Tag: বিজেপি

  • আমেরিকা ভারতকে হবু চীন-বিরোধী জোটে পাচ্ছে না

    আমেরিকা ভারতকে হবু চীন-বিরোধী জোটে পাচ্ছে না

    গৌতম দাস

    ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3aW

     

    চীন মনে করে ইন্দো-প্যাসিফিক বলে কিছু দাঁড়াবে না, কারণ এটা একটা ডেড এন্ড।Hegemonic nature of US Indo-Pacific Strategy exposed – Global Times

    [সার সংক্ষেপঃ আমেরিকা চীন ঠেকানোর (Containment) লক্ষ্যে জোট গড়তে চায়, ইন্দো-প্যাসিফিক জোট। সেটাই পরিস্কার করে বলছে এখন।   কিন্তু এই জোটের বৈশিষ্ট্য কী হবে সেটাসহ এর চেহারা গত দুই দিনে অনেকটাই পরিষ্কার করে ফেলেছে। কিন্তু তাদের জন্য খারাপ খবর হল, সে জোটের ‘নৌকায়’ তারা চাইলেও ভারতকে তুলে নিতে পারছে না। ব্যাটে-বলে হচ্ছে না। তারা যেমনভাবে ভারতকে চায় আর বাস্তবের যে ভারত সেদুটোতে মিল নাই। এক নয়, তাই মিলছে না।  গত ৯-১০ সেপ্টেম্বর তাদের নিজেদের মনের কথাগুলো নিয়ে প্রকাশিত কয়েকটা আর্টিকেলে তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। ফলে তাদের কথাগুলো  দু’টি শর্ত যুক্ত করে তারা বলছে।  আর ভারতকে সেই শর্তপূরণ সাপেক্ষে ঐ নৌকায় তুলে নেয়া যেতে পারে বলে ঐ আর্টিকেল সিদ্ধান্ত টেনেছে। শর্ত দু’টি হল – যদি ভারতের পতিত অর্থনীতি উঠে দাঁড়ানোর জন্য আবার জোয়ার আনা যায় আর দুই, বর্তমান ভারত রাষ্ট্র, রাজনীতি ও দলে ‘লিবারেল বৈশিষ্ট্য’ হাজির থাকতে হবে – যার মানে হল মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো মোদীকে বন্ধ করতে হবে। আর প্লুরাল বা একাধিক মুখ ও ধারার রাজনীতি যেখানে পাশাপাশি চলতে পারে এমন সমাজ গড়তে রাজি হয়ে ভারত যদি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়। তবে এটাও পরিষ্কার যে, সাধারণভাবে ভারত তো বটেই বিশেষত মোদীর সরকার এদুই শর্ত কোনো দিনই পূরণ করতে পারবে না। কাজেই সাত মণ ঘি ঢালা হচ্ছে না, রাধাও নাচবে না। কারণ এই শর্ত পূরণ করার অন্তত একটা অর্থ হল, বিজেপি-আরএসএসকে ভাল হয়ে যেতে হবে;  নাম ও রাজনীতি পরিত্যাগ করতে হবে।
    সে জন্যই কি আমরা আরেকটা ডেভেলপমেন্ট দেখছি, খুব সম্ভব তাই। রাশিয়ার পুতিনের মধ্যস্থতায় সীমান্ত ইস্যুতে চীন-ভারত ‘”পাঁচ দফা ঐকমত্যের” এক যৌথ বিবৃতির ঘোষণা প্রকাশ করেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর রাতে মস্কোতে এমন সভা সমাপ্ত হয়েছে। রয়টার্সের নিউজ ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টায় এই খবর হোস্ট করেছে। এর ফলে পরবর্তী বিস্তারিত দিক বিশেষত ভারতে চীনা বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর প্রায় সবকিছুতে যে অবরোধ এবং ঘোষিত-অঘোষিত বাধা আরোপ ও প্রপাগান্ডা চালু করা হয়ে আছে এসবের এখন কী হবে, আমরা এর সম্পর্কে এখনো কিছুই জানি না। তবে বিবিসি ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্যের এ দিকটার করুণ অবস্থা নিয়ে “উঠতি বহু ব্যবসার চোখে অন্ধকার”’ শিরোনামে এক রিপোর্ট করেছে।]

     

    আমেরিকা তাদের হাতের কার্ড দেখিয়ে ফেলেছে। চীন ঠেকাতে আমেরিকা কী করতে চায় বা কী আশা করে – তা আর্টিকেল লিখে প্রকাশ করে ফেলেছে। অনেকে এ পর্যন্ত এটা-সেটা বলে পেটের কথা বাইরে আনতে চেষ্টা করেছে বিভিন্ন সময়ে। ফাইনালই তারা এখন উপস্থাপনের একটাই ভাষ্য ঠিক করেছে। গুছিয়ে থিতু হয়ে বলা সেই ভাষ্যটা হল – এশিয়ার দেশগুলো কোনদিকে যাবে; চীনের বেল্ট-রোডে নাকি আমেরিকান ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে, সেটা তাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাংলাদেশের চ্যানেল২৪ টিভি একটা নিউজ প্রচার করছে, [এটা ছোট করে আর ওর বাংলা ভার্সানটাই লিঙ্ক দিয়েছি। আগ্রহীরা ‘মুখোমুখি | আর্ল মিলার-যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত’ এই শিরোনামের মূল পুরা ভিডিওটা ইউটিউবে দেখে নিতে পারেন।] এখানে বাংলাদেশে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত মিলার আগেই বলে নিয়েছেন, “চীন আমেরিকার শত্রু না, প্রতিদ্বন্দ্বি”। তবে বাংলাদেশ এটা না ওটা নেবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে এখানে ‘চোঙ্গা ফুকতে’ দেখা গেল। তবে বাংলাদেশের কোনোটাই না নেয়ার অপশন আছে কি না স্পষ্ট বোঝা যায়নি।
    এছাড়া এই উপস্থাপনে সবচেয়ে বড় অসঙ্গতিটা হল, চীনা বেল্ট-বোড প্রকল্পের সাথে আমেরিকার “ইন্দো-প্যাসিফিক জোট” – এদুটার মধ্যে তুলনা টানা চলে না, এরা সমতুল্য বিষয়ই নয়।  বেল্ট-রোড মূলত একট প্রজেক্ট যাকে বড়জোড় বহুদেশকে সামিল করে নেয়া চীনের এক অর্থনৈতিক মেগাপ্রকল্প বলা যেতে পারে।  বিপরীতে প্রথমত, ইন্দো-প্যাসেফিক জিনিষটা কি তা এখনও স্পষ্ট না। যেমন রাষ্ট্রদুত মিলার চ্যানেল২৪-কে বলেছেন ইন্দো-প্যাসেফিক ‘নেশনস্‌ মানে রাষ্ট্রের জোট।  কিন্তু সেক্ষেত্রেও কথা হল এটা কী সামরিক জোট না অর্থনৈতিক জোট, তা অস্পষ্ট। অন্তত অর্থনৈতিক তো নয়ই।  আহলে বেল্ড-রোড এর সাথে এটা তুলনীয়ই নয়। তবে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো সময়ে ইন্দো-প্যাসেফিক বলতে এক যুদ্ধজোটে সামিল করা্র কথা বুঝিয়েছে। যে জোটের ভিতরে আবার আছে কোয়াড [QUAD] জোট। কোয়াড মানে আমেরিকা জাপান, অষ্ট্রেলিয়া ও ভারত এই চার রাষ্ট্রকে নিয়ে কথিত চীনবিরোধী যুদ্ধজোট। যেটা আবার এখনও পর্যন্ত গত সর্বশেষ পাঁচবছর ধরে – এক পা আগে তো দু’পা পিছে এমন হয়ে আছে। তাহলে কথা দাড়ালো,  ইন্দো-প্যাসেফিক এই শব্দগুলো মিলারের ভাষার ‘নেশনস’ হোক কিংবা অন্যদের ভাষ্যে সেটা ‘যুদ্ধজোট’  যাই হোক তা অন্তত বেল্ট-রোড – এই অর্থনৈতিক প্রকল্পের সাথে তুলনা করা যায় এমন সমতুল্য কোন বিষয় বা ফেনোমেনা হতেই পারে না।
    আবার চ্যানেল২৪ নিজে এটাকে ইন্দো-প্যাসেফিক “করিডোর” বছে।  কেন বলছে এর কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে সবমিলিয়ে  যারা ভেবেছিলেন বাংলাদেশে ‘চীনা প্রভাব’ ছুটানোর জন্য ভারতের সর্বাত্মক তৎপরতা চীন-ভারতের লাদাখ সীমান্ত সংঘর্ষের কারণে হাজির হয়েছে, তাদের অনুমান ‘ভুল’। বিষয়টা আসলে হল – এশিয়ার চীনের বিরুদ্ধে একটা শেষ লড়াই লড়ার খায়েশ এখন আমেরিকান নির্বাচনের আগে আমেরিকার দুই দলেরই (বাই-পার্টিজান) খায়েশ হয়ে দাড়িয়েছে, এই হল বাস্তবতা। খালি তফাত এটুকুই যে, ট্রাম্প জিতলে একটু কৌশলে ভিন্নতা থাকবে যেটা বাইডেন জিতলে তুলনামূলকভাবে সফট কৌশল হবে। অর্থাৎ এশিয়ার চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকান লড়াইয়ের চেষ্টা শুরু  হবে আসন্ন আমেরিকান নির্বাচনের পরের বিজয়ী প্রশাসনের হাত দিয়ে। কিন্তু লড়াই একটা কমবেশি হবে সেটা নিশ্চিত।
    সেটা হলেও এটাকে শেষ লড়াই বলছি এ জন্য যে, ঠিক এটাই ওবামার প্রথম টার্মে ২০১১ সালে চেষ্টা করা হয়েছিল , ‘এশিয়া পিভোট’ নাম দিয়ে যা ওবামার সেকেন্ড টার্মেও বিস্তৃত থাকলেও বোঝা গিয়েছিল যে, এটা অকেজো, কাজ করছে না; মানে ভুয়া চেষ্টা। ব্যাপারটা সার কথায় বললে, ‘পিভোটে’ অনুমানে ধরে নিয়েছিল এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো মনে করে, চীন এক আগ্রাসী শক্তি। আর তাই এই শক্তির বিরুদ্ধে এশিয়ার দেশগুলোকে একটা চীনবিরোধী সামরিক জোটে আমেরিকা শামিল করতে পারবে বলে ধরে নিয়েছিল। কিন্তু এই অনুমান সঠিক ছিল না। তাই এটা ফেল করে যায়, কারণ এশিয়ার দেশগুলো বলতে চায় – চীনের অনেক কিছুতেই তাদের বিরোধিতা বা অপছন্দ থাকলেও সে জন্য আমেরিকান নেতৃত্বে কোনো চীনবিরোধী জোটে বা যুদ্ধজোটে তাদের ঢুকতেই হবে, এটা হবে আত্মঘাতী। এতে ‘ওভার অ্যাক্ট’ করা হয়ে যাবে। এর চেয়ে চীনের সাথে যদি কোনো দেশের সীমান্তবিরোধ থাকে তা নিয়ে আপত্তির কথা নিয়মিত বলে যাওয়া ও ডায়ালগের চেষ্টা (এব্যাপারে আদর্শ উদাহরণ সম্ভবত প্রেসিডেন্ট দুতের্তো-র ফিলিপাইন) করে যেতে হবে।
    আর একই সাথে, উঠতি অর্থনীতির চীনের সাথেই অর্থনৈতিক (পুঁজি-পণ্য বিনিময়ের গভীর ) সম্পর্ক জোরদার করা হবে নিজ দেশ পরিচালনার সঠিক কৌশল। এর বিপরীতে কোনো যুদ্ধের সম্ভাবনার মধ্যে নিজ দেশকে ফেলে দেয়ার মানে হবে অর্থনৈতিকভাবে নিজ দেশকে শেষ করে দেয়া। কাজেই ঐ আমেরিকান কৌশলের পক্ষে প্রায় কেউই নামেনি। তাই ওবামার শেষ বছর, পুরো ২০১৬ সালটাই ছিল আসলে তার ‘পিভোট’ গুটানোর বছর। কিন্তু পরে ট্রাম্প আমলে নিজের টার্মে চীনবিরোধিতাও তিনি অবশ্যই করেছেন, কিন্তু নিজে জাতিবাদী আমেরিকান হিসেবে আর অবশ্যই তা চীনবিরোধী কোনো জোট গড়তে অনাগ্রহী থেকে। এর ফলে আগে ‘চীন ঠেকানোর’ রাজনৈতিক তৎপরতার ধারা জারি রাখা বা আমেরিকান থিঙ্কট্যাংকগুলোর জন্য গাইড হিসেবে যে ভূমিকা রাখছিল ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে এসে পেন্টাগন বা স্টেট ডিপার্টমেন্ট সে কাজ থেকে নিজেদেরকে  প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। এ কারণে গত দুই বছর ধরে কিছু আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক আবার নিজেরাই ‘চীন ঠেকানোর’ লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছিল। এবারের এই মিশনের মুখ্য ভূমিকায় ছিল ও আছে থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’ [www.atlanticcouncil.org]। এর মূল ভূমিকাটা হল যেন, মোদীর ভারতকে আমেরিকান নৌকায় তোলা, এটাকে সর্বক্ষণের ধ্যানজ্ঞান করা। একাজে তাদের জন্য  মূল গুরুত্বপুর্ণ প্রিয় ব্যক্তিত্ব এস জয়শঙ্কর, তিনি মোদীর এখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যার সাথে  প্রায় সর্বক্ষণ যোগাযোগের মাধ্যমে মোদী সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখছে। কারণ আবার উল্টাদিকে মোদীর এক ট্রমার নাম হল চীন। চীন আবার কোন সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে ১৯৬২ সালের মত ভারতকে মার দিয়ে যায় কি না!  এরই কাউন্টার হিসাবে নিজের নিরাপত্তাবোধ, সেফবোধ করার জন্য বিশেষত মোদীকে আমেরিকা যতই তুচ্ছতাচ্ছিল্য অথবা কেবল নতুন নতুন আমেরিকান অস্ত্র কিনবার জন্য চাপ সব সহ্য করে হলেও আমেরিকা পাশে আছে এই বোধটা মোদী পেতে চেয়ে এসছেন। আর মোদীর ধারণ তার মনোবাসনা সবচেয়ে ভালভাবে আমেরিকায় ঠিক ঠিক জায়গায় কানে তুলতে পারেন একমাত্র জয়শঙ্কর। তাই ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’  আর মোদী এই দুজনের মাঝে জয়শঙ্কর, দুদিকেই দুজনে দুজনার। যদিও  ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’ ছাড়াও অন্য আরোদিকে ভূমিকা রাখছিল আরেক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এন্ডোমেন্ট’  [Carnegie Endowment[ আর কার্ণেগি ইন্ডিয়ার ওয়েবপেজ এখানে।

