Tag: মোদি

  • আসলে সিপিএম এর সাথে মমতাও হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে

    আসলে সিপিএম এর সাথে মমতাও হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে
    গৌতম দাস
    ০৩ ডিসেম্বর ২০২৪   দুপুর ১২ঃ ৩৩
    https://wp.me/p1sCvy-5UX

     

    বাংলাদেশে জাতিসংঘের শান্তি সেনা পাঠানো হোক, চান মমতা

     

    গতকাল ভারতের আগরতলায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার অফিসে হামলা হয়েছে। যার সোহা বাংলাটা হল, মোদি-জয়শঙ্কর এর গ্রাম্য মোড়লের মত চিন্তায় এই হামলা করিয়েছেন, হতে দিয়েছেন। আবার ঘটনা ঘটানোর পরে মাফ চাইতেছেন।
    মোদি-জয়শঙ্কর কে গ্রাম্য মোড়লের বোকা-চিন্তা বললাম এজন্য যে যেন এরা ধরে নিয়েছেন যে ঢাকার মানুষেরা ভারতীয় হাইকমিশনের অফিস কোথায় চিনে না, ঢাকায় প্রণয় ভার্মা কোন বাসাতে থাকেন তা ঢাকার মানুষেরা জানে না! অথবা মোদি-জয়শঙ্কর এর মত এসব স্থানগুলোতে একটা হামলা ঘটিয়ে দিয়ে এরপর আমাদের পররাষ্ট্র  উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বোধহয় কম নাটুকেপনা করতে পারবেন!!!
    একমাত্র মোদি-জয়শঙ্কর এর মত মফস্বলি চিন্তার লোকেরাই এমন ভাবতে পারে।  বিশেষ করে মফস্বলি রাজনীতিতে বিজেপি-আরএসএস এর ট্রেনিং পাওয়া মোদি এমনটা ভাবতে পারেন। কিন্তু জয়শঙ্কর??? উনি তো পেশাদার কূটনীতিক ক্যাডার ছিলেন! কাজেই উনার তো জেনেভা কনভেনশনের আইন-নিয়মকানুন না জানার কোন সুযোগই নাই! এর অর্থ তিনিও নিজ পদমর্যাদা ভুলে মোদির পা-চাটার জন্য মোদির মফস্বলি খায়েশ পূরণে সম্মতি দিয়েছেন???
    আগরতলায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার অফিস মানে জেনেভা কনভেনশন অনুসারে ওটা বাংলাদেশ-ভুখন্ড সমতুল্য গন্য করতেই হবে; এই স্থাপনা যেকোন ভারতীয়ের আক্রমণ দূরে থাক স্পর্শ থেকেও দূরে রাখতে হবে ভারত সরকারকে। সেকাজে যা যা নিরাপত্তা লাগে সব যোগান ভারত-সরকার দিতে বাধ্য, এমন লিখিত প্রতিশ্রুতির পরে বাংলাদেশে সেদেশে গিয়েছে!  কাজেই এখানে সরি বলবারও কোন অবকাশ নাই!
    মোদি-জয়শঙ্কর যদি মনে না রাখেন যে এপর্যন্ত প্রতিবার এমন ঘটনাগুলোতে বাংলাদেশ সরকার তার নিজ জনগণকে মটিভেট করে যেকোন ভারতের উস্কানিতে শান্ত থেকেছে। গত ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রামে সরকারের কর্মি আদালতে সরকার নিজ বা বাদিপক্ষের বক্তব্য উপস্থাপনে আদালতে নিয়োজিত কর্মী যাকে পাবলিক প্রসিকিউটর বা সংক্ষেপে পিপি নামে ডাকা হয় – সেই পিপি সাইফুল ইসলাম আলিফ কেন আদালতে ইসকনের চিন্ময় এর জামিনের বিরোধিতা করল এই অজুহাতে আলিফ কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এসব গুন্ডামি কী বাংলাদেশের মানুষ কম জানে? কিন্তু বাংলাদেশের সরকার ও আম-জনগণ এরপরেও নিজেদের সংযত রেখেছে – পরেরদিনের চারচারটা জানাজার আয়োজন করেছে চট্টগ্রামবাসী; এভাবে তাদের মনের ক্ষোভ, দুঃখ বেদনা মানসিক চাপ ইত্যাদি সবকিছুকে ঐ জানাজার মধ্যে দাফন করে দিয়ে আম-জনগোষ্ঠির এক  জন-ঐক্য  সৃষ্টি  ও দায়ীত্বপুর্ণ আচরণে সবাইকে পরিচালিত করে আমরা উঠে দাড়িয়েছিলাম – এক অনন্য নজির করেছিল সেদিন!

    অথচ মোদি-জয়শঙ্কর এর মফস্বলি আচরণের মত একটু ইশারাই কী যথেষ্ট ছিল না?  – মুহুর্তের মধ্যে ইসকন-চিন্ময় গং চিহ্ন লোপাট হয়ে যেত না? রক্তের বন্যায় আমরা এরপরে কোনপক্ষই আর কেউ নিজেদের কাছেই মানুষ হিসাবে মুখ দেখাতে পারতাম না!  কিন্তু আমরা সেসব দিকে যাই নাই, সেসবের কিছুই করি নাই!  নিজেদের সংযত রেখেছি। যদিও বারবার মোদি-জয়শঙ্কর আমাদেরকে উস্কানি দিয়ে যাচ্ছে! আমরা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে সব বিদেশি কূটনীতিকদের মাধ্যমে সারা দুনিয়াকে সব ঘটনাই জানিয়েছি।  মোদি-জয়শঙ্কর আপনারা কিছু পেটি-স্বার্থে আর কত নিচে নামবেন? বাংলাদেশ আপনাদের কোন হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি বা স্বার্থের কাছে মাথা ঝুকাবে না!
    এখানে সবচেয়ে বড় তামাশাটা হল, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা যারা প্রতি মুহুর্তে গত দুশ বছর ধরে মুসলমান মানেই নিচা মানুষ, এরা জঙ্গি পশ্চাদপদ ইত্যাদি তাই মুসলমানকে তাদের পায়ের নিচে দাবায় রাখতে হবে বলে প্রোপাগান্ডা-বয়ান খাড়া করে গেছে – যে প্রপাগান্ডার মুখ্য শব্দ বা কয়েন করা শব্দ হল সাম্প্রদায়িকতা – কিছু হলেই হিন্দুত্ববাদ যাকিছুই অপরাধ করুক উস্কানি দেক না কেন আমাদের হিন্দুত্ববাদকেই রক্ষা করতে হবে মানে  আমাদেরকেই তথাকথিত অ-সাম্প্রদায়িক হয়ে থাকতে হবে। মানে হিন্দুত্ববাদ এর কোন দোষ-অপরাধ নাই, ওর এর গায়ে টোকাও দেয়া যাবে না, উল্টা রক্ষা করে যেতে হবে। আর এটাই কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল অ-সাম্প্রদায়িকতা রাজনীতি ও অবস্থান!  এতে আসলে প্রমাণ হয় যে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল নামের আড়ালে এরাই প্রকৃত হিন্দুত্ববাদী।  একারণেই এরা সবাই এখন মোদি-জয়শঙ্করের ভারতের মফস্বলি আচরণ ও উস্কানির বিরুদ্ধে কোন টু-শব্দ নাই; প্রথম আলো নিঃশ্চুপ, এই ইস্যুতে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী [কোন ৩৪জন বুদ্ধিজীবীর প্যাকেজ] এদেরকে আর দেখা যাচ্ছে না। এরা মুখে তালা দিয়ে কোথায় যেন লুকিয়ে বসে আছে!!! কী সুন্দর  বাংলাদেশ তাই না!!!  যেখানে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা মোদির হিন্দুত্ববাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে ততপর থাকে! 

    এটা কী সুন্দর  বাংলাদেশ তাই না!!!  যেখানে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা অবলীলালায় মোদির হিন্দুত্ববাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে ততপর থাকে! আর উলটা আমাদেরকেই কথিত ‘অসাম্প্রদায়িক’ থাকবার বাণী শোনায়!!!!  

    আরেক মফস্বলি মমতা বন্দোপাধ্যায়ঃ
    কলকাতার আরেক মফস্বলি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়, তিনি বাংলাদেশকে জাতিসংঘ শান্তিবাহিনীর অধীনে নিতে চান! এখানে দেখেন বিবিসির নিউজ। 
    আরে ভাই আগে  জাতিসংঘ কী, শান্তিবাহিনী কী – এগুলো কী খায় না মাথায় দেয় – সেটা জানেন! জানার পরেই না হয় মুখ খুলেন? নাকি?
    এখন বাংলাদেশের মিডিয়া স্বাধীনতা মানে হল হিট বাড়ানোর জন্য সত্য-মিথ্যার পরোয়ার দরকার নাই। জার্নালিজমের নীতি মানা হচ্ছে কিনা পরোয়ার দরকার নাই!  কারণ, ওয়েবে যত বেশি দর্শক-পাঠক কে উস্কানি তুলে ডেকে নিয়ে আসো কোন অসুবিধা নাই, আর এটাই তো এভাবে হিট বাড়িয়ে অর্থ কামানোর সহজ পথ!  এই হল, এখনকার বাংলাদেশের মিডিয়া স্বাধীনতা  আর প্রথম আলো যেখানে যার আদর্শ ও মডেল! শুধু তাই নাই আমাদের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ মির্জা ফকরুল এখন খোলাখুলি র-এর এজেন্সি নিয়েছেন। তিনিওই আগামি সংসদের যারা আসন ভিক্ষা করেন এমন সবদলকে আসন ভিক্ষা দিবার নেতা কারণ তার হাতে র-এর এজেন্সি এসে গিয়েছি। আর তাই এমন সম্ভবত ২১টা মানে প্রায় সব নির্বাচনি দল এখন ফকরুলের নেতৃত্বে এমন এই প্রথম আলো মার্কা  বাংলাদেশের মিডিয়া স্বাধীনতার পক্ষে খাঁড়ায় গেছে। এটা হল পাঠকে বিক্রি করে দেওয়ার মিডিয়া স্বাধীনতা। তার মানে, এরা কী সাংঘাতিক গণতন্ত্রী! আপনারা চিন্তা করতে পারেন……।
    তো বাংলাদেশের এমন দুই “স্বাধীন মিডিয়া” – প্রথম আলো আর মানবজমিন – তাদের আবার আজকাল নাকি কলকাতার সংবাদদাতাও আছে!  ফলে মমতার বক্তব্যকে কত সেনসেটিভ বা হাইপ তুলে রিপোর্টটা করা যায় সেদিকে এরা ব্যস্ত হয়ে উঠে। এমন জব্বর খবর – এই পয়সার মাল –  এটা নিয়ে উত্তেজনা উঠানোর (মানে অঢেল অর্থ বা হিট কামানোর) সুযোগ তো হাতছাড়া করা যায় না?
    কিন্তু এতে সবই হয়েছে আর খোদ জার্নালিজম টাই বাদ হয়ে গেছে!

    প্রথম কথা হল, এই মিডিয়া স্বাধীনতা ওয়ালারা খেয়ালই করেন নাই যে – মমতার কথাগুলো অসামঞ্জস্যপুর্ণ। বাংলায় যেটাকে আমরা বলে কথার মধ্যে তাল নাই। একেকবার একেক অর্থ করে কথা বলেছেন। উনি কার কথা কাকে নিয়ে বলছেন তাই আউলায়ে ফেলেছেন। অথচ এদিকটা  সেটাই কেউ সামনে আনে নাই, গুরুত্ব দেয় নাই। প্রথম আলো আর মানবজমিন  এর নিউজ পাবেন এখানে।
    সবার আগে মমতার কথাগুলো যে অসামঞ্জস্যপুর্ণ তা নিয়ে অন্তত একটা বাক্য খরচ করেছে বিবিসি বাংলা।

    “……এ জাতীয় ঘটনা (সহিংসতার) ঘটতে থাকে তাহলে আমরা আমাদের লোকেদের ফিরিয়ে আনব। সরকার উদ্যোগ নেবে। তারা ফিরে আসলে থাকার, খাওয়ার কোনও সমস্যা হবে না। কোনও ভারতীয়ের উপর অত্যাচার হবে সেটা আমরা হতে দিতে পারি না।”

    উপরের এই বাক্যগুলো ছিল মমতার মূল কোট-আনকোট বক্তব্য। এখানে মমতার ধারণা বাংলাদেশে গত ৫ আগষ্টের কথিত হিন্দু নির্যাতন হচ্ছে মোদি, ইসকন ইত্যাদি এদের যে প্রপাগান্ডা ভারত সরকার করছে তাতে মমতার ধারণা কথিত যে নির্যাতন তা ভারতীয় হিন্দুদের উপর হচ্ছে।  এখন এতে যে বিভ্রান্ত তা হল,
    এক. নির্যাতিতরা ভারতীয় হিন্দু হলে তারা বাংলাদেশে বসে থেকে নির্যাতন খাইতেছে কেন?
    দুই. মমতা তো কথিত নির্যাতিতদেরকে  “আমাদের লোকেদের  বলেছেন। আমাদের লোকেদের ফিরিয়ে আনব – বলেছেন???? আরো পরিস্কার করে পরের বাক্যে বলেছেন, ভারতীয়ের উপর অত্যাচার হবে সেটা আমরা হতে দিতে পারি না। তাহলে?
    তিন. মমতা আসলে বেদিশ [বেদিশা] হয়ে গেছেন! সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে ভারতীয় হিন্দুরা এদের থাকাটাই তো অপরাধ! নাকি? এর কী হবে?
    চার. নাকি মমতা মোদি-বিজেপি-আরএসএস এর ভক্ত হয়ে উঠেছেন?  সেটা এই কারণে যে – “সারা দুনিয়ার হিন্দুদের (তিনি যে দেশেরই নাগরিক হন না কেন, সে হিন্দুর) রক্ষকর্তা একমাত্র মোদি, মোদির সরকার – ইদানিক এই বক্তব্য রেখেছে তারা বিবিসির এক রিপোর্টে; এখন মমতা কী সেই বক্তব্যের ভিক্ত অনুসারি হয়ে উঠেছেন? আর সেকারণেই বাংলাদেশে কথিত নির্যাতিত হিন্দু সে বাংলাদেশি / ভারতীয় সকলের রক্ষাকর্তার দায়ীত্ব তো মহান ভারত ও মহান মোদি নিয়েছে – ফলে এখন মমতাও মহান মমতা হয়ে সেই দায় বোধ করে কথা বলছেন! তাই কী????

    এসবেরই সারকথা, একটা ইস্যুতে কোন ঘটনা-বিবরণ না জেনেই লাঠি হাকিয়ে দেয়া বলতে যা বুঝায় মমতা তাই করে স্টুপিড হয়ে গেছেন!
    আর সেকারণেই ব্যাপারটা নজর করেছে বিবিসি তারা বুঝাতে চাইছে মমতার এই স্টুপিডিটি এই বিবৃতির সাথে বিবিসি নাই; তার এর কোন দায় নিচ্ছেনা।
    আর তাই ঐ রিপোর্টে বিবিসির মন্তব্য বা সতর্কবার্তা লিখাছে যে  ‘ভারতীয়দের উপর অত্যাচার’ বলতে তিনি কাদের বুঝিয়েছেন, তা ওই বক্তব্যে পরিষ্কার করেননি। মানে বিবিসি এই “কথা হয় না কথার” কোন দায় নেয় নাই। 

    অথচ আমাদের বাংলার স্বাধীন মিডিয়া এসব বাদ দিয়ে মমতা শান্তি রক্ষী বাহিনী দেয়েছে এদিকে পাটয়হককে নিয়ে গেলেন। অথচ, বাংলাদেশি পত্রিকা হিসাবে মমতা কে দেখার ও তার বক্তব্য-চিন্তার মধ্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে যে স্টুপিড চিন্তা কাজ করছে সেদিকে চোখ ফেলে নাই। মমতার কথা যে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপুর্ণ এদিকটা যেন তারা দেখেই নাই অথবা এদিকটা নিজ নিজ পত্রিকা পাঠককে সাবধান করে দেয়া যেন তাদের দায়ীত্ব না। সলে তারা আছে হিট কামাতে আর এতে পরোক্ষে হিন্দুত্ববাদের  অসাম্প্রদায়িকতা জাগিয়ে রাখতে।
    তবে প্রথম আলোর কলকাতা রিপোর্টার একটা বাড়তি তথ্য দিয়েছেন সেকথা আসছি।

    মমতা কেন এমন পোলাপানি বিবৃতি দিতে গেলেনঃ
    পুরা কলকাতায় তো বটেই ভারতের এখনকার রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদকে প্রধান করে তুলেএনেছেন মোদি সরকার এন্ড গং।  আর বাকি দলগুলো এই হিন্দুত্ববাদ করে সাজানো মোদির নির্বাচনি রাজনীতিকে আপন করে নিয়েছেন বা আত্মাহুতি দিয়েছেন। এর পিছনের মূল কারণ ভারতের রাজনীতিটাই গড়ে উঠেছে সেই ১৮১৫ সাল থেকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে, কখনও আবছা বা স্পষ্ট করে, মূলত হিন্দুত্ববাদ কে কেন্দ্র করে।  ভারতের সব রাজনীতিই কমবেশি হিন্দুত্ববাদ প্রভাবিত। যেমন এথেকে কমিউনিস্ট সিপিএমও এর বাইরে না। বরং সবসময় হিন্দুত্ববাদকেই সামনে আনার ক্ষেত্রে শীর্ষভুমিকা পালন করে গেছে। অনেকের শুনে অবাক লাগতে পারে কথাটা। কিন্তু এনিয়ে একটা রেফারেন্সই যথেষ্ট।  সেটা হল, কেন সুশোভন সরকার বেঙ্গল রেনেসাঁ নামে বইটা বের করেছিলেন? [বইটার গুগল পিডিএফ-ও পাওয়া যায় নেটে তবে ইংরাজিতে ] আর কেন এই বইটায় খোদ কমিউনিস্ট পার্টি (যার একচুয়াল ততপরতা ১৯৩৫ সাল থেকে শুরু হয়েছিল) সেকালে সাপোর্ট দিয়েছিল, পার্টি সেক্রেটারি পিসি যোশী একটা ভুমিকা লিখে দিয়েছিলেন? কেন? আর ঐ বইয়ে কী আছে? বিশেষ করে হিন্দুমেলার চাপ্টারটা?? এটা কজন পড়েছেন?
    এটা প্রমাণ করে খোদ কমিউনিস্ট পার্টি টা শুরুই হচ্ছে হিন্দুত্ববাদকে সাথে নিয়ে।

    যাই সেকথা, প্রথম আলো মমতা নিয়ে লিখেছে, “……গত ২৮ নভেম্বর সিপিআইএমের পলিটব্যুরো বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ শান্তি সেনা পাঠানোর প্রস্তাব করলেন”।
    এটাই হল সেই গুরুত্বপুর্ণ দিক। মমতা মনে করেন কলকাতার ভোটের রাজনীতিতে তার প্রধান বয়ান-রাজনীতি বা ইডিওওলজির দিক থেকে প্রধান প্রতিপক্ষ-এনিমি হল সিপিএম। এর পাল্টা সিপিএম আরো বেশি করে মনে করে মোদি-বিজেপি নয়, সারা ভারতে তাদের প্রধান রাজনীতির এনিমি হল মমতা। কারণ মমতাই তাদের ৩০ বছরের কলকাতার ক্ষমতা থেকে উপড়ে ফেলে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতায়। শুধু তান না একারণে, সিপিএম তার ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে মোদির কোলে উঠে বসতেও বা অপ্রকাশ্য এলায়েন্স করতেও রাজি। করেছেও তাই।
    আর সেকারণেই তারা মোদির হিন্দুত্ববাদি রাজনীতির পক্ষে সিপিএম এই মিথ্যা দাবিতে মোদি সরকারের অনুরূপ বিবৃতি দিয়েছে। দেখতে যায় নাই যে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের এই উন্মাদনা কেন সত্যি না। সেটা ইনডিপেন্ডেন্টলি ভেরিভাই করতে যায় নাই, চাই নাই। এতে সারা ভারত হিন্দু ভোটের লোভে মোদি যেন হিন্দুত্বের শুরসুরি দিয়ে সব নিয়ে যা যায় সেটা ঠেকাতে তারা সকলে কংগ্রেসের প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, সিপিএম ও মমতা ইত্যাদি লাইন ধরে হিন্দুত্ববাদের রাজনীতিকে আপন করে নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। সত্য-মিথ্যা বা ফ্যাক্টসের ধার ধারে নাই। মূলত সিপিওএম এর বিবৃতির পরে মমতাও বিবৃতি দিতে অস্থির হয়ে পড়েন।

    এমনকি যেখানে দুদিন আগেও মমতা বলেছিলেন্, এটা কেন্দ্রের মানে কেন্দ্রীয় মোদি সরকারের দেখভালের ইস্যু। তাই তিনি এনিয়ে তেমন কিছু বলতে চান না। অথচ নিজের বক্তব্যের বিরোধিতা করেই তিনি শান্তিবাহিনী ডাকার বিবৃতি দফিয়ে ফেলেছেন। যেন শান্তিবাহিনী হিন্দুসেনা সব!!!!! ডাক দিলেই এসে যাবে!  প্রথম কথা এই শান্তিবাহিনী বসানোর অর্থ কী ভারত দিবে? বইতে রাজি আছে? বাজারে ডালের দাম না জেনে প্লেটের ভাতে বিরাট এক গর্ত করেছে ডাল নিবে বলে………!!! এদেরকে আর কী বলব?

    সারকথায়, যতদিন ভারতের যেকোন দল, কেন হিন্দুত্ববাদ বিরোধিতা করতে হবে, আর তা কী করে এনিয়ে চিন্তা-ততপরতায় সোচ্চার না হবে ততদিন এদের কারো মুক্তি নাই। ভারত ভাঙনের দিকে এগিয়ে যাবেই। এথনিক জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদী চিন্তার  হিটলারের উতখাত ছাড়া যেমন জর্মানির প্রতিবেশি কোন ইউরোপীয় রাষ্ট্রে শান্তি  তো বটেই সারা দুনিয়ায় শান্তি আসে নাই, দুনিয়াতে শান্তি আসে নাই; ঠিক সেরকম মোদির ভারতও এশিয়ার হিটলারই হয়ে উঠবে ক্রমশ!
    আর ২৯% মুসলমান ভোটের উপর দাঁড়ানো মমতাও কেবল হারতেই থাকবেন; উলটাপালটা বকবেন তাতে কোন লাভ হবে না!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     ০৩ ডিসেম্বর ২০২৪  দুপুর ০১ঃ ২৩  

    আপডেটঃ    ২০২৪  

  • জামায়াতের উপর আনন্দবাজারি ইসলামিবিদ্বেষ

    জামায়াতের উপর আনন্দবাজারি ইসলামিবিদ্বেষ
    গৌতম দাস
    ২২ নভেম্বর ২০২৪ বিকাল ১৭ঃ ৫২
    https://wp.me/p1sCvy-5OI

     

     

     

    ১।  রাজনীতি আর চালাকি এক জিনিষ না। এক করে দেখলে খেসারত দিতেই হবে।
    ২। দাওয়া পার্টি (ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার সংগঠন) আর রাজনৈতিক দল একেবারেই এক নয়।  তাতে আপনারা দাওয়া পার্টিওই থেকে যাবেন, রাজনৈতিক দল কখনই হতে পারবেন না।
    ৩। সবার আগে রাজনীতি বা পলিটিক্স ধারণাটার অর্থ তাতপর্য কী তা ভাল করে বুঝে নেন।  বিশেষ করে রাজনীতি বলতে কী কী না – তা স্পষ্ট করে বুঝে নেন।

    এমন তিনটা প্রশ্নের জবাব নিয়ে সব ইসলামি দলের আগে কিছু হোমওয়ার্ক করে নেয়া উচিত!

    জামায়াতের কেন্দ্রিয় সভাপতি ডাঃ শফিকুর রহমানের উপর কিছু একটা খারাপ প্রভাব ভর করেছে, মনে হচ্ছে।  নইলে তিনি কলকাতার ইসলামবিদ্বেষী পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিতে রাজি হবেন কেন???
    কলকাতার  আনন্দবাজার পত্রিকা (যেটা ইসলামবিদ্বেষ ছাড়া একটা বাক্য লিখতে পারে না এমন প্রবল হিন্দুত্ববাদী) সেই পত্রিকা ডাঃ শফিক সাহেবের সাক্ষাৎকার ছেপেছে।  সবচেয়ে বড় কথা তাদের করা প্রশ্ন এটা কোন সাংবাদিকতা বা জার্নালিজমের নীতিমালায় পরে না।

    যেমন প্রশ্নগুলো দেখেনঃ
    ১। জামায়াতে ইসলামীর ভারত-বিরোধিতা সর্বজনপরিচিত। কী বলবেন?

    ২। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীকে দেখা হয় কট্টর ইসলামি সংস্থা হিসাবে, অন্যান্য ইসলামি রাষ্ট্রে যে ‘ইসলামিক ব্রাদারহুড’ রয়েছে তার অংশ হিসাবে। নিজেদের সংগঠনকে কী ভাবে দেখেন?

    ৩। কিন্তু বিএনপি-র একটি অংশ আপনাদের কট্টরপন্থী মনোভাব নিয়ে অস্বস্তিতে। কী বলবেন?

    ৪। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর থেকেই সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় তাদের বিরুদ্ধে হিংসার প্রতিবাদে সরব। কী ভরসা দেবেন?

    ৫। শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আপনারা সরকারে এলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কোন দিকে যাবে?

    ৬। একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার এবং জামায়াত মিলিমিশে আওয়ামী লীগের পর এ বার বিএনপি-কেও সরিয়ে দিতে চাইছে। দুই বড় রাজনৈতিক দলকে বাইরে রেখে নতুন শক্তির উত্থান হবে। কতটা ঠিক?

    অর্থাৎ আনন্দবাজার এটা আসলে কোন মিডিয়া না। এটা  নিজেই -“আরেকটা রাজনৈতিক সত্বা বা এনটিটি” – যার আবার বাংলাদেশ নিয়ে এক হিন্দুত্ববাদি অবস্থান আছে।
    আর জামায়াতের সভাপতিকে এখন সেই হিন্দুত্ববাদি আক্রমণ ভেদ করে নিজের কথা বলার জায়গা বের করতে হবে!!!

    প্রস্তুতিহীন জামায়াত সভাপতিঃ
    সবার আগে বলি, এবার ৫ আগষ্টের পরে জামায়াতের ভিতর এক স্ফুর্তি দেখা যাচ্ছে যেন দলের রাজনীতি ও অবস্থান কিছুই ঠিক না করে শুধু গলার জোরে বা চালাকি-পুর্ণ বাকচাতুরি দিয়ে সবার মন জয় করে ফেলবে। এমনকি যেন হিন্দুত্ববাদি মনের ভারতেরও!  অথচ সবার আগে নিজেদের কোন কোন অবস্থান-বক্তব্যগুলো দুর্বল তা কাটানো নিয়ে কোন হোমওয়ার্ক করেন নাই জামায়াত গত ১৬ বছর; যা  তাদের এখনকার কাজ-ততপরতায় ছাপ ফেলে চলেছে। কিন্তু কোন রিয়েলাইজেশন বা আত্ম-উপলব্দি নাই।

    যেমন ধরেন,  ৫ আগষ্টের পরে বিশেষ করে এবারের দুর্গাপুজা-কেন্দ্রিক মন্দির স্থাপনায় কমিউনিটি-পাহারায় জামায়াতের অংশ নেয়া – এপর্যন্ত ঠিক আছে। বরং ভারতীয় প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে এটা বড় ইতিবাচক জবাব তো বটেই সাথে যাকে বলে ঠেসে চড় মারার মত জবাব, অবশ্যই!
    কিন্তু এর পরে কোথায় থামতে হবে তারা সে আক্কেল দেখাতে ব্যর্থ হলেন। তারা জামায়াতের হিন্দু শাখা খুলে বসতে গেলেন। সবচেয়ে মারাত্মক করলেন পুজা মন্ডপ পাহারায় গিয়ে জোশের ঠেলায় ওটা ইসলামের দাওয়া বা প্রচার ছড়ানোর জায়গা মনে করলেন সেটাকে। ‘ইসলামি সঙ্গিত’ পরিবেশন করে আসলেন। কী এক জটিল অবস্থা! ফলাফল বুঝতেই পারেন যা ক্রেডিট এতদিন জামায়াত কামিয়েছিল তা সব পানিতে গেল!

    আচ্ছা উপরে  আনন্দবাজারের অগ্নি রায়ের প্রশ্নগুলো দেখেন। এটা দেখার পরে এখন জামায়াতের নেতারা কী বুঝেছেন যে বাংলাদেশে তাদের পুজা বা হিন্দু সার্ভিস দেওয়ার কায়দা ও এর নতিজা কী? কোন ইতিবাচক প্রভাব কী আছে আনন্দবাজারিদের তাদের প্রশ্নের মধ্যে??? নাকি এটা আরো আক্রমাণাত্মক এক হিন্দুত্ববাদের মুখোমুখি হয়েছিলেন সভাপতি ডাঃ শফিক??
    যার সোজা মানে হল, কোন কাজ কীভাবে করতে হবে, হিন্দুত্ববাদি মনকে ডিল করবেন কীভাবে? এর জন্য এক ভাল ও আগাম প্রস্তুতি লাগবেই! যতদিন তা রপ্ত না হয় ততদিন নিজেদের বিরত রাখেন, ওদের এড়ায়ে চলেন – এটাই একমাত্র পথ! ৫ আগষ্টের পরের জোশে, সব জয় করে ফেলতে পারবেন বলে বিনা প্রস্তুতিতে আগায় যাওয়া ঘটালে এর চেয়ে বড় আত্মহত্যা আর কী হতে পারে?

    আরেকটা দিক হল, জানায়াত নেতাদের মধ্যে এক অদ্ভুত ধারণা। তা হল, তারা এখন ইন্ডিয়ান রাজনীতি মানে, মোদি সরকার, র-এর প্রতিনিধি, বা কোন হিন্দুত্ববাদি নেতা এমন যে কারো সাথে তারা এখন বোধহয় খুবই আপন হয়ে গেছেন!!!!!  এটা হতে পারে কোন র-এর লোকের সাথে কথা হয়েছে আপনাদের, তাদের মিঠা মিঠা কথা ছিল যেখানে ধরা যাক – আওয়ামি লীগের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ না তুললে বা উচ্চবাচ্য না করলে – সদয় আচরণ প্রকাশ করলে বোধহয় তারা জামায়াতকে এখন থেকে অনেক আপন করে নিবে!!! সহাবস্থান তৈরি হবে? তাই কী??? কাজেই জামায়াতের এত উতফুল্ল খোশ-মেজাজের কারণ কী?

    সম্প্রতিকালে অর্থহীন ও কোন ব্যাখ্যা বিহীনভাবে জামায়াতের আওয়ামি লীগ ও ভারতের প্রতি উদারতা প্রকাশ বাংলাদেশের রাজনীতির পরিসরে ব্যাপক সন্দেহ ও ক্ষোভ তৈরি করেছে। তা তো জামায়াত নেতৃত্বের অগোচরে থাকার কথা নয়!  যে উদ্দেশ্য  আওয়ামি লীগ বা ভারত প্রীতি দেখানো – এতে ফলাফল কী একেবারে উলটা হয়ে যায় নাই, উলটা আসে নাই? লাভ দূরে থাক বদনাম আর গায়ে লাগা কালি কী তার চেয়ে বেশি হয় নাই?

    সর্বোপরি, কথিত এই সাক্ষাতকার কী প্রমাণ করে?
    এই হিন্দুত্ববাদি মিডিয়া জামায়াত দল ও এর সভাপতিকে নুন্যতম মর্যাদা দিয়ে কথা বলেছে? উত্তর হল যে, না।
    তাহলে এথেকে জামায়াত দল ও এর নেতারা কী শিক্ষা নিলেন বা নিবেন?
    হিন্দুত্ববাদি ভারতের কারও কথায় পটতে হয় না – তাতে তিনি  মিডিয়ার লোক কিংবা র-এর লোক যেই হন না কেন! তাই নয় কী? আর সবার উপরে নিজের সম্মান রক্ষা করতে হয় সবার আগে নিজেকে। কখনও অন্যের হাতে তা ছেড়ে দেয়া যায় না!

    জামায়াত ও বিএনপির জন্য কিছু শিক্ষা রেখে গেছেঃ
    সবচেয়ে বড় কথা বিএনপি ও জামায়াত কে মনে রাখা দরকার তাদের এই হিন্দুত্ববাদি রাজনীতির সরকারের সাথে অবস্থান থেকে তাদের মিডিয়া ও তাদের আম জনতার অবস্থান এসব কিছু পক্ষে কখনই -বিএনপি ও জামায়াত – বিশেষ করে জামায়াতকে তাদের দরকার কারণ  তাদের সাফাই বা জাস্টিফিকেশন দরকার যে কেন তারা নিজেরা এমন উগ্র হিন্দুত্ববাদি একরোখা? অন্যভাবে বললে, তারা জানে তাদের হিন্দুত্ববাদি রাজনীতির বিরুদ্ধে অজস্র মানুষ প্রশ্ন তুলে থাকে যার জবাব তাদের কাছে নাই। আর সেই ঘাটতি পূরণ  করতে তারা  -বিএনপি ও জামায়াত- কে বাঁকা ভাবে হাজির করবেই। যাতে এটা তাদের অসৎ কাজের সাফাই হয়ে হাজির হয়!!!
    কাজেই বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতারা যারা ভাবছেন – ভারতের সমর্থন পিছনে নিয়ে (র-এর লোকেরা মিঠা আশ্বাস দিয়েছে )  বা পিছনে থাকলে তাদের আগামি নির্বাচনে বড় আসন নিয়ে সংসদে হাজির হওয়া প্রায় সমাগত – এই তো একটু দূরে – এমন তাদের সকলের জন্য আনন্দবাজারের এই কথিত সাকক্ষাতকার হল এক কঠিন শিক্ষা! যে গ্রহণ করবে, বুঝবে এটা তার জন্য শিক্ষণীয়; আর যে বুঝবে না তার জন্য এটা তেজপাতা!!!
    এরা মুখে যা আশ্বাসই দিক না কেন তারা ইসলামবিদ্বেষের জায়গা থেকে বিএনপি ও জামায়াত এর নেতাদের সুযোগ পেলে অপমান করবেই!
    অন্তত জামায়াত নেতাদের এতে কী কোন আক্কেল হবে???

    ভারতীয় মিডিয়াকে মোকাবিলা করতে কিছু পরামর্শঃ
    প্রথম প্রশ্নটার ক্ষেত্রেই দেখা যাক।

    এর জবাবে বলা যেতে পারত যেমন, আমরা ভারত-বিরোধিতা না বরং আমরা বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্যের খায়েসের বিরোধিতা করি –
    এতে ওদের তোলা বয়ানকে ফুটো করে  তা ফিরে ওদেরই মুখে মারা হতে পারত!
    সাথে আরেকটা বলা যেত যে ব্যাপারটা – সর্বজনপরিচিত যদি হয়েই গিয়ে থাকে তাহলে আর প্রশ্ন করতে এসেছেন কেন?

