

    এই প্রশ্নটা গুরুত্বপুর্ণ! যেই ল্যু-বাইডেনের আমেরিকা গত  ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সালের হাসিনার সাথে একসাথে কাজ করবে বলে লিখিত চিঠি দিয়েছিল। আর সেই হাসিনা মানে বাইডেনের পার্টনার হাসিনা সরকারকে  বাংলাদেশের মানুষ উতখাত করে দিয়েছিল বাইডেনের ঐ খায়েসের চারমাসের মধ্যেই!!! মানে প্রথমত আমেরিকান ইন্টেলিজেন্স সব ভুয়া, কাগুজে বাঘ মাত্র! আর এটাই প্রমাণিত হয়েছিল! আর সবচেয়ে বড় কথা এরপরেও আমরা –  ইউনুস সাবকে আমেরিকা পাঠিয়েছি। বাইডেনকে তিনি বলেছেন আর পিছনে না,  সামনের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে!!! শুধু তাই না, দেখেন ল্যু-বাইডেনের ইন্দো-প্যাসিফিক পলিসি কেউ খাইলো না। সেটা এখন মৃত! আর বিপরীতে আমরা এর চেয়েও এক বাস্তব প্রস্তাব,  বাংলাদেশ-আমেরিকার উভয়ের স্বার্থ আছে এমন পলিসির প্রস্তাব আমরাই বাইডেনকে জানিয়েছি। সাথে এটাও যেখানে লুকানো নয় যে চীনের সাথে আমাদের ঋণ-বাণিজ্য এবং সস্তায় অস্ত্রদাতা ইত্যাদি সব সম্পর্কও চলবে! যা নিয়ে আমেরিকার ভয় পাবার কিছুই নাই। আমরা আমেরিকান (FDI) প্রাইভেট বিনিয়োগও ওয়েলকাম করব!
    এসব কারণে, আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমেরিকা যদি আরেকবার বেকুব হতে না চায় তবে আমেরিকা (যে প্রশাসনেরই হোক) বাংলাদেশ প্রশ্নে ইন্ডিয়াকে দূরে রাখবে! ইন্ডিয়া-আমেরিকা সম্পর্ক যেমন-ই থাক বা না থাক এর ভিতর বাংলাদেশ কোন প্রসঙ্গ হবে না,  আসবে না – এই নীতি-বৈশিষ্ট বজায় রাখবে; এই সীমারেখা মেনে চলবে!
    তাহলে এটাও এখানে বলে রাখা যায় যে আমেরিকা যদি এই – বাংলাদেশকে আলাদা রাখার নীতি-বৈশিষ্ট – মেনে না চলে তবে স্বভাবতই আমরা সারা বাংলাদেশ সরাসরি এন্টি-আমেরিকানও হয়ে যাব!! কোন আমেরিকা? যে আমেরিকা আমাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল ২০০৭ সালে! আমাদেরকে ভারতের করদ রাজ্যে পরিণত করা হয়েছিল তখন থেকে! ইউনুস সরকার গত চার মাসে এই প্রসঙ্গ কখনও বাঁকা-কথা বা রেফারেন্স হিসাবে আনে নাই। কেবল ইন্ডিয়ার আধিপত্যের বিরোধ করে গেছি আমরা ইউনুস সরকারের মাধ্যমে! কিন্তু এবারও আমেরিকা সোজা না হলে, আত্মঘাতি হলে আমরা সরাসরি আমেরিকাবিরোধী দেশ-সরকার হয়ে যাব। সবচেয়ে বড় কথা (আর কোন ভারসাম্য নয়) আমরা সেক্ষেত্রে প্রকাশ্যেই চীনের কোলে গিয়ে উঠবে এমন বাংলাদেশ হব হয়ত! আর এর সম্পুর্ণ দায়দায়িত্ব বর্তাবে আমেরিকার উপর; যা সবাই খোলা চোখেই দেখতে পাবে!!!

    এবার শেষাংশ, এটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপুর্ণঃ
    আমি মনে করি উপরে যা যা বললাম এসব কারণে সুলিভান এই ইন্ডিয়া সফরে (ফাঁকে-ফোকরেও) বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আনবেন না।
    এছাড়া ইতোমধ্যেই সুলেভানের এই সফরের মুল কারণ যা সব প্রধান এজেন্সি মিডিয়াতেই ছাপা হয়েছে বিশেষত রয়টার্স সেখানে সোজা আমেরিকান প্রশাসনের রেফারেন্স দিয়ে বলা হয়েছে এই সফর মূলত [about the impact of Chinese dams,] নদীতে বাঁধ ও বিদ্যুৎ প্রকল্প যেটা চীন নিয়েছে – সে প্রসঙ্গে ভারতের আপত্তিওগুলো কী তা নিয়ে নীতিগত অবস্থানের নৈকট্য কী করা যায় তা নিয়ে।
    এখন আরেকটু ভেঙ্গে বলি। আমাদের দেশে যেটা মূল ব্রহ্মপুত্র নদ নামে পরিচিত [চীনের তিব্বতে ইয়ারলুং জাংবো নদ এটাই ভারত-বাংলাদেশে যার পরিচিতি  ব্রহ্মপুত্র নামে] যা ভারতের আসাম হয়ে কুড়িগ্রাম-ময়মনসিংহ দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। এই নদী মূলত চীনের মেকং অঞ্চল থেকে শুরু হয়ে চীনের তিব্বত থেকেই ইন্ডিয়ায় (আসামে) প্রবেশ করেছে। পরে আসাম হয়ে বাংলাদেশে। বাংলাদেশে এসে আমরা এটাকে ব্রহ্মপুত্র বলি!  চীন উজানে এই নদিতে নানান জায়গায় বাধ ও জলবিদ্যুত প্রকল্প করেছে। আমেরিকা ভারতের উপর এর প্রতিক্রিয়া প্রভাব নিয়ে কথা বলতে এসেছে […… about the impact of Chinese dams,]...।
    তবে এটা ঠিক নদীর পানি নিয়ে মারামারি নয়; আমেরিকা বুদ্ধিমানের মত এটাকে  পরিবেশ ইস্যু হিসাবে তুলতে চায়। নিচে সুলিভানের ইন্ডিয়া সফর কেন তা নিয়ে আমেরিকান প্রশাসনের মূল বক্তব্যটা কি দিয়েছে তা তুলে দিলাম। এটা রয়টার্স থেকে নেয়া। বাকি সব মিডিয়ার বক্তব্যের সারকথাও এইটাইঃ

    “We’ve certainly seen in many places in the Indo-Pacific that upstream dams that the Chinese have created, including in the Mekong region, can have really potentially damaging environmental but also climate impacts on downstream countries,” a senior U.S. official said ahead of Sullivan’s visit.

    তাহলে সারাংশে বললে, সুলেভানের সফরে বাংলাদেশ কোন প্রসঙ্গই নয়।  এই বিচারে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
    আর নিশ্চিত করেই আমেরিকান প্রশাসন জানিয়েছে, আলোচনার টপিক হল (civilian nuclear cooperation, artificial intelligence, space, military licensing and Chinese economic overcapacity)এগুলা। অর্থাৎ যার কোনটাই বাংলাদেশ সম্পর্কিত নয়। যদিওও ভারতের কিছু প্রপাগান্ডা মিডিয়া ভয় দেখানো সুত্রহীন রিপোর্ট ছেপেছে।

    Washington also expects that topics such as civilian nuclear cooperation, artificial intelligence, space, military licensing and Chinese economic overcapacity will be brought up in the visit, the U.S. official said

     

    কিন্তু একটা নতুন সুবিধার দুয়ার উন্মোচিতঃ
    ইন্ডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালোয়ের মুখপাত্র এখন এক রণধীর জয়সোয়াল! [এই অংশটার জন্য দুটো মিডিয়া রিপোর্ট পাঠকের ভাল কাজে লাগবে। একটা হল ভারতের Mint-Livemint আর আরেকটা হল আমাদের ইত্তেফাক। লিঙ্ক সাথে দিয়ে দিলাম। কারণ জয়সোয়ালের মন্তব্য এখানে ভাল কাভার করেছে এরা।  ]
    গত চারমাস তাঁকে আমরা দেখেছি কেবল – বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন চলছে – এনিয়ে কথা বলতে। কিন্তু এবার সুলেভানির সফর নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি নিজে ও ইন্ডিয়ার জন্য এক বিপদ ডেকে এনেছেন।
    কমন নদীর পানিতে ভাটির দেশের সমান অধিকার থাকে। এটাই আন্তর্জাতিক আইন। যে বোধটা এতদিন বাংলাদেশে উপেক্ষিত, সব শাসকের কাছেই।  এই প্রথম বহু কাঠখর পুড়িয়ে ইউনুসের মুখ দিয়ে সামএ আনা গেছে ফেনীতে এবারের বণ্য বা ইন্ডিয়ার বাধ খুলে দেয়া কে কেন্দ্র করে।

    মজার কথা হল, সুলিভানের সফরে চীন-ভারত কমন নদীর পানি ইস্যুতে এই জয়সোয়াল দাবি করেছেন যে তিনি জানেন, যে ভাটির দেশের (মানে ইন্ডিয়ার) এক্ষেত্রে সমান অধিকার আছে।

    রণধীর জয়সোয়াল বলেন, অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশেরও কিছু অধিকার আছে। রাজনৈতিক ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে সেই অধিকারের কথা বারবার জানানো হয়েছে। সেই অধিকার ও স্বার্থের বিষয়ে ভারতের পর্যবেক্ষণ জারি আছে। সরকার সেইমতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও গ্রহণ করবে।

    তাহলে এটা কী আমাদের জন্যও সুযোগ না যে ঠিক একই কারণে আমাদের সাথে ভারতের ৫৪ নদীর পানির হিস্যায় আমাদেরও ভাটির দেশ হিসাবে ইন্ডিয়ার সাথে সমান অধিকার আছে। -এবং এটা তো জয়সোয়াল জানেনই -! সুতরাই নদীর পানি ইস্যুতে আমাদের সমান ও ন্যায্য ভাগীদারির কথাটা এখন আমরা সহজেই তুলতে পারার রাস্তা উন্মোচিত হচ্ছে সেটা এখানে দেখতে পাওয়াটা জরুরি!
    ফলে সে অনুযায়ী আমাদের ফরেন অফিস তার কাজ ও নীতি সামলানো এখন ফরজ!
    এই মাজা ভাঙ্গা উপদেষ্টা যদি এখানে পারফরমেন্স দেখাতে না পারেন তবে তাকে বদলানোর দায়ীত্ব ইউনুস সাহেবের। পাবলিক তৌহিদ সাহেব চিনে না। আমরা একাজে ততপর ফরেন অফিস না দেখতে পেলে কিন্তু আমরা ইউনুস সাহেবকেই দায়ী করব! কাজেই আমাদেরকে এই ইস্যুতে এখনই পদক্ষেপ দেখানোর উপর নির্ভর করছে ইউনুস সরকারের সার্থকতা!!! নাইলে এটা একটা খামোখা সরকার হয়ে দাঁড়াবে!!!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ  বিকাল ০৪ঃ ৩৫    ০৬ জানুয়ারি ২০২৫

     

     

     

     

     

     

     

     

     

     

  • ট্রাম্পের বিজয়ে বাংলাদেশের জন্য এক সংক্ষিপ্ত নোট

    ট্রাম্পের বিজয়ে বাংলাদেশের জন্য এক সংক্ষিপ্ত নোট
    গৌতম দাস
    ০৬ নভেম্বর ২০২৪     সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৫
    https://wp.me/p1sCvy-5Nm

     


    2024 U.S. Presidential Election ট্রাম্পের বিজয় 

     

     

    ট্রাম্পের বিজয়ে বাংলাদেশের জন্য এক সংক্ষিপ্ত নোটঃ
    ‘হাসিনা এন্ড গং’ বাদে বাংলাদেশের প্রায় সকলের ভয়/আশঙ্কা হল, আমেরিকান নির্বাচনের ফলাফল থেকে না এই হাসিনা-গোষ্ঠি কোন সুবিধা পেয়ে যায়। তাতে আবার কেউ কেউ বলত ট্রাম্প জিতলে হাসিনা সুবিধা পাবে আবার সংখ্যায় কম হলেও কেউ কেউ বলত কমলা জিতলে সেটা হবে!
    এখন পর্যন্ত, অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে ট্রাম্পকে পরিস্কার বিজয়ী (২৭৯ ইলেক্ট্ররাল ভোটে) দেখা যাচ্ছে।

    আমার অবস্থান হিসাবে অনেক আগে থেকেই আমি বলেছিলাম, ট্রাম্পই জিতবে – ‘আমেরিকান মন’ আমি যতটুকু বুঝি। মুল কারণ, কে বেশি মিডিয়ার সরব – ট্রাম্পের পক্ষ না কমলার? এই প্রশ্নে সবসময় ডেমোক্রাটেরা (কমলা) এগিয়ে থাকে। আসলে এদের আওয়াজ পাবলিকলি ও মিডিয়ায় বেশী উচ্চারিত হয় বলে এমন মনে হয়। তুলনায় রিপাবলিকান ট্রাম্পের আম ভোটার-সমর্থকেরা হল, ‘কোর এথনিক হোয়াইট ওয়ার্কিং ক্লাস’, যাদের আওয়াজ মিডিয়ায় কম আসে।  আর তা দেখেই মিডিয়া অনুমানে কমলা জিততেছে অনুমানের জন্ম হয়ে থাকে!! এনি-ওয়ে সেসব এখন অতীত; মূলকথা এখন  ট্রাম্প বিজয়ী!
    গ্লোবাল পরিসরে তাকিয়ে কিছু কথা বললে, মোটা দাগে সবার উপরে ট্রাম্প এবারও আগেরবারের মতই কট্টর ‘জাতিবাদি’ হবেন। এই যে – এথনিক সাদাচামড়ার শ্রেষ্ঠত্বের – সুরসুরি তোলা ‘জাতিবাদি’ নীতি – এতা আগেরবার কার্যত অকেজো থাকলেও এবারও সেটাই তিনি সবার উপরে ছেয়ে রাখবেন; সে ধারণা তিনি দিয়ে রেখেছেন।
    এখন বাংলাদেশিদের আশঙ্কা / চিন্তা যেখানে সেটা হল বাংলাদেশে সরকারের উপর ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিঃ  এটা কী হাসিনা-গোষ্ঠি অভিমুখি হবে??? এই হল মুখ্য প্রশ্ন!

    আসলে ঠিক এটাও মুখ্য প্রশ্ন না। আমরা যা বুঝতে চাচ্ছি তাতে মুখ্য প্রশ্ন হল, ভারত-আমেরিকা কী আগের মতই বাংলাদেশ প্রশ্নে ‘একসাথে’ ও ‘এক নীতিতে’ এবং ‘ভারতের চোখ দিয়ে দেখে’ কাজ করবে?  এর মানে, আমাদের উদ্বিগ্নতা আসলে ট্রাম্পের আমেরিকা বাংলাদেশ প্রশ্নে কতটা ভারতের ঘনিষ্ট থাকবে???

    এককথায় এর জবাব, বাংলাদেশ প্রশ্নে ট্রাম্পের আমেরিকা ও ভারত আর একসাথে কাজ করতে পারবে না। করবে না, সম্ভব নয়!

    মৌলিক কারণগুলোঃ
    ১। ইতোমধ্যেই গত সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে ভারত-আমেরিকা পরস্পর থেকে ২০০৭ সালের আগের মতই – দূরে চলে গেছে।
    ২। এছাড়া, ভারতের প্রায়োরিটি বা প্রধান স্বার্থই বদলে গেছে। চীনবিরোধী হয়ে আমেরিকার সঙ্গে খাতির থেকে (বাংলাদেশের উপর দখল-মাতব্বরিসহ) ভারতের যা কিছু এতদিনের “প্রাপ্তি” ঘটেছে এর চেয়ে – আমেরিকার সে হাত ও ঘনিষ্ঠতা ছেড়ে দিয়ে ভারত বরং চীনের (সাথে রাশিয়া বা ব্রিকস ক্যাম্পে থাকলে) ঘনিষ্ট হলে নয়া যেসব প্রাপ্তি তা ভারতের জন্য এখন বেশী কাম্য ও লোভনীয়। যেমন, চীনা ঋণ ভারতকে এখন পেতেই হবে যা এতদিন দূরে থাকার কারণে সে লস করেছে।
    ৩। এনিয়ে চীন-ভারত হাত ধরাধরি করে এখন অনেক ঘনিষ্ঠ ও অনেক দূর চলে গিয়েছে এবং এক লম্বা-দুরি পথ তারা যাবে বলে ঠিক করে ফেলেছে। মানে সহসাই এই পথ থেকে আর সরবে বা ফিরবে না।
    ৪। অনাষ্ঠুনিকভাবে ট্রাম্প বিজয়ী হতে না হতেই আজকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের ছোট ভিডিও ক্লিপ দেখে নেন। সেখানে জয়শঙ্কর জানিয়েছেন তিনি মনে করেন (সারকথায়) আমেরিকা এখন থেকে আইসোলেশন [isolation] মানে, বাকি দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন বা আলাদা হয়ে চলতে যাচ্ছে – এমন নীতির ফাঁদে আমেরিকা পড়ে গেছে।

    অতএব যারা অজানা আশঙ্কায় ভয় পাচ্ছেন অথবা হাসিনা গোষ্ঠি যারা নিজেদের দিকে আশার আলো খুঁজছেন – এমন উভয় পক্ষের ভাগে কিছু জুটছে না তা বুঝা যাচ্ছে। ট্রাম্পের বিজয়ে আম-বাংলাদেশিদের আশঙ্কার কোন কারণ নাই। আবার হাসিনা-গোষ্টিদের আগামি জীবন হতাশাতেই পরিপুর্ণ থাকতেছে – সে ইঙ্গিত একেবারে পুষ্ট ও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

    আর সবার উপরে ইউনুস সাহেবের যে ব্যক্তি পরিচিতি আমেরিকায় মানে তাদের – কোর থিঙ্কট্যাঙ্ক ও অন্যান্য ইন্টেলেক্ট ও একাদেমিক বা পলিটিক্যাল কর্তাদের – মধ্যে আছে তারাই বরং ট্রাম্প প্রশাসনকে গাইড করবে এই বলে যে এতদিন বাংলাদেশে আমেরিকান নীতির যে বেইজ্জতি ও দেউলিয়া  হয়ে থাকা দশা ছিল সেটা থেকে তাদেরকে উদ্ধারের জন্য বরকত হিসাবে এসেছেন ইউনুস! কাজেই তাঁকে বরণ করে আগলে রাখেন, এই হবে সম্ভাব্য নীতি! মোটা দাগে এই হয়ে পারে ট্রাম্পের হবু নীতি এবং এরচেয়েও গুরুত্বপুর্ণ হল, আমেরিকান এই অবস্থানটা হবে বাই-পার্টিজান – মানে আমেরিকার প্রধান দুই দলই এটা সাপোর্ট করবে!!!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ  সকাল ১১ঃ ০০  ০৭ নভেম্বর  ২০২৪
    শেষ আপডেটঃ      ২০২৪

     

  • জেনারেল আজিজের উপর আমেরিকান নয়া ‘পদক্ষেপ’ কেন?

    জেনারেল আজিজের উপর আমেরিকান নয়া ‘পদক্ষেপ’ কেন?

    গৌতম দাস
    ২১ মে ২০২৪
    https://wp.me/p1sCvy-5DG

     

    ছবি ডেইলি স্টার থেকে নেয়া 

     

     

    গতকাল দুপুর থেকেই খবরটা  ঢাকায় ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়ছিল যে সাবেক এক ‘বাংলাদেশ আর্মি চীফ’ জেনারেল আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে আমেরিকান অসন্তোষ বা এনিয়ে তাদের “নয়া পদক্ষেপ” এর খবর। আজ ডেইলিস্টার লিখেছে, “আমেরিকা আজিজ আহমেদ ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের উপর [“United States has imposed sanctions on former chief of Bangladesh Army Aziz Ahmed and his immediate family…”] স্যাংশন  দিয়েছে। এলেখায় বেশির ভাগ সময় জেনারেল আজিজকে নিয়ে আমেরিকান বিবৃতিকে  আমি “আমেরিকান পদক্ষেপ” বা শুধু “পদক্ষেপ” বলে চিহ্নিত করব। যদিও ডেইলি স্টার সহ অনেক মিডিয়াই এটাকে স্যাংশন আরোপ করা বলেছে। আর এর বিপরীতে আমেরিকান বিবৃতিতে স্যাংশন শব্দটা দেখিনি। তাই, এই বতর্ক থেকে দূরে থাকতে  একে “আমেরিকান পদক্ষেপ” বলব এখানে।

    “আমেরিকান পদক্ষেপ” বলতে শব্দে যাই থাক, বাংলাদেশে সামাজিকভাবে এক বড় খুশির প্রতিক্রিয়া হয়েছে দেখার মত। এতে লক্ষ্যণীয় যে,  বিগত দুবছরের সরকারবিরোধী আন্দোলনকালে যারা আমেরিকান সাপোর্ট ও সহায়তার ব্যাপারে গভীরভাবে বাইডেন-লু এর আমেরিকার উপর “রাজনৈতিক আস্থা” রেখেছিল; গভীর নির্ভরশীলতায় আপন বোধ করত প্রবল খুশির প্রতিক্রিয়া এসেছে মূলত তাদের থেকে।  কিন্তু এসব সত্বেও , সেসময়ে এরাই আবার বাধ্য হয়েছিল নির্বাচনের আগে যখন আমেরিকা  নিজেই নিজ কমিটমেন্টের উলটা ঘুরে গিয়ে বাংলাদেশকে ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল শুধু না, একেবারে “বিজয়ী” হাসিনার কোলে গিয়ে উঠেছিল; আর তা দেখে লজ্জায় মারা গিয়েছিল যারা মূলত তারাই এবার জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে আমেরিকান পদক্ষেপ দেখে আর নিজেদের চাপা কষ্ট বা প্রতারিতবোধের কষ্ট আর লুকিয়ে রাখতে পারে নাই। বাংলাদেশের এই “আমেরিকা সমর্থক গোষ্ঠি” লজ্জায় মরমে মরে গিয়েছিল, নির্বাচন ঘটে যাবার পর থেকে এতদিন পর্যন্ত। বিশেষ করে এখন বাইডেন-হাসিনা নাকি “কেমন জানি বন্ধু” যা নিয়ে আবার মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উচ্ছ্বাস জানিয়ে বিএনপিকে টিটকিরি দিয়ে কথা বলে চলেছে। এদিকে আমেরিকার ধারণা তারা একসাথে বাইডেন-হাসিনা ‘কী জানি’ [ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি] উতযাপনও শুরু করে দিয়েছিল ইত্যাদি!  তাই গত চার-পাঁচ মাস “আমেরিকা সমর্থক গোষ্ঠি”দের কেটেছে এসব নখড়া দেখতে দেখতে!  অতএব পালটা এবার এদের উচ্ছ্বাসের প্রতিক্রিয়াই ছিল আজ দেখার মত। যেন তারা বলতে চাচ্ছে – তাদের প্রিয় আমেরিকা অনেক সুইট – এরা বিট্রে করে না, ফেলে পালায় না ইত্যাদি। মানে যেন সিনেমার ডায়লগের ভাষায়,   উদ্ধার করতে ‘মেরা অর্জুন [এখানে আমেরিকা] জরুর আয়েগা”। কিন্তু আসলেই কী তাই? এটার মানে কী আমেরিকার ফিরে এসেছে?   আমেরিকা কী ফিরে এসে গেছে? বা আসবে?

    বলা বাহুল্য উচ্ছ্বসিত এই আমেরিকা সমর্থকেরা কঠোর সরকারবিরোধী; তারা সরকারের পতন দেখার জন্য উন্মুখ বহুদিন থেকেই জেনুইনলি। কিন্তু তারা সকলে কী তা এবার দেখতে পাবে?
    এনিয়ে আমার মন্তব্য ও পরামর্শ হবে – এখনও উচ্ছ্বসিত না হয়ে “ধীরে চলেন”। প্রচুর [if, not, but’] এসবের যদি, কিন্তু আছে সামনে; সেসব ব্যাপারে – আমেরিকা কী অবস্থান নেয় সুযোগ থাকে; পরিস্থিতি কতটা আমেরিকার ফেবারে থাকে বা আমেরিকা চায় তা এখনও অনিশ্চিত। আর সবচেয়ে বড় কথা আমেরিকা যাদের ভরসায় বা যাদের সমর্থন পেতে বা খুশি করতে চেয়ে বা লক্ষ্য করে এই “পদক্ষেপ ঘোষণা” নিয়ে থাকুক না কেন বাংলাদেশের সেই রাজনৈতিক অংশ কী আমেরিকাকে আগের মতই গ্রহণ করবে? এটাই এখন একেবারেই অনিশ্চিত। যেমন, মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়া দেখা যাক!