    এই ‘কার্নেগি এন্ডোমেন্ট’ (সংক্ষেপে এন্ডোমেন্ট বলব)  সেই বুশের আমলে ২০০৬ সাল থেকে এই কাজে ভারতে ভূমিকা রেখে চলেছে। তবে রেজিস্ট্রার্ড ইন্ডিয়ান শাখা হয়েছে অনেক পরে আর, তবে সেটা সম্ভবত এনজিও হিসাবে। ভারতের চীনবিরোধী বয়ান ভাষ্য যাই আমরা ভারতে চালু থাকতে দেখি বিশেষত, সকল ভারতীয় থিঙ্কট্যাংকের ফান্ড পাওয়া এবং তাদের যে কমন এক বয়ানে অবস্থান, এটাকে সাজিয়ে দিয়েছে  মূলত এই কার্নোগি এন্ডোমেন্ট। যেমন, “চীন ভারতকে মুক্তমালার মতো ঘিরে ফেলছে” অথবা চীন “ঋণের ফাঁদে” সবাইকে ফেলছে ইত্যাদি।  এন্ডোমেন্টের আরেক বড় ফান্ড দিবার খাত হল তরুণ গ্রাজুয়েটদেরকে  মাস্টার্স পড়তে বা পিএইচডি করতে পশ্চিমে যেতে স্কলারশীপ দেওয়া। আসলে এর বিনিময়েই তাদেরকে আমেরিকান বয়ানে দীক্ষা নিতেই হয়।  তাই কার্নোগি এন্ডোমেন্ট এর প্রধান কাজ আমেরিকান বয়ান ছেয়ে ফেলা, খাড়া করা ও নিয়ন্ত্রণ করা। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর নিজের জাতিবাদী রাজনীতিতে নিজেকে হাজির করার আগে পর্যন্ত এন্ডোমেন্ট প্রবলভাবে ভারতে নিজের ফান্ড ঢেলে তৎপর ছিল। নিয়মিত তরুণদের মাস্টার্স বা পিএইচডির জন্য স্কলারশিপ বরাদ্দ করেছে আর ওসব বয়ান মুখে তুলে দিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের অবস্থান তাদেরকে এরপর থেকে তৎপরতা ছোট করে আনতে বাধ্য করেছিল। আগে এর বড় কর্মকর্তা  ছিলেন সি রাজামোহন। তিনি সম্ভবত এখন এটা ছেড়ে সিঙ্গাপুরের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু একটা মজার তামাশা ঘটেছে। রাজামোহন অনেক আগে থেকে নিয়মিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় সাপ্তাহিক কলাম লিখে থাকেন। লাদাখে চীনা হামলায় অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা মারা যাবার পরে তাঁর লেখা একটা কলামের শিরোনাম মোদীর উচিত চীনকে এক পরাশক্তি বলে মেনে নেওয়া। মানে মোদীকে এককালে আমেরিকান বয়ানে সাজিয়ে এখন মোদীকে উলটা পরামর্শ দিচ্ছেন চীনকে মেনে নিতে।

    সেই কার্নেগি এন্ডোমেন্টে এখন আরো অনেক ততপর।  এন্ডোমেন্টের পক্ষ থেকে এশলে জে তাল্লিস [Ashley J. Tellis,, Tata Chair for Strategic Affairs; মানে হল তাল্লিসের কাজের চেয়ারের জন্য ফান্ড দেয় ভারতের টাটা কোম্পানি]। তিনি আমেরিকান আগামী সম্ভাব্য অবস্থানের ডকুমেন্টটা তৈরি করেছেন। লেখাটা এখানে পাবেন।  এই লেখাকে কার্নেগি এন্ডোমেন্টের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক পলিসি ব্রিফিং হিসেবে দেখতে বলে – উল্লেখ করে হিন্দুস্তান টাইমসে একটি আর্টিকেল ছাপানো হয়েছে। সেটা আবার লিখেছেন মঞ্জরি চ্যাটার্জি মিলার, যিনি বোস্টন ইউনিভার্সিটির পারদি স্কুলের [Frederick S Pardee School of Global  Studies] অধ্যাপক। তিনি নিজের লেখাটা আনাদেরকে  পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এভাবে – “আমেরিকার দীর্ঘ দিনের এক খায়েশ, ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে এশিয়ায় কাউন্টার-ওয়েট হিসেবে কাজে লাগায়। ভারত কী তা করবে?’ [The United States has long wanted it to act as a counterweight to China. Will Delhi do so?]
    ঐ পুরো লেখাতেই গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হল এই ‘কাউন্টার-ওয়েট’ [Counterweight to China], বাংলায়, চীনের পাল্টা ওজন বা বাটখারা।  এশলের এই লেখাটা ছাড়াও অধ্যাপক মঞ্জরি আরেকটা লেখার কথা তুলেছেন। তা হল- ড্যানিয়েল টেনরিরো [DANIEL TENREIRO] এর লেখা; যার শিরোনাম ‘এশিয়ায় চীনের পাল্টা বাটখারা হিসেবে ইন্ডিয়া’ [India as Counterweight to China in Asia]।

    ড্যানিয়েলের লেখাতে পরিষ্কার যে, ভারতকে চীনের কাউন্টার-ওয়েট হিসেবে এশিয়ায় পাওয়া- এর প্রয়োজনটা ভারতের নয়। বরং, খোদ আমেরিকার ও ড্যানিয়েলের মতো স্ট্র্যাটেজিস্টদের। তাই ড্যানিয়েল বা মঞ্জরি আশা রাখছেন, ভারত কি আমেরিকার হয়ে কাউন্টার-ওয়েট বা চীন ঠেকানোর  ভূমিকায় নামবে? কিন্তু কেন?

    কারণ স্ট্র্যাটেজিস্টদের মনের খায়েশ হল – চীনের পাল্টা ওজনদার রাষ্ট্রটাকে (ভারতকে) হতে হবে আমেরিকার হাতের পুতুল। চীনের মত না হলেও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় হতে হবে। আর মি. এশলে কোনো লাজলজ্জার বালাই না রেখে বলেছেন, ভারত বা সেই পাল্টা ওজনদার রাষ্ট্রটাকে দু’টি শর্ত মানতে হবে- ‘ইকোনমিক অগ্রগতি’ [‘economic momentum’ ] ফেরত আনতে হবে আর ‘লিবারেল বৈশিষ্ট্যের’ [‘liberal credentials’] হতে হবে।

    কথাটাকে বাংলাদেশিদের বুঝার মত করে বলতে গেলে এভাবে বলা যায়, বাংলাদেশকে যেমন ২০০৯ সাল থেকে ভারতের জন্য “ওপেন মার্কেট” আর ভারতের চোখে যথেষ্ট  “লিবারেল” বৈশিষ্টের মনে হয় এমন করে সাজিয়ে দেয়া হয়েছিল বা বাংলাদেশ ভারতের জন্য এমন দুটা শর্ত পূরণ করা হয়েছিল। ঠিক সেই রকমই এবার আমেরিকারও খায়েস হল, ভারতেকে আমেরিকার জন্য “ওপেন মার্কেট” আর আমেরিকার চোখে ভারতকে  যথেষ্ট  “লিবারেল” বৈশিষ্টের মনে হয় এমন করে সাজানোর শর্ত পূরণ করা হোক – এই হল এশলে, মঞ্জরি বা ড্যানিয়েলের মত স্ট্রাট্রজিষ্টদের আমেরিকার জন্য খায়েস ও প্রেসক্রিপশন। তবে বাংলাদশের বেলায় যেমন একজন প্রণব মুখার্জি ছিল আমেরিকার বেলায় নিশ্চয় একটা সাদা চামড়ার প্রণব মুখার্জি থাকবে, সেটা কে তা এখনও জানা যায় নাই।

    কিন্তু কেন এশলে কে ভারতের নাম এমন শর্ত আকারে বলতে হল? এশলে লেখাটার শিরোনামের দিকে তাকালে দেখি তা হল,  ‘বড় লীগে যোগ দিতে হলে ভারতের রাস্তা’ [India’s Path to the Big Leagues]। এর মানে আসলে এশলে তার লেখাটা শুরুর আগেই বুঝে গেছেন, ভারত চীনের পাল্টা তাদের পেয়ারের কাম্য  হবু ওজনদার দেশটা হচ্ছে না। হতে পারছে না। পারবে না। তাই তিনি তখন সরাসরি লিখতে বসেছেন- ‘কেন ভারতকে দিয়ে হবে না’। সে কারণে উল্টা করে লিখতে বসেছেন কোন শর্ত পূরণ করলে হবে। যেখানে এশলে জানেন, এই শর্ত ভারত পূরণ করতে পারবে না। তাই তিনি শর্ত লাগিয়ে বলছেন।

    আবার সমালোচকের চোখ দিয়ে দেখে বললে, এশলে অ্যান্ড গং-এরা চীনের কাউন্টার-ওয়েট বলে কাউকে খুঁজেই পাবে না। যদিও ভারতের প্রবল আর বিশেষ ‘খামতি’ আছে। কিন্তু ভারতের খামতি না থাকলেও এশলেরা ভারতকে বেছে নিতে পারতেন না। কেন?

    কারণ আমেরিকার দরকার এমন এক ভারত যাকে সে চীনবিরোধী তাদের মডেল দেশ হিসেবে তারা তুলে ধরতে পারে। চীন খারাপ, চীন আদর্শ না, চীন কথিত লিবারেল দেশ নয়, ইত্যাদির বিপরীতে যেন তারা এমন ভারতকে তুলে ধরতে পারে – যে ভারত আমেরিকার চোখে আদর্শ ও কাম্য দেশ, এভাবে। কিন্তু তাহলে আবার ভারতকে এমন আদর্শ দেশ বলে ফুলানোরই বা আমেরিকার কেন বা কী দরকার? দরকার এ জন্য যে, ভারত লিবারেল- এই প্রশংসা করে এর বিনিময়ে ভারতের ওপর মাতব্বরিটা  আমেরিকা নিজের হাতে তুলে নিতে চায়, ভারত না আমেরিকার জন্য বিপুল বিনিয়োগ আর লাভালাভের কেন্দ্র বানাতে চায় ভারতকে। সে জন্য ভারতে তাদের “ইচ্ছামতো একটা সংস্কার” করে সাজিয়ে নিতে চায়। কিন্তু এখানে সাবধান। এখানে কথাটা এভাবে বলাতে ভারতের অর্থনীতিকে ভারতের নিজেরই জন্য কোন সংস্কার দরকার নাই, এটা বুঝে বা ধরে নেওয়া চভুল হবে। ভারতের অর্থনীতির সংস্কার দরকার অবশ্যই আছে। কিন্তু এর মানে “আমেরিকার স্বার্থে ভারতের অর্থনীতির সংস্কার” – এমন বুঝা বিরাট ভুল ও ভিন্ন অর্থ হবে।

    যেমন- এশলের লেখায় আরো দু’টি বিশেষ শব্দ আছে- ‘ফাস্ট-গ্রোয়িং ‘ফ্রি মার্কেট ডেমোক্র্যাসি’[fastest-growing free market democracy]। এর মধ্যে সোনার পাথরের বাটি ধরণের অর্থহীন শব্দটা হল – “ফ্রি মার্কেট ডেমোক্র্যাসি”। এখানে ‘ফ্রি মার্কেট’ শব্দের সাথে ‘ডেমোক্র্যাসি’ শব্দের কী সম্পর্ক? এসবের অর্থহীন কথা ও শব্দের ভজকট মিশাল দিয়ে তারা খাড়া করেছে যাতে তাদের স্বার্থটা সহজে বুঝা বা ধরা না যায়। অথচ এর ভেতর দিয়ে তারা বুঝাতে চায়- ভারতকে আমেরিকার ডমিনেটেড বাজার ব্যবস্থা করে গড়ে পেতে চায় তারা। কিন্তু জবাব দিতে চায় না ভারত কেন এটা আমেরিকাকে দেবে? ইন্ডিয়ান পুঁজি আর ব্যাবস্থাপনা দক্ষতা কী নাই? পুঁজি ঘাটতি থাকতে পারে কিন্তু তা বলে ভারত সব আমেরিকার হাতে ছেড়ে দিয়ে অধস্থন নিতে হবে কেন?  এসব বিদ্যানেরা সংস্কার আর লিবারেল – এসব শব্দের আড়ালে আমেরিকান স্বার্থটা হাসিল করতে চায়।
    যে কথা বলছিলাম, ভারতের নিজস্ব অন্য খামতি যে নাই তা নয়। যেমন ভারতের রুট সমস্যা তথাকথিত স্বদেশিয়ানা বা অর্থহীন ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ ধরণের কথাবার্তা। মোদীও বলতে ভালোবাসেন, তিনি “আত্মনির্ভর অর্থনীতির” লোক। ভালো কথা। তার যা ইচ্ছা হতে চান, হবেন। কিন্তু মোদী তাহলে আবার রফতানি করতে ডলার গুনতে ভালোবাসেন কেন? ওসব ডলার পেয়ে জমিয়ে তিনি কী করবেন? ডলার জমানো মানেই তো তিনি আমদানিও করবেন! তাহলে উনার ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ কোথায় রইল? আবার মোদীর খুব খায়েশ দুনিয়াটা এমন হয়ে যাক যেন তিনি কেবলই রফতানি করতে পারেন। যেন সবাই তাকে রফতানি করতেই দিক! অথচ এটা তো অসম্ভব কল্পনা। তবু ভারতের খায়েশ, দরকার হলে সুযোগ পেলে অন্যকে পুরনো কায়দায় কলোনি করে শাসন করা। তবে ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ তার বাস্তবে যতটা না দরকার এর চেয়ে বেশি শব্দটা প্রপাগান্ডা হিসেবে দরকার। কারণ উগ্র হিন্দু জাতিবাদের জোশ তুলতে তথাকথিত স্বদেশিয়ানা বা অর্থহীন ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ শব্দগুলোর প্রপাগান্ডা-মূল্য অনেক। তবে আবার সাবধান এই কথিত জাতিবাদী স্বদেশিয়ানার উদ্ভট ধারণা – এসব  বিজেপির একার নয়, নেহরু আমল থেকেই ভারতের সব রাজনৈতিক দলের কমবেশি অবস্থানই এটা;  এটা একই সমস্যা ভারতজুড়ে।