    পরের প্রশ্নঃ জামায়াত কে নিয়ে এই প্রশ্ন প্রায়ই আমাদের দেশেও প্রগতিবাদই=হিন্দুত্ববাদিদের থেকে  উঠতে দেখা যায় যা খুবই বিরক্তিকর। প্রশ্নটা হল যেমন – “জামায়াতে ইসলামীকে দেখা হয় কট্টর ইসলামি সংস্থা” বা জামায়াত একক কট্টর সংগঠন বা অনেক বলে এক জঙ্গি সংগঠন!

    এর জবাব হতে পারত যা তা নিয়ে কথা।  আসলে জামায়াত কখনও এসব ফালতু অভিযোগ কে চ্যলেঞ্জ করে নাই বা করতে পারে নাই।  অথচ জামায়াতের উচিত সোজা পালটা চ্যালেঞ্জ করা। দেখাতে বলা যে কোন ঘটনার কারণে কট্টর, জঙ্গী বা এজাতীয় বিশেষনের প্রমাণ কী? বা  এটা বলতে কী বুঝাতে চাইছেন? জামায়াত কী কোন সশস্ত্র সংগঠন? কেন এসব বিশেষণ ব্যবহার করা হুচ্ছে? বাংলাদেশের রাজনৈতিক কালচারে যা পারমিশেবল (মানে চলে বা গ্রহণযোগ্য) যেমন ককটেল, লাঠি, ইট ইত্যাদি বড়জোর কখনও দেশি পিস্তল  বিশেষ করে তা ছাত্র সংগঠন পর্যায়ে লীগ, বিএনপি, জাসদ ইত্যাদি সকলেই করে থাকে। জামায়াতও এসবের বাইরে না। কিন্তু গত ১৬ বছরের ছাত্রলীগ যেভাবে পেটোয়া বাহিনী, হেলমেট লীগ, বা পুলিশের  হাত ধরে পাশাপাশি অস্ত্র হাতে বিরোধিদলের মিছিলে আক্রমণ, খুন করে ফেলা ইত্যাদি করে গেছে – আর যারা এসবের দিকে নজর করে নাই এরা সকলেই হিন্দুত্ববাদি…! মিলিয়ে দেখেন।  এরকম পালটা জবাবে রুখে দাঁড়ানো যেত!
    সোজাকথা, আমাদের গড়ে উঠা নিজের রাজনীতির কালচার অনুযায়ী লীগ, বিএনপি, জাসদ ইত্যাদি যা করে জামায়াত কখনই এর বাইরে নয়; বাইরে যায় নাই। কাজেই এসব কট্টর বা জঙ্গী শব্দের ব্যবহার কেন? বরং এসব প্রশ্নের বিরুদ্ধে পালটা অভিযোগ করা যায় যে আপনি কী উতরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগীর কট্টরতা (মুসলমান হলেই তাঁর বাড়িঘর বুলডোজ করায় চ্যাম্পিয়ান) ও নৃশংসতার সাথে তুলনা করে কথা বলছেন?
    যেমন আমাদের এক নারী উপদেষ্টা একইভাবে – বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন প্রসঙ্গে জবাব দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, যে না তেমন কিছু না। অন্তত ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার সাথে যে তান্ডব ঘটেছিল এর তুলনায় কিছুই হয় নাই বাংলাদেশে!

    তিন নম্বর প্রশ্নটা দেখেন। বলছে, – বিএনপি-র একটি অংশ আপনাদের কট্টরপন্থী মনোভাব নিয়ে অস্বস্তিতে আছে – এরপালটা জবাবে বলা যেত যেমন, আপনি কী বিএনপির সাথে আমাদের ঝগড়া লাগিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন? কিন্তু সেটা কী আপনার কাজ? আপনার এসব হাইপথিটিক্যাল (কল্পনা করে নেয়া প্রশ্ন) প্রশ্ন আনবেন না প্লিজ! সরি আপনার প্রশ্ন ঠিক নাই। এই বলে এই প্রশ্নের আর কোন কথা বলতেন না, এমন করা যেত!

    চতুর্থ প্রশ্নঃ ……অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর থেকেই সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় তাদের বিরুদ্ধে হিংসার প্রতিবাদে সরব। কী ভরসা দেবেন?
    জবাবে বলা যেতঃ আপনার প্রশ্নটাই কী বলছে না যে এটা আপনাদের উস্কানি! না হলে, “অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর থেকেই” – এভাবে বলছেন কেন? আমাদের বর্তমান অন্তর্বর্তি সরকার বহুবার বলেছে এটা বাড়িয়ে বলা ভারতের প্রপাগান্ডা। এনিয়ে অন্তত আপনাদের প্রিয় বিবিসি বাংলার রিপোর্ট টা দেখে নিয়েন! তারা কেন এটাকে প্রপাগান্দা বলেছে দেখে নিতে পারেন!

    পঞ্চম প্রশ্নঃ শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আপনারা সরকারে এলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কোন দিকে যাবে?
    এখানে বলা যেত, এর মানে তাহলে,  হাসিনার ১৬ বছরের ফ্যাসিজম ও এই গুম-খুনের শাসনের পিছনে ও সহায়তায় যে ভারত ছিল তা স্বীকার করে নিচ্ছেন? তবে আপনার প্রশ্নের জবাব হল, এটা ভারতের উপরই নির্ভর করে। ভারত যদি আবার হাসিনা মত ঘনিষ্ট কাউকে তার পেতেই হবে বলে খুঁজে এর দায়ভার ও পরিণতি ভারতকেই নিতে হবে! তাই না?

    ষষ্ঠ প্রশ্নঃ
    একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার এবং জামায়াত মিলিমিশে আওয়ামী লীগের পর এ বার বিএনপি-কেও সরিয়ে দিতে চাইছে। দুই বড় রাজনৈতিক দলকে বাইরে রেখে নতুন শক্তির উত্থান হবে। কতটা ঠিক?
    এর জবাব হতে পারত এভাবে –  এটা আপনার  সীমা ছাড়ানি এক কল্পিত বা হাইপথিটিক্যাল প্রশ্ন ? আপনি নিজেই তো এখনও নিশ্চিত হন নাই যে আপনার কথা-অনুমান সঠিক কিনা। তাই না? তো আগে সিওর হয়ে নেন এর পরে না এই প্রশ্ন করবেন?

    সারকথায়, জামায়াতের প্রতি আনন্দবাজারি এই ঘৃণ্য আচরণ থেকে বিএনপিও চাইলে শিক্ষা নিতে পারে। যারাই ভারতের মোদির সাথে ঘনিষ্ট হতে যাবে, সবকিছুকে খুব সহজ মনে করবে তাদের সবার জন্য এই একই ফলাফল অপেক্ষা করছে!  ভারতকে ডমিনেট বা আধিপত্য করতে দেয়া, বাংলাদেশের বাপ-মা হয়ে উঠতে চাওয়া – এটা নিয়ে যে কেউ নিশ্চিত থাকতে পারে যে যা দেখছেন এটাই এর পরিণতি হবে। আর এটাকেই তো আমরা নাম দিয়েছে ইন্ডিয়ান হেজিমনি বা ভারতীয় আধিপত্য!!!
    এমনকি হাসিনাও  – “ভারতকে আমি যা কিছু দিয়েছি ……” ডায়লগটা স্মরণ করতে পারেন, যদি না ইতোমধ্যেই অন্ধ না হয়ে গিয়ে থাকেন! আর বাংলাদেশের পাবলিক!!!
    ইতোমধ্যেই জনপরিসরে আপনাদের ইজ্জতের কী হয়েছে তা সাহস করে একটু খবর নিতে পারেন। যা সামনে আপনাদেরকে আরো ছিন্নভিন্ন করে দিবে!!!  চুড়ান্ত গণবিচ্ছিন্ন হবেন আপনারা!! – যদি চান, চাইতেই থাকেন!!!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ  সন্ধ্যা ০৬ঃ ৪০   ২২ নভেম্বর  ২০২৪
    শেষ আপডেটঃ      ২০২৪

  • ভারতের নির্বাচনঃ কংগ্রেসও সরকার গড়ে ফেলতে পারে

    মোদি হেরেছেন আগামিতে কী?
    এর অর্থ, তাতপর্য ও মূল্যায়ন” –

     

    ভারতের নির্বাচনঃ কংগ্রেসও সরকার গড়ে ফেলতে পারে
    গৌতম দাস
    ০৫ জুন ২০২৪ সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৭
    https://wp.me/p1sCvy-5Fv

    নরেন্দ্র মোদি ও রাহুল গান্ধী

     

    প্রথম আলোসহ অনেক মিডিয়ায় আজ ভোরবেলায় দেয়া রিপোর্টের শিরোনাম –   ৫৪২ আসনের চূড়ান্ত ফল: বিজেপি ২৪০, কংগ্রেস ৯৯ আসন। এটা অবশ্য একা প্রথম আলো না, এমনকি সারা ভারতের ইংলিশ পত্রিকাগুলোরও প্রায় কমন শিরোনাম এটাই!
    কিন্তু এই ফলাফলের এমন উপস্থাপন আমাদের দেশে এতে অর্থ খোলসা হবে না। বলা যায় কিছুই বুঝা যাবে না। কিন্তু যদি একই তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে করা বা দেয়া অন্য শিরোনামটা হয় এমন যে – “বিজেপি একা সরকার গড়তে পারছে না – আবার কংগ্রেসও গড়ে ফেলতে পারার দাবিদারও” – তাতেও এই নয়া শিরোনামও সঠিকই থাকে মানে, একই তথ্য-সম্মত রিপোর্টের শিরোনামই  থাকে।  আর সেক্ষেত্রে আমাদের লাভালাভ হত এই যে আমরা ভারতের এবারের নির্বাচনী ফলাফলের অর্থ-তাতপর্য সহজেই ধরতে পারতাম!  কারণ এমন নয়া শিরোনাম শুনলে বাংলাদেশীরা সবাই নড়েচড়ে বসবেন।  হ্যা, কথা একেবারে সত্য! এতটুকু বাড়িয়ে বলা হয় নাই;  আর এতে কোন যদি-কিন্তুও নাই।

    এবার একটু খুলে বলা যাক, তবে স্বল্প কথায় বললে, ভারতে সরকার গড়তে কোন দলকে ২৭৩+ আসনে বিজয়ী হতেই হয়। আর বিজেপি এবার পেয়েছে ২৪০ আসন। অর্থাৎ মোদির বিজেপি তাই এবার  ৩২-৩৫ আসনের ঘাটতিতে আছে। একথার অর্থ হল বিজেপি কোনভাবেই একা সরকার গড়তে পারছে না। এই অর্থে বিজেপি এবারের ফলাফল হল, বিজেপি হেরে গিয়েছে।  সেজন্যই  গতকাল সকাল দশটার পর থেকেই বিজেপির সুর বদলে ফেলেছে। মোদি আর নিজ দলের সকলেই বিজেপির নাম মুখে নেয়া বন্ধ করেছে; এর বদলে তারা তাদের রাজনৈতিক জোট এনডিএ [NDA, National Democratic Alliance] এই নাম বলা শুরু করেছে। যেমন দাবি করছে, এনডিএ (বিজেপি নয়) আবার ক্ষমতায় আসতেছে। আসলে বিজেপি যে একা আর সরকার গড়তে পারছে না সেটা মোদির অজানা ছিল না। কিন্তু আগের মতই হামবড়া “ভাব” বজায় রাখতে না পারলেও কর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে এই “সুক্ষ্ম কারচুপি” বা কথার ফাঁকি তৈরি করেছে যে বিজেপি নয়, এনডিএ আবার ক্ষমতা আসতেছে!

    বিজেপি এখন নিজের নাম ভুলে কেবল এনডিএ এনডিএ করছে, কেনঃ
    আসলে এতদিন মানে পিছনের দুবারই সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজেপিই সরকার গঠন করে থেকেছে। তাই বিজেপি যা চায় তাই জোটের বাকি সকলকে মেনে চলতে হয়েছে। এতে আবার, এতদিন এনডিএ আছে ঠিকই কিন্তু তেমন উচ্চারিতই নয়, এমন দশা হয়েছিল !  এছাড়া সবচেয়ে বড়কথাটা হল বিজেপির সবসময় যে  প্রধান নীতি মেনে চলেছে তা হল অন্যের দল ভাঙ্গিয়ে প্রার্থীকে নিজদলের প্রার্থী করা; আর তা করে গেছে অর্থ বা যেকোন “অবৈধ সুবিধার” লোভ দেখিয়ে। তাতে সেটা এনডিএ জোটের ভিতরের কেউ হতে পারে আবার বাইরেরও! কোন পরোয়া করে নাই। আর মোদির এসব কাজের অর্থের যোগান? সেটাও কোন অসুবিধাই নয়; কারণ, দলের ফান্ডের ভান্ডার আদানি বা আম্বানিরা তো আছেই! এরই পরিণতি হচ্ছে এনডিএ জোটের প্রায় সকল দলই (যাদের এবার মোট আসন হল ৫২) বিজেপি বা তাদের নিজ এনডিএ জোটের প্রতি আনুগত্যহীন! এতে সারকথাটা দাড়িয়েছে এই যে – না মোদি না তাঁর এনডিএ জোটের কেউ – কারোরই কোন স্থির কমিটমেন্টে আর কেউ নাই। সব পক্ষই যখন তখন অন্য জায়গায় সুবিধা দেখলেই এনডিএ জোট ভেঙ্গে ত্যাগ করে চলে যায় অথবা সময়ে জোটে ফিরে আসে  – এটাই এতদিনের কমন প্রাকটিস!  গতকাল সন্ধ্যা থেকেই তাই মোদির প্রধান দুর্দশাটা হল – বিজেপি এই নাম ভুলে গিয়ে এই জায়গায় এনডিএ জোটের নাম বসিয়ে উচ্চারণ।  এছাড়াও আরও সিরিয়াস দিক মানে, মোদির গত দশবছরের ইজ্জত ধুলায় মিটানোর মত দুর্দশা হল যে মোদিকে এখন থেকে দুই এন বা N  দিয়ে যাদের নাম নাইডু আর নীতিশ – এদের মন যুগিয়ে চলতে হবে, পা-ধরতে হবে।

    আজ ভোর থেকেই নিশ্চিত হওয়া এই কঠিন বাস্তবতা হল, মোদিকে এখন নিশ্চিতভাবেই এই ৫২ জনের হাত-পা চাটতে হবেই। আর তিনি তা ইতোমধ্যেই শুরু করে দিয়েছেন! যেমন এই ৫২ জনের মধ্যে বড় আসন ওয়ালা দুই এনডিএ জোট সঙ্গী দল হল – টিডিএ [তেলেগু দেশম পার্টি TDP] যেটা অন্ধ্রপ্রদেশ (হায়দ্রাবাদ) রাজ্যের দল; আর এরই মূল নেতা চন্দ্রবাবু নাইডু [Nara Chandrababu Naidu ]। আর আরেকজন হলেন বিহারের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার; দেখুন “এবার খেলা দেখাবেন নীতীশ কুমার, কার্ড তো তাঁর হাতেই, তাকিয়ে গোটা দেশ”। সবচেয়ে মজার কথা হল, কংগ্রেসসহ অন্যান্য মোদিবিরোধী দলের বর্তমান জোট ইন্ডিয়া [I.N.D.I.A] এর জন্ম বলা হচ্ছে মাত্র ১১ মাস আগে (July 2023)। আর এই জোট গঠনের উদ্গাতা ও প্রথম উদ্যোগীদের একজন হলেন কিন্তু এই নীতিশ কুমার; যিনি পরে আর এই জোটে আর থাকেন নাই কারণ, তিনি এসেছিলেন মোদির এনডিএ জোট ভেঙ্গে আর মোদি আবার তাকে বড় কোন “সুবিধার” বিনিময়ে আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন।  এককথায় গত দশবছরের মোদি জমানায় তিনি সমসময় মোদির পক্ষে, আর না-হয় মোদিবিরোধী  এদুই জোটের কোন একটার সাথে বারবার বদলাবদলিতে থেকেছেন।

    যদিও নীতিশের তুলনায় নাইডু – তিনি অনেক স্থির। বেশির ভাগ সময় তিনি কংগ্রেস ও তার বন্ধুদলের সাথে জোটের সঙ্গি থেকেছেন; কেবল এবারই সম্ভবত তিনি মোদির কোলে। তিনিই ইন্ডিয়ার আইটি খাতে যা সুনাম এর জনক! এককথায় গ্লোবাল আইটি খাতে একদিকে আমেরিকান গবেষণায় বুদ্ধি-পরিকল্পনা-ডিজাইন ইত্যাদি সবই তাদের আর অন্যদিকে তাতে ভারতের সস্তা কিছুটা এডুকেটেড শ্রমের অংশটা মাথা হল চন্দ্রবাবুর অন্ধ্রপ্রদেশ-হায়দ্রাবাদ রাজ্য। তাই ভারতের গৌরবজনক টেক সিটি [Tech city] বলতে এই হায়দ্রাবাদ।
    ওদিকে অন্ধ্রে কেন্দ্রের নির্বাচনের দিনই রাজ্য সরকারেরও নির্বাচন হয়ে যায় একই সাথে প্যারালাল, এমন চারটা রাজ্যের একটা সে। গতকাল পাঁচ বছর পরে নাইডু আবার রাজ্য নির্বাচনে (বিজেপির সাথে করা জোটে) বিপুল ভোটে ফিরেছেন। আর এদিকের হিসাবে, এবার নীতিশ-নাইডু মিলিয়ে তাদের মোট আসন প্রায় ২৮; নীতিশ ১২ আসন আর নাইডু ১৬ আসন। ফলে বুঝতেই পারছেন বর্তমানে এনডিএ জোটে থাকা  নীতিশ-নাইডু মোদির কাছে কত গুরুত্বপুর্ণ। যেমন নাইডুর বিজয়ে ইতোমধ্যেই নাইডুকে মোদি তোয়াজ করতে চলেছেন; বিজয়ে ফোন করেছেন। আগামি নয় জুন নাইডু নয়া মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিবেন আর তাতে উপস্থিত থাকবেন সম্ভবত মোদি স্বয়ং! দেখেন,  অন্ধ্র প্রদেশের বিধানসভায় শপথ নেবে, তখন সেখানে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং!  এর পরিকল্পনা চলছে।

    কিন্তু মোদির দিক থেকে দেখলে ভয়ঙ্কর কথাটা হল, বিজেপি জোটের নীতীশ-নাইডুর সঙ্গে যোগাযোগ করছে কংগ্রেস। খবরটা হিন্দুস্তান টাইমসের আমি নিজেই গতকাল রানিং এনডিটিভিসহ স্থানীয় হিন্দি চ্যানেলে দেখেছিলাম; তখন নির্বাচন নিয়ে কংগ্রেসের প্রেস ব্রিফিংয়ের পরে এই সংবাদ জেনেছিলাম। আর আজকে সব মিডিয়া লিখছে সব ছোট বড় দল এখন দিল্লিমুখি – মানে ধরাধরি পায়ে পরার কেনা বেচা এখন তুঙ্গে চলবে। আমাদের টিডিএস পত্রিকা সেগুলারই একটা সাম-আপ ছেপেছে – “মোদির ‘প্লেন’ ছেড়ে বিরোধী ‘প্লেনে’ নিতিশ? মাঝ-আকাশে জল্পনা তুঙ্গে!” । মানে হল নীতিশ কুমারকে নিয়ে টানা হেচড়া দরাদরি সম্ভবত চরমে উঠেছে।

    এসবের অর্থ কী?
    অর্থ খুব সোজা। মোদি একা (মানে কেবল বিজেপি) সরকার গড়ার দাবিদার নন; কারণ তাদের মোট আসন ২৪০ মাত্র, এটাই সব কিছু স্বাক্ষ্য! আর দ্বিতীয় কথা, আরো যে ৩২-৩৫ আসন মোদিকে যোগাড় করতেই হবে (যার মধ্যে নাইডু-নীতিশ মিলে ২৮ আসন থাকবে তা ধরে নেয়া আছে); আর এছাড়াও ৭-১০ জন আরো এমপি লাগবে; সাথে স্টান্ড-বাই আরো কিছু এমপি লাগবে। মজার কথা হল, এতে সব খুচরা আসন পাওয়া দলই এখন অনেক দাম হাকাবে। সবচেয়ে বড় কথা অলক্ষ্যে কংগ্রেসের ইন্ডিয়া জোটও যদি এতে মোদির চেয়ে বেশী সংখ্যায় এমপি যোগাড় করতে পারে তবে মোদিও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বাদ যাবেন। তাঁর তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার শখ খতম! যদিও ভারতের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রী হবার প্রথম সুযোগ ও আহবান মোদিই পাবেন; কারণ তার দলের অবস্থান ২৪০ এমপি।
    এমনকি আগামি দশদিনের মধ্যে যদি মোদি আপাতত এমপি যোগাড়ে সফলও হয়ে যান তবুও পরের দুমাসের মধ্যে আবার ক্রাইসিস দেখা দেওয়া – সেটাও অসম্ভব নয়। মোদির যোগাড় করা এমপিগুলো আগামি দিনগুলোতে নিজেই ভেগে যাবে বা কংগ্রেস ভাগায়ে নিয়ে যাবে – এমন শঙ্কার মধ্যেই কাটবে! এককথায় নিয়মিত এক ভাঙ্গাগড়ার ভিতর দিয়ে দুর্বলভাবে খাড়া করা কোন সরকারই বারবার গঠন হতে থাকবে!  এজন্য শিরোনামে বলেছি কংগ্রেসও দাবিদার হয়েই থাকবে। এনিয়ে আরো একটু বিস্তারে যাব পরবর্তিতে এলেখার শেষের দিকে।

    তাহলে আগামিতে ভারতে কী হতে যাচ্ছেঃ এক.
    আপাতত পয়েন্ট দুইটা।
    ১। ভারতের মোদির হিন্দুত্ববাদ এখানেই আটকে গেল; আরও আগানোর সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। ভারত হিন্দুত্ববাদ মুক্ত হতে থাকবে এখন থেকে; অন্তত উচ্চারিত হবে না আর! এটাকে বলা যায় হিন্দুত্ববাদের দিন শেষ; এর শুরু হল এখন থেকে!
    ২।  প্রমাণিত হল, হিন্দুত্বের সুরসুরি দিয়ে মানুষের পেটের ক্ষুধা বা কাজ না পাওয়া বেকারত্ব-কে ঢাকা দিয়ে সাময়িক চলতে পারলেও শেষে মোদি ফেল করতই; সেটা এবারই ঘটে গেল!

    হিন্দুত্ববাদের দিন শেষঃ
    গতকালই কলকাতা থেকে প্রথম আলোতে লিখেছে, নীতিশ-নাইডুর হাতে এখন বিজেপির বাঁচা-মরা। এটা আসলে খুবই কম করে বলা। কেন?
    গতকাল থেকেই কলকাতার আনন্দবাজার একেবারে মমতার পক্ষ আঁকড়ে ধরা অবস্থান নিয়ে ফেলেছে। আর কোন এদিক-ওদিক তাকানোর অবস্থায় নাই এই পত্রিকা! আজকেও এরা এক মুল্যায়ন রিপোর্ট লিখেছে। নিচে দেখেন।

    “ভোটের ফলপ্রকাশের পর মঙ্গলের সন্ধ্যায় ‘জয় জগন্নাথ’ দিয়ে মঙ্গলবার বক্তৃতা শুরু করলেন নরেন্দ্র মোদী (ঘটনাচক্রে, এ বার ওড়িশায় বিপুল জয়
    পেয়েছে বিজেপি)। দেশে তৃতীয় বার এনডিএ কেন্দ্রে সরকার গড়ার জাদুসংখ্যা পেরিয়ে যাওয়ার পর মোদীর ৩৪ মিনিটের বক্তৃতায় এক বারও
    ‘জয় শ্রীরাম’ শোনা গেল না। রামমন্দিরের কথা বললেন যদিও। বিজেপি নয়, জোর দিলেন এনডিএ নামক জোটের উপর। তাঁর ভাষণে বার বার
    শোনা গেল এনডিএ-র কথা”।

    আনন্দবাজারের অবজারভেশন তাতপর্যপুর্ণ! মোদির মুখে আর ‘জয় শ্রীরাম’ শোনা গেল না, নাই।  জোর দিলেন বিজেপি নয়, জোর দিলেন এনডিএ নামক জোটের উপর। আর এই কথাগুলোই আমিও উপরে বলেছি। কেন এমন হচ্ছে? এককথায় কারণটা হল, মোদির এখনও আবার প্রধানমন্ত্রী হবার সুযোগ থাকলেও সেটা অবশ্যই হতে হবে এক কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী!! আর কোয়ালিশন সরকার মানেই হল, বিজেপির শ্লোগান ও কর্মসুচী বা দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে চলবে না। এরই এককথায় বলা অর্থ হল, মোদির হবু কোন কোয়ালিশন সরকারে হিন্দুত্ববাদের বয়ান, বক্তব্য শ্লোগান চলবে না। এটা বলাই বাহুল্য।  হিন্দুত্ব বা হিন্দুত্ববাদের দাগ বা গন্ধ মোদির কোয়ালিশন শরীক কোন দলই নিতে চাইবে না। কারণ, বিশেষত মোদির চেয়েও কংগ্রেসের থেকে কখনও বেশী দাম পেতে কখন কোন শরীক দলকে কংগ্রেসের জোটের দরজায় টোকা দিতে হয় তা কে জানে? তাই ছোট দলগুলোর কেউই আগাম নিজ দলের সম্ভাবনা নষ্ট করতে চাইবে না! তাি মোদি এসব নিজেই বুঝে, আগাম নিজেই ঠান্ডা পায়ে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছেন!!! এটা বেশ মজার না?
    কে ভেবেছিল যে খোদ মোদিকেই হিন্দুত্ববাদ বা জয় শ্রীরাম ত্যাগ করে একদিন এসবকেই এড়িয়ে চলতেই হবে!! এর চেয়ে বড় তামাসা আর কী হতে পারে??? যদিও এরপরেও কোন কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কোন নিশ্চয়তা মোদির হাতে নাই!

    দুই. পেটের ক্ষুধা বনাম হিন্দুত্বের সুরসুরিঃ
    এটা ঠিক যে উগ্র জাতিবাদ মানে যেটা খোলাখুলি নিজ জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদ এর কথা সগর্বে বলে। তাও আবার সেই উগ্র জাতিবাদ  (ভাষা, ভুগোল বা অন্যকিছু ভিত্তিক জাতিবাদ না হয়ে যেটা ধর্মীয় জাতিবাদ) যদি ধর্মভিত্তিক উগ্র জাতিবাদ হয় সেক্ষেত্রে এমন উগ্র জাতিবাদী অনুসারী মাত্রই এক কমন সমস্যার মুখে তাদের পড়তে দেখা যায়। সেটা হল ধর্মবোধ এমনই উচ্চে উঠে যায় যে তিনি নিজ শরীরের কথা ভুলে যান বা অস্বীকার করতে বসে যান। অথচ কোন রক্তমাংসের মানুষের পক্ষে কী নিজ শরীরের কথা চাহিদা ভুলে যাওয়া সম্ভব? মানে হল, মানুষ মাত্রই সে বৈষয়িক; মানে সে রক্ত-মাংসের শরীর, তার ক্ষুদা লাগে। আর এই নানা ধরণের শারীরিক ক্ষুধা এটা সারাদিন ধর্মবোধে ডুবে বুঁদ হয়ে থাকলেও কমবে না, ক্ষুদা পুরণ হবে না। এটাকেই বলে নিজ শরীরের চাহিদা বা ক্ষুধা অস্বীকার করে কারও স্পিরিচুয়াল  বা ধর্ম-ভক্ত হয়ে উঠার সুযোগ নাই!  মানুষ আগে শরীর টিকায়ে বেঁচে থাকতে পারলে এরপরই কেবল সে স্পিরিচুয়াল  বা ধর্ম-ভক্ত হয়ে উঠতে পারে! অর্থাৎ আগে শরীর (মানে চাকরি বা কাজ) পরে হিন্দুত্ববাদ!

    এখন এখানে এককথায় বললে, শাসক হিসাবে মোদি অযোগ্য কারণ তিনি গত দশ বছরে দেশে নুন্যতম সংখ্যায় কাজ সৃষ্টি করতে পারেন নাই; এমন কোন অর্থনীতি খাড়া করতে পারেন নাই।  [একই সমস্যা ছিল মোদির আগের কংগ্রেস কোয়ালিশনের (২০০৪-১৪) দশ বছরেও]। ফলে এবার নির্বাচনের আগে এমন বহু সাধারণ মানুষ বা পাশ করা বেকারদেরকে নিয়ে ছোট ইন্টারভিউ দেখেছি তারা বলছেন, মোদির হিন্দুত্ববাদ তাঁদের ভাল লাগে [হিন্দুত্বের  জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদের সুরসুরি যেহেতু]; কিন্তু একই নিশ্বাসে তিনি বলছেন তিনি বেকার; এটা তাঁর খারাপ বা অসহ্য লাগে।
    মোদির হিন্দুত্ববাদ যাদের ভাল লাগে, মোদির এমন সাপোর্টার সবাই এবার মোদিকে ছেড়ে যান নাই; যদিও গেছেন কেবল একটা অংশ। ফলা ফল তাই বলছে! কিন্তু তাতেই মোদির এমন ভরাডুবি! শারীরিক ক্ষুধা সবসময়ই এমনই ধর্মবোধেরও  উপরে আগে বা প্রায়োরিটিতে অবস্থান করে থাকে! এর আরেকটা প্রমাণ হল, এত ঢাকঢোল পিটিয়ে সুপ্রীম কোর্টকেই হাত করে রায় নিয়ে মোদি বাবরি মসজিদের উপর রামমন্দির নির্মাণ শেষ করলেন। ভেবেছিলেন এটা তাকে এবার ভোটে ব্যপক মাইলেজ দিবে; তিনি ভোটে অনেক আগিয়ে থাকবেন। অথচ ঘটেছে উলটা।
    এবার উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টি (কংগ্রেসের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে) যে মূল শ্লোগান দিয়েছে তা আসলে এটাই যে হিন্দু-মুসলমানের অমীমাংসেয় ক্যাচাল উস্কে ঝগড়া বিতর্ক কিংবা রামমন্দির নির্মাণ ইস্যু এসব পাশে রাখেন, আগে কাজ সৃষ্টি করেন – মানুষ ক্ষুধার্ত সেদিকের তাকান!  সেদিকটা নিয়ে সরকারী কর্মসুচী, প্রকল্প তৈরি করেন আগে। আর এটাই এই দলকে পপুলারিটি দিয়েছে। মোদি-যোগীকে ভেঙ্গে তছনছ করে দিয়েছে। উত্তরপ্রদেশের মোট আশি আসনের ৪৪ টাই নিজেরা পেয়েছে সমাজবাদী দলের জোট!
    ঠিক একই জিনিষ ঘটেছে মমতার পশ্চিমবঙ্গে। মুসলমান প্রধান আসনগুলোতে বিজেপির বিরুদ্ধে মমতার শ্লোগানও ছিল একই। বুঝা গেল ধর্মবোধ গুরুত্বপুর্ণ অবশ্যই, কিন্তু শারীরিক ক্ষুধা চাহিদা ভুলে সম্ভবত দশ বছরের বেশী সমাজের একটা বড় অংশ এভাবে চলতে পারে না! মোদির বা হিন্দুত্ববাদের হার হয়েছে এখানেই!

    তাহলে কী দাড়ালো?
    মূলকথাটা হল ভারতের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে – রাইজিং ইন্ডিয়া হতে – ইন্ডিয়া এখনও অনেক দূরে। এবারের নির্বাচন যেন এমনই এক ম্যাসেজ বা রায় চোখ আঙুল দিয়ে দেখাল।  গালগল্প তুলে আর এক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের চাপাবাজির দক্ষতা দিয়ে রাইজিং ইন্ডিয়া হওয়া যায় না। দেশে কাজ সৃষ্টি করতে হয়! টানা দশবছর হিন্দুত্ববাদের উত্থান দেখে যারা এতদিন এটাকেই ভারত শ্রেষ্ঠ, উগ্র হিটলারি হিন্দুত্ববাদী জাতিবাদই ভরসা আর এগুলোই ভারতের অর্থনীতি রাইজিং ইন্ডিয়াতে পৌছে যাবার লক্ষণ মনে করেছিল – তারাই সেই আম জনতাই আবার ফিরে গেল তাদের মনে পড়ল তারা ভুল আর মোহ এর মধ্যে আটকে গেছে। তাদের পেটে ক্ষুধা চিনচিন করছে!  কারণ তাদের কাজ নাই, অর্থনীতি নাই মানে কাজ নাই! এবার প্রায় ১৮০০ কোটি রুপী খরচ করে বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। এটা ‘ফৈজাবাদ’ কনষ্টিটুয়েন্সী যার নাম বদলে অযোধ্যা করা হয়েছে। এই কথিত অযোধ্যেতেই বিজেপি হেরে গেছে, ৪৮ হাজারেরও বেশী ভোটে সমাজবাদি পার্টির কাছে।

    এতে ভারতের আগামি পরিণতি কী হতেপারেঃ
    আমি আগে অনেকবারই বলেছি নেহেরুর হাতে ভারত এই রাষ্ট্রগঠন – এটাই মারাত্মক ত্রুটিপুর্ণ। কারণ, “কেন্দ্র নামে” এই ভুতুড়ে ক্ষমতা-প্রতিষ্ঠানের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখে ভারতরাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল। আসলে বৃটিশ আমলেও ভারত বলে একই প্রশাসনের শাসনের অধীনে চলা কোন ভুখন্ড বলতে কিছুই ছিল না। ছিল কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক হেড কোয়ার্টার। আর এই কোম্পানি হেড কোয়ার্টার এর অধীনে আলাদা আলাদা কিছু রাজ্য এবং এরই পাশাপাশি ৫৫০ এরও বেশী আলাদা আলাদা করদ রাজ্য। এমন রাজ্য-প্রদেশ বা করদ রাজ্য এরাও আবার কেউ কারো অধীনে শাসিত নয়। সবাই আলাদা আলাদা ভাবে  এক কোম্পানি হেড কোয়ার্টার এর অধীনে শাসিত! তাই এক ভারত বলে কিছুইর অস্তিত্ব ছিল না। তাই নেহেরু একেবারে গায়ের জোরে সবকিছুকে এক ভুতুড়ে কেন্দ্রের অধীনে করে একটা ভারতরাষ্ট্র গড়তে গেছিলেন। আর এটাই আজ কাল হয়েছে।  এতে সবচেয়ে খারাপ ও বিপদের কথা হল, এই কেন্দ্র জিনিষটা আসলে কী? এটা কেমন ধরণের রাষ্ট্রচিন্তা? তা কখনই আমল করা হয় নাই। একাদেমিকেরাও না, রাজনীতিবিদেরাও না। এমন না হবার পিছনের মূল কারণ হল কমিউনিজম বা সবরোগ-হর সমাজতন্ত্রী ধারণা;  আর সমাজতন্ত্রী মানে সমাজের এক অংশ অপর অংশের উপর দাবড় দিয়ে রেখে চলে থাকে; ফলে চলতেই হবে – এমন ঘোষিত এক একনায়কতান্ত্রিক ধারণা। বিপরীতে এখানে রিপাবলিক বা পাবলিক ধারণাটাই অনুপস্থিত। পাবলিকের ক্ষমতা, গণ বা নাগরিক অধিকার ধারণাটাই অনুপস্থিত। এমনকি আমেরিকা কেন ফেডারল রাষ্ট্র -এর অর্থ বৈশিষ্ট কী তাও ভারতের কেউ, নুন্যতম কোন একাদেমিশিয়ান বুঝতে গেছেন জানা যায় না।   সবাই বড় জোর বাচ্চাদের মত করে আধো আধো বোলে (কেন্দ্রিয় সরকার না বলে) উচ্চারণ করে ইউনিয়ন গভর্মেন্ট। অথচ রাষ্ট্রই বুঝে না!

