Tag: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

  • ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!

     

    বাংলাদেশ প্রসঙ্গেঃ
    ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!

    ১৪ জুলাই ২০২৩   মধ্যরাত ০০ঃ ০৫
    https://wp.me/p1sCvy-4In

     

                        VOA  –  MODI & BIDEN

     

    “বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমেরিকা আর ভারতের কথা শুনে কোন সিদ্ধান্ত নিবে না!” – সেসব দিন শেষ হয়েছে। হ্যা কথা এটাই; যদিও কথাটা আমার নয়। কথাটা বলেছেন এসএনএম আবদি; ভারতীয় সাংবাদিক!  আবদি লিখেছেন “Heart of the Matter: India, US not on the same page in Bangladesh” আক্ষরিক অর্থে বললে, আবদি বলছিলেন “ঘটনার মূলে হল – ভারত ও আমেরিকা আর একমতে বাংলাদেশের কোন কিছুকে দেখছে না”।

    হা বাংলাদেশ নিয়ে ভারত-আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি আর এক নয়ঃ
    আবার এসএনএম আবদি [SNM Abdi] ভারতীয় সাংবাদিক;  এক দৈনিকের সাবেক  সম্পাদক এসএনএম আবদি চলতি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আবার লিখেছেন। প্রায় একমাসের বেশি কিছুদিন আগে তাঁর লেখা নিয়ে আমার আলোচনা-মন্তব্যে তাঁর পরিচয় নিয়ে অনেক লিখেছি। তাই এবার আবার সেদিকে যাচ্ছি না। তবে দৃশ্যত আবদি আর সুবীর ভৌমিক (যিনি আবদির মত গত শতকের আরেক সাংবাদিক), এরা দুজনেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ও সম্ভবত এঁরা তাদের মিডিয়া উইংয়ে কাজ করেন বলে মনে করা হয়। অনেকে যারা ভারতের রাজনীতির উত্থান-পতন ও ট্রেন্ড-অভিমুখ মনিটর করেন, খেয়াল রাখেন এটা তাদের ধারণা বা মতামত। এদের দুজনেরই তাই একই সমস্যা যে তাঁরা পাবলিকলি বলতে পারেন না যে তাঁরা এখন কী করেন বা কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে আছেন বা কাজ করেন! কোন প্রতিষ্ঠানের বেতনের লিস্টে বা পে-রোলে তাদের নাম আছে! ইত্যাদি!

    আবদি আবার বাংলাদেশ প্রসঙ্গে লিখেছেন গত ১০ জুলাইয়ে, ভারতের ফ্রি-প্রেস-জর্নাল নামে এক বহু পুরানা ইংরাজি পত্রিকাতে, যার শিরোনাম “Heart of the Matter: India, US not on the same page in Bangladesh” । আমাদের মানবজমিনও আবার সে লেখা অনুবাদ করে চাপিয়েছে – “বাংলাদেশ বিষয়ে ভারত থেকে আলাদা যুক্তরাষ্ট্র, নিতে চায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত” – এই শিরোনামে। ফলে পাঠক যারা বাংলা বা ইংরাজি যেটা থেকেই পড়তে চান পড়তে পারেন।

    আমার এলেখার বড় শিরোনাম,  “বাংলাদেশ-আমেরিকা প্রসঙ্গঃ ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!”। যেটা আবদির শিরোনামের কথাটাই তবে আমার ভাষায় লিখা বলা যায়।  আমরা বলে এসেছি, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ওয়ান ইলেভেনের ক্ষমতা দখলের পরে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। আমরা একথা বহুবার বলেছি।  ভারত কে দিয়ে আমেরিকার চীন ঠেকানোর কাজের বিনিময়-মজুরি হিশাবে। কিন্তু তা কি চিরদিনের জন্য নাকি কতদিনের জন্য??

    এই প্রশ্নে বাংলাদেশে হাসিনাবিরোধী একাংশের ধারণা এটা যতদিন হাসিনা ক্ষমতায় থাকবেন ততদিন। যদিও বাস্তবে ঘটনাটা এমন না। এভাবে ঘটে নাই। অপ্নতত এখন তো একেবারেই পরিস্কার যে দিন ফুরিয়েছে। তবুও যেমন এক. ২০১৮ সালের শেষের নির্বাচনে হাসিনা চেয়েছিল ভারত ২০১৪ সালের মত খোলাখুলি ন্যাংটা হয়ে হাসিনাকে সমর্থন জানাক! কিন্তু মোদির ভারত বুদ্ধিমান হতে চেয়েছিল সম্ভবত! তাই এত দায় না নিয়ে দূরে দাঁড়ায় কেবল মাখনটা উঠিয়ে খেতে চাওয়া এক অবস্থান নিয়েছিল। আর এতে হাসিনা ক্ষেপে গিয়ে এক প্রকাশ্য হুঙ্কারে যে  বয়ান দিয়েছিলেন “ভারতকে যা দিয়েছি সারা জীবন মনে রাখবে: শেখ হাসিনা” –  রিপোর্ট্ টা তখনকার বাংলা ট্রিবিউনের। কিন্তু তাতে কী এরপর ভারত-বাংলাদেশ স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক কী নাই হয়ে গেছিল? না ঠিক তা নয়। তবে এই ভাষায় ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাবে না। যদি বলি এরপরে মানে ২০১৯ সাল থেকে হাসিনা-মোদি সম্পর্কে আর কোন নয়া চুক্তি হয়েছে কিনা – এই বিচারে বলা যায় হাসিনা-মোদি এরপর আর কোন চুক্তি হয় নাই অথবা নয়া চুক্তি করে কিছু দেয়া হয় নাই। তবে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আগের করা চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন অর্থে ২০১৯ সালের পরেও অনেক কিছুই দেয়া হয়েছে, হচ্ছে। আর সবসময়ই একটা রুটিন সম্পর্ক তো আছেই যেটা অবশ্যই বেশ ঘনিষ্ট। এমনকি যতটা ঘনিষ্ট সময়ে এর চেয়েও বেশি করে তা দেখানোও হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতিকালে যত অ্যামেরিকান চাপ বাড়ছে ততই ভারতের মুরোদ থাকুক আর নাই হাসিনা সরকার ততই ভারতের কোলে মুখ-গুজে – “দেখেন না কিছু করতে পারেন কিনা” টাইপের  চাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে এমন রিপোর্ট ভারতীয় পত্রিকায় বেশি দেখা যাচ্ছে; যা প্রথম আলো একেবারে লজ্জ্বার মাথা খেয়ে হলেও তাদের বরাতের উপর চড়ে মিথ্যা করে ভারতীয় করিতকর্মের মিথ্যা বয়ান তৈরি করে চলেছে।   যদিও এর মানে এমনটা একেবারেই নয় যে ভারতের সাথে হাসিনার খাতিরের সম্পর্কটা অটুট আছে বা ধরে রাখা গেছে! সেটা একেবারেই নয়; বাস্তবতাই সেটা নয়। মূলকথা আমেরিকাকে সুপারিশ করে ভারতের সেই মুরোদই হারিয়ে গেছে!

    কিন্তু হাসিনার সাথে ভারতের সম্পর্কটা কী বা কেমন আর সবচেয়ে বড় কথা ভারত-বাংলাদেশের এই বিশেষ খাতিরদারি সম্পর্কটা ২০০৭ সালে কেন হতে পেরেছিল? তা নিয়ে আমাদের আম-জনতা লেবেলে জানা-বুঝা কম। বরং তর্ক হতে দেখা যায় এটা ভারত অধীনস্ত এক সরকার কীনা এনিয়ে; এবং বলাই বাহুল্য তর্কে দেখা যায় সংখ্যাগরিষ্ট অংশই মনে করে এটা ভারত অধীনস্ত এক সরকার। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন হল কেন এটা হতে পারল? এককথায় এর জবাব হল, এটা আমেরিকার কারণে। অন্যভাবে বললে বড়ভাই আমেরিকা এশিয়ায় নিজস্বার্থে চীন-ঠেকাতে ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল। আর তাতেই ভারতের ‘মুই কি হনু’ এমন এক অবস্থা তৈরি হয়েছিল। শুরুতে সে নিজেকে অ্যামেরিকান বরকন্দাজ-প্রতিনিধি বা আমেরিকার লোকাল এজেন্ট ভাবা শুরু করেছিল। আর অন্তত টানা দশবছর এটা সে উপভোগ করেছিল যতক্ষণ না ট্রাম্প এসে  ২০১৭ সালে আমেরিকার আগের সরকার-প্রশাসন গুলোর দেয়া বিশেষ সুবিধা ট্রাম্প সেবার সব কেড়ে নিয়ে বাতিল করেছিল। যদিও সেটা ছিল আসলে আগের দেয়া অর্থনৈতিক সুবিধা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক নয়।

    আর এবার সব রাজনৈতিক সুবিধা প্রত্যাহার – এটাই ঘটেছে একালে বাইডেন ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতাসীন হওয়ার শুরু থেকেই একট একটু করে। একমাত্র একালে যা সুনির্দিষ্ট আকারে দৃশ্যমান হচ্ছে!  মূলত ভারতীয় মুসলমানদের উপর নিপীড়ন নির্যাতন, বৈষম্য আর সাধারণভাবে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের অভিযোগ; যেটা প্রতিবছরের ধর্মীয় স্বাধীনতা [Freedom of religion or religious liberty – OHCHR] লঙ্ঘনের সুচকে প্রতিফলিত এবং এর  আমেরিকান কমিশনার প্রতিবছর প্রেসিডেন্টের কাছে সুপারিশ করে গেছে প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু এবার এসব কিছুকে ছাড়িয়ে বাইডেন মোদির বিরুদ্ধে কত সিরিয়াস আর কত আগিয়ে গেছে তা প্রকাশ হয়ে পরে যখন দেখা যায় মোদির বিরুদ্ধে বাইডেন প্রশাসন মোদিবিরোধী সকল গোষ্ঠির নেতা হিশাবে  কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীকে সহায়তা করছে। সেটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে,  গুজরাত হত্যার বিবিসিতে প্রচারিত ডকুমেন্টারি থেকে শুরু করে  আদানির শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি ফাঁস ও ধ্বস নামিয়ে দেয়া, আদানিকে তুলাধোনা করে জর্জ সোরেস (গ্লোবাল শেয়ার মার্কেটে হেজ ফান্ড বা hedge fund এর এক কুতুব শেঠ) এর পাবলিক বক্তৃতা ইত্যাদিতে প্রকাশিত। এরপরে রাহুল গান্ধীর প্রথমে লন্ডন ও পরে আমেরিকা সফর আর সেখানে গিয়ে সবখানেই থিঙ্কট্যাংক ও মানবাধিকার গ্রুপের সাথে দিনরাত বৈঠক – ইত্যাদি এঘটনা থেকেই প্রথম পরিস্কার হয়ে যায় যে ভারতের পিঠে হাত রাখার দিন এবার শেষ হয়েছে! ২০০৭ সালে  বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া নিয়ে আমেরিকা যেভাবে অভিযুক্ত যাই হোক না – মূল ভারত-আমেরিকান সম্পর্কই এখন আর সেই আগের জায়গায় নাই হয়ে গেছে। কারণ, বাইডেন এখন ভারতের আগামি নির্বাচনে মোদিকে আর দেখতে চান না মর্মে অবস্থান নিয়ে ফেলেছেন আর বলা যায় তা প্রকাশ্যও হয়ে গেছে। শুধু তাই নয় এটা এখন পরিস্কার যে সেজন্য আইন বাঁচিয়ে দুরত্বে থেকে বাইডেন যতটা সম্ভব সব ভাবেই মোদি বিরোধীদের জোটের রাহুলকে নেতা মেনে গড়ে উঠার পক্ষে আগিয়ে গিয়ে সহায়তা করেছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা দেখতে পারেন এখানে।  তবে আমার আমেরিকা-ভারত দুরত্বের কথা লেখাতে অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে তাহলে, সম্প্রতিকালে মোদির আমেরিকা সফর এটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করব?

    স্বল্পে মূলকথায় বললে, এবারের মোদির সফর ছিল একেবারেই অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সফর। যেটাকে টেনেটুনে বড়জোড় সামরিক অস্ত্র কেনা-বেচা বা কিছু সামরিক ইকুইপমেন্ট ভারতে  উতপাদন করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও টেকনোলজির চুক্তি হয়েছে বলা যেতে পারে। এমনকি এই সফরে গ্লোবাল বা আঞ্চলিক কোন ভারত-আমেরিকা স্ট্রাটেজিক আলোচনা বা আমরা “কমন স্ট্রাটেজিক বন্ধু” জাতীয় কোন কথাবার্তাও হয় নাই।  তবে এশিয়ায় ভারত ও আমেরিকা উভয়েই চীনবিরোধি নিজ নিজ স্ট্রাটেজিক অবস্থানের রাষ্ট্র। যদিও তাদের মধ্যে কোন কমন জীবিত কোন প্লাটফর্মও [কোয়াডের মত যা এখন মৃত অকার্যকর অর্থে]  অবশিষ্ট নাই বা বেঁচে নাই। ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি [নন অফিসিয়াল জোট ধরণের] উদ্যোগ বলে এতে ভারত-আমেরিকা চীনবিরোধী হয়ে আছে ধরে কিছু কথা হয়; তাও সেটা যৌথতায় নয়! এছাড়া ভারত কোন সামরিক জোট করতে চায় না – এই নীতির দেশ বলে এনিয়েভারতের নুন্যতম উচ্ছসিত হওয়ার বাস্তবতাই নাই। অর্থাৎ মোদির ঐ সফরটার একমাত্র ফোকাস বাণিজ্যিক। কোন রাজনৈতিক আলোচনায় সেখানে হয় নাই। বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা তো অনেক দুরের বাত!

    তাহলে হানিমুন শেষঃ
    হা শেষ! ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন ঘটিয়ে যেটা শুরু হয়েছিল – আমেরিকা বড় ভাই ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল বলে ভারত নিজেই ‘হাসিনার বাংলাদেশের’ মালিক হয়ে গেছে বলে যে ভাব নিয়ে চলছিল এর অবসান হয়েছে। এটাকে আবদি তার এবারের লেখায় বলেছেন বাংলাদেশ নাকি ভারতের প্রভাব বলয়ের দেশ [… Bangladesh is in India’s zone of influence, New Delhi is mum on the sudden proactive US role in Bangladesh’s internal affairs. ] অথবা কখনও বলেছেন হাসিনা হলো ভারতমুখাপেক্ষী সরকার [pro-India Prime Minister Sheikh Hasina-led Awami League …।]।  এবং এভাবেই ভারত এতদিন নিজেকে ভুয়াবাজি মিথ্যা করে হলেও পরাশক্তি ভাব ধরে চলেছিল – এরই সমাপ্তিকাল!
    এর মূল কারণ, এখন বাইডেন প্রশাসন মোদি-যুগের অবসান দেখতে মনস্থ করেছে।  মোদির মুসলমান বিদ্বেষ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন কে ব্যবহার করে বাইডেন তাই এপ্রসঙ্গকে সামনে উঠিয়ে ফোকাসে এনেছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ এটাই। এতে ইতোমধ্যেই মোদিবিরোধী জোট সবল হচ্ছে – নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিভেদকে সেকেন্ডারি করে কার্পেটের নিচে তা চাপা দিতে পেরেছে – মিডিয়াও মোদিবিরোধীয় সরব হয়ে উঠছে। এমনকি এর ছাপ আদালত পাড়াতেও পড়েছে যে মোদির বিরুদ্ধে রায় দেয়া যেন এখন সহজ ও সম্ভব।   কেন্দ্রীয় ক্ষমতার হাতে থাকা প্রতিষ্ঠান সিবিআই, ইডি, রাজ্যপালের অফিস বা আয়কর বিভাগ লেলিয়ে দিয়ে  বিরোধীদের শাসিত রাজ্যে মোদি নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার চরমে উঠেছে – আর এর অবসানে বিরোধীরা জোটবদ্ধ ও নিজেরা ভোকাল হওয়া সম্ভব বলে মনে করতে শুরু করেছে –  বাইডেনের একটু দুরবর্তি সহায়তাতেই!
    এসবের সারকথা হল, যদি ২০২৪ সালে মোদি যদি পুনরায় নির্বাচিত হতে না পারেন তবে মোদিবিরোধী সেই ভারতের উপর অ্যামেরিকান প্রভাব অনেক বেশি হবে।  চাই কী সেই ভারত, আমেরিকার এশিয়া নীতি যেমন বার্মা নীতির সাথে এলাইন [align] বা সমপাতিত করে নিজেকে পুনর্গঠিত হতে পারে বলে আমেরিকার মনে আশা জাগতে পারে।  আর সেই আমেরিকা হবে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমেরিকা যেকথা বলবে সেটাই শেষ কথা! এনিয়ে ভারতের সাথে কোন আলোচনাই নয়।  ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক সেই অভিমুখেই ইতোমধ্যে   রওনা দিয়ে দিয়েছে – এটাই আবদির এই নয়া লেখার প্রধান দাবি!!

    এজন্যই আবদি বলছেন, বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমেরিকার হঠাত সক্রিয় ভুমিকার বিরুদ্ধে ভারত বোবা হয়ে গেছে ও আছে [… New Delhi is mum on the sudden proactive US role in Bangladesh’s internal affairs]। বাংলাদেশের ভিতরেও যতটা শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ যেভাবে নিজস্বার্থ উপযোগী করে আকার দিয়ে, এজেন্সি দিয়ে দাঁড় করিয়ে এতদিন রাজত্ব করছিল এমন সবকিছু থেকে আপাতত গুটিয়ে প্রত্যাহার শুরু হয়েছে।  আর হয়ত তা সীমিত করে পুনর্গঠিত করার ইচ্ছায়ও হতে পারে। এসবেরই সোজা মানে হল,  যেই “বাবা আমেরিকা” ভারতকে পড়শিদের উপর কিছু মাতব্বরি করার ক্ষমতা দিয়েছিল  সেই বাবা এখন ভারতের সব ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ভারতকে ফকির করে দিচ্ছে।

    যে রাশিয়ান জাহাজের মালামাল খালাসের মুরোদ ভারতের হয় নাইঃ
    আবদি তার লেখার শেষের দিকে বাংলাদেশের রূপপুরে পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কিছু রাশিয়ান ইকুইপমেন্ট নিয়ে বাংলাদেশে আসতে চাওয়া এক রাশিয়ান জাহাজ-কে কিভাবে মাল খালাস না করে তা রাশিয়ায় ফেরত নিয়ে যেতে হয়েছিল এর বর্ণনা দিয়েছেন – একটা বড় উদাহরণ হিশাবে।  ঘটনা হলো রাশিয়ান জাহাজটা ছিল আমেরিকার স্যাংশন খাওয়া তালিকায়।  তাই ঐ জাহাজে বাংলাদেশে ভীড়তে গেলে আমেরিকা তা রোধ করতে বাংলাদেশকে আগাম তথ্য জানিয়ে সতর্ক করেছিল। এতে প্রতিক্রিয়ায়  রাশিয়া ও বাংলাদেশের সাথে আলাপ করে ভারত লিড নিয়ে রাজি হয়েছিল যে ঐ নিষিদ্ধ জাহাজ সে কলকাতার হলদিয়ায় ভিড়িয়ে মালামাল নামিয়ে সহজেই সড়ক পথে সেসব মালামাল বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিবে। কিন্তু বিধি বাম! কারণ সেদিন শেষ হয়েছে। তাই আমেরিকা ভারতকেও তার আপত্তির কথা জানিয়ে দেয় যাতে সে নিষিদ্ধ জাহাজ নোঙ্গর না করায় কলকাতা। আবদি লিখছে, আমেরিকা আপত্তির পদক্ষেপে এগিয়ে এলে ভারত পিছু হটে যায়!

    শুধু তাই নয় ঐ লেখার শেষে আপনি একটা মরাল লিখেছে এভাবেঃ
    এই গল্পের শেষে প্রকাশিত নৈতিক ভাষ্যটা হল, আমেরিকা এখন মনে করে তার কথাই শেষ কথা – এর উপর কোন কথা নাই। এবং পুরান দোস্ত ভারত অ্যামেরিকান এই নয়া অবস্থান পছন্দ বা অপছন্দ যাই হোক ভারতকে এমন অ্যামেরিকান ইচ্ছাকে মেনেই বেচে থাকা অভ্যাস করতেই হবে!  [“The moral of the story is that the US believes in having the last word, and even allies like India must learn to live with it whether they like it or not.”। মানে মোদিকে এমন অপমান হজম করতে শিখতে হবেই!

    কেন আবদি এমন সংবাদের বাহক হলেনঃ
    ব্যাপারটা হলো, এই নতুন অভিমুখ সম্পর্কে অনেকদিন ধরেই বলছি। কিন্তু ভারতের  কেউ এসব কথাকে সত্যি বলে বলে আমাদেরকে জানায় নাই। বরং উলটা প্রপাগান্ডা করতেই দেখেছি। তাহলে এই অসহায় ভারত – আমেরিকার সামনে গড়াগড়ি খাওয়া এই ভারতের ইমেজ আমাদের সামনে আনার দায়িত্ব আবদি কেন নিলেন? আগে উপরে লিখেছি বাংলাদেশে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের ততপরতা অন্তত আপাতত গুটিয়ে রাখার কথা কানে আসার কথা বলেছি। আবদির এই লেখা কানে আসা সেসব সংবাদ নিয়ে নিশ্চয়তা যোগালো বলা যায়।  তার মানে ভারত এই খবর নিশ্চয়তা দিয়েই ছড়িয়ে দিতে চাইছে?? মানে বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গ্রুপ বা গোষ্ঠিতে ভাঙ্গা-গড়া না হোক অন্তৎ ক্রমশ এদের ভাঙ্গার কথা নিয়মিত শুনব আমরা – তাই কি???

    যাকিছু আপোষে নিজ ইচ্ছায় আসতেই আছে ও থাকবে  তা সাদরে গ্রহণ কর জনগণ! জনগণ বুদ্ধিমান!

    সবশেষে আবদির কিছু সত্যবচনঃ
     আবদি এখানে যে অবস্থান নিয়ে লিখেছেন তা হল বাংলাদেশে হাসিনার ২০১৪ আর ২০১৮ সালের নির্বাচনে কারচুপি আর গুম খুন হত্যায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের যত অভিযোগ সেসবকেই তিনি সত্য বলে গ্রহণ করে নিয়ে কথা বলেছেন। এসব পাশ কাটিয়েও তিনি সদর্পে বলছেন হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় রাখতে হবে! কেন? তার একটাই সাফাই আর তা হল, বাংলাদেশে ভারতের গভীর স্বার্থ আছে যে হাসিনা-ই রক্ষা করে দিতে পারবে।  অর্থাৎ কোন ন্যায়-ইনসাফ বা আন্তর্জাতিক আইনের ন্যায্যতা নয়। শ্রেফ ভারতের স্বার্থ – কাজেই আব্দি ভারতের সেই স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন????? বড়ই অদ্ভুত না! মানে কোন মানুষ কী কোন ন্যায়-ইনসাফের ভিত্তি ছাড়াই – আমার  ওইটা ভাল লাগে বা ওইটা আমি খাবো আমাকে এনে দেও ইত্যাদি এভাবে কথা বলতে পারে???

    তিনি এটাও পরিস্কার করেই বলছেন তাই এই চাওয়া – ভারতের স্বার্থ বলে তা পেতে চাওয়া এটা হাসিনারও (বেইনসাফি) উচ্চাঙ্খা বটে; এমনকি এর মানে হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মই থেকে ছিটকে পিছলিয়ে পড়ে যাওয়া এমনকি যেটা বাংলাদেশকে এক দলের ও এক নেতার বাংলাদেশে পরিণত করবে…। [That would no doubt serve India’s national interests; and of course, fulfil Hasina’s ambitions; but would also mean ignoring the democratic backsliding that has reduced Bangladesh into a one-party, one-leader nation.]

    তবুও এটাই তাঁর আকাঙ্খা! কি তামসা!

     

     

    আপডেটেডঃ  ১৪  জুলাই ২০২৩; রাত ০২ঃ ০৮
    আপডেটেডঃ     জুলাই ২০২৩;

    >>>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

     

     

  • ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ -কেন মোদি আর সিপিবির একই দাবি!

    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ -কেন মোদি আর সিপিবির একই দাবি!
    গৌতম দাস

    ৯ জুলাই ২০২৩  ভোর ০৩ঃ  ৫৪
    https://wp.me/p1sCvy-4Hx

     

     

     

     

    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ কথাটা ভেঙ্গে সরাসরি উদোম করে দেখালে এর মানে হল, নাগরিক রাষ্ট্রে কোন ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা রাখাই যাবে না। বিশেষ করে ইসলামি বিয়ে। এর বদলে ধর্ম নির্বিশেষে সকলকের জন্য একই (তাই ইউনিফর্ম বা সার্বজনীন বলা) এবং একমাত্র ‘রাষ্ট্রীয় বিয়ের আইনেই’ বিয়ে করতে হবে। এই হোল সিভিল কোড বুঝনেওয়ালাদের দাবি।   তাদের সার্বজনীন ‘রাষ্ট্রীয় বিয়ের আইন’ মানে হল, কোন  বিয়েকে ধর্মের সংশ্লিষ্টতাহীন করে সাজাতে হবে; যেটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। এবং ধর্মীয় বিয়ে আর রাষ্ট্র আমল করবে না; এর বদলে নাগরিক হিশাবে দুই পুরুষ-নারী নাগরিকের মধ্যে বিয়ের আইন করা হবে।
    একথা শুনে অনেকের মনে হতে পারে বা ভালই তো!!! ধর্ম বা হিন্দু-মুসলমান নিয়ে ক্যাচালের চেয়ে এই ‘রাষ্ট্রীয় বিয়ের আইন’ তো খুবই ভালো!!! এর মধ্যে বেশ প্রগতিশীলতা আর এডভ্যান্সমেন্টও দেখে ফেলতে পারে কেউ!!! ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশংসায় আমরা কাউকে খুশিতে উত্তেজিতও হয়ে উঠতে দেখতে পারি। আর পোগতিশিল=হিন্দুত্ববাদীরা খুশিতে নেচে উঠতে পারে এই বলে যে এবার ‘মুসলমান কোপানির’ একটা ভাল অস্ত্র পাওয়া গেছে!!
    হ্যা ঠিকই তাই। ‘ইউনিভার্সাল সিভিল কোড’ এর দাবিদারেরা অসৎ মনে ও উদ্দেশ্যে ইসলামের সাথে রাষ্ট্রের একেবারেই অপ্রয়োজনীয় বিরোধ খাড়া করতে, মুসলমান কোপাতেই এই দাবি করে থাকে। তাই এনিয়ে একটা মজার দিক বা মিলের দিক দেখিয়ে দেই তাহলে অনেক কিছুই পরিস্কার হয়ে যাবে।
    বাংলাদেশে ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এর দাবি সবচেয়ে উচ্চকন্ঠে করে থাকে কমিউনিস্ট পার্টি, সিপিবি। এর খাস প্রমাণ  পাওয়া যাবে এখানে  ২০২৩ সালে সমাপ্ত সিপিবি এর দ্বাদশ কংগ্রেসে গৃহীত ও প্রকাশিত প্রস্তাব যা সাপ্তাহিক একতা  পত্রিকায় ছাপা হয়েছে সেখান থেকে। তাতে ১২ নম্বরে যার উপশিরোনাম [১২. নারীর প্রতি সহিংসতা সম্পর্কে] এর অধীনে চার নম্বর দাবিতে লেখা আছে দেখেন  [৪.      ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।] ।    এবং বলাই বাহুল্য তার নারী (এনজিও) সংগঠন মহিলা পরিষদও এই দাবি করে থাকে। অন্যদিকে,  আগামি বছরে মানে ভারতের আবার কেন্দ্র সংসদ নির্বাচন আসন্ন। তাই মোদি বা বিজেপির এবারেরও মুসলমানদেরকে কোনঠাসা করে রাখার সফল নেতা হিশাবে মোদির  অন্যতম নির্বাচনী ইস্যুও হল এই ‘‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ কায়েম।

    তাহলে সিপিবি আর মোদির মধ্যে মিলটা কোথায় আর কেনইবা এই মিল দেখছি আমরা???   বলাই বাহুল্য এই মিল হল একই ইসলামবিদ্বেষ আর মুসলমান কোপানির খায়েসজাত – এটাই তাদের মধ্যে কমন;  তাই এই লক্ষ্যের ঐক্য!!
    তবে যারা এখনও প্রগতিশীল আর সাথে বাড়তি হিশাবে যাদের কেউ কেউ হয়ত নারীবাদিও তাদের জন্য বলে রাখি যদি তারা সাদা মনে – শ্রেফ বুঝবার জন্য মানার জন্য না – যারা জানতে চান যে কেন ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ দাবিটা ভুল তাহলে তা এলেখার শেষের দিকে “আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথার কী হবেঃ”  – এই উপ-শিরোনামে লেখাটা পাবেন; পড়ে নিতে পারেন।

    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ যখন হাতিয়ারঃ
    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এই শব্দ কয়টা শুনলে অনেকের কাছে পবিত্র বা উচ্চমার্গীয় মনে হতে পারে, তাই অনেকের ক্ষেত্রে কিছুটা ভক্তিতে অজান্তে মাথা ঝুঁকেও যেতে পারে; সেটা এই বলে যে এটা একটা খুবই ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট খচিত’ কোন পরম জ্ঞান হবে নিশ্চয় যা কোন প্রগতিশীল সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় খুবই কাজের ও উপাদেয়!!!

    কিন্তু  আমি দুঃখিত পাঠক। এই অনুমান একেবারেই মিথ্যা শুধু না বরং উলটা। এটা আসলে মন ভর্তি যাদের ইসলাম বিদ্বেষ, যারা তক্কে তক্কে থাকে কিভাবে মুসলমানদেরকে সমাজে নিচা দেখাবে –  মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়ানি বা জাগানি কিছু প্রগতিশীল ভাব ধরাদের কারবার এটা; যারা আসলে হিন্দুত্ববাদী। তাদের কাছেই – মুসলমান কোপানির এক ভাল হাতিয়ার হল এই শব্দগুচ্ছে – ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’।

    শব্দগুলো ইংরাজিতে যার বাংলায় ইতিবাচক অর্থে সারকথা হল,  একটা রাষ্ট্রে ধর্মের বাইরে বিয়ে সংক্রান্ত আইনী ধারা।

    রিপাবলিক রাষ্ট্রমাত্রই কী তা ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’এর পরিণত হবেঃ
    না একেবারেই না। তবে মুসলমানবিদ্বেষ যদি আপনার গোপন খায়েস হয় তবে এমন জাতিরাষ্ট্র বা রিপাবলিক রাষ্ট্রকে আপনি মুসলমান কোপানি বা বৈষম্য তৈরিতে উপযোগী করে হাজির করবেনই। আর সেজন্য  ‘‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এই হাতিয়ার তুলবেনই। ফলে এই অসততার এমন আউটকামই আমরা হয়ত দেখব। তাই এককথায় বললে, রিপাবলিক রাষ্ট্রমাত্রই তা গড়ার মূল উদ্দেশ্যই তো হল নাগরিক বৈষম্য দূরে রাখা। ধর্মীয় বা যে কোন পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিক অধিকারে সকলেই সমান – এই নীতির বাস্তবায়ন। কাজেই মুসলমান বা ধর্মীয় বিয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র অবস্থান নেয়া অপ্রয়োজনীয়; আর তাতে এতে  বৈষম্য তৈরিতে উপযোগী করে যে কোন রাষ্ট্র গড়া বা রূপ দেয়া হবে যেটা অগ্রহণযোগ্য ও প্রতিরোধযোগ্য হ্যে দাঁড়াবে যা কাম্য নয়।   

    একথা সত্য যে, একটা রিপাবলিক রাষ্ট্র ধর্ম বা অন্যকোন পরিচয় নির্বিশেষে বৈষম্যহীন ভাবে তার সকল নাগরিকের সকল ‘মৌলিক নাগরিক অধিকার’ সুরক্ষা দিবার প্রতিশ্রুতিতেই কেবল জন্ম নিতে পারে বা হওয়ার কথা।
    কিন্তু বাংলাদেশ মানে যে পুরাতন অখন্ড ভারত ভেঙ্গে আজ যে তিন রাষ্ট্র হয়েছে  এর একটা রাষ্ট্র – এই বাংলাদেশে (সাথে হিন্দুত্ববাদি ভারতেও) কিছু পোগতিশিল কমিউনিস্টের এই ধারণা যে – না এভাবে চলবে না। রাষ্ট্রকে ইসলাম কোপাতেই হবে। মুসলমান বিদ্বেষী ও মুসলমানের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানি ইত্যাদি এমন বৈশিষ্ট তাদের “কল্পিত আধুনিক রাষ্ট্রের” থাকতেই হবে। নাইলে আর সেটা তাদের জাতিরাষ্ট্র হয় কী করে – এতে তো “মজা” নাই। অথচ এটা আধুনিক রাষ্ট্রের কাজ বা এক্তিয়ারই নয়; বা উদ্দেশ্যই নয়। কারণ এমন রাষ্ট্রে মুসলমান নাগরিককে যদি চিন্তায় খাটো আর নিচা সংস্কৃতির বলে মিথ্যা হলেও তুলে ধরতে করে তবে তা এক চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রই হবে!  তবে বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রই যদি তাদের মজা পাবার উপাদান হয় তো বলার কিছু নাই!  অতএব একারণেই ভারতে ১৯৪৭ সালের পরে সম-নাগরিক অধিকারের নয় বরং হিন্দু আধিপত্যের ভারতবর্ষ মানে হিন্দু জাতশ্রেষ্ঠত্বের এক ভারত জাতিরাষ্ট্র সেখানে গড়ে উঠেছে। আর তাই-ই হয়েছে আমাদের বাস্তবের ভারত! আর এর প্রভাবে অন্য দুই রাষ্ট্রও তাই একই!

    তবে বিশেষ করে পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে ১৯৫১ সালে জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাশ হবার পরে জমিদারি হারানো জমিদার হিন্দুরা প্রতিশোধ নিতে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিল। এই ভেবে যে এই পার্টি ধর্মবিরোধী; কাজেই এদের ধর্মবিরোধী রাজনৈতিক ধারার আড়ালে বসে তারা মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণাছড়ানি বয়ান প্রগতির বয়ান বলে হাজির করতে পারবেন। প্রগতিবাদিতার আড়ালে এরা রাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইসলামের সাথে সংঘাত বাধাতে আর রাষ্ট্রকে দিয়ে ইসলাম কোপাতে বা এভাবে রাষ্ট্রকে সাজাতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। যদিও এতে কারও লাভ হয় নাই। কারণ, প্রতিশোধ নেয়া মানুষের করণীয় কাজ হতে পারে না। তবু এই ততপরতাকেই আমরা  এই অঞ্চলে চিনি পোগতিশিলতা-কমিউনিস্ট বলে। তারা আমাদেরকে ধর্মচিন্তা-মুক্ত বিশেষত ইসলাম-চিন্তা মুক্ত এক সমাজ-রাষ্ট্র হাজির করতে চায়; আর এভাবে তারা তাদের জমিদারি হারানির ক্ষোভের প্রতিশোধ নিতে তারা কায়েম করতে বদ্ধপরিকর! তাই তাদের এক নম্বর কৌশল হল আধুনিক রাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয় বা গায়ে পড়ে ভাবে হলেও ইসলামের বিরুদ্ধে খাড়া করে হাজির করা।

    আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথাঃ
    আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা তেমনই এক ইস্যু যা দিয়ে পোগতিশিল-কমিউনিস্টরা রাষ্ট্রকে মুসলমান কোপানোর কাজে ব্যবহার করতে চায়; আর তা পারবে বলে তারা মনে করে। তারা অপ্রয়োজনীয়ভাবে ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা বিশেষত ইসলামি ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা ভেঙ্গে চুরমার করতে চায়।
    আর এটাকেই তারা ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট খচিত’ তাদের কথিত উচ্চমার্গীয় জ্ঞান জাত ততপরতা বলে আড়াল নিয়ে দাবি করে থাকে! কিন্তু আড়ালে কেন?
    কারণ, প্রগতিবাদীদের ৯৯.৯৯% এর ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট” জিনিষটা কী এসম্পর্কে পড়াশুনা-বুঝাবুঝি একেবারেই নাই। বেশির ভাগই এর নাম শুনে নাই।  তবে এর অন্তত একটা কারণ হল, মার্কসের কোন রচনায় রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট বা আধুনিকতা বা রিপাবলিক রাষ্ট্র ইত্যাদি সেখানে কোন প্রসঙ্গই নয়, হয় নাই। আবার এমনকি তাদের মধ্যে যারা অতি দিগগজ  মানে ধরেন যারা লন্ডনে গিয়ে ইংরাজী সাহিত্যে পিএইচডি করে এসেছেন – এরাও অন্তর্ভুক্ত মানে একই অবস্থা তাদের! তাই এরা কখনও ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট’ নিয়ে দুপাতা লিখেছেন জানা যায় না। ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট’ কে প্রগতিশীলতা-কমিউনিস্ট এর সাথে রিলেট করে কিছু ব্যাখ্যা করেছেন জানা যায় না।  অর্থাৎ কার্যত যেহেতু তাদের চিন্তার মুরোদ নাই – অক্ষম উত্থানরহিত; তাই ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট’ নিয়ে তাদের হাউশ তাদের খায়েসের বাতচিত তারা কেবল তাদের মধ্যেই এক আড়ালের মধ্যে রেখে দিয়েছেন। এবং অলিখিত আলোচনাতেই আটকে রাখেন!
    অথচ এরা প্রত্যেকে আধুনিক রাষ্ট্রকে দিয়ে ইসলাম কোপানির অগ্রসেনানী সৈনিক! রাষ্ট্রকে তারা তাদের ইসলামবিদ্বেষ এর খায়েস পূরণের হাতিয়ার করে অপব্যবহার করতে চায়!

    ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা ও রিপাবলিক রাষ্ট্রঃ
    আপন ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – একে একটা নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য অধিকার হিশাবে দেখা এটা ইউরোপের কোন দেশে নাই; কিন্তু একমাত্র কেবল আমেরিকান কনষ্টিটিউশনে এটা পাওয়া যাবে। পিছনের অনেক কারণের মধ্যে মূল কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান বা ওসমান সাম্রাজ্যের পতনের পরে এই সাম্রাজ্য-ভুখন্ডকে কার্যত বৃটিশ ও ফরাসীরা  নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া থেকে। এরপর এরা ওসব ভুখন্ডের মুসলমান বাসিন্দাদেরকে শাসন করতে গিয়ে – পুরানা ক্রুসেডে ইউরোপের হারের কথা না মনে পড়ে যায় – এটা একটা ভয়ের কথা ছিল। এজন্য যে নতুন শাসন-তত্ব শাসক বৃটিশ ও ফরাসীরা ১৯১৮ সালের পরে ওসমান সাম্রাজ্য ভুখন্ডে  চালু করেছিল তা হল, কথিত নয়া রাষ্ট্রে, রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করা নামে এক অদ্ভুত বায়না সেখানে তারা হাজির করেছিল। গত ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফিলিয়া সম্মেলনের কখনও অথবা ক্লাসিক্যাল ইউরোপীয় রাষ্ট্র-চিন্তায় কখনও এমন কথা শুনা যায় নাই।  বরং উল্টা আমেরিকা নিজে ১৭৭৬ সালে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশ হবার পরে পনেরো বছরের মধ্যে ১৭৯১ সালের ডিসেম্বরে প্রথম কনষ্টিটিউশন সংশোধনী আনা হলে সেখানে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো কী কী তা বর্ণনা করতে গিয়ে সেখানে এই প্রথম কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার বলতে তাতে ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – এটাকেও এক নাগরিক অধিকারের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। আর এথেকে এটা প্রমাণ করেছে যে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারনার সাথে ধর্ম পালনের কোন বিরোধ নাই। তাই রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করার কথা বুজরুকি ও শয়তানি!
    কিন্তু এই শয়তানিটাই আপন হয়ে দাড়ায় আমাদের এই অঞ্চলে হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের অনুসারি, হিন্দুত্ববাদিদের কাছে।   ফলে তা প্রগতিশীল ও কমিউনিস্টদের কাছেও।

    সব সিভিলাইজেশনই ধর্মতত্বের হাত ধরেই আগিয়েছেঃ
    কিছু কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। সারা দুনিয়াতে মানব সভ্যতার বয়স  ধরা হয় প্রায় ছয় হাজার বছরের বেশি। ইতিবাচক অর্থে মানব সভ্যতা (human Civilization) এর সোজাসাপ্টা মানে হল যখন থেকে মানুষ যাযাবর জীবন, ফলমূল খাবার টোকায়া খাওয়ার জীবন ছেড়ে এবার কৃষিকাজ শিখে চাষাবাদ শুরু করেছিল। আর চাষাবাদের জীবনের পুর্বশর্ত হল, থিতু হয়ে কোন এক নদীবিধৌত উর্বর ভুখন্ডে বসতি স্থাপন করে বসে যাওয়া  – আগের কোন যাযাবর জীবনের বিপরীতে।  যেটাকে আমরা একালে এমন একেক ভুখন্ডে গড়ে উঠা বসবাস যা থেকে আসলে নানান এথনিক [ethnic] বৈশিষ্টে ভিন্নতায় আমাদের নিজ সভ্যতায় বসবাস শুরু হয়েছিল – আর এটাকেই আমরা সিভিলাইজেশন অর্থে সভ্যতা বলছি।  যা আসলে মূলত এথনিক অর্থে জাত-সভ্যতা! আর  এই এথনিক পরিচয় বলতে যার ভিতরের এক প্রভাবশালী উপাদান হল ধর্মতাত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়!  আর প্রগতিশীলতার নামে আমাদের অনেকের মনে বৈষম্যহীন অধিকারের রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চেয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে এরা  ধর্মতাত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এর সাথে সংঘাত বাধানোকে অনিবার্য মনে করে থাকে। আর এখান থেকেই সব বিরোধের উতপত্তি।
    এখন এই ছয় হাজার বছরের মধ্যে প্রায়  দুহাজার বছর আগে যীশুর জন্ম।  এর মধ্যে নবীর যুগও এসেছে। আর এই সময়কালে সবসময়ই আমরা অনেকগুলো মানে কোন না কোন একটা ধর্মতত্বের হাত ধরেই হেটেছি। আমাদের হাত খালি থাকে নাই। আর ইতিবাচক অর্থে দুনিয়ায় আমাদের সকল সভ্যতা ধর্মতত্বের হাত ধরেই এপর্যন্ত হেটে এসেছে। পরবর্তিতে ১৪৫০-১৫৫০ এই সময়কালকে বলা হয় বিজ্ঞানের যুগ শতবর্ষ – যখন একনাগাড়ে বিজ্ঞানের গুরুত্বপুর্ণ আবিস্কার গুলো ঘটেছিল। কিন্তু এরপরেও এসময়ে “বিজ্ঞান” এসে যাওয়াতে দুনিয়া থেকে কোন ধর্মতত্ব  তো নাই হয়ে যায় নাই! বরং বলা যায় বিজ্ঞানকে পাশে জায়গা ছেড়ে দিয়ে ধর্মতত্ব তার জায়গাতেই আছে। মাঝে একটু কেবল সময় লেগেছে এডজাস্ট হতে পরস্পরকে জায়গা করে দিতে।  তাই শেষ বিচারে  মানুষের এখনকার চিন্তা-চর্চার রূপ যেখানে গিয়েই ঠেকুক চিন্তা-চর্চার শুরুর দিকে সবকিছুই ছিল ধর্মতাত্বিক বৈশিষ্ঠের। কাজেই ধর্মতত্ব জিনিষটা গায়ের জোরে ত্যাগ করার বিষয়ই নয়! আর কাকে ত্যাগ করব আমাদের সকলের আদি না হলেও পুরাতন সব প্রজন্মকে??? এটা কী সম্ভব?? কাজেই  ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – একে মৌলিক নাগরিক অধিকার হিশাবে রিপাবলিক রাষ্ট্রে রেখে দেওয়া একটা খুবই উপযুক্ত এপ্রোচ বা আগানোর উপায়। কিন্তু কাজ আরও আছে আর তা করতে হবে বুদ্ধিমান হয়ে!

     

    তাহলে আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথার কী হবেঃ
    খুবই সহজ!
    ১। সবার আগে আমাদের মনের ভিতরের যেকোন ধর্মের প্রতি সমস্ত বিদ্বেষ, ঘৃণা ইত্যাদি বাইরে বের করে ফেলে দিতে হবে; তাতে আমরা যার যার ধর্মপালনের লোক হই আর নাই হই না কেন! ধর্মপালন বা মানা না মানা আপনার নিজস্ব বিষয়। কিন্তু ধর্মের প্রতি সমস্ত বিদ্বেষ, ঘৃণা ইত্যাদি ত্যাগ করতেই হবে! নাগরিক যার যার ইচ্ছা হবে তাকে তার ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – একে মৌলিক নাগরিক অধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে করতে হবে। আর আমরা তার ফেলো বা পাশের নাগরিকেরা আমাদের দায়িত্ব হবে আমরা নিজেরা যেই ধর্মই পালন করি অথবা কোন ধর্মই পালন না করলেও ফেলো নাগরিকের অধিকার রক্ষায় আমাদের সহযোগিতামূলক অবস্থানে যেতে হবেই।
    ২।  আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা মানেই যেগুলো বহু পুরানা ট্রাডিশন হিশাবে কোন না কোন ধর্মতত্বের ঘরে বসে, হাত ধরেই শুরু হয়েছিল। ধর্মীয়-কালচারাল ও সামাজিকতায় মাখামাখি হয়ে থাকা এই ট্রাডিশনে হস্তক্ষেপ বা ভেঙ্গে দেয়ার চেষ্টা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়; আর এটা রাষ্ট্রের কোন কাজ বা এক্তিয়ারই নয়। বিশেষত এক হিশাবে দেখলে এসব ট্রাডিশন মানা না মানা তো পারসোনাল ইস্যু।  তবে রাষ্ট্রের দায় আছে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো সুরক্ষা দেওয়ার। তাই সেই কর্তব্য পালন করার প্রয়োজনে ট্রাডিশনাল বিয়ের প্রথায় কোন হাত না লাগিয়ে রাষ্ট্র বরং কিছু বাড়তি কাজ করণীয় বাধ্যতামূলক করে দিতে পারে। যেমন বিয়ে ধর্মীয়-সামাজিক রীতিতেই ট্রাডিশন মেনেই চলবে। তবে এর আর বাড়তি দিকটা হতে পারে হলঃ ক. এই বিয়েটা সরকারি লাইসেন্স নেয়া কাজি বা রেজিষ্টার্ড কাজির কাছে লিপিবদ্ধ (রেজিষ্ট্রেশন) করাতেই হবে। যেই কাজিই আবার বিয়ের সাতদিন বা একমাসের মধ্যে (যেভাবে বলা থাকবে) সরকারি ডাটাবেজে এই বিয়ের সব তথ্য ফিড করা হয়েছে তা নিশ্চিত করবে – ঐ বিয়ের ডকুমেন্টে বা কাবিনে ডাটাবেজ সংরক্ষকের প্রতিস্বাক্ষর যুক্ত করে দিবে। এতাই মূলত রেজিস্টার্ড কাজির রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মূল করণীয় কাজ হবে।
    একচুয়ালি, এটাই বাংলাদেশের বর্তমান কাজি অফিসের কাজের প্রচলিত নিয়ম; যেটা ইতোমধ্যেই চালু হয়ে আছে ১৯৮৮ সাল থেকে মানে, এরশাদের আমলে। এবং সেসময় আমাদের রাষ্ট্রের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা তো ভেঙ্গে ফেলতে বা হস্তক্ষেপ করতে হয় নাই। বরং সেসময় মূল কনসার্ণ ছিল পুরুষেরা যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে আর যেকোন মনের দশা খেয়ালে থাকা অবস্থায় তাঁর নারীকে তালাক দিয়ে দিচ্ছিল। এই দায়িত্বহীন কাজগুলোকে শৃঙ্খলা আনতে গিয়ে দেখা গেল ১৯৮৮ সালের আগে বিয়ে হত পাড়ার মসজিদের মোয়াজ্জিন কে ডেকে এনে দুজন দোস্তকে সাক্ষী রেখেই বিয়ে সম্পন্ন মনে করা হত। কিন্তু কোথাও এই বিয়ের তথ্য সংরক্ষণ করার কোন সিস্টেমই ছিল না।  আর তাই দায়িত্বহীন তালাক তখনই শৃঙ্খলে আনা সম্ভব হবে যখন বিয়েটা যে হয়েছিল এর ডাটাবেজ সংরক্ষিত থাকবে ও সার্টিফাই বা সার্টিফিকেট দেবার ব্যবস্থা থাকবে। এসব কারণেই ১৯৮৮ সাল থেকে বিয়ের ডাটাবেজ সংরক্ষণ ভিত্তিক কাজি-রেজিষ্টার্ড বিয়ে ব্যবস্থা চালু করা গেছিল। তবুওও এতে এখনও  যেটা অসম্পুর্ণ অংশ তা হল, মুসলমান বাদে অন্য নাগরিকদের  বেলায় এমন কোন রেজিষ্ট্রশনের সহজ ব্যবস্থাটা এখনও নাই।  অথচ রাষ্ট্রের দিক থেকে দরকারি হল, কোন ধর্মীয় ট্র্বেডিশনের বিয়ে সেটা হোক বা না হোক – সমান্তরালভাবে সকল নাগরিক মাত্রই সবার বিয়ে রেজিষ্টেশনেরে ব্যবস্থা থাকতেই হবে। কারণ, এটা না থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে নারী নাগরিকেরা। নিশ্চয় আমরা সকলে মানব যে বিয়ের পরে সামাজিক পারিবারিক দায়ীত্ব ফেলে পুরুষেরা সোজা হেটে চলে যেতে খুবই ওস্তাদ!

    অতএব, কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রে ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ ব্যবস্থা চালু একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। সকল নাগরককে একই খুড়ে মাথা কামিয়ে দিতে হবে কেন? মানে ধর্মবিহীন বিয়ের ব্যবস্থা কায়েমই একমাত্র রাষ্ট্রের করণীয় এটা ভিত্তিহীন কথাই শুধু নয়, এই বক্তব্য ধর্মবিদ্বেষী যা মূলত ইসলামবিদ্বেষী ঘৃণাজীবীদের অসৎ কাজ হবে। এককথায় ‘ইউনি্ফর্ম সিভিল কোড’ এর উদ্দেশ্য মুসলমান কোপানি আর ঘৃণাচর্চার দোকান খুলে বসার সামিল! আর  মূলত  ধর্মপালনের কাজ স্বাধীনভাবে করার সুযোগ করে দেয়া রাষ্ট্রের কাজ তাতে ধর্ম তার এক্তিয়ারের মধ্যে কাজ করবে আর রাষ্ট্র নাগরিক অধিকার রক্ষার পক্ষে তার এক্তিয়ার ও দায়ীত্ব পালন করে যাবে। এখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অসততায় ইসুলাম বা মূসলমান এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে খাড়া করা শুধু অন্যায় নয়, এটা অপরাধও!

    তাহলে মোদি এখন কী করছেনঃ
    মোদি গত কয়েক বছর ধরে ভারতীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে আরেক বৈষম্য চালু করতে পায়ে পারা দিয়ে হলেও জবরদস্তিতে  ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ চালু করার হুমকি দিয়ে চলেছেন। তাঁর এই ইসলামবিদ্বেষকে আড়াল করতে এখানে এসে তিনি মর্ডানিস্ট হবার ভান করছেন। যাতে মুসলমানেরা আরও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়।  কিন্তু ভারতের অনেক পুরানা রাষ্ট্র বলে এর কিছু সুবিধাও আছে।  তাই তাদের বিচার বিভাগের অংশ প্রতিষ্ঠান ‘আইন কমিশন’ এর মতামত যথেষ্ট শক্তিশালী।  এমনকি কোন আইন বদলাতে গেলে সেবিষয়ে আইন কমিশনের মতামত ভালই গুরুত্ব পায়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

    কলকাতার আনন্দবাজার ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এর বাংলা করেছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। ইলেকশনের আগে আর পিছনে অ্যামেরিকান সমর্থনে রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধীদল এখন একজোট হচ্ছে বলে  অনেক কিছুতেই আর মোদির টাকা খেয়ে মিডিয়া কাজ করছে না। তাই আনন্দবাজার নিজেই জানাচ্ছে ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ নিয়ে ভারতের আইন কমিশনের মতামত কী? নিচের সেই পুরা প্যারাগ্রাফটাই আনন্দবাজার থেকে তুলে আনা হয়েছে দেখেন।

    “কী বলেছিল ২১-তম আইন কমিশন?”
    সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বলবীর সিংহ চৌহানের নেতৃত্বাধীন ২১-তম আইন কমিশনের মত ছিল, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকারের মতো পারিবারিক বিষয়ে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিষ্টান, পার্সি, জৈন সকলের একই আইন চালু করার প্রয়োজন নেই। পারিবারিক আইনে সংস্কার নিয়ে কমিশনের বক্তব্য ছিল,“সংঘাতের সমাধান ফারাক মুছে ফেলা নয়। অধিকাংশ দেশ এখন ফারাককে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে এগোচ্ছে। ফারাক থাকাটাই মজবুত গণতন্ত্রের প্রতীক। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এখন কাঙ্ক্ষিত নয়, প্রয়োজনও নেই। তার বদলে যেখানে বৈষম্য রয়েছে, সেগুলো দূর করা উচিত।”

    অর্থাৎ এককথায় বললে আইন কমিশন প্রধানমন্ত্রীর সাথে নাই। তবু মোদি ডেসপারেট ভাবে আগাচ্ছেন। আর ওদিকে এতদিন কংগ্রেস-কমিউনিস্টেরা ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ কে মুসলমানেদেরকে প্রগতিশীলতায় শিক্ষিত করার আইন মনে করত। কিন্তু এখন?
    এখন এরা মোদিবিরোধী প্রায় সকলেই অবস্থান বদলে নিয়েছে। তারা এখন আইন কমিশনের বক্তব্যকেই নিজেদের বক্তব্য বলে প্রচার করতে নেমেছে। সিপিএম এর পরিবর্তিত অবস্থান পাওয়া গেছে তাদের গণশক্তি পত্রিকায়। নিচে সে অংশ তুলে আনা হয়েছেঃ

     সিপিএম এর অভিন্ন দেওয়ানি বিধি 
    বিবৃতিতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে তৎপরতার বিরোধিতা করে পলিট ব্যুরো বলেছে, এই বিষয়ে ফের আলোচনা শুরু করেছে বর্তমান (২২তম) আইন কমিশন। অথচ এর আগের আইন কমিশন (২১তম) বিষয়টি নিয়ে নানা পর্যায়ে আলোচনা করে ২০১৮ সালেই বলেছিল, ‘‘এখন অভিন্ন দেওয়ানি বিধির না প্রয়োজন আছে, না এই বিধি কাম্য।’’ সিপিআই(এম) এই অবস্থানকে সমর্থন করে। অভিন্নতা আর সমতা এক নয়। পার্টি সমস্ত সম্প্রদায়ের মহিলাদের সমানাধিকারের পক্ষে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত ও প্রথাগত আইনগুলিকে সংস্কারের মাধ্যমেই সেই লক্ষ্যে সব থেকে ভালভাবে এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে, যে প্রক্রিয়ায় সক্রিয় গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ থাকবে ওই সম্প্রদায়গুলির সমস্ত মহিলা ও পুরুষের।

    কংগ্রেসের অবস্থান এখানে পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের প্রগতিশীলদের অবস্থান আগে যাই থাক তাদের উচিত হবে ভেবে চিন্তে তাদের আপডেটেড অবস্থান দেখানো।
    আশা করব সমাজের সকল অংশ ইতিবাচকভাবে নিজ নিজ দায়-অবস্থান দায়ীত্বের সাথে তুলে ধরবেন; তাতে আগে আমরা যে অবস্থানেই থাকি না কেন! ঘৃণা-বিদ্বেষ আমাদের কারও জন্যই কোন সমাধান-অবস্থান নয় হতে পারে না! এটুকু আমাদের না বুঝার কিছু নাই!

    আপডেটেডঃ ০৯ জুলাই ২০২৩;  দুপুর ১২ঃ ৫৮
    আপডেটেডঃ ১০ জুলাই ২০২৩;  দুপুর ০৩ঃ ৩৩

    >>>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ব্রিকস বুঝাবুঝিতে পিছিয়ে – আমার কেন আদার বেপারী 

    ব্রিকস বুঝাবুঝিতে পিছিয়ে – আমার কেন আদার বেপারী
    গৌতম দাস

    ২৫ জুন ২০২৩  সকাল ০৮ঃ ০৪

    https://wp.me/p1sCvy-4EQ

     

              BRICS

    আবার ব্রিকস [BRICS]! বাংলাদেশে এনিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে! তাতে এর সবটা না হোক মূল বিষয়টা কী তা বুঝি -না-বুঝি, অনেকেই এতে মেতে উঠেছে এই মনে করে যেন এটা বাইডেনের আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনের এক কড়া সিদ্ধান্ত-পদক্ষেপ।  আর হাসিনা বাংলাদেশকে ব্রিকসে নিয়ে উঠালে মানে সদস্য  করে ফেললে তা বাইডেনের আমেরিকাকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। অথবা বাইডেনকে যেন এক কড়া জবাব দেয়া হবে। এই ভুল অনুমানের উপর মিডিয়া গরম!  কারণ ব্রিকস মানে যেন একটা অর্থনৈতিক পক্ষ-জোট!  এই এজাম্পশন বা ধরে নেওয়া অনুমান একেবারেই ভিত্তিহীন! এক ভুল অনুমান!  দাঁড়ানো এক ভুল বুঝাবুঝি! 

    কথা আরো আছে তাহলে ব্রিকস যদি নেহায়তই এক আমেরিকাবিরোধী অর্থনৈতিক জোট হয় আর এর জন্ম মাত্র ২০০৯ সালে – সেটা কী ২০০৯ এর জায়গায় গত শতকে ধরা যাক ১৯৯০ এর দশকে হত তবে কী এটা আমেরিকাকে আরো আগে বধ করে ক্ষতিগ্রস্থ করে দিতে পারত না? ব্যাপারটা কী তাই?  তাহলে তো এই প্রশ্নেরও জবাব পেতে হবে যে ব্রিকস উদ্যোক্তারা সেটা করে নাই কেন?  সারকথায় ব্রিকস কখন কার্যকর হবে – খুলবে  সেই সময় নির্ধারণ – সেটা কী উদ্যোক্তাদের ইচ্ছাধীন? নাকি অন্য কোন শর্ত (অবজেকটিভ) বা কিছু পুর্ব-প্রস্তুতি পূরণ  আগে হতে হবেই যেটা চীনের ইচ্ছাধীন নয়?  এই জবাবটা এখনই দিয়ে নেই। এটা চীন বা আমেরিকাবিরোধী কারও ইচ্ছাধীন নয়। বরং বেশকিছু বিষয়কে বাস্তবে যোগ্য হয়ে উঠতেই হবে, পেকে উঠতে বা যোগ্য- ম্যাচিউরিটি -তে পৌছাতে হবেই! যা এখনও হয় নাই। তবে হওয়ার দিকে হাঁটছে! এছাড়া আগেই বলেছি এটা কোন অর্থনৈতিক জোট একেবারেই নয়। কোন আশিয়ান [ASEAN] অথবা RCEP [Regional Comprehensive Economic Partnership ] ধরণের বিশেষ অর্থনৈতিক জোট একেবারেই নয়! তাই এটা ঠিক কে অ্যামেরিকান আর কে চীনের পক্ষ নিয়ে কথা বলব আর এই ভিত্তিতে কাকে সঠিক বলব ব্যাপারটা মোটেও তা নয়!  

    অতএব, এমনই অনেকগুলো ভুল বুঝাবুঝির মধ্যে প্রথম এক সমস্যা হল ব্রিকস নিয়ে রিপোর্টিংয়ের। যেমন বাংলাদেশে বেশির ভাগ মিডিয়ায় শিরোনাম – বাংলাদেশ ব্রিকসে যোগ দিতে যাচ্ছে – ধরণের। একথার মানে কী? বাংলাদেশ চাইলেই কী ব্রিকসে যোগ দিতে পারবে? নাকি আগে দাওয়াত আসতে হবে? মানে তারও আগে ব্রিকস নিজেরা কোন নয়া সদস্য নিতে চায় এমন এক তাদের আভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত হতে হবে। মানে ব্রিকস এর পক্ষে এটা এমন পরিপক্ক হয়েছে বসে সিদ্ধান্তে আসতে হবে! কিন্তু এসব প্রশ্ন এখনও এখানে সবটা পরিস্কার ঠিক তা নয়।

    তবে তুলনায় আপাতত এখানে ডেইলি স্টারের রিপোর্ট অনেক স্বচ্ছ ও সাবধানী। মানে যা জানে না, তা নিয়ে আগায় নাই; অনুমান করে ইচ্ছামত লিখে নাই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনকে কোট করে তারা লিখেছে, “We will surely join once they invite us. We have yet to receive any formal letter…. । বাংলা করলে হয়, “আমাদের একবার দাওয়াত করলেই আমরা নিশ্চয় সেখানে যোগ দিব। (এর আগে) আমাদেরকে এখনও তাদের আনুষ্ঠানিক (দাওয়াতের) চিঠি পেতে হবে”।  মানে আশা করা হচ্ছে যে আগামি আগষ্টে তাদের এবারের ব্রিকস সম্মেলনের আগে তারা নয়া সদস্য হতে আগ্রহী বা যাদেরকে তারা সদস্য হিশাবে নিতে আগ্রহী তারা দাওয়াত পত্র পেতে পারে। এরপরেই যোগ দেয়া না দেয়া নিয়ে নড়াচড়া শুরু হবে।

    ব্রিকস নিয়ে বিভ্রান্তিই বিভ্রান্তিঃ
    ব্রিকস নিয়ে যেকোন কিছুতেই বিভ্রান্তির শেষ নাই। এর এক অন্যতম কারণ, ব্রিকস যাদের লেখার বিষয় হয়েই যায় যেমন, মিডিয়া রিপোর্টার বা যারা কলাম লিখেন কমবেশি এদের সকলের মধ্যেই বিভ্রান্তি ঢুকে আছে, তা বর্তমান। যেমন ধরণ হিশাবে ব্রিকস কেমন সংগঠন – এই প্রশ্ন কে কিভাবে নাড়াচাড়া করছে কি লিখছে তাতেই বুঝা যায় যে তারা প্রায় সকলেই বিভ্রান্ত; মানে নিশ্চিত জানা নাই। প্রথমত, মিডিয়ায় অনেকেই “ব্রিকস-কে অর্থনৈতিক জোট” ভেবেছে।  যেমন প্রথম আলোর এক ‘বিশেষ প্রতিনিধি’ লিখছে,  “ব্রিকস হচ্ছে পাঁচ দেশের একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট”।  অর্থাৎ এই বিশেষ প্রতিনিধি ব্রিকস-কে শুধু অর্থনৈতিক জোট-ই না একে এক আঞ্চলিক জোটও বানিয়েছে। কিন্তু ব্রিকস আর যাই হোক কোন আঞ্চলিক বা ভৌগলিক জোট একেবারেই নয়। কোথায় দক্ষিণ আফ্রিকা আর কোথায় রাশিয়া আর কোথায় ভারত বা চীন – এসব একটা অঞ্চল বা একটা মহাদেশেই সব সদস্য তা তো নয়; কাজেই একটু কল্পনা করে দেখলেই তো এমন ভুল করার কথা না!
    আবার দ্যা বিজনেস স্টান্ডার্ড এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান- পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক ড. এম এ রাজ্জাক এর বরাতে জানাচ্ছে,  তিনি বলছেন – ‘আমাদের স্মরণে রাখতে হবে এটা কোনো বাণিজ্য জোট নয়, তাই যোগ দিলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে না।’  আবার ঐ একই রিপোর্ট,  এবার আরেক বরাতে জানাচ্ছে, – “যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির ব্রিকসকে একটি ‘শিথিল ধরনের অর্থনৈতিক জোট’ বলে অভিহিত করেন, যেখানে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা রয়েছে”।  এটাও এক শতভাগই ভুল অনুমান।
    জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বিডিনিউজও লিখেছেন, –  ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের অর্থনৈতিক জোট ব্রিক এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলন হয় ২০০৯ সালে। এটা তো এক ভিত্তিহীন ভুল অনুমান যে ব্রিকস এক অর্থনৈতিক জোট!
    আবার এক কলাম লেখক ব্রিকসকে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের জোট মনে করে – ধরে নিয়েই লিখেছে “বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্যঘাটতি, যেখানে আমদানি রপ্তানির চেয়ে অনেক বেশি, সেখানে ব্রিকসের সুবিধা আদায়ে একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে”;  তিনি আরও একই লেখায় অন্যখানে লিখেছেন, “…… ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য বিষয়ে উদারতার অভাব আছে“।
    অর্থাৎ সবার ভিতরেই দেখা যাচ্ছে একটা বিভ্রান্তি কাজ করছে যে ব্রিকস [BRICS] কী ধরণের জোট – এই প্রসঙ্গে। অনেকের লেখার রেফারেন্স আনলাম এবং অবশ্যই এসব কাউকে খাটো করার জন্য না। বরং একধরণের সার্ভের মত করে কয়েকজনের লেখা এনে দেখলাম যে সমাজে বিষয়টা নিয়ে আলোচনায় ভুল কোথায় হচ্ছে। সমস্যাটা কোথায়! আর এখন এই বিভ্রান্তি কাটাতে আমার বক্তব্য কী সেটাই নিচে বলব।

    ব্রিকস কোন অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট একেবারেই নয়ঃ
    হ্যা একথা সত্য যে ব্রিকস কোন অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট একেবারেই নয়। এই বুঝাবুঝি ভিত্তিহীন ও ভুল।  কথাটা যদি এভাবে বলি যে আইএমএফ [IMF] বা বিশ্বব্যাংক [ WB or IBRD] বা এডিবি [ADB] বা আইডিবি [Islami DB] এআইআইবি [AIIB] বা এনডিবি [NDB] ইত্যাদি – এরা হল কোন অর্থনৈতিক জোট অথবা কোন বাণিজ্য জোট তাহলে বুঝাবুঝিতে যে কঠিন সমস্যা সৃষ্ঠি হবে – এটা সেধরণের ভুল। দুনিয়ার প্রায় ১৯২+ রাষ্ট্র জাতিসংঘের সদস্য। আর এদের মধ্যে প্রায় সকল রাষ্ট্র-ই  আবার IMF ও WB এদুই প্রতিষ্ঠানের সদস্য। কিন্তু তবু কোন যুক্তি বা বাস্তবতাতে IMF ও WB কোন  অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট একেবারেই নয়।

    বরং সোজাসাপ্টা বললে,   দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের পরিস্থিতিতে ১৯৪৪ সালে Bretton Woods সংগঠন বলে এক গ্লোবাল কনফারেন্সে IMF-WB এদুই গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া হয়েছিল। আবার এদেরকে ঠিক কোন জোট বা সমিতি বলা হয় না। বলা হয় মাল্টি ল্যাটারাল [multi-lateral] বা বহু-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।  আর এসব বহু-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মূল উদ্দেশ্য হল, একটা আন্তরাষ্ট্রীয় ও গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সিস্টেম গড়ে তোলা। অনেক সময় যেটাকে Global Econimic order  – এক শৃঙ্খলাবদ্ধ নিয়মের ব্যবস্থা বলা হয়। আর তা গড়তে Bretton Woods সেই সভায় তাতে স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন এর মত দেশের প্রতিনিধি সহ অন্য আমেরিকাসহ লিডার দেশ এবং আমাদের মত ছোট দেশের প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত ছিল। এটা নিউ হ্যাম্পশায়ারের  Bretton Woods এলাকায় Bretton Woods নামে হোটেলে জন্ম নেয়া এক ঘটনা।  উদ্দেশ্য ছিল  – জাতিসংঘকে যদি বলি এক গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেম কায়েম ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান ঠিক সেই রকম IMF-WB হল এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম কায়েম ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান কায়েম করা যাতে একটা গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বা সিস্টেম চালু করা যায়।

    তাহলে ব্রিকস কীঃ
    ব্রিকস হল সেকালের জায়গায় একালে আরেকটা উদ্যোগের নাম যাদের লক্ষ্য একাল এখন গ্লোবাল নেতৃত্বে এক পালাবদলের যুগ – সেই পালাবদলে মূলত চীনের নেতৃত্বে সেকালে  IMF-WB এর মতই তবে একালে এবং  আগামিতে বিকল্প এক গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বা সিস্টেম কায়েমের লক্ষ্যে কাজ শুরু করা। আর সেকাজের উদ্যোক্তা সংগঠন হল ব্রিকস [BRICS] যার জন্ম ২০০৯ সালে।  তবে পরিস্কার থাকতে হবে ব্রিকস  নিজেই কোন বিকল্প  IMF অথবা WB সমতুল্য প্রতিষ্ঠান তা একেবারেই নয়। বিকল্প  IMF ও WB ধরণের প্রতিষ্ঠান হাজির করা একাজে অবশ্যই লম্বা প্রস্তুতি ও সময় লাগবে; আর তা করার জন্য উদ্যোক্তা তাও আবার একেবারে প্রাথমিক উদ্যোক্তা সংগঠন হল ব্রিকস। যেটা ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকা – এই পাঁচদেশের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে তৈরি এক প্রাথমিক উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান মাত্র।  আর এই মাত্র পাঁচদেশ সদস্য থাকা অবস্থাতেই বিকল্প  IMF-WB গড়ার আগ্রহ থাকলেও কেবল বিকল্প WB গড়ার লক্ষ্যের এক ভ্রুণ প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে ইতোমধ্যেই তারা চালু করেছে গত ২০১৫ সালে। এর নাম নিউ ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক [NDB  বা এনডিবি], যেটাকে বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান বলে গণ্য করতে পারি। আর এই প্রথম ব্রিকসের সদস্য দেশ সম্প্রসারণের কালে ২০২১ সাল থেকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই এর সদস্য হয়ে গেছে। প্রথম আলো লিখেছে, ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্রিকস-ব্যাংকের সদস্য হয়। যদিও আমার ধারণা এভাবে  ব্রিকস-ব্যাংকের সদস্য লিখাটাও এক ভুল বুঝাবুঝির উৎস বা ভুল হবে। বরং যদি বলা যেত ব্রিকস উদ্যোগের বিশ্বব্যাংক অথবা আরেকটু পরিস্কার করে ব্রিকস উদ্যোগের বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান – তাহলে এসব কথা নয়া ভুল বুঝাবুঝি তৈরি করত না। মূলকথা ব্রিকস-কে কখনই  অর্থনৈতিক জোট অথবা কোন বাণিজ্য জোট হিশাবে তো নয়ই এমনকি ব্রিকস নিজেই এক আইএমএফ অথবা বিশ্বব্যাংক হতে যাচ্ছে এভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়া যাবে না। তা ভুল হবে।

    মূলকথা ব্রিকস-কে কখনই  অর্থনৈতিক জোট অথবা কোন বাণিজ্য জোট হিশাবে তো নয়ই;
    এমনকি ব্রিকস নিজেই এক বিকল্প আইএমএফ [IMF] অথবা বিশ্বব্যাংক [WB] হতে
    যাচ্ছে এভাবেও পরিচয় করিয়ে দেয়া যাবে না। কারণ সেটাও ভুল। 

    বরং ব্রিকস হল স্রেফ উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান যার ইচ্ছা আছে আগামি দিনের দুনিয়াতে
    বিকল্প  IMF এবং WB প্রতিষ্ঠান গড়ে নিয়ে এক
    নয়া  গ্লোবাল  সিস্টেমের জন্ম দেয়া।
    আর ‘ব্রিকস উদ্যোগ’ যেন জন্ম নিয়ে নেয়, গড়ে উঠে – আমেরিকা নিজেই পরোক্ষে ইস্যুটাকে এদিকে ঠেলে দিয়েছে।    

     

    আমাদের বুঝাবুঝি পরিস্কার না থাকার পিছনের অন্তত দুই সমস্যাঃ
    যতদুর লিখেছি তাতে অন্তত এতটুকু পরিস্কার যে আমাদের সমাজে বুঝাবুঝিতে ব্যাপক সমস্যা আছে। এদিকে, আমরা চাই বা না-চাই আমাদের পরিচিত দুনিয়াটাতে ব্যাপক বদল ঘটে যাচ্ছে এটা অন্তত আমাদের টের পাবার কথা। এব্যাপারে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একেবারেই অপ্রস্তুত। পাবলিক বা সরকারি হলে সেখানকার মূল ইস্যু লীগ বা বিএনপি কোনটা ভাল!!!!! কে কোনদিকে!!
    অথচ হওয়া উচিত ছিল ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াকে বুঝব কী করে এবং গ্লোবাল সিস্টেম প্রতিষ্ঠান যেগুলো সেই ১৯৪৫ সালে যাত্রা শুরু করেছে এদের ততপরতায় যে দুনিয়ায় নয়া ব্যবস্থা চালু হয়েছিল একে বুঝবার উপায় কী? সেগুলোর ভাল-মন্দ দিক নিয়েও আলোচনা হতে পারত। আর সেকাজে তরুণদের যোগ্য করে  গড়ে তোলা এটাই হতে হত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনার মূল লক্ষ্য। কিন্তু তা হয় নাই। আমরা এর বদলে কেন কমিউনিজম বা কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদিতায় ঈমান আনতেও হবে এবং এটাই নাকি সবচেয়ে “অগ্রসর জ্ঞান” তা মনে করে আমরা বাস্তবতা বা বাস্তব জীবনের বাইরে থাকতে চেয়েছি।  যেটা এখন পরিস্কার যে আমাদের এই অঞ্চলে কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদিতাই আসলে এক হিন্দুত্ববাদী মাত্র। আর এটাই আমাদেরকে ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়ায় যে নয়া ধারা একটা গ্লোবাল সিস্টেম-ব্যবস্থা খাড়া হয়ে গেছে তা বুঝতেই দেয়নি।

    বরং ব্যাপারটা হয়েছে এমন যেন, একটা জিনিষ বাঘ না বিড়াল সেটা বুঝব শিখে ফেলব কী করে সেই বুঝাবুঝির ক্ষমতা শানানো বা চর্চা করা নয়; এর চেয়ে আমরা ভাগ হয়ে গেছি এভাবে যে আমাদের মধ্যে কে কে এটাকে বাঘ বলার পক্ষে আর কে কে বিড়াল বলার পক্ষে। ফলে এরই নিট ফলাফল হল আমরা কোন পক্ষই আজ দুনিয়াকে এসব ফেনোমেনাগুলোকে বুঝতে আমরা কেউ-ই সক্ষম নই, হই নাই।
    তাই, আমাদের বোকা বোকা প্রশ্ন হল জাতিসংঘ কেন “গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান” নয়। কেন কেউ কেউ ভেটো সদস্যধারী? এই খায়েস শুনলে মনে হবে প্রশ্নকর্তা খুবই বোদ্ধা! কিন্তু আসলে সে একটা পড়ালেখা না করা চটকদার তার্কিক! আবার অগ্রসরতার দাবিদার কমিউনিস্ট তাদেরও জাতিসংঘ  মানে, এই গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কোন ধারণা নাই।  আর  IMF-WB  সম্পর্কে ধারণা সেটা আরো করুণ অবস্থা। কমিউনিস্টদের চোখে এগুলো হলো “নিপাত যাক প্রতিষ্ঠান”।   মানে যেকথা বলছিলাম বাঘ না বিড়াল এর বুঝাবুঝি ও ফারাক করতে শিখা ও জানা – এসব জানার পদ্ধতি শিখার কাজ যেখানে মুখ্য হওয়া উচিত ছিল সেসব ফেলে আমরা হয়ে গেলাম কে বাঘকে বিড়াল বলে বা কে বিড়ালকে বাঘ বলবে এনিয়ে দুপক্ষের লড়াইয়ে বিভক্ত। IMF-WB “নিপাত যাক প্রতিষ্ঠান” -এধরণের হতেও পারে! কিন্তু এর আগে এসব প্রতিষ্ঠানকে চিনব কী করে, কী করে চিনতে হয় এর জানার পদ্ধতি-উপায় কী আমরা জানলাম না। এর ম্যান্ডেট কী, এটা কী করে, কী করার উদ্দেশ্যে জন্ম আমরা কমিউনিস্টেরা তা জানি না। প্রথমে তাদের বলতে দেখলাম এরা নাকি সুদ খেতে আসছে এমন লগ্নি প্রতিষ্ঠান!!!!!  এর সোজা মানে হল IMF-WB এদের সুদহার কত তাই কোন খবর কমিউনিস্টেরা জানেই না।  আবার আচ্ছা  IMF-WB “নিপাত যাক প্রতিষ্ঠান” মানে হল বাংলাদেশ যদি এদুই প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ ত্যাগ করে তাহলে কী বাংলাদেশ মানে ধরা যাক বাংলাদেশের অর্থনীতি কী টিকে থাকতে পারবে? কেন পারবে অথবা পারবে না তা আমাদের কমিউনিস্টেরা বলতে পারবে, মনে হয় না।  তাহলে?

