Tag: মোদি

  • যুদ্ধ নয়, মোদি এখন ‘উন্নয়নের’ পতাকা তুলেছেন

    যুদ্ধ নয়, মোদি এখন ‘উন্নয়নের’ পতাকা তুলেছেন
    গৌতম দাস
    ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

    যুদ্ধ নয়, মোদি এখন ‘উন্নয়নের’ পতাকা তুলেছেন

     

     

    যেকোনো আন্দোলন, বিক্ষোভ বা প্রতিরোধের পন্থা দেখা যায় – হয় সেটা গণ-আন্দোলন না হয়, সশস্ত্র তৎপরতায় পথে ঘটে। ভারতের দখলকৃত কাশ্মীরে জনগণের আন্দোলন শুরু থেকেই নানান পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এটা সেখানে প্রতিষ্ঠিত যে ভারতের দখলের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গণ-আন্দোলনের পথ এখানে বেশি কার্যকর। আর সেখান থেকেই অল পার্টি হুরিয়াত কনফারেন্স নামে এক সামাজিক রাজনৈতিক জোটের জন্ম এবং এর নেতা হিসাবে সৈয়দ আলি শাহ গিলানি, মিরওয়াইজ উমর ফারুক অথবা ইয়াসিন মালিক ইত্যাদি নামে গণ-আন্দোলন পন্থার নেতাদের আবির্ভাব। এথেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে সময়ে সশস্ত্রভাবে ভারতীয় সেনা ব্যারাকে গিয়ে দুটো সেনা মেরে আসার চেয়ে রাজপথের আন্দোলন অনেক বেশি শক্তিশালী ও ফলদায়ক। সামরিকভাবে হামলার চেয়ে কার্ফু ভেঙ্গে রাস্তায় সাধারণ মানুষের নেমে আসা অথবা জানাজায় অংশগ্রহণ, কোন গৃহবধুর রাস্তায় নামা ইত্যাদি এগুলো অনেক বেশী শক্তিশালী। কাশ্মীরে দিল্লীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো এখানে উদোম করে চোখ আঙুল দিয়ে সারা দুনিয়াকে দেখানো সহজ হয়ে যায়। এই কারণ কাশ্মীরে সশস্ত্র প্রতিরোধ চলুক এটা দিল্লীর সরকারেরও পছন্দের দিক। দিল্লী তাই এই প্রতিরোধ আন্দোলন মোকাবিলার পথ একটাই – এদেরকে জঙ্গী বলে প্রপাগান্ডা করা। এরা জঙ্গি, পাকিস্তান থেকে আসা “সীমা পারকে আতঙ্কবাদী” অর্থাৎ কাশ্মীর ভারতের দখলকৃত থাকার বিরুদ্ধে কাশ্মীরের জনগণের কোন চাওয়া নাই, কোন প্রতিরোধ নাই – সব সমস্যার গোড়া হল “শান্তির” কাশ্মীরে পাকিস্তান থেকে পাঠানো সন্ত্রাসবাদ। এই বলে প্রপাগান্ডা করা। অতএব “ওরা জঙ্গী” এটা বলতে পারলেই একমাত্র ভারত সরকারের তাদেরকে সরাসরি গুলি করে মারার পক্ষে ন্যায্যতা হাজির করতে পারে। এসব কারণে কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থার স্তরে গণ-আন্দোলন বেশী ফলদায়ক। তবে খেয়াল রাখতে হবে, বর্তমান স্তরে বলেছি, সব সময় বলি নাই।  কারণ কে না জানে বিজয় লাভ করতে হলে চুড়ান্ত দিনগুলোতে সাধারণত সশস্ত্র পথেই তা ঘটাতে দেখা যায়। কারণ সব পথ তখন একটাই, সশস্ত্র প্রতিরোধ, মোকাবিলা। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ এর এক আদর্শ উদাহরণ। এগুলো সবাই জানে। কিন্তু যেটা মানুষ কম জানে বা খেয়াল করেনি, তা হলো ‘সফট ল্যান্ডিং’ বলে একটি ব্যাপার আছে। ‘সফট ল্যান্ডিং’ ধারণাটি উড়োজাহাজ সংশ্লিষ্ট, সেখান থেকে ধার করে এনেছি। এর মানে হল, উড়োজাহাজে যাত্রা আকাশে যতই আরামদায়কভাবে উড়ুক বা ঘটুক না কেন, সেটা আসল আরামদায়ক ভ্রমণ কি না, এর বিচার করা হবে ওই উড়োজাহাজের মাটিতে নামা মসৃণ ছিল কি না তা দিয়ে। অর্থাৎ মাটিতে নামার সময় ল্যান্ডিং বা নেমে আসাকে অবশ্যই কোনো বড় ঝাঁকুনি বা কোনো দুর্ঘটনা না ঘটিয়ে একেবারে মসৃণভাবে ঘটতেই হবে। নইলে সব বৃথা। ঠিক সে রকম আন্দোলন যদি গণ-আন্দোলন থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধের স্তরে যাওয়ার সময় মসৃণ না হয়, পরিপক্ব হওয়ার আগে অস্ত্র ধরা হয় অথবা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর অস্ত্র ধরা হয়- দুই ক্ষেত্রেই ওই আন্দোলন ভণ্ডুল হয়ে যাবে। এতে তা আত্মঘাতী হতে বাধ্য। উড়োজাহাজের  গোত্তা খেয়ে মাটিতে পড়ার মত হবে।
    কাশ্মিরের নিরস্ত্র গণ-আন্দোলন বিক্ষোভ প্রতিরোধ পঁচাত্তর দিনেরও বেশি কারফিউ অমান্য করে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু উরির ব্যারাকে হামলা করিয়ে কেউ না কেউ অপরিপক্ব অবস্থায় ওর মধ্যে সশস্ত্রতার আমদানি ঘটিয়ে দিয়েছে। কাশ্মিরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার ব্যারাক উরিতে গত ১৮ সেপ্টেম্বর এক হামলায় ১৮ জন সেনার মৃত্যু ঘটেছে। এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারত দাবি করে যে, এই হামলা পাকিস্তান থেকে এসে ‘সীমা পার কি জঙ্গীরা’ করেছে। জবাবে স্বভাবতই পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এটা প্রমাণহীন এবং কোনো ইনভেস্টিগেশন বা তদন্তের আগেই করা প্রপাগান্ডা বলে দাবি করেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ‘‘পাকিস্তানের মাটি থেকে কোনও রকম অনুপ্রবেশ হয়নি।’’

    কিন্তু আসল ব্যাপার হল, এমন দাবি আর পাল্টা দাবিতে কে ঠিক বলছে, তাতে আর কিছুই আসে যায় না। কারণ ভারতের নিট উদ্দেশ্য লাভ এতে ঘটে গিয়েছে। কাশ্মিরে লাগাতার প্রায় তিন মাস হতে চলা বিক্ষোভ আর সেটা মোকাবেলায় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর লাগাম ছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে দিল্লি সরকার যখন ছেঁড়াবেড়া অবস্থা, তখন মোদির সরকার এখন স্থানীয়সহ গ্লোবাল মিডিয়াকে ভুলিয়ে দিতে পেরেছে যে, আসল ইস্যু ছিল কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন এবং এতে নির্যাতন-নিপীড়ন। তা আর আজ ইস্যু নয়। এখন ইস্যু হল ভারত-পাকিস্তানের বিবাদ। মূলকথা উরির সামরিক ব্যারাকে হামলা যেই করুক, কাশ্মিরে চলা গণ-আন্দোলনকে আড়ালে ফেলে ভারত-পাকিস্তানের সম্ভাব্য যুদ্ধকে সফলভাবে সামনে এনে ভারত গণ-আন্দোলনকে স্যাবোটাজ করতে পেরেছে। আর এরই নিট বেনিফিট নিয়েছে, বেনিফিসিয়ারি হয়ে মোদি সরকার যুদ্ধের ঢোল পেটাচ্ছে। কি মজা!
    গত কয়েক দিন ধরে অনেকেই জানতে চেয়েছে, যুদ্ধ কি লেগে যাবে নাকি? তাদের আশঙ্কার বড় কারণ জানা গেল যে, শেখ হাসিনা সরকার এই ইস্যুতে ‘মোদি সরকারের পাশে থাকবে’ বলে বিবৃতিতে জানিয়েছে সেখান থেকে। ‘মোদি সরকারের পাশে থাকবে’ বলাতে আমাদের এতে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই সেকথা বলে তাদেরকে আশ্বস্ত করে কথা বলা সহজ হয়েছে। কারণ এ পর্যন্ত মানে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মিডিয়ায় যা এসেছে, তাতে যুদ্ধ আসন্ন- এমন মনে করার মতো কিছু চোখে পড়েনি। তবে মূলকথা হল, সেনাছাউনিতে সশস্ত্র হামলার ঘটনার বেনিফিসিয়ারি হিসেবে মোদি ভারত-পাক যুদ্ধের দামামা তুলতে পেরেছে। আর সেখান থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, উরির ঘটনার চিত্রনাট্য ইন্ডিয়ার নিজেরই তৈরি কি না। প্রথমে প্রশ্নটা তুলেছিল পাকিস্তানি মিডিয়া, পরে খোদ ইন্ডিয়ান মিডিয়া। এবিষয়ে আনন্দবাজার লিখেছে, কিন্তু একই ভাবে উরি হামলার মুহূর্তটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমও। তবে সেই ভারতের মিডিয়া এই সন্দেহের কথা তুলেছিল কিছু ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের বরাতে, পরোক্ষভাবে। যেমন, ভারতের দাবি অনুসারে চারজন কথিত হামলাকারী জয়স-ই মোহাম্মদ জঙ্গি। ব্যারাকে জঙ্গি হামলায় পরে নাকি এরা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রিটায়ার্ড এয়ার ভাইস মার্শাল কপিল কেকের বরাতে হিন্দুস্তান টাইমস প্রশ্ন তুলছে- এই চার জঙ্গির দাফনের জন্য কেন এত তাড়াহুড়া করা হলো। ওই রিপোর্টের শিরোনাম হলো, (“Should India have waited? ‘Hurried’ burial for Uri attackers raises eyebrows”) “দাফন করতে ভারতের দেরি করা উচিত ছিল।’ তাড়াহুড়া না করে এর বদলে তারা এই লাশগুলো সংরক্ষণ করে পাকিস্তানের কাছে জবাবদিহি চাইতে পারত।

    কপিল কেক পুরানা রেফারেন্স দিয়ে বলছেন, এ ধরনের জঙ্গি হামলার ক্ষেত্রে সাধারণত ‘হামলাকারীদের মৃতদেহগুলা সংরক্ষণ করা হয়, পাকিস্তানকে তলব করা হয়, প্রমাণাদি পেশ করা হয়। মৃতের পরিবারকে খবর দিতে বলা হয়, যাতে তারা লাশ নিয়ে গিয়ে দাফনের ব্যবস্থা করতে পারেন।’ কপিল বলছেন, কমন প্র্যাকটিস হলো… “এর আগে গত জানুয়ারি মাসে পাঠানকোট এয়ারবেজ হামলার ঘটনায় জঙ্গিদের লাশ চার মাস ধরে রাখার পর দাফন হয়েছিল। আর ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলায় নিহত ৯ জন লস্কর-ই তাইয়্যেবা জঙ্গির লাশ প্রায় এক বছর মর্গে রাখা হয়েছিল। ২০০১ সালের পার্লামেন্ট ভবনে আত্মঘাতী হামলার ঘটনায় পাঁচ জঙ্গির লাশ দাফন করা হয়েছিল প্রায় এক মাস বাদে”। এ ছাড়া সব ক্ষেত্রেই লাশ নিয়ে গিয়ে দাফন-কাফন করার জন্য পাকিস্তানকে আহ্বান জানানো হয়েছিল, যদিও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। অথচ উরিতে শেষ রাতের এই হামলা ঘটে যাওয়ার ঘণ্টাখানেকের ভেতর জানানো হলো যে, এই জঙ্গিরা সবাই পাকিস্তানি। এমনকি এ ক্ষেত্রে জঙ্গি হামলার লাশ দাফনের প্রচলিত জায়গাও বদলানো হয়েছে।
    আবার ২১ সেপ্টেম্বরের হিন্দুস্তান টাইমস পাঁচটা পয়েন্ট তুলে দিয়ে ব্যাখ্যা করেছে, কেন পাকিস্তানে হামলা করা ভারতের জন্য সহজ হবে না। এ ছাড়া ওই রিপোর্টে হামলার ঘটনার পর আন্তর্জাতিক কমিউনিটি কে কিভাবে দায়সারা করে এই হামলার নিন্দা করছে তা উল্লেখ করেছে। প্রায় প্রত্যেকেই শুধু হামলার নিন্দা করছে কিন্তু কেউ পাকিস্তানের নাম নেয়নি, দায়ী করে নাই বা উল্লেখ করেনি। এমনকি বাংলাদেশের নিন্দার বিবৃতিতেও পাকিস্তানের নাম নেয়া হয়নি। অর্থাৎ হামলায় ভারতীয় ভাষ্য বাইরের দুনিয়ার প্রায় সবাই এড়িয়ে গেছে, সম্ভবত এই দাবি প্রমাণসাপেক্ষ বলে। যেমন রাশিয়ার পুতিন মন্তব্য করেছেন কোনো দায়দায়িত্ব না নিয়ে খুব সাবধানে। বলেছেন, ‘ইন্ডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী’। (stating: “We are also concerned about the fact that, according to New Delhi, the army base near Uri was attacked from Pakistani territory.”) আমেরিকানদের বক্তব্যও একই রকম সাবধানের, পাকিস্তানের নাম না নিয়ে বলেছে কাশ্মির (“an attack in the Valley”) ‘ভ্যালিতে যে হামলা হয়েছে আমরা তার নিন্দা করি”। – ওদিকে ব্রিটিশ সরকার উল্টা ডুবিয়েছে। উরি হামলার নিন্দা করে তারা বলেছে, ‘ইন্ডিয়া অ্যাডমিনিস্ট্রেডেট কাশ্মির’ (Uri as a part of “India-administrated Kashmir”)। অর্থাৎ বলতে চেয়েছে যেন কাশ্মির ভূখণ্ডটি আসলে ঠিক ভারতের না।
    ওদিকে বিবিসি ‘ভারত কি পাকিস্তানে হামলা চালাতে পারবে?’ এই শিরোনামে ২০ সেপ্টেম্বর এক রিপোর্ট করেছে। লিখেছে, ভারতের একজন নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অজয় শুক্লা মনে করেন, “নরেন্দ্র মোদি সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নানা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম রেখেছে। কিন্তু কোনো সন্ত্রাসী হামলার বিপরীতে কড়া জবাব দেয়ার মতো সামরিক শক্তি এবং পরিকল্পনা তৈরি করেনি নরেন্দ্র মোদির সরকার। এখন মনে হচ্ছে সরকার তার নিজের বাগাড়ম্বরের মধ্যেই আটকা পড়ে গেছে”। অর্থাৎ মোদি কাশ্মিরের গণপ্রতিরোধ থেকে দেশি বিদেশি সবার চোখ সরাতে পেরেছেন ঠিকই, কিছু যুদ্ধের প্রস্তুতিতে বা মুডে নেই। ওই রিপোর্টের শেষ বাক্য হল, “অনেক বিশ্লেষক মনে করেন ভারতকে মাথা ঠাণ্ডা রেখে সুচিন্তিত এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। এর বিপরীতে শুধু রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর করলে সেটি শুধু ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতায় ক্ষতি করবে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন”। অথচ ঠিক সেই সমস্যাই ইতোমধ্যে তৈরি করে ফেলেছেন মোদি।
    মোদিসহ বিজেপি নেতারা এখন কেরালার কোঝিকোড়ে শহরে, শনিবার ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে তিন দিনব্যাপী বিজেপির জাতীয় কমিটির সভা চলছে। ভারতের মিডিয়াতে এক নতুন শব্দের আমদানি হয়েছে- jingoism বা ‘জিঙ্গ-ইজম’। যার অর্থ উগ্র জাতীয়তাবাদী গরম কিন্তু ফাঁপা কথা বলে যুদ্ধের দামামা বাজানো। ১৮৭৮ সালের রাশিয়ান গানবোটের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারের যুদ্ধনীতির সপক্ষে একটা বাগাড়ম্বর গান লেখা হয়েছিল, সেখানে jingo বলে এক শব্দ ছিল। তাদের কারবারকে ঠাট্টা করতে “jingoism’ শব্দ দিয়ে তাদেরকে চিনানো শুরু হয়েছিল। তাই থেকে ‘জিঙ্গ-ইজম’ এই শব্দের উৎপত্তি। সমালোচকদের সবার অভিযোগ মোদিসহ দলের নেতারা ‘জিঙ্গ-ইজমে’ ভুগছেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তবু এতে জনগণ দূরে থাক, নিজ বিজেপি দলের কর্মীদেরই সন্তুষ্ট করা জবাব দিতে পারছেন না নেতারা। আনন্দবাজার গত প্রায় দশ দিনের বেশি হবে কাশ্মির ইস্যুতে সরকারের গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও পরাজয়ের কাহিনী নিয়ে বিস্তারিত লিখে চলছিল। শনিবার ২৪ তারিখের আনন্দবাজারের অনলাইন সম্পাদক সম্পাদকীয়তে দুঃখ জানিয়ে লিখছেন, ‘যুদ্ধের বিরোধিতাও যেন দেশদ্রোহিতার নামান্তর!’ এরপর ওইদিনের এক রিপোর্টের শিরোনাম হল, “কড়া জবাব কোথায়, ফুঁসছে বিজেপি, নতুন করে ভাবনাচিন্তা করতে হচ্ছে”। অর্থাৎ মোদি এখন নিজ দলের কর্মীদের সামলাতে হয়রান হয়ে গেছে – নিজের কর্মীরাই ফুঁসছে। ওই রিপোর্টের প্রথম বাক্য হল, “দাঁতের বদলে গোটা চোয়াল প্রথম দিনেই খুলে নিতে চেয়েছিলেন যিনি, তার গলাতেই আজ নরম সুর”। এটা বলতে আনন্দবাজার বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধবের কথা বুঝিয়েছে। মোদির সবচেয়ে বিশ্বস্ত লাঠি হল বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। আর তাঁর পরের ব্যক্তিত্ব, মূল সংগঠন ‘সঙ্ঘ পরিবার’ থেকে এসে বিজেপির সাধারণ সম্পাদক এই নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন রাম মাধব। তিনি এক গরম বক্তৃতায় আগের দিন ‘দাঁতের বদলে গোটা চোয়াল’ খুলে নেয়ার কথা বলেছিলেন। সেই বরাতে আনন্দবাজারের ওই কথা। রিপোর্টে আনন্দবাজার এর পরে লিখেছে, “পাকিস্তানকে জবাব দিতে কূটনীতি ছাড়া আর কোনো পদক্ষেপের হদিস দিতে পারেননি” রাম মাধব। অসন্তুষ্ট ক্ষুব্ধ দলের কর্মীদের চাপের মুখে পরে দলের আরেক সচিব শ্রীকান্ত শর্মা বোঝানোর চেষ্টা করেন, “প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সেনার তরফে গোড়া থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। সেনাকে পদক্ষেপ করার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এবার সেনা কিভাবে কাজ করবে, সেটি তাদের এখতিয়ারে পড়ে। এর বেশি আর কী করা যেতে পারে এ মুহূর্তে?” – আনন্দবাজার থেকে কোট করে আনা কথাগুলো।  ওদিকে কাশ্মীর ঘটনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে মন্ত্রীসভায় কিছু মন্ত্রীর মতভেদ প্রকাশ হয়ে পড়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ কয়েকটা গুরুত্বপুর্ণ সভায় উপস্থিত থাকেন নাই এমন রিপোর্টও ভারতীয় মিডিয়ায় এসেছে।  কেরালায় বিজেপির অভ্যন্তরীণ ঐ সভার প্রথম দিন পাকিস্তান প্রসঙ্গে মোদি কী করতে চান, তা তুলে ধরতে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি কোঝিকোড়ে শহরে এক জনসভায় বক্তৃতা দিয়েছেন। ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ওই বক্তৃতা থেকে কোট করে তা দশটা পয়েন্ট হিসেবে তুলে এনে ছাপিয়েছে। এই দশটা পয়েন্ট পড়লে যে কেউ বুঝবে মোদি পাকিস্তানের সাথে কোনো যুদ্ধের চিন্তা করছেন না, এটা তার মাথাতেই নেই।

    ওই দশ পয়েন্টের দ্বিতীয় এবং সাত থেকে দশ নম্বর পয়েন্ট- এগুলো পড়লে যে কেউ এটা বুঝবে। দ্বিতীয় পয়েন্টটি হল, ‘উরিতে যে আঠারোজন সেনা নিহত হয়েছেন তাদের আত্মত্যাগ জাতি স্মরণ করবে”। (Indians will never forget the gruesome act of killing 18 soldiers in Uri.) অর্থাৎ সম্ভবত এর মানে হল, ওই আঠারোজনই সবচেয়ে বড় সংখ্যার ‘শহীদ’। এরা ছাড়া আগামিতে আর কোন সেনা শহীদ হচ্ছে না। মোদি ইতোমধ্যে তা জেনে গেছেন। আর ওই আঠারোজনের জীবনের বিনিময়েই মোদী কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন থেকে দৃষ্টি সরাতে সক্ষম হলেন- সেজন্য কি? এর জবাব আগামীতে পরিষ্কার হবে।
    পরের সাত ও আট নম্বর পয়েন্টে দেখা যাচ্ছে মোদি পাকিস্তানের সরকারের বদলে পাকিস্তানের জনগণের সাথে কথা বলতে চাইছেন। সেজন্য তাদের অ্যাড্রেস করে বক্তব্য রেখেছে। কংগ্রেস মোদীর বক্তৃতার সেদিকটাতে খোচা দিতে পরেরদিন টিপ্পনি করে বলেছে, মোদী সম্ভবত আগামি নির্বাচন “পাকিস্থান থেকে লড়বেন”।  অর্থাৎ সার কথা হল, তিনি যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধে যাচ্ছেন না, এর ইঙ্গিত সেটা। যেমন সাত নম্বরের প্রথম বাক্যটা হল, তিনি “পাকিস্তানের জনগণকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছেন- আসেন একটা যুদ্ধ লড়ি।’ এটুকু পড়ে পাঠকের মনে সামরিক যুদ্ধের কথাই ভেসে উঠবে। কিন্তু না, মোদি সামরিক যুদ্ধের কথা বলছেন না। পরের বাক্যে জানা গেল যে – “কে কত বেশি উন্নয়ন করতে পারে, এরই প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানকে জেতার চ্যালেঞ্জ” দিচ্ছেন তিনি। বলছেন, “এটা হবে কে আগে বেশি চাকরি সৃষ্টি করা, দারিদ্র্য দূর করা আর শিক্ষার হার বাড়াতে পারে- এরই চ্যালেঞ্জ”। এ কথা থেকে এটা পরিষ্কার যে, তিনি আর যুদ্ধ নয়, যুদ্ধের বয়ানে৪ও নাই। এখন “উন্নয়নের” (তার শ্লোগান ‘সবকা বিকাশ সবকা সাথ’) চিন্তার ভেতরেই সরে আসতে চাইছেন। যুদ্ধে যাওয়ার মানে উন্নয়ন-বিরোধী কাজ, (যা তিনি করেছেন সব ডুবে যাবে, সব বেপথে যাবে- এটা পরিষ্কার করে তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন। ফলে মোদির পরিষ্কার যুদ্ধবিরোধী পথের ইঙ্গিত।
    আট নম্বর পয়েন্টও একই ইঙ্গিত। তিনি বলছেন, পাকিস্তানের জনগণের তাদের নেতাদেরকে জিজ্ঞাসা করা উচিত যে, “আমরা দুই দেশ একই সময়ে স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু আমরা করি সফটওয়্যার রফতানি আর পাকিস্তান করে সন্ত্রাসবাদ রফতানি, কেন”। অর্থাৎ একই চিন্তা কাঠামোর বক্তব্য- “যুদ্ধ বনাম উন্নয়ন আর তিনি উন্নয়নের পক্ষে”। এরপর ৯ নম্বর পয়েন্ট। এটা হলো পাকিস্তান বিষয়ে তিনি সর্বোচ্চ কী করবেন, সে প্রসঙ্গে। এক কথায় বললে, কেবল কূটনৈতিক তৎপরতা এবং এটাই হবে সেই সর্বোচ্চ করণীয়। তিনি পাকিস্তানকে পশ্চিমাসহ প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন। অর্থাৎ যুদ্ধ নয়, কূটনীতি তার পথ।
    শেষে দশ নম্বর পয়েন্ট। এটা বদ দোয়া দিয়ে সান্ত্বনা পাওয়ার মত। মোদি বলছেন,”একদিন পাকিস্তানের জনগণ নিজ ঘরের তৈরি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে”। যুদ্ধের ভুয়া দামামা বাজানোর চেয়ে তবুও এটা ভালো নিঃসন্দেহে। দশ পয়েন্টের সারকথা, যুদ্ধ বনাম উন্নয়নে মোদি উন্নয়নের পক্ষে।
    আনন্দবাজারের রিপোর্টের শেষ দুই বাক্য এ রকম- “পাকিস্তানে সামরিক পদক্ষেপ না করতে পারা নরেন্দ্র মোদি এই বিদ্রোহী নেতাদের আগামীকাল সংবর্ধনা দেবেন। তার পরই “গরিবি হটাওয়ের স্লোগান দেবেন তিনি। লক্ষ্য, উত্তর প্রদেশ, পঞ্জাবের ভোট”। অর্থাৎ লক্ষ্যণীয় যে মোদিকে আনন্দবাজার পত্রিকা পরিচয় করাচ্ছে এই বলে যে, তিনি হলেন- ‘পাকিস্তানে সামরিক পদক্ষেপ না করতে পারা নরেন্দ্র মোদি।’ এরপর আর কোনো মন্তব্য নিঃপ্রয়োজন। যুদ্ধ বিষয়ে কোনো খবর আর নেই। কাজকর্ম যেমন চলছিল, তেমনি রুটিন। সামনের কাজ আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন, আর এর কৌশল নির্ধারণ। বিজনেস এজ ইউজুয়াল! আসলে হিন্দুত্ত্ব – এর শ্লোগান তুলে ভোটের বাক্স ভরে তোলা যায় হয়ত তবে যুদ্ধের বাজারে এই শ্লোগান একেবারেই অচল। কোনই কাজে আসে না, উলটা মিথ্যার ভান্ড ফুটে যাবার  বিপদ ঢেকে আনে। বলাই বাহুল্য।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (প্রিন্টে ২৬ সেপ্টেম্বর) ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

     

  • ভারতে এবার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার কথা উঠেছিল কেন

     ভারতে এবার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার কথা উঠেছিল কেন

    গৌতম দাস

    ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬

    ভারতে এবার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার কথা উঠেছিল কেন

    বাংলাদেশে খবরটা সবাই পড়েছেন বেশ উতসুক হয়ে আগ্রহের সাথে। কারণ বিষয়টা  জন্মলগ্ন থেকে বাংলাদেশকে ভাটির দেশ হিসাবে পাওনা পানি থেকে বঞ্চিত করার ভারতের জুলুম ও অত্যাচারের কাহিনীর অংশ। জুলুম ও অত্যাচার সহ্য করা বাংলাদেশে বিষয়টা উস্কে তোলার মত খবরটা হল, ভারতের বিহার রাজ্যের চলতি মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার, তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাথে দেখা করে ফরাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দিতে দাবী করেছেন। এই ফারাক্কা বাঁধ তৈরি করে গঙ্গা নদীর পানির উপর ভাটির দেশ হিসাবে বাংলাদেশের যা ন্যায্য হিস্যা সেই পানি জবরদস্তি করে ভারত আটকে নিয়ে রেখেছে। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা দিয়ে রেখেছে শুধু তাই না, সেই পানি খাল কেটে পশ্চিমবঙ্গের অন্য নদীতে নিয়ে গেছে। তাই বাংলাদেশের সকলের চোখে, এটা বাংলাদেশের চরম স্বার্থহানিকর ঘটনা। ফলে  ভারতের দুষমনির প্রতীক হল ফারাক্কা বাঁধ। এবার সেই ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দেবার কথা তুলেছেন ভারতের বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি ২২ আগষ্ট ২০১৬ প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাথে দেখা করেন। আনন্দবাজার পত্রিকার ২৪ আগষ্টের রিপোর্ট বলছে – নিতীশ কুমারের অভিযোগ, “বিহারে গঙ্গা অববাহিকায় বন্যার জন্য ফরাক্কা বাঁধ দায়ী। বক্সার থেকে ফরাক্কা পর্যন্ত গঙ্গার নাব্যতা অনেকটাই কমেছে। ফলে জল জমে তা দু’পার ছাপিয়ে যাচ্ছে। ফলে বন্যা কবলিত এলাকা বাড়ছে। তাই ফরাক্কা বাঁধের পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। ফরাক্কা বাঁধ ভেঙে দেওয়া উচিত বলেও মনে করেন নীতীশ”। এই খবর বাংলাদেশের কাছে যেন আল্লার দুনিয়ার ন্যায়-ইনসাফের ঘন্টা আপন উদ্যোগে বেজে উঠার ইঙ্গিত ইশারা এটা। যদিও মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার এই দাবি করেছেন বাংলাদেশের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে নয়, বিহারের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে। কারণ বিহার এখন গঙ্গা নদী প্রবাহের উপচানো পানিতে বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। উতপত্তিগত দিক থেকে গঙ্গা নদী ভারতের যেসব প্রদেশ আগে ডিঙ্গিয়ে এরপর বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ক্রমানুসারে ভারতের সেসব প্রদেশ বা রাজ্যগুলো হল – সবার আগে উত্তরপ্রদেশ এরপর বিহার, এরপর পশ্চিমবঙ্গ হয়ে শেষে বাংলাদেশের চাপাই-নবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলা। তো নীতিশ কুমারের দাবি কী আমাদের জন্য ইনসাফের ইশারা? এটা বুঝবার জন্য আমাদের সবার কান খাড়া হয়েছিল, সন্দেহ নাই।

    ঐ সাক্ষাত ছিল এক মুখ্যমন্ত্রীকে দেয়া এক প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক এপয়েন্টমেন্ট করে দেয়া সাক্ষাত। অতএব এতে অনুমান করা ভুল হবে না যে তা অনেক আগেই ঠিক করা হয়েছিল। তবে এটা নেহায়েতই এক মুখ্যমন্ত্রীকে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত ছিল না। এর আরও বহু গভীর মাত্রা আছে। প্রথমত নীতিশ বিহারের এক আঞ্চলিক দল জনতা দল (ইউনাইটেড)এর সভাপতি ও মুখ্যমন্ত্রী। না এতটুকুই নয়। গত ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপির মোদী নিরঙ্কুশভাবে জিতে আসার পর ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে যে মোদী ঝড় উঠেছিল সে ঝড় ঐ নির্বাচনের পরেও অন্যান্য রাজ্য নির্বাচনেও থামছিলই না। শেষে গত নভেম্বর ২০১৫ বিহারের প্রাদেশিক (বিধানসভা) নির্বাচনে প্রথম সবচেয়ে শক্তভাবে থেমে উলটা দিকে তা ঘুরেছিল। বিজেপি শোচনীয়ভাবে হেরেছিল। আর নীতিশ কুমারের নেতৃত্বের বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়েছিল। ঐ জোটে বিহারের আর এক বড় আঞ্চলিক দল, লালু প্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর ছিল সোনিয়া গান্ধীর খোদ কংগ্রেস পার্টিও। এককথায় বললে বিজেপি বিরোধী শক্ত জোট ছিল সেটা। ফলে সেই শক্ত জোটের সবার প্রতিনিধি ও নেতা ছিলেন নীতিশ কুমার । নীতিশের পরিচয়-বৈশিষ্ঠের আরও কিছু বাকী আছে। আগামি বছর ২০১৭ ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ঐ নির্বাচনেও যদি বিজেপির হার হয় তবে তা ভারতের রাজনীতিতে আর এক নতুন দিকে মোড় ঘুরানো ঘটনা হবে সেটা। ঐ হারকে পুজি করে ভারতের পরবর্তি লোকসভা (২০১৯) নির্বাচনে বিজেপির মোদীকে হারানোর লক্ষ্যে বিজেপি-বিরোধী জোট গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। কারণ আগামি নির্বাচনে বিজেপি-বিরোধী দল কংগ্রেস হবে না। আঞ্চলিক দলগুলোর গঠিত জোট হবে মোদীর বিজেপির প্রধান বিরোধী, প্রধান চ্যালেঞ্জ।  এই লক্ষ্যে সম্ভাব্য ঐ জোট গড়ে তোলার খুবই তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা। সম্ভাব্য ঐ আঞ্চলিক দলের জোট গঠনের মূল নেতা ও উদ্যোক্তা হবেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।  এই জোটের মূল লক্ষ্য হবে বিজেপি ও মোদীর ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে কেন্দ্রের ক্ষমতা দখল। গত কেন্দ্রীয় নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে কংগ্রেস ক্রমশ শুকিয়ে ছোট হতে হতে অনেক আগেই কোন এক আঞ্চলিক দলের সমান প্রভাবের দল হয়ে গেছে। ফলে নীতিশ-মমতাসহ নানান আঞ্চলিক দলের মিলিত জোট বনাম বিজেপির মোদী – এই হবে ঐ নির্বাচনে মূল ক্ষমতার লড়াই।

    ভারত রাষ্ট্রের জন্মগত সুত্রে দুর্বলতা বা ত্রুটি হল ওখানে কেন্দ্র কে, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কোথায় কিভাবে তৈরি হয় তা রাজ্যে বসে টের পাওয়া যায় না। ফলে ভুতুড়ে কেন্দ্র বনাম রাজ্য এর বিবাদ জন্ম থেকেই। ফলে বিজেপি বনাম আঞ্চলিক দলের জোট এর লড়াই  এর তাতপর্য  এবার পুরানা ‘কেন্দ্র-রাজ্য’ ক্ষমতার লড়াইকে আবার মুখ্য হয়ে তুলতে যাচ্ছে। অতএব মোদী সেই বিশেষ নীতিশ কুমারকে সাক্ষাতের এপয়েন্টমেন্ট দিয়েছিলেন।

