Tag: America

  • বার্মা নিয়ে আমেরিকান বোকা পরিকল্পনায় উলটা, সব নিয়ন্ত্রণ এখন চীনের হাতে উঠার পথে

    বার্মা নিয়ে আমেরিকান বোকা পরিকল্পনায় উলটা,
    এখন সব নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে উঠার পথে
    গৌতম দাস
    ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা ১৭ঃ ৪৮
    https://wp.me/p1sCvy-5mC

     

    China success, Western failure in revolutionary Myanmar

     

     

    বর্তমানের বার্মা নিয়ে বিশেষ করে তার “সীমান্ত যুদ্ধ” নিয়ে অজানা আশঙ্কা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে।  যদিও এটা দুই দেশ বার্রমা ও বাংলাদেশের মধ্যে – “সীমান্তে ঘটা কোন যুদ্ধ”- নয়। বরং একই বার্মার সেনা সরকার আর বিদ্রোহী এথনিক (ethnic) গোষ্ঠির যুদ্ধ। কিন্তু ঘটনাস্থল যেহেতু বাংলাদেশ-বার্মা সীমান্ত আর সেনা সরকারের বাহিনী বলতে তারা কার্যত বার্মার সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিজিপি বা Border Guard Police) ফলে, “বিজিপি বনাম বিদ্রোহী গোষ্টির” যুদ্ধের গোলা কখনও কখনও বাংলাদেশে এসে পড়ছে। আর এটাই সীমান্ত সংলগ্ন বাংলাদেশিদের জনজীবনকে মারাত্মক আতঙ্কিত করছে। এতে এলাকার বাংলাদেশি প্রশাসন বাসিন্দাদের সরিয়ে নিরাপদ দুরত্বে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেটা সঠিক সিদ্ধান্ত।

    বার্মা কী আর, কোথা থেকে এখানে, এর পিছনের পটভুমি নিয়ে কিছু কথাঃ
    বার্মার পিছনের পটভুমির দিক নিয়ে অল্প কথায় বললে, প্রথমত, বার্মা কখনও জনগণের ক্ষমতার উপর দাঁড়ানো অন্তত মুখে বা কনষ্টিটিউশনে লিখে স্বীকার করা অর্থেও কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র করা হয় নাই, ছিল না আর এখনও নয়। রিপাবলিক বলতে বুঝায় যে, ঐদেশের শাসনক্ষমতা (ruler) যখন স্বীকার করে নেয় যে তার ক্ষমতার উতস একমাত্র জনগণ; মানে ঐ দেশের বাসিন্দা-পাবলিকেরা নিজ দেশের শাসকদেরকে একটা শাসন ব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্যে (গণভোটে বা জনপ্রতিনিধিত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে)  রায়-ম্যান্ডেট দিয়েছে। আবার এই শাসকেরা রাজা-বাদশা নয় অথবা রাজা-বাদশার উত্তরাধিকার সুত্র তারা নিজেদের রাজা বলে দাবী করছে না।  এই অর্থে বার্মা কখনই কোন রিপাবলিক নয়। এমনকি দেশের নামেও রিপাবলিক শব্দটা নাই; তাহলে বার্মা কী এর সবই অস্পষ্ট। তাই বার্মার শাসক বলতে আসলে, এখানে মূল ক্ষমতাটা এক ধরণের মিলিটারীদের একটা ক্লাবের হাতে যাদের উপরে কেউ নাই; আর তারাই দেশটাই মালিক ও ক্ষমতাধারী। এভাবেই এটা চলে আসছে অং সান সুচি এর বাবাদের [আমরা যে নামে চিনি এই “সু চি” এর বাবার নাম অং সান (Aung San)] আমল থেকে।
    কেন এরকম? এর মৌলিক কারণ হল বার্মা দেশের বাসিন্দাদের মেন্টর (Mentor) [মানে যাদের চিন্তা অনুসরণে বা প্রভাবিত হয়ে] – বার্মার এই মেন্টর কারা ছিল সেটা বুঝতে হবে আগে। যেমন, আমাদের উপর মেন্টর – প্রভাবক ভুমিকা যদি বৃটিশ কলোনিদখলদার বা ভারতের উপর বৃটিশদের রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা-কে বলি তবে বার্মার মেন্টর হল সেকালের রাজতন্ত্রী জাপান। যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) এশিয়ায় হিটলারের সহযোগী একমাত্র শাসক ছিল জাপান আর সে জাপান তখনও সম্রাট শাসিত ছিল। অর্থাৎ বিশ্বযুদ্ধে দুপক্ষের প্রধান রাষ্ট্রগুলো সকলেই রিপাবলিক হলেও জাপান ছিল এক ব্যতিক্রম – ছিল সম্রাটের সাম্রাজ্য। একারণে, এখনও জাপান রাষ্ট্রের নাম কি – তা খুঁজে দেখলে সেই আনুষ্ঠানিক নামে কোন রিপাবলিক শব্দ নাই। এর বদলে সব জায়গায় ‘ইউনিয়ন’ বলে একটা শব্দ আছে যার আবার সুনির্দিষ্ট অর্থ নাই। অর্থাত পাবলিক বা জনগণের ক্ষমতা বলে বা বুঝায় – এমন কোন ধারণা ইঙ্গিতও নাই।

    বৃটিশেরা ভারতের মতই বার্মা দখল ও কলোনি করেছিল ১৮২৪ সালে। কিন্তু এই দখলি বার্মা-কে তারা ভারতের সাথে মাখিয়েই শাসন করে গেছিল। যেমন দখলি-বার্মা ভুখন্ড যেন ভারতেরই আরেকটা প্রদেশ এভাবেই তারা শাওন শুরু করেছিল। তবে এনিয়ে তরুণ বার্মীজদের মনে চরম অসন্তুষ্টি টের পেয়ে গত ১৯৩৭ সালের এপ্রিলে প্রথম  বৃটিশ-ভারত বর্মাকে ভারত থেকে আলাদা করে বৃটিশদের কলোনি শাসন কায়েম করেছিল। অর্থাৎ এর আগে পর্যন্ত বৃটিশ-ভারতেরই আরেকটা প্রদেশ যেন বার্মা – এভাবেই বৃটিশেরা বার্মা শাসন করে গিয়েছিল।  আর চলমান ব্যাপক এই ক্ষোভে বিক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালয় তরুণদের মধ্যে থেকে নানা ঘটনাবলী শেষে একপর্যায়ে প্রথমে এদের ত্রিশজনকে (যারা বার্মার শাসকদের ভয়ে তখন থাইল্যান্ডে পালিয়ে ছিল) –  এদের জাপানে নিয়ে ট্রেনিং দিয়েছিল জাপানের রাজতন্ত্রী সরকার। এই ত্রিশজনের একজন হলেন সু চির বাবা। কিন্তু তাদের ঐ ট্রেনিংয়ের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা বা খারাপ দিকটা হল, বৃটিশ শাসকের বিরুদ্ধে যারা এই ট্রেনিং দিয়েছিল তারা রাজতন্ত্রী। তাই এই ট্রেনিং কোন রাজনৈতিক ট্রেনিং ছিল না। কোন মনার্কি [monarchy] বা রাজা-বাদশার দেশে রাজনীতি ধারণা বা রাজনৈতিক দল ভোট ইত্যাদি কিছুই থাকে না। রাজার দেশে প্রজারা স্বাধীন ব্যক্তি নয়। প্রজা মানেই তো অধীনস্ত [sub-ordinate] মানেই সে স্বাধীন সত্বা নয়। তাই সমাজে স্বাধীন ব্যক্তি ধারণা ও ব্যক্তি ধারণা উত্থান এর ধারণা আসা খুবই গুরুত্বপুর্ণ! একেবারে পুর্বশর্তের মত জরুরি।   রাজনীতিটাই বাদ দিয়ে সামরিক ট্রেনিং মাত্র; যা মারধর, গোলাগুলি আর টর্চার কিভাবে করতে হয় এসব শিখা সর্বস্ব! অথচ ঐ ত্রিশজন ট্রেইন্ড তরুণই একাল পর্যন্ত বার্মার শাসন ক্ষমতা ও কাঠামো যা হয়েছে সবকিছুর উদগাতা, কিন্তু যারা “রাজনীতি” বলতে কি তা জানে নাই একারণেই পরবর্তিতে এটা আর্মির একটা ক্লাব ছাড়া আর কিছুতে গিয়ে পৌছাতে পারে নাই। এই ত্রিশজনই তাই হয়ে উঠেছিল বার্মার সকল ক্ষমতার উৎস এবং শাসক। এটাই ১৯৪২ সালে বৃটিশ ইন্ডিয়ার সাথে লড়াই করে শাসক বৃটিশদেরকে পরাজিত করে (তবে জাপানের কোলে বসে) নিজেরা বার্মাকে স্বাধীন করেছে বলে ক্রেডিট নিত। ১৯৪৮ সালে ভারতের মত বার্মাও বৃটিশ কলোনি-শাসকেরা ত্যাগ করে চলে যায়। আর শুরু হয় “স্বাধীন বার্মায়” ঐ ত্রিশ জনের শাসন। যারা এরপর মূল দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায় কেউ সামরিক বাহিনীতে কেউ রাজনীতিতে রাজনৈতিক শাসক – এভাবে। এতে শাসন ব্যররথতার জন্য একে অপরকে দায়ী করতে থাকে। যা সমাপ্ত হয়  যখন ১৯৬২ সালের শেষ নির্বাচনের পরে ঐ মিলিটারি অংশটাই জেনারেল নে উইনের নেতৃত্বে সব ক্ষমতা দখল করে বসেছিল। এসবের উত্তরসুরি আজকের ক্ষমতাসীন সামরিক ক্লাব। তবে নে উইন সেকালে নিজেকে সোভিয়েত কমিউনিস্ট ধারার কমিউনিস্ট বলে পরিচয় দিতেন।

    অন্যদিকে, এথনিক (ethnic)-জাত বিভক্তি বার্মাতে মারাত্মক। মূল এথনিক গোষ্টি বর্মীরা [Bamar (68%)] আর বাকিদের মধ্যে আবার তুলনায় সংখ্যায় বড় এমন আরও সাতটা [The eight ‘official’ groups are the Bamar (68%), Chin (2.5%), Kachin (1.5%), Karen (7%), Kayah (1.83%), Mon (2%), Rakhine (4%) and Shan (9%).] – এভাবে এথনিক জাত গোষ্ঠির কথা আলোচিত হয়, এরা এই সাত জনগোষ্ঠি সকলেই বর্মীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহী যোদ্ধা।   মনে রাখতে হবে এতসব জাত-বিভক্তি সত্বেও এর একমাত্র সমাধান হল – কেবল রাজনীতিই পারে সকল এথনিক পক্ষকেই সাথে নিয়ে একটা রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা (রিপাবলিক) কায়েম করে সকলে সমান অধিকার বসবাস করা। কিন্তু  এটাই স্বাধীন বার্মার জন্মের আগে থেকেই অনুপস্থিত। শাসক বর্মী বা বামার-রা বার্মা নাম বদলে মায়ানমার রেখেছিল সাধু সাজতে; কিন্তু তা লোক দেখানি ছিল বলে অন্য এথনিক কেউ আমল করে নাই।
    গত ১৯৮৯ সালে নে উইনের শাসনও ক্ষমতাচ্যুত হয়, ক্ষমতা নেয় সাত-আট বর্মী জেনারেলদের একটা গোষ্ঠি; কিন্তু জাতিসংঘের অবরোধ আরোপে সেই সরকারও দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু সীমান্ত আছে বলে একমাত্র চীনই হয়ে যায় বার্মার সাথে বাকি দুনিয়ার যোগাযোগের মাধ্যম; ইনফরমাল চোরাচালানি টাইপের ‘বাণিজ্য সম্পর্ক’ শুরু হয়েছিল সেই থেকে। পরে ২০০৭ সালে ভারতের কূটবুদ্ধি-পরামর্শে দুতয়ালিতে আমেরিকা-ইউরোপ-পশ্চিমারা চীনের পাশাপাশি তারাও বার্মার মাখন খেতে এগিয়ে আসে। যার দলিল হল ২০০৮ সালের কথিত কনষ্টিটিউশন মানে সামরিক ক্ষমতাকে স্বীকৃতি (উদ্ভট ভাবে, আর্মি প্রতিনিধিরাও সংসদে ২৫% হয়ে বসবে) দিয়ে এক কনষ্টিটিউশন। এছাড়া বাইরে দেখাবে সুচি কে  যেন  তিনি সিভিল-শাসন বলে তারা সাইনবোর্ড হিসাবে রাখবে। ভারতের কূটবুদ্ধি-পরামর্শ এত তীব্র হয়ে উঠেছিল যে জেনারেলেরা এই প্ররোচনায় ইসলামবিদ্বেষী হয়ে রোহিঙ্গাদের ২০১৭ সালে মেরেধরে দেশত্যাগ করতে, বাংলাদেশে যেতে বাধ্য করেছিল। মজার কথা হল, তখন আমেরিকা, চীন, ভারত, ইউ ইত্যাদি কেউই শাসক জেনারেলদেরকে দায়ী বা দোষারোপ করে নাই। সকলেই কথিত এক আরসা (ARSA) বাহিনীকে এদের উপর দোষ চাপিয়েছিল। কারণ, বর্মি জেনারেলেরা ওসব (আমেরিকা, চীন, ভারত, ইউ ইত্যাদি) সকল-বিদেশিকেই নানান ব্যবসা বিতরণ করে দিচ্ছিল। যেটা কেউই হারাতে চায় নাই। ফলে কোন বার্মা এক্ট বা গণতন্ত্র-মানবাধিকারের কথা কারই মনে ছিল না।  কিন্তু সেটাও অচল হয়ে পড়ে ২০২০ সালের নির্বাচনের পরে, আর্মি আবার সব ভেঙ্গে দিয়ে নিজের হাতে সব ক্ষমতা নেয়।

    এবার চলতি ঘটনার দিকেঃ   
    বার্মা নানান কারণে এক অদ্ভুত জায়গা ও পরিস্থিতি। চীন বার্মায় একই সাথে সেনা সরকার এবং বিদ্রোহী এথনিক গোষ্ঠিগুলার সাথে ‘ঘনিষ্ট’ সম্পর্ক রেখে চলতে পারে। সেনা সরকার আপত্তি করে না। এমন খুব কম দেশই পাওয়া যাবে বা নাই। মানে জেনারেলদের এতই চীনকে দরকার যে বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলার অস্ত্রের উৎসও চীন অবলীলায় হতে পারে। তবে এতদিন চীন কোনপক্ষকেই একে-অন্যের উপর চড়াও হয়ে উঠতে দেয় নাই, ভারসাম্য বজায় চলতে বাধ্য করে রাখতে পেরেছিল। এটাই চীনের বর্মীজ সেনা ও বিদ্রোহীদের মধ্যে যেন একটা লাইন টেনে, বিবদমান প্রত্যেকের সীমারেখা বাতলে দিয়ে আর তাতে চীন নিজেই এক ভারসাম্য শাসক হয়ে দুপক্ষের উপর দাঁড়িয়ে থাকা শুরু হয়েছিল।  তবে মোটামুটি গত (২০২৩) ডিসেম্বরকে টার্গেট করে চীন এই ভারসাম্যটা ভেঙ্গে জেনারেলকে নিচে বা কোনঠসা করে বিদ্রোহীদেরকে চড়াও হয়ে উঠতে এলাও করেছে। কিন্তু সেটা কেন?

    আমেরিকার বার্মা এক্টঃ
    চীনের এমন আগের ভারসাম্য কিছুটা ভেঙ্গে আবার নয়াভিত্তিতে আরেক ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে ততপর হবার পিছনের কারণ আমেরিকার কথিত বার্মা এক্ট।  বাইডেনের আমেরিকার সমস্যা হল, মুরোদ থাক আর নাই থাক সবকিছু আগেই লেড়েচেড়ে আউলা করে দিতে হবে – এই নীতিরই এক ফসল হল বার্মা এক্ট। যতদুর আন্দাজ করা যায় মোটা দাগে এতে আমেরিকান পরিকল্পনাটা হল, বার্মায় দখল দেয়া মানে জেনারেলদের পতন ঘটিয়ে যেন সামরিক ক্যু হয়েছে এমনভাবে পছন্দের জেনারেল বসিয়ে তা করা। আর এর সাফাই হিসাবে বার্মায় গণতন্ত্র-ও-মানবাধিকার আনবেন বাইডেন, এর নামই বার্মা এক্ট!  ব্যাপারটা সামরিক আবার আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে আমেরিকা নিজ মেরিন বার্মার মাটিতে নামাবে না, কেবল এরিয়াল (arial) কভার মানে আকাশপথে কাউকে উড়তেই দিবে না – যাতে বার্মার কোন উড়োজাহাজই মাটি ছেড়ে ডানা না মেলতে পারে। আর বাংলাদেশের পদাতিক ব্যবহার করবে আমেরিকান মেরিনের জায়গায়।  আবার বাংলাদেশের পদাতিক মুভ করাতে চাইলে আগে আমাদের  সরকারের উপর দখল লাগবে। তাইবাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নামে বিরোধিরা বিজয়ী হতে পারলে এর সুবিধার উপর ভর করে তাতে “বাইরের” সুবিধাটা (মানে যেমন বার্মা দখল) আমেরিকা পেত। কিন্তু আগেই বলেছি আমেরিকান মুরোদের খবর নাই! তাই সবকিছু লেড়েচেড়ে আউলিয়ে সবাইকে পথে নামিয়ে ভন্ডুল করে – পুরানা সব ভারসাম্য নষ্ট করে এখন বাইডেন পলাইছে শুধু না। হাসিনাকে ‘ব্যক্তিগত’ চিঠি লিখতেছে।

    যদিও বিষয়গুলো এত সহজ নয়। পুরানা ভারসাম্য ভাঙ্গার একটা খেসারত তো থাকবেই। মোটামুটি গত ডিসেম্বর ছিল বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা – অন্তত চীনের ক্যালকুলেশন এটাই ছিল। এভাবে মার্ক করে চীনও আমেরিকান বার্মা এক্টকে মোকাবিলার নিজ পরিকল্পনা সাজাইয়েছিল। অর্থাৎ চীনের দিক থেকেও ডিসেম্বর ছিল টার্গেট; তবে তা ঠিক বাংলাদেশ নিয়ে নয় ভিন্ন অর্থে মানে, বার্মাকে নিয়ে। এইযা ভিন্নতা!

    বার্মায় কী ঘটছে এর একটা সোর্স এশিয়া টাইমসঃ
    এশিয়ান টাইমস এটা হংকং থেকে প্রকাশিত একটা সমৃদ্ধ ওয়েব ম্যাগাজিন। এটাকে এটাকে সম্ভবত এশিয়ার “ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল” বললে অত্যক্তু হবে না। অর্থাৎ নিউইয়র্কের আদি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল যেমন বাবা গ্লোবাল পুঁজি বাজার যদি ধরি তবে চীন -কেন্দ্রিক নয়া এশিয়ান পুঁজি বাজার তৈরি হয়েছে হংকং-সিঙ্গাপুর কেন্দ্রিক; আর এসবকে কেন্দ্র করে জর্নাল-টা হল এশিয়ান টাইমস। যার আবার ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস বলে আলাদা পত্রিকা হয়েছে, সাথে আরো একটা। প্রায় আটজনের একটা গ্রুপ যাদের ওয়াল স্ট্রিটে মিডিয়ায় কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তারাই মূলক এই পত্রিকাটা চালায়। এদের উপর ভর করে আবার একদল পলিটিক্যাল এনালিস্ট গড়ে উঠেছে বার্মাসহ আশিয়ান জোট এলাকার রাজনৈতিক ঘটনাবলীতে কাজ করা যাদের এলাকা। এদের একজন হল ডেভিড স্কট ম্যাথুসন [DAVID SCOTT MATHIESON]; যিনি নিজের পরিচয় লেখেন – an independent analyst working on conflict, humanitarian and human rights issues – এভাবে। এসব ততপরতা গুলোকে বলা যায় গ্লোবাল নেতা আমেরিকা-পরবর্তিতে এশিয়ায় কী হতে যাচ্ছে এরই রিপোর্টার এনাস্লিস্ট হচ্ছেন এরা।
    সেই ডেভিড স্কট বর্তমান বার্মার পরিস্থিতি নিয়ে নিএই দুখানা এনালাইটিক্যাল রিপোর্ট ছেপেছেন। আর একই সাথে নিউইয়র্ক টাইমসে ছাপা হওয়া একটা রিপোর্টের রেফারেন্স দিয়েছেন যেটা আসলে আমেরিকান প্ররোচনায় বিদেশে গঠন করা জান্তাবিরোধী সু চির সরকার এর করুন হাল নিয়ে লেখা রিপোর্ট। আনুষ্ঠানিকভাবে সু চুদের সরকারকে আমেরিকার নিজের মত করে সাজিয়ে নেয়া National Unity Government of Myanmar বা সংক্ষেপে NUG বলে ডাকা হয়।  যাদের অবস্থা হল বাংলাদেশে এখনকার বাংলাদেশি বিরোধীদলের মত যারা হাসিনা পতন বা নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েও পুরানা গান-ই গাইছে। এই অবস্থাকে বুঝাতে ইংরাজিতে শব্দটা হল এবানডান (abandon) বা পরিত্যক্ত বলতে যা বুঝায়! তো বাইডেনের আমেরিকান পরিত্যক্ত আমাদের বিরোধীদলের মতই, সু চিদের NUG সরকারের অবস্থা। নিউইয়র্ক টাইমসে ছাপা হওয়া সেই করুণ রিপোর্টও দেখতে পারেন এখানে।  এদেরকেই বাইডেন তার বার্মা এক্টের খোরাক বা কথিত হবু সরকার বানাতে চেয়েছিল, আর তাদের অবস্থা আমাদের বিরোধীদলের মত!!!

    বার্মা এক্টকে মোকাবিলার চীনা নিজ পরিকল্পনাঃ
    চীনের দিক থেকে নিজ পাল্টা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আমেরিকার নিজেরটার চেয়ে তুলনামূলক অনেক সহজ ছিল। এর মূল কারণ, আগে দীর্ঘদিন থেকেই  বর্মার সেনা সরকার আর বিদ্রোহী – এভাবে দুপক্ষের উপরই চীনা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই ছিল। মানে যদি বার্মার ভিতরের তিনটা পক্ষ আছে ধরলে, এর একটা হল জেনারেলদের জান্তা সেনা সরকার; দুই হল, সাত-আটটা এথনিক-জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্টি যারা আবার এখন চীনের প্ররোচনায় ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স নামে একত্রিত হয়েছে। নয়া পরিস্থিতিতেও জেনারেলেরা আর ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স দুইটাই এখনো চীনের নিয়ন্ত্রণে। আর তৃতীয় পক্ষটা হচ্ছে কেবল আমেরিকার নিয়ন্ত্রণের সু চিদের NUG। যেটারই এখন পরিত্যক্ত অবস্থা!
    আর  এবারের চীনা পরিকল্পনা ছিল জেনারেলদের হাতটা ধরেই রাখা কিন্তু এবার একটু ঢিলা করে ধরা যাতে বিদ্রোহীরা একটু আপার হ্যান্ড পায়। এতে যদিও আগের ভারসাম্য মানে জেনারেল আর বিদ্রোহীরা আগে প্রত্যেকে যে সীমারেখার মেনে চলার মধ্যে দিয়ে ভারসাম্য তৈরি করে বসবাস করছিল  – সেটাই এখন চীন ভেঙ্গে দিতে চাচ্ছে। আর তা দিলে চীনের স্বার্থের এতে কোন ক্ষতি হবে না কেন? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজব। মানে জেনারেলেরা এতে বিগড়ে গিয়ে চীনবিরোধী হয়ে যায় যদি? চাইকি আমেরিকার হাত ধরে ফেলে যদি?

    জবাব হল, চীন জানতে এমন দুটাই অসম্ভব। কারণ জেনারেলদের চীনবিরোধী হওয়া মানে কি ভারত? নাকি রাশিয়া বা খোদ আমেরিকার হাতধরা? না, এমন প্রত্যেকটাই বাস্তবে অসম্ভব।  চীনবিরোধী হয়ে রাশিয়া একচুলও অন্যদিকে যাবে না। আর আমেরিকা? আগেই বলেছি বাইডেনের যতই “বার্মা এক্ট” থাকুক বা সু চিদের NUG  থাকুক এই আমেরিকা তো এখন বাংলাদেশ ছেড়েই ভেগে গেছে কাজেই – মানে বাংলাদেশ থেকে সামরিক সহায়তা পাবার বাস্তবতাই আউলায়ে গেছে – আর এতে আমেরিকা তার বার্মা এক্টও এখন কিছু ছেড়া কাগজ মাত্র- মুরোদহীন। আর এতদিন আমেরিকা তো এই জেনারেলদের বিরুদ্ধেই হম্বিতম্বি করে গেছিল। ফলে সেই জেনারেলেরা এখন চীনের উপর ক্ষেপে গিয়ে বাইডেনের হাত ধরার কোন বাস্তবতাই নাই। আবার আমেরিকা বার্মার ঠিক কার হাত ধরার কথা ভেবেছিল জেনারেলেরা নাকি সু চিদের NUG দের??? অবশ্যই সেটা সু চিদের NUG। মানে জেনারেলদের ভাগ্যে আমেরিকান দীয়া-আশীর্বাদের কোন সুযোগই ছিল নাই, ছিলই না।  আর এখন তো বাইডেন নিজেই পরিত্যক্ত।  আর ওদিকে ভারতও এসবের ভিতর উল্লেখ-অযোগ্য। কারণ এর না আছে অর্থনৈতিক বা সামরিক সক্ষমতা। পারে কেবল কূটকাচালি বা প্যাচ-লাগানি। যেটাও এখানে সম্ভব না; যদিও ভারতের হম্বিতম্বি আছে সেকথায় শেষে যাবো! তবে সেটাও কারও ঘাড়ে চড়ে করতে চাইবে ভারত আর এটাই সম্হভবত হাসিনা সরকার!! আর মনে রাখতে হবে আমেরিকান বার্মা এক্ট পরিকল্পনা তো ভারতেরও স্বার্থবিরোধী করে সাজানো ছিল।
    কাজেই চীনের দিক থেকে জেনারেলদের হাত হাল্কা করে ধরার এটাই ছিল পারফেক্ট টাইম। কারণ তারা তবু চীনকে ছেড়ে কোথাও যাবার জায়গা নাই। সেজন্যই শুরুতেই যেটা বলেছি, বার্মীজ সেনা সরকারের উপর বিদ্রোহীদের চড়াও হতে দেওয়াটা আসলে চীনা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। যার দুচারটা গোলা বাংলাদেশে এসে পড়ছে। চীনা পরিকল্পনায় বাংলাদেশে সম্ভাব্য সরকার বদলের সময়কাল ছিল ডিসেম্বর-কেন্দ্রিক। তাই জেনারেলদের উপর বিদ্রোহীদের সওয়ার হওয়ার টাইমিং-টা ছিল সে-মোতাবেক !
    তাই বার্মা এক্ট সফল করতে হাসিনাকে সরাতে আমেরিকার এগিয়ে আসার আগেই সেক্ষেত্রে বাইডেন দেখত বার্মা বিদ্রোহীদের ক্ষমতায় কিন্তু জেনারেলরাই নাই, উধাও! কিন্তু এখন বাইডেনের পলায়ন ঘটে যাওয়াতে এতে নিট কিছু লাভ হতে পারে জেনারেলদের। তারা আয়ু পাবে। কিন্তু আরও অনেক পরে।

    এবার আবার ডেভিড স্কটের রিপোর্ট থেকে এনিয়ে তার বক্তব্য তুলে আনব।
    তিনি বলছেন, একটা ভুল আশা ছড়িয়ে পড়েছিল যে থাইল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনের মতো মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র। পুরা বক্তব্যটাই নিচে কোট করে দিয়েছে। ডেভিড স্কটের রিপোর্ট এর মূল লেখাটার শিরোনাম হল, China success, Western failure in revolutionary Myanmar এখানে। যার বাংলা অনুবাদ ছেপেছিল প্রথম আলো। আমি সেই অনুবাদের লিঙ্ক হল এখানে।

    মিয়ানমারের ক্ষেত্রে চীন আন্তর্জাতিক পরিসরের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়। মিয়ানমারের ওপর চীনের প্রভাবকে স্পষ্টভাবে আলাদা করা
    যায়। তিন বছর ধরে একটি চিৎকারই প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে যে মিয়ানমারের প্রতিরোধ আন্দোলনে বাইরে থেকে অস্ত্র দরকার। একটা ভুল আশা ছড়িয়ে
     পড়েছিল যে থাইল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনের মতো মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মিয়ানমারের প্রতিরোধযোদ্ধাদের
    নীরবে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে চীন। থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের ওপর চীনের কৌশলগত সমর্থন না থাকলে অপারেশন ১০২৭ সম্ভবপর হতো না।

    আর ডেভিড স্কটের শিরোনামেই প্রায় সবকথা বলা আছে। লিখছেন চায়না সাকসেস আর ওয়েস্টার্ণ ফেইলিওর। মনে রাখতে হবে ডেভিডেরা সুইডেন, সুইজারল্যান্ড বা নরওয়ের শান্তি নিয়ে কাজ করা গ্রুপের সাথে সম্পর্কিত। তবে ডেভিডের সবচেয়ে মারাত্মক কথা যে –  “একটা ভুল আশা ছড়িয়ে পড়েছিল যে থাইল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনের মতো মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র”। আর এটাই বাংলাদেশের এখনকার বিরোধী দলেরও সেই একই অবস্থা! ডেভিড আরো লিখছেন, “কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মিয়ানমারের প্রতিরোধযোদ্ধাদের  নীরবে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে চীন। থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের ওপর চীনের কৌশলগত সমর্থন না থাকলে অপারেশন ১০২৭ সম্ভবপর হতো না”।
    এই হচ্ছে ডেভিট স্কটের তথ্য ও ব্যাখ্যা। আর ঐ অপারেশন ১০২৭ হচ্ছে সেনা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সম্মিলিত অপারেশনের কোন নাম – যেটা চীন সমর্থিত।

    আমেরিকার বোকা পরিকল্পনায় এখন উলটা, সব নিয়ন্ত্রণ এখন একা চীনের হাতেঃ
    কথা ঠিক, পরিশেষে পুরা পরিস্থিতির সবটাই চীনা নিয়ন্ত্রণে।  বার্মার তিনপক্ষের সু চিরা বাইডেন হাতছেড়ে দেওয়ায় পত্রিত্যক্ত! আর বাকি দুপক্ষ মানে জেনারেলেরা আর বিদ্রোহিদের মধ্যে থে বর্তমানে চীন বিদ্রোহীদেরকে আপার হ্যান্ডে বসিয়ে রেখেছে।   কিন্তু আমি মনে করি না চীন বার্মা বিদ্রোহীদেরকে জেনারেলদের উপরে বসায় দিবে – জিতিয়ে বা জিততে দিবে। এর চেয়ে চীন বরং আবার জেনারেল আর বিদ্রোহীদের মধ্যে মানে উভয়ের ক্ষমতা ও এক্তিয়ার প্রসঙ্গে আবার নয়া এক ভারসাম্য ব্যবস্থা তৈরি করে দিবে। চীন যদি বুদ্ধিমান হয় তো এটাই করবে। তবে এটা অবশ্যই নয়া আরেক ভারসাম্যে – মানে পুরান হিসাবে নয়। এতে অনেক কিছুতেই বিদ্রোহিরা এবার আপার হ্যান্ড পাবে। আর এসবের মূল নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে আরও সবল হবে। রোহিঙ্গারা ফিরবে কিনা সে ইস্যুতে চীন এখন এককভাবে নির্ধারক হবে। অর্থাৎ মুল কথা – বার্মার যে এথনিক জাতিহগত সংঘাত এটা মিটানোর মত রাজনীতির হদিস বা রাজনৈতিক জ্ঞান বা বুঝাবুঝি এখনও বার্মার কোন কোণাতেই নাই।  চীনেরও জানা নাই। কারণ সমাধানটা হল ফেডারেলিজম (Federalism)। অনেকে আমেরিকান ফেডারেলিজম বললে বুঝে। আর এটা আমেরিকার বাইরে – মানে ইউরোপেরই কোথাও নাই। আর সবচেয়ে বড় কথা এটা হল – জাতিবাদ বা কমিউনিস্টদের জাতীয়তাবাদের বিপরীত ধারণা। অর্থাৎ জাতিবাদি লড়াই (এথনিক বিবাদ) অনেক দেশের মত বার্মারও এখন প্রধান শত্রু! 

    আর সব হারানি ভারত এসবের ফয়দা খেতে এখন হাসিনার মাধ্যমে – অন্তত বর্মা ইস্যুতে তাকে চীনবিরোধী অবস্থানে জায়গা করতেই হবে মনে করছে। এককথায়, বর্মা সীমান্তে বিশৃঙ্খলা সাময়িক হলেও ভারতেরও স্বপ্নে পোলাও খাবার মত  এক আশা তৈরি হয়েছে  যে, হাসিনা সরকারের কাঁধে চড়ে ভারতের বার্মা দখলের মুরোদ না থাকলেও একটা শেয়ার নিতে চায়। ভারত আবার প্রবল একটা আশাও খাড়া করেছে যে একাজে আমেরিকার তাদের পিছনে দাঁড়াবে। ভারতের এই অবাস্তব আশা – উচ্চাশা এটাই এখন হাসিনা সরকারকে বেচাইন করে তুলছে!  এসবের কারণে, সরকার এতে ততটাই চীন থেকে দূরে না চাইলেও হয়ে পড়ছে। সরকার সতর্ক না হলে ভুল পদক্ষেপ দিয়ে ফেললে তাতে শুধু সরকার না পুরা বাংলাদেশই – সরকারের ভারতপ্রীতিতে বা চাপে পড়ে – বিরাট বিপর্যয় ডেকে আনবে! যদিও সবকিছুই এখনও – প্রাইমারি অভিমুখ কোনটা নিবে  – সেই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে – কিন্তু লক্ষণগুলো খুবই খারাপ ঝোঁকের! এক ব্যাপক  দেশি-বিদেশি নয়া পোলারাইজেশনও ঘটাবার চেষ্টা শুরু হয়েছে। তা কতদুত সফল হবে এখনই জানি না। যদিও একারণে, ব্যাপক উঁকিঝুঁকি মারা শুরু হয়েছে!

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ১১ ফেব্রুয়ারি  ২০২৪, ভোর চারটা দশ মিনিট

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • নিজেদেরকেই রিভিউ বা হাসিনার ক্ষমতার চ্যলেঞ্জ কে বুঝা

     নিজেদেরকেই রিভিউ বা হাসিনার ক্ষমতার চ্যলেঞ্জ কে বুঝা
    গৌতম দাস

    ১৬ জানুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৫
    https://wp.me/p1sCvy-5j8

     

                  বিএনপি ক্ষমতায় আসতে অন্ধকার গলি খুঁজছে: প্রধানমন্ত্রী

     

    আমেরিকান প্রেসিডেন্টদের ক্ষমতার আয়ু রাখা হয়েছে (আমাদের মত পাঁচ বছর না) চার বছরের। তাই বাইডেনের আয়ুকাল (২০২১-২৪), মানে ২০ জানুয়ারি ২০২১ থেকে ২০ জানুয়ারি ২০২৫। যে কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের বাংলাদেশের উপর প্রভাব এর বিচারে বাইডেন প্রশাসন এক ব্যতিক্রম হবেন। ইতিহাসে বাইডেনই সম্ভবত বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় আর দীর্ঘ প্রভাব ফেলা প্রেসিডেন্ট হবেন।  ফেলে ছড়িয়ে একটা ঢিলেঢালা হিসাব করলেও বাংলাদেশের উপর বাইডেনের প্রভাবের ব্যাপারটা ইতোমধ্যেই প্রায় দুবছরের।  আর সেই সময়কাল বলা যায় গত ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের বছর শেষ – এভাবে মোটামুটি এই দুবছরের কথা বলছি।  আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাইডেনের সম্ভবত চরমতম প্রভাবিত করার আয়ুকাল ছিল এই দুই বছর। যদিও এদুই বছর চরমতম প্রভাব বিস্তারের ফলাফল কী হয়েছিল বলে আগামিদিনের ইতিহাসে কী লেখা হবে?

    বাংলাদেশের আগামিদিনের ইতিহাসে বাইডেনের আমেরিকাকে নিয়ে কী লেখা হবেঃ
    প্রথমত লেখা হবে, বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের মধ্যে ব্যাপক ওলটপালট ঘটিয়ে দিবার কান্ডটা করেছেন এই বাইডেন প্রশাসন। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের কপালে যাই হোক প্রেসিডেন্ট বাইডেন নিজের দেশের জন্য বাংলাদেশ থেকে কিছু গালাগালি আর হতাশা ছড়ানোর দায় ভিন্ন খুব কিছুই ফেরত নিতে পারেন নাই। তিনি এদুই বছর বিরাট খাটাখাটনি করেছেন, কিন্তু সবই ব্যর্থ আর পন্ডশ্রম! মানে প্রচুর দামি এই শ্রম তা হলেও এটা কারোরই ভোগে লাগে নাই! বেকার গেছে। এজন্য দায়ী বাইডেন প্রশাসনের কিছু হামবড়া কর্তা যেমন আজরা জেয়া বা ডোনাল্ড ল্যু ইত্যাদি।
    আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হিসাবে সেই ১৯৪৫ সাল থেকে ছড়ি ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছে, আমাদের মত দেশে অপছন্দের সরকার হলে তাকে ফেলে দেয়া এই ছিল আমেরিকার স্টাইল।  এরপর নয়া সরকারকে দিয়ে আমেরিকা যা চায় তাই আদায় করে নিত। কিন্তু লক্ষ্য করা গেছে এই হামবড়া কর্তারা তাতেও এবার পরিবর্তন আনতে গেছেন। এরা যে স্টাইল ফলো করতে গেছেন তা হল ঠিক সরকার ফেলানো না বরং সরকার রেখেই অর উপর চাপ দিয়ে আমেরিকার পছন্দমত কাজ বা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা। অনেকটা এই কর্তারা যেন বলতে চান যে সরকার বদলে আমরা কি করব ওর চেয়ে বরং একে আমার স্বার্থের পক্ষে চুক্তি করা বা অবস্থান নিতে বাধ্য করলেই তো বেশী লাভ! আর এতে ফলাফল হয়েছে এমন যে না আমেরিকানেরা কিছু পেয়েছে না বাংলাদেশের বিরোধীদলের ভাগ্যে কিছু জুটেছে! অথচ বাইডেন প্রশাসন এই নয়া এক্সপেরিমেন্ট করতেই সবটা সময় ব্যয় করে ফেলেছে – যার আলটিমেট ফলাফল শুন্য থেকেছে!

    ওদিকে বরং ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, বাংলাদেশের। এখনকার অবস্থা হয়েছে সব রাজনৈতিক দলের (মানে সরকার ও বিরোধী সব দলের) কথা বলছি – সকলেই প্রচন্ড ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে; একেবারেই দিশাহীন ওল্টপাল্ট অবস্থা হয়েছে সবার।
    শব্দটা সবার বলেছি, মানে হাসিনা সরকারেরও। যদিও কেউ কেউ বা হাসিনা নিজেও এটাকে মনে করতে পারেন কথিত নির্বাচন তিনি সম্পন্ন করেছেন ও নিজেকে আবার বিজয়ী ঘোষণা করতে পেরেছেন; সুতরাং এটাই বাইডেনের উপর দিয়ে তার ক্রেডিট!  বিশাল বিজয় হয়েছে। কিন্তু – তাই কী?
    না,  তা একেবারেই নয়। কেন? ৭ জানুয়ারি নির্বাচন শেষ হয়েছে এখন থেকে কম করে হলেও সাতদিন আগে। কিন্তু খেয়াল করেন পুরা আওয়ামী লীগের কথাও না ধরে যদি ৩০০ এমপির (২২৩ জন খোদ লীগের নিজের আর বাকিরা ব-কলমে তো লীগেরই নয়ত লীগের অনুগ্রহপ্রাপ্ত) কথাই ধরে কথা বলি এই এমপিরা কেউ জানে না যে এখন কী? কী বলতে হবে? মানে তারা কী অর্জন করেছে বলে এখন বলতে হবে তারা কেউ জানে না! মুল কারণ, এনিয়ে হাসিনার কোন নির্দেশ আসে নাই।
    যদিও এটা ঠিক এবারের কথিত নির্বাচিতেরা সকলেই এই নির্বাচনের পরে কঠোরভাবে হাসিনার হাতের মুঠোতে সংহত বা কেন্দ্রীভুত! কিন্তু সবাই কাঠের পুতুল হয়ে আছে! কে কে জিতবে সেটা নির্ধারণ থেকে শুরু করে পরে কাকে কাকে ও কেমন মন্ত্রী করে নেয়া হবে বা কে কে বাদ পড়বে বা কেন ইত্যাদি সবই এককভাবে হাসিনার মুঠোয়! তাঁর বাইরের কেউই জানেন না ঠিক কোন লজিক বা বিবেচনায় কে বাদ পড়ছেন বা উপরে উঠছেন! অথচ সকলেই তটস্ত যে না জানি কি করার কারণে এমপি হতে বা পরে মন্ত্রী হতে বাদ পড়ে যাবেন বা গৃহিত হবেন! এমনকি নৌকা মার্কা পেলেও বাদ পড়তে পারেন!  পরে এখন তিনি যাবেন কোনদিকে কোথায় সেটাও কেবল হাসিনাই জানেন! আমাদের এই বক্তব্যগুলোর ভিত্তি গত সপ্তাহ-দশদিন ধরে বাংলাদেশের টিভিতে প্রকাশিত রাজনৈতিক ঘটনাবলীর ছবি ও বর্ণনা নিয়ে রিপোর্ট সেগুলো!  নির্বাচনের পরে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা যেকোন মন্ত্রী – ধরেন জুনাইদ আহ্‌মেদ পলক; টিভিতে তার চোখের ভাষা দেখে মনে হয় সেখানে যেন লেখা আছে যে তিনি কিভাবে জিতলেন, কেন জিতলেন এমনকি প্রতিমন্ত্রী পদটাও টিকে গেল কেমনে – তিনি জানেন না। সেজন্য কেবল শুকরিয়া আদায় – এটাই কেবল তার নিজের করা বাকি সবই তাঁর!! অথচ এলাকা হিসাবে পলকের পড়শি সদ্য প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার তার কেন এমন হল তা কেউ জানে না!  কেবল এটা সেটা কিছু অনিশ্চিত অনুমান করতে পারেন মাত্র!

    তাতপর্যপুর্ণ ১১ জানুয়ারিঃ
    কেন তাতপর্যপুর্ণ বলছি? নির্বাচনের তারিখ ছিল ৭ জানুয়ারি। এর ফলাফল কি ঘোষণা দিবে তা আন্দাজ থাকলেও এই তিনশ আসনের ফল সাজিয়ে গুছিয়ে প্রকাশ করতে ৮ জানুয়ারি দুপুর গড়িয়ে যায়।  আর এরপরের ৯-১১ জানুয়ারি এই তিনদিনে সরকার যেসব মেজর কাজ দ্রুততার সাথে হাসিনার লোকেরা শেষ করেছেন তা হল বিজয়ী তালিকা গেজেট করা মানে, নয়া সংসদ সদস্যদের তালিকা আনুষ্ঠানিক করে বানানো এরপর তাদের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ সম্পন্ন করা আর এরচেয়েও আরেক কঠিন কাজ মন্ত্রী বাছাই করা। মানে নেয়া বা বাদ দেয়া। বলা হয়েছে “সর্বশেষ গত (১১তম সংসদে) মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা ছিল ৪৮ জন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও ছিলেন ২৫ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী এবং ৩ জন উপমন্ত্রী।  এদের মধ্যে ৩০ জনকেই বাদ দেয়া হয়েছে ” । মানে এক বিশাল ঢেলে সাজানো আর তাতে পুরান মন্ত্রীদের দুই-তৃতীয়াংশ  বাদের খাতায় চলে গেছেন। আর এমন বাদ দিবার পরে শেষে নতুন মন্ত্রীসভা হয়েছে ৩৭ জনের। আর তাদের মন্ত্রণালয় নয়া বন্টনো সম্পন্ন করা হয়েছে। আর এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে বোধহয় সবচেয়ে কম সময়ে ঘটা এমন ঘটনা। মাত্র তিনদিনে এটা সম্পন্ন।
    তাই বলা যায় ১১ জানুয়ারি সন্ধ্যারাতের মধ্যেই সব কাজ শেষ; এটা তাতপর্যপুর্ণ। কিন্তু তর্ক এখান থেকেই! যে এত তাড়াতাড়ির পিছনের কারণ কি?