    আবার দ্বিতীয় সমস্যাটা হল, একালে বিশেষ করে হাসিনার ১৫ বছরে অনেকেই আমেরিকায় বসবাসের রেসিডেন্ট পারমিট পেয়েছে। কিন্তু তাতে আবার এরা একটা কমপ্লেক্সে মানসিক জটিলতায় পড়েছে।  তারা চীন ভাল না আমেরিকা ভাল এই তর্কে অংশ নিতে চায়। তা খুবই ভাল কথা কোন অসুবিধা নাই। কিন্তু তাদের যে দ্বিধা তা হল, তাদের কী আমেরিকা ভাল – একথার পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বলা উচিত নয়!!!!  অর্থাৎ জাতিবাদের সমস্যায় পড়েছেন তারা; যেটা অবশ্য একেবারেই অপ্রয়োজনীয় বিবেচনা। আর আমেরিকা তো  হাসিনার বাংলাদেশ নয়।  তবুও কেউ কেউ আরেক ধাপ উপরে। তারা মনে করে তারা যদি অ্যামেরিকান প্রশাসনের অবস্থানের পক্ষ নিয়ে কথা না বলি তাহলে কী এটা পরে কখনও তাদের রেসিডেন্ট পারমিট বাতিলের পক্ষে যুক্তি হয়ে হাজির হয়ে যাবে? এসব!! “এক্ষেত্রে কে কী পক্ষ-বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন তা নিয়ে আমার বলার নাই। কিন্তু যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল, যেমন ব্রিকস বুঝাবুঝির ক্ষমতা বাড়ানো বা বুঝাবুঝির পদ্ধতিটাই জানা এদিকে কারও আগ্রহ নাই।   বরং বাঘকে বিড়াল বলে বা কে বিড়ালকে বাঘ বলে চালিয়ে দিবে কিনা – কোনটা করবে এটা হল তাদের তর্ক। যা খুবই হতাশজনক!
    তাহলে কথা ছোট করি এখন। তাহলে যারা ১৯৪৫ সালের পরের গ্লোবাল সিস্টেমটা কেন এমন হয়ে খাড়া হয়েছিল তা বুঝতেই অক্ষম – বরং কেবল পক্ষ-বিপক্ষ হয়ে থাকতে চায় বা এসেছে তারা কীভাবে ব্রিকসকে ব্যাখা করতে পারবে বুঝাবুঝি শানাতে পারবে!
    আবার  কমিউনিস্টরা মনে করেন ক্যাপিটালিজম করা অথবা মুনাফা কামানো খারাপ কাজ। কিন্তু বাস্তবতা হল সেই রাম বা অযোধ্যা কোনটাই নাই, টিকে নাই। পুরানা চীনও নাই। সোভিয়েতেরও আগে সেই ১৯৫৮ সালের পর থেকে পুরান চীন নাই।   কাজেই সোভিয়েত বুঝ দিয়ে সোভিয়েতের বাইরের দুনিয়াকে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া কেন? তাতে তো বাইরের সবাইকেই পাপী মনে হবে। কারণ ‘বাইরের দুনিয়া” যেটা সেটাই এখন বাস্তব দুনিয়া। কাজেই সোভিয়েতের টুলস দিয়ে ব্রিকসকে বুঝবার চেষ্টা অর্থহীন!  তাইতারা তো ব্রিকস আলোচনায় ঢুকতেই সক্ষম হবেন না; তাদের অপ্রয়োজনীয় এবং নিপাত যাক অবস্থানের কারণে! তাই ব্রিকস বুঝাবুঝি তাদের জন্য নয়!

    এজন্যই বলছিলাম, যারা বুঝতে চান তাদের জন্য তাহলে সারকথায় এর মানে আমরা এখন আরেক সমস্যায় পড়লাম যে তাহলে আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক কেমন ধরণের সংগঠন যারা সেই ১৯৪৪ সালে একই [ Bretton Woods] বৈঠকে জন্ম নিয়েছিল, তা বুঝতে হবে আগে। আবার, তারা একই বৈঠকে জন্ম নেয়া হলে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক নামে আলাদা দুইটা হবার দরকার হল কেন? এসব দিকগুলো আমাদের জানতে হবে নইলে ব্রিকস উদ্যোগের কিছুই স্পষ্ট বুঝা যাবে না।  আরেকভাবে বললে, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক এদের ম্যান্ডেট বা কী দরকারে জন্ম দেয়া হয়েছিল সেসব কাহিনী ঘাটতে হবে। হ্যা কিছু করার নাই। কারণ, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক তাহলে কী ধরণের প্রতিষ্ঠান – কোন অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট কী? না অবশ্যই না।  তাহলে কেমন প্রতিষ্ঠান এরা? এই হল মুখ্য জানবার প্রশ্ন!

    একটা ক্লু দিয়ে শুরু করা যাক!
    লক্ষ্য করলে দেখব এক আইএমএফ ছাড়া বাকি বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি – এসব প্রতিষ্ঠানের নামের শেষে ব্যাংক বা “ইংরাজিতে B” আছে। কাজেই নামের শেষে ব্যাংক আছে এমন প্রতিষ্ঠানকে  অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট মনে করা অবশ্যই অর্থহীন বা মিলল না – এটুক তো বুঝাই যায়! এরপর আরও ইতিবাচকভাবে বুঝতে চাইলে লক্ষ্য করব এসব প্রতিষ্ঠানের নামে ইংরাজিতে B লেখা থাকার আগে বা পরে দেখেন D আছে,  যেখানে D  হল ডেভেলবমেন্ট শব্দের আদ্যক্ষর।  মানে হল বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি ইত্যাদি এরা সবাই আসলে ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক ধরণের প্রতিষ্ঠান; মানে বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি  এরা কোন অর্এথনৈতিক জোট নয়, একেবারেই নয়। তবে এরা ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক অবশ্যই।

    আচ্ছা,  ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক বলতে ঠিক কী বুঝবঃ
    এর জবাব হল, ব্যাংক বলছে যেহেতু ফলে ঋণ দেয় তা হয়ত অনুমান করা যায়। কিন্তু এই অনুমান কী সঠিক? হ্যা একেবারে সঠিক।  কিন্তু এটা অবশ্যই আমাদের দেশের  প্রাইভেট ন্যাশনাল ব্যাংক বা সরকারি সোনালি ব্যাংকের মত ব্যাংক নয়। এটা হল ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক যেখানে ডেভেলবমেন্ট এর মানে করতে হবে ইংরাজিতে যেটাকে ইনফ্রাস্টাকচার ডেভেলবমেন্ট [অবকাঠামো উন্নয়ন] বলে। আর সেখান থেকে ছোট করে নেয়া শব্দ শুধু ডেভেলবমেন্ট কথাটাই বাংলায় উন্নয়ন।

    আর ইনফ্রাস্টাকচার বা অবকাঠামো শব্দের ব্যবহার অবকাঠামো ব্যাঙ্ক [DB] এভাবে এই শব্দের ব্যবহার ও ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। অনেকে মার্শাল প্ল্যান কথাটা শুনে থাকবেন। বিশ্বযুদ্ধে যেহেতু তাই সেখানে রাস্তাঘাট কারখানা বাড়িঘ্অর বা পানি-বিদ্যুতের উতপাদন অবকাঠামোর এসব দিক থেকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ জর্মানিসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের অবকাঠামোগুলো পুণঃর্গঠন ও উন্নয়ন [reconstruction & Development (RD)] জন্য নয়া উদ্যোগ পরিকল্পনার নামই মার্শাল প্ল্যান । এখানে আমেরিকা একাই মানে  অ্যামেরিকান প্রশাসনের দিক থেকে যে বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল সেটাই মার্শাল প্ল্যান নামে পরিচিত।  সেসময়ে (RD) খুবই এক চালু শব্দ ছিল। যেকারণে আজকের বিশ্বব্যাংকের (WB) মূল পুরা নাম হল [IBRD – International Bank for Reconstruction & Development ]।  আর অবকাঠামো [Infrastructure] বলতে ঠিক কী বুঝব? কোন দেশের অর্থনীতি চালু ও সরগরম থাকার পুর্বশর্ত হচ্ছে ভাল অবকাঠামো থাকা। মানে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট, পানির সাপ্লাই, নিস্কাষণ ব্যবস্থা, কারখানার বর্জ্য রিসাইক্লিং, নগর অবকাঠামো, শিল্পাঞ্চল অবকাঠামো, গ্রামীন রাস্তাঘাট ইত্যাদি গড়তে হয় আগেই। তবেই অর্থনীতি চাঙ্গা হতে পারে। আর সবচেয়ে বড় শর্ত হচ্ছে এসব গড়তে হবে নামমাত্র বা কমসুদের (১% এরও কমে) ঋণে।  সেসব অবকাঠামো গড়তে নামমাত্র সুদে সরকারকে ঋণ দেয়াই  বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি – এসব ডেভেলবমেন্ট ব্যাংকের ম্যান্ডেট বা মুখ্য কাজের লক্ষ্য। এককথায় এগুলো কর্মাশিয়াল বা বাণিজ্যিক ঋণ নয়, তাই সুদ নামমাত্র। এটা ডেভেলবমেন্ট ব্যাংকের মুখ্য বৈশিষ্ঠ। এটাই  যদিও অর্থনীতি উঠে দাড়ালে মাথাপিছু আয় বাড়তে শুরু করলে সরকারকে দেয়া এই ঋণের সুদ বেড়ে ৩% পর্যন্ত হতে পারে!
    তাহলে আমাদের মূল আলোচ্য প্রসঙ্গ – বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি এই ধরণের প্রতিষ্ঠান কোনভাবেই কোন  অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট নয়। এমন মনে করা ভুল, ভিত্তিহীন। এগুলো আসলে ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক ধরণের প্রতিষ্ঠান।

    তাহলে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা যেটা এখন আছে আগে তা বুঝলে পরে, আগানো যাবে ব্রিকস কীঃ
    নয়া প্রসঙ্গে যাবার আগে একটা সাবধানতাঃ
    ঘরে ঢুকার আগে বাইরে জুতা খুলে ঢুকার মত পাঠকেরা দয়া করে আপনি কোন পন্থী – প্রো অ্যামেরিকান নাকি প্রো চীন অথবা ধরেন কোল্ডওয়ার কালের মত আপনি সোভিয়েত না অ্যামেরিকান পন্থী – ইত্যাদি এসব ভাগ ও আলাপ গুলো এই আলোচনা পাঠের আগে বাইরে রেখে আসেন। তাহলে এই আলোচনার কথাগুলো বুঝতে সুবিধা পাবেন।  কারণ এখানে কথাগুলো যে পন্থীরই হোন এমন সবার জন্য লেখা হয়েছে। বরং আপনি নিজেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল বলে মনে রেখে পড়তে বসলেই বুঝতে ঝামেলা হতে পারে। পরে আরো বিস্তার করব সেসব কথা।

    তাহলে ব্রিকস কী ? কেমন ধরণের প্রতিষ্ঠান?
    এটা খুবই প্রতিষ্ঠত এক সত্য যে ১৯৪৫ সাল নাগাদ বিশ্বযুদ্ধে শেষে (কমিউনিস্ট নেতা স্তালিন সহ) সকলে মেনে নিয়েছিল যে আমেরিকাই গ্লোবাল নেতা। এর মূল কারণ হল বা তখনকার বাস্তবতা ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রপক্ষের সকলের প্রধান খরচ এককভাবে সকলকে  যুগিয়েছিল একনাগারে চারবারের (১৯৩২-১৯৪৪) নির্বাচিত অ্যামেরিকান  প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। অর্থাৎ মিত্রপক্ষ এই জোটের একমাত্র নেতা হয়ে দাড়িয়েছিলেন রুজভেল্ট। শুধু তাই নয় যুদ্ধে শেষে আবার ইউরোপের নানান দেশের ( এমনকি এবার কেবল মিত্রপক্ষের দেশগুলোকেই নয় সাথে হিটলারের পক্ষের দেশগুলোসহ) অবকাঠামোগুলো পুণঃর্গঠন ও উন্নয়ন এর খরচও যোগান  বা অবকাঠামো ঋণ হিশাবে দিয়েছিল ঐ আমেরিকা একাই। এজন্য আমেরিকা বাদে ইউরোপীয়-সহ প্রায় সকল দেশই পরে আমেরিকাকে ধরেছিল  একটা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা দাঁড় করানোর জন্য উদ্যোগ নিতে। যত সহজে এই গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা কথাটা লিখলাম ততই কঠিন অনেকের জন্য এটা বুঝা বা ইমাজিন করে বুঝা কঠিন। বিশেষ করে কোন কমিউনিস্টের পক্ষে কমিউনিস্ট থেকে গিয়ে এটা বুঝা কঠিন হবে। এর অন্তত একটা কারণ হল, কমিউনিস্ট বুঝাবুঝিতে বাণিজ্য বিশেষ করে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য  (এবং গ্লোবাল বাণিজ্যও) একটা অপ্রয়োজনীয় বিষয়! কারণ যতই নিজেদের এরা কমিউনিস্ট বলে দাবি করুক এরা মূলত উগ্র জাতিবাদীদের মত গভীর অর্থনৈতিক জাতিবাদিও। মানে কোনকিছুই আমদানি করা যাবে না; পারলে অন্যদেশে কেবল রপ্তানি করেন – এমন চিন্তার। স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আজ ১৫ টা আলাদা রাষ্ট্র হয়েছে – এটা এত বড়। তাই ভিতরে প্রায় সব ধরণের প্রয়োজনীয় পণ্য একই নিজ সোভিয়েত দেশেই উতপাদন সম্ভব ছিল। যেটা আমাদের মত দেশের বেলায় অসম্ভব।  এই সুযোগে কমিউনিস্টদের  (অবাস্তব বা আইডিয়েল) অনুমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য  (এবং গ্লোবাল বাণিজ্যও) অপ্রয়োজনীয়। এছাড়া, বাণিজ্য মানে তো মুনাফা কামানো যা তাদের চোখে হারাম কাজ!  অথচ খোদ কার্ল মার্কস এর কাছে এক্সচেঞ্জ [exchange] (বাংলায় বিনিময় যেমন পণ্য বিনিময় থেকে প্রেম বিনিময় বা সম্পর্ক) কেন এত গুরুত্বপুর্ণ ও প্রায় সর্বব্যাপী এক ধারণা কেন?
    অথচ আবার খেয়াল করেন মোদি যে এক উগ্র অর্থনৈতিক জাতিবাদী এবং কট্টর চীনবিরোধী। অথচ ভারতে যে মোবাইল ব্যবহার হয় এর ৭৩% মার্কেট শেয়ার হল একা চীনের। আমি জানি না কমিউনিস্টেরা এই ফেনোমেনাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন! কেন এটা ঠেকানো যাচ্ছে না?

    তাই আরেক সাবধানতা -দুই বলে রাখি। গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা জিনিষটা কী তা নিয়ে আলাপেঃ
    মূলত এটা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাই তবে এরচেয়েও বড় এরই গ্লোবাল রূপ।  আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা মানে যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বানিজ্য যাতে চলতে পারে এর একটা সিস্টেম গড়ে তোলা। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে এত জটিল সিরিয়াস ভাবা কেন? যদি এর মূল সমস্যাটা বুঝতে পারি তাহলে সবকিছু বুঝব।
    যেমন আপনার দেশীয় মুদ্রায় কেনা-বেচা আপানার দেশের সীমানার ভিতরেই কেবল চলতে পারে। সীমানা পার হয়ে গেলে আপনার পকেটের আপনার দেশীয় মুদ্রা ভিনদেশে আর গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই কিছুই কিনতে পারবেন না।তাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে ধারণা লাগবে, একটা সিস্টেম লাগবে। এর চেয়েও বড় কথা কোন প্রতিষ্ঠান লাগবে যার কাজ হবে যেকোন দেশের মুদ্রার প্রতিদিনের বিনিয়ময় হার কী হবে তা জানানো। আর একাজ সে টেকনিক্যাল ও ইম্পারশিয়াল নিউট্রাল কোন পদ্ধতি দাড় করিয়ে সে ভিত্তিতে প্রকাশ করবে। আর যে গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান এই কাজ করবে – সেই প্রতিষ্ঠানটারই নাম হল আইএমএফ।  এসব দিকের বিপরীতে কমিউনিস্টেরা মনে করে  আইএমএফ হল নাকি কেবল শর্ত দেওয়ার প্রতিষ্ঠান। না বুঝে কত কথাই না বলা যায়! কমিউনিস্টদের আরেক ভুয়া অনুমান হল, আইএমএফ এমন শর্ত দেয় বেশি মুনাফা কামানোর জন্য। এজন্য যে হাসিনা সরকার পরিণত হয়েছে বিদেশে অর্থপাচারের সরকারে ফলে হাতে ডলার শুণ্যতার সরকার, কমিউনিস্টেরা তাকে সাফাই যোগাতে চেয়ে বলছে ডলার সংকটের সব দোষ নাকি আইএমএফ এর।  কারণ নাকি আইএমএফ খালি শর্ত দেয়। আর এই ভুয়া আলাপের লেজ ধরে অর্থমন্ত্রীও সাফাই দিয়ে বলে সরকার  “আইএমএফ এর শর্তের কথা ভেবে” মানে আমল করে এবারের বাজেট দেয় নাই। মানে খুবই বিপ্লবী সরকার এটা! আর তা শুনে কমিউনিস্টেরা হাততালি দিয়ে উঠেছে।

    যে আলাপ তুলি নাইঃ
    প্রশ্ন হল ব্রিকস এক উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান বলছি যার লক্ষ্য আগামি দিনে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থার বিকল্প সিস্টেম আনা। এই ব্রিকস তাহলে নিজ জন্মের ১৪ বছর পেরিয়ে গেছে এখনও আইএমএফ নিয়ে কিছু করছে না কেন, অগ্রগতি ধীর কেন?  জবাবটা আপাতত এক বাক্যে শেষ করব। জবাব হল, চলতি গ্লোবাল অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থাটা অ্যামেরিকান ডলার কেন্দ্রিক। মানে এখন দুনিয়ায় বৈদেশিক বাণিজ্যে ৭০% এর বেশি পণ্য কেনাবেচা হয়, ইনভয়েস লিখা হয় অ্যামেরিকান ডলারে। সবার আগে এখানে বদল ঘটতে হবে; ঘটাতে হবে। অন্য মুদ্রা ইউয়ান অথবা  অন্যদেশের মুদ্রায় হতে হবে। এটাই সেই পুর্বশর্ত যা না হলে ব্রিকস উদ্যোগের সফলতা দেখাতে পারবে না। কিন্তু একালে আবার বাইডেন ডলারে বাণিজ্য করতে পারবে না এমন ডলার স্যাংশন যেকোন ব্যক্তি বা সরকারের উপর জারি করছে যথেচ্ছভাবে তা প্রয়োগ হচ্ছে। এটাই পরোক্ষে ব্রিকসকে আশা জাগানো হয়ে যাচ্ছে, বা সাহায্য করছে। যেটাকে আমেরিকার দিক থেকে দেখলে উপস্থিত লাভালাভ পেতে গিয়ে বাইডেন অপব্যবহার করে ফেলছেন – বলবেন অনেকে। এমন ডলারের সুবিধা অপব্যবহারের বিপদ বাড়ছে কথাটা সম্প্রতিকালে বাইডেনের  ট্রেজারি মন্ত্রী স্বীকারও করেছেন Yellen Says Sanctions May Risk Hegemony Of US Dollar।

    তাহলে আদার ব্যাপারী কথা তুললাম কেনঃ
    কথাটা আমার না স্বয়ং শেখ হাসিনার। বিডিনিউজের রিপোর্টার লিখছেন, প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক আরও জানতে চেয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক কোনো মুদ্রা চালু করার পরিকল্পনা বাংলাদেশের আছে কি না। উত্তর দিতে গিয়ে মুচকি হেসে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আদার ব্যাপারি জাহাজের খবর নিতে বলছেন”।

    এইকথাটাই প্রমাণ করে যে হাসিনা নিশ্চিত যে ব্রিকসের সদস্য হলে সেটা বাইডেনের আমেরিকাকে ছেড়ে যাওয়া বা বুড়া আঙুল দেখানো এসবের কোনটাই নয়। তিনি তো আদার ব্যাপারী, তাই এটা তিনি বুঝেন। এটা কেবল একটা ভাব ধরা যে ব্রিকসে যোগ দিয়ে হাসিনা বাইডেনের প্রভাবের বাইরে চলে যাবেন বা বাইডেনকে যেন একটা উচিত শিক্ষা দিলেন। তবে এসব কথা দলের কর্মীদের মনোবল বাড়াতে কাজে আসবে এতটুকুই মাত্র।

    এছাড়া সকল পাঠককে আরেকটা কথা মনে করিয়ে দিয়ে শেষ করব। ব্রিকসের জন্মদাতারা সহ সকল রাষ্ট্র আজও আইওএমএফ ও বিশ্যাব্যাংকের সদস্য হয়েই আছে। ছাড়ে নাই। কোনদিন যদি চীন আমেরিকার জায়গায় গ্লোবাল নেতার প্রতিষ্ঠা পায় কেবল তখনও হয়ত অনেক বিশ্বব্যাংকের মত সমতুল্য প্রতিষ্ঠান থাকলেও দুনিয়ায় আইএমএফ হবে একটাই; তবে অবশ্যই সেটা হবে ঢেলে সাজিয়ে নেয়া এক নয়া আইএমএফ!

    আপডেটঃ ২৫ জুন ২০২৩  সকাল ১০ঃ ১২
    আপডেটঃ ২৫ জুন ২০২৩  বিকাল ০৫ঃ ৫৫

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • মোদি-বাইডেন সাক্ষাতে কি হবে তা এখনই জেনে নেন

    মোদি-বাইডেন সাক্ষাতে কি হবে তা এখনই জেনে নেন
    গৌতম দাস

    ২২ জুন ২০২৩      সকাল ০৯ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-4E8

     

                   Biden hosts Indian Prime Minister Modi at White House

     

    মোদির বাইডেন সাক্ষাত হবে আজকে। কিন্তু এর আগেই ভারত একটা হাইপ [HYPE] তুলেছে মানে মিথ্যা প্রপাগান্ডার ‘ওভার-পাবলিসিটি’ শুরু করেছে গত কমপক্ষে প্রায় দশদিন ধরে।
    এর উদ্দেশ্য দুইটা। এক.  আভ্যন্তরীণভাবে ভারতের ভোটারদের দেখানো যে মোদি এক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব পরাশক্তি নেতা হয়ে গেছে। আর দুই. বাংলাদেশে হাসিনা সরকার টিকবে কিনা সেই নির্ধারক ভাগ্যবিধাতা হলেন মোদি, সেটা সত্য-মিথ্যা যাই হোক এই ইমেজ তিনি গড়তে চান।
    ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ২১-২৪ জুন তার আমেরিকা সফরে ইতোমধ্যেই আমেরিকায় পৌছেছেন। আজ ২২ তারিখ প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সাথে তার সাক্ষাতের কথা।
    এদিকে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য অ্যামেরিকান নয়া ভিসা পলিসিতে দেয়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর থেকে, বাংলাদেশে ভিতর সরকার বা বিরোধী দলগুলোর যেখানে আমেরিকান এই নীতির বিরুদ্ধে কোন আপত্তি জানিয়ে বক্তব্য প্রায় নাই বললেই চলে; বরং এর চেয়ে এই নিষেধাজ্ঞা অপর দলের জন্য কত খারাপ হয়েছে  আর তাতে অন্যদলটা কত বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে এনিয়ে সরকারি  প্রপাগান্ডাটাই মুল আসর দখল করেছে; যদিও এতে ব্যাপারটা মানুষ তামাসা হিশাবে দেখেছে। অন্তত ফেসবুক কে যদি আমার সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জানার (সোশাল মিডিয়া) উৎস বলে  ধরি তাহলে  এমনটাই সোশাল মিডিয়ার ডমিনেটিং মুড।  আর মানুষের কাছে যে ওয়েলকামিং মেসেজ গেছে তা হল, অ্যামেরিকান ভিসা পলিসি এবার মানুষকে একটা ভাল কিছু দিবে কারণ, এটা হাসিনা সরকারের উপর মারাত্মক চাপ তৈরি করতে শুরু করেছে!
    ওদিকে আবার ভারতের প্রতিক্রিয়া হয়েছে উলটা। ভারতের মিডিয়া, কলাম লেখক, একাদেমিক বা থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ইত্যাদিতে যুক্ত যারা তাদের সবার একই ভাষ্য আমেরিকা “কত্ত-ই না খারাপ দেশ” – যে তারা বাংলাদেশের উপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে! আর এতে বাংলাদেশের উপর ভারতের আলগা খবরদারি মানে তাদের ভাষায় “বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ” সেটা আর কিছুই এখন উসুল করা যাবে না; আগের সাজানো বাগান থেকে কত সহজেই না লুট ততপরতা চালানো যে অবারিত সুযোগ ছিল যেন সেটা এখন বন্ধ বা ক্ষুন্ন হতে যাচ্ছে আর এই ম্যাসেজ তারা পাঠ করে ফেলেচ্ছে। আর একারণে তারা রীতিমত কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে।
    এতে সবচেয়ে অসুবিধা যেটা তা হল তাদের স্বার্থের পক্ষে ন্যায্যতা কী? সাফাই বয়ান কী? এমন কিছু তো একটা থাকতেই হবে। নইলে “বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ” হারিয়ে যাচ্ছে বললেই এর অর্থ হবে সেটা অবৈধ স্বার্থ নয়, ন্যায্য স্বার্থ অথবা হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার বিনিময়ে নেয়া কোন অসম চুক্তি বা ঘুষের চুক্তি নয় এমন একটা নুন্যতম বয়ান অবশ্যই হতেই হবে। আর এখানেই অসাঞ্জস্যতা এক বিরাট ঘাটতি ভারতের সব বক্তব্য বা দাবিকে দুর্বল করে রেখেছে।

    পেড মিডিয়া প্রপাগান্ডাঃ
    এই সুযোগে প্রথম আলোর মত পত্রিকাগুলো যারা ভারতের গোয়েন্দাবিভাগের মিথ্যা সাজানো প্রপাগান্ডা খবর নিজেরা একে সত্যি বলে নিজ পত্রিকায় খবর ছাপে; তাদের এই দালালি ততপরতারর রেট মনে হচ্ছে বেড়ে গেছে। অথবা গোয়েন্দাবিভাগ নিজেরাই যেচে রেট বাড়িয়ে দিয়েছে হয়ত যাতে  মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছাপতে এরা আরো দুঃসাহসী হয়ে উঠে, লোভনীয় পরিমাণ অর্থের লোভে অস্থির, ডেসপারেট। বেচাইন হয়ে যায় যেন!
    সম্ভবত সেকারণেই আমরা  নিউজ দেখছি প্রথম আলোতে যেখানে মরিয়া হয়ে বিপদে পড়বে জেনেও এসব প্রপাগান্ডার আবর্জনা  তারা খবর বলে ছাপছে। ধরা পড়লে শিরোনাম বদলে লঘু করার চেষ্টা করছে তবু প্রপাগান্ডা কাজ চালিয়েই যাচ্ছে। এসব মিথ্যা খবর তৈরির ভঙ্গিটা হল এমন দাবি করা যেন ভারতের মোদিই হচ্ছে বাংলাদেশে বাপ! তাই যেন বাংলাদেশে কী ঘটবে এর একমাত্র নির্ধারক ও ভাগ্যবিধাতা হলেন মোদি! মোদি যেন বাংলাদেশকে তাঁর কোন বাপের তালুক হিশাবে পেয়েছেন। তাই মোদিই একমাত্র হাসিনা সরকারকে ভিসা নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদির অ্যামেরিকান চাপ থেকে বাঁচাবেন, উদ্ধার করবেন। এই হল এসবের সারকথা!

    যেমন, গতকাল ২১ জুন সকাল থেকে দেখা গেল আরেক প্রপাগান্ডা যে বাংলাদেশ মানে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন নাকি জয়শঙ্কর বা ভারতকে অনুরোধ করেছে যেন মোদি তার আমেরিকার সফরে বাইডেনের কাছে হাসিনার জন্য কিছু সুপারিশ করে। যার সার ইঙ্গিতটা হল, লেম্যানের ভাষায় বললে মোদি যেন হাসিনা সরকারকে আরেকবার রেখে দেয়ার বন্দোবস্ত করে দেয়, আমেরিকাকে বলে!

    ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বারানসিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ ভুক্ত
    দেশগুলোর
    মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকের ফাঁকে গত ১২ জুন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে
    বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
    এ কে আব্দুল মোমেনের সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে। সূত্র বলছে, বিভিন্ন
    পর্যায়ে ভারতের কর্মকর্তাদের কাছে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বিষয়টি তুলেছেন।

    যদিও ভারতের মিডিয়ার এই দাবি আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন ও সেতুমন্ত্রী কাদের অস্বীকার করেছেন। তার মানে ভারতের দাবি একপক্ষীয়, সকলেই বিনা তর্কে গ্রহণ করে এমন দাবি নয়।
    আর এটাই ছিল ২১ জুন সকাল থেকে প্রথম আলোর প্রপাগান্ডা এসাইনমেন্ট। অথচ প্রথম আলোর এই কাজটা এক মারাত্মক জার্নালিস্টিক অসততা। কেন?

    বর্তমান বাংলাদেশ প্রশ্নে, আমাদের মোমেন অথবা আমেরিকা সফররত মোদির ভারত এদের যে কেউ নানা প্রপাগান্ডা করতেই পারে যার সোজা অর্থ ফ্যাক্টস লুকাইতে পারে। তাহলে এক্ষেত্রে প্রথম আলোর অবস্থান হওয়া উচিত অন্তত নিজে ফ্যাক্টস না লুকানো বা কাউকে লুকাতে না দেওয়া বা সাহায্য না করা। এই সাপেক্ষে মানে এটা করার পরেই কেবল ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার অর্থের ভান্ডে প্রথম আলো একটু-আধটু মুখ দিতে পারে; যতটুকু যা পায়। কিন্তু প্রথম আলো – খোদ জার্নালিজম – এই কাজটাই ত্যাগ করে চলে গিয়েছে।

                                                                TIMES

    যেমন, ভারতের কিছুপক্ষের নানান দাবি বা মোমেনের দাবিতে তা সব তোলপাড় করে ফেলতে পারে, এমনকি মোদির অ্যামেরিকান সফরকে কেন্দ্র করে মিথ্যা আশা বা প্রপাগান্ডা যে হাসিনা আবার টিকে যাচ্ছে বলে হৈচৈও শুরু করতে পারে। আর এক্ষেত্রে মোদি ও বিজেপির প্রধান লাভের লক্ষ্যটা হল মিথ্যা হলেও এটা দিয়েই মোদির ইমেজ গড়া; মানে মোদিকে এক পরাশক্তি নেতা হিশাবে তুলে ধরা যে বাংলাদেশে সরকারকে বাঁচায় – এই ইমেজ গড়াটাই বিজেপির সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ। তাতে এটা পুরাটাই মিথ্যা  হয় যে বাইডেন মোদির কথা শুনবেই না অথবা আদৌও এনিয়ে মোদি-বাইডেন হয়ত আলাপই হবে না – এমন হলেও ক্ষতি নাই। কারণ মোদির এই পরাশক্তি বা মিথ্যা গ্লোবাল নেতার ইমেজ – এটাই আগামি ভারতের নির্বাচনে বিজেপি ব্যবহার করবে আর দাবি করবে মোদির নেতৃত্বে ভারত কত উঁচুতে উঠেছে। আর এতে হাসিনা মিথ্যা আশা আকাঙ্খা তৈরি করে এর ছলনায় আরো হতাশ হয়ে যাবে কিনা সেটা তো মোদির বিবেচনাই নয়!
    অতএব এই ভুয়া উচ্ছাস তুলে হলেও ভারত মরিয়া হয়ে হাসিনার -জান যাওয়া অবস্থায়- এই মিথ্যা পরাশক্তি নেতার ইমেজ কামাতে নেমেছে। এমনকি পরোক্ষে তিনি হাসিনাকেও ট্রাপে ফেলেছেন, তা হলেও।
    আর এই পরিস্থিতিতে এখানে প্রথম আলো যেপথ নিল, তা হল এর মধ্যে ফ্যাক্টস বা সত্যটা কী? সেটা বের করতে না যাওয়া।  মোদি কী আসলেই বাইডেনকে বলে হাসিনার সব বালা-মুসিবত মানে আরেকবার ক্ষমতায় থেকে যাবার বন্দোবস্ত করে দিতে পারবেন? নাকি এর কোন আদৌ সুযোগই নাই?
    না, প্রথম আলো এবিষয়ে ফ্যাক্টস উদ্ধার সেদিকে গেল না – বরং সে গেল মোদির মিথ্যা প্রপাগান্ডাকে হাইপ বা উচ্ছাস তোলা বা যোগানো – যেটা সরাসরি একটা প্রতারণা???
    অথচ জার্নালিজমে সৎ থাকলে প্রথম আলোর ন্যায্য কাজ হত ফ্যাক্টসের সন্ধানে যাওয়া; যে অন্তত মোদির আদৌ কিছু করার সুযোগ আছে কিনা! সেটা যাচাই করে আসা!

    অনেকের মনে সন্দেহ হতে পারে সেটা কী খুবই সহজ হবে? এমন ভেবে! হা এটা এখানে একেবারেই সহজ এবং তৈরিই ছিল। যেমন, মোমেন বা মোদির ভারতের অনেকের দাবির প্রসঙ্গ হল বাইডেন বা অ্যামেরিকান অবস্থা নিয়ে – মানে বাইডেন-মোদি সামিটে (বাংলাদেশ প্রসঙ্গে) বাইডেন কী অবস্থানে থেকে কথা বলবেন? তাতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আলোচনায় উঠে আসুক বা না আসুক – বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বাইডেনের অবস্থান আগে থেকেই কী জানা যায় না, সেই তালাসে যেতে হত।

    এই প্রসঙ্গে অথেনটিক নিউজ পাবার এক বেস্ট জায়গা ও এক ব্যক্তি হল জন কিরবি [John Kirby ]। যিনি হোয়াইট হাউসে বসেন কারণ তিনি হলেন হোয়াইট হাউসের ন্যশনাল সিকিউরিটির স্ট্রাটেজিক কমিউনিকেশনের কো-অরডিনেটর কাম মুখপাত্র [National Security Council coordinator]। যিনি নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং দিয়ে থাকেন। মোদির এই সফরটা দুই রাষ্ট্রের দুই এক্সিকিউটিভ হেড এর মধ্যে। মানে অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্টের সাথে। তাই কোন অথেনটিক নিউজ পেতে হলে, হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র এখান key personality বিবেচ্য হবে। আর জার্নালিস্ট তো বটেই এমনকি  যারা এডভান্স পাঠক  এটা এদের কারোরই অজানা নয়। আর বাংলাদেশে বসে তাঁর [কিরবি-র] যেকোন ব্রিফিং পাবার সবচেয়ে উপযুক্ত উপায় হল অ্যামেরিকান সরকারি ওয়েব সাইটে [সাধারণত যেটা https://www.state.gov] যাওয়া যেখানে সব বিস্তারিত থাকে। যেমন মোদি-বাইডেন হবু সাক্ষাত উপলক্ষ্যে আগাম যে ব্রিফিং সেটা ছিল ২০ পৃষ্ঠারো বেশি তাহলেও পুরাটাই ঐ ওয়েব সাইটে দেয়া আছে। এখন জার্নালিজম করতে চাইলে এসব খবর জানা ও সংগ্রহ করা ছিল প্রথম আলোর সরাসরি দায়ীত্ব!