    আজ বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়াঃ
    আজকে বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, “আজিজ আহমেদের নিষেধাজ্ঞা আরেকটা বিভ্রান্ত করাঃ মির্জা ফখরুল”। এর সোজা মানে হল, আমেরিকা আগেও বিভ্রান্ত করেছে তাই আবার আরেকটা বিভ্রান্তি আনা বলেই দেখতে চাচ্ছে বিএনপি – আমেরিকান এই পদক্ষেপকে!  কেন তিনি এমনটা বললেন সেটা বুঝার চেষ্টা করতে পারেন আমেরিকা সমর্থকেরা। উচ্ছ্বসিত আমেরিকা সমর্থকদের মত করে, আলমগীর সাহেবেরও তো অন্তত ইতিবাচক মন্তব্য করার কথা! কিন্তু এই মন্তব্য অন্তত নেতিবাচক! কিন্তু সেটাই বা কেন?  এছাড়া আরেকটা কথাও তিনি ওখানে বলেছেন।  আলমগীর সাহেব বলছেন – “নিজের ঘরকে যদি নিজে সামলাতে না পারি, অন্য কেউ সামাল দেবে না। নিজের শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে হবে, নিজের শক্তি দিয়ে তাদের (আওয়ামী লীগ) পরাজিত করতে হবে”। এই বাক্যের মূল শব্দ নিজের শক্তিতে দাঁড়ানো, আমেরিকার না। এদিকটা মনোযোগ দিয়ে বুঝতে হবে।
    কাজেই আমার মন্তব্য ও পরামর্শ হবে – বাংলাদেশের “উচ্ছ্বসিত আমেরিকা সমর্থক”, আপনারা একেবারেই ধীরে চলেন; স্থির হয়ে নেন আগে! আর সমস্ত স্ব-সক্ষমতা  দিয়ে পরিস্থিতি বুঝতে ও ব্যাখ্যা পেতে চেষ্টা করেন সবার আগে। এর আগে কোন মুভ করলে ভুল হবে।

    এখন কেন এই আমেরিকান পদক্ষেপঃ  
    জবাবটা এবার এখানে খাড়া বলে ফেলি। ভারতের নির্বাচনে মোদি নাকি এবার হেরে যাবেন। আমেরিকান এই পদক্ষেপ এমন এই অনুমানের উপর নির্ভর করে নেয়া হয়েছে; যেটা এখনও ঘটে নাই। আগামি ৪ জুনে প্রকাশিতব্য ভারতের নির্বাচনী ফলাফলে মোদি হেরে গেছে – এটা আমেরিকাসহ আমরা সকলেই শুনতে পাব হয়ত। এই হল সেই অনুমান। সোজা কথা এটা এখনও ঘটে নাই; ঘটতেও পারে!

    তাই বলাই বাহুল্য যদি উলটা হয়। মানে মোদি যদি নিজেকে বিজয়ী বলে ঘোষণা দেখাতে পারেন তবে সেক্ষেত্রে বলাই বাহুল্য – “আমেরিকার পদক্ষেপের” এখানেই আপাতত ইতি হয়ে যাবে।
    তবে মির্জা ফকরুলের নেতি-প্রতিক্রিয়ার কারণ ভিন্ন। এর সাথে আমরা যেন আবার আমেরিকার ভাবনা বা অনুমানের সাথে সম্পর্কিত করে না দেখি; এটা সম্পর্কিত নয় তাই। সেটা বিএনপির নিজস্ব আলাদা কারণ।

    এখন আমার অনুমান হাসিনা বা মোদি সরকারও খুব নিশ্চিত নন যে আমেরিকা বা বাইডেন-লু ঠিক কী বুঝে এমন বেমাক্কা এক পদক্ষেপ হাঁকালেন?  বিবৃতির কাগজে আমেরিকা  “ডেজিগনেশন” [designation] এই শব্দটা ব্যবহার করেছে। মানে নামকরণে সাবেক জেনারেল আজিজকে অপরাধী বলে চিহ্নিত করে ফেললো।
    তবে আমি মন্ত্রী হাসান মাহমুদ যে কথা বলেছেন যে আমাদের সরকার জানত দুদিন আগে বাংলাদেশের আমেরিকার এমবেসিকে বাইডেন প্রশাসন জানিয়েছিল, এনিয়ে কিছু বলছি না।

    আরেকটা কথা, হাসান মাহমুদ যে কথা বলেছেন যে – এটা “ভিসা স্যাংশন নয়” – একথা কিন্তু সত্য [US sanction on Aziz not under visa policy: foreign minister]। বরং অরিজিনাল স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতিতেও স্যাংশন বলে কোন শব্দই নাই। এছাড়া আমেরিকার ঐ বিবৃতিতে আজিজ ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের  – আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ বা সম্পত্তি বায়োজাপ্ত ইত্যাদি কোন শব্দাবলীও নাই।

    কেবল একটাই শব্দ আছে “ডেজিগনেশন”। মানে, বাংলায় বললে “চিহ্নিত করা” ধরণের বা নামকরণ করা যেন। তাই বলছে, আমেরিকান প্রশাসন সাবেক জেনারেল আজিজকে দুর্নীতিবাজ যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধবংস বা বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছে। এই হলো অভিযোগ ও নামকরণ। একথা অবশ্যই বেশ ওজনদার!  কিন্তু সেজন্য আমেরিকার দিক থেকে শাস্তি কী বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ কী আরোপ করা হবে – এধরণের কোন বাক্য আর সেখানে নাই। তবে কোন আইনে এই ডেজিগনেশন এর একটা ধারা নম্বরউল্লেখ করা আছে; তা হল  [7031(c)] ।  হতে পারে ঐ ধারার বিস্তারে কোন শাস্তির কথা লেখা আছে। তবে আপাতত আমরা তা জানি না।

    তাই,  উপরে আমি লিখেছে, জেনারেল আজিজের উপর স্যাংশন আরোপ করা হয়েছে। হা বলেছি তবে নিজ বরাতে না। বলেছি ডেইলিস্টারের বরাতে। বিবৃতিতে স্যাংশন শব্দটাই নাই আগেই বলেছি; আমি গত রাতে পড়েছি। তাই ঢাকার মিডিয়ায় কীভাবে আসছে এমনকি হাসান মাহমুদ তিনিওও স্যাংশন আরোপ হয়েছে বলেছেন।

    তাহলে মূলকথাটা হল, আগামী ৪ জুন ভারতের নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের দিন। এদিন যদি মোদিই হেরে গেছেন বলে প্রকাশিত হয় তবেই আমেরিকান বিবৃতি আরো পাতা খুলে ফুলে-ফলে বিকশিত হয়ে উঠতে চাইবে। এবং সেক্ষেত্রে খুব দ্রুতই বহু বহু সব ঘটনা ঘটবে।   ইতোমধ্যেই অবশ্য ভারতে রাষ্ট্রক্ষমতার করিডোরে প্রবল আলোড়ন বয়ে যাচ্ছে যে মোদি এবার হারছেন। ভারতের যত জুয়ার আড্ডা আছে বড় বড় সব বিখ্যাত ডেরা সেখানে মোদি হেরে যাওয়ার পক্ষে বাজি ধরা জুয়ারি লোকের সংখ্যাই বেশী, রেটও হাই। এটা একটা খুবই তাতপর্যময় তথ্য! ইতোমধ্যে ভারতীয় শেয়ার বাজারও সব বিক্রি করে দাম ফেলে মানে আগে নিজ বিনিয়োগ বাচাও – এমন জোয়ার তুলেছিল আমরা দেখেছি।  আার অন্যদিকে, ভারতে ভোটপ্রদানের % যদি ৬০ এর নিচে যায় তবে মনে করা হয় এটা মোদির হারার লক্ষণ! সেটাও চারপর্বের পর থেকে দেখা যাচ্ছে!
    তবুও আমার শেষ কথা, এমন যত আলামতই দেখা যাক না কেন –  মোদির হাতে থাকা “ভোট বাক্সকে সফটওয়ার ম্যানিপুলেশনের সক্ষমতা” যদি অকার্যকর হয়ে থাকে তবেই একমাত্র তবেই, উপরে যা বলেছি তা সত্য হতেও পারে, নইলে মোদি নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করবেনই আগেরবারের মতই!!
    এবার এক বাক্যে বলি,  যদি মোদি হেরে যায় তবে সবচেয়ে কঠিন সঙ্কটে পড়বে হাসিনা সরকার! আর হবু সেটাই আমেরিকার পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য!
    নিচে আমেরিকান বিবৃতিটা সেঁটে দেয়া হলঃ

    Designation of Former Bangladesh Official for SIGNIFICANT Corruption:

    The U.S. Department of State announced today the public designation of former General Aziz Ahmed, previously Chief of the Bangladesh Army Staff, due to his involvement in significant corruption.  His actions have contributed to the undermining of Bangladesh’s democratic institutions and the public’s faith in public institutions and processes.

    Aziz Ahmed engaged in significant corruption by interfering in public processes while helping his brother evade accountability for criminal activity in Bangladesh.  Aziz also worked closely with his brother to ensure the improper awarding of military contracts and accepted bribes in exchange for government appointments for his personal benefit.

    This designation reaffirms the U.S. commitment to strengthening democratic institutions and rule of law in Bangladesh.  The United States supports anticorruption efforts in Bangladesh through assistance to make government services more transparent and affordable, improve the business and regulatory environment, and build capacity in investigating and prosecuting money laundering and other financial crimes.

    These public designations are made under Section 7031(c) of the annual Department of State, Foreign Operations, and Related Programs Appropriations Act.  This action renders Aziz and his immediate family members generally ineligible for entry into the United States.

     

     

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ    ২১ মে ২০২৪  রাত ১১ঃ ২৬
    শেষ আপডেটঃ   ২৩ মে ২০২৪, ভোর  ০৫ঃ ৪৬

  • ভারতের নির্বাচনী তামাসা ও আগামি দক্ষিণ এশিয়ার হবু চিত্র!

    ভারতের নির্বাচনী তামাসা ও আগামি দক্ষিণ এশিয়ার হবু চিত্র!
    গৌতম দাস
    ১৭ মে ২০২৪  সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫৪
    https://wp.me/p1sCvy-5Cc

     

       “ভারতের নির্বাচন কমিশনের ‘হাঁটু কি এখন দুর্বল’?”  – এটা গত ২০১৯ সালের ভারতের নির্বাচনের সময়ের বিবিসির রিপোর্ট। যা ভারতের নির্বাচনি তামাসা বুঝবার জন্য এখনও গুরুত্বপুর্ণ।

     

    ভারতের নির্বাচনী তামাসা!
    ভারতে এখন নির্বাচন চলছে। মানে সাতপর্বে ১৯ এপ্রিল থেকে ০১ জুন পর্যন্ত সাতটা আলাদা আলাদা দিনে বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মূলত মোট একই সিকিউরিটি ফোর্স বারবার কিন্তু নানান আসনে ব্যবহারের সুবিধা পাবার জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। নইলে, যেটা একই দিনে সব আসনে নির্বাচন হলে আসন প্রতি ফোর্সের সংখ্যা কমাতে হত, তা এখানে এড়ানো সম্ভব। আজ ১৭ মে ২০২৪;  মানে ইতোমধ্যে ভারতের চার পর্বেই নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেছে। এখন বাকি আছে ২০ মে, ২৫ মে আর ০১ জুনের নির্বাচন। মানে ০১ জুনেই সাত পর্বের নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে যাবে। এরপর দুদিন গ্যাপ দিয়ে ফলাফলের জন্য ৪ জুন সকাল থেকে সব ভোটের বাক্স নানা রাজ্যে একই দিনে একসাথে গণনা শুরু হবে। আর ঐদিনই দুপুর ১২ টার মধ্যে মিডিয়ায় বিশেষত টিভিগুলোতে কে কোথায় আগিয়ে আছে এই ট্রেন্ড [trend] বা অভিমুখ অনুমানের সুযোগ দর্শক-পাবলিকের কাছে এসে যাবে। যদিও সব ভোট গণনায় আরো সময় লাগবে। এরপর ঐদিনেই সন্ধ্যা সাতটার পর থেকে ক্রমশ আরো স্পষ্ট হতে থাকবে; ভোটের ফলাফলের আরো স্পষ্ট  অভিমুখ কোনদিকে। আর ঐদিনই রাত বারোটার মধ্যে অভিমুখ তো বটেই ফলাফলেও একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে কোন দলের জোট বিজয়ী হতে যাচ্ছে।  এই হলো এবারের ভারতের নির্বাচনি দিন-তারিখ!

    এবারের ভারতের নির্বাচন নিয়ে আমি  এপর্যন্ত এবারের হবু বা ইতোমধ্যেই ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী যা আসছে ও ঘটবে এসবের অর্থ তাতপর্য অথবা বিশ্লেষণ নিয়েও কিছুই লিখি নাই। তুলনায় গতবার মানে গত ২০১৯ সালের নির্বাচনের বেলায় সম্ভবত মোট আট / দশটা লেখা দিয়েছিলাম। তাহলে এবার দূরে আছি কেন?
    মূল কারণ, ২০১৯ সালে পুরা নির্বাচনের সময়ের ঘটনাবলীর খুবই কমই মনিটর করতে বাদ রেখেছিলাম। যেমন ভোটের আগের অন্তত তিনটা সার্ভে গ্রুপের সার্ভে সম্পর্কে স্টাডি ও ফলো করেছিলাম। যারা আবার একই সাথে  “বুথ ফেরত ভোটারদের” সাক্ষাতকার নিয়ে সার্ভে রিপোর্ট নিয়েও আমার স্টাডিতে অনেক সময় দিয়েছিলাম। শেষের দিকে ভারতের অনেক মিডিয়ার সাথে আমিও ধারণা দিচ্ছিলাম যে মোদির দল বিজেপি ও তাদের জোট[এনডিএ] সম্ভবত নির্বাচনের হেরে যাবে। কিন্তু না। মোদি-অমিত শাহের হাতে ভোটের বাক্স ম্যানিপুলেশনের [অবৈধ হাত ঢুকিয়ে ফলাফল উলটানো] ব্যবস্থা আছে। এবং তা খুবই সুনির্দিষ্ট করে ফল আনতে পারে এমন বা  যেখানে যতটুকু ফলাফল পালটানো দরকার তা করার ক্ষমতা সম্পন্ন। এদিকটা তখন আমল করা হয় নাই। তাই বিপত্তি। আর এবারও অনেক কিছুই পরিবর্তন হলেও মোদি-অমিত শাহের হাতে ভোটের বাক্স ম্যানিপুলেশনের ব্যবস্থা বহাল ও অটুট আছে বলেই জানি। তাই এবার দূরে থেকেছি লিখা থেকে যদিও, এবারেরও খবরাখবর রাখছি কিন্তু কিছু লিখি নাই।

    গতবারও এমন সব পর্বের নির্বাচনের পরে গণনার দিন শুরুর আগে এমন চারদিনের গ্যাপ ছিল। মনে করা হয় ঐ গ্যাপের দিনগুলোই মোদি-অমিতের চোখে এসব ম্যানিপুলেশনের উপযুক্ত সময় আর তা তখনই করা হয়ে থাকে বলে এপর্যন্ত যতটুকু জানা যায়। যেমন দেখেন, উপরে যে ছবিটা ব্যবহার করেছি সেটা ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিবিসির একটা রিপোর্ট থেকে নিয়েছি। যেখানে তখনকার শিরোনাম ছিল কত এগ্রেসিভ বা উদগ্র আক্রমানাত্মক! শিরোনাম লিখেছিল – “ভারতের নির্বাচন কমিশনের ‘হাঁটু কি এখন দুর্বল’!!!
    সেসময়ের অমিত শাহ যিনি এখন কেন্দ্র-সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (তখন তিনি কোন মন্ত্রীই ছিলেন না, কেবল ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক) তিনি তখন এক টিভি লাইভ শোতে এসে বলেছিলেন বিজেপি ৩০০ পার করবে। ভারতে সরকার গড়তে ২৭২+ আসনে বিজয়ী হতে হয়। তো ৩০০ পার মানে হল ৩০০ এর বেশী আসন পাবে। সত্যিই তাই ঘটেছিল। ২০১৯ সালে, একা বিজেপির মোট আসন পেয়ে হয়েছিল ৩০৩।  মোদি সেসময় মানে ঐ টিভি শো এর দিন কাশী (উত্তরপ্রদেশের খুবই গুরুত্বপুর্ণ হিন্দুদের এক তীর্থস্থান মনে করা হয়) থেকে ফিরেছেন। সেখানে নাকি তিনি কয়েকদিনের ধ্যানে বসেছিলেন!!! সেবারের নির্বাচনের শেষদিনের আগেই  মোদি কাশীতে গিয়ে ধ্যানে বসেছিলেন তাঁর হরেক রকমের রংঢঙ আর প্রপাগান্ডার অংশ হিসাবে। তাই সেই শো তে তিনি অমিত শাহের পাশে বসে থাকলেও বেশী কথা বলছিলেন না। তবে অমিত শাহের সেদিনের ঘোষণা ছিল যে তারা ৩০০ আসন পার করবেনই, এটা শোনার পর থেকে আমার মনে গভীরতম সন্দেহ শুরু হয়েছিল যে অমিত শাহের কথাই সম্ভবত সত্য হতে যাচ্ছে! আমি বোকা হয়ে যাচ্ছি!

    আগেই বলেছি অমিত শাহের কথা সত্য হয়েছিল; নিজ দলের আসন ছিল ৩০৩ আর সাথে বিজেপির নিজ জোট [NDA] এর আসন সহ মোট আসন হয়েছিল ৩৫৩। সেবারের মূলত এমন ম্যানুপুলেটেড বা হস্তক্ষেপ করা ফলাফলের কারণেই এবার ভারতের নির্বাচন নিয়ে কোন ধরণের লেখা লিখিই নাই। এড়িয়ে গিয়েছি। আর তাই এবার এটাই প্রথম লেখা। তাহলে আবার কেন ভোট পর্বের মাঝামাঝি সময়ে এখন লিখতে আসলাম?
    সেসব আরেক কাহিনী যা বাংলাদেশেও ছড়িয়েছে। ছড়িয়েছে কারণ এবার এক প্রবল অনুমান হল, মোদি এবার নির্বাচনে নাকি হেরে যাবেন। আর তাতে কংগ্রেসের রাহুল এন্ড গং মানে তাদের জোট ক্ষমতায় আসলে আমেরিকার সাথে তাদের বিশেষ সম্পর্কের সরকার হবে সেটা।  তাই বলাই বাহুল্য এর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের আয়ুসহ আনাচে কানাচে। সেকারণে এখন বাংলাদেশে যাই ঘটছে বা ঘটবে সেসকল ঘটনার সাথেও এইসব (মোদি হারবেন ধরণের) কল্পিত-অনুমিত ঘটানাবলীর মিল আছে কিনা সেই জল্পনা-কল্পনাও প্রবলে উঠেছে।

    যদিও এমন বহু ঘটনা – গুজব, আধা গুজব, আধা সত্যি  ইত্যাদি সবই কানে আসছে। তবুও ভারতের এবারের নির্বাচন নিয়ে আমার নিজ অবস্থান হল, মোদি-অমিত শাহের হাতে বাক্স ম্যানিপুলেশনের মেকানিজম নাই তা খর্ব বা অকেজো হয়ে গেছে একথা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত  শেষ বিচারে মোদির হারের কোন সম্ভাবনা (অন্তত আমার কাছে) নাই আর তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। যদিও এবার ইতোমধ্যেই এমনকি এখন ভারতের ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান -র- বলতে সেটা,  ‘মোদির র’ আর ‘কংগ্রেসি র’ বলেও ভাগের কথা উঠে গেছে, এমনটা সত্বেও!

    এমনিতে রাহুলের কংগ্রেস বা তাদের জোটের [I N D I A] পক্ষে বাইডেন প্রশাসন এবার দাঁড়িয়েছিল বেশ আগেই।  আর তাতেই  মোদিকে বিপুল অর্থদাতা ও তাঁর অবাধে খরচে উৎস যে আদানি গ্রুপ; আর এর বিরুদ্ধে বাইডেন প্রশাসনের লেগে পড়াতেই তাতে এই গ্রুপের শেয়ারে ধ্বস নামিয়ে দিয়েছিল, বলে মনে করা হয়। ওপেন সোসাইটি খ্যাত বা হেজ ফান্ড ব্যবসায়ী জর্জ সোরেস নিজেই [একালে বিভিন্ন দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমেরিকান হস্তক্ষেপের ধারা বজায় রাখতে যে অর্থের প্রয়োজন হয় তা যোগাতে আমেরিকা প্রশাসন আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে গেছে; তাই সেই অভাব পূরণে অর্থের চালান যোগাতে এখন সবচেয়ে বড় যোগান দাতা হয়েছে এই ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন নামের থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান। পুরানা সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙ্গে গেলে তা যে ১৫ রাষ্ট্র হয়েছিল এমন সব রাষ্ট্রেই আমেরিকান (এনজিও) হস্তক্ষেপ এর উসিলায় অর্থ ঢেলেছে এই প্রতিষ্ঠান। এটাকে তারা অরেঞ্জ রেভেলিউশন বলে ডেকে থাকে। ]
    বাইডেনের হয়ে ভারতে  আদানির বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিলেন জর্জ সোরেস; এক পাবলিক বক্তৃতা দিয়ে তিনি নিজে আদানির বিরুদ্ধে মার্কেট তাতিয়ে  ছিলেন। কিন্তু এতকিছু করে বাইডেন প্রশাসন আগিয়েও মাঝে হঠাত কংগ্রেসী রাহুলদের সব ততপরতায় ভাটা দেখতে পাই আমরা। রাহুলের জোটও অসংলগ্ন বা আভ্যন্তরীণ দ্বিধায় শ্লথ হতেই দেখেছিলাম। কিন্তু এবার ডোনাল্ড লু এর সফর [তিনি এমাসে বাংলাদেশে আসার আগে ভারত পরে শ্রীলঙ্কা সফর করে এসেছিলেন।] যেটা  বাইডেন প্রশাসনেরও ভাটা বা শেষ সময়ে সফর এটা; এবার তাঁর রুট ছিল ইন্ডিয়া-শ্রীলংকা হয়ে বাংলাদেশ।  আর লু এর এবারের ভারত সফরের পরে আমরা দেখি যে ‘ইন্ডিয়া’ জোটে সরব বা চাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। ওদিকে ভোট প্রদান চতুর্থ পর্বে এসে অবজারভেশন বলছে, ভোটপ্রদানের হার নিম্নমুখি। আর ভারতের ভোট বিশ্লেষকেরা একমত যে  মোট ভোটপ্রদানের নিম্নহার (%) মানে তা মোদির ভোট  কম  হবার লক্ষণ।  আবার ওদিকে ইরানের সাথে মিলে চাবাহার [Chābahār ] সমুদ্র বন্দর চালু ও ব্যবহারের ততপরতা শুরু করেছে ভারত বহুদিন এই প্রকল্প পরিত্যক্ত থাকার পরে। যদিও আবার ততপর হওয়াতে বাইডেন প্রশাসন ভারতকে থ্রেট করেছে, নিষেধাজ্ঞা বা ব্যবস্থা নিবার হুমকি দিয়েছে।
    ইত্যাদি এসব কিছু নতুন সব ঘটনাবলীতে মুল ঘটনা হয়ে উঠে আসছে বাইডেন প্রশাসন ও কংগ্রেসের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা অনেকদূর আগিয়ে গিয়েছে। আর তা থেকেই নিট ফলাফল হল, মোদির এবার হেরে যাওয়ার আলাপ, সম্ভাবনা বা গুজব উঠে আসছে তা বলা যায়। এককথায় বললে, বাইডেন প্রশাসনের কাছে, চলতি নির্বাচনে এক প্রো -আমেরিকান নয়া সরকার দেখতে চাওয়া হল তাদের প্রায়োরিটি। এই আকাঙ্খাটা খুব একটা কোথাও লুকানো ঠিক তা নয়। বরং কোথাও কোথাও এনিয়ে গভীর সব পরবর্তি পরিকল্পনা করতে বসে গেছে সংশ্লিষ্ট অনেকেই।  এমনকি তাতে কথিতভাবে মোদি আর অমিত শাহের মধ্যে গভীর দ্বন্দ্বের কথাও আবিস্কার করে রেখেছে অনেকে। অথচ এরা জানেনা মোদি-অমিত এরা দুজন ‘হরি আর হর এর মত’ হরিহরাত্মা!
    আর এই মিলিত-আত্মার জন্ম হয়েছিল ২০০২ সালে গুজরাত কিলিং  বা মুসলমান নিধনের কালে যখন গুজরাটি মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মোদি আর তাঁর ডানহাত ছিল এই অমিত শাহ, যিনি ছিলেন আবার ঐ মোদির রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! এই যুগল একসাথে আরএসএস-কে হাত করে, প্রভাবিত করে বিজেপি থেকে – লাল কৃষ্ণ আদভানি এবং অন্য দু’জন নেতা মুরলী মনোহর যোশি ও উমা ভারতী (এরা তিনজন হলেন আদালতের খাতায় বাবরি মসজিদ ভাঙার মূল আসামি) সহ অন্যান্য সব বুড়াদেরকে বয়সের অজুহাত তুলে দলের সব কমিটি থেকে বিদায় করে দিয়েছিল!  এরপর গত দশবছর ভারতের ক্ষমতায় থেকে তারা যা যা করেছে তা কেবলমাত্র এদুই জনের আজীবনের প্লান ও খায়েস বলে মনে করা হয়। এদের মাঝে আর কেউ নাই। তবে লিডার কেবল মোদিই। কাজেই যারা মোদি- অমিতের বিচ্ছেদ বা দ্বন্দ্বের কথার গল্প ছড়াচ্ছেন এই বিচারে তারা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এখনও শিশু!
    এছাড়াও, সবকথার শেখ কথা হল, মোদি-অমিতের হাতে যতক্ষণ ভোটবাক্স ম্যানিপুলেশনের সক্ষমতা আছে ততক্ষণ সব জল্পনা-কল্পনা অনুমান লু-তত্ব সবই ভুয়া আর অকেজো বলে হাজির হবেই বলে আমার ধারণা। মোদি আবার বিজয়ী হবেনই, সম্ভবত এভাবেই। এপ্রসঙ্গ আরেকটু কথায় শের দিকে আবার আসব। এর আগে উপরের কথা শেষ করে নেই।