    একদিকে সরকারবিরোধীরা এর সমালোচনা করে কর্মীদের মনোবল বাড়াতে চেয়েছে। প্রশ্ন তুলেছে বা নিজ মনোমত ব্যাখ্যা খাড়া করেছে যে সরকার ভীত সেকারণেই এই তাড়াহুড়ো করে নয়া মন্ত্রীসভা গঠন শেষ করেছে। রাজনীতিতে ঠেস মেরে বা খোটা দিয়ে সরকার আর বিরোধীদের মধ্যে বাকযুদ্ধ চলা খুবই কমন জিনিষ, যা আমাদের মত প্রায় সবদেশেই চলে। কিন্তু বাংলাদেশের বিরোধীদলের অযোগ্যতাটা অন্য খানে!

    হাসিনা এর পালটা জবাব দিয়েছেন যার সারকথা হল, আমাদের মুরোদ আছে তাই করেছি। বলেছেন, “আরে তাড়াতাড়ি, আমাদের তো সব তৈরি আছে। করব না কেন? আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হই না। জানি নির্বাচন হবে। নির্বাচনে জিতলে কী করব, হারলে কী করব—এগুলো সব আগে থেকেই তৈরি করা থাকবেই। তাই আমাদের সময় লাগবে কেন? সময় নষ্ট করব কেন? আমাদের একটা দিনেরও মূল্য আছে। উন্নয়নের ধারাটা অব্যাহত রাখতে হবে।’” – এইসব কথা।
    আসলে বিরোধীদের লক্ষ্য ছিল কথিত নির্বাচনে হাসিনা দলকে বিজয়ী বলে পেশ করাতে নিজ কর্মি-সমর্থকদের ভাঙ্গা মনোবল চাঙ্গা করা। ভাঙ্গা কারণ তারা  নির্বাচন ঠেকায় দিতে বা হাসিনারে বাধ্য করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই অর্থে বিরোধীদের পরাজয় হয়েছে এটা তো দিনের আলোর মত পরিস্কার, তা অস্বীকারের জো নাই। তবু তারা চেষ্টা করেছে এটা বুঝাতে যে এখনও যেন হাসিনা সরকারকে চাপ দিয়ে আমেরিকা অনেক কিছুই বাধ্য করতে পারে! আর এর প্রমাণ হল, হাসিনা সরকার গঠনে তাড়াহুড়ো করছে। কিন্তু আসলে কি এটা সত্যি? কতটা সত্যি?

    নয়া সরকার গঠনে হাসিনা তাড়াহুড়ো করেছে সত্য। কিন্তু কেন, এটাই প্রশ্নঃ
    কথা সত্য দেখলাম আমরা হাসিনা তিনদিনের মধ্যে সরকার গঠনের সব করেছে এমনকি দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি শেষে ১৫ তারিখ সকালেই প্রথম মন্ত্রীসভার বৈঠক করে ফেলেছেন। কিন্তু এত তাড়া কেন?
    কানখাড়া করে আমাদের শুনা ও বুঝা উচিত এটা কোনই আমেরিকান চাপ নয়।  বরং বাস্তবত আমেরিকা এধরণের সব চাপ দেয়ার সক্ষমতা হারিয়েছে বা নিজেই নাই করে ফেলেছে। এটা হল কঠিন সত্যিটা। কিন্তু বিরোধীরা এটা নিজেরা বিশ্বাস করতে বা মানতে পারছে না। বা চাচ্ছে না – ব্যাপক হতাশা আসবে বলে। কেন? মানে কেন এমন হল?

    আসলে এটা মুখে মাটি ঢুকে যাওয়ার মত অবস্থা! মাটি আমাদের খাদ্য না। তাই মুখে কোন কারণে মাটি পড়লে থু থু করে ফেলা আর বারবার মুখ ধুয়ে পরিশুদ্ধ, মন কে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। বিরোধীদের সেই মাটি খাওয়া দশাটাই হল, তাদের আত্মত্যাগ, শতকষ্টের শেষ দুবছরের আন্দোলনে প্রায় শতভাগ তারা আমেরিকা-নির্ভর করে সাজানো কৌশলের মধ্যে থেকে আগাতে চেয়েছে।  এই একপেশে পশ্চিমা অতিনির্ভরতাই তাদের খেয়ে ফেলেছে, সব শ্রম-ঘাম পানি করে দিয়েছে। তাই তারা এখন বিশ্বাস করতে চায় নাই আমেরিকা ফেল করতে পারে অথবা বাইডেনের আমেরিকারই চরম অযোগ্যতাও আছে।

    আর সবার আগে, বাংলাদেশের বিরোধীরা এদিকটা যেন বুঝতেই চায় নাই যে বাইডেনের আমেরিকারই কিছু গভীর নিজস্ব স্বার্থ আছে সেটাই বাইডেনের প্রায়োরিটি বা প্রথম বিবেচনাই শুধু নয়; সরাসরি বললে সেই স্বার্থই বাইডেনের কাছে তার সব ততপরতার একমাত্র নির্ধারক উপাদান। মানে বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতিতে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা ও নির্ভরতার কথা আছে মানেই এটা নয় যে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বাইডেনের কাজকর্মের চালিকাশক্তি বা ড্রাইভিং ফোর্স। অথচ আমাদের বিরোধীরা সেটাই বিশ্বাস করেছে!
    অথচ আমরা কি ভুলতে পারি হাসিনার এই দানব ক্ষমতাটা আমেরিকারই তৈরি। জঙ্গীবাদ দমনের নামে হাসিনা যে তার সকল রাজনৈতিকবিরোধীদেরকেও নির্মুল করে ফেলতেছে, বাংলাদেশ একটা গুম-খুন-অপহরণের রাষ্ট্র হয়ে উঠতেছে ইত্যাদি – সেটা কি আমেরিকাসহ পশ্চিমারা দেখে নাই? জানে না?  বরং তারা সেসব দেখেও এরাই হাসিনাকেই পিঠচাপড়ে বাহবা দিয়ে যেতে আমরা দেখেছি। এর পিছনের কারণ একটাই পশ্চিমাদের চীন ঠেকানোর স্বার্থ – এটাই সুপ্রীম। আর একাজের ভেট-উপহার হিসাবে তারা বাংলাদেশকে অবলীলায় ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। আমেরিকার স্বার্থ এতই নির্মম ও নিষ্ঠুর একচোখা আত্মস্বার্থকামী! যার কাছে তার আপন-স্বার্থই সব! এটা তো আমেরিকা সব সময়ই!

    কিন্তু অবজেকটিভিটি বা প্রকৃতির মার-প্রতিশোধ বলে কথা আছে যা কেউ এড়াতে পারে না। আর সেটাই ঘটে চলেছে বারবার। যেমন ২০০৭ সাল থেকে যখন এটা আমেরিকার কাছেই সত্য প্রমাণিত যে আফগানিস্তানে তার পা আটকে গেছে। আর এতে আমেরিকার গ্লোবাল অর্থনৈতিতে যে পিছিয়ে পড়া শুরু এটাই চীনের কাছে ‘পড়ে পাওয়া সুবিধা’ হয়ে হাজির হবে ও হয়েছেও। সেই থেকে আমেরিকা যেটাতে হাত দিয়েছে সব ক্ষেত্রেই হারতেই আছে! এখন এতে বিদেশিদের কি বিপদ হল তা ছেড়ে আমাদের দেশের ক্ষেত্রে আসি!

    হাসিনাবিরোধী সকলের শর্টকামিং বা প্রধান খামতিঃ 
    মূল বিষয়টা ক্ষমতা ধারণা। রাষ্ট্র-ক্ষমতা কি একে বুঝতে পারা। এবারের আন্দোলনে বিরোধীদলের শ্রম-ঘাম পরিশ্রম ব্যয় সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ!  তবু তাদের পদক্ষেপ দেখে কখনই মনে হয় নাই যে তারা ক্ষমতা ধারণাটা বুঝে। এই সোজাকথাটা হল, বলপ্রয়োগ। হাসিনা বলপ্রয়োগে সক্ষম ও সফল। যেই সক্ষমতাটা ব্যবহার করেই সে ক্ষমতায় আছে আর বারবার নিজেকে নির্বাচিত বলে দাবি করছে। তাহলে তাকে ক্ষমতাচ্যুত কেউ করতে চাইলে তাকেও পালটা সেও বলপ্রয়োগের যোগ্য আর সেটা আরো শক্তিশালী ক্ষমতা এটাই প্রমাণ করতে হত। মানে সেভাবে হাজির হতে হত। এটাি বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ এর লড়াইয়ের মূল কথা। এর বাইরে বাকি সবই এর ঝালর-সাজসজ্জা (ডেকোরেটিভ ও প্রেজেন্টেশন এর অংশ)।  অন্যভাষায় এটাকেই আমি প্রায়শই বলি মুরোদ। মানে পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ। আপনার এই মুরোদ আছে তো আপনি রাজনীতিতে আছেন। মুরোদ নাই তো রাজনীতিতে আপনি কেউ না হয়ে থাকবেন।

    তাহলে নির্বাচন কি? এর কি কোন ভুমিকাই নাই?
    অবশ্যই আছে। আর সেটা হল, যাদের যাদের পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ আছে এমন দলগুলোর মধ্যে একটা সমঝোতার নিয়ম সেটা। কিন্তু সাবধান; এখানে লক্ষ্য করবেন প্রমাণিত পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ আপনার আছে আপনিও সক্ষম – এভাবে সাথে আপনারও থাকলেই এরপর আপনি ঐ সমঝোতা নিয়মের সদস্য বিবেচিত হবেন, নইলে নয়। আর কি সেই সমঝোতা? সেটা হল, যাদের যাদের মুরোদ আছে কেবল তাদের মধ্যেই যে সবচেয়ে বেশী জনসমর্থন বা ভোট-কনষ্টিটুয়েন্সি আছে সেই সেবার ক্ষমতায় যাবে।
    তবে সাবধান, আপনি ক্ষমতায় গেলেও অন্য আর যারা  পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ ওয়ালা সদস্য তাদেরও কিছু কমন স্বার্থ ও সুবিধা আপনি তাদেরকেও দিতে বাধ্য থাকবেন। যেমন আপনি ক্ষমতায় আছেন বলে আমার গণ-সমাবেশ আপনি গ্রেনেড (এটা মিলিটারি গ্রেড আর্মস যা পুলিশের হাতে রাখা হয় না) হামলা করতে বা ভেঙ্গে দিতে পারবেন না। আমি রাস্তায় সমাবেশ করে আমার কথা বলতে পারব কিন্তু সেজন্য ক্ষমতাসীন আপনি মিছিলে আমাকে পায়ে-থাইয়ে গুলি করে আমাকে পঙ্গু করে দিতে বা সরাসরি বুকে গুলি করে আমাকে খামোশ বা বাধা দিতে পারবেন না। অথবা এরই আরেক বর্ধিত রূপ ক্ষমতাসীন আপনি আমাকে গুম-খুন-অপহরণ করে বাধা তৈরি করতে পারবেন না। এটাই সেই সমঝোতার নিয়ম। আরেক ভাষায় এটাই নাগরিক সকলের কনষ্টিটিউশনাল রাইট। এমনকি এই যেটাকে মুরোদওয়ালাদের সমঝোতা  বলছি এটাই আমেরিকান কনষ্টিটিউশনের প্রথম সংশোধনী (১৭৯১)।   আর এটাকেই আমরা এর এই বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ দিকটা পর্দা দিয়ে ঢেকে দিয়ে বলি “সিভিল রাজনীতি”, বা আবেগে বলি পরিচ্ছন্ন রাজনীতি। মানে যেটাকে কমিউনিস্টেরা বলে গণ-আন্দোলন (যেটা সশস্ত্র নয়) বা মাস-লাইন এর রাজনীতি।  আর আমরাও এথেকেই ভাব মারি যেন রাজনীতি মানেই ক্ষমতা নয়; মানেই বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ নয়।  কাম্য রাজনীতি মানে হল যেন সিভিল রাজনীতি!!! আর সেকারণেই বলেছি এই মুরোদওয়ালাদের মধ্যে সমঝোতা – এই সমঝোতা কনষ্টিটিউশনাল রাইট। এই রাইট বা খেলার নিয়ম যখন ক্ষমতাসীনেরা মানবে না , অস্বীকার করবে বুঝতে হবে এই অমান্য মানেই তখন পালটা বলপ্রয়োগের মুরোদ এর দিকে রাজনীতিকে নিতেই হবে। আর এখানটাতেই আমাদের বিরোধী দলেরা নিজেদেরকে ব্যর্থ বলে তুলে ধরেছে। ভেবেছিল আমেরিকা একাজটা করে দিবে!

    কিন্তু এবারের দুবছরের আন্দোলনে কি হয়েছেঃ
    প্রথম অপরাধ হল, রাজনীতিতে ক্ষমতায় আসতে চাইলে তা যে বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ – এই মূলসুত্র বিরোধীদলেরা মান্য করি নাই। যেন ভুলে গেছি বা থাকতে চেয়েছি।
    এর চেয়েও বড় অপরাধ হল, ধরেই নিয়েছি সব আমেরিকা করে দিবে। যেন আমাদের কাজ হল কেবল বড় সমাবেশ করে দেখিয়ে দেয়া। কিন্তু সরকার পড়বে কি করে? অনেক বড় নেতাকে বলতে শুনেছি বা জেনেছি তারা বলেছেন – সরকার কি করে পড়বে এ’দায় নাকি তাদের নয় আমেরিকার!!! সাথে এটাও বলেছেন, এভাবে আমেরিকা  তার দায় সম্পন্ন করে দিলে মানে সরকার পড়ে গেলে তারা তখন আবার নির্বাচন দিতে হবে বলে দাবি করতে থাকবে!!!!  আর এটাই শুধু অতি আমেরিকা-নির্ভরতাই নয় যেন নিজ বিবেচনা জ্ঞান-বুদ্ধি খুলে পাশে ফেলে রেখে নিজেই গাধা সেজে বসে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়া! আত্মপ্রবঞ্চনাও বোধহয় এমন ভোলেভালা হয় না! 

    এই আলোচনা থেকে এটা পরিস্কার যে এবারের দুবছরের আন্দোলনের প্রধান খামতি হল এরা জানে না বা ভুলে ছিল যে রাজনীতিতে ক্ষমতা মানে তা বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ। আর এর বাইরে কোন সত্য নাই।  সেকারণে, যেখানে দরকার ছিল আভ্যন্তরীণ যত শক্তি বা যত পালটা-বলপ্রয়োগের মুরোদ সমাজের যাদের যাদের আছে যারা সরকারের উপর ক্ষুব্ধ তাদের সকলকে সবার আগে জড়ো ও যোগাড় করা; আর পরে এর উপর দিয়ে আমেরিকান সহায়তা যত যা পাওয়া যায় তা সামিল করে পালটা-বলপ্রয়োগের মুরোদ দেখানো এভাবে; সেখানে বাস্তব ঘটনাটা হয়ে দাড়িয়েছিল যে পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ – এই অংশটাই একেবারে অনুপস্থিত। আর সাথে সব আমেরিকা করে দিবে এই মনোভাব সপ্তমে উঠানো হয়েছিল! এমনকি ২৮ অক্টোবরের সমাবেশ সেটা আহবানের পিছনেও – সব আমেরিকাই করে দিবে আর আমাদেরকে অহিংস হয়ে বসে থাকলেই হবে -এ’ছিল তাদের স্পষ্ট ভাবনা! তাই এক সাউন্ড গ্রেনেডে্র শব্দে সব অক্কা পেয়েছিল!  মঞ্চে বক্তৃতারত অবস্থাতেই সব ফেলে পালানো ঘটেছে। আর এটা হঠাত নয়, এটাই আগাম সিদ্ধান্ত ছিল! যেন আমেরিকাকে বলা যে ভাইসাব আমরা কিন্তু আমাদের করণীয় পার্ট শেষ করলাম; বাকিটা দেইখেন!

    অথচ উলটা করে চিন্তা করেন। ২৮ অক্টোবরের কর্মসুচি সেদিন না থাকলেই মানে কোন কর্মসুচি না থাকলেই সেটাতে  বিরোধীদের পক্ষে পরিস্থতি থাকত! কারণ, হাসিনা অপেক্ষা করছিল কিভাবে সহিংসতা, জঙ্গিত্বের অভিযোগ তুলে বিরোধী আন্দোলনকে মাঠ থেকে বিদায় করবে, সাজা দিয়ে জেলে রাখবে আর তার কারচুপির নির্বাচন আয়োজনের পথে ফাইনালি রওনা দিবে।
    আবার দেখেন ২৮ অক্টোবর থেকে ৭ জানিয়ারি বা এর পরেও আমেরিকা নিশ্চুপ যাকে বলে নট নড়ন-চরণ!! তার মানে বিরোধীরা – আমেরিকা ভাইজান বাকিটা দেইখেন – বলে যে মঞ্চ ছেড়ে ভেগেছিল  সেটা তারা করেছিল এবিষয়ে আমেরিকান মনোভাব কি – তারা এরপরে আসলেই কি কিছু করবে বা করতে পারে – এনিয়ে কিছু না জেনেই। তাহলে কিসের ভিত্তিতে কি লক্ষ্য করে ২৮ অক্টোবরের সমাবেশ ডাকা হয়েছিল? এটাই কি আবেগে ধরে নেয়া নয় বা ছিল না যে – আমেরিকা ভাইজান বাকিটা দেইখেন????

    মানে, মনে করা হয়েছিল গণ-মহাসমাবেশ সফল করা মানেই বিরোধীদলের দায়দায়িত্ব করণীয় সব শেষ ওখানে। এটাই কি হাসিনার বলপ্রয়োগের জোরে ক্ষমতা ধরে রাখার বিরুদ্ধে পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ দেখানো??? অবশ্যই না। এটাসি তো সবচেয়ে বড় ভুল! কারণ, তাদের ভাষাতেও যদি বলি তবে গণ-মহাসমাবেশ আর গণ-অভ্যুত্থান তো এক কথা নয়। বরং দুইয়ের দুরত্ব বহুদুর! এছাড়াও একালে গণ-অভ্যুত্থান এটাও সহজ যা যথেষ্ট নয়!  এটাও বহু কঠিন হয়ে গেছে, যেটা ১৯১৭ সালে পারা যেত সেটা এখন খুবই কঠিন। এখানে তা নিয়ে বিস্তারে বলার সুযোগ নাই তাই সংক্ষেপে বলব, একালে ১৯১৭ সালের রাশিয়ার মত হবু বা গণ-অভ্যুত্থানকামী দেশটা বাকি দুনিয়া থেকে আর বিচ্ছিন্ন নয়। প্রত্যেকটা রাষ্ট্র এখন বিপুল্ভাবে বিকশিত হয়ে পরা গ্লোবাল বাণিজ্যের কারণে এই গ্লোবাল বাণিজ্যে নানান স্বার্থের অংশ হয়ে গেছে। তাই এখন বাংলাদেশে কি হয় তাতে ওসব দেশের বিশেষ করে প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর সরাসরি স্বার্থের দিক এখন জ্বলজ্বলে!  এমনকি ১৯৬৯ সালের আমাদের সাতদিন আয়ুর যে গণ–অভ্যুত্থান যেটা বলা হয় সেটাও ছিল অর্কেস্টেডেড বা সাজানো! তাই টিভি-তে এসে সেকালে আয়ুব খানের সারেন্ডার-বক্তৃতা ছিল যে,  আসেন গোলটেবিল করি, ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থার করি।

    তাহলে মূল পয়েন্টটা হল, সবার আগে সরকারবিরোধী এভেলেবল দেশীয় সকল শক্তি (সরকারি ইন্সটিটিউশন প্রশাসন যারা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ) এমন সকল সরকারবিরোধী স্বার্থ – এমন সকলকে নিয়ে একটা বুঝাবুঝি তৈরি করা এরপরে আমেরিকার কথা আসতে পারে – এমন হতে হত। এর বদলে সবই পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ এর খবর নাই তা ভুলে কেবল এক আমেরিকা ভরসা! এমনই বোকা আর এবসার্ড কাজটাই আমরা করতে গেছিলাম!

    এখানে সাথে আর একটা সাবধান বাণীঃ বলপ্রয়োগ আর পালটা-বলপ্রয়োগ এর মুরোদ বিষয়টা বুঝবার সময় ভুলেও এটা ন্যায় নাকি অন্যায় – এমন বিবেচনা এর ভিতর আনবেন না। মুরোদ-ই সত্য! যো জিতা ও-হি সিকান্দার! যে নিজেকে ডিফেন্ড করতে সক্ষম তার জন্যই এই দুনিয়া! বাকি সবকিছু আসবে এরপরে। সবার আগে ক্ষমতা এরপরে আইন বা ন্যয়-অন্যায় বা অধিকার বোধ ইত্যাদি! যার সোজা মানে হল, আগে মুরোদ এর বিজয় এরপরে সেই মুরোদকে গণ-মানুষের স্বার্থ, গণস্বার্থ (পাবলিক ইন্টারেস্ট), ন্যয়-অন্যয় বোধ, অধিকার বোধের পায়ে সমর্পণ বা উতসর্গ করে দেয়া! দিতে হবে! এই হল পথ! এর কোন উল্টা-পাল্টা বা আগে-পিছে করা যাবে না!  আর মুরোদ না থাকলে না বুঝলে রাজনীতি তার জন্য নয়!

    এমবেসি পাড়ার ক্ষমতার করিডোরে কান পেতে ইনফরমাল যা জানা যায়ঃ
    কেন আমেরিকা বা ওর প্রতিনিধি পিটার হাস ২৮ অক্টোবরের আগে থেকেই ক্রমশ  নিশ্চুপ? প্রায় নো এক্টিভিটি? নো স্যাংশন-নিষেধাজ্ঞায় চলে গেছিলেন?
    এর অনেকগুলো ভাষ্য-ই পাওয়া যায় যার মধ্যে বেশী মুখে মুখে ফেরা ভাষ্যটা হল যে, গত দুবছরের এই শেষের দিকে এসে আমেরিকার কাছে পরিস্কার হওয়া শুরু করেছিল যে আমেরিকা যদি এরচেয়েও বেশী  স্যাংশন-নিষেধাজ্ঞায় চাপ হাসিনা সরকারের উপর প্রয়োগ করে তবে সেটা আনবেয়ারেবল বা অসহ্য হয়ে যাওয়াতে এই সরকার এখনও যেভাবে একটু ব্যলেন্স রেখেছে যে কেবল চীন নয় (যদিও একটু বেশী নির্ভরতার) তবুও পশ্চিমের সাথেও পাশাপাশি যোগাযোগ ও লেনদেন সম্পর্ক একটা রেখে চলে। কিন্তু এটাই আর তখন একেবারেই থাকবেই না। একপেশে হয়ে সরকার একেবারেই সবকিছুর জন্য চীন-মুখি হয়ে বা চীনের কোলে উঠে যাবে। পশ্চিম থেকে পুরাটাই বিচ্ছিন্ন হয়েই বিকশিত হতে থাকবে! যেটা আমেরিকার একেবারেই কাম্য নয়!
    অনেকে আবার  একটু পাকামো করে এখানে ভারতকে টেনে তাকে ক্রেডিটটা দিতে চায় যে ভারত দীর্ঘদিন থেকে এমন ঘ্যানর ঘ্যানর করলেও বাইডেন প্রশাসন এটাকে গুরুত্ব দেয় নাই। সেটাই নাকি এখন এই ডিসেম্বরে এসে পিটার হাসের আমল পেয়েছে।
    এক্ষেত্রে আমাদের পালটা বক্তব্য হবে তাহলে – এর মানে হল “কি করিলে কি হইবে” সেসব পুর্ণ হোমওয়ার্ক সবার আগে  সম্পন্ন না করেই বাইডেন প্রশাসনের এসব আজরা জেয়া বা -ডোনাল্ড ল্যু রা মাঠে নেমেছিল??? আচ্ছা এসব লোকগুলো কি ফাজলামো না সিরিয়াস কাজ করতে এসেছিল?? যারা হোমওয়ার্ক শেষ না করেই সিদ্ধান্ত নেয় কাজে নেমে আসে তাদেরকে আমরা কি বলবো???

    কাজেই দেখা যাচ্ছে এই বয়ানও সুবিধাজনক হল না। তাই আরেক বয়ানের হদিস পাওয়া যায়। সেটা হল প্রধানমন্ত্রীর সন্তানকে মানি লন্ডারিং মামলায় আটকে চাপ দিলে সেটা বাইডেনের আমেরিকার জন্য অব্যর্থ অস্ত্রের মত কাজে দিবে, এটাই নাকি মনে করা হয়েছিল। কিন্তু  প্রধানমন্ত্রীর এজেন্ডা-ক্রম এর ভিতরে সন্তানকে বাঁচানো  – এটাকে তিনি কোন এজেন্ডাই করেন নাই বা  রাখেন নাই। তাই আজরা জেয়াদেরও কপাল ফুটা হয়ে হাজির হয়!  মানে হাসিনার পরিকল্পনার কাছে তারা সবাই হেরে যায়!
    এটা সত্য-মিথ্যা যাই হোক বরং আমরা দেখেছি হাসিনা সরকারের সবার আগেই প্রায়োরিটি ছিল যে – নির্বাচন-সম্পন্ন হয়েছে দাবি করে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করে দেখানো। একাজকেই প্রথম ধ্যান-জ্ঞান করে নেমে পড়া। কারণ, এটাই হল তাঁর সব ক্ষমতার ভিত্তি না শুরু! কথা সত্য। কিন্তু তাহলে কি এরপরে সন্তান বাচানোর ইস্যু আসবে?  না তাও নয় তিনি তা করেন নাই; আগেই বলেছি এটা এখন তাঁর এজেন্ডাতেই নাই। আর এতেই বাইডেন প্রশাসনের কুতুবেরা নাকি বোবা হয়ে যায়! মানে এই প্রশাসন হাতে -বার্গেনিংয়ের বুটি – শুন্য হয়ে সব অকেজো হয়ে যায়! আর এটাই নাকি পিটার হাসের ক্রমশ নিশ্চুপতা!!!!! এর সত্য-মিথ্যা আমরা নিশ্চিত নই। তবে সন্তান বাঁচানোকে কোন প্রায়োরিটিতে না রাখার সিদ্ধান্তই সফল ও কার্যকর!
    তাহলে হাসিনার এরপরের বা সেকেন্ড প্রায়োরিটি কি?

    হাসিনার দুঃচিন্তা কি নিয়েঃ
    বলার পেক্ষা রাখে না হাসিনা নিজের এই সেকেন্ড প্রায়োরিটি সফল হবে কিনা এনিয়ে চিন্তিত। যদিও কোনভাবেই সেটা বাইডেন আবার নয়া সরকারের ক্ষমতার উপর চাপ দিতে পারে – এটা তা নয়! এটা আন্দাজে ঢিল ছোড়া আর যার মূল লক্ষ্য হতাশ কর্মীদের মনোবল খাড়া করা। এই অ্আন্দাজি কাজ এটা আত্মঘাতিমূলক! যেখানে বিরোধীদের সকলের কাজ এখন নিজেদেরকেই সঠিকভাবে মুল্যায়ন, কি কি ভুল হয়েছে এটা খুজে দেখে স্বীকার ও কারেকশন করে নেয়া সেখানে চাতুরি উলটা নেগেটিভ ভুমিকায় হাজির হবেই!
    তাহলে হাসিনার সেকেন্ড প্রায়োরিটি বা দুঃশ্চন্তা কি নিয়ে?

    এই পিটার হাস বা বাইডেন প্রশাসন স্যাংশন-নিষেধাজ্ঞা এটা এখন ক্রমশই অকেজো দুর্বল হয়ে যাবে। সেকথায় আরেকটু বিস্তারে আসব।
    এর আগে, নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করতে সক্ষম হলেও এই ২০২৪ সালেই হাসিনার জন্য অন্তত দুইটা বিপদ বা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। সবচেয়ে বড় বিপদের ইস্যু হল দেশের অর্থনীতির বেহাল – এই হাল! এটাই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ তার সামনে। পড়িমরি অবস্থা! এটা তিনি জানতেন তাই অনেক আগেই বলেছিলেন আমেরিকা নাকি দেশে দুর্ভিক্ষ আনবে।

    গত ৯ ডিসেম্বর কালের কন্ঠের এই শিরোনাম ছিল মার্চের দিকে দুর্ভিক্ষ ঘটাতে ষড়যন্ত্র হচ্ছে – গোপাল্গঞ্জে শেখ হাসিনা। কিন্তু কেন বলেছিলেন অথবা এর ঘটনা পরম্পরা কি?
    এর একেবারে প্রথমে বা শীর্ষে আছে আপাদমস্তকে চোর একটা শ্রেণী। এটা ঠিক ধনী-গরীবের ধনি শ্রেণী বলতে যা বুঝাই ঠিক তা নয় যে যেকোন সরকারের বিরুদ্ধে যেমন অভিযোগ থাকে যে সরকার ধনীদের পক্ষে কাজ করে গরীরসহ বাকি দেশের সকলকে ডুবিয়েছেন। বরং এরা হোল চোর-লুটেরা আর হাসিনাকে এমন চোরদের উপর ভরসা করেই নিজ ক্ষমতা-শ্রেণী সাজাতে হয়েছিল। হাসিনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বা খামতির দিক হল তাঁর অবস্থান ঠিক রাজনীতি না, প্রতিহিংসা! বাবার হত্যার প্রতিশোধ! তাই আকন্ঠ নিমজ্জিত চুরির সুবিধা খাওয়া একটা শ্রেণী যারা জিন্দাবাদ দিয়ে হাসিনার চোখবুজা সমর্থক সেজেছে। হাসিনা তাদের আনুগিত্য কিনেছে। অথচ প্রশাসনের ভুল পরামর্শে হাসিনা যখন তেলের দাম এক লাফে দেড়্গুণ বাড়িয়েছিল এই আকন্ঠ লুটেরারা সবার আগে সকলে মিলে মানে তারা প্রায় সকলেই ব্যাংক ঋণএর ডিফল্টার তারা কব্জায় থাকা সকল টাকা একসাথে ডলারে কনভার্ট করে দেশ ছাড়তে ততপর হয়েছিল। এতে সৃষ্ট যে ডলারের চাহিদা এটা একেবারেই কৃতিম, স্বাভাবিক অর্থনীতিতে যে ডলার লাগে সেই চাহিদা নয়। আর আমাদের অর্থনীতি এই সীমাহীন যোগান দিতেও সক্ষম ঠ্যাকার কোন কারণ নাই। এই ভারসাম্যহীনতাকেই এই এলোমেলো দশা আমরা বলছি দেশের অর্থনীতির বেহাল অবস্থা। অর্থাৎ হাসিনা নিজেই যে অর্থনৈতিক শ্রেণীর উপর ভর করে তার প্রতিহিংসা বা বাবার নাম প্রতিষ্ঠার কাজ হাতে নিতে চেয়েছিলেন সেটাই তার আসল শত্রু!
    তাহলে এখন হাসিনার চ্যালেঞ্জটা কি? তিনি চিন্তিত কেন?
    সোজা কথায় দুইটা কাজ তাকে করতেই হবে বা অর্জন করতেই হবে। এক নগদ (ক্যাশ) ডলার ঋণ যা কমপক্ষে দশ বিলিয়নের আশেপাশে। যদিও তাঁর আসল প্রায়োরিটি অর্থে প্রধান বিষয় হল, আইএমএফ এর কাছ থেকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে একটা পজিটিভ বা ভাল রিপোর্ট। মনে রাখতে হবে বিদেশী পুঁজি বাজারের কাছে কোন দেশের অর্থনৈতিক হাল মানে এর সম্ভাবনা-সংশয় নিয়ে (সেই ১৯৪৫ সালে প্রথম আইএমএফ এর জন্মের পর থেকে এপর্যন্ত) আইএমএফ এর দেয়া রিপোর্ট বাজারের কাছে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য, আন-বায়াসড রিপোর্ট বলেই মনে করা হয়। যদিও অনেকে ভুল্ভাবে মনে করে থাকেন এমন রিপোর্ট না, যেন আইএমএফ এর কাছ থেকে পাওয়া ঋণই আসল বিষয়। অবুঝ কমিউনিস্টেরা এই বোকা বুঝ তৈরি করেছে। দেশ অর্থনৈতিক সংকটে পড়লে আইএমএফ এর রিমেডি বা প্রতিকার বাতলে দেয়। আর এটাকেই কমিউনিস্টেরা হুদাই শর্ত দিল কেন বলে অবুঝ হৈচৈ শুরু করে থাকে। অথচ লক্ষ্য করলে দেখা যাবে কোন দেশের এমন অরররথনৈতিক দুর্দশায় যদি আইএমএফ এর হিসাবে প্রতিকার-বুদ্ধিতে ২০ বিলিয়ন ডলার দরকার হয় তবে আইএমএফ নিজে ছয় বিলিয়নের বেশী দেয় না। অর্থাৎ আইএমএফ এর লোন দেয়াটা মুখ্য না ওর রেকমেন্দেড করণীয় পরামর্শটাই মুখ্য। এটা ২০১৮ সালে পাকিস্তানের ইমরানের ক্ষেত্রে কি হয়েছিল সেই উদাহড়ণ মাথায় রেখে বলছি। চীন পুরা ২০ বিলিয়ন একাই দিতে চেয়েছিল, ইমরান নেন নাই। আইএমএফ ৬, চীন ৬ আর বাকিটা সৌদি (তেল শোধনাগার প্লান্ট) থেকে এভাবে নিয়েছিলেন। কারণ বাজার এসব পরিস্থিতিতে একমাত্র প্রফেশনাল বিশ্বাসযোগ্য আইএমএফ পাকিস্তানের অর্থনীতির অলিগলিতে ঢুকে সব দুর্বলার কথা জেনেছে কিনা।
    অদিকে এখন বলাই বাহুল্য আইএমএফ এর এক নম্বর শর্ত হবে চোর শ্রেণীর ইচ্ছাকৃত খেলাপী ব্যাঙ্ক ঋণ উদ্ধার করে নিয়ে আসো।  ডলারের দুধরণের বা নানান রেট বন্ধ কর। সরকারী-ব্বসরকারির মধ্যে একদুই টাকার ফারাক এমন স্থিতিশীল ডলারের মূল্য-হার ফিরিয়ে আনতেই হবে। এটাই মূল জিনিষ। অতেব নগদ ডলারের ঋণ যোগাড় আর তা নিয়ে এরপর আইএমএফ এর প্রতিকার-পরামর্শ পালন শেষ করে আইএমএফ এর কাছ থেকে ভাল অর্থনৈতিক অবস্থার একটা সার্টিফিকেট যোগাড় – এই হল হাসিনার দুই মাথা ব্যাথার নাম!
    দুটাই কঠিন কাজ!

    চোর শ্রেণীর ইচ্ছাকৃত খেলাপী ব্যাঙ্ক ঋণের অর্ধেক্টাও কি উদ্ধার করতে পারবেন?  মনে রাখতে হবে এরাই কিন্তু হাসিনার সমর্থক ও পোষ্য শ্রেণী; মানে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে নামার মত কাজ এটা! কাজেই ………!!!

    দুই বা দ্বিতীয়টা হল চীনের কাছ থেকে নগদ ডলার ঋণ আনা! কিন্তু চীন কি হাসিনার উপর আস্থা রাখবে? হাসিনা বিনিময়ে চীনকে সবকিছু দিতে রাজী থাকলেও চীন আপত্তি করতে পারে এই বলে যে তুমি তো বারবার কথা দিয়েও ভারত-প্রেমি! তাই আস্থা নাই!

    এখানে আমরা একটা কথা মনে রাখতে পারি যে এবারই প্রথম হাসিনা আমেরিকার চাপ সামলানোর জন্য ভারত-নির্ভর নয়। যেটা অন্তত ২০১২ সাল থেকেই হাসিনার ভারত-নির্ভরতার মূল কারণ! যেটা এবারই ভারতের আমেরিকার কাছে কোন সুপারিশ করেছে আর হাসিনা এর বিনিময়েই ক্ষমতায় তা নয়। কাজেই এবার ভারতের স্বার্থ নিয়ে পরে দেখব মনে করার সুযোগ হাসিনার আছে।  আর সেই লিভারেজ ব্যবহার করে সে চীনকে সন্তুষ্ট করতে লেগে পড়তে পারে! চাইকি এজন্য এবার যদি হাসিনাকেই এক নম্বর ভারত-বিরোধী ভুমিকায় দেখা যায় তাতে অবাক হবার কিছু নাই! যদিও কি হয় কি দাড়ায় সেটা আমাদের বাস্তবে দেখে বুঝতে হবে।

    আর এসব কিছুর শেষ কথাটা কীঃ
    শেষ কথাটা হলো – দেশের অর্থনীতির বেহাল দশা, নিয়ন্ত্রণহীন মুদ্রাস্ফিতিতে গরীব মানুষ ক্রয়ক্ষমতা না হারিয়ে ফেলে; খাদ্য ক্রয় করা টিকে থাকার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলার আসল নাম হল দুর্ভিক্ষ – এটা যে আমরা না ভুলি! বিরোধীদলেগুলো যত দ্রুত ঐ আমেরিকা আসতেছে – এই মিথ্যা ত্যাগ করে বাস্তবে ফিরে আসে এটা প্রথম কাজ্জ। এরপর হাসিনার চ্যাক্ষমতার চ্যালেঞ্জ বা দেশের অর্থনীতির বেহাল অবস্থাটার গুরুত্ব বুঝতে পারে আর তা থেকে করণীয় নির্ধারণ করতে পারে এবং তা ইতিবাচকভাবে এটাই হতে পারে তাদের বেরিয়ে আসার পথ! 

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ   জানুয়ারি   ২০২৪,

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে

    আমরা কী জানি না,
    আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে

    গৌতম দাস
    https://wp.me/p1sCvy-5i1

    খুবই তাতপর্যপুর্ণ হিন্দুস্তান টাইমসের এই কার্টুন যা ছাপা হয়েছে এক রিপোর্টের সাথে। সারকথায় যা I WON! আর  BANGLADESH LOST! মানে হল  ইন্ডিয়ান অন্তত এই মিডিয়া আর হাসিনার সাথে নাই! 

     

     

    আমি বিরক্ত! যারপরনাই বিরক্ত! আমরা কী জানি না,
    আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে? তাহলে?
    [যারা মনে করেন – “আমেরিকা পালাবে? আমার বিশ্বাস হয় না!” – আমি তাদের ধারণাকে সম্মান জানাচ্ছি। আর আপাতত আমরা দেখি ঘটনা কোন দিকে যায়। এর আগে পাশাপাশি থাকতে আমি অসুবিধার কিছু দেখছি না।]

    হাসিনা তো এই প্রথম নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করল না, এসব তো সে আগেও করেছে ফলে সেদিক থেকে নতুন কিছু না, সেসব। ফলে আমাদের অজানা নয়!

    কিন্তু বিরোধীরা মানে, যেমন ধরেন সুনির্দিষ্ট করে ফেসবুক-ভিত্তিক কিছু সরকারবিরোধীদের কথাই যদি ধরি – এদের মধ্যে কিছু লোক যারা বাস্তবতা ফেস করতে পারছেন না।  আচ্ছা বলেন ত – আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে এটা কী আমরা জানি না!  দেখি নাই কখনো? তাই কী এখন  অনেকে বুঝতে পারছে না যে কী হইতেছে! আমাদের উচিত হবে আমেরিকা পলাইতে নিলে এর আগে (২০১৮ নির্বাচনের পরে) আমরা কী দেখেছিলাম সেই স্মৃতি হাতড়ানো! সব খুঁজে বের করা।

    এমনিতে যারা সহজে ভাবতে পারছেন না, সমস্যা তাদের একটা না অনেক। এই সমস্যা মনোগঠনগত! যেমন বাস্তব কী, রিয়েল [real]  কি – এটা তাদের কাছে অস্পষ্ট। মনে করেন বুঝেছেন কিন্তু আসলে না। আইডিয়েল কেই তারা রিয়েল মনে করেন তাই এরা কনফিউজড বা বিভ্রান্ত, আইডিয়াল [ideal] এর সাথে রিয়েলের ফারাক করে বুঝতে হবে।  আইডিয়েল মানে যা হওয়া উচিত জ্ঞান করে ব্যাপারটা জেনেছিলেন বা শিখেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয় নাই। কারণ বাস্তবে যা হয় ওটাই তো সত্যি, বাস্তব অর্থে সত্য [reality]!
    অথচ আমাদের সরকারবিরোধী সমর্থকেরা এদের অনেকে হল এমন, যা তারা দেখতে চায় না যেন সেটা বাস্তবে ঘটতে পারবে না বা ঘটেই নাই; ঘটবে না – এমন মনে করা ব্যক্তি বা চিন্তা করে এমন ব্যক্তিত্ব!
    এটাকেই অনেকে পুষ্ট না-হওয়া মানসিক বিকাশ বলবেন হয়ত তা বলুক!  তবে  এদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটা দেখা যায় যখন সাময়িক পরাজয় আসে! আর তাতে এরা আরো বাস্তবতা বিমুখ হতে শুরু করে। আর এতে সাধারণত সবচেয়ে ক্ষতিটা হয়, এরা আবার দ্রুত উঠে দাড়াতে পারে না!

    ভগ্নদুত কীঃ
    পুরানা বা সংস্কৃত ঘেষা বাংলায় একতা শব্দ আছে ‘ভগ্নদুত’ বলে। আগেরকার রাজাদের দিনে, যেখানে কোন যুদ্ধ চলতে তা থেকে রাজধানী বা রাজার আবাসস্থল অনেক দুরেই হত। এখন সেসব যুদ্ধের খবরাখবর দেয়া-নেয়ার জন্য বিশেষ দক্ষ বিশ্বস্ত রাজদুত ছিল। তাদের মাধ্যম্বের রাজা যুদ্ধের খবরাখবর নিতেন। এখন কোন যুদ্ধে রাজার পক্ষ যদি পরাজিত হত তো সেই খবরও তো রাজার কাছে পৌছাতে হত, কেবল সাফল্যের খবরগুলোই রাজার কাছে পাঠাত তা তো না! কিন্তু সমস্যা বাধত তখনই!
    দুনিয়াতে মাথাগরম গাধার মত বোকা রাজার সংখ্যাও তো কম ছিল না। তো তেমনই রাজারা অনেকে যে কান্ডটা করে বসত তা হল, রাজার পক্ষের পরাজয়ের বার্তা বয়ে আনতে যে রাজদুত, রাজা পরাজয়ের বার্তা শুনে তাকেই খুন করে ফেলত। যেন বিরাট বিরত্ব দেখিয়েছেন ভাবত। আর এতে মানে দাড়াতো যেন দুত নেহায়ত খবরটাই ক্যারিয়ার বা বাহক নন। ঐ বাহক-ই যেন রাজাকে যুদ্ধে হারিয়েছেন! মানে হল, পরাজয়ের বার্তা যে বয়ে আনছেন আর রাজা যুদ্ধে হেরেছেন যে কারণে এদুটা যে একই জিনিষ না তা এসব গাধার বুদ্ধির রাজারা বুঝতে চাইত না। আর কিছু চামচা পারিষদ এতে তাল দিত যে দেখেছো তাদের রাজা কত সেনসেটিভ এই বলে তেল মারত।
    তো বাংলাদেশে এখন হয়েছে তাই। যারা বিরোধীদের খবর স্বীকার করে কথা বলছে তাদেরকেই দায়ী করা লোকের সংখ্যা বাড়ছেই। ভগ্ন দুত-কে হত্যা করাটাই এখন বীরত্ব! আশা করি এখন এমন বীরত্ব তারা ত্যাগ করবেন!

     

    আচ্ছা, আমেরিকা হেরে গেলে পরে, কী করে থাকেঃ
    প্রথম কথা হল, আমেরিকা হেরে গেলে কী করে? মানে পলায় কেমনে?
    তা আমরা কী আগে দেখি  নাই? মানে বলতে চাচ্ছি, এই ২০২৪ সালের আগে দেখি নাই?

    যেমন ধরেম ২০১৮ সালের নির্বাচনে, যখন বিএনপিকে সাত আসন পাইতে দেওয়া হয়; বিশেষ করে সে নির্বাচনের পরে কী হয়েছিল?
    সাহস করে নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন তো দেখি, কার আশ্বাসে বিরোধীরা সেবার নির্বাচনে গেছিল? সেবার হঠাত বিরোধীরা “নির্বাচনে যাবার কৌশল” – এপথ নেয় নাই নিশ্চয়!
    আমেরিকার কোন আশ্বাস ছাড়া তো সেটা হয় নাই! যেটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যাই হোক! এখন হতেই পারে সে আশ্বাসের বাহক ছিল কামাল হোসেন! অথবা বিরোধীদলগুলো নিজেই যে যার মত বাড়তিভাবে আমেরিকান কর্তা বা দুতাবাসের সাথে কথা বলে নিয়েছিল! মিনিমাম এতটুকু না হলে তো সেবার নির্বাচন কৌশল ওমন হয় নাই! তা বলাই বাহুল্য!

    তাহলে এখন আসেন। ঐ নির্বাচনের দিন সকালে উঠে যখন সকলে জানতে পারল যে ভোট আগের রাতে হয়ে গেছে – এমনকি জেনেছি তখনকার আমেরিকান রাষ্ট্রদুত রবার্ট মিলার [Earl R. Miller]তিনিও এর বাইরের নন! এখন বলেন তিনি কেন আম জনতার মত সকালে উঠে জানলেন? আগে কেন জানতে পারলেন না?
    আসলে কথার পিঠে কথা আসে। এই রবার্ট মিলার কোথা থেকে দৃশ্যপটে আসলেন? রাষ্ট্রদুত তো ছিল মার্শা বার্ণিকাট। হা, আমাদের ২০১৮ সালের নির্বাচনের ঠিক ৪২ দিন আগে আমেরিকা, বাংলাদেশে তার রাষ্ট্রদুত বদল করেছিল। বার্ণিকাটের বদলে মিলারকে এনেছিল।
    আর পাঠক এটা নিশ্চয় জানেন আমেরিকা কখন মাঝপথে তার রাষ্ট্রদুত বদল করে দেয়? সরকারের রানিং পলিসি আচমকা বদলে গেলে মানে আমেরিকা বদলালে  তারা পরিস্থিতি সামলাতে সাথে রাষ্ট্রদুতও বদলে দেয়। এমনকি এর আগেও ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের ঘটক রাষ্ট্রদুত বিউটিনিস-কে ১/১১ ঘটনার ছয়মাসের মধ্যে প্রত্যাহার করে বদলে দিয়েছিল আমেরিকা!  তাহলে আমেরিকা পলাইতে নিলে তখন কী করে – এটা তো আমরা কিছু এক্সপেরিয়েন্স রাখি! অভ্যস্ত আমরা। তাহলে এখন বাস্তবতাকে মানতে না চাওয়া কেন?
    বরং, এখনকার প্রধান করণীয় তো বাস্তবতা বা রিয়েলিটিকে আপন করে নিয়ে আবার উঠে দাড়াতে চান যারা তারা মুল্যায়নে বসেন নয়া রাস্তা খুজেন।

    কাউকে দেবতা বানানোটা নিজেরই ভুলঃ
    এধরণের বহু বাণী আমরা জানি যে – কারো উপর এত আস্থা রেখেন না যেন সে নিজেই নিজেকে দেবতা গণ্য করতে থাকে। আমাদের এমন অসচেতনাতেই আমাদের কেউ কেউ আমেরিকাকে দেবতা গণ্য করে নিয়েছিল। আর বলাই বাহুল্য সেটা বিরাট ভুল। আর তা বুঝতে আর এই ভুল কাটাতেও তাদের বেশী সময় লাগছে বা লাগবে। এর একনম্বর ভুলটা হল, আমেরিকা হল মানবাধিকার-গণতন্ত্রের রক্ষক – পাহারাদার গণ্য করার পর্যায়ে নিয়ে গেছিলাম বুঝে না বুঝে কেউ কেউ।  এর বাস্তব দিকটা বুঝতেই চাই নাই। এভাবে বুঝতেই চাই নাই যে মানবাধিকার-গণতন্ত্রের রক্ষক আমেরিকা যে নয় তা সে নিজেও জানে। সে এসেছিল এটাকে ব্যবহার করতে, এখনকার প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতিতে এটাকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন; এতটুকুই। আমরা কী জানতাম না যে গত পনেরো বছর ধরে আমেরিকান সমর্থনেই জঙ্গী তাড়ানোর অজুহাতে হাসিনা সরকার দানব হয়েছে? এমনকি দুমাস আগেও ইইউ এর নেতারা (অন্তত তিনটা দেশ) তর্ক করেছে যে হাসিনা তো ভালই নাকি জঙ্গী তাড়িয়েছে! সুতরাই তাকে সরাতে চাই কেন আমরা? হাসিনা যে কিছু হলেই জঙ্গী তাড়ানোর নামে তার সব রাজনৈতিক-বিরোধীদের নির্মুল করে দিয়েছে এটা কী আমেরিকা-ইইউ জানত না, দেখে নাই?
    কাজেই আমাদের পুরা ভার ছেড়ে দিয়ে এত আস্থা রাখা কেন? এজন্যই গত দুবছরের আমাদের মাঠের ততপরতার উপর  আমেরিকা-ইইউ এর যদি নয়া কোন সমর্থন দিয়ে থাকে সেটাকে তাদের কাফফারা হিসাবে দেখা আমাদের জন্য সবচেয়ে সঠিক হত।  যদিও বড় বিরোধী দলগুলো এপথের চেয়ে বরং পুর্ণ ভক্তি দেখিয়ে “আমরা এবিষয়ে আমেরিকান অবস্থান সমর্থন করি” ধরণের বয়ান দিয়ে গেছে আমরা দেখেছি।

    তবে এমন চিন্তার ভুল বাংলাদেশে বহুদিনের। যেমন ধরেন, বাংলাদেশ সার্বভৌম কিনা! এনিয়ে সবচেয়ে বেশী করে নিজের অজ্ঞতা দেখিয়ে থাকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা। আর এদেরই প্রভাবে বেশ খানিকটা গত দুবছরের মাঠের বিএনপি।
    যেমন ধরেন, জাতিসংঘকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, আচ্ছা বাংলাদেশ কী সার্বভৌম? তাতে ঐ কর্তা বলবে অবশ্য অবশ্যই। চাই কী তিনি জাতিসংঘের ম্যান্ডেট খুলেও দেখায় দিতে পারেন যে জাতিসংঘের চোখে বাংলাদেশ সার্বভৌম। কিন্তু এবার যদি সেই কর্তার কাছে আবার দাবি করেন যে আমি যে আমাদের দেশের জন্য যেকোন সার্বভৌম সিদ্ধান্ত  নিতে যে ক্ষমতা লাগবে সে ক্ষমতা আমারটা আমাকে বুঝায়ে দেন! তাহলে কী হবে?
    এবার সেই কর্তা বলবে আমি বিনয়ের সাথে বলছি, আসলে সার্বভৌম নিজেই হয়ে উঠতে হয়, আপনার সার্বভৌমত্ব অন্য কেউ গুনে গুনে আপনাকে আপনার সার্বভৌমত্ব বুঝিয়ে বা ফিরে দিতে পারে না! মানে নিজেই উঠে দাড়াতে হয়।

    এবারও তাই হয়েছে, আমরা বুঝেছি উল্টা। আর ওদিকে আমেরিকা চেয়েছিল আপনাদের মানবাধিকার-গণতন্ত্র ফেরত দিবার অজুহাতে এই অঞ্চলে তার কিছু এজেন্ডা ছিল ভেবেছিল তা কতটা পরিপুরণ করে নিতে পারে।  কিন্তু আপনারা সেদিকটা না খেয়াল করে যারা যারা তাকে দেবতার আসনে বসিয়ে ছিলেন তাদের এখন সেখান থেকে বের হতে একটু সময় লাগবে, লাগছে হয়ত। কিন্তু বের হতেই হবে কারণ এটাই বাস্তবতা!
    আবার এখন এসব কথা তুলছি বলে ফিরে এক প্রান্ত থেকে উলটা আরেক প্রান্ত মানে চীনকে দেবতা মানতে শুরু করে দিয়েন না!

    তাহলে এখন কী হবেঃ
    এখন যা হবে তা সবই মূলত রুটিন। সারকথায় সবাই জানাবে হাসিনা খুবই খারাপ! অন্যজনও বলবে হা সে তো অবশ্যই খারাপ!
    হাসিনা আমাদের উত্তর কোরিয়া বানায়ে ছাড়বে অথবা বাংলাদেশ একদলীয় দেশ হয়ে যাবে ইত্যাদি কথা উঠবে।
    হ্যা অবশ্যই সন্দেহ নাই। কার্যত তাই হওয়া শুরুওও হয়েছে। যদিও এর কোন প্রভাব হাসিনাকে থামাবে না বা তারা থামাতে আসবেও না।

    তবে এবার কথিত যে সংসদ কায়েম হল, তাতে ৬১ জনের বেশী স্বতন্ত্র হিসাবে বিজয়ের দাবিদার। এদের মধ্যে আবার ৯৫% এর মত হবেন যারা এখনও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কমিটির সক্রিয় সদস্য। মানি সক্রিয় আওয়ামী লীগার! তাই আগামিতে আর জাতীয় পার্টি নয়। বিরোধীদল বানাবার এবারের নয়া ফর্মুলা হবে এসব স্বতন্ত্র (আধা- মূলত আওয়ামী লীগারেরা) এরাই এবার এক সংসদে বসেই সংসদীয় বিরোধী-জোট বানায় নিবে। আর এবাই বিরোধী দলের আইনি মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা দাবি করবে। এরকমই একটা ‘বিরোধীদল’ হতে যাচ্ছে খুব সম্ভবত।  এতে হাসিনাও বাঁচবে; আর কত! বার বার এই নির্বাচন আসলেই দরাদরি  আর জাপা তারা আজকাল অনেক ডাট মারে এমনকি মাঙনা বিদ্যুতকেন্দ্র রেন্টাল বিদ্যুৎ এর মালিকানা চেয়ে বসে; সেগুলো আর কত হাসিনা সহ্য করবেন?  এছাড়া এদের জন্য হাসিনাকেও ভারতের হাত-পা ধরতে হয় যেন (জাপা) কাদেরদেরকে একটু বলে বা বকে দেয়! তাই এবারই সেসবের বালাই শেষ। এখন থেকে সবাই স্বাধীন!
    আর বাকিরা  মানে বিদেশিরা কি করবে? তারা সকলেই একটা করে বিবৃতি দিয়ে তাদের দায় শেষ করবে।

    আমেরিকান বিবৃতিঃ
    রুটিন যেভাবে বলে থাকে – মার্কিন  পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, “যুক্তরাষ্ট্র অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে একমত যে, এই নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু হয়নি। নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ না করায় আমরা হতাশ”। ফলে বুঝতেই পারছেন আমেরিকা এখন কী সুবিধায় আছে। মানে হল এখন উলটা দাঁড়ালো যেন বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় আমেরিকা হতাশ! কী তামসা! সাথে বিরোধীদলের প্রতি পরামর্শও রেখেছে আমেরিকা – “সব দলের প্রতি সহিংসতাকে পরিহার করারও আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটন” – কিন্তু কেন এমন পরামর্শ?
    কারণ এখন আবার বিরোধীরা কোন আন্দোলন করতে গিয়ে যদি হতাহত খুনোখুনি মৃত্যু হয় তাই, আগেভাগেই আমেরিকা হাত ধুয়ে নিল যে আমেরিকা কিন্তু এতে নাই!

    আরও আছে কিছু কথার কথা, নিচে দেখেনঃ

    “যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে একটি অবাধ ও মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় (ইন্দো–প্যাসিফিক) অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অভিন্ন
    লক্ষ্যে কাজ করা, বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষা ও নাগরিক সমাজের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা এবং দুই দেশের
    জনগণের মধ্যে ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”

     এর প্রথমে আছে বাইডেনের হারু প্রোগ্রাম IPS বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি। যেটার বা এই ব্যর্থতার নেতা স্পেশালিস্ট  ডোনাল্ড ল্যু এর গলার এই হারু-মালা চড়ায়ে দেয়া ছাড়া এর আর কোন মূল্য নাই। বাইডেনের IPS এর ঘন্টা বেজে গেছে। এই কঠিন কথাগুলো বলছি এজন্য যে একবার তাকায় দেখেন যে এগারোটা দেশ হাসিনাকে তাঁর বিজয়ে গতকালই অভিনন্দন জানিয়েছে এই প্রথম সাত রাষ্ট্র কারা?

    শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানালেন যে ৭ দেশের রাষ্ট্রদূতেরাঃ
    লিঙ্ক এখানে
    । এই সাত দেশের মধ্যে চীন, রাশিয়া, ভুটান ও ভারত – এই চারজন হল হাসিনা বা চীনের ঘরের লোক! মানে এরা এ তো হোনাই থা ধরনের! কিন্তু বাকি তিন রাষ্ট্র ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কা – এরা তো এখনকার খোদ আমেরিকার প্রত্যক্ষ স্ট্রাটেজিক প্রভাবের দেশ! যার মধ্যে আবার ফিলিপাইনো???? কি সাংঘাতিক?? কোল্ডওয়ার যুগের ফ্যাসিস্ট জেনারেল মার্কোস এর ছেলের ফিলিপাইন? মানে মার্কসের ছেলে যার বর্তমান প্রেসিডেন্ট! শুধু তাই না! এই যে একটু আগে আমরা আমেরিকান বিবৃতিতে একটি অবাধ ও মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় (ইন্দো–প্যাসিফিক) অঞ্চল প্রতিষ্ঠার খায়েস পুনঃব্যক্ত হতে দেখলাম সে খায়েসের এখনকার প্রধান রাষ্ট্রই হল এই ফিলিপাইন। ফিলিপাইনকে দিয়ে আমেরিকা নিয়মিত চীনের সঙ্গে ফিলিপাইনের সমুদ্রসীমা বিষয়ক বিবাদ জীবন্ত রেখে চলেছে। তাহলে সেই ফিলিপাইন হাসিনার সমর্থনের প্রায় এক নম্বরে সমর্থন জানাতে এসে পড়েছে, সেটা কি কারণে? তাহলে বাইডেনের আমেরিকা কোথায়? তারা ফিলিপাইনকে এলাও করল কেন???

    সব আউলাইনা লাগতেছে! জেনারেল মার্কোসের ছেলে বর্তমান প্রেসিডেন্ট বংবং মার্কোস [Bongbong Marcos] আমেরিকার বাইরে এসে এ’কোন খেলা!!!

    আবার দেখেন বৃটেন। নির্বাচনের আগের তিনমাস আমার কান ঝালাপালা দেশি-বিদেশি মানবাধিকার কর্মীদেরকে বারবার তিনদেশের নাম শুনতে হচ্ছিল – বৃটেন (যুক্তরাষ্ট্র) ফ্রান্স ও জর্মানির। এদের কথা হল, হাসিনা নাকি ভালই জঙ্গি তাড়িয়েছে তাহলে আমরা হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি চাই কেন? ইত্যাদি। আর আজ দেখেন কী তামসা! রাত না পোহাতেই আমেরিকান বিবৃতি অনুসরণে সাথে সাথে বিবৃতি বাংলাদেশের নির্বাচন গণতান্ত্রিক হয়নি: যুক্তরাজ্য! মানে এরা সবদিকেই আছে লিপ সার্ভিস নিয়ে।
    আবার নিরুত্তর প্রশ্নো আছে। যেমন ধরেন এখন মানে আট জানুয়ারি তারা জানাচ্ছে  –নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠায়নি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা। অথচ এই খবরটা আগে মানে নির্বাচনের জানায় নাই কেন? বাংলাদেশে স্ব স্ব দেশের এমবেশী কী করছিল? অথচ নির্বাচনের পরে বলাতে এসব ভুয়া পর্যবেক্ষক তারা যা করতে এসেছিল এর সবটাই পুরণ করে ফেলেছে। এমনকি গতকাল বিকেলের সাংবাদিক সম্মেলন করে আরো বিভ্রান্তি ছড়ানো পর্যন্ত! আমরা এজন্য কাকে দায়ী করব?

    কিছুক্ষণ আগের, নয়া ১৯ দেশের অভিনন্দনঃ
    এই সমর্থন-অভিনন্দন গুলোর অর্থ হচ্ছে যে আপনাদের দেশে একটা নির্বাচন হয়েছে কিনা আমি আগ্রহী নই। কিন্তু আমি আপনারদেশের সাথে ব্যবস্থা চাই। আর এই উনিশ দেশের মধ্যে আছে, সৌদি আরব আর জাপান। জাপান মানে? হা এটা চীনবিরোধী আমেরিকান সবচেয়ে বড় স্ট্রাটেজিক মিত্র! আমরা তাই জানতাম। অন্তত ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যু বা অন্তত এশিয়ায় আমেরিকার চীন বিরোধীতার প্রশ্নে। অথচ হায় হায় তাহলে এ আমরা কী দেখছি? কেন?  আরো মেট্রো রেল বা সমুদ্রবন্দর প্রকল্প!!! সব চীন পেয়ে যাবে এই ভয়ে? ভাগ পেতে?
     সৌদি নয়া তেলশোধনাগার প্রকল্প! বাকিটা পাঠক বুঝে নেন।

    আসেন এখন “জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক” প্রধানঃ
    এটা নতুন না যে জাতিসংঘের বইয়ে বা দলিলে যাই থাক, জাতিসংঘ গলা চড়ায় ততটা যতটা আমেরিকা তাদের চাবকায়! গত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশ গুম-খুন-অপহরণের রাষ্ট্র হয়ে আছে “জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক” প্রধান এর তো তাতে কোন খবর ছিল না। তবে গত একদেড় বছর আমেরিকা চাবকিয়েছে তাই তাদের কিছু চিৎকার শুনেছি। এখন “জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক” প্রধান – হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক; এটাই তার সম্ভবত শেষ চিৎকার!  যদিও জোশের ঠেলায় একটু বেশী বলে ফেলেছেন। বলেছেন, “পথ পাল্টান, সত্যিকার অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের পরিবেশ তৈরি করুন”! 

    কথাগুলো শুনতে খুবই ভাল লেগেছে সন্দেহ নাই। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল হাসিনাকে কী পাগলা কুত্তায় কাটছে? তিনি এসব করবেন কেন? তার ঠেকা লাগছে? তার তো কোন ঠেকা নাই!

    তাহলে কী হবে, ঠিক কী বলতে চাইঃ
    কথা খুব সহজ! যার মাথা ব্যাথ্যা তাকেই ওষুধ খুঁজে আনতে হবে। সেই মুরোদও লাগবে! মুরোদ যার ক্ষমতা তারই হবে, তার কাছে ফিরে আসতে পারে তা!!!
    এভিন্ন সবকিছুতেই রুটিন বিবৃতিই চলতে থাকবে!

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০৯ জানুয়ারি   ২০২৪,

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে…

    দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে…
    গৌতম দাস
    ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩  ১৯ঃ ৫৪
    https://wp.me/p1sCvy-4Zu

     

     

                         President Biden Holds a Press Conference

     

     

    শিরোনামটাই কত সুন্দর! “দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে ……!”
    মানে ভারত ছেড়ে ভিয়েতনামে পালিয়ে -এরপর বাইডেন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচছেন! সেখানে হোটেলে পৌচ্ছে যেন দশ মিনিট ভাল করে শ্বাস নিয়ে এরপরে সাংবাদিক ডেকে নিয়ে আসা হয় বাইডেনের সামনে! তাইতেই বাইডেন জানান ভারতে মোদি তাঁকে কথা বলতে দেন নাই। [কনফারেন্সের ভিডিও ক্লিপ এখানে – 4:04 থেকে মোদির প্রসঙ্গ] মানে  যেন একদম যাকে বলে চোকিং [choking] – একেবারে টুঁটি চেপে শ্বাসকষ্ট উঠিয়ে দিয়ে ছেড়েছেন!  হয়ত এতে প্রমাণ হয়েছে বাইডেন না, একেবারেই না! বরং, মোদি-ই বাইডেনের চেয়ে  বেশি পাওয়ার ফুল অন্ততঃঃ নিজ দেশে!!! ব্যাপারটা এরকমই কিছু একটা হয়ে মিডিয়ায় হাজির হয়েছে।

    আসলে হয়ত, মোদি যার নাম তামাসা না করে তিনি কী কোন কাজ করতে পারেন না? বোধহয় না! হলোও তাই!  এটা এখন পরিস্কার যে মোদি তিনি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সাথে জি২০ সম্মেলন চলার ফাঁকে সাইড লাইনে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। যেটা খুবই স্বাভাবিক! কিন্তু যেটা মারাত্মক অস্বাভাবিক তা হল যে ঐ দ্বিপাক্ষিক সভার পরে – না যৌথভাবে, না মোদি নিজে একা অথবা বাইডেনকে – কোন সাংবাদিক সম্মেলন করতে দেন নাই। আর এটাকে, মোদি তাঁর সাফল্য মনে করতে পারেন! তবে এটাই পারফেক্ট স্বৈরশাসকের আচরণ! কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র বা এর শাসকের আচরণ না!  যারা পাবলিক শব্দের অর্থ বুঝে নাই তারাই প্রধানমন্ত্রী; এরই চিহ্ন এসব! অথচ পাবলিক শব্দ না বুঝলে কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের অর্থ তিনি কী বুঝেন? বুঝতে পারবেন?

    কোন দুই সরকার প্রধান নিজেদের মধ্যে কোন বৈঠক শেষে সাংবাদিক সম্মেলন করেন, করতে হয়। এই রেওয়াজ তাঁরা মানেন এজন্য যে তাঁরা কী আলাপ করেছেন এর একটা সারাংশ অন্তত – নিজ নিজ ‘পাবলিক’ বা জনগণকে জানানো তাদের দায়িত্ব আর এটা জনগণের দিক থেকেও সেটা জানা তাদের মৌলিক অধিকার! আর সেই ‘পাবলিক বা জন-অধিকার’ পূরণ করতেই বৈঠকের পরে সাংবাদিক সম্মেলন ডাকা হয়ে থাকে। কারণ, একমাত্র সাংবাদিকেরাই পেশাদারি ভাবে ঐ বক্তব্য জনগণের কাছে নিয়ে যাবেন। এই অর্থে এখানে সাংবাদিক মানেই জন আকাঙ্খার এক ধরণের প্রতিনিধি। কাজেই মিডিয়া মানে কেবল মিডিয়ার মালিক আর মিডিয়ার শান-সৈকতের সাথে মিডিয়ার আয়ের হিসাবের বড়াই মাত্র নয়!  পাবলিক ধারণাটাকে সার্ভ করা বা সেবা দেওয়াটাই মিডিয়ার প্রধান কাজ!  তবে পাবলিক শব্দের অর্থ-তাতপর্য না জানলে এসবের কিছুই বুঝা যাবে না। আর তখনই মনে হবে সাংবাদিক সম্মেলন করা না -করা প্রধানমন্ত্রীর বাপের ইচ্ছা অথবা এসবই প্রধানমন্ত্রীর খেয়াল ও তাঁরই একক এক্তিয়ারের এলাকা যেন! কিন্তু কে কাকে বুঝাবে যে পাবলিক শব্দের অর্থ-তাতপর্য কী??? 

    তবে ঘটনা্টা মোদিকে বাইডেনের ভারত ত্যাগ করার ২৪ ঘন্টার  মধ্যে ভীষণ বিপদ আর বিব্রতকর অবস্থায় ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। কারণ, ভিয়েতনামে পৌছেই বাইডেন সাংবাদিক সম্মেলন করার কারণে সবকিছুই দেশে-বিদেশে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে।  প্রথম আলোর দিল্লি সংবাদদাতা লিখছেন, 

    “বাইডেনের সফরে সংবাদ সম্মেলন করা নিয়ে কিছুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের টানাপোড়েন চলছিল। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল মোদি-বাইডেন দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর সে দেশের প্রথা অনুযায়ী সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করতে। যেকোনো দেশের নেতার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর হোয়াইট হাউসে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করা যুক্তরাষ্ট্রের রীতি। সেই রীতি মেনেই গত জুন মাসে মোদির সফরের সময় হোয়াইট হাউস কাভার করা সাংবাদিকদের প্রশ্ন করতে দেওয়া হয়েছিল। যদিও সংক্ষিপ্ত, তবু সেই সফরে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ভারতীয় গণতন্ত্র, সংখ্যালঘু সমাজের অবস্থান ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে জবাবদিহি করতে হয়েছিল। গত ৯ বছরে মোদির শাসনামলে সেটাই ছিল প্রথম ঘটনা। দেশে-বিদেশে কোথাও তাঁকে প্রশ্ন করার যে অধিকার কাউকে দেননি, সেই প্রথম তা দিতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ, সেটাই ছিল সফরের শর্ত।
    সেই শর্তের কথাই এবার যুক্তরাষ্ট্র মনে করিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর কোনো রকম প্রশ্নোত্তর পর্বের মুখোমুখি হতে মোদি রাজি হননি। ভারতের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, প্রশ্নোত্তর পর্ব বা সংবাদ সম্মেলন—কোনোটাই করা হবে না। এমনকি প্রেসিডেন্ট বাইডেন আলাদাভাবেও কোনো সংবাদ সম্মেলন করতে পারবেন না। সিএনএন তা নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রচার করেছিল। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভারতে না হলেও বাইডেন ভিয়েতনাম গিয়ে সফররত সাংবাদিকদের সেই অধিকার দেবেন”।

    আসলে বেচারা মোদি! তারও যে কী কষ্ট আর ঝামেলায় দিন কাটছে সেট মোদি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না!!!  তিনি গত একমাস ধরে হরিয়ানায় মুসলমান কোপানোর এক জরুরী কাজে, এসাইনমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত আছেন, সামনে নির্বাচন। হরিয়ানার গুরগাঁও এর নুহ [Haryana’s Nuh] এলাকাটা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট। মুখ্যমন্ত্রী যোগী সেখান থেকে মুসলমান নিশ্চিন্ন করার “বুলডোজার পলিসি” নিয়েছেন বলা হচ্ছে। তা যেন কম কম দেখা যায় এজন্য এখানে প্রগতির পত্রিকাত দিক থেকে থেকে দেখেন, হরিয়ানায় মুসলমান অঞ্চলে এবার উচ্ছেদের হুমকি। এখন আপনারাই বলেন যে, অন্তত এই অবস্থায় সাংবাদিক কেউ যদি মোদিকে জিজ্ঞাসা করে বসে যে হরিয়ানার নুহ এলাকায় কী হচ্ছে? তখন মোদি কী বলতেন?? তখন হিন্দুত্ববাদকে এমন দেশি-বিদেশির সামনে পরা ইজ্জত কে বাঁচাতো? কাজেই এটা তো ‘হিন্দুত্ববাদের জাতীয় স্বার্থ’, প্রগতিবাদের স্বার্থ; তাই না? কাজেই কীসের সাংবাদিকতা আর পাবলিক? ফেলায় রাখেন সব!

    আর বাইডেন হাতের কাছে বা পাশে মোদিকে – সাংবাদিকের সামনে পেলে কী করতেন এর এক সহজ ভাষ্য বা চিত্রকল্প আমরা পাই ভিয়েতনাম থেকে। সেখানে মানে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় পৌছে বাইডেন বলেছেন, “‘যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বন্ধুত্ব ও অংশীদারত্ব আরও জোরদার কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে আমি ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিস্তারিত আলোচনা করেছি। যা আমি সব সময় করে থাকি, এবারও তা–ই করেছি। শক্তিশালী ও সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ে তুলতে মানবাধিকারকে সম্মান করা, নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা থাকা যে গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রসঙ্গ তুলে ধরেছি”। অর্থাৎ খুবই ভদ্রভাবে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন মোদি কেমন “দায়ীত্ববান জনপ্রতিনিধি ও প্রধানমন্ত্রী”!
    কথাগুলো যত মোলায়েমভাবে বলা তাতে এর প্রতিটা শব্দ দিয়েই বাইডেন আসলে মোদিকে ছিড়ে ফালা-ফালা করে দিয়েছেন! মানে বাইডেনের পলিসি তো এখন আসলে সবার জন্যই এক।  আর সংক্ষেপে তা হল – মানবাধিকার রক্ষা করে চলেন, নাগরিক বৈষম্য করা ত্যাগ করেন নাহলে উনি স্যাংশন দিবেন।  বাইডেনের এই ওষুধ হাসিনার জন্য যা  তা এখন শক্তিমান ভারতের মোদির জন্যও তাই! এতে হাসিনা-মোদি সাক্ষাত হলে তারা একই নিঃস্পেষক বাইডেনকে বদ-দোয়া দিতে পারেন কিংবা নিজেরা পারস্পরিক সহমর্মিতায় গলা জড়াজড়ি করে কাঁদতে পারেন! কিন্তু বাইডেনের হাত থেকে তাঁরা কেউই ছাড় পাচ্ছেন না; কারণ, তাঁরা দুজনই বাইডেনের বন্দী যেন!

    ঘটনা হল অনেক কিন্তু তা্মাসা তবু আমাদের পিছু ছাড়ছে না! তাহলে হাসিনা-মোদি এরা দুজনেই যদি এভাবে একই বাইডেনের বন্দিশালার বন্দি হয়ে থাকেন তাহলে হাসিনার বন্দীমুক্তির সুপারিশ মোদী বয়ে নিয়ে বাইডেনের কাছে যাবেন – এই যে গল্প গত কমপক্ষে দুমাস ধরে এই সৌম বন্দোপাধ্যায়,  প্রথম আলো আর ওদিকে অগ্নি রায় আর ডয়েচ ভেলে, ডেইলি স্টার চালিয়ে গেল, তার কী হবে???? যেমন গত ১৮ জুন মোদির আমেরিকা সফরের চারদিন আগে সৌম্য প্রথম আলোতে লিখেছিলেন বাইডেন-মোদি বৈঠক, মোদির আলোচনায় থাকছে বাংলাদেশ । আর এখান থেকেই শুরু হয়েছিল ডাহা মিথ্যাগুলো প্রথম আলোর সাথে মিলে প্রপাগান্ডা করা।  মানে এতদিন মোদির গোয়েন্দা বিভাগের ফান্ডের অধীনে থেকে এসব প্রপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর এবার সৌম্য লিখে গেছেন আর প্রথম আলো তা ছাপিয়ে গেছে। কিন্তু এবার? এবার আর মোদির খিদমতের ফান্ড এর অধীনে না। এবার বাইডেন-রাহুলের ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়ে মোদির আকাম ফাঁস করে দেয়া। তাই এবারে সৌম্যের লেখা ও প্রথম আলোর ছাপা বক্তব্যের শিরোনামঃ দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে ভারত নিয়ে যা বললেন বাইডেন। মানে মোদিকে কবর দিয়ে সৌম্য আর প্রথম আলো এখন বাইডেন-রাহুল গান্ধী ক্যাম্পে গিয়ে উঠলেন! এতে ওদিকে, মাঝখান থেকে মোদি-হাসিনা দুজনেই ক্ষতিগ্রস্থ – তাতে কেউ কারও হয়ে একই বাইডেনের কাছে সুপারিশ করবে বা মিথ্যা আশ্বাস পরস্পরকে দিবে সে মূরোদ আর কারো নাই!! কারণ, মোদির সুপারিশের ভান্ড ফুটা হয়ে, সব মিথ্যা উদাম হয়ে পড়েছে!!! এটাই তো হওয়ার কথা,  আর কত? আর তাই হয়েছে!!

    এনিয়ে বাংলাদেশের বেশিরভাগ মিডিয়া রিপোর্টই ভারতের মিডিয়ায় যা ছাপা হয়েছে, তা। যেমন ইন্ডিয়া  টুডে যেটা মূলত প্রো-মোদি সেটাও কংগ্রেসের জয়রাম রমেশের এক টুইট বা এক্স বার্তাকে উদ্ধৃত করে রিপোর্ট করেছেঃ “Na karunga, na karne dunga…’: Congress mocks PM over Biden’s speech in Vietnam”। মানে  মোদির হয়ে যেন জয়্রাম রমেশ বলছেন যে,  “মোদি নিজেও প্রেসের সাথে কথা বলবেন , না বাইডেনকেও বলতে দিবেন”।
    এই রিপোর্টাই বাংলা করে আমাদের TBS ছেপেছে। শিরোনামঃ ভিয়েতনাম গিয়ে বাইডেন জানালেন, নরেন্দ্র মোদিকে মানবাধিকার ও মুক্ত গণমাধ্যমের কথা বলেছেন। এক কথায় বললে, প্রায় পনেরো বছর ধরে প্রেস এড়িয়ে চলা মোদি এবার একেবারে বাইডেনের হাতে ধরা খেয়ে গেলেন। একজন প্রধানমন্ত্রীর প্রেসের সাথে সম্পর্ক-মুলাকাত-বাতচিত থাকবে না এটা ছোট-বড় যেকোন আধুনিক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর ইমেজের জন্য, তিনি কেমন শাসক তা বুঝবার জন্য – একটা সবচেয়ে কালো দাগ অবশ্যই! সেটাই মোদির গায়ে লেগে গেছে!

    একইভাবে কলকাতা থেকে কলকাতা টিভি-ও মোদির বিরুদ্ধে কড়া এক রিপোর্ট লিখে বলেছেঃ “……ভিয়েতনামে গিয়ে বৈঠকের বিষয় নিয়ে হাটে হাঁড়ি ভাঙলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট”, যে লেখার শিরোনাম হলঃ মোদিকে মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলেছি: বাইডেন। এই রিপোর্টটা আসলে সাজানো হয়েছে – যত কড়াভাবে সম্পাদক মোদিকে বধ করতে পারবেন ততই পাবলিকের দৃষ্টি আকর্ষণ তথা কাভারেজ ভাল হবে মিডিয়ার – এই সুত্রে!

    তাহলে, মোদির শাসনের সমস্ত সঞ্চয় ইতি-ইমেজ সব কালো কালিতে ঢেকে গেছে – যেটার দেশের ভিতরে প্রভাব হয়ত ইজ্জত একটু ‘কম ডুবে যাবে’ ধরণের কিন্তু দেশের বাইরে মোদির ইজ্জত একেবারেই ম্লান হয়ে গেছে। বিশেষ করে পশ্চিমা মুল্যবোধের নুন্যতম চর্চা আছে এমন যেকোন দেশে। আর আমাদের দেশে মোদি ও হাসিনার সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হল, মোদি হাসিনার হয়ে বাইডেনের কাছে সুপারিশ করে দিবে এই বকোয়াজ সেটা আর এখন লীগের কর্মি বাহিনীও বিশ্বাস করবে না। তারা শকড হয়ে যাবে! – সেটাই এখন এতই উদাম হয়ে গেল!

    বাইডেনের কাছে যে মোদির নিজের বেইল নাই সে করবে হাসিনার জন্য সুপারিশ? কিভাবে?

     

    আপডেটঃ   ২০২৩;

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    ।

     

     

     

     

     

     

     

     

  • মোদি এখন যুদ্ধ না ডায়লগের ভক্ত ফেরিওয়ালা

    মোদি এখন যুদ্ধ না ডায়লগের ভক্ত ফেরিওয়ালা;
    আবার জি২০-ও তাই যদিও ভিন্ন কারণে

    গৌতম দাস
    ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩   সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-4Yr

     

                         G20 summit ends with India, Brazil and Russia boasting success

     

    মোদি এখন আর বিতর্কিত ভুখন্ড নিয়ে, উগ্র হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ববাদী জোশে ‘লড়কে লেঙ্গে’ বলে জবর দখলকারি হতে চান না। তাই তিনি এখন আর যুদ্ধ না। যেন,  ডায়লগে বিশ্বাসী। আপোষ আলোচনার ডিপ্লোমেসিতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিতর্ক-বিবাদ সমাধানের পক্ষের এক গভীর বিশ্বাসী লোক হতে চান তিনি! এমনকি এব্যাপারে আন্তর্জাতিক রুল ও আইনের সহায়তাতেও এবং এসবের অধীনে যেতেও ইচ্ছুক!

    তাহলে মোদিকে একটু মনে করিয়ে দেয়া যাক, গত ২০১৯ সালে মানে মোদি ভারতে দ্বিতীয় সরকার গঠনের পরের প্রথম সংসদে ৫ আগষ্ট, মোদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেছিলেন যে সারা কাশ্মীরই ভারতের, তা বলেছিলেন কেন? ৩৭০ ধারা বাতিল বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন কেন? যেখানে কাশ্মীরের রাজা কাশ্মীর ভারতের সাথে যুক্ত বলে যে দাবি তা অবৈধ, অগ্রহনযোগ্য বলে বাতিল  করে জাতিসংঘ রেকমন্ড করেছিল – কোন রাজা কী বলেন সেটা না, কাশ্মীরের বাসিন্দাদের সম্মতিই একমাত্র নির্ধারক মানে এক রেফারেন্ডাম বা গণভোট করে নিতে হবে; আর এটাই হবে ব্যাপারটা ফয়সালার ভিত্তি।  কিন্তু নেহেরু তা অমান্য করে সেই জাতিসংঘ সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব ফেলে রেখে দিয়েছিলেন। আর এই অবৈধ কাজ করে আবার সম্ভবত মনের অস্বস্তি মিটাতে সান্ত্বণা হিশাবে  নেহেরু ভারতের কনষ্টিটিউশনে আর্টিকেল ৩৭০ ধারা এনেছিলেন। যার সারকথা হল, কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদার রাজ্য করা কিন্তু সেটা আবার ভারতেরই যেন থাকে – এই ইচ্ছামত সংযোজনী আনা। যেটা বিবদমান কোন পক্ষের কেউ চায় নাই।  এমনকি ভারতের সুপ্রীম কোর্টের রায় হল, ৩৭০ ধারা বাতিল করা যাবে না।  অথচ এসবই অমান্য করে  মোদি-অমিত জোর করে সেই ৩৭০ ধারা বাতিল করেছেন; এবার দাবি করছেন পুরা কাশ্মীর ভুখন্ডই ভারতের। এই হল ২০১৯ সালের মোদি-শাহের সংযোজন। যদিও আবার এখানে কেন কাশ্মীর ভারতের হবে এনিয়ে কোন কারণ-যুক্তি বা দলিল কোন কিছুরই উল্লেখ করেন নাই!!  যা অনেকটা –  আমি বলেছি তাই ওটা আমার ধরণের গোয়ার্তুমি!!! অথচ সেই মোদি এখন ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসি এর অনুসারী হতে চাইছেন??? সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদি এক আন্তর্জাতিক সভার বন্তৃতায় এসব নয়া খায়েস নয়া ভান-ভনিতার কথা বলেছেন!!!

    তাহলে এই যে কাশ্মীর ১৯৪৭ সাল থেকেই এক বিতর্কিত ভুখন্ডই থেকে যাওয়া, আর একে ২০১৯ সালের ৫ আগষ্ট থেকে মোদি-শাহ এর জবরদস্তিতে পুরা কাশ্মীরই ভারতের অংশ-ভুখন্ড বলে দাবি করা এটা কোন বা কার সাথে ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসি করার পরে অথবা কোন “আন্তর্জাতিক আইনের শাসন” অথবা কোন “জাতিসংঘের প্রস্তাব” বলে  বিতর্ক মিটানো হয়েছিল????

    “Speaking at the East Asia Summit in the Indonesian capital Jakarta, Modi reiterated that “today’s era is not of war” and “dialogue and diplomacy” form “the only path to resolution” – a theme he has advocated for an end to the war in Ukraine ever since its invasion by Russia in February 2022.” – Indian Express September 8, 2023 

    উপরের এই উধৃতিটা নিয়েছি ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় এক সম্মেলনে ভারতের মোদির বক্তৃতা নিয়ে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার রিপোর্ট থেকে। দুদিন আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ সেখানে “ইস্ট এশিয়া সামিট” এর সম্মেলন ২০২৩’ [18th East Asia Summit (EAS)] এর ১৮তম অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।  “ইস্ট এশিয়া সামিট” বলতে বুঝতে হবে মূলত আশিয়ান দশ রাষ্ট্র আর এরপরেও আরো প্রায় আট রাষ্ট্রের এই সম্মেলন। সেই আট রাষ্ট্র হল – চীন, রাশিয়া, আমেরিকা – ভারত, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান।  এই সামিটে গিয়ে মোদি যে বক্তব্য রেখেছেন – সেটাতে চীনকে উদ্দেশ্য করে কিন্তু নাম না নিয়ে দেয়া মোদির এই স্ববিরোধী বক্তব্য। এখন ভিজা বিড়াল সাজা প্রধানমন্ত্রী মোদি বলতে চেয়েছেন – যে সে হল দুনিয়ায় আইনের শাসন দেখতে চাওয়া প্রধানমন্ত্রী’ আর চীন হল যে আইনের শাসন মানে না এমন রাষ্ট্র। আর যে বিতর্কিত ভুমি যা ভারতের চোখে অরুনাচল আর চীনের চেখে তা ঝাঙনান ‘Zangnan’ সেই বিতর্কিত ভুমি নিয়ে  চীনকে খোঁচা মারতেই মাদি এমন [ সরাসরি না এমন ফ্রি কিক] বক্তৃতা মেরেছেন।

    আর এভাবে ভাব ধরেছেন যেন সন্ন্যাসী ভারতের এটা খুবই পবিত্র এক সাধু অবস্থান যে কারো ভুমির দিকে তাকায় না পর্যন্ত এমনই যোগী এই মোদি!!! অতএব এটাই ইউক্রেন ইস্যুতেও মোদির অবস্থান যেন তিনি পুতিন-জেলেনেস্কিকে বলছেন – ভায়েরা আমার তোমরা ডায়লগের মাধ্যমে সব মিটসাট করে নেও”।  তবে ভুলে যাওয়া যাবে না যে এই বক্তব্য হল মোদির সাইনবোর্ড – যা লটকানো থাকে কেবল দেখানোর জন্য। আর কার্যত মোদি বলতে চেয়েছেন,  ভাই পুতিন তুমি আমাকে ৬০ ডলারেরও নিচে [বাজারের গড় দাম যেখানে ৮০ ডলার বা উপরে] সস্তায় তেল পাঠাতেই থাকো যাতে আমার আটটা রিফাইনারিতেই দিন রাত আমি তেল শোধনাগার চালিয়ে সেই তেল রফতানির পবিত্র সুবিধা খেয়ে যেতে পারি! ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসির খেদমতগার আমি মোদি তো – আছিই তোমাদের সাথে!!!

    সারকথায়, মোদির হিন্দুত্ববাদের ভারত যদি মনে করে সারা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড আর এব্যাপারটা হল ভারত রাষ্ট্র কী মনে করে একান্ত তার ব্যাপার – তাই এনিয়ে অন্যের কিছুই বলার নাই। েখন একই ফর্মুলা মেনে, চীন যদি বলে ঝাঙনান ‘Zangnan’ চীনা রাষ্ট্রের ভুখন্ড – তাহলে তো আর এখানে মোদির এটা “যুদ্ধের যুগ নয়” অথবা এটা “আন্তর্জাতিক আইনের শাসন যুগ” অথবা  এটা “ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসিতে সমাধান” অথবা কোন “জাতিসংঘের প্রস্তাব” বলার আর তো কোন সুযোগ নাই; খোদ মোদিরও না।  মানে মোদি নিজেই নিজের অবস্থানকে ব্লক করছেন – অবস্থা! মোদির সব কথাই তাই অর্থহীন প্রলাপ মাত্র হয়ে গেছে!

    ওদিকে, আনন্দবাজার মোদির এই বক্তৃতাটাকে উগ্র হিন্দুত্ববাদি জোশ আর দেশপ্রেমের উথলায়ে উঠেছে বলে ব্যবহার করেছে; তাই তারা জোশ তোলা এক শিরোনাম করেছেঃ জি২০ বৈঠকের আগে জকার্তায় চিনকে কড়া বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী – এভাবে। আর তাতে পাঠককুল যেন বলে উঠেছিল জিতে রহ মোদি!!!
    এছাড়াও আনন্দবাজার জানাচ্ছে মোদি সেখানে আরো বলেছেন, “বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ঘিরে রয়েছে অনিশ্চয়তা। সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদের পাশাপাশি ভূকৌশলগত সংঘাত সবার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। এর মোকাবিলা করার জন্য বহুপাক্ষিক আইনের শাসন মানা আন্তর্জাতিক বিধি ও ব্যবস্থা প্রয়োজন”। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে মোদি সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ কিছুই উল্লেখ করতে বাদ রাখেন নাই।

    “বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ঘিরে রয়েছে অনিশ্চয়তা। সন্ত্রাসবাদ,
    মৌলবাদের পাশাপাশি ভূকৌশলগত সংঘাত সবার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ।
    এর মোকাবিলা করার জন্য বহুপাক্ষিক আইনের শাসন মানা আন্তর্জাতিক বিধি ও ব্যবস্থা প্রয়োজন।”

    এর মানে মোদি সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ ইত্যাদি যাই তার কাছে তার শত্রু মনে হয়েছে এমন কিছুকেউ উল্লেখ রাখতে পিছুপা হন নাই। কিন্তু তিনি কী জানেন এসবের উদ্গাতা আসলে তিনি নিজেই??? কারণ, তিনি  যতবার তাঁর হিন্দুত্ববাদ নিয়ে আমাদের তাড়া করেন, আক্রমণ করেন ততবারই আমরা বাংলাদেশ থেকে যারা এটা প্রতিরোধ করি, রেজিস্ট [resistance] করি  এসব কিছুকেই ভারতের হিন্দুত্ববাদিরা নামকরণ করে মৌলবাদ হিশাবে। আমাদের প্রতিরোধ বা resistance – এটাই হিন্দুত্ববাদি চোখে মৌলবাদ!!!  বাংলাদেশে আমাদের অস্তিস্ত রক্ষার জন্য আমাদেরকে হিন্দুত্ববাদি সকল ততপরতাকে প্রতিরোধ করতেই হয় ও হবেই!! 

     

    জি২০ সম্মেলনের আজ শেষ দিনঃ
    তবে আগে সেলফির দিন নিয়ে অল্প কথাঃ

    ইতোমধ্যে এবারের জি২০ সম্মেলন ২০২৩ আয়োজন করা হয়েছিল ভারতে, ৯-১০ সেপ্টেম্বর। আজ তার শেষ দিন। গতকাল প্রথমদিনের বিকালে ছিল শো-অফ বা রাষ্ট্রপ্রধান নেতাদের ব্যক্তি ইমেজ বাড়ানো যেটাকে বলে “পাবলিক ইমেজ” ক্রিয়েট বা তৈরি করে নেওয়ার এক শান্ত বিকেল। যেটা বাংলাদেশে বসেও আমরা টের পেয়েছিলাম এক সেলফি-ময় হয়ে উঠা সর্বত্র!!  বাইডেনের লক্ষ্য ছিল এক উদার মনের প্রেসিডেন্টের ইমেজ তৈরি করা।  বিশেষ যে প্রধানমন্ত্রী তাকে উঠতে বসতে গালাগালি, তার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী, আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপকারি অথবা ২০ ঘন্টার লম্বা জার্নি করে দেখতে যাওয়ার মত আরও মহাদেশ আছে (মানে আমেরিকা আর যাবেন না বা পড়োয়া করেন না) ইত্যাদি এতসব বক্তব্য দেয়ার পরে তাঁকেই বাইডেনের সময় দেওয়ার দিক থেকে। ফলে এই বিচারে বাইডেন বাংলাদেশের সরকার নিয়ে যা রাজনৈতিক-কূটনৈতিক অবস্থান ও অসন্তোষ-ই থাক না কেন তিনি সেকারণে, মানবিক-সামাজিক সৌজন্য ভদ্রতা দেখানো আর নিজ উদার মনের পরিচয় অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি-ই আগিয়েছেন এটাই তিনি প্রমাণ করে নিয়ে গেছেন। কিন্তু বিপরীতে হাসিনা এই বিচারে তিনি ততটাই ইমেজ হারিয়েছেন।  যা বলেছেন তা তিনি মিন করেন এমনটা তিনি প্রমাণ রাখতে পারেন নাই। তিনি এজায়গায় শোচণীয় হেরেছেন।  যদিও এনিয়ে সাধারণ সম্পাদক ও. কাদের তার এক সেলফিতে বিএনপি নেতাদের ঘুম হারাম: ওবায়দুল কাদের বক্তব্যে এতে আওয়ামি দলীয় নেতা-কর্মির মনোবল চাঙ্গা করতে হয়ত কাজ করেছে কিন্তু এটা ততটাই হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ক্ষতি হয়েছে যে তাহলে রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ-কে আনার অর্থ কী দাড়ালো??? গতকাল বিকেলে লক্ষ্য করেছি প্রগতিশীল মানে  [প্রগতিবাদ=হিন্দুত্ববাদ] চিন্তার ব্যক্তি বা লেখকেরা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে যে তাহলে কী তাদের হাসিনাই টিকে গেল – বাইডেনের সাথে রফা হয়ে গেল!!! এই খুশি তারা আর লুকাতে পারেন নাই বা লুকিয়ে রাখার টেনশন সহ্য করতে চান নাই যে তারা ভারতপন্থি বা র-পন্থি!! তারা সরাসরি বা পরোক্ষে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন যে, তাহলে তো হাসিনা টিকেই গেল, তাই না!!!
    আমি অবশ্য তাদেরকে আর মানসিক যাতনা দিতে চাই নাই!  কারও অসুস্থতা কখনও কাম্য হতে পারে না! তবে অবাক হয়েছি তাদের চিন্তা করবার অক্ষ্মতাস দেখে যে তারা একটা সৌজন্য-ইমেজের স্বার্থ আর একই লোকের রাজনৈতিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থ  এদুটার ফারাক করতে শিখেন নাই। আপনার এনিমি-কে তার মেয়ের সামনেই খুন করতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা (essential-ness) কী আছে বা থাকতে পারে??? নাকি এমন চিন্তা এটাকেই তো গাধামি, এক মফস্বলি চিন্তা বলে!  কারণ, সেকাজটা অন্ততপক্ষে বাচ্চাটাকে চকলেট দিয়ে দূরে পাঠিয়ে করতে হবে  – আর এটাই স্বাভাবিক!  আর বাইডেন এক্ষেত্রে চকলেট-ই এস্তেমাল করেছেন!!!   আর তাতে শত্রুতা তো ভোতা হয়ে যায় নাই। শত্রুতা শত্রুতার জায়গাতেই বহাল আছে!!!

    সম্মেলনের যৌথ ঘোষণা প্রসঙ্গেঃ
    যেকোন দুই রাষ্ট্র অথবা বহুরাষ্ট্রীয় মোলাকাত বা সম্মেলন থেকে কোন যৌথ ঘোষণা আসাটা নুন্যতম তাদের মধ্যে কিছু ঐক্যমত্য আছে তা প্রকাশ করে। সেজন্য এটা খুবই কাম্য – সে কোন সামিট  মানে শীর্ষ দুই বা ততোধিক সরকারপ্রধান এর সাক্ষাত যাকে আমরা Summit বলে বুঝি; এমন সামিট মানেই এর সফলতার নুন্যতম মাপকাঠি হল যৌথ ঘোষণা – মনে করা হয় কূটনীতি চর্চায়! কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে গতবছর জি২০ সামিট থেকে ইউক্রেন যুদ্ধের ইস্যুতে রাশিয়াকে টার্গেট করে, দায়ী করে সমস্ত বক্তব্য সাজানো হয়েছিল। লন্ডন গার্ডিয়ানের ভাষায়  “.…..All references to Russia, Russian aggression and Russia’s withdrawal in relation to the war in Ukraine that featured in last year’s joint statement at the G20 summit in Bali” । 

    কিন্তু এবার আক্কেল হয়েছে। ঐ সমস্ত লিখে কী কী অর্জন হয়েছে তা তো আজ এক বছরের মধ্যে সব পক্ষই পরিস্কার বুঝতে পেরেছে। সবচেয়ে বড় কথা সারা পশ্চিম – মানে বাইডেন্সহ ইউরপের সব কুতুব রাষ্ট্রের সরকার প্রধানদের নিজ নিজ ইলেকশব ফেস করতে হবে। আর তাতে এরা কেউই নিজ নিজ জনগণের কাছে যুদ্ধের পক্ষে তাদের সাফাই অনুমোদন করিয়ে নেয়া মানে তাদের স্ব স্ব রাষ্ট্রের জনজীবন যুদ্ধের ফলে ভাল আছে আরামে বা বিশেষ সুবিধা পেয়েছে তা একেবারেই নয়। কাজেই অন্তত বাইডেনের কথা যদি বলি আহামি ২০২৪ নভেম্বর তাকে আমেরিকান নির্বাচনের মুখোমুখি দাড়াতে হবে।  অনেকবার যুদ্ধ চালানোর প্রার্থী জিতেছে যেমন বুশের দ্বিতীয় বা সেকেন্ড টার্মের জয়। কিন্তু আবার ওবামার দুবারের জয়  যুদ্ধ থেকে ফেরত আনবার প্রার্থী ছিলেন বলে! অনুমান করা হচ্ছে এবার যুদ্ধ থেকে ফেরত আনার প্রার্থির পক্ষে রায় যাব। তাই আগামি বছরের শুরু থেকেই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করাতে হবে বা বন্ধ দেখব বলে অনেকের অনুমান। ইত্যাদি এসব জল্পনা-কল্পনার ফলাফল হল এবার জ২০ এর যোথ ঘোষণায় আপোষের ভাষা চলে এসেছে।

    তাই গত বারের বালি সম্মেলন সেসব-ই বাদ রাখা হয়েছে এবার। রাশিয়াকে এবার দায়ী করা আর নয়।   সেটা তাদেরবি বিভক্তি আরো বাড়াবে আর এবার ভয় কাজ করছিল এ ঐ যুদ্তেধ তাদের যে কোন আসার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে […alleviating fears that disagreements over the Russia-Ukraine war would prevent a consensus for the first time.]। আর একারণের এর বদলে নতুন যেসব শব্দাবলির উপর জোর দিয়ে ঐক্যমত্য আনা হয়েছে তা হলো …।Instead, the declaration emphasised that states must “refrain from the threat or use of force to seek territorial acquisition” and that “the use or threat of use of nuclear weapons is inadmissible”.
    অর্থাৎ এমন প্রধান দুইটা ভাষ্য যা বাংলা করে লিখলে হবে – ১। কোন ভুখন্ড বিতর্কে কোন হুমকি দেয়া বা শক্তি ব্যবহার না করার আহবান জানানো হয়েছে। 
    এছাড়াও  ২। কোন পক্ষের কোন পারমানবিক অস্ত্রের ব্যবহার বা ব্যবহার করার হুমকি অনুমোদন-অযোগ্য বলা হয়েছে ঐ যৌথ সর্বসম্মতির ঘোষণায়।

    এককথায় বললে, কাউকে হেয় করার উপরে এটা ইতিবাচকতার জয় – এই লাইনে কথা বলার ধারার জয়লাভ!

    তবে একটা মন্তব্য এখানে করাই যায়ঃ
    সারা পশ্চিম মানে আমেরিকা ও ইউরোপ মিলে ইউক্রেন ইস্যুতে সব দায় রাশিয়ার উপর চাপানোর যে কূটনীতি সেটাই কিন্তু আসলে জি২০ এর যৌথ ঘোষণা লিখতে গিয়ে পিছু হঠেছে বা আপোষী হতে বাধ্য হয়েছে। আর তা হয়েছে এবারের ব্রিকস সম্মেলন (২২-২৩ আগষ্টে) আগে হওয়া আর এবার তারা নিজেরা ডালপালা বিস্তার করে বড় প্রভাব ও বড় আশা নিয়ে হাজির হয়েছে – বলে সেই জোটবদ্ধ প্রভাব জি২০ তে পিছন থেকে  ক্রিয়াশীল ছিল। আর তাদের চাপেই মূলত এই আপোষী যৌথ ঘোষণা ২০২৩। যেখানে রাশিয়াকে আগের বছরের মত অভিযুক্ত করা দূরে থাক – এবার যৌথ ঘোষণায় রাশিয়া শব্দটাই নাই, অনুপস্থিত!
    মজার কথা হল, এই পিছনের ঘটনাটা আমেরিকা প্রভাবিত মিডিয়ায় রিপোর্টেড হয় নাই। হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী এএফপি-ফ্রান্স২৪ তে মানে, AFP এই গ্লোবাল মিডিয়া এজেন্সিতে আর তা প্রকাশিত হয়েছে FRANCE24  এই টিভি-প্রিন্ট মিডিয়া গ্রুপের পত্রিকায়। এরা নাম প্রকাশ না করে লিখেছে,   ” আমরা পুরা জি২০ সম্মেলনকে ইউক্রেনাইজড করে ফেলার পশ্চিমা  প্রচেষ্টার হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি এবং সম্মেলন সফল করেছি।

    “We were able to prevent the West’s attempts
    to ‘Ukrainize’ the summit agenda,” the veteran
    diplomat said, dubbing the two-day gathering a “success”.

     এদিকে এই সুযোগে রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভও সুযোগ নিয়েছেন – ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানাচ্ছে তিনি বলেছেন, এক ইউক্রেন ইস্যু দিয়ে যেন যাতে এবার জি২০ সম্মেলনকে ঢেকে ফেলা না যায় সেব্যাপারে মূল কাজটা করেছে ‘গ্লোবাল সাউথ’ গ্রুপ [Global South helped avoid Ukraine issue overshadowing G20 agenda: Russia]।  গ্লোবাল সাউথ বলতে ব্রিকস-কে বুঝানো হয়ে থাকে।  আর এই সুযোগে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা আর সাউথ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামফোসা ভোকাল হয়ে উঠতে শুরু করেন।
    লুলা বলেন, জি২০ এর এজেন্ডাকে কোন বাইরের ঘটনা আমাদের মধ্যে বিভক্তি ঘটায় তা হতে দিতে পারি না। বাইরের ঘটনা বলতে তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের ইস্যু বুঝিয়েছেন। আরো বলেছেন, জি২০ কে বিভক্ত করার কোন শখ নাই আমাদের। দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বদলে আমাদের দরকার শান্তি ও সহযোগিতা!

    “We cannot let geopolitical issues sequester the G20 agenda
    of discussions,” Lula said, an implicit reference to wrangling over the Ukraine war.
    “We have no interest in a divided G20. We need peace and cooperation instead of conflict.”

     এদিকে আগামি বছরের জি২০ এর সভাপতি হচ্ছেন ব্রাজিলের লুলা। তাই তিনি এখনই ঘোষণা করে দিয়েছেন, তিনি যদি আগামি বছরও প্রেসিডেন্ট থাকেন (যদিও না থাকার কোন কারণ নাই) পুতিন ঐ সম্মেলনে আসবেন কারণ তিনি (পুতিনকে) গ্রেফতার হওয়ার কোন সুযোগ রাখবেন না [ If I’m the president of Brazil and if he comes to Brazil, there‘s no way that he will be arrested,” he told Indian news network Firstpost on Saturday.]। 

    আর এই সুযোগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভারভ এক মন্তব্য করে নিয়েছেন – এবারের জি২০ সম্মেলন এক “বাঁধভাঙ্গা সম্মেলন” – …  Calling it a “breakthrough summit”, Lavrov said 

    এই ছিল মোটাদাগে সম্মেলনে পক্ষ-বিপক্ষের মন্তব্য বা মনের কথাগুলো!! এথেকে অন্তত একটা জিনিষ পরিস্কার যে দুনিয়ার নেতৃত্ব অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব প্রবলভাবে পরিবর্তিত, বদলে যাওয়া শুরু হয়ে গেছে।  এবছরের ব্রিকস আর জি২০ সম্মেলন এর দুই ঐতিহাসিক চিহ্ন হয়ে থাকল। 

    শেষ কিছু কথাঃ
    কিন্তু জি২০ জিনিষটা কী? কারা এমন সম্মেলনের চাহিদা দাতা? কারণ, এই টপ জিডিপি-ওয়ালা দুনিয়ার ২০ রাষ্ট্র  এরা তো বিশেষ আমেরিকা-চীনা বলে মূল দুই পক্ষ-বিপক্ষে পরস্পরের চরম বিরোধী! তাহলে দুনিয়ায় এমন আ

    র কে আছে যে এমন ২০ দেশকে এই সম্মেলন প্রতি বছর জড়ো হতে বাধ্য করছে??? সেসব জানলে হয়তো এবারের সম্মেলনের ঘটনাগুলো আরো পরিস্কার বুঝতে তা সহায়ক হত!!

    হ্যা ঠিক তাই!  সেজন্য আগামিতে জি২০ গ্রুপ এরা কে কারা কী এদের উদ্দেশ্যে আর কে এর পরিচালক সে নিয়ে আগামিতে লেখা আনব; সেকথা বলে শেষ করছি!

     

    আপডেটেডঃ   আপডেট ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩  রাত ০৯ঃ ৪৮

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ভারতের স্বার্থে শাহরিয়ারের চীন বা হাসিনাবিরোধিতা দেখানোর বাড়াবাড়ি

    ভারতের স্বার্থে শাহরিয়ারের চীন বা হাসিনাবিরোধিতা দেখানোর বাড়াবাড়ি
    গৌতম দাস
    ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩   ১৯ঃ ৪৭ সন্ধ্যা
    https://wp.me/p1sCvy-4XV

     

           ‘চীনের উত্থান : উদ্বিগ্ন প্রতিবেশী’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন

    শাহরিয়ার কবীর এবার একেবারে ধরা খেয়ে গেছেন। এটা টু মাচ[too much] হয়ে গেছে; তিনি সীমা ছাড়িয়েছেন। এছাড়া, আরেকটু বারাবাড়ি করলে এবার হয়ত দেখব তাকে উপড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে।হয়ত দেখব তিনি নিজেই লিখে দাবি করছেন যে তিনি বোবা হয়ে গেছেন!!! হা ব্যাপারটা আসলেই এতই সিরিয়াস!!
    বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন কী করে পার হবে, হাসিনা সরকার টিকে যেতে পারবেন কীনা এটা একটা অনিশ্চয়তা যা কেউই কী দাঁড়াবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারে; তাতে আপনি যে-পক্ষেরই লোক হন। তবে আপনি আত্মবি্শ্বাস দেখাতে পারেন, প্রপাগান্ডা করতে পারেন বা এমন পক্ষ-বিপক্ষ অনেক কিছুই! কিন্তু অন্তত পরবর্তি ছয়-সাত মাসের পরেই একমাত্র নিশ্চিত জানা যাবে যে ঠিক কী ঘটল। এর আগে দুপক্ষই প্রাণপণ নিজের পক্ষে চেষ্টা করে যাবে এটাও স্বাভাবিক। কিন্তু পরিস্থিতি্তের কোন আন্দাজ ছাড়াই এমন সময়ে শাহরিয়ার ভারতের এক দালালির ঠিকাদারি নিয়ে এসেছেন। সেটা হল হাসিনা যেন চীন-ঘনিষ্ট না হন – ভারতকে ফেলে চীনা ঘোরতর সহযোগিতা নিতে না যান ইত্যাদি এমন সেসব প্রপাগান্ডা!
    এটা কে না জানে যে হাসিনা এই সংকটে নিজে যেকোনভাবে ক্ষমতায় টিকে যাবার চেষ্টা করবেন।  তাতে চীনের কোলে না কার কোলে উঠে এটা পার হবেন সেটা তো সেকেন্ডারি বিবেচনা!  প্রাইমারি বিবেচনা হল, সংকট পার হওয়া!  অথচ মামার বাড়ীর আবদারের মত ভারত বলছে  যে না তুমি চীনের কোলে উঠতে পারবা না!!!  আর শাহরিয়ারকে লাগিয়েছে ঠিকা দিয়ে এনিয়ে প্রপাগান্দা করতে! সব বিচারেই এটা অর্থহীন!  কারণ হাসিনার এক নম্বর বিবেচনা হল, ক্ষমতায় টিকে যাওয়া। আগেও তাকে টিকতে হবে। টিকে গেলে এরপরে যে হয়ত ভারতের জন্য কিছু করতেও পারে। অথচ ভারতের পোলাপানি আবদার হল যে না, হাসিনাকে সবার আগে ভারতের স্বার্থ মানতে হবে, বুঝতে হবে??? কোন সুস্থ মানুষ এভাবে চিন্তা করে না! আর এই অসুস্থ আর অবাস্তব চিন্তাটাকে বাংলাদেশে ফেরি করার ঠিকা নিয়ে এসেছে শাহরিয়ার কবীর! যেন ভারতের এই ঠিকা টা না পেলে বা নিলে আগামি বছর সে না খেয়ে থাকবে যেন এমন মরণপণ অবস্থ দশা তার!  যেন এক রেলওয়ে কুলি যে লাগেজটা বহন অযোগ্য কিনা তা বুঝবার অবস্থা নাই; বাসায় অভাব এত বেশি!!

    বাংলাদেশের প্রো-ইন্ডিয়ানদের এক প্রকাশ্যে মহড়া হয়েছে গতকাল। এরা সরকারের ঘরে উঠে বসে থাকা লোকজন এবং এরা সরকারের ঘরে বসেই সরকারের বিরোধীতা করতে চাইছেন।
    এরা সরকারের ঘরেই বসে থাকা লোক এবং বাংলাদেশিই; কিন্তু প্রো-ইন্ডিয়ান এলিমেন্ট। ভারতের বাংলাদেশ নীতি দেখভাল করার ঠিকাদার বলা যায় সম্ভবত এদেরকে!
    গতকাল, এক পুস্তক প্রকাশনী বা “মোড়ক উন্মোচন” অনুষ্ঠান হয়েছে – পত্রিকার ভাষায় বললে, “মঙ্গলবার বিকালে প্রেস ক্লাবে “চীনের উত্থান: উদ্বিগ্ন প্রতিবেশি” শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান” হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর (মানিক) রচিত এই বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের সময় মূখ্য আলোচকের বক্তব্য দেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির”।

    বইয়ের নাম এর মধ্যে “উদ্বিগ্ন” শব্দটা আছে – আর সেই উদ্বিগ্ন প্রতিবেশিটা হচ্ছে বাংলাদেশ নয়, সেটা আসলে ভারত। কিন্তু সে তার সেই উদ্বিগ্নতা – এটা সে চালিয়ে দিতে চায় বাংলাদেশের নামে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে বর্তমান হাসিনা সরকারের নামে।

    শাহরিয়ারের সারকথা হল – চীন খারাপঃ
    কিন্তু কেন খারাপ?
    ১। শাহরিয়ার বলেছেন,  … “এই বইয়ে  (চীনের উত্থান: উদ্বিগ্ন প্রতিবেশি) প্রাসঙ্গিকভাবে উঠে এসেছে কীভাবে চীনের স্বাধীনতায় ভারত বিশাল অবদান রেখেছে। তখন স্লোগান ছিলো হিন্দি-চীনি ভাই ভাই। সেই সৌহার্দ্য থেকে কীভাবে সংঘাতে পৌঁছল…”।

    উপরে কথিত, চীনের স্বাধীনতায় ভারত বিশাল অবদান – এই তথ্য ভুল।  অন্তত গত ২০২২ ডিসেম্বরে কলকাতার প্রাক্তন সাংবাদিক ও গোয়েন্দার সংস্থার লোক সুখরঞ্জন দাসগুপ্তের এক লেখা ছাপা হয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় শিরোনামঃ চীন-ভারত সম্পর্ক কোন পথে। সেই লেখার ভাষ্য শাহরিয়ারের এই তথ্য সাপোর্ট করে না।

    আর খুবই অল্পকথায় বলতে ঘটনাটা আসলে, ১৯৬০ সালে  চীন-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ট করতে নেহেরু চৌএনলাইকে কলকাতায় এনেছিলেন। আর সেখানকার শ্লোগান ছিল হিন্দি-চীনি ভাই ভাই অথবা নেহেরুর পঞ্চশীলা নীতি ইত্যাদি। তাই এটা না চীন (১৯৪৯) না ভারত (১৯৪৭) এমন কারো স্বাধীনতায় কারো অবদানের ঘটনাই নয়।   আর সেটা আবার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট (1953 to 1961) আইসেনহাওয়ারের আমল। যিনি বিখ্যাত বা কুখ্যাত – সিআইএ পাঠিয়ে দেশ দখল- এর কারণে। তিনি নেহেরুকে পটিয়ে তিব্বতের দালাইলামাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও তাদেরকে মাও-বিরোধী ততপরতায় সহায়তা দিতে সি আইএ পাঠিয়েছিলেন ভারতের মাধ্যমে – যারা ভারতে থেকে এই ততপরতা করবে। কিন্তু মাও এর সরকার এসব টের পেয়ে যখন সামরিকভাবে ধাওয়া দেন তখন সিআইএ দালাইলামাকে সাথে নিয়ে তিব্বত ছেড়ে পালিয়ে ভারতের আশ্রয়ে পর্যন্ত তুলে দিয়ে গেছিল। কিন্তু  তাদের ভারতে প্রবেশ,  সেটা ভারতের হিমাচল প্রদেশ দিয়ে নয় যেখানে এখন দালাইলামা আশ্রিত। সিআইএ অনেক ঘুর পথে আসামের দিশপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে এসেছিল। আর চীনারা সেই ধাওয়া করতে এসেই তারা পুরা আসাম দখল করেছিল আর একমাস একদিন পরে নিজেরাই তা ছেড়ে দিয়ে চীনে ফিরে যায়।
    কাজেই শাহরিয়ারের উচিত একটু কষ্ট করা নেট ঘেটে দেখা সস্তা ভারতীয় যা মনে চায় লিখাগুলোর ফাঁদে না পরা!

    ২।  শাহরিয়ার ঐ সভায় বলেছেন, “…এদিকে নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে চীন কাউকে সাহায্য করেনি। তাই চীন-ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব আমাদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে কিনা সে বিষয়ে ভাবতে হবে”।
    এখানে হঠাত করে চীন-ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব – এর কথা বললেন কেন? বললেন কারণ “শাহরিয়ার ভারতের স্বার্থপন্থী” হয়ে এবার উলটা হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছেন। আর তা বলছেন যেন ভারতের মুখপাত্র হয়ে যে, হাসিনা আপনি – “চীন ও ভারত দুদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছেন – এটা বাংলাদেশের জন্য বিপদ আনবে। তাই হাসিনা,  সেটা না করে আপনি কেবল ভারতের সাথে লেগে থাকেন”। ভারতের এমন খায়েসটা ভারত শাহরিয়ারকে দিয়ে অভিযোগের আকারে তুলিয়েছে।

    এতা বলাই বাহুল্য আসন্ন নির্বাচন ইস্যুতে হাসিনা ভীষণ আমেরিকান চাপে আছেন। কোনভাবে একটা নির্বাচন হয়েছে আর তিনি আবার জিতেছেন – এটা ঘোষণা দিতে পারলে এরপর বাকিটা মানে আমেরিকান পরের চাপ ডিঙিয়ে টিকে থাকার ব্যপারে চীন তাকে সাহায্য করবে – এমন একটা ঝাপসা বয়ান বাজারে চালু আছে।
    এটা আদৌ সত্য কিনা তেমন ডকুমেন্ট অর্থে তা কেউ দেখেছে জানা যায় না। কিন্তু মোদির ভারত এই ঝাপসা বয়ানের ভিত্তিতেই হাসিনা বিরোধিতা শুরু করেছে বা প্রপাগান্ডাও শুরু করেছে। আর এটাই এসব কথা ঢাকায় চালু হবার পিছনের কারণ।  আর এসব প্রপাগান্ডাই বাংলাদেশে চীন-হাসিনা বিশেষ সম্পর্কের রহস্য হয়ে ঝাপসা বয়ান হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে।  শাহরিয়ারের এই বক্তৃতা সেই (ঝাপসা বয়ান ছড়ানোর) ততপরতারই একটা অংশ! তবে মোদি এই অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে এর কারণেই, বাংলাদেশকে ব্রিকসে উঠতে দেয় নাই – মনে করা সম্ভবত ভুল হবে না!। যদিও মুখে মুখে বা প্রকাশ্যে হাসিনা-মোদির মধ্যে এখনও অনেক ভাব – সেটাও জারি আছে। হাসিনা জি২০ এর সভায় যাচ্ছেন। অতএব সারকথায় ভারতের চোখে চীন খারাপ – একথাটাই এখানে শাহরিয়ার বলছেন। অথচ শাহরিয়ারের এই ততপরতাই বলে দিচ্ছে ঝাপসা বয়ান ভাষ্যটা ভারতের। যেটা শাহরিয়ার ফেরি করতে এনেছেন।

    ৩। শাহরিয়ার আরো বলছেন, চীনের ঋণের ফাঁদে পড়েছে শ্রীলঙ্কা, এর আগে একইভাবে পাকিস্তানও ঋণের ফাঁদে পড়েছিল। অথবা আরও সার করে অন্য জায়গায় বলেছেন, “চীন ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য এই অঞ্চলে ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। তাদের কাছ থেকে ঋণ সহায়তা নেওয়ার আগে ভাবতে হবে”।
    শাহরিয়ারের প্রথম মন্তব্য ঋণের ফাঁদে প্রসঙ্গ বাংলাদেশের বেলায় সত্যি নয়। পরিসংখ্যান বলে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ প্রশ্নে চীনের ঋণ তৃতীয় বড় ঋণ। তা এনিয়ে আর কথা বাড়াবো না। তবে পরের কথা যেটা বলেছেন এটাই সঠিক আর এটাই মুখ্য সুত্র যে “ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য এই অঞ্চলে ঋণ সহায়তা” । তবে আমি কেবল ‘ভূরাজনৈতিক’ এই আধো-বোলের আন্দাজি শব্দটা ফেলে দিব। বদলে “গ্লোবাল ইকনমি” বলব।  আর পরের আধিপত্য শব্দটা ফেলতে বলব না তবে অর্থ আরো খুলবার জন্য সাথে প্রভাব বিস্তার শব্দটা লাগিয়ে নিতে বলব। আর কথাটাকে এবার সাজিয়ে বলব – গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য ঋণ দেয়া ঠিক তা নয় বরং, এটা সারা দুনিয়াকে ব্যাপক অবকাঠামো ঋণ দিবার মুরোদ – এটা এসে গেলে একটা দেশ এটা দিয়েই এরপর গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়ে উঠে – এভাবে বলব।
    যেমন ধরেন ভারত একই চীনের পথে হাটে না কেন? কারণ ভারতের অর্থনীতির সেই মুরোদ নাই, এখনও হয় নাই। আবার তাহলে এর আগে আমেরিকা কী করেছিল? হা ঠিক আজ চীন যা করে নেতা হতে চাইছে ১৯৪৫ সালের পরে আমেরিকা ঠিক সেকাজ করেই গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার বা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল। এমনকি মোদির ক্ষমতার প্রথম পাঁচ বছরে ভারতেও চীনা ঋণ কত অথবা এমনকি মোদি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালিন গুজরাতে চীনা ঋণ কত ছিল – সেসব তথ্য মোদি লুকিয়ে রেখেছে কেন? পারলে তা বের করেন!!!!
    ভারত চীনা প্রভাবের বিরোধী হতেই পারে। কিন্তু তা বলে শাহরিয়ার চীনা ঋণ খারাপ বা অনৈতিক ধরণের বাজে কথা – এসব তার না করাই ভাল!
    মনে রাখবেন হাসিনা যে সর্বক্ষণ উন্নয়নের গল্প শুনাচ্ছে এই ‘উন্নয়ন’ আর (চীনের দেয়া) অবকাঠামো ‘ঋণ’ – এদুটা একই কথা – দুদিক থেকে দেখে বলা। হাসিনা চীনা-ঋণ না পেলে বা নিলে কী করত???  ভারতের ঋণ নিত? ভারতের সে মুরোদ আছে????? একারণে, শাহরিয়ারের এসব কথা ফালতু কথা!!! আজাইরা ভারতকে চীনের উপরে – যেন বিশাল মুরোদের এমন গল্প ছড়াতে এসেছেন। অথচ এসব অর্থহীন!!!

    ৪। শাহরিয়ার আরো বলেছেন, “মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের ব্যবহৃত সব বুলেট চীনের: শাহরিয়ার কবির”। শাহরিয়ারের  এসব শুরশুরি উস্কানে আবেগ আওয়ামি লীগারেরাও খাবে না; প্রগতিবাদীরাও না। শাহরিয়ারের এটা হয়েছে আসলে পোপের চেয়েও বেশি খ্রীশ্চান হতে চাওয়া যেন! অনেক দেশেরই স্বাধীনতা যুদ্ধের শত্রু-মিত্র অনেক রকম ছিল, থাকে। ছিল বলছে মানে হল সেটা ধরে আজীবন বসে থাকা অবাস্তব চিন্তা। যেমন ধরেন ভিয়েতনামের (স্বাধীনতার যুদ্ধে) চেয়ে বড় আমেরিকান নিষ্পেষণ খুব কম দেশের ইতিহাসে আছে। এজেন্ট অরেঞ্জ (Agent Orange) শব্দটা গুগলে যেকেউ সার্চ দেন দেখেন কী বের হয়, কী এটা! এই কেমিক্যাল উড়োজাহাজ থেকে ছিটিয়ে ভিয়েতনামের গভীর বনজঙ্গল সব সাফ করা হয়েছিল যাতে বিদ্রোহিরা বনে লুকাতে না পারে; কারণ এই কেমিক্যাল toxic, plant-killing chemical (herbicide)।
    কিন্তু মানুষের জীবনের উপর এর প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ, যেদিকটা সকলেই উপেক্ষা ক্করেছিল। ভিয়েতনামিজদেরকে আমেরিকা মানুষ মনে করে নাই! এতই তীব্র ছিল তাদের নিজ স্বার্থবোধ। কারণ এটা মানুষের জীবনে cancer, congenital (birth) disorders and life-threatening health complications. নিয়ে আসে। আজও ভিয়েতনামের কোন দম্পতি জানে না যে তাদের বাচ্চা জন্ম নিতে গেলে কেমন বিকলাঙ্গ হবে – হাত স্বাভাবিক কিন্তু হঠাত করে কবজি থেকে  বা কনুই এর পর থেকে তা আর নাই, একইভাবে পা নাই – সারকথায় ডিফেক্টিভ বাচ্চা জন্ম নিচ্ছে এখনও যার কোন প্রতিকার নাই।  কিন্তু এই ভিয়েতনামেরই আজ সবচেয়ে বাণিজ্য সম্পর্ক ভাল আমেরিকার সাথে; অন্যতম রপ্তানি গন্তব্য!  এখন এর মানে কী ভিয়েৎনামিজরা খুব খারাপ!
    শাহরিয়ার  আপনি ভারতের স্বার্থে দালালির ঠিকাদারিতে বাংলাদেশের মানুষকে আবেগ-ইমোশনাল করে শুড়শুড়ি তুলার চেষ্টা করছেন? এখন বলেন কোনটা খারাপ? ভারতের কাছে আবার বেচবেন?  বাংলাদেশের  মানুষের আবেগ চটকাচ্ছেন কেন???

    ৫। শাহরিয়ারদের এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ফ্লপই হবে। ভারতের অর্থের অপচয়ই হবে। কারণ শাহরিয়ারদের টার্গেট শ্রোতার ঠিক নাই।
    এটা বলাই বাহুল্য যে যারা বাংলাদেশে এখন হাসিনাবিরোধী তারা শাহরিয়ারদের টার্গেট শ্রোতা গ্রুপ নয়। আর এমনিতেও বাংলাদেশের আম-মানুষ তারা খোদ শাহরিয়ার এন্ড গং এমন যেকারো বিরোধী সেই শাহবাগের দিন গুলো থেকেই। তাহলে শাহরিয়ারের টার্গেট শ্রোতা গ্রুপ কারা? যারা হাসিনার পক্ষের হাসিনার দলীয় লোক এরা? অথবা যারা ঠিক দলের নয় তবে লীগের সুবিধাভোগী? এরা?

    এরা শাহরিয়ারের কোন কথাতেই কান দিবে না তাতে তা যতই খোদ ভারতের স্বার্থকে প্রগতিবাদী জামা পড়িয়ে হাজির করলেও। এর মূল কারণ, এরা কেউই  ভারত ছেড়ে চীনের কোলে (হাসিনার) উঠাকে খারাপ ভাববে কেন? কোন কারণ নাই। এটা সারভাইবাল বা মরিয়া আত্মরক্ষার পর্যায়! এছাড়া এটা খারাপ ভাবার মধ্যে তো তাদের কোন স্বার্থই নাই!!! বরং হাসিনা টিকে গেলেই তাদের স্বার্থ!
    এছাড়া হাসিনার নেক নজরে যে আছে, পড়েছে একবার – সেই আবার এখন হাসিনাবিরোধীতা দেখাবে????? কেন? বরং হাসিনা এযাত্রায় টিকে গেলে তারা খুশি হবে। আর সেটা চীনের হাত ধরে কিনা তাতে তাদের কী এসে যায়? – সেটা কী তাদের জন্য কোন আপত্তি হবার কিছু????
    সারকথায় শাহরিয়ার গংদের পক্ষে এখন দাঁড়াবার কেউ নাই।তাদের বয়ান শুনবার মত কোন সামাজিক গ্রুপই এখন আমাদের সমাজে নাই।  এটা তো ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাইয়ের যুগ  একেবারেই নয়! যে প্রগতি-ওয়ালারা ঝাপিয়ে পড়বে!   আসলে শাহরিয়ার গংয়েরা সবাই   তারা এমন এক ভারতীয় ইচ্ছা-স্বার্থ ফেরি করার ঠিকা নিয়ে আসছেন যেটা এখন বাংলাদেশের কেউ খাবে না। আর বেশি বারাবাড়ি করলে হাসিনার উপর দিয়ে কথা বললে এরা নিজেরাই কেউ তাদেরকে ‘উপড়ে ফেলে দিবে’ – এমন রিস্ক নিচ্ছেন তারা।

    আর এটাই এক শাহরিয়ার কবীর আর ঐ বই লেখক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী (মানিক) ছাড়া ওখানে আর যারা বক্তব্য রেখেছেন তারা কেউই  – হাসিনা চীনা-ঘনিষ্ট হয়েছেন বা আরো হতে পারেন – এনিয়ে কোন অভিযোগ করে বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। বরং সকলেই ভারসাম্য রেখে কথা বলেছেন। সারকথায় হাসিনাকে চটাতে চাচ্ছেন না -চটে যাক এমন কথা কেউ বলছেন না – যার সোজা মানে তারা সবার আগে হাসিনাকেই ছুয়ে থাকতে চান, আনুগত্য ঠিক রাখতে চান – এটা পরিস্কার রেখেছেন!!!

    ওখানে আর যারা বক্তৃতা দিয়েছেন তারা হলেন, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার ইত্যাদি কেউই ভারসাম্য না রেখে কথা বলেন নাই।  যেমন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মাদ আলী শিকদার। তিনি বলেন, চীন নিজের শক্তিতে উত্থান করেছে। চীনকে আমরা উপেক্ষা করতে পারবো না, তাই তাদের জানতে হবে। চীন যে প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছে- এতে সংঘাত অনিবার্য। এই অঞ্চলের দেশগুলোকে এই সংঘাত এড়াতে সচেষ্ট হতে হবে।

    এখন সবশেষে একটা কথা মনে করিয়ে দিব। কথিত হাসিনা-চীন আশ্বাস সেটা যদি সত্যিও ধরে নেই, তবুও এই সহায়তা পাওয়া তো শর্তযুক্ত। সে শর্ত বা বাস্তবতা বা যদির কথাটা হল,  যে হাসিনা সরকার চীনের সহায়তা পাবার পুর্বশর্ত  পুরণে নিজেকে কোনমতে করা একটা নির্বাচন দেখিয়ে নিজেকে বিজয়ী করতে পারতে হবে আগে। তবেই না এসব জল্পনা-কল্পনা!  কাজেই মোদির ভারত বা শাহরিয়ারের দালালির ঠিকাদারিতে  কি বললে এটা নিয়ে আমাদেরও এতে মনোযোগী হবার মত কিছুই নাই।  তবে এই লেখায় যা করা হল, তা হল, শাহরিয়ার গং যে মোদির ঝাপসা বয়ান টার উপর দাঁড়িয়ে প্রপাগান্ডা করতে এসেছেন সেটাই খুলে দেখিয়ে দেয়া!! এতটুকুই!

    একটা কথা লিখতে চেয়েছিলাম বাদ পড়ে গেছে। আগামি এক বছরের মধ্যে এটা একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে ভারত বাংলাদেশের রাজনীতি-তে কেউ না, কোন ফ্যাক্টর না। এটা ২০০৭ সালের আগে বাংলাদেশের কাছে যেমন ভারত ছিল, এটা সেই ভারত হয়ে যাবে। এর মূল কারণ, এখনো আমেরিকা ঘোষণা না দিয়ে যেটা করে যাচ্ছে তা হল – চীন ঠেকানোর ঠিকাদারিতে ভেট-উপহার হিশাবে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। বাইডেনের আমেরিকা সেই অবস্থানের ফাইনাল বদল বা সমাপ্তি টেনে দিলেও সেটা তিনি এখনও পাবলিক ঘোষণা দিয়ে করেন নাই।  অন্য আরেকটা ফ্যাক্টস হল, হাসিনা এখনও ক্ষমতায়। একারণে, মোদি  মিথ্যা ভাব ধরার সুযোগ নিতে পারছেন যেন ভারত এখনও আমেরিকার দেয়া খবরদারিটাই ব্যবহার করছে; সেটা তার যেন অটুট আছে। অথবা মোদির ভারত যা বাংলাদেশে করে মাতবরি দেখায় তা আমেরিকা অনুমোদিত অথবা মোদির ভারত চাইলেই সে আমেরিকার কাছে হাসিনার পক্ষ হয়ে সুপারিশ করতে পারে ইত্যাদি। অথচ  এসবই ভুয়া ভিত্তিহীন। আমেরিকা যা কিছু বাংলাদেশ প্রসঙ্গে  ২০০৭ সালে ভারতকে দিয়েছিল  সেসবই প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। কিন্তু হাসিনা এখনও ক্ষমতায় আছে বলে মোদি এই মিথ্যা ভাব ও অভিনয়টা এখনও করে যেতে পারছে। একারণেই অগ্নি রায়েরা মিথ্যা কথা বলে করে খেয়ে যেতে পারছে।

    আগামি এক বছরের মধ্যে এই জিনিষটাই এই মিথ্যা ভাব ধরা – এটাই উন্মুক্ত হয়ে যাবে যে বাংলাদেশের উপরে ভারত কেউ না। আর আমেরিকাও এমন কোন কর্তৃত্ব বাংলাদেশের উপর খাটাতে ভারতকে দেয় নাই; ফিরিয়ে নিয়েছে। এসবই স্পষ্ট উদাম হয়ে যাবে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে ভারতে নির্বাচন অনুষ্ঠান শেষ ফলাফলও প্রকাশ হয়ে যায় – এর পর থেকে।  ভারত কেউ না হয়ে যাবে। বাংলাদেশের উপর প্রভাব থাকবে কেবল আমেরিকা ও চীনের। একা ভারত, সে না আমেরিকা না চীনের ঘনিষ্ট থাকবে বা হবে। তবে ভারতের উপর আমেরিকান চাপ বাড়ার সম্ভাবনা (একেবারে বাংলাদেশের মত না হলেও ভারতের উপর আমেরিকার সাব-অর্ডিনেট হওয়ার চাপ বাড়বে) আর সে পরিস্থিতিতে ভারত হয়ত চীনের কোলে উঠতে চাইতে পারে।   ঘটনা যে দিকে গিয়েই থিতু হোক না কেন ভারত বাংলাদেশ কেউ না হয়ে যাবে ক্রমশ!! এই সম্ভাবনা এখন আমরা ক্রমশ উন্মুক্ত হতে দেখছি!

     

     

    আপডেটেডঃ   ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩;  রাত ০২ঃ ১৯ 

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • গ্লোবাল অর্ডার কী

    গ্লোবাল অর্ডার কী
    গৌতম দাস
    ৩০ আগষ্ট ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4SG

     

                      Locking China Out of the Global Order Could Backfire

    এবারের ব্রিকস এটা ১৫তম সম্মেলন; মানে হল এটা ২০০৯ সালে প্রথম তার জন্ম সম্মেলন করে যাত্রা শুরু করেছিল। গত ২৪ আগষ্ট এর ১৫তম সম্মেলন দক্ষিণ আফ্রিকায় শেষ হল। কিন্তু এই প্রথম এই সম্মেলন দুনিয়াটাকে ঝাঁকি দিয়েছে – এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি। আর ততধিক বেশি করে পশ্চিমা দুনিয়া (ইউরোপ-আমেরিকা) প্রকাশ্যে নিশ্চুপ কিন্তু তাদের সবগুলো ইন্দ্রিয়ই খাঁড়া; কি জানি হচ্ছে সেদিকে কান খাড়া। এর আগে কোন বিষয় নিয়েই এত করে সবার এন্টেনা খাঁড়া করতে তাদের দেখা যায় নাই। অন্যদিকে আবার, এমনকি আমাদের মত দেশ থেকে যারা গত ২০-২২ বছরের সময়কালে আমেরিকাসহ পশ্চিনা দেশে গিয়ে থাকবার রেসিডেন্স পারমিট যোগাড় করে নিয়েছে এরাও (মানে ব্ল্যাক-ব্রাউনেরা) সাদাদের সাথে মিলে এই প্রথম তাদের সব ইন্দ্রিয় খাড়া করেছে। অথচ এরা দুচার বছর আগেও যেমন ধরেন ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে প্রবল তর্ক করেছে যেন তারা পুর্ণমাত্রায় পশ্চিমা অরিজিনের নাগরিক হয়ে গেছে ফলে তাদের  স্বার্থও পশ্চিমারাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে এলাইনড, এক লাইনে। তাই তাদের স্বপ্ন-কামনার আমেরিকা বা পশ্চিম কত মহান, কত স্টেবল কত সম্ভাবনাময় আর তা তাদের স্বপ্ন-কল্পনা পূরণের জন্য পারফেক্ট!  ফলে চীন-রাশিয়া বা জাতিসংঘের ভাষার গ্লোবাল সাউথ [global south] – এরা তাদের স্বপ্নকল্পনা পুরণের পথে বাধা হয়ে জামা টেনে ধরছে যেন – এই মনোভাব দেখছিলাম আমরা। এরাও কানখাড়া! এমন পরিস্থিতিতে এই পটভুমিটা মাথায় রেখে এবার যদি ব্রিকস এর ১৫তম সম্মেলনের দিকে তাকাই তাহলে বলতে হয়, এবারের সম্মেলন সারা দুনিয়াকে এমন এক মজার জায়গায় নিয়ে ফেলে দিয়েছে; আর যেন বলছে এখন নতুন করে হাটা শিক্ষা কর!! আগের জানাশুনায় আর চলবে না, কাজ হবে না। তাই নতুন করে আগে হাঁটতে শিখে নে তাড়াতাড়ি!  বলতে চাচ্ছি, গত প্রায় আশি বছরের  আমেরিকান নেতৃত্বের যে পরিচিত দুনিয়া – সেটায় ফাটল ধরেছে। আগের মত থাকছে না। তাই অনেক নয়া জানাশুনা, পড়াশুনা  লাগবে!   এটাই হল, এবারের ব্রিকস [BRICS] সম্মেলনের নিরবে দুনিয়ার সবার বিশেষত আমাদের মত দেশগুলোসহ সবার কাছে ম্যাসেজ!

    ব্রিকস জন্ম নিয়েছিল সেই ২০০৯ সালে, কিন্তু কেন কী পরিস্থিতিতে কি দরকারে এর জন্ম তা বাংলাদেশের একাদেমিক বা মিডিয়া জগত এখনও বেখবর আছে। এর মূল কারণ, ব্রিকস জিনিষটা কী অথবা কেন সেটাই এখনও পুরাপুরিই স্পষ্ট হয় নাই আমাদের দেশের ‘জানার’ জগতে।  বিশেষ করে এই সম্মেলন নিয়ে বাংলাদেশের বাংলা মিডিয়াগুলোর রিপোর্ট দেখলে তা বুঝা যায়। তবে ইংরাজি মিডিয়া গুলো একটু ব্যতিক্রম। কারণ ইংরাজি রিপোর্ট এর সুবিধা হল কপি-পেস্ট বা অনুবাদ করে তারা কোনভাবে চালিয়ে দিতে পারেন। যদিও তাতেও তাদের দুর্বলতাও অপ্রকাশ্য নয়)। কারণ, সবচেয়ে মুখ্য প্রশ্ন, কেউ জানেই না বলতে পারছে না বাংলাদেশ কেন ব্রিকস থেকে বাদ??? গত ২৪ আগষ্ট (ব্রিকস সম্মেলনের শেষ দিন) পর্যন্ত সব রিপোর্টের এই এক দশায়। এমনকি ২৪ আগষ্ট রাত বারোটা মানে ২৫ আগষ্ট তারিখের শুরুতে যাদের হুশ হয়েছে জেনেছে তারাও ঘটনা বুঝে উঠে এরপর সেই ভিত্তিতে রিপোর্টে হাজির করতে গিয়ে কেউই ২৫ আগষ্ট সন্ধ্যার আগে পারে নাই। বিশেষ করে সে খবরটা কোথায় আছে, আবার তা পেলেও কী এঙ্গেলে তা দেখতে হবে এটাই তাদেরকে বেশি ভুগিয়েছে। কারণ রয়টার্স কী-কোথায় এটা তাদের অজানা নয় – হলেও সুনির্দিষ্ট হওয়া সহজ ছিল না।  তাতে  এরপরেও দেখা যায় কোন কোন মিডিয়া হাল ছেড়ে দিয়েছে। তাই তারা ২৫ তারিখে আর ব্রিকস নিয়ে হাজিরই হয় নাই। এরা যে হাল ছেড়ে দিয়েছে তা বুঝা যায় তারা এবার ব্রিকস নিয়ে মহা মাতবর তাদের কূটনীতিক সেকশন কে ক্ষমা দিয়ে দিয়েছে। আর  ২৫ তারিখ থেকে তাদের অর্থনীতি সেকশন থেকে ব্রিকস ইস্যুতে কিছু খবর ছেপেছে। এজন্যই বাংলাদেশে সবার রিপোর্টই তাই কমবেশি হালকার উপর ঝাপসায় মারা ধরণের বক্তব্য জুড়ে দেয়া।

    আমরা নতুন কোন কিছু দেখলে বা একে চিনতে চেষ্টা করলে বা কাউকে চিনাতে গিয়ে, – ঐ নতুনের সাথে কিছু তুলনীয় এমন কিছুর সাথে তুলনা করেই  নয়া ধারণাটা পরিচিত করাতে যাই। তাতে  যতটা সমতুল্য যতটা কাছের সদৃশ্য এমন কিছু পাওয়া যায় যা আবার ইতোমধ্যেই সমাজে অনেক পরিচিত থাকে; তবেই নতুন কাউকে এর পরিচয় দেয়া সহজ হয়। মুলকথা একমাত্র কাছাকাছিও  জানা কিছুর সাথে তুলনা করেই নয়া বিষয়কে মানুষ পরিচিত করাি আমরা।
    কিন্তু ব্রিকস এর বেলায় একে চিনাবো কী করে?  আর এর কাছাকাছি ঘটনা ফেনোমেনাই বা কী – তাই তো আমাদের অনেকের জানা নাই! মূলস্মস্যাটা ছিল আসলে এখানে!

    ব্রিকস এর বেলায় একে চিনাবো কী করেঃ
    আমি আগে বহুবার বলেছি ব্রিকস যা হতে যায় করতে চায় সেই উদ্দেশ্য হল – আমেরিকার নেতৃত্বে যে গ্লোবাল অর্ডারটা কায়েম আছে এখনও (যেটাকে বেশির ভাগই  আমরা ভুল করে একে আমেরিকান “পরাশক্তি” বলে বুঝি বা ডাকি) এই গ্লোবাল অর্ডারের মধ্যে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান থাকে বা আছে।
    ঠিক যেমন একটা দেশ-রাষ্ট্রে  ‘স্টেট ইন্সটিটিউশন’ [রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান] থাকে এটা তেমনই। আসলে  (গ্লোবাল অর্ডারের জায়গায়) “লোকাল অর্ডার” বললে সেটাই দেশ বা রাষ্ট্র ধারণা হয়ে যায়।  কারণ, রাষ্ট্র মানে সেটা নিজের বা স্থানীয় এই অর্থে রাষ্ট্রকে গ্লোবাল অর্ডারের সাথে তুলনায় লোকাল অর্ডার বলেছি। আর অর্ডার মানে মূলত নিয়ম-শৃঙ্খলায়  সাজানো বা বিন্যাস্ত করা।  তাই লোকাল অর্ডার বলতে বুঝা যেতে পারে নিজস্ব রাষ্ট্রের নিয়ম-শৃঙ্খলা  মানে, বুঝতে হবে তা একটা দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা বা রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে।  তবে লোকাল বলাটা অবশ্যই গ্লোবাল এই ধারণার সাপেক্ষে, এটাও মনে রাখতে হবে। কারণ লোকাল শব্দটা নানান অর্থের ব্যবহার হতে পারে। আর অর্ডার [order], এই অর্ডার বলতে অনেক সময় নির্দেশ বা হুকুম দেয়া অর্থ হলেও এখানে অর্ডার কথাটার মানে নিয়ম-আইন-শৃঙ্খলাময় একটা  সিস্টেম [system] যা বাংলায় ব্যবস্থা। যে অর্থে পুলিশ-কে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বলা হয়।
    ঠিক সেরকম ১৯৪৫ সাল থেকে দুনিয়া আমেরিকার নেতৃত্বে এক গ্লোবাল অর্ডার (সেবারই প্রথম) চালু হয়েছিল যেন, তা এক ‘গ্লোবাল রাষ্ট্র ব্যবস্থা’। আর এটাকেই “গ্লোবাল অর্ডার” বলছি। তবে শুধু আমি না, বুঝমান একাদেমিকেদের দেয়া ভাষা এটা; ফলে তাদের থেকে নেয়া এই শব্দ ও এর ব্যবহার। আবার রাষ্ট্রে যেমন অনেক ‘স্টেট ইন্সটিটিউশন’ [রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান] থাকে  যেমন সংসদ, নির্বাহি বিভাগ (মানে প্রধানমন্ত্রীর অফিস; আর যার অন্তর্গত থাকে এডমিনিস্ট্রেশন, অর্থ বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা ইত্যাদি মন্ত্রণালয়-বিভাগ ) আর বিচার বিভাগ ইত্যাদিতে একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় তেমন, গ্লোবাল অর্ডার এর বেলায় সেটাও কিছু “গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের” উপর দাঁড়িয়ে থাকে। এমন গ্লোবাল রাজনৌতিক প্রতিষ্ঠানটা হল জাতিসংঘ আর গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক । মূলত এইদুটো দিয়েই ১৯৪৫ সালে গ্লোবাল অর্ডার খাঁড়া করা; তা  যাত্রা শুরু হয়েছিল । তবে এগুলোকে “গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের” এর জায়গায় যেমন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর বেলায় এগুলো মাল্টিলেটারাল বডিও [multilateral body] বলা হয়। কারণ,  এখানে  মাল্টিলেটারাল বলতে তা ‘বহুরাষ্ট্রীয়’ ফলে তা  ‘বহুপক্ষীয়’ এমন বুঝানো হয়। তবে মাল্টিলেটারাল বলতে আক্ষরিক বাংলা অর্থ হল,  বহু-বাহুবিশিষ্ট। পরবর্তিতে জাতিসংঘ বা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ছাড়াও ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন (WTO) অথবা একালে পরিবেশ প্রসঙ্গে [ UNEP], হিউম্যান রাইট [UNHRC] ইত্যাদি নানান মুখ্য গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়ে নেয়া হয়েছে। আর এমন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো মিলিয়েই সমন্বয় করেই একটা “গ্লোবাল অর্ডার”  বা বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হয়ে আছে।  তবে সাবধান আমি গ্লোবাল অর্ডার [Global order] বলেছি কোন জিও [Geo-Order] বলি নাই। এমনকি জিও-পলিটিক্স [Geo-politics] -ও বলি নাই। একালে মানুষ যখন একটা কিছুকে বুঝতে পারে না বা ব্যাখ্যা করতে পারে না তখন এটাকে বলে জিও-পলিটিক্স  বা ভূরাজনীতি। তাই কেউ যখন বলবে, “সবই ভুরাজনীতির খেলা” এর মানে হল, বক্তা বুঝতে পারছেন না এটা কিভাবে ব্যাখ্যা করে বলবেন!! এটাই বুঝতে হবে!! যার মানে হল –  যা “আমি যা জানি না, বুঝি না” সেটাই ভুরাজনীতি।

    কিন্তু আমরা ‘গ্লোবাল অর্ডার’ ধারণাটা – সেটা বহুল প্রচলিতভাবে জানি নাই কেন?
    মূল কারণ কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা; যার আদিগুরু সেকালের (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯৪৫) সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট, প্রধান কমিউনিস্ট নেতা জোসেফ স্তালিন। যিনি পরে মারা যান ১৯৫৩ সালে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রধান গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠেছিল আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। ঐ যুদ্ধে ১৯৪২ সাল থেকে হিটলারের অক্ষশক্তি [Axis powers] বিরোধি মিত্রশক্তি [Allied powers] – এভাবে যুদ্ধের দু-পক্ষ; আর হিটলারবিরোধী মিত্রপক্ষের মূল নেতা ছিলেন রুজভেল্ট।  তিনিই মিত্রশক্তি নামে জোটবদ্ধতার প্রথম উদ্যোক্তা, মিত্রশক্তির সকলের হয়ে যুদ্ধের মূল মোটা খরচগুলোর একা বহনকারি দেশ, সারা পশ্চিম ইউরোপ মানে যারা সেকালের সারা দুনিয়ার কলোনি দখলদার শক্তি কিন্তু সকলেই এরা যুদ্ধের ব্যয় যোগাতে গিয়ে অর্থ সঙ্কটে দেঊলিয়া অবস্থায় – এঅবস্থায় এদের সকলকেই নিজ অধীনে আনার বা  ঐ যুদ্ধে বিজয়ী হলে শেষে তারা সকলেই কলোনি দখল ত্যাগ করতবে এই শর্তে বাধ্য করে রুজভেল্ট এদের সবার সাথে চুক্তি করেছিল। এভাবে  বাগে আনা ইত্যাদির মূল কারিগর হলে আমেরিকার নেতা রুজভেল্ট। তাই এই যুদ্ধে রুজভেল্টের প্রধান নেতা হিশাবে উত্থান এভাবেই, এসব কারণেই।
    পশ্চিম ইউরোপ মানে যারা কলোনিদখলদার ব্যবসায়ী এদের দেশ সেটা আর এরা, যুদ্ধের ব্যয় যোগাতে বাধ্য হয়ে রুজভেল্টকে নেতা মেনে নিয়েছিল তা বুঝা গেলেও সোভিয়েত ইউনিয়নও কেন এর ভিতরে একইভাবে ঢুকে গেছিল?  কারণ, হিটলারের হাত থেকে বাঁচতে চাওয়া স্তালিন যিনি দেখতেছেন হিটলারবিরোধী একটা জোট হচ্ছে আর আবার সেই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট যুদ্ধের মুখ্য খরচগুলো বইবেন – কাজেই  হিটলারের হাত থেকে বাঁচতে এত ভাল সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেন নাই। তিনিও তাই রুজভেল্টের নেতৃত্বের মিত্রশক্তিতে যোগ দিতে দেরি করেন নাই। আসলে, মূল পলিটিক্যাল চুক্তি মানে যুদ্ধ শেষে আমরা একটা জাতিসংঘ গড়ব – এই চুক্তিতেই ভিত্তিমূলক সবকথা লেখা ছিল যা ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যা এখন ইতিহাসে “জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা”
    এমনকি যুদ্ধ শেষে দেশগুলোর পুনর্গঠনের অর্থও ঋণ হিশাবে দিয়েছিল আমেরিকা। বিশ্বব্যাংকের জন্মের পরে এই প্রতিষ্ঠানে মুখ্য ততপরতা ছিল ইউরোপের পুনঃর্গঠন। আর বিশ্বব্যাংক[WB] যার পুরা নাম হল ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রিকনষ্ট্রাকশন এন্ড ডেভলবমেন্ট [International Bank for Reconstruction and Development (IBRD)] –  এই নামের মধ্যে রিকনষ্ট্রাকশন [বা বাংলায়] পুনর্গঠন এই শব্দটাই বিশ্বব্যাংকের জন্ম ও শুরুর কর্মের ইতিহাস এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে। কারণ, বিশ্বব্যাংক যেখন আমাদের মত দেশে দেশে অবকাঠামো গড়তে নামমাত্র সুদে ঋণ দেয় – সেই কাজটা তো পুনর্গঠন নয়। মানে অবকাঠামো (কোন ব্রিজ বা রাস্তা অথবা কারখানা) আগে  ছিল যুদ্ধে বা কোন কারণে ভেঙ্গে গেছে এমন নয়, বরং এই প্রথম বারের মত গঠন। তা সত্বেও বিশ্বব্যাংক-কে তার জন্মের দাগ পুনর্গঠন বা রিকনষ্টাকশন শব্দটা নামের মধ্যে বয়ে বেড়াচ্ছে।
    স্তালিন কত রুজভেল্টের ঘনিষ্ট ছিলেন, ১৯৪২-৪৫ এই তিন বছর তা বুঝার একটা ভাল উপায় হল, এই তিন বছরে যত দেশ রুজভেল্ট ভ্রমন করেছেন সেখানে তার দুই বগলে সঙ্গে থাকতেন দুই নেতা স্তালিন আর চার্চিল (সেকালের বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী)। কিন্তু যুদ্ধ শেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন – এই যুদ্ধে রুজভেল্টের  এমন নির্ধারক অবদান যতটা কম পারা যায় এমনভাবে সোভিয়েত ইতিহাসে ছাটাই করে দেয়া হয়। যাতে মনে হয়, স্তালিনের একক কারিশমাতেই তিনি হিটলারের হাত থেকে সোভিয়েতকে বাঁচিয়েছেন। [আমাদের মত দেশগুলোর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা কেবল লিখিত সোভিয়েত-রুশ ইতিহাসই, সহি বলে পড়ে থাকেন। আমার বহু সিনিয়র (কমিউনিস্ট)-কে এমন ইতিহাসই বলতে শুনেছি।  এছাড়া তাদের আরেকটা রুল হল,   যা কিছু লাল বইয়ে তাই তাদের জন্য সহি (খাঁটি সত্য) ও শ্রেণীর ইতিহাস। আর লালবইয়ের বাইরের সব “বুর্জোয়া” বা “সাম্রাজ্যবাদের” ইতিহাস – মানে মিথ্যা এই বিবেচনা।]

    পরবর্তিতে বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইতিহাসের এভাবে সাফল্যের ব্যাখ্যাটাই জোরদার হয়ে দাড়ায় ও আরেক সাফাই দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। রুজভেল্ট মারা যান ১৯৪৫ সালের আগষ্টে। আর ১৯৫৩ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে নয়া প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার এর আমেরিকা সেটা এবার আর আগের মত “গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান” গড়া অথবা গ্লোবাল জনগণের জন্য কাজ ও ইমেজ গড়ার যে আমেরিকা সেটা  বদলে হয়ে যায় এক লুটেরা স্বার্থের আমেরিকা। যা শুরু হয়েছিল সিআইএ দল পাঠিয়ে ইরান দখল দিয়ে। তখন থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম আমেরিকাকে “সাম্রাজ্যবাদ” বলে খেতাব দেয় বা ডাকা শুরু করেছিল।  অথচ আজ দুনিয়ার খুব কম কমিউনিস্টই বলতে পারবে কবে থেকে কমিউনিস্ট চোখে আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদ হয়েছে? বরং প্রায় শতভাগই সম্ভবত বলবে জন্ম থেকে!!! ্ওযডী সেটা আবার কার জন্ম সোভিয়েত ইউনিয়ন নাকি আমেরিকা!!! সে আরেক ঝামেলা!!!   আর এই সুযোগেই সোভিয়েত ইতিহাস থেকে বিশ্বযুদ্ধের নির্ধারক আমেরিকা বা প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকেই মুছে ফেলার সুযোগ পোক্ত হয়ে নিয়েছিল!

    আবার একটু পিছনে যাই, ওদিকে (১৯৪২-৪৫ এই সময়কালে) মিত্রশক্তির নেতা রুজভেল্টের দেয়া সুবিধা স্তালিন নিতে গিয়ে  আমেরিকার প্রস্তাবিত গ্লোবাল অর্ডার গড়ার পরিকল্পনায় সামিল হতে স্তালিন বাধ্য হয়েছিলেন, তা বলা যায়। সেই সাথে ১৯৪৪ সালের দিকে রুজভেল্ট প্রথম তার জাতিসংঘ ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়ার ধারণা স্তালিনসহ সেকালের প্রধান মিত্রদের কাছে হাজির করেছিলেন। ভেটো সদস্যপদ রাখার ব্যবস্থা চালু করে স্তালিনের মূল সব আপত্তি সামলিয়েছিলেন রুজভেল্ট। এরপরে এবার স্তালিনকে ঘনিষ্টভাবে পেয়ে নিজ “গ্লোবাল অর্ডার” গড়ার স্বপ্ন-পরিকল্পনায় স্তালিনকে সামিল করে নিয়েছিলেন।  এতে স্তালিন একসাথে রুজভেল্টের সাথে মিলে  গ্লোবাল পলিটিক্যাল প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘ গড়তে রাজি তো হয়েছিলেনই।  জাতিসংঘ গড়ে গড়ে উঠতে পেরেছিল। এমনকি গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়তে ১৯৪৪ সালে এর যে জন্মসভা বসেছিল তাতে প্রতিনিধিও পাঠিয়েছিলেন। সেই প্রতিনিধি ২২দিন ব্যাপী লাগাতর চলা জন্মসভায় হাজির থাকলেও এরপর প্রত্যেক রাষ্ট্রের চাঁদা পরিশোধ করা সাপেক্ষে সদস্যপদ গ্রহণের প্রসঙ্গ আসা ও সময় থেকে সোভিয়েত প্রতিনিধি অনুপস্থিত হয়ে যায়। সেই থেকে গ্লোবাল অর্ডার তৈরির উদ্যোগের সাথে কার্যত স্তালিন থেকেও না-থাকা হয়ে যায় – জাতিসংঘ গড়তে হ্যা কিন্তু  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়তে না – এভাবে। কিন্তু এনিয়ে সোভিয়েত পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে  কোন আপত্তি অথবা উচ্চবাচ্য কিছু শুনে নাই।  কেন স্তালিন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক না গড়ে ফিরে এলেন – এনিয়ে কোন আর্টিকেল লেখা বা এটা আমেরিকানদের খারাপ কাজ এমন কোন বক্তব্য আনা এমন কোনকিছুই করা বা বলা হইয়েছে জানা যায় না। এমনকি ১৯৫৩ সালে প্রথম রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় এলে আইসেনহাওয়ার – তিনি আমেরিকার ভোল বা ইমেজ বদলানো ততপরতা শুরু করেছিলেন যেটা থেকে সোভিয়েত প্রতিক্রিয়া হল যে আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদ। কিন্তু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সম্পর্কে কোন ভাল-মন্দ মুল্যায়ন বা নাম নেয়া ইত্যাদি সোভিয়েত সরকারের দিক থেকে হয়েছে, নেতারা কখনও করেছেন এমন কিছু জানা যায় না।
    সব মিলিয়ে এসবে রুজভেল্ট-স্তালিন মিলে যে অভিমুখ একটা গ্লোবাল অর্ডার চালু করার যতটুকু একসাথে করার যাচ্ছিল বা পরিকল্পনা ছিল তা ১৯৫৩ সালের পরে শুকিয়ে মারা যায়, কোন চিহ্নই থাকে নাই। পরের সোভিয়েত নেতৃত্ব নিকিতা ক্রুশ্চেভ থেকে ব্রেজনেভ বা গর্বাচেভ পর্যন্ত কেউ কখনও নির্দিষ্ট করে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক নিয়ে কিছু বলেছেন জানা যায় না। তবে আমেরিকা ওটা “পুঁজিবাদী সমাজ বা ব্যবস্থা” ফলে যেন তা তাদের জন্য অগ্রহণযোগ্য ও পাপকাজ এমন অনুমান থেকে কথা বলা, খারাপ চোখে দেখানো এটা বজায় ছিল সব সময়েই। কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিশাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সমালোচনা জানা যায় না।

    কিন্তু কেন এমন ছিল?  আর এর চেয়ে বড় কথা যে সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রগুলোকে (মোট প্রায় ২৫-৩০ রাষ্ট্র) আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্য করে না  নেওয়াতে বা তারা না হওয়াতেই কী আমেরিকান নেতৃত্বে পশ্চিম  এরা কী একটা গ্লোবাল অর্ডার খাড়া করতে ব্যার্থ হয়েছিল বা থমকে দাড়িয়ে গেছিল? সোজা জবাব হল, একেবারেই না।  বরং গ্লোবাল অর্ডার  নিজের মত করে বিকশি হয়েছে আর এখন অনেক ডালপালা গজিয়ে আরো বিস্তৃত হয়েছে। তবে অবশ্যই এই বিকাশ আদর্শ নয়, দোষত্রুটি আর সীমাবদ্ধতা ও খামতিও প্রচুর। কিন্তু সাফল্যও ফেলনা নয়।
    কিন্তু মজার কথাটা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে (১৯৯১) গেলে তা থেকে আলাদা হওয়া ১৫ রাষ্ট্র আর এই সোভিয়েতের প্রভাবাধীন বা বাফার রাষ্ট্র হিশাবে যেমন পোল্যান্ড, রোমালিয়া ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ২৫-৩০ রাষ্ট্র ছিল যারা সকলে ঐ ১৯৯২ সালেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্যপদ নিয়ে নিয়েছিল। এখন ছোটখাট পাঁচটা দেশ বাদে দুনিয়ার সকলেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্য। মানে ১৯৩ রাষ্ট্রের জাতিসংঘের বিপ্রীতে আইএমএফ সদস্য ১৮৮, তাই।  এখনকার দুনিয়া গ্লোবাল অর্ডার বানানোর দিক থেকে অনেকটাই অগ্রসর হয়ে গেছে। তবে আগেই বলেছি অবশ্যই দোষত্রুটি প্রচুর। সেসব সংস্কার করে যেতেই হবে প্রত্যেক কালের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যতটা একে এলাও করে।

    কিন্তু আমাদের মত দেশের বেলায়, তারা ১৯৯১ সালের আগের সোভিয়েত অনুসারি কমিউনিস্ট হয়েই থেকে গেছেন। এরা নিজেদের জন্য আর আমাদের মত দেশের একাদেমিক জগতে তাদের প্রভাবের কারণে এরা না নিজেরা কিছু জেনেছে না কাউকে জানতে দিয়েছে যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ঠিক কী ধরণের প্রতিষ্ঠান। কারণ, তাদের আপত্তি এক জায়গাতেই যে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উতপাদন না হওয়া – মানে তাদের সমাজতন্ত্র না হওয়া মানেই এগুলো পাপের ফসল তাই অগ্রহণযোগ্য!!! এই হলো তাদের মূলকথা।
    এতে তাদের আপত্তিটা দাড়িয়েছে এমন যদি কোন আওয়ামীলীগ নেতাকে জিজ্ঞাসা করা হয়  যে বিএনপি কে নিয়ে তোমাদের আপত্তিটা ঠিক কী? আর তাতে যদি লীগ নেতা জবাব দেয় যে ওরা আওয়ামীলীগ নয় এবং  ওরা আওয়ামীলীগ করে না – তাহলে এটা যেমন জবাব হবে এটা তাই!!

    তো সে যাই হোক তাদের আপত্তি তাদের সাথে থাকুক সেটা কোনই সমস্যা নয়।
    কিন্তু তাদের প্রভাব আমাদের মত দেশের একাদেমিক জগতে গ্লোবাল সিস্টেম বা অর্ডারটা কী এসম্পর্কে বেখবর করে রেখে দিয়েছে। এদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে এক অর্ডারের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থা মানে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এটা তো বহাল হয়ে এর বয়স  প্রায় আশি বছর হয়ে গেছে। আর ওদিকে রাইজিং চীন যে অন্তত অর্থনৈতিক দিক থেকে নেতৃত্ব নিতে উঠে চলেছে (যদিও আরো সময় লাগবে)। ফলে নেতৃত্বের পালাবদলটাই আসন্ন হয়ে উঠেছে আর তাতে চীনা নেতৃত্বের  নতুন গ্লোবাল (যা আপাতত কেবল) অর্থনৈতিক অর্ডারটা কেমন হতে পারে – এটা নিয়ে লড়াই ঝগড়ায় তা কোথায় গিয়ে থিতু হবে – এরই সময়কাল চলছে। এখন। একথা শুনে মনে করার কারণ নাই যে এটা কেবল চীন-আমেরিকার লড়াই। তা একেবারেই নয়।
    বরং উভয় পক্ষই বাংলাদেশকে নিজের যেদিকে সুবিধা মনে হয় সেদিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইবে,চাচ্ছে। কিন্তু আমরা কোন্দিকে যাব বা এই তানাতানি কিভাবে সামলাবো এর প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে গ্লোবাল অর্ডার জিনিষটা কী তাই তো বুঝিনাই!! গ্লোবাল শুধু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরণের প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক যে গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার এটাও তো বুঝি নাই!! কমিউনিস্ট জ্ঞানিদের তো আরো ধারণা নাই। তাহলে? বাংলাদেশের একাদিমিক জগত বা সুনির্দিষ্ট করে আই আর বা অর্থনীতি কেউই তৈরি নয় – প্রয়োজনটাই বুঝে সারতে পারে নাই অবস্থা!!!!
    তাদের আল টপকা কথা হল, হাসিনা চাইলে ব্রিকসে যোগ দিতে পারে!!! যেন বিরাট এক জ্ঞানের কথা বলেছে!!

    আমরা নিজের জন্য কী করতে পারিঃ
    এদিকে গ্লোবাল পালাবদলে এতদিনের আমেরিকান নেতৃত্বের অবস্থানে চীন উঠে আসতে চলেছে। অথচ কমিউনিস্টেরা ১৯৪৫ সালে দুনিয়ায় কী গুরুত্বপুর্ণ বদলে এসেছে তা খেয়াল করে নাই। শুধু তাই না, দেশের একাদেমিক জগতকেও এটা খেয়াল করা বা বুঝার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নেতি ধারণাই দিয়েছে।  তাই  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কী ধরণের প্রতিষ্ঠান ও কেন, তা নিজেও জানে নাই, অন্যদেরও জানা হয় নাই। তাহলে এখন যখন প্রায় আশি বছর পরে আমেরিকান নেতৃত্বের বিকল্প হিশাবে চীনের নেতৃত্বের ব্রিকস খাড়া হতে চলেছে আর এরই প্রথম অর্থপুর্ণ কিছু পদক্ষেপ চীন নিয়ে ফেলেছে তখন এই ঘটনা-ফেনোমেনা নিয়ে আমাদের একাদেমিক বা কমিউনিস্টেরা কীভাবে আর কথা বলবে, যেটা সে আগে খেয়ালই করে নাই, প্রস্তুতি নেয় নাই?
    এজন্যই বলেছি আমেরিকান নেতৃত্বের যে পরিচিত দুনিয়া – সেখানটায় ফাটল ধরেছে। তা আগের মত থাকছে না। তাই অনেক নয়া জানাশুনা, পড়াশুনা  লাগবে!   এটাই হল, এবারের ব্রিকস [BRICS] সম্মেলনের নিরবে দুনিয়ার সবার বিশেষত আমাদের মত দেশগুলোসহ সবার কাছে ম্যাসেজ!
    ফলে কী কী ও কেমন ধরণের বদল আসন্ন তাতে সম্ভাব্য প্রভাবগুলো কী কী হতে পারে সেসব বুঝাবুঝির তরিকা জানতে হবে, পদ্ধতি জানতে হবে – দেখার নতুন অভ্যাস চর্চা লাগবে ইত্যাদি…। তবে সাবধান এটা ১৯৪৫ সালের মত রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নেতৃত্বে বদল যেমন ঘটেছিল এবার আগে থেকেই পরিস্কার যে এটা কেবল চীনের নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতিক এক অর্ডার আসতে পারে মাত্র।  ফলে ডলারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য কমে যাবে হয়ত কিন্তু নাই হবে না।  আবার গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতৃত্ব সহসাই আমেরিকার হাত থেকে যাচ্ছে না। আবার রাজনী আর  অর্থনৈতিক গ্লোবাল নেতৃত্ব যদি আলাদা হয় তবে কেমন ফিট করবে্‌, কার্যকরভাবে চলতে পারবে কিনা সেটা এক বিরাট প্রশ্ন যার জবাব অজানা!
    সবচেয়ে বড়কথা এই পালাবদল যদি আপোষে না হয়ে যুদ্ধ লেগে যায় বা এড়াতে না পারে মানে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ফয়সালার দিকে চলে যায় তাহলে কী হবে! আর এতে সব পক্ষের জন্যই তা মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনবে সন্দেহ নাই।  এর একটা চিহ্নের কথা বলা যায়। তা হল, আগামি বছর শুরুতে যদি ইউক্রেন যুদ্ধ না থামে তবে সেটা হবে খুবই খারাপ চিহ্ন। কেননা এর মানে হবে আমেরিকার আগামি নির্বাচন যেটা ২০২৪ সালের নভেম্বরে হওয়ার কথা সেটাও যুদ্ধের মধ্যেই হবে??
    আর সেসব নিয়ে বুঝাবুঝি আর তাতে গ্লোবাল স্বার্থের ঝগড়াগুলোর মাঝে নিজ-রাষ্ট্রের ভালমন্দ বুঝবার জন্য আমরা কতটুকু যোগ্য হয়ে উঠব? যতটুকু পুরান কমিউনিস্ট প্রভাবের মধ্যে আমরা যে যেমন থেকে যাব তারা তক্তি গভীর অবুঝ থেকে যাব। এর বিকল্প হল, একটা ফ্যাক্টসকে আদর্শগত পক্ষপাতিত্বের ভিত্তিতে গ্রহণ করা বা ব্যখ্যা করা বা ব্যাখ্যা দেয়া ত্যাগ করতে হবে।  সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে ঐ আদর্শগত বুঝাবুঝিতে খামতি আছে। সেই খামতি পূরণ করে বরং সামলানো – নিজের চিন্তাকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।   একথাটাই আরেকভাবে বললে, আমি কমিউনিস্ট তাই কমিউনিস্ট-চিন্তা-ফ্রেমে ফেলেই আমাকে যেকোন ঘটনা ব্যাখ্যা করতে হবে – এই জিদ ত্যাগ করতে হবে।

    আপডেটেডঃ    আগষ্ট  ২০২৩; 

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ব্রিকসে নয়া ছয় সদস্য, বাংলাদেশ বাদ; এর অর্থ তাতপর্য কী

    ব্রিকসে নয়া ছয় সদস্য, বাংলাদেশ বাদ; এর অর্থ তাতপর্য কী
    গৌতম দাস
    ২৭ আগষ্ট ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4SM

     

                  BRICS new six Members

    ব্রিকস সম্মেলনের শেষদিনের সিদ্ধান্ত হল, নয়া ছয় দেশকে [সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, ইথিওপিয়া ও আর্জেন্টিনা], তারা এই প্রথম তাদের জোটকে সম্প্রসারিত করে নয়া সদস্য করতে চাইলো। কিন্তু বাংলাদেশ? এত ঢাকঢোল পিটানো বাংলাদেশ যে এই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব হাজির রেখেছিল সেই-ই  বাদ হয়ে গেছে; সে এই ছয় রাষ্ট্রের মধ্যে জায়গা পায় নাই! কিন্তু ঠিক কেন? ব্যাপারটা বড়ই অদ্ভুত! আমার আগের লেখায় শিরোনাম ছিল “মোদির আনা শর্ত ও পরিণতিতে বাংলাদেশ ব্রিকসে নাই’। কিন্তু ঠিক কীভাবে তা কার্যকর হয়েছিল তা বুঝতে একটু গভীরে যেয়ে এবার কথা বলব।
    ইতোমধ্যে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করা সুবীর ভৌমিক, সেও গতকাল (২৫ আগষ্ট) আবার বাংলাদেশকে নিয়ে এক লেখা দিয়েছে; যার শিরোনাম India, US narrow differences over Bangladesh ahead of elections]। । কিন্তু সুবীরের এই অবস্থান চারদিন আগের আনন্দবাজারের অগ্নি রায় বা দেবদীপ এদের অবস্থান থেকে একেবারে উলটা দিকে। তা একেবারে ভুতের মুখে রামনামের মত!  সুবীর লিখেছে,  বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের ইস্যুতে “সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে” দেখা আমেরিকান অবস্থান যে এদেশে একটা অবাধ ও সুস্থ নির্বাচনই হতে হবে – এই বিষয়ে অনেক আলাপ আলোচনার পরে ভারত আমেরিকার অবস্থানের পক্ষে সায় দিয়েছে […India has agreed to the US stand of putting “absolute priority” on a free and fair parliamentary election due in January 2024.] সত্যিকরে বললে, এটা আবার অগ্নি রায় বা দেবদীপ পুরোহিত-দের প্রপাগান্ডার উলটা আরেক প্রপাগান্ডা নিঃসন্দেহে। কিন্তু অগ্নিদের মতই সুবীরও কোন প্রমাণ বা কোন সোর্স উল্লেখ করা ছাড়াই আরেক চাপাবাজি বক্তব্য। ফলে এ’বক্তব্যের কোনই মুল্য নাই। তবে এটা নিঃসন্দেহে সত্যিকথা যে ভারতীয় কারও – সে মোদি-ই হোক বা যেই কেউ  – এদের কারও আর বাংলাদেশে কোন বিশ্বাসযোগ্যতা অবশিষ্ট নাই।  আমরা এখন বড় জোড় তাদের কথা শুনব – আর পাশে আবর্জনার ড্রামে তা ফেলে রাখব; কারণ আমরা তাদের কাউকেই বিশ্বাস করি না।

    আমার আগের লেখায় বলেছিলাম রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে যে ভারতের আপত্তিতে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বাদ পড়েছে।  গত ২৩ আগষ্ট রয়টার্সের সেই রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ব্রিকসের সম্প্রসারণ শেষ মুহুর্ত এসে ব্রিকসের আভ্যন্তরীণ বিভক্তির মুখে আটকে গেছে; BRICS expansion faces eleventh hour hurdle as divisions persist। এটা হল,  ব্রিকসের ভিতরের খবর বের করে এনে তাদের লিখা। বলেছে ভারতের মোদি-ই  নিজেই শেষ মুহুর্তে নয়া দুই শর্ত  শেষে হাজির করেছে ।

    ঐ রিপোর্ট বলেছে ইলেভেন্থ আওয়ারে মানে শেষ মুহুর্তে ভারত নয়া সদস্য নেয়া হবে কী ভিত্তিতে মানে কী শর্তে এই বিষয়ে কিছু বক্তব্য পেশ করেছিল। শুধু তাই না একথাগুলো লেখা হয়েছিল “LAST-MINUTE SPOILER” এই নামের রয়টার্সের লেখার এক উপ-শিরোনামের নিচে। যার  অর্থ হল, শেষ মুহুর্তে যিনি সব ভন্ডুল [SPOILER] করে দেন। আর বলাই বাহুল্য সেই SPOILER হলেন ভারতে প্রধানমন্ত্রী মোদি।

    ঐ রিপোর্ট লিখেছিলঃ
    “but the source said it had been delayed after
    Indian Prime Minister Narendra Modi
    introduced new admission criteria.”

    কিন্তু কী ছিল সেই নয়া দুই শর্ত?
    “The BRICS country official said that admission criteria
    India’s Modi proposed included requiring members
    not be the target of international sanctions,
    ruling out potential candidates Iran and Venezuela.
    Modi was also pushing for a minimum per capital GDP requirement”

    কথাগুলো সোজা করে বাংলায় বললে, হবু ব্রিকস সদস্য হতে হলে – এরা কেউ আমেরিকান স্যাংশনের খাওয়া দেশ হতে পারবে না। তিনি অবশ্য আমেরিকা শব্দটা লুকিয়ে সে জায়গায় আন্তর্জাতিক লিখেছিলেন। আর দ্বিতীয় শর্তটা হল, ঐ হবু সদস্য দেশের অর্থনীতিতে  ওর নুন্যতম অর্জিত জিডিপি থাকতে হবে।

    এখন আমরা দেখব ব্রিকসের সদস্যপদ লাভে মোদির প্রথম শর্ত প্রসঙ্গেঃ
    মোদির একথার কোন মানেই হয় না যে হবু সদস্য দেশ আন্তর্জাতিক স্যাংশন খাওয়া দেশ হতে পারবে না। কারণ, স্যাংশন বা আন্তর্জাতিক স্যাংশন খাওয়া দেশ মানে কী? মানে আমেরিকার যথেচ্ছারে স্যাংশন চাপানো যেটা ঐ দেশের ডলারে বাণিজ্য এর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। কিন্তু আমেরিকা এমন স্যাংশন দেয়ার কে? কী তার অথরিটি? এটা লুকাছাপার কিছু নাই যে এবারের বাইডেন প্রশাসন ইচ্ছামত যার উপরে আরোপের ইচ্ছা এভাবে স্যাংশন আরোপ করে গিয়েছেন। কারণ, আমেরিকান ডলার আমেরিকা রাষ্ট্রের নিজের মুদ্রা হওয়াতে যে পড়ে পাওয়া সুবিধা আমেরিকার হাতে তাতে যেকোন দেশ যেন ডলারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় কেনা-বেচা না করতে পারে এই বাধা দিবার সুযোগ আমেরিকার হাতে আছে। আর আমেরিকা তার এই সুযোগ এর অপব্যবহার করবে না – এটাই আশা করা হয়েছিল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম-সভায়।  কিন্তু তা ছিল ভদ্রলোকি চুক্তির মত ঠিক আইনি বাধা নয়; আর সে অনুমানটাকেই আমেরিকা অমান্য করে চলেছে।  “পরে পাওয়া” সুবিধাটাই খেয়ে চলেছে।
    আর ওদিকে, ব্রিকস তৈরি হয়েছে যেসব রাষ্ট্র নিয়ে বা হবু সদস্যদের নিয়ে হতে চাচ্ছে তারা আমেরিকার এই অত্যাচার, যথেচ্ছাচারে অতিষ্ট হয়েছে বলেই তো নয়া ব্রিকস এর সদস্য হতে এসেছে। কাজেই আমেরিকান স্যাংশন কারো উপর  আরোপিত হলে সেই দেশকে আবার সদস্যপদ না দেয়ার মানে হল যেন, আমেরিকান ইচ্ছায় ব্রিকসের সদস্যপদ দেয়া। মানে ব্রিকস চালাবে যেন আমেরিকা – এমন অবস্থা তৈরি করা!  মানে কার্যত ব্রিকস-কে আমেরিকার খামখেয়ালি ইচ্ছার অধীনস্ত প্রতিষ্ঠান করে ফেলা।  আর এভাবেই ভারত যদি ব্রিকসের নয়া সদস্যপদ লাভের শর্ত করতে চায় তাহলে আর এদের ব্রিকস গড়ার দরকার কী?
    অথবা আরেকটা দিক আছে! তাহলে, চীনের মুদ্রা ইউয়ান ভিত্তিতে যদি ব্রিকস প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে তাহলে চীনও কী আমেরিকার মতই যেকোন ব্রিকস সদস্য দেশের উপর চীনা খামখেয়ালি রুস্তমি শুরু করতে পারবে?   আর ভারত সেটা মান্য করে চলবে? মোদি তার মানে এটাই চাইছেন???? তাই কি??? মোদি সাব কী বলেন!!! 

    আর তামাসার কথা যে, ভারত কী নিশ্চিত যে ইউয়ান-ভিত্তিক ব্রিকস এরপর ভারতের উপরেই চীন সেই প্রথম  (ইউয়ান) স্যাংশনটা আরোপ করবে না? কাজেই “স্যাংশন খাওয়া দেশ সদস্যপদ পাবে না” এই শর্ত তো ভারতের জন্যই সবচেয়ে বড় আত্মঘাতি হয়ে উঠতে পারে!!!  তাহলে ভারতের এই  গদগদ হওয়া “আমেরিকা তোষণ” এর মানে কী? এমন আত্মভোলা ছাগলামির মানে কী?

    আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে ভারত  ” আমেরিকান স্যাংশন খাওয়া দেশকে” – সদস্যপদ দিয়ে ঐ দেশের সাথে আমেরিকান  ক্যাচাল-সংঘাতের দায়গুলো ব্রিকসে আনতে চাচ্ছে না, এড়াতে চাইছে মানে এই প্রশ্নে আমেরিকার বিরাগভাজন হতে চাচ্ছে না। কিন্তু সেটা হলেও এভাবে আমেরিকার খামখেয়ালিপনা আমল করে এর ভিত্তিতে একটা  ব্রিকস খাড়া করা কী সম্ভব, নাকি এটা বাস্তব? বা এর কোন দরকার আছে? যেমন ধরেন এখনই সবচেয়ে বড় স্যাংশন খাওয়া দেশ হল খোদ পুতিনের রাশিয়া। তাহলে মোদির প্রস্তাবিত শর্ত অনুসারে তো রাশিয়াকেই ব্রিকসের সদস্যপদ থেকে বাদ দিতে হয়! অথবা ধরা যাক, কোন কারণে ভারতের উপরেই কোন আমেরিকান স্যংশন যদি আরোপিত হয় তাহলে কী ভারত সরল বালকের মত নিজেই ব্রিকসের বাইরে গিয়ে বসবে? তাতে রাজি থাকবে তো??? একথার মানে হল, যে আপনার বাসায়  আপনি নিজে ঢুকতে পারবেন কিনা সেটা আর কেউ না একেবারে কোন বাইরের লোক বা পড়শি তার খামখেয়ালি ইচ্ছার কথা আপনি মেনে চলবেন? আর তা মেনেই আপনি আপনার নিজের বাসায় ঢুকবেন, ঢুকতে হবে? অথচ সেটাই মোদির ভারত প্রস্তাব করছে? এটা এবসার্ড[absurd] অর্থহীন; আজীব ও অবাস্তব ঘটনা! ভারতের এটা এক আজীব আমেরিকা প্রীতি! যেটার কারণে ভারত খোদ নিজেই আমেরিকার কাছে নিজের অস্তিত্ব নিজেই বিলীন করতে হতে পারে তা জেনেও ভারত তা করতে এক পায়ে খাড়া!!!!  তাই কী?  এটা মানে হয় না এমনই এবসার্ড অবিশ্বাস্য ঘটনা!  যা বাস্তব পরিস্থিতিতে ভারত নিজেই অমান্য করবে!

    মূল কথাটা খেয়াল রাখতে হবে। ব্রিকসের সকল রাষ্ট্র যদি নাও চায়, তাহলেও ডলারের পাশাপাশি ডলারের বিকল্প কারেন্সি-ভিত্তিক (ধরা যাক চীনা ইউয়ান) ব্রিকস নামের আরেক অর্থনৈতিক  গ্লোবাল অর্ডার খাড়া করার চেষ্টা করার অর্থ হল ডলারের একছত্র অধীপতি থাকাকে টেনে নিচে নামানো। তাই ব্রিকস খাড়া করব এই মজা লুটতে এলাম  অথচ আমেরিকা বা তার ডলারের সাথে প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব না, এড়ায় চলতে পারব, চ্যালেঞ্জ করব না এই অনুমান ভিত্তিহীন এবং তা অর্থহীনও!! বোকার স্বর্গে বসবাস! মানে হল, মোদির ভারতের দশা হয়েছে সে  আমেরিকা ডাকলেই যদি তার বাসায় গিয়া ভারতকে পাশে  শুইতেই হয়, সঙ্গ দিতেই হয় –  তাহলে আর ঐ ভারতের আবার ব্রিকস নামের নয়া বিয়ে করতে যুক্ত হতে এসেছে কেন, দরকার কী?

    আসলেই মোদি এক আজব লোক!!!  সত্যি মোদি সাব পারেও বটে!!!
    [একটা ঘোষণাঃ উপরে যে গ্লোবাল অর্ডার কথা বা ধারণাটা  উল্লেখ করেছি – এটা খুবই ফান্ডামেন্টাল কনসেপ্ট।  তাই এনিয়ে আলাদা করে একটা লেখা প্রায় রেডি আছে, ‘ফাইনাল টাচ’ দিয়ে একদিন পরেই পোস্ট করব।]

    মোদির দ্বিতীয় শর্ত প্রসঙ্গেঃ
    এছাড়া  দ্বিতীয় শর্তও প্রায় একই রকমের অর্থহীন! মূল কারণ হল, ব্রিকস যদি পুরানা আইএমএফের বিকল্প প্রতিষ্ঠান হয়ে গড়ে উঠতেই চায় তাহলে হবু সদস্যদেশের নুন্যতম জিডিপি থাকতে হবে এমন শর্ত এর অর্থ কী? আমার দেশের নুন্যতম জিডিপি কেন উল্লেখযোগ্য কোন জিডিপি নাই বলেই তো আমি সদস্য হতে এসেছি, নাকি তামসা করতে? আর মূলকথায়, আইএমএফের জন্মের সময় কী সে এমন শর্ত দিয়ে নয়া সদস্য নিয়েছিল? দেয় নাই তো? তাহলে এখনই বা কেন এটা মোদির প্রস্তাব??  মোদির কনসালটেন্টেরা কি তাহলে গাধা-গরু, পড়াশুনায় ফাঁকি দেয়া ছাত্র যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক স্টাডি করে নাই? নাকি মাদী ব্রিকস-কে বড়লোক রাষ্ট্রগুলোর ক্লাব বানাতে চাইছে? কিন্তু তেমন ক্লাব হিশাবে জি৭ – গ্রুপ  প্রথম বড়লোক রাষ্ট্রের ক্লাব তো আছেই – মোদি সেখানে না গিয়ে ব্রিকসে এসেছে কেন?

    ন্যায্যতার প্রশ্ন ফান্ডামেন্টাল, তাই সবার আগে এই প্রশ্ন তুলতেই হবেঃ
    অর্থনীতিতে বঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রগুলোকে অন্তত সুযোগের দিক থেকে সাম্য – সবাই সমান সুযোগ পেয়েছে – এতটুকুই যদি না করতে পারে তাহলে নয়া ব্রিকস খাড়া করার দরকার কী? এর সাফাই ন্যায্যতা কী? আমেরিকা্র খামখেয়ালি মত একালে আর কাকে কোন কোন দেশকে এমন সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবে দুনিয়া?  এমন সুবিধা ব্রিকসের চীন বা চীনের মত অন্য কোন ব্রিকস সদস্যের হাতে যেন না থাকে, না উঠে সেজন্যই তো ব্রিকস এর প্রয়োজনীয়তা! নাকি??  ব্রিকস তখনই তো কেবল নুন্যতম ইনসাফের প্রতিষ্ঠান বলে দাবি করতে পারবে; নাকি? আর আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি মোদির ভারতের মত যারাই বে-ইনসাফিতে অন্যের জন্য গর্ত খুড়ে রাখলে সে অনেক সুবিধা খেতে পারবে মনে করছে – এরা নিজেরাই আগামিতে সেই গর্তে পড়বেই! এটাই ইনসাফের মহিমা! 

    তাহলে কী দাঁড়ালো, এটাই কী আগামি ব্রিকসের মাতবর সদস্য হিশাবে মোদির ভারতেরআমেরিকার মত এক খামখেয়ালি ক্ষমতার হাতা হয়ে উঠার খায়েসের ইঙ্গিত দিচ্ছে?  ্মানে বগলে ইট নিয়ে মুখে শেখ ফরিদ!!! আসলে এটাই তো বৃটিশ কলোলিদখলদারেরা চলে গেলে বা এর অবসান হলেও সেই বৃটিশ দখলদারের স্বভাব নিজে পেতে চাওয়া “নেহেরুর ভারত” হওয়ার পুরানা খায়েস!!!

    বাহা রে নন্দ! বাহ রে মোদি! তোর খায়েসের বলিহারি!! মোদি আসলেই পারে! এই দুনিয়ায় অসাম্যের নিয়ম-আইন কানুন যেখানে সমান থেকে উন্মুক্ত করার দাবি উঠছে, এই মোদি সেখানে যে নিজেকে অবলীলায় এর ভায়োলেটর (violator) অমান্যকারি এক দানব হিসাবেই পরিচিত করতে চাচ্ছে!

    যাহোক উপরে আমরা মোদির  হবু সদস্যদের সদস্যপদ লাভের শর্ত নিয়ে মোদির প্রস্তাবের পর্যালোচনা করলাম, দেখলাম। কিন্তু ফাইনালি ব্রিকস কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?  মানে কলোনিদখলদারি মনের মোদির ভারত নয়া শর্ত  জুড়ার যে প্রস্তাবই আনুক না কেন, শেষে ব্রিকসের এই সম্মেলন এবিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?  নয়া সদস্যপদ লাভের কীশর্ত ঠিক করেছিল?

    ব্রিকসে নয়া সদস্যপদ লাভের শর্ত কী ঠিক হয়েছেঃ
    সেটা ব্রিকস ঠিক খোলাখুলি আমাদের জানায় নাই। বলা ভাল ব্রিকস আসলে  তা খোলাখুলি না বলার পরোক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা বে-ইজ্জতি হতে যায় না, তাই এতে বুঝা গেছে !

    কিন্তু নয়া ছয় সদস্য কারা হবে আর তাতে বাংলাদেশ নাই – এই সিদ্ধান্তের তাতপর্য কী?
    এই তাতপর্য ব্যাখ্যা করতে পারলেই বুঝা সহজ যে ব্রিকস এর সদস্য হবার ফাইনাল ক্রাইটেরিয়া বা শর্ত এখন কী দাঁড়িয়েছে।

    “সদস্য হতে শর্ত” শেষে কী দাঁড়ালো ও এর তাতপর্য কি; ঘটনা যখন ইরানঃ
    ব্রিকসের  সদস্যপদ লাভের শর্ত কী তা তারা প্রকাশ্যে জানায় নাই। কিন্তু তাদের কার্যকলাপ দেখে বুঝা সম্ভব যে তারা ঠিক কী চেয়েছে এবং হয়েছে বা হচ্ছে।  যেমন কারা এই ছয় রাষ্ট্র এর প্যাটার্ন যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখি ইরান এই রাষ্ট্র সদস্যপদ লাভ করেছে; যেটা একটা বিশেষ প্যাটার্ণ নির্দেশ করে। কী সেটা?  ইরানের অর্থনীতি সেই জন্মের সময় ১৯৭৯ সাল থেকেই আমেরিকার নিয়মিত ও অসংখ্য স্যাংশনে জর্জরিত। মানে ইমাম খোমিনীর বিপ্লবে স্বাধীন ইরান জন্ম থেকেই সে আমেরিকান খামখেয়ালিপনার শিকার হয়ে আছে। কিন্তু সেই ইরান এবার ব্রিকস এর সদস্যপদ পেয়েছে। যার সোজা মানে হল, এতদিন কেবল চীন বুক ফুলিয়ে ইরানের তেল কিনার ২৫ বছরের চুক্তি করেছিল। আজ ব্রিকস জানিয়ে দিল তারা ইরানের মুখের উপর যে অন্যায় লাগাম টেনে ধরার আমেরিকান খায়েস ছিল যা ইরানের অর্থনৈতিক সব সম্ভাবনাকে স্তব্ধ করতে রেখেছিল – তা ব্রিকস অন্যায় মনে করছে।  ব্রিকস অন্তত (আমেরিকান স্যাংশন) যে মানতে চাচ্ছে না এটাই পরিস্কার হয়ে গেছে ব্রিকসের এই সিদ্ধান্ত থেকে। মনে রাখতে হবে  এক, খোদ ভারত ট্রাম্পের সময় থেকে ইরানের তেল যেন কেউ না কিনে তা বাস্তবায়নের বাধা হিশাবে যে স্যাংশন-শর্ত দিয়েছিল সেবারই প্রথম- মোদির ভারত তা মেনে নিয়েছিল। ট্রাম্পের জাতিসংঘ প্রতিনিধি Nikki Haley এর সেসময়ের এমন মন্তব্য নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্ট দেখতে পারেন এখানে।  এমন অন্যায়-বেইনসাফি ভাবে সেকালে ভারতের বিক্রি হয়ে যাওয়াতে  ট্রাম্পের কাছ থেকে ভারত কী গোপন সুবিধা পেয়েছিল আমরা জানি না। তবে এরপর থেকে ভারত আর ইরানি তেল কিনে নাই, সস্তায় দিলে এমনকি নিরাপদে তেল ইরান নিজেই পৌছে দিলেও না করেছিল ভারত। আর মনে রাখতে হবে, এখনও  ব্রিকসের কোন সিদ্ধান্ত নিবার পদ্ধতি হল সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেদিকে তা নয়, বরং সর্বসম্মতিতে। এর মানে এবার মোদি সজ্ঞানে মেনে নিলেন যে ভারতও এবার ব্রিকস-এ ইরানের নয়া সদস্যপদ অনুমোদন করছে ভারত। অর্থাৎ ব্রিকসের সদস্যপদ লাভের নয়া শর্ত  যা মোদি আরোপ বা হাজির করতে প্রস্তাব করেছিল তা হাওয়া হয়ে গেছে। মোদি নিজেই  সেকথা আর আঁকড়ে ধরে বসে নাই; বরং নিজেই ফাইনালি আর কার্যকর করতে চায় নাই। কিন্তু কেন? আর তাহলে এসব ভুয়া শর্ত প্রস্তাব করেছিল কেন?

    কারণ, এককথায় মোদির আনা শর্ত ছিল ভুয়া ওজনহীন!  এই শর্ত সে প্রয়োগ হোক তা চায় নাই বরং অন্য কোন উদ্দেশ্য এর ছিল। সেকথায় পরে আসবো।

    “সদস্য হতে শর্ত” শেষে কী দাড়ালো ও এর তাতপর্য কি; ঘটনা যখন সৌদি, ইউএই (UAE) এবং মিসরঃ
    নয়া ছয় সদস্য এরা আর কে কে এর অর্থ তাতপর্য খুঁজলে পাই সেখানে আরেকটা প্যাটার্ণ। সেটা হল, আরও তিন রাষ্ট্র – সৌদি আরব, ইউএই আর এমনকি সাথে মিসর। [এখানে UAE বলতে যার সাত ভুখন্ডের বৃহত্তম ফলে বড় প্রভাবশালী হল দুবাই; তবে রাজধানী হল আবুধাবি]।  এছাড়া  মধ্যপ্রাচ্যের এই তিন রাষ্ট্রের সাথে ইরানও আছে (উপরের অর্থে নয় আরও অন্য অর্থে) – এটা যদি মনে রাখি তবে এর আরও অন্যান্য অর্থ-তাতপর্য আছে সে ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। তাই এখানে আবার ইরানের উল্লেখ সেটা প্রথম তাতপর্য হিশাবে উপরে যা লিখেছি এরও বাইরের ইরান। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিপ্লবের পর থেকে এতদিন কেউ কাউকে সহ্য করে না এমন প্রবল দুই প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল ইরান বনাম সৌদি। আর এই দ্বন্দ্ব লাগিয়ে রাখার বড় ফ্যাক্টর এই প্রধান শক্তি ও সমর্থক এবং সুবিধাভোগী হয়ে  সুবিধা খেয়ে গেছিল আমেরিকা।  কাজেই এখানে ইরান-সৌদি একসাথে ব্রিকসের সদস্যপদ লাভ – এই আলাদা বৈশিষ্ঠকে আমল করা চোখে তা দেখতে হবে।  এর পিছনের ঘটনা হল, সম্প্রতি  ইরান-সৌদির পুরানা সেসব বিবাদ পাশে সরিয়ে রেখে এদুই শক্তির হাত মিলিয়েছে; আর এভাবে চলার উদ্যোক্তা-মধ্যস্থতাকারি হল চীন। এতে প্রকাশিত চীনের এই সক্ষমতার কথা পশ্চিমের কেউ অস্বীকার করছে না। বরং চোখ বড় বড় করে ভীত ঈর্ষান্বিত চোখে হলেও তাদেরকেও ইরান-সৌদি ঐক্য, হাত মিলানোকে স্বাগত জানাতেই হচ্ছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ-কে ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন ও বিদ্রোহকে সৌদি দমন থেকে যা এতদিন এক মহা মানবিক সমস্যা তৈরি হয়ে ছিল তা মিটমাটের রাস্তা খুলে দিয়েছে। হুতি ইস্যু ও এর বিবাদ থেকে বের হবার – এই ইস্যু অবসান হতে যাবার সুযোগ আসাতে প্রবল প্রশংসা করতেই হয়েছে সংশ্লিষ্ট সকলকে।  কারণ কেউই নিজেকে বিবাদ পছন্দ করা মানুষ বলে হাজির করতে পারে না।    আর  ইউএই (UAE) যার সাত ভুখন্ডের বৃহত্তম ও প্রভাবশালী হল দুবাই – ওর আমীর ও তার বড় সন্তান হল বর্তমানে সৌদি আরবের MBA [প্রিন্স সালমান যিনি কার্যত সৌদি শাসক] এর সবচেয়ে কাছের বড় সমর্থক ও চিন্তা শেয়ার করা বন্ধু। অর্থনৈতিক অর্থে মধ্যপ্রাচ্যের বাদশা দেশগুলোতে আধুনিকতার সংস্কার আনার জন্য এদুই প্রিন্স নিজ উদ্যোগ ও কাজের জন্য যারা গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছেন।  একসাথে করতে একাজে এমনকি সৌদি যেসব কাজ করতে চায় কিন্তু নিজ নামে করতে চায় না তা করে দেয় দুবাই প্রিন্স – এমনটাও দেখা গেছে। বিশেষ করে বর্তমানে সৌদিতে যে অর্থনৈতিক সংস্কার বা ঢেলে সাজানো চলছে তাতে এদুই প্রিন্সের ভুমিকা খুবই গুরুত্বপুর্ণ।

    তাহলে সৌদি-দুবাই আর ইরান – এ তিনের মাঝে আবার চীন, এর এক আলাদা বিশেষ তাতপর্য আছে। কী সেটা?
    এটাই নব উত্থিত ব্রিকস  এই বিকল্প ব্যবস্থা কায়েমের পথে চীন প্রথম অর্থপুর্ণ পদক্ষেপ। আগে অনেকবার বলেছি ১৯৪৫ সালে আমেরিকান নেতৃত্বে এক গ্লোবাল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক গ্লোবাল অর্ডার চালু হয়েছিল । ইতোমধ্যে প্রায় আশি বছর এটা চলতে পেরেছে, আজও চলছে কিন্তু এখন আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা যত কমছে এর চেয়ে বহু গুণে চীনের সক্ষমতা বেড়ে সে আমেরিকাকে জিডিপিতে  ছাড়িয়ে এক নম্বর অর্থনীতির দেশ হওয়ার পথে।  দুনিয়ার সবদেশকেই একেবারেই কম বা না সুদে অবকাঠামো বিনিয়োগ যোগানোর সক্ষমতা – এটাই কোন দেশের গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হওয়ার একেবারে প্রাথমিক যোগ্যতা। কারণ এমন বিনিয়োগ দানের সক্ষমতা যখন কোন দেশের অর্থনীতির হয়, এটাই দুনিয়ায় বেশির ভাগ দেশের উপর ঐ সক্ষম দেশের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হয়ে দাড়ায়, দাঁড়াবেই। আমেরিকার বদলে ওর এতদিনের গ্লোবাল নেতৃত্বের জায়গায় চীন উঠে আসতেছে, দখল করতেছে – এভাবেই দিন কে দিন দৃশ্যমান হাজির হয়ে উঠছে।ঙ্কারণ,  গরীব তো বটেই এমনকি মধ্যম আয়ের দেশগুলোও (যেমন আশিয়ান জোটের দেশগুলো) যারা অবকাঠামো ঋণ পেতে ৩% পর্যন্ত সুদ দিতে প্রস্তুত (কারণ, আমেরিকার নেতৃত্বের পুরানা ব্যবস্থাটা মানে বিশ্বব্যাংক এমন সরকারগুলোকে অবকাঠামো ঋণ আর দেয়ই না তবে এসবদেশের প্রাইভেট কোম্পানিকে হলে দিতে রাজি। এই নীতি ফলো করে বিশ্বব্যাংক।) তাই, এদের কাছে চীনা অবকাঠামো ঋণ খুবই কাম্য। ইতোমধ্যেই বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য চীনের AIIB -এই ব্যাংক তাই মধ্যম আয়ের দেশগুলোর কাছে খুবই আদরণীয়!   আর মনে রাখতে হবে, এখনকার চীনের মত একটা দেশ যখন একবার অর্থনৈতিক সক্ষমতার চরম বৃদ্ধির স্তরে পৌছে [মানে নিজ অর্থনীতি বিপুল সারপ্লাস জমা করতে থাকে বা উদ্বৃত্ব সম্পদে ভরে উঠে ] এমন হয়ে যাবার অর্থ হল এরপরের দশ বছরের মধ্যেই ঐ দেশ সামরিক শক্তি হিশাবে সে হাজির হতে, দৃশ্যমান হতে শুরু করতে পারে।  আর এসব সম্ভাবনা ও সুবিধার কারণে চীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বে আমেরিকার জায়গায় বসে যাবার সুযোগ পেতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে, আর তা কমবেশি খোদ আমেরিকাই মেনে নেওয়া বা রেফার করে কথা বলা শুরু করে দিয়েছে।
    এটাকে আমি বারবার গ্লোবাল পালাবদল বলছি। আর এটা নিয়ে একদল আছে যাতা এটাকে কথিত ভুরাজনীতিক ঘটনা বলে পরিচয় করাতে চাচ্ছে। এভাবে নিজের অজ্ঞতা ঢাকার কিছু নাই, এটা অপ্রয়োজনীয়। ভূরাজনীতি বা জিও-পলিটিক্স  এই শব্দের মধ্যে যে ভূ [geo- জিও] শব্দটাই তো সঠিক নয়। কারণ এটা গ্লোবাল অর্ডার এরই নেতৃত্বের মধ্যে পালাবদলের ঘটনা।  যেখানে রূট শব্দ ও ধারণাটা হল গ্লোবাল [Global]। যা ভূ [geo- জিও] একেবারেই না। কারণ,  গ্লোবাল আর জিও- একই শব্দ না, এক অর্থও না। তবে গ্লোবাল না বলে অনেক বাংলায় “বিশ্বব্যবস্থা” লিখে; সেটা চলতে পারে।  এটা বোকা বোকা অবুঝ শব্দ  ভূ [geo- জিও]  বলার চেয়ে ভাল!

    নয়া গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠছে চীন – এই লক্ষ্যেই চীন পুরানা  গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট করে কেবল গ্লোবাল মুদ্রা ও বাণিজ্য ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক আইএমএফ আর অবকাঠামো ঋণ দেবার বিশ্বব্যাংক – এই দুই গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের পাল্টা ও বিকল্প সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়তে উদ্যোগ নিতেই এমন এক জোট খাড়া করেছে যাকে আমরা ব্রিকস বলে চিনছি।
    তবে আইএমএফ আর বিশ্বব্যাংক এর সমতুল্য (কিন্তু চীনা নেতৃত্বে) এমন বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়া সহজ কাজ নয়। এছাড়া গড়ার কাজটা চীনের বেলায় শুরুতে সে কিছু দেশকে সাথে নিয়ে বসে কথা শুরু করেছে।  বৈঠকে বসে শুরু করলেই তা খাড়া হয়ে বা কার্যকর হয়ে যাবে না।  সে পথের প্রধান বাধাথল – এখনকার ব্যবস্থায় আমেরিকান ডলারেই বেশির ভাগ আন্তঃরাষ্টীয় লেনদেনবিনিময় বাণিজ্য  (আমদানি-রপ্তানি) সম্পন্ন হওয়া। আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা একেবারেই কমে গেলেও এ’জায়গায় ডলারের উপর ব্যবহার কারি দেশ ও মানুষের পুরানা আস্থা অভ্যাস সহসা বদলে দেয়া যায় না একারণে। ইতোমধ্যে বাইডেন প্রশাসন  স্যাংশন দেয়ার অতিব্যবহারের কারণে একটা বড় সংখ্যাক দেশ চাইছে ডলার নির্ভরতার বিকল্প – এমন দেশগুলোর শীর্ষে আছে রাশিয়া। হাসিনার বাংলাদেশও অতি আগ্রহী। কিন্তু আগেই বলেছি এটা ঘরে বসে বিকল্প খাড়া করে দিবার বিষয় নয়। তাতে রাশিয়া বা বাংলাদেশ এর মত দেশগুলো যতই ছটপট করুক! তাহলে ডলার মুদ্রা ভিত্তিক বাণিজ্যের আধিপত্য একে পিছনে ফেলে মানে ডলারে ব্যবসাকে সেকেন্ড অবস্থানে নামিয়ে দিয়ে, পরের সবচেয়ে চালু মুদ্রা ইউয়ান, একে সামনে আনার উপায় কী?

    গত ২০১৫ সালে চীনা ইউয়ান মুদ্রাকে আইএমএফ অনুমোদিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিশাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তার আগে এমন আইএমএফ অনুমোদন দেয়া মুদ্রাগুলো হল (শুরুতে মার্কিন ডলার ছাড়াও) বৃটিশ পাউন্ড, জাপানিজ ইয়েন, ইইউ এর ইউরো। আর এসবের সাথে সেবার পঞ্চম কারেন্সি তখন হয়েছিল ইউয়ান[Yuan]। কিন্তু ইউয়ান ইতোমধ্যেই লেনদেনের মুদ্রা হিশাবে ডলার বাদে বাকি মুদ্রাগুলোকে ছাড়িয়েছে।  তাই এব্যাপারে চীনা গবেষণা অনুমান যা পরোক্ষে প্রকাশিত – এর ভাষ্য অনুযায়ী এমন চাবিকাঠিটা হল চীন প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কিনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে দ্বিতীয় বড় অর্থনীতির দেশ হিশাবে। তাই সুস্থির চীন আর সাথে অস্থির রাশিয়া উভয়েই মনে করে যে এসব জ্বালানি ক্রয়ের পেমেন্ট যদি ডলারের বদলে ইউয়ানে বদলে দেয়া যায় তাহলে মার্কিন ডলার ডমিনেন্সের উপর এক বড় ধাক্কা দেয়া সম্ভব। আর তাতেই ইউয়ান হয়ে যেতে পারে গ্লোবাল বাণিজ্য-লেনদেনের প্রধান মুদ্রা । মানে গ্লোবাল বাণিজ্য ঘটবার প্রধান মুদ্রা হয়ে উঠতে পারে ইউয়ান।  যেটা গ্লোবাল বাণিজ্যে  মোটামুটি ৬০% এর বেশি হয়ে কোন মুদ্রা পৌছাতে পারলে তবে এরপর তা ক্রমশ বাড়তে থাকে  – আর তাকে সহসাই নামানো যায় না।  যে পথে এখন ডলার উত্থিত হয়ে আছে! চীনা ইউয়ান উত্থানে এক নম্বর মুদ্রা হয়ে উঠতে এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য পরিকল্পিত পথ এটাকেই মনে করা হয় – তাত্বিক ও অর্থনীতিবিদ পর্যায়ের ধারণায়। আর, এপথেই চীন আগাচ্ছে বলে মনে করা হয়। এনিয়ে গত ২০১৫ সালে আমারই অনেক লেখা আছে।

    কাজেই এটা এখন বলাই বাহুল্য যে এই পথে গ্লোবাল বাণিজ্যকে ঠেলে দেবার ক্ষেত্রে সৌদি আরব কেন চীনের কাছে গুরুত্বপুর্ণ ও অন্যতম এক নির্ধারক শক্তি।  ইউএই(UAE) এর তেলবিক্রির সক্ষমতা খুবকিছু না থাকলেও সে সৌদির যেকোন কাজ-উদ্যোগের এক নম্বর সহযোগী-সমর্থক। আর এবার এদের সাথে ইরান,  যে ১৯৭৯ সাল থেকেই জ্বালানি বিক্রি সক্ষমতা থাকা সত্বেও গরীব দেশ হয়ে আছে, ইরানি অসুস্থ বাচ্চার জন্য ওষুধ কিনে দিতে অর্থনীতি অক্ষম হয়ে পড়ে ছিল – সেই ইরান গত ৪৪ বছরে খুব কম সময়েই সে নিজের তেল বিক্রি করতে পেরেছে। এই ইরানও এবার যুক্ত হয়ে গেছে যেটা এর আগে সৌদি-ইরান বিরোধ লাগিয়ে রাখার জন্য ইরান আরো অসহায় হয়ে ছিল। এখন হবে উলটা। এবার ঠিক তেল বিক্রি না তবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির গ্লোবাল ভুমিকার নায়ক হয়ে উঠবে এই তিন দেশ।  আমরা মনে রাখতে পারি ইরান-চীন ২৫ বছরের বাণিজ্য-বিনিয়োগ চুক্তির কথা। যার সার কথা ইরানের তেলের বিনিময়ে চীনা ঋণ, বিনিয়োগ টেকনোলজি আর চীনা বাজার সবই উন্মুক্ত হবে ইরানের কাছে।   এছাড়া এর আরো সম্ভাবনা – মানে কোন দিকে সম্ভাব্য কী হতে পারে সেদিকে তাকালে পাই তুরস্কের এরদোয়ান-কে। যদিও তিনি শুরুতেই যোগ দিতে অপারগ হবেন। তা হলেও এটা বলাই যায় যে ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্য এখন চীনের পক্ষে ও হাতে চলে গেছে।  তাই সৌদি, ইউএই (UAE) এবং মিসর কে ব্রিকসের সদস্য করে নেয়া এটা ছিল চীনের  কাছে বিরাট প্রায়োরিটি; অন্তত বাংলাদেশের তুলনায়। যদিও বাংলাদেশ চীনের জন্যও খুবই গুরুত্বপুর্ণ – এখানে ভারতের চেয়েও চীনকে প্রভাবশালী হয়ে উঠতেই হবে! কিন্তু বর্তমান অস্থিরতায় সে হাসিনার টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে দেখে – আর তা বুঝা যায় কেন সে বাংলাদেশের চেয়েও মধ্যপ্রাচ্যকে প্রায়োরিটীতে উপরে রাখলো

     এতদিন মিসর ছিল আমেরিকান সক্ষমতার এক প্রধান হাতা, এক নির্ভরশীল ফ্যাক্টর। এখন কী হবেঃ
    মূলকারণ, ১৯৭৮ সালে আমেরিকান মধ্যস্থতায় ইসরায়েলকে মিসরের সাথে ক্যাম্প-ডেভিড চুক্তি করতে বাধ্য করেছিল আমেরিকা। আর এর মাধ্যমেই কিসিঞ্জারের মধ্যপ্রাচ্য পলিসির (তেলের উপর খবরদারি সহ) [Kissinger ME policy] এতদিন প্রধান পশ্চিমা-নীতি মধ্যপ্রাচ্যে কার্যকর হয়ে ছিল। আর এর সুযোগেই আমেরিকা ইসরায়েলকে দিয়ে বারবার ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ হাতে পেয়েছে, ব্যবহার করে। মধ্যপ্রাচ্য আমেরিকার হাতের মুঠোয় হয়ে যাওয়ার  চাবি কাঠি হয়ে ছিল এতদিন। আমেরিকার এই বিশেষ প্রভাব ও সক্ষমতাটাই এখন দুর্বল হয়ে শুরু করবে; চীনা প্রভাব এর উপরে জায়গা নিবে। এটাই গ্লোবাল অর্থনৈতিক পালাবদল বা এর আরেকটা প্রকাশের দিক!
    কিন্তু এবার চীনা মধ্যস্ততায়  সৌদি, ইউএই (UAE) এবং ইরানের সাথে মিসরও এসে যাওয়াতে ইসরায়েল – সেও এখন আমেরিকার চেয়েও সরাসরি চীনের সাথে যোগাযোগ করে নিজ নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা খুঁজে নিতে বাধ্য হবে। ইরানকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আক্রমাণাত্মক অবস্থান যদি কমাতে চায় তবে চীনের কাছে যেতে হবে। চীনের মাধ্যমে ইরানের কথা শুনতে হবে।  ক্রমশ মধ্যপ্রাচ্য মানেই  চীনই সেখানকার একমাত্র কার্যকর শক্তি ও জায়গা  – এমন বলে মেনে নিতে হবে  – যারই মধ্যপ্রাচ্যে স্বার্থ আছে এমন সকলকেই  – ঘটনা ফেনোমেনোর অভিমুখ এখন সেদিকে আগিয়ে গেল। আমেরিকার চেয়ে চীন এখন ইসরায়েলের কাছে নিজ নিরাপত্তার নিশ্চিত করার স্বার্থে অনেক বেশি ওজনদার প্রভাবের দেশ হয়ে উঠার সম্ভাবনা। এককথায় ইসরায়েল-মিসর সহ সারা মধ্যপ্রাচ্যে চীন এখন আমেরিকার চেয়ে শক্তিশালী ও বড় প্রভাব নিয়ে হাজির হতে থাকবে। আর এসব ততপরতা পিছনের এক  নয়া গ্লোবাল অর্থনৈতিক ভিত্তির যোগানদার হয়ে হাজির হবে ব্রিকস ও চীনা নেতৃত্ব।

    তাহলে মোদির দেয়া সদস্যপদ লাভের শর্তের কী পরিণতি হলঃ 
    এক বা্ক্যে  সারকথাটা বললে, মোদির ভারত চেয়েছে হাসিনার বাংলাদেশ যেন অন্তত এবার ব্রিকস সদস্যপদ লাভ নাকচ হয়ে যায়। আর সেটাই মোদি ঘটিয়েছে বিনিময়ে, চীনের অন্যস্বার্থে সে সম্মতি দিবে এই কৌশল করে। এটাকে আপাতত মোদি নিজের বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য মনে করতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এতে সারা বাংলাদেশ এখন মোদির ভারতকে প্রবল বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী এক দানব রাষ্ট্র যাকে পরাজিত করতেই হবে বলে গণ্য করা শুরু করে দিয়েছে পপুলার বাংলাদেশ। এতে বলাই বাহুল্য বাংলাদেশে ভারতের নুন্যতম প্রভাবও যেন না থাকে এটাই তারা আগামি যেকোন সরকারের কাছে দেখতে চাইবে। আর এটা ভারতের যেকোন শাসক শত কান্নাকাটি অথবা শত ষড়যন্ত্র করেও ফিরাতে পারবে না।
    শেষ বিচারে মোদি তাই এতে ভারতের লাভের চেয়ে বরং বিশাল ক্ষতি ডেকে আনলেন। মোদি সেই কাজটাই করলেন! যেটা অন্যের জন্য খাল কাটা! আগামিতে বাংলাদেশে কোন দলের পপুলার ক্ষমতার উপর ভর করে আসার একনম্বর ফ্যাক্টর হয়ে গেল ভারতের প্রভাবশুন্য করার নীতি-পলিসি দেখানো।

    বাংলাদেশ যেন অন্তত এবার ব্রিকস সদস্যপদ লাভ নাকচ হয় এটা মোদি ঘটিয়েছে বিনিময়ে, চীনের অন্যস্বার্থে সে সম্মতি দিবে এই কৌশল করে।
    এটাকে আপাতত মোদি নিজের বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য মনে করতে পারে।
    কিন্তু মনে রাখতে হবে এতে সারা বাংলাদেশ এখন মোদির ভারতকে প্রবল বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী এক দানব রাষ্ট্র যাকে পরাজিত করতেই হবে
    বলে গণ্য করা শুরু করে দিয়েছে পপুলার বাংলাদেশ। এতে বলাই বাহুল্য বাংলাদেশে ভারতের নুন্যতম প্রভাবও যেন না থাকে এটাই তারা আগামি
    যেকোন সরকারের কাছে দেখতে চাইবে। আর এটা ভারতের যেকোন শাসক শত কান্নাকাটি অথবা শত ষড়যন্ত্র করেও ফিরাতে পারবে না।
    শেষ বিচারে মোদি তাই এতে ভারতের লাভের চেয়ে বরং বিশাল ক্ষতি ডেকে আনলেন। মোদি সেই কাজটাই করলেন! যেটা অন্যের জন্য খাল কাটা!
    আগামিতে বাংলাদেশে কোন দলের পপুলার ক্ষমতার উপর ভর করে আসার একনম্বর ফ্যাক্টর হয়ে গেল ভারতের প্রভাবশুন্য করার নীতি-পলিসি দেখানো। 

     

    কিন্তু আপাতত বাংলাদেশের হাত ছাড়তে কেন চীন এতে রাজি হলঃ
    এর উত্তরটা, প্রশ্নটাকে আরেক ভাবে বুঝে বা পেশ করে দেয়া যাক। ছয়টা দেশ এবার সদস্যপদ লাভ করলো – এর সোজা অর্থ তাহলে এর স্বপক্ষে মোদির ভারতও সমর্থন দিয়েছে নইলে তা সর্বসম্মত হত না – তা পাশও হত না।  আর মোদি এই সমর্থন দিয়েছে – অবশ্যইচীনের সাথে একটা কিছুর বিনিময়ে। আর এটাই বাংলাদেশে সদস্যপদ সওদা [bounty] হয়ে যাওয়া!
    আসলে, চীন বাংলাদেশ বাদে যাদেরকে সদস্যপদ এবার দিতে চায় তাতে মোদির সম্মতি কিনে নিয়েছে। আর এই কেনা-বেচার সওদা হয়েছে বাংলাদেশের সদস্যপদ না পাওয়া। বাংলাদেশ যেন সদস্যপদ না পায় এতে চীনকে রাজি করিয়ে বিনিময়ে মোদি ঐ ছয় রাষ্ট্রের সদস্যপদ লাভে নিজ অনুমোদন দিতে রাজি হয়েছে। বলা যায় এই হল, চীনের সাথে মোদির ডিল বা গিভ এন্ড টেক!  কাজেই এখানে মোদি এখানে ব্রিকসের নয়া সদস্যপদ লাভের শর্ত যাই পেশ করুক প্রকৃতপক্ষে সবই ছিল ভুয়া, দেখাইন্না এক বাহানা মাত্র। আর ওদিকে সবকিছু শেষ হয়েছে এই ডিলের মাধ্যমে! কিন্তু মোদি কেন এমন চরম হাসিনাবিরোধি অবস্থান নিল?
    এটা কমবেশি অনেকের  কাছেই পরিস্কার যে ২০১৯ সাল থেকে হাসিনা ভারতের চেয়ে অনেক বেশি চীনের সাথে কমিটেড। ২০১৮ এর নির্বাচন যেমনই হোক, কথিত ঐ নির্বাচনের ব্যয় চীন যোগানোর মাধ্যমে এই সম্পর্ক যাত্রা শুরু করেছিল। সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর বা চীনা তিস্তা প্রকল্প ইত্যাদি চীনের আগ্রহ যেগুলোতে বিশেষ করে যেগুলো ভারতের আপত্তি বা হাসিনাকে ফুসলিয়ে নিজের পক্ষে নিয়ে এতদিন যেসব প্রজেক্ট ভারত হাসিনাকে নিতেই দেয় নাই। নাকচ বা বন্ধ করে দিয়েছে মূলত সেগুলোতেও তখন থেকেই চীন চেয়েছে হাসিনাকে সিদ্ধান্ত নিতে রাজি করানো – এটাই ছিল চীনেরর মূল লক্ষ্য।  আর এগুলো সবকিছুর উপর যেকোন উপায়ে বাধা দেয়া – এটাই গত সাড়ে চার বছর মোদির ভারত চেষ্টা করে গেছে। যেমন, চীনা তিস্তা প্রকল্পে ভারতের সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের দিকে ১৬ কিমি পর্যন্ত চীনারা কোন কাজ করতে পারবে না বলে ভারত আপত্তি  তুলে রেখেছে।  তিস্তার মত প্রকল্পগুলোতে চীনকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন না দেয়ার পিছনে এমন ভারতীয় আপত্তিকে উপেক্ষা করে হাসিনা কাজ করতে পারে নাই। তবে সব প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন এগিয়ে যেতে পারে নাই আর বাধা সৃষ্টি করে রাখার বেশি কিছু ভারত করতে পারে নাই – এই হল এক খামোখা ব্যলেন্সিং পয়েন্ট এমন হয়ে থেকেছে। কিন্তু আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে পরিকল্পনা হল আগামিতে হাসিনা যদি নিজেকে আবার বিজয়ী বলে যেভাবেই হোক ঘোষণা করতে পারে তাহলে এরপরেই ভারতের আপত্তিগুলো পায়ে মারিয়ে চীনের সাথে হাসিনা এগিয়ে যাবে এই ছিল চীনের সাথে সরকারের বুঝাবুঝি – অনুমিত ধারণাটা এরকম। পশ্চিমা গোয়েন্দা ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট গুলোও এরকম ধারণা দিচ্ছে। অথচ অন্য কোন কিছু দিয়ে হাসিনাকে ফিরাতে মোদি ব্যর্থ হয়ে থাকছিল।  এতে হাসিনার যুক্তি ছিল সে চীনের সাথে এমন ডিল না করলে ক্ষতায় ফিরতে পারবে না – আমেরিকান চাপ ফেরানো অসম্ভব। আর মোদির যুক্তি হাসিনা-চীনের এই ঘনিষ্ঠতা মোদির ভারতের কাছে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।  এই ত্রিভুজ সংকট পরিস্থিতিতে না পেরে মোদি হাসিনাকে থামাতে গিয়ে শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করেছে – মোদি খোদ চীনের সাথেই ডিল করে বসেছে।
    তাহলে চীনের দিক থেকে – সেই-ইবা কেন মোদির প্রস্তাবে রাজি হল?

    চীনকে দেয়া  মোদির ডিল-প্রস্তাব যে হাসিনার হাত ছেড়ে দিতে হবে – এতে চীন কেন রাজি হল?
    এখন এটা তো সবাই জানে দেখাই যাচ্ছে যে বাস্তবতা হল,  চীন ও মোদি উভয়েই  বা এরা দুপক্ষই  হাসিনার হাত ছেড়ে দিয়েছে। বা বাংলাদেশকে ব্রিকসের সদস্যপদ না দিতে তারা এক ঐক্যমত্য কায়েম করেছে।  এর মানে মোদির ডিল-প্রস্তাবে চীন হ্যা দিয়েছে। তাহলে চীন এমন করল কেন? বাস্তবত  চীনের এতে রাজি হয়ে যাওয়া এটাই সব বলে দিচ্ছে যে খুব সম্ভবত চীনের  ক্যালকুলেশন-অনুমান হল, হাসিনা আর আগামিতে ক্ষমতায় থাকতে বা ফিরতে পারছে না। তাই, মোদির ডিল-প্রস্তাব চীনের মেনে নিয়ে হাসিনাকে ছেড়ে দেয়া আর বিনিময়ে বাজি ছয় রাষ্ট্রকে সদস্যপদ দেওয়া প্রশ্নে মোদির ভারতকে দিয়ে সমর্থন দেওয়ানো – এই ডিল গ্রহণই চীনের জন্য সহি বেটার ডিল এবং সবচেয়ে লাভজনক!

    অর্থাৎ মোদি যা চেয়েছিল তা পেয়ে নিয়ে বাসায় গেছে। চীনও যেটা বেশি লাভজনক তাই পেয়ে নিয়ে ফিরে গেছে। মাঝখানে হাসিনা এদুইয়ের বেচা-বিক্রির ডিলের মধ্যে পরে সবই হারিয়েছে।
    এছাড়া চীনের দিক থেকে দেখলে  তার ইউয়ানকে ডলারের স্থান নেওয়ার  পক্ষে  কাজ শুরু করার  স্বার্থ মানে এর পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যকে কাজে লাগানো এটা অনেক বেশি অর্থপুর্ণ। ও বড় প্রায়োরিটি। সেটাই সে পেয়ে গেছে।

    শেষ করব তাহলে ইথিওপিয়া আর আর্জেন্টিনা কেন সদস্যপদ পেলো এর তাতপর্যঃ
    ইথিওপিয়া সম্পর্কে  বাইরের বিশেষ করে এশিয়ার মানুষের ধারণা খুবই কম। সৌভাগ্যবশত আমার প্রায় তিন বছর ওর রাজধানী আদ্দিস আবাবা-তে বসবাসের অভিজ্ঞতা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করেই কিছু কথা বলব।
    ইথিওপিয়ার বৈশিষ্ট একঃ
    বাইরের দুনিয়া থেকে বা অন্য মহাদেশ থেকে আফ্রিকার প্রবেশের গেটওয়ে মূলত তিনটা। বিশেষ করে বাণিজ্যিক বিমানের রূটগুলো লক্ষ করলে বুঝা যায়। আপনাকে সবার আগে কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা আর না হয় ইথিওপিয়াতে ঢুকতে হবে।  এসব ফ্লাইট নিতে হবে। পরে যে আফ্রিকান দেশে যেতে চান  সেদেশের ফ্লাইট বদলে নিতে হবে কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা আর না হয় ইথিওপিয়া থেকে। মানে এই তিন দেশই হয়ে উঠেছে আফ্রিকার যেখানে যেতে চান এরই হাব বা প্রথম মোকাম দেশ।
    ইথিওপিয়ার বৈশিষ্ট দুইঃ
    আফ্রিকা থেকে কলোনি দখল উঠে গেছে এশিয়ার পরেপরেই – ১৯৬০-৮০ এই সময়ের মধ্যে  ব্যাতিক্রম কেবল সাউথ আফ্রিকা ১৯৯৪।  আর একেবারেই ব্যতিক্রম হল ইথিওপিয়া যে কখনও কলোনিদখলও হয় নাই। শুধু তাই না, পুরা দুই বিশ্বযুদ্ধের সময় ইথিওপিয়া রাজা হাইলে সেলাসি শাসিত দেশ ছিল। রাজা ক্ষমতায় ছিল ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। যতক্ষণ তা এক সোভিয়েত কমিউনিস্ট সমথিত  সামরিক ক্যু ঘটেছিল হাইলে মেঙ্গাস্তু [Mengistu Haile Mariam] -র হাতে। আরও পরে ১৯৯১ সালে চীনাস্ইটালে গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে ফেলার মত আরেক কমিউনিস্ট গ্রুপ এখন ক্ষমতায়। আর সেনাবাহিনী হল ঐ গেরিলা বাহিনীর সদস্যরা।
    সারা আফ্রিকার আর বড় পিছনে পড়ে অক্ষমতা হল, নুন্যতম পুজি বিকশিত বা শহরায়ন ঘটবার আগেই কলোনিদখল হয়ে যাওয়া। কথাটা অন্যভাবে বললে, সারা আফ্রিকার মানুষ আগে শহর কী জিনিষ তা দেখেনি। কলোনি মাস্টারেরা দখলের পর তারাই শহর গড়েছিল – মানে এসব মাস্টারের হাত ধরেই আফ্রিকার মানুষ শহর কী তা চিনেছিল। তুলনায় ভারতে বৃটিশেরা দখল নিবার আগেই আমাদের অন্তত তিনটা বড় বড় সমৃদ্ধ শহর (লক্ষ্ণৌ, হায়দ্রাবাদ আর দিল্লি) গড়ে উঠে গিয়েছিল।  আর এসব শহরের শহুরে পোষাক-ই হলো পাঞ্জাবি, এজন্য এটা কোন ধর্মের পোষাক নয়। শহরের প্রতীকী পোষাক বলে তা এখনও ভারতের সামাজিক অনুষ্ঠানে বা বিয়ের মুখ্য পোষাক!
    আফ্রিকার এই মারাত্ম পিছনে পড়ে থাকা এটা এতই মারাত্মক যে কলোনি শাসকেরা ফিরে গেলে সাধারণ ট্রেডিং  মুদিখানা বা পষাকের মত নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ট্রেডিং – এটা শুরু করার মত মধ্যবিত্ত আফ্রিকার প্রায় সব দেশেই গড়ে উঠে নাই। আর এজায়গাটাই দখল করে আছে বৃটিশদের হাত ধরে আফ্রিকার মাইগ্রটেড ভারতীয় শ্রমিক পরিবারেরা। অথচ এই কমন চিত্রের একমাত্র ব্যতিক্রম হল ইথিওপিয়া।
    একালে অবকাঠামো পুঁজি ও সাথে FDI বা বিদেশি কারখানা পুঁজিও চীনের চীনের কারণে পাওয়া সহজ হয়েছে বলে এমন পুঁজি কাজে লাগানোর সক্ষমতা ইথিওপিয়ার সবচেয়ে বেশি। একারণের চীনের চোখে এক গুরুত্বপুর্ন গন্তব্য হল ইথিওপিয়া! মানে এটাও আফ্রিকায় চীনেরই বড় স্বার্থের দেশ যাকে চীন ব্রিকস এর সদস্য করে নিল!

    সবশেষে আর্জেন্টিনাঃ
    গত কমপক্ষে সাত বছর ধরে লাগাতর আর্জেন্টিনা অর্থনৈতিক অবস্থা ডুবন্ত। যার মুদ্রাস্ফীতি ১০০% এর বেশি আর ৪০% এর বেশি লোক দারিদ্র সীমার নিচে চলে গেছে। এঅবস্থায় ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা  আর্জেন্টিনার কেস ব্রিকসে নিয়ে আসে, বিশেষ করে চীনের নজর ও বিবেচনায়।  ভেনেজুয়েলা যেমন সেবার চীনের কাছে কিউবান সুপারিশ  পেয়েছিল।  তেমনই আর্জেন্টিনাওপক্ষে পাওয়া শক্ত সুপারিশের কারণে চীনের নজরে আসায় এর পরিণতিতে র্আজেন্টিনাও এবার ব্রিকসের সদস্যপদ লাভ করে যায়। আর এতে চীনের আরেক বড় লাভ হয় নিজের পক্ষে ব্রাজিলের সমর্থন ও আস্থা আরো পোক্ত হল।

    তাহলে এককথায় বললে ছয় নয়া সদস্যই অনুমোদন পেয়েছে মূলত চীনের আগ্রহ ও সমর্থনের কারণে।  কারণ,  মোদি যতই ভাব দেখাক ব্রিকস বলতে এর মূল সক্ষমতা তো চীনের।  একমাত্র চীনেরই আমাদের মত দেশকে অবকাঠামো বা অন্যধরণের পুঁজি ঋণ দিবার সামর্থ আছে। তাতে ব্রিকস এর উদ্যোক্তা সদস্য আরো চার রাষ্ট্র হলেও এরা হল ডেকোরেশন!  বাস্তবত কার্যত চীনই মূল চালিকাশক্তি। তাতে ভারতের মোদি যতই ভাব দেখাক! বাংলাদেশকে ব্রিকসের বাইরে রাখুক!
    এরই রিফ্লেকশন ঘটতে বা ছাপ পড়তে দেখেছি আমরা এবারের নয়া সদস্যপদ বিতরণে!

    আপডেটেডঃ  ২৮  আগষ্ট  ২০২৩; রাত ২ঃ ১৩
    সর্বশেষ  আপডেটেডঃ  ২৯ আগষ্ট ২০২৩;  সকাল ০৮ঃ ১১ 

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • বিএনপির আত্মহননের সহজ পথ, মির্জা ফকরুলের ‘মৌলবাদ’

    বিএনপির নিজেকে খতমের সহজ পথ, মির্জা ফকরুলের ‘মৌলবাদ’
    গৌতম দাস
    ২২ আগষ্ট ২০২৩  মধ্যরাত  ০০ঃ ০২
    https://wp.me/p1sCvy-4Q3

     

     

                                     Fundamentalism

     

    আনন্দবাজার-অগ্নি রায় এর “দাগী অপরাধী” ততপরতা শেষ হচ্ছে না বা থামছেই না। বরং  সেটা এতই ক্ষমতাধর যে একদিনের মধ্যে বিএনপি সেক্রেটারি মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর-কে একেবারে মৌলবাদবিরোধি করে ছেড়েছে! যত্তবড় মৌলবাদবিরোধি সিপিবি কেন কোন কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল কেউ এতদিন হতে পারে নাই!  নিশ্চয় এতে প্রগতিশীল ও সাহিত্য-সাংস্কৃতি জগতের যারা এতদিন আওয়ামি লীগ ওবস্থা ভাল না বুঝে ছুড়ে ফেলে বিএনপিকে প্রগতিশীল বানানোর কাজে লেগে পড়েছিল তারা তাদের পড়ে পাওয়া সাফল্য দেখে ব্যাপক খুশি হয়ে উঠেছেন!
    দেখা যাচ্ছে, এতে সর্বশেষ যোগ দিয়েছে দক্ষিণ-ভারতের দ্যা হিন্দু মিডিয়া গ্রুপের এক নয়া প্রপাগান্ডা-ময় ফ্রি পত্রিকা যার নাম “ফ্রটলাইন” [Frontline]।  মূল মিথ্যা কথাটা ছিল, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে নাকি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমেরিকার কাছে এক ‘কূটনৈতিক নোট’ বা “বার্তা” পাঠানো হয়েছে। যেটা পুরাটাই মিথ্যা।  কোন প্রমাণ ছাড়াই এধরণের মিথ্যা প্রপাগান্ডার দাবি প্রথমে ভারতের একটা বা দেড়-টা মিডিয়া থেকে ছড়ানো হয়েছে। মূল অপরাধী আনন্দবাজার-অগ্নি রায়দের আর, সেই কথিত মিথ্যা বার্তা-কে একটু ঘুড়িয়ে-ফিরিয়ে কিন্তু একইভাবে কোন প্রমাণ বা খবরের উৎস কে তা না জানিয়ে পরে তা প্রচার করেছে ডয়েচ ভেলে। তবে এটা নয়াদিল্লির ডয়েচ ভেলে। আর পরে প্রথম আলো-স্টার এই ডয়েচ ভেলের মিথ্যা রিপোর্টের বরাতে সেই চোথা-কপিটাই ছেপেছিল। একাজটাও সমান অপরাধের এজন্য যে  এরা তো দেখতেই পাচ্ছিলেন ডয়েচ ভেলের লেখাটা কোন “নিউজ” না। এটা এক “দাগী [despotic] ততপরতা” কারণ এতে তথ্যের কোন উৎস জানানো হয় নাই। তাই এটা কোন  “নিউজ” হয় নাই বরং একথা গুলো ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালইয়ের কে ও কবে বলেছে এর কোন প্রমাণ সাথে না দিয়েই উলটে  আনা হয়েছে – এক গায়েবী “কূটনৈতিক নোট” এর দাবি। এই অপরাধী কাজ তো জার্নালিজমের লোক ও চোখ হিশাবে প্রথম আলো-স্টারের বুঝতে না পারার কোনই কারণ নাই। কিন্তু তা সত্বেও এই অপরাধী কাজে তারাও সামিল হয়েছে।

    তবে ফ্রন্টলাইন অথবা ডয়েচ ভেলে বা প্রথম আলো-স্টার  এরা সকলেওই ভেসে গিয়ে এক লোভে। লোভটা হল, বাংলাদেশের এখন যে অবস্থা যে রাজনৈতিক গুমোট অবস্থা তাতে সবচেয়ে “পাবলিক নজরদারিতে আছে ইন্ডিয়ান সরকার; মানে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতের মিডিয়া। এখন মিডিয়া বাণিজ্যিক চোখে দেখলে, এটাই বাংলাদেশ-ইন্ডিয়ান মিডিয়ার চোখে এটা সবচেয়ে লোভনীয় – নিজ নিজ মিডিয়া রিচ [media reach] বাড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ। যার সোজা মানে যত বেশি ভিউ ততই অর্থলাভ। এছাড়াও এই মিথ্যা প্রপাগান্ডার রাজনৈতিক লাভালাভ উঠবে ভারত ও বাংলাদেশের চলতি সরকারের ঘরে। তাই তাদের থেকেই আরেক অঙ্কের অর্থ পাবার সম্ভাবনা। আর বলাই বাহুল্য এতে বড় ফান্ডটা হওয়ার কথা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার মিডিয়া ফান্ড। এসব চিন্তা থেকেই মনি-কাঞ্চনের চকচকে লোভে এসব মিডিয়ার চোখে; তাতে এই কথিত “ভারতীয় বার্তা” অসত্য বা বাপ-মার হদিস হলেই বা কী? চকচকে লোভের কাছে এই হদিস-হীনতা মামুলি!!!
    এর একটা প্রমাণ দেয়া যাক।

    “দ্যা হিন্দু” মিডিয়া গ্রুপের আরেক সাবসিডিয়ারি বা সহায়ক কোম্পানি তবে, প্রপাগান্ডা পত্রিকা হল ফ্রন্টলাইন। কেন এমন বিশেষণ লাগিয়ে বলছি? কারণ, মূল ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা এই ইংলিশ ডেইলি এখন আগে অর্থ পরিশোধ পে [pay] করলে তবেই পড়তে দিবে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া তাদেরই আরেক ব্যবসা বিষয়ক বা শেয়ার মার্কেট মুখ্য করা আরেক পত্রিকা বিজনেস লাইন আরো আগেই পে [pay] পত্রিকা করা হয়েছে। তাতে বলাই বাহুল্য পাঠক কমে গেছে। তাই সমান্তরালে “ফ্রটলাইন” কে সামনে আনা হয়েছে যেটা ওপেন মানে পয়সা লাগবে না। ফ্রন্টলাইন পত্রিকা থেকে উপরের ছবিটা নেয়া হয়েছে বাংলাদেশের ২১ আগষ্ট সকাল পোনে আটটায়।  আর এতে তখনও দেখা যাচ্ছে “ফ্রটলাইন”  খবরের প্রধান হেড লাইন হল আগের দিনের মানে, ২০ আগষ্ট সকাল নয়টায় ছাপানো বা হোস্ট করা বাসি ও মিথ্যা প্রপাগান্ডা স্টোরিটা। অথচ আজকাল নেট বা ওয়েব পত্রিকার যুগের কোন মিডিয়ায়  মুখ্য হেড লাইন নিউজের জায়গায় কোন খবরকে কী ২৪ ঘন্টা লটকায়ে থাকে? না রাখা উচিত, না বাস্তব সম্মত?? প্রশ্নই আসে না। তাহলে ফ্রন্টলাইন কেন রেখেছে? কারণ, এই প্রপাগান্ডা মিছা খবরটা “পয়সার মাল”। এটা এখনও পত্রিকার রিচ বাড়াবে বা বাড়ছে বলে ম্যানেজমেন্টের বুঝ! পাঠক টানবে, আনাগোনা হবে সেটাই তাদের অন্যসব আজকের টাটকা নিউজের চেয়েও সর্বোচ্চ হিট দিবে! সেই বিবেচনায় এই ২৪ ঘন্টা পুরানা চোথা-কপিটা টাঙ্গিয়ে রাখা হয়েছে। এ’থেকে অবশ্য এটা কেমন মান ও পাঠক আদরের পত্রিকা তা ঠাহর করা যাচ্ছে, সেটাই উদাম হয়েছে। যদিও সারকথাটা হল, এখানে মিডিয়া বা জার্নালিজম বলে কিছু নাই, সবটাই ব্যবসা আর অর্থের লোভই মুখ্য!!!

    ওদিকে কথিত ‘কূটনৈতিক “বার্তার” কারণে অবস্থা এমন হয়েছে যে এই গল্পের কোন সত্যতা নাই সেই গল্প নিয়ে লীগ-বিএনপি রাজনৈতিক নেতারা বিবৃতি দেয়া শুরু করেছে। বলছে, “যদি ভারত এমন বক্তব্য” দিয়ে থাকে অথবা “যদি এমন ভারতীয় বার্তা” মানে কূটনীতিক নোট বলে কিছুর অস্বিত্ব থেকে থাকে – এভাবে “যদির কথা” তুলে যার যার মনের খায়েস বা বাকযুদ্ধ চালানো হয়েছিল গতকাল সারাদিন।
    এভাবে যদির উপর দাঁড়িয়ে কথা বলাটা চরম বোকামি শুধু না বরং বেইজ্জতি হবার সম্ভাবনা!  কারণ, এখন যদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর এবার  সোজা বিবৃতি দিয়ে বা সাংবাদিক ডেকে জানায় যে বাংলাদেশকে নিয়ে ভারত আমেরিকাকে কথিত কোন বার্তাই পাঠায় নাই – তখন কী হবে!!!  সেটা হবে অনেকটা এরকম যে সমাজে কেউ কাউকে যদি বলে [যেটা বাস্তবে কেউ করে না] আপনি আমাকে যদি গালি দিয়ে থাকেন তবে আমি আপনাকে জুতা দিয়ে মারব। আরে বাবা আমি গালি দিয়েছি কিনা সেটা তো আগে নিশ্চিত হবে আপনাকে, নাকি? যদি গালি না দিয়ে থাকেন তখন তো নিজেকেই লজ্জা পেতে হবে!  এছাড়া এসবের মধ্যে কূটনীতিক রীতিনীতি শিষ্টাচার এর ব্যাপার আছে। তাই সেটা হবে কোন ঘটনা বাস্তবে ঘটার আগেই “যদি তা ঘটত” এমন কাল্পনিক ধরে নিয়ে মারামারি শুরু করে দেয়া।  স্বভাবতই এতে মানুষ সবার আগে “যদি দিয়ে কথা বলা” লোকটাই মূল উস্কানিদাতা বলে সাব্যস্ত করবে!  কারণ,  “যদি দিয়ে কথা বলা” মানে পায়ে পারা দিয়ে ঝগড়া শুরু করা।  অথচ সেটাই ঘটেছে।
    এব্যাপারে অন্তত কিছু শোভন এবং কূটনীতিক (কোন বাংলাদেশি) এক খসড়া বক্তব্য হতে পারত যদি বলত – “এ দেশের মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন বিদেশি শক্তি কথা বলতে পারে না, অশ্রদ্ধা করতে পারে না – এটা সবার মনে রাখা উচিত”।  “জনগণের ইচ্ছা” এটাই আমাদের সার্বভৌমত্ব,  জনপ্রতিনিধিদেরকে দেয়া ম্যান্ডেট। কাজেই, কোন বিদেশি  শক্তির আমাদের জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার নুন্যতম সুযোগ নাই। এমন যে কোন ততপরতাকে আমারা প্রতিরোধ করতে বাধ্য। তাই কোন বিদেশি শক্তির এমন ততপরতা হবে খুবই দুঃখজনক ঘটনা।  আমরা আশা করব সকলেই এব্যাপারে নিজেকে সংযত করে নিবেন!

    কিন্তু এক্ষেত্রে বিএনপি আরো এক ধাপঃ
    যেমন বিএনপি “যদি দিয়ে কথা বলে” থেমে গেল তাও একটা মানে হত। কিন্তু মির্জা ফকরুল এরপর যেন একেবারে যেন  নিজে নিজেকেই বিব্রত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি আরও আগ বাড়িয়ে বলেছেন,  ‘আমরা এ কথা খুব স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, কোনো মৌলবাদী দল এখানে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ দেশের ৫২ বছরের ইতিহাসে দেখা গেছে, কখনোই কোনো মৌলবাদী দল ক্ষমতায় আসতে পারেনি। বরং তাদের যে শক্তি, সেই শক্তি ক্ষীয়মাণ হয়ে এসেছে”।


    মির্জা ফকরুল এর এই বক্তব্য এটা আত্মঘাতি, নিজেকেই নিজে অপমান করা এই বক্তব্য। কেন?

    ১। মির্জার মৌলবাদি দল টা কে? মির্জার জানা উচিত এই শব্দের উতপত্তি। এই শব্দ কারা ব্যবহার করে আর এখন তা ফকরুল সাহেব ব্যবহার করলে এর ইম্পিকেশন [implication] বা আরো সংশ্লিষ্ট ও সংযুক্তভাবে জড়ানো আরো অর্থ কী দাঁড়াবে তা তাঁর খেয়াল করা উচিত ছিল।
    এটা কোল্ড ওয়ার যুগ (১৯৫৩-৯১) এর শেষ আমলের শব্দ। সুনির্দিষ্ট করে  ১৯৭৯ সালে ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল। কারণ, ঐ বছরই খোমেনির ইরানের বিপ্লব সংগঠিত হওয়াতে নিজ সেন্ট্রাল এশিয়া ভুখন্ডও না ঐ বিপ্লবের প্রভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এই ছিল সোভিয়েত শাসক ব্রেজনেভের ভয়। তিনি আফগানিস্তানকে দখল নিয়ে বাফার স্টেট [buffer state] বা ‘মাঝের পাহারাদার ভুখন্ড’ করতে চেয়েছিলেন। আর এর থেকে পরবর্তিতে পাকিস্তানকে সামনে রেখে এর মাধ্যমে আমেরিকা ঐ দখল হয়ে থাকা আফগানিস্তানে  সোভিয়েত এর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের দিয়ে (মোজাহিদ যার বড় অংশই পাঠান বা পশতুন গোষ্ঠি) সশস্ত্র প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিল। তাই দেশে দেশে সোভিয়েত সমর্থক বিশেষ করে আমাদের মত দেশের কমিউনিস্টেরা এই মোজাহিদ প্রতিরোধকে মুসলমান বলে নিচা দেখাতেই “মৌলবাদ” শব্দ চালু করেছিল; আর তা মূলত পৃষ্টপোষক হিশাবে আমেরিকার বিরুদ্ধে।  এটা তো স্বাভাবিক আফগানিস্তানের মানুষ মানেই মূলত মুসলমান বা ইসলাম অনুসারি। কাজেই দখলদার সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তাদের যেকোন প্রতিরোধ হলেই সোভিয়েত-প্রীতিতে কমিউনিস্টেরা তাদের আজীবনের ইসলামবিদ্বেষ এর ঝোলা মেলে বের করে সামনে আনবে; মুসলমানদেরকে বা তাদের ধর্মকে এথনিক পরিচয়কে নিচা দেখাবে ইত্যাদি; অথচ এটাই বর্ণবাদিতা। এটা সিম্পল এক গালাগালিতে – “অপর” ধর্মীয় এথনিক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে ঘৃনা-বিদ্বেষ ছড়ানোর রেসিজম।   আর এই রেসিজম-মূলক মূল শব্দটাই হল “মৌলবাদ”। পরে আমেরিকা সমর্থিত [মূলত উচ্চমাথায় টেকনিক্যাল অস্ত্র স্ট্রিনজার (Stinger missiles) রকেট যা কাঁধে নিয়ে ছুঁড়ে হেলিকপটার ফেলে দেয়া যায়]  মোজাহিদ প্রতিরোধে টিকতে না পেরে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান ত্যাগ করে ফিরে চলে যেতে বাধ্য হয়।  কিন্তু  এক বাক্যে মৌলবাদি বলতে মূলত সেটা ছিল কোল্ড-ওয়ার যুগের আমেরিকার বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট বা “প্রগতিবাদী” অভিযোগ, কালি লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

    পরবর্তি ঘটনা সংক্ষেপ হল, বাধ্য হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিরে চলে যাওয়াতে আমেরিকা পরে আফগানিস্তানে আগ্রহ হারায়; ঐ যুদ্ধবিধস্ত দেশ এরপরে যেখানে খুশি যাক মনে করতে শুরু করেছিল। শুধু তাই না এর পরবর্তিতে সেখানে কী হবে সেসব দায় ফেলে আমেরিকাও নিজেকে  গুটিয়ে ফেলেছিল।  এতে মারাত্মক এনার্কিজম আর তাতে আইন-শৃঙ্খলা ভেঙ্গে চরমে যায় শুরু হয় লুটপাট আর তা ঠেকাতেই তালেবান মানে মাদ্রাসার ছাত্রের নিয়ে মোল্লা ওমরের প্রতিরোধ দাঁড়িয়ে যায়।  পরে ওর ভিতরেই পুষ্ট হয়ে গড়ে উঠেছিল আলকায়েদা মুভমেন্ট, যার প্রথম প্রকাশ হতে হতে পরবর্তি শতক এসে যায়, আর সেটাই নাইন-ইলেভেন। লক্ষণীয় যে মৌলবাদ শব্দটা এতে মলিন হয়ে পিছনে পড়ে যায় [নতুন শব্দ আলকায়েদা, আই-এস ইত্যাদি আরো অনেক কিছু এসে যাওয়াতে], আর ব্যবহার কমে গেলেও আমাদের দেশের কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা আগের মতই মুসলমানবিদ্বেষ থেকে মৌলবাদ শব্দটা ব্যবহার চালু রাখে। শেষে আমাদের এদিকের যেকোন মুসলমান জনগোষ্ঠির প্রতিরোধ ততপরতাকেই ভারত সরকার আর এদেশের কমিউনিস্ট বা “প্রগতিবাদী” গোষ্ঠি এরা মানে, পিছনের উৎস পদচিহ্ন খুঁজে বের করলে,  জমিদার হিন্দুর সেট করা স্বার্থবোধ ও ভাষ্যকে যারা একালেও নিজ স্বার্থ ও ভাষ্য মনে করে – এরাই মৌলবাদ শব্দটা চালু রেখেছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য মির্জা ফকরুল সেই শব্দটাই হাতড়ে খুজে বার করে এনেছেন। ভেবেছেন মৌলবাদী শব্দটা বললে সেই আমেরিকা ও ভারত বিএনপির উপর সদয় ও খুশি হয়ে উঠবে – এটা এক পরিহাস!!!
    মির্জা ফকরুল জানেনই না যে তিনি আসলে আমেরিকাকেই গালি দিচ্ছেন। আর চীন ঠেকাতে ঠিকা পাওয়া ভারত, এনিয়ে জোট বন্ধুত্বের সেই ভারত-আমেরিকা আর স্ট্রাটেজিক কমন সম্পর্কে নাই, বা সেই অর্থে বাংলাদেশ নিয়ে স্ট্রাটেজিক বন্ধু বা কমন স্বার্থ নাই। “ওয়ার অন টেরর” বলে ভাষ্য মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি থেকে ট্রাম্প আমলেই বাদ গেছে।  

    একটা মজার কথা হল, বাংলাদেশে মৌলবাদ বলে গালি দেয়া ব্যাপারটা দুর্বল ও কমে গেলেও ভারতের আর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট- প্রগতিবাদি জগতে মৌলবাদ শব্দটা কোন কোন পকেটে এখনও চালু বিশেষ করে (তাদের সমর্থকের একাংশ যারা অতৃপ্ত হিন্দু-মনের এরা এখনও মৌলবাদ বলতে পছন্দ করে সুখ পায়) – অথচ তাদের কাছে মোদির বিজেপি নিয়ে কোন আপত্তি, অস্বস্তি ইত্যাদি কিছুই নাই; মৌলবাদ-বোধ নাই।  অথচ বিজেপির হিন্দুত্ববাদ যা বাংলাদেশে এমনকি ইসকন নামে বিস্তৃত অথচ এদের ততপরতাকে  বাংলাদেশের কমিউনিস্ট- প্রগতিবাদিদের মৌলবাদ-বিরোধি চোখে কোন খারাপ কিছু বা আপত্তির নয়। এটা কোন “হিন্দু মৌলবাদ” ধরণের কিছু নয়, রাজনীতিতে ধর্ম আনা নয়, হিন্দুধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বা রাজনীতির আপত্তিকর ততপরতা নয়। তাদের চোখে হিন্দুত্ববাদ-কে তারা মৌলবাদ মনে করে না !!! ব্যাপারটা ভালো মজার না!

    বিএনপি কাদের দল, ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি – মুসলিম জাতিবাদঃ
    এক বিপরীত বাংলাদেশের ঘটনা হল, ভোটারের টাইপ মানে ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি হিশাবে যদি বলি সেই বিচারে তবে ” মুসলমান জাতিবাদি” সমর্থক চিন্তা ধারা – এমন ভোটারেরা এক বড় অংশ বিএনপিকেই ভোট দিয়ে থাকে। তবে সাবধান এদের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক দিকের সাথে নব্বই এর দশকে উত্থিত তালেবান বা পরবর্তিকালের সশস্ত্র যেকোন ইসলামি রেডিকেল ধারা এদের কোনই সম্পর্ক নাই। মিলায় ফেলবেন না।  অন্তত ভোটার গোষ্টির টাইপ বিচারে। কারণ ইসলামি রেডিকেল কোন ধারাই ঠিক কোন ভোটার গোষ্টি নয়, ভোটের রাজনীতিটা তাদের নয়। বৃহত্তর অর্থে বললে,  এই “মুসলমান জাতিবাদি” ক্যাটাগরির ভোটার বাংলাদেশে নুন্যতম ৩৫% ধরা হয়, যার বাকি সমর্থক উঠানামা করা ভোটার।  আবার এমনকি রাজনৈতিক চিন্তা হিশাবে  “মুসলমান জাতিবাদি” চিন্তার কর্মি আওয়ামি লীগের ভিতরেও পাওয়া যাবে।
    খোদ হাসিনার কথাই দেখেনঃ
    ভাল করে একটু খুঁজলে দেখা যাবে সব সচেতন বাংলাদেশীর ভিতরেই কিছুটা হলেও “মুসলিম জাতিবাদ” আছে। অন্তত মনের কোন কোনায়। কথাটার মানে কী? কী বলতে চাইলাম?  শেখ হাসিনার কথাই ধরা যাক। আমার ধারণা তিনিও এর বাইরে নন! কেন?
    তিনি কিভাবে এর বাইরে থাকবেন? খোদ শেখ মুজিব কী এর বাইরে? তিনি তো কলকাতায় পড়ালেখার সময় থেকে তো বটেই এর আগের জমানা থেকেই মুসলিম জাতিবাদী – সেকালে এর প্রকাশের নাম ছিল মুসলিম লীগ!    আর সবচেয়ে বড় কথা খোদ শেখ হাসিনা তাঁর বাবার এই মুসলিম লীগার নেতার পরিচয় একটুও লুকান নাই, মুঝে ফেলেন নাই বা আড়াল করে দেন নাই। গর্বের সাথেই অবলীলায় ছাপতে বলে দিয়েছেন! হাসিনার তত্বাবধানে প্রকাশিত শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী হাসিনা কোথাও এডিট করে কিছুই একালে বাদ দিতে দেন নাই।  প্রফেসর আনিসুজ্জামান সহ যারা এডিটরিয়াল বোর্ডে ছিলেন তারা সুপারিশ করলেও হাসিনা তাদের কথা শুনেন নাই।  এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে!! যদিও ১৯০৬ অথবা ১৯৪৭ সালের মুসলিম লীগ আর ১৯৫৪ সালের পর থেকে হয়ে যাওয়া মুসলিম লীগ আর এক থাকে নাই; ১৯৭১ সালে যেটা একেবারেই পুর্ব-পাকিস্তান অথবা বাংলাদেশ-বিরোধিই হয়ে গেছিল – সেসব কথা আলাদা। অন্যভাবে বললে এক. মুসলিম জাতিবাদ  এই কনসেপ্ট-টা সব সময় একই বা একটাই সাংগঠন এর মাধ্যমের প্রকাশিত বা প্রতিনিধিত্ব হয় নাই!  আর দুই. এটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ। ভারত এপর্যন্ত যা করেছে – হিন্দুত্ববাদ কে যেমন যতটা তীব্র অথবা সফট মাত্রায় হাজির করেছে বা বাংলাদেশ সম্পর্কে যা নীতি-পলিসি নিয়েছে আর তাতে বাংলাদেশ এরই যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে এর  নাম হচ্ছে “মুসলিম জাতিবাদ”; তবে এটা অবশ্যই প্রতীকী নাম!
    আর সম্ভবত এজন্য বলা হয়, আমরা নিজেরাই আমাদের শত্রু বা অপছন্দের ব্যক্তিত্বের আকার-বৈশিষ্ট কেমন হবে এরই মূল জন্মদাতা!

    আমাদের আদি পাপ  আমাদের বাধাঃ
    কনষ্টিটুয়েন্সি
    শব্দটার আক্ষরিক অর্থ ভোটার – জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে যারা সেই ভোটার। আবার এর আরেক বাংলা ভাষ্য আছে। যেমন আমরা বলে উনি কোন আসনথেকে দাড়িয়েছেন। কথ্য ভাষার এই আসন শব্দটাই নির্বাচন কমিশনের খাতায় লেখা আছে কনষ্টিটুয়েন্সি বলে।তসিকমিশন বলবে উনি কোন কনষ্টিটুয়েন্সি থেকে দাড়িয়েছেন। মূল বা রূট শব্দ কনষ্টিটুট [constitute] শব্দের অর্থ হল গঠন করা; সেখান থেকে এখানে রাষ্ট্রগঠনসম্পর্কিত আলাপ করছি আমরা। তাই কনষ্টিটুয়েন্সি মানে যারা রাষ্ট্রগঠন করে সেই ভোটার।
    এবার তাহলে বিএনপি এই দলের ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি কারা? এই প্রশ্নের অর্থ হল সমাজের কোন ধরণের ভোটার বিএনপি-কে ভোট দিয়ে থাকে – এমন কোর [core বাংলায় শাঁস] সমর্থক আমাদের সমাজের কোন গোষ্ঠির মানুষেরা? তাই এই প্রশ্নের জবাব হল, বিএনপি হল কোর কনষ্টিটুয়েন্সি মুসলিম জাতিবাদ।  কোর মানে যাদের ভোট নড়চড় হয় না বিএনপিতেই আসে; আর এদের ছাড়াবা  বাদে বাকি ভোটার হল ফ্লোটিং। যারা যখন পক্ষে কখনও বিপক্ষে ভোট দিয়ে থাকে। 

    এখন “প্রগতিশীলতার” প্রভাবে পড়ে মুসলিম জাতিবাদ মানে মুসলিম শব্দটা শুনেই ঝাপিয়ে পড়বেন না বা দুরত্ব তৈরি করবেন না। কেবল খেয়াল করে দেখেন, বৃটিশ ভারতে প্রথম রাজনৈতিক দল কংগ্রেস এটাকে তো হিন্দু জাতিবাদি দলই বানানো হয়েছিল। যার রূট খুঁজলে ১৮১৫ সালের রাম মোহন রায়ে যেতে পারেন। পরবর্তিকালে গান্ধী-নেহেরুরা একাজই করেছে; হিন্দু জাতিবাদকে সাফাই দিয়ে গেছে।  অথচ  হিন্দু জাতিবাদ শব্দটা শুনলে আপনার মনে দুরত্ব তৈরি করার কোন প্রতিক্রিয়া না হলে বুঝবেন আপনি প্রগতিশীল এবং মুসলমানবিদ্বেষী। একথাত বিরুদ্ধে সাফাই হিশাবে আপনার মনে হতে পারে যে আপনি তো আসলে ধর্মীয় জাতিবাদের বিরোধিতা করছেন! কিন্তু না; করছেন না।  করলে তো হিন্দু জাতিবাদ শুনলেও একই দুরত্ব তৈরির প্রতিক্রিয়া হত!! তা তো হয় না। বরং প্রগতিশীলেরা কংগ্রেস দলকে আপন মানে। অনেকটা নিজেরই তবে আপনি তো জাতে উঁচা আর এরা হল আম “পপুলার অংশ”। আর তা মনে করে সাথেই রাখেন, আপন মানেন। অথচ মূল কথাটা হল, আপনি সংখ্যাগরিষ্ট এই যুক্তিতে হিন্দু জাতিবাদ এর দল খুললে এটা অবশ্যই প্রতিক্রিয়ায় একটা মুসলিম জাতিবাদি দলও অবশ্যই তৈরি হবে।  কারণ,  হিন্দু জাতিবাদ দল খুলে আপনি মুসলমান নাগরিকদেরকে একা, বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন, ঠেলে দিয়েছেন মুসলিম জাতিবাদ করতে। বুঝিয়ে দিয়েছেন তারা আপনার সমান নয় – নিচা, আপনারই অধীনস্ত, পায়ের নিচের লোক!  আর এই হল আমাদের আদি পাপ!!!
    এরই সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ১৮৮৫ সালে জন্মানো কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়ায় ২০ বছরের মধ্যে ১৯০৬ সালের মুসলিম লীগ!  কারণ, ব্যাপারটা হল, আপনি যদি অপরের এক ধর্মকে নিচা দেখান, গালমন্দ করেন – মনে রাখবেন সব ধর্মের চোখেই অপর সবগুলো ধর্মই মিথ্যা, তাদের ritual-রিচুয়াল  (শরীয়তি আচার নিয়মগুলো) অর্থহীন – কোন মানে হয় না – বুজরুকি ভন্ড ইত্যাদি মনে হতেই পারে। আসলে আপনি আপনার ধর্মের রিচুয়ালের সাথে মনে মনে তুলনা করছেন আপনারটাই  সবচেয়ে সহি  এই বিবেচনায়!  কিন্তু পরক্ষণেই আপনার বিবেকবান হওয়ার কথা।  সে কারণে, বুদ্ধিমান লোকেদের বুঝ এখানেই থামবে না। কারণ, সে সাথে সাথে বুঝে যায় যে তাহলে তো অপর ধর্মের লোকেরাও আমার ধর্মকেও একই নিচা বা ‘মানে হয় না’ এমন আরেক  নিচা ধর্ম ও রিচুয়ালের লোক হিশাবে দেখছে!!!  সেটাও তো আপনার কাম্য হতে পারে না! তাহলে  এথেকে মুক্তি বের হবার পথ কী? 

    খুবই সহজ।  পথটা হল যে, কারোরই অপরের ধর্ম-রিচুয়াল-কে নিচা দেখানো উচিত না।  নিজের ধর্ম  সেফ রাখা বা বাঁচানোর জন্য।  তাহলেই সকল ধর্ম অপমান, নিচা দেখানো ইত্যাদির হাত থেকে বাঁচতে পারে। এজন্যই সকলের চোখে নিজ নিজ ধর্ম শ্রেষ্ঠ এই বোধ থাকলেও কোন বুদ্ধিমান মানুষ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ববোধ অন্যকে মানতে বাধ্য করে না, চাপায় দিতে যায় না অথবা মানতে হবে বলে দাঙ্গা বাধায় দিতে যায় না। এটা সে করতে পারে না। একমাত্র এমন হলেই সকল ধর্মই আপন আপন জগতে শ্রেষ্ঠ থাকতে পারে। কোন সমাজে এমন বোধ বেশিরভাগ মানুষের ভিতর এলে তবেই একটা রাষ্ট্রগঠন সম্ভব। যে রাষ্ট্রকে অবশ্যই  সবার  ইচ্ছামত নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা  নিশ্চিত করতে হবে – নাগরিক অধিকারের বিচারে নাগরিক মাত্রই সকলের অধিকার সমান; কোন বৈষম্য করা যাবে না – এই নীতিতে  তা গড়ে তুলতে হবে।  কিন্তু মনে রাখতে হবে আদি পাপ  আমাদের বাধা দিয়ে রেখেছে; যেটা সবার আগে পাশ কাটাতে হবে!!    

    আমাদের মূল আলোচ্য প্রসঙ্গে ফিরছিঃ
    ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সির বিচারে বিএনপি এই দলের কোর সমর্থক ভোটার বেজ হল  “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার। বিপরীতে আওয়ামি লীগেরও বাঙালি জাতিবাদি কোর ভোটার ঐ ৩৩% এর আশেপাশে তবে এসবই ২০০৯ সালের আগের হিসাব ও অনুমান।  ভোটার হিশাবে সমর্থদের  এই মৌলিক ভিত্তিগত ফারাকের কারণেই আওয়ামি লীগ কখনও বিএনপি হতে পারে না, পারবে না; বিপরীতে বিএনপিও লীগ হতে পারবে না।  তাহলে, মির্জা আলমগীরের এই আল-টপকা মৌলবাদ শব্দের ব্যবহার এর মানে কী? নিজের পায়ে কুড়াল  মারা? হা ঠিক তাই! মানে সিপিবির কোন নেতার যেন বিএনপির সেক্রেটারি হয়ে যাবার দশা??? এমন আনফিট এক দশা-পরিস্থিতি! আচ্ছা, তাই  বিএনপি ভোটের রাজনীতিতে যে  “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটারদের দল, সে  কি করে কথিত “মৌলবাদবিরোধি” হয়! কারণ ভারতের চোখে আর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের চোখে খোদ বিএনপি তো মৌলবাদি দল!!!  আর আমরা ভারতের অযাচিত প্রভাব বিরোধী ফলে প্রতিরোধী যেকেউই তো আসলে ভারতের চোখে মৌলবাদী ট্যাগপ্রাপ্ত!! মানে   মূলত মুসলিম জাতিবাদী ভোটারের দল বিএনপি কিভাবে  নিজ সমর্থক ভোটারের বিরুদ্ধে যাবে? চাইলেও কী যেতে পারবে? [ তবে বছর দুয়েক সময় পেলে পারবে হয়ত কিন্তু তাতে চিত্রটা দাঁড়াবে এভাবে যে “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার ভিত্তিক আরেকটা নয়া দল গড়ে উঠেছে। ফলে আজকের বিএনপি পরিণত হয়ে উঠতে পারে এক কথিত মৌলবাদিবিরোধী বিরুদ্ধে নয়া এক প্রগতিবাদি বিএনপি হতে চেষ্টা করতে পারে; যেটা হবে আসলে ভারতের পছন্দের এক আওয়ামি বি-টিম যার কোর সমর্থক হতে পারে বড়জোর ১০%।

    তাহলে মির্জা এত দ্রুত এমন “মৌলবাদ-বিরোধী” বক্তব্য কেনঃ
    মূল কথাটা হল, মির্জা নিজেই আল-টপকা  “মৌলবাদ-বিরোধী”বা পক্ষ বলে তর্কটা নিয়ে গেছে।  অথচ কোন মৌলবাদ-তর্ক তো হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে ইস্যু ছিল না!
    যদিও গত ২০১৫ সাল থেকেই বিএনপির মধ্যকার এক বেহুশ আর পোলাপানি চিন্তা দেখা দিয়েছিল যে,  প্রগতিবাদিদের মত মৌলবাদ-বিরোধি বক্তব্য দিতে পারলে দল ভারত ও পশ্চিমা শক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য হবে – যেন আওয়ামি সমতুল্য হবে দল!  মানে এরা সেই থেকে বেমালুম অসতর্কতায়  নিজ “মুসলমান জাতিবাদি” কোর সমর্থক গোষ্ঠিরই বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চেয়ে চলেছে। কিন্তু কেন? কারণ, বিএনপির অস্থির কথিত তরুণ নেতাদের অপুষ্ট বুঝের বোকা-অনুমান হল ভারতের সমর্থন ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না। আওয়ামি লীগকে দেখেই তাদের এই সর্টকাট অনুমান!  অথচ মূল কথাটা হল, বাংলাদেশের উপর ভারতের কর্ত্ত্বত্ব ও প্রভাব ভারতের নিজ মুরোদে সৃষ্ট হয় নাই। আসে নাই। এটা এককালে আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল তাই। কিন্তু এখন বাইডেন প্রশাসন ভারতের সাথে সেই বিশেষ [চীন ঠেকানোর ঠিকাদারির দায় থেকে ভারতকে মুক্ত করে দিয়েছে]। শুধু তাই না, এরপর বাংলাদেশের উপর পুরানা ভারতীয় প্রভাব ভেঙ্গে দিয়ে বাইডেন নয়া সম্পর্ক গড়তে নয়া পলিসি-অবস্থান নিয়েছে। যেটা শুধু বাংলাদেশের উপর ভারতের মাতব্বরি উপড়ে ফেলাই নয়,  ভারত-আমেরিকার পুরানা সম্পর্কে-কেও বদলে নিবে!  এবার গত জুনে ২২-২৪ মোদির বাইডেন সফর তাই  সেই সফর ছিল মূলত সামরিক ক্রেতা-বিক্রেতার সাক্ষাত-সফর। যা মূলত ভারতে (যুদ্ধ বিমানের ইঞ্জিন বানানোর কারখানা বসানোতে) আমেরিকার বিনিয়োগ সংক্রান্ত…। এর সাথে রাজনৈতিক বা স্ট্রাটেজিক কোন ইস্যু নাই, আলোচনার এজেন্ডা বা তালিকায় তা ছিল না।

    কিন্তু লেটেস্ট ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক বিষয়টা – এসব পরিস্কার জানা সত্বেও মোদি-হাসিনা ভান করতে চায় যে যেন ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক আগের মতই আছে। ফলে মোদিও যেন আমেরিকার কাছে হাসিনার সুপারিশকারিই এখনও আছে। এই ভান এর উপর ভিত্তি করে গত দুদিনের মিথ্যা প্রপাগান্ডা চলছে, আওয়ামি কর্মিদের মনোবল বাড়াতে! আর তাতেই এক সিপিবি কর্মি যেন বিএনপির সেক্রেটারি হয়ে বসে গেছে অবস্থা!! রাজনীতির খোঁজ-খবর বা অভিমুখ না জেনে না রেখে রাজনীতি করা যায় না। মির্জা ফকরুল-সহ তাদের নীতিনির্ধারকদের ভুল-অনুমান হল, এভাবে মৌলবাদের কথা তুললে নিশ্চয় আমেরিকা বা পিটার হাস খুব সন্তুষ্ট হবে আবার ওদিকে মৌলবাদবিরোধি গলা চড়ালে মোদির হিন্দুত্ববাদও বেজায় খুশি হবে। অথচ ওরা খবর নেয় নাই সেকালে নব্বইয়ের দশকে মৌলবাদ বলতে এর প্রধান পৃষ্টপোষক বলতে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা আমেরিকাকেই বুঝাত – এতে তাদের সেই বয়ান হল,  “মৌলবাদ উত্থান” ঘটার জন্য প্রধান অভিযুক্ত আমেরিকা!
    মির্জা ফকরুলের মুখ দিয়ে বের হওয়া যে বয়ান হাজির হয়েছে এটা চলতে থাকলে ক্রমশ এটা এমন নয়া বাস্তবতায় পৌছাবে সেটা হল  বাংলাদেশের “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার সমর্থকদের দল হিশাবে বিএনপি তার স্থান হারাবে।  আর তাতে ভিন্ন এক নয়া দল গঠিত হয়ে এর উপর ভর করে নয়া এক ‘মুসলিম জাতিবাদি’ কনষ্টিটুয়েন্সির দল হাজির হতেও পারে। যা বলাই বাহুল্য বর্তমান বিএনপিকে শুকিয়ে ফেলবে।

    মুসলিম জাতিবাদ আসলে কী কেন তা টিকে থাকতে থাকবেঃ
    একালের এর পিছনের মূল কারণ গত পনেরো বছরের হাসিনা শাসনের আড়ালে ভারতের লুটপাট  – বিনাপয়সার করিডোর থেকে শুরু করে ভারতের বাংলাদেশ থেকে যা তাদের নেয়া দরকার সবই তারা নিয়ে যাচ্ছে। খোদ হাসিনার ভাষাতেই বললে তিনি আমাদের  জানিয়েছেন, “ভারতকে যা দিয়েছি ওরা আজীবন মনে রাখবে”। তাই এখনকার বাংলাদেশ হল, ভারতবিরোধিতা এক টইটম্বুর – চরমে উঠা বাংলাদেশ – মনে রাখতে হবে এটা খোদ ভারতেরই সৃষ্টি – ভারতের এই লুটপাট সব কাজে ভারতের স্বার্থ এর প্রায়োরিটি – এসবই করে চলেছে গত ১৫ বছর ধরে। সবচেয়ে বড় কথা রাষ্ট্রের শাসনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর সুযোগ বন্ধ! যার সোজা অর্থ ভারতের এই হিন্দুত্ববাদি চোখ বাংলাদেশের নিজ স্বার্থকে ভারতের পায়ের নিচে নেওয়া এর বিরুদ্ধে নিরব জন-প্রতিরোধ বা রেজিসট্যান্স [resistance]   – এর প্রতীকী নামই মুসলিম জাতিবাদ। এটাই একালের মানে! অতএব ভারতের হিন্দুত্ববাদি ‘বাংলাদেশ নীতি’ এরই ডেকে আনা বিপরীতের নাম  “মুসলমান জাতিবাদি” প্রতিরোধ; তাই এই পরিচয় নিয়েই তাদেরকে আরো থাকতে হবে। তাতে বিএনপি তাদের প্রতিনিধিত্ব করবে বা যোগ্য থাকবে কিনা সেটা বিএনপি-কেই নির্ধারণ করতে হবে। ভোটার গোষ্ঠি অবস্থাকেই পুষ্ট করার জন্য নয়া কোন দল হাজির হওয়া বা আগিয়ে আসা – এসব সেক্ষেত্রে কোন অসম্ভব বা দুরের কিছু না।

    তবে ভারত যে মিথ্যা “কূটনীতিক বার্তার” কথা তুলে আওয়ামী কর্মিদের হতাশা ভেঙ্গে মন চাঙ্গা করতে চেষ্টা করেছে সেটা এখন কমবেশি পরিস্কারঃ
    আর এতে ভারতীয়  “সাফাই ভাষ্য” চরমভাবে দুর্বল।  তারা বলছে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে হাসিনা ফিরে ক্ষমতায় না থাকলে ভারতের স্বার্থ বিঘ্নিত হবে – এটাই কথিত সেই ভারতীয় বার্তা। এখন একবার ভেবে দেখেন, দুনিয়ার কোন নির্বাচন কমিশন অথবা আদালতের কাছে এটা তো বলাই যায় না যে আমি ওমুককে বিজয়ী দেখতে চাই। অথবা (আদালতের কাছে) ওমুকের ফাঁসির রায় চাই। একথা বলার মানে হয় না। কারণ এটাই তো নিশিভোট! কোন নির্বাচন ফলাফল কেমন হতে হবে তা আগাম দাবি করে বলার মানে হল সেটা আর নির্বাচনই নয়। অথবা শাহবাগের মত দাবি – আগাম ফাঁসির রায়ই হতে হবে বয়ে রায় চাই একথা বলার মানে হল সেটা আর বিচার নয় বা আদালতের রায় নয়। এছাড়া ভিন্ন একটা দেশ, বাংলাদেশের নির্বাচনে হাসিনাকেই বিজয়ী দেখতে চাই এটা কী বলা যায়? মানে হয়? নাকি এসব কথা  জনসমক্ষে প্রচার হয়ে যাবার পর আমেরিকার পক্ষে ইচ্ছা থাকলেই কী এসবের বাস্তবায়ন বা মেনে নিতে পারবে???

    সারকথায় এটা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আমেরিকা দিবার মত কোন “ভারতীয় বার্তাই” হয় নাই – কোন কূটনীতিক বার্তা হওয়া দূরে থাক!   এটা “শাহবাগী ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই” – এর চেয়েও ন্যাংটা উলঙ্গ এক বর্বর ভাষ্য! যেমন, আমরা কী বলতে পারি যে আমরা ভারতের আগামি নির্বাচনে মোদিকেই আবার ক্ষমতায় দেখতে চাই; এটাই বাংলাদেশের স্বার্থ!!!!!
    এধরনের বাচালদের কাজ কামে আমেরিকার জড়িত হবার নুন্যতম সম্ভাবনা নাই। বাইডেনের আমেরিকা অন্য নানান ইস্যু পদক্ষেপে ভুল করতে পারে, অন্যায় করতে পারে। কিন্তু তারা বোকা নয়।  তাহলে এসব কথিত ভারতীয় বার্তার একমাত্র লক্ষ্য হল, ভেঙ্গে পড়া আওয়ামি কর্মিদের চাঙ্গা করারই এক অকেজো চেষ্টা মাত্র!

    আপডেটেডঃ    ২২ আগষ্ট ২০২৩;  সকাল ০৭ঃ ৩৫
    সর্বশেষ আপডেটেডঃ  ২৩ আগষ্ট ২০২৩;  সকাল ০৮ঃ ২৫

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • আনন্দবাজার-অগ্নি রায়ের গায়েবী “সুত্রে” যা খুশি লিখা 

     

    আনন্দবাজার-অগ্নি রায়ের গায়েবী “সুত্রে” যা খুশি লিখা
    গৌতম দাস
    ২০ আগষ্ট ২০২৩   মধ্যরাত ১২ঃ ৩৬

    https://wp.me/p1sCvy-4Ox

     

            হাসিনাকে দুর্বল করলে ক্ষতি সবার, বার্তা আমেরিকাকে

     

    ঘটনা বড়ই অদ্ভুত! ভারত বাংলাদেশ বা হাসিনা সরকারকে নিয়ে তাদের ভাষায় “বাংলাদেশের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের বার্তা”  এমন কোন বার্তার অস্তিত্ব আদৌ আছে কিনা এর কোন খবর নাই। আনন্দবাজার, ডয়েচ ভেলে, প্রথম আলো অথবা  ওবায়দুল কাদের (সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী) এমন কারো কাছেই এমন খবরের নিশ্চয়তা নাই; কেউই নিশ্চিত করেন নাই বা এমন খবরের রেফারেন্স কী তা বলেন নাই। অথচ গতকাল থেকে এখনও কথিত এই ভারতীয় বার্তা নিয়ে প্রায় সব পক্ষই কথা বলে চলেছে। “ভারতীয় বার্তা” বলে কিছুর অস্বিত্ব কী? তা না বলে  যারা এনিয়ে কথা বলছেন তারা অন্যায় করছেন।  এভাবে “ভারতীয় বার্তা” বলে কিছু থাকলে তার কথা এই…... এভাবে শর্ত সাপেক্ষে নিজের কথা বলছেন। অথচ এভাবে কথা চলতে পারে না, মানে হয় না। খুব সম্ভব কয়েকদিনের মধ্যে ভারতের এক সরকারী ভাষ্য এখন আসন্ন যেখানে তারা বলবেন –  না তো এমন কোন ভাষ্য তো আমরা দেই নাই!!!!!
    অথচ এবার আনন্দবাজারের সাথে একইভাবে খবরের উৎস কী সেটা উল্লেখ না করে গায়েবী লিউজ ছেপেছে ডয়েজ ভেলে।  আর এই মিথ্যা গায়েবী খবর প্রথম আলো ডয়েচ ভেলের বরাতে ছেপেছে।  দাবি করেছে “কূটনৈতিক নোটে ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার দুর্বল হয়ে পড়লে ভূরাজনৈতিক দিক থেকে তা ভারত এবং অ্যামেরিকা কারও পক্ষেই সুখকর হবে না”। কিন্তু কোথায় ভারত এমন  কূটনৈতিক নোটে জানিয়েছে এর কোন হদিস নাই। মানে এরাও প্রথম আলো, স্টার, আনন্দবাজার এর মত একই দলে যোগ দিল। এতে বলাই বাহুল্য ডয়েচ ভেলে কেও মূল্য চুকাতে হতে পারে।   যেন সকলে এরা হাই স্টেকে জুয়ারি জুয়া খেলতে নেমেছে সাংবাদিকতা নামে!!!!

    আনন্দবাজারের অগ্নি রায় যা শুরু করেছিলেনঃ
    প্রথম কথা হল আজকের আনন্দবাজারে অগ্নি রায়ের লেখাটা এটা কোন সাংবাদিকতা-ই নয়। এটা আসলেই এক বাজারি লেখা যার পায়ে কেবল ঘুঙ্ঘুরটাই নাই!  একটা মনগড়া  আর কোন রেফারেন্স ছাড়া কিছু  রচিত বাক্যের গল্প বলা যায় একে বড় জোর। যেমন এই বানানো গল্পটা মোট ৪৪৪ শব্দের। কিন্তু তাতেই এর ভিতর অগ্নি রায় চার বার  “সুত্র বলছে” ব্যবহার করেছেন। মানে সোজাসাপ্টা এটা গায়েবী কথাবার্তা যার বাপ-মা নাই।  আর এধরণের চাপাবাজি শব্দ আর মিথ্যা কথাই সেখানে আছে। তবে আনন্দবাজারি লেখায় “সুত্র” মানে তা ইংরাজি সোর্স [source] এর বাংলা করেছে তারা এভাবে। আর এভাবে কথিত “সুত্র” এর কথা বলে আনন্দবাজার সাংবাদিকতায় খবরের সোর্স বলার বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যেতে চায়। এটাই অসৎ জার্নালিজম!   জার্নালিজমে নুন্যতম ফেয়ার [fair] বা সৎ জার্নালিজমের প্রধান ও নুন্যতম শর্ত হল খবরের সোর্স উল্লেখ করতেই হয়; পাঠক-কে জানাতেই হয়। অথচ এই ৪৪৪ অক্ষরের গল্পটার মধ্যে কোন উপযুক্ত সোর্সের কথা উল্লেখ নাই। অথচ সমানে যা খুশি তাই দাবি করে চলা হয়েছে। অথচ আনন্দবাজার প্রবর্তিত সেই অস্তিত্বহীন কথিত “ভারতীয় বার্তা” প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের আর মির্জা ফকরুল পর্যন্ত কথা বলে ফেলেছেন!!
    তবে আরো সব প্রসঙ্গে ঢুকবার আগেই পাঠককে মনে করিয়ে দেই। বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের এবার এখন একেবারে ঘুম নাই অবস্থা তৈরি হয়েছে। সেকথা ভারতের ভাষাতেই বললে, ভিসানীতি ধরণের স্যাংশন দিয়ে হাসিনাকে নির্বাচন করতে বাধ্য করা হলে সেটাতে নাকি ভারতের স্বার্থ খুন্ন হবে। এটা আবদি বা সুবীর ভৌমিক আমাদেরকে খোলাখুলিই জানিয়েছে।  যার মানে হল, হাসিনাকে ভোট কারচুপি বা রাতের ভোট করতে দিলেই একমাত্র ভারতের স্বার্থ রক্ষিত হবে।  যার সারকথাটা হল, নির্বাচন এর নামে যা হবে হোক কিন্তু শেষে হাসিনাকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে নাহলে নাকি ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ ক্ষুন্ন হবে। এমনকি তাদের বিদেশ মন্ত্রণালোয়ের মুখপাত্রও অরিন্দম বাগচি আমাদেরকে কনষ্টিটিউশন মাফিক মানে হাসিনার মাপে চলতে হেদায়েত করেছে।

    এখন এসবের সারকথাটাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভারতের মিডিয়ায় লেখা হচ্ছে। এবং খুব সম্ভবত এটা চলতি বছরের দ্বিতীয় বড় ঢেউ তোলা ফাঁপা উচ্ছ্বাস এর চেষ্টা।  যার প্রথমটা তোলা হয়েছিল মোদির আমেরিকা বা বাইডেন সফরের কালে (২১-২৪ জুন ২০২৩), আগে ও পরের সময়ে। কিন্তু এসব মিথ্যা হাইপ তোলার দায় দায়িত্ব না নিয়ে ও অস্বীকার করে ভারতের বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর ২ জুলাই জানায়ছিলেন একেবারে উলটা কথা – যে ভারত নাকি “প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে”।  [এপ্রসঙ্গে আমার সেসময়ের লেখা – “জয়শঙ্করের কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’!” – লেখাটার লিঙ্ক এখানে]।  তার মানে অগ্নি রায়দের মত মিথ্যা প্রপাগান্ডা লেখকদের পরিণতি মাত্র গত মাসেই আমরা দেখেছি; যখন জয়শঙ্কর এসবের কোন দায়দায়িত্বই নেন নাই। অথচ তাসত্বেও  আনন্দবাজার ও অগ্নি রায়েরা এবার আবার দ্বিতীয় বড় ঢেউ তোলা ফাঁপা উচ্ছ্বাস শুরু হয়েছে।

    তবে খুব সম্ভবত এবারের পটভুমি হল আগামি মাসে [৯-১০ সেপ্টেম্বর] অনুষ্ঠিতব্য ভারতে G20 নেতাদের সম্মেলন। নিচে সংক্ষেপে G20 জিনিষটা কী তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যাদের হাতে সময় কম তারা এটা পার হয়ে এরপরের প্যারাতেও চলে গিয়ে সেখান থেকে পড়া শুরু করতে পারেন। ভারতের জনসংখ্যা এখন চীনের চেয়েও বেশি। ফলে সে পটেনশিয়াল বা সম্ভাব্য বিনিয়োগ গ্রহিতা। তাই এবারের সম্মেলন সেখানে।

    G20 নেতাদের সম্মেলন কীঃ
    দুনিয়াতে যেসব রাষ্ট্রের জিডিপি সবার চেয়ে উপরের দিকে এমন টপ ২০টারাষ্ট্রের  কমন অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে কথা বলার এক জোট হল এই G20। প্রতিবছর নানান দেশে এর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এটা গড়ে উঠার ইতিহাস হল, এক কথায়, এটা মূলত ওয়াল স্ট্রিট [wall Street]  নিউইয়র্ক,  এর আগ্রহ ও আবেদনে গঠিত ও সৃষ্ট।  ওয়াল স্ট্রিট এক প্রতীকী নাম বা শব্দ যার অর্থ এটা বিরাট বিরাট পুঁজি (ঋণ দেয়া) বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠান। এর এতই বড় প্রতিষ্ঠান যা কমিউনিস্টদের কল্পনাতেই নাই। নাই কারণ, এবিষয়ে তাদের প্রধান গুরু জোসেফ স্তালিনেরও কোন ধারনা ছিল না। কিন্তু তামাসাটা হল,  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রধান যুদ্ধের খরচ যোগানদার ও নেতা ছিলেন অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। রুজভেল্টের অর্থনৈতিক-সহ সবধরণের সহযোগিতাতেই স্তালিন তার সোভিয়েত ইউনিয়নকে হিটলারের জার্মানির হাতে আক্রান্ত ও পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এখানে আসল কথাটা হল, রুজভেল্টের পিছনে ছিল এই ওয়াল স্ট্রিট -ই। ওয়াল স্ট্রিট এর বৃহত ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে করিতকর্মা ও দক্ষ কর্মিরাই ছিল রুজভেল্টের মন্ত্রী, প্রশাসক, পরামর্শদাতা, বিভিন্ন সরকারি কমিশনের প্রধান ইত্যাদি সবকিছুতে...। আর স্তালিন মারা যান ১৯৫৩ সালে, মারা যাবার আগে তিনি জানতেন যে ওয়াল স্ট্রিট  কী জিনিষ এমন প্রমাণ কেউ দেখে নাই।  সম্ভবত একারণেই, পরবর্তিতে স্তালিনের অনুসারি কমিউনিস্টদের কল্পনায় সবচেয়ে বড় পুঁজির কারবারী  হল, বহুজাতিক কোম্পানি [MNC: Multi National Corp.] বা কর্পোরেট হাউজগুলো। আর আমাদের মত দেশের কমিউনিস্টেরা অনুসরণ করে ইউরোপীয় কমিউনিস্টদের। যেখানে ইউরোপীয় কমিউনিস্টদের চোখেও ওয়াল স্ট্রিট বলেই কিছু নাই। তাই বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের তো খবরই নাই।
    এই MNC দেরই বাপ হল ওয়াল স্ট্রিট। সেটা এই অর্থে যে MNC গুলোকেই  বড় বড় পরিমাণ পুঁজি ঋণ বা বিনিয়োগ হিশাবে দেয় ওয়াল স্ট্রিট; মানে ওয়াল স্ট্রিটের বড় বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো।  তাই ওয়াল স্ট্রিট শব্দের আলোচ্য প্রসঙ্গে মানে হল যাদেরকে বিনিয়োগ পুঁজির বাজারকে বাড়াতে সব সময় নয়া বাজারের খোঁজে বেরাতে হয়। এজন্য এরা প্রভাবশালী রাষ্ট্র বা অর্থনীতিগুলোকে তারা চাপ দিয়ে বেড়াতে হয়।  ওয়াল স্ট্রিট এর আবেদন ও দাবি হল, তোমরা  G20 দেশগুলো বছরে একবার করে নিজেদের মধ্যে বসে সমন্বয় বাড়াও, এতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য আরো বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাধাগুলো কী তা নিয়ে আলাপ করে বড় ২০ দেশ কোঅর্ডিনেটশন বাড়াও। কারণ, একমাত্র তাহলেই ওয়াল স্ট্রিট এর বাজার বাড়বে; মানে এতে তোমাদের অর্থনীতিও বাড়বে দ্রুত।  এই হল সংক্ষেপে G20।

    কিন্তু মোদির ছেঁচড়ামো গেল না। ভারতের জনসংখ্যা এখন চীনের বেশি হয়ে গেছে বলে ভারত এখন চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া অর্থনীতি যেন হয়ে গেছে  তা একেবারেই নয়। তবে ওয়াল স্টিটের চোখে ভারত পটেনশিয়াল রাইজিং বলে সে  বড় জোর সম্ভাব্য পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে বিনিয়োগ ঋণ গ্রহিতা। এতটুকুই। আর মোদিকে এই সম্ভাবনাটাকেই বাস্তব করে দেখাতে পারতে হবে, ভারতের অর্থনীতিকে  বাস্তব গতি দিতে পারতে হবে। মানে ভারত জি-২০ সম্মেলন করেছে বলেই ভারতের অর্থনীতি তেমন উচা হয়ে গেছে তা একেবারেই নয়। কিন্তু মোদির ছেচরামি হল, তাকে ভারতের অর্থনীতি সে জায়গায় উচা করার আগেই এর ফায়দা নিতে হবে – এই লাইনে রওনা দিয়েছে। আর সেই সাথে ভাব করতে হবে ভারত যেন পরাশক্তি। তবে এই ভাব-ভাষ্যটাই মোদি আভ্যন্তরীণ ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার করে ভোট তুলতে চায়।  আর এরই সাথে হাসিনার বাংলাদেশ জি-২০ দেশগুলোর ধারেকাছেরও কেউ না হওয়া সত্বেও মোদি হাসিনার বাংলাদেশ তার অধস্থন  হাতা-ল্যাসপেন্সার এই অপমান করার বিনিময়ে হাসিনাকে  জি-২০ এর দাওয়াত করে এনে দেখাতে চায়। তার নিজ দেশে দেখাতে চায় যে মোদির ভারতেরও অধস্থন এক  হাতা-ল্যাসপেন্সার দেশ-সরকার আছে!!! এটাই মোদির ছেচরামি!!! অথচ কার্যত অনাহুত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে আমরা ঐ সভায় কী সম্মান পাবো সেখানে??  বড়লোক বন্ধুর বিয়েতে যেতে পেরেছি তা অনেক গরীর বন্ধু এক বিরাট অর্জন বা জাতে উঠা বলে মনে করতে পারে, এটা সেরকমই কিছু একটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি!!!

    সেটা কী দাঁড়াবে তা দেখা যাবে। এর আগে অনেক কিছুই ঘটবে। তবে এনিয়ে আপাতত আনন্দবাজার ও অগ্নি রায়েরা এবার আবার দ্বিতীয় বড় ফলস এক ঢেউ তুলতে চাইছে।   যেমন শিরোনাম থেকেই বিশ্লেষণ শুরু করা যাক। অগ্নি রায় বলছে “হাসিনাকে দুর্বল করলে ক্ষতি সবার, বার্তা আমেরিকাকে”। এখানে সবারটা কে কে? একা মোদির ভারত ছাড়া তো কেউ নাই। আমেরিকাই তো ভারতের সাথেই নাই। অগ্ন রায় যেটা এককালে ছিল যেন সেটা এখনও আছে এই মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে একথা বলছেন। মানে ২০০৭ সালের যে আমেরিকা বাংলাদেশে হাসিনাকে বসিয়ে সেই বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল – সেই আমেরিকা তো এখনকার আমেরিকা নয়। দেখাই যাচ্ছে হাসিনা সরকারই বলতেছে, আমেরিকা তাকে উতখাত করতে চায়। সর্বশেষ ১৬ আগষ্ট সরকার বলছে, আমাকে সরানোর চেষ্টা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী, লিঙ্ক দেখেন। অথচ অগ্নি রায় গল্প ফেঁদেছে হাসিনা সরকার দুর্বল হলে নাকি সেটা আমেরিকারও ক্ষতি?? মানে সোজাসাপ্টা একটা আরেকটার বিপরীত কথা!
    এরপরে স্টোরির শুরুতে অগ্নি রায়ের প্রথম বাক্য “বাংলাদেশে হাসিনা সরকার দুর্বল হলে তা ভারত এবং আমেরিকা কারও পক্ষেই সুখকর হবে না বলে মনে করে নয়াদিল্লি”। যেটা নিয়ে আমরা উপরে দেখলাম এটা এক ভারতের ছাড়া আর কোন দেশের স্বার্থ নয়।  এরপর পরের বাক্যঃ

    “কূটনৈতিক সূত্রের খবর, একাধিক স্তরের বৈঠকে নয়াদিল্লি
    এ কথা জানিয়েছে বাইডেন প্রশাসনকে।
    সূত্রের খবর— বাংলাদেশের
    আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আমেরিকার বর্তমান ভূমিকায় ভারত যে খুশি নয়,
    ওয়াশিংটনকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে সেই বার্তাও”।

    এটা অগ্নি রায়ের সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী মন্তব্য।  গত জুনেই মোদির আমেরিকা সফরে এটা ফকফকা স্পষ্ট হয়ে যায় যে বাইডেনের সাথে মোদির, বাংলাদেশ নিয়ে কোন কথাই হয় নাই। এছাড়া পরে জয়শঙ্কর উলটা ক্রেডিট নিয়েছে এই বলে যে প্রতিবেশি দেশে ভারত কম জড়াচ্ছে। তাহলে এসব সুত্রের খবর বলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা কেন??  ফ্যাক্টস হল, ত এনিয়ে ওয়াশিংটনকে ভারত কিছুই জানায় নাই। কারণ বাংলাদেশকে নিয়ে একই স্বার্থের পাটাতনে ভারত-আমেরিকা আর নাই।   ভারতের সাথে মিলে আমেরিকার এশিয়াকে দেখার দিন শেষ হয়েছে। বাইডেনের আমেরিকা এখন এশিয়াকে দেখতে চায় ভারতকে ছাড়াই। বরং ভারতের স্বার্থবিরোধি অবস্থান নিয়ে।  আর তা শুধু আগামিতে মোদিকে হারিয়ে রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোটকেই ২০২৪ সালের ক্ষমতায় দেখতে চাওয়া  এতটুকুই নয়। আরো আছে!  কী সেটা?

    বাইডেনের আমেরিকার নয়া এশিয়া নীতি-পলিসি সেখানে কেবল রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোট এর ভারত নয়, সেই ভারত এমন হবে যে হবে যে হবে সম্ভাব্য সারা দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকার পদচারণা করতে চাইছে সেই আমেরিকাকেই সমর্থন করবে, এমন এক অধস্তন অনুসারী ভারতকেই আমেরিকা দেখবার আকাঙ্খা করছে। আরো আছে – আর তা শুরু বাইডেনের বার্মা পলিসি-ই নয়; মানে বাইডেন যেমন আগামি বার্মা দেখতে চায় সেটাকেই ভারত সমর্থ করবে মানে, ওর বিরোধিতার বদলে বরং অ্যামেরিকান স্বার্থের ভিতরেই ভারত নিজের স্বার্থ খুজে নিচ্ছে বা খাপ খাইয়ে নিচ্ছে এমন হতে হবে – শুধু তাও নয়।  এটা হল, সপ্তম নৌবহর কেবল বঙ্গোপসাগরে নয় আন্দামানেও হাজির থাকতে চায়।

    ঠিক যেমন বাংলা ট্রিবিউন লিখেছে, 
    ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে নানা খেলা চলছে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই এলাকাটাকে
    নিয়ে নানা ধরনের খেলার একটা চক্রান্ত। যেহেতু আমি জানি
    , আমি বুঝি যে কীভাবে আমাকে ক্ষমতা থেকে
    সরাবে। তাদের কিছু কেনা গোলাম আছে
    , পদলেহনকারী আছে, তাদের বসিয়ে এই জায়গাটাকে নিয়ে খেলবে।
    সেটাই হচ্ছে প্রচেষ্টা। সেটা আমি ভালোভাবে বুঝতে পারি”।

    কিন্তু হাসিনার এসব বক্তব্যের কারণে কিছুই বদলাবে না। যেমন, ২০০৬ সালের শেষে যদি ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন নিয়ে,  আজ সরকার যেমন বক্তব্য রাখছে, তখনকার  বিএনপি যদি একই রকম বক্তব্য দিত তাতে ওয়ান-ইলেভেন ঘটা বা কিছুই ঘটা আটকাতো না। তখনও ভারত মহাসয়াগরের কথার মত অন্য কথাও তো ছিল। যেমন যদি বিএনপির দিক থেকে  বলা হত এভাবে  যে,  আমাদের বদলে আমেরিকা আওয়ামী সরকারকে ক্ষমতায় আনবে, বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিবে ……ইত্যাদি! তাতে কী কিছু ওয়ান-ইলেভেন ঘটা আটকাতো? মোটেও না।
    এসরের মূল ইস্যুটা হল জনপ্রতিনিধিদের গণবিচ্ছিন্নতা।   এমনকি আজ গণ বিচ্ছিন্নতার দিক থেকে আজকের  হাসিনা সরকারের সেকালের বিএনপির চেয়ে বেশি গণবিচ্ছিন্ন। সেটা এই অর্থে যদি অন্তত একটা ফ্যক্টর বিবেচনা করি যে আমাদের মত দেশে জনপ্রতিনিধিদের অন্তত কিছুটা ভয় বা লজ্জা থাকে যে দিন শেষে আমাকে আবার জনগণের কাছেই ভোট চাইতে যেতে হবে। কিন্তু সেটা এখন থাকত হয়ে গেছে।  গত ১৫ বছর ধরে  সরকার প্রশাসন আমলা পুলিশ এমনকি যেকোন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি তা একেবারে আওয়ামি মাঠকর্মীটারও আর সেসবের পরোয়া করা বালাই নাই। কারণ, সেটাও ম্যানেজ করার মেকানিজম মাঠকর্মী-নেতাদের হাতে পর্যন্ত এসে গেছে। জনপ্রতিনিধিদেরকে ভোট চাইতে আর পাবলিকের কাছে যেতে হয় না – এটাই সে মেকানিজম।  কাজেই  এখন ক্ষমতাসীনদে্রা এখন আম-জনতাকে সব ধরণের পরোয়ার বাইরে বা উর্ধে উঠে গেছেন। এরই উলটা দিকটার নামই হল এক  “জনবিচ্ছিন্ন জনপ্রতিনিধি ব্যবস্থা” যা জন্ম দিয়েছে এক গণবিচ্ছিন্নতার দল ও সরকার ব্যবস্থার রাজনীতি।  তাই আগেই বলা যায় এসব “ভারত মহাসাগরের গল্প” বলে এবারও আরো কিছুই ফিরানো যাবে না।

    সারাংশটা হল্‌  এখন কেন আমাদের মত দেশে কেন কিছু “ফিরানো” যায় না – এর আসল কারণ পাওয়া যাবে একজন জনপ্রতিনিধির আবার গণবিচ্ছিন্নতা কী? এটা তো স্ববিরোধি কথা!!! হা এই স্ববিরোধের আরেক নাম নিশিভোট!  এথেকে সে কেন গণবিচ্ছিন্ন এর অর্থ  কিছুটা হলেও বুঝা যাবে।  আবার, মূলত  এখনকার বাংলাদেশের রাজনীতির এই – গণবিচ্ছিন্নতা বৈশিষ্ট – এর কারণেই এখন গণ-অভ্যুত্থানের কথা বকোয়াজ, ফাকা-আওয়াজে উলটা বরং তা জুতসই “ভারতের দালালি” করার বক্তব্য হয়ে থাকবে।  যেটা অনেকেই গণ-অভ্যুত্থানের কথার আড়ালে তা করছেন।  আর এতেই কার্যত তৃতীয় শক্তির হস্তক্ষেপ জাতীয় কথা ও শব্দাবলী এসবই মুখ্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়,  দাঁড়াবেই! সেটা আমরা পছন্দ করি বা নাই করি!

    ভারত জামাতে ইসলামি বলে কী বুঝাতে চায়ঃ
    আনন্দবাজার বা অগ্নি রায় তাদের এই ৪৪৪ শব্দের লেখায় প্রথম ১১৫ শব্দের পরের ১৮০ শব্দ কেবল ব্যয় করেছে জামাতে ইসলাম বলে এক শব্দ আর ধারণা নিয়ে। এনিয়ে সবার আগে পাঠককে একটা সাবধান করে দেই। ঐ লেখায় “জামাতে ইসলাম” লেখা হলেও এশব্দ শুধু রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলাম  বুঝান হয় নাই। এটা একটা দলের নাম করার আড়ালে একটা প্রতীকী শব্দ হিশাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এশব্দ দিয়ে বুঝতে হবে বাংলাদেশে ইসলাম সম্পর্কিত যেকোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ – এর কথা বুঝানো হয়েছে।   এভাবে জামাতে ইসলাম বলে সব জিঘাংসা বিদ্বেষ উগড়ে দেওয়ার শুরু ২০০৮ সাল থেকে, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে যারাই গেছেন সকলেই  জামাতে ইসলাম এদুটো শব্দ দিয়ে গত ১৫ বছর ধরে  জিঘাংসা বিদ্বেষ ছড়িয়ে কথা বলে গেছেন।  ভারতও সেটাই রপ্ত করে কথা বলছে। এটা হল ভারতের কাছে অনেকটা ১৯৪৭ সালের আগের জমিদারি শাসনে শাসিত পুর্ববঙ্গে ফিরে যাবার (মৃত) আকাঙ্খার মত। এটাই জামাতে ইসলাম শব্দে এর বিরুদ্ধাচারণ।
    কথাটা স্পষ্ট হবে, যদি উত্তর খুঁজি যে ভারত বা  আনন্দবাজার বা অগ্নি রায় এরা জামাতে ইসলাম শব্দগুলো বলে কীসের বিরোধিতা করছে? অথবা আরো স্পষ্ট করে তারা এর বদলে কী দেখতে চাইছে?

    এরা সকলেই [এবং এমনকি খুব সম্ভবত বাংলাদেশের এখনকার বেশির ভাগ হিন্দু-সহ প্রগতিশীলেরা ] এদের কাছে যে আদর্শ বাংলাদেশ কাম্য সেটা হল ১৯৪৭ সালের আগের জমিদার হিন্দুর আধিপত্যের যে পুর্ববঙ্গ – সেটাই, সেখানে যদি ফেরত যাওয়া যেত। ভেঙ্গে বললে সেটা হল কোন নাগরিক সাম্য নয়, আইনের চোখের ধর্ম-নির্বিশেষে সব নাগরিক অধিকারে সাম্য নয় বরং জমিদার হিন্দু আধিপত্য করবে আর ইসলাম-মুসলমানের কোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ – সেটাকে অবশ্যই দমানো হবে শুধু না এদের সকলকে জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স মেনে নিতে হবে।
    এক্ষেত্রে মুসলমানদেরকে কী কী মেনে নিতে হবে? সেই তালিকার নাম সেটা অন্য শব্দে বললে তা হল – মুসলমানদেরকে অসাম্প্রদায়িক-  হয়ে থাকতে হবে। এটা শুধু বাংলাদেশের বেলায় নয়, এখনকার সারা ভারতের – মানে কেবল মোদির ভারতের না বা হিন্দুত্ববাদের ভারতের নয় – সারা ভারতের বেশীর ভাগ হিন্দু নাগরিকের আকাঙ্খা। এমন এক ভারত রাষ্ট্রই এদের কল্পনা।  আসলে যেকোন থিওলজি-তে দাঁড়িয়ে কল্পনায় যে কোন মর্ডার্ণ রাষ্ট্রের অনুমান এমন হয় ও হবেই।  আসলে যেকোন এথনিক বৈশিষ্ট ভিত্তিক আধিপত্যের কল্পনা এটা দিয়ে জাতিরাষ্ট্র কায়েম হবে হয়ত কিন্তু তা রিপাবলিক রাষ্ট্র হবে না যেটা ‘নাগরিক সাম্য’ অথবা “ধর্ম-নির্বিশেষে সব নাগরিক অধিকারে সাম্য” এটা হবে না।
    এককথায় বললে, ভারতের হিন্দুত্ববাদ (সাথে একালের ওয়ার অন টেরর) এটাই কিন্তু বাংলাদেশে  -ইসলাম সম্পর্কিত যেকোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ  জোরেসোরে ঘটিয়েছে।  এটা হল হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ।  অথচ তামাসাটা হল, হিন্দুত্ববাদের ভারত বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ ঘটিয়ে যে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ সেটাকেই “জামাতে ইসলাম” বলে প্রতীকী নামে বিরোধিতা করছে!
    আর ঐ যে জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স এর চিহ্ন ও নমুনা হিশাবে মুসলমানদেরকে “অসাম্প্রদায়িক” হয়ে থাকতে বলার দাবি ও বয়ান এটাই সবচেয়ে বেশি করে বয়ে বাংলাদেশের নিয়ে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ ফেরত মুসলমানেরা
    ।  কারণ কলকাতায় থাকার সময়ে এসব মুসলমানেরা অসাম্প্রদায়িক থাকবে এই শর্তেই তো শিক্ষিত হতে সুযোগ পেয়েছিল।    অথচ বাংলাদেশে ফিরে এরাই প্রগতিবাদের নামে হয়ে গেল হিন্দুত্ববাদের (জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স ধারণার) ক্যারিয়ার।
    তবে এত শব্দ থাকতে বাংলাদেশের চেতনাবাদী বা “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি” কেন ইসলাম কোপাতে “জামাতে ইসলাম” বলে প্রতীকী শব্দটা বেছে নিল?  এর কারণ হল, “জামাতে ইসলাম” নামে ডেকে কাউকে কোপানো এর  পরে এমন নৃশংসতার পক্ষে কোন সাফাই হাজির করা ওদের জন্য খুবই জরুরি।  আর ইসলাম কোপানোর স্বপক্ষে সেই সাফাই বয়ানটা হল, যে এটা সাধারণ ভাবে “বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশকে” কোপানোর নৃশংসতা করা নয়; বরং এটা যেনবা  ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামের অপরাধের বিরোধিতা করা হচ্ছে। 

    কঠিন সত্যিটা হল,   বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক যেকোন প্রকাশকে কোপানোর নৃশংসতা করা – এটা তো রেসিজম। ঘোরতর এক Racism; এক নির্মুল আকাঙ্খা।  এক এথনিক[ethnic] জাত-ধর্ম বিদ্বেষ – ইসলামবিদ্বেষ! এথনিক ক্লিনজিং [ethnic cleansing] বা অন্যের জাত-ধর্ম নির্মুলের ভয়াবহ আকাঙ্খা!!   অথচ এটাই প্রগতিশীলতা বলে চালানোর চেষ্টা  চলছে।

    তাহলে আনন্দবাজার কেন এখানে জামাতে ইসলাম শব্দ দিয়ে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ নিল?
    কারণ, সে আমেরিকাকে ভয় দেখাতে চায় যে হাসিনা আগামিতে ক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশে ইসলামিজম ছেয়ে যাবে। কাজেই হাসিনাই ক্ষমতায় থাক! এই হল তাদের ছদ্ম-পরিচয়ে থেকে বলা সাজেশন!

    কিন্তু এনিয়ে অ্যামেরিকান অবস্থান কীঃ
    এটা বলাই বাহুল্য যেকেউই  ক্ষমতাসীন যখন থাকে তখন সে কখনই  বিরোধি যেকোন “রেডিক্যালিজম” মানে ক্ষমতাসীনকে সশস্ত্রভাবে উতখাত করতে চাওয়া যেকোন শক্তির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর বা নির্মমই হবে।  একারণের সবদেশের কনষ্টিটিউশনেই লেখা থাকে এসব “রেডিক্যালিজম”  করলে ওর শাস্তি হল মৃত্যুদন্ড। তাই  ইসলামি রেডিক্যালিজমের বিরুদ্ধে আমেরিকার অবস্থান থাকা তা কোন নতুন জিনিষ নয় বরং অনস্বীকার্য বা obvious ঘটনা অবস্থান। এছাড়া ওয়ার অন টেরর এর টানা বিশ বছর এর বেশি হয়ে গেল; এখন   আমেরিকার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা-শিক্ষা তো হয়েছেই ধরে নিতে পারি। সম্ভবত সেকারণের আমাদের মত দেশে অ্যামেরিকান নীতি এখন ইসলামি রাজনীতি মানেই এর বিরোধী হতেই হবে ঠিক তা নয়। মানে কোন মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রে ইসলামি রাজনীতি করা যাবে না ঠিক তা নয়। তবে মূল অবস্থানতা হল এই যে, নাগরিক অধিকারের দিক থেকে সব ধর্মের নাগরিকের অধিকার সমান বা সাম্য ধারণার মধ্যে থাকলে  ইসলামি রাজনীতি করতে কোন দলেরই সমস্যা নাই। তবে এর সাথে কথা আরো কিন্তু কথা বা ফারদার ব্যাখ্যা তারা সাথে দিয়ে বা করে থাকে। যেমন তারা সমাজে প্লুরালিজম [Pluralism]  থাকবে মানে হল,  ওদেশে বহু এবং বিরোধি মতামত-রাজনীতি থাকবে এটা মানতে রাজি থাকতে হবে। এছাড়া একথাটাই আরেকভাবে বলা ইনক্লুসিভ [Inclusive] বলে আরেক শব্দের কথা তারা বলে দেয়। যেমন যেকোন রাজনীতি-চিন্তাকে তার সকল বিরোধিতাকারীদেরকেও সাথে পাশাপাশি নিয়ে চল্তে পারতে হবে।  মানে কোন বিরোধি মতামত বক্তব্যকে চাপিয়ে কোনায় ফেলে দেয়া বা কোনঠাসা করে রাখা  – সেটা না করে বরং সবার বক্তব্যই বলতে দিতে হবে, তাতে শেষে কার বক্তব্য ও তা কতটুকু পাবলিক গ্রহণ করবে সেটাই হবে সবকিছুর নির্ধারক। এসবই মোটা দাগে অ্যামেরিকান অবস্থান। মানে সারাংশে বললে, ভারত বা আনন্দবাজারি গোষ্ঠি  ইসলামি রাজনীতি বা ইসলামি জুজুর ভয় দেখালেই আমেরিকা ভয় পেয়ে পালাবে বা হাসিনাকে ফরে ক্ষমতায় রেখে দিবে আর  এই বাজারি গোষ্ঠি এতে সফল হয়ে যাবে – এগুলা বেকুরি সর্টকার্ট ও ধান্দালি চিন্তা।

    এগুলো আসলে কলকাতার কিছু মফস্বলি চিন্তা।  তাদের দুনিয়া বলতে তা কলকাতার মধ্যেই আবদ্ধ বলে মনে করে – এরা আমেরিকাকে আন্ডার এস্টিমেট করছে খামোখা। এসব তো এমনকি জয়শঙ্করই আমল করবে না,  করার কথা না। মোদি-জয়শঙ্কর বরং  ভারতে বাইডেনের পলিসিকে  কৌশলে পাশ কাটিয়ে কিভাবে মোদিকে আবার ক্ষমতাসীন করবে – এই চিন্তায় নির্ঘুম! নিজ মাথার ঘায়ে তারা নিজেরাই পাগল অবস্থায়! যদিও হাসিনাকে জি-২০ এর সভায় ডেকে আনতে পেরেছে বলে এটা মোদি সরকারের বিরাট কূটনৈতিক  সাফল্য বা মোদি আন্তর্জাতিক জগতে এক বিশাল নেতা এসব কথা ছড়িয়ে ভোটের বাক্সে এর ইতি প্রভাব যেন পড়ে ইত্যাদি এসব কান্ড তো মোদি অবশ্য করবেনই!!  এমনকি বাইডেনও জি২০ এর সভায় আসতেছেন; তাই বাংলাদেশের হাসিনার জন্য মোদিই যেন বাইডেনের কাছে সুপারিশ করবেন বলে মোদি প্রপাগান্ডাও করবেন। সেটা নিজে বলবেন না অবশ্যই – তবে কয়েকটা মিডিয়ায় এমন জল্পনা-কল্পনা রিপোর্টও করাতে পারেন। যদিও তা অবশ্যই ওখানেই শেষ হবে; মানে সত্যিই মোদি কী বাইদেনের সাথে কথা বলেছিলেন তা নিয়ে আর কোন রিপোর্ট হবে না। ফুলস্টপ!

    হাসিনা জি-২০ মিটিংয়ে গেলেও বাইডেনের সাথে কোন সাইড-লাইন টকঃ
    আমরা এখনও কেউ জানিনা (এছাড়া এখনও সময় আছে) যে হাসিনা শেষে জি-২০ এর সভায় ভারত সফরে নিশ্চিত যাবেন কী না! ধরে নেয়া যাক তিনি যাবেন। যদি যানও তবু হাসিনার সরাসরি বাইডেনের সাথে বা মোদির মধ্যস্ততায় কোন কথা কী হবার সম্ভাবনা আছে? সাইড লাইনে? অনুমান হচ্ছে এর সম্ভাবনা খুবই কম। এর অন্তত একটা কারণ হল, আমেরিকার সাথে বসে কোন আর লাভ বা পরিস্থিতি হাসিনার পক্ষে আগাবে এমন বাস্তবতা সম্ভবত আর নাই। তা এখন ঢাকায় একেবারেই স্পষ্ট!  যেমন সর্বশেষ যে দুজন কংগ্রেস-ম্যান ঢাকা সফরে এসেছিলেন তা সরকারের জন্য কোন সুখকর কিছু ছিল না। এই সফরে কংগ্রেস-ম্যানদের বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জবাব ছিল এর এক মাপকাঠি। কারণ, মোমেনের জবাব দেখে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল যে কংগ্রেস-ম্যানদের প্রশ্নগুলো কাম্য বা ওয়েলকামিং  নয়! খাস বাংলায় বললে মোমেন -টেরা উত্তর- দিয়েছিলেন।  এছাড়া অতিথিরা ঢাকার পৌছানোর আগেই মোমেন অনেকবারই বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই আগমন ওয়েলকামিং নয়। তিনি বলে দিয়েছেন, নির্বাচনের আগে সরকার আমেরিকার সাথে আর কোন চুক্তিতেই যাবেন না।  অথবা হাসিনার নিজেরই ভারত মহাসাগরে কী ঘটতে যাচ্ছে সংক্রান্ত বক্তব্য থেকে বুঝা যায় তিনি আমেরিকার সাথে সম্পর্কের উন্নয়নের কোন আশা আর সম্ভবত দেখেন না।
    কাজেই এই পরিস্থিতিতে তিনি জি-২০ এর সভায় বাইডেন বা অন্য কারও সাথে কথা বলার আগ্রহে আছে – এটা আমাদের জন্য কষ্ট কল্পিত!
    আর এসব খুটিনাটি দিক বা এর ডেভেলবমেন্ট বিবেচনায় রেখে কথা বলা – এটা আনন্দবাজার বা অগ্নি রায়ের মুরোদের মধ্যে তা আছে এমন মনে হয় না। তার আসলে একটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালানো তাও আবার সেটা মফস্বলি বুঝাবুঝির উপর ভর করে করতে যাওয়া …… না এটাকে এখানেই ছেড়ে যেতে হচ্ছে আমাদের!

    আপডেটেডঃ    ২০ আগষ্ট ২০২৩;  রাত ০১ঃ ৫৩
    আপডেটেডঃ     ২০২৩;

    >>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com