    এখন দেখা যাক প্রথম আলো হিন্দুস্থান টাইমস এর যে প্রপাগান্ডা রিপোর্ট ২১ তারিখ ভোর থেকে লোড করেছে সেটার সময় হল আমাদের ভোর পাঁচটায়। অথচ জন কিরবি এর ব্রিফিং হয়ে গেছে অ্যামেরিকান ২০ তারিখ সকাল ১১টায়। মানে এর ব্রিফিং আমরা বাংলাদেশে বসে রিপোর্টটা সংগ্রহের যোগ্য হয়ে গেছিল  ঐদিনই (২০ জুন) তবে আমাদের মোটামুটি রাত বারোটার পর থেকেই।
    অর্থাৎ প্রথম আলো জন কিরবি এর ব্রিফিং বক্তব্য আমলেই নেয় নাই; নেওয়ার দরকারও মনে করে নাই। বলতে গেলে উপেক্ষা করে লুকিয়েছে আর বরং এরই পালটা প্রপাগান্ডা রিপোর্টটাই পরের (২১ জুন) ভোরবেলা থেকে প্রচারণায় এনেছে।

    জন কিরবি – তিনি কী বলেছিলেনঃ
    জন করবি এর ব্রিফিং সাধারণত অনেক লম্বা হয়, সারা দুনিয়ার নানান দেশ প্রসঙ্গ হিশাবে থাকে তাই! তাই এটা ছিল জন কিরবির বিশ পৃষ্টা জুড়ে দুনিয়ার প্রসঙ্গ এর ব্রিফিং এখানে পাবেন ;  তা হলেও ওর ভিতর বাংলাদেশ প্রসঙ্গটা আছে ওর চতুর্থ পৃষ্টায়। পুরাটা ডাউনলোড করে চতুর্থ পৃষ্টায় খুজেন। 

                         NSC Coordinator John Kirby


    জনকিরবি বলছেনঃ

    বাইডেন-মোদি হবু আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উঠুক বা নাই উঠুক; অথবা এমনকি মোদি সেখানে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে যাই বলেন না কেন –  বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অ্যামেরিকান অবস্থান আগে থেকেই নির্ধারিত। আর তা হচ্ছেঃ আমরা ইতোমধ্যেই পরিস্কার করে বলেছি যে আমরা চাইব বাংলাদেশে একটা ফ্রি ও ফেয়ার নির্বাচন হবে। আর আমরা ভিসা পলিসিতে ট্রাভেল নিষেধাজ্ঞা তো এজন্যই দিয়েছি যাতে কেউ এই ইলেকশনে যা ইচ্ছা তাই না করতে পারে। অতএব এপ্রসঙ্গে এভাবে আমি কেবল আমাদের অবস্থান থেকেই কথাগুলো বলে দিলাম। আর আপনারারো বুঝলেন আমাদের স্পষ্ট অবস্থানটা কী। আর আমরা এব্যাপারে একেবারের পাবলিক সামনে খোলাখুলিও তবে একই সাথে আমরা ভারতীয় সরকারকে তাদের বাংলাদেশ সরকারের সাথে যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সেটা যাই থাক সেনিয়ে চাইলে তাদের কথা বলতেই দিব বা আমাদের শুনাতেও পারবে।

    We have already made clear our desire to free and fair elections in Bangladesh, and you’re right, we adapted our visa policy to restrict travel to individuals who undermine Bangladeshi elections.  So I can only speak for ourselves.  You know where we are.  We’ve been pretty public about that, but we would let the Indian Government talk about their bilateral relations.

    মূল বিষয়টা হচ্ছে আগে বলেছি অ্যামেরিকান ভিসানীতি প্রকাশের পরে ভারত নিশ্চিত হয়ে যায় যে গত ১৫ বছর ধরে হাসিনাকে ক্ষমতায় সমর্থন জুগিয়ে বাংলাদেশ উপর যে জুলুম লুটপাটের রাজত্ব গড়ে যে সমস্ত অসম সুবিধা খেয়ে এসেছিল সেসবের ইতি হতে যাচ্ছে। তারা নিজেরাই লিখছে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের কথিত নির্বাচনে যেসব কান্ডকীর্তির ভোট করে বারবার নিজের ক্ষমতাকে হাসিনা বাড়িয়ে নিয়ে এসেছিলেন তা আর এবার আগামিতে হচ্ছে না। এটাই অ্যামেরিকান ভিসানীতির সবচেয়ে বড় ইম্পিকেশন বা খাঁড়া অর্থ। যেটা ভারত ও হাসিনার উপর ও বিরুদ্ধে সরাসরি প্রয়োগ হতে যাচ্ছে।
    ভারতীয় মিডিয়ায় সকলেই কমবেশি একথা ছাপছেঃ

    Washington’s intention is crystal clear. It has put Prime Minister Sheikh Hasina’s Awami League government on a tight leash to dissuade it from resorting to undemocratic, illegal, and extra-constitutional methods to win the upcoming general elections like the previous rigged elections in 2014 and 2018. But New Delhi, in contrast, wants Hasina to win by any means.    

    তাহলে, এই হলো দুধ আর পানির আলাদা হয়ে যাওয়া। কিন্তু প্রথম আলোর এই এভেলএবেল ফ্যাক্টস টা তুলে আনে নাই। বরং এর উলটা মিথ্যা প্রপাগান্ডাকেই গতকাল সকাল থেকে প্রচার করে গেছে।

    এখন এই প্রথম আলো; এই জার্নালিজম কী টিকে থাকতে পারবে? না পারে?

     

    আপডেটঃ ২৩ জুন ২০২৩ ০১ঃ ৫৪ am

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • চীন ভাইসাবের সমস্যা

    চীন ভাইসাবের সমস্যা
    গৌতম দাস
    ১৬ জুন ২৩  মধ্যরাত  ০০: ০৪
    https://wp.me/p1sCvy-4CP

           আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আমরা প্রস্তুত: চীন। [চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন]

    চীনা এমবেশির ফেসবুক পেজ থেকে গতকাল মিডিয়ার কিছু খোরাক এসেছিল [মুল ইংরাজিটা এখানে]। এরপর সবাই নিজ নিজ মত করে ফোকাস সাজিয়ে সে খবর মিডিয়ায় এনেছে। এর মধ্যে সবাইকে ছাড়ানো ফোকাসে প্রথম আলোও তা হাজির করেছে। তাতে মনে হইয়েছে চীন এবার বোধহয় যেন  হাসিনার বাংলাদেশকে সাথে নিয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে। দুনিয়াকে সব অনাচার থেকে মুক্ত করবে ইত্যাদি এমনই বোধহয় এর শপথ!
    না বাস্তবতা একেবারেই তা নয়। আমরা একসাথে কাজ করব এতটুকু তো বলাই যাই। কিন্তু পরের শব্দটা যখন নীতিগতভাবে, মানে মূলত কমন পলিসিতে তহ্ন একথার একরকম মানে হবে। আর যখন সরাসরি বা আকার ইঙ্গিতে বলা হবে যুদ্ধের বা বলপ্রয়োগের কথা তাহলে সেটা অন্যরকম! অনেকেই চীনাদের কথাটা –  “We stand ready to work together with Bangladesh and other countries to oppose all forms of hegemonism and power politics,…।” কথাটাকে নীতিগত সমর্থনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন নাই। বাইরে নিতে চেয়ে ইঙ্গিত রেখে মানে করেছেন। তাতেই এটা সাংঘাতিক শুনাচ্ছে। খুব সম্ভবত এটাই ভারতের ইচ্ছা যেকারণে প্রথম আলো এসব কথার এক্সট্রিম অর্থের ইঙ্গিত এনেছে।

    কিন্তু কোর ফ্যাক্টস-টা মানে মর্মশাসটা হল, আমেরিকা হাসিনাকে সরাতে পারলে, মোদিকেও সরাতে পারলে এতে লাভের গুড়ের এক বড় অংশ যাবে চীনের পক্ষে আর তা কিছুই না করেই!

    আমাদের উচিত হবে, “একসাথে কাজ” বলতে এইটারে নীতিগত পর্যায়ে রাখা ও বুঝা পর্যন্তই; তা ছাড়িয়ে ফিজিক্যাল যুদ্ধ, বা পাশে দাড়ায় যুদ্ধ এসবের ইঙ্গিত দেয়াটা হল উস্কানি তোলার চেষ্টা – এটা যেন মনে রাখি।

    এখন তাহলে চীন ভাইসাবের সমস্যাটা কীঃ
    চীনের মুখপাত্র অভিযোগ করেছেন, যে আমেরিকা “hegemonism and power politics”করে।
    আচ্ছা, চীনই কী প্রথম বা এবারই প্রথম যে আমেরিকার “hegemonism and power politics” এর নিন্দা করে কথা বলছে বা তুলছে?

    মোটেও না, একেবারেই না। এমনকি ১৯৫৩ সাল থেকে একেবারে আনুষ্ঠানিকভাবে আমেরিকা একাজ করে চলেছে। সেবারই প্রথম সিআইএ বাহিনী পাঠিয়ে ইরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে শাহের রাজতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিল আমেরিকা। এটা দুনিয়া সকলেই জানে শুধু তাই নয়, এটা একালে আমেরিকা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকারও করে নিয়েছে। পরে একালে ২০১৩ সালে এই স্বীকারোক্তি নিয়ে নিউজ রিপোর্ট এখানে CIA admits role in 1953 Iranian coup

    । 
    কিতু তামাশা হল আমেরিকার এসব বিশেষ স্বভাব পরিচয় জানার পরও আজকের চীন [১৯৫৮ সাল থেকে মাওয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে ঢেলে সাজানো যে চীন]  সেও কী সেই আমেরিকার সাথে ঘনিষ্ঠতম সুসম্পর্ক করে নাই; আর সেটা অন্তত ২০১০ সাল পর্যন্ত????
    শুধু তাই না এই চীন-আমেরিকা হানিমুন এমনই হানি-ময় ছিল হবু বাংলাদেশকে বিক্রি করে দিয়ে আমেরিকা-চীন এর সখ্যতা কী তখন ঘোষণা দিয়ে  এরা একসাথে সেসময়ের (১৯৭১) পাকিস্তানের আয়ুব-ইয়াহিয়ার পক্ষ নেয় নাই?
    আর তখন কী আমেরিকা  hegemonism and power politics নীতিতে ছিল না??? আমি নিশ্চিত কোনপক্ষই এটা অস্বীকার করবে না।  এমনকি ২০১০ সালের পর থেকে আজকের আবার আমেরিকা-চীন প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ক্রমশ এটা মুখোমুখি সংঘাতের সম্ভাবনা হাজর করার দিকে যাচ্ছে – এটাই তো বাস্তবতা!

    কাজেই আজকে হঠাত আমেরিকাকে আবার hegemonism and power politics এর কর্তা বলে আবিস্কার কেন? এটা পরিস্কার করে বলা উচিত ছিল চীনা মুখপাত্রের। এটাই সেই ফ্যাক্টস যে আজ আমেরিকাকে আবার hegemonism and power politics এর জন্য দায়ী করে কথা তোলা এটা চীনের এখনকার বাংলাদেশ নীতি! আবার এটাই সত্য কাল যদি আর কোন দৈব দুর্বিপাকে হাসিনা ক্ষমতা হারায় ফেলেন তাহলে আবার তখনও চীনা অবস্থান আবার বদলে যাবে, আর সেটাও স্বাভাবিকই হবে!
    সারকথায় তাহলে মূল বিষয়টা হল চীনা স্বার্থ। এটাই সবক্ষেত্রেই সবকিছুর নির্ণায়ক আর তাই এর মধ্যে আমেরিকা ভাল কী খারাপ কিংবা hegemonism and power politics কিনা সেটা খোজা অর্থহীন।কাজেই বাংলাদেশেও তো রাজনৈতিক ধারাগুলোর স্বার্থ – এর অন্তত দুইটা পক্ষ তো আছে আমরা ধরে নিতে পারি যে তারা হল – “প্রো  আর এন্টি” – হাসিনা। চীন যেমন তার যখন যেমন স্বার্থ সে ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তেমনই  তারাও তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ মোতাবেক অবস্থান নিবে, কোনটাকে সঠিক বা কোনটাকে বেঠিক বলবে! তাই না? এটাই তো স্বাভাবিক!

    কথা আরও আছে খানিকটাঃ
    এই যে চীন আজ হাসিনার পক্ষে দাঁড়িয়ে আমেরিকার hegemonism and power politics বলে খারাচ্ছে [নীতিগতভাবে] – তাতে, চীন নিশ্চয় জানে এটা কোন ক্ষমতার হাসিনা!

    ওয়ান-ইলেভেন বা ২০০৭ সালে বাংলাদেশে যে নয়া (অ্যামেরিকান) ক্ষমতার উদয় হয়েছিল এর সরাসরি সুবিধাভোগী এবং সরাসরি সেই ততপরতার গন্তব্য ও পরিণতিই তো হাসিনা ক্ষমতাসীন হয়ে উঠে যেটা আজ পনেরো বছর ধরে বহাল। এটা কী চীনের অজানা? তা তো নয়। তাহলে সেটাও তো এই আমেরিকারই hegemonism and power politics এর এক সদম্ভ প্রকাশই ছিল। অথচ চীন কী তখন এই আমেরিকারই অথবা আমেরিকার কোলে উঠে ক্ষমতা নেওয়ার জন্য কী হাসিনা সরকারের কোন সমালোচনা করেছিলেন? কোন অ্যামেরিকান hegemonism and power politics তখন চীন দেখতে পায় নাই কেন????

    বরং চীন কী করেছিল?
    ২০১০ সাল থেকেই চীন শুধু হাসিনা সরকারই নয়, পার্টি টু পার্টির কথা বলে আওয়ামী লীগের সাথে বিশেষ সম্পর্ক শুরু করেছিল। ঐ বছরের ঈদের ছুটিতে ততকালীন লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম চীন সফরে গেছিলেন। আর চীন সরকার তক্কে তক্কে ছিল কীভাবে বিশ্বব্যাংকের পাশ দিয়ে হলেও অবকাঠামো ঋণদাতা হিশাবে বাংলাদেশে ঢুকা যায় কিভাবে। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে তা পেতে চীনের (বিশেষত ভারতীয় বাধা পেরিয়ে) ২০১৬ সাল লেগে যায়। কিন্তু কখনই চীন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অ্যামেরিকান হেজিমনির (hegemonism and power politics) সমালোচনা করেই নাই। কেন? হোপ চীন এই সত্যের সাথে একমত হবে।
    তাহলে এখানেও সারকথা হল চীন যেটাকে তখন স্বার্থ মনে করেছিল সেটাই ছিল নির্ণায়ক! তাতে আমেরিকা hegemonism and power politics এর শক্তিধর – সেটা হ্যা কিংবা না তাতে কিছু আসে যায় নাই।

    তাহলে এখন শেষ কথাটা চীনকে শুনতে হবেঃ।
    তাহলে এখন সেই আমেরিকারই একই হাসিনা সরকারের উপর স্যাংশন দেয়া – এটা আসলে কী?

    সম্ভবত বাংলাদেশের মেজরিটি মানুষ বলবে এটা কাফফারা! আমেরিকার ২০০৭ সালে আমাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত! তবে স্বভাবতই এগুলো আমজনতার ভাষা যারা থিওলজি বা ম্যাটোফোরে [matafor] কথা বলে থাকে তাই! – ঠিক রাজনৈতিক ভাষা বা ভাষ্য হয়ত নয় তা বলতে পারেন!

    তাহলে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বা পরিভাষাটা কী?
    সেটা হল, এখন অ্যামেরিকান স্বার্থ হল এশিয়ায় একটা ওলটপাল্ট বা ঢেলে সাজানো। গত ২৩ বছর ধরে অনুসৃত অ্যামেরিকান এশিয়া নীতি ঢেলে সাজানো। আর এই নয়ানীতিতে বাইডেন প্রশাসন  এখন আর হাসিনাকে আর দেখতে চাইছে না। কেন?

    কম করে বললেও এতে একটা সংযোগ হল ভারত মানে মোদির ভারতের! সেখানেও বাইডেন মোদিকে দেখতে চাইছে না। খাড়া ভাবে (ব্যক্তি বাদ দিয়ে) বললে, গত ২৩ বছর আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল, চীন ঠেকানোতে ভারতকে ব্যবহার করবে বলে। আর এরই মজুরি ছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।
    কিন্তু এখন সময়টা হল অ্যামেরিকান বদল যাওয়ার –  মানে গত ২০০১ সালে ওয়ার অন টেরর বা এর কিছু আগে যার শুরু হয়েছিল সেই নীতি-পলিসির পল্টে যাওয়া বা পল্টানি শুরু হয়েছে এখন। যখন প্রেসিডেন্ট বুশ ভারত এনপিটি [NPT] এর সদস্য না হওয়া সত্বেও তাকে পরমানুর কাচামাল পাওয়া, পরমানু এনরিচমেন্ট ইত্যাদিয়ে সাহায্য করে ভারতের মন জয় করে বুশের আমেরিকা ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করেছিলেন। কাশ্মীর নির্বাচনি ব্যবস্থা রাজীব থেকে বাজপেয়ি সকলেই ভেঙ্গে দিয়ে কাশ্মীরকে সশস্ত্র আন্দোলনের ভুমি এই নতুন দিকে ঠেলে দিলেন অথচ বুশ এটাকে মুসলমানদেরই দোষ, সশস্ত্রতা – কথিত “জঙ্গীবাদই” সমস্যা বলে সুর মিলিয়েছিলেন সেই সময়ে।

    ঘটনা হল আমেরিকা এখন হায় হায় করছে পুরানা সেই নীতি নেওয়াটা ভুল মনে করছে, সেটা মুখে না বললেও এক্ষণকার পদক্ষেপগুলো তা বলছে। তারা মনে করে ভারতের পিঠে হার রাখার জন্যই ভারত যেন ‘বেয়াদব’ হয়ে গেছে ভুয়া পরাশক্তির দাবিদার হয়ে গেছে। তুলনায় আমেরিকার খুব একটা কোন লাভ হয় নাই। এটাই পরোক্ষে সেসময়ের নীতি-পলিসিটা ভুল বলা হয়ে যাচ্ছে – কারণ তা বলেই না তা এখন বদলে দিতে চাচ্ছে।   তাই এখনকার অ্যামেরিকান লক্ষ্যকে ভারতের শব্দে বললে এটা যেন আমেরিকার “ভারতকে আওকাত শিখানোর” সময় এটা। কথাটা জামা পড়িয়ে বললে এককথায়, এক সাব-অর্ডিনেট বা অধীনস্ত ভারত দেখতে চায় আমেরিকা। যেটা সারকথায় কোন চীন-রাশিয়া-ভারত জোট এর হয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে দাড়াবার হুমকি দিবে না। যদিও আপাতদৃষ্টিতে চীনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভারতের প্রপাগান্ডা যাতে ভারত মানে করে থাকে চীনই তার প্রধান শত্রু – এধরণের কথাই আমরা এখনও দেখছি। কিন্তু অ্যামেরিকান চাপ যত বাড়বে তাতে ভারত চীনের কোলে গিয়ে উঠবে এটাই সবার স্থির অনুমান!

    মোদি বাইডেনের দাওয়াতেঃ
    মজার কথা হল এমাসেই ২১-২৪ জুন  মোদি বাইডেনের আমন্ত্রণে আমেরিকা যাচ্ছেন। সেখানে বাইডেন ভারতকে নিয়ে যেন তোলায় তোলার সুযোগ নিবে; দরদামে নিবদ্ধ হবে।  সারকথায় বাইডেন সম্ভবত মোদিকেই বলবেন, সাব-অর্ডিনেট হয়ে ভারতকে তেমন সাইজে ছোট হয়ে যেতে। না হলে তিনি রাহুলের পক্ষ হয়েই  নিশ্চিত দাঁড়াবেন।
    বিপরীতে মোদি চাইবেন তাকে জিততে দিতে আর জিতবার পর ভারত-আমেরিকা এক কমন স্টাটেজিক দোস্ত হবেই এই ওয়াদা করতে চাইবেন তা যত গভীরে সম্ভব এমনটাই হতে পারবেন তিনি। এমনকি, এটা বলাও বিচিত্র নয় যে মোদি বলবেন বাকি সবদেশের সাথে সম্পর্কের উপর আমেরিকার সাথে সম্পর্ককে তিনি জায়গা দিতে চান ইত্যাদি।
    স্বভাবতই মোদি একবার নির্বাচন করে ফেললে আর মোদিকে আটকানোর কোন সুযোগ আমেরিকার হাতে থাকবে না, তাই বলাই বাহুল্য  যা করার আমেরিকাকে আগেই করতে হবে। কাজেই এই আলাপ থেকে কোন ডিলে বা রফায় এবারে পৌছানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ। প্রায় তা  যাবে না।
    তবে বাইডেনের দিক থেকে এটা মোদিকে একবার শেষ বাজিয়ে দেখা বা নেওয়া যে মোদির দিকে গেলে বাইডেনের জন্য কোন ভাল ডিল ছিল না –  এখন ২৪ জুনের পরে এব্যাপারে বাইডেন নিশ্চিত হয়ে যাবেন হয়ত। এবং দেখা যাচ্ছে বাইডেনের গন্তব্য ক্রমশ  মোদিবিরোধীদের দিকে, মানে  রাহুলের দিকে! এদিকে শেষে যাবে হয়ত!
    তাহলে সেক্ষেত্রে এই পুরা প্রক্রিয়ায় শেষে ভারতের আসল সাইজ সক্ষমতাটা কী সেটাই উদোম হওয়ার দিকেই যাচ্ছে। এভাবে ভারতের সক্ষমতাটা প্রকাশ্য হয়ে যাওয়াটা এতে তো তা চীনের জন্যও কম লাভজনক হচ্ছে না- তাই নয় কী???
    তবে আমার কথা হল, ঘটনাটাক যেদিকেই যাক মোদি বা রাহুল বা মোদিবিরোধী জোট যাদের হাতেই ক্ষমতা গিয়ে শেষে ঠেকুক – ভারতরাষ্ট্র এতে এক্ষণকার চেয়ে মারাত্মকভাবে সক্ষমতায় এক দুর্বল ভারত হিশাবে পরিণত হবেই। ভাই পিঠে হাত রেখেছিল বলে এত দিনকার সব রোয়াবি পরাশক্তির ভাব সব চুপসে যাবে! আর এথেকে পরে পাওয়া চার আনা আসবে বাংলাদেশের পকেটে! এছাড়াও এতে সেই নয়া ভারতও কী চীনের দিক থেকে এক কাম্য-ভারত নয়, হবে না!! অবশ্যই!
    তার মানে আমেরিকার নীতি-অবস্থান চীনের জন্যও লাভজনক হতে পারে!

    তাহলে বাংলাদেশে আমেরিকা যদি কোন প্রায়শ্চিত্য করতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে তাতে চীনের বিরোধী অবস্থান অপ্রয়োজনীয়; বাংলাদেশের কেউ কেউ এরমধ্যে এটা তার পক্ষের মনে করে দাঁড়িয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক, তাই না! সময় দুনিয়ার ঘটনাবলী ঘুর্ণিঝড় ভুমিকম্প ইত্যাদির মত করে অবজেকটিভলি দেখাও খারাপ হয় না!

    শেষকথাঃ
     এবিষয়ে আমার নিজের রিডিং নিয়ে দুটা কথা বলব।
    এক. আমি মনে করি এই মন্তব্য বাংলাদেশ বা হাসিনার নাম ধরে চীন বললেও এর টার্গেট বাংলাদেশ নয়। এর টার্গেট হল গ্লোবাল শ্রোতা এই অর্থে যে যেন বলা যে, চীন নয় আমেরিকাই এশিয়াকে আউলা ঝাউলা [প্লানডার বা plunder] করছে।  তোমরা অযথাই সবকিছুতে চীনকে দোষী করছো [বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির কথা যদি মনে রাখি।]। চ্চীন এটা বলবারই মওকা নিয়েছে – বাংলাদেশ ইস্যু বা এই ইস্যুর মাথায় দাঁড়াবার সুযোগ নিয়ে। কাজেই এসব চীনা কথা বার্তায় বাংলাদেশ ঠিক কোন প্রসঙ্গই না।

    দুইঃ দুনিয়াতে হিউম্যান রাইট ইস্যুটা ইস্যু হতে পেরেছে এই সেদিন, জাতিসংঘের জন্মেরও পরে ১৯৪৮ সালে। তাও কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো এখনও জাতিসংঘ এর হিউম্যান রাইট বিষয়ক কোন কথায় মানে না আমল করে না; তা মানে না। মূল কারণ কমিউনিস্ট চিন্তায় রাজনীতিতে হিউম্যান রাইট বলে কিছু নাই।  বিপরীতে জাতিসংঘের ভিতরের যেকোন ফোরামে কোনটাই ইস্যু হিশাবে উঠাবে হবে কোনটা হবে না, এসবের চেয়েও বড় কথা কতটা গুরুত্ব দিয়ে কোন ইস্যুকে উঠানো হবে এসব ব্যাপারে আমেরিকা এখনও একলাই রাজা।  সে আগ্রহ দেখালে হবে না হলে কিছুই হবে অথবা দাফনায় দেয়া হবে – এই হল বাস্তবতা! এসবই আমেরিকাকে নির্ণায়কের এক বশাল ভুমিকা দিয়ে রেখেছে। কাজেই যখন আমেরিকা কোন হিউম্যান রাইট ইস্যু তুললে তাতেআমেরিকা যদি নিজের কোন স্বার্থ দেখে কেবল  তখনই সে উঠবে; নইলে দাফন হয়ে যাবে। যেমন দেখেন হাসিনার গুম খুন তো প্রথম পর্বে সবচেয়ে একচেটিয়া ছিল ২০১৬ সাল পর্যন্ত। অথচ সবকিছু আমেরিকার জানা সত্বেও তা কোথাও এক চিলতেও ইস্যু হয় নাই। কারণ আমেরিকা আগ্রহী ছিল না, ইস্যু মনে করে নাই যা তার কাজে লাগবে!  আজ মনে করছে বলেই তো এটা বিরাট ইস্যু! এসব দিক দিয়েই ইস্যুটা বুঝতে হবে।
    আবার উল্টা কথাটা হল, এবারর বাইডেনের আমলে এসে ইইউ শেষ বেলায় বাইডেনের নীতির মধ্যে মিশে গেল। এটা যদি না হত তাহলে কী দেখতাম?
    আমরা দেখতাম ইইউ এর পাঠশালায় চীন হিউম্যান রাইট এর  ক্লাস করছে। এবিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে আমার ২০১৯ সালের পুরানা লেখা এখানে দেখতে পারেন আগ্রহীরা।   এব্যাপারটা দুদুবারের চীন-ইইউ যৌথ ঘোষণাতেও উল্লেখ আছে। কাজেই হিউম্যান রাইট যদি কোন ইস্যুই নয় বা বাজে কথা হয় – তা নিশ্চয় নয়; তাহলে তো চীন ইইউ এর পরামর্শ নিত না। সমস্যাটা হিউম্যান রাইট ইস্যু কী গুরুত্বপুর্ণ ইস্যু নয় না বা তা নিয়ে অন্যদেয়াশ কথা বলতে পারবে সেটাই বরং বাজে কথা। সবাইওই বলতে পারবে। কিন্তু ইস্যু হল বলবে কিনা। আর কোন রাষ্ট্র তখনই বলবে পক্ষে অথবা বিপক্ষে যেদিকে নিজের স্বার্থ দেখব। এই হল বটম লাইন!

    আপডেটঃ ১৬ জুন ২০২৩  ভোর রাত ০১ঃ ৩৭
    আপডেটঃ ১৭ জুন ২০২৩  বিকাল ০৫ঃ ৩৫

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • বেচারা আবদি

    বেচারা আবদি
    গৌতম দাস

    ৮ জুন ২০২৩    ০০ঃ ০১ মধ্য রাত
    https://wp.me/p1sCvy-4AX

     

    India’s Stakes at Risk as the US Armtwists Bangladesh Over Election

     

    এমন আবদি সাব-রে লইয়া আমরা কী করিবঃ
    এসএনএম আবদি [SNM ABDI]
    ভারতের প্রিন্ট মিডিয়া জগতে একজন সম্পাদক। এখন অবশ্য কোন মিডিয়ায় নাই, তবে ‘র’-এর সাথে সম্পর্কিত। তার এক দুঃখ-কাহিনী ভরা লেখা প্রকাশিত হয়েছে গতকাল ৬ জুন, ভারতের কুইন্ট [The QUINT] পত্রিকায়। সেখানে লেখার শেষে আবদির পরিচয় দেয়া হয়েছে  আউটলুক পত্রিকার সাবেক ডেপুটে এডিটর হিশাবে। আউটলুক-কে ভারতের মাপে “প্রগতিবাদী” মিডিয়া গণ্য করা হয়। আর কথিত মোদির-সেকুলার ভারতে কোন মুসলমান এডিটরের জন্য “প্রগতিশীলতাই” সবচেয়ে ভাল সার্টিফিকেট হয়ত!
    কিন্তু আবদি সাব এখন দেখি লেখাটা লিখেছেন য়াগের মতই ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের জন্য বা হয়ে। আজকাল তাঁর মত লেখকেরা এতই বেপরোয়া হয়েছেন যে সরাসরিই ‘র’-এর নাম লিখতেও  আর এদের ডর-লজ্জা করে না। ভদ্র ড্রয়িইং রুমে ‘র’-এর নাম প্রকাশ্যে উচ্চারণ করা অসভ্যতা, বেয়াদবি মানা হবে এজন্য যে র [RAW] এই সংগঠন ভিনদেশে অন্তর্ঘাতমূলক বা subversive কাজ করে, অবলীলায় নিজ স্বার্থে সেদেশের নিরীহ মানুষও মেরে ফেলতে পারে, কেবল  এই হত্যাকে নিজদেশের স্বার্থ মনে করলে। যেটা বলাই বাহুল্য, মানুষ জগতের কাছে সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য আদব-স্বভাব নয়; যদিও তা কোন দেশের রাষ্ট্রস্বার্থ হতেই পারে। একারণে ‘র’-এর নাম প্রকাশ্য উচ্চারণ এড়িয়ে চলা ভদ্রতার রেওয়াজ!  যেমন আপনি কখনই বলতে পারেন না বা বলবেন না যে ওমুকের বাসা থেকে আপনি এটা চুরি করে এনেছেন! এটা হয় না!  কিন্তু  একালে আবদি বা সুবীর ভৌমিক দেখা যাচ্ছে এসব পরোয়া করা ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের কাছে  ভদ্র-অভদ্র হলে কিছুই যায় আসে না।  বরং ‘র’-এর ক্ষমতা বা সাফল্য দেখানোই যেন গর্বের কাজ!

    আবদির এলেখার মুলকথাটা হল – লিখেছেন, বাংলাদেশে আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞা এতে “ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়, বিদেশে অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতা চালানো গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’, ন্যাশনাল সিকিউরিটি সমন্বয়ক সেক্রেটারিয়েট এবং এমনকি প্রধানমন্ত্রীর অফিস সকলেই বিরাট এক ঝাঁকি [jolted ] খেয়েছে”। মানে আবদি সাব বেচারা দুঃখ পেয়েছেন এমনভাবে ভারতের গুরুত্বপুর্ণ সকলকে ঝাঁকি দিয়ে ছুড়ে ফেলে দেওয়াতে! দেখেন নিচের ইংরাজিটা……

    It has jolted the Ministry of External, Affairs,
    the Research and Analysis Wing,
    the National Security Coordination Secretariat, and even the Prime Minister’s Office.

    দুবছর আগেও এমনই গোয়েন্দা বিভাগের এক ফরমায়েসি লেখা লিখছিলেন আবদি। আর এসবেরও আগে ২০১১ সালে তিনি বাংলাদেশে  প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর সফরসঙ্গী হিশাবে এসেছিলেন। তখন অবশ্য তিনি দ্যা ফাস্ট পোস্ট -এই নামের ইংরাজি দৈনিকের সম্পাদক ছিলেন। মানে এখন [কংগ্রেস-ভার্সানে] গোয়েন্দাবিভাগের সাথে সম্পর্কিত তিনি। আর মনমোহনের যেই সফরটা ছিল এক প্রতারণার সফর – তিস্তার পানির বিনিময়ে করিডোর নেওয়ার কথা থাকলেও আজও সেই প্রতিশ্রুতি ভারত পূরণ করেনি, অথচ করিডোর ভোগ করে চলেছে সমানে ও অবলীলায়। এটাকেই ভারতের সাফল্যও মনে করছেন এরা।

    এবার যে পত্রিকায় আবদির লেখা ছাপা হয়েছে তার সম্পর্কেও দুকথা বলা দরকার। একালে নাগরিক অধিকারের উপর আক্রমাণাত্মক মোদি সরকারের ভারতে, এখনও সবার চেয়ে মাথা উচু করা সাহসী ভারতীয় মিডিয়াটা হলে ওয়াইর [WIRE] । বাকিরা  টিকতে পারে নাই। আর ওয়াইর-এর পরে যে এখনও মোদির টাকার লোভ আর চাপ সামলিয়ে এখনও  কিছু করে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে সেই পত্রিকা হল কুইন্ট [the QUINT]।   যদিও আবদির লেখার কোন দায়িত্ব তারা নিতে চায় না তা জানিয়ে রেখেছে।

    আবদির গতকালের লেখা প্রসঙ্গেঃ
    এলেখার  শিরোনামেই বাংলাদেশে ভারতের হার ও ভারতের স্বার্থ বিপদে আছে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে আর এরপর ছটপটানি-তে বাঁচার চেষ্টা করছেন যেন, এভাবে লেখা। যার শিরোনাম লিখেছে এভাবে, India’s Stakes at Risk as the US Armtwists Bangladesh Over Election মানে “বাংলাদেশের নির্বাচন ইসুতে আমেরিকার হাত-মুচড়ানো থেরাপির প্রয়োগে ভারতের স্বার্থ একেবারে ধরা”।
    শুরুর প্যারায় লিখছেন, বাংলাদেশে “আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞার চাপ এটা ভারতের জন্য সত্যিই এক খারাপ সংবাদ” [is really bad news for India]। কিন্তু তিনি কেন বাংলাদেশের উপর আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় এক ভিন্ন দেশ ভারত এতে নিজের বিপদ দেখছে?? তা জানা যায় না!

    তবে তাঁর পরের প্যারাটা সবচেয়ে মজার। এবার এখানে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে হাসিনা ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে হাসিনা অগণতান্ত্রিক, অবৈধ ও আইন-বহির্ভুত কায়দায় জিতেছিলেন। তাই লিখেছেন, “ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য পরিস্কার। এটা হাসিনা সরকারকে এমন এক শক্ত-ঘেরটোপের ভিতরে ফেলেছে তাতে হাসিনা যেন আর ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মত করে অগণতান্ত্রিক, অবৈধ ও আইনবহির্ভুত উপায়ে ভোটে কারচুপি করতে না পারে। কিন্তু বিপরীতে দিল্লি যেকোন উপায়ে হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় দেখতে চায়” । দেখেন দেখি আবদির আবদার!!!

    Washington’s intention is crystal clear. It has put Prime Minister Sheikh Hasina’s Awami League government on a tight leash to dissuade it from resorting to undemocratic, illegal, and extra-constitutional methods to win the upcoming general elections like the previous rigged elections in 2014 and 2018. But New Delhi, in contrast, wants Hasina to win by any means”.

    আবদির এই প্যারাটা একদিকে সততার সাথে মন খুলে বলা তার মনের কথা (মানে চোরের মনে কথার মত) আর বলাই বাহুল্য তা চোরামির গল্প সবাইকে খুলে বলার মতই এক গাধামি অবশ্যই!  আবার অন্যদিকে যেকোন সাফাই-বক্তব্যে অন্যতম দিক হলে সেটাকে একটা ন্যায়-ইনসাফের উপর দাঁড়ানো কথা হতেই হয়। অথচ আবদি আমলই করছেন না যে তার খায়েস-আকাঙ্খা যেটা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা বা মোদি সরকারের খায়েস-আকাঙ্খা  – সেটার পিছনে কোন ন্যায়-ইনসাফের লেশ মাত্র নাই!
    যেমন আবাদির শেষ বাক্যটা দেখেন  New Delhi, in contrast, wants Hasina to win by any means” – আমেরিকার ইচ্ছার বিপরীতে ভারত চায় যেকোন উপায়ে নির্বাচনে জিতানো ।
    আচ্ছা আবদি সাব, বলেন তো দেখি  তার মানে যেটা হাসিনাকে যেকোন উপায়ে জিতানোর ভারতীয় খায়েস সেটা কী আর কোন “নির্বাচন” থাকে?? না কারচুপি হয় সেটা??? এছাড়া এভাবে ভারত অন্যায়-বেইনসাফিতে যদি হাসিনা জিতাতে চায় তাহলে বিপরীতে আমেরিকার বাংলাদেশে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপকে হস্তক্ষেপ বলার সুযোগ বা নৈতিকতা কী আর ভারতের থাকে??? আবদি ‘র’-এর খেদমতে এতই মশগুল যে এই বেইনসাফি দিকটার দিকে তাঁর কোন চোখ নাই, আমল নাই!!!