    ফসলের মাঠ ও শহরও ডুবে যাওয়া বিহারের এবারের বন্যার প্রভাব হয়েছিল মারাত্মক। টানাটানিতে চলা রাজ্য আর তুলনামূলক উদ্বৃত্তে চলা রাজ্য এই ভিত্তিতে যদি ভারতের রাজ্যগুলোকে ভাগ করি তবে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার টানাটানিতে চলা রাজ্যের অন্তর্গত। ফলে বন্যায় ব্যাপক ত্রাণের আয়োজন করার সীমাবদ্ধতা এখানে আছে। আর এই সীমাবদ্ধতা সমস্যাটা ব্যক্তি নীতিশ কুমার অথবা তার দল-জোটের কারণে নয়।  ওদিকে এই বন্যায় মানুষের যা ক্ষয়ক্ষতি এককথায় বিহার রাজ্য সরকারের পক্ষে তা পুরণ অসম্ভব। ফলে যেটা সম্ভব তা হল তাতক্ষণিক কিছু ত্রাণ বিতরণ। সারকথায় বিহারের জনগণের ক্ষোভ মোকাবিলা আসলেই কঠিন। ফলে৪ জনগণের ক্ষোভকে কেন্দ্রের উপর ঠেলে দেয়ার তাগিদ নীতিশের আছে। ওদিকে এই বন্যা কেন হল, এর সাথে কী ফারাক্কায় বাঁধ দেওয়ার কোন সম্পর্ক নাই? অবশ্যই আছে। গঙ্গার মত প্রবল বিপুল পলিমাটিবাহী নদীর ক্ষেত্রে এর উপর বাঁধ দিলে সে প্রভাব আরও জটিল ও মারাত্মক হওয়ার কথা, হয়েছেও। অতএব সবমিলিয়ে এর দায় কার কেন্দ্রে না রাজ্যের এই বলে দায় ঠেলাঠেলির এক বিরাট ক্ষেত্র হল বন্যা ও বাঁধ ইস্যু। বিশেষত যখন বাঁধ দেয়া ও মেন্টেনেন্স ব্যবস্থাপনার প্রশাসন চলে সরাসরি কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত – তাই এই দায় কেন্দ্রের; ওদিকে বন্যা হলে তা মোকাবিলা ও ত্রাণ বিতরণ রাজ্যের দায়। এসব কথা সাক্ষাতের আগেই আগাম ভেবে নিয়েছিলেন নীতিশ ও মোদী দুজনেই। কারণ, ঐ সাক্ষাত থেকে দায় ঠেলাঠেলি শুরুর এক বিরাট সম্ভাবনা আছে তা দুজনেই জানতেন। নীতিশ মোদীর কাছে এসে নিজ বিহার জনগণকে বুঝাতে ও দেখাতে চেয়েছিলেন মুল সমস্যা ফারাক্কা বাঁধ। অর্থাৎ দায় কেন্দ্রের। মোদীর কাছে বাঁধ ভেঙ্গে দেওয়ার কথা তুলে, দাবি জানিয়ে তিনি সে অর্থ করতে চেয়েছিলেন যে দায় কেন্দ্রের। আর মোদী সেকথা টের পেয়ে সাথে সাথে বাঁধ কর্তৃপক্ষকে  বাঁধের সব গেট খুলে দেবার নির্দেশ জারি করেন। এভাবে তিনিও বুঝাতে চাইলেন রাজ্য যা চেয়েছে তিনি ততক্ষণাত তাই দিয়ে দিয়েছেন, সুতরাং কেন্দ্রের দায় নাই।  বন্যায় কারণে  বিহারের জনগণের যদি কোন কষ্ট-ক্ষোভ থেকে থাকে তবে এর দায় ত্রাণের পরিমাণ কম  অথবা বিতরণে রাজ্য সরকারের সমস্যাজাত। ফলে ২৩ আগষ্ট নীতিশ-মোদীর সাক্ষাত ছিল আসলে আগামি ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে কার ইমেজ ক্রেডিট ভাল তা এখন থেকেই ঠিকঠাক রাখার প্রতিযোগিতা। ফলে ঐদিনের প্রথমার্ধে ঘটনাবলী ছিল নীতিশের বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবী জানান আর মোদীর ততক্ষণাৎ সবগুলো গেট খুলে দিবার নির্দেশের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছিল।

    কিন্তু কেবল নীতিশ আর মোদী নন গঙ্গার ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে ভারতেই আরও পক্ষ আছে। যেমন পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান হল ফারাক্কা বাঁধ থাকা তার স্বার্থের পক্ষে। কারণ গঙ্গার পানি শেষে বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পৌছানোর বদলে সেই পানি বাংলাদেশে ঢুকবার আগেই তা কেটে গতিপথ বদলে আলাদা খাল খুড়ে টেনে ভাগীরথী-হুগলী নদীতে ফেলা হয়েছে। এভাবে হুগলী নদী ধরে শেষে ঐ বাড়তি পানি কলকাতা বন্দরে নিয়ে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে ফেলা হয়েছে। মমতার মুল উদ্বেগ হুগলী নদীতে পড়া পলিমাটির চরের কারণে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার বন্দরের নাব্যতা সঙ্কটে পড়েছে, এথেকে বন্দরকে রক্ষা করা, বন্দরকে সচল রাখা। ফারাক্কা বাঁধ তৈরির আগে মনে করা হয়েছিল যে খাল কেটে আনা অতিরিক্ত বা বাড়তি পানির চাপের তোড়ে হুগলী নদীতে পড়া পলিমাটি অপসারণ হয়ে যাবে যাতে এভাবে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার বন্দরের নাব্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। কিন্তু এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে পানি টেনে আনার পরও তা দিয়ে পলিমাটি পর্যাপ্ত বা কাম্য মাফিক কিছুই সরানো যায় নাই। ফলে  বন্দরের এই নাব্যতা সংকট খুব মিটে নাই তো বটেই উলটা নাব্যতা রক্ষা যতটুকু হচ্ছে তা বজায় রাখতে গিয়ে প্রত্যেক বর্ষা মৌসুমে ঐ সংযোগ খাল (৪০ কিমি লম্বা) ও নদীর দুই পাড় উপচে পড়া পানিতে এলাকায় বন্যা হচ্ছে। ফলে বিহার ছাড়াও নাব্যতা রক্ষার কাফফারা হিসাবে পশ্চিমবঙ্গেও প্রতিবছর বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক।

    কিন্তু এসব সত্ত্বেও নীতিশের বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবির কয়েক ঘন্টা পরে ঐদিনই ভারতের এনডিটিভি মমতাকে প্রতিক্রিয়া জিজ্ঞাসা করেছিল। জানতে চাওয়া হয়েছিল যে নীতিশের ঐ দাবীর পর মমতার প্রতিক্রিয়া কী? ক্লিপে দেখা যাচ্ছে, মমতা এর কোন জবাব না দিয়ে এড়িয়ে চলে যান।   এতে এনডিটিভির রিপোর্টার মন্তব্য করে এটা মমতার কৌশলগত নিশ্চুপ থাকা। পরে কলকাতার নদী ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র ক্যামেরার সামনে (ঐ একই ক্লিপে দেখুন শেষ ভাগে) দাবি করেন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দিলে নাকি এখন ২০০ কিমি নদী শুকিয়ে যাবে। তাই তাঁর মতে নীতিশের দাবী আজিব রিডিকুলাস, তিনি বলেন। পরে ঐ রিপোর্টের অন্য অংশ থেকে জানা যায় মমতা বলছেন, বিহারে বন্যার কারণ মনুষ্য-সৃষ্ট। কারণ সঠিক সময়ে বাঁধের পানি ছাড়া হয় নাই। ফলে পুরা ব্যাপারটায় কেন্দ্রের দায়।

    মমতার এই বক্তব্যের পরে ঐদিনই (২৩ আগষ্ট পরের দ্বিতীয়ার্ধে) বিজেপি শিবিরে টনক নড়ে। তারা আবার ভেবে মুল্যায়ন করে দেখে যে ভোটের রাজনীতির দিকে লক্ষ্য রেখে রাজনীতিকদের কথা সাজানো ও পরস্পরের বিরুদ্ধে দোষারোপের লড়াইয়ে তারা পিছিয়ে পড়ে গেছে। কারণ নীতিশ আর মমতার ভাষ্যে ভিন্নতা আছে। অথচ এর সুবিধা বিজেপির পক্ষে কাজে লাগানো হয় নাই। তাই আবার নতুন করে দোষারোপ সাজানোর উদ্যোগ নেয় তারা। বিহারের রাজনীতিতে নীতিশ কুমারের প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিত্ব হলেন বিজেপি নেতা হলেন সুশীল কমার মোদী। তিনি একদিন পরে অর্থাৎ ২৫ আগষ্ট মিডিয়ায় এক বিবৃতি পাঠিয়ে তাই এবার তিনি দাবি করলেন, নীতিশের ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবীর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই। তিনি আরও ব্যাখ্যা দিতে থাকলেন, “বরং যেহেতু নীতিশের বিহার সরকার বন্যা মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয় নাই, ত্রাণ ঠিক মত বিতরণ করতে পারে নাই – সেই খামতি আড়াল করতে সে এখন বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবী তুলেছে”। অর্থাৎ  তিনি মমতার পক্ষে ছদ্মভাবে দাঁড়িয়ে মমতা-নীতিশের বক্তব্য বা অবস্থানের বিরোধ বড় করে দিতে চাইলেন। এছাড়াও বন্যার কারণ ফারাক্কা বাঁধ নয় – বলে বাঁধকে দায়ী হওয়ার হাত থেকে বাচিয়ে দিতে চাইলেন তিনি। আর এর চেয়েও বড় কথা তিনি ইচ্ছা করে এক বিভ্রান্ত তৈরি করলেন। বন্যা হওয়া না হওয়ার জন্য বাঁধ দায়ী কীনা এটা এক জিনিষ। কিন্তু তিনি দাবী করলেন ফারাক্কা বাঁধ নয়, রাজ্য সরকারের ত্রাণ ঠিকমত বিতরণ ব্যবস্থাপনা না করতে পারাটাই যেন বন্যার কারণ। যেন ত্রাণ পরিমানে প্রচুর আর  ঠিকমত বিতরণ করতে পারলে তাহলে আর বিহারে বন্যা হত না।  এই হল ভারতের আগামি কেন্দ্র-রাজ্য লড়াই প্রকট হয়ে উঠার আগেই পরস্পরের দোষারোপ করে দায় ঠেলাঠেলির – ভোটের রাজনীতি।

    ঘটনার এখানেই শেষ না। কারণ গঙ্গা ও ফারাক্কা বাঁধ দেয়ার সাথে যুক্ত পক্ষ শুধু ভারতে না, ভারতের বাইরেও বাংলাদেশ আছে। তাই এবার বাংলাদেশ অংশ। এখানে দুই মন্ত্রীর পরস্পর বিরোধী দুই বক্তব্য নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে সরকার ঘনিষ্ট বিডিনিউজ২৪ গত ২৮ আগষ্ট।  তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর নির্বাচনী এলাকা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা, যেটা এবারের ফারাক্কা বাধের গেট খুলে দিবার কারণে বন্যায় অন্যতম ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা। রোববার ভেড়ামারা উপজেলার চর গোলাপনগরে পদ্মা নদীর পাড়ে বন্যাদুর্গতদের মধ্যে  ত্রাণ বিতরণের সময় ফারাক্কা ব্যারেজের প্রভাব নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানাচ্ছেন। তিনি লিখছেন তথ্যমন্ত্রী ইনু বলেন, “অভিন্ন নদীর উপর একতরফা গেইট খুলে দেওয়াটা সঠিক কাজ নয়। এ বিষয়ে আমাদের যে ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে, তার হিসাব করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আর্কষণ করব।” একই সময়ে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যববস্থাপনামন্ত্রী মায়া চাঁদপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক মতবিনিময় সভায় ফারাক্কা ব্যারেজ নিয়ে কথা বলেন। আওয়ামী লীগ নেতা মায়াকে উদ্ধৃত করে বিডিনিউজ২৪ লিখেছে,“এক সময় আমরা বলেছি ফারাক্কার বাঁধ আমাদের জন্য মরণ ফাঁদ। কিন্তু এখন তা ভারতের জন্য মরণ ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা ফারাক্কার পুরো বাঁধ ছেড়ে দিলে কিংবা ভেঙে দিলে আমাদের দেশে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। পদ্মার পানি এখনও বিপদসীমার নিচে আছে। ফারাক্কার পানি আমাদের কোনো ধরনের সমস্যা হবে না বলে আমরা মনে করি”। অর্থাৎ সংকীর্ণ চোখে যার যার নির্বাচনী এলাকার মানুষকে বুঝ দিবার বক্তৃতা এগুলো। ঠিক সামগ্রিক দেশ ও জনগণের স্বার্থের দিক থেকে দেয়া অবস্থান নয়।

    নিতীশ-মমতার অবস্থানের বিরোধকে বড় করে দেখানোর সুযো নিবার জন্য এবার এগিয়ে আসেন ভারতের রঞ্জন বসু। তার সে তৎপরতা আমরা পাই গত ০২ সেপ্টেম্বর কলকাতার সাংবাদিক রঞ্জন বসুর লেখা বাংলা ট্রিবিউনে “ফারাক্কার গেট খোলা নিয়ে অপপ্রচারে ‘বিরক্ত’ বাংলাদেশ” শিরোনামে। ঐ লেখায় দাবী করা হয়েছে, নতুন করে ফারাক্কা বাধের গেট খোলার কোন ঘটনাই আসলে ঘটে নাই। কারণ বর্যার সময় সবগেট খোলাই থাকে। ফলে নতুন করে গেট না খুললেও মিডিয়ার তা প্রচার হয়েছে। হয়ত রঞ্জন বসুর এই দাবী সত্য। কিন্তু ঐ লেখায় দাবী করা হয়েছে আমাদের দিল্লী দুতাবাস নাকি দাবি করেছে রাজশাহী বা অন্য কোথায় কোন বন্যা হয় নাই। রঞ্জন বসু লিখেছেন, “……পদ্মায় বাড়তি পানির স্রোতে রাজশাহী বা অন্য কোথাও কি বন্যা হয়েছে বলে খবর এসেছে?” পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। অর্থাৎ দেখা যাছে, রঞ্জন বসুর লেখার এই অংশ আবার আর এক চরমপ্রান্ত বা সবকিছু অস্বীকারের চেষ্টা। উপরের দুই মন্ত্রীর বক্তব্যসহ বিডিনিউজের রিপোর্ট এর প্রমাণ। জানিয়ে রাখা ভাল গত ২৮ আগষ্ট খোদ ঐ  বিডিনিউজ২৪ এর ১.৪৬ মিনিটের এক ভিডিও ক্লিপ রিপোর্টের শিরোনাম হল “রাজশাহীর শহর রক্ষা বাঁধে ফাটল”। ফলে রঞ্জন বসু এবং দিল্লীর বাংলাদেশ দুতাবাসের নামে তার দাবি একশ ভাগ মিথ্যা। এটা বড় জোড় মমতা-নীতিশের বিরুদ্ধে মোদীর পক্ষে রঞ্জন বসুর এক মিথ্যা প্রচারণা মাত্র।

    সারকথায় বললে,এই লেখায় ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশ নিয়ে প্রকাশিত সব পক্ষের বক্তব্যগুলোকে একসাথে পাখির একটা চোখ দিয়ে দেখলে যেমন হয় তেমনই এক সঙ্কলন। এককথায় বললে, বাংলাদেশের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে এসব কথোপকথন গুলো একটাও নয়। ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াইয়ে ফারাক্কা ইস্যু হয়েছিল মাত্র।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [লেখাটা এর আগে  মাসিক অন্যদিগন্তের চলতি প্রিন্ট সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তা আবার সংযোজন ও এডিট করে ফাইলান ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

     

  • মোদী কেন বেলুচিস্তানের ‘মানবাধিকারকর্মী’ হতে চায়

    মোদী কেন বেলুচিস্তানের ‘মানবাধিকারকর্মী’ হতে চায়
    গৌতম দাস
    ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬, বৃহষ্পতিবার

    মোদী কেন বেলুচিস্তানের ‘মানবাধিকারকর্মী’ হতে চায়

     

    ঘটনার শুরু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গত ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ থেকে। সেখানে তিনি এই ভাষণে বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ( এবং সাথে পাকিস্তানের কাশ্মীর অংশেও) দমন করতে গিয়ে পাকিস্তান সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ এনেছেন। ‘‘আমি বালুচিস্তান, গিলগিট, ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের বিষয়ে বলতে চাই। এ নিয়ে ভারত সরব হওয়ায় গত কয়েক দিনে ওখানকার অনেক লোক আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ।’’ এর ব্যাখ্যা হিসেবে ভারতের পক্ষ থেকে (ভারতীয় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে ব্যক্তি যোগাযোগে করলে) নাকি বলা হয়েছে, মোদী স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে বেলুচিস্তান প্রসঙ্গ এনেছেন এ জন্য যে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও আগের দিন ১৪ আগস্ট তাদের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ভারত-অধিকৃত কাশ্মিরে চলমান লাগাতার বিক্ষোভ, কারফিউর প্রসঙ্গ টেনে একে ‘কাশ্মিরের স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তার মানে এসব আসলে একটা পাল্টাপাল্টি ব্যাখ্যা, যেখান থেকে সত্যতা বের করা কঠিন। তবে ১৪ আগস্টের আগেও ড্রেস রিহার্সেলের মত করে মোদী বেলুচ প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। গত ১২ আগস্ট ছিল প্রধানমন্ত্রী মোদির সাথে ভারতের কাশ্মিরকেন্দ্রিক সব রাজনৈতিক দলের সাথে বৈঠক হয়। মুজাহিদ কমান্ডার বুরহান ওয়ানির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কাশ্মিরে লাগাতার কারফিউ কাশ্মিরের জনজীবন স্থবির করে রেখেছে। সেখান থেকে বের হওয়ার উপায় হিসেবে ঐ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই বৈঠকে মোদী সর্বপ্রথম বেলুচিস্তানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। আনন্দবাজারের রিপোর্টের ভাষায়, ‘গত শুক্রবার কাশ্মির প্রসঙ্গে সবর্দলীয় বৈঠকে প্রথম এই নিয়ে মুখ খোলেন প্রধানমন্ত্রী। এই নতুন পদক্ষেপের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোদি সেই বৈঠকে বলেছিলেন,পাক-অধিকৃত কাশ্মির ও বালুচিস্তানের মানুষ যারা এখন অন্য কোনো দেশে থাকেন, তাদের সাথে যোগাযোগ করে পাকিস্তানের নির্যাতনের কথা সামনে আনতে হবে।’ সার কথা হল, কাশ্মির অসন্তোষে বুরহান ইস্যুর পর থেকে বর্তমানে ভারত যে চাপের মুখে আছে সেখান থেকে মুক্তি পেতে পাল্টাপাল্টিতে পড়ে ঘটনা এখন মোদীর ভারতের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ পর্যন্ত ঠেকেছে।

    নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ তোলা অন্তত ভারতের দিক থেকে একেবারেই নতুন অস্ত্র। এই অস্ত্র ভারতের জন্য শুধু নতুন তাই নয়। কারণ মানবাধিকার ইস্যু সবসময়ই দু’ধারী তলোয়ারের মত। কাঁচের ঘরে বসে অ্ন্যের উপর ঢিল ছুড়ার মত। ফলে তা ব্যবহার করতে গিয়ে নিজের হাত ক্ষতবিক্ষত করে ভারত নিজের জন্যই বিপদ ডেকে আনবে। এক কথায় বললে কারো বিরুদ্ধে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ আনা ভারত কখনোই নিজের কাজ মনে করেনি বা নিজের চায়ের কাপ হিসেবে গ্রহণ করেনি। আজ ভারত যেমন এক এককাট্টা রাষ্ট্র বলে দেখি কলোনি আমলের বৃটিশ-ভারত ঠিক তা ছিল না। সরাসরি কিছু প্রাদেশিক (সেকালে প্রেসিডেন্সী বলা হত) সরকারি এলাকা আর প্রায় ৫০০ এরও বেশি ছোট বড় করদ রাজ্য – এই সব মিলিত ভুখন্ডটাকে বলা হত বৃটিশ-ভারত। বিগত ১৯৪৭ সালে ভারতের জন্মের সময় থেকেই অন্তত পরের তিন বছর ধরে সমানে পিটাপাটা আর সামরিক বলপ্রয়োগ করে বিভিন্ন রাজার রাজ্যকে মুল ভুখনন্ডে অন্তর্ভুক্তিতে বাধ্য করতে হয়েছিল। অর্থাৎ নেহেরুর নেতৃত্বের নতুন ভারত সরকারের অধীনে পুরান স্টাইলে কোন রাজাকে কর-খাজনা দিয়ে করদ রাজ্য হয়ে থাকার ব্যবস্থা রাখেন নাই। যেখানে ভারতভুক্তি আপোষে হয় নাই সেখানে সামরিক বল প্রয়োগ করে তা করা হয়েছিল। এর পরবর্তিকালের ভারতে একের পর এক লাগাতার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও মাওবাদী আন্দোলনের সমস্যা ভারত রাষ্ট্রকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। কাশ্মির, পাঞ্জাব, নকশাল আর উত্তর-পূর্বের সাত বোন রাজ্যের আন্দোলন সেসবের উদাহরণ। যে রাষ্ট্রকে জন্মের পর থেকেই লাগাতার বিচ্ছিন্নতাবাদী বা রাজনৈতিক সমস্যাকে রাষ্ট্রের সশস্ত্র বলপ্রয়োগ, হত্যা-নির্যাতনের ভেতর দিয়ে দমিয়ে নিজের রাষ্ট্রকে সংহত রাখতে হয়েছে ও হচ্ছে, সুনির্দিষ্ট সেই রাষ্ট্রের কাছে ‘মানবাধিকার’ শব্দটিই হারাম। কারণ সে নিজেই সর্বক্ষণ ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ কাঁধে নিয়ে ঘুরছে। স্বভাবতই ওই রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজি হবে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ধারণাটি যেন দুনিয়াতে নেই, এমন ভাব ধরে থাকা। জন্মের পর থেকে এটাই এত দিন ভারত রাষ্ট্রের পুরানা সব সরকারের গৃহীত নীতি ছিল। ছিল বলতে হচ্ছে, কারণ অগ্রপশ্চাৎ যথেষ্ট বিবেচনা করে মোদি সেই নীতি এখন ভেঙেছে তা মনে করা যাচ্ছে না। খুব সম্ভবত চলতি কাশ্মীর ক্রাইসিস আরও মহীরুহ হয়ে সামনে আসতেছে এটা আঁচ  করে, মোকাবিলায় উপায়ন্ত না দেখে আপাতত “কুইনাইন খাইয়ে” যেভেবেই হোক জ্বর ছাড়াবার ব্যবস্থা এটা। এতে এরপর কুইনাইন সারাবে কে সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
    ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ধারণাটি যেন দুনিয়াতে নেই, এমন ভাব ধরে থাকা – এটাই এতদিনের ভারতের নীতি ছিল তা সবচেয়ে ভালোভাবে প্রমাণিত দেখা যায় পশ্চিমা রাষ্ট্রের সাথে ভারতের সম্পর্কের দিকে, বিশেষ করে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের দিকে তাকালে। যেকোনো পশ্চিমা বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পাতানোর শুরুতে ভারত সব সময় সবার আগে কবুল করিয়ে নেয় যে ‘কাশ্মির ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু’, ভারত এই ইস্যুর ‘কোনো আন্তর্জাতিকায়ন চায় না’, এমনকি ‘জাতিসঙ্ঘেও মুখোমুখি হতে চায় না’ – এ ব্যাপারে ভারতের সেই পরদেশী বন্ধু একমত আছে। এমন একমত হবার পরই কেবল ভারত সে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কে আগায়। সে কারণে যে আমেরিকা মানবাধিকার ইস্যুকে অন্য রাষ্ট্রের পেছনে লাগার, তাকে বিব্রত করার বিষয় হিসেবে ব্যবহার করে প্রতি বছর রিপোর্ট বের করে থাকে, অথচ সে ভারতের কাশ্মির ইস্যুতে উল্টো নিজেকেই নিয়ন্ত্রিত রাখে। তো এই হল, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ইস্যু কেন ভারতের চায়ের কাপ নয়, এটা ভারতের জন্য নয়- এই ভাব ধরে রাখার ভারতীয় স্টাইল। তাই ‘মানবাধিকার’ ভারতের জন্য ‘নো গো’ বা অগম্য এলাকা- এভাবেই এত দিন ছিল। ভারতের কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীদের ব্রিফিংও এত দিন এই আলোকে সাজানো ছিল, এভাবেই চলে আসছিল।
    তাই  ‘বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন’ দমন করতে গিয়ে পাকিস্তান সরকার ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে’- মোদির এই নতুন বয়ানের পথ অনুসরণ করা দেখে সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত হয়েছে ভারতের ভেতরেরই অন্য রাজনৈতিক, প্রাক্তন আমলা ও মিডিয়া গোষ্ঠী। তাঁরা দেখতে পাচ্ছে, মোদির রাজনৈতিক লাইনটি এ রকম যে, মোদি এখন থেকে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ তুলবে। আর তাতেই নাকি পাকিস্তান কুপোকাত হয়ে যাবে। মোদির এই লাইনের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, ভারতের কাশ্মিরের অসন্তোষ তৈরি করার জন্য পুরোপুরিভাবে পাকিস্তান সরকারকে দায়ী করে দোষ চাপানোর ফলে অনেক রিলিফ পাওয়া যাবে, চাপ কমানো যাবে। ঠিক যেমন বেলুচিস্তানে অসন্তোষের জন্য পাকিস্তান ভারতকে দায়ী করে থাকে। উভয় পক্ষের এসব দায়ী করার ঘটনার সাথে সবচেয়ে ভাল তুলনীয় ঘটনা হল, ঠিক যেমন পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হত ভারতের প্ররোচনাতেই নাকি পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হয়েছে। যেন বাংলাদেশের জনগণের কোনো রাজনৈতিক আকাঙ্খা বা লড়াই-আন্দোলন বলে কিছু ছিল না। আবার তাই বলে বাংলাদেশের আন্দোলন বলশালী হলে এর মধ্যে ভারতের কোনোই স্বার্থ-প্রভাব ছিল না, এটা ঠিক তা বলাও নয়। ব্যাপারটা হল হবু বাংলাদেশ ও ভারত উভয়পক্ষই নিজের নিজের স্বার্থ দেখেছিল। ফলে স্বার্থের এক সম্মিলন আমরা দেখেছিলাম। তবে প্রপাগান্ডার সময় মুখ রক্ষার্থে পাকিস্তান ভারতের প্ররোচনার কথাই বলবে। ঠিক যেমন ভারতের কাশ্মির সমস্যা ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের প্ররোচনাকে দায়ী করার পথ ধরতে চাইছে। প্রচারণার এসব স্টাইল নতুন নয়। যেটা নতুন তা হল ভারতের আমলা কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীরা মোদীর এই নতুন রাজনৈতিক লাইনের ভেতর বিরাট বিপদ ও সমস্যা দেখছে।
    আনন্দবাজার পত্রিকা ঘটনার পরের দিন অর্থাৎ ১৬ আগস্ট মোদির বক্তব্য নিয়ে বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ তারা তখনো ছিল খোশমেজাজে, কারণ বিপদ তখনো কেউ তাদের মনে করিয়ে দেয়নি। এ দিনের আনন্দবাজারের দু-দু’টি রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ‘ভারত-পাক সঙ্ঘাতের নয়া কেন্দ্র চিরবিদ্রোহী বালুচিস্তান’ এবং ‘কাশ্মিরের জবাবে বালুচ তাস, পাকিস্তানকে ফের খোঁচা মোদির’– যা তাদের স্পষ্ট উচ্ছ্বাসের প্রকাশ। আনন্দবাজার সবসময় তাতানো সেনসেশনাল আর খুবই সস্তা জাতীয়তাবাদী শিরোনামে রিপোর্ট লিখে থাকে। এই উচ্ছাস তেমনই। তবে সে হানিমুনের পিরিয়ড এখানেই শেষ। এর পরের দিন থেকে আনন্দবাজারসহ সব মিডিয়া, কূটনীতিক সবাই খুবই সতর্ক, যার প্রতিফলন দেখা যায় মিডিয়া রিপোর্টগুলোতে। পরের দিন ১৭ আগস্ট থেকে মিডিয়া পুরো উল্টে যায়। যেমন এবার আনন্দবাজারের রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘লাভ কী হবে বালুচ তাসে, উঠছে প্রশ্ন’ অথবা আরও একদিন পর ১৮ আগস্টের রিপোর্ট, ‘বালুচিস্তান নিয়ে বেপরোয়া হতে গিয়ে মোদি এখন ঘোর কূটনৈতিক প্যাঁচে’। এখানে ভারতীয় বাংলা পত্রিকার রেফারেন্স দিয়ে বাংলায় বুঝানোর সুবিধা নিলাম। ইংরেজি পত্রিকা রিপোর্টগুলোও কমবেশি একই রকম।
    তাহলে কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীরা এতে কী বিপদ দেখলেন? তারা আসলে বলতে চান মানবাধিকার রেকর্ডের রিপোর্ট নিয়ে পাকিস্তানের সাথে ভারত প্রতিযোগিতা করলে তাতে পাকিস্তানের যা হবে হোক, কিন্তু ভারতের কাপড় খুলে যাবে। কারণ জন্ম থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদ বা রাজনৈতিক আন্দোলনের হুমকি সামলাতে গিয়ে ভারত মারাত্মক দুস্থ ও বিপজ্জনক অবস্থায় আছে; কারণ তার মানবাধিকার রেকর্ড খুবই খারাপ। ফলে মানবাধিকারের কথা যত চেপে রাখা বা এড়িয়ে যাওয়া যায় ততই ভাল।
    তাই আনন্দবাজার লিখছে, “…দ্বিধাবিভক্ত দেশের কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক শিবির। অনেকের প্রশ্ন, ইসলামাবাদের ঢিলের বদলে পাটকেল ছোড়ার এই নতুন পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে কি না?”। আর সবশেষে লিখছে, তবে কূটনীতিকদের একাংশের মত, “বালুচিস্তান নিয়ে ভূকৌশলগত খেলা চালিয়ে পাকিস্তানের ওপর চাপ তৈরি করা যাবে। কিন্তু তাতে কাশ্মির সমস্যা মিটবে না। বালুচিস্তানের সাথে চিন ও ইরানের স্বার্থও জড়িত। মোদির এই তাসে ওই দু’টি দেশও ক্ষুব্ধ হবে বলেই মত অনেক কূটনীতিকের”। যদিও মোদীর এই মানবাধিকার বয়ানের লাইনের আরও এক আসল কারণ আছে তা এখানে আনন্দবাজার বলে নাই। সেটা এই রচনার শেষের দিকে আনব।
    অর্থাৎ এখানেও আসল কারণ লুকিয়েছে মিডিয়া রিপোর্ট। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কংগ্রেসের সাবেক বিদেশমন্ত্রী সলমন খুরশিদ, তিনি আসল কারণ কিছুটা বলেছেন। আনন্দবাজার বলছে, সলমন খুরশিদের মতে, “অন্য দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে ঠিকই। কিন্তু খোলাখুলিভাবে তা নিয়ে ভারত নাক গলায় না। …সে দেশের নেতাদের কাছে ঘরোয়াভাবে আমরা উদ্বেগ জানাই ঠিকই। কিন্তু সেটাকে কখনো নীতি হিসেবে ব্যবহার করি না। তাহলে পাকিস্তানের সাথে আমাদের পার্থক্য কী হলো? …বালুচিস্তান নিয়ে ভারত গলা চড়ালে পাকিস্তানও কাশ্মির নিয়ে আরো সরব হওয়ার সুযোগ পাবে”। তবে কংগ্রেস দল সলমন খুরশিদের কথাকে নিজ দলের কথা তা বলতে পারেনি। বরং বলেছে এটা সলমনের ব্যক্তিগত মতামত। আনন্দবাজার এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলছে, “ভোটের রাজনীতির কথা ভেবে কংগ্রেস মোদির পাকিস্তান বিরোধিতা থেকে দূরে যেতে চায়নি। তাই এমন সিদ্ধান্ত”।
    এখানে এখন একটা তথ্য দেইয়া যাক। পাঠকের মনে হতে পারে এগুলো ভারত-পাকিস্তানের “সাদিও পুরানা” ক্যাচাল, এতে আমাদের কী! এমন দেশী পাঠককে সন্তুষ্ট করার জন্য তথ্যটি হল, আমাদের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সম্প্রতি ভারত সফরে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানকার তথ্যমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ শেষে ইংরেজি দৈনিক ‘দি হিন্দু’ পত্রিকার সাথে কথা বলেছেন। ওই পত্রিকার এসংক্রান্ত রিপোর্টের শিরোনাম, ‘মোদীর বেলুচিস্তান ইস্যুতে বাংলাদেশের সমর্থন’ (Bangladesh backs Modi on Balochistan)। ওই রিপোর্ট থেকে দু’টি উদ্ধৃতি আনব এখানে। এক. ইনু বলেছেন, “বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে (বেলুচ) মুক্তি আন্দোলন সমর্থন করতে বাধ্য এবং আমরা শিগগিরই বেলুচিস্তান প্রসঙ্গ আমাদের সরকারের নীতি ঘোষণা করব”। এরপর উদ্ধৃতি দুই. “দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাপারের টেররিজম পাঠিয়ে আর বেলুচদের মতো গণতান্ত্রিক জনগোষ্ঠীর ওপর তাদের নিজ ভূখণ্ডে নির্যাতন করে ইসলামাবাদ কী পেতে চায় তা ব্যাখ্যা করা উচিত”।
    মানবাধিকারের নীতিগত দিক থেকে এবং সে বিচারে আমাদের তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য সঠিক। যেকোনো মুক্তি আন্দোলন বা রাজনৈতিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারি নির্যাতনের কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ খুবই মারাত্মক। কিন্তু তবু তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে ভারত সন্তুষ্ট হয়েছে কি না বলা মুশকিল। কারণ, যে কেউই ওই একই বাক্যে বেলুচ শব্দের জায়গায় কাশ্মির আর ইসলামাবাদের জায়গায় দিল্লি বসিয়ে ফেলার সুযোগ আছে। এতে ভারতের কোনো সরকারি পাঠক খুশি না হয়ে উল্টো বিপদ দেখে ফেলতে পারেন।

    সবশেষে এখানে মোদীর মানবাধিকার কর্মী হবার এই লাইন কেন নিলেন এর আসল কারণ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। এটা সেপ্টেম্বর মাস। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ ২৫ তারিখের আশেপাশে নিউইয়র্ক বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের নিয়ে সরগরম থাকে। কারণ জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলি বা সাধারণ পরিষদের বৈঠক চলে। বিগত ১৯৪৮ সাল থেকে জাতিসংঘের মূল রাজনৈতিক ক্ষমতাধর নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মীরে গণভোট দিবার এক প্রস্তাব পেন্ডিং বা চাপা পড়ে আছে। এজন্যই ভারত বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের আগে কবুল করিয়ে নিয়ে রাখে যে, “কাশ্মির ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু”, ভারত এই ইস্যুর “কোনো আন্তর্জাতিকায়ন চায় না”।  কাশ্মীরের অসন্তোষ চলছে। এবারের বুরহান ইস্যুতে এপর্যন্ত প্রায় ৭৫ এর উপরে মানুষ সেখানে মারা গিয়েছে।  তাই ভারতের আশঙ্কা পাকিস্তান এবারের জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলিতে কাশ্মীর ইস্যুকে সরগরম করার চেষ্টা করবে। তাই পালটা কৌশল হিসাবে আগেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আর টেররিজমের ইস্যু তুলে রাখার কৌশল নিয়েছে ভারত। অন্যান্য মিডিয়া ব্যাপারটা আবছা ভাষায় বললেও ভারতের livemint পত্রিকা স্পষ্ট করে লিখেছে পাকিস্তান ২২ জন ডিপ্লোম্যাট নিয়োগ দিয়েছে যারা কাশ্মীরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যু নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে লবি করবে। মোদীর ভাষ্য জাতিসংঘে এই লড়াইয়ে জিতবার জন্যই সে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। তাই এবারের G20 বা টপ ২০টা অর্থনীতির রাষ্ট্রের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ৫ সেপ্টেম্বর চীনে। মোদী সেখানকার বক্তৃতায় নাম না ধরে ইতোমধ্যেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও টেররিজমের অভিযোগ তুলে বক্তৃতা করেছেন। আর ওদিক সিপিএম এর সীতারাম ইয়াচুরী মোদীকে অভিযোগ করছেন যে তিনিওই পাকিস্তানকে জাতিসংঘে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি বলছেন,

    “We are giving an opportunity to Pakistan by raising the Balochistan issue. Now Pakistan may say that since India is taking about Balochistan, which is an integral part of that country, they have the right to talk about Kashmir. With this kind of foreign policy, we are giving an opportunity to others to internationalise the Kashmir issue,” Mr. Yechuri said.

    অর্থাৎ ইয়াচুরি বলতে চাইছেন, আমরা সবসময় বলে এসেছিলাম, “কাশ্মীর ইস্যু ইন্টারনাশনালাইজ করতে দিব না। সেখান থেকে মোদী সরে আসাতেই এটা ঘটতেছে”। এখন দেখা যাক, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমরা কী দেখব। আগামি নভেম্বরে সার্ক সম্মেলন বসার কথা পাকিস্তানে। আদৌও তা হবে কিনা তা পুরাটাই নির্ভর করছে এই সেপ্টেম্বরের ফলাফল কেমন কী হয়, তিক্ততা কেমন মাত্রায় ছড়ায় ইত্যাদি অনেক কিছু উপরে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সরকার প্রধান যেতে পারছেন না বলে প্রচার হওয়া শুরু করেছে।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় অনলাইনে ২১ আগষ্ট ২০১৬ (প্রিন্টে ২২ আগষ্ট) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও অনেক কিছু সংযোজন ও এডিট  করে আবার ফাইনাল ভার্সান আকারে ছাপা হল।]

  • হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত-রাষ্ট্রকে বদলাবে কে

    হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত-রাষ্ট্রকে বদলাবে কে
    গৌতম দাস
    ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬,রবিবার

    হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত-রাষ্ট্রকে বদলাবে কে

    ভারত রাষ্ট্রের ভিত্তি মূলত হিন্দুত্ব। এটা বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়েরই অবস্থান; এটা তারা সঠিক মনে করেন, মেনে চলেন। বরং এর কোনো বিচ্যুতি ঘটছে মনে হলে একে অপরকে দোষারোপ করে। কেন করেন? কারণ তাদের মনে হয়, প্রায় ২৯টা ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন ধরনের ভিন্নতার মানুষের এত বিশাল জনসংখ্যার মানুষকে কী দিয়ে একত্রে ধরে রাখা হবে বা যাবে? তবে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা ও বাছবিচার ছাড়াই তাদের ধারণা ‘হিন্দুত্ব’ – এটাই সেই সুপার গ্লু যা তাদের সব আশঙ্কার সমাধান।

    আসলেই কী রাষ্ট্র গঠন করতে গেলে এমন একটা সুপার গ্লু – হিন্দুত্ত্বের বা কমন ধর্মীয়  ভিত্তি অথবা কমন ভাষার ভিত্তি  ইত্যাদি একটা না একটা ‘আইডেনটিটি’ এরকম একটা কিছু লাগেই? এমন ভাবনা থেকেই দুনিয়াতে আইডেনটিটির রাজনীতি শুরু হয়ে আছে। । ‘আইডেনটিটির রাজনীতি’ ছাড়া কী রাষ্ট্রগঠন অসম্ভব?  আমরা নিশ্চিত রাষ্ট্রচিন্তায় এদিকটা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করা হয় নাই। অথচ আবার এই হিন্দুত্ত্বের ভিত্তির ভারত রাষ্ট্রের মূল কারিগর কংগ্রেস ও অন্যান্য ‘প্রগতিশীলদের’ চোখে পাকিস্তান – ইসলামের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠন করে খুব খারাপ কাজ করেছে বলে তাদের অভিযোগ। অথচ সারকথা করে বললে, বাংলা ভাষার ভিত্তিতে আইন্ডেন্টিটি পলিটিক্সের উপর রাষ্ট্র গড়ে তুললে সেটা ভাল বা আদর্শ, ধর্মের (হিন্দুত্ত্ব বা মুসলমানিত্বের ভিত্তিতে আইন্ডেন্টিটি পলিটিক্সের উপর রাষ্ট্র গড়ে তুললে সেটা খুব খারাপ বা অগ্রহণযোগ্য এটা বলা বা ভাববার সুযোগ নাই।

    সে যাক, ভারতের প্রধান দুই সর্বভারতীয় দল দল কংগ্রেস ও বিজেপি এরা এ জায়গায় ঐকমত্য। অন্যদের মধ্যে ‘বাস্তববাদীতার দোহাই দেয়া’ সিপিএম সেও ঐ দুই দলের মতো করে ভাবে ও মান্য করে যে ধন্বন্তরি ওষুধ বা সুপার গ্লু-এর নাম হিন্দুত্ব। কিন্তু কোনো দল প্রকাশ্যে মানে ফরমালি তা স্বীকার করে না। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে বলে, স্বীকার করে যুক্তি দেয়। তবে বলা না বলা, সেটাঅন্য জিনিস। ফলে এখান থেকেই আরো দুই খান কথা বলে তাদের বিভক্তি শুরু হতে দেখি আমরা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ভিত্তি হিন্দুত্ব- কংগ্রেস ও বিজেপির এ ব্যাপারে একমত হয়ে এটা মেনে নেয়ার পরও প্রত্যক্ষভাবে হিন্দুত্ব ভিত্তির ভারত রাষ্ট্রের কথা বাইরে প্রকাশ বা স্বীকার করা ঠিক হবে কি না- এই প্রশ্নে কংগ্রেস ও বিজেপির ভিন্নতা শুরু। কংগ্রেস মনে করে, কৌশলী হওয়ার দরকার আছে। কথাটা সেকুলারিজমের ভেক ধরে বলতে হবে। বুঝতে বুঝাতে হবে হিন্দুত্ব কিন্তু মুখে বলতে হবে ‘সেকুলারিজম’। উপরে সেকুলারিজমের জামা গায়ে দিয়ে এর আড়ালে বসে মুখে সেকুলারিজম বললে হিন্দুত্বের এফেক্ট পাওয়া যাবে, আনা যাবে। এই হল কৌশল। এর বিপরীতে বিজেপি মনে করে, সেকুলারিজম- এটার আবার কী দরকার? হিন্দুত্বকে রাষ্ট্রভিত্তি হিসেবে মানতে পারলে বলতে পারব না কেন? বরং ‘বোকা’ হয়ে লাভ নেই। হিন্দুত্বের গর্বকে বুক উঁচা করে সামনে আনলে এই ‘আইডেন্টিটির রাজনীতি’ কংগ্রেসের ওপরে তাদেরকে একটা বাড়তি মাইলেজ দিবে। কারণ হিন্দু কনস্টিটুয়েন্সিতে এটা খুবই ফলদায়কভাবে মানুষের মনে সুড়সুড়ি লাগানোর ক্ষমতা রাখে। ভারতের সেকুলারিজম সত্যিই এমন এক তামাশার নাম।

    ২০১৪ সালের নির্বাচনে মোদির বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপির মূল দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের (আরএসএস)  গৃহীত ও নির্ধারিত এক কর্মসূচি ‘ঘর ওয়াপসি’ চালু করেছে। এমন কর্মসূচির পক্ষে লজিকটি হল, ভারতে হিন্দু ছাড়া অন্য ধর্মের যারাই আছে, তারা কোনো না কোনো সময়ে হিন্দু থেকেই ধর্মান্তরিত। অতএব, এই যুক্তিতে আরএসএস-বিজেপি তাদের ‘ওয়াপাস’- মানে ফিরিয়ে আনার প্রচার-প্রপাগান্ডার কর্মসূচি নিতে পারে, ফোর্স করতে পারে, বিজেপি সরকারের প্রটেকশনের আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের হয়রানি করতে পারে, পাবলিক নুইসেন্স করতে পারে, সব পারে। আর এতে এক কামে সব কাম হবে। হিন্দুত্বের জয়জয়কার হবে, ভোটের বাক্সও ভরে উঠবে। বাড়তি লাভ হল কংগ্রেসও ভয়ে সিটিয়ে কেঁচো হয়ে থাকবে। কারণ এতে কংগ্রেসকে বিজেপি খুব সহজে উভয় সঙ্কটের ক্যাচালে ফেলতে পেরেছে। কংগ্রেস ভেবে ভীত যে, ‘ঘর ওয়াপসির’ বিরোধিতা করতে গেলে কংগ্রেসঈ হিন্দুরা হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সির প্রভাবে বিগড়ে গিয়ে যদি কংগ্রেসকে ভোট না দেয়! এই ভয়ে কিছু না বলে দলটি চুপ থাকে।
    আসলে বিজেপি এ জায়গায় স্মার্ট ও ‘সৎ’। সে হিন্দুত্বের রাষ্ট্র চায়, হিন্দুত্বের রাজনীতি করে এবং প্রকাশ্যে তা বলেও। আর স্মার্ট এ জন্য যে, সে বুঝে গেছে কংগ্রেসকে এভাবে উভয় সঙ্কটে ফেলে জব্দ করা সহজ। এর পরও মূল বিষয় এখানে কন্সটিটুয়েন্সি। কন্সটিটুয়েন্সি মানে- ভোটারদের ক্যাটেগরি বা গ্রুপ অথবা ভোটার এলাকা; যারা কোন কথা, কোন দাবি অথবা কোন ইস্যুর পক্ষের ভোটার- এক কথায় কোন ক্যাটেগরির ভোটদাতা, কোন ভোটারদের গ্রুপে একে ফেলা যায় এই অর্থে ‘ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি’। আগেই বলেছি- কংগ্রেস ও বিজেপি উভয়েই একমত যে, হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারত রাষ্ট্র থাকুক এবং থাকতেই হবে। এর পক্ষে তাদের কমন যুক্তি হল, এটা না হলে ভারতকে এক রাখা, একভাবে ধরে রাখার আর কোনো উপাদান বা আঠা-গ্লু নেই। কারণ রাষ্ট্র বলতে তারা একমাত্র এই আইডেন্টিটি-ভিত্তিক রাষ্ট্রই কল্পনা করতে সক্ষম। অন্য কোনো রাষ্ট্র হওয়া আদৌ সম্ভব কি না নেহরুর জমানা থেকেই এই পর্যন্ত এটা নিয়ে তাদের হোমওয়ার্ক বা পড়াশোনা আছে বলে জানা যায় না। এর বাইরে তাদের কল্পনা আগায় না, ভোঁতা করে রেখে দেয়া থাকে, তাই কাজ করে না। বরং আইডেন্টিটি-ভিত্তিক হিন্দুত্ব চিন্তার সুড়সুড়ি জাগানোর ক্ষমতা সীমাহীন। তাই সেটার প্রতি লোভে সবার চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। সারকথা দাঁড়াল ওপরের সেকুলার পর্দা সরিয়ে ফেললে কংগ্রেস ও বিজেপির ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি আসলে একই। আর এটাই হল সমস্যার গোড়া। কেন? কোন রাজ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে অথবা সাধারণভাবে বিজেপি যখন ‘ঘর ওয়াপসি’ ধরনের কর্মসূচি চালাতে নেমে পড়ে তখন কংগ্রেস এর কোনো বিরোধিতা করতে পারে না। কারণ ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচি তো ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণার’ সাথে সামঞ্জস্যের দিক থেকে সবচেয়ে পারফেক্ট। আসলে কংগ্রেস মনে করেছিল বা বলা ভাল, নিজের সেকুলারিজম স্ট্রাটেজিতে নিজেকে সাজিয়েছিল এই মনে করে যে, যেকোনো হিন্দু বিশেষত শিক্ষিত হিন্দু বুঝবে তার হিন্দুত্ব সেকুলারিজমের মোড়কে ‘ব্রান্ড করে’ প্রকাশ করাই সবচেয়ে লাভের। কারণ এতে সরাসরি হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিকে তো পাওয়াই যাবে। সেই সাথে সেকুলারিজমের জামা পরা ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি আর অহিন্দু (মুসলমান বা ক্রিশ্চানসহ সবটা) ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিকেও কাভার করা যাবে- কংগ্রেস অনেক আগে থেকেই এসব অনুমানের ওপর সাজানো দল। কিন্তু বিজেপির ঘর ‘ওয়াপসি কর্মসূচি’র সামনে কিছু বলতে না পারায়, মুখ বন্ধ রাখতে হওয়ায় কংগ্রেসের কাম্য, তিন ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিই কংগ্রেসের ওপর বেজার হচ্ছে। তারা কংগ্রেসকে অকেজো মনে করছে। কারণ এই তিনের প্রথমটা, সরাসরি হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি- এরা মনে করে কংগ্রেসের তুলনায় বিজেপিই ভালো ও সঠিক। সেকুলারিজমের জামা পরা ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিতে যারা পড়ে, এদের মধ্যে পশ্চিমা জীবনকে আদর্শ মানা আধুনিক ভোটাররা এমনিতেই গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, এরা নিজের ‘ক্লাস সচেতনতার’ কারণেও নিজেই আলাদা ও বিশেষ হয়ে থাকতে চায়। এরা ঘর ‘ওয়াপসি’র মতো কর্মসূচির সামনে নিজেই অসহায় মার্জিনালাইজড বোধ করে। আর তৃতীয়, অহিন্দু (মুসলমান বা ক্রিশ্চানসহ সবটা) ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি- ঘর ওয়াপসি দেখে এরা হতাশ হয়ে কংগ্রেসকেই অভিশাপ দিতে থাকে যে, কংগ্রেস ‘সেকুলারিজমে’ সিরিয়াস না। এবার  গত মে মাসে সদ্যসমাপ্ত আসামের নির্বাচনের এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, হিন্দুত্বের ভোটাররা কংগ্রেস ছেড়ে কিভাবে বিজেপিমুখী হয়েছে।
    তবে এর ব্যতিক্রম কী হতে পারে তা বোঝার জন্য কাছাকাছি সবচেয়ে ভালো উদাহরণ সম্ভবত মমতা বা তাঁর তৃণমূল কংগ্রেস। বিশেষত ঐ একই সময় গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নির্বাচনে তাঁর দলের বিশাল বিজয়ের পরিপ্রেক্ষিতে। যদি খোজ করা হয় যে, ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণা’র প্রশ্নে মমতার অবস্থান কী? মমতা তত্ত্ব জানেন না, তত্ত্ব করেন না, তত্ত্বের বড়াইও তাঁর নেই। মমতাকে সম্ভবত মাঠ অথবা  ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট’ দেখার ভিত্তিতে চলা পপুলার রাজনীতিক বলা সঠিক হবে। ফলে তাকে বুঝতে হবে তার বাস্তব তৎপরতা দিয়ে। প্রথমত, তিনিই দেখালেন সেকুলারিজম নামের ছলনা না করেও প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিরও নেতা হওয়া সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গে মোট মুসলমান ভোটার মোট ভোটারের প্রায় ৩০%। ৩-৪% বাদ এরা সবাই আজ মমতার পিছনে। এমনকি মুসলীম লীগ অথবা সিপিএমে যারা মুসলমান নেতা ছিলেন তাঁরা গত নির্বাচনে মমতার দলের টিকিটে ভোটে দাড়িয়েছেন এবং জিতেছেন। তবু মমতা আজ পর্যন্ত কোথাও বলেননি যা তিনি করছেন তিনি সেটাকে সেকুলারিজম নাম দেয়ার কোনো ইচ্ছা করেন অথবা একাজকে সেকুলার বলে ডাকার দরকার আছে। গত রাজ্য নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের দিন নিজ দল আবার বিজয়ী হয়েছে জানার পরে মিডিয়া মন্তব্যের কোথাও এই বিজয়কে তিনি সেকুলারিজমের জয় বলার দরকার মনে করেননি। বরং বলেছেন, বিজেপি হিন্দুত্বের কথা তুলে সব কিছুকে ভাগ-বিভক্ত করে এটা তার অপছন্দ। আবার বিগত ২০১৪ সালে বর্ধমানে কথিত জঙ্গি বোমা ইস্যুতে মুসলমানবিদ্বেষী ও তৃণমূল বিরোধী যে মিথ্যা জঙ্গী-আবহাওয়া তৈরি করা হয়েছিল, বিজেপির অমিত শাহ তা করেছিলেন আর লজ্জার মাথা খেয়ে কংগ্রেস ও সিপিএম এতে তাল দিয়ে নিজের রুটি সেঁকার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় লাভ করেও ফলাফল প্রকাশের দিন তবুও তৃণমূল দল অথবা পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি সংযত আচরণ করেছে। বলেনি যে, মুসলমানেরা ‘এবার দেখিয়ে দিয়েছে’। ‘বর্ধমান ঘটনার প্রতিশোধ নিয়েছে’- এ ধরনের কোন ইঙ্গিতও প্রকাশ করেনি। মমতার দল ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতি বছর ২১ জুলাই দলের ১২ কর্মী হত্যার বিরুদ্ধে ‘শহীদ দিবস’ পালন করে থাকে। এবারের ২১ জুলাই দলীয় কর্মসূচিতে জনসভায় দেয়া মমতার বক্তৃতাকে মিডিয়া শিরোনাম দিয়েছিল, ‘ছাগল মুরগি খেলে দোষ নেই। গরু খেলেই দোষ!”। ” কেউ নিরামিষ খান। তাই বলে যারা আমিষ খান, তাদের আক্রমণ করবেন?”। ” শাড়ি-ধুতিতে দোষ নেই। যত অপরাধ সালোয়ার-কামিজ আর লুঙ্গিতে?” এ ছাড়া নাম না ধরেই বিজেপির বিশেষায়িত দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক দলের (আরএসএস) সম্পর্কেও কথা বলেন মমতা। তিনি বলেন, ‘ভারতবাসী কী পরবে, কী খাবে- সেগুলো ঠিক করে দেবে একদল লোক?”। এসব বক্তব্যের ভেতর দিয়ে ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণা’র বিরুদ্ধে মমতার আপত্তি বুঝে নেয়া যায়। তবে এটা মমতাকে আদর্শ বলে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে এমন মনে করলে ভুল হবে। মমতার রাজনৈতিক ঝোঁকের ভেতরে ‘রাষ্ট্র হিন্দুত্বের ভিত্তিতে হতে হবে’ এমন চিন্তার বাইরে থাকার চেষ্টা আছে। এতটুকুই বলা হচ্ছে। তবে তা শেষে কোথায় যাবে তা এখনই বলতে চাওয়া ভুল হবে।
    ইতোমধ্যে মোদির বিজেপি ‘ঘর ওয়াপাসির’ পরে – গরু খাওয়া, জবাই ইত্যাদি নিয়ে আরেক তুলকালাম ‘গোরক্ষা কর্মসূচি’ চালিয়ে যাচ্ছিল। এখনও পর্যন্ত গরু খাওয়া, জবাই করা যাবে না – এটা কেন্দ্র বা মোদি সরকারের কোনো আইন নয়। কেবল মহারাষ্ট্রসহ আরো কিছু রাজ্যের আইনে তা সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ এটা স্থানীয় আইন; বাকি আর রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য তা পালনীয় নয়। কিন্তু মোদি সরকার বা খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ব্যাপারে সক্রিয় হয়েছে। আমাদের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে তিনি বিএসএফকে ‘গোরক্ষার’ পক্ষে উদ্বুদ্ধ করে গেছেন। যেসব রাজ্যে গোরক্ষার এমন আইন নেই, সেখানেও তা ঠেকাতে বিজেপি কর্মীরা মাঠে ‘গোরক্ষক’ সেজে নেমে জনগণকে নাজেহাল করছে। মধ্যপ্রদেশে দুই মহিলাকে তারা মাংস বহন করছিলেন এই অজুহাতে পুলিশের সামনেই তাদেরকে নির্যাতন-নাজেহাল করেছে। দিল্লির শহরতলির ভেতর চলাচলকারী ট্রেনে এমনকি ডিম – তা হাতে নিয়ে কোনো যাত্রী তা বহন করতে পারবেন কি না এটাও এখন ট্রেন কোম্পানি ও পুলিশের কাছে ইস্যু। তারা নজরদরি বসিয়েছে। অথচ ভারতের কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশন, নির্বাচন কমিশন অথবা উচ্চ আদালতে এসব হিন্দুত্বের দলের বিরুদ্ধে তাদের সেক্টোরিয়ান আচরণ এবং সম্প্রদায়গত বিভেদ বিদ্বেষ ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে েকশন নিবার সুযোগ আছে তা করছে না, কেউ সেখানে অভিযোগ করারও সাহস দেখাচ্ছে না। মানে হিন্দুত্বভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র এতই সেকুলার যে, অভিযোগ করার কাউকে আমরা দেখি না। উলটা দিকে বিজেপিকে থামানোর কেউ নেই। এটা প্রমাণ করে ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তি কত বেপরোয়া ও ডমিনেটিং। তাহলে?

    হঠাৎ গত ৬ আগস্ট থেকে কিছু উল্টা হাওয়া বইতে দেখা গেছে। খোদ নরেন্দ্র মোদি এ দিন নিজেই নিজের দলীয় ‘গোরক্ষকের’ বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাদেরকে ‘সমাজবিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘এরা বেআইনি কাজকারবারে জড়িত!’ “নিজেদের ‘কালো ধান্ধা’ ধামাচাপা দিতেই গোরক্ষকের মুখোশ পরে নতুন ব্যবসা শুরু করেছে।” মোদির কথায়, ‘এসব দেখে আমার প্রচণ্ড রাগ হয়।’ — অবাক করা হঠাৎ এই গেম চেঞ্জ? এটা কেন? ভারতের মিডিয়া আসন্ন উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনকে এর পেছনের কারণ বলে ব্যাখ্যা করছে। ওখানে ভারতের প্রকট জাতবর্ণের বিভক্তিতে ডুবে থাকা সমাজের দলিত- চর্মকার, ঋষি, কসাই, মাংস ব্যবসায়ী, গরু ব্যবসায়ী ইত্যাদিরা হল উত্তর প্রদেশের এক বড় সমাজ; আসন্ন ভোটে তাদের মন পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এদের ভোট ছাড়া নির্বাচন বৈতরণী পার হওয়া যাবে না টের পেয়েই নাকি মোদীর এমন হার্ট বদল। উত্তর প্রদেশ রাজ্যের জনবিন্যাস ও গঠনপ্রকৃতির দিক থেকে (জাতপাতের ধরনসহ) সাথে লাগোয়া বিহার রাজ্যের অনেক মিল। আর গত বছরের শেষে নভেম্বর ২০১৫, বিহারের নির্বাচনের সময়ও একই ভাবে ‘গোরক্ষা’ ইস্যু বিজেপি তুলেছিল ও চলছিল। কিন্তু ওই নির্বাচনে বিজেপির শোচনীয় পরাজয় ঘটে। বিগত ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় ধসের পরাজয় সেটা। ফলে সেই  আশঙ্কা মোদিকে স্পর্শ করেছে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই নির্বাচনে ভোট-রাজনীতিতে ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তিকে স্থায়ীভাবে না হলেও সাময়িকভা্েব দুর্বল কতে নির্বাচন করতে চাইছে বিজেপি। তবে আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে বিজেপির হার-জিত ভারতে বিজেপি শাসনের ভবিষ্যৎ নির্ধারক উপাদান হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকেই বলছেন, উত্তর প্রদেশের হার মোদির সরকারের আগামীতে ২০১৯ সালে পরেরবার সরকারে না আসার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    Goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখা এর আগে গত ১৪ আগষ্ট ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (১৫ আগষ্ট প্রিন্টে) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও পরিবর্তন সংযোজন ও এডিট করে আবার ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

  • শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা

    শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা
    গৌতম দাস
    ১৮  জুন ২০১৬

    শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা

     

    ‘শাঙ্গরি-লা ডায়লগ’ বা Shangri-La Dialogue। এটা প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় এমন একটি নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলনের নাম। পুরা নাম IISS Shangri-La Dialogue। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রায়.৫০ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক প্রধানদের নিয়ে সিঙ্গাপুরে এর আয়োজন হয়। তাদের মধ্যে আমেরিকা, চীন, জাপান, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ইত্যাদি ছাড়াও এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্য অনেক রাষ্ট্রও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। শাঙ্গরি-লা নামটা মূলত ইন্ট্যারনাশনাল এক চেইন হোটেল গ্রুপের। আর ওদিকে আইআইএসএস- ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। এটা ইংল্যান্ড ভিত্তিক এক থিঙ্কটাংক বা গবেষণা স্টাডি ধরনের প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ আইআইএসএস ও সিঙ্গাপুর সাংরিলা হোটেলের যৌথ উদ্যোগে ২০০২ সালে জন্মের পর থেকে সিঙ্গাপুরের শাঙ্গরি-লা হোটেলে প্রতি বছর এই নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন হয়ে থাকে। আর শাঙ্গরি-লা হোটেলে নাম থেকে শাঙ্গরি-লা শব্দটা ধার নিয়ে এই সম্মেলনের নামকরণ করা হয়েছে ‘শাঙ্গরি-লা ডায়লগ’। সে হিসাবে একইভাবে এবারের সম্মেলন শুরু হয়েছিল ৩ জুন ২০১৬ থেকে। চলেছিল রোববার ৫ জুন পর্যন্ত।

    হংকংয়ের সবচেয়ে পুরানা এক দৈনিক পত্রিকা হল, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। শাঙ্গরি-লা ডায়লগ প্রসঙ্গে তারা বিরাট রিপোর্ট ছেপেছে। যার মূল বক্তব্য হল, সম্মেলনের এবারেরও ফোকাস আবার সেই দক্ষিণ চীন সাগর। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে চীন ও আমেরিকা উভয়পক্ষ চাচ্ছে কোনো রেটরিক বা উচ্চবাচ্য থেকে যেন উত্তেজনা না ছড়িয়ে যায়। উভয় পক্ষ কোনোভাবেই চায় না যে সমুদ্রসীমা বিতর্ক চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে অচল ও তেতো বানিয়ে ফেলে।
    যেমন ওয়াশিংটনভিত্তিক এক থিঙ্কট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারনাশনাল স্ট্রাডিজ’-এর ড. বন্নি গ্লসার মনে করেন দক্ষিণ চীন সাগর সমুদ্রসীমা বিতর্ক ইস্যুতে চীন ও আমেরিকা প্রত্যেকেই নিজ অবস্থানে শক্ত হয়ে দাঁড়াবেন। কিন্তু কোনোভাবেই তারা উভয়েই এই মিটিংকে তাদের বিরোধ প্রকাশ বা প্রদর্শনের জায়গা বানাবেন না। গ্লসার বলছেন, “এ কথা সত্যি যে দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে আমাদের মৌলিক কিছু স্বার্থ সঙ্ঘাত আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনোভাবেই শাঙ্গরি-লা ডায়লগ আমাদের বিরোধে কোনো ফয়সালা আনার স্থান নয়”।
    ঐ রিপোর্ট লিখছে, “আমেরিকা চায় এই অঞ্চল শান্তি, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে তাকে বিবেচনা করুক ও তার ওপর আস্থা রাখুক। কিন্তু একইসাথে এ অঞ্চল চীন-আমেরিকার সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রভূমি হয়ে উঠুক এটাও চায় না। এটা আমেরিকা বুঝে। তাই শাঙ্গরি-লা ডায়লগে আমেরিকার প্রচেষ্টা থাকার কথা এ দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা”। একারণে আমরা দেখছি এই রিপোর্টের শুরুতে উপরে উধৃত এই লম্বা বাক্যটা আছে। কিন্তু তাতে একটা ছোট শব্দ আছে বাংলায় বললে তা হলো ‘আগলে ধরে রাখা’ বা ইংরাজিতে contain। বলা হচ্ছে চীন ও আমেরিকা দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে উত্থিত যেকোনো টেনশন আগলে ধরে রাখার পক্ষে পদক্ষেপ নিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে একমত হয়েছে।

    ঐ রিপোর্ট সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও চীন-আমেরিকার সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হুয়াঙ জিং কে উদ্ধৃত করেছে। তিনি বলছেন, “চীন-আমেরিকার বিরোধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে, এটা দাঁড়িয়ে দেখা উভয়ের কারও স্বার্থের পক্ষে যায় না”। হুয়াঙ শাঙ্গরি-লা ডায়লগের অর্গানাইজিং কমিটির একজন সদস্যও। তিনি ভিতরের তথ্য জানাচ্ছেন, “আসলে দক্ষিণ চীন সাগর টেনশনের ইস্যু সম্মেলনের তিন দিনের পাঁচ সেশনে কখনই আনা হবে না। এর বদলে বরং শেষের দুই দিনের অনুষ্ঠিতব্য যে ছয়টা সাইড মিটিং হওয়ার কথা তার কোন একটাতে এনিয়ে কথা হবে”। অর্থাৎ মূল আলোচনায় নয় পার্শ্ব-আলোচনার বিষয় হিসেবে সাউথ চায়না সি বিতর্ক রাখা হয়েছে। হুয়াঙ বলছেন, “চীন ও আমেরিকা উভয়েই চায় তাদের অবস্থানের মতভেদকে নিচুস্বরে নামিয়ে রাখতে এবং শাঙ্গরি-লা ডায়লগের হোস্ট সিঙ্গাপুরও চায় না যে তার আয়োজিত এই সভা দক্ষিণ চীন সাগরে ইস্যুর ভেতরে হাইজাক হয়ে যাক”। অবশ্য এখানে আর এক মজার তথ্য তিনি শেয়ার করেছেন। হুয়াঙ জিং বলছেন, দিনকে দিন নিজের দাবিনামা নিয়ে চীন যেভাবে সরব অগ্রসর হচ্ছে তাতে সেটাকে আমেরিকা কী করে মোকাবেলা করবে, মুখোমুখি হবে – এ প্রশ্নে আসলে খোদ আমেরিকাতেই ‘হোয়াইট হাউজ বনাম পেন্টাগনের’ মধ্যে বিতর্ক ও মতভেদ আছে। তবে সেই বিতর্ক ও মতভেদ থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কোনোভাবেই চীন-আমেরিকার পরস্পরের দিকে থুথু ছিটিয়ে ঝগড়া করুক তা হতে দেবেন না। কারণ আগামী সপ্তাহ থেকে চীন-আমেরিকার মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক “স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক ডায়লগ” অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটা উভয় রাষ্ট্রের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর সমন্বয়ের লক্ষ্যে প্রতিবছর নিয়মিত হয়ে আসছে। সেটার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাক ওবামা তা হতে দিতে পারেন না।
    তাই হুয়াঙ ও গ্লসার উভয়েই নিশ্চিত করে বলছেন, শাঙ্গরি-লা ডায়লগ অনুষ্ঠানে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী এস্টন কার্টার যে নির্ধারিত বক্তৃতা রাখার কথা আছে সেখানেও এস্টনের স্বভাবসুলভ গরম বক্তব্যও নিচুস্বরে হাজির করা হবে। যেমন এস্টন কার্টার এর আগে – চীন তার দাবির পক্ষে জোরাজুরি করতে গিয়ে ‘বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার এক গ্রেট ওয়াল’ রিস্ক নিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। চীন এই শাঙ্গরি-লা মিটিংয়ে কোন মন্ত্রী নয় বরং এক সামরিক কর্তা এডমিরাল সান জিয়াঙগুয়ের নেতৃত্বে যোগ দিয়েছে। ফলে এমন প্রশ্নের জবাবে, এডমিরাল সান সম্ভবত নিজেদের পুরানা অবস্থানই রক্ষা করে চলবেন। এসব দিক বিবেচনা করে গ্লসার বলছেন, ‘আমি মনে করি না যে, চীনা পক্ষের আগামীকালের বক্তৃতায় আমরা নতুন কোন কথা শুনব’। এই “সাংরিলা মঞ্চ নিজের পার্থক্য নিয়ে কথা বলার একটা খুবই ভালো জায়গা, কিন্তু আসলে একটা ভারসাম্য অবস্থা বের করে আনার পক্ষেই আমাদের কাজ। সে জন্য আমি মনে করি না যে এই সভা থেকে কোনো শক্ত কথার মার বা ধারালো রেটরিক কিছুই শুরু হবে না। বিশেষত যখন চীন-আমেরিকার মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক ‘স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক ডায়লগ’ অনুষ্ঠান যখন পরের সপ্তাহে”।
    এমন ঠাণ্ডা বাতাবরণ যে ইতোমধ্যে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এর আর এক লক্ষণ হল, ভিয়েতনামের ততপরতা। দক্ষিণ চীন সাগর সমুদ্রসীমা বিতর্কে চীনের সাথে একমাত্র ভিয়েতনামের সম্ভবত সবচেয়ে তিক্ত সম্পর্কটা হয়ে গেছে। সেই ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির নৌবহরকে ভিয়েতনামের কোনো এক পোর্টে নোঙর করে অতিথির বেড়ানো বেড়িয়ে যেতে দাওয়াত দিয়েছে। ভিয়েতনামের প্রতিরক্ষা দফতরের মুখপাত্র সুত্রে এটা জানা গেছে।
    সাউথ চাইনা মর্নিং পোষ্ট এই রিপোর্টের শেষে কিছু ছোট মজার মন্তব্য করেছে। যেমন ওই রিপোর্টে তথ্য দিয়ে বলেছে, “ভিয়েতনাম চীনা নৌবহরকে দাওয়াত দিয়েছে এমন সময় যখন ভারতের দুইটা যুদ্ধজাহাজ ভিয়েতনামের ‘ক্যাম রণ বে’ বন্দর গত বৃহস্পতিবার ত্যাগ করে গেছে। এ ছাড়া পোস্টের আর একটা মন্তব্য বাক্য, ‘দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে কিন্তু আমেরিকার মত ভারতেও কোনো দাবি বা স্টেক নেই; ফলে বিরোধ-বিবাদের সে কোনো পক্ষও নয়’।
    পোষ্টের এই মন্তব্যে অনেক কথা লুকানো আছে। সময়ের অভাবে সব এখানে আনার সম্ভব হবে না। শুধু ভিয়েতনাম চীনা নৌবহরকে দাওয়াতের এক ঘটনাই আবহাওয়া সম্পর্কে অনেক কিছুর নির্দেশক। অর্থাৎ গুমট পরিস্থিতির ভেতরে কোথাও থেকে একটা ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। না হলে এটা দাওয়াতপত্র পর্যন্ত গিয়েছে তা হতো না।
    তবে এখানে আমরা গত বছরের শাঙ্গরি-লা ডায়লগের কথা স্মরণ করতে পারি। সে সময়কাল প্রায় একই ছিল, ২৯-৩১ মে ২০১৫ সাল। ইস্যুও প্রায় একই। দক্ষিণ চীন সাগরের পূর্ব দিক পূর্ব চীন সাগর চীন সীমান্তের যার অপর পাড়েই জাপান। পূর্ব চীন সাগর  নিয়ে চীন ও জাপানের সমুদ্র সীমা বিতর্ক আছে। আমেরিকার উস্কানিতে জাপান  গতবার পূর্ব চীন সাগর ইস্যুকে তেতে উঠেছিল।  গত বছরের প্রথম থেকেই এই ইস্যু নিয়ে চীন-জাপানের বিরোধ বিবাদকে তাতিয়ে তুলে চলছিল আমেরিকা । কিন্তু এবারের মত একইভাবে গতবারও আমেরিকা জাপানকে গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নেয়ার অবস্থা করেছিল। বছরের শুরু থেকেই জাপানকে দিয়ে চীনের সাথে  ঝগড়ার মুখোমুখি করিয়ে যেন এখনই যুদ্ধ লেগে যাচ্ছে এমন এক অবস্থায় এনে শেষে শাঙ্গরি-লা ডায়লগে যখন উভয়ের মুখোমুখি হয়ে গেল তখন এখানে এসে পূর্ব চীন সাগর ইস্যুতে আমেরিকার পুরা উল্টো অবস্থান। ভোল পালটে মিটিংয়ে আমেরিকানরা এবার জাপানিজদের খালি জামা টেনে ধরা শুরু করেছিল। কি জানি যদি জাপানিজরা চীনাদের সাথে যদি ঝগড়া বাধিয়েই ফেলে তবে সেটা তো আমেরিকাকেও জাপানের সাথে মিলে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে যাওয়ার অবস্থায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে। আর পৌঁছালে তখন কী হবে? এই আসল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল আমেরিকা। অর্থাত এশিয়ায় আমেরিকার এই নীতির মূল কথা হলো যেন, কোন রাষ্ট্র বিরোধ ও স্বার্থসঙ্ঘাত দেখা দিলেই সেটাকে যুদ্ধের দিকে নিতে হবে, ঠেলে দিতে হবে। অথচ এটা তো কোনো কাজের কথা নয়। একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এমন নীতি বাস্তবায়ন অসম্ভব বলে একেবারে না করে দেয়া যাবে না। তবে এটা খুবই এক্সষ্ট্রীম পথ, সর্বশেষ অবলম্বন; সব পথ ফেল করার পর যা করা হয়। তাই গতবারের সাংরিলার পর আজ পর্যন্ত আমরা দেখছি খোদ জাপানসহ সবাই যেন ভুলে গেছে যে পূর্ব চীন সাগরে দ্বীপের মালিকানা নিয়ে চীনের সাথে জাপানের কোন ইস্যু ছিল।
    পাঠক কেউ যেন বুঝতে ভুল না করেন। তাই কিছু কথা পরিস্কার করে বলে রাখা ভাল। তা হল, এখানে উপস্থাপিত বক্তব্যে এটা বলা হচ্ছে না যে চীন এক মহাপরাক্রমশালী হয়ে গেছে ফলে জাপান ভিয়েতনাম ইত্যাদিরা যেন চীনকে ‘লাড়তে’ না যায়! এমন ওকালতি আমরা এখানে করতে বসিনি। চীনের পক্ষে এমন খেয়ে না খেয়ে এজেন্ট বা চীনের বিদেশনীতির ব্যাগ বহনকারী দালাল সাজার আগ্রহ আমাদের নেই। এর কোনো অর্থও হয় না।
    বিষয়টা হল, যুদ্ধ সম্পর্ক আমাদের দেখা বা জানা পুরানা ইতিহাসের অভিজ্ঞতার ভিতর ইতোমধ্যে এক ব্যাপক বদল ঘটে গেছে। বিশেষ করে এই সদ্য পেছনে ফেলা কোল্ড ওয়ারের কালের (১৯৫০-৯২) যুদ্ধ ধারণা। ঐ সময়ের যেকোনো দুই রাষ্ট্রের বিরোধ মানেই শেষ বিচারে আসলে তা সোভিয়েত-আমেরিকান মতাদর্শিক, রাজনীতি বা অর্থনৈতিকসহ সবকিছুতে স্বার্থবিরোধ সঙ্ঘাত। কিন্তু তবু কেবল একটা বিষয় ছাড়া সেসব বিরোধের অন্য সব দিক প্রায় সবই এখনকার মতোই । সে অমিলের দিকে সবার মনোযোগ দিতে বলব। কোল্ড ওয়ারের ওই সময়কালে যেকোনো সঙ্ঘাতের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল সেই স্বার্থবিরোধে সোভিয়েত অথবা আমেরিকা পরস্পর পরস্পরকে যুদ্ধের মাঠেই একমাত্র ফয়সালা করবে এভাবে ঠেলে দিতে পারত, সম্ভব ছিল। অর্থাৎ শত্রু মানেই নির্মূল। যেন একই কথা। নির্মুল ছাড়া শত্রু মোকাবিলা বলে আর কিছুই হতে পারেনা, এমন ধরেই নেয়া হত।  এটাই ছিল একমাত্র পথ ও লক্ষ্য। এর মাধ্যমেই যেকোনো বিরোধের মীমাংসা করতে হবে এটা সহজেই ভাবা যেত। কোনো স্বার্থবিরোধ দেখা দিলেই কূটনীতি বা ডায়লগের ন্যূনতম কথা বলার চেষ্টাও না করে তাকে শত্রু নিশ্চিহেৃর লাইনে ভাবা সম্ভব ছিল।
    এমন ভাবনার মূল কারণ, দুনিয়ায় তখন ছিল দুটো অর্থনীতি। যাদের মধ্যে আবার কোনো লেনদেন বিনিময় বলতে কিছু ছিল না, এমনিভাবে দুনিয়া দুই ধরণের অর্থনীতি ও পরস্পর সম্পর্কহীন হয়ে বিরাজ করত। কেউ কারও সাথে লেনদেন বিনিময়েওর সম্পর্কে নাই। কেবল দুইটা অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ নিজ নিজ ব্লকের ভিতর আলাদা আলাদা বিনিময় ব্যবস্থার এমন দুই জোটে বিভক্ত ছিল। ফলে একের বোমা হামলায় অপরের অর্থনীতি ও প্রাণসহ বৈষয়িক সব কিছু নিশ্চিহৃ হয়ে গেলেও তাতে বোমা আক্রমণকারীর কোনোই ক্ষতি ছিল না। যেমন, আমেরিকা পক্ষের কোনো পুঁজি পণ্য লেনদেন বিনিয়োগ অপর সোভিয়েত ইউনিয়নে কোথাও বি-নিয়োজিত ছিল না। ফলে সারা সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বংস হয়ে গেলেও তাতে এর লেনদেন বিনিয়োগ প্রভাব আমেরিকায় পড়বে না। রাশিয়ায় কোনো আমেরিকান বিনিয়োগকারীই ছিল না বলে আমেরিকারই ফেলা বোমায় কোনো আমেরিকান বিনিয়োগ নষ্ট হবে এমন কোনো সম্ভাবনা ছিল না। আর একালে ঠিক এর উলটা। দুটো অর্থনীতি বলতে দুনিয়ায় এখন কিছু নেই, বরং আছে একটাই, একই গ্লোবাল পুজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা। ফলে এখন চীনে আমেরিকা বোমা ফেললে তাতে অবশ্যই কোনো না কোন আমেরিকান বিনিয়োগ বা অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপরই সে বোমা পড়বে। একারণে রাষ্ট্র স্বার্থবিরোধে একমাত্র যুদ্ধই করতে হবে, যুদ্ধে ফয়সালা করতে হবে অথবা এটাই একমাত্র সমাধানের পথ একথা আর সত্য নয়, বাস্তবতাও নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের (১৯৯২) পরে অথবা কোল্ড ওয়ার যুগের সমাপ্তিতে এটাই আমাদের যুদ্ধ ও স্বার্থ ধারণায় ইতোমধ্যেই এক বিরাট পরিবর্তন এনে দিয়েছে। যদিও তা আমরা অনেকেই টের পাইনি অথবা কিছু হলেও অনেকেই পেয়েছেন।
    অথচ এই নতুন বাস্তবতাতেও সবাই আমাদের চোখে পট্টি পড়াতে চাচ্ছে। সবাই আমরা একালের স্বার্থ বিরোধকে সেকালে কোল্ড ওয়ার কালের চোখ দিয়ে দেখগাতে চাচ্ছে। পুরনো চশমায় যুদ্ধ পরিস্থিতি বুঝার কল্পনা করার চেষ্টা করছি। অথচ এটা ভুল, অবাস্তব। বরং এভাবে আমেরিকা যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে নিজের যুদ্ধ বা স্ট্রাটেজিক জোটের খোলে ছোটবড় দেশকে তুলে নিতে চাচ্ছে। আর বুঝে না বুঝে এতে তাল ধরেছে ভারত। চীনের সাথে যেন ভারতের যেন একটাই সম্ভাব্য সম্পর্ক  – যুদ্ধ। আমেরিকা প্রতিবারই সারাবছর চীনের বিরুদ্ধে সে এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর জন্য খুবই একটা দরকারি শক্তি এটা প্রমাণ করতে গরম অবস্থা তৈরি করে থাকে। কিন্তু শেষে শাঙ্গরি-লা সম্মেলন এলেই তাকে ক্ষেমা দিতে হয়। কারণ এটা ডায়লগের আসর। ডায়লগের আসরে হুমকি চলে না। আর যদি যুদ্ধ লেগে যায় সেটা হবে – দেশ ভিন্ন, কিন্তু  সেই ভিন দেশের কোন না কোন আমেরিকান বিনিয়োগ এর উপরে তাহলে আমেরিকাকেই বোমা মারার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমেরিকা জানে এটা এবসার্ড, এটা সে করতে পারে না। এখন কথা হল শাঙ্গরি-লা ডায়লগ এলেই সব ঠাণ্ডা পানি ঠেলে দেয়া হয় কেন? ঠাণ্ডা পানিই যদি বাস্তবতা হয় তবে ভুয়া গরম সৃষ্টি করা আমেরিকার ও তার সাগরেদদের দিক থেকে এক মারাত্মক দায়িত্বহীনতা। আর এমন সাগরেদ হয়ে ভারতের নিজ জনগণকে মিথ্যা বলছে, প্রতারণা করে চলছে – কোল্ড ওয়ার যুগের মত মিডিয়া গরম করে বলে যাচ্ছে – চীন এই নিয়ে গেল সেই নিয়ে গেল। চীন ভারতের সব উন্নতির পথে বাধা! অথচ কে না জানে এটা কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫০-১৯৯২) দুই অর্থনীতির সম্পর্কহীন  লেনদেন হীন সময় নয়। এখানে দুই রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধ প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বীতা সবই আছে।, আবার চীন-ভারতের ঘনিষ্ঠ  বছরে ৭৩ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন আছে। কারণ তারা একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অন্তর্গত একই অর্থনীতির দুই অংশ মাত্র। যে কারণে ঐ চীনকেই আবার মোদির “বিকাশের প্রোগ্রামের” ভারত , নিজেরর আগামির জন্য নতুন পাচ শহরের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব দিয়ে চুক্তি করেছে। আমরা নতুন ধরণে যুগে প্রবেশ করে গেছি। একে বুঝতে আমরা যেন অন্তত আশির দশকের কোল্ড ওয়ারের ধারণা ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করতে না যাই। কারণ ওটা অচল, আনফিট।
    লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে ০৬ জুন (প্রিন্টে ০৭ জুন) ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ওয়েবে প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তা আবার পরিবর্ধিত ও এডিট করে আবার ছাপা হল।]

  • পশ্চিমবঙ্গে কে ক্ষমতায় ফিরবে- তৃণমূল না বামফ্রন্ট

    পশ্চিমবঙ্গে কে ক্ষমতায় ফিরবে- তৃণমূল না বামফ্রন্ট
    গৌতম দাস
    ১৮  এপ্রিল ২০১৬,  সোমবার
    গৌতম দাস

    পশ্চিমবঙ্গে কে ক্ষমতায় ফিরবে- তৃণমূল না বামফ্রন্ট

    আবার এক ঝলকে ভারতের কিছু রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। ভারতের প্রাদেশিক সরকারের নির্বাচনকে রাজ্যের (রাজ্যসভা নয়) নির্বাচন বা বিধানসভা নির্বাচন বলা হয়।  আগামী ৪ এপ্রিল থেকে এই ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের চার রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এভাবে মোট পাঁচ বিধানসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নসীম জইদি জানিয়েছেন, আসামে ২ দফা এবং কেরালা, তামিলনাডু ও পণ্ডিচেরিতে এক দফা করে ভোট নেয়া হলেও পশ্চিমবঙ্গে তা নেয়া হবে ৬ দফায়। এমনকি দিনের হিসাবে সাত দফায় ভোট হবে পশ্চিমবঙ্গে। ফলে প্রায় এক মাস ধরে চলবে এই ভোট পর্ব। পশ্চিমবঙ্গে ২৯৪টি আসনে মোট ৭৭ হাজার ২৪৭টি ভোট গ্রহণ কেন্দ্রে ভোট নেয়া হবে। আর সব রাজ্যের সবখানে ভোট নেয়া শেষে আগামি মাসে একই দিন  ১৯ মে, পাঁচ রাজ্যের ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফায় সেই ভোট গ্রহণ করা হয়েছে বিগত ৪ এপ্রিল।

    কী করলে নির্বাচনে জেতা যাবে ভারতের রাজনৈতিক দলের আচরণ ও ততপরতার ভিত্তি সেটাই। এই বিচারে ভারতের রাজনীতি মূলত নির্বাচনকেন্দ্রিক। সত্য-মিথ্যা আধা সত্য ইত্যাদি মিলিয়ে যেটা বললে ভোটের বাক্স ভরে উঠবে তাই বলতে হবে, করতে হবে, এটাই হয়ে গেছে ভারতের রাজনীতি। এটাই ভারতের রাজনীতিক সব দলের পরিচালনের মৌলিক নীতি। এর বাইরে ভারতের রাজনৈতিক দল অন্য কোন নীতি-অবস্থান নাই। বাংলাদেশের দিক বিচারে, এবার একসাথে পাঁচ জায়গায় বিধান সভা নির্বাচন হলেও এর দুটা হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের সীমানার দুই প্রান্তে – আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে। তাই ঠিক ২০১৪ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনের মতো মোদি এবারো নির্বাচনী বক্তৃতা করতে এসে গেছেন। আর ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতোই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিষ উগড়ে দেয়া বক্তৃতা করছেন। এর প্রধান ইস্যু হল, বাংলাদেশ থেকে তথাকথিত অনুপ্রবেশ ইস্যু। বিশেষত আসামে এই ইস্যুর প্রপাগান্ডা, দামামা প্রবল। আবার মুখে বলে বাংলাদেশ থেকে আসা অনুপ্রবেশকারি কিন্তু ব্যাতিক্রমহীনভাবে বুঝানো হয় “মুসলমান”।  এ নিয়ে তাঁরা নিয়মিত কথা বলছেন, হুঁশিয়ারি ও হুঙ্কার দিচ্ছেন। এ ছাড়া তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং পুরো সীমান্ত সিল করে দেয়ার হুমকি ইতোমধ্যে দিয়েছেন। কিন্তু মজার কথা হল, সেই গত ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরের দু’বছর মোদি বা তার সরকার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশ নিয়ে আর কোন কথা বলেনি। ফলে অনেকে আশা করতে পারেন যে, এবারও বিধানসভার নির্বাচনের আগে অনুপ্রবেশ নিয়ে মোদি ও তার দল হয়ত চিৎকার করবেন কিন্তু ভোটের পর সম্ভবত আর কোনো কথা তুলবেন না, ভুলে যাবেন। এটাকেই ভারতের নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি বলে। এ কারণেই অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী রাজনীতিতে কোনো সরকার যেসব কথা বলবে এর সাথে সরকারের বিদেশ নীতি বা পড়শির প্রতি নীতিতে কোন ছাপ পড়বে না, এর সাথে কোনো সম্পর্কও থাকে না।
    পাঁচটি বিধানসভার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন হবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের চলতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধায়, মানে তাঁর দল তৃণমূল-কংগ্রেস ক্ষমতায়। পাঁচ বছর আগে বা ২০১১ সালে মমতা প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। মানে এর আগে রাজ্য-সরকারে কমিউনিস্ট সিপিএমের বামজোট ক্ষমতায় ছিল এবং একটানা ৩৪ বছর ধরে তারা ক্ষমতায় ছিল। ফলে অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, বামজোট কী এবার আবার ক্ষমতায় ফিরে আসবে, সম্ভাবনা কতটুকু? সম্ভাবনা আছে কি না বা সেটা যা-ই থাক স্বভাবতই আমরা তা একেবারে নিশ্চিত হতে পারি একমাত্র নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর। তবে এর আগেই একটা ঘটনা হল, খোদ সিপিএমই যেন খোদ আমাদেরকে আগাম জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা এই নির্বাচনে জিতে ফিরে আসছে না। কিভাবে তা জানিয়েছে? না, অবশ্যই সিপিএম বা বামফ্রন্ট এ কথা ঘোষণা দিয়ে বলেনি। বলেছে কাজ তৎপরতায় আর নিজের আচার-আচরণে তা প্রকাশ করে। যেমন সিপিএম, মানে জোটবদ্ধ বামফ্রন্ট এবার একা নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস-বামফ্রন্ট মিলে জোটে, সিট ভাগাভাগি করে নির্বাচনে অংশ নিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  সিপিএম এর নিজের দলের অভ্যন্তরীণ বাধা এবং কংগ্রেসের বেলায় তাদের কলকাতা স্থানীয়সহ কেন্দ্রিয় নেতৃত্বকে এব্যাপারে রাজি করানোর নানান অনিশ্চয়তা কাটিয়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি ততপর সিপিএমের নেতা সীতারাম ইয়েচুরির তৎপরতা শেষে সফলতার মুখ দেখেছে। কংগ্রেস-বামফ্রন্টের গাঁটছড়া এর আগে অনেকবারই হয়েছে, তবে সবসময় তা কেবল কেন্দ্রের ক্ষমতা বা নির্বাচনকে লক্ষ করে হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় রাজ্যপর্যায়ের নির্বাচনে কংগ্রেস-বামফ্রন্টের গাঁটছাড়া এই প্রথম। ইতোমধ্যে নির্বাচনের আগেই কংগ্রেসের সাথে আসন ভাগাভাগির পর্যায়ে জোটবদ্ধতাও কার্যকর হয়ে গেছে। তাই এখন কংগ্রেসের সাথে বামফ্রন্টের আসন ভাগাভাগি করে নির্বাচনে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তটাই প্রমাণ করে যে, তাদের নিজের সম্পর্কে নিজস্ব মূল্যায়নটা কী! তারা মনে করে একা বামফ্রন্ট হিসেবে তারা সম্ভবত জিতবে না। তার সম্ভাবনা এখনো কম। একনাগাড়ে ৩৪ বছর শাসনের পর তারা তৃণমূলের কাছে ২০১১ সালে প্রথম হেরে গিয়েছিল। সে ঘটনা এখন পাঁচ বছরের অতীত ঘটনা হয়ে গেলেও, জনগণের মনোভাব এখনো তাদের দিকে যথেষ্ট সদয় হয়ে ফেরেনি এটাই সিপিএম এর মুল্যায়ন, এটাই তাদের নিজের সম্পর্কে রিডিং। এই রিডিংয়ের কারণেই  এবার কংগ্রেসের সাথে দ্বিধা ছেড়ে আগেভাগে জোট বেঁধে বামফ্রন্ট নির্বাচনে দাঁড়িয়েছে। কংগ্রেসের সাথে তার জোটবদ্ধতার তাৎপর্য এটাই।
    আবার এটা শুধু বামফ্রন্টের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী শরিক সিপিএমের নিজের সম্পর্কে নিজস্ব মূল্যায়নই নয়। কংগ্রেসেরও পশ্চিমবঙ্গে তাদের নিজস্ব দশা পরিস্থিতি সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন এটা। আজকের সিপিএমের ক্ষমতাচ্যুতি দশা মাত্র পাঁচ বছরের। বিগত ১৯৭৭ সাল থেকে একটানা ৩৪ বছর ক্ষমতার রমরমাতে ছিল বামফ্রন্ট। অর্থাৎ ওই ৩৪ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের অবস্থাও এমনই শোচনীয় ছিল। মানে একমাত্র ১৯৭৭ সালের আগেই কেবল পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের রমরমা অবস্থা ছিল। সে দিক থেকে কংগ্রেসের দুরবস্থা এবার ২০১৬ সালের নির্বাচনে নতুন কিছু নয় হয়ত। কিন্তু অন্য বিচারে কংগ্রেসের জন্য এটা অবশ্যই নতুন দশা। কেন? বিগত ২০১৪ সালের কেন্দ্রীয় বা লোকসভার নির্বাচনে কংগ্রেসের অবস্থা অতীতের যেকোনো সময় থেকে ভিন্ন রকমের এবং আরো শোচনীয়। ঐ(২০১৪) নির্বাচনের ফলাফল থেকেই মোদি প্রধানমন্ত্রী হন আর ওই নির্বাচনে জোটে অংশগ্রহণ করা বিজেপি নিজের জোট ছাড়াই একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করেছিল। অথচ কংগ্রেসের অবস্থা ঠিক এর উল্টো। বিগত ২০০৪ সাল থেকে পরপর দুই টার্ম যে কংগ্রেস কেন্দ্রে জোট সরকার গঠন করে ক্ষমতায় ছিল সেই কংগ্রেস ২০১৪ নির্বাচনের ফলাফলে এতটাই শোচনীয় যে, লোকসভায় বিরোধী দলের অবস্থান পেতেও সমস্যা অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছিল। অনেক কষ্টে শেষে বিরোধী দলের মর্যাদা জোটাতে হয়েছে। কারণ বিরোধী দল হতে  প্রয়োজনীয় এমন সংসদীয় আসন সে পায়নি। কংগ্রেসের আসন ছিল লোকসভার মোট আসন ৫৪৩-এর ১০ ভাগেরও কম, ৪৫-এর আশপাশে। শুধু তাই নয়, কংগ্রেস নিজের এই দুরবস্থা টের পেয়েছিল, তা স্বীকার এবং মনেও রেখেছিল।
    দু’মাস আগের সর্বশেষ বিহার বিধানসভার নির্বাচন হয়েছিল। ওই নির্বাচনে কংগ্রেস সর্বভারতীয় দলের দাবি ত্যাগ করেছিল; যেন সে বিহারের অন্যান্য আঞ্চলিক দলের পাশাপাশি তাদের মতোই আর একটা দল। এমন মর্যাদাতেই কংগ্রেস বিহারেরই বিধানসভা নির্বাচনে এক জোটে অন্তর্ভুক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। এথেকে মনে করা যেতে পারে যে, তার দিন শেষ হয়েছে – এটা কংগ্রেস মেনে নিয়ে আগাচ্ছে। বাস্তবতা সে আগেই মেনে নিচ্ছে। আগামীতে ভারতজুড়ে সংগঠন আছে এমন সর্বভারতীয় দল বলতে কংগ্রেস বলে আর কিছু থাকবে না – এজন্যও যেন সে রেডি হচ্ছে। বড়জোর এক স্থানীয় আঞ্চলিক দলের অবস্থান পেয়ে অন্যান্য আঞ্চলিক দলের সাথে কোনো জোটে অস্তিত্ব ধরে রাখার চেষ্টা করে যাবে। পশ্চিমবঙ্গে এবারের কংগ্রেস সেই নতুন চেহারার কংগ্রেস। সে হিসেবেই সিপিএম বা বামফ্রন্টের সাথে পশ্চিমবঙ্গে সে জোটবদ্ধ হয়েছে।
    পশ্চিমবঙ্গের ৪ এপ্রিল থেকে ভোট শুরু হয়ে গেছে এবং প্রথম পর্বে ১৮ বিধানসভা আসনের নির্বাচন দিয়ে এই নির্বাচন শুরু হবে। ওই ১৮ বিধানসভার আসন মূলত মাওবাদ প্রভাবিত এলাকাগুলোর। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট ছাড়া আরো দুই মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হল বিজেপি এবং ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী মমতার তৃণমূল। এখন কে জিততে পারে এই প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গে বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের বিন্যাসকে ভিত্তি ধরলে  – ওই নির্বাচনে তৃণমূল ভাগে পেয়েছিল ৩৯.৮ শতাংশ, বামফ্রন্ট ২৯.৯ শতাংশ, কংগ্রেস ৯.৭ শতাংশ, আর বিজেপি ১৭ শতাংশ ভোট। ইতোমধ্যে এবার কংগ্রেস-বামফ্রন্ট জোট গড়ে ফেলেছে। তাই, ২০১৪ সালের হিসাব মাথায় রাখলে একই বিচারে এবার এই জোটের ভাগের সব ভোটের যোগফল দাড়ানোর কথা  ৩৯.৬ শতাংশ। আর ওদিকে সব কিছু আগের মতো থাকলে সে ক্ষেত্রে মমতার পক্ষে আসতে পারে ৩৯.৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় কাছাকাছি। তাই মমতার দিক থেকে দেখলে এই জোট হওয়াটা তার জন্য অস্বস্তিদায়ক। কারণ পুরাণ ভোটের ফলাফলের বিচারে কংগ্রেস-বামফ্রন্ট জোট ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস ফেললে মমতার তা ভাল লাগার কথা নয়।
    তবে পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনে অন্য আরো অনেক ফ্যাক্টরও আছে। যেমন ফ্যাক্টর নম্বর এক। বিগত ২০১১ সালের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রাপ্ত মোট ভোট ছিল ৪ শতাংশ, আর ২০১৪ সালে সেখান থেকে বেড়ে গিয়ে মোদি নামের জোয়ারে তা হয়েছিল ১৭ শতাংশ। এবারের নির্বাচনে প্রাপ্ত মোট ভোটে সেটা আবার কমে ৪ শতাংশে ফিরে যাবে বলে বিজেপি বিরোধী অথবা পক্ষের অনেকেই অনুমান করছেন। যদি তাই হয় তবে সে ক্ষেত্রে বিজেপির অবশিষ্ট বা বের হয়ে যাওয়া ভোট কংগ্রেস-বামফ্রন্ট জোট আর তৃণমূলের মধ্যে ফিরে চলে যাবে তা স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে পারি। কিন্তু কিভাবে কী অনুপাতে সেটা কংগ্রেস-বামফ্রন্ট জোট আর তৃণমূলের মধ্যে ভাগ হবে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এনিয়ে জল্পনা-কল্পনাও পরিসংখ্যান নাড়াচারা শুরু হয়ে গেছে। এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি থেকে এবার মুখ ফিরিয়ে নেয়া বা ফেরত চলে আসা ভোটারদের মাত্র ২০ শতাংশ যদি তৃণমূলের ভাগে এসে যায় তাহলেই তৃণমূল আবার জিতে যাবে। মানে সে ক্ষেত্রে ২০১৪ সালে প্রাপ্ত মোট ভোটের ১৭ শতাংশ যা বিজেপির ছিল তা এবার কমে ৪ শতাংশ হয়ে গেলে – অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের ফেরত চলে যাওয়া ভোট হবে মোট মোটের ১৩ %। অর্থাত সেক্ষেত্রে গতবারের বিজেপির পাওয়া মোট ভোটের ১৭% ভোট এবার ভাগ হবার কথা – বিজেপি ৪%, কংগ্রেস-বামফ্রন্ট ৪.৫৫% (১৩% এর ৩৫%) আর তৃণমূলের ভাগে ৮.৪৫% (১৩% এর ৬৫%) – এভাবে অর্থাৎ ৩৫ঃ৬৫ ভাগ হলেই দেখা যাচ্ছে মমতার তৃণমুল জিতে যাবে।  কারণ সেক্ষেত্রে অর্ধেকের বেশি বিধানসভা আসন তৃণমূল নিজের পক্ষে পেয়ে জিতে যাবে। আর যদি বিজেপির কমে যাওয়া ভোটের ৩৫% এর জায়গায় মাত্র ১৫ শতাংশ তৃণমূলের পক্ষে আসে তাহলে কংগ্রেস-বামফ্রন্টের জোট তৃণমূলের চেয়ে বেশি আসন পেয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসবে। অতএব, বিজেপির কমে যাওয়া ভোটের কত অংশ তৃণমূল নিজের দিকে টানতে পারবে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
    মুসলমান ভোটার পশ্চিমবঙ্গে আরেক বিরাট ইস্যু; বিশেষ করে সাচার কমিশনের রিপোর্টে মুসলমানদের দুরবস্থার কথা ফুটে উঠতে শুরু করার পর থেকে। বিগত ২০১১ সালের নির্বাচনের পর থেকেই “মুসলমান ভোট” ইস্যু হয়ে উঠতে শুরু করে। সবার নজর পড়ে যে, পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের ২৮ শতাংশ মুসলমান এবং এটা এখন প্রতিষ্ঠিত যে, পশ্চিমবঙ্গের মোট মুসলমান ভোটারের প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটারই মমতার দলের পক্ষের ভোটার হয়ে গেছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে। মমতার তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান কমিউনিটির সাথে রাজনৈতিক আঁতাত এবং বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করে ফেলেছে। এর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের দিক হল, এর আগে সেই ১৯৪৭ সালের পর থেকেই মুসলমান ভোটাররা প্রথমে কংগ্রেসের ভোটব্যাংক হয়েছিল, এরপর ১৯৭৫ সালের পর থেকে তা বদলে গিয়ে পরের ৩৪ বছর ধরে বামফ্রন্টের ভোটব্যাংক হিসেবে ছিল। কিন্তু দুই জায়গাতেই মুসলমানেরা ছিল সেকুলার জামা গায়ে দিয়ে নিজের মুসলমান পরিচয় ঢেকেঢুকে আড়াল করে। সে তুলনায় মমতার দলে এসে এবার তাঁরা ভোটার হয়েছে খোদ মুসলমান পরিচয়েই, কোনো আড়াল লুকাছাপা না করেই। ফলে এটা বিজেপির জন্য চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
    বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচনের ফলাফলে ক্ষমতায় আসার পরপরে কয়েক মাসের মধ্যে বর্ধমান বোমাবাজির ইস্যু তুলে বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ – মুসলমানেরা জঙ্গি, তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে, অনুপ্রবেশকারি, তারা জেএমবি ইত্যাদি নানা প্রপাগান্ডার ঝড় তুলে ফেলেছিল। সেই মিথ্যা প্রপাগান্ডায় পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা লিড ভূমিকা নিয়েছিল আর তা বিস্তৃত হয়ে বাংলাদেশের প্রথম আলো আর ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি – আনন্দবাজারের রিপোর্টের বরাতে রিপোর্ট করে ওই মিথ্যা প্রপাগান্ডায় শামিল হয়েছিল। দাবি করেছিল এগুলো জামায়াতের কাজ। কিন্তু হঠাৎ করে মোদির প্রধানমন্ত্রীর অফিস  বিজেপির অমিত শাহের প্রচার-প্রপাগান্ডার তথ্যকে অনুমোদন না দিয়ে খোদ মোদির সরকার পিঠ ফিরে দাঁড়িয়ে যায়। লোকসভায় দাঁড়িয়ে মোদির এক মন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে সেটা অস্বীকার করেছিল। ফলে সেই থেকে বর্ধমান ইস্যু বা মুসলমান-জঙ্গি ইস্যু আস্তে আস্তে চাপা পড়ে যায়। এমন হওয়ার মূল কারণ বিজেপি হিসাব করে দেখেছিল যে, নিজেদের ওই প্রপাগান্ডা সফল হলে তৃণমূল হয়তো ঘায়েল হবে কিন্তু এর ফলাফল বিজেপির পক্ষে আসবেই না; বরং না এসে তা কংগ্রেস-বামফ্রন্টের পক্ষে চলে যাবে। কারণ তখনকার বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান সিপিএমের বিমান বসু খোদ বিজেপির অমিত শাহের ভাষ্যের সাথে মিল রেখে প্রায় একই ভাষায় তৃণমূলকে বাংলাদেশের জামায়াতের পৃষ্ঠপোষক ও জঙ্গি সংগঠন বলে প্রপাগান্ডা চালিয়েছিল। তাই মোদির হঠাৎ করে ওই পিঠটান দেয়া।
    মোদির এই পিঠটান দেয়া নীতির আলোকে সেই থেকে মমতা গত দুই বছর মোদি সরকারের বিরুদ্ধে দুই সংসদেই (লোকসভা ও বিশেষ করে রাজ্যসভাতে) বিরোধিতার কোনো ইস্যুতে যোগ দেয়নি; অথবা কোনো বিরোধী জোটে যোগ দিয়ে বিরোধিতা করেনি। যা করেছে তৃণমূল আলাদা করে করেছে। মোদির বিজেপি, কলকাতায় তৃণমূলের ক্ষমতায় ফিরে আসার চেয়ে বামফ্রন্টের ফিরে আসার বিরোধী বেশি। তাদের ধারণা, সিপিএমকে আর আরেকটি পাঁচ বছরের টার্ম পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে পারলে বামফ্রন্ট চিরদিনের মতো ক্ষমতায় ফিরে আসার সক্ষমতা হারাবে। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির লক্ষ্য এটাই। তাই এই নীতির আলোকে বিজেপির লক্ষ্য হল এবারের বিধানসভা নির্বাচনও মমতার হাতে চলে গেলে তা যাক। এভাবে ছেড়ে দিয়ে এরও পরের বার মানে ২০১৯ সালের লোকসভা এবং ২০২১ সালের বিধানসভার নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে কৌশল সাজানো। এতসব হিসাবকিতাব এর কারণে সব মিলিয়ে মমতার তৃণমূল খুব সম্ভবত মার্জিনালি হলেও আবার নির্বাচিত হয়ে জিতে সরকার গঠন করতে সম্ভবত সক্ষম হতে যাচ্ছে। তবে মমতার বিরুদ্ধে বিজেপির অন্য এক কামনা ও করণীয় আছে। বিষয়টি বাইরে থেকে মানে বাংলাদেশ থেকেও সুনির্দিষ্টভাবে খেয়াল না করলে বোঝা সম্ভব নয়। বিষয়টি হলো মমতার তৃণমূল ভোট কারচুপির দিকে ঝুঁকছে বলে বিজেপিসহ সব বিরোধীর অভিযোগ ও অনুমান। বাংলাদেশে বসে এর সত্যতা নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু না বলতে পারলেও ভারতের নির্বাচন কমিশনের অ্যাকশন ও তৎপরতার বিরুদ্ধে মমতার আপত্তি চিৎকার ক্রমশ বাড়ছে – সেটা লক্ষ্য করা যায়। যেমন মমতার খাতিরের পুলিশ অফিসার বা প্রশাসনিক আমলার বিরুদ্ধে কমিশন ক্রমান্বয়ে বদলির আদেশ দিলেই মমতা তাতে হইচই করে উঠছেন। যেমন কলকাতার পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার অথবা আমলা আইপিএস অফিসার ভারতী ঘোষকে নির্বাচন কমিশনের বদলি করা নিয়ে মমতা কঠিন আপত্তি তুলেছে, যদিও মমতা তা ঠেকাতে পারে নাই। তবে মমতা যে ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাতেই মমতার বিরুদ্ধে কারচুপির সন্দেহের সত্যতা প্রবল হচ্ছে।
    ভারতের নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে আমাদের যতই ইতিবাচক ধারণা থাক মমতার আমলে বিগত বছরগুলোতে মেয়র-কাউন্সিলর ধরণের স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে মমতার বিরুদ্ধে ভোটকেন্দ্র দখলের সীমাহীন কারচুপির অভিযোগ উঠেছিল। এগুলো বর্তমানে বাংলাদেশের মতো মানের নির্বাচন হয়েছে বলে মনে করার কারণ আছে। এ কারণে এবার নির্বাচন কমিশন আরো কড়া কিছু পাল্টা কঠোর অ্যাকশনে গেছে। আর এরই বিরুদ্ধে মমতা সোচ্চার হয়েছেন। সোচ্চার হলেও হয়তো সেটা তেমন কিছু হতো না কিন্তু তিনি যা বলছেন তা থেকে মমতার বিরুদ্ধে মারাত্মক সব অভিযোগের পাল্লাই ভারী হয়। মমতা পাবলিক মিটিংয়ে এ নিয়ে কী বলছেন তা আনন্দবাজার থেকে কোট করছি, “ইলেকশন আসলে অনেক কেন্দ্রীয় বাহিনী আসবে। ইলেকশন কমিশনের অবজার্ভার আসবে। কোনো দিন তাদের ভুল বুঝবেন না। যত্ন করবেন, আদর করবেন। তারা আমাদের অতিথি। অতিথিকে যত্ন করা আমাদের কাজ। তারা কিছু বললে চুপচাপ শুনবেন। কিন্তু মনে রাখবেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী বা কমিশন তিন দিনের জন্য, তারপর আমরাই থাকব। কমিশন চলে গেলে তৃণমূলই থাকবে এলাকায়। ভোটারদেরও তৃণমূলকে সঙ্গে নিয়েই থাকতে হবে”। মমতার এই হুমকি মমতাকে নির্বাচনে জিততে সাহায্য করবে হয়তো কিন্তু তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাল্লাকেই আরো মজবুত করবে। সাদা কথায় কারচুপির অভিযোগ মমতার ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে ০৬ এপ্রিল ২০১৬  দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকার এবং ০৩ এপ্রিল ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় প্রথম ভার্সান হিসাবে ছাপা হয়েছিল। এখানে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে এডিট করে ছাপা হল।]

     

     

     

  • ভারত-চীনের সাথে সম-সম্পর্ক রক্ষার মানে কী

    ভারত-চীনের সাথে সম-সম্পর্ক রক্ষার মানে কী
    গৌতম দাস
    ২৩ নভেম্বর ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-d1

    বাংলাদেশে যোগ দেয়া শ্রীলঙ্কার নতুন রাষ্ট্রদূত গত ১২ নভেম্বর বাংলাদেশের কূটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (ডিকাব) সাথে এক মতবিনিময়-বিষয়ক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে দৈনিক মানবজমিনে এক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে পরের দিন, গত ১৩ নভেম্বর। মানবজমিন লিখেছে, “ভারত ও চীনের সঙ্গে সমান সম্পর্ক রক্ষা করে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা দুই দেশ বেশি সুফল পেতে পারে” বলে মনে করেন ঢাকায় নিযুক্ত শ্রীলঙ্কান হাইকমিশনার ইয়াসোজা গুনাসেকেরা।
    রাষ্ট্রদূতের এই বাক্যের কথা আপাতভাবে খুবই সাদামাটা মনে হতে পারে; কিন্তু আসলে তা নয়। ওই বাক্যে গুরুত্বপুর্ণ শব্দ হলো, সমান বা সমান সম্পর্ক। অর্থাৎ তিনি চীন ও ভারতের সাথে শুধু সম্পর্ক রক্ষা নিয়ে কথা বলেননি, বলেছেন ‘সমান সম্পর্ক’ রাখার কথা। আর সমান সম্পর্ক রাখাটা হবে ‘বেশি সুফলের’, সে কথা তিনি বলছেন। কেন? সেটাই আজকের লেখার প্রসঙ্গ।

    গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিসরে এক বিস্তর পালাবদলের কালে
    এই শতকে দুনিয়াতে গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিসরে এক বিস্তর পালাবদল চলছে। আমেরিকার পরাশক্তিগত অবস্থান নড়বড়ে হওয়ার কথা আগেই শুনা গিয়েছিল এখন বাস্তবে ফলতে শুরু করেছে। কোনো রাষ্ট্র পরাশক্তিগত অবস্থান পায় বা দেখাতে পারে, যখন এর আগেই  অর্থনীতি শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে দেশটির অর্থনীতি প্রথম দুই বা বড়জোর তিন রাষ্ট্রের পর্যায়ে উন্নীত হয়ে গিয়ে থাকে। বলা যায়, দুনিয়ায় অর্থনীতিগত শ্রেষ্ঠত্বের অবস্থানের ওপর ভর করে কোনো রাষ্ট্র পরাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। অর্থনীতিগত অবস্থানের দিক থেকে চীন আমেরিকাকে কয়েক বছর ধরে ছাড়িয়েই যাচ্ছে বলেই আমেরিকার পরাশক্তিগত অবস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দ্বিতীয় আর এক ঘটনা হলো, বিশ্ব অর্থনীতিতে পুঁজিপ্রবাহের অভিমুখ পশ্চিম থেকে পুব দিকে এশিয়ামুখী হয়ে পড়েছে। দুনিয়ায় অর্থনৈতিক তৎপরতার মোকাম বা ভারকেন্দ্র হয়ে উঠেছে এশিয়া। এসবের মিলিত ফলাফলে এশিয়ায় আরো দুটো ইস্যু তৈরি হয়েছে। একটা আমাদের সাউথ এশিয়া অঞ্চলের ধরাধরি আর অন্যটা সাউথ চায়না সি বা চীনের প্রবেশ পথ দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চলের উত্তেজনা। এমন উত্তেজনার মূল কারণ বিশ্বে আমেরিকার পরাশক্তিগত প্রভাব কমে যাওয়া টের পেয়ে আমেরিকা নিজেই এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর কাছে নিজের সামরিক ক্ষমতাজাত সার্ভিস বিক্রির চেষ্টা করছে। সে এই বলে  এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোকে যে, চীনের নব উত্থান ও এর কোনো সম্ভাব্য খারাপ প্রভাব থেকে বাঁচতে তোমাদের সামরিক সহযোগিতা দরকার হবে। এই বরকন্দাজ হতে সার্ভিস দিতে চাই আমি। বিনিময়ে তোমরা আমার সাথে এক টিপিপি (ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে আমাকে ব্যবসায় দিবে। সাউথ চায়না সিকে কেন্দ্র করে আমেরিকার তৈরি করা দ্বন্দ্ব ও টেনশন ছড়ানোর বৈশিষ্টটা এ রকম।
    আর অন্য দ্বিতীয় বিষয়টা হল, আমাদের অঞ্চলে মানে, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলেরটা আর একটু অন্য রকম। বাড়তি আরো কিছু বৈশিষ্টের কারণে। সেটা হলো, আমেরিকা ভারতকে তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে বা পাশে আছে ধরনের ধারণা তৈরি করে  ভারত-চীনের দ্বন্দ্ব উসকে দিতে চাইছে। এটা করার সুযোগ নিতে পারছে কারণ ভারত ও চীনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দ্বন্দ্বের ইস্যু আছে। আর তা মূলত অসম সামরিক সক্ষমতার কারণে। ভারতের সামরিক সক্ষমতার ঘাটতি – যেটা আমেরিকা বিক্রি ও সরবরাহ দিবার উছিলায় সে ভারতের ঘনিষ্টতা চাইছে। আবার ভারতও সম্ভাব্য সামরিক বিরোধের কথা ভেবে আমেরিকাকে অস্ত্রের উৎস এবং বিরোধে অন্তত মধ্যস্থতাকারীর ভুমিকা নিতে পারে – এমন দরকার অনুভব করছে। এছাড়া ১৯৬২ সালের অভিজ্ঞতা ভারতের ভাল নয়। এসব মিলিয়ে সারকথায় চীন নিয়ে ভারতের ভীতি ও সন্দেহ আছে, আর আমেরিকা সেটাকেই ভালোমতো ব্যবহার ও উসকে দিয়ে রাখতে চায়। আবার চীন-ভারতের সম্পর্ক সবটাই বিরোধাত্মকতা নয়। বরং আর বিপরীত দিকে ভারত-চীনের পারস্পরিক ব্যবসায়িক সহযোগিতার প্রয়োজন এবং স্কোপ আছে। এবং সে সুযোগ পরস্পর নিচ্ছে। বাণিজ্য-ব্যবসায়ের দিক থেকে উভয়ের উভয়কে দরকার। কিন্তু আর এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ আর এক দিক আছে। আমেরিকার নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে পরিচালিত চলতি অর্থনৈতিক গ্লোবাল অর্ডারটা যেটা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। BRICS ও AIIB ধরণের উদ্যোগের আবির্ভাব এর প্রমাণ। পুরানা অর্ডারটাকে ভেঙে আমেরিকার কর্তৃত্বের বাইরে এক নতুন গ্লোবাল অর্ডার দাঁড় করাতে ভারত ও চীনের একসাথে কাজ করা উভয়ের ভবিষ্যতের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ দিকটা খেয়াল করে আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে ভারতের দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের দিকগুলো উদোম করে উসকানি দিয়ে প্রধান ও মুখ্য করে তোলার নীতি নিয়েছে। এসবের মিলিত প্রভাব ও ফলাফলে এশিয়া, বিশেষত আমাদের অঞ্চলে মূল তিন শক্তি আমেরিকা, ভারত ও চীন – এশিয়ায় পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়ছে, টানাহিঁচড়া করছে, এশিয়ার বাদবাকি প্রত্যেকটা রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করার প্রবল চেষ্টা করছে। এ অঞ্চলের প্রতিটা দেশের রাজনীতিতে এই তিন শক্তির প্রভাব তাই আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রবল। অন্য দিকে প্রতিটা দেশের ভেতরে প্রতিদ্বন্দ্বী মুল দু-তিনটা রাজনৈতিক দল থাকে, সম্পর্কের দিক থেকে এরা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। যদিও এটাই স্বাভাবিক। তবু অনেক সময় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্ব বিদেশী তিন রাজনৈতিক শক্তির দ্বন্দ্বের আলোকে সাজানো হয়ে যায়, জড়িয়ে যায়। যা হওয়া উচিত নয়। কারণ যার যার নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের দিক থেকে এমন অবস্থা মারাত্মক আত্মঘাতী।
    আমেরিকা, ভারত ও চীন এই তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের স্বার্থের লড়াই, পারস্পরিক শত্রুতা ইত্যাদি প্রত্যেকেই নিজ রাষ্ট্রস্বার্থে করছে, লড়ছে; এগুলো করারই কথা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল একটা বিষয় বাদে তা হবার কথা। তা হলো, আমেরিকার নেতৃত্বে-কর্তৃত্বে পরিচালিত চলতি অর্থনৈতিক গ্লোবাল অর্ডারটা ভেঙে নতুন গ্লোবাল অর্ডার দাঁড় করানো – এ বিষয়টায় চীন ও ভারতের কোর স্বার্থ একই।
    কিন্তু এতে আমাদের কী? এটা কী শুধুই আমেরিকা, ভারত ও চীন এই তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের নিজ নিজ স্বার্থের লড়াই যেখানে আমরা দর্শকমাত্র যার কিছুই আসে যায় না? না একেবারেই তা নয়। এটা দূরে দাঁড়িয়ে দেখা পরাশক্তিগত লড়াইয়ের মত নয়। আমাদের সুনির্দিষ্ট স্বার্থ আছে। এটাতে আমাদের মতো গরিব রাষ্ট্রসহ সবারই এখানে গভীর ও এক  কমন স্বার্থ আছে। গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময়ের চলতি বিশ্বব্যবস্থা যেটা আমেরিকার মত মোড়ল ও তার সাগরেদদের দিকে কান্নি মেরে সাজানো ও দাঁড়ানো ব্যবস্থা বলে যেটাকে আমরা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা বলে অভিযোগ করি – এরই তো ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা তৈরি হয়েছে। অল্প বিস্তর ভাঙ্গা শুরু হয়েছে। এটা পুরা ভেঙ্গে নতুন আসন্ন ব্যবস্থাটায় আমাদের জন্য কতটুকু কী রিলিফ দিবে তা তো কেউ এমনি দিবে না, আর তা বুঝে নিবার ব্যাপার ও কাজ আছে। সেজন্য আমাদের প্রথম কাজ হল, পরিবর্তনের অভিমুখ রবং কোথায় কী পরিবর্তন হতে পারে কতটুকু তা ঠিকমত বুঝে পদক্ষেপ নেয়া, নিজের অবস্থান নেয়া, দল জোট পাকানো ইত্যাদি। ফলে চীন ও ভারতসহ এই ইস্যুতে যারাই নতুন গ্লোবাল অর্ডার বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য বিনিময়ব্যবস্থা দাঁড় করানোর পক্ষে থাকবে তাদের পক্ষে থাকা আমাদের কাজ। এই ইস্যু বাদে অন্য সব বিষয়ে আমেরিকা, ভারত ও চীনের লড়াই আসলে তাদের নিজ নিজ একান্ত স্বার্থে নিজের লড়াই। আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থ তাতে নেই। অতএব সাবধান, এসব ধরনের লড়াইয়ে এই তিন শক্তির কোনো একটার পক্ষ নেয়া আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য বিপজ্জনক। বিশেষত এই তিন রাষ্ট্রের কোনো একটার কোলে ঢুকে অপর দুই অথবা কোনো একটার পক্ষে দাঁড়ানো আরো বিপজ্জনক। যেমন, চীনের কোলে বসে চীন-ভারতের বিরোধকে কাজে লাগিয়ে চীনের পক্ষ নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে চীনের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানো। অথবা ঠিক একই কাজ কিন্তু উল্টা ভাইস ভারসা – ভারতের পক্ষে জোটবদ্ধ হয়ে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। অর্থাৎ ভারত অথবা চীন কোনো একটার পক্ষ নিয়ে নিজের স্বার্থে অপরটার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো বা খেলার চেষ্টা – এটা অতিবুদ্ধিমানের গলায় দড়ির অবস্থাই তৈরি করবে।
    এ ধরনের ঘটনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাধারী দেশ হলো শ্রীলঙ্কা। সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি। তার আগে আমরা খুঁজছি রাষ্ট্রদূতের ‘সমান সম্পর্ক’ কথাটার অর্থ ঠিক কী হতে পারে বা হওয়া উচিত।

    কী কী নির্ণায়ক মেনে চললে সেটা ‘সমান সম্পর্ক’ কথাটার অর্থ হবে :
    ০১. আমেরিকা, ভারত ও চীন – কোনো এক রাষ্ট্র অন্য দুইয়ের যে কারো উপর বাড়তি সামরিক স্ট্র্যাটেজিক সুবিধা পায়, এমন কাজে সহযোগিতা করার বিষয়কে বাংলাদেশের জন্য হারাম জ্ঞান করতে হবে।
    ০২. তিন রাষ্ট্রের প্রত্যেকের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে অবশ্যই গভীরে নেয়া যাবে। কেবল কাউকে একচেটিয়া, বিশেষ করে অন্যকে বঞ্চিত করে একচেটিয়া বাণিজ্যিক সম্পর্ক করা বা দেয়া যাবে না।
    ০৩. এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় মাপকাঠি হিসেবে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি সিদ্ধান্তের মুখ্য বিষয় অবশ্যই নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ হতে হবে। এদিক থেকে তাকিয়ে কাজ করলেই তখন আর কোনো সিদ্ধান্তকে ‘কারো বিরুদ্ধে কাউকে বাড়তি সুবিধা’ দেয়ার জন্য করা হচ্ছে এমন হবে না। কেউ আঙুল তুলতেও পারব না।
    ০৪. এই তিন রাষ্ট্রের কোনো একটার সামরিক স্বার্থকে বাংলাদেশের সাথে করা ওর বাণিজ্যের সম্পর্ক আলাপ ডিলের ভেতর আনা যাবে না। সযত্নে দূরে রাখতে হবে। যেমন গভীর সমুদ্রবন্দর এটা একমাত্র বাণিজ্যিক বিষয়, পারস্পরিক একমাত্র বাণিজ্য সহযোগিতার বিষয় হিসেবে আসতে হবে। এর ভেতর কোনো ধরনের ইস্যু যেমন, সামরিক বিষয় আনা যাবে না। মিলানো যাবে না, হারাম জ্ঞান করতে হবে। বন্দর প্রজেক্টকে পরবর্তিতে কখনও প্রয়োজনে বা সময়েও সামরিক ব্যবহার করা যাবে না এই সুযোগ আগে থেকেই মুখবন্ধেই ঘোষণা দিয়ে নাকচ করে রাখতে হবে।
    ০৫. তিন রাষ্ট্রের কারো সাথে এমন কোনো সম্পর্কে যাওয়া যাবে না, যেটা দেশের নয় বরং ক্ষমতাসীন নিজ দলকে ক্ষমতা রাখতে সুবিধা পাওয়ার জন্য করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলকে মনে রাখতে হবে – কারণ এর অর্থ হবে, নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী দলকেও একই কাজ করতে উসকানি দেয়া ও আগাম নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট দিয়ে রাখা।
    ০৬. এই তিন রাষ্ট্রের যেকোন কারো কাছ থেকেই যেকোনো সামরিক হার্ডওয়ার অবশ্যই কেনা যাবে; কিন্তু কোনো সামরিক সহযোগিতা চুক্তি, যেটা বিশেষত অন্য দুইয়ের যেকোনো এক অথবা দুটোরই বিরুদ্ধে তৎপরতা মনে হয় এমনটতে জড়ানো যাবে না। যেমন, চীনা সাবমেরিন বা আমেরিকান হার্ডওয়ার বা পুরান নেভি আইটেম কেনা, বা অল্প দামে পাওয়া ঠিক আছে। কিন্তু এর বদলে অন্য দুই যে কোন রাষ্ট্রের সাথে কোন সামরিক সহযোগিতা চুক্তি বিশেষত যেটা এই তিনের অন্য যেকোন রাষ্ট্রস্বার্থের বিরুদ্ধে যায় তা করা যাবে না।
    ০৭. কোনো “প্রতিহিংসায়” তিনের কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, পথ চলা বা পরিচালিত হওয়া যাবে না। তাতে অতীতে ওই রাষ্ট্র আমাদের নিজ দেশেরই কোনো এক রাজনৈতিক দলের সাথে বিশেষ খাতিরের সম্পর্ক রক্ষা করে থাকুক না কেন। এর কারণ, আমাদের কোথাও না কোথাও ফুলস্টপ বলতে হবে। কেয়ামত সে কেয়ামত সেটা চলতে দেয়া যাবে না। কারণ প্রতিহিংসার সূত্রে আবার ভবিষ্যতে এই তিনের আর এক রাষ্ট্রকে কোনো বিশেষ ফেবার দেয়া অথবা বঞ্চিত কোনোটাই দিতে করতে শুরু হতে দেয়া যাবে না। যেমন ভারতের এখনকার ভূমিকার জন্য প্রতিহিংসা করা যাবে না। ভারত অথবা চীনকে শাস্তি দেয়ার জন্য আমেরিকার সাথে কোনো সামরিক সহযোগিতায় জড়িয়ে যাওয়া যাবে না।

    ওপরের এই সাতটা পয়েন্ট দিয়ে যা বলতে চাচ্ছি তা হল পুরা বিষয়টা বুঝিয়ে বলার সুবিধার জন্য কেবল। এটা অবশ্যই এই সাত পয়েন্টই সব কথা বা শেষ কথা, তা মনে করে নেয়া ভুল হবে।

    ঘটনার ব্যকগ্রাউন্ড শ্রীলঙ্কা
    শ্রীলঙ্কার পরপর দু’বারের বিগত সরকারের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রাজা পাকসে। তার ক্ষমতায় আসার ঠিক আগে কয়েক যুগ ধরে চলে আসা শ্রীলঙ্কার তামিল বিদ্রোহকে তাঁর কালে প্রথম বলপ্রয়োগে দমন ও বিদ্রোহী সশস্ত্র গ্রুপকে সমূলে উৎখাত করে দেয়া হয়েছিল। এ কাজে চীনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা ছিল। জাতিসংঘে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ও এসংক্রান্ত চাপ সামলাতে ভূমিকা রেখেছিল দেশটি। ফলে বিদ্রোহ দমন-উত্তর পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কার পাকসের সরকারকে চাপ সামলানোর দিক থেকে চীনের খুবই উল্লেখযোগ্য সহযোগিতার ভূমিকা ছিল। এ ছাড়া আবার ঐ আমলে চীনের বিপুল বিনিয়োগও শ্রীলঙ্কায় এসেছিল। আর সর্বশেষ চীনের দুই সাবমেরিনের বহর তিনি শ্রীলঙ্কার বন্দরে নোঙর করতে দিয়েছিলেন। কী বয়ানে কী সম্পর্কে চীনা সাবমেরিন এসেছিল, তা সাধারণ্যে যথেষ্ট স্পষ্ট জানা না গেলেও ভারতের সরকারের ও মিডিয়ায় এর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল প্রবল। কারণ টেনশন কমিয়ে দূরে রাখার জন্য অনেক সময় ‘শুভেচ্ছা সফরেও’ নৌজাহাজ আমেরিকারটা চীনে অথবা চীনেরটা আমেরিকায় যায়। এমনকি আবার ‘যৌথ সামরিক মহড়াও’ হতে দেখা যায়।

    মুক্তামালায় ঘিরে ধরার গল্প
    এছাড়া  এ প্রসঙ্গে আর এক কথা বলা ভালো। বিগত ২০০৫ সালে বুশের আমলে ভারত-আমেরিকার বিশেষ সম্পর্ক শুরু হয়। এমনটা শুরু হওয়ার আগে ভারত সরকারের সামরিক, স্ট্র্যাটেজিক, নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলোয় থিংক ট্যাংক বা এমন বিষয়ে গবেষণা খাতের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ভারত সরকারি বিনিয়োগ খুবই কম ছিল। এরই অবসান ঘটেছিল, সামরিকসহ বহুবিধ খাতে ভারত-আমেরিকার সহযোগিতা চুক্তির যুগ ২০০৫ সালে শুরু হলে থিংক ট্যাংক বা গবেষণা খাতেও আমেরিকা সহযোগিতা দেবে এমন চুক্তি হয়। ফলে প্রতিষ্ঠান গড়তে সহযোগিতা দেবে বা আমেরিকান থিংক ট্যাংক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ভারতীয় শাখা খুলবে, আমেরিকান পিএইচডি স্কলারশীপে বা কাজের খরচ যোগাতে স্কলারশিপে যৌথ গবেষণার কাজ করবে,   ইত্যাদি নানা কর্মসূচি শুরু হয়েছিল। এতে আসল যে ঘটনাটা ঘটে যায় তা হল, আমেরিকান থিংক ট্যাংক-গুলোর বয়ান, দৃষ্টিভঙ্গি এরপর থেকে ভারতীয় ইনটেলেক্টদেরও বয়ান দৃষ্টিভঙ্গি হতে শুরু করে যায়। বিশেষত আমেরিকার চীনবিরোধী বা ক্যাম্পেইনমূলক যেসব প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোর বয়ান ভারতে ভালোমতো ছড়িয়ে পড়েছিল। আর সেসব বয়ানগুলোই আবার এদের লেখা কলাম বা বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য সুত্রে ভারতীয় মিডিয়াতে ছেয়ে ফেলে। যেমন চীন নাকি গভীর সমুদ্রবন্দর বানিয়ে ভারতকে চার দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। অথবা চীন ভারতকে সামরিক দিক থেকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা নিয়েছে। লাফলে ভারতীয় মিডিয়ার কল্যাণে এগুলো অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ও পপুলার প্রপাগান্ডা এবং একচেটিয়া বয়ান হয়ে দাঁড়ায়। যদিও এই প্রপাগান্ডা বয়ানের দুর্বল দিক হল, যেন গভীর সমুদ্রবন্দর বানানো বিষয়টা সামরিক উদ্দেশ্যেই একমাত্র হয়, এটা ধরে নেয়া হয়েছে। অথচ বন্দর বানানোর প্রধান উদ্দেশ্য অবশ্যই হতেই হয় বাণিজ্য। বাণিজ্য উদ্দেশ্য সাধিত হবার পরে পড়ে পাওয়া সুবিধা হিসাবে সামরিক কাজে এর ব্যবহার এটা অপ্সহনাল ব্যাপার। কখনই মুল উদ্দেশ্য হয় না। কারণ একমাত্র বাণিজ্যিক আয় দিয়েই কোন বন্দর বানানোর কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিপুল খরচ তুলে আনা সম্ভব। সে জন্য বাণিজ্যই একমাত্র ও  মুখ্য উদ্দেশ্য হতে বাধ্য। যদিও এরপর বন্দর মালিক রাষ্ট্রের অভিপ্রায় থাকলে এর দ্বৈত ব্যবহার হিসেবে সামরিক কাজে তা ব্যবহার হতে পারে। কিন্তু যদি বলা হয় কেবল ভারতকে ঘিরে ফেলার উদ্দেশ্যেই এই গভীর সমুদ্রবন্দরগুলো করা হচ্ছে, তবে তা সত্যের অপলাপ এবং প্রপাগান্ডাই হবে। এ ছাড়া মুক্তোর মালা বা ঘিরে ফেলা বলতে যে ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে, সেটাও কতটা সত্যি তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
    এপর্যন্ত পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় দুটো গভীর সমুদ্রবন্দর হয়েছে, তাতেই মুক্তোর মালা বা ঘিরে ফেলা বয়ান শুরু হয়। বাংলাদেশের সোনাদিয়া তখনো আলাপে আসেনি।বা এখনও বাস্তবায়নের আলাপ নাই। কিন্তু এই প্রপাগান্ডায় যে ফ্যাক্টসকে পরিকল্পিতভাবে আড়াল করা হয় তা হল, চীনের উত্তরপুর্ব দিক ছাড়া বাকি তিন দিকের ভুখন্ড ল্যান্ড লকড – ভুবেষ্টিত। সমুদ্রে বের হবার পথ নাই। বিশেষ করে চীনের পুরা দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পুর্ব দিক পাহাড় পর্বতে অগম্য। তবে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পুর্ব সীমান্ত পুরাপুরিভাবে ল্যান্ড লকড হলেও তা ছুটাবার কিছু সুযোগ আছে। যদিও ওসব দিক দিয়ে কোন সমুদ্রে বের হওয়ার উপায় নেই, কিন্তু চীনের পশ্চিম, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব (কুনমিং) অঞ্চলের মানুষকে পুরা চীনের সাথে সমানতালের বিকাশে আনতে চাইলে চীনকে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশকে বন্দর বানিয়ে দিয়ে ওই বন্দর নিজেরও বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্রেতা হিসেবে হাজির হলে তা উভয় দেশেরই লাভ হতে পারে। যার মূল কারণ চীনও ওসব বন্দরের ব্যবহারকারি হবে বলে এই অর্থে বিনিয়োগ পরিকল্পনার খরচ তুলে আনা ভায়াবল হয়, তাই। অন্য দিকে চীনেরও ল্যান্ড লকড দশা ঘোচে। অর্থাৎ মুক্তোমালার গল্প থুয়েও আমরা এর ভিন্ন ও আর এক বয়ান পেতে পারি। অর্থাৎ পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও সম্ভাব্য বাংলাদেশ এই তিন দেশ যদি বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগ চীনকে দেয় তবে সবারই বাণিজ্যিক লাভ হয়। তাই চীনের ল্যান্ড-লকড দশার দিকে নজর না দিয়ে কেবল ভারতকে ঘিরে ধরার জন্য এই বন্দর নির্মাণ করছে এই বয়ান খুবই নিম্নমানের প্রপাগান্ডা। এখন এই তিন দেশ যদি বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগের উপরে চীনকে সামরিক ব্যবহারের সুযোগ খুলে তখন ভারতের প্রপাগান্ডা অর্থপুর্ণ হতে পারে। আপাতত এবিষয়ে  কোন সামরিক সহযোগিতা চুক্তির ছায়া চিহ্নও নাই।

    গল্পের বিকল্প ও বুদ্ধিমান হওয়া
    তবু ভারতের মনে সন্দেহ আছে এটা বাস্তবতা। এই আলোকে ভারত বুদ্ধিমানভাবে ইতিবাচক হতে পারে। যেমন এসব বন্দর ব্যবহারের চুক্তি যেন অ-সামরিক থেকে যায় এই স্বার্থকে লবি বা পারশু করা। বিশেষত ভারতও ওসব বন্দর ব্যবহারকারি হয়ে নাম লিখানো সবচেয়ে ভাল। সেক্ষেত্রে ঐ বন্দর “কেবল বাণিজ্যিক কাজেই” ব্যবহারকারি সকলে ব্যবহার করবে একথা মুখবন্ধ ঘোষণায় অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া সহজ। যেমন  বাংলাদেশের বেলায় তো এটাই সহজ পথ।
    বিশেষ করে যেমন, বাংলাদেশে কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর যদি হয়, তবে বাস্তবতই এর ব্যবহারকারী হবে চীন ও ভারত উভয়েই। কারণ এরা উভয়েই – চীনের বেলায় ওর দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব অংশ (কুনমিং) এবং ভারতের বেলায় ওর পুরা সাতভাই পূর্ব দিক ল্যান্ড লকড। কারণ এখানেও আবার বন্দরের ব্যবহারকারী বেশি হবে বলে বন্দর বানানোর বিনিয়োগ খরচ তুলে আনার সম্ভাব্যতা সম্ভাব্য এই বন্দরের সবচেয়ে ভালো এবং কম সময়ে ঘটবে। আর সে জন্য এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, বাংলাদেশকে আগেই ঘোষণা করে বলতে হবে এবং বলা সম্ভব যে বিদেশীদের এই বন্দরের সামরিক ব্যবহার নিষিদ্ধ। কারণ যে বন্দরের সম্ভাব্য ব্যবহারকারী চীন ও ভারত উভয়েই, সেখানে একমাত্র আগেই নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়ে তবেই এই প্রকল্প নেয়ার পথে আগানো সম্ভব।

    যা-ই হোক, আমাদের শ্রীলঙ্কা প্রসঙ্গে ফিরে যাই।  শ্রীলঙ্কার হাম্বনটোটা গভীর সমুদ্রবন্দর এমনিতেই অনেক আগে থেকেই ‘মুক্তামালায় ঘিরে ধরার’ প্রপাগান্ডার শিকার। এর ওপর আবার শ্রীলঙ্কায় চীনা সাবমেরিন আসাটা, বোঝা যায় এটা যথেষ্ট সেনসিটিভিটি বা সতর্কতার সাথে করা হয়নি, তা আজ বলাই বাহুল্য। এর ফলাফল হয়েছিল মারাত্মক। শ্রীলঙ্কার গত নির্বাচনে রাজাপাকসেকে সরাতে ভারতের বিশেষ হস্তক্ষেপ তৎপরতার অভিযোগ পাকসে ক্যাম্প থেকে উঠেছিল। শ্রীলঙ্কায় পরপর দু’বার নির্বাচন ঘটিয়ে পাকসের বিপরীত ক্যাম্প ‘চীনের সে বাড়তি প্রভাব’ দূর করেছে। আপাতত নতুন সরকার থিতু হয়েছে। সেসবের বিস্তারে এখানে না গিয়েও বলা যায়, রাজা পাকসের অতিরিক্ত চীনের দিকে ঢুকে যাওয়ার অভিযোগ কমবেশি সত্য। এই অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেই শ্রীলঙ্কার নতুন রাষ্ট্রদূত সম্ভবত বলেছেন, ‘ভারত ও চীনের সাথে সমান সম্পর্ক রক্ষা করে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা দুই দেশ বেশি সুফল পেতে পারে।’
    আবার সমান সম্পর্ক বলতে এক ধরণের ভারসাম্যমূলক এক সম্পর্কের কথা তিনি বলছেন। কিন্তু এখানে সমান মানে ‘সমান দূরে’ ঠিক তা নয়। আবার ভারসাম্য বলতেও লাঠির এক দিকে চীনকে, অন্য দিকে ভারতকে বেঁধে কাঁধে নেয়ার ভারসাম্য ঠিক তাও নয়। বরং ওপরে যে সাতটি পয়েন্ট উল্লেখ করেছি সে আলোকে এটা বোঝা যেতে পারে। যার সারকথা হলো, বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কাকে ভারত-চীনের দ্বন্দ্ব অবিশ্বাস ও সন্দেহের ভেতরে, ওর অংশ হওয়া যাবে না। এটা ভুল হবে। এই অর্থে এটা সমান সম্পর্ক বা ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক।

    সতর্কতা
    এ ছাড়া মনে রাখতে হবে, এ কালের যেকোনো দুই রাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সম্পর্ক সব সময় বিশেষ। েই অর্থে যে, তা কোনভাবেই আর আগের দিনের (১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার আগের) মত নয়। কোনোভাবেই তা রাশিয়া-আমেরিকার কোল্ড ওয়ারের কালের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝার চেষ্টা করা যাবে না, গেলে ভুল হবে। স্পষ্টতই কারণ এখানে চীন-ভারতের দ্বন্দ্বের কথা যেমন বলা হচ্ছে ঠিক, তেমনই সেই চীনের সাথেই আবার মোদি সরকারের আমলে ভারতের ২০ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো বিনিয়োগ চুক্তি হয়েছে, কাজ চলছে। চীন-ভারত উভয় পক্ষের বাণিজ্যের বাজার ৭০ বিলিয়ন ডলারের কম নয়। এ দিকগুলো মনে রেখে ভারত-চীন সম্পর্ক বুঝতে হবে।

    অস্থির উথালপাথাল সময়ে বুদ্ধিমান প্রুডেন্ট হওয়াই একমাত্র ভরসা।

    [এই লেখাটার আগের ভার্সান দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। সেটা আরও পরিবর্তন, সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল]

  • “মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামাত-মুক্ত বিএনপির” রাজনীতি

    “মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামাত-মুক্ত বিএনপির” রাজনীতি
    গৌতম দাস
    ২৬ আগষ্ট ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-bf

    গত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। সে সফরের পর দেশের সরকার বা বিরোধী দল অথবা কোন বিদেশী কূটনীতিক কেউ দায়িত্ব নিয়ে বলেনি নরেন্দ্র মোদি কী মেসেজ রেখে গেলেন। কিন্তু কানাঘুষা,আর অনুষঙ্গী ঘটনাবলিতে ক্ষমতাসীনদের আচরণ বক্তব্য থেকে দিনে দিনে এটা স্পষ্ট হচ্ছে যে, মোদি-হাসিনা এবং মোদি-খালেদা আলোচনায় একটা নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার বিষয় ইস্যু হিসাবে উঠেছিল। অনুমানে ধরে নেয়া এই আলোচনার পক্ষে সাক্ষ্য দেয় এমন দু’টি শব্দ এরপর থেকে রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত হয়ে উঠতে দেখা যায় – “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি”। এই ব্যাপারটাকে উল্টো করে বলা যায় যে, “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” এই দু’টি বাক্য চালু হওয়া থেকে বোঝা যায় মোদির সফরে নির্বাচন বিষয়ে একটা ইস্যু সেখানে উঠেছিল। আর একটু স্পষ্ট করে বলা যায়, নির্বাচন বিষয়ে অনুমান করা ঐ আলাপের সারকথা সম্ভবত এরকম যে, “সকলকে নিয়ে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা দরকার কারণ রাজনৈতিক সঙ্কট এভাবে ফেলে রাখাটা আমাদের সবার জন্যই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে”। মোদির সফর- উত্তরকালে মোদির এই মেসেজের অর্থ কী অথবা কেমনে কী অর্থ দাঁড়িয়ে যায় সেসব সম্ভাবনার আগেই সম্ভবত শেখ হাসিনার সরকার এবং ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা নিজেই এর অর্থ নিজের মত করে সাজানো শুরু করে দেয়। সে অর্থটাই সম্ভবত “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” এই দু’টি বাক্য চালু করেছে। তবে এথেকে “মধ্যবর্তী নির্বাচন” কথাটার অর্থ কমবেশি সহজে বোঝা যায় কিন্তু “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” কথাগুলোর অর্থ তাৎপর্য কী?