    এক কথায় বললে ভারতের কোথাও কোনও কোণায় না রাজনীতিক পাড়ায় না একাদেমিক পাড়ায় – রাষ্ট্রচিন্তা ও এর অলিগলি নিয়ে কোন ধারণাই নাই। তাই আপনা থেকে ভারতরাষ্ট্রের এই আদি ও মৌলিক ত্রুটি কখনও কাটবে না। আসলে সেই ১৯৮৯ সালে রাজীব গান্ধীর শেষ আমল থেকেই এটা পরিস্কার হয়ে উঠেছিল, নেহেরুর তৈরি কেন্দ্রের নামে জবাব্দীহিতা হীন একটা কথিত কেন্দ্রের হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রিভুত করে রাখা ভারতরাষ্ট্র এর দিন শেষ হয়েছে। এতে হয়েছে যেটা সারা ভারত শাসন করতে গেলে প্রথম শর্ত হল সারা ভারতে স্থানীয় কমিটি সংগঠন আছে (এটাকে ভারতে সর্বভারতীয় দল বলা হয়) এমন একটা কেন্দ্রীয় দল থাকা। নেহেরু মারা যান ১৯৬৪ সালে, আর ১৯৮৯ সালে এসে রাজীবের হাতের কংগ্রেস বুঝে যায় যে তারা আর সর্বভারতীয় দল নয়। সম্ভবত রাজীব মারা (১৯৯১) যাবার আগেই বুঝে গেছিলেন এই সংকটের কথা। সেজন্যই কী তিনি বিজেপিকে একটা সুযোগ দিতে গেছিলেন? যেটা প্রথমে ১৯৮৯ সালের কাশ্মীরের নির্বাচনে কারচুপি করে কাশ্মীরের ইসলামি রাজনীতিকে ভোটের রাজনীতি থেকে সশস্ত্র পথে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন; পরে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গাকে কেন্দ্র করে বিজেপির উত্থানের রাস্তা খুলে গেছিল সেদিকে ঠেলে দিছিলেন? কিন্তু তাতেই মোদির দশবছরের শাসন শেষেও বলা যায় বিজেপিও সর্বভারতীয় দল হতেই পারে নাই। এরই সোজা সাপ্টা মানে হল, এখন এর এক মাত্র  বিকল্প হল কোয়ালিশন সরকার!

    মোদির এবারের হারের তাতপর্য- এক. কোয়ালিশন সরকারঃ
    রাজীব গান্ধীই ছিলেন শেষ স সরকারের শাসন। যেন সেটা টের পেয়েই বিজেপির জন্য রাস্তা খুলে দিছিলেন তিনি। আর আজ এর পরিণতি হল, মোদির এবারের হারের ভিতর দিয়ে শুধু মোদির এবারেরই নয় আগামিতেও ভার শাসিত হতে থাকবে এক কোয়ালিশন সরকারের মাধ্যমে। মানে বিজেপি বা কংগ্রেসকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের কোয়ালিশন।  এটাই আবার আস্ত আস্তে বিজেপি বা কংগ্রেস দল দুটো আরো ছোট হতে হতে সেগুলো প্রভাব হারিয়ে ভারতের রাজনীতি হয়ে যাবে আঞ্চলিক দলগুলোর দলগুলোর কয়েকটা স্থায়ী জোটের সরকার। এমন কয়েকটা আঞ্চলিক দলের আঞ্চলিক জোটের কথা ভেবেই বলেছিলাম এমন প্রধান তিনটা আঞ্চলিক দলের জোট হবে সম্ভবত। যেমন দক্ষিণ ভারতীয় জোট, উত্তর ভারতীয় জোট আর পুর্ব ভারতীয় জোট ইত্যাদি।

    মোদির এবারের হারের তাতপর্য- দুই. দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকারঃ
    দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার – এটাই হয়ে উঠবে বাকি সবকিছুকে ছাপিয়ে প্রধান বৈশিষ্ঠ। এটা এবার থেকেই শুরু হয়ে যাবে। যে৪মন উপরে দেখিয়েছিম কেন খোদ মোদিকে ইতোমধ্যেই হিন্দুত্ববাদ বা রামমন্দির এসব ইস্যু নিয়ে কথা নিজের পেটেই দাফন করে দিতে হবে। কারণ কোয়ালিশন সরকারে শরীকের মন যুগিয়ে চলতেই হবে।
    এছাড়া আরো কথা আছে। যেমন ইতোমধ্যেই গতকাল বিকালে ভারতের হিন্দি নিউজ চ্যানেলে উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ সৃষ্টির কথা শোনা গেছে। এতদিন এই ব্যাপারটা ছিল বড় জোর রাজ্য সরকারের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে। মানে শরীক দলকে মন যুগাতে উপ-মুখ্যমন্ত্রী পদ সৃষ্টি করে তাদের আসন দেয়া হয়েছে। কখনও সেটা আবার আরো দু-তিনটা উপ-মুখ্যমন্ত্রী দেখা গেছে। এবার সেই একই ভাবনা থেকেই সবচের‍্যে বেশী পিছলা শরীক বিহারের নীতিশকে উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ অফার করা হতে পারে। আর সেক্ষেত্রে হায়দ্রাবাদের নাইডু সাহেব কেন বাদ পড়বেন? সেক্ষেত্রে তিনিওও আরেক উপ-প্রধানমন্ত্রীর হকদার হয়ে যেতে পারেন।
    অনেকের কাছে ব্যাপারটায় ব্যাপক তামাসার দিক নজরে পড়লেও একটু সিরিয়াস দিকে যাওয়া যাক। এই উপ-প্রধানমন্ত্রী বানানোর যে অভিমুখ এর সোজা মানে হবে সেই কোয়ালিশন সরকার যেকোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এটা মতভেদে ডুবে থাকবে। এককথায়, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয় সেসব ইস্যুতে সে ব্যাপারে একেবারেই অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়ে যাবে।  তাই দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার এর খাঁড়া অর্থ হল সিদ্ধান্তহীনতার অকেজো সরকার!

    মোদির এবারের হারের তাতপর্য- তিন. ‘র’-এর মত প্রতিষ্ঠান দুর্বল ও অকেজো হতে থাকবেঃ
    অনেকে ব্যাপারটা খেয়াল করেছেন অথবা না। সামরিক বা ইল্টেলিজেন্স ধরণের প্রতিষ্ঠান; এগুলোর জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম এমন সরকার হতে হয়।  যেকোন সরকারী প্রতিষ্ঠানকেই কোন না কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে হতে হয়। আবার মন্ত্রণা লয়ের অধীনে চলে যাওয়া মানে দীর্ঘসুত্রিতা; কারণ মন্ত্রণালয় থেকে পরে আবার প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌছানি আর সিদ্ধান্ত ফাইনাল করা এটাই দীর্ঘসুত্রিতা। এজন্য ‘র’-এর মত প্রতিষ্ঠান এটা সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অধীনে সেটা একই সাথে হ্যা আবার না। আসলে দীর্ঘসুত্রিতা এড়াতে মাঝখানে কোন মন্ত্রী নাই ঠিকই কিন্তু অজিত দোভাল-কে উপদেষ্টা করে রাখা হয়েছে। তাঁর মাধ্যমেই এটা দ্রুত প্রধানমন্ত্রীকে জানানো বা অনুমোদনের ব্যাপারগুলো দ্রুত সেরে নেবার ব্যবস্থা সম্পন্ন। এটাই হল আদর্শ রূপ!

    কিন্তু সমস্যা হল যখন কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় থাকে বিশেষত যখন শরীক দলও অনেক প্রভাবশালী বা ওজনদার – মানে কথা না শুনলে সরকার ভেঙ্গে যেতে পারে এমন। সেক্ষেত্রে একই প্রধানমন্ত্রী কিন্তু কোয়ালিশন সরকারের বলে তিনি আগেই প্রতিজ্ঞা করেছেন পার্টনারের কাছে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও পার্টনার বা  উপ-প্রধানমন্ত্রীকে না জানিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিবেন না।

    এখন ধরা যাক, একটা আন্তরাষ্ট্রীয় অপহরণ ও গুমের কেস। অন্যদেশ থেকে এনে ভারতের কোন রাজ্যের সড়কে তাকে ফেলে রেখে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পরে ঐ শহরের এসপি গিয়ে সেটা উদ্ধার দেখানো হবে। এখন এতে র-কে জড়িত হতে হলে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন স্বাক্ষর লাগবে – অফিস বা বিজনেস অর্ডারে মনে করেন এভাবেই নির্দেশিকায় লেখা আছে। এখন সেই ফাইল প্রধানমন্ত্রীর অফিসে পড়ে আছে কিন্তু কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন নাই। কেন?
    কারণ, গতবার এমনই এক সিদ্ধান্তগ্রহণের বেলায় এক উপ-প্রধানমন্ত্রীকে রাজী করানো হয়েছিল এভাবে যে তিনিও একটা বিজনেস ডিলে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন চান। প্রধানমন্ত্রী সেটা দিতে রাজি হলেই তবেই তিনিও আগের সিদ্ধান্ত অনুমোদন দিতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে নানান প্যাচে আর ঝামেলায় পড়ে প্রধানমন্ত্রী নিজ প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেন নাই। কাজেই এখন র-এক্ষেত্রে এক-দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করলেও প্রধানমন্ত্রী তাদেরকে অনুমোদন দিবার অবস্থায় নাই!

    এতে ফলাফল কী হবে?
    ‘র’-এর মত প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল ও অকেজো হতে থাকবে। একদিক দিয়ে এটা ভাল হয়ত। যে র যেভাবে বেপরোয়া কানাডা-আমেরিকার মত দেশে গিয়ে গুম-খুন করে আসছে বীরদর্পে – সেগুলো ভারতে কোয়ালিশন ধরণের সরকারের কারনে সিদ্ধান্তহীনতায় দুর্বল ও অকেজো হতে থাকবে; এমন ততপরতা কমে আসবে।  অবশ্য অনেকে বলেন, এনিয়ে এক লেখা বইয়ে ভারতের অশোক রায়না এমনই ধারণা পোষণ করেছেন। 
    কিন্তু সাধারণভাবে যে কোন রাষ্ট্রস্বার্থ এমন হয় যেটা এমন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করতেই হয় যেমন অন্যদেশের জাশুশি-গোয়েন্দাগিরি ঠেকানো। সেক্ষেত্রে ঐ রাষ্ট্রের কোয়ালিশন সরকার রাষ্ট্র-কাঠামো ও এর ততপরতাকেই স্থবির করে দিতে পারে।

    এককথায় বললে, সিদ্ধান্তহীনতা যে কোন রাষ্ট্রের অস্তিত্বরক্ষার বা নরমাল ফাংশনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা। আর নিয়মিত কোয়ালিশন সরকার মানেই সিদ্ধান্তহীনতা।
    এজন্যই বলেছিলেম এভাবে চললে ভারত রাষ্ট্র এভাবে ক্রমশ স্থবির হতে থাকবে সম্ভবত তিনটা আঞ্চলিক রাজ্য জোটে বিভক্ত হয়েও টিকতে না পেরে।

    মোদির এবারের হারের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বড় তাতপর্য এটাই!

    আর সবশেষে বলাই বাহুল্য, ভারতে যতই দুর্বল আর কোয়ালিশন সরকার গঠিত হবে ততই সেই সরকার দুর্বল হয়ে পড়বে বাংলাদেশের উপর তার অযাচিত সব হস্তক্ষেপ, সব প্রভাব ও আধিপত্য ঘটানোর ক্ষেত্রে !! নিজ মাথার ঘাঁয়ে পাগল এমন সরকার বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সময় দিতে চাইবে না। এমনকি ভারতের কোটারি সমর্থন স্বার্থের ও সহায়তার উপরে দাঁড়ানো বাংলাদেশের যেকোন সরকারো দুর্বল হয়ে পড়বে!

     

     

     

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ      ২০২৪  রাত
    শেষ আপডেটঃ   জুন মে ২০২৪, সকাল 

  • জেনারেল আজিজের উপর আমেরিকান নয়া ‘পদক্ষেপ’ কেন?

    জেনারেল আজিজের উপর আমেরিকান নয়া ‘পদক্ষেপ’ কেন?

    গৌতম দাস
    ২১ মে ২০২৪
    https://wp.me/p1sCvy-5DG

     

    ছবি ডেইলি স্টার থেকে নেয়া 

     

     

    গতকাল দুপুর থেকেই খবরটা  ঢাকায় ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়ছিল যে সাবেক এক ‘বাংলাদেশ আর্মি চীফ’ জেনারেল আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে আমেরিকান অসন্তোষ বা এনিয়ে তাদের “নয়া পদক্ষেপ” এর খবর। আজ ডেইলিস্টার লিখেছে, “আমেরিকা আজিজ আহমেদ ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের উপর [“United States has imposed sanctions on former chief of Bangladesh Army Aziz Ahmed and his immediate family…”] স্যাংশন  দিয়েছে। এলেখায় বেশির ভাগ সময় জেনারেল আজিজকে নিয়ে আমেরিকান বিবৃতিকে  আমি “আমেরিকান পদক্ষেপ” বা শুধু “পদক্ষেপ” বলে চিহ্নিত করব। যদিও ডেইলি স্টার সহ অনেক মিডিয়াই এটাকে স্যাংশন আরোপ করা বলেছে। আর এর বিপরীতে আমেরিকান বিবৃতিতে স্যাংশন শব্দটা দেখিনি। তাই, এই বতর্ক থেকে দূরে থাকতে  একে “আমেরিকান পদক্ষেপ” বলব এখানে।

    “আমেরিকান পদক্ষেপ” বলতে শব্দে যাই থাক, বাংলাদেশে সামাজিকভাবে এক বড় খুশির প্রতিক্রিয়া হয়েছে দেখার মত। এতে লক্ষ্যণীয় যে,  বিগত দুবছরের সরকারবিরোধী আন্দোলনকালে যারা আমেরিকান সাপোর্ট ও সহায়তার ব্যাপারে গভীরভাবে বাইডেন-লু এর আমেরিকার উপর “রাজনৈতিক আস্থা” রেখেছিল; গভীর নির্ভরশীলতায় আপন বোধ করত প্রবল খুশির প্রতিক্রিয়া এসেছে মূলত তাদের থেকে।  কিন্তু এসব সত্বেও , সেসময়ে এরাই আবার বাধ্য হয়েছিল নির্বাচনের আগে যখন আমেরিকা  নিজেই নিজ কমিটমেন্টের উলটা ঘুরে গিয়ে বাংলাদেশকে ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল শুধু না, একেবারে “বিজয়ী” হাসিনার কোলে গিয়ে উঠেছিল; আর তা দেখে লজ্জায় মারা গিয়েছিল যারা মূলত তারাই এবার জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে আমেরিকান পদক্ষেপ দেখে আর নিজেদের চাপা কষ্ট বা প্রতারিতবোধের কষ্ট আর লুকিয়ে রাখতে পারে নাই। বাংলাদেশের এই “আমেরিকা সমর্থক গোষ্ঠি” লজ্জায় মরমে মরে গিয়েছিল, নির্বাচন ঘটে যাবার পর থেকে এতদিন পর্যন্ত। বিশেষ করে এখন বাইডেন-হাসিনা নাকি “কেমন জানি বন্ধু” যা নিয়ে আবার মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উচ্ছ্বাস জানিয়ে বিএনপিকে টিটকিরি দিয়ে কথা বলে চলেছে। এদিকে আমেরিকার ধারণা তারা একসাথে বাইডেন-হাসিনা ‘কী জানি’ [ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি] উতযাপনও শুরু করে দিয়েছিল ইত্যাদি!  তাই গত চার-পাঁচ মাস “আমেরিকা সমর্থক গোষ্ঠি”দের কেটেছে এসব নখড়া দেখতে দেখতে!  অতএব পালটা এবার এদের উচ্ছ্বাসের প্রতিক্রিয়াই ছিল আজ দেখার মত। যেন তারা বলতে চাচ্ছে – তাদের প্রিয় আমেরিকা অনেক সুইট – এরা বিট্রে করে না, ফেলে পালায় না ইত্যাদি। মানে যেন সিনেমার ডায়লগের ভাষায়,   উদ্ধার করতে ‘মেরা অর্জুন [এখানে আমেরিকা] জরুর আয়েগা”। কিন্তু আসলেই কী তাই? এটার মানে কী আমেরিকার ফিরে এসেছে?   আমেরিকা কী ফিরে এসে গেছে? বা আসবে?

    বলা বাহুল্য উচ্ছ্বসিত এই আমেরিকা সমর্থকেরা কঠোর সরকারবিরোধী; তারা সরকারের পতন দেখার জন্য উন্মুখ বহুদিন থেকেই জেনুইনলি। কিন্তু তারা সকলে কী তা এবার দেখতে পাবে?
    এনিয়ে আমার মন্তব্য ও পরামর্শ হবে – এখনও উচ্ছ্বসিত না হয়ে “ধীরে চলেন”। প্রচুর [if, not, but’] এসবের যদি, কিন্তু আছে সামনে; সেসব ব্যাপারে – আমেরিকা কী অবস্থান নেয় সুযোগ থাকে; পরিস্থিতি কতটা আমেরিকার ফেবারে থাকে বা আমেরিকা চায় তা এখনও অনিশ্চিত। আর সবচেয়ে বড় কথা আমেরিকা যাদের ভরসায় বা যাদের সমর্থন পেতে বা খুশি করতে চেয়ে বা লক্ষ্য করে এই “পদক্ষেপ ঘোষণা” নিয়ে থাকুক না কেন বাংলাদেশের সেই রাজনৈতিক অংশ কী আমেরিকাকে আগের মতই গ্রহণ করবে? এটাই এখন একেবারেই অনিশ্চিত। যেমন, মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়া দেখা যাক!

    আজ বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়াঃ
    আজকে বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, “আজিজ আহমেদের নিষেধাজ্ঞা আরেকটা বিভ্রান্ত করাঃ মির্জা ফখরুল”। এর সোজা মানে হল, আমেরিকা আগেও বিভ্রান্ত করেছে তাই আবার আরেকটা বিভ্রান্তি আনা বলেই দেখতে চাচ্ছে বিএনপি – আমেরিকান এই পদক্ষেপকে!  কেন তিনি এমনটা বললেন সেটা বুঝার চেষ্টা করতে পারেন আমেরিকা সমর্থকেরা। উচ্ছ্বসিত আমেরিকা সমর্থকদের মত করে, আলমগীর সাহেবেরও তো অন্তত ইতিবাচক মন্তব্য করার কথা! কিন্তু এই মন্তব্য অন্তত নেতিবাচক! কিন্তু সেটাই বা কেন?  এছাড়া আরেকটা কথাও তিনি ওখানে বলেছেন।  আলমগীর সাহেব বলছেন – “নিজের ঘরকে যদি নিজে সামলাতে না পারি, অন্য কেউ সামাল দেবে না। নিজের শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে হবে, নিজের শক্তি দিয়ে তাদের (আওয়ামী লীগ) পরাজিত করতে হবে”। এই বাক্যের মূল শব্দ নিজের শক্তিতে দাঁড়ানো, আমেরিকার না। এদিকটা মনোযোগ দিয়ে বুঝতে হবে।
    কাজেই আমার মন্তব্য ও পরামর্শ হবে – বাংলাদেশের “উচ্ছ্বসিত আমেরিকা সমর্থক”, আপনারা একেবারেই ধীরে চলেন; স্থির হয়ে নেন আগে! আর সমস্ত স্ব-সক্ষমতা  দিয়ে পরিস্থিতি বুঝতে ও ব্যাখ্যা পেতে চেষ্টা করেন সবার আগে। এর আগে কোন মুভ করলে ভুল হবে।

    এখন কেন এই আমেরিকান পদক্ষেপঃ  
    জবাবটা এবার এখানে খাড়া বলে ফেলি। ভারতের নির্বাচনে মোদি নাকি এবার হেরে যাবেন। আমেরিকান এই পদক্ষেপ এমন এই অনুমানের উপর নির্ভর করে নেয়া হয়েছে; যেটা এখনও ঘটে নাই। আগামি ৪ জুনে প্রকাশিতব্য ভারতের নির্বাচনী ফলাফলে মোদি হেরে গেছে – এটা আমেরিকাসহ আমরা সকলেই শুনতে পাব হয়ত। এই হল সেই অনুমান। সোজা কথা এটা এখনও ঘটে নাই; ঘটতেও পারে!

    তাই বলাই বাহুল্য যদি উলটা হয়। মানে মোদি যদি নিজেকে বিজয়ী বলে ঘোষণা দেখাতে পারেন তবে সেক্ষেত্রে বলাই বাহুল্য – “আমেরিকার পদক্ষেপের” এখানেই আপাতত ইতি হয়ে যাবে।
    তবে মির্জা ফকরুলের নেতি-প্রতিক্রিয়ার কারণ ভিন্ন। এর সাথে আমরা যেন আবার আমেরিকার ভাবনা বা অনুমানের সাথে সম্পর্কিত করে না দেখি; এটা সম্পর্কিত নয় তাই। সেটা বিএনপির নিজস্ব আলাদা কারণ।

    এখন আমার অনুমান হাসিনা বা মোদি সরকারও খুব নিশ্চিত নন যে আমেরিকা বা বাইডেন-লু ঠিক কী বুঝে এমন বেমাক্কা এক পদক্ষেপ হাঁকালেন?  বিবৃতির কাগজে আমেরিকা  “ডেজিগনেশন” [designation] এই শব্দটা ব্যবহার করেছে। মানে নামকরণে সাবেক জেনারেল আজিজকে অপরাধী বলে চিহ্নিত করে ফেললো।
    তবে আমি মন্ত্রী হাসান মাহমুদ যে কথা বলেছেন যে আমাদের সরকার জানত দুদিন আগে বাংলাদেশের আমেরিকার এমবেসিকে বাইডেন প্রশাসন জানিয়েছিল, এনিয়ে কিছু বলছি না।

    আরেকটা কথা, হাসান মাহমুদ যে কথা বলেছেন যে – এটা “ভিসা স্যাংশন নয়” – একথা কিন্তু সত্য [US sanction on Aziz not under visa policy: foreign minister]। বরং অরিজিনাল স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতিতেও স্যাংশন বলে কোন শব্দই নাই। এছাড়া আমেরিকার ঐ বিবৃতিতে আজিজ ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের  – আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ বা সম্পত্তি বায়োজাপ্ত ইত্যাদি কোন শব্দাবলীও নাই।

    কেবল একটাই শব্দ আছে “ডেজিগনেশন”। মানে, বাংলায় বললে “চিহ্নিত করা” ধরণের বা নামকরণ করা যেন। তাই বলছে, আমেরিকান প্রশাসন সাবেক জেনারেল আজিজকে দুর্নীতিবাজ যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধবংস বা বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছে। এই হলো অভিযোগ ও নামকরণ। একথা অবশ্যই বেশ ওজনদার!  কিন্তু সেজন্য আমেরিকার দিক থেকে শাস্তি কী বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ কী আরোপ করা হবে – এধরণের কোন বাক্য আর সেখানে নাই। তবে কোন আইনে এই ডেজিগনেশন এর একটা ধারা নম্বরউল্লেখ করা আছে; তা হল  [7031(c)] ।  হতে পারে ঐ ধারার বিস্তারে কোন শাস্তির কথা লেখা আছে। তবে আপাতত আমরা তা জানি না।

    তাই,  উপরে আমি লিখেছে, জেনারেল আজিজের উপর স্যাংশন আরোপ করা হয়েছে। হা বলেছি তবে নিজ বরাতে না। বলেছি ডেইলিস্টারের বরাতে। বিবৃতিতে স্যাংশন শব্দটাই নাই আগেই বলেছি; আমি গত রাতে পড়েছি। তাই ঢাকার মিডিয়ায় কীভাবে আসছে এমনকি হাসান মাহমুদ তিনিওও স্যাংশন আরোপ হয়েছে বলেছেন।

    তাহলে মূলকথাটা হল, আগামী ৪ জুন ভারতের নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের দিন। এদিন যদি মোদিই হেরে গেছেন বলে প্রকাশিত হয় তবেই আমেরিকান বিবৃতি আরো পাতা খুলে ফুলে-ফলে বিকশিত হয়ে উঠতে চাইবে। এবং সেক্ষেত্রে খুব দ্রুতই বহু বহু সব ঘটনা ঘটবে।   ইতোমধ্যেই অবশ্য ভারতে রাষ্ট্রক্ষমতার করিডোরে প্রবল আলোড়ন বয়ে যাচ্ছে যে মোদি এবার হারছেন। ভারতের যত জুয়ার আড্ডা আছে বড় বড় সব বিখ্যাত ডেরা সেখানে মোদি হেরে যাওয়ার পক্ষে বাজি ধরা জুয়ারি লোকের সংখ্যাই বেশী, রেটও হাই। এটা একটা খুবই তাতপর্যময় তথ্য! ইতোমধ্যে ভারতীয় শেয়ার বাজারও সব বিক্রি করে দাম ফেলে মানে আগে নিজ বিনিয়োগ বাচাও – এমন জোয়ার তুলেছিল আমরা দেখেছি।  আার অন্যদিকে, ভারতে ভোটপ্রদানের % যদি ৬০ এর নিচে যায় তবে মনে করা হয় এটা মোদির হারার লক্ষণ! সেটাও চারপর্বের পর থেকে দেখা যাচ্ছে!
    তবুও আমার শেষ কথা, এমন যত আলামতই দেখা যাক না কেন –  মোদির হাতে থাকা “ভোট বাক্সকে সফটওয়ার ম্যানিপুলেশনের সক্ষমতা” যদি অকার্যকর হয়ে থাকে তবেই একমাত্র তবেই, উপরে যা বলেছি তা সত্য হতেও পারে, নইলে মোদি নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করবেনই আগেরবারের মতই!!
    এবার এক বাক্যে বলি,  যদি মোদি হেরে যায় তবে সবচেয়ে কঠিন সঙ্কটে পড়বে হাসিনা সরকার! আর হবু সেটাই আমেরিকার পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য!
    নিচে আমেরিকান বিবৃতিটা সেঁটে দেয়া হলঃ

    Designation of Former Bangladesh Official for SIGNIFICANT Corruption:

    The U.S. Department of State announced today the public designation of former General Aziz Ahmed, previously Chief of the Bangladesh Army Staff, due to his involvement in significant corruption.  His actions have contributed to the undermining of Bangladesh’s democratic institutions and the public’s faith in public institutions and processes.

    Aziz Ahmed engaged in significant corruption by interfering in public processes while helping his brother evade accountability for criminal activity in Bangladesh.  Aziz also worked closely with his brother to ensure the improper awarding of military contracts and accepted bribes in exchange for government appointments for his personal benefit.

    This designation reaffirms the U.S. commitment to strengthening democratic institutions and rule of law in Bangladesh.  The United States supports anticorruption efforts in Bangladesh through assistance to make government services more transparent and affordable, improve the business and regulatory environment, and build capacity in investigating and prosecuting money laundering and other financial crimes.

    These public designations are made under Section 7031(c) of the annual Department of State, Foreign Operations, and Related Programs Appropriations Act.  This action renders Aziz and his immediate family members generally ineligible for entry into the United States.

     

     

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ    ২১ মে ২০২৪  রাত ১১ঃ ২৬
    শেষ আপডেটঃ   ২৩ মে ২০২৪, ভোর  ০৫ঃ ৪৬

  • ভারতের নির্বাচনী তামাসা ও আগামি দক্ষিণ এশিয়ার হবু চিত্র!

    ভারতের নির্বাচনী তামাসা ও আগামি দক্ষিণ এশিয়ার হবু চিত্র!
    গৌতম দাস
    ১৭ মে ২০২৪  সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫৪
    https://wp.me/p1sCvy-5Cc

     

       “ভারতের নির্বাচন কমিশনের ‘হাঁটু কি এখন দুর্বল’?”  – এটা গত ২০১৯ সালের ভারতের নির্বাচনের সময়ের বিবিসির রিপোর্ট। যা ভারতের নির্বাচনি তামাসা বুঝবার জন্য এখনও গুরুত্বপুর্ণ।

     

    ভারতের নির্বাচনী তামাসা!
    ভারতে এখন নির্বাচন চলছে। মানে সাতপর্বে ১৯ এপ্রিল থেকে ০১ জুন পর্যন্ত সাতটা আলাদা আলাদা দিনে বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মূলত মোট একই সিকিউরিটি ফোর্স বারবার কিন্তু নানান আসনে ব্যবহারের সুবিধা পাবার জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। নইলে, যেটা একই দিনে সব আসনে নির্বাচন হলে আসন প্রতি ফোর্সের সংখ্যা কমাতে হত, তা এখানে এড়ানো সম্ভব। আজ ১৭ মে ২০২৪;  মানে ইতোমধ্যে ভারতের চার পর্বেই নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেছে। এখন বাকি আছে ২০ মে, ২৫ মে আর ০১ জুনের নির্বাচন। মানে ০১ জুনেই সাত পর্বের নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে যাবে। এরপর দুদিন গ্যাপ দিয়ে ফলাফলের জন্য ৪ জুন সকাল থেকে সব ভোটের বাক্স নানা রাজ্যে একই দিনে একসাথে গণনা শুরু হবে। আর ঐদিনই দুপুর ১২ টার মধ্যে মিডিয়ায় বিশেষত টিভিগুলোতে কে কোথায় আগিয়ে আছে এই ট্রেন্ড [trend] বা অভিমুখ অনুমানের সুযোগ দর্শক-পাবলিকের কাছে এসে যাবে। যদিও সব ভোট গণনায় আরো সময় লাগবে। এরপর ঐদিনেই সন্ধ্যা সাতটার পর থেকে ক্রমশ আরো স্পষ্ট হতে থাকবে; ভোটের ফলাফলের আরো স্পষ্ট  অভিমুখ কোনদিকে। আর ঐদিনই রাত বারোটার মধ্যে অভিমুখ তো বটেই ফলাফলেও একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে কোন দলের জোট বিজয়ী হতে যাচ্ছে।  এই হলো এবারের ভারতের নির্বাচনি দিন-তারিখ!

    এবারের ভারতের নির্বাচন নিয়ে আমি  এপর্যন্ত এবারের হবু বা ইতোমধ্যেই ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী যা আসছে ও ঘটবে এসবের অর্থ তাতপর্য অথবা বিশ্লেষণ নিয়েও কিছুই লিখি নাই। তুলনায় গতবার মানে গত ২০১৯ সালের নির্বাচনের বেলায় সম্ভবত মোট আট / দশটা লেখা দিয়েছিলাম। তাহলে এবার দূরে আছি কেন?
    মূল কারণ, ২০১৯ সালে পুরা নির্বাচনের সময়ের ঘটনাবলীর খুবই কমই মনিটর করতে বাদ রেখেছিলাম। যেমন ভোটের আগের অন্তত তিনটা সার্ভে গ্রুপের সার্ভে সম্পর্কে স্টাডি ও ফলো করেছিলাম। যারা আবার একই সাথে  “বুথ ফেরত ভোটারদের” সাক্ষাতকার নিয়ে সার্ভে রিপোর্ট নিয়েও আমার স্টাডিতে অনেক সময় দিয়েছিলাম। শেষের দিকে ভারতের অনেক মিডিয়ার সাথে আমিও ধারণা দিচ্ছিলাম যে মোদির দল বিজেপি ও তাদের জোট[এনডিএ] সম্ভবত নির্বাচনের হেরে যাবে। কিন্তু না। মোদি-অমিত শাহের হাতে ভোটের বাক্স ম্যানিপুলেশনের [অবৈধ হাত ঢুকিয়ে ফলাফল উলটানো] ব্যবস্থা আছে। এবং তা খুবই সুনির্দিষ্ট করে ফল আনতে পারে এমন বা  যেখানে যতটুকু ফলাফল পালটানো দরকার তা করার ক্ষমতা সম্পন্ন। এদিকটা তখন আমল করা হয় নাই। তাই বিপত্তি। আর এবারও অনেক কিছুই পরিবর্তন হলেও মোদি-অমিত শাহের হাতে ভোটের বাক্স ম্যানিপুলেশনের ব্যবস্থা বহাল ও অটুট আছে বলেই জানি। তাই এবার দূরে থেকেছি লিখা থেকে যদিও, এবারেরও খবরাখবর রাখছি কিন্তু কিছু লিখি নাই।

    গতবারও এমন সব পর্বের নির্বাচনের পরে গণনার দিন শুরুর আগে এমন চারদিনের গ্যাপ ছিল। মনে করা হয় ঐ গ্যাপের দিনগুলোই মোদি-অমিতের চোখে এসব ম্যানিপুলেশনের উপযুক্ত সময় আর তা তখনই করা হয়ে থাকে বলে এপর্যন্ত যতটুকু জানা যায়। যেমন দেখেন, উপরে যে ছবিটা ব্যবহার করেছি সেটা ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিবিসির একটা রিপোর্ট থেকে নিয়েছি। যেখানে তখনকার শিরোনাম ছিল কত এগ্রেসিভ বা উদগ্র আক্রমানাত্মক! শিরোনাম লিখেছিল – “ভারতের নির্বাচন কমিশনের ‘হাঁটু কি এখন দুর্বল’!!!
    সেসময়ের অমিত শাহ যিনি এখন কেন্দ্র-সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (তখন তিনি কোন মন্ত্রীই ছিলেন না, কেবল ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক) তিনি তখন এক টিভি লাইভ শোতে এসে বলেছিলেন বিজেপি ৩০০ পার করবে। ভারতে সরকার গড়তে ২৭২+ আসনে বিজয়ী হতে হয়। তো ৩০০ পার মানে হল ৩০০ এর বেশী আসন পাবে। সত্যিই তাই ঘটেছিল। ২০১৯ সালে, একা বিজেপির মোট আসন পেয়ে হয়েছিল ৩০৩।  মোদি সেসময় মানে ঐ টিভি শো এর দিন কাশী (উত্তরপ্রদেশের খুবই গুরুত্বপুর্ণ হিন্দুদের এক তীর্থস্থান মনে করা হয়) থেকে ফিরেছেন। সেখানে নাকি তিনি কয়েকদিনের ধ্যানে বসেছিলেন!!! সেবারের নির্বাচনের শেষদিনের আগেই  মোদি কাশীতে গিয়ে ধ্যানে বসেছিলেন তাঁর হরেক রকমের রংঢঙ আর প্রপাগান্ডার অংশ হিসাবে। তাই সেই শো তে তিনি অমিত শাহের পাশে বসে থাকলেও বেশী কথা বলছিলেন না। তবে অমিত শাহের সেদিনের ঘোষণা ছিল যে তারা ৩০০ আসন পার করবেনই, এটা শোনার পর থেকে আমার মনে গভীরতম সন্দেহ শুরু হয়েছিল যে অমিত শাহের কথাই সম্ভবত সত্য হতে যাচ্ছে! আমি বোকা হয়ে যাচ্ছি!