    ভারতীয় লেখকেরা বিশেষ করে যারা মোদির কোলে বসে লেখেন তারা এত উচ্চমাত্রার উগ্রজাতিবাদে ভুগেন যে তাদের কাছে ন্যশনাল ইন্টারেস্ট বলে এক  আজিব ধারণা তাদের লালন করতে দেখা যায় যা অনুসারে ভারতের স্বার্থ-রক্ষার্থে তারা যাই করুক তা জায়েজ ও বৈধ হয়ে যাবে – বলে এক আজিব ধারনা তারা লালন করে থাকে। আবদিও এমনই এক লোক।
    আবদি লিখছেন, “একদিকে আমেরিকা হাসিনার প্রতি অবিশ্বাসে মাত্রা তুঙ্গে নিয়ে গেছে যে সে হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায়, অন্যদিকে ভারতের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হচ্ছে যেকোন উপায়ে হাসিনাকে ২০২৪ এর নির্বাচনে চতুর্থবারের মত জিতিয়ে আনা; আর এটাই
    তার বিদেশনীতি-কাম নিরাপত্তা স্বার্থ”।
    নিচে মূল ইংরাজিটা।

    “On the one hand, the US has such grave misgivings about Hasina that it wants to evict her from power. And on the other hand, the biggest priority of India’s foreign policy-cum-security establishment is to get Hasina re-elected in January 2024 for a fourth successive term at any cost.”

    তাঁর মানে যেটাকে ভারতের কথিত “জাতীয় স্বার্থ” মনে করা হবে সেটা ভারত চাইলেই পাবে আর তা পাওয়ার জন্য ভারত সবকিছু করতে পারবে; তাতে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ বা নিজ রাষ্ট্রীয় এক্তিয়ারের বাইরে তা চলে গেলেও অথবা  অন্যদেশের সার্বভৌমত্ব এক্তিয়ার ভঙ্গ করলেও যেন কিছু এসে যায় না। অর্থাৎ সারকথাটা হল, ভারত সেটাকে তার জাতীয় স্বার্থ মনে করছে কিনা – এই হবে মাপকাঠি। এই মাপকাঠি ধরে সব জায়েজ মনে করতে হবে!! যদি খালি  ভারত মনে করে তাহলেই ভারত তা আদায় করতে পারবে!!!!
    তবে এই কথা শুনে তো আমাদের হাততালি দিয়ে উঠা উচিত। কারণ তাহলে, মোদি দেখতে খুবই খারাপ তুলনায় রাহুল অনেক হ্যান্ডসাম ছোকড়া। ফলে বাংলাদেশ যদি মনে করে মোদিকে উপড়ায়ে ফেলায় দিয়ে রাহুল কেন  বরং মমতাদিদিকে যদি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতায় নিয়ে আসি আর খালি সেটা যদি বাংলাদেশের ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট বলে ঘোষণা করে দেই তাহলে তো আমরাও  ইচ্ছামত ভারতের সরকার বদলাতে পারব, তাই না??? কী মজাই না হবে!!! সত্যি! আবদি নিশ্চয় এতে খুশি হয়েছেন?

    এরপরে এসে এই বার আবদি সাবের হুশ এসেছে যে তাহলে বাংলাদেশ নিয়ে আমেরিকা-ভারতের কাড়াকাড়িতে তাহলে ভারত কী সবসময় মার খেয়েই যাবে? পরিস্থিতি সবসময় আমেরিকার পক্ষে ছেড়ে দিয়ে ভারত কী স্যাক্রিফাইস করেই যাবে নাকি উলটা আমেরিকাকে অমান্য করবে অথবা এমন অমান্য করা কী ঠিক হবে?  এই ধরণের লোমছোম কথাবার্তা  লিখে চলেছেন আবদি……The gaping chasm underlines the India-US conflict over Bangladesh and raises valid questions about India’s capabilities to pursue its goal defying the US – and whether it is wise to do so. It also flags gross US insensitivity to India’s interests even in India’s own backyard and how the US always expects India to quietly sacrifice its interests for America if they happen to clash!

    মজার কথা হল, এরপরেও আবদি মনে করেন, বাংলাদেশ হল নাকি ভারতের বাগানবাড়ি বা শখের মামাবাড়ি  ফলে সেখানে কেন আমেরিকান মাতব্বরি চলবে [India’s interests even in India’s own backyard] এনিয়ে ক্ষোভ জানাচ্ছেন তিনি। কিন্তু বাংলাদেশ ভারতের কোন বাপের বাগানবাড়ি সেটা অবশ্য আমরা বাংলাদেশিরা জানি না বা মানিও না…।

    তিনি এরপরেও আবার ভারতীয় জাতীয় স্বার্থের কথা তুলেছেন। বলছেন ভারতের কাছে পরীক্ষিত বন্ধু হল নাকি হাসিনা! আর ওদিকে আমেরিকা সে না হাসিনার পক্ষে না আওয়ামি লীগের পক্ষে – আমেরিকা কেবল সরকার বদল বা শাসক বদলে দিবার পক্ষে!!! For India, there is no alternative to Hasina – New Delhi’s tried and tested ally. But the US is neither in Hasina’s nor Awami League’s favour – it is in favour of an outright regime change, no less.
    মানে হল আবদি বলছেন ভারত নামের এই বাচ্চাটার মুড়ির মোয়া ভালো লেগেছে এখন তাকে তার হাতে সেটা না  দিয়ে অন্যকিছু দিলে কী তার ভাল লাগবে? আসলে আমেরিকা কতই না নিষ্ঠুর আর কী বলব!!! মাসুম বাচ্চা ভারতের কথা একবারো ভাববে না?????

    এরপর তিনি হাসিনাকে এক মারাত্মক সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে তা ভেবে সাবধান করেছেন। বলছেন, সাবধান “…… There is a very high probability of visas of Hasina’s immediate family members……” কথাটার বাংলা করলে,  হাসিনার আপন পরিবারের সদস্যদের উপরও আমেরিকা ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ [মানে তারাও যেন আমেরিকায় প্রবেশাসধিকার না পায় বা থাকলে বের করে দেয় ] এমন ব্যবস্থা জারি হতে পারে……।।

    তবে আসলে,  আবদি লোকটার চিন্তা ভাবনা খুবই ভোঁতা আর বোকা-বোকা কিসিমের, সন্দেহ নাই। যেমন বলতেছেন, হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশ নাকি চীন আর পাকিস্তানিতে ভরে যাবে। মানে সেই আশির দশকের সব অচল চিন্তাভাবনা – হিন্দু-মুসলমান রেষারেষিতে ফেলে পেটি-মধ্যবিত্ত যেভাবে চিন্তা করে বা করত!  এর মানে  উনি জানেনই না যে হাসিনার সাথে একালে খুবই ও সবচেয়ে ভাল সম্পর্ক হল পাকিস্তানের; বাংলাদেশ পাকিস্তানি হাই-কমিশনারেরও। এছাড়া, চীন ২০১৬ সাল থেকে চীনের হাত খুলে অবকাঠামো ঋণ দেয়া যা একচোটে প্রায় ২৬ বিলিয়ন যা বাংলাদেশের জীবনে মোট বাকি সবার দেওয়া ঋণের চেয়েও বেশি। আর এটাই হাসিনার উন্নয়নের গল্পের পিছনের মূল রসদ। তাদের দলের চোরদের খাই মিটানোর উপায়!! একই অবস্থা ভারতের। চীন-ভারতের বাণিজ্য এখন বছর ১১৫ বিলিয়নের (যার মধ্যে চীন থেকে ভারতে আমদানি ৯৮.৫বিলিয়ন বাকিটা চীনে রপ্তানি) কাছাকাছি তাতে লাদাখ সীমান্তে চীন-ভারতের যতই লড়াই ঝগড়া থাক। আবাদি-কে এসব দিকে চোখ তুলে তাকাতে শিখতেই হবে – আশির দশকের পরে এখনও পুরাণা চিন্তা বা পুরাতন গল্প ইত্যাদি এসবের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলেই চলার এটা হল বেকুবের সাহস!

    এককথায় বললে আবদি আসলে হারু পার্টি। তিনি আগাম ধরে নিয়েই লিখতে বসেছেন যে [যেটা উনি ঠিকই বুঝেছেন] যে গত পনেরো বছর ধরে ভারত হাসিনার বাংলাদেশকে  যে চুসা চুসে গিয়েছে সেসব দিন এখন ফুরিয়ে আসছে। তাই প্রতিটা বাক্যে আবদি তিনি আপসোস ঝড়িয়ে কথা বলেছেন। এমনকি আরেক বাঙালি পেটি কর্মকর্তা – ঢাকায় ভারতের সাবেক এক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী – তাঁর কথিত এক বাণী স্মরণ করেছেন আবদি। আবদি বলছেন ২০১৮ সালের দিকে পিনাক রঞ্জন লিখেছিলেন – “হাসিনার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়া এই অসৎ উদ্দেশ্যে করা একটা কাজ …the Awami League removed the provision for caretaker government “with malafide intent to give it control over the election process”. ” –  যেটা নির্বাচনি প্রক্রিয়ার উপর হস্তক্ষেপ করতে চেয়ে করা কাজ…”।

    In a rare criticism of Hasina by an Indian official, Pinak Ranjan Chakraborty who served as India’s Ambassador in Dhaka from 2007 to 2009, wrote in 2018 post-retirement that the Awami League removed the provision for caretaker government “with malafide intent to give it control over the election process”.

    শেষ কথাটা হল, আবদি দেখতে পেয়েছেন, “বাংলাদেশ এখন আমেরিকার পরামর্শের পক্ষেই ক্রমশ ঝুকে যাকচ্ছে এবং যাবেই; আর এতে সবকিছুই বিএনপির পক্ষে চলে যাচ্ছে…”

    আমাদের শেষের বাক্যে মাত্র দুইটা শব্দ – বেচারা আবদি!  

    >>>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • আবার সুবীর ভৌমিক!

    আবার সুবীর ভৌমিক!
    গৌতম দাস

    ২ জুন ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4yv

             Why Did the United States Just Sanction Bangladesh – FP

     

    আবার সুবীর ভৌমিক! তিনি আবার একটা লেখা পয়দা করেছেন, একই ফেডারেল পত্রিকায়। তবে এবার সম্ভবত শ্রীরাধা দত্তের দ্বারা সুবীর উদ্বুদ্ধ হয়েছেন যে – “ভারত এক পরাশক্তি”, এমন ভাব দেখানিতে সামিল হয়ে।  স্বপ্নে পোলাও খাবার মত এই ভাব ধরে কল্পিত ধারণার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ নিয়ে আরো কত কী তো লেখা সম্ভব!! অসম্ভবএর কী আছে? আর এতে মোদির ভারতের ইমেজ অনেকটাই ফাও ফাও বাড়িয়ে নিবার অনেক সুযোগ আছে। তাই সুবীর মনে হচ্ছে এবার সে লাইনে আবার একটা লেখা পয়দা করেছেন।

    লেখার শিরোনামঃ “India intervenes to douse tempers in US-Bangladesh spat” মানে হল – “আমেরিকা-বাংলাদেশের মধ্যে গরম হয়ে যাওয়া কথাবার্তায় ভারতীয় হস্তক্ষেপ, উত্তেজনার পারদ নামাতে”।

    তার মানে সারকথা হল, ভারত এক বিরাট পরাশক্তি আর মোদি তার বিরাট নেতা – এই প্রপাগান্ডা করতে এসেছেন সুবীরও। এতে তিনি মোদিকে এতই বিরাট নেতা বানাচ্ছেন যে তিনি যেন দুপক্ষকে শান্ত করেছেন [নিচে মূল ইংরাজিটা দেখতে পারেন।]। এই অভিনয়ের উপর দাঁড়িয়ে সুবীর কথা সাজিয়েছেন। আবার সুবীর নিজেই এক সাফাইও হাজির করেছেন যে কেন ভারত গুরুত্বপুর্ণ হল। সুবীর বলছেন, ভারত নাকি “উভয় পক্ষকে সহনশীল সংযত [advising moderation] হতে পরামর্শ দিয়েছে”। কিন্তু কেন দিতে গেল আর কেন আর কী সুত্রে ওরা উভয়পক্ষ ভারতের কথিত পরামর্শ গ্রহণ করল বা ভারতকে পরামর্শ দিবার জায়গা করে দিল? এনিয়ে সুবীর নিজেই ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন, কারণ আমেরিকা নাকি ভারতের কৌশলগত পার্টনার আর বাংলাদেশের কাছে ভারত হল সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু , তাই।

    “India has played a vital role by advising moderation
    on both sides since it is close to both the US(its strategic partner)
    and Bangladesh (its most trusted friend in South Asia).”

    সমস্যা হল, বাংলাদেশের মানুষ জানে যে এটা একটা শতভাগ মিথ্যা কথা। কারণ, স্বামী প্রাক্তন হয়ে গেলে তাকে কী আর স্বামী বলে চালায় দেয়া যায়? আমেরিকার সাথে ভারতের স্ট্রেটেজিক মিল অবস্থানের যে সম্পর্ক ছিল সেটা আর কার্যত নাই। বাইডেন মোদি-বিহীন ভারত চাওয়া শুরু করলে কী আর পুরানা এসব সম্পর্ক এখনও জিন্দা আছে বলে চালিয়ে দেয়া সম্ভব?? আবার  অন্যটা, মানে হাসিনা সরকার? ভারত যে সুযোগ পেলে হাসিনা সরকারকে বেঁচে দিয়ে হলেও পরবর্তি সরকারের সাথে সম্পর্ক বা খাতির জমানো করতে পিছপা হবে না সেটা তো কারও অজানা থাকার কোন কারণ নাই! তাহলে কেন সুবোর এদিকটা আড়াল করতে চাইছেন?

    আর ইতোমধ্যেই ভারত যে এমন বেচাবিক্রির জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে এর প্রমাণ সুবীর তার এই লেখাতেই রেখেচেন। সেখানে যাচ্ছি একটু বাদে। তার আগে, সবচেয়ে আজিব বাত হল, সুবীর নিজেই জানাচ্ছেন “……  R&AW chief Samant Goel to Dhaka,” – মানে র-এর চীফ নিজেই ঢাকা-ইন্ডিয়া দৌড়াদৌড়ি করতেছেন। প্রথমত সুবীর কেন সামন্ত গোয়েলের এই গোপন ততপরতা পাবলিক করে দিচ্ছেন? সুবীরের হয়ত ধারণা এতে হাসিনা সরকার খুশি হবে? অথবা র-এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে আবছায় থাকবে! তাই কী? না হলে, গোয়েলের এই গোপন ততপরতা পাবলিক করে দিবার কোন লাভজনক কারণ তো দেখা যাচ্ছে না!
    তবে অন্যদিকে,  সুবীর কী জানেন না যে এই কথাটা বাংলাদেশের আম-মানুষ সবচেয়ে অপছন্দ করবে????? যেখানে বাংলাদেশের  আম-মানুষের ভারতীয় ততপরতা নিয়ে সবসময় উদ্বেগের মধ্যে থাকে; অবিশ্বাস করে!  অন্যভাবে বললে, R&AW অথবা এর chief এর প্রতি বাংলাদেশের আম মানুষের নুন্যতম সহানুভুতি নাই, থাকার কোনও কারণও নাই! কারণ, গত ১৫ বছর ভারত বাংলাদেশিদের স্বার্থের এদিকটায় কোন আমলই করে নাই! তাহলে সুবীরের এই বেপরোয়া ভাবটা কেন?  সামন্ত গোয়েল বা প্রণয় ভার্মা-রা বিরাট দৌড়াদৌড়ি করছেন এই তথ্য কী হাসিনা সরকারের পক্ষে যাবে, তার জন্য ভাল হবে? প্রশ্নই আসে না, পাবলিকের চোখে ভাল হবে না বরং নেগেটিভ হবেই! তাহলে সুবীরের এসব পাকামো কেন? এর একটাই কারণ হতে পারে যে মোদি ও তার ভারত যে বিরাট পরাশক্তি হয়ে গেছে – সেই ফাঁপা আর শতভাগ মিথ্যা হলেও সেই কথাটাকেই ফুটানি দেখানোর জন্য ব্যবহার করা!!

    এটাই আসলে হাসিনা সরকার মরুক আর বাচুক জাহান্নামে যাক এই সরকারকে এখন বেচা দিয়ে হলেও সামন্ত গোয়েল বা মোদির স্বার্থ উদ্ধার মনে হচ্ছে তাদের প্রধান লক্ষ্য!

    আবার লেখার শুরুর প্যারাতেই সুবীর হাসিনা সরকার সম্পর্কে লিখছেন Bangladesh has promised ………who are linked to electoral fraud.
    মানে সুবীর বলছেন, – অ্যামেরিকা বলেছে যারা নির্বাচনী প্রতারণা বা কারচুপিতে সংশ্লিষ্ট তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে, এজন্য সরকার সুষ্ঠ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।  আবার পরে সুবীর আরো বলেছেন, ২০১৪ আর ২০১৮ এর নির্বাচনে যারা ভোটচুরিতে দুবারই ব্যাপারটাকে আবর্জনা বানিয়ে ফেলেছিল তাদের উপর আমেরিকা খুবই ক্ষুব্ধ। [it feels, has marred two successive national elections in 2014 and 2018.]
    আবার সুবীর সাথে জুড়ে দিয়েছেন হাসিনা সরকার এসব কারচুপির কথা ঝেড়ে অস্বীকার করেছে……। তাই কী করার কথা না? সরকার স্বীকার করার পরে কী আর সরকার থাকে?

    আচ্ছা সুবীর সাব এত পিছলা-পিছলি করতাছেন কেন? যেমন,  ২০১৪ সালের কথাই ধরেন, ভারত সরকার বা তার গোয়েন্দা বিভাগের কাছে ফাস্ট-হ্যান্ড ইনফরমেশনই আছে?  নাই কী? ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং-কে দিয়ে ভারত সরকার যে এসাইনমেন্টে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল তা কী তামাম ভারতীয় সরকারি পক্ষের কাছে অজানা? সেখানে বিএনপি বাদ আর এরশাদকে বিরোধী দল সাজিয়ে নির্বাচন পার হতে হবে – এই ছিল সুজাতার এসাইনমেন্ট তা তো সেই সময়ই এরশাদ ঐ সময়ের সুজাতার সাথে এরশাদ তাঁর মিটিং থেকে বের হয়েই ভারতের এই সিদ্ধান্তের কথা সরাসরি সাংবাদিকদের জানিয়ে দিয়েছিলেন। একালেও চলতি বছরে সংসদে জাতীয় পার্টিও সেসব পুরানা ভারতীয় প্রতারণার কথা তারা নিজেরাই স্বীকার করে আবার আমাদের জানিয়েছে, এখানে দেখুন।  কাজেই এসব তো সুবীর সাবের কিছুই অজানা নয়। তাহলে এখন এমন ঢং করে নিঃস্পাপ সাজা – এটা তো বাংলাদেশের আজ-জনতার জন্য বিরক্তিকর নেকামোই ঠেকবে! নাকি?

    আবার র‍্যাবের উপর অ্যামেরিকান স্যাংশনের জন্য হাসিনার যেসব দুর্বল সাফাই – যে র‍্যাব কথিত জঙ্গিবাদ দমন করেছে – বলেছেন সেগুলোকেই সুবীর আঁকড়ে ধরে আবার হাজির করেছেন এখানে। কিন্তু কথা হল সুবীরের টার্গেট শ্রোতা কে? আমেরিকা? বাংলাদেশের আম-জনতা? এদের কারও কাছেই তো এই সাফাই গ্রহণীয় নয়। তাহলে কে টার্গেট শ্রোতা? ভারতের সরকার অথবা হাসিনা সরকার? সেটা তো ঘরে ডেকে নিয়ে বললেও হত! এর প্রয়োজন কী? কার ভোগে লাগবে এই প্রকাশ্য চামচামি?

    সোজা কথায় আমরা দেখছি এবার সুবোর ভৌমিক খুবই অস্থির বেচাইন; কথার তালমিল রাখতে পাচ্ছেন না।
    তবে সুবীরকে যা মনে রাখতে হবে তা হল এটা ২০১৩-১৪ সাল নয়। এটা ২০২৩ সাল। ফলে নানার আমলে ঘি খাইছিলেন সেই গল্প হাজির করে এখন তুড়ি বাজাতে চাইলে তো আর বাজবে না। এখন আমেরিকান অবস্থান আর ভারতের অবস্থান এক নয়, স্ট্রাটেজিক মিলের গল্প সে তো বহু দূর, যা বহু আগেই ছিঁড়ে গেছে; এশিয়ায় ভারত-আমেরিকা এখন যার যার তার তার আর সর্বপরি খোদ মোদিকেই ক্ষমতাচ্যুতি বা অপসারণ এখন অন্তত বাইডেনের কামনা!  কাজেই পরাশক্তি ভাবধরা মোদির চেয়ে এক অধীনস্ত ইন্ডিয়া –  এটাই  বাইডেনের এশিয়া নীতির সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ।  সেটাকে অধীনস্ত বা বাইডেন-রাহুল ডিল যাই বলি না কেন!   আদতে সবকিছুই মোউলিক জায়গায় আসলে বদলে গেছে। কাজেই খামোখা মোদিকে পরাশক্তি বা বাংলাদেশের ত্রাতা ভাব ধরে লাভ নাই। আমেরিকা ভারতের এখনও স্ট্রাটেজিক বন্ধু বলে মিথ্যা ভাব ধরেও লাভ নাই! এতে মোদির গুরুত্ব বাড়ারও কোন কারণ নাই! এমনকি তা হাসিনা সরকারের কাছেও না!

    কে মিথ্যা বলছেন সুবীর না শ্রীরাধাঃ
    আবার সবচেয়ে বড় কথা শ্রীরাধা দত্ত [যাকে নিয়ে গত সপ্তাহেই লিখেছি এখানে দেখেন] অফিসিয়ালি আরএসএস এর সাথে যুক্ত মানে আরএসএস এর এক থিঙ্কট্যাঙ্কের ভিআইএফ [VIF] এর এক কর্ণাধর। বিপরীতে সুবীর ভৌমিক আপনি যা কিছুই হন না কেন অফিসিয়ালি ভারত সরকারের কেউ না।
    এখন  শ্রীরাধা দত্ত বিবিসি-কে বলে গেছেন ভারত সরকার হাসিনার জন্য কিছু করবে না। আর সুবীর আপনি বলছেন উল্টাটা। কী হল তাহলে?
    আবার হাসিনা সরকার টিকানোর পক্ষেই নাকি র-এর প্রধান সামন্ত গোয়েলের ঢাকা সফর ছিল বলে গল্প দিচ্ছেন! মানে এসেছিলেন এটা আপনিই সাক্ষ্য দিয়ে বলছেন তাই এটা আমাদের অস্বীকারের কিছু নাই। কিন্তু সরকার টিকানোর জন্য কী এসেছিলেন? না উল্টাটা, আমরা বিভ্রান্ত! তাহলে আসলটা কী?  ঠিক কোনটা আসল তা নিয়ে আপনার উপর আস্থা রাখা যাচ্ছে না! তাই,  খুব সম্ভবত শ্রীরাধা নয়,  সুবীর আপনি একদম ডাহা মিথ্যা বলছেন।

    কথা বেশি বললে চাপাবাজি সব বের হয়ে পড়ে!!! এত বারবার একেক কথা দিয়ে আপনার হাজিরাটাই সব অস্থিরতারই ইঙ্গিত!
    আর স্বভাবতই এতে, বাংলাদেশে ভারত সরকার বা মোদি বা সুবীর ভৌমিক ইত্যাদি এদের সকলেরই বিশ্বাসযোগ্যতা শুণ্যের কোঠায় ডুবে যাচ্ছে! অসৎ লোকে দুনিয়াটা ভারি হয়ে উঠছে!

    +++

    আপডেটেডঃ ০২ জুন ২০২৩ দুপুর  ১০ঃ ৫৮ ১১

    গৌতম দাস,
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’ জিনিষটা কী; বাংলাদেশ কোথায়?

    ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’ জিনিষটা কী; বাংলাদেশ কোথায়?
    গৌতম দাস

    ২৭ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4vF

     

           ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটিজি: যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে চীনকে মোকাবেলা করবে

     

    বাংলাদেশে এখন পড়াশুনা করার চেয়ে আঁতলামো বেশি গুরুত্বপুর্ণ হয়ে গেছে। এতে আমাদের সাংবাদিক বন্ধুটাও ‘কূটনৈতিক রিপোর্টার’ বলে নিজ পরিচয়টা বোল্ড করে লিখতে যতটা আগ্রহী এর চেয়ে ঠিক এর উলটা – ততোধিক যেন তাঁর অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে কোন দেশি বা আন্তর্জাতিক ইস্যুকে বুঝার ব্যাপারে।  যেমন, ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি জিনিষটা কী অথবা কবে কোথা থেকে এলো তা আমাদের মিডিয়া নিজে বুঝেছে ও পাবলিককে কিছু স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে, এমন জানা যায় না। কেবল ভাষাভাষা আর এমনিতেই  যতটুকু যা আন্দাজে ঢিল মেরে যেটুকু যা মিলে সেটুকুতে তারা বুঝে যে, আমেরিকা কিছু একটা আমাদের সরকার থেকে চাচ্ছে! কিন্তু কী সেটা? সাংবাদিকেরা তা জানে, এমন মনে হয় না।

    এর উপর আবার লেটেস্ট খবর হল, হাসিনা সরকার নাকি তার ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’ কী তা লিখে আমেরিকার হাতে দিয়েছে, জানিয়েছে। তা খারাপ না ভাল আমরা তেমন জানি না।  কিন্তু, কি লিখা আছে সেখানে? অন্তত কয়েকটা বাক্যে  সরকারের জবাবের সারকথাটা কীঃ অথবা ধরাযাক এছাড়া লিখতে গিয়ে সরকার কী কী অসুবিধা ও কী বাধা ঠেকছিল ইত্যাদি নিয়ে আমাদের পাঠককে সেটা আমাদের মিডিয়া জানাতে পারে নাই। এনিয়ে একমাত্র রিপোর্ট যা পাওয়া যায় তা হল বাংলা বিবিসির – সেটাই কোন কোন মিডিয়া তুলে এনে ছাপিয়ে দায় শেষ করেছে। ছাপিয়েছে। আবার কেউ কেউ আবার এনিয়ে কলাম লিখেছেন যা এতই অখাদ্য যে সেগুলো আবার বিরাট গেম বা খেলা হবে টাইপের…। তবে সকলের মধ্যেই একটা ভাব আছে যেন  সরকারের ডিএসএ [ডিজিটাল সিকিউরিটি এক্ট] আইনের ভয়েই যেন তারা কিছু লিখে নাই। যা শতভাগ এক মিথ্যা কথা। কারণ সরকার প্রধান নিজেই বক্তৃতায় এনিয়ে তাঁর নিজের কথা তুলে ধরেছেন। তাই পাবলিকলি হাসিনার বলা সেসব কথাগুলোই রিপোর্ট আকারে অবশ্যই ছাপিয়ে দেয়া যেত, কোন সমস্যা ছিল না।
    ঘটনা আরও আছে এনিয়ে ঢাকায় জাপানের রাষ্ট্রদুত আবার বলেছেন, ঢাকার প্রকাশিত ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি – এটা নাকি তাদের ফেবারে!!! বলেছেন “জাপানের উদ্যোগ ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস) নিয়ে সঠিক পথেই হাঁটছে ঢাকা”। ]  আবার অনেকে বলছেন,  আমেরিকাও অনেকটা তেমনই ইঙ্গিত দিয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়! বলেছে, ঢাকা সম্প্রতি তার ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক (আইপিও) প্রকাশ করেছে, যার অনেক কিছুর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির (আইপিএস) মিল রয়েছে।  পরের এই খবরটার আবার এটা যেখানেই ছাপা হোক এর মূল সোর্স হল সরকারি বাসস। এর মানে সরকার নিজেই মনে করে, এই ভাষ্যটা সঠিক! এমনকি  অ্যামেরিকান বা কুগেলম্যানের ফরেন পলিসিও এমন এক রিপোর্ট ছেপেছিল।

    আচ্ছা তাই যদি শেষমেশ  দশা-পরিস্থিতি হয়, তাহলে ভারি মজার কথা তো!!
    মানে তাহলে তো আমেরিকা হাসিনা সরকারকে ক্ষমতায় রেখেই দিবে বা দিচ্ছে নাকি – আর ঝামেলা নাই কী বলেন!!!  এমন কী বলা যায় না, রিপোর্ট করে দেয়া যায় না?  না আ আ … এবার আর এমন “রিপোর্টার” কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না; সবাই নাকি “গোপন সব খবর” মানে স্কুপ নিউজ খুজাতেই খুবই ব্যস্ত হয়ে আছে!
    আচ্ছা তাহলে আমাদের – আই আর [IR] – মানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ‘ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস’ ডিপার্টমেন্টগুলো নিশ্চয় অনেক কিছু না হলেও কিছু জানে ও বলতে পারত! না,  তাও মনে হচ্ছে না। কারণ তাদেরকে রেফার করে কোন মিডিয়ায় ত কোন নিউজ নাই! তাহলে?? আমাদের কী হবে? এই হলো আমাদের মিডিয়া!!

    ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’ এই জিনিষটা কীঃ
    এর আদ্যোপান্ত নিয়ে খুঁটিনাটি সব নিয়ে এখানে কথা বলতে গেলে পাঠক অতি-তথ্যের ভারে হারিয়ে যাবেন। তাই এখন অল্পকথায় মুল বিষয়টা বলার চেষ্টা করব। যদিও এনিয়ে কয়েকবছর আগে আমার অন্তত একটা ছিল যেটা খুজতে এখন একটু টাইম লাগবে। তবে ইতোমধ্যে পেয়ে গেলে সেই রেফারেন্সও দিব।

    ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’ ইস্যুটা বুঝার জন্য সবচেয়ে ভাল মানে সহজ এপ্রোচ বা উপায় হতে পারে এই যে,  খেয়াল করলে দেখব এই ইস্যুটা একটা আগাম অনুমানের উপর দাড়ায়ে আছে; সেই ধরে নেয়া অনুমানটা কী, তা যদি আগেভাগে বুঝে নেই। সে অনুমানটা হল যে, “চীন আন্তর্জাতিক রুল মানে না”।  এখানে আন্তর্জাতিক রুল বলতে বুঝতে হবে জাতিসংঘের হেফাজতে থাকা নানান আন্তর্জাতিক আইন-কানুন, আন্তরাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধ মিটাবার জন্য অতীতে নানান সময়ে ডাকা রাষ্ট্রগুলোর সভায় নেয়া সিদ্ধান্ত ও কনভেনশন ইত্যাদি।

    এখন ‘চীন আন্তর্জাতিক রুল মানে না’ এই আগাম অনুমান যদি সত্যি ধরে নেই তবে এর ভিত্তিতে পালটা আমেরিকার নেতৃত্বে ও চীনবিরোধী হয়ে যে জোট তৈরি করতে হবে – সে দাবিই হবে ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’ ইস্যুটার মূলকথা। কারণ তাহলেই এতে সহজেই আমেরিকা চীনকে কোনঠাসা করে ফেলবে বা পারলে একঘরে করে রাখার পথে  হাঁটবে – এই হল আমেরিকার মূল স্ট্রাটেজি। কিন্তু এটা আমেরিকার মূল স্ট্রাটেজি হলেও আমেরিকা ও তার বন্ধুরা “চীন আন্তর্জাতিক রুল মানে না” – এভাবে কথাটা বলতে চায় না।  কথাটা তারা ভিন্ন ভাষায় বলতে চায়।  তাই অনেক ঘষাঘষি ড্রাফট মুসাবিদা করার শেষে যে ভাষ্য-রূপটা দেখা যায় সেটা হল – “…advancing the  common vision of a free, open, inclusive, peaceful, and secure Indo-Pacific region“ ; যার বাংলা করে বললে – একটা অবাধ ফ্রি, খোলামেলা, সবাইকে নিয়ে, শান্তিপুর্ণ ও নিরাপদ এমন কমন দৃষ্টিভঙ্গিতে – ইন্দো-প্যাসেফিক রিজিয়ন গড়ে আগানো।

    এখন সবার আগে একটা কথা বলে নেই। এই যে – “advancing the common vision of a free, open, inclusive, peaceful, and secure Indo-Pacific region”  – এই যে ভাষ্যটা এনেছি এটা আসলে  ২০২০ সালের; এখণকার নয়। মানে বাইডেনের আগের ট্রাম্প আমলের; আর সে আমলে ট্রাম্পের শেষ বছর ২০২০ সালে তিনিও অ্যামেরিকান কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের কারণে বাধ্য হয়েছিলেন এই ভাষ্যের অ্যামেরিকান কৌশল নিয়ে এশিয়ায়, তার স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি সেক্রেটারি স্টেফান বিগান [Stephen Biegun] কে পাঠিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন ১৪ অক্টোবর ২০২০; উদ্দেশ্য এশিয়ায় আমেরিকার এই স্ট্রাটেজি প্রচার করে এরপক্ষে এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোকে দলে ভিড়ানো। এখানে লক্ষ্যণীয় যে তখন এই স্ট্রাটেজিকে ডাকা হত ইন্দো-প্যাসেফিক রিজিয়ন এর স্ট্রাটেজি বলে। যেটা এখন বাইডেন আমল থেকে সরাসরি, ” ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি” বলে ডাকা হচ্ছে।  আর এছাড়া বড় ফারাক হল তখন ছিল সবাইকে আমেরিকার নিজ-স্ট্রাটেজিতে সামিল হতে ডাকার; যেজন্য ডেপুটি সেক্রেটারি স্টেফান বিগান এসেছিলেন। আর এখন বাইডেন ডাইরেক্ট একশন করতে চান; তাই এবার এটা সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু এর আমলে সেটা এখন হয়েছে ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’- যার মানে আর করণীয় হল এশিয়ার বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার প্রত্যেক দেশকে  তার ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’ কী তা লিখে আমেরিকার কাছে জানাতে হবে। মানে হল, ঐদেশ কী  “চীনকে আন্তর্জাতিক রুল মানে না” – বলে মনে করে কিনা সেটাই বলতে হবে।  তবে কথাটা ঘুরায় বলতে হবে অর্থাৎ  বলতে হবে ঐদেশ ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে অবাধ ফ্রি, খোলামেলা, সবাইকে নিয়ে, শান্তিপুর্ণ ও নিরাপদ এমন  দেখতে চায় কিনা।!! এদিক থেকে!
    যদিও সব ততপরতার সারকথাটা হল, যেন আপনাকে আগেকার দিনের সোভিয়েত-আমেরিকা বলে কোল্ডওয়ারে বিভক্ত দুই ব্লক বা জোটের ঝগড়ার মত; তবে একালের চীনকে রুল মানে না – অথবা চীন খারাপ দেশ – এসব ট্যাগ দিয়ে যেন আপনি চীনের বদলে অ্যামেরিকান   ব্লকে আপনি আসছেন কিনা – এরই ভাগাভাগির তুলে দেখানোটাই হল একালের ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’। যদিও মনে রাখতে হবে একালের ধারণাটা আরো অনেক সুনির্দিষ্ট। যেমন, আপনার দেশ নিজ অবকাঠামো এবং ডাইরেক্ট ঋণ- বিনিয়োগ সেটা চীনের থেকে নিবেন আর চীনের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের রমরমা অবস্থা গড়বেন সেটা হবে না।  কারণ একালে দেখাতে হবে যে চীন তো আন্তর্জাতিক সমাজে চলার দেশ না, [UNRULY] দেশ যে কোন নিয়ম মানে না, আর ঘামন্ডি বেয়ারা দেশ – একথা যদি মানেন তবে আপনি চীনের সাথে ঋণ-বিনিয়োগের সম্পর্ক, মাঙনা টিকার চালান নেয়া কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য এমন কোন কিছুই করতে পারেন না – এই হল ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির মূল আর্গুমেন্ট, এমন হতে হবে।