    এখানে তামাশার দিকটা হল, বিএনপির রাজনীতি কেমন হবে জামায়াত ছাড়া না জামায়াত সহ এই শর্ত আওয়ামী লীগের মুখ থেকে আসছে। এক্ষেত্রে এমন একটা ভাব তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে যেন এখানে আওয়ামী লীগ দাতা আর বিএনপি গ্রহীতা। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিএনপির ক্ষমতাদাতা নয়। আওয়ামি লীগ নিজে বড়জোর নিজের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে আবার নিজের মত করে একটা নির্বাচন দিতে পারে, তাই নয় কি? কারণ এটা কারো না বুঝতে পারার কারণ নেই যে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে অনেক কিছু হয়ত দিতে পারে কিন্তু এর পরেও যা কখনই দিতে পারে না তা হল ক্ষমতা। আর যাই হোক, আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ক্ষমতাদাতা হতে পারে না। হওয়ার কথাও নয়।
    তবু এই সরল কথাটা আড়াল করে একটা ভাব ছড়ানো হয়েছে যেন এক শর্ত সাপেক্ষে ক্ষমতাসীন সরকার বিএনপির ক্ষমতাদাতা হতেও পারে। কি শর্তে? যে, বিএনপি যদি জামাতমুক্ত হয় তবে যেন সে লীগের কাছে থেকে ক্ষমতাও পেয়ে যেতে পারে! তাই আওয়ামি লীগ এখান থেকেই বিএনপিকে নির্দেশদাতা হবার ভান ধরেছে, বলছে যে জামাতমুক্ত হয়ে যাও তুমি!

    এ’এক সত্যি বিরাট তামশা। শুধু তাই না। এছারা এখানে এভাবে আর একটা ইঙ্গিত তৈরি করা হয়েছে যেন ৫ জানুয়ারিতে কোনো নির্বাচন না করা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ এর পক্ষে সাফাই দিচ্ছে এমন যেন নেহায়ত বাধ্য হয়ে ৫ জানুয়ারিতে কোনো নির্বাচন না করা সত্ত্বেও আওয়ামি লীগ নিজেকে বৈধ সরকার বলে দাবি করেছে। যেমন, লীগের হস্তক্ষেপ ছাড়া একটা ফেয়ার নির্বাচন হলে তাতে বিএনপি নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসে পড়লেও যেন আওয়ামী লীগের আপত্তি ছিল না,থাকত না। কিন্তু লীগের হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে এজন্য যে, ওই নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতযুক্ত থেকে যাবার কারণে সহযোগী জামায়াত ক্ষমতায় চলে আসবে আর কেবল ঠিক এখানেই আওয়ামী লীগের আপত্তি। জামাত ঠেকানোর মহান কর্তব্য সম্পন্ন করার জন্যই যেনবা জবরদস্তিতে আওয়ামি লীগ নির্বাচন না হতে দিয়েও নিজেকে নির্বাচিত দাবি করছে! তাই কী? আওয়ামী লীগের এমন সাফাই, এমন ইঙ্গিত অবশ্য কেউই বিশ্বাস করে না, এমনকি তারা নিজেরাও না। এটা যে ছলনামূলক মিথ্যা কথা, কেউ বিশ্বাস করবে না জেনেও মুখরক্ষার জন্য বলা কথা তা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সবাই জানে, মানে। তবু তাদের এই কথা বলা ছাড়া মুখরক্ষার সাফাই হিসেবে আর কিছু বলার নেই। এই হল, “জামাতমুক্ত বিএনপি দেখতে চাওয়া” আওয়ামি লীগের আবদারের সারকথা।
    তবে এ বিষয়ে আরও করুণ অবস্থা ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের। গত ৫ জানুয়ারি ২০১৪ নির্বাচনের আগের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেখানেও হবু নির্বাচনের পক্ষে শক্ত হয়ে দাঁড়ানো এবং এরশাদকেও হবু নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য যে যুক্তি তিনি এরশাদকে দিয়েছিলেন এরশাদের সাথে সুজাতার মিটিং শেষে তা গরম থাকতে থাকতেই এরশাদ নিজেই মিডিয়াকে স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন। সুজাতা সিং বলেছিলেন জামায়াত ক্ষমতায় এসে যাবে তা ঠেকানোটা এরশাদের আসল কাজ। মহান দায়িত্ত্ব। আর জামায়াত ঠেকাতে হবে সে জন্য এরশাদকে হাসিনার সাথে নির্বাচনে যেতে হবে। আর এই মহৎ কাজের জন্যই বিএনপি-জামায়াতকে বাইরে রাখার যে সুযোগ পাওয়া গেছে তা ব্যবহার করতে এরশাদের নির্বাচনে যেতে যেন দ্বিধা না করেন। সুজাতার যুক্তির সারকথা ছিল বাংলাদেশের ক্ষমতাকে “জামাতমুক্ত” দেখতে যাওয়ার খায়েশ। বুঝা যাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামি লীগকে ভোট না দিলেও জবরদস্তিতে লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চাওয়ার ভারতের ব্যকুলতা কত তীব্র ছিল যে একটা ভাল সাফাই যুক্তি যোগাড় করতে না পারলেও বাংলাদেশে এমন ন্যাংটা হস্তক্ষেপের পক্ষে কথা বলতে সুজাতা কত ডেসপারেট ছিলেন।
    সুজাতা সিং সেসময়ের ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের মধ্যে শীর্ষ কূটনীতিক। এই শীর্ষ কূটনীতিকের এটা নিঃসন্দেহে তার করুণ দুর্দশার চিত্র। তিনি তার হস্তক্ষেপের কাজকে,এরশাদের সাথে মিটিংয়ের বক্তব্যের স্বপক্ষে পাবলিকলি কোন সাফাই হাজির করতে পারেন নাই। এর ফলে তাঁর কথা হয়ে গেছে এমন যে, বাংলাদেশের মানুষ যদি চায়ও বিএনপি-জামায়াতকে ভোট দেবে, নিজেদের প্রতিনিধি বলে নির্বাচন করবে তবু সুজাতার ভারত তা হতে দিতে পারে না। আচ্ছা, এটা কি কোনো অতিথি পররাষ্ট্র সচিব বলতে পারেন? সেটা কি বাংলাদেশের জনগণ কাকে নির্বাচন করবে, নেতা প্রতিনিধি মানবে এর বিরুদ্ধে সুজাতার সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং বাধা দেয়ার সফর ছিলো না? সম্ভবত সে জন্য এর পর থেকে তিনি আর কখনো বাংলাদেশে মিডিয়ার মুখোমুখি হননি।
    সেই থেকে এবারও ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের একই দুর্দশা দেখা যাচ্ছে। তারা তাদের বক্তব্যের পক্ষে এবারও র‍্যাশানালিটি বা যুক্তি-বুদ্ধি হাজির করতে পারছে না। তাদের সব যুক্তির প্রধান কথা সবসময় যা থাকে তা হচ্ছে, বাংলাদেশের “ইসলামি সন্ত্রাসবাদ বা তাদের উত্থান” – এই বিষয়ে তারা উদ্বিগ্ন। খুবই ভালো কথা। ফ্যাকটস হিসেবে ভারতের এমন উদ্বিগ্নতার পক্ষে সত্যতা আছে কি না সে তর্ক না তুলেই ভারতের উদ্বিগ্নতা স্বীকার করে নেয়া যাক।
    কিন্তু সে জন্য তারা বাংলাদেশের জনগণ কাকে ভোট দেবে তা কি ঠিক করে দিতে পারে? একটা হস্তক্ষেপের নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়াতে পারে? জনগণ কোন দলকে কোন নেতাকে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা তাতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে? ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের পছন্দের দল ও নেতার পক্ষে যদি জনমত না থাকে,তাদের পছন্দের নেত্রীর পাবলিক রেটিং যদি না থাকে তারপরও কি তাদের জিতিয়ে আনার পক্ষে কিছু করার সুযোগ থাকে?
    আমরা এখানে খুবই সাধারণ একটা প্রশ্ন তুলেছি। প্রশ্নটা হলো, ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের পছন্দের দল ও নেতার পক্ষে যদি জনমত না থাকে, নেত্রীর নিজ গুণেই যদি নিজেদের পাবলিক রেটিং ধরে রাখতে না পারেন, না থাকে তাহলে কি তারা বাংলাদেশে একটা হস্তক্ষেপবিহীন নির্বাচন হতে দেবে না? এসব বিষয় মোটেও কোনো বিশাল কিছু নয়। এসব প্রশ্ন তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ১৯৪১ সালে রুজভেল্ট-চার্চিলের বিখ্যাত আটলান্টা চার্টারে সমাধা হয়ে গেছে, সেকালেই। এটা এখনও যারা মানতে পারে না তারা নিশ্চয় এখনো কলোনি শাসনের পক্ষের লোক। অথচ সে সময়ই এটা দুনিয়াতে সমাধা হয়ে গেছিল যে, জনগণকে পছন্দের নেতা প্রতিনিধি নির্বাচন করতে না দেয়া, নেতা বেছে নিতে না দেয়া মারাত্মক অপরাধ। অন্য রাষ্ট্রের এমন কাজের কোনো অধিকারই নেই। ভিন রাষ্ট্র বা পড়শি রাষ্ট্র প্রতিবেশী দেশের নির্বাচিত কোনো নেতাকে বড় জোর প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু কোন নেতাকে নির্বাচিত হতে,বেছে নিতে জনগণকে কোনোক্রমেই বাধা দিতে পারে না। ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের একালে এমন অধপতিত দশায় পড়তে হয়েছে যে তারা প্রত্যক্ষ বাধা দিচ্ছেন। আবার তাদের কাজের পক্ষে যুক্তিবুদ্ধি সাজিয়েও দাঁড়াতে পারছেন না। খোলাখুলি হাসিনার গায়ের জোরের পক্ষে গিয়ে দাঁড়াতে হচ্ছে।
    তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গোড়ার সঙ্কট হলো, হাসিনার আওয়ামী লীগ পাবলিক রেটিং নেই। অথচ ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা সেই হাসিনার ওপর সব বাজি ধরে বসতে চান। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন একটা করিয়ে নিয়েছেন,কিন্তু শান্তি নেই। নতুন নির্বাচনের প্রয়োজন এটা এখন স্বীকার না করে পারছেন না। রা নির্বাচন না দিলে আরো বড় বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। ঘটনা পরিস্থিতি সেক্ষেত্রে হাতছুট হয়ে যেতে পারে সে সম্ভাবনার রিস্ক নিতে হবে।
    তাই লজ্জার মাথা খেয়ে আওয়ামী লীগ নিজেকেই মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামায়াতমুক্ত বিএনপির কথা পাড়তে হচ্ছে। অথচ বুঝতে চাইছেন না যে আওয়ামী লীগের মুখ দিয়ে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপির’ শর্ত আওড়ানোর কোনো মানে হয় না। কারণ এর মানে কী বিএনপি জামায়াতমুক্ত হলে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ক্ষমতা দেবে? ক্ষমতায় এনে দিবে? আর বিএনপি যদি জামাতমুক্ত না হয় তাহলে লীগ কোন ফেয়ার বা হস্তক্ষেপহীন নির্বাচন হতে দিবে না? এটাই কী ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের অবস্থান বক্তব্যের স্বপক্ষে যুক্তি? ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ কথাটার পক্ষে সাফাই?

    অন্য আর একদিক থেকে বললে, জামায়াতমুক্ত বিএনপির বাসনা অবশ্য আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের থাকতেই পারে – যদি সেটা তাদের বাসনা মাত্র হয়। কারণ আইনগতভাবে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’র শর্ত আরোপ করতে পারে জনগণ অনুসমর্থিত কনস্টিটিউশনাল একটা রেফারেন্ডাম। দেশের ভিতর কে কেমন পার্টি হবে এটা বিএনপির আওয়ামী লীগের উপর কিংবা আওয়ামী লীগের বিএনপির উপর আরোপ করার বিষয় নয়। ঠিক যেমন বিএনপি আওয়ামী লীগকে বা ভাইসভারসা কেউ কাউকে ক্ষমতায় আনতে পারে না,এমনটা অবাস্তব ঠিক তেমনই শর্ত দিতে কিংবা শর্ত পূরণ করলে তবেই অন্যকে ক্ষমতায় আনব এটাও অবাস্তব। অর্থহীন কথাবার্তা। এ ছাড়াও মনে রাখতে হবে এ বিষয়ে কথা বলার দিক থেকে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা কেউ না, কোনো পার্টিই নয়।
    এ কারণে বিএনপির কোনো নেতা অথবা কোনো সুশীল বুদ্ধিজীবী অথবা প্রথম আলোর উপসম্পাদকের মতো কোনো মিডিয়া কর্মী যখন এমন কথা ছড়ায় যে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ হতে হবে এটা হাস্যকর। অবাস্তব। এক্ষেত্রে তারা অবশ্যই আদতে আওয়ামী কর্মী না হলে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দার স্বার্থ পালনকারী।

    এখানে বলে রাখা ভাল, আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা “জামায়াতমুক্ত” অথবা “জামায়াত বিরোধিতা” এমন কথা বলে বা লিখে কেবল জামায়াত রাজনৈতিক দলকে বুঝায় না। তারা আসলে বুঝাতে চায় যেকোনো ইসলামি রাজনীতি বা রাজনীতির সমর্থক; এক কথায় বললে ইসলামি ফেনোমেনা বা পুরা ইসলামি কনস্টিটুয়েন্সি। এখন আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা তারা সবাই আসলে বুঝাতে চায় তারা বাংলাদেশে কোনো ইসলামিক রাজনৈতিক অভিপ্রকাশ, রাজনীতিতে কোনো ইসলামি ফেনোমেনা তারা দেখতে চায় না। যদি তাদের চাওয়াটা ন্যায্য বলে ধরেও নেই তবু এটা বাস্তবায়ন করার উপায় লীগ-বিএনপির এক দল অপর দলকে শর্ত দেয়া নয় বরং জনসমর্থিত (রেফারেন্ডাম বা তুল্য কোনো কিছুর মাধ্যমে) এমন একটা কনস্টিটিউশন হাজির করে তা নিশ্চিত করা। কারণ এক দল অন্য দলকে ক্ষমতায় আনার কেউ নয়। কোন রাজনীতি কে করতে পারবে তা একে অপরকে ডিকটেক্ট করার তারা পরস্পরকে বলার কেউ নয়।
    আবার বাংলাদেশে কোনো “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতি থাকতে পারবে না” আর বাংলাদেশে কোনো “ইসলামিক রাজনৈতিক অভিপ্রকাশ,রাজনীতিতে কোনো ইসলামি ফেনোমেনা থাকতে পারবে না” বলা এক কথা নয়। প্রথম বক্তব্যটা কনস্টিটিউশনে বলার পরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকতে পারে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু দ্বিতীয় বক্তব্যটার বেলায় ইসলামি নাম নিয়ে আইনত কিছুই থাকতে পারবে না। তবে অবশ্যই নাম না নিয়েও তা থেকে যাবে। কারণ আইন করে একটা রাজনৈতিক চিন্তাকে স্তব্ধ করা যায় না। আবার প্রথম কথাটা পড়শি ভারতসহ যেকোনো বিদেশী আশা করতে পারবে। মানে “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির” বিরুদ্ধে বলতে পারবে, আশা করতে পারবে। কিন্তু এরপরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকলে তা নিয়ে বলার ক্ষেত্রে বিদেশীরা কিছু বলার কেউ নয়।
    আমাদের এখানকার প্রসঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওপরের শেষ বাক্যটা। অর্থাৎ ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ বলে কিছু হবে কি না এ নিয়ে ভারতের কিছু বলার নেই। ভারত বলার কেউ নয়। ‘সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতি থাকতে পারবে না’ এমন ধরনের কথা বাংলাদেশের কনস্টিটিউশনে বলার পরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকতে পারে কোনো অসুবিধা নেই। আর এ নিয়ে ভারতের কথা বলার কোনো সুযোগ নেই।
    কিন্তু এসব আইনি সাংবিধানিক কাজের দিক দিয়ে না এগিয়ে আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের মুখ দিয়ে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপির’ কথা বলানো খুবই বিপজ্জনক। কারণ একটা কথা মনে রাখতে হবে, বাস্তবতা হলো, “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির” বিরুদ্ধে মেজরিটি মানুষের একটা কনসেনসাস জনমত আছে। জনমত জরিপেও সেটা প্রতিফলিত হবে। কিন্তু যদি বলা যায় “কোনো ইসলামি রাজনৈতিক দলই বা ফেনোমেনাই বাংলাদেশে থাকতে পারবে না” সে ক্ষেত্রে দেখা যাবে এই একই জনগোষ্ঠী বা জনমতের মেজরিটি উল্টো রায় দেবে। শুধু তাই নয়,চাপাচাপি করতে যাওয়ার জন্য নিজের দেশ ভূমি জমিতে ‘সন্ত্রাসবাদ’ দেখতে চায় না এর সপক্ষের মেজরিটির ঐকমত্যের জনমতটাও এরপর আর থাকবে না। হত্যা করা হবে।
    এ ছাড়া একটা কথা সুনির্দিষ্ট করে বলার সময় হয়েছে যে বাংলাদেশে ‘সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির’ হতে পারে বা থাকতে পারে এটা ভারতের স্বার্থের বা উদ্বিগ্নতার বিষয় নয়। ভারত বরং এসব বিষয়ে তত সিরিয়াস নয়। বিষয়টাও তত সিরিয়াস নয়। রাষ্ট্রের রুটিন তৎপরতাতে সেসব দিক নিয়ন্ত্রণ করে রাখা সম্ভব এবং তাই হচ্ছেই। বরং ভারতের সিরিয়াস প্রসঙ্গ হলো, ক. বিনা শুল্কে, বিনা বিনিয়োগে, বিনিয়োগের দায় না নিয়ে ট্রানজিট হাসিল করা খ. বাংলাদেশ চীনের সাথে অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সম্পর্কে কতটা পক্ষে বা দূরে থাকবে তা বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থে নির্ধারণ করার বদলে ভারতের স্বার্থে নির্ধারণ করতে বাধ্য করা। ভারত তার নিরাপত্তার উদ্বিগ্নতার কথা বলে এর আড়ালে এসব অর্থনৈতিক রাজনৈতিক স্বার্থ বাংলাদেশ থেকে হাসিল করতে জবরদস্তি করে চলছে। এ কাজে কোনো পাবলিক রেটিংয়ে দুর্বল রাজনৈতিক দলই তার জন্য বেশি উপযুক্ত। কারণ যত জনসমর্থন বেশি ভারতের কথা তত সে শুনবে না।

    দুই.
    গত এক সপ্তাহে খালেদা জিয়ার কথিত এক মন্তব্যকে নিয়ে দু’টি প্রপাগান্ডা রিপোর্ট বের হয়েছে। প্রথমটি ভারতের ‘দি হিন্দু’ (THE HINDU) পত্রিকার খোদ সম্পাদকীয়। দ্বিতীয়টি স্টাটফোর (STRATFOR) নামে আমেরিকান গোয়েন্দা ইনটেলিজেন্স পত্রিকার এনালাইসিস রিপোর্ট। দু’টি রিপোর্টের প্রসঙ্গ একই এবং এটা পরিষ্কার যে, ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের প্রভাবে এই রিপোর্ট দু’টি তৈরি। বাংলাদেশে তারা যে অবস্থান বা নীতিতে পরিচালিত সেই নীতির পক্ষে এ দুটোই প্রপাগান্ডা রিপোর্ট। হিন্দু সম্পাদকীয় বের হয়েছে ২৮ জুলাই আর স্টাটফোরেরটা বের হয়েছে ৩০ জুলাই। দু’টি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ‘খালেদা জিয়া নাকি নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসেছেন। ফলে তাতে নাকি বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।’

    হিন্দু দাবি করছে, ‘BNP’s decision to drop its demand for the formation of a caretaker government। আর স্টাটফোর দাবি করছে, Khaleda Zia has indicated that parts of the opposition might be willing to drop some of their demands — such as imposing a neutral caretaker government to oversee elections.
    প্রথমত তথ্য হিসেবে এটা মিথ্যা যে, খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ছেড়ে দিয়েছেন, বা সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত ২৫ জুলাই খালেদা জিয়া তার গুলশানের অফিসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইনজীবীদের সাথে সাক্ষাতের সময় নাকি এ কথা বলেছেন। বিডিনিউজ২৪ পত্রিকার রাজনৈতিক লাইন বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক লাইনের সবচেয়ে কাছাকাছি। ফলে এখানে পর্যবেক্ষণ হল, সরকার আর ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের কমন অবস্থানটাই সবচেয়ে ভালো প্রতিফলিত হয় এই পত্রিকার রিপোর্টে। সেই বিডিনিউজ ঐদিনের প্রসঙ্গে খালেদার কথা কী বুঝেছে তা দেখা যাক। বিডিনিউজ২৪ ইংরাজী শিরোনাম করেছে, Khaleda says fairness is the key, caretaker or no caretaker’। আর ভেতরে কোট আনকোট লিখছে, ‘It is not necessary that elections should be under a caretaker government. Whatever it is called, we want a neutral government to ensure free and fair elections’। এতটুকু পড়ে যে কারো নিশ্চিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট যে, খালেদা কেয়ারটেকারের দাবি ত্যাগ করেছেন এমন বুঝ এখান থেকে বের করার সুযোগ নেই। কারণ সারকথা হলো, খালেদা জিয়া ‘কেয়ারটেকার’ শব্দ নিয়ে আঁকড়ে বসে থেকে ঝোলাঝুলি না করে ‘হস্তক্ষেপবিহীন নির্বাচন’ দাবি তার মূল কথা এটাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। অর্থাৎ বিডিনিউজ অন্তত ভুল বা উল্টো বোঝেনি। তবু হিন্দু আর স্টাটফোর বুঝেছে।
    তবু কি আর করা যাবে এবার তাদের বোঝার যুক্তিবুদ্ধি বা লজিকটা কী তা পরখ করা যাক।

    খালেদা জিয়া কেয়ারটেকার দাবিটা যদি ত্যাগ করেই থাকেন তো সেটা ইতিবাচক বা তার মধ্যে আশার আলো দেখার কি আছে?
    গত দু-তিন বছরে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনগুলোর ন্যূনতম ফেয়ারনেস বা গ্রহণযোগ্যতা প্রসঙ্গে যদি এই দুই মিডিয়া রিপোর্টারের ধারণা না থাকে তবে বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের এমন সম্পাদকীয় বা বিশেষণ লেখার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সুতরাং ধরে নিতে হবে শেখ হাসিনার অধীনে যেকোনো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার গুরুতর সঙ্কট যে আছে এটা তারা জানেন। আর কে না জানে হাসিনার অধীনে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নেই এ জন্য নয় যে বিরোধীরা তাতে অংশগ্রহণ করেনি। অংশগ্রহণ করলেও সেখানে আরো মারাত্মক সঙ্কট আছে। সর্বশেষ ঢাকা সিটি নির্বাচন এর সাক্ষী যেখানে খোদ খালেদার গাড়িতে নিয়মিত আক্রমণ করতেও শেখ হাসিনা দ্বিধা করেনি। ভোট কারচুপির ডেস্পারেটনেস দেখার মতো। তাহলে এ অবস্থায় খালেদা কেয়ারটেকারের দাবি ছেড়ে দিয়েছে সুতরাং এটা ভালো খবর হিসেবে উদযাপন করা উচিত, তাই কী? তার মানে এই পত্রিকা দু’টি একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হওয়াটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না, গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন খালেদার কথিত কেয়ারটেকারের দাবি ছেড়ে দেয়া, এটাকে আবার তাদের ভালো এক ‘আপসরফাও’ মনে হয়।

    পত্রিকায় রিপোর্ট লিখতে গেলে ন্যূনতম কিছু এথিকসের ওপর দাঁড়াতেই হয়। একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে সব পত্রিকা দাঁড়াবে এটাও তো স্বাভাবিক। আমরা এখানে দেখছি পত্রিকা দুটো বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়ানো দরকার মনে করছে না। এর চেয়ে বরং না করে কথিত আপসরফা করে ফেললে আমাদেরকে খুশি হতে তাগিদ দিচ্ছে। পত্রিকা দুটো নিজেরাও দেখা যাচ্ছে এ খবরে খুশি হয়েছে। নির্বাচনটা এখন বিশ্বাসযোগ্য না হলেই বরং এই দুই পত্রিকা খুশি দেখা যাচ্ছে। এ কেমন খুশি? কেমন এথিকসবোধ?

    স্টাটফোরের নামে সম্প্রতিকালে দাগ লেগেছে। সম্প্রতি উইকিলিকস সিআইএর সাথে তাদের অনৈতিক যোগাযোগের ফাইল ফাঁস করে দিয়েছে। নইলে এর আগে এটা যথেষ্ট সম্মানজনক পত্রিকা ছিল। কিন্তু ‘হি্ন্দু’ (১৮৭৮ থেকে প্রকাশিত) মাদ্রাজ থেকে বের হওয়া প্রায় দেড় শ’ বছরের পুরানো ইংরেজি পত্রিকা। যেকোনো পত্রিকা তার দেশে-বিদেশের রিপোর্ট করতে গিয়ে তার সরকারের অবস্থান তাকে কাঁধে করে ঘুরতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, যদি না মনিকাঞ্চন বা অনুগ্রহ লাভের কোনো ব্যাপার না থাকে। এ ছাড়া এটা সম্ভবও নয়। কারণ সরকার অনেক সময় অনেক অবস্থান নেয় অনেক কারণে, অনেক স্বার্থে। এর সবগুলো সবসময় ওই পত্রিকারও স্বার্থ হবে এমন কোনো কারণ নেই। বরং না হওয়াই স্বাভাবিক। যেমন নিজের দেড় শ’ বছরের ইমেজ রাখার স্বার্থ আর আমলা-গোয়েন্দা বাহিনীর প্রপাগান্ডা রিপোর্ট এই দুই স্বার্থ স্ববিরোধী হতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে তা আত্মঘাতী হয়েছে।

    এক বিচারে ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা সফল যে তারা দুটো পত্রিকাকে তাদের প্রপাগান্ডায় শামিল করতে পেরেছে। এতে পত্রিকা দুটো যে এথিক্যাল সঙ্কটে জড়িয়ে গেছে এর দায় ক্ষতি তাদের নিজেদেরই বহন করতে হবে। তবে স্টাটফোর আবার হিন্দুর থেকে এককাঠি সরেস। স্টাটফোর দাবি করছে শেখ হাসিনা নাকি গত দু-তিন বছরে যা করেছেন এটা নাকি বিরোধী দল দমন নয়, সন্ত্রাসবাদ দমন। তাই যদি হয় তাহলে আবার খালেদার সাথে আলোচনা, কম্প্রোমাইজ এসবের মানে কি? যে সন্ত্রাসী তার সাথে আবার আলোচনা নিগোশিয়েশন কম্প্রোমাইজ কি হতে পারে? তাকে তো দমন ও নির্মূল করারই কথা। এই প্রশ্ন দেখা যাচ্ছে স্টাটফোরের মাথায় আসেনি। এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে একটা স্পেস ভাড়া দেয়ার রিপোর্ট তারা করছে এটা তাদের কাছেও পরিষ্কার।

    তাহলে, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামায়াতমুক্ত বিএনপি’র রাজনীতির অর্থ হলো এক আকাক্সক্ষা যে আশা করছে বিএনপি যেমন-তেমন এক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে আওয়ামী লীগকে পুনর্বার যেভাবে হোক বিজয়ী ঘোষণা করে দেয়ার জন্য। মানুষের আকাঙ্খার রকমফেরের আসলে কোনো শেষ নেই।

    [লেখাটার প্রথম ভার্সান সংক্ষিপ্ত আকারে আগে ছাপা হয়েছিল গত ০৯ আগষ্ট ২০১৫, মাসিক অন্যদিগন্ত পত্রিকায়। এখানে আবার নতুন করে লিখে, এডিট করে ছাপা হল।]

  • মমতার বাংলাদেশ সফর ও প্রত্যাশা

    মমতার বাংলাদেশ সফর ও প্রত্যাশা

    গৌতম দাস
    ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

    ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-9n

    mamota

    পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ঢাকা সফরে এসেছেন। এমন সময়ে তার আসা যখন আমরা বিরাট রাজনৈতিক সংকট, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। এই সংকটে ভারতের অবস্থান কোন দিকে এ’সম্পর্কে জানতে আমরা আগ্রহী, বিশেষত দিল্লি আর কলকাতার অবস্থানের ঐক্য ও পার্থক্য আমরা বুঝতে চাই। বলা বাহুল্য, এখানে ভুল করার বিশেষ কোন অবকাশ নাই যে মমতা একটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কোন প্রতিনিধি তিনি নন, প্রতিনিধিত্ব তিনি করছেনও না, করার সুযোগও নাই। তাহলে মমতার এই সফরের প্রয়োজন দেখা দিল কেন?
    এর দুটো দিক আছে। এক, হাসিনা সরকার কেন মমতার সফরে আগ্রহ দেখালেন? আর দুই, মমতা এই সফর কেন প্রয়োজন মনে করলেন? এই দুটো বিষয় নিয়ে আমরা এখানে কথা তুলব।
    বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্কের দিক থেকে বিচারে ভারতের কোন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা থাকতে পারে তবে দিল্লির নীতি নির্ধারক শক্তি হিসাবে মনেকরে তাকে গণনায় নেবার কোন কারণ নাই। না রাষ্ট্রীয় প্রটোকল হিসাবে না ব্যবহারিক সুবিধার কারণে। ভারতের যে কোন রাজ্য সরকারের সাথে আমাদের সৌজন্যমূলক সম্পর্ক থাকাটাই যথেষ্ট, কারণ খামাখা সম্পর্ক খারাপ করার কোন মানে হয় না। ভারতের কনষ্টিটিউশনে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক অনুসারে যেসব প্রাকৃতিক সম্পদ রাজ্যের ভাগে পড়েছে সে বিষয়ে কোন বৈদেশিক চুক্তির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে হলে রাজ্য সরকারের মতামতের সঙ্গে সমন্বয় করার বাধ্যবাধকতা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আছে। তবে আবার কোন বিদেশি কোম্পানীকে কারখানার জমি বরাদ্দ দেবার ক্ষেত্রে রাজ্যের ভুমিকাই প্রধান, কেন্দ্র সেই ক্ষেত্রে পিছনে। ইত্যাদি। কিন্তু বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজ্যগুলোকে নিয়েই যে ভারত ইউনিয়ন সেই সমগ্র ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করার এখতিয়ার একমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের। কেন্দ্রীয় সরকার কি করে রাজ্য সরকারকে নিজের প্রতিনিধিত্বের অধীনে আনবে সেটা নিশ্চিত করবার দায়ও কেন্দ্রীয় সরকারের। যেমন কেন্দ্রীয় সরকার নদীর পানি নিয়ে বাংলাদেশের সাথে কোন চুক্তি করার সময় রাজ্য সরকারকে কেমন করে দিল্লির সিদ্ধান্ত-বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করে সেটা তাদের ব্যাপার। আমাদের সাথে চুক্তি করতে আসবে কেন্দ্রীয় সরকার, তার দায়দায়িত্বও কেন্দ্রীয় সরকারের । তবে বুদ্ধিমানের মত “ইনফরমালি” আমাদের জেনে রাখা জরুরি ও ভাল যে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি রাজ্যের সম্মতি রয়েছে কিনা। ঐ সম্মতি সাথে নিয়ে কেন্দ্রের প্রতিনিধি এসেছেন কি না। অর্থাৎ ঐ ইস্যুতে ভারতের যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী-আমলা কথা বলতে এসেছেন ‘বাস্তবে’ তিনি রাজ্যেরও প্রতিনিধিত্ব সত্যিই করছেন কিনা সেটা আমাদের জানা থাকা দরকার। কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে কোন মতদ্বৈততা থাকতে পারে যা না জানলে দিল্লির সঙ্গে কোন বিষয়ে চুক্তি এক হাওয়াই চুক্তি হয়ে থেকে যেতে পারে। এমন রেকর্ডও আছে যেমন, কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী-আমলা জানতেন যে তারা রাজ্যকে সহমতে না নিয়েই বাংলাদেশে চুক্তি করতে আসছেন। তবু তারা এসেছেন আর আসার আগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে বলে এসেছেন যে চুক্তিটা হয়ে যাবার পরে আপনার আপত্তি আমাদের কেন্দ্রীয় সরকারকে জানিয়ে চিঠি দিলে আমরা এরপর চুক্তির বাস্তবায়ন না করে ফেলে রাখব। ফলে আপনার অসুবিধা হবে না। এতে সত্যমিথায় যাই থাকুক দিল্লি এটা করে এবং দুর্বল প্রতিবেশির সঙ্গে তাদের এ ধরনের অসৎ সম্পর্ক চর্চা অস্বাভাবিক কিছু নয় বাংলাদেশে এই বিশ্বাস বেশ প্রবল। গত তিস্তাচুক্তির সময় এমন কথা শোনা গেছিল। এরপর আমাদেরকে জানানো হল যে মমতার জন্যই নাকি ঐ চুক্তিটা হয় নাই। অথচ এটা তো আমাদের জানার বা শোনার কথা নয়। কারণ আমাদেরকে যদি এমন কথা শুনতেই হয় তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলে যারা আমাদের কাছে এসেছিলেন সেই মনমোহন সিং বা প্রণব মুখার্জি আসলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কেউ ছিলেন না, তারা প্রতিনিধি ছিলেন না। ভারতের প্রতিনিধিত্বের ম্যান্ডেট বাস্তবে তাদের ছিল না। সরকারে থেকেও তারা সরকারি নন। ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছিল যেন যার গোডাউনে মাল নাই অথবা যে মাল আছে সেটা তাঁর নিজের নয় সেই পার্টির সাথে পণ্য বিনিময় চুক্তি করতে গিয়েছিলাম আমরা। এই পরিস্থিতিতে আমরা কি দেখলাম? দেখলাম যে চুক্তি হতে গিয়েছে দিল্লির সঙ্গে, কিন্তু তার কোন খবর নাই, আর অন্যদিকে কলকাতার মুখ্যমন্ত্রীর সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, খাতির জমানোর চেষ্টা করতে থাকলাম। অর্থাৎ যেটা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দায় এবং কাজ উভয়ই আমরা নিজের কাঁধে নিলাম। সেই থেকে বাংলাদেশে কলকাতার মুখ্যমন্ত্রীর গুরুত্ব আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করেছি কিম্বা ভারতের রাজনীতিবিদরা আমাদের প্রতারিত করবার জন্য কি ধরনের ছুতা ব্যবহার করে তার বৈশিষ্ট্য ও মাত্রা সম্পর্কে আমাদের ভালই অভিজ্ঞতা হয়েছে।
    ভারতের এই কপট কূটনীতি প্রসঙ্গে আরও দুটো কথা বলা জরুরি। এমনিতেই হাসিনার এই ভারত-খাতিরের জমানায় আমরা ভারতের সাথে বাংলাদেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলো যেন কেবল তিস্তা আর ল্যান্ড বাউন্ডারির দুই ইস্যু সেই স্তরে নামিয়ে এনে দিয়েছিলাম। সীমান্ত হত্যা, বাকি নদীর পানি বন্টন ইত্যাদি আর কোন ইস্যু যেন আমাদের আর নাই। ওদিকে ল্যান্ড বাউন্ডারি – আমাদের সাধারণ্যের প্রচলিত ভাষায় ছিটমহল বিনিময় চুক্তি – তা মুলত ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরার মধ্যে সেকালে স্বাক্ষরিত হওয়া এক চুক্তি। ফলে সেকালের ঐ চুক্তিতেই তা শেষ হবার কথা। কিন্তু সেকালে চুক্তি একটা হয়েছিল বটে কিন্তু বাস্তবায়নের খবর আজও হয় নাই। অর্থাৎ আজও কাগজে কলমে মীমাংসিত বিষয়টা আসলে একটা অমীমাংসিত ইস্যু হয়ে আছে। ছিটমহল বিনিময় চুক্তির শর্ত অনুসারে দুই রাষ্ট্রের সংসদে ঐ স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুসম্মতি জানিয়ে অনুমোদন দেবার কথা ছিল। বাংলাদেশে আমরা তা সততার সঙ্গে করেছিলাম সেকালেই, কিন্তু ভারতের পার্লামেন্ট এখনও তা করেনি। আদালতে মামলা আছে এই অজুহাতে এখনও সেটা পেন্ডিং। যদিও ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে ঐ চুক্তি হতে পারে বলে রায় দিয়ে মামলা চূড়ান্ত নিস্পত্তি করে দিয়েছে গত ১৯৯৪ সালেই। সেই থেকে ইস্যুটা ঝুলে ছিল। এদিকে এখনকার পার্লামেন্টে চুক্তির বিপক্ষে দেওয়া আপত্তির যুক্তি বেশ অদ্ভুত। ভারতের বিগত পার্লামেন্টে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি বা মমতার দলের আপত্তি ছিল এরকম যে, যেহেতু এখানে সমান পরিমাণ ছিটমহলের জমি বিনিময় হবে না, ভারত কম পাবে তাই এই চুক্তি তারা পার্লামেন্টে পাশ করবে না। প্রথম ধাক্কায় শুনতে অনেকের মনে হতে পারে যে এই কথায় বোধহয় যুক্তি আছে। কিন্তু সে ধারণা ভিত্তিহীন। অল্পকথায় ভারতের সুপ্রীম কোর্ট চুক্তিটা হতে পারে বলে রায় দিয়েছিল ওর যুক্তিটা শুনলে আমরা বুঝব যে এসব কথা ঈর্ষাকাতর এক পেটি-মনের চিন্তা ও  ছলনা মাত্র।
    যেকোন আধুনিক রাষ্ট্রের গঠনের ভিত্তিগত ধারণা বা পিছনের চিন্তা হল, নতুন রাষ্ট্র ঘোষণা মানেই ওর ভুখণ্ডগত সীমারেখাসহ তা উল্লেখ করে তার ওপর ঐ রাষ্ট্রের সার্বভৌম এখতিয়ার ঘোষণা। পরবর্তিতে রাষ্ট্রের কোন নির্বাহী (প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী বা পার্লামেন্ট) ঐ ঘোষিত রাষ্ট্রীয় ভুখন্ডের কোন অংশ অন্য কোন রাষ্ট্রকে দিয়ে দিতে বা বিনিময় করার ক্ষমতা রাখে না। এই যুক্তিতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার ঐ চুক্তি অবৈধ এবং পার্লামেন্ট ঐ চুক্তির পক্ষে অনুসিদ্ধান্ত জানাতে পারে না বলে আদালতে মামলা করা হয়েছিল। এর বিপরীতে এই মামলা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে নিস্পত্তি করার যুক্তি হল – ঠিকভাবে দেখলে এটা ভারতের ভূখন্ড বাংলাদেশকে দিয়ে দেওয়া বা বিনিময় করার মত কোন চুক্তি নয়। মূলত এটা, ১৯৪৭ সালে তৎকালীন ভারত-পাকিস্তান দুটো আলাদা রাষ্ট্র গঠনের সময় উল্লেখিত ভুখণ্ডের কোন অদল-বদলও নয়। বরং চুক্তিটা হল, ঐ গঠন-ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ে সীমা চিহ্নিত করণের পর্যায়ে দীর্ঘকালীন বিষয়টি অমীমাংসিত ফেলে রাখা বিষয়ের মীমাংসা। অতএব এই চুক্তি হতে পারে। অর্থাৎ এটা মাঠ পর্যায়ে সীমা চিহ্নিত করণের মামলা মাত্র। কোন জমি অদলবদলের চুক্তি নয়।
    একই যুক্তিতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এখন একমাত্র সমান পরিমাণ জমির বিনিময়ই কেবল এই চুক্তি হতে পারে বা হতে হবে এমন কথার কোন ভিত্তি নাই। তাহলে বিনিময় বলা হচ্ছে কেন? কারণ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশ ঘেরা ভুখন্ডে অথবা বাংলাদেশের নাগরিকের বেলায় উলটা ভারতের ভুখন্ডে এই অবস্থায় আছে। ফলে উভয় পক্ষেই নাগরিকেরা নিজ নিজ মুল রাষ্ট্র ও ভুখন্ডের সাথে যুক্ত হবে তাই বিনিময় ধরণের একটা ধারণা এখানে প্রচলিত হয়েছে। কিন্তু আইনী ভাষায় এটা মূলত উভয় রাষ্ট্রের অমীমাংসিত সীমানা চিহ্নিত করণের মামলা। এখানে চিহ্নিতকরণের পরের হিসাবে কারও ভাগে জমি কম বেশি হতেই পারে। কিন্তু সেই হিসাবটা চুক্তির ভিত্তি নয়, সেটা চুক্তির জন্য কোন বিবেচ্য বিষয়ই নয়। অতএব ভারতের পার্লামেন্টের বিরোধীদের যুক্তি ভিত্তিহীন। এছাড়া বাংলাদেশের চোখে দেখলে, এটা মমতার বা তার রাজ্য সরকারের বিষয় নয়। এটা সমগ্র ভারতের প্রতিনিধিত্ত্ব করে বলে দাবিদার কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয়। তাদেরই আইনী বাধ্যবাধকতা। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার আপত্তি কি এটা শোনা বা দেখার দায়দায়িত্ত্ব আমাদের নয়। ফলে মমতার কাছে আমাদের দেনদরবার করার কোন যুক্তিই নাই। রাষ্ট্র হিসাবে আমরা চিনি কোন রাজ্য সরকার নয় কেবল কেন্দ্রীয় সরকারকে, যে ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করে দাবি করে আমাদের সাথে চুক্তি করতে আসে বা এসেছিল।
    দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা হল পানি চুক্তি, বিশেষ করে তিস্তা পানি চুক্তি। মমতাসহ যারা এই চুক্তির বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছিল তাদের যুক্তির প্রসঙ্গে যাব। এ প্রসঙ্গে প্রায়ই একটা কথা শুনতে পাই যে, নদীতে পানিই নাই ভারত দিবে কোথা থেকে। অথবা প্রাকৃতিক পানি এখন কমে আসছে তাই আমরা কতদুর কি করতে পারি। অথবা মমতার ক্লাসিক যুক্তি – তিস্তার পশ্চিমবঙ্গ অংশের অববাহিকা অঞ্চলের লোকেরাই চাষাবাদের পানি পাচ্ছে না, আমরা আর কি দিব। ইত্যাদি। অর্থাৎ পানি চুক্তির প্রসঙ্গটা যেন ভারতের প্রয়োজন মিটানোর পর আমাদের দিবার মত পানি থাকে কি না এর ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া এই “প্রয়োজন” কথাটাকে কি দিয়ে ব্যাখ্যা করব? বুঝব? পশ্চিমবঙ্গের মানুষের পানির ‘প্রয়োজন’-এর সীমা কিভাবে কোথায় টানব? মানুষের প্রয়োজনও অসীম। এখানে পুরা তর্কটাকে পর্যবসিত করা হয়েছে আগে পশ্চিমবঙ্গের “প্রয়োজন” মিটাতে হবে এরপর বাংলাদেশ। না থাকলে নাই। ভারতের দিক থেকে এটা একটা ম্যানেজমেন্টের প্রশ্ন। কিভাবে তারা তাদের “প্রয়োজনের” সমস্যাটাকে আগে মিটিয়ে নেবে তারপর বাংলাদেশের জন্য কি করতে পারে সেটা বিবেচনা করবে। অর্থাৎ ভারত সদয় পানিদাতা আর আমরা ঐ দাতার ভিক্ষাপ্রার্থী। আন্তরাষ্ট্রীয় কমন নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশ আমরা, উজানের দেশ ভারত পানি আটকে রেখে দিয়েছে আর আমরা তার ভিক্ষা প্রার্থী? তাই কি? আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের দেনাপাওনা ভিক্ষা বা দয়ার উপর দাঁড়ায় না। বিশেষত স্বার্থের প্রশ্নে দয়া বা ভিক্ষা চলে না। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি দয়াদাক্ষিণ্য প্রদর্শনে পর্যবসিত হয়।
    না আমরা মোটেই পানিভিক্ষাপ্রার্থী না। আন্তর্জাতিক নদী আইন বলছে, উজান দেশের মত ভাটির দেশও সমান কমন নদীর পানির ভাগীদার। এটা তার হক। এছাড়াও উজানের দেশ নদীর মুল ধারা থেকে খাল কেটে বা বাঁধ দিয়ে পানি সরিয়ে নিতে সে পারে না। তিস্তা নদীর ক্ষেত্রে নদীর সিকিম অংশে তাই করা হয়েছে। তাহলে দাঁড়ালো, পানি ভাগাভাগির আসল ভিত্তি হল, ভাটির দেশের হক ও অধিকার। উজানের দেশের কাছে সে পানির জন্য ভিক্ষাপ্রার্থী নয়। আগে উজানের দেশের পানির প্রয়োজন মিটানো এরপর যদি থাকে তবে বাংলাদেশ পাবে এই সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে দিল্লিকে দেয়া হয় নি, দেয় না। অতএব ভারতের পানির প্রয়োজন কত তা জানারও কোন প্রয়োজন আমাদের নাই। অথচ পানি ভাগাভাগির আলাপ উঠলেই ভাগের ভিত্তি কি এটা অস্পষ্ট থেকে যায়। ভাগের ভিত্তি কি তা অস্পষ্ট রেখে মিডিয়াসহ সব জায়গার আলাপ শুরু হয়ে যায় ভারতের প্রয়োজনের গল্প। আজ পর্যন্ত কোন পানির আলোচনায় পানি ভাগের ভিত্তি কি এনিয়ে কোন কথা আমরা শুনি নাই। সব খানে বয়ানটা হল ভারত পানির সদয় দাতা। আশা করি মমতার এই সফরেও আমরা এই একই গান শুনতে পাব। মমতা দির দয়ার ওপর তিস্তার পানি পাওয়া না পাওয়া নির্ভর করছে গণমাধ্যমগুলো এই বাজে তর্ক করে যাবে।

    দুই
    মমতার দিক থেকে তাঁর বাংলাদেশ সফরের তাগিদটা কি? আমার আগের লেখায় বলেছিলাম, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচন আগামি বছর ২০১৬ সালের মে মাসে। ইতোমধ্যে মমতা এক বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন। ৩৪ বছরের বামফ্রন্টকে পরাজিত করে গত ২০১১ সালে নির্বাচনে রাজ্য সরকার দখলের চেয়েও প্রভাবের দিক থেকে এটা আরো বড় বিপ্লব। বড় তার তাৎপর্য। কে কি ধরণের মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করে ভোটে জিতেন সেই ভোটারদেরকে বলা হয় কনস্টিটুয়েন্সী। আমরা এই ধারণাকে নামিয়ে ক্ষুদ্র করে অর্থ করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এমপি কোন এলাকা থেকে জিতে এসেছেন ঐ “এলাকার” অর্থে আমরা কনস্টিটুয়েন্সী শব্দটাকে নামিয়ে এনেছি। যদিও এর মূল অর্থ এমপি কাদের প্রতিনিধি, কোন ভোটাররা তাকে ভোট দিয়েছেন তারাই ঐ এমপির কনস্টিটুয়েন্সী – এটাই এর অর্থ।
    তো এই অর্থে মমতার দল তৃণমুলের মূল কনস্টিটুয়েন্সী এখন পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটাররা। যেখানে মুসলমান ভোটার মোট ভোটারের ২৮%। যারা এরআগে প্রথমে কংগ্রেস ও পরে বামফ্রন্টের ভোটার ছিল। এখন মমতার অবদান তিনি মুসলমান ভোটারদের মুসলমান হিসাবেই মুক্তি দিয়েছেন, তাদের এখন আর “সেকুলার” ভোটার বলে অকেজো ধারণার আড়ালে লুকানোর দরকার নাই। তারা যা তাই। পিছিয়ে পড়া দশা থেকে বের হতে তাঁরা এখন কেন্দ্র ও রাজ্যের রিসোর্স বরাদ্দে নিজের অংশ দাবি করতে পারে। আগামি দিনে কতদুর এর বাস্তবে পারবে কি দাঁড়াবে সেসব আলাদা প্রশ্ন। অর্থাৎ এসবের প্রতি রাজনৈতিক স্বীকৃতির প্রসঙ্গ এখন সামনে এসে গেছে। একধরণের রাজনৈতিক স্বীকৃতি এসেছে, এখন দেখার বিষয় অর্থনৈতিক অর্থে এটা কতটা কতদিনে বাস্তবায়িত হয়। মুসলমান ভোটারদের ইস্যু বাকি সব কলকাতা কেন্দ্রিক দল যেমন বিজেপি, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের জন্য বিরাট মাথাব্যাথার ইস্যু হয়ে গেছে।
    এর অর্থ বাকি ৭২% ভোট এখন তৃণমূল সহ চারটা দলের মধ্যে ভাগ হবে, ভোটের সংখ্যার এই সংখ্যাতত্ত্ব পশ্চিমবঙ্গের আগামি নির্বাচনে মূল নির্ধারক, মূল নির্বাচনি ইস্যু। এখান থেকেই দলগুলোর রাজনৈতিক বয়ানের ভিন্নতা এবং মিল। যেমন ইদানিং বিজেপি ও বামফ্রন্টের বয়ানের ফারাক খুজে পাওয়া মুশকিল হয়ে গেছে। কারণ এখন মূল বয়ান হতে হবে এন্টি-মুসলমান যেটা এন্টি-তৃণমূল হয়ে কাজ করবে, তৃণমূলকে কাটবে। কিন্তু সরাসরি এন্টি-মুসলমান বয়ান তো দেয়া যায় না, এতে সেকুলারদের সেকুলার জামা আর গায়ে থাকে না, আপনাতেই খুলে পড়ে। আবার ভারতের নির্বাচনী আইনে ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই বয়ানটা কিছুটা বদলে হয়েছে – আড়াল করতে করা হয়েছে ‘জঙ্গী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বয়ান’। জঙ্গী-সন্ত্রাসী মানেই তো মুসলমান এই সূত্রে। শুধু তাই নয় পড়শি বাংলাদেশ। বাংলাদেশ মানে একটা হিন্দু-মনের চোখে মুসলমান, হিন্দুর ‘অপর’ — এ ছাড়া কলকাতা ভিন্ন কিছু ভাবতে পারে তার প্রমাণ খুবই কম। আর কি! বাংলাদেশকে এটাতে জড়াতে পারলে বয়ান আরও পোক্ত হবে। ফলে এই হল, বাংলাদেশ-জঙ্গী-সন্ত্রাস বয়ানের সুত্র। মমতা বাদে বাকি তিন দলের আসন্ন নির্বাচনে প্রপাগান্ডার কৌশলও তাই মুসলমানদের কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে।
    মমতার বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীদের প্রচার। বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের সময় শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষী সেকুলারদের তুষ্ট করার চেষ্টা করবেন মমতা। কলকাতায় হিন্দুত্ববাদীদের প্রচারের বিপরীতে একদিকে মুসলমানদের ভোটের ক্ষেত্রে একচেটিয়া সমর্থন ধরে রাখা, অন্যদিকে বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষী সেকুলারদের সঙ্গে অতিরিক্ত মৈত্রী প্রদর্শন করে কলকাতার হিন্দুদের অভিমান হ্রাস করা — এই দোদুল্যমান রাজনীতি মমতা ব্যানার্জির। বাংলাদেশ সফরে নিজের ভাবমূর্তি ধরে রাখাই তার প্রধান উদ্দেশ্য। আমাদের ইমপ্রেস হবার কিছু নাই। এখনকার সফরে বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষী সেকুলারদের প্রতি তাঁর অতিরিক্ত আগ্রহ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বিরক্তি উৎপাদন করলেও পশ্চিম বঙ্গের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সহমর্মিতার প্রয়াস বাংলাদেশের জনগণ সমর্থন করবে। ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং ইসলাম বিদ্বেষী রাজনীতির বিপরীতে সীমান্তের দুই পাশের জনগণের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জি কী ভূমিকা রাখেন তা দেখার জন্য নজরে এই দেশের জনগণের আগ্রহ আছে।
    বর্ধমান জেলায় একটা বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল গত বছর অক্টোবরে। সেটা কাজে লাগিয়ে এই প্রপাগান্ডায় আলো-বাতাস লাগানো হয়েছে। ওদিকে সারদা কেলেঙ্কারি নামে এক অর্থ কেলেঙ্কারিতেও মমতার দল অভিযুক্ত হয়ে আছে। (সারদা কেলেঙ্কারি হল আমাদের ‘ডেসটিনি” কেলেঙ্কারির মত সমতুল্য ঘটনা।) এই দুইয়ে মিলে প্রপাগান্ডার গল্প জমিয়ে তোলা হয়েছে। এই গল্পকে আরও সুনিপুণ করতে বাংলাদেশের জামাতকেও টেনে আনা হয়েছে। যাতে মূলত এন্টি-মুসলমান ক্যাম্পেনটাকে জামাত-জঙ্গী-সন্ত্রাসী এসব শব্দের মোড়কে হাজির করা যায়। সেটা জায়েজ এমন একটা ন্যায্যতাও টানা যায়। জামাত পর্যন্ত প্রসঙ্গ টানা শুরুর কারিগর মূলত পশ্চিমবঙ্গ বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর। গত ২০১৪ মে মাসের কেন্দ্রীয় নির্বাচনের আগে নির্বাচন উপলক্ষ্যে কলকাতা বামফ্রন্টের প্রধান সমাবেশ থেকে তিনি এই বয়ান দিয়েছিলেন। মুসলমান কনস্টিটুয়েন্সী মমতার কাছে হারানোর দুঃখের তীব্রতা আমাদের এভাবেই তিনি জানিয়েছিলেন। তখনও বর্ধমান ইস্যু হাজির হয় নাই। পরে এই ইস্যু হাজির হলে বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি অমিত শাহ — যিনি পশ্চিমবঙ্গের আগামি নির্বাচনে দলকে জিতানোর মূল দায়িত্বে এখন আসীন — তিনি বিমান বসুর বয়ানটাকেই এবার বাড়তি আকার দেন। ফলে পশ্চিমবঙ্গে আগামি নির্বাচনে তখন থেকে অনেকবার উচ্চারিত শব্দ হয়েছে বাংলাদেশ, আগামিতেও থাকবে, নির্বাচন পর্যন্ত। কিন্তু অমিত শাহের এসব কারবারে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদী সরকার নিজেকে দূরে রাখতে চান। যদিও তার বিশ্বস্ত প্রধান অমিত শাহকে তিনিই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে দলকে ক্ষমতাসীন করার এসাইমেন্ট সঁপেছেন। তবু নিজের হাত ধুয়ে রাখতে, আর তা রেকর্ডে রাখতে মোদী ইতোমধ্যেই ভারতীয় পার্লামেন্টে নিজের এক মন্ত্রীর লিখিত বিবৃতি পাঠ করিয়ে পরিস্কার করেছেন যে, বাংলাদেশ-বর্ধমান-সারদা ইস্যু এসব মিলিয়ে যে বয়ান তার পক্ষে  তদন্তকারি গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ এর রিপোর্টে প্রমাণ করার মত তথ্য মিলেনি। অমিত শাহ ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসন, র কে আর সেই সাথে এনআইএ-এর বাংলাদেশ সফর, পালটা বাংলাদেশ থেকেও আমাদের গোয়েন্দাদের সফর ইত্যাদিতে প্রশাসন পর্যায়ে অনেকদুর ব্যবহার করেছেন। মোদী সরকারের বিবৃতির পরে তবুও পশ্চিমবঙ্গ পর্যায়ে প্রপাগান্ডা এখনও একই রকম রয়ে গেছে। কারণ জঙ্গী-সন্ত্রাসের ভীতিটা রয়েই গেছে।

    মমতার প্রত্যাশা
    এই পটভুমিতেই মমতা বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি কি চাইবেন হাসিনার কাছে?
    মমতা চাইবেন, হাসিনা যেন পশ্চিমবঙ্গের চলতি নির্বাচনী প্রপাগান্ডার লড়াইয়ে, বাংলাদেশকে জড়িয়ে যে জঙ্গী-সন্ত্রাসের বয়ান চলছে একে পরিপুষ্ট না করেন। হাসিনা নিজে এমন কোন বয়ান যোগ না করেন যেটা এই বয়ানকে পরিপুষ্ট করে। বরং বাংলাদেশের নাম যতই উঠুক তিনি যেন এটা ভারতের এক আঞ্চলিক এবং একেবারেই নির্বাচনী রেঠরিক সেদিক থেকে দেখেন। যার বিপরীতে কলকাতার বয়ানের বিরুদ্ধে যায় হাসিনার নিজস্ব পালটা বয়ানে যদি তেমন কিছু হাসিনা যোগ করতে রাজি হন তাহলে সেটা মমতার চরম পাওয়া হবে। আর যদি তা না-ই পারেন, তবে যেন চুপ থাকেন, তাহলেও মমতার জন্য এটা ভাল কাজে লাগবে। এই হবে মমতার চাওয়া। এটাই তার বাংলাদেশ সফরের মুল উদ্দেশ্য। অবশ্য সেটা যাই হোক এই সফর থেকে একটা বাড়তি সুবিধা তিনি পাবেন। মমতা যে বাংলাদেশ থেকে “যাওয়া” জঙ্গী সন্ত্রাসীর আশ্রয় প্রশ্রয় দেবার নেত্রী নন — যে প্রপাগান্ডা কলকাতায় তাঁর বিরোধীরা জারি রেখেছে – তার প্রমাণ তিনি এবার করতে পারবেন। সেটা হবে এরকম যে, তিনি বাংলাদেশ সফরে এসেছেন এবং হাসিনার দ্বারা ভাল আপ্যায়িত হয়েছেন। তিনি জঙ্গী সন্ত্রাসীর আশ্রয় প্রশ্রয়দাত্রী হলে কি এই মর্যাদা পেতেন!
    কিন্তু মমতা যেভাবে যা চাইবেন তাই হাসিনা দিবেন এমন কোন কারণ নাই। তাহলে হাসিনা কিসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিবেন? তাঁর সিদ্ধান্ত নিবার ভিত্তি হবে মমতা কি দিতে পারেন যা তার ক্ষমতাকে পোক্ত করতে কাজে লাগতে পারে। হাসিনার সরকারের পক্ষে মোদীর সমর্থন আনার ক্ষেত্রে মমতা সঠিক লোক নন, বরং উলটা। তবে তিস্তার পানি বা ল্যান্ড বাউন্ডারি ইস্যুতে তিনি আপত্তি করবেন না এমন ধারণা মমতা ঘোষণা করতে পারেন। যদিও এমন ঘোষণা মানেই এগুলো সরাসরি বাংলাদেশের পেয়ে যাওয়া নয়। যদিও ল্যান্ড বাউন্ডারি ইস্যু আগামি ২৩ মার্চের মধ্যে ভারতের পার্লামেন্টে চুড়ান্ত হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে এবং তা মোদীর ক্রেডিটে আসবে। তার চেয়েও বড় কথা হাসিনার কাছে এর মূল্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে সরাসরি তাকে সাহায্য করে এমন কোন ইস্যু নয়। বাংলাদেশের চলতি সংকটের যাত্রায় যদি হাসিনা ক্ষমতায় টিকে যেতে পারেন তবে এরপরে হয়ত প্রপাগান্ডায় এটা তাঁর কাজে লাগতে পারে। সারকথায় মমতা যা দিতে পারেন তা হাসিনার চলতি ক্ষমতা-সংকটকে সরাসরি সাহায্য করতে পারে এমন কিছু নয়। ফলে মমতার অফার হাসিনার জন্য বড়জোর অপ্রত্যক্ষ এক সুবিধা মাত্র। আগামিতে কাজে দিবে এমন। এধরণের বিচারের প্রেক্ষিত থেকে হাসিনার সিদ্ধান্ত পরিচালিত হবে বলে অনুমান করা যায়। এই সফরের বাকিটা হবে হাসিনা ও মমতার উভয়ের জন্যই শো-আপ এর লাভালাভ।
    ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫।
    [এই লেখাটা গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার সামান্য এডিট করে ছাপা হল।]

  • বাংলাদেশে গণতন্ত্রঃ দিল্লি-ওয়াশিংটনের নতুন সম্পর্কের আলোকে

    বাংলাদেশে গণতন্ত্রঃ দিল্লি-ওয়াশিংটনের নতুন সম্পর্কের আলোকে

    গৌতম দাস

    ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-99

    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ phil reiner

    যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র পরিচালক ফিল রেইনার (Phil Reiner) গত ০৩ ফেব্রুয়ারি এক প্রেস কনফারেন্স আয়োজন করেছিলেন। বিষয় ছিল সদ্য সমাপ্ত ওবামার ভারত সফর সম্পর্কে প্রেসকে অবহিত করা। ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস ২৬ জানুয়ারি। এ বছরের প্রজাতন্ত্র দিবস অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসাবে ওবামা ২৫-২৭ জানুয়ারি ভারত সফরে এসেছিলেন। ফিল রেইনার ওবামার ভারত সফরে সঙ্গী ছিলেন। ঐ প্রেস কনফারেন্স ছিল মূলত ভারত সফরে ওবামার দিক থেকে নিজের তাৎপর্য বিশেষত অর্জনগুলো তুলে ধরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ স্টেটের ওয়েবসাইটে রেইনারের প্রেস কনফারেন্সটিকে সেই ভাবেই পেশ করা হয়েছে। (আগের লিঙ্কে দেখুন, From President Obama’s Trip to India: Perspectives on U.S.-India Relations।
    গত কংগ্রেস সরকারের শেষ তিন বছর ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ক্রমশ অমীমাংসিত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিরোধে জড়িয়ে স্থবির হয়ে পড়েছিল। এসব বিরোধগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ইস্যুতে বিশেষত বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে ঘিরে উভয়ের বিরোধ আরও প্রকাশ্য ও চরমে উঠেছিল। জানুয়ারি ২০১৪ সফরটা ছিল স্বল্প সময়ের মধ্যে ওবামা-মোদীর দ্বিতীয় মুলাকাত। গতবছর মে মাসে ভারতের নির্বাচনের ফলাফলে মোদীর জয়লাভ ও সরকার গঠনকে ভারত এবং আমেরিকা উভয়েই তাদের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে বিরোধ মিটানোর উপায় হিসাবে দেখেছিল। কারণ উভয়ে অনুভব করছিল যে সম্পর্ক স্থবির রাখাতে উভয়েই ভালোরকম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ফলে মোদীর দিক থেকে আটমাসের সরকারের সাফল্য হল, দ্রুততর সময়ে বিরোধ নিষ্পত্তি। সেখানে ওবামা-মোদীর নানান দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের প্রসঙ্গে আলাপের সময় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছিল।

    ফিল রেইনার এর প্রেস কনফারেন্সের খবরটা আমাদের মিডিয়ায় প্রচার হতে শুরু হয়েছিল গত সপ্তাহে, ৪ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে। খবরটা হল, গত মাসের শেষে ওবামার ভারত সফরে ওবামা-মোদী দুজনের আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছিল। আসারই কথা, এটা অনুমান করা খুব কষ্টকল্পিত কিছু ছিল না। কিন্তু তাদের আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছে ব্যাপারটা তথ্য হিসাবে কোন সংবাদপত্রে আসা এক কথা আর যেচে তার প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি ভিন্ন। শেষেরটা অবশ্যই কষ্টকল্পিত। যদিও ভারত অথবা আমেরিকার দিক থেকে এই স্বীকারোক্তি দেয়া বা না দেয়াটা খুব জরুরি নয়। এমনকি ভারত-আমেরিকার শীর্ষ আলাপে ভিন্ন দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে মন্তব্য রেওয়াজ সম্মতও নয় বলে কেউই এ বিষয়ে তেমন কিছু প্রকাশ্যে আশা করে নাই। ফলে বাংলাদেশ বিষয়ে কোন কথা হয়ে থাকলে সেক্ষেত্রে হয়ত আমরা ভারত বা আমেরিকার সরকারি ভাবে না, বরং শুনতাম বড়জোর কোন অনুসন্ধানী দেশি বা বিদেশি মিডিয়া কর্মীর বিশেষ রিপোর্ট থেকে। এভাবেই কূটনৈতিক বিষয়গুলো প্রকাশিত হওয়া রেওয়াজ।

    কিন্তু আমরা ব্যতিক্রম দেখছি। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র পরিচালক ফিল রেইনার না চাইতে বৃষ্টির মত অনেক তথ্য আমাদের ঢেলে দিয়ে জানাচ্ছেন, যার মধ্যে বাংলাদেশ প্রসঙ্গও আছে। লক্ষ্য করার মত বিষয় হল, তিনি প্রেসিডেন্টের হোয়াট হাউস অথবা স্টেট বা পররাষ্ট্র ডিপার্টমেন্টের নেহায়েতই কোন মুখপাত্র নন। অর্থাৎ আমেরিকা তার স্টেট ডিপার্টমেন্টের কোন মুখপাত্রের মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ বা প্রচার করতে চাইছেন না। সাদামাটা রুটিনের বদলে চাইছেন এই প্রকাশ ও প্রচার গুরুত্ব পাক। তাই বক্তব্য এসেছে একজন একজিকিউটিভ কর্মকর্তার মুখ দিয়ে। ফিল রেইনার মিডিয়াতে এসে অনেক প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিচ্ছেন। এটাও একটা ব্যতিক্রম। যেমন “বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ হয়েছে কি না” । এই তথ্য বড়জোর মিডিয়া কর্মীর মাধ্যমে প্রকাশ্যে এলেই যেখানে যথেষ্ট হত। তা ছাড়িয়ে — অফিসের মুখপাত্রও না — একেবারে আমেরিকার দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের এক পরিচালকের মুখ দিয়ে প্রকাশ করা হল। এখানে কেবল একটাই স্বাভাবিক অথবা বলা যেতে পারে দৃশ্যমান ছুতা: সদ্য সমাপ্ত ওবামার ভারত সফরে তাঁর অর্জন প্রেসকে অবহিত করা। এখানে ইংরেজি ‘রিড আঊট’ কথাটা ‘তাৎপর্য “অর্জন” ইত্যাদি অনুবাদে সতর্কভাবেই ব্যবহার করতে হচ্ছে কারণ এটা আমেরিকার দিক থেকে শুধু বিরাট অর্জনই নয়, ওবামার এই সফরকে রেইনার ‘গেম চেঞ্জিং’ বলে উল্লেখ করেছেন।
    অর্থাৎ পাশা খেলায় দান বা চাল দিয়ে খেলার অভিমুখ উলটানোর মত ঘটনা। তা সেটা ছিল অবশ্যই। অনেক মিডিয়াতেও এই শব্দটাই ব্যবহার করা হয়েছে। সে প্রসঙ্গের বিস্তারে এখানে যাব না। তবে ঐ প্রেস কনফারেন্স বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এসেছিল অবশ্য সাইড টক হিসাবে। তবু সেই “সাইড টকের” প্রসঙ্গেই ফিল রেইনার অনেক বেশি লম্বা সময় ব্যয় করেছেন। আর সেসব কথা বলতে গিয়ে ফিল রেইনার অনেকটা যেচে বাড়তি তথ্য দিয়েছেন।
    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশের প্রতি মার্কিন নীতি বুঝতে হলে সরকারী ভাষ্যগুলো সরাসরি ইংরেজিতে মূল দলিলে পড়াই ভাল। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের অনুবাদ বা ব্যাখ্যা নয়। মুল মানে অরিজিনাল ইংরাজি হুবহু বক্তব্য পাঠ করার পিছনে আরও একটা কারণ আছে। মানবজমিন তাদের প্রতিবেদনে “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” বলে একটা কথার অনুবাদ যেভাবে ব্যবহার করেছে তাতে বিভ্রান্তির সুযোগ আছে। ফিল রাইনার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” মানে ইংরাজিতে “পারটিসিপেটরি ইলেকশন” বা “অল পার্টি ইলেকশন” ধরণের কোন কথা বলেন নাই। বরং তাঁর বক্তব্যে তিনি কখনও “ডেমোক্রাটিক প্রসেস” আবার কখনও “ডেমোক্রাটিক ফোর্স” শব্দ ব্যবহার করেছেন । অর্থাৎ তিনি গণতন্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করে ওর শক্তি দেখিয়ে -এই পথে দেশি-বিদেশি সবার অন্তর্ভুক্তির তাগিদ নিয়ে আগাতে চান। যাতে আওয়ামি লীগ, বিএনপিসহ কোন ‘গণতান্ত্রিক’ পক্ষ বাদ না পড়ে। আবার ওদিকে ভারত ও আমেরিকাও ঐক্যমত্যে আসতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে মানবজমিন এটাকেই তার পাঠকের জন্য “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” বলে অনুবাদ করেছে। গণতন্ত্রিক ব্যবস্থা চালু আর ওর শক্তি দেখানোর কথা বলে আসলে ফিল রাইনার বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির মত নির্বাচনকে ভারতের সমর্থন করার সমালোচনা করেছেন। নিজ দেশে কোন দলকে কায়দা করে নির্বাচনে জিতিয়ে আনার কথা ভারত যেমন ভাবতেই পারবে না সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশে একটি দলকে ভারতের জিতিয়ে আনার কথাও ভাবা যায় না। কিন্তু এ ধরনের নীতি দিল্লি নিল কি করে? এই দিকটা নিয়ে ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রশংসা করে আর এর সাথে তুলনা করে ফিল রেইনার প্রকারান্তরে বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির মত নির্বাচনের প্রতি ভারতের সমর্থন করারই সমালোচনা করেছেন। আবার “ডেমোক্রাটিক প্রসেস” বা “ডেমোক্রাটিক ফোর্স” এর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবার আহ্বান জানিয়ে ভারত-আমেরিকার ঐকমত্যের ভিত্তি দাঁড় করাতে চাইছেন। ফিল রেইনার বলছেন,
    “আমি একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি, প্রেসিডেন্ট ওবামা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেছি, যেটি একটি উদাহরণ। আমরা সাম্প্রতিক শ্রীলংকায়ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেছি। নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা উত্তেজনাপূর্ণ। এ সফরে দুই নেতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শক্তি ও নাগরিক শক্তির যে উত্থান হয়েছে তাতে একমত পোষণ করেছেন। আমরা বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই নেতার মধ্যে এখনও আলোচনা অব্যাহত আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন”। (দেখুন, মানব জমিন, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)
    অনেক লম্বা বক্তব্য। আর এতে প্রথমেই তার বক্তব্য নিবদ্ধ করেছেন “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” শব্দ দিয়ে। অর্থাৎ বাংলাদেশে যে সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” হয়নি – কথা সেদিক নিবার প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। সাধারণভাবে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বিভিন্ন দেশের “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের” উদাহরণ তুলে তিনি বলতে চেয়েছেন ভারত ও শ্রীলঙ্কায় “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়নি।

    ফিল রেইনারের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে প্রসঙ্গ করার আর এক তাৎপর্য আছে। বাংলাদেশে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার আর ওবামা সরকারের মধ্যে বড় ধরণের প্রকাশ্য বিরোধ দেখা দেয়। সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রশ্নে আমেরিকা পক্ষে আর ভারত বিপক্ষে অবস্থান প্রকাশ করে। শুধু তাই না ভারতের এই অবস্থানের প্রাকটিক্যাল মানে হল, হাসিনার পাবলিক রেটিং যত নিচেই হোক, নির্বাচনের নামে যা হয় হোক, বাংলাদেশের মানুষ কাকে ভোট দিতে চায় তাতেও ভারতের কিছুই আসে যায় না, যে কোনো উছিলায় দিল্লি আওয়ামী লীগকেই আবার ক্ষমতায় দেখতে চায়। রেইনার সম্ভবত সেকথা স্মরণ করে আমাদের জানালেন যে, এসব নিয়ে ভারত-আমেরিকার বিরোধ আগে যে জায়গায়ই থাক এবারের মোদী-ওবামা আলোচনায় ভারত-আমেরিকার নীতি ও স্বার্থ বিষয়ে পুরানা অনেক বিরোধে এলোমেলো সংঘাতময় অবস্থান এবার ইস্ত্রি করে সোজা করা হয়েছে। সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” এই কমন নীতিগত অবস্থান তেমনি একটা। কিন্তু রেইনার এখানেও থামেন নাই। আরও বাড়তি বলছেন, “বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিটিকে (দুটি দেশ) অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে” নিয়েছেন। অর্থাৎ অতীতের সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে এখন ভারত-আমেরিকা একমত হয়েছে শুধু তাই নয়, বরং ঐ ভুয়া নির্বাচনের পরিণতিতে বাংলাদেশের বর্তমান “অস্থিতিশীল পরিস্থিতির” দিকেও তারা নজর রেখেছেন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল শেষ বাক্য –“বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই নেতার মধ্যে এখনও আলোচনা অব্যাহত আছে”। অর্থাৎ তাদের অতীতের গুরুতর অনৈক্য ঘটে যাওয়া বিষয়ে এখন শুধু ঐকমত্য প্রকাশ করা নয়, বরং এখন সেই ঐকমত্যের বাস্তবায়ন বা কারেকশনের জন্য তারা কাজ করে যাচ্ছেন।

    যেচে এসে ফিল রেইনারের এসব তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের আর এক উদ্দেশ্য সম্ভবত আছে। বাংলাদেশ নীতি প্রশ্নে আমেরিকা-ভারতের অবস্থানের সংঘাত ২০১১ সাল থেকে। এরপর সেই স্বার্থ বিরোধ ২০১৩ সালে এসে চরম স্থবির অবস্থায় পড়ার কথা আমরা সবাই জানতাম। এই স্থবির দশা এরপর কোনদিকে যাবে আদৌ কোনো দিকে যাবে কিনা, নাকি কতদিন এমনই দিশাহীন পড়ে থাকবে এসব কেউ জানত না। পরবর্তিতে ২০১৪ সালের মে মাসে মোদীর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নির্বাচিত হয়ে আসা, আর আস্তে আস্তে ভারত-আমেরিকার পুরান স্থবির বিরোধের ঝাঁপি খুলে দেখতে দেখতে এটা ছিল মোদী-ওবামার খুবই স্বল্প সময় মাত্র সাড়ে তিন মাসের মধ্যে মোদীর দ্বিতীয়বার ওবামার সাথে সাক্ষাত। এর আগের লেখায় বলেছিলাম, ভারত-আমেরিকার বিরোধ যতটা না ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস সরকার ও রাজনীতিবিদের এর চেয়ে সম্ভবত আরও বেশি আমেরিকার সাথে ভারতের গোয়েন্দা-আমলার পর্যায়ের বিরোধ। এপ্রসঙ্গে আমরা আমেরিকায় ভারতের কূটনৈতিক দেবযানী খেবড়াগোড়া কাহিনী আর এর পালটা ভারতে আমেরিকান কূটনীতিকদের বিশেষ সুবিধা কেড়ে নেওয়া এমনকি নিরাপত্তা কমিয়ে দেওয়ার বিষয়টা স্মরণ করতে পারি।
    ভারতের ২০১৪ নির্বাচনের আগে এবং পরে বহুবার আমরা বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ কে বলতে শুনেছি যে ভারতের নির্বাচনের ফলাফলে কংগ্রেস-ভিন্ন অন্য দলের বিজয়ে সরকার বদল হলেও ভারতের বৈদেশিক নীতিতে এর প্রভাব পড়ে না, বদল হয় না, হবে না। একথার অর্থ আরও পরিষ্কার করে তিনি গত জুন ২০১৪ সালে অর্থাৎ মোদীর জয়লাভে প্রধানমন্ত্রীত্ব নিবার পরেও বলেছিলেন, বাংলাদেশে “০৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রয়োজনে। আমরা ঐ ইস্যু এখন আর আবার ফিরে মূল্যায়ন করতে চাই না কারণ এখন এজেন্ডা ভিন্ন হয়ে গেছে”।( About the January 5 elections, Pankaj Saran said that was a constitutional requirement. “I do not see that issue will be revisited today because today the agenda is different.” – ১৫ জুন ২০১৪ ঢাকা ট্রিবিউন।)
    পঙ্কজ শরণের এমন কথার অর্থ কি? এর মুল উদ্দেশ্য হাসিনাকে সাহায্য করা এভাবে যে, কংগ্রেস সরকার আবার জিতে না আসতে পারছেনা টের পেয়ে যাতে হাসিনার কর্মি-সমর্থক নিজের নিজের ভাগ্য গুছাতে হাসিনাকে ফেলে কেটে না পড়ে। বলাবাহুল্য এটা একজন হাইকমিশনারের সীমাছাড়ানি কাজ । পঙ্কজের বাড়াবাড়ি। অথচ পঙ্কজ জানেন, একদিকে ভারত-আমেরিকার সামগ্রিক সম্পর্ক স্থবির হয়ে আছে, বাংলাদেশ নীতিতে উভয়ে দুই মেরুতে আছে, পরবর্তীতে এই সম্পর্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যু উভয়পক্ষের জন্য এক জায়গায় আসা জরুরি এই তাগিদ আছে। সেটা আদৌ হবে অথবা হবে না তার কোন দিশা নাই। অন্যদিকে মে মাসের ২০১৪ সালেই ভারতের নতুন দল ক্ষমতায় এসেছে। নির্বাচনের আগেথেকেই জানা যাচ্ছিল নতুন প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রায়োরিটি ও এজেন্ডা কংগ্রেস থেকে একেবারেই আলাদা হবে। নতুন প্রধানমন্ত্রী মোদী আমেরিকার সঙ্গে ভারতের নিজস্ব অমীমাংসিত ইস্যুগুলো (এবং এরই ফাঁকে বাংলাদেশ নীতিতে বিরোধ) নিয়ে ভারতের নিজের কারণেও নতুন করে সমাধানে উদ্যোগী হতে বাধ্য । ফলে তা কোনদিকে মোড় নিয়ে কিভাবে কোথায় গিয়ে দাড়ায়, ঐক্যমত্যে আসে কি না সেসব আগাম অনুমান করা কঠিন। কিন্তু সে যাই হোক পঙ্কজ শরণ এর জন্য অপেক্ষা করতে একেবারেই রাজি নন। তিনি আগেই হাসিনার সমর্থকদের চাঙ্গা করে রাখতে চান। সেজন্য আগেই নিজ দায়িত্বে জবরদস্তিতে ঘোষণা দিয়ে রাখলেন যে মোদী প্রধানমন্ত্রী হলেও তাতে ভারতের নীতিতে কোন বদল হবে না, ভারত যেভাবেই হোক হাসিনাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষেই থাকবে, ইত্যাদি। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ভারতের গোয়েন্দা-আমলা যতই শক্তিশালী হোক না কেন রাজনীতিকরাই শেষ কথা বলার ক্ষমতা রাখেন এবং এটা আইনি, আমলাদের বিজনেস রুল ও রেওয়াজের দিক থেকেও সত্য। ভারতের গোয়েন্দা-আমলারাও এটা মেনে চলতে অভ্যস্ত। তবু পঙ্কজ যেন কি বিশেষ কারণে মরিয়া। তিনি ধরেই নিতে চান এবং প্রমাণ করতে চান নতুন দলের প্রধানমন্ত্রী মোদী আমেরিকার সাথে স্থবির অমীমাংসিত ইস্যুতে যাই করেন, যেভাবে নতুন আকার দেন না কেন তা পঙ্কজ তথা গোয়েন্দা-আমলাদের হিসাব, পথ ও কথা না শুনে মোদী করতে পারবেন না। যেন করতে দেয়া হবে না। এককথায় বললে, এটা রাজনীতিবিদদের উপর আমলাদের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার বালখিল্য ধারণা প্রসূত এক কল্পনা। রাজনীতিবিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য খোলা স্পেস ছেড়ে না দিয়ে উলটা তাদের নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা।
    বালখিল্য ওমন কাজের ফলাফলেই কি ইতোমধ্যেই মোদীর হাতে সচিব পর্যায়ের তিনজনের বাধ্যতামূলক অপসারণ? এমন মনে করার কারণ আছে। যাই হোক আপাতত আমাদের প্রসঙ্গের দিক থেকে এসবের সারকথা হল, গোয়েন্দা-আমলা বিশেষত সুজাতা সিং বা পঙ্কজ শরণ ধরণের ব্যক্তিত্বের মনোভাব এবং ভারতের বিদেশনীতিতে সাধারণ ভাবে গোয়েন্দা-আমলাদের প্রভাবের একটা ফলাফল হল মোদী ক্ষমতায় আসার পর দিল্লী তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে কী ধরণের সম্পর্ক রচনা করতে চায় সেই বিষয়ে অ্নিশ্চয়তা। দৃশ্যত মোদী কংগ্রেসের চেয়ে আলাদা এবং নতুন এজেন্ডা নিয়ে আবির্ভূত হাজির। সাড়ে তিন মাসের মধ্যে দু’বার ওবামার সঙ্গে সাক্ষাত করে এক নতুন নীতিগত ঐক্যমত্যের আবহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি নীতিতে ভারত-আমেরিকা কোন ঐকমত্যে আসতে পেরেছে কি না সেটা এরপরও বোঝা যাচ্ছিল না। বিশেষত সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে। যদিও বোঝা যাচ্ছিল তাঁরা একটা একমতে এসেছেন সে ব্যাপারে বেশ কিছু আলামত দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে এতদিন নিশ্চিত হয়ে কেউই কিছু বলতে পারছিলেন না। পুরানা এক ষ্টেলমেট পরিস্থিতিই বিরাজ করছিল। কোনদিকে নড়াচড়া করছিল না। এমনকি গত ২৬ জানুয়ারি ওবামা-মোদীর মধ্যে এইসব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করলেও এর কোন ছাপ অন্তত বাংলাদেশে পড়ছিল না। দৃশ্যমান হচ্ছিল না। ফিল রেইনার যেন ওবামা-মোদীর নীতিগত ঐকমত্যের দিকটা দৃশ্যমান করতেই ঐ প্রেস কনফারেন্সে স্পষ্ট ও বিস্তৃত স্বীকারোক্তি হাজির করেছিলেন।
    এতে একটা জিনিষ পরিষ্কার হয়েছে। মোদীর জয়লাভের পরও পঙ্কজ শরণের “সাংবিধানিক প্রয়োজনে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন” হয়েছিল, অথবা “এটা অতীতের মৃত ঘটনা এটা নিয়ে আবার ভেবে দেখার কিছু নাই” – এধরণের বক্তব্য যেটা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে এখন চাকরি হারানো পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং এর বক্তব্যেরই কপি – এই সব কিছুকে ফিল রেইনারের বক্তব্য সরাসরি নাকচ করে। বিশেষ করে রেইনারের সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে বক্তব্য পঙ্কজ শরণের ভারতের অবস্থান বলে যা প্রচার করছেন তাকে সরাসরি নাকচ করে। গত ৩ জানুয়ারি রেইনারের বক্তব্য প্রচারের পর দশ দিনের বেশি দিন গত হতে চলল, কিন্তু এখনও খোদ পঙ্কজ শরণ নিজে অথবা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেইনারের বক্তব্য নিয়ে কোন আপত্তি অথবা ভিন্ন বক্তব্য জানাতে আমরা দেখি নাই।

    ফিল রেইনারের বক্তব্যের সারকথার আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি দাবি করছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় “শান্তি ও স্থিতিশীলতার” ব্যাপারে দুই নেতা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন। এই বিষয়টা ওবামা-মোদীর স্বাক্ষরিত ৫৯ দফা “যৌথ ঘোষণার” ৪৬ নম্বর দফায় এবং আলাদা করে স্বাক্ষরিত “এশিয়া নীতি বিষয়ে যৌথ ষ্ট্রাটেজিক ভিশন”র শুরুতেও উল্লেখিত হয়েছে। এগুলো ভারত-আমেরিকার নীতিগত ঐকমত্যের দিক। কিন্তু কি উপায়ে এসব নীতি বাস্তবায়ন করা হবে এপ্রসঙ্গে ফিল রেইনার দাবি করছেন, -ওবামা ভারতের সক্রিয় “গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া” ও “এর নির্বাচন” এবং “এটা যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে” এবং এর মাধ্যমে “গণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা”, এবং “জনগণের সব অংশের ক্ষমতাবান হয়ে উঠা” এসব কিছু হতে পারে সেই উপায়। এব্যাপারে উভয় নেতা একমত হয়েছেন। তাই এই ‘উপায়কে’ তারা উভয়ে খুব গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন এবং উৎসাহিত করতে থাকবেন। “উভয় নেতার কথোপকথন দেখে (I was able to see in terms of the conversation)” এটাই ফিল রেইনারের অনুভব ও মন্তব্য।
    মোদী-ওবামার মিটিংয়ে সম্পর্কের অগ্রগতি দেখে উচ্ছ্বসিত ফিল রেইনার বক্তব্য এভাবে উপস্থাপনের আর একটা কারণ আছে। ওবামার ভারত সফরের পরে সিএনএনের ফরিদ জাকারিয়ার সঙ্গে কথোপকথনে, ওবামা চীন প্রসঙ্গে কথা বলছিলেন। কারণ ইতোমধ্যে এই সফর চীনের বিরুদ্ধে ভারত-আমেরিকার জোট পাকানো কিনা তা নিয়ে মিডিয়ায় কথা উঠে গিয়েছিল। ওবামা জানিয়েছেন, এসব “বুলি” বা উস্কানিমূলক ধরণের আলোচনা থেকে দূরে থেকে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের বন্ধনের পক্ষে কাজ করে যেতে চান তিনি।
    এশিয়ায় চীন-আমেরিকা-ভারতের অবস্থা এখন এমনই যে কোন দৈব ঘটনাবলে এরা তিন পক্ষ মিলে কোন চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারলে এরপরেও পারস্পরিক কিছু সন্দেহ অবিশ্বাসের বাস্তবতা থেকেই যাবে। এর মূল কারণ বাকি দুপক্ষের তুলনায় চীনের উত্থিত অদম্য “অর্থনৈতিক সক্ষমতা” এবং তীব্র প্রতিযোগিতা। এর ফলাফলে এই তিন পক্ষের যে কেউ অন্য দুইয়ের চেয়ে, তুলনামূলকভাবে আগের চেয়ে ভাল অবস্থানে থাকার চেষ্টা করবেই। এক্ষেত্রে চীনের চেয়ে ভারত ও আমেরিকার অন্তত একটা বাড়তি সুবিধা হল, ভারত ও আমেরিকা নিজেদেরকে “আভ্যন্তরীণভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা অনুসরণের শক্তি” মনে করে। তাদের বিচারে যা চীনের নাই। ফলে যদি তারা উভয়ে মিলে একাগ্রভাবে এশিয়ার জন্য প্রত্যেক দেশে ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুসরণের পক্ষে’ থাকে তবে এশিয়ায় জোট পাকানোর ক্ষেত্রে তারা চীনের চেয়ে এগিয়ে থাকবে বলে তাদের উভয়ের দৃঢ় অনুমান। চীনের উত্থান দেখে পালটা যতদূর সম্ভব গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের পক্ষে থাকা, ড্রাম বাজানো – এই অনুমানের অরিজিনাল উদ্গাতা হলেন এখনও সক্রিয় তবে বুড়ো তাত্ত্বিক হেনরি কিসিঞ্জার। যদিও চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের এইকালে পাশাপাশি একই সাথে ইসলাম কিছু প্রশ্ন তুলে সামগ্রিকভাবে পশ্চিমকে কুপোকাত করে ফেলেছে। আর একে ওয়ার অন টেররের নীতিতে মোকাবিলা করতে গিয়ে কিসিঞ্জারের তত্ত্বও অকেজো এবং কথার কথা হয়ে আছে। এসব আমেরিকাসহ পশ্চিমের অজানা নয়। তবু যেসব অঞ্চলে চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার বিষয় আছে সেসব জায়গায় কিসিঞ্জারের তত্ত্ব কিছু কাজে লাগতে পারে এই আশা আমেরিকা ছেড়ে দেয় নাই। যেমন, ভারত-আমেরিকার প্রসঙ্গ উঠলেই আমরা কূটনীতিতে সেখানে দেখব বলা হচ্ছে দুনিয়ার দুই “বৃহৎ কার্যকর গণতন্ত্র চর্চার দেশ”, “গণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা” – ইত্যাদি। অর্থাৎ ওবামা তাঁর চীনকে ঘায়েল করার “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির ফাঁদের মাহাত্ম ও সুবিধার লোভ দেখিয়ে ভারতকে কাছে টানতে চাচ্ছে। চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় ভারত-আমেরিকার “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির কমননেস বা সাধারণ দিক এরই ভিত্তি বলে ড্রাম পিটতে চাইছে।
    তবে ভারত-আমেরিকা ড্রাম বাজাতে চাইছে কথা সত্য হলেও এতে ভারতের কিছু পুরান জামা খুলে পড়ারও লক্ষণ এটা। যেমন, নেহেরু আমলের ভারত তখনও বৃহৎ “গণতান্ত্রিক” নাকি তথাকথিত “সমাজতান্ত্রিক” রাষ্ট্র ছিল এর ফয়সালায় কোন স্পষ্ট উচ্চারণ আজ এখনও নাই। কেউ সাহস করে নাই এখনও । তবু মাঝামাঝি ষাটের দশকের সময়ে রাশিয়া-আমেরিকার বাইরে “জোটনিরপেক্ষ দেশের” একটা তকমা নেহেরুর ভারতের ছিল অনেকদিন। তাসত্ত্বেও ঐ অবস্থাতেই কালক্রমে নেহেরুর আমল থেকেই অস্ত্রের চালানের প্রয়োজনে ভারত যতই রাশিয়া মুখি হয়েছিল ততই ভারতের মুখে আর “আমাদের বৃহৎ গণতন্ত্রের” ঢাক শোনানোর দরকার দেখা যায় নাই। বরং সত্তর দশক থেকে ইন্দিরা আমলে “সমাজতন্ত্র” আর “সেকুলারিজম” ভারতের প্রধান পরিচয় বলে তিনি স্পষ্ট দাবি করতে শুরু করেন। তামাশার দিকটা হল, সেটাই আবার ইন্দিরার “জরুরী আইন” জারি করে ভারত চালানোর কাল। এরপর ১৯৮৫ সালের পর থেকে নেহেরুর নাতি রাজীবের আমলে ক্রমশ “সমাজতান্ত্রিক” রাষ্ট্র কথাটা কার্পেটের তলে চলে যেতে থাকে আর “বৃহৎ গণতন্ত্র” কথাটা প্রথম সামনে আসতে থাকে। তবুও তখনও একটা জিনিষ – আমেরিকা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিনা এই সার্টিফিকেট ভারত আমেরিকাকে দেয় নাই, মূলত রাশিয়ান ব্লক রাজনীতির পুরান দায় বা লিগ্যাসির কারণে। না দিয়ে চলতে হয়েছিল। শেষে গত ২০০৪ সাল থেকে কংগ্রেসের ইউপিএ এর সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে আমেরিকার সাথে ষ্ট্রাটেজিক এলায়েন্সের দিকটা স্পষ্ট আকার নিতে থাকে। কংগ্রেসের প্রণব মুখার্জির মুখে আমরা ভারত দুনিয়ার “বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ” এই বয়ান শুনেছি। অর্থাৎ তিনি আর ভুয়া “সমাজতন্ত্রের” জামা পড়তে চাচ্ছেন না। ভারত এবার পরিষ্কার করে “বৃহৎ গণতন্ত্রের” ভারত হল। আর এর সম্ভবত আরও চূড়ান্ত দিকটা ঘটল এবারের মোদী সরকারের হাতে। ভারতের কনষ্টিটিউশন গ্রহণ ও কার্যকর হবার দিন ২৬ জানুয়ারি, যেটা তাদের ভাষায় প্রজাতন্ত্র দিবস। সম্ভবত ২০০৪ সাল থেকে ভারতে গত কয়েক বছরের এক নতুন রেওয়াজ চালু করা হল যে, ঐদিন কোন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রধান অতিথি করে আনা হবে। আর গত বছর থেকে। আমেরিকার সাথে ভারতের জটিল ও জট পাকিয়ে যাওয়া সম্পর্কের গিট-ছুটাতে একটা শো-আপ করা মোদীর খুবই দরকার হয়ে পড়েছিল। মোদী তাই ওবামার প্রতি আন্তরিকতা ও ব্যক্তিগতভাবে ছুঁয়ে থাকার ইমেজ দেখাতে ওবামাকে হঠাৎ করে প্রজাতন্ত্র দিবসের মূল অতিথি হিসাবে এবার দাওয়াত দেন। শুধু তাই নয়, প্রকাশ্য এই ঘোষণা প্রথম তিনি নিজেই প্রকাশ করেন নিজের টুইটার একাউন্ট বার্তা থেকে। কিন্তু প্রজাতন্ত্র দিবস তো নিজেই রাষ্ট্রের জন্য প্রতীকী। “প্রগতিশীলতার” শ্লোগান ধরে রাখার লোভে আমেরিকাকে “সাম্রাজ্যবাদ” বলে নিজের প্রজাতন্ত্র দিবসে দাওয়াত দিবার কথা এর আগে সম্ভবত ভারতের কোন নেতা কেউ ভাবতেও চায়নি। মোদী সেটাই করে দেখায়ে দিলেন। কিন্তু এটা ভাবা ভুল হবে যে মোদী আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদ তকমার বদলে গণতন্ত্রী বলে সার্টিফিকেট দিতে চান বলে এটা করেছেন। মনে রাখতে হবে, এবারের মোদী-ওবামা সাক্ষাতে যৌথ ঘোষণায় যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এর প্রায় সব ইস্যুগুলোই গত কংগ্রেসের আমলে ২০০৫ থেকে চালু ছিল তবে অকেজো অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। এবার সেগুলোই অর্থাৎ আমেরিকার সাথে সব পুরান চুক্তিই এবারের চুক্তিগুলোর বিষয়। কারণ বাস্তবায়নের শুরু থেকেই নানান বিরোধ সংঘাত একটা করে বের হতে হতে গত দশ বছরে ভারত-আমেরিকা সামগ্রিক সম্পর্কই স্থবির হয়ে গিয়েছিল। ভারতের দিক থেকে মোদীর সাফল্য এই যে তিনি মাত্র আট মাসে ওবামার সাথে দ্বিতীয় সাক্ষাতেই প্রত্যেক ইস্যুতে জটগুলো মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন, চুক্তিগুলো নবায়ন করেছেন। ভারতের বৈদেশিক সম্পর্কের নানান সমস্যা ও সম্ভাবনার ক্ষেত্রে যেমন, চীন বা জাপানের সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অর্থনৈতিক মুখ্য ইস্যু, আমেরিকার সাথে ঠিক তেমনটা নয়। আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক অর্থনৈতিকও বটে তবে মুখ্য ইস্যুগুলো হল সামরিক, ষ্ট্রাটেজিক এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ-ঝগড়া বিষয়ক নীতি নিয়ে। ফলে তা যথেষ্ট জটিলও। মোদীর দিক থেকে, আমেরিকার সাথে এসব মুখ্য ইস্যুগুলোকে সুরাহা করে, পার হয়ে তবেই নিজের মুখ্য ফোকাস – অর্থনীতি বা ইনফ্রাষ্টাকচার উন্নয়নের দিকে তাঁকে যেতে হবে। তাই কাজের মানুষ মোদীর এই তাড়া। কিন্তু এই বিষয়গুলো ভারতের জন্য কি লাভালাভ আনবে, কতটুকু কাজে লাগবে সেই বিস্তারিত আলোচনা এখন না অন্য কোথাও তুলতে হবে।
    এখনকার প্রসঙ্গে আমাদের জন্য এতটুকুই প্রাসঙ্গিক যে এযাত্রায় মোদী ওবামার সাথে মিলে “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির মাহাত্মে যদি মেতে উঠেন, ফিল রেইনারের বক্তব্য যদি অর্থপূর্ণ হয় তাহলে অন্তত – বাংলাদেশের ভোট, ভোটার বা নির্বাচন আমরা কিছু বুঝি না, ভারতের জন্য বাংলাদেশের ওমুক দলকেই আমরা ক্ষমতায় দেখতে চাই ভারতের এই অন্যায় দুঃসহ আবদার থেকে আমাদের আপাতত মুক্তি মিলতে পারে। আমাদের নগদ লাভ এখানেই। তবে এখানে এসব কথার অর্থ আরও পরিষ্কার করার দরকার আছে। যেমন এর অর্থ এমন নয় যে আমাদেরকে চীনের বা আমেরিকার পক্ষপুষ্ট হয়ে বা যেয়ে ভারতের বিরুদ্ধে যাওয়া। এমন মনে করা ভুল হবে। সাধারণভাবে বললে, এশিয়ায় ভারত, চীন বা আমেরিকা এই তিন শক্তির কোন একটার ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের দিকে ঢলে পড়ে অপর দুটোর কোন একটার বিরুদ্ধে এটাকে ব্যবহার করার চিন্তা করাই যাবে না। বরং কারও ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের পক্ষে না গিয়ে বিশেষত কারও ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের বিপক্ষে অন্যকে সুবিধা দিবার আত্মঘাতী পথে না গিয়ে বাংলাদেশের নিজের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে এক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান অবশ্যই নিতে হবে। এটাই একমাত্র রাস্তা আমাদের টিকে থাকার জন্য খোলা আছে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসের দশা এক্ষেত্রে সেরকমের উদাহরণ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে এমন রাজনৈতিক ক্ষমতার দল করা যাবে না যে, নিজের জনসমর্থন হারিয়ে, আকণ্ঠ লুটপাটে নিমজ্জিত হয়ে এরপর চীন অথবা ভারতকে বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে নিজে ক্ষমতায় থাকতে চায় – এই দুর্গতির পথে হাটা যাবে না। এটা বর্তমান আওয়ামী লীগের সরকার, আগামী সম্ভাব্য বিএনপি অথবা আসন্ন যেকোনো দলের বেলায় কঠিন ভাবে সত্যি। এদিকটা খেয়াল রেখে এজন্য উপযোগী রাজনৈতিক ক্ষমতা, পদ্ধতি কাঠামো তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। তবেই আমরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে সক্ষম হতে পারি। এছাড়া আভ্যন্তরীণ কোন বিভাজনের ইস্যু যেমন সেকুলারিজম বনাম ইসলাম ধরণের বিভাজন পরিহার করে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির দিকে মনোযোগী হতে হবে।
    এসব ঘটনাবলী ঘটছে খুবই দ্রুত। স্বভাবতই ফিল রেইনারের এই প্রেস বক্তব্য হাসিনা সরকার ও সমর্থকদের মনোবল ভাঙ্গার জন্য যথেষ্ট। ফলে এর পালটা কিছু প্রোপাগান্ডাও আমরা লক্ষ্য করছি। দৃশ্যত এর কেন্দ্রবিন্দু বিবিসি, তবে বিবিসি কলকাতার বাংলা বিভাগ। প্রথম রিপোটটা এসেছিল কেন্দ্রীয় বিজেপি নয়, কলকাতা বিজেপি সুত্রে। দুদিন পরে, এরপর ছাপা হয়, “বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে হাসিনা সরকার পঙ্কজ সরণকে আশ্বস্ত করেছেন”। পঙ্কজের নামে চালানো তবে পঙ্কজ নয় “বিশেষ সুত্রে পাওয়া” এমন বরাতে, যে পঙ্কজ সরণকে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে হাসিনা সরকার কি বলেছেন। অর্থাৎ যেন পঙ্কজ সেটা ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কাছে কিভাবে রিপোর্ট করেছেন সেই ভঙ্গিতে। আদৌও পঙ্কজ সেটাই রিপোর্ট করেছেন কি না তা আমরা কেউ জানি না। আর এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলাদেশের কোন সরকারই ফরমালি পঙ্কজ সরণকে এটা বলবে না যে নিজ সরকারের হাতে দেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নাই। ফলে বাংলাদেশের সরকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছেন, ড্রাইভিং সিটে আছেন এমনটাই স্বাভাবিকভাবে হাসিনা পঙ্কজকে বলবেন। আস্থা রাখতে বলবেন। কিন্তু তাতে ভারতের হাইকমিশনার আশ্বস্ত হয়ে গেছেন কিনা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব রিডিং কি সেটা একেবারেই আলাদা বিষয়। এরপর আবার ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ও সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব পঙ্কজের রিডিং কতটুকু কিভাবে গ্রহণ করবেন, একমত হবেন বা হয়েছেন সেটা আরও আলাদা। কিন্তু বাংলা বিবিসির রিপোর্টে এই পুরা বিষয়টাকে প্রোপাগান্ডা করতে শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে, “আশ্বস্ত করেছেন” বলে দাবি করে। একথা সত্যি যে হাসিনা সরকার পঙ্কজকে “আশ্বস্ত করাতেই চাইবেন”। কিন্তু সেটাকে পঙ্কজের আশ্বস্ত হওয়া এবং তাতে ভারতের সচিব ও রাজনৈতিক নেতৃত্বও “আশ্বস্ত হয়েছেন” বলে ইঙ্গিত করে চালিয়ে দেয়া মিডিয়া টুইষ্টিং। এটা আর নিউজ নয়, বড় জোর এক লেখকের কলাম বা ভিউজ। কারও রাজনীতির প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার হওয়া এমনটা হয়ত মিডিয়ায় হয়, করে থাকে কিন্তু সেটাকে অন্তত নিউজ দাবি করে করা যায় না। তবু আপাতত এসব প্রোপাগান্ডার চল আমরা দেখছি।

    [লেখা এই রচনা এর আগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫  চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে সামান্য এডিট করে আবার ছাপা হল।]