    মজার ব্যাপারটা হল, একমাত্র চীন-ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বেলায় এই সমস্যাটা তুলনায় কম। কারণ চীন ব্যাপারটা দেখে এ জায়গা থেকে যে, তার পার্টনার দুনিয়ার সব সমস্যারই ডিপো হতে পারে। হলে তা হোক। তাই এটা ধরে নিয়েই চীন পার্টনারের সমস্যা কী সেদিক থেকে না গুনে বরং প্রাকটিক্যালি মাঠে ঠিক কী হলে চীন কাজ করতে পারে সেটা পূরণ আছে কি না সেদিক থেকে মাপা শুরু করে। নইলে বলে দেয়, সে পারবে না। এ জন্য চীনের সাথে ভারতের কাজের সম্পর্ক তুলনায় ভালো। আর চীনের অ্যাপ্রোচ ব্যবহারিক দিক থেকে বলে ভারতীয়রাই বদলে যায়; মেনেও নেয়। কারণ তারা দেখে তারা এই ব্যবহারিক বদলটা না করলে চীনের সাথে সম্পর্ক বা ডিলটাই হবে না। চীনাদের এই অ্যাপ্রোচে সুবিধার দিক হলো –  পার্টনারের নিজস্ব  প্রবলেমটা কী এটা নিয়ে আগেই তারা ঝগড়া শুরু করে না। যাই হোক, সার কথাটা হল – আমেরিকানদের সাথে কোনো ভারতীয় জাতিবাদীর কিল হওয়া একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাতে দোষ কার অথবা কে কতটা ভালো-মন্দ সে আলাপ উঠায় রাখি।

    তাহলে এখন কী হবে?
    বাস্তবতা হচ্ছে, আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ কাজে কাউন্টার ওয়েট হিসেবে ভারতকে ব্যবহারের পক্ষে ভারতের সাথে কোনো সম্পর্কই কার্যকর হচ্ছে না; যদিও এমন ভাব নেয়ার অঙ্গভঙ্গি সম্ভবত জীবিত ও জারি থাকবে। অনেক সময় মানুষ তা চায় না বলে কোন প্রমাণিত সত্য জিনিস মেনে নিতেও তার কষ্ট হয়। তেমন অবস্থার উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর মোদীর কাছে  এখন সম্ভবত এটা প্রমাণিত যে, চীন তার হিন্দুত্বের রাজনীতির জন্য তুলনামূলক ভালো বিকল্প। তবু চীনের বেলায় যেটুকু সঙ্ঘাত বারবার সামনে এসে পড়বেই সেটা বারবার এড়িয়ে হলেও মোদী চলতে পারবেন। কিন্তু যেটা সহসা চীন-ভারত সম্পর্ককে আগের জায়গায় ফিরতে দেবে না তা হলো- সারা ভারতে ‘চীন আমাদের শত্রু’ বলে যে ক্যাম্পেইন মোদী চালিয়েছেন তা সহসাই লোপ পাবে বা উধাও হবে না।

    আবার অন্য দিকে, আমেরিকা ও তার বন্ধুরা যেটাকে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক জোট’ বলে ড্রাম পিটাচ্ছে এই প্রপাগান্ডাও সহসাই থেমে যাবে না; তাতে ভারতের সাথে আমেরিকার কোন সম্পর্ক হোক আর নাই হোক তা জারি থাকবে। দ্বিতীয়ত, এি জোটের আরেকটা নাম আছে, এশিয়ান-ন্যাটো। মানে ইউরোপে যেমন ১৯৪৫ সালের পরে সোভিয়েতবিরোধী সবাইকে ন্যাটো সামরিক জোটে জড়ো করা হয়েছিল, সেই ন্যাটোই যেন এবার এশিয়ায় জাগতে যাচ্ছে, এমন ভাব শুরু করা হয়েছে। মোদীর প্রো-আমেরিকান মন্ত্রী জয়শঙ্কর তাই একবার বলেন, ভারত জোটনিরপেক্ষ দেশ; আরেকবার বলেন, জয়শঙ্করদের এশিয়ান ন্যাটোর স্বপ্নের কথা। ব্যাপারটা নিয়ে জয়শঙ্করের সবচেয়ে বড় সমালোচক হলেন প্রচণ্ড ক্ষেপা এমকে ভদ্রকুমার, তিনি এক সিনিয়র সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক রাষ্ট্রদূত ও বর্তমানে দুহাতে লেখা এক কলাম লেখক।https://www.reuters.com/article/us-india-china-idUSKBN262039তামাশার দিকটি হল – এই জয়শঙ্করই আবার মস্কোতে সাংহাই করপোরেশনের মিটিংয়ে হাজির হওয়ার উছিলায়  মস্কোর মধ্যস্থতায় চীন-ভারত যে পাঁচ দফা আপস সমঝোতা করল সেখানে ভারতের প্রতিনিধি। জয়শঙ্করের গা থেকে তখনো আমেরিকান কোনো ডিনারের ঢেঁকুর উঠছিল হয়ত। তবে রয়টার্সই একমাত্র এর ব্যাপক রিপোর্টিং করেছে। তাতে তারা দু’টি ছবি ছেপেছে যেখানে রাশিয়া, চীন ও ভারতের তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফানি পোজ দিয়ে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু তিনজনই ‘ফানি’ভাবে নানা অঙ্গভঙ্গি করে ছবি তুলেছেন, যেটা অবশ্যই কূটনৈতিক আচরণ না হলেও; একটু ইনফরমাল মুড প্রকাশ করেছে যেন, আমেরিকাকে তিনজনে ঠাট্টা করতে এসব করেছেন। এর বটম লাইনটা হল, চীন-ভারতের সম্পর্ক  আবার আগের বন্ধুর মুড়ে ফিরে যাওয়া শুরু করবে হয়ত। কিন্তু তা কতটা? মনে হয় না খুব সহসাই সেটা আগের লেভেলে ফিরে যাচ্ছে। আর দ্বিতীয়ত, চীন ঠেকানোর কাজে ভাটা পড়লে আমেরিকা তো কাজের অভাবেই মারা যাবে! একমাত্র একটু ভরসা, নির্বাচনে বাইডেন যদি জিতেন। সে ক্ষেত্রে চীনের থেকে বাণিজ্যে আমেরিকার জন্য অনেক বড় ছাড় আনতে পারবেন তিনি। ফলে ট্রাম্প আমলের বাণিজ্যযুদ্ধের অনেকটাই স্মৃতিতে পেছনে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু হিউম্যান রাইট ইস্যুতে বাইডেন অনেক বেশি চীনকে ঘায়েল করবেন। কমবেশি আমরা নিশ্চিত। এ ব্যাপারে ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার সেক্রেটারি অব ডিফেন্স মার্ক এস্পারের আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোনকল করেছেন যেটা অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। ঢাকার অভ্যন্তরীণ মিডিয়া ‘রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সহায়তার’ ওপর জোর দিলেও ঢাকার দূতাবাসের বিবৃতিতে “একটি অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের প্রতি তাদের যৌথ প্রতিশ্রুতির” কথা বলে সেখানে জোর দেয়া হয়েছে। রাষ্টড়দুত মিলারের “বাংলাদেশের জন্য ইচ্ছা কোনদিকে যাবে – এই ভাষ্যের তুলনায় এসপারের ভাষ্য অনেক এগ্রেসিভই বলতে হয়।  এর অভ্যন্তরীণ আমেরিকান মেসেজটা হল – যেন বলতে চাচ্ছে, আমরা চীন ও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে হিউম্যান রাইট ইস্যুতে শক্তভাবে চেপে ধরতে আসছি। ফলে আমরাও আপনার কাছে গুরুত্ব চাই। ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে তাই আমাদের ক্যাম্পে আসুন। অর্থাৎ ভারতকে আমেরিকা পাচ্ছে না, আপাতত এটাই সারকথা মনে হলেও মিয়ানমার বা ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে বাংলাদেশের জন্য এগুলো ডমিনেটিং বিষয় হতে যাবার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গেল। তবে বাংলাদেশের সাথে আমেরিকান প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক জোট কোথায় সম্পর্কিত তা এই ফোনকল স্পষ্ট করতে পারেনি।  হাসিনা চাইবে আমেরিকা, চীন ও ভারত স্কলকেই পাশাপাশি রেখে দিয়ে একটা নিউট্রাল অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে। বাংলাদেশের জন্য সেটাই সঠিক ও আদর্শ অবস্থানই হত, অবশ্যই। কিন্তু তা হাসিনার জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জিং, কারণ তার মূল জিনিষটাই নাই। পাবলিক সাপোর্ট বা রেটিং।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “আমেরিকা ভারতকে হবু জোটে পাচ্ছে না” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]
  • জাতিগিরির ‘স্বদেশী জাগরণ’ অচল ও পরাজিত

    জাতিগিরির ‘স্বদেশী জাগরণ’ অচল ও পরাজিত

    গৌতম দাস

    ১০ আগস্ট ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-38z

     

    Swadeshi Jagran Manch – स्वदेशी जागरण मंच, From Facebook

    প্রসঙ্গটা ভারত থেকে শুরু করছি এমন হলেও ব্যাপারটা কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এমন চিন্তার ফেনোমেনা আমাদের মত সব দেশেই কম-বেশি আছে। তাই এর প্রভাব সবখানে। কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীরাও এনিয়ে বিভ্রান্ত থাকে, তাই প্রচ্ছন্নে সমর্থনও করে। ‘জাতি’ বা ‘স্বদেশীপনা’ ইত্যাদি ধরণের শব্দ দিয়ে এরা নিজেদের তুলে ধরে। যদিও এগুলা একেবারেই ভুল চিন্তা। কী প্রেক্ষিতে এমন চিন্তা দুনিয়ায় উদয় হয়েছিল তা ভুলে বা আমল না করেই নকল বা ‘আউট অব কনটেক্সট’  এক চিন্তাধারা এটা। বিশেষ করে যেখানে দেশ বা রাষ্ট্র বলতেই মনে খামোখা ‘জাতি’ বলে ধারণা হাজির হয়। জাতি ধারণাটাই fetish বা ভুতুড়ে অস্পষ্ট চিন্তা। কিন্তু তাসত্বেও  আবার পরিস্কার থাকার দরকার আছে যে, ‘জনগোষ্ঠীগত কমন স্বার্থ’ অথবা ‘জনস্বার্থ’ বা ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট’- এসব ধারণাগুলো সঠিক,  ফলে এগুলো টিকে থাকবে। কারণ এধারণাগুলোর সাথে রাষ্ট্রে কোন ‘জাতি’ ধারণা থাকা না থাকার কোনো সম্পর্ক নেই, অনিবার্যও নয়।

    আসলে  কলোনি দখলবাজ ইউরোপের লুট করতে জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে পরা ব্যবসায়ীরা এরা প্রতিদ্বন্দ্বি দেশের (যেমন ইংলিশের বিরুদ্ধে ফরাসি) দখলবাজদের বিরুদ্ধে নিজ নিজ দেশের কলোনি দখলবাজেরা এই জাতি ধারণা ছড়িয়েই  দেশের সবপক্ষের পুর্ণ সমর্থন যোগাড় করেছিল। এখানে বিদেশি বিরোধিতা খুবই মুখ্য জিনিষ। যেমন ফরাসিদের  বিরুদ্ধে ইংলিশ দখলবাজদের বিদেশিবিরোধিতা কথা তুলার তাগিদে যে তত্ব হাজির করেছিল এটাই জাতিবাদ বা জাতি ধারণার শুরু। এককথায়, অন্য (আমাদের মত দেশকে) কলোনিদখলকে সমর্থন আর এই অন্যায়কে দেশের ভিতর থেকে দ্বিধাহীন  সমর্থন আর সাফাই পাবার তত্ব হল জাতিতত্ব বা জাতি ধারণা। তাহলে দাঁড়ালো, জাতি ধারণা আবার কার্যকর পেতে হলে পুর্বশর্ত হল কলোনি ব্যবস্থা দুনিয়াই আবার চালু থাকতে বা করতে হবে। অথচ.১৯৪৫ সালের পরের কপিবাজেরা, এই  জাতিবাদীরা এটা কখনও খেয়াল করে দেখেনি।

    একারণেই বিজাতীয় বা বি-জাতির বিপরীতে জাতি ধারণা – সেটা পরবর্তিতে যতই অপ্রয়োজনীয় ও নেতি হলেও তা সেকালে মিথ্যা করে “নিজেদের” বলে একটা ধারণা হাজির করে টিকানো হয়েছিল। সেই সাথে, বিদেশী মানেই খারাপ, বিদেশের বিরুদ্ধে ‘আমরা’ অথবা ‘স্বদেশী’ ধরনের এক ধারণা হলো জাতি। এখান থেকেই স্বদেশী পণ্য ভালো, তা মোটা ভাত বা মোটা কাপড় হলেও ভালো ইত্যাদি বলে ভুয়া দাবি করা হয়।

    এ ছাড়াও ১৯৪৫ সালের পরের কলোনিমুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের ধারণা হচ্ছে, একটা “জাতিবোধ” ছাড়া “দেশ”, “রাজনীতি” বা “রাষ্ট্রের” কল্পনা অসম্ভব। অথচ এসব ভিত্তিহীন কথা। কাজেই একটা জাতিবোধ থাকতেই হবে আর সেই সাথে কথিত “জাতীয়” বা দেশীয় পণ্যের প্রতি ভালোবাসা আর বিদেশী পণ্যের প্রতি ঘৃণা, পারলে তা বর্জন; না হলেও অন্তত কম-ভালোবাসা থাকার ‘স্বদেশীপনা’ তো থাকতেই হবে! এগুলা জাতি ধারণার পক্ষে ভুয়া বয়ান!
    এখানে স্বদেশীপনা শব্দটা ব্যবহার করেছি নেতি ও ঠাট্টা অর্থে। অনেকটা ছেলেমিপনা, আদেখলাপনা বা পোলাপান শব্দের মত নেতিবাচক অর্থে। অর্থাৎ যাকে ‘স্বদেশী’ বলছি তা আসলে স্বদেশী বা দেশের জন্য ইতিবাচক নয়; সেটা বুঝাতে; আর আসলে তা নয় সেই হুঁশ আনার জন্যই এমন ব্যবহার।

    আলোচনার সমস্যাঃ
    এদিকে এ ধরনের আলোচনার সমস্যা হয় যেটা তা হল, ব্যাপারটা কী তা বুঝিয়ে বললেও এবং তা ভালই বুঝা গেলেও সেটা তত্ত্বগত ধারণার মত একটা দূরত্বেই থেকে যায়। তাই অবস্থা হয় – কথা সত্য কিন্তু মানতে পারব না- ধরনের। সেকারণে, আজ এখানে কোন তত্ব নয়, একেবারে বাস্তবে ঘটেছে, বাস্তব সমস্যা হিসেবে হাজির হয়েছে সেটা দেখিয়ে এখানে কথা বলে দেখাব যে, কথিত জাতিবোধের স্বদেশীপনা একটা ভুল ও অকার্যকর ধারণা। আর সেটা এখানে দেখাব ভারতের এখনকার বাস্তব সমস্যা বা উদাহরণের পরিপ্রেক্ষিতে।
    আরো আছে। যেমন সমস্যা হচ্ছে প্রায় সবাই স্বদেশীপনা শব্দের সাথে পরিচিত। ফলে ধারণাটা জানা আছে কিন্তু কেউ বাস্তবে একালের নিজ নিজ দেশে ধারণাটা পরখ করে দেখেনি। তবে একালে ধারণাটার সত্যতা না থাকলেও এর একটা প্রবল আবেগী দিক আছে; ভুয়া হলেও তা একটা আবেগী জোশ তুলতে পারে – যেমন ‘দেশের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া’ বা ‘কল্পিত বিদেশী বা শত্রুর বিরুদ্ধে এক হওয়া’ ধরনের; আর এটাই আমাদের মত দেশের রাজনীতিবিদেরা সবাই ব্যবহার করে গেছে এ পর্যন্ত করে চলেছে, আর সমানে ফায়দা তুলে গেছে। তাতে ধারণাটা সত্য না হলেও কোনো অসুবিধা হয়নি। যেমন ভারতে এমন আরেক চরম মিথ্যা আড়ালের শব্দ হল, “ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট”। আপনি সাংবাদিক আপনি জানেন কোন একটা কথা মিথ্যা। কিন্তু তবুও “ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট” এর নামে আপনি সেকথা সত্য বলে চালাচ্ছেন। এটা মূলত মিথ্যা বলে তা কোনভাবেই সাংবাদিকতাই নয় আপনি জানেন তবু আপনি তা সত্য বলে গ্রহণ করতে বলছেন!