    তবে বলাই বাহুল্য এসব কথাগুলো নিজ রাষ্ট্রের ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’ লেখার সময় সরাসরি চীনের নাম নিয়ে বললে অনেক কূটনীতিক বিপত্তি, ঝামেলা দেখা দিবেই। তাই চীনের নাম না ধরে বলতে হবে  আর সেই স্টান্ডার্ড ভাষ্যটা  হল,  ইন্দো-প্যাসেফিক মহাসাগরের  সাউথ চায়না সি- অঞ্চলে  আকাশপথ বা সমুদ্রপথকে অবাধ ফ্রি, খোলামেলা, সবাইকে নিয়ে, শান্তিপুর্ণ ও নিরাপদ চলাচল দেখতে চায় আমার দেশ। আর এই কথাটা বিভিন্ন দেশকে বলায় নেয়াটাই হচ্ছে আমেরিকার ‘ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’- এর সারকথা। তবে যতদিন যাচ্ছে আমেরিকা এই মূল ভাষ্যটা আরও আপডেট ও বিস্তারিত করে সাজাচ্ছে। যেমন ইউ.এস.এইড [USAID] – এটা আমেরিকার বিদেশি সাহায্যদাতা মূল প্রতিষ্ঠান। এর ওয়েবসাইটে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি’র অনেক বিস্তারি ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। উপরের লাইনে আমার লালকালিতে লেখা প্রতিটা শব্দের আরো বিস্তারি ব্যাখ্যা সেখানে পাওয়া যাবে।   আর সেখানে দেখবেন মূল লালকালির কথাগুলো আর ছোট করে বলা হয়েছে। যেমন  লেখা হয়েছে, “Strategic Approach to the U.S. Vision for a Free, Open, and Resilient Indo-Pacific”। যদিও ব্যাখ্যা দিবার সময় তা আরো বিস্তার করা হয়েছে।   পাঠকদের কেবল একটাই অনুরোধ করব যে দয়া করে এসব পাঠ করার সময় এগুলোকে – দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অথবা অ্যামেরিকান ষড়যন্ত্র বা সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র ইত্যাদি ট্যাগ লাগিয়ে  দেখবেন না। এটা বরং গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের যুগে চীনের বিপরীতে চীনের স্বার্থের স্ট্রাটেজির বিপরীতে আমেরিকার স্বার্থ-উদ্ধারের স্ট্রাটেজি – এজায়গা থেকে দেখা ও বুঝার চেষ্টা করলে ভাল হবে।  সেখান থেকে তাহলে বাংলাদেশ কী অবস্থান নিবে, নেওয়ার সুযোগ আছে তা বুঝার লক্ষ্য নিয়ে পাঠ করতে বসতে হবে।

    ট্রাম্পের আমলের ‘ইন্দো-প্যাসেফিক রিজিয়ন এর অ্যামেরিকান স্ট্রাটেজি’ হাসিনা কিভাবে ফিরিয়ে দিয়েছিলঃ
    উপরে বলেছি একালে বাইডেনের আমলের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি – সেটাকে ট্রাম্পের আমলের বলা হত ইন্দো-প্যাসেফিক রিজিয়নে অ্যামেরিকান স্ট্রাটেজি। আর সেই কাজে ডেপুটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টেফান বিগান  বাংলাদেশে এসেছিলেন ২০২০ সালের ১৪ অক্টোবরে। আমি সেদিনের বাংলাদেশের ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকার খবরের রেফারেন্স দিয়েছে এখানে।  আপনারা চাইলে এখানে অথবা  এখানে আরো ওদিনের পত্রিকা  দেখতে পারেন। সেদিনের রিপোর্টেই প্রথম অবশ্য, “দিল্লির চোখে বাংলাদেশকে দেখে না ওয়াশিংটন” প্রসঙ্গ উঠেছিল।  স্টেফানের সফরে তিনি মূল যে প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন তা হল, বাংলাদেশ যেন ইন্দো-প্যাসেফিক রিজিয়নে অ্যামেরিকান স্ট্রাটেজির সাথে এলাইন [align] হয়।
    কিন্তু এই প্রস্তাবের ভিতরের আসল কথাটা কী? তা হল, বাংলাদেশ যেন চীনের সাথে ঋণ-বিনিয়োগ নেয়া বা ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত না হয় কারণ চীন যেহেতু আনরুলি [unruly] নিয়ম বা আইনের শাসন মানে না, তাই। এখন এই অ্যামেরিকান প্রস্তাব নিয়ে হাসিনা সরকারের সমস্যা হল, সে ২০১৬ সাল থেকে চীনের অবকাঠামো ঋণ, বিনিয়োগ আর ব্যবসার উপর নিজ অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখ দিয়ে অনবরত উন্নয়নের বুলি বের হচ্ছে।  কারণ, বিপুল অবকাঠামোর নির্মাণের জন্য বাংলাদেশে ঋণ যোগাড় করতে হবে – সে বিপুল খামতিতে আছে আর  তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক অপ্রতুল, এছাড়া আমেরিকা সে একক দাতা বলে ভারসাম্য তার দিকে তার ইচ্ছাই সব ইচ্ছা – এভাবে জন্ম থেকে পরের সত্তর বছর এভাবেই চলেছে। কাজেই চীনকেই হাসিনার দরকার; বিশেষ করে আবার হাসিনার নিজদলের কর্মীদের আনুগত্য-লোভ ঠিক রাখতে গেলে এমন বিপুল ঋণ-বিনিয়োগের কিছু অংশ তাদের পিছনে ঠিকাদারি বা সরাসরিভাবে ব্যয় সম্ভব। আবার চীনা ঋণের প্রকল্পের টেন্ডার হয় না। কাজেই এই ইলাহি-রাজ-রাজারার কারবার ব্যবস্থা চীনের সাথে বিশেষ সম্পর্কের জন্যই সরকারের পক্ষে  সম্ভব হয়েছে।  উল্টাদিকে যদি তা চীনের হাত ছেড়ে দেয় তবে আমেরিকা নিজে বা বিশ্বব্যাংক এর মাধ্যমে কী চীন যেভাবে ঋণ-বিনিয়োগ ও বাণিজ্য দিচ্ছে এর নামমাত্র কিছু অংশ দিতে পারবে – আমেরিকা কী এক্ষেত্রে চীনের তুল্য না হোক নুন্যতম বিকল্প? এককথায় এর জবাব হল, না। আমেরিকার সেসক্ষমতা শুকিয়ে গেছে।
    আর সবচেয়ে বড় কথা আমেরিকার স্ট্রাটেজিই তো ছিল ভুল। কারণ ২০১২ সালে এি কৌশল শুরু হবার পর থেকে এটা বহুবার আমেরিকা ঢেলে সাজিয়েছে নতুন নামে। কিন্তু সবসময় এই কথিত  ইন্দো-প্যাসেফিক রিজিয়নে অ্যামেরিকান স্ট্রাটেজি সামরিকতা নির্ভর করে সাজানো হয়েছে।  সেখানেও বাস্তবতাহীনভাবে ধরে নেয়া হয়েছে যে পুর্ব থেকে দক্ষিণ এশিয়া (যার কল্পিত কেন্দ্র হল সাউথ চায়না সি) এই সারা অঞ্চলের দেশগুলোর চীনের সাথে অমীমাংসিত সমুদ্রসীমা আছে তাই এই ইস্যুতে নিরাপত্তার অভাব আছে। কাজেই আমেরিকা সহজেই এসব দেশকে চীনের বিরুদ্ধে  নিজেকে প্রটেকশন দাতা করে নিয়ে দাড়াতে পারবে বলে অনুমান করেছে। তাই দেশগুলো সহজেই আমেরিকার নিরাপত্তা নৌকায় উঠে পড়বে, এই ছিল আমেরিকার অনুমান।  এই ছিল আমেরিকার গভীর অনুমান; কিন্তু একেবারেই অকেজো অনুমান!!! এজন্যই ওবামার ২০১২ সালের স্ট্রাটেজির নাম ছিল এশিয়া পিভট [PIVOT].  পিভট মানে দাড়িপাল্লায় দুই পাল্লা যে দন্ডের দুই মাথায় ঝুলে থাকে সেই দন্ডের ঠিক মাঝখানের বিন্দু হচ্ছে পিভট। পাল্লার একদিকে চীন আর অন্যদিকে চীনের থেকে নিরাপত্তার অভাব বোধ করবেই ধরে নেয়া এমন দেশগুলো – এভাবে দুইপাল্লার মাঝখানে পিভট হয়ে বসবে আমেরিকা আর সে বানরের পিঠাভাগ করার ভুমিকায় নেমে যাবে।

    কিন্তু কেন অ্যামেরিকান এমন কল্পনাঃ 
    কারণ চীনের ভৌগলিক অবস্থান; – চীন মূলত তার সাড়ে তিনদিক পাহাড় বা ভুমিতে ঘেরা এক ভুখন্ড। ওর কেবল উত্তরপুবদিক দিয়েই সমুদ্রপথে চীনে প্রবেশ বা  বের হওয়া সম্ভব।  আবার মূল ডাঙ্গা ভুখন্ড থেকে বের হলেই সামনে ক্রমশ কোন এক মহাসাগর তা নাই। যেমন বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে বের হলে বঙ্গোপসাগর ছেড়ে সামনে আগালে তা ক্রমশ গভীর মহাসাগরের নাগাল পাবে। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে তেমন নয় বরং চীন থেকে বের হলে সামনে চীন সাগরের চার পাশে অনেক দ্বীপ-ভুখন্ড যেগুলো নানান রাষ্ট্র যারা চীনের পড়শি দেশ।      ফলে প্রায় সবার সাথেই সমুদ্রসীমা এনিয়ে বিতর্ক আছে এবং এতা খুবই স্বাভাবিক। আমাদের সামনে মানে আমাদের সমুদ্রপথের ডাইনে বামে না সামনে আর কোন দেশ-ভুখন্ড নাই। আমাদের ডাঙ্গা থেকে সমুদ্রে যাবার পথে ডাইনে ভারত বামে বার্মা আছে তাতেই আমাদেরকে জাতিসংঘের [UNCLOS – United Nations Convention on the Law of the Sea] এই সালিশি প্রতিষ্ঠানের কাছে যেতে হয়েছিল – বিতর্ক-মারামারি না করে দুই পড়শিদের সাথে আপোষে মাপামাপির সমাধান পেতে। কাজেই চীন যার সমুদ্র-অঞ্চলের চারদিকে ভিনদেশের-ভুখন্ড তার কী অবস্থা তা অনুমেয়।
    আমেরিকা অনুমান করে নিয়েছিল চীনের এই ভৌগলিক অবস্থানের কারণে চীনের সাথে পড়শিদের সংঘাত তো আসন্ন হবেই! কিন্তু না, বাস্তবতা  সেপথে হাটে নাই, ঘটনা  হয়ে যায় ভিন্ন। তার আগে চীনের পড়শি কারা কেমন রাষ্ট্র তারা? এর এক বড় অংশই হল আসিয়ান (ইস্ট-তিমুর যোগদান ছাড়া একে বাদ রাখলে আসিয়ান এটা  দশ রাষ্ট্রীয়  মূলত এক অর্থনৈতিক জোট) জোটের সদস্য। আর অর্থনীতিক দিক থেকে যারা মধ্যম আয়ের, তবে বাংলাদেশের চেয়ে উপরে অবস্থান। সম্ভবত অর্থনৈতিক জোট হবার কারণে তাদের কমন অবস্থান চীনবিরোধী অ্যামেরিকান ইচ্ছা অনুসারের এক  আসিয়ান এমন হয় নাই। বরং জোটের দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থকে সবার উপরে রেখেছে। তাই তাদের চীনের সাথে সমুদ্রসীমা বিতর্ক থাকলেও তা মিটানোর জন্য তারা আমেরিকার সাহায্য-সহায়তার জন্য দারস্থ হয় জোট তা চায় নাই।
    এর কারণ এক. তারা চায় নাই যে চীন-আমেরিকার সামরিক টেনশন বা স্বার্থঝগড়ার সমাধান  তা আসিয়ান কোন দেশের কাঁধে বন্ধুক রেখে সম্পন্ন হোক। দুই. এটা ছিল প্রথমটার চেয়ে অনেক বেশি নির্ধারক।  অনেকের হয়ত জানেন যে বিশ্বব্যাংক আপার [upper] মধ্যম আয়ের সদস্য দেশের (যে দেশের গড় মাথাপিছু হিশাবে আয় ৪০৪৫ ডলারের বেশি এই ক্যাটাগরি্তের দেশের) জন্য ঋণ পেতে কাজে লাগে না। কারণ, বিশ্বব্যাংক মূলত জোর দেয় এমন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর দিকে যাদের মাথাপিছু গড় আয় একহাজার ডলারের নিচের। তাই যেকোন অবস্থায় এমন দেশগুলোকে বিশ্বব্যাংক নিজের আইডিএ (IDA) স্লট বলে, এই ক্যাটাগরিতে ঋণ দেয় যেটাদের সুদের হার মাত্র ০.৭৫%, আর যেটাতে ঋণশোধের জন্য ৪০ বছরের মত লম্বা সময় দেয়। যাতে খাতক দেশের ঋণশোধের কিস্তির চাপ কম হয়।  বিশ্বব্যাংকেই এই IDA ক্যাটাগরি ছাড়াও এর উপরে আরেকটা ক্যাটাগরিতে ঋণ দেয় যাদের আয় লোয়ার [lower] মধ্যম আয়ের শুরু্তের দিকের; মানে যারা গড় মাথাপিছু ১০৩৬ ডলারের উপরে চলে গেছে কিন্তু তা এর আপার লিমিট ৪০৪৫ ডলার এই প্রান্ত দিকে যায় নাই। তাদেরকেও বিশ্বব্যাংক লোন দেয় কিন্তু এবার সুদের হার ২% এর উপরে। তাই এর উপরের মাথাপিছু আয়ের দেশগুলার কাছে ঋণ পাবার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক কোন কাজে লাগে এমন প্রতিষ্ঠান নয় হয়ে আছে। একারণেই ২০১৩ সালে যখন চীনা সিঙ্ঘভাগ মালিকানার চীনা হাতে থাকা – ও  বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ষ্ঠানের [AIIB] জন্ম দেয় তখন চীন AIIB ব্যাংককে আপার [upper] মধ্যম আয়ের  খাতক দেশগুলোকে  টার্গেট করে সাজিয়ে নিয়েছিল। অর্থাৎ এদুই কারণে আসিয়ান দেশগুলোর কাছে অর্থনৈতিক বিচারে চীনের আলাদা বিশেষ মূল্য আছে। তাতে চীনের সাথে তাদের সমুদ্রসীমা নিয়ে অমীমাংসেয় ইস্যু আছে – সেটা সত্বেও। কিন্তু অর্থনৈতিক ইস্যুতে চীন তাদের কাছে  সাহায্যকারি দেশ তাই, চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক  তাদের কাছে প্রায়রিটি ইস্যু হয়ে থাকে যায়। তবে এটা তাদের সমুদ্রসীমা নিয়ে দাবি্কে কোনই ছাড় দেয়াও নয়।
    সবমিলিয়ে তাই ওবামা আমলেই ২০১৫ সালে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে আমেরিকার পিভোট স্ট্রাটেজি অকার্যকর। কিন্তু ইতোমধ্যেই আমেরিকা যেখানে যা বিনিয়োগ করেছিল তাও পানিতে চলে যায়। যেমন আমেরিকা অষ্টেলিয়াতে একটা নিজ সামরিক ঘাটি বানিয়েছিল যেটা নির্মাণের পরে ২০১৬ সালে চালু করা হয়, তাও তেমন কাজ আসে নাই। পরবর্তিতে ২০১৭ সালের আগে ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে অ্যামেরিকান নতুন করে কোন নয়া স্ট্রাটেজি চালু হতে পারে নাই। কোয়াড [QUAD] নামে চারদেশীয় নয়া উদ্যোগ সেবারই  নিজ জন্মের দশ বছর পরে চালু করা হয়েছিল। কিন্তু ঐ ২০১৭ সালেই তা চারদেশ এক সাথে একই ভাষায় কোন বিবৃতিও দিতে পারে নাই। কারণ ঐ চারদেশের প্রত্যকেই চীনের দেয়া বিশেষ ব্যবসায়িক সুবিধা ভোগ করে বসে ছিল বলে কারও কলম উঠে নাই। ট্রাম্পের মিড-টার্মের (২০১৮) পরে বিশেষত শেষ বছর ২০২০ সালে নতুন করে  “ইন্দো-প্যাসেফিক রিজিয়নে” অ্যামেরিকান স্ট্রাটেজি চালু হয়েছিল। আর এরই পরের রূপ হয় ২০২১ সাল থেকে বাইডেনের   ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি -এই নামে।
    আর হাসিনা ২০২০ সালে স্টেফান বিগিন-কে  খাড়া ভাষায় বলেছিল, আমরা কোন যুদ্ধজোটে বা এর কোন পক্ষে যাবো না। বরং আপনাদের যদি ঋণদান প্রকল্প থাকে যেমন চীনের বেল্ট-রোড ধরণের তবে পরে আইসেন। ফলে স্টেফান বিগিন হাসিনার উপর কোন চাপ বা ছাপ ফেলতে পারে না। সম্ভবত এখান থেকেই ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি নিজের অধীনে IPEF [Indo-Pacific Economic Framework] নামে অবকাঠামো ঋণদানেরও এক প্রতিষ্ঠান চালুর চেষ্টা করেছিল যেটা এখনও অসমাপ্ত, প্রস্তুতির ভিতরেই আছে। চালু হতে পারে নাই। কিন্তু বাইডেন প্রশাসনইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি নামে প্রচন্ড  চাপ সৃষ্টি করা ও সবাইকে নিজ নিজ স্ট্রাটেজি দেখাতে বলাতে এবারই প্রথম হাসিনা সরকার তা করতে বাধ্য হয়েছিল।
    তাহলে আমাদের সরকার নিজের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি বলে যা প্রকাশ করেছে (যার নাম দিয়েছে ইন্দো-প্যাসেফিক আউটলুক) সেখানে কী আমাদের সরকার চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, নিন্দা করেছে???  নাহলে,  জাপান কেন বলল সঠিক পথেই হাঁটছে ঢাকা আর ওদিকে আমেরিকা বলল, তারা নাকি আমাদের কৌশলপত্রের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির (আইপিএস) অনেক মিল পাইলো! কেন?

    এমাসেই ইন্ডিয়ান ওশেন কনফারেন্সে ভারতকে উপরে তুলে ধরতে এটাতে বাংলাদেশ হোস্ট হয়েছিল। কিন্তু এটা এতই অগোছাল ছিল যে অংশগ্রহণকারি দেশ মানে বক্তৃতার বক্তারা সবাই একই প্রসঙ্গে কথা বলতে পারে নাই। যে যেটা পেরেছে সে প্রসঙ্গে কথা বলেছে। যেমন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসেফিক আউটলুক এখানে কী অবস্থান নিয়েছেন তা নিয়ে নিজেই বক্তৃতায় বলেছেন।  তো সরকার প্রধান ঐ বক্তৃতায় বলেছেন, “……ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং নিরাপত্তার বিষয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে নৌচলাচল ও ওভারফ্লাইটের স্বাধীনতার অনুশীলনকে সমুন্নত রাখার আহ্বান” জানান।
    এছাড়া আরেক স্থানে বলেছেন, এ অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ, ন্যায়সঙ্গত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য …ইত্যাদি। এখন এর মানে কী এর মাধ্যমে মানে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে নৌচলাচল ও ওভারফ্লাইটের স্বাধীনতারঅনুশীলনকে সমুন্নত রাখার”  কথা বলে হাসিনা চীনের প্রতি কী নিন্দা  জানিয়ে ফেললেন?? অবশ্যই নয়। তাহলে  আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে নৌচলাচল ও ওভারফ্লাইটের স্বাধীনতার… পক্ষে কথা বললেন যে?  তবুও তাতেও এটা চীনের নিন্দা আর আমেরিকার পক্ষে দাঁড়ানো নয়; হয় নাই। কেন?

    আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে নৌচলাচল ও ওভারফ্লাইটের প্রসঙ্গের মধ্যে  এখানে আন্তর্জাতিক আইনবলতে বুঝতে হবে জাতিসিংঘের হেফাজতখানার দলিলে যা আছে। তো সেকথা উচ্চারণ করাতে জাতিসংঘের কোন সদস্য দেশের এতে কোনই অসুবিধা নাই।  এমনকি এই কথাগুলো চীনও যদি তাদের কোন বিবৃতিতে উল্লেখ করে তবু সেটা চীনের বিপক্ষের বক্তব্য বলে মনে করা যাবে না।  কারণ এই বক্তব্যে লেখা নাই যে  “আন্তর্জাতিক আইন  অনুসারে নৌচলাচল ও ওভারফ্লাইটের স্বাধীনতার  কথা যা বলা আছে তা চীন বা অন্য কোন দেশ লঙ্ঘন বা ভায়োলেট করেছে। তাই এটা চীনের বিরুদ্ধের বলা কোন বক্তব্যই নয়।
    কিন্তু একালে  স্টেফান বিগিন-কে বাংলাদেশের হাসিনা কখনও “নৌচলাচল ও ওভারফ্লাইটের স্বাধীনতা” নিয়েই কিছু বলেন নাই।  তিনি স্টেফান-কে বলেছিলেন, এসব যুদ্ধের অস্ত্র বেচা বা পক্ষ-বিপক্ষে অবস্থান নিবার কথা তিনি যা বলছেন যা নিয়ে বাংলাদেশ আগ্রহি নয়। বরং অবকাঠামো ঋণ নিয়ে আমেরিকা যদি বিতরণ করা শুরু করে, তখন তারা নক দিতে পারে  সেটা দিয়েন কিন্তু এখন যান……। কিন্তু এবার বাইডেন-লু এর আমলে তিনি আরেকটু আগিয়ে বলেছেন আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে নৌচলাচল ও ওভারফ্লাইটের স্বাধীনতা থাকার কথা আছে। তবে এর সাথে আবার  এমন কোন কথা  বলা হয় নাই যে চীন এটা অবমাননা করেছেন – তাতে আমেরিকা মনে করতে পারে যে তার উপস্থাপিত ইস্যু হাসিনা গ্রহণ করেছে অবশ্যই। কিন্তু এর সাথে চীনকে কোনই নিন্দাবাক্য জানায় নাই। ফলে এই মূল জায়গায় হাসিনা সরকার আগের ভুমিকাতেই আছে। মাএ হাসিনা সরকারের ইন্দো-প্যাসেফিক আউটলুকে চীন প্রসঙ্গে অবস্থান আগের মতই আছে। এটাই ফাইনাল অবস্থান!

    তাহলে সারকথাটা হল,  হাসিনা সরকারের আমেরিকার বিরুদ্ধে সোজা খাড়ায় যাওয়া না হোক – অন্তত আমেরিকার পক্ষে দাঁড়িয়ে চীনকে দেখা বা চীনকে আমেরিকার স্টাইলে নিন্দা করা  -এগুলো কিছুই না করেও টিকে ছিল। যার সোজা মানে হল আমেরিকার কথা না শুনে চীনের সাথে অবকাঠামো ঋণ বা চীনা বিদেশি বিনিয়োগ নেয়া এবং অবাধে চীনের সাথে ঘোরতর ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্পর্ক গড়ার কাজ চালিয়ে যাওয়া সবই করেছিল বা এখনও করছে। কিন্তু এই অর্জন পাবলিকের অর্জন হতে পারল না। পাবলিকের অর্জন বলে হাসিনা পাবলিকের অনুমোদন প্রশংসা লাভ সেটা করতে পারছে না কেন? এক অ্যামেরিকান “ভিসা দেয়া হবেনা” – উলটা চোর আর নাগরিকের মৌলিক অধিকার ভঙ্গকারিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিবে আমেরিকা একথাটা সদর্পে বলেই বরং খোদ আমেরিকাই বাংলাদেশের পাবলিকের কাছে হিরো হয়ে গেছে। এমনটা আজ কেন হল?  মূল কারণ, হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ তো সঠিক! এটা পাবলিক মনে করে। আর এরই প্রকাশ তো আমেরিকার পক্ষে হাততালি! দেখেন ২০১৪ আর ২০১৮ সালে দুইদুবার নির্বাচনে হাসিনার চরম অস্বচ্ছতায় নিজেকে জবরদস্তিতে বিজয়ী ঘোষণা করে আনার  সুখ – এটা দশবছরের জন্য ক্ষমতা পেয়ে যাবার সুখ নিঃসন্দেহে সীমাহীন!  আবার ওদিকে চীনের সাথে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প পাস যার কোন ওপেন টেন্ডার হয় না, জি-টু-জি বা সরকার-সরকারে চুক্তির নামে ওপেন কোন টেন্ডার না করেই প্রকল্পমুল্য ইচ্ছামত লেখা গেছে সেখানে, অর্থ লুট আর ভাগবাটোয়ারা করা যায় – এমন কাজের সুখ সীমাহীন, তা বলাই বাহুল্য! 
    কিন্তু সেসবেরই কাফফারা দিতে হচ্ছে এখন।  অ্যামেরিকান পক্ষে বাংলাদেশে পাবলিক ইমেজ বাংলাদেশে কখনই তেমন উজ্জ্বল নয়, ছিল না। তা সত্বেও এখন অ্যামেরিকান ভিসা দেয়া হবেনা বলাতে কমন মানুষ হাততালি দিচ্ছে মানে ঐ আমেরিকাকেই অন্তত এখনকার জন্য ত্রাতা ভাবছে – মানে কে দেশী আর কে বিদেশি এদিক দিয়ে আর দেখছে না এটা মারাত্মক ডেনজারাস হয়ত – কিন্তু হাসিনার চরম পরাজয় এখানেই! কারণ সে জনবিচ্ছিন্ন! আর কতটা জনবিচ্ছিন্ন তা – ভিসা দেয়া হবেনা – বলাতে জনউল্লাস দেখে সকলেরই বুঝতে পারা সম্ভব!
    এককথায় বললে কূটনীতিতে হাসিনা আমেরিকার বিরুদ্ধে সফল ফাইট দিতে দাঁড়াতে পারলেও চীনের সাথে “চুরির সম্পর্কে অস্বচ্ছ সম্পর্কে” জড়িয়ে যাওয়াতেই – হাসিনার এসব অর্জনকে পাবলিক এনডোর্স [endorse] বা অনুমোদন করছে না, পাচ্ছে না। পাবলিক এসবকে নিজের অর্জন মনে করতে চাচ্ছে না। গুম-খুনের অভিযোগ-দাগের এই হল কাফফারা!  আবার নিন্দনীয় কমিউনিস্ট কায়দায় সিপিবি এই অন্যায় টাকে বিবৃতি দিয়ে সাফাই গাইতে গেছে।  এটা নাকি  ” অ্যামেরিকান হস্তক্ষেপ” – এই  বলে চালিয়ে দিবার চেষ্টা করেছে। তাহলে তো হিটলারের বিরুদ্ধেও আমরা তো বাইরের লোক তাই আমাদের কিছু বলার সুযোগ নাই। কারণ সেটা সার্বভৌম জর্মান সরকারের বিরুদ্ধে “বাইরের হস্তক্ষেপ” হয়ে যাবে, তাই কী!!!!  কোনটা দালালি আর কোনটা রাজনীতি তা ফারাকের বোধশক্তিহীন এরা!
    আবার বাংলাদেশে যারা আমেরিকা আমাদেরকে আগের মত ফেলে চলে যাবে অথবা হাসিনা-আমেরিকা আপোষ হয়ে যাবে, হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে দিবে ইত্যাদি বল ও অবস্থান নিয়েছিল – তারা এখন থেকে ভুল বলে আপাতত প্রমাণিত হয়ে গেল।  হাসিনা-আমেরিকা আপোষের জায়গা নাই হয়ে গেল বা কোন ঘনিষ্ট সম্পর্কে থাকার সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেল! অ্যামেরিকান ভিসা দেয়া হবেনা একথার সার অর্থ এটাই!

    সবশেষে, আমার কথ আনা বিবিসির; বিবিসি লিখেছে, “ভারত এবং প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যত মিত্র দেশ আছে, এই ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিতে তাদেরকে একটি চীন-বিরোধী জোটে জড়ো করতে চায়। এই জোটের অনেক ধরণের লক্ষ্য আছে- সামরিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং কূটনৈতিক”।
    আর এজন্যই চীনের অবস্থান নিয়ে বলছে – সুনির্দিষ্ট কোন একটা দেশকে টার্গেট-বিরোধিতা করে বা তাকে বাইরে রেখে দুনিয়াতে কোন একটা জোট গঠন করা কী জায়েজ, এটা কেমন ততপরতা?

    “ভারত এবং প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যত মিত্র দেশ আছে,
    এই ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিতে তাদেরকে একটি চীন-বিরোধী জোটে জড়ো করতে চায়।
    এই জোটের অনেক ধরণের লক্ষ্য আছে- সামরিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং কূটনৈতিক। “– – – – – –

    হা, এই প্রশ্ন আমাদের নাগালের মধ্যে থেকে বেশি তুলেছেন বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদুতেরা। এই জায়গায় আমেরিকা বেশ গুটিয়ে আছে জবাবহীন হয়ে!
    শেষ করার আগে জানিয়ে দেই আমি ঐ প্রশ্নের জবাব নিয়ে আর লিখি নাই। সেটা হল, যে এজাম্পশন [assumption] এর উপর আমেরিকা দাড়িয়েছে যে সে অনুমানটা হল যে, “চীন আন্তর্জাতিক রুল মানে না”। – এই অনুমান টা আমেরিকার কেন হল? প্লাস এটা কতদুর সত্য-মিথ্যার চেয়ে কেন আমেরিকা এই অবস্থান নিল সেটা বুঝা বেশি জরুরি – এভাবে নেওয়াই উপযুক্ত হবে। সেজন্য এনিয়ে একেবারেই এখানে আগাই নাই, টাচ করি নাই। সেটা শুরু করলে এওলেখার আয়তন দ্বিগুণ হয়ে যেত। তাই এই প্রসঙ্গ নিয়ে আলাদা করে লিখতে হবে। পরে হয়ত সবগুলো জুড়ে একটা বই করা যেতে পারে। তবে ব্যাপারটা গুরুত্বপুর্ণ আর এই ইস্যুতে চীন-আমেরিকার রেষারেষির শুরু কম করে হলেও ২০০৮ সাল থেকে। সেসব দলিল দস্তাবেজ যার কিছু আমার সংগ্রহে আছে তা পাবলিকের সামনে আনতে হবে। পরবর্তিতে তা করতে হবে। আপাতত এখানেই শেষ!
    আপডেটেডঃ ২৭ মে ২০২৩ সকাল ১১ঃ ২৯

    +++++
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • কর্ণাটক নির্বাচনী বিজয় মোদিবিরোধীদের কতটা আগিয়ে দেবে!

    কর্ণাটক নির্বাচনী বিজয় মোদিবিরোধীদের কতটা আগিয়ে দেবে!
    গৌতম দাস

    ১৮ মে ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4t2

     

             India: Congress victory strong message against majoritarian politics

     

    দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্য সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ১০ মে যার, ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ১৩ মে এবং  এই ফলাফল হয়েছে মোদির জন্য একালের খুবই বিপর্যয়কর এক আঘাত। অনেকটা যেন ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভাগ্যে নেমে এসেছিল এক কঠিন নেতি ফলাফল বিপর্যয় হিশাবে যখন, বিজেপি ঐ নির্বাচনে বিরাট মার্জিনে জিতে আসতেছেই বলে ব্যাপক প্রপাগান্ডা  আওয়াজ তোলার পরে বাস্তব ফলাফল দেখা গিয়েছিল একেবারে উলটা; বিজেপি সেবার তার গত ২০১৯ সালের সফলতাটাই ধরে রাখতে পারে নাই; বরং আরও নিচে নেমে গেছিল। এবার কর্ণাটকের ফলাফল বিজেপির জন্য অনেকটা সেরকম তো বটেই তবে এর চেয়েও বেশি নেতি প্রভাব ফেলেছে। এর বড় কারণ হল প্রথমত, আগামি কেন্দ্রীয় নির্বাচন আসন্ন। মানে হল, আগামি বছর মে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন ততদিনে শেষ হয়ে ফলাফলও প্রকাশিত হয়ে যাবে।

    এছাড়াও, অন্যান্য বড় ফ্যাক্টরগুলো হলঃ এতদিন গত ২৩ বছরেরও বেশি যে ভারত ছিল এশিয়ায় অ্যামেরিকান স্ট্রাটেজিক পার্টনারই শুধু না, ভারত ছিল আমেরিকার হয়ে এশিয়ায় চীন ঠেকানোর বরকন্দাজ। আর এর বিনিময়ে মানে বরকন্দাজির নামে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার চলতি বছর থেকে বাইডেনের আমেরিকা সেই পুরানা অনুসৃত নীতি থেকে সরে এসেছে। যদিও সরকারি আনুষ্ঠানিকভাবে   আমেরিকা বা ভারত দুই সরকারের কোন পক্ষ থেকেই কোন ঘোষণা  দেওয়া হয় নাই কৌশলগত কারণে কিন্তু, দুপক্ষই নিজ নিজ সরকারের পথচলা ও আচার আচরণে এমনকি ভিন্ন প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে প্রকাশিত করে ফেলছে যে তাদের পথ আলাদা হয়ে গেছে। তবুও যেটা অনেকটা একটা বিয়ে ভেঙ্গে গেছে কিন্তু এর আনুষ্ঠানিক ডিভোর্স হয় নাই – এর মত। তাই আচার-আচরণ বসবাসে তা প্রতিফলিত হবেই, সেরকম। সেই নয়া  গতি-প্রকৃতি কেমন এনিয়ে ভারতের মনোভাব যেভাবে প্রকাশিত তা নিয়ে একটা লেখা আসবে আগামিতে।

    এতদিন বাইডেন সরকার বিভিন্নদেশের শাসকদের বিরুদ্ধে   মানবাধিকার লঙ্ঘণের এর অভিযোগ আনা আর স্যাংশন আরোপ – অন্তত এই দুই নীতি নিয়ে সামনে আগিয়েছে। তাসত্বেও এর কোনটাই এতদিন মোদি সরকারের উপর প্রয়োগ করে নাই। ছাড় দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলেছিল। কিন্তু এবার সবকিছুই প্রকাশ্যে চলে এসেছে। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর সংসদ সদস্যপদ খারিজ ও সাজা দান ইস্যুতে আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট(পররাষ্ট্র বিভাগ) এর মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল জানিয়েছিল তারা সব লক্ষ্য করছে [we r Watching], নোট নিচ্ছে। তাই, আমার আগেরই এক লেখায় কিছু বিস্তারিত বাক্যে লিখেছিলাম। সেই গত লেখায় এখানে, যার সারকথাটা হলঃ
    “যেমন, গুজরাত মুসলমান-নিধনের ডকুমেন্টারি বিবিসিতে প্রকাশ, মোদির দোস্ত আদানির শেয়ার বাজারে করা কারসাজির গুমোড় ফাঁস, কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর ‘ভারত-জোড়ো’ পদযাত্রা, রাহুলের লন্ডন সফর ও সফরে গিয়ে ভারতে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠিগুলোকে সোচ্চার হবার পরোক্ষ আহবান জানিয়েছেন [defenders of democracy have been “oblivious” to the systematic erosion of democracy in India. ]  যেটাকে প্রত্যক্ষ আহবান বলে দাবি করে মোদির অভিযোগ, আদালতে মোদির কারসাজি করে রাহুলকে শাস্তির রায় ঘোষণা ও প্রভাব বিস্তার; এছাড়া, পালটা হিশাবে মোদির ভারতের বৃটিশ এনজিও অক্সফামের বিরুদ্ধে তাদের অফিস তল্লাসি ও মামলা,  গায়ের জোরে রাহুলের সংসদ সদস্যপদ বাতিল, সর্বশেষ কাশ্মীরে পুলওয়ালে জওয়ান হামলায় ৪০জনের মৃত্য ও এতে মিথ্যা করে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার দাবি ও ভারতের বিমান বাহিনীর পাকিস্তানে হামলার মিথ্যা খবর ছড়ানো ইত্যাদি নিয়ে মোদি নিজেই দায়ি বলে গুমোড় ফাঁস করেছেন। পুলওয়ামা হামলা: সরকারের ভুল চেপে যেতে বলেছিলেন মোদি; বলছেন, সেকালে মোদির নিয়োজিত কাশ্মীরের রাজ্যপাল  সত্যপাল মালিক – এসব ঘটনাই এক সুত্রে গাথা ও যুক্ত।”
    অর্থাৎ মোদির ভারত থেকে অ্যামেরিকার আলাদা হয়ে যাওয়া রাস্তাটা হল এই যে, বাইডেন এখন দেখতে চান ২০২৪ সালে্র নির্বাচনে মোদি সরকার যেন ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হয়; আর এর স্বপক্ষে “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দলকে”  আইন বাঁচিয়ে যতটা সহায়তা করা যায় এর সবটা করতে নেমে পড়েছে আমেরিকা। তাই কর্ণাটক রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির গোহারা হার “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দলকে” নতুন উতসাহে আগিয়ে যেতে উতসাহিত করবে আর ঠিক ততটাই যেন তা বিজেপি-কে হতাশ ও নিরুতসাহিত করবে! এটাই হল কর্ণাটক নির্বাচনের একতা বড় তাতপর্য, যা একেবারেই ভারতের একটা আঞ্চলিক হিশাবেও যায় না কর্ণাটক এমন এক রাজ্য নির্বাচন মাত্র হওয়া সত্বেও, এর মধ্য দিয়ে এক  গ্লোবাল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার দিক ফুটে উঠেছে! এনিয়ে সবচেয়ে বড় করে ভোটের হার-জিত দুপক্ষই পরস্পরকে টিটকারি করেছে টুইটারে।  যেমন তেমনই একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক মোটা ভাই কর্ণাটক নির্বাচনের ফলাফল আসতেই ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এই নির্বাচনে অমিত শাহ প্রত্যক্ষভাবে পরিচালনা করেছেন আর সকল প্রার্থীই ভোট ছেয়েছেন মোদির নামে। তাই ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক “মোটা ভাই” পালাচ্ছে। আর গুজরাতি ভাষায় মোটা ভাই মানে বড় ভাই যার মাথায় আবার প্রতীকিভাবে অমিত শাহের মত বিশাল টাক আছে।

