Tag: হিন্দুত্ব

  • মোদী-হাসিনার ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’, কে কী পেল

    মোদী-হাসিনার ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’, কে কী পেল

    গৌতম দাস

    ২১ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০৫  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3iQ

    নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বৈঠক

    [আগের কথা সবার আগে। যারা এই ভার্চুয়াল বৈঠককে হাসিনা আবার ভারতের কোলেই উঠতে যাচ্ছে কিনা অথবা, উঠল কিনা সেটা বুঝতে চোখ-কান খাড়া করেছেন, তাঁদের বলে রাখি পরিস্থিতি আবার সেদিক কোন পক্ষ থেকেই নিবার জন্য এই বৈঠক ছিল না। সে অর্থে এটা বলা যায় রুটিন। এখন বাস্তবতাটাই আর তেমন নাই, ফেবারেবলও নয় তা দুপক্ষই মনে মনে স্বীকার করে নিয়েছে। এটাই সবচেয়ে বড় ঘটে যাওয়া  পরিবর্তন। বাইডেনের জিতে আসাটাই এসব পরিবর্তনের মূল কারণ। বাইডেন উত্থান ফেস করতে হাসিনার জন্য কাজে লাগবে – ভারত এখন তেমন কোন শক্তিই নয়। বরং, চীনই কিছু কাজে আসতে পারে, তুলনামূলক অর্থে এক বেটার সম্ভাবনা। এই হল সেই নির্ধারক রিডিং। যা সবকিছুকে বদলে দিয়েছে এমন, এক ড্রাইভিং ফোর্স!  দুই, এটা খুব সহসাই আর পুনরায় ভারতমুখি সেদিকে যাচ্ছেই না। তিন, ঘটনা-পরিস্থিতি সম্ভবত আর কোনদিনই ২০১৮ সালের আগের মত হবে না, যাবে না। “ও দিন গুজর গয়া! ফুলষ্টপ! ]

    গত ১৭ ডিসেম্বর মোদি-হাসিনা দুই প্রধানমন্ত্রীর এক ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’ অনুষ্ঠিত হয়েছে; মানে কার্যত যার যার দেশের অফিস রুমে বসেই ঐ বৈঠকটা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তারা পরস্পর কথা বলেছেন। যদিও দু’দেশের পাবলিক টিভিতে এই অনুষ্ঠান যেভাবে ও যতটুকু আমাদের সামনে আনা হয়েছে তাতে পুরাটাই কাঠপুতলির শো-এর মত খুবই আড়ষ্ট আর যান্ত্রিক মনে হয়েছে। এদিকে ভার্চুয়াল হলেও তা ‘শীর্ষ বৈঠক’ বা সামিট যখন বলা হচ্ছে তখন দু’পক্ষেরই চাওয়া-পাওয়াও অবশ্যই ছিল অন্তত ‘কিছু’।

    বাংলাদেশের দিক থেকে বললে, ভারতের প্রতি আমাদের সরকারি অবস্থান ও সময়টা যাচ্ছে এখন ভারতের জন্য খুব ‘করুণ’ এবং ‘দুঃসময়ের’ বলা যায়। এমন অভিমুখের শুরু ২০১৮ সালের শুরুর দিক থেকেই; আমাদের সরকারেরও ‘মন-বাঁধা’ সে সময় থেকেই। আর এর স্পষ্টতা অ্যাকশনে প্রকাশ পেতে থাকে ২০১৮ ডিসেম্বরের “নৈশ-ভোটের” সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই। কথাটা এভাবে বলা যায়, শেখ হাসিনা চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে চলতি সরকারের আমলের শুরু থেকেই কখনো পিছপা হননি। সেই ২০১০ সাল থেকেই তিনি লেগে আছেন, চীন সফর করে যাচ্ছেন। সফর বিনিময়ও হচ্ছে। তবে সম্পর্কের মাত্রার দিক বিচারে প্রধানমন্ত্রী এগিয়েছেন ততটুকু যতটুকু ভারত এলাও করেছে অথবা ভারতের কড়া আপত্তি পেরিয়ে তিনি ‘ছাড়’ আনতে পার পেয়েছেন। সেটাই তিনি এবার গত ২০১৯ জানুয়ারির শুরু থেকেই অবাধে করা শুরু করে গেছেন যেন; যতটুকু বাস্তব কাজকর্ম দেখে অনুমান করা যায়- এই অর্থে বলা যায়, বর্তমান সরকার যা কিছু ভারতকে দেয়ার ব্যাপারে সরকারি কমিটমেন্ট দিয়ে রেখেছিলেন কেবল তাই শেষ করা হচ্ছে, কিন্তু নতুন কমিটমেন্টে তেমন আগ্রহ নেই। অবস্থাদৃষ্টে ব্যাপারটা এমনই মনে হচ্ছে। এ ছাড়া ঘটনার ফোকাস আসলে এদিকটায় নয়, বরং উল্টা দিকে। ব্যাপারটা বাজারে আসছে বরং এভাবে যে, সরকার কতটা গভীরভাবে চীন-ঘনিষ্ঠ এর খোলাখুলি বহি:প্রকাশ থেকে। এথেকেই এবার অর্থ তৈরি হচ্ছে যে তাহলে সরকার প্রধান আর আগের মত ততটা ভারত ঘনিষ্ঠ থাকতে চাইছেন না। তবে এ ছাড়াও আরেকটা বিবেচনা সম্ভবত তিনি আমলে নিচ্ছেন। আমরা জানি, মুজিব খুন হয়ে যাওয়ার পরে একসময় শেখ হাসিনা নিরাপত্তার তাগিদে প্রায় পাঁচ বছর ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলে কৃতজ্ঞতা বা আগামীর দিক বিবেচনা যেমন মানুষের মধ্যে কাজ করে তেমন কিছু একটা হয়তো আছে বলে মনে হয়েছে। ফলে একধরনের সফটনেস এখনো থাকলেও সেটা অবশ্য কোনোভাবেই ২০০৯ সালের মত আর নয়। সেই পাতার পাঠ পার হয়ে গেছে, আর ফিরে পাবার সুযোগও নাই। তবু সর্বোপরি আমাদের পরিষ্কার থাকা ভাল যে, প্রতিবেশী ভারতের সাথে একটা স্বাভাবিক বা রুটিন সম্পর্ক তো থাকবেই যেটা নিয়ে আলোচনার তেমন কিছু নাই। ভারতের সাথে বাড়তি বা “বিশেষ সম্পর্কটা” আর থাকবে কি না- এটাই কেবল আলোচনার।

    সম্পর্ক ঢলে পরছে, নতুন এক বাস্তবতার অনুভবঃ
    তবে আমাদের সবাইকেই মানতে হবে এবারের  ‘ভার্চুয়াল বৈঠকে’ একটা নতুন ব্যাপার উঠে এসেছে। তা হল, এবারের কয়েক ঘন্টার আনুষ্ঠানিকতায় একটা নতুন অনুভব সব সময় বজায় থেকেছে যে, ভারত বাংলাদেশের মন পাওয়ার চেষ্টা করছে (দ্য প্রিন্টের জ্যোতি মালহোত্রা নিজেই এটা স্বীকার করে বলেছেন, ভারত তার “দেমাগ” বা ওভারউয়েনিং ইনফ্লুয়েন্স খুইয়েছে’ [replaced India’s overweening influence in the region] )- যেটা এবার সব ঘটনার সারফেসে হাজির হচ্ছিল। যদিও এই অঞ্চলে ভারতের নাকি প্রভাব ছিল বলে যে গল্প দেয়া হচ্ছে তা শত্ভাগ ভিত্তিহীন। চীন ঠেকানোর মজুরি হিসাবে আমেরিকার দেয়া উপহার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া – এই এটা ছাড়া এশিয়ায় ভারতের প্রভাব বলতে কোনদিনই কিছু ছিল না।  তবে নেহেরুর কিছু স্বপ্ন-কল্পনায় পোলাও-কোরমা খাওয়ার গল্প ছিল আমরা শুনেছিলাম যে, বৃটিশেরা ভারত ছেড়ে চলে গেলেও যেনবা নেহেরু সাব’কে কল্পিত ভাইস-রয় বা রাণীর প্রতিনিধিত্ব দিয়ে গেছিলেন। কল্পনায় নেহেরু এমন ভাব ধরে চলতেন অবশ্যই। আর তা থেকে নেহেরুর মধ্যে কলোনি-দখলদার এটিটুড এর যাত্রা! কাজেই এশিয়ার ভারতের প্রভাব বলতে এক মিছা স্বপ্ন-প্রভাব কথাটাই আমরা অনেকবার শুনেছি। নিজ বা অন্যদেশে প্রচুর বিনিয়োগের ক্ষমতা এটাই কোন রাষ্ট্রকে অন্যদেশের উপর প্রভাব-ধারী রাষ্ট্র হিসাবে হাজির করে। আর ঠিক এই  বিনিয়োগ সক্ষমতা জিনিষটাই ভারতের কোনদিন ছিল না, হয় নাই।

    ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’ থেকে আশা করার আমাদের তেমন কিছু ছিল নাঃ
    এসব দিক বিচারে ভার্চুয়াল বৈঠক থেকে বাংলাদেশের বিরাট কিছু পাওয়ার আশা হাসিনার ছিল তা মনে হয় না। কেবল স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পুর্তিতে ও তা পালনে ভারতের সাথে একটা অনুষ্ঠান করে আনুগত্য-প্রতিদান জানানো। আর আনুষ্ঠানিকভাবে যেটাকে সাত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা বলা হয়েছে এরই একটা হল, “নয়া দিল্লি জাদুঘরের সাথে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের সহযোগিতা”- এ নিয়ে একটা সমঝোতা স্মারকে হাসিনার আগ্রহ থাকতে পারে। এমন এক ব্যবহারিক কাজের প্রতি সম্ভবত সরকারের যা আগ্রহ ছিল। সেটার আর বিস্তারিত দিক হল, মহাত্মা গান্ধীর সমান্তরালে শেখ মুজিবকে নিয়ে এসে একটা ‘জাদুঘর শো’-এর আয়োজনের ব্যাপার আছে এখানে তাই। এ ধরনের কিছু ছাড়া ছাড়া বিষয় ছাড়া ঢাকা বা হাসিনার পক্ষ থেকে খুব কিছু আশা ছিল তা মনে হয়নি। বাকিগুলো সবই সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর ডেকোরেশন পিস।
    তবে স্পষ্ট করেই আমরা সবাই নিশ্চিত থাকতে পারি, তিস্তার পানিতে আমাদের দেশের ভাগ বুঝিয়ে দেয়ার কোনো ইচ্ছা-পরিকল্পনা ভারতের কোনো দিন ছিল না, আজও নাই, আগামীতেও হয়তো হবে না যদিনা আমরা তাদের বাধ্য করার মেকানিজম বের করতে পারি।

    বিপরীতে দিশা-হারানো ভারতঃ
    এর বিপরীতে ভারতের অবস্থা ছিল বেদিশা, অপ্রস্তুত। তারা হয়ত বুঝছেন, না-বুঝার কারণ নাই বলে যে, এ’আমলে এসে বাংলাদেশ ক্রমশ তাদের ‘হাতের বাইরে’ চলে যাওয়া শুরু করে দিয়েছে এবং যাবেই। যেমন মিডিয়ার কথা যদি ধরি, ভারতের নিজের মিডিয়াগুলো একমত হতে পারেনি – কেন এই ভার্চুয়াল বৈঠক হচ্ছে। বরং অনেককেই মন্তব্য করতে দেখা গেছে যে, তারা লিখেছেন, গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের শীর্ষপর্যায়ের সাথে বাংলাদেশের তেমন যোগাযোগ বা সাক্ষাৎ নেই। অন্ততপক্ষে সেটা তো ভেঙেছে, এটাই নাকি ‘অনেক অর্জন’। এমন প্রায় একই অবস্থা বাংলাদেশেরই এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের। বুঝা যাচ্ছে তিনি ঢাকার এমবেসির ভালই প্রভাবাধীনে উটে বসেছেন। তাই যেন তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন কথা যে তাঁর কথার তালমিল  না থাকলেও জোর করে হলেও ভারতের স্বার্থের পক্ষে তাঁকে কথা বলতেই হবে। ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক ভাল হতেই হবে; এমনকি ভাল না হলেও ভাল বলতেই হবে। এমনই করুণার দশা তাঁর। বিবিসিকে তিনি বলছেন, “,……পানি বণ্টন, সীমান্ত প্রাণহানি, রোহিঙ্গা সংকট এবং করোনাভাইরাস মোকাবিলার মতো বিষয় আলোচনায় উঠতে পারে……তবে সেটা হোক বা না হোক, নানা ইস্যুতে দুই দেশের সমঝোতা স্বাক্ষর, বৈঠক ইতিবাচকভাবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন। তিনি আরও বলছেন,

    “যে সমঝোতাগুলো স্বাক্ষরের কথা বলা হচ্ছে, আপাত: দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বা স্পর্শকাতর যে বিষয়গুলো রয়েছে, তার তুলনায় এগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে আমরা যে ট্রেন্ড দেখেছি,সেটা হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা। সেটা কিন্তু অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ”।

    অথচ ঘটনা হল উলটা। ভারতের সাথে আমাদের অধীনস্ততার সম্পর্ক সেটা তো “দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ” না হলেই তো বরং ভাল! তাই নয় কি? বাস্তবতা হল, ভারত-বাংলাদেশের কথিত “ভাল সম্পর্কের” তাল কেটে গেছে অনেক আগেই। বড় কথা হাসিনা আর সেটা নিয়ে আমলও করছেন না। এখন সবকিছু চলছে “দেখন শোভা” আকারে। এই হল বাস্তবতা।
    ওদিকে দ্য হিন্দু লিখেছে, “অবকাঠামো ও কানেক্টিভিটি প্রজেক্ট এই ভার্চুয়াল বৈঠকের ফোকাস” [Modi-Hasina summit to highlight infrastructure, connectivity projects]। এরাও আসলে দিবাস্বপ্নে আছেন। কারণ বাস্তবে এনিয়ে তেমন কোন উচ্চবাচ্যই হয়নি। আর আসলে এটা ছিল আসামকে রেলওয়ে করিডোর আরো পোক্তভাবে দেয়ারই একটা প্রকাশ, যেটা প্রকৃতপক্ষে শেখ হাসিনারই আগের কমিটমেন্ট এখন বাস্তবে পূরণ করে দেয়া। ভারতের বাকিরা, মানে সরকার ও মিডিয়া- এরা যেমন বাড়িয়ে বলা ছাড়া কোন ছাড়া কোনকথাই বলতেই পারেন না, তেমনি কিছু একটা যার যার মন-মত বলেছেন।
    যেমন আরেকদল অন্ধের হাতি দেখার মত বলছেন, মোদীর ভারতের ‘পড়শির গুরুত্ব’  নাকি সর্বাগ্রে বা (Neighbor First) – এই বলে নাকি মোদীর এক নীতি আছে, আর এর উপরেই নাকি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দাঁড়িয়ে আছে। এসব শিরোনাম করেছেন অনেকে যেমন, দ্য প্রিন্ট [The Print], ওয়াইর [WIRE], ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস [Indian Express] বা থিংকট্যাংক ওআরএফ [ORF] এর মতন যারা তারা শিরোনাম করেছে, “নেইবার ফাস্ট” কথার মিথ্যা বাকচাতুরী থেকে। অথচ মোদীর এই নীতির ব্যবহারিক কার্যকারিতা কোথায় আছে আর সেটা  কী তা তারা কেউ বলতে পারবেন না। এমনকি এটাও তারা দেখতে পান না যে, তাদের “মহান ভারত” সামান্য কয়েক মাসের জন্য কয়েক টন পেঁয়াজের বাড়তি শুল্কের লোভও ছাড়তে পারে না; আগে থেকে বলতেও পারে না ঠিক কী করতে চায় পেঁয়াজ নিয়ে; বাংলাদেশের সাথে এনিয়ে একটা নিয়ম বা কমিটমেন্টেও আসতে পারে না। অথচ বাংলাদেশের দিকে দেখেন, যে আসামের জন্য বিনা পয়সায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের আসামে তেল পাইপলাইন, গ্যাস পৌঁছে দেয়া, বিদ্যুতের করিডোর, সড়ক, নৌ-করিডোর, বিনা পয়সায় বাংলাদেশের তিন বন্দর আসামে ব্যবহার করা হবে এবং প্রায়োরিটিসহ ইত্যাদি। অথচ সেই আসামই আবার ‘মুসলমান খেদাও’ এর আন্দোলন করবে, এনআরসি করবে! কিন্তু এরা সকলে মুখে বলবে সবই নাকি ‘পড়শি আগে’ বলে মোদীর নাকি এক নীতি আছে সে অনুযায়ী চলছে। আসলে তামাশার আর শেষ নেই! তারা কি কেবল তামাশাই ভালোবাসেন?
    আর এ ব্যাপারে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে দ্যা প্রিন্ট বলে এক ওয়েব মিডিয়া। এখন করোনাকালে ভারতে মিডিয়ায় কর্মীদের বেতন দেয়াই কঠিন হয়ে গেছে। তাই যেন এই মিডিয়া এবার সরকারি মুখপাত্র সেজেছে। এছাড়া, সাথে পেজ বিক্রি বা সরকারি (গোয়েন্দা) প্রপাগান্ডার খেপ মারার কাজে লেগে পড়েছেন। ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’ প্রসঙ্গে এরা কমপক্ষে তিনটা রিপোর্ট করেছেন। এর মধ্যে একটা মারাত্মক ভুল এবং না বুঝা তথ্য দিয়ে লিখেছেন জ্যোতি মালহোত্রা [Jyoti Malhotra]।
    সাধারণভাবে বললে, ভারতীয় মিডিয়া-কর্মীদের আত্ম-জিজ্ঞাসাও নাই। কোনো যাচাই বা জিজ্ঞাসাই নেই যে ভারত কী কোন গ্লোবাল অর্থনৈতিক শক্তি? তা কিভাবে বা কবে থেকে? আসলেই কী ব্যাপারটা সত্যি – এই যাচাইয়ের সাহস নাই। বরং উলটা তাদের ধারণা এটা যেন দাবি করার ব্যাপার। তারা জোরসে দাবি করলে বা ভাব ধরলে যেন তারা তা হয়েই যাবে! অথচ স্বাধীনভাবে যাচাই করলে বা সামান্য একটু চোখ-কান খুলে রাখলেই তাদের না বোঝার কোনো কারণ নাই যে, ভারত নিজেই অবকাঠামো ঋণ-গ্রহণকারী দেশ, এখনো। এই গণ্ডিই পার হয় নাই ভারত। আর সবচেয়ে বড় পরিমাণ এমন ঋণ তারা এখনো পেয়ে চলেছে চীন থেকে। অথচ ভারতের সরকার ও মিডিয়া ভাব করতে চায় উলটা – যেন ভারত বাংলাদেশের বিরাট ঋণদাতা। ব্যাপারটা যে কারও বুঝতে পারার সহজ উপায়টা হল, বাংলাদেশে ভারতের কোন প্রকল্প – এর মূল্যের দিকে নজর ফেলা। কারণ, দশটাকার হলেও সেটা প্রকল্প আর দশ বিলিয়ন ডলারের হলেও সেটা প্রকল্প। এমনিতেই গত ১০ বছরে ভারতের এমন প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে এর (কমিটমেন্ট দেয়া) দশভাগ অর্থও এখনো ছাড় করা হয়নি। ভারত-প্রিয় প্রথম আলো লিখছে, “তিন দফায় ৭৩৬ কোটি ডলার ঋণচুক্তির মধ্যে এখন পর্যন্ত অর্থছাড় হয়েছে মাত্র ৭০ কোটি ডলার”।  এছাড়াও এসব ভারতীয় ঋণের মুখ্য শর্ত হল, প্রায় সমস্ত পণ্য ও সেবা (মানে শ্রমিকও) ৮৫% ভারত থেকেই কিনতে হবে। মানে দাদা “…খেয়ে এসেছেন না গিয়ে খাবেন” তত্বের একদম খাঁসা প্রয়োগ।  মূলত একারণের ঋণের অর্থছাড়েও অগ্রগতি নাই। ফলে ভারতের সবদিকেই লাভ আর লাভ! এছাড়াও ভারতের এমন প্রকল্পে দেখা যাবে, প্রকল্পের মোট মূল্য ভারত হিসাব করে থাকে হাজার ডলারে। অথচ চীনের কথা বাদই দিলাম পশ্চিমাদেশের সবচেয়ে কম সামর্থের রাষ্ট্রটাও মিলিয়ন ডলারে ছাড়া দাতা বা ঋণ-প্রকল্পের কোন মূল্য হিসাব করে না। মানে হল, ইত্তেফাকের আনোয়ার হোসেন মঞ্জু যদি নিজ ভান্ডারিয়া উপজেলায় পানির ট্যাপকল বসানোতে ভারতের ৫ কোটি টাকা ব্যয়কে “বাংলাদেশে ভারতীয় প্রকল্প” বলেন,  সেটা তো যার আত্ম-লজ্জাবোধ নাই তাকে ঠেকানো যাবে না। শুধু তাই না এজন্য মঞ্জু সাহেব তিনি নিজে যদি হাইকমিশনারকে সাথে নিয়ে ভান্ডারিয়া ভ্রমণ করেন, তাতে এনিয়ে কিছু বলতে আমাদেরই লজ্জা লাগবে।

    এক জ্যোতি মালহোত্রাঃ
    দ্যা প্রিন্টের জ্যোতি মালহোত্রা তাঁর লেখায় বাংলাদেশের পদ্মা ব্রিজ তৈরি সম্পন্ন করার প্রসঙ্গ তুলেছেন। কথা সত্য, পদ্মা ব্রিজ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাথে প্রথম দিকে দুর্নীতির অভিযোগ (অনেক পরে বিশ্ববাংক নিজেই ঢাকা সরকারের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ কানাডার আদালত থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল।) তারা তুলেছিল। আর সেই তোলার পর থেকে শেষে পদ্মা প্রকল্পই বাতিল হয়ে গেলে সে সময় ভারত নিজেই আগ বাড়িয়ে বাংলাদেশকে এক বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অথচ এখন পর্যন্ত এনিয়ে ভারত আর পরে কখনো কথা এগোয়নি। কিন্তু জ্যোতি মালহোত্রা নিজে থেকেই তাদের রাজনীতিবিদ ও সরকারের প্রতি এমন গাধামির কমিটমেন্ট করা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু তা করেছেন সাথে কিছু ভুয়া তথ্যসহ। জ্যোতি তাঁর লেখায় শিরোনাম করেছেন, ‘ভারত না, চীন বাংলাদেশে ব্রিজ বানিয়েছে; কিন্তু মোদী সরকার মনে করছে সবকিছু এখনো হাতছাড়া হয় নাই” [China, not India, builds a bridge in Bangladesh, but Modi govt believes all is not lost yet”]। মালহোত্রার ধারণা ও ভাবটা হল তিনি এমন শিরোনাম করে বিরাট এক “বুদ্ধিদীপ্ত জ্ঞানের কথা” বলেছেন।
    এখানে ‘ব্রিজ’ বলতে তিনি পদ্মা ব্রিজ বুঝিয়েছেন। কিন্তু সত্যটা হল, চীনা অর্থে বাংলাদেশ পদ্মায় মূল ব্রিজটা বানায়নি। বরং এই মূল অংশের পুরোটাই বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থ। অবশ্য এর নির্মাণ ঠিকাদার চীনা এক কোম্পানি China Railway Major Bridge Engineering Group Co, Ltd (MBEC)। কিন্তু সাবধান। তারা এই মূল ব্রিজের কেবল ঠিকাদার, কোনো অর্থদাতা নয়। আমরা আশা করব ও ধরে নিচ্ছি যে ভারতের বাকি মিডিয়াকর্মীরা ঠিকাদার আর ঋণদাতার ফারাক নিজে বুঝতে পারেন, এমন যোগ্যতা তাঁদের আছে। এছাড়া মূল ব্রিজের উপর দিয়ে গাড়ি চলার ব্যবস্থা থাকলেও  এর নিচ তলায় আলাদা করে কেবল রেল প্রকল্পের (রেললাইন পাতা) কাজ সম্প্রতি শুরু হয়েছে। কিন্তু এই অংশের কাজটার জন্য বাড়তি প্রায় ২.৬৭ বিলিয়ন ডলার চীনা ঋণ নেয়া হয়েছে [$2.67b loan deal signed with China]। কিন্তু রেলওয়ের ঠিকাদারও আবার ওই মূল ব্রিজ বানানোর ঠিকাদারই। কাজেই জ্যোতির বক্তব্য সঠিক নয়।
    আবার লক্ষণীয় এই যে, ভারতকে চীনের সাথে তুলনা করা আরেক আহাম্মকি। যদিও সবসময় ভারতের সাংবাদিকেরা সব সময় এটাই করে থাকে। যেমন এনিয়ে শিরোনামে “সবকিছু এখনো হাতছাড়া হয় নাই” জ্যোতির  এমন কথার অর্থ কী? তিনি কী মোদীকে অভিযোগ করে বলছেন, ভারত আমাদেরকে চীনের মত ব্রিজ বানায়ে দেয় না কেন? বা এখনও দিতে পারে? এর মানে ব্যাপারটা কী এতই সহজ যে, মোদী সরকার চাইলে এখনো বাংলাদেশের উপর চীনের মতোই প্রভাব বিস্তার ঘটাতে পারে। অথচ জ্যোতি কথাটা বলছেন কোনো রকম স্টাডি বা পড়ালেখা না করে। প্রভাব-বিস্তারের সক্ষমতা ভারতের কেন নাই তা নিয়ে কোন বুঝাবুঝি না জড়ো করেই। এটাই ভারতীয় সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
    আবার, এই ‘প্রভাব বিস্তার’ কথার মানে কী? পড়শি রাষ্ট্রকে চাপ দিয়ে যেনতেন একটা চুক্তি করিয়ে নেয়া? ভারত-নেপাল অথবা ভারত-ভুটান চুক্তির মত? অথচ কথাটা হল, বড় অর্থনীতির যে রাষ্ট্র চলতি সময়ে সারপ্লাস একুমুলেশন বা উদ্বৃত্ত সঞ্চয়  সবাইকে ছাড়িয়ে বেশি করে চলেছে, সেই আসল প্রভাবশালী রাষ্ট্র। এখনকার ভারত এমন কোন রাষ্ট্র নয়। এটা না হলে সে কখনো দুনিয়ায় প্রধান প্রভাব-বিস্তারি এবং গ্লোবাল অর্থনীতির নেতারাষ্ট্র হতে পারবে না; হবে না। টানা গত ৭৫ বছর ধরে আমেরিকা এসব শর্ত পূরণ করে তবেই নেতা হয়ে টিকে ছিল। এটা জোর খাটিয়ে নেপাল বা ভুটানের উপর নেহরুর নয়া কলোনিশাসক হওয়ার চেষ্টা নয়। সে জন্য পড়াশুনা না করলে ‘প্রভাব বিস্তার’ কথাটার অর্থ বোঝা যাবে না। এরই পরিণতি হল, ভারতে একেকটা নেহরুর জন্ম ও তার ‘কলোনি শাসক’ হওয়ার চিন্তা। যে নেহরুরা মনে করেন দুইটা রাষ্ট্রের মধ্যে একমাত্র সম্পর্ক হল, একটা আরেকটার ওপর প্রভাব বিস্তার করে সেটাকে অধীনস্থ করা বা কলোনি বানানো। তুরস্কের নিউজ-এজেন্সি টিআরটি ভারতকে এই ‘কলোনি বুঝ’ ত্যাগ করতে পরামর্শ দিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ভারত কী এখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় সারপ্লাস একুমুলেশনের রাষ্ট্র? একেবারেই না, মোটেও নয়। এটা জানা ভারতের মিডিয়া বা নেতাদের জন্য কোনো কঠিন কাজ নয়। আর ভারতের সাংবাদিকেরা এর ভাব ধরলে বা ভান করলে এই অর্জনটা হয়ে যাবে না, হওয়া যাওয়ার অইথ এ যায় নয়। তাহলে?

    এ ছাড়া আরো এক বড় অসঙ্গতি হলো, এ যুগে (হিন্দু) জাতিবাদী রাষ্ট্র হয়ে এটা অর্জন করা যাবে না। কারণ (হিন্দু) জাতিবাদ মানেই হলো, ব্রাহ্মণ্যবাদ ও এর জাতপ্রথায় সক্রিয় থাকা এক সমাজ। কারণ এটা দুনিয়ার চরম বৈষম্যের প্রকাশ। তাই এই সামাজিক রীতি বৈষম্যহীন নাগরিক-সাম্য রাষ্ট্রের সাথে স্ববিরোধী সংঘাতপূর্ণ ধারণা। এ ছাড়া জাতিবাদী চিন্তার বড় অনুষঙ্গ হলো, জাতিরাষ্ট্র বা কথিত ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের’ ধারণা। জাতীয় স্বার্থ যে অনুসরণ করে তার পক্ষে সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। কারণ সাংবাদিকতায় ফ্যাক্টসের ওপর দাঁড়াতে হবেই। কথিত জাতির (রাষ্ট্রের) স্বার্থকে প্রধান বিবেচ্য বলে গণ্য করে ফ্যাক্টসের ওপর দাঁড়ানো না-ও হতে পারে। সাংবাদিকতা ক্যাডার সার্ভিসের চাকরি নয়। অথচ ভারতে সবচেয়ে বড় করে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েই ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের সাংবাদিকতা’ করেন দ্য প্রিন্টের সম্পাদকসহ ওই মিডিয়ার সবাই। খবরের সত্য-মিথ্যা নয়, দেশপ্রেমের নামে মালহোত্রাসহ সবাই সাংবাদিকতা করছেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী হিন্দুত্ববাদ যেটাকে জাতির স্বার্থ মনে করবে সেটি প্রকৃত রাষ্ট্রস্বার্থ নাও হতে পারে। কারণ এটা তো আসলে একটা কূপমণ্ডূক দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি। সেটিকে ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলে সাংবাদিকরা মানতে বাধ্য হতেই পারেন না।

    জ্যোতি মালহোত্রা আরেক কী কারণে আমাদের ডেইলি স্টারের সম্পাদককে খুব পছন্দ করেছেন মনে হচ্ছে। তিনি এই সম্পাদকের সাক্ষাৎকার (যেটা আসলে সাক্ষাতকার না বলে অনধিকার ও অত্যাচার বলা ভাল) নিয়েছেন। আমরা এর একটাই কারণ অনুমান করতে পারি, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মাহফুজ আনাম বাংলাদেশে আমেরিকার হস্তক্ষেপের পক্ষের সক্রিয় প্রবক্তা ছিলেন। হয়ত সেই সূত্রে। এছাড়া আনাম সাহেব পদ্মা সেতুর মূল কাঠামোর কাজ সমাপ্তির দিনে এবার তিনি প্রধানমন্ত্রীকে এক দেবীর আসনে বসিয়ে গত ১১ ডিসেম্বর এক মন্তব্য-কলাম লিখেছিলেন। সেসব কথাগুলোই আবার জ্যোতি মালহোত্রা তাঁর লেখায় ‘কোট’ করেছেন। যাই হোক, মাহফুজ আনামকে জ্যোতির প্রশ্নে বা সেই উছিলায় দাবি হল – ভারত বাংলাদেশকে ১৯৭১ সালে স্বাধীন হতে সাহায্য করেছে। কাজেই আমরা ভারতকে ফেলে চীনের প্রভাবে যাচ্ছি কেন বা চীনা ঋণে ঢুকতে যাচ্ছি কেন? জ্যোতি সাক্ষাতকার এমন আগ্রাসী ও অসৌজন্যতাপুর্ণ আদব-হীন প্রশ্নে ভরপুর ছিল। যেন তিনি ভারতের হয়ে আমাদেরকে জবাবদিহিতা চাইতে এসেছেন! সোজা করে বললে, এটা আসলে জ্যোতি মালহোত্রার এক দিকে গাধামি প্রশ্নের উছিলায় করা এক বেয়াদবি। অপর দিকে এটা মারাত্মক অনধিকার চর্চা।

    “১৯৭১ সালে সাহায্য” বলে যে ইঙ্গিত জ্যোতি দিচ্ছেন এর মানে কী? আমরা একাত্তর সালে ঐ কথিত সাহায্য নিয়ে ভারতের কলোনি হয়ে গেছিলাম? জ্যোতি কি তাই দাবি করছেন? তাহলে তো আমাদের অভিযোগ-মুল্যায়ন সঠিক যে, নেহরু আমল থেকেই ভারত আদতে একটা কলোনি দখলদার হতে চাওয়া মনোভাবের ও নীতির রাষ্ট্র। অথচ ভারতকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ নিজে একটা সার্বভৌম রাষ্ট্র তাই সে কেন কী করবে, এর জবাবদিহিতা কাউকেই দিবে না। সে প্রশ্নই উঠে না। কাজেই জ্যোতির তার অনধিকার আর গাধামি প্রশ্ন করা বন্ধ রাখা উচিত। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা যত ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ বিষ ভিয়েতনামে বিমান থেকে ছিটিয়েছে, এর কোনো তুলনা নেই। যার কারণে এখনো ভিয়েতনামি মা-বাবাদের  বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হয়। অথচ এখনকার ভিয়েতনাম-আমেরিকা সম্পর্ক সে সময়ের চীন-ভিয়েতনামের ঘনিষ্ঠতম সম্পর্কের চেয়েও ভালো। কাজেই কলোনি মানসিকতা অবিলম্বে ত্যাগ করে ভারতের সাংবাদিকদের বরং আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে তাদের উচিত চোখ কান খুলে পড়াশোনা করা।

    তাহলে মোদী কেন ভার্চুয়াল বৈঠকে এসেছিলেন?
    বাস্তবত এটা আর তার অজানা নয় যে বাংলাদেশ ক্রমেই ভারতের মুঠো থেকে বের হয়ে যাচ্ছে এবং যাবেই। কিন্তু মোদীর সবচেয়ে বড় সমস্যা হল তিনি সেকথা তাঁর ভোটার কনস্টিটিউয়েন্সির কাছে স্বীকার করতে পারবেন না। কারণ তিনিই তার সরকারের সব বৈদেশিক সম্পর্ককে আভ্যন্তরীণ নির্বাচনি ইস্যু করে হাজির করেছেন। বলা ভাল মাখায় ফেলেছেন। তিনি এপর্যন্ত  নিয়মিত দাবি করে গেছেন যে তাঁর হিন্দুত্ববাদের চরম দেশপ্রেমের কারণে তার সরকারের বৈদেশিক সম্পর্কগুলোতে তিনি চ্যাম্পিয়ান। অতেওব এখন তার ধরা খাওয়ার সময়। তাই বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ক ঢিলা হয়ে গেছে এটা স্বীকার করার সোজা ফল হবে রাহুল গান্ধীসহ বিরোধীদেরকে সাহায্য করা, ফলাফলে তিনি নিজে ভোট হারাবেন। তাই এই ভার্চুয়াল বৈঠক করে তিনি আবার তার ভোটারদের কাছে এটা তুলে ধরে দাবি করবেন যে, না বাংলাদেশ আগের মতোই “ভারতের প্রভাবাধীনে” আছে। তার লাভ এতটুকুই। তবে ভোটে এর প্রভাব মোদীর জন্য অনেক মূল্যবান! সার কথায়, এটা তাই পরস্পরের ‘পিঠ চুলকে দেয়া’র ভার্চুয়াল বৈঠকও বটে!

    তবে “ফুটানির ভাণ্ডটা ফুটা” করে দিয়েছেন তৌহিদ হোসেন। বিবিসিকে তিনি বলেছেন, “…… পানি বণ্টন, সীমান্ত সঙ্ঘাতের মত ইস্যুতে আলোচনা বা সমঝোতা না হলে অন্য এসব ইস্যু ততটা গুরুত্ব বহন করে না” – এমনটাই  মনে করছেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো: তৌহিদ হোসেন।’

    ধুর্ত মিথ্যাবাদী জ্যোতি মালহোত্রাঃ
    জ্যোতি লেখা আর্টিকেল দেখে মনে হবে মোদী যেন তাকে বাংলাদেশে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডার করার জন্য ভাড়া করেছেন। জ্যোতিকে যেন দেখাতেই হবে বাংলাদেশের ভারতের তথা মোদী সরকারের প্রভাব কমে নাই মোদী এখনও ফাইট করে যাচ্ছেন। তাতে কূট, ধুর্তামি বা মিথ্যা বলে হলেও জ্যোতি তা করতে হবে। জ্যোতি লেখার শিরোনামের একাংশে লেখা ছিল এখনও সব শেষ হয়ে যায় নাই [Still, all is not lost]।  এটা বলে তিনি কী বুঝাতে চাচ্ছেন?
    সেটা জ্যোতি তার লেখার ভিতরে বলেছেন এভাবেঃ
    Bangladesh has recently told China to get lost or pay up for the trials of the Chinese Covid vaccine in Bangladesh, while signing an agreement with India’s Serum Institute to buy three crore doses. অর্থা্ৎ তিনি দাবি করছেন – যে চীনা ভেকসিন [SINOVAC বা সাইনোভ্যাক] বাংলাদেশেরও পরীক্ষায় অংশ নেয়া ও শেষে তা পাবার কথা ছিল সেই প্রসঙ্গে – জ্যোতি মালহোত্রার দাবি বাংলাদেশ নাকি চীনকে (বা সাইনোভ্যাক) বলেছে  “হয় দূর হও নাহলে টাকা দেও”। অথচ ফ্যাক্টস হল জ্যোতি তাঁর এই দাবির পক্ষে কোন প্রমাণ দিতে পারেন নাই। এমনকি কোথায় এমন কথা বলেছে তাও তিনি দেখাতে পারেন নাই।  অর্থাৎ তিনি সরাসরি  মিথা প্রপাগান্ডা করেছেন। তাহলে ব্যাপারটা আসলে কী?

    কথাটা হল, সাইনোভ্যাক একটা চীনা প্রাইভেট কোম্পানি হলেও চীনা সরকারের কো-অরডিনেশনে বাংলাদেশের ওর ট্রায়ালের শেষ বা তৃতীয় পর্যায়ে সামিল হবার প্রস্তাব পেয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এই প্রস্তাবের পক্ষে  সময়ে সাড়া দিতে না পারায় সাইনোভ্যাক অন্য দেশকে ঐ জায়গায় সামিল করে নিয়েছে। ফলে বাংলাদেশে অনেক দেরি করে সাড়া দেওয়াতে এবার ফান্ড যোগাড়ের সমস্যা দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশ সাইনোভ্যাকের ভ্যাকসিন পাওয়া থেকে বাদ পরে যায়।

    এরপরে শুরু হয়ে যায় কার ভুল বা ব্যর্থতায় বাংলাদেশ বাদ পড়ল এনিয়ে দোষ ঠেলাঠেলি। আর ওদিকে ভারত ও আমেরিকান মিডিয়াও আগ্রহী হয়ে উঠে চীনকে দায়ী বা ব্যর্থ প্রমাণ করার জন্য। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীও প্রকারন্তরে বাংলাদেশের দায় ঠেলার জন্য  ভারতের মিডিয়াকে নিজের স্বার্থে ফেবারেবল ভাবতে থাকে।

    রয়টার্স সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য গ্লোবাল নিউজ এজেন্সির একটা, কিন্তু ইন্ডিয়ান রয়টার্স এটা বাদে। কারণ, যেকোন ইস্যুতে ভারত সরকারের ভাষ্যের সাথে সাংঘর্ষিক হয় এমন নিউজ তারা তারা যতই সত্য হোক প্রচার করতে পারে না।  তাই এই সাইনোভ্যাক ইস্যুতে ভারত সরকার প্রভাবিত যে নিউজটা বাজারে এসেছে সেখানেও ইন্ডিয়ান রয়টার্স লিখেছেঃ

    Sinovac informed the health ministry in a letter, seen by Reuters, that a delay in approvals in Bangladesh had resulted in funding getting reallocated to trials in other countries.

    ঠিক এই কথাটাই উপরে আমার ব্যাখ্যায়ও আছে। মূল কথা delay in approvals, আমরা সাইনোভ্যাককে অনুমোদন দিতে দেরি করেছি। আর সেই সাথে এতে funding getting reallocated  অর্থাৎ ফান্ড অন্যদেশের নামে স্থানান্তর হয়ে যায়। এদুই কথার সোজা মানে আমাদের সময়ে সিদ্ধান্ত না পারাই সব ব্যররথতার উৎস।

    কিন্তু ইন্ডিয়ান রয়টার্স-সহ ইন্ডিয়ান ও আমেরিকান বেনার নিউজ এই সুযোগে শিরোনাম বা নিউজ করেছে – Bangladesh will not co-fund Sinovac’s vaccine trial। কেন? 

    অনুমান করা যায় বাংলাদেশ বাদ পরার পর বিকল্প কী আছে জানতে কৌতুহল হবে। এর জবাবে ফান্ড যেহেতু নয়া পরিস্থিতিতে মুল সমস্যা তাই ফান্ড যোগাড়ের কথাই তো সবদিক থেকে আসবে। তাই এবার নিজের মান বাঁচাতে ও দোষ ঠেলতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অজুহাত খাড়া করে ভারত ও আমেরিকান মিডিয়াকে অনেক কথার সাথে বলছেন, “বাংলাদেশ সাইনোভ্যাককে কো-ফান্ড করব না” । এতে ভাবটা এমন যেন  সব প্রস্তাব ভেস্তে গেছে হঠাত করে সাইনোভ্যাকের অর্থ চাওয়াতে। এভাবে খবরটা উপস্থাপন করলে ঐ দুই মিডিয়াই চীনবিরোধী মিথ্যা প্রপাগান্ডার সুযোগ তারা নিতে পারে ও তারা নিয়েছে। আর এমন ব্যাখ্যা না হোক এমন কথা টুইস্ট করার কারণে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজের দায় এড়ানোর কিছু সুযোগ পেয়ে যান। কিন্তু তবু ইন্ডিয়ান রয়টার্সকে স্বীকার করতেই হয়েছে মূল সমস্যা – “বাংলাদেশের সময়ে সিদ্ধান্ত না পারা”।
    আর এথেকেই ধুর্ত মিথ্যাবাদী জ্যোতি মালহোত্রা সিদ্ধান্তে গিয়েছেন ভারতের জন্য এখনও সময় আছে [Still, all is not lost]।  আর একেবারেই  বানানো কথা যে বাংলাদেশ নাকি চীনকে বলেছে ,হয় দূর হও নাহলে টাকা দেও। জ্যোতি তবু রেফারেন্স দিয়েছে  ভারতের এক ছোট ওয়েব মিডিয়া লাইভ-মিন্ট থেকে। সেখানে সরাসরি “told China to get lost or pay“–  এমন কোন শব্দ বা বাক্য নাই।

    তো এখন তাহলে বাংলাদেশে ভারতের জন্য সবকিছু হারায় না – কথাটার জ্যোতি মালহোত্রার বিশেষ অর্থ কী হতে পারে? যে ভারত এখন তাহলে ভারত বাংলাদেশকে ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে? তাই কী? এটাই কী জ্যোতি মালহোত্রা মোদীকে ম্যাসেজ দিচ্ছেন?

    আগেই বলেছি ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী দেশপ্রেমের মিথ্যা নাটক তাদেরকে বাস্তব থেকে দূরে রাখে। কোন কিছু শিখতেও দেয় না, আগ্রহীও করে নাই। তথ্যের ব্যাপারে তারা গাধা-গরুই থেকে যায়। তথ্য সামনে তাকলেই নিজেই শিখে নেয় না। জ্যোতি মালহোত্রা কী জানেন না ভারতের হয়ে আসা বাংলাদেশকে দুলাখ শিশি কিন্তু কেবল একলাখ মানুষকে দেয়া যাবে এমন ভ্যাকসিনে কী হয়েছে? তিনি নিশ্চয় জানবেন ঐ ভ্যাকসিন ভারতের না, ইউরোপ থেকে প্রতিটা তিন ডলারে কিনে তা তারা বাংলাদেশকে পাঁচ ডলার করে বেচবেন। এই হল ভারতের বাংলাদেশকে কথিত ভ্যাকসিন দানে ভারতের কৃতিত্ব!

    বাস্তবতা হল, দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতা হয়ে থাকার প্যারা বা হেপাও প্রচুর।  চীন হবু নেতা, এছাড়া ফান্ডও যোগাড় করা তার জন্য তুলনামূলক সহজ। তাই একটা আশা থাকবে তবে বাংলাদেশকে পারসু করতে হবে মানে চীনকে হেদায়েত করতে জানতে হবে যেন সে বাংলাদেশের ভ্যাকসিন ফান্ড যোগাড় বা পাবার ব্যাপারটাতে নজর দেয়। আমাদেরকে সাহায্য করে।  আরেকটা হতে পারে পশ্চিমা দাতব্য ফান্ড – বিল গেটস সহ আর যারা এব্যাপারে দাতব্য ফান্ড যোগাড়ের চেষ্টা করছেন, তাঁদের টা।

    আর জ্যোতি মালহোত্রাকে বুঝতে হবে এই হল বাস্তব দুনিয়া যারা বা যেটা ফান্ডের সম্ভাব্য উৎস। বাংলাদেশের ফান্ড লাগবে মানেই বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব বাড়ানোর জন্য দুয়ার খুলেছে তা সত্যি না, বাস্তব নয়। প্লিজ হুশে আসেন! এছাড়া শকুনের বদ-দোয়া বা অভিশাপে সমাজে বেশি বেশি করে গরু মারা যায় না!  যাবে না! কোনদিন তা হবে না!  আপনি বা আমি পছন্দ-অপছন্দ যাই করি কিংবা নাই করি না কেন, তবু চীন গ্লোবান নেতা হবে; চীন সামর্থবান হয়েছে আরও পোক্তভাবে হবে। কারণ এটাই নৈব্যক্তিক (objective reality) বাস্তবতা! কাজেই ঈর্ষা বা হিংসা শেষ করেন, ইতি টানেন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৯ ডিসেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “মোদি কী পেতে ‘ভার্চুয়াল বৈঠক” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

     

  • গ্লোবাল বাণিজ্য, আইএমএফ ও ট্রাম্পের ডি-কাপলিং

    গ্লোবাল বাণিজ্য, আইএমএফ ও ট্রাম্পের ডি-কাপলিং

    গৌতম দাস

    ১৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3id

     

     

    Washington is pressing for a post-pandemic decoupling from China

    আমেরিকার এবার নভেম্বর ২০২০ নির্বাচন সমাপ্ত এবং ফলাফল অনানুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়েছে। তাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হারিয়ে জো বাইডেন বিজয়ী হতে যাচ্ছেন জানা গেছে। তবে ফলাফল নিয়ে নানা রাজ্যের যেসব আপত্তি এর নিষ্পত্তি এখনো শেষ হয়নি। তবে সবাই প্রায় মেনে নিয়েছেন, বাইডেনই আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী ঘোষিত হবেন। গ্লোবাল মিডিয়াতে বাইডেনকে নামের আগে রীতি অনুযায়ী “প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট” [President-Elect] শব্দ যোগ করেই পরিচিত করানো হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বড় কথা, বাইডেন তাঁর হবু নতুন সরকারে মানে আমেরিকান ভাষায়, বাইডেন প্রশাসনে কাদেরকে মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা প্রধান কর্মকর্তা করবেন এই বাছাইও শুরু হয়ে গিয়েছে। বেছে নেয়া ব্যক্তিদের নাম ক্রমেই সামনে আসছে।

    হবু বাইডেন প্রশাসনে তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ পদ “সেক্রেটারি অব স্টেট” বা আমাদের ভাষায় “পররাষ্ট্রমন্ত্রী”। এক হিসাবে এটা প্রশাসনের দ্বিতীয় প্রধান গুরুত্বপূর্ণ পদ। এই পদে বাইডেন যে নাম বেছে নিয়ে ঘোষণা করে দিয়েছেন তিনি  এন্টনি ব্লিঙ্কেন [Antony John Blinken]। হার্ভার্ডের গ্রাজুয়েট ব্লিঙ্কেন এর আগে ওবামা আমলে একসময় উপ-নিরাপত্তা মন্ত্রী (২০১৩-৫) আর উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী (২০১৫-৭) হিসেবে কাজ করেছেন। অর্থাৎ বাইডেন তখন উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন বলে তার সাথে কাজ করেছেন। অনুমান করা হচ্ছে, সেসব সূত্রে ব্লিঙ্কেন এবার হবু বাইডেন প্রশাসনে বাছাইয়ে টিকেছেন।

    এদিকে ট্রাম্পের আমলেই একটা নতুন শব্দ চালু হয়েছিল ‘ডি-কাপলিং’ [decoupling]। ইংরেজি ‘ডি-কাপলিং’ শব্দের অর্থ কঠিন কিছু নয়, আমাদের প্রায় পরিচিত। এটা আসলে কাপলের [couple] উল্টা শব্দ। কাপল শব্দের একটা অর্থ, দম্পতি (স্বামী-স্ত্রী)। মানে, কারো সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হয়ে যাওয়া। আর এরই উল্টা শব্দ হল, ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করা বুঝাতে ডি-কাপলিং। ট্রাম্পের আমলে শেষের দিকে এই শব্দটা ব্যবহার করে বলা হত যেমন,  ট্রাম্প চীনকে ডি-কাপলিং করার নীতি নিয়েছে। মানে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যবসাবাণিজ্যের সম্পর্ক থেকে চীনকে আলাদা করে দূরে বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাচ্ছেন ট্রাম্প, চীনের সাথে তাঁর বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে। যেমন, যেসব আমেরিকান কোম্পানি চীনে গিয়ে ফ্যাক্টরি গড়ে তুলেছে তা স্থানান্তর করে আমেরিকায় ফিরিয়ে না আনলেও চীনের বাইরে অন্য দেশে নেয়ার পরিকল্পনা করেছেন। আর তাতে ওই স্থানান্তরের খরচও ট্রাম্পের সরকার বহন করবে। এই ছিল,  ট্রাম্পের ডি-কাপলিং। এমনকি এই প্ররোচনায় জাপান এগিয়ে এসেছিল। অবশ্য যুক্তি দিয়েছিল যে, চীনের ‘ভাইরাস’ থেকে বাঁচতে এটা সে করছে। যদিও কোনো এন্টারপ্রাইজ বা বড়  কোম্পানির ক্ষেত্রে এমন স্থানান্তর খুবই রুটিন। আর তা মূলত যে কারণে সাধারণত হয়ে থাকে তা হল, ফেলে আসা দেশে ন্যূনতম মজুরি তুলনায় অনেক বেড়ে যাওয়া। অথবা উল্টা করে বললে, নতুন কোন দেশ পাওয়া গেছে যেখানে ন্যূনতম মজুরি অনেক কম এবং অবকাঠামোগত সুবিধা অনেক ভাল, প্রশাসন দক্ষ চটপটে ইত্যাদি। আর এমন পাওয়া যায় বলেই ফ্যাক্টরি স্থানান্তর করা হরহামেশাই হয়ে থাকে। যেমন জাপান বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে বাংলাদেশের এক সিগারেট কোম্পানি কিনে বাংলাদেশের সিগারেট ব্যবসায় ঢুকে গেছে অনেকটা এমনভাবেই। যদিও এখানে ব্যাপারটা ঠিক মেশিনপত্র নয়, পুঁজি স্থানান্তর করে। আর বিপরীতে, ট্রাম্পের ‘ডি-কাপলিং  ব্যবস্থাটার কথা বলা হয়েছিল এর উদেশ্য ছিল, চীনকে একঘরে করা, চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধের অংশ হিসেবে।
    কিন্তু হবু পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন ইতোমধ্যেই ডি-কাপলিং প্রসঙ্গে তার শক্ত বিরোধী অবস্থান জানিয়ে বলেছেন, “ডি-কাপলিং করা এক অবাস্তবচিত ও উল্টা ফল দেবে এমনটা কাউন্টার-প্রডাকটিভ ধারণা” […।decoupling is ‘unrealistic’ and ‘counterproductive’; it also wouldn’t work]।’ এ নিয়ে তিনি আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স-এ  বক্তৃতাও করেছেন।

    গ্লোবাল বাণিজ্যঃ
    ‘গ্লোবাল বাণিজ্য’ [Global Trade] শব্দটা শুনলে বিরাট দুনিয়াব্যাপী কোনো ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটা একেবারেই দূরের কিছু না। এখানে বাণিজ্য মানে লেনদেন; অর্থাৎ আপনি আপনার পণ্য দিবেন আর অন্যের পণ্য নিবেন। কিন্তু না, অনেকের মনে হতে পারে এর আরেকটা মানে আছে। সেটা হল, বাণিজ্য মানে পণ্য দিয়ে মুদ্রা নেবেন। হ্যাঁ, এই কথাও ঠিক; তবে এটা পুরো ঘটনার অর্ধেকটা। আপনি পণ্য দিয়ে যে মুদ্রা নিয়ে ফিরলেন এরপরে সেই মুদ্রা দিয়ে আবার অন্য পণ্য বা কাঁচামাল কিনবেন। মানে, কিনতে হবে আপনাকে; খুব স্বাভাবিক। যেটা শেষ বিচারে পণ্য বেচে আরেক পণ্য কেনার ঘটনায় গিয়ে দাঁড়াবে। একারণে বাণিজ্য মানে, পণ্য লেনদেন। এটাই পণ্য কেনাবেচা মানে বিনিময়, ইংরেজিতে এক্সচেঞ্জ [exchange]। তাই গ্লোবাল বাণিজ্য মানে একটা গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ, দুনিয়াব্যাপী পণ্য বিনিময়।
    কথাগুলো ধারণা হিসেবে অবশ্যই ঠিক আছে, তবুও একটা বিষয় এতে আড়ালে থেকে গেছে, সেটাকে সামনে আনতে হবে। সে বিষয়টা হল মুদ্রা। পণ্য কেনাবেচা করতে গেলে মুদ্রা লাগবে। এর সাথে কথা আরো আছে। পকেটে পর্যাপ্ত টাকা থাকলে আপনি বাংলাদেশের যেখানেই যান যেকোনো পণ্য কিনতে পারবেন। টাকার বিনিময়ে বিক্রেতা আপনাকে পণ্য দিবে। তবে আবার সেই কিছু ‘কিন্তু’ও এখানে আছে সাথে! বাংলাদেশের সীমান্ত পার হলে কী হবে? না, এইবার আর কেউ আপনাকে কোন পণ্য বেচবে না। কারণ আপনার হাতে বাংলাদেশের মুদ্রা, তাই বাংলাদেশের ভেতরে থাকলে যেকোনো বিনিময় সম্ভব হলেও সীমান্ত পার হলে কিন্তু আর ওই মুদ্রা চলবে না। প্রত্যেকটা স্থানীয় মুদ্রার সীমাবদ্ধতা হল এটাই; দেশের সীমানা পার হলে ওই মুদ্রায় কোন বাণিজ্য, পণ্য কেনাবেচা বা বিনিময় আর চলে না। তাহলে?
    দেশের বাইরেও বাণিজ্য বা বিনিময় করতে চাইলে এবার প্রয়োজন “আন্তর্জাতিক মুদ্রা”। এমন এক মুদ্রা, যা দেশের সীমানা পার হয়ে গেলেও যেকোনো দেশেই ওই মুদ্রায় পণ্য বাণিজ্য বা বিনিময় বিক্রেতারা তখনও করবেন। তাই এবার সোজা বলা যায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রায় যে বাণিজ্য সম্পন্ন করা যায় তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। এটাকেই গ্লোবাল বাণিজ্যও বলে। বাংলাদেশের বাইরের সাথে কোনো কিছু বেচাকেনা, বাণিজ্য করে আসা – এটাই গ্লোবাল বাণিজ্য। আমাদের সীমান্তের বাইরের ভারত থেকে কোনো কিছু বাণিজ্য করে আসাও তাই গ্লোবাল বাণিজ্যের অংশ। কাজেই “গ্লোবাল বাণিজ্য” বলতে সুদূরের কোন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের সীমান্ত পার হলেই এর শুরু।
    এখন “আন্তর্জাতিক মুদ্রা” আবার কী? গ্লোবাল বাণিজ্য মানে বুঝেছিলাম তা আদতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য বেচাকেনার বাণিজ্য। আর এটাই সম্পন্ন করার একটা সিস্টেম বা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে যে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেটাই আইএমএফ। ফলে যেসব দেশের মুদ্রাকে আইএমএফ আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে স্বীকৃতি দিয়েছে (আইএমএফ এর টেকনিক্যাল শর্ত পূরণের কারণে), যে মুদ্রার বিনিময় হার (conversion rate) আইএমএফ নির্ধারণ করে দিয়েছে, এমন মুদ্রাগুলোই কেবল আন্তর্জাতিক মুদ্রা। যেমন এখন পর্যন্ত – ডলার, পাউন্ড, ইউরো, ইয়েন ও ইউয়ান আন্তর্জাতিক মুদ্রা। তবে মনে রাখতে হবে এগুলো কিন্তু একই সাথে প্রধানত দেশীয় মুদ্রা বা নিজ নিজ দেশের স্থানীয় মুদ্রা যাকে আবার ‘ডাবল রোল’ হিসেবে কাজ করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রারও স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
    এখন এতে দুনিয়াতে যে বিরাট পরিবর্তন এসেছে তা হল – একটা ‘গ্লোবাল অর্ডার’ বা নিয়ম-শৃঙ্খলার ব্যবস্থাপনা চালু হয়ে গেছে যার কারণে আমরা নিজ দেশের ভেতরের মতই দেশের বাইরেও বাণিজ্য-বিনিময় বা গ্লোবাল বাণিজ্য সহজেই করতে পারি। এবং তা কবে থেকে? গত ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের পর থেকে।

    কিন্তু এ তো গেল ইতিবাচক দিক। এবার নেতিবাচক দিক থেকে দেখা যাক। যেমন ইরান কোন কোন দেশের সাথে বাণিজ্য করতে পারবে বা আদৌ কারো সাথে পারবে কি না এটা ডিকটেট করার ক্ষমতা এসে গেছে আমেরিকার হাতে। এই ক্ষমতাটা যদিও পড়ে পাওয়া। মানে আইএমএফ এটা জেনেশুনে দিতে চেয়েই দিয়েছিল ব্যাপারটা এমন নয়। এটাকেই আমরা ইরানের ওপর আমেরিকার “অবরোধ” [Sanction] বলে জানি। অবরোধ – মানে ইরান নিজদেশের বাইরের কারো সাথে বাণিজ্য করতে পারবে না। কিন্তু এটা আমেরিকা কার্যকর করে কী করে? ের জবাবের আগে একটা কনসেপ্ট পরিস্কার করে নেই। আমেরিকার যে অবরোধ দেয় তা আইএমএফ-এর অনুমোদনে প্রাপ্ত কোন ক্ষমতা নয়, বরং আমেরিকা নিজ ক্ষমতাতেই এটা আরোপ করে থাকে। কিন্তু ইরান সেটা মানতে বাধ্য হয় কেন? সোজা। আমেরিকার ‘অবরোধ’ কথার প্রাকটিক্যাল মানে হল, যেন আমেরিকা বলছে, ইরান তুমি কোন কেনাবেচা ডলারে করতে পারবে না; মানে, ইনভয়েসে মূল্যটা “আমেরিকান ডলারে” তা লিখতে পারবা না। করলে কী হবে, আমেরিকা বাধা দেবে কিভাবে? ইনভয়েসে বা বিলে ডলারে দাম লেখার মানে হল, ঐ কেনাবেচা সম্পন্ন করতে গেলে ক্রেতার ব্যাংক আর বিক্রেতরা ব্যাংকের লেনদেনের মাঝখানে একটা আমেরিকান ব্যাংকের সাহায্য-সহায়তা লাগবেই। না হলে কেনাবেচায় মূল্যের অর্থ-স্থানান্তর ঘটানো যাবে না। আর ট্রাম্প তাঁর দেশের ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন যে, “যেসব দেশ বা ব্যক্তিকে অবরোধ তালিকায় ফেলেছি এদের দেশের কোনো কোম্পানির  অর্থ ছাড়ে তোমরা জড়িত হবে না, হলে ঐ আমেরিকান ব্যাংককেই আমেরিকা-রাষ্ট্র বিলিয়ন ডলারের জরিমানা করবে”। এভাবেই অবরোধ কার্যকর করেছে আমেরিকা। এই এক পড়ে পাওয়া বিশাল ক্ষমতা আমেরিকান হাতে আছে বা এসে গিয়েছে, সেই থেকে।

    ডি-কাপলিংঃ
    তাহলে ট্রাম্পের চীনের সাথে বাণিজ্যযুদ্ধে “চায়না ডি-কাপলিং” এই প্রোগ্রামের আসল মানে কী? মানে হল, চীনকে একঘরে করা। যেটা আরও পরিস্কার করে বললে, চীনকে বাদ দিয়ে বাকি দুনিয়ার যত বেশি দেশ পাওয়া যায় এমন সকলকে নিয়ে আগে যেমন আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়ে ছিল  যেন সে অবস্থাটাই ফিরে এসেছে বলে ট্রাম্পের সুখবোধ ফিরে পাবার এ’এক বাসনা!  তবে এটা বাসনাই! মূল কারণ এই শতকের শুরু থেকেই চীন হল সেই রাষ্ট্র যার হাতে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সারপ্লাস সঞ্চিত হওয়া শুরু হয়েছে। যার অর্থ চীনই এখন আমাদের মত বা এর চেয়েও ভাল অর্থনীতির রাষ্ট্র এমন যাদেরই আবার বিদেশি বিনিয়োগ-পুঁজি খুবই দরকার তাঁদের চীনকে খুবই দরকার। এছাড়া চীনের উঠতি বিশাল বাজার সেটাও আকর্ষণীয়। অতএব ট্রাম্প তো ফেল করবেন; করছেনও। কারণ এই জায়গায় এসে আমেরিকা আর চীনের বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বি কোনটাই একেবারেই নয়। একারণে অষ্ট্রেলিয়া বা এমনকি জাপান যারা ট্রাম্পের হামবড়া বাতের কোয়াড [QUAD] জোটের দুই মাতবর; এই তারাই আবার চীনের নেতৃত্বের RCEP বাণিজ্য জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটলে সেখানে সবার আগে নাম লিখায়। সাথে দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড ভিয়েতনাম কেউ বাইরে বাকি থাকে নাই।

    যদিও বাস্তবত ট্রাম্প ব্যর্থ হয়েছেন তবু এমন ঘোষিত নীতিটা এখনও বর্তমান। তাই এই ‘একঘরে’ করতে চাইলে মানে আসলে ঠিক কী হত? আমাদের গ্রাম-সমাজের প্রেক্ষিতে একঘরে মানে ওর নুন, পানি বন্ধ করে দেয়া; আর ওর সাথে কেউ কোনো পণ্য বিনিময় করবে না যার ব্যবহারিক মানে ‘নো এক্সচেঞ্জ’! ওকে সমাজ থেকে বের করে দেয়া; সেক্ষেত্রে যদিও সে আগের বাড়িতেই বসবাস করবে, তারপরেও। কেমন করে এটা ঘটানো সম্ভব হবে? কারণ, ওর সাথে পণ্য বিনিময় না করা মানে, ও যে লবণটা খাবে সেটাও তাকে নিজেই সমুদ্রের পানি জোগাড় করে শুকাতে হবে, না হয় লবণের খনি জোগাড় করতে হবে এবং তা নিজেই। তাতে সমুদ্র হাজার মাইল দূরে বা লবণের খনি খুঁজতে পাকিস্তানের সিন্ধুতে যেতে হতে পারে। মূল কথায়, যা কিছু সে ভোগ করবে তার সবটার ‘উৎপাদক’ তাকে নিজেই হতে হবে। নইলে তা ভোগ করা যাবে না, ভোগ নাই! ‘নো এক্সচেঞ্জ’ কথার মানে তাই। এখান থেকেই ‘সমাজ’ কথাটার মানে কত বিশাল সে হুঁশ আসতে পারে আমাদের। আমরা যারা যারা পণ্য বিনিময় করি-জড়াই তারা এই কাজের মাধ্যমে আসলে একটা সমাজ গড়ে তুলি, অজান্তেই। সমাজ মানে তাই এক অর্থে পণ্য বিনিময়কারীদের সমাজ, পরস্পরকে স্বীকৃতি দেয়ার সমাজ। এমনকি এভাবে ‘আন্তর্জাতিক সমাজ’ও। অর্থাৎ চীন যেখানে আমেরিকার বদলে নয়া গ্লোবাল নেতা হবার সবগুণ সম্পন্ন হয়ে উঠছে সেখানে ঐ চীনকেই একঘরে করার চিন্তা? এটা ট্রাম্পের একটা ফাজলামো ছাড়া আর কিইবা বলা যায়!

    জাতিবাদী সমাজঃ
    আর গ্লোবাল পণ্য বিনিময়কারীদের সমাজ ঠিক এর উল্টা অর্থ সেটাই হল “জাতিবাদী সমাজ”। সে জন্য জাতি-রাষ্ট্র বা বিদেশবিরোধীতা কথাটার অর্থ এখানেই। তত্ত্ব অনুযায়ী (তত্ব বলেছি কারণ বাস্তবে এমনটা দেখা যাবে না; অলীক) এসব জাতিবাদী দেশে সবকিছুই নিজেরাই দেশের ভিতরে উৎপন্ন করার কথা। জানি একথা শুনে অনেকেই খুশিতে পুলকিত হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু না ঘটনাটা হবে উলটা! তত্ত্বীয়ভাবে বললে এরা আমদানি-রফতানি কোনটাকেই না বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তারা তা অপছন্দ করে। কিন্তু বাস্তবতা এর উলটা।
    নরেন্দ্র মোদী সাহেব কট্টর হিন্দুত্ব জাতিবাদী। তিনি জাতিবাদী সমাজের প্রবক্তা। বক্তৃতায় সবসময় আত্মনির্ভর, স্বদেশী দেশপ্রেমিক টাইপের কথা তুলে বক্তৃতা করবেন এরা। কিন্ত সেই মোদী সীমান্তে চীনের হাতে মার খেয়ে চীনা-পণ্য বয়কটের হুঙ্কার দিয়েছিল। অর্থাৎ আগেই যেমন চীনা-পণ্য আমদানি করতেন, কোন কোন পণ্য ৯০% পর্যন্ত চীনা আমদানির, তেমনই তিনি আর করবেন না বলে হুঙ্কার দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টাটা, ভারতে চীনা পণ্যের আমদানি বেড়েছে। দেখুন, As Chinese imports boom, what happened to Modi’s ‘self-reliant’ India?
    এটাই মোদীর ‘আত্মনির্ভরশীল’ তবে ‘অলীক অর্থনীতি’। গত সপ্তাহে ভারতের নতুন পার্লামেন্ট বিল্ডিং নির্মাণ উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই আত্মনির্ভরশীল (তবে অলীক) অর্থনীতির গড়বেন [New Parliament building testament to Aatmanirbhar Bharat: PM Modi] বলে ‘চাপা মেরেছেন’।
    এখানে আরেকটা কথা পরিস্কার করে রাখা ভাল। এই জাতিবাদিরাই আবার নিজ দেশের বিদেশি পণ্য আমদানিকে খুবই অপরাধ বা নিচা চোখে দেখে থাকেন। এটাও অর্থহীন এবং এক মিথ্যা ধারনা-বুঝ। প্রথমত আমি আমদানি করতে পারি মানে আমার বৈদেশি্ক মুদ্রা যথেষ্ট আছে। অর্থাৎ অন্যকিছু পণ্য আমি উতপাদন ও রপ্তানি আমিই করি তবেই না ঐ মুদ্রা পাই। তাহলে এটা খারাপ কেন? যেমন আমরা গার্মেন্ট রপ্তানি করতে পারি মানে হল অন্তত একটা ধরণের পণ্য আছে যা উতপাদনে আমরা দক্ষ বলে সবার চেয়ে কম শ্রমে মানে দামি তা রপ্তানি করতে পারি। আর এরপরে ঐ প্রাপ্ত অর্থ দিয়েই আমরা অবশ্যই আমদানি করব,।কাজেই আমদানি মানেই নিচা বা খারাপ এমন ধারনা ভিত্তিহীন!

    ট্রাম্পের অবুঝ খায়েস ডি-কাপলিংঃ
    তামাশার কথা হল, ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছিলেন এমনই এক কল্পিত আমেরিকান জাতিবাদী অর্থনীতি গড়বেন বলে- ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নামে।
    ট্রাম্প সেই গত চার বছরে আবদার ধরে বসেছিলেন যে, চীন চাক বা না চাক তিনি চীনকে একঘরে রাষ্ট্র বানাবেনই। তবে এটা তো আসলে অলীক, এক খায়েশের কথা। আর বাস্তবে সেটা আসলে উল্টা। তিনি চীনবিরোধী হতে চান এমন বুঝা না বুঝা উসকানি-চুলকানি যাদের আছে এ ধরনের দেশগুলোর একটা আমেরিকান প্রভাবাধীন জোট বানিয়ে চীনকে তা থেকে আলাদা করে দিতে চান। এমনই কল্পরূপের কিছু নমুনা হল, ‘কোয়াড’ রাষ্ট্র গ্রুপ (ভারত, আমেরিকা, জাপান ও অষ্ট্রেলিয়া) বা হবু ইন্দো-প্যাসিফিক উদ্যোগ ইত্যাদি।
    আপাতত ট্রাম্পের হাত থেকে দুনিয়া বেঁচে নাজাত পাইছে, চায়না অথবা কোন দেশকে ডি-কাপলিং করা দুনিয়াকে আর দেখতে হচ্ছে না। কারণ ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে গেছেন। আর ব্লিঙ্কেনও দাবি করছেন, তিনি বুঝেছেন ডি-কাপলিং অবাস্তব। কিন্তু ধরা যাক, ট্রাম্প নির্বাচনে জিতলে কী হত?

    সত্যিকার অর্থে ‘কোল্ড-ওয়ার ২’ কী?
    এক কথায় বললে, ট্রাম্পের হবু পদক্ষেপে সেটাই হওয়ানোর চেষ্টা হত। ফলে যেন তা সম্ভাব্য সত্যিকার অর্থে ‘কোল্ড-ওয়ার ২’। যদিও এটা নিয়ে অনেকে এর আগে আন্দাজে ঢিল মেরেছেন। চীন ও আমেরিকার ঝগড়া-সঙ্ঘাত কখনও মারাত্মক হলেই লিখে দিয়েছেন ‘কোল্ড-ওয়্যার ২’ আসছে। কিন্তু না। ঠিক কোন শর্ত পূরণ হলেি কেবল ‘কোল্ড-ওয়্যার ২’ হতে পারে, সেটাই আমরা জানব এখন। তার আগে,  কোল্ড ওয়ার বলতে ঠিক কী বুঝব? গত ১৯৫৩-৯১ সাল, এই সময়কালে দুনিয়াটাকে সোভিয়েত-আমেরিকা এদের উভয়ের নেতৃত্বে দুইটা ব্লকে ভাগ করে নেয়া হয়েছি্‌ বা গিয়েছিল। কিন্তু শুধু দুই ব্লক-জোটরাষ্ট্রে দুনিয়া ভাগ করলেই সেটা কোল্ড-ওয়্যার বলে চালানোটা আনাড়িপনা হবে। তাহলে আর কী শর্ত লাগবে? সেটি হল, প্রথমত যদি একটা ব্লক-জোট ‘গ্লোবাল বাণিজ্যে’ অংশ না নেয়। নেয়ার যোগ্য না হয়। কিন্তু অংশ নেয় নাই তা বুঝব কেমন করে? এটা বোঝা খুবই সহজ। একেবারেই সহজ বুদ্ধিটা হল কোন রাষ্ট্র যদি আইওএমএফের সদস্যপদ না নিয়ে থাকে এর মানে তখন সে চাইলেও আর গ্লোবাল বাণিজ্যে যোগ দিতে পারবে না। তাই আমরা জেনেছিলাম সোভিয়েত ইউনিয়নের কখনই সদস্যপদ আবেদনই করে নাই। আর সাথে তার ব্লকের বেশির ভাগ রাষ্ট্রই এমন সদস্যপদ নেয় নাই। অথবা বাংলাদেশ  মত; যে নিয়েছে ১৯৭৩ সালে। কিন্তু ১৯৭৬ সালের শুরুরদিকের আগে তেমন কোন সক্রিয়তায় কোন কাজে লাগায় নাই। এভাবেই আমরা শেখ মুজিব জীবিত থাকতে ১৯৭৪ জুলাইয়ে দুর্ভিক্ষটা পর্যন্ত আমরা যেন সোভিয়েত ব্লকেই ছিলাম। আবার শেখ মুজিব নিজেই ১৯৭৪ সেপ্টেম্বর থেকে আইওএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সক্রিয়তা চাইতে গেছিলেন। তো, এদেরকেই  যারা কোল্ড-ওয়ারে জড়িয়ে গেছিল এমন দেশের ব্লক বুঝাতে চাচ্ছি।  এদের যারা যারাই আইএমএফের সদস্যই না হয় অথবা আগে হয়ে থাকলে এখন সদস্যপদ ত্যাগ করে – এটাই সবচেয়ে ভাল প্রমাণ যে এরা ‘গ্লোবাল বাণিজ্যে’ অংশ নেয় না। আইএমএফের সদস্যপদ ত্যাগ করা মানে, ওসব রাষ্ট্র আর ‘গ্লোবাল বাণিজ্যে’ অংশ নিতে পারবে না। ঠিক এমনটা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সোভিয়েত ব্লকের অনেক রাষ্ট্রের।
    কিছু বেজ ফ্যাক্টস বলে রাখি। আইএমএফের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৪ সালে আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটনউড শহরের এক হোটেলের ২২ দিনের সম্মেলনে, ৪৪ রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিয়ে। তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের মানে, জোসেফ স্টালিনের প্রতিনিধিও তাতে অংশ নিয়েছিলেন; কিন্তু এর জন্ম দলিল তৈরি করা সম্পন্ন হওয়ার পরে ফাইনাল সদস্যপদ নিয়ে যখন চাঁদা দিয়ে স্বাক্ষর করতে একটা দিন ধার্য হয়েছিল তখন থেকে কোনো সোভিয়েত প্রতিনিধি আর উপস্থিত হননি। তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন কখনই আইএমএফের সদস্য ছিল না। তবে  আইএমএফ ফাংশনাল হলে পঞ্চাশের দশকে সোভিয়েত ব্লকের অনেক সদস্যই যেমন- পোল্যান্ড এর সদস্যপদ পেতে আবেদন করেছিল। তাতে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক উভয়েই অনুমোদন করলেও আমেরিকান প্রশাসনের আপত্তিতে তা বাতিল হয়ে যায়। অতএব মূল কথাটা হল সোভিয়েত ব্লক-জোটের সাথে আমেরিকার নেতৃত্বে বাকিদের ব্লক-রাষ্ট্রের কোনো গ্লোবাল বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল না। তাই পণ্য বিনিময় বাণিজ্য সম্ভব ছিল না। এটাই যেকোন ‘কোল্ড-ওয়ার’ পরিস্থিতি আবার দেখা দিতে গেলে প্রধান শর্ত, যা আগে পুরণ হতেই হবে।

    কাজেই ট্রাম্পের স্বপ্ন একালে অধরা হয়ে থাকার সম্ভাবনাই ছিল প্রচুর। মূল কারণ এখন দুনিয়ার খুব কম রাষ্ট্রই আছে যে আর আইএমএফের সদস্য নয়। বিশেষ করে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও ভেঙ্গে আরো ১৫ রাষ্ট্রে পরিণত হবার পর থেকে এরা সকলেই আইএমএফের সদস্যপদ নিয়ে নিয়েছিল সেজন্য। আর ১৯৮০ সালে কমিউনিস্ট চীন আইএমএফের সাথে সম্পর্ক সক্রিয় করে ফেলার পর থেকে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য দেশের মধ্যে ১৯০ টা দেশই আইএমএফের সদস্যপদ নিয়ে নিয়েছে। এই অবস্থায় চীনকে আর একঘরে করা আরো অসম্ভব হয়ে গেছে। যে চীন দুনিয়ার হবু নেতা এবং পালটা নতুন করে পুরান আইএমএফের সংস্কার করে নিবার ক্ষমতা সম্পন্ন।  কাজেই ট্রাম্প আবার জয় লাভ করলেও আইএমএফ একটা বড় ঝাকুনি খেত হয়ত। কিন্তু তবু আইএমএফের সদস্যপদ সবারই থেকে যেত। ওদিকে সারা ইউরোপ ট্রাম্পের আমেরিকার উপর ১৯৪৫ সালের পরে এই প্রথম আস্থা হারিয়েছিল যেটা আর ফিরে আসত না। যেমন এর উল্টাটা, সেই আস্থা আবার কতটা ফিরে পাওয়া যাবে সেলক্ষ্যে বাইডেন ঝাপিয়ে পড়ে কাজ করার পরিকল্পনা নিচ্ছে্ন এখনই।

    তাই  একালে বাইডেনের হবু প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, ডি-কাপলিং ‘অবাস্তব’ ও ‘কাউন্টার-প্রডাকটিভ’। কথাটা অনেক তাৎপর্যপূর্ণ; যদিও এর মানে বাইডেনের আমলে চীন ও আমেরিকার মধ্যে আর কোনো সঙ্ঘাত থাকবে না  – না সেটারও কোন সত্যতা নাই, এর একেবারেই সত্যি নয়। মূল বিষয়, একই গ্লোবাল বাণিজ্য সমাজে সবাই থাকছে কি না। আর একই বাণিজ্য সমাজে আর যদি কখনও না থাকে একমাত্র সেক্ষেত্রেই যেটা হতে পারে ‘কোল্ড-ওয়ার ২’ পরিস্থিতি। কাজেই না-বুঝ ‘কোল্ড-ওয়ার ২ বলে এ নিয়ে আলাপ তোলা বন্ধ করাই ভাল। আর উল্টাটা যদি চীন-আমেরিকা একই বাণিজ্য সমাজে যদি থাকে, তবেই দুনিয়া ফান্ডামেন্টালি ঠাণ্ডা থাকবে!‘ বলাই বাহুল্য!

    সবশেষেঃ
    ১। কয়েক মণ চাল-ডাল যদি একবার মিশিয়ে ফেলা হয়, এরপর তা আবার আলাদা করে আগের জায়গায় আলাদা চাল ও আলাদা ডাল করা প্রায় অসম্ভব এক ঘটনা। এই যুগে ডি-কাপলিং প্রয় সেরকমই এক অলীক ধারণা!
    ২। একটা মজার কথা হল, কমিউনিস্টদের কাছে তবু সেই থেকে জোসেফ স্টালিনের মতই “গ্লোবাল বাণিজ্য” এক অ-বুঝ ধারণা শুধু না, একটা নো-গো [no-go] ধারণা; যা তারা বুঝার চেষ্টাও করে না, আলোচনায় অংশগ্রহণও করে না! বরং অনেকটা যেন হারাম খাদ্যের প্রতি যেমন মানুষের আগ্রহ থাকে না সেরকম! এমনকি কেন এমন ‘হারাম মনোভাব সেটা উলটে দেখা বা রিভিউও করে না এরা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১২ ডিসেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “গ্লোবাল বাণিজ্য ও ট্রাম্পের ডি-কাপলিং” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • গান্ধীর সত্য মানে ‘ট্রুথ’ নয়, ফ্যাক্টস

    গান্ধীর সত্য মানে ‘ট্রুথ’ নয়, ফ্যাক্টস

    গৌতম দাস

    ১২ নভেম্বর ২০২০, ২১:৩৬

    https://wp.me/p1sCvy-3i5

    অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে অনেকের মূল্যায়ন আমরা দেখে থাকি; কিন্তু কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গেলে, সেখানে অন্তত কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে তা করা হচ্ছে – তা নিয়ে আমাদের পরিষ্কার থাকা উচিত। না হলে তা যথার্থ মূল্যায়ন বলে বিবেচিত না হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার কোন মানদণ্ডটা সঠিক? সেটা কী এমন যে চোখে আঙুল দিয়ে পাঠককে দেখাতে হবে? না, ব্যাপারটা ঠিক তাও না। কারণ কোন মানদণ্ড অনুসরণ করে মুল্যায়ন করা হলে বুদ্ধিমান পাঠক তা অবশ্যই ধরে ফেলতে পারবেন। কাজেই কী মানদন্ড ব্যবহার করা হয়েছে তা চোখে আঙুল দিয়ে পাঠককে দেখানোটা জরুরি নয়। কিন্তু পরিস্কার মানদন্ড বজায় থাকতে হবে।

    আমাদের পড়া অনেক মূল্যায়নই, সেটা গান্ধীকে (মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী) নিয়েও হতে পারে – তা এমন মানদণ্ডের সমস্যার জালে আটকে থাকতে পারে। তবে গান্ধীর  একাডেমিক লাইফের দুর্বল দিক নিয়ে অনেক নেতি কথা প্রচলিত আছে- যা অনেকের লেখায় আমরা দেখতে পাই। তবে গান্ধী নিজেও বলে গেছেন, তিনি ছাত্র হিসেবে খুবই মধ্যমমানের [mediocre] ছিলেন, মেধাবি ছিলেন না। তবে সেক্ষেত্রেও কারও শিক্ষাগত যোগ্যতা কত দূর, তা জানা দিয়ে তাকে মূল্যায়ন করা সঠিক পদ্ধতি না।

    গান্ধী ব্যারিস্টার ছিলেন। সে জন্য কী তাকে বড় বিদ্যাধারী মানতে হবে? না এমন কোনো মানে নেই। এর চেয়ে বরং ব্যারিস্টার কথাটা আমাদের আর কী ধারণা বা চিন্তার আবহাওয়া তৈরি করে দেয় সে দিকে যাওয়া যেতে পারে। মনার্কি বা রাজতন্ত্রের যুগে কেউই ব্যারিস্টারি পড়েনি, আমরা ধরে নিতে পারি।  কারণ, রিপাবলিক না  অধিকারের ধারণার তখন চল ছিল না; শুরু হয়নি বলে চাইলেও পড়া যেত না। এটা বুঝলে ও মানলে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারি। কারণ ব্যারিস্টার মানে হল সেটা আর রাজতন্ত্র না, তা ছিল আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের যুগের কথা। যেখানে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও উৎস জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার হাতে। মানে সব রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস ওই পাবলিক- এটা শুরুতেই স্বীকার না করে উপায় নেই। এখন গান্ধী মর্ডান রাষ্ট্র, রিপাবলিক ও রিপ্রেজেন্টেশন ধারণাগুলো কতটা বুঝতেন ও মানতেন এগুলো হতে পারে গান্ধীকে মূল্যায়নের একটা পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া।

    দ্বিতীয়ত, গান্ধী সবসময় পকেটে এক খণ্ড গীতার কপি নিয়ে ঘুরতেন বলে জানা যায়। মূলত গীতার ‘সত্য’ তার আকর্ষণের বিষয় ছিল; কিন্তু এই ‘সত্য’ নিয়ে তার বাড়াবাড়ি থেকে বোঝা যায়, তিনি দর্শন পর্যন্ত বা চিন্তার পদ্ধতি কী – ইত্যাদি বিষয়গুলো পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি বা এসব বিষয়ে তার আগ্রহ ছিল এমন ধারণা দেয় না।

    যদিও ‘গীতা’ যাকে আমরা সাধারণভাবে এক থিওলজিক্যাল এক্সপ্রেশন বলে দেখতে ও বুঝতে পারি, সেখানকার কোনো বক্তব্যের ‘সত্য’ মানে এটা আবার  থিওলজির ‘সত্য”। মানে সেটা আইডিয়েল অর্থে ‘সত্য’- ‘কী হওয়া উচিত’ এই অর্থে। কারণ ধর্মতত্ব আইডিয়েল (ideal বা আদর্শ) বিষয় নিয়ে নাড়াচাড়া করে থাকে।

    ইংরাজি ভাষায় ট্রুথ[Truth] আর ফ্যাক্টস[Facts] এই দুটা শব্দেরই আমরা বাংলা করি “সত্য”। যদিও ফ্যাক্টস মানে সত্য – এখানে সত্য বর্ণনা অর্থে সত্য। মানে ঠিক বলছি কীনা এই অর্থ ‘সত্য’ ধারণা।  আর ট্রুথ শব্দটা ধর্মতত্বের সত্য ধারণা।   এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে আমাদের জন্য লক্ষ্যণীয় যে, গান্ধীর ‘সত্য’ আর গীতার ‘সত্য’ ধারণা ও প্রসঙ্গ এক না। বরং গান্ধীর সত্য হল “ফ্যাক্টস”। কাজেই এ নিয়ে এত হৈ চৈ ফেলানোর কিছু নেই। অর্থাৎ কোনো মানুষের চিন্তা যখন খুবই প্রাথমিক স্তরে থাকে, তখনকার আলাপ এগুলো বলা যায়। অথচ এটা নিয়ে গান্ধীর ‘সত্যাগ্রহ’ আন্দোলন বলে বুঝে-না বুঝে কত আড়ম্বর করা হয়েছে। আর তাতে গান্ধীর ‘সত্যের’ সীমাবদ্ধতাই প্রকাশ পেয়েছে আরও ভালোভাবে। কারণ গান্ধীর ‘সত্য’ থিওলজির ধারণার মতো নয়। তাতে পকেটে গীতা রাখা, না রাখায় কোনো ফারাক নেই। তাই বলা যায় গীতার সত্য মানে কোনো থিওলজি বা ধর্মতত্ত্বীয় সত্য ধারণা নিয়ে গান্ধী নাড়াচাড়াই করেননি।

    প্রসঙ্গ আরও আছে। গান্ধী সারাজীবন হিন্দুধর্ম গ্রন্থগুলো থেকে এর নানা তাফসির বা ব্যাখ্যাকর্তা হিসেবে সমাজে হাজির থাকতে চেয়েছেন; কিন্তু এতে ঘোরতর সমস্যাটা হলো যে, আপনি কোন ধর্মের তাফসিরকারী আর রাজনীতিবিদ একই সঙ্গে এটা হতে পারে না। দ্বিধা তৈরি হবে। রাজনীতিবিদ মানেই আপনি সব নাগরিকের জন্য নেতা হয়েছেন, ধর্ম নির্বিশেষে সবাই আপনার ‘কনস্টিটুয়েন্সি’ এটা মেনে নিয়েই রাজনীতিতে যেতে হয়। ‘কনস্টিটুয়েন্সি’ মানে হলো আপনি তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি বা নেতা হতে চান। এই ‘কনস্টিটুয়েন্সি’কে এক সঙ্গে বাঁধা ও গড়াই তো রাজনীতি; কিন্তু গান্ধী ‘কনস্টিটুয়েন্সি’ ভঙ্গ করেছেন। হিন্দুধর্ম গ্রন্থগুলোর তাফসিরকারী হয়ে বক্তৃতা দিয়ে বুঝিয়েছেন যে, তিনি কেবল হিন্দুদের জন্যই রাজনীতিবিদ। তাও আবার হিন্দুদের সবাই নয়। কেন? সেখানেও বিভক্তি টেনেছেন। কেবল সেসব হিন্দু যারা তার করা তাফসিরের অনুসারি ভক্ত বা সঠিক মনে করেন, কেবল তাদের। কাজেই তিনি ভারত স্বাধীনকারী রাজনীতিবিদ হতেই পারেন না। এ ক্ষেত্রে তিনি ন্যূনতম ধরনও মানেননি। ফলে তিনি এ সেক্টরে অযোগ্য।

    তাহলে কী আমি ধর্ম আর রাজনীতি আলাদা করতে পরামর্শ দিচ্ছি? একেবারে তা না কিন্তু। সোজা জবাবটা হল, যে কোনো থিওলজি মানেই হলো তা আর রাজনৈতিক পরিভাষায় হাজির থাকে না। এছাড়া কোন একটা থিওলজি মানেই হল তা আর সার্বজনীন অর্থাৎ ধর্মনির্বিশেষে সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। তা কেবল নির্দিষ্ট কোন ধর্মের অনুসারীদের জন্য প্রযোজ্য। তবে থিওলজির গভীর জ্ঞানের কথাগুলোকে ঠিক রেখে শুধু পরিভাষা বদলে নতুন করে রাজনৈতিক পরিভাষায় স্থাপন করে সার্বজনীন রূপে সব নাগরিকের জন্য অবশ্যই হাজির করা যাবে। বা তা করা উচিত; কিন্তু এমন কোন যোগ্যতা গান্ধীর ছিল বলে আমার জানা নেই।

    সবশেষে বলবো গান্ধীর যুগের সবাই ডুবেছিল জাতি বা নেশন ধারণার কারণে- যা তাদের অযোগ্য করে দিয়েছিল। এ নিয়ে সংক্ষেপে বলব। তারা সবাই আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র বলতে এই জাতিরাষ্ট্রই বুঝতেন। তাও আবার নেশন বলতে কোনো না কোনো ধর্মীয় অর্থে জাতি, যেমন ব্রিটিশ জাতি মানে তারা বুঝতেন ‘এঙলো ক্যাথলিক খ্রিস্টান’ ধর্মীয় নেশন। তাই এরই অনুকরণে তারা ভারতেও হিন্দু ধর্মীয় জাতির এক জাতিরাষ্ট্র- এমন এক রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্ন মনের ভেতরে পুষে নিয়েছিলেন।

    তবে ব্যাপারটা আরও একশ’ বছরের পুরনো। গান্ধী ভারতের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ১৯১৪-৫ সালের দিকে। এর একশ’ বছর আগে ১৮১৫ সালে রামমোহন রায় প্রথম ভারতে জাতিরাষ্ট্রের ধারণা নির্মাণ করেছিলেন। তিনিই প্রথম ব্রিটিশদের বুঝেছিলেন ‘এংলো ক্যাথলিক খ্রিস্টান’ ধর্মীয় নেশন হিসেবে। তবে এর অনুকরণে আগে তিনি ভারতের সবাইকে একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম ধর্মে দ্বীক্ষিত করতে ১৮১৫ সালে ব্রাহ্ম-ধর্ম প্রকল্প নিয়ে ব্রাহ্ম সমাজ গড়ে তুলেন। এর মাত্র আঠারো বছরের মধ্যে ১৮৩৩ সালে রামমোহন মারা যান। পরে অনেক চেষ্টা করেও ব্রাহ্ম সমাজ আর এগোতে পারেনি, উল্টা তা দুই/তিন ধারায় বিভক্তও হয়ে যায়। আর তাতে হিন্দু নেতারা সবাই এবার ব্রাহ্মধর্ম ফেলে হিন্দুধর্মীয় এক জাতিরাষ্ট্র গড়া ছাড়া উপায় নেই যুক্তিতে গোপনে বা প্রকাশ্যে তৎপরতা শুরু করেন।  অর্থাৎ অখন্ড ভারতের জন্য এক হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্র কায়েম করাকে জায়েজ মানা শুরু হয়েগেছিল। আর এতেই বলা বাহুল্য  এজন্য এটাই এখনো ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের আদি পাপ হয়ে আছে। বিশেষত নেহেরু-গান্ধীও হিন্দুধর্মীয় এক জাতিরাষ্ট্র রাজনীতির অনুসারী হয়ে উঠেন। স্বাধীন ভারতের চূড়ান্ত রূপ দেয়া হয়েছে- এ দুই নেতার হাতে। আর এ কারণে এখন কম-বেশি ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সবাই অস্থিরতা ও সংঘাতে রয়েছে।

    জাতিরাষ্ট্র চিন্তার বিকল্প দুনিয়া এখন হাজির; কিন্তু কেউ সেদিকে আগ্রহ দেখায় না। অন্তত ভারতের কেউ করে না। বরং আরও জোরেসোরে জাতির স্বার্থ বলে এক শব্দে হিন্দুধর্মীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণাটাকেই আবার হাজির করে। আরএসএস-বিজেপির রাষ্ট্রচিন্তা হল এই হিন্দু জাতি রাষ্ট্র ভারতেরই আরও দানব ভার্সন।

    লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

    [এই লেখাটা  গত ২৮ অক্টোবর ২০২০, সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “গান্ধীকে নিয়ে মূল্যায়ন” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নষ্টা-সেকুলারিজমের বীণা সিক্রি

    নষ্টা-সেকুলারিজমের বীণা সিক্রি

    গৌতম দাস

    ২৩ নভেম্বর ২০২০, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3gD

    ব্যাপারটা একটু পুরনো। কিন্তু বারবার ফিরে আসে এমন পুরনো রোগ। বীনা সিক্রি [Veena Sikri ] বাংলাদেশে ভারতের সাবেক এক রাষ্ট্রদূত। গত ২০০৩-০৬ সময়কালে তিনি রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ভারতের প্রায় সকলের সব কিছুতে শো-আপ বা বাড়িয়ে বলা বা দেখানো – এটা এমনকি বেসরকারি পর্যায়ে তো বটেই সরকারি পর্যায়েও অভ্যাসের মত হয়ে গেছে। বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে সম্ভবত শো-আপ করাদের শীর্ষ আছেন বীণা। আর বাংলাদেশে তিনি এটা করার আরো সুযোগ নিয়ে থাকেন কারণ তিনি সরকারি আমলা হিসেবে চাকরি শেষ করলেও এখন সাউথ এশিয়ান উইমেন্স নেটওয়ার্কের (South Asia Women’s Network, SWAN)) আহ্বায়ক বলে জানা যায়, এর সুযোগে।

    সিক্রির সেকুলারিজম-বোধঃ
    দেখা যায়, তিনি সবসময় আমাদের যেচে ‘হেদায়েত’ করতে ভালোবাসেন আর ইদানীং তা সবচেয়ে বেশি যা নিয়ে, সেই সাবজেক্ট হচ্ছে  সেকুলারিজম। আবার তাঁর সেকুলারিজম ভাবনাটা ‘বিশেষ’। সেটা যেন উল্টো মনে করিয়ে দিতে চায় যে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কিন্তু মুসলমান। তাই যেন বলতে চান, এরা তো একটু খাটো (!), সেটা এখন এঁরা সেকুলার হলে  সমান পক্ষ হতেও পারে!। যদিও এই সাবজেক্ট নিয়ে তাঁর জানা-বুঝা ঠিক বা যথেষ্ট কি না তা নিয়ে সন্দেহ করার কারণ আছে। এ ছাড়াও অন্য যেসব প্রসঙ্গ তিনি সাধারণত আনেন ও কথা বলেন সেগুলো যেমন – ভারত নাকি পড়শিদের জন্য ‘বড়ভাই’, সে কথাটা আবার উনি নিজমুখেই বলছেন। এমনই ডেস্পারেট এবং যেন  মুল্যবোধের ঘাটতিতে থাকা ও অপ্রয়োজনীয় সংঘাত শো করা মানুষ তিনি। গত ২০১৫ সালে ভারতের এক ওয়েব মিডিয়ায় [livemint] তিনি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন যেটা ঢাকার দৈনিক ইত্তেফাকও পরদিন অনুবাদ করে ছেপেছিল। ওর বাংলা শিরোনাম ছিল- “ভারত এখন দক্ষিণ এশিয়ায় ‘এলডার ব্রাদার’ : বীনা সিক্রি”। আবার ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের এশিয়ান এজ পত্রিকায় তিনি বলেন, “বাংলাদেশ মুসলমান ও বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে আটকে গেছে” [Bangladesh is caught between Bengali and Muslim identities: Veena Sikri]। এ ছাড়াও শাহবাগ আন্দোলনের আমলে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে বলছেন, সেটা নাকি “৭১-এর প্রজন্মের জেগে উঠা ছিল” – ইত্যাদি ধরনের ভারতীয় ব্যাখ্যা যার সার কথা হতে দেখা যায় যেটাকে আমরা প্রচলিত ভাষায় বলি, ইসলাম ‘কোপানো’র সুযোগ নেয়া আর উচ্ছ্বাস দেখানো। তখন প্রশ্নকর্তা অবশ্য শাহবাগের মধ্যে যা দেখেছিলেন সেটা হল এক না- বুঝা অবুঝ চোখে এক “আরব স্প্রিং” বলে একে ভ্রম। অথচ আরব স্প্রিং (নামেও বোঝা যাচ্ছে) সেকালে ঘটেছিল সাধারণত মুসলমান প্রধান রাষ্ট্রে। আর আমেরিকান এই প্রোগ্রামের লক্ষ্যও ছিল সেটা।  কিন্তু বাংলাদেশের শাহবাগ তো ইসলামবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত কথিত “সেকুলারদের” আন্দোলন!

    এমনিতেই যারা বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত হয়ে আসেন এঁদের মধ্যে একটা ‘কলোনি দখলদার মাস্টার’ ভাব কমবেশি থাকতে দেখা যায়; যেন তারা ভারত সরকারের ভাইস-রয় বা ‘কলোনি রাজপ্রতিনিধি, আমাদের দেখভাল বা দেখেশুনে রাখতে ও হেদায়েত করতে এসেছেন। ঠিক যে জিনিসটা ১৯৪৭ সালে আগস্টে কলোনিমুক্ত ও স্বাধীন ভারত হয়ে গেলে নেহরুর মধ্যে দেখা গিয়েছিল বা যেত। বডি ল্যাঙ্গুয়েজে তিনি নিজেকে ‘ব্রিটিশ ভাইসরয়’ ভাবতেন যার সবচেয়ে ভাল ও বিস্তারিত প্রমাণ আমরা দেখতে পাই নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তির ভাষায়। কলোনিদখলি চোখ মনে করে দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে সার্বভৌম সমমর্যাদার সম্পর্ক হতে পারে না। কোন সম্পর্ক হলে তা হতেই হয় দখলদার ও অধস্তনের, এই বিশ্বাস তাঁর প্রখর ছিল। ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করে চলে গেলেও নেহরু যেন ব্রিটিশের উত্তরসূরি; তাই তিনি কলোনি মাস্টারের সেই ভূমিকায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। এমন চিন্তার সমস্যার গোড়া হল – নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র চিন্তার মধ্যে; যেখানে দুই রাষ্ট্রের সমমর্যাদার নাগরিক সম্পর্ক বলে কোনো ধারণা বা ইমাজিনেশন থাকে না, কাজ করে না। সব কিছুকেই এরা মাস্টার-স্লেভ বা প্রভু আর গোলামঅধস্তন বানিয়ে ফেলেন এবং সেভাবে দেখে থাকেন। এর বাইরে ভাবতে পারেন না। অথচ মজার কথা এরাই আসেন আমাদেরকে সেকুলারিজম শিখাতে; আর এতে যদিও আমরা তাঁদের ক্লাস-সেন্স দেখি আর প্রীত হই!।

    বীণা সিক্রির সেকুলারিজম আসলে একজন হিন্দু জাতিরাষ্ট্রবাদীর ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো বৈ আর কিছু নয়। এটি সবচেয়ে সহজে ধরা পড়ে যখন আমরা দেখি আরএসএস-বিজেপির মতো পাঁড় হিন্দুত্ববাদী দলের মোদী সরকার প্রায় সাত বছর ধরে ভারতে ক্ষমতায়; অথচ বীণা সিক্রির মোদীর বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি বা সমালোচনাই নাই; বরং ভাবটা হল একেবারে সব ঠিকঠাক সুন্দরভাবে চলছে। অথচ “জয় শ্রীরাম” বলানোর জবরদস্তি অত্যাচার নিপীড়নে টেকা দায়, মুসলমান নাগরিকের বুকের খাঁচার ওপর লাফিয়ে উঠছে তাঁরা। কিন্তু বীণা সিক্রির তাতে কোন বিকার আছে আমরা দেখি নাই! তার মানে, সিক্রির সেকুলারিজম ভাবনার ফিল্টারেও আরএসএস বা মোদী পার হতে যেতে পারেন। এর চেয়ে তামাশা আর কী হতে পারে! আবার দেখি – বীনা সিক্রি মোদী-অমিতের ভারতের পড়শি দেশের থেকে কেবল ‘না-মুসলমানদেরই নাগরিকত্ব দেয়া’ হবে এই চরম বৈষম্যমূলক আইন গ্রহণ করেছেন বলে প্রকাশ্যে জানাচ্ছেন। এমনকি বীণা সিক্রি মোদীর এই আইনের পক্ষে তিনি নিজে সাফাই গেয়ে বলেছেন, এটা ‘ন্যায্য’। এখানে তাকে “বাহ রে সেকুলারিস্ট” ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ দেখি না।

    সিক্রির ভারত ‘এলডার ব্রাদার’ তত্ত্বঃ
    ভারতের বাইরের মানুষ ভারতের বড় ভাই সুলভ আচরণের বিরুদ্ধে আপত্তি ও নিন্দা জানিয়ে থাকে। অথচ বীণা ভারতের এই অশিষ্ট ও আন-ওয়েলকাম আচরণ এটাকেই ভারতের জন্য গৌরবের বলে মনে করেন বা তুলে ধরে থাকেন।   বীনা সিক্রির এমন বুঝাবুঝির দৌড় দেখে জানা যায়, তার চিন্তা কত স্থুল। আর তিনি মনে করেন, বাকচাতুরি দিয়ে তিনি কথা বলবেন আর এটাকে কূটনৈতিক কথা বলে সবাই তা গ্রহণ করবে বা মেনে নিবে।

    বাংলাদেশে ২০০৭ সালের জবরদস্তির তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করে আমেরিকা বাংলাদেশকে ক্রমেই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল; যাতে ভারত যেমন ইচ্ছা আসামসহ নর্থ-ইস্টের জন্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিটের নামে পুরো একটা করিডোর এবং তা বিনাপয়সায় এবং প্রায়রিটিতে আমাদের দুই বন্দরও প্রায় বিনাপয়সায় ব্যবহার করতে পারে। অবশ্য আসাম নিয়ে ভারতের জন্মের সময় (১৯৪৭) থেকেই নেহরুসহ ভারতের শাসকদের দ্বিধা ছিল যে, আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্টের জন্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর মাগনা পেলেও সেটা দরকার কি না, নেয়া ঠিক হবে কি না! এ কথাটা শুনতেই আজব ও অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। কিন্তু কথা সত্য।

    আসামের অসুস্থ দ্বৈততাঃ বাংলাদেশের করিডোর ভোগ করে কিন্তু মুসলমান খেদাও চায়
    ভৌগলিকভাবে, আসামসহ ভারতের পুরা নর্থ-ইস্ট কিন্তু বাকি ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বা ল্যান্ডলকড নয় একেবারেই। অন্তত ১৮ কিলোমিটার সংযোগ-ভূমির (চিকেন নেক) দ্বারা এটি সরাসরি ভুমিসংযুক্ত। আবার দেশভাগের সময়ের আগে বা পরে কখনোই নর্থ-ইস্টের জন্য করিডোর বা ট্রানজিট দরকার বলে ভারত কখনো এমন কিছু পাওয়ার ইচ্ছা বা আগ্রহই প্রকাশ করেনি। এটাই প্রমাণ করে, ভারত আসামের জন্য করিডোর বা ট্রানজিট চায় না, অন্তত এই প্রশ্নে তাদের বিরাট দ্বিধা আছে। কেন?

    কথাটা বুঝা খুবই সহজ। আসাম যে যুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে করিডোর বা ট্রানজিট চাইবে, বাংলাদেশের অগভীর ফিডার বন্দর বা কোন গভীর সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করে পণ্য আনা-নেয়ার সুবিধা চাইবে, এরই সাথে সাথে ঠিক একই যুক্তিতে আসামসহ নর্থ-ইস্টের ওপারে আরো উত্তরে আছে চীন। চীনের ঐ ভূখন্ডের বাসিন্দারা তাঁরা পুরোপুরিই ল্যান্ডলকড বলে, তারাও আসামের ওপর দিয়ে করিডোর বা ট্রানজিট চাইবে আর একইভাবে অসমীয়দের মত বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া সব করিডোর ফ্যাসিলিটিই পেতে চাইবে। এর সোজা মানে হবে, ভারতকেও আসামের ওপর দিয়ে চীনকে করিডোর সুবিধা পেতে দিতে বাধ্য হতে হবে। কিন্তু এটাই ভারত কখনো চায় না। এতে নাকি ভারতের আসামের ‘পবিত্রতা ও শান্তি নষ্ট হয়ে যাবে’- এই হল ভারতের প্রকাশ্য যুক্তি।  এটা আসলে নিজ সন্তানকে হাত-পা নুলা করে দিয়ে এবার তাকে দেখিয়ে রাস্তায় বসে ভিক্ষা করানো – এভাবে আয়-ইনকাম করার মত। আসাম ডেভেলপড হয়ে গেলে তা দেখে চীনের সাথে আসামের সীমান্তে লাগোয়া অংশ আসামের উপর দিয়ে করিডোর চেয়ে বসতে পারে তাই, আসামকে নুলা করে রাখতে হবে, এই মনোভাব!
    এ জন্যই আমরা দেখি স্থানীয় (অসমীয়, বোড়ো বা অন্যান্যরা) আসামের বাসিন্দারা কথিত ‘বাঙালিদের বহিষ্কার’ চাইত সেই ১৯৫১ সাল থেকে। কিন্তু কখনো বাংলাদেশের ওপর দিয়ে করিডোর বা ট্রানজিট চায়নি। অথচ আবার ভারতের শাসকরা পিছিয়ে পড়া আসামে (১৯৭২ সালের আগে পুরো নর্থ-ইস্টকে আসাম রাজ্যের অংশ গণ্য করা হত) কখনো অবকাঠামো বিনিয়োগই ঠিকমতো দিতে রাজি হয়নি; সম্পদ নাই বা ঘাটতি বলে এড়িয়ে গেছে। আর তাতে আসামই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রবল সব বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন জেগে উঠেছে (এখনও উঠে আছে), তবু ভারত কিছুই করতে রাজি হয়নি, নির্বিকার।
    আমরা নাকি “মাগনা পেলে আলকাতরাও খেতে চাই”- এখন সেই অবস্থা হয়েছে ভারতের। মাগনায় করিডোর পাচ্ছে বলে যেন এখন ভারতের আগ্রহ হয়েছে। কিন্তু ইন্টারেস্টিং হল – বাংলাদেশ বিনাপয়সার পোর্টসহ করিডোর দিচ্ছে; এটা বিজেপির পক্ষ থেকে আসামের বাসিন্দাদের জন্য কোনো উপহার মোদী সরকার এনে দিয়েছে – এটা প্রকাশ্য সত্য হলেও এটা আসামে কোন দলের নির্বাচনী ইস্যু নয়। এখনও এমন মানে বা মনে করা হয়নি। মূল কথা, আসামের এ পাওয়াটা লোপ্রোফাইলে রেখে দিতে চায় ভারত সরকার। কারণ সম্ভবত বাংলাদেশ যে এত বিশাল সুবিধা দিয়েছে এটা বেশি প্রচার করা হলে না বাংলাদেশ থেকে বাংলাদেশ বা মুসলমানবিরোধী ও বিদ্বেষী আন্দোলন বন্ধ (আসামের বাঙালি খেদাও বা এখনকার নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে অসমীয় মুসলমানদের খেদানো) করার দাবি বের হতে পারে। এ ছাড়া এর প্রচার বেশি হলে কখন আবার চীন না একই সুবিধা দাবি করে ভারতের কাছে চেয়ে বসে আর বাংলাদেশ তাতে সমর্থন দেয়। এটা অবশ্যই বিরাট এক তামাশা যে, পোর্টসহ করিডোর সুবিধা পাওয়া আসামের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের কোনো দলের নির্বাচনে এটা কোনো ইস্যুই কেউ করতে রাজি না…।

    করিডোর নেয়ার পালটা কী, বাংলাদেশকে কী দিয়ে বুঝ দিবেঃ
    কিন্তু সমস্যা আরেক জায়গায়। আমেরিকা আমাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দিলেও ভারতের জন্য এটা কিছু চক্ষুলজ্জার যে, কোন কিছু পাল্টা সুবিধা বাংলাদেশকে না দিয়ে করিডোর নেয়াটা কেমন দেখাবে! তাই এই অস্বস্তিটা কাটাতেই ঠিক করা হয়, বাংলাদেশকে “দুধ-ভাত খেলোয়াড়” বানিয়ে খেলায় নিবে। সেটা কী?
    মরহুম শেখ মুজিব সেই ১৯৭৪ সালে ভারতকে বেরুবাড়ি দিয়ে দিয়েছিলেন, বিনিময়ে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন কিন্তু আমাদের ছিটমহলে যাওয়ার করিডোর ভারত দিয়ে দেবে – এই ভূমিবিনিময় চুক্তি হয়েছিল ওই সময়। তাই আমাদের কনস্টিটিউশন সংশোধন করে শেখ মুজিব আমাদের কর্তব্য করেছিলেন তখনই। কিন্তু ভারত তার দায় কখনো গত ৪১ বছরে পূরণ করেনি। অর্থাৎ এটা আমাদের পাওনা অধিকার হলেও ভারত আটকে রেখেছিল। এ ছাড়া তিস্তার পানি পাওয়াও ছিল আমাদের ভাটির দেশের পাওনা ও অধিকার। আর যা কোনো রাষ্ট্রের পাওনা অধিকার সেটি পেতে আবার নতুন করে ভারতকে কোন কিছু দিয়ে ভারতের সাথে বিনিময় করার প্রশ্নই ওঠে না। সেটা হবে অনেকটা যেন সেই ঠগের কারবার যে, আমার থেকে ধার নেয়া টাকা ফেরত দেয় না। কিন্তু একবার যে ফেরত দিবার আগ্রহের নামে এবার আমার থেকেই আবার নতুন করে ধার নিয়ে সেই টাকা দিয়েই আমার আগের ধার শোধ করল বলে দাবি করছে; ঠগের বাটপাড়ি যেমন হয়। ভারত সেই ছিটমহল ভূমিবিনিময়ের আইন এবার ৪১ বছর পরে ২০১৫ সালের মে মাসে পার্লামেন্টে পাস করা হয়েছে। আর তিস্তার পানি? সেটাও আমাদের পাওনা হলেও তা আর কখনোই পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না।

    কিন্তু এই ২০১৫ সালের মে মাসে ভারতীয় পার্লামেন্টে আইন পাস হওয়াটাকে নিয়ে বীণা সিক্রির মন্তব্য সাক্ষাৎকারে দেখেন।  “এই চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারত তার বড় ভাই (বিগ ব্রাদার) পরিচিতি মুছে দক্ষিণ এশিয়ায় জ্যেষ্ঠ ভাই (এলডার ব্রাদার) হিসেবে সম্মান অর্জন করেছে বলে মনে করেন বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীনা সিক্রি” [……By approving implementation of LBA, India has shed its “big brother” tag and acquired an “elder brother” status in South Asia, says Veena Sikri ]। দেখেন কারবার! আসলে টাউটারিতেও তো কিছু সীমা থাকে। সিক্রি সেটাও ছড়িয়ে গেছেন।

    শুধু তা-ই নয়, সিক্রির আরো চাপাবাজি হল, তিনি বলছেন – সংসদে এই আইন পাস করে দিয়ে নাকি মোদী তাঁর “প্রতিবেশী প্রথম” [neighbourhood first] মতবাদ কাজে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন”। এ ছাড়া আরো আছে। সিক্রি বলেছেন, এই আইন পাস হওয়াতে নাকি, “ভারতের জন্য ভূখণ্ডগত জাতীয় ক্ষতি হয়েছে” [for India, it’s a notional loss of territory]।  এটা কলোনিদখলবাজ ইংরেজদের চেয়েও শঠতাপূর্ণ কথা। কারণ এটা ছিল ভূমির বিনিময়ে ভূমি নেয়ার চুক্তি। তাই তথাকথিত কোন আত্মত্যাগের বালাই নাই এবং নয় এটা। এটা কারো জন্যই একপক্ষীয় কোন ভূমি হারানোই নয়। আমরাও সমতুল্য ভূমি হারিয়েছি। অথচ সিক্রি এটা এখানে তুলে ধরছেন ‘ভারতের দয়া’ বলে, “একপক্ষীয় ভূমি হারানো” বলে। ফলে সত্যিই আমরা ঠগের পাল্লায় পড়েছি দেখা যাচ্ছে। এটাই হলো, টিপিকাল ছেচরামো! আমরা নির্বাক!

    এভাবে সর্বশেষ যে মিথ্যা বলা আর চাপাবাজিটা বীনা সিক্রি করেছেন আর আবার এদেশে লেখা ছাপিয়েছেন, সেটা গত  ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, বাংলা-ইংরেজি দুভাবেই ছাপিয়েছিল [তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি দ্রুত স্বাক্ষরিত হওয়া উচিত]।

    এ ছাড়াও ভারত-বাংলাদেশ মিলিয়ে গত ২৯ আগস্ট এক ভার্চুয়াল ওয়েবনিয়ার আলোচনায় তিনি আবার আরো মিথ্যা ও চাপাবাজি করতে গেছেন। এটাই তাঁর তথাকথিত নষ্টা-সেকুলারিজম নিয়ে। এর আয়োজক ছিল Indian Council for International Cooperation নামে কেউ। সেখানে তিনি দাবি করে বলেছেন, “বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশন বঙ্গবন্ধুর লিগ্যাসি এবং ওর মধ্যে সেকুলারিজম, ডেমোক্র্যাসি, সোস্যালিজম ও জাতীয়তাবাদ বলে কিছু বৈশিষ্ট্য আছে – যেগুলো ইন্ডিয়ান কনস্টিটিউশনের সাথে কমন”।   ……….. “ঢাকার ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশন আমাদের দুই দেশের মধ্যে নতুন ধরনের সম্পর্ক শুরু করতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে”।

    ইসলাম-কুপানি নষ্টা-সেকুলারিজমঃ
    লক্ষ্য করা যাচ্ছে বীনা সিক্রি ইদানীং সুযোগ পেলেই ‘জ্ঞানী’ লোক হওয়ার আর বাংলাদেশকে সেকুলার হতে জ্ঞান দেয়ার উৎস হিসেবে নিজেকে হাজির করতে চাইছেন। কিন্তু আমরা সত্যিই খুব দুঃখিত! আমরা মনে করি, তার কনস্টিটিউশন বা সেকুলারিজম বিষয়গুলো নিয়ে নুন্যতম কোন জ্ঞান বা ধারণাই নেই। সাথে কিছু ফ্যাক্টস প্রসঙ্গেও একেবারেই জানা নাই। কিন্তু এজ ইউজুয়াল আন্দাজে বলা ঠিকই আছে। বীণা সিক্রি চাইলে  একেবারেই কান খুলে শুনে রাখতে পারেন, নিচের বাক্যটাঃ

    কোনো কনস্টিটিউশনে যদি “আমাদের নীতি সেকুলারিজম” জাতীয় কিছু বলে উল্লেখ থাকতে দেখি আমরা তবুও ঐ রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হবে না। আসলে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হওয়ার কোন পথ বা পদ্ধতিই এটা নয়। একেবারেই নয়। এমনকি কনস্টিটিউশনের কোথাও সেকুলারিজম শব্দটা উল্লেখ করা না থাকলেও সেই রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হতে পারে।

    মানুষ মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত শিখে এবং চাইলে শিখতেও পারে। সিক্রি, আপনার উচিত হবে এ বিষয়ে পড়তে বসা, স্টাডি করা। দুঃখজনক হল – নেহরু, গান্ধীসহ যারা আগের ভারতের নেতা ছিলেন এমনকি ইন্দিরা গান্ধী এরা কেউই উপরে যে প্যারাটা লিখেছি, সে কথাগুলো জানতেন তা মনে হয় না। সে কারণে ভারতের কনস্টিটিউশনেও সেকুলারিজম শব্দটা আগে ছিল না। এরা সবাই সেকুলারিজম কী করলে একমাত্র হয় সে বিষয়ে জানাজানি শেষ না করেই মারা গেছেন। সেটা তাঁদের এজেন্ডাও ছিল না মনে করার কারণ আছে। কারণ কংগ্রেস ১৮৮৫ সালে জন্মের পর থেকে যে রাষ্ট্রের ধারণা রপ্ত ও বাস্তব করেছে সেটার মূল বৈশিষ্ট হল –  এক হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র।

    তাই একটা সত্য আগে জেনে রাখুন। সেকুলারিজম লিখে রাখা নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের দুই কনস্টিটিউশনে এটি কমন কথা এবং কমন ভিত্তি এবং এই কমন ভিত্তির বলে যে নতুন ধরনের সম্পর্ক ইত্যাদি অনেক কথা বীনা বলেছেন তাও অর্থহীন এবং ভিত্তিহীন – অসত্য ও ভুল।

    ফ্যাক্টসটা হল – বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার সময় রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এই তিন নীতি লেখা হয়েছিল, ১৯৭১ সালের এপ্রিলে ১১ বা পরে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১।  এরপরে ১৯৭১ সালের অক্টোবরেও – ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেক এই অনুরোধ প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার থেকে তত দিনে তিনবার চাওয়া হলেও ভারত তা দেয়নি। কারণ ইন্দিরা গান্ধীর রাষ্ট্র বিষয়ক ধারনায় অস্পষ্টতা ছিল। কিন্তু যেটা তাকে তাড়া করছিল তা হল,  ভারত মানে মূলত একটা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র ভারত যার জন্মের শত্রু পাকিস্তান যে পাকিস্তানের পুর্ব অংশ যা বাংলাদেশ নামে সাধীন হতে চাইছে কিন্তু সব ছাপিয়ে ইন্দিরাকে যা খোঁচা দিচ্ছে এরা তো নব্বই ভাগই মুসলমান – এই মুসলমানদের স্বাধীন হতে তিনি কেন গাটছাড়া বাধবেন? তাই তিনি একটা নিশ্চয়তা চাচ্ছিলেন, একটা রক্ষাকবচ চাইছিলেন। যদিও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সবগুলো পক্ষই এলাইয়েন হয়ে যাবার কারণে বাংলাদেশ স্বাধীন করতে সবাই সক্রিয় হবেনই এটা নির্ধারিত হয়ে গেছিল একাত্তরের আগষ্টেই। যেমন বাস্তবত সুযোগ ছি না নাহলে ইন্দিরাই মন শান্তির জন্য তিনি হয়ত অনুরোধ রাখতেন তোরাও ভারতের মত একটা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র হয়ে যা। তাই এরই বিকল্প শব্দ যা সম্ভবত তার পরামর্শকেরা তাকে দেয় সেটা হল “সেকুলারিজম”।  কিন্তু একটা রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন কী করে সেকুলার গণ্য হয়, কী করে তা নিশ্চিত করতে হয় তা তারা কেউ জানতেন না।  জানতেন না এত কঠিন শব্দ উচ্চারণ করে বলছি এজন্য যে  – এই কাজটা অন্তত “আমরা সেকুলার” অথবা “আমাদের রাষ্ট্রনীতি হল সেকুলার” এভাবে  তা কনষ্টিটিশনের প্রতিটা পাতায় লিখে রাখলেও তা হবে না। ফলে ইন্দিরার “আমাদের রাষ্ট্রনীতি হল সেকুলার” – লিখে রাখা দেখেই নিশ্চিত বলা যায় যে তাঁরা এটা কেউই জানতেন না। ইন্দিরার ভয় যে বাংলাদেশ না কথিত ইসলামি রাষ্ট্র হয়ে যায় – এটাই ছিল তাঁর আসল ভয়। কিন্তু তিনি জানেনই না এই ভয় তাড়ানোর পথ কী। তাই পুরা আনাড়ী হয়ে সেকুলারিজম শব্দটা তিনি আকড়ে ধরেন।  এতে তখনকার মত বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকারকে ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর যে  ড্রাফট বা পরামর্শটা পাঠান যাতে তিনি সররত আছেন জানান  সেখানে – সেকুলারিজম, ডেমোক্র্যাসি, সোস্যালিজম ও জাতীয়তাবাদ বলে নতুন করে এই চার নীতির কথা উল্লেখ করে- এটাই ভিত্তিতে বাংলাদেশ যেন নতুন করে অনুরোধ পাঠায় ইনফরমালি তাই বলা হয়েছিল।

    আরেকটু বলে রাখা ভাল, হিন্দু-ভারত ও প্রগতিধারীরা ইসলামি রাষ্ট্র বা মুসলমান রাষ্ট্র হয়ে গেল কিনা এনিয়ে প্রবল শঙ্কায় থাকে যদিও ভারত নিজেই যে হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র হয়ে জন্ম হয়ে আছে সে খবর তাঁদের নাই। তারা প্রায়ই আপত্তি তুলে পাকিস্তান একটা ইসলামি রাষ্ট্র বা মুসলমান রাষ্ট্র হয়েছিল। কিন্তু কেউই বলতে পারবে না কি দেখে তারা তা বুঝেছিল তাও বলতে পারবে না। কেবল আপাত জ্ঞানীরা দাবি করবে পাকিস্তানের ফরমাল নাম দেখে – সেটা হল ইসলামি রিপাবলিক অফ পাকিস্তান। এই নামের মধ্যে ‘ইসলাম” লেখা থাকার কারণে। কিন্তু শব্দটা আসলে ডেকোরেটিভ বা নেহায়তই সাজানোর জন্য।  পাকিস্তান রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্টমূলক শব্দ হল রিপাবলিক, একমাত্র যা দিয়ে ওর ক্যারেকটর প্রকাশ পায়। এর অর্থ হল, এটা নাগরিকের ভোটে প্রতিনিধিত্বে নির্বাচিত ক্ষমতার রাষ্ট্র এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কথা হল, এই নাগরিক হিন্দু এবং মুসলমান দুধরণের যেকেউই হতে পারে। মানে হিন্দু নাগরিকের ভোটটা অর্ধেক বলে গণনা হবে তা নয়। একজন মুসলমান নাগরিকের ভোটের মত সমান হিন্দুর ভোটটাও ঐ এক ভোট বলেই গণনা হবে। যদিও পাকিস্তান রাষ্ট্রে নাগরিক বৈষম্যমূলক কিছুই ছিল না এমন দাবি এখানে করা হচ্ছে না।

    জাতিরাষ্ট্রের ভুল নয়, দরকার বৈষম্যহীন সম-অধিকারের নাগরিক রাষ্ট্রঃ
    যাহোক কথা শেষ করতে এখন সংক্ষেপ করব। আসলে বাই ডেফিনেশন রিপাবলিক শব্দের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত যে আরেক অর্থ আছে তা হল এখানে নাগরিক বলতে সবাই বৈষম্যহীন সমান অধিকারের নাগরিক হতেই হবে ধরে নেয়া হয়েছে। তাতে নাগরিকদের মধ্যে  ধর্মীয় বা গায়ের রঙ, বা পাহাড়ি-সমতলি ধরনের ইত্যাদি যত ভিন্নতাই থাকুক না কেন। আইডিয়েলি এটাই হল রিপাবলিক ধারণা। সেটাকে আরও স্পষ্ট রাখার জন্য “সাম্য নীতির” কথা অনেকে আলাদা করে উল্লেখ করে রাখে অনেক কনষ্টিটিশন। আর যে কনষ্টটিউশন সাম্যনীতি মানবে বলে পাবলিককে প্রতিশ্রুতি দেয় সেটাই (কোন ধর্মবিদ্বেষী নয়) সত্যিকার সেকুলার রাষ্ট্র বলে বিবেচিত হবার জন্য যথেষ্ট। তাই মূলকথা ” নাগরিক সাম্যনীতি মানবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়াই – যথেষ্ট। এরপরে ঐ রাষ্ট্র আর সেকুলার কিনা এটা বোকার প্রশ্ন। ধর্ম কুপানোর বদ-চিন্তার সাথে নষ্টা-সেকুলারিজম এতে বিদায় হতে পারে। ধর্ম থেকে রাষ্ট্র আলাদা করা এটাও আরেক বদ-চিন্তা, মূলত অপ্রয়োজনীয় চিন্তা।

    কিন্তু সাবধান লেখাই যথেষ্ট না। সামাজিক রাজনৈতিক প্রাকটিস বা চর্চায় সেকথাকে বাস্তব করে দেখানো এটা আলাদা কাজ। সেটা আলাদা করে অর্জনের বিষয়। কনষ্টিটিউশনে লিখে রাখার প্রায় দুশ বছর পরেও আমেরিকায় – “ব্লাক লাইফ ম্যাটারস” বলে আন্দোলন করে মানুষে হুশ ফিরাতে হয়।

    যারা সেকুলারিজম জিনিষটাই খায় না মাথায় দেয় বুঝে না তারাই কনষ্টিটিউশনে সেকুলারিজম লিখে এবার প্রবল্ভাবে ইসলামবিদ্বেষী চর্চায় মেতে উঠে।

    বীণা সিক্রির কথায় ফিরি আবার। এখন সার করলে, এর মানে- ১. সেকুলারিজম, ডেমোক্র্যাসি, সোস্যালিজম ও জাতীয়তাবাদ বলে নতুন করে এই চার নীতি করার শর্তেই নিরুপায় বাংলাদেশকে ভারতের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতে হয়েছে। ২. তখনও ভারতের কনস্টিটিউশনে এই চার নীতির কোনো শব্দই ছিল না। তা অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে আমাদেরও ১৯৭২ সালের সংবিধানের অনেক পরে, ১৯৭৬ সালে, নতুন করে ভারতের কনস্টিটিউশন সংশোধন করে নিবার সময় [THE CONSTITUTION (FORTY-SECOND AMENDMENT) ACT, 1976]। এবং বলা বাহুল্য ভারতের সমাজ রাজনীতিতে যার কোন ইম্প্যাক্ট বা ভুমিকা নাই। কারণ, থাকলে আরএসএস বা মোদী সরকারের জন্ম হবার কথা না। তাই মূলত কাজটা ইন্দিরা গান্ধীসহ ভারতের যারাই এই কথিত ও নষ্টা-সেকুলারিজমের ভক্ত অথবা যারা রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার হয় কিভাবে বুঝেন না তাদের সবার চরম অজ্ঞতাই প্রকাশ করে এবং এ অজ্ঞতা চিহ্ন হয়ে থেকে গেছে – সেকুলারিজম লিখে রাখা না রাখা পর্যন্তই এদের জ্ঞান।

    এক দিকে নতুন রাষ্ট্র গড়ার সময়ে কী কী বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হয়, সেসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় যথেষ্ট ধারণা না রাখা, অন্য দিকে মূলত ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণার পরিণতিই হলো আমাদের তিন দেশে (ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান) অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও সব অসাম্যের সবচেয়ে বড় কারণ।  কারও মনের দগদগে ধর্মবিদ্বেষ ও ঘৃণা যেন সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে এজন্য সেকুলারিজম ধারণাটাকেই এর সাফাই-হাতিয়ার করে হয়েছে। নষ্টা-সেকুলারিজমকে – সেভাবে ব্যবহার করা হয়ে এসেছে এত দিন।

    আবার তাজউদ্দিন যা লিখতেই বাধ্য হয়ে থাকেন, বাংলাদেশের মানুষরা সচেতন, তাই তাদের প্রতি এই বিদ্বেষ ও ঘৃণা তারা টের পেয়েছে। তাই তারাও কনস্টিটিউশনে ‘সেকুলারিজম’ বলে এক শব্দ লিখে রেখে সকল নষ্টামি চিন্তাকে প্রতিরোধ ও শায়েস্তা করতে, কিছুটা রাগে ক্ষোভে পাল্টা – আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস বা রাষ্ট্রধর্ম ধরনের শব্দ বা ধারণা ঢুকিয়ে রেখেছে। যদিও তারা ভালোই জানে, এগুলো লিখে রাখা বা না রাখার সাথে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস নড়াচড়া হবে না, হওয়ার কোনোই সম্পর্ক নেই।

    যারা নষ্টা-সেকুলারিজমের শয়তানি থেকে বেরিয়ে শুদ্ধ হতে চান, তারা আরেকটু একটু খোঁজখবর করতে পারেন। রাজা রামমোহন রায় যাকে ভারতের কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলরা ভারতে, বিশেষ করে বাংলায় ‘রেনেসাঁর আদিগুরু’ বলে সবাই জানেন ও মানেন, তিনিই তো ব্রাহ্মসমাজ ও ব্রাহ্মধর্ম চালু করেছিলেন, ১৮১৫ সালে। তা হলে এখানে রেনেসাঁর আদিগুরু ধর্ম চালু করেন কেমনে? আর সেই ধর্ম এখানে ইতিবাচক হয় কেমনে?

    প্রগতিশীলদের এক প্রিয় ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তিনি ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী ছিলেন। কারণ তার দাদা দ্বারকানাথ শুধু রামমোহনের অনুসারী ছিলেন না, ১৮৩৩ সালে রামমোহন মারা গেলে তিনিই ব্রাহ্মসমাজের দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথ ১৯১১-১৫ সময়কালে ব্রাহ্মসমাজের মুখপাত্র ‘তত্ত্ববোধিণী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।

    কিন্তু তবু সেকুলারিজম বলি আর নাই বলি, বৈষম্যহীন সার্বজনীন সম-নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র কেন কায়েম হয় নাই আমাদের তিন রাষ্ট্রে – আমাদের সেই আদি-পাপ অন্যখানে – সেকথা এখনও বলা হয় নাই। রামমোহন ভাবতেন ১. রাষ্ট্র মানেই তা নেশন-স্টেট, ২. আর নেশন বা জাতি মানেই ধর্মের ভিত্তিতে জাতি।

    এই বোধটাই বৈষম্যহীন সমান অধিকারের নাগরিক ধারণা বা রিপাবলিক ধারণা বুঝতে না পারা বা পৌছাতে না পারার প্রধান বাধা, মুল কারণ – যেটা রামমোহন রায়ের আদি-পাপ। আমরা তিন রাষ্ট্র যার ভুক্তভোগী সাফারার!

    আর এসব ধারণা মূলত কলোনিবৃটিশ রাজের আমলের জাতি বা জাতিরাষ্ট্র এর ধারণাজাত। কিন্তু হিটলারের উত্থান ভয়াবহতা দেখার পরে ১৯৫৩ সাল থেকে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্র এক কনভেনশন ডেকে নিজেদের ভূল সংশোধন অরে নিয়েছিল। আমরা যার খবর জানি না।

    তবু রামমোহন উদ্দেশ্যমূলকভাবে এমন করেছিলেন সেটা মনে করা ভুল হবে।  আসলে ভারতের সবাইকে ব্রাহ্মধর্মে নিয়ে গিয়ে এরপর সবাইকে নিয়ে এক ব্রাহ্মধর্মীয়-জাতিরাষ্ট্র গড়তে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন বলেই এই ধর্ম চালু করেছিলেন। তবে তা সফল হয়নি। যদি সফল হত তবুও এটা রাষ্ট্র বিষয়ে ভুল ধারণা ।  আর প্রথম ধর্মের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র গড়ার পরিকল্পনাকারী এই রামমোহন রায়। তা হলে ১৯০৬ সালে মুসলিম লিগ গঠন এবং জিন্নাহকে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ার দায়ে অভিযোগ আনা কিভাবে সঠিক হয়? সর্বোপরি ১৮৮৫ সালে জন্ম নেয়া কংগ্রেস দল সেটা তো এই রামমোহন রায়ের উদ্যোগেরই শেষ পরিণতি।

    তবু একজনের কথা এখানে উল্লেখ করে রাখি যার “ধর্মের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র গড়ার” ইচ্ছাটা উদ্দেশ্যমূলক। বাকিটা পাঠকেরা আরও খোঁজ করেন। তিনি হলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধায়। ১৮৭৯ সালে তাঁর লিখিত এক প্রবন্ধপুস্তক – নাম ছিল ‘সাম্য’। কিন্তু বইটার দ্বিতীয় মুদ্রণের সময় তিনি তা প্রত্যাহার করে নেন, আর ছাপান নাই। রামমোহন বলা যায় অকালেই অসুস্থ হয়ে মারা যান। কিন্তু এরপরেও যারা ব্রাহ্ম প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন বটে কিন্তু কার্যকর হচ্ছে না এটা সকলেই বুঝতে পারছিলেন। শেষে ১৮৭২-৭৮ সালের মধ্যে এটা তিন টুকরা ভেঙ্গে যায়। এরপর যারা ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করেছে বলে এটাকে সাফাই হিসাবে ব্যবহার করে হিন্দু প্রকল্প মানে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র প্রকল্প করে আগিয়ে যান তাঁদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র অন্যতম। এসবেরই পরিণতি ১৮৮৫ সালের কংগ্রেস। কিন্তু মুসলমানেরা কেউ একটা হিন্দু জাতিরাষ্ট্র প্রকল্পকে নিজের মনে করে নিবে সেকথার কোন জবাব দেয় নাই। বরং এদের স্বাধীন ভারত রাষ্ট্র চিন্তা যে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র প্রকল্প চিন্তা তা ক্রমশ লুকিয়ে চলার কৌশল নিয়েছে। সামনের হিন্দু শব্দটা উচ্চারণ এড়িয়ে চলেছে। তবু প্রধান চিন্তার ভুল বা আদি-পাপ হল রাষ্ট্র মানেই ব্রাহ্মধর্মীয় জাতিরাষ্ট্র এই রাষ্ট্র-বুঝ।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২১ নভেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “বীনা সিক্রির নষ্ট সেকুলারিজম” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নেহেরু থেকে প্রণব বা মোদীর জাতিসঙ্ঘ পাঠ

    নেহেরু থেকে প্রণব বা মোদীর জাতিসঙ্ঘ পাঠ

    গৌতম দাস

    ০৫ অক্টোবর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3cY

    প্রতি বছর ২৫ সেপ্টেম্বরের আগে-পরের দিনগুলোতে সাধারণত দেখা যায় সরকার প্রধানেরা নিউইয়র্কমুখী হচ্ছেন। তখন তারা জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের [UNGA, UN General assembly] সভায় যোগ দিতে ব্যস্ত দিন কাটান। সাধারণ পরিষদের সভা মানে, বছরে এই একটাই গুরুত্বপুর্ণ অনুষ্ঠান যা সব সদস্যরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্র এখন প্রায় ১৯৩ টি। এখানে সবার হাজিরা বাধ্যতামূলক না হলেও জাতিসঙ্ঘের এই জমায়েতেকে যেন এক ‘বিশ্বসভা’। মানে যা দুনিয়ার সব জনগোষ্ঠীর হাজির থাকার এক প্রতিনিধিত্বমূলক বিশ্বফোরাম বা বিশ্বদরবার ধরনের ধারণা – সেটা কোথাও ঘোষণা করা না থাকলেও, ক্রিয়াশীল থাকে বলে মনে করা যায়, এখানেই এর গুরুত্ব। এ’বছরও সেপ্টেম্বরে এর ব্যতিক্রম হয়নি। যদিও ফারাক এতটুকুই ছিল যে এবার কোন সরকারপ্রধানই কোভিডের কারণে জাতিসংঘে নিজ সশরীরে হাজির হননি, আগাম রেকর্ড করা বক্তব্য পাঠিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদীও বক্তব্য পাঠিয়েছিলেন।

    জাতিসঙ্ঘ কেমন ধরনের প্রতিষ্ঠান আর কী তার ক্ষমতার এখতিয়ার ও সীমা? এটা কী পারে বা পারে না? এ নিয়ে সাধারণ্যে প্রচুর বিভ্রান্তি আছে, এমনকি সরকারপ্রধান বা অনেক দেশের একাডেমিক পর্যায়েও।

    সাধারণত কোনো পাবলিক প্রতিষ্ঠান আর সাম্য ধারণাটা প্রায় হাত ধরাধরি করে চলে। এজন্য সংগঠন বা সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান মানেই তা মাস (ইংরেজি mass বা বাংলায় গণ) অর্গানেইজেশন বলে ধরে নেয়া হয়। আর কোন গণসংগঠন মানেই সেখানে সদস্যরা সবাই সমান; এমন সাম্যতাই সেখানে ভিত্তি বলে সবাই মেনে নিয়ে থাকে। তবে গণপ্রতিষ্ঠান মানেই সবাই সেখানে সমান – এটা আধুনিক কালের ধারণা। কিন্তু এটারইবা আসল মানে কী?

    তা হল, যখন রাজা বা সম্রাটের শাসন বা রাজবংশের দিন ফুরিয়েছে আর এর বিপরীতে পাবলিক বা জনগণের শাসন বলে ধারণার উদ্ভব ঘটেছে। কোনো ব্যক্তি বা রাজা নয়, সব রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস পাবলিক বা জনগণ।  প্রতিটা নাগরিক তবে সম্মিলিতভাব ক্ষমতার উৎস, একথা থেকে যেখানে সবকিছুর শুরু। আর ঐ সমাজে ও সংগঠনে ‘রাজকীয় মর্যাদার’ কোন বিশেষ বলে কেউ থাকে না। বরং পাবলিকের রাষ্ট্রটাই হল সমাজের সবচেয়ে বড় বা প্রধান গণপ্রতিষ্ঠান। তাই কোন ব্যক্তি বা রাজার খামখেয়ালি না, পাবলিক আর পাবলিকের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব মাধ্যমে এখানে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। অন্তত হওয়ার কথা।
    এই সূত্রে পাবলিকের রাষ্ট্র বা ‘রিপাবলিক’ [republic] কথাটা এসে গেছে সেখানে রাষ্ট্রসহ যেকোনো গণপ্রতিষ্ঠান মানেই ধর্ম নির্বিশেষে নাগরিক সবাই সমান, এমন বৈষম্যহীনতার এক সাম্য ধারণা ও নীতি বজায় থাকতে হবে।

    এখন এই বিচারে তাহলে ১৯৪৫ সালে জাতিসঙ্ঘের ম্যান্ডেট লিখে যখন জন্ম হয়েছিল সেকালে এর সব সদস্য রাষ্ট্রই সমান এমন ধারণার ভিত্তিতেই একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটা যাত্রা শুরু করেছিল। যদিও ব্যতিক্রম আছে। যেমন- সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সদস্যরা সবাই সমান আর সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। কিন্তু জাতিসঙ্ঘেরই আরেকটা ফোরাম আছে নিরাপত্তা পরিষদ [UNSC, UN Security Council] যা এক অর্থে সাম্যনীতির ফোরাম নয়। তাহলে কী এটা পাবলিক প্রতিষ্ঠানের নীতি ভঙ্গ করে গড়া হয়েছে? জবাব হবে, না। ঠিক তা নয়; আর সেটা জরুরিও নয়। তাহলে? ব্যাপারটা কী, কিভাবে এটা ব্যাখ্যা করব?

    আমরা এ বিষয়ে অনেক ফতোয়া পাবো, এমনকি অনেক একাডেমিক প্রতিষ্ঠানেও; যেখানে হয়ত স্টুডেন্টরা শিখছে – জাতিসঙ্ঘ ‘অগণতান্ত্রিক’ প্রতিষ্ঠান। গণতান্ত্রিক শব্দটা এখানে আনলাম অনেকে ব্যবহার করে বলে।  প্রথমত ‘গণতন্ত্র’ খুব ভালো শব্দ নয়, বরং চাতুরীর শব্দ।
    পাবলিকের ক্ষমতার রাষ্ট্র বা রিপাবলিক ধারণার বিকল্প বা সমতুল্য ধারণা ‘গণতন্ত্র’ নয়। যেমন এতে অনেকে কোন একটা দেশের বেলায় হয়ত বলবে,  “সেদেশে নির্বাচন হয়, চাইকি সেটা নিশীথভোট হয়ত, অতএব গণতন্ত্র আছে” – টাইপের কথা বলে রিপাবলিক ধারণাকে অর্থ তাৎপর্যহীন করে ফেলতে পারে। তাই এখানে দুটি পয়েন্টে কথা বলব।

    প্রথম পয়েন্টঃ আমরা জাতিসংঘের প্রসঙ্গে কথা বলছি মানে প্রসঙ্গটা এখানে ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রবিষয়ক; আর আমরা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে একাকার করে দেখছি। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই এক করে দেখলেও কোনো ভুল হয় না, এ কথাও সত্যি। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক ভুল হয় ও হবেই। লক্ষ্যণীয়, এছাড়াও আমরা নিরাপত্তা পরিষদ নিয়ে কথা বলছি মানে এটা একটা রাষ্ট্রের ভিতরের বা অভ্যন্তরীণ দিক নিয়ে কথা বলছি না, বলছি রাষ্ট্রের বাইরে বা ঊর্ধ্বের বিষয় নিয়ে। রাষ্ট্রের বাইরে বা ঊর্ধ্বের বিষয় মানে এখন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কথা খেয়াল রেখে তা লঙ্ঘন যাতে না হয় এভাবে কথা বলতে হবে। সোজা কথাটা হল, জাতিসঙ্ঘ বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর কোনো সমিতি বা এসোসিয়েশন এমনটা বুঝে নিয়ে,এরপর প্রশ্ন হল,  জাতিসঙ্গে বসে নেয়া সবার সিদ্ধান্ত কী কোনও একটা সদস্য রাষ্ট্রের উপর প্রয়োগ করা যাবে? কারণ তা করতে গেলে তো ঐ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হবে? এজন্য, যেকোনো রাষ্ট্রের ওপর আরেক রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রগুলোর কোনো সিদ্ধান্ত যেমন কার্যকর মনে করা যায় না, তেমন জাতিসঙ্ঘেরও। অর্থাৎ সার্বভৌম বাংলাদেশের উপর জাতিসংঘ কোন সুপার-স্টেট হতে পারে না; কিংবা আরেক বড়ভাই রাষ্ট্র বলে কিছু থাকতেই পারে না। (তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে করা যায়।) কাজেই ব্যক্তিদের নিয়ে একটা সমিতি বা ক্লাব ব্যক্তির উপর ক্লাব বা দলের সিদ্ধান্ত দিতে পারলেও এই ব্যাপারটা রাষ্ট্রের বেলায় খাটতে পারে না। রাষ্ট্রগুলোর কোনো সমিতি বা কোন জাতিসংঘ তার কোন সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করতে পারে না। রাষ্ট্রই শেষ কথা এর উপর আর কেউ কর্তা থাকতে পারে না। তাই, এখানে এসে যা ব্যক্তির বেলায় সত্য ও প্রযোজ্য মনে করা যায় তা রাষ্ট্রের বেলাতেও সত্য ও প্রযোজ্য বলে একাকার করে দেখা যাবে না, ভুল হবে।

    তাহলে কী জাতিসঙ্ঘের কোন সিদ্ধান্ত সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সদস্য রাষ্ট্রের  উপর প্রযোজ্য নয় বা করা যাবে না? তাহলে হয়ে আছে কী করে? সেটা বুঝার জন্য সার্বভৌমত্ব কথাটা খেয়াল রেখে – একটা কায়দা করা হয়েছে – সেদিকে তাকাতে হবে। যেমন ধরা যাক, সব রাষ্ট্র বসে কোন নতুন আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন তৈরি করতে লাগলো। বাংলাদেশের প্রতিনিধি ধরা যাক তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দলিল প্রস্তুত শেষে ওই দলিলে স্বাক্ষর দিয়ে এলেন। এখন ঐ আইন মানতে বাংলাদেশকে বাধ্য করানো কী যাবে? কারণ সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হবে। আমাদের সংসদের বাইরের কোন আইন আমাদের কেন মানতে হবে? তাই এই জটিলতা এড়িয়ে যেতে বা এথেকে বিরত থাকতে যা করা হয় তা হল, জাতিসংঘের ঐ মিটিংয়ে পাশ হওয়া ওই আইন বা কনভেনশনটাই এবার দেশে নিয়ে এসে সরাসরি আমাদের সংসদে পেশ করা হয়। যেন আমরা আমাদের সংসদে কোনো প্রস্তাব পেশ করছি এভাবে। এইবার সেই প্রস্তাব আমাদের সংসদে পাস হওয়ার পর সেটা আর জাতিসঙ্ঘের আইন বা কনভেনশন বলে বাংলাদেশ মেনে চলছে এমন নয়। সেটা আমাদের সংসদে পাস হয়ে যায় যদি তবে তা আমাদের সংসদে গৃহীত আইন বলে মানতে কোন আর অসুবিধা নাই। এই প্রক্রিয়াটাকেই র‌্যাটিফিকেশন [ratification] বা অনুসমর্থন করে নেয়া বলে।  আর এই হল সার্বভৌমত্ব বাঁচিয়ে আর জাতিসঙ্ঘের সাথে দেশের সম্পর্ক রক্ষার সমাধান।

    দ্বিতীয় পয়েন্টঃ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ১৯৩৩-১৯৪৫ সালের এ সময়ে একনাগাড়ে চারবারের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। জাতিসঙ্ঘের আইডিয়া বা ইমাজিনেশনের উদ্গাতা মূলত তিনি। এর পেছনের কারণ, তিনি হলেন সেকালের কলোনি শাসন উচ্ছেদ করে দেয়ার পক্ষের লোক। যাতে এরপর স্বাধীন হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রগুলো নিজ অর্থনীতি পরিচালনা করতে গিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে আমেরিকান পুঁজিবাজারের ঋণখাতক হতে চাইলে হতে পারে। মানে নিজ প্রয়োজনীয় ঋণের গ্রহীতা অর্থে পুঁজিবাজারের ক্রেতা হয়ে উঠে। যাতে দুনিয়ায় কলোনি দখল শাসনের চেয়ে তুলনামূলক অনেক ভাল স্বাধীন রাষ্ট্রের ব্যবসা-বাণিজ্যের এক আন্তঃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। একাজে তিনি আবার যুদ্ধের বিপক্ষের লোক। এজন্য সবাইকে নিয়ে আগে আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন তৈরি করে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্বার্থ বিরোধ মীমাংসার ব্যবস্থা হিসেবে জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ার পক্ষের লোক। কারণ তাঁর অনুমান যুদ্ধে পুঁজি-সম্পদ বিনষ্ট হয় মারাত্মক, তাই এমন বাস্তবতা থেকে তিনি সরতে চাচ্ছিলেন। [যদিও তার স্বপ্ন বা আইডিয়া আর পরবর্তিতে বাস্তবের আমেরিকা ১৯৫৩ সাল থেকেই আর এক থাকে নাই। তবে তা নিয়ে কথা আজকের প্রসঙ্গ নয়।] যদিও সেকালে তার প্রস্তাব ইউরোপের নেতারা সহজেই মেনে নিয়েছিল কারণ হিটলারের আক্রমণের মুখে  তাদের তখন  আমেরিকার অধস্তন হয়ে পড়া এবং পুরা মুখাপেক্ষি হয়ে থাকার দশা তাই। কিন্তু তখনকার  সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্তালিন তা মানতে চাননি। স্তালিনের সোজা আপত্তির দিকটা ছিল, যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য রাষ্ট্রের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয় ও  চলে এমন এক জাতিসঙ্ঘ গড়ার পর ঐ প্রতিষ্ঠান আমেরিকান কলকাঠির প্রভাবে কোন সময় সেই জাতিসঙ্ঘ তার কোন সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত যদি সংখ্যালঘু বলে সোভিয়েত ইয়নিয়নের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে তখন কী হবে?
    আবার স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সোভিয়েত রাষ্ট্র ওর ঊর্ধ্বে বা বাইরের জাতিসঙ্ঘ বলে কারো সিদ্ধান্ত কেন বাধ্য হয়ে মানবে? অতএব স্তালিন তা একেবারেই মানতে নারাজ।

    ভেটো ধারণার আবির্ভাবঃ
    এই জটিলতা সমাধান করতেই আসে ‘ভেটো’ সিস্টেমের আইডিয়া। এর সোজা ব্যবহারিক মানে হল, সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই ভেটোওয়ালা সদস্য রাষ্ট্রের একটাও যদি আপত্তি করে, না ভোট দেয় (না-ভোটটাই ভেটো) তবে সেটা আর সিদ্ধান্ত হতে পারবে না। সেজন্য এটা আলাদা করে নিরাপত্তা পরিষদ এই ফোরাম, এখানে পাঁচ রাষ্ট্রের একটাও যদি কোন ইস্যুতে আপত্তি করে তাতে আলোচনার প্রস্তাব ভোটাভুটির আগেই বাতিল হয়ে যাবে। তবে এটা গেল ভেটো ব্যবস্থার নেগেটিভ দিক থেকে ব্যাখ্যা। এটাকে উল্টা ইতিবাচক করে বলা যায়, উপস্থিত দুনিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতাগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পাঁচটা পরাশক্তি বা বিশেষ রাষ্ট্র একমত না হলে সেটা নিয়ে এরপর আর সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত হতে পারবে না। দুনিয়ার ক্ষমতা-ভারসাম্যের জন্য সবার আগে পাঁচটা বিশেষ রাষ্ট্রের একমত হয়ে থাকা জরুরি একথাটা সবার মেনে নেওয়ার ভিত্তিতেই আসলে জাতিসংঘের জন্ম। এই আইডিয়া হাজির করেই রুজভেল্ট স্তালিনকে নিজের নৌকায় তুলতে পেরেছিলেন, জাতিসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়িত হয়েছিল।

    মফস্বলি মোদীর এবারের জাতিসংঘঃ
    এবারের সেপ্টেম্বরে মোদি নাকি খুবই সফল এক প্রধানমন্ত্রীর মত জাতিসঙ্ঘে বক্তৃতা রেখেছেন। অন্তত কলকাতার আনন্দবাজারের চোখে তাই। উগ্র হিন্দুজাতিবাদী অবস্থানের আনন্দবাজার এবার প্রকাশ্যেই হিন্দুত্ব জাতিবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।  ভারতের “সীমান্ত সঙ্ঘাতের” এই “মোক্ষম সময়ে” প্রধানমন্ত্রী মোদী নাকি ভারতের “নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা আরো জোরালো ভাবে তুললেন”- এভাবে লিখেছে আনন্দবাজার। মানে আনন্দবাজারের কথা শুনে মনে হচ্ছে রুজভেল্টসহ সবাই নিজের নিজের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা আরো জোরালো তুলেছিল” বলেই যেন জাতিসঙ্ঘ গড়ে উঠেছিল! মফস্বলি আর কাকে বলে! আনন্দবাজার আর, নেহেরু থেকে প্রণব মোদী এভাবে সকলেই যদি মফস্বলি হয়ে যায় তো ভারতের ভবিষ্যত কী? একটু পড়াশুনা ও তথ্য সংগ্রহ আর বুঝাবুঝি ভারতকে কে করাবে? কঠিন এক পরিস্থিতি! আনন্দবাজারসহ এসব উগ্র হিন্দুজাতিবাদের ধারণা হল যে ঐ নিজের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা এক উদগ্র হিন্দুজাতি হয়ে মোদীর মত যুদ্ধবাজ-দেশপ্রেমিক [jingoist] নেতার নেতৃত্বে জোরালো করে তোলা – এটাই হল চাবিকাঠি! যেটা একেবারেই হিটলারের জর্মানির নীলচোখের জর্মান জাতশ্রেষ্ঠত্ব চিন্তা। সে ভিত্তিতেই এবারের মোদীর বক্তৃতার স্ক্রিপ্ট [Full text of PM Modi] লিখেছেন সম্ভবত হিটলারকে গুরু মানা কোন আরএসএস নেতা!

    কিন্তু জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি কী? কোন বক্তব্য? আর সেটা ভারতের কোনো রাজনীতিবিদ, কী মিডিয়া ঠিক কী বুঝেছে এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে কেবল আনন্দবাজারও বুঝেনি তাও নয়। আসলে এযুগে এখনো যারা “জাতিরাষ্ট্র চিন্তার” রাজনীতিতে আছেন কোন জাতিসংঘ বা এর চেয়েও কোন উন্নত প্রতিষ্ঠান বা দুনিয়া গড়া তাদের বুঝের বাইরেই থেকে যাবে, আমরা ধরে নিতে পারি। এছাড়াও উলটা এরা যদি হিটলারের মত আরো উগ্র-জাতি চিন্তার কেঊ হন তাহলে তো কথাই নেই। যেমন ছিল জাতিসঙ্ঘে মোদীর এই বক্তব্য। বাস্তবত জন্ম থেকেই ভারত জাতিসঙ্ঘ কী তা বুঝে উঠতে পারে নাই। অন্তত নিচের কয়েকটা পয়েন্ট থেকে তা বুঝে নেয়া যায়।

    এক. জাতিসঙ্ঘের জন্ম হল সেই পথচিহ্ন-মার্ক যখন “জাতিরাষ্ট্র” [nation state] ধারণার নিকৃষ্ট পরিণতি হিসেবে হিটলারের জার্মানির উত্থান ও যুদ্ধের ধ্বংসলীলা যা সারা ইউরোপ দেখেছিল। দেখার পরে জাতিসঙ্ঘের জন্ম ততপরতার সমান্তরালে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্র এক কনভেনশন ডেকে (১৯৫০ সালে স্বাক্ষর নেয়া শুরু আর ১৯৫৩ সালে কার্যকর) জাতিরাষ্ট্রভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র ত্যাগ করে অধিকারভিত্তিক ও নাগরিক বৈষম্যহীনতার প্রতিশ্রুতিতে নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছিল। আর ভারতের কোনো রাজনীতির ধারাই বা রাজনীতিবিদ তা টেরও পায়নি। একাডেমিকরাও এর খবর এখনো পেয়েছেন এমন জানা যায় না। বরং উলটা ভারতে ‘জাতীয় স্বার্থ’ কথাটা রীতিমত দানব হয়ে উঠেছে। এই শব্দ দিয়ে আপনি প্রধানমন্ত্রী বা সম্পাদক যেকোনো ডাহা মিথ্যা বলে যেতে পারেন। কেবল জাতীয় স্বার্থের খাতিরে এটা বলছেন এই সাফাই দিলেই সব জায়েজ থাকবে। এমনকি মুসলমান বা দলিতের ওপর সব জুলুম অত্যাচার হত্যা সব করতে পারবেন। এই হলো বর্ণহিন্দুর চরম রেসিজমের একালের ভারত। হতে পারে এই ‘জাতীয়স্বার্থ’ ভঙ্গের ভয়ে একাডেমিকেরাও ভারত জাতিরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু বলতে চান না।

    দুই. জাতিসঙ্ঘ জাতিরাষ্ট্র ধারণার ওপর কখনোই দাঁড়ানো নয়। এজন্য জাতিসঙ্ঘ কাশ্মিরের সমাধান করতে বলেছিল রাজার ইচ্ছা নয়, কোন কথিত জাতির ভিত্তিতেও নয়। কাশ্মির ভূখন্ডের বাসিন্দা নির্বিশেষে তাদের ভোটের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য, রায় দিয়েছিল। নেহেরু তা করেন নাই, মোদি পর্যন্তও তা কেউ করেন নাই। সারা ভারতের রাজনীতি মনে করে হিন্দুত্ব ও জাতিরাষ্ট্র ধারণার উপর ভিত্তি করেই তাদের রাজনীতি ও মহান ভারত রাষ্ট্র খাড়ায় আছ। রাম মোহন রায় থেকে শুরু করে (হিন্দুত্বের) জাতিরাষ্ট্র এখনও তাদের রাজনীতির মূলভিত্তি। তাতে কেউ হিন্দুত্বের ভিত্তি কথাটা গলা নামিয়ে বলে বা মুখে উচ্চারণ না করেও ধরে নিয়ে কথা শুরু করে। আর মোদীর মত যারা এরা সবাই গলা চড়ায় প্রকাশ্যে বলে, এই যা ফারাক। নেহেরুও তাই কাশ্মীরের রাজা খুজে বের করেছে। অথচ কাজটা সহজ ছিল কাশ্মীরের ধর্ম নির্বিশেষে সব ধরণের জনগণের কাছে এপ্রোচ করতে পারতেন, তাদের সমর্থন চাইতেন যেই রাজনীতিতে নেহেরু যেতেই পারেন নাই, বা করতেন না।
    আর এছাড়া সুযোগ পেলেই অন্য বা পড়শি রাষ্ট্রকে অধস্থন কলোনিকৃতের মত রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। কলোনি করে নেয়া ছাড়াও যে দ্বিপাক্ষিক ব্যবসা বাণিজ্য করে লাভবান হওয়া যায় এটা ভারতের বুঝে দেখা হয় নাই। কলোনিচিন্তাই তার কাছে পথ থেকে গেছে। ভারতের ধারণা এটাই নিজরাষ্ট্র পরিচালনার খাসনীতি (নেপাল-ভারত চুক্তি এর খাস উদাহরণ)। অথচ এর উলটা কলোনিদখল হারাম – এই ধারণার উপর জাতিসংঘ দাঁড়ানো।

    তিন. একালের জাতিসঙ্ঘে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার লোভ জেগেছে ভারতের। আর মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে তা জাগিয়েছে আমেরিকা। চীন ঠেকানোর খেপ মারতে ভারতকে নিয়োগ করার জন্য এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমেরিকা। তামাসা হলো ভারত সেটা বিশ্বাস করেছে। কারণ ভারত খবরই রাখে নাই যে আমেরিকার সেই মুরোদ এখন আর রাখে না। যা ছিল জাতিসঙ্ঘের জন্মের আগে। যা এখন আর কিছুই নাই। এখন কেউ কাউকে সদস্যপদ পাইয়ে দিতেই পারে না।
    তাই আমেরিকান ঝুলানী মুলা খেয়ে বিশ্বাস করেছিল প্রণব মুখার্জি। গত ২০১০ সালে হাসিনার প্রথম ভারত সফরের যৌথ ঘোষণায় প্রণব তাই লেখিয়ে নিয়েছিল যে বাংলাদেশ ভারতে ভেটো সদস্যপদ পায় যেন তা সমর্থন করে। প্রণবের জাতিসঙ্ঘ পাঠ এমনই যে তিনি বুঝেছিলেন হাসিনার মত অনেক দেশের সমর্থন বাগানো যেন জাতিসংঘে ভারতের ভেটোসদস্যপদ হাসিলের উপায়।
    ব্যাপার হল, ভেটো সদস্যপদ দেয় কে? ব্যাপারটা ভারতের আর জানাই হলো না। একালে মোদীও তাই বিশ্বাস করে বলছেন, “আর কত দিন রাষ্ট্রপুঞ্জের সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়ার বাইরে থাকবে ভারত?”। মোদী পুরাই বেকুবি আরো ধারণাটা হল, এই কথাটা জোর দিয়ে উদগ্রভাবে বললে বোধহয় কেউ শুনবে বা কাজ হবে। মোদী বক্তৃতায় এবার সেটাই করেছেন। আর আনন্দবাজার আরেক বেকুব হয়ে এটারই প্রশংসা করে ছেয়ে ফেলেছে। কিন্তু কথা হল, মোদী এটা কার কাছে চাচ্ছেন? জাতিসঙ্ঘ না আমেরিকা নাকি চীন? নাকি কারও কাছে এটা চাওয়ার জিনিষ কিনা সেটা মোদী বা তার পরামর্শকেরা নিশ্চিত হয়েছেন? উগ্র জাতিবাদীর কাছে আসলে সব কিছুই জোর দাবি করে নেওয়ার জিনিষ! এর বাইরে কোন ভাবনা তাদের কাজ করে না!

    প্রথম কথা, এটা এককালের মানে জাতিসঙ্ঘের জন্মের আগের সময়ের কোন রাষ্ট্রের মুরোদের প্রশ্ন  ছিল যে কে কাকে সদস্যপদ দিতে পারে। যা সেকালে একমাত্র আমেরিকারই ছিল। এমনকি সেকালের স্টালিনেরও ছিল না। ইউরোপেরও কারোই না; তারা হিটলারের মার খেয়ে ১৯৪১ সালের আগষ্টের পর থেকে একেবারেই আমেরিকার মুখাপেক্ষি। ফলে এরা নিজের ভেটো সদস্যপদটা ঠিকঠাক মত হাসিল হয়েছে কিনা কেবল এতেই সন্তুষ্ট ছিল। যেমন পঞ্চম দেশ চীন এর মধ্যে ঢুকে নিজ ভেটো সদস্যপদ পেয়েছিল কী করে?

    [যারা পড়তে কম সময় দিতে চান তারা নিচের প্যারাটাই বাদ দিয়ে পড়তে পারেন।]

    চীন কিভাবে ভেটো সদস্যপদ পেয়েছিলঃ
    এর জবাবটা একালে যে জানে সে-ই সেকালের পুরা ব্যাপারটা বলতে পারবে। চীন আসলে ছিল সেকালের পুরা সময়জুড়েই  জাপানের কলোনি, পুরাটা না হলেও চীনের অন্তত ২৫% এর মত ভুমি সমসময়ই জাপানের দখলে ছিল।  বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের জর্মান ইতালি ও জাপানের বিরোধী যে মিত্রশক্তিজোট গড়ে উঠেছিল আমেরিকার রুজভেল্ট তার মূলনেতা হিসাবে নিজ স্বপ্নের আগামি দুনিয়া যার হবু গ্লোবাল নেতা হবে আমেরিকা, সেই দুনিয়ায় এশিয়ান কলোনিশক্তি হিসাবে জাপানকে ধবংস করে চীনকে এশিয়ার হবু নেতা ও আমেরিকার পক্ষের দেশ হিসাবে দেখতেন তিনি। মূলত রুজভেল্টের সে স্বপ্ন-কল্পনার কারণে চীন ভেটো সদস্যপদ পেয়ে গেছিল। এমনকি এটা চীনও তা চেয়েছিল বা কল্পনা করেছিল কখনও তা জানা যায় না।
    কিন্তু একটা আসল কথা এখনও এখানে বলা হয় নাই। আমাদের জেনে নিতে হবে। আমরা এতক্ষণ  যে চীনের কথা বলছি সেটা মাওয়ের চীন নয়। মাওয়ের চীন তখন উদয় হয় নাই, হয়েছিল আরও চারবছর পরে ১৯৪৯ সালে। তাই এতক্ষণ চীন বলতে বুঝিয়েছি – চীনা ন্যাশনালিষ্ট রাজনীতির নেতা চিয়াং কাইসেকের চীনের কথা। কিন্তু রুজভেল্ট ও কাইসেকের কপাল পোড়া দুঃখটা হল, ১৯৪৫ সালে কলোনিশক্তি জাপানের পতন হলে এর মাত্র চারবছর পরেই ১৯৪৯ সালে মাওয়ের বিপ্লব চীনে ক্ষমতা দখল করেছিল। আর চিয়াং কাইসেক পালিয়ে সেকালেও চীনেরই ভুখন্ড কিন্তু আলাদা দ্বীপ তাইওয়ানে, আশ্রয় নিয়েছিল। এরপর একদিকে মাওয়ের বিল্পবীদের লংমার্চের ক্লান্তি অন্যদিকে সেকালের হবু বিশ্বশক্তির দুই নেতা স্তালিন ও প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান (১৯৪৫ সালে রুজভেল্টের স্বাভাবিক মৃত্যু হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট এই ট্রুম্যান প্রেসিডেন্ট হন) এদের চাপাচাপিতে “যুদ্ধের বদলে শান্তির” কথায় মাও আর ফিরে তাইওয়ান দখলে যান নাই, পরে দেখবেন বলে ছেড়ে দেন। এতে পরবর্তিতে চিয়াং কাইসেক তাইওয়ানেই ঘাটি গেড়ে বসে যায়। যেটা এখনও আছে। এটা পরে আরও পোক্ত হয়ে যায় আমেরিকার কারণে। কারণ মাওয়ের চীনই আগের জাতিসংঘে রেজিষ্টার করা ভেটো সদস্যপদের চীন হিসাবে নিজের প্রতিনিধিত্ব চাইলে আমেরিকা এতে সমর্থন দিতে এবার গড়িমসি শুরু করেছিল। স্তালিনও কিছুই করতে পারে নাই। মাওয়ের চীন নিচু স্বরে মনে করে স্তালিন চায় নাই তাই হয় নাই। তবে সেসময় মাও চাইলে হয়ত আলাদা নতুন চীন হিসাবে সদস্যপদ পেতে পারত কিন্তু সেক্ষেত্রে আগের ভেটো সদস্যপদ চিরদিনের মত হাতছাড়া হয়ে তাইওয়ানে হাতে থেকে যেত। তাই মাওয়ের  চীন এরপর জাতিসংঘের সদস্যপদ নাই এভাবে এমন চীন হয়েও রয়ে গেছিল। কিন্তু কতদিন?
    একনাগাড়ে (১৯৪৯-১৯৭১) এই সময়টা। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর অর্থাৎ যখন আমরা উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে আশ্রিত, খাওয়া না খাওয়া হয়ে আছি আর নির্যাতন, হত্যায় নিত্যসঙ্গি হয়ে দিন যাচ্ছে; ১৯৭১ মার্চের পরের সেই ঐবছরেরই সেপ্টেম্বরের  জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ঘটেছিল প্রকাশ্যে অনেক কিছু। সেখানে এক প্রস্তাবে উপর ভোটের সময় সংখ্যাগরিষ্টতার ভোটে “এতদিনের তাইওয়ানের ভোগ করা ভেটো সদস্যপদ” এর আসল হকদার মাওয়ের চীন বলে ঐ সিদ্ধান্ত প্রস্তাব পাশ হয়ে যায়। আর এর চেয়েও বড় কথা এটা সম্ভব হয়েছিল কারণ ঐ ভোটাভুটির সময়ে আমেরিকা ছিল আধারাজি কিন্তু আবার বাধাও দেয় নাই, এমন অবস্থান নিয়েছিল সেকারণে। কেন? এর পিছনের লম্বা কারণ হল, এটাই ছিল বিগত ১৯৬৮ সাল থেকে চলে আসা গোপনে চীন-আমেরিকান আলোচনা-বুঝাবুঝি-আলাপের প্রথম প্রকাশ। যেটা সেসময়ে ঘটেছিল পুর্ব পাকিস্তানের স্বার্থের বিনিময়ে, আয়ুব-ইয়াহিয়ার শাসন কাল জুড়ে তাদের মধ্যস্ততায়। আর সাথে আরও সবচেয়ে নির্ধারক ঘটনাটা ছিল – ১৯৭১ সালের এপ্রিলে কিসিঞ্জার পাকিস্তান সফরে যাচ্ছেন একথা বলে মাঝের দুদিন গোপনে কিসিঞ্জার সেই প্রথম মাওয়ের চীন সফর করেছিলেন। সেসময়েরই একমত হওয়া ডিলের প্রথম সাক্ষাত আলাপ ও আতাঁত ছিল সেটা। মূলত মাওয়ের চীন আমেরিকান পুঁজি ও ব্যবসা বাণিজ্য চীনে প্রবেশ করতে দিবে যদি নিক্সনের আমেরিকা বিনিময়ে  চীন নামের ভেটো সদস্যপদ তাইওয়ানের বদলে এটা তখন মাওয়ের চীনের হাতে এনে দিবে তাতে রাজি হয়। এই ছিল ডিল। এভাবেই মাওয়ের চীন জাতিসংঘের ভেটো সদস্যপদ লাভ করেছিল। আর মাঝের সময়ে লম্বা আলোচনা ও বুঝাবুঝি করে নেওয়ার পর ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকা পরস্পরকে স্বীকৃতি দিয়ে উভয় দেশে এমবেসি খুলে গভীর বাণিজ্য সম্পর্ক শুরু করেছিল।

    গ্লোবাল নেতা হিসাবে আমেরিকা আর কাউকে এখন ভেটো সদস্যপদ পাইয়ে দিবার বা এমন কোন নেতাগিরি মাতব্বরি করারই মুরোদ রাখে না; সব এখন প্রায় শুকিয়ে আসছে। এটা বুঝা কী খুব কঠিন? দ্বিতীয়ত আগামিতেও  জাতিসংঘের কোন সংস্কার হওয়া অথবা এমনকি ভেটো সদস্যের পাঁচ দেশের তালিকাও বদলাবে না,  যতক্ষণ না নতুন গ্লোবাল নেতা কেউ এসে বসছে। সেটা এখনই বলে দেয়া যায়। কারণ, এটা হবে সেই হবু নেতার নতুন করে জেগে উঠা প্রভাব ইচ্ছা বা এখতিয়ার। অন্যভাবে বলা যায়, তার সাথে অন্যরাষ্ট্রের সম্পর্কের মাত্রার ওপর নির্ভর করবে আর কোন রাষ্ট্র নতুন করে জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা পাবে, নাকি কেউই পাবে না অথবা বাদ যাবে। এখন যদি হবু সে নেতা চীন হয়, তবে তাই! সমস্যা হচ্ছে জাতিসংঘের উত্থানের সময়ের ঘটনাবলী নিয়ে আপনার স্টাডি বা পরিস্কার বুঝাবুঝি না থাকলে আপনি মফস্বলি চিন্তাই তো করবেন, আমেরিকার টাউটারি মিথ্যা আশ্বাসই আপনার  কাছে সত্যি মনে হবে। আর এই বেপুথে যেতে আপনাকে আরও টানবে আপনার জাতিরাষ্ট্র চিন্তা। অথচ ১৯৪৫ সালের পর থেকে এই কলোনিচিন্তাটাই, এই জাতিরাষ্ট্র চিন্তা যে  মৃত সে খগবর আপনি রাখেন নাই।

    আজকের ভারত মানে এই হিটলার-অনুসারি হিন্দুত্ববাদী ভারত, একে  চীন আগামিতে নতুন নেতা হলে  কেন একে ভেটো সদস্যপদ দিতে যাবে, না অন্য কেউ দিবে? আর এমন সদস্যপদ পাওয়ার প্রাথমিক যোগ্য হবার জন্য তবু অন্তত কিছু রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও কমিটমেন্ট তো ভারতের লাগবে! কেবল হিন্দুত্বের জন্য যে ভারত নিজ দেশের অন্যান্য অ-হিন্দু সকল নাগরিকের প্রতি চরম বৈষম্য করে, কোন সাম্য আচরণের কথা চিন্তাও করতে পারে না সেই ভারতকে কে এবং কেন ভেটো সদস্যপদে টেনে তুলবে?

    আবার মোদীর ধারণা দেখেন, তিনি বক্তৃতায় বলেছেন, ‘জাতিসঙ্ঘ এবং ভারতের মূল আদর্শ নাকি এক।’ ‘বসুধৈব কুটুম্বকম (গোটা বিশ্বই আত্মীয়) এই মন্ত্র রাষ্ট্রপুঞ্জের সভায় বার বার’ নাকি জাতিসঙ্ঘে উচ্চারিত হয়ে থাকে। অথচ মোদীর ভারত হল এমন, যে হিন্দু নয় বা যার হিন্দুত্ব নাই এমন কাউকে সে সহ্য করতে পারে না। সেই মোদী এমন ফাঁপা আওয়াজ দিচ্ছে!
    দেখা যাচ্ছে এটাই এখনও ভারতের জাতিসঙ্ঘ রিডিং!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৩ অক্টোবর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “মোদি-প্রণবের জাতিসঙ্ঘ পাঠ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • “সারা কাশ্মিরই ভারতের” দাবির পরিণতিতে লাদাখে হাতছাড়া

    “সারা কাশ্মিরই ভারতের” দাবির পরিণতিতে লাদাখে হাতছাড়া

    গৌতম দাস

     ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3bw

    India-China joint statement

    আকসাই চিন [Aksai Chin] যেটা ভারতের ভাষায় ‘লাদাখ’ তা নিয়ে  চীনের সাথে ভারতের কোন একবার সীমান্ত ভুখন্ড চুক্তি করা বা এলএসি টানতে সমঝোতা করার মানেই এরপর ‘সারা কাশ্মিরই ভারতের’ এই দাবি করার ভারতের আর সুযোগ নাই। কারণ চুক্তি করা বা এলএসি টানা মানেই আকসাই চিন চীনেরই ভুখন্ড তা মেনে নিয়েই চুক্তি করতে যাওয়া হয়েছিল। তাই চীন-ভারতের ১৯৯৬ সালের এলএসি সমঝোতা চুক্তি মানেই আকসাই চিন চীনের বলে স্বীকার করে নেওয়া। কাজেই এরপর অমিত শাহের সংসদে লোকসভায় (৫-৬ আগষ্ট ২০১৯) “সারা কাশ্মিরই ভারতের” বলে ঘোষণা করা মানে এটা আগের – ১৯৯৬ সালের এলএসি সমঝোতা চুক্তিকে একপক্ষীয়ভাবে অস্বীকার বা বাতিল করা। এভাবে মোদী-অমিত প্রমাণ করেছে ভারত এক অশিষ্ট রাষ্ট্র (rogue state)।

    দুই পড়শি রাষ্ট্রের সীমান্ত [border] জিনিষটা খুবই অদ্ভুত। সীমান্ত একার হয় না। আপনার নিজ রাষ্ট্র-সীমানা কতদুর – সেটা হল আপনার পড়শির সাথে আপনি আলোচনা করে, সেখানে নানান পুরানা ম্যাপ বা যুক্তি-কারণ দেখিয়ে একটা ঐক্যমত্যে এটা যতদুর বলে আপনারা পরস্পর সাব্যস্ত করেছেন। আর সেই ঐক্যমত্যের সীমানা এরপরে একটাই ম্যাপে তা চিহ্নিত [demarcate] করেছেন। এবার সেই একই ম্যাপের দুইটা কপি দুই রাষ্ট্র নিয়ে রেখে দিয়েছেন। অর্থাৎ পুরা প্রক্রিয়াটা দুই রাষ্ট্র মিলে; যার সোজা মানে সীমান্ত একা চিহ্নিত করা যায় না।

    আচ্ছা সীমান্ত একা একাই দাবি করলে মানে যেকোন কিছু একটাকে নিজের সীমানা বলে দাবি করলে কী হবে?
    এর উত্তরটা খুব সহজ। সেটা ডিমার্কেটেড সীমানা হবে না। তা না হলেই বা কী অসুবিধা? সেক্ষেত্রে প্রথমত সেটাকে বলা হবে – “বিতর্কিত সীমান্ত” – মানে হল অপর পক্ষ সেটা মানে না। একমত না কারণ তার ধারণা ভিন্ন। আর সেখান থেকেই এবার লাইন অব কন্ট্রোল অথবা লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল বা এলএসি ধরণের নতুন নতুন শব্দের উতপত্তি। আর বলাই বাহুল্য অনবরত সীমান্ত টেনশন। আর সেখান থেকে কখন না যুদ্ধ লেগে যায় অবস্থা, মাথার উপর টিকটিক। আর এর উলটাটা হল, একবার যদি ঐক্যমত্যে ম্যাপ এঁকে তা শেয়ার করে নেওয়া যায় তো সব ঠান্ডা। সম্ভবত সেকারণে, কলোনি শাসিত হবার একটা ইতিবাচক দিক আছে।  সেটা হল সব কলোনি শাসকই সর্বপ্রথম পুরা কলোনি রাষ্ট্রের সীমানা পড়শিদের সাথে বসে ডিমার্কেটেড করে নিতেন। তাদের চোখে একাজের পিছনেই বিনিয়োগ যথার্থ কারণ এর বিকল্প হল, অযথা যেকোন সময় যুদ্ধের রিস্ক বা খরচের দায় নিতে রেডি থাকা। তাহলে মনে হচ্ছে,  সব সুবিধা আর লাভালাভই ডিমার্কেটেড সীমান্ত করে নেওয়া দুই পড়শিরাষ্ট্র দুজনের পক্ষে।
    তাই কী? হা মোটাদাগে তাই। কোন নেগেটিভ দিক কী এতে নাই। হা অবশ্যই আছে। এক বিরাট অসুবিধা আছে। অসুবিধাটা হল, একবার কমন ম্যাপ করে ফেলার পর আর পড়শির দখলে থেকে যাওয়া কোন ভুমি আপনার বলে আর দাবি করতে পারবেন না। করলে কী হবে? করলে এবার লিগ্যালি মানে আইনত আপনি ডিফল্টার বা অনুপ্রবেশকারী মানে অপরাধী বলে চিহ্নিত হবেন। ঠিক সে ঘটনাটাই ঘটেছে মোদী-অমিতের কপালে! কিভাবে?

    পাঁচদফার যৌথ ঘোষণা আবার পেন্ডুলামওঃ
    সীমান্ত বিরোধ সংঘাত নিয়ে চীন-ভারতের পাঁচ দফা ঐকমত্যের যৌথ ঘোষণা রাশিয়ার মধ্যস্থতায় গত ১০ সেপ্টেম্বর মস্কোতে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু খবর কী শুধু এতটুকুই? না, এর মধ্যেই সব আছে মনে করলে ভুল হবে, আর সেটা দুই কারণে। প্রথমত, পরের দিনই ১১ সেপ্টেম্বর বা সময় হিসাবে কয়েক ঘণ্টা পরই ছিল আমেরিকার সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের (সাথে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংকে নিয়েও) গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন বা ভার্চুয়াল মিটিং। এটাকে দেখে এক পলিটিক্যাল কমেন্টেটর মন্তব্য করেছেন, ভারত পেন্ডুলামের মতো আমেরিকা না চীন এই করে দোল খাচ্ছে, এর প্রতীকী চিহ্ন এটা [India swings like a pendulum between China and US]। কথা হয়ত মিছা নয়। আমরাও গত সপ্তাহের লেখায় বলেছিলাম “তামাশা হল আমেরিকার সাথে এক মিটিংয়ে খাওয়া ডিনারের ঢেঁকুর জয়শঙ্কর চীনের সাথে মিটিংয়ে গিয়ে তোলেন”। কাজেই মোদীর ভারতের কঠিন ডিলেমা মানে ‘এধার না উধারের দু নৌকায়’ পা দেয়ার সঙ্কটটা এখানেই।
    তবুও দ্বিতীয়ত, সার কথায় বললে আমেরিকার সাথে ১১ তারিখের মিটিংটা বড়ই আজিব, এমনকি নামের দিক থেকেও। এ নিয়ে একটা বড় রিপোর্ট করেছে ভারতের দ্যাপ্রিন্টের নয়নিমা বসু। আর তিনি তা করেছেন এই বিশ্বাস করে যে, কোনো যুদ্ধে ভারতের পক্ষে আমেরিকার দাঁড়িয়ে যাওয়ার দলিলটাই যেন লেখা হচ্ছে বা হবে এখানে। কাজেই ভারতের আর যেন চীনভীতির কিছু নেই! থাকবে না! কিন্তু নয়নিমার রিপোর্টিংয়ে সাজানো এই মেজাজ ও অনুমানগুলোর আলোকে তাঁর লেখা পড়া ভুল হবে।

    ১১ সেপ্টেম্বর ভারত-আমেরিকার মিটিংটা ছিল মূলত আমেরিকার অস্ত্র বিক্রির; আর তা এই বিক্রির পদ্ধতিগত বিস্তারিত দিক নিয়ে মিটিং। ঐ মিটিংয়ের নাম – ‘ভারত-আমেরিকার ২+২ মিনিস্টরিয়াল ডায়লগের ইন্টারসেশনাল মিটিং” বা ইংরাজিতে [“Intersessional Meeting of the U.S.-India 2+2 Ministerial Dialogue”]। বেকায়দার নাম শুনেই ঘাবড়ানোর কিছু নেই। অস্ত্র বিক্রি করতে বিস্তারিত আলাপের জন্য এটা দু’পক্ষেরই দু’টা করে মন্ত্রী মিলে বৈঠক, আর দু’পক্ষের পররাষ্ট্র আর প্রতিরক্ষা মন্ত্রীরা এখানে উপস্থিত থাকবেন – তাই ‘২+২’ বলা। আর এখানে অস্ত্র বিক্রি বলতে, একে৪৭ বা মেশিনগানের মতো সিম্পল অস্ত্র নয়; বড়, জটিল ও হাইটেক বায়ুযানবিষয়ক ব্যাপার। তাই এমন ক্ষেত্রে আমেরিকার কমন প্র্যাকটিস হল, ওসব অস্ত্র বা যন্ত্র প্রভৃতি বিক্রির আগে সব ক্রেতাকে অবশ্যই অনেকরকম চুক্তি করিয়ে নেয়া যে, কী কী শর্তে এগুলো ভারত ব্যবহার করতে পারবে, ট্রেনিং কী হবে, যন্ত্রাংশ সরবরাহ কেমনে কী হবে, স্টক কী করে রাখতে হবে, দক্ষভাবে এর ব্যবহার কী করে করতে হবে, সাথে ইনটেলিজেন্স কী লাগবে, তার ট্রেনিং কে দেবে প্রভৃতি খুঁটিনাটি বিস্তারিত দিক থাকে এর মধ্যে। এ ছাড়া অস্ত্র বিক্রি কোনো সাধারণ পণ্য নয়। তাই দুদিকের দুজন মন্ত্রী লাগে। আর সাথে এত পদ্ধতিগত বাধা পার হতে হয়। এমনিতে আমেরিকার দিক থেকে নিজেদের অস্ত্র বিক্রির দায় ও ক্রেডিট পেন্টাগনের। কিন্তু স্ট্র্যাটেজিক ও পলিটিক্যাল দিক এর সাথে জড়িয়ে থাকে বলে তাদের ফরেন অফিসকেও সাথে নিয়ে নামতে হয়। এরপর সেসব ‘পদ্ধতিগত দিক’ ফাইনাল করে চুক্তিতে পৌঁছানোই ছিল ঐ সভার উদ্দেশ্য। এমন পদ্ধতি মানতে হয় আরেক কারণে। যেমন, ভারতের সাথে রাশিয়ার খাতির খুব কম নয়। তাই ভারত যদি আমেরিকার কোনো অস্ত্র বা সামরিক যন্ত্র কিনে আর তা রাশিয়াকে দেখতে দেয় যাতে সে  ভেঙেচুরে তার সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে শিখে ফেলতে পারে! তাই এটা ঠেকানোই এসব চুক্তির আসল উদ্দেশ্য যাতে অস্ত্র বা সামরিক যন্ত্র তৃতীয় দেশের হাতে না যায়।

    তবে বলাই বাহুল্য, কোনো অস্ত্র বিক্রেতা দেশ আপনার দেশকে অস্ত্র বিক্রি করেছে – এখন এর মানেই আপনার কোন শত্রুর সাথে আপনার যুদ্ধ লাগলে তখন আপনার পাশে মাঠে এসে অস্ত্র বিক্রেতাও দাঁড়িয়ে লড়বে – এমন গ্যারান্টিও সে ক্রেতা দেশ দিয়েছে  – যারা এটা মনে করে তাদের অবশ্যই তা বিরাট আহাম্মকি কান্ড বুঝতে হবে। এদের থেকে দূরে থাকতে হবে। যদিও কোনো অস্ত্র বিক্রি মানে, সেটা দু’দেশের মধ্যে এক ধরনের ছোটখাট ‘সামরিক চুক্তি’ মনে করা দোষের হবে না। আবার আমেরিকার সাথে সামরিক চুক্তি হচ্ছে বলে এটুকু পড়ার পরই গা-গরম করে ফেলা যাবে না, কারণ এর মানে হয় না। তবে একবার (১৯৬২) চীনের হাতে মার খাওয়াতে ভারতের নেতাদের যে মানসিক ট্রমা হয়েছে তা থেকে উদ্ধার পেতে অজান্তে বা জেনেই যাতে কিছু সান্ত্বনা পাওয়া যায় এমন ইঙ্গিত রিপোর্টে থেকে যেতেই পারে। তবু আমাদের বুঝাবুঝিতে পরিষ্কার ফারাক রাখতে হবে – অস্ত্র বিক্রির চুক্তির সাথে সামরিক-স্ট্র্যাটেজিক জোটে ঢুকে পড়ার চুক্তির কোনো সম্পর্ক নেই; দুটো আলাদা।

    তবু নয়নিমা এমন বিভ্রান্তি তৈরির পক্ষে অজ্ঞাত ও ‘নাম বলতে না চাওয়া’ সরকারি কর্তার কথা বলে আড়ালে দাবি করেছেন, মোদী সরকার নাকি সামরিক-স্ট্র্যাটেজিক জোটে ঢুকে পড়তে গভীর আগ্রহে আছে তাই দুটাকে এক করে দেখছেন নয়নিমা।

    কিন্তু কথিত অজ্ঞাত বলে যাই দাবি করুন, বেজ ফ্যাক্টস হল, মোদির নীতি-নির্ধারকেরা পরিষ্কার যে, তারা আমেরিকার সাথে ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে উঠতে পারছেন না। ট্রাম্পের আমেরিকা অবশ্য আরো সরেস হয়ে দাবি করছেন এই জোট হবেই আর যেন এর নাম হয়ে যাবে ‘এশিয়ান ন্যাটো’। যদিও এমন দাবির বিরুদ্ধে জয়শঙ্কর আগেই দায় ঝেড়ে ফেলতে বলছেন, “ভারত জোটনিরপেক্ষ অবস্থানেই” থাকবে। কিন্তু আবার পরিষ্কারও করেন না যে, তাহলে মোদীসহ অমিত-মাধব [রাম মাধব বিজেপির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল ও আরএসএস এর খাস নেতা ] সবারই মনে যুদ্ধের মাঠে আমেরিকা ভারতের পাশে খাড়া হবে এমন আশার বাতি কেন জ্বালিয়ে রাখেন তারা, নিভান না কেন?

    কেউ মনে আশার আলো জ্বালিয়ে রাখলে আর কী করা, মনের উপর হাত চলে না। তবে মোদির নীতিনির্ধারকরা পরিষ্কার যে, তারা ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে উঠতে পারছেন না। এর অন্তত একটা প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। সেটা হলো চীনের সাথে পাঁচ দফা ঐকমত্য করতে মোদীর রাজি হওয়া। এর অন্তত প্রথম দুটো দফা এর প্রমাণ। পুরা পাঁচ দফা এখানে। ওর প্রথম দফা লিখেছে (এখানে বাংলাটা ভারতের সরকারি ওয়েবসাইটের করা, ওর পিডিএফ সেখান থেকে নেয়া)  –  …… “‘ভারত-চীন সম্পর্কের বিকাশে নেতাদের ঐকমত্যের শৃঙ্খলা থেকে উভয় পক্ষের পথনির্দেশিকা গ্রহণ করা উচিত”।
    এর মানে ভারত-চীন সম্পর্কের ভিত্তি হল, দু’দেশের যেগুলো এখন ঐকমত্য হয়েছে এমন পয়েন্ট; তাই দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু তাহলে এর এখন মানে হয়ে গেছে যে, ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট লোকসভায় কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত ৩৭০ ধারা জবরদস্তি বাতিল করে দেয়া ভুল হয়েছে। কারণ অমিত শাহের এই বাতিল করে দেয়ার ভিত্তিতেই পরের দিন তিনি আলাদা ও পরিষ্কার করে  ঘোষণা করে দেন, সারা কাশ্মিরই এখন একমাত্র ভারতের অংশ। অর্থাৎ পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মিরের অংশ ও চীনের অধিকৃত কাশ্মিরের অংশ (আকসাই চীন) ইত্যাদি সবই ঐদিন থেকে ভারতের বলে অমিত শাহ ঘোষণা করে দিয়েছিলেন [PoK, Aksai Chin integral part of J&K, can die for it: Amit Shah in Lok Sabha]।

    “Kashmir is an integral part of India, there is no doubt over it. When I talk about Jammu and Kashmir, Pakistan occupied Kashmir and Aksai Chin are included in it and can die for it,”  -Amit Shah, 06 August 2019 in the parliament

    আসলে ঐদিনের ঘটনায় মোদী-অমিত যে রাষ্ট্র-রাজনীতি বিষয়ে কত নাদান, তাই স্পষ্ট হয়েছিল। কারণ এই ঘোষণার সোজা মানে, ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ থেকে ওই ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৭২ বছরে যা কিছু সীমান্ত-ভূমি বিষয়ে ভারত-চীন সমঝোতা ও চুক্তি আছে বা হয়েছিল – এর সবকিছু ভারত সেদিন সংসদে একাই একপক্ষীয়ভাবে বাতিল বলে ঘোষণা করে দিয়েছিল। কারণ অমিত শাহ বলছেন  কাশ্মীরের চীনের অংশ (আকসাই চিন) আর পাকিস্তানের অংশ সহ পুরা কাশ্মীরই ভারতের ইন্টিগ্রাল বা অবিচ্ছেদ্দ অংশ। কারণ অমিত শাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে ভারতীয় কনষ্টিটিউশনের ৩৭০ ধারা বাতিলের বিল পাশ করাতে পুরা কাশ্মীর এরপর থেকে সরাসরি  ভারতের  অবিচ্ছেদ্দ অংশ হয়ে গেছে।  এতে আরো মানে হল লাদাখে ভারত চীনের সাথে সীমান্ত আলোচনায় (১৯৯৩-৬) কাশ্মীরের যেসব ভুখন্ড চীনের কাছ থেকে ছাড় পেয়ে নিজের এলএসি বলে ১৯৯৬ সাল থেকে যা নিজের ভুখন্ড বলে দাবি করছিল সেসব চুক্তির আর কোন মূল্য নাই। তা অকেজো ও বাতিল।  কারণ ৫-৬ আগষ্ট ২০১৯ থেকে সারা কাশ্মীরই ভারতের কারণ অমিত শাহ সেটা সংসদে ঘোষণা দিয়েছে – এটাই এর একমাত্র ভিত্তি। পুরা আকসাই চিন যদি অমিত শাহের ভারতের হয়ে যায় তাহলে আবার মাত্র ১৯৯৬ সালের একমতের এলএসি পর্যন্ত ভারতের সীমানা – এই দাবির মানে কী? এই দাবি স্ববিরোধী।

    কোনো দু’দেশীয় চুক্তি হওয়ার পর এবার কোনো একটা পক্ষ একাই তা বাতিল বলে ঘোষণা করে দিলে জেনেভা কনভেনশন চালু হওয়ার পর থেকে এমন বাতিলকারী রাষ্ট্রকে অশিষ্ট রাষ্ট্র [ROGUE State] মনে করা হয়। ইংরেজি এই শব্দের মানে হল, যে নিয়ম বা আইন মানে না, শয়তান বা চিট করে চলা লোক বা রাষ্ট্র। অর্থাৎ অমিত শাহের ঐ ঘোষণা ভারতকে অশিষ্ট রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
    কেন এমন খারাপ কথা? তাহলে কী দুদেশের কোন ‘হওয়া’ চুক্তি আর কখনো বাতিল করা যাবে না? তা নয়; অবশ্যই যাবে। কিন্তু পদ্ধতি মেনে তা করতে হবে। “অশিষ্ট” হয়ে নয়, একপক্ষীয় খেয়াল খুশিতে নয়। বাতিলের ইচ্ছা প্রকাশ করে অপরপক্ষকে নোটিশ দিয়ে আলোচনার তারিখ নিয়ে এবার আলোচনায় বসতে হবে। সাধারণত সব চুক্তিতেই কিভাবে ঐ চুক্তি বাতিল করা যাবে তাও লেখা থাকে। কাজেই সে মোতাবেক ঐ মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত হিসাবে চুক্তি বাতিল করা যাবে। কিন্তু মোদীর ভারত একেবারে গায়ের জোরে তাই করেছে।
    মোদী-অমিতের চোখ নিবদ্ধ ছিল ৩৭০ ধারা বাতিল আর পুরা কাশ্মীর এরপর থেকে সরাসরি  ভারতের  অবিচ্ছেদ্দ অংশ – এই ঘোষণার লাভালাভের দিকে। তারা উগ্র জাতিবাদী ধারণায় এই ঘোষণার ফলাফল পরিণতি হিসাবে এরপর থেকে সমস্ত হিন্দু ভোট জাতগর্বে উঠে দাঁড়াবে আর বিজেপির পক্ষে ভোটের বাক্সে চলে আসবে – এই অনুমানের দিকে ছিল তাদের মূল দৃষ্টি।  কিন্তু তাদের ঘোষণা যে এতদিন   চীন-ভারতের সব সীমান্ত ভূমিবিষয়ক চুক্তি ও এলএসিগুলোকেও বাতিল করে দিচ্ছে সেদিকটা একেবারেই আমল করেন নাই।

    তাই অমিত শাহের ঐ ঘোষণার পর চীনা প্রতিক্রিয়া কী ছিল তাও মোদী সরকার আমলে নেয়নি। কিন্তু ২০১৯ সালে ৩১ অক্টোবর বেইজিংয়ে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেগুলার প্রেস ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে সে কড়া প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছিল। বলেছিল, “ভারত একপক্ষীয়ভাবে খেয়াল খুশিতে নতুন করে জম্মু-কাশ্মির ও লাদাখ বলে তাদের দুটা ইউনিয়ন টেরিটরি ঘোষণা করেছে যার মাধ্যমে আসলে চীনা টেরিটরিকে ভারতীয় প্রশাসনের অন্তর্গত বলে দাবি করা হয়েছে। এতে চীনা সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে”।

    কেন এত কড়া চীনা প্রতিক্রিয়া?
    এর পেছনের লম্বা ইতিহাসের সংক্ষেপটা হল, কাশ্মিরের এই চীন-ভারত সীমান্তটাই পূর্ব লাদাখ যা ব্রিটিশ আমল থেকেই কখনোই উভয়পক্ষের সম্মতিতে সীমান্ত চিহ্নিত করে নেয়া হয়নি এমন সীমান্ত। ব্রিটিশেরা তার কলোনি পড়শিদের সাথে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ার ডিমার্কেটেড ম্যাপ তৈরি করত। কিন্তু করদ রাজ্যগুলো মানে ওর সীমানাগুলোকে বাদ দিয়ে। কারণ আইনত প্রিন্সলি বা করদ স্টেটগুলো বৃটিশদের ঠিক কলোনিভুমি নয়। আর কাশ্মির ছিল করদরাজ্য। সেজন্য কখনোই লাদাখ সীমান্ত চীন-ভারতের বসে একমত হয়ে চিহ্নিত করে নেয়া কোন সীমান্ত নয়। তাই সর্বপ্রথম চীন ওই এলাকায় কতদূর নিজের এলাকা বলে দাবি করে বা এলএসি দাবি করে তা ঘটেছিল ১৯৫৯ সালে। এটাই ১৯৫৯ সালের এলএসি [LAC]। পরবর্তিতে ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের পরে চীন তা আরো পোক্ত করে নেয়। কিন্তু পরবর্তীতে একালে চীন-ভারত সম্পর্কের উত্থান-পতনে যখন তা ভালো হয়েছে তখন সীমান্ত আলোচনায় বসার মত অবস্থায় ১৯৯৩-৯৬ সালের এই চার বছরে বিস্তীর্ণ এলাকা চীন ভারতের পক্ষে ছেড়ে দেওয়ার চুক্তি করেছে। কারণ, চীনের সেসময় নীতি ছিল – কোনো এলাকা স্ট্র্যাটেজিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ মনে না হলে আর সে এলাকা নিয়ে ভারতের দাবি থাকলে তা ভারতের কাছে ছেড়ে দেয়া। কারণ ভারতের সাথে অন্যসব সম্পর্কের লম্বা এনগেজমেন্টে চীনের অনেক গভীর স্বার্থ আছে। তাই আস্থা সম্প্রসারণ চীনের জন্য জরুরি মনে হয়েছিল। এ কারণে ১৯৯৩ সালের এলএসিতে ভারত প্রথম বিস্তীর্ণ ভূমি ছাড় পায় যা ১৯৯৬ সালে ভারত পায় চীনের আরো চরম ছাড়ে। সেজন্য চীন-ভারত লাদাখ সীমান্ত বলতে ভারত সর্বশেষ ১৯৯৬ সালের এলএসিকে মূল ভিত্তি মনে করে এসেছে। কিন্তু অমিত শাহের ৫-৬ আগস্টের ঐ ঘোষণা যে এসব (১৯৯৩-৬ সালের) চুক্তি আর বুঝাবুঝিকে নাকচ করে দিচ্ছে – এটা তারা টেরও পয় নাই। এমন মেসেজ যে মোদী সরকার চীনকে দিয়ে ফেলছে সেটাও তারা বুঝেছেন বলে মনে হয় না। আবার অমিত যে সারা কাশ্মিরকেই ভারতের একক অংশ বলে দাবি করছেন সেটা সচেতনভাবেই করছেন। কিন্তু আইনিচুক্তি ও কূটনৈতিক কনসিকোয়েন্স-পরিণতি না বুঝে। তাই চীনের বক্তব্য, তাহলে অমিতের  ঐ (৫-৬ আগষ্ট ২০১৯) ভাষ্য বলছে – আমাদের দু’দেশের আলোচনা, চুক্তি ও এলএসি আর সব বুঝাবুঝি বাতিল ও ভুয়া। কারণ অমিত শাহ একপক্ষীয়ভাবে দাবি করেছেন “পুরা কাশ্মিরই ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ”।

    কাজেই এখনকার সীমান্ত সংঘাতে চীনা ভাষ্য ও চীনের পালটা সামরিক ততপরতার ব্যাখ্যাটা হলঃ  চীন বলতে চাইছে,  অমিত শাহ যদি একপক্ষীয়ভাবে সব ভুখন্ড দাবি করেন, এর মানে তিনি নিজেই ১৯৯৩-৯৬ সালের সব চুক্তি ও এলএসি বাতিল বলে দাবি করছেন। তাই ভারতের সাথে এবারের সীমান্ত সংঘাতে “আমরাও ঐ পালটা গায়ের জোরে ১৯৫৯ সালের এলএসিকে ভিত্তি মেনে সব ভূমি নিজেদের দখলে নিয়ে নিয়েছি”। কোন ভারতীয় এলএসি কে মান্য করি নাই। কারণ যে এলএসি অমিত শাহই বাতিল করে দিয়েছেন তা মানবার কোন দায় আমাদেরও নাই। এমনকি এক সামরিক চাপ ফেলে এরপর মোদী সরকারকে দিয়ে ‘চীন ভারতীয় কোনো ভূমি দখল করেনি বলিয়ে নিয়েছি”। অর্থাৎ মোদিকে দিয়ে মানিয়েছি, ১৯৯৬ সালের এলএসিকে ভিত্তি ধরে নয়, ১৯৫৯ সালের এলএসিকে ভিত্তি ধরলে চীন ভারতের কোনো ভূমি দখল করেনি। আর মোদী তাই মেনে নিয়েছেন।

    তাহলে এখন পাঁচ দফা ঐকমত্যের যৌথ ঘোষণার মানে কীঃ
    অতএব এখন পাঁচ দফা ঐকমত্যের যৌথ ঘোষণার মানে হল উপরের পুরা চীনা ভাষ্যটাই মোদীর মেনে নেওয়া। কারণ অপশনগুলোর মধ্যে এটাই মোদীর জন্য সবচেয়ে কম ক্ষতির ও বহনযোগ্য। যেমন  পাঁচ দফা ঐকমত্যের প্রথম দফার অর্থ হল – আবার আমরা স্বীকার করছি, চীন-ভারতের আলোচনায় যেকোনো ঐকমত্যই আমাদের সম্পর্কের সবকিছুর ভিত্তি হবে। অমিত শাহ বা কোনো মন্ত্রী কোথায় কী বলেছেন, সেটা নয়।

    পাঁচদফার প্রথম দফাঃ

    1. The two Ministers agreed that both sides should take guidance from the series of consensus of the leaders on developing India-China relations, including not allowing differences to become disputes.

    এমনকি এ কারণে দ্বিতীয় দফা খেয়াল করা যাক। ওখানে বলা হয়েছে, ‘দুই বিদেশমন্ত্রী সহমত হয়েছেন যে, সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি কোনো পক্ষের জন্যই ভালো নয়। তার জন্য তারা সহমত হয়েছেন যে, উভয়পক্ষের সীমান্ত বাহিনীর উচিত তাদের আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাওয়া, দ্রুত সৈন্য সরিয়ে নেয়া, সঠিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং উত্তেজনা প্রশমিত করা।’ অর্থাৎ প্রথম দফা মেনে নেয়া সাপেক্ষে দ্বিতীয় দফায় উভয়পক্ষ সৈন্য ফিরিয়ে নিতেও একমত। এতেই তাদের স্বার্থ!

    2. The two Foreign Ministers agreed that the current situation in the border areas is not in the interest of either side. They agreed therefore that the border troops of both sides should continue their dialogue, quickly disengage, maintain proper distance and ease tensions.

    অতএব ভারত-চীন সম্পর্কের নতুন ভিত্তি এখন থেকে পারস্পরিক আলোচনায় ঐকমত্য। আর এটাই মোদী মেনে নিয়েছেন বলেই পাঁচ দফার ঐকমত্য টানা  সম্ভব হয়েছে আর এটাই এখন সবকিছুর ভিত্তি। তাই পুরা পাঁচ দফায় ‘এলএসি’ বলে কোনো শব্দই রাখা হয়নি। মানে সীমান্ত আলোচনা বলতে কিছু থাকতে গেলে তা নতুন করে ‘ফির সে শুরু’ করতে হবে। আর ফের আলোচনায় ঐকমত্য হলে সবই ভারতের, আবার তা হতেও পারে। কিন্তু এর আগে পর্যন্ত সব ভূমি চীনের দখলে থাকবে। তাই যেন ‘এলএসি’ শব্দের আর দরকার কী? ভারত ভালো মানুষ ও রাষ্ট্র, চীনের মনে এমন আস্থা জমলে আবার সবকিছু সে ফেরত দিতে পারে। এমন কী, আরো বেশি ভুমি চীন ফেরত দিয়ে দেবে – পাঁচ দফায় যা লেখা নেই এমনও হতে পারে; কিন্তু ইঙ্গিত আছে এই হলো তার মূল কথা।

    মোদি এটা মেনে নিলেন কেন?
    প্রধান কারণ নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই সব ভারতীয় সেনাদের লাদাখ থেকে মোদীকে ফেরত আনতেই হবে। শীতকাল শুরু হয়ে যাবে, ঠান্ডা ছেয়ে যাবে। কারণ ভারতের অর্থনীতি এমন যে, ঐ বরফজমা ঠাণ্ডার মধ্যে তাদের সেখানে  গরম ঘরে রাখার মত খরচ জোগানোর সামর্থ্য ভারতের নাই। একথা কয়েক সপ্তাহ আগে সাবেক এক পররাষ্ট্র সচিব ও উপদেষ্টা শ্যাম সরন বলেছিলেন। যা মোদী তাকে দিতে বলিয়েছে বলে অনুমান করা হয়। ফলে এমনিতেই তাকে সেনা প্রত্যাহার করতেই হতো।

    Shyam Saran also said, “My sense is, if this, for example, continues during the winter — which would be very difficult because this area is very inhospitable during winter – it would require a considerable investment in setting up heated dwelling units, making certain you have enough equipment for use during very very severe winters.” – ইকোনমিক টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়া

    এ ছাড়া আরো অন্য কারণ হল, মোদী আমেরিকার ওপর আস্থা রাখেন না যদিও মনের কোণে একটা স্বপ্নদেখার মত খায়েসের বাতি তিনি জ্বালিয়ে রেখেছেন। যদিও বাস্তবত হুঁশের-মোদী বুঝেন, সেটা সত্যি নয়। মোদি আসলে অসহায়। চীনের কাছে ভালো মানুষের পরীক্ষা দেয়া ছাড়া তার হাতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। কাশ্মীর পুরাটাই সরাসরি ভারত অংশ এই উগ্র হিন্দু জাতিবাদের জোশ তুলতে পারলে পরের সব নির্বাচনে ভোটের বাক্সে ভারতের সব হিন্দু ভোট ঢেলে বিজেপির ভাগে আসতেই থাকবে – এই অনুমান ও প্রচন্ড লোভে পড়ে গত ৫ আগষ্ট ২০১৯ থেকে তিনি যাই করতেছেন তাই এখন বুমেরাং হয়ে তার গলায় আটকেছে। তবে এদিকে আবার খুব সম্ভবত তিনি অনুভব করেন যে, এমন দশায় আমেরিকার ওপর আস্থা রাখা মানে নিজের পছন্দের হিন্দুত্বের রাজনীতি কখনো ভারতীয় জনগণের হাতেই প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আগেই আমেরিকারই হুকুমে ত্যাগ করতে হবে। এ ছাড়া ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য আমেরিকান ব্যবসায়ীদের আধিপত্যে খুলে দিতে হবে তাকে- এভাবেই তথাকথিত ‘ওপেন মার্কেট’ করে সংস্কার করতে হবে ভারতের অর্থনীতি ও বাজার। এগুলো মোদীর জন্য ‘আরো বড় আত্মহত্যা’। মোদির ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যবসায়ী। মানে গুজরাটি বেনিয়া। মোদি শব্দের অর্থও তাই। কাজেই আমেরিকার এসব আবদারের অর্থ তার না বুঝার কিছু নেই। সম্ভবত সে জন্য তিনি আমেরিকার কাছে যেতে পারছেন না।

    পাঁচ দফা ঐকমত্য বিষয়টা ভারতের পাবলিককে কীভাবে বলবেনঃ
    বলাই বাহুল্য এটা এক পাহাড় ডিঙ্গানো, মোদীর নিজের ফাদে আটকানো।  যে মোদী-অমিত ‘সারা কাশ্মিরই ভারতের’ একথা বলে হিন্দুত্বের বুকের ছাতি ফুলাতে গেছিলেন তারা এখন কীভাবে বলবেন চীনের কাছে উলটা লাদাখের ভূমি খুইয়ে এখন নতুন করে সমঝোতার মাধ্যমে সেই ভুমি ফেরত আনতে যাচ্ছেন তিনি?

    তাই এনিয়ে আরো দুটা কথা আছে। যার মূল বিষয় চীনের সাথে করা পাঁচ দফা ঐকমত্য কেন করছেন এনিয়ে তিনি পাবলিকের সামনে কী বলবেন? এসব ব্যাপারে মোদীর কিছু ধুর্ত বুদ্ধি আছে।  সেজন্যই তিনি জয়শঙ্করকে দিয়ে করা আরেকটা ভাষ্য প্রকাশ করিয়েছেন। যেমন লক্ষ্য করেন, আনন্দবাজারের ১১ সেপ্টেম্বরের শিরোনাম : ‘মস্কোয় দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। আগে সেনা সরাক চিন : জয়শঙ্কর’। অর্থাৎ এখানে ভারত কী সাংঘাতিক বিপ্লবী!  এখানে ভারত বিরাট শক্তি, এমন দাবি করা হচ্ছে উগ্র জাতিবাদী ঢংয়ে।     এছাড়া, আগে চীন কী করে দেখি, এরপর ইচ্ছা হলে ভারত করবে – এমন ডাটদেখানোর এক ভাব তৈরি করা হয়েছে। মোদির ভারত এমনই শক্তিশালী! এটা কেমন কী হল?
    না, খুব সহজ। যৌথ ঘোষণাটাকে অগুরুত্বপূর্ণ করে পেছনে ফেলে রাখতে জয়শঙ্কর তাই এর পরেও আরেকটা ভাষ্য তৈরি করে সে ভিত্তিতে বিদেশ মন্ত্রণালয় থেকে আরেকটা আভ্যন্তরীণ মিডিয়া ব্রিফিং সহ বিবৃতি দিয়েছেন; ঠিক যেমনটা মিডিয়া শুনতে চায়, পাবলিককেও শুনাতে চায়, সেভাবে। এখানে সবচেয়ে বড় কথা ভারতের হিন্দুজাতিবাদী মিডিয়াও এমন ভাষ্যই চায়। এরা ‘ন্যশনাল ইন্টারেস্ট বা কথিত হিন্দুজাতির স্বার্থের নামে গু-গোবর সব হালাল করে তারা চালিয়ে দিবে।

    কেউ কেউ ‘বিশেষ’। কারা এরা?
    কিন্তু এর পরেও কথা আছে। সবাই তো আবার আম-পাবলিক নয়। কেউ কেউ ‘বিশেষ’। কারা এরা? যেমন সাবেক সামরিক জেনারেল অশোক মেহতা। তিনি নিজের লেখার শিরোনাম দিয়েছেন, “যৌথ-বিবৃতিতে কী মিসিং আমাদের সেদিকে তাকানো উচিত” [We Need to Look at What Was Missing in the India-China Joint Statement]।

    তিনি বলতে চাইছেন যেমন, ‘এলএসি’ শব্দটা যৌথবিবৃতিতে নাই। এ ছাড়া আরো বড় জায়গার গ্যাপ তিনি ধরেছেন। যেমন সীমান্তে “আগে যে যেখানে ছিল সেখানে ফেরত যাবে” এমন শব্দগুলো সব সময় থাকত কিন্তু এবার তা কোথাও নেই। এছাড়া এখন ‘এলএসি’ শব্দটার বদলে লেখা হয়েছে ‘বর্ডার এরিয়া’। এছাড়া তিনি বেইজিংয়ের গ্লোবাল টাইমসের একটা টুইটের ছবি তুলে এনে দেখাচ্ছেন। যেখানে লেখা আছে, “ভারত শান্তি চাইলে ভারতকে ১৯৫৯ সালের ৭ নভেম্বরের এলএসি মেনে নিতে হবে। আর যুদ্ধ চাইলে চীন যুদ্ধ করবে। দেখা যাক কোন দেশ শেষে টিকে”। বলাই বাহুল্য এসব কথা জেনারেলেদের আত্মসম্মানে লাগে তাই ভাল কথা না। বলাই বাহুল্য, জেনারেলদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে এসব লেখায় বাধা দিলে বাহিনীতে প্রভাব পড়বে। এর চেয়ে উপেক্ষাই মোদির জন্য একমাত্র কৌশল। একই রকম প্রশ্ন তোলা আরো লেখকের লেখা আছে। যেমন আরেক প্রাক্তন সামরিক কর্তা ও বর্তমান সামরিক সাপ্তাহিকের [editor of FORCE magazine] সম্পাদক প্রবীণ সোয়েনি শিরোনাম দিয়ে লিখছেন, ‘যৌথ বিবৃতি থেকেই বুঝা যাচ্ছে ভারত কী হারিয়েছে”।

    কিন্তু এসব সামরিক লোকেদের ভুলটা কোথায়?
    তারা বলতে চাইছেন, ভারতের আগে ১৯৯৬ সালে এলএসি অনুযায়ী সীমান্ত ছিল এখন মোদী সেটা চীনের কাছে খুইয়ে এসেছেন কেন? এটাই তাদের সবার সার বক্তব্য। অথচ তারা একটু কষ্ট করে আরো বিস্তারে আরো বিশাল ভুখন্ড পাওয়াটা দেখতে চাইছেন না। সেটা হল ৫-৬ আগষ্ট ২০১৯ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে তো তাদেরকে  “‘সারা কাশ্মিরই ভারতের’ বলে আরো বড় ভুখন্ড এনে দিয়েছেন – সেদিকে দেখেন না কেন? এতে এটা বুঝতে তাদের অসুবিধা কোথায় অমিত শাহই তো সেদিন  -১৯৯৬ সালে এলএসি- মানেন নাই। বাতিল বলেছেন বলা যায়। কারণ আকসাই চিনসহ সারা সারা কাশ্মিরই যদি ভারতের’ হয় তবে ওর ভিতরের কোন ভুখন্ড -১৯৯৬ সালে এলএসি – নিয়ে চীন-ভারতের সমঝোতা তো অমিত শাহকে সবার আগে অস্বীকার বা বাতিল মনে করতেই হবে।

    অতএব সবার আগে এসব জেনারেলদেরকে বুঝতে হবে অমিত শাহের দাবির অর্থ কী। ফলে চীন না, সবার আগে “১৯৯৬ সালে এলএসি” অমান্য বা বাতিল করছে খোদ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আর তা করেছেন সংসদে মানে লোকসভাতে।  কাজেই চীনের আর সেটা মান্য-অমান্যের দায় কী? তাই জেনারেলদের অভিযোগ যাওয়া বা জবাবদীহিতা চাওয়া উচিত মোদী-অমিতের কাছে। মোদী সেকারণের সংসদের এনিয়ে কোন আলোচনা হতে দেন নাই।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “‘সারা কাশ্মিরই ভারতের’ দাবির পরিণতি ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।   এছাড়া  আমার আরেকটা লেখা যেটা  ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, প্রায় একই কাছাকাছি শিরোনামে, “চীন-ভারতের সীমান্ত বিরোধ” নামে। পরবর্তিতে ঐ দুই লেখাটাকে একত্র করে  এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আমেরিকা ভারতকে হবু চীন-বিরোধী জোটে পাচ্ছে না

    আমেরিকা ভারতকে হবু চীন-বিরোধী জোটে পাচ্ছে না

    গৌতম দাস

    ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3aW

     

    চীন মনে করে ইন্দো-প্যাসিফিক বলে কিছু দাঁড়াবে না, কারণ এটা একটা ডেড এন্ড।Hegemonic nature of US Indo-Pacific Strategy exposed – Global Times

    [সার সংক্ষেপঃ আমেরিকা চীন ঠেকানোর (Containment) লক্ষ্যে জোট গড়তে চায়, ইন্দো-প্যাসিফিক জোট। সেটাই পরিস্কার করে বলছে এখন।   কিন্তু এই জোটের বৈশিষ্ট্য কী হবে সেটাসহ এর চেহারা গত দুই দিনে অনেকটাই পরিষ্কার করে ফেলেছে। কিন্তু তাদের জন্য খারাপ খবর হল, সে জোটের ‘নৌকায়’ তারা চাইলেও ভারতকে তুলে নিতে পারছে না। ব্যাটে-বলে হচ্ছে না। তারা যেমনভাবে ভারতকে চায় আর বাস্তবের যে ভারত সেদুটোতে মিল নাই। এক নয়, তাই মিলছে না।  গত ৯-১০ সেপ্টেম্বর তাদের নিজেদের মনের কথাগুলো নিয়ে প্রকাশিত কয়েকটা আর্টিকেলে তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। ফলে তাদের কথাগুলো  দু’টি শর্ত যুক্ত করে তারা বলছে।  আর ভারতকে সেই শর্তপূরণ সাপেক্ষে ঐ নৌকায় তুলে নেয়া যেতে পারে বলে ঐ আর্টিকেল সিদ্ধান্ত টেনেছে। শর্ত দু’টি হল – যদি ভারতের পতিত অর্থনীতি উঠে দাঁড়ানোর জন্য আবার জোয়ার আনা যায় আর দুই, বর্তমান ভারত রাষ্ট্র, রাজনীতি ও দলে ‘লিবারেল বৈশিষ্ট্য’ হাজির থাকতে হবে – যার মানে হল মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো মোদীকে বন্ধ করতে হবে। আর প্লুরাল বা একাধিক মুখ ও ধারার রাজনীতি যেখানে পাশাপাশি চলতে পারে এমন সমাজ গড়তে রাজি হয়ে ভারত যদি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়। তবে এটাও পরিষ্কার যে, সাধারণভাবে ভারত তো বটেই বিশেষত মোদীর সরকার এদুই শর্ত কোনো দিনই পূরণ করতে পারবে না। কাজেই সাত মণ ঘি ঢালা হচ্ছে না, রাধাও নাচবে না। কারণ এই শর্ত পূরণ করার অন্তত একটা অর্থ হল, বিজেপি-আরএসএসকে ভাল হয়ে যেতে হবে;  নাম ও রাজনীতি পরিত্যাগ করতে হবে।
    সে জন্যই কি আমরা আরেকটা ডেভেলপমেন্ট দেখছি, খুব সম্ভব তাই। রাশিয়ার পুতিনের মধ্যস্থতায় সীমান্ত ইস্যুতে চীন-ভারত ‘”পাঁচ দফা ঐকমত্যের” এক যৌথ বিবৃতির ঘোষণা প্রকাশ করেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর রাতে মস্কোতে এমন সভা সমাপ্ত হয়েছে। রয়টার্সের নিউজ ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টায় এই খবর হোস্ট করেছে। এর ফলে পরবর্তী বিস্তারিত দিক বিশেষত ভারতে চীনা বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর প্রায় সবকিছুতে যে অবরোধ এবং ঘোষিত-অঘোষিত বাধা আরোপ ও প্রপাগান্ডা চালু করা হয়ে আছে এসবের এখন কী হবে, আমরা এর সম্পর্কে এখনো কিছুই জানি না। তবে বিবিসি ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্যের এ দিকটার করুণ অবস্থা নিয়ে “উঠতি বহু ব্যবসার চোখে অন্ধকার”’ শিরোনামে এক রিপোর্ট করেছে।]

     

    আমেরিকা তাদের হাতের কার্ড দেখিয়ে ফেলেছে। চীন ঠেকাতে আমেরিকা কী করতে চায় বা কী আশা করে – তা আর্টিকেল লিখে প্রকাশ করে ফেলেছে। অনেকে এ পর্যন্ত এটা-সেটা বলে পেটের কথা বাইরে আনতে চেষ্টা করেছে বিভিন্ন সময়ে। ফাইনালই তারা এখন উপস্থাপনের একটাই ভাষ্য ঠিক করেছে। গুছিয়ে থিতু হয়ে বলা সেই ভাষ্যটা হল – এশিয়ার দেশগুলো কোনদিকে যাবে; চীনের বেল্ট-রোডে নাকি আমেরিকান ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে, সেটা তাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাংলাদেশের চ্যানেল২৪ টিভি একটা নিউজ প্রচার করছে, [এটা ছোট করে আর ওর বাংলা ভার্সানটাই লিঙ্ক দিয়েছি। আগ্রহীরা ‘মুখোমুখি | আর্ল মিলার-যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত’ এই শিরোনামের মূল পুরা ভিডিওটা ইউটিউবে দেখে নিতে পারেন।] এখানে বাংলাদেশে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত মিলার আগেই বলে নিয়েছেন, “চীন আমেরিকার শত্রু না, প্রতিদ্বন্দ্বি”। তবে বাংলাদেশ এটা না ওটা নেবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে এখানে ‘চোঙ্গা ফুকতে’ দেখা গেল। তবে বাংলাদেশের কোনোটাই না নেয়ার অপশন আছে কি না স্পষ্ট বোঝা যায়নি।
    এছাড়া এই উপস্থাপনে সবচেয়ে বড় অসঙ্গতিটা হল, চীনা বেল্ট-বোড প্রকল্পের সাথে আমেরিকার “ইন্দো-প্যাসিফিক জোট” – এদুটার মধ্যে তুলনা টানা চলে না, এরা সমতুল্য বিষয়ই নয়।  বেল্ট-রোড মূলত একট প্রজেক্ট যাকে বড়জোড় বহুদেশকে সামিল করে নেয়া চীনের এক অর্থনৈতিক মেগাপ্রকল্প বলা যেতে পারে।  বিপরীতে প্রথমত, ইন্দো-প্যাসেফিক জিনিষটা কি তা এখনও স্পষ্ট না। যেমন রাষ্ট্রদুত মিলার চ্যানেল২৪-কে বলেছেন ইন্দো-প্যাসেফিক ‘নেশনস্‌ মানে রাষ্ট্রের জোট।  কিন্তু সেক্ষেত্রেও কথা হল এটা কী সামরিক জোট না অর্থনৈতিক জোট, তা অস্পষ্ট। অন্তত অর্থনৈতিক তো নয়ই।  আহলে বেল্ড-রোড এর সাথে এটা তুলনীয়ই নয়। তবে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো সময়ে ইন্দো-প্যাসেফিক বলতে এক যুদ্ধজোটে সামিল করা্র কথা বুঝিয়েছে। যে জোটের ভিতরে আবার আছে কোয়াড [QUAD] জোট। কোয়াড মানে আমেরিকা জাপান, অষ্ট্রেলিয়া ও ভারত এই চার রাষ্ট্রকে নিয়ে কথিত চীনবিরোধী যুদ্ধজোট। যেটা আবার এখনও পর্যন্ত গত সর্বশেষ পাঁচবছর ধরে – এক পা আগে তো দু’পা পিছে এমন হয়ে আছে। তাহলে কথা দাড়ালো,  ইন্দো-প্যাসেফিক এই শব্দগুলো মিলারের ভাষার ‘নেশনস’ হোক কিংবা অন্যদের ভাষ্যে সেটা ‘যুদ্ধজোট’  যাই হোক তা অন্তত বেল্ট-রোড – এই অর্থনৈতিক প্রকল্পের সাথে তুলনা করা যায় এমন সমতুল্য কোন বিষয় বা ফেনোমেনা হতেই পারে না।
    আবার চ্যানেল২৪ নিজে এটাকে ইন্দো-প্যাসেফিক “করিডোর” বছে।  কেন বলছে এর কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে সবমিলিয়ে  যারা ভেবেছিলেন বাংলাদেশে ‘চীনা প্রভাব’ ছুটানোর জন্য ভারতের সর্বাত্মক তৎপরতা চীন-ভারতের লাদাখ সীমান্ত সংঘর্ষের কারণে হাজির হয়েছে, তাদের অনুমান ‘ভুল’। বিষয়টা আসলে হল – এশিয়ার চীনের বিরুদ্ধে একটা শেষ লড়াই লড়ার খায়েশ এখন আমেরিকান নির্বাচনের আগে আমেরিকার দুই দলেরই (বাই-পার্টিজান) খায়েশ হয়ে দাড়িয়েছে, এই হল বাস্তবতা। খালি তফাত এটুকুই যে, ট্রাম্প জিতলে একটু কৌশলে ভিন্নতা থাকবে যেটা বাইডেন জিতলে তুলনামূলকভাবে সফট কৌশল হবে। অর্থাৎ এশিয়ার চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকান লড়াইয়ের চেষ্টা শুরু  হবে আসন্ন আমেরিকান নির্বাচনের পরের বিজয়ী প্রশাসনের হাত দিয়ে। কিন্তু লড়াই একটা কমবেশি হবে সেটা নিশ্চিত।
    সেটা হলেও এটাকে শেষ লড়াই বলছি এ জন্য যে, ঠিক এটাই ওবামার প্রথম টার্মে ২০১১ সালে চেষ্টা করা হয়েছিল , ‘এশিয়া পিভোট’ নাম দিয়ে যা ওবামার সেকেন্ড টার্মেও বিস্তৃত থাকলেও বোঝা গিয়েছিল যে, এটা অকেজো, কাজ করছে না; মানে ভুয়া চেষ্টা। ব্যাপারটা সার কথায় বললে, ‘পিভোটে’ অনুমানে ধরে নিয়েছিল এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো মনে করে, চীন এক আগ্রাসী শক্তি। আর তাই এই শক্তির বিরুদ্ধে এশিয়ার দেশগুলোকে একটা চীনবিরোধী সামরিক জোটে আমেরিকা শামিল করতে পারবে বলে ধরে নিয়েছিল। কিন্তু এই অনুমান সঠিক ছিল না। তাই এটা ফেল করে যায়, কারণ এশিয়ার দেশগুলো বলতে চায় – চীনের অনেক কিছুতেই তাদের বিরোধিতা বা অপছন্দ থাকলেও সে জন্য আমেরিকান নেতৃত্বে কোনো চীনবিরোধী জোটে বা যুদ্ধজোটে তাদের ঢুকতেই হবে, এটা হবে আত্মঘাতী। এতে ‘ওভার অ্যাক্ট’ করা হয়ে যাবে। এর চেয়ে চীনের সাথে যদি কোনো দেশের সীমান্তবিরোধ থাকে তা নিয়ে আপত্তির কথা নিয়মিত বলে যাওয়া ও ডায়ালগের চেষ্টা (এব্যাপারে আদর্শ উদাহরণ সম্ভবত প্রেসিডেন্ট দুতের্তো-র ফিলিপাইন) করে যেতে হবে।
    আর একই সাথে, উঠতি অর্থনীতির চীনের সাথেই অর্থনৈতিক (পুঁজি-পণ্য বিনিময়ের গভীর ) সম্পর্ক জোরদার করা হবে নিজ দেশ পরিচালনার সঠিক কৌশল। এর বিপরীতে কোনো যুদ্ধের সম্ভাবনার মধ্যে নিজ দেশকে ফেলে দেয়ার মানে হবে অর্থনৈতিকভাবে নিজ দেশকে শেষ করে দেয়া। কাজেই ঐ আমেরিকান কৌশলের পক্ষে প্রায় কেউই নামেনি। তাই ওবামার শেষ বছর, পুরো ২০১৬ সালটাই ছিল আসলে তার ‘পিভোট’ গুটানোর বছর। কিন্তু পরে ট্রাম্প আমলে নিজের টার্মে চীনবিরোধিতাও তিনি অবশ্যই করেছেন, কিন্তু নিজে জাতিবাদী আমেরিকান হিসেবে আর অবশ্যই তা চীনবিরোধী কোনো জোট গড়তে অনাগ্রহী থেকে। এর ফলে আগে ‘চীন ঠেকানোর’ রাজনৈতিক তৎপরতার ধারা জারি রাখা বা আমেরিকান থিঙ্কট্যাংকগুলোর জন্য গাইড হিসেবে যে ভূমিকা রাখছিল ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে এসে পেন্টাগন বা স্টেট ডিপার্টমেন্ট সে কাজ থেকে নিজেদেরকে  প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। এ কারণে গত দুই বছর ধরে কিছু আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক আবার নিজেরাই ‘চীন ঠেকানোর’ লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছিল। এবারের এই মিশনের মুখ্য ভূমিকায় ছিল ও আছে থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’ [www.atlanticcouncil.org]। এর মূল ভূমিকাটা হল যেন, মোদীর ভারতকে আমেরিকান নৌকায় তোলা, এটাকে সর্বক্ষণের ধ্যানজ্ঞান করা। একাজে তাদের জন্য  মূল গুরুত্বপুর্ণ প্রিয় ব্যক্তিত্ব এস জয়শঙ্কর, তিনি মোদীর এখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যার সাথে  প্রায় সর্বক্ষণ যোগাযোগের মাধ্যমে মোদী সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখছে। কারণ আবার উল্টাদিকে মোদীর এক ট্রমার নাম হল চীন। চীন আবার কোন সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে ১৯৬২ সালের মত ভারতকে মার দিয়ে যায় কি না!  এরই কাউন্টার হিসাবে নিজের নিরাপত্তাবোধ, সেফবোধ করার জন্য বিশেষত মোদীকে আমেরিকা যতই তুচ্ছতাচ্ছিল্য অথবা কেবল নতুন নতুন আমেরিকান অস্ত্র কিনবার জন্য চাপ সব সহ্য করে হলেও আমেরিকা পাশে আছে এই বোধটা মোদী পেতে চেয়ে এসছেন। আর মোদীর ধারণ তার মনোবাসনা সবচেয়ে ভালভাবে আমেরিকায় ঠিক ঠিক জায়গায় কানে তুলতে পারেন একমাত্র জয়শঙ্কর। তাই ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’  আর মোদী এই দুজনের মাঝে জয়শঙ্কর, দুদিকেই দুজনে দুজনার। যদিও  ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’ ছাড়াও অন্য আরোদিকে ভূমিকা রাখছিল আরেক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এন্ডোমেন্ট’  [Carnegie Endowment[ আর কার্ণেগি ইন্ডিয়ার ওয়েবপেজ এখানে।

    এই ‘কার্নেগি এন্ডোমেন্ট’ (সংক্ষেপে এন্ডোমেন্ট বলব)  সেই বুশের আমলে ২০০৬ সাল থেকে এই কাজে ভারতে ভূমিকা রেখে চলেছে। তবে রেজিস্ট্রার্ড ইন্ডিয়ান শাখা হয়েছে অনেক পরে আর, তবে সেটা সম্ভবত এনজিও হিসাবে। ভারতের চীনবিরোধী বয়ান ভাষ্য যাই আমরা ভারতে চালু থাকতে দেখি বিশেষত, সকল ভারতীয় থিঙ্কট্যাংকের ফান্ড পাওয়া এবং তাদের যে কমন এক বয়ানে অবস্থান, এটাকে সাজিয়ে দিয়েছে  মূলত এই কার্নোগি এন্ডোমেন্ট। যেমন, “চীন ভারতকে মুক্তমালার মতো ঘিরে ফেলছে” অথবা চীন “ঋণের ফাঁদে” সবাইকে ফেলছে ইত্যাদি।  এন্ডোমেন্টের আরেক বড় ফান্ড দিবার খাত হল তরুণ গ্রাজুয়েটদেরকে  মাস্টার্স পড়তে বা পিএইচডি করতে পশ্চিমে যেতে স্কলারশীপ দেওয়া। আসলে এর বিনিময়েই তাদেরকে আমেরিকান বয়ানে দীক্ষা নিতেই হয়।  তাই কার্নোগি এন্ডোমেন্ট এর প্রধান কাজ আমেরিকান বয়ান ছেয়ে ফেলা, খাড়া করা ও নিয়ন্ত্রণ করা। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর নিজের জাতিবাদী রাজনীতিতে নিজেকে হাজির করার আগে পর্যন্ত এন্ডোমেন্ট প্রবলভাবে ভারতে নিজের ফান্ড ঢেলে তৎপর ছিল। নিয়মিত তরুণদের মাস্টার্স বা পিএইচডির জন্য স্কলারশিপ বরাদ্দ করেছে আর ওসব বয়ান মুখে তুলে দিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের অবস্থান তাদেরকে এরপর থেকে তৎপরতা ছোট করে আনতে বাধ্য করেছিল। আগে এর বড় কর্মকর্তা  ছিলেন সি রাজামোহন। তিনি সম্ভবত এখন এটা ছেড়ে সিঙ্গাপুরের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু একটা মজার তামাশা ঘটেছে। রাজামোহন অনেক আগে থেকে নিয়মিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় সাপ্তাহিক কলাম লিখে থাকেন। লাদাখে চীনা হামলায় অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা মারা যাবার পরে তাঁর লেখা একটা কলামের শিরোনাম মোদীর উচিত চীনকে এক পরাশক্তি বলে মেনে নেওয়া। মানে মোদীকে এককালে আমেরিকান বয়ানে সাজিয়ে এখন মোদীকে উলটা পরামর্শ দিচ্ছেন চীনকে মেনে নিতে।

    সেই কার্নেগি এন্ডোমেন্টে এখন আরো অনেক ততপর।  এন্ডোমেন্টের পক্ষ থেকে এশলে জে তাল্লিস [Ashley J. Tellis,, Tata Chair for Strategic Affairs; মানে হল তাল্লিসের কাজের চেয়ারের জন্য ফান্ড দেয় ভারতের টাটা কোম্পানি]। তিনি আমেরিকান আগামী সম্ভাব্য অবস্থানের ডকুমেন্টটা তৈরি করেছেন। লেখাটা এখানে পাবেন।  এই লেখাকে কার্নেগি এন্ডোমেন্টের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক পলিসি ব্রিফিং হিসেবে দেখতে বলে – উল্লেখ করে হিন্দুস্তান টাইমসে একটি আর্টিকেল ছাপানো হয়েছে। সেটা আবার লিখেছেন মঞ্জরি চ্যাটার্জি মিলার, যিনি বোস্টন ইউনিভার্সিটির পারদি স্কুলের [Frederick S Pardee School of Global  Studies] অধ্যাপক। তিনি নিজের লেখাটা আনাদেরকে  পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এভাবে – “আমেরিকার দীর্ঘ দিনের এক খায়েশ, ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে এশিয়ায় কাউন্টার-ওয়েট হিসেবে কাজে লাগায়। ভারত কী তা করবে?’ [The United States has long wanted it to act as a counterweight to China. Will Delhi do so?]
    ঐ পুরো লেখাতেই গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হল এই ‘কাউন্টার-ওয়েট’ [Counterweight to China], বাংলায়, চীনের পাল্টা ওজন বা বাটখারা।  এশলের এই লেখাটা ছাড়াও অধ্যাপক মঞ্জরি আরেকটা লেখার কথা তুলেছেন। তা হল- ড্যানিয়েল টেনরিরো [DANIEL TENREIRO] এর লেখা; যার শিরোনাম ‘এশিয়ায় চীনের পাল্টা বাটখারা হিসেবে ইন্ডিয়া’ [India as Counterweight to China in Asia]।

    ড্যানিয়েলের লেখাতে পরিষ্কার যে, ভারতকে চীনের কাউন্টার-ওয়েট হিসেবে এশিয়ায় পাওয়া- এর প্রয়োজনটা ভারতের নয়। বরং, খোদ আমেরিকার ও ড্যানিয়েলের মতো স্ট্র্যাটেজিস্টদের। তাই ড্যানিয়েল বা মঞ্জরি আশা রাখছেন, ভারত কি আমেরিকার হয়ে কাউন্টার-ওয়েট বা চীন ঠেকানোর  ভূমিকায় নামবে? কিন্তু কেন?

    কারণ স্ট্র্যাটেজিস্টদের মনের খায়েশ হল – চীনের পাল্টা ওজনদার রাষ্ট্রটাকে (ভারতকে) হতে হবে আমেরিকার হাতের পুতুল। চীনের মত না হলেও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় হতে হবে। আর মি. এশলে কোনো লাজলজ্জার বালাই না রেখে বলেছেন, ভারত বা সেই পাল্টা ওজনদার রাষ্ট্রটাকে দু’টি শর্ত মানতে হবে- ‘ইকোনমিক অগ্রগতি’ [‘economic momentum’ ] ফেরত আনতে হবে আর ‘লিবারেল বৈশিষ্ট্যের’ [‘liberal credentials’] হতে হবে।

    কথাটাকে বাংলাদেশিদের বুঝার মত করে বলতে গেলে এভাবে বলা যায়, বাংলাদেশকে যেমন ২০০৯ সাল থেকে ভারতের জন্য “ওপেন মার্কেট” আর ভারতের চোখে যথেষ্ট  “লিবারেল” বৈশিষ্টের মনে হয় এমন করে সাজিয়ে দেয়া হয়েছিল বা বাংলাদেশ ভারতের জন্য এমন দুটা শর্ত পূরণ করা হয়েছিল। ঠিক সেই রকমই এবার আমেরিকারও খায়েস হল, ভারতেকে আমেরিকার জন্য “ওপেন মার্কেট” আর আমেরিকার চোখে ভারতকে  যথেষ্ট  “লিবারেল” বৈশিষ্টের মনে হয় এমন করে সাজানোর শর্ত পূরণ করা হোক – এই হল এশলে, মঞ্জরি বা ড্যানিয়েলের মত স্ট্রাট্রজিষ্টদের আমেরিকার জন্য খায়েস ও প্রেসক্রিপশন। তবে বাংলাদশের বেলায় যেমন একজন প্রণব মুখার্জি ছিল আমেরিকার বেলায় নিশ্চয় একটা সাদা চামড়ার প্রণব মুখার্জি থাকবে, সেটা কে তা এখনও জানা যায় নাই।

    কিন্তু কেন এশলে কে ভারতের নাম এমন শর্ত আকারে বলতে হল? এশলে লেখাটার শিরোনামের দিকে তাকালে দেখি তা হল,  ‘বড় লীগে যোগ দিতে হলে ভারতের রাস্তা’ [India’s Path to the Big Leagues]। এর মানে আসলে এশলে তার লেখাটা শুরুর আগেই বুঝে গেছেন, ভারত চীনের পাল্টা তাদের পেয়ারের কাম্য  হবু ওজনদার দেশটা হচ্ছে না। হতে পারছে না। পারবে না। তাই তিনি তখন সরাসরি লিখতে বসেছেন- ‘কেন ভারতকে দিয়ে হবে না’। সে কারণে উল্টা করে লিখতে বসেছেন কোন শর্ত পূরণ করলে হবে। যেখানে এশলে জানেন, এই শর্ত ভারত পূরণ করতে পারবে না। তাই তিনি শর্ত লাগিয়ে বলছেন।

    আবার সমালোচকের চোখ দিয়ে দেখে বললে, এশলে অ্যান্ড গং-এরা চীনের কাউন্টার-ওয়েট বলে কাউকে খুঁজেই পাবে না। যদিও ভারতের প্রবল আর বিশেষ ‘খামতি’ আছে। কিন্তু ভারতের খামতি না থাকলেও এশলেরা ভারতকে বেছে নিতে পারতেন না। কেন?