     

    সফটওয়ার ভিত্তিক বাক্স ম্যানিপুলেশনঃ
    ততদিনে কানে আসছিল অন্য আরেক দিকের তথ্য, (দেশি-বিদেশি) ইন্টেলিজেন্স ইনফরমেশন যে মোদি ভোটের বাক্স বা ইভিএম বাক্স ম্যানিপুলেট (বাইরে থেকে প্রোগ্রামিং ব্যবহার করে ফল গণনা শুরুর আগেই হবু ফলাফল উলটে রাখা) করার সফটওয়ার সংগ্রহ করেছেন। অনুমান করা হয়ে থাকে এটা জুয়ারি শহর ম্যাকাও [Macao] আর- উত্তরকোরিয়া ভিত্তিক সফটওয়ার গ্রুপ যারা সাহায্য করছে বা করে চলেছে। অনেকে এমনকি এটাও মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ হ্যাকিংয়েও এই গ্রুপের কেউ কেউ টেকনিক্যাল কাজ ও দিকে এসব অর্থে ও সুত্রে জড়িত ছিল। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটা হল, এদিকটা নিয়ে মানে ভারতের নির্বাচনে ভোটের বাক্সের স্বচ্ছতা রাখা নিয়ে যত আবেদন  বা দাবি এপর্যন্ত তোলা হয়েছে এর সবই হয় ভারতের নির্বাচন কমিশন নিজে বা সুপ্রীম কোর্ট – এরা সেসব নাকচ করে ফেলে রেখেছে। কখনও সুপ্রীম কোর্ট বলেছে এটা কমিশনের কাজের উপর হস্তক্ষেপ হবে তাই তারা কিছু করবে না; আবার কখনও  (নির্বাচন) কমিশনের  কাছে মামলা ফেরত পাঠিয়ে হাত ধুয়ে ফেলেছে। আর নির্বাচন কমিশন বেশির ভাগ সময় যেকোন পাবলিকের আবেদনের ক্ষেত্রে জবাবই দেয় নাই বা নাকচ করে ফেলে রেখেছে। এনিয়ে আমার অন্তত তিনটা পুরানা লেখায় এসব নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছি। বেশিরভাগ সময় ফেরত পাঠানোর যুক্তিতে বলা হয়েছে যে এতে নির্বাচন ব্যবস্থা ফলাফল দিতে দেরি করবে বা ম্যানুয়াল ভোটের মত হয়ে যাবে তাই এতে হাত দেয়া যাবে না। অর্থাৎ যেন স্বচ্ছ নির্বাচন করা এটা প্রধান বিবেচনা নয়; এর বদলে অস্বচ্ছ ও কারচুপির সুযোগ রেখে দেওয়া আর এভাবেই তাড়াতাড়ি ফল আসার নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তোলাটাই আদালত ও কমিশনের কাছে লক্ষ্য!
    মজার কথা হল, এই অবস্থা সত্বেও কয়েকমাস আগে ভারতের প্রধান বিচারপতি বাংলাদেশে এসেছিলেন আমাদেরকে সবক শিখাতে যে ভারতের বা কোন দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায়  সুপ্রীম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের ভুমিকা কতই না মহান ও পবিত্র! আগ্রহিরা দেখতে পারেন এনিয়ে আমার পুরানা লেখা।

    যেটা অনুমান করা যায় সারকথায়,  মোদির তৈরি এটা একটা বিরাট র‍্যাকেট; অর্থ ও নানান ব্যক্তিগত সুবিধার আয়োজন ঘটিয়ে এই সিস্টেমটা দাঁড় করানো হয়েছে মোদি আর অমিত শাহের জুটিতে।  এবং ততই খোলাখুলি তাদের কাজের ধরণ। যেমন ২০১৯ সালের নির্বাচনে আইনভঙ্গের জন্য অনেক প্রার্থীকে সতর্ক করে ফাইন বা শাস্তি দিয়েছিল কমিশন। কিন্তু মোদির নামে বহু অভিযোগ জমা পড়লেও বা স্থানীয় নির্বাচনী কমিশন কর্তারা একশনের অনুমতি চাইলেও কমিশনারেরা তাতে অনুমতি দেয় নাই। অর্থাৎ প্রার্থী মোদি বিরুদ্ধে নির্বাচনি আইন ভঙ্গের সব অভিযোগই ব্যবস্থাহীন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থেকেছিল সেবার।  ভারতের নির্বাচন কমিশন প্রধান-সহ তিন সদস্য বিশিষ্ট। এটা সব সময় তাদের দুই-এক ভোটে এমন সিদ্ধান্ত দিয়েছিল সেসময়। আর তৃতীয় সদস্য অশোক লাভাসা, তাঁর আপত্তি ভোট সবসময় সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখিয়ে উপেক্ষা করা হয়েছে। সেই নির্বাচন শেষে কয়েক বছরের মধ্যে শেষে অশোক লাভাসাকে কমিশন ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। আপোষ করে তিনি এখন ম্যানিলায় বিশ্বব্যাংক সমতুল্য এডিবি-তে ভারত সরকারের প্রতিনিধি হয়ে লটকে আছেন। মানে নির্বাচন কমিশন থেকে তাঁকে বের করে দেয়া হয়েছে কায়দা করে।
    এমনকি এখনকার যে নির্বাচন কমিশন তা এবারের নির্বাচনী তারিখ ঘোষণার আগের সপ্তাহেও হয়ে পড়েছিল, এক সদস্য বিশিষ্ট; মানে কেবল প্রধান কমিশনার বিশিষ্ট। কারণ, আভ্যন্তরীণ আয়োজনে মোদি বাকি দুজনের পদত্যাগ করায়ছেন যাতে মোদি নয়া দুজন নতুন পছন্দের কমিশনার নিতে পারেন। তাই-ই হয়েছিল। আর এরপর তিন-সদস্য বিশিষ্ট হয়েই দুদিন পরে ঐ কমিশন এবারের নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করেছিল। আমাদের দুদকের মত তথাকথিত এমন নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান মোদির হাতে অনেকগুলো। যেমন সিবিআই [Central Bureau of Investigation], ইডি[Enforcement Directorate] ,  এনআইএ [National Investigation Agency], আইবি [Intelligence Bureau (India]; এছাড়া আয়কর বিভাগ আছে। আর এর বাইরে যে আর কত এমন প্রতিষ্ঠান আছে অগুনতি। কিন্তু সারকথা হল, বিভিন্ন রাজ্যের বিরোধীদলের বিরুদ্ধে মোদি্র এদের লাগিয়ে দেয়া, হয়রানি করা, বিজেপির সাথে আপোষে আসতে বাধ্য করাই এদের মুল লক্ষ্য হয়ে আছে মোদির ইচ্ছায়। এসবই মূলত পলিটিক্যাল স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহার।
    আর এর বাইরে গত পাঁচ বছরে ধরে চলেছে মোদির আরেক মারাত্মক ব্যবস্থা। এর আনুষ্ঠানিক নাম ইলেকটোরাল বন্ড [electoral bonds] স্কিম। সরকারী ব্যাংক স্টেট ব্যাংক [SBI] থেকে এটা কেবল যেন বিজেপি-কে চাঁদা আদায়ের এ’এক আজিব ব্যবস্থা। এই ব্যাংক আসলে বড় ব্যবসায়ীদেরকে এই বন্ড বিক্রি করে থাকে; কিন্তু কে কিনল সে পরিচয় পাবলিকলি দেখায় না। আর বিজেপি সরকার উপরে যে দুদক সমতুল্য প্রতিষ্ঠানের কিছু নাম দেখালাম, এদেরকে দিয়ে হয়রানির ভয় দেখিয়ে ঐ ব্যাংকে চাঁদা জমা করে আসতে মানে বন্ড কিনতে বাধ্য করে থাকে। এখাতে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুসারে প্রায় একমাত্র সুবিধাভোগী হল বিজেপি। আর মোট এমন বন্ডের পরিমাণ ১২ হাজার কোটি রুপীরও বেশী। গত ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে থেকে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। এটা পাঁচ বছর লুটপাট করতে দিবার পরে এবার নির্বাচনের আগে সুপ্রীম কোর্ট বীর হয়ে উঠেছিল। তারা ওসব চাঁদাদাতা সবার নামের তালিকা চলতি নির্বাচনের কয়েকদিন আগেই একদিনের মধ্যে  প্রকাশ করতে “স্টেট ব্যাংক-কে পালনীয় বাধ্যতামূলক” বলে নোটিফাই করেছিল। আর তাতেই সব নাম বের হয়ে আসে। অথচ পাঁচ বছর আগেই একাজ তারা করতে পারত।
    সবচেয়ে বড় কথা উপরে যেসব ইনভেস্টিগেশন প্রতিষ্ঠানের অল্পকিছু তালিকা দিয়েছি সেগুলো অপব্যবহার করেই বিজেপি সব বিরোধীদল আর ব্যবসায়ীদেরকে সাইজ করে গেছে যাচ্ছে। অথচ না সুপ্রীম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন এদিকে তাকায়-ই নাই। এটাই মূলত মোদির নামে এখন ফ্যাসিজমের অভিযোগ তুলেঅনেককে আগিয়ে আসতে দেখছি। কিন্তু এমন অভিযোগ তোলার ক্ষমতা এখনও যেন তাদের দেশের বাইরে – বাইডেন প্রশাসনের হাতে! এমনই দুর্দশা!

    আর এমন মোদি-ব্যবস্থার মধ্যেই আবার এবারের নির্বাচন হচ্ছে! আর কোর্ট বা কমিশন এব্যাপারে নির্বিকার! দেখেন এটা কমবেশি এখন সবাই জানে যে সরাসরি মুসলমানবিদ্বেষ করে ঘৃণা জাগিয়ে মোদি ভোটের প্রপাগান্ডা পরিচালনা চালিয়ে যাচ্ছে! অথচ এটা ঠেকানোই ছিল কোর্ট এবং কমিশন   এর মুখ্য দায়ীত্ব! কিন্তু এরা নির্বিকার! এটাই প্রমান করে ভারত কোন চুলায় মাথা লুকায়েছে! অথচ সমাজ অসহায়! এমনকি মোদিকে ফ্যাসিবাদ বলতেও যেন সাহস করছে না!

    এখন দুইটা শেষ কথাঃ
    অনেকাংশেই কথাগুলো বলব ভারত-ইরানের চাবাহার পোর্ট কে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি ইরান-ভারত চুক্তি হয়েছে। আর তাতে পোর্ট পরিচালনা ভারতকে দেয়া হয়েছে। আর তাতেই আমেরিকা ভারতকে কড়া স্যাংশনের হুশিয়ারি দিয়েছে।

    ১। এই নির্বাচনে মোদি ফিরে জিতুক কিংবা বিরোধি কোয়ালিশন জিতুক – একটা মূল কথা হল, ভারত ক্রমশ আমেরিকা থেকে দূরে যেতে থাকবে।  মানে ততই ভারত একেবারে চীনের কোলে উঠে না গেলেও অন্তত নিউট্রাল বা একধরণের গভীর ব্যবসায়িক সম্পর্ক করতে অনেক ধাপ আগিয়ে যাবে। এককথায় বললে, চীন-ভারত উভয়ের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ বিষয়ক দুরত্বটা ফিকে হতে থাকবে। আর ব্যবসায়িক স্বার্থ ততই ওর জায়গা নিবে।
    বাংলাদেশের গত কথিত নির্বাচনের কয়েকদিন আগে আমি লিখেছিলাম আমেরিকা আমাদেরকে রাস্তায় ফেলে চলে গেলে তা এশিয়া থেকেই আমেরিকার বিদায়ের সুত্রপাত ঘটবে। এখানে সেই কথাটাই বলছি তবে আরেক ভাবে আরেক দিক থেকে। এবার মোদি ক্ষমতায় নিজেকে বিজয়ী দাবি করে টিকে গেলে ইন্ডিয়া-আমেরিকার সম্পর্কের পতন ও পারস্পরিক দুরত্ব ঘটবে খুবই দ্রুত। আর যদি কংগ্রেস এন্ড গং জিততে পারে তবে সাময়িক এই নয়া সরকার আমেরিকা-ঘনিষ্ট বলে নিজেদের দেখানো শুরু করবে। কিন্তু সেটা হবে সাময়িক ক্ষীণ আয়ুর এক ঘটনা। মানে জমবে না। অচিরেই একেবারে সাধারণ ব্যাবসায়িক স্বার্থের বিরোধ বাধা হবে।
    যেমন ধরা যাক, ভারত-ইরানের চাবাহার পোট [Chabahar Port ]। এটা এদুই দেশের জন্যই গুরুত্বপুর্ণ , তবু ভারতের জন্য বেশী।  পাকিস্তানের গোয়াদর গভীর সমুদ্র বন্দর ভারত পুরানা ক্যাচালের কারণে ব্যবহার করতে পারবে না। এর মানে হল, সেন্ট্রাল এশিয়া বা আফগানিস্তানে (ল্যান্ডলক দেশ) পণ্য পাঠাতে অসুবিধায় পড়তে হবে। অথচ ঐ রুটে শুধু গোয়াদরের সুবিধা না। আর গোয়াদর ব্যবহার করতে পারলে এরপর ওদিকে চীনের বেল্ট-রোধ ধরে একদিকে একেবারে ইউরোপ পর্যন্ত ট্রেন বা সড়ক পথে পরিবহনের যে সুবিধা; অন্যদিকে ইরান থেকে পুবে সেন্ট্রাল এশিয়া আফগানিস্থান যে সড়ক ও রেল সুবিধা তৈরি হয়েছে তা থেকে ভারত বঞ্চিত হয়ে আছে।  এসব কিছুরই অন্তত এক ছোট বিকল্প হলেও চাবাহার ভারতের জন্য এক ভাল বিকল্প ও বাস্তবতা।
    কিন্তু আমেরিকা ইরানের সাথে কোন সম্পর্কই রাখা যাবে না কেউ রাখলে তার উপর স্যাংশন দেয়া হবে – এই হুশিয়ারিই আমেরিকার এশিয়া থেকে বিদায় হয়ে যাবার পথেই তাকে কয়েক ধাপ ঠেলে দিবে। কারণ, ভারতে মোদি অথবা রাহুল যাদের সরকারই আসুক কারোই চাবাহারের পক্ষে না থাকার বিকল্প নাই। কারণ, এটা ভারতের জন্য বিরাট এক বাণিজ্যিক সুযোগ। কাজেই আমেরিকা বিরোধিতার পথেই ভারতকে যেতে হবে।

    আবার সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ  আরেকদিকের কথা বলিঃ
    ইরানের ভারতকে দেয়া এই অফার – এবিষয়ে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি এতে চীনের সম্মতি আছে। আর আছে বলেই ইরান সহজেই এতদুর আগিয়ে পোর্ট পরিচালনার ভার ভারতকে দিয়ে দিয়েছে। যেখানে আমেরিকান সুবিধা খেতে ট্রাম্পের আমলে ভারত ইরানের হাত ছেড়ে পালিয়েছিল। সেসময় ইরান তেল ভারতে পৌছে দিতে চেয়েছিল তাও ভারত ইরানের তেল কিনতে রাজি হয় নাই। বরং রাজি না হয়ে এই সিদ্ধান্তকে বিক্রি করে আমেরিকার থেকে সুবিধা নিয়েছিল। সেই থেকে চাবাহার প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে গেছিল। কিন্তু প্রতিশোধ ভুলে এখন ইরানের আবার আগানো এটা চীনের আগ্রহ ও প্ররোচনাতেই বলে অনুমেয়। চীনের ক্যালকুলেশন পাকা যে ইরান এই সুবিধা দিলেই ভারতের আমেরিকার বিরোধিতা বাস্তবতা হয়ে উঠবে।  আর সেটা দেখতেই ইরানকে দিয়ে এই অফার। বাণিজ্যিক দিক থেকে এতে ইরানেরও তো ক্ষতি নাই।
    আবার এ’ঘটানার মাধ্যমে চীন ভারতের কাছে ম্যাসেজ দিয়েছে যে ভারতেরও বাণিজ্য সুবিধা কার্টেল / ছেটে ছোট করা চীনের নীতি নয়, তাতে চীন-ভারত যতই বিরোধ থাকুক। আসলে চীন ভারতকে বলতে চায় ভারতও গোয়াদর ডিপ পোর্ট হয়ে বেল্ট-রোড ধরে সেন্ট্রাল এশিয়া বা আফগানিস্থানে বা অন্যদিকে, ইউরোপ পর্যন্ত চীনা বেল্ট-রোডের রেল ও সড়ক ফেসিলিটিজও ব্যবহার করতে পারে। চীন এনিয়ে বাধা তৈরির বদলে পজিটিভলি আহবান জানাচ্ছে। ভারতের অর্থনীতি বিকাশে চীনের ক্ষতি নাই, লাভ আছে। এছাড়া সবচেয়ে বড় লাভ দক্ষিণ এশিয়া থেকে আমেরিকাকে আউট করা হবে তাতে। কারণ, আমেরিকা ভারতে পা রাখতে সুযোগ পায় বলেই বার্মা, বাংলাদেশের মত দেশে যা খুশি করার চেষ্টা করে থাকে।
    এখন মোদি ক্ষমতায় ফিরলে আমেরিকা-ভারতের সম্পর্কের ইতি দ্রুত ঘটবে। আর আমেরিকা ভারতের উপর স্যাংশন দিলে তাতে ভারতও দ্বন্দ্ব ভুলে বাধ্য হয়ে ডলার ফেলে ইউয়ানে বাণিজ্য শুরু করে দিবে।  আবার যদি কংগ্রেস কোয়ালিশন ক্ষমতায় আসে তাহলেও এটাই ঘটবে। হয়ত শুরুর এক বড় জোর দুই বছর একটু আমেরিকান-ভারত (কংগ্রেস) ঘষাঘষি জারি থাকবে। আর ক্রমশ সেটা ভারতের বাণিজ্য স্বার্থেই হবু কংগ্রেস সরকারও একই পথ ধরবে। খুব সম্ভবত সেক্ষেত্রে মোদির চেয়ে দ্রুতই কংগ্রেস চীনের কোলে গিয়ে উঠার সুযোগ নিতে চাইবে।

    ২। মোদি যদি ক্ষমতায় ফিরতে পারেনঃ
    সেক্ষেত্রে এটা চরম দানব এক মোদি হবে। বিরোধী বলে কারো অস্তিত্ব নিয়ে টিকাই মুশকিল হয়ে যাবে। ইতোমধ্যেই কানাঘুষা তিনি ভারতের কনষ্টিটিউশনেও হাত দিবেন।  এই ধারা যতই তীব্র হবে হিন্দুত্ববাদী – এই উগ্র জাতিবাদি মোদির ভারত ততই পরিণতিতে বিচ্ছিন্নতা বাদের মুখোমুখি হবে। আর তা ঘটে গেলে ভারত মেজর তিন টুকরা হবে। মোদি এখন ক্ষমতায় টিকে আছে ভারতরাষ্ট্র গঠনগত দিক থেকে এক সেন্ট্রালাইজড কুক্ষিগত ক্ষমতার আর এর উপর আবার উগ্র হিন্দু-জাতিবাদি রাষ্ট্র বলে। আবার এটাই আবার মোদির আগামিতে ক্ষমতায় উত্থান ঘটলে এই গঠন বৈশিষ্টই মোদির ভারতকে ভাঙ্গনের দিকে নিয়ে যাবে দ্রুত!

    সব মিলিয়ে ভারতের প্রতিটা পরিবর্তনের ধাক্কা চাপ (এমনকি শরণার্থীর) বাংলাদেশে এসে আছড়ে পড়তে পারে সেক্ষেত্রে! বাকি যা কিছু পাঠক আন্দাজ করে নিয়েন। এই হল, আগামি দিনের দক্ষিণ এশিয়ার কিছু বিচ্ছিন্ন চিত্র!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ    ১৭ মে ২০২৪  সন্ধ্যা ০৭ঃ ১৮
    শেষ আপডেটঃ   ২৪ মে ২০২৪  বিকাল ০৩ঃ ৫৫

  • রেহমান সোবহান কেন বললেন – জিয়া ঋণ খেলাপীর জনক; কথাটা কী সত্য?

    রেহমান সোবহান কেন বললেন – জিয়া ঋণ খেলাপীর জনক; কথাটা কী সত্য?
    হাসিনা থেকে পদক, সম্মাননা পেতে তিনি এত মরিয়া কেন?
    গৌতম দাস
    ২৯ এপ্রিল ২০২৪  সন্ধ্যা ১৮ঃ ৪৬
    https://wp.me/p1sCvy-5xj

     

    দেশে খেলাপি ঋণের জনক জিয়াউর রহমান: রেহমান সোবহান

     

    [রেহমান সোবহান কেন বললেন – জিয়া দেশে ঋণ খেলাপীর জনক; কথাটা কী সত্য?
    এছাড়া তিনি হাসিনা থেকে পদক সম্মাননা পেতে এত মরিয়া কেন?]

    বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সিপিডি [CPD] এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান ও চেয়ারম্যান হলেন অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান,  যার বয়স এখন ৮৯ বছর। ভেবেছিলাম এই বয়সে আর তাঁকে নিয়ে কিছু বলব না; অন্তত তিনি মুরুব্বি বয়সের, এই খাতিরে! কিন্তু না। তিনি নিজেই যেন তা হতে দিতে চান না! মানুষের জীবনকালের কাজে-কর্মে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় ভুল শুদ্ধ বহু কিছুই হয়, হতেই পারে। কিন্তু জীবন সায়হ্নে এসেও স্বাভাবিক বাস্তবতা থেকে পালিয়ে কেউ যখন নিজেকে ভুলহীন বিশুদ্ধজ্ঞানে উপস্থাপন করতে চায় অথবা এদিকটা যেন বুঝেবই নাই, খেয়াল করেন নাই অথবা নিজ কৃতকর্মের কোন দায় নিতে চায় না ইত্যাদি আচরণ করে বসে,  এটা খুবই পীড়াদায়ক!  একারণেই মনে হচছে, এই শেষ জীবনে এসে এখন তিনি যেন “বাঙালি জাতিবাদের” এক ভগবান হয়ে উঠতে চাইছেন। যিনি আবার যেন সব ভুল-শুদ্ধের উর্ধে! অন্যদিকে আবার হাসিনার এই পনেরো-ষোল বছরের শাসনের দিকে তাকালে দেখতে পাই – যারা হাসিনার বাবার আমলে মানে তাঁর বাবার সাথে কাজ করেছেন, স্মৃতি আছে তাদের অনেকের প্রতি হাসিনা বিশেষ “আনুকুল্য” দেখিয়েছেন। পদক প্রদান, বিশেষ সম্মাননা থেকে বৈষয়িক লাভালাভ পাইয়ে দেয়া ইত্যাদি্র ভাল-মন্দ তিনি করেছেন।  আর এটাই আবার অনেকের ক্ষেত্রে কাল হয়ে দাড়িয়েছে যে জীবন সায়হ্নে এসে হলেও যেভাবেই হোক হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে কিছু একটা উসিলায় হাসিনার আনুকুল্য আদায় করে তবেই বাকি জীবন শেষ করতে চান!
    যদিও এই দৃষ্টি-আকর্ষণ করে সুবিধা নেয়ার ফেনোমেনা – এটা আবার দেখা যায় সুবিধা-বাদিদের কেবল শেষ জীবনের আকাঙ্খার বিষয় না। যেমন উপরের দিকের সরকারী আমলারা জেনে গেছেন যে নিজ পরিবারের কেউ আওয়ামি লীগ করতেন বা তিনি নিজে ছাত্রলীগ করেছেন এটা বেচে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ আছে; এমন অনেকেই সচিব হওয়া বা ভাল পদোন্নতি নিয়েছেন এটা তো হাসিনার এই আমলে ডাল-ভাতের রেওয়াজ।  এমনকি সারা জীবন জাসদ বা বাসদ করেছেন অথচ এখন হাসিনার ছাত্রলীগ করেছেন বলে দেখিয়ে দাবি করে সচিব বা সমতুল্য পদোন্নতি নিয়েছেন এমন অনেক পরিচিত, সহপাঠি বা অপরিচিতকেও চিনি। এসব এখন খুবই কমন! এটাকেই অনেকে আবার মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী এখন ক্ষমতায় অথবা এটাই ‘চেতনার” রাজনীতিক ক্ষমতার মহিমা ও তাতপর্য বলেও  এক নামি কমিউনিস্ট একবার আমাকেই বুঝিয়েছিলেন!