    ভৌগলিক ভাবে কর্ণাটক কোথায়, কেন আর এর গুরুত্বই বা কীঃ
    শুরুতে একবাক্যে কর্ণাটকের এই নির্বাচনের ফলাফল একটু বলে নেই। এই নির্বাচনে মোট আসন ছিল ২২৪ যার মধ্যে এবার কংগ্রেস একাই জিতেছে ১৩৯ আসনে, যেখানে সরকার গঠনের জন্য নুন্যতম প্রয়োজনীয় হল ১১৩ আসন। এখানে গত রাজ্য নির্বাচন হয়েছিল ২০১৮ সালে আর সেবারই প্রথম বিজেপি দল ১০৪ আসন পেয়েছিল যা এককভাবে সরকার  গঠন করার মত যথেষ্ট আসন নয়। কিন্তু এদিয়েই বিজেপি ষড়যন্ত্র এঁটে বাকি আসন সেবার বিরোধীদের থেকে ভাগিয়ে এনে গত পাঁচ বছর রাজ্য সরকার গঠন করতে সক্ষম ও তা চালিয়ে এসেছিল। কারা সেই ভাগিয়ে আনা লোক তা নিয়ে এলেখার শেষে কথা বলব।

    এবার, ভৌগলিক ভাবে কর্ণাটকের পরিচিতি প্রসঙ্গে। উত্তর-ভারতের আর্য-প্রভাবিত সব রাজ্যগুলোর বিপরীতে ভারতের দক্ষিণের চারটা প্রদেশকে   ‘দ্রাবিড়ীয়ান’ রাজ্য বলা হয়। অনেক সময় এই রাজ্যগুলোকে ‘দাক্ষিণার্ত’ [DECCAN] অঞ্চলও  বলতে দেখা হয়। আসলে ভূ-গঠনশৈলী হিশাবে এই পুরা অঞ্চলটাকেই (সংস্কৃতঘেঁষা বাংলায়) বলে মালভুমি, ইংরাজিতে যা  Plateau বলে পরিচিত। আর গ্রামের সাধারণ বাংলায় যেটা পাহাড়ের উপরের এক ব্যাপক বিস্তীর্ণ সমতলভুমি – এমন ভুখন্ডকে বুঝায়।  যার নাম বাংলা উচ্চারণে লিখলে হবে  ডেকান প্লাটো [DECCAN Plateau]। 

    মিথিওলজি বা প্রচলিত ধারণায়ঃ
    মিথিওলজি [mythology] মানে বলা যায় কিংবদন্তি ধারণা; বহু পুরানা প্রচলিত থাকা ধারণায় যা আছে বা থাকে কিন্তু যার প্রমাণ নিয়ে কেউ আগ্রহ করে না বা মাথা ঘামায় না।  সব এথনলজি [ethnology] বা জাতির ধারণার মধ্যেই এমন নানান মিথ [myth] থাকতে দেখা যায়। সেকথা একটু পরে আসছি।   ভারতের উত্তর-দক্ষিণের মধ্যে ধর্মীয় ও কালচারাল ঝগড়ার মূল ইস্যুটা প্রাচীন ও ঐতিহাসিক একারণে যে ভারতের বাইরে থেকে এসে আর্যরা যেখানে প্রথম খুঁটি গেড়ে বসেছিল সেটা সারা ভারত না বরং,  কেবল উত্তর ভারত মাত্র। পরে সেখান থেকে এর আশেপাশের প্রদেশ যেমন মহারাষ্ট্র (মারাঠি) এর উপর অংশ, মধ্যপ্রদেশ আর পুবে বিহার পর্যন্ত সহজেই প্রভাব বিস্তার ও ভাষার দিক থেকে এসব রাজ্যের উপর সংস্কৃত ভাষার প্রভাব-আধিপত্য ছড়াতে পেরেছিল। কিন্তু কখনই দাক্ষিণার্থে প্রবেশ করতে পারে নাই। আর প্রায় একইভাবে ওদিকে পুবে বিহারে – ভোজপুরি ভাষার বিহার পেরিয়ে বাংলায় পুরাটা দখল নিতে পারে নাই আর্যরা।  আর্যরা মহারাষ্ট্র পেরিয়ে আরও দক্ষিণে দাক্ষিণার্থের কোথায় প্রবেশ না করতে পারার মূল কারণ মনে করা হয় এই ডেকান প্লাটো মানে পাহাড়ের উপরের সমতলভুমি, এটাকে তারা সদলে পার হতে পারে নাই।
    এমনকি মিথিওলজিতে [এথনিক মিথের ধারণায়] দেখা যায় আর্যদের দেবতা ও তাদের আবাস স্বর্গের ধারণায় – সেখানে সুরালোক বলতে স্বর্গ বুঝানো হয়ে থাকে অর্থাৎ স্বর্গ মানে সুর বা দেবতা-দের আবাস যেখানে।  আর বিপরীতে যারা দেবতাদেরকেই স্বর্গচ্যুত করতে চায় এরাই হল তাদের চোখে অসুর। যেন দেবতাদের দিক থেকে দেখলে সুর হল তারা নিজেরা; তারা নায়ক সেখানে আর অসুর হল ভিলেন বা বিপরীত।  দুর্গাপুজার মুর্তিতে দেখা যাবে ওটা হল, দুর্গা লড়ছেন এক অসুরের সাথে। আর কেমনে চিনব যে এটা অসুর? দেখা যাবে মহিষের পেট চিড়ে যে বেরিয়ে এসেছে আর দেখতে কুচকুচে কালো – এই হল আর্যদের ভিলেন-বোধ। আর তাতে এটাই মহিষাসুর!
    সারকথায় মিথিক্যাল বর্ণনাগুলোতে সেটা কার দিক থেকে দেখা বর্ণনা – এটাই খুবই নির্ধারক। যেমন পশ্চিমবঙ্গেই একদল সাঁওতাল ট্রাইব আছে যারা দুর্গাকেই উলটা ভিলেন মনে করে থাকে; আর মেনে বিপরীতে মহিষাসুর এরই পুজা করে থাকে। এনিয়ে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার এক নিউজ এখানে। আবার মহিষাসুর নিয়ে কলকাতার বাঙালির আলাদা ভার্সান এখানে দেখা যেতে পারে।

    দাক্ষিণার্ত – ভারতের এই অঞ্চলটা হল এই উচু পাহাড়-মালভুমি তা আগেই বলেছি; কিন্তু যার আবার দুই দিকেই দুই সাগর। মানে বামে বা পশ্চিমে হল আরব সাগর আর ডানে বা পুবে হল বঙ্গোপসাগর। ভূ-প্রাকৃতিক এসব কারণে এই অঞ্চলের মানুষেরা প্রচন্ড খাঁড়া রোদের মধ্যে বসবাস করতে হয় আর তাতে রোদে পোড়া বলে তাদের গায়ের রঙ খুবই কালো হয়ে থাকে। বিশেষ করে যারা যত বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপকুলে ও মাছধরা পেশায় তারা ততই কালো। কাজেই এই কালো রং-ই হয়েছে আর্যদের চোখে নিচা মানুষ; মানে,  যাদের আর্যরা ঘৃণা ছিটিয়ে নিচা দেখাতে চায় যাদের সেই আম জনগণ – এরাই নাকি  আর্যদের চোখে অসুর! এরা অসুরের জাত! কেউ কেউ তাদের দ্রাবিড়ীয়-ও [DraviDian] বলে থাকে।  তামিলনাড়ূর সবচেয়ে বড় দলের নাম ডিএমকে [DMK -Dravida Munnetra Kazhagam ] যেখানে ডি [D] মানে দ্রাবিড়। [ভারতের নামগুলোর মধ্যে তাই কখনও ইংরাজিতে ‘ডি’ অক্ষর দেখা গেলে এর উচ্চারণ বাংলায় “ড়” করতে হবে]।
    আর একটা কথা বলার সুযোগ নেই। কর্ণাটক এর ভাষার নাম কানাড়া যা দ্রাবিড়ীয় চারটা ভাষার একটা।  কর্ণাটকিরা নিজেদের কন্নড় জাতির লোক মনে করে থাকে, তাই তাদের ভাষার নাম কানাড়া। কর্ণাটকের কন্নড় ভাষা পাশের মানে উপরের সীমান্ত সংলগ্ন মহারাষ্ট্র (মুম্বাই) এর দক্ষিণ সীমান্ত বা পুবে বা ডানপাশে অন্ধ্রপ্রদেশ ও নিচের তামিলনাড়ুতেও কন্নড় ভাষা বলার চল আছে।

    দ্রাবিড়ীয় চার রাজ্যের কর্ণাটকঃ
    দ্রাবিড় শব্দের আক্ষরিক অর্থ ঘন কালো চামড়ার মানুষ যাদের দক্ষিণ ভারতে দেখা যায় [a member of an ancient dark-skinned people of southern India.]  । এদিকে ১৯১৬ সাল থেকেই তামিল বা দ্রাবিড়ীয়রা তাদের দলীয় প্রতীক ছিল এক দাড়িপাল্লার ছবি যা হিন্দুধর্মীয়  জাত-বিভাজন ও বৈষম্যের বিপরীতে সাম্যের প্রতীক। আর এদের সাথে ছিল একটা ফ্লাগ – যা ছিল একটা পুরাটাই কালো ফ্লাগ; আর এর কেন্দ্রে কেবল একটা লাল সার্কেল চিহ্ন থাকত। যেখানে এই কালো হল তাদের নিচা করে রাখা মর্যাদার ও নিপীড়নের প্রতীকি বিরুদ্ধতা যার বিরুদ্ধে উঠে দাড়ানোর  প্রতীক হল লালচক্র চিহ্ন।

    The party at its inception retained the flag of the South Indian Liberal Federation, which had a picture of a traditional type of balance signifying the idea of equality.[26] Its central theme was to remove the degraded status imposed on Dravidians. 

    ভারতে দ্রাবিড়ীয়ান বলতে এরা পুরানা হিশাবে চার রাজ্য ছড়িয়ে আছে – কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু আর কেরালা।
    কর্ণাটকঃ কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী ব্যাঙ্গালোর (নতুন নাম ব্যাঙ্গালুরু)। আর এই ব্যাঙ্গালোর রাজধানী থেকে ১২০ কিমির ভিতরে পশ্চিম দিকে টিপু সুলতানের মহীসুর বা ইংরাজিতে মাইসোর [Mysore] অবস্থিত। আর মাইসোর শব্দটা আবার অনেকে দাবি করেন যে মহিষাসুর শব্দের নাকি অপভ্রংশ যেখানে এর অর্থ  ‘মহিষের মত তুচ্ছ প্রাণীর গর্ভে জন্মানো অসুর’।
    আর অন্ধ্রপ্রদেশ – এই নয়া রাজ্য গঠিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হবার পরে এবং এই অন্ধ্রপ্রদেশের রাজধানী করা হয়েছিল বৃটিশ আমলের নিজামের হায়দ্রাবাদকে। এছাড়া মোগল আমল থেকেই বিকশিত লক্ষ্ণৌ এর পরের দ্বিতীয় বড় শহর ছিল হায়দ্রাবাদ – এই সেই হায়দ্রাবাদ। অর্থাৎ পুরানা হায়দ্রাবাদ রাজ-রাজ্যকে এর রাজধানী করে নিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য গঠিত হয়েছিল।
    তেলেঙ্গনা  – এটা বাড়তি; মানে হল আগের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের এক অংশ এখন তেলেঙ্গনা হয়েছে। ভেঙ্গে গেলেও  বাকি অন্ধ্রপ্রদেশ এখন আগের নামেই তবে আলাদা রাজ্য।
    তামিলনাড়ু – এই নামেই বুঝা যাচ্ছে এটা দক্ষিণ ভারতের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী তামিল এথনিক জাতি-রাজ্য, আগের নাম মাদ্রাজ।
    আর সর্বদক্ষিণে হল কেরালা রাজ্য। এভাবেই পুরানা হিশাবে ভারতের দক্ষিণী চার রাজ্য (নতুন হিশাবে পাঁচ রাজ্য) মিলিয়ে দাক্ষিণার্ত। সমুদ্র সংযোগের দিক থেকে ভারতের নিচের দিকের বা দক্ষিণী অংশ এটা। যার আবার পশ্চিম দিকে আরব সাগর কিন্তু দক্ষিণ দিকটা তখনও বঙ্গোপসাগর বা এর সর্ব-পশ্চিম প্রান্ত – এভাবে বিভক্ত। আর দক্ষিণের আরব সাগরের সংযোগ দিয়েই আরব দেশ থেকে ব্যবসায়ীদের সাথে ধর্মপ্রচারকেরা আরবদেশ থেকে ১০০০-১১০০ সালের দিকে প্রধানত এই কেরালা দিয়েই প্রবেশ করেছিল। এভাবে প্রথম ব্যাপক মুসলমান সংযোগ ও ভারতে ইসলামের প্রসার শুরু হয়েছিল।  এমনকি খ্রীশ্চানিটিও বিশেষত পর্তুগীজেরাও এই দাক্ষিণার্ত দিয়েই ভারতে এসেছিল। প্রায় কাছাকাছি সময়ে।

    মোদির হিন্দুত্ববাদের এযুগে এসেও আর্যদের অসমাপ্ত কাজ করার খায়েসঃ 
    এখন,  একালে মোদির হিন্দুত্ব হিন্দিভাষাভাষি অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি প্রভাব-আধিপত্য ছড়িয়ে বসেছে। তাই এক অর্থে হিন্দুত্ববাদ যেন আর্যদেরই নয়া অনুসারি এবং ব্রাক্ষ্মণ-ইজম এর ধারা হয়েই থাকতে চায়। যদিও আবার সাধারণভাবে সব হিন্দুভোট তাকে পেতে ও নিতেই হবে। তাই আর্য-ভাব ও ব্রাক্ষ্মণ-ভাব সে প্রকাশ্যে আনে না; অন্তরে চর্চা করে।  আবার জায়গামত জাত-পাত ভেদের বা উচ্চ-বংশের ঠাকুর এর সুবিধাও পেলে উঠিয়ে নিবে। তাই মোদির হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা হল তার মানে – এটা পুরানা আর্য-শ্রেষ্ঠত্ব ধারণারই যেন আর এর একালের রূপ  হল আরএসএস-বিজেপি;  পুরানা আর্য কারবারিদেরই যেন একালের এক নয়া উত্থান!  তাই উত্তর ভারতের দিক থেকে দেখলে কর্ণাটক হচ্ছে দাক্ষিণার্তে প্রবেশের এক প্রবেশদ্বার যেন!
    তবে মোদির বিজেপি-আরএসএস এদের খায়েসস হল আর্যদের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করা। মানে হল দাক্ষিণার্তকেও হিন্দি বলয়ের অধীনে ও প্রভাব প্রতিপত্যিতে নিয়ে আসা। এজন্য গত ২০১৮ সালের সরকার গঠন করার পর থেকে  বিজেপি-আরএসএস এই দাবি ও প্রপাগান্ডা করতে থাকে যে তারা দাক্ষিণার্ত প্রায় দখল কর্বে ফেলেছে! যদিও বাস্তবে ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়!

    মোদির বিজেপি-আরএসএসের এমন যত স্বপ্ন বা খায়েসই থাক এনিয়ে দুটা বড় ঘটনার কথা বলব।
    এক হলঃ সরাসরি এন্টি-ব্রাহ্মণ আন্দোলন যা প্রথমে সংগঠিতভাবে শুরু হয়েছিল  ১৯১৬ সালে তামিলনাড়ুতে। পরে ১৯৩৭, ১৯৪০ সহ অনেক বারই।  সেবার জাস্টিস পার্টি নামে দল গঠন করে তা শুরু হয়েছিল। পরবর্তিতে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতে আবার সেই আন্দোলন শুরু হয়েছিল তামিলনাড়ুতে পেরিয়ার রামস্বামী [ E. V. Ramasamy (Periyar)] নামে নেতার হাতে। সেসময় দ্রাবিড়ীয় সমাজে বিয়ে করতে গেলে যেন ব্রাহ্মণ-কে ডাকতে বা নির্ভরশীল হতে না হয় তাই এই আন্দোলন। তারা স্বাধীন ভারতের তামিল রাজ্য সরকারের হাত দিয়ে সংসদে এক সিভিল ম্যারেজের আইন পাশ করিয়ে নেন। যেহেতু রাজ্য সরকারের আইন ফলে ব্রাহ্মণ ডেকে এনে বিয়ে পড়ানোর বাধ্যবাধকতা এতে নাই হয়ে যায়।  পরবর্তিকালে রামস্বামীর এই আন্দোলনই ১৬৬৪-৬৫ সালের দিকে [এর আগে ১৯৬৩ সালে নেহরু  Official Languages Act in 1963 চালু করেছিলেন – এর বিরুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ ও বাধা হিশাবে উঠে এসেছিল। হিন্দি চাপানোর প্রতিবাদে সারা দাক্ষিণার্তে জুড়ে তারা প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল। তামিলনাড়ুতে কিছু মানুষ গায়ে আগুন ধরিয়েও প্রতিবাদ করেছিল। এই আইনে সারা ভারতের সব রাজ্যের স্কুলে হিন্দি ভাষা শিখা বাধ্যতামূলক করা হয়। যা দ্রাবিড়ীয় অঞ্চলে কোথাও গ্রহণযোগ্য হয়  নাই।

    আবার ওদিকে, অনেকে মনে করেন এরপরেই নেহরু মারা যান ১৯৬৪ সালে হার্ট এটাকে। তাই অনেকের ধারণা সেসময়ের দুটা রাজনৈতিক বিপর্যয়ের শক নেহরু শারীরিক-মানসিক ভাবে অসহ্য হয়ে যায় বলে অনেকে মনে করেন।  সে দুই রাজনৈতিক ঘটনার এক হল, নেহেরুর হিন্দি-ভাষার ভারত-সাম্রাজ্য বা হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা বানিয়ে ভারত গড়ার খায়েস মার খেয়ে যাওয়া। আর দ্বিতীয়টা হল ১৯৬২ সালে চীনের ভারত আক্রমণ এবং আসাম দখলসহ (সাথে লাদাখের অনেক অংশ-ভুখন্ড ও জম্মুকাশ্মীরের বর্তমান আকসাই চীন) এর ঘটনা; যেটা  ২১ নভেম্বর ১৯৬২ তে চীন একমাস একদিন পরে স্বেচ্ছায় সেনা প্রত্যাহার করে ফিরে গেছিল।
    আর নেহেরুর হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার জোড়জবরদস্তির প্রতিক্রিয়ায়, এতে দ্রাবিড়ীয় চার রাজ্য আরও বেশি করে এন্টি-হিন্দি রাজ্য হয়ে উঠেছিল এবং এখনও সেই সেন্টিমেন্ট বর্তমান যা সবচেয়ে বেশি তামিলনাড়ুতে। সেখানকার ডিএমকে পার্টি এরপর থেকে তামিলনাড়ুতে প্রধান দল হয়ে উঠে আছে। পরবর্তিতে অবশ্য কেবল ডিএমকে দলটাকে ছেড়ে বেরিয়ে আরেকটা আন্না-ডিএমকে দল হয়েছে। যারা দুই দল অদলবদল করে রাজ্য সরকারে ক্ষমতায় আসে – অন্য কোন দল নাই। ওদিকে নেহেরুর মৃত্যুর পরের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী কম্প্রোমাইজ হিশাবে হিন্দি-কে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারটা কনষ্টিটিউশনে উহ্য করে রাখেন। যেটা পরবর্তিকালে ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এক অবজারভেশন-রায়ে ঘোষণা করে যে ভারতে রাষ্ট্র-ভাষা বলতে কিছু নাই, ভাষার বাধ্যবাধকতাও নাই। তবে অফিসিয়াল ভাষা বলে অনেক কিছু আছে যা সব মিলিয়ে এখন ইংরাজি ও হিন্দিসহ মোট ২২টার মত।

    গত ১৯১৮ সালের মানে আগের বারের কর্ণাটক রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল ঘাটতিতে থাকা নয়্টা আসন কিনে নিয়ে। আর তা জুগিয়েছিল কর্ণাটকের আরেক ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী সামাজিক-ধর্মীয় গোষ্ঠি যাদেরকে লিঙ্গায়েত [Lingayat or  Lingayatism] নামে ডাকা হয়।   যারা লিঙ্গায়েত নিয়ে আর একটু পড়াশুনা করতে চান তারা এখানে লেখাটা পড়তে পারেন।  এরা বলাই বাহুল্য হিন্দুত্ববাদের বিরোধী।  এছাড়া  ২০১৮ সালের নির্বাচনে সব লিঙ্গায়েত রাজ্য-সংসদ সদস্য বিজেপিতে বা কংগ্রেসেই সবাই এমন ছিল না। অর্থাৎ দুদলের মধ্যেই লিঙ্গায়েত সদস্য ছিল। লিঙ্গায়েত-রা কর্ণাটক ভোটারদের মধ্যে ১৭% জনগোষ্ঠি। তা হলেও তারা দুই দলের মধ্ইযে নির্বাচিত সদস্য হয়ে ছিল। কিন্তু মোদি সেবার লিঙ্গায়েতদের জজবা তুলে তাদের সব রাজ্য-সংসদ সদস্যকে দলছুট করে নিজ দলে ভিড়ান। এভাবেই তার নয় আসনের খামতি তিনি পূরণ করে সেবার সরকার গঠনে সফল হয়েছিল।  কিন্তু এবার নির্বাচনের আগে লিঙ্গায়েত হবু রাজ্য-সংসদ সদস্যদের কংগ্রেসে যোগ দিবার ঝড় উঠেছিল। কিন্তু পরে ফলাফল প্রকাশের পরে একটা রিপোর্ট এমন ফলাফলের ব্যাখ্যা করে বলেছে যে এতে কংগ্রেসের পক্ষ্যে সব লিঙ্গায়েত সদস্যের আসন যায় নাই সত্য। তবুও তা এমন হয় নাই যে কংগ্রেস এতে তেমন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কারণ শেষ বিচারে ভোট ব্যালেন্স হয়ে গেছে।

    ওদিকে ভোটারদের আরেক বড় চাঙ্ক হল মুসলিম ভোট। কর্ণাটকে মুসলমান ভোটারদের সংখ্যা মোট ভোটারের ১২% এর মত।  আর এতে মোদির সেই পুরানা কৌশল -ইসলামোফোবিয়া আর ঘৃণা ছড়ানী চালু করেছিল। আপনাদের অনেকেরই গত ২০২২ ফেব্রুয়ারিতে মুসকান নামের এক কলেজ তরুণীর সাহসী প্রতিবাদের ভিডিওদেখেছেন; এখানে টুইটারে দেখেন, মনে আছে নিশ্চয়। হা সেটাই ছিল মোদির নোংরা পুরানা কৌশল যে তরুণদের মাঝে হিজাব তর্ক তুললে তাতে ইসলাম-ঘৃণা জোরদার হবে আর হিন্দু-ভোটারদের মুসলমান-বিদ্বেষী করতে পারলে তাতে বেশির ভাগ হিন্দুভোট বিজেপির পক্ষে আসবে – এই ছিল মোদির অনুমান। কিন্তু ভাগ্যের ফের মুসলমান-বিদ্বেষী জজবা তেমন করে কর্ণাটকে উঠে নাই।  মোদি মুসলমান ঘৃণা এতই তুঙ্গে তুলতে চেয়েছিলেন যে তার ২২৪ আসলে প্রার্থীদের মধ্যে একটা আসনেও মুসলমান প্রার্থীকেই রাখেন নাই।  তাই ফলাফল দেখে এখন মনে করা হচ্ছে মুসলমানেরা হিজাব মামলায় আদালতে তাদেরকে হারিয়ে দেয়া হলেও নির্বাচনের আগে তারা সংগঠিত হয়ে কংগ্রেসের পক্ষে একযোগে ভোট দিতে পেরেছেন।

    এব্যাপারে এটা মনে করা অমুলক হবে না যে  এক্ষেত্রে আমেরিকার সমর্থন মানে মোদিবিরোধী  “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দলকে” নৈতিক সমর্থন দিয়ে যতটা সম্ভব সহায়তা দেয়া – এটা যথেষ্ট কাজ করেছে। সবচেয়ে বড় কথা বিরোধীদলের সবাইকে আস্থা দিয়েছে যে তারা চাইলে মোদির বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে পারে, মোদিকে হারাতেও পারে।  আসলে বিরোধী জোটের পক্ষে অ্যামেরিকান সংসর্গ সম্পর্কে আগেই বলেছি এটা সাবধানী ও পরোক্ষ পদক্ষেপ হলেও গ্লোবাল মহলে মোদি সরকারের আভ্যন্তরীণ পরিচালনায় কতটা সে স্বৈরাচারী আর মূলত মুসলমানবিদ্বেষী ঘৃণা প্রচারক – মোদির এই পরিচয়কে বাইরের দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকা এক বড় সহায়ক।
    যদিও ভারতের রাজনীতি এপর্যন্ত ভিতরের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কখনই বিরোধীদলকে বাইরে নিতে দেয়া হয় নাই। এটা সম্ভব হয়ে এসেছে কারণ বেশির ভাগ দ্বন্দ্ব পাকিস্তান বা কাশ্মীর-কেন্দ্রিক। অথবা কখনও পাঞ্জাব বা আসামের মত বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সমস্যাকে দেশের স্বার্থ বলে ধামাচাপা দিতে চেষ্টা করা হয়ে এসেছে।  এছাড়া জন্ম থেকেই ভারত এত উগ্র জাতিবাদ (যা মূলত হিন্দু-জাতিবাদ) দিয়ে শাসিত- পরিচালিত হয়ে এসেছে যে এটা মূলত শেষবিচারে এক “এন্টি-পাকিস্তানি জাতি” ধারণা; তাই এটা সহজেই এক উগ্র-হিন্দুজাতিবাদ ধারণা হতে পেরেছে। [অনেকে অবশ্য  পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এর উল্টাটাও বলবেন।]
    ভারতে কখনই  রাজনৈতিক অধিকারের ইস্যুকে অথবা জনগণের নাগরিক অধিকারের অথবা বাক ও ব্যক্তির অধিকারের ইস্যুকে  যেকোন রাষ্ট্রের গঠনে জনগণের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকারের জায়গা থেকে দেখতে দেয়া হয় নাই। এবং সবচেয়ে বড়কথা রাজনীতিবিদ ও জনগণের মধ্যে সেই রাজনীতিক চিন্তার অভ্যাস বা চর্চাই হতে দেয়া হয় নাই। প্রতিটা উগ্র-জাতিবাদী জাতিরাষ্ট্রে এমনটা হওয়াই খুব স্বাভাবিক; আর বিপরীতে শাসকের প্রথম পছন্দও [নেহেরু সহ সকল ভারতীয় শাসক] তাই একটাই –উগ্র জাতিরাষ্ট্র– যেখানে জাতিবাদ, দেশপ্রেম, দেশ মাতৃকা ইত্যাদি এসব শব্দের আবেগ-সুরসুরি তৈরি করে জনগণকে দাবায় রাখাটাই শাসকদের কমন কৌশল হয়ে থাকে।
    তৃতীয় বিশ্বের দেশে এমন হওয়ার পিছনে আরেক দায়ী ফ্যাক্টর হচ্ছে প্রগতিশীল-কমিউনিস্ট। আসলে এদের রাষ্ট্র- সম্পর্কিত অস্পষ্ট ও অপুষ্ট ধারণাই  [শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণাই] এজন্য দায়ী।  যেটা অন্যভাষায় মনে করিয়ে দিলে কমিউনিস্ট চিন্তায় অধিকারের ধারণা নাই শুধু না এটা হারাম – এমন হওয়াটাই সেই দায়ী ফ্যাক্টর। নয়া চলতি শতকের শুরু থেকে আবার সেটা জঙ্গীবাদ দমনের নামে বিরোধী রাজনীতিকের নির্মুলকরণ কর্মসুচি হয়ে দাড়িয়েছে।  যদিও আমেরিকা আজ মোদির চাপে দাবিয়ে রাখা ভারতের নাগরিক রাজনৈতিক অধিকারকে বের করে  মুক্ত  করে আনার পক্ষে কাজ করছে কিন্তু এই  জঙ্গীবাদ দমনের নামে জনগণের অধিকার ও বিরোধী রাজনীতিকে কোনঠাসা করে রাখার পক্ষে শাসকের এই নয়া চর্চার জন্য খোদ আমেরিকার ওয়ার অন টেরর নীতিও কম দায়ী নয়!  আবার, মোদির ক্যাশিয়ার আদানির শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি ও তাতে ধস নামানোর পিছনে এতে পরিবেশ তৈরি করে দিতে অ্যামেরিকার কিছু সহায়ক ভুমিকা থাকায় এর সুবিধা ভারতের বিরোধী দলেরা পেয়েছে। যেমন আদানির পতনের পরে গ্লোবাল শেয়ার মার্কেটের উতসাহীদের সাথে নিয়ে আরেক শেঠ শেয়ার ব্যবসায়ী জর্জ সোরেস, তিনি এক আসরে লম্বা বক্তৃতা দিয়ে আদানিকে সমালোচনা করে শুইয়ে দেয়া – এটা শেষবিচারে ভারতের বিরোধিদের পক্ষে গিয়েছে।  যদিও ভারতের বিরোধী রাজনীতিকদের  আজকে আমেরিকার এই সমর্থন নেওয়ার কিছু নেগেটিভ এফেক্টও আছে যা কার্যকর হতে পারে। তবুও বর্তমানে সতর্কভাবে অ্যামেরিকান এই সমর্থন নেয়াটা খুবই সঠিক ও হালাল কাজ-ই হবে।

     Temple run: Hard lessons for Rahul Gandhi’s ‘soft Hindutva’

    এর পিছনের মূল কারণ হল ভারতের এক বাস্তবতা। সেটা হল আমেরিকা আজ আছে বলেই “রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী দল” বলে কোন কিছুই ভারতে সম্ভব হচ্ছে যা এতদিন সম্ভব ছিল না। কংগ্রেস বা রাহুল গান্ধী পরিবারের রাজনৈতিক চিন্তায় বড় খামতি এজন্য দায়ী।
    যেমন ২০১৮ সালে থেকেই মোদী বিরোধী রাজনীতি বিশেষত মোদির হিন্দুত্ববাদ বিরোধীরা কিভাবে মোকাবিলা করবেন – এনিয়ে রাহুল ও কংগ্রেস চরম অযোগ্যতার প্রমাণ রেখেছিল। তারা ধরেই নিয়েছিল মোদির তখন প্রায় পাঁচবছরের হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি ছেয়ে ফেলাতে পেরেছিলেন। আর এতে কংগ্রেস ধরেই নিয়েছিল  যে এরপর থেকে ভারতে বোধহয় আর কংগ্রেস নিজের রাজনীতিও হিন্দুত্ববাদকে আপন ও অনুসরণ করে গড়ে নেয়া দিক এসে গেছে। তাই ২০১৯ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনের আগে্র বছর গত কর্ণাটকের রাজ্য নির্বাচনে রাহুল নিজে এক মন্দিরে পুজা দিয়ে কংগ্রেসের সফট হিন্দুত্ববাদ চালু করেছিলেন উপরের ছবি ও লিঙ্কে গিয়ে দেখতে পারেন। তারা ধরেই নিয়েছিলেন কংগ্রেসও হিন্দুত্ববাদের নামে ভোট না চাইলে ভারতের হিন্দুরা তাদেরকে আর ভোট দিবে না! এই মিথ্যা অনুমানের পিছনে ছূটতে যাওয়া কংগ্রেস এটাই ইঙ্গিত করে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ১৮৮৫ সালে জন্ম নেয়া কংগ্রেস এটা তো হিন্দু জাতিরাষ্ট্র এর ভারত কায়েমেরই প্রথম রাজনৈতিক দল হয়েই গড়ে উঠেছিল।

    অথচ এর বেকুবিপনার পাল্টা উদাহরণ কিন্তু তখনও রাহুলের সামনে ছিল।
    কলকাতার রাজনীতিতে তৃণমূল সেই ২০১১ সাল থেকে রাজ্য সরকারে ক্ষমতায় আসছে। আর সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় হল যে তৃণমূলের মমতা কখনই কোন ব্রান্ডের কোন হিন্দুত্ব এর নামে হিন্দুদের কাছে ভোট চাইতে হয় নাই, তবু যথেষ্ট হিন্দুভোট তার দল পেয়েছে।   কোন হিন্দুত্ব বয়ান ছাড়াই তিনি লাগাতর তিন তিনবার হিন্দুদের ভোট পেয়ে রাজ্যে সরকার গড়ে চলেছেন। কোন সমস্যা হয় নাই! কেন? তার মানে একবারও এদিকে রাহুল বা কংগ্রেস একবারও চোখ মেলে তাকায়নি! এটাই কংগ্রেস দলের ক্রমশ নিঃশেষ হয়ে যাবার পিছনের অন্যতম মূল কারণ, যেন এটা কংগ্রেসের নিজেই নিজেকে যেন বলা যে এই দলের আয়ূ শেষ!!! আজকে রাহুল “ভারত জোড়ো” [ মুসলমান ঘৃনাবিদ্বেষে জনগণ বিভক্ত হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে জনগণের একত্র হওয়া বা জোড়া লাগানো পক্ষে এক প্রচারণা] নামে পদযাত্রা কর্মসুচিতে এসেছে।  এটা তখনই কংগ্রেস শুরু করেছে যখন পিছনে অ্যামেরিকান ফ্যাক্টর উপস্থিত হয়ে কংগ্রেস রাজনীতিকে নয়া সাহস ও দিশা দিয়েছে!  অর্থাৎ মোদি যুগের ভারতে সবাইকেই একমাত্র হিন্দুত্ববাদের নামেই ভোট চাইতে হবে – এই মিথ্যা অনুমান থেকে রাহুল ও কংগ্রেস এখন বের হয়ে এসেছে। যেটা না করে স্ফট হিন্দুত্বের পক্ষে দাড়ানোটা শুধু আত্মঘাতিই তা না; কংগ্রেস দল যে মূলত জন্ম থেকেই হিন্দু-ইজমের [গান্ধীর Hinduism -তাও বলা চলে] দল হিশাবে গড়ে তোলা হয়েছিল এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ!

    সবশেষে একটা কথাঃ যদিও কর্ণাটকের নির্বাচনে মোদিবিরোধীরা বিরাট জয় পেয়েছে এরপরেও খুবই শক্তভাবে পাঠক সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে এই নির্বাচনের দুটা কনষ্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠান যারা আইনীভাবে দায়ীত্বপ্রাপ্ত ছিল এই নির্বাচনকে সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করার – এমন দুই প্রতিষ্ঠান হল সুপ্রীম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশন।  যাতে এমনকী সরকার বা সরকারি দলের বিরুদ্ধেও নির্বাচনি আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেন। কিন্তু আগের নির্বাচনেওর মতই এখানে এওদুই প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের হাত থাকা কিছু প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধি দলের বিরুদ্ধে নিয়মিত অপব্যবহার ও হয়রানি করে যাচ্ছে। এমন প্রতিষ্ঠান গুলো যেমন সিবিআই [CBI – Central Investigation boreau), ইডি ED [Enforcement Directorate, For Economic Law], আয়কর অধিদপ্তর ইত্যাদি এগুলো প্রতিষ্ঠান দিয়ে বিরোধীদের হয়্রানি করা হচ্ছে যাতে চাপে ফেলে বিরোধীদলের নেতাদেরকে সরকারের সাথে আপোষে আসতে বাধ্য করা যায়। মোদির চাপের কাছে সমস্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান নত হয়েছে, মোদির খাম খেয়ালির অধীনস্ত হয়েছে।
    এরকম দশটা ফ্যাক্টর মোদি বিরোধিদলের বিরুদ্ধে এখনও খাড়া করে রেখেছে। The WIRE পত্রিকা এমন দশটা ফ্যাক্টরের কথা উল্লেখ করে রিপোর্ছেট করেছে যার শিরোনাম Ten Factors to Remember Amidst the Congress’s Win and BJP’s Defeat in Karnataka। পাঠকের উচিত হবে এই দশ বাধার কথাও যেন তারা জেনে রাখে।

    কর্ণাটকের রাজ্য নির্বাচন ভারতের সকল বিরোধিকেই সাহস যোগাক যে তাদের একত্রে উঠে দাঁড়াতেই হবে। যদিও সামনে অনেক পথ আর তাতে অনেক যদি-কিন্তু আছে! আপাতত তাদের জন্য শুভ কামনার বেশি আগানোটা আমার জন্য প্রয়োজনীয় নয়!  তাই শুভ কামনা জানিয়ে শেষ করছি!