    তাহলে মিথ্যা হলেও তা ব্যবহারের সুযোগ কেন পাওয়া যায়ঃ
    কেন এমন সুযোগ পাওয়া যায়? কারণ দুনিয়ার শুরুর দিকে পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেন অবিকশিত অবস্থায় ছিল এবং স্বাভাবিক। তাই ব্যাপারটা মনে রাখার জন্য একটা সহজ সুত্র হল – কমুনিকেশন বা যোগাযোগ শব্দটা। যত ভাল বা বিকশিত কমিউনিকেশন ততই ভাল পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেন।

    কমিউনিকেশনঃ
    ছোট একটা শব্দ কমিউনিকেশন, কিন্তু এর অর্থ অ-নে-ক গুলো। কমিউনিকেশনের অনেকগুলো রূপ। এখানে কমুনিকেশন শব্দের সঠিক মানে কোনটা? না সবগুলো, কোনটাই বাদ নয়।  যেমন রাস্তাঘাট বুঝাতেও আমরা কমিউনিকেশন বলি। বলি কমিউনিকেশন ভাল না বা কমিউনিকেশন মিনিষ্ট্রি। কিন্তু তাও আবার সড়ক নাকি রেল নাকি এয়ার বা এরোপ্লেনের কমিউনিকেশন, এমন অনেকগুলো ভাগ আছে। আবার কমিউনিকেশন মানে তো ভাষাও, ল্যাঙ্গুয়েজ। আরো আছে। কমিউনিকেশন মানে টেলিফোন, টরেটক্কা করে পাঠানো পুরানাদিনের টেলিগ্রাফ। এমনকি তা বেতার, এফএম রেডিও  অথবা পুলিশ-আর্মির ওয়ারলেস – রজারস। আবার কমিউনিকেশন মানে আইটি – এর নেটওয়ার্ক, ইমেল, ফেসবুক বা স্যাটেলাইট ইত্যাদি সব।  অর্থাৎ এক কমিউনিকেশন শব্দ দিয়ে অনেক কিছুই বুঝায়। তা বুঝাক কোনই অসুবিধা নাই।

    তবে আসল কথাটা হল, দুনিয়াতে এই কমিউনিকেশন যত বিকশিত ততই, পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেনও সে মাত্রায় ব্যাপক। আর যতদিন  দুনিয়ায় কমিউনিকেশন দুর্বল বা অবিকশিত বলে দুনিয়ায় কোণায় কোণায় থাকা মানুষকে চেনাজানাও দুর্বল থাকে; মানে মানুষে মানুষে পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেন বিকশিত নয় বা নাই । অথবা এক জনগোষ্ঠীর সাথে অন্য জনগোষ্ঠী এবং অন্য সব জনগোষ্ঠীর সাথে পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেন নাই অথবা তেমন নাই অর্থাৎ ব্যাপক হয়ে না উঠেছে, তত দিন স্বদেশীপনা ধারণাটা যে মিথ্যা বা ধারণাটার যে সমস্যা তা টের পাওয়া যায় না।

    গত ১৬০৭ সাল থেকে ধরা হলে পরের প্রায় ৩০০ বছর ধরে  দুনিয়ায় চালু ব্যবস্থাটা বলি কলোনি যুগ; যখন দখলবাজ ছোটবড় পাঁচ-ছয় রাষ্ট্র বাকি প্রায় সব দেশকে দখল করে কলোনি বা উপনিবেশ যুগ কায়েম করেছিল। সে সময় কোনো দেশের বাইরে পণ্য বিনিময় লেনদেন বলতে ছিল  মুলত দখল-মালিক দেশ আর প্রজা দেশের মধ্যে; তাও আবার ছিল একপক্ষীয়- মূলত প্রজা বা দখলি-হওয়া দেশ থেকে লুটেরা সম্পদ দখল-মালিক দেশে নেয়া (যেমন ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া থেকে ব্রিটেনে) – এই রকম। এ ছাড়া ওদিকে পাঁচ-ছয়টা কলোনি দখলদার মালিকের নিজেদের মধ্যে লেনদেন – সেটাও ছিল প্রায় নাই না খুবই সীমিত পর্যায়ে। তাই জাতি ধারণা আর স্বদেশীপনা যে ভুয়া অচল ধারণা তা ইউরোপ কলোনিযুগে টের পায়নি। আবার কলোনি যুগের প্রায় ৩০০ বছর ইউরোপ ‘বিদেশী মাত্রই শত্রু’ গণ্য করা জাতি ধারণার জাতিরাষ্ট্র, নেশন-স্টেট ছিল। এটাই কলোনি-মালিক জাতি-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে লেনদেন ও বিনিময় বাণিজ্য প্রায় ‘নাই’ ধরনের সীমিত হয়ে থাকার আরেক কারণ। সুতরাং, এক কথায় ‘জাতি’ ধারণাটা বা দেশকে জাতি বলে বুঝা – এটা মূলত কলোনি দখল করা যেসব দেশের মূল ব্যবসা তাদেরই অনুসৃত ও প্রচলিত ধারণা। এদের চিনবার মূল বৈশিষ্ট্য হল এরা জাত বা জাতির বাইরে কারো সাথে লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় পছন্দ করে না, খারাপ মনে করে। তাই এখান থেকেই বিদেশির বিরুদ্ধে স্বদেশী বলে ধারণা জন্মানো সহজ ও সম্ভব।

    এজন্যই, স্বদেশী-জাতি-কলোনি যুগ এগুলো সম্পর্কযুক্ত শব্দ। কলোনি যুগেই জন্ম বলে জাতি বা স্বদেশী ধারণা সেখানে প্রথম পাওয়া যায়। দুনিয়াতে প্রথমত জাতি বা জাতিরাষ্ট্র ধারণাটার জন্ম বা পাওয়া যায় কলোনি যুগে; মানে ১৬০৭-১৯৪৫ অর্থাৎ প্রায় ৩০০ বছরের সময়কালের এবং মূলত ইউরোপে।

    কিন্তু পরবর্তিতে মানে কলোনি যুগ-পরবর্তী সময়কাল আগের কলোনি সময়ের তুলনায় অনেক ছোট, ৩০০ এর বিপরীতে মাত্র প্রায় ৭৫ বছর। এই পঁচাত্তর বছর, ১৯৪৫ থেকে একাল পর্যন্ত সময়টা কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার কাল। মোটা দাগে বললে সবার আগে কলোনি মুক্তি ঘটেছিল এশিয়ায়; পরে ল্যাটিন আমেরিকা আর শেষে ১৯৮০ সালের মধ্যে আফ্রিকা (সাউথ আফ্রিকা বাদে) সবাই প্রায় স্বাধীন হয়ে যায়। ফলে এবার সব রাষ্ট্রের সাথে সব রাষ্ট্রের লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় ব্যাপক রূপ নেয়া শুরু হয়। তবে কমিউনিস্টরা লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় ব্যাপারটা নিয়ে শুরু থেকেই অস্পষ্ট ও দ্বিধায় ছিল বলে তারা বাণিজ্যে রাজি হয়নি মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের কারণে। এছাড়া আর ১৯৫৩ থেকে ১৯৯১ সাল-  এই কোল্ডওয়্যারের যুগের কারণে। ফলে সোভিয়েতকে অনুসরণ করে পুরা কমিউনিস্ট ব্লক লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় করতে আসেনি, যোগ দেয় নাই। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে ১৯৯২ সাল থেকে সকলেইও অবশ্য বাণিজ্যে যোগ দেয়।

    কিন্তু এর আগেই সব অর্গল খুলে যায়। কারণ, আশির দশকের শুরু থেকেই গ্লোবালাইজেশন শুরু হয়ে গিয়েছিল। মানে যেকোনো দেশের সাথে যেকোনো দেশের লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হতে শুরু করেছিল। বাংলাদেশে আমাদের জন্য তা সহজে বোঝার চিহ্ন হল, যখন থেকে আমরা গার্মেন্ট এক্সপোর্ট শুরু করি এবং ক্রমে তা বাড়াতে থাকি।

    একটা পর্যবেক্ষণ হিসাবে বলা যায়, গত ৪০০ বছরের দুনিয়ায় দেশ (রাষ্ট্র)গুলোর মধ্যে লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় উন্মুক্ত ও পরিপাটি ব্যবস্তা ছিল মাত্র প্রায় পচাত্তর বছর। যার আবার সক্রিয় বাণিজ্য চালু ছিল কেবল  মাত্র শেষের চল্লিশ বছর। আর এর ইমিডিয়েট আগের ১৯৪৫ সালথেকে চালু হওয়া ব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের কাছে  বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত থাকলে ব্যাপক লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় চালুর প্রস্তুতি নিতেই প্রথম ত্রিশ-পয়ত্রিশ বছর চলে যায়।  এখন একটা সাধারণ সূত্র হলো, লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় না থাকা মানেই সেটা হবে জাতি বা জাতি-রাষ্ট্র বা স্বদেশী চিন্তার কাল। আর যতই গ্লোবালাইজেশন, ততই লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় ব্যাপকতর; ততই বাস্তবে জাতি বা জাতিরাষ্ট্র বা স্বদেশী চিন্তার অকার্যকারিতা বা বিলুপ্তির দিকে চলে যাবে।

    আবার মজার ফ্যাক্টস হলো, ইউরোপ ১৯৪৫ সালের পরে জাতি বা জাতিরাষ্ট্র বা স্বদেশী চিন্তা ত্যাগ করে সরে যায় অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে নিজেদের রূপান্তরিত করে নিয়ে।

    কিন্তু ট্রাজেডিটা হলো ইউরোপ রূপান্তরিত হয়ে গেলেও আমরা জানি না আর তাল বুঝি না বলে অবুঝ-নাবুঝ হয়ে আমাদের মত দেশের বেলায় রাষ্ট্রের মডেল হয়ে যায় ইউরোপের ফেলে দেওয়া ঐ ‘জাতি’ ধারণা। মানে, জাতিরাষ্ট্র বা স্বদেশী চিন্তা। এমন চিন্তার সপক্ষে কমিউনিস্টদের সাপোর্টও ছিল। কারণ তারাও বিভ্রান্ত। এখনো বেশির ভাগই জেনে না জেনে  জাতি-রাষ্ট্র করে থাকে। অথচ এটা স্ববিরোধী। কারণ জাতিরাষ্ট্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনীতি হল, কলোনি দখল যুগে থাকা এবং দখলবাজ হয়ে থাকা। আর অপর বৈশিষ্ট্য হল প্রায় নাই অথবা খুবই সীমিত বৈদেশিক লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময়ে থাকা। যার সোজা মানে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশগুলো জাতি বা স্বদেশিপনা ধারণাগুলো আকড়ে আপন করে নিয়ে থাকা এতা এক চরম স্ববিরোধিতা।  এজন্য এরা মুখে বলবে স্বদেশিপনা আত্মনির্ভরতা ইতাদি ছেদো কথা। কিন্তু ডলার দেখলে ডলার পেতে এক্সপোর্ট করতে লালা পড়বে। আপনি যদি স্বদেশি অর্থনীতির লোক তবে ঐ প্রাপ্ত ডলার দিয়ে কী করবেন?  বলাই বাহুল্য ঊনি আমদানিওও করবেন আর ঐ আমদানির মুল্য শোধ করতে ঐ ডলার ব্যভার করবেন। তাহলে কী দারালো আপনি আসলে সবটাতে সবখানেই আছেন। অথচ হুদাই স্বদেশিপনা বিদেশিবিরোধিতার ভাব ধরেন।

    এই স্ববিরোধিতা কী ধরনের সঙ্কট নিয়ে হাজির হয় তা এখন আমরা দেখব ভারতের ক্ষেত্রে। সেখানে ১৯৪৭ সালে জন্ম থেকেই এখানে জাতিরাষ্ট্র ধারণাকে খুবই শক্ত করে (অন্তত আমাদের চেয়ে অনেক বেশি) আঁকড়ে ধরা এক রাষ্ট্র গড়েছিল। এর উপর আবার ‘জাতি’ বলতে এটা হিন্দু-জাতির এক জাতিরাষ্ট্র বুঝে তারা। গত ২০১৪ সাল থেকে বিজেপি ক্ষমতায় আসাতে এই হিন্দু জাতিরাষ্ট্র বোধ সবার উপরে তাদের চাপানোর ঝোঁক আরো প্রবল। এখন চীনের সাথে সীমান্ত সঙ্ঘাতে ২০ সেনাকে হারিয়ে যতই স্বদেশীপনাকে নরেন্দ্র মোদী আঁকড়ে ধরতে চাইছেন ততই জাতিরাষ্ট্র, হিন্দুত্ব বা স্বদেশীপনা ধারণার অকার্যকারিতা আর ভুয়া আবেগসর্বস্বতা প্রকট হয়ে হাজির হচ্ছে।