    বাংলাদেশ যাত্রা শুরু কথিত এক  “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” দিয়ে, কারা ছিলেন এর মূল কারিগরঃ
    বাংলাদেশে জন্মযাত্রার শুরুতে কথিত এই  “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির” এক অন্যতম কারিগর ছিলেন রেহমান সোবহান। তবে কমিউনিস্ট-সমাজতন্ত্রীদের আবেগ-বিবেকের তর্কের চক্কড়ে না পড়ে, ব্যাপারগুলো আরেক দিক থেকে দেখব ও দেখাব।  বাংলাদেশের ইতিহাসে কমিউনিস্টদের কমিউনিস্ট ভাবনা থেকে আনা গজব, সবচেয়ে ক্ষতিকর ব্যবহারিক কাজ হল কথিত এই  “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি”; ১৯৭২ সাল থেকেই যার নেতৃত্বে ছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ – ততকালীন অর্থমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রী ও পাট মন্ত্রী এসবগুলোই ছিলেন তাজউদ্দিন একাই। তাঁর নেতৃত্বেই কথিত “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” কায়েম করতে যাওয়া হয়েছিল। যার করুণ পরিণতিই হল ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ! এমনকি এখান থেকেই যে শেখ মুজিবের হত্যা বা মৃত্যুর পরিস্থিতি যে আসন্ন হয়ে উঠবে এমনটা খুব কেউ বুঝেনই নাই। তবে তখন এমন অনুঘটক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পিছনের মূল কারণ কিন্তু এই কথিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির ডেকে আনা  দুর্ভিক্ষ – এই করুণ পরিণতি, সেটা বলাই বাহুল্য! তবে এই কথিত সমাজতন্ত্রের সারকথা বা মুখ্য বাণী-টা ছিল যে, দেশের কারখানাসহ “সকল উতপাদন ব্যবস্থাকে সরকারী মালিকানায়” নিয়ে যেতে পারলেই নাকি মোক্ষলাভ ঘটবে!

    এমনিতেই কোন প্রতিষ্ঠানের ‘ম্যানেজমেন্ট’ মানে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ব্যবস্থা যা ঐ প্রতিষ্ঠান/অফিসের, দক্ষতার সাথে উতপাদন ব্যবস্থার জন্য খুবই জরুরি; আর এছাড়া, প্রতিষ্ঠানটা টিকতে পারবে কিনা এর জন্য ভাইটাল বিষয়। কিন্তু সোভিয়েত কমিউনিজম এর চোখে ম্যানেজমেন্ট ধারণাটাই নাকি এক “শোষণ ব্যবস্থার” ধারণা; তাই এটা তাদের চক্ষুশুল ছিল!  অর্থাৎ ম্যানেজমেন্ট মানে দক্ষ উতপাদক হওয়া এটা নাকি বুর্জোয়া ধারণা; আর এটা নাকি তাই শোষণের হাতিয়ার!

    কোন নীতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় তা কাজ করছে আগাচ্ছে যেটা বুঝার ঊপায় কিঃ
    তবু এসব কথা এখন থাক; এসব কথা এখন পাশে ফেলে রেখে যদি একটু আগাই তবে, একটা দেশের সমগ্র অর্থনীতিক পরিকল্পনা নিয়ে আগানো (তা বিশেষ “পবিত্র জ্ঞান করা” সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি বা যেকোন অর্থনীতিই হোক না কেন)  বা বাস্তবায়নে চলে গেলে এরপর এই অগ্রগতি কাঙ্খিতভাবে চলছে কীনা এটা দেখার কোন ব্যবস্থাও সাথে থাকাটা খুবই প্রয়োজনীয় একটা দিক। এটাকেই বলে মনিটরিং বা অগ্রগতি মনিটর ব্যবস্থা যার থাকাটা খুবই এসেনশিয়াল আর প্রফেশনাল কাজের পুর্বশর্ত। এখান থেকেই মনিটরিং এর ইন্ডেক্স [index] বাংলায় যেটাকে আমরা সূচক বা নির্দেশক নামে চিনি বা বলি – তা খুবই গুরুত্বপুর্ণ!  কারণ কী দেখে বুঝব অগ্রগতি  পরিকল্পনা মাফিক ও দিকে চলছে কিনা?   কারণ না হলে যদি পরিকল্পনাটা পাঁচবছরের হয় তাহলে কী কেবল পাঁচবছরে পরেই জানা যাবে যে পুরা পরিকল্পনাটাই আসলে ফেল করেছে? অথবা সফল হতে যাচ্ছে?  নাকি প্রকল্প শুরু হওয়ার সুনির্দিষ্ট সময় পরে পরে যেমন ধরা যাক,  প্রতি তিনমাস পরে কখন কী কী  অগ্রগতি ও লক্ষণ-সুচক দেখা যাবে; এভাবে বা ওভাবে কখন কী দেখা যেতে  হবে  – এটাই সুচক ইন্ডেক্স এর মাপামাপি।  অর্থনীতির অভিমুখের সিগনাল দেয় এটা!   কিন্তু যদি অন্তত শুরুর একবছর পরেও এমন কোন রেজাল্টই না দেখা যায় তবে আগেই বুঝে নিতে হবে যে এই প্রকল্প ফেল করতে যাচ্ছে, ইত্যাদি। এগুলোকেই মোটাদাগে – অগ্রগতি মনিটর ব্যবস্থা- বলে বুঝা হয়।

    এখন তাজউদ্দিনের সেই “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি”  কায়েমের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অপরাধ ও অঘটনমূলক ঘটনাটা ছিল যে, তারা সমাজতন্ত্র  প্রতিষ্ঠার এই “পবিত্রকাজে” রওনা করার পরে মানে একেবারে আড়াই বছর পরেই দেখলেন ও জানলেন যে এটা নুন্যতম সফলতা দূরে থাক তাদের এই পবিত্র অর্থনীতি দেশে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ডেকে এনে সব শেষ করে দিয়েছে। রাষ্ট্র-সরকার মুখ থুবড়ে পড়েছে। এই ফলাফল দেখে আমাদের অনুমান কোন মনিটরিং ব্যবস্থার সুচক সেখানে রাখা হয় নাই; বরং বিপ্লবী রাজনৈতিক আবেগে সবাই ভরপুরভাবে ডুবে ছিল!!

    আর এই পরিণতি  দেখে সবার আগে এসব “অকর্মা সমাজতন্ত্রীদের” সকলকে পদত্যাগ করিয়ে সরিয়ে দিয়েছিলেন ক্ষুব্ধ শেখ মুজিব।  শুধু তাই না, ঐ ১৯৭৪ সালেরই সেপ্টেম্বরে (সেবারের জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের উসিলায়) আমেরিকা গিয়ে কিসিঞ্জারের সাথে প্রথম দেখা করেছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য সেই প্রথম বিশ্বব্যাংক-কে সংশ্লিষ্ট করা; মানে দ্রুত অনুদান, ঋণ জোগাড়। গত ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ লাভ করলেও মুজিব সরকার বা অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সাথে কার্যকরি কোন সম্পর্ক করতে যান নাই; তাঁরা সম্পর্ক না রাখাটাই বিপ্লবীপনা বলে বুঝেছিলেন!  ফলে আমাদের অর্থনীতিতে বিশ্বব্যাংকের অনুদান, সাহায্য যোগাড় ধরণের কোন খাতাই খোলা হয় নাই। কারণ এই মন্ত্রী তাজউদ্দিন ও তাঁর সহ বিপ্লবীরা কেনিয়াতে ১৯৭৩ সালেও সে সময়ের বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের [রবার্ট ম্যাকনামারা] সাথে আলোচনার প্রস্তাব (পরিচিতি ও সৌজন্য সাক্ষাত) পেলেও এই সোভিয়েত বিপ্লবীরা তা প্রত্যাখ্যান করে ফেলে রেখেছিলেন। প্রতি পরের-বছর বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন হয় দুনিয়ার নানান দেশে; সেটাই সেবার হয়েছিল KENYA 1973 হিসাবে; এখানে এক আর্কাইভ লিঙ্ক দেওয়া হল যারা এবিষয়ে আরও গভীরে যেতে চান এমন আগ্রহিদের জন্য। আবার একালেও অনেক বিপ্লবীকে (আনু মোহম্মদ ও তাঁর বন্ধুদের) দেখা যায় বিশ্বব্যাংককে এই প্রত্যাখানকে নিয়ে গর্ব করতে।  আসলে না জানার অনেক সুবিধা যা খুশি বলা যায়!!!  এছাড়া যদিও এর আগে ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট ম্যাকনামারা বাংলাদেশে এসে শেখ মুজিবের সাথে দেখা করে একই প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এছাড়া, VOA এর এক ভিডিও তে দেখা যায় তাজউদ্দিনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

    এবার মূল প্রসঙ্গে আসি;  রেহমান সোবহান ক্রমশ চরম বিপদজনক হয়ে উঠছেন। যেন দেশ জাহান্নামে গেলেও মৃত্যুর আগে তাঁকে হাসিনার থেকে পদক-সম্মাননা পেতেই হবে! জীবন সায়হ্নে হাসিনার দৃষ্টি ও আনুকুল্য পেতে যাতে তিনি “বাঙালি জাতিবাদের” এক ভগবান হিসাবে কোন পদক বা সম্মাননা পেতে পারেন যেন একারণেই মরিয়া হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশ জন্মের পরে সেই ১৯৭২ সাল থেকেই তিনি কথিত “পরিকল্পিত ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” কায়েমের কালে টপ তিন-চারজনের একজন ছিলেন। তিনি ছিলেন স্বাধীনতা পরবর্তি সেকালের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য।  আবার মনে রাখতে হবে সেকালের পরিকল্পনা কমিশন মানে সাংঘাতিক ব্যাপার, আজকের মত গুরুত্বহীন না। এর মূল বৈশিষ্ট বুঝতে হবে এভাবে যে, সেকালে সমাজতন্ত্র মানেই হল পরিকল্পিত অর্থনীতি এমনটাই গর্বের সাথে বুঝা হত;  আবার এর অর্থনীতিক পরিকল্পনা হত পাঁচসালা, পাঁচ বছরের জন্য। তাই সব সময়ই দেশের অর্থনীতি এক চলমান পাঁচসালা পরিকল্পনার অংশ হয়ে থাকত। কিন্তু ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রের এসব ভংচং সবকিছুই নিজ গৌরবে খতম হয়ে গেলেও এই পাঁচসালা পরিকল্পনার রেওয়াজটা পরেও কিছুদিন চালু ছিল।। স্মরণ হাতড়ে বলছি ১৯৮০ এর দশকে এটা লুপ্ত হয়ে যায়। কাজেই রেহমান সোবহানের সেকালে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য থাকা ছিল অনেক ভারী জিনিষ। একালে দেখছি সিপিডি থেকে প্রকাশিত তাঁর বায়োডাটায় ব্যপারটা লেখা আছে এভাবে ……He served as Member, Bangladesh Planning Commission, in charge of the Divisions of Industry, Power and Natural Resources, । সেই সাথে ওখানে আরো লেখা আছে যে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্টের এডভাইসারি কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন যার এক্তিয়ার বা কর্মক্ষেত্র ছিল পরিকল্পনা বিভাগ ও অর্থনীতির ইআরডি [ERD] বিভাগ। এখানে  পাঠককে জানিয়ে রাখা ভাল যে বাংলাদেশে বাকশাল শাসন (২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫) কায়েমের পর থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত দেশে প্রেসিডেন্সিয়াল সরকার ব্যবস্থা চালু ছিল।  যার সারকথা হল সেটা প্রধানমন্ত্রী ব্যবস্থা নয় বরং প্রেসিডেন্টই সব ক্ষমতার উতস ও সরকারের প্রধান নির্বাহি ক্ষমতাধারী; মানে কোন প্রধানমন্ত্রী নয় বরং প্রেসিডেন্টের হাতেই সব ক্ষমতা ন্যস্ত ছিল। তাই রেহমান সোবহানের ১৯৯১ সাল পর্যন্ত – প্রেসিডেন্টের এডভাইসারি কাউন্সিলের সদস্য- কথার মানে ও ওজনদার তাতপর্য, সেটা আমাদের বুঝতে হবে। আর তা জিয়া ও এরশাদ এদুই প্রেসিডেন্টের আমল জুড়ে সেটাও বুঝতে হবে।

    আবার সম্প্রতি দেখলাম সম্ভবত রেহমান সোবহান তার জীবনী প্রকাশ উপলক্ষ্যে তিনি যা বলছেন এর সারকথা হল, বৃটেনে থাকার সময়ের লেবার পার্টি করেই তিনি ‘কমিউনিজম’ শেখেছেন। কি সাংঘাতিক কথা আর, কী সহজ তাই না!!  এর মানে কার্ল মার্কসের কোন মূল লেখা বই বা কোন গুরুত্বপুর্ণ আর্টিকেল পাঠ নিয়ে কিছু জেনেছেন – এভাবে এটা তাঁর জানবার পথ ছিল না। এখন তাই তাঁর নিজেই নিজেকে মুল্যায়ন করা উচিত যে, শুধু এটুকু দিয়ে “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” করতে যাওয়া কী ঠিক হইছে? বাংলাদেশের প্রতিটা সাধারণ মানুষ যার দ্বারা এফেক্টেড ও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল??? এটা কী কোন ছেলেখেলার বিষয়?  বিশেষ করে বৃটিশ লেবার পার্টি মানে তো ওয়ার অন টেররের কালে প্রেসিডেন্ট বুশের সহযোগী প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার এর পার্টি! এছাড়া বড় জোর ওর জ্ঞানের দৌড় হল এক ট্রেড ইউনিয়নিস্ট এর যেমন থাকে! লেনিন কেন নিজ পার্টিরই কোন ট্রেড ইউনিয়ন করার বিরুদ্ধে ছিলেন, আগ্রহিরা সেটা জেনে নিতে পারেন!

     রেহমান সোবহানের “ভ্যালু এডিশন” বুঝঃ
    আমি অনেকবার বলেছিল রেহমান সোবহান হলেন, বাংলাদেশে বসে ভারতের স্বার্থরক্ষা ও দেখার কনসাল্টেন্ট। বাংলাদেশের ঘাড়ে চড়ে ভারতকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ইন্ডিয়ান এজেন্ট হল রেহমান সোবহান ও তাঁর এইকাজের প্রতিষ্ঠানটাই হল সিপিডি। উলটা করে বললে, সিপিডির সর্ববৃহত ক্লায়েন্ট হল ভারত সরকার বা তার গোয়েন্দা বাহিনী। যদিও তিনি নিজে এটাকে “প্রগতিশীল আর ইতিবাচক” কাজ হিসাবেই গণ্য করে থাকেন!!!
    Regional Comprehensive Economic Partnership (RCEP) is a free-trade agreement (FTA) – এদুই ধারণার মধ্যে FTA সারকথায় এর মানে হল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যে একে অপরের বাজারে পণ্য নিয়ে ঢুকলে কত কী শুল্ক ছাড় দিবে বা শুল্কই আরোপ করবে না এরই ছুক্তি। এমন FTA বানিজ্য জোটের ভিতর আবার RCEP একেবারেই নতুন ধারণা। আর এই RCEP এটাই হল এক “ভ্যলু এডেড চেইন” এই ধারণার ভিত্তিতে পণ্য উতপাদন ও ভোগ – তা শেয়ার করার ব্যবস্থা। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ধারণা হল ভ্যলু (value); এই ভ্যালু আসলে কী? মনে রাখতে হবে মার্কস সারপ্লাস ভ্যলু তত্বের জন্য বিখাত আর এটাই তাঁর জীবিনের মুখ্য অবদান মানেন অনেক। তাই ভ্যলু (value) সম্পর্কে তার বিস্তারে লেখা রচনা আছে। একেবারেই সার কথায় ভ্যলু (value) মানে হল কোণ পণ্য উতপাদনে একদিকে থাকে কাঁচামাল আর এই কাঁচামালের উপর মানুষের শ্রম যোগ করেই পণ্য উতপাদন করা হয়। এই শ্রম যোগ করা এটাই ভ্যলু (value) এডিশন। একারণের উতপাদিত পণ্যের মূল্য কাঁচামানের মুল্যের চেয়ে ছাড়িয়ে। কাজের উতপাদনে শ্রম যোগ করাই ভ্যালু এডিশন। এখন কয়েকটা দেশ মিলে কোন অর্থনৈতিক জোট যদি কোন পণ্য উতপাদনের ক্ষেত্রে যে দেশ যে অংশটায় দক্ষতার সাথে ভ্যালু এড করতে পারে তা করে ফাইনালি কোন একটা দেশে যদি তা এসেম্বল করে ফিনিস প্রডাক্ট-টা তৈরি হয় আর এবার ঐ পণ্য যদি জোটের সব দেশ কিনে ও ভোগ করে তবে ঐ উতপাদিত ঐ পণ্য হল  “ভ্যলু এডেড চেইন” পদ্ধতিতে উতপাদিত ও ভোগ্য এক পণ্য। আর বলাই বাহুল্য এই পণ্য যেহেতু সবদেশেরই শ্রম আছে তাই কেউই আর এর প্রবেশের উপর শুল্ক-আরোপ করে না আর সুবিধাটা সদস্য সকল দেশ পাবে। এমনই চীনা উদ্যোগের প্রথম জোট হল RCEP  যা পুর্ব-এশিয় আশিয়ান দশ দেশ ও এর বাইরে ঐ অঞ্চলের আরো ছয় FTA সদস্য দেশ; যাদের মধ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড, অষ্টেলিয়াও আছে। আইডিয়াটা হাজির করা হয় ২০১১ সালে।
    এমন জোট বাস্তবায়িত হয় ২০২০ সালে। কিন্তু ভারতের স্বার্থ-ধর রেহমান সোবহান ব্যাপারটা জানার পর সম্ভবত ভেবেছিলেন তাঁর ক্লায়েন্ট ভারতকে সুবিধার হাড়ি খুলে চমকে দিতে হবে। তিনি ক্লায়েন্ট ভারতকে খুশি করতে বিবেচনাবোধ হারিয়ে দাবি তুললেন ভারত-বাংলাদেশকে মিলে  “ভ্যলু এডেড চেইন” পণ্য উতপাদনে যেতে হবে।

    আবার ভারতও সব শুনে মনে করেছিল রেহমান সোবহানের কাছে খুবই জ্ঞানের এক কথা তারা শুনলেন। কারণ ভারত ভেবেছিল এটাকরতে পারলে তাহলে ভারতও তো চীনের সমতুল্য এক বিরাট দেশ হয়ে যাবে!!  তারা রাজি হয়ে যায়।  রেহমান সোবহান ঠিক করে দেন এই জ্ঞানের আলোচনাটা ঢাকায় হবে আর এটা ডেইলি স্টারের নামে আয়োজন করা হবে। তাই হয় আর এতে ভারত সরকারের হুকুমে ভারতীয় আমলারা দল বেধে অংশ নিয়েছিল।  এটাসি ঘটেছিল ২০১৬ সালে তিনি ডেইলি স্টারকে দিয়ে আয়োজিত সেমিনারে ভারতীয় আমলাদেরও ঢাকায় জড়ো করেছেন – উদ্দেশ্য “ভ্যলু এডেড চেইন” শিখাবেন।

    ‘ভ্যালু এডিশন চেইনে’ উতপাদন, উগ্র অর্থনীতিক জাতিবাদ এর জন্য হারামঃ 
    চোথা মারা মানের অপরের ধারণা বুঝে বা বুঝে টুকলিফাই করা – ব্যাপারটা শেষে তাই হয়েছিল। গোড়ার ফ্যাক্টস হল, রেহমান সোবহান ‘ভ্যালু এডিশন চেইন’ জিনিষটাই ঠিকমত বুঝেন নাই; এছাড়া মার্কসের ভ্যলু সম্পর্কেও প্রাথমক কিছু ধারণা থাকতে হবে। তিনি ভেবেছিলেন চীন বা RCEP এর ধারণাটা তিনি সহজেই ক্লায়েন্ট ভারতের কাছে বেচে দিতে পারবেন। কিন্তু ফাঁকি বা চোথা মারা ধারণার কারণে ভ্যলু এডিশনের সাথে শুল্ক-আরোপের সম্পর্ক কী তিনি জানেন নাই। আবার মনে রাখতে হবে বিদেশি পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করা আর এভাবেই বিদেশি পণ্যের প্রবেশ ঠেকিয়ে দেয়া ১৯৪৫ সালের পরে জাতিবাদি ও কলোনিমুক্ত দেশগুলোতে খুবই পপুলার পদক্ষেপ ছিল। এটাকেই ইকোনমিক ন্যাশনালিজম বলে।  সব জাতিবাদিরাই ইকোনমিক ন্যাশনালিস্ট, মোদির মত উগ্র হলে তা আরও বেশী। এমনকি স্তালিন ও তার কমিউনিজম ও আসলে ইকোনমিক ন্যাশনালিস্ট।  মুল কারণ, এরা বা এই চিন্তার মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ধারণাটাই নাই। আর একারণেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য না হয়েও সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৫-১৯৯১ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। এমনকি সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যাবস্থা ছিল না;  আসলে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য না হলে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যই সম্ভব নয়।

    কিন্তু রেহমান সোবহান এসব জানতেন পড়াশুনা আছে তা তাঁর কাজদেখে এমন জানা যায় না। যেমন ধরেন, তিনি কী জানেন উগ্র জাতিবাদী রাষ্ট্র ভ্যালু এডিশন বুঝতেই পারবে না।  গ্রহণ করবে না বা সম্ভব না? কারণ এই রাষ্ট্র-সরকার উগ্র জাতিবাদী মানে সে ইকোনমিক ন্যাশনালিজম করে বেড়ায় – মানে অন্য দেশের পণ্যকে সে কড়া ট্যাক্স বসিয়ে নিজ সীমান্তের বাইরে রাখাটাই সঠিক মনে করে। নিজ অদক্ষপুর্ণ দামে প্রস্তুত পণ্যকে যে এভাবেই প্রটেক্ট করে; আর দেশের মানুষকে তাই কিনতে বাধ্য করে থাকে। এটাই তো ইকোনমিক ন্যাশনালিজম । তাহলে তিনি মোদীর ভারতকে ভ্যালু এডিশন বুঝাবেন কেমন করে? রেহমান সোবহান সেদিকটা না বুঝেই বাগড়ম্বরা করতে গেছেন ইন্ডিয়া বাংলাদেশের পাটের উপর, ব্যাটারির উপর, বাথ সোপের উপর এরকম ট্যাক্স বসিয়ে রেখেছে। আর রেহমান সোবহান বলছেন ভারত-বাংলাদেশ নাকি “ভ্যলু এডেড চেইন”  এর যৌথ পণ্য উতপাদন করতে যাওয়া উচিত!!! এই হল প্রগতিশীল বিরাট বুঝমান রেহমান সোবহান!    দেখেন এখানে এনিয়ে ২০১৬ সালের ডেইলিস্টারের রিপোর্ট। এছাড়া এসব ইস্যু নিয়ে আমার পুরানা লেখা আগ্রহিরা এখানে  আর এখানে দেখতে পারেন।

    কিন্তু তবু এত ক্ষমতাধর রেহমান সোবহান কখনও ১৯৭৪ এর কথিত সমাজতন্ত্রী অর্থনীতির পরাজয় ও দেশকে একটা দুর্ভিক্ষে নিয়ে ফেলা এজন্য কোন দায় কখনও নেনই নাই। কোন একাদেমিক আলোচনাও টেনেছেন জানা যায় না।  এমনকি যদি কেন ঐ অর্থনীতি ফেল করেছিল এনিয়ে কোন সৎ মূল্যায়ন বা তাঁর কোন সৎ অনুভবও কোথায় আলোচনা করেছেন জানা যায় না।