    আগেই বলেছি অমিত শাহের কথা সত্য হয়েছিল; নিজ দলের আসন ছিল ৩০৩ আর সাথে বিজেপির নিজ জোট [NDA] এর আসন সহ মোট আসন হয়েছিল ৩৫৩। সেবারের মূলত এমন ম্যানুপুলেটেড বা হস্তক্ষেপ করা ফলাফলের কারণেই এবার ভারতের নির্বাচন নিয়ে কোন ধরণের লেখা লিখিই নাই। এড়িয়ে গিয়েছি। আর তাই এবার এটাই প্রথম লেখা। তাহলে আবার কেন ভোট পর্বের মাঝামাঝি সময়ে এখন লিখতে আসলাম?
    সেসব আরেক কাহিনী যা বাংলাদেশেও ছড়িয়েছে। ছড়িয়েছে কারণ এবার এক প্রবল অনুমান হল, মোদি এবার নির্বাচনে নাকি হেরে যাবেন। আর তাতে কংগ্রেসের রাহুল এন্ড গং মানে তাদের জোট ক্ষমতায় আসলে আমেরিকার সাথে তাদের বিশেষ সম্পর্কের সরকার হবে সেটা।  তাই বলাই বাহুল্য এর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের আয়ুসহ আনাচে কানাচে। সেকারণে এখন বাংলাদেশে যাই ঘটছে বা ঘটবে সেসকল ঘটনার সাথেও এইসব (মোদি হারবেন ধরণের) কল্পিত-অনুমিত ঘটানাবলীর মিল আছে কিনা সেই জল্পনা-কল্পনাও প্রবলে উঠেছে।

    যদিও এমন বহু ঘটনা – গুজব, আধা গুজব, আধা সত্যি  ইত্যাদি সবই কানে আসছে। তবুও ভারতের এবারের নির্বাচন নিয়ে আমার নিজ অবস্থান হল, মোদি-অমিত শাহের হাতে বাক্স ম্যানিপুলেশনের মেকানিজম নাই তা খর্ব বা অকেজো হয়ে গেছে একথা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত  শেষ বিচারে মোদির হারের কোন সম্ভাবনা (অন্তত আমার কাছে) নাই আর তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। যদিও এবার ইতোমধ্যেই এমনকি এখন ভারতের ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান -র- বলতে সেটা,  ‘মোদির র’ আর ‘কংগ্রেসি র’ বলেও ভাগের কথা উঠে গেছে, এমনটা সত্বেও!

    এমনিতে রাহুলের কংগ্রেস বা তাদের জোটের [I N D I A] পক্ষে বাইডেন প্রশাসন এবার দাঁড়িয়েছিল বেশ আগেই।  আর তাতেই  মোদিকে বিপুল অর্থদাতা ও তাঁর অবাধে খরচে উৎস যে আদানি গ্রুপ; আর এর বিরুদ্ধে বাইডেন প্রশাসনের লেগে পড়াতেই তাতে এই গ্রুপের শেয়ারে ধ্বস নামিয়ে দিয়েছিল, বলে মনে করা হয়। ওপেন সোসাইটি খ্যাত বা হেজ ফান্ড ব্যবসায়ী জর্জ সোরেস নিজেই [একালে বিভিন্ন দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমেরিকান হস্তক্ষেপের ধারা বজায় রাখতে যে অর্থের প্রয়োজন হয় তা যোগাতে আমেরিকা প্রশাসন আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে গেছে; তাই সেই অভাব পূরণে অর্থের চালান যোগাতে এখন সবচেয়ে বড় যোগান দাতা হয়েছে এই ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন নামের থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান। পুরানা সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙ্গে গেলে তা যে ১৫ রাষ্ট্র হয়েছিল এমন সব রাষ্ট্রেই আমেরিকান (এনজিও) হস্তক্ষেপ এর উসিলায় অর্থ ঢেলেছে এই প্রতিষ্ঠান। এটাকে তারা অরেঞ্জ রেভেলিউশন বলে ডেকে থাকে। ]
    বাইডেনের হয়ে ভারতে  আদানির বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিলেন জর্জ সোরেস; এক পাবলিক বক্তৃতা দিয়ে তিনি নিজে আদানির বিরুদ্ধে মার্কেট তাতিয়ে  ছিলেন। কিন্তু এতকিছু করে বাইডেন প্রশাসন আগিয়েও মাঝে হঠাত কংগ্রেসী রাহুলদের সব ততপরতায় ভাটা দেখতে পাই আমরা। রাহুলের জোটও অসংলগ্ন বা আভ্যন্তরীণ দ্বিধায় শ্লথ হতেই দেখেছিলাম। কিন্তু এবার ডোনাল্ড লু এর সফর [তিনি এমাসে বাংলাদেশে আসার আগে ভারত পরে শ্রীলঙ্কা সফর করে এসেছিলেন।] যেটা  বাইডেন প্রশাসনেরও ভাটা বা শেষ সময়ে সফর এটা; এবার তাঁর রুট ছিল ইন্ডিয়া-শ্রীলংকা হয়ে বাংলাদেশ।  আর লু এর এবারের ভারত সফরের পরে আমরা দেখি যে ‘ইন্ডিয়া’ জোটে সরব বা চাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। ওদিকে ভোট প্রদান চতুর্থ পর্বে এসে অবজারভেশন বলছে, ভোটপ্রদানের হার নিম্নমুখি। আর ভারতের ভোট বিশ্লেষকেরা একমত যে  মোট ভোটপ্রদানের নিম্নহার (%) মানে তা মোদির ভোট  কম  হবার লক্ষণ।  আবার ওদিকে ইরানের সাথে মিলে চাবাহার [Chābahār ] সমুদ্র বন্দর চালু ও ব্যবহারের ততপরতা শুরু করেছে ভারত বহুদিন এই প্রকল্প পরিত্যক্ত থাকার পরে। যদিও আবার ততপর হওয়াতে বাইডেন প্রশাসন ভারতকে থ্রেট করেছে, নিষেধাজ্ঞা বা ব্যবস্থা নিবার হুমকি দিয়েছে।
    ইত্যাদি এসব কিছু নতুন সব ঘটনাবলীতে মুল ঘটনা হয়ে উঠে আসছে বাইডেন প্রশাসন ও কংগ্রেসের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা অনেকদূর আগিয়ে গিয়েছে। আর তা থেকেই নিট ফলাফল হল, মোদির এবার হেরে যাওয়ার আলাপ, সম্ভাবনা বা গুজব উঠে আসছে তা বলা যায়। এককথায় বললে, বাইডেন প্রশাসনের কাছে, চলতি নির্বাচনে এক প্রো -আমেরিকান নয়া সরকার দেখতে চাওয়া হল তাদের প্রায়োরিটি। এই আকাঙ্খাটা খুব একটা কোথাও লুকানো ঠিক তা নয়। বরং কোথাও কোথাও এনিয়ে গভীর সব পরবর্তি পরিকল্পনা করতে বসে গেছে সংশ্লিষ্ট অনেকেই।  এমনকি তাতে কথিতভাবে মোদি আর অমিত শাহের মধ্যে গভীর দ্বন্দ্বের কথাও আবিস্কার করে রেখেছে অনেকে। অথচ এরা জানেনা মোদি-অমিত এরা দুজন ‘হরি আর হর এর মত’ হরিহরাত্মা!
    আর এই মিলিত-আত্মার জন্ম হয়েছিল ২০০২ সালে গুজরাত কিলিং  বা মুসলমান নিধনের কালে যখন গুজরাটি মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মোদি আর তাঁর ডানহাত ছিল এই অমিত শাহ, যিনি ছিলেন আবার ঐ মোদির রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! এই যুগল একসাথে আরএসএস-কে হাত করে, প্রভাবিত করে বিজেপি থেকে – লাল কৃষ্ণ আদভানি এবং অন্য দু’জন নেতা মুরলী মনোহর যোশি ও উমা ভারতী (এরা তিনজন হলেন আদালতের খাতায় বাবরি মসজিদ ভাঙার মূল আসামি) সহ অন্যান্য সব বুড়াদেরকে বয়সের অজুহাত তুলে দলের সব কমিটি থেকে বিদায় করে দিয়েছিল!  এরপর গত দশবছর ভারতের ক্ষমতায় থেকে তারা যা যা করেছে তা কেবলমাত্র এদুই জনের আজীবনের প্লান ও খায়েস বলে মনে করা হয়। এদের মাঝে আর কেউ নাই। তবে লিডার কেবল মোদিই। কাজেই যারা মোদি- অমিতের বিচ্ছেদ বা দ্বন্দ্বের কথার গল্প ছড়াচ্ছেন এই বিচারে তারা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এখনও শিশু!
    এছাড়াও, সবকথার শেখ কথা হল, মোদি-অমিতের হাতে যতক্ষণ ভোটবাক্স ম্যানিপুলেশনের সক্ষমতা আছে ততক্ষণ সব জল্পনা-কল্পনা অনুমান লু-তত্ব সবই ভুয়া আর অকেজো বলে হাজির হবেই বলে আমার ধারণা। মোদি আবার বিজয়ী হবেনই, সম্ভবত এভাবেই। এপ্রসঙ্গ আরেকটু কথায় শের দিকে আবার আসব। এর আগে উপরের কথা শেষ করে নেই।

     

    সফটওয়ার ভিত্তিক বাক্স ম্যানিপুলেশনঃ
    ততদিনে কানে আসছিল অন্য আরেক দিকের তথ্য, (দেশি-বিদেশি) ইন্টেলিজেন্স ইনফরমেশন যে মোদি ভোটের বাক্স বা ইভিএম বাক্স ম্যানিপুলেট (বাইরে থেকে প্রোগ্রামিং ব্যবহার করে ফল গণনা শুরুর আগেই হবু ফলাফল উলটে রাখা) করার সফটওয়ার সংগ্রহ করেছেন। অনুমান করা হয়ে থাকে এটা জুয়ারি শহর ম্যাকাও [Macao] আর- উত্তরকোরিয়া ভিত্তিক সফটওয়ার গ্রুপ যারা সাহায্য করছে বা করে চলেছে। অনেকে এমনকি এটাও মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ হ্যাকিংয়েও এই গ্রুপের কেউ কেউ টেকনিক্যাল কাজ ও দিকে এসব অর্থে ও সুত্রে জড়িত ছিল। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটা হল, এদিকটা নিয়ে মানে ভারতের নির্বাচনে ভোটের বাক্সের স্বচ্ছতা রাখা নিয়ে যত আবেদন  বা দাবি এপর্যন্ত তোলা হয়েছে এর সবই হয় ভারতের নির্বাচন কমিশন নিজে বা সুপ্রীম কোর্ট – এরা সেসব নাকচ করে ফেলে রেখেছে। কখনও সুপ্রীম কোর্ট বলেছে এটা কমিশনের কাজের উপর হস্তক্ষেপ হবে তাই তারা কিছু করবে না; আবার কখনও  (নির্বাচন) কমিশনের  কাছে মামলা ফেরত পাঠিয়ে হাত ধুয়ে ফেলেছে। আর নির্বাচন কমিশন বেশির ভাগ সময় যেকোন পাবলিকের আবেদনের ক্ষেত্রে জবাবই দেয় নাই বা নাকচ করে ফেলে রেখেছে। এনিয়ে আমার অন্তত তিনটা পুরানা লেখায় এসব নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছি। বেশিরভাগ সময় ফেরত পাঠানোর যুক্তিতে বলা হয়েছে যে এতে নির্বাচন ব্যবস্থা ফলাফল দিতে দেরি করবে বা ম্যানুয়াল ভোটের মত হয়ে যাবে তাই এতে হাত দেয়া যাবে না। অর্থাৎ যেন স্বচ্ছ নির্বাচন করা এটা প্রধান বিবেচনা নয়; এর বদলে অস্বচ্ছ ও কারচুপির সুযোগ রেখে দেওয়া আর এভাবেই তাড়াতাড়ি ফল আসার নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তোলাটাই আদালত ও কমিশনের কাছে লক্ষ্য!
    মজার কথা হল, এই অবস্থা সত্বেও কয়েকমাস আগে ভারতের প্রধান বিচারপতি বাংলাদেশে এসেছিলেন আমাদেরকে সবক শিখাতে যে ভারতের বা কোন দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায়  সুপ্রীম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের ভুমিকা কতই না মহান ও পবিত্র! আগ্রহিরা দেখতে পারেন এনিয়ে আমার পুরানা লেখা।

    যেটা অনুমান করা যায় সারকথায়,  মোদির তৈরি এটা একটা বিরাট র‍্যাকেট; অর্থ ও নানান ব্যক্তিগত সুবিধার আয়োজন ঘটিয়ে এই সিস্টেমটা দাঁড় করানো হয়েছে মোদি আর অমিত শাহের জুটিতে।  এবং ততই খোলাখুলি তাদের কাজের ধরণ। যেমন ২০১৯ সালের নির্বাচনে আইনভঙ্গের জন্য অনেক প্রার্থীকে সতর্ক করে ফাইন বা শাস্তি দিয়েছিল কমিশন। কিন্তু মোদির নামে বহু অভিযোগ জমা পড়লেও বা স্থানীয় নির্বাচনী কমিশন কর্তারা একশনের অনুমতি চাইলেও কমিশনারেরা তাতে অনুমতি দেয় নাই। অর্থাৎ প্রার্থী মোদি বিরুদ্ধে নির্বাচনি আইন ভঙ্গের সব অভিযোগই ব্যবস্থাহীন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থেকেছিল সেবার।  ভারতের নির্বাচন কমিশন প্রধান-সহ তিন সদস্য বিশিষ্ট। এটা সব সময় তাদের দুই-এক ভোটে এমন সিদ্ধান্ত দিয়েছিল সেসময়। আর তৃতীয় সদস্য অশোক লাভাসা, তাঁর আপত্তি ভোট সবসময় সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখিয়ে উপেক্ষা করা হয়েছে। সেই নির্বাচন শেষে কয়েক বছরের মধ্যে শেষে অশোক লাভাসাকে কমিশন ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। আপোষ করে তিনি এখন ম্যানিলায় বিশ্বব্যাংক সমতুল্য এডিবি-তে ভারত সরকারের প্রতিনিধি হয়ে লটকে আছেন। মানে নির্বাচন কমিশন থেকে তাঁকে বের করে দেয়া হয়েছে কায়দা করে।
    এমনকি এখনকার যে নির্বাচন কমিশন তা এবারের নির্বাচনী তারিখ ঘোষণার আগের সপ্তাহেও হয়ে পড়েছিল, এক সদস্য বিশিষ্ট; মানে কেবল প্রধান কমিশনার বিশিষ্ট। কারণ, আভ্যন্তরীণ আয়োজনে মোদি বাকি দুজনের পদত্যাগ করায়ছেন যাতে মোদি নয়া দুজন নতুন পছন্দের কমিশনার নিতে পারেন। তাই-ই হয়েছিল। আর এরপর তিন-সদস্য বিশিষ্ট হয়েই দুদিন পরে ঐ কমিশন এবারের নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করেছিল। আমাদের দুদকের মত তথাকথিত এমন নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান মোদির হাতে অনেকগুলো। যেমন সিবিআই [Central Bureau of Investigation], ইডি[Enforcement Directorate] ,  এনআইএ [National Investigation Agency], আইবি [Intelligence Bureau (India]; এছাড়া আয়কর বিভাগ আছে। আর এর বাইরে যে আর কত এমন প্রতিষ্ঠান আছে অগুনতি। কিন্তু সারকথা হল, বিভিন্ন রাজ্যের বিরোধীদলের বিরুদ্ধে মোদি্র এদের লাগিয়ে দেয়া, হয়রানি করা, বিজেপির সাথে আপোষে আসতে বাধ্য করাই এদের মুল লক্ষ্য হয়ে আছে মোদির ইচ্ছায়। এসবই মূলত পলিটিক্যাল স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহার।
    আর এর বাইরে গত পাঁচ বছরে ধরে চলেছে মোদির আরেক মারাত্মক ব্যবস্থা। এর আনুষ্ঠানিক নাম ইলেকটোরাল বন্ড [electoral bonds] স্কিম। সরকারী ব্যাংক স্টেট ব্যাংক [SBI] থেকে এটা কেবল যেন বিজেপি-কে চাঁদা আদায়ের এ’এক আজিব ব্যবস্থা। এই ব্যাংক আসলে বড় ব্যবসায়ীদেরকে এই বন্ড বিক্রি করে থাকে; কিন্তু কে কিনল সে পরিচয় পাবলিকলি দেখায় না। আর বিজেপি সরকার উপরে যে দুদক সমতুল্য প্রতিষ্ঠানের কিছু নাম দেখালাম, এদেরকে দিয়ে হয়রানির ভয় দেখিয়ে ঐ ব্যাংকে চাঁদা জমা করে আসতে মানে বন্ড কিনতে বাধ্য করে থাকে। এখাতে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুসারে প্রায় একমাত্র সুবিধাভোগী হল বিজেপি। আর মোট এমন বন্ডের পরিমাণ ১২ হাজার কোটি রুপীরও বেশী। গত ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে থেকে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। এটা পাঁচ বছর লুটপাট করতে দিবার পরে এবার নির্বাচনের আগে সুপ্রীম কোর্ট বীর হয়ে উঠেছিল। তারা ওসব চাঁদাদাতা সবার নামের তালিকা চলতি নির্বাচনের কয়েকদিন আগেই একদিনের মধ্যে  প্রকাশ করতে “স্টেট ব্যাংক-কে পালনীয় বাধ্যতামূলক” বলে নোটিফাই করেছিল। আর তাতেই সব নাম বের হয়ে আসে। অথচ পাঁচ বছর আগেই একাজ তারা করতে পারত।
    সবচেয়ে বড় কথা উপরে যেসব ইনভেস্টিগেশন প্রতিষ্ঠানের অল্পকিছু তালিকা দিয়েছি সেগুলো অপব্যবহার করেই বিজেপি সব বিরোধীদল আর ব্যবসায়ীদেরকে সাইজ করে গেছে যাচ্ছে। অথচ না সুপ্রীম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন এদিকে তাকায়-ই নাই। এটাই মূলত মোদির নামে এখন ফ্যাসিজমের অভিযোগ তুলেঅনেককে আগিয়ে আসতে দেখছি। কিন্তু এমন অভিযোগ তোলার ক্ষমতা এখনও যেন তাদের দেশের বাইরে – বাইডেন প্রশাসনের হাতে! এমনই দুর্দশা!

    আর এমন মোদি-ব্যবস্থার মধ্যেই আবার এবারের নির্বাচন হচ্ছে! আর কোর্ট বা কমিশন এব্যাপারে নির্বিকার! দেখেন এটা কমবেশি এখন সবাই জানে যে সরাসরি মুসলমানবিদ্বেষ করে ঘৃণা জাগিয়ে মোদি ভোটের প্রপাগান্ডা পরিচালনা চালিয়ে যাচ্ছে! অথচ এটা ঠেকানোই ছিল কোর্ট এবং কমিশন   এর মুখ্য দায়ীত্ব! কিন্তু এরা নির্বিকার! এটাই প্রমান করে ভারত কোন চুলায় মাথা লুকায়েছে! অথচ সমাজ অসহায়! এমনকি মোদিকে ফ্যাসিবাদ বলতেও যেন সাহস করছে না!

    এখন দুইটা শেষ কথাঃ
    অনেকাংশেই কথাগুলো বলব ভারত-ইরানের চাবাহার পোর্ট কে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি ইরান-ভারত চুক্তি হয়েছে। আর তাতে পোর্ট পরিচালনা ভারতকে দেয়া হয়েছে। আর তাতেই আমেরিকা ভারতকে কড়া স্যাংশনের হুশিয়ারি দিয়েছে।

    ১। এই নির্বাচনে মোদি ফিরে জিতুক কিংবা বিরোধি কোয়ালিশন জিতুক – একটা মূল কথা হল, ভারত ক্রমশ আমেরিকা থেকে দূরে যেতে থাকবে।  মানে ততই ভারত একেবারে চীনের কোলে উঠে না গেলেও অন্তত নিউট্রাল বা একধরণের গভীর ব্যবসায়িক সম্পর্ক করতে অনেক ধাপ আগিয়ে যাবে। এককথায় বললে, চীন-ভারত উভয়ের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ বিষয়ক দুরত্বটা ফিকে হতে থাকবে। আর ব্যবসায়িক স্বার্থ ততই ওর জায়গা নিবে।
    বাংলাদেশের গত কথিত নির্বাচনের কয়েকদিন আগে আমি লিখেছিলাম আমেরিকা আমাদেরকে রাস্তায় ফেলে চলে গেলে তা এশিয়া থেকেই আমেরিকার বিদায়ের সুত্রপাত ঘটবে। এখানে সেই কথাটাই বলছি তবে আরেক ভাবে আরেক দিক থেকে। এবার মোদি ক্ষমতায় নিজেকে বিজয়ী দাবি করে টিকে গেলে ইন্ডিয়া-আমেরিকার সম্পর্কের পতন ও পারস্পরিক দুরত্ব ঘটবে খুবই দ্রুত। আর যদি কংগ্রেস এন্ড গং জিততে পারে তবে সাময়িক এই নয়া সরকার আমেরিকা-ঘনিষ্ট বলে নিজেদের দেখানো শুরু করবে। কিন্তু সেটা হবে সাময়িক ক্ষীণ আয়ুর এক ঘটনা। মানে জমবে না। অচিরেই একেবারে সাধারণ ব্যাবসায়িক স্বার্থের বিরোধ বাধা হবে।
    যেমন ধরা যাক, ভারত-ইরানের চাবাহার পোট [Chabahar Port ]। এটা এদুই দেশের জন্যই গুরুত্বপুর্ণ , তবু ভারতের জন্য বেশী।  পাকিস্তানের গোয়াদর গভীর সমুদ্র বন্দর ভারত পুরানা ক্যাচালের কারণে ব্যবহার করতে পারবে না। এর মানে হল, সেন্ট্রাল এশিয়া বা আফগানিস্তানে (ল্যান্ডলক দেশ) পণ্য পাঠাতে অসুবিধায় পড়তে হবে। অথচ ঐ রুটে শুধু গোয়াদরের সুবিধা না। আর গোয়াদর ব্যবহার করতে পারলে এরপর ওদিকে চীনের বেল্ট-রোধ ধরে একদিকে একেবারে ইউরোপ পর্যন্ত ট্রেন বা সড়ক পথে পরিবহনের যে সুবিধা; অন্যদিকে ইরান থেকে পুবে সেন্ট্রাল এশিয়া আফগানিস্থান যে সড়ক ও রেল সুবিধা তৈরি হয়েছে তা থেকে ভারত বঞ্চিত হয়ে আছে।  এসব কিছুরই অন্তত এক ছোট বিকল্প হলেও চাবাহার ভারতের জন্য এক ভাল বিকল্প ও বাস্তবতা।
    কিন্তু আমেরিকা ইরানের সাথে কোন সম্পর্কই রাখা যাবে না কেউ রাখলে তার উপর স্যাংশন দেয়া হবে – এই হুশিয়ারিই আমেরিকার এশিয়া থেকে বিদায় হয়ে যাবার পথেই তাকে কয়েক ধাপ ঠেলে দিবে। কারণ, ভারতে মোদি অথবা রাহুল যাদের সরকারই আসুক কারোই চাবাহারের পক্ষে না থাকার বিকল্প নাই। কারণ, এটা ভারতের জন্য বিরাট এক বাণিজ্যিক সুযোগ। কাজেই আমেরিকা বিরোধিতার পথেই ভারতকে যেতে হবে।

    আবার সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ  আরেকদিকের কথা বলিঃ
    ইরানের ভারতকে দেয়া এই অফার – এবিষয়ে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি এতে চীনের সম্মতি আছে। আর আছে বলেই ইরান সহজেই এতদুর আগিয়ে পোর্ট পরিচালনার ভার ভারতকে দিয়ে দিয়েছে। যেখানে আমেরিকান সুবিধা খেতে ট্রাম্পের আমলে ভারত ইরানের হাত ছেড়ে পালিয়েছিল। সেসময় ইরান তেল ভারতে পৌছে দিতে চেয়েছিল তাও ভারত ইরানের তেল কিনতে রাজি হয় নাই। বরং রাজি না হয়ে এই সিদ্ধান্তকে বিক্রি করে আমেরিকার থেকে সুবিধা নিয়েছিল। সেই থেকে চাবাহার প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে গেছিল। কিন্তু প্রতিশোধ ভুলে এখন ইরানের আবার আগানো এটা চীনের আগ্রহ ও প্ররোচনাতেই বলে অনুমেয়। চীনের ক্যালকুলেশন পাকা যে ইরান এই সুবিধা দিলেই ভারতের আমেরিকার বিরোধিতা বাস্তবতা হয়ে উঠবে।  আর সেটা দেখতেই ইরানকে দিয়ে এই অফার। বাণিজ্যিক দিক থেকে এতে ইরানেরও তো ক্ষতি নাই।
    আবার এ’ঘটানার মাধ্যমে চীন ভারতের কাছে ম্যাসেজ দিয়েছে যে ভারতেরও বাণিজ্য সুবিধা কার্টেল / ছেটে ছোট করা চীনের নীতি নয়, তাতে চীন-ভারত যতই বিরোধ থাকুক। আসলে চীন ভারতকে বলতে চায় ভারতও গোয়াদর ডিপ পোর্ট হয়ে বেল্ট-রোড ধরে সেন্ট্রাল এশিয়া বা আফগানিস্থানে বা অন্যদিকে, ইউরোপ পর্যন্ত চীনা বেল্ট-রোডের রেল ও সড়ক ফেসিলিটিজও ব্যবহার করতে পারে। চীন এনিয়ে বাধা তৈরির বদলে পজিটিভলি আহবান জানাচ্ছে। ভারতের অর্থনীতি বিকাশে চীনের ক্ষতি নাই, লাভ আছে। এছাড়া সবচেয়ে বড় লাভ দক্ষিণ এশিয়া থেকে আমেরিকাকে আউট করা হবে তাতে। কারণ, আমেরিকা ভারতে পা রাখতে সুযোগ পায় বলেই বার্মা, বাংলাদেশের মত দেশে যা খুশি করার চেষ্টা করে থাকে।
    এখন মোদি ক্ষমতায় ফিরলে আমেরিকা-ভারতের সম্পর্কের ইতি দ্রুত ঘটবে। আর আমেরিকা ভারতের উপর স্যাংশন দিলে তাতে ভারতও দ্বন্দ্ব ভুলে বাধ্য হয়ে ডলার ফেলে ইউয়ানে বাণিজ্য শুরু করে দিবে।  আবার যদি কংগ্রেস কোয়ালিশন ক্ষমতায় আসে তাহলেও এটাই ঘটবে। হয়ত শুরুর এক বড় জোর দুই বছর একটু আমেরিকান-ভারত (কংগ্রেস) ঘষাঘষি জারি থাকবে। আর ক্রমশ সেটা ভারতের বাণিজ্য স্বার্থেই হবু কংগ্রেস সরকারও একই পথ ধরবে। খুব সম্ভবত সেক্ষেত্রে মোদির চেয়ে দ্রুতই কংগ্রেস চীনের কোলে গিয়ে উঠার সুযোগ নিতে চাইবে।

    ২। মোদি যদি ক্ষমতায় ফিরতে পারেনঃ
    সেক্ষেত্রে এটা চরম দানব এক মোদি হবে। বিরোধী বলে কারো অস্তিত্ব নিয়ে টিকাই মুশকিল হয়ে যাবে। ইতোমধ্যেই কানাঘুষা তিনি ভারতের কনষ্টিটিউশনেও হাত দিবেন।  এই ধারা যতই তীব্র হবে হিন্দুত্ববাদী – এই উগ্র জাতিবাদি মোদির ভারত ততই পরিণতিতে বিচ্ছিন্নতা বাদের মুখোমুখি হবে। আর তা ঘটে গেলে ভারত মেজর তিন টুকরা হবে। মোদি এখন ক্ষমতায় টিকে আছে ভারতরাষ্ট্র গঠনগত দিক থেকে এক সেন্ট্রালাইজড কুক্ষিগত ক্ষমতার আর এর উপর আবার উগ্র হিন্দু-জাতিবাদি রাষ্ট্র বলে। আবার এটাই আবার মোদির আগামিতে ক্ষমতায় উত্থান ঘটলে এই গঠন বৈশিষ্টই মোদির ভারতকে ভাঙ্গনের দিকে নিয়ে যাবে দ্রুত!

    সব মিলিয়ে ভারতের প্রতিটা পরিবর্তনের ধাক্কা চাপ (এমনকি শরণার্থীর) বাংলাদেশে এসে আছড়ে পড়তে পারে সেক্ষেত্রে! বাকি যা কিছু পাঠক আন্দাজ করে নিয়েন। এই হল, আগামি দিনের দক্ষিণ এশিয়ার কিছু বিচ্ছিন্ন চিত্র!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ    ১৭ মে ২০২৪  সন্ধ্যা ০৭ঃ ১৮
    শেষ আপডেটঃ   ২৪ মে ২০২৪  বিকাল ০৩ঃ ৫৫

  • হাসিনা কি ভারতের চাপে ভুল পথ ধরতে আগাচ্ছেন

    হাসিনা কি ভারতের চাপে ভুল পথ ধরতে আগাচ্ছেন
    গৌতম দাস
    ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪  সন্ধ্যা ১৮ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-5la

     

     

    হাসিনা সম্ভবত  ভুল করতেছেন। ভুল পথে ধরতে যাচ্ছেন।  আর এতে চীনের থেকে “বাজেট সহায়তা” বলে নগদ ডলারে, প্রায় দুই ডিজিটের ঋণ আনা বোধহয় তাঁর হাত ছুটে যাবে! আর তাতে সব মিলিয়ে মানে কি দাঁড়াবে? বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে ভাঙ্গা অর্থনীতি! যা ক্রমশ আমাদেরকে দুর্ভিক্ষদের দিকে নিবে? আর আমরা তা দাঁড়ায় দাঁড়ায় দেখব?

    কেন বলছি একথা?
    এটা আর লুকানোর কিছু না যে সরকারের অর্থনৈতিক সংকট কাঁধে নিয়ে হাসিনার একটা খেলনা নির্বাচন শেষে নিজেকে তাতে বিজয়ী-প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা কললেন বটে কিন্তু তাতে করে তার ক্ষমতায় খাড়ায় যাবার চেয়েও আরো বড় ও মারাত্মক সঙ্কট হল ‘অর্থনৈতিক’  – সেটাই এখন সরকারকে জাপটে চেপে ধরেছে! গত মাসে নয়া সরকার গঠনের পর থেকেই ঢাকার চীনা রাষ্ট্রদুত প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন মন্ত্রীর অফিসে গিয়ে সাক্ষাতের রিপোর্ট  হচ্ছে মিডিয়ায়। আর এসব রিপোর্টে কেন চীনের এসব সাক্ষাত হচ্ছে বা ইস্যু কি; তা নিয়ে আমাদের জল্পনা কল্পনাও করতে হচ্ছে না। যেমন চীনা রাষ্ট্রদুত ইয়াও ওয়েন এর সাথে নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ এর যে প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাত হয়েছে এনিয়ে হাতের কাছে দুটা রিপোর্ট দেখছি। বিবিসি বাংলার বেলায় শিরোনাম, “বাংলাদেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন ‘পাশে থাকবে’ কীভাবে?” –  আর বণিকবার্তায় শিরোনাম, বাংলাদেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে পাশে থাকবে চীন— রাষ্ট্রদূত” – মানে দুটাই প্রায় একই ভাষার শিরোনাম।

    “ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন গত বেশ কয়েকমাস যাবত বলে আসছেন যে বাংলাদেশ
    রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন পাশে দাঁড়াবে। কয়েকদিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সাথে বৈঠকের
    পর চীনের রাষ্ট্রদূত আবারো একই কথা বলছেন,
    যেটি সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট হয়েছে।” – বিবিসি

    অর্থাৎ আমাদের জল্পনা-কল্পনার কিছু নাই, কারণ ব্যাপারটা খোলাখুলি-ই যে বাংলাদেশের কঠিন রিজার্ভ সংকট বর্তমান। আর এতে সহায়তা দিতে চীন আগ্রহী বা রাজিও আছে। এরই ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে।  এছাড়া বিবিসি দুজন মন্তব্যকারীকেও নিয়ে এসেছে সংকট নিয়ে তাদের মতামত দিবার জন্য। একজন হলেন সিপিডির কর্তা দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। আর অন্যজন ডঃ জাহিদ হোসেন যিনি নিজ কেরিয়ার গড়তে সেই আশির দশকের শেষ থেকেই বিশ্বব্যাংক ওয়াশিংটনের এর সাথে কাটিয়ে শেষটা বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের চীফ ইকোনোমিস্ট হিসাবে শেষ করেছেন। এরপর আনুষ্ঠানিক অবসর নিলেও কনসালটেন্ট হিসাবে বিশ্বব্যাংক ঢাকার এক্সটারনাল বা ছুটাকাজ-সম্পর্কে জড়িত ও অভিজ্ঞ মতামত দিয়ে থাকেন।

    দেবপ্রিয় সম্পর্কেও আরেকটু বিস্তারে পরিচয় বলা দরকার। এককথায়, দেবপ্রিয় এখন শুধু সিপিডির কর্তাব্যক্তি শুধু তাই নয়, তিনি প্রায় যেন ভারতের মুখপাত্র হয়েছেন। যদিও বলা হয় সিপিডির জন্ম ১৯৯৩ সালে কিন্তু এটা প্রথম লাইম-লাইটে  এসেছিল ২০০৪ সালে। তাও আবার পরের ১/১১ এর ক্ষমতাদখলের পক্ষে প্রস্তুতিমূলক কাজ ২০০৪ সাল থেকেই শুরু হয়েছিল বলে। কিন্তু সার অর্থে সেটা ছিল আসলে ভারতের স্বার্থের পক্ষে ‘কনসালটেন্সি’ এবং তা খোলাখুলি। বিশেষত বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের নর্থ-ইস্টকে বিনা পয়সায় সব ধরণের করিডোর দেয়ার ওকালতি। এমনকি যারা সিপিডির এই দালালি ব্যবসার সাথে একমত নয় তারা সবই নাকি “অশিক্ষিত” এমন মন্তব্যও করেছিলেন রেহমান সোবহান।

    এটুকুই নয়, একেবারে সাম্প্রতিককালে দেবপ্রিয় একেবারে রানা দাসগুপ্তের সাথে পাল্লা দিয়ে তবে একসঙ্গে বাংলাদেশের প্রো-ইন্ডিয়ান প্রধান হিন্দু লিডার হতেও আপত্তি করছেন না। দেবপ্রিয়ের মুল পেশা “উন্নয়ন কনসালটেন্সি” কিন্তু একালে তিনি (সাথে সিপিডির বস রেহমান সোবহানও)  এই পরিচয় ছাপিয়ে ভারত-সমর্থিত হিন্দু নেতা হতে দ্বিধা করছেন না। কোন প্রফেশনাল মানুষের এমন কাজ ও নিচা মানের কমবিনেশন  (কনসাল্টেন্সি আর প্রো-ইন্ডিয়ান প্রধান হিন্দু লিডার একত্রে) আমরা আগে দেখি নাই। কিন্তু এমন কেন? কারণ, দেখতে দেবপ্রিয়র এটা দুটা পেশা-ততপরতা হলেও এদের মিলটা হল দুইটাই ভারতের স্বার্থ আর তিনি বাংলাদেশে থেকেও সেই স্বার্থের প্রতিনিধি।

    মুল ও গুরুতর প্রসঙ্গ হল বাংলাদেশ রিজার্ভঃ
    উপরে দেখলাম আমরা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা বা রিজার্ভের মারাত্মক সংকট আছে, তা এখন সরকারিভাবেও স্বীকৃত। তা চীনা রাষ্ট্রদুত আর নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে প্রথম আলাপেই আলোচিত ও রিপোর্টেড। আর এই সংকট মিটাতে চীন সবচেয়ে সম্ভাব্য এক মুশকিল আহসান বটে! কিন্তু এক বড় কিন্তু আছে।  সেটা হল, চীন কেন বাংলাদেশকে বৈদেশিক মুদ্রা দিবে?