    বাস্তব উদাহরণ হিন্দু জাতিরাষ্ট্র ও এর স্বদেশীপনাঃ
    ভারতের একটা মিডিয়া রিপোর্ট পড়ে শুরু করা যাক। দ্য হিন্দু পত্রিকার ঘরেরই আরেকটা পত্রিকা আছে যেটা ব্যবসা-বাণিজ্যকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকাশিত হয়, এর নাম ‘হিন্দু বিজনেস লাইন’ [Hindu Business Line]। সে পত্রিকার ২৭ জুলাইয়ের এক লিডিং রিপোর্ট বলছে, জাপান ভারতের কাছে এক আজব অনুরোধ রেখেছে। ঐ খবরের শিরোনাম দেখেন,

    Japan to India: Don’t increase tariff on Chinese inputs used by Japanese firms

    যার বাংলা করলে মোটের উপর কথাটা হল,  ‘ভারত যেন চীন থেকে আসা পণ্যের ওপর বাড়তি ট্যাক্স এবং কোনো কোনো চীনা পণ্যের আমদানির উপরেই যে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা যেন আরোপ না করা হয়।’ জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ট্রেড প্রমোশন ডিপার্টমেন্ট এই অনুরোধ নিয়ে মোদী মন্ত্রিসভার দরবারে এসেছে তদবির করতে।

    এখানে পিছনের কথা আগে একটু বলে নেই। চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ, অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর পালটা প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে মোদি ভারতে সাথে চীনের বাণিজ্য সম্পর্ককে বিরূপ করে তুলতে সব মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই সাথে চীনা পণ্য বর্জনের রাজনৈতিক কর্মসূচিও নিয়েছিলেন। এই প্রপাগান্ডা কাজের জন্য আগে থেকেই বিজেপি-আরএসএস এর দলীয় এক অঙ্গ-সংগঠন তৈরি করাই ছিল, যার নাম ‘স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ’ [Swadeshi Jagran Manch ]। নাম শুনে নিশ্চয় বুঝা যাচ্ছে এর কাজ হল স্বদেশিপনা দেখানো। এখন দেশে-বিদেশে এই সংগঠনের তৎপরতাই জোরদার করা হয়েছে- চীনা পণ্য বর্জনের স্লোগান এদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে। যেমন ইন্ডিয়ান ক্রিকেটে এবারের কোন এক টুর্ণামেন্টে স্পন্সর হয়েছিল চীনা মোবাইল কোম্পানি ‘ভিভো’ [VIVO]।

    তবে বলাই বাহুল্য, এটা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সাথে মিলে চীনা ভিভোর সাবসিডিয়ারি কোম্পানি। এখন মোদী চীনা কোম্পানির উপর বৈষম্য বা বিরূপতা আরোপের নির্দেশ জারি করাতে ওই জাগরণ মঞ্চ ক্রিকেট বোর্ডের কাছে ভিভোকে বাতিল করার আবেদন নিয়ে যায় এই যুক্তিতে যে, এটা চীনা কোম্পানি বলে  এদেরকে স্পন্সর দেয়া  হয়েছে ‘জাতির বর্তমান মুডের বিরুদ্ধে’ বোর্ডের করা কাজ [because Vivo is a Chinese company and BCCI’s move goes against the “current mood of the nation”.]।
    এছাড়া ওদিকে সিনিয়র মন্ত্রী নীতিন গড়করি যিনি বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প দেখাশুনা করেন, তিনি গত ১ জুলাই ঘোষণাই করে দিয়েছেন কোনো চীনা কোম্পানি ভারতে টেন্ডারে অংশ নিতেই পারবে না [India to ban Chinese companies from highway projects, says Nitin Gadkari]। অর্থাৎ চীনা কোম্পানির সাথে segregation বা বিচ্ছেদ ইতোমধ্যেই মাঠে কার্যকর। একই হিসাব মতে, ম্যানুফাকচারিং খাতেও চীনা পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, না হয় শুল্ক এমন বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে যেন কেউ আমদানি না করে।

    অনেকেরই ধারণা, ভারতে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী জাপান। এছাড়া চীনবিরোধী চার দেশ জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকা- এদের জোট ‘কোয়াড’ যার মধ্যে জাপানও আছে [কোয়াড নিয়ে জানত আমার এক গতবারের লেখার  কোয়াড আসছে এই শিরোনামের প্যারাটা দেখে নেয়া যেতে পারে। ] । এবং  আমেরিকা আশা করছে তারা সামরিক জোট হিসেবে কাজ করার কথাও চিন্তা করবে; এদের তো এতে পোয়া বারো। তাহলে তো জাপানের এখন চার দিকে লাভ আর লাভ হওয়ার কথা।

    কিন্তু হতাশ করা কথা হল তা ঘটছে না! আমরা বরং দেখছি উলটা এই জাপানই তার ট্রেড প্রমোশন বিভাগ দিয়ে মোদীর কাছে  দেনদরবার করছে যেন, চীনা পণ্য আমদানি অটুট থাকে, কোন বাড়তি ট্যাক্স আরোপ না করা হয়; চীনকে ভারতে নিজ পণ্য রপ্তানীতে কোনো ধরণের বাধা না দেয়া হয়। কেন?

    এর সোজা মানে তাহলে ভারতের চীনা পণ্য বর্জনের দেশপ্রেম, স্বদেশীপনা বা জাতিগিরি ফলানো এগুলো অচল হয়ে যাচ্ছে।

    জাপানের চীনা পণ্যের প্রতিইবা এমন দরদি মায়া কেন?
    ভারতে গাড়ির কোম্পানির বেশির ভাগই জাপানি ব্র্যান্ডের সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার। অন্তত প্রাইভেট কার – এই গাড়ির মার্কেটে। কিন্তু তা হলে হবে কী, এর ম্যানুফেকচারিং ও অ্যাসেম্বলিতে যন্ত্রাংশ-স্পেয়ার – ভারত বা জাপান কেউই নিজেরা বানায় না। চীন থেকে কিনে আনে। আর অ্যাসেম্বল বা জোড়া লাগিয়ে জাপানি গাড়ি তৈরি করা হয়। কেন? কারণ ওসব পার্টস জাপানে তৈরি করলে গাড়ির দাম বেড়ে  যাবে। কারণ লিভিং কষ্ট বা লেবার কষ্ট বা ন্যূনতম মজুরি জাপানে অনেক বেশি। আবার ভারতেও তা তৈরি করতে গেলে সে ক্ষেত্রেও চীনের তুলনায় অদক্ষতার কারণে দাম বেশি পড়বে, কোয়ালিটিও খারাপ হবে সামগ্রিকভাবে মোট কথা জাপানি গাড়ি বিক্রির প্রফিটে টান পড়বে। অতএব চীনা পার্টস হলে কী হবে ওটাতেই মোক্ষ। এতে অবশ্য পিছনের একেবারে মুখ্য কারণ, চীনা যেকোনো ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানায় প্রোডাকশন লাইন সাজানোর নতুন কৌশল। এটা অ্যাডভান্সড ম্যানেজমেন্ট বুদ্ধিতে সাজানো। ফলে তা দক্ষ এবং কম উৎপাদন খরচ বলে সবার চেয়ে কমপিটিটিভ। আর সেটার লোভেই জাপানিরা কোয়াড জোটের কথিত সামরিকতার লোভ ভুলে উলটা মোদীর কাছে চীনকে ভারতে পণ্য রপ্তানিতে রেখে দেয়ার সুপারিশে লেগে পড়েছেন।

    ওদিকে অবশেষে ক্রিকেট বোর্ড ভিভো মোবাইলের কী অবস্থা বা পরিণতি?
    এটাকে বলে, “পুণঃ মুসিক ভব!”। মানে আবার ইদুঁর হয়ে যা। দয়াপরবশ হয়ে এক সাধু এক ইঁদুরকে  বিরাট ক্ষমতাবান বানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মানুষ এত অত্যাচারিত হোয়ার অভিযোগ উঠতে থাকে যে বিরক্ত হয়ে সাধুকে বলতেই হয়,  “পুণঃ মুসিক ভব!”। মানে আবার ইদুঁর হয়ে যা।  ভিভোকে কিভাবে রেখে দেওয়া যায় এর তদবীর শুরু হয়েছে। কারণ এক. প্রতিবছর প্রায় ৪৪০ কোটি রুপী করে পাঁচ বছর ধরে টাকা দিয়ে আসছে। লোভ লাগার মত ভাল পরিমাণের টাকা, কারোণ এই চীনা মোবাইল ওয়ান অব দা টপ পছন্দের তাই বোর্ডকে অফার করার ক্ষমতাও প্রতিদ্বন্দ্বিদের চেয়ে বেশি। এছাড়া এখন ভিভোকে বাদ দিবার কথা তুললে উলটা ক্ষতিপুরণ দিতে হতে পারে। আর দুই. বোর্ড এখন অমিত শাহের ছেলের কর্তৃত্বে  ফলে তিনি ভিভোকে নিয়েই এগিয়ে যাবার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে এখন ঘটনা মোদীর হাতে তিনি নিশ্চয় শেষ মীমাংসাটা দিবেন। ভিভো-কে স্পন্সরশিপ থেকে বাদ দিতে গিয়ে দেখে তাদের প্রফিট মার্জিনে টান পড়ছে। কাজেই মোদীকে বলে, ভিভোকে রেখেই চলা যায় কিনা!

    অর্থাৎ সার কথা চীনাপণ্য ভারতের বাজারে ঢুকেছে নিজ যোগ্যতা ও পণ্য ক্রেতা মনোরঞ্জনের ক্ষমতার জোরে। এটাই হলো সরাসরি কথিত স্বদেশীপনা বনাম গ্লোবালাইজেশন। যে পণ্যে যে সবচেয়ে নিচের কম খরচে মানে কম শ্রমে ও দক্ষতায় বানাতে পারে, সবাই ওই পণ্য তার কাছেই কিনবে- এটাই হলো গ্লোবালাইজেশনের ভিত্তি। তাতে সে দেশী-বিদেশী না কোন দেশী সেটা কোনো বিবেচ্য নয়। ফাঁপা আবেগের দেশীবোধ বলে কিছু নেই। দেখাই যাচ্ছে এটা কাজ করছে না। অর্থাৎ গ্লোবালাইজেশনের এত ভিত্তি ও খেলার নিয়মে প্রত্যেক রাষ্ট্রকেই কোনো না কোনো পণ্যে বা ওর কোনো পার্টস উৎপাদনে সবচেয়ে কম শ্রমে ও বেশি দক্ষতায় বানাতে পারতেই হবে। তা হলেই ভ্যালু অ্যাডেড প্রোগ্রামে তাকেও অন্য সব রাষ্ট্র গোনায় ধরতেই হবে। চাইলেও বাদ দেয়া যাবে না। এভাবেই যা কিছু দেশটা ভোগ করে তার সব কিছুই আর স্বনির্ভরতা বা আত্মনির্ভরতার ভুয়া স্লোগান দিয়ে নিজের অদক্ষ হাতে বানাতে হবে না। বরং এর বিপরীত ‘গিভ অ্যান্ড টেক’। আরো বেশি করে পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতায় জড়িয়ে পড়তে হবে যাতে কেউ আলগা ‘ফুটানি’, বেশি দাম, বেশি গরজ তৈরি করতে না পারে। বরং সবাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
    তবে এখানে একটা মধ্যবিত্তের পেটিমনকে সামলাতে হবে যেন ছিঁচকে সমালোচনার চোখে না দেখা হয়।  যেমন কেউয়ু বলল চীন ছাড়া ভারতের চলেই না। না এমন খোটা দেয়া পেটি সংকীর্ণ চিন্তা। যদিও তা টংয়ের চা দোকানে চলবেই বন্ধ করা যাবে না।

    ব্যাপারটা হল গ্লোবালাইজেশন অন্যকে নিচা দেখানোর জন্য নয়।  বরং সবাই যেন কোন না কোন একটা পণ্য সবার চেয়ে বেশি দক্ষতায় উতপাদন করতে পারে – পারুক এই উদ্যোগ সফল হোক সেই কামনা। কারণ সে সফল হলে আমরা সবাই ঐ সফলতার ভাগ নিব। ব্যাপকভাবে পারস্পরিক পণ্যবিনিময়ে মেতে উঠব। একা একা কথিত স্বনির্ভরতা অর্জনের নামে আসলে অদক্ষতায় কোয়ালিটি খারাপ দাম বেশি এমন পণ্য গলাধকরণ করার বিপরীতে ব্যাপকভাবে নির্ভরশীলতা কিন্তু এটা একা না সবাই সবার উপর নির্ভরশীল এমন ইন্টার ডিপেন্ডেন্সি – তৈরি করার সম্পর্ক। যাতে কেউ একজন ডাট দেখানো,  বেশি অন্যায় সুবিধা না নিতে পারে তা কমে আসে – এটাই গ্লোবালাইজেশন । যাতে চাইলেই কেউ যুদ্ধ লাগিয়ে না দিতে পারে। কারণ যেখানে বোমা ফেলার কথা ভাবছে সেখানে ঐ শহরে নিজের স্বার্থও আছে।  আর কেউ নিজের মাথায় বোমা মারে না। কাজেই ডায়লগ আর বুঝমান হওটাটাই উভয়পক্ষের লাভ, সহজ রাস্তা।

    ভারতে চীনের রাষ্ট্রদুত সান ওয়েদং এক ওয়েবনিয়ার অন লাইন আলোচনায় এটাই মন্তব্য বা হেদায়েত করে ছেন। বলেছেন ভারত-চীনের অর্থনীতিতে বিচ্ছেদ আনা বা দুরত্ব তৈরি করা হবে একালের স্বাভাবিক স্রোতের উলটা হাটার চেষ্টা। এটা সফল হবে না। তিনি ঐ আলোচলায় ডাটা দিয়ে দেখিয়েছেন, স্পেয়ার পার্টস বা যন্ত্রাংশ কম্পিউটারে ৯২%, টিভিতে ৮২%, নেটওয়ার্কের  অপটিক্যাল ফাইবারে ৮০%, মটরসাইকেলে ৮৫% ইত্যাদি এভাবে চীনাপণ্য ভারতে আপদানি করা হয়ে থাকে।