    বিআইডিএস ও রেহমান সোবহানঃ
    বিআইডিএস [BIDS] কী তা এই প্রজন্ম কমই জানে, আমার অনুমান। আসলে বাংলাদেশের রাজনীতিক চিন্তা ও সক্রিয়তায় কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা যেভাবে এখন উপেক্ষিত কোনঠাসা, গুরুত্ব-প্রভাবহীন নিস্তেজ হয়ে গেছে বিআইডিএস এই প্রতিষ্ঠানের দশাও তাই। আমাদের প্রজন্মের একাদেমিক যৌবনে বিআইডিএস – একে দেখা হত এক বিরাট প্রগতিশীল জ্ঞান ও গবেষণার প্রতিষ্ঠান।  বিআইডিএস সরকারী ফান্ডে চলা এক আধা-সরকারি বা স্বায়ত্বশাসিত এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। অরিজিনালি বিআইডিএস এর জন্ম পাকিস্তান আমলে করাচিতে; আর নাম ছিল পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট ইকনোমিকস বা পাইড [PIDE]। ১৯৭১ সাল ঘুরে,  একে বাংলাদেশে এনে ১৯৭৪ সালে এসে এর নাম হয় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ  বিআইডিএস [BIDS]। বিস্তারে গিয়ে কথা না বললেও, অরিজিনালি করাচিতে এটা আমেরিকা প্রভাবিত এক প্রতিষ্ঠান ছিল; মানে কমিউনিস্ট ভাবাদর্শী নয়।  কিন্তু বাংলাদেশে এসে এটা হয়ে যায় কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের প্রতিষ্ঠান; এমনকি এখনও প্রচ্ছন্নে এটা তাই মানা হয়। দুই বাক্য উপরে ডেভেলবমেন্ট শব্দটা আমি সবুজ রঙ দিয়েছি; আর BIDS শব্দের D যার প্রতীক! ক্রিটিক্যালি বললে এই ডেভেলবমেন্ট বা বাংলায় উন্নয়ন – এই শব্দ ও ধারণাটাই এন্টি কমিউনিস্ট।  কেন? ডেভেলবমেন্ট মানে হল – মানে এর পুরা কথাটা হল “ইনফ্রাস্টাকচার ডেভেলবমেন্ট” – কিন্তু একে সংক্ষেপে বলতে শুধু ডেভেলবমেন্ট শব্দটা নেয়া হয়েছে। আর বাংলাতে বললে এটা অবকাঠামো উন্নয়ন [Infrastructure Development] যাকে সংক্ষেপে আমরা শুধু উন্নয়ন বলি।  ১৯৪৫ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর জন্মের সাথে সম্পর্কিত এক মুখ্য কনসেপ্ট হল এই “ইনফ্রাস্টাকচার ডেভেলবমেন্ট”। মনে রাখা যেতে পারে বিশ্বব্যাংক এটাও এর সংক্ষিপ্ত নাম। আর এই প্রতিষ্ঠানের পুর্ণনাম হল, International Bank for Reconstruction and Development (IBRD)।

     কমিউনিস্টদের কাঙ্খিত ক্যাপিটালিজমের বিনাশ বা পতন এখনও হয় নাইঃ
    খুবই সংক্ষেপে বললে, খোদ কার্ল মার্কস সহ কমিউনিস্টদের আকাঙ্খা ও অনুমান ছিল যে দুনিয়াতে ক্যাপিটালিজম টিকবে না; টিকতে পারবে না। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিজ গুনেই ভেঙ্গে পড়বে। কার্কস তাঁর সারপ্লাস ভ্যলু তত্বের প্রেক্ষিত এমনটা মনে করতেন। তাই এই আকাঙ্খা-বিশ্বাস খোদ মার্কসের (১৮১৮-১৮৮৩) ছিল; একইভাবে লেনিনেরও (১৮৭০-১৯২৪) ছিল। ফলে পরবর্তি প্রায় সকল কমিউনিস্টদেরও। কিন্তু কমিউনিস্ট অনুমান বা ভবিষ্যতবাণীকে মিথ্যা প্রমাণ করা এক্ট বা এমন প্রধান ততপরতা মনে করা হয় – এই ১৯৪৫ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম হওয়া।  যেটা লেনিন পরবর্তিতে ১৯৪৫ সালের এসে সোভিয়েত  প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্তালিন চেয়ে চেয়ে দেখেছিলেন যে  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম হচ্ছে। কিন্তু তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসেছিলেন। কোন প্রতিক্রিয়া দেন নাই, দেখান নাই, কিছু লেখেনও নাই। সম্ভবত তিনি অস্পষ্ট ছিলেন, নিশ্চিত ছিলেন না যে কী বলা ঠিক হবে! অন্যদিকে এদুই প্রতিষ্ঠানের জনক  বা ফাউন্ডিং ফাদার মনে করে খোদ আইএমএফ-ই নিজের ওয়েব সাইটে লিখে রেখেছে যাদের নাম – এমন দুজন হলেন, বৃটিশ অর্থনীতিবিদ কেইনস [John Maynard Keynes ]  আর অপর জন হলেন সেকালে আমেরিকান ট্রেজারি মন্ত্রণালয়ের চীফ ইকোনমিস্ট ডেক্সটার [Harry Dexter White]। এরা মূলত দুনিয়ায় উন্নত দেশ মানে অর্থনীতিতে সারপ্লাসের দেশ থেকে গরীব দেশের জন্য অবকাঠামোগত ঋণ এর ব্যবস্থা করে দুনিয়াকে এক নয়া গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের পথে সাজিয়ে ফেলেছিলেন। এদিকের ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়া জুড়ে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশের এক দুনিয়া হয়ে উঠেছিল। তাই, সারপ্লাস অর্থনীতির বড় দেশগুলো তাদের সম্পদের একটা ছোট অংশ আমাদের মত দেশে অবকাঠামোগত ঋণ (প্রায় নাই সুদে) দেওয়ার একটা গ্লোবাল কাঠামো ও প্রতিষ্ঠান (আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক) গড়াতে এদুই প্রতিষ্ঠান শুরুতে খুবই প্রাণবন্ত ও সচল এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম চালু করতে পেরেছিলেন। এটাই অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থনীতি। সংক্ষেপে উন্নয়নের অর্থনীতি।  মজার কথা হল জনবহুল চীন এই অর্থনীতির সুবিধা নিবার পথ ধরেই আজ প্রায় খোদ আমেরিকাকেই ছাড়িয়ে যাওয়া দুনিয়ার বড় অর্থনীতি যা আগামিতে পালাবদলে নেতা আমেরিকার স্থান নিবার পথে উঠে  আসছে!  অর্থাৎ অবকাঠামো উন্নয়নের ধারণাটাই কমিউনিস্ট আগের ভবিষ্যতবাণীকে আপাতত নাকচ করে রেখেছে, এটা এক কঠিন বাস্তব সত্য।  আর একারণে বলাই বাহুল্য যে “উন্নয়ন”, এটা এন্টি কমিউনিস্ট ধারণা; যা কমিউনিস্ট প্রেডিকশনকেও নাকচ করে রেখেছে।

    এজন্যই BIDS [প্রাক্তন নাম PIDE] কে বলেছি এটা আমেরিকা প্রভাবিত ধারণা। আবার তামাসাটা হল, এই BIDS ১৯৭৪ সালের পর থেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের গবেষণা প্রতিষ্ঠান হয়ে যায়; যা এখনও কম-বেশি তাই।  আর রেহমান সোবহান প্রগতিশীল পরিচয়েই অবসরের (১৯৯২) আগে পর্যন্ত এই BIDS এর  ডিজি বা প্রধান ছিলেন।  সারকথায়,  ১৯৭৪ এর আগে পর্যন্ত রেহমান সোবহান বাংলাদেশে “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” গড়ার বিরাট কুতুব কারিগর; আবার ১৯৭৪ সালের পরবর্তিতে BIDS জেগে উঠলে মানে পুঁজিতান্ত্রিক অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থনীতি শুরু হলে পরে (১৯৮০) তিনিই আবার BIDS এর প্রধান হয়ে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের উন্নয়নের অর্থনীতিরই মুল্যায়নকারী, প্রকল্পের গবেষক! ব্যাপারটা হেভি মজার নিঃসন্দেহে। তবে একটা বাক্য পাওয়া যায় উইকিতে যেটা রেহমান সোবহানের  বায়ো বা পরিচিতি্র অংশ। সেই বাক্যটা এরকম, …… After the liberation of Bangladesh in 1971, Sobhan was appointed a member of the Planning Commission. He quit when he, along with others, fell from the grace of Sheikh Mujib in 1975. । বাংলায় বললে, ১৯৭৫ আসতে আসতে শেখ মুজিব কমিশনের সকলকে বের করে দেন; তারা সকলে নিজে পদত্যাগ করতে বলেন  আর এভাবেই তাঁরা শেখ মুজিবের অনুগ্রহ বা গুড-বুক থেকে  সকলে ঝড়ে পরেছিলেন।

    অথচ, ১৯৭২ সাল থেকেই এই প্রগতিশীল কথিত “কমিউনিস্ট অর্থনীতির গোষ্ঠির” এরা আমাদের দেশে বিশ্বব্যাংক সাহায্য করতে বা অনুদান দিতে অথবা প্রায় না সুদে ঋণ দিতে চাইলেও এরা তা ঠেকিয়ে রেখেছিল। যেটার জন্যই  শেখ মুজিবকে পরে তবে ঐ ১৯৭৪ সেপ্টেম্বরেই নিউইয়র্ক গিয়ে কিসিঞ্জারের সাথে দেখা করে প্রথম বিশ্বব্যাংকের সাহায্য নিতে তাঁর আগ্রহ তিনি পুনরায় প্রকাশের সুযোগ নিয়ে তা নিশ্চিত করে এসেছিলেন।   কিসিঞ্জার তাতে একমত হলেও তা বাংলাদেশে আসার প্রস্তুস্তি শেষ করে আসতে আসতে ১৯৭৬ সালের বাজেট বছর শুরু হতে সময় লেগে যায়। আর ততদিনে শেখ মুজিব নিহত, এই কাফফারা দিতে হয়! বিশ্বব্যাংক সেই প্যাকেজে প্রথমে অনুদান (যার সুদ-আসল কিছুই ফেরত দিতে হয় না ) সাহায্য আর পরে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (প্রায় না সুদের ০.৭৫%) ঋণ দেয়া শুরু করলে এর স্থানীয় ইভ্যালুয়েটর ও সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনার কনসালটেন্সি পায় কিন্তু আধা-সরকারি বিআইডিএস [BIDS] আর এই বি আইডিএসের প্রধান ছিলেন রেহমান সোবহান। মানে দাড়িয়েছিল এমন যে, দুভিক্ষ লাগানো কথিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির এক কর্তা তখন হয়ে গেছেন বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক প্রকল্পের ইভ্যালুয়েটর!!!

    এখন পুরাই বিষটাকে যদি ইতিবাচকভাবে দেখি তবে এটা ছিল রেহমান সোবহানের জন্য একটা খুবই ভাল সুযোগ। তিনি এই দুই প্রচেষ্টা [কথিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি আর পরে বিশ্বব্যাংকের উন্নয়নের অর্থনীতি ]  এই দুই অর্থনীতির ব্যবহারিক তুলনা (আতলামো না) এমন ভালো-মন্দের মুল্যায়ন মন্তব্য তিনি নিজ সৎ -অভিজ্ঞতা আকারে হলেও লিখে যেতে পারতেন! যা নিঃসন্দেহে পরবর্তি প্রজন্মের জন্য এক মৌলিক সোর্স হতে পারত!  কিন্তু হায়! কিছুর বলার নাই। রেহমান সোবহান এখন একালে বাংলাদেশ যেন ভারতকে  করিডোর দেয় – এই জবরদস্তি ও বিনা পয়সায় তা দেওয়ার দালাল হয়েছেন!

    এমনিতেই ২০০৭ সাল থেকে (আসলে ২০০৪ সালে সিপিডির সৎপ্রার্থী আন্দোলনের সময় থেকেই) তিনি বাংলাদেশে ভারতের লুটে নেয়া স্বার্থ হাসিল বা পাইয়ে দিবার ক্ষেত্রে সরাসরি এজেন্টের ভুমিকায় নেমে গেছিলেন। যেটা এখনও নানা উছিলায় ও ডালপালায় সক্রিয় আছে। যেমন বাংলাদেশ থেকে ভারতকে বিনা পয়সায় আর বাংলাদেশের স্বার্থ ত্যাগ করে কেবল একচেটিয়া ভারতের স্বার্থে ভারতকে করিডোর পাইয়ে দিবার পক্ষে তিনি এক নম্বর ওকালতকারি।  এমনকি যারা ভারতকে করিডোর দিবার বিপক্ষে তাদেরকে তিনি প্রকাশ্য সভায় ‘অশিক্ষিত’ বলেছেন; এতই ঘামন্ডি আত্মদর্পী তিনি। দেখুন ১। ট্রানজিট বিরোধিতাকে ‘অশিক্ষিতদের বিতর্ক’ বললেন রেহমান সোবহান; ২।  “Bangladesh is the only country to see debate over transit, which is very usual through borders,” ……“I think it’s a debate of ignorant people,”। 

    এগুলো হল এখন তাঁর ক্রেডেনশিয়াল; বিরাট অর্জন!!! বাংলাদেশে এই লবি আর দালালি করে দিয়েই তিনি শেষ জীবনে সিপিডি [CPD] কে খাড়া করেছেন। এটা নাকি তাঁর যোগ্যতা!! আর প্রতীকিভাবে বললে যেমন ধরেন মুচকুন্দ দুবে যিনি ভারতের এক সাবেক আমলা কূটনীতিক; বাংলাদেশে এক সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদুত ও বলা যায় যিনি প্রো-কংগ্রেসী। তিনি একালে ঢাকা আসলে পরে রেহমান সোবহান তাঁকে নিয়ে যেন পবিত্র তীর্থে যাচ্ছেন এভাবে তাঁরা দুজনে প্রথম আলোর অফিসে এসে মতিউর রহমানের সাথে মোলাকাত করবেন! আবার অনেকে বলেন, প্রথম আলো আর সরকারের মধ্যে যে টেনশন বা যেমন প্রধানমন্ত্রীর অফিসে অনা-আমন্ত্রণ বা ঢুকতে না দেওয়া এসব পেরিয়ে তাদের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারি হলেন রেহমান সোবহান! ইত্যাদি।

    কিন্তু কেন এই লেখাঃ
    উপরে এতক্ষণ যা যা লিখেছি তা বলার জন্য  মূলত এলেখা লিখতে বসি নাই।  সেগুলো পটভুমি মাত্র! আর এখন সেই মূল প্রসঙ্গে যাব।  সম্প্রতিকালে রেহমান সোবহান এক মহৎ কর্ম করেছেন!!
    গত দুবছর একটু একটু করে এবছরে এসে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে গভীর দুর্দশায় নিমজ্জিত; এটা সারা দেশের লোক টের পাচ্ছে। বিশেষ করে প্রত্যেকটা বাণিজ্যিক ব্যংক ব্যাপক অনাদায়ী খেলাপি ঋণ এর ভারে ডুবে আছে। যদিও কম বেশী আছে যা থেকে দুর্বল আর সবল ব্যাংক এর ধারণা টানা হয়েছে। যেখান থেকে মূল সমস্যাটা হল, প্রত্যেকটা ব্যাংক তার আমানত মানে আম পাবলিকের জমা টাকা খেয়ে ফেলেছে – অনাদায়ী খেলাপি ঋণ এর সংকট কথাটার প্রকৃত অর্থ এটাই। তাই মিডিয়া রিপোর্ট আসছে যে প্রায় প্রত্যেকটা ব্যংকই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে টিকে আছে, প্রতিদিনের দায় মিটাচ্ছে। এই সময় রেহমান সোবহান এক সভায় বক্তৃতায় বলেছেন, “দেশে খেলাপি ঋণের জনক জিয়াউর রহমান: রেহমান সোবহান”। খোজ নিয়ে জানা গেল এমন কথা তিনি ২০১৮ সালেও একবার বলেছেন। দেখুন, ঋণ খেলাপির সংস্কৃতি জিয়ার আমলে শুরু: রেহমান সোবহান।

    কোন একাদেমিক বা গবেষকের জন্য এমন বক্তব্য অপরাধমূলক; এক ক্রিমিনাল বক্তব্য। জনমানুষকে বিভ্রান্তকারি বক্তব্য। কেন এমন বলছি??

    তাঁর এই বক্তব্যকে দুভাবে দেখব। এক,  বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি এদের বিতর্ক-ঝগড়া কোন সিরিয়াস আলোচনায় আনার যোগ্য নয়। যদিও তাদের এমন ঝগড়া কালচারে পরিণত হয়েছে। আমরা এক্ষেত্রে বড়জোড় যা পারি তা হল, কোন সিরিয়াস আলোচনায় অথবা একাদেমিক টেবিলে বা জগতে এসব তর্ক-কে না আনতে পারি; এড়িয়ে যেতে পারি। অর্থাৎ ইতিবাচক  ও অর্থপুর্ণ আলোচনার তাগিদ থাকলে কোন একাদেমিশিয়ানের এই বিতর্ক-ঝগড়া সচেতনভাবেই টেবিলে আনার কথা না বরং এড়িয়ে চলার কথা। কিন্তু আমরা দেখছি রেহমান সোবহান এটা এনেছেন। ১৯৮০-৮১ সালের ঘটনাকে লীগ বনাম বিএনপির ক্যাচালের মত করে এখানে তুলে এনেছেন। কেন এনেছেন?

    কারণ দুই, তিনি বর্তমানে দুর্দশায় নিমজ্জিত অর্থনীতির এই কালে হাসিনার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ জনমানুষের ক্ষোভ বা তা থেকে উঠা হাসিনার সংকটকে লঘু করে দিয়ে চেয়েছেন। যেন বলতে চেয়েছেন যে খোদ জিয়াউর রহমানই যেহেতু এটা শুরু করেছেন আজ থেকে ৪৫ বছর আগে তাইলে আর একালে হাসিনার আর দোষ কী? কিন্তু আসলেই কী তাই যে, জিয়াই খেলাপী ঋণের কালচার সৃষ্ট করেছিলেন কী?

    অন্যদিকে আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখছি কথাটা হাসিনা, ওবায়দুল কাদের বা লীগের কেউ রেহমান সোবহানের এই চাতুরিকে প্রশ্রয় দেয় নাই, পিক-আপ করেই নাই। যাকে বলে লীগের কেউ এতে মাতে নাই!!! কেন? খুব সম্ভবত হাসিনা খেলাপি ঋণ নিয়ে আলোচনাতেই ঢুকতে চায় নাই। কারণ তিনি জানেন প্রায় প্রত্যেকটা ব্যাংকই অনাদায়ী খেলাপি ঋণের দুর্গতি আটকে আছে। শুধু তাই না এই খেলাপিরা সোজা বা ঘুর পথে সরকারী দলের বা আড়ালে থেকে সুবিধা খেয়ে নিয়েছে।  আসলে এগুলো আদায় করার মুরোদ সেটা সরকারেরও নাই!  আর সবচেয়ে বড়কথা ঋণগুলো যারা নিয়ে ভেগে গেছে এরা বেশির ভাগই তার দলীয় নেতা বলে সরকার এদের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারবে না। খুব সম্ভবত এটাই সরকারের মূল্যায়ন!

    কিন্তু রেহমান সোবহানের এনিয়ে এত তাগিদ উতলা কেন?
    এলেখাতেই শুরুতে বলেছি, হাসিনা তাঁর বাবার আমলের লোক, শেখ মুজিবের সাথে কাজ করেছেন স্মৃতি আছে এমন ব্যক্তিত্বদের একালে  পদক প্রদান, বিশেষ সম্মাননা থেকে বৈষয়িক লাভালাভ পাইয়ে দেয়া তিনি করেছেন। আবার আরেকটা ফ্যাক্টস হল, রেহমান সোবহানের পেশাগত এক বড়ভাই আছে। নাম প্রফেসর নুরুল ইসলাম (গতবছর ২০২৩ সালে মারা গেছেন)। যিনি ১৯৭২ সালে গঠিত সরকারী পরিকল্পনা কমিশনের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট। কথাটা একটু বুঝায়ে বলতে হবে। সোভিয়েত ভাষ্য বলে থাকে যে তারা পরিকল্পিত অর্থনীতি করে থাকে। তাই পরিকল্পনা কমিশন বা মন্ত্রণালয়, সেখানে এটা খুব গুরুত্বপুর্ণ। সেই আদলে, আমাদের পরিকল্পনা কমিশনের তখন একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট আর প্রেসিডেন্ট পদ ছিল। পদাধিকার বলে প্রধানমন্ত্রীই কমিশনের প্রেসিডেন্ট হতেন। আর এর প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন (একালের হিসাবে যেটা পরিকল্পনামন্ত্রী পদ) তবে এটা টেকনিক্যাল পোস্ট – আর এই নুরুল ইসলাম ছিলেন সেই ভাইস প্রেসিডেন্ট।

    এখন আওয়ামি আমলে কথিত আছে যে পাকিস্তান আমলে এই সিনিয়র অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলাম আর জুনিয়র রেহমান সোবহান এরাই নাকি শেখ মুজিবের ১৯৬৬ সালের ছয়দফার প্রনেতা বা ড্রাফটকারি। শুধু তাই নয় এরাই দুই পাকিস্তান অংশের অর্থনীতির দশা ইকোনমিক ডাটা ব্যবহার করে তুলে দেখিয়েছিলেন যে তুলনায় পুর্ব পাকিস্তান বঞ্চিত ও অসাম্যের শিকার!  সেকালের এসব ততপরতা থেকেই এরা নিজেদের হিরো ভাবতে ভালবাসেন আর তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে শেখ মুজিব ঘনিষ্ট ছিলেন। তাই সেকাল থেকেই এই ক্রেডিট কিছু বিনিময় মূল্য কিছু বিশেষ করে রাখা ইত্যাদি তারা তাদের শেষ জীবন্বের মরিয়া হয়ে চেয়ে থাকেন।  কিন্তু সমস্যা হল, আগেই বলেছি বাংলাদেশের শুরুতে কথিত ঐ  সমাজতান্তিক অর্থনীতি দুর্ভিক্ষ ঘটিয়ে শেষ হলে শেখ মুজিব তাজউদ্দিন সহ সকলকে পদচ্যুত করেন, মানে পদত্যাগ করতে বলেন। এতে তাদের স্বাধীনতা-পুর্ব সব ক্রেডিট কালো হয়ে যায়।  অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলাম এর কেসটা আবার আরো খারাপ। কারণ, তিনি সেকালের অর্থনৈতিক দুর্দশা আর দুর্ভিক্ষের মধ্যেই বা কিছুটা আগেই (সম্ভবত সেপ্টেম্বর ১৯৭৪) বিদেশে জাতিসংঘের [FAO] er চাকরি নিয়ে তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান। যেটা শেখ মুজিবকে আহত করেছিল। আবার বলা হয় একবছরের ছুটি নিয়ে গেলেও আর ফিরে আসেন নাই।
    অথচ বিদেশি চাকরি শেষ করে গত কয়েক বছর ধরে তিনি দেশে এসে হাসিনার মন, দৃষ্টি ও স্বীকৃতি পেতে কোন কিছুই করতে বাদ রাখেন নাই। উদ্দেশ্য একটাই হাসিনা যেন স্বাধীনতা-পুর্ব অবদানের ঘটনায় তাদের স্বীকৃতি দেন। কিন্তু তাঁর দেশত্যাগ ও শেখ মুজিবের আহত হওয়া; আর ওদিকে এমনকি অনেকে দাবি করেন ১৯৭৪ সালে তাজউদ্দিননের পদত্যাগ উত্তরকালে শেখ মুজিব নুরুল ইসলামকেই নাকি অর্থমন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নুরুল ইসলাম তখন দেশত্যাগে ব্যস্ত। খুব সম্ভবত, সমাজতন্ত্রী করতে গিয়ে দেশকে দুর্ভিক্ষে ফেলা আর নুররুল ইসলাম-সহ এমন তাদের অন্যান্যা সহযোগী অনেকেই নিজ উন্নতির লক্ষ্যে হারিয়ে যান। (যেমন আনিসুর রহমান, মোসাররফ ইত্যাদি অনেকেই যেখানে একমাত্র ব্যতিক্রম  সম্ভবত প্রফেসর মোজাফফর আহমেদ যাকে জিয়া নিজ ক্যাবিনেটে শিল্পমন্ত্রী উপদেষ্টা করে রেখেছিলেন, যিনি বিশেব্যাংকের অনুদানে ঢাবিতে আইবিএ প্রতিষ্টান সাজিয়ে নেন। ) এসব বিবেচনা থেকেই শেখ হাসিনা সমাজতন্ত্রী অর্থনীতিবিদ এই গোষ্ঠির কাউকেই কোন আনুকুল্য বা কোন বিশেষ সম্মন্ননা জানাতে এখনও কারও প্রতি রাজি হন নাই। হাসিনার এই মুল্যায়ন খারাপ বা ভুল তা বলা কঠিন; বা অন্যভাবে বললে, এমন বলার মত যথেষ্ট পয়েন্ট আমাদের হাতে নাই। বিরাট জ্ঞানীরা দেশে দুর্ভিক্ষ লাগিয়ে দিয়ে কেটে পড়বেন বা কোন দায় নিবেন না, রিকভারিতে হাত লাগাবেন না – তো এরা তাহলে দেশের জন্য কারা? রেহমান সোবহানও পরের পাঁচ বছর বিদেশে চাকরিতে ছিলেন।

    তামাসার কথাটা হল, গত বছর নুরুল ইসলাম মারা [৯মে ২০২৩] যান, য়ার এতে সঙ্গীসাথীদের নিয়ে যে শোক সভা ডাকা হয়েছিল সেখানে উপস্থিত প্রগতিশীল গোষ্ঠির তরফ থেকে তাতে বক্তারা সবাই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে হাসিনাকে দুষে কথা বলেছিলেন। এখানে   এখানে  এখানে দেখুন।    এছাড়া দেশে ফিরার পর থেকে নুরুল ইসলাম মৃত্যুর আগে পর্যন্ত  তার আক্ষেপ ছড়িয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় সাক্ষাতকার দিয়ে গেছিলেন। যার সর্বশেষটা সম্ভবত এইটা। আর এতে লক্ষ্য করা যায় কেউই সমাজতন্ত্রী অর্থনীতির দুর্ভিক্ষ এই পরিণতি নিয়ে, এর দায় নিয়ে কোন প্রসঙ্গই তুলেন নাই। আমার ধারণা অন্তত একারণে, তারা কোন কিছুর বিশেষ প্রাপ্তির দাবিদার হওয়াটা নিজেরাই ম্লান করে দিয়েছেন! আবার নুরুল ইসলামের মৃত্যুর পরে খোদ রেহমান সোবহানের লেখাটাও এখানে দেখতে পারেন।

    তবু এই লেখায়  মুলকথাটা হল, রেহমান সোবহান এর ভাষায় তার “কমরেড” নুরুল ইসলামকে হাসিনার পাত্তা না দেয়া বা নিরুত্তাপ থাকা – এটা দেখার পরও মনে হচ্ছে রেহমান সোবহান হাসিনার মত পেতে হাল ছাড়তে রাজি না। তিনি সম্ভবত ভেবেছেন, তাঁর লাস্ট ট্রাম্প হল – দেশে খেলাপি ঋণের জনক জিয়াউর রহমান -একথাটা রটায় দিলে নিশ্চয় হাসিনা এবার তাঁকে কোলে তুলে নিবেনই!!! কিন্তু হায়!  রেহমান সোবহানের পোড়া কপাল, তেমন কিছুই ঘটে নাই! হাসিনাও একথা তুলে নিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে কোন ব্যাশিং করতে যান নাই!

    তবে মূল প্রশ্ন, আসলেই কী জিয়া ঋণ খেলাপীর জনক? নাকি এই বক্তব্য রেহমান সোবহানের এক অসৎ কাজ – এক ইন্টেকচুয়াল অসততা?
    প্রথম কথা হল জিয়ার আমলে ঋণ খেলাপীর ঘটনা ঘটেছে।  কিন্তু ফ্যাক্টস হল, এমন ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট জিয়ার ছিলই না।  এই সিদ্ধান্ত ছিল খোদ বিশ্বব্যাংকের।
    এর প্রমাণ, আমি নিচে বাংলা অর্থসুচক পত্রিকা থেকে রেহমান সোবহানের এই বক্তব্য নিয়ে ছাপানো রিপোর্ট উঠিয়ে এনেছি আর নিচে সেঁটে দিয়েছি।  ওখানে দেখা যাচ্ছে রেহমান সোবহান বলছেন, “বিশ্বব্যাংকই এই ঋণদানে চালিকাশক্তি। তাদের পরামর্শেই ওই সময়
    বেসরকারি খাতের উন্নয়নে বিপুল ঋণ দেওয়া হয়েছে”
    ।

    “সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে দেশে খেলাপি ঋণের জনক হিসেবে আখ্যা দিয়ে রেহমান সোবহান বলেন,
    ওই সময় বিশ্বব্যাংকও খেলাপি ঋণ তৈরিতে চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তাদের পরামর্শেই ওই সময়
    বেসরকারি খাতের উন্নয়নে বিপুল ঋণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকের ব্যালান্স শিটের দিকে তাকানো হয়নি।
    শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থার মাধ্যমে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়া হয়েছে। এরপর তাদের খেলাপি
    ঋণ বেড়ে গেলে বিশ্বব্যাংক একটি কথাও বলেনি, যদিও পরবর্তীকালে তারাই খেলাপি ঋণের বিষয়ে সোচ্চার…”

     

    পয়েন্ট দুইঃ
    রেহমান সোবহান কী চেক করেছেন কোন কোন ব্যাঙ্ক এমন ঋণ বিতরণ করেছে যা খেলাপি ঋণ হয়ে গেছিল?

    এর জবাবটা রেহমান সোবহান  নিজেই সম্ভবত অজান্তেই আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন।

    ১। সেকালের খেলাপি ঋণ যে ব্যাংকের সে ব্যাংকের কার আমানতের অর্থ এটা?
    রেহমান সোবহান নিজেই বলেছেন এগুলো – “শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থার মাধ্যমে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়া হয়েছে” -সেই ঋণ।  এখন শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থার যে ঋণ দিয়েছে খেলাপি হয়ে যাবার জন্য সেই অর্থ মানে ব্যাংকের আমানত কাদের অর্থ? কারা এদুই ব্যাংকে অর্থ রেখেছিল, অর্থ আমানত রেখেছিল যাতে তা ঋণ হিসাবে বিতরণ করা যায়? [যে ঋণ পরে অনাদায়ী খেলাপি ঋণ হয়ে যায়?]। এর জবাব হচ্ছে,  এই অর্থ আম পাবলিকের কারও না। সরকারেরও না।
    কারণ শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থা – এদুই নামে এরা ব্যাংক হলেও এদের গ্রাহক বা সেবা-ক্রেতারা সাধারণ মানুষ নয়। এদুই ব্যাংকে কোন সাধারণ মানুষ বা স্বল্প আয়ের মানুষের একাউন্ট নাই। তাই এমন আম নাগরিকের কোন অর্থ এখানে রাখা নাই, একাউন্ট খুলে দেয় না। এদুই ব্যাংক কেবল মাত্র যারা সম্ভাব্য উদ্যোক্তা যারা শিল্প- কারখানা গড়বেন তাদেরকে ঋণ দেওয়া ও ফেরত নেওয়ার ব্যাংক। কেবল এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আমানত ও একাউন্ট আছে। এককথায় এগুলো বিশেষায়িত ব্যংক। যাদের সার্ভিস-ক্রেতা জনসাধারণ নয়। কেবল সম্ভাব্য শিল্প উদ্যোক্তারাই এর খাতক। তাও আবার এই খাতকেরা কিন্তু এই ব্যাংকে তাদের নিজের অর্থ আমানত হিসাবে রাখতে আসেন নাই।

    এখন আসেন আরো সরাসরি প্রশ্ন তাহলে,  এই দুই ব্যাংক তাহলে ঋণ দিবার মত অর্থ কোথা থেকে পায়? কারা এই অর্থদাতা?

    এর জবাব হল, এই অর্থই বিশ্বব্যাঙ্ক আমাদের সরকারের মাধ্যমে দুই বিশেষায়িত সরকারী ব্যাংক শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থা কে দিয়েছে; যাতে এদুই ব্যাংক সিলেক্টেড উদ্যোক্তা যাদের ঋণের আবেদন অনুমোদিত হয়েছে তাদেরকেই কেবল বিতরণ করবে এমন ব্যাংক। এর মানে সোজা ভাষায় হবু শিল্প উদ্যোক্তাদেরকে বিতরণের জন্য দেয়া এই অর্থ যা, না আমাদের সরকারী অর্থ, না তা কোন সাধারণ মানুষের অর্থ। অর্থাৎ এই ঋণদান শেষে খেলাপি হয়ে গেলেও এর দায়ভার সরকারের নয়।  এসবের প্রকৃত কারণ এটা ছিল বিশ্বব্যাংকের এক এক্সপেরিমেন্ট প্রকল্প এর ঋণ যে বাংলাদেশের শিল্পায়ন ঘটাতে গেলে তাদেরকে কিভাবে আগাতে হবে এজন্য তাদের বুঝাবুঝি শক্ত করার প্রকল্প এটা।

    বিশ্বব্যাংক-কে বুঝাবুঝিঃ
    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে বুঝাবুঝির সমস্যা, এটা আসলে কী ধরণের প্রতিষ্ঠান, এর কাজ ও ম্যান্ডেট কী এটা নিয়ে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের বুঝা-পড়া সবচেয়ে করুণ!  ব্যাপারটা তাদের কাছে নিপাত যাক বলতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ!
    তবুও সেকালের বিশ্বব্যাংক কেন এমন করেছিল তা নিয়ে আরো বিস্তারিত বুঝাবুঝি যারা প্রবেশ করতে চান তাদেরকে সত্তর ও আশির দশকের বিশ্বব্যাংককে স্টাডির বিষয় হিসাবে নিতেই হবে। এছাড়া তাদের জন্য আরেক বড়কাজ হবে – ROBERT McNAMARA  (5th President of the World Bank Group, April 1, 1968 – June 30, 1981) – এই ব্যক্তিত্বকে জানতেই হবে; তার  কাজ ও জীবনী প্রক্রিয়াকে।  তবে সাবধান; তাঁর কাজ ন্যয়সম্মত নাকি অন্যায় এসব মুল্যায়ন পাঠকের হাতেই থাক! কিন্তু ফ্যাক্টসগুলো জানা থাকতেই হবে – তাতে বা পাঠকের কাছে নেতি বা ইতিবাচক যাই হোক! এটাই আমার আবেদন থাকবে।
    কেন তাকে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিল? তিনি ছিলেন আসলে আমেরিকান ফোর্ড মটোর কোম্পানির প্রেসিডেন্ট। পরে তাঁকে (১৯৬১-৬৮) আমেরিকান সরকারের নিরাপত্তা মন্ত্রী  [Defence Secretary] করা হয়। এরপর তিনি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিলেন। কিন্তু কেন? কী তার এক্সপার্টিজ যা তাঁকে নিয়ে এত চাহিদা তৈরি করেছিল? খুবই সংক্ষিপ্তভাবে একটু উত্তর দেই। তিনি তাঁর বিশেষ ম্যানেজমেন্ট কোয়ালিটি এই সক্ষমতার জন্য বিখ্যাত বলে নিয়োগদাতারা বিশ্বাস করতেন। তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রীর আমলটাই ছিল আসলে আমেরিকার ভিয়েতনাম যুদ্ধের কাল। আর সবশেষে বিশ্বব্যাংকে তাঁকে আনা হয়েছিল এটা মনে করে যে তাঁর আগমনের আগে বিশ্বব্যাংক এশিয়াতে এসে ভাল কাজ করতে পারছিল না। এর সুরাহা করতে। এশিয়ায় সরকারগুলোর সাথে মিলে কোন দেশের মূল অর্থনীতি খাঁড়া করলেও এর সুবিধা নিয়ে প্রান্তিক অঞ্চলের বহু গরীব লোককে তা স্পর্শ করতে পারছিল না। ঐ দেশের অর্থনীতিক কার্যক্রমে একেবারে প্রান্তিক গরীবদেরকে তাতে সামিল করতে পারছিল না। এটাই এককথায় বিশ্বব্যাংকের কর্মসুচি গ্রামের প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে সমস্যার  মুখোমুখি হচ্ছিল। এটা ভাঙতেই ম্যাকনামারার ম্যানেজমেন্ট বুদ্ধি কাজে আসবে মনে করা হয়েছিল।
    তাই ম্যাকনামারার টেকনিক অনুসরণ করতে গেলে এজন্য অর্থ অপচয় কিছু হলে হোক, এই নীতি নেয়া হয়েছিল। তিনি এক নয়া টার্গেট নেন প্রান্তিক অঞ্চলে যেভাবেই হোক কম সুদের ঋণ সহজলভ্য করতেই হবে – তাতে কিছু চোর বাটপার বিশ্বব্যাংকের অর্থ মেরে দিলেও ক্ষতি নাই। একবার প্রান্তিক অঞ্চলে অর্থ (ঋণ বা মূলধন) এভেলএবল করতে পারলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠি তাদেরকে ক্যাপিটালিজম এর অংশ করে ফেলতে পারলে পরে এরা নিজেরাই এগিয়ে আসবে। তাতে শুরুতে কিছু অর্থ ফেরত আসবে না, মেরে দিবে, অপচয় হবে তা হলেও কেবল শুরুতে এই পথেই আগাতে হবে। বিশ্বব্যাংক তাই অনুসরণ করেছিল। আর এসময়কালের অপচয় নিয়েই আনু মোহম্মদের মত অনেকেই সেকালের বাস্তবতায় লিখেছেন, এর অনেক অভিযোগ আছে। কিন্তু আশির দশকের শেষে বিশেষ করে ৯১ সালের পরে এসব এলোমেলো হয়ে থাকা অব্যবস্থা, ক্ষতি, অপচয় ইত্যাদি সবকিছুকেই কঠোর এক জবাবদীহিতার অধীনে আনা হয়। ইন্টিগ্রইটি [INTEGRITY] বা জবাবদীহিতা শাখাকে মূল আলাদা এক প্যারালাল শাখা তৈরি করা হয় যারা কেবল বিশ্বব্যাংকের বোর্ডের কাছে জবাবদীহিতা করবে। এভাবেই ম্যাকনামারার আমলের ইচ্ছা করে তৈরি কিছু আবর্জনা তখন সব সাফা করা হয়। এই পরীক্ষারই আরেক অংশ ছিল আমাদের শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থা মত  প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিল্পঋণ বিতরণ করার উদ্যোগ। যেখানে বিশ্বব্যাংকের অনেক অর্থেরই অপচয় হয়েছিল। এতে বলাই বাহুল্য এই সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট জিয়ার সরকারের নয়, তাই এতে অনাদায়ী খেলাপী ঋণের দায়ও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের উপর চাপায় নাই। কিন্তু সেকথা উল্লেখ না করে জিয়াকে দায়ী করে এমন বক্তব্য দেয়া ইন্টেলেকুচুয়ালি গ্রহণযোগ্য নয়! সৎ ততপরতা নয়!

    আরেকটা কথা বলে শেষ করব, এটা মার্কসের এক তত্ব যে যেকোন দেশের শিল্পায়নের শুরুতে যে পুঁজির যোগাড় তা এসেছে অন্যের অর্থ আত্মসাত করেই বা সরকারী ট্যাক্সের অর্থ না দিয়ে সেই অর্থ মেরে দিয়ে ইত্যাদি ধরণের সব অসদুপায় ব্যবহার করেই। এটাই মার্কসের আদিম পুঁজি সঞ্চয়ের তত্ব।  ম্যাকনামারার বিশ্বব্যাংক এটাকেই ইতিবাচকভাবে নিয়েছিল। তাই খেলাপি ঋণের নামে অর্থ লোপাট করতে দিয়েছিল।  যেমন একটা একসময়ের বিড়ি ফ্যাক্টরির কথা জানি যে ১৯৯৯ সালের ১০০ কোটি টাকা আবগারি টাক্স মেরে দিয়েছিল যা সরকারের প্রাপ্য ছিল। কিন্তু সে ছিল আসলেই ভাল উদ্যোক্তা। তাই সে মেরে দেওয়া সেই ১০০ কোটি সেকালের বিচারে অনেক টাকা। সেই অর্থ দিয়ে সে ছয়টা নতুন কোম্পানি খুলেছিল যার চাওরটাই ছিল কারখানা আর দুইটা মার্কেটিংয়ের। এবং সবগুলোই এখন খুবই ভাল চলে এখন সে শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসায়ী। ম্যাকনামারা এই পথ ধরার পক্ষপাতি ছিলেন।
    কিন্তু ম্যাকনামারার শেষ জীবন কাটে হতাশায়। শেষ পনেরো বছর তিনি কারো সাথে দেখা করতেন না। কোন সাক্ষাতকারো না। এভাবেই তিনি ২০০৯ সালে মারা যান। কিন্তু কেন তিনি একান্তে চলে গেছিলেন সেটাই জানা জরুরি। তাঁর কোনকিছুই   গ্রহণ করে নিবার কথা আমি বলছি না। তবে তাকে বিস্তারিত জানা আমাদের অনেক কাজে লাগবে বলে আমি মনে করি।

    শেষ কথাটা হল, নিশ্চয় আমি রেহমান সোবহানকে এসব দিক জানাবার বা শিখাবার কেউ নই; আমি তুলনার অনেক ছোট্ট তুচ্ছ। তবে দাবি ও আশা করব অন্তত তিনি এসব জেনে নিয়ে তবেই না মূল্যায়ন করে মন্তব্য করবেন যে দেশে খেলাপি ঋণের জনক জিয়াউর রহমান – কথাটা সত্যি কিনা!! অবশ্যই আমি এবিষয়ে তাঁকে শিখাবার কেউ না, এটা আমার কাজও না। তাঁর প্রতি কোন উদ্ধত্ত দেখানো এটাও আমার জন্য হারাম। তিনি আমাদের কাছে সম্মানিত অবশ্যই! কিন্তু কম বা যথেষ্ট চিন্তা না করে কেউ একটা মন্তব্য বা কথা বলে ফেলবে এটাও আশা করি না!  অগ্রহণযোগ্য!

    ২।  এবার তুলনা করব। বাংলাদেশের এখন যে ঋণ খেলাপির ঘোরতর সমস্যা তা কী শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থার এর খেলাপি ঋণের মতন?
    প্রশ্নই আসেনা। পদ্মা ব্যাংকের কথাই যদি ধরি, পদ্ম্যা ব্যাংকের খাতক আর শিল্প ব্যাংকের সেবা খাতক এক নয়। সবচেয়ে বড়কথা আমানতের প্রশ্ন। পদ্মা বা ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানত সরাসরি দেশের আম জনতার। আপনার-আমার বাসায় গৃহিকর্মী হেল্পারের কাজ যারা করে এখন গরীব মহিলাদের অর্থ। যারা মাসে দুশ-পাচশ করে টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করে, তাদের কষ্টার্জিত আমানত করা টাকা। আর সে টাকাই ঋণ দিয়ে খেলাপী করা হয়েছে। তাই কোনভাবেই ন্যাশনাল ব্যাংক আর শিল্প ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এক বা তুলনীয় উদাহরণ নয়। কারণ, শিল্পব্যাংকের আমানত বিশ্বব্যাংকের দেয়া আর তারা জানে এটা তাদের এক্সপেরিমেন্ট; তাই অর্থ ফেরত নাও আসতে পারে।

    তাহলে এখন প্রশ্ন রেহমান সোবহানের মত এক ব্যক্তিত্ব তিনি ন্যশনাল ব্যাংক ধরণের ক্রাইসিসে পরা ব্যাংকের খেলাপি হওয়া আর শিল্প ব্যাংকের খেলাপি – এদুটাকে এক করে দেখলেন কেন? কীভাবে?  এ যেন “সোবহান” যার যার নামের সাথে আছে তারা সবাই কী একই রকম ব্যবহারের হবেই? তেমনই অনাদায়ী খেলাপি ঋণ মানেই কী এমন সব কেসগুলো একই?  তাহলে  এসব ফারাক বুঝা কী রেহমান সোবহান সাহেব এর জন্য কঠিন কোন কাজ? আমরা বুঝতে অক্ষম!

    একমাত্র পথ হল, ইন্টেলেকচুয়াল সততা বজায় রেখে আমাদের সকলের কাজ-মন্তব্য করা উচিত!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ     ০৩ এপ্রিল ২০২৪  সন্ধ্যা ৬ঃ ১৫
    এই আপডেটে মূলত -‘ভ্যালু এডিশন চেইন’ নিয়ে অংশটাই একটু বিস্তার ঘটানো হয়েছে।

     

     

     

  • ইরান-ইসরায়েল বিরোধের ইস্যুকে বুঝবার পদ্ধতি ও সাথে অন্যান্য

    ইরান-ইsরায়েল বিরোধে,
    এই ইস্যুকে বুঝবার পদ্ধতি ও সাথে আমার কিছু রিডিং
    গৌতম দাস
    ১৫ এপ্রিল ২০২৪   সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা

    https://wp.me/p1sCvy-5wh

     

    US will not take part in any Israeli retaliatory action against Iran

     

    ইsরায়েলের উপর ইরানের হামলা আসন্ন বলে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল আর এর আগে গাজায় লাগাতর ইরায়েলি ম্যাসাকার ঘটে চলা ইত্যাদি এসব কিছুর একটা পর্যায় সম্ভবত আমরা পার হতে যাচ্ছি। বিশেষত ইরানের হামলার পরে কী যুদ্ধ দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে যাবে – এই ছিল সারা দুনিয়া তো বটেই গ্লোবাল অর্থনীতি ও রাজনীতির মুখ্য টেনশন। এই টেনশন বা টান টান উত্তেজনার একটা আপাত পর্যায়কাল শেষ হল বলে সকলের ধরে নিচ্ছে।  বিশেষ করে খোদ ইsরায়েল বড় বাঁচা বেঁচে গেছি বলে দুর্ঘ্নিশ্বাস ফেলেছে। আর কথিত পশ্চিমা ওস্তাদদেরকে থ্যাঙ্ক জানিয়েছে। ……credited an international military coalition with helping thwart   .।
    কিন্তু আকাঙ্খা –  নানান মুসলিম-প্রধান দেশের মূলত তরুণদের পর্বত প্রমাণ ‘মুক্তির’ আকাঙ্খা মানে প্যালেসটাইনিদের জন্য সহমর্মীতা থেকে উতপন্ন যেসব আকাঙ্খা সেই আকাঙ্খা-চাহিদার তুলনায় বাস্তবে ইsরায়েলকে ইরানের শিক্ষা দেয়া মানে, মিসাইল ও ড্রোন নিয়ে হামলার কার্যকারিতা হয়ত তুলনায় কম মনে হচ্ছে! সেকারণে, অনেকেই অসন্তুষ্ট! অনেককে দেখেছি ফেসবুকে ইরানের উপরই ঝাল ঝেড়ে ক্ষোভ প্রশমণ করেছেন!
    এবারের গত বছর ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় হত্যার যে অসহনীয় পরিস্থিতি ও গাজাবাসীর আত্মত্যাগ তা কী এবারও ক্ষতি বেশী লাভ তুলনায় কম হয়েই থাকবে?

    আগেই মূলকথাটাই সরাসরি বলে নেয়া যাক; প্রসঙ্গের ভিতরে ঢুকে বিস্তারে যাবার আগেই। আরব-ইরায়েলের যুদ্ধ-দ্বন্দ্ব-রক্তাক্ত সংঘাত সেই ১৯৪৮ সালে ইsরায়েল – এই দানব রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই। অথচ প্রকৃত ও শুরুর দ্বন্দ্বটা ছিল ইsরায়েলের সাথে পশ্চিমাস্বার্থের, পশ্চিমা দেশগুলোর। বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে ইউরোপ থেকে ইহুদিবিরোধী চরম মনোভাব বা জর্মান-কেন্দ্রিক নির্মুলের [cleansing] মনোভাব থেকে।  তাই ইউরোপে ছড়িয়ে থাকা ইহুদি জনগোষ্ঠি শেষে সারা ইউরোপ ছেড়ে পুনর্বাসিত হতে  দখলীকৃত প্যালেস্টাইনী ভুমিতে ইsরায়েল রাষ্ট্র জন্মাক, গড়ে উঠুক – এটা চেয়ে আমেরিকার নেতৃত্বে সারা পশ্চিরা সরকারগুলো এই ভূমি দখলী কাজে ইsরায়েলকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহায়তা-সমর্থন করেছিল। এভাবেই নিজেদের পাপ ও অপরাধ তারা মুসলমান উপরে সঁপে দিয়েছিল!