    এছাড়া এখানেও আবার সব পরিসরেই আরেকটা ভুল বুঝাবুঝি আছে সেটা হল – রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন ‘পাশে থাকবে’ ; এই রিজার্ভ সংকট মানে ঠিক আসলে কি? বাংলাদেশের হাতে বা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঞ্চয় বা মজুদে ‘যথেষ্ট’ নগদ ডলার নাই। আর এটা কমপক্ষে গত দুবছরের ফেনোমেনা।  বলা যায় ২০২২ সালের আগষ্টে তেলের দাম ৫১% বাড়ানোর সময়কাল থেকেই রিজার্ভ সংকট মারাত্মক হয়ে উঠেছিল যা এখন সম্ভবত চরমকাল পার করছে।
    কিন্তু যে “রিজার্ভ সংকট” শব্দে এটা বলা হচ্ছে সেটা কি চীন যে ২০১৬ সাল থেকে ঢেলে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প দিয়েছে সেসব প্রকল্পের বৈদেশিক মুদ্রা ছাড় দেয়া ত্বরান্বিত করা অথবা নতুন করে চীন বাংলাদেশকে আরো বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে কি??
    এর সরাসরি জবাব হল  -‘না’ সেটা না। আসলে বলা হচ্ছে ১. চীনের বাংলাদেশকে নগদ ডলার এবং ২. তা বড় পরিমাণ (ধরা যাক দশ বিলিয়নের মত) নগদ ডলার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সাথে চালু চীনা উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থছাড়ের কথা অবশ্যই আছে। কিন্তু সেটা এখানে গৌণ ও ভিন্ন বিষয়! চীনের আমাদেরকে নতুন করে নগদ ডলার ঋণ দেয়া আর  চীনা উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থছাড় – এদুইটা একই জিনিষ একেবারেই না। আর এখানেই এদুটাকে মাখামাখি করে অনেকের মধ্যেই বুঝাবুঝিতে জট পাকানো ধারণা আছে।
    বাংলাদেশের রিজার্ভের দিক থেকে দেখলে একটা ২০ বিলিয়ন ডলারের চীনাসহ যে কারো কোন উন্নয়ন প্রকল্প শুনতে অনেক বড় মনে হলেও প্রতিবছর এর  অর্থছাড় বড় জোর মাত্র এক বিলিয়ন ডলার হবে। কারণ প্রকল্প যত বড়ই হোক পুরা প্রকল্পের অর্থ (বৈদেশিক মুদ্রা) তো শুরুতে বা একবারেই বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়া হয় না। বরং প্রকল্প যতটুকু বাস্তবায়ন হয় ততটুকুই অর্থছাড় ঘটে। এছাড়া প্রতিবছরের অর্থছাড়ের সব অর্থ দিয়েই তো যা কেনা হয় এর সবকিছুই বাংলাদেশি পণ্য বা শ্রম নয়। অর্থাৎ বিদেশি পণ্য কেনা মানেই সেই অর্থ (বৈদেশিক মুদ্রা) আবার বিদেশেই চলে যাবেই। তাই সারকথায়, উন্নয়ন প্রকল্পের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে্র মধ্যে ধরে রাখা খুবই কঠিন। কারণ, অর্থছাড় ব্যাপারটা আসলে ধীরগতির কাজ-বাস্তবায়ের হারের উপর নির্ভরশীল বা সম্পর্কিত; এছাড়া অর্থছাড় হলেও তা দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য বা শ্রম কেনা হবে যতটুকু কেবল ততটুকু বৈদেশিক মুদ্রাই বাংলাদেশের রিজার্ভে থেকে যাবে। একারণে আমাদের রিজার্ভ সংকট – এটা যত বড়ই বিদেশি উন্নয়ন প্রকল্প নেই না কেন – এটা মিটবে না।

     আমাদের দরকার নগদ ডলারঃ
    অর্থাৎ আমাদের রিজার্ভ সংকট মিটাতে গেলে আরো বড় বড় নতুন বা পুরানো প্রকল্পের দ্রুত অর্থছাড় দিয়েও মিটবে না। তাই আমাদের রিজার্ভ সংকট মিটানোর চাহিদাকে পরিস্কার করতে বুঝাতে বলা হবে নগদ ডলার (বৈদেশিক মুদ্রা) লাগবে। আর এটা অবশ্যই উন্নয়ন প্রকল্প ঋণ একেবারেই নয় – এভাবেই বুঝতে হবে।

    কিন্তু কি নামে দেশে সাধারণত এসে থাকে নগদ ডলার?
    এককথায় জবাব – বাজেট সহায়তা নামে এসে থাকে। এটাই এর টেকনিক্যাল বা খাতওয়ারি নাম! মানে সরকারের বাৎসরিক বাজেটের বৈদেশিক মুদ্রা অংশের দায় মিটাতেই কেবল সরকার এই নগদ ডলার ব্যবহার করতে পারবে।  এজন্য অনেকে এটাকে “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের দায়” মিটানোও জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রাও বলে থাকে। তবে মূল কথাটা হল, এটা প্রকল্প ঋণ সহায়তা নয়। আমরা যেন দুটা ধারণাকে মাখায় না ফেলি।
    ব্যাপারটা আমরা দেখছি একমাত্র স্পষ্ট করে ধরতে পেরেছেন ও ব্যাখ্যা করেছেন ডঃ জাহিদ হোসেন,  ঢাকা বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ।

    “চীন তো বলেনি যে বিনিয়োগে সমস্যা হলে, তারা বাংলাদেশের পাশে থাকবে। তারা বলেছে, রিজার্ভের সমস্যা হলে পাশে থাকবে।
    তার মানে তোমার ক্যাশ নাই, আমরা তোমাকে ক্যাশ দেব। এটাই তো মিন (বোঝানোর) করার কথা।”
    জাহিদ হোসেন মনে করেন, তিনভাবে এই সহায়তা বা পাশে থাকার বিষয়টি হতে পারে। … বাজেট সহায়তা কিংবা ব্যালেন্স
    অব পেমেন্ট সহায়তা হতে পারে।” – বিবিসি

    কিন্তু কোন দাতাদেশই নগদ ডলার বা বাজেট সহায়তা দিতে চায় নাঃ
    কেন? কারণ, ২০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন প্রকল্প দেয়া তুলনায় সহজ; অথচ ৫-৭ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা দেয়া কঠিন। দাতা দিতে চায় না।  তুলনা করে বললে, ৫-৭ বিলিয়ন ডলারের কোন উন্নয়ন প্রকল্পের সব অর্থ যদি দাতা একবারেই একাউন্ট ট্রান্সফার করে দেয় তবে সেটাই তখন কার্যত বাজেট সহায়তা হয়ে যায়। এতে তাহলে সরকার কাজ বাস্তবায়ন অনুযায়ী বছরে মাত্র কয়েক মিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে পারে আর বাকি ডলার আমদানি ব্যয়-সহ এমন সব কাজেই ব্যবহার করতে পারবে। একারণে, বাজেট সহায়তা ঋণ কোন সীমার বাইরে খরচ-ব্যবহার করা যাবে না তা কড়াভাবে বলা বা শর্তে বলা থাকে। এই অর্থে বাজেট সহায়তা হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্প ঋণের চেয়েও অনেক বাড়তি সুবিধা ঋণ গ্রহিতা পাবে বা তাকে দেয়া হয় এমন এক ঋণ। এক স্পেশাল ঋণ, যার মোবিলিটি বা ব্যাবহারযোগ্যতা ঋণ গ্রহিদার জন্য বহুগুণ!

    তাহলে কোন দাতা দেশ এমন বহুল সুবিধা সম্পন্ন ‘বাজেট সহায়তা’ ঋণ কখন ও কেন দিতে রাজি হবেঃ
    এককথায় জবার, দাতাও যখন বিনিময়ে অন্য অনেক সুবিধা পাবে! যেমন বাংলাদেশে চীন ‘বাজেট সহায়তা’ ঋণ দিবে তখন যখন সে বিনিময়ে বিশেষ স্ট্রাটেজিক সুবিধা পাবে; এমন হতে পারে !  এককথায় বিশেষ সুবিধার ঋণ তাই দাতাও এথেকে বিনিময়ে তার বিশেষ সুবিধা আদায় করতে বা পেতে চাইবেই।  সম্প্রতি শেয়ার বিজ পত্রিকা ভারতের ঋণ প্রসঙ্গে একটা রিপোর্টের শিরোনাম হল, “পাইপলাইনে আটকে আছে ৮০ শতাংশ ঋণ” । তাও আবার সেটা ১৩ বছর ধরে। এছাড়া এসব ঋণের ৭৫% পণ্য বা শ্রম ক্রয় ভারত থেকে হতে হবে এমন শর্ত দেয়া। এমনিতেই ভারতের এসব প্রকল্প মানেই হল যা বাস্তবায়ন হলে সুবিধা কেবল ভারত পাবে – এমন! মানে বাংলাদেশ থেকে কড়িডোরের সুবিধা নিবে ভারত তাও বিনা পয়সায় আর সেজন্য যে রাস্তাঘাট ব্যবহার ভারত করবে – বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঐ রাস্তাঘাট নির্মাণের খরচ মানে ঋণ গ্রহণ ও সুদ পরিশোধ করবে বাংলাদেশ। এই হল ভারতীয় স্টাইল! যেমন ভারত কলকাতা-ত্রিপুরা রোড বা ট্রেন চলাচলের সুবিধা নিবে; ভারত পদ্মা সেতু ব্যবহার করবে আর সেতুর চীনা-ঋণ নেয়া ও পরিশোধের দায় বাংলাদেশ নিবে। আর ভারত কেবল আখাউড়া থেকে  ত্রিপুরা লাইনে পাঁচ-ছয় কিমি ট্রেন লাইন প্রকল্পে অর্থ খরচ করে (যেন পুরা প্রকল্পেই) সেটাতে ভারত বাংলাদেশকে ঋণ দিয়েছে বলে দেখাবে।  এককথায় বললে এভাবেই ভারত সমস্ত স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা একপক্ষীয় ভাবে ব্যবহার করবে। আর দাবি করবে ভারত নাকি বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী ঋণদাতা! এমনকি আজকাল অনেক তরুণ ফেসবুকার কেও পাওয়া যাবে যে প্রমান করে দিবে যে বাংলাদেশকে ভারতের দেয়া ঋণ চীনের চেয়েও পরিমাণে বেশী!

    কেন এভাবে এই তুলনা করে দেখালাম?
    দেখালাম এজন্য যে জাহিদ হোসেনের সাথে একই প্রশ্ন দেবপ্রিয়কে করেছিল বিবিসি। দেবপ্রিয়-ই ভারতের সাথে তুলনা ডেকে এনেছিলেন। বিবিসি লিখেছে “…ভারতের দেয়া ক্রেডিট লাইনের কথা উল্লেখ করে মি. ভট্টাচার্য…”। এটা কি তুলনীয় ঘটনা? ভারত কি অবকাঠামো ঋণ দেয়ার মত নিজে যোগ্য অর্থনীতি হয়েছে? দেবপ্রিয় এর সেখবর নাই, তবুও তিনি কোশেশ চালিয়ে গেছেন। এমনই খেদমতগার তিনি! যে ভারত বিনা পয়সায় স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা একপক্ষীয়ভাবে নিচ্ছে তার সাথে চীনের অবকাঠামো উন্নয়নের ঋণদাতা ভুমিকার তুলনা করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, কেন বাংলাদেশ চীনের নগদ ডলার দেওয়ার বাজেট সহায়তা শিরোনামের ঋণ নিতে পারবে না – এম মিথ্যা ও ভুয়া ধারণায় ভয় দেখিয়েছে।

    “তবে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নেবার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা হতে পারে বলে
    উল্লেখ করেন মি. ভট্টাচার্য। কারণ, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ঋণ নিয়েছে এবং সামনে ঋণের আরো কিস্তি আসবে।
    এমন অবস্থায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নিতে গেলে আইএমফ বিষয়টা মানবে কি না সেটাও একটা দেখার বিষয়, বলছিলেন মি. ভট্টাচার্য।” – বিবিসি

     

    দেবপ্রিয় মস্কোর প্লেখানভ রাশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা ও পিএইচডি। ফলে সারাজীবন তিনি “পশ্চিমা পচা-গলা পুঁজিবাদের”  বিরোধীতা ও নিন্দা করে এসেছেন। যা বুঝি না তার নিন্দা করা তো খুব আরামেরই।  আর এখন মোদির “হিন্দুত্ববাদের পুঁজিবাদ” তাঁর কাছে খুব মিস্টি ও উপাদেয়। অথচ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক তার কাছেও নিপাত যাক সংগঠন। সুযোগ পেলেই তিনি এ’সংগঠনের বিরুদ্ধে বিষ উগলে দেন। অথচ উনার নিজ অযোগ্যতা হল, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এটা কি ও কেমন প্রতিষ্ঠান অথবা ১৯৪৫ সালের পরে গ্লোবাল পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক ব্যাবস্থা হিসাবে এটা কিভাবে কাজ করে? আবার এটা কোথায় কোথায় গরীব দেশের বিরোধী আবার কোথায় ঐ গরীব দেশের কাছেই “অন্ধের  কাছে তাঁর লাঠির” মতই সহায়ক – ইত্যাদি এসব দিকে তিনি বেখবর! এই গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেমটা চালু আছে বলেই কিন্তু তিনি আয়-ইনকাম করার সুযোগ পেয়েছেন সেতাই তিনি মনে হয় খেয়াল করেন নাই!

    প্রথম কথা হল, কোন দেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে ওর একটা দিক হল (সবটা নয়) নগদ ডলারের অভাব বা প্রয়োজন হয়ে পরে। এর সবটা আইএমএফ দেয় না বা যোগান দিতে পারে না। এছাড়া এমন সংকটে আইএমএফের কাজ ও প্রধান ভুমিকাটা ঠিক ঋণ দেয়া বা নগদ ডলার যোগান দেয়া না। বরং ১৯৪৫ সাল থেকে আইএমএফের কাজের মধ্যে দিয়ে তৈরি হওয়া যে পেশাদার অভিজ্ঞতা তা দিয়ে সে কোন দেশের পড়ে যাওয়া অর্থনীতিকে টেনে তোলার পথ বাতলানো (যেটাকে কমিউনিস্টেরা আধো বোলে শর্ত দেয়া বলে না-বুঝা হৈ চৈ করে থাকে)। মানে পড়ে যাওয়া ট্রেনকে আবার লাইনে তোলার মত! সেকারণে গ্লোবাল পুঁজি বাজার সংশ্লিষ্ট যেকেউ এসব ক্ষেত্রে ঐ পতিত দেশের অর্থনীতি কারকশন পদক্ষেপগুলো নিয়ে উঠে এসেছে কিনা এব্যাপারে কেবল আইএমএফ এর বক্তব্য-কেই বিশ্বাস করে। এখন অসুবিধা হল মাঙনা পরামর্শ দিলে পতিত দেশ তা আমল করতে চায়না; যেন এতে সিরিয়াসনেস আনতেই বা সেটা ঠেকাতেই কিছু ঋণ ঐ সংকটে পতিত দেশকে আইএমএফও দিয়ে থাকে। যেমন, বাংলাদেশের এখন ৫-১০ বিলিয়ন ক্যাশ ডলার লাগবে বলে কথা উঠেছে সেখানে আইএমএফের দেয়া এখনকার (বছর দেড় আগে শুরু হওয়া) ঋণ হল ৪.৭ বিলিয়ন। কিন্তু তা দেয়া হবে প্রতি ছয় মাসে মাত্র ৬৮২ মিলিয়ন (৬৮.২ কোটি) ডলার করে; মানে সাড়ে তিন বছর ধরে। এভাবে সাত কিস্তিতে অর্থ পাবে। তাও আবার প্রতিবার উন্নতির (রিকভারির) যে টার্গেট  আইএমএফ দিবে তা পূরণ সাপেক্ষে পরের কিস্তির অর্থ ছাড় হবে – এভাবে।
    কিন্তু ছয় মাসে ৬৮২ মিলিয়ন মানে মাসে ১০০ মিলিয়ন ডলারের মত; এটা কোন অর্থই না।  যেখানে শুধু জ্বালানি আমদানিতে আমাদের প্রতি মাসে ব্যয় এক বিলিয়ন ডলার। মানে শুধু জ্বালানি আমদানির মোট অর্থের দশভাগের একভাগ মাত্র আইএমএফের দেয়া ঋণ প্রতি মাসে। অর্থাৎ আইএমএফের ঋণটা “টোকেন” (token) ; বা নাম কা ওয়াস্তে!
    আগের অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন এই কিস্তির ডলার উনি একলা নিজেই বাংলাদেশকে দিতে পারেন। যেটা এতই অল্প!

    অথচ জ্ঞানী দেবপ্রিয় আন্দাজে বলতেছেন যেহেতু “বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ঋণ নিয়েছে এবং সামনে ঋণের আরো কিস্তি আসবে।”– তাই আমরা আর এখাতে চীনের থেকে নগদ ডলার বা বাজেট সহায়তা খাতে নাকি ঋণ নিতে পারব না। যেন বাচ্চা বয়সে আমাদেরব শোনা সেই ডায়লগ যে বলতে চাচ্ছেন-  “না না অমন করেনা মা বকবে”।  তাই সেই ভাষায় দেবপ্রিয় বলছেন, “এমন অবস্থায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নিতে গেলে আইএমফ বিষয়টা মানবে কি না সেটাও একটা দেখার বিষয়”।

    আসলে দেবপ্রিয় বলতে চাচ্ছেন বাংলাদেশ বা হাসিনা যেন চীনের কাছে না যায়। এ্যটাই তাদের মন-কামনা!!!  আর এখানে এই তাদের মানে ভারতীয় স্বার্থের বুঝতে হবে!  হাসিনা যেন চীনের থেকে বাজেট সহায়তার নগদ ডলার ঋণ করতে না যায়।  কেন? এতে দেবপ্রিয় এর কি অসুবিধা?
    দেবপ্রিয় বলতে চাইছেন এতে ভারত রাগ করবে। কারণ, হাসিনার চীনের কাছে যাওয়া মানে তিস্তা প্রকল্প জাতীয় আরো অনেক (ভারতের মাতব্বরি অস্বীকার করে সম্মতি দেয়া) প্রকল্পে হাসিনার সম্মতি দেওয়া বা হাসিনাকে নগদ ডলার সহায়তা ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে চীনকে স্ট্রাটেজিক সুবিধা দেয়া। এখন বাংলাদেশ তার নিজ স্বার্থে চীনকে কি দিবে নিবে সেটা একান্তই বাংলাদেশের স্বার্থ! এখানে ভারতের বলার কি আছে? কিন্তু দেবপ্রিয় মনে করেন এটা তার ও ভারতের স্বার্থবিরোধী!

    এবার এর উলটা দিক থেকে দেখি। হাসিনা নগদ ডলার সহায়তা যদি না আনতে পারে তাহলে কি হবে? আগামি মাস থেকেই আমদানি ব্যয় মিটাবার সামর্থ ভেঙ্গে সব এলোমেলো হয়ে পড়বে বলা হচ্ছে। অর্থনীতি চরম বিশৃঙ্খলায় পড়বে। মুদ্রাস্ফীতি আকাশ ছুবে করবে – ধরাম করে ছাদে ঠেকবে। মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বি হওয়া কথাটার-ই আরেক ভাষ্য হল, গরীব মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শেষ। নুন্যতম খাদ্য কেনার সামর্থটাও নাই হয়ে যাবে। এটাই দুর্ভিক্ষের আরেক নামে। এজ্জন্য কোন দেশের ফরেন রিজার্ভ শুণ্যের দিকে কিনা এটাও দুর্ভিক্ষ আসবার একটা বড় সিগনাল!  অর্থাৎ ভারত বা তার এজেন্ট দেবপ্রিয় আমাদের হুমকি-ভয় দেখাচ্ছেন যেন হাসিনা চীন না ভ্রমণে না যায়। কারণ, এতে নাকি ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ চীনের কাছে ক্ষুন্ন হবে! কি আবদার!! অথচ এতে বাংলাদেশের অর্থনীতি ফেল করলে যে দুর্ভিক্ষের দিকে যাবে তবু হাসিনা তা ঠেকাতে ব্যবস্থা না নেক এটাই ভারতের আবদার!
    অথচ এনিয়ে ক্রমান্বয়ে ভারত হাসিনার উপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। সর্বশেষ বিনা পাবলিক ঘোষণায় অজিত দোভালের সফরও বাংলাদেশ সফরও সেকারণে বলে কানাঘুষা চলছে!

    একটা সমতুল্য অভিজ্ঞতাঃ
    করোনার টিকা আমরা কোথা থেকে কিনবো?  এই টিকা প্রথম অনুমোদন পেলে দেখা দিয়েছিল কাড়াকাড়ি। কারণ, বড়লোক পশ্চিমা দেশগুলো তাদের মোট চাহিদার ছয়-সাত গুণ বেশী টিকা নিজেদের জন্য সংগ্রহ-মজুত শুরু করেছিল। খামোখা নিজ সাদা শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্খায়। আর এটাই আমাদের মত গরীর দেশের অবস্থা আরো শোচণীয় করেছিল। চীন অফার দিয়েছিল তাদের টিকার গবেষণার শেষ বা তৃতীয় ফেজে যুক্ত হবার বিনিময়ে টিকা পাওয়ার। কিন্তু এতে ভারতের চেয়েও চীনের বাংলাদেশের উপর প্রভাব বেড়ে যাবে তাই এক শয়তানি চাল দিয়েছিল ভারত। বাংলাদেশ প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৪০০ মিলিয়ন ডলার ভারতের টিকা কারখানায় বিনিয়োগ করলে তারা  আমাদের প্রয়োজনীয় টিকা সরবরাহ করবে। তাহলে টিকা ক্রয় নিয়ে বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যবসায়ী- মন্ত্রী উপদেষ্টারা এই সুযোগে বিরাট আয় করে নিতে পারবে। অর্থ্বের লোভে সরকারও সেদিকেই রওনা দিয়েছিল; সরকারি সহায়তায় বেসবকারি বিনিয়োগও দিয়ে যুক্ত হয়েছিল ভারতের সাথে।  তবু চীন এনিয়ে একটাও কথা পাবলিকলি বলে নাই। রয়টার্স মুখে মাইক ধরলেও বলেছিল – নো কমেন্ট!
    আর সরকার-বেসরকারি দালালেরা ভেবেছিল তারা সহজেই জিতে গিয়েছে। ভেবেছিল চীন কি বোকা যে সহজেই ওয়াক ওভার দিয়ে দিছিল। আর তারা স্বপ্নে ৪০০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে কত হচ্ছে তা গুণা-গুনতি শুরু করেছিল!
    কিন্তু না, সব হিসাব ভুল!
    কয়েকমাসের মধ্যে মোদি ঘোষণা করে বলেছিলেন বাংলাদেশে টিকা পাবে না। আগে ভারতের জনগণ সকলে টিকা পাবে এরপর দেখা যাবে! কিন্তু তখন হাসিনা টিকা পাবেন এমন বিকল্প কোথায়? পশ্চিম উতপাদকেরা সবাই নিজেকে বা অন্য পশ্চিমাদের নিয়েই ব্যস্ত!  ফলে হাসিনার আবার সেই চীনের কাজে গিয়েই হাতেপায়ে ধরা! স্বভাবতই চীন এবার হেসেছিল কিনা আমরা জানি না! কিন্তু বাংলাদেশ থেকে চীন তাদের স্টাটেজিক সুবিধা যা তারা আগের বেছে রেখেছিল তা এবার উসুল করে নেওয়ার বিনিময় আমাদেরকে টিকা দিয়েছিল। সেজন্য টিকা চুক্তি করতে চীনা স্বাস্থ্যমন্ত্রী না এর বদলে  তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এসেছিল। বড় শিরোনামে বললে, এটাই কক্সবাজারে ছয় কিলোমিটারের (রিফুয়েলিং) রানওয়ে নির্মাণ ও এর সাথে আরো অনেক চীনা স্ট্রাটেজিক স্বার্থ বিষয়ক বিষয়ে তা পাইয়ে দিতে চুক্তিতে উপণীত হতে হয়েছিল আমাদেরকে। তার মানে দাঁড়ালো সেকালে হাসিনাকে এই কাজে ভারত-ই ঠেলে দিয়েছিল!  এবারও বাজেট সহায়তা আনতে হাসিনার সম্ভাব্য চীন সফরকে কেন্দ্র করে কি একই ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে?

    এখন ভারতের মোদিসহ বিরাট বিরাট সব স্ট্রাটেজিক এনালিস্ট, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা সব যারা যারা আছেন তারা হিসাব দেন! বলেন, বাংলাদেশকে শুরুতে চীনা টিকা গবেষণায় যুক্ত হয়ে টিকা যোগাড়ে বাগড়া দিয়ে ভারতের কি লাভ হয়েছে? অবশ্যই কোন লাভ হয় নাই। উলটা ক্ষতি হয়েছে। স্ট্রাটেজিক দিক থেকে চীনারা ভারতের ও আমেরিকার উপরেও আগিয়ে গেছে।  আর ভারতের এসব তথাকথিত স্ট্রাটেজিক পরিকল্পকেরা আপনারা তো নিজের স্বার্থই রক্ষা করতে জানেন না। এটাই প্রমাণিত হয়েছে।  মনে করেন অর্থের লোভ আর মনি-পরী হানিট্রাপের মাধ্যেমেই সব অর্জন করে ফেলবেন। আপনারা এতই বুদ্ধিমান! আর ‘র’-এর কাজ আগানোর ভিত্তিও এই অর্থ আর মেয়েমানুষ দিয়ে ট্রাপ করা! অথচ আপনারা ভাবছেন চীনের বুদ্ধি-পরিকল্পনার উপরে আপনি এই অর্থ আর মেয়েমানুষ দিয়ে ট্রাপ দিয়ে জিতে যাবেন; রাজত্ব করবেন!    এর সোজা মানে দাঁড়ালো এখন জবাব নাই আপনাদের কাছে? বাংলাদেশের করোনার টিকা চীন থেকে সংগ্রহের প্রথম পরিকল্পনাকে ফেল করিয়ে দিয়ে ভারতের কি লাভ হয়েছে? নাকি আলটিমেটলি ভারতই বাংলাদেশকে আরো বেশী করে চীনে কোলে উঠিয়ে দিয়েছে?
    ভারতের স্ট্রাটেজিক জ্ঞানীরা এখন আমাদের দিকে না তাকিয়ে ভারতের নিজের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে মুল্যায়ন করেন আগে; সাহস থাকলে!

    এরপরে এর ভিত্তিতে ঠিক করেন হাসিনাকে আবার এখন চীন সফরে (বাজেট সহায়তা আনতে) যেতে বাধা দিবেন কোন সাহসে? কোন লক্ষ্যে ও যোগ্যতায়? আপনাদের মূল সমস্যা তো অর্থনৈতিক সামর্থ নয়, হিংসা-ভিত্তিক চিন্তা! তাই চিন্তা, বুদ্ধি পরিকল্পনা সবই এখানে এসে সব শুকিয়ে যাবে আপনাদের!  অথচ সেই পুরানা পথ; অজিত দোভালকে পাঠিয়ে চাপ দিবেন??? পেটি (petite বা উচ্চারণে পেতিত মানে ক্ষুদ্র বা সংকীর্ণ) চিন্তা, পেটি দোকানদারি মানসিকতা বা হাভাতে এরা অবশ্য এগুলাই করে থাকে! যারা বিরাট চকচকে লোভের চিন্তায় শেষে সবসময় আত্মঘাতি হয়ে থাকে! মোদি কেন এর ব্যতিক্রম হবেন!

    ভারত-চীনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের শিকার না হইঃ
    এই বক্তব্যটা মন্ত্রী ওয়ায়দুল কাদেরের। গত ৪ ফেব্রুয়ারি পুরা বক্তব্যটা নিয়ে মিডিয়া শিরোনাম ছিল – আমরা যেন চীন-ভারতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত না হই: ওবায়দুল কাদের ।  দেখে পড়ে মনে হতে পারে যে হাসিনা খুবই সতর্ক বোধহয় তাই চীন-ভারত দুটা দেশ থেকেই দূরে থাকতেই হাসিনা সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। না, এই অনুমান ভাবনাটা ভুল! কারণ, এটা হল আসলে সম্ভবত হাসিনা এখন আর চীন সফরের কথা ভাববেন না! আর তাতে সবকিছু সিদ্ধান্তহীনতায় ফেলে বসে থাকতে চাইছেন। কারণ, হাসিনার চেয়ে কে সবচেয়ে বেশী জানে যে চীনের কাছ থেকে নগদ ডলার না আনা মানে অর্থনৈতিক রিকভারি হবে না; মানে দেশকে ক্রমশ এক দুর্ভিক্ষ এ’দিকে ঠেলে দেয়া হবে?

    হাসিনার কাছে পরিস্থিতিটা এখন কোন দুরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের শিকার জড়িয়ে যাওয়া বা না যাওয়ার  হিসাবে দেখতে যাওয়াটাই ভুল! হাসিনার জন্য বাংলাদেশের জন্য লক্ষ্যটা হল  অর্থনৈতিক রিকভারি আর তা করে, দুর্ভিক্ষ এড়ানো। সবচেয়ে বড় কথা এতে কোন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যাওয়া বা না যাওয়া যাই ঘটুক – তবুও দুর্ভিক্ষ যদি এড়াতে পারে তবে সবের দায় জনগণ এর কাছে সারেন্ডার করলে তারা তা শেয়ার করবে। কিন্তু কেবল মনে রাখেন একটা চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ – এটা বাংলাদেশের অভিমুখ, গতিপথ অপরের প্রত এটিচ্যুড ইত্যাদি সব বদলে দিয়েছিল। পুরা পঁচাত্তর সালটা আমাদের খুনাখুনিতে কেটেছে। ১৯৮১ সালের আগে কিছুই নুন্যতম থিতু হয় নাই! আর সেই থেকে খুড়িয়ে চলা, পড়ছি আর উঠছি, খুড়িয়ে চলছি – জনমত বিভক্ত! কোন রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকেই এরপরে আমরা নুন্যতম বের হতে পারছি না! প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা ইত্যাদি নেগেটিভ এটিচ্যুড বার বার ছাপিয়ে উঠছে!

    হাসিনা কি করতেছেন তা তিনি নিজেই স্থির মনে এখানে খুঁজে দেখতে পারেন। যেমন, তিনি মনে করেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর হয়ে ক্ষমতা নিয়েছেন। ধরে নিলাম তিনি ঠিক ও সৎ ও ন্যায্য কথাই বলছেন। কিন্তু তাহলে স্কুলের পাঠ্যবই তা ভারতে পাঠিয়ে ছাপানোর নামে তাদের অনুমোদন নিতে পাঠান কেন? এটা কি কোন মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর কাজ হতে পারে? সালমন রহমান কখনও বইয়ের ব্যবসা করেন নাই, ছিলেন না। অথচ তাকেই কেন বই ছাপিয়ে আনার দায়ীত্ব দেয়া হয়েছে কেন? পাঠ্যবই ছোটখাট জিনিষ না।  ভারতীয়দের সম্পাদিত বই পড়ালে কি বাংলাদেশ থেকে মুসলমানদের কথিত জঙ্গীবাদী মানসিকতা দূর হয়ে যাবে? কথিত ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ হয়ে গেলে জঙ্গীবাদ চলে যাবে – এটাই কি মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর এসব চিন্তার ভিত্তি নয়? অথচ এটাই তো ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের নিচে বাংলাদেশকে রেখে দেওয়া; নয় কি? আচ্ছা ভারতের পাঞ্জাবের খালিস্তান মুভমেন্ট কি জঙ্গীবাদ নয়, এটাও কি ভারতের সরকারি পাঠবই পড়েই আর তা পড়ার পরেও জন্মাইছে। তাই নয় কি? হায় মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী!!! তাহলে আমরা কোথায় দাড়াবো? আমাদের কোথায় নিয়ে চলেছেন আপনারা?

    তাহলে মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর শত্রু হল  ইসলামি জঙ্গীবাদ মানসিকতা আর এটাকে ধুয়ে পরিস্কার করতেই গঙ্গায় ডুব দেওয়ানো্র জন্যই এমন পাঠ্যবই ব্যবস্থাপনা?  এভাবে আমরা কি আমাদের মুসলমান পরিচয়কে এভাবে শুদ্ধ ও হিন্দুত্ববাদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে নিতে পারবো? নাকি এরপরও মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী বলে কিছু অবশিষ্ট থাকবে? আসলে, হিন্দুত্ববাদের অধীনস্ত হয়ে একটা “মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী” বা হাসিনার বাংলাদেশ বলেও কিছুই থাকবে না! মানে হবে না!! কারণ, নিজের অস্তিত্বের অর্থ তাতপর্য নিজেকেই তৈরি করতে হয়!

    ভারত তার পেটি স্বার্থে যতই বাধা সৃষ্ট করুক সিদ্ধান্ত নিতে হবে একান্তই নিজ দেশ-মানুষের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে তাতে চীনের খুশি-অখুশি নাকি ভারতের  খুশি-অখুশি এসব অনেক নিচের প্রায়োরিটি! বাংলাদেশের কাছে নিজ স্বার্থের উপরে কেউ নাই, থাকতে পারে না!
    অর্থনৈতিক রিকভারি আর তা করে , দুর্ভিক্ষ এড়ানো এটাই আমাদের মুখ্য স্বার্থ। আমরা আরেকবার দুর্ভিক্ষ দেখতে পারি না!  এতে ফেল করা বা পরাজিত হওয়া যাবে না!!!
    কাজেই “আমরা যেন চীন-ভারতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত না হই”-এটা হতাশা আর সংকটে পালিয়ে যায় যারা তাদের কথা!

    আমাদের শাসকদের নিজ স্বার্থ বুঝতে অন্তত সুমতি হোক!

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০৬ ফেব্রুয়ারি   ২০২৪, সন্ধ্যা  সাতটা

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • কী তামসা! দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়

    কী তামসা! দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়
    গৌতম দাস
    ১০ নভেম্বর ২০২৩  ২১ঃ ৫৮ রাত

    https://wp.me/p1sCvy-57i

               দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায় – স্টিফেন ইবেলি বলেন, রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের ভারতে ‘টু প্লাস টু’ বৈঠকে যোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।

    আবার শুরু হয়েছে। সেই পুরানা বানানো গল্প –  ভারত নাকি আমেরিকার সাথে দেন-দরবার করে হাসিনাকে বাঁচাবে। ফিরে হাসিনাকেই ক্ষমতায় রাখবে ইত্যাদি! মানে সেই পুরানা “আনন্দবাজারি” ও  “অগ্নি রায়” আর তাঁদের ঢাকার সহযোগী – মার্কা মিথ্যা প্রপাগান্ডা। আর তা শুনে কিছু না বুঝে হাহাকার করে উঠা লোকের সংখ্যাও কম নয় যারাই মূলত – ভারত আবার হাসিনাকে বোধহয় ক্ষমতায় রেখে দিল – এই প্রপাগান্ডাকে পরোক্ষে আয়ু দিচ্ছেন। আর তাতে মিথ্যা প্রপাগান্ডার অপ-সাংবাদিকতা করে হিট বাড়ানোর অসৎ ততপরতার জয়জয়কার শুরু হয়েছে। এবার একাজের লিড হল, বিবিসি বাংলার শুভজ্যোতি ঘোষ। তিনি নেমেছেন যে নিজে ভারতীয় আর ভারতীয় বলেই যেন এক আরএসএসের কর্মির মত আচরণ করে আসছেন তিনি। আর তাত এই আচরণের পিছনে আছে আরেক পরিচয়।

    কলকাতার আরএসএস এর এককালের (২০১৬) দায়ীত্বে থাকা নেতা তথাগত রায় এখানে দেখেন তার পরিচয়,
    এরই চ্যালা-শিষ্য ছিলেন এই শুভজ্যোতি ঘোষ! 
    তথাগতের আমলে (সে সময়
    জঙ্গীবাদের নামে যা খুশি লিখতে-করতে-চালাতে পারত এরা), তাতেই এই শুভজ্যোতির উত্থান!

    শুভজ্যোতি ঘোষ, তিনিই এবার প্রপাগান্ডা লিড-নেতা! বাংলা বিবিসি-তে তিনি সত্য-মিথ্যায় মিশানো এক প্রপাগান্ডা রিপোর্ট করেছেন। আর তা থেকেই প্রধান প্রপাগান্ডাটা শুরু হয়েছে। আর এটাই বাংলাদেশে প্রথম আলো, কালের কন্ঠ ইত্যাদি এরা বিবিসির নাম না নিয়েই ঐ মেটারিয়াল দিয়ে সুত্রবিহীন স্ব স্ব রিপোর্ট করেছে।  যদিও গতদিনটা শুরু হয়েছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এরও এক মিথ্যা প্রপাগান্ডা রিপোর্ট দিয়ে। সেটা এখানে দেখতে পাবেন।

    মিথা প্রপাগান্ডার শিরোনাম কীঃ
    গতকাল ১০ নভেম্বর ছিল আভ্যন্তরীণ রুটিন ঘটনা হিশাবে ভারত-মার্কিন সংলাপের দিন। আর সে উপলক্ষ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন তাঁদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনকে সাথে নিয়ে আগের দিনই ভারত সফরে পৌছে গেছিলেন। বলাই বাহুল্য এতে বাংলাদেশের কোনই সংশ্লিষ্টতা নাই; থাকার কোন কারণও নাই। কিন্তু তা সত্বেও এই ইন্ডিয়ার হাসিনাকে দেয়া মিথ্যা মিডিয়া প্রপাগান্ডা সার্ভিস যে এই সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় আসবে! কেউ কেউ সাবধানী খাড়া মিথ্যা বলতে ভয় পেয়েছে।  যেমন কালের কন্ঠ লিখেছে  “ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপ : উঠতে পারে বাংলাদেশ প্রসঙ্গও” ।  আবার প্রথম আলো তো খুবই সাহসী মিথ্যাবাজ। তাই সে বুক ফুলিয়ে শিরোনাম করেছে,দিল্লিতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ।  কিন্তু প্রকাশ করার পর বুঝেছে এত হারাম কাজ দুনিয়া সহ্য করবে না। রাত দশটার মধ্যেই ঢাকার মানুষ চোরামি জেনে গেছে। মানে প্রথম আলো – এরা এত নিচে নেমেছে যে প্রথম প্রপাগান্ডা নিউজটা গায়েব করে দিয়েছে। লক্ষ্য করবেন এর রেফারেন্স লিঙ্কটা প্রিয়.কম এর। এই ওয়েবে কারো অনেকের প্রকাশিত লেখাই অটো কপি করে রাখা থাকে। তাই আমি সেখান থেকে লিঙ্ক দিয়েছে। এছাড়া ফেসবুকে যারা স্ন্যাপ কপি করে স্টাটাস দিয়েছিল ততক্ষণাত তাঁদের স্টাটাসে প্রথম আলোর প্রথম রিপোর্টটা এখনও লটকানো আছে।
    তাই এবার শিরোনাম সহ সবই বদল। বলা যায় এবার দিল্লির সৌমের বরাতে প্রথম আলোর একেবারে ভাল মানুষী এবং পুরা উলটা শিরোনাম – যুক্তরাষ্ট্রকে বলল ভারত নির্বাচন কীভাবে হবে, তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় ।

    তাহলে শুভজ্যোতি কী করেছিলঃ
    শুভজ্যোতি একদিকে প্রায় তেরশ অক্ষরের প্রপাগান্ডা রিপোর্ট-টা করছেন, শিরোনামে কায়দা করে উস্কানি দিয়ে লিখছেন দিল্লিতে ভারত-মার্কিন সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় আসবে!!!  অপরদিকে লেখা সেই রিপোর্টের একেবারে শেষে ভারতীয় মুখখপাত্র অরিন্দম বাগচির উদ্ধৃতি দিয়ে লিখছেন, “বাগচি বলেছেন, আমরা তৃতীয় কোনও দেশের নিজস্ব নীতি নিয়ে মন্তব্য করি না, এখানেও করতে চাই না”। 

    “বাংলাদেশের নির্বাচন একান্তভাবেই তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা তৃতীয় কোনও দেশের নিজস্ব
    নীতি নিয়ে মন্তব্য করি না, এখানেও করতে চাই না”, -জানিয়েছেন ওই মুখপাত্র। সেই সঙ্গেই তিনি যোগ
    করেছেন, “বাংলাদেশের মানুষ নিজেরাই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন। ঘনিষ্ঠ মিত্র ও পার্টনার
    হিসেবে আমরা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে মর্যাদা দিই।”

    যার সোজা মানে হল, শুভজ্যোতির পুরা রিপোর্বটের বক্তব্যটাই ভুয়া প্রপাগান্ডা! কারণ, অরিন্দম বাগচির কথা সত্য হলে শুভজ্যোতির কথা যে ভারত-মার্কিন সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় – এটা মিথ্যা।  অদ্ভুত, এরপরেও এমন রিপোর্ট আবার বিবিসি বাংলায় ছাপা হয়েছে সাংবাদিকতা বলে!!!!

    ঘটনা হল, পিটার হাস নাকি দিল্লি গেছেনঃ
    সকাল থেকেই বাংলাদেশে প্রপাগান্ডা শুরু যেখান থেকে যে ঘটনা হল, পিটার হাস নাকি দিল্লি গেছেন! প্রপাগান্ডিস্ট কালবেলার কথাই ধরেন, তার এই রিপোর্ট দেখেন।  এরা পিটার হাসকে দিল্লি পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সকাল থেকেই এই মিথ্যা প্রপাগান্ডার খারাপ  প্রভাব পড়েছে! কারণ পিটার হাস দিল্লি চলে গেছেন!

    তো – তাতে কী হবে? না, তাঁদের থামার সময় নাই। পিটার হাস ইন্ডিয়া গেছে মানেই যেন ফিরে এসে তিনি হাসিনা কে নির্বাচিত ঘোষণা করে দিবেন! তাই কান্নাকাটি???
    তাঁদের কে বলি – এখন থামেন, একটু শ্বাস নেন ভাল করে; এবার শুনেন!

    প্রথম কথা হল, আজ সন্ধ্যা সাতটায় সমকালে ছাপানো ছবি-সহ নিউজ বলছে, দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়। এখন বুঝেন প্রপাগান্ডার হাত-পা, ডালপালা কতদুর বিস্তৃত!

    দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়

                                                                                     এটাই বিবিসির প্রপাগান্ডা রিপোর্ট 

     

     


    এমনকি হাস যদি ইন্ডিয়া যেতেন তবুও কিছুই মানে হত না কেনঃ

    কারণ, আজ দশ নভেম্বর দিল্লিতে ভারত-মার্কিন ২+২ সভা শুরু হবে আর তাই সেখানে আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন আগের দিনই এসেছেন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও হাস যদি যেতেন তিনি মূলত বড় জোর ব্লিঙ্কেনের সাথেই দেখা করতে যেতেন। তবু কোনভাবেই পিটার হাস ভারত-মার্কিন ২+২ সভার কেউ হতেন না। কারণ তিনি এর কেউ নন।

    আর তাতেও কী কী ‘সত্য না’ থেকেই যেতঃ
    ১। পিটার হাস ২+২ সংলাপ-সভার কেউ নন, হবেনও না। তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদুত মাত্র!
    ২। এখানে ২+২ সংলাপ মানে আসলে কী? তা হল, ভারত-মার্কিন দুপক্ষেরই দুই পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর সাথে ভারতেরও পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, ( তাই, ২+২) – একসাথে ডাকা নিয়মিত সভা – এমন সভার কাঠামোর নাম হল  ‘টু প্লাস টু’ মন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপে; যা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। এর উদ্দেশ্যে ছিল প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারত-মার্কিন একসাথে কাজ করা কার্যত যা, ভারতকে আমেরিকান অস্ত্র বিক্রি এবং কী কী শর্তে বিক্রি সেসব নিয়ে আলোচনা। কারণ রাশিয়ার কী কী অস্ত্র ভারত কিনলে আমেরিকা অস্ত্র ভারত পাবে না সে তর্ক আছে। আর দ্বিতীয়ত, পারস্পরিক সামরিক রিসোর্স ও স্টোর-গুদাম শেয়ার করতে পারে কিনা যা পরে পূরণ করে দেয়া হবে এধরণের এক আলাপের সম্ভাব্যতা যাচাই দিয়ে এই সংলাপ শুরু হয়েছিল।  সুতরাং বলাই বাহুল্য, এই সংলাপে বাংলাদেশে কোন ইস্যুই না। এটাই আমাদের জন্য মূল কথা।  একারণেই বলছি পিটার হাস  ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের কেউই নন।
    ৩। মনে রাখতে হবে ২০১৮ সাল মানে সেটা ট্রাম্পের আমল। আর এবার বাইডেনের আমলেই এই সভাতেও এবার যুক্ত করা হয়েছে ইন্দো-প্যাসেফিক ইস্যু। যা আসলে এশিয়ায় চীন ইস্যুতে ভারত-মার্কিন একসাথে কাজ করতে পারে কিনা, কতটুকু? এনিয়ে তাঁদের আলোচনা। অর্থাৎ, এখানে এটাতেও বাংলাদেশ কোন ইস্যু-ই না!

    মূল কিছু কথা হাতে গুনে মনে রাখতে হবেঃ
    এক. এশিয়ায় বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতকে নিয়ে আমেরিকা আর যৌথ কিছুই করবে না। যেটা ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া ঘটেছিল। সে সময় এক্ষেত্রে আমেরিকান লক্ষ্য ছিল ভারতকে চীন ঠেকানোর কাজে ব্যবহার করার ঠিকা দেয়া। সেই ঠিকা দেয়া-নেয়া এখন ওভার! মানে শেষ বা ইতিটানা হয়েছে। যার প্রাথমিক কাজটা করে রেখেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০১৭ সালেই। তিনি এই ঠিকার বিনিময়ের বস্তুগত সুবিধায় ভারতকে আমেরিকায় (কম বা না-শুল্কে) ১৬ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সুবিধা বাতিল করেছিলেন।  আর পুরা এসাইনমেন্ট-ঠিকা অবলুপ্তি ঘটিয়েছে বাইডেন প্রশাসন। তবে এসাইনমেন্ট বা ঠিকা দেওয়াটাও যেমন আনুষ্ঠানিক ভাবে দেয়া যায় না (এসব কাজ পাবলিকলি করা হয় না) সম্ভব ছিল না; সেকারণে এই ঠিকা বাতিল টাও আনুষ্ঠানিকভাবে করার কিছু নাই। যদিও এতে ঠিক কি ঘটেছে সেটা আমরা জেনেওবুঝে নিতে পারি বাস্তবতা দেখে। এর আগে আমার পুরানা লেখায় বিরোধী কংগ্রেস নেতা শশী থারুর লেখা থেকে – এই ঠিকা দেওয়ার –  রেফারেন্স আছে আমি দেখিয়েছিলাম! আলী রিয়াজেরাও এটা স্বীকার করতে চায় নাই!

    তবুও এর স্বপক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, বাইডেনের নয়া নীতি-পলিসিগুলো যদি খেয়াল রাখি। যেমন বার্মা এক্ট, বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর রাখার আগ্রহ কিংবা আন্দামান নিয়ে আমেরিকান পরিকল্পনা (ও আমেরিকান খায়েসও বলতে পারি) ইত্যাদি এসবের দিকে যদি নজর রাখি। এসব কোন ইস্যুতেই ভারত আমেরিকার খায়েসের সাথে চলতে পারবে না – ভারতেরও ঘোষিত নীতি-পলিসি এর বিরোধী। তাই এখানে এসে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক – এই কবি এখানে নীরব থাকবে। ভারত আমেরিকান খায়েস-কে আপন করে নিতে পারবে না শুধু না বরং ভারতের অবস্থান এর চরমতম-বিরোধী! এমনকি ২০২৪ সালে যদি মোদির পরাজয়ে রাহুল বা অন্য কেউ ক্ষমতায় আসে সেক্ষেত্রেও আমেরিকান খায়েস সম্ভবত পূরণ হবে না! এককথায়, আমেরিকান খায়েস – এই ইস্যুটার ভাগ্য অনিশ্চিত!
    সুতরাই এককথায়, বাংলাদেশে কে ক্ষমতায় আসবে বা থাকবে এই প্রশ্নে আমেরিকান অবস্থান আর কখনও ভারতের সাথে শেয়ার করে এই সিদ্ধান্ত আমেরিকা আর গ্রহণ করবে না। অর্থাৎ সেটা হবে আমেরিকার একক সিদ্ধান্ত।

    দুই.
    কিন্তু তাই বলে কী এশিয়ায় চীনবিরোধী অবস্থান, স্বার্থ ততপরতা প্রশ্নে ভারত-আমেরিকা  কমন স্বার্থেও কোন সম্পর্ক বা এক সাথে কমন স্ট্রাটেজিতে কাজ সব নাই হয়ে যাবে? অবশ্যই না। এটা থেকেই যাবে কারণ এটা আলাদা ইস্যু। এমনকি বাংলাদেশে হাসিনার সাথে চীন কী সম্পর্ক রচনা করছে তা নিয়েও ভারত-মার্কিন আলাপ হতে পারে কিন্তু সেটা হবে – বাংলাদেশের ক্ষমতায় কোন সরকার থাকবে সেই প্রশ্ন বাদ দিয়ে –  যেটা একান্তই আমেরিকার একক বিষয় হয়েই থেকে যাবে!
    আমাদের সমস্যা হল, কেন ভারত হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে থাকছে সেটা আমরা ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের সংঘাত ও প্রেক্ষিত থেকে দেখা বুঝা করি। যেন এর বাইরে অন্য কোন কারণ থাকতেই পারে না। ব্যাপারটা যেন হিন্দু-মুসলমানের পুরানা বিরোধই! আমি সবাইকে অনুরোধ করব একটু অন্যদিক থেকেও দেখেন! প্লিজ!! 

     তিন.  তবে এক্ষেত্রে মানে ভারত-মার্কিন সংলাপে কিছুটা  গোলমাল পাকিয়ে ফেলতে পারেন ডোনাল্ড ল্যু (সবাই নয়)। তিনিই এবার   ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের মধ্যে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি বা আইপিএস (IPS) ঢুকিয়ে ফেলার মূল কারিগর। বাইডেনের ইলেকশনী প্রচার স্ট্রাটেজি সাজানোর সময় থেকেই নির্ধারিত ল্যু-এর এই অবস্থান ও পদ। কিন্তু সরি ল্যু! সো ফার তার সাকসেস প্রায় জিরো!  পাকিস্তানে আর সর্বশেষ হাসিনার বাংলাদেশে ল্যু-এর আইপিএস স্ট্রাটেজির এর অর্জন শুন্যই বলা যায়। তবে এবার তিনি ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। আর খুব বেশি এটা আগাবে এমন সম্ভাবনা কম!

    চার. ভারত চাইবে এই আলাপের ছায়ায় এক ফাঁকে চীন ঠেকানোর ঠিকাদারি-টা আবার পাওয়া যায় কিনা! সেদিকটা উস্কে তুলতে; আবার যদি লাইগ্যা যায় – আর কী!  একদম আগের মতই না হলেও ভিন্ন মোড়কে অথবা কিছু অংশের কাজ!
    কিন্তু না। আমেরিকা এদিকে ভারতকে আবার এই ইস্যুতে ছাড় বা ঠিকা দিবার জায়গা এবং পরিকল্পনা কোনটাই নাই। আর তা থেকেই আলোচনায় ভারত বিরোধাত্মক ইস্যুগুলোকে সামনে তুলতে শুরু করে ফেলতে পারে। তাহলে, ভারত-আমেরিকার এবারের সংলাপ মোদির শেষ জমানা খারাপ পরিণতি ফলাফলের দিকে রওনা দিবে!

    পাঁচ. অথচ বিবিসি লিখেছে, “বৈঠকে দুই দেশের চারজন মন্ত্রী মিলে সার্বিকভাবে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েও আলোচনা করবেন বলে ডোনাল্ড লু নাকি মন্তব্য করেছেন। কিন্তু এই প্রসঙ্গে কোনও বিশেষ দেশের নাম তিনি উল্লেখ করেননি। আসলে দোনাল্ড ল্যু এর বরাতে যা যা বিবিসিতে শুভজ্যোতি লিখেছেন এর সবটাই মিথ্যা প্রপাগান্ডা! তাই কোন রেফারেন্স এখানে নাই যে ল্যু এসব কথা কোথায় বলেছেন???

    এসব কথা থেকে পরিস্কার যে বিবিসির এই কথিত রিপোর্ট একেবারেই ভুঁয়া। ঘরে বসে ইচ্ছামত বানানো! ভারত-মার্কিন সংলাপে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়ে কোন আলোচনা এমনিতেই হওয়ার সুযোগ নাই। কারণ, ১। তা সংলাপ কাঠামোর মধ্যে পরে না। ২। এসময়ে ভারত বা  বাংলাদেশের কারো ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েই আলোচনা তোলাটাই ভারতের জন্য রিস্কি। কারণ, তাতে ভারতের নিজের ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েও আলোচনা উঠে যেতে পারে।‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ ইস্যুটাই মোদির জন্য সেনসেটিভ। সেই খবর যার নাই তিনি বিবিসির এই মনগড়া রিপোর্ট লিখতে গেছেন বলেই এই সমস্যা।

    তাহলে কী দাঁড়ালোঃ
    ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ নিয়ে আজ বাংলাদেশ প্রসঙ্গের নামে যা কিছু হয়েছে এর কোন বিশ্বাসযোগ্যতাই নাই। বিশেষ করে বিবিসি এনিয়ে অপরাধী-সাংবাদিকতা করেছে।
    কিছুক্ষণ আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কাত্রার বয়ানে মানবজমিনে যা ছাপা হয়েছে সেটার উপর বিশ্বাস মানবজমিনও রাখে নাই; এমন না রেখেই মানবজমিন এই রিপোর্ট ছেপেছে।
    আবার ভারত-মার্কিন যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কাত্রার আবার বক্তব্য কেন? তিনি কিভাবে এটা দিতে পারেন? উনি কে এখানে? দুই পররাষ্ট্র-মন্ত্রীর যৌথ বক্তব্যের পরে তিনি কে?? কী তার প্রটোকল????
    ভারতের চেষ্যেটা হল, গায়ের কাপড় খুলে গেলেও ন্নযাংটা হয়েও যদি  হাসিনার ক্ষমতাকে যেকোন উপায়ে কিছু প্রাণ পাইয়ে দেয়া যায় কীনা – এরই এক মিথ্যা প্রাণান্তকর প্রয়াস!
    ভারতের এই খামোখা প্রচেষ্টা উলটা হাসিনা ও লীগের বিরুদ্ধে যাবার সম্ভাবনাই বেশি! মানুষ বিরক্তবোধ করবে, যে এত মিথ্যা বলার কী দরকার!  মিথ্যা কারো সঙ্গি হয় না!

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ   ১১ নভেম্বর  ২০২৩,   দুপুর ০১ঃ ৩৫

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ভারতের পালিওয়াল গং – মুখে হারের সুর;

    ভারতের পালিওয়াল গং – মুখে হারের সুর;
    বাংলাদেশের ভারত সমালোচকদের সাথে আপোষের পরামর্শ!

    গৌতম দাস
    ০৭ নভেম্বর ২০২৩    ১৮ঃ ৫৭
    https://wp.me/p1sCvy-56t

     

              “The AL believes the use of force and mounting casualties in the Opposition camp will rupture party supremo Tarique Rahman’s command and control over the BNP.”

     

    ওরা ভয় পেয়েছে! কমরেড!
    সিপিবি-মার্কা স্টাইলে লিখলাম!

    কিন্তু ওরা কারা!
    অবিনাশ পালিওয়াল এন্ড গং; মনে হচ্ছে এরা ভয় পেয়েছে!  অবিনাশ পালিওয়াল [Avinash Paliwal]; তার নামটা ইংরাজিতে যেভাবে হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে তা উচ্চারণ করার সময়ে সেটা অনুসরণ না করে বরং, আমাদের  বাংলা শব্দে লিখলে যেমন হবে সেভাবে লিখলাম – অবিনাশ পালিওয়াল। এই অবিনাশ আবার একটা লেখা দিয়েছে; তাঁর লেখায় তিনি সাধারণত বাংলাদেশের আর্মি নিয়ে হালকা টাচ রেখে লিখে থাকেন, এবারও তাই করেছেন। তাঁর স্টাইলে তিনি ব্যাপারটাকে সবসময় তিনি লিখে থাকেন সিভিল-মিলিটারি রিলেশন [civil-military relations in Bangladesh] – এভাবে। এবারও ব্যতিক্রম হয় নাই।
    তাঁর লেখা হিন্দুস্তান টাইমসে ৪ নভেম্বর ছাপা হয়েছে। শিরোনাম Elections in sight, churn in Bangladesh politics , যার অনুবাদ মানবজমিন ছেপেছে গতকাল ৬ নভেম্বর; শিরোনাম নির্বাচন এবং বাংলাদেশের রাজনীতি, ভারতের যা করা উচিত...। অনেকে বলেছেন মানজমিনের শিরোনামটা মূল লেখার শিরোনামের বাংলা অনুবাদ নয় কেন? প্রথমত বাংলা অনুবাদ দিতে মানবজমিন বাধ্য নয়। আর এর চেয়েও বড়কথা এই শিরোনামটা লেখাটার বিষয়বস্তু যা আছে এর সঠিক প্রতিফলন! অবিনাশ সত্যিই  ভারতের যা করা উচিত তাই নিয়েই লিখেছেন।

    কিন্তু অবিনাশ কে? কেমন লেখা তিনি লেখেন?
    অফিসিয়ালি তিনি লন্ডনের এইক বিশ্ববিদ্যালয় সোয়াস [SOAS University] এর সিনিয়র লেকচারার যেখাকনে তাঁর ফ্যাকাল্টি সাবজেক্ট হল ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস [IR]। লন্ডনের কিংস কলেজ আর এই সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাথে ( আমেরিকা বা পশ্চিমের অর্থে নয়) বরং ভারতের শীর্ষ ব্যাবসায়ীদের অর্থে পরিচালিত এক থিঙ্কট্যাংক ORF [Observer Research Foundation] আর, এসবের সাথে জড়িয়ে থাকা ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান র’ – এভাবে সবটা মিলিয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট ততপরতা তারা চালিয়ে থাকে লন্ডন শহরে বসে। যেটা দেখে মনে হতে পারে যে এরা তো ভারতের বাইরের কেউ, আলাদা। কিন্তু আসলে এরা ভারত সরকার নিয়ন্ত্রিত ও সংগঠিত। অবিনাশ পালিওয়াল এদেরই নিয়োজিত [assigned] একজন! বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ (বিশেষত বাংলাদেশ আর্মি) তাঁর সাবজেক্ট! অনেক সময় তাঁর মাধ্যমেই ভারতের প্রতিক্রিয়া আমাদের কাছে পৌছানো হয় বা আমাদেরকে জানানো হয় – এভাবেও মনে করতে পারি।

    এবার অবিনাশ কী ভারতীয় ম্যাসেজ নিয়ে এসেছেনঃ 
    তিনি শুরুতেই বলছেন, “ঢাকায় সরকার ও বিরোধীদের অচলাবস্থা এটা নির্বাচনী গণতন্ত্রের উপর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, এমনকি সিভিল-মিলিটারী সম্পর্কের উপরও ছাপ ফেলবে [The Government-Opposition stand-off in Dhaka will have consequences for electoral democracy, may impact civil-military relations]”। এই বাক্যের নির্বাচনী-গণতন্ত্র না হয় বুঝলাম কিন্তু এতে  সিভিল-মিলিটারী সম্পর্কের উপর ছাপ কথাটা কোথা থেকে এলো আমরা জানি না। কারণ এটা একটা ইঙ্গিতপুর্ণ কিন্তু অস্পষ্ট করে রেখে দেয়া বাক্য! সাধারণত যার উদ্দেশ্য থাকে লেখক নিজে না বলে পাঠককে নিজ অনুমান করে নেয়া কোনহ অর্থ করে নিয়ে বুঝতে বাধ্য করা বা ঠেলে দেয়া।
    এটা তো পরিস্কার যে সরকার ও বিরোধীদের অচলাবস্থা বা সংঘাত যেটা লেখক ইঙ্গিত করছেন সেখানে বাংলাদেশের মিলিটারি তো কোন পক্ষই নয়।  বর্তমান দৃশ্যপটের কোথাও মিলিটারির কোন উপস্থিতিই নাই, কোন পক্ষ নয় সে! তাহলে, তা সত্বেও মিলিটারির প্রসঙ্গ তুলে উস্কানি দিচ্ছেন তিনি, এটাই আমরা দেখছি। কেন? এমন কোন ঘটনা মানে আরো গভীর ভারতীয় ধারার কোন ঘটনার মধ্যেই কী তিনি ভারতীয় স্বার্থ দেখতে পাচ্ছেন? এনিয়ে অবিনাশকে আমাদের একটা কথাই বলার আছে তা হল, এটা ২০০৭ সাল নয়! ফলে সেসময়ের মত আরো গভীরভাবে ভারতীয় স্বার্থের পক্ষে কোন ক্ষমতার উত্থান এবার ঘটবে না। মূল কারণ এবার বাংলাদেশকে আবার আরো ভারতীয় স্বার্থময় করে ভারতের হাতে তুলে দেয়া ঘটতে দেয়া হবে না। আমাদের  আম-জনগণ এবার নিজ স্বার্থের পাহারাদার।

    শিয়াল যেমন মুরগি ধরতে পারলে খুশিতে লোভে চকমকে হয়ে উঠে তেমনি এক শব্দ ধুর্ততা বা ধুর্তামি শব্দ হল কানেকটিভিটি [connectivity]।  যার আসল মানে হল ভারতের নর্থ-ইস্ট অঞ্চল থেকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে ইচ্ছামত এবং বিনা পয়সায় করিডোর ও পোর্ট সুবিধা নেয়া! তা এমন ভাবে নেয়া যেন এই সুবিধা নেয়াটা ভারতের বাপের সম্পত্তি। আর কানেকটিভিটির নামে বাংলাদেশ নিজ স্বার্থ খুইয়ে ভুলে গিয়ে ভারতের জন্য কাজ করাই যেন বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কাজ! এমনকি করিডোরের জন্য রাস্তাঘাট সহ সব অবকাঠামো বা পোর্ট অবকাঠামো বিনির্মাণের জন্য যে সরকারকে যে বিদেশি ঋণ নিতে হবে এটাও আমাদের জনগণের দায়! আর ভারত এখান থেকে বিনা পয়সায় এই সকল নির্মিত অবকাঠামো ব্যবহার করবে – এর নামই কানেকটিভিটি!!!
    ঘটনা হল আসামসহ নর্থ-ইস্ট তো বাকি ভারতের সাথে শিলিগুড়ি দিয়ে এখনও ১৯৪৭ এর দেশভাগের  যুক্তই আছে।  সেকালে নেহেরু এসব সুবিধাতেই সন্তুষ্ট ছিলেন বলেই তো তিনি নর্থ-ইস্টের আরোও কোন  করিডোর ও পোর্ট সুবিধা চান নাই। তিনি পুর্ণ সন্তুষ্ট ছিলেন বলেই তো আর কোন কথা তিনি নিজ তার কালে এমনকি পুরা গত শতকে কখনও খায়েজ করেন নাই, কাউকে জানান নাই! অরররথাত করিডোর ও পোর্ট ভারতের জন্য অত জরুরি কিছু নয়।
    কিন্তু একালে একটা বিশেষ সরকারকে জবরদস্তিতে ক্ষমতায় রাখার পক্ষে ভারতের সমর্থনের বিনিময়ে বাংলাদেশকে বিনা পয়সায় কানেকটিভিটির ব্যবস্থা করে দিতে হবে সেটা তো বাংলাদেশের সেই সরকারের দায় ও স্বার্থ! এটা কোনভাবেই বাংলাদেশের আম-জনগণ এর স্বার্থ নয়! কাজেই কানেকটিভিটি শব্দটার আমাদের কাছে অর্থ হল রক্তচোষা-লুটেরা!  ।

    তামাসার কথা হল, এই রক্তচোষা-লুটেরা! শব্দ কানেকটিভিটি এর দোহাই দিয়েই অবিনাশ নিজের খুশি প্রকাশ করেছেন; আর ভারতের কোর স্বার্থও দেখেছেন। শুধু তাই না দাবি করেছেন যেহেতু বাংলাদেশের কানেকটিভিটি নিতে ভারতের স্বার্থ আছে তএব বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে ভারত শেয়ার হোল্ডার মহয়াজন! [Such deepening of infrastructural connectivity inevitably raises India’s stakes in Bangladesh’s politics.]
    অবিনাশ নিজেকে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস এর শিক্ষক বলে পরিচয় দেন। অথচ কান্ড দেখেন!  এর মানে হল ভারতের কোন বিদেশি ব্যবসায়ীর যদি বিনিয়োগ থাকে তবে ভারতের রাজনীতিতে আবার বলছি ভারতের রাজনীতিতে ঐ ব্যবসায়ীর ভাগীদারি বা স্টেক [stakes] আছে! সোজা কথা অর্থনীতিক বিনিয়োগে ভাগ থাকলে রাজনীতিতেও আপনি ভাগীদার? একথা একজন  ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস এর শিক্ষক বলেন কেমন করে????
    সবই আসলে মামার বাড়ীর আবদার! যা ইচ্ছা যা দরকার সবই তারা আবদার করতে পারে। বাস্তবতা হল, বাংলাদেশে এবারের রাজনীতিক অসন্তোষের পরিণতিতে  যদি হাসিনার ক্ষমতার যুগের অবসান ঘটে তবে ভারতের মামার বাড়ী উপভোগের অবসান ঘটবে!  অবিনাশ পালিওয়ালের  উচিত হবে সেসব পরিণতিতে কী করবেন তা নিয়ে মনোযোগী হওয়া!  সবচেয়ে বড়কথা এবারের আমেরিকান স্বার্থ শুধু হাসিনার বাংলাদেশের জন্য বৈরি তাই নয়। এটা মোদির ভারতের জন্যও সমান বৈরি! বাইডেন মোদিকে আবার নির্বাচিত দেখতে চায় না – এর ছায়া ইতোমধ্যেই ভারতের রাজনীতিতে পড়ে গেছে, সরগরম হয়েছে। তা এমনকি ফেসবুকের মজা-তামাসা করার বা ব্যক্তি-নিজেকে তুলে ধরার যে রিল [reel] স্টাটাস; সেখানেও তা ছড়িয়ে পড়েছে। যার মূল ইস্যু মোদি গত প্রায় দশবছর ক্কোথায় কী মিথ্যা বলেছেন তা নিয়ে ভিডিও প্রমাণসহ ট্রল করা!  সেদিকে এত বড় একটা বিষয় থাকতে অবিনাশ খামোখা বাংলাদেশ নিয়ে পড়ে আছে!!! তাই নয় কী??

    অবিনাশ ইতোমধ্যেই হাসিনাবিরোধী অবস্থানেঃ
    কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে অবিনাশের এই লেখায় ইতোমধ্যেই তিনি হাসিনার হাত ছেড়ে দিয়েছেন, এই অর্থে যে তিনি হাসিনার অসংখ্য ভুল ত্রুটি তুলে ধরেছেন আর তা করেছেন বিরোধী অবস্থানে বসে। যেমন তিনি হাসিনাকে ডায়লগ-বিরোধী বলে [Hasina refusing dialogue  দোষারোপ করেছেন। সরকারের পরিচালিত দানবীয় দমন [ State-led crackdowns] চলছে বলেছেন। এমনকি বিএনপির প্রশংসা করে লিখছেন [politics in Bangladesh has evolved along expected lines. ]। বিএনপি সক্ষমতা দেখিয়েছে demonstrated the capability ,  হাসিনাবিরোধীদের জড়ো করেছেন [capitalise politically on widespread discontent against Hasina], আর সবচেয়ে বড় সার্টিফিকেটটা না দিয়ে পারেন নাই। বলেছেন, বিএনপি project itself as a secular-liberal actor by at least publicly disassociating from the Jamaat-e-Islami and mobilise considerable diplomatic support in the West।   যার সোজা মানে হল, অবিনাশ পালিওয়াল ঘুড়িয়ে স্বীকার করে নিছেন যে তার মত ভারতীয়রা হেরে গেছেন, তাঁদের প্রপাগান্ডা ফেল করেছে। তাঁরা এখন হাসিনার পতন দেখছেন টের পেয়েছেন তাই যত দ্রুত সম্ভব হাসিনার হাত ছেড়ে বিএনপির কোলে উঠতে কসরত শুরু করেছেন!

    বিএনপি এক শৃঙ্খলা মেনে চলা শক্তিঃ
    পালিওয়াল বিএনপিকে এই লেখায় এত বেশি সব সার্টিফিকেট দিয়েছেন যা ধরে রাখার পাত্রের অভাব দেখা দিয়েছে।   গত পনেরো বছর ধরে আমরা শুনে আসছে হাসিনা ছাড়া বিএনপি-জামাত সহ বাকি সবাই আমরা জঙ্গি! আমাদের চিন্তা-রাজনীতি সবই জঙ্গি; মানে হল বাস্কিরা আমরা ভারতের সাথে একই টেবিলে বা একই আসরে বসারই অযোগ্য মানুষ! যেন আমাদের চেহারাটা মা-কালির মত রুদ্র-মুর্তির,  হাতে কোপ-মেরে মাথা আলাদা করার খাঁড়া, আর গা-থেকে পোষাক থেকে রক্ত ঝড়ছে ইত্যাদি। ভারতের চোখে ফলে সেই সুত্রে বাংলাদেশের হিন্দুত্ববাদী প্রগতিবাদীদের চোখে বাংলাদেশের হাসিনা বাদে বাকি আমরা সবাই জামাত-বিএনপির দানব সব একেক জন!  গত প্রায় পনেরো বছর ধরে আমাদের এই চিত্র-কল্প, এই গল্প-গাথা এই ভিতরেই ছিল আমাদের বসবাস; কোন রকমে দিন গুজরান!

    কিন্তু অবিনাশ পালিওয়াল আজ আমাদের কী কথা শুনালেন?
    BNP’s image as being a disciplined force

    তিনি বড় বড় অক্ষরে লিখেছেন –  BNP’s image as being a disciplined force। বাংলায় বললে, বিএনপির আজ ইমেজ নাকি এক সুশৃঙ্খল শক্তির। শুধু তাই না, আরো সাংঘাতিক সব প্রশংসাবাণী! পরে যোগ করেছেন এই বিএনপি নাকি এতই অহিংস যে উলটা তারাই ভিকটিম যারা আওয়ামি ত্রাস গুপ্ত-হত্যাকারী এবং পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে আত্মরক্ষা করে টিকে আছে ...that is defending itself from AL henchmen and the police.।

    প্রথম কথা কথা হল, গত পনেরো বছর ধরে ভারতের কোন একাদেমিকের বয়ান মানেই ছিল তাঁরা জামাত-বিএনপি নাম করলেই বুঝতে হল এরপর তারা আমাদের সকল হাসিনা-বিরোধীদের বিরুদ্ধে কুতসা আর ঘৃণামূলক বাক্য বলবেন! এই ছিল রুল!! আর তাতে সবচেয়ে বড় ক্রিমিনাল যেন হয়ে থাকতে দেখা যেত তারেক রহমান-কে। কিন্তু আজ এই লেখায়, একেবারেই উলটা। এই আন্দোলনে “বিএনপির অর্জন” এভাবে না বলে, পালিওয়াল লিখছেন  From Rahman’s viewpoint, মানে রহমানের (তারেক রহমান) দৃষ্টিভঙ্গিতে… এভাবে।  যদিও এটা বলার পরের বাক্যে কিছু গড়বড় করেছেন যেটা নিচে সরাসরি কোট করে তুলে আনা হয়েছে আগ্রহিরা দেখতে পারেন। পালিওয়াল দেখছেন, হাসিনা যথেষ্ট কোনঠাসা হয়ে গেছেন। কিন্তু আবার লিখে ফেলেছেন বিএনপি সামরিক হস্তক্ষেপ ডেকে আনতে পারে। যদিও পালিওয়াল বলেছেন, এই ডেকে আনাটা “বিএনপিকে সারবস্তুতে কোন সুবিধা দিবার সম্ভাবনা কম, কিন্তু এই বাহিনী যাই করুক তা রহমানের পক্ষেই যাবে”!
    প্রথমকথা বাহিনী নিয়ে এসব আলোচনা অস্বস্তিকর; তাও আবার বিদেশির মুখে! দ্বিতীয়ত, জল্পনা-কল্পনায় এমন যা খুশি লিখে দেওয়া আর আমাদের তাতে অংশ নেয়ার মানে হয় না, তাতে তা যতই পাঠকের আকাঙ্খার পক্ষের বক্তব্য মনে হোক না কেন! আর কিছু শব্দ ও বাক্য যেখানে বাস্তবতা-বর্জিত! কাজেই পালিওয়ালদের এই পল্টি-মারার দিকটা যে বিএনপি-জামাত এখন খুব ভাল সুশৃঙ্খল – এদিক্টা  দেখানো ছাড়া আর কোন দকে আমরা আলোচনা নিব না!

    From Rahman’s viewpoint, Hasina is cornered enough
    to either step down or engage in violence triggering
    wider civil strife. The former can enable the formation
    of a caretaker government,
    the latter could
    invite military intervention.
    The army’s re-entry into politics is unlikely
    to benefit the BNP substantially, but it could
    even the playing field in Rahman’s favour.

    এছাড়াও LG (retired) Hasan Sarawardi এর গ্রেফতার নিয়েও তিনি অনেক গল্প আর ইঙ্গিত রচনা করেছেন। যেসব অর্থহীন! এসব ভারতের পক্ষেও যায় নাই, পালিওয়াল অনেক করিতকর্মা ও জ্ঞানী বা অনেক জানেন ইত্যাদি এসবের কোনটাই মানে হয় নাই, প্রমাণ হয় নাই। বরং তার নাদানি-ই তুলে ধরেছে!  বুঝা গেছে তিনি প্রপাগান্ডা রচনার জন্যও কত আনফিট!

    সবশেষে, মোদি সরকারের জন্য পালিওয়ালের পরামর্শঃ
    হ্যা, পালিওয়ালের মোদিকে দেয়া পরামর্শটা বরং ইন্টারেস্টিং।  প্রথমত কথাগুলো তিনি ছোট করে এক বাক্যেই লিখেছেন।
    যার সারকথাটা হল, হাসিনার দিন শেষ – এটা পালিওয়াল এন্ড গং এরা বুঝে গেছে! যেমন তারা ভারতকে (মানে মোদি সরকারকে) বলছে ইতিবাচক হতে। কোন বলপ্রয়োগে দমনের রাস্তাকে সমর্থন করা ত্যাগ করতে। আর বরং একটা নিরপেক্ষ অবস্থান তৈরি করে নিতে। যাতে বাংলাদেশে যারা ভারতের সমালোচক আছে তাঁদের জন্য দুয়ার খুলে রাখা হয়। বাংলাদেশে যে ঝড় উঠেছে (হাসিনা পতনের লক্ষ্যে) তা পুরণ-সমাপ্ত হলে যেন তাঁদের সাথে একটা আপোষ করে নেয়া যায়!

    The best way to ensure that India preserves some positive equities,
    and is not compelled to explore high-cost coercive options, is to
    craft an impartial position that leaves the door open to
    reconciliation with the numerous India critics in
    Bangladesh after the storm passes.

    কিন্তু অবিনাশ পালিওয়াল এর আহবান ও ততপরতা কী বাংলাদেশের মানুষের মনে আগ্রহ জাগাবে?   সম্ভাবনা কম। কারণ , গত পনেরো বছর যারা লুটে-চুষে খেয়েছে তাদেরকে বাংলাদেশ কীভাবে ও কেন বিশ্বাস করবে? আর কাদেরকে করবে? ভারতের হিন্দুত্ববাদ-কে? আর আমরা তো অনেক দুরের! সবার আগে ভারতের মুসলমান বা মোদি-বিরোধিদের প্রতি যে বৈষম্য চলছে এর অবসান করে দেখান! তাদেরকে সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে দেখান! নাকি? সবার আগে এই পরীক্ষায় পাশ করে দেখান! এসব একাদেমিশিয়ানেরা এব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন। আগে এরা নিজের অবস্থান জানাক!
    আর হাসিনা পরবর্তি (যদি হয়) বাংলাদেশের কাছে ভারত, এটা ক্রমশ ২০০৬ সালের ভারত হতে চলেছে। দিন একই রকম থাকে না, বদলে যায়; গুজর গেয়া!  তাই সেই আগামি দিন থিতু হয়ে উঠার পরে দেখা যাবে! এখন সব পতন আর ভাঙনের দিন! আর কত!
    আর আগামিতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভাল হবার কোন কারণ দেখিনা। তাতে সেই ভারত ২০২৪ সালের মে মাসের নির্বাচন পরবর্তি যতই নয়া ভারত বা হিন্দুত্ববাদ-বিরোধীই হোক না কেন! মূল কারণ, বাংলাদেশের আম-মানুষের ভারতের উপর নুন্যতম আস্থা-বিশ্বাস নাই!  আর বলাই বাহুল্য নয়া সবকিছু শুরু হতে পারে একটা ন্যায়-ইনসাফে পুরান ঘটনাবলীর বিচার থেকে যার কোন সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না! তাই আপাতত ফুলস্টপ! সব ফেলে রাখেন!!!

    সর্বশেষ আপডেটঃ  রাত ০৯ঃ ৩৭, ০৭ নভেম্বর    ২০২৩,

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • চন্দন নন্দী-রানা দাসগুপ্তদের ব্যর্থ করে দিতেই হবে!

    ওরা ইসলামি দল খুঁজেছে!
    চন্দন নন্দী, রানা দাসগুপ্তদের ব্যর্থ করে দিতেই হবে!
    গৌতম দাস

    ১৫ অক্টোবর ২০২৩    বিকেল ১৭ঃ ২৩

    https://wp.me/p1sCvy-55l

              কুমিল্লায় হামলার প্রতিবাদে শাহবাগে অবস্থান হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের

     

    এবার ২০২৩ সালের দুর্গাপুজা আগামি সাতদিনের মধ্যেই শুরু হবে। মানে পুজা শুরু বা সপ্তমী হবে সম্ভবত ২১ অক্টোবর শনিবার। কিন্তু ইতোমধ্যেই সেই চন্দন নন্দী বা “কংগ্রেসি ‘র’” কানেকটেড লেখক – তিনি এবার ‘র’ এর হয়ে, গত ২০২১ সালের দুর্গাপুজার সময়ে ঘটা ঘটনার (বসা মুর্তির কোলের উপর কোরান শরীফ রেখে আসা) মত করে আবার খুব সম্ভবত সেই কুমিল্লা থেকেই দাঙ্গা ও উত্তেজনা তৈরি করে এর দায় বিএনপি বা কোন ইসলামি দলের উপর চাপানোর প্রচেষ্টা নিয়েছে।  গত পরশু ১৩ অক্টোবর তিনি লিখেছেন, “কুমিল্লা শহরে নাকি হেফাজতে ইসলামিরা শুক্রবারের জুম্মার নামাজের পরে কুমিল্লার হিন্দু মাইনরিটির আক্রমণ করেছে ও ধাওয়া দিয়েছে”।

    …another crowd of Islamists belong to the Hefazat-e-Islam,
    after offering Friday prayers, chased and attacked members
    of the minority Hindu community in Comilla district…

    অথচ বাংলাদেশের যেসব মিডিয়া ঘটনাটা কাভার করেছে তাতে উল্লেখিত বর্ণনায় ফ্যাক্টস হল,  এটা কুমিল্লা আওয়ামি লীগ বনাম রানা দাসগুপ্তের সংগঠন (হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীশ্চান ঐক্য পরিষদ, HBCUC) – এদুই সংগঠনের মধ্যকার গত কয়েকদিনের ঝগড়া ও তর্ক-বিতর্ক; আর তা থেকে কুমিল্লা শহরে গত শুক্রবার তাঁদের দুই মিছিল মুখোমুখি হয়ে গেলে শ্লোগান-পাল্টা শ্লোগানের পরে হাতাহাতিতে ‘ঐক্য পরিষদের’ চারজনের মাথা ফেটে যাবার মত আহত হয়েছে। অর্থাৎ সারকথায় ঘটনা আসলে আপন ঘরে ঘরের বিবাদ! মানে কোন ইসলামি সংশ্লিষ্টতা দূরে থাক কোন ইসলামি গন্ধও নাই! বরং এতা হল, আওয়ামি লীগের সাথে ভারতের তল্পীবাহক এক বাংলাদেশী হিন্দু সংগঠনের ‘ঐক্য পরিষদের’ বিবাদ। অথচ চন্দন নন্দী ঘটনাটার মধ্যে হেফাজতে ইসলামকে আবিস্কার করেছেন। বাংলাদেশের আজকের পত্রিকা, প্রথম আলো, সমকাল, যুগান্তর,  মানবজমিন, ডেইলি স্টার ইত্যাদি মিডিয়ায় এমনকি চন্দন নন্দীর প্রিয়  বিডিনিউজ২৪ অথবা ‘অসাম্প্রদায়িক’ দেশ রূপান্তর, প্রো-ইন্ডিয়ান কালের কন্ঠ এমন প্রত্যেকটা পত্রিকায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে বিবাদটা  আওয়ামী যুবলীগ ও রানা দাসগুপ্তের ঐক্য পরিষদের মধ্যে।  মানে হেফাজত-সহ কোন ইসলামি সংগঠন এর সাথে -পাঁচেই নাই। কোন ছায়াও নাই!  অথচ চন্দন নন্দী চারদিকে একাই কেবল ইসলামি দল দেখতে পেয়েছেন। কারণ, খোদ রানা দাসগুপ্তও কোন ইসলামি দলকে নয়, খোদ সরকারকে দায়ী করে শাহবাগে বক্তৃতা করেছেন। তিনি বলেছেন, “কুমিল্লায় স্থানীয় সংসদ সদস্য বাহাউদ্দিন বাহারের অনুসারীরা এই হামলা চালিয়েছেন” ।  প্রথম আলোর সোহরাব হাসানও এবার ছাত্রলীগ-যুবলীগের টার্গেট সংখ্যালঘুরা শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয় লিখেছে।
    অথচ, চন্দন নন্দীর লেখায় দাবি, বাংলাদেশের মুসলমানেরা হিন্দু মেরেছে। মানে হল, বাংলাদেশের মুসলমানেরা হিন্দু দেখলেই যেন খাবলিয়ে ছিঁড়ে খেতে তেড়ে আসছে নরেন্দ্র মোদির বজরং দলের গুন্ডাদের মত – এমন কাল্পনিক এক ছবি এঁকে নিজ গল্পগাথার কথা বলে গেছেন চন্দন নন্দী। লিখেছেন, …after offering Friday prayers, chased and attacked members of the minority Hindu community in Comilla district। মানে মিথ্যা কাল্পনিক বয়ানেরও একটা সীমা থাকে নন্দী সেটাও মানতে চান নাই। এখন এটা কী ‘র’ এর মরিয়া কোন  পুজা-এজেন্ডা নাকি অর্থের পাহাড় প্রমাণ চাপের কারণে ঘটেছে – তা জানা যায় নাই!
    আবার তিনি বাংলাদেশের সকল মিডিয়ায় প্রকাশিত বয়ান যেখানে বলা হয়েছে আক্রমণকারীরা যুবলীগ ও ছাত্র লীগের – সেটাও তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন আর আবার বলছেন আমাদের মিডিয়া নাকি ঢাকাঢাকি করে ভিন্ন লেবেল লাগিয়ে রিপোর্ট লিখেছে –  The Bangladeshi media labelled the attackers as men belonging to the Juba League and the Chhatra League.”। মানে হল নন্দীর দাবি,  বাংলাদেশের সকল মিডিয়াই নাকি মিথ্যা করে আক্রমণকারীরা যুবলীগ ও ছাত্র লীগের বলেছে বা চিহ্নিত (labelled) করা হয়েছে। অর্থাৎ চন্দন নন্দী-ই হলেন একমাত্র সত্যবাদী যুধিষ্ঠির!  তিনি কোন এক গায়েবী চোখে দেখেছেন???

    চন্দন নন্দী ও ‘র’ এর এই ডেসপারেট বা মরিয়া হয়ে মিথ্যা বলা – এটাই
    আমাদের শঙ্কিত করে যে তারা এবারের দুর্গাপুজার সময়ে এরা আমাদেরকে
    শান্তিতে থাকতে দিবে না, এমন কোন পরিকল্পনা করেছে কিনা!
    তাই ইতোমধ্যেই কোন একটা ইসলামি সংগঠনের নাম হাতড়িয়ে বেড়াচ্ছে!

    চন্দন নন্দীর এমন ভয়ংকর দানব  হয়ে উঠার পিছনে আমাদের প্রগতিশীলদের দায় আছেঃ
    চন্দন নন্দী; ভেবেছিলাম একে নিয়ে আর লিখব না, বোধহয় লিখতে হবে না! কিন্তু না। যে এবার একবারে ভারতের গোয়েন্দা-অন্তর্ঘাতমূলক কাজ ও এমন সংস্থা [RAW] এর সাথে সরাসরি জড়িয়েছে। আসলে  যে জীবনে কখনও এমন জড়িয়েছে সে তা আর জীবনেও ছাড়তে পারে না। এই কথাটাই এখন আরো স্পষ্ট করে বলা যায় যে ভারতের চন্দন নন্দীর বাবা – তিনি ছিলেন মানে তিনি সাবেক ‘র’ এর কর্মকর্তা এজেন্ট। কিন্তু সেসব মোদি ২০১৪ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগের ঘটনা। তাই তিনি ‘কংগ্রেসি র’। পরে মোদির জমানায় এসে এরাই হয়ে গেছিলেন মোদির ‘র’ এর  ঢেলে সাজানো নয়া কর্তাদের সহকারী!  কাজেই সেই সুত্রে বাবার ‘র’ কলিগ, জুনিয়র বা কলিগের ছেলে ইত্যাদিদের সুত্রে চন্দন নন্দীও ‘কংগ্রেসি র’। আর এরাই এখন তার গুজব বা আধাসত্য বয়ান বা খবরের উৎস। আর একারণে, অনেক আগে লিখেছিলাম চন্দন নন্দী ‘কংগ্রেসি র’। এমনিতেই ১৯৬৮-৭০ সালের দিকে জন্ম নেয়া ‘র’  এর উত্থান, বিকাশ সবই কংগ্রেসের হাতে আর সেই সুত্রে, ‘কংগ্রেসি র’ মানে প্রায় ঘরের ছেলের অবস্থা ইত্যাদি । যা প্রায় ২০১৩ সালের শেষ পর্যন্ত কমবেশি প্রবল বহাল ছিল।  এছাড়া ‘কংগ্রেসি র’ এই নামকরণ আবার লক্ষ্য করেছি  চন্দনের মত কিন্তু ঢাকার বাসিন্দা এমন ‘কংগ্রেসি র’ যারা আছেন; যারা, বলাই বাহুল্য আওয়ামি জমানায় বহাল তবিয়তে থাকছেন, তারাই নিজেরা নিজেদের পরিচয় দেয় এভাবেই – ‘কংগ্রেসি র’ বলে, তা শুনেছি। এছাড়াও এমনকি এসব সুত্রে ঢাকার অনেক সরকারি অফিসও চন্দনের আধাসত্য বক্তব্যের স্কুপ সোর্স হওয়া বিচিত্র নয়, বরং স্বাভাবিক হয়ে গেছে!

    এবছর চন্দন নন্দীকে নিয়ে লিখেছিলাম আমিই প্রথম যখন তিনি বিডিনিউজ২৪ পত্রিকায় একটা লেখা ছাপেন  গত ২ সেপ্টেম্বর, যা হাসিনা-মোদি দুই সরকারকেই বিব্রত করেছিল। ফলে বিডিনিউজ২৪ ওয়েব পত্রিকাটা বন্ধ হয়ে গেছিল, যা সম্প্রতি আবার খুলেছে। এরপরে লক্ষ্যণীয় যে চন্দন তাঁর লেখার প্রসঙ্গ / বিষয় বদল করে মানে কার দিক থেকে লিখবে সেই এটিচ্যুডে বদল ঘটিয়েছেন। চন্দনের সাধারণ ঝোঁক হল, ‘র’ এর ঘরের তথ্য বাইরে প্রকাশ করে দিয়ে ক্রেডিট নেয়া। আর নন্দীর এমন করার পিছনের সাইকোলজিটা হল – চন্দনের বাবার সাথে চন্দনের বনিবনার অভাব। আবার এর পিছনে ঘটনা হল, চন্দন পশ্চিমে উচ্চশিক্ষা শেষ না করে ভারতে ফেরত আসা, টাইমস অব ইন্ডিয়ায় চাকরিরও সমাপ্তি ইত্যাদি এসব নিয়ে সম্ভবত ‘র’ এর এজেন্ট বাবার সাথে তার ব্যাপক ও গভীর মনোমালিন্য।  বর্তমানে সে কোথাও কোন চাকরিতে নাই। কিন্তু খেপ মারতে হয় ফ্রি-ল্যান্সার নামে আর পুরানা ‘র’ এর যোগাযোগ-গুলো ব্যবহার করে…।
    তাই এবার প্রথম বিডিনিউজে সে লেখা ছাপিয়েছিল  হাসিনা-মোদি দুই সরকারকেই জন্য বিব্রতকর হবে এমন বয়ান ছাপিয়ে। চিন্তা না করে কাজে ওস্তাদ চন্দন নন্দী এখানেও ভেবে দেখে কাজ করেব নাই যে এর পরিণতি কী হবে! তাই ঘরের ভিতর খারাপ প্রতিক্রিয়া হওয়া স্বাভাবিক! সম্ভবত সেকারণে, আমরা দেখলাম পরের লেখা থেকে নন্দী এটিচ্যুড বদলে ফেলেছেন। তিনি হয়ে উঠেন আর হাসিনা-মোদি নয় এবার কেবলমাত্র হাসিনার বিরুদ্ধের সত্য-আধাসত্য প্রপাগান্ডা করা। যেগুলো অবশ্যই জার্নালিজমের বিচারে অপ-জার্নালিজম!
    সেই থেকে  চন্দন হয়ে যায় হাসিনা বা তাঁর ছেলে বা সরকার সম্পর্কে আধাসত্য বা কোন বিশ্বাসযোগ্য সোর্স ছাড়া গায়েবি সোর্সের নামে ছড়ানো্র এক প্রপাগান্ডা লেখক। এছাড়া তিনি তার লেখার জন্য ভারতের নর্থ-ইস্ট অঞ্চলের এক ইংরাজি ওয়েব সাইট NorthEast News কে আপাত স্থায়ীভাবে বেছে নি্য়েতে দেখেছিলাম আমরা। কেন এমন?
    ভারতের নর্থ-ইস্ট মানে আসাম-সহ  সাথে ছোট ছোট পাহাড়ি গোত্রভিত্তিক (ট্রাইবাল) মোট সাত রাজ্য। কিন্তু এগুলো ভারতের অবিরাম মাথাব্যাথ্যা যে এরা কে কখন না জানি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার জন্য সশস্ত্র আন্দোলন করে বসে। এই ভয় থেকেই এই এলাকায় ভারতের গোয়েন্দা ও ‘র’ ততপরতা ব্যাপক, অনেক বেশি। অনুমান করা হয় সেই সুত্রে সারা নর্থ-ইস্টের প্রায় সব ইংলিশ-ওয়েব পত্রিকা যা আছে তা  প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে ‘র’ এর ততপরতায় নিয়ন্ত্রিত। মূলকারণ, এসব মিডিয়া নিজে চলার আয় নিজে করতে পারে না। আর সেই সুত্রে ‘র’ এর অর্থ বা ভর্তুকিই তাঁদের একমাত্র সহায়! একারণে, সারা নর্থ-ইস্ট থেকে নাগাল্যান্ড হয়ে বার্মা – মানে একেবারে থাইল্যান্ড সীমান্ত পর্যন্ত সব ইংরাজি ওয়েব সাইটগুলো এই একই দশায়!  ফলে নন্দীর এবং সময়ে এমন একেকটা ওয়েব পত্রিকায় সুবীর ভৌমিকের আবির্ভাব একারণেই ঘটতে দেখেছি আমরা। আর  এমনই এক NorthEast News এ এবার নন্দীর আবির্ভাব ঘটেছিল।
    এদিকে উপরে বলেছি, হাসিনা বিরোধী এবারের প্রপাগান্ডা হাজির করাতে এখনকার বাংলাদেশে মাস-লেবেলে এমনকি বিদেশের বাংলাদেশিদের কাছেও নন্দী ক্রমশঃ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল। আমি ২০১৫ সাল থেকে নন্দীকে ফলো করি। আমার পুরানা লেখায় সেকারণে “নন্দী কে” তা লিখতে সহজ করে ধারাবাহিক বর্ণনা দিয়েছিলাম।  আর এই লেখা এখনও আমার সাইটে  প্রতিদিন কমপক্ষে পঞ্চাশজন বিদেশে থাকা বাংলাদেশি নক করে থাকে, দেখতে পাই! অনুমান করি তাঁদের মূল বিষয় আসলে চন্দন নন্দী কে? এই কৌতুহল!

    সবচেয়ে খারাপ কাজ করেছে আমাদের প্রগতিশীল মহল! ফ্যাক্ট চেকিং-এর নামে একজন চন্দন নন্দীকে নাকচ করতে গেছেন। তাও সেটাও আবার (ইসরায়েল-ইন্ডিয়া কানেকটেড) সোয়েব চৌধুরীর আরেক প্রপাগান্ডা পত্রিকা দ্যা ব্লিটজ [The BLITZ] এর রেফারেন্স দিয়ে; মানে ভর করে!! মানে ব্লিটজ যেন এক নুন্যতম বিশ্বাসযোগ্য পত্রিকা এটা ধরে নেয়া হয়েছে সেখানে। মানে, গত শতকে বাংলাদেশের ইনকিলাব পত্রিকা থেকে উত্থিত সোয়েব চৌধুরি সম্পর্কে একালে যাদের কোন ধারণা নাই্‌ তাদেরই এক ছেলেখেলা হয়ে গেছে কাজটা! এককথায় বলা যায় যে ব্লিটজের কোন  পাঠক বিশ্বাসযোগ্যতা নাই, অথচ তার কাঁধে মাথা রেখে আরেক বিশ্বাসযোগ্যতা-হীন চন্দন নন্দীকে নাকচ করার কিছু কী আছে? না থাকতে পারে? এমন চন্দন নন্দীর পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু বলা – দুটাই বিপদ হয়ে দাঁড়াতে পারে!
    এদিকে অন্যান্য প্রগতিশীলদেরকে দেখা গেছে এই ফ্যাক্ট চেককে আপহোল্ড বা আপন করে  নিয়ে দেখেছেন কেউ!  আবার চন্দন নন্দী সম্প্রতিকালে এক সাক্ষাতকার দিয়েছেন আমেরিকা থেকে প্রচারিত কনক সারোয়ার এর ভিডিও ক্লিপে। এই সাক্ষাতকারকেও একই সাথে প্রগতিশীলদের অনেকেই প্রশংসা করেছেন, আপন করেছেন। এই সাক্ষাতকারের শুরুতে [০২ঃ ২৪ মিনিটে] চন্দন নন্দীর উপস্থিতিতে কনক চন্দনকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে চন্দনের বাবা  যে ‘র’ এর কর্মকর্তা অফিসার ছিলেন ও বাংলাদেশে পোস্টেড ছিলেন, তা কনক আমাদের জানিয়েছেন!  ]
    এদিকে প্রগতিশীলতার কাহিনীর শেষ নাই! সিপিডি এর মালিক  ডঃ রেহমান সোবহান আর সাথে ডঃ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মিলে এরা গত ২০০৭ সালে ভারতের আসামকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর দেওয়ার পক্ষে প্রপাগান্ডা করবেন, এই ঠিকা পেয়েছিলেন। এমনকি যারা তাঁর বিরোধিতা করছেন তাদেরকে তিনি অশিক্ষিতও বলেছিলেন। সেই রেহমান সোবহান আর দেবপ্রিয় গঙ এদের এবারের ঠিকা সম্ভবত রানা দাসগুপ্তের সংগঠন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীশ্চান ঐক্য পরিষদ এর পরামর্শক হওয়া যাতে এই সংগঠন আওয়ামি লীগকে ছদ্ম তুলাধুনা করে আবহাওয়া তৈরি করে বিএনপির কাঁধে রানা দাসগুপ্তকে সওয়ার করানী! এরা গত পনেরো বছর ধরে হাসিনা সরকার হিন্দুদের জন্য কিছু করেন নাই, অবস্থা নাকি আরো খারাপ হয়েছে বলে হাসিনাকে উঠতে বসতে গালাগালি শুরু করেছেন – উদ্দেশ্য বিএনপির কোলে উঠা বা রানা দাসগুপ্তকে তুলে দেওয়া!
    এই সকল প্রগতিশীল মহল এখন কুমিল্লার ঘটনায় কী করবেন? এটা তো প্রকাশ্য যে সেখানকার আওয়ামি এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিনের বাহার “মদবিহীন পুজা” করতে আহবান করেছেন। আর সেটার বিরোধিতা করার উসিলায় রানা দাসগুপ্ত মাঠে নেমেছেন। সকল রিয়েল উত্তেজনার শুরু সেখান থেকে। আর কথা তো সত্য যে কলকাতায় পুজার সময় মদের বার বা বেচাবিক্রি বন্ধ রাখা হয়, কারণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বা ঠিক রাখার সাথে এর সরাসরি সম্পর্ক আছে তাই। বাহার এমপি সেটার রেফারেন্স টেনেছেন!  অথচ চন্দন নন্দী এবার ‘র’ এর এজেন্ডা নিয়ে নেমে রানা দাসগুপ্ত দেরকে নাকি হেফাজত ইসলামি বা মুসলমানেরা আক্রমণ করেছে বলে মিথ্যা কথা ছড়াচ্ছেন!। ইতোমধ্যেই প্রগতিশীলদের আদরণীয় হয়ে উঠে চন্দন নন্দীর ধারণা তিনি এবার সেই প্রগতির ইমেজ বিক্রি আর এর ক্যাশ ছিটিয়ে  – মুসলমানেরা হিন্দুদের আক্রমণ করেছে –  বলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা ফ্রেমে আওয়ামি বনাম রানা দাসগুপ্তের ঝগড়াকে লুকিয়ে তা ঢেলে সাজিয়ে- এটা হিন্দুদের উপর মুসলমানদের হামলা বলে চালিয়ে দিবেন! সেটা আবার এখন কিছু কাজের অগ্রগতি দেখাতে শুরু করেছে।

    যেমন ডেইলি স্টার ইতোমধ্যেই রানা দাসগুপ্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। পাঠককেও নিতে উস্কানি তুলেছে। তাই এনিয়ে তাঁদের রিপোর্টে এমপি বাহারের   ‘এটা শুধু আমার কথা নয়, দিল্লি থেকেও এটা বলেছে।’ বলে উপ-শিরোনাম করেছে। সম্পাদক মাহফুজ আনাম এতদিন নিজে ‘র’ বা ভারতের দালালির লোক বলে পরিচিত হয়ে যাওয়াকে অসুবিধা নাই মনে করলেও তাঁর নিজের আওয়ামি লীগের সাথে সম্পর্ক নাই – সেতা প্রমাণ করে রাখতে নিজ আওয়ামি বিরোধিতাকে খুব সিরিয়াসলি নিতে দেখছি আমরা। তাই এর আগে ওবায়দুল কাদেরের আমরাও আছি দিল্লি­ও আছে, বক্তব্যের সমালোচনা করে উল্টা নিজেই এক কলাম লিখে ফেলেছেন। আর মাহফুজ সাহেব এখন কুমিল্লার আওয়ামি এমপি বাহারের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছেন। মানে এই এমপিকে নিচা করেছেন বা ভিলেন করে এঁক্কে দিয়েছে! এতে সার মানে দাঁড়িয়েছে যে রানা দাসগুপ্তকে সাপোর্ট করা মানেই তো চন্দন নন্দীকে সাপোর্ট করা! অর্থাৎ এখানে পরোক্ষে কায়দা করে ‘র’ এর পক্ষে দাঁড়িয়েছে ডেইলি স্টার।

    তাহলে রানা দাসগুপ্ত গত পনেরো বছর ধরে আওয়ামি মাখন লুটে এখন আওয়ামি-বিরোধী ঝান্ডা দেখানো কেনঃ
    হা এটাই ঘটনা কেন্দ্র! অল্পকথায় বললে, হাসিনার আওয়ামি লীগের ক্ষমতার অবস্থা ভাল নয়! কখন কী হয়ে যায় ঠিক নাই। এই হল এদের মূল উপলব্দি! সবচেয়ে সাড়ে সর্বনাশ হল, সেই আওয়ামি লীগ ছাড়া মোদির ভারত বাংলাদেশে বিএনপি বা আর অন্য কোন দলের দিকে এতদিন ফিরেও তাকায়ও নাই! তাই এ’বস্থায় বিএনপির কোলে উঠতে রানা দাসগুপ্তসহ মোদির ভারতের আগ্রহটাই মুখ্য হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে! আর তা থেকেই – সেটারই মরিয়া দশা দেখছি আমরা! রানা দাসগুপ্ত  চরম বেচাইন হয়ে উঠেছেন!  এরই গ্রাউন্ড সাজাতে সম্ভবত রানা দাসগুপ্ত মোদির ভারতের হয়ে প্রক্সি-যোদ্ধা বা এডভান্স পার্টি হয়ে উঠতে চাইছেন! যাতে বিএনপি এখন মোদির এডভান্স পার্টি রানা দাসগুপ্তের দিকে একট কোল দেয়! সেকারণেই রানা চরম আওয়ামি-বিরোধীতা শো করছে্ন – যা জরুরত সে জাদা – সেটা তো অবশ্যই!
    এটাই আমরা দেখছি।  আর এটা দেখে ততধিক জ্বলে উঠছে আওয়ামি লীগ মানে যুবলীগ-ছাত্রলীগ! আর মহড়াস্থল কুমিল্লা কারণ ২০২১ সালে ভারত এখানে সফল হয়েছিল! কোরান শরীফ রাখা ইকবাল কে?  সেটা নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ভিডিও ক্লিপের প্রমাণ দাখিল করার পরও ইকবালের পিছনে কে তা আর হাজির না করে আওয়ামি লীগ বরং উলটা ভারতকে বাঁচিয়ে  দিয়ে সেই সুবিধায় নিজ ক্ষমতায় থাকার ক্ষেত্রে ভারত সহায়তা দিয়ে যাক – এভাবে ক্যাশ করতে কাজ করে গেছিল! এনিয়ে এখন হয়ত আপশোষ করছে! আর ইকবাল?
    ১৬ মাসের সাজা দেয়া ইকবাল এখন বেকসুর খালাসের পরে লাপাত্তা করে দিয়েছে সরকার!  আর ওদিকে রানা দাসগুপ্ত এখন বিরাট বিপ্লবী – এক বছর ঘুমিয়ে কাটিয়ে এখন ইকবাল খুঁজে ফিরছেন, তাঁর আরো শাস্তি দিতে চেয়ে উলটা সরকারের বিরুদ্ধেই তিনি সোচ্চার! বেচারা হাসিনা সরকার!!!
    আবার ওদিকে খেয়াল করেন, মোদির এডভান্স পার্টি বলতে সেটা কিন্তু ঠিক রানা দাসগুপ্ত নন। বরং মোদি-আরএসএস বেটার প্রতিনিধিত্বের পার্টি হল গোবিন্দ প্রামানিক এরটা। তাহলে রানা কেন এখন গুরুত্বপাবে? এনিয়ে প্রামানিককে রানাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। তবু রানা দাসগুপ্তই এখন মোদির এক নম্বর আদরের দল কারণ, যেমন ধরেন রেহমান সোবহান আর দেবপ্রিয় গঙ এদের মত লোকদের পক্ষে সরাসরি আরএসএস এর গোবিন্দ প্রামানিক হল একটু অস্বস্তিকর, এর চেয়ে রানা দাসগুপ্ত এই গংদেরকে একটু আড়াল দেয়! তাই এই আয়োজন! নিঃসন্দেহে পরিকল্পিত আয়োজনই চলছে!

    নন্দী আর দাসগুপ্ত গং ওরা এখন হন্যে হয়ে যুতসই  ইসলামি দল খুজছে। যাতে সবমিলিয়ে হেফাজত-সহ ইসলামি দলগুলোর অন্তত কাউকে তার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে তাদেরকে বলির বখড়া বানাতে রানা-নন্দীরা উঠেপড়ে লেগেছে! কিন্তু এবারের পরিকল্পনা আমরা বাস্তব হওয়া ঠেকাতে পারি এবং অবশ্যই ঠেকাতে হবে। সেজন্য আমাদেরকে সচেতন ও সাবধান হতে হবে। কারো সাজানী ফাঁদে বা উস্কানিতে পড়া যাবে না। আর এভাবে তাঁদের অসৎ পরিকল্পনা উন্মোচিত করে দিয়েই একমাত্র আমরা তাদেরকে পরাজিত করতে পারি! রানা-নন্দীদের পরিকল্পনাসহ সব ততপরতার নিন্দা জানাই!

     

     

    আপডেটঃ ১৬ অক্টোবর ২০২৩,    রাত ০১ঃ ১৭
    সর্বশেষ আপডেটঃ ১৬ অক্টোবর ২০২৩,    রাত ০১ঃ ৫০

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • মোদি কীভাবে পশ্চিমাদের তদন্তে সহযোগী হবেন

    কানাডায় ‘র’-এর খুনঃ
    মোদি কীভাবে পশ্চিমাদের তদন্তে সহযোগী হবেন

    গৌতম দাস
    ২৭ সেপ্টেম্বর  ২০২৩  সন্ধ্যা ১৮ঃ ৫৯
    https://wp.me/p1sCvy-52J

     

            …Canada row wake-up call on rival India

    কানাডায় নাগরিকত্ব নিয়ে বসবাসকারি এক শিখ নেতাকে খুন করতে মোদির ভারত রাষ্ট্রের এক অন্তর্ঘাতমুলক খুনাখুনির প্রতিষ্ঠান ‘র’ [RAW] কানাডায় গিয়ে একাজ করে এসেছে। কানাডায় ‘র’ এর স্টেশন চিফ, যিনি নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে মিথ্যা ‘তিনি যেন কূটনীতিক’ এই ছুপা পরিচয় নিয়ে কানাডায় ছিলেন। তিনি এই খুনের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করেছেন বলে ইন্টেলিজেন্স তথ্য থেকে ধারণা করা  ও অভিযোগ উঠেছে। তাই তাকে, কানাডা সরকার ‘বহিস্কার’ [‘অনাকাঙ্খিত ব্যক্তি ঘোষণা’ বা persona non grata] করে দিয়েছে।
    এই ঘটনা নিয়ে খোদ  আমেরিকা থেকেই বহু মিডিয়া রিপোর্ট  প্রকাশিত হয়েই চলেছে। এখনও আসছে। বিশেষ করে শুরুর দিকে রয়টার্সের খবরগুলো আর পরে  নিউ ইর্য়ক টাইমসে এই রিপোর্টটা সারা ফেলেছে। এতে প্রকাশিত ভাষ্য থেকে এর স্টোরির সারাংশটা এরকম যে, আমেরিকা প্রতিদিনই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে অসংখ্য বিদেশি দুব্যক্তির কথোপকথনের মধ্যে বা-হাত-ঢুকিয়ে [intercept]  তা শুনে থাকে। কিন্তু এত তথ্যের ভিড়ে এক কথোপকথন (যেটার এক প্রান্তে ছিলেন এখন বহিস্কৃত কানাডায় কানাডায় ‘র’ এর স্টেশন চিফ বলে অনুমান করা হচ্ছে) আমেরিকার হাতে এসে যায়। সেই তথ্যসহ আরো অনেক কিছুই আমেরিকা কানাডা সরকারের সাথে শেয়ার করেছিল। এমনিতেই সাধারণভাবে এদুই রাষ্ট্র পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় অনেক কিছুই তারা শেয়ার করে, পরস্পরকে সাহায্য করে থাকে, যেন একই রাষ্ট্র এর দুই অংশ তারা।
    খুনের ঘটনাটায় ভুক্তভোগীর নাম [Hardeep Singh Nijjar] হরদীপ সিং নির্জ্জার,  যিনি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন স্বাধীন এক শিখ রাষ্ট্র কায়েমের  – মানে খালিস্তান আন্দোলনের কর্মী; এই অর্থে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের রাজনীতির অনুসারী।
    অনেকের ধারণা হতে পারে যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন মানেই তা টেররিজম বা একালে জঙ্গীবাদের ক্যাটাগরিতে ফেলে একে নিন্দা করা যায়। ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। আপনি যদি দাবি তুলেন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার জন্য আমি রেফারেন্ডাম চাই – আর এটাই আমার দাবী সেক্ষেত্রে নেতিভাবে দেখিয়ে কোন শাসকেরই এথেকে  সুবিধা খাবার সুযোগ থাকে না। কানাডায় বসে শিখ কমিউনিটি এভাবে তাদের দাবি পরিচালিত করছে। যা সম্পুর্ণ আইনিভাবেও বৈধ আন্দোলন!
    হরদীপ সিং তিনি কানাডায় খুন হন চলতি বছরের গত জুন মাসে। এরপর পরেই ব্যাপারটা ভারত-কানাডার মধ্যে সরকারি পর্যায়েই আলোচনা হয়েছিল, তবে তা মিডিয়া থেকে গোপন রাখা হয়েছিল। এমনকি সদ্য সমাপ্ত গত ৯-১০ সেপ্টেম্বর ভারতে অনুষ্ঠিত জি২০ এর সম্মেলন চলার কালেই কূটনৈতিক চক্রে কিছু পশ্চিমা রাষ্ট্রের মধ্যে একসাথে এবং সাথে মোদিকে নিয়েও কিন্তু গোপনে আলোচনাও হয়েছিল। (যেটা এখন জানা যাচ্ছে এমন সংশ্লিষ্ট পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো তা মিডিয়ায় স্বীকার করছে)। বিশেষ করে ইন্টেলিজেন্স তথ্য শেয়ার করার  আরেক অপ্রকাশ্য গ্রুপ ‘৫ আই’ [5 EYE] – এই গ্রুপ যার নাম বাংলা করলে হয় পাঁচ চোখের গ্রুপ। আর এর সদস্যরা হল, আমেরিকা, ইউকে, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। সোভিয়েতের সাথে কোল্ড ওয়ার রেষারেষির আমলে এটা আমেরিকা, ইউকে এর মধ্যে এক গোপন চুক্তিতে প্রথম এর জন্ম হয়েছিল যার সাথে কালক্রমে অন্য তিন দেশ যুক্ত হয়েছিল। কেবল ২০১০ সালে এমন জোটের তথ্য প্রকাশ্যে এনে উন্মোচিত করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার জি২০ সম্মেলনে এই জোটও তা গোপনে বিস্তর আলোচনা করলেও  এ’থেকে কোন অগ্রগতি, দিশা বা পরের পদক্ষেপ কী তা বের না হওয়াতে এখন খোলাখুলি একে-অপরের  কূটনীতিক বহিস্কার-সহ, এখন আমেরিকা খোলাখুলি ভারতকে – খুনী কে তা বের করতে – কানাডিয়ান তদন্তে সহযোগিতা করার জন্য প্রকাশ্যে শক্ত আহবানে এসে ঠেকেছে। যার মানে হল, ভারতকেই এখন ‘র’ এর দিক থেকে যারা যারাই এই খুনের সাথে জড়িত ছিল তাদেরকে বিচারের জন্য কানাডার হাতে তুলে দিতে হতে হবে – এই হল সারা পশ্চিমের হয়ে ভারতকে আমেরিকান পরামর্শ ও অনুরোধ।  আর আমেরিকান অনুরোধ মানে এখন এটা ক্রমশ ভারতের জন্য বাধ্যবাধকতা হতে থাকবে!  আর বলাই বাহুল্য যে এটা হল আপোষে ব্যাপারটা সবচেয়ে কম আন্দোলিত করে সমাপ্তি টানার প্রস্তাব। এখন মোদি এতে একমত না হলে ক্রমশ ভারতের উপর চাপ বাড়বে এবং অবশ্যই এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে পশ্চিমাদেশের সাথে ভারতের শত্রুতার চরমে যেতে থাকবে – এতে কোনই সন্দেহ নাই।
    আপনি একটা রাষ্ট্র মানে একটা রাষ্ট্রস্বার্থ হলেও অপর এক রাষ্ট্রের ভিতরে ঢুকে গোপনে সেদেশের নাগরিক কাউকে খুন করে আসতে পারেন না। এটা আন্তর্জাতিক বা দেশীয় আইনেও ক্রিমিনাল অপরাধ। তাতে ঐ খুন হওয়া ব্যক্তি আপনার কাছে আপনার রাষ্ট্রের যতবড়ই শত্রু বিবেচিত থাক না কেন! এই যে অপর দেশ-ভুমিতে ঢুকে ঐ দেশের নাগরিককে হত্যা এটা সেই অন্যদেশের সাথে যুদ্ধ ঘোষণার সামিল!  এতে আইনি পথ ছিল মানে হতে পারত যে ভারত কানাডা সরকারের কাছে হরদীপ সিং এর নামে ভারতে মামলা আছে তাই তাঁকে ভারত সরকারের হাতে হস্তান্তরের দাবি করা। কিন্তু এখন যা হয়েছে তা হল কানাডার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে ফেলার মত এক্ট করে ফেলার কুটনীতিক-সামরিক দিক তো আছেই এছাড়াও হরদীপ সিং কে নিয়ে ভারত কোন বিচার প্রক্রিয়া অনুসরণের আগেই  মানে ভারতে চোখেও তো  বিচার-প্রমাণ প্রক্রিয়া শেষে প্রমাণিত কোন  অপরাধী নয় তাহলে তাকে আগেই খুন করা হল কেন? মানে ভারত হরদীপ সিং কে কোন বিচার প্রক্রিয়ায় আনতেই চায় না যুদ্ধের এনিমি যেন এমন বিবেচনায় খুন করেছে!!!  অর্থাৎ বলা যায় মোদি সরকার তাঁকে নিয়েই বিচারের পথে না গিয়ে আইন বহির্ভুত [extra judicial] খুন বা কিলিং ঘটিয়েছে !! এটা তো ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার প্রধান প্রধানমন্ত্রী মোদির সরাসরি নির্দেশে এক কিলিং!!!! আর না হলে যুদ্ধের এনিমি হিশাবে ট্রিট করেছে – এর দুটোতেই মোদির ভারত অপরাধী!

    অন্তর্ঘাতমুলক [subversive] মানে কীঃ
    ভারতের বিদেশে গোয়েন্দাগিরি ও অপততপরতার সংগঠন হল ‘র’ [RAW]। এসব অপততপরতাকে বাংলায় অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতা বলাই সঠিক! যদিও অনেকে এটাকে স্যাবোটাজ [sabotage] শব্দে ব্যাপারটাকে ধরতে চেষ্টা করেন।
    অন্তর্ঘাত শব্দটা ডিকশনারী মানে দেখলেই বুঝা যায় এটা কত ভয়ঙ্কর। এর ডিকশনারি মানে হল, ভিতরে থেকে বসবাস করেও গোপনে কারো ক্ষতি করা। এখানে ভিতরে বলতে যাকে খুন করবে বা ক্ষতি করবে তার দেশে কিংবা খোদ তাঁর বাড়িতেই মেহমান হয়েও এবং বন্ধু সেজে এমন খুন বা ক্ষতি করবে। অর্থাৎ শব্দটা নিজ থেকেই এক ক্ষতিকর শব্দ। এর উপর আছে এর বিশ্বাসঘাতক দিকটা।  এখানেই শেষ না, আরো আছে। সব মিলিয়ে সেটা মানে, মানুষের এমন কাজ হল চরম অনৈতিক ও অসৎ[immoral] কাজ। তাহলে  এটা তো এমনিতেই অধঃপতিত এক ধারণা  তবু, মানুষের সমাজেই তো এমন অন্তর্ঘাতমূলক কাজের প্রতিষ্ঠান যেমন ‘র’-কে লুকিয়ে থাকতে/আছে পাওয়া যায়!!! হ্যা একথা সত্য তবে কেবল একটা জায়গায় অন্তর্ঘাত ততপরতার পক্ষে কিছু সমর্থকও পাওয়া যায়। সেখানে আসছি পরে, এর আগে…।

    এর মূল ইংরাজি  শব্দটা হল সাবভারসিভ [subversive] যারই সংস্কৃত ঘেঁষা এক বাংলা করা হয় অন্তর্ঘাতমুলক; বা এমন কাজ বা ততপরতা। সাবভারসিভ এর আক্ষরিক মানে হল ‘উপড়ে ফেলা’ [overthrow something]।  আর এই উপড়ে ফেলার অর্থ সরকার উপড়ে ফেলা, ব্যক্তিকে উপড়ে ফেলা মানে খুন করা এবং তার বাসায় গিয়ে খুন করা সহ কোন সরকার বা কোন প্রতিষ্ঠানকেই দমন করা, দাবড়ে দেয়া ইত্যাদি। ভারতের ‘র’ হল তেমনই এক সাবভারসিভ প্রতিষ্ঠান।
    সবচেয়ে বড়কথা যে কোন রাষ্ট্রের আইনের বিচারে ও চোখে সাবভারসিভ কাজটা সবসময়ই ‘অবৈধ’। তাতে এটাও সম্ভব যে, সাবভারসিভ কাজ মানেই প্রো-একটিভ মানে নিজেই আগাম “আইন নিজের হাতে তুলে” নিয়ে – উপড়ে ফেলার খুন জখম বলতে যা যা বুঝায় এর সবই করে আসা। আর মনে রাখতে হবে,  ‘র’ ভারতের হলেও সেই  ভারতেরই আইনেও ভিনদেশের কোন  ‘র’  সমতুল্য প্রতিষ্ঠান ও এর ততপরতাও চলে তবে সেটাও অবৈধ। শুধু তাই না, ভিনদেশে গিয়ে ‘র’ এর মত প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা সে দেশের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধ ঘোষণার সামিল!!  একারণে, ধরা যাক বাংলাদেশে কোন ‘র’ এর এজেন্ট এসে প্রকাশ্যে বলতেই পারবে না যে সে ‘র’ এর এজেন্ট। কারণ, ‘র’ সাবভারসিভ কাজের প্রতিষ্ঠান বলেই তা এক অবৈধ প্রতিষ্ঠান।  আপনি ‘র’ – এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এই পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশের (বা যেকোন দেশের) ভিসা পাবার প্রশ্নই আসে না!  আর এই অনৈতিক ও অসৎ সংগঠন বলেই এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে আপনার অফিস বা বাসার ড্রয়িং রুমে প্রবেশ-বসবাস অনুমতি পাবে না!

    কোথায় অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতার পক্ষে কিছু সমর্থকঃ
    উপরের পুরা প্যারাগ্রাফটাই অন্তর্ঘাত শব্দটার নেতি ও বিশ্বাসঘাতক দিকটা উন্মোচন করা হয়েছে এর প্রতিটা বাক্যে। তাহলে অন্তর্ঘাত কাজের এর পক্ষে এর সমর্থক কারা? কারা হয় এমন সমর্থক?

    এককথায় এর জবাব উগ্র জাতিবাদি চিন্তার লোকেরা!
    লক্ষ্য করলে দেখা যাবে উগ্র জাতিবাদি চিন্তা বা রাজনীতির যেখানে রমরমা বা ইতিহাসের যেসব যুগে তা রমারমা ছিল সেসব কালে উগ্র জাতিবাদি চিন্তার পাশে বসে থাকতে আমরা পেয়েছিলাম সাবভারসিভ বা অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা ও প্রতিষ্ঠানকে। ১৯৫০ সালের আগের সাড়ে তিনশ বছর ছিল পশ্চিমাদেশে বিশেষত ইউরোপ ছিল জাতিরাষ্ট্র বা উগ্র জাতিবাদি চিন্তার যুগ। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নানান কারণে এর অনেক কিছুই একেবারেই বদলে যায়। সবচেয়ে বড় কারণ, খোদ ইউরোপই জাতিরাষ্ট্র ধারণার রাষ্ট্র চর্চা বন্ধ করে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে নিজেদের রূপান্তরিত করে নিয়েছিল। এছাড়া আরও  পরে কোল্ড ওয়ারের আমলে তা কিছুটা দেখা দিলেও তা সীমিত ও নিয়ন্ত্রিতই থেকে যায়। এককথায় এর মূলকারণ আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু ও এর বিস্তার। কারণ, রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের সাথে অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতাও চালাবে আবার আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যও চালাবে এটা কঠিন। মানে এদুটো একসাথে চালানো খুবই মুশকিল। যেমন ইতোমধ্যেই কানাডা-ভারত আবার কানাডা-ইউকে যে বাণিজ্য আলোচনা চলছিল তা এখন পিছনে পরে সব এলোমেলো হয়ে গেছে।    তাই যেমন,  সোভিয়েত ব্লক আর পশ্চিমাদেশ এদের মধ্যে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ছিল না, সম্ভবও ছিল। একারণে এদের – পরস্পরের বিরুদ্ধে পরস্পর অন্তর্ঘাত্মূলক ততপরতা  চলতে পেরেছিল কোল্ড ওয়ার আমলে। তাই পশ্চিমাদেশে এটা কমে গেলেও এশিয়ায় বিশেষত ভারতে তা ব্যতিক্রম। দুটা কারণে। এক .  ভারতে এটা হিন্দুত্ববাদ এই উগ্রজাতিবাদে আচ্ছন্ন এক জাতিরাষ্ট্র। আর দ্বিতীয় কারণ, জন্ম থেকেই ভারত-পাকিস্তান রেষারেষি সম্পর্ক। যদিও সাধারণভাবে সাবভারসিভ বা অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা চালানোর মত প্রতিষ্ঠান অনেক রাষ্ট্রই সক্ষম থাকে। কিন্তু  তা করে না, কেবল গোয়েন্দা ততপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ সে সক্ষমতা সীমাবদ্ধ রাখে। আর ভারত-পাকিস্তান এদের মধ্যেই এর ব্যাপক ব্যবহার – এটাই গুরুত্বপুর্ণ জায়গা। এর উপর এসব প্রতিষ্ঠানের অন্য দেশে গিয়ে অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা ঘটানোর পরে দেখা যাবে কেবলমাত্র উগ্র জাতিবাদি দেশেই দেখা যাবে যে শাসক একাজকে গৌরবের বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে বা ওদেশের মিডিয়া প্রকাশ্যে এটা গৌরবের কাজ বলছে।

    তাই উগ্র জাতশ্রেষ্ঠত্ববাদ- হিন্দুত্ববাদী ভারত আর এই ভারতের প্রতিষ্ঠান র-এর কোন ততপরতা পাকিস্তানে ঘটিয়ে এলে তা ভারতের মিডিয়া প্রকাশ্যে তাতে উতযাপনের বিষয় হিশাবে তুলে ধরে থাকে।
    কানাডায় হরদীপ সিং-কে খুন করা আসার প্রেক্ষিতে কলকাতার আনন্দবাজার ঠিক একাজটাই করেছে।

    কলকাতার আনন্দবাজারের র-এর অন্তর্ঘাতি ততপরতার পক্ষে প্রকাশ্য উতযাপনঃ
    উপরে বলেছি, অনেক রাষ্ট্রেরই  সাবভারসিভ বা অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা চালানোর মত সক্ষম প্রতিষ্ঠান থাকলেও এমন ততপরতায় তারা যায় না বা এনিয়ে কথিত দেশপ্রেমি উতযাপন তারা করে না। সম্ভবত কাজটার মধ্যে অনৈতিক, অসততার দিক আছে তা খেয়াল রাখে বলে। কিন্তু মফস্বলী কলকাতার কাছে এই খারাপ দিকটার কথা খেয়াল রেখে বা ভেবে এথেকে দূরে থাকার মত কোন ক্রিটিক্যাল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠে নাই। এর উপর ক্ষমতায় যখন মোদি তখন সে আরেক হিন্দুত্ববাদী রাহুলের বাবা রাজীব গান্ধীর আমলের র-এরও আবার বিশেষ অন্তর্ঘাত-বাহিনী (‘টিম জে’) বানিয়ে কী করে পাকিস্তানে অপ-ততপরতা চালিয়ে এসেছিল সেই কথিত গর্বের কাহিনী এখন ছেপেছে আনন্দবাজার। অন্তর্ঘাত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজটা যেন খুবই গর্বের তা একালেও এই পত্রিকা পাঠকের মনে এখন হরদীপ হত্যার সময় যাতে জনমত কানাডার হত্যাকে গৌরবের মনে করে সে উস্কানি তুলতেই আনন্দবাজারের এই উদ্যোগ। এর শিরোনামেই ব্যাপারটা খুবই গৌরবের এমন উস্কানি তুলতে লেখা হয়েছে – “পাকিস্তানের ঘরে ঢুকে শত্রু নিধন, খলিস্তানিদের ঠেকাতে রাজীব গান্ধীর গোপন তাস ছিল ‘টিম জে’ “। এই ‘টিম জে’ হল র-এর ভিতরেই আরেক বিশেষ বাহিনী যা রাজীব গান্ধী তৈরি করিয়েছিলেন। মনে রাখতে পারি ইন্দিরা গান্ধী খুন হয়েছিলেন শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমন করতে গিয়ে শিখদের কাছে পবিত্র “স্বর্ণমন্দিরে হামলা ও তছনছ করে সেখানে আশ্রয় নেয়া সকল আন্দোলনকারীদেরকে হয় হত্যা করেছিল বা বের করে গ্রেফতার করেছিলেন। আর স্বর্ণ মন্দিরে সেনা অপারেশনের বদলা নিতেই ১৯৮৪ সালের ৩১শে অক্টোবর তারা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল। রাজীব গান্ধীও প্রায় একইভাবে শ্রীলঙ্কার তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যুতে খুন হয়ে গেছিলেন। এমনকি খোদ দিল্লিতেই ইন্দিরার হত্যা হয়ে যাবার কয়েকদিন পরে শিখ-জাতির বাসিন্দা পেলেই তাদের উপর কংগ্রেসিরা এথনিক ক্লিনজিং করেছিল!

    সাধারণভাবে বললে, ভারতে বারবার বিচ্ছিন্নতাবাদের সমস্যা হাজির হচ্ছে জন্মের সময়ে ভারত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রগঠনে কিছু মারাত্মক ত্রুটির কারণে। নেহেরুর রাজনৈতিক চিন্তার বৈশিষ্ট হল ১। এটা কলোনিশাসক মডেল। জবরদস্তিতে ঘাড়ে চড়তে হবে আর শুষে নিতে থাকতে হবে  তাতে সেটা আভ্যন্তরীণভাবে কেন্দ্রিভুত ক্ষমতার নামে অথবা পড়শির উপরে চড়াও ধরণের হলেও একই ফর্মুলা। ২। ভারতের রাজ্যগুলোর উপরে একমাত্র তথাকথিত কেন্দ্রের কড়া নিয়ন্ত্রণেই ভারতকে এক রাখা সম্ভব। এটা নেহেরু বিশ্বাস করতেন। আর এরই প্রতিফলন তিনি ঘটিয়ে রেখেছেন যা এখনও বর্তমান ভারত রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে।   আর একারণেই পালটা প্রতিক্রিয়ায় সব সময় কোন না কোন রাজ্যে ভারত ভেঙ্গে রাজ্যগুলোর আলাদা হবার উপক্রম!! উল্টোদিক থেকে পড়লে অন্যভাষায় বললে, এটাই বিচ্ছিন্নতাবাদ। আর তা ঠেকাতে উগ্র জাতিবাদী প্রপাগান্ডা যে বিচ্ছিন্নতাবাদ মানেই অপরাধ! সোজা ভাষায় বললে, নেহেরুর কাছে শাসন বলতে কলোনিশাসক যেভাবে ভারতকে অধীনস্ত রেখে শাসন করেছিল, সেটাই মডেল। এর বাইরে ১৭৭৬ সাল থেকে স্বাধীন আমেরিকা যে ফেডারল বলে আরেক রাষ্ট্র ধারনার হাজির ও সবচেয়ে স্টেবল-থিতু ধারণা বলে প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে এটা তিনি বেখবর। বরং বৃটিশেরা চলে গেলেও তিনি নেহেরুই যেন তখনও বৃটিশ রানীর ভাইসরয় এই মনে করে তিনি ভারত রাষ্ট্র কাঠামো ও শাসন সাজিয়েছেন।
    আবার এর সাথে ছিল উগ্র হিন্দুত্ব জাতিবাদী ও এর কথিত অর্থহীন দেশপ্রেম!!! আর সেটাই তবে আরো উগ্র উপস্থাপনায় একালে মোদির আমলে তা হয়ে উঠেছে হিন্দুত্ববাদী শাসনের প্রধান হাতিয়ার। আর তা থেকেই কথিত হিন্দুত্বের দেশপ্রেম এর আবেগ তুলে ভোটের বাক্স ভরা। তাই শিখ কমিউনিটির উপর যে নিরবিচ্ছিন্ন নিপীড়ন এটাকেই মিথ্যা করে ইতিবাচকভাবে হাজির করতে উগ্র জাতিবাদী দেশপ্রেম ছড়িয়ে দেয়া উস্কে তোলা – একাজটাই করেছে আনন্দবাজার। তাতে আরেক দেশে গিয়ে গোপন ও গুপ্ত হত্যা করে আসা যে আন্তর্জাতিক অপরাধ এমন কোন বোধ তাদের নাই। অথচ ভারতে  ২০০৮ সালে পাকিস্তানের ২৬/১১ মুম্বাই হামলা সেই একই ঘটনার উলটা পিঠ। মানে একই জিনিষ ভারত করলে তা দেশপ্রেম ও বীরত্ব; কিন্তু পাকিস্তান করলে সেটা অন্যায় আর মুসলমানের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষ দিয়ে একে প্রতিবাদ ও বিচার করে দেখাতে হবে!!! এই হলো উগ্র জাতিবাদের মূলনীতি।  সেটা অনুসরণ করেই আনন্দবাজার বলতে চাচ্ছে কানাডায় গিয়ে হরদীপ সিং-কে হত্যা এই অন্তর্ঘাতি ততপরতা এটা ভারতীয় দেশপ্রেম এবং এটা যেন বৈধ এবং ভারতীয় দেশপ্রেম ও বীরত্বের নজির! জনমনে এই উগ্র হিন্দুত্বের জাতিবাদ এবং এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করেছে আনন্দবাজার যাতে তারা কানাডায় গিয়ে হত্যা করাটাকে অন্যায়-অবৈধ না একেবারে উলটা দেশপ্রেমের বীরত্ব হিশাবে দেখে!

    মফস্বলি আনন্দবাজারের বেকুবিটা হল, তারা ভেবেছে সারা দুনিয়াটাই যেন মুসলমানের পাকিস্তান তাই মুসলমানদেরকে তো যা খুশি শাস্তি দেয়া যায় এই হলো অনুমান! তাই পাকিস্তানে ভারতের র-এর ‘টিম জে’ যেটা করতে পেরেছে সেটা যেন সে কানাডাতেও করতে পারবে!! এটা যেন কোন ব্যাপারই না!!! এই হলো তাদের হিন্দুত্ববাদের গাধামি! তারা বুঝেই নাই যে কানাডার গায়ে হাত মানে এটা অলিখিতভাবে আমেরিকার [সাদা ককেশীয়] গায়ে হাত তোলার সামিল! এর উপর কানাডা আমেরিকার সাথে জি৭ জোটের সদস্য! শুধু তাই নয় কানাডা ন্যাটোর সদস্য এবং ইন্টেলিজেন্স শেয়ার গ্রুপ ফাইব আই [Five EYE]  এর সদস্যও বটে! তাই মোদি যদি আমেরিকান “সহযোগিতার প্রস্তাবে” রাজি না হন তবে এই বিরোধ ক্রমশ চরমে না উঠে উপায় থাকবে না।

    ওদিকে মোদি হরদীপ সিং হত্যার পথে পা বাড়িয়েছেন আরেক কারণে! শুধু ভারত দেশের বাইরের হিসাবের কথাটা হল, পশ্চিমাদের চীন-ঠেকানোর কাজে ভারত গুরুত্বপুর্ণ পিলার ও বন্ধু তাই সেই ভারত এক্ষেত্রে কানাডায় গিয়ে খুন করেও পার পেয়ে যাবে; এছাড়া এতটুকুই না। মোদি আসন্ন আগামি নির্বাচনে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে শায়েস্তার পদক্ষেপ নিয়ে বীরত্ব আর গর্ব প্রকাশ করে হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের জজবা উঠাবে -ভোটারদের আবেগী করেও তুলবে যাতে এর প্রভাব মোদি-বিজেপির ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হয়!  কাজেই আমেরিকার দাবি যে “কানাডার সাথে  তদন্তে ভারতকে সহযোগিতা” এই আহবান – মোদির এতে সায় দেয়া এটা প্রায় অসম্ভব ও অবাস্তব একটা ঘটনা হয়ে থাকার সম্ভাবনা বেশি! আর সেক্ষেত্রে আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিমের কাছে ভারত যতই চীন-ঠেকানোর দেয়াল- এই গুরুত্বের দেশ হোক না কেন মোদির ভারতকে পশ্চিম এক্ষেত্রে তারা পাচ্ছে না!!! সে সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি!

    আবার অন্যদিকে; আগামি বছরের শুরুতেই এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে ভারতে নির্বাচন, তাতে কংগ্রেসের রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধীদলকে ক্ষমতায় দেখতে চায় বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিম; যা কানাডায় খুনের ঘটনার বহু আগে থেকেই একটিভ হয়ে ছিল। মোদির হিন্দুত্ববাদের এক ব্যবহারিক রূপ হল মুসলমানের উপর চরমতম বৈষম্য ও পায়ের নিচে দাবিয়ে রাখার নানান বেআইনি পদক্ষেপ নেয়া – অন্যদিকে ভয় আর প্রলোভন দেখিয়ে  বিচার বিভাগকেই নিস্ক্রিয় রাখা, বদলি বা ডিপার্টমেন্ট বদল পর্যন্ত ঘটিয়ে বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশনকে স্থবির রাখা -সহ সবকিছু করে মোদি এক রামরাজত্ব কায়েম করে রেখেছেন। আর এসব করেই আবার বাড়তি হিশাবে মুসলমান ঘৃণা বা শিখদের প্রতি ঘৃণা উস্কে তা বিক্রি মানে, এভাবে ভোটের বাক্স ভরার নীতিতেই মোদি গত দশবছর ধরে ক্ষমতায় টিকে আছে।
    কিন্তু এখন মোদির সেসব পরিকল্পনা ও ছকের কী হবে, কী প্রভাব পড়বে সেসবও দেখার বিষয়!  আসন্ন নির্বাচনের সময়ে, কানাডায় অন্তর্ঘাত কাজ যে যুদ্ধ ঘোষণার সমান কাজ তা হলেও – সেটা করা মোদির ঠিক আছে এমন জোশ তুলে আনা  – এটামোদির বিজেপি করতে যাবে আর টিকাতে পারবে?  আবার মোদি যদি পেরে যায় তাহলে এই মোদিকে বাইডেনের নেতৃত্বের পশ্চিম কী বোকার মত দাঁড়িয়ে দেখবে??? এসবই হয়ে উঠবেই আগামির ঘটনাবলীতে মুখ্য নির্ধারক সব প্রশ্ন!!!

    সর্বশেষঃ একটু আগে প্রথম আলো জানাচ্ছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর পালটা কানাডাকে অপরাধীদের আশ্রয় দিবার অভিযোগ করেছেন। এর অর্থ বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমের সাথে কোন আপোষের পথ বের করার পথে মোদির ভারত হাটবে না, যাচ্ছে না।

    সর্বশেষ আপডেটঃ   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩; দুপুর ০১ঃ ৪৫
    সর্বশেষ আপডেটঃ  

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com