    কিন্তু সাবধান এটা ভারতকে ছোট দেখানোর জায়গা থেকে পড়বেন না।  ভারতকে তার ভোগ্য সব পণ্য বানাতে হবে, আর সবখাতেই দক্ষ হতে হবে ইত্যাদি না একেবারেই না। এটাই জাতিচিন্তার লাইন। স্বদেশিপনার লাইন। বরং এসব উপেক্ষা করে এর বিপরীতে বরং ভারত কোন কোন পণ্য বানাতে পেরেছে আর এতে (হোক তা খুবই ছোট পণ্য) সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জন করাতে সেই পণ্যের উপর চীনের নির্ভরশীলতা তৈরি হচ্ছে, আর ঐ পণ্য চীনে আমদানি আস্তে আস্তে বাড়ছে – এসব নির্মাণ হল আসল পথ। ৈ যে বললাম হোক তা খুবই ছোট পণ্য এনিয়ে এই তাইওয়ানি উতপাদকের এক প্রবাদমূলক ব্রিলিয়ান্ট বয়ান হল, মাথা হতে হবে, হাতির মত বড় কিছুর মাথা না হতে পারলেও অসুবিধা নাই। কিন্তু মাথা হতে হবে। কিছু না পারলে মুরগীর মাথা হয়ে দেখান।
    এই হল কথিত জাতি বা মিথ্যা স্বদেশিপনা ধারণার বিপরীতে পারস্পরিক গভীর নির্ভরশীলতার সঠিক লাইন।

    কিন্তু গত লেখার শিরোনামেই বলেছিলাম ভারত এই বুঝ ধারণ  করতে বা সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। কেন?
    কারণ, সারা ভারতকে জন্ম থেকেই এই মিথ্যা অচল – ‘জাতি’ বা স্বদেশি ধারণায় বুঁদ করে রাখা হয়েছে। ডুবে আছে। একালে মোদী জমানায় একথাগুলোকেই  মিথ্যা হলেও আরও শানিয়ে তোলা হয়েছে। আর এর সাথেই তাদের হিন্দুত্বের ধারণা জুড়ে রাখা হয়েছে, হিন্দুত্ব কেন শ্রেষ্ঠ এর সাফাই টানা হয়েছে।  আর এই হিন্দুত্ব বিক্রি করেই, হিন্দুত্বের গর্ব উস্কানি দিয়েই এবার হিন্দুভোট তার ভোট সংগ্রহের বা ভোট টানার মূল মেকানিজম।  এজন্য বলেছি মোদী পারবেন না। কিন্তু সেটা তত্বকথা ঠিক আছে থাক। বাস্তবে মোদী কী করে তকার গভীর উভয় সঙ্কট সামলান, কী পরিণতি হয় সেটা দেকার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, তবে তা প্রত্যক্ষে দেখতে পাওয়া হবে আমাদের জন্য এক অর্জন।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৮ আগষ্ট ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “জাতিগিরির ‘স্বদেশী জাগরণ’ অচল” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

     

     

  • ভারতকেই পথ বেছে নিতে হবে, সে সম্ভবত ফেল করবে

    ভারতকেই পথ বেছে নিতে হবে, সে সম্ভবত ফেল করবে

    গৌতম দাস

    ০৭ আগস্ট ২০২০, ০০:০৭ শুক্রবার

    https://wp.me/p1sCvy-38a

     

           Chinese Ambassador in India, on Decoupling India-China Economy, YouTube

    ভারত-চীন সংঘাত বা বিতর্ক সহসা মিটছে না। তবে আস্তে আস্তে অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। আর কী হলে তা মিটতে পারে তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ভারত কী গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার গ্লোবাল অর্ডারটা সম্পর্কে বুঝে? যদি বুঝতে পারে তবে এই অর্ডারের  নেতৃত্বে বদলের নির্ধারক সময়কাল হাজির হয়েছে। ভারত এর কোনদিকে থাকতে চায় – এনিয়ে ভারতকে এখনই সিদ্ধান্ত অবস্থান নিতে হবে। এতদিন ভারত দুদিকেই পা দিয়ে থাকার সুবিধা যা পেয়েছিল তা শেষ। তাই পুরানের সাথে গাটছাড়া বেধে শেষ হয়ে যাবে না নতুনের সাথে থেকে নিজের বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে এনিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদিও নতুন নেতা চীনের সাথে ভারতের না যাবার সম্ভাবনা এখনও বেশ বেশি দেখা যাচ্ছে। এর মূল কারণ ভারত “গ্লোবাল অর্ডার” জিনিষটা ধরতে পারে না। এর কারণ আবার হল, জাতি-রাষ্ট্র চিন্তায় বা এরই সহযোগী চিন্তা  – “স্বদেশীপনা” বা বিদেশী মাত্রই আমার অর্থনৈতিক শত্রু – এই চিন্তার উপর দাঁড়িয়ে রাজনীতি করা বিজেপি-আরএসএস, এরা কখনই গ্লোবাল অর্ডার বা খোদ গ্লোবাল শব্দটার অর্থ তাতপর্য কখনই বুঝতে পারবে না। কারণ তাদের ‘হিন্দুজাতি’ বা খোদ জাতি-রাষ্ট্র ধারণাটাই এক [fetish] কাল্পনিক রাজনীতি। এছাড়া এই “জাতি” ধারণার জন্ম ও বিকাশ ও টিকে থাকা সবই ঘটেছিল ইউরোপের কলোনি যুগে ও কলোনি শাসনের পুর্ব-পটভুমিতে। বিশ্বযুদ্ধের শেষে কলোনি শাসন লুপ্ত হয়ে গেলে এই জাতি-রাষ্ট্র ধারণা ফেলে দিয়ে ধুয়ে মুছে ইউরোপ অধিকার-ভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়ে যায়। কিন্তু কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রে অসামঞ্জস্যভাবে জাতি-রাষ্ট্র চিন্তাতে ভর করেই এগুলো বিকশিত হচ্ছে মনে করা হয়েছিল। আজ গ্লোবাল ইকোনমির প্রধান ধারা আরো বেশি করে  পারস্পরিক লেনদেন বিনিময় বাণিজ্যে গভীরে জড়িয়ে যাওয়া। কারণ এটা ভ্যালু এডিশন শেয়ারের যুগে প্রবেশ করছি আমরা। তাই এই যুগে ঐ পুরানা সুপ্ত “অসামঞ্জস্যতা” প্রকট ভাবে হাজির হচ্ছে। তাই এখকার দুনিয়ায় যে চীন-আমেরিকা বা চীন ভারত যা কিছু হবু সংঘাত  ও টেনশন – এটা জাতি-রাষ্ট্রবাদীদের চোখে নেহায়ত দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা।  এগুলো যে “গ্লোবাল” মাত্রার সমস্যা, কোন বাই-লেটারাল বা দ্বিপাক্ষিক জটিলতা নয় তা এরা টেরই পাবে না। সম্ভাবনা নাই।

    কোন দুই দেশের সীমান্তঃ কিছু তত্বকথা
    এনিয়ে যে কথাগুলো আমরা প্রায়ই শুনে থাকিঃ সীমান্ত বা ম্যাপ কথার আসল মানে হল – সীমান্তের দুই পক্ষের ঐকমত্যে একটাই ম্যাপ যেখানে আঁকা হয় আর ঐ একই ম্যাপের দুটি কপি দুই পক্ষের হাতে ছাড়া তখন  অন্য কোনো ম্যাপ বা এলএসি [LAC] বলে আর কিছু  থাকে না। এটি সম্ভব যখন দুই পক্ষই সীমান্তে একটি শান্ত নীরবতা একটা প্রশান্তি অর্জনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে আর সেই মেজাজে আসবে। কারণ, অপরের ভুমি দখলের কলোনি যুগ বহু আগেই শেষ হয়েছে।  বিপরীতে কোনো পক্ষ যখন মনে করবে আমি যেটা আমার রাষ্ট্রসীমা বলে বুঝি সেটাই আমাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর অর্থ সেখানে সীমান্ত চিহ্নিত করা, একটাই ম্যাপ তৈরি কখনোই ঘটবে না। আর স্বভাবতই এতে দেশের অর্থনীতিতে মানুষের জীবনমানে বাড়াতে মনোযোগে দেওয়ার বদলে নিঃস্ফলা সীমান্তেই সব সময় কেটে যাবে। এটাই ঘটবে কারণ, আপনি অন্যের দাবি উপেক্ষা করে, এর সুসমাধা না করে কোনো ভূমি দখল করে শান্তিতে থাকতে পারবেন না। কখন টেনশন আসবে আমি জানবেনও না। এখানে চিহ্নিত বা ডিমার্কেশন শব্দের আসল মানে হল – নিজেই নিজের রাষ্ট্রসীমা বলে এককভাবে কিছু দাগানো- একবারেই নয়। বরং পড়শিকে সাথে নিয়ে দাগানো। যাতে দাগাবেন একবারই। এরপর এ নিয়ে কেবল শান্তি আর প্রশান্তিই অর্জন করবেন।
    এ লক্ষ্যেই আপনাকে কিছু হোমওয়ার্কও করতে হবে। কারণ ডিমার্কেশনের আলোচনা মানেই মূলত গিভ অ্যান্ড টেক। পেতে হবে আর ছাড়তেও হবে। কী কী আপনাকে পেতে হবে তা বাদে বাকি সীমানা-বিতর্কে সব খানেই ছাড় দিতে বা নিগোশিয়েট করতে রাজি আছেন এটি বুঝায় দেন। প্র্যাকটিশটা উভয়পক্ষ করলে সহজে কাজ শেষ করা সম্ভব। কিন্তু এটা তখনই সম্ভব যখন আপনি শুধু না, উভয়পক্ষেরই প্রশান্তি লাভ প্রধান লক্ষ্য। সত্যিকারের ডিমার্কেশনের লক্ষ্যে এগিয়ে এসেছেন। গিভ অ্যান্ড টেক শেষে একটি ম্যাপ আঁকতে এসেছেন। কারণ, সামরিক শক্তি দিয়ে ভূমি দখল করা যায়, ডিমার্কেশন করা যায় না।

    [একটু অফসাইডে এটা মূল প্রসঙ্গের বাইরের কিছু কথা। ফলে নিচের এই প্যারা আপনি বাদ দিয়ে রেখে ব্রাকেটের শেষে আবার পড়া শুরু করতে পারেন।]

    [ভারতে কিছু নতুন ডেভেলপমেন্টঃ আজকের কথা শুরু করার আগে ভারতে কিছু নতুন ডেভেলপমেন্ট, তাই গুরুত্বপুর্ণ কিছু বাড়তি কথা যোগ করব এখানে। যখন লিখছি তখন সময়টা ৫ আগষ্ট ২০২০ এর দিবাগত রাত পেরিয়ে মধ্যরাতের দিকে যাচ্ছে যাতে আইনত ৬ তারিখ শুরু হবে কিছুক্ষণের মধ্যে। আর আমার এই বাড়তি প্রসঙ্গ হল, আজকের ভারতের জন্য ঘটনাবহুল “৫ আগষ্ট”।  ৫ আগষ্ট উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জন্য নির্ধারক দুটা কারণে।
    এক, কাশ্মীর যে আইনি সুত্রে  ভারতের সাথে আগে একভাবে যুক্ত ছিল বলে মনে করা হত সেই ৩৭০ ধারা বাতিল করে মোদী-অমিত গতবছর এদিন থেকে সংসদীয় ততপরতা শুরু করেছিল। আর এরপর শ্রেফ গায়ের জোরে ঘোষণা করেছিল যে কাশ্মীর এখন থেকে ভারতের সরাসরি অংশ। অতএব এদিন হল দখলদারি ও নতুন হত্যার প্রথম বার্ষিকী। আর দুই, বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে সে জায়গায় রামমন্দির বানানোর জন্য এর ভিত্তিপ্রস্তত স্থাপনের দিন;  মোদী ও তাঁর দলবলেরা এই ৫ আগষ্টকেই এর দিন হিসাবে ঠিক করেছে, যার নাম দিয়েছে ‘ভুমি পুজার” দিন।
    কিন্তু এদুই দিক থেকে আজ এসবের মাহাত্ম বা তাতপর্য নিয়ে কথা বলব না, ঠিক সেটা আমার প্রসঙ্গ না।  প্রসঙ্গ হল, আমরা স্বীকার করি আর নাই করি ভারতের রাজনৈতিক জগতে বড় বড় কিছু গভীর রাজনৈতিক সংকট আছে। যেটাতে সময় না দিলে তা ভারতরাষ্ট্রের অস্তিত্বের সঙ্কট হয়ে হাজির হতে পারে।  যেগুলোকে শুধু সংকট বা ক্রাইসিস না বলেও কিছুটা ইতিবাচক শব্দে একে চ্যালেঞ্জ – ভারতের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বলা যেতেও পারে। সেই প্রেক্ষিতে, এই ৫ আগষ্টকে, ইতিহাসে লেখা হবে এই বলে যে যেদিন থেকে ভারতের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল (ও যারা এদের কোন একের সাথে জোটে সম্পৃক্ত) – বিজেপি ও কংগ্রেস এদের দিন শেষ তা লেখা হয়ে গেছিল। কী অর্থে? না, এদের হাতে আর ভারতের বর্তমান ও আসন্ন রাজনৈতিক সঙ্কটগুলোর মিটানো বা সমাধান করতে আর কোনই ভুমিকা থাকবে না, তাই নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার দিন। কেন?
    তত্বগত বা কিছুটা কঠিন ভাষায় বললে, বিজেপি চীনের সাথে কথিত সীমানা লড়াইয়ে হার স্বীকার করে  নেওয়াতে এনিয়ে কোন নির্বাচনে আর এটাকে ইস্যু করে সুবিধা হবে না। তাই ফেলে পালিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর বদলে “হিন্দুত্বের বিজয় ও গর্বের” উস্কানি তুলে আগামি ২০২৪ সাল পর্যন্ত সব নির্বাচনে ভোট চাইবে মোদী ও বিজেপি। অর্থাৎ এবার মাঠের ভাষায় বললে, মোদী ও বিজেপি  – চীন, পাকিস্তান বা সীমান্ত এসব ইস্যু আর ভোট-নির্বাচনে নিয়ে আসবে না, মোদী ভোট চাওয়ার ইস্যু করবে না।  তারা প্রধানত, রামের নামে (মসজিদের উপর রামের মন্দির নির্মাণের বিজয়-সাফল্য, ফলে তারাই আসল রামভক্ত, পুজারী ইত্যাদিতে মিথিক্যাল রামকে বাস্তব বানানোর কারবার), এভাবে ভোট চাইবার রাজনীতি শুরু করবে। মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের সাফল্য হবে বিজেপির প্রধান নির্বাচনি ফোকাস বা অর্জন বলে হাজির করা। এটাই এখন থেকে হিন্দুত্বের বা হিন্দু ভোট মেরুকরণের প্রধান ফোকাস হবে।
    ওদিকে ঠিক একারণের আমরা লক্ষ্য করছি এর বিপরীতে এবার, কংগ্রেসের তাতপর্যপুর্ণ সিদ্ধান্ত হল যে তারাও এখন থেকে  বিজেপির মত হিন্দুত্বের রাজনীতিই করিবে।  এনিয়েই প্রতিযোগিতায় নামবে। ৫ আগষ্ট উপলক্ষ্যে  মা সোনিয়া অথবা ভাই রাহুল নয়, প্রিয়াংকাকে দিয়ে  কংগ্রেস সিদ্ধান্ত জানিয়েছে যে মোদীর মসজিদ গুড়িয়ে এর উপর মন্দির নির্মাণের সাফল্যের  ‘ভুমি পুজার” দিন – এই হিন্দুত্বের ভাগ নিতে কংগ্রেসও এগিয়ে এসেছে। তাই কংগ্রেস মনে করছে, এদিন নাকি কথিত জাতির ইউনিটি, ভাতৃত্ব ও সাংস্কৃতিক সহমর্মিতা প্রকাশ ও উতযাপনের দিন – আর আনন্দবাজার লিখেছে প্রিয়াংকা বলছে রাম নাকি সবার করার দিন, তা সকলের উতযাপনের দিন এই ৫ আগষ্ট। সবচেয়ে ভয়ানক বোকার মত কথা তিনি বলেছেন,  ‘Rab is Ram’।