    +++++++
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

     

  • চলতি পাকিস্তান, ইমরান ও আমেরিকা

    চলতি পাকিস্তান, ইমরান ও আমেরিকা
    গৌতম দাস

    ১২ মে, ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4rH

     

         Top Pakistan court orders ex-PM Imran Khan’s release after deadly riots

     

    পাকিস্তানের পিটিআই [PTI] বা তেহরিকে ইনসাফ যার বাংলায় মানে “ইনসাফের জন্য আন্দোলন” – এই  দলের প্রধান ইমরান খান। তিনি পাকিস্তানের রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা (যার স্বপক্ষে  ইতিবাচক রেটিং ৬১%) তাঁকে গত বুধবার ০৯ মে পাকিস্তান সরকার গ্রেফতার করেছে। অ্যামেরিকান সিএনবিসি [CNBC] নিউজ এঘটনায় শিরোনাম লিখেছে, Former Pakistani Prime Minister Imran Khan arrested amid tensions with military.]  সেনাবাহিনীর সাথে উত্তেজনার মধ্যেই ইমরানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যদিও আইনত দেখানো হয়েছে যে গ্রেফতার করা হয়েছে পাকিস্তানের NAB [National Accountability Bureau] আইনে ও মামলায় যেটা আমাদের “দুদুকের” মতই যেন এক প্রতিষ্ঠান তবে এটা দুদুকের চেয়ে আরও ক্ষমতাবান আর আমাদের মতই সরকার অনুগত। তবে সরকার গ্রেফতার করেছে বলছি  যে কারণে প্রথমত তা হল, ইমরানকে গ্রেফতার করা হয়েছে আমাদের র‍্যাব এর কাছাকাছি এক প্যারা-মিলিটারি বাহিনী [paramilitary Rangers] দিয়ে এবং তা ইসলামাবাদ হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে। বিশেষত যেখানে আদালত (হাইকোর্ট) আগে থেকেই কোন ধরণের গ্রেফতার না করতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছিল। এবং এর পরেও গ্রেফতারের করার বিরুদ্ধে আদালত প্রশাসনকে শো-কজ করেছে। দ্বিতীয়ত, তবে সবচেয়ে বড়  ঘটনাটা ঘটিয়েছে সেনাবাহিনী নিজেই এক উস্কানিমূলক বিবৃতি দিয়ে; এখানে দেখেন । ফলে এটা একটা শাহবাজ সরকার আর বর্তমান সেনাবাহিনী এভাবে নেতৃত্বের যৌথ-উদ্যোগের ফসল হয়ে দাড়িয়েছে, তা্রা চাক বা না-চাক!

    এতে সবমিলিয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। সীমার বাইরে মানে তা সেনাবাহিনীরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে – বুঝতে হবে। কেন তা বলছি কারণ, এক. ইমরানকে গ্রেফতারের সাথে সাথে পাকিস্তানের চার প্রদেশেই ১৪৪ ধারা জারি করে চারজনের বেশি একসাথে চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু কোথাও “বিক্ষোভকারি জনগণ” তা মানে নাই। রাস্তায় নেমে গিয়েছে  – যা লক্ষণ হিশাবে একেবারেই কারও জন্য ভাল ইঙ্গিত নয়। সবচেয়ে বড় কথা সবপ্রদেশেই সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মিছিল হয়েছে, কোথাও তা সেনাব্যারাক-গেটের বাইরে। তবে লাহোরে পাশের এক সেনা-আবাসনে হামলা পর্যন্ত ঘটেছে।  তাই এর মধ্যে পরিস্থিতি সেনা নিয়ন্ত্রণেরও বাইরে চলে যাবার উপাদান আছে। এবং এই অর্থে তা যেন পাকিস্তানে অ্যামেরিকান স্বার্থেরও বাইরে চলে যেতে চাইছে।  কারণ, এরই মধ্যে সবচেয়ে খারাপ কাজটা করে ফেলেছে সেনাবাহিনী।  সেনা-মিডিয়া আইএসপিআর [ISPR] এর বিবৃতির নামে তারা ঘটনায় হস্তক্ষেপ করেছে। সেটা এমন ভঙ্গিমায় যেন তারা পাকিস্তানের সব আইনের উর্ধে। 

    একটু পিছনে থেকে বলা যাকঃ
    শুধু সেনার প্রসঙ্গটা একটু পিছন থেকে যদি বলি। গতবছর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এক জনসমাবেশে যোগ দেওয়ার সময় আততায়ীর গুলিতে  ইমরান খানের উপর জান-হামলা ঘটেছিল। সৌভাগ্যবশত গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তার পায়ে লেগেছিল ফলে তিনি জানে বেঁচে যান। কিন্তু প্রত্যক্ষ সেই আততায়ী বন্দুকধারী স্পটেই জনতার হাতে ধরাও পড়ে যায়। সেটার ভিডিও ক্লিপও ছড়িয়ে পড়েছিল। ইমরান খান সবসময়ই ভোকাল; তিনি কোনহুমকিতেই ভিতু হন না, চোখে চোখে রেখে কথা বলতে পারেন। দীর্ঘদিন বৃটেনে বসবাসে থাকার কারণে পশ্চিমা ভ্যলুজ ও আচার-কালচার সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল যা থাকাটাই স্বাভাবিক। সর্বোপরি আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে নেতৃত্ব দিয়ে সারা দুনিয়া ঘুরে বেড়ানোতে সেটা খাটো কোন কাজ ছিল না – বিশেষত দেশকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার থেকে  তা কোন অংশ দূরে বা খুবই খাটো ছিল – এমনটা ভাল মন্তব্য হবে না। আবার এখনকার পাকিস্তানের বিচারে  ইমরান অবশ্যই একজন পাকিস্তানি বড় এলিট কিন্তু আজ তার সেসব অর্জন তাঁর সেসব এলিটজম সবই আজ পাকিস্তানের জনগণের সেবায় তাদের পদতলে সমর্পিত! কাজেই এরচেয়ে মধুর এলিটিজম আর কী হতে পারে!! আবার তিনিই বুকফুলিয়ে বলতে পারেন আমি বিদেশে ডলার পাচার করিনা, দরকার হয় না। বরং দীর্ঘদিন ক্রিকেট খেলে যেসব বিদেশি আয় জমিয়েছি তা সময়ে পাকিস্তানে ফিরিয়ে আনি।

    তিনি তাই সরাসরি এই হত্যা প্রচেষ্টার জন্য সিনিয়র মিলিটারি অফিসার ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফকে দায়ী করে বক্তব্য দেন। কিন্তু সেনাবাহিনী সেটাকে “গুন্ডামির” কায়দায় প্রতিহত করার চেষ্টা করতে থাকে। কেন গুন্ডামি বলছি?
    আধুনিক বিচার ব্যবস্থায় অভিযোগ আনা বা অ্যামেরিকান ভাষায় যেটা ইনডাইক্টমেন্ট (indictment) এর মানে হল “বিচারের জন্য যেসব অভিযোগ” আনা বা তোলা হয়েছে। এটা বিচার করে দেখার আগে [Pre-] করা অভিযোগ। যার সোজা মানে এগুলো অভিযোগ তবে অবশ্যই প্রমাণিত নয়। কেবল শুনানি-বিচার প্রক্রিয়া শেষেই জাজের রায়ে যা প্রমাণিত গণ্য হতে পারে, এর আগে নয়। এর আগে সবই অপ্রমাণিত এবং কিছু অভিযোগ মাত্র।
    সিএনবিসি লিখছে, “…this week for “highly irresponsible and baseless allegations against a serving senior military officer without any evidence,” to which Khan replied via video statement Tuesday: “This is my army and my Pakistan. I don’t need to lie.’ “। যার সারকথাটা বাংলায় বললে্‌, এক সেনা মুখপাত্র ইমরানকে বলেছেন যে ইমরান একজন সিনিয়র সেনা অফিসারের বিরুদ্ধে প্রমাণছাড়া অত্যন্ত দায়ীত্বজ্ঞানহীন ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এনেছেন। পরে এনিয়ে ইমরান যার এক ভিডিও জবাবে বলেছেন, ” ‘এই হল আমাদের আর্মি এবং আমাদের পকিস্তান! আমার কি আর মিথ্যা বলার দরকার আছে!’ ” অর্থাৎ সেনা ভাষ্যটা হচ্ছে এমন যেন আমাদের গুলশান-বারিধারার কোন এলিট কাউকে ধমকাচ্ছে আর বলছে তো এত বড় সাহস – তুই জানিষ কার বিরুদ্ধে তুই অভিযোগ করেছিস??????

    ফ্যাক্টস হল এটা আধুনিক রাষ্ট্র বা জনগণের ক্ষমতার রাষ্ট্র গড়ার যুগ, রাজা-শাসনের যুগ নয়। রিপাবলিক আর রাজার যুগের ফারাক বুঝতে হবে। ফলে যেকোন কারও বিরুদ্ধেই মামলা করা ও অভিযোগ দাখিল এখন জায়েজ। এবং সবচেয়ে স্বাভাবিক আজকের শাসন ব্যবস্থায়! অন্তত আইনে এটা স্বীকার করে নেয়া আছে!  আর তাতে কোন মামলা “…..প্রমাণছাড়া অত্যন্ত দায়ীত্বজ্ঞানহীন ও ভিত্তিহীন” ভাবে কেউ তুলেছে কিনা  সেটা দেখার জন্য তো আদালত ও বিচারক তো আছেই। এটা তো  জমিদারি কায়দায় ধমক দিয়ে কাউকে বসানোর কিছু নাই, এবং ও দিন গয়া! এছাড়া আপনি কথিত জমিদার চাইলে আপনার স্বার্থ দেখভালের জন্য আরও দশটা উকিল-ব্যারিস্টারও লাগাতে পারেন। কিন্তু ধমকানোর তো কোন সুযোগ নাই। এটাই তো গুন্ডামি!! আর সবচেয়ে বড় কথা, কোন আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রে  আমরা কেউ-ই আদালত ও বিচারের উর্ধে নই।  আদালতই আমার বিরুদ্ধে যেকোন অভিযোগের বিচার করে দেখতে পারে; খালাস অথবা শাস্তি দিতে পারে।  এমনকি সেনাপ্রধানসহ যেকোন  সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে কোন সিভিলিয়ানের অভিযোগ যদি সেনাদের মনে হয় সেটা সেনা আদালতের ভিতরে হওয়া উচিত তাতেও কোন সমস্যা নাই। সিভিত আদালতে মামলা উঠার পর সেনারা আপীল দিতে পারেন এই যুক্তিতে যে কেন এই  মামলাটা সেনা আদালতে হতে হবে, সেনা প্রতিষ্ঠানও নিশ্চিত করুক যে তারা বিচারের নিশ্চয়তা দিচ্ছে আর তা সিভিল বিচারক যদি তার রায়ে এব্যাপারে একমত হয় তাহলে তো হয়েই গেল। আর যদি সিভিল বিচারক নিজেই বিচারের ইক্তিয়ার দেখেন তিনি বিচার চালু রাখবেন আর সেনাদের তা মানতে হবে। এনিয়ে কারোরই নিজেকে সব আইনের উর্ধে বা কোন রাজা বা এলিট ভাববার তো কোন সুযোগ নাই, প্রয়োজন নাই।

    অ্যামেরিকান ভুমিকাঃ
    আমাদের অনুমান এখানেই আমেরিকার অন্তত কিছু  ইতি ভুমিকা আছে; কারণ, পাকিস্তানে অ্যামেরিকান অনেক বড় স্বার্থ জড়িত আছে। যদি শুধুমাত্র চলতি শতকের শুরু থেকেই দেখি সেদিকে তাকাই তবে বলতেই হয় যে  ২০০১ সালের ওয়ার অন টেররের লঞ্চিং প্যাড ছিল পাকিস্তানের ভুমি। এবং খামোখা বিনা কারণে জাস্ট অ্যামেরিকান স্বার্থে পাকিস্তানকে আমেরিকা তার লঞ্চিং প্যাড হয়ে থাকতে ২০ বছর ধরে বাধ্য করে গেছে। কোন আইন বা ন্যয্যতা ছাড়াই। লঞ্চিং প্যাড মানে যেমন আফগানিস্তানে মারা আমেরিকার প্রতিটা বোমা বা উড়ে যাওয়া প্রতিটা যুদ্ধযান পাকিস্তানের ভুমি ইচ্ছামত ব্যবহার করেই তা করেছিল। এমনকি আফগানিস্তান তো ল্যান্ড লকড দেশ; কাজেই সেখানে প্রবেশ করতে গেলে পাকিস্তানের উপর দিয়ে তাদের যাওয়াই ছিল একমাত্র উপায়, ভরসা ও সহজ। আর এতে পাকিস্তানের প্রতিটা সাধারণ মানুষের জনজীবন আমেরিকার প্রতিটা ততপরতায় একেবারে তছনছ হয়ে গেছে। তাদের জীবনযাত্রা যারপরনাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আমেরিকা ভাবতে পারে পাকিস্তানের দুই পুরানা দলের  [নওয়াজের মুলসিল লীগ ও ভুট্টোর পরিবারের পিপিপি] নেতাদেরকে তো আমরা যথেষ্ট পয়সা খাইয়েছি তারা বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছে – কিন্তু কে না জানে এসব করে এতে কিছুই শোধ হয় না বা এগুলো কোন প্রতিদানও নয় ঘুষ মাত্র!  এখন একালেও আমেরিকা যদি বুঝমান ও বুদ্ধিমান আচরণ করতে চায় তাহলে অন্তত নতুন করে আর অপরাধের মাত্র না বাড়িয়ে একালের যেকোন গণমানুষের স্বার্থের ইস্যুতে সহানুভুতি হয়ে থাকতে পারে। অন্তত কিছু পাপ ধুয়ে যাক এতে, একটু মন জয়ের চেষ্টা করুক!!! এটা কী খুব বেশি চাওয়া? যদি আমেরিকার তাই মনে হয় তবে বুঝতে হবে আমেরিকার গ্লোবাল নেতা থাকার দিন ফুরিয়েছে!

    নিশ্চয় আমেরিকার জানা আছে ইমরানের পিটিআই-ই একমাত্র পাকিস্তানি রাজনৈতিক দল যে আমেরিকার এই পাকিস্তানকে লঞ্চিং প্যাড হতে বাধ্য করার বিরুদ্ধে কথা তুলে তৈরি হয়েছে। নিশ্চয় বুদ্ধিমান ও প্রাকটিক্যাল অ্যামেরিকান নীতিনির্ধারকেরা মানবেন যে এজন্য অ্যামেরিকার পাকিস্তানের পিটিআই দলকে আগাম এনিমি ঠাউড়ে রাখা কোন কাজের কথা নয়। এটা স্টুপিডিটি হবে।  বরং পিটিআই এর সাথে ইতিবাচকভাবে সহানুভুতির সাথে ওয়ার্কেবল সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টার মধ্যেই সবার ভাল লুকিয়ে আছে – ইতিবাচক কোন কিছু শুরু হতে পারে সেখান থেকে।

    তাহলে কী করতে হতঃ
    একালের দুনিয়ার প্রধান ট্রেন্ড বা অভিমুখ হল গ্লোবাল অর্থনীতির অংশ হওয়া, নিজ দেশের বিকাশ ঘটানো।
    মানে ব্যাপারটা যদি পাবলিকের স্বার্থের চোখে দেখেন তাহলে এটা হল যে কলোনিদখল যুগের শেষ বা ১৯৪৫ সালের পরের কলোনিমুক্ত স্বাধীন আমাদের মত দেশগুলোতে – গ্রাম থেকে লোক জমি থেকে থেকে উচ্ছেদ হয়ে শহরে কাজ- ও নয়া জীবনের খোজে আসতেই থাকে এটা সব দেশেই স্বাভাবিক ঘটনা-ফেনোমেনা। কিন্তু শহরে এসে যে টেম্পর হেলপারির চাকরি জুটাতে পেরেছে তাযদি দেখা পরের পাঁচটা প্রজন্ম হয়ে গেছে কিন্তু জীবন মান একই জায়গায় থেকে গেছে – এটাই হল কমিউনিস্ট চিন্তার নেগেটিভ প্রভাব ও মারাত্মক নেগেটিভ অচলায়তন প্রভাব।  এটাই হল অর্থনীতিতে কোন দিকে বিকশিত হতে না দেওয়া। যেন চারি-তে কুকুরের শুয়ে থাকা। যেখানে চারি মানে হল মাটির বড় পাত্র যা গো-পালন ঘরে গরুকে খৈল-ভুসিতে মেখে দেয়া খাদ্যদানের মাটির পাত্র – যেখানে থেকে গৃহপালিত গরু আরামে খেতে পারে। কিন্তু সময়ে আবার এও দেখা যায় যে একটা গৃহপালিত কুকুর ঐ চারিতে আরামে শুয়ে আছে।  চারি কুকুরের খাদ্য-পাত্র নয় অথচ সেই পাত্র কুকুর দখল করে রেখেছে আর গরুকেও খেতে দিচ্ছে না। এটাই কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল নামের অর্থনৈতিক চিন্তার জন্য খুবই প্রতিকী! তাদের অর্থনীতি-চিন্তা  এরকমই যে নিজে ঐ পাচ-প্রজন্মকে ঐভাবে টেম্পো হেল্পার করে আটকে রেখেছে বাড়তে দেয় নাই; নিজেরাও দেশের অর্থনীতিকে বাড়তে দেয় নাই – যেমন বিদেশি পুঁজি হারাম জাতীয় নানান আপ্ত বাক্যে।
    এই বিচারে একালের অভিমুখ হচ্ছে আর তথাকথিত কোন আদর্শ আর নয়, বরং গ্লোবাল অর্থনীতির অংশ হওয়া, নিজ দেশের নুন্যতম বিকাশ ঘটানো – গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমার জন্য বিশেষ কী সুবিধা লুকিয়ে আছে তা তালাশ করে [Comparative advantage] বুদ্ধিমানের মত তা নিজ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে কাজে লাগানো। গরীবের জানগুলো একটু বাচুক, একটু শ্বাস নিতে দেন আগে পরে বাঁচলে কোন বাপের নাম আবার নিব না-হয়!!!!!।

    আসলে বলতে চেয়েছি পুরানা অচল স্থবির চিন্তা থেকে বের হতে হবে। আর তাই, একালেও পছন্দ না হলে স্বার্থবিরোধ দেখা দিলে গ্লোবাল নেতাদের ভিনদেশের অপছন্দের কোন প্রধানমন্ত্রী-প্রেসিডেন্ট মেরে ফেলা এগুলা খুবই পুরানা ধারণা। অন্তত কোল্ডওয়ারের পরের যুগে এবার তাতে ক্ষান্ত দেয়ার সময় হয়েছে মানা উচিত।  একালে চীন-ভারত ঝগড়াও করে আবার ব্যবসায় করে সমান তালে। এটাই বর্তমান কাল তা বুঝতে হবে! এসব  খুনোখুনি কলোনি আমলে, কিংবা কোল্ড ওয়ারের যুগে এমনকি আশির দশকের ইউরোপেও হয়ত মানাত। কিন্তু নয়া শতকে সেটা আর নয়, তা একেবারেই বেমানান; অনেক হয়েছে আর নয়। যেই ঘটাক ইমরানকে আততায়ী দিয়ে হত্যা প্রচেষ্টা এটা খুবই নিম্নমানের চিন্তা, কাজ-আচরণ। এটা অগ্রহণযোগ্য। একালে যাকে শত্রু মনে হচ্ছে তার সাথেও বাণিজ্য- ব্যবসায়ীক সম্পর্ক রাখতে জানতে হবে। এটাই একালের ট্রেন্ড, ও নয়া বৈশিষ্ট।

    তাহলে আমেরিকার ভুমিকা কী হতে পারত?
    এসব আততায়ী-মার্কা ঘটনায় আমেরিকার কোনও সংশ্লিষ্টতা নাই ধরে নিয়েই বলা যায়, আমেরিকার অনেক কিছুই করণীয় ছিল, নিজ স্বার্থেই। তার উচিত ছিল অন্তত বিবদমানদের মধ্যে মধ্যস্ততার ভূমিকা নেয়া, এভাবে করে ব্যাপারটা বাড়তে না দেয়া।  প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত  হতে হত – আমেরিকাকে লিড নিতে হত –  সবপক্ষই যাতে মানে ও গ্রহণযোগ্য হয় এমন একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট তদন্ত ও বিচারের ভিতর দিয়ে ইস্যুটার সমাপ্তি টেনে মিটিয়ে দেওয়া।
    ওদিকে যদিও এটা ঠিক যে  ২০১৮ সালের পরে একালে আমেরিকাকে পাকিস্তানে জায়গা করে নিতে হয়েছে নওয়াজ-শাহবাজ (সেই সাথে ভুট্টো পরিবার) গংয়ের হাত ধরে, যারা চিহ্নিত সম্পদ লুটেরা। এভাবে স্টার্ট আপ – এটাই আমেরিকার কপালের দুর্ভাগ্য! বাইডেন প্রশাসনের জন্য এটা খুবই খারাপভাবে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের শুরু! যে সম্পর্কের কোনই নুন্যতম স্টান্ডার্ড নাই। যেন কোন নীতি-পলিসির বালাই না থাকাটাই স্বাভাবিক!

    এখন এর শেষ হবে কোথায়?
    পাকিস্তানের শাহবাজ সরকার এক অদ্ভুত রেওয়াজ চালু করেছে; এতে এই সরকার কত অক্ষম অপারগ ও অযোগ্য আর আনফিট এরই প্রমাণ । তিনি প্রধানমন্ত্রী বলছেন তিনি চীফ জাস্টিসের রায় মানবেন না??????  কারণ চীফ জাস্টিস সমন্বয়ে গঠিত এক আদালত রায় দিয়েছিল যে মে ২০২৩ মাসের মধ্যে প্রাদেশিক নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। এদিকে মিডিয়া আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে জেনারেল মোশাররফের পরের পাকিস্তানে  এপর্যন্ত আদালত  দুইটা প্রধানমন্ত্রীকে শ্রেফ রায় দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, তা যেন আমরা মনে রাখি!!!

    তাহলে পাকিস্তানে সিভিল সরকারের ভবিষ্যত কই?
    সেনাবাহিনী কী তাহলে শাহবাজ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে ইমরান ও তার দলকে সামরিকভাবে দমন করে ক্ষমতা নিবে?  আর তখনও কী আমেরিকা বসে দেখতেই থাকবে – কিছু না ছুয়ে বা না দেখে? আর কাউকে কী আমেরিকা বিশ্বাস করাতে পারবে যে সে কিছুই করে নাই?  আর তাতে কী তার ইজ্জত বাঁচবে?
    পাকিস্তানের সামরিক শাসন নিয়ে সেই অর্থে একটা মৌলিক ঘটনা জেনে রাখা ভাল হবে।  কোল্ডওয়ারের আমলে মানে সোভিয়েত আমলে বা ১৯৫৩-১৯৯২ এই সময়কালের এক কমন ফেনোমেনা ছিল, আমাদের মত গরীব দেশে পপুলার কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতার কাছে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব হারিয়ে আমেরিকাকে একমাত্র নির্ভর করতে হত কোন  সামরিক সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়ে। আর এটাকেই যেন সামরিক বাহিনী ক্ষমতালোভী বলে তারা নিজ ইচ্ছায় এমন করে থাকে বলে প্রচার করে থাকে; তারা একদল সুশীল বা বাকশাল-পছন্দের লোক এমন করে থাকে যেমন প্রথম আলোর (মৃত) মিজানুর রহমান খান বা একালের সোহরাব হাসান। আবার প্রায় একই চিন্তার আরেক বৃটেন প্রবাসী পাকিস্তানির অধ্যাপক আছেন নাম আয়েশা সিদ্দিকা [Ayesha Siddiqa] । এটা আমাদের মত দেশের সেনাবাহিনী নিজে নয় বরং এর পিছনে আমেরিকার কাজ করার ধরণই তাদের এমন করেছে – এই অংশটা তারা অজানা রেখে দিতে চায়। এনিয়ে রান্ডের [RAND Corporation] এক গবেষণা রিপোর্ট আche.

    সংক্ষেপে ঘটনাটা হল – গত ১৯৯১-৯২ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙ্গে যাওয়ার কালে সেসময় ১৯৯৩ জানুয়ারিতে ক্ষমতার শপথ নিয়েছিলেন বিল ক্লিনটন – সেটা তার প্রথম টার্ম ছিল আর তিনি দুই টার্ম প্রেসিডেন্ট ছিলেন।  অ্যামেরিকান রাজনীতি নির্ধারিত হওয়ার একটা বড় সামাজিক জায়গা হচ্ছে ওর থিঙ্কট্যাংকগুলোর যে সমাজ সেখানে; কারণ তাদের থিঙ্কট্যাংকগুলোর ফান্ড সংগ্রহ ও ফান্ড ব্যবহারের কো-অর্ডিনেশন বা সমন্বয় হয়ে থাকে ইনফরমালি কিন্তু খুবই নিবিড়ভাবে – এসব সামাজিক ইনফরমাল আসরে বসে। র‍্যান্ডের ঐ রিপোর্টে আছে – এমনই এক ইনফর্মাল সভায় থিঙ্কট্যাংকগুলোর যুক্তি ছিল  – এতদিন আমেরিকান ধারাবাহিক সরকার- প্রশাসনগুলো সোভিয়েত উপস্থিতির যুক্তি দিয়ে বলত ওদের প্রপাগান্ডার জন্যই আমাদের মত দেশে আমেরিকা অজনপ্রিয় আর সেটা পূরণ করতেই আমেরিকাকে সামরিক আইন জারি করে ওসব দেশে ক্ষমতা ও প্রভাব চর্চা করতে হয়ে থাকে। অতএব সোভিয়েত পতনে যেহেতু দুনিয়া এক-মেরুর হয়ে গেছে, অ্যামেরিকান এক-মেরুর দুনিয়া – তাই এখন থেকে অ্যামেরিকান সরকার-প্রশাসকদের সামরিক শাসন থেকে সরে আসার নীতি নেয়া উচিত। এটা সবচেয়ে ভাল সময়। এই প্রেক্ষিতে তাই   ক্লিনটন বা ডেমোক্রাটদের  পক্ষ থেকে  থিঙ্কট্যাংকগুলোর কাছে প্রতিশ্রতি দেয়া হয়েছিল যে তারা আর আমাদের মত দেশকে সামরিক শাসন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করবে না।  এর পিছনে মূল আর্গুমেন্ট ছিল যে দুনিয়া যেহেতু আমেরিকাই এক  পরাশক্তির কাজেই আমেরিকার আর সেনা শাসন দরকার হবে না। [যদিও ভারত-পাকিস্তান কারগিল সীমিত যুদ্ধ (১৯৯৯) হয় আর এর সব দায় মোশাররফ এর বলে পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী  নওয়াজ ভারতের কাছে মন্তব্য করেন, পরে তিনি মোশাররফকে ক্ষমতাচুত করতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়া আর শেষে কার্যত পালটা মোশাররফ এর নামেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্ষমতাদখল করেছিল –  শ্রীলঙ্কা থেকে মোশাররফকে বহনকারী  বাণিজ্যিক বিমানকে করাচীর মাটিতে নামতে জায়গা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল যা নওয়াজ সরকার কিছু সময় আটকে রেখে দিয়েছিল।] এই ঘটনার পরে ক্লিনটন তাই সামরিক ক্ষমতা বলেই মোশাররফ এর (১৯৯৯ সালের) এই ক্ষমতা দখলকে স্বীকৃতিই দেয় নাই। চলেছিল ২০০১ সাল পর্যন্ত। এরপরে, ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেন বুশের আমলে টুইন টাওয়ার হামলার দিনের শেষভাগে  সেকালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোলিন পাওয়েঙ্কে সিএনএন-এ স্বীকার করে নিতে দেখা যায় যে তারা মোশাররফ সরকারের সাথে কাজের কথা বলেছেন – অর্থাৎ তখন থেকে কার্যত বুশের আমেরিকা পাকিস্তান সরকারকে স্বীকার নিচ্ছে। তবে এখন এতকথা বলার মূল বাক্যটা হল, এরপর থেকে পিছনের এই কারণেই  এতদিন পাকিস্তানে সামরিক ক্ষমতাদখল আর কখনও হয় নাই বলে মনে করা হয়।

    তাহলে স্বভাবতই প্রশ্নঃ  পাকিস্তান সেনাবাহিনী কী  এবার আবার ইমরান ও তার দলকে সামরিকভাবে দমন করে আবার ক্ষমতাদখলের পথে রওনা দিবে? আর তারপরেও এবার আমেরিকা  কাউকে কী বিশ্বাস করাতে পারবে যে সেকিছুই করে নাই, ভুমিকা নাই?

    একাল আর সেকাল অনেক ফারাকঃ
    এমনিতেই দুনিয়ার সব “একাল আর সেকালে”  এর মধ্যে  অনেক ফারাকই থাকে, থাকবেই। তাহলে আর এবারের আলাদা বিশেষত্ব কী? মানে এবার গ্লোবাল নেতা হিশাবে অ্যামেরিকার ক্ষেত্রে এর আর বিশেষত্ব কী?
    আগে একটু বলে নেই। গ্লোবাল নেতা কথাটার অর্থ কোল্ডওয়ারের আমলে নিশ্চিতভাবে ধরে নেয়া হত এর অর্থ পরাশক্তি  – মানে সামরিক পরাশক্তি বা পরাশক্তিগত সামর্থ। অথচ একালে মানে ১৯৯২ সালের পরে থেকেই এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে ধারণাটা মোটেও  সামরিক নয়। এটা আসলে মূলত দুনিয়ায় মানে কোন দেশের গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরিসরে সামর্থ কতটা। অর্থাৎ নিজ অর্থনীতিতে এক বিপুল উদ্বৃত্ব সঞ্চয়ের নয়া এক নিরন্তর ধারাবাহিক সক্ষমতার দেশ হওয়া যা অন্তত পরের শতবছর ধরে এমনি টিকে থাকবে। যারা আরও আগ্রহী তারা “অ্যামেরিকান সেঞ্চুরী” নামের একটা ধারণার তালাশ করতে পারেন। গত ১৯৪১ সালের অ্যামেরিকান টাইমস ম্যাগাজিনের এক নয়া সহযোগী পত্রিকার যার প্রচ্ছদ কাহিনীর নাম ছিল এই “অ্যামেরিকান সেঞ্চুরী” । আমার কোন পুরা লেখায় এই আর্টিকেলটা সংযুক্ত আছে – সেটা এখানে দেখতে পারেন। কেন ওর নাম “দ্যা অ্যামেরিকান সেঞ্চুরী”  হল তা বুঝতে হবে। আরেকভাবে বললে এটাই বিনিয়োগ করার সামর্থ বিশেষ করে সারা দুনিয়ার গরীবদেশগুলোকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ঋণ [Infrastructure Dev. loan] এবং সাথে এফডিআই [FDI]  দেওয়ার সক্ষমতা আর তা রাষ্ট্রীয় ভাবে বা বিশ্বব্যাংকের মত নানান প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা কথাটার অর্থ এটাই – এভাবে একালে বুঝতে হবে।

    এই সক্ষমতার বিচারেরই একালে আমেরিকা চীনের চেয়ে অনেক পিছনে পড়ে গেছে। এই উপলব্দি বা বুঝাবুঝিটা এমন না যে  আপনার পছন্দ  আমেরিকা, আর আমার পছন্দ চীন সেজন্য আমি প্রসঙ্গটা তুলছি আর তাই আমি আর আপনি ভিন্ন ভিন্ন কথা বলব।  এমন না।  যখনই কোন দেশে একালে অ্যামেরিকান এই ঋণ-বিনিয়োগ সক্ষমতায় ঢিলা পড়ছে – মানে সরাসরি জি-টু-জি বা বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ-বিনিয়োগ দিতে পারছে না  – আর তখনই ঐ ফাঁক দিয়ে চীনা ঋণ-বিনিয়োগ বিপুল পরিমাণে ঢুকে পড়ছে।  আবার কোন দেশের  চীনের কাছে নেয়া ঋণ তা সময়কাল পুর্ণ হবার পর ফেরতদান যদি ডিউ [due] মানে বকেয়া হয়ে যাবার তারিখ পার হয়ে যায় তবে অনুরোধ করলে চীনের সেই তারিখ আরো দু এক বছর বাড়িয়ে দেওয়ার সামর্থ প্রচুর – এটাও চীনের আরেক শক্তি অন্য গ্লোবাল নেতা  অথবা এর কাছাকাছি দাবিদার  যে কারো তুলনায়!

    যেমন ধরা যাক আমেরিকা সাপোর্টেড শাহবাজ-ভুট্টো সরকার ক্ষমতায় এলো ইমরানের সরকারকে সরিয়ে। এখন এমনিতেই অর্থনৈতিক চরম সংকটে থাকা পাকিস্তানের অর্থনীতিকে জাগিয়ে তুলতে শাহবাজ সরকারকে চীনে দৌড়াতে হবে কেন? এটা অড! কেন আমেরিকা এই সহায়তা করার উপযুক্ত থাকবে না – এটাই একালের আমেরিকার সামর্থের প্রশ্ন! পাকিস্তানে প্রভাব বিস্তারের রাজনৈতিক সামর্থ তার অটুট আছে কিন্তু অর্থনৈতিক সামর্থ ছাড়া রাজনৈতিক সামর্থ অকেজো – এটাই প্রমাণিত হচ্ছে! এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আজ আমেরিকাকে যদি কাজ করতে হয় তবে কোনভাবেই এসব সেনা গুন্ডামি সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে পারে না। সেনা বনাম জনগণের সংঘাতে নিশ্চুপ দর্শক হতে পারে না। এটা আত্মঘাতি!

    এককথায় বললে, আমেরিকান যেকোন ব্যর্থতা, বোকামি বা ভুল এর সুযোগ আপনাতেই বিপরীতে চীনের কোলে গিয়ে জড়ো হবেই। তাতে আমরা কে অ্যামেরিকান সমর্থক আর কে চীনের – সেটা অপ্রয়োজনীয়। তা চোখে আঙুল দিয়ে পাকিস্তানের পরিস্থিতি আমাদের দেখাচ্ছে!

    এর উপরে শাহবাজ সরকার এই কথিত বিরাট নায়ক NAB (মানে যেন আমাদের দুদুক), NAB – তারা শাহবাজকে অর্থ পাচার মামলায় নির্দোষ সার্টিফিকেট দিয়েছে। এটাও কী আমেরিকা বসে বসে দেখবে?
    এদিকে সর্বশেষ খবর হল সুপ্রিম কোর্ট গত ৯ মে, NAB [এটাই Al-Qadir Trust case] মামলায় ইমরানকে নাটকীয়তা করে গ্রেফতারকে অবৈধ ঘোষণা করে ইমিডেয়েট রিলিজ করে দিতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে।  আর এসব সমস্ত ঘটনাবলীতে অ্যামেরিকান অবস্থান কোথায়, কোথাও প্রকাশ্য সে হদিস নাই। আর সেনাবাহিনীর অবস্থান তাহলে এখন কোথায় দাঁড়ালো? সেনাদের গণবিরোধী [anti-people] ইমেজ এটা অবশ্যই পাকিস্তানের আমজনতা পাবলিকের কাছে আমেরিকা-ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে।

    আর ওদিকে আগামিতে যে মেজর সংঘাতের ইমেজ বা আগমনিবার্তা এসবের ভিতর দিয়ে উঠে আসছে তাতে আদালত শাহবাজ সরকার  ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে  আদালত-নিজস্ব তার ক্ষমতাকে সংহত ও প্রো-পাবলিক এবং তা ন্যায্য বলে প্রতিভাত করে নেয়ার সুযোগ তৈরি করে ফেলল। আর সেনাবাহিনী এখানে দুধ-আম এক হয়ে যাবার পর নিজে শুকনা আঠি হয়ে পাত্রের বাইরে গড়াগড়ি দিচ্ছে.. এমন অবস্থায় চলে গেল।  আগামিতেও তা দিতে থাকবে। অর্থাৎ আদালতের পাকিস্তানে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের রায় ও নির্দেশ অমান্যের দায়য়ে এবার শাহবাজ  সরকার শজেই অভিযুক্ত হবে। এবার জনসমর্থন নিয়ে এখন সুপ্রিম কোর্ট  নিজ প্রাতিষ্ঠানিক অথরিটি  প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়ে যাবে – যার অর্থ শাহবাজ সরকারের জন্য খারাপ সময়ের দিন সামনে , এরই ইঙ্গিত!

    আমেরিকা মনে করতে পারে, দাবিও করতে পারে বা নিজেকে বুঝ দিতে পারে যে তারা পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এতে তাদের কিছু বলার নাই করার ছিল না; কাজেই তারা নিরপেক্ষ। কিন্তু সমস্যা হল পাকিস্তানের আম-পাবলিক মাইন্ডে এটা জায়গা পাবে না। পাকিস্তান আর্মি আর আমেরিকা যে আলাদা – আলাদা তাদের স্বার্থ ও উপস্থিতি তা যতটুকুই সত্য হোক না কেন পাবলিক মাইন্ডে – তারা আলাদা – এমন ধারনা তৈরি করার পক্ষে আমেরিকা এতদিন কোন কাজ করেছে বলে জানা যায় না।

    তবে এপর্যন্ত পুরা ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে লুজার – সবচেয়ে ইমেজ খুয়ানো ক্ষতিগ্রস্থ সংগঠনের নাম হল পাকিস্তান সেনাবাহিনী – সে এখন সত্যিই গণবিচ্ছিন্ন একটা বোঝা –  অন্তত সাময়িক সময়ের জন্য হলেও! আভ্যন্তরীণ নিজ জনগণকে থ্রেট করা বা ধমকানো এ্টা দুনিয়ার কোন সেনাবাহিনীর কাজ হতে পারে না।  কিন্তু তাই ঘটেছে পাকিস্তানে – বর্তমান সেনা নেতৃত্ব এমনই বোকা আত্মভরি, উদ্ধত ও আন-সিভিল! তাহলে ইতিহাস বোধহীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইমরানের গ্রেফতারকে ও ততপরবর্তি জনবিক্ষোভকে কালো অধ্যায় [BLACK CHAPTER] বলে চিহ্নিত করেছিল – তার কী হবে এখন???
    যদিও পাকিস্তানের মুদ্রাস্ফীতি এখন ৩৬% এর উপরে। ফলে জীবনের উপর উঠে পড়া এই কঠোর সময়েও পাবলিকের রাস্তায় নেমে এসে প্রতিবাদ, এটা উদাহরণ হয়ে থাকবে!


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক