Tag: ভারত

  • হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত-রাষ্ট্রকে বদলাবে কে

    হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত-রাষ্ট্রকে বদলাবে কে
    গৌতম দাস
    ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬,রবিবার

    হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত-রাষ্ট্রকে বদলাবে কে

    ভারত রাষ্ট্রের ভিত্তি মূলত হিন্দুত্ব। এটা বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়েরই অবস্থান; এটা তারা সঠিক মনে করেন, মেনে চলেন। বরং এর কোনো বিচ্যুতি ঘটছে মনে হলে একে অপরকে দোষারোপ করে। কেন করেন? কারণ তাদের মনে হয়, প্রায় ২৯টা ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন ধরনের ভিন্নতার মানুষের এত বিশাল জনসংখ্যার মানুষকে কী দিয়ে একত্রে ধরে রাখা হবে বা যাবে? তবে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা ও বাছবিচার ছাড়াই তাদের ধারণা ‘হিন্দুত্ব’ – এটাই সেই সুপার গ্লু যা তাদের সব আশঙ্কার সমাধান।

    আসলেই কী রাষ্ট্র গঠন করতে গেলে এমন একটা সুপার গ্লু – হিন্দুত্ত্বের বা কমন ধর্মীয়  ভিত্তি অথবা কমন ভাষার ভিত্তি  ইত্যাদি একটা না একটা ‘আইডেনটিটি’ এরকম একটা কিছু লাগেই? এমন ভাবনা থেকেই দুনিয়াতে আইডেনটিটির রাজনীতি শুরু হয়ে আছে। । ‘আইডেনটিটির রাজনীতি’ ছাড়া কী রাষ্ট্রগঠন অসম্ভব?  আমরা নিশ্চিত রাষ্ট্রচিন্তায় এদিকটা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করা হয় নাই। অথচ আবার এই হিন্দুত্ত্বের ভিত্তির ভারত রাষ্ট্রের মূল কারিগর কংগ্রেস ও অন্যান্য ‘প্রগতিশীলদের’ চোখে পাকিস্তান – ইসলামের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠন করে খুব খারাপ কাজ করেছে বলে তাদের অভিযোগ। অথচ সারকথা করে বললে, বাংলা ভাষার ভিত্তিতে আইন্ডেন্টিটি পলিটিক্সের উপর রাষ্ট্র গড়ে তুললে সেটা ভাল বা আদর্শ, ধর্মের (হিন্দুত্ত্ব বা মুসলমানিত্বের ভিত্তিতে আইন্ডেন্টিটি পলিটিক্সের উপর রাষ্ট্র গড়ে তুললে সেটা খুব খারাপ বা অগ্রহণযোগ্য এটা বলা বা ভাববার সুযোগ নাই।

    সে যাক, ভারতের প্রধান দুই সর্বভারতীয় দল দল কংগ্রেস ও বিজেপি এরা এ জায়গায় ঐকমত্য। অন্যদের মধ্যে ‘বাস্তববাদীতার দোহাই দেয়া’ সিপিএম সেও ঐ দুই দলের মতো করে ভাবে ও মান্য করে যে ধন্বন্তরি ওষুধ বা সুপার গ্লু-এর নাম হিন্দুত্ব। কিন্তু কোনো দল প্রকাশ্যে মানে ফরমালি তা স্বীকার করে না। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে বলে, স্বীকার করে যুক্তি দেয়। তবে বলা না বলা, সেটাঅন্য জিনিস। ফলে এখান থেকেই আরো দুই খান কথা বলে তাদের বিভক্তি শুরু হতে দেখি আমরা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ভিত্তি হিন্দুত্ব- কংগ্রেস ও বিজেপির এ ব্যাপারে একমত হয়ে এটা মেনে নেয়ার পরও প্রত্যক্ষভাবে হিন্দুত্ব ভিত্তির ভারত রাষ্ট্রের কথা বাইরে প্রকাশ বা স্বীকার করা ঠিক হবে কি না- এই প্রশ্নে কংগ্রেস ও বিজেপির ভিন্নতা শুরু। কংগ্রেস মনে করে, কৌশলী হওয়ার দরকার আছে। কথাটা সেকুলারিজমের ভেক ধরে বলতে হবে। বুঝতে বুঝাতে হবে হিন্দুত্ব কিন্তু মুখে বলতে হবে ‘সেকুলারিজম’। উপরে সেকুলারিজমের জামা গায়ে দিয়ে এর আড়ালে বসে মুখে সেকুলারিজম বললে হিন্দুত্বের এফেক্ট পাওয়া যাবে, আনা যাবে। এই হল কৌশল। এর বিপরীতে বিজেপি মনে করে, সেকুলারিজম- এটার আবার কী দরকার? হিন্দুত্বকে রাষ্ট্রভিত্তি হিসেবে মানতে পারলে বলতে পারব না কেন? বরং ‘বোকা’ হয়ে লাভ নেই। হিন্দুত্বের গর্বকে বুক উঁচা করে সামনে আনলে এই ‘আইডেন্টিটির রাজনীতি’ কংগ্রেসের ওপরে তাদেরকে একটা বাড়তি মাইলেজ দিবে। কারণ হিন্দু কনস্টিটুয়েন্সিতে এটা খুবই ফলদায়কভাবে মানুষের মনে সুড়সুড়ি লাগানোর ক্ষমতা রাখে। ভারতের সেকুলারিজম সত্যিই এমন এক তামাশার নাম।

    ২০১৪ সালের নির্বাচনে মোদির বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপির মূল দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের (আরএসএস)  গৃহীত ও নির্ধারিত এক কর্মসূচি ‘ঘর ওয়াপসি’ চালু করেছে। এমন কর্মসূচির পক্ষে লজিকটি হল, ভারতে হিন্দু ছাড়া অন্য ধর্মের যারাই আছে, তারা কোনো না কোনো সময়ে হিন্দু থেকেই ধর্মান্তরিত। অতএব, এই যুক্তিতে আরএসএস-বিজেপি তাদের ‘ওয়াপাস’- মানে ফিরিয়ে আনার প্রচার-প্রপাগান্ডার কর্মসূচি নিতে পারে, ফোর্স করতে পারে, বিজেপি সরকারের প্রটেকশনের আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের হয়রানি করতে পারে, পাবলিক নুইসেন্স করতে পারে, সব পারে। আর এতে এক কামে সব কাম হবে। হিন্দুত্বের জয়জয়কার হবে, ভোটের বাক্সও ভরে উঠবে। বাড়তি লাভ হল কংগ্রেসও ভয়ে সিটিয়ে কেঁচো হয়ে থাকবে। কারণ এতে কংগ্রেসকে বিজেপি খুব সহজে উভয় সঙ্কটের ক্যাচালে ফেলতে পেরেছে। কংগ্রেস ভেবে ভীত যে, ‘ঘর ওয়াপসির’ বিরোধিতা করতে গেলে কংগ্রেসঈ হিন্দুরা হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সির প্রভাবে বিগড়ে গিয়ে যদি কংগ্রেসকে ভোট না দেয়! এই ভয়ে কিছু না বলে দলটি চুপ থাকে।
    আসলে বিজেপি এ জায়গায় স্মার্ট ও ‘সৎ’। সে হিন্দুত্বের রাষ্ট্র চায়, হিন্দুত্বের রাজনীতি করে এবং প্রকাশ্যে তা বলেও। আর স্মার্ট এ জন্য যে, সে বুঝে গেছে কংগ্রেসকে এভাবে উভয় সঙ্কটে ফেলে জব্দ করা সহজ। এর পরও মূল বিষয় এখানে কন্সটিটুয়েন্সি। কন্সটিটুয়েন্সি মানে- ভোটারদের ক্যাটেগরি বা গ্রুপ অথবা ভোটার এলাকা; যারা কোন কথা, কোন দাবি অথবা কোন ইস্যুর পক্ষের ভোটার- এক কথায় কোন ক্যাটেগরির ভোটদাতা, কোন ভোটারদের গ্রুপে একে ফেলা যায় এই অর্থে ‘ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি’। আগেই বলেছি- কংগ্রেস ও বিজেপি উভয়েই একমত যে, হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারত রাষ্ট্র থাকুক এবং থাকতেই হবে। এর পক্ষে তাদের কমন যুক্তি হল, এটা না হলে ভারতকে এক রাখা, একভাবে ধরে রাখার আর কোনো উপাদান বা আঠা-গ্লু নেই। কারণ রাষ্ট্র বলতে তারা একমাত্র এই আইডেন্টিটি-ভিত্তিক রাষ্ট্রই কল্পনা করতে সক্ষম। অন্য কোনো রাষ্ট্র হওয়া আদৌ সম্ভব কি না নেহরুর জমানা থেকেই এই পর্যন্ত এটা নিয়ে তাদের হোমওয়ার্ক বা পড়াশোনা আছে বলে জানা যায় না। এর বাইরে তাদের কল্পনা আগায় না, ভোঁতা করে রেখে দেয়া থাকে, তাই কাজ করে না। বরং আইডেন্টিটি-ভিত্তিক হিন্দুত্ব চিন্তার সুড়সুড়ি জাগানোর ক্ষমতা সীমাহীন। তাই সেটার প্রতি লোভে সবার চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। সারকথা দাঁড়াল ওপরের সেকুলার পর্দা সরিয়ে ফেললে কংগ্রেস ও বিজেপির ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি আসলে একই। আর এটাই হল সমস্যার গোড়া। কেন? কোন রাজ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে অথবা সাধারণভাবে বিজেপি যখন ‘ঘর ওয়াপসি’ ধরনের কর্মসূচি চালাতে নেমে পড়ে তখন কংগ্রেস এর কোনো বিরোধিতা করতে পারে না। কারণ ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচি তো ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণার’ সাথে সামঞ্জস্যের দিক থেকে সবচেয়ে পারফেক্ট। আসলে কংগ্রেস মনে করেছিল বা বলা ভাল, নিজের সেকুলারিজম স্ট্রাটেজিতে নিজেকে সাজিয়েছিল এই মনে করে যে, যেকোনো হিন্দু বিশেষত শিক্ষিত হিন্দু বুঝবে তার হিন্দুত্ব সেকুলারিজমের মোড়কে ‘ব্রান্ড করে’ প্রকাশ করাই সবচেয়ে লাভের। কারণ এতে সরাসরি হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিকে তো পাওয়াই যাবে। সেই সাথে সেকুলারিজমের জামা পরা ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি আর অহিন্দু (মুসলমান বা ক্রিশ্চানসহ সবটা) ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিকেও কাভার করা যাবে- কংগ্রেস অনেক আগে থেকেই এসব অনুমানের ওপর সাজানো দল। কিন্তু বিজেপির ঘর ‘ওয়াপসি কর্মসূচি’র সামনে কিছু বলতে না পারায়, মুখ বন্ধ রাখতে হওয়ায় কংগ্রেসের কাম্য, তিন ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিই কংগ্রেসের ওপর বেজার হচ্ছে। তারা কংগ্রেসকে অকেজো মনে করছে। কারণ এই তিনের প্রথমটা, সরাসরি হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি- এরা মনে করে কংগ্রেসের তুলনায় বিজেপিই ভালো ও সঠিক। সেকুলারিজমের জামা পরা ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিতে যারা পড়ে, এদের মধ্যে পশ্চিমা জীবনকে আদর্শ মানা আধুনিক ভোটাররা এমনিতেই গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, এরা নিজের ‘ক্লাস সচেতনতার’ কারণেও নিজেই আলাদা ও বিশেষ হয়ে থাকতে চায়। এরা ঘর ‘ওয়াপসি’র মতো কর্মসূচির সামনে নিজেই অসহায় মার্জিনালাইজড বোধ করে। আর তৃতীয়, অহিন্দু (মুসলমান বা ক্রিশ্চানসহ সবটা) ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি- ঘর ওয়াপসি দেখে এরা হতাশ হয়ে কংগ্রেসকেই অভিশাপ দিতে থাকে যে, কংগ্রেস ‘সেকুলারিজমে’ সিরিয়াস না। এবার  গত মে মাসে সদ্যসমাপ্ত আসামের নির্বাচনের এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, হিন্দুত্বের ভোটাররা কংগ্রেস ছেড়ে কিভাবে বিজেপিমুখী হয়েছে।
    তবে এর ব্যতিক্রম কী হতে পারে তা বোঝার জন্য কাছাকাছি সবচেয়ে ভালো উদাহরণ সম্ভবত মমতা বা তাঁর তৃণমূল কংগ্রেস। বিশেষত ঐ একই সময় গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নির্বাচনে তাঁর দলের বিশাল বিজয়ের পরিপ্রেক্ষিতে। যদি খোজ করা হয় যে, ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণা’র প্রশ্নে মমতার অবস্থান কী? মমতা তত্ত্ব জানেন না, তত্ত্ব করেন না, তত্ত্বের বড়াইও তাঁর নেই। মমতাকে সম্ভবত মাঠ অথবা  ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট’ দেখার ভিত্তিতে চলা পপুলার রাজনীতিক বলা সঠিক হবে। ফলে তাকে বুঝতে হবে তার বাস্তব তৎপরতা দিয়ে। প্রথমত, তিনিই দেখালেন সেকুলারিজম নামের ছলনা না করেও প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিরও নেতা হওয়া সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গে মোট মুসলমান ভোটার মোট ভোটারের প্রায় ৩০%। ৩-৪% বাদ এরা সবাই আজ মমতার পিছনে। এমনকি মুসলীম লীগ অথবা সিপিএমে যারা মুসলমান নেতা ছিলেন তাঁরা গত নির্বাচনে মমতার দলের টিকিটে ভোটে দাড়িয়েছেন এবং জিতেছেন। তবু মমতা আজ পর্যন্ত কোথাও বলেননি যা তিনি করছেন তিনি সেটাকে সেকুলারিজম নাম দেয়ার কোনো ইচ্ছা করেন অথবা একাজকে সেকুলার বলে ডাকার দরকার আছে। গত রাজ্য নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের দিন নিজ দল আবার বিজয়ী হয়েছে জানার পরে মিডিয়া মন্তব্যের কোথাও এই বিজয়কে তিনি সেকুলারিজমের জয় বলার দরকার মনে করেননি। বরং বলেছেন, বিজেপি হিন্দুত্বের কথা তুলে সব কিছুকে ভাগ-বিভক্ত করে এটা তার অপছন্দ। আবার বিগত ২০১৪ সালে বর্ধমানে কথিত জঙ্গি বোমা ইস্যুতে মুসলমানবিদ্বেষী ও তৃণমূল বিরোধী যে মিথ্যা জঙ্গী-আবহাওয়া তৈরি করা হয়েছিল, বিজেপির অমিত শাহ তা করেছিলেন আর লজ্জার মাথা খেয়ে কংগ্রেস ও সিপিএম এতে তাল দিয়ে নিজের রুটি সেঁকার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় লাভ করেও ফলাফল প্রকাশের দিন তবুও তৃণমূল দল অথবা পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি সংযত আচরণ করেছে। বলেনি যে, মুসলমানেরা ‘এবার দেখিয়ে দিয়েছে’। ‘বর্ধমান ঘটনার প্রতিশোধ নিয়েছে’- এ ধরনের কোন ইঙ্গিতও প্রকাশ করেনি। মমতার দল ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতি বছর ২১ জুলাই দলের ১২ কর্মী হত্যার বিরুদ্ধে ‘শহীদ দিবস’ পালন করে থাকে। এবারের ২১ জুলাই দলীয় কর্মসূচিতে জনসভায় দেয়া মমতার বক্তৃতাকে মিডিয়া শিরোনাম দিয়েছিল, ‘ছাগল মুরগি খেলে দোষ নেই। গরু খেলেই দোষ!”। ” কেউ নিরামিষ খান। তাই বলে যারা আমিষ খান, তাদের আক্রমণ করবেন?”। ” শাড়ি-ধুতিতে দোষ নেই। যত অপরাধ সালোয়ার-কামিজ আর লুঙ্গিতে?” এ ছাড়া নাম না ধরেই বিজেপির বিশেষায়িত দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক দলের (আরএসএস) সম্পর্কেও কথা বলেন মমতা। তিনি বলেন, ‘ভারতবাসী কী পরবে, কী খাবে- সেগুলো ঠিক করে দেবে একদল লোক?”। এসব বক্তব্যের ভেতর দিয়ে ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণা’র বিরুদ্ধে মমতার আপত্তি বুঝে নেয়া যায়। তবে এটা মমতাকে আদর্শ বলে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে এমন মনে করলে ভুল হবে। মমতার রাজনৈতিক ঝোঁকের ভেতরে ‘রাষ্ট্র হিন্দুত্বের ভিত্তিতে হতে হবে’ এমন চিন্তার বাইরে থাকার চেষ্টা আছে। এতটুকুই বলা হচ্ছে। তবে তা শেষে কোথায় যাবে তা এখনই বলতে চাওয়া ভুল হবে।
    ইতোমধ্যে মোদির বিজেপি ‘ঘর ওয়াপাসির’ পরে – গরু খাওয়া, জবাই ইত্যাদি নিয়ে আরেক তুলকালাম ‘গোরক্ষা কর্মসূচি’ চালিয়ে যাচ্ছিল। এখনও পর্যন্ত গরু খাওয়া, জবাই করা যাবে না – এটা কেন্দ্র বা মোদি সরকারের কোনো আইন নয়। কেবল মহারাষ্ট্রসহ আরো কিছু রাজ্যের আইনে তা সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ এটা স্থানীয় আইন; বাকি আর রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য তা পালনীয় নয়। কিন্তু মোদি সরকার বা খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ব্যাপারে সক্রিয় হয়েছে। আমাদের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে তিনি বিএসএফকে ‘গোরক্ষার’ পক্ষে উদ্বুদ্ধ করে গেছেন। যেসব রাজ্যে গোরক্ষার এমন আইন নেই, সেখানেও তা ঠেকাতে বিজেপি কর্মীরা মাঠে ‘গোরক্ষক’ সেজে নেমে জনগণকে নাজেহাল করছে। মধ্যপ্রদেশে দুই মহিলাকে তারা মাংস বহন করছিলেন এই অজুহাতে পুলিশের সামনেই তাদেরকে নির্যাতন-নাজেহাল করেছে। দিল্লির শহরতলির ভেতর চলাচলকারী ট্রেনে এমনকি ডিম – তা হাতে নিয়ে কোনো যাত্রী তা বহন করতে পারবেন কি না এটাও এখন ট্রেন কোম্পানি ও পুলিশের কাছে ইস্যু। তারা নজরদরি বসিয়েছে। অথচ ভারতের কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশন, নির্বাচন কমিশন অথবা উচ্চ আদালতে এসব হিন্দুত্বের দলের বিরুদ্ধে তাদের সেক্টোরিয়ান আচরণ এবং সম্প্রদায়গত বিভেদ বিদ্বেষ ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে েকশন নিবার সুযোগ আছে তা করছে না, কেউ সেখানে অভিযোগ করারও সাহস দেখাচ্ছে না। মানে হিন্দুত্বভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র এতই সেকুলার যে, অভিযোগ করার কাউকে আমরা দেখি না। উলটা দিকে বিজেপিকে থামানোর কেউ নেই। এটা প্রমাণ করে ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তি কত বেপরোয়া ও ডমিনেটিং। তাহলে?

    হঠাৎ গত ৬ আগস্ট থেকে কিছু উল্টা হাওয়া বইতে দেখা গেছে। খোদ নরেন্দ্র মোদি এ দিন নিজেই নিজের দলীয় ‘গোরক্ষকের’ বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাদেরকে ‘সমাজবিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘এরা বেআইনি কাজকারবারে জড়িত!’ “নিজেদের ‘কালো ধান্ধা’ ধামাচাপা দিতেই গোরক্ষকের মুখোশ পরে নতুন ব্যবসা শুরু করেছে।” মোদির কথায়, ‘এসব দেখে আমার প্রচণ্ড রাগ হয়।’ — অবাক করা হঠাৎ এই গেম চেঞ্জ? এটা কেন? ভারতের মিডিয়া আসন্ন উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনকে এর পেছনের কারণ বলে ব্যাখ্যা করছে। ওখানে ভারতের প্রকট জাতবর্ণের বিভক্তিতে ডুবে থাকা সমাজের দলিত- চর্মকার, ঋষি, কসাই, মাংস ব্যবসায়ী, গরু ব্যবসায়ী ইত্যাদিরা হল উত্তর প্রদেশের এক বড় সমাজ; আসন্ন ভোটে তাদের মন পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এদের ভোট ছাড়া নির্বাচন বৈতরণী পার হওয়া যাবে না টের পেয়েই নাকি মোদীর এমন হার্ট বদল। উত্তর প্রদেশ রাজ্যের জনবিন্যাস ও গঠনপ্রকৃতির দিক থেকে (জাতপাতের ধরনসহ) সাথে লাগোয়া বিহার রাজ্যের অনেক মিল। আর গত বছরের শেষে নভেম্বর ২০১৫, বিহারের নির্বাচনের সময়ও একই ভাবে ‘গোরক্ষা’ ইস্যু বিজেপি তুলেছিল ও চলছিল। কিন্তু ওই নির্বাচনে বিজেপির শোচনীয় পরাজয় ঘটে। বিগত ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় ধসের পরাজয় সেটা। ফলে সেই  আশঙ্কা মোদিকে স্পর্শ করেছে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই নির্বাচনে ভোট-রাজনীতিতে ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তিকে স্থায়ীভাবে না হলেও সাময়িকভা্েব দুর্বল কতে নির্বাচন করতে চাইছে বিজেপি। তবে আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে বিজেপির হার-জিত ভারতে বিজেপি শাসনের ভবিষ্যৎ নির্ধারক উপাদান হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকেই বলছেন, উত্তর প্রদেশের হার মোদির সরকারের আগামীতে ২০১৯ সালে পরেরবার সরকারে না আসার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    Goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখা এর আগে গত ১৪ আগষ্ট ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (১৫ আগষ্ট প্রিন্টে) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও পরিবর্তন সংযোজন ও এডিট করে আবার ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

  • নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা

    নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা
    গৌতম দাস
    ২৩ আগষ্ট ২০১৬, সোমবার

    নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা

     

     

    নেপালের রাজনীতিতে আবার কিছু উত্তাপ দেখা দিয়েছে। মাওবাদী নেতা ৬১ বছর বয়সী পুষ্পকমল দাহাল (প্রচণ্ড) আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আবার বলছি এ জন্য যে, তিনি নেপাল থেকে রাজতন্ত্র উৎখাতের নায়ক। রাজতন্ত্র উৎখাতের পর নেপালে ২০০৮ সালে এই মাওবাদী গেরিলা নেতা প্রথম নির্বাচিত ও পপুলার প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন । কিন্তু এর পরের ও সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে নেপালের ৫৯৫ জনের আসনের পার্লামেন্টে প্রাপ্ত আসন বিন্যাসে নেপাল রাজনীতিতে প্রধান তিনটা দলের অবস্থান ছিল, নেপালি কংগ্রেস ১৯৬ আসন, লিবারেল কমিউনিস্ট দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল বা সিপিএন (ইউএমএল) এর ১৭৫ আসন আর মাওবাদী কমিউনিস্ট ইউসিপিএন (মাওবাদী সেন্টার)-এর ৮০ আসন। এটাই চলতি   সংসদের আসন বিন্যাস। এভাবে মোট ৪৫১ আসন (৭৫% আসন) এই তিন দলের ভাগে আর বাকি ১৪৪টা আসন আরো প্রায় ২৭টা ছোট ছোট দলের (মাধেসি ও ত্বরাই অঞ্চলের দলসহ) মধ্যে বিভক্ত। ফলে এমন আসনবিন্যাস অনুসারে মূল তিন দলের প্রতি দুই দলের জোট হলেই সরকার গঠন সম্ভব। কারণ তাতে কোয়ালিশন অর্থে কোনো সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখানো সম্ভব। ২০১৩ সালের নির্বাচনের পর থেকে এর আগে দু-দু’বার কোয়ালিশন সরকার হয়েছিল, যা এবা্রেরটা নিয়ে তৃতীয়বারের কোয়ালিশন সরকার হল। প্রথমটা ছিল নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্বে লিবারেল কমিউনিস্টদের সমর্থনে সরকার গঠন । আর টিকেছিল ফেব্রুয়ারি ২০১৪ থেকে অক্টোবর ২০১৫ পর্যন্ত। যেখানে মাওবাদী ছিল বাইরে বিরোধী দলে। নেপালের প্রথম কনস্টিটিউশন অনুমোদিত ও গৃহীত হয়েছিল ঐ সরকারের আমলে, তবে প্রধান তিন দলেরই সক্রিয় জোটবদ্ধ সমর্থনে। এরপর ওই প্রথম কোয়ালিশন সরকার ভেঙে দ্বিতীয়বার কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়েছিল। সেবার তা হয়েছিললিবারেল কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে খাড়গা প্রসাদ অলিকে প্রধানমন্ত্রী করে  আর মাওবাদী কমিউনিস্টদের সমর্থনে, যা টিকেছিল গত ২৪ জুলাই ২০১৬ পর্যন্ত মাত্র ৯ মাস। আর সেখানে নেপালি কংগ্রেস ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দলে ছিল। আর এবার আবার মাওবাদী নেতৃত্বে আর নেপালি কংগ্রেসের সমর্থনে সরকার গঠন হয়েছে, আর লিবারেল কমিউনিস্টরা আছে ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দলে। অর্থাৎ সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে কারো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় ঝুলন্ত পার্লামেন্ট তৈরি হওয়ায় এটা স্বাভাবিক যে এ পর্যন্ত তৃতীয়বার কোয়ালিশন সরকার দেখা হয়ে গেল।

    গত ৪ আগস্ট ২০১৬ মাওবাদী নেতা ৬১ বছর বয়সী পুষ্পকমল দাহাল প্রচণ্ড প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এর আগের দিন পার্লামেন্ট ভোটে এই নেতা দাহাল, কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন লাভ করেছিলেন। কিন্তু সরকার বদলের ঘটনায় আনসিন বা অদেখা অংশে কী ঘটেছিল?
    বলা হয়ে থাকে নেপালের প্রধান তিন দল নেপালি কংগ্রেস, লিবারেল কমিউনিস্ট দল সিপিএন (ইউএমএল) আর মাওবাদী কমিউনিস্ট ইউসিপিএনের মধ্যে ভারত নিজের দিক থেকে সে যার ওপর সবচেয়ে খাপ্পা সে দল হলো বিগত প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রসাদ অলির লিবারেল কমিউনিস্ট। ভারতের এক থিংকট্যাংক জাতীয় সংগঠন যার নাম  “সাউথ এশিয়া অ্যানালাইসিস গ্রুপ”। তাদের রাগ-ক্ষোভ পাঠ করে আমরা ব্যাপারটাকে বুঝতে চেষ্টা করব। নেপালের রাজনৈতিক পরিবর্তনে মাওবাদী দাহাল সরকার শপথ নেয়ার দিন ছিল গত ৪ আগস্ট আর ওই দিন প্রকাশিত হয় ড. এস চন্দ্রশেখরের নামে একজনের লেখা তাদের এই রিপোর্ট। বিগত প্রধানমন্ত্রী অলি সম্পর্কে তিনি লিখছেন, “অলি ছিল তিতা। (বলতে চাচ্ছেন পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী অলির সমাপনী বক্তৃতার ভাষা ছিল তিতা) তাঁর তিতা হওয়ার কারণ আছে। কারণ নেপালি কংগ্রেস আর মাওবাদী দুই দলই তাকে নিচু করেছে, নিচু দেখিয়ে ছেড়েছে। অলি বলেছেন, যেভাবে তার সরকারকে নামানো হয়েছে এটা নীতিবিহীন ও তা কাম্য ছিল না”। লেখক চন্দ্রশেখর নেপালের সংসদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলির দেয়া ১১০ মিনিটের সমাপনী বা শেষ বক্তৃতার কথা বলছিলেন। চন্দ্রশেখর বলছেন, ‘সবাই অলিকে অদক্ষতা ও অযোগ্য শাসকের অপবাদ দিয়ে ক্ষমতা থেকে নামিয়েছে অথচ এসবই আগের সব সরকারের ব্যর্থতার ফসল”। না, চন্দ্রশেখর সবটা ঠিক বললেন না। কারণ, নেপালের বিরুদ্ধে চালানো ভারতের সাড়ে চার মাসের সড়ক-রফতানি অবরোধের কারণে বাজারে জ্বালানি তেলের যে কালোবাজারি তৈরি হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে অলি সরকার কড়া অ্যাকশন নিতে সক্ষমতা দেখাতে পারলে জনগণের কিছু কষ্ট লাঘব নিশ্চয়ই করা যেত। কিন্তু সরকার তা পারেনি। এটা তো অন্যের সরকারের আমলের কাহিনী না। ফলে অলি সরকার যার সমর্থনের সরকার ছিল, সেই মাওবাদীরা আগেই কয়েকবার অলি সরকারের এই অযোগ্যতার কঠোর সমালোচনা করেছিল, সরকারকে সাবধান করেছিল। আসলে চন্দ্রশেখর যেন বলতে চাইছেন অন্যেরা অলি সরকারের বিরুদ্ধে যা অভিযোগ এনেছিল সেগুলো ভুল। বরং চন্দ্রশেখর বিগত অলি সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বিশেষ অভিযোগ আনতে চান যে অভিযোগগুলোি একমাত্র সাচ্চা। খোঁচা মেরে তিনি বলছেন, “অলির যদি নেপালের রাজনীতিতে কোনো অবদান থাকে তা হল, তিনি নেপালের রাজনীতিকে পাহাড়ি আর মাধেসি বলে পুরোপুরি দুই ভাগে বিভক্ত করে ছেড়েছেন”। এই বয়ানেও চন্দ্রশেখর ভারতের সব আকামের দায় আবর্জনাও অলির মাথায় ঢেলে দেয়ার চেষ্টা করলেন। ফ্যাক্টস হল, ভারতের অবস্থা এখন সব হারিয়ে কাশ্য গোত্র। ভারতের ভুল নীতির কারণে নেপালের প্রধান তিনটা দলের সাথেই ভারতের কাজের সম্পর্ক অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে ভারতের স্বার্থ তাদের মধ্য দিয়ে এই তিন দলের কোন একটার ভিতর দিয়ে পার করে আনার ন্যূনতম সুযোগ সেখানে আর ভারতের জন্য অবশিষ্ট নেই। ভারত তাই সব হারিয়ে কম বা ছোট প্রভাবের মাধেসিদের দলগুলোকে একমাত্র ভরসা করতে গিয়েছে। এই নিরুপায় অবস্থা এটাই ভারতের ভালনারেবিলিটির প্রকাশ।  আবার সেসব ছোট দল গুলোকেও প্রভাবিত করেছে যাতে তারা সব ধরনের চরম আপসহীন লাইন ধরে। যাদেরকে কেবল সবকিছুতে ‘মানি না’ বলতে পারাটাকে অর্জন বলে বুঝানো হয়েছে। অথচ শেষ বিচারে অপরাপর নেপালি জনগোষ্ঠির প্রতিনিধির সাথে একটা কার্যকর কাজের সম্পর্কে পৌছানো, নিগোশিয়েশন এখানেই তাদের আসতে হবে। এরা জানে না, নিজের স্বার্থ আদায় অর্জনের পথ কোনটা। ভারত সাড়ে চার মাসের  তাদের সহায়তায় অবরোধ চালিয়েছে। এভাবে চলে অবস্থা এখন এমন যে মাধেসিদেরও নেপালের রাজনীতিতে তাদের যতটুকু গুরুত্ব ছিল তা খুইয়ে তাদের পথে বসিয়ে ছেড়েছে ভারত। ভারত এখন নিজের সব আকামের ফলাফল থেকে হাত ধুয়ে ফেলে এর সব দায়ও অলির ওপর চাপাচ্ছে।
    চন্দ্রশেখর এর পরও বলছেন, ‘আমিই বরং আমার আরো কিছু নিজের গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ অলির ওপর চাপাব।’ বলছেন, অলি নাকি “ভারত-নেপাল সম্পর্কের ওপর আর কিছুতেই কাটানো যাবে এমন কিছু ক্ষতি” করে ফেলেছেন। চন্দ্রশেখরের দাবি, “আগামীতে অলিকে সবাই স্মরণ করবে ভারতের ওপর নেপালের অতি নির্ভরতা কমানোর উদ্যোক্তা পিতার ভূমিকার জন্য এবং চীনের সাথে সম্পর্কের রাস্তা খোলার জন্য। যদিও এটা সম্ভবত খুব একটা সফলতা দেখাতে পারবে না। তবে তার উদ্যোগ নেপালে প্রশংসার চোখে দেখা হবে”। অর্থাৎ মনে চরম ক্ষোভের কথা কিছু মিষ্টি শব্দে প্যাঁচ দিয়ে হাজির করলেন তিনি। চন্দ্রশেখরণের এই মন্তব্য নিয়ে খুব কিছু বলার নেই, কারণ এটা প্রকারান্তরে ভারতেরই আপন দোষ স্বীকারের আর স্বব্যাখ্যাত ধরনের। তবে ভারত নিজেকে আত্মজিজ্ঞাসায় ফেলার, নিজ দোষ মূল্যায়নের একটা এক্সারসাইজ করে দেখতে চাইলে তা করার সুযোগ নিতে পারে। আমাদের সিপিবি বা মেননের গোত্রের স্ট্যান্ডার্ডের এক লিবারেল কমিউনিস্ট দল হল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অলির দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট লেলিনিস্ট)। ভারত এমন কী নীতি নিল যে, কেন এরা এমন চরম ভারতবিরোধী হয়ে গেল, নেপালের অতি ভারতনির্ভরতা কমানোর আর চীনের সাথে যেচে সম্পর্ক গড়ার নায়ক হয়ে গেল? অথচ এরা তো নামেই কমিউনিস্ট কিন্তু আজীবন এরা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়া দূরে থাক, রাজতন্ত্রের অধীনে আইন মানা এক নির্বাচনী দল ছিল মাত্র। সেই দল কেন কিসের ফেরে পড়ে এমন ভারতবিরোধী রেডিক্যাল অবস্থানের দল হয়ে গেল? ভারতের থিংকট্যাংক ওয়ার্কিং অ্যাকাডেমিকদের এর জবাব সবার আগে নিজেকে নিজে দেবেন। একমাত্র এরপরই তাদের উচিত হবে তাদের সরকারকে কোনো পরামর্শ দেয়া। তাই নয় কী! মনে রাখতে হবে, আমরা অলির দলের কথা বলছি। আমরা মাওবাদী দাহালের কথা বলছি না। যেটা হলে সহজেই এরা নিজেদের বেকুবি আড়াল করতে পারতেন আর এসব অ্যাকাডেমিকদের পণ্ডিতি ফলানো সহজ হতো হয়তো।
    এটা কমবেশি এখন পরিষ্কার যে মাওবাদী আর নেপালি কংগ্রেস জোটের বর্তমানের নতুন গঠিত সরকার আগামী ২০১৮ সালে নেপালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ভাগাভাগি পালা করে ক্ষমতায় থাকার এক চুক্তি করেছে এবং এর প্রথম টার্মে মাওবাদী দাহাল ক্ষমতা নিয়েছে। এ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী দাহালের সরকার ক্ষমতায় থাকবে আগামী ১১ মাস। চন্দ্রশেখরণ এবার তার লেখায় প্রধানমন্ত্রী দাহালের সমস্যা কী হবে তা নিয়ে কথা বলছেন। চন্দ্রশেখরণের ভাষায়, দাহালের সমস্যাঃ
    ১. “দাহাল কোনো ঐকমত্যের সরকার গড়তে পারবেন না। কারণ মাধেসি ইস্যুতে কনস্টিটিউশন সংশোধনের দরকারে অলির দল তাতে বাধা সৃষ্টি করবে”। কথাটা বদ-দোয়ার মত শোনালেও কথা সত্য সংসদের আসনের বিন্যাসের হিসেবে অলির দলের সমর্থন ছাড়া দাহালের পক্ষে এমন কোনো বিল পাস সম্ভব নয়। কিন্তু মজার দিক হলো, এর ভেতর দিয়ে মাওবাদী দাহাল এক গঠনমূলক ও সঠিক উদ্যোগ নেয়ার মত এবং যোগ্যতা দেখানোর মত এক রাজনীতির নেতা – একথা ভারতের এই অ্যাকাডেমিক স্বীকার করে নিচ্ছেন। আর তাহলে মাধেসি ইস্যুতে এবং মাধেসিদের বিরুদ্ধে দাহালের কোনো ক্ষোভ-ঘৃণা তো না-ই, বরং নিজ সমগ্র জনগোষ্ঠীকে একক রাজনৈতিক কমিউনিটিতে গড়ার কাজটা সম্পর্কে তিনি খুবই সচেতন, এমনটাই প্রমাণ হচ্ছে। মাধেসিরা অবরোধের সাড়ে চার মাসে ভারতের স্বার্থের পুতুলের ভূমিকাকে প্রধান করে ভারতেরই রাজনীতি করে গেছে। তবুও সেটা নিয়েও দাহাল তাদেরকে কোনো শাস্তি দিতে চান এমন মনোভাব নেই। এখন তাহলে বাকি থাকল অলির দল। সে ক্ষেত্রে অলির দল কেন মাধেসি ইস্যুতে শুধুই বিরোধিতা করবে? মাধেসিদের ওপর অথবা দাহালের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসায়? এটা খুব ভালো কনভিন্সিং ব্যাখ্যা হলো না। এটা আসলে ভারতের স্বার্থের খায়েশ হয় তো! যদি অলি খামাখা এক বিরোধী অবস্থান নেয় তবে সেটা ভারতকে নেপালি রাজনীতিতে ঢুকে পড়ার বা অনবোর্ড হওয়ার একটা অছিলা হয়ে হাজির হতে পারে? কিন্তু শকুনের বদ-দোয়ায় কি গরু মরে!
    ২. দাহালের দ্বিতীয় সমস্যা হিসেবে চন্দ্রশেখরণ লিখছেন, “দ্বিতীয়টা হলো ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন কমিশন ইস্যু”। একথা ঠিক, এবার প্রধানমন্ত্রিত্বে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার দাহালের আগ্রহের পেছনে অন্যতম কারণ এই ইস্যু।  চন্দ্রশেখরণ লিখছেন, “মাওবাদীদের সশস্ত্র রাজনীতি করার সময়ে ঘটা কিছু নিষ্ঠুরতার ঘটনা থেকে নিজেদের বেমালুম খালাস করিয়ে নেয়ার তাগিদ কাজ করেছে। এ ধরনের কয়েক হাজার মামলা থেকে সহজে এরা পার পাবে না”। এই উপস্থাপনও তো দেখা যাচ্ছে চন্দ্রশেখরের বদ-দোয়া দেয়ার।
    প্রথম কথা হল, নেপালের রাজনীতিতে বেইল হারানো, প্রভাব হারানো ভারত নিজেকে গোনায় ধরানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। খড়কুটোও আঁকড়ে ধরতে চাইছে। এমনকি তারা নিজের জ্ঞানবুদ্ধির ওপরও ভরসা রাখতে পারছে না। তাই নেপালের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কার কী দুর্বলতা বা ভুল আছে, সেগুলো খুঁজে খুঁজে ভারত তা ক্যাশ করার তালে নেমেছে। কিন্তু সেকাজেও তারা পটু নয়। যথেষ্ট হোম-ওয়ার্ক করে তারা নামে নাই। বরং নেপালের দলগুলো প্রতিহিংসার রাজনীতি করুক এটা কামনা করছে। যেগুলো আসলে কামনা না বদমানুষের বদ-দোয়া। এভাবে কারো কিছুই অর্জন হয় না। দিন চলে না, চলবে না। কারণ শেষ বিচারে জীবন খুবই ইতিবাচক। ভারতেরও এই সত্য আঁকড়ে ধরা উচিত।
    এবার প্রসঙ্গের আরো ভেতরে যাওয়া যাক। কথা সত্য যে, এই ইস্যুতে দাহাল বহু সময় উদ্বিগ্ন হয়েছেন। কারণ বিশেষ করে এই ইস্যু থেকে হিউম্যান রাইটের ভায়োলেশনের কোনো কেস বানিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত আইসিসিকে প্রভাবিত করতে ভারতের তৎপরতা আছে, যাতে দাহালকে যদি ফাঁসাতে পারে তবে শকুনের বদদোয়ায় গরু মরার মতো হয় ব্যাপারটা। ফলে ভারতের আঙুল ঢুকানোর আর খোঁচাখুঁচির খবর দাহাল পাচ্ছিলেন। ফলে তিনি এই ইস্যুটা ফেলে রাখা, হেলেদুলে গাফিলতি দেখানো অদক্ষতা করার বিরুদ্ধে বিগত সরকার অলির কাছে বৈঠক করে অসন্তোষ জানিয়েছিলেন। কিন্তু চন্দ্রশেখরণের এটাকে দ্বিতীয় সমস্যা বলে হাজির করতে গিয়ে – এর বয়ানে ভারতের বদ মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করে ফেলেছেন।
    চন্দ্রশেখরণ খেয়াল করেননি তিনি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন’ নিয়ে কথা বলছেন। কোন আদালতের বিচার নিয়ে নয়।  দক্ষিণ আফ্রিকার ডেসমন্ড টুটুর দেখানো এই পথ অবশ্যই এক ন্যায়বিচার ইনসাফের রাস্তা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা থেকে জাত। কিন্তু তা প্রচলিত আদালতের পথে নয়। কারণ এটা আজকাল সবাই মানেন যে, আদালতের পথেও ন্যায়ভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে প্রয়োজনীয় আরো অনেক কিছু মানবিক উপাদান উপেক্ষায় হারিয়ে যেতে পারে। তাই সবচেয়ে বড় কথা ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন’ কোনো ধরনের প্রতিহিংসার পথ নয়। যে্মন প্রতিহিংসা চন্দ্রশেখরণ তার এই পুরো রচনার ছত্রে ছত্রে হাজির রেখেছেন। ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনে একটা সত্য, তা সে যতই তিতা হোক তাকে সামনে আনতে হয় আর সেটি কমিউনিটির সব মানুষকে নিয়ে পুনর্গঠন করার পথ। কেবল আদালতে ধরে এনে শাস্তিই দিয়ে এটা অর্জন করা যাবে না। কষ্ট দেয়া আর কষ্ট পাওয়া এমন উভয়ের আত্মশুদ্ধি আর ক্ষত সারানো এক লম্বা প্রক্রিয়া এটা। একটা সামাজিক ও কমিউনিটি পুনর্গঠন এর লক্ষ্য। কোনো হিংসার বদলে প্রতিহিংসার শাস্তি  – এমন কোনো চেইন কোথাও তৈরি থাকলে তৈরি হয়ে গেলে তা ভেঙে দেয়াই এর লক্ষ্য। আর সোজা কথা আগে বলেছি, এটা কোনো আদালতের পথ নয়। তবে অবশ্যই ইনসাফ সন্ধানের পথ। এখন দাহালের সমস্যা দূরে থাক, সমস্যা আসলে চন্দ্রশেখরণের। তার মনে রয়ে গেছে যেন কোন আফালতের বিচার নিয়ে তিনি কথা বলছেন অথচ মুখে তিনি দাবি করছেন যে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনের কথা তিনি বলছেন। অথবা হতে পারে অজ্ঞতায় দুটাই তার চোখে একই ঠেকে। অথচ তিনি এর ভেতর এটা দাহালের ‘হোয়াইট ওয়াশ অব এট্রোসিটি’ আকাক্সক্ষা খুঁজছেন, দেখতে পাচ্ছেন? মানে একটা  ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনকে তিনি দেখছেন এটা নাকি নিষ্ঠুরতা থেকে হাত ধুয়ে ফেলে বেচে যাওয়ার উপায় হিসাবে। তার মানে ডেসমন্ড টুটুও তাই করেছিলেন। এটা তার উদ্দেশ্য ছিল বলে তিনি অভিযোগ করছেন। তার মানে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনে কি কেউ নিজেকে হোয়াইট ওয়াশ অব এট্রোসিটি করতে পারে? একথা বলে চন্দ্রশেখ্রণ প্রমাণ করলেন তিনি ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এর প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোন ধারণাই তাঁর নাই। অথচ এই পদ্ধতি হল, কেউ কাউকে যে কষ্ট দিয়েছে তা খোলা মনে নিজেই স্বীকার করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটা। শুধু তা-ই নয়, তা আবার এমন খোলা নিষ্পাপ মনে হতে হবে যেন তা ভিকটিমের মন ছুঁয়ে যায়। স্পর্শ করলে বুঝতে হবে খোলা মনে সব স্বীকার করেছে। তবেই ভিকটিম বা তার আত্মীয় স্বজনের মনের সব ক্ষোভ দূর হবে সব হিংসা-প্রতিহিংসা মিলিয়ে যাবে। এখানে পুরা প্রক্রিয়ায় কারো কোনো নিষ্ঠুরতার “হোয়াইট ওয়াশ” বা ধুয়ে আনা দেখার সুযোগ কোথায়? আসলে চন্দ্রশেখরের কথার মানে কেউ অপরাধ করেছে আর তিনি এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে নিজের জিঘাংসা চরিতার্থ ব্যবহার করতে চাইছেন। মন ভর্তি জিঘাংসা নিয়ে থাকলে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন কেউ মুখে যতই উচ্চারণ করুক না কেন তিনি বিষয়টিই বুঝবেন না। আসলে ভারতের বা সেই অর্থে চন্দ্রশেখরের সমস্যা হল, দাহালের ওপর প্রতিহিংসার শাস্তি দেয়ার সুযোগটি হারিয়ে যাওয়ার জন্য তারা আক্ষেপ শুরু করেছেন। আর কেন দাহাল তাদের এই সুযোগ দিচ্ছে না, এতেও দাহালের দোষ খুঁজছেন। সত্যিই অপূর্ব মানুষের জিঘাংসা মনের প্রতিহিংসা!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    Goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় গত ৭ আগষ্ট ২০১৬ অনলাইনে (প্রিন্টে ৮ আগষ্ট ২০১৬) ছাপা হয়েছিল। তা আবার আরও এডিট ও সংযোজন করে এখানে আবার ছাপা হল।]

     

  • যখন ভয়ে মানুষ যেচে সত্য কথা বলে

    যখন ভয়ে মানুষ যেচে সত্য কথা বলে

    গৌতম দাস
    ১৪ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার
    http://wp.me/p1sCvy-1uG

    গত ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান কাফের ঘটনা দেশি-বিদেশি সকলকে ব্যাপক নাড়া দিয়েছে। সিএনএন, বিবিসি আর আল-জাজিরা এই তিন আন্তর্জাতিক নিউজ চ্যানেল পুরা দশ ঘন্টা জুড়ে সমানে কভার করাতে, এছাড়া সময়ে লাইভ ব্রডকাস্ট করাতে সারা দুনিয়ায় খবরটা এত ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা যায়। এতদিন যে যা নিয়ম-নীতি মেনে অথবা কোন কিছুই না মেনে বেপরোয়াভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এই ঘটনা এবার এমন সবাইকে অভিমুখ বদলাতে, বিষয়টা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। এর মূল কারণ সম্ভবত এটা আলকায়েদা বা আইএস ধরণের ততপরতায় ভারতীয় উপমহাদেশের কোন দেশের উপর প্রথম হামলার ঘটনা। যা এর আগে দেখা যায় নাই। ভারতীয় মিডিয়া এই হামলার ঘটনাকে গত ২০০৮ সালের তাদের বোম্বাই হামলার সাথে বার বার মিলিয়ে দেখাতে চেয়েছে। প্যারালাল টানার চেষ্টাও করছিল। ভারতের মিডিয়ার এই অক্ষম প্রচেষ্টা ২০০১ সালের ৯/১১ এ টুইন টাওয়ারে হামলার সময় থেকে করে আসছে। অথচ বোম্বাই হামলা – হামলার ঘটনা হিসাবে অনেক ঘটনার সাথে মিললেও আমাদের মনে রাখতে হবে ভারতের ক্ষেত্রে এই ধরণের ঘটনাগুলোর উৎস কাশ্মীর কেন্দ্রিক যা কোন আন্তর্জাতিক ঘটনা না, বড় জোর হয়ত তা আঞ্চলিক ঘটনা বলে দাবি করা যায়। আর তার চেয়েও বড় কথা কাশ্মীর ইস্যু বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ধরণের ক্যাটাগরির ঘটনা। নিশ্চয় আমাদেরকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আর গ্লোবাল ইসলামি ফেনোমেনা যা পশ্চিমের চোখে “আন্তর্জাতিক টেরর মুভমেন্ট” – এর তো ফারাক টানতেই হবে। আসলে দুই ধরণের ঘটনাকে মিলিয়ে গুলিয়ে মিডিয়ায় দেখানোর চেষ্টা ভারতের পররাষ্ট্র নীতির কৌশল মাত্র। এটা দোষের নয় হয়ত, নিজের বয়ান খাড়া করার জন্য অনেক রাষ্ট্রই এমন করে থাকে। তবে স্বভাবতই এমন বয়ানের খাতক সবাই হবে এমন আশা ভারতের মিডিয়ার না থাকাই ভাল। সবাইকে এটা মেনে নিতেই হবে তাও নয়। অন্যদিকে যারা আইএসের উপস্থিতির বিষয়টা যে কোন উদ্দেশ্যে অস্বীকার করে যাচ্ছিল, বলা যায় এরা সবাই এর পরিণতির দিকটা উপেক্ষা করে এক ধরণের বেপরোয়া চলছিলেন একথা সত্যি হলেও তাদের কাছে সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারটা অজানা ছিল তা নয়। অথচ সকলেই একটা ভান কর গেছে যেন তারা এমন একটা কিছু ঘটবে বা ঘটতে যাচ্ছে জানতেনই না। অথবা অবস্থান হল যে দেখি না আগে বাস্তবে ঘটুক, ততদিনে আর একটু বেশিক্ষণ সুবিধাদি খেয়ে নেই। এজন্য এরাই হামলার ঘটনা ঘটবার পরেপরেই একেবারে উলটা গান ধরেছে, সব ছেড়ে ভদ্র সভ্য হবার চেষ্টা করছে,সেই সুবিধা খাওয়া শক্তি। হামলার ঘটনার শুরু পয়লা জুলাই রাত প্রায় পোনে নয়টা। তবে বাংলাদেশে এই প্রথম জিম্মি করার ঘটনা বলে ঘটনার ব্যাপকতা ও গভীরতার দিকটা বুঝতে সকলের সময় লেগেছিল। প্রায় রাত দশটার আগে কেউই ঘটনার মাত্রা ঠাহর করে বুঝতে সক্ষম হন নাই। এরপর সারারাত ধরে উতকন্ঠা শেষে জিম্মি উদ্ধার একশন অভিযান শুরু হয় সকালে অর্থাৎ ২ জুলাই সকাল সাতটা চল্লিশ মিনিটে। তাতে কী ঘটল সকালে, ফলাফল কী দাড়াল – সকাল দশটার আগে এর নিউজ মিডিয়ায় আসে নাই। তবে এরপর থেকে দিনভর ক্রমশ পরিস্কার হতে থাকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ।
    পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা ইদানিং মানে, গত কয়েকমাস ধরে বাংলাদেশের ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগী হয়ে উঠেছে। আগেকার দিনে দৈনিক পত্রিকা বলতে আমরা প্রিন্ট পত্রিকাই বুঝতাম। কিন্তু সেগুলো সবই এখন একই সাথে অনলাইনও হয়ে উঠেছে। অনলাইন মানে আগে যেমন ছিল, প্রতিদিনের খবর পরেরদিন সকালে একসাথে প্রিন্ট হয়ে বের হওয়া সে নিয়ম-ছন্দ এখানে ভেঙ্গে ফেলা। দিনের ঘটনা দিনেই যখন ঘটছে প্রায় তখনই প্রকাশিত করে ফেলা হল অনলাইনের বিশেষ বৈশিষ্ঠ। এমনকি ঘটনা উদ্ভাসিত হয়ে ঘটা শেষ পর্যন্ত ডেভেলপিং স্টোরি হিসাবে ক্ষণে ক্ষণে একাধিক রিপোর্ট বের করে ফেলা যায় ও হয় এখানে। এটাও অনলাইন পত্রিকার আর এক বিশেষ বৈশিষ্ঠ। আনন্দবাজার অনলাইন শুধু হয় নাই, নিয়মিত সম্পাদকের বাইরে অনলাইন সম্পাদক বলে আলাদা লোক নিয়োগ দিয়েছে। বাংলাদেশের পাঠক টানার জন্য আনন্দবাজার দিনের শুরুতে সরাসরি পাঠকের মেলবক্সে অনলাইন পত্রিকার লিঙ্ক পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। আরও আছে। পত্রিকায় আগে যে সাব-ক্যাটাগরি হেডিং করা খবর পরিবেশন করত যেমন – কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গের জেলা, রাজ্য, কেন্দ্র এরপর বিদেশ এভাবে মোটা দাগের ক্যাটাগরিতে ভাগ করে। এবার এর পাশাপাশি –কেন্দ্র আর বিদেশের মাঝখানে ‘বাংলাদেশ’ বলে নতুন ক্যাটাগরি যোগ করা হয়েছে। প্রতিদিন অন্তত এক বা একাধিক বাংলাদেশ সংক্রান্ত খবর সেখানে তোলা হয়ে থাকে। আর থাকে নতুন নিয়োগ পাওয়া– সম্ভবত বাংলাদেশ পাতার ভার যার উপর সেই “অমিত বসুর” একটা রিপোর্ট। যদিও এটা রিপোর্ট না কলাম, তা নিশ্চিত কর বলা মুশকিল। তবে যেটা নিশ্চিত তা হল অমিত বসুর রিপোর্ট মানেই – প্রধানমন্ত্রী হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে, উন্নতি হচ্ছে, পাকিস্তানের চেয়ে আগে যাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় মধ্যে ভাল বিনিয়োগ হচ্ছে, ইত্যাদির ঢেডা পিটানো প্রশংসাসুচক রিপোর্ট। আর বলা বাহুল্য এসবের বিপরীতে ‘বিএনপি-জামাত’ এর নানান নেতিবাচক ফেনোমেনায় তাদেরকে ভিলেন বানানো থাকে। সবমিলিয়ে এই হল অনলাইন সম্পাদক অঞ্জন বন্দোপাধ্যায়ের লেখা তাঁর আলাদা সম্পাদকীয়সহ সাজানো অনলাইন আনন্দবাজার, বাংলাদেশ যার বিশেষ ফোকাস।
    শুরুতে যেকথা বলছিলাম, ০২ জুলাই সকাল দশটার পর থেকে জিম্মি উদ্ধার কাহিনী নিউজ হয়ে প্রচারিত হওয়া শুরু করেছিল। দুপুর তিনটা চল্লিশ মিনিটে আনন্দবাজার অনলাইনের বাংলাদেশ নিউজ সেকশনে একটা রিপোর্ট আপলোড করা হয়। শিরোনাম “মধ্য এশিয়ার অর্থই অনর্থ ঘটাচ্ছে বাংলাদেশে!” – যার লেখক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী। লেখাটা মন্তব্য প্রতিবেদন ধরণের বলা যেতে পারে। লেখার প্রসঙ্গ বিচার করলে বুঝা যায়, বাংলাদেশের জিম্মি ঘটনার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা কী হতে পারে সে সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা দেয়া এর উদ্দেশ্য। অথবা হয়ত লেখককে সম্পাদকের অনুরোধটা হয়ত এমনই ছিল।
    হোলি আর্টিজানের ঘটনায় ভারতের সংশ্লিষ্ট ইন্টারেষ্ট বা কনসার্ণ গ্রুপের কিছু সাধারণ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এর মধ্যে প্রধান কমন প্রতিক্রিয়া হল, স্বভাবতই ভয়ভীতি। এছাড়া এথেকে উতসারিত পরের প্রতিক্রিয়া হল – যতটা সম্ভব দুরত্ত্ব তৈরি করে দাঁড়ানো যাতে তা ভারত ‘অ-সংশ্লিষ্ট’ এই ভাব তৈরি করে। ভারত এসব ছুয়ে নাই তা দেখান। এর মূল উদ্দেশ্য ভারত এসবে সংশ্লিষ্ট না ফলে ভারত যেন বাংলাদেশের সাথে টার্গেট না হয়। হামলা যেন না ছড়িয়ে ভারতে প্রবেশ না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখা পদক্ষেপ। যেমন এব্যাপারটা সবচেয়ে প্রতীকী প্রতিক্রিয়ার রূপ হল, কোন স্পষ্ট ঘোষণা না দিয়ে অনির্দিষ্ট ও হঠাত করে ঢাকা-কলকাতা ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ ট্রেন বন্ধ করে দেয়া। সাদা চোখে এসব পদক্ষেপ হয়ত অস্বাভাবিক না। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে জায়গায় আজ এসে পৌছছে তা সে জায়গায় আনতে ভারতের বাংলাদেশ নীতির দায় আছে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে ভারতের নীতি অবস্থানকে সাথে নিয়ে দেখলে তা বুঝা যাবে। সেক্ষেত্রে বলা যায় এটা বাংলাদেশকে বিপদে ফেলে এখন পালিয়ে যাওয়া, সম্পর্ক ও দায়–হীন বলে হাত ধুয়ে ফেলা – এভাবে ভারতের নিজেকে হাজির করার চেষ্টা।
    উপরে ভারতের সাধারণ প্রতিক্রিয়া বুঝাতে প্রথম শব্দটা লিখেছে ‘ভয়ভীতি’। মানুষ ভয় পেলে বয়ান ১৮০ ডিগ্রী বদলে ফেলতে পারে তাই যেন বুঝা গেল সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরীর এই লেখায়। মোট ৬৭৬ শব্দের এই লেখার প্রথম ৫৩৮ শব্দ তিনি ব্যয় করেছেন ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদ ব্যাখ্যা করতে বা বলা যায় দায়ী করতে। বলা বাহুল্য সেটা এক অর্থনীতিবাদী ঝোকের ব্যাখ্যা। দুনিয়ার সব অঘটনের জন্য ‘পুঁজিবাদ দায়ী’ করা ধরণের। এছাড়া এই ব্যাখ্যা-ধারা বলতে চায় – দুনিয়ার ঘটনাবলী ঘটে নৈব্যক্তিকভাবে, বা ঘটবেই ধরণের। ফলে যেন মানুষ দায়ী না, ঘটনার কর্তাও সে নয়। অথবা কর্তা কেউ নয় ও নাই। এই ব্যাখ্যার ঝোক, ঘটনার কর্তা দেখতে পায় না বা চায় না। তবে লেখক সব্যসাচীর লেখায় ‘পুঁজিবাদ’ মূল প্রসঙ্গ নয়, বরং যা তিনি বলবেন এর পটভুমি রচনার উপাদান বলা যায়। কী তিনি বলবেন?
    এককথায় বললে তাঁর বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী। ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের এর হামলাকারিরা কোন কিসিমের মাদ্রাসা ছাত্র নয়। বরং একেবারে দেশ-বিদেশের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং তাঁরা উচু সমাজের সন্তান। এসব প্রকাশ হয়ে পড়ার পর অনেকেই ব্যাপক অস্বস্তিতে ভুগছেন। কারণ এতে ‘সন্ত্রাস’ বিষয়ে তাঁদের সব গালগল্প আর গরীব-ঘৃণা উদোম হয়ে গেছে। লেখক সব্যসাচীও তাদের একজন তবে একটু ভিন্নভাবে। সারকথায় বললে, তিনি বলতে চাইছেন, পুঁজিবাদের কারণে, মধ্যপ্রাচ্যে মাইগ্রেটেড লেবার গিয়েছে। সেই লেবাররাই বাংলাদেশের “জঙ্গীবাদ” সমস্যার জন্য দায়ী। সব্যসাচীর নিজের ভাষায় পড়েন, “……পাঠানো অর্থে তাঁদের পরিবারদের সমৃদ্ধ করে তুলছেন, তাঁরা কিন্তু নিজেরা দ্রুত আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন ওই দেশগুলোর স্বাভাবিক ‘আফিমের নেশা’ ধর্মীয় উন্মাদনায়, বাড়াবাড়িতে। দারিদ্র্য,অশিক্ষা বা অল্প শিক্ষার জন্যই এটা হচ্ছে। তাঁরা মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর কড়া ‘ডোজ’-এর মৌলবাদে আকৃষ্ট হচ্ছেন। আর যে বাংলাদেশিরা রুটি-রুজির টানে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে যাচ্ছেন, শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য তাঁদের তেমন নেই বলে (যাকে ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ বলা হয়) তাঁরা চট করে ওই ‘সোনার হরিণ’-এর টানে মজে গিয়ে ওই ধর্মীয় ‘আফিম’-এর নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ছেন। তাঁদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে ওই ‘আফিমের নেশা’ (মৌলবাদ) আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে”।
    প্রথমত, সব্যসাচীর ভুগোল-বোধে সমস্যা আছে। তিনি আসলে বলতে চাইছেন মিডল-ইষ্ট বা মধ্যপ্রাচ্যের কথা। কিন্তু শব্দে সেটাকে বলছেন, “মধ্য এশিয়া”। কিন্তু ইষ্ট মানে তো এশিয়া নয়, প্রাচ্য। যে অর্থে ওয়েষ্ট বলতে যেভাবে পাশ্চাত্য বুঝি। আবার সেন্ট্রাল এশিয়া বলে আলাদা রিজিয়ন আছে। বৃটিশ-ইন্ডিয়া কলোনি সাম্রাজ্যের যুগে যা আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্তের রুশ জার সাম্রাজ্য অঞ্চল। ফলে তিনি মধ্য এশিয়া বলতে সেন্ট্রাল এশিয়া বুঝাচ্ছেন কিনা পাঠক বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত সব্যসাচীর আর বাকী দিকটা হল, ইসলাম-বিদ্বেষ। আবার শুধু তাই না, বরং সাথে আছে শ্রেণী ঘৃণা। একেবারে “শিক্ষা,বংশ পরিচয়,সামাজিক কৌলিন্য” কথা তুলে তিনি ঘৃণা ছড়িয়েছেন। কিন্তু এতকিছু করেও সব্যসাচীর কোন লাভ হয় নাই। সব পানিতে পড়ছে। কেন? এই লেখা তিনি লিখছেন ২ জুলাই দুপুরে। আর্টজানের হামলাকারিদের “শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য” তখনও প্রকাশ হয় নাই। পরে পরিচয় প্রকাশিত হলে দেখা গেছে “হামলাকারি জঙ্গীদের” “শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য” অর্থাৎ হামলাকারিদের পারিবারিক পরিচয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগত পরিচয় সব্যসাচীরা নিজের জন্য যেমন কাম্য মনে করেন সেই একই শ্রেণীর অথবা সম্ভবত আরও উচু শ্রেণীর। অতএব বলার অপেক্ষা রাখে না সব্যসাচীর ঘৃণাতত্ত্ব বুমেরাং হয়ে ‘ধরা খেয়েছে’। ইংরাজিতে কথা বলা, স্বচ্ছল ঢাকার এলিটদের সন্তান, দামি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া যারা সম্ভবত সব্যসাচীর চেয়ে আপাদমস্তক আধুনিক তারাই আর্টিজান হামলাকারি। ফলে স্পষ্টত সব্যসাচীর গরীব ও মুসলমান-বিদ্বেষী অবস্থান এখানে সবার সামনে উন্মোচিত হয়ে গেছে।

    ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানো প্রথম ৫৩৮ শব্দের পরে সব্যসাচীর লেখার শেষ ১৩৮ শব্দ। এটাও ভীষণ কৌতুক কর। ঠাকুর ঘরে কে রে আমি কলা খাইনি – ধরণের। মানুষ অনেক সময় প্রচন্ড ভয় পেলে আগাম ও যেচে অনেক সত্য কথা বলা শুরু করে। এটা যেন তেমনই এক ঘটনা। সরাসরি সব্যসাচীর বক্তব্য উঠিয়ে আনছি, বলেছেন, “৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে যে ভাবে আদালতের নির্দেশের মাধ্যমে একের পর এক যুদ্ধাপরাধীকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হচ্ছে আর সে সব দ্রুত কার্যকর করা হচ্ছে, তাতে আমার মনে হয়, বাংলাদেশি যুব সমাজের কাছে এই বার্তা যাচ্ছে যে, হাসিনা সরকার প্রতিশোধস্পৃহায় ভুগছেন। তাঁরা এটা থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন যদি কোনও আন্তর্জাতিক আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হত বা বাংলাদেশি আদালতে ওই মামলাগুলোয় যদি অন্তত এক জন বিদেশি বিচারপতি রাখা যেত”।

    তার মানে সব্যসাচী একটা হামলা খেয়েই সাথে সাথে স্বীকার করছেন যে সরকার প্রতিশোধস্পৃহায় ভুগছে। এটা সত্যিই এক দেখার মত তামাশা। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ হয়েছে কথা সত্য, যা আইনী ভাষায় বললে, এটা আদালতে প্রমাণ করলে তা শাস্তিযোগ্য বিষয়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে অবিচার আর বেইনসাফি করা হয়েছে। তবে সেটাও তুলনায় খুবই ক্ষুদ্র বিষয়। এর তুলনায় এঘটনার ভিতর দিয়ে খোদ রাষ্ট্রের ভিত নাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, রাষ্ট্র আজ অন্যের দাস হয়েছে। রাষ্ট্র আজ ভেঙ্গে পড়ার দশায়। এটা আমার কথা নয়, প্রকারন্তরে এটাই আসলে সব্যসাচীই স্বীকার করছেন। তিনি এটাকে “সরকারের প্রতিশোধস্পৃহায়” করা কাজ বলছেন। তার মানে এখানে কোন বিচার হয় নাই, ‘প্রতিশোধস্পৃহায়’ করা কাজ হয়েছে। কিন্তু এঘটনাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ আউলিয়ে সব ধবংস হয়ে যাবার পর এখন সব্যসাচী এর কারেকশন খুজছেন। আদালতের স্টান্ডার্ড নিয়ে কথা তুলছেন। অর্থাৎ সাব-স্টান্ডার্ড আদালত ব্যবহার করা হয়েছে প্রকারন্তরে তা বুঝিয়েছেন। বলছেন, যদি “আন্তর্জাতিক আদালতে” বিচার করা হত এবং “বিদেশি বিচারপতি রাখা যেত” – এসব কথা বলছেন। তাহলে স্বভাবতই এখানে যে প্রশ্নটা নিরুত্তর থেকে যায় যে, এটা এতদিন তিনি আমাদের বলেন নাই কেন? এখন বলে তিনি কী হামলাকারিদের এক্টকে ন্যায্যতা দিলেন না? তবে এখানে একটা ফ্যাক্টস বলে রাখা ভাল। আর্টজানে হামলাকারিরা জামাত রাজনীতির খাতক না, এটা বলা যায়। কারণ আইএস খোদ তাদের মাসিক প্রকাশনাতে জামাতকে “মুরতাদ” মনে করে বলে জানিয়েছে।

    কিন্তু অবাক কান্ড যে আনন্দবাজার সব্যসাচীকে দিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করা ধরণের আর্টিকেলে কারেকশনের কথা বলে সেই আনন্দবাজারই আবার গত ৮ জুলাই এই অবস্থানের ঠিক উলটা কয়েকটা “পেজ ফর সেল” রিপোর্ট ছেপেছে। গত ৮ জুলাইয়ের বাংলাদেশ নিয়ে ছয়টার বেশি রিপোট ছেপেছে যার সবগুলাই “পেজ ফর সেল” ধরণের রিপোর্ট। অর্থাৎ আনন্দবাজার তার পত্রিকার পাতা বা জায়গা কোন বিশেষ গ্রাহককে বিক্রি করেছে। আর ঐ গ্রাহক ঐ পাতায় যা মনে চায় তাই লিখে ভরিয়েছে। এরপর আনন্দবাজার আবার তা ছাপলেও কিন্তু নিজে মনে করে গ্রাহক ঐ পেজে যা লিখেছে তার দায়দায়িত্ত্ব আনন্দবাজারের নাই। এই হল ‘পেজ ফর সেল’।

    গত ৮ জুলাই প্রকাশিত সেসব রিপোর্টের মধ্যে দুই দুখানা হল জমিদারি-রুস্তমি আমলের কিশোরগঞ্জের জমিদারদের জমিদারি চলে যাবার হাহুতাশ ও হাহাকার বিষয়ক। প্রথমত কিশোরগঞ্জ কেন? কারণ এবার ঈদের দিন শোলাকিয়া ঈদের জামাতকে টার্গেট করে সেই মাঠে পৌছানোর রাস্তায় পুলিশ চেকপোস্টে সশস্ত্র হামলা করা হয়েছিল। ফলে সেই সুত্রে কিশোরগঞ্জ এখানে বিষয়। কিন্তু কাদের দিয়ে আনন্দবাজার কিশোরগঞ্জ নিয়ে আর্টকেল লিখে ছাপাচ্ছে? কিশোরগঞ্জের জমিদারের দুই উত্তরাধিকারী। এটাই হল ইন্টারেস্টিং রগড়ের দিক। আমাদের অনেকের পরিচিত The Autobiography of an Unknown Indian বইয়ের লেখক নীরদ চন্দ্র চৌধুরীর পিতা ছিলেন কিশোরগঞ্জের নবগ্রামের জমিদার পরিবারের সন্তান। সেই নীরদ চন্দ্র চৌধুরী আবার এই শতকে বসেও পুর্ববঙ্গের মানে একালের বাংলাদেশের মুসলমানদেরকে বাঙালী বলে স্বীকার করেন না। এটা অবশ্য উনি একা নন, বৃটিশ কলকাতা হল জমিদারির আয় পয়সায় বেড়ে ঊঠা শহর। ভেঙ্গে বললে, বাংলার জমিদার-প্রজা সম্পর্কের কৃষি থেকে পাওয়া উদ্বৃত্ত লুটেরা সম্পদ পুঞ্জিভুত হয়ে যে শহর গড়ে উঠেছিল তার নাম কলকাতা। আর কলকাতায় এতে যে ধরণের চিন্তা, রাজনীতি, সাহিত্য সংস্কৃতি বা লাইফ ষ্টাইল যা গড়ে উঠেছিল এককথায় এটার প্রতীকী শব্দই “বাঙালী”। সেজন্য শব্দ হিসাবে কলকাতা ও বাঙালী প্রায় সমার্থক শব্দ। তবে এই বাঙালী ধারণাতে অবশ্যই আমরা পুর্ববঙ্গের কেউ অন্তর্ভুক্ত নই, গণ্য নই। আর ঐ কলকাতা বা বাঙালী – এটা জমিদার ঔরসের বাঙালি, বা সংক্ষেপে “জমিদার বাঙালি”। পুর্ববঙ্গের আমরা, আমাদের দুটা কথা এখানে মনে রাখা দরকার, এক. বাংলার জমিদার প্রজা সম্পর্কের কৃষির সেসময়ের শোষিত প্রজাদের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ট অংশ ছিল মুসলমান। আর দুই, ‘কলকাতা’ বা ‘বাঙালী’ প্রকল্প প্রজা মুসলমানদের বাঙালি মনে করতে না, স্বীকৃতি ছিল না। ফলে বলা যায় ‘জমিদার বাঙালি’ প্রকল্প খুবই ‘ক্লাস কনশাস’ প্রকল্প ছিল।

    সেই সুত্রে এজন্য নীরদ চন্দ্র চৌধুরি (১৮৯৭-১৯৯৯) নিজ জীবদ্দশায় গত আশির দশকেও আনন্দবাজার পত্রিকায় পুর্ব্বঙ্গের মুসলমানদের সম্পর্কে লিখেছিলেন “তথাকথিত বাঙালী”। সেই নীরদ চৌধুরির সন্তান হলেন ধ্রুবনারায়ণ চৌধুরী। আর নীরদ চৌধুরিরই আপন বড় ভাইয়ের মেয়ে হলেন কৃষ্ণা বসু। (কৃষ্ণা বসু নিজেই তার আর এক পরিচয় জানিয়ে বলেছেন তিনি, ভারতের প্রাক্তন লোকসভা সাংসদ এবং সুভাষচন্দ্র বসুর পরিবারের সদস্যা।) ধ্রুবনারায়ণ চৌধুরী এবং কৃষ্ণা বসু এরা দুজন আনন্দবাজার পত্রিকায় দুটো আর্টিকেল ছাপিয়েছেন গত ৮ জুলাই। তাদের বাপ-দাদাদের জমিদারি আমলে কিশোরগঞ্জে কত দুধ-ননীর নহর বয়ে যেত এরই বর্ণনা দিয়ে। এবারের ঈদের শোলাকিয়ায় হামলার বিরুদ্ধে তাদের মনে পড়ছে বাপ-দাদার কিশোরগঞ্জের কথা। তারা তুলনা করছেন বাপ-দাদাদের জমিদারির কিশোরগঞ্জ কত ভাল ও আদর্শ ছিল। যদিও দুজন মানছেন কিশোরগঞ্জ তারা দুজনই প্রায় কখনও যান নাই। আনন্দবাজারের এই প্রজেক্টটাই আসলে ইন্টারেস্টিং। যেন “জঙ্গীবাদ” খেদিয়ে আনন্দবাজার বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে আবার জমিদারি ফেরত আনার স্বপ্ন দেখছে! আমরা আজ জঙ্গীবাদের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি এর মানে কী পরিত্যক্ত পরাজিত জমিদারি ব্যবস্থা আমরা এখন ভাল মনে করব? আনন্দবাজারের ধারণা এটাই জমিদার নীরদ চৌধুরির উত্তরাধিকারদের দিয়ে হাহুতাশ ছড়ানোর ভাল সময়। তাই জঙ্গীবাদের চেয়ে জমিদারি শোষণ নিষ্পেষণ ব্যবস্থা ভাল ছিল এমন তুলনা ইঙ্গিত টানছে। অথচ আনন্দবাজারের কী খেয়াল রাখা উচিত ছিল না যে “জমিদারি” শব্দটা কলকাতায় না-বুঝা গৌরবের ভাবতে পারে। ওর বনেদিয়ানাকে কুর্নিস জানাতে পারে এমনকি তা কারো পেয়ারের হলেও বাংলাদেশ “জমিদারি” খুবই ঘৃণিত একটা শব্দ। আর কোন প্রজারই জমিদারের দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণের কথা না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আনন্দবাজারের চেষ্টা হচ্ছে পরাজিত জমিদারের দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখা কিশোরগঞ্জের বর্ণনা একালে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দেয়া। বাংলাদেশ মূলত মুসলমান প্রজাদের আবাসভুমি। বৃটিশ উপনিবেশ মাস্টারের কোলে বসে কিশোরগঞ্জের জমিদার নীরদচন্দ্র চৌধুরীরা কী মৌতাতে হুকায় টান দিতেন,ইংলিশ নাটক মঞ্চস্থ করতেন কী না এসব গল্পগুলো এপার বাংলাদেশ খাবে না। খাবার কোন কারণ নাই। বরং ক্রোধ হবার সম্ভাবনা।

    সবশেষে মুরোদ তত্ত্ব দিয়ে শেষ করব। দানব সরকারের বিরুদ্ধে যখন নিজের গুম খুন হয়ে যাওয়া অথবা সরকারের দাবরানির চোটে নিজের জান বাঁচাতে যখন নুন্যতম সরকার বিরোধীরা সবাই ব্যস্ত ঠিক সেই সময়টাই হল সবচেয়ে বিপদজনক। কেন? কারণ সেই সময় জনগণ মুরোদ ওয়ালাদের খুঁজে,তাদের মর্দানি দেখতে পছন্দ করে ফেলতে পারে। মানে দানব সরকারের বিরুদ্ধে যে কেউ সশস্ত্র সবল প্রতিরোধ করতে মুরোদ রাখে তাদের দেখতে পছন্দ করে ফেলতে পারে। অর্থাৎ ফাঁকা রাজনীতির কথা না “মুরোদ”। তাই এটা আমাদের সবার জন্য ভীষণ বিপদজনক সময়। অন্যভাষায় এটা তাই “জঙ্গীবাদ” জন্মাবার জাগবার সবচেয়ে ফেবারেবল সময়। এভাবে জঙ্গীবাদ জনগণের মৌন সমর্থন পেয়ে যায় ‘যদি’ সেটাই সবার জন্য সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক হবে। অনেকে এধরণের সময়কে নকশাল যুগ বলে। এটাই মুরোদ তত্ত্ব। আশা করি আমরা মুরোদ তত্ত্ব মনে রাখব।

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১০ জুলাই দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (১১ জুলাই প্রিন্টে)ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও পরিবর্ধিত ও এডিট করে ফাইনাম ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

  • শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা

    শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা
    গৌতম দাস
    ১৮  জুন ২০১৬

    শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা

     

    ‘শাঙ্গরি-লা ডায়লগ’ বা Shangri-La Dialogue। এটা প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় এমন একটি নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলনের নাম। পুরা নাম IISS Shangri-La Dialogue। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রায়.৫০ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক প্রধানদের নিয়ে সিঙ্গাপুরে এর আয়োজন হয়। তাদের মধ্যে আমেরিকা, চীন, জাপান, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ইত্যাদি ছাড়াও এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্য অনেক রাষ্ট্রও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। শাঙ্গরি-লা নামটা মূলত ইন্ট্যারনাশনাল এক চেইন হোটেল গ্রুপের। আর ওদিকে আইআইএসএস- ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। এটা ইংল্যান্ড ভিত্তিক এক থিঙ্কটাংক বা গবেষণা স্টাডি ধরনের প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ আইআইএসএস ও সিঙ্গাপুর সাংরিলা হোটেলের যৌথ উদ্যোগে ২০০২ সালে জন্মের পর থেকে সিঙ্গাপুরের শাঙ্গরি-লা হোটেলে প্রতি বছর এই নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন হয়ে থাকে। আর শাঙ্গরি-লা হোটেলে নাম থেকে শাঙ্গরি-লা শব্দটা ধার নিয়ে এই সম্মেলনের নামকরণ করা হয়েছে ‘শাঙ্গরি-লা ডায়লগ’। সে হিসাবে একইভাবে এবারের সম্মেলন শুরু হয়েছিল ৩ জুন ২০১৬ থেকে। চলেছিল রোববার ৫ জুন পর্যন্ত।

    হংকংয়ের সবচেয়ে পুরানা এক দৈনিক পত্রিকা হল, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। শাঙ্গরি-লা ডায়লগ প্রসঙ্গে তারা বিরাট রিপোর্ট ছেপেছে। যার মূল বক্তব্য হল, সম্মেলনের এবারেরও ফোকাস আবার সেই দক্ষিণ চীন সাগর। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে চীন ও আমেরিকা উভয়পক্ষ চাচ্ছে কোনো রেটরিক বা উচ্চবাচ্য থেকে যেন উত্তেজনা না ছড়িয়ে যায়। উভয় পক্ষ কোনোভাবেই চায় না যে সমুদ্রসীমা বিতর্ক চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে অচল ও তেতো বানিয়ে ফেলে।
    যেমন ওয়াশিংটনভিত্তিক এক থিঙ্কট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারনাশনাল স্ট্রাডিজ’-এর ড. বন্নি গ্লসার মনে করেন দক্ষিণ চীন সাগর সমুদ্রসীমা বিতর্ক ইস্যুতে চীন ও আমেরিকা প্রত্যেকেই নিজ অবস্থানে শক্ত হয়ে দাঁড়াবেন। কিন্তু কোনোভাবেই তারা উভয়েই এই মিটিংকে তাদের বিরোধ প্রকাশ বা প্রদর্শনের জায়গা বানাবেন না। গ্লসার বলছেন, “এ কথা সত্যি যে দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে আমাদের মৌলিক কিছু স্বার্থ সঙ্ঘাত আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনোভাবেই শাঙ্গরি-লা ডায়লগ আমাদের বিরোধে কোনো ফয়সালা আনার স্থান নয়”।
    ঐ রিপোর্ট লিখছে, “আমেরিকা চায় এই অঞ্চল শান্তি, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে তাকে বিবেচনা করুক ও তার ওপর আস্থা রাখুক। কিন্তু একইসাথে এ অঞ্চল চীন-আমেরিকার সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রভূমি হয়ে উঠুক এটাও চায় না। এটা আমেরিকা বুঝে। তাই শাঙ্গরি-লা ডায়লগে আমেরিকার প্রচেষ্টা থাকার কথা এ দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা”। একারণে আমরা দেখছি এই রিপোর্টের শুরুতে উপরে উধৃত এই লম্বা বাক্যটা আছে। কিন্তু তাতে একটা ছোট শব্দ আছে বাংলায় বললে তা হলো ‘আগলে ধরে রাখা’ বা ইংরাজিতে contain। বলা হচ্ছে চীন ও আমেরিকা দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে উত্থিত যেকোনো টেনশন আগলে ধরে রাখার পক্ষে পদক্ষেপ নিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে একমত হয়েছে।

    ঐ রিপোর্ট সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও চীন-আমেরিকার সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হুয়াঙ জিং কে উদ্ধৃত করেছে। তিনি বলছেন, “চীন-আমেরিকার বিরোধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে, এটা দাঁড়িয়ে দেখা উভয়ের কারও স্বার্থের পক্ষে যায় না”। হুয়াঙ শাঙ্গরি-লা ডায়লগের অর্গানাইজিং কমিটির একজন সদস্যও। তিনি ভিতরের তথ্য জানাচ্ছেন, “আসলে দক্ষিণ চীন সাগর টেনশনের ইস্যু সম্মেলনের তিন দিনের পাঁচ সেশনে কখনই আনা হবে না। এর বদলে বরং শেষের দুই দিনের অনুষ্ঠিতব্য যে ছয়টা সাইড মিটিং হওয়ার কথা তার কোন একটাতে এনিয়ে কথা হবে”। অর্থাৎ মূল আলোচনায় নয় পার্শ্ব-আলোচনার বিষয় হিসেবে সাউথ চায়না সি বিতর্ক রাখা হয়েছে। হুয়াঙ বলছেন, “চীন ও আমেরিকা উভয়েই চায় তাদের অবস্থানের মতভেদকে নিচুস্বরে নামিয়ে রাখতে এবং শাঙ্গরি-লা ডায়লগের হোস্ট সিঙ্গাপুরও চায় না যে তার আয়োজিত এই সভা দক্ষিণ চীন সাগরে ইস্যুর ভেতরে হাইজাক হয়ে যাক”। অবশ্য এখানে আর এক মজার তথ্য তিনি শেয়ার করেছেন। হুয়াঙ জিং বলছেন, দিনকে দিন নিজের দাবিনামা নিয়ে চীন যেভাবে সরব অগ্রসর হচ্ছে তাতে সেটাকে আমেরিকা কী করে মোকাবেলা করবে, মুখোমুখি হবে – এ প্রশ্নে আসলে খোদ আমেরিকাতেই ‘হোয়াইট হাউজ বনাম পেন্টাগনের’ মধ্যে বিতর্ক ও মতভেদ আছে। তবে সেই বিতর্ক ও মতভেদ থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কোনোভাবেই চীন-আমেরিকার পরস্পরের দিকে থুথু ছিটিয়ে ঝগড়া করুক তা হতে দেবেন না। কারণ আগামী সপ্তাহ থেকে চীন-আমেরিকার মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক “স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক ডায়লগ” অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটা উভয় রাষ্ট্রের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর সমন্বয়ের লক্ষ্যে প্রতিবছর নিয়মিত হয়ে আসছে। সেটার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাক ওবামা তা হতে দিতে পারেন না।
    তাই হুয়াঙ ও গ্লসার উভয়েই নিশ্চিত করে বলছেন, শাঙ্গরি-লা ডায়লগ অনুষ্ঠানে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী এস্টন কার্টার যে নির্ধারিত বক্তৃতা রাখার কথা আছে সেখানেও এস্টনের স্বভাবসুলভ গরম বক্তব্যও নিচুস্বরে হাজির করা হবে। যেমন এস্টন কার্টার এর আগে – চীন তার দাবির পক্ষে জোরাজুরি করতে গিয়ে ‘বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার এক গ্রেট ওয়াল’ রিস্ক নিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। চীন এই শাঙ্গরি-লা মিটিংয়ে কোন মন্ত্রী নয় বরং এক সামরিক কর্তা এডমিরাল সান জিয়াঙগুয়ের নেতৃত্বে যোগ দিয়েছে। ফলে এমন প্রশ্নের জবাবে, এডমিরাল সান সম্ভবত নিজেদের পুরানা অবস্থানই রক্ষা করে চলবেন। এসব দিক বিবেচনা করে গ্লসার বলছেন, ‘আমি মনে করি না যে, চীনা পক্ষের আগামীকালের বক্তৃতায় আমরা নতুন কোন কথা শুনব’। এই “সাংরিলা মঞ্চ নিজের পার্থক্য নিয়ে কথা বলার একটা খুবই ভালো জায়গা, কিন্তু আসলে একটা ভারসাম্য অবস্থা বের করে আনার পক্ষেই আমাদের কাজ। সে জন্য আমি মনে করি না যে এই সভা থেকে কোনো শক্ত কথার মার বা ধারালো রেটরিক কিছুই শুরু হবে না। বিশেষত যখন চীন-আমেরিকার মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক ‘স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক ডায়লগ’ অনুষ্ঠান যখন পরের সপ্তাহে”।
    এমন ঠাণ্ডা বাতাবরণ যে ইতোমধ্যে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এর আর এক লক্ষণ হল, ভিয়েতনামের ততপরতা। দক্ষিণ চীন সাগর সমুদ্রসীমা বিতর্কে চীনের সাথে একমাত্র ভিয়েতনামের সম্ভবত সবচেয়ে তিক্ত সম্পর্কটা হয়ে গেছে। সেই ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির নৌবহরকে ভিয়েতনামের কোনো এক পোর্টে নোঙর করে অতিথির বেড়ানো বেড়িয়ে যেতে দাওয়াত দিয়েছে। ভিয়েতনামের প্রতিরক্ষা দফতরের মুখপাত্র সুত্রে এটা জানা গেছে।
    সাউথ চাইনা মর্নিং পোষ্ট এই রিপোর্টের শেষে কিছু ছোট মজার মন্তব্য করেছে। যেমন ওই রিপোর্টে তথ্য দিয়ে বলেছে, “ভিয়েতনাম চীনা নৌবহরকে দাওয়াত দিয়েছে এমন সময় যখন ভারতের দুইটা যুদ্ধজাহাজ ভিয়েতনামের ‘ক্যাম রণ বে’ বন্দর গত বৃহস্পতিবার ত্যাগ করে গেছে। এ ছাড়া পোস্টের আর একটা মন্তব্য বাক্য, ‘দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে কিন্তু আমেরিকার মত ভারতেও কোনো দাবি বা স্টেক নেই; ফলে বিরোধ-বিবাদের সে কোনো পক্ষও নয়’।
    পোষ্টের এই মন্তব্যে অনেক কথা লুকানো আছে। সময়ের অভাবে সব এখানে আনার সম্ভব হবে না। শুধু ভিয়েতনাম চীনা নৌবহরকে দাওয়াতের এক ঘটনাই আবহাওয়া সম্পর্কে অনেক কিছুর নির্দেশক। অর্থাৎ গুমট পরিস্থিতির ভেতরে কোথাও থেকে একটা ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। না হলে এটা দাওয়াতপত্র পর্যন্ত গিয়েছে তা হতো না।
    তবে এখানে আমরা গত বছরের শাঙ্গরি-লা ডায়লগের কথা স্মরণ করতে পারি। সে সময়কাল প্রায় একই ছিল, ২৯-৩১ মে ২০১৫ সাল। ইস্যুও প্রায় একই। দক্ষিণ চীন সাগরের পূর্ব দিক পূর্ব চীন সাগর চীন সীমান্তের যার অপর পাড়েই জাপান। পূর্ব চীন সাগর  নিয়ে চীন ও জাপানের সমুদ্র সীমা বিতর্ক আছে। আমেরিকার উস্কানিতে জাপান  গতবার পূর্ব চীন সাগর ইস্যুকে তেতে উঠেছিল।  গত বছরের প্রথম থেকেই এই ইস্যু নিয়ে চীন-জাপানের বিরোধ বিবাদকে তাতিয়ে তুলে চলছিল আমেরিকা । কিন্তু এবারের মত একইভাবে গতবারও আমেরিকা জাপানকে গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নেয়ার অবস্থা করেছিল। বছরের শুরু থেকেই জাপানকে দিয়ে চীনের সাথে  ঝগড়ার মুখোমুখি করিয়ে যেন এখনই যুদ্ধ লেগে যাচ্ছে এমন এক অবস্থায় এনে শেষে শাঙ্গরি-লা ডায়লগে যখন উভয়ের মুখোমুখি হয়ে গেল তখন এখানে এসে পূর্ব চীন সাগর ইস্যুতে আমেরিকার পুরা উল্টো অবস্থান। ভোল পালটে মিটিংয়ে আমেরিকানরা এবার জাপানিজদের খালি জামা টেনে ধরা শুরু করেছিল। কি জানি যদি জাপানিজরা চীনাদের সাথে যদি ঝগড়া বাধিয়েই ফেলে তবে সেটা তো আমেরিকাকেও জাপানের সাথে মিলে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে যাওয়ার অবস্থায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে। আর পৌঁছালে তখন কী হবে? এই আসল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল আমেরিকা। অর্থাত এশিয়ায় আমেরিকার এই নীতির মূল কথা হলো যেন, কোন রাষ্ট্র বিরোধ ও স্বার্থসঙ্ঘাত দেখা দিলেই সেটাকে যুদ্ধের দিকে নিতে হবে, ঠেলে দিতে হবে। অথচ এটা তো কোনো কাজের কথা নয়। একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এমন নীতি বাস্তবায়ন অসম্ভব বলে একেবারে না করে দেয়া যাবে না। তবে এটা খুবই এক্সষ্ট্রীম পথ, সর্বশেষ অবলম্বন; সব পথ ফেল করার পর যা করা হয়। তাই গতবারের সাংরিলার পর আজ পর্যন্ত আমরা দেখছি খোদ জাপানসহ সবাই যেন ভুলে গেছে যে পূর্ব চীন সাগরে দ্বীপের মালিকানা নিয়ে চীনের সাথে জাপানের কোন ইস্যু ছিল।
    পাঠক কেউ যেন বুঝতে ভুল না করেন। তাই কিছু কথা পরিস্কার করে বলে রাখা ভাল। তা হল, এখানে উপস্থাপিত বক্তব্যে এটা বলা হচ্ছে না যে চীন এক মহাপরাক্রমশালী হয়ে গেছে ফলে জাপান ভিয়েতনাম ইত্যাদিরা যেন চীনকে ‘লাড়তে’ না যায়! এমন ওকালতি আমরা এখানে করতে বসিনি। চীনের পক্ষে এমন খেয়ে না খেয়ে এজেন্ট বা চীনের বিদেশনীতির ব্যাগ বহনকারী দালাল সাজার আগ্রহ আমাদের নেই। এর কোনো অর্থও হয় না।
    বিষয়টা হল, যুদ্ধ সম্পর্ক আমাদের দেখা বা জানা পুরানা ইতিহাসের অভিজ্ঞতার ভিতর ইতোমধ্যে এক ব্যাপক বদল ঘটে গেছে। বিশেষ করে এই সদ্য পেছনে ফেলা কোল্ড ওয়ারের কালের (১৯৫০-৯২) যুদ্ধ ধারণা। ঐ সময়ের যেকোনো দুই রাষ্ট্রের বিরোধ মানেই শেষ বিচারে আসলে তা সোভিয়েত-আমেরিকান মতাদর্শিক, রাজনীতি বা অর্থনৈতিকসহ সবকিছুতে স্বার্থবিরোধ সঙ্ঘাত। কিন্তু তবু কেবল একটা বিষয় ছাড়া সেসব বিরোধের অন্য সব দিক প্রায় সবই এখনকার মতোই । সে অমিলের দিকে সবার মনোযোগ দিতে বলব। কোল্ড ওয়ারের ওই সময়কালে যেকোনো সঙ্ঘাতের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল সেই স্বার্থবিরোধে সোভিয়েত অথবা আমেরিকা পরস্পর পরস্পরকে যুদ্ধের মাঠেই একমাত্র ফয়সালা করবে এভাবে ঠেলে দিতে পারত, সম্ভব ছিল। অর্থাৎ শত্রু মানেই নির্মূল। যেন একই কথা। নির্মুল ছাড়া শত্রু মোকাবিলা বলে আর কিছুই হতে পারেনা, এমন ধরেই নেয়া হত।  এটাই ছিল একমাত্র পথ ও লক্ষ্য। এর মাধ্যমেই যেকোনো বিরোধের মীমাংসা করতে হবে এটা সহজেই ভাবা যেত। কোনো স্বার্থবিরোধ দেখা দিলেই কূটনীতি বা ডায়লগের ন্যূনতম কথা বলার চেষ্টাও না করে তাকে শত্রু নিশ্চিহেৃর লাইনে ভাবা সম্ভব ছিল।
    এমন ভাবনার মূল কারণ, দুনিয়ায় তখন ছিল দুটো অর্থনীতি। যাদের মধ্যে আবার কোনো লেনদেন বিনিময় বলতে কিছু ছিল না, এমনিভাবে দুনিয়া দুই ধরণের অর্থনীতি ও পরস্পর সম্পর্কহীন হয়ে বিরাজ করত। কেউ কারও সাথে লেনদেন বিনিময়েওর সম্পর্কে নাই। কেবল দুইটা অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ নিজ নিজ ব্লকের ভিতর আলাদা আলাদা বিনিময় ব্যবস্থার এমন দুই জোটে বিভক্ত ছিল। ফলে একের বোমা হামলায় অপরের অর্থনীতি ও প্রাণসহ বৈষয়িক সব কিছু নিশ্চিহৃ হয়ে গেলেও তাতে বোমা আক্রমণকারীর কোনোই ক্ষতি ছিল না। যেমন, আমেরিকা পক্ষের কোনো পুঁজি পণ্য লেনদেন বিনিয়োগ অপর সোভিয়েত ইউনিয়নে কোথাও বি-নিয়োজিত ছিল না। ফলে সারা সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বংস হয়ে গেলেও তাতে এর লেনদেন বিনিয়োগ প্রভাব আমেরিকায় পড়বে না। রাশিয়ায় কোনো আমেরিকান বিনিয়োগকারীই ছিল না বলে আমেরিকারই ফেলা বোমায় কোনো আমেরিকান বিনিয়োগ নষ্ট হবে এমন কোনো সম্ভাবনা ছিল না। আর একালে ঠিক এর উলটা। দুটো অর্থনীতি বলতে দুনিয়ায় এখন কিছু নেই, বরং আছে একটাই, একই গ্লোবাল পুজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা। ফলে এখন চীনে আমেরিকা বোমা ফেললে তাতে অবশ্যই কোনো না কোন আমেরিকান বিনিয়োগ বা অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপরই সে বোমা পড়বে। একারণে রাষ্ট্র স্বার্থবিরোধে একমাত্র যুদ্ধই করতে হবে, যুদ্ধে ফয়সালা করতে হবে অথবা এটাই একমাত্র সমাধানের পথ একথা আর সত্য নয়, বাস্তবতাও নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের (১৯৯২) পরে অথবা কোল্ড ওয়ার যুগের সমাপ্তিতে এটাই আমাদের যুদ্ধ ও স্বার্থ ধারণায় ইতোমধ্যেই এক বিরাট পরিবর্তন এনে দিয়েছে। যদিও তা আমরা অনেকেই টের পাইনি অথবা কিছু হলেও অনেকেই পেয়েছেন।
    অথচ এই নতুন বাস্তবতাতেও সবাই আমাদের চোখে পট্টি পড়াতে চাচ্ছে। সবাই আমরা একালের স্বার্থ বিরোধকে সেকালে কোল্ড ওয়ার কালের চোখ দিয়ে দেখগাতে চাচ্ছে। পুরনো চশমায় যুদ্ধ পরিস্থিতি বুঝার কল্পনা করার চেষ্টা করছি। অথচ এটা ভুল, অবাস্তব। বরং এভাবে আমেরিকা যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে নিজের যুদ্ধ বা স্ট্রাটেজিক জোটের খোলে ছোটবড় দেশকে তুলে নিতে চাচ্ছে। আর বুঝে না বুঝে এতে তাল ধরেছে ভারত। চীনের সাথে যেন ভারতের যেন একটাই সম্ভাব্য সম্পর্ক  – যুদ্ধ। আমেরিকা প্রতিবারই সারাবছর চীনের বিরুদ্ধে সে এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর জন্য খুবই একটা দরকারি শক্তি এটা প্রমাণ করতে গরম অবস্থা তৈরি করে থাকে। কিন্তু শেষে শাঙ্গরি-লা সম্মেলন এলেই তাকে ক্ষেমা দিতে হয়। কারণ এটা ডায়লগের আসর। ডায়লগের আসরে হুমকি চলে না। আর যদি যুদ্ধ লেগে যায় সেটা হবে – দেশ ভিন্ন, কিন্তু  সেই ভিন দেশের কোন না কোন আমেরিকান বিনিয়োগ এর উপরে তাহলে আমেরিকাকেই বোমা মারার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমেরিকা জানে এটা এবসার্ড, এটা সে করতে পারে না। এখন কথা হল শাঙ্গরি-লা ডায়লগ এলেই সব ঠাণ্ডা পানি ঠেলে দেয়া হয় কেন? ঠাণ্ডা পানিই যদি বাস্তবতা হয় তবে ভুয়া গরম সৃষ্টি করা আমেরিকার ও তার সাগরেদদের দিক থেকে এক মারাত্মক দায়িত্বহীনতা। আর এমন সাগরেদ হয়ে ভারতের নিজ জনগণকে মিথ্যা বলছে, প্রতারণা করে চলছে – কোল্ড ওয়ার যুগের মত মিডিয়া গরম করে বলে যাচ্ছে – চীন এই নিয়ে গেল সেই নিয়ে গেল। চীন ভারতের সব উন্নতির পথে বাধা! অথচ কে না জানে এটা কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫০-১৯৯২) দুই অর্থনীতির সম্পর্কহীন  লেনদেন হীন সময় নয়। এখানে দুই রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধ প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বীতা সবই আছে।, আবার চীন-ভারতের ঘনিষ্ঠ  বছরে ৭৩ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন আছে। কারণ তারা একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অন্তর্গত একই অর্থনীতির দুই অংশ মাত্র। যে কারণে ঐ চীনকেই আবার মোদির “বিকাশের প্রোগ্রামের” ভারত , নিজেরর আগামির জন্য নতুন পাচ শহরের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব দিয়ে চুক্তি করেছে। আমরা নতুন ধরণে যুগে প্রবেশ করে গেছি। একে বুঝতে আমরা যেন অন্তত আশির দশকের কোল্ড ওয়ারের ধারণা ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করতে না যাই। কারণ ওটা অচল, আনফিট।
    লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে ০৬ জুন (প্রিন্টে ০৭ জুন) ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ওয়েবে প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তা আবার পরিবর্ধিত ও এডিট করে আবার ছাপা হল।]

  • স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস

    একা ভারত এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস
    গৌতম দাস
    ০৭ জুন, ২০১৬

    স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস

    যুদ্ধে প্রথম পারমানবিক বোমা ব্যবহারের অভিজ্ঞতা আমেরিকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ফলাফল আমেরিকার পক্ষে আসন্ন এটা নির্ধারিত হয়ে উঠার পরও আমেরিকা ১৯৪৫ সালে এই বোমা জাপানের উপরে ব্যবহার করেছিল। এমন করার পিছনের কারণ যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে এর ব্যবহারের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাখা এবং এর ভয়াবহতার মাত্রা কেমন হয় সেটাও বুঝে রাখতে। বলা বাহুল্য কোন হুশজ্ঞানওয়ালা চিমটি কাটলে লাগে টের পায় এমন মানুষের জন্য সেটা খুবই খারাপ ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। সম্ভবত সেটাই এরপর থেকে আজ পর্যন্ত  দুনিয়া আর কোথাও এই অস্ত্রের ব্যবহার আমরা আর দেখেনি। কিন্তু এসব বাজে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তবু বিভিন্ন রাষ্ট্রের পারমানবিক অস্ত্র অর্জন এবং ভান্ডারে রাখার আগ্রহ কমাতে পারে নাই। বিগত ১৯৭৬ সালের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান পারমানবিক বোমা অর্জন করে ফেলেছিল। এটা উপমহাদেশীয় বা একদিকের পরিস্থিতি। কিন্তু ততদিনে অন্যদিকে অর্থাৎ পশ্চিমে বা কোল্ড ওয়ার লড়ার দুই মাতবর আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দুনিয়ার পরিস্থিতি তাদেরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে – এটা বিপদ বুঝতে পেরে গিয়েছিল।  তাই, পারমানবিক অস্ত্র আর ব্যবহার করবে না বলে পরস্পর পরস্পরের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক চুক্তি স্বাক্ষর দিয়ে ফেলেছিল।  এটাই Non-Proliferation Treaty অথবা NPT – সেই আন্তর্জাতিক চুক্তি, ১৯৬৮ সালে যা স্বাক্ষরিত হয়। সে বিষয়ে পরে আসছি। কিন্তু এখানে আলোচনার জন্য গুরুত্বপুর্ণ হল, ভারত ও পাকিস্তান; যাদের পারমানবিক অস্ত্র আছে তা সবাই জানে। কিন্তু এরা দুজন আজ পর্যন্ত কখনই এনপিটি তে স্বাক্ষর করে নাই। এটা ঠিক যে অস্ত্র হিসাবে পারমানবিক অস্ত্র পশ্চিমের কাছে ডেড ইস্যু, খামোখা পয়সা নষ্ট ধরণের বিষয় আর এর সবচেয়েও বড় দিক খতরনাক। কিন্তু এতটুকুওই সব বা শেষ কথা নয়। যেমন, এই অস্ত্রই যদি আবার এশিয়ার কোন দেশ যদি এখনও তা অর্জন করতে চায় তবে সে ঘটনাতে পশ্চিমা যে কোন মাতব্বর দেশ নড়চড়ে বসে আর নিজের জন্য হুমকি গণ্য করে থাকে।

    তা সত্ত্বেও এই পরিস্থিতিতে “ভারত ও এনপিটি” আবার এখন ইস্যু। সারকথায় বললে এর মূল কারণ, ভারত এনপিটিতে স্বাক্ষর না করলেও একালে আমেরিকা যেচে পড়ে ভারতকে পারমানবিক টেকনোলজি ও মালামাল দিবে বলে উস্কানি দিয়েছে। এবং সেটা ভারত এনপিটিতে এবার স্বাক্ষর না করেই হাসিল করতে পারে এমন লোভের মুলা ঝুলিয়েছে আমেরিকা। এর উদ্দেশ্য হল, ভারতের কথিত চীন-ভীতির বিপরীতে দেখানো যে ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে আমেরিকা কত কেয়ার করে! ভারত আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার হয়ে আরও কাছে আসুক। এছাড়াও আমেরিকান খায়েসটাকে গুছিয়ে বললে তা হল এরকম যে প্রতিদানে, নতুন যে গ্লোবাল অর্থনীতিক অর্ডার আসন্ন, যাতে মনে করা হচ্ছে চীনের স্টেক হবে হাই বা অনেক বেশি। তাতে ভারত যেন আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনের সাথে সে নতুন অর্ডারের পক্ষে অবস্থান না নেয়। অর্থাৎ পুরান বা চলতি গ্লোবাল অর্ডার, যেটা আমেরিকান নেতৃত্বে সাজানো তা এখনও ভারতের স্বার্থের দিক থেকে লোভনীয় বলে যেন ভারত মনে করে। পারমানবিক ইস্যুর দিক থেকে এই বিষয়টা বুঝতে আজকের প্রসঙ্গ সেদিকে নিব।

    গত ২০০৫ সাল, সেটা ছিল প্রেসিডেন্ট বুশের প্রথম টার্মের শাসন রাজত্বের শেষ বছর। আর একই সাথে আমেরিকার দিক থেকে সেটা ছিল ভারতকে কাছে টানার কৌশলের অথবা চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে উস্কে তোলা শুরুর বছর। চীন ও ভারতের নিজেদের পারস্পরিক স্বার্থে নিজেদের ভিতর মিল-অমিল, ঝগড়া-বন্ধুত্ব বহু কিছু আছে। থাকাও স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘস্থায়ী দিক থেকে দেখলে তাদের কিছু গভীর কমন স্বার্থ আছে ফলে এই অর্থে তারা ঘনিষ্ট বন্ধু, কিন্তু আপাত দিক থেকে এটাই আবার পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতারও এবং নানান স্বার্থ-বিরোধেরও। তাই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বুশের লক্ষ্য ছিল, চীন-ভারতের সম্পর্কের ভিতর যতই ভালভালাইয়া থাকুক সেটার ফলাফল হিসাবে তা থেকে উভয়েই যেন একসাথে আমেরিকা তাদের ‘কমন এনিমি’ এই জ্ঞান না করে বসে, এই প্রশ্নে যেন তারা এককাট্টা হয়ে দাড়িয়ে না যায়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বুশ জুলাই ২০০৫ সালে প্রথম ভারত সফরে আসেন। এক যৌথ ঘোষণাও স্বাক্ষরিত হয় ১৮ জুলাই ২০০৫। সেই সাথে এই প্রথম পাবলিক হয়েছিল যে ভারত ও আমেরিকার সামরিক সম্পর্কই শুধু নয় কী ভিত্তিগত কাঠামোর মধ্যে ভারত-আমেরিকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পর্ক  হবে তাও ইতোমধ্যেই তারা চুড়ান্ত করে ফেলেছে।

    একেবারে জন্মের সময়ের পটভুমির দিক থেকে বললে,  ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একচেটিয়া সরবরাহকারী ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বা বর্তমান রাশিয়া) কে কেন্দ্র করে সাজানো অর্থাৎ কোল্ড ওয়ার সময় থেকেই ওর মূল সরঞ্জাম ও এর সরবরাহ মূলত রাশিয়া ঘরাণার। কোল্ড ওয়ার মানে দুনিয়াটা দুই ব্লকে বিভক্ত থাকবার সময় বা বিভক্ত হয়ে ছিল যখন। ছোট-বড় সব রাষ্ট্রকে যখন হয় সোভিয়েত ব্লক নয়ত আমেরিকান ব্লকে ঢুকে যেতেই হয়েছিল। যখন দুটা থেকেই বাইরে থাকার উপায় ছিল না বা যেত না। এটা ছিল সেই ব্লক যুগ বা কোল্ড ওয়ারের যুগ। কোল্ড ওয়ার – মানে ঠিক যুদ্ধ লাগিয়ে জড়িয়ে যাওয়া নয় কিন্তু সব সময় যুদ্ধে জড়িয়ে থাকার মতই টেনশনে থাকা। আর গোয়েন্দা আর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স, সাবভারসিভ এক্টের ষড়যন্ত্র চারদিকে।  সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে (১৯৯২) যাবার পর থেকে কার্যত সেই কোল্ড ওয়ার এখন মৃত, দুনিয়া আর এখন ব্লকে ভাগ করা নাই। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে সে সময়ের তৈরি হওয়া অস্ত্রের ঘরানা সেই হিসাব, কেবল তাই এখনও প্রচ্ছন্নে বহাল আছে।

    ইতোমধ্যে ১৯৯২ সাল নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আলাদা ১৫ রাষ্ট্র হয়ে যাওয়া – এটাকে কোল্ড ওয়ার যুগের সমাপ্তি সুচনা বলা যায়। ওদিকে এই ঘটনার পরের দুই টার্ম (১৯৯৩-২০০১) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিল ক্লিনটন। আর ক্লিনটন যুগের পরিসমাপ্তিতে, এরপরেই ২০০১ সাল থেকে জুনিয়র বুশও পরপর দুই টার্ম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ক্লিনটনের সময়কালটা ছিল –“কোল্ড ওয়ার শেষ হয়েছে এখন তারা একলাই রাজা” ধরণের আমোদে থাকার। কারণ কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তিতে দুনিয়াতে আর আমাদের মত দেশগুলোকে সোভিয়েত অথবা আমেরিকান কোন না কোন ব্লকে ঢুকে টিকে থাকতে হবে এই বাস্তবতার অবসান ঘটেছিল। একথাকেই আর একভাবে বলা যে দুনিয়া তখন থেকে আর বাইপোলার নয়। মানে, পরাশক্তি অর্থে দুনিয়া আর দুই মেরুতে বিভক্ত থাকে নাই। এতে স্বভাবতই আমেরিকান বিদেশ নীতিতে সেই প্রথম বিরাট পরিবর্তন এসেছিল। নতুন মৌলিক কিছু বদল তখনই মানে, ক্লিনটনের আমলেই হয়েছিল। যেমন আমাদের মত দেশে আমেরিকা সমর্থিত কোন সরকার ক্ষমতায় থাকলে তাকে আর ‘আগের মত’ সামরিক সরকার হতে হবে না। স্টেট ডিপার্টমেন্টের নতুন নির্দেশিকা অবস্থান হল, বেসামরিক সরকারের পক্ষে থাকতে হবে। সর্বোতভাবে চেষ্টা করতে হবে ক্ষমতা বেসামরিক হাতে রাখতে। কোল্ড ওয়ারের যুগে আমেরিকা ব্যতিক্রমহীনভাবে আমাদের মত যে কোন দেশে কোথাও বেসামরিক সরকার টিকাতে পারে নাই। ফলে আমেরিকা সমর্থিত সরকার মানেই সেটা সামরিক সরকারই হতে দেখা গিয়েছিল। এই অর্থে ক্লিনটনের সময়কালটা ছিল আমেরিকার দিক থেকে বেসামরিক সরকার টিকানোর সফলতা উপভোগের কাল। অবশ্য এটাও বাইরের দিক থেকে তাকিয়ে বলা। আর ভিতরে ভিতরে তা ছিল নতুন পরিস্থিতিতে এক মেরুর কালে আমেরিকান নতুন বিদেশনীতিতে আর কী বৈশিষ্ট আনা যেতে পারে,  কী হওয়া উচিত তা নিয়ে আরও বিস্তারে ভাবনা চিন্তার কাল। তবে আমেরিকান নতুন বিদেশ নীতির আরও পোক্ত রূপ হাজির করতে এবং তার বাস্তবায়ন শুরু হতে হতে ক্লিনটন আমল পেরিয়ে বুশের আমল চলে আসে।  আর এসব নতুন চিন্তা ভাবনা থেকেই পুরানা চিন্তা ও ব্লক ভেদাভেদ দৃষ্টিভঙ্গী ভেঙ্গে আমেরিকা ভারতের দিকে এগিয়ে আসার নতুন নীতি নেয়। বুশের আমল থেকে আমরা আমেরিকার নতুন ও পোক্ত বিদেশ নীতির বাস্তবায়নের কাল হিসাবে দেখতে পারি।

    ওদিকে জুনিয়র বুশের প্রথম টার্মই আবার একই সাথে ভিন্ন আর এক ফেনোমেনা স্পষ্ট দৃশ্যমান হাজির হবার বছর। সেটা ছিল চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের দু’দশকের কালপর্ব (১৯৯০-২০১০), ডাবল ডিজিট জিডিপি গ্রোথের সেকেন্ড ডিকেড বা দ্বিতীয় দশ বছর। যদিও চীনের এই উত্থানের ফলে আমেরিকা-রাষ্ট্রের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের উপর এর প্রভাব পরিণতি কী হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আমেরিকান সরকারি স্পষ্ট গবেষণা লব্ধ ফল আসা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালের পর থেকে, যার চুড়ান্ত রিপোর্ট এসেছিল ২০০৮ সালে। এসবের আগে যদিও অনুমান নির্ভর কিছু খবর যেমন, প্রজেক্টেড রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল ২০০৪ সালেই (ষ্টাটিষ্টিক্যাল প্রজেকশন রিপোর্টের জন্য আমেরিকান বিখ্যাত ম্যাগাজিন)  ফর্বস ম্যাগাজিনের সৌজন্যে। ফলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন-ভারত একজোটে কোন কমন স্টাটেজিতে যেন না দাঁড়ায়  সে উদ্দেশ্যে ভারতকে কাছে টেনে বাড়তি খাতির করে চীন ও ভারতের মধ্যে দুরত্ত্ব তৈরি করা ছিল সেকালে আমেরিকান বিদেশ নীতির এক বিশেষ বৈশিষ্ট। জুনিয়র বুশের ২০০৫ সালের জুলাইয়ের ভারত সফরকে এই আলোকে দেখলে অনেক প্রশ্নের ব্যাখ্যা মিলবে। ঐ সফরের ফোকাস ঘটনা ছিল, ভারতকে আমেরিকার নিউক্লিয়ার টেকনোলজিসহ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বা বিক্রির সিদ্ধান্ত।

    আগেই বলেছি, নিউক্লিয়ার বোমা বা পারমাণবিক বোমা পশ্চিমের হাতে এসে মারাত্মক অস্ত্র হিসাবে কার্যকর হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ কালে। এরপর সেখান থেকে এই অস্ত্রের গবেষণা ও বিকাশ বিস্তা্র সবচেয়ে বেশি ঘটে কোল্ড ওয়ারের সময় (মোটামুটি ১৯৫০-১৯৯২) কালে। যদিও ঠিক এর উলটা অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্রের উতপাদন বৃদ্ধি ও বিস্তার রোধে পরাশক্তিগত ততপরতাও শুরু হয় ১৯৬৮ সাল থেকে। স্বাক্ষরিত হয় NPT চুক্তি। অর্থাৎ প্রো-লাইফারেশন কথার সোজা বাংলা অর্থ “আয়ু দেয়া” বা “সহজেই যা বিস্তার লাভ করে”। কাজেই পারমাণবিক NPT  কথার মানে বাংলা করলে দাড়ায়, পারমানবিক অস্ত্র বা এর টেকনোলজির বিস্তার রোধের চুক্তি। আমেরিকান সরকারি ইতিহাস অনুসারে ১৯৬১-৬৮ প্রায় এই ৭ বছর ধরে নিগোশিয়েশনের ফসল হল এই চুক্তি। এর আবার তিন পৃথক পর্যায় বা অংশ আছে – নন-প্রোলিফারেশন, ডিসআর্মামেন্ট ও পিসফুল ইউজ। অর্থাৎ বিস্তার রোধ (অস্ত্রে ব্যবহারের লক্ষ্যে গবেষণা ও উতপাদন বন্ধ), নিরস্ত্রীকরণ (যে অস্ত্র তৈরি হয়ে গেছে এর ধ্বংস বা ব্যবহার বন্ধ করা) ও (যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে নয় তবে এই টেকনোলজির) শান্তিপুর্ণ ব্যবহার। প্রথম চোটে আমেরিকা, বৃটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এতে স্বাক্ষর করেছিল ১৯৬৮ সালে। কিন্তু তবুও  চীন ও ফ্রান্স  ১৯৯২ সালের আগে স্বাক্ষর করে নাই বলে একমাত্র এরপরই জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্যরেই স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়। অন্যভাবে বলা যায় এই চুক্তিতে স্বাক্ষরের বিষয়টাই ১৯৯২ সালের আগে অর্থাৎ  কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তির আগে কার্যকর করা যায় নাই। বিশেষ করে যারা ভেটো-ক্ষমতাধারী এবং যাদের সবার হাতে পারমানবিক অস্ত্র মজুদও আছে, একারণে। এছাড়া যাদের হাতে অস্ত্র মজুদ নাই তারাসহ বর্তমানের মোট স্বাক্ষর করা দেশের (তাইওয়ানসহ) সংখ্যা ১৮৯। কিন্তু স্বাক্ষর করতে একেবারেই ইচ্ছুক নয় (এদের মধ্যে যাদের পারমানবিক অস্ত্র আছে জানা যায় বা অনুমান করা যায়) এমন রাষ্ট্র হল  ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও সাউথ সুদান। সাউথ আফ্রিকাকেও এই দলে ফেলা যেত সে সময়। কিন্তু ১৯৯৪ সালে বর্ণবাদিতা বিরোধী সরকার কায়েমের পরে সে এনপিটি স্বাক্ষর করা দেশ হয়ে যায়। ওদিকে উত্তর কোরিয়া স্বাক্ষর করেছিল প্রথমে কিন্তু আবার প্রত্যাহার করেছে ২০০৩ সালে। এদের মধ্যে কেবল ভারত ও পাকিস্তান হল এমন রাষ্ট্র যাদের হাতে পারমানবিক অস্ত্র থাকার ব্যাপারটা সবাই জানে এবং তারা নিজেরাও স্বীকার করে। নিজ স্বীকারোক্তির ১৯৭৪-৬ সাল থেকেই পারমানবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হলেও এরা এনপিটি তে স্বাক্ষর করতেও চায় না। চলতি একবিংশ শতকের আগে এনপিটি বিষয়টা এভাবেই ছিল।  আর এসবের টেকনিক্যাল খুটিনাটি দিক তদারক করা এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে রিপোর্ট করার প্রতিষ্ঠান হল IAEA (ইন্টারন্যাশনাল এটমিক এনার্জি এসোশিয়েশন)।

    এনপিটি স্বাক্ষরিত দেশগুলোর মধ্যে পশ্চিমের যেসব দেশের হাতে পারমানবিক অস্ত্র ও টেকনোলজি আছে এবং যারা সেটা অন্য রাষ্ট্র কাউকে (কেবল শান্তিপুর্ণ ব্যবহারের জন্য) দিতে চায় তাদের সেই  দেওয়ার বিষয়টা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ৪৮ সদস্যের এক নিয়ন্ত্রণ গ্রুপ আছে যার নাম NSG, নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ বা এনএসজি। গ্রুপের সদস্যরা মূলত পারমানবিক টেকনোলজি অথবা মালামাল সরবরাহে সক্ষম। ফলে শান্তিপুর্ণ ব্যবহার যেমন বিদ্যুৎ উতপাদনে এবং বৈধভাবে ব্যবহার করতে চাইলেও কোন এক এনএসজি গ্রুপের সদস্যকে ধরতে  হবে।  তবে কিছু ব্যতিক্রমি পরিস্থিতি এখানে স্পষ্ট করা দরকার। যেমন ইরান, অনুমান করা হয় সে পাকিস্তান (ব্যক্তিগতভাবে বিজ্ঞানী কাদের খান) বা উত্তর কোরিয়া অথবা উভয়ের কাছ থেকে মালামাল ও টেকনোলজি সংগ্রহ করেছে। অর্থাৎ এনএসজি এর কেউ তাকে সরবরাহে রাজি হয় নাই। ভিন্ন আর এক ব্যতিক্রম ভারত। ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশ ভারত সফরে পারমানবিক টেকনোলজি ও মালামাল সরবরাহ বিষয়ে চুক্তি করেছিল।

    এই হল পিছনের পটভুমি। এখন ভারত ঐ চুক্তি কার্যকর হয়েছে দেখতে চাইলে তাকে আর এক বাধা পার হতে হবে। সেটা হল, উপরে যে নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ বা এনএসজি এর কথা বলেছি, ভারতকে ঐ গ্রুপের সদস্য হয়ে নিতে হবে। কারণ ভারতের সাপ্লায়ার আমেরিকা ভারতকে সরবরাহ দিতে পারে যদি ভারত এনএসজি এর সদস্য হয়। অন্য ভাষায় বললে এই গ্রুপের পালনীয় নিয়মকানুন মেনে সরবরাহকৃত মালামাল ও টেকনোলজি ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতি দেয়। আমেরিকার সরবরাহ পেতে ভারতকে আগে এনএসজি এর সদস্যপদ পেয়ে নিতে হবে এব্যাপারে খোদ ভারত বা আমেরিকার কোন বিতর্ক নাই। তাহলে বিতর্ক কী নিয়ে? বিতর্কে ভারতের দাবি, আমার অতীত আচরণ ও ট্রেক রেকর্ড ভাল ফলে আমি আমেরিকা এই NSG থেকে সাপ্লাই পাবার যোগ্য।  কিন্তু স্পষ্ট করে যেটা ভারত বলছে না তা হল, এর অর্থ কী ভারতের NSG এর সদস্য গণ্য করে নিতে হবে, অথবা আর কোন বিবেচনায় না গিয়ে সদস্যপদ দিয়ে দিতে হবে? এছাড়াও NPT স্বাক্ষরের কী হবে? ভারত NPT তে স্বাক্ষর না করলেও NSG এর সদস্য গণ্য হতে পারে? এর মানে NPT তে স্বাক্ষর করা NSG এর সদস্য হবার ক্ষেত্রে পুর্বশর্ত নাও হতে পারে? তাই কী?

    যারা এনপিটি এর সদস্য অর্থাৎ পারমানবিক মালামাল ও টেকনোলজি যারা কেবল শান্তিপুর্ণ কাজে, অস্ত্র নয় বিদ্যুৎ উতপাদনের মত কাজে ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বলে স্বাক্ষর করেছে কেবল তাদেরকে নিয়েই এনএসজি বা সরবরাহকারিদের গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। অর্থাৎ এনএসজি এর সদস্য হবার পুর্বশর্ত হল এনপিটি তে স্বাক্ষর করে আসা, এর সদস্য হওয়া। কিন্তু ভারত কখনই এনপিটিতে স্বাক্ষর করে নাই। ফলে সে এনপিটি এর সদস্যই নয়। ফলে তর্কের বিষয় এটা যে, এনপিটি সদস্য না হয়েও ভারত এনএসজি এর সদস্য বলে গৃহীত হবে কী না?

    সোজা ভাষায় ভারত চাচ্ছে বা চেষ্টা করছে, এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেই সে আমেরিকার টেকনোলজি ও মালামাল পেতে চায়। কিভাবে?

    ভারতের মিডিয়া চলতি মে মাসে অভিযোগের রিপোর্ট ছেপেছে যে আমেরিকা থেকে ভারতের নিউক্লিয়ার বিষয়ক সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে  চীন বাধা সৃষ্টি করছে।  যেমন ইংরাজি ‘দি হিন্দু’ এর শিরোনাম “চীন ও পাকিস্তানের আপত্তি উল্টায়ে দিয়ে আমেরিকা বলছে ভারত এনএসজি এর সদস্য হবার জন্য রেডি”। এটা শিরোনাম, আর রিপোর্টের বডিতে আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র জন কিরবি এর উদ্ধৃতিতে বলা হচ্ছে, তিনি বলেছেন, “ ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট (ওবামা) ভারত সফরের সময় তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে, আমেরিকার ব্যাখ্যায় ভারত মিসাইল টেকনোলজি কনট্রোল রেজিমের শর্তাবলী পূরণ করে এবং ভারত এনএসজি এর সদস্য হবার জন্য রেডি (India meets missile technology control regime requirements and is ready for NSG membership,)”। বুঝাই যাচ্ছে আমেরিকা সরাসরি একথা বলছে না যে ভারত এনপিটি এর সদস্য না হলেও এনএসজি এর সদস্য বিবেচিত হতে পারে কীনা। এছাড়া আমেরিকার বুঝ ব্যাখ্যার কথা বলা হচ্ছে। তার মানে অন্য কারো ব্যাখ্যা আর এক রকম হতেও পারে। এসবের বিপরীতে চীন বলছে। আমেরিকার সাথে ভারতের চুক্তি সেটা এখানে ইস্যু নয়। সেটার ভিতর চীনের আপত্ দেখার কিছু নাই। তার অবস্থান হল, ভারত এনপিটি এর সদস্য হয়ে নিলেই সব সমাধান। এর কারণ হিসাবে চীন বলছে গত বছর এনএসজি এর সভায়, এনপিটি এর সদস্য হতে হবে আগে – এটাই এনএসজি এর সদস্য হবার পুর্বশর্ত হিসাবে বলা হয়েছে। ফলে এখানে চীনের বাড়তি পরামর্শ হল বিষয়টা নিয়ে এনএসজির যারা সদস্য তাদের সাথে কথা বলে ভারত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারে। অর্থাৎ এটা পরিস্কার ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক বা তাদের কোন চুক্তির বিরোধিতা বা ঠেকায় দেয়া দিবার কোন ইচ্ছা এখানে চীনের নাই।

    ‘দি হিন্দু’ স্টেট ডিপার্টমেন্টের জন কিরবিকে উদ্ধৃত করে আরও বলছে, “কেউ এনএসজি এর সদস্য হতে পারবে কীনা তা নিয়ে দেয়া বক্তব্য বর্তমান সদস্যদের আভ্যন্তরীণ বিষয়”। অর্থাৎ এনিয়ে ভারতের বলার কিছু নাই।

    তাহলে শেষে কোথায় দাড়াল বিষয়টা? শেষ কথা হল, মিডিয়াগুলোকে – ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক জমে উঠতে চীন বাধা দিচ্ছে এমন এক ধারণা – ছড়াতে ব্রিফ করা হয়েছে। আর এই খামোখা চীন বিরোধিতা তাতিয়ে দিয়ে খোদ ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি এখন চীন সফরে আছেন। আর আলোচনার মূল বিষয় এনএসজি এর সদস্যপদ, একেবারে ‘হর্সেস মাউথ’ ফয়সালা।

    কে না জানে, এনপিটি স্বাক্ষরের সোজা অর্থ পরমাণুর অস্ত্রে ব্যবহার তাহলে এরপর আর করা যাবে না। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের পাঁচ ভেটো ক্ষমতার রাষ্ট্র সহ প্রায় সকলে এই কনভেনশনে স্বাক্ষরদান করে ফেলেছে। ফলে কারই আর যে সুবিধা নাই এবং সবাই স্বাক্ষর দিয়ে প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ যে আর পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না। তাহলে কীসের ভিত্তিতে কেন আমেরিকা বা এদের কারো সহয়তাতেই অস্ত্র বানানো ও প্রয়োগের ভারতের একা সুবিধা থাকবে? এবং থাকবে সেটা আমেরিকার হাত দিয়ে, সুপারিশে? ভারত কী আশা করে দুনিয়ায় এনপিটি স্বাক্ষর না-কারি রাষ্ট্র হবে একমাত্র ভারত! যাকে আবার তোলা তোলা করে বিশেষ খাতিরে আমেরিকা পরমাণু টেকনোলজি ও মালামালও দিবে। কারণ আমেরিকার চীনের উত্থানের এতই ঠেকেছে! আর এই সুবিধা আর কারো থাকবে না। তবে একা ভারত ঐ টেকনোলজি ও মালামাল দিয়ে অস্ত্র বানানোর দিকেও চাইলে চলে যেতেও পারবে! কী তামশা! বলা বাহুল্য ভারত স্বপ্নের ঘোরে আছে। আর কেউ স্বপ্নে খেলে পোলাও খাওয়াই উচিত!

     

    [লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্তের ৩০মে ২০১৬ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও বর্ধিত আকারে ও এডিট করে ছাপা হল।]

  • নেপালে আবার নড়াচড়া

    নেপালে আবার নড়াচড়া
    গৌতম দাস
    ১৭ মে ২০১৬,  মঙ্গলবার
    http://wp.me/p1sCvy-1bK

    ভারতের সাথে তার সব পড়শি রাষ্ট্রের সম্পর্কই নানান রকম খটমট ও সঙ্ঘাতে পরিপূর্ণ। ব্যতিক্রম বা ভারতেরই ভাষায় ‘সফলতা’, কেবল বাংলাদেশে। গত সপ্তাহে ৯ মে নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারির সরকারিভাবে ভারত সফরে যাওয়ার কথা ছিল। আনুষ্ঠানিকতার দিক থেকে এটা হওয়ার কথা ছিল ভারতের রাষ্ট্রপতির অতিথি হিসেবে তাঁর ভারত সফর। কিন্তু সফরের মাত্র দুই দিন আগে ৬ মে নেপাল থেকে সরকারিভাবে জানানো হয় যে, নেপালের রাষ্ট্রপতি এই সফর বাতিল করেছেন। এই খবর মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয়নি। কিন্তু খবরটার গুরুত্ব ছিল আরো কয়েক গুণ বেশি। কারণ একটা বাড়তি খবরও সাথে ছিল, নেপাল সরকার ভারতে নেপালের রাষ্ট্রদূত দীপ কুমার উপাধ্যায়কেও প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কূটনীতিতে ‘প্রত্যাহার’ শব্দটির বিশেষ অর্থ আছে। অর্থাৎ প্রত্যাহার বা recall এই শব্দটি কী কী অর্থ নিশ্চিত করে আর কী কী করে না, তা সুনির্দিষ্ট থাকে। যেমন নিশ্চিত অর্থ হল, তার সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে  ঐ রাষ্ট্রদুতকে দেশে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। এরপর, কেন বলা হয়েছে এর কারণের দিক থেকে এর আবার দুটো মানে হতে পারে- এক. ঐ রাষ্ট্রদূতকে চাকরিচ্যুত বা দায়িত্বচ্যুত করা হয়েছে। অথবা দুই. কেবল ওই দেশ থেকে রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে কিন্তু তাঁর চাকরি বহাল আছে। ফলে এরপর অন্য কোথাও তাঁকে নিয়োগ দেয়া হবে। কিন্তু নেপালের রাষ্ট্রদূতের বেলায় তার প্রত্যাহারের কারণও মিডিয়ায় উল্লিখিত হতে থাকে। আর কারণটা সরকার নিজে মিডিয়ায় প্রচার করতে না চাইলেও মিডিয়া নিশ্চিত করছে যে নেপালি সরকার রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মিডিয়ায় প্রকাশিত হিসেবে অভিযোগ তিনটার: প্রথমটাই বড় সাঙ্ঘাতিক, কাটমান্ডুতে থাকার সময় চলতি প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলির (K P Sharma OLI অথবা K P OLI নামে তিনি বেশি পরিচিত) সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা করেছেন। দ্বিতীয় অভিযোগ, দিল্লিতে বসে অফিস চালিয়েছেন এমনভাবে যে সেখানে তিনি কী করছেন কিভাবে করছেন তা নিজ দেশে তার কাজের হিসাব নেয়া রিপোর্টিং কর্তৃপক্ষ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে না জানানো। আর তৃতীয় অভিযোগ, ভারতের রাষ্ট্রদূত রণজিত রায়ের (Ranjit Rae) সাথে নেপালের পশ্চিম সীমান্ত সফরে গিয়েছেন অথচ দেশের নিজ মন্ত্রণালয়কে কিছুই জানাননি। অনুমান করা যায়, মূল অভিযোগ আসলে শেষেরটাই। আর সেটা করতে গিয়ে প্রথম দু’টি অভিযোগ তৈরির অবস্থা সৃষ্টি করেছেন।

    আসলে গত ৬ মে ছিল নেপালের জন্য ঘটনাবহুল দিন। সেটা শুধু রাষ্ট্রপতির সফর বাতিল আর ভারত থেকে নেপালি রাষ্ট্রদূতের প্রত্যাহারে ঘটনার কারণে নয়। এ দুটো যদি দেশের বাইরের ঘটনা বলি তবে ঐদিনের বাকি ঘটনাবলি ছিল অভ্যন্তরীণ। এর আগের দিন মানে, ৫ মে অলি সরকারের অন্য পার্টনার দল হল নেপাল মাওবাদী পার্টি, যার সমর্থনে (কিন্তু তারা সরকারে অংশ না নিয়ে বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েছে) অলির সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে সেই মাওবাদী দলের প্রধান পুষ্প কমল দাহাল প্রচন্ড মিডিয়ায় জানিয়ে দিয়েছিলেন তার দল ওলি সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের কথা ভাবছে। তবে এও জানিয়েছিলেন ঐদিনের সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাঁর মিটিং আছে। পরের দিন ৬ মে প্রচন্ড জানান, তিনি আপাতত সমর্থন প্রত্যাহার করছেন না; বরং এপ্রসঙ্গে নয় দফা দাবিতে তাদের সমঝোতা হয়েছে। ফলে সরকার আগের মতোই থাকছে।
    এরপর ঘটনাবলী নিয়ে আরো কিছু বর্ণনায় যাওয়ার আগে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পেছনের পটভূমি সংক্ষেপে বলে নেয়া ভালো হবে যাতে এখনকার অবস্থা বুঝতে সুবিধা হয়।
    সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনের ফল অনুসারে নেপালের মোট ৬০১ আসনের পার্লামেন্টের মধ্যে প্রধান তিন দলের মোট আসন সংখ্যা, এরা প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বা ৪৫১ আসন দখল করে আছে। কিন্তু কেউই নিরঙ্কুশ বা অর্ধেকের বেশি ৩০১ আসন পায়নি বলে, কেউ একক সরকার গঠনে সক্ষম নয়। আর আসনসংখ্যা অনুসারে ওপরের প্রথম দল নেপালি কংগ্রেস (১৯৬ আসন), দ্বিতীয় (চলতি প্রধানমন্ত্রীর) নেপালি কমিউনিস্ট ইউএমএল (১৭৫ আসন) আর তৃতীয় মাওবাদী কমিউনিস্ট (৮০ আসন)। বিগত রাজতান্ত্রিক সরকার উচ্ছেদ করার পরে নেপালে প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্রের স্থাপন করার ক্ষেত্রে সোচ্চার মূলত মাওবাদীরা হলেও এদের সাথে অপর দুই দলও ছিল। ফলে এই তিন দল সে সময় থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্রের সংবিধান রচনা ছিল দ্বিতীয় প্রচেষ্টার নির্বাচনী ফলাফল। কারণ প্রথম প্রচেষ্টা ফেল করেছিল। আর এই তিন দলের আসন সংখ্যা মোট করে দেখানোর কারণ হল, ২০১৩ সালের নির্বাচনের পর এই তিনটা দলই ভারত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। খুব সম্ভবত এই তিন দলের মধ্যে ভারত প্রসঙ্গে কমন কিছু অবস্থান আছে, যা ইনফরমাল এবং অপ্রকাশ্য। এটাই ভারত থেকে চরমভাবে এই তিন দলকে দূরে নিয়ে যায় আবার এটাই তাদের পরস্পরের মধ্যে বন্ধনের হেতু, ও ভিত্তি।
    আসলে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজতন্ত্র উচ্ছেদের (মে ২০০৮) পরে, প্রথমবারের কনষ্টিটিউশন প্রণয়ন ও রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টায় নির্বাচিত সরকার গঠনের পর থেকে ভারতের সাথে এক এক করে প্রধান তিনটি দলেরই সঙ্ঘাতময় সম্পর্ক হয়ে যায়। অথচ রাজতন্ত্র উচ্ছেদে রাজনৈতিক পরিকল্পনার শুরুর সময় থেকে ভারতের ভূমিকা ছিল খুবই ইতিবাচক। সেসময় আমেরিকানদের কূটনীতির সহযোগী অবস্থান ছিল খুবই নির্ধারক। ফলে আমেরিকার সাথে সমন্বিত ভারতের সে ভূমিকা ছিল গঠনমূলক। কিন্তু রাজতন্ত্র উচ্ছেদ উতখাতের পর তৎকালীন প্রথম অন্তর্বর্তি নির্বাচিত সরকার ছিল মাওবাদীদের সরকার। আর ভারত ক্রমেই কাজের ও স্বার্থের দিক থেকে গড়ে ওঠা এতদিনের ভালো সম্পর্ককে প্রথমে মাওবাদী সরকারের সাথে ও পরে অন্য দুই পার্টির সাথে ক্রমেই আস্থা হারিয়ে তিক্ত করে ফেলেছিল। ফলে মাওবাদী সরকার সংবিধান রচনা সম্পন্ন হয়েছে, এ ঘোষণা করতে ব্যর্থ হয়। বলা যায়, তিন পার্টির সাথে সম্পর্ক হারিয়ে, ‘কনষ্টিটিউশন রচনা সম্পন্ন হয়েছে’ এই ঘোষণা ঠেকিয়ে দেয়াকেই ভারত নিজের সাফল্য মনে করেছিল। ভারত নেপালের প্রধান এই তিনটি দলকেই প্রভাবিত করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে বা হাতছাড়া হয়ে যায়। অথচ লক্ষ্যণীয়, ভারতের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী সেখানে ছিল না। সংক্ষেপে কয়েক বাক্যে এর কারণ চিহ্নিত করলে বলতে হবে- ১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই নেহরুর হাতে যে ভারত হাজির হয়েছিল, তাতে পড়শিনীতি বা বিদেশনীতির মৌলিক কিছু জন্মত্রুটি ছিল। যেমন নেহরু যেন মনে করতেন, পড়শি বা বিদেশনীতি মানেই বিগত ব্রিটিশ কলোনির বিদেশনীতিই। কথাটা এভাবে বলার পিছনের কারণ হল, মনে রাখতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর পঞ্চাশের দশক ছিল দুনিয়া ব্যাপী “উপনিবেশ মুক্তির” যুগ। [কিন্তু খুব সতর্কভাবে ‘উপনিবেশ মুক্তি’ কথাটার  মানে বুঝতে হবে।  এসম্পর্কে বাড়তি বিস্তারিত কিছু কথা আলাদা করে নিচে সবশেষের কয়েক প্যারায় আনা হয়েছে।  আগ্রহীরা এসম্পর্কে বিস্তারিত সেখানে পড়তে পারেন।] নেহেরুর চোখে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের রূপ উপনিবেশকালীন রূপ – ‘প্রভু-দাস’ এই রূপেরই ধারাবাহিকতা। এরই ছাপ আমরা দেখি নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তিতে। সেই থেকে ভারতের পড়শি বা বিদেশ নীতি এই আলোকে সাজানো হয়ে আছে। মানে জবরদস্তি, চাপ খাটানো, অন্যের সার্বভৌমত্বকে সম্মানের কোনো বিষয় সেখানে রাখার দরকার কী এমন ভাবনায় পরিচালিত এক অবস্থা! অথচ উপনিবেশ-উত্তর সে যুগে উপনিবেশ মুক্তিই বা পড়শির সাবভৌমত্বকে সম্মান করার বিষয় তখন স্পষ্ট প্রধান বিষয় হয়েছিল। এসব পালনীয় শেষ করে বা সুরক্ষিত রেখেও ভারত পড়শি দেশসহ যেকোন দেশে বিদেশ নীতি পরিচালনা করা সম্ভব করতে পারত। ভারতের জনসংখ্যা বড় মানে অর্থনীতিও বড়। এছাড়া ভারত ভাগ হয়েছে বটে কিন্তু কলোনিয়াল শাসনকালের মাখনটা মূল ভারত ভুখন্ডেই থেকে গিয়েছে। পরবর্তিতে আজ পর্যন্ত একটা ভাল রকমের পুজিতান্ত্রিক বিকাশ এই ভারতে ঘটে গিয়েছে। এই অগ্রসর অবস্থার কারণে পড়শী যেকোন দেশের সাথে ভারতের পণ্য বাণিজ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফেয়ার এক বাণিজ্য বিনিময় সম্পর্ক হলেও সেখানে পড়ে পাওয়া ভাবে ঐ বিনিময়ের ভারসাম্য ভারতের পক্ষেই থাকবে। ফলে এক দেয়ানেয়ার ফেয়ারনেস-ন্যায্যতা বজায় রাখলেও সেই অর্জন ভারতের জন্য যথেষ্ট। অথচ প্রজাতান্ত্রিক ভারতের জন্মের পরে সত্তর বছর পেরিয়ে একুশ শতকে এসেও ভারতের বিদেশনীতির পুরনো তরিকাকেই আছে আর একেই তার নীতি ও সাফল্যের কাঠি মনে করে যাচ্ছে। ল্যান্ডলকড কোনো কিছু শর্তের বিনিময়ে রাষ্ট্রেরও পড়শির সমুদ্রবন্দরের প্রবেশ ও ব্যবহারের অধিকার আছে- জাতিসঙ্ঘের এমন আইন কনভেনশন যখন প্রণীত হতে যাচ্ছে তখন এই আমলে ল্যান্ডলকড নেপালকে প্যাঁচে ফেলে তার সাথে কলোনি-দাসের মতো আচরণ করতে চাইলে পালটা ঝাপ্টা তো খেতেই হবে।
    নেপালের জনগণ নিজ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়ে একে উচ্ছেদ করেছে। সে কাজে ভারতের সাহায্য পেয়েছে, কিন্তু সেটা ফিরে আবার ভারতের কলোনি হওয়ার জন্য নয় নিশ্চয়ই। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু ভুল নীতিতে পরিচালনের কারণে নেপালের প্রধান তিনটি দলই এর পর থেকে ভারতের প্রভাবের একেবারে বাইরে চলে গেছে। ভুল বিদেশনীতিতে সব হারিয়ে উপায়হীন হয়ে ভারত এর পর থেকে মাধেশি ও জনজাতির জনগোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে নিজের শক্তি দেখাতে গিয়েছে। ফলে একদিকে সরকারসহ তিন নেপালি দল আর অন্যদিকে ভারত – এরকম পক্ষাপক্ষিতে পরস্পরের প্রতি শক্তি প্রদর্শনের ঘটনা হলো গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ – ওই তিন দলের নেপালের সংবিধান রচনা সম্পন্ন ও গৃহীত হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়ে বসা। আর তা প্রতিরোধে ভারত নিজের সীমান্ত শুল্ক বিভাগ আর সাথে মাধেশি অঞ্চলের ছোট দলের মাধ্যমে ভারত থেকে ল্যান্ডলকড নেপাল অভিমুখে পণ্য চলাচলে অবরোধ আরোপ করে। যদিও মুখে তা স্বীকার করে নাই। এখানে প্রথমত যে প্রশ্নটা ওঠে, নেপালের সংবিধান ঘোষণাতে এর বিরুদ্ধে ভারতের কী বলার আছে! ভারত ভিন রাষ্ট্র, তার কী বলার থাকে না থাকতের পারে? ভারত কী নেপালের মাধোশি বা জনজাতি জনগোষ্ঠিগুলোর প্রতিনিধি? নাকি ভারত ভিন রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতিনিধি হবার কোন সুযোগ সেখানে আছে?  এভাবে আজিব প্রতিনিধি সাজার চেষ্টা এটাই তো ভারতের জন্য বিপদজনক। বাজে উদাহরণ নয় কী? ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনীতিক ও আমলারা নিজেদের ব্যার্থতা ঢাকতে এন অবস্থার সৃষ্টি করেছে।  কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশন গৃহিত হবার ঘোষণার বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে পারে সে দেশেরই কোনো অসন্তুষ্ট জনগোষ্ঠী। পড়শির আপত্তি করার বিষয়ই নয় এটা। লিগ্যাল এই পয়েন্টটি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখান থেকেই পড়শির ওপর হস্তক্ষেপের জেনুউন অভিযোগ উঠে আসে। এটা সম্ভবত দুনিয়ায় প্রথম উদাহরণ এবং ভারতের দিক থেকেও খুবই বাজে উদাহরণ। কারণ এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারতের পড়শি রাষ্ট্রের কোনো অসন্তুষ্ট জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়িয়ে সেই পড়শি রাষ্ট্রের  বিরুদ্ধে আপত্তি তোলার পথ দেখিয়ে রাখল ভারত। অথচ বিষয়টা এত জটিল ছিল না। একটা স্থিতিশীল নেপালের জন্য অথবা অন্য কোনো যুক্তিতে ভারতের নিজ স্বার্থের দিক থেকে উদ্বেগ থাকতেই পারে। কিন্তু সেটা প্রকাশ করার ভঙ্গী খুব গুরুত্বপুর্ণ। ভারতকে সেটা প্রকাশ করতে গেলে অবশ্যই ন্যুনতম পড়শির সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষা করেই তা হতে হবে এবং তা করা সম্ভবও। সে লক্ষ্যে ভারত পড়শি সরকার বা দল্গুলোকে লেগে থেকে বুঝানোর চেষ্টা করতে পারত। কিন্তু এটা যে প্রচেষ্টা করা হয়েছে তা খুবই নিকৃষ্ট। আসলে নেপালের রাজতন্ত্র উৎখাতে সাহায্য সহযোগিতা করার সময় থেকেই ভারত নিজেরও স্বার্থগুলো স্পষ্ট করে এই প্রধান তিন দলের মধ্যে বুঝিয়ে রাজি করার উদ্যোগ নিতে পারত। যেটাকে আমরা পারশু (pursue) বা লেগে থেকে বুঝানোর চেষ্টা বলি। কিন্তু ভুল বিদেশনীতি, ভুয়া আত্মগরিমা, নকল উপনিবেশী ভ্যানিটি ভারতকে সে পথে যেতে দেয়নি। এই ভুলের মূল্যায়ন ভারতের ভেতর থেকেই একদিন উঠে আসবে। কারণ তবেই ভারতের সামনে আগানোর বাধা সরাতে সক্ষম হবে।
    এমনিতেই টানা সাড়ে চার মাস ধরে চলা নেপালের সাথে পণ্য চলাচলে অবরোধের ফলাফলও শেষ বিচারে ভারতের বিপক্ষে গেছে। উদ্দেশ্য ছিল নেপালি জনগণকে শাস্তি দেয়া। কিন্তু ভারতের শাস্তিও কম হয় নাই। এই সাড়ে চার মাস আসলে যেন উভয় পক্ষের কার কত দূর সহ্যক্ষমতা তারই পরীক্ষা চলেছে। পরিশেষে এতে নেপালের দিক থেকে দেখলে তার বিজয়ের দিকটি হল, নেপালের জনগণের কাছে এত দিন যেটা অকল্পনীয় মনে হয়েছিল যে ভারতের ভেতর দিয়ে ছাড়া তাদের অন্যভাবে অন্য কোন দিক দিয়ে বাইরের দুনিয়ায় বের হওয়ার উপায় নেই। কিন্তু ভয়াবহ ঐ নিরুপায় পরিস্থিতিই অপর পড়শি চীনের ভেতর দিয়ে বের হওয়ার বিকল্প উপায় অবরোধের এই দুর্যোগের সময়ে হাজির হয়ে গিয়েছিল। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী অলি চীনের সাথে এ বিষয়ে চুক্তি সম্পন্ন করে ফেলেছেন। নানান সুবিধাজনক স্পটে ৯টা রেল ও সড়কপথ হবে বের হবার পথ। আর এরই লক্ষ্যে সার্বিক পরিকল্পনা, ভায়াবিলিটি স্টাডি ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। ভারতের মিডিয়া টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, একবার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়ে গেলে সেই নেপালকে আর কোনো কথাই শুনানো ভারতের পক্ষে সম্ভব হবে না। বরং এত দিন ভারতের দাবড়ে মুখচাপা দিয়ে রাখা আচরণের বিরুদ্ধে সব অর্গল খুলে ওই নেপালি জনগণ যা করার তাই করবে। বলা বাহুল্য সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যাবে। ভারতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানগত। ওদিকে অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার দিক থেকে নতুন রেল ও সড়কপথে ব্যয় শুরুতে কিছুটা বেশি হলেও এক দিকে সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাম চুকানোর স্বার্থে আশা করা যায় নেপালের জনগণ তা বইতে রাজি হবে। আর এতে ক্রমেই আরো বাড়তি উৎপাদন ও চলাচল বেড়ে যাওয়ার মুখে আস্তে আস্তে ব্যয়ও কমে আসতে শুরু করবে। তবে এখান থেকে এমন মনে করা ভুল হবে যে চীন এটাকে পড়ে পাওয়া ফায়দা হিসেবে দেখবে কি না। এ প্রসঙ্গে চীন অনেক আগেই পরিষ্কার করে রেখেছে। এশিয়ার অর্থনৈতিক পড়শি শক্তি হিসেবে ট্র্যাডিশনালি বা নিজ যোগ্যতায় যেসব বাজার বা সম্পর্ক সুবিধা তার আছে এর শেয়ার ভারতকে দেয়া চীন নিজের বৃহত্তর স্বার্থের দিক থেকে করণীয় মনে করে। কারণ সে জানে ও মানে দুনিয়াতে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার কায়েমের ক্ষেত্রে ভারত তার সঙ্গী। নতুন অর্ডার তৈরির ক্ষেত্রে চলতি নেতা আমেরিকা হবে অতীত নেতা আর ভারত হবে আগামী সহযোগী। ভারত সেসবের পক্ষে নিজের ভূমিকা বুঝে এগিয়ে আসার আগেই চীন ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে নিজ আমন্ত্রণের মনোভাব স্পষ্ট করে রাখতে চায়।
    যেমন নেপালের আমদানি তেলের চাহিদার মাত্র ১৩ ভাগ চীন থেকে আসার চুক্তি হয়েছে। এখন বাকিটা নির্ভর করে ভারতের ওপর। ভারত যদি অবরোধ-সম্পর্কের পথেই থাকতে চায়, তবে এই ভাগের হার শতভাগ হওয়ার দিকে যাওয়া ছাড়া যে উপায় থাকবে না তা বলাই বাহুল্য।
    ইতোমধ্যে ভারত আরেক হুমকি তৈরির চেষ্টা করেছে। ভারতের ভাষায় চাপ সৃষ্টি করার কৌশল। বিগত মাওবাদীদের সশস্ত্র রাজনীতি পরিচালনার সময়ের পুরনো মানবাধিকার ভঙ্গের মামলা, এ ছাড়া একালে সাড়ে চার মাসের অবরোধের সময় মাধেশি জনগোষ্ঠীর অনেকে আহত, নিহত হয়েছেন। প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসঙ্ঘের ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ বা ইউপিআরের মুখোমুখি হতে হয়। গত বছরের শেষে সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নেপাল প্রসঙ্গের সভায় ভারত ওপরের উল্লেখ করার দুই ইস্যুতে আপত্তি দায়ের করে। যাতে সরকার ও মাওবাদীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু ব্যাপারটা ভারতের দিক থেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া খুব সহজ নয়। কারণ এখানেও ভারত একইভাবে নিজের বিরুদ্ধে অন্য যেকোনো দেশের অভিযোগের আঙুল উঠানোর রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছে। যেমন সেই অভিযোগ হতে পারে ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মির ও উত্তর-পূর্বের রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী দমনে মানবাধিকার লঙ্ঘনসংক্রান্ত। এটা ভারতও জানে। ফলে ভারতের এক মিডিয়া জানাচ্ছে ইউপিআর ইস্যু নিয়ে বেশি দূর যেতে ভারতের ইচ্ছা নেই।
    কিন্তু তবু এই পদক্ষেপের কথা ভেবেই মাওবাদী দলনেতা প্রচন্দ অলির ওপর সমর্থন প্রত্যাহার করার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন গত ৫ মে, নতুন কিছু পালটা পদক্ষেপে নিতে চেয়েছিলেন। তার প্রস্তাব ছিল, এই তিন দলের সমন্বয়ে একটা সর্বসম্মতির সরকার হোক যাতে সম্মিলিত কৌশলে ভারতের যেকোনো সিদ্ধান্ত মোকাবেলা করতে পারে। আর যদি তা না করা যায়, সবাই রাজি না হয়, সে ক্ষেত্রে নেপাল কংগ্রেস দলের সমর্থনে সে নিজেই প্রধানমন্ত্রী হয়ে সরকার গড়তে চায়। এমন সিদ্ধান্তের কারণ, অলি সরকারের ওপর জনগণের ক্ষোভ বাড়ছে। যার মূল কারণ সরকারের অদক্ষতা বা নন-পারফরম্যান্স। আর সবচেয়ে বড় হলো, এখন অবরোধ উঠে গেলেও জ্বালানি তেল, চিনি ইত্যাদি এজাতীয় জিনিসের দাম কমেনি। ব্যাপক চোরাচালানি মজুদদারি কারবার চলছে সরকার ও দলের প্রশ্রয়ে। ফলে কোনো পদক্ষেপ ছাড়া ওলির হাতে সরকার ছেড়ে রাখতে ভরসা পাচ্ছেন না মাওবাদী নেতা প্রচন্দ। এতে গত ৬ মে নেপাল ঘটনাবহুল হওয়ার পেছনে ভারতের চাপ সামলানোর নতুন কৌশল ও পদক্ষেপ হিসেবে কী করা যায়, এর অংশ মনে করা যেতে পারে। আর এ প্রসঙ্গে ভারতের মিডিয়ার ব্যাখ্যা হলো, অলি সরকার এসব ঘটনায় ভারতকে দায়ী করে নিজ জনগণের কাছে দেখাতেই নেপালের প্রেসিডেন্টের ভারত সফর আচমকা বাতিল করায়। এতে নিজ সরকারের ব্যর্থতার অনেক কিছুই আড়াল করার কিছু সুযোগ পেতে পারেন, এটাও ভেবে থাকতে পারেন।

    [ওদিকে ভারতে নেপালের রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহার পর্ব খুবই খারাপভাবে শেষ হয়। রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহারের আদেশ মানতে অস্বীকার করেন। ফলে স্বভাবতই অলি সরকার তাঁকে বরখাস্ত করেন এবং ভারত সরকারকে নোটিফাই করেন। পরে এই ঘটনা আর এক মোড় নেয়। কূটনৈতিক পাড়ায় খবর উঠতে থাকে৪ যে এই ইস্যুতে নেপালে ভারতের রাষ্ট্রদুত রণজিত রাওকে নেপালে “পারশন নন গ্রাটা” বা ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করতে যাচ্ছে। কোন কূটনীতিকের বিরুদ্ধে হোস্ট দেশ কোন ক্রিমিনাল চার্জ আনার সুযোগ নাই জেনেভা কনভেন অনুসারে। তিনি যে অপরাধই করেন না কেন। এর বদলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা হল ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা। যার বাস্তব ফলাফল ঐ দেশ থেকে বের করে দেয়া। এই প্রচার তুঙ্গে উঠার এক পর্যায়ে উত্তেজনার পারদ নামাতে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিবৃতি দিতে এই জল্পনাকল্পনা নাকচ করেন।]

    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা গতকাল ১৬ মে অনলাইনে (আজ প্রিন্টে ) দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। তা এখানে আবার নানা সংযোজনে ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

    ফুটনোটঃ
    ‘উপনিবেশ মুক্তি’ কথাটার অর্থ
    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা ইউরোপের ইতিহাস আমরা বৃটিশদের চোখ দিয়ে পড়েছি ও জানি।  ফলে ঐ যুদ্ধে “আর কখনও কলোনি করব না” আমেরিকাকে দেয়া বৃ্টিশদের এই দাসখতের কথা আমাদের জানা হয় নাই। এই যুদ্ধ সম্পর্কে এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস বৃটিশ বয়ান এডিয়া গিয়েছে। সোজা কথায় বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার কৃতীত্ব হল সে সারা ইউরোপের কলোনি প্রভুদের কাছ থেকে কলোনি আর না করার দাসঅখত লিখায় নিয়েছে। আর সারা দুনিয়াকে এক ‘উপনিবেশ মুক্ত দুনিয়া’ উপহার দেবার রাস্তা খুলে দিয়েছে।  অনেকের কাছে এটা অবাক লাগতে পারে। তারা “আটলান্টা চার্টার” পড়ে দেখতে পারেন, যেটা আসলে কলোনি প্রভুদের আমেরিকাকে দেয়া দাসখত। আর আমাদের সৌভাগ্য যে আমেরিকার ওয়াল স্ট্রীট বুঝেছিল দুনিয়া থেকে উপনিবেশ তুলে দেয়াই তার স্বার্থ, ক্যাপিটালিজম আরও গ্লোবাল ও  বিকাশিত হয়ে উঠার পুর্বশর্ত। ফলে হিটলারের হাত থেকে আক্রান্ত ও বিধ্বস্ত কলোনি প্রভু-শিরোমনি বৃটিশসহ ইউরোপকে  বাচাতে আমেরিকা এগিয়ের আসার পুর্বশর্ত হিসাবে এই দাসখত স্বাক্ষর করিয়ে নেবার সুযোগ নিয়েছিল।
    কিন্তু আমাদের এখানকার প্রসঙ্গের জন্য সেসব কথার প্রাসঙ্গিকতা এতটুকুই যে জওহরলাল নেহেরুও দুনিয়া থেকে উপনিবেশ উঠে যাবার উপরে উল্লেখিত দিকটা সম্পর্কে ওয়াকেবহাল ছিলেন না। তাঁর বিচারে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের রূপ কেবল একটাই, মাস্টার-স্লেভ বা প্রভু ও দাস এর বাইরে অন্য কিছু হতে পারে না।  নেপালের সাথে পুরানা বৃটিশ-নেপাল ১৯২৬ সালের চুক্তির আদলে করা নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তি করা এই সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। নেহেরু ধরতেই পারেন নাই আটলান্টা চার্টার চুক্তি কেমন আগামি দুনিয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।  ফলে এখন থেকে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের রূপ আর কেবল কলোনি মাস্টারের প্রভু-দাস রূপ ছাড়াও অন্যরূপে বিকশিত হবার শর্ত তৈরি হয়েছে।  এবসলিউট অর্থে নয় তবে এটা তুলনামূলক অর্থে আগের সরাসরি উপনিবেশ রূপের চেয়ে লিবারেল রূপ সম্পর্ক আকারে হাজির হবে।

  • “ভারত মাতা কি জয়” বলা-না-বলা

    ‘ভারত মাতা কি জয়’ বলা-না-বলা
    গৌতম দাস
    ১২ এপ্রিল   ২০১৬,   মঙ্গলবার, ১৯:৩২

    http://wp.me/p1sCvy-Tv

    বিজেপির কল্যাণে ভারতে “দেশপ্রেমের রাজনীতি” এক বিরাট ইস্যু হয়ে উঠেছে। বলা বাহুল্য, এসবের সারকথা হল – এক উগ্র জাতীয়তাবাদী বা এক বর্ণবাদী রাজনীতি হাজির করা। নিজেকে অন্য সবার চেয়ে ‘একমাত্র’, ‘মহান’ বা ‘শ্রেষ্ঠ’  দেশপ্রেমিক বলে হাজির করা। দেশপ্রেমিকতার সংজ্ঞা সঙ্কীর্ণ করতে করতে এমন কিছু শব্দে নামিয়ে আনা বা সীমিত করে ফেলা, যেটা কেবল নিজ দলীয় রাজনীতিকেই বুঝায়। যাতে কেবল নিজের দলই দেশপ্রেমের দাবিদার একমাত্র দল হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশেও “চেতনার” রাজনীতিটাও প্রায় এমনই। তাই এটা বেশ মজার ব্যাপার যে এ জায়গায় এসে ভারতের মোদি সরকার আর বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের দেশপ্রেমের রাজনীতিটা এক। আবার এর রাজনৈতিক বয়ানেও আরেক সাধারণ মিল দেখতে পাওয়া যায়। দু সরকারের কাছেই দেশপ্রেমের বিপরীত শব্দ হলো পাকিস্তান; এনিমি আর পাকিস্তান শব্দটি অদলবদল করে ব্যবহার করা হয়েছে বলে।  নিজের যেকোন রাজনৈতিক বিরোধীর বিরুদ্ধে ভারত ও বাংলাদেশের কমন ডায়লগ হল, পাকিস্তান পাঠিয়ে দেয়া হবে। বাংলাদেশ থাক, ভারত এখানে প্রসঙ্গ।
    ভারতে বিগত দু-তিন মাসে দিল্লির জওয়াহেরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) ছাত্রসংসদের নেতা গ্রেফতার ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেয়াকে কেন্দ্র করে এই ‘দেশপ্রেমের রাজনীতির’ এক ভালো বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল। আগেই বলেছি এভাবে ‘দেশপ্রেমের রাজনীতি’ স্বভাবতই এক উগ্র জাতীয়তাবাদ হাজির করেছিল। নিজের দলকে অন্য সবার তুলনায় ‘একমাত্র দেশপ্রেমিক’ দল হিসেবে হাজির করা হয়েছিল।
    এভাবে ক্ষমতাসীন বিজেপিকে এক কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী লাইনে নিয়ে গেলে দলের লাভ হবে, সঠিক রাজনৈতিক লাইন নেয়া হবে বলে এখনো বিজেপির তরফে মনে করা হয় দেখা যাচ্ছে। বিজেপির সেন্ট্রাল ওয়ার্কিং কমিটির সভা সমাপ্ত হয়েছে গত মাসে ২০ মার্চ রোববার; দলের জাতীয় কর্মসমিতির ওই বৈঠকে গৃহীত রাজনৈতিক প্রস্তাবে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “বাকস্বাধীনতার যুক্তিতে দেশবিরোধী, জাতিবিরোধী বক্তব্যকে কোনোভাবে রেয়াত করা হবে না”। অর্থাৎ উগ্র জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমের রাজনীতি আরও  চলবে, টার্গেট পূরণ হয় নাই। অন্য দিকে এর পাল্টা কংগ্রেস-কমিউনিস্টরা মিলে এক সরকার-বিরোধী জোট গড়ার চেষ্টা চলছে। বলা বাহুল্য, এর লক্ষ্য বিজেপির ক্ষমতার বিরোধিতা। কিন্তু সেই বিরোধযী রাজনীতিক বয়ানটা কি উগ্র জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, পাকিস্তান ইত্যাদি শব্দগুলো ব্যবহার না করে তৈরি করা হচ্ছে? এই প্রশ্নের জবাব স্পষ্ট করে ‘হ্যাঁ’ একেবারেই বলা যাচ্ছে না, তাই ‘হা বলা মুশকিল’ বলে থামতে হবে। তবে এতটুকু বলা যায়, এরা অন্তত আপাতত এ শব্দগুলোতে একটু কম জোর দিয়ে বা কম গুরুত্ব দিয়ে পেছনে আড়ালে ফেলে নিজেদেরটা এক লিবারেল রাজনীতির অনুসারি লাইন বলে হাজির করতে চাইছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ভারত রাষ্ট্রের ভিত্তি ‘হিন্দুত্ব হতেই হবে’ এর বাইরে চিন্তা করার সক্ষম এমন প্রমাণ কেউ রাখে নাই। ফলে বলা যায় ভারতের কমিউনিস্টসহ প্রধান ধারার দলগুলোর মধ্যে এমন কোনো রাজনৈতিক ধারা নেই।  অতএব বিজেপির রেসিজমের বা উগ্র দেশপ্রেমের রাজনীতির বিপরীতে এক “আপাত-লিবারেল” রাজনীতি যেন দাঁড়াচ্ছে; তা ভুয়া হলেও এমন একটা ভাবও সৃষ্টি হয়েছে। সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দিক থেকে কংগ্রেস-কমিউনিস্ট জোট গড়ার চেষ্টাকে এমন উদ্যোগ বলেই চিহ্নিত করা যায়। এর মূল উদ্দেশ্য ভোটের রাজনীতি; ভোটের রাজনীতিতে বিজেপির চেয়ে ভালো অবস্থান পাওয়া। কোনো লিবারেল রাজনীতির পক্ষে দাঁড়ানো নয়। রাজনৈতিক দল ছাড়াও এমন রাজনীতির (ছল করে হলেও এক আপাত-লিবারেল রাজনীতি) সমাজের আরেক বড় এমন খাতক বা সমর্থক হল ভারতের মিডিয়া। ভারতের মিডিয়ার প্রধান ধারাও এমন আপাত-লিবারেল অবস্থান নিয়েছে। নিজেদেরকে বিজেপির চেয়ে অনেক ভাল এবং লিবারেল বলে হাজির করছে। আমাদের প্রথম আলোর দিল্লি প্রতিনিধি সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় তেমনদের একজন। গত ১৪ মার্চ ‘দেশপ্রেমের নতুন সংজ্ঞা ও হিন্দুত্ব’ শিরোনামে প্রথম আলোতে লেখায় এ বিষয়টিই তুলে এনে তিনি বিজেপিকে গালমন্দ করে নিজেকে লিবারেল বলে হাজির করেছেন। এককালে সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন টিকে ছিল, পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকেই সেকালে “কোল্ড ওয়ার” চালু হয়েছিল। তখনকার রাজনীতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ দুনিয়া কমিউনিস্টদের মধ্যে নিজেদের এনিমিকে তারা ‘দক্ষিণপন্থী’ বলে চেনানোর একটা রেওয়াজ চালু করে  রেখে ছিল। একালের ফেসবুকীয় ভাষায় বললে বাক্যটা হবে, কমিউনিস্টরা নিজের শত্রুদেরকে ‘দক্ষিণপন্থী’ বলে ট্যাগ লাগাত।  অর্থাৎ আমরা বামপন্থীরা ভালো আর বিপরীতে দক্ষিণপন্থী যারা ওরা খারাপ- এই ছিল বয়ানের ভেতরের মুল প্রম্পট বা সাজেশন। কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর আমেরিকার সাথে সেই কোল্ড ওয়ার সম্পর্ক আর দুনিয়ার কারো সাথে কারও আর নাই। এছাড়া সেই থেকে এখন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ আমরা সবাই, সব রাষ্ট্র। ফলে কাকে কে দক্ষিণপন্থী বা বামপন্থী বলবে এর তাল কেটে সব অর্থহীন হয়ে গেছে। যদিও অনেকে পুরানা অভ্যাসবশত অথবা নতুন চিন্তা করতে অক্ষম বলে, বা সারা দুনিয়াটাই যে এখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীন হয়ে গেছে এটা খোলা দিনের মত পরিস্কার থাকলেও তা দেখতে বুঝতে আমলে নিতে অক্ষম বলে, অথবা নিজেরা ভুয়া ভ্যানিটিতে ‘প্রগতিশীল’ বলে দাবি করে আলাদা মর্যাদা পেতে চায় বলে কোল্ড ওয়ার স্টাইলে দক্ষিণপন্থি-বামপন্থি ট্যাগ করা ছাড়া কথা বলে না। বুঝা যাচ্ছে সৌম বন্দোপাধ্যায় তেমনই একজন যে পুরনো অভ্যাসে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে অপছন্দের কাউকে দক্ষিণপন্থী বলার অভ্যাস অনেকে এখনো ছাড়তে পারেনি। এতে প্রকারান্তরে যে নিজেকে চিন্তা করতে অক্ষম পুরানা “বামপন্থী” বলে দাবি করা হয়ে যায় সে হুঁশও সেখানে থাকে না। সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে সেভাবেই হাজির করে বিজেপি সম্পর্কে লিখেছেন, “ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় না থাকা এবং আদর্শগত অনমনীয়তা এ দেশে প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থীদের বরাবরই পিছিয়ে রেখেছে। পক্ষান্তরে নেহরুর সমাজতন্ত্র, ইন্দিরা গান্ধীর বামঘেঁষা রাজনীতি প্রশ্রয় দিয়েছে বামপন্থী ভাবধারাকে”।
    এ সময়ের বিজেপির এই সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান আরো এক ধাপের বৈশিষ্ট্য, আকার ও মাত্রা ধারণ করেছে। আরএসএস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘকে বিজেপির মূল মতাদর্শিক সংগঠন মনে করা হয়, বিজেপিও তা অস্বীকার করে না। সেই আরএসএসের প্রধান মোহন ভগত দেশপ্রেম বিষয়ে এক ফতোয়া জারি করেছেন। তিনি বলেছেন, “ভারত মাতা কি জয়” বলতে হবে- এটা হল ফিল্টারে পাস করা সেই দেশপ্রেমের স্লোগান। একমাত্র এই শ্লোগানটা বলা  সব ভারতীয়কে বাধ্যতামূলক করতে চান তিনি। কোন ভারতীয় একমাত্র এই শ্লোগান দিতে পারলেই তিনি তাঁকে দেশপ্রেমিক মানবেন, নইলে না। তিনি এমনই আইন দেশে চালু করার পক্ষপাতী বলে জানিয়েছেন। সম্প্রতি তাঁর এই ফতোয়া ভারত জুড়ে স্বভাবতই  রাজনৈতিক হইচই সৃষ্টি করেছে। এটাই বিজেপির নিজেকে টগবগে সবার মুখে মুখে থাকার ভালো কৌশল মনে করে। ভারতের হায়দ্রাবাদ ও মুম্বাইয়ের এক আন্চলিক ইসলামি দলের নাম অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (AIMIM)। এই দলের সভাপতি হায়দ্রাবাদের বাসিন্দা আসাদউদ্দিন ওয়াসি। ওয়াসির বাবা এবং দাদাও এই দলের সভাপতি ছিলেন। ব্যারিস্টার আসাদউদ্দিন ওয়াসি নব্বইয়ের দশকে প্রথমে হায়দ্রাবাদের প্রাদেশিক বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন। পরে পরপর তিনবার তিনি হায়দ্রাবাদ (বর্তমানে তেলেঙ্গনা রাজ্যের অংশ) আসন থেকে কেন্দ্রীয় লোকসভার এমপি নির্বাচিত হয়ে আছেন। এবছরের মার্চ মাসে মোহন ভগতের “ভারত মাতা কি জয়” বাধ্যতামূলক করার দাবির পরে ওয়াসি মুম্বাইয়ে এক জনসভার বক্তৃতায় আরএসএস সভাপতি মোহন ভগতের দাবির বিরোধীতা করেন।
    তিনি আরএসএসের প্রধান মোহন ভগতের দাবির বিষয়ে তার আপত্তি জানিয়ে পাল্টা প্রস্তাবমূলক বক্তৃতা করেছেন। তিনি সরলভাবে বলেছেন, ‘ভারত মাতা কি জয়’ কথাটি বাধ্যতামূলকের জায়গায় অপশনাল রাখলেই, তাহলে তাঁর আর কোন আপত্তি নেই। কিন্তু তাতেই বিজেপি, শিবসেনা নেতারা হৈ চৈ শুরু করে দেয়। রামদেব প্রমুখ নেতারা তাকে পাকিস্তান পাঠিয়ে দেয়ার, নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার দাবি জানাতে থাকেন। ওয়াসির নিজের বক্তব্যের স্বপক্ষের প্রধান যুক্তি হল দেশকে মা-রূপে কল্পনা করা এবং পূজা করা সব নাগরিকের বেলায় প্রযোজ্য করা ঠিক হবে না, আর সেটা জরুরিও নয়। আর এমন কথা ভারতের কনস্টিটিউশনেও নেই।
    গত মাসে ভারতের রাজ্যসভা সেশনে ছিল বা চালু ছিল। ওয়াসির মুম্বাই বক্তব্যের পরে পরেও দিল্লীতে রাজ্যসভার সমাপ্তি অধিবেশন চলছিল। জাভেদ আখতার একজন হিন্দি সিনেমার গীতিকার এবং সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখক। তিনি কোন রাজনীতিক নন, তবে আশি দশকের জনপ্রিয় ও বিখ্যাত অনেক হিট সিনেমার কাহিনী লেখক। “সেলিম-জাভেদ” (একালের নায়ক সালমান খানের বাবা সেলিম খান এর সাথে মিলে জয়েন্ট ক্রেডিটে) নামে তাঁরা সিনেমার কাহিনী লিখতেন। তবে এখনও তিনি কেবল সিনেমার গানের নামকরা গীতিকার হিসাবে সক্রিয়। তিনি কংগ্রেস দল থেকে নমিনেশন পাওয়া রাজ্যসভা সদস্য। রাজনৈতিক বিশ্বাসে তিনি সেকুলার বলে রাজ্যসভায় তিনি ওয়াসিকে মুসলমান রাজনীতিক আর তিনি সেকুলার রাজনীতিক এই ভাগ বজায় রেখে কথা বলার চেষ্টা করেন। ফলে নিজের সেকুলারিজম স্পষ্ট করার তাগিদে তিনিও ওয়াসিকে সমালোচনা করা দরকার মনে করেন। তবে তিনি ভাবলেন মধ্যমপন্থা তার জন্য সঠিক হবে। বলে রাখা ভাল এই ইস্যুতে অন্য সময়ের মতই কংগ্রেসের দলকে বেকায়দায় ফেলে রেখেছে বিজেপি। কংগ্রেসের সমস্যা হল দেশকে সে মা কল্পনা করেই না, এমন আপত্তির কথা যদি বলে তবে হিন্দু কনস্টিটুয়েন্সি না বেজার হয়,ভোট দেয়া থেকে না মুখ ফিরিয়ে নেয় এই ভয়ে এই ভয়ে কংগ্রেস দেশকে মা জ্ঞান করাই সঠিক মনে করে। অর্থাৎ বিজেপির অবস্থানই কংগ্রেসের প্রকাশ্য অবস্থান। তাই জাভেদ আখতার রাজ্যসভায় বললেন, “ভারত মাতা কি জয় বলা বাধ্যতামূলক দায়িত্ব কি না এটা তিনি জানেন না। আবার এমনকি তিনি জানতেও চান না। তবে আমি জানি ‘ভারত মাতা কি জয়’ বলা আমার অধিকার।” মুল ইংরাজি অংশটা হল, He simplistically argued, “I don’t know whether it is my bounden duty to chant ‘Bharat Mata ki Jai’. I don’t even want to know that. All I know is it is my right to chant ‘Bharat Mata ki Jai.’, অনুবাদ আমার। ভারতের দিল্লী থেকে প্রকাশিত এক ইংরেজি ওয়েব দৈনিক আছে, ওয়াইর (WIRE) নামে। আমি সে পত্রিকার ২১ মার্চ সংখ্যার বরাতে লিখছি।
    এভাবেই মোহন ভগতের মুখ্য দাবি ‘বাধ্যতামূলক করতে হবে’ প্রসঙ্গটাই জাভেদ আখতার এড়িয়ে গেলেন এবং প্রকারান্তরে মোহন ভগতকে হিন্দুত্বের দাবিকে জায়গা করে দিলেন।WIRE পত্রিকা এপর আরও জানাচ্ছে, “Later, he was pointedly asked the same question at the India Today conclave –can anyone be forced to chant ‘Bharat Mata ki Jai’? Here Akhtar became more nuanced and said even if Owaisi had the right not to do so he should have expressed it in a less confrontational manner. So it was the form he was objecting to, not so much the content!”। [আমার করা অনুবাদ] বাংলায়, “পরে যখন তাকে সুনির্দিষ্ট করে জিজ্ঞেস করা হয়, কাউকে ওই স্লোগান দিতে বাধ্য করা যায় কি না, এর জবাবে এবার তিনি ব্যাপারটাকে আরও তুচ্ছ করে বললেন, ‘ওয়াসির অধিকার থাকলেও তিনি সেটা সঙ্ঘাত-প্রকাশ পায় বলে তা এড়িয়ে গিয়ে বলা উচিত ছিল। তাই ওয়াসির ব্যাপারে তার আপত্তিটি বিষয়বস্তু নিয়ে ঠিক নয়।’ এরপর WIRE এর রিপোর্টার মন্তব্য করছেন, ‘জাভেদ আক্তারের এই মোচড়ামুচড়ি বেশ মজার’”।
    আমরা এতক্ষণ সেকুলার তামাশা দেখলাম। কিন্তু এই তামাশার এখানেই শেষ না, আরও আছে। এরপরে ঘটনাস্থল রাজ্যসভার অধিবেশন স্থলের বাইরের লবি, এই পাবলিক প্লেস। জাভেদের স্ত্রী অভিনেতা শাবানা আজমি স্বামীকে নিতে এসেছেন। সেখানেই স্ত্রীর সাথে  জাভেদ আখতার হাটতে হাটতে ঐ রিপোর্টারের সাথে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছিলেন। শাবানা আজমি প্রশ্নের সম্মুখীন জাভেদ আখতারের সাহায্যে এগিয়ে এসে বলেন, “আমি ওয়াসিকেই জিজ্ঞেস করতে চাই তিনি “ভারত ‘আম্মি’ কি জয় বলতে রাজি কি না”। এখানে শাবানার তামাশার দিকটা হল, শাবানা আজমি মনে করতে পারেন যে ‘মাতার’ জায়গায় ‘আম্মি’ বসিয়ে তিনি মহা সেকুলার এক রসিকতা করে দেখিয়েছেন। আসলে কিন্তু তিনি বিতর্কটাই বুঝেন নাই। শাবানার মন্তব্য প্রমাণ করে ওয়াসির আপত্তির পয়েন্ট – কেন দেশকে মারূপে জ্ঞান করা তিনি সব নাগরিকের উপরে চাপিয়ে দিবার বিপক্ষে কথা বলছেন, জরুরিও মনে করেন না বরং বাধ্যতামূলক না করে অপশনাল রাখার পক্ষপাতি – এসব কথার গুরুত্ত্ব তিনি বুঝেনই নাই।
    সবশেষে ঐ পত্রিকা রিপোর্টারের মন্তব্য করেছেন, “জাভেদ আক্তারের সমস্যা ও জটিলতা আমরা যে কেউ বুঝতে পারি। ব্যাপারটা হল, ‘ভারত মাতা কি জয়’ বলে নিজের সাংবিধানিক অধিকার চর্চা করা – এটা আজকাল  যেকোনো তবে কেবল হিন্দুর জন্য সবচেয়ে সহজ। রাজনীতি আজ এমনই প্রহসন এবং ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। আর বিপরীতে, ‘আজকের রাজনৈতিক পরিবেশে মুসলমান থাকা সহজ নয়, যেখানে আগ্রাসী জাতীয়তাবাদের পরিণতির দিকটি হল, মুসলিম কমিউনিটিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উত্ত্যক্ত করা’।”
    এখানে সারকথা হলো, সেকুলার অবস্থান মানে কংগ্রেসের অবস্থান এবং সেকুলার জাভেদ আখতারের অবস্থান আমরা চেয়ে চেয়ে দেখলাম। যারা কেউই আরএসএসের প্রধান মোহন ভগতের নাগরিকের ওপর জোর খাটিয়ে বাধ্যতামূলক করার (মৌলিকভাবে অসাংবিধানিক) দাবির বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারলেন না। হিন্দু ভোট হারানোর ভয়ে চুপ থাকলেন। উল্টা ওয়াসিকে দোষী করলেন। অন্য আর এক ভা্রতীয় পত্রিকায় দেখা গেল জাভেদ আখতার ভোটের রাজনীতির খেলাটা বুঝেছেন। সেখানে তিনি বলছেন, …..Please forget next election and think about the country”। কিন্তু বকে শুনে কার কথা – না কংগ্রেস, না বিজেপি। আবার তিনিও জানেন কেউ শুনবে না। এখান থেকে এক সাধারণ শিক্ষা হল, আরএসএসের প্রধান মোহন ভগত সবার আগে একটা সঙ্কীর্ণ সম্প্রদায়গত অবস্থান নিলেন এবং অন্যদের ওপর তা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করাতে অন্যরাও যার যার আরেক কোটারি স্বার্থ বাচাতে সেই সংকীর্ণ সম্প্রদায়গত অবস্থান নেয়ার দিকে সবাইকে বাধ্য করলেন। সব রাজনৈতিক বিভেদের উপর সম্প্রদায়গত বিভক্তির রাজনীতি সবচেয়ে প্রভাবশালী অধিপতির জায়গা পেয়ে গেল।

    ঘটনার ডালপালা আরও আছে। এবার ঘটনাস্থল ঐ একই ১৬ মার্চ মহারাষ্ট্রের প্রাদেশিক বিধানসভার বাজেট অধিবেশন চলছিল। ঐ বিধানসভায়  AIMIM দলের মুসলমান দুই  নির্বাচিত সদস্য ওয়ারিস পাঠান এবং ইমতিয়াজ জলিলকে চলতি বাজেট অধিবেশন পর্যন্ত বহিস্কার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাঁদেরকে ভারত মাতা কি জয় বলতে বলা হলে তাঁরা তা অস্বীকার করে দেশকে অপমান করেছে। ভোটের রাজনীতির হিসাব এবং লোভ এমনই যে বিজেপি ও শিবসেনার আনা বহিস্কারের প্রস্তাব AIMIM বাদে সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়। হা সর্বসম্মতিক্রমে, মানে কংগ্রেস সহ যে দলই সংসদে আছে সবাই হিন্দু ভোট হারানোর ভয়ে বহিস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এমনকি কংগ্রেস সদস্যরা বহিস্কারের পক্ষে বক্তব্য রেখেছে। এই হল কংগ্রেস এবং সেকুলারিজম।  অথচ এখনও পর্যন্ত ভারতের কনষ্টিটিউশনে “ভারত মাতা কি জয়” বলা না বলা কোন আইনী বিষয়ই নয়। কারণ “ভারত মাতা কি জয়” বললে অথবা না বললে কনষ্টিটিউশন ভঙ্গ হবে বা কোন আইন ভঙ্গ হবে এমন কোন আইন নাই। ব্যাপারটা দাড়িয়েছে এমন যে কোন সাংবিধানিক ভারতীয় প্রজাতন্ত্র বলে কিছু আসলে নাই। আছে “ভারত মাতা কি জয়” এর এক ভারত। সবার উপর এটাই একমাত্র সত্য।
    এতক্ষণকার ঘটনা শুনে মনে হতে পারে হিন্দু-মুসলমান বিষয়ক সঙ্ঘাত তো আমরা বুঝিই, এর আর নতুন করে কী বোঝার আছে!
    উপরের এসব ঘটনা সর্বশেষ ২১ মার্চের, এরপর ২৩ মার্চ। আমাদের অনেকের ধারণা ভারতের পাঞ্জাবের শিখ, এরা বোধহয় হিন্দুই। না তা নয়। সারা আশির দশকজুড়ে ভারতে পাঞ্জাবের ভারত থেকে আলাদা রাষ্ট্র হবার লক্ষ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র আন্দোলন চলেছিল। এটা তাদের ভাষায়, সশস্ত্র খালিস্তান কায়েমের আন্দোলন। ভারত কেন্দ্রীয় সরকারের বহু দমন-পীড়নের জেল জুলুম গুম হত্যার পর তা কোন রকমে থিতু হয়। পলাতক রাজনৈতিক কর্মীদের এক বিরাট গ্রুপ পশ্চিমা নানা দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে থেকে যায়। যার সবচেয়ে বড় অংশটা কানাডায় আশ্রয় পায় ও নেয়। এদিকে ভারতের কনষ্টিটিউশনের অধীনে আইনী দল হিসাবে অনেকে আঞ্চলিক শিখ আকালি দল খুলে এর ভিতরে থিতু হয়। পরে এই দলের আবার অনেক বিভক্তি আসে। সেই থেকে এই দলের দুই অংশের কোনো একটা পাল্টাপাল্টি করে বিধানসভা দখল মানে রাজ্য সরকার গঠন করে আসছে। শিখদের শিরোমণি আকালি দল (অমৃতসর) নেতা সিমরনজিৎ সিং মান সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, শিখরাও ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগান দিতে পারবে না। আকালি দল নামের দলগুলোর মধ্যে এই ফ্রাকশনটায় খালিস্তান আন্দোলনের রাজনৈতিক সমর্থক বেশি। তবে এরা এই কোন সশস্ত্র না সংসদীয় রাজনীতিতে লিপ্ত। সভাপতি সিমরনজিৎ সিং মান একজন প্রাক্তন পুলিশের আইজিপি, যিনি ১৯৮৪ সালে অপারেশন ব্লু স্টার এ গোল্ডেন টেম্পলে হামলার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছিলেন। সিমরনজিৎ সিং মান সাংবাদিকদের বলেন, শিখরা কখনই নারীদের পূজা করে না, এ জন্য তারা ‘ভারত মাতা কি জয়’ বলবে না।

    যে কথা বলছিলাম, এতক্ষণকার ঘটনা শুনে মনে হতে পারে হিন্দু-মুসলমানবিষয়ক সঙ্ঘাত তো আমরা বুঝিই, শিখনেতা মানের বিবৃতি আসায় আমাদের জন্য সুবিধা হিসেবে এসেছে যে আমাদেরকে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক পরিসর গড়ার কাজ ও কথা ভাবতে হবে। বিষয়টি সিরিয়াস।

    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটার প্রাথমিক ভাষ্য এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ২৮ মার্চ ২০১৬ ছাপা হয়েছিল। তা এখানে আবার পরিবর্ধিত ও এডিট করে ফাইনাল ভাষ্য হিসাবে ছাপা হল। ]

     

     

     

  • চীন-ভারতের কোর সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বীর নয়, সহযোগীর

    চীন-ভারতের কোর সম্পর্ক প্রতিদ্বন্দ্বীর নয়, সহযোগীর
    গৌতম দাস

    ১৪ মার্চ ২০১৬, সোমবার
    http://wp.me/p1sCvy-RW

    শিরোনাম দেখে ভুল পড়ছি মনে হতে পারে কিন্তু আসলে ঠিকই পড়েছেন। ভারত ও চীনের সম্পর্ক কেমন, এ প্রসঙ্গে কোনো এভারেজ বা আম ভারতীয়কে বলতে বললে তার মুখ থেকে খুবই তিক্ত বক্তব্য শুনতে পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বক্তব্য এমন তিক্ত-বিষাক্ত হওয়ার পেছনে দায়ী ভারতের উপস্থিত মিডিয়ার ব্রিফিং। ভারতের সামরিক ও ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠানের মিডিয়া ব্রিফিং সম্ভবত এর কারণ আর তা এমন শক্তই। ভারতের সামরিক ও ইন্টেলিজেন্স এর ব্যাপারে ভারতের মিডিয়া খুবই অনুগত, যেটাকে একেবারেই বাছবিচারহীন আনক্রিটিক্যাল বলে অনেকের ধারণা। এটা ঠিক-বেঠিকের প্রশ্ন নয়, ফ্যাক্টস। এই সূত্রে অনুমান করা যায়, ভারতীয় ইন্টেলিজেন্সের কৌশলগত অবস্থান সম্মত মিডিয়া ব্রিফিং সম্ভবত এর কারণ। ফলে আমরা সর্বক্ষণ শুনতে পাই ভারতের প্রায় সব মিডিয়াই প্রপাগান্ডা করে বলছে- “চীন তাদের চার দিক থেকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করছে”। কিন্তু বাস্তব অবস্থা কি একেবারে ঠিক এ রকমই? সেটা এবার পরীক্ষা করে দেখব।
    কয়েক মাস ধরে পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এর অবস্থা ভয় পাওয়া পথিকের মত; যে চলতি পথে  নিজেকেই সাহস যোগানোর জন্য উঁচুস্বরে গান ধরে থাকে। কারণ এভাবে গান ধরলে নিজেকেই দুজন মনে হয়।  “চীন আমাদের ভারতকে এভাবে অথবা সেভাবে ঘিরে ফেলছে” এই নিয়মিত প্রচারের সাথে এই পত্রিকা সম্প্রতি এবার আরো খবর ছড়াচ্ছে- ভিয়েতনাম, ব্রুনাই, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন বা মিয়ানমার- এই রাষ্ট্রগুলো ভারতের সাথে নৌ-সামরিক নানান তৎপরতা বা চুক্তিতে যুক্ত হচ্ছে ইত্যাদি। খবরগুলো ভারতের অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠীকে আস্থার প্রপাগান্ডায় নেয়ার মতো করে সাজানো, সন্দেহ নেই। তবে উপরে যে দেশগুলোর নাম নিলাম, এদের মধ্যে কমন দিকটি হল, এরা বেশির ভাগই চীনের পড়শি রাষ্ট্র। সমুদ্রপথে চীনে প্রবেশের এবং চীন থেকে সমুদ্রপথে বাইরের দুনিয়ায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে চীনের একমাত্র প্রবেশদ্বার দক্ষিণ চীন সাগর। প্রবেশমুখের চারপাশের প্রায় সব পড়শি-রাষ্ট্রের সাথে চীনের সমুদ্রসীমা বিতর্ক বিরোধ শুরু হয়ে আছে, চলছে দু-তিন বছর ধরে। এর ফলে চীনের পড়শি-রাষ্ট্রগুলোর ক্ষোভ-অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের নেতা হয়ে সার্ভিস দিতে চায়, এমন ধারণা হাজির করলে অর্থনীতিতে উঠতি চীনের বিপরীতে পড়তি আমেরিকার এ অঞ্চলে কৌশলগত দাম-গুরুত্ব বাড়বে বলে মনে করে সে। ফলে দক্ষিণ চীন সাগরে এটা একটা টেনশন জাগানোর কারণ। এছাড়াও এমন টেনশন জেগে ওঠার পেছনের আরও কারণ এই সাগরে এমন সাতটি দ্বীপ আছে, যেগুলো জেগে ওঠার পথে বা উঠেই গেছে; চীন যার সবগুলোই নিজের বলে দাবি করে আসছে এবং ইতোমধ্যেই সব দ্বীপে কম-বেশি স্থাপনা গেড়েছে। এ ছাড়াও এই সাগরের নিচে তেল-গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনাও প্রচুর। অপর দিকে আবার জ্বালানি তেলের উৎস মধ্যপ্রাচ্য এলাকা আরব সাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত চীনে প্রবেশের এই অঞ্চল প্রসঙ্গে পরিসংখ্যান বলছে, এখানে বছরে সব মিলিয়ে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য বা পণ্য জাহাজের চলাচল হয়ে থাকে। তাই চীন চায় এই এলাকাকে নিজের মুক্তাঞ্চল হিসেবে দেখতে। চীনের চোখে ভারত বা আমেরিকা- এদের নিজ রাষ্ট্রীয় সীমানার আশপাশের অঞ্চল এটা নয়। ফলে এই অঞ্চল এ দুই রাষ্ট্রের সরাসরি নিজেদের প্রত্যক্ষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট, এমন নয়। তবুও আমেরিকা ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’ নামের এক তত্ত্ব আউড়িয়ে এ এলাকার সবখানেই নিজের অবাধ চলাচলের অধিকার ফলাতে চায়। এর বিপরীতে চীনের স্পষ্ট আপত্তি ও অবস্থান হল, নিজ সমুদ্রসীমানার ১২ মাইলের মধ্যে কেউ প্রবেশ করলে বা উঁকিঝুঁকি মারার চেষ্টা করলে তাকে চীন সামরিকভাবে প্রতিরোধ করবেই। কারণ চীনের যুক্তি, এই ১২ মাইল নিজের ‘একান্ত অঞ্চল’ বলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এ ছাড়া চীনের ব্যাখ্যায় এটা খুবই সেনসেটিভ এলাকা এ জন্য যে, নিজ যুদ্ধজাহাজ নিয়ে এখানে ফ্রিডম অব নেভিগেশন যুক্তিতে প্রবেশ করে আমেরিকার ফ্রিডম টেস্ট করতে চাওয়া খুবই বিপজ্জনক। কারণ, আমেরিকা ভুলচুকে ও অনিচ্ছায় ১২ মাইলের ভেতরে প্রবেশ করে ফেললে প্রতিক্রিয়ায় চীনের আমেরিকাকে আক্রমণ করে বসতে হতে পারে। কারণ, এখানে স্থাপিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অনেক ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন আর তুলনায় দূরত্ব মাত্র ১২ মাইল।
    ওইদিকে আমেরিকা শুধু চীনের পড়শিদের নেতা হতে চায় তাই নয়, সে চায় ভারতও এ কাজে একইভাবে আমেরিকার পাশে থাকার সিদ্ধান্ত নিক।
    কথা শুরু করেছিলাম দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে ভারত-চীন সম্পর্কের চেয়েও পেছনের আরো বড় ক্যানভাস ভারত-চীন সম্পর্কের মধ্যকার সামরিক টেনশন কেমন, তা নিয়ে। এ কথা দুনিয়ার কেউ অস্বীকার করবেন না যে, এমন সামরিক টেনশনের কোনোই বাস্তবতা নেই, তা নয়। ভারত ও চীনের মধ্যে যদি কখনো কোনো অছিলায় সামরিক সঙ্ঘাত লেগেই যায়, তবে সম্ভাব্য সেই বাস্তবতা হবে ভারত-চীনের সীমান্তে অচিহ্নিত থেকে যাওয়া বেশ কিছু অংশের কারণে। যদিও ভারত-চীন দু’পক্ষই বিষয়টি নিয়ে কোনো টেনশন যেন না বাড়ে, সে লক্ষ্যে যৌথ মাপামাপি আর ডায়লগের ভেতর দিয়ে তা মিটিয়ে ফেলতে চায়। এমন যৌথ ইচ্ছা প্রকাশ করে বিগত কংগ্রেস সরকারের আমলে ২০১৩ সালের অক্টোবরে ইতোমধ্যেই একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং দু’পক্ষের নির্বাহী প্রধানের ঘোষিত স্থায়ী প্রতিনিধি পর্যায়ে সরাসরি এ নিয়ে নিয়মিত বৈঠক আয়োজনের কাজ চলছে। এ ছাড়াও কখনো আকস্মিক কোনো ঘটনায় এবং অনিচ্ছায়ও কোনো সামরিক টেনশন যেন ছড়িয়ে না পড়ে সে লক্ষে মাঠপর্যায়ে হটলাইন টেলিফোন যোগাযোগ সুবিধা চালু করা হয়েছে ওই চুক্তির ফলে। স্বভাবতই এসবের অর্থ উভয় পক্ষ এ ধরনের এক সীমান্ত সমঝোতা চুক্তি করতে আগ্রহবোধ করেছিল আগে থেকেই। এই আগ্রহবোধের তাগিদ অনুভবকে কেবল একটা দিক থেকেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব; সেটা হল উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিরাট সম্ভাবনা আছে, যেটা দু’পক্ষই স্বীকার করে ও কাজে লাগাতে চায়। বিগত ১২ বছরে বিশাল পণ্য লেনদেন বিনিময়, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়েছে, যার মোট পরিমাণ এখন ৭০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।

    আগ্রহবোধ বিষয়টিকে আরেকটু বিস্তার করে বলা যায়। যেমন প্রথমত, দু’টি রাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে সামরিক-অসামরিক কোনো টেনশন থাকলেই তা আমাদের মনে পুরনো ৪০ বছরের অভিজ্ঞতায় ছেয়ে থাকা আমেরিকা-সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘ঠাণ্ডাযুদ্ধ’ বা ‘কোল্ডওয়ার’ দিয়ে তা বুঝতে হবে এই অভ্যাস একেবারে বাদ দিতে হবে। বরং পরামর্শ থাকবে, ঠাণ্ডাযুদ্ধ দিয়ে কোন কিছুকে বুঝার মানসিকতা আমরা জীবনেও চিরতরে যেন ত্যাগ করি, এদিয়ে আর যেন কোনো কিছুকে বুঝার চেষ্টা না করি। কারণ, ইতোমধ্যেই এমন এক বড় ফারাক এখানে ঘটে গেছে, যাতে কোল্ডওয়ার ধরনের শর্ত-পরিস্থিতি দুনিয়ায় আর কখনো কোথাও ফিরে আসবে না। বরং আমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করতে পারি যে, আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন কোনো একই কমন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের মধ্যকার সম্পর্কিত দুই অর্থনীতি ছিল না। আরো সোজা ভাষায় বললে সে সময়ে এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো পারস্পরিক পণ্য বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন সম্পর্কই ছিল না, বরং প্যারালাল এমন দুটো জোটের অর্থনীতি হয়ে তারা তখন চালু ছিল, যাদের মধ্যে আবার কোনো বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন নাই। ফলে পরস্পরের মধ্যে সহজেই এমন শত্রুতা কল্পনা করা খুবই সম্ভব ছিল যে, পরস্পর পরস্পরকে অবলীলায় দুনিয়া থেকে নির্মূল করার কথা ভাবতে পারে এবং তাতে একজন অপরজনকে নাই করে দিলেও পারস্পরিক কোনো পণ্য বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন সম্পর্ক নেই বলে এতে বেঁচে থাকা অপর রাষ্ট্রপক্ষের অর্থনীতিতে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। অর্থাৎ রাষ্ট্রস্বার্থ বিরোধে বিরোধীকে নির্মূল করার মতো যেকোনো চরম পর্যায়ে নেয়ার বাস্তবতা ও সুযোগ তখনো ছিল। কিছু আজ সারা দুনিয়ার প্রতিটি রাষ্ট্রই অন্য রাষ্ট্রের সাথে যতই স্বার্থবিরোধ থাক, তারা আবার সবাই একই গ্লোবাল অর্থনীতির অংশ হয়ে পরস্পরের সাথে পণ্য বিনিময় বাণিজ্য লেনদেন সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত সম্পর্কিত হয়ে আছে। এটাই সবচেয়ে প্রভাবশালী বাস্তবতা। ফলে এখানে রাষ্ট্রস্বার্থ বিরোধ প্রবল আছে এবং তা থাকলেও কিন্তু সে বিরোধকে কোনো চরম দিকে নেয়ার সুযোগ নেই। ফলে বিরোধকে বরং নির্মূল বা চরমে না নিয়ে, এই পথ ছাড়া অন্য আর যেকোনো পথ অবলম্বন করে বিরোধ লড়াইয়ের মীমাংসা খুঁজে নেয়াই মঙ্গল। কারণ, এখন অন্যের নির্মূল মানে নিজেরও বিরাট ক্ষতি। অতএব, একদম সারকথায় ভারতের মিডিয়া যতই তারস্বরে চিৎকার করুক যে ‘চীন ভারতকে চার দিক থেকে ঘিরে ফেলল’ তা সত্ত্বেও চীন-ভারতের মধ্যে এমন সীমান্ত সমঝোতা চুক্তির পক্ষে উভয় রাষ্ট্র আগ্রহ দেখাতে পারা সম্ভব। এবং সেটাই হয়েছে।
    কিন্তু ২০১৩ সালের শেষে ওই চুক্তির পরও এখন “চীন ভারতকে মুক্তামালার মত চার দিক থেকে ঘিরে ফেলছে” ভারতের এই প্রপাগান্ডায় কোনো ভাটা পড়েনি। এটাকে ভারতের মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের মিডিয়া প্রসঙ্গে কৌশলগত অবস্থান বলে মনে করা যেতে পারে। এছাড়াও এর পেছনে আর দু’টি কারণকে চিহ্নিত করা যেতে পারে: এক. সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে তুলনায় চীনের থেকে ভারত পিছিয়ে আছে। অস্ত্রের ও বাহিনীর সক্ষমতা বিষয়টি যেকোনো রাষ্ট্রের অর্থনীতির সক্ষমতার বা মুরোদের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। কারণ, সামরিক ব্যয় জোগানোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকলে তবেই তা ওই রাষ্ট্রের অস্ত্র ও বাহিনী মজুদের সক্ষমতা হিসেবে হাজির হতে পারে। এই বিচারে ভারত চীনের চেয়ে পিছিয়ে আছে; ভারত তুলনায় ছোট অর্থনীতির বলে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তবুও যেটুকু ব্যয় জোগানোর সামর্থ্য ভারতের হাতে আছে, তার সমতুল্য অস্ত্রশস্ত্র কেনা বা উৎপাদন করতে পারার সক্ষমতার দেখানোর ক্ষেত্রে ‘ম্যানেজমেন্ট বিষয়ক’ বেশ কিছু ঘাটতি ভারতের আছে। এসব সমস্যা ঢেলে সাজানোর জন্য সময়ে ভারতের মিডিয়ায় তা খোলাখুলি আলোচনাও হতে দেখা গেছে। এসব সমস্যা ভারত দ্রুত আপ্রাণ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। ফলে এই অবস্থায় প্রপাগান্ডা দিয়ে অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠীকে ধরে রাখার উদ্যোগ এটা হতে পারে। আর পয়েন্ট দুই. ১৯৬২ সালে নেহরু আমলে চীন-ভারত এক প্রত্যক্ষ যুদ্ধ হয়েছিল, যে যুদ্ধে ভারতের শোচনীয় হার ভারতের কাছে ট্রমার মতো এখনো মানসিক বিষয় হয়ে আছে বলে মনে করা হয়। যেটা একালে সামরিক সক্ষমতা এখন অর্জনে থাকলে বা তৈরি হলেও নিজের ওপর আস্থা বিষয়ক এক খচখচি থেকেই যায় ধরনের। এ ছাড়া সবার উপরে, মিডিয়ার সব কিছুকেই উগ্র জাতীয়তাবাদ ছড়িয়ে দেখার এক প্রপাগান্ডা তো আছেই। যার পরিণতিতে সব আলোচনায় হয়ে যায় যেন দুই ছাপোষা কেরানির রাস্তার ধারে বসে টংয়ের চা দোকানের আলাপ; যারা জাহাজের খবরাখবর নিয়েও আলাপ করছে, রাজা-উজির মারছে এসব। আনন্দবাজার পত্রিকার খবর উপস্থাপনে এই ভাষা ও ইঙ্গিত দিয়ে লেখা হয়। সম্ভবত তারা মনে করে, এটাই সাধারণ মানুষকে বোঝানোর ভাষা, তরল করে লেখার ভাষা। নিজের পক্ষে ন্যায্যতা টানার উপায় হিসেবে তারা হয়তো এমন বলবে, কিন্তু তবু এটা অন্যায্য যুক্তি তাই তা অপ্রতিষ্ঠিতই থেকে যাবে।
    আমেরিকা চায় ভারতও আমেরিকার মতো ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’ এর অধিকার টেস্ট করতে আমেরিকার সাথে যৌথভাবে এ অঞ্চলে টহল দিতে এগিয়ে আসুক। এ কাজে আমেরিকা ভারতকে উসকানিমূলক প্রস্তাব দিয়েছিল। সম্প্রতি গত ১০ ফেব্রুয়ারি বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক এক্সক্লুসিভ রিপোর্টে এ কথাই ছেপেছে। রয়টার্স বলছে, ‘আমেরিকা চায় তার আঞ্চলিক বন্ধুরা সবাই চীনের বিরুদ্ধে এমন জোট অবস্থান নিক। কিন্তু ভারত সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।’ ভারতীয় নেভাল মুখপাত্র রয়টার্সকে এ প্রসঙ্গে জানিয়েছে, ‘ভারতের নীতি হলো অন্য রাষ্ট্রের সাথে একই ফ্ল্যাগ-কমান্ডের অধীনে কোনো যৌথ টহলে ভারতের অংশ না নেয়া। ভারত এখন পর্যন্ত জাতিসঙ্ঘ ছাড়া অন্য কোথাও কোনো ভিনরাষ্ট্রের সাথে যৌথ টহলে অংশ নেয়নি; না নেয়ার ভারতের এই নীতিতেই সে এখনো অটল আছে।’ এখানে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমেরিকার মনের গোপন খায়েশ প্রকাশিত হয়েছে- এটাই চীনের বক্তব্য। এ নিয়ে চীনের সরকারি নীতিনির্ধারণী বিষয়ক পত্রিকা ‘গ্লোবাল টাইমস’ বেশ কয়েকটা লেখা ছেপেছে। ভারত-আমেরিকা-চীন এই ট্রয়কার পারস্পরিক সম্পর্কের দিক নিয়ে আরো কিছু বক্তব্যও সেখানে হাজির করেছে। চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে নামাতে রাজি করানোর আমেরিকান খায়েশ মার খাওয়াতেই চীনের মুখে এই বোল ফুটেছে এমন মনে করা অসঙ্গত হবে না। গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, ‘নিজের অর্থনীতিক বিকাশ-উন্নতির স্বার্থ এবং চীনের সাথে মিলে ব্রিক ব্যাংক উদ্যোগে ভারতের স্বার্থের দিক থেকে ভাবলে ভারতের কাছে চীন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগরে আমেরিকার সাথে যৌথ টহলের আমেরিকান প্রস্তাবের পাল্লায় পড়ার বিলাসিতা করতে গিয়ে ভারত চীনা সহযোগিতা হারাতে পারে না।’ কথা সত্যি। ভারতের দিক থেকে কথাটির মূল বিষয়- ভারতের কাছে প্রায়রিটি কোনটি। ভারত সঠিকভাবেই ধরেছে, সময়টা এখন পুরনো গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার ভেঙে আমেরিকার বদলে চীনা নেতৃত্বের সাথে মিলে নতুন এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার সাজিয়ে তোলা। দুনিয়াকে নতুন করে নেতৃত্ব দেয়া। সাজিয়ে ওঠার এই কাজে ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থ স্পষ্টতই নতুন অর্ডার, নতুন নেতৃত্বের সাথেই। ফলে পুরনো অর্ডারে নয়, ভারতের ভবিষ্যৎ চীনের সাথে নতুন অর্থনৈতিক অর্ডার গড়ার কাজেই। এ প্রসঙ্গে আমার আগের লেখায় অনেক সময় এই অবস্থানই ব্যক্ত করেছি বটে বিষয়টি নিয়ে এর আগে কখনোই ভারত, আমেরিকা বা চীন কেউ কখনো স্পষ্ট করে মুখফুটে কিছু বলেনি। ভারতও স্পষ্ট না করে বরং আমেরিকাকে এক মিথ্যা ভানের মধ্যে রেখে ফায়দা নেবার চেষ্টা করে গেছে। যেমন আমেরিকান নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংকের বিপরীতে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্টের ব্যাংক গড়তে গিয়ে এর গঠনকাঠামো রচনা করার সময় চীনের পরে দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার ভারতের হওয়ার ক্ষেত্রে চীনের সম্মতি পেতে ভারতের কোনো অসুবিধাই হয়নি। এবং সম্ভবত সেজন্য এই প্রথম চীনের দিক থেকে গ্লোবাল টাইমস ব্যাপারটিকে পরিষ্কার বাক্য লিখে বলেছে, ‘… ভারত চীনের সহযোগিতা-সম্পর্ক, সমর্থন হারানোর কথা ভাবতেই পারে না।’ বিষয়টির গুরুত্ব লক্ষ করে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাও ১ মার্চ সংখ্যায় চীনের গ্লোবাল টাইমসকে উদ্ধৃত করে এক রিপোর্ট ছেপেছে। এর প্রথম বাক্য হলো, ‘বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগরে আমেরিকার সাথে যৌথ টহলে অংশ নিয়ে চীনের সমর্থন হারানো ভারতের পোষাবে না।’

    [লেখাটা এর আগে ৭ মার্চ ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে এখন আপডেট করে ছাপান হল। ]
    goutamdas1958@hotmail.com

  • রাষ্ট্র কী কাউকে জামিনদার রেখে গড়ার কাজ

    রাষ্ট্র কী কাউকে জামিনদার রেখে গড়ার কাজ

    ভারতকে জামিনদার রেখে নেপালি রাষ্ট্র গড়ার খায়েস
    ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬,বুধবার

    গৌতম দাস
    http://wp.me/p1sCvy-Fa

    গত প্রায় চার মাস ধরে ল্যান্ড লকড নেপালে পণ্য প্রবেশ ও যাতায়াত রুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এটা মূলত ভারতের আরোপ করে অবরোধ। জ্বালানি তেল, রান্নার গ্যাসসহ ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামাল সব কিছুর সরবরাহ এতে ব্যাহত হচ্ছে। এক কথায় বললে ভারত থেকে নেপালে যাওয়া সব পণ্যের চালানের উপর অবরোধ চলছে। নেপাল ল্যান্ড লকড ভূখণ্ড বলে সে ভারতের মধ্য দিয়ে পণ্য আনা-নেয়ায় নির্ভরশীল।
    গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ নেপাল তার নতুন রাষ্ট্র গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ কনষ্টিটিউশন প্রণয়ন ও রচনার সমাপ্তিতে তা কার্যকর-চালুর ঘোষণা দিয়েছিল। প্রত্যেক রাষ্ট্রের জন্য এটা এক গুরুত্বপুর্ণ প্রক্লেমেশন। এই প্রক্লেমশনে ভিন-রাষ্ট্রের খুশি বা দুঃখ পাবার কো বিষয় নয়। কিন্তু সেই থেকে অখুশি অসন্তুষ্ট ভারত পণ্য অবরোধের রাস্তা ধরেছিল। ভারতের ব্যাখ্যা অনুসারে, দেশটি স্বীকার করে না যে- ভূমি আবদ্ধ নেপালে পণ্য সরবরাহের একমাত্র পথ ভারত অবরুদ্ধ করেছে। যদিও এটা প্রমাণিত যে ভারতীয় কাস্টম এবং বর্ডার গার্ড বিএসএফ স্পষ্ট বলছে যে ‘ওপরের নির্দেশে’ তারা এটা বন্ধ রেখেছে। তবু ভারতের ব্যাখ্যা হলো, নেপাল-ভারত সীমান্তের অধিবাসী যারা সমতলীয় ‘ত্বরাই’ অঞ্চলের বাসিন্দা ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এদেরই বড় অংশ হলো মাধেসি জনগোষ্ঠী। যারা মনে করে নতুন কনস্টিটিউশনে তাদের প্রতিনিধিত্ব সঠিক ভাবে হয় নাই, কম করে রাখা হয়েছে। এজন্য তারা অসন্তুষ্ট হয়ে নেপাল-ভারত সীমান্ত অবরোধ করে রেখেছে। ভারত থেকে পণ্য আসা বন্ধ করেছে। ব্যাখ্যা যার যাই হোক, বাস্তবতা হল এটা কার্যত নেপালের জন্য সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক অবরোধ। আর সেই সূত্রে তা নেপালের রাজনীতিতে রাজনৈতিক স্থবিরতা তৈরি করেছিল। সম্প্রতি এই স্থবিরতা কাটার লক্ষণ দেখা দিয়েছে।
    নেপালের জনগোষ্ঠী গঠনের মধ্যে এমনিতেই সমতল-পাহাড়ি এমন ভূবৈশিষ্ট্যগত বিভেদ আগে থেকে ছিল। কিন্তু একালে নেপাল-ভারত সীমান্তের জনগোষ্ঠী সমতলী অঞ্চলের মাধেসি নেতারা তাদের স্বার্থ নেপালে ভারতের স্বার্থের সাথে মাখিয়ে গাঁটছড়া বেঁধে তুলে ধরাতে নিজ নেপালিদের জনগোষ্ঠীগত স্বাভাবিক বিভেদকে অস্বাভাবিক ও বড় করে ফেলা হয়েছে।

    নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৮ সালে ঐতিহাসিক পাশ ফেরার মতো প্রধান ঘটনা হল গত ২৪০ বছরের নেপালের শাসক ‘শাহ’ রাজবংশের শাসনের পরিসমাপ্তি। যেটাকে আমরা রাজনৈতিকভাবে নতুন এক বিপ্লবী গণরাজনৈতিক ক্ষমতার উত্থানের ফলে রাজতন্ত্রের শাসনের অবসান ও রাজতন্ত্র ব্যবস্থার সমূলে উচ্ছেদের ঘটনা হিসেবে দেখতে পারি। ব্যাপারটাকে প্রতীকী দিক থেকে বললে এতে রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে একটা রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে, এর বদলে এক প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এ ছাড়া এসব ঘটনাবলির ভেতর দিয়ে প্রকাশিত আরেক ঐতিহাসিক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী সত্য হল, নেপালের রাজতন্ত্র ব্যবস্থা উচ্ছেদের লড়াইয়ে ভারতের ভূমিকা ছিল আমেরিকার সহায়তায় কেবল ইতিবাচক সহযোগী বা সমর্থকের নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারকের। রাজতন্ত্র উচ্ছেদের লড়াই – শুরু করার দিক থেকে এতে একক নির্ধারক ভূমিকা রেখেছিল নেপালের নতুন মাওবাদী রাজনৈতিক ধারার দল ইউনাইটেড কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওবাদী) বা ইউসিপিএন (মাওবাদী)। যারা এ লড়াইকে কেবল নিজ মাওবাদীদের নয়, সারা নেপালি জনগোষ্ঠীর লড়াই এবং এটা নেপালিদের সাধারণ ও প্রধান স্বার্থ হিসেবে হাজির করতে সক্ষম হয়েছিল। এরপর নেপালের সব সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে এর পক্ষে সমর্থক হিসেবে সংগঠিত করা- কাজের এই শেষের অংশে আরো দুই প্রচলিত রাজনৈতিক দলের ভূমিকা ছিল। এরা হলো আমাদের সিপিবির মতো কনস্টিটিউশনাল কমিউনিস্ট দল- কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড এমএল ) এবং নেপালি কংগ্রেস। নেপালের রাজনীতিতে মাওবাদীরাসহ এ তিনটি দলই সেই থেকে ৮০-৮৫ শতাংশ নেপালি জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। বলা যায়, রাজতন্ত্র-উত্তর রাজনৈতিক ক্ষমতা ও শক্তির নিয়ন্ত্রক হল এই তিনটি দল, যাদের মধ্যে তা ভাগাভাগি হয়ে আছে। আর এ তিনটি দলের জোটের পেছনেই ভারত পূর্ণ সমর্থন জুগিয়ে নেপালের রাজতন্ত্রে সমাপ্তিতে ইতিবাচক ও নির্ধারক ভূমিকা রেখেছিল।
    কিন্তু রাজতন্ত্র উৎখাত হলেও নেপালে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করা যায়নি। নেপালের প্রধান রাজনৈতিক সমস্যা এখানেই। প্রধান কারণ, নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে উত্থিত ক্ষমতায় ভারতের কোনো ভাগ বা স্টেক নেই। নেপালি রাষ্ট্রক্ষমতায় ভারতের স্বার্থের প্রতিনিধি কেউ নয়, নেই। কারণ রাজতন্ত্র উৎখাতে নির্ধারক পর্যায়ের ভূমিকা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে ভারত এটা নিজগুণে বিষাক্ত করে ফেলেছে। ভারতের ট্র্যাজেডি হল সে ঠিক কী চায়, কিভাবে চায় এ ব্যাপারে হোমওয়ার্ক করা সুনির্দিষ্ট ও উপযুক্ত – নেপালের স্বার্থের ভেতর দিয়ে তা ভারতেরও স্বার্থ এভাবে এমন কোনো নীতি-পলিসি পেশ করা ও এর পক্ষে সমর্থন আদায় করতে না পারার কারণে সে নেপালের ক্ষমতার স্টেক থেকে বিচ্ছিন্ন। মনে রাখা যেতে পারে, মাওবাদীদের ১৯৯৬ সালে ৪০ দফার দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলনের শুরুর সময় তারা নেপাল-ভারত কলোনিয়াল চুক্তির (১৯৫০ সালের চুক্তি) বিরুদ্ধে আঙুল তুলে এবং ভারতকে নেপালের প্রধান শত্রু বলে চিহ্নিত করে ওই আন্দোলন শুরু করেছিল। ফলে খুব সম্ভবত ঐ চুক্তি ও ভারত সম্পর্কে এই মূল্যায়ন প্রসঙ্গে এ তিন দলের কিছু অভিন্ন মূল্যায়ন, অলিখিত সমঝোতা আছে। তৈরি হয়েছে। ফলে এই তিন দল যাদের নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও নেপালের বর্তমান নতুন শক্তি ক্ষমতা তাদের হাতে ও নিয়ন্ত্রণে। সব ক্ষমতা এ তিন দলের হাতে ভাগাভাগি হয়ে আছে। আর এরই প্রতীকী প্রকাশ তারা ঘটিয়েছে নেপালের নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দিয়ে ও পরবর্তীকালে সরকার গঠন করে। নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দেয়ার পর থেকে মাওবাদী দলের সমর্থনে অপর কমিউনিস্ট দল সিপিএন (ইউএমএল) এখন সরকার গঠন করে ক্ষমতায়, যার প্রধানমন্ত্রী খার্গা প্রসাদ শর্মা অলি। আর এই সরকার গঠনের আগে সংসদের ভোটাভুটিতে নেপালি কংগ্রেস এ’দুই কমিউনিস্ট দলের জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছে হেরে গিয়ে বিরোধী দলে আসন নিয়ে আছে।
    আর এটাই ভারতের রাজনীতিবিদ ও আমলাদের ব্যর্থতা-অযোগ্যতাকে রেজিস্টার্ডভাবে প্রমাণিত করেছে যে, এ তিন দলের হাতে ভারতের স্বার্থ উপেক্ষিত। এ তিন দল ভারতকে দায় মনে করে, ব্যাগেজ হিসাবে দেখে। ভারতের ব্যাগেজ বইতে এরা কেউ এখনো রাজি নয়। ফলে নেপালের তৈরি হওয়া নতুন ক্ষমতায় ভারতের কোনো স্টেক নেই। উপায়ান্তর না দেখে ভারতকে এখন ভরসা করতে হচ্ছে নেপালের অ-প্রধান ধারার জনগোষ্ঠী, সমতলীয় ত্বরাই অঞ্চলসহ অন্যান্য অধিবাসী মূলত মাধেসিদের রাজনীতির ওপর।
    এককথায় বললে এই রাজনৈতিক উপস্থাপন সেকটারিয়ান, বাংলায় আমরা যেটা সাম্প্রদায়িক বিভক্তির রাজনীতি বলে চিনি। যদিও ভারতে – এরা ভারতের সব মিডিয়া এই রাজনীতিকে হাজির করছে, যেন নেপালি সংখ্যালঘুদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর জন্য ভারত এটা করছে। অথচ সত্যিকার ঘটনা হলো ২০০৬-২০০৯ সাল, যেটা নেপালের রাজনীতির মৌলিক বদলের দিক থেকে টার্নিং পয়েন্ট- এটাই আনুষ্ঠানিকভাবে নেপাল থেকে রাজতন্ত্র উঠে যাওয়ার তাৎক্ষণিক আগের ও পরের সময় – সে সময়ে নেপালের রাজনীতিতে মাধেসি বলে কোনো ইস্যু কোনো কিছু ছিল না।
    নেপালের জনসংখ্যার বিন্যাসের দিক থেকে এটা বলা হয়, পাহাড়ি-সমতলি হিসেবে জনসংখ্যা প্রায় সমান দু’ভাগে বিভক্ত। আবার কেবল মাধেসিদের নিয়ে রাজনীতি করে নেপালে এমন আঞ্চলিক দলের প্রায় শেষ নেই। আর এমন আঞ্চলিক দল খোলার হিড়িক লেগেছিল ২০০৯ সালে, যখন ‘মাধেসি’ ইস্যু হতে শুরু করে। এর আগে মাধেসিরা সবাই প্রধান ধারার ওই তিন দলের কোনো একটা করত, বেছে নিত। আর এর মধ্য দিয়েই নিজেদের প্রতিনিধিত্ব পেত। অর্থাৎ ওই তিন প্রধান রাজনৈতিক দল দুই কমিউনিস্ট ও নেপালি কংগ্রেস এর আগে মাধেসিসহ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর পুরোটাকেই প্রতিনিধিত্ব করত। তবে মাধেসিদের নানান আঞ্চলিক দল হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও যারা প্রো-ইন্ডিয়ান অবস্থান নিয়েছে এরা ছাড়াও  মাধেসিসহ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর একটা বড় অংশকে এখনো ঐ তিন দলই প্রতিনিধিত্ব করে।
    যেমন যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম অবরোধে আটকে থাকা নেপাল বা নেপাল-ভারত সম্পর্ক, এর জট খোলার আলামত দেখা যাচ্ছে। সংসদে নেপালের কনস্টিটিউশনে প্রথম সংশোধনী আনা হয়েছে। গত ২৩ জানুয়ারি তা পাস হয়েও গেছে। মোট ৬০১ মোট সদস্যের এই সংসদে প্রো-ইন্ডিয়ান অবস্থানের মাধেসি সদস্য যারা ভোটাভুটির সময়ের আগেই ওয়াকআউট করে গেছে, এরা হলো মাত্র ৩৫ জন। সংশোধনীটা পাস হয়েছে মোট ৬০১ সদস্যের মধ্যে ৪৬১ সদস্যের পক্ষ ভোটে। সাত সদস্যের বিপক্ষ ভোটে। আর ঐদিনের সভায় অনুপস্থিত সদস্য মোট ১২৮ জন, যার মধ্য মাধেসি  ঐ ৩৫ জনও অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ যারা অবরোধের পক্ষে এমন মাধেসি সংসদ সদস্য মাত্র ৩৫ জন। ফলে ভারত প্রচার চালাবার সময় মাধেসিসহ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠি গুলো জনসংখ্যার অর্ধেক বলে প্রপাগান্ডা করলেও ফ্যাক্টস হল, মাধেসি জনগোষ্ঠি আঞ্চলিক প্রো-ইন্ডিয়ান দলগুলোকে ভোট দেয় নাই। এজন্য তারা মোট ৬০০ জনের মধ্যে মাত্র ৩৫ জন।
    প্রো-ভারত মাধেসি দলগুলোকে নিয়ে আঞ্চলিক সবচেয়ে বড় জোট হলো ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক মাধেসি ফ্রন্ট। গত চার মাসের অবরোধে রাজনীতিতে তারা শুধু শাসক ক্ষমতাসীনদের থেকেই নিজেদের বিচ্ছিন্ন করেনি ও বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি, বরং একই সাথে নেপালের সাধারণ মানুষ, প্রধান ধারার পাহাড়ি জনগোষ্ঠী থেকেও নিজেদের দূরে দাঁড় করিয়েছে। নিজেদের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শত্রুর কাতারে দাঁড় করিয়েছে। একই ভূখণ্ড ও রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানান ধরনের স্বার্থবিরোধ থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বার্থবিরোধ থাকা এক জিনিস, আর সেই বিরোধকে শত্রুতায় রূপ দেয়া আরেক জিনিস। গত পাঁচ মাসে এই বিপজ্জনক শত্রুতার আগুন নিয়ে খেলার কাজটা ভারতের প্ররোচনায় মাধেসিরা করেছে।
    নেপালের কনস্টিটিউশনে প্রথম সংশোধনী আনার পরের পরিস্থিতিকে ভারতের হিন্দুস্থান টাইমস বর্ণনা করছে এভাবে, বলছে “এর পরও ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক মাধেসি ফ্রন্ট এই সংশোধনী প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলছে এটা তাদের কিছু দাবি মেনেছে, সব নয়। কিন্তু নেপালের এই নতুন অবস্থান নেপাল ও ভারতকে কাছাকাছি এনেছে”। হিন্দুস্থান টাইমসের এই মন্তব্যে অনেক কিছুর ইঙ্গিত আছে। যেমন- এখনকার এক নম্বর বাস্তবতা হলো পাঁচ মাস ধরে অবরোধ চালানোর পরে মাধেসিদের পক্ষে এই আন্দোলন আর চালানোর অবস্থায় নেই। এমন ধারণা ভারত দিতে চাইছে। গত ২৬ জানুয়ারি রয়টার্সের এক রিপোর্টে এ বিষয়ে এক ডিটেইল নিউজ এসেছে। ওদিকে নেপালি সংসদে সংশোধনী পাস হওয়ার পর ভারত একে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও আসলে ভারত ও প্রো-ভারত মাধেসিদের অবস্থান হল, তারা সম্ভবত অবরোধ একেবারে না তুলে ধীরেসুস্থে তুলতে চাচ্ছে। কারণ, এত দিন তারা আন্দোলন এমনভাবে পরিচালিত করেছে, যেন তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন করছে, নেপাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। ফলে সে চিন্তায় বিচ্ছিন্নতার জায়গা থেকে ফেরত আসতে সময় লাগবে। এ ছাড়া আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের কথা চলছে। ওই সফর শেষে অবস্থা বুঝে এরপর পরিস্থিতি আস্তে ধীরে সহজ হতে পারে। যদিও লিখিতভাবে ভারতের স্বাগত জানানো বিবৃতিতে অবরোধ পরিস্থিতি এখন থেকে স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
    কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো সংবিধানে সংশোধনী আনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রো-ভারত ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক মাধেসি ফ্রন্টের নেতা রাজেন্দ্র মাহাতোর দাবি। তিনি দুটো অদ্ভুত দাবি করেছেন। যার ভেতর দিয়ে নেপালের নতুন ক্ষমতায় স্টেক হারানো ভারতের করুণ দুর্গতিই প্রকাশ করে। আবার এই দাবির ভেতর দিয়ে একই সাথে মাধেসি সেক্টরিয়ান বা বিভক্তির রাজনীতির আগুন নিয়ে খেলার বিপজ্জনক দিকটি উদোম হয়েছে। যে আগুন ভারতের জন্যও সমান বিপদের হতে পারে। মাহাতোর দাবি, ভারতকে তিনি নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জড়িত হোক বা হস্তক্ষেপ করুক দেখতে চান। আর দ্বিতীয়ত, নেপাল সরকার যেসব আইনি সংশোধনী যা আনছেন তা বাস্তবায়নে তিনি ভারতকে জামিনদার বা গ্যারান্টার হিসেবে দেখতে চান।

    সত্যিই এমন তামাশা সহজে খুব একটা দেখা মেলে না। ভারতের সেক্টরিয়ান রাজনীতির মহিমা এমনই যে, মাধেসি নেতারা এখন বলছেন নেপাল সরকারকে বিশ্বাস নেই, ভারতকে জামিনদার হিসেবে চাই! খবরটা ১৮ জানুয়ারির ভারতের দি হিন্দু পত্রিকার বরাতে একই দিন ১৮ জানুয়ারি আমাদের দৈনিক বণিক বার্তা ছেপেছে। অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে, মাধেসি নেতাদের কী বলা উচিত আর কী নয়, এসব শিখিয়ে-পড়িয়ে আনার ব্যাপারেও ভারত একেবারেই নাদান। মাহাতোর এই কথা প্রমাণ করেছে তিনি রাষ্ট্র সম্পর্কে মৌলিক ধারণাও রাখেন না। তিনি রাষ্ট্র কী তা-ই বোঝেননি। ফলে তার এমন দাবি। অথচ রাষ্ট্র গঠন করা ভিনরাষ্ট্রকে জামিনদার রেখে করার জিনিস নয়। আবার রাষ্ট্র গঠনের কাজ নিজে করার কাজ; বাইরের কাউকে হস্তক্ষেপ করতে ডেকে করার কাজও নয়। নিজ জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভিন্ন নাগরিক ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠিত হয়। আর ঐ ভিত্তির গাঠনিক দলিল হল কনস্টিটিউশন। বাইরের জামিনদার নয়। তাই রাজেন্দ্র মাহাতো তিনি আসলেই বড়জোর নেপাল রাষ্ট্রে ভারতের স্বার্থের এজেন্ট হয়েই থাকতে চান। এতটুকুর জন্যই তিনি যোগ্য। এটা যেন বাবাকে জামিনদার রেখে কেউ বিয়ে করতে চাওয়ার শখ প্রকাশ করছে। অথচ যেখানে জামিনদার রাখার কথা ভাবতে হয় সেটা কি বিয়ে!
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে ৩১ জানুয়ারি দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এর প্রিন্ট পত্রিকায় এবং পরের দিন ০১ ফেব্রুয়ারি দৈনিক নয়া দিগন্ত প্রিন্ট পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। খানে তা আবার পরিমার্জন সংযোজন এবং এডিট করে ছাপা হল।]

  • কানে পানি গেছে, এবার কী সত্যিই বাঘ এসেছে!

    কানে পানি গেছে,
    এবার কি সত্যিই বাঘ এসেছে!

    গৌতম দাস
    ০১ ডিসেম্বর ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-hR

    বাংলাদেশে “আইএস এসেছে, আইএস আসে নাই” মনে হচ্ছে এই ছুপাছুপি খেলার অবসান ঘটতে শুরু করেছে। ২৮ নভেম্বর শুরুর প্রথম প্রহরে চ্যানেল আইয়ের টকশোতে এসেছিলেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত। আলোচনার এক ফাঁকে তিনি সরাসরি উপস্থাপক মতিউর রহমান চৌধুরীকে বলেই ফেললেন,”দাবিক” ম্যাগাজিনটা দেখেছেন নিশ্চয়! বলা বাহুল্য, দৈনিক মানবজমিনের মালিক সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীই সম্ভবত সবার আগে তাঁর পত্রিকায় দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্টের রিপোর্ট ছাপিয়েছিলেন। বলা যায়, “আইএস আছে” দাবির পক্ষে প্রথম স্থানীয় মিডিয়ার স্বীকারোক্তি সেটা।

    আইএসের মুখপত্র বলা হয়ে থাকে বা স্বীকৃত মাসিক ম্যাগাজিন হলো দাবিক। বিদেশী গোয়েন্দা ইনটেলিজেন্স জগতে দাবিককে আইএসের মাসিক মুখপত্র মনে করা হয়। আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো থেকেও স্বীকারোক্তি মিলা শুরু হয়েছে। ওদিকে ভারতের অবস্থান বেশ তামাশার। অথবা বলা যায়, ‘দাবিক আইএসের মুখপত্র নয়’এমন উল্টা দাবি কোনো মহল থেকেই এখনো কাউকে করতে দেখা যায়নি। বিশেষত দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্ট ছাপা হবার পর। তবে মাস খানেক আগে “আইএস বলে কিছু নাই। সব জামাত এর কাজ।” এই ভাষ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা এজেন্সীর বরাতে বহু রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়া ০৬ অক্টোবর সংখ্যা। বাংলাদেশের ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো এই রিপোর্টের বরাতে নিজ নিজ পত্রিকায় পরের দিন লেখা ছাপিয়েছে। টাইম অব ইন্ডিয়া ভারতের ইন্টেলিজেন্স সুত্রের বরাতে আমাদেরকে ‘নিশ্চিত করছে’ বলে পত্রিকাটা দাবি করেছিল যে দুই বিদেশী হত্যায় আইএসের সংশ্লিষ্টতা নেই। সেই সাথে আমাদের জানিয়েছিল বাংলাদেশ সরকারের মতোই বরং একাজের জন্য তারা জামায়াতে ইসলামিকে দায়ী মনে করে।  ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল (অব.) সৈয়দ আতা হাসনাইন দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে একটি উপস্থাপনা দেন। তারপর প্রশ্নোত্তর পর্বে উপস্থিত একজন জানতে চান, বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি আছে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, আমার মনে হয়, বাংলাদেশে বিস্তৃতভাবে আইএস নেই। ভারত ও পাকিস্তানেও একইভাবে আইএসের বিস্তৃত উপস্থিতি নেই। হাসনাইন সাহেব ন্যদের চেয়ে একটু বুদ্ধিমান দেখা যাচ্ছে। তিনি যেন অস্বীকার করলেন না তবে বিস্তৃত উপস্থিতি নাই।  অথচ এক মাসও যায়নি, মনে হচ্ছে এবার কানে পানি ঢুকেছে। হিন্দুস্থান টাইমস ২৮ নভেম্বর লিখছে, বগুড়ায় হামলার ঘটনায় আইএস-সংশ্লিষ্টতা নেই, সরকারি এই দাবিকে সন্দেহের মুখোমুখি করেছে। এছাড়া ভারতের দি হিন্দু পত্রিকা দাবিক পত্রিকায় আইএসের বক্তব্য সিরিয়াসলি নিয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে “বেঙ্গল” নামে ঢাক দেয়াটাকে। এককথায় বললে ভারতে বড় সব প্রিন্টেড মিডিয়া আইএসের উপস্থিতি প্রসঙ্গে আগের অস্বীকার অবস্থান ছেড়ে স্বীকার করে রিপোর্ট করা শুরু করেছে।
    ভারতের মিডিয়ার অবস্থান তামশার বলছি আর এক কারণে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ভারতী জৈন নামের সাংবাদিক  ০৬ অক্টোবর (যে নিউজটা প্রথম আলো অনুবাদ করে ছেপেছে পরের দিন ০৭ অক্টোবর) ভারতের জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা লিখছেন, “জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের কার্যক্রম সারা বিশ্বেই আছে। দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চরমপন্থীদের সম্পৃক্ততা আছে—এমনভাবে প্রচার চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী; যেন কাজটি করেছে আইএস। এটি করা হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। জামায়াতে ইসলামীর এর পরের পরিকল্পনা হতে পারে, এটা দেখানো যে ‘হাসিনা সরকার বাংলাদেশে বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।” অথচ ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়া গত ১৫ সেপ্টেম্বর ভারতীয় জামাতে ইসলামির আর এক রিপোর্ট ছেপেছে। এম পি প্রশান্ত নামের সাংবাদিক লিখছেন, ভারতের জামাতে ইসলাম আইএসের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামতে যাচ্ছে। “Jamaat-e-Islami to launch campaign against ISIS” – এই হল ঐ রিপোর্টের শিরোনাম। কারণ ভারতীয় জামাত মনে করে আইএস ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে।  কারণ তারা অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছে। আর আইএসের খলিফাগিরিও এক নকল কারবার”। তাহলে এই রিপোর্ট থেকে বুঝা যাচ্ছে আইএস কে জামাত কিভাবে মুল্যায়ন জানা যাচ্ছে। তাহলে ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্টের বরাতে ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়ার – “বাংলাদেশে জামাতই আইএস” এই প্রপাগান্ডার মানে কী?

    সিরিয়ার উত্তরে আলেপ্পো প্রদেশের এক শহরের নাম দাবিক। এই নামের গুরুত্ব হল, বলা হয়ে থাকে কোনো এক হাদিসে এই শহরের নামের উল্লেখ আছে যে, এই শহরে রোমান অর্থাৎ খ্রিষ্টানদের সাথে মদিনা থেকে আসা সৈন্যদের শেষ লড়াই হবে। এবং ক্রুসেডাররা পরাজিত হবে। হাদিসের মত ওল্ড স্ক্রিপ্টে এই শহরের নামের রেফারেন্স থেকে সম্ভবত সে কথা স্মরণ করে আইএসের পত্রিকার নাম দাবিক রাখা হয়েছে। এর আগে দাবিকের প্রথম সংখ্যায় তাঁরা নিজেদেরকে পরিচিত করার প্রতীকী স্লোগান হিসেবে লেখা হয়েছিল, ‘আনটিল ইট বার্নস দি ক্রুসেডর আর্মিস ইন দাবিক অর্থাৎ “প্রত্যাদেশ মোতাবেক দাবিক শহরে খ্রিষ্টান ক্রুসেডর সেনাদের পুড়িয়ে শেষ করার আগে পর্যন্ত”।
    দাবিক যে কারণেই নাম রাখা হোক না কেন আমাদের প্রসঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল এই ১২তম সংখ্যাতেই প্রথম ‘বেঙ্গল’ নাম উল্লিখিত হয়েছে। মোট ৬৫ পৃষ্ঠার এই সংখ্যায় ৩৭ নম্বর পৃষ্ঠায় কোনো এক আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির রচিত একটা লেখা ছাপা হয়েছে। আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির ওই লেখার শিরোনাম “দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল”। ঐ রিপোর্টের লক্ষণীয় ব্যাপার হল, নামের মধ্যে বাঙালি ও বেঙ্গল শব্দের বহুল ব্যবহার। বাংলাদেশকে কেন “বেঙ্গল” নামে তারা ডাকছে এর একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা বা নোট দিয়েছে। বলছে ১৯৭১ এর আগের (সম্ভবত বুঝাতে চেয়েছে বৃটিশ আমলের বাংলা) ন্যাশনালিষ্ট বাংলাকে বুঝাতে তারা “বেঙ্গল” নামটা নিয়েছে। এথেকে আমরা আবার “তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি” বলে মিলিয়ে যেন ভুল না বুঝি। তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি ধরণের মোটেও নয়। বরং যেকোন ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদে তাদের আপত্তি সেজন্য।

    যাহোক সেটা, শুধু তা-ই নয় বাংলাদেশে আইএসের এফিলিয়েশন বা স্বীকৃতি দেয়া সংগঠন হিসেবে জেএমবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। আর বিএনপি (ন্যাশনালিস্ট মুরতাদ্দিন) এবং জামায়াতকে (পার্লামেন্টারি মুরতাদ্দিন) সংগঠন আর আওয়ামী লীগকে ‘তাগুতি সরকার’ হিসেবে চিহ্নিত ও ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া জেএমবির মূল নেতা আদালতের রায়ে ফাঁসিতে মৃত্যু হওয়া শায়েখ আব্দুর রহমানকে বীর শহীদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
    এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি ভাষ্যে দাবিক ম্যাগাজিনের বক্তব্যের সত্যতা বা এর অস্তিত্ব স্বীকার করে এমন বক্তব্য দেখা যায়নি। অর্থাৎ সরকারি ভাষ্য “বাংলাদেশে কোনো আইএস জঙ্গি নেই” এই বয়ান এখনো অটুট আছে। বাংলাদেশে নিরাপত্তাবিষয়ক এক গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামান অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি থাকার পক্ষে সম্ভাবনার কথা বলে গেছেন। এমনকি কাজের ধরন হিসেবে আইএস স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের এফিলিয়েটেড হিসেবে ঘোষণা করে ওই সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ভেতর দিয়ে নিজেরা হাজির থাকে সে কথাও বলেছিলেন। দাবিকের ১২তম সংখ্যা সম্পর্কে বাংলা দৈনিক মানবজমিনের রিপোর্টের পর আমেরিকার এনবিসি টিভি নেটওয়ার্কের বরাতে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকাও এক রিপোর্ট করেছে। মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামানের বরাতে প্রথম আলো ওখানেও লিখছে যে তিনি বলেছেন,‘যেহেতু আইএসের নিজস্ব প্রকাশনায় (দাবিক) বাংলাদেশ সম্পর্কে এত বিস্তারিতভাবে লেখা হয়েছে। তাই বিষয়টি আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। যদি এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে এদের প্রতিহত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’

    বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মিথ্যাগুলো অদ্ভুত। সরকার নিজেও জানে এটা মিথ্যা, আমরাও যে জানি সরকার এটা মিথ্যা বলছে, সেটাও সরকার জানে। কিন্তু এর পরেও সরকার নিজের মিথ্যা বয়ানটাকে আঁকড়ে থাকবে। আর আমাদেরকে বলতে থাকবে‘বুঝোই তো আমার বয়ান মিথ্যা, তবু আমাকে মিথ্যা বলতে সুযোগ দাও।’ তেমনই এক বয়ান হলো, ‘এই দেশে আইএস বলে কিছু নোই।’ দাবিকের ১২তম সংখ্যা প্রকাশের পর সরকারের এই মূল বয়ানে কোনো বদল আসেনি। তবে এখন কেবল বাড়তি যে কথাগুলো সরকারি বয়ানে যোগ হয়েছে তা হলো, কখনো বলে জামায়াত বা কখনো বিএনপি এগুলো করছে। কখনো বলে জামায়াত জেএমবির নামে করছে। কখনো বলে জামায়াত আইএস নাম দিয়ে করছে। প্রথম আলোর ওই রিপোর্টেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “এ দেশে আইএস বলে কিছু নেই। ইতালীয় নাগরিক তাবেলাকে বিএনপি নেতা কাইয়ুম তার ভাইকে দিয়ে শুটার ভাড়া করে হত্যা করেছে। তাদের কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এসব ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে তারাই আইএসের নামে এসব প্রচার করছে। এসব প্রচারণাকে আমরা গুরুত্ব দিই না”। অর্থাৎ আইএস নেই এখনো সে কথা আঁকড়ে ধরে আছে। তবে বাড়তি স্বীকারোক্তি হল, এক. আইএসের নাম দিয়ে অন্যেরা কেউ করছে। দুই. জামায়াত-বিএনপি এগুলো করেছে। এ কথা ঠিক যে জামায়াত-বিএনপিকে জড়িয়ে মিথ্যা বয়ান দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের আর একধরনের উদ্দেশ্য আছে। তা হলো, সরকারবিরোধী সাংবিধানিক ধারার বিরোধী দল জামায়াত-বিএনপির ওপর দমনপীড়ন বা চলতি গণগ্রেফতারের পক্ষে এক ন্যায্যতার বয়ান খাড়া করা। ফলে “আইএস আছে” স্বীকার করে নিলে জামায়াত-বিএনপির ওপর নিপীড়নের পক্ষে বয়ানের ভিত্তি থাকে না। এমনিতেই এ বয়ান জনগণ বা খোদ সরকার কেউ বিশ্বাস করে না। সবাই বোঝে এটা সরকারের মুখরক্ষার বয়ান মাত্র।
    তবে এ কথাও সত্যি যে, কিছু টেকনিক্যাল সমস্যাও আছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতা বিষয়ে সরকার কোনো স্বীকারোক্তি বয়ান দিয়ে দিলে কতকগুলো অসুবিধা ও জটিলতা সৃষ্টি হবে যেগুলো সরকার এড়াতে চায়। যেমন, কোনো দেশে ‘সন্ত্রাসবাদী’ তৎপরতা ও উপস্থিতি আছে, এমন অফিসিয়াল স্বীকৃতি থাকলে হয়ত বিদেশী দূতাবাস বা প্রতিষ্ঠানকে কিছু রুটিন নিরাপত্তা বিষয়ক করণীয় এমন পদক্ষেপ নিতেই হবে। যেমন, অতি জরুরি স্টাফ ছাড়া বাকিদের দেশে পাঠিয়ে দেয়া, ইমারজেন্সি উন্নয়ন কর্মসূচি ছাড়া বাকি সব তৎপরতা বন্ধ করে দেয়া, স্ব স্ব দেশের যেসব নাগরিক বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারি প্রকল্পে নিয়োজিত আছে নিরাপত্তার জন্য তাদেরকে দেশে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ ও চাপ দিতে হবে ইত্যাদি। আর এরই সার প্রভাবটা পড়বে বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্যে অর্থনীতিতে। তাই সরকার এসব বিপর্যয় হয়ত এড়াতে চায়। তবে অবশ্যই এমন স্বীকারোক্তি না দেয়ার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলকে দমনের কাজে এই বয়ানকে খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার মারাত্মক বিপজ্জনক এবং অগ্রহণযোগ্য।

    দুই.
    ইসলামি রাজনীতির পক্ষে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই কি তাকে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন বলা ঠিক হবে? এমনিতেই পশ্চিমের “টেররিজম” – এর সংজ্ঞাও কোন স্পষ্ট ভিত্তি নাই। এককথায় তা সাবজেকটিভ; আমি চাই তাই ধরনের। অনেকটা যেন আমি অমুক সংগঠনকে টেররিস্ট বলতে চাই তাই – এরকম। কিন্তু কেন বলতে চাই – এর কোন জবাব নাই,  বলব না, নিরুত্তর।  বিভিন্ন দলিলে বলা হয়েছে টেররিস্ট দল কারা এক তালিকা আছে। ঐ তালিকায় যাদের নাম আছে ওরাই টেররিষ্ট। এভাবে আসলে কোন সংজ্ঞা না দিয়েই টেররিজম কোনটা বা টেররিষ্ট কারা এর ছদ্ম ভিত্তি দাঁড় করানো হয়েছে। এটা আমেরিকান কায়দা। আবার ঠিক এই কায়দা অনুসরণ করে জাতিসংঘেরও এক নিজস্ব টেররিস্ট তালিকা ও কায়কারবার।
    তো যে কথা বলছিলাম, পশ্চিমা সংজ্ঞার দিক থেকে বিচারেও ব্যাপারটা সম্ভবত ঠিক তা নয় যে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই সে পশ্চিমের চোখে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন। বরং সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কার ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার কোথায় এই প্রশ্ন বিচারে আমরা ভিন্ন এক ভাগ-বিচার দাঁড় করতে পারি। যেমন, যেগুলো পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর যেগুলো তা নয় এমন দুইয়ের ভাগ-বিচারের মধ্যে বড় ফারাক হল, পাকিস্তানের ভূমিতে ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার আছে, এমন সংগঠন সম্পর্কে একটা অনুমান আমরা করতে পারি যে এসব সংগঠন নিজেদের এজেন্ডা যা-ই থাক, মাঝে মধ্যে পাকিস্তান সরকার বা এর গোয়েন্দা বাহিনীর দেয়া অ্যাসাইনমেন্টও সম্পন্ন না করে দিলে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ওসব সংগঠনের তৎপরতা পাকিস্তানের চলতে দেয়ার কথা নয়। যেটাকে আমরা বলতে পারি ট্যাক্স দিয়ে চলা। কারণ, সশস্ত্র সংগঠন মানেই যেকোনো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক আইনের চোখে তা বেআইনি তৎপরতাই হবে। ফলে সেই বেআইনি দিক উপেক্ষা করে কাজ করতে দিতে পারে একমাত্র সরকার বা এর কোনো এজেন্সি। কথাটা আরেকভাবে বলা যায়, সশস্ত্র ওসব সংগঠনের কোনো তৎপরতা যদি সরাসরি পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইচ্ছার সাথে সংঘাতের বিষয় হয়, তাহলে পাকিস্তান সরকার এসব সশস্ত্র সংগঠনকে নিজ ভূমিতে থেকে তৎপরতা চালাতে দিবে না। দিতে পারে না। এই বিচারে আলকায়েদা ও আইএস ছাড়া বাকি প্রায় সব সংগঠন পাকিস্তানভিত্তিক। ফলে পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর পাকিস্তানভিত্তিক নয়, এভাবে দুটো ভাগ আমরা করতে পারি।
    আবার পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোর আর এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল, এরা দুনিয়াব্যাপী তৎপরতার সংগঠন নয়। এমনকি এরা ঠিক আঞ্চলিক সংগঠনও নয়। মানে আমাদের অঞ্চলের সব রাষ্ট্রেই সংগঠনের শাখা ও তৎপরতা আছে তা নয় এবং সব সরকারের বিরুদ্ধে তৎপর এ কথাও সঠিক নয়। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রে তৎপর এবং এই অর্থে বলা যায়, বেশির ভাগই কাশ্মির ইস্যু কেন্দ্রিক সংগঠন। এটাই তাদের মূল কাজের এলাকা। তবে উপচে পড়া এফেক্ট হিসেবে বাংলাদেশেও এদের তৎপরতা থাকতে পারে। কিন্তু মূল কথা আলকায়েদা বা আইএসের সাথে সম্পর্ক বা এফিলিয়েটেড সংগঠন এরা কেউ নয়।
    তাহলে পাকিস্তানভিত্তিক আর আন্তর্জাতিক- এভাবে ভাগ দেখানোর আর এক কারণ হল, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো ৯/১১-এর আগেও হাজির ও তৎপর ছিল। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিজ নিজ স্বার্থে পরস্পরের বিরুদ্ধে এবং অপর রাষ্ট্রের ভেতর কাউন্টার ইনটেলিজেন্স বা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালানোর বহু পুরনো রেওয়াজের ধারাবাহিকতা সংগঠন। পশ্চিমা বা আমেরিকানরা যে অর্থে সন্ত্রাসবাদী বা টেরর সংগঠন বলতে বোঝে, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো এর পুরো অর্থ বহন করে না। অটল বিহারি বাজপেয়ির বিজেপি সরকার ২০০৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত  ভারতে ক্ষমতাসীন ছিল। পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোকে এরা সে সময় এক নতুন নামে ডাকত, বলত  “সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদ”। অর্থাৎ সীমান্তের অপর পাড় থেকে মানে পাকিস্তান থেকে যারা আতঙ্ক বা সন্ত্রাস ছড়াতে এসেছে। এই নাম খুবই অর্থপূর্ণ। পশ্চিম তাঁর সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদী বলতে যাদেরকে বোঝাতে চায় ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদীরা’ ঠিক সে সংগঠন এরা নয়।
    এসব বিচারে এবার স্পষ্ট করে বলা যায়, আলকায়েদা বা আইএসের সন্ত্রাসবাদ ভারত অথবা বাংলাদেশ এপর্যন্ত কখনও দেখে নাই। এর আগে কখনোই অভিজ্ঞতা নেয়া বা মোকাবেলা করতে হয়নি। মনে হচ্ছে, এবারই প্রথম করতে হবে। তাহলে এত দিন ভারতের ভোকাবুলারিতে সর্বক্ষণ যে জঙ্গিবাদের কথা শুনে এসেছি সেগুলো কী ছিল? দু’টি পয়েন্টের দিক থেকে তা ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রেওয়াজি অন্তর্ঘাতী তৎপরতা যেগুলো ছিল, আফগান যুদ্ধফেরত যোদ্ধাদের ফেরার কারণে যেটা আরো বড় মাত্রা পেয়েছিল; সেকালে নাইন ইলেভেন আমেরিকায় হামলার পর আমেরিকা ভারতের সমর্থন চাওয়াতে ভারত তার নিজ অভিজ্ঞতার ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদকে’ আমেরিকান বুঝের ‘সন্ত্রাসবাদ’ বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বলে চালানোর সুযোগ পেয়েছিল এবং নিয়েছিল। কিন্তু তবু ভারত অভ্যন্তরীণভাবে নিজস্ব মূল্যায়নে পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র তৎপরতা আর আন্তর্জাতিকভাবে আলকায়েদা ও আইএসের তৎপরতাকে পরিষ্কার আলাদা ভাগ করেই বুঝে থাকে। তবে এত দিন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সে তৎপরতায় ভারতের নিষ্ঠা আছে, অথবা বাংলাদেশে তার সিকিউরিটি স্বার্থ আছে এসব কথা ছড়িয়ে সে বাংলাদেশে নিজের পছন্দের সরকার রাখাকে জায়েজ করেছে। বিনিময়ে ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থ আদায় করা আর সবচেয়ে বড় স্বার্থ বাংলাদেশ থেকে মাগনা ট্রানজিট আদায় করা এগুলো চালু রেখেছে। আজ সম্ভবত সময় ঘনিয়েছে। কানে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতার বিপক্ষে ভারতের নড়াচড়া প্রস্তুতি নিতেই বা  করতেই হচ্ছে তাকে। আইএস তৎপরতার উপস্থিতি, হোক না তা স্থানীয় সংগঠনকে এফিলিয়েশন দেয়া তৎপরতা, এটা ভারতের পক্ষে আর কোনোভাবেই খাটো করে দেখা সম্ভব হচ্ছে না। এই জায়গায় এসে বাংলাদেশ সরকারের স্বার্থের পক্ষে ‘আইএস নেই’ সে কথা বলবার অবস্থায়  ভারত আর নেই। যদিও সর্বশেষ গত অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে দুই বিদেশী হত্যার পরেও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে তাল মিলিয়ে ও নিজের গোয়েন্দা তথ্যের সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিল আইএস নেই। একই সাথে এবার ভারতীয় মিডিয়াগুলোর ভোল বদলও লক্ষণীয়। অন্তত নিরাপত্তার প্রশ্নে এই ইস্যুতে হাসিনার বয়ান ও স্বার্থকে ভারত আর নিজের স্বার্থের সাথে মিলিয়ে দেখতে ও চলতে পারছে না।
    বলা বাহুল্য, ভারতের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ, নিরাপত্তাবিষয়ক জেনুইন কোনো হুমকি ইত্যাদি – এসবকে অন্য সব কিছুর ওপর তাকে স্থান দিতেই হয়। সবার আগে চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা।

    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে গতকাল ৩০ নভেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এরই ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আরও সংযোজন এডিট করে এখানে আজ আবার ছাপা হল।]

    সর্বশেষ এডিটঃ ০১ ডিসেম্বর, ভোর ০২ঃ৫২