    “a celebration of national unity, fraternity and cultural affinity” – WIRE.  “রাম সবার” – আনন্দবাজার

    সোজা কথায় মসজিদ ভেঙ্গে দেয়া এখন থেকে কংগ্রেসের চোখে কথিত জাতীয় উতসব আবার ভাতৃত্বেরও নাকি দিন! এ কেমন জাতি? আর কাদের কাদের মধ্যেইবা ভাই গিরি? সে এক বিরাট বিস্ময়। মোদী-অমিত-মোহন ভাগওয়াত থেকে গোলঅওয়াকারও যেটা সাহস করে নাই, কংগ্রেস এখন থেকে সেই কথিত হিন্দু জাতি, হিন্দুত্ব এসবের ভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসাবে যাত্রা শুরু করল।  আর তাকে অনুসরণ করেছে আম আদমি পার্টিও। তাই ভারতের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে ভবিষ্যতে বিজেপির সাথে কংগ্রেসের কোন ভুমিকা থাকবে না তাই নির্ধারিত হয়ে গেল। আর মোদীর বিজয় হল এই যে এখন থেকে (মমতার মত দুএকজন বাদে) সবার রাজনীতির ভিত্তি হল সরাসরি হিন্দুত্ব। ]

    সম্প্রতি ভারতে চীনের রাষ্ট্রদূত সান ওয়েদং একটি ভার্চুয়াল বা অনলাইন কথোপকথনে অংশ নিয়েছিলেন। ‘ওয়াইর’[WIRE] ভারতের এক ইংরেজি ওয়েব পত্রিকা, যেটি একালে এক ব্যতিক্রম; উগ্র জাতিবাদী যুদ্ধবাজ চিন্তাধারী ও হিন্দুত্ববাদীদের ঠিক বিপরীতে সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়ে রিপোর্ট করে যাচ্ছে। এই ওয়াইর পত্রিকাও উপস্থিত ছিল। তাদের বরাতে আমরা জানছি, রাষ্ট্রদূত সেখানে মোটাদাগে কী বলেছেন। সেই প্রসঙ্গে যাবার আগে অন্য কিছু কথা।

    ভারত-চীনের বাস্তব সীমান্তঃ
    সীমান্ত বা ম্যাপ নিয়ে তত্ত্বকথা থুয়ে বাস্তবে আসি।   ভারতের অভ্যন্তরে এখন প্রধান আলোচ্য বা তর্ক হল – প্রতিহিংসা – যে কী উপায়ে ‘প্রতিশোধ’ নেয়া যায়।  ভারতের ভাষায় “মুখ-তোর” বা বাংলায় বললে “দাঁতভাঙা” জবাব দেয়ার পথ খুঁজছে তারা। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, ভারতের চরম জাতিরাষ্ট্রবাদী রাজনীতির কারণে এর প্রতীক মোদী সরকারকে চীন একেবারে আউলায়ে দিয়ে চরম অপমানিত করে দিয়ে গেছে। যখন অন্তত ২০ সেনার নির্মম মৃত্যুর পর মোদীকে দিয়ে চীনারা বলিয়ে ছেড়েছে – ভারতের ভূমিতে (চীনারা) কেউ  আসেনি, বেদখল হয়নি। যার মানে দাঁড়িয়েছে অন্তত ওই ২০ জন সেনা চীনা ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করে চীনাদের হাতে মারা গেছে। এরচেয়ে বড় অপমান আর কী হতেপারে! এছাড়া এভাবেই গলওয়ান উপত্যকা পুরাটাই চীনাদের, তাও মোদীকে দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেয়া হয়েছে। যদিও আরও অন্যান্য ভূখণ্ডগুলো এখনো চীন ছাড়ল না কেন, কবে ছাড়বে, তাদের মুভমেন্ট কী – এ নিয়ে প্রতিদিন ভারতে মিডিয়া রিপোর্ট বের হচ্ছে, আর মোদীর উপর চাপ বাড়াচ্ছে। অথচ ভারতের সব মিডিয়াই জানে তারা একটা ‘জুয়াচুরি’ খেলছে। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য যদি হয় যে চীন, ভারতের কোনো ভূখণ্ডই দখল করে নাই। তবে এই যে প্রতিদিন রিপোর্ট লেখা হচ্ছে যে, চীন ভারতের ভূখণ্ড, অমুক লেক, অমুক ভূমি ছেড়ে যায়নি – এই এসবের কী কোনো মানে আছে? সত্যতা আছে?  প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষী যা দখলই হয় নাই তা আবার চীন ছেড়ে যাবে কী করে? দাবি করাই বা কেন?

    তাহলে কোনটা সত্য? চীন ভারতের কোনো ভূমি দখল নেয়নি? নাকি এখনকার মিডিয়া রিপোর্ট। ফ্যাক্টস হল, সারা ভারত জানে উগ্র হিন্দু জাতিবাদের মোদী এখানে সোজা  মার খেয়ে হেরে গেছে। জাতিরাষ্ট্রবাদী চিন্তায় যা এতদিন খুবই সহজ কাজ মনে করা হয়েছে যে যেকোন সীমান্তবিরোধকে আভ্যন্তরীণ নির্বাচনে “ভুয়া হিন্দুত্বের বিজয়” বা দেশপ্রেম হিসেবে দেখিয়ে হিন্দু পোলারাইজেশন ভোট ঘটানো চলে এসেছিল অথচ, আজ এখানে প্রমাণ হয়েছে এটা কত বড় আত্মঘাতী, এরই বড় প্রমাণ আমরা এখানে পাই।

    অথচ সীমান্তবিরোধকে তথাকথিত ‘জাতির’ হার-জিত হিসেবে দেখানোর কী আছে? সীমানা বিরোধকে মিটানোই দুই দেশের ডায়লগ সহ সবকিছুর লক্ষ্য, এটা তো কারো কোন “ভূমি বিজয়” একেবারেই নয়। দ্রুত যেকোনো সীমানা বিরোধ বা বিতর্ককে কথিত ‘হিন্দু জাতির’ হার-জিত হিসেবে দেখানোর মোদীর হিন্দুত্ব – এ ব্যাখ্যার কবলে পড়ে মোদীর অপমান এবং তার হিন্দুত্বের পতন বা মার খেয়ে যাওয়া এটাকেই এখন সারা ভারতের অপমান ও মার খেয়ে যাওয়া বলে হাজির করার কসরত চলছে। এছাড়া সারা ভারত জানে সামরিকভাবে  প্রতিশোধ নেয়ার অবস্থায় বা মুরোদে ভারত নাই। তাহলে?

    কোয়াড’ আসছেঃ
    অতএব  উপায়ন্তহীন মোদী এখন আরেক স্বপ্ন ছড়িয়েছেন – ‘কোয়াড’ [QUAD] আসছে। তারাই নাকি ভারতকে এবার প্রতিশোধ নিয়ে দেবে। এই কোয়াড কারা? কোয়াড শব্দের  এক সংস্কৃতিঘেঁষা বাংলা হবে চতুষ্টয় বা চারটা; মানে  চার মহাজন। তবে এখানে সুনির্দিষ্ট করে এর অর্থ চার রাষ্ট্রজোট – ভারত, আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু জন্ম থেকেই চলছে এর নানান উত্থান আর পশ্চাদ অপসারণ। জাপান এর জন্ম প্রস্তাব দিয়েছিল বাকিদের কাছে। কিন্তু তা দেয়ার পর ১০ বছর এর আর খবর ছিল না। এরপর ২০১৭ সালে যদিওবা এর জন্ম দেয়া হল, তাও সেটি কাকের ঘরে কোকিলের জন্মের মত করে। মানে ফিলিপাইনে ২০১৭ সালে উদ্যোক্তারা আরও অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে এক  ‘আসিয়ান সম্মেলন’ করতে এসেছিলেন। কিন্তু এর ফাঁকে মানে সাইডলাইনে বসে জন্ম দিয়ে ফেলেছিলেন কোয়াড নামে এক ব্লকের। কিন্তু তাতেও আবার জন্মাইছেন এ খবর সামনে আনতে প্রথম বিবৃতি দিতে গিয়েই ধরা। সেই মূল বিবৃতিটা চার দেশ চার রকমভাবে নিজেদের কথা ঢুকিয়ে এডিট করে ছেপেছিল। পরিণতি চারটি আলাদা ভার্সন এর, ২০১৭ সালে ভারতের দা হিন্দুর রিপোর্ট দেখেন এখানে। আর সেই সাথে এনিয়ে ততকালে আমার এক লেখা এখানে – “চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!”।

    তবু এদের মুখে কোয়াড নিয়ে হামবড়া গর্বের ফেনা তোলার শেষ নেই। বলা হচ্ছে – এটি নাকি ডেমোক্র্যাসি’স বা গণতন্ত্রওয়ালাদের জোট। আসলে তারা হল চীনবিরোধী, তাই। আমেরিকার ভাষায় চীনে তো ‘গণতন্ত্র’ নাই, তাই তাদের পোয়া বারো।  আর তাতেই চীনবিরোধী  বলে ঐ চার রাষ্ট্র নিশ্চয় “ডেমোক্রেসির চ্যাম্পিয়ান”।  নিজেরা কী তা বুঝানোর এটাই তারা তরিকা হিসেবে নিয়েছে। অথচ ঘটনা হল, জন্ম থেকেই এই ডেমোক্র্যাসি শব্দটা সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নকে খাটো বা নিচা করে দেখাতে আমেরিকা জন্ম দিয়েছিল। আর রাষ্ট্র বুঝাতে ক্লাসিক্যাল মূল শব্দটা হল – ‘মর্ডান রিপাবলিক’, কখনই যাকে ডেমোক্রাসি বলা হয় নাই। তা বাদ রেখে একটু সরিয়ে সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নকে খোঁচা দিতে এই শব্দ হাজির করা হয়েছিল। তো ভালো! কী আর বলব। হিন্দু উগ্র জাতিরাষ্ট্রবাদী মোদী আর তার অনুসারীরা যদি ভারতের কোন মুসলমান নাগরিকের বুকের ওপর উঠে; তাদের বুকের হার ভেঙ্গে দিয়ে জবরদস্তিতে তাকে দিয়ে জয় শ্রীরাম বলানোকে তাদের “ডেমোক্র্যাসির” বিরাট নায়ক বলে জাহির করতে থাকেন আর মোদী ঐ ডেমোক্রাসির বিরাট নেতা হন – তাহলে বলতে হয়, হে ডেমোক্র্যাসি দূরেই থাকো, আমার লাগবে না! তা তোমাদেরই থাক। আর অমন ডেমোক্রাসিকে ধিক্কার!
    এর মানে আবার অবশ্যই এও নয় যে, চীনারাষ্ট্র এর কোন অযোগ্যতা বা খামতি নাই। তবে অবশ্যই এই কথিত ‘ডেমোক্র্যাসি’র ফেরিওয়ালারা বিপজ্জনক ও ধান্দাবাজ। এমনই ধান্দাবাজ  যারা আবার নিজেরা চার রাষ্ট্র পরস্পরকেই বিশ্বাস করে না। তো এই ফেরিওয়ালারা ২০১৭ সালে জন্মের পর থেকে ঘুমিয়েই ছিলেন। কোন সক্রিয়তা ছিল না। কিন্তু গত এক মাসে আবার জেগেছে। তাতে চীনাদের হাতে অপমানিত ভারত ও মো্দী যেন তিন দিনের ক্ষুধার্ত লোক যে প্রথম রুটির দেখা পেল। সর্বস্ব হতাশায় ঢুবে যাওয়া ভারতের মনে এবার সবার মনে তাই আশা, এবার মনের জ্বালা মিটবে! কিন্তু আদৌ মিটিবে কী?
    সন্দেহ আছে প্রবল। যেমন জাপানের পত্রিকা নিক্কিই-এর উপ- শিরোনাম হল, Pompeo says ‘Quad is revived’ and calls for democracies to unite। আর শিরোমানে নিজেরাই সন্দেহ রেখে বলছে এটা এমবিশাস, মানে উচ্চভিলাসী – US seeks ambitious relationship with ‘global power’ India.।
    এদিকে চীন-ইরান ২৫ বছরের চুক্তি হচ্ছে এই খবর বাজারে এসে যাওয়ার পর ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (সমতুল্য) মাইক পম্পেও ইউরোপে গিয়েছিলেন। পরে অস্ট্রেলিয়াতেও যান। কিন্তু ২৯ জুলাই পম্পেওকে অষ্ট্রেলিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানালেন, “চীনবিরোধিতা প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়া আমেরিকাকে আংশিক সাপোর্ট দিবে” [Australia gives US partial support against China]। এই হল মিডিয়া শিরোনাম। শুধু তাই নয়, ভেতরে লিখছে পার্শিয়াল মানে কী। বলছে  – দক্ষিণ চীনসাগরে চীনবিরোধী জোটের মহড়ায় অস্ট্রেলিয়া যোগ দিবে না। আরো আছে। চীনের সাথে অস্ট্রেলিয়া গভীর বাণিজ্য সম্পর্ক সে অটুট […pursue policies independent of both the US and close trade ally China.] রাখবে। আর লাগে কিছু? বোঝা গেছে না!