    কারণ আমেরিকার দরকার এমন এক ভারত যাকে সে চীনবিরোধী তাদের মডেল দেশ হিসেবে তারা তুলে ধরতে পারে। চীন খারাপ, চীন আদর্শ না, চীন কথিত লিবারেল দেশ নয়, ইত্যাদির বিপরীতে যেন তারা এমন ভারতকে তুলে ধরতে পারে – যে ভারত আমেরিকার চোখে আদর্শ ও কাম্য দেশ, এভাবে। কিন্তু তাহলে আবার ভারতকে এমন আদর্শ দেশ বলে ফুলানোরই বা আমেরিকার কেন বা কী দরকার? দরকার এ জন্য যে, ভারত লিবারেল- এই প্রশংসা করে এর বিনিময়ে ভারতের ওপর মাতব্বরিটা  আমেরিকা নিজের হাতে তুলে নিতে চায়, ভারত না আমেরিকার জন্য বিপুল বিনিয়োগ আর লাভালাভের কেন্দ্র বানাতে চায় ভারতকে। সে জন্য ভারতে তাদের “ইচ্ছামতো একটা সংস্কার” করে সাজিয়ে নিতে চায়। কিন্তু এখানে সাবধান। এখানে কথাটা এভাবে বলাতে ভারতের অর্থনীতিকে ভারতের নিজেরই জন্য কোন সংস্কার দরকার নাই, এটা বুঝে বা ধরে নেওয়া চভুল হবে। ভারতের অর্থনীতির সংস্কার দরকার অবশ্যই আছে। কিন্তু এর মানে “আমেরিকার স্বার্থে ভারতের অর্থনীতির সংস্কার” – এমন বুঝা বিরাট ভুল ও ভিন্ন অর্থ হবে।

    যেমন- এশলের লেখায় আরো দু’টি বিশেষ শব্দ আছে- ‘ফাস্ট-গ্রোয়িং ‘ফ্রি মার্কেট ডেমোক্র্যাসি’[fastest-growing free market democracy]। এর মধ্যে সোনার পাথরের বাটি ধরণের অর্থহীন শব্দটা হল – “ফ্রি মার্কেট ডেমোক্র্যাসি”। এখানে ‘ফ্রি মার্কেট’ শব্দের সাথে ‘ডেমোক্র্যাসি’ শব্দের কী সম্পর্ক? এসবের অর্থহীন কথা ও শব্দের ভজকট মিশাল দিয়ে তারা খাড়া করেছে যাতে তাদের স্বার্থটা সহজে বুঝা বা ধরা না যায়। অথচ এর ভেতর দিয়ে তারা বুঝাতে চায়- ভারতকে আমেরিকার ডমিনেটেড বাজার ব্যবস্থা করে গড়ে পেতে চায় তারা। কিন্তু জবাব দিতে চায় না ভারত কেন এটা আমেরিকাকে দেবে? ইন্ডিয়ান পুঁজি আর ব্যাবস্থাপনা দক্ষতা কী নাই? পুঁজি ঘাটতি থাকতে পারে কিন্তু তা বলে ভারত সব আমেরিকার হাতে ছেড়ে দিয়ে অধস্থন নিতে হবে কেন?  এসব বিদ্যানেরা সংস্কার আর লিবারেল – এসব শব্দের আড়ালে আমেরিকান স্বার্থটা হাসিল করতে চায়।
    যে কথা বলছিলাম, ভারতের নিজস্ব অন্য খামতি যে নাই তা নয়। যেমন ভারতের রুট সমস্যা তথাকথিত স্বদেশিয়ানা বা অর্থহীন ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ ধরণের কথাবার্তা। মোদীও বলতে ভালোবাসেন, তিনি “আত্মনির্ভর অর্থনীতির” লোক। ভালো কথা। তার যা ইচ্ছা হতে চান, হবেন। কিন্তু মোদী তাহলে আবার রফতানি করতে ডলার গুনতে ভালোবাসেন কেন? ওসব ডলার পেয়ে জমিয়ে তিনি কী করবেন? ডলার জমানো মানেই তো তিনি আমদানিও করবেন! তাহলে উনার ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ কোথায় রইল? আবার মোদীর খুব খায়েশ দুনিয়াটা এমন হয়ে যাক যেন তিনি কেবলই রফতানি করতে পারেন। যেন সবাই তাকে রফতানি করতেই দিক! অথচ এটা তো অসম্ভব কল্পনা। তবু ভারতের খায়েশ, দরকার হলে সুযোগ পেলে অন্যকে পুরনো কায়দায় কলোনি করে শাসন করা। তবে ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ তার বাস্তবে যতটা না দরকার এর চেয়ে বেশি শব্দটা প্রপাগান্ডা হিসেবে দরকার। কারণ উগ্র হিন্দু জাতিবাদের জোশ তুলতে তথাকথিত স্বদেশিয়ানা বা অর্থহীন ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ শব্দগুলোর প্রপাগান্ডা-মূল্য অনেক। তবে আবার সাবধান এই কথিত জাতিবাদী স্বদেশিয়ানার উদ্ভট ধারণা – এসব  বিজেপির একার নয়, নেহরু আমল থেকেই ভারতের সব রাজনৈতিক দলের কমবেশি অবস্থানই এটা;  এটা একই সমস্যা ভারতজুড়ে।

    মজার ব্যাপারটা হল, একমাত্র চীন-ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বেলায় এই সমস্যাটা তুলনায় কম। কারণ চীন ব্যাপারটা দেখে এ জায়গা থেকে যে, তার পার্টনার দুনিয়ার সব সমস্যারই ডিপো হতে পারে। হলে তা হোক। তাই এটা ধরে নিয়েই চীন পার্টনারের সমস্যা কী সেদিক থেকে না গুনে বরং প্রাকটিক্যালি মাঠে ঠিক কী হলে চীন কাজ করতে পারে সেটা পূরণ আছে কি না সেদিক থেকে মাপা শুরু করে। নইলে বলে দেয়, সে পারবে না। এ জন্য চীনের সাথে ভারতের কাজের সম্পর্ক তুলনায় ভালো। আর চীনের অ্যাপ্রোচ ব্যবহারিক দিক থেকে বলে ভারতীয়রাই বদলে যায়; মেনেও নেয়। কারণ তারা দেখে তারা এই ব্যবহারিক বদলটা না করলে চীনের সাথে সম্পর্ক বা ডিলটাই হবে না। চীনাদের এই অ্যাপ্রোচে সুবিধার দিক হলো –  পার্টনারের নিজস্ব  প্রবলেমটা কী এটা নিয়ে আগেই তারা ঝগড়া শুরু করে না। যাই হোক, সার কথাটা হল – আমেরিকানদের সাথে কোনো ভারতীয় জাতিবাদীর কিল হওয়া একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাতে দোষ কার অথবা কে কতটা ভালো-মন্দ সে আলাপ উঠায় রাখি।

    তাহলে এখন কী হবে?
    বাস্তবতা হচ্ছে, আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ কাজে কাউন্টার ওয়েট হিসেবে ভারতকে ব্যবহারের পক্ষে ভারতের সাথে কোনো সম্পর্কই কার্যকর হচ্ছে না; যদিও এমন ভাব নেয়ার অঙ্গভঙ্গি সম্ভবত জীবিত ও জারি থাকবে। অনেক সময় মানুষ তা চায় না বলে কোন প্রমাণিত সত্য জিনিস মেনে নিতেও তার কষ্ট হয়। তেমন অবস্থার উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর মোদীর কাছে  এখন সম্ভবত এটা প্রমাণিত যে, চীন তার হিন্দুত্বের রাজনীতির জন্য তুলনামূলক ভালো বিকল্প। তবু চীনের বেলায় যেটুকু সঙ্ঘাত বারবার সামনে এসে পড়বেই সেটা বারবার এড়িয়ে হলেও মোদী চলতে পারবেন। কিন্তু যেটা সহসা চীন-ভারত সম্পর্ককে আগের জায়গায় ফিরতে দেবে না তা হলো- সারা ভারতে ‘চীন আমাদের শত্রু’ বলে যে ক্যাম্পেইন মোদী চালিয়েছেন তা সহসাই লোপ পাবে বা উধাও হবে না।

    আবার অন্য দিকে, আমেরিকা ও তার বন্ধুরা যেটাকে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক জোট’ বলে ড্রাম পিটাচ্ছে এই প্রপাগান্ডাও সহসাই থেমে যাবে না; তাতে ভারতের সাথে আমেরিকার কোন সম্পর্ক হোক আর নাই হোক তা জারি থাকবে। দ্বিতীয়ত, এি জোটের আরেকটা নাম আছে, এশিয়ান-ন্যাটো। মানে ইউরোপে যেমন ১৯৪৫ সালের পরে সোভিয়েতবিরোধী সবাইকে ন্যাটো সামরিক জোটে জড়ো করা হয়েছিল, সেই ন্যাটোই যেন এবার এশিয়ায় জাগতে যাচ্ছে, এমন ভাব শুরু করা হয়েছে। মোদীর প্রো-আমেরিকান মন্ত্রী জয়শঙ্কর তাই একবার বলেন, ভারত জোটনিরপেক্ষ দেশ; আরেকবার বলেন, জয়শঙ্করদের এশিয়ান ন্যাটোর স্বপ্নের কথা। ব্যাপারটা নিয়ে জয়শঙ্করের সবচেয়ে বড় সমালোচক হলেন প্রচণ্ড ক্ষেপা এমকে ভদ্রকুমার, তিনি এক সিনিয়র সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক রাষ্ট্রদূত ও বর্তমানে দুহাতে লেখা এক কলাম লেখক।https://www.reuters.com/article/us-india-china-idUSKBN262039তামাশার দিকটি হল – এই জয়শঙ্করই আবার মস্কোতে সাংহাই করপোরেশনের মিটিংয়ে হাজির হওয়ার উছিলায়  মস্কোর মধ্যস্থতায় চীন-ভারত যে পাঁচ দফা আপস সমঝোতা করল সেখানে ভারতের প্রতিনিধি। জয়শঙ্করের গা থেকে তখনো আমেরিকান কোনো ডিনারের ঢেঁকুর উঠছিল হয়ত। তবে রয়টার্সই একমাত্র এর ব্যাপক রিপোর্টিং করেছে। তাতে তারা দু’টি ছবি ছেপেছে যেখানে রাশিয়া, চীন ও ভারতের তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফানি পোজ দিয়ে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু তিনজনই ‘ফানি’ভাবে নানা অঙ্গভঙ্গি করে ছবি তুলেছেন, যেটা অবশ্যই কূটনৈতিক আচরণ না হলেও; একটু ইনফরমাল মুড প্রকাশ করেছে যেন, আমেরিকাকে তিনজনে ঠাট্টা করতে এসব করেছেন। এর বটম লাইনটা হল, চীন-ভারতের সম্পর্ক  আবার আগের বন্ধুর মুড়ে ফিরে যাওয়া শুরু করবে হয়ত। কিন্তু তা কতটা? মনে হয় না খুব সহসাই সেটা আগের লেভেলে ফিরে যাচ্ছে। আর দ্বিতীয়ত, চীন ঠেকানোর কাজে ভাটা পড়লে আমেরিকা তো কাজের অভাবেই মারা যাবে! একমাত্র একটু ভরসা, নির্বাচনে বাইডেন যদি জিতেন। সে ক্ষেত্রে চীনের থেকে বাণিজ্যে আমেরিকার জন্য অনেক বড় ছাড় আনতে পারবেন তিনি। ফলে ট্রাম্প আমলের বাণিজ্যযুদ্ধের অনেকটাই স্মৃতিতে পেছনে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু হিউম্যান রাইট ইস্যুতে বাইডেন অনেক বেশি চীনকে ঘায়েল করবেন। কমবেশি আমরা নিশ্চিত। এ ব্যাপারে ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার সেক্রেটারি অব ডিফেন্স মার্ক এস্পারের আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোনকল করেছেন যেটা অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। ঢাকার অভ্যন্তরীণ মিডিয়া ‘রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সহায়তার’ ওপর জোর দিলেও ঢাকার দূতাবাসের বিবৃতিতে “একটি অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের প্রতি তাদের যৌথ প্রতিশ্রুতির” কথা বলে সেখানে জোর দেয়া হয়েছে। রাষ্টড়দুত মিলারের “বাংলাদেশের জন্য ইচ্ছা কোনদিকে যাবে – এই ভাষ্যের তুলনায় এসপারের ভাষ্য অনেক এগ্রেসিভই বলতে হয়।  এর অভ্যন্তরীণ আমেরিকান মেসেজটা হল – যেন বলতে চাচ্ছে, আমরা চীন ও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে হিউম্যান রাইট ইস্যুতে শক্তভাবে চেপে ধরতে আসছি। ফলে আমরাও আপনার কাছে গুরুত্ব চাই। ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে তাই আমাদের ক্যাম্পে আসুন। অর্থাৎ ভারতকে আমেরিকা পাচ্ছে না, আপাতত এটাই সারকথা মনে হলেও মিয়ানমার বা ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে বাংলাদেশের জন্য এগুলো ডমিনেটিং বিষয় হতে যাবার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গেল। তবে বাংলাদেশের সাথে আমেরিকান প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক জোট কোথায় সম্পর্কিত তা এই ফোনকল স্পষ্ট করতে পারেনি।  হাসিনা চাইবে আমেরিকা, চীন ও ভারত স্কলকেই পাশাপাশি রেখে দিয়ে একটা নিউট্রাল অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে। বাংলাদেশের জন্য সেটাই সঠিক ও আদর্শ অবস্থানই হত, অবশ্যই। কিন্তু তা হাসিনার জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জিং, কারণ তার মূল জিনিষটাই নাই। পাবলিক সাপোর্ট বা রেটিং।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “আমেরিকা ভারতকে হবু জোটে পাচ্ছে না” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]
  • জাতিগিরির ‘স্বদেশী জাগরণ’ অচল ও পরাজিত

    জাতিগিরির ‘স্বদেশী জাগরণ’ অচল ও পরাজিত

    গৌতম দাস

    ১০ আগস্ট ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-38z

     

    Swadeshi Jagran Manch – स्वदेशी जागरण मंच, From Facebook

    প্রসঙ্গটা ভারত থেকে শুরু করছি এমন হলেও ব্যাপারটা কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এমন চিন্তার ফেনোমেনা আমাদের মত সব দেশেই কম-বেশি আছে। তাই এর প্রভাব সবখানে। কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীরাও এনিয়ে বিভ্রান্ত থাকে, তাই প্রচ্ছন্নে সমর্থনও করে। ‘জাতি’ বা ‘স্বদেশীপনা’ ইত্যাদি ধরণের শব্দ দিয়ে এরা নিজেদের তুলে ধরে। যদিও এগুলা একেবারেই ভুল চিন্তা। কী প্রেক্ষিতে এমন চিন্তা দুনিয়ায় উদয় হয়েছিল তা ভুলে বা আমল না করেই নকল বা ‘আউট অব কনটেক্সট’  এক চিন্তাধারা এটা। বিশেষ করে যেখানে দেশ বা রাষ্ট্র বলতেই মনে খামোখা ‘জাতি’ বলে ধারণা হাজির হয়। জাতি ধারণাটাই fetish বা ভুতুড়ে অস্পষ্ট চিন্তা। কিন্তু তাসত্বেও  আবার পরিস্কার থাকার দরকার আছে যে, ‘জনগোষ্ঠীগত কমন স্বার্থ’ অথবা ‘জনস্বার্থ’ বা ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট’- এসব ধারণাগুলো সঠিক,  ফলে এগুলো টিকে থাকবে। কারণ এধারণাগুলোর সাথে রাষ্ট্রে কোন ‘জাতি’ ধারণা থাকা না থাকার কোনো সম্পর্ক নেই, অনিবার্যও নয়।

    আসলে  কলোনি দখলবাজ ইউরোপের লুট করতে জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে পরা ব্যবসায়ীরা এরা প্রতিদ্বন্দ্বি দেশের (যেমন ইংলিশের বিরুদ্ধে ফরাসি) দখলবাজদের বিরুদ্ধে নিজ নিজ দেশের কলোনি দখলবাজেরা এই জাতি ধারণা ছড়িয়েই  দেশের সবপক্ষের পুর্ণ সমর্থন যোগাড় করেছিল। এখানে বিদেশি বিরোধিতা খুবই মুখ্য জিনিষ। যেমন ফরাসিদের  বিরুদ্ধে ইংলিশ দখলবাজদের বিদেশিবিরোধিতা কথা তুলার তাগিদে যে তত্ব হাজির করেছিল এটাই জাতিবাদ বা জাতি ধারণার শুরু। এককথায়, অন্য (আমাদের মত দেশকে) কলোনিদখলকে সমর্থন আর এই অন্যায়কে দেশের ভিতর থেকে দ্বিধাহীন  সমর্থন আর সাফাই পাবার তত্ব হল জাতিতত্ব বা জাতি ধারণা। তাহলে দাঁড়ালো, জাতি ধারণা আবার কার্যকর পেতে হলে পুর্বশর্ত হল কলোনি ব্যবস্থা দুনিয়াই আবার চালু থাকতে বা করতে হবে। অথচ.১৯৪৫ সালের পরের কপিবাজেরা, এই  জাতিবাদীরা এটা কখনও খেয়াল করে দেখেনি।

    একারণেই বিজাতীয় বা বি-জাতির বিপরীতে জাতি ধারণা – সেটা পরবর্তিতে যতই অপ্রয়োজনীয় ও নেতি হলেও তা সেকালে মিথ্যা করে “নিজেদের” বলে একটা ধারণা হাজির করে টিকানো হয়েছিল। সেই সাথে, বিদেশী মানেই খারাপ, বিদেশের বিরুদ্ধে ‘আমরা’ অথবা ‘স্বদেশী’ ধরনের এক ধারণা হলো জাতি। এখান থেকেই স্বদেশী পণ্য ভালো, তা মোটা ভাত বা মোটা কাপড় হলেও ভালো ইত্যাদি বলে ভুয়া দাবি করা হয়।

    এ ছাড়াও ১৯৪৫ সালের পরের কলোনিমুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের ধারণা হচ্ছে, একটা “জাতিবোধ” ছাড়া “দেশ”, “রাজনীতি” বা “রাষ্ট্রের” কল্পনা অসম্ভব। অথচ এসব ভিত্তিহীন কথা। কাজেই একটা জাতিবোধ থাকতেই হবে আর সেই সাথে কথিত “জাতীয়” বা দেশীয় পণ্যের প্রতি ভালোবাসা আর বিদেশী পণ্যের প্রতি ঘৃণা, পারলে তা বর্জন; না হলেও অন্তত কম-ভালোবাসা থাকার ‘স্বদেশীপনা’ তো থাকতেই হবে! এগুলা জাতি ধারণার পক্ষে ভুয়া বয়ান!
    এখানে স্বদেশীপনা শব্দটা ব্যবহার করেছি নেতি ও ঠাট্টা অর্থে। অনেকটা ছেলেমিপনা, আদেখলাপনা বা পোলাপান শব্দের মত নেতিবাচক অর্থে। অর্থাৎ যাকে ‘স্বদেশী’ বলছি তা আসলে স্বদেশী বা দেশের জন্য ইতিবাচক নয়; সেটা বুঝাতে; আর আসলে তা নয় সেই হুঁশ আনার জন্যই এমন ব্যবহার।

    আলোচনার সমস্যাঃ
    এদিকে এ ধরনের আলোচনার সমস্যা হয় যেটা তা হল, ব্যাপারটা কী তা বুঝিয়ে বললেও এবং তা ভালই বুঝা গেলেও সেটা তত্ত্বগত ধারণার মত একটা দূরত্বেই থেকে যায়। তাই অবস্থা হয় – কথা সত্য কিন্তু মানতে পারব না- ধরনের। সেকারণে, আজ এখানে কোন তত্ব নয়, একেবারে বাস্তবে ঘটেছে, বাস্তব সমস্যা হিসেবে হাজির হয়েছে সেটা দেখিয়ে এখানে কথা বলে দেখাব যে, কথিত জাতিবোধের স্বদেশীপনা একটা ভুল ও অকার্যকর ধারণা। আর সেটা এখানে দেখাব ভারতের এখনকার বাস্তব সমস্যা বা উদাহরণের পরিপ্রেক্ষিতে।
    আরো আছে। যেমন সমস্যা হচ্ছে প্রায় সবাই স্বদেশীপনা শব্দের সাথে পরিচিত। ফলে ধারণাটা জানা আছে কিন্তু কেউ বাস্তবে একালের নিজ নিজ দেশে ধারণাটা পরখ করে দেখেনি। তবে একালে ধারণাটার সত্যতা না থাকলেও এর একটা প্রবল আবেগী দিক আছে; ভুয়া হলেও তা একটা আবেগী জোশ তুলতে পারে – যেমন ‘দেশের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া’ বা ‘কল্পিত বিদেশী বা শত্রুর বিরুদ্ধে এক হওয়া’ ধরনের; আর এটাই আমাদের মত দেশের রাজনীতিবিদেরা সবাই ব্যবহার করে গেছে এ পর্যন্ত করে চলেছে, আর সমানে ফায়দা তুলে গেছে। তাতে ধারণাটা সত্য না হলেও কোনো অসুবিধা হয়নি। যেমন ভারতে এমন আরেক চরম মিথ্যা আড়ালের শব্দ হল, “ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট”। আপনি সাংবাদিক আপনি জানেন কোন একটা কথা মিথ্যা। কিন্তু তবুও “ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট” এর নামে আপনি সেকথা সত্য বলে চালাচ্ছেন। এটা মূলত মিথ্যা বলে তা কোনভাবেই সাংবাদিকতাই নয় আপনি জানেন তবু আপনি তা সত্য বলে গ্রহণ করতে বলছেন!

    তাহলে মিথ্যা হলেও তা ব্যবহারের সুযোগ কেন পাওয়া যায়ঃ
    কেন এমন সুযোগ পাওয়া যায়? কারণ দুনিয়ার শুরুর দিকে পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেন অবিকশিত অবস্থায় ছিল এবং স্বাভাবিক। তাই ব্যাপারটা মনে রাখার জন্য একটা সহজ সুত্র হল – কমুনিকেশন বা যোগাযোগ শব্দটা। যত ভাল বা বিকশিত কমিউনিকেশন ততই ভাল পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেন।

    কমিউনিকেশনঃ
    ছোট একটা শব্দ কমিউনিকেশন, কিন্তু এর অর্থ অ-নে-ক গুলো। কমিউনিকেশনের অনেকগুলো রূপ। এখানে কমুনিকেশন শব্দের সঠিক মানে কোনটা? না সবগুলো, কোনটাই বাদ নয়।  যেমন রাস্তাঘাট বুঝাতেও আমরা কমিউনিকেশন বলি। বলি কমিউনিকেশন ভাল না বা কমিউনিকেশন মিনিষ্ট্রি। কিন্তু তাও আবার সড়ক নাকি রেল নাকি এয়ার বা এরোপ্লেনের কমিউনিকেশন, এমন অনেকগুলো ভাগ আছে। আবার কমিউনিকেশন মানে তো ভাষাও, ল্যাঙ্গুয়েজ। আরো আছে। কমিউনিকেশন মানে টেলিফোন, টরেটক্কা করে পাঠানো পুরানাদিনের টেলিগ্রাফ। এমনকি তা বেতার, এফএম রেডিও  অথবা পুলিশ-আর্মির ওয়ারলেস – রজারস। আবার কমিউনিকেশন মানে আইটি – এর নেটওয়ার্ক, ইমেল, ফেসবুক বা স্যাটেলাইট ইত্যাদি সব।  অর্থাৎ এক কমিউনিকেশন শব্দ দিয়ে অনেক কিছুই বুঝায়। তা বুঝাক কোনই অসুবিধা নাই।

    তবে আসল কথাটা হল, দুনিয়াতে এই কমিউনিকেশন যত বিকশিত ততই, পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেনও সে মাত্রায় ব্যাপক। আর যতদিন  দুনিয়ায় কমিউনিকেশন দুর্বল বা অবিকশিত বলে দুনিয়ায় কোণায় কোণায় থাকা মানুষকে চেনাজানাও দুর্বল থাকে; মানে মানুষে মানুষে পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেন বিকশিত নয় বা নাই । অথবা এক জনগোষ্ঠীর সাথে অন্য জনগোষ্ঠী এবং অন্য সব জনগোষ্ঠীর সাথে পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেন নাই অথবা তেমন নাই অর্থাৎ ব্যাপক হয়ে না উঠেছে, তত দিন স্বদেশীপনা ধারণাটা যে মিথ্যা বা ধারণাটার যে সমস্যা তা টের পাওয়া যায় না।

    গত ১৬০৭ সাল থেকে ধরা হলে পরের প্রায় ৩০০ বছর ধরে  দুনিয়ায় চালু ব্যবস্থাটা বলি কলোনি যুগ; যখন দখলবাজ ছোটবড় পাঁচ-ছয় রাষ্ট্র বাকি প্রায় সব দেশকে দখল করে কলোনি বা উপনিবেশ যুগ কায়েম করেছিল। সে সময় কোনো দেশের বাইরে পণ্য বিনিময় লেনদেন বলতে ছিল  মুলত দখল-মালিক দেশ আর প্রজা দেশের মধ্যে; তাও আবার ছিল একপক্ষীয়- মূলত প্রজা বা দখলি-হওয়া দেশ থেকে লুটেরা সম্পদ দখল-মালিক দেশে নেয়া (যেমন ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া থেকে ব্রিটেনে) – এই রকম। এ ছাড়া ওদিকে পাঁচ-ছয়টা কলোনি দখলদার মালিকের নিজেদের মধ্যে লেনদেন – সেটাও ছিল প্রায় নাই না খুবই সীমিত পর্যায়ে। তাই জাতি ধারণা আর স্বদেশীপনা যে ভুয়া অচল ধারণা তা ইউরোপ কলোনিযুগে টের পায়নি। আবার কলোনি যুগের প্রায় ৩০০ বছর ইউরোপ ‘বিদেশী মাত্রই শত্রু’ গণ্য করা জাতি ধারণার জাতিরাষ্ট্র, নেশন-স্টেট ছিল। এটাই কলোনি-মালিক জাতি-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে লেনদেন ও বিনিময় বাণিজ্য প্রায় ‘নাই’ ধরনের সীমিত হয়ে থাকার আরেক কারণ। সুতরাং, এক কথায় ‘জাতি’ ধারণাটা বা দেশকে জাতি বলে বুঝা – এটা মূলত কলোনি দখল করা যেসব দেশের মূল ব্যবসা তাদেরই অনুসৃত ও প্রচলিত ধারণা। এদের চিনবার মূল বৈশিষ্ট্য হল এরা জাত বা জাতির বাইরে কারো সাথে লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় পছন্দ করে না, খারাপ মনে করে। তাই এখান থেকেই বিদেশির বিরুদ্ধে স্বদেশী বলে ধারণা জন্মানো সহজ ও সম্ভব।

    এজন্যই, স্বদেশী-জাতি-কলোনি যুগ এগুলো সম্পর্কযুক্ত শব্দ। কলোনি যুগেই জন্ম বলে জাতি বা স্বদেশী ধারণা সেখানে প্রথম পাওয়া যায়। দুনিয়াতে প্রথমত জাতি বা জাতিরাষ্ট্র ধারণাটার জন্ম বা পাওয়া যায় কলোনি যুগে; মানে ১৬০৭-১৯৪৫ অর্থাৎ প্রায় ৩০০ বছরের সময়কালের এবং মূলত ইউরোপে।

    কিন্তু পরবর্তিতে মানে কলোনি যুগ-পরবর্তী সময়কাল আগের কলোনি সময়ের তুলনায় অনেক ছোট, ৩০০ এর বিপরীতে মাত্র প্রায় ৭৫ বছর। এই পঁচাত্তর বছর, ১৯৪৫ থেকে একাল পর্যন্ত সময়টা কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার কাল। মোটা দাগে বললে সবার আগে কলোনি মুক্তি ঘটেছিল এশিয়ায়; পরে ল্যাটিন আমেরিকা আর শেষে ১৯৮০ সালের মধ্যে আফ্রিকা (সাউথ আফ্রিকা বাদে) সবাই প্রায় স্বাধীন হয়ে যায়। ফলে এবার সব রাষ্ট্রের সাথে সব রাষ্ট্রের লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় ব্যাপক রূপ নেয়া শুরু হয়। তবে কমিউনিস্টরা লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় ব্যাপারটা নিয়ে শুরু থেকেই অস্পষ্ট ও দ্বিধায় ছিল বলে তারা বাণিজ্যে রাজি হয়নি মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের কারণে। এছাড়া আর ১৯৫৩ থেকে ১৯৯১ সাল-  এই কোল্ডওয়্যারের যুগের কারণে। ফলে সোভিয়েতকে অনুসরণ করে পুরা কমিউনিস্ট ব্লক লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় করতে আসেনি, যোগ দেয় নাই। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে ১৯৯২ সাল থেকে সকলেইও অবশ্য বাণিজ্যে যোগ দেয়।

    কিন্তু এর আগেই সব অর্গল খুলে যায়। কারণ, আশির দশকের শুরু থেকেই গ্লোবালাইজেশন শুরু হয়ে গিয়েছিল। মানে যেকোনো দেশের সাথে যেকোনো দেশের লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হতে শুরু করেছিল। বাংলাদেশে আমাদের জন্য তা সহজে বোঝার চিহ্ন হল, যখন থেকে আমরা গার্মেন্ট এক্সপোর্ট শুরু করি এবং ক্রমে তা বাড়াতে থাকি।

    একটা পর্যবেক্ষণ হিসাবে বলা যায়, গত ৪০০ বছরের দুনিয়ায় দেশ (রাষ্ট্র)গুলোর মধ্যে লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় উন্মুক্ত ও পরিপাটি ব্যবস্তা ছিল মাত্র প্রায় পচাত্তর বছর। যার আবার সক্রিয় বাণিজ্য চালু ছিল কেবল  মাত্র শেষের চল্লিশ বছর। আর এর ইমিডিয়েট আগের ১৯৪৫ সালথেকে চালু হওয়া ব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের কাছে  বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত থাকলে ব্যাপক লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় চালুর প্রস্তুতি নিতেই প্রথম ত্রিশ-পয়ত্রিশ বছর চলে যায়।  এখন একটা সাধারণ সূত্র হলো, লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় না থাকা মানেই সেটা হবে জাতি বা জাতি-রাষ্ট্র বা স্বদেশী চিন্তার কাল। আর যতই গ্লোবালাইজেশন, ততই লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় ব্যাপকতর; ততই বাস্তবে জাতি বা জাতিরাষ্ট্র বা স্বদেশী চিন্তার অকার্যকারিতা বা বিলুপ্তির দিকে চলে যাবে।

    আবার মজার ফ্যাক্টস হলো, ইউরোপ ১৯৪৫ সালের পরে জাতি বা জাতিরাষ্ট্র বা স্বদেশী চিন্তা ত্যাগ করে সরে যায় অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে নিজেদের রূপান্তরিত করে নিয়ে।

    কিন্তু ট্রাজেডিটা হলো ইউরোপ রূপান্তরিত হয়ে গেলেও আমরা জানি না আর তাল বুঝি না বলে অবুঝ-নাবুঝ হয়ে আমাদের মত দেশের বেলায় রাষ্ট্রের মডেল হয়ে যায় ইউরোপের ফেলে দেওয়া ঐ ‘জাতি’ ধারণা। মানে, জাতিরাষ্ট্র বা স্বদেশী চিন্তা। এমন চিন্তার সপক্ষে কমিউনিস্টদের সাপোর্টও ছিল। কারণ তারাও বিভ্রান্ত। এখনো বেশির ভাগই জেনে না জেনে  জাতি-রাষ্ট্র করে থাকে। অথচ এটা স্ববিরোধী। কারণ জাতিরাষ্ট্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনীতি হল, কলোনি দখল যুগে থাকা এবং দখলবাজ হয়ে থাকা। আর অপর বৈশিষ্ট্য হল প্রায় নাই অথবা খুবই সীমিত বৈদেশিক লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময়ে থাকা। যার সোজা মানে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশগুলো জাতি বা স্বদেশিপনা ধারণাগুলো আকড়ে আপন করে নিয়ে থাকা এতা এক চরম স্ববিরোধিতা।  এজন্য এরা মুখে বলবে স্বদেশিপনা আত্মনির্ভরতা ইতাদি ছেদো কথা। কিন্তু ডলার দেখলে ডলার পেতে এক্সপোর্ট করতে লালা পড়বে। আপনি যদি স্বদেশি অর্থনীতির লোক তবে ঐ প্রাপ্ত ডলার দিয়ে কী করবেন?  বলাই বাহুল্য ঊনি আমদানিওও করবেন আর ঐ আমদানির মুল্য শোধ করতে ঐ ডলার ব্যভার করবেন। তাহলে কী দারালো আপনি আসলে সবটাতে সবখানেই আছেন। অথচ হুদাই স্বদেশিপনা বিদেশিবিরোধিতার ভাব ধরেন।

    এই স্ববিরোধিতা কী ধরনের সঙ্কট নিয়ে হাজির হয় তা এখন আমরা দেখব ভারতের ক্ষেত্রে। সেখানে ১৯৪৭ সালে জন্ম থেকেই এখানে জাতিরাষ্ট্র ধারণাকে খুবই শক্ত করে (অন্তত আমাদের চেয়ে অনেক বেশি) আঁকড়ে ধরা এক রাষ্ট্র গড়েছিল। এর উপর আবার ‘জাতি’ বলতে এটা হিন্দু-জাতির এক জাতিরাষ্ট্র বুঝে তারা। গত ২০১৪ সাল থেকে বিজেপি ক্ষমতায় আসাতে এই হিন্দু জাতিরাষ্ট্র বোধ সবার উপরে তাদের চাপানোর ঝোঁক আরো প্রবল। এখন চীনের সাথে সীমান্ত সঙ্ঘাতে ২০ সেনাকে হারিয়ে যতই স্বদেশীপনাকে নরেন্দ্র মোদী আঁকড়ে ধরতে চাইছেন ততই জাতিরাষ্ট্র, হিন্দুত্ব বা স্বদেশীপনা ধারণার অকার্যকারিতা আর ভুয়া আবেগসর্বস্বতা প্রকট হয়ে হাজির হচ্ছে।

    বাস্তব উদাহরণ হিন্দু জাতিরাষ্ট্র ও এর স্বদেশীপনাঃ
    ভারতের একটা মিডিয়া রিপোর্ট পড়ে শুরু করা যাক। দ্য হিন্দু পত্রিকার ঘরেরই আরেকটা পত্রিকা আছে যেটা ব্যবসা-বাণিজ্যকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকাশিত হয়, এর নাম ‘হিন্দু বিজনেস লাইন’ [Hindu Business Line]। সে পত্রিকার ২৭ জুলাইয়ের এক লিডিং রিপোর্ট বলছে, জাপান ভারতের কাছে এক আজব অনুরোধ রেখেছে। ঐ খবরের শিরোনাম দেখেন,

    Japan to India: Don’t increase tariff on Chinese inputs used by Japanese firms

    যার বাংলা করলে মোটের উপর কথাটা হল,  ‘ভারত যেন চীন থেকে আসা পণ্যের ওপর বাড়তি ট্যাক্স এবং কোনো কোনো চীনা পণ্যের আমদানির উপরেই যে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা যেন আরোপ না করা হয়।’ জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ট্রেড প্রমোশন ডিপার্টমেন্ট এই অনুরোধ নিয়ে মোদী মন্ত্রিসভার দরবারে এসেছে তদবির করতে।

    এখানে পিছনের কথা আগে একটু বলে নেই। চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ, অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর পালটা প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে মোদি ভারতে সাথে চীনের বাণিজ্য সম্পর্ককে বিরূপ করে তুলতে সব মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই সাথে চীনা পণ্য বর্জনের রাজনৈতিক কর্মসূচিও নিয়েছিলেন। এই প্রপাগান্ডা কাজের জন্য আগে থেকেই বিজেপি-আরএসএস এর দলীয় এক অঙ্গ-সংগঠন তৈরি করাই ছিল, যার নাম ‘স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ’ [Swadeshi Jagran Manch ]। নাম শুনে নিশ্চয় বুঝা যাচ্ছে এর কাজ হল স্বদেশিপনা দেখানো। এখন দেশে-বিদেশে এই সংগঠনের তৎপরতাই জোরদার করা হয়েছে- চীনা পণ্য বর্জনের স্লোগান এদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে। যেমন ইন্ডিয়ান ক্রিকেটে এবারের কোন এক টুর্ণামেন্টে স্পন্সর হয়েছিল চীনা মোবাইল কোম্পানি ‘ভিভো’ [VIVO]।

    তবে বলাই বাহুল্য, এটা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সাথে মিলে চীনা ভিভোর সাবসিডিয়ারি কোম্পানি। এখন মোদী চীনা কোম্পানির উপর বৈষম্য বা বিরূপতা আরোপের নির্দেশ জারি করাতে ওই জাগরণ মঞ্চ ক্রিকেট বোর্ডের কাছে ভিভোকে বাতিল করার আবেদন নিয়ে যায় এই যুক্তিতে যে, এটা চীনা কোম্পানি বলে  এদেরকে স্পন্সর দেয়া  হয়েছে ‘জাতির বর্তমান মুডের বিরুদ্ধে’ বোর্ডের করা কাজ [because Vivo is a Chinese company and BCCI’s move goes against the “current mood of the nation”.]।
    এছাড়া ওদিকে সিনিয়র মন্ত্রী নীতিন গড়করি যিনি বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প দেখাশুনা করেন, তিনি গত ১ জুলাই ঘোষণাই করে দিয়েছেন কোনো চীনা কোম্পানি ভারতে টেন্ডারে অংশ নিতেই পারবে না [India to ban Chinese companies from highway projects, says Nitin Gadkari]। অর্থাৎ চীনা কোম্পানির সাথে segregation বা বিচ্ছেদ ইতোমধ্যেই মাঠে কার্যকর। একই হিসাব মতে, ম্যানুফাকচারিং খাতেও চীনা পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, না হয় শুল্ক এমন বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে যেন কেউ আমদানি না করে।

    অনেকেরই ধারণা, ভারতে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী জাপান। এছাড়া চীনবিরোধী চার দেশ জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকা- এদের জোট ‘কোয়াড’ যার মধ্যে জাপানও আছে [কোয়াড নিয়ে জানত আমার এক গতবারের লেখার  কোয়াড আসছে এই শিরোনামের প্যারাটা দেখে নেয়া যেতে পারে। ] । এবং  আমেরিকা আশা করছে তারা সামরিক জোট হিসেবে কাজ করার কথাও চিন্তা করবে; এদের তো এতে পোয়া বারো। তাহলে তো জাপানের এখন চার দিকে লাভ আর লাভ হওয়ার কথা।

    কিন্তু হতাশ করা কথা হল তা ঘটছে না! আমরা বরং দেখছি উলটা এই জাপানই তার ট্রেড প্রমোশন বিভাগ দিয়ে মোদীর কাছে  দেনদরবার করছে যেন, চীনা পণ্য আমদানি অটুট থাকে, কোন বাড়তি ট্যাক্স আরোপ না করা হয়; চীনকে ভারতে নিজ পণ্য রপ্তানীতে কোনো ধরণের বাধা না দেয়া হয়। কেন?

    এর সোজা মানে তাহলে ভারতের চীনা পণ্য বর্জনের দেশপ্রেম, স্বদেশীপনা বা জাতিগিরি ফলানো এগুলো অচল হয়ে যাচ্ছে।

    জাপানের চীনা পণ্যের প্রতিইবা এমন দরদি মায়া কেন?
    ভারতে গাড়ির কোম্পানির বেশির ভাগই জাপানি ব্র্যান্ডের সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার। অন্তত প্রাইভেট কার – এই গাড়ির মার্কেটে। কিন্তু তা হলে হবে কী, এর ম্যানুফেকচারিং ও অ্যাসেম্বলিতে যন্ত্রাংশ-স্পেয়ার – ভারত বা জাপান কেউই নিজেরা বানায় না। চীন থেকে কিনে আনে। আর অ্যাসেম্বল বা জোড়া লাগিয়ে জাপানি গাড়ি তৈরি করা হয়। কেন? কারণ ওসব পার্টস জাপানে তৈরি করলে গাড়ির দাম বেড়ে  যাবে। কারণ লিভিং কষ্ট বা লেবার কষ্ট বা ন্যূনতম মজুরি জাপানে অনেক বেশি। আবার ভারতেও তা তৈরি করতে গেলে সে ক্ষেত্রেও চীনের তুলনায় অদক্ষতার কারণে দাম বেশি পড়বে, কোয়ালিটিও খারাপ হবে সামগ্রিকভাবে মোট কথা জাপানি গাড়ি বিক্রির প্রফিটে টান পড়বে। অতএব চীনা পার্টস হলে কী হবে ওটাতেই মোক্ষ। এতে অবশ্য পিছনের একেবারে মুখ্য কারণ, চীনা যেকোনো ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানায় প্রোডাকশন লাইন সাজানোর নতুন কৌশল। এটা অ্যাডভান্সড ম্যানেজমেন্ট বুদ্ধিতে সাজানো। ফলে তা দক্ষ এবং কম উৎপাদন খরচ বলে সবার চেয়ে কমপিটিটিভ। আর সেটার লোভেই জাপানিরা কোয়াড জোটের কথিত সামরিকতার লোভ ভুলে উলটা মোদীর কাছে চীনকে ভারতে পণ্য রপ্তানিতে রেখে দেয়ার সুপারিশে লেগে পড়েছেন।

    ওদিকে অবশেষে ক্রিকেট বোর্ড ভিভো মোবাইলের কী অবস্থা বা পরিণতি?
    এটাকে বলে, “পুণঃ মুসিক ভব!”। মানে আবার ইদুঁর হয়ে যা। দয়াপরবশ হয়ে এক সাধু এক ইঁদুরকে  বিরাট ক্ষমতাবান বানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মানুষ এত অত্যাচারিত হোয়ার অভিযোগ উঠতে থাকে যে বিরক্ত হয়ে সাধুকে বলতেই হয়,  “পুণঃ মুসিক ভব!”। মানে আবার ইদুঁর হয়ে যা।  ভিভোকে কিভাবে রেখে দেওয়া যায় এর তদবীর শুরু হয়েছে। কারণ এক. প্রতিবছর প্রায় ৪৪০ কোটি রুপী করে পাঁচ বছর ধরে টাকা দিয়ে আসছে। লোভ লাগার মত ভাল পরিমাণের টাকা, কারোণ এই চীনা মোবাইল ওয়ান অব দা টপ পছন্দের তাই বোর্ডকে অফার করার ক্ষমতাও প্রতিদ্বন্দ্বিদের চেয়ে বেশি। এছাড়া এখন ভিভোকে বাদ দিবার কথা তুললে উলটা ক্ষতিপুরণ দিতে হতে পারে। আর দুই. বোর্ড এখন অমিত শাহের ছেলের কর্তৃত্বে  ফলে তিনি ভিভোকে নিয়েই এগিয়ে যাবার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে এখন ঘটনা মোদীর হাতে তিনি নিশ্চয় শেষ মীমাংসাটা দিবেন। ভিভো-কে স্পন্সরশিপ থেকে বাদ দিতে গিয়ে দেখে তাদের প্রফিট মার্জিনে টান পড়ছে। কাজেই মোদীকে বলে, ভিভোকে রেখেই চলা যায় কিনা!

    অর্থাৎ সার কথা চীনাপণ্য ভারতের বাজারে ঢুকেছে নিজ যোগ্যতা ও পণ্য ক্রেতা মনোরঞ্জনের ক্ষমতার জোরে। এটাই হলো সরাসরি কথিত স্বদেশীপনা বনাম গ্লোবালাইজেশন। যে পণ্যে যে সবচেয়ে নিচের কম খরচে মানে কম শ্রমে ও দক্ষতায় বানাতে পারে, সবাই ওই পণ্য তার কাছেই কিনবে- এটাই হলো গ্লোবালাইজেশনের ভিত্তি। তাতে সে দেশী-বিদেশী না কোন দেশী সেটা কোনো বিবেচ্য নয়। ফাঁপা আবেগের দেশীবোধ বলে কিছু নেই। দেখাই যাচ্ছে এটা কাজ করছে না। অর্থাৎ গ্লোবালাইজেশনের এত ভিত্তি ও খেলার নিয়মে প্রত্যেক রাষ্ট্রকেই কোনো না কোনো পণ্যে বা ওর কোনো পার্টস উৎপাদনে সবচেয়ে কম শ্রমে ও বেশি দক্ষতায় বানাতে পারতেই হবে। তা হলেই ভ্যালু অ্যাডেড প্রোগ্রামে তাকেও অন্য সব রাষ্ট্র গোনায় ধরতেই হবে। চাইলেও বাদ দেয়া যাবে না। এভাবেই যা কিছু দেশটা ভোগ করে তার সব কিছুই আর স্বনির্ভরতা বা আত্মনির্ভরতার ভুয়া স্লোগান দিয়ে নিজের অদক্ষ হাতে বানাতে হবে না। বরং এর বিপরীত ‘গিভ অ্যান্ড টেক’। আরো বেশি করে পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতায় জড়িয়ে পড়তে হবে যাতে কেউ আলগা ‘ফুটানি’, বেশি দাম, বেশি গরজ তৈরি করতে না পারে। বরং সবাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
    তবে এখানে একটা মধ্যবিত্তের পেটিমনকে সামলাতে হবে যেন ছিঁচকে সমালোচনার চোখে না দেখা হয়।  যেমন কেউয়ু বলল চীন ছাড়া ভারতের চলেই না। না এমন খোটা দেয়া পেটি সংকীর্ণ চিন্তা। যদিও তা টংয়ের চা দোকানে চলবেই বন্ধ করা যাবে না।

    ব্যাপারটা হল গ্লোবালাইজেশন অন্যকে নিচা দেখানোর জন্য নয়।  বরং সবাই যেন কোন না কোন একটা পণ্য সবার চেয়ে বেশি দক্ষতায় উতপাদন করতে পারে – পারুক এই উদ্যোগ সফল হোক সেই কামনা। কারণ সে সফল হলে আমরা সবাই ঐ সফলতার ভাগ নিব। ব্যাপকভাবে পারস্পরিক পণ্যবিনিময়ে মেতে উঠব। একা একা কথিত স্বনির্ভরতা অর্জনের নামে আসলে অদক্ষতায় কোয়ালিটি খারাপ দাম বেশি এমন পণ্য গলাধকরণ করার বিপরীতে ব্যাপকভাবে নির্ভরশীলতা কিন্তু এটা একা না সবাই সবার উপর নির্ভরশীল এমন ইন্টার ডিপেন্ডেন্সি – তৈরি করার সম্পর্ক। যাতে কেউ একজন ডাট দেখানো,  বেশি অন্যায় সুবিধা না নিতে পারে তা কমে আসে – এটাই গ্লোবালাইজেশন । যাতে চাইলেই কেউ যুদ্ধ লাগিয়ে না দিতে পারে। কারণ যেখানে বোমা ফেলার কথা ভাবছে সেখানে ঐ শহরে নিজের স্বার্থও আছে।  আর কেউ নিজের মাথায় বোমা মারে না। কাজেই ডায়লগ আর বুঝমান হওটাটাই উভয়পক্ষের লাভ, সহজ রাস্তা।

    ভারতে চীনের রাষ্ট্রদুত সান ওয়েদং এক ওয়েবনিয়ার অন লাইন আলোচনায় এটাই মন্তব্য বা হেদায়েত করে ছেন। বলেছেন ভারত-চীনের অর্থনীতিতে বিচ্ছেদ আনা বা দুরত্ব তৈরি করা হবে একালের স্বাভাবিক স্রোতের উলটা হাটার চেষ্টা। এটা সফল হবে না। তিনি ঐ আলোচলায় ডাটা দিয়ে দেখিয়েছেন, স্পেয়ার পার্টস বা যন্ত্রাংশ কম্পিউটারে ৯২%, টিভিতে ৮২%, নেটওয়ার্কের  অপটিক্যাল ফাইবারে ৮০%, মটরসাইকেলে ৮৫% ইত্যাদি এভাবে চীনাপণ্য ভারতে আপদানি করা হয়ে থাকে।

    কিন্তু সাবধান এটা ভারতকে ছোট দেখানোর জায়গা থেকে পড়বেন না।  ভারতকে তার ভোগ্য সব পণ্য বানাতে হবে, আর সবখাতেই দক্ষ হতে হবে ইত্যাদি না একেবারেই না। এটাই জাতিচিন্তার লাইন। স্বদেশিপনার লাইন। বরং এসব উপেক্ষা করে এর বিপরীতে বরং ভারত কোন কোন পণ্য বানাতে পেরেছে আর এতে (হোক তা খুবই ছোট পণ্য) সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জন করাতে সেই পণ্যের উপর চীনের নির্ভরশীলতা তৈরি হচ্ছে, আর ঐ পণ্য চীনে আমদানি আস্তে আস্তে বাড়ছে – এসব নির্মাণ হল আসল পথ। ৈ যে বললাম হোক তা খুবই ছোট পণ্য এনিয়ে এই তাইওয়ানি উতপাদকের এক প্রবাদমূলক ব্রিলিয়ান্ট বয়ান হল, মাথা হতে হবে, হাতির মত বড় কিছুর মাথা না হতে পারলেও অসুবিধা নাই। কিন্তু মাথা হতে হবে। কিছু না পারলে মুরগীর মাথা হয়ে দেখান।
    এই হল কথিত জাতি বা মিথ্যা স্বদেশিপনা ধারণার বিপরীতে পারস্পরিক গভীর নির্ভরশীলতার সঠিক লাইন।

    কিন্তু গত লেখার শিরোনামেই বলেছিলাম ভারত এই বুঝ ধারণ  করতে বা সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। কেন?
    কারণ, সারা ভারতকে জন্ম থেকেই এই মিথ্যা অচল – ‘জাতি’ বা স্বদেশি ধারণায় বুঁদ করে রাখা হয়েছে। ডুবে আছে। একালে মোদী জমানায় একথাগুলোকেই  মিথ্যা হলেও আরও শানিয়ে তোলা হয়েছে। আর এর সাথেই তাদের হিন্দুত্বের ধারণা জুড়ে রাখা হয়েছে, হিন্দুত্ব কেন শ্রেষ্ঠ এর সাফাই টানা হয়েছে।  আর এই হিন্দুত্ব বিক্রি করেই, হিন্দুত্বের গর্ব উস্কানি দিয়েই এবার হিন্দুভোট তার ভোট সংগ্রহের বা ভোট টানার মূল মেকানিজম।  এজন্য বলেছি মোদী পারবেন না। কিন্তু সেটা তত্বকথা ঠিক আছে থাক। বাস্তবে মোদী কী করে তকার গভীর উভয় সঙ্কট সামলান, কী পরিণতি হয় সেটা দেকার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, তবে তা প্রত্যক্ষে দেখতে পাওয়া হবে আমাদের জন্য এক অর্জন।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৮ আগষ্ট ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “জাতিগিরির ‘স্বদেশী জাগরণ’ অচল” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

