Tag: হিন্দুত্ব

  • মুচকুন্দ দুবে দুকূল হারানো এক “বেচারা”!

    মুচকুন্দ দুবে দুকূল হারানো এক “বেচারা”!

    গৌতম দাস
    ৩১ মে ২০২১, ২০:০৫ সোমবার

    Muchkund-Dubey

    বিবিসি বাংলা গতকালকে একটা রিপোর্ট করেছে “প্রেসিডেন্ট জিয়া ভারতকে গ্যাস বেচতেও রাজি হয়ে গিয়েছিলেন: ভারতীয় কূটনীতিক” – এই শিরোনামে। গত কয়েকদিন ধরে “ঢাকা-দিল্লির বন্ধুত্বপুর্ণ সম্পর্কে ফাটল বাড়ছে’ টাইপের নিউজ – অনেক মিডিয়ায় হতে দেখা গেছে। এমনিতেই গত ২০১৮ সালের প্রথমদিকের সময় থেকে “ভারতকে যেটা দিয়েছি তারা তা সারা জীবন মনে রাখবে’ বলে হাসিনার বক্তব্য দেওয়ার পর থেকে স্বামী-স্ত্রী বা বন্ধুত্বের সম্পর্কে ফাটলের যে সন্দেহ শুরু হয়েছিল তা আর কখন মিটে নাই। যদিও তা কখনও প্রবল হয়েছে কখনও ভাটার টানে আছে মনে হয়েছে।

    কিন্তু বিবিসির এই নিউজটা সম্ভবত একটা চিহ্ন যে, এবার সত্যিই আমাদের আপা এই বিরাট ভারতকে কয়েকটা চড়-থাপ্পড় না হলেও একটা বড় দাগা বা ধাক্কা দিয়েছেন মনে হচ্ছে। আর এরই চিহ্ন হল সর্বশেষ বিবিসির এই নিউজ।  বর্তমান দিলীপ ঘোষের আগে বিজেপি-আরএসএসের তহবিল আগলে কলকাতায় বসে থাকতেন তথাগত রায়। তাঁর আমল থেকে লক্ষ্য করা গেছিল বিবিসির এই শুভজ্যোতি ঘোষ রিপোর্টকে। যা পড়ে মনে হত তিনি বিবিসি না, আরএসএসের কোন ক্যাডার হয়ে বিবিসিতে লিখেছেন সেটা। পরবর্তিতে তথাগত রায়কে নর্থ-ইস্ট রাজ্যের গভর্ণর করে সরিয়ে নিলে শুভজ্যোতি ঘোষ এর অত্যাচার থেকে পাঠকেরা সে যাত্রায় রক্ষা পেয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে সেদিন আবার ফিরে এসেছে। এবং খুব সম্ভবত শুভজ্যোতি ঘোষের এবারের এসাইনমেন্ট আর স্থানীয় নেতা হিসাবে নয়,বিজেপির কেন্দ্র বা সরকার থেকে উতসারিত। অতএব বিবিসির প্রশাসক / সম্পাদক বলে সংশ্লিষ্ট যারা আছেন তাদের সচেতন হবার এটা হাই-টাইম যে বাংলাদেশের আম-পাবলিক থেকে বিবিসির বিচ্ছিন্ন হওয়া বা দূরে চলে যাওয়া এসব ঘটা শুরু হয় সাধারণত এখান থেকেই।

    কূটনীতিক মুচকুন্দ দুবে জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার শেষ জমানায় (১৯৭৯-৮২) ঢাকায় ভারতের রাষ্ট্রদুত ছিলেন। আর পরে ১৯৯০-৯১ সালের দিক ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হয়েছিলেন, এরপরে অবসরে যান। এছাড়া বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক নিয়ে প্রায়ই মিডিয়াগুলো যাদের মন্তব্য তাতে সংযোজন করে রিপোর্ট পুর্ণ করে থাকেন দুবে তাদের একজন। আবার ভারতের যারা ঢাকায় যোগাযোগ-সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপুর্ণ সেন্টার হিসাবে প্রথম আলোকে গোনায় শীর্ষে রাখেন মুচকুন্দ দুবে তাদের একজন। বছর দেড়েক আগে রেহমান সোবহানকে সাথে নিয়ে তাঁকে প্রথম আলোর অফিস ঘুরতে আসতে দেখেছিলাম আমরা। কিন্তু কখনই তাঁকে বিজেপি-আরএসএসের ধব্জা বহনকারী মনে হয় নাই; আর এবার তার চেয়েও নিকৃষ্ট কিছু মনে হয়েছে।

    বিবিসির উল্লেখিত ঐ নিউজের একটা অংশ এমনঃ
    “মি. দুবে বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ‘বাস্তববাদী জিয়াউর রহমানকে ভারতও কিন্তু বিশ্বাস করত’।
    ‘পরের দিকে ভারত সরকার মনে করতো তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেছিলেন। কিন্তু জিয়া কোনওদিন তা করেননি বলেই ভারতের ধারণা ছিল।”

    ক্যাডার কুটনীতিক দুবের বয়স এখন ৮৭ বছরের কম নয়। এখন এই বয়সে কেউ যদি তাকে কূটনীতির ভাষা শিখাতে আসে সেটা দুবের জন্যই উপাদেয় হবে না বলাই বাহুল্য। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি ভাষা ব্যবহারে তিনি কত নিচে নামতে পারেন; নেমে একেবারে তলিয়ে যাচ্ছেন। তিনি অভিযোগ করছেন “খালেদা জিয়া পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেছিলেন”, তাই তিনি খারাপ বা ভারত তাকে বিশ্বাস করত না ইত্যাদি। মিঃ দুবে খালেদা জিয়াকে অপছন্দ করতেই পারেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে তিনি সে সময়কালের এক প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে কথা বলছেন। খালেদা জিয়া কেন পাকিস্তান সরকার নয়,প্রধানমন্ত্রী নয়, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রী অথবা রাষ্ট্রদুত নয়……দুবে বলছেন,খালেদা জিয়া পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেছিলেন।

    ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কোন কূটনীতিক কী বলবেন যে “হাসিনা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেছিলেন” – এটাই হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ!নাকি শুধু এটা বলাই যথেষ্টের চেয়েও বেশি হবে যে যদি তিনি বলেন হাসিনা “ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেছিলেন”। এটাই কী কোন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্মানের সাথে তুলে ধরার উপযুক্ত পথ নয়? মিঃ দুবে আপনি খালেদা জিয়াকে অপমান করতে চাইছেন কেন?

    তাহলে মিঃ দুবে, খালেদা জিয়াকে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার পর্যায়ের প্রটোকলে নামাচ্ছেন। কেন? নাকি তাঁকে নিচা দেখাতেই হবে এটাই আপনার এসাইনমেন্ট? তাই কী?
    এতে একজন সাবেক কূটনীতিক হিসাবে কুটনীতিক দুবের কী সম্মান বেড়েছে? নাকি তিনি মরিয়া, অর্থকষ্টে আছেন কী? এত নিচে নিজেকে নামান কীভাবে?

    দুবে-রা এমন ডেসপারেট হয়ে উঠছেন কেন? সেজন্য এখন মনে হচ্ছে হাসিনার বাংলাদেশ ভারতকে আসলেই বড় ধাক্কা দিয়েছে। কাদায় ফেলে দিয়েছেন! সেজন্যই কী মোদীর সরকার শুভজ্যোতি ঘোষ, বিবিসি আর মিঃ দুবে ইত্যাদি যাদেরকেই পেয়েছেন সবাইকে খেপ মারতে কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন হাসিনার মন পাওয়া বা মন গলানোর জন্য? ভেবেছে জিয়া ও খালেদা জিয়া কত খারাপ সে বন্দনাগুলো তুলে ধরলে হাসিনার মন পাবে ভারত? এদেরকে আর কী বলব? বেচারা!

    কোন কাজ করতে গেলে আগে কিছু হোমওয়ার্ক করে নিতে জানতে হয়। মিঃ দুবে এসবেরও যোগ্য নয়। গত ২০০১ সালের নির্বাচনের পরে অনেক সময়ই হাসিনা আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক “কথার লড়াইয়ে” অভিযোগ করা শুরু করেছিলেন যে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানেরা (মানে খালেদা জিয়া বা বিএনপি) ভারতকে গ্যাস বিক্রি করতে মুচলেকার বিনিময়ে ক্ষমতায় এসেছেন। আর সেই থেকে হাসিনা প্রায়ই এমন অভিযোগ করে থাকেন। কিন্তু মিঃ দুবে মনে হচ্ছে একেবারেই বেখবর আছেন। এই খবরটাই রাখেন নাই। এখন বলেন, মিঃ দুবে আপনি একই মুরগি কয়বার জবহ দিবেন? নাকি দেওয়া যায়? হাসিনা বলে আসছেন এটা খালেদা জিয়া আর আপনি এখন দাবি করছেন এটা জিয়াউর রহমান! কী তামশা!
    আবার মিঃ দুবের খেয়াল রাখা উচিত হাসিনার অভিযোগটা ছিল উলটা ভারত ও আমেরিকার উপরে।শিরোনামটাই লক্ষ্য করেন। হাসিনা বলেছিলেন,  আ.লীগকে হারাতে একজোট হয়েছিল ভারত-যুক্তরাষ্ট্র।  কাজেই মিঃ দুবে এখন কোথায় পালাবেন? এজন্যই বলছিলাম হোমওয়ার্ক না করে কোন কুটনীতিক দূরে থাকে কোন বুদ্ধিমান মানুষই কাজে নামে না।  মিঃ দুবে এখন বলেন যে অভিযোগ আপনার দেশের বিরুদ্ধে হাসিনা তুলেছেন সেই অভিযোগ এখন খোদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার বিরুদ্ধে আপনিও তুলতেছেন!  এজন্যই আপনি বেচারা হবেন!

    আগে বাংলাদেশের বেড়ে উঠার ইতিহাস জেনে নেনঃ
    আর মিঃ দুবে আপনি দু-এক বছর রাষ্ট্রদুত থাকলেও সত্তরের দশকের বাংলাদেশ সম্পর্কে ওর সমসাময়িক পটভুমি সম্পর্কে আপনার নুন্যতম ধারণাও নাই। প্রথমত সে সময়ে গ্যাস যে বিদেশে বেচা যায় সেটাই রাজনীতির পাড়ায় জানা ছিল না। আর ওদিকে আমাদের গ্যাসের চাহিদা ছিল খুবই কম আর আমরা তখন ডাঙ্গা মাটির নিচের গ্যাসই ব্যবহার করে কখন তা শেষ হতে পারে তা আমাদের মনে হত না। কারণ এরশাদের আমলে বিশ্বব্যাংকের সংস্কারের ফলেই আমাদের অর্থনীতির আকার প্রথম বড় হয়। তাই গ্যাসের চাহিদা বাড়ে, একমাত্র তখনই উপকুলে সাঙ্গুর গ্যাস তুলবার প্রসঙ্গ প্রথম সামনে আসে।

    আর সবচেয়ে বড় কথা ১৯৮০ এর দশকের আগে মানে এরশাদের ক্ষমতাদখল নিবার আগের রাজনৈতিক পরিবেশ আর পরের মধ্যে ্প্রথম আমরা আকাশ-পাতাল ফারাক হয়ে যেতে দেখি। সাধারণভাবে সেকালের রাজনীতিতে আর বিশেষ করে ছাত্র রাজনীতিতে অসততা বা কোন আদর্শ মেনে না চলার ঝোঁক – এমন দেখতে পাওয়া সম্ভব ছিল না। রাজনীতি তখনও সমাজে অনেক পবিত্র জ্ঞান আর মর্যাদা পেত। সেটা খুব সম্ভবত একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের অল্প-পরবর্তিকালের কারণে। আর এটাকেই পরিকল্পিতভাবে এরশাদকে ভাঙতে হয় কারণ তিনি প্রথমত সামরিক সরকার বলে গণবিচ্ছিন্ন ছিলেন। আবার এর চেয়েও বড় কথা বিশ্বব্যাংকও চায় নাই তার নেতৃত্বের ঐ অর্থনৈতিক সংস্কারে “পাবলিক সংশ্লিষ্ট” হোক – এসব মিলিয়ে নিজেকে সারভাইভ করাতেই শাসক এরশাদ অর্থলাভের লোভে বা বিনিময়ে ছাত্র রাজনীতির সুচনা করেন। এছাড়া এসব থেকেই দুর্নীতি ক্রমশ সমাজে চোখে পড়ার মত জেঁকে বসতে থাকে। আর এর আরেক সবচেয়ে বড় কারণ খারাপ আমলারা আর “নির্বাচিতদের জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা দেও” – এনজিও-সুশীলেরা এই ভুয়া অবুঝ শ্লোগানটা ভুল ভাবে দেওয়ায় বিশেষ করে “পারটিসিপেটরি গণতন্ত্র” নামে সোনার পাথরের বাটি বুঝের ততপরতায় পুরা প্রশাসনকে দুর্নীতিতে ভরপুর করে তোলা হয়েছিল।

    কাজেই ৭৯-৮০ সালের জিয়ার যুগে বাংলাদেশের রাজনীতি পকেট ভর্তি করার কালে প্রবেশই করে নাই। আবার তখন কমিউনিস্টরাও সমাজে যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিল, বিশেষত নৈতিক রাজনীতির ব্যাপারে। আর তাতে সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক কমান্ডে কমিউনিস্ট কতৃত্ব তখনও খুবই শক্তিশালী ছিল। বলা যায় ১৯৮৫ সালের পর থেকে এটা হেরে-ম্লান হয়ে যেতে শুরু করেছিল।

    আবার মূল কথা যারা জিয়াউর রহমানের রাজনীতির ও শাসনকালের বহু দোষত্রুটি থাকতেই পারে। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে নুন্যতম যিনি জানেন না তারা জিয়া সম্পর্কে এসব লুজ-টক অবলীলায় বলতে পারেন। এর পিছনের মূল কারণ সম্ভবত, তখনও বাংলাদেশে সমাজে বৃটিশ আমল থেকে কাজ করে আসা ভ্যালুজ যা রাষ্ট্র সরকারে পাবলিক স্বার্থ প্রসঙ্গে সেই মূল্যবোধ তখনও যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। বড় ভাবে ভেঙ্গে পরে নাই। আমলারা অদক্ষ হতে পারে কিন্তু কিছু মূল্যবোধ তাদের উপর তখনও কাজ করত। জিয়াউর রহমানকে আমরা  “সেই মুল্যবোধের আদর্শ রাজ-কর্মচারি” টাইপ ভাবতে পারি বা বলতে পারি। এটাকেই এরশাদের হাতে প্রশাসনিক সংস্কারের নামে আর পারটিসিপেটরির নামে পুরাপুরি দুর্নিতিতে ডুবিয়ে দেওয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল। বাস্তবে তাই কাগজ কলমে প্রশাসনিক বিজনেস রুল বদলে যায় পুরা আশির দশকের মধ্যেই। আর এর সবর্ত্র প্রয়োগে দুর্নীতি ছড়ায় ৯১ সালের পরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্বে ও প্রশাসন ও রাজনীতিকের যৌথ উদ্যোগে। মূল কারণ, কেউ নির্বাচিত হলেই যেন সব মাফ তিনি সব দুর্নীতির নায়ক হতে পারেন, সরকারের স্টান্ডিং রুল বলে কিছু থাকার আর দরকার নাই। সেগুলো নাকি আমলাতন্ত্র। আমলাতন্ত্র অরিজিনালি একটা পজিটিভ শব্দ সেটাই এসব পেটিমধ্যবিত্ত কমিউনিষ্ট জানে নাই – এদিকটা অর্ধশিক্ষিত সুশীলেরা কেউ বুঝে নাই।

    কাজেই প্রেসিডেন্ট  জিয়া সম্পর্কে মিঃ দুবে যা বলেছেন এসব হাল্কা প্রপাগান্ডা এগুলো কোন সাবেক কূটনীতিকের বক্তব্য বলে ভাবা কঠিন। আবার সেগুলো এমন উদ্দেশ্যমূলক গীবত যে মনে হয় না যে সরকারও সেটা গ্রহণে আগ্রহ দেখাবে বা তার আকাজে লাগবে।

    ওদিকে জিয়ার আমলের ভারতের সঙ্গে হওয়া বিভিন্ন চুক্তি প্রসঙ্গেঃ নেহেরুর কংগ্রেস মূলত একটা কলোনিদখলদারি মনোভাবের দল ও সরকার ছিল। এর মূল কারণ সম্ভবত নেহেরুর ভয় যে দাবড়ে রেখে শাসন করলেই একমাত্র পাবলিককে একসাথে ধরে যাখা যায়। নইলে ভারতের ২৮/২৯ রাজ্যকে একসাথে ভারতে ধরে রাখা যাবে না। ভারত ভেঙ্গে যাবে। এই ছিল নেহেরুর সবচেয়ে করুণ রাজনৈতিক অনুমান বা বিশ্বাস। আর ততই তিনি ছিলেন সমকালীন আন্তর্জাতিক আইন, নীতি কনভেনশন সম্পর্কে অজ্ঞ। তাই নেহেরুর ভারত কখনই পড়শি কাউকে তার ন্যায্য আইনগত পাওনা দেয় নাই। ইতিবাচক ডিল করা যায় কিভাবে তাই তিনি জানতেন না। ডিল বলতে কেবল রাজা-প্রজার ডিলই বুঝতেন। সেকারণেই ভাটির দেশ হিসাবে আমাদের ন্যায্য পাওনার পানি, সেটা আমরা দুবারই পেয়েছি বিশেষত যখন কংগ্রেস সরকারে ছিল না। জিয়ার আমলটা ছিল মোরারজি দেশাইয়ের আমল,তাই পানি পেয়েছিলাম। এটাই মূল সুত্র। কাজেই মিঃ দুবের মনে করার কোন কারণ নাই যে আমরা ভারত সম্পর্কে বুঝা জানাশুনা রাখি না।

    আর গ্যাস নিয়ে আরেকটা আসল কথা বলা যাক। বাংলাদেশে কখনই এমন প্রমাণিত গ্যাস রিজার্ভ ছিল না যা নিয়ে রপ্তানির কথা ভাবা যায়। এই হল বটম অব দা ফ্যাক্টস। এখন ধরা যাক জিয়া এবং খালেদা দুজনই খালি গ্যাস বিক্রি করে দিতে চান এমন খারাপ মানুষ ছিলেন। কিন্তু এখন প্রশ্ন হল, তাহলে ভারত সেসব কথা বিশ্বাস করেছিল কেন? তার মানে ভারতের নিজের ইন্টেলিজেন্স ছিল না? সে জানতই না যে বাংলাদেশের রিজার্ভের অবস্থা কী? তাহলে এই ভারত লইয়া দুবে-রা কী করিবে? কতদুর যাইবে?

    তবে আগামিতে ভারতের পররাষ্ট্র বা গোয়েন্দা বিভাগ মিঃ দুবেদেরকে দিয়ে ঠিক এর উলটা কথা বলাতেও পারে যে, “হাসিনাকে ভারত সরকার কখনও বিশ্বাস করে নাই”। সেটা কী খুব অমূলক হবে? মনে হচ্ছে না! তবে সেটা অন্য আরেকটা মি.দুবে নিয়ে এসে এরপর তাকে দিয়ে বলাতে পারে। ভারত-বাংলাদেশের “সম্পর্কে ফাটল দেখা” দেক আর নাই দেক, সবকিছু হঠাত চিতপট হয়ে উলটে যাওয়া মোটেও অবিশ্বাস্য নয়। কারণ, সময়টাই অস্থির…।

    তবে মিঃ দুবে, আপনার এই ভুয়া সাফাই বা খালেদা জিয়াকে নিয়ে অশোভন কটু কথা বলা, এর ফল একদিন তাকে ভোগ করতে হতে পারে। সেদিন এটা তিনিসহ পুরা ভারতেরই বিরুদ্ধে চলে যাবে। কোন পেশাদার কূটনীতিক তাই এমন আচরণ কখনও করেন। রাষ্ট্রস্বার্থ মূলত খুবই ডেলিকেট জিনিষ। কূটনীতিক আচরণ তাই ঠাট্টা নয়। মানানসই কূটনীতিক আচরণের ব্যাপারে তাদেরকে সেকারণে সবসময় সতর্ক থাকতেই হয়। তবে জিয়া বা খালেদার বিরুদ্ধে বলতে পেরেছেন বলেই হাসিনা তাঁদেরকে পছন্দ করবেন এই অনুমানের ভিত্তি নাই। মিঃ দুবে সেক্ষেত্রে দুকূল হারানো এক “বেচারা” হয়ে যেতে পারেন!

     

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    ৩১ মে ২০২১
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধিতা কেন করতে হবেই

    ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধিতা কেন করতে হবেই

    গৌতম দাস

    ৩১ মে ২০২১, ০০:০৫  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3zf

     

    Pro-Palestinian protesters seen on O’Connell Street, Dublin, 

    কেন আমরা ইসরাইলের বিরোধিতা করি এবং করে যাবো? বাংলাদেশে আমাদের প্রায় নব্বই ভাগ জনগোষ্ঠি মুসলমান আর ফিলিস্তিনিরাও মুসলমান। তাই আমাদের মুসলমান নাগরিকেরা ধর্মীয় দায়িত্ব অনুভব করে যে ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানোর।  আর তাই ফিলিস্তিনিদেরই ঘাড়ের ওপর বসে তাদেরকে বঞ্চিত করে কেবল ইহুদিদের জন্য বানানো জুলুমবাজ ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা – এই হল আমাদের সাধারণ মানুষের ধর্মতাত্ত্বিক বোধ ও কর্তব্য। ফিলিস্তিনিদের লড়াই সংগ্রাম সমর্থন করে যাওয়া আমাদের কাজ। এটা ধর্মতাত্বিক দিক থেকে খুবই শক্ত এক পদক্ষেপ ও শক্ত আর্গুমেন্টও এবং সবার উপরে এটা ফিলিস্তিনিদের পক্ষে এক ব্যাপক জনসমর্থন জোগানোর দিক থেকে খুবই কার্যকর উপায়!

    কিন্তু তবু অন্যান্য দিকেরও তৎপরতা এবং পালটা শক্ত বয়ান ও পয়েন্ট আমাদের দরকার আছে। কারণ এটা কলোনি যুগ পেরিয়ে অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রের যুগ এবং গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা বলতে যা আমরা সামনে দেখি তা এক অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাই – এমন এক গ্লোবাল সময়ে আমরা বসবাস করছি। এর কেন্দ্রে আছে কলোনিমুক্ত রাষ্ট্রগুলোর এক প্রভাবশালী অ্যাসোসিয়েশন, নাম তার ‘জাতিসঙ্ঘ’। জাতিসঙ্ঘের অনেক দুর্বলতা, অক্ষমতা ও অকর্মণ্যতা এবং সর্বোপরি, ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ার সমস্যা সবই আছে, কথা সত্য। কিন্তু এসব সত্ত্বেও জাতিসঙ্ঘই কমান্ড করে বলে দিতে পারে, কাউকে কলোনি দখল করে শাসন করা অবৈধ। সাদ্দাম-পরবর্তী ইরাককে বুশের দখল করে নেয়া তাই জাতিসঙ্ঘের চোখে ‘অবৈধ দখল’ ছিল এবং কফি আনান তা পাবলিকলি ঘোষণা করে বলে দিয়েছিলেন।
    আবার, ১৯৪৭ সালে কাশ্মিরের রাজাও কাশ্মির ভারতের সঙ্গে যুক্ত ও বিলীন হতে চায় বলে কাগজে সই করেছিলেন। কিন্তু জাতিসঙ্ঘ তা মানে নাই, অবৈধ মনে করেছিল। কারণ জাতিসংঘের জন্ম ম্যান্ডেট মনে করে, কাশ্মিরের পক্ষে এই সিদ্ধান্ত নেয়ার একমাত্র বৈধ অধিকারী কাশ্মির-ভূখণ্ডের বাসিন্দা জনগণ, ফলে গণভোট করে তাদের রায় জেনে নিয়ে তা অনুসরণ করতে হবে। অতএব, আধুনিক রাষ্ট্র ও এর কাঠামোগুলোর গুরুত্বও বুঝতে হবে।
    আবার ধরা যাক হয়ত, আপনার মাথায় রাষ্ট্র বিষয়ে অনেক ভারী তত্ত্বকথা আছে বলে আপনি মনে করেন। কিন্তু দয়া করা উপস্থিত আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাটার কোনো অর্জন নেই, কিছু হয় নাই, কিচ্ছু না, বলে এর বিরুদ্ধে কামান দাগার কাজ হাতে নেবেন না। এটা অপ্রয়োজনীয়। আপনি নতুন যা করতে চান, যে নতুন ক্ষমতা কায়েম করতে চান তা করুন- সেজন্য এখন তা নিয়ে প্রচার, বুঝানো, হেদায়েত সব করতে থাকুন আর সে কাজে জাতিসঙ্ঘসহ এই আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাটা আপনার পক্ষে যতটা সম্ভব ব্যবহার করেই তা করতে থাকুন। পরে নিজে ক্ষমতাবান হয়ে গেলে পুরান সবকিছু বদলে ফেলতে এরা কেউ বাধা হবে না। সোজা কথা বর্তমানের অর্জনকে ফেলে দিয়ে পায়ে মাড়িয়ে এগিয়ে যেতে চাইবেন না। বরং বলতে পারেন, এটা যথেষ্ট অর্জন হয়নি। আরোঅনেক কিছু করতে হবে। কিন্তু দয়া করে এটা বলবেন না যে, এটা কোনই অর্জন নয়।

    এখন আসুন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা মোতাবেকই ইসরাইল রাষ্ট্র কেন ভেঙে দেয়া উচিত – সেসব বুঝে নেয়ার চেষ্টা করি। মনে রাখতে হবে, ইসরাইল টিকে আছে (যেভাবেই হোক) মূলত নিজের পক্ষে এক গ্লোবাল সমর্থন জোগাড় করতে সক্ষম হয়ে আছে বলে। কাজেই আমাদেরও ঐ গ্লোবাল সমর্থন ভাঙতে হবে, আর পালটা সমর্থন যোগাড় করতে হবে। কখন ও কিভাবে? আমেরিকার নেতৃত্বের এই গ্লোবাল সমর্থকদের দুর্বলতার জায়গায় আঘাত করতে হবে যখন এরা নিজেই দুর্বল থাকবে। আর সেক্ষেত্রে ঠিক তার দুর্বলতার জায়গাটা হল – আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার চোখেই ইসরাইল অন্যায্য রাষ্ট্র – এই কথা সর্বত্র তুলে ধরতে হবে এবং এমন এক সময়ে যখন আমেরিকা নিজেই তার গ্লোবাল নেতৃত্ব ধরে রাখার ক্ষেত্রে হিমশিম বেকায়দায়। ফলে গ্লোবাল নতুন মেরুকরণ দুনিয়াজুড়ে আসন্ন হয়ে উঠছে যখন তখনই সে কাজের সবচেয়ে ভালো সময়।

    আধুনিক রাষ্ট্রের কী কী বৈশিষ্ট্য ইসরাইল লঙ্ঘন করেঃ
    আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাষ্ট্রকে বলতে এক রিপাবলিকই বুঝায় আর তাকে  রিপাবলিকই হতে হয়। রিপাবলিক মানে যেখানে ক্ষমতার উৎস জনগণ। অর্থাৎ এর পাল্টা হল রাজা-সম্রাটের দেশ মানে কোনো রাজতান্ত্রিক শাসন তা নয়। তাহলে জাতিসঙ্ঘ রাজতান্ত্রিক দেশকে কি সদস্যপদ দেয় না? দেয়, অবশ্যই দেয়। কিন্তু যখনই কোনো রাজার দেশের রাজক্ষমতা কখনো ওর নিজ জনগণের চোখে টালমাটাল বা চ্যালেঞ্জ হয়ে যায় তখনই কেবল জাতিসঙ্ঘ ওকে টেকনিক্যাল সহায়তা করে যাতে সে নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্র হয়ে উঠে এমন সাহায্য করে। তবে সাবধান, যত দিন তা বাদশাহর দেশ থাকে তত দিন আবার তাকে বদলাবার কাজ জাতিসঙ্ঘের নয়। সেকাজ ওর আভ্যন্তরীণ জনগণের।  তাই রিপাবলিক রাষ্ট্র না হয়েও কোনো রাজশাসন জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ পেতে পারে। তবে রাজশাসনকেও রিপাবলিক সদস্য রাষ্ট্রের জন্য জাতিসঙ্ঘের সব আইন, নিয়ম ও কনভেনশন এবং মানবাধিকারসহ যা কিছু আছে সেগুলো মেনে চলতে প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। এই কারণেই দুবাইয়ের প্রিন্সেস লতিফাকে নিয়ে জাতিসঙ্ঘ তাঁর “অধিকার লঙ্ঘনের” জন্য বাদশা-আমীরদের সমালোচনা করছে ও উদ্বেগ জানাতে পারছে।

    অন্য দিকে আবার ঠিক বাদশাহদের মতই কমিউনিস্টরাও মনে করেন, অভ্যন্তরীণভাবে নিজ দেশে ‘হিউম্যান রাইট’ বজায় রাখা তাদের রাজনীতি নয়, এজেন্ডা বা পালনীয় নয়। তবে এমন রাষ্ট্রগুলোর কৌশল হয় (এটা অবশ্য স্বৈরাচারীদেরও কৌশল) সে কথা পাবলিকলি স্বীকার করে না-বলা।  আর  তবুও অমন পরিস্থিতিগুলোতে সরাসরি জাতিসঙ্ঘের ‘হিউম্যান রাইট’ মানি না তা অবশ্যই তারা কোথাও বলে না। বরং কৌশলগতভাবে এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে চলে, যতদূর পারে।

     সেকালে  ইউরোপের ইহুদিরা কেন জায়নিস্ট রাষ্ট্রই চেয়েছিল?
    বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিদ্বেষ ও নৃশংসতার পর এর বিরুদ্ধে কেন মূলত জার্মান ইহুদিরা একটা “জায়নিস্ট” রাষ্ট্র গড়াকে তাদের জন্য রক্ষাকবজ বলে সাব্যস্ত করেছিল? মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আচরণ ও ব্যবহার বড় অদ্ভুত। যেমন, বর্ণবাদিতার চরম অত্যাচার যে সয়েছে তাকে-ই আবার আমরা পাল্টা প্রতিহিংসায় সেই একই বর্ণবাদী হয়ে উঠতে দেখি! এখানে তাদের কাম্য ‘জায়নিস্ট রাষ্ট্র’ মানে কী তা গুরুত্ব দিয়ে আমাদের বুঝতে হবে। এর মানে হল, এটা ‘কেবল ইহুদিদের’ রক্ষার জন্যই একটা রাষ্ট্র হতে হবে। এই ছিল সেকালে তাদের প্রবল বিশ্বাস ও অনুমান। তাদের সেই অনুমানের ভিত্তি থাকুক আর না।

    ফলে স্বভাবতই কেবল ইহুদিদেরই সব ধরনের বাড়তি বা বিশেষ সুবিধা দেয়ার রাষ্ট্র এটাকে হতেই হবে। এই ছিল তাদের দাবি।   এর পক্ষে সাফাই হল, যেহেতু ইহুদিরা এতবড় এক ভিক্টিম তাই  তাদেরকেই বিশেষ সুবিধা দিতেই হবে। আর এখান থেকেই এক মিথ্যা দাবি তারা করে যে, এই জায়নিস্ট রাষ্ট্র এসব সুবিধাদির না পেয়ে থাকলে ইহুদিরা দুনিয়াতে আর কোথাও সুরক্ষিত হবে না, শান্তি পাবে না। অথচ এই দাবি শুধু ভিত্তিহীনই না এটা সম্পুর্ণ অর্থহীন।

    প্রথমত, এটা আসলে একটা মানসিক ট্রমা [trauma] বা আঘাতপ্রাপ্ত মানুষের বক্তব্য। যখন অসুস্থ মানুষটা এমন স্তরে  থাকে তখনকার বক্তব্য। এটা এক ধরনের ট্রমা যা মানুষকে সবসময় নিরাপত্তার অভাববোধে পাগল করে তোলে। আর প্রথমে যা ছিল তাদের নিরাপত্তার অভাববোধে জন্ম নেয়া ট্রমা, পরে সময়ে এর কিছু থিতু হলে সম্ভবত এটাই রূপান্তরিত হয়ে যায় প্রতিহিংসা-স্পৃহায়। সেসময়ের এমন হিটলারি নৃশংসতার পরে সব মানুষের মনেই কমবেশি প্রতিহিংসা-স্পৃহা জেগে ওঠা হয়ত অস্বাভাবিক নয় যদিনা কেউ পরে  কোন সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট বা এক্সসারসাইজের ভেতর  দিয়ে না গিয়ে থাকে; বা আগাম ব্যবস্থা না নেয় এই বলে ও মেনে যে, সে-ই আবার ফিরে কোনো প্রতিহিংসা করতে পারে না, কারণ এটা তাকেও  আরো অসুস্থ বানিয়ে ছাড়বে।

    জায়নিস্ট এক রাষ্ট্রের কল্পনা ও দাবি তাই আসলে অনিরাপত্তা-বোধজনিত ট্রমা থেকে। কারণ কোনো আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কল্পনা ও করণীয় মানেই এর প্রধান কাজ হল, ওদেশের সব নাগরিককে নিরাপত্তা দেয়া। কাজেই ঐ রাষ্ট্রে আলাদা করে জায়নিস্টদের  বিশেষ সুবিধা দেয়া ধরণের  রাষ্ট্রের স্বপ্ন-কামনা, এটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু জায়নিজম বলতে চাচ্ছে সে এতে সন্তুষ্ট নয়; কারণ সে ট্রমাগ্রস্ত; তাই কেবল এই ট্রমাগ্রস্ত ইহুদিদের জন্য আলাদা করে নিরাপত্তাবোধ দেয়ার রাষ্ট্র, এক জায়নিস্ট রাষ্ট্রই, একমাত্র এতেই তাদের আস্থা। তাই এটাই গড়তে হবে।

    তাহলে তাদেরকে বিশেষ সুবিধার একটা রাষ্ট্র গড়তে দিলে অসুবিধা কী?
    অসুবিধা এক. তাদের ট্রমাগ্রস্ততা কাটানোর জন্য সর্বোত্তম উপায় কি একটা সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্টের দুনিয়া সেরা কোন হাসপাতালে তাদেরকে নেয়া? নাকি, একটা ইহুদিবাদী কথিত বিশেষ সুবিধার রাষ্ট্র  গড়তে দেয়া? আশা করি পাঠকেরা বুঝেছেন, এখানে ট্রমাগ্রস্ততার চিকিৎসা একটা ভাল হাসপাতালই দরকার। কোনো জায়নিস্ট রাষ্ট্র নয়। কারণ সমস্যাটা  মানসিক অসুস্থতা, তাই প্রয়োজন ওর জন্য ট্রিটমেন্ট।

    অসুবিধা দুই. জায়নিস্টদেরকে দেয়া বিশেষ সুবিধার রাষ্ট্রনির্মাণের কল্পনা আসলে নিজেই  আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার  বিরুদ্ধ চিন্তা! এটা মৌলিকভাবে বিরোধী। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক অবস্থান বা শর্ত হল, তাকে নাগরিকদের মধ্যে “রাজনৈতিক সাম্য” নিশ্চিত করতেই হয়। রাজনৈতিক অধিকারে সাম্য, যা কোনরকম বৈষম্যহীন এক সাম্য। এখানে কাউকে বিশেষসুবিধা দেয়ার কথাটা আনা মাত্রই তা আর আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার থাকে না; মৌলিকভাবে বিরোধী হয়ে যায়। বরং আপনি নিজের গড়া যেকোন রাষ্ট্রে নিশ্চিত নিরাপত্তা অবশ্যই পেতে পারেন, যদি আপনার রাষ্ট্র ব্যতিক্রমহীনভাবে সবারই নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। আর এতাই রাষ্ট্রের অন্যতম কাজ। কিন্তু আপনি চাচ্ছেন যে – না, আমাকে বিশেষ নিরাপত্তা দিতে হবে কারণ আমি ভিক্টিম। এই হল জায়নবাদিতা – এই অসুস্থ চিন্তার সমস্যার শুরু। আর এর ভিক্টিমহুড তৎপরতা মানে আমি এখন ভিক্টিম বলে ভিক্টিমের প্রতি সমাজের যে সহানুভূতি তৈরি হয় সেইটা বেচে ভিক্টিম এখন খেতে চায়! এটাকেই বলে ‘ভিক্টিমহুড’। অর্থাৎ, বাড়তি সুবিধা নিতে চায়। অন্যকে মারবে-ধরবে এমন যা খুশি করবে এটা চায়…।

    অতএব এখান থেকেই আসছে ইহুদিদের জন্য বিশেষ বাড়তি সুবিধা পাবার ইহুদিবাদী রাষ্ট্র, অথবা হিন্দুত্বের জন্য বিশেষ সুবিধার হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র অথবা এ রকম যেকোনো ধর্মের তা হতে পারে।  আবার ধর্ম ছাড়াও তা হতে পারে। যেমন- বাঙালি জাতিবাদীদের জন্য বিশেষ সুবিধার বাঙালিবাদী রাষ্ট্র। এরা হয়ত দাবি করবে যে সে নিজের জন্য নিরঙ্কুশ এক ক্ষমতা চায়, কম করে দুই যুগ বা বিয়াল্লিশ সাল পর্যন্ত ধরে ক্ষমতায় থাকতে চায়।

    অসুবিধা তিন. জায়নবাদী চিন্তার আরেক বৈশিষ্ট্য হল, সে সর্বজনীনতাকে ভয় পায়, কারণ ভিক্টিমহুডের অজুহাতে ‘বিশেষ’ সুবিধা চায়।  আর বিশেষ বাড়তি সুবিধার উল্টাটা হল সার্বজনীনতা।  কাজেই আপাতত যে ইসরাইলের রাষ্ট্রসীমা আর ওর ভেতরেই যে অরিজিনাল আরব মুসলমানেরা বাস করছে যাদের বের করে দেয়া যায় নাই, তবে তাঁদের জমিসম্পত্তি দখল করে সরকারি পয়সায় সেখানে হাইরাইজ বানিয়ে এরপর তা নিজেরা ভাগ করে খেতে চাওয়ার “ভিক্টিমহুড” বা বাড়তি সুবিধা এটা। কাজেই সর্বজনীন আইন থাকলে তো ঐ আরব মুসলমানেরা ইসরায়েলের ভিতরে বসবাস করলেও জমি হারাবে না। কাজেই ভিক্টিমহুডের আওয়াজে ‘বাড়তি সুবিধা’ নেয়া মানেই হল, অন্যেরটা কেড়েও নেয়া এবং তাদেরকে এক বিচারহীনতায় দিন যাপনে ঠেলে দেওয়া। এ ছাড়া আরো আছে, একইভাবে ইসরাইলের রাষ্ট্রসীমার বাইরেও যেসব ফিলিস্তিনি ভূমি আছে সেগুলোও একইভাবে দখল করা এবং তা একেবারে গায়ের জোরে। এরও সাফাই সেই একই ভিক্টিমহুড, জায়নিস্ট রাষ্ট্রের বাড়তি সুযোগ…।

    আর এটাকেই বলে ‘কলোনি দখল’। সোজা ভাষায় ইসরাইলই একালে মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর দুনিয়াতে যে যাত্রা শুধু করেছিল কলোনি দখল অবৈধ এই আন্তর্জাতিক আইন রীতির ভিত্তিতে – সেই দুনিয়াটাতেই আবার  কলোনি দখলের ব্যবসা, করে খাওয়ার বুদ্ধি আবার শুরু করে দিয়েছে এই জায়নিজম। কেন এভাবে বললাম?

    কারণ আজও বেশির ভাগ মানুষ এমনকি একাদেমিক মানুষও – জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি ও এর ইতিহাস একেবারেই জানে না। ন্যূনতমটাও জানে না। এর জন্য প্রধানত দায়ী তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল যিনি আমাদের ‘কলোনি মালিক’ ছিলেন। তিনি চান নাই যে আমেরিকার কাছে তাঁর নাকেখত দেবার ইতিহাস ও এই  দুর্বলতার কথা জনে জনে জানুক। আর দ্বিতীয়ত দায়ী নেহরুর মত রাজনীতিবিদেরা যারা নিজেরাই এসব ইতিহাস জানেন না, যার অজস্র প্রমাণ দেয়া যায়। যেমন সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল, কাশ্মীর ইস্যুটাকে  জাতিসংঘের নজরে নিয়ে গেছিলেন তিনিই। ভেবেছিলেন রাজা হরি সিং এর ভারতের সাথে যুক্ত ও বিলীন হবার  চিঠি (একসেশন ইন্সট্রুমেন্ট বা মনবাসনা) তার কাছে আছে অতএব জাতিসংঘ নিশ্চয় তার পক্ষে রায় দিবে! এর মানেই হল  জাতিসংঘের জন্মভিত্তি-মূলক বক্তব্য ও অবস্থান নেহেরুও জানেন না, কখনও খবর নেন নাই।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেলট ১৯৪১ সালের আগস্ট পর্যন্ত কোনো পক্ষকেই সমর্থন না করে যুদ্ধের বাইরে নিজ যুক্তরাষ্ট্রকে রেখেছিলেন। কারণ তিনি চেয়েছিলেন সারা দুনিয়াকে কলোনি করে রাখা ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোকে এই যুদ্ধ শেষে কলোনি দখল যুগের অবসান ঘটাতেই হবে। তারা ঘটাবেন –  এই প্রতিশ্রুতি দিলেই কেবল আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসাবে তিনি তাদের পক্ষে হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবেন।

    এই শর্তে প্রথম যিনি এগিয়ে আসেন তিনি হলেন তখনকার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল; কারণ নইলে হিটলারের কাছে হেরে ও পাল্টা দখল হয়ে যেত তার দেশ-ভূমি। তাই ১৪ আগস্ট ১৯৪১ সালে চার্চিল ও রুজভেল্ট আট দফার এক চুক্তি [Atlantic charter] স্বাক্ষর করেছিলেন ; যার প্রথম দফাটাই হল – তারা দুই রাষ্ট্র প্রতিজ্ঞা করছে যে তারা নিজ নিজ মূল ভূখণ্ডের বাইরে কোনো ভূমি দখলে আর যাবে না। এটাই পরে হয়ে যায় কলোনিয়াল-দখল অবৈধ একথার ভিত্তি। কারণ এই চুক্তিটাই পরে আরো দুই রাষ্ট্র স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন আর চিয়াং কাইশেকের চীন (মাওয়ের চীনের আগের রূপ) – এভাবে চার রাষ্ট্র মিলে আবার একসাথে স্বাক্ষরিত হয় ১ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে। আর এটাকেই বলা হয় জাতিসঙ্ঘের ‘জন্ম ঘোষণা’ বা ভিত্তি। একই দিনে আরো প্রায় ২৬টা দেশও এতে স্বাক্ষর করেছিল। আর ওই দিনই আমেরিকা হিটলারের জোটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল এবং হিটলারের জোটসঙ্গী জাপানে আক্রমণ চালিয়েছিল। সেই থেকে এজন্য কলোনি দখল নিষিদ্ধ আর এটাই জাতিসঙ্ঘের প্রতীক। কাজেই জাতিসঙ্ঘের সদস্য থাকতে চাইলে ইসরাইল জায়নিস্ট হতে পারবে না। কারণ জায়নিজম মানেই হল বাড়তি সুবিধা, গায়ের জোরে অন্যের ঘরবাড়ি দখল আর এসবই এক ভিক্টিমহুডের সহানুভুতি উসিলা ও আড়ালে। এককথায় ইসরাইল নতুন করে কলোনি দখল শুরু করেছে।  অবশ্য এসব ছাড়াও অন্যের ভূমি দখলের কারণে ইতোমধ্যেই ইসরাইলের বিরুদ্ধেই নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া রেজুলেশন আছে।

    অসুবিধা চার. লক্ষ করলে দেখা যাবে যারাই জায়নিস্ট বা হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র কায়েম করেছে বা করতে চায় তারা নেশন-স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র ধারণার অনুসারী। জাতিরাষ্ট্র হল প্রথম যুগের আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা এ বিষয়ের মুখ্যচিন্তা। যেমন – আগের রাজতন্ত্র ভেঙে রিপাবলিক গড়তে চাওয়া ইউরোপীয় চিন্তা বাস্তবায়নের শুরু বলা যায় ১৬৪৯ সালের ইংলিশ (ক্রমওয়েলের) রেভিলিউশনকে। এই নতুন রিপাবলিক ধারাই নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে থিতু হয়েছিল আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ইউরোপ হিসাবে আর পরে তা চলেছিল ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। সে সময়ের (১৬০৭-১৯৪৫) ইউরোপীয় বিপ্লবে স্থাপিত নতুন রাষ্ট্রগুলোই রিপাবলিক বা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার শুরু বলা যায়। অর্থাৎ রাজা নয়, জনপ্রতিনিধিরাই ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন এমন রিপাবলিক সেগুলো।

    তবু এরা সবগুলোই ছিল ‘জাতিরাষ্ট্র’ (নেশন-স্টেট বা Nation State) ধরনের রিপাবলিক। মানে আমরা প্রত্যেকে নাগরিক কি না, রাষ্ট্রে আমাদের রাজনৈতিক সাম্য থাকবে কি না, বৈষম্যহীন অধিকার থাকবে কি না- এসব সেখানে উহ্য থাকে এমন রাষ্ট্র। এর বদলে আমরা একটা ‘জাতি’ এই উদগ্র ধারণার প্রাবল্য যেখানে প্রচণ্ড। এই ধারণারই সবচেয়ে বিকশিত ফসল হলো হিটলারের নাৎসিবাদ। এককথায় বললে এই রূপটা ছিল কলোনিদখলের অর্থনীতির সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ রাষ্ট্র-রূপ। মূল কারণ, কম্পাস আর বারুদ আবিস্কারের পরের ইউরোপের প্রধান ব্যবসা ছিল বড় জাহাজ কিনে যুদ্ধ সাজিয়ে কলোনিদখলে বেরিয়ে পড়া।  তেমনই (১৬০০ সালের) এক বড় কোম্পানির নাম হল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যা ভারতে এসেছিল। ইংল্যান্ডে এরই রাজনৈতিক রূপ হল নেশন স্টেট।

    আর আধুনিক রাষ্ট্রের জাতিরাষ্ট্ররূপে এই আদি ধারায় তিনশ’ বছর পরে তা থেকে হিটলারের উত্থান দেখে এর সব  দায়দায়িত্ব ত্যাগ করে বাকিরা নিজ নিজ রাষ্ট্র আমূলে বদলে নেয়। সারা ইউরোপ ১৯৫৩ সালে ৪৭ রাষ্ট্রের এক সম্মেলনের (Council of Europe) মাধ্যমে সবার নিজ রাষ্ট্রভিত্তি বদল করে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নেয়া হয়। সেই থেকে ইউরোপে ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণাটা পরিত্যাজ্য ও ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের এদিকে নেহরুর ভারতসহ বাংলাদেশ এখনো জাতিরাষ্ট্র। এই ধারাতেই জায়নবাদী ইসরাইলও এক জাতিরাষ্ট্র। মূল কারণ উগ্র জাতিবাদী চিন্তা ভালো খোলে ‘জাতিরাষ্ট্র’ এর মধ্যে। আমরা এক ওমুক গর্বের ধর্মীয় বা ভাষার বা জাত-এথিনিসিটির “জাতি” বলে গালগল্প, মিথ্যা শ্রেষ্ঠত্ববোধের সুপ্রীমিস্ট আবেগী সুড়সুড়ি তুলতে পারা যায় সহজেই।  অথচ আমাদের সবার জন্যই এটা ত্যাগ করার সময় পেরিয়ে গেছে সেই পঞ্চাশের দশকেই।

    ইদানিংকালের কিছু মারাত্মক লক্ষণঃ
    ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্মের সময়ে যারা কিশোর বা টিনএজে ছিল তাদেরই সন্তান পেরিয়ে টিনএজ নাতিদের কাল এটা।  ফলে এমনিতেই কেন ইসরায়েল রাষ্ট্র অগ্রহণযোগ্য তা যথেষ্ট স্পষ্ট ছিলনা। ফলে এটা কমিউনিস্টদের সমর্থনের আরব জাতিয়তাবাদ ও হাল্কা ইসলামের কারণে আমরা বুঝতাম যে আমাদের ফিলিস্তিনিদের পক্ষে থাকতে হবে। রাষ্ট্র হিসাবে ইস্রায়েলের মারাত্মক ত্রুটি কী তা চর্চা হতে দেখা যায় নাই কোথাও। অতেব একালে টিনএজ নাতিদের কালে স্রেটা আরও কত দুরবস্তায় যাবে তা অনুমেয়। আমাদের পাসপোর্টে  ইসরায়েলে  যাওয়া যাবে কিনা সেটা ঢাকায় এখন বড় আলোচনার বিষয়। আর ততই ইসরায়েল যাওয়াটাই ঠিক হবে কিনা, ন্যায়-অন্যায়বোধে উচিত হবে কিনা – সেদিকটা ততই ম্লান হয়ে আছে দেখা যাচ্ছে। গত সপ্তাহে এক টকশোতে অংশগ্রহণকারি ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ অধ্যাপকের বক্তব্য ছিল খুবই বিপদজনক। তবে উপরে যা বলেছিল এর ভাল উদাহরণ। তিনি বলছিলেন ইসরায়েল দেশ ঘুরে ফিরে আমাদের দেখার জন্য আমাদের পাসপোর্ট উন্মুক্ত করে দেয়া উচিত। বলা বাহুল্য তা কেউ বিরোরোধিতা করেন নাই, তবে সামাজিক অস্বস্তির কথা খেয়াল রেখে কেউ প্রশংসায় করেন নাই।  আমরা বুঝলাম অধ্যাপক পদ বাগিয়ে ফেললেও জ্জানবুদ্ধি পাকে নাই।  কৌতুহলি টিনএজ পেরিয়ে আমাদেরকে ন্যায়-অন্যায়বোধের শিক্ষা নিতে হয় সেদিকে তিনি বড় হন নাই।

    কুখ্যাত আব্রাহাম একর্ড-এর চাতুরিঃ
    আমার গতবারের লেখায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প- প্রধানমন্ত্রী নেতানেয়াহুর কুখ্যাত আব্রাহাম একর্ড [Abraham Accords ] বা চুক্তির কথা বলেছিলাম। যেটা আসলে ফিলিস্তনিদের স্বার্থ উপেক্ষা করে আরব বাদশা দেশগুলোর সাথে ইসরায়েলের স্বীকৃতি ও সম্পর্ককে কথিত স্বাভাবিকীকরণ উদ্যোগ। তবে আরেকটু বেশি দিকটায় তাকালে দেখা যাবে এটা আসলে চীনের উত্থানে মধ্যপ্রাচ্যের ভারসাম্য বদলে যেমন ইরানের উত্থান ঘটার সম্ভাবনা সেই কারণে ট্রাম্প-নেতানেয়াহু এবং বাদশা এরা সকলেই ভীত। তাই এরই একজোটবদ্ধতার প্রতিক্রিয়া এটা।
    কিন্তু আমাদের এখনকার প্রসঙ্গ এটা নিয়ে ঠিক আপত্তি তোলা নয়, অন্যকিছু। এমনকি এই চুক্তি বাস্তবায়ন হলে কী হবে তাও না। বরং খুবই সহজ। এখানে যে চুক্তিটা স্বাক্ষরিত হয়েছে কোন পয়েন্টে সেই চুক্তিটা কেন গ্রহণযোগ্য নয়, করা যাবে না – সেটা আপনাদেরকে দেখানো।  সেখান থেকেই জানা যাবে ইসরায়েল রাষ্ট্র ও ইহুদীবাদ চিন্তার বিরুদ্ধে আমাদের মুল আপত্তিটা কী!