    হিটলার ইউরোপ থেকে ইহুদি জনগোষ্ঠি নির্মুল-নিধনের এথনিক ক্লিনজিং [ethnic cleansing] এর অপরাধ করেছিলেন। এই নৃশংস ঘটনায় কোন মুসলমান-প্রধান রাষ্ট্র বা কোন মুসলমান জনগোষ্ঠি একেবারেই সংশ্লিষ্ট নয় বা কখনও  কোন দৃশ্যপটেই ছিল না। মূলত জর্মান থেকে তাদের নির্মুল ও বের করে দেওয়া হলেও যেহেতু আরব বা প্যালেস্টাইন ভুমিদখল করে তাদের ঘাড়ে চড়ে সেখানেই ইহুদিদের বসতি গড়তে ঠেলে দেয়া হয় তাতে ইহুদিরাও আর সারা ইউরোপ বা আমেরিকাকে আর শত্রু ঠাউড়ালো না। নয়া শত্রু ঠাউড়ালো আরব বা মুসলমানদের।  যে নয়া শত্রুর ভুমি ইহুদিরাই দখল করেছিল। আর দখলিকাজে পশ্চিমারা ইহুদিদের সাহায্য-সহায়তা তাদের করেছিল বলে ইহুদিরা নিজেদের আসল শত্রুদের ভুলে যায় ও মাফ করে দেয়। অথচ জন্ম থেকেই খৃশ্চান ধর্ম বা এর অনুসারীরা ইহুদিদের শত্রু হয়েই জন্মেছিল – ইহুদি-খৃশ্চান বিরোধ তাই তখন থেকেই।  তা সত্বেও  ওদিকে যারা কিছুই করে নাই সেই মুসলমান বা আরবেরা হয়ে যায় ইহুদিদের নয়া টার্গেট, নয়া মূল শত্রু!

    এ যেন বাইরে ব্যাপক মার খেয়ে এসে হতাশ পুরুষের বাসায় ফিরে মনের সুখে  বউ পিটানোর বিপ্লবীপনা!! ইহুদিরা যদি প্যালেস্টাইনিদের উপর তাদের ভুমিতে জবরদখলি করে পুনর্বাসিত না হয়ে যদি, ইউরোপের কোন ভুমিতেই নয়া আবাস গড়ত হত তাহলে যারা ইহুদি এথনিক ক্লিনজিং এর হোতা তাদের সঠিক ভাবে অপরাধের প্রতিকার হত!!
    অথচ নয়া ঠাউড়ানো শত্রু মুসলমানদের উপর দানব ইsরায়েল রাষ্ট্রের অত্যাচার এখনও চলছে; আর এটাই এখন আর কোন আরব রাষ্ট্রই দায় নিতে চায় না; একে কেকে সবাই কেটে পড়েছে আর যেন সব দায় সওয়ার হয়েছে ইরানের ঘাড়ে। আর সেটাই একালে ইরান-ইsরায়েল বিরোধ-সংঘাত হিসাবেই হাজির! গত ১৯৭৮ সালে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির পর থেকে কোন মুসলমান রাষ্ট্র আর প্যালেস্টাইনের পক্ষে লড়াইয়ে লক্ষ্যহীন হয়ে সক্রিয় থাকতে চায় নাই ; আরব জাতিবাদের পক্ষের রাষ্ট্র বলেও কেউ আর থাকতে চায় নাই। আরব জাতিবাদের পরিচয় ফেলে সবাই সেই থেকে নিজ নিজ আরব পরিচয় পিছনে ফেলে নিজ নিজ দেশ-রাষ্ট্রের জাতিবাদ [আরব জাতিবাদের বদলে সিরীয় বা মিসরীয় জাতিবাদ হয়ে গেছে] বলে পরিচয় বদলে নিয়েছিল। আর এঘটনারই আরেক ভাষ্য হল, আরাফাতের পিএলও [PLO] বা পিএফএলপি [PFLP] নামে যত বিপ্লবী যোদ্ধা ছিল সেসব হারিয়ে এখন মূখ্য নাম ইরান-সমর্থিত হামাস [HAMAS]! প্রথম দিকে হামাস এরা ইসলামি দল বলে প্রগতিশীলেরা নাক শিটকালেও এখন বাস্তবতা হল, হামাস ইসলামিস্ট কিনা সেই আপত্তি তলিয়ে গেছে – বাস্তবতায় মুরোদ দেখানোর সক্ষমতার বিচারে হামাস হল  এক সাহসী লড়াকুর নাম!  এরাই একমাত্র – ভুলে যাওয়া প্যালেস্টাইনদের লড়াইকে আবার চাঙ্গা করেছে! সামনে এনেছে! যদিও পথটা খুবই কঠিন ও চড়া মূল্যের। ইতোমধ্যেই তেত্রিশ হাজারের উপর জীবন, গাজাবাসীকে জীবন দিয়ে দিতে হয়েছে। কিন্তু তবু মুখ্য সাফল্য হল, ভুলিয়ে দেয়া লড়াইকে আবার সামনের কাতারে হাজির করা গেছে।  এবারের লড়াই-সংগ্রামের সবচেয়ে বড় সাফল্য এটাই। একে তুচ্ছ করা খাটো করে দেখা অপরাধ হবে! সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করব, আকাঙ্খার তুলনায় এই অর্জন হয়ত কম মনে হতেই পারে! কিন্তু দেখা-বিচারের ক্ষেত্রে একে যেন খাটো করে দেখা না হয়। ছোট করে না দেখা হয়। কারণ, এই অর্জনের তাতপর্য ব্যাপক!

    ইতোমধ্যে এতদিনে অন্যদিকের আরেক ডেভেলবমেন্ট হল, আমরা জানি চলতি নয়া শতকে মুসলমানেরা বঞ্চিত, উপেক্ষিত ও বৈষম্যের শিকার বলে একটা অনুভব ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে; এই বলে তাদের মুক্তি – গ্লোব-জুড়ে তাদের মুক্তির আকাঙ্খা এখন অনেক দূর ছড়িয়েছে। বিশেষ করে বুশের ওয়ার অন টেররের আমলে তাদের উপর আক্রমণ, সীমাহীন বৈষম্য অন্তহীন হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আমাদের মত দেশে মুসলমানেরা বঞ্চিত, উপেক্ষিত বলে তাদের মুক্তি চাই বলে যতই চিতকার উঠুক – তা বাস্তবায়িত হবে ততটুকুই যতটুকু  এখনকার দুনিয়ার মূল দ্বন্দ্ব-বিবাদে ও মেরুকরণে  ইসলামি আকাঙ্খা কতটা বাস্তববাদী হয়ে প্রধান দ্বন্দ্বে ভিতরে নিজেকে সফলভাবে গেঁথে দিতে / নিতে পেরেছে।

    প্রধান দ্বন্দ্ব বুঝতে পারা খুব গুরুত্বপুর্ণঃ
    ইরান কেন আরো বেশী করে ইসরায়েলের উপর আমাদের তরুণের আকাঙ্খা পূরণের মত আক্রমানাত্মক হতে পারলো না? – এটাই এখনকার  এক প্রধান জিজ্ঞাসা! অনেকে মনে করছেন ইরান ভিতু, কম মুরোদের কিংবা ওরা শিয়া বলে নেতৃত্ব দিতে পারল না!
    কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এগুলো একটাও সঠিক না। বিষয়টা সঠিক বুঝবার এপ্রোচ নয়!  তাহলে কীভাবে বুঝব কোনটা সঠিক? তরুণের আকাঙ্খা কী এভাবে মার খেতেই থাকবে?

    না, অবশ্যই না। তবে এসব ঘটনা বুঝবার পদ্ধতি না জানা থাকলে এমন অপ্রয়োজনীয় দোষারোপ চলতেই থাকবে।

    প্রধান দ্বন্দ্ব বুঝতে পারা এসব এক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি। প্রধান দ্বন্দ্ব মানে?
    একটা সমাজ, রাষ্ট্রে বা এমনকি একটা পরিবারে অনেক ধরণের স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা সমস্যা থাকে। একটা পরিবার দিয়েই যদি বলি ধরা যাক – অনুমিত এমন পরিবারে ধরা যাক দু-তিন ভাইবোন আর বাবা-মা নিয়ে সংসার; যেখানে বাবা চাকুরিজীবী মানে যার আয়ে ঐ সংসার। এখন ঐ বাবার চাকরি টিকিয়ে রাখা, তিনার নিজে সক্ষম থাকা ফিট থাকা এটাই সেখানে প্রধান স্বার্থ। এর বাইরে ধরা যাক বড় ছেলে রাজধানীতে গিয়ে ইঞ্জিয়ারিং পড়তে চায় আর এই লক্ষ্যে কলেজ স্তরেই তাকে ভালো টিউশন শিক্ষক মানে পড়ালেখায় বিনিয়োগ দেয়া জরুরি।  কিন্তু এই চাহিদা-আকাঙ্খা কোনভাবেই বাবা কেন্দ্রিক প্রধান স্বার্থ যেটা ঐ পরিবারের এর চেয়ে বড় হতে পারবেই না। ছেলের স্বার্থই প্রধান এমন গুরুত্বপুর্ণ জিনিষ হতে পারবে না। একইভাবে অন্য ভাইবোনদেরও পড়ালেখা বেড়ে উঠার যেসব চাহিদা-আকাঙ্খা আছে সেগুলো পুরণ হওয়া এটাও বাবা কেন্দ্রিক প্রধান স্বার্থের চেয়ে বড় হতে পারবে না।  এমনকি মায়ের কোন অসুস্থতাও না। বাবার ফিট থাকা প্রধান স্বার্থ কারণ, বাবাটাই প্রধান বা পরিবারে একমাত্র আয় আনবার ব্যক্তি। বাবা না থাকলে পরিবার পথে বসবে।

    আমাদের বর্তমান দুনিয়া ইতিমধ্যে (মূলত অর্থনৈতিক কারণে) এতই পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে গেছে যে একালে যে কোন কিছুই আর লোকাল-আঞ্চলিক বিরোধ দ্বন্দ্ব নয়। সব দ্বন্দ্বই মিটাতে গেলে সমাধান পেতে চাইলে তা গ্লোবাল ইস্যু হয়ে যায়। কিন্তু গ্লোবাল ইস্যুতে প্রধান দ্বন্দ্ব আরেক জিনিষ, আরেকটা ইস্যু। তাই সব লোকাল ইস্যুকেই সবার আগে গ্লোবাল প্রধান দ্বন্দ্বে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিতেই হয় – এক মেরুকরণে অবস্থান নিতে হয়। প্যালেস্টাইন ইস্যু বা আরব স্বার্থ বা মুসলিম তরুণদের আকাঙ্খা যেটাই হোক তা মিটতে পারে তাই গ্লোবাল প্রধান দ্বন্দ্ব মিটা বা সমাধান কিভাবে হবে সেই সাপেক্ষে।  প্রধান দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে  মুসলিম তরুণদের আকাঙ্খা পূরন হতে পারবে না।

    গ্লোবাল পালাবদল এর সময়কালেঃ
    আসলে, গ্লোবাল ইস্যুতে প্রধান দ্বন্দ্ব-বিরোধ হল যে এটা পালাবদলের কাল, মানে গ্লোবাল নেতৃত্বেই এখানে পালা বদল আসন্ন। গত প্রায় আশি বছরে ধরে আমেরিকা যে গ্লোবাল নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে তা পরিবর্তিত হতে চাইছে – উদিয়মান চীনের হাতে। তাই চীনকে এখন এক নয়া গ্লোবাল মেরুকরণ ঘটাতে নামতেই হচ্ছে।
    মধ্যপ্রাচ্য নীতি বা মিডল-ইস্ট পলিসি অর্থে কথাটা তুলছি। ১৯৭৩ সালের শেষে কিসিঞ্জার আমেরিকান মিডল ইস্ট পলিসি দিয়েছিলেন যা এতদিন ধরে আমেরিকা নিজ স্বার্থ, রাজত্ব সামলিয়েছে। এটা মুখ্যত গালফ রাজতন্ত্রগুলোকে নিজের পক্ষে দাঁড় করিয়ে আমেরিকা এদের ব্যবহার করে গেছে।
    কিন্তু একালে কখন চীন মধ্যপ্রাচ্য এর ভিতরে ঢুকে গেছে আর সব মেরুকরণ উলটে দিয়েছে বাইডেনের আমেরিকা তা টের পাবার আগেই কাজ শেষ করেছে। আমেরিকান ব্যর্থতার শুরু এখান থেকেই। সবচেয়ে দৃশ্যমান হল, ইরান বিপ্লবের (১৯৭৯) পর থেকে লাগাতর সৌদি-ইরান বিরোধ। আমেরিকা এই বিরোধকে আরো উস্কে তুলে সৌদিদের সুরক্ষা দিচ্ছে এই ভান করে আমেরিকা নিজের পক্ষে মানে ইরানকে দাবড়ে বা বঞ্চিত রাখতে এর সুবিধা ব্যবহার করে গেছে। কিন্তু কখন চীনা মধ্যস্থতায় সৌদি-ইরান নুন্যতম একসাথে কাজ করতে সম্মত এমন কূটনীতি-ব্যবসা বিনিময়ে নয়া পথ খুলে ফেলেছে তা আমেরিকা যখন টের পেয়েছে তা অনেক দেরি হয়ে গেছে। চীনা নয়া মেরুকরণে, তুরস্ক, ইরান আর এদিকে মালয়েশিয়া ইত্যাদি মুসলমান-প্রধান রাষ্ট্রগুলো একটা কমন রাজনীতি নীতিমালা যেন অনুসরণ করতে পারে এমন কাছাকাছি চলে এসেছে।
    আবার ওদিকে নয়া আফগানিস্থানে দেখেন;  আমেরিকা বিতাড়িত করে সদ্য মুক্ত আফগানিস্তানে তা-লে-বা-নদের সাথে চীন নয়া ও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। আফগান মাটির নিচের কেবল দামি পাথর উত্তোলন ও তা বাজারজাতকরণ ঘটিয়েই চীন আফগান অর্থনীতি উজ্জ্বল করে দিয়েছে। যদিও বিনিময়ে চীনা রাজনৈতিক  চাহিদা ছিল একটাই যে,  আফগান শাসকদেরকে তাদের দেশের ভিতরে আশ্রয় নেয়া আইএস-কে [খোরাসান] দূরে ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। যারা মূলত সশস্ত্র চিনা উইঘুর গোষ্ঠির আশ্রয়দাতা ও পৃষ্ঠপোষক!  আর ওদিকে  আইএস-কে এখন প্রায়ই গোপনে আমেরিকা পক্ষ হয়ে (এমনকি সময়ে ভারতেরও হয়েও) খেপ মারা এসাইমেন্ট (বোমাবাজি বা হত্যার) করে দেয়। [সম্প্রতি রাশিয়ায় গানের কনসার্টে হামলার ক্ষেত্রে এরা সি আইএ এর হয়ে কাজ করেছে বলে পুতিনের অভিযোগ অনুমান।]।  হিলারি ক্লিনটনের আমলে এরাই একইভাবে ঠিকা নিয়ে লিবিয়াকে তছনছ করে রাস্তায় গাদ্দাফিকে লিঞ্চিং করেছিল। কিন্তু সবটা লাভ হয় নাই। এরাই শেষে বেনগাজি আমেরিকান এমবেসিতে রাষ্ট্রদুত-সহ সকল স্টাফকে হত্যা করে পালিয়ে গিয়েছিল!

    আবার দেখেন, বাইডেনের প্রথম তিন বছরে,  ইরানের উপর আমেরিকা নিরন্তর ডলার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইরানকে পঙ্গু করে রেখে দেওয়ার চেষ্টা করে গেছে। এর বিপরীতে চীন ইরানি তেল কেনার ২৫ বছরের চুক্তি করেছে, বিভিন্ন পণ্য বিনিময়, চীনা বিনিয়োগ আর চীনা ইউয়ান ব্যবহার করতে দিতে দিয়ে চীন ইরানকে এক বিকল্প দুনিয়ার সন্ধান করে দিয়েছে। সারকথায় সব মিলিয়ে এক নয়া ভারসাম্যে নয়া মেরুকরণের মধ্যপ্রাচ্য – এই অর্থে এক নয়া গ্লোবাল অর্ডারের ইঙ্গিতও এখানে আছে। আর এর ভিতর দিয়েই মধ্যপ্রাচ্য রাষ্ট্রস্বার্থগুলো যখন নিজেদের মধ্যেকার স্বার্থ-বিরোধকে যদি সামলে রাখতে পারে তরে সকল রাষ্ট্রই এক এক নয়া মুক্তির দিশা – টানেলের প্রান্তে আলো দেখতে পেতে পারে। এই হল এর সারকথা।   সৌদি আরবও তার ২০৩০ সালের মধ্যে বর্তমানের কেবল তেলবিক্রির উপর নির্ভরশীল এমন  একচেটিয়া নির্ভর করা দেশ নিজ অথনীতিকে তেলের বাইরে এক নয়া অর্থনৈতিক ভিত্তির সৌদি হয়ে উঠতে -যুদ্ধ সংঘাত টেনশেন ও অস্থিতিশীলতা পাশে ফেলে নিজ আকাঙ্খা পূরণ করতে পারে – চীনের নয়া মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে সৌদি এখান থেকে দেখছে।
    একটা সাবধানবাণী দিয়ে রাখি।
    এটা চীনপন্থি হওয়া নয়; তা হয়েছে বা হতে ইঙ্গিতও দিচ্ছি না।  সারকথাটা হল, গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল হঠাত সহসা ঘটে না। তবে এখন এটা আসন্ন, তাই সবাই এর সুযোগ নিতে চাইছে – এতে আমেরিকার বিকল্প যে কোন নেতৃত্বের বেলাতেই এমনই ঘটবে। এতে সব রাষ্ট্রই পুরানা বৃত্ত পুরানা রেস্টিকশন বা টেনে দেওয়া সীমা ভেঙ্গে – নয়া কোন ভারসাম্য নিজের পক্ষে গড়ে নিবার সুযোগ হিসাবে দেখবেই। তাতে এই বিকল্প এটা চীন কী না – আমি বা আপনি চীনকে ভালবাসি পছন্দ না ঘৃণা করি বা ভক্ত? সেসব বিচার এখানে একেবারেই গৌণ! এককথায় একমাত্র নিজ নিজ রাষ্ট্রস্বার্থই এখানে প্রধান এক্টর!!
    শেষের ঘটনা দিয়েই যদি বলি, সংকীর্ণ আত্মস্বার্থে পলায়নপর গালফ স্টেট এর লজ্জাজনক ২০২০ সালের কাজ ছিল তথাকথিত আব্রাহাম একর্ড [Abraham accords ] নামে ইরায়েলের সাথে নিজ  নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের প্রটেকশন চুক্তিতে যাওয়া। দুবাই ও বাহারাইন [UAE and Bahrain ] প্যালেস্টাইনিদের ভুলে গিয়ে ই-রায়েলের সাথে এই আপোষ চুক্তি করেছিল।  যেখানে দুবাই ছিল আসলে সৌদি আরবের এডভান্স পার্টি। মানে সোদিদের এই আপোষপথ অনুসরণ করার কথা ছিল। এনিয়ে দ্বিপাক্ষিক সৌদি-ইওরায়েল বৈঠকও চলমান ছিল। কিন্তু গত বছর এপ্রিল ২০২৩ সালে সব উলটে যায়।

    The United Arab Emirates and Bahrain made peace with Israel in 2020 through
    the so-called ‘Abraham accords’ and Saudi Arabia was considering following
    suit in return for U.S. security commitments.

     

    সারকথায়, এই গ্লোবাল পালাবদল এই গ্লোবাল দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে উপেক্ষা করে কোন মধ্যপ্রাচ্য স্থিতিশীলতা দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। অর্থাত প্রধান দ্বন্দ্ব মীমাংসার অংশ নিতে হবে। আর এরই নয়া মেরুকরণের ভিওত্রে ঢুকে এর মধ্যে নিজ নয়া স্বার্থ বের করে আনতে হবে।
    আর একই কথা প্যালেসটাইনের মুক্তির প্রশ্নের নয়া ও বাস্তব দিশা!

    দানব ইসরায়েলি রাষ্ট্র গড় উঠেছে নেতা আমেরিকার প্রশ্রয়ে প্রটেকশনে এবং এখনও টিকে আছে আমেরিকান ডেমোক্রাট বা রিপাবলিক দুদল নির্রবিশেষে এদের প্রশ্রয়ে প্রটেকশনে। চীনের নয়া মধ্যপ্রাচ্য নীতি প্রতিক্রিয়ায় কার্যত ইসরায়েলকে আরো বেশী করে আমেরিকার কোলে উঠিয়ে দিয়েছে যেটা এখন ইউরোপের কোলেও তুলে দিবার সামিল। আর এতেই ওদের আসল নৈতিক সংকটকে উদাম করে দিয়েছে।
    ইসরায়েলকে এবারের ইরানের হামলা থেকে রক্ষা করতে এগিয়েছে কারা? বৃটিশ, ফরাসি আমেরিকা এরা? আর বলছে নাম প্রকাশ করতে চায় না এমন আরো কিছু দেশ! যে অন্যের ভুমি দখলকারি তার আবার নিরাপত্তা দিতে এগিয়ে এসেছে পশ্চিম, এই নৈতিক সংকট এতই দেউলিয়া এখানে!

    পুরানা প্রগতিশীল (ইসলাম কোপানো) ধারণার উপর দাঁড়িয়ে অনেকে বলে থাকেন, যে দানব ইsরায়েল রাষ্ট্রকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা আমেরিকা এনেছে এথেকে দুনিয়াকে মুক্ত হতে নাকি আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ লাগবে। মানে এদের সারকথাটা দাঁড়ায় সে এটা নাকি প্রায় অসম্ভব!!  কিন্তু না, সরি; এই চিন্তা অপরিপক্ক!
    ব্যাপারটা বিশ্বযুদ্ধ হতেই হবে তা না। বিষয়টা হল দানব ইসরায়েল টিকে আছে আর নিরন্তর নুইসেন্স করে যেতে পারছে কারণ একে প্রটেক্ট করছে আমেরিকা। কাজেই গ্লোবাল নেতা থেকে আমেরিকার সরে যাওয়া, চ্যুত হয়া দুর্বল হয়ে যাওয়া এটা ঘটে গেলেই – এটাই একমাত্র প্রয়োজনীয় শর্ত। এখন আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে চলে যাওয়া কী করে ঘটবে তা আমরা নিশ্চিত জাতি না। কিন্তু সেকারণে, এটা ঘটতে আরেকটা বিশ্বযুদ্ধই লাগবে এমন করে কথা বলাটা একেবারেই বোকামি; আর দানব ইsরায়েল রাষ্ট্রের বিলুপ্তি এর বাস্তবায়নের পথ কেবল এটাই বলতে পারা উচিত; দানব ইsরায়েলের বিলুপ্তি অসম্ভব – এমন মানে করা ইঙ্গিতপুর্ণ কথা বলার তো প্রয়োজন নাই। এর চেয়ে গ্লোবাল পালাবদলকে ফলো করা য়ার বুঝতে পারাই যথেষ্ট।

    আমাদের মত দেশের মুসলিম তরুণদের আকাঙ্খার কথা বলছিলাম।  তাদের আকাঙ্খায় থাকা কোন ইসলামি বিপ্লব বা রাজনীতি কতটা সঠিক বা ভাল সে বিচার-পর্যালোচনা এখানে এখন পাশ কাটাবো, প্রসঙ্গটা আলাদা বলে। তবে এর মধ্যে কেবল পরিবর্তনের  আকাঙ্খাটাকে নিয়ে কথা বলব। আর তা করতে চাইলে তাঁদেরকে অন্তত গ্লোবাল প্রধান দ্বন্দ্ব বা পালাবদলের ভিতর দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য নয়া নীতি নয়া মেরুকরণকে দেখতে পারতেই হবে। এটা কেবল ইরানের বা সৌদি রাষ্ট্রের বিচার-পর্যালোচনা নয়। মনে রাখতে হবে প্যালেসটাইন ইস্যু নিজে নিজেই দুনিয়ার প্রধান দ্বন্দ্ব নয়। আসন্ন  গ্লোবাল পালাবদল এই গ্লোবাল দ্বন্দ্বকে ঘিরে যে নয়া মেরুকরণ ঘটছে ঘটবে এই ভিতরেও প্যালেসটাইন ইস্যু বা দানব ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিনাস এই উপস্বার্থ-কে দেখতে পারতে হবে। আর তবেই সফলভাবে এর সমাধান বের করে আনা যাবে। অরুণদের আকাঙ্খাকে অস্থিরতা দিকে নয় বরং স্থিরতা ও গ্লোবাল পালাবদল এই গ্লোবাল দ্বন্দ্বকে বুঝাবুঝির সক্ষমতা অর্জন করতে হবে; কারণ এটাই এখানে মুখ্য হবে। সবচেয়ে বড় কথা চীনা নয়া মধ্যপ্রাচ্য নীতি আর একে ঘিরে মেরুকরণের সময় প্যালেসটাইন ইস্যুর সমাধান ও দানব ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিনাস এই উপস্বার্থ উপযুক্তভাবে প্রোথিত করে নিতে হবে।

    ইরানের এবারের ইসরায়েলে হামলা কেন সীমিত ছিল এর প্রধান কারণ, গ্লোবাল অর্থনীতি এমনিতেই নুব্জ হয়ে আছে বিশেষত করোনা ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বাইডেনের ভুল সিদ্ধান্ত ভুল যুদ্ধ ইউক্রেন থেকে এখন ক্রমশ আরো সব সঙ্কট ছড়িয়ে পড়ছে। গত সাড় তিন বছরে দিশাহীন ডলার অবরোধের নেতি প্রভাব এখন ক্রমশ আরো সবল হচ্ছে – ডলারের বদলে ইউয়ানে গ্লোবাল বাণিজ্যে অগ্রগতি ঘটে গিয়েছে যা খোদ বাইডেনের নীতির প্রতিক্রিয়া – নিজের পায়ে কুড়াল মারা হয়ে উঠতে শুরু করেছে। আমেরিকান মুদ্রাস্ফীতি গত তিনমাসে আরো বেড়েছে আর তাতে ইতোমধ্যেই বাণিজ্য ব্যবস্থায় শঙ্কা ছড়িয়েছে। এর মাঝে যদি ইরানের ইসরায়েল হামলা তীব্র হয় তবে এর ধকল কাটানো মুশকিল হবে। যেমন সবার আগে তেলের দাম বৃদ্ধি পাবে যা এত সংকটের মধ্যেই গড়ে আশি ডলারের মধ্যে ছিল যা এখনও আশি-নব্বই ডলারের মাঝে থাকছে – এটা উথাল-পাথাল হলে সবার আগে উতপাদন ও মুল্যবৃদ্ধিতে সব এলোমেলো অনিশ্চিয়তার পথে হাটবে – যেটা আরেক অর্থে পধান ইস্যু।
    এই স্বার্থেই ইনফরমালি হলেও চীন=-আমেরিকার ম্যাসেজ বিনিময় ঘটেছে।  মধ্যপ্রাচ্য লেবেল এনিয়ে ব্যাপক কটনীতি  কাজ করেছে। রয়টার্স এনিয়ে চারটা রিপোর্টে এসব দেখিয়েছে। এমনকি ইরানের ইওরায়েলে হামলার পরে ইওরায়েল কোন পালটা হামলার চিন্তা করলে তা এই দেশকে নিলে দায়ীত্ব ও পরিণতির দায় নিয়ে করতে হবে বলে বাইডেন হুশিয়ারি দিয়েছেন। ইসরায়েলের যুদ্ধ-ক্যাবিনেটও এখন নিজে একা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না বা চাচ্ছে না। সে বন্ধু-শ্যন্য হয়ে পড়েছে। তাই পশ্চিমা-বন্ধুদেরকেও আর হারাতে চাচ্ছে না বলে এই সিদ্ধান্ত। আর মুখে বলছে ইরানের হামলার পরে তা যতই ক্ষতি ইসরায়েলের হোক না কেন এর কোন প্রতিক্রিয়া তারা এখন না ভবিষ্যতে কখনও দেখাবে।

    আপাতত এতটুকুই!

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ    ১৫ এপ্রিল ২০২৪  রাত ৯ঃ ০০

  • জেনেট ইয়েলেনঃ চীন-আমেরিকার কাছে আসা কী এখন শুরু হবে?

    বাইডেনের আরেক হারঃ
    চীন-আমেরিকার কাছে আসা কী এখন শুরু হবে?
    গৌতম দাস
    ০৮ এপ্রিল ২০২৪   সন্ধ্যা ০৭ঃ ৫২
    https://wp.me/p1sCvy-5vk

     

           U.S. Treasury Secretary Janet Yellen meets with Wang Weizhong, deputy party secretary and governor of Guangdong, … in southern China’s Guangdong province, April 5, 2024. (Pool/AP)

     

    আমেরিকায় বলে ট্রেজারী সেক্রেটারি, ইংল্যান্ডেও বলে ‘চ্যান্সেলার অফ এক্সচেকার’ আর সমতুল্য ভাবনায় আমরা যাকে বলি অর্থমন্ত্রী। তবে অবশ্যই কড়া সমতুল্য বলে কিছু নাই। কারণ, কঠোর বিবেচনায় সবগুলো ধারণাই আবার আলাদা বলেও মানে ট্রেজারী সেক্রেটারি আর অর্থমন্ত্রী এক নয় বলেও প্রমাণ করা যাবে। আমরা এখানে  তুলনীয় অর্থে ট্রেজারী সেক্রেটারি বলতে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের অর্থমন্ত্রী ধরে নিয়ে এখানে কথা বলব। বাইডেনের বর্তমান অর্থমন্ত্রীর নাম জেনেট ইয়েলেন [Janet Yellen]।  নিয়মিত হুঙ্কার দেয়া বাইডেন এর এই অর্থমন্ত্রী জেনেট চীনের কাছে এক আর্জি নিয়ে চীন সফরে গেছেন ও আছেন। একলম্বা সফর এপ্রিল ৩-৯ জুড়ে [From April 3-9,…… ] চলবে এই সফর বলে জানিয়েছে চীনের অবস্থিত আমেরিকান এমবেসী। কেন এই সফর তা এককথায় বললে, আমেরিকান এক রাজ্য জর্জিয়ার সোলার বিদ্যুৎ কোম্পানীগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সোলার কোম্পানি বলতে যারা electric vehicles, solar cells and lithium batteries ইত্যাদি এসব সম্পর্কিত পণ্য উতপাদক! কেন, আর তাতে চীনের সাথে এর সম্পর্কটা কী?

    জেনেটের নিজ সরকারী বিবৃতির ভাষায় বললে, ……because it could not compete against large quantities of goods that China was exporting at artificially depressed prices. সারকথাটা বাংলা করে বললে – “  চীনে উতপাদিত এই পণ্য উতপাদনের বিপুল সক্ষমতা ও তুলনামূলক কম-মুল্যের সাথে সমতুল্য আমেরিকান কোম্পানিগুলো পেরে না উঠাতে[could not compete] “ –  আমেরিকান কোম্পানিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
    পাঠককে পরিস্কার করে দেই এটা কোন নিউজ এজেন্সির রিপোর্ট থেকে কোট করি নাই। এটা জেনেটের নিজ মন্ত্রণালয় এর ওয়েব সাইটে প্রকাশিত জেনেটেরই বিবৃতি। তাই কোন ভিন্ন ব্যাখ্যা বা অর্থের ভিন্নতার সুযোগ নাই। আর, এখন আসি যে জেনেট ঠিক কী চাইতে চীনে এসেছেন? রয়টার্স লিখেছে, ...concerns are growing over the global economic fallout from China’s excess manufacturing capacity, বাংলায় সারকথা – এই পণ্যের গ্লোবাল মার্কেটে [এখানে গ্লোবাল মার্কেট বলতে মুলত আমেরিকান মার্কেটের উদ্বেগ বুঝতে হবে ] উতকন্ঠা বাড়ছে চীনের অতি-উতপাদন সক্ষমতার সাথে পারছে না বলে!!

    জেনেট কী আশা নিয়ে চীন সফরেঃ
    জেনেট কী আশা নিয়ে চীন সফরে তা বুঝবার সহজ পথ হল,  সফরে আলোচনা শেষে তিনি কী পেলেন এনিয়ে তার নিজের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত বিবৃতি পাঠ – এটাই সবচেয়ে ভাল সোর্স। সেই বিবৃতিটা এখানে পাওয়া যাবে।  এই বিবৃতির শিরোনাম – Statement from Secretary of the Treasury Janet L. Yellen on Announcement of New U.S.-China Initiatives Following Meeting -। আর ওর ভিতরের অংশ ছোট ছোট করে তুলে এনে বাংলায় পাঠককে দেখাবো এখন।

    ভিতরের বক্তব্য ১ঃ
    উচ্ছসিত খুশি প্রকাশ করে জেনেট ইয়েলেন বলছেন,
    আমি খুবই খুশি যে আমরা (তিনি ও চীনা প্রতিনিধি) একমত হয়েছেন যে তারা দুইটা তাতপর্যময় নয়া উদ্যোগ চালু করতে পেরেছেন। এতে কী হবে? এতে “আমেরিকান শ্রমিক ও কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষা পাবে আর এতে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ রক্ষিত হবে” – জেনেট বলছেন। সারকথায় এতে চীন আমেরিকান কোম্পানিগুলোর জন্য গ্লোবাল বাজারের কিছু অংশের ভাগ আপোষে আমেরিকাকে ছেড়ে দিবে।  আর সেটাই জেনেট কথিত  “two significant new initiatives”, আর এটাই এই সফরে তাঁর চীনের কাছ থেকে অর্জন! 

    “I am pleased that we have agreed to launch
    two significant new initiatives that will advance
    the interests of American workers and firms
    and help protect U.S. national security.”

    ভিতরের বক্তব্য ২ঃ
    এক নম্বর অর্জন হল, জেনেট বলছেন যে, “এখন চীন-আমেরিকা তাদের আভ্যন্তরীণ ও গ্লোবাল অর্থনীতির ইস্যুতে এক ভারসাম্যপুর্ণ অর্থনৈতিক উন্নতি [মানে আমেরিকাকে ছুড়ে ফেলে একক চীনা উন্নতি নয়] পথে গভীর নিচ পর্যন্ত স্বার্থ-মতামত বিনিময় করতে পারব। আর এতে চীনের অতি-উতপাদন সক্ষমতায় ভারসাম্য টানাসহ সাথে আমি এখানে সুযোগ নিব যাতে আমেরিকান কারখানা আর শ্রমিকেরা চীনের কাছে থেকে একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিজেদের জন্যও পায় – এদিকে চীন যেন খেয়াল রাখে। আমি বিশেষ করে কিছু সুনির্দিষ্ট উদ্বেগ প্রসঙ্গে খেয়াল রাখব যেমন কিছু উতপাদন সেক্টরে সরকারী সহায়তায় চীনের অতিউতপাদন সক্ষমতার ধাক্কা যা আমাদের উপর পড়ছে আর এই ধাক্কা আমেরিকান অর্থনীতির উপর পড়ছে”।

    First, we agreed that the U.S. and China will hold intensive exchanges on balanced growth
    in the domestic and global economies. These exchanges will facilitate a discussion around
    macroeconomic imbalances, including their connection to overcapacity, and I intend to
    use this opportunity to advocate for a level playing field for American workers and firms.

    I am particularly concerned about the impact of Chinese industrial overcapacity in
    certain sectors as a result of government support, and the impact it could have on
    the American economy. 

    ভিতরের বক্তব্য ৩ঃ
    এটা হল জেনেটের বলা এই সফরে তাঁর দ্বিতীয় তাতপর্যপুর্ণ অর্জন প্রসঙ্গে। কী সেই অর্জন?
    চীন-আমেরিকা দুদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যায়ে গ্লোবাল অর্থনীতিক নিয়ন্ত্রণ আনার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা।  এখানে দুদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুঝাতেই শব্দদুটো হল, Treasury-PBOC Cooperation।  যেখানে টেজারি হল জেনেটের মন্ত্রণালয় আর PBOC  মানে হল পিপলস ব্যাংক অফ চায়না – চীনে আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংক সমতুল্য তাদের প্রতিষ্ঠানকে বুঝাতে তা PBOC নামে ডাকা হয়। এবং এই সহযোগিতা বিনিময় হবে বিদেশে অর্থপাচার বিরোধী কাজগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতা।

    Second, we agreed that the U.S. and China will start Joint
    Treasury-PBOC Cooperation and Exchange on Anti-Money
    Laundering to expand cooperation against illicit finance
    and financial crime.
     

    অর্থাৎ এই পুরা সফরটার একটাই উদ্দেশ্য ছিল – সেটা হল, চীন-আমেরিকান সহযোগিতা, বিরোধ না।  কিন্তু সেটা এত দেরিতে এই বোধোদয় এত দেরিতে কেন? 

    চীন-আমেরিকান বিবাদ কী ও কেনঃ
    শুরুতে এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি গত ৩ এপ্রিল ২০২৪ মানে জেনেটের সফর শুরুর একই দিনে তবে কিছু আগেই,  বাইডেন-শি এক গুরুত্বপুর্ণ টেলিফোন কথোপকথন করেছেন। শি  মানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং  [Xi Jinping]। এই কথোপকথন নিয়ে আগ্রহিরা এই দুটা রিপোর্ট দেখতে পারেন। APnews আর  REUTERS  এদুইটা হল বিখ্যাত তিন গ্লোবাল নিউজ এজেন্সীর অন্যতম দুই কর্ণাধার। এটা পাঠক যারা এই প্রসঙ্গের গভীরে ঢুকতে চান তাদের জন্য।  তবে সারকথাটা বলে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার চারবছরের ক্ষমতা-আয়ুর তিনবছর তিন মাস পার করে ফেলেছেন; এছাড়া আর ছয়মাস (নভেম্বর ২০২৪ এর প্রথম সপ্তাহে)  এর মধ্যে তাকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরীক্ষা দিয়ে নিজেকে পাস দেখাতে হবে।  আর মিডিয়ায় জোর অনুমান পরিস্থিতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে যাবে। সে যাই হোক এই সময়কালে বাইডেন গড়ে বছরে একবারের কিছু বেশী হয়ত চীনা প্রেসিডেন্টের শি সাথে এমন  ফোনালাপ করেছেন! অর্থাৎ বাইডেনের নীতি ছিল চীন-মার্কিন অসহযোগিতা। এর পিছনের মূল কারণ কী?

    এটা পালাবদলের যুগ চলছেঃ
    এর পিছনের মূল কারণ বলতে প্রথমে যা আমাদেরকে বুঝতে হবে এটা পালাবদলের যুগে প্রবেশ করেছি আমরা।  এটা পালাবদলের যুগ মানে হল, গত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকা সেই যে গ্লোবাল নেতা হয়ে বসেছিল সেটা এখন ফুরিয়ে আসছে আর বিপরীতে চীন সেই আসনে গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠে আসতে চাইছে। এখানে গ্লোবাল নেতা বলতে – কোন দেশের অর্থনীতি এখন সবাইকে ছাপিয়ে সারপ্লাস বা নয়া বাড়তিমূল্য নিজ অর্থনীতি জমা করতে পারছে – যার সোজা অর্থ হল অন্য দেশের অর্থনীতিকে ঋণ-বিনিয়োগ দিবার নেতা হয়ে উঠছে এরই হিসাবের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলা। আর বলাই বাহুল্য অন্যদেশকে বিশেষ করে আমাদের মত দেশকে অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় সুদহীন বিনিয়োগ দেয়া আর সাথে ডাইরেক্ট বিনিয়োগ হিসাবে বাণিজ্যিক পুঁজি ধার দেয়া  – একাজে এখন সবার উপরে সক্ষম রাষ্ট্র হল চীন। আমাদের মত কলোনি দখল হয়ে থাকা দেশ থেকে দখলদারেরা ২০০ বছরের সারপ্লাস সব লুটে নেয়া হয়েছিল। ফলে এই ঘাটতি যে রাষ্ট্র মিটিয়ে নয়া আশার আলও যে এগিয়ে আসে সেই চীনের প্রভাব আমাদের উপর থাকবেই!  এটাকে ইতিবাচক দেখা হবে, স্বাভাবিক! এটা পন্থি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না – যে আপনি কাউকে বলবেন যে উনি আমেরিকা ছেড়ে চীন-পন্থি বলেই নাকি তিনি দেশে চীনা বিনিয়োগ-সহযোগিতাকে ইতিবাচক দেখছেন। সবচেয়ে বড় কথা গত প্রায় ৮০ বছর এই ভুমিকাতেই আমেরিকা গ্লোবাল নেতা ছিল!
    এককথায় বললে, আমাদের মত সব গরীব খাতক-দেশকে  অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় সুদহীন বিনিয়োগ [development loan] আর সাথে ডাইরেক্ট বিনিয়োগ [FDI] যে দাতা দেশ দিতে পারে সেই-ই গ্লোবাল নেতা ধারণাটার সারকথা!
    উলটা দিকে চীনের এই উত্থান এটা ততই আমেরিকার গ্লোবাল নেতা স্টাটাস ও সক্ষমতা শুকিয়ে যেতে থাকছে ও থাকবে এটা স্বাভাবিক। এককালের এমন গ্লোবাল নেতা বৃটিশ সরকারেরও মুরোদ এভাবে শুকিয়েছিল বলে আমেরিকার উত্থান হয়েছিল।

    কিন্তু এটা আমেরিকার কোন প্রেসিদেন্ট (বিশেষ করে ২০০০ সালের পরের কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট) শেষে ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন নাই। ভেবেছেন তাদের সামরিক সক্ষমতা ও গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান সমুহকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তো অটুট আছে – এই ভাবনা থেকে। তবে একটা লাইন টেনে বলা যায় ২০১৭ সাল পর্যন্ত আমেরিকান প্রতিটা প্রেসিডেন্ট যে নীতি অনুসরণ করেছেন তা হল, চীনের কাছে যাওয়া আর একটা না একটা সেক্টরে নিজের অর্থনীতির জন্য বাজার ছাড় চীনের থেকে নিয়ে এসেছেন।  সবচেয়ে বড় কথা চীনও এই সহযোগিতা করে গেছে। সবচেয়ে বেশী এখন সহযোগিতা নিয়ে এসেছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা (দুই টার্মের ওবামা ২০০৯-২০১৬ সময়কালে)। আর এটাই এই একই চীনা সহযোগিতা টোকাতে এখন বের হয়েছে এখনকার প্রেসিডেন্ট বাইদেন।

    এমনকি ডনাল্ড ট্রাম্প ২০১৭ সালে ক্ষমতায় এসে প্রথম বছরও একই নীতিতে চীনা বাজার সহযোগিতা টোকানো – তা এনেছেন। কিন্তু পরের বছর থেকে ট্রাম্পের নয়া রাস্তা হয়ে যায় অসহযোগিতা – মানে সংঘাতে মোকাবিলার পথে যাওয়া। শুরু হয় আমেরিকায় চীনা আমদানি নানা পণ্যের উপর ইচ্ছামত কর আরোপ – এটা ছিল ২৫% থেকে ৬৬% পর্যন্ত করারোপ। যদিও ট্রাম্পের শপথের পর থেকে যে নীতি ঘোষণা করেছিলেন তিনি তা হল অর্থনীতির গ্লোবালাইজেশন আর নয়। মানে ১৯৮০ সাল থেকে  অর্থনীতির গ্লোবালাইজেশন এর নেতা ছিল খোদ আমেরিকা। এটা ছিল তথাকথিত অর্থনীতিক জাতিবাদ – এই মৃতপ্রায় নীতির বিপরীতে অর্থনীতির গ্লোবালাইজেশন  এর পথে দুনিয়াকে সঠিকভাবেই ঠেলে দেওয়া। অথচ ট্রাম্পই প্রথম ২০১৭ সালে ক্ষমতার শপথের পর থেকেই পুরানা  অর্থনীতিক জাতিবাদ   কে কতটা ফিরিয়ে আনা যায় এই ব্যর্থ পথে তিনি ফিরে রওনা দিয়েছিলেন। যদিও এর মূলধারা হোয়াইট সুপ্রিমিজম [সাদা ককেশীয়রাই শ্রেষ্ঠ জাতি] ধারণা। একি কারণে, তিনি আমেরিকার একাই ন্যাটো [NATO] এর ৯৫% খ্রচ যোগানো ত্যাগ করার পক্ষে। তিনি কোন গ্লোবাল নেতা থাকার ব্যয়ভার বইতে রাজি ছিলেন না।
    বিপরীতে বাইডেনও তাই তবে একটু ঘুরিয়ে ভিন্ন পথে।
    যেমন চীনা পন্যে বাড়তু করারোপ যা ট্রাম্প করে গেছিলেন তিনি তা বন্ধ না করে সেটাই চালিয়ে গেছেন, এখনও চালু আছে। আর বাইডেনও  হোয়াইট সুপ্রিমিষ্ট নীতি নিয়েছেন। তবে তফাত হল, ট্রাম্প আমেরিকার ভিতরের সাদা বাদ বাদামি বা কালো লেবার তাড়িয়ে দিবার পক্ষপাতি – মেক্সিকো বর্ডার পারলে পুরা ল্যাটিন আমেরিকান বর্ডার বন্ধ করতে চান। বিপরীতে বাইডেন দেশের বাইরে হোয়াইট সুপ্রিমিষ্ট নীতি অনুসরণ করে গেছেন। সারকথায়, দুনিয়ায় সাদা ককেশীয় শাসন কলোনি দখলদারের হাতে যার বয়েস হয় প্রায় পাচশ বছর।  তিনি তাই  ইইউ-কে সাথে এই সাদা শাসন আরো চালিয়ে যেতে চান। কেন? চীন গ্লোবাল নেতার আসনে বসে যাওয়া মানে পশ্চিমা সাদা শ্রেষ্ঠত্ব এর শাসনের দিনের শেষ হবে। আর এখান থেকে ইউক্রেনকে সামনে রেখে রাশিয়ার সাথে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের লড়াই এর শুরু। তবে তাদের ময়ল আগ্রহ ছিল রাশিয়ার অবস্থা খারাপ হলে চীন তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসে সামরিকভাবে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের কাছে হেরে যাবে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে চীন গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠলেও এই কৌশলে চীন হেরে লোপাট হয়ে যাবে আর দুনিয়া সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের শাসন টিকে যাবে – চলতে থাকবে। যদিও চীন দূরে থেকেই রাশিয়াকে সহযগিতা দিয়্বে গেছে।  আর বাইডেনের ডলার অবরোধ কাজ করে নাই। উলটা ইন্ডিয়া রাশিয়াত সস্তা তেল নিয়ে রপ্তানিকারক হয়ে অর্থ লুটেছে আর ও দিকে রাশিয়াও বিদেশি মুদ্রার সমস্যায় না পরে উলটা রিজার্ভ বাড়িয়েছে সোনা কিনেছে।
    বাইডেনের টানা তিন বছর ছিল তথাকথিত গণতন্ত্র-মানবাধিকার এর পররাষ্ট্রনীতি আর সাথে ডলার অবরোধ সহ নানান ধরণেরস্যাংশন আরোপ করার নীতি। তিনি দাবি করে এসেছিলেন আমেরিকার এসব অস্ত্র লুকানো অবস্থায় পড়ে আছে আর তিনি এসব অস্ত্র ব্যবহার করে দুনিয়া থেকে চীনা প্রভাব কাটাবেন।
    এরই সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র ও প্রদর্শন স্থল ছিল সাউথ চায়না সি – অন্যভাষায় বললে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাতেজি দিয়ে চীনকে একঘরে করবার খায়েস। যেমন বাংলাদেশকেই চীনা বিনিয়গসহ সব ধরণের প্রভাব মুক্ত করা এর লক্ষ্য ছিল।

    কিন্তু গত সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে আমেরিকা আমাদেরকে পথে ফেলে চলে যায় শুধু তাই না। এবার আবার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে যায়।

    বাইডেন এখন চীনের সাথে ফিরে সহযোগিতার লাইনেঃ
    আর সব হারিয়ে অর্জন-শুণ্য বাইডেন এখন চীনের সাথে ফিরে সহযোগিতার লাইনে!!!! নিজ কারখানা-কোম্পানি বাঁচাতে এখন চীনের কাছেই হাত পাতা।
    সগযোগিতা অবশ্যই সঠিক ও বিনা-যুদ্ধের পথে স্বার্থ-দ্বন্দ্ব এর মোমাংসার পথ!! তার মানে বাইডেনের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাতেজি করে কোন লাভ হয় নাই। ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি একটা পুরাটাই ভুল পথ ভুল সিদ্ধান্ত ছিল!!!  সবটাই গচ্চা গেছে পানিতে। ডোনাল্ড ল্যু এই কথিত মহান ব্যক্তিত্বকে তাহলে আসলে বাইডেনের দরকার ছিল না, দুনিয়ারও না।  উনি তাহলে একতা খামোখা ছিলেন!!!! নাকি তাই তো? 

    তাহলে আমাদের আম-স্বার্থ, রাষ্টড় রাজনীতি ও অধিকার এসবের যে ক্ষতি বাইডেন করে গেলেন এর দায় কে নিবে এখন???
    এসবের সোজা মানে এক ভারত ছাড়া দুনিয়াতে কেউ আর আমেরিকাকে বিশ্বাস করবে না! 

    এরপরেও আবার বাইডেনের আয়ূ আর মাত্র ছয় মাস। যদি ট্রাম্প বাবাজি জিতে আসেন তো সেক্ষেত্রে কী হবে?
    কথা একটাই, আমাদের রাস্তা আমাদের স্বার্থ নিয়ে আমাদেরকেই ভেবে-চিন্তে  আর সর্বোপরি শত্রু-বন্ধু বুঝে ফারাক করে উঠে দাঁড়াতে হবে!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ     মার্চ ২০২৪    সন্ধ্যা
    আপডেটঃ     মার্চ ২০২৪   রাত