     

     

  • ভারতকেই পথ বেছে নিতে হবে, সে সম্ভবত ফেল করবে

    ভারতকেই পথ বেছে নিতে হবে, সে সম্ভবত ফেল করবে

    গৌতম দাস

    ০৭ আগস্ট ২০২০, ০০:০৭ শুক্রবার

    https://wp.me/p1sCvy-38a

     

           Chinese Ambassador in India, on Decoupling India-China Economy, YouTube

    ভারত-চীন সংঘাত বা বিতর্ক সহসা মিটছে না। তবে আস্তে আস্তে অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। আর কী হলে তা মিটতে পারে তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ভারত কী গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার গ্লোবাল অর্ডারটা সম্পর্কে বুঝে? যদি বুঝতে পারে তবে এই অর্ডারের  নেতৃত্বে বদলের নির্ধারক সময়কাল হাজির হয়েছে। ভারত এর কোনদিকে থাকতে চায় – এনিয়ে ভারতকে এখনই সিদ্ধান্ত অবস্থান নিতে হবে। এতদিন ভারত দুদিকেই পা দিয়ে থাকার সুবিধা যা পেয়েছিল তা শেষ। তাই পুরানের সাথে গাটছাড়া বেধে শেষ হয়ে যাবে না নতুনের সাথে থেকে নিজের বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে এনিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদিও নতুন নেতা চীনের সাথে ভারতের না যাবার সম্ভাবনা এখনও বেশ বেশি দেখা যাচ্ছে। এর মূল কারণ ভারত “গ্লোবাল অর্ডার” জিনিষটা ধরতে পারে না। এর কারণ আবার হল, জাতি-রাষ্ট্র চিন্তায় বা এরই সহযোগী চিন্তা  – “স্বদেশীপনা” বা বিদেশী মাত্রই আমার অর্থনৈতিক শত্রু – এই চিন্তার উপর দাঁড়িয়ে রাজনীতি করা বিজেপি-আরএসএস, এরা কখনই গ্লোবাল অর্ডার বা খোদ গ্লোবাল শব্দটার অর্থ তাতপর্য কখনই বুঝতে পারবে না। কারণ তাদের ‘হিন্দুজাতি’ বা খোদ জাতি-রাষ্ট্র ধারণাটাই এক [fetish] কাল্পনিক রাজনীতি। এছাড়া এই “জাতি” ধারণার জন্ম ও বিকাশ ও টিকে থাকা সবই ঘটেছিল ইউরোপের কলোনি যুগে ও কলোনি শাসনের পুর্ব-পটভুমিতে। বিশ্বযুদ্ধের শেষে কলোনি শাসন লুপ্ত হয়ে গেলে এই জাতি-রাষ্ট্র ধারণা ফেলে দিয়ে ধুয়ে মুছে ইউরোপ অধিকার-ভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়ে যায়। কিন্তু কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রে অসামঞ্জস্যভাবে জাতি-রাষ্ট্র চিন্তাতে ভর করেই এগুলো বিকশিত হচ্ছে মনে করা হয়েছিল। আজ গ্লোবাল ইকোনমির প্রধান ধারা আরো বেশি করে  পারস্পরিক লেনদেন বিনিময় বাণিজ্যে গভীরে জড়িয়ে যাওয়া। কারণ এটা ভ্যালু এডিশন শেয়ারের যুগে প্রবেশ করছি আমরা। তাই এই যুগে ঐ পুরানা সুপ্ত “অসামঞ্জস্যতা” প্রকট ভাবে হাজির হচ্ছে। তাই এখকার দুনিয়ায় যে চীন-আমেরিকা বা চীন ভারত যা কিছু হবু সংঘাত  ও টেনশন – এটা জাতি-রাষ্ট্রবাদীদের চোখে নেহায়ত দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা।  এগুলো যে “গ্লোবাল” মাত্রার সমস্যা, কোন বাই-লেটারাল বা দ্বিপাক্ষিক জটিলতা নয় তা এরা টেরই পাবে না। সম্ভাবনা নাই।

    কোন দুই দেশের সীমান্তঃ কিছু তত্বকথা
    এনিয়ে যে কথাগুলো আমরা প্রায়ই শুনে থাকিঃ সীমান্ত বা ম্যাপ কথার আসল মানে হল – সীমান্তের দুই পক্ষের ঐকমত্যে একটাই ম্যাপ যেখানে আঁকা হয় আর ঐ একই ম্যাপের দুটি কপি দুই পক্ষের হাতে ছাড়া তখন  অন্য কোনো ম্যাপ বা এলএসি [LAC] বলে আর কিছু  থাকে না। এটি সম্ভব যখন দুই পক্ষই সীমান্তে একটি শান্ত নীরবতা একটা প্রশান্তি অর্জনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে আর সেই মেজাজে আসবে। কারণ, অপরের ভুমি দখলের কলোনি যুগ বহু আগেই শেষ হয়েছে।  বিপরীতে কোনো পক্ষ যখন মনে করবে আমি যেটা আমার রাষ্ট্রসীমা বলে বুঝি সেটাই আমাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর অর্থ সেখানে সীমান্ত চিহ্নিত করা, একটাই ম্যাপ তৈরি কখনোই ঘটবে না। আর স্বভাবতই এতে দেশের অর্থনীতিতে মানুষের জীবনমানে বাড়াতে মনোযোগে দেওয়ার বদলে নিঃস্ফলা সীমান্তেই সব সময় কেটে যাবে। এটাই ঘটবে কারণ, আপনি অন্যের দাবি উপেক্ষা করে, এর সুসমাধা না করে কোনো ভূমি দখল করে শান্তিতে থাকতে পারবেন না। কখন টেনশন আসবে আমি জানবেনও না। এখানে চিহ্নিত বা ডিমার্কেশন শব্দের আসল মানে হল – নিজেই নিজের রাষ্ট্রসীমা বলে এককভাবে কিছু দাগানো- একবারেই নয়। বরং পড়শিকে সাথে নিয়ে দাগানো। যাতে দাগাবেন একবারই। এরপর এ নিয়ে কেবল শান্তি আর প্রশান্তিই অর্জন করবেন।
    এ লক্ষ্যেই আপনাকে কিছু হোমওয়ার্কও করতে হবে। কারণ ডিমার্কেশনের আলোচনা মানেই মূলত গিভ অ্যান্ড টেক। পেতে হবে আর ছাড়তেও হবে। কী কী আপনাকে পেতে হবে তা বাদে বাকি সীমানা-বিতর্কে সব খানেই ছাড় দিতে বা নিগোশিয়েট করতে রাজি আছেন এটি বুঝায় দেন। প্র্যাকটিশটা উভয়পক্ষ করলে সহজে কাজ শেষ করা সম্ভব। কিন্তু এটা তখনই সম্ভব যখন আপনি শুধু না, উভয়পক্ষেরই প্রশান্তি লাভ প্রধান লক্ষ্য। সত্যিকারের ডিমার্কেশনের লক্ষ্যে এগিয়ে এসেছেন। গিভ অ্যান্ড টেক শেষে একটি ম্যাপ আঁকতে এসেছেন। কারণ, সামরিক শক্তি দিয়ে ভূমি দখল করা যায়, ডিমার্কেশন করা যায় না।

    [একটু অফসাইডে এটা মূল প্রসঙ্গের বাইরের কিছু কথা। ফলে নিচের এই প্যারা আপনি বাদ দিয়ে রেখে ব্রাকেটের শেষে আবার পড়া শুরু করতে পারেন।]

    [ভারতে কিছু নতুন ডেভেলপমেন্টঃ আজকের কথা শুরু করার আগে ভারতে কিছু নতুন ডেভেলপমেন্ট, তাই গুরুত্বপুর্ণ কিছু বাড়তি কথা যোগ করব এখানে। যখন লিখছি তখন সময়টা ৫ আগষ্ট ২০২০ এর দিবাগত রাত পেরিয়ে মধ্যরাতের দিকে যাচ্ছে যাতে আইনত ৬ তারিখ শুরু হবে কিছুক্ষণের মধ্যে। আর আমার এই বাড়তি প্রসঙ্গ হল, আজকের ভারতের জন্য ঘটনাবহুল “৫ আগষ্ট”।  ৫ আগষ্ট উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জন্য নির্ধারক দুটা কারণে।
    এক, কাশ্মীর যে আইনি সুত্রে  ভারতের সাথে আগে একভাবে যুক্ত ছিল বলে মনে করা হত সেই ৩৭০ ধারা বাতিল করে মোদী-অমিত গতবছর এদিন থেকে সংসদীয় ততপরতা শুরু করেছিল। আর এরপর শ্রেফ গায়ের জোরে ঘোষণা করেছিল যে কাশ্মীর এখন থেকে ভারতের সরাসরি অংশ। অতএব এদিন হল দখলদারি ও নতুন হত্যার প্রথম বার্ষিকী। আর দুই, বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে সে জায়গায় রামমন্দির বানানোর জন্য এর ভিত্তিপ্রস্তত স্থাপনের দিন;  মোদী ও তাঁর দলবলেরা এই ৫ আগষ্টকেই এর দিন হিসাবে ঠিক করেছে, যার নাম দিয়েছে ‘ভুমি পুজার” দিন।
    কিন্তু এদুই দিক থেকে আজ এসবের মাহাত্ম বা তাতপর্য নিয়ে কথা বলব না, ঠিক সেটা আমার প্রসঙ্গ না।  প্রসঙ্গ হল, আমরা স্বীকার করি আর নাই করি ভারতের রাজনৈতিক জগতে বড় বড় কিছু গভীর রাজনৈতিক সংকট আছে। যেটাতে সময় না দিলে তা ভারতরাষ্ট্রের অস্তিত্বের সঙ্কট হয়ে হাজির হতে পারে।  যেগুলোকে শুধু সংকট বা ক্রাইসিস না বলেও কিছুটা ইতিবাচক শব্দে একে চ্যালেঞ্জ – ভারতের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বলা যেতেও পারে। সেই প্রেক্ষিতে, এই ৫ আগষ্টকে, ইতিহাসে লেখা হবে এই বলে যে যেদিন থেকে ভারতের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল (ও যারা এদের কোন একের সাথে জোটে সম্পৃক্ত) – বিজেপি ও কংগ্রেস এদের দিন শেষ তা লেখা হয়ে গেছিল। কী অর্থে? না, এদের হাতে আর ভারতের বর্তমান ও আসন্ন রাজনৈতিক সঙ্কটগুলোর মিটানো বা সমাধান করতে আর কোনই ভুমিকা থাকবে না, তাই নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার দিন। কেন?
    তত্বগত বা কিছুটা কঠিন ভাষায় বললে, বিজেপি চীনের সাথে কথিত সীমানা লড়াইয়ে হার স্বীকার করে  নেওয়াতে এনিয়ে কোন নির্বাচনে আর এটাকে ইস্যু করে সুবিধা হবে না। তাই ফেলে পালিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর বদলে “হিন্দুত্বের বিজয় ও গর্বের” উস্কানি তুলে আগামি ২০২৪ সাল পর্যন্ত সব নির্বাচনে ভোট চাইবে মোদী ও বিজেপি। অর্থাৎ এবার মাঠের ভাষায় বললে, মোদী ও বিজেপি  – চীন, পাকিস্তান বা সীমান্ত এসব ইস্যু আর ভোট-নির্বাচনে নিয়ে আসবে না, মোদী ভোট চাওয়ার ইস্যু করবে না।  তারা প্রধানত, রামের নামে (মসজিদের উপর রামের মন্দির নির্মাণের বিজয়-সাফল্য, ফলে তারাই আসল রামভক্ত, পুজারী ইত্যাদিতে মিথিক্যাল রামকে বাস্তব বানানোর কারবার), এভাবে ভোট চাইবার রাজনীতি শুরু করবে। মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের সাফল্য হবে বিজেপির প্রধান নির্বাচনি ফোকাস বা অর্জন বলে হাজির করা। এটাই এখন থেকে হিন্দুত্বের বা হিন্দু ভোট মেরুকরণের প্রধান ফোকাস হবে।
    ওদিকে ঠিক একারণের আমরা লক্ষ্য করছি এর বিপরীতে এবার, কংগ্রেসের তাতপর্যপুর্ণ সিদ্ধান্ত হল যে তারাও এখন থেকে  বিজেপির মত হিন্দুত্বের রাজনীতিই করিবে।  এনিয়েই প্রতিযোগিতায় নামবে। ৫ আগষ্ট উপলক্ষ্যে  মা সোনিয়া অথবা ভাই রাহুল নয়, প্রিয়াংকাকে দিয়ে  কংগ্রেস সিদ্ধান্ত জানিয়েছে যে মোদীর মসজিদ গুড়িয়ে এর উপর মন্দির নির্মাণের সাফল্যের  ‘ভুমি পুজার” দিন – এই হিন্দুত্বের ভাগ নিতে কংগ্রেসও এগিয়ে এসেছে। তাই কংগ্রেস মনে করছে, এদিন নাকি কথিত জাতির ইউনিটি, ভাতৃত্ব ও সাংস্কৃতিক সহমর্মিতা প্রকাশ ও উতযাপনের দিন – আর আনন্দবাজার লিখেছে প্রিয়াংকা বলছে রাম নাকি সবার করার দিন, তা সকলের উতযাপনের দিন এই ৫ আগষ্ট। সবচেয়ে ভয়ানক বোকার মত কথা তিনি বলেছেন,  ‘Rab is Ram’।

    “a celebration of national unity, fraternity and cultural affinity” – WIRE.  “রাম সবার” – আনন্দবাজার

    সোজা কথায় মসজিদ ভেঙ্গে দেয়া এখন থেকে কংগ্রেসের চোখে কথিত জাতীয় উতসব আবার ভাতৃত্বেরও নাকি দিন! এ কেমন জাতি? আর কাদের কাদের মধ্যেইবা ভাই গিরি? সে এক বিরাট বিস্ময়। মোদী-অমিত-মোহন ভাগওয়াত থেকে গোলঅওয়াকারও যেটা সাহস করে নাই, কংগ্রেস এখন থেকে সেই কথিত হিন্দু জাতি, হিন্দুত্ব এসবের ভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসাবে যাত্রা শুরু করল।  আর তাকে অনুসরণ করেছে আম আদমি পার্টিও। তাই ভারতের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে ভবিষ্যতে বিজেপির সাথে কংগ্রেসের কোন ভুমিকা থাকবে না তাই নির্ধারিত হয়ে গেল। আর মোদীর বিজয় হল এই যে এখন থেকে (মমতার মত দুএকজন বাদে) সবার রাজনীতির ভিত্তি হল সরাসরি হিন্দুত্ব। ]

    সম্প্রতি ভারতে চীনের রাষ্ট্রদূত সান ওয়েদং একটি ভার্চুয়াল বা অনলাইন কথোপকথনে অংশ নিয়েছিলেন। ‘ওয়াইর’[WIRE] ভারতের এক ইংরেজি ওয়েব পত্রিকা, যেটি একালে এক ব্যতিক্রম; উগ্র জাতিবাদী যুদ্ধবাজ চিন্তাধারী ও হিন্দুত্ববাদীদের ঠিক বিপরীতে সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়ে রিপোর্ট করে যাচ্ছে। এই ওয়াইর পত্রিকাও উপস্থিত ছিল। তাদের বরাতে আমরা জানছি, রাষ্ট্রদূত সেখানে মোটাদাগে কী বলেছেন। সেই প্রসঙ্গে যাবার আগে অন্য কিছু কথা।

    ভারত-চীনের বাস্তব সীমান্তঃ
    সীমান্ত বা ম্যাপ নিয়ে তত্ত্বকথা থুয়ে বাস্তবে আসি।   ভারতের অভ্যন্তরে এখন প্রধান আলোচ্য বা তর্ক হল – প্রতিহিংসা – যে কী উপায়ে ‘প্রতিশোধ’ নেয়া যায়।  ভারতের ভাষায় “মুখ-তোর” বা বাংলায় বললে “দাঁতভাঙা” জবাব দেয়ার পথ খুঁজছে তারা। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, ভারতের চরম জাতিরাষ্ট্রবাদী রাজনীতির কারণে এর প্রতীক মোদী সরকারকে চীন একেবারে আউলায়ে দিয়ে চরম অপমানিত করে দিয়ে গেছে। যখন অন্তত ২০ সেনার নির্মম মৃত্যুর পর মোদীকে দিয়ে চীনারা বলিয়ে ছেড়েছে – ভারতের ভূমিতে (চীনারা) কেউ  আসেনি, বেদখল হয়নি। যার মানে দাঁড়িয়েছে অন্তত ওই ২০ জন সেনা চীনা ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করে চীনাদের হাতে মারা গেছে। এরচেয়ে বড় অপমান আর কী হতেপারে! এছাড়া এভাবেই গলওয়ান উপত্যকা পুরাটাই চীনাদের, তাও মোদীকে দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেয়া হয়েছে। যদিও আরও অন্যান্য ভূখণ্ডগুলো এখনো চীন ছাড়ল না কেন, কবে ছাড়বে, তাদের মুভমেন্ট কী – এ নিয়ে প্রতিদিন ভারতে মিডিয়া রিপোর্ট বের হচ্ছে, আর মোদীর উপর চাপ বাড়াচ্ছে। অথচ ভারতের সব মিডিয়াই জানে তারা একটা ‘জুয়াচুরি’ খেলছে। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য যদি হয় যে চীন, ভারতের কোনো ভূখণ্ডই দখল করে নাই। তবে এই যে প্রতিদিন রিপোর্ট লেখা হচ্ছে যে, চীন ভারতের ভূখণ্ড, অমুক লেক, অমুক ভূমি ছেড়ে যায়নি – এই এসবের কী কোনো মানে আছে? সত্যতা আছে?  প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষী যা দখলই হয় নাই তা আবার চীন ছেড়ে যাবে কী করে? দাবি করাই বা কেন?

    তাহলে কোনটা সত্য? চীন ভারতের কোনো ভূমি দখল নেয়নি? নাকি এখনকার মিডিয়া রিপোর্ট। ফ্যাক্টস হল, সারা ভারত জানে উগ্র হিন্দু জাতিবাদের মোদী এখানে সোজা  মার খেয়ে হেরে গেছে। জাতিরাষ্ট্রবাদী চিন্তায় যা এতদিন খুবই সহজ কাজ মনে করা হয়েছে যে যেকোন সীমান্তবিরোধকে আভ্যন্তরীণ নির্বাচনে “ভুয়া হিন্দুত্বের বিজয়” বা দেশপ্রেম হিসেবে দেখিয়ে হিন্দু পোলারাইজেশন ভোট ঘটানো চলে এসেছিল অথচ, আজ এখানে প্রমাণ হয়েছে এটা কত বড় আত্মঘাতী, এরই বড় প্রমাণ আমরা এখানে পাই।

    অথচ সীমান্তবিরোধকে তথাকথিত ‘জাতির’ হার-জিত হিসেবে দেখানোর কী আছে? সীমানা বিরোধকে মিটানোই দুই দেশের ডায়লগ সহ সবকিছুর লক্ষ্য, এটা তো কারো কোন “ভূমি বিজয়” একেবারেই নয়। দ্রুত যেকোনো সীমানা বিরোধ বা বিতর্ককে কথিত ‘হিন্দু জাতির’ হার-জিত হিসেবে দেখানোর মোদীর হিন্দুত্ব – এ ব্যাখ্যার কবলে পড়ে মোদীর অপমান এবং তার হিন্দুত্বের পতন বা মার খেয়ে যাওয়া এটাকেই এখন সারা ভারতের অপমান ও মার খেয়ে যাওয়া বলে হাজির করার কসরত চলছে। এছাড়া সারা ভারত জানে সামরিকভাবে  প্রতিশোধ নেয়ার অবস্থায় বা মুরোদে ভারত নাই। তাহলে?

    কোয়াড’ আসছেঃ
    অতএব  উপায়ন্তহীন মোদী এখন আরেক স্বপ্ন ছড়িয়েছেন – ‘কোয়াড’ [QUAD] আসছে। তারাই নাকি ভারতকে এবার প্রতিশোধ নিয়ে দেবে। এই কোয়াড কারা? কোয়াড শব্দের  এক সংস্কৃতিঘেঁষা বাংলা হবে চতুষ্টয় বা চারটা; মানে  চার মহাজন। তবে এখানে সুনির্দিষ্ট করে এর অর্থ চার রাষ্ট্রজোট – ভারত, আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু জন্ম থেকেই চলছে এর নানান উত্থান আর পশ্চাদ অপসারণ। জাপান এর জন্ম প্রস্তাব দিয়েছিল বাকিদের কাছে। কিন্তু তা দেয়ার পর ১০ বছর এর আর খবর ছিল না। এরপর ২০১৭ সালে যদিওবা এর জন্ম দেয়া হল, তাও সেটি কাকের ঘরে কোকিলের জন্মের মত করে। মানে ফিলিপাইনে ২০১৭ সালে উদ্যোক্তারা আরও অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে এক  ‘আসিয়ান সম্মেলন’ করতে এসেছিলেন। কিন্তু এর ফাঁকে মানে সাইডলাইনে বসে জন্ম দিয়ে ফেলেছিলেন কোয়াড নামে এক ব্লকের। কিন্তু তাতেও আবার জন্মাইছেন এ খবর সামনে আনতে প্রথম বিবৃতি দিতে গিয়েই ধরা। সেই মূল বিবৃতিটা চার দেশ চার রকমভাবে নিজেদের কথা ঢুকিয়ে এডিট করে ছেপেছিল। পরিণতি চারটি আলাদা ভার্সন এর, ২০১৭ সালে ভারতের দা হিন্দুর রিপোর্ট দেখেন এখানে। আর সেই সাথে এনিয়ে ততকালে আমার এক লেখা এখানে – “চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!”।

    তবু এদের মুখে কোয়াড নিয়ে হামবড়া গর্বের ফেনা তোলার শেষ নেই। বলা হচ্ছে – এটি নাকি ডেমোক্র্যাসি’স বা গণতন্ত্রওয়ালাদের জোট। আসলে তারা হল চীনবিরোধী, তাই। আমেরিকার ভাষায় চীনে তো ‘গণতন্ত্র’ নাই, তাই তাদের পোয়া বারো।  আর তাতেই চীনবিরোধী  বলে ঐ চার রাষ্ট্র নিশ্চয় “ডেমোক্রেসির চ্যাম্পিয়ান”।  নিজেরা কী তা বুঝানোর এটাই তারা তরিকা হিসেবে নিয়েছে। অথচ ঘটনা হল, জন্ম থেকেই এই ডেমোক্র্যাসি শব্দটা সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নকে খাটো বা নিচা করে দেখাতে আমেরিকা জন্ম দিয়েছিল। আর রাষ্ট্র বুঝাতে ক্লাসিক্যাল মূল শব্দটা হল – ‘মর্ডান রিপাবলিক’, কখনই যাকে ডেমোক্রাসি বলা হয় নাই। তা বাদ রেখে একটু সরিয়ে সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নকে খোঁচা দিতে এই শব্দ হাজির করা হয়েছিল। তো ভালো! কী আর বলব। হিন্দু উগ্র জাতিরাষ্ট্রবাদী মোদী আর তার অনুসারীরা যদি ভারতের কোন মুসলমান নাগরিকের বুকের ওপর উঠে; তাদের বুকের হার ভেঙ্গে দিয়ে জবরদস্তিতে তাকে দিয়ে জয় শ্রীরাম বলানোকে তাদের “ডেমোক্র্যাসির” বিরাট নায়ক বলে জাহির করতে থাকেন আর মোদী ঐ ডেমোক্রাসির বিরাট নেতা হন – তাহলে বলতে হয়, হে ডেমোক্র্যাসি দূরেই থাকো, আমার লাগবে না! তা তোমাদেরই থাক। আর অমন ডেমোক্রাসিকে ধিক্কার!
    এর মানে আবার অবশ্যই এও নয় যে, চীনারাষ্ট্র এর কোন অযোগ্যতা বা খামতি নাই। তবে অবশ্যই এই কথিত ‘ডেমোক্র্যাসি’র ফেরিওয়ালারা বিপজ্জনক ও ধান্দাবাজ। এমনই ধান্দাবাজ  যারা আবার নিজেরা চার রাষ্ট্র পরস্পরকেই বিশ্বাস করে না। তো এই ফেরিওয়ালারা ২০১৭ সালে জন্মের পর থেকে ঘুমিয়েই ছিলেন। কোন সক্রিয়তা ছিল না। কিন্তু গত এক মাসে আবার জেগেছে। তাতে চীনাদের হাতে অপমানিত ভারত ও মো্দী যেন তিন দিনের ক্ষুধার্ত লোক যে প্রথম রুটির দেখা পেল। সর্বস্ব হতাশায় ঢুবে যাওয়া ভারতের মনে এবার সবার মনে তাই আশা, এবার মনের জ্বালা মিটবে! কিন্তু আদৌ মিটিবে কী?
    সন্দেহ আছে প্রবল। যেমন জাপানের পত্রিকা নিক্কিই-এর উপ- শিরোনাম হল, Pompeo says ‘Quad is revived’ and calls for democracies to unite। আর শিরোমানে নিজেরাই সন্দেহ রেখে বলছে এটা এমবিশাস, মানে উচ্চভিলাসী – US seeks ambitious relationship with ‘global power’ India.।
    এদিকে চীন-ইরান ২৫ বছরের চুক্তি হচ্ছে এই খবর বাজারে এসে যাওয়ার পর ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (সমতুল্য) মাইক পম্পেও ইউরোপে গিয়েছিলেন। পরে অস্ট্রেলিয়াতেও যান। কিন্তু ২৯ জুলাই পম্পেওকে অষ্ট্রেলিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানালেন, “চীনবিরোধিতা প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়া আমেরিকাকে আংশিক সাপোর্ট দিবে” [Australia gives US partial support against China]। এই হল মিডিয়া শিরোনাম। শুধু তাই নয়, ভেতরে লিখছে পার্শিয়াল মানে কী। বলছে  – দক্ষিণ চীনসাগরে চীনবিরোধী জোটের মহড়ায় অস্ট্রেলিয়া যোগ দিবে না। আরো আছে। চীনের সাথে অস্ট্রেলিয়া গভীর বাণিজ্য সম্পর্ক সে অটুট […pursue policies independent of both the US and close trade ally China.] রাখবে। আর লাগে কিছু? বোঝা গেছে না!

    ঘটনাটি তাহলে কী? কোয়াড ব্লক দাঁড়ায় না কেন? অথচ ইন্ডিয়ানরা এত ভরসা করে বসে আছে! এমনকি ফিলিপাইনে থাকেন এক ভারতীয় অরিজিন হায়দারিয়ান সম্ভবত খ্রিষ্টান, তিনি এশিয়া টাইমসে লিখেন। তিনিও প্রবল উৎসাহে গত সপ্তাহে ২৭ জুলাই কোয়াড নিয়ে রিপোর্ট লিখছেন এক আকাশ ফাটানো শিরোণামে Quad alliance forms ‘arc of democracy’ around China। কিন্তু লেখার মাঝখানে নিজেই লিখছেন, কিন্তু চীনের সাথে ব্যবসায় লাভালাভের স্বার্থে ইন্ডিয়া আর অস্ট্রেলিয়া এরা কখনো চীনবিরোধী এই জোটে সক্রিয় হয়নি ……India and Australia were until now often reluctant to participate in an ostensibly anti-China alliance.।

    তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়?
    একটা মৌলিক দিক নিয়ে কথা তুলব। সে শব্দটা হল অবজেকটিভ। কিন্তু এর মানে কী? ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প কিংবা সুনামি এধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি জানি। কিন্তু মানুষ কি কখনো এর বিরুদ্ধে, যেন দুর্যোগ থামিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে লড়াই-এর চিন্তা করছে – এমন কী আমরা কখনো দেখেছি? অবশ্যই না। বরং আমরা সবসময় দেখি এধরণের খবরটা জেনে নিয়ে মানুষ এবার এর সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া যায় কী করে; যাতে লক্ষ্য থাকে কত কম ক্ষতিতে এটি পার করা যায় কিভাবে। মানে কোনো লড়াই নয়, বরং একভাবে একে স্বাগত জানানোই বলা যায়। এগুলোকেই আমরা অবজেকটিভ ঘটনা বলতে পারি। যা অবজেক্টের উলটা  সাবজেক্ট – মানে কর্তা মানুষের কারণে ঘটে না। (যদিও লোভে অজান্তে করে বসতে পারে।)  এগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা। এই অবজেকটিভ ঘটনাগুলোর প্রতি সাবজেক্ট মানুষের আচরণ সবসময় সব কালেই পুর্বনির্ধারিত। আর তা হল  অধস্থন, অবজেকটিভিটির বশ্যতা স্বীকার করে নেয়া।  অবজেকটিভ ক্ষমতার সামনে দাঁড়ানো বোকামি। তাতে সেটাকে প্রাকৃতিকতা বলেন কিংবা স্পিরিচুয়ালিটি বলেন – এমন কোন ফারাক নাই।  তবে এপ্রসঙ্গে একজনের নাম ও পরিণতি মনে করতে পারেন  – রবার্ট ম্যাকনামারা Robert S. McNamara । আমেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী (সমতুল্য) ভিয়েতনাম যুদ্ধের কু-নায়ক ও কেমিকেল অরেঞ্জ বোমা ফেলায় আজীবন সকলের বদ-দোয়া প্রাপ্ত খলনায়ক তিনি। যার কারণে এখনও ভিয়েতনামে বিকলাঙ্গ বাচ্চা পয়দা হচ্ছে, কেউ জানে না কার বেলায় কোন হবু বাচ্চার সেটা হবে।ম্যাকনামারা ছিলেন অবজেকটিভিটির সাথে লড়তে যাওয়া কুখ্যাত বোকা। অতএব, সব সমাজের দুরছাই নিন্দা এড়াতে জীবনের শেষ বিশ বছর তিনি নিজেকে ঘরে বন্দী করে কথা না বলে কাটিয়েছেন।
    তাহলে সারকথাটা হল, অবজেকটিভিটি প্রসঙ্গে সাবজেক্ট মানুষ হিসাবে আমাদের ভূমিকা নির্ধারিত। তা হল- কোনো লড়াই বা যুদ্ধ একেবারেই নয়, বরং পাশ কাটিয়ে থাকা যতটা সম্ভব যাতে ক্ষতি কম হয়। বলা যায়, তাই আমরা এ ধরনের অবজেকটিভ বা ‘প্রাকৃতিক’ ঘটনার সাথে আমরা ভুলেও লড়তে যাই না। এটি আমাদের কাজও নয়।
    ওদিকে আরেকটা ধারণা হল “গ্লোবাল”; মানে – একটি গ্লোবাল সিস্টেমের প্রয়োজন শুরু হয়; যেকোনো দুটি রাষ্ট্রের পণ্য বিনিময় বাণিজ্যের লেনদেনের প্রয়োজন মিটাতে। কেন? কারণ ওই লেনদেন বাণিজ্যে দুই রাষ্ট্রের কারো মুদ্রা দিয়েও বাণিজ্য চালানো যায় না। মুদ্রামান, বিনিময় হার জানা ছাড়া বিনিময় অসম্ভব। এখান থেকেই গ্লোবাল মুদ্রা, এর মান এক ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা’ কার্যকর থাকার প্রয়োজনীয়তা্র অনুভব ও তা মিটানোর শুরু।
    সময়কাল ১৬০৭-১৯৪৫, এই প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি দখলের আমলে ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা’ খুবই সীমিত ছিল। তাই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গ্লোবাল বাণিজ্যব্যবস্থা কার্যকর চালু ছিল না। কিন্তু এই ব্যবস্থা বা গ্লোবাল অর্ডার দুনিয়া প্রথম চালু হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে ১৯৪৫ সাল থেকে। আর ‘গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায়’ মেজর লেনদেনের মুদ্রা এখনো ডলার, আর এর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান মালিকানা শেয়ারও ঐ আমেরিকার হাতেই। বিগত ৭৫ বছর ধরে আমেরিকা নেতার অবস্থান নিয়ে আছে। যদিও এ প্রভাব ইদানীং কমে আসছে, বিপরীতে চীন সে জায়গা নিয়ে ক্রমেই উঠে আসছে। আমাদের বক্তব্যের ফোকাস হল – এই দুই দেশের উঠে আসা বা পড়ে যাওয়াটা যত না সাবজেকটিভ, এর চেয়ে ঢের ঢের বেশি এটা বস্তুগত, তাই অবজেকটিভ ঘটনা। দুনিয়ায় উদ্বৃত্ত সম্পদ বা পুঁজির সঞ্চিতি বা একুমুলেশন একেক সময় মুখ্যত একের দেশের হাতে, নানা কারণে ঘটেছে। এটা আবার সহসাই চলেও যায় না। আবার, কবে আসবে কবে নাগাদ যাবে তাও আন্দাজে বলা যায় না।  অতএব যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে চীনের উত্থান ঠেকানো যাবে না। চীনের উত্থানের বড় দিকগুলোই এক অবজেকটিভিটি।
    কিন্তু এরপরও মোদীরা জিদে ধরা যাক যুদ্ধের দিকে ঘটনা গড়িয়ে দিল। কিন্তু আর ঘটনা বৈশিষ্ট হল যতই নাবুঝা কল্পনায় বলি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা – এগুলো কিন্তু ভুয়া আর মিছা -পুরাটাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কল্পনায় ঠাসা যখন পারমানবিক অস্ত্র কথাটাই প্রচলিত ছিল না। কিন্তু এখন প্রধান বিবদমানদের হাতে পারমানবিক অস্ত্র আছে। অতএব এখন যুদ্ধ মানে সে্টা খুবই সীমিত পরিসরে রাখতে হবে; কারণ তা কোনোভাবেই যেন পারমাণবিক উস্কানির দিকে না যায় তা দুপক্ষকেই মনে রাখতে হবে। যতই জিদ উঠে যাক সীমিত যুদ্ধে থাকতেই হবে। সীমিত যুদ্ধ মানে তা আপস মিটমাটের রাস্তায় নিতে সচেষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু তাতেও সবচেয়ে বেশি অর্থনীতির ক্ষতি হবে চীন বাদে বাকি সবার। কারণ, চীনের ক্ষতি সামলানোর দিক থেকে সবার চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকবে। কিন্তু এরপরও ঘটনা এখানেই শেষ নয়। বলা যায় শুরু। কেন?

    কারণ, এই কথিত ডেমোক্র্যাসিসরা তাদের ভেঙেপড়া অর্থনীতি আবার চাঙা ও পুনর্বাসন করতে দুনিয়ায় সাহায্য পাবার মত একমাত্র শক্তি বেঁচে থাকবে চীনই। ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে দেখতে পারেন ঠিক এ ঘটনাই ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। যুদ্ধে হিটলারের জোটের বিরুদ্ধে যারাই আমেরিকার পক্ষে ছিল; সবাইকে যুদ্ধের খরচ দিয়েছে আমেরিকা, এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নকেও। আবার যুদ্ধ শেষে পুনর্বাসনের অর্থ জুগিয়েছে সকল্কে, ধার দিয়েছে সেও ঐ আমেরিকাই। এছাড়া সে যুদ্ধ শেষে আবার পরাজিত হিটলারের জার্মানি, তার বন্ধু জাপান বা ইতালি এদেরও পুনর্বাসনের অর্থ জুগিয়েছে ঐ আমেরিকাই। ইতালিতে তো দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। যে আমেরিকার বিরুদ্ধে মুসোলিনি যুদ্ধ করেছিল; ইতালীয়রা সেই আমেরিকার কাছেই ভিক্ষা চেয়েছিল, দুই হাত তুলে তাদের গডের কাছে মিনতি জানিয়েছিল আমেরিকাকে সুমতি দিতে এবং আমেরিকাও হাত খুলে সাহায্য এবং পুনর্বাসন সব কিছু অর্থ ঋণ-অনুদান দিয়েছিল। কাজেই……।

    দুনিয়া খুব কঠিন জায়গা। ইতিহাস পড়েন, একই ভুল দ্বিতীয়বার করার মানে হয় না। রেললাইনে মাথা দিয়ে আবার বুঝার দরকার নেই যে মাথা কাটা যাবেই। কাজেই প্রথম কাজ বুদ্ধিমান হন। জিদ ত্যাগ করেন, প্রতিশোধের স্পৃহা ত্যাগ করেন। এটি নেগেটিভ এনার্জি। এটা কমবেশি সবার ক্ষতি করবে। মূলকথা, মানুষের স্বভাব বা কাজ না অবজেকটিভিটির বিরুদ্ধে লড়া। নিজের স্বার্থের জন্য লড়বার আরো অনেক পথ আছে, সেগুলো খুঁজেন, ইনোভেটিভ হন। রাস্তা পাবেন। কেবল সতর্ক থাকেন কোনগুলো ধ্বংসাত্মক, তা এড়ায় চলেন। আর সবচেয়ে বড় কথা (থিওলজিতে বিশ্বাসী লোকেরা বলবে আল্লা চাহে তো) আস্থা রাখেন দিন আপনারও আসবে!

    কিন্তু এখনই একটি পরীক্ষা করে নেন। আমেরিকার ট্রাম্প যে কোয়াডের পিছনে তাল দিচ্ছেন তাতে তিনি নিজে থাকবেন তো? নাকি? ২০১৭ সালে জন্মের সময় ট্রাম্পের আমেরিকা কিন্তু পালিয়েছিল। কারণ সেবারই সবার আগে ট্রাম্পের চীন সফর ছিল। সমস্যা হয়েছিল চীন ঠিক কত কী বাজারসুবিধা দিতে রাজি; তা ক্যালকুলেট করতে সময় লাগছিল বলে তত দিনে ট্রাম্প ফিলিপাইনে এসে কোয়াডের জন্ম ঘোষণা করে দেয়ার পরই চীন থেকে বাজারসুবিধা দেয়ার তালিকা এসে পড়াতেই ট্রাম্প আর কোয়াডের পক্ষে থেকে শক্ত অবস্থান নিতে যা কথা হয়েছিল তা আর এমনকি যৌথ বিবৃতিতেও হাজির করতে রাজি থাকেননি। আর তা থেকেই অন্তত তাদের যৌথতায় – তাতে ভাঙনের একটি কারণ।

    তাহলে এবার? এবারো আমেরিকাকেই পরীক্ষা করতে বলছি। মূলত ট্রাম্প চীনবিরোধী যত গরম গরম কথা বলেছেন – সেগুলার মধ্যে আমেরিকার রাষ্ট্রের নীতি-পলিসি এর কোনগুলো বা কত শতাংশ আর কতটা ট্রাম্পের নির্বাচনী ভোট টানতে চেয়ে বলা হচ্ছে –  তা আগে পরিষ্কার হতে নেন। কেন?

    সাংবাদিকরা প্রশ্ন করে ট্রাম্পকে তাড়া করে বেড়াচ্ছেন যে “কিছু দিনের মধ্যেই লকডাউন থেকে তড়িঘড়ি করে সব খুলে ফেলার চাপের কারণেই মূলত ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে”। এ জন্যই দেড় লাখের বেশি আমেরিকানের মৃত্যু হয়েছে। এটা ট্রাম্পের চরম ব্যর্থতা কী না? তাই ট্রাম্প প[আলিয়ে বেড়াচ্ছেন।  ট্রাম্পের প্রতি ঠাট্টাগুলো লক্ষ্য করেন, আর কত লোক মরলে পরে আমেরিকা মহান (great) হবে?  আর ততই তিনি ভোটারদের মধ্যেও এই মনোভাব বেড়ে যাওয়ার কারণে তিনি এখন উঠতে বসতে  চীনবিরোধি গরম কথা বলছেন। “চীনা ভাইরাস” বলে নিজের সব দুর্ভাগ্যের জন্য সব কিছুর জন্য চীন দায়ী বলে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা তুঙ্গে নিচ্ছেন। কাজেই কোনটা চীনবিরোধী রাষ্ট্রের পলিসি অবস্থান আর কোনটা ট্রাম্পের ভোটের বাক্স ভরানোর প্রপাগান্ডা তা একমাত্র আলাদা হয়ে যাবে নভেম্বরের ৩ তারিখের নির্বাচনের পর। এর আগে পর্যন্ত এটা মাখামাখি হয়েই থাকবে।  কাজেই মোদী যে আমেরিকার উপর আস্থা বিশ্বাস রাখছেন ঢালছেন – এর ভিত্তি ঠিক আছে তো?

    আবার দেখেন ট্রাম্প সরকারের আয়ু মূলত আর তিন মাস। কারণ নির্বাচনী ফল হয়ে যাওয়ার পর সেটা মূলত রুটিন সরকার। তাহলে এই তিন মাসের জন্য পম্পেও এর এত দৌড়াদৌড়ি, কোয়াডের প্রপাগান্ডা এটি কি একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না, অসঙ্গতিপূর্ণ নয়? এগুলো একমাত্র সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে যদি এগুলো সবই নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করতে করা হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে পম্পেওর দৌড়াদৌড়িও – সেটাও খুবই পারফেক্ট টাইমিং। কিন্তু মোদীর জন্য তাহলে কী হবে? হিন্দু জাতিবাদী মোদী ও তার সকল সমর্থকরা এদের জন্য কী হবে? হতাশায় আত্মহত্যা বাড়াবেন? এটা হতেও পারে!

    ওদিকে আরেক ঘটনা তৈরি হচ্ছে। এখন ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক জাতীয় বিদ্বানেরা কিভাবে চীনের বিরুদ্ধে খোঁচাখুঁচি লাগানো যায় তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্ক করে তাদের দিন যাচ্ছে। এতে সবচেয়ে উপরের জনপ্রিয় আলাপটা হল, চীনের একচীন নীতি বা তিব্বত বা হংকং নীতি ভারত না মেনে ভাঙলে চীন কেমন শায়েস্তা হবে – এই হল তাদের আলোচনার প্রসঙ্গ। অর্থাৎ তাইওয়ান, হংকং বা তিব্বত এদেরকে স্বাধীন রাষ্ট্রের মত খাতির আচরণ করা বা মর্যাদা দেয়া। অথচ এতে প্রধান ভায়োলেশনটা হবে, চীন যেকোনো দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক পাতানোর আগে এক পূর্বশর্ত স্বীকার করিয়ে নেয় যে – তাইওয়ান, হংকং বা তিব্বত ইত্যাদি এগুলো কোনো স্বাধীন ভূমি নয়, চীনেরই অংশ বলে গণ্য করতে রাজি হতে হবে। অর্থাৎ এই বিদ্বানেরা বলতে চাইছেন; তারা মোদীর ভারতকে পরামর্শ দিচ্ছেন – যার সোজা মানে মোদী যেন চীনের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। কিন্তু এত দূর পরিণতি কী তারা মেপে কথা বলছেন? আমরা নিশ্চিত নই।

    যাই হোক, উপরে ভারতের চীনা রাষ্ট্রদূতের কথা বলছিলাম। তিনি ওই আলাপে এ প্রসঙ্গগুলো নিজেই এনে পরিস্থিতি সম্পর্কে পাকা বোঝাবুঝি রেখে কাজ করতে পরামর্শ রেখেছেন। ভদ্র ও বক্তব্য নরম রাখতে বলেছেন। উভয় পক্ষেরই উচিত হবে পরিস্থিতি সম্পর্কে উভয় পক্ষ (মানে চীনা পক্ষও) যেন ভালো আর পুরো বোঝাবুঝি করে এরপর পদক্ষেপ নেয়। তবে ভারতের সাথে সীমান্ত নিয়ে তিনি কিছু সোজা ইঙ্গিত দিয়েছেন, সে্টার প্রসঙ্গে বলেই আজকের লেখা শেষ করব।

    মায়েদের দুষ্ট সন্তানকে সামলানোঃ
    কথাগুলো অনেকটা দুষ্ট সন্তানকে সামলাতে মায়েরা অনেক সময় শর্ত দিয়ে কথা বলেন। বলেন যে, পায়েস তিনি আজ রেঁধেছেন, তুলেও রেখেছেন বাটিতে। কিন্তু শান্ত ও বুঝমান সন্তানের মত আচরণ যারা করবে তারাই কেবল ঐ পায়েসের বাটির হকদার হবে। ঠিক এইকথা মনে রাখলে আমরা চীনের পদক্ষেপগুলোর অর্থ বুঝতে পারব।
    চীনের সাথে ভারতের এবারের সঙ্ঘাত মূলত লাদাখ অঞ্চলে। কাশ্মীরেরই ভারত-চীন সীমান্তের অংশ এটা।  কিন্তু এখানেই কেন? কারণ ভারত গত বছর এই ৫ আগস্টই লাদাখেরই স্ট্যাটাস বদলিয়েছে। কেন? ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মির ভারতেরই অঙ্গীভূত করে নেয়ার সময়। এই ঘটনাটা বিজেপির হাতে পড়ে কাশ্মির মোদীর কাছে জাস্ট একটা হিন্দু পোলারাইজেশন ঘটিয়ে ভোট পাওয়ার ইস্যু। যাতে মোদী ব্যাপারটাকে ‘হিন্দুজাতির বীরত্ব’ হিসেবে দেখিয়ে আরো বেশি ভোট পেতে পারেন, এরই লক্ষ্য। এতে কাশ্মিরিদের কী পরিণতি হবে অথবা পড়শিদের কাছে কী ম্যাসেজ যাবে এ নিয়ে তিনি পুরো বেপরোয়া থাকবেন।

    যেমন ম্যাসেজ কী গেছে?
    চীন-ভারত যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৬২ সালে। ওই যুদ্ধের আগে ও পরে লাদাখ অঞ্চলের বহু অংশই চীন দখলে নিয়ে নিয়েছিল। পরে আস্তে আস্তে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করলে ১৯৯৩-৯৬  এই সময়টা ভারতের জন্য ছিল খুবই নির্ধারক। এ সময়কালেই লম্বা সময় ধরে চীন-ভারত সীমান্ত আলোচনা চলেছিল। পুরনো ১৯৫৮-৬০ সালের সেই এলএসি দেখিয়ে চীন যেসব ভূখণ্ড দাবি করত সেসব দাবির বড় বড় অংশ ১৯৯৩-৯৬ সালের আলাপের সময় চীন ভারতকে ছেড়ে দিয়েছিল। আসলে সেটা চীনের ভাষায়,  শান্ত ও প্রশান্তির কামনা ও আকাক্ষায় ভারতকে পেয়েছিল বলে  দুই দেশের সীমান্ত আলাপে এভাবে এগিয়ে এসেছিল চীন। কিন্তু গত বছর কাশ্মির ও লাদাখের স্ট্যাটাস মোদীর খেয়ালি একক ইচ্ছায় বদলে দেওয়াতে – এটা ওই ১৯৯৩-৯৬ আলোচনার সময়ে তৈরি হওয়া যে পারস্পরিক বোঝাবুঝি তা পুরো উপেক্ষা ও ভেঙে ফেলা হয়েছে বলেই চীন মনে করছে। আর ঠিক একারণেই এখন ১৯৫৮-৬০ সালের দাবির এলএসি মোতাবেক সব পুরানা ছাড় দেওয়া ভুখন্ড চীন আবার দখল করে নিয়েছে। সেই ধারণাতে ফিরে গেছে। তাই চীন এখানে পরামর্শে ও ইঙ্গিতে বোঝাতে চায় যে, ভারত যদি ফের শান্তি চায় বিশ্বাস করাতে পারে – আর যেসব বিষয়ে পারস্পরিক বোঝাবুঝিতে সম্পর্কের অনেক অগ্রগতি হয়েছিল তা ফিরিয়ে আনে, তবেই  চীন একমাত্র ১৯৯৩-৯৬ সালের বুঝাবুঝি সীমানা বা এলএসিতে আবার ফিরে চলে যাবে। ভারতকে ভূখণ্ড ছাড় আবার দেবে। নইলে না। আর যদি উল্টা ভারত আমেরিকার কোলে গিয়ে উঠে আর এক-চীন নীতি ভাঙাসহ নানা হুমকি দিতে থাকে তবে সীমান্ত ১৯৫৮-৬০ সালেরটাই বহাল থাকবে। শান্তি চাওয়া সৎ প্রতিবেশী হলে একরকম আর উল্টাটা হলে আরেক রকম। সারকথা, সিদ্ধান্ত ভারতের। ভারতকেই ঠিক করতে হবে সে কোন পথে যাবে, ঠিক কী চায়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৭ আগষ্ট ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “ভারতকে বেছে নিতে হবে কোনদিকে যাবে” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বিদেশিবিরোধিতা সস্তা মিথ, ‘গ্লোবাল অর্ডার’ বুঝেন

    বিদেশিবিরোধিতা সস্তা মিথ, ‘গ্লোবাল অর্ডার’ বুঝেন

    গৌতম দাস

    ২৭ জুলাই ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-37d

    Sharad Pawar: The God of Broken Mandates, YOUTUBE Rare Interviews, Crux Files

    আপনি যে ভুখন্ডে দাঁড়িয়ে আছেন চাইলে কেবল তার কথা মনে রেখে নিজের সম্পর্কে কথা বলতে পারেন। নিজের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারেন এভাবে। অথবা অন্যটা হল,  এই গ্লোব বা বিশ্বের যে অংশ আপনার ঐ ভুখন্ড, গ্লোবাল পটভুমির কথা খেয়ালে রেখে এবার আপনি আপনার ভুখন্ড সম্পর্কে অনুভবের কথা বলতে পারেন। এখানে খেয়াল করেন, দ্বিতীয়টাও কিন্তু আপনার সম্পর্কেই অনুভব। কিন্তু ফারাক হল, এখানে এক গ্লোবাল পটভুমিতে আপনি, এভাবে।  তাতে এই দুই ভাষ্য হবে দুরকম।  সেক্ষেত্রে প্রথমটাকে বলা হবে এক লোকাল ভাষ্য আর দ্বিতীয়টাকে গ্লোবাল ভাষ্য।  অর্থাৎ আপনারই  সম্পর্কে প্রথমটা হল এক সংকীর্ণ ভাষ্য আর পরেরটা পুর্ণ ভাষ্য। এই হল লোকাল বনাম গ্লোবাল ভাষ্যের ফারাক।
    [লেখাটা অনেক বড় হয়ে গেছে, এড়াতে পারিনি। তবে একটা উপায় আছে, যারা ছোট ভার্সানে পড়তে চান তারা কিছু প্যারা বাদ দিয়ে পড়তে পারেন। যে সব প্যারা এক ইঞ্চি জায়গা ছেড়ে শুরু এগুলোই সেই প্যারা। বাদ দিয়ে পড়া যায় এখানে এমন দুটা প্যারা আছে। এতে লেখাটা অনেক ছোট হবে। চেষ্টা করে দেখতে পারেন। ]

    গ্লোবাল প্রেক্ষিত বা দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়াই ভারতের প্রবীন রাজনীতিক শারদ পাওয়ার [Sharad Power] কথা বলেন। তবে তিনি একা নন বরং ভারতের প্রায় সব রাজনীতিকই এমন, তাই তাঁকে সব রাজনীতিকেরই প্রতীকী প্রতিনিধি হিসাবে ধরে নিয়ে কথা হবে। এঁদের দেশ বলতে একটা ‘লোকাল’ বুঝের ধারণায়,  আর এক কল্পনার জগতে বাস করা রাজনীতিবিদ। মানে গ্লোবাল প্রেক্ষিতে থেকে এবার লোকাল অনুভবটা করতে পারেন না এরা, মিসিং। এঁরা মনে করেন তারা ‘স্বনির্ভর’, ‘আত্মনির্ভরশীল’, ‘স্বদেশ’ ইত্যাদি শব্দের লোক। কিন্তু আসলে তাঁরা এসব শব্দের মিথ্যা ফুলজুড়ি বিলানো ধরনের রাজনৈতিক জগতের জন্য লড়ছেন। যদিও  এঁদের অনেকেই জানেন এটা বাস্তব নয়, বাস্তবে এসব নেই, পরাবাস্তবতা অস্তিত্বহীন। তবু এটা কেবল তাদের কল্পনায় আছে। রেখে দিয়েছেন। কারণ তারা মনে করেন হোক অবাস্তব তবু এর একটা ‘উপযোগিতা’ আছে।  বাস্তবায়ন অযোগ্য হলেও এটা তাদের লাগে পাবলিকের কাছে কিছু স্বপ্ন বিলিয়ে কল্পনায় জগতে পাবলিককে প্রবেশ করিয়ে যাতে আবেগী কিছু মিথ্যা কথা বলে তাদের সংযত রাখতে পারেন। আবার সময়ে উস্কে তুলতে পারেন – এমন কিছু শব্দ দিয়ে যেমন দেশপ্রেম, দেশভক্তি, হিন্দু জাতি মহান অথবা ভারতীয় জাতি মহান ধরনের অলীক এবং অর্থহীন। একদিকে এরা গ্লোবাল প্রেক্ষিত বা গ্লোবাল অর্ডার বলে দুনিয়াতে কিছু আছে কি না তারা খোঁজ করে দেখেননি। আবার অন্যদিকে তবু কেবল ভুয়া স্বদেশিপনায় অলীক স্বপ্নগুলোই তারা বিক্রি করেন, এটাই তাদের রাজনীতি। অন্তত ভোট যোগাড়ের কৌশল। এটাই ভারতের নেশন-স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র বাদীদের অনড় রাজনীতি। তাতে এরা হিন্দুত্বের জাতিবাদী বিজেপিই হোক কীংবা  সফট হিন্দুত্বের জাতিবাদী কংগ্রেস যেই হোক। জাতিবাদী সকল রাজনীতির বৈশিষ্ট এটা।

    কেন শারদ পাওয়ার প্রসঙ্গঃ
    শারদ পাওয়ার, ৮০ বছর বয়সী ভারতের প্রবীণ রাজনীতিবিদদের একজন, যিনি এখনো রাজনীতিতে সক্রিয়। মূলত মারাঠা জনবসতির রাজ্য মহারাষ্ট্র, যার রাজধানী মুম্বাই; আর এর এখনকার ক্ষমতাসীন রাজ্য-সরকার এক কোয়ালিশন সরকার। এতে শারদ পাওয়ার কেবল এক অংশীদার শুধু নন, অ্যাংকর বলা যায়, যিনি জোট ধরে রাখার ক্ষেত্রে এক বড় মুরব্বির ভূমিকা পালন করে থাকেন। এই রাজনীতিবিদ ১৯৬০ সালের দিকে ২০ বছর বয়সে প্রথম কংগ্রেস দলে নাম লিখিয়েছিলেন।  আর অনেক পরে, তিনি আসলে ভারতের এক সাবেক প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাওয়ের সমসাময়িক; এই অর্থে যে, ১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধী মারা যাওয়ার পর তাঁরা একসাথে দলের প্রধান পদের দাবিদার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের শিকা শেষে নরসীমার পক্ষে যায়। নরসীমা প্রধানমন্ত্রীও হন, আর শারদ পাওয়ার পান পরের ভারী পদ প্রতিরক্ষা মন্ত্রিত্ব। অবশ্য তিনি একবার কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রীও ছিলেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক জীবনে তিনি অন্তত পাঁচবার মুখ্যমন্ত্রী আর অনেকবার অনেক মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছেন।
    কিন্তু ১৯৯৯ সালে এসে পুরনো প্রতিযোগিতার লেজ ধরে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাঁকে আরো চাপের মুখে ফেলে হারাতে চেয়ে পাল্টা গান্ধী পরিবারের হাতে দলের সবক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার কৌশল নিয়েছিল। পরিণতিতে একপর্যায়ে তিনি কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে নিজেই নিজ আঞ্চলিক মারাঠাকেন্দ্রিক এক দল খুলে বসেন যার নাম- ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি বা এনসিপি। কিন্তু কংগ্রেসের প্রতি নিজের জন্ম-মোহটা থেকেই গিয়েছিল বলা যায়। তাই আমরা পরবর্তিতে দেখি প্রায় সব সময়ই তিনি কংগ্রেস দলের সাথে ঐক্যে নানান কোয়ালিশন করে ক্ষমতায় অথবা কখনো বিরোধী দলে থেকেছেন।

    শারদ পাওয়ার ভারতের রাজনীতিবিদদের এক সিম্বল বা প্রতীক ধরে নিয়েই আজকের কথা আগাবো আমরা। আমাদের আজকের লেখায় তাকে বেছে আনার গুরুত্ব হল – তার সমবয়সী ভারতীয় কোন রাজনীতিবিদ আর রাজনীতিতে প্রায় নেই বললেই চলে। তাঁরা অবসরে নয়ত মৃত। গান্ধী পরিবারে ক্ষমতা এক বংশ পরম্পরার মধ্যে কুক্ষিগত হওয়ায় একদিকে কংগ্রেসে আর অন্যদিকে মোদীর উত্থানের পর মোদীর দলেরও সিনিয়র প্রায় সব নেতাকে (ঘোষণা দিয়ে ৭০ বছর বয়স যাদের হয়ে গিয়েছে তারা সবাইকে) অবসরে পাঠিয়ে দেয়াতে, বলতে গেলে ভারতের সিনিয়র রাজনীতিকদের এক আকাল শুরু হয়েছে যার মধ্যে শারদ পাওয়ার সম্ভবত একমাত্র ব্যতিক্রম যিনি ৬০ বছর একটানা রাজনীতি করেও এখনো সক্রিয় রাজনীতিক। আমাদের দরকার ছিল একজন ভারতীয় রাজনীতিকের যিনি অন্তত টানা ৬০ বছর সক্রিয় রাজনীতি করেছেন এবং এখনো ভারতের রাজনৈতিক ঘটনাবলি বিশেষ করে বর্তমান চীন সম্পর্কে কী ভাবেন তা সেই নিজ বুঝটাই সরাসরি অবলীলায় তুলে ধরেন বা ধরতে রাজি আছেন। কারণ ভারতের রাজনীতিকদের চিন্তার ঝোঁক বা ট্রেন্ডের একটা উদাহরণ হিসেবে কাউকে পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল যাতে তাকে দেখিয়ে প্রতীক হিসেবে বাকিদেরই এক নমুনা হিসাবে তাঁকে তুলে ধরে কথা বলা যায়। আমাদের মনে হয়েছে শারদ পাওয়ার তেমনই একজন, ভারতীয় রাজনীতিকদের কমন ট্রেন্ডের প্রতীক।

    এক মুখপাত্র ‘সামনা’ ম্যাগাজিনঃ
    মুম্বাইয়ে এখন মূলত শিবসেনা দল ক্ষমতায়। কিন্তু তারা তাদের সাবেক জোটসঙ্গী বিজেপিকে বাদ দিয়ে এবার সাথে কংগ্রেস আর এনসিপিকে নিয়ে মিলে রাজ্যক্ষমতায় সরকার গঠন করে আছে। আর মুরব্বি হিসেবে পরামর্শ দিয়ে শারদ পাওয়ার এই জোটকে  ইতোমধ্যেই কয়েকবার সরকার-পড়ে-যাওয়া  সামলিয়েছেন। অনুমান করা হয়, শারদ পাওয়ারের এসব দিক ও গুরুত্ব বিবেচনা করে – শিবসেনা দলের মারাঠি ভাষায় প্রকাশিত এক দলীয় মুখপত্র পত্রিকা আছে নাম ‘সামনা’- (এর একটা ভাল বাংলায় অর্থ হবে সম্ভবত মুখোমুখি বা ফেস করা) এই পত্রিকায় শারদ পাওয়ারের এক লম্বা সাক্ষাৎকার নিয়ে ছাপা হয়েছিল। মারাঠি ভাষার সেই সাক্ষাৎকার পরে গত ১২ জুলাই আরেক (মূলত টিভি) মিডিয়া ‘নিউজ ১৮’ [NEWS18.COM]-এর ওয়েবে ইংরাজিতে অনুবাদ করে ছাপা হয়েছিল। যা আমাদের হাতে মানে নজরে আসে।
    সময়কাল হিসেবে এই সাক্ষাৎকার হল চীন-ভারত সীমান্তে সংঘর্ষ, উত্তেজনা ও অন্তত ২০ ভারতীয় সেনা মারা যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। ফলে সেসব ঘটনাকে পটভূমিতে রেখে পাওয়ার কথা বলে গেছেন।
    ভারতে কী রাজনীতি চলে আসছে? তা অন্তত গত ৬০ বছর ধরে যে চিন্তায় যে রাজনীতি তারা সব দলের সবাই যা করে এসেছেন এমন কোনো রাজনীতিকের নিজের মুখে এর স্বীকার করেছেন – এমনটা সহজে পাওয়া যায় না। আমরা এই সাক্ষাৎকারটাকেই নিব ভারতের দল নির্বিশেষে বিভিন্ন রাজনীতিবিদদের চিন্তার সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও ঝোঁক বা ট্রেন্ড কেমন, কী – সেটা বুঝতে ও রেফার করতে একটা উদাহরণ হিসেবে।

    লোকাল বনাম গ্লোবালঃ
    আমরা প্রায়ই বলতে শুনি, ভারতীয় রাজনীতিকদের গ্লোবাল প্রেক্ষিত বোধ একদমই নেই। এই কথাটা বলতে ঠিক কী বুঝব? শুরুতে যেটা বলছিলাম, তারা যে রাজনীতির বোধে অভ্যস্ত ও যাকে আদর্শ মনে করে বড় হয়েছে, সারা দেশে যেটা ব্যাপকভাবে আচ্ছন্ন প্রধান ধারার চিন্তা সেটা হল – এক পবিত্র দেশপ্রেম আর নেশন বোধ। মানে প্রবল জাতিরাষ্ট্র-বাদী বা সংক্ষেপে প্রবল জাতিবাদী এবং মূলত এক কাল্পনিক স্বদেশিপনা। আর সর্বোপরি এপ্রসঙ্গে উপরে যেভাবে বলছি, তাতে এ’এক “লোকাল” চিন্তা।  সম্ভবত এত প্রবল এর স্বদেশিপনা বলেই এরা এর মধ্যে আর গ্লোবাল প্রেক্ষিত বোধকে জন্ম নিতে দেয় নাই। বিজেপির মোদী অথবা শাওরদ পাওয়ার ইত্যাদি সবাই এই জায়গায় এক – কম অথবা বেশি স্বদেশিপনা আর আর লোকাল চিন্তাতেই সব সীমিত। আর এক কমন দিক এরা সকলে জাতি-রাষ্ট্র বাদী।
    সব রাষ্ট্র ব্যবস্থাই মূলত এক লোকাল ফেনোমেনা – এক স্থানীয় সিস্টেম। অর্থাৎ রাষ্ট্র একটা সিস্টেম – এক বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা, কিন্তু তা স্থানীয়। আর একে লোকাল বা স্থানীয় বলছি বলে এর সাপেক্ষে একটা গ্লোবাল বা বাইরের বলতে কিছু আছে। হা আছে। ঠিক যে অর্থে রাষ্ট্র মূলত আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা। তাহলে ওর বাইরের দিকের কী হবে? কোন বাইরের? কেবল নিজেরই বাইরের? না। সব রাষ্ট্রেরই কমন বাইরের দিক যেটা তা নিয়ে কথা বলছি। মানে কেবল একটা রাষ্ট্রের কথা আর বলছি না। একটা রাষ্টের মধ্যে প্রসঙ্গ আর নাই, বের হয়ে গেছি। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্তঃসম্পর্ক এখন প্রসঙ্গ। এই আন্তঃসম্পর্কঅকে একটা ব্যবস্থাধীন করার জন্য একটা সিস্টেম লাগবে মানে আরেক বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা লাগবে, এটার কী হবে? আসলে এটাকেই বলছি গ্লোবাল – এক গ্লোবাল সিস্টেম দরকার। গ্লোবাল অর্ডার, গ্লোবালি ছেয়ে থাকা এক বিধিবদ্ধ ব্যবস্থার কথা বলছি।
    তাহলে এখন সার করে বললে, রাষ্ট্র বলতে যদি স্থানীয় বা লোকাল পর্যায়ের এক আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা বুঝি তবে রাষ্ট্রগুলোর বাইরের দিকের জন্য আরেকটা ব্যবস্থা, এক গ্লোবাল সিস্টেম বা গ্লোবাল অর্ডার লাগবে। এটাই গ্লোবাল অর্ডার, এর কথা বলছি।
    দুনিয়ায় প্রথম এক গ্লোবাল অর্ডার স্থাপিত হয়েছিল আমেরিকার হাতে বা নেতৃত্বে। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে, এতে বিজয়ীদের হাতে ও নেতার নেতৃত্বে। এই প্রথম অর্ডার চালু করতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তা করা হয়েছিল। এমন সব গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর হয়েছিল ১৯৪৫ সালে। যদিও প্রস্তুতির কাজ ১৯৪২ সাল থেকে শুরু বলা চলে।
    তার মানে কী এর আগে কোন গ্লোবাল ব্যবস্থা বলতে দুনিয়াতে কিছু ছিল না?  হ্যাঁ ঠিক তাই। আসলে এর আগের দুনিয়া বলতে ১৬০৭-১৯৪৫ এই সময়কালটা কলোনি যুগ। মানে তা দখল শাসন ও লূটের যুগ। তখন কলোনি মালিকদের মধ্যে শত্রুতাই ছিল মুখ্য, তেমন কোন আন্তঃবাণিজ্য বা সম্পর্ক বলতে খুব তেমন কিছু ছিল না।
    আসলে গ্লোবাল অর্ডার বলতে এ্কটা একই সাথে এটা মূলত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বা অর্ডার বুঝায়।  আর এই তিনটাই প্রথম চালু হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে ১৯৪৫ সালের ঐ সময়ে। তাহলে এর আগের কালটাকে কি বলতে পারি? বলতে পারি সেটা ছিল একটা কলোনি যুগ যার মাধ্যমে একধরণের “কলোনি ক্যাপিটালিজম” বলতে পারি একে কিন্তু সাথে খুবই সীমিত বা তেমন কোন বাণিজ্যিক ব্যবস্থা ছিল না বলা যায়। এখন ৭৫ বছর পরে আমেরিকার নেতৃত্বের ঐ গ্লোবাল ব্যবস্থার যুগ ধীরে ধীরে শেষ হচ্ছে। আর সে জায়গা নিতে উঠে আসতে চাইছে চীনের নেতৃত্বের এক ভিন্ন গ্লোবাল ব্যবস্থা বা অর্ডার।

    গ্লোবাল অর্ডার বলতে মুখ্য ফোকাস আন্তর্জাতিক বাণিজ্যঃ
    গ্লোবাল ব্যবস্থার মুখ্য বা কেন্দ্রীয় ফোকাস বলতে সবসময়ই সেটা হল বাণিজ্য – আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। এই বাণিজ্যের এক সিস্টেম গড়ে তোলা ও নিয়ন্ত্রিত হয় মূল দুই নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে, আর সাথে বাণিজ্যিক বিষয়ে রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের পারস্পরিক বুঝাবুঝির প্রতিষ্ঠান হল ডাবলুটিও। আগেই বলেছি গ্লোবাল অর্ডার বলে যাই বুঝি না কেন এর মুখ্য জিনিষ হল এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা। গ্লোবাল পণ্য ও পুঁজির লেনদেন বিনিময় বাণিজ্য। যা আবার আসলে একটা মুদ্রা ব্যবস্থা – আন্তর্জাতিক  বেচাকেনা বিনিময়ের মুদ্রা ব্যবস্থা। কারণ প্রত্যেক রাষ্ট্রের সীমানা যেখানে শেষ সেই রাষ্ট্রের স্থানীয় মুদ্রা দিয়ে কেনাবেচা সেখানেই শেষ। তাই যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য হতে পারে যেকোন দু রাষ্ট্রের মানে সব রাষ্ট্রের কাছেই গ্রহণযোগ্য এক মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করতে পারা দিয়ে; মানেই এক আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করতে হবে আগে। নইলে পণ্য বিনিময় অচল। এই কাজটারই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ। আমরা বলি দুনিয়াটা বড়লোক দেশের দিকে ফেবার করে সাজানো। কথা সত্য। এরই আরেক অর্থ হল, আইএমএফ বড়লোক রাষ্ট্রগুলোর দিকে কান্নি মেরে কাজ করে ও সাজানো। কিন্তু সাবধান। এর মানে আইএমএফ “নিপাত গেলে” এটা কোন সমাধান নয়, হবে না। আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্ভব করতে চাইলে আইএমএফ ধরণের কোঅর্ডিনেশন ও নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠান আমাদের লাগবেই। তবে যাতে সে কান্নি না মারে – তা বন্ধ করার ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে। যদিও কান্নি মারা বন্ধ করতে সক্ষম হওয়া সেটা কিন্তু এক ক্ষতিগ্রস্থ-পক্ষদের গ্লোবাল ক্ষমতার অর্জন ও নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার প্রশ্ন। মানে এটা আইএমএফ “নিপাত” যাওয়ার প্রশ্ন নয়। আমরা যাই নতুন কিছু করি না কেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা চালু রাখা ও নিয়ন্ত্রণ – দুনিয়াকে চালু রাখার জন্য অনিবার্য প্রয়োজনীয়।
    অনেকে শ্লোগান দেন, বিদেশি পুঁজি, বিদেশি পণ্য ইত্যাদি সব হারাম – দেশি – স্বদেশিপনাই একমাত্র পথ। এরাই অবশ্য জাতি-রাষ্ট্র বাদী। আর এটাই কলোনি যুগের ধারণা। যখন আন্তর্জাতিক পণ্য বিনিময় বাণিজ্য ধারণাটাও ছিল না। ফলে স্বদেশি বা আত্নম্বভরিতা ধরণের ধারণা জন্মানোর জন্য উর্বর মাটি-পরিস্থিতি। আর রাজনীতি বা রাজনৈতিক ক্ষমতা মানেই অন্যদেশ ভুমি কলোনি-দখলের ক্ষমতা। এরচেয়েও বড় কথা “স্বাধীন রাষ্ট্র” বলে কিছু নাই। আছে কলোনি হয়ে থাকা রাষ্ট্রের ধারণা – মাই লর্ড বলে হাত জোর করে দাঁড়িয়ে থাকা। ফলে এই দশা-পরিস্থিতি জন্ম নেয়া রাষ্ট্র ধারণাটাই জাতি-রাষ্ট্র ধারণা। আর এদেরই অলীক কল্পনাটা হল অর্থনৈতিক স্বদেশিপনা, বিদেশি মানে হারাম ধারণা। পণ্য বিনিময় বানিজ্য ধারণাকে নিচে চাপা দিয়ে ফেলে রাখা। বলাই বাহুল্য এটাই এবসার্ড, অবাস্তব কথা বলা। বাস্তবে তাদের কথা মিলিয়ে দেখে এরপর তারা বলে না। আপনি নিজেই একটা কারখানা দিলেন কিন্তু সেটা চালাতে যদি অন্য দেশের একটা টেকনোলজি, একটা ধাতব অংশ যা খুবকম দেশে পাওয়া যায় ইত্যাদি এমন হয় (আর সব কিছুই – সেটা ধাতু বা কাঁচামাল সব দেশে পাওয়া যায় না, যাবে না বলে) সেক্ষেত্রে ঐ কারখানা চলবে না। কারণ,ধাতু বা কাঁচামাল বা টেক (বাজার না হয় না বললাম) ইত্যাদি পেতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময়ই ওর একমাত্র সমাধান। কিন্তু স্বদেশিপনা জাতিবাদী আপনি তো কিছুই বিদেশের কিনতেও চান না, বেচতেও চান না। অথচ এটাই আইএমএফ “নিপাত যাক” কথার ব্যবহারিক সত্যিকারের মানে।
    সারকথায়, এই জাতিবাদীদের জন্ম কলোনি যুগে যখন দুনিয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা বলতে কিছুই ছিল না। কিন্তু সেখান থেকে আজকের দুনিয়ায় একটা গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থার দুনিয়ায় রূপান্তরিত হয়ে গেল কেমন করে? কে করল তা এরা ‘কেউ’ জানে না।  এই কেউ বলতে জাতি-রাষ্ট্র বাদী আর কমিউনিস্ট দুই পক্ষকেই বুঝতে হবে। এই রূপান্তরটা সম্পর্কে এদুই পক্ষই অন্ধকারে। গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থা, খারাপ-ভাল ত্রুটিপুর্ণ যাহোক একটা গ্লোবাল অর্ডার কার্যকর হয়ে আছে এটা তারা জানে না। যদিও এটা থাকার সুবিধা গ্রহণ করতে তারা দ্বিধা করে না। ডলার কামানোকে কাঙ্খিত ভগবান পাওয়ার মতনই মনে করে। যদিও আবার যারা একটু সিনিয়র মোটামুটি বুঝতে পারে গ্লোবাল ব্যবস্থা একটা কিছু আছে তারা আবার সে ধারণায় পানি ঢেলে একে নেতি চোখে দেখে আর বলে ওটা “সাম্রাজ্যবাদী”। একারণে তারাও অন্ধকারে।
    কেউ বুঝুক অথবা সারাজীবন অন্ধকারেই থেকে যাক গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে কেন্দ্রে রেখে একটা গ্লোবাল অর্ডার দুনিয়ার কার্যকর আছে। আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে গড়ে উঠা যে ব্যবস্থাটা বয়স এখন প্রায় ৭৫ বছর। এদিকে আবার এই গ্লোবাল ব্যবস্থার নেতা আমেরিকাকে অন্তত অর্থনৈতিক দিক থেকে চ্যালেঞ্জ করে নেতৃত্ব নিতে চীনের উত্থান এখন আসন্ন। ধীরে ধিরে তা কার্যকর হওয়া শুরু করেছে। এটা যে আসন্ন তা চীন নিজে বলেছে বলে জেনেছি তা নয়। এটা আমেরিকান সার্ভে-স্টাডিতে পাওয়া রিপোর্টর ফাইন্ডিংস বলেছে।
    এখন সমস্যা কত গভীর হয়েছে দেখেন! যে জাতিবাদীরা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল সিস্টেম বা অর্ডার সম্পর্কে পুরাই অন্ধকারে থেকে গেছিল গত ৭৫ বছর ধরে তারা এখন কিভাবে বুঝবে যে এখন যে আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বটাই বদল হয়ে চীনের উত্থানের সময় হয়েছে?

    অতএব চীন বা আমেরিকেকেও ভারত বিবেচনা করছে গ্লোবাল অর্ডারের হবু অথবা পুরান নেতা হিসাবে নয়। বড় জোর আর পাঁচটা পড়শি রাষ্ট্রের মতই যেখানে এরা দুজন হয়ত কিছু বাড়তি ক্ষমতাধর রাষ্ট্র, এরকম। গ্লোবাল সিস্টেম বলতে মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আর তাকে কেন্দ্র করে পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক সিস্টেম এক গ্লোবাল ব্যবস্থা বলে যে কিছু আছে এসব তাদের নলেজ-অনুমানের বাইরে মনে হচ্ছে। একটা জাতিসংঘ বলে কিছু আছে তা জানে। কিন্তু কে বানালো এটা, কেন বানাতে পারল, সেসব জানা এসব গ্লোবাল প্রেক্ষিতের ভিতর দিয়ে ভারতের দুনিয়াকে জানা – না, জাতি-রাষ্ট্রের রাজনীতির জন্য এসব জানা জরুরি নয়। এসব বিষয় সবচেয়ে ভাল্ভাবে ধরা পড়ে জাতিসংঘের ভেটো-মেম্বার হওয়ার জন্য তাদের বোকার আকুতি দেখলে। বুশ আমলের শেষে ওবামার শুরুতে ওবামা ভারতকে চীন ঠেকানো বা চায়না কনটেইমেন্ট কাজের ঠিকা দেওয়ার কথা পাকা করেছিল। আর তখন টোপ দিয়েছিল যে বিনিময়ে আরেকটা মুলা দিবে। সেটা হল ভেটো-মেম্বার পদ। আর প্রণব মুখার্জি তা বিশ্বাস করেছিল এতই দৃঢ়ভাবে যে ২০১০ সালে হাসিনার ভারত সফরে হাসিনাকে দিয়ে দাবি তুলিয়েছিল যে ভারতকে ভেটোক্ষমতা দিতে হবে! জাতিসংঘের জন্ম কেন হয়েছিল কী করতে হয়েছিল আর কেনই বা এই ভেটোক্ষমতার ব্যবস্থা্র জন্ম তা প্রণব বুঝেন এরপর আর তা মনে হয় না। যদি হত তাহলে ওবামা আশ্বাস যে ফাঁকা ধুর্তমি তা ধরতে পারতেন। ভেটো কথাটার ব্যবহারিক মানে কী তাই তো তিনি বুঝেন নাই, দেখা যাচ্ছে। কথা হল পাঁচ ভেটো মেম্বারের কেবল একজন যদি ভেটো দেন মানে না করে দেন তবে সেই সিদ্ধান্ত হবে না। কাজেই ওবামা চাইলেই ভারতকে নতুন সদস্যপদ দিতেই পারবেন না। অন্তত চীনকেও পক্ষে নিতে হবে। তা যদি বুঝতেন তাহলে তো চীনকেই আগে সন্তুষ্ট করতে যেতেন। আসলে সেটাও কম বোকামি হত না। কারণ, আমেরিকা নেতা ছিল বলেই ডিকটেট করে ঐ পাঁচজনকে ভেটো ক্ষমতা দিয়ে হলেও একটা জাতিসংঘ গড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। দুনিয়ার নেতা বদলালে পরে তার ডিকটেটের ক্ষমতা কী মাত্রায় হবে সেটার উপর নির্ভর করে তিনি জাতিসংঘ-২ বলে কিছু শুরু করতে পারবেন কিনা! এতা গ্লোবাল সিস্টেম সম্পর্কে বুঝাবুঝির মামলা। তবে সাবধান তা আবার ইউরোপের কোন দেশের বই-পুস্তক পড়ে জানা যাবে না। অর্থাৎ সারা ভারত এই অতি জাতি-রাষ্ট্রবাদ এটাই তাদের গ্লোবাল প্রেক্ষিত থেকে ভারতকে অস্তিত্বের তাতপর্য ও সম্ভাবনা কখনও বুঝতে পারেন নাই। গ্লোবাল প্রেক্ষিত সম্পর্কে দুর্বল বুঝাবুঝির উতস এখানেই। মজার কথা কলোনি আমলের ও ঐ আমলের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ ধারণা বলে কলোনি শাসনের সমাপ্তিতে সারা ইউরোপের সকল রাষ্ট্র এটা ১৯৫৩ সালের মধ্যে ত্যাগ করে, বাতিল করে দেয়। সেটা রাজনীতিকরা তো নয়ই, ভারতের একাদেমিকরাও টেরও পেয়েছে জানা যায় না।
    সাধারণভাবে ভারতের রাজনীতিক্বেওর পর্ব এখানেই শেষ করে এবার শারদ পাওয়ারের পর্ব।

    সুনির্দিষ্ট শারদ পাওয়ারের লেখা থেকেঃ
    বয়ান একঃ ঐ সাক্ষাৎকারে শারদ পাওয়ারের বক্তব্য, ‘চীন সামরিক সক্ষমতা ভারতের চেয়ে দশ গুণ বড়। কাজেই পাকিস্তানের চেয়ে চীন আমাদের বড় শত্রু ও হুমকি”। কিন্তু এর মানে কী যারাই ভারতের চেয়ে সামরিক দিক দিয়ে বড় তারা সবাই ভারতের শত্রু? তাই নয় কী?
    অর্থাৎ তাহলে তো আমেরিকা ভারতের জন্য চীনের চেয়েও আরো বড় শত্রু; মানতে হবে। কারণ আমেরিকা সামরিক দিক দিয়ে এখনো চীনের চেয়ে বড়। কিন্তু পাওয়ার-সহ ভারতীয় নেতা ও পাবলিক কি তাই মনে করবে? ট্রাম্প পুজা করা বিজেপি তো অবশ্যই না। তার মানে ভারতের চেয়ে সামরিক সক্ষমতায় বড় হওয়াটাই ভারতের কেউ শত্রু হবেই। এটা ভিত্তিহীন তাই কারো মানার কোন কারণ নাই!
    আবার তিনি বলছেন, ‘শত্রুর কথা উঠলেই আমাদের পাকিস্তানের কথা মনে আসে। কিন্তু না, পাকিস্তান নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। বরং সামনে চীন আমাদের প্রধান শত্রু, কারণ ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করার চীনের ক্ষমতা আছে, আর আছে দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচি”।

    পাওয়ারের এই বোঝাবুঝিও ভুল। কারণ একই যুক্তিতে তো তাহলে আমেরিকাও ভারতের শত্রু হয়ে উঠতে পারে। মানে উঠবেই। এই যে ‘ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ’ কথাটা- এখানে কে শত্রু হবে আর কে মিত্র হবে এটা বুঝবার ভিত্তি কী?
    আসলে শারদ পাওয়ার বা তার মত করে ভাবা (জাতি ভাবনার) মোদীর মধ্যে কোনো ফারাক নেই। তারা সবাই একই চিন্তা ফ্রেমের লোক যেটা পুরনো ফ্রেমের কলোনি আমলের ফ্রেম ও সে আমলে সারা ইউরোপ এভাবেই চিন্তা করত। যার সার কথাটা হল – বিদেশী মাত্রই আমার শত্রু। আমার দেশে আমরা এক জাতি আর এর বাইরে সবাই ‘বিদেশী’ যার মানেই ওরা সবাই আমার শত্রু। এটাই জাতি-রাষ্ট্রের ধারণার চিন্তা ফ্রেম। য়াগে বলেছি এটা অবশ্য সারা ইউরোপ ১৯৫৩ সাল থেকে বাদ দিয়েছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, বিদেশী মাত্রই শত্রু এ কথা সবসময় ঠিক নয়। বরং বিদেশীর সাথে ‘বাণিজ্যও’ করা সম্ভব আর তা দুদেশের জন্য বিরাট লাভজনক হতে পারে। বাণিজ্য মানে পণ্য বিনিময়, লেনদেন- এক পণ্যের বিনিময়ে অন্য পণ্য দেয়া। যেটা নিজ নিজ দেশের হাটবাজার-গঞ্জে করে থাকি, সেটাই তবে কিছু ভিন্ন রূপে বা ভিন্ন শর্ত-পরিস্থিতিতে।

    যদিও আন্তঃরাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক পরিস্তিতিতে সেখানে আরেক বাস্তব টেকনিক্যাল সমস্যা আছে। সেটা হলো মুদ্রা। একটা দেশের সীমানার মধ্যে ওই দেশের মুদ্রা- এটাই পণ্য বিনিময় বাণিজ্যে বিরাট ও মূল ভূমিকা রাখে। কিন্তু সমস্যা অন্যখানে, আপনি পকেটে টাকা নিয়ে সারা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত চষে বেড়াতে পারবেন, যা মনে চান আর যা সেখানে পাওয়া যায় সব কিনতে পারবেন। কিন্তু দেশের সীমান্ত পার হলেই বাংলাদেশী মুদ্রা আর কাজ করবে না। আপনি বাধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বেন। অর্থাৎ সীমান্ত ছেড়ে যাওয়া মানে তখন পড়শি দেশের মধ্যে একটা বিনিময় বাণিজ্যের অবস্থা। সেক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশে বেচাকেনা মানে কেবল সে দেশের মুদ্রাই চলবে। তাই আপনার সে ক্ষেত্রে বাড়তি দরকার পড়বে একে তো মুদ্রার বিনিময় হার জানা আর মুদ্রা বিনিময় করে দিতে রাজি থাকা একটা দোকান বা ব্যাংক। আরো কথা আছে- আলোচ্য দুই দেশকে আইএমএফের সদস্য হতে হবে। নইলে বিনিময় হার জানাসহ আরো বহুবিধ জটিলতার মুখে পড়বেন। কেনাবেচা লাটে উঠবে। কিন্তু একটা বিশাল ঘটনা এখানে ঘটে গেছে। তা হল, এই দুই দেশের বাণিজ্য মানে জাতিরাষ্ট্রবাদী রাজনীতিবিদরা জন্মের পর থেকে দেখে আসছেন একটা গ্লোবাল বাণিজ্যের ব্যবস্থা চালু হয়েই আছে। তাই তারা ধরে নেন, এই ব্যবস্থাটা দুনিয়ার জন্ম থেকে নিশ্চয়ই ছিল।
    এটাই শতভাগ মিথ্যে অনুমান। আইএমএফেরই জন্ম এইমাত্র ১৯৪৪ সালে। এর মানে এর আগে বিনিময় বাণিজ্য খুবই কঠিন না প্রায় ছিলই না, দরকারও কম ছিল, সে অন্য কারণে। এক কথায় আজ আইএমএফ যা করে এই পুরোটাই সেকালে করত মাত্র এক ব্যক্তির মালিকানার এক ব্যাংক আর ইউরোপের আর তিন-চার শহরে বসে থাকা তার তিন-চার ছেলে মিলে। সেদিকে এখন আর যাবো না। আরো যাবো না কমিউনিস্ট রহস্য-গল্প দূরে রাখার জন্য।
    যে কথা বলছিলাম, তার মানে যেকোনো দুই দেশের মধ্যে পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য মানে হল – আইএমএফের জন্ম এর আগেই হয়ে গিয়েছে আর এই বাণিজ্য আর কেবল দুই দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বা ‘লোকাল’ ঘটনা একেবারেই নয়। একটা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা দুনিয়ায় চালু থাকা। তাতে জাতিবাদী মন যতই মনে করুক পড়শি দেশের সাথে বাণিজ্য একটা লোকাল ঘটনা, এটা কিন্তু একেবারেই সত্য নয়।
    গত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই গ্লোবাল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থাবলির পুরো কাঠামোই যে তৈরি হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে সেটা আমরা টের না পেয়ে বিদেশী পুঁজি, বিদেশী ঋণ ঘৃণাকারী যেই হই না কেন। একটা গ্লোবাল সিস্টেম আছে বা ১৯৪৫ সালে চালু হয়েছিল বলেই মোদী বা শারদ পাওয়ারের ‘দেশী অর্থনীতি’ নামক কল্পনা চালু আছে। নইলে তো বাণিজ্যের অভাবে না খেয়ে রাজনীতিবিদিদের মুখ দিয়ে কথাই বের হত না!

    কাজেই আমাদের একটা বড় অবজারভেশন ও দাবি যে, ভারতের রাজনীতির সাধারণ ধারা হল তাদের এক প্রবল মিথ্যা অনুমান যে সব কিছুই ‘লোকাল’। তারা ‘বিদেশী’ বিরোধী। বিদেশী মাত্রই ভারতের স্বার্থবিরোধী ইত্যাদি যত সব মনগড়া কল্পনা আছে। মানে ভারতের অভ্যন্তরীণ চোখে দুনিয়াটাকে দেখা। কিন্তু এর বিপরীতে আমাদের মত রাষ্ট্রগুলোর উপরে একটা প্রবল প্রভাবশালী গ্লোবাল ব্যবস্থা বা গ্লোবাল অর্ডার কার্যকর থাকে ও সক্রিয় কাজ করে থাকে। সেই গ্লোবাল অর্ডারের অধীনে আমাদের অভ্যন্তরীণ বা লোকাল ঘটনাবলিগুলো তৈরি ও কার্যকর হয় ও ক্রিয়াশীল থাকে। কিন্তু আমরা তা টের পাওয়ার যোগ্য না হলে মনে হবে গ্লোবাল সিস্টেম বলে কিছু নেই। ভার্তে যা ঘটে তার সবই যেন তার অভ্যন্তরীণ স্বার্থ বা ইচ্ছা দিয়েই ঘটায়। সার কথায়- গ্লোবাল প্রেক্ষিতই বড় প্রভাব বিছিয়ে ঠিক করে দেয় লোকাল ঘটনাবলি কেমন ঘটবে। কাজেই স্থানীয় স্বাধীন কোন প্রেক্ষিতে লোকাল ঘটনাবলি ঘটে না, ঘটবে না। চীন পালটা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ার উদ্যোগ ও এক নয়া গ্লোবাল ব্যবস্থা খাড়া করতে চায় বলে, চাইতে পারে বলেই ভারতের কাছে অফার আসতে পারে আসবে। আবার ভারত যদি ঠিক করতে বসে আমেরিকার চীন ঠেকানোর ঠিকা নিয়ে আমেরিকার সাথে ভাগ্যকে বেধে ডুবতে বসা সিস্টেমের নায়কের সঙ্গি হবে নাকি নতুন গ্লোবাল অর্ডার যে ঠিক করবে যে দুনিয়ার ভবিষ্যত ঠিক করবে তার সাথে যাবে – এটা কে বেশি সুবিধা দিবে সেই মামলা একেবারেই নয়। ভারতের ভবিষ্যত নতুন গ্লোবাল অর্ডারের ভিতরে – যদি গ্লোবাল অর্ডার জিনিষটা বুঝতে সক্ষম হন।
    বয়ান দুইঃ শারদ পাওয়ার বলছেন, “ভারতের জন্য সত্যিকারের হুমকি হলো চীন, যে চীন ভারতের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে গেছে। অতএব, ঐ চীনের সাথে, কমরেডদের সাথে আমাদের খুব গলাগলি আছে, (যেমন একই দোলনায় বসে মোদি-শিং দোল খাচ্ছে আর কথা বলছে) এমনটা এই ছবি দেখিয়ে য়ামাদের মাঝে যে শত্রুতা এর মোকাবিলা হবে না। মোদি হাত মিলাচ্ছে বা কুলাকুলিতে জড়িয়ে ধরছে প্রেসিডেন্টকে শি কে এটা হতে পারে না”।
    এর চেয়ে জাতিবাদী বক্তব্য আর কী হতে পারে?
    শারদ পাওয়ারের এসব কথা তাকে আরো নাদান কম চিন্তা ও সঙ্কীর্ণ বুঝের লোক বলে পরিচিত করবে। তার প্রথম সমস্যা শত্রু আর প্রতিদ্বন্দ্বী শব্দ দুটোকে মাখিয়ে ফেলা। যেমন ক্লাসের দুই ফার্স্ট-সেকেন্ড স্টুডেন্টের মধ্যে যেটা হয় সেটাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলে, শত্রুতা নয়। স্পোর্টসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় কিন্তু কেউ কারো শত্রু নয়।
    সোভিয়েত ইউনিয়ন-আমেরিকার মধ্যে শত্রুতা ছিল তা সত্ত্বেও কোনো কোনো ফোরামে একসাথে বসে কথা বলা ও কাজ করার মতো বন্ধুত্ব থাকতেই হত। কিন্তু কোন বাণিজ্য সম্পর্ক, পণ্য লেনদেন ছিল না, গ্লোবাল বাণিজ্য সিস্টেমের সুবিধাও কার্যকর ছিল না। কিন্তু এটা ১৯৪৫-৯২ সাল পর্যন্ত। আর এর পর থেকে রাশিয়ার পুতিনসহ নিজেকে কমিউনিস্ট মনে করা (আজ অথবা আগের) সব রাষ্ট্রই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে গেছে। মানে দুনিয়াটা এখন একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে এসে গেছে। যেটা এখনো আমেরিকার একার পকেটে সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণে। আর এটাই ভেঙে পড়ছে ধীরে ধীরে আর চীনের নেতৃত্ব নতুন একটা ব্যবস্থা গড়তে, বদল ঘটাতে এগিয়ে আসছে। মোদী বা শারদের মত কথিত দেশী জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকরা আগেই আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্ডারের মধ্য থেকেও এর সম্পর্কে বেখবর থেকেছে। নিজের স্বনির্ভর-অর্থনীতি নামে সোনার-পাথর বাটি ধরণের কাল্পনিক ধারণার মধ্যে বসবাস করে গেছে বলে গ্লোবাল অর্ডারের পালাবদল ব্যাপারটা কখনও বোধগম্য হয় নাই। বাস্তবতা হল – ভারত চাইলেও পুরনো আমেরিকার নেতৃত্বের পুরনো অর্ডারের মধ্যে বসবাস করতে পারবে না। খোদ আমেরিকাকেও চীনের নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারের মধ্যে ঢুকতে হবে। কারণ একসাথে দুনিয়াতে দু’টি অর্ডার চালু থাকতে পারবে না। দুইটা আইএমএফ চালু থাকতে পারবে না।

    একাধিক বিশ্বব্যাংক  যদিও থাকতে পারবে। তাহলে কেন চীন ভারতের শত্রু? আবার খেয়াল করতে হবে যে, চীন শত্রু না হলেও খুবই খারাপ প্রতিদ্বন্দ্বী সেই চীনই আবার বাণিজ্যের পার্টনার হতে পারে, পুঁজি বিনিয়োগদাতা ইত্যাদি এসবই একালে সম্ভব। কারণ কোল্ড-ওয়্যারের আমলে সোভিয়েত-আমেরিকা কোন একই বাণিজ্য ব্যবস্থার সদস্য ছিল না। সোভিয়েতরা বৈদেশিক বাণিজ্যে বিশ্বাস করত মনে হয় না। অন্তত এনিয়ে তাদের তাত্বিক অবস্থানও নাই। এটাই সেকালে শত্রুতা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হওয়া সম্ভব ছিল। সেটা একালে আর সম্ভব নয়। কারণ এখন চাল-ডাল মিলে গেছে, এখন আলাদা করা তত্বে সম্ভব বলে যদিও দেখাতেও পারে বাস্তবে এটা প্রায় অসম্ভব।
    আবার ঘটনা হল, চীনের সাথে ভারতের নতুন ও পাল্টা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক নির্মাণ প্রকল্প ব্রিকস, সেটা এতদিন ঠিকই চলছিল। এর মানে কী তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শত্রুতা মিলিয়ে গেছিল, তা ছিল না? বিস্মিত হতে হয় শারদ পাওয়ারের চিন্তা না করে কথা বলে বসা দেখে। অথচ প্রতিদ্বন্দ্বিতা শত্রুতা যাই বলেন তা অবশ্যই ছিল। কিন্তু সবাই নখ লুকিয়ে ফেলা শত্রুতা সামনে না নিয়ে আসা অর্থে একটা কার্যকর লেনদেনের সম্পর্কের মধ্যে ছিল। এটা সম্ভব। আর এটাই একালের গ্লোবাল সিস্টেমের বৈশিষ্ট। যেটা জাতি ধারণা নিয়ে ধরাছোয়া যাবে না। সবই উলটাপালটা মনে হবে। কাজেই ভারতের সব দুর্দশার রুট কারণ এসব জাতিবাদী, বিদেশবিরোধী আজিব চিন্তা যা এদেরকে গ্লোবাল সিস্টেম বুঝতে সবসময় বিরাট বাধা হয়ে থেকেছে!

    মোদী বা শারদের বিদেশ-নির্ভরতা বিরুদ্ধে কথা বলাটা ভুল। বিদেশের সাথে পণ্য-বিনিময় বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়া মানেই তা  বিদেশনির্ভরতা নাও হতে পারে। যদি ব্যাপারটাকে ইন্টারডিপেন্ডেন্সি –পরস্পরের উপর পরস্পর নির্ভরশীল হওয়া, একপক্ষীয় না এভাবে সাজানো যায়। আর ব্যাপক বৈদেশিক বাণিজ্যে জড়িয়ে যাওয়া মানে কিছু কিছু রপ্তানি পণ্যে মাস্টার উতপাদক হয়ে যাওয়া। মানে সবচেয়ে দক্ষ উতপাদক মানে সবচেয়ে কম শ্রমে তা উতপাদন করতে পারা নায়ক হওয়া। এসব নয়া ধারণা, বিদেশ-নির্ভরতা বিরুদ্ধবাদীদের মাথায় ঢুকবে না!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ২৫ জুলাই ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “শারদ পাওয়ার সবার প্রতিনিধি” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]