    The Abraham Accords Declaration:
    We, the undersigned, recognize the importance of maintaining and strengthening peace in the Middle East and around the world based on mutual understanding and coexistence, as well as respect for human dignity and freedom, including religious freedom.
    We encourage efforts to promote interfaith and intercultural dialogue to advance a culture of peace among the three Abrahamic religions and all humanity.
    We believe that the best way to address challenges is through cooperation and dialogue and that developing friendly relations among States advances the interests of lasting peace in the Middle East and around the world.
    We seek tolerance and respect for every person in order to make this world a place where all can enjoy a life of dignity and hope, no matter their race, faith or ethnicity.
    We support science, art, medicine, and commerce to inspire humankind, maximize human potential and bring nations closer together.
    We seek to end radicalization and conflict to provide all children a better future.
    We pursue a vision of peace, security, and prosperity in the Middle East and around the world.
    In this spirit, we warmly welcome and are encouraged by the progress already made in establishing diplomatic relations between Israel and its neighbors in the region under the principles of the Abraham Accords. We are encouraged by the ongoing efforts to consolidate and expand such friendly relations based on shared interests and a shared commitment to a better future.

    উপরের এই চুক্তিতে কেন আরব-ইসরায়েলি বন্ধুত্ব দরকার এর জন্য আবেগী প্রচুর শব্দ ও বাক্য এখানে আছে। এমন কী আব্রাহামিক সুত্রে আরব-ইসরায়ল কেন ভাই বা বন্ধু  সেকথা তুলে আবেগ তৈরি করতে সেটাকেই এই চুক্তির শিরোনাম বানায় ফেলা হয়েছে। একেবারে আবেগে কেন্দে ফেলার অবস্থা!  এই চুক্তি  মাত্র ২৪০ শব্দে তৈরি। আর চুক্তিতে এমন যেসব ভারী শব্দ আছে সেগুলোর নমুনা হল যেমন  ………for human dignity and freedom …… including religious freedom.  all humanity   cooperation and dialogue……… friendly relations   ………no matter their race, faith or ethnicity.  support science, art, medicine, and commerce to inspire humankind ………  a vision of peace, security, and prosperity ………এমনকি শেষে সশস্ত্রতার ও সংঘাত বিরোধিতার কথা আছে। অর্থাত …… to end radicalization and conflict – এমন সবকিছুর রেফারেন্স আছে।  বলা যায় দুনিয়ার সব ভাল কথার কিছু বাদ নাই।

    কিন্তু যা নাই তা হল রাজনৈতিক সাম্য, অধিকারের সাম্যতার কোন কথা নাই। কেন নাই?

    কারণ, এটা স্বীকার করে নিলে জায়নিজম আর থাকে না, ইহুদি-ফিলিস্তিনির মধ্যে রাজনৈতিক সাম্যে অধিকারে সমান হয়ে যায়। আর এমন সমান হয়ে গেলে আর ইহুদির জন্য বাড়তি সুবিধা, শ্রেষ্ঠত্ববাদ কিংবা পক্ষপাতিত্বের বিচার ব্যবস্থা ইত্যাদি সবই অচল হয়ে যায়। ভিক্টিমহুড বিক্রি করা খাওয়ার সুযোগ থাকে না।  অথচ এভাবেই রাজনৈতিক অসাম্য রেখেই  জায়নিজম টিকে থাকতে চায়। আর ভাব ধরে ইহুদিবাদীরা সকলের সাথের সম্পর্ক চায়, মিলেজুলে থাকতে চায়। যেন মনে হয় ফিলিস্তিনিরাই সব গল্ডগোলে উতস, অশান্তি করা মানুষ তারা, যারা কেবল  সশস্ত্রতা চায়। অতএব ফিলিস্তিনিরাই জঙ্গী ও টেরর………।

    সবশেষে তামাশার দিকটা হল, যে ইউরোপীয় ইহুদিরা হিটলারি নাৎসিবাদের শিকার হয়েছিল তারাই এরপরে ফিলিস্তিনিদের ওপর সওয়ার হয়ে শুধু নয়, সেই হিটলারকেই কপি করে জায়নবাদিতা চর্চায় ইসরাইল রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে।
    আমরা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিচারেও ইসরাইলের বিরোধিতা করে যাবো কারণ, এই জায়নবাদী রাষ্ট্র আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ন্যূনতম শর্তও পূরণ করেনি। এই রাষ্ট্র নাগরিক বৈষম্যপূর্ণ, রাজনৈতিক অসাম্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা, পক্ষপাতমূলক বিচারব্যবস্থার, সর্বোপরি কলোনি দখল করা ফিরিয়ে আনতে চাওয়া রাষ্ট্র। কাজেই এখানে এসে জায়নিজম=ইসরায়েল এর বিরোধিতা স্রেফ কোনো মুসলিম ইস্যু বলে সীমাবদ্ধ তা আর নয়। এটা যারা দুনিয়ায় রাজনৈতিক সাম্যের প্রতিষ্ঠা দেখতে চান তাদের সবার ইস্যু!
    জায়নিজমের বৈষম্যের প্রতিকার হওয়ার আগে পর্যন্ত ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধিতা তাই আমরা করি এবং করে যাবো!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ২৯ মে  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে    “কেন ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধিতা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারত নাকি সুপারপাওয়ার, এখন তৃতীয় বিশ্বে

    ভারত নাকি সুপারপাওয়ার, এখন তৃতীয় বিশ্বে

    গৌতম দাস

    ১০ মে ২০২১, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3wM

     

     

    India not really a Superpower

    গত ২ মে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি কলকাতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস দলের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। বিজেপির ৭৭ আসনের বিপরীতে তৃণমূল ২১৩ আসন পেয়ে বিধানসভায় জিতেছে। কিন্তু আরএসএস-বিজেপি ব্যাপারটাকে যেন ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট ও সরকারের নির্বাচনের মত পর্যায়ের  বিশাল গুরুত্বের বানিয়ে ছেড়েছিল। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতায় থাকায় বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারি প্রশাসনকে দুমড়ে মুচড়ে কিভাবে সেই ক্ষমতাকে এক রাজ্যের নির্বাচনে চরম অপব্যবহার করতে গিয়ে হারতে পারে এরই নজির হয়ে থাকবে এই নির্বাচন!

    মোদীর কাছে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন কেন গুরুত্বেরঃ
    আরএসএস-বিজেপি এই রাজ্য নির্বাচনকে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা এবং এতে সম্ভবত সর্বোচ্চ অর্থকড়ি ও সময় ঢালার পেছনের কারণ কী?  যেমন একমাসেরও বেশি সময় ধরে  আটপর্ব এইনির্বাচনের শ্লট বানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আর কোথাও আট পর্বে তা হয় নাই। আবার আটপর্ব যে অপ্রয়োজনীয় ছিল এর প্রমাণ কমিশন অজান্তে নিজেই তুলে ধরেছে। পাঁচপর্ব নির্বাচনের পর কোভিড ভাইরাসের প্রভাব বেড়ে যাওয়াতে কমিশন সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছিল। সেখানে বাকি সবভোট একদিনে নিয়ে সব শেষ করার জন্য মমতা প্রস্তাব দিলে  কমিশন টেকনিক্যাল আপত্তির কথা তুলে তা নাকচ করেছিল।  তা হল, একদিনে ভোট নিতে গেলে মোট যে পরিমাণ ফোর্স লাগবে তা এখন সংগ্রহ করার সময় নাই। তাদের এই কথায় প্রমাণিত যে এত মাস জুড়ে নির্বাচন আয়োজনের দরকার ছিল না। কেবল সময় থাকতে ফোর্স সংগ্রহ করলেই হত। তাহলে  নির্বাচনের মাঝের দিনের গ্যাপ এত বেশি রাখা হয়েছিল ইচ্ছা করেই। আর এই “খেয়ালি” ইচ্ছাটা কার খেয়ালে?  এটাই এখন স্পষ্ট এক রাজ্যের নির্বাচনে  মোদী  নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করে রেকর্ড গড়েছেন। যাতে তিনি একমাসের মধ্যে মোট ১৮ দিন কলকাতায় সভা করতে পারেন এবং তা করেছেন। এটাই ক্ষমতার অপব্যবহার আর পশ্চিমবঙ্গের  এবারের  নির্বাচনকে আরএসএস-বিজেপি  কী মাত্রার গুরুত্ব দিয়েছে তার প্রমাণ। তাহলে কথা সোজা, দেখা গেল এবার ‘কলকাতা দখলকে’ আরএসএস-বিজেপি মাত্রারিক্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু সেটাই বা কেন?

    সবাই রাম-পুজারী হিন্দু না, বিজেপির দরকার একই হিন্দুঃ
    ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক দিক থেকে বললে ভারত মানে বৃহত্তর উত্তরপ্রদেশের হিন্দু ভারত- এমন ভাবনার আধিপত্য চলে আসছে।  ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার উপর ভারতের জন্ম থেকেই এই আধিপত্য সবসময় ক্রিয়াশীল থেকে আসছে।  আর তাই এর সাথে দক্ষিণ ভারতের বিরোধের কথা আমরা অনেকে কম-বেশি শুনেছি। দক্ষিণ ভারত হিন্দি জানলে বুঝলেও হিন্দি ব্যবহার করে না চল নাই – একথাও আমরা শুনেছি।
    হায়দরাবাদের (বা অন্ধ্রের) পরে তেলেঙ্গানা থেকে কর্নাটক, তামিলনাড়ু হয়ে কেরালা পর্যন্ত এই দক্ষিণী অঞ্চল একে ভারতের ভাষায় দাক্ষিণাত্য (ডেকান বা Deccan) বলা হয়।  দক্ষিণদিক কথার সংস্কৃত উচ্চারণ ‘দাক্ষিণাত্য’ আর এই খটমটে শব্দ বৃটিশেরা ইংরেজিতে সহজে উচ্চারণ করতে গিয়ে ‘ডেকান’ বানিয়ে ফেলেছে। ভাষার দিক থেকে এই অঞ্চলের চারটা ভাষাকে একসাথে একে দ্রাবিড়ীয় ভাষার অঞ্চল বলে। এটাই হিন্দিবিরোধী ও আর্যবিরোধী দ্রাবিড় সমাজ অঞ্চল। আসলে দাক্ষিণাত্য বলতে বুঝায়, ভারতের দক্ষিণের পুর্ব ও পশ্চিম উপকুল এবং এক বিস্তৃর্ণ উচু মালভুমি ও পর্বতমালা (plateau and mountain ranges) যার সর্বোচ্চটা আনাইমুদি (২৬৯৫ মিটার), এভাবে এই পুরা অঞ্চলকে।  আর এই বিস্তৃর্ণ মালভুমি ও পর্বতমালা এলাকা টপকাতে পারে নাই বলেই উত্তরের আর্য আক্রমণ ও সম্ভাব্যদখল থেকে দক্ষিণ বেঁচে যায়। প্রাচীনকালের সেই লড়াই প্রতিরোধ এবং এর ফলাফল এখনও সক্রিয় ও কার্যকর ফলে ঐতিহাসিক গুরুত্বের। ফলে দক্ষিণ-ভারতের হিন্দি না-বলা এটা শ্রেফ শখ বা কারও খেয়াল মোটেও নয়।
    এছাড়া আরও আছে।  যেমন, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনের পর থেকেই এই দ্রাবিড় সমাজ “ব্রাহ্মণ তাদের সমাজে অপ্রয়োজনীয়” বলে এক সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন করেছিল। ব্রাহ্মণ ছাড়াও বিয়ে করা যাবে বলে আইনও তৈরি করেছিল, যা এখনো চালু আছে। এরই উত্তরসুরি আঞ্চলিক ডিএমকে ও আন্না-ডিএমকে দল। ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার আন্দোলনও করেছিল এই রাজ্যগুলো যার কেন্দ্র ছিল তামিলনারু। [আগ্রহিরা  E V Ramaswami (EVR or “Periyar”) এই ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্ট যেকোন ইতিহাস পড়তে পারেন।] এছাড়াও ১৯৬২ সালে হিন্দিভাষা চাপানোবিরোধী আন্দোলনে জীবন দিয়ে রুখে দেয়ার কারণে আজও ভারতের সুপ্রীম কোর্টের ব্যাখ্যায় ভারতের কনষ্টিটিউশনে উল্লেখিত কোনো “রাষ্ট্রভাষা” নেই – এমন করে রাখা হয়েছে। তবে সরকারি দাপ্তরিক ভাষা আছে আর তা হিন্দি (ঠিক হিন্দি নয় হিন্দুস্থানি) এবং ইংরাজি।  আর্য-হিন্দির আগ্রাসন দক্ষিণে এমন প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। আর একইভাবে  একই রকম আর্য-হিন্দির আগ্রাসন  প্রতিরোধ পেয়েছিল বিহার পেরিয়ে বাংলায় প্রবেশমুখে। তাই বাংলাভাষা টিকে যায়, যদিও প্রাচীন বাংলা অঞ্চলের সেই প্রতিরোধ ভারতের দক্ষিণের মত পর্যায়ের প্রবল ছিল না বলে এর প্রচারও কম হয়েছে। এসব প্রতিরোধের চিহ্ন হয়েই এবং সে কারণে এখনও ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয় বৈশিষ্ট বলতে মেজর তিনটা ধারা দেখতে পাওয়া যাবেই – উওর, দক্ষিণ ও পুর্ব  ধারা বা ঘরানার সঙ্গীত ও নৃত্যধারায়।  অবশ্যই এগুলো এথনোলজি  অর্থে [ethnological] ভারতীয় জাতিবৈশিষ্ঠের ভিতরের মৌলিক ভিন্নতা।  এই ভিন্নতা বলতে আলাদা আলাদা ভাষা, খাদ্যাভাস ইত্যাদিতে এথনিক-ধরণের ভিন্নতাগুলো তো  বটেই এছাড়া আরও ভালভাবে  এই ভিন্নতা  সাংস্কৃতিকভাবেও ধরা যায় যেমন নাচ-গানে, বাদ্যযন্ত্রে, ঘরানায় স্পষ্ট সাংস্কৃতিক ট্রেডিশনের ভিন্নতায়।  তাই এককথায় বললে, তামিলনারুর মত কলকাতাও আর্য-হিন্দিবিরোধী আরেক হাব। এজন্য পশ্চিমবাংলা আরএসএস-বিজেপির আরেক মাথা ব্যাথা।  মূল কারণ আগেও বলেছি বিজেপির রাজনৈতিক এজেন্ডা হল ভারতের রাজ্যগুলোতে এথনোলজি-সাংস্কৃতিক অর্থে তারা ভিন্ন ভিন্ন হিন্দু। বিজেপি সেগুলোর উপর এক রাম-পুজারী হিন্দুত্ব চাপিয়ে দিয়ে সবাইকে বেধে এক হিন্দুত্বের জাতিরাষ্ট্র কায়েম করতে চায়।  হিন্দুত্ববাদের আরএসএস-বিজেপি এবার কলকাতায় রাজ্য নির্বাচনে সেই ‘বাংলা’কে বিজয় মানে, জবরদস্তিতে উপর থেকে এক ইউনিফর্ম হিন্দুত্ব চাপানোর খেয়ালে কলকাতায় এসেছিল। এবং পরাজিত হয়ে গেল। বিজেপির যে হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্বের জাতিবাদ – এটা তারা সারা ভারতে কায়েম করতে চায়। অর্থাৎ এখনকার ভারতের ২৮ রাজ্যের মোট ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠী সনাতন ধর্মাবলম্বী বলা হলেও এরা সাংস্কৃতিক-এথিনিক অর্থে সবাই একই ধরনের হিন্দু নয়। কিন্তু বিজেপির ভাষায় বললে, তারা ভারতের সব রাজ্যের হিন্দুকে “রামের অনুসারী” হিন্দু বানাতে চায়, এমন এক পরিচয়ে বাঁধতে চায়। যাতে এর ফলে ভারত এক হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠত্বের জাতিরাষ্ট্র হয়।

    Supremacist বা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতাঃ
    সারা দুনিয়ায় আমিই সুপ্রীম বা শ্রেষ্ঠ এমন শ্রেষ্ঠত্ববাদি [Supremacist] – এই চিন্তার প্রাবল্য জেগে উঠা দেখেছিলাম আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে জর্মান, ইটালি ও জাপানের মধ্যে যার প্রধান ভোকাল নেতা ছিলেন হিটলার।  আমার জাতটা শ্রেষ্ঠ এই জাতগর্ব বা রেসিজম [Racism] – এই হল সমস্যা ও সংঘাতের শুরুর ভাষ্য বা মিথ্যা সাফাই।  কারণ এরপরেই বলা হবে যে আমিই শ্রেষ্ঠ অতএব তাই আমার কথা তোমাকে শুনে চলতে হবে, আমার অধীনতা মানতে হবে, আমি তোমাকে পুড়িয়ে মারব, গ্যাস চেম্বার করব, তোমাকে কলোনিদখল করব ইত্যাদি। অনেক সময় আবার এই জাত বলতে নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব যেটা হিন্দু বা মুসলমান বা অন্যকোনটা হতে পারে অথবা ‘গায়ের রং’ যেমন হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার – ইত্যাদি হয়ে পারে। এগুলো আমরা কমবেশি দেখেছি বা পরিচিত।
    কিন্তু সাবধান – কেউ হিন্দু মানেই সে রেসিস্ট বা শ্রেষ্ঠত্ববাদি (হিন্দুত্ববাদী) হবেই এমন নিশ্চিত ধরে নেয়াটা খুবই ভুল হবে। কারণ নাও হতে পারে। েকইভাবে, কেউ মুসলমান মানেই সে রেসিস্ট নাও হতে পারে। পাকিস্তানি পাঞ্জাবী মানেই সেও ব্যক্তি হিসাবে রেসিস্ট নাও হতে পারে। উলটা আমি বাঙালি জাতিবাদি এই ভাব ধরে যখন পাকিস্তানিদের “পাকি” বলে ডাকব – এটাই রেসিজম হবে। তাহলে মূল কথাটা হল কেউ কী করে নিজেকে  প্রেজেন্ট বা হাজির করছি, কী দাবি করছি;  বিশেষ করে দলবদ্ধ হয়ে বা রাজনৈতিক দিক থেকে  – এর উপরই নির্ভর করবে  কেউ  শ্রেষ্ঠত্ববাদি বা রেসিস্ট কিনা।  এই বিচারে  আরএসএস-বিজেপির হিন্দুজাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা রেসিজমের দল যারা এখন ভারতে ক্ষমতায়।  আর লক্ষ্য করেন, চেক করে দেখেন সেখানে শ্রেষ্ঠত্ব – আমিই শ্রেষ্ঠ, আমারটাই শ্রেষ্ঠ ইত্যাদি ধরণের ভাব বা ধারণা আছে কি না? যদি থাকে তবে অন্যকে নিন্দা করার আগে নিজেকে সংশোধন করে নেন। অনেক সময় আমরা না-বুঝে, না খেয়াল করে অসচেতনে অনেক কিছু করে বসি।

    আবার আরেক চিহ্ন হল,  রেসিজমের মধ্যে –  শ্রেষ্ঠত্ব, মহান বা বেস্ট এসব শব্দ বা ধারণা থাকবেই। ফলে এখান থেকে বের হতে হবে বা এড়িয়ে থাকতে হবে আমাদের।  বিশ্বযুদ্ধের পরে জাতিসংঘের জন্মের ভিতর দিয়ে এই প্রথম আইডিয়া বা  বয়ান হিসাবে শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা রেসিজমকে ক্রিমিনাল অপরাধ মনে করা হইয়েছে আর তা বলা বাহুল্যই  নিন্দনীয় করা হয়েছে। কিন্তু তবু ব্যবহারিক চর্চায় মনের কোণায় ছোট রূপে হলেও তা এখনও থেকে গেছে শুধু না, তা আরো  প্রকাশ্য হবার চেষ্টা অনেক প্রবল হয়েছে। যার পিছনের মূল কারণ মনে করা হয় যে সময়টা এখন  -“গ্লোবাল সিস্টেমে নেতৃত্বে পালাবদলের”।  সারা দুনিয়া এতদিন বেশিরভাগ সময়েই বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবেই জনবসতি বা সিভিলাইজেশনগুলো শাসিত ও পরিচালিত হয়ে এসেছে। কেবল শেষ প্রায় পাঁচশ বছর বলা যায় কলোনিদখল সুত্রে দুনিয়া পশ্চিমের সিভিলাইজেশনের অধীনে সংগঠিতভাবে অধীনস্ততা চলে গেছিল।  এরই ভিতর আবার য়ারও শেষের ইমিডিয়েট ৭৫ বছর তা দুনিয়ার আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বে কেটেছে। আর এটাতেই পালাবদল আসন্ন হয়ে উঠেছে। কিন্তু এতে  বদল অনিবার্য জেনেও পুরানা শাসনের সুখ যাদের ছাড়তে ও নতুনকে মেনে নিতে ইচ্ছা করছে না এদেরই একটা অংশ এক সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ আকড়ে উঠে দাড়াতে চাইছে। পুরানা গল্পের উস্কানি  – যে আমাদের কতকিছুতে শ্রেষ্ঠত্ব ছিল – এই কথিত অতীত মহান, গ্রেট, বেস্ট এসব শব্দ দিয়ে – এক শ্রেষ্ঠত্ববাদ খাড়া করার জন্য তারা প্রাণপণ চেষ্টা শুরু করেছে। যদিও তারা জানে কারণ আমেরিকান সরকারি গবেষণার সবগুলো ফাইন্ডিংসই (২০০৮ থেকে সর্বশেষ ২০২১ সালেরটা) তাদের জানিয়েছে এই পালাবদল অনিবার্য অবশ্যই কিছুই তারা ঠেকাতে পারবে না কারণ এই পরিবর্তন অবজেকটিভলি নির্ধারিত। সাবজেক্ট বা মানুষের নিয়ন্ত্রণে আর নয়।  কিন্তু তবু মরিয়া হয়ে সাময়িক বিশৃঙ্খলা তৈরিতে কেউ কেউ এগিয়ে আসা বন্ধ করে নাই।

    কেন বিজেপির হিন্দুত্ব বা এক হিন্দু-ভারতের কথিত এক জাতিরাষ্ট্র গড়তে ব্যর্থ হবে?
    এর মূল ব্যবহারিক সমস্যাটা হল,  ভারতের সব রাজ্যের বাসিন্দারা শ্রীরামকে তাদের প্রধান দেবতা মানে না বা তাকে ঘিরে প্রধান দেবতাপূজা বা প্রধান উৎসব উদযাপন করে না। যদিও আবার শ্রীরামকে তারা অমান্য করে ঠিক তাও নয়। অর্থাৎ প্রায় সব রাজ্যেই তাদের নিজস্ব ‘প্রধান দেবতা’ ও সে অনুযায়ী এক প্রধান বার্ষিক উৎসবও আছে। ফলে বাংলায় দুর্গা বনাম রামের একটা প্রধান ভিন্নতা আছে এবং এটা প্রধান বাস্তবতা। শুধু তাই নয়, মনে রাখতে হবে, এটা অন্য কারো দেবতাকে অমান্য করা এর মূল বিষয় নয়। কিন্তু নিজ ভাষা, নিজ শিল্পকলা, নিজ গাথাগল্প সাংস্কৃতিক এ ট্র্যাডিশনে অন্য কোনো রাজ্যের, ন্যূনতম অন্যের হস্তক্ষেপ বা আধিপত্য অথবা ডিকটেট, সামান্য চুল পর্যন্ত কোনো বদল আনা এরা একে অন্যের বেলায় বরদাশত করতেই পারবে না। কারণ এভাবেই তো ভারতে একেকটা রাজ্য স্ব স্ব ভিন্নতা নিয়ে হাজির ও ঐক্য হয়ে হাজির আছে। এভাবেই এরা একেকটা  ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’ অর্থে ভিন্ন ভিন্ন জাতি। যেমন, বাঙালি, উড়িয়া, গুজরাতি, মারাঠি রাজস্থানী  ইত্যাদি এরা ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’ জাতি। ঠিক যেমন কলকাতার বাঙালি ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’  জাতিবোধ নিয়ে তারা সবসময় নিজের মতো হয়ে থাকতে ও উঠতে চাইবে। অথচ সবাই মূলত হিন্দু হলেও এই কালচারাল গভীর ভিন্নতা এটাই বার বার বলছে   আরএসএস-বিজেপির রাজনীতি ভুল ও অকেজো অবাস্তব বলে তা ব্যর্থ হবেই। আর সবচেয়ে বড় কথা এটা অপ্রয়োজনীয়।
    কিন্তু  তবু আরএসএস-বিজেপি  হিন্দুত্বভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের ভারত গড়ার জিদে আটকে থাকা দল, তারা এমন ভারত গড়ে নিজ একক রাজনীতি ও নিয়ন্ত্রণে ভারতকে আনবেই এই জিদের প্রচেষ্টার দল। তাই আরএসএস-বিজেপি বলা যায়, এই রাজ্য নির্বাচনকে এই প্রথম নিয়েছিল দুর্গার ওপর রামের আধিপত্য কায়েম করা যায় কি না এর উদ্যোগ হিসেবে। সেক্ষেত্রে মমতার দলের বিজয়ের তাৎপর্য হল, বাংলা তার দুর্গা আঁকড়ে ধরে বিজেপির হিন্দুত্ব এবং তার রাজনৈতিক ‘রামকে’ পরাজিত করল। এই অর্থে পুরনো আর্য-বাংলা ঐতিহাসিক লড়াইটা আবার বাংলা জিতে রিনিউ করে নিলো।

    এ জন্যই এই নির্বাচন নিয়ে কলকাতার বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নির্বাচনে কেবল তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরাই তৃণমূলকে ভোট দেননি। অর্থাৎ তৃণমুলের  হিন্দু-মুসলমান সমর্থকেরা  মিলেই কেবল তৃণমূলকে ভোট দেননি। এর সাথে আরো আছে বাঙালি অর্থে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট; এমনকি বিজেপির সমর্থকদের একটা বড় অংশ যারা নিজ দল ছেড়ে মমতাকে মানে ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’ বাঙালির পক্ষে ভোট দিয়েছে। এই বিশ্লেষকদের দাবি এটা হয়েছে বলেই মমতার পক্ষে মোট প্রায় ৪৮.৫% ভোট পড়েছে দেখা যাচ্ছে। যেমন আনন্দবাজার লিখেছে, “দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন প্রাপ্তি এবং ভোট শতাংশের হিসেব কষে নির্বাচনী বিশ্লেষকদের একাংশের ব্যাখ্যা, বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-রও একটা অংশের সমর্থন গিয়েছে মমতার ঝুলিতে”।
    এবারের নির্বাচন তাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিজেপির হিন্দুত্বের আধিপত্যের কাছে নত না হওয়া বরং, হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র গড়ার প্রপাগান্ডায় কলকাতার বাঙালিদের সেই পাল্লায় না পড়া। তারা নিজ বাংলা এথনিসিটির অর্থে জাতি রক্ষার লড়াইয়ে রাজনৈতিক শ্রীরামকে পরাজিত করতে এগিয়ে এসেছিল। এই অর্থে বাংলার সাথে লেপ্টে লেগে থেকেছে, তাকে ছেড়ে যেতে রাজি হয়নি। অথচ ব্যাপারটা হলো, বিজেপির ভাষ্যের এক আর্য-হিন্দির রাজনৈতিক ‘রাম’-এর ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র; এ নিয়ে জোরাজুরি করাতেই মমতার জন্য অনেক কিছুই সহজ হয়ে যায় রাজনৈতিক ‘রাম’কে হারানো।

    কিন্তু একারণেই আবার অনেকেই আশঙ্কা করছেন এখন; অনেকে বলছেন এটাই বিজেপির হামলার শেষ নয়। আরএসএস-বিজেপির স্টাইল এভাবে হার স্বীকার করে নেয় না। প্রতিশোধ নিতে তারা ফিরে আসে। সাধারণত এরপর আসে মুসলমান হত্যা-নিপীড়নের হুজুগ নিয়ে। মুসলমান নির্যাতন, দাঙ্গা হত্যা নিপীড়ন করা খুবই সহজ – এই সুযোগ নিয়ে তারা কৌশল সাজিয়ে আসে। কারণ দেখা যায়, আরএসএস-বিজেপির একটা স্থির ধারণা হল যে, ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গায় এক চরম মার-হত্যা-নিপীড়ন দাঙ্গা ঘটানো- এই ‘ভয়ের রাজনীতি’ কায়েম করা তাদের হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের জিগির তোলার উস্কানি ও সাংগঠনিক শ্রীবৃদ্ধির প্রধান অস্ত্র ও উপায়। এটা তারা বিশ্বাস করে থাকে। তাই যখনই ভোটে পরাজয় হয় তখনই তারা এ কৌশলের কথা চিন্তা করে। কারণ নিজেদের পরাজয়ের হতাশাকে তারা প্রতিহিংসা দিয়ে পূরণ করে এগোনোকেই সঠিক কৌশল মনে করে।

    ঠিক যেমন সর্বশেষ দিল্লির রাজ্য নির্বাচনে সেটাই আমরা দেখেছিলাম। সে সময় নাগরিকত্ব ইস্যুতে দিল্লির নির্বাচনে মুসলমানরা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টিকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করলে এরপরে দিল্লিতে মুসলমান পাড়াগুলোতে পরিকল্পিতভাবে দাঙ্গা ও হত্যা, তথা ম্যাসাকার হয়েছিল। দিল্লির কোর্ট-হাইকোর্ট আজো সেসব মামলায় কোনো প্রতিকার করতে পারেনি। অথচ মূল নেতা ‘মিশ্র’ সব ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন। বাংলায় মমতার বিজয়ের পরে এ হামলা হবেই এমন বলার কোন মানে নাই; তবে এটা হবেই না – তা বলাও অবশ্যই ভুল। বরং সব দিকে সচেতন ও সোচ্চার থাকাই সঠিক কাজ।
    কিন্তু বাংলাদেশে একটি ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে ‘কেন্দ্রীয় শাসনের হস্তক্ষেপ’ চেয়ে চার-পাঁচজনের একটা গ্রুপকে মানববন্ধন নামে দাড়াতে দেখছি আমরা। অনেকটা ‘হিন্দুদের জন্য হিন্দুরা’- টাইপের যুক্তিতে এসব আজব দাবি; যেখানে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বাংলাদেশের কেউ কোনো পক্ষের নয়। তাই কলকাতার আরএসএস-বিজেপি ঢাকায় এসে ব্যানার নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে দাঁড়ানো – এগুলো অবশ্যই কোনো ভালো লক্ষণ নয়। ফলে অবিলম্বে সরকারের এ বিষয়ে সতর্কতা, পদক্ষেপ নেয়া ও নজর দেয়া উচিত। কারণ সবশেষে এরা সবাই সংখ্যালঘু অজুহাতে ভিকটিম সেজে নিজেদের সব আকাম কাজের দায় চাপাবে আমাদের সরকারের উপরেই!

    পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের অভিনন্দনঃ
    এদিকে আমাদের প্রথম আলোর দিল্লি সংবাদদাতা সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জয়ের পর দলনেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাঠানো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের অভিনন্দন বার্তা যথেষ্ট আগ্রহ সঞ্চার করেছে। কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, মোমেনের ওই চিঠি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও শাসক দলের অনুসৃত নীতির বিরুদ্ধেও এক প্রচ্ছন্ন বার্তা”। কিন্তু তিনি লিখেছেন এই প্রথম নাকি ভারতে “রাজ্যের নির্বাচনকে ‘ধর্মীয় আধারে’ করার চেষ্টা হয়েছিল। বিজেপি নেতারা ভোট প্রচারে নাকি সরাসরি ‘বিভাজনের নীতিকে’ প্রাধান্য দিয়েছেন”।
    সরি, আপনার দাবি গ্রহণ করতে পারলাম না। প্রথমত, ‘বিভাজনের নীতিকে’ প্রাধান্য দেয়া অথবা ‘ধর্মীয় আধারে’ ভারতের রাজ্য নির্বাচন বিজেপির এটিই প্রথম নয়। কলকাতা তো বটেই এমনকি রাজস্থানের নির্বাচনেও বাংলাদেশের মুসলমানদের ভারতে অনুপ্রবেশের ভুয়া অভিযোগ তুলে ‘তেলাপোকা’ বলা হয়েছে। আজ হঠাৎ করে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পাওয়ার মত অনুভব হতে পারে কারও; তবু এসব একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। বিজেপি কখনো কি লুকিয়েছে যে, সে প্রায়ই মুসলমানদের জন্য দাঙ্গা ও হত্যার আজাব হয়ে আসে না? তার দলের রাজনীতিই তো হল , হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ব বা হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠা এবং ভারতের রাজ্যগুলোর সবাই প্রধান জনগোষ্ঠী হিসেবে সনাতন হিন্দু বলে পরিচিত হলেও বিজেপিসহ যেকোনো শ্রেষ্ঠত্ববাদী দলের এই কমন ফিচার হয় যে, তারা এক একক পরিচয়ে সবাইকে বাঁধতে চাইবেই – এক জাতশ্রেষ্ঠত্ব কায়েম করার চেষ্টা করবেই। যা এক পন্ডশ্রম যদিও! বিজেপি তো এগুলো লুকায় না! কিন্তু যাদের এসব নজরদারি করার কথা সেই নির্বাচন কমিশন বা ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এখানে নজর দিতে রাজি নয়। অথচ ধর্মীয় আধারে বা বিভাজনের নীতিতে ভোট চাওয়া – এটা বিজেপির জন্য দল নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার মত কৃত অপরাধ, তবু  তা তারা করেই চলছে, অবলীলায়। এখন এসব রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের পরিচালকেরা খোদ নিজেদেরই যদি নিজেদের ভারতের নাগরিক নয়, হিন্দু হিসেবে আবিষ্কার ও গর্ব করে থাকেন ও চলেন তবে ভারতের কনস্টিটিউশনে কী লেখা থাকল তাতে কিছুই আসবে যাবে না। উল্লিখিত ব্যক্তিদের মত সাংবাদিকের চোখেও এগুলো কোনো বড় সমস্যা হিসেবে ধরা পড়বেও না।

    উনি আরো লিখেছেন, কলকাতার “ভোটে বিজেপির বিপর্যয় ও তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জয়ের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাঠানো অভিনন্দন বার্তায় সেই স্বস্তির ছোঁয়া স্পষ্টতই পরিলক্ষিত। সেটাই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্তরে আগ্রহ জাগিয়েছে”।
    তাঁর এ’কথাতে বলা যায়, সেটা কলকাতায় যা হয় হোক কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন এ ছাড়া আর কী বলতে পারতেন? তবে তার অবশ্যই ভারতের কাছ থেকে কোনো কিছু আশা করার মত বোকামি করার কিছু নেই! আবার এতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রটোকলের যে ব্যত্যয় নেই তা তো কূটিল কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেছেন আর নিজেই সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন যে, ‘মোমেনের অভিনন্দন বার্তা কূটনৈতিক প্রটোকলের দিক থেকে নিখুঁত”। কাজেই এনিয়ে আমাদের কী আর বলার আছে!

    মোদির বিজেপি ভারতে ক্ষমতাসীন আছে ও নির্বাচন করে যাচ্ছে সাত বছরের বেশি ধরে। তিনি যে ‘এক শ্রীরামের নামে’ [শুধু হিন্দু হলে হবে না] এমন এক পরিচয়ে ভারতের সব রাজ্যের হিন্দুকে নিয়ে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র কায়েম করতে চান সেই মেরুকরণের চেষ্টা তিনি সবসময় করে চলেছেন। কিন্তু সাত বছর ধরে, দেব মুখার্জির মত অনেকেই ব্যাপারটাকে প্রশ্রয়ের চোখেই দেখে এসেছেন।

    বরং এমন ভারতের সাংবাদিক, কূটনীতিক বা একাডেমিশিয়ানের বিরাট কুল – তাদের চোখে  মোদী এখন ‘বিরাট সফল নেতা’। কারণ এদের চোখে তিনি নাকি ভারতকে এক “পরাশক্তির প্রায় কাছাকাছি’ পর্যায়ে নিয়ে গেছেন বলে অনেকেই মনে করছেন। তাই সেই মোদী বাঙালির দুর্গার উপর ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদী’ চাপালেন কি না বা কোনো ‘ধর্মীয় বিভাজন’ টেনে ভোটের জোশ তৈরি করলেন কি না তাতে তাদের কী আসে যায়! বরং মোদী বলতে চেয়েছেন – ন্যায়-অন্যায় ইনসাফ বোধ এসব কোনো ভিত্তি নয়। বরং অন্যায়কারী হিন্দু হলেই সে আপনার ভাই, তার পাশে দাঁড়াতে হবে। এই হলো মোদীর আরএসএস-বিজেপির রাজনীতির ভিত্তি।
    এতে মোদীর এই রাজনীতিতে যদি কলকাতায় একটি দাঙ্গা ও হত্যাযজ্ঞের আয়োজন করে ফেলতে পারে , তাতে বাংলাদেশের হিন্দুদের কোন স্বার্থটা উদ্ধার পাবে? নিজেকে রক্ষা পারবে কেন? কার দয়ায়? না, এ নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই। চিন্তা করতেই রাজি না। এছাড়া কোনো কেন্দ্র থেকে কোনো মোদি কি তাদের বাঁচাতে আসবেন? আর আমাদের সরকার এ-কোন মোদীর ভারতকে করিডোরসহ অসংখ্য সুযোগ সুবিধা খুলে দিবে যে কলকাতায় একটা দাঙ্গা ও হত্যার আয়োজন করতে চায়?

    অতএব যেখানে বসে যে যা বলছেন তা চিন্তা করে দায়-দায়িত্ব নিয়েই মুখ খুলবেন – এটাই আমরা সকলকেই আগাম সতর্ক করতে পারি!

    বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো এবং বাংলাদেশ পর্যবেক্ষক শ্রীরাধা দত্ত। যতটুকু শুনেছি এটা  আরএসএস-বিজেপির দল ও চিন্তা প্রভাবিত একটি থিংকট্যাংক। সেখানকার শ্রীরাধা বলছেন, ‘ভারতের অঙ্গরাজ্য হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের এক আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিই প্রধান বিবেচ্য।”
    এসব মুখস্থ আপ্তবাক্য বা কথার কথা ভারতে অনেক লেখা হয়েছে। তাই এসব শুনলে আমাদের অস্বস্তি লাগে। পারলে বিজেপির ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদ’ অথবা ‘ধর্মীয় বিভাজন’ রাজনীতি- এর বিরুদ্ধে লিখে দেখান। পারলে পক্ষেও লিখতে পারেন। কিন্তু চুপ থাকবেন না। এ সময় লিপ সার্ভিস দিয়ে পরিবর্তন আসবে না যদিও বাংলাদেশে আমরা আপনাদের উপর আশা রাখি না। আপনাদের মোদীর ভারতরাষ্ট্র ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদ’ থেকে ‘ধর্মীয় বিভাজন’-এর রাজনীতি করে যাবে আর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সব আশা জিইয়ে রাখবেন এটা আর কত চলবে? বা চলতে পারে?  না, চলতে পারে না। এসব বুঝা কী খুব কঠিন!

    ‘পরাশক্তি’ ভারতঃ
    এখন ভারতের সাংবাদিক, কূটনীতিক বা একাডেমিশিয়ানের এক বিরাট দল সব প্রসঙ্গ ছেড়ে এমন প্রচন্ড মোদীভক্ত হয়ে উঠেছেন যে দেখার মত! কেন? তারা কিভাবে মোদীভক্ত হয়েছেন? তাতেই বাকি সবাই নিজে নিজেই বুঝে যাবেন।
    ভারতের এখন বিভিন্ন রাজ্যে করোনা মহামারীতে রোগীদের অক্সিজেনের অভাবে বহু লোকের প্রাণ যাচ্ছে। এছাড়া সরঞ্জাম বেড এমনকি মৃত সতকারে শ্বশানেও পর্যাপ্ত  জায়গা পাওয়ায়ো কঠিন হয়েছে। অর্থাৎ মোদী যে ‘সরকার চালাতে’ গিয়ে একেবারেই ব্যর্থ হয়ে গেছেন – এখানে এসে তা আর কারো থেকে তিনি লুকিয়ে রাখতে পারেননি। এ ব্যাপারটাকে ‘সরকার চালাতে’ না বলে ফরমাল ভাষায় বলা হয় ম্যানেজমেন্ট ফেইলিওর; যার চেয়ে দুনিয়ায় আর বড় ফেল বা পরাজয় নেই।

    ভারতে গত ১৬ বছরের এক ভ্যানিটি বা অহমিকা ভারতের আমলা-রাজনীতিবিদরা চালু করে রেখেছিলেন যে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও বিদেশী সাময়িক সাহায্যও নেয়া যাবে না। কিন্তু কেন কংগ্রেস-বিজেপিসহ সব আমলা-রাজনীতিবিদ সাহায্য না নেয়ার এমন জিদ করেছিলেন? মিলিয়ে দেখুন, ১৬ বছর মানে হলো ২০০৫ সাল থেকে। তার সোজা মানে হলো, বুশের আমলে ভারত যখন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার থেকে ‘চীন ঠেকানোর’ ঠিকা পেয়েছিল, সে সময়ের সিদ্ধান্ত এটা। বাংলাদেশকে অ্যামেরিকার ভারতের হাতে  তুলে দিবার সিদ্ধান্তও এর একটু পরে ঘটেছিল। কিন্তু ভারত সিদ্ধান্ত নেয়, এ সুযোগে নিজেকে এক ‘পরাশক্তি’ হিসেবে অসত্য হলেও তুলে ধরবে, দেখাবে। তাই তারা ১৬ বছর আগে মুরোদে না কুলালেও দুর্যোগেও বিদেশী সাময়িক সাহায্য নেয়া নিষিদ্ধ করেছিল।
    তা হলে এখন সে কথা কেন তুলছি?

    কারণ অক্সিজেন সঙ্কটের শুরুতেই মোদি আর (সাহায্য না নেয়ার) ‘ফুটানিকা ডিব্বা’টা বহন করতে রাজি হননি কিংবা বলা ভালো এটাই তা ত্যাগের মোক্ষম সময় যে এই সুযোগে তিনি ভ্যানিটি ছেড়ে পালিয়ে বাঁচার সুযোগ নিয়ে ফেলেন। সে কারণের যেন মোদী এবার মোট ২০টি দেশের কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণ করেন, যার মধ্যে চীন আছে। এমনকি ক্ষুদ্র ভুটানও।

    আর এতেই তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে সাংবাদিক-ইন্টেলেকচুয়ালরা। এ নিয়ে তাদের মনোভাব সবচেয়ে ভালো পাঠ করা যায় দ্যা প্রিন্টে ছাপা এক আর্টিকেলে। ওর শিরোনামটাই তাদের চিন্তা পাঠ করার জন্য যথেষ্ট। ওই আর্টিকেলের শিরোনাম হল, ‘ভারত কি তৃতীয় বিশ্ব হয়ে ফেরত গেল? মশকরাটা হল, আমাদের পরাশক্তির আকাঙ্খাটা এভাবে কোভিডের হাতে পড়ে ন্যাংটা হয়ে গেল”  [Is India back to being ‘Third World’? Irony of an aspiring superpower exposed by Covid crisis]।

    একই মনোভাব ‘দ্যাহিন্দু’র সুহাসিনী হায়দারের। তিনি প্রায় চ্যালেঞ্জের মত মোদিকে লিখেছেন তিনি কেন বিদেশী সাহায্য নিতে গেলেন? [Why has India accepted foreign aid after 17 years?]  এভাবে লিডিং সাংবাদিককুলের মধ্যে হতাশার ছায়া নেমে আসতে দেখছি আমরা।

    মূল কথাটা হলো, মোদীর ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদ’ থেকে ‘ধর্মীয় বিভাজন’- এসব দিকের জন্য তারা মোদীকে কাঁধে বসিয়ে তুলে ধরতে কোনোই শরম বোধ করেন না। কারণ এই হিন্দুত্বের মোদী তাদের মিথ্যা হলেও পরাশক্তির স্বাদ চাটিয়েছে বলে মনে করে তাঁরা। এখন মোদী সেই মিথ্যা গর্ব বা ভ্যানিটিটা কেড়ে ফেলে দেয়ায়ই তাদের এত হইচই।

    কাজেই হিন্দুত্ব কলকাতায় মার খেয়ে গেল কি না আর তাতে দিল্লির মত কলকাতার মুসলমান মারার উৎসব আসন্ন কি না!  না, এগুলো তাদের অ্যান্টেনার নজরে আসার যোগ্য হয়নি। এই জয় শ্রীরামের জয়জয়কার থেকে ভারতকে কে বাঁচাবে?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৮ মে  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “ভারত এখন তৃতীয় বিশ্ব ” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে,  পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • মমতার উত্থান ও মোদীর হিন্দুত্বের পরাজয়ের তাতপর্য

    মমতার উত্থান ও মোদীর হিন্দুত্বের পরাজয়ের তাতপর্য

    গৌতম দাস

    ০৪ মে ২০২১, ০০:০৩ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3we

     

    ভারতের পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল যার মধ্যে আবার দুই রাজ্য হল আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ, যারা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব আর পশ্চিম সীমানাজুড়ে। এর মানে হল গত পুরা মে মাসে আমাদের হিন্দুত্বের প্রবল প্রপাগান্ডার ভেতরে বসবাস করতে হয়েছিল। তবে এই নির্বাচন শেষে গণনা ও সব ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে, পাঁচ রাজ্যের একই সাথে ২ মে সকাল থেকে। যা এখন প্রায় সব রাজ্যে রাজ্যের পুর্ণফল প্রকাশিত।
    আর  গতকাল ২মে দুপুর তিনটা নাগাদ পরিস্কার হয়ে যায় যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ক্ষমতাসীন তৃণমুল কংগ্রেস দল মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে এককভাবে দুশ-এর বেশি আসন নিয়ে আবার ক্ষমতায় ফিরতেছে।  সর্বশেষ সোমবার রাত সাড়ে সাতটায়, তৃণমূল ২১৩ আর বিজেপি ৭৭ আসন এভাবে আনন্দবাজার ফলাফল দেখাচ্ছে। এদিকে মমতার নিজের নন্দীগ্রাম আসনে তিনি হেরেছেন বলা হচ্ছে। যা তিনি আপাতত মেনে নিয়েছেন তবে আপত্তিসহ এবং তিনি সুপ্রীমকোর্ট পর্যন্ত যাবেন সে হুশিয়ারি দিয়েছেন। এদিকে মমতা আজ সন্ধ্যায়  বলছেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আগামি বুধবার শপথ নেবেন। রাজ্যের প্রাদেশিক সংসদ মানে বিধানসভায় বিজয়ী সদস্য না হলেও ছয় মাস পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী থাকা যায় অস্থায়ীভিত্তিতে। আর যেখানে ঐ ছয়মাসের মধ্যে কোন আসন খালি হলে (মানে  দলের কাউকে পদত্যাগ করিয়ে খালি করে নিয়ে) সেই উপ-নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে এলেই স্থায়ী ও রেগুলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া যায়।
    ওদিকে ৩মে বিকাল পাঁচটায় খবর ছিল, মমতা সাংবাদিক বক্তৃতায় জানিয়েছেন মোট বিজয়ী আসন হতে যাচ্ছে সম্ভবত ২২১। মানে এমন আসন সংখ্যা বা এর কাছাকাছি দেখতে চাওয়া মমতার অনুমান।

    এই ফলাফলের তাতপর্যঃ
    আমাদের সাধারণ মন্তব্য এককথায় বললে সেটা হবেঃ  সারা ভারত না হোক, এটা হল – অন্তত পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদের পরাজয় এবং আরএসএস- বিজেপির হিন্দুত্বকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পাবলিক প্রত্যাখ্যান।  কিন্তু কেন এমন হল এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চারদিক থেকে শুরু হয়ে গেছে, যা হওয়াই স্বাভাবিক। কলকাতার আনন্দবাজার এমনই একটা ভারতীয় বিশ্লেষণ তুলে এনেছে দেখা যাচ্ছে  যা ঠিক তার নিজের নয় তবে সংগৃহীত। নিচে সেটাই এখানে হবহু তুলে  দিচ্ছিঃ
    তৃণমুল দলের “দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন প্রাপ্তি এবং ভোট শতাংশের [এখন পর্যন্ত যা প্রায় ৪৮%] হিসেব কষে নির্বাচনী বিশ্লেষকদের একাংশের ব্যাখ্যা, বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-রও একটা অংশের সমর্থন গিয়েছে মমতার ঝুলিতে। বিজেপি যখন রাজ্যে ধর্মীয় মেরুকরণের প্রচার চালাচ্ছে, মমতা তখন মধ্যবিত্ত, মহিলা এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের একত্রিত করে ফেলেছেন বলেই বিশ্লেষকদের একাংশের মত। তা না হলে এই জয় এবং ভোট শতাংশ তৃণমূলের ঝুলিতে আসা সম্ভব নয় বলেই তাঁদের ধারণা। কারণ, তৃণমূলের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভোট শতাংশপ্রাপ্তি এ বারই”।

    এখানে বিশ্লেষক বলতে যারা বুথফেরত ভোটারদের সাথে কথা বলে একটা জরিপকাজ সমাপ্ত করে থাকেন আর সেই ফলাফলের বিশ্লেষণ হাজির করেন – এনিয়ে তারা পেশাদার কাজ করেন। উপরে তাদের সারকথা হল, মমতার দল কেবল তার রেগুলার সমর্থক ভোটারদেরই ভোট পান নাই। সেটা ছাপিয়েও তিনি অবশ্যই যারা বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-রও একটা অংশের ভোটার এদের অনেকেরও ভোট পেয়েছেন।  কেন পেলেন আর কেন তারা এমন কথা বলছেন কিসের ভিত্তিতে? কারণ তাদের ভিত্তি হল, এমনটা হয়েছে বলেই মমতার দল  এত ভোট (এখনই এটা প্রায় ৪৮% যা গণনার শেষপর্যন্ত ৫০% এর কাছে যাবে বলে অনুমান ) ও আসন পেয়েছেন।

    অনেকে জানেন শুধু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনেই  মোট মুসলমান ভোটার প্রায় ২৭-২৮% হয়ে থাকে। আর এর মধ্যের আবার  বড় অংশটাই ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে তৃণমুল একাই পেয়ে আসছে। তাহলে  মমতার দলের বাক্সে এখনকার সম্ভাব্য  মোট ৫০% ভোটপ্রাপ্তি হতে যাচ্ছে একথার  মানে হল –  মমতা নিজ দল ও সমর্থকদের ভোট ছাড়াও প্রায় সব ধর্মের সমান সংখ্যক সমর্থক ভোটারদের ভোটও মমতার দল যোগাড় করতে এবার সক্ষম হয়েছে।  আর এতেই  মমতা ও তার দল হল পশ্চিমবঙ্গে ধর্ম নির্বিশেষে সেই প্রতীক যারা একটা কমন ধারা, তৃণমুল দলে ভিতর “যাদের ইচ্ছা” সমবেত হয়ে – এমন একটা “মেজরিটি ম্যান্ডেট” তৈরি করেছে। আর মমতা হলেন যে ম্যান্ডেটের বাহক নেতা। তাহলে কী কারণে মমতা নিজ দল ও সমর্থকদের বাইরের ভোটারদেরও টানতে পারলেন?

    অন্যদিকে আরও প্রশ্ন, তাহলে তৃণমুলের নিজে বিজয়ের মধ্য দিয়ে ঠিক কাদেরকে  প্রত্যাখান করলেন? আর কীইবা এই বিজয়ের তাতপর্য?

    ঠিক অখন্ড ভারত না,  আজকের রাজনৈতিক ইন্ডিয়া, এই রাষ্ট্র ২৮ রাজ্যের সমাহার।  কালচারাল দিক থেকে বললে ভারতের মেজরিটি বা ৮০ ভাগ নাগরিক সনাতন ধর্ম অনুসরণ করে থাকেন। কিন্তু তবুও কোন একক “দেবতার” (মানে সবাই একই দেবতার) অনুসারি-পুজারি তারা নয়। বরং রাজ্য-ভিত্তিতে দেখা যায় তাদের  একেক আঞ্চলের আলাদা ‘প্রধান দেবতার পুজার” প্রচলন আছে। এমনকি সেই দেবতার পুজা উতসবকে ঘিরেই আলাদা আলাদা বার্ষিক প্রধান ধর্মীয় উতসব ঐ রাজ্যে পালিত হয়।  অর্থাৎ কলকাতার মত সব রাজ্যে বা সবার প্রধান উতসব ‘দুর্গাপুজা” নয়। কিন্তু এটার সুবিধা-অসুবিধা কী? এটা নিয়ে কথা বলছি কেন?
    কারণ আর কারোই তেমন কোন অসুবিধা না হলেও,  আরএসএস- বিজেপির এতে বিরাট অসুবিধা। কেন? কারণ এরা  যারা রাজনৈতিক এক “হিন্দুত্ব নির্মাণ” করতে চায়, এজেন্ডা নিয়েছে  এবং “হিন্দুত্বের এক জাতিরাষ্ট্র” খাড়া করা ইমাজিন করে; এই নামে ভারতীয়দের সকলকে বাধতে চায় তাদের এমন ২৭ রকম রাজ্য বা  হিন্দুত্ব হলে চলে না।

    তাদের দরকার একটাই রকমের হিন্দুত্ব, প্রাকটিস। তাই আরএসএস- বিজেপির রাজনৈতিক স্ট্রাটেজি ও ব্যাখ্যা হল, ভারতের উত্তরের ওপারে (কথিত আছে ইউরোপ বা জার্মান এরিয়ান থেকে আসা ধারা) সেখান থেকে এসেছে সেই এরিয়ান রেস যা ভারতের আর্য প্রজাতি বলে দাবি করে তারা। আর এমন দাবি করলে সুবিধা হল তাতে সবাই একই উৎসের বলে এই অজুহাতে সকলকে এক সুতায় বাধা যায়, সহজেই। যদিও এই ভারতেই আবার মোট তেত্রিশ কোটি দেবতার বয়ানও বিদ্যমান। আর বড় কঠিন বাস্তবতা হল,  আলাদা আলাদা রাজ্যে প্রধান উতসবের ভিন্নতা – এসবই  আরএসএস- বিজেপি র রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পক্ষে মানে কোন একক হিন্দুত্ব তৈরির পক্ষে সায় দেয় না।  যেখানে এমনকি কালচারালি ভাষার ভিন্নতায় প্রত্যেক রাজ্য ভিন্ন। সেটা তো বটেই এছাড়া আবার যেমন কালচারাল  গান-নাচের বৈশিষ্ঠে তা  মৌলিকভাবেই আলাদা আলাদা ঘরানার। একেবারে বাদ্যযন্ত্রগুলোই আলাদা, রাগ আলাদা স্ব স্ব বৈশিষ্ঠের মহিমায় মহিমান্বিত। যা স্বভাবতই  কোন রাজ্য পরশি কারও তারা অস্বীকার বা অভারল্যাপ হওয়া বা আড়ালে পড়ে যাওয়ার ব্যাপারে খুবই সেনসেটিভ।  এককথায় তারা আঞ্চলিকতার বৈশিষ্ঠে ভরপুর এবং সেদিক থেকেই আলাদা। আর তাতে অন্তত কম করে হলেও মূল তিনটা ভাগে যা ভাগ করা যায়।

    কিন্তু  অন্যদের উপরে উত্তরভারত কেন্দ্রিক আর্য চিন্তাচর্চার জীবন ধারার প্রভাব  প্রাচীনকালে অখন্ড ভারতের আমল থেকে এই উত্তরের  অগ্রযাত্রা ছেয়ে বসলেও ভারতেরই   দুঅঞ্চলে বা জায়গায় প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। যে প্রতিরোধ সে আর পাড় হতে পারে নাই। এক হল দাক্ষিণার্তে [Decan] “দ্রাবিড়ীয়” [Dravidian] প্রতিরোধ আর এদিকে তাদেরই আরেক ধারার মারাঠা-বিহার পেরিয়ে আরো পুবে “বাংলার” প্রবেশমুখে প্রতিরোধ। এি প্রতিরোধ টিকে যাওয়া তাদের আগে থেকে চলে আসা  ভিন্নতার রূপবৈশিষ্ঠের ছাপটাই তাই প্রবল্ভাবে এখনও গান-নাচের ক্লাসিকাল চর্চাতেও স্পষ্ট। ভাষা তো আছেই। কিন্তু এসব ন্যাচারাল হিস্টোরিক্যাল অমিল-বেমিলগুলোকেই আরএসএস- বিজেপি  জবরদস্তিতে অস্বীকার করে এক দাবি করতে চায়, এক বলে দেখাতে চায়। আসলে চায় কথিত এক আর্য-চিন্তা (যা আসলে আরএসএস- বিজেপি এর) এরই আধিপত্য।

    দুনিয়ার সব (ভিতরে ভিতরে বা বাইরেও) জাতিবাদী বা জাতি-রাষ্ট্রবাদীরাই এই একই ভুল করে। এমন পথেই যায়। তারা সবাইকে এক ভাষায় কথা বলাতে চায়, নয়ত একই কালচারে বা একই ধর্মে বা একই দেবতায়। তাদের একেবারেই ভিত্তিহীন কিন্তু তবু দৃঢ় বিশ্বাস এভাবেই মানুষকে নাকি কেবল এক রাষ্ট্রে ধরে রাখা যায় – এক জাতি-রাষ্ট্রে। অথচ দেখা যায় এর বিপরীতে আমেরিকার বয়স আড়াইশ বছর আর সে জাতি-রাষ্টর  নয়।  বরং এটাই এক প্রথম ও সবল এক ফেডারল রাষ্ট্র। যা পঞ্চাশটা বড় বড় সাইজের রাষ্ট্রের ভিন্নতার সমাহার। কাজেই আগের সব জাতি-রাষ্ট্র পরিশেষে যেমন ফেল করেছে ভেঙ্গে গিয়েছে ; আরএসএস- বিজেপি র একই আর্য-হিন্দুত্বে (রামকে প্রতীক করে) এক হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা এটাও প্রত্যাখ্যাত হবে। প্রায় কাছাকাছি সমস্যা কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের। যখন ১৯৯২ সালে ভেঙ্গে ১৫ টুকরা হল তাতে বুঝা গেল কী জবরদস্তি না চলেছিল। যেমন একটা জবরদস্তি হল, সবাইকে রুশ ভাষা শিখানো।

    এমনিতেই বেশীরভাগ  দেশি-বিদেশি মানুষ আরএসএস- বিজেপির  এক হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা এমন প্রজেক্টের কথা জানে না, ধরতেই পারে না।  বিজেপি তাদের চোখে এক আম রাজনৈতিক দলই মনে হয় তাদের কাছে। কলকাতায় কংগ্রেস বা নানা ধরণের বাম যখন একে একে ভেসে গেছে আর একই সাথে আরএসএস- বিজেপির হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনায় প্রবল অর্থ ও রিসোর্স খরচ করে হিন্দুত্বের রাজনীতি সব ছেয়ে ফেলতে সে যখন মরিয়া – এমন সব রাজনীতিকেই এবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিনে রুখে দিয়েছেন একা মমতা।  কেন একা মমতা বলছি? কারণ মমতার বিশ্বস্ত কমরেডদেরকে যখন বিজেপি প্রলোভন দেখিয়ে কেড়ে নিয়ে গেছে ফলে তৃণমুল – সেই দল মানে আক্ষরিক অর্থেই একা মমতা হয়ে গেছে।  একটা তথ্য দেখেন অনেক অর্থ তাতপর্য বুঝা যাবে তাতে। এই নির্বাচনে এবার একা মোদী এক মাসেই ২২ বার এসে জনসভা করেছেন।  মানে প্রায় প্রতিদিন একটার কিছু কম। এথেকে বুঝা যায় কলকাতার এই নির্বাচন মোদী ওতার দলের কাছে কী! সেই নির্বাচনে মমতা এদের সবাইকে পরাজিত করে দিয়েছেন।
    কিন্তু প্রশ্ন হল, মমতা তাহলে তিনি হারালেন কাকে? তিনি হারিয়েছেন উতখাত ও প্রত্যাখান করেছেন – মূলত আরএসএস- বিজেপিকে সাথে তাদের যে হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা আছে সেটাকেও। যেটা গত সাত বছরে ক্রমশ ধেয়ে আসছিল, ছেয়ে বসছিল। কোথাও তেমন কোন শক্ত প্রতিরোধ কেউ তৈরি করতে পারে নাই।  এমনকি দ্রাবিড়িয় এলাকায় অন্তত কোয়ালিশনে হলেও বিজেপি থাকার চেষ্টা করে গেছিল। এজন্যই এটা শ্রেফ একটা তৃণমুল দলের না, একজন মমতার বিজয় নয়। এটা ভারত রাষ্ট্রকে হিন্দুত্বের নামে হিটলারের মত এক তান্ডবের হাত থেকে প্রাথমিকভাবে রক্ষা করা।

    যারা মমতার তিন তারিখে বিকেলের কালিঘাটে তার বাড়ির পাশের সাংবাদিক সম্মেলন দেখেছেন (ফেসবুকে ক্লিপে দেখেছি আমি) তারা খেয়াল করবেন মমতাও এবিষয়ে সেখানে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন এই বিজয় ভারতের জনগণকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কী থেকে? এক উদগ্র হিন্দুত্ব, এক হিন্দুত্বের রাষ্ট্র, সবাই একই এক  টাইট  ইউনিফর্ম-এ – এমনই কিন্তু নতুন করে আরেক নীলচোখের আরিয়ান উগ্র জাতিবাদ, আরেক জার্মান হিটলারের উত্থান হতে চাচ্ছে যেন ! – এসব কিছু থেকে ভারতকে বাঁচিয়ে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, মমতা তাই এই জনগণকে বারবার সালাম আর থ্যাঙ্কস দিচ্ছিলেন। বিপরীতে মমতা বলতে চাচ্ছিলেন সবাইকে একই রকম হিন্দু [আরএসএস- বিজেপির হিন্দু] হতে হবে কেন?

    অথচ ভিন্নতার ঐক্যের হিন্দু হলে অসুবিধা কী? সবাইকে ইউনিফর্ম হিন্দু হতে হবে কেন?  আর জবরদস্তি কেন? এছাড়া হিন্দু ছাড়াও তো অন্যধর্মের নাগরিক আছে, অনেক হিন্দু আরএসএস- বিজেপির হিন্দু নাও হতে চাইতে পারেন, এমনকি কোন রাজনৈতিক হিন্দু হতেই নাও চাইতে পারেন! তারা কোথায় যাবে? অথচ সকলকে নিয়েই এক রাজনৈতিক সাম্যে –  এমন বৈচিত্রগুলোর ঐক্যের এক ভারতীয় নাগরিক হলে হতে চাইলে পারবে না কেন?

    রাজনৈতিক সাম্য মানে নাগরিক হিসাবে সবাই সমান, সম অধিকারে সমান। ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ, গায়ের রং, সমতলি-পাহাড়ি সব ধরণের পরিচয় নির্বিশেষে সমান অধিক্কারের নাগরিক – এই ভিত্তিতে ঢেলে সাজাতে হবে রাষ্ট্রকে। এটাই জাতি-রাষ্ট্রের বিপরীতে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র। সব ভিন্নতাগুলোর ঐক্য গড়ার প্রাথমিক ভিত্তি।

    এদিকে কোভিড সমস্যা মোকাবিলা করতে গয়ে মোদী প্রশাসনের ম্যানেজমেন্ট ব্যর্থতা, এই পটভুমিতে ভারতকে নতুন দিশা আর ঐক্যের পথ দেখানোর সুযোগ ……

    এসব দিকগুলাই হল, তৃণমুলের টানা তৃতীয় বা এবারের বিজয়ের গভীর তাতপর্য।

    গৌতম দাস
    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    ০৪ মে ২০২১

  • না চিকিৎসা না পেটে কিছু – হিন্দুত্ব এখন সব ব্যর্থতাই ঢাকতে অক্ষম

    না চিকিৎসা না পেটে কিছু – হিন্দুত্ব এখন সব ব্যর্থতাই ঢাকতে অক্ষম

    গৌতম দাস

    ২৬ এপ্রিল ২০২১, ০০:০৮

    https://wp.me/p1sCvy-3vl


    সরকার সঙ্কটে। মোদী সরকারের  নির্বাচন কমিশন, সুপ্রীমকোর্ট , মিডিয়া ইত্যাদি এমন প্রধান সব ইনস্টিটিউশনগুলো কোভিড ক্রাইসিসের সময় ভারতকে নিচে নামিয়ে, অকার্যকর করেছে। এক সাক্ষাতকারে এমন মন্তব্য করেছেন ভারতের সুপ্রীমকোর্ট বার এসোসিয়েশনের সাবেক এক প্রেসিডেন্ট, দুষ্মন্ত দুবে।
    আর নিচের ছবিতে, ডঃ রামচন্দ্র গুহ একজন স্বনামধন্য ইতিহাসবিদ তিনিও এক সাক্ষাতকারে বলছেন, মোদী ক্ষমতা-লোভী অসুস্থ [megalomaniac]; আর এটাই  কোভিডকালে ভারতের প্রশাসনিক মিস-হ্যান্ডিলিং পিছনে মোদীর নেতৃত্বের স্টাইল, এটাই প্রধান কারণ। এখানে সাথে দেয়া লিঙ্কগুলো আসলে সাক্ষাতকারের ইউটিউব লিঙ্ক, পাঠক খুলে দেখতে পারেন।

    চারদিকে “হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ব” – এই সুরসুরি  বেচে ক্ষমতা দখল আর এভাবেই ২০১৪ সাল থেকে এতদিন করে খেয়ে আসছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।  কোন ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ববাদ অথবা এমন ধর্ম-ভাষা ইত্যাদির সুরসুরি তুলে নানা কিসিমের জাতিবাদগুলো এভাবেই মানুষের উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজত্ব করে থাকে। তবে আগে ছিল সেটা মোদীর উত্থানের সময়। আর এখন পতনের সময় এর চেয়েও ভয়াবহভাবে তিনি হঠাত পড়তে শুরু করেছেন। ভারতের কোভিড ভাইরাস মোকাবিলা করতে গিয়ে এই দ্বিতীয় ঢেউ [মাল্টিপল  বংশ-প্রজাতির ভাইরাস [variant] একসাথে আবির্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে] এর কালে মোদী সরকারের হিন্দুত্বের চাপাবাজি ও উন্মাদনা তুলে  এবার আর কিছুই ঢাকতে পারছে না। সব ম্যানেজমেন্ট অক্ষমতা আর ব্যর্থতা উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। উপরের সাক্ষাতকারের বক্তাদের বক্তাদের বক্তব্যের সারকথা এটাই।

    A Naga Sadhu, or a Hindu holy man, waves the Indian flag as he takes a dip in the Ganges river during the first Shahi Snan at “Kumbh Mela”, or the Pitcher Festival, in Haridwar, India, March 11, 2021. REUTERS/Anushree Fadnavis

    এদিকে, এটা উত্তরাখন্ড প্রদেশের (আগের উত্তর প্রদেশের অংশ) “হরিদ্বারে কুম্ভমেলা্র” ছবি। এসব ধর্মীয়-স্নান জাতীয় ততপরতার সাথে  [সাধু আর পতাকা এদুই এর মিলন এটা খুবই তালমিল-হীন ] ভারতীয় পতাকার কোন সম্পর্ক এর আগে কখনও দেখা গেছে বলে মনে পড়ে না। সম্ভবত, এটা বিদেশিদেরকেও দেখানো [এই ছবিদুটা আলজাজিরা ও জাকার্তাপোস্ট পত্রিকা থেকে নেয়া] যেন এর উদ্দেশ্য।  এছাড়াও আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হিন্দুত্বের জোশ-জজবা তুলে ভোট আদায়ের সাথে, মানে হিন্দুত্বের রাজনীতির সাথে সাধুগিরির সামাজিক ততপরতা একে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে বলে এমন; যা আগে পুরানা দিনে কখনও দেখা যায় নাই। এখন হচ্ছে এটাই  হিন্দুত্বের ভারতের মোদীর বিরাট নেতি অবদান।  মোদীর আরো বড় অবদান হল কোভিড দ্বিতীয় ঢেউ এর মধ্যেই অভয়দান করে এমন লাখ লাখ লোকের জমায়েতের আয়োজন করতে উতসাহ দেয়া। এই মেলায় এমনকি, এখানে কোন লালার স্যাম্পেল না দিয়েই আপনি কোভিড নেগেটিভ বলে সার্টিফিকেট পেতে পারেন, সে ব্যবস্থা আছে [Testing negative without even giving a sample]। মোদী এখন বুঝতেছেন নিশ্চয়, এখানে কে কাকে আসলেই ফাঁকি দিতে পেরেছিল!

    আবার এর বিপরীতও আছে। কিছু আনন্দবাজারি মাথাব্যাথাও দেখে গিয়েছিল যে,  এক সাধু অভয় দিচ্ছিলেন – ভগবান আছে সব নাকি তিনিই রক্ষা করবেন……“It’s the voice of god, who says nothing will happen. God won’t let anything happen to us. I have full faith,” said Baba Prakash Puri Maharaj।
    আবার মেলার আয়োজক প্রধান  বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বলেছেন, “আমাদের কাছে বিশ্বাস সবথেকে বড়। মা গঙ্গার উপর মানুষের বিশ্বাস রয়েছে বলেই তো এত মানুষ এখানে স্নান করতে এসেছেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন মা গঙ্গা তাঁদের এই অতিমারির হাত থেকে বাঁচাবেন”। এমনকি উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী তীর্থ সিংহ রাওয়াতও বলেছিলেন, ‘‘মানুষের স্বাস্থ্য অবশ্যই গুরুত্ব পাবে। তাই বলে ধর্মকে অবহেলা করতে পারব না”। ভোটের বাজার এতই চড়া।  কারণ, এবার হিন্দুত্বকে পিছনে ফেলে ছাপিয়ে উঠেছে কোভিড পরাক্রমশালী। মানে কোভিডে মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা ফেল করায় আবার গরীবের কাজ ও পেটের বন্দোবস্ত করতে মোদী সরকার ফেল করায়।   অথচ ঠিক উলটা হয়েছিল গতবছর লকডাউনের আগে মারকাজের ইসলামি জমায়েতের বিরুদ্ধে সরকারি একশনে। বিবিসি লিখছে “প্রসঙ্গত, গত বছরের মার্চে দিল্লির নিজামুদ্দিনে তাবলীগ জামাতের যে মারকাজে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মুসুল্লী জড়ো হয়েছিলেন, সেটিকে করোনা সংক্রমণের একটি ‘সুপার স্প্রেডার’ ইভেন্ট হিসেবে সরকারি কর্মকর্তারাই চিহ্নিত করেছিলেন”। যা মুসল্লিদেরকে সাজা খাটতে হয়েছিল, আদালতে দারস্ত হয়ে কোনমতে বাঁচতে হয়েছিল।  যদিও ইসলামবিদ্বেষ উঠানো হয়েছিল চরমে এই বলে যে প্রজাতি হিসাবে মুসলমান মাত্রই তাঁরা নিম্নস্তরের জীবন-অভ্যাসের মানুষ এই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ ও ঘৃণা ছড়িয়ে ।

    এটা এক প্রভাবশালী সাংবাদিক-সম্পাদক রাজদীপ সারদেশাই এর ভাবনা বলা যায়। তিনি বলতে চাইছেন, “অনুপযুক্ত শাসকের [inappropriate Governance] জন্যই কী ভারতের এই পরিণতি হল?

    এসব নিয়ে এখন সারকথায় বললে, এতদিন মোদী ও তার হিন্দুত্ব নাকি খুবই পপুলার, মারাত্মক জনপ্রিয়, এসব শুনতে শুনতে কাল ঝালাপালা অবস্থায় ছিলাম আমরা। কিন্তু এবার হঠাত করে মনে হচ্ছে সবার কানে পানি ঢুকে গেছে। কারণ, একেবারে উলটা গান শুরু হয়ে গেছে। মোদী আর হিন্দুত্ব নিয়ে নাকি ভারত আর ভাল নাই। মোদীর জনপ্রিয়তা হঠাত করে ব্যাপক ধ্বসের মুখে!  ভারতে এখন প্রতিদিনে কোভিডে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা তিন লাখের উপরে। আর সাথে মৃত্যুর সংখা ২৬০০ এর উপরে। কোন কোন রিপোর্ট দাবি করছে টুইটারে  হ্যাশটাগ #ResignModi এখন ক্রমশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।  অর্থাৎ ঠিকমত চিকিতসা না পাওয়া – যেমন টিকা বা অক্সিজেনের অভাবে থাকা চিকিতসালয়  আর কাজ না পাওয়ায় মানুষ প্রত্যেকের পেটে টান দেওয়াতে এবার মোদী আর আর তাঁর হিন্দুত্বকে পরাজিত করে সবার উপরে জোয়ার বা প্রভাব বিস্তার করেছে মানুষের বৈষয়িক জীবন  – যেমন স্বাস্থ্যসেবা আর কাজ পাওয়া। এই বেসিক বাস্তবতা। এতদিন মোদী ও তার বন্ধুরা ভেবেছিল তাঁরা হিন্দুত্ব এই জোশ বা আবেগ দিয়েই বাকি দিনও চালিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু এই প্রথম  হিন্দুত্বের উপর কোভিড ক্রাইসিসে মোদীর ব্যর্থতা প্রধান ইস্যু হিসাবে উঠে আসছে। মানুষের বৈষয়িক জীবনের নুন্যতম চাহিদাটুকুও পুর্ণ না হওয়া – এটাই হিন্দুত্বের মোদীকে ধাওয়া করে পরাজিত করতে চাইছে।

    হিন্দুত্ব ফেল করেছে কেন?
    আগে বলেছি মানুষের বৈষয়িক জীবনের নুন্যতম চাহিদাটুকুও পুর্ণ না করেও মোদীর হিন্দুত্ব বিজেপিকে গত সাতবছর ধরে কেবল সার্ভিসই দিয়ে যেতে পেরেছিল। কিন্তু সম্ভবত আর না। সেই রাতারাতি নোট বাতিল (পাঁচশ ও হাজারের নোট বাতিল) সিদ্ধান্তের সময় থেকেও যদি ধরি। মানুষের সহ্যক্ষমতা অপরিসীম তা বলাই বাহুল্য।  আজ রিপোর্টারেরা লিখছে, তারা ভেবেছিল, মোদী এটা বেচতে সক্ষম হয়েছিল  যে হিন্দুত্বের ঐক্য – এই জাতিবাদ মানুষের জন্য অনেক কিছু এনে দেবে, অনেক সমস্যার সমাধান আনবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য  সাধারণ মানুষের। তারা তখনও প্রতারিত, এখনও। এটা তখনও সত্যি ছিল এখনও সত্যি যে মানুষের বৈষয়িক জীবনের নুন্যতম চাহিদাটুকুও পুর্ণ করতে যেমন এক নুন্যতম দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন প্রয়োজন, মোদী এর কখনই উপযুক্ত নয়, ছিল না। কিন্তু কোভিড ক্রাইসিস এখন চরমে উঠার মাধ্যমে এই ম্যাসেজ কী পাবলিকের কাছে পৌছাবে? আমরা এখনও নিশ্চিত নই।  তবে গণহারে পাবলিক যে এক বিরাট ধাক্কা খেতে যাচ্ছে, এটা প্রায় নিশ্চিত।  যেটা আরও ভয়াবহ ঘটনা হবে, দরজায় কড়া নেড়ে অপেক্ষা করছে তা হল, কোভিডে ঢলে পড়া অর্থনীতি যা নেগেটিভ প্রবৃদ্ধিতে চলে গেছে ও আছে দেড় বছর ধরে তা কী এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় আদৌও সামলাতে পারবে? এটাই হয়ে উঠতে পারে হিন্দুত্বের উপর প্রধান নির্ধারক ধাক্কা।  ভারতের বাজেট-বর্ষ শু্রু হবার মাস বা কাল হল ১ এপ্রিল। অথচ ভারতের উভয় সঙ্কটটা হল যে, এখনই লকডাউন আরোপ না করলে কোভিড একেবারেই আরো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। আবার উল্টা দিকটা হল, এখন লকডাউনের দিলে এর ধাক্কা সামলানোর মত অর্থনীতি আর চালু থাকবনে না। এছাড়া, মানুষের সুস্থ থাকা ও কাজ থাকার বাস্তবতা আরও শুকিয়ে মরবে। এমন বাস্তবতায় গত সাতবছরে মোদীর হিন্দুত্ব ভারতের জন্য আরো কী কী হারানোর কারণ হয়েছে তা নিয়ে কিছু কথা বলব।

    ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কঃ
    রাজনীতিবিদ অপেক্ষাকৃত তরুণ কেউ হলে একটা বাড়তি সুবিধা কখনো পেতে বা নিতে দেখা যায়। সেই হল, এপ্রোচ বা আগানোর ধরণ। মানে কোন মনোভাব থেকে বসে একটি সমস্যাকে নেতা দেখবে? তাঁর আগের রাজনীতিক নেতারা যেভাবে দেখে এসেছেন সেভাবেই? নাকি নয়া উদ্যোগে? কোনো নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা বিকল্প পথ খুঁজে দেখে তাতে সমাধান বা অবস্থা বদলের চেষ্টা করবেন? দেখা যায়, রাজনৈতিক নেতা বা প্রধানমন্ত্রী নতুন বা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী হলে তিনি অনেক ভিন্ন দিক থেকে সমাধান খুঁজতে চাইছেন, যা আগে ভাবা হয়নি। সমস্যা বা বিরোধগুলোকে বিপক্ষ অংশের সাথে বসে মানে তাদের চোখেও দেখে এক নয়া এপ্রোচে নতুন পথে সমাধান বা বিপক্ষকে মানানোর বা পরস্পরের সমস্যাটা ঠিক কোথায় তা ঠিকঠাক বুঝে এগোনোর পথ এক্ষেত্রে খুঁজে থাকেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তেমনই এক ব্যক্তিত্ব!

    ইমরান যখন ২০১৮ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেন, তখন ভারতে বিজেপির মোদীর প্রথম টার্মে ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে চার বছর পার করে ফেলেছেন তিনি। মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালের মে মাস থেকে। মানে পরের বছর ২০১৯ সালের মে মাসে মোদী আবার নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা তখন। মোদী দ্বিতীয়বার দাঁড়িয়েছিলেন এবং তিনিই ‘বিজয়ী’ বলে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু ইমরান খান পাকিস্তানের আগের যেকোনো প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে নয়া এপ্রোচ, নয়া উদ্যোগ নেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন অপেক্ষাকৃত কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই। কিন্তু সার কথাটা বললে, নয়া উদ্যোগের প্রধানমন্ত্রী ইমরানের থেকে মোদীর ভারত নয়া উদ্যোগ বা অ্যাপ্রোচের কোন সুবিধা পেতে বা নিতে চান বা নিয়েছেন; এমন আমরা দেখিনি। কেন?

    প্রথমত, এটা ঠিক মোদীর বিরুদ্ধে যতটা অভিযোগ, এর চেয়ে বরং বলতে হবে মোদির পক্ষে আসলে এমন কোনো আশা দেখতে পাওয়া বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার নয়া উদ্যোগর পথে আগোনো অথবা ইমরানকে উৎসাহ দেয়া ইত্যাদি কোনটাই আসলে মোদির পক্ষে সম্ভবই ছিল না। সেই প্রসঙ্গেই এখানে বলব।

    তবে এর আগে সাধারণভাবে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান এই তিন দেশের দুর্ভাগ্য যেখানে আটকে গেছে ও আটকানো শুরু হয়েছিল তা নিয়ে দু’টি সাদা কথা বলে নেব।

    ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় বিরোধের ইস্যুগুলো এমন যে, এর অন্তত কিছু গূঢ়-ইস্যু নিয়েই অনন্তকাল বিবাদ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। মানে কোন সমাধানের দেখা পেতে এখানে কতগুলো প্রজন্ম লাগবে এর হদিস কেউ জানে না। কাশ্মির ছাড়াও জন্ম থেকেই বিরোধের সূত্রপাত এমন অনেক ইস্যু আছে।

    কিন্তু এসব বিরোধের আসল উৎস কী তা স্বল্প কথায় বললে – এর প্রধান উৎস হলো ব্রিটিশরা কলোনি-ইন্ডিয়া ত্যাগ করে চলে গেলে কলোনিমুক্ত ভারত কেমন রাষ্ট্র হবে এ নিয়ে অপরিপক্ব জবাব দেয়ার চেষ্টা এবং রাষ্ট্র নিয়ে খাটো চিন্তা-ধারণা হাজির করা থেকেই আজকের ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান- এ তিন দেশ সেই থেকে সাফার করে আসছে, ধুঁকে মরছে।

    সমাজের কোন একদল নিজ ধর্মীয় বা যেকোনো আইডেনটিটিরই এক জাতি-রাষ্ট্র করবে বলে, বুঝে বা না বুঝে যদি গোঁ ধরে তবে এর পরিণতিতে তা বাকি সব পক্ষই আরেকটা করে ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম বা ভাষা অথবা অন্য যেকোনো ভিন্নতার আইডেনটিটির ভিত্তিতে জাতি-রাষ্ট্র গড়তেই তো চাইবেই। সব বিবাদের শুরু এখান থেকে, আর এথেকে নানান দিকে তা যাবেই। এটাই অনিবার্য আর তাই হয়েছিল। এই সরল সত্য ও বাস্তবতা বোঝার যোগ্যতা যারা প্রধান নেতৃত্ব দাবি করেছিল তাদের কারো ছিল না; বরং সবাইকে একটা আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্রে আনতেই হবে আর সেটা হতে হবে এক হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রই; এভাবে তা বাকি সবার ওপরে চাপিয়ে দিয়ে হলেও যেন ‘এটাই হতে হবে’। কংগ্রেসের এই জবরদস্তি, এ থেকেই সব বিরোধের আরো ডালপালায় বিস্তার এখনো চলছে। এর শুরু বা আদিপাপের রচয়িতা-কর্তা মুসলিম লীগ বা জিন্নাহ একেবারেই নয়। এই মিথ্যা প্রপাগান্ডাও চালু আছে। তবে এরা অবশ্যই নিরুপায় হয়ে অনুসারী মাত্র। সেই মূল রচয়িতা-কর্তা হলেন রাজা রামমোহন রায়;  এবং বিগত ১৮১৫ সাল থেকে শুরু করা তাঁর ব্রাহ্মসমাজ গড়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা। এই ব্যর্থতা থেকেই পরে বঙ্কিম-প্রমুখেরা এক “হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের” জন্ম দেয়া বা গড়াই কংগ্রেসের লক্ষ্য সেট করেন।  আর তাতে সব বিবাদের শুরু হয় এখান থেকে।  রামমোহন, তিনি বোকা নাকি ইসলামবিদ্বেষী? সে যাই হোক, পাঠক বিচার করবেন, তবে কমিউনিস্টদের চোখে রামমোহনকে তারা মানেন ‘বেঙ্গল রেনেসাঁর আদিগুরু’ হিসাবে! এখন তাহলে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরাই ব্যাখ্যা করে দেন যে, কমিউনিস্টদের চোখে ধর্মচর্চা তো এখনোও খুবই খারাপ কাজ। অথচ এই বহু কথিত রেনেসাঁর আদিগুরু রামমোহন, তিনি কী করে নতুন একটা আস্ত ধর্ম – ব্রাহ্মধর্ম চালু করেছিলেন? এ কোন বিপ্লবীপনা? আবার এটা নিয়েইবা সব রেনেসাঁবাদী কমিউনিস্টরা আজও বেমালুম চুপচাপ নির্বিকার কেন? কিভাবে? এর সাফাই কী এবং কৈ? তারা কেউ বলেন না! কেন?

    আমাদের অনেকের মনে হতে পারে, ভারত-পাকিস্তানের ক্যাঁচাল থেকে বাংলাদেশ এখন স্বাধীন হয়ে অনেক দূরে গিয়ে বেঁচেছে। কিন্তু তা একেবারেই না। এমন মনে হলেও এটা সত্য নয়। কারণ অখণ্ড ভারতে আমাদের মূল বিবাদ ছিল, ভাষা বা ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতিরাষ্ট্র খাড়া করে সমাধা পাওয়ার খায়েশ থেকে শুরু হওয়া নানা লড়াই থেকে বিভক্তি। তাতে বাংলাদেশে আমরা এখন ভৌগোলিকভাবে ভারত-পাকিস্তানের কেউ না বলে তাদের ক্যাঁচালের কেউ না – এই আত্মপ্রসাদ পেতে চাইলেও যা আমরাও সাথে নিয়েই হাঁটছি তা হল, বাংলাদেশ এখনো একটা ভাষা বা ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্রই। সেই আদিপাপ আমরা ত্যাগ করতে পারিনি। বাংলাদেশ বাংলা ভাষাভিত্তিক আইডেনটিটির এক জাতি-রাষ্ট্র। আর তা কোন ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র থেকে কোন অর্থেই আলাদা কিছুই না? মূল কারণ যেকোনো আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র মাত্রই একটা অস্থিতি ও নতুন বিবাদের উৎস হয়ে তা থেকে যাবে বলে এ থেকে বের না হতে পারার বিবাদ থাকবে। যেমন বাংলাদেশের কেউ কেউ মুসলিম জাতিরাষ্ট্র হতে চাইবে। পাহাড়িরা যেমন জুম্মু জাতিরাষ্ট্র। এ কারণে হিন্দু-মুসলমান নিয়ে বিবাদে আমরা এখনো সবাই প্রায়ই আক্রান্ত হই,আটকে আছি।  আর এতে সামাজিক-অর্থনৈতিক সব অর্জনই সময়ে ম্লান হয়ে যায়।

    বাংলাদেশ এখনো একটা ভাষাভিত্তিক  আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্রই। সেই আদিপাপ আমরা ত্যাগ করতে বা বের হতে পারিনি। বাংলাদেশ বাংলা ভাষাভিত্তিক আইডেনটিটির এক জাতি-রাষ্ট্র। আর তা কোন ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র থেকে কোন অর্থেই আলাদা কিছুই বা বিবাদের বাইরে না? মূল কারণ যেকোন আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র মাত্রই একটা অস্থিতি ও নতুন বিবাদের উৎস হয়ে তা থেকে যাবে বলে – এ থেকে বের না হতে পারার বিবাদ থাকবে। যেমন বাংলাদেশের কেউ কেউ মুসলিম জাতিরাষ্ট্র হতে চাইবে। পাহাড়িরা যেমন জুম্মু জাতিরাষ্ট্র চাইবে। এসব কারণে হিন্দু-মুসলমান নিয়ে বিবাদে আমরা এখনো সবাই প্রায়ই আক্রান্ত হই,আটকে আছি।  আর এতে সামাজিক-অর্থনৈতিক সব অর্জনই সময়ে ম্লান হয়ে যাবে। অথচ দরকার ছিল নন-আইডেনটিটি ও এক; সবাই সমান নাগরিক এই ভিত্তিতে এক “রাজনৈতিক সাম্য”; মানে সমঅধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র।

    এখন আমাদের প্রসঙ্গ মোদী-ইমরানের মধ্যে সীমিত করব। ভারত-পাকিস্তানের অবস্থা এখন এমন যে, সবাই ন্যূনতম এক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চায় হয়ত; সব পক্ষেরই কাম্য।  কিন্তু একই সাথে এর সমস্যা অন্যখানে। কারণ এক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এমনকি বিজেপি-আরএসএসের মোদীরও হয়ত অকাম্য নয়। শান্তি পেয়ে গেলে তা মোদীর জন্য খারাপ কিছু হতো না। কিন্তু সমস্যা হল প্রায়োরিটির, অর্থাৎ মোদীও পাকিস্তানের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চান না অথবা কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী ইমরান ক্ষমতায় এসেছেন তার সাথে নতুন উদ্যোগ নিতে চাইবেন, তা করতেও মোদির কোনো আপত্তি আছে – ব্যাপারটা তা নয়, তা একেবারেই নয়। সমস্যা হলো প্রায়োরিটির।

    মোদির প্রায়োরিটি হল মানে এসবের আগে আরেকটা কাম্য জিনিষ আছে। সেটা হল,  ভারতের নির্বাচনে ‘হিন্দু-ভোটের মেরুকরণ’ হতে হবে, পরিস্থিতিকে এমন হতে বাধ্য করতে হবে, যাতে সব হিন্দু-ভোট বিজেপির বাক্সমুখী হয়, এমন এক জজবা-উত্তেজনা সৃষ্টি করা। কারণ ইমরান ক্ষমতায় আসার পরের বছর ২০১৯ সালের মে মাসে মোদীকে আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার নির্বাচনে জিততে হবে। তাই পাকিস্তানের সাথে মিথ্যা করে হলেও সীমান্ত-উত্তেজনা সৃষ্টি করা, সেভাবেই ভারতের সেনা ও সিভিল প্রশাসনকে সাজানো আর ঠিক নির্বাচনের আগে এই সীমান্ত বিবাদকে কোন একটা উসিলায় চরমে তোলা- এটাই হয়ে পড়েছিল মোদীর প্রায়োরিটি। যার মূল্কথা, পাকিস্তানের ইমরানের সাথে ভাল সম্পর্কের খারাপ সম্পর্কই মোদীর জন্য বেশি ফলফায়ক। এমনকি সম্পর্কখারাপ এতা দেখানোতেই বেশি ফলদায়ক হবে – এই ছিল মোদীর চাওয়া। অর্থাৎ ভোটের বাক্সে হিন্দু মেরুকরণের ভোট, এটাই মোদির সবার উপরের প্রায়োরিটি হয়ে পড়েছিল। তাই ছদ্মযুদ্ধ লাগানো, পাকিস্তানে ভারতের মিথ্যা বোমা ফেলে আসার দাবি বা ছলনা তৈরি, ইত্যাদিই খুবই টপ প্রয়োরিটি ছিল মোদির কাছে। আর ৩৬ ইঞ্চি ছাতি দেখিয়ে মোদীই একমাত্র ভারত রক্ষাকারী নায়ক – এই ইমেজ ছিল নাকি ভোটে মোদীর ‘তুরুপের তাস’!

    অন্য ভাষায় বললে, মোদির হিন্দুত্ব মানে হিন্দু জাত-ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব- এমন দাবি করে যে রাজনীতি মোদী খাড়া করতে চান, অর্থাৎ কেউ হিন্দু হলেও বাস্তবত বরং সে হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার নাও হতে পারে, এমন হিন্দুত্বের রাজনীতির বাহক তিনি নাও হতে চাইতে পারেন – কিন্তু এটাই মোদী কখনোই এটা হতে দিতেই চান না, পারেন না। পরিষ্কার করে, মোদী মানে দিতে চান উল্টা। বলতে চান, কেউ হিন্দু মানেই সে মোদীর হিন্দুত্ব রাজনীতির বাহকও। এই একমাত্র অর্থ এবং ব্যাখ্যা ও বয়ানে মোদী পুরা ব্যাপারটাকে  আটকে রাখতে চান। এটাই বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি এবং এটা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্ববাদ। এটাই হিটলারের জার্মানি আর্য-নীল চোখের শ্রেষ্ঠত্ববাদ অথবা ট্রাম্পের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ – এদের সবারই আরেক ভাই হিসেবে মোদী হিন্দুত্বের এক উত্থান ঘটাতে চেয়ে এসেছেন।

    মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইতিহাসে ইমরান খানই প্রথম প্রধানমন্ত্রী – যিনি পাকিস্তানের তরুণ; নতুন করে যারা পাকিস্তানকে নিয়ে চিন্তা করতে চান এরই প্রতীক হলেন ইমরান। ইমরানই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, পাকিস্তানি নাগরিক সে যে ধর্মেরই হোক – পাকিস্তানের সব নাগরিকের মতই সবার সমান অধিকার আছে। ব্লাসফেমি আইন – যেটা মূলত এতদিন  জমিজমার দখলের সঙ্কীর্ণ স্বার্থ উদ্ধারের কাজে করা মামলা হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে, এমন আসামিদের মামলার বিচারে সুপ্রিম আদালত যাকে খালাস দিয়েছে, নির্বাহী সরকারপ্রধান হিসেবে ইমরান তার মুক্তি নিশ্চিত করেছেন ; ইচ্ছামতো দেশ-বিদেশ যাওয়া বা চলাচলের অধিকার। ইমরান এটাকেই তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য কর্তব্যজ্ঞান করেছেন।

    অথচ চরম সঙ্কীর্ণ ও হিন্দুত্বের ভোট জোগাড়ে ব্যস্ত বিজেপির মোদী এমন ইমরানের কাছ থেকে ভারতের জন্য কোনো সুবিধাই চাইতে বা নিতেই পারেননি। কারণ মোদীর লক্ষ্য অন্য সংকীর্ণ কিছু। মোদীর লক্ষ্য মুসলমান-পাকিস্তানের সাথে টেনশন তুলে বা জিইয়ে রেখে সেই ইত্তেজনা নিজ দেশের নির্বাচনে হিন্দুভোট পোলারাইজ করতে ব্যবহার করা।  তাই ভারত-পাকিস্তানের বিবাদের ইস্যুগুলোর কোনো একটার বেলায় কিছু হাল করতে বা উদ্যোগী হতে পারেননি মোদী।  মোদীর সবার আগে দরকার বা প্রায়োরিটি হল, ইমরানকে মুসলমান দেশের নেতা ফলে শত্রু হিসাবে চিত্রিত করণ। এতেই মোদী তার সব ফয়দা দেখেছিলেন। যেমন এই আমলে,  ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তানে পড়েছে যে কার্তারপুর-এর শিখ গুরুদুয়ারা, তা ভারতের পাঞ্জাবের শিখরা এখন যেকোন ভ্রমণকারীর মত মাত্র ২০ ডলার ফি দিয়ে ভ্রমণ করে আসতে পারেন। মানে গুরুদুয়ারা তীর্থ করে আসতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী ইমরানের কারণে এটি সহজেই বাস্তব হয়ে গেছে।

    পরাক্রমশালী করোনার সামনে মোদীর হিন্দুত্বও খাটোঃ
    কিন্তু পরাক্রমশালী করোনাভাইরাস মোদীর মত যারা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতিক তাদেরকেও সোজা করতে পারে। অনেক কিছুই করতে বাধ্য করতে পারে, তাই মনে হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় মুখে স্বীকার না করেও মিডিয়া রিপোর্ট হাজির হতে দিচ্ছিল যে ভারত-পাকিস্তান আলোচনা চলছে কখনো গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আর ‘র’-এর মধ্যে। অথবা প্রশাসনিক কর্তা পর্যায়ে এবং মিডিয়া থেকে দূরে থেকে। এমন আলাপ আগের কংগ্রেস বা বিজেপি আমলেও হয়েছে, আর সেসব হয়েছিল মূলত ব্যাংককে। এবারো তা ব্যাংককে বা দুবাইয়ে হচ্ছে বলে মিডিয়া রিপোর্ট দিচ্ছে।

    কিন্তু কেন তারা এত লুকোচুপি করে আবার দেখাও করছে? এবং তা নিজ নিজ দেশের বাইরে করছে? কেন?

    একমাত্র কারণ মোদীর ‘ভোটবাক্স’ প্রায়োরিটি, যা আগে বলেছি। ভারতের কল্পিত বিরাট শত্রু মুসলমান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মোদী একাই লড়ে ভারতের হিন্দুস্বার্থ রক্ষা করে চলেছেন, এই ইমেজ মোদীর ভোটবাক্সের জন্য খুবই দরকারি। কিন্তু এর অবস্থা এখন খুবই সঙ্গীন। যেমন কাশ্মিরে লাদাখ সীমান্তে যখন চীনের সাথে ভারতের সামরিক টেনশন চলছিল তখন মোদীর-সেনাদের টেনশন বাড়ছিল যে, কখনো যেন ভারতকে চীনের পাশাপাশি পাকিস্তান – এই দুই দেশের সাথে না তাদের নিজ নিজ সীমান্ত দুটা যুদ্ধক্ষেত্রে লড়তে না হয় এটাই নিশ্চিত করা। তাই সে সময় চীনের পাশাপাশি পাকিস্তানের সাথেও কথা বলে ভারত ধারণা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় যে, ভারত পাকিস্তানের সাথেও সঙ্ঘাত চায় না। এটা অবশ্যই ভারত পাকিস্তান দুই দেশের জন্যই লাভজনক ছিল। কারণ যুদ্ধের ফ্রন্ট খুললে তা পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য কোনো ইতিবাচক ঘটনা ভাবার কারণ নেই। আর এ বাস্তবতার সুবিধাটাই ভারত উঠিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু পাবলিকলি দেখা করলে মোদীর ভোটবাক্সে টান পড়বে। আর সে কারণেই এত লুকোচুরি।

    এখানে কোভিডের আরেক সুবিধা বা অসুবিধার কথাও বলা দরকার। গত দেড় দুই বছরে মিডিয়া প্রশ্নে মোদী সরকার বিরাট সুবিধা ভোগ করে চলেছে। ভারতের লিডিং প্রায় সব মিডিয়া এখন মোদীর অনুগত, পায়ের কাছে ঘুরঘুর করার অবস্থা! কেন? কোন মন্ত্র বলে? কারণ প্রতিটি মিডিয়া কোভিডের ঠেলায় বিক্রি ও বিজ্ঞাপন কমে এক অর্থনৈতিক টানাটানিতে ডুবে গেছে। ফলে কর্মীদের ৪০ শতাংশ বেতন দেয়ার প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করতে মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট হিমশিম খাচ্ছে। এ অবস্থাটাই বোঝা যাবে এটা দেখলে যে, ধনী-গরিব প্রতিটি মিডিয়াই এখন পাবলিক ডোনেশনের চাঁদা চেয়ে নোটিশ টাঙ্গিয়ে রেখেছে। কাজেই সবাই এখন একমাত্র ও সহজ উপায় হিসেবে দেখছে বিজেপির রাজনীতির পক্ষে সাফাই দেয়ার কাজকে। এমন মিডিয়া হয়ে যাওয়ার বিনিময়, সরকারি দল বা সরকারি ফান্ড হাতিয়ে নেয়া – এভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টাই এখন সব মিডিয়ার প্রধান ট্রেন্ড বা ধারা। তবে মিডিয়াগুলো আরেক নয়া কৌশল ধরেছে। তারা বলতে চাচ্ছে, তারা আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্ববাদের ঠিক প্রমোটর নয়। কিন্তু তারাই আবার দাবি করছে, তারা আসলে সেটা করেনি। তারা বরং হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্রের সরকার, সরকার যেই হোক তাকে সমর্থন দেয়া এটাই দ্য হিন্দুর সুহাসিনী হায়দারের কর্তব্য, অথবা দ্য প্রিন্টের শেখর গুপ্তের কর্তব্য – এরা এই আড়াল টেনে কাজটা করে যাচ্ছে।

    কিন্তু তবু সম্প্রতি আরো কিছু উইকেটের পতন ঘটেছে। এটা শ্রুতি কপিলা [SHRUTI KAPILA] নামে এক লেখকের দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় এক মন্তব্য-রিপোর্ট। তিনি বলছেন, টুইটারে ‘রিজাইন মোদি’ এই হ্যাশট্যাগ পপুলার ভিত্তি পেয়ে উঠছে [The trending of #ResignModi on Indian Twitter…… ]। তিনি দাবি করেছেন, এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কোভিড মহামারী এবার এই প্রথম ‘রাজনৈতিক’ হয়ে উঠছে। [It finally signalled that the Covid pandemic had become political.] মানে, রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠছে।

    তিনি লিখছেন, “গত বছরের এনিয়ে বিপর্যয়ের সময়ও মহামারী ছাপিয়ে উঠা সত্ত্বেও নিজ পপুলারিটি নিয়ে ‘চির-স্ট্রং’ মোদী এসবের ঊপরে থাকতে চেয়েছিলেন। বহু সার্ভেতেই দেখা গেছে, তিনি উপরে আছেন”। মিস কপিলা এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলতে চান, গত বছরের কোভিড পরিস্থিতি কোনোভাবেই কম চ্যালেঞ্জিং ছিল না। কিন্তু জনগণ এরপরও সম্মিলিতভাবে মোদীর উপর (তাঁর হিন্দুত্বের উপর) আস্থা রেখেছিলেন যে, তাদের হিন্দুত্বের ঐক্যবদ্ধতার কারণে মোদী সবাইকে রক্ষা করে নেবেন।

    মিস কপিলা আরো লিখছেন, ‘ভারতে এখন প্রতিদিন নতুন আক্রান্ত কোভিড-রোগী ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৬৯১ জনের; এমন সংখ্যা এটাই সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আর মাফ করতে পারছে না। কমতেছে। টুইটারে প্রকাশিত ট্রেন্ড, ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া হতাশা, এগুলোই সম্ভবত মোদীর হিন্দুত্বের সমর্থন হারিয়ে ফেলার প্রথম ইঙ্গিত! এখন ক্রমেই তাদেকে দেখা যাচ্ছে ভয়ের  বদলে ‘বিক্ষুব্ধ’ হয়ে উঠাকে প্রাধান্য দিতে। সম্ভবত এদিকটা খেয়াল করেই, মোদি সম্প্রতি পাবলিককে ডিসিপ্লিন থাকার জন্য আকুল আবেদন করেছেন”।’

    তাহলে দেখা যাচ্ছে এবারে মোদীর হিন্দুত্ব – এটা আর মহামারীর কারণে সরকারের উপর পাবলিকের আস্থার সঙ্কট কমে যাবার  বিপর্যয় ঠেকাতে পারছে না? কোভিডের মহামারীতে চিকিৎসার অভাব আর পেটের টানের বিরুদ্ধে এবার ‘হিন্দুত্ব’ আর কিছুই ঢেকে ফেলতে পারছে না! হিন্দুত্বের জোশ আর কি কাজ করছে না? মোদী এবার সব লুকিয়ে আগলে রাখতে কি ফেল করবেন! মোদি কী পাবলিকের আস্থাহীন নেতা হয়ে যাবেন? দেখা যাক! পানি কতদুর গড়ায়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৪ এপ্রিল ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “হিন্দুত্ব ফেল, কোভিডে চিকিৎসাস্বল্পতা ও পেটের টানে” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে,  পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ

    ‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ
    প্রথম পর্ব

    গৌতম দাস

    ২৫ মার্চ ২০২১

    https://wp.me/p1sCvy-3n4

    সাতচল্লিশের দেশভাগ মানে যখন নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছিল আর সেকথার সোজা মানে হল এমন রাষ্ট্রজন্ম হওয়াতে বৃটিশ জমিদারি ব্যবস্থাটাই উচ্ছেদ হয়ে যায়।  আর এথেকেই সারা পুর্ব-পাকিস্তানের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে প্রজারা জমির ভোগদখল (কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে) লাভ করে। ফলে বাস্তবত পুর্ববঙ্গ আলাদা নিজেই (এক পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ অর্থে)  এক রাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতে আগের জমিদারদের হাতে জমিদারী থাকার কাগজপত্র থেকে গেলেও কার্যত তারা সব জমিই হারিয়ে ফেলেছিল। মূল কারণ, এবার  জমিদারেরা আর রাষ্ট্রক্ষমতার কেউ নয়। মুসলীম লীগ এর ক্ষমতায়। ফলে আক্ষরিক অর্থেই এটা জমিদারী-উচ্ছেদের এক বিপ্লব ছিল।  যদিও আইনিভাবে এই জমিদারি উচ্ছেদ হয় পরে ১৯৫১ সালের ১৬ মে East Bengal State Acquisition and Tenancy Act of 1950 এই আইনে, পুর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক সংসদে তা পাশ হওয়াতে। সবচেয়ে মনে রাখার মত ঘটনাটা হল এই বিপ্লব ঘটেছিল তথাকথিত কোন কমিউনিস্ট পার্টির হাতে নয়। বরং যাকে প্রগতিবাদীরা উঠতে বসতে “সাম্প্রদায়িক দল বলে গালাগালি করে”, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করল বলে নিন্দা ও তুচ্ছ করে  সেই মুসলিম লীগের নেতৃত্বে। তবে মুল কথা আজকের বাংলাদেশের সারা ভুখন্ডের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে (ততকালীন প্রজারা যারা আমাদের দাদা নানা বা পুর্বপুরুষ) জমির মালিক হয়েছিল যারা যে যেই জমি প্রজা হিসাবে চাষাবাদ করত সেই জমির খাজনা নতুন পাকিস্তান সরকারকে পরিশোধ করা সাপেক্ষে সেই সেই জমির মালিক এবং ভোগ-দখল ও উত্তরাধিকারিকে হস্তান্তরকারি মালিক হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। ঐ ১৯৫১ সালের আইন এখন বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের অংশ গণ্য করা হয়।

    কিন্তু বিরাট ট্রাজেডিটা হল, এভাবে ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই জমি পেয়েছিল কিন্তু কেউ অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক সংগঠন বা ব্যক্তি, গ্রুপ কেউ পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম যে সঠিক হয়েছিল অন্তত জমিদারি উচ্ছেদের ফলে যে তারা বাসিন্দারা জমির মালিক হয়েছিল এই কারণে অথবা, এই কৃষি-বিপ্লবের তাতপর্যকে স্মরণ করে – এমন সাফাই-বয়ানের ভিত্তিতে কোন ইতিহাস, কেউ লেখে নাই। স্কুলে পাঠ্যপুস্তক রচনা করে নাই। এর বদলে স্কুলে পড়ানো হয়েছে প্রগতিশীলতা, জমিদারদের বয়ানে লেখা  ইতিহাস ইত্যাদির যা কলকাতায় পড়ানো হত সেই ইতিহাস বই। 

    উনিশশো সাতচল্লিশ সালের দেশভাগ;  মানে কলোনি ‘বৃটিশ-ইন্ডিয়া’ ত্যাগ করে চলে যাবার সময় বৃটিশ শাসকদের এই কলোনিকে ভারত ও পাকিস্তান এ’দুই স্বাধীন রাষ্ট্রে ভাগ ও ক্ষমতা হস্তান্তর করে দিয়ে যেতে হয়েছিল। এঘটনাই সাধারণ্যের মুখের ভাষায় ‘দেশভাগ’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান ছিল হিটলারের জর্মানের পক্ষশক্তি,  কিন্তু যুদ্ধে তারা উভয়ে (সাথে মুসোলিনি-সহ)) মিলে হয় পরাজিত শক্তি। আর ঐ  পরাজয়ের পর জাপানের ফাইনাল সারেন্ডারের দিন ছিল ১৫ আগষ্ট ১৯৪৫। তাই এঘটনার সাথে মিল রেখে, এর দ্বিতীয় বার্ষিকী ১৫ আগষ্ট ১৯৪৭, এই দিনেই স্বাধীন ভারতের প্রথম স্বাধীনতা দিবস বা ক্ষমতা হস্তান্তর দিবস হবে বলে ঠিক করা হয়েছিল।

    দেশভাগ কী খারাপ কাজ, নেতি ঘটনাঃ
    দেশভাগ মানে সেটা একদিক থেকে বিচারে বৃটিশ “ভাইসরয়” এর ক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে যাওয়াও বটে। ইংরাজিতে ব্যবহৃত Viceroy বা Vice-roy শব্দটা ফরাসি “vice-king” থেকে এসেছে। কিন্তু ভাইস-রয় আমাদের প্রেক্ষিতে অর্থ কি?
    ভারতে বৃটিশ শাসনের প্রথম প্রায় একশ বছর (১৭৫৭-১৮৫৮) আমরা ছিলাম “বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির” দখল-শাসনে। আর পরে ১৮৫৮ সালের ২ আগষ্ট, থেকে ঐ দখল-শাসন শেষ পর্যন্ত সরাসরি বৃটিশ রাজসরকারের শাসনের অধীনে চলে যায়। শেষের সেই শাসন ছিল আরও প্রায় নব্বই বছরের, ১৯৪৭ এর আগষ্ট পর্যন্ত। আর ঐ বৃটিশ-শাসকপক্ষের সর্বোচ্চপদ বা রাজা/রানীর মুখ্য প্রতিনিধির পদকে বলা হত “ভাইসরয়”। কথাটা আসলে ভাইস-রয় (রয়েল শব্দকে ছোট করে নেয়া অংশ হল ‘রয়’ সম্ভবত সেজন্য; অথবা অনেকে মনে করেন ফরাসি ভাষায় আরওআই (roi) – এই ‘রয়’ মানে রাজা;  সেখান থেকে) অথবা বাংলা করে বললে, ভাইসরয় মানে রাজা/রানীর প্রতিনিধি। ভারতের শেষ বৃটিশ ভাইসরয় ছিলেন লর্ড মাউন্টব্যাটন। তিনি চেয়েছিলেন নতুন দুই স্বাধীনদেশেরই ক্ষমতা হস্তান্তরের অনুষ্ঠানে তিনি নিজে উপস্থিত থাকবেন। তাই একই দিনে অনুষ্ঠান না করে একদিন আগে ১৪ আগষ্ট ১৯৪৭ পাকিস্তানে ক্ষমতা হস্তান্তর অনুষ্ঠান উৎযাপন করা হয়েছিল। আর পরদিন ১৫ আগষ্ট ভারতে তা করা হয়েছিল।
    এরপর ভারত ও পাকিস্তান নামে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দুইদেশ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটাকেও প্রচলিত জনপ্রিয় ডাকনাম হিসাবে ‘দেশভাগ’ বলে ডাকার চল শুরুও হয়। অনেক সময় একাদেমিকভাষাতেও “দেশভাগ’ শব্দটা ব্যবহার হতে দেখা যায়। যদিও এর সাথে এক অনুষঙ্গ অনুমানও থাকতে দেখা যায়।  অল্পকিছু  ব্যতিক্রমে সেই অনুমানটা হল, “দেশভাগ” জিনিষটা একটা খুবই নেগেটিভ ঘটনা বা খারাপ কাজ। মানে দেশভাগ শব্দ ব্যবহারকারি বক্তা যেন বলতে চান যে দেশভাগ হওয়াটা ভাল হয় নাই, না হলে ভাল হত। ফলে যাদের কারণে দেশভাগ হয়েছে তারা যেন খারাপ লোক। এদিকটা আমরা এখানে পরখ করে দেখব আসলে তা  সত্য কিনা বা কতটা সত্য।

    কিন্তু দেশভাগ ঘটনাটা কেন ঘটল আর ঘটনাটা খারাপ বা নেতিনাচক ঘটনা কিনা সে আলাপে একটু পরে যাব। এর আগে, দেশভাগ খারাপ – একথার মানে কী? এটা বলে ঠিক কী বুঝাতে চায়? ব্যাপারটা কী এরকম যে এই দেশভাগ কেউ চায় নাই, চাওয়ার পক্ষে কেউ ছিল না, এমন? কিন্তু না, এটা তো হতেই পারে না!  কারণ চাহানেওয়ালা পক্ষ কেউ যদি নাই থাকে তবে দেশভাগ বা বৃটিশ-ইন্ডিয়া ভাগ হল কেন? তাই ভাগ যেহেতু হয়েছে অতএব চেয়েছে এমন জনগোষ্ঠিও অবশ্যই ছিল এবং তারা উপেক্ষিত হবার মত অল্প জনসংখ্যার তা মনে হবারও কোন কারণই নাই। তাহলে এরা কারা? এখান থেকেই আমরা কথা শুরু করব।

    কথাটা উলটা করে বললে, কারা মনে করেন দেশভাগ ইতিবাচক এবং কী নির্ণায়ক-বৈশিষ্ট দিয়ে তাদেরকে আলাদা করা বা চিনা যাবে? অনেকের মনে অনুমান হতে পারে অন্তত যারা নবগঠিত স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের নাগরিক হয়েছিলেন নিশ্চয় তারা সকলে দেশভাগ হওয়াকে সঠিক ও আপন ভাবতেন! না খুবই সরি। এই অনুমানও ভিত্তিহীন, অন্তত পুরা না আংশিক সত্য। যদিও একেবারে জন্মের পরপরই পাকিস্তানের মুসলমান জনগোষ্ঠীর কাছে দেশভাগ আপন ঘটনা ছিল অবশ্যই। তবে, এটা পুর্ব পাকিস্তানে যতটা না পশ্চিম পাকিস্তানে তার চেয়ে শতগুণই  আপন মনে করা হয়েছিল।  পশ্চিম পাকিস্তানের যারা বাসিন্দা হলেন তারা ভারত থেকে আলাদা রাষ্ট্র হওয়াটাকে নিজেদের জন্য একটা বড় অর্জন বলে মনে করে এসেছে, এখনও করে। যে কারণে, পশ্চিম পাকিস্তানের বাইরে যারা আমরা, এই আমরা যাই মনে করি না কেন ঐ পাকিস্তানের ভিতরে সর্বত্র আজও তাদের পাকিস্তান রাষ্ট্রলাভের প্রতীক হয়ে আছেন জিন্নাহ। এবং তা অবিতর্কিত “জাতির পিতা” পরিচয়ে; তিনি পাকিস্তানের সকল দলের রাজনীতিতে ও দলের কাছে এক অবিতর্কিত গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। যদিও পুর্ব-পাকিস্তানে ব্যাপারটা একবারেই ভিন্ন। সে প্রসঙ্গে ধাপে ধাপে আসছি।

    পাকিস্তানের পুব আর পশ্চিমের জমির মালিকানা ধরণ একেবারেই ভিন্ন ছিলঃ
    এখানে একটা কথা বলে রাখা দরকার। পুর্ব-পাকিস্তান আর পশ্চিম-পাকিস্তানের জনগোষ্ঠির মধ্যে দেশভাগ ব্যাপারটা নিয়ে অনুভব-অনুভুতির প্রতিক্রিয়ায় মধ্যেও একটা বড় ভিন্নতা ছিল। যে ভিন্নতার মূল কারণ হল ভুমি মালিকানা ব্যবস্থার দিক থেকে পুব ও পশ্চিমের অবস্থা একই ছিল না। দুশ বছরের বৃটিশ শাসনামল জুড়েই পুর্ববঙ্গ (মানে আসলে এখনকার পশ্চিমবঙ্গসহ সারা-বঙ্গও) ছিল ভুমি মালিকানা ব্যবস্থা্র দিক থেকে বৃটিশ শাসনের প্রবর্তিত “জমিদারি” মালিকানা ব্যবস্থা । যার আবার  বেশিরভাগ জমিদার মালিকেরা ছিল হিন্দু। মানে মুসলমান জমিদার কিছু ছিল বটে;  কিন্তু সেটা যেন ব্যতিক্রম। যেমন এভাবে বলা যায় জমিদারদের নিজেদের ‘কমন স্বার্থ’ কী হবে তা নির্ধারণে মুসলমান জমিদারদের কখনও কোন ভুমিকা বা বক্তব্য ছিল এমন জানা যায় না। আর এর বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানে ভুমি মালিকানা ব্যবস্থাটা ছিল ট্রাডিশনাল;  যেটা মোগল আমল থেকে চলে আসছিল। যেটার মূল বৈশিষ্ট হল,  মোগল শাসক অথবা তার প্রতিনিধিকে আপন  ভোগদখলে থাকা জমির খাজনা দেয়া সাপেক্ষে আপনিই জমির মালিক। আর মালিক বলতে, খাজনাদাতার নামেই জমির টাইটেল জারি হত। তাতে কোথাও কোথাও বিশাল বিশাল জোতদার যাদের স্থানীয় ভাষায় ‘জাঠ’ এথনিক গোষ্ঠি বলা হয়, এদের দখলি জমির পরিমাণ আকাশ ছোয়া। যেমন পাকিস্তানের ৬৪% জমি ৫% জোতদারের মালিকানায়, এমন ইউটিউব বর্ণনা দেখতে পারেন। আবার পশ্চিম পাকিস্তানের প্রথম জমির সিলিং [ceiling, জমির মালিকানা থাকার পরিমাণ]  বেধে দেয়া হয়েছিল। আয়ুবের হাত ধরে ১৯৫৯ সালে সেখানে আরোপিত সিলিং দেয়া হয়েছিল সেচ সুবিধার জমির বেলায় ৫০০ একর আর না থাকলে ১০০০ একর পর্যন্ত জমির মালিকানা বৈধ। এর মানে এই সিলিং আরোপের আগে কেমন জোতদারি ছিল তা অনুমেয়। সারকথায় জমির মালিকানার প্রশ্নে  এসবই ছিল পাকিস্তানের পুব আর পশ্চিমের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফারাক। তবে জমিদারি ব্যবস্থা থাকা আর না থাকা ছিল এক বড় রাজনৈতিক ফারাকের কারণ। তবে আমাদের এখানকার আলোচনার জন্য মুল কথা পুর্ব পাকিস্তানে জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থা।

    কাদের কাছে দেশভাগ কাম্য ছিলঃ
    আমরা কথা বলছিলাম, দেশভাগকে ইতিবাচক বা কাম্য – এভাবে দেখার লোক কারা ছিল তা নিয়ে। সারা ভারতের প্রেক্ষিতে হিন্দু জনসংখ্যা সেকালে সংখ্যাগরিষ্ট ছিল। যেমন ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে পর্যন্ত সারা ভারতে মোট মুসলমান জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২৫%।  তাই সব মিলিয়ে এসবের কারণে বৃটিশ আমলে – হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক আধিপত্য ছিল সমাজের প্রায় সর্বত্র। এমনকি কেবল পুর্ববঙ্গকে বিচারে নিলে হিসাবে মুসলমানেরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ট হলেও এখানেও সেই একই – হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ও অর্থনৈতিক আধিপত্য পুর্ববঙ্গেও বজায় ছিল। এর পিছনের আরও কারণ  – যেভাবে বৃটিশ-ভারতের রাজধানী কলকাতার উত্থান ঘটেছিল, সেদিকে তাকাতে হবে।

    তত্বগত কথা হল,আধুনিককালের যেকোন রাজধানী মানেই যেখানে তুলনায় তা অন্যান্য প্রদেশ বা জেলাগুলো রাজধানীর চেয়ে অবকাঠামোর দিক থেকে হয় কম উন্নত বা পিছিয়ে পড়া। তাই পিছিয়ে পড়া এলাকার রাজধানীমুখি হওয়া খুবই কমন ঝোঁক। গ্রামে জমি থেকে উতখাত হওয়া লোকেরা রাজধানীতে কাজ-পাওয়ার সুযোগ-সুবিধা নিতে ও ভাগ্য-অন্বেষণে রাজধানীতেই এসে ভীড় করে থাকে। ফলাফলে রাজধানী এক নতুন ধরণের মিশ্র জনগোষ্ঠির নতুন (আধুনিক) ভাষা্র শহর হয়ে উঠে। কিন্তু কলকাতা সেদিক থেকে বেশ ব্য্যতিক্রম। কলকাতা বৃটিশ সংস্পর্শে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগা প্রথম প্রহরের ঘটনা এমন রাজধানী কলকাতা বলে সুবিধা পেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু আবার এর বাইরে আরেক দিক হল, কলিকাতার সাথে বাকি ভারত তো বটেই এমনকি বাকি বঙ্গের সবধরণের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল খুবই দুর্বল, পিছিয়ে পড়া ও অবিকশিত। এমনটা বজায় থাকার কারণে কেবল মূলত স্থানীয় বাংলা প্রেসিডেন্সির শাসক শ্রেণীই এখানে রাজধানীতে প্রভাব-আধিপত্য জমিয়ে বসার সুযোগটা নিয়েছিল। কিন্তু এরাই বা কারা?

    সারা বাংলা সমাজের প্রধান উতপাদন ব্যবস্থা ছিল কৃষিকাজ আর পরে (১৭৯৩ থেকে) ভুমি মালিকানা ব্যবস্থা জমিদারি বলে, জমিদার হিন্দুরাই বৃটিশ-কলোনি ক্ষমতার কোলে বসে ও ঔরসে কলকাতার শাসক শ্রেণী হয়েছিল। আর সেখান থেকেই কলকাতা মানে তা হিন্দুদেরই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্যের কলকাতা শহর হয়ে উঠেছিল। আবার আরেক দিক থেকে বলা যায় ভারত মানে সবসময় বর্ণহিন্দুর জাতপ্রথার [cast system] শাসনটাই যেন আবার “জমিদার হিন্দু” এই নতুন নামে ও জমিদার-প্রজা সম্পর্কের ঢংয়ে চেপে বসেছিল। যদিও আবার এর ভিতরেও আরেক ভাগাভাগি বজায় থাকতে দেখা যেত। প্রজা বলতে সারা বাংলার হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধরণেরই প্রজা থাকলেও তাঁদের মধ্যে আরেক বড় ভাগাভাগি ছিল। সেটা কেমন বা কেন?

    প্রজাদের মধ্যে হিন্দু-মুসলমান ভাগ থাকলেও হিন্দু প্রজারা জমিদার হিন্দুদের সাথে ‘কালচারাল নৈকট্য’ অনুভব করত। মানে জমিদারদের কালচারাল হেজিমনি বা আধিপত্য আছে তা হিন্দু-প্রজাদেরও সুবিধা নেওয়ার সুযোগ আছে অনুভব করত। ফলে তাদেরও মুসলমান প্রজাদের উপর (অর্থনৈতিক স্টাটাসে সমগোত্রীয় হলেও) আধিপত্য আছে –  জমিদারদের এই কালচারাল ক্ষমতার শেয়ার হোল্ডার তাঁরাও এবং তাঁরা সম্বন্ধযুক্ত বলে অনুভব করত। তারা মুসলমান প্রজাদের চেয়ে সামাজিক মর্যাদায় উপরের বলে স্থান ও বিবেচনা নিজেরা মনে করত এবং তা দাবি ও চর্চা করত। জমিদারের বৈঠকখানায় আগত হিন্দু প্রজারা মুসলমান প্রজাদের তুলনায় আলাদা ভাল ট্রিটমেন্ট পেত বলে এমন অনুভবের পিছনে এটা একটা কারণ মনে করা যায়। যেমন মুলমান-প্রজাদের মাটিতে বসানোর বন্দোবস্তের বদলে হিন্দুপ্রজাদের আলাদা শতরঞ্জিপাতা আসন, মুসলমান প্রজাদের দেয়া সস্তা নারকেলের মালার হুকার বদলে পিতলের হুকা,ভাল তামাক ইত্যাদি পেত। অর্থাৎ জাতপ্রথার প্রবল বলবত থাকার প্রভাব ও অজুহাতে মুসলমান প্রজাদের সামাজিক মর্যাদা-অবস্থান হিন্দু নমশুদ্র বা চর্মকারেরও চেয়েও অন্তত আরেক ধাপ নিচে বিবেচনা করা হত।
    আর এভাবেই কেবল জমিদার হিন্দুর দাপট ও পরিচয়ে সে একমাত্র শাসক ও শ্রেণীর আধিপত্য, এই ধারণা বলবত রেখেছিল। যদিও   কলকাতার জয়া চ্যাটার্জির ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত মূল ইংরাজি বই “Bengal Divided” [Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932-1947] , যার অনুবাদ বইয়ের নাম  “বাঙলা ভাগ হল”,সেখানে এদেরকেই “বাংলার হিন্দু ‘ভদ্রলোক’ বা এলিট” বলে তিনি চিনিয়েছেন। এপ্রসঙ্গে লেখা আমার ক্রিটিক এখানে পাবেন।

    কেন কলকাতা ব্যতিক্রম কী অর্থেঃ
    কিন্তু কেন কলকাতা ব্যতিক্রম হতে পেরেছিল? এর আরেকটা বড় ফ্যাক্টর ছিল। এখানে জমিদার হিন্দু যাদেরে বলছি ইংরাজী [race] রেস এবং [ethnic] এথনিক এই দুই অর্থেই জাতি বুঝলে এই জমিদার এরা কোন ‘জাতি’? এর জবাব হল, জমিদারি ব্যবস্থা চালু হওয়াতে যে শাসক-ক্ষমতা সে ক্ষমতার বলে এরা নিজেদের ‘বাঙালি’ বলে এক নতুন পরিচয় নির্মাণ করেছিল ও পরিচয় দিত। কথাটাকে ‘তারা বাঙালি ছিল’ এতটুকু না বলে, এভাবে সরাসরি না বলে ঘুরিয়ে বলার কারণ আছে। পুব-পশ্চিম বঙ্গ এবং এই সারা ভুখন্ডের হিন্দু ও মুসলমান মিলে যে সারা বঙ্গ অঞ্চল, তারা সকলে মিলেই যে ‘বাঙালি রেস’, সারা দুনিয়া বাঙালি বলতে এদেরকেই চিনে, তাই একথাটাতে অস্বীকার করার কিছু নাই। তাই তো হবারই কথা।

    কিন্তু কলোনি-ক্ষমতা্র ঔরসে উত্থিত কলকাতা, জমিদারের কলকাতা সেটা মেনে উত্থিত হয় নাই। প্রথমত,আগেই বলেছি কলকাতা – সমাজের ক্লাসিক্যাল ডেভেলবমেন্ট যেমন কোন স্বাভাবিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও পরিণতির অর্থে যেমন বলা হয় – ‘একুমুলেশন অব ক্যাপিটাল’ বা সারপ্লাস যেখানে সঞ্চিত হয় এমন নদীতীরের কোন গঞ্জ বা শহর অর্থে কলকাতা কোন শহর নয়, ছিল না। যে অর্থে কলকাতা কলোনি প্রভাব ও সংস্পর্শের বাইরে গড়ে উঠা অর্থে ভারতেরই কোন শহর নয়। যেমন মোগল আমলেই  মানে প্রাচীন ভারত কলোনি মাস্টারের হাতে পড়বার আগেই – হায়দ্রাবাদ, লক্ষ্ণৌ বা দিল্লি বড় মোগল শহর হিসাবে হাজির ছিল। কিন্তু কলকাতা তা ছিল না। মানে  কোন কলোনিদখলকারির ছোঁয়া লাগার ছাড়াই, সুনির্দিষ্ট করে বৃটিশেরা ভারতদখলের আগে থেকেই ভারতে অনেক বড় শহরের জন্ম হয়ে গেলেও কলকাতা সে তালিকার কেউ নয় বা তালিকায় ছিল না। তাই হায়দ্রাবাদ, লক্ষ্ণৌ বা দিল্লি মোগল আমলেই বড় শহর, এগুলোকেই স্বাভাবিক পরিণতির শহর বলছি। আর বিপরীতে  কলকাতা এসবের বাইরে ছিল বৃটিশের হাতে গড়ে উঠা শহর। অর্থাৎ যেমন আফ্রিকায় কলোনিদখলের ফেনোমেনা। ওখানে কলোনিদখলের আগে আফ্রিকায় নিজ শহর বলতে যা বুঝায় এমন কিছু কোন আফ্রিকান দেশে ছিল না। বরং প্রায় সবদেশের বেলায় তারা কলোনি মাস্টারের হাত ধরে আফ্রিকানেরা প্রথম শহর কি তা  গড়েছিল ও চিনেছিল। আমাদের কলকাতার বেলায় তার অনেকটাই সত্য।

    এই সুবিধাটাই কলকাতার জমিদার হিন্দুরা নিয়েছিল। এই শহরের স্থানীয় শাসক শ্রেণী হিসাবে নতুন উত্থিতরা হল এই জমিদারেরা । যেটাকে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনের (জমিদারি আইন ) ফলাফল বলা যায়। এছাড়াও এতে দুটা জিনিষ এই জমিদার হিন্দুরা নতুন আকার ও সংজ্ঞা দিয়ে নিয়েছিল। তা হল, একটা হিন্দুস্বার্থের চোখে কারা বাঙালি? আর কারা নয়? আর বাংলা ভাষা কোনটা বলতে কোনটা বুঝাবে? এদুটাই তারা একক হাতে ও সংকীর্ণ স্বার্থের চোখে  নির্ধারণ করে নিয়েছিল।

    না একথা বলা বাতুলতা হবে যে বৃটিশেরা আসার আগে অতীতে বাংলার কোন কোণে ভাষা কী কী কতদুর বিকশিত হয়েছিল সেটা কেমন, আর্কিলজি বা প্রাচীন ইতিহাসে কী পাওয়া গেছে অথবা চাই কী চর্যাপদ কী ইত্যাদি। না, আমি এসবের কথা  এখানে তুলছি না, তোলা হচ্ছে না। বরং আগেই বলেছি জমিদার হিন্দু শাসকেরা এরা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবার আগে বাংলায় কি ছিল সেটা যাই থাক সেটা এখানে আলোচনার প্রসঙ্গ নয়। আসলে তাদের কলকাতায় তাঁরা মূলত বাঙালি কারা এর এক নতুন আকার ও সংজ্ঞা দিয়ে নিয়েছিল, তাতে বৃটিশেরা আসার আগে আমরা কী, কেমন ছিলাম বলে যে যাই বুঝি না কেন। আর এখান থেকে জমিদার হিন্দুর তত্বাবধানে নির্ধারিত ও নির্মাণ হয়েছিল এক নতুন আকার ও সংজ্ঞা যে, বাঙালি কারা, বাংলাভাষা কোনটা। আর এদেরই স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল –  “মুসলমানেরা বাঙালিই নয়”। এটাই কলোনি-কলকাতার বাঙালির সংজ্ঞার মৌলিক দিক। আর সংস্কৃত ঘেঁষা করে আর সংস্কৃত-ব্যকরণ-সম্মত করে (সাথে ইংরেজ পাদ্রী ধর্মপ্ররচারকদের স্বার্থে ও তাদের হাতে) যে বাংলা গদ্যভাষা খাঁড়া করা হয়েছিল তা নিয়ে এমনকি রবীন্দ্রনাথেরও আপত্তি ছিল।

    —–“মুসলমানেরা বাঙালিই নয়” – কথাটা কী সত্য? —-

    আধুনিক শব্দটা অদ্ভুত, এটা সবচেয়ে ভাল অপ-ব্যবহার হয় কাউকে আধুনিক নয় বলে দাবি করে খালি একবার কোন ফতোয়া দিয়ে দেয়া। এরপর অতএব সে নিশ্চয় “পশ্চাতপদ” [মুসলমানেরা পশ্চাতপদ], এটা প্রমাণ হয়ে গেছে বলে দাবি করা যাতে বিপরীতে, বক্তা নিজেকে ‘প্রগতিশীল’ বলে প্রমাণ করতে ও তুলে ধরতে সক্ষম হয়ে যায়। এসব বদ-মতলবের বাইরে বর্ণনা অর্থে “আধুনিক ভাষা” বলে একটা ধারণা-শব্দ ব্যবহার করব। বলাই বাহুল্য এটা রেনেসাঁর পরিণতি অর্থে যে আধুনিক ধারণা,  সে অর্থেও ব্যবহার করা হচ্ছে না।

    আইডিয়েল [ideal] চোখে যখন আমাদের ভুখন্ডের সকল অংশের, সকল জেলা বা অঞ্চলের প্রতিনিধি সকলকে রাজধানিতে হাজির রেখে কমবেশি সকলের প্রভাব ও মিশ্রণে একটা ভাষা উত্থিত করার চেষ্টা করা হয় সেটাকে আধুনিক বাংলা ভাষা। তবে এর সাথে  আরেকটা বড় ফ্যাক্টর অর্থনৈতিক বিকাশ; মানে  কিভাবে ও তখন পর্যন্ত কতদুর সেটা বিকশিত ছিল বা হবার সুযগ ছিল – সেটাই। যে অর্থে শহর বা নগর মানে  হাঁটুরে গঞ্জের চেয়েও উপরে আরো বড় ‘গঞ্জ’ মানে accumulation of Capital  বা উদ্বৃত্ব সঞ্চয়ের কেন্দ্র যেটা বা যেখানে এটা ঘটে বা হয়ে উঠে সেটাই শহর বা নগর। এটাই বুর্জোয়া [bourgeois] সিভিল সোসাইটি জন্মাবার বৈষয়িক পুর্বশর্ত। (বুর্জোয়া শব্দটা এখানে গালি বা নেতিবাচক অর্থ করা ভুল হবে।) যা এরপর নগর রাষ্ট্র, রিপাবলিক ইত্যাদির হওয়ার দিকে রওনা দিতে পারে যদি না তা বিদেশি কলোনিদখলদারদের হস্তক্ষেপের খপ্পরে না পড়ে।
    এখানে নেপথ্যে বলে রাখি, এই পিঙ্ক কালারে লেখা অংশটা এটা আমিই বাক্য সাজিয়ে লিখেছে অবশ্যই।  কিন্তু এর আইডিয়াটা আমি পেয়েছি আমার – কার্ল মার্কসের জার্মান ভাবাদর্শ (পার্ট ওয়ান) – পাঠ থেকে। অর্থাৎ পাঠ ও এখানে উপস্থাপন এর সব দায় আমার কিন্তু মূল আইডিয়াটা অবশ্যই ওস্তাদের। যার কাছে যা নিয়েছি সে ঋণ আগে স্বীকার করে নেয়া ভাল। কেউ আমার একথায় একমত না হলে ক্ষতি নাই, আমি আমারটা স্বীকার করে রাখলাম।  আমার মত ক্ষুদ্র মানুষের চোখে ও বিচারে – ‘শহর বা নগর’ মানে আসলে কী তা বুঝবার ক্ষেত্রে এটা মার্কসের দুর্দান্ত অবদান, বেস্ট জায়গা হচ্ছে এটা। 

    তবে এখানে আলোচনায় এটাকে আধুনিক বলার সুত্র এটাই যে সারা বাংলাদেশের সব জেলা অঞ্চলকে রাজধানীকেন্দ্রিক করে বসবাস শুরু করানোটা চাট্টিখানি কথা নয় যে এটা চাইলেই করা যায় এমন নয়। যেমন এখনকার ঢাকাকে বলা যায় তুলনামূলক পারফেক্ট রাজধানী। কারণ অন্তত ১৯৮২ সালের পর থেকে আস্তে আস্তে বাংলাদেশের সব অঞ্চলের (উপজেলা) সাথেই এর যোগাযোগের সব ব্যবস্থাই ভাল বলে সব অঞ্চলের লোক এখন ঢাকায় পাওয়া যাবে। বর্তমানে ঢাকার কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় একাদেমিক ও কালচারাল পাড়াগুলোর অলিগলি পর্যন্ত দেশের সব অঞ্চলে লোকেদের একসেস বা যাতাযাত আছে; পৌছাতে পারে। ফলে সব আঞ্চলিক ভাষারই ঢাকায় প্রবেশ ও পৌছানো এখন অনেক সহজ। ফলে ঢাকায় বাংলা ভাষা বলে যেটা ক্রমশ দাঁড়াচ্ছে তাকে প্রভাবিত করার সুযোগ এখন বাংলাদেশের সব অঞ্চলের ভাষার হাতের কাছে আছে। এখন যেকোন অঞ্চলের ভাষার বা কোন একটা অঞ্চলের শব্দে এর ভাবপ্রকাশের সক্ষমতা যত প্রবল  বা তা যত ‘কমিউনিকেটিং’ (এক্সপ্রেসিভ অর্থে) সেই ভাষা বা শব্দ অন্যদের উপর প্রভাব ফেলবে তত বেশী। অন্য সকলে  সেই ভিন-আঞ্চলিক শব্দও এখানে আপন করে নিবার সম্ভাবনা তত বেশি। এমন এই আদর্শ সুযোগটা ১৯৮২ সালের আগে বাংলাদেশে ছিলই না। এরপর ইকোনমিক বা কাঠামোগত প্রশাসনিক সংস্কারের কারণে আস্তে ধীরে এটা বদলাতে শুরু করে আজ  এই জায়গায় এসেছে। এখানে একালের ঢাকার প্রসঙ্গ আনলাম তুলনা করে জমিদার আমলের একেবারে শুরুর দিকের কলকাতাকে পরিচয় পরিয়ে দিবার জন্য।

    যেমন এখন বলব,  আর ঠিক এর উল্টাটা ঘটেছিল কলকাতায় মোটাদাগে সেই ১৮০০ সালের আশেপাশের সময় থেকেই। সেসময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থাটাই পুরাটাই যেন এমন প্রিমিটিভ স্তরে ছিল যে ফলে অব্যবস্থার সুযোগটা কাজে লাগিয়ে জমিদার হিন্দু শ্রেণী যাকে ইচ্ছা তাকে বাঙালি বলা থেকে বাদ দিয়েছে, মুসলমানেরা বাঙালি নয় বলতে পেরেছিল আর বাঙালি জাত ও ভাষা যেকোনটাকে তা জমিদারের নিজের একক ইচ্ছা ও খেয়ালে হস্তক্ষেপ ও নির্ধারণ করে নিতে পেরেছিল।

    সারকথায় যার পরিণতিতে, এটাকে আমরা বলতে পারি বাংলার সমাজের প্রায় অর্ধেক অংশকে শাসক জমিদার-হিন্দু “মুসলমানেরা বাঙালি নয়” বলে তাদেরকে জমিদার-হিন্দুর মার্জিনালাইড প্রজা [যার অবস্থান হিন্দু-প্রজারও নিচে] মাত্র করে (চাপানো ব্যাখ্যায়) ফেলে রাখার সুযোগ নিয়েছিল।

    মানুষের রেস (race বা জাতি) পরিচয় বিষয়টা ডিএনএ সংশ্লিষ্ট যাকে প্রচলিত কথায় ‘রক্তের সম্পর্ক বলি’ সেই সম্পর্কিত ও জাত। তুলনায় ধর্মীয় পরিচয় যেটা এথনলজিক্যাল বা নৃতাত্ত্বিক অর্থে যুগ যুগে তৈরি ধর্মীয়-সামাজিক পরিচয়। কারোরই রেসিয়াল পরিচয় কেউ বদলানো যায় না পারে না, তবে তুলনায় ধর্মীয়-সামাজিক পরিচয়গুলোর খুবই স্বল্প কিছু অংশ বদলে যেতে পারে। কাজেই (রেসিয়াল ও এথনিক) জাত পরিচয়ে যে বাঙালি সে আবার মুসলমান ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণের কারণে রেসিয়াল বাঙালি থেকেও মুসলমান মানে বাঙালি-মুসলমান অবশ্যই হতে পারে। অবিভক্ত বাংলায় এর পুরা বাঙালি জনগোষ্ঠির এই অর্ধেক  ছিল মুসলমান-বাঙালি আর আবার পুর্ব বাংলায় তারা সংখ্যাগরিষ্ট। অথচ এদেরই কোনঠাসা করতে ও আধিপত্যের ছড়ি ঘুরাতে ও দাবিয়ে রাখতে, জমিদার-হিন্দুরা তাদেরকে বাঙালি রেসের (race) অংশ মানতে অস্বীকার করেছিল। কিন্তু কী এসে যায় যেখানে কোন রেস পরিচয় যা আসলে মূলত বদলানো বা অস্বীকারেরই অযোগ্য! সেই জবাব তারা জমিদার হিন্দু বা এইচিন্তার উত্তরসুরিদের পরবর্তিতে দিয়েছিল। পুর্ববঙ্গ বা একালে বাংলাদেশে এরাই ১৯৭১ এক সশস্ত্র যুদ্ধ করে এই মুসলমানেরা  নিজেদের “বাঙালি” এবং একই সাথে মুসলমান বলে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছিল, ব্যাপকভাবে নাড়া ফেলে দিয়ে। কারণ মা আর সন্তানের প্রথম কথোপকথন কোন ভাষায় শুরু হবে সেটা যেমন বদলানো যায় না – সেটা জন্মের আগেই নির্ধারিত হয়েই থাকে – এটা তেমনই, বদলানো যায় না। কলোনি-জমিদার আমল থেকেই মুসলমানদেরকে বাঙালি বলতে অস্বীকৃতি যতটা তীব্র হয়েছিল ১৯৭১ সালে এটাই ততোধিক বেগে – মুসলমানেরাই সেই প্রকৃত বাঙালি যারা ভাষার জন্য জীবন পর্যন্ত দিতে পারে তা প্রমাণ করে ছেড়েছিল। ফলে তারা রেসিয়াল ও এথনোলজিক্যালি বাঙালি কীনা এই স্বীকৃতি কারও থেকে চায় না্‌ কারও থেকে নিবার দরকার ফুরিয়ে গেছিল। তা রক্ত দিয়ে নিজেই প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছিল।

    কিন্তু তবু, একালে আরএসএসের উত্থান, গায়ের জোর খাটিয়ে সব ইচ্ছামত করে ফেলবে এমন এক জবরদস্তির হিন্দুত্বের বা হিন্দুত্ববাদের নয়া উত্থানের যুগ। তেমনই সময়কালে এবছর ছিল বিদ্যাসাগরের জন্মশতবার্ষিকী। তাই নিচে এদিকে ‘হিন্দু সংহতি’ বলে আরএসএসের এক অঙ্গসংগঠন এর ততপরতাকে দেখেন, উপরে বলা আমার কথাগুলোর মিল পাবেন।  যারা গত অন্তত চার বছর ধরে প্রকাশ্যে জনসভা করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে নাম ধরে উস্কানি তৈরি করে চলেছে। ফেসবুক পেজে তাঁদের ভারচুয়াল উপস্থিতি দিয়ে তারা এবার সেপ্টেম্বরের ২০২০ এর শেষে বাংলাদেশিদের কাছে পৌছে গিয়ে আক্রমণ শুরু করেছিল। তাঁদের শ্লোগান ও বক্তব্য ছিল এমন যেন তা সেই কলোনিযুগে জমিদার হিন্দুর বয়ানেরই পুনঃআবির্ভাব। বক্তব্য গুলো এমনঃ
    ধর্মের ভিত্তিতে বাংলা ভাগ হ‌ওয়ার পরে এই পশ্চিমবঙ্গ হল বাঙ্গালী হিন্দুর ন্যাচারাল হোমল্যান্ড। অর্থাৎ এই মাটির মালিক হল হিন্দু বাঙ্গালীরা। তাই পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় সম্পদের উপরে অধিকার সর্বপ্রথমে হিন্দু বাঙ্গালীর। পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ক্ষমতার স্বাভাবিক উত্তরাধিকার হিন্দু বাঙ্গালীর”।
    “বাংলাদেশী ভাষা পৃথক করো, সনাতনী বাংলা রক্ষা করো।
    বিদ্যাসাগরের বাংলাকে বিকৃত করে যে ভাষা আজ বাংলাদেশে চলছে তাকে কি বাংলা ভাষা বলা যায়?”

                                                                                         হিন্দু সংহতি ফেসবুক

    আরএসএস-এর  অঙ্গসংগঠন “হিন্দু সংহতি”  নামে এই সামাজিক সংগঠন, উপরে এই সংগঠনেরই ফেসবুক লিঙ্ক দেয়া হয়েছে। তাদের এসব কথার জবাব একটাই, যে পুর্ববঙ্গ বা একালে মুসলমান অধ্যুসিত বাংলাদেশ একে,  কলকাতার জমিদার হিন্দুরা কোন কালেই তারাও “বাঙালি” এই স্বীকৃতি দেয় নাই; আমরা তা চাইও না, অপেক্ষাও করে নাই। বরং আমরা তাদের কেয়ার করি নাই কখনও, এখনও করি না। আমরাই আমাদের রেসিয়াল ও এথনিক পরিচয় নির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে যে বাংলাদেশ নিজেই এখন এক স্বাধীন রাষ্ট্র। অর্থাৎ আমরা তো বিদ্যাসাগরের বাংলা বলে যদি কিছু থেকে থাকে এর থেকে বাইরে এবং তাদের চোখে অছ্যুত (untouchable)। আর আমরাও কী কলকাতার স্বীকৃতি কখনই চেয়েছি? বরং আমরা নিজেই প্রজা-বাঙালির বাংলাদেশ গড়ে নিয়েছি। [যদিও শাহবাগের কিছু  কবি-সাহিত্যিক এখনও প্রবল আছে এরা নিজেদের লেখা কবিতা বা সাহিত্য হয়েছে কিনা তা নিজেরা নিজেকে মুল্যায়ন করতেও অক্ষম তাই উত্থানরহিত। এদের অযোগ্যতা ক্ষমাহীন যখন দেখি এরা কলকাতার পদতলে নিজেদের সঁপে দিয়ে সার্টিফিকেট নিয়ে চায় যে তাদের সাহিত্য হয়েছে কিনা; এরা এমনই সেলফ-লেস বা মর্যাদা বোধহীন স্টুপিড।] অতএব বিদ্যাসাগরের বাংলা বলে আরএসএস এর কোন প্রকল্প যা আছে আমরা একে কেয়ার করি না, পাত্তা দেই না। বরং পরামর্শ থাকবে দূরে থাকেন। দাদাগিরি করতে এসেন না। চাইলে হিন্দুগিরি করেন কিন্তু কেবল কলকাতার ভিতরে সীমাবদ্ধ থেকে, যদি কলকাতার তা সহ্য হয়। এদিকে আমরা নিজেকে নিয়ে খুবই ভাল আছি। পুর্ববঙ্গকে মর্ডানিটি শিখাতে এসেন – এটা আপনাদের কাজ বা আপনারা এই যোগ্যতা নিজের জন্য রেখে দেন, প্লিজ। আর ভারতীয় হিসাবে  কলকাতার সমস্ত দায় এবং আবর্জনা সবই তো কলকাতারই! আমাদের তাতে ভাগীদারি বা দাবি নাই। ডিজ-ওনড এন্ড ফুলস্টপ!

    ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া বা ভিকটিমহুডঃ
    সব ক্রিয়ারই নাকি প্রতিক্রিয়া থাকে, থেকে যায়। তবে আসলে কথাটা হল ফোলানো বেলুন টিপাটিপির মত! ফোলানো বেগুনের কোন  একদিকটা চাপ দিয়ে ধরলে তাতে প্রতিক্রিয়ায় অন্যদিকটা বেশি ফুলে যাবে। প্রতিক্রিয়া ঘটতে অনেক সময় হয়ত তা ‘ফেবারেবল’ সুযোগের অপেক্ষা করেন। আপনি কাউকে যেমন ট্রিট করবেন, নিচা দেখাবেন কী পায়ের নিচে পিষবেন, অপমানে কোনঠাসা বা মার্জিনালাইজ করবেন তার পুরাটা না হলেও এরই বড় কিছু প্রতিক্রিয়া এরপরে আপনার উপর পালটা আসবেই। সেটা চিন্তা করে তাই এর মুখোমুখি হতে আগেই তৈরি থাকতে পারেন! আপনি হয়ত তখন নাকিকান্না করবেন, কী ভিকটিম হিসাবে পুরান সেই দাপুটে জমিদারের ছাতার নিচের আপনি এবার নিজেকে ভিকটিম হিসাবে ভিকটিমহুড দেখিয়ে তুলে ধরে দেখিয়ে উলটা সহানুভুতি তৈরির চেষ্টা করবেন, এমনটাই সাধারণত দেখা যায়। ঠিক এই জিনিষটাই যেন ঘটেছিল পাকিস্তান আন্দোলনের পরিণতিতে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েমের পরে। কারণ পাকিস্তান মানে তার পুর্ব-পাকিস্তান অংশে মানে, আগের পুর্ব-বঙ্গে স্থানীয় শাসক যে জমিদার-হিন্দু ছিল, পরে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে বলাই বাহুল্য এবার আগের ঐ জমিদার হিন্দুদেরই এতদিনের আয়েস ও লালিত রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ও আধিপত্য যুগের অবসান ঘটেছিল, অন্তত পুর্ববঙ্গে বা পুর্ব-পাকিস্তানে। আরও এতে বিশাল রাজনৈতিক এক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল। যা এই অঞ্চলের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সকল পুর্ববঙ্গীয় বাসিন্দাকে উল্টপালট প্রভাবিত করেছিল। তবে পরিবর্তন মূলত সবই পুর্ববঙ্গে। দেশভাগে পুর্ববঙ্গে যখন জমিদার-হিন্দু শাসন ক্ষমতা ও আধিপত্য হারিয়েছিল তখনও বাংলার অপর অংশ পশ্চিমবাংলায় তাঁদের আধিপত্য কিন্তু আগেরর মতই অটুট ছিল। তাই প্রথম প্রতিক্রিয়া হিসাবে জমিদার-হিন্দু ও তার মাখনের স্বাদ চাখনা প্রজা-হিন্দু এবার পুর্ব-পাকিস্তান থেকে পশ্চিমবঙ্গে মাইগ্রেশন বা স্থানান্তরিত হয়ে যায়। এটাই তাদের সেই দুঃখে হু হু করে উঠা মনে দেশভাগ – আর অভিশাপ, শাপান্ত! অর্থাৎ সেটা আর শুধু জমিদার-হিন্দু বা এলিট হিন্দুরাই নয় বরং জমিদারেরই আদরের ব্যাপক প্রজা-হিন্দুরাও এথেকে বাদ পরে নাই। আর তা মূলত এতদিন  প্রজা-হিন্দুরা যারা জমিদার-হিন্দুর সাথে “কালচারাল নৈকট্য” অনুভব করে  মুসলমান-প্রজার উপরের স্তরের জাতবিভাগের অবস্থান দাবি করে সেই অজুহাতে মুসলমান প্রজার উপর আধিপত্যের স্বাদ নিত, সব সুবিধা নিয়ে এসেছিল সেসব – বলা যায় এবার কাফফারা হিসারে সেই অপকর্ম যেন সুদে-আসলে উসুল হয়ে এসেছিল।

    যেকোন ফোর্স মাইগ্রেশন অবশ্যই খারাপ, কখনই তা কাম্য নয়। কিন্তু পুর্ববঙ্গের প্রজা-হিন্দুরা সাময়িক “কালচারাল নৈকট্য” এর আধিপত্যের মজা খেতে গিয়ে লং-টার্মে নিজেদের জন্য নিজেকেই এর ভিকটিমে পরিণত করেছিল।  এরপর  আজও যে ৮-১০% হিন্দু বাংলাদেশ অবশিষ্ট আছে তারা সেই থেকে নিজের দুঃস্থ অবস্থা এই ভিকটিমহুডকে বিক্রি করে যতটা প্রভাব তৈরি করা যায় এর উপর দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে চলেছে। এই বিশাল রাজনৈতিক যজ্ঞ এসবেরই মূল বা ফোকাস দল হল সিপিবি। আর এরপরে ন্যাপ, আওয়ামি লীগ থেকে শুরু করে শাহবাগ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা সকল প্রগতিশীল – এরা এখনও সেই হেরে যাওয়া ঝান্ডা আকড়ে আছে!!!  সত্যি এক দুর্দান্ত অপচয় বটে!!! যাদের সাহসও নাই যে তারা গত দু’শ বছরের বেশি জমিদার-হিন্দুর অসম্পুর্ণ সন্তুষ্টির এক আকাঙ্খা  -ভটক তে হুয়ে আকাঙ্খা – তারা কেন বয়ে বেড়াচ্ছে, কী করে আসছে তা উল্টে-পাল্টে দেখে! এটাই এখন এক তীব্র ইসলামোফোব ঘৃণা ও বিদ্বেষ!!!

    পাকিস্তান পেরিয়ে আজ বাংলাদেশ রাষ্ট্র – এটাও নেহেরু-গান্ধীর ভারতের মতই আরেক নেশন স্টেট যার সারকথা হল, ব্যাপক নাগরিক বৈষম্য। বিশেষত ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যবহারিকভাবে এই চরম অসাম্য চর্চা হতে দেখা যায়।  যার একমাত্র সম্ভাব্য সমাধান জাতি-রাষ্ট্র উপড়ে ফেলা আর এর বদলে নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে নিয়ে পুণর্গঠন। রামমোহন রায়ের (১৮১৫ সালের ব্রাহ্ম-সমাজ এর নেশন-বোধ) এই আদি পাপ বা আদি ভুল থেকে বেরিয়ে আসা।  যদিও রাষ্ট্রগঠনের এসব দিক নিয়ে সচেতনতা এখনও রাজনীতিতে এমনকি একাদেমিক পাড়াতেই নাই, কোথাও নাই।  এবং বিশেষত এই না থাকার আসল কারণ  “ব্যবহারিক কমিউনিস্ট চিন্তার” ক্ষতিকর আধিপত্য। বিশেষত ষাট থেকে আশির দশক পর্যন্ত (কারণ এরপর নিজেই মারা যায়) কমিউনিস্ট আধিপত্য। যারা আজও রাষ্ট্রগঠনের এদিক নিয়ে আলোচনা বা বুঝাবুঝি করতে অযোগ্য। কারণ তারা এসব আলোচনাকে “বুর্জোয়া” বা “ডানপন্থি” বলে দেখিয়ে এসেছিল। সেসব এক অবুঝ ও নাদানদের  দুর্দশা হয়ে আছে এখনও।  আর মূলত “শ্রেণী রাষ্ট্রের” বা রাষ্ট্রের শ্রেণী বৈশিষ্টের কথা জোর দিয়ে তুলতে গিয়ে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণার মৌলিক দিক – নাগরিক অধিকার ও নাগরিক সাম্য প্রতিষ্ঠার  কাজটাই তুচ্ছজ্ঞানে বাদ দিয়ে গেছে। কেবল রাষ্ট্রের শ্রেণী বৈশিষ্টের বুঝের খোদ রাষ্ট্রচিন্তা বলতেই তা এক দানবীয় স্বৈর এমনকি কখনও অবলীলায় এক ফাসিজমের ধারণায় পরিণত হয়েছে। কমিউনিস্টরা জনপ্রতিনিধিত্ব বা পাবলিক রিপ্রেজেন্টেশন ধারনাটাো কখনও গ্রহণ করে নাই বরং তুচ্ছ ও অপ্রয়োজনীয়-জ্ঞান করে ফেলে দিয়েছে ও হারিয়ে ফেলেছে।  বাস্তবে ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে এমন যে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতার নামে এরাই আজ অচল “জাতি-রাষ্ট্র” ধারণার প্রধান প্রবক্তা।

    এভাবে এরপর কী হতে হবে সে আলাপে আপাতত ছেদ দিয়ে একটু পিছনে ফিরা যাক। আসলে ১৯৪৭ এর দেশভাগ বলে যা পরিচিত, এতে পুর্ববঙ্গের জমিদারি ছেড়ে কলকাতা চলে যাওয়াতে তার ফেলে আসা জমিদারি বা জমি সেটা তো তখন আরেক রাষ্ট্র বা ওর অংশ হয়ে গেছে। সারকথায় যার উপর পশ্চিমবঙ্গ কেন ভারতেরও আর কোন owning বা কর্তৃত্ব বা এক্তিয়ারই নাই হয়ে গেছিল। ইতোমধ্যে কালক্রমে পুর্ব-পাকিস্তানের প্রাদেশিক পার্লামেন্টে ১৭৯৩ সালের পুরানা জমিদারি আইন (চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন) বাতিল করে ১৯৫১ সালের ১৬ মে নতুন প্রজাস্বত্ব আইন (ল্যান্ড একুজেশন এন্ড টেন্যান্সি এক্ট ১৯৫০) পাশ হয়ে যায়। সেই ‘জমিদার উচ্ছেদ আইন’ এখনও বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের অংশ হয়ে আছে। আর এতে জমিদারির শেষ ক্ষমতাটুকু অন্তত পুর্ব-পাকিস্তানে তা বাতিল ও চিরসমাপ্তি লাভ করেছিল। আর এরই ফলাফলে পুর্ববঙ্গে আগে যারা প্রজা বা ভাগচাষী ছিল তারা তখন থেকে সরকারকে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে আগের চাষাবাদের জমিরই মালিক বলে আইনি স্বীকৃতি পায়, তাঁদের নামেই টাইটেল জারি হয়। ১৭৯৩ সালের জমিদারি ব্যবস্থা চালুর আগে যে টাইটেল প্রজাদের নামেই ছিল। আর এই আইনটা তৈরির সময় যে সাধারণ ফর্মুলা অনুসরণ করে তৈরি বা মেনে করা হয় তা হল, (এখনও বাংলাদেশের জমি অধিগ্রহণ আইন আছে এটা সেটাই) জমি অধিগ্রহণ আইন  অনুসারে পাবলিক ইন্টারেস্টে বা জনস্বার্থে, পুর্ব-পাকিস্তান সরকার যেকোন জমি “অধিগ্রহণ করা হল” বলে ঘোষণা দিতে পারে। সেই আইন দিয়েই প্রথমে সারা পুর্ব-পাকিস্তানের সব জমি অধিগ্রহণ (ল্যান্ড একুজেশন) করে নেয়া হল বলে ঘোষণা জারি করা হয়। আর এর ফলে আগের সব জমিদারি মানে, জমিদারের মালিকানা টাইটেল বাতিল হয়ে যায়। ফলে এবার যে প্রজা যে জমি চাষাবাদ করত এবার সেই প্রজাই ঐ জমির জন্য সরকারকে খাজনা দেয়া সাপেক্ষে তাকেই মানে তার নামেই জমির নয়া মালিকানা টাইটেল জারি করে দেয়া হয়েছিল। আর এই হল আজকের বাংলাদেশের সকল ভুমি মালিক যাদের পুর্বপুরুষের জমির টাইটেল কেড়ে নিয়ে বৃটিশ শাসনের শুরুর দিকে জমিদার নামে নতুন একটা শ্রেণীর কাছে তাঁদের জমি নতুন টাইটেল করে দেয়া হয়েছিল, দুশবছর পরে হলেও এই জবরদস্তির অবসান ঘটেছিল। পুর্ব পাকিস্তানের ‘প্রজারা’ হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে জমির মালিকানা টাইটেল ফেরত পেয়েছিল তখন থেকে। সোজা কথায় পাকিস্তানের জন্ম মানে পুর্ব-পাকিস্তানের আগের প্রজাদের এবার নিজের নামে জমি ফিরে পাওয়া। অন্তত এই একটা কারণে পুর্ব্বঙ্গের সকল প্রজারা পাকিস্তান আন্দোলনের সুবিধাভোগী বেনিফিশারি বলে পাকিস্তান কায়েমকে অন করা উচিত!   অতএব সারা পুর্ববঙ্গের প্রজা-কৃষকেরা (হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে) স্বাধীন পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে এখান থেকেই ডাইরেক্ট বেনিফিশারি হয়ে যায়, কারণ তারা জমি পেয়েছিল। এরাই ছিল পাকিস্তান আন্দোলন আর পাকিস্তান কায়েমের সরাসরি বেনিফিসিয়ারী ফলে নিট সমর্থক হওয়ার কথা! কিন্তু না! যদিও এই অবস্থাটা পরবর্তিতে দুএক বছরের মধ্যে একই রকম আর থাকে নাই। কিছুদিনের মধ্যেই বিভ্রান্ত ও উলটে যায়। এবার পয়সা হাতে পেয়ে কৃষকেরা নিজ সন্তানকে যতই শিক্ষা নিতে পাঠিয়েছিল ততই তারা মাথা কামিয়ে প্রগতিশীল-কমিউনিস্ট হতে পথ ধরেছিল। এটাই নাকি আধুনিকতা!!! কেউ যা উল্টে-পাল্টে চেক করে দেখে নাই – সেই পুরানা জমিদার-হিন্দুর স্বার্থবয়ানের চোখে লেখা মর্ডানিটি, স্বাধীনতা, ব্যক্তিবোধ ও প্রেম ইত্যাদির চক্করে পড়ে গেছিল তা আজও তারা টের পায় নাই যে ভুলটা কোথায় হয়েছিল!!!  জমিদার-হিন্দুর মূল বয়ান হল ধর্মই সব নষ্টের গোড়া। তবে সাবধান!  এখানে ধর্ম মানে কেবল ইসলাম বা মুসলমানদের কারণেই তার জমিদারি উচ্ছেদ হয়ে গেছে। একারণে ১৯৪৫ সালের পরে জমিদার ও অনুসারিরা দলে দলে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিল। তাই মর্ডানিটি, স্বাধীনতা, ব্যক্তিবোধ ও প্রেম ইত্যাদি  আধুনিকতার ধারণাগুলোকে তারা ইসলাম-উচ্ছেদের প্রকল্পের দিক থেকে ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করেছিল।  অতৃপ্ত আত্মা নাকি মারাত্মক প্রতিহিংসাপরায়ন হয়। জমিদারি-হারানোর অতৃপ্ত আত্মার তাই হয়েছিল।  তাই তামাসাটা দেখেন, সে নিজে কিন্তু নিজধর্ম পালন করেও আধুনিক-প্রগতিশীল হয়ে আছে!  কেন?  [দ্বিতীয় পর্বে দেখেন আগামী কাল শুক্রবার]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    সর্বশেষ এডিট আপডেটঃ ২৪ মে ২০২৩ ভোর-রাত  দুইটা চল্লিশ

    [সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল এই পত্রিকা গ্রুপেরই এক ভগ্নি, আরেক ত্রৈমাসিক সাময়িকী পত্রিকাও আছে।  কিন্তু মূলত সেটা প্রিন্টেড পত্রিকা, যার  সাথে কেবল এক ই-পেপার ভার্সান আছে।  এই লেখাটা ঐ ত্রৈমাসিক দেশকাল পত্রিকার গত অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২০  সংখ্যায়, “সাতচল্লিশের দেশভাগের তাতপর্য ও  অতঃপর ……” এই নামে ছাপা হয়েছিল।  তা প্রায় পাঁচ হাজার অক্ষরের অনেক বড় লেখা  ছিল। সেই লেখাটাকে এবার আবার এডিট করে আরো সংযোজন-বিয়োজন করে তিনপর্বে তা  এবার নতুন নামে  নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।

    ওদিকে ত্রৈমাসিক দেশকাল পত্রিকার  ই-পেপার পাঠক ফেন্ডলি নয়।  তাই আগের লেখাটার এক পিডিএফ ভার্সান এখানে পেতে পারেন। নামিয়ে নিতে হবে। ]

  • জয়শঙ্কর চান চীনের বদলে জাপান! কিন্তু লাভ নাই

    জয়শঙ্কর চান চীনের বদলে জাপান! কিন্তু লাভ নাই

    গৌতম দাস

    ০৮ মার্চ ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3pl

    জয়শঙ্কর বলেছেন, ‘নো ক্রাইম নো ডেথ’। PPBD

    s-jaishankar-aka-momen-040321-201

    দেখানো উদ্দেশ্য ছিল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আগামি ২৬ মার্চ ঢাকায় আসছেন, এটা নিশ্চিত করতেই নাকি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর গত ৪ মার্চ এক দিনের ঢাকা সফর করে গেলেন। কিন্তু এই সফরের যেসব মিডিয়া কাভারেজ রিপোর্ট ছাপা হয়েছে বাংলাদেশে বা ভারতে, তা দেখে আমরা পরিষ্কার যে, দুই দেশের মিডিয়াই “উদ্দেশ্যের বিচারে” পুরা বিভ্রান্ত। জয়শঙ্কর ঠিক কেন এসেছিলেন? যেমন – প্রথমত তাঁর এই সফরের মূল উদ্দেশ্য হওয়ার কথা, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অতিথি হিসেবে মোদীর বাংলাদেশ সফরের কূটনৈতিক ব্যবস্থাদি চূড়ান্ত করা। কিন্তু প্রায় সব মিডিয়া রিপোর্টই এমন যে, এই প্রসঙ্গ নিয়ে কথাবার্তা কোথাও আছে কি না তা খুঁজতে হবে, খালি চোখে পাওয়া যাবে না। এমনই অবস্থা!

    তাহলে ওসব মিডিয়া রিপোর্ট বা শিরোনাম কী নিয়ে? দুই দেশেরই বেশির ভাগ মিডিয়ার শিরোনাম ও রিপোর্টের ফোকাস হল – “সীমান্ত হত্যা”। যেন মোদীর সফর না, ‘সীমান্ত হত্যা’ ছিল আলোচনার মূল এজেন্ডা!  আর সবচেয়ে ভয়ংকর যে কথা বলা হয়েছে সেখানে – বাংলাদেশ আর ভারত নাকি একমত হয়েছে যে, সীমান্তে অপরাধ হচ্ছে তাই হত্যা করতে হচ্ছে। অপরাধ ও হত্যা, একে অপরের কাউন্টার বা রিমেডি! এই প্রসঙ্গে বড় করে জয়শঙ্করের বাণী সামনে এনেছে বিডিনিউজ২৪। জয়শঙ্করের বরাতে তারা লিখছে, “আমি মনে করি, আমরা একমত হয়েছি, যে কোনো মৃত্যুই দুঃখজনক। কিন্তু আমাদের নিজেদের জিজ্ঞেস করতে হবে, সমস্যাটি কেন হচ্ছে এবং আমরা জানি, সমস্যাটি কী। সমস্যা হচ্ছে অপরাধ।… সুতরাং আমাদের মিলিত উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ‘অপরাধহীন ও মৃত্যুহীন’ সীমান্ত। আমি নিশ্চিত, আমরা যদি এটা করতে পারি, অপরাধহীন ও মৃত্যুহীন সীমান্ত, তাহলে একসাথে এই সমস্যার সমাধান করতে পারব”।

    বুঝা গেল ‘সীমান্ত হত্যা’ নিয়ে জয়শঙ্কর কথা সাজিয়ে এসেছিলেন ভালই, বলতে চেয়েছেন সীমান্তে অপরাধ হচ্ছে তাই হত্যা করতে হচ্ছে। অনেক মিডিয়া তাই সরাসরি কোট করে লিখেছে “অপরাধ নাই তো মৃত্যুও নাই” [India for ‘No crime, no death’ policy on border, says Jaishankar]  কিন্তু  তাতে সীমান্ত হত্যার “হত্যা” শব্দটা জয়শঙ্কর বেশ চাতুরির সাথে লক্ষণীয়ভাবে বদলে দিয়েছে আর বসিয়ে নিয়েছে “মৃত্যু”। কারণ “হত্যা হচ্ছে” মানে ভারতীয় বিএসএফ হত্যা করছে- এটা স্বীকার করা হয়ে যায়। তাই এবার শব্দ বদলে এক চাতুরী করা। ‘হত্যা’র বদলে ‘মৃত্যু’ শব্দ ব্যবহার করেছেন জয়শঙ্কর। তিনি বলেছেন, ‘নো ক্রাইম নো ডেথ’ এটাই নাকি তাদের সীমান্ত-নীতি। মানে না কিল, তো না ডেথ। আর তাতে মানে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশী হতভাগ্য নাগরিক-ব্যক্তিটার কেন সীমান্তে মৃত্যু হয়েছে, কে গুলি করেছে, এটা জয়শঙ্কর জানেন না বা সেটা যেন কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়। অথবা সীমান্তে খুন হওয়া বাংলাদেশি নাগরিক-লোকটা যেন নিজেই বিএসএফকে গিয়ে বলেছেন তাকে গুলি করে মেরে ফেলতে!

    কিন্তু এসব ছেঁদো আলাপে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিনি কী করছিলেন? মি. মোমেন যদি বুঝেই থাকেন যে তিনি জয়শঙ্করের সাথে বাতচিতে বাংলাদেশীদের সীমান্তে হত্যা ঠেকাতে পারবেন না, এ নিয়ে কথা তুলেও সুবিধা করতে পারবেন না, তাহলে এটাকে তিনি তাদের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ইস্যু করলেন কেন, হতে দিলেন কেন? কেন রাজি হয়েছেন এতে? এর মানে কী? কী আলোচনার ইস্যু হবে সেটাতেও সম্মতি দেয়া না-দেয়ার মুরোদও তিনি হারিয়েছেন?  এটা আলোচনার ইস্যু না করলে আমাদের কী (বাড়তি) ক্ষতি হতো? তিনি কী ব্যাখ্যা করতে পারবেন? এ ছাড়া এখন এর চেয়েও বড় একটা প্রশ্ন উঠেছে!

    প্রশ্নটা হল  – বাংলাদেশের কোনো নাগরিক অপরাধ যদি করেও থাকে তাহলেই কী তাকে খুন-হত্যা করতে পারেন? করা যায়?  জয়শঙ্করেরা তাকে হত্যা বা খুন করে ফেলবেন? এই হত্যাকে লুকিয়ে একে ‘মৃত্যু’ বলে ডাকতে পারেন? মি. মোমেন আপনি এটাকে ‘মৃত্যু’ বলে ডাকার কে? কেন একে ‘মৃত্যু’ বলতে জয়শঙ্করকে সম্মতি দিয়েছেন? এটা সিরিয়াস লিগ্যাল প্রশ্ন! এর জবাব কী?

    বিডিআর ও বিএসএফ দুটোই পড়শিদেশের সিভিলিয়ান ফোর্সঃ
    বর্ডার গার্ড (সাবেক নাম বিডিআর) ও বিএসএফ এ দুটোই পড়শি দুই দেশে সিভিলিয়ান ফোর্স হিসেবেই গণ্য, অর্থাৎ এটা যার যার দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। মানে সামরিক বাহিনীর মত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়। বরং এটা পুলিশের সমতুল্য এক সিভিল প্রশাসন যাদের কাজ অপরাধীকে ধরে আদালতে পেশ করা। আত্মরক্ষার মতো পরিস্থিতি ছাড়া অতিরিক্ত (অ্যাকসেসিভ ফোর্স) বলপ্রয়োগ না করা, হত্যা না করা। সীমান্ত রক্ষীবাহিনী তাই স্থানীয় থানার মাধ্যমে আসামিকে আদালতে পেশ করতে পারে। সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিষয়ক দুই দেশের চুক্তি (যেটা পাকিস্তান আমল থেকেই চালু হয়েছিল আর স্বাধীন বাংলাদেশে সেটাকেই রিনিউ করে নেয়া হয়েছে) করার উদ্দেশ্যই ছিল মূলত দুটা। এক. সীমান্ত অপরাধের ইস্যুগুলোকে যেন সিভিল প্রশাসনের অধীনে রেখে পরিচালনা করা যায়; দুই দেশের নাগরিকের মধ্যে সদ্ভাব থাকে; দুই সীমান্ত রক্ষীবাহিনীই যেন অযথা এবং ‘অতিরিক্ত’ শক্তিপ্রয়োগ না করে। আর দুই. এতে সুবিধা হল, দুই দেশের সেনারা সীমান্ত থেকে বহুদূরে (সম্ভবত ২৫ কিলোমিটারের বাইরে) ব্যারাক গড়ে থাকতে পারে। এতে সীমান্তে টেনশন কমানোর সহায়ক পরিবেশ পাওয়া যায়। সেনাবাহিনীর এনগেজমেন্টের রুল ভিন্ন এবং তা সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে। একটা দেশের শত্রুর ব্যাপারে যেভাবে আচরণ করা উচিত সেভাবে। আর এখানে সবার উপরের কথা হল, সামরিক স্ফিয়ারের কোনো খুন বা ছোট-বড় গোলাগুলির ঘটনা কোনো দেশের আদালতে তোলার বিষয়ই নয়, আর তা এখতিয়ারেরও বাইরে। বড় জোর, কোন আভ্যন্তরীণ নিয়মভঙ্গ হলে নিজ নিজ দেশের সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোর্ট অব এনকোয়ারি হতে পারে; তাও বিশেষ ক্ষেত্রে। তাই দেশের সীমান্ত যদি সেনাবাহিনী দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার মানেই হল, সীমান্ত-সম্পর্কিত অপরাধীরা এক্ষেত্রে আদালত-বিচার ইত্যাদির সুবিধা পাবে না। তা দেয়া যাবে না। এটা এড়াতেই দুদেশে সীমান্তে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বসানোর চুক্তি।

    এসবের সার কথাটা হল, ভারত-বাংলাদেশ উভয়েই নিজ সেনাবাহিনীকে সীমান্তের ২৫ কিলোমিটার দূরে ব্যারাকে রেখে এবার নিজ নিজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত ও পরিচালিত নিজ নিজ সীমান্ত রক্ষীবাহিনী দিয়ে উভয়েই সীমান্ত নিরাপত্তা পরিচালনা করার চুক্তি করা হয়েছিল। যার মানেই, সীমান্তে কোনো “অপরাধ ঘটলে তা গুলি” করে সমাধান করা যাবে না। অপরাধ মানেই, গুলি করে হত্যা বা মৃত্যু নয়। কারণ সীমান্ত রক্ষীবাহিনী সেনাবাহিনী নয়। তারা অপরাধীকে প্রতিপক্ষ দেশে হস্তান্তর করতে পারে প্রটোকল থাকলে, চাই কী নিজ নিজ দেশের আদালতে পেশ করতে পারে। তাতে রায় সাপেক্ষে আসামিকে শাস্তি পেতে হতে পারে। তবে তা আর সীমান্ত বাহিনীর এখতিয়ারই নয়, সিভিল পুলিশের কাজ। তাহলে মি. মোমেন কিভাবে ‘নো ক্রাইম নো ডেথ’-জয়শঙ্করের এই সীমান্তনীতিতে সায় দিয়েছেন? এ প্রসঙ্গে, বিডিনিউজের রিপোর্ট দাবি করছে মোমেনকে পাশে নিয়ে জয়শঙ্কর বলেছেন … ‘আমরা একমত হয়েছি’…। তাহলে নিজের হাত পরিষ্কার রাখতে এখন মি. মোমেনের উচিত নিজে থেকে এ ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়া, কেন তিনি একমত?

    এক ধান্দালি শব্দ ‘কানেকটিভিটিঃ’
    দুই দেশেরই মিডিয়ায় দ্বিতীয় গুরুত্বের ফোকাস ছিল ‘কানেকটিভিটি’ [Connectivity]। শব্দটা এবার প্রথম আলো বাংলা করেছে “সংযুক্তি”। সরি, এটা ভাল বাংলা হয় নাই। বিশেষত এই অনুবাদ কনটেক্সট বা প্রেক্ষিত থেকে দূরে চলে গিয়েছে, এতে বিচ্ছিন্ন সম্পর্কহীন হয়ে গেছে। ভাল বাংলা হতে পারত “সংযোগ”। মূলত শব্দটার অর্থ “অবকাঠামোগত সংযোগ”।  কিন্তু এসব বাদ দিয়ে আরেক মূল সমস্যা এখানে দেখা দিয়েছে।

    যেমন, অনেক মিডিয়া রিপোর্টে আবার ‘কানেকটিভিটি’ শব্দটাই নাই অথবা অর্থহীনভাবে দু-এক শব্দে আছে। যেমন- ভারতের দক্ষিণী- দৈনিক দ্য হিন্দু [thehindu], যা গত দুই জোড়া বছর ধরে মোদীর জাতিবাদের এক বড় প্রবক্তাই শুধু নয়, বিশেষ করে বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের খোদ ‘সাফাইদাতা মুখপত্র’ যেন এমন ভূমিকা রেখে চলেছে। বিশেষ করে ওর সুহাসিনী হায়দার বা কল্লোল ভট্টাচার্যের লেখা রিপোর্টগুলো। বলাই বাহুল্য, যা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের বলার কথা সেই দায়িত্ব অযাচিত হয়ে একটা মিডিয়া পালন করতে পারে না। এটা মারাত্মক দৃষ্টিকটু শুধু নয় এটা সরকারের তোষামোদ। আর যা তোষামোদ করা তা আর ন্যূনতম কোনো স্বাধীন মিডিয়া কি না সে প্রশ্ন উঠবেই। দ্য-হিন্দুর অবস্থা এমনই! সময়ে মনে হয়েছে জার্নালিজমের ভূমিকা ভুলে গিয়ে ‘অতি দেশপ্রেমী-জাতিবাদী হিটলারের’ ভাই দ্য-হিন্দুর ওপর ভর করেছে। আমাদের চলতি সরকার ২০১৯ সালে গঠন হওয়ার পর থেকে ক্রমাগত দ্য-হিন্দু অবলীলায় এ কাজ করে চলছে, যা তার কাজই নয়। কিন্তু তামাসার দিকটা হল, মনে হচ্ছে এবার জয়শঙ্করের সফরে দ্য-হিন্দুকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় ‘বেওয়াফা’ করে ছেড়েছেন, মানে ভাগাড়ে নামিয়ে দিয়েছেন। জয়শঙ্করের কানেকটিভিটি শব্দের গোপন অর্থ তাতপর্য কী তা দ্যা হিন্দু আমাদের কিছুই জানাতে পারে নাই।  দ্য-হিন্দুর রিপোর্টে ‘কানেকটিভিটি’ শব্দটা অকিঞ্চিতকরও অর্থহীন, তবে হাজির আছে মাত্র। অথচ  প্রতিদ্বন্দ্বি মিডিয়া এনডিটিভি [India Keen To Focus On Connectivity With Bangladesh: S Jaishankar] , ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গ্রুপের মিডিয়াতেও [considering involving a third country like Japan in further expanding its connectivity ] তা যথেষ্ট অর্থপূর্ণভাবে রয়েছে।

    এটাকে বলা যায়  জয়শঙ্করের ‘কানেকটিভিটি’ ট্যুরঃ
    সত্যিকারভাবে বললে, এটা এখন কমবেশি পরিস্কার যে জয়শঙ্করের এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল “চীনের বদলে জাপান”! এ কথার মানে কী? মানে হল, গত ১২ বছরের শুরু থেকেই ঢাকা সরকার সবসময় চীনের একটা হাত ধরে রাখা না হলেও অন্তত একটা আঙুল ছুঁয়ে থাকা্র নীতিতে ছিল আমাদের সরকার, বিশেষত ২০১০ সালে সরকার প্রধানের প্রথম চীন সফরের পর থেকেই। অথচ বিপরীত দিকটা হল, “প্রো-ইন্ডিয়ান” হয়েই কিন্তু এই সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। আর তাতে সরকারের দিক থেকে ভারতকে এই সাফাই-ব্যাখ্যা দেয়া হত যে (২০১২ সালে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক লোন বাতিলের পর থেকে), বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বিপুল ঋণ পাওয়া দরকার। যেটা দিবার মুরোদ ভারতের নাই তাই বড় উৎস হিসেবেই বিশ্বব্যাংকের বিকল্প চীনের সাথে এত যোগাযোগ শুরু করেছে। এমনকি ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং-এর বাংলাদেশে সফর থেকে বাংলাদেশ প্রথম ২০ বিলিয়ন ডলারের নানান অবকাঠামো ঋণের কমিটমেন্ট পেয়েছিল। সেটা ২০১৯ সালের মধ্যে বরং বাস্তবে বেড়ে ২৬ বিলিয়নে পৌঁছেছিল। এতে যদিও সব প্রকল্পের সব অর্থ খরচ হয়ে যায় নাই, তবে সব অর্থ বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দ হয়ে গেছে ও প্রকল্প চলমান। তাই এমনকি গত বছর আরো প্রায় ৬-১০ বিলিয়ন ডলারের নতুন প্রকল্প নেয়ার কথা চলছে। সারকথায় বাংলাদেশের চীন-ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণটা ভারতকে মেনে নিয়েই এতদিন চলতে দেখেছি আমরা।

    পালটা টানাপোড়েন শুরুর দিনঃ
    কিন্তু এই চীনকে মেনে নেওয়া সম্পর্কের মধ্যেও ২০১৯ সালের শুরু থেকেই ভারত থেকে বাংলাদেশের আরো দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যেটার আগমনবার্তা দেখেছিলাম আমরা – ২০১৮ সালের ২৬ মে মাসে ভারত সফর শেষে হাসিনা দেশে ফিরে ৩১ মে দৃশ্যত তাঁর খুবই হতাশ মন্তব্যে সেই বিখ্যাত উক্তি, “আমি ভারতকে যেটা দিয়েছি তারা তা সারা জীবন মনে রাখবে“। একটা ক্ষোভ থেকে এটা বলা হয়েছে অনুমান করা যায়। আর এথেকে এরই প্রতিক্রিয়ার বাস্তবায়নের শুরু ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে। সরকথায় এটা ছিল – এটা যতটা ভারত থেকে দূরে সরে যাওয়ার উদ্যোগ ততটাই যেন চীনের সাথে আগের চেয়েও এবং খোলাখুলি বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়া। য়ার তা থেকে, তিস্তা নদীর নাব্যতা বা ধারণক্ষমতা বাড়ানোর প্রায় বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প নেয়া হয়েছিল সেখানে। ইতোমধ্যে আমেরিকায় বাইডেন ক্ষমতায় আসার পরে আমরা লক্ষ করেছি আরো বেশি করে ত্রাতার মতই চীনকে আঁকড়ে ধরাও শুরু হয়েছিল।

    কিন্তু এই সব কিছুকে উলটে দিয়ে দুই সপ্তাহ আগে আমরা আবার শুনছিলাম বিরহের সুর – চীনের হতাশ হয়ে করা কথাবার্তা যে, আমরা আর কখনো জুট বা জুট মিল (পুনর্বাসন) এবং বস্ত্রখাতে বাংলাদেশকে সহযোগিতার কথা তুলব না [Angered, China says will never back Bangladesh jute sector]। যদিও একটা নতুন ও অখ্যাত পত্রিকা [বিজনেসইনসাইডার-বিডি] ছাড়া আর কোথাও এই খবরটা দেখা যায় নাই। অথচ এক মাস আগেও চীনা উদ্যোক্তারা নাকি বাংলাদেশের বিনিয়োগ বোর্ডের শীর্ষে ভীড় করেছে তাই যৌথ বিনিয়োগে সম্ভাবনা দেখছে বাংলাদেশ-চীন বলে রিপোর্ট দেখছিলাম আমরা।

    আবার এর পরপরেই আসে আরও প্রকাশ্য বিরোধের খবর। বিবিসি বাংলার এক রিপোর্টে পদ্মা সেতুর রেল প্রকল্পের চীনা ঠিকাদারকে বিল পে না-করা নিয়ে সরকারের সাথে এক বড়সড়-বিরোধ আমরা জানতে পারি। ঠিকাদার যখন বিল না পাওয়ার অভিযোগে বিবৃতি দিয়ে কাজ বন্ধ করে এটা খুবই অস্বাভাবিক কিন্তু চরম বিরোধের আভাস দেয়। অভিজ্ঞতা বলে, সাধারণত এটা দেনাপাওনার কিন্তু মারাত্মক বিরোধ।  তখন থেকেই অনুমান বেড়ে চলছিল, এটা আবার চীনের থেকে বাংলাদেশের অনেক দূরে চলে যাবার ইঙ্গিত হয় কি না!  মনে হচ্ছে সেসব অনুমানের সঠিকতাই প্রমাণ করতে যেন জয়শঙ্করের আগমন! এখানেই জয়শঙ্করের এই সফরকে ঠিক মোদীর সফরের আগমনবার্তার বাহক যতটা না, এর চেয়ে বেশি এটা জয়শঙ্করের ‘কানেকটিভিটি’ ট্যুর মনে হচ্ছে! কিন্তু ‘কানেকটিভিটি’ এই আজিব শব্দ কেন?

    বাংলাদেশের জন্য এক ক্ষতিকর শব্দ ‘কানেকটিভিটিঃ’
    ভারতের হাতে ব্যবহৃত বহুরূপী শব্দ এই “কানেকটিভিটি”।  একেক সময় ভারত একেক ধান্দায় এই শব্দটা ব্যবহার করেছে। কিন্তু কমন দিকটা হল এটা বাংলাদেশের জন্য সবক্ষেত্রেই এক মারাত্মক ক্ষতিকর শব্দ হয়েই থেকেছে। মজার কথা হল, গত ২০০৯ সালে এই সরকার ক্ষমতায় আসার আগে এই শব্দটা বাংলাদেশে পরিচিত শব্দটা ছিল না। তখন মানে ২০০৯ সাল থেকে সুনির্দিষ্ট করে এই শব্দের অর্থ ছিল – ভারতের পুরা নর্থ-ইস্টকে বাংলাদেশের পশ্চিমে, পশ্চিমবঙ্গের সাথে সংযোগ করে দেয়া (এটাই কানেকটিভিটি) এবং সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে এবং বিনাপয়সায় গড়ে দেয়া। আর সেটা আকাশ, রেল, সড়ক, মাটির নিচে পাইপ লাইনে, বিদ্যুতের খুঁটি দিয়ে এবং নদী ও সমুদ্রপথে- সম্ভাব্য প্রায় কিছুই বাদ না রেখে।

    সবচেয়ে অবাক কাণ্ড হলো, আমাদের মন্ত্রীরাও ‘কানেকটিভিটি’ ‘কানেকটিভিটি’ বলে বেড়াতেন (সবচেয়ে বেশি বলতেন দীপুমনি যখন তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী) এমনকি কেউবা (প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা) করিডোর সুবিধায় দেওয়া সার্ভিসের অর্থ বা ভাড়াটাও “চাওয়া লজ্জার” বলে দাবি করেছেন। অথচ ‘কানেকটিভিটি’ শব্দের সাথে যুক্ত সব কিছুই ছিল চরম একপক্ষীয়ভাবে ভারতের চাহিদাপূরণ এবং তা বাংলাদেশের ক্ষতি ও নিজেদের অসুবিধা করে হলেও। আর এবার  আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে গত পরশু সফরে এসে আবার জয়শঙ্কর ‘কানেকটিভিটির’ গান! সেই শব্দ আওড়াতে শুরু করেছেন। কেন?

    এবার নতুন কী চানঃ
    এবার জয়শঙ্কর নতুন কিছু চাচ্ছেন কিন্তু যার সাথে ‘কানেকটিভিটি’ শব্দটার আসলে আবার কোনই সম্পর্ক নেই। যেমন ‘প্রথম আলো’ প্রথম দিনই মানে ৪ মার্চেই যে রিপোর্ট করেছে – তাতে সে ‘কানেকটিভিটি’ শব্দটা নতুন কিছু আভাস পাবার মত করে, সে কথাই লিখেছে। যেখানে বাংলাদেশের অন্য মিডিয়ারা কিছু তেমন লিখে নাই বরং উপেক্ষা করে গেছে। হয়ত বুঝে নাই বা টের পায় নাই কিছু বলে।  প্রথম আলো জয়শঙ্করের মুখভাষ্যে লিখেছে, “এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে আমরা একসাথে কাজ করছি না। যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ৫০ বছর পার হয়েছে এবং পরের ২০ বছর কী করা যেতে পারে, আমি বলব সংযুক্তি (‘কানেকটিভিটি’)। আমাকে আপনাদের প্রধানমন্ত্রী উদ্ধৃত করে বলেছেন যে, সংযুক্তি হচ্ছে উৎপাদনশীলতা। যদি আমরা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সংযুক্তি ঠিকমতো করতে পারি, তবে এই অঞ্চলের সামগ্রিক ভূঅর্থনীতি পরিবর্তিত হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগর খুব কার্যকর। আমরা দুই পক্ষই বিশ্বাস করি, এটি করা সম্ভব”।
    প্রথম আলো আরো লিখেছে, “সংযুক্তি প্রসঙ্গে এস জয়শঙ্কর বলেন, আজকের বৈঠকের বড় একটি সময় তারা এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তৃতীয়পক্ষকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার বিষয়েও তারা আলোচনা করেছেন। সম্ভাব্য দেশ হিসেবে জাপানের নাম এসেছে। কারণ, জাপানের সাথে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের সম্পর্ক যথেষ্ট ভাল। বঙ্গোপসাগরে জাপানের সংযুক্তি প্রকল্প রয়েছে। সম্পর্কোন্নয়নে তিনি সংযুক্তিকে বড় লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করেন”।

    প্রথম কথা হল, ‘কানেকটিভিটি’ শব্দের আড়ালে এতদিন ভারত যেভাবে তার নর্থ-ইস্টকে ভারতের বাকি অংশের সাথে কানেক্ট বা যুক্ত করা – এটাই এর মূল অর্থ এবং ভারতের চরমতম একপক্ষীয়ভাবে সুবিধা নেওয়া। এবং এই কানেক্ট করা মানে  সব মাধ্যমে একপক্ষীয় সুবিধায় বিনাপয়সায় জুড়ে নিয়েছে, এর অর্থ সেখানেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এবারের ‘কানেকটিভিটি’ শব্দ দিয়ে আরও অন্য সুবিধা চাচ্ছে ভারত। তাই এবারের সাথে আগেকার ‘কানেকটিভিটি’ অর্থের কোনো মিল নাই। দ্বিতীয়ত, এর সাথে কথিত ‘তৃতীয় পক্ষ’ জাপানের সম্পর্ক কী? এর ন্যায্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা কী? জাপানকে কেন আনতে হবে? তা জয়শঙ্কর এর কোন ন্যায্যতা বা সাফাই দেখাতেই পারেন নাই।
    আসলে “জাপানের কথা” তাকে আনতেই হবে। আর এটাই ছিল তাঁর এই সফরের মুখ্য কিন্তু পরোক্ষে ও পিছনে রেখে দেয়া উদ্দেশ্য।  কিন্তু দেখা যাচ্ছে, খুব একটা হোমওয়ার্ক  করে এরপর প্রসঙ্গটা তিনি আনেন নাই। পিছনের কারণ সম্ভবত এই যে, উদ্দেশ্যটা খুব একটা ‘স্বচ্ছ’ না। কিন্তু স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকলেও হোমওয়ার্ক করে আসতে কোন অসুবিধা থাকার কথা না।  তবে সারকথা হল, তিনি আমাদেরকে খুবই আন্ডার-এস্টিমেট করেছেন। ভেবেছেন  যথেষ্ট ন্যায্যতা-সাফাই ছাড়া এভাবে ‘তৃতীয় পক্ষ’ বলে জাপানের নাম আনা তাও আবার অপ্রাসঙ্গিক ভাবে ‘কানেকটিভিটি’ শব্দের আড়ালে চাতুরিতে – যেন এটা আমাদের কাছে খুব ইজি-গোয়িং হবে। সরি, এটা তিনি না করলে ভাল করতেন।  কানেকটিভিটির উসিলা একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে আছে।  তিনি দাবি করছেন, “আজকের বৈঠকের (মানে ৪ মার্চের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনা) বড় একটি সময় তারা এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তৃতীয় পক্ষকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার বিষয়েও তারা আলোচনা করেছেন। সম্ভাব্য দেশ হিসেবে জাপানের নাম এসেছে”। তবে জয়শঙ্করের এই কথাটা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য কথা না যে ঐ দিনই মানে বিমান থেকে তিনি নামার পর মাত্র এক ঘণ্টার আলাপের মধ্যে এই সব আলাপ করেছেন – না এটা মেনে নেয়া গেল না। এরপর আমাদের জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর হল,  – তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের মন্ত্রী আমাদেরকে আগে-পরে কখনই কিছুই জানালেন না। অথচ জয়শঙ্করের মুখেই প্রথম কথাটা শুনতে হচ্ছে। কিন্তু ঠিক কী বলতে চান বা বলেছেন জয়শঙ্কর?
    জয়শঙ্কর সম্ভবত  বলতে চান, ‘জাপানের সাথে তার কথা হয়েছে। বাংলাদেশ যেন তার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো-ঋণ চীনের বদলে জাপান থেকে নেয়।’ এ কথাটাই জয়শঙ্কর কীভাবে বলবেন বুঝতে না পেরে এটাও নাকি ‘কানেকটিভিটির’ আলাপ এই সূত্র ধরে বলতে গিয়েছেন। তাহলে জয়শঙ্করের ‘কানেকটিভিটি’ মানে হল, চীন বাদ আর এর বদলে জাপানি ঋণ নিতে হবে – এই অনুমান সত্য ধরে নিয়ে এবার কিছু আলাপ করা যাক।

    চীন বাদ আর এর বদলে জাপানি ঋণঃ
    এক কথায়, এটা তুলনীয় বা সুবিধাজনক নয়, তাই অকার্যকর হয়ে পড়বে। আসলে জাপান নিজেও জানে, তার সুদের হার চীনের চেয়ে বেশি। আবার অন্যদিক থেকে, জাপানের সাথে আমাদের দেশের সম্পর্ক সেই জিয়ার আমল থেকেই সব আমলেই ভাল। ওদিকে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শোচনীয় হারের পর থেকে আমেরিকার “ছায়ায় নিচে থেকে চলে বা চলতেই হয়” [যেমন কোন সামরিক বাহিনী না গড়ার শর্তও ছিল, জাপানে আমেরিকান আর্মি ব্যারাক স্থাপন সেই থেকে] বলে রাজনৈতিক দিকের দায়ও সব আমেরিকার। এসব জটিল দিক আছে। আবার যেমন জাপানি পণ্যের বিক্রি বাড়ানো কথা যদি ধরি।  বাংলাদেশে জাপানি গাড়ির চাহিদা বাড়াতে গেলে এখানে রাস্তাঘাট, ব্রিজ অবকাঠামোর উন্নতি লাগবে। তাহলে এসব বিষয়ে বাংলাদেশে জাপানি প্রজেক্ট নিতে মানে তাতে ঋণ  দিতে জাপানকে আগ্রহী হতে হবে। জাপানের দিক থেকে এর আবার আরেক দিক আছে।  সেটা হল, এসব প্রকল্পগুলোতে জাপানই  ঋণ না দিলে তাতে জাপানি কোম্পানিগুলো সরাসরি কিংবা তাদের শেয়ার কেন কোরিয়ান কনস্ট্রাকশন কোম্পানিগুলো এ দেশে কাজ পাবে কোথা থেকে? কাজেই এসব কিছুই মিলে হল, বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানি সম্পর্কের ভিত্তি। এটা বহু আগে থেকেই অনেক গভীর সম্পর্কের। কাজেই এখন জাপানি অবকাঠামো ঋণ নিতে নতুন করে  ভারতের দরকার কী?  ভারতের ভুমিকা শতভাগই আলগা গায়ে পড়া এবং অপ্রয়োজনীয়।  এখানে ভারতের ভূমিকা নিষ্প্রয়োজন ছাড়া আর কী?
    আবার জয়শঙ্করও নিশ্চয় – ভারতের ক্ষেত্রেই জাপানি ঋণ পাওয়া প্রসঙ্গে এসব প্রশ্নের জবাব নিশ্চয় জানেন। যেমন – অবকাঠামো খাতে জাপানের চেয়ে চীনা ঋণ ভারতেও বেশি কেন? ভারতে মোদীই সবার আগে চীনকে ভারতে ডেকে আনেন, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়। কারণ তুলনামূলক বেটার শর্তের বলে তিনি চীনা অবকাঠামো ঋণ নিয়ে সম্পর্ক শুরু করেছিলেন। পরে কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী হলে পুরানা  ঋণ-গ্রহীতা সম্পর্ক কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বাড়িয়ে তুলেন। একই পর্যায়ে মোদী জাপানি ঋণে আগ্রহী হন নাই কেন?

    তাহলে জয়শঙ্কর জাপানকে চীন উপরে উঠিয়ে সে নাম প্রস্তাব করছেন কেন? কারণ, জয়শঙ্করের মনের এক বাসনা হল, এটা ভারতের চীনবিরোধী রাজনৈতিক ক্লাব (জোট) গড়ার স্বার্থ বা খায়েশ; তাই ধরেই নিলাম কোনো কথিত ‘ইন্দো-প্যাসিফিক জোটের আলাপ’ এটা। কিন্তু ভারতের (সাথে জাপানেরও) হাত ধরলেই কি বাইডেন – তিনি বাংলাদেশের সরকারকে কোলে উঠিয়ে জায়গা দিবেন? তাই কী!
    তাহলে বাইডেনের কাছে, যে কাশ্মিরের হিউম্যান রাইটস ইস্যু কিংবা মুসলমান নির্যাতনের ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের কালো রিপোর্ট মোদীর নামে আছে যা বলাই বাহুল্য অসংখ্য কাঁটাযুক্ত, তার কী হবে? হিউম্যান রাইট নিয়ে একই অবস্থা আমাদেরও! এগুলো পাড় হবে কী করে?
    তাহলে ব্যাপারটা শুধু চীনের চেয়ে জাপানের একটু না হয় সুদের হার বেশি, তা নয় অথবা ঋণ চীনের চেয়ে কতটা বেশি দিতে পারবে সে বিষয় থাকলেও ততটুকুই নয়। আরও বড় দিক আছে।  কিন্তু এগুলোর চেয়ে বড় বিষয় হলো বাইডেনের ‘গায়ে কাঁটার’ জন্য ওর কোলে ওঠার সুযোগই নাই, এর কী হবে?

    তবে  সব কিছুর উপরে জয়শঙ্করের কথার বিরাট এক বিপদের ইঙ্গিত আছে।  কথাটা হল, “……বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সংযুক্তি ঠিকমতো করতে পারি, তবে এই অঞ্চলের সামগ্রিক ভূঅর্থনীতি পরিবর্তিত হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে বঙ্গোপসাগর খুব কার্যকর……”।

    এই কথার মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সংযুক্তি মানে কানেকটিভিটি – এই অংশটাই ধরা যাক; এর মানে কী?  ভৌগলিকভাবে বললে এটা অর্থহীন কথা।  কারণ, সারা ভারতের সাথে তার নর্থ-ইস্ট ভালভাবে কানেকটেড নয়। কারণ মাঝখানে বাংলাদেশ আছে। কাজেই ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে কানেকটিভিটির কিছু নাই। বাংলাদেশ ভারত ছাড়াই, ভারত পেরিয়ে যাওয়া ছাড়াই আমরা বাইরের দুনিয়ার সাথে কানেকটেড; এবং তা এক নেপাল ও ভুটান ছাড়া। যা ভারত আমাদের দেয় নাই। এখাস্ন থেকে এটা কী যথেষ্ট না ভারতের কানেকটিভিটি বলে কী বুঝাতে চায়? এটা চরমভাবে সব সুবিধা এক পক্ষীয়ভাবে ভারতের নিয়ে নেয়া ছাড়া অন্য কোন অর্থ নাই।  তাহলে আগামি বিশ বছর “সামগ্রিক ভূঅর্থনীতি পরিবর্তিত” হতে দেখার জন্য অপেক্ষা করার কী আছে? বাংলাদেশের গত বারো বছর কী উদাহরণ হিসাবে যথেষ্ট নয়? বার বার রেললাইনে মাথা দিয়ে নতুন করে আর কী বুঝব যে মাথা কাটা যায় কিনা?  তাহলে জয়শঙ্করের “বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আবার কানেকটিভিটি” কথাটার এবারের মানে কী ভারতের ভিতর দিয়ে বিদেশের সাথে সম্পর্ক করা? যার ঠোটকাটা মানে হল বাংলাদেশের ভারতেরই এক ভেসেল স্টেট হওয়া?  আর একদম খাড়া সোজা অর্থ হল, ভারতেরই একটা রাজ্য বনে যাওয়া?  যেটা আমাদের হতে বাকি আছে?

    জয়শঙ্কর ‘বঙ্গোপসাগরের’ কথা তুলেছেনঃ
    জয়শঙ্কর সেই সাথে “বঙ্গোপসাগরের” কথা তুলেছেন। সাথে ভারতের আগামি ২০ বছরের স্বপ্ন! এর আবার মানে কী? বহুদিন থেকেই জানা যায়, আমেরিকান নেভির বঙ্গোপসাগরে সেভেন্থ ফ্লিট এর স্থায়ী মোতায়েনের একটা খায়েশ আছে – এর সংশ্লিষ্ট কিছু কী হবে? ভারত কী বাংলাদেশকে বগলে রেখে আমেরিকাকে দূরে রাখার বাসনা করছে; এভাবে কী ভারত নিজেই মাতবর হওয়ার খায়েশ পুরা করবে?  আর তাতে আমরা হব দুধ ভাত অথবা গুটি? কিন্তু আমরা আগেই জানি এসব যত সম্ভাব্য চিত্রই আঁকা হোক না কেন সব চিত্রই একপক্ষীয়ই , সেটা এককভাবে কেবল ভারতের স্বার্থেই সাজানো হবে। গত বারো-চৌদ্দ বছরের য়ামাদের অভিজ্ঞতা বলে ভারতের “কানেকটিভিটি” শব্দের বাস্তব অর্থ ও পরিণতি এর বাইরে যায় নাই। আর কেউ কেউ ‘ক্ষমতায় থাকা গিয়েছে’ এই এক ব্যক্তিস্বার্থের বিনিময়েই ভারত সমর্থন হাসিল করেছে। আর সেখান থেকেই কী ভারত সাহসী হয়ে উঠে এবার আবার আরও ২০ বছরের গল্প-প্রস্তাব ফেরি করতে এসেছে!  এখনও সেসব যথেষ্ট স্পষ্ট নয়।

    চার শিফটের কাজঃ
    একটু তামাশা নেয়া যাক, আলোচনা অনেক সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে। জাগোনিউজ আর বাংলা ট্রিবিউন লিখছে, “ড. জয়শঙ্কর জানান, করোনাভাইরাসের প্রভাব কাটিয়ে ভারতের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং সেখানে শিল্প কারখানাগুলোয় আগে যেখানে তিন শিফটে কাজ হতো, এখন সেখানে চার শিফটে কাজ হয়”। আল্লাহ’র দুনিয়ায় একেকটা দিন মাত্র ২৪ ঘন্টার। এর মধ্যে কারখানার শিফট করা যায় মাত্র তিনটা, আট ঘন্টা করে। তাহলে এর ভিতরে চারটা শিফট তারা কীভাবে সম্ভব করতেছে! প্রো-ইন্ডিয়ান চামচামিতেও কী কিছু লাগাম থাকা উচিত না তাই না?  দালালি আসলেই মহান ও ক্রিয়েটিভ!

    তাই আপাতত ইমিডিয়েট বাস্তবতায় ফিরে আসি। আবার যদি ধরা যাক কোনো জাদুবলে বাংলাদেশ বাইডেনের আমেরিকার কোলে উঠেই গেল? কিন্তু বর্তমান সরকার কী নিজে আমেরিকাকে আস্থায় নিতে পারবেন? কাজেই এটা শেষে আবার কিছু দিন-বছর ভারতের উদ্যোগে ফেরে আমাদের নাকে দড়ি বেঁধে ঘুরানো ঘটনা হবে?  বড় বিপদই আসতেছে! যদিও মনে হচ্ছে আপাতত অপরিষ্কার অংশগুলো পরিষ্কার দেখতে আমাদের আরো কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৬ মার্চ  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “চীনের জায়গায় জাপান হলেও দুঃখ যাবে না” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। পত্রিকার কলাম লেখার সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। প্রথম অসুবিধা লেখার সাইজ মোটামুটি ২০০০ অক্ষরের মধ্যে রাখতেই হয়। কারণ এটাই কাগজে ছাপা হয় বলে জায়গা সীমিত। আবার সুবিধার দিক হল, এই প্রথম ভার্সানে যেভাবে চিন্তা করে লিখেছিলাম তা নিজেই আবার পরে রিভিউ করে নিয়ে নতুন ফোকাসে এখানে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাও যায়।  ফলে আমার এই নিজস্ব সাইটের সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে লেখাটাকে পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন।
    সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • লাদাখে ভূখন্ড হারিয়েও সেনা প্রত্যাহার, মোদির আপোস

    লাদাখে ভূখন্ড হারিয়েও সেনা প্রত্যাহার, মোদির আপোস

    লাদাখে ভুখন্ড হারিয়েও সেনা প্রত্যাহার, মোদীর আপোষ
    গৌতম দাস
    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    “India has no military capability to alter the situation”

    – Indian Gen. Panag

    [সার-সংক্ষেপঃ লাদাখ, ভারতের উত্তর-পুর্বে চীন-ভারত সীমান্তের নাম। গত ২০২০, মে মাস থেকে এই সীমান্তে চীন ও ভারত মুখোমুখি সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে বসেছিল। আর  ১৯৯১-৯৪ সালের সময়গুলোতে ভারত-চীন সীমান্ত আলোচনায় আপোষে চীন যেসব ভুখন্ড ভারতের অনুকূলে ছেড়ে দিয়েছিল, যা ভারতের (LAC) এলএসিতে পাওয়া ভুখন্ড মনে করা হয়, সেসব ভূখন্ড চীন মে মাসের ঐ সময়ে ফিরে দখল করে নিয়ে বসে গিয়েছিল।

    এই নিয়ে এক সামরিক সংঘাতে ১৫ জুন ২০২০ তারিখে ২০জন ভারতীয় সেনা নিহতও হয়েছিল। কিন্তু তা সত্বেও মোদি সেসময় সংসদে ও রেডিও বক্তৃতায় বলেছিলেন, “... neither has anyone entered Indian territory, nor is anyone present in Indian territory currently, and nor is any Indian post captured”। আসলে চীন গতবছর মে মাসের শুরু থেকেই ১৯৯১-৯৪ সালে ভারতকে ছেড়ে দেওয়া ভুখন্ডগুলোই পুনর্দখল করে বসেছিল। কিন্তু একথা সত্যি হওয়া সত্বেও ২০জন ভারতীয় সেনা হত্যা হওয়ার পরও মোদি অমন বিবৃতি দিয়েছিলেন। কেন?

    এর জবাব এখন পরিস্কার জানা যাচ্ছে। আসলে ১৯৯১-৯৪ সালে ভারতকে ছেড়ে দেওয়া LAC-এ পাওয়া ভূখন্ডগুলোই পুনরায় দখল কথার মানে হল এর আগের ১৯৫৯ সালের চীনের দাবিকৃত ভারত-চীন সীমান্তরেখা। এখন ভারত-চীন আলোচনায় ভারত ১৯৫৯ সালের চীনের দাবিকৃত ভারত-চীন সীমান্তরেখাকেই ভারতও তাঁদের স্থায়ী সীমান্তরেখা বলে মেনে নিয়েছে। উভয়পক্ষ এই ভিত্তিতেই সীমান্তে সেনা সমাবেশ ভেঙ্গে দিতে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা অনুসারে এর দুই পাড়ে নতুন সীমান্ত বরাবর সেনা প্রত্যাহার করতে সম্মত হয়েছে এবং ধাপে ধাপে সেটির বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

    সে অনুযায়ী, প্রথম পর্ব ছিল ‘প্যাংগং সো (Pangong Tso) লেকের দুই পাড় থেকে সেনা ও স্থাপনা প্রত্যাহার। গত ১১-১৯ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধান্ত মতই এই প্রত্যাহার কোনো ব্যত্যয় ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। আর ভারতের এই সীমান্তেরই এক সাবেক জিওসি লে জে পরাগ; এই ব্যাপারটাকে দেখে বলেছেন, … the “disengagement” is happening exactly as per China’s 1959 claim line because India has no military capability to alter the situation….it is “good for the long term peace” ।

    সোজা বাংলায়, আমাদের সামরিক মুরোদ নাই তাই চীনের দাবি মোতাবেক ১৯৫৯ সালের সীমান্ত আমরা মেনে নিয়েছি। এটা দীর্ঘস্থায়ী শাস্তির জন্য ভালই হয়েছে”। কিন্তু কেন ভারতকে এমন পাওয়া-ভুখন্ড ফিরে ত্যাগ করতে বা হারাতে হচ্ছে?]

    Ladakh Stand-Off: India & China, Pangong Tso withdrawal done

    একদম বেড়াছেড়া!

    পথ চলতে চলতে পথিক কখন কোথায় নিজের জামাকাপড় খুইয়ে এসেছে সে হুশই নাই! যখন খেয়াল হল তখন এক বেড়াছেড়া অবস্থা! কেন? কারণ এখন লজ্জা ঢাকে কী দিয়ে সে এক কঠিন সমস্যা। আরেকদিকে, কৌতূহলী আশেপাশের মানুষকে কিভাবে কেন এসব হল তার ব্যাখ্যাও দিতে পারছে না। কাজেই, এ এক বেড়াছেড়া অবস্থা বটে!

    বেড়াছেড়া শব্দটা কথ্য ভাষায় প্রচলিত শব্দ; তাই অনেকে একে ইনফরমাল শব্দ বলবেন হয়ত। তবু ‘বেড়াছেড়া’ শব্দটা আসলে খুবই এক্সপ্রেসিভ মানে, যা ঘটেছে তাকে এক শব্দে ফুটিয়ে তুলতে এক উপযুক্ত-প্রকাশক শব্দ। ইন্ডিয়া, মানে ভারতের মোদি সরকারের আজ এমনই বেড়াছেড়া দশা।

    কেন? কী হয়েছে??

    এবারে মোদির কাপড় খুলে নেয়ার অবস্থার শুরু বলা যায় গত ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে। লাদাখ – ভারতের ভাষায় তার উত্তরপূর্ব কোণের ভারত-চীন সীমান্ত যেখানে দুই দেশের সৈন্য মুখোমুখি হয়ে বসে আছে গত ২০২০ সালের মে মাস থেকে। ভারত (মিডিয়াও) এটাকে এক ‘অচলাবস্থা’ (standoff) বলে বর্ণনা করে এলেও চীনের কাছে ব্যাপারটা এমন অচল নয়। কারণ পরিস্থিতি ক্রমশ তার পক্ষেই এগিয়ে চলেছে। যেন – এবার ঘুঘু ধরা পড়েছে, অপেক্ষা কেবল তাকে কাচিয়ে উপরে তুলে পাকড়াও করার অবস্থা। এবং তাই হতে যাচ্ছে আসলে।

    কারণ অবশেষে মোদি চীনের কাছে ‘ভূখণ্ড হারিয়েছে’ স্বীকার করে নেয়ার পর উভয়পক্ষই যার যার সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে সম্মত শুধু না, তা বাস্তবায়নের প্রথম পর্যায়ও শেষ করে ফেলেছে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি। কথাটার মানে হল, চীন-ভারতের সীমান্তের যত জায়গায় সৈন্য সমাবেশ করা হয়ে আছে/ছিল তার একেকটা এলাকা থেকে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার শুরু হয়েছে। এরই প্রথম এলাকা ‘প্যাংগং সো’ নামে লেকের দুই পাড় থেকে প্রত্যাহার, যা গত দশ দিনে শেষ হয়ে গেছে। এখন পরের পর্বের প্রত্যাহার নিয়ে ফোর্স পর্যায়ে কথা বলা ও বাস্তবায়ন শুরু হবে।

    সেনা প্রত্যাহার কোথায় গিয়ে থামবে, নতুন কোন সীমান্তেঃ
    কিন্তু মূল প্রশ্ন : উভয়পক্ষ সৈন্য প্রত্যাহার করবে না হয় বোঝা গেল কিন্তু প্রত্যাহার করে কোথায় গিয়ে থামবে? অর্থাৎ কোনটাকে এখন নতুন সীমান্ত বলে উভয়পক্ষ মেনে চলবে? কারণ সব ফাটাফাটি সংঘাত বা মূল বিতর্কের উৎসই তো ছিল সেটাই!

    না, নতুন সীমান্তরেখাও এখন আর অমীমাংসিত নয়। লক্ষ করা যায়, চীন পা-ফেলে থাকে সাধারণত অনেক ক্যালকুলেশন করে। আসলে গত বছরের ৫ মে এর শুরু থেকেই চীন নিজের সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছিল ১৯৫৯ সালের এলএসি [Line of Actual Control, LAC] বা গৃহীত সীমান্তরেখা মেনে।

    যদিও কী মেনে চীন একাজ করছে তা কখনো প্রকাশ্যে বলেনি। কিন্তু “১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখায়” ফিরে যেতে বলে চলেছিল ভারতের সাথে সব মিটিংয়েই। আর এখনকার সমঝোতাও হচ্ছে সেই ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ মোদির ভারতের মেনে নিতে রাজি হওয়ার বিনিময়ে। কাজেই উভয়পক্ষের সৈন্য ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখার’ দুই পাড়ে যার যার দেশের সংলগ্ন অংশে গিয়ে বসবে। আর সেটাই হবে নতুন সীমান্তরেখা।

    এটাই সৈন্য প্রত্যাহারের ভিত্তি বলে মেনে নিতে মোদি রাজি হয়েছেন। যদিও মোদীর জন্য এখন এটাই বিরাট সমস্যা আর ইজ্জতের ব্যাপার যে পাবলিকের কাছে তিনি এই ‘ভূমি হারানোর আপস ও বিনিময়ের কথা কিভাবে বলবেন!

    পাঠক যারা কম সময় দিতে চান, কম বিস্তারে পড়তে তারা নিচের ছোট প্যারার অংশটুকু বাদ দিয়ে সরাসরি পরের প্যারায় চলে যেতে পারেন।

    ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ কী?
    একটা বড় তথ্য দিয়ে রাখি। ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ কথাটা মূলত চীনের প্রস্তাবিত একটা সীমান্ত ধারণা। কিন্তু তা উভয়পক্ষের সম্মতিতে আঁকা কোনো ম্যাপ – ঠিক তা নয়। এটা ১৯৫৯ সালে চৌ এনলাই ও নেহেরুর এ’দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যকার চিঠি চালাচালির ঘটনা যেখানে চৌ নেহেরুকে “ম্যাকমোহন লাইন” [McMahon line] মেনে সীমান্ত টানার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

    “ম্যাকমোহন লাইন” প্রসঙ্গে বেশি বিস্তারে যাব না। কমকথায় বললে,  এই লাইন টেনে ঝগড়া মিটাবার চেষ্টাটা ১৯১৪ সালের, তিব্বতকে নিয়ে। হ্যাঁ, তিব্বতকে নিয়ে।  কিন্তু তিব্বতের দুর্ভাগ্য হল, তিব্বত স্বাধীন নাকি চীনের অধীনে স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ এই নিয়ে বিতর্ক মাও-এর আগের চীনা-জাতিবাদী শাসক চিয়াং কাইশেকের আমলের। যদিও ভারতের দিক থেকে অনেকে সময় ধারণা দিবার চেষ্টা করা হয় যে কমিউনিস্ট মাও খারাপ ও এগ্রেসিভ বলে তিব্বত নিয়ে সমস্যা তৈরি করেছেন তিনি, ফলে দালাই লামাকে নিয়েও।

    অথচ ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। ম্যাকমোহন লাইন এর প্রমাণ। এটা ১৯১৪ সালের জুলাইয়ে ঘটনা যখন তিব্বত প্রদেশের সাথে এর সীমান্ত সংলগ্ন বৃটিশ-ইন্ডিয়ার কমন সীমান্ত ম্যাপ কী হলে উভয় পক্ষ তা মেনে নিবে সে আলোচনা চলছিল, এটাই সেকালের দশ মাস ধরে চলা সিমলা কনফারেন্স চুক্তি [Simla Accord] নামেও পরিচিত।

    ম্যাকমোহন ছিলেন বৃটিশ-ইন্ডিয়ান সেনা অফিসার ও পরে বৃটিশ-ইন্ডিয়া সরকারের বিদেশমন্ত্রী এবং সে হিসেবে তিনি ঐ সীমান্ত আলোচনার প্রধান নেগোশিয়েটর। তাই তার নামেই ম্যাকমোহন লাইন বলে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের দিন ঠিক হয়েছিল। তিব্বত প্রদেশের প্রতিনিধিসহ কেন্দ্রের চিয়াং কাইশেক সরকারের প্রতিনিধিও উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু শেষে কাইশেক সরকারের প্রতিনিধি স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেন এই যুক্তিতে যে তাঁদের চোখে তিব্বত তো মূলচীনের-ই প্রদেশ। কাজেই তিব্বত কিভাবে স্বাক্ষরদাতা পার্টি হয় এই ছিল তাঁদের আপত্তি।

    অর্থাৎ তাঁদের আপত্তি ঠিক বৃটিশ-ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে নয়। তিব্বত স্বাধীন দেশ/ প্রদেশ কিনা সেই বিতর্ক। তাই পরবর্তিতে চীন মাওয়ের বিপ্লবের অধীনে কমিউনিস্ট চীন হয়ে গেলে কমিউনিস্ট চীনের অফিসিয়াল অবস্থান হয়ে যায় এটি যে, তিব্বত চীনের প্রদেশ আর ম্যাকমোহন লাইনই ভারতের সাথে সীমান্তরেখা। কিন্তু ততদিনে আবার নেহেরুর ইন্ডিয়া সেটা গ্রহণ করতে চায়নি। কারণ ইতোমধ্যে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে চীন আরও ভুখন্ড দখল করেছিল। যেটা পরে অবশ্য ছেড়েও দেয়। এরপর থেকেই [Line of Actual Control, LAC] বা গৃহীত সীমান্তরেখা কথাটার উৎপত্তি হয়।

    ঐ চিঠি চালাচালিতে বর্ণনামূলক অর্থে কথা বলার সময় কারও দখলে থাকা ভুমি বুঝাতে চীন এই [LAC] ব্যবহার করেছিল। যেটা অবশ্যই উভয়পক্ষের সম্মতিতে গৃহিত কোনো কমন ম্যাপের স্টাটাস নয়।  তাই টেকনিক্যালি ভারত কখনই ১৯৫৯ সালের কোনো সীমান্ত বুঝাতে [LAC] শব্দটা ব্যবহার করতে চায় না। তবে চীন-ভারত সীমান্ত সম্পর্কে সবচেয়ে ভাল সুসময় বলা যায় ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল।

    ১৯৯১ সালে নরসীমা রাও-এর প্রধানমন্ত্রীত্বের আমলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি পেং ভারত সফরে এসেছিলেন। আর তাতে উভয়পক্ষের সম্মতিতে [LAC] কোনটা হবে এনিয়ে বিস্তর আলোচনা ও রফার শুরু হয়েছিল। এতে নরসীমার ফিরতি চীন সফর ঘটেছিল ১৯৯৩ সালে এবং  সেই সফরকালে উভয়পক্ষ [LAC] এর দুই পাড়ে শান্তি বজায় রাখার লক্ষে এক সীমান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। আর তখন থেকেই ভারতও অফিসিয়ালি [LAC] কথাটা মেনে নিয়েছিল ও ব্যবহার শুরু করেছিল। আর সেই থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বহুবার তাঁদের বিভিন্ন সীমান্তে  নতুন করে সম্মতিতে সীমান্তরেখা টানা হয়েছিল যেগুলো ঐ বছরের [LAC] যেমন, [LAC 1994] এভাবে বলার চল শুরু হয়েছিল।

    সারকথায়, ১৯৯১ সাল থেকে এবারের বলা [LAC] এর বাড়তি অর্থ হল তখন থেকে [LAC] মানে উভয়পক্ষের সম্মতি নিয়ে আঁকা সীমান্তরেখা। কিন্তু এত সম্মতির পরেও আবার ২০২০ সালে কেন সীমান্তে সেনা সমাবেশ?

    এর একমাত্র কারণ হল, ভারতের কনষ্টিটিউশনের ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা করে ২০১৯ সালের ৫ আগষ্ট সংসদে অমিত শাহের সারা কাশ্মীরই (পাকিস্তান ও চীনা অধিকৃত অংশসহ) ভারতের অংশ দাবি করা। অর্থাৎ এখানে আসলে মোদি-অমিতের সরকার দাবি করে ফেললেন যে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত যত কিছু সীমান্ত সমঝোতা ও চুক্তি হয়েছিল তা তারা মানেন না। এবং এই না মানা একপক্ষীয় ভাবে। আর একপক্ষীয়ভাবে কোনো চুক্তি বাতিল করে দেয়া মানে উভয়পক্ষ বসে কোনো আলোচনায় থেকে নয় – যেটি কূটনীতিতে খুবই অশিষ্ট [rogue] আচরণ গণ্য করা হয়, তাই ঘটানো হয়েছিল।]

    কিন্তু তা সত্ত্বেও চীন-ভারতের ভাল সম্পর্কের সময়ে, ১৯৯১-৯৪ এই পাঁচ বছরে সীমান্ত নিয়ে আপস আলোচনায় ফলাফলের ভিত্তিতে সে সময়ে প্রতি বছরই উভয়ের সম্মতিতে চীন নিজের দাবিকৃত অংশ থেকে বেশ কিছু ভূখণ্ড ভারতকে ছেড়ে দিয়েছিল। এ থেকেই এলএসি৯১, এলএসি৯২, এলএসি৯৩ ও এলএসি৯৪ এর জন্ম। তাহলে এখন ১৯৫৯ সালকেই আবার ফিরে নতুন করে সব সীমানার ভিত্তি মেনে নিয়ে এখনকার মোদির আপসনামার অর্থ কী?

    অর্থ হচ্ছে, ১৯৯১-৯৪ এই পাঁচ বছরে চীন-ভারত সীমান্ত নিয়ে আপোস আলোচনায় যা কিছু ভূখণ্ড ভারত পেয়েছিল তা আর ভারতের হাতে থাকল না। ভারত এই ভূখণ্ডের দাবিই যেন ছেড়ে দিল। সেটা ভারতের অনিচ্ছাকৃত হলেও মোদি-অমিতের “পুরা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড”, সংসদে এই দাবি করাতে এমন অর্থই তৈরি হয়ে গেছিল।

    এর সোজা মানে হল মোদীর এখন ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা’ মেনে আপোস করাতে ভারত চীনের কাছে বড় ভূখণ্ড হারাচ্ছে সেটা স্বীকার করে নিল। শুধু তাই না, এর আরেক বিশেষত্ব আছে।

    আগে মীমাংসিত ছিল এমন ভূখণ্ড এবার আবার চীনকে ছেড়ে দেওয়া হয়ে গেল। কিন্তু কেন? এমন তো আগে কখনো হয়নি! মোদি কি যেকোনোভাবে একটা সেনা প্রত্যাহারের চুক্তিতে আসার স্বার্থে পাগল হয়ে এমনটি করছে? একেবারেই যে তা নয় সেটা বলা মুশকিল। কারণ এই করোনাকালের আগে থেকেই মোদির ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই নাজুক। তাই এই সময় সেনা প্রত্যাহার, খরচ কমানো এবং সাথে টেনশনও কমানো ইত্যাদি মোদীর জন্য এক বিরাট চাহিদা তো বটেই। সেকারণে এই আপোস মীমাংসা মানে সেনা প্রত্যাহার বা [disengagement] এটির মূল শর্ত হলে মোদি তাতেও রাজি।

    পাঠকের কাছে ব্যাপারটা আমাদের ভাষ্যে না বলে টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপের মিডিয়ায় ছাপা হওয়া এক সাবেক কমান্ডার লে. জেনারেল পানাগের [Lt Gen HS Panag (Retd)] বয়ানে তুলে ধরব। তিনি পরপর দু’বার রাষ্ট্রীয় মেডেলপ্রাপ্ত সেনা অফিসার।

    লে. জে. পানাগ বলছেন, ‘… এই সৈন্য প্রত্যাহার ঘটছে একেবারে ঠিক চীনের দাবিকৃত ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা অনুসারে। কারণ এ পরিস্থিতিকে ভিন্ন কোনো বিকল্প আকার দেয়ার মতো সামরিক যোগ্যতা ভারতের নাই।’

    তিনি আরো বলেন, তবুও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য এটাই ভালো  [……” that the “disengagement” is happening exactly as per China’s 1959 claim line because India has no military capability to alter the situation. However, he said, it is “good for the long term peace”………”The plan, he presumed, will include acceptance of McMohan Line in Northeast with some give and take between New Delhi and Beijing, as per the 1959 proposal.”]।

    কিন্তু এই জেনারেল যে কথা কোনো রাখঢাক না করে গড়গড়ে বলে গেলেন মোদির সে সক্ষমতা নাই। কারণ লাদাখ বা সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে মোদির নেয়া সব পদক্ষেপেই সততার অভাব ছিল। মোদীর অসততা হল, তিনি নিজ ভোটবাক্স ভরাতে সীমান্তে তিনি বীর, বীরত্ব দেখাচ্ছেন তিনি, হিন্দুত্বের বিজয় আনছেন তিনি ইত্যাদি ভুয়া বয়ানের সুরসুরি তুলতে এসব করেছেন।

    তিনি কাশ্মীর দখল করেছেন। পুরা কাশ্মীর ভারতের মধ্যে এনেছেন তাই তিনি ও তার দল হিন্দুত্বের বীর। এসব জাতশ্রেষ্ঠত্বের জজবা উন্মত্ত জোশ, আধা সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে মিশিয়ে তিনি এনেছেন যেকোনো অ-হিন্দুর বিরুদ্ধে। যার সবকিছুর উদ্দেশ্য ভোটবাক্সকে হিন্দুর-ভোটবাক্স এই জোয়ার তুলে।

    আবার এই মিথ্যা বীরত্বের দাবি করতে গিয়ে যেমন – ভারত-চীন প্রত্যক্ষ সেনা সংঘাতে ভারত যখন ২০ জন সৈন্য হারিয়েছিল তার পরে মোদি সর্বদলীয় বৈঠকে দাঁড়িয়ে এবং ‘মন কি বাত’ নামের রেডিও প্রোগ্রামে বিবৃতি দিয়েছিলেন যে, ‘চীন ভারতের কোনো ভূখণ্ড দখল করে নাই, কোনো অনুপ্রবেশ ঘটেনি’ ইত্যাদি। তার সোজা অর্থ হলো, ভারতের সৈন্যরাই চীনে অনুপ্রবেশ করে মার খেয়ে মরেছে। অথচ আসলে মোদীর ওই বিবৃতিতে স্বীকার করে নেয়া হয় যে, চীনা দাবিকৃত ‘১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখাই’ তাদের উভয়ের প্রকৃত সীমান্ত। যদিও মোদি কখনোই তার ওই কথার কোনো ব্যাখ্যা দেননি। সংসদে আলোচনাও তুলতে দেননি।

    কাজেই  এখনকার ‘সেনা প্রত্যাহার’ নিয়ে মোদির বড় সমস্যা হল, তার সংসদ বা নাগরিকের কাছে তিনি কিভাবে খুলে বলবেন যে তার উগ্র জাতিবাদী হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠত্বের রাজনীতি আর হুঙ্কার আসলে সব অচল আর ভুয়া! ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নেয়ার বিনিময়ে তিনি চীনা সৈন্যদের ঠাণ্ডা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু সেজন্য তিনি বাৎচিত শুরু করছেন আরেক শঠতার আশ্রয়ে।

    এক. তিনি যে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নিয়ে বিনিময়-সওদা করছেন- এ কথা একেবারে লুকিয়ে ফেলেছেন।

    দুই. এই বিষয়ে পাবলিকের সামনে কথা শুরু করছেন চীনারা সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়ে যাচ্ছে – এখান থেকে। যেন এটা দু’পক্ষেরই সেনা প্রত্যাহার নয়, যেন শুধুই চীনা সৈন্য প্রত্যাহার হচ্ছে। অর্থাৎ যেন চীনা সেনারা ভারতে এসেছিল, এখন পালিয়ে গেল। এটাই যেন এক বিরাট সুখবর আর মোদী সরকারের বিজয়- এমন ভাব দেখাচ্ছেন। অন্তত দুটো মিডিয়া দ্যা হিন্দু আর দ্যা প্রিন্ট এ কাজে মোদির ইজ্জত বাচানোর মত করে এমন ভাষ্য লাগাতার তৈরি করে যাচ্ছে।

    অথচ সত্যিকার ব্যাপারটা হল, ভারতীয় সেনারা ‘পিছিয়ে’ ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখায় ফিরে গেল আর চীনা সৈন্য প্রত্যাহার নয় বরং ওই ছেড়ে যাওয়া ভূখণ্ডের দখল নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।

    মোদীর ইজ্জত বাঁচানোর চেষ্টায় আরেক মন্ত্রী ভিকে সিংঃ
    মোদি তাই ‘চীনারা সৈন্য প্রত্যাহার করে নিয়ে যাচ্ছে’ এমনই কাছাকাছি কিছু একটা ব্যাখ্যায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথকে দিয়ে সংসদে বিবৃতি পড়ে শোনান, ঐ ১১ জানুয়ারি যেদিন ভারতীয় সেনা ইতোমধ্যেই মাঠে সেনা প্রত্যাহার শুরু করে দিয়েছিল সেদিন। তবু এতকিছুর পরেও আগেই আরেক বিরাট বিপর্যয় ঘটে গেছিল। সে ঘটনাটা ঘটিয়েছিল মোদীর আরেক মন্ত্রী ভিকে সিং।

    তিনি আসলে ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান, এক ফোর-স্টার জেনারেল। সম্ভবত মোদি তাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন মিথ্যা অ্যাডভ্যান্স ঢোল পিটানোর – ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নিয়ে মোদি আপোস করছেন এদিকটা লুকিয়ে কথা শুরু করার জন্য। তিনিই প্রথম বলতে নামেন যে এই সেনা প্রত্যাহার এটাই নাকি মোদীর বিজয়। কিভাবে?

    তিনি গত ৭ জানুয়ারি ভারতের দক্ষিণে তামিলনাড়ুর মাদুরাই শহরে সফরে গিয়ে জনগণকে ব্যাপারটা ‘সহজ করে বুঝিয়ে বলার’ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু এতে তিনি হিতে বিপরীত করে ফেলেন। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন চীন-ভারত সীমান্ত সম্পর্কগুলো কত সহজ ফলে অন্যের দেশে অনুপ্রবেশ ঘটানো -এগুলো কোনো ব্যাপার না। এই ধারণা তৈরি করতে গিয়ে বলে বসেন যে ভারত কতবার যে চীনা ভূখণ্ডে ‘অনুপ্রবেশ’ করেছে এর শেষ নেই।

    আরো এক কাঠি ওপরে গিয়ে বলেছেন, “চীনারাও অনুপ্রবেশ করেছে তবে আমাদের চেয়ে কম। চীনারা ১০ বার করলে আমরা ৫০ বার করেছি”   [“Let me assure you, if China has transgressed 10 times, we must have done it at least 50 times,”।

    বলাই বাহুল্য, এরপর এটাই সমালোচনার মুখ্য বিষয় হয়ে যায়। এমনকি এ নিয়ে চীনে চীনা সরকারি মুখপাত্রকে জিজ্ঞাসা করাতে তিনি কয়েক শব্দে এক মন্তব্য করেন যে, “সত্যি কথা সবসময় অজান্তেই মুখ দিয়ে বের হয়ে পড়ে।”

    আসলে ভিকে সিং সেখানে আরেক ভুয়া দাবি করে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নেয়াকে আড়াল করতে গিয়েছিলেন। তিনি তাই মনে করায় দিয়ে বলার ছলে বলেন, চীনা পণ্য বর্জন প্রোগ্রাম নিয়েছিল বিজেপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো। আর সরকার চীনা বিভিন্ন অ্যাপ-প্রোগ্রাম ভারতে নিষিদ্ধ করেছিল, ভারতে বাণিজ্যে বা টেন্ডারে অংশ নেয়া বন্ধ করেছিল। আর তাতেই নাকি চীনারা চাপে পড়েছিল তাই তারা সেনা প্রত্যাহারে রাজি হয়েছে।

    কিন্তু তার এই দাবিও আসলে ভুয়া। কারণ পরিসংখ্যান বলছে যে, বরং চীন থেকে কাঁচামাল বা তৈরি পণ্যের আমদানি বেড়ে গিয়েছে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ এক দাবি ভিকে সিং শুরুতেই করেছিলেন সেখানে। তিনি বলে বসেন, চীনের সাথে অফিসিয়াল সীমান্তরেখা বলে কোনোকিছু কখনও আঁকাই হয় নাই; [……”  official border with China has never been demarcated.“।

    তার মানে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি পেং ১৯৯১ সালে ভারতে আসেন নাই, নরসীমা রাও-ও ১৯৯৩ সালে পাল্টা চীন সফরে যান নাই। অতএব ১৯৯১-১৯৯৩ এই সময়কালের মধ্যে [LAC] নিয়ে চীন-ভারত উভয়পক্ষের মধ্যে প্রথমবারের মত কোনো সমঝোতা হয় নাই?

    আসলে এটা তিনি বলছেন কারণ মোদি নিজেই এই “অস্বীকারের” [১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নিয়ে] ফাঁদে পড়েছেন। তাই ইতিহাস উল্টাতে ভিকে সিং সারা ভারতকে সেই ফাঁদে ফেলতে চাইছেন। ওদিকে, কংগ্রেস গত সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী একে এন্থনী অভিযোগ করে বলেন, লাদাখের এই সেনা প্রত্যাহার আসলে চীনের কাছে সারেন্ডার “Disengagement in Ladakh is surrender to China,” ছাড়া কিছুই না।

    যা হোক, এই সেনা প্রত্যাহার মনে হচ্ছে সফলতার দিকেই যাবে, তাতে ভারতকে যে শর্তই পালন করতে হোক না কেন। তবে ঘটনা আরো কিছু আছে।

    আসলে এখন মোদির এত দ্রুত আপোস করে ফেলার পেছনের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মোদি আশা করতেন, চীন-আমেরিকার বাণিজ্য বিরোধটা যদি সামরিক দিকে গড়ায় তাহলে তিনিও এর আড়ালে, ভারতের চীনের সাথে বিরোধকে সামরিক দিকে ঠেলে দেয়ার সুযোগ নিতে পারবেন। কিন্তু তা হয়নি, মোদির কপাল খারাপ!

    কিন্তু রেকর্ড বলছে, ট্রাম্প তার চার বছরে পরিস্থিতি কখনোই সামরিক দিকে যেতে দেননি। যদিও অনেক গরম কথা, হুঙ্কার দিয়েছেন। আর ওই চার বছরে তিনি মোদিকেও বাকচাতুরি ছাড়া কোনো ফেভারই দেননি। কিন্তু উল্টা ভারতে অস্ত্রবিক্রির সুবিধা নিয়েছেন। সেটা যাই হোক শেষে বাইডেন এসে যাওয়াতে এসব দিকে মোদির সরকার এখন একেবারেই হতাশ। কেবল অপেক্ষা করছেন বাইডেনের সাথে প্রথম মোলাকাতে কী আলামত দেখেন তা জানতে। পছন্দ না হলে এবং বিশেষ করে মানবাধিকারের চাপ খেলে জয়শঙ্করের তৈরি আরেকটা অবস্থান আছে সে দিকে যাবেন। সেটা হলো তিনি বলবেন, এখন থেকে চীন-আমেরিকার বিরোধে ভারত আর কোনো দিকে নেই, গ্যালারির দর্শকমাত্র হয়ে থাকবে। যেন অনেকটা ঘরে খাবার নাই বলে উপোস রাখছি এমন বলে বেড়ানো হবে সেটা আর কী।

    সবশেষে, চীন গত বছর সীমান্তে সেনা সমাবেশের শুরু থেকেই আগে ভারতকে ১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা মেনে নেয়ানো মানে, এলএসি৯১, এলএসি৯২, এলএসি৯৩ ও এলএসি৯৪ এর মাধ্যমে যেসব ভূমি ফেরত দিয়েছিল তা আবার কেড়ে নিতে এগিয়েছিল কেন?

    স্বল্পকথায় বললে, ব্যাপারটা ২০১৯ সালে মোদির “পুরা কাশ্মিরই ভারতের”- সংসদে এই দাবি করার খেসারত। সংসদে ৩৭০ ধারা বাতিল করার পরে অমিত শাহ একটা বিবৃতি দিয়েছিলেন ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, কাশ্মিরের তিন অংশ- ভারত ও পাকিস্তানের দখলের অংশ এবং চীনের দখলে থাকা অংশ- এই পুরো কাশ্মিরই ভারতের ভূখণ্ড। এই ঘোষণাতেই সবকিছুর ট্রিগার টিপে দেয়া হয়েছিল।

    আজ মোদি সরকার “১৯৫৯ সালের সীমান্তরেখা” মেনে নিতে বাধ্য হলেন। দুনিয়ার সব উগ্র জাতিবাদীর পতনের মত এই হিন্দুত্ব জাতিবাদ এখানেও হেরে গেল।

    চীন বলতে চাইল, ভারত আপোস আলোচনায় সীমান্তবিরোধ মিটানোর মত কোনো পার্টনারই নয়, যোগ্য নয় তাই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “সেনা প্রত্যাহারে গিয়ে মোদির যে দশা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মিয়ানমার কোন রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব

    মিয়ানমার কোন রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব

    গৌতম দাস

    ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3nc

    মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী / ডিফেন্স ফোর্স নামে ক্লাবের প্রধান মিন অং লাইং

    গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মিয়ানমার মানে, বার্মা-দেশ আবার দেশী-বিদেশী খবরের শিরোনামে উঠেছে। যদিও রয়টার্স বা বিবিসি বলছে ১ ফেব্রুয়ারি ভোরে মিয়ানমারে নাকি একটা ক্যু হয়েছে। আসলেই কী তাই? না, ঠিক তা নয়। আপাত চোখে একটা ক্যু মনে হলেও। কারণ আগে থেকে কোথাও যদি একটা রিপাবলিক বা জন-প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র গঠন [constitute] হয়ে থাকে একমাত্র এরপরেই না প্রশ্ন উঠে ঐ রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী কোন সামরিক ক্ষমতাদখল বা ক্যু করেছে কিনা! যেটা রাষ্ট্রই নয় বরং  একটা সামরিক ক্লাব তার বেলায় এটাকে ক্যু বলা না বলায় কী এসে যায়? তাই নয় কী? তাহলে পশ্চিমারা সবাই একে ‘ক্যু’ বলছে কেন?
    এটা বলছে কারণ আমেরিকা-ইউরোপের বা পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ভাষ্য এটা।  এককথায়, কারণ এই রাষ্ট্রগুলো গত ত্রিশ বছরেরও বেশি আগে থেকে দাবি করে আসছিল যে বার্মায় নুন্যতম হিউম্যান রাইট নেই, অনবরত এর চরম লঙ্ঘন হচ্ছে। কথা সত্যও বটে। ফলে আমেরিকা তো বটেই সেসময় জাতিসংঘ থেকেও অবরোধ জারি করা ছিল। বার্মাকে অস্ত্রবিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল।  কিন্তু ২০০৭-১০ এই সময়কালে সব উলটে যায়। টেবিলের নিচে ডিল হয়। হিউম্যান রাইট  বিক্রি হয়ে যায় যা আমেরিকার নেতৃত্ব পশ্চিমারা সব সময় করে আসছে।  কারো হিউম্যান রাইট  রেকর্ড খারাপ থাকলে এর বিনিময়ে পশ্চিমারা সওদা করে  নিজেদের বৈষয়িক স্বার্থ হাসিল করে নিয়ে থাকে। এই ডিলেরই বাইরের প্রকাশ্য চিহ্ন হল নতুন করে লিখিত বার্মার কনষ্টিটিউশন-২০০৮। যেখানে বার্মা সামরিক ক্লাবের ক্ষমতাটা আগের মতই ক্লাবের হাতে থেকে যায় তবে সাথে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ বা ‘ফুটানি কা ডিব্বা’ লটকে দেয়া হয়। সেটা হল,  অং সান সুচির [Aung San Suu Kyi] একটা সিভিলিয়ান ফেস। এতেই ভাব ধরা হয়েছিল যে বার্মা যেনবা একটা জন-প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র। অথচ ক্ষমতাটা ছিল আগের মতই বার্মার “ডিফেন্স সার্ভিস” নামে এক সামরিক ক্লাবের হাতে।
    আসলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছিল,  হিউম্যান রাইট বিষয়ক অভিযোগ আগে যা ছিল তা পশ্চিমের সবাই দলবেধে বেচে দিয়েছিল, মানে মিটিয়ে নিয়েছিল জেনারেলদের সাথে মিলে দেনা-পাওনায়। আর বিনিময়ে বার্মার জেনারেলদের থেকে বাগিয়ে  ব্যবসা ও সম্পদ লুটের ভাগ নিয়েছিল।  আর এটা শুধু অভিযোগ সব চেপে যাওয়া নয়, উলটা সার্টিফিকেট দিয়েছিল যে এরপর থেকে নাকি কথিত “গণতন্ত্রের পথে সংস্কার” হতে শুরু করেছে!   এই “গণতন্ত্র” শব্দটা অদ্ভুত। বিয়ে করে নাই; অথচ বাচ্চা পয়দা হয়েছে দাবি করার মত।  তাই কনষ্টিটিউশন-২০০৮ এটাই তো প্রমাণ যে  বার্মা একটা সামরিক ক্লাব মাত্র, আর ঐ ক্লাবের গঠনতন্ত্রই হল কনষ্টিটিউশন-২০০৮। মোটকথা ব্যতিক্রমহীনভাবে সারা পশ্চিম বার্মার জেনারেলদের থেকে ব্যবসা ও সম্পদ লুটের ভাগ পেয়ে চেপে গিয়েছিল।  আর এই ডিলটাই ঘটাতে প্রাইমারি দুতায়ালিটা ঘটিয়ে দিয়েছিল ভারত, ফলে সেও কিছু ভাগ পেয়েছিল।  আর চীনের কথা আর কী বলব! সে বরং হিউম্যান রাইটের ঢং না করে বরং সোজা সাপ্টা ঘুষ দেয়া আর কাজ নেয়ার লাইনে ছিল। তাই , যেটা বার্মার উপর আশির দশক থেকে জাতিসংঘের আরোপিত অবরোধ সে আমল থেকে চীন সেটার একাই ফয়দা লুটেছিল। কারণ বার্মার পড়শি বলে একমাত্র চীনের মাধ্যমেই না-দেখার ভান করে বার্মা বাইরের দুনিয়ার সাথে সক্ষম রেখে চলতে পারছিল। তাই এটা ছিল চীনের পড়ে পাওয়া সুবিধা।
    তাহলে এখন কী হয়েছে? জেনারেলেরাও কেন ক্যু বলাতে আপত্তি করছে না? মিয়ানমারের জেনারেলরা এই উছিলায় চাইছে তাদের আর ক্লাব নয়, রাষ্ট্রই মনে করা হোক এবং এটাই তাদেরও ভাষ্য। তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়? সমস্যা হল, মিয়ানমার একটা দেশ অবশ্যই। কিন্তু এটা জন্ম থেকে কখনোই রাষ্ট্র নয় মানে – মিয়ানমার ১৯৪৮ সালের স্বাধীনতা মানে এর আগের কলোনি দখলদার জাপান অথবা ব্রিটিশদের থেকে মুক্ত হওয়ার পর থেকেই এটাকে খতিয়ে না দেখে  অভ্যাসে রাষ্ট্র মনে করা হয়েছিল। আর পাঁচটা কলোনিমুক্ত হওয়া স্বাধীন রাষ্ট্র ভেবে।  নেহেরুর ভারত বা জিন্নাহ’র পাকিস্তান অর্থেও বার্মা কখনও রাষ্ট্র হতে পারে নাই। যেমন অন্তত একটা ছোট্ট কথা দিয়ে বলা যায়।
    খুবই অল্প কথায় বললে, প্রশ্নটা ক্ষমতার, মানে রাষ্ট্রক্ষমতার।  যেমন, শাসন-ক্ষমতাধর যেকোন শাসককে বলতে পারতে হয়, কে তাঁকে ক্ষমতা দিয়েছে। মোটা দাগে এখানে দুধরণের জবাব দেখতে পাওয়া যায়। এক. যারা ক্ষমতার উৎসের জবাব দিতে পারে না, হদিস দিতে পারে না; যাদের বেলায় ক্ষমতার উত্তরাধিকার হিসেবে রাজার সন্তান রাজা এমন হয়। অথবা এদের আদি রাজার ক্ষমতার হদিস না দিতে পেরে দাবি করেন যে ক্ষমতা ‘ঐশ্বরিকভাবে’ পেয়েছে।
    আর দুই. যারা হিম্মত রাখে ও ব্যবহারিকভাবে মেনে নেয় যে ‘ক্ষমতা জনগণের’। সে-ই জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিনিধি, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তারা ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। এই দ্বিতীয় ধারার বেলায় কেবল এরাই দাবি করতে পারে, তাদের রাষ্ট্র আছে আর সেই দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা একটা রাষ্ট্রগঠন করেছেন, ফলে এরপর একটা সরকার গঠনও করেছে। এই দ্বিতীয় ধারাকেই বলা যায় এটা এক রিপাবলিক বা জনগণের প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র। কাজেই রিপাবলিক বাদে আর কোনো দেশেরই ক্ষমতার উতসের হদিস থাকে না, উত্তরাধিকারী রাজা-সম্রাটের সন্তানেরা রাজা-সম্রাট হয়ে থাকে। কোথাও কোথাও বড়জোর সমাজের কিছু এলিট মিলে তাদের পছন্দের কাউকে শাসক বানিয়ে রাখে। ফলে কোথাও শাসক থাকা মানে তা ‘দেশ’ অবশ্যই; কিন্তু শাসক থাকা মানেই তা ‘রাষ্ট্র’ নয়। আবার যদিও  দুনিয়াতে যা দেখা গেছে, এই অর্থে ইতিহাসে ১৬৫০ সালের আগে রিপাবলিক রাষ্ট্র বলে কিছু ছিল না।
    তবে নিজ ক্ষমতার উৎস কী, কে দিয়েছে তা পরিষ্কারভাবে বলতে পারা বা না-পারা- এটাকেই আমরা কোনো ‘দেশ’কে ‘রাষ্ট্র’ বলেও মানা না মানার মূল নির্ণায়ক বলতে পারি।

    কিছু ব্যতিক্রম, ‘নগর-রাষ্ট্র’
    তবে ব্যতিক্রম হিসেবে ক্ষণকালের জন্য আমরা কোথাও নগর-রাষ্ট্র ধারণা লক্ষ করি। যেমন যিশুর জন্মের ৭৫৩ বছর আগে [753 BC] ‘প্রাচীন রোমে’ রাজতন্ত্রের পত্তন হয়েছিল। পরে (প্রায় আড়াইশ’ বছর পরে) সেখানে নগর-রাষ্ট্রের ধারণার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল, সেটাও যিশুর জন্মের ৫০৯ বছর আগে [509 BC]। এটাই প্রথম দীর্ঘস্থায়ী রিপাবলিক। পরে সেটাও ভেঙে যায় যিশুর জন্মের মাত্র ২৭ বছর আগে [27 BC]। তাতে এবার ফিরে আবার রাজতন্ত্র বা মোনার্কি মানে, রোমান এম্পায়ার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আর তা টিকেছিল যিশুর জন্মের ৪৭৬ বছর পরে [476 AD] পর্যন্ত। এ সময়েরই মাঝামাঝি রোমে প্রভাব বেড়ে যাওয়া খ্রিষ্টধর্ম সামলাতে না পেরে শেষে ৩১৩ সালে সম্রাট কনস্টান্টিন নিজেই রোমকে ‘খ্রিষ্টান রোম’ বলে ঘোষণা করেন। তখনই তিনিসহ সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক সদলে খ্রিশ্চান ধর্মগ্রহণ করেছিলেন।

    কলোনিদখল হয়ে যাওয়ার মধ্যেও ভালোমন্দ আছেঃ
    অনেকে বলে থাকেন, দেশ যদি কলোনি দখলে যায়ই তবে জাপানের কলোনি হওয়ার চেয়ে ব্রিটিশ কলোনি হওয়া ভাল। এমন কেন বলেন?
    ব্রিটিশেরা ‘পশ্চিমা’ বলে এশিয়ান জাপানের চেয়ে তারা ভাল, ব্যাপারটা একেবারেই তা নয়। আগে দেখেছি, রোম ‘নগর-রাষ্ট্রও’ টিকে নাই। শেষে তা রোম সাম্রাজ্যের ভেতরে হারিয়ে যায়; যে সাম্রাজ্য আবার ৪৭৬ সালের [476 AD] মধ্যে নিজেও বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু পরে “হলি রোমান এম্পায়ার” নামে, ৮০০ সাল থেকে রাজা শার্লেমেন [Charlemagne] (ফরাসি উচ্চারণে শাআলে-মেঁ) নতুন করে “হলি রোমান এম্পায়ার” [Frankish king Charlemagne as Roman emperor by Pope Leo III on Christmas Day in the year 800] নামে এক  সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটান। তবে আগের রোমান সাম্রাজ্যের সাথে নয়া হলি রোমান এম্পায়ারের কোনো সম্পর্ক নেই, কেবল নামের কিছু মিল ছাড়া। আর এখনকার জার্মানি-ফ্রান্সের মাঝের ফ্রাঙ্ক [Frank] ভূখণ্ডকে কেন্দ্র রেখে এর বিস্তার শুরু হয়েছিল। মোটা দাগে, এই সাম্রাজ্যই (৮০০-১৮০৬) সময়কাল জুড়ে জারি ছিল আর এখনকার ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্রেরই পূর্বের-শাসক ছিল। যদিও শেষের ৩০০ বছর বিশেষত ১৬৪৮ সাল থেকেই এটা নামকাওয়াস্তে সাম্রাজ্য হয়ে গিয়েছিল। এমনকি তা আলাদা আলাদা ছোট সাম্রাজ্য হয়ে প্রত্যেকে নিজেদের  সীমানাও ভাগ করে নিয়েছিল। আর সেগুলোই একালে রিপাবলিক রাষ্ট্ররূপ [তবে জাতি-রাষ্ট্র] হয়ে নিয়েছিল যা এখনকার ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর সীমানা নির্দেশ করে।
    এভাবে এক পর্যায়ে ১৬৫০ সালের ব্রিটেনে ক্রমওয়েলের বিপ্লবকেই (Cromwell revolution) ধরা হয়, প্রথম রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার বিজয়। তবে এরপরে সাম্রাজ্যগুলোর ভেতরেই এদের শাসন-কাঠামো কী হবে তা নিয়েও রাষ্ট্র-ধারণার ক্রম-রূপান্তর ঘটেছিল; যেখানে মূল প্রশ্ন ছিল রাষ্ট্রক্ষমতা।

    রিপাবলিক রাষ্ট্রের অলিগলির ভাবনাঃ
    সারকথায় সেটা হল যেমন, নাগরিক হল উপাদান বা কনস্টিটুয়েন্ট। আর এই কনস্টিটুয়েন্টদেরকে নিয়ে রাষ্ট্র কনস্টিটিউট বা গঠন করা – [যেখান থেকে কনষ্টিটিউশন বা Constitution] ধারণাটা। আর এসব ধারণার উপর রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠিত। এখানে পাবলিক বা নাগরিকই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস – এই ধারণা আস্তে ধীরে সমাজগুলোতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এর সাথে সাথে তাই রিপ্রেজেন্টেশন বা প্রতিনিধিত্ব ধারণাও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এটাই জন-প্রতিনিধিত্বের ধারণা; কালক্রমে যা মাঠে ময়দানের ভাষায় ভোট বা নির্বাচন। এখান থেকে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত আরো শব্দ যেমন – জনস্বার্থ, জনস্বাস্থ্য, জনপ্রশাসন, জনপরিবহন অথবা পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন (জনস্বার্থে মামলা)। আবার এখান থেকেই মাও সেতুংয়ের চীনের ভাষায় তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাম  – পিপলস ব্যাংক, সেনাবাহিনীর নাম – পিপলস আর্মি ইত্যাদি। সার কথাটা হল, রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ; রাষ্ট্রপরিচালনায় সব ক্ষমতার উৎস জনগণ – এটাই মূল ভিত্তি। এই ধারণাকে মূল ও কেন্দ্রীয় ধারণা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্র ধারণার বিস্তার ঘটেছে। তাই না কোন রাজা, না সম্রাট, না কোন রাজ-উত্তরাধিকারী বা না সমাজের এলিটদের বেছে নেয়া কেউ প্রমুখ – এরা কেউই ক্ষমতার উৎস নন। রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস একমাত্র জনগণ। জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিনিধি – নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই একমাত্র জনগণের হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন। এটাই রিপাবলিক (গণপ্রজাতন্ত্রী) রাষ্ট্র ধারণাটার সারকথা।
    কিন্তু রাষ্ট্র ধারণার এদিকটা এশিয়ায় এভাবে এত বিকশিত হয়নি। একটা মোনার্কি মানে সেখান থেকে ছোট রাজা থেকে বড় সম্রাটের সাম্রাজ্য আর সেখান থেকে  কলোনি দখলদার মালিকের সাম্রাজ্য হয়ে ওঠার পরে দেখা গেছে, এদের বিকাশের এখানেই সমাপ্তি।  এরা আর রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা পর্যন্ত বিকশিত হতে পারে নাই।  যেমন এশিয়ান অরিজিন জাপান, এর সম্পর্কে আমরা খুবই কম জানি বা চর্চা করি। সে মূলত পূর্ব এশিয়ার (ততকালে অবিভক্ত) একই কোরিয়া ও চীনের আংশিক কলোনি দখলদার এক সাম্রাজ্য ছিল যা নিজে বৃটিশদের মত কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। কেবলমাত্র এক সম্রাটের সাম্রাজ্য (তবে কলোনিদখলদার) ছিল। এবং সেকালের বার্মার কিছু নেতা অথবা পশ্চিমবাংলার সাবেক কংগ্রেসি নেতা সুভাষ বোস – এদের মাধ্যমে ব্রিটিশ-ভারত এই কলোনিকে জাপান নিজের প্রভাবাধীনে কিছু অংশ বা পারলে পুরাটাই পুণঃদখলি কলোনি করে নেয়ার চেষ্টা করেছিল এমনই আরেক কলোনি মাস্টার ছিল সেই জাপান।

    জাপান নিজেকে রিপাবলিক রাষ্ট্র মনে করে কিনা এখনও অস্পষ্টঃ
    কিন্তু জাপান সম্পর্কে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আরেক দিক আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের ভাগাভাগিতে জাপান হিটলারের জার্মানির পক্ষে আর আমেরিকা-সোভিয়েত-ব্রিটিশ মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধে জার্মানির হিটলারের সাথে জাপানও হেরে যায়। কিন্তু আমেরিকা আর সব  ‘হারুপার্টির’ মত জাপানকেও ত্রাণ এবং অবকাঠামো ও শিল্প পুনর্বাসনের অর্থ-বিনিয়োগ দিয়েছিল। এতে জাপান পুণর্গঠিত হয়ে উঠেছিল তবে কেবল সামরিক দিকে আমেরিকার অধীনস্ত থেকে পুনর্গঠিত এক নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার জাপান গঠন করা হয়েছিল। এই নতুন জাপান নিজেকে এবার আর কোন সম্রাটের সাম্রাজ্য ফিরে দাবি না করলেও নয়া রাষ্ট্র দাবি করেছিল। কিন্তু সেটাও রিপাবলিক কি না তা জানা যায় না। এছাড়া জাপানে রাজনীতি বলে কিছু আছে কি না, চিন্তায় ও চর্চায় রাজনৈতিকতা [Polity] আছে কিনা, তাও জানা যায় না। জাপানের ফরমাল নাম “ইউনিয়ন অব জাপান”। অর্থাৎ কোথাও এটা যে ‘রিপাবলিক’ সে কথা বলা হয়নি।
    ওদিকে জাপানে রাজনৈতিক চিন্তা ও চর্চার দিক সবসময়ই খুবই দুর্বল। রাজনৈতিক ধারণা বলতে এখানে বড় জোর একটা জাতিরাষ্ট্র বা দেশপ্রেম – এই পর্যন্তই, যেন এর কোন রাজনৈতিকতা নাই বা সেবুঝে না। বিশেষত জাপানের কলোনি দখলের পক্ষে নিজ কোন সাফাই দেয়ার যেন প্রয়োজন – অনুভব ছিল আমরা দেখি না। যেন তারা বুঝাতে চায় তাদের গায়ের জোর ছিল তাই দখল করেছিল – এধরনের, যেটা বলা বাহুল্য ব্রিটিশদের মত নয়।
    কারণ এসবের বিপরীতে ব্রিটিশদের রাজনীতি ও রাষ্ট্র নিয়ে ধারণা ছিল। শুধু তাই না কলোনিদখল করা দেশ বৃটিশ-ইন্ডিয়াতে যেমন- রামমোহন রায়,  (কমিউনিস্টরা যাকে রেনেসাঁর আদিগুরু মনে করে) তাঁর চিন্তার সীমাবদ্ধতা ও কমতির শেষ নেই কথা সত্য। তবু একটা রাজনৈতিক রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন ব্রিটিশেরা তাঁকে এবং অন্য নেটিভদের দিতে পেরেছিল ও দিয়েছিল। অবশ্য তা মূলত নেশন-স্টেট ধরনের জাতিবাদী, দেশপ্রেম টাইপের আবেগী ধারণা। এটা মূলত জাতিরাষ্ট্র অর্থে রিপাবলিক ধারণা হলেও তা পাবলিকের ক্ষমতার রাষ্ট্র মনে করা হত। এ ক্ষেত্রে রামমোহনে চিন্তার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটা রাজনৈতিকতা সেখানে ছিল আমরা দেখি। এককথায় জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস ও কেন্দ্র এতটুকু চিন্তার রাজনৈতিকতা ব্রিটিশ কলোনি থেকে পাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু জাপানের কলোনি হলে এটুকু কেন কোন রাজনৈতিকতা পাওয়ার সুযোগ ছিল না, নাই। এর একেবারে গোড়ার কারণ জাপান আসলে ছিল এক সম্রাটের সাম্রাজ্য; মানে সেকালে তা ছিল এক রাজতান্ত্রিক জাপান। তবে যদিও তা মার্শাল তেজো ধরণের সামরিক নেতা নির্ভর। এদিকে বলাই বাহুল্য রাজতন্ত্রে “রাজনীতি” বলে কোন ধারণা থাকে না। তাই, শাসনের ক্ষমতা কক্তৃত্ব একমাত্র জনগণের এই ধারণা সমাজে না থাকলে সেখানে রাজনীতি শব্দ ও ধারণার উদ্ভব ঘটে না। থাকতেই পারে না। ফলে কোন ধরণের রাজনৈতিকতাও। তাই নেতা সুভাষ বোস বা বার্মার তরুণদের জাপানি আর্মি যত যাই কিছুই শিখিয়ে থাকুক বা ট্রেনিং দেক তার চিন্তায় রাজনীতি বা রাষ্ট্র ধারণার লেশ মাত্র ছিল না। থাকার কথাও না।

    জাপানে কোন ধরণের রাজনৈতিকতার ধারণা না থাকা, এদিকটাই জাপানি ট্রেনিংপ্রাপ্ত মিয়ানমার শাসকদের ভিন্ন করে তুলেছে বলে অনুমান করা যায়। সেকারণেই বার্মা কেন রাষ্ট্রই নয়, কোনো রিপাবলিক নয়, এর কারণ আমরা এখানে খুঁজলে পাবো।

    তবে মিয়ানমার কেন ব্রিটিশ শাসনবিরোধিতা করতে জাপানের কাছে গিয়েছিল, এর পেছনে আবার সবচেয়ে বড় কারণ মনে করা হয় দুটা। ব্রিটিশরা বার্মা দখল করেছিল ১৮২৪ সালে, ছেড়ে গিয়েছিল ১৯৪৮ সালে। কিন্তু এই ১২৪ বছরের মাত্র শেষ ১১ বছর (১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৮) বাদে বাকি সবটা সময় বার্মাকে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ারই একটা প্রদেশ রূপে ঘোষণা করে বৃটিশেরা শাসন করেছিল। আর ভারতীয় ও ব্রিটিশদের উপর এটাই বার্মিজদের প্রধান ক্ষোভের কারণ। সেটাই বা কীভাবে?
    বার্মাকে এমন প্রদেশ হিসেবে গণ্য করে শাসন করাতে বার্মার ক্ষমতায় সবার উপরে ব্রিটিশরা থাকলেও মূলত ভারতীয় সিভিল সার্ভিস অফিসারদের অধীনে বার্মা নিজেকে দেখতে পেত। এর ফলে আরো ঘটনা হল বার্মার শহর-গঞ্জে ভারতীয়রা বার্মায় ব্যবসায় ও চাকরিতে প্রধান ভূমিকায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছিল। যেমন কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের গল্প উপন্যাসগুলো মনে করা যেতে পারে যেখানে বার্মার নাম এই কারণেই বারবার এসেছে। ফলে ভারতীয়রা হয়ে যায় বার্মার সাধারণ মানুষের চোখে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও লুটেরা; যার উপরে কলোনি মালিক ব্রিটিশের ওপর বার্মিজ ঘৃণা তো আছেই।
    ফলে বার্মিজ তরুণদের কাছে জাপানের শাসকেরা হাতছানি তৈরি করতে পেরেছিল। এতে বার্মিজদের পালটা প্রতিক্রিয়া হয় যে, তারা জাপানি সাহায্য নিয়ে হলেও দেশ থেকে ভারতীয় ও ব্রিটিশদের তাড়াবে। এমনকি ভারতীয়দের বিরুদ্ধে এই ঘৃণা ১৯৪৮ থেকে ’৬০ সাল পর্যন্ত আরো তীব্র হয়েছিল তাদের সমূলে ভারত ফেরত পাঠাতে। তবে তরুণদের জাপানি-প্রীতি বাড়ার আরেক বড় কারণ হল, ১৯৪১ সালে বিশ্বযুদ্ধের ভিতর জাপান থাইল্যান্ড দখল করে নিয়েছিল। আর বার্মার প্রতিবেশী হল থাইল্যান্ড। রেঙ্গুন ইউনিভার্সিটির তরুণ, সু চির বাবা অং সান ও তাঁর বন্ধুরা প্রায়ই ব্রিটিশদের নির্যাতন বা খোঁজাখুঁজি এড়াতে পালিয়ে থাইল্যান্ডে আশ্রয় নিতেন। আর সেখানেই জাপানি আর্মির সাথে তাদের প্রথম মোলাকাত ঘটেছিল। সেখানেই সাব্যস্ত হয় যে, জাপানিরা তাদের সামরিক ট্রেনিং দিবে। অং সান গোপনে দেশে ফিরে নিজ বন্ধুদের সংগঠিত করে নিয়ে যান। পরবর্তীকালে ট্রেনিংপ্রাপ্ত এরাই হয় ট্রেনার যা গড়ে তুলেছিল বার্মিজ ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি [Burmese Independent Army, BIA] নামের সেনাবাহিনী। পরের বছর ১৯৪২ সালে জাপানিরা বার্মা আক্রমণ করলে এই বাহিনীর তরুণ সেনারা জাপানিদের পক্ষে পদাতিক যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। এতে জাপানিরা ব্রিটিশদের হাত থেকে বার্মাকে স্বাধীন করে ফেলে। আর এতে বার্মায় গড়ে উঠা জাপানি প্রশাসনে অংশ নিয়েছিলেন অং সান ও তার বন্ধুরা।

    আমাদের মোগল আমলে ‘রাজনীতি’ বলে কোন শব্দই ছিল না, কেন?
    কিন্তু নির্ধারক ভূমিকাটা ঘটেছিল আরেকটু অন্যখানে। জাপানিরা অং সানের ৩০ জন বিশেষ বন্ধুদের একটা দলকে বিশেষ ট্রেনিং দিয়েছিল বিআইএ গঠনের সময়। এদের গল্প-বীরত্বই আজও বার্মার আর্মির পুঁজি। সাথে আবার একই সাথে বার্মা কোন রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব হিসাবে গড়ে উঠবার পিছনের কাহিনী। মনে রাখতে হবে জাপান তাঁদের যতকিছুরই ট্রেনিং দেক তাতে রাজনৈতিক ট্রেনিং বা রাষ্ট্র-বিষয়ক কোন ট্রেনিং বা ধারণা তাদেরকে দেয় নাই। কারণ খোদ জাপানেই তো রাজনীতি বলে কিছু ছিল না। স্মরণ করেন, আমাদের মোগল আমলে ‘রাজনীতি’ বলে কোন শব্দই ছিল না। কারণ রাজতন্ত্রে এসব ধারণা বা শব্দ থাকে না। যে কারণে এখনকার সৌদি আরবেও রাজনীতি শব্দটা নাই। রাজনীতি শব্দ বা ধারণা থাকার পুর্বশর্ত হল যখন রাজতন্ত্রের বিপরীতে “জনগণই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস” – এধারণা প্রতিষ্ঠিত থাকে।

    পরবর্তিতে মাত্র তিন বছরের মধ্যে জাপানিদের ব্রিটিশদের কাছে হার স্বীকার করতে হয়েছিল। মূল কারণ ১৯৪৫ সালের আগস্টে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জাপান-জার্মান অক্ষশক্তির হার হয়েছিল। ফলে বার্মার ক্ষমতা আবার সেই ব্রিটিশদের হাতে ফিরে চলে যায়। আর তা থেকেই পরে ১৯৪৮ সালে অং সানের (তিনি ১৯৪৭ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছিলেন)বন্ধুরা ক্ষমতা নেন, বিশেষত ঐ ‘প্রমিন্যান্ট’ ৩০ জন।

    বিশেষ ত্রিশজনের পরিণতিঃ
    কিন্তু বার্মার শাসনে দুর্যোগের দিন শুরু হয় এখান থেকেই। মূলত এই ৩০ জন ভাগ হয়ে গেছিলেন মূলত কারা মূল সিভিলিয়ান রাজনীতিবিদ বা প্রশাসক হবেন আর কারা মূল আর্মি অফিসার হবেন – এভাবে। কিন্তু এটাই কাল হয়ে দাঁড়ায়- এ দুই দলের কারা শ্রেষ্ঠ অথবা কাদের ভূমিকা নির্ধারক, এসব নিয়ে। আসলে পেছনের ঘটনাটা আরেকটু ভিন্ন। জাপানি ট্রেনিংয়ে কখনোই রাজনৈতিকতাকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। একই কারণে রাষ্ট্রক্ষমতার ও রাষ্ট্রগঠন সংক্রান্ত ধারণা দেয়া হয়নি। কারণ এসব বিষয়ে জাপানিরা নিজেদেরই ধারণা ছিল না। বরং উলটা, তাঁদের ধারণা বলতে সবই ছিল ক্ষমতার ধারণা; তাও আবার যেখানে ক্ষমতা মানে কেবল সামরিকতা। কিন্তু ক্ষমতার অর্থ তো দুইটা; সামরিক ক্ষমতা ও সাফাই বয়ান এর(নেরেটিভের) ক্ষমতা। রাষ্ট্রধারণা, জনগণ ক্ষমতার উৎস কেন বা জনপ্রতিনিধির ধারণা ইত্যাদি ব্যাপারে কোনো ধারণাই এদের ছিল না। এর উপর আবার বার্মা [রেস ও এথনিক অর্থে] প্রধান ৯টি জাতে বিভক্ত যাদের অন্তত তিনটি গোষ্ঠী ব্রিটিশ আমলেই স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করত। কিন্তু স্বাধীন বার্মার জেনারেলরা প্রথমেই তা কেড়ে নিয়েছিলেন। এখন এসব জাতিগোষ্ঠীকে কিভাবে মোকাবেলা করা হবে এ নিয়েও লাগে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। এসব জটিলতার সমাধান হবে একমাত্র বল প্রয়োগে তা মনে করে, অং সানের আরেক বন্ধু নেউইন যিনি সামরিক জেনারেল ছিলেন, ১৯৬২ সালে সামরিক বলে ক্ষমতা দখল করার ঘোষণা দেন। অর্থাৎ সিভিল রাজনীতিক বনাম আর্মির ভাগ হয়ে থাকায় একে অপরকে অযোগ্য ব্যাপারটা বুঝে না মনে করা – এরই ভাব ও পরিণতিতে। সেই থেকে দেশের ক্ষমতা আর কখনোই সিভিল রাজনীতিকের হাতে আসেনি। আবার রাষ্ট্র রাজনীতি এই শব্দগুলোই বা কী, রাষ্ট্রগঠন কী জিনিষ তা জীবনেও আর জেনারেলেরা সহ বার্মিজ সমাজের জানা হয় নাই। ঐ “ত্রিশজন বীরের” গর্ব ও আবেগের নিচে সব চাপা পড়ে আটকে যায়। অথচ ঐ ত্রিশজনই ট্রেনিংয়ে রাষ্ট্র রাজনীতি ধারণাগুলোই কখনও শুনে নাই।

    তাহলে ২০০৮ সালে কনষ্টিটিউশন লেখার অর্থ তাতপর্য কী?
    কথা শুরু করেছিলাম ‘মিয়ানমার কোনো রাষ্ট্র’ নয় বলে। কেন? মিয়ানমার অবশ্যই একটা ‘দেশ’। কিন্তু এই দেশের মালিক যেন একটা ‘ক্লাব’ এবং এটা একটা সামরিক ক্লাব।
    একটু বড় সেসব পিছনের গল্প। বার্মা একটা দেশ ওর শাসক আছে কিন্তু তা রাষ্ট্র নয়, মানে জনগণের রাষ্ট্র নয়।  অনবরত যে মূলত বার্মিজ বা বুদ্ধিষ্টদের বাদে অন্যান্য সব জাতিগোষ্ঠির উপর হত্যা নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। এজন্য বার্মার উপর পশ্চিমা দেশের তো বটেই জাতিসংঘেরও অবরোপ করা ছিল সেই আশির দশক থেকে। অর্থাৎ বার্মা ছিল একঘরে। বার্মাকে অস্ত্রবিক্রিও নিষেধ ছিল। কিন্তু চীনের সাথে সীমান্ত আছে বলে অনেকটা চোরাচালানের ছলে বা বেনামে ব্যাপক পণ্যবিনিময় চলত। এটাই তার একমাত্র সীমান্তের বাইরে যাবার উপায় ছিল। চীনের সাথে এই সম্পর্ক আবার চীনের যখন ডাবল ডিজিট উত্থান সে যুগে বার্মার সাথেও বেড়ে উঠেছিল।

    সে সময়টা ছিল গ্লোবাল অর্থনীতিতে ২০০৮ সালের মন্দা আসার আগের বছর পর্যন্ত সময়কাল। তাই অর্থনীতি ভাল চলাতে কোন দেশের মাটির নিচের গ্যাস-তেল কে আগে কিনে নিতে বুকিং দিয়ে রাখতে পারে  এর প্রতিযোগিতা ছিল। আমাদের এদিকে চীন ও ভারতের মধ্যে। সেই সুত্রে বার্মার একটা খনির গ্যাস ভারত বুকিং দিতে কথা শুরু করেছিল। কিন্তু শর্ত ছিল  হুইলচার্জ দিয়ে বাংলাদেশের উপর দিয়ে পাইপলাইন বসিয়ে এই গ্যাস নেয়া হবে। কিন্তু বাংলাদেশ এই অনুমতি দিতে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করাতে ইতিমধ্যে প্রতিযোগিতায় চীন ঐ গ্যাস কিনে ফেলার ডিল করে ফেলে। মূলত এরপর থেকে ভারত নতুন এক আইডিয়া নিয়ে একদিকে বার্মা অন্যদিকে মূলত আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের সাথে মধ্যস্থতার ভুমিকায় হাজির হয়েছিল। ভারতের মূল পয়েন্ট ছিল অবরোধের সুফল অন্য সবাই বাদ যাচ্ছে, আর একচেটিয়া তা কেবল চীন খাচ্ছে। সুচি তখনও হাউজ এরেস্টে ছিল। তাই নামকা ওয়াস্তে হলেও যদি দেখানো যায় যে বার্মা একটা রাজনৈতিক সংস্কার শুরু করেছে আর তাতে যে মূল ক্ষমতা তা আগের মতই বাহিনীর হাতে রেখে দিয়েও তাঁদেরই অধীনে কেবল সুচিকে কিছু ক্ষমতা দিয়ে তারা “গণতন্ত্র কায়েম” করেছে বলে যদি পশ্চিম সার্টিফিকেট দেয় তবে এই উসিলায় বার্মার সব অবরোধই পশ্চিম ও জাতিসংঘ তুলে নিতে পারে। এবার তখন আর একা চীন না, ভারত ও পশ্চিমারাও বিনিয়োগ পণ্য-পুজি বার্মার বাজারে রপ্তানির ব্যাপক সুযোগ নিতে পারে। তবে এমন এই রফাতেও জেনারেলদের কথিত লোকদেখানো সংস্কার (যেটা রাষ্ট্র সংস্কার নয় মোটেও) করে নির্বাচন দিতেই ২০১০ সাল লেগে গিয়েছিল। আর তখনই কি কি ক্ষমতা জেনারেলেরা সুচিকে দিতে চায় এর হিসাব লিখে রাখতেই কথিত ‘কনষ্টিটিউশন সংস্কার’ করা হয়েছিল। ফলে এই সংস্কারে যে আজকের দশায় পড়বে তা সবাই জানলেও সবাই তা এড়িয়ে বার্মার বাজারে ঢুকতে ঝাপিয়ে পরেছিল। যেমন, বার্মায় মোবাইল ব্যবহারকারি ছিল মাত্র কয়েক পার্সেন্ট, সেটা এখন ৯২% । এভাবে যে যা পেরেছে খাবলে নিয়েছে এতদিন। ওদিকে ২০১০ সালের নির্বাচন এই কনষ্টিটিউশন ২০০৮ এর অধীনেই হয়েছিল। সুচি তখন মুক্ত কিন্তু বুঝাবুঝি অনুসারে নির্বাচনে অংশ নেয় নাই। আর আর্মি একাই অংশ নিয়েছে বেনামে, নিজেরাই একটা দল (ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলবমেন্ট পার্টি, USDP) খুলে নিয়েছিল। এভাবেই ক্ষমতায় ছিল। আর পরের ২০১৫ সালের নির্বাচনে সু চির দল এনএলডি অংশ নিয়ে প্রধান নির্বাচিত দল হয়। কিন্তু তবু বাহিনী সরকারের উপর নিয়ন্ত্রণ হারায় নাই। কারণ কনষ্টিটিউশনে লেখা আছে সংসদের নিম্ন কক্ষে চার ভাগের এক ভাগ আসন ৪৪০/১১০, আর উচ্চকক্ষের ৩৩% আসন “ডিফেন্স সার্ভিস”কে দিতে হবে।  যেটা আবার সার্ভিস প্রধান ঠিক করে দিবেন কোন অফিসার সংসদ সদস্য হবে। এতেও শেষ হয় নাই। স্বরাষ্ট্র,প্রতিরক্ষা, সীমান্তরক্ষীসহ পাঁচ মন্ত্রীত্ব সেনাবাহিনীকে দিতে হবে আর সার্ভিস প্রধান এই নিয়োগ দিবে। আর সবার উপরে “ডিফেন্স সার্ভিস” প্রধানের থাকবে সবকিছুর উপর এক ভেটো ক্ষমতা।

    অর্থাৎ “ডিফেন্স সার্ভিস” এরাই আসলে বার্মা দেশের (সরি, রাষ্ট্র বলতে পারছি না) মূল মালিক, এটা এখানে বুঝা গেল। নাহলে ডিফেন্স চীফ কি করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগ দিবেন!

    বার্মার কনস্টিটিউশনে ‘ডিফেন্স সার্ভিস’ কারা ও কীভাবেঃ
    মিয়ানমারে এখন তৃতীয় কনস্টিটিউশন চলছে। এর সর্বশেষটা রচিত হয়েছিল ২০০৮ সালে।
    কনস্টিটিউশন ২০০৮ [এখানে পিডিএফ কপি পাবেন] এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল, এই কনস্টিটিউশনের শুরুতে তৃতীয় পাতায় দ্বিতীয় প্যারাতে যে অনুচ্ছেদ, এর শিরোনাম ‘বেসিক প্রিন্সিপল’ [Basic Principles of the Union, p.3]। এর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রগঠনের উদ্দেশ্য হিসেবে (এ থেকে এফ) এভাবে সাতটি উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে। আর এর সর্বশেষ এফ বা সপ্তম উদ্দেশ্যই হলো, হাজার কথার এককথা। সপ্তম উদ্দেশ্য হল, ‘দেশের ডিফেন্স সার্ভিসকে রাষ্ট্রের জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকায় অংশগ্রহণে সক্ষম করা” [Enabling Defence Services to be able to participate in the National Political leadership role of the State]।

    বলেছিলাম বার্মা রাষ্ট্র্র নয় একটা দেশ মাত্র। বলেছিলাম, রাজতন্ত্রিক দেশ দেশের ক্ষমতার উৎস জানাতে ব্যর্থ হবেই। অপরদিকে, রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়লে বলা সম্ভব, রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ। সেটা যাই হোক, নির্বাচিতের বেলায় জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতা হবেন নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট। আর তার অধীনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থাকবে। নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার অধীনে থাকবে সামরিক বাহিনীসহ সব প্রতিষ্ঠান। এই হলো রিপাবলিক ক্ষমতার কাঠামোগত বিন্যাস। অথচ কনস্টিটিউশনের সপ্তম উদ্দেশ্য বলছে, ‘দেশের ডিফেন্স সার্ভিসকে রাষ্ট্রের “জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকায় অংশগ্রহণে সক্ষম করা”। অর্থাৎ এই বাক্য অর্থহীন ও স্ববিরোধী। “ডিফেন্স সার্ভিসের সদস্যরা” দেশের ‘রাজনৈতিক নেতা’ হয় কী করে?  আর এটাই নাকি ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনের উদ্দেশ্য?  কিভাবে?

    আবার এই ‘ডিফেন্স সার্ভিস’ বলতে আমাদের মতো রাষ্ট্রকাঠামোর সেনাবাহিনী বলে বুঝা ভুল হবে। কারণ মিয়ানমারের বর্তমান কনস্টিটিউশনের ‘ডিফেন্স সার্ভিস’ বলতে একে সবার উপরের ক্ষমতার এক প্রতিষ্ঠান বলে যদি ধরে নেন তাহলে এরপর এর পুরোটার অর্থ স্পষ্ট হবে। এ জন্যই বলেছি, মিয়ানমারের ‘ডিফেন্স সার্ভিস’ একটা ক্লাবের মত; তবে সামরিক ক্লাব, যে আবার দেশের মালিক। আর ঠিক এ কারণেই মিয়ানমার কোনো রাষ্ট্রের নাম নয়, রাষ্ট্র নয়।

    শেষকথাঃ
    বার্মায় পশ্চিমাদের ব্যবসা বাগানোর লোভে লোকদেখানো কারবারের নাম ‘গণতন্ত্র’। মানে কথিত যে বার্মার গণতান্ত্রিক সংস্কার’ এতদিন চলতে তা ফেল করল। এটাই ১ ফেব্রুয়ারির তাতপর্য। এর মানে হল ২০১৫ সালের নির্বাচন ছিল “ডিফেন্স সার্ভিস” ক্ষমতায় নিজের নিয়ন্ত্রণ না হারিয়ে সিভিলিয়ানদেরকে কতদুর ক্ষমতার ভাগ দিতে পারে, এরই পরীক্ষা। “ডিফেন্স সার্ভিস” এখন বলল যে সেই পরীক্ষা অচল, অসম্ভব। কারণ এবার ২০২০ সালের নভেম্বর নির্বাচনে সুচির দল আরও বেশি আসন দখল করেছে, প্রায় ৮৩% ভোট। এতে স্বভাবতই সুচি আরও বেশি ক্ষমতার হকদার হয়ে উঠত। তাই এবারের নতুন সংসদ বসার আগেই সিভিল রাজনীতিকদের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিল। সুচি গ্রেফতার তো বটেই, দেশের প্রেসিডেন্টও ক্ষমতাচ্যুত ও বন্দি। আর্মি চীফ আরেক সাবেক আর্মি সদস্যকে প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দিয়েছেন।

    কিন্তু তবু অনেক গণতন্ত্রী বার্মায় সেনাবিরোধী মিছিল সমাবেশ দেখে খুব উতসাহিত হচ্ছেন, আশার আলো দেখছেন। তাদেরকে বার্মার ইতিহাস পড়তে বলব। ঠিক এরকম নির্বাচন অনুষ্ঠান এর আগে ১৯৬০ সালের পর থেকে দুবার ঘটেছিল। দুবারই সিভিলিয়ানেরা প্রবল্ভাবে জিতেছিল। এবং ক্ষমতা পেতে প্রবল সভা সমাবেশ করেছিল। কিন্তু নির্বিচার গুলিতে সবাইকে দমিয়ে ফেলা হয়েছিল আর জীবিতদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। এখনও রাষ্ট্র-রাজনীতি-ক্ষমতা সম্পর্কে না-বুঝ লোকেদের বেলায় ভিন্ন কিছু হবে না। “গণতন্ত্র” দিয়ে রাষ্ট্রগঠন করা যায় না। বিশেষত যেখানে “ডিফেন্স সার্ভিস” নামে সামরিক ক্লাব থাকে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “মিয়ানমার একটা সামরিক ক্লাব” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  এছাড়া  সাপ্তাহিক  “সাম্প্রতিক দেশকাল”  পত্রিকায় ১৬ ফেব্রুয়ারিতে  মিয়ানমারে কোন সামরিক ক্যু হয়নি” এই শিরোনামে আমারই আরেকটা লেখা ছাপা হয়েছিল।    পরবর্তিতে ঐ দুই লেখাকে একসাথে করে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • দেউলিয়া ব্যবসায়ীকে প্রেসিডেন্ট বানাতে হয় না

    দেউলিয়া ব্যবসায়ীকে প্রেসিডেন্ট বানাতে হয় না

    গৌতম দাস

     ১১ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০৬,  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3kW

     

    TRUMP’s MENTAL STAGE

    আপনি যখন অন্যকে শারীরিকভাবে কষ্ট দিয়ে সুখ অনুভব করবেন তখন বুঝতে হবে আপনি মানসিক অসুস্থতার পর্যায়ে প্রবেশ করে ফেলেছেন। উপরের চারটা ছবির মধ্যে কম-বেশি সেসবের ছাপ খুঁজে পাওয়া যাবে। বিশেষ করে প্রথমটায়। কারণ এই অসুস্থতার সাথে মুখভঙ্গি বদলের সম্পর্ক আছে। ট্রাম্পের মানসিক অসুস্থতা নিয়ে আমেরিকায় বিশেষত সাইকিয়াট্রিস্ট মহলে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হবার পর থেকেই বিস্তর আলোচনা হয়ে এসেছে। এমন সাইক্যাট্রিক রিপোর্ট ও এমন আলোচনার অজস্র রিপোর্ট ওয়েব সাইট পাওয়া যাবে।
    এদিকে আমেরিকার অর্থনৈতিক অবস্থা প্রবলভাবে ঢলে পড়ছে, প্রভাব হারাচ্ছে আর তা নিয়ে অজস্র রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে।  বিশেষ করে ট্রাম্পের আমলে সাথে চলতি করোনাকালে এই ভাইরাসের প্রভাব প্রতিক্রিয়া ম্যানেজমেন্ট ও মোকারিলা প্রশ্নে ট্রাম্পের আমেরিকা পরাজিত হয়েছে বলা যায়। জনসংখ্যার  ৬.৬% আক্রান্ত হয়েছে যা হয়ত তুলনায় খুব বেশি নয় কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় চার লাখ (৩.৭২ লাখ) ছুঁয়ে ফেলার দিকে যেটা ট্রাম্পের পারফরমেন্সের দশা মাপার ক্ষেত্রে এক বড় ইন্ডিকেটর।  আর ঠিক এক দিকটাকে স্টাডির মধ্যে নিয়ে একটা স্টাডি রিপোর্ট বলছে অর্থনীতিতে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীনের এক নম্বরে যাওয়ার কথা যেটা আগে বলা হয়েছিল যে এটা ২০৩৫ সালের দিকে ঘটবে সেটা এখন বলা হচ্ছে কোভিড মোকাবিলায় লড়াইয়ে ট্রাম্প আমেরিকাকে হারিয়ে পিছনে ফেলে দিবার কারণে সেটা এখন ২০২৮ সালের মধ্যে ঘটে যাবে।
    এসবেরই প্রভাবে এখন ১২.৮ মিলিয়ন (১.২৮ কোটি) বেকারের ট্রাম্পের আমেরিকায় অর্থনৈতিক সংকটের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী বা হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট্রদের প্রভাব। অর্থাৎ সাদা মানুষেরাই শ্রেষ্ট, আমেরিকা হল মূলত সাদাদের, এখানে অন্যান্য কালারের মানুষেরা এসে সাদা মানুষদের দুঃখ দুর্দশা সংকট বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই সাদাদের  শ্রেষ্ঠত্ব ‘রি-ক্লেম’ করে ফেরত নিতে হবে। যার আসল মানে হল সাদা সুপ্রিমিস্টদের চরম উগ্র বর্ণবাদী হতে হবে। চারবছর আগে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান আসলে ছিল এই সাদাবাদীদেরই রাজনৈতিক উত্থানের প্রথম বড় প্রকাশ। আর এই সাদা রাজনীতির পাবলিক ফিগার স্টিভ ব্যানন  (Stephen K. Bannon), তাঁকে ট্রাম্পের ‘হোয়াইট হাউজের চীফ স্ট্রাটেজিস্ট’ হিসাবে  নিয়োগ দেয়া ছিল ট্রাম্পের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতির সবচেয়ে স্পষ্ট প্রকাশ। কিন্তু এই রাজনীতির একটা লিগাল সমস্যা আছে। আমেরিকার কোন সিটিং প্রেসিডেন্ট সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের পক্ষে প্রচারক [preach] হলে তাঁর এর বিরুদ্ধে মামলা খাবার বা ইমপিচ হবার সম্ভাবনা আছে। তাই ট্রাম্প একটা দুরত্ব রেখে এদের সমর্থন করে থাকে। ব্যাননকেও এক পর্যায়ে উপদেষ্টা পদ থেকে খারিজ করে দেন তিনি।  কিন্তু এবার ০৬ জানুয়ারি ২০২১-তে?

    এদিকে অবশেষে জানা গেল প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট বাইডেন ও তার ক্যাম্পের সমর্থকেরা আমাদের জানাচ্ছেন, আমেরিকায় টেরোরিস্ট কারা! কথিত ট্রাম্প সমর্থক যারা ক্যাপিটোল হিলের আমেরিকান কংগ্রেসের ভিতরে প্রবেশ করে ৬ জানুয়ারি তান্ডব ভাঙচুর চালাতে ঢুকেছিল বাইডেন নিজমুখে বলছেন, তারা ‘টেরোরিস্ট’। কিন্তু এতেও পরিস্কার হয়নাই বা লুকিয়ে ফেলা হয়েছে  এঁদের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী পরিচয়ের দিক।  তবে আটই জানুয়ারির পর থেকে মিডিয়ায়  প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়ে গেছে এদের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী পরিচয়। অর্থাৎ বাইডেনের বা অনেক আমেরিকান “বাংলাদেশ এক্সপার্ট” যারা সংসদে হামলাকারিদেরকে “টেররিস্ট” বলে নামকরণ করছেন এরা আসলে হামলাকারিদের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ এই মূল পরিচয়, এই মারাত্মক রেসিজম ও ইসলামবিদ্বেষী পরিচয় – এসবই আড়াল করে রেখেছিলেন, গুরুত্ব দেন নাই। সেসবগুলো এখন প্রকাশ্যে সামনে এসে গেছে।  এদিকে  ফেসবুক ও টুইটার কর্তৃপক্ষ এখন প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে এদের সচিত্র ততপরতা, কী কী গ্রুপের সদস্য হয়ে তারা ঐদিন দলবদ্ধ হয়ে ততপর ছিল এর বিবরণ দিয়েছে। আর সেই সাথে ওসব সোশাল মিডিয়া বলছে তারা ট্রাম্পের একাউন্ট চিরদিনের মত মুছে দিয়েছে। যেখানে মূল অভিযোগ তারা জানিয়েছে ট্রাম্প ও তার এই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী সমর্থকেরা ফেসবুক ও টুইটার প্লাটফর্ম ব্যবহার করে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে মানুষ হত্যা ও ঘৃণা-হিংসা ছড়ানোর কাজে নেমে গেছিল।

    সবশেষে পরিস্থিতি এখন পুরাটাই  বাইডেনের পক্ষে, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পুরাটাই আমেরিকার সংসদের (কংগ্রেসের উভয়কক্ষের) হাতে চলে গিয়েছে। এটা ট্রাম্পের জন্য আরও বিপদজনক হয়ে উঠেছে কারণ ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকানদের বড় অংশটাই এখন কোন্টাকির সিনেটর ম্যাক-কনেলের [Mitchell McConnell ] নেতৃত্বে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এবং  তিনি তার গ্রুপ নিয়ে সম্ভবত  আগামি সোমবারে ডেমোক্রাটদের আনা ট্রাম্পকে ইমপিচমেন্টের (অনাস্থা ও অযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা) প্রস্তাব যেটা তুলতে যাচ্ছে তা সমর্থন করে বসতে পারেন।

    বিপদজনক দেউলিয়া ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পঃ
    যেকোনো ব্যবসামাত্রই তাতে উত্থান-পতন আছে, থাকবে। এটা তেমন অস্বাভাবিক কিছু নয়। এমনকি এই সূত্রে কারও ব্যবসা ফেল করাতে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কিন্তু তাই বলে দেউলিয়া হলেই ঐ ব্যবসায়ীর মানসিক রোগ বা অস্থিরতাও দেখা দিবেই তা কিন্তু নয় যদিও কারো বেলায় এটা হতেও পারে। আবার তেমন কিছু নাও হতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটা কিছু হয়েছে কিনা চেক করার দরকার আছে। দেউলিয়া [Bankrupt]  হলে ঐ ব্যবসায়ী সাথে আবার কোন মানসিক রোগগ্রস্ত হয়েছেন কি না তা নিশ্চিত হওয়া দরকার। নইলে কোন সিটিং প্রেসিডেন্ট নিজেই সংসদে হামলার জন্য দাঙ্গাবাজ রেসিস্টদের এনে উক্সানি দিতে পারে?  আমেরিকান কংগ্রেসে তা হামলাভাঙচুর পর্যন্ত ঘটাতে পারে, কিছু লোক বেঘোরে মারা পড়তে পারে!  তাই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মানসিক স্বাস্থ্য চেক করার সময় বয়ে যাচ্ছে, যদিও এই আওয়াজ আগেও উঠেছিল।
    সেই ২০১৬ সালে প্রার্থী হওয়ার আগেই, ট্রাম্পের মানসিক স্থিতি চেক করে নেয়া দরকার ছিল, সেটা আজ স্পিকারসহ আমেরিকা রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা হাড়ে হাড়ে বুঝছেন।  ট্রাম্পের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে কোন কোন অনুসন্ধানী ফ্যাক্টচেক রিপোর্ট মতে, ওয়াশিংটন পোস্ট জানাচ্ছে,  ট্রাম্প ১১ বার নিজেকে দেউলিয়া ব্যবসা কোম্পানি হিসেবে রেজিস্টার্ড হয়েছিলেন।

    কোনো প্রতিষ্ঠানের ‘দেউলিয়া’ হওয়া মানে কীঃ
    কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজেকে ‘দেউলিয়া’ ঘোষণা করিয়ে নেয়া মানে কী? আমেরিকান বিজনেস ল’ অনুসারে কোম্পানির মালিকেরা নিজেরাই নিজ কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষণা করাতে পারেন, তবে আদালতের মাধ্যমে। সাধারণত এটা কোম্পানি মালিক ও ম্যানেজমেন্টের ঘোষিত সিদ্ধান্ত হিসেবে ঘটে থাকে। অনেকের মনে হতে পারে, মালিক নিজেই কেন ঘোষণা করবেন, নিজেকে কি কেউ পাগল বলেন বা বলবেন?
    হ্যাঁ বলবেন, ও বলে থাকতে পারেন। কারণ, নিজ কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষণা করিয়ে নেয়ার জন্য আদালতে ঐ কোম্পানিকেই আবেদন করতে হয় আর তাতে আদালতের অনুমোদন পেতে হয়। কিন্তু কখন ও কেন? যখন সাধারণত দেখা যায় কোনো কোম্পানির আয় ও অর্জিত সম্পদের মোট মূল্যের চেয়ে ওই কোম্পানিকেই পরিশোধ করতে হবে, সম্ভাব্য এমন দায়-দেনার পরিমাণ ছাড়িয়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে।
    কিন্তু এমন পরিস্থিতি কেন হয় বা হতে পারে? সাধারণত দেখা যায় কোম্পানিটা ধরা যাক সেটা ওষুধের মত পণ্য উৎপাদনকারী এবং বাজারে খুবই সুনাম-ওয়ালা কোম্পানি। কিন্তু ওর যেকোন একটা পপুলার ওষুধ-পণ্যের গুণে ত্রুটি ধরা পড়েছে যা উৎপাদনকালীন বা মুল ফর্মুলাতেই মারাত্মক ত্রুটিজনিত এক ভুল। আর তাতে হয়ত ঐ ওষুধ ব্যবহার করে কয়েক লাখ লোক অসুস্থ হয়ে পড়েছে বা অঙ্গ হারিয়েছে অথবা এদের মধ্যে প্রায় শ’খানেক লোক মারাও গেছেন। এমন হলে ভুক্তভোগীরা আদালতে মামলা করা শুরু করেছে হয়ত। হয়ত দু-একটা মামলার অবস্থা থেকে বোঝাও যাচ্ছে, এসব মামলায় কোম্পানির বিরুদ্ধে আদালতে শাস্তির রায় হয়েই যাবে আর শাস্তির পরিমাণও অনেক বড়, হয়ত মাথাপিছু কয়েক কোটি টাকার উপরে দিতে হবে একেকজন ভুক্তভোগীকে।
    এই পরিস্থিতিতে তখন ঐ কোম্পানি নিজ ক্ষতি ও দায় কমাতে বা বেঁচে যেতে আদালতে নিজ উদ্যোগেই আবেদন করে যে, তার কোম্পানিকে দেউলিয়া ঘোষণা করে দেয়া হোক। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত সব ভুক্তভোগীর সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ দিতে গেলে এর দায় কোম্পানি অ্যাসেট বা মোট সম্পদের চেয়ে বেশি। এখন এতে আদালত ঠিক কী করবেন? আদালত এই আবেদনে সন্তুষ্টি থাকলে এবার আদালত কোনো এসেট নির্ণয় ও মূল্যায়ন কোম্পানিকে ঐ ওষুধ কোম্পানির খরচে নিয়োগ দিয়ে ঐ দাবির যথার্থতা যাচাই করবেন। যদি ওই নির্ণয় কোম্পানির রিপোর্টও মালিকদের আবেদনের সাথে মিলে যায় তখন সাধারণত আদালত রায় দেন যে, পণ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানির যতটুকু সম্পদ বর্তমানে আছে সেই অনুপাতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের অর্থ কম করে দিয়ে যেন সব দায় মিটিয়ে দেইয়া হয়। অর্থাৎ ক্ষতিপূরণ দানের ব্যাপারটা অসীম না থাকতে দিয়ে সম্পদ যা আছে সে অনুসারি সীমিত বা আনুপাতিক করে দেয়া হয় এতে। এরপর আদালত ঐ ক্ষতিপূরণ ভাগ করে দেয়া সাপেক্ষে ঐ ওষুধ কোম্পানিকে দেউলিয়া  ও দায় পরিশোধের পরে বিলুপ্ত ঘোষণা করে দিতে পারে। তাই সারকথায় কোন কোম্পানি তার বিভিন্ন ধরনের পাওনাদারদের দাবি যদি মেটাতে ব্যর্থ হয়, সম্পদের চেয়ে দায়ের পরিমাণ যদি বেশি হয় তাহলে সে নিজেকে আদালতের কাছে দেউলিয়া প্রমাণ করিয়ে আদালতের মুখ দিয়ে নিজেকে দেউলিয়া ঘোষণা করিয়ে নেয়, যাতে পাওনাদার থেকে বেঁচে যাওয়া যায়।
    ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত হাউজিং ডেভেলপমেন্টের ব্যবসায়ী। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় ২০১৬ সালের এক ফ্যাক্টচেক রিপোর্ট বলছে, তিনি কমপক্ষে ১১ বার এমন দেউলিয়া ঘোষণা করিয়েছেন নিজেকে।
    এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, কোনো কোম্পানির মূল মালিকের বহু স্বপ্নের বাস্তবতা হয়ে থাকে তাঁর নিজের ঐ কোম্পানি। ফলে কোম্পানিকে বাজারে দেউলিয়া হয়ে যেতে দেখলে সেটা কারো কারো বেলায় এক মানসিক আঘাত হয়ে হাজির হতেও পারে। একারণে দেখা যায়, মালিক আর নুন্যতম স্বাভাবিক মানুষ নাই, মানসিক বিকারগ্রস্থ ব্যক্তি হয়ে গেছেন। এতে হয়ত দেখা যায় সামাজিক সাধারণ মূল্যবোধ দ্বারা, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বা সামাজিক দায়বোধ বা জবাবদিহিতা ইতাদির প্রতি আর তাঁর কোন অনুভূতিই কাজ করে না। আসলে সম্ভাব্য এমনই মানসিক অসুস্থতায় পৌঁছেছেন ট্রাম্প। এদের মনোবিকার হয় এমন যে এখন তো তার কোম্পানিটাই আর নাই। কাজেই তিনি আর এখন সমাজের মুল্যবোধ মেনে কী করবেন?  ফলে সবকিছুই মিথ্যা এমন হতাশা ও নৈরাশ্যের জগতে চলে যান তিনি। এর ফলে ঐ অবস্থায় নিজেকে সুস্থভাবে পরিচালিত করার মত অবস্থায় ঐ মালিক আর থাকেন না। এই  অস্বাভাবিকতা যেকোনো মাত্রার মানসিক স্থিতিশীলতা, অস্থিরতা হয়ে হাজির হতে পারে।
    এখন এমন অবস্থায় আরও বাড়তি দিকটা হল,  মানসিক-অসুস্থ মানুষ নিজের সমাজ, পরিবারে থাকলে সেটা এক জিনিস; কিন্তু যদি রাষ্ট্রীয়-সরকারি পদ, তিনি প্রধান নির্বাহী, প্রেসিডেন্ট হয়ে বসেন? সেটা অবশ্যই মারাত্মক। কারণ সেটা তো সারা দেশের মানুষের প্রতিদিনের স্বার্থের ব্যাপার। তাই নির্বাহী পদে নমিনেশন পেপার পেশ করার আগেই শর্ত হিসেবে তার মানসিক স্থিরতা (মেডিক্যাল স্টান্ডার্ড মতে) পরীক্ষা করে নেয়ার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রশাসন পরিচালনা মানে, সম্ভবত শত কোটি নাগরিক ভাগ্য নিয়ে যাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একজন দেউলিয়া ব্যবসায়ীর মানসিক অস্থিরতার রিস্ক ঐ দেশের জনগণ নিতে পারে না।
    ঠিক এই অবস্থাটা আজ আমেরিকান পাবলিক অনুধাবন করছে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে। কিন্তু ঠিক কী হয়েছিল গত ৬ জানুয়ারি?

    WASHINGTON, DC – JANUARY 06: Thousands of Donald Trump supporters storm the United States Capitol building following a “Stop the Steal” rally on January 06, 2021 in Washington, DC. The protesters stormed the historic building, breaking windows and clashing with police. Trump supporters had gathered in the nation’s capital today to protest the ratification of President-elect Joe Biden’s Electoral College victory over President Trump in the 2020 election. (Photo by Spencer Platt/Getty Images)

    কী ছিল গত ৬ জানুয়ারি?
    আমেরিকার কনস্টিটিউশনের বহু কিছু দু’রকম মানে হয়ে যেতে পারে এমন বাক্য যতটা সম্ভব এড়িয়ে গিয়ে রচনা করার উপর জোর দিয়ে রচিত হয়েছে। যেমন নির্বাচন কবে হবে, সেটাও বলা থাকে ওমুক বছরের ওমুক মাসের প্রথম মঙ্গলবারে – এভাবে। অর্থাৎ সব কিছুই আগাম ও ফিক্সড। রাষ্ট্রের কোন নির্বাহির বিবেচনা মতে নির্বাচনের দিন ঠিক করার সুযোগ রাখাই হয় নাই।  সবার বিবেচনাবোধ এক বা সমান হয়না; মানুষে মানুষের মধ্যে এনিয়ে ফারাক হতে পারে; তাই কথা এমনভাবে লেখা হয়েছে যাতে তা  হওয়ার সুযোগই রাখা হয়নি। এভাবেই গত বছর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ৩ নভেম্বর আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এতে  আবার নির্বাচনের পরে কত দিনের মধ্যে রাজ্যগুলোর ফলাফল তারা কে কোথায় পৌঁছে দেবেন তাও বলে রাখা আছে। এই পদ্ধতিতে এবং আনুষ্ঠনিকতার দিক থেকে এক গুরুত্বের দিন হল ৬ জানুয়ারি। কারণ, ঐদিন আমেরিকার দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কংগ্রেস বা সংসদের উভয়কক্ষ এক যৌথ অধিবেশনে মিলিত হবে। আমেরিকায় আমাদের সংসদের মত আছে ‘প্রতিনিধি পরিষদ’ বা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং আরেক দ্বিতীয় কক্ষ আছে ‘সিনেট’। ঐদিন এরা উভয়েই ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল হিল জেলায় অবস্থিত প্রতিনিধি পরিষদের নির্ধারিত হলঘরে একসাথে অধিবেশনে বসবেন। আর ঐ যৌথ সভায় সভাপতিত্ব করবেন রাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তার পাশে বসবেন হাউজ স্পিকার। এই হিসাব মতে,  ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ৬ জানুয়ারি সভাপতির আসন নিয়েছিলেন। আর সাথে পাশে বসেছিলেন পরপর চারবারের ও এবারেরও স্পিকার (ডেমোক্র্যাট) ন্যান্সি পেলোসি [Nancy Pelosi ]।
    ওদিকে নির্বাচনের ফলাফল কিভাবে চূড়ান্ত হবে কে করবেন, আর তাতে বিতর্ক বা আপত্তি থাকলে তা কী করে নিষ্পত্তি হবে এরও সবই আগাম বলে দেয়া আছে। প্রত্যেক রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের কাজ ও পরিচালনা সেখানেই শেষ করা হয়। কারণ কোনো কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন বা অফিস আমেরিকায় রাখা হয়নি। তাই ৫০ রাজ্যের আমেরিকার প্রত্যেক রাজ্যে একজন সেক্রেটারি থাকেন যিনি ঐ স্টেটের (সরকারের নয়) ‘সেক্রেটারি অব স্টেট’; আর যার প্রধান কাজ হল তিনি প্রধান নির্বাচন অফিশিয়াল এবং এটা নির্বাচিত একটা পদ; তিনিই ভোটের ফলাফল চূড়ান্ত করেন, কারও আপত্তি থাকলে তাও নিষ্পত্তি করেন। আপত্তিকারী এতে সন্তুষ্ট না হলে তিনি স্থানীয় জেলা জজ থেকে শুরু করে ফেডারেল সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যেতে পারেন। আর এরপরে সেই চুড়ান্ত ফলাফল তিনি ঐ যৌথ অধিবেশন কক্ষের সভাপতির (রাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট) অফিসে পৌছানোর ব্যবস্থা করেন।

    ট্রাম্প নভেম্বরের নির্বাচনের আগে থেকে ‘বড় পাগলামোতেই’ আছেন। একজন প্রেসিডেন্টের জন্য এটা কোন ভাল পরিচায়ক নয় অবশ্যই। তিনি নির্বাচনের ফলাফল নিজের বিপক্ষে হলে মেনে নেবেন না, ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন না, ইত্যাদি নানাকথা আউড়ে চলেছিলেন নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকেই। এদিকে বাস্তবে ৩ নভেম্বরের দু’দিন পর থেকেই পরিষ্কার হতে থাকে নির্বাচনে ট্রাম্প হেরে যাচ্ছেন। আর ততই ট্রাম্পের পালটা পরিকল্পনার কথাগুলো কানাঘুষা প্রচার হতে থাকে। সবখানেই ট্রাম্প বা তার পক্ষের এজেন্টদের কমন অভিযোগ ছিল – তাঁকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে, কারচুপি হয়েছে। এরই একপর্যায়ে দেখা যায় এসব ফলাফল বিতর্কগুলো সাথে কোন প্রমাণ না দিয়েই তাঁরা কেবল অভিযোগ মাত্র করে গিয়েছেন। তাই সে মামলাগুলো জেলা জজের আদালতেই শেষ হয়ে যায়, মামলা ডিসমিস। ফলে প্রমাণ অভাবে কোন অভিযোগ কখনোই কোন জেলা জজের আদালতে উপরে যেতে পারেনি। কারণ সবখানেই ট্রাম্পের অভিযোগ ছিল – তাকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে, কারচুপি হয়েছে। অথচ মূলকথা, সব আদালতেই যা হাজির ছিল না তা হল, সাথে পেশ করা তথ্য প্রমাণ। অন্তত মামলা শুরু করার মত কিছু ন্যূনতম প্রমাণও ছিল না। ফলে  প্রায় সব আদালতই ন্যূনতম প্রমাণ দেখাতে না পারার কারণে মামলা ডিসমিস করে দিয়েছে। শেষে এক পর্যায়ে ট্রাম্প নিজেই মিডিয়াতে নিজেই স্বীকার করে নিতে বাধ্য হন যে, সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত তার মামলাগুলো দায়ের করা বা পৌঁছানোর মত অবস্থায় তিনি নাই বা মেরিট এগুলোর নেই। কিন্তু এরপরেও সবসময় তিনি শেষ কথা হিসেবে মুখস্তের মত বলে চলেন যে, তাঁকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে, কারচুপি হয়েছে।

    তাই এসবের বিপরীতে, ট্রাম্পের এক বড় পরিকল্পনার দিন ছিল গত ৬ জানুয়ারি। কিন্তু ৬ জানুয়ারি আমেরিকার নির্বাচনি ফলাফলের দিক থেকে অবশ্যই একটি আনুষ্ঠানিকতার পর্ব কেবল। বিশেষ করে, আমেরিকায় কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন রাখা হয়নি বলে এর বিকল্প কিছু বলে যেন রাজ্য পর্যায়ে চূড়ান্ত ফলাফলগুলোর যোগফল চূড়ান্তভাবে কে ঘোষণা করবেন এরই এক আনুষ্ঠানিকতার দিন কংগ্রেসে ঐ যৌথ অধিবেশন এটা। তাই পরিষ্কার করেই কনষ্টিটিউশনে  বলা আছে যে, যৌথসভার সভাপতি ভাইস প্রেসিডেন্টের ঐদিনের কাজ কী কী। মূলত তা দুটো। রাজ্যের পাঠানো ফলাফলের বাক্স যা তার অফিসে পাঠানো হয়েছিল তা উন্মোচন করা এবং তা গণনার জন্য নির্ধারিত স্টাফদের নির্দেশ দেয়া; আর তা হবে যৌথসভার (সংসদ ও সিনেটের) সদস্যদের সম্মুখে। সেখানে ভোট গণনার কাজ শেষ হলে উপস্থিত যৌথ সদস্যদের প্রস্তাব-ভোটে চূড়ান্ত ফলাফল যা সেখানে পাওয়া যাবে তা ঘোষণা করা হবে।

    ট্রাম্পের কনষ্টিটিউশন পাঠঃ
    এখন ট্রাম্পের বা তার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য উপদেষ্টাদের দেখা যায়, উটকো কিছু ব্যাখ্যা তারা হাজির করে গেছে। আর দেউলিয়া ব্যবসায়ী মনের ট্রাম্প নিজে বুদ্ধি বলে তাঁর উপদেষ্টাদের এসব আজগুবি পাঠ বিশ্বাস করেছিলেন।  যেমন ট্রাম্প তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে সুনির্দিষ্ট কিছু করণীয় ও নির্দেশ দিয়েছেন, সেটা তিনি প্রকাশ্যেও বলেছেন।
    এখন কথা হল, ট্রাম্প কি যা তার খুশি তা করতে পেন্সকে নির্দেশ দিতে পারেন? নাকি যা যা করার এখতিয়ার পেন্সকে কনস্টিটিউশন দিয়েছে কেবল সেগুলোর মধ্যে থাকা সাপেক্ষে নির্দেশই দিতে পারেন? এখানে ট্রাম্পের ধারণা তিনি যেকোন কিছু নির্দেশ দিতে পারেন। অথচ তা তিনি পারেনই না। তবু তিনি পেন্সকে (নির্দেশ) বলেছিলেন, তিনি যেন যোগফল পাওয়ার পর ঘোষণা করেন, এই ফলাফল তিনি মানছেন না বা অনুমোদন করছেন না। কিন্তু কার্যত সময়ে দেখা গেল মাইক পেন্স ট্রাম্পের নির্দেশ অমান্য করে বসেছেন। অধিবেশন শুরুর আগে তিনি এক বিবৃতি পাঠ করেন।

    “It is my considered judgment that my oath to support and defend the Constitution constrains me from claiming unilateral authority to determine which electoral votes should be counted and which should not,” Pence said in a letter to Congress.  বাংলা করে বললে, “আমার বিচার বিবেচনায়, আমার শপথের সময় দেয়া কনষ্টিটিউশন রক্ষা ও সমুন্নত রাখার প্রতিশ্রুতি অনুসারে কোন ইলেকটোরাল কাউন্ট হবে কোনটা হবে না এই সিদ্ধান্ত নিবার একক কোন কর্তৃত্ব আমাকে দেয় নাই”।

    অর্থাৎ তিনি ট্রাম্পের নির্দেশ মেনে কাজ করতে পারছেন না, এটাই তিনি জানিয়ে দেন।  আর এখান থেকে শুরু হয় ট্রাম্প-পেন্স এর ডিপারেচার।  অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে, মানসিক অসুস্থতা কেবল ট্রাম্পের, এখনো তার ভাইস প্রেসিডেন্টকে এটা তেমন স্পর্শ করেনি। তাই যৌথ অধিবেশন শুরুর মুহূর্তে পেন্স এক লিখিত ঘোষণায় জানান, তিনি প্রেসিডেন্টের অনুরোধ রাখতে পারছেন না। কেবল কনস্টিটিউশন যা তাকে করার এখতিয়ার দিয়েছে এর ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প এবার হতাশ হয়ে এক টুইট করেছিলেন, “পেন্স সাহসী নন। তার সাহসের অভাব আছে, তাই তিনি পারলেন না” [“didn’t have the courage to do what should have been done.”]। অথচ ফলাফল নিয়ে আপত্তি তুলবার জায়গা তো ঐ অধিবেশনই নয়। সেটার জায়গা যার যার রাজ্য নির্বাচন অফিসে বা আদালতে।
    ইতোমধ্যে ঐ অধিবেশকে নিয়ে অনেক নাটকীয়তা করা হয়। সবশেষে ওই যৌথসভা থেকে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করে বলা হয়, বাইডেন বিজয়ী বলে তারা ‘সার্টিফাই’ করছেন [Biden’s election victory certified after chaos at US Capitol leaves four people dead]। তবে এর আগে অনেক নাটকীয়তা হয়েছে। ট্রাম্প তার সমর্থকদের দিয়ে দাঙ্গা হাঙ্গামার ব্যবস্থা করেছিলেন সংসদের ভেতরে মূল হলসহ বিভিন্ন কক্ষে প্রবেশ করে ভাঙচুর করা হয়েছিল। (যদিও পরে পুলিশ জানাচ্ছে যে তারা হামলাকারিদের দখলে থাকা অস্ত্র ও বোমার এক বিরাট মজুদ আটক করেছে। ) অবশ্য এর আগেই পুলিশ ও ন্যাশনাল গার্ডরা সব নির্বাচিত সদস্যকে প্রত্যেকের মুখে একেবারে গ্যাস মাস্ক পরিয়ে সংসদ বিল্ডিংয়ের ভেতরেই গোপন কুঠিতে তাদের নিরাপদ গোপন স্থানে রেখে এসেছিলেন। এদের মধ্যে ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ট্রাম্প অসুস্থ বা তেমন কিছু হলেই তঁকেই  প্রেসিডেন্ট পদে বসতে হতে পারে, তাই প্রেসিডেন্টের মাপের এই নিরাপত্তা অবস্থা। এছাড়া ঐ সংসদকেই কার্যত আমেরিকান রাষ্ট্রের অন্যতম বাস্তব রাষ্ট্ররূপ মনে করা হয়। তাই মূলত পুলিশের আধিপত্যেই ওই দিনটা দাঙ্গাহাঙ্গামাকারিদেরসহ সংসদে সবার কেটেছে। পুলিশ আধিপত্য করে গেছে দাঙ্গাবাজদের পরাস্ত ও নিয়ন্ত্রণ করেছে।

    তবে মিডিয়াসহ ট্রাম্পের মধ্যে যে ধারণাটা কাজ করতে দেখা গেছে তা হল,  যেন ঐ যৌথ অধিবেশন চাইলেই তাঁদের ভোটাভুটিতেই বা অধিবেশনের সভাপতি পেন্স চাইলেই যাখুশি ফলাফল যেমন ইচ্ছা ঘোষণা করতে পারেন। এরা একটা এমন আশা নিয়ে বসে থেকেছেন, রিপোর্ট করেছেন। কিন্তু বটমঅব দা  ফ্যাক্টস হল, একটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পাবলিক সেখানে সরাসরি ভোট দেয়ার পর সেই ফলাফলের বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু ঘোষণা করার ক্ষমতা কি পরে ঐ যৌথ অধিবেশনের কারো থাকতে পারে? কনস্টিটিউশন কি এমন এখতিয়ার পেন্স বা ওই হাউজকে চাইলেও দিতে পারে? এর সোজা জবাব হল, দুনিয়ার কোন কনষ্টিটিউশনই এটা পারেই না। এমনকি আমেরিকান কনস্টিটিউশন না পড়েই বলা যায়, এটা তাঁদের কনস্টিটিউশনেও থাকতে পারে না। কারণ সে ক্ষেত্রে এর অর্থ হবে জনগণের ম্যান্ডেটের বিরোধিতা; ওই ম্যান্ডেটকে উল্টে দিতে পারে কোনো ব্যক্তি বা সমষ্টিকে এমন এখতিয়ার কনস্টিটিউশন দিতেই পারে না।  পাবলিকের দেয়া ভোট-ম্যান্ডেট এটা সুপ্রীম নাকি ঐ যৌথ অধিবেশন বা ওর সদস্যরা? অবশ্যই পাবলিকের ম্যান্ডেটই চুড়ান্ত। কারণ পাবলিকের ভোটের এই ম্যান্ডেট সুপ্রিম, এর ওপর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে। পাবলিক ম্যান্ডেটকে উলটে দেয়া যায়, কারেক্ট করা যায় এমন বিন্ধুমাত্র ক্ষমতা ঐ যৌথ অধিবেশনকে বা কাউকেই দুনিয়ার কোন কনষ্টিটিউশন দিতেই পারে না। পাবলিক ম্যান্ডেটকে উলটে দিবার ক্ষমতা হিসাবে মাইক পেন্স কেউ না? উনি নাথিং! তিনি কেউ নন, তিনি এমন এক্তিয়ার বিহীনও।

    এখন আবার ফিরেএকটা সামআপ হিসাবে বলা যায়, আসলে আমেরিকার এই সমস্যাটা কি ব্যক্তি- ট্রাম্পের মানসিক অসুস্থতা-জাত? না তা অবশ্যই নয়। সমস্যাটা মূলত রাজনৈতিক। অর্থাৎ পলিটিকো-অর্থনৈতিক। আর সেটা জাগিয়ে তুলেছে চীনের অর্থনৈতিক  উত্থান, এই অবজেকটিভ ফেনোমেনা। চীন নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক  হবু নেতা হতে চলেছে, আমেরিকাকে সরিয়ে। ফলে এর আঘাতে আমেরিকান সমাজ-রাজনীতি টালমাটাল হয়ে যাচ্ছে। ঠান্ডামাথায় এর প্রতি ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে আমেরিকার রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেরাই এলোমেলো বিভক্ত হয়ে পড়ছে মূলত ভুল অনুমান, ভুল পাঠ এর কারণে। তবে অর্থনৈতিক সঙ্কট সবসময়ই এরকম হাজারো রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরিও করে থাকে। একমাত্র পোক্ত নেতৃত্ব এটা মোকাবিলা করতে পারে। কারণ, যা হবেই তাকে যতটা কমক্ষতিতে পারে এভাবে স্বাগত জানিয়ে এই রূপান্তরকে কম অস্থিরতায় পার করে দিতে পারে – এটাই হতে হবে তাঁদের মূলসুত্র।

    ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টঃ
    এখন আগামি সোমবার থেকে নতুন ইস্যু ট্রাম্পের ইমপিচমেন্ট। ডেমোক্রাটেরা এই প্রস্তাব তুলতে যাচ্ছে।  অনেকে আশা করছেন এখানে বিভক্ত রিপাবলিকানদের অনেকে তাকে সাপোর্ট করবে। এটা কিছু একটা ফলাফল আসবে হয়ত তা খুব তাতপর্যপুর্ণ কিছু নয় কারণ আর মাত্র নয় দিন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট আছেন।  তাহলে এই ইমপিচমেনট কেন? সেটার আসল কারণ ট্রাম্পকে চাপে রাখা যাতে তিনি “ইরানের উপর হামলার নির্দেশ” জাতীয় কিছু মানসিক ভারসাম্যহীন কাজ না করে বসেন তা থেকে বিরত বা চাপে রাখতে। যেমন স্পিকার ন্যান্সি ইতোমধ্যে আমেরিকান আর্মির টপ কয়েকজন জেনারেলের সাথে কথা বলে তার উদ্বেগ জানিয়েছেন, মতবিনিময় করেছেন এসব নিয়ে।

    তাহলে দিনশেষে মানে আগামিতে কী হতে যাচ্ছে?  এককথায় বললে, চীনের উত্থানের চাপের মুখে আমেরিকার নিজেকে রক্ষার সক্ষমতা গত ৬ জানুয়ারির ঘটনায় বেশ কয়েকধাপ নিচে নামিয়ে দিবে। এর মূল কারণ ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়ে গেল  যে আসন্ন ‘আমেরিকান সঙ্কট” মোকাবলায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব সকলের মধ্যে সংকটটা ঠিক কী এনিয়ে নুন্যতম ঐক্যমত নাই। তাঁদের মারাত্মকভাবে বিভক্তিরই প্রকাশ গত কয়েকদিনের ঘটনাবলী। এম্নকি রিপাবলিকান দলই পুরা বিভক্ত।  সংকটটা ঠিক কী এনিয়ে নুন্যতম ঐক্যমত থাকত তাহলে ট্রাম্পের জাতিবাদ যার আরেক নাম সাদা সুপ্রিমিস্ট – এই চিন্তা মাইনর কিছু হয়ে থাকত।  এটা হল সেই লক্ষণ যে আমেরিকার বিভক্তি সহসাই মিটছে না।  অর্থাৎ আমেরিকা অপ্রয়োজনীয়ভাবে আরো দুর্বলই হচ্ছে। তবে তা হয়ত তাতক্ষণিক নয়।, কিন্তু ধীরে ধীরে। যদিও বাইডেনের প্রথম বছরের মধ্যেই আমেরিকানেরা ট্রাম্পের বিরোধী হয়ে যাবে। কারণ তারা বুঝতে শুরু করবে ট্রাম্প তাঁদের কী ক্ষতি করে দিয়ে গেছে। যদিও সাদা সুপ্রিমিস্ট ধারা ভাল রকমই থেকে যাবে! ঠিক যেমন ট্রাম্প তো আগেই জানতেন তিনি ছয় তারিখেই হেরে যাবেন সব শেষ হয়ে যাবে। তবু তিনি এই নষ্টামিটা করলেন কেন?  কারণ সাদা সুপ্রিমিস্টরা মনে করে রিপাবলিকান পার্টির উপর তারা পুরা কব্জা কাজ (এখন সব রিপাবলিকান সাদা সুপ্রিমিস্ট ধারার নয়) করতে হলে, তাদেরটাই প্রধান ধারা হিসাবে ছেয়ে বসতে চাইলে সেকাজের পক্ষে বিনিয়োগ এটা।  যদিও যৌথ কংগ্রেস অধিবেশনে দাঙ্গা হাঙ্গামাটা একটা নৈরাজ্যমূলক কাজ হিসাবেই দেশে-বিদেশে দেখা শুরু হয়ে গেছে। ফলে তাঁদের উদ্দেশ্য একেবারেই কাজ করবে না। উলটা তারাই সমাজে কোনঠাসা হয়ে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি! বিশেষত ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্র ট্রাম্প ও সাদা সুপ্রিমিস্টদের নিন্দা করেছে, এমনকী ভারতের মোদীও দিনশেষ দেখে এই নিন্দাকারিদের দলে!

    নির্বোধের খুশি!

    ভারতীয় পতাকা দোলানোর গর্বঃ
    সাদা সুপ্রিমিস্ট যারা হয় তারা তো নয়ই কিন্তু তাঁদের নেতা-পরিচালকেরা সুস্থ মাথায় চিন্তা করতে পারে এর অভাব সবসময় লক্ষ্য করা যায়। অন্য ভাষায় বললে নুন্যতম যুক্তিবুদ্ধির সামঞ্জস্যপুর্ণ “বয়ান-ভাষ্য” কখনই তাঁদের থাকে না, দাঁড় করাতে পারে না। অথচ বয়ান ছাড়া কেউ রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে হাজির হতে পারবে না। যেমন নিউজিল্যান্ডের ৫০ জনের মত মুসলমান হত্যার এক সাদা সুপ্রিমিস্ট ব্রেনটন (Brenton Harrison Tarrant) এর কান্ডটা আমাদের নিশ্চয় মনে আছে। ওর বয়ান হল, নিউজিল্যান্ডে মুসলমানেরা বাইরের লোক, তারা সাদা নয় ইত্যাদি, অতএব হত্যা……। আচ্ছা সে নিজেও কী নিউজিল্যান্ডে “বাইরের লোক” নয়।  কোন সাদা চামড়ার কেউ নিউজ্যল্যান্ডের আদি লোক নয়।  তাঁদের পুর্বপুরুষেরা সকলেই ইউরোপের আর মূলত বৃটেনের।  তাও একেবারেই গরীব, সহায় সম্পদহীন খেটে খাওয়া, জেল খাটা অংশ। কারণ মূল মিডল ও লোয়ার মিডল ক্লাস অংশটা আগেই আমেরিকা চলে গেছিল।  তাহলে এই বিদেশি, বাইরের লোক, দখলদার এসব শব্দের ভিত্তি কৈ?

    ক্যাপিটোল হিলে ৬ জানুয়ারির আয়োজকই ছিল সাদা সুপ্রিমিস্টরা। অথচ সেখানে গিয়ে হাজির হয়েছে এক ভারতীয় অরিজিন বাসিন্দা।কলকাতার আনন্দবাজারের অনুসন্ধানি দাবি  যে তিনি ভিনসেন্ট জেভিয়ার। লিখেছে, “কট্টর ট্রাম্প সমর্থক হিসেবে পরিচিত ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা বছর চুয়ান্নর ভিনসেন্ট যে তাঁর কৃতকর্মে অনুতপ্ত নন, সেটাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি”।  এছাড়াও লিখেছে, “কাল সেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত  ভিনসেন্ট জেভিয়ার নিজেই সংবাদমাধ্যমকে বললেন, ‘‘ভারতকে অসম্মান করাটা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। আমি আসলে আমেরিকাতেও যে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য আছে, সেটা বোঝাতে চেয়েছিলাম। দেখাতে চেয়েছিলাম, রিপাবলিকান পার্টি একেবারেই বর্ণবিদ্বেষী নয়।’’
    এসব কথা বলে না ঐ কথিত ভিনসেন্ট না আনন্দবাজার নিজেদের মনভাব অভিপ্রায় ঢাকতে পেরেছে। ৬ জানুয়ারি নিয়ে  আনন্দবাজার দুটা রিপোর্ট করেছে। কিন্তু দুটাতেই সহানুভুতির জায়গায় দাঁড়িয়ে লেখা।  কেন, কীসে এই সহানুভুতি?  ভারতের মিডিয়া ও রাজনীতিবিদের এটিচুড হল, ট্রাম্পই তাঁদের ফেবারেট লোক ছিল, বাইডেন নয়। কারণ হিউম্যান রাইট ইস্যুতে বাইডেন ভারতকে ছেড়াবেড়া করে দিবেন। তাঁদের মোদীসহ হিন্দুত্ববাদ দুনিয়াজুড়েই নিন্দার বিষয় হয়ে উঠবে তাতে। কাজেই ট্রাম্পই তাঁদের পছন্দের নেতা যে ভারতের মুসলমানকে পিটিয়ে মারলে বা কাশ্মীরে আগুন ছড়িয়ে দিলেও মোদীকে কিছুই বলবেন না। অতএব ৬ জানুয়ারি যদি লাইগা যায়, চাইকি ট্রাম্প যদি আবার নিজেকে প্রেসিডেন্ট বলে আবার ফিরে আসতে পারেন তাহলে তো লাভই লাভ! এই জায়গায় এসে কথিত ভিনসেন্ট আর আনন্দবাজার দুজনের অবস্থান এক জায়গায়। কিন্তু সেজন্য ভারতীয় পতাকা বইবার দরকার কী?
    এইখানে এসে ভিনসেন্ট ধরা খেয়ে গিয়েছেন। তিনি মূলত হিন্দুত্ববাদের লোক এবং জাতিবাদী তাই আমেরিকান ভোটার হয়েও ভারতীয় পতাকা ছাড়া হাটেন না।  তিনি বাদামি, হোয়াইট নন।  তাই তিনিই কিন্তু সাদা সুপ্রিমিস্টদের একদম আসল টার্গেট। কিন্তু মোদী-ট্রাম্প প্রেম তাঁকে  ঐ জমায়েতে নিয়ে গিয়েছে। আবার সাদা সুপ্রিমিস্টদের জমায়েতে গিয়ে তিনি সার্টিফিকেট দিচ্ছেন, সাদা সুপ্রিমিস্টদের ভিতরে বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য খুজেছেন! কি তামসা!তারা বর্ণবাদী নয় বলে সাফাই দিয়েছেন।  মানুষের আসলেই বড় অদ্ভুত প্রাণী!  আর ওদিকে আনন্দবাজার আরো তামাশার। তাঁদের হেডলাইন হল, “তাণ্ডবে তেরঙ্গা উড়িয়েও অবিচল“। মানে হোক না “তান্ডবে” কিন্তু তেরঙ্গা ভারতীয় পতাকা তো তুলেছে! তাই এটা নাকি গৌরবের!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৯ জানুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “আগে প্রেসিডেন্টের মানসিক স্বাস্থ্য চেক করুন” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]