    ঘটনাটি তাহলে কী? কোয়াড ব্লক দাঁড়ায় না কেন? অথচ ইন্ডিয়ানরা এত ভরসা করে বসে আছে! এমনকি ফিলিপাইনে থাকেন এক ভারতীয় অরিজিন হায়দারিয়ান সম্ভবত খ্রিষ্টান, তিনি এশিয়া টাইমসে লিখেন। তিনিও প্রবল উৎসাহে গত সপ্তাহে ২৭ জুলাই কোয়াড নিয়ে রিপোর্ট লিখছেন এক আকাশ ফাটানো শিরোণামে Quad alliance forms ‘arc of democracy’ around China। কিন্তু লেখার মাঝখানে নিজেই লিখছেন, কিন্তু চীনের সাথে ব্যবসায় লাভালাভের স্বার্থে ইন্ডিয়া আর অস্ট্রেলিয়া এরা কখনো চীনবিরোধী এই জোটে সক্রিয় হয়নি ……India and Australia were until now often reluctant to participate in an ostensibly anti-China alliance.।

    তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়?
    একটা মৌলিক দিক নিয়ে কথা তুলব। সে শব্দটা হল অবজেকটিভ। কিন্তু এর মানে কী? ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প কিংবা সুনামি এধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি জানি। কিন্তু মানুষ কি কখনো এর বিরুদ্ধে, যেন দুর্যোগ থামিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে লড়াই-এর চিন্তা করছে – এমন কী আমরা কখনো দেখেছি? অবশ্যই না। বরং আমরা সবসময় দেখি এধরণের খবরটা জেনে নিয়ে মানুষ এবার এর সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া যায় কী করে; যাতে লক্ষ্য থাকে কত কম ক্ষতিতে এটি পার করা যায় কিভাবে। মানে কোনো লড়াই নয়, বরং একভাবে একে স্বাগত জানানোই বলা যায়। এগুলোকেই আমরা অবজেকটিভ ঘটনা বলতে পারি। যা অবজেক্টের উলটা  সাবজেক্ট – মানে কর্তা মানুষের কারণে ঘটে না। (যদিও লোভে অজান্তে করে বসতে পারে।)  এগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা। এই অবজেকটিভ ঘটনাগুলোর প্রতি সাবজেক্ট মানুষের আচরণ সবসময় সব কালেই পুর্বনির্ধারিত। আর তা হল  অধস্থন, অবজেকটিভিটির বশ্যতা স্বীকার করে নেয়া।  অবজেকটিভ ক্ষমতার সামনে দাঁড়ানো বোকামি। তাতে সেটাকে প্রাকৃতিকতা বলেন কিংবা স্পিরিচুয়ালিটি বলেন – এমন কোন ফারাক নাই।  তবে এপ্রসঙ্গে একজনের নাম ও পরিণতি মনে করতে পারেন  – রবার্ট ম্যাকনামারা Robert S. McNamara । আমেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী (সমতুল্য) ভিয়েতনাম যুদ্ধের কু-নায়ক ও কেমিকেল অরেঞ্জ বোমা ফেলায় আজীবন সকলের বদ-দোয়া প্রাপ্ত খলনায়ক তিনি। যার কারণে এখনও ভিয়েতনামে বিকলাঙ্গ বাচ্চা পয়দা হচ্ছে, কেউ জানে না কার বেলায় কোন হবু বাচ্চার সেটা হবে।ম্যাকনামারা ছিলেন অবজেকটিভিটির সাথে লড়তে যাওয়া কুখ্যাত বোকা। অতএব, সব সমাজের দুরছাই নিন্দা এড়াতে জীবনের শেষ বিশ বছর তিনি নিজেকে ঘরে বন্দী করে কথা না বলে কাটিয়েছেন।
    তাহলে সারকথাটা হল, অবজেকটিভিটি প্রসঙ্গে সাবজেক্ট মানুষ হিসাবে আমাদের ভূমিকা নির্ধারিত। তা হল- কোনো লড়াই বা যুদ্ধ একেবারেই নয়, বরং পাশ কাটিয়ে থাকা যতটা সম্ভব যাতে ক্ষতি কম হয়। বলা যায়, তাই আমরা এ ধরনের অবজেকটিভ বা ‘প্রাকৃতিক’ ঘটনার সাথে আমরা ভুলেও লড়তে যাই না। এটি আমাদের কাজও নয়।
    ওদিকে আরেকটা ধারণা হল “গ্লোবাল”; মানে – একটি গ্লোবাল সিস্টেমের প্রয়োজন শুরু হয়; যেকোনো দুটি রাষ্ট্রের পণ্য বিনিময় বাণিজ্যের লেনদেনের প্রয়োজন মিটাতে। কেন? কারণ ওই লেনদেন বাণিজ্যে দুই রাষ্ট্রের কারো মুদ্রা দিয়েও বাণিজ্য চালানো যায় না। মুদ্রামান, বিনিময় হার জানা ছাড়া বিনিময় অসম্ভব। এখান থেকেই গ্লোবাল মুদ্রা, এর মান এক ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা’ কার্যকর থাকার প্রয়োজনীয়তা্র অনুভব ও তা মিটানোর শুরু।
    সময়কাল ১৬০৭-১৯৪৫, এই প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি দখলের আমলে ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা’ খুবই সীমিত ছিল। তাই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গ্লোবাল বাণিজ্যব্যবস্থা কার্যকর চালু ছিল না। কিন্তু এই ব্যবস্থা বা গ্লোবাল অর্ডার দুনিয়া প্রথম চালু হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে ১৯৪৫ সাল থেকে। আর ‘গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায়’ মেজর লেনদেনের মুদ্রা এখনো ডলার, আর এর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান মালিকানা শেয়ারও ঐ আমেরিকার হাতেই। বিগত ৭৫ বছর ধরে আমেরিকা নেতার অবস্থান নিয়ে আছে। যদিও এ প্রভাব ইদানীং কমে আসছে, বিপরীতে চীন সে জায়গা নিয়ে ক্রমেই উঠে আসছে। আমাদের বক্তব্যের ফোকাস হল – এই দুই দেশের উঠে আসা বা পড়ে যাওয়াটা যত না সাবজেকটিভ, এর চেয়ে ঢের ঢের বেশি এটা বস্তুগত, তাই অবজেকটিভ ঘটনা। দুনিয়ায় উদ্বৃত্ত সম্পদ বা পুঁজির সঞ্চিতি বা একুমুলেশন একেক সময় মুখ্যত একের দেশের হাতে, নানা কারণে ঘটেছে। এটা আবার সহসাই চলেও যায় না। আবার, কবে আসবে কবে নাগাদ যাবে তাও আন্দাজে বলা যায় না।  অতএব যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে চীনের উত্থান ঠেকানো যাবে না। চীনের উত্থানের বড় দিকগুলোই এক অবজেকটিভিটি।
    কিন্তু এরপরও মোদীরা জিদে ধরা যাক যুদ্ধের দিকে ঘটনা গড়িয়ে দিল। কিন্তু আর ঘটনা বৈশিষ্ট হল যতই নাবুঝা কল্পনায় বলি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা – এগুলো কিন্তু ভুয়া আর মিছা -পুরাটাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কল্পনায় ঠাসা যখন পারমানবিক অস্ত্র কথাটাই প্রচলিত ছিল না। কিন্তু এখন প্রধান বিবদমানদের হাতে পারমানবিক অস্ত্র আছে। অতএব এখন যুদ্ধ মানে সে্টা খুবই সীমিত পরিসরে রাখতে হবে; কারণ তা কোনোভাবেই যেন পারমাণবিক উস্কানির দিকে না যায় তা দুপক্ষকেই মনে রাখতে হবে। যতই জিদ উঠে যাক সীমিত যুদ্ধে থাকতেই হবে। সীমিত যুদ্ধ মানে তা আপস মিটমাটের রাস্তায় নিতে সচেষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু তাতেও সবচেয়ে বেশি অর্থনীতির ক্ষতি হবে চীন বাদে বাকি সবার। কারণ, চীনের ক্ষতি সামলানোর দিক থেকে সবার চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকবে। কিন্তু এরপরও ঘটনা এখানেই শেষ নয়। বলা যায় শুরু। কেন?

    কারণ, এই কথিত ডেমোক্র্যাসিসরা তাদের ভেঙেপড়া অর্থনীতি আবার চাঙা ও পুনর্বাসন করতে দুনিয়ায় সাহায্য পাবার মত একমাত্র শক্তি বেঁচে থাকবে চীনই। ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে দেখতে পারেন ঠিক এ ঘটনাই ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। যুদ্ধে হিটলারের জোটের বিরুদ্ধে যারাই আমেরিকার পক্ষে ছিল; সবাইকে যুদ্ধের খরচ দিয়েছে আমেরিকা, এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নকেও। আবার যুদ্ধ শেষে পুনর্বাসনের অর্থ জুগিয়েছে সকল্কে, ধার দিয়েছে সেও ঐ আমেরিকাই। এছাড়া সে যুদ্ধ শেষে আবার পরাজিত হিটলারের জার্মানি, তার বন্ধু জাপান বা ইতালি এদেরও পুনর্বাসনের অর্থ জুগিয়েছে ঐ আমেরিকাই। ইতালিতে তো দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। যে আমেরিকার বিরুদ্ধে মুসোলিনি যুদ্ধ করেছিল; ইতালীয়রা সেই আমেরিকার কাছেই ভিক্ষা চেয়েছিল, দুই হাত তুলে তাদের গডের কাছে মিনতি জানিয়েছিল আমেরিকাকে সুমতি দিতে এবং আমেরিকাও হাত খুলে সাহায্য এবং পুনর্বাসন সব কিছু অর্থ ঋণ-অনুদান দিয়েছিল। কাজেই……।

    দুনিয়া খুব কঠিন জায়গা। ইতিহাস পড়েন, একই ভুল দ্বিতীয়বার করার মানে হয় না। রেললাইনে মাথা দিয়ে আবার বুঝার দরকার নেই যে মাথা কাটা যাবেই। কাজেই প্রথম কাজ বুদ্ধিমান হন। জিদ ত্যাগ করেন, প্রতিশোধের স্পৃহা ত্যাগ করেন। এটি নেগেটিভ এনার্জি। এটা কমবেশি সবার ক্ষতি করবে। মূলকথা, মানুষের স্বভাব বা কাজ না অবজেকটিভিটির বিরুদ্ধে লড়া। নিজের স্বার্থের জন্য লড়বার আরো অনেক পথ আছে, সেগুলো খুঁজেন, ইনোভেটিভ হন। রাস্তা পাবেন। কেবল সতর্ক থাকেন কোনগুলো ধ্বংসাত্মক, তা এড়ায় চলেন। আর সবচেয়ে বড় কথা (থিওলজিতে বিশ্বাসী লোকেরা বলবে আল্লা চাহে তো) আস্থা রাখেন দিন আপনারও আসবে!

    কিন্তু এখনই একটি পরীক্ষা করে নেন। আমেরিকার ট্রাম্প যে কোয়াডের পিছনে তাল দিচ্ছেন তাতে তিনি নিজে থাকবেন তো? নাকি? ২০১৭ সালে জন্মের সময় ট্রাম্পের আমেরিকা কিন্তু পালিয়েছিল। কারণ সেবারই সবার আগে ট্রাম্পের চীন সফর ছিল। সমস্যা হয়েছিল চীন ঠিক কত কী বাজারসুবিধা দিতে রাজি; তা ক্যালকুলেট করতে সময় লাগছিল বলে তত দিনে ট্রাম্প ফিলিপাইনে এসে কোয়াডের জন্ম ঘোষণা করে দেয়ার পরই চীন থেকে বাজারসুবিধা দেয়ার তালিকা এসে পড়াতেই ট্রাম্প আর কোয়াডের পক্ষে থেকে শক্ত অবস্থান নিতে যা কথা হয়েছিল তা আর এমনকি যৌথ বিবৃতিতেও হাজির করতে রাজি থাকেননি। আর তা থেকেই অন্তত তাদের যৌথতায় – তাতে ভাঙনের একটি কারণ।

    তাহলে এবার? এবারো আমেরিকাকেই পরীক্ষা করতে বলছি। মূলত ট্রাম্প চীনবিরোধী যত গরম গরম কথা বলেছেন – সেগুলার মধ্যে আমেরিকার রাষ্ট্রের নীতি-পলিসি এর কোনগুলো বা কত শতাংশ আর কতটা ট্রাম্পের নির্বাচনী ভোট টানতে চেয়ে বলা হচ্ছে –  তা আগে পরিষ্কার হতে নেন। কেন?

    সাংবাদিকরা প্রশ্ন করে ট্রাম্পকে তাড়া করে বেড়াচ্ছেন যে “কিছু দিনের মধ্যেই লকডাউন থেকে তড়িঘড়ি করে সব খুলে ফেলার চাপের কারণেই মূলত ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে”। এ জন্যই দেড় লাখের বেশি আমেরিকানের মৃত্যু হয়েছে। এটা ট্রাম্পের চরম ব্যর্থতা কী না? তাই ট্রাম্প প[আলিয়ে বেড়াচ্ছেন।  ট্রাম্পের প্রতি ঠাট্টাগুলো লক্ষ্য করেন, আর কত লোক মরলে পরে আমেরিকা মহান (great) হবে?  আর ততই তিনি ভোটারদের মধ্যেও এই মনোভাব বেড়ে যাওয়ার কারণে তিনি এখন উঠতে বসতে  চীনবিরোধি গরম কথা বলছেন। “চীনা ভাইরাস” বলে নিজের সব দুর্ভাগ্যের জন্য সব কিছুর জন্য চীন দায়ী বলে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা তুঙ্গে নিচ্ছেন। কাজেই কোনটা চীনবিরোধী রাষ্ট্রের পলিসি অবস্থান আর কোনটা ট্রাম্পের ভোটের বাক্স ভরানোর প্রপাগান্ডা তা একমাত্র আলাদা হয়ে যাবে নভেম্বরের ৩ তারিখের নির্বাচনের পর। এর আগে পর্যন্ত এটা মাখামাখি হয়েই থাকবে।  কাজেই মোদী যে আমেরিকার উপর আস্থা বিশ্বাস রাখছেন ঢালছেন – এর ভিত্তি ঠিক আছে তো?

    আবার দেখেন ট্রাম্প সরকারের আয়ু মূলত আর তিন মাস। কারণ নির্বাচনী ফল হয়ে যাওয়ার পর সেটা মূলত রুটিন সরকার। তাহলে এই তিন মাসের জন্য পম্পেও এর এত দৌড়াদৌড়ি, কোয়াডের প্রপাগান্ডা এটি কি একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না, অসঙ্গতিপূর্ণ নয়? এগুলো একমাত্র সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে যদি এগুলো সবই নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করতে করা হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে পম্পেওর দৌড়াদৌড়িও – সেটাও খুবই পারফেক্ট টাইমিং। কিন্তু মোদীর জন্য তাহলে কী হবে? হিন্দু জাতিবাদী মোদী ও তার সকল সমর্থকরা এদের জন্য কী হবে? হতাশায় আত্মহত্যা বাড়াবেন? এটা হতেও পারে!

    ওদিকে আরেক ঘটনা তৈরি হচ্ছে। এখন ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক জাতীয় বিদ্বানেরা কিভাবে চীনের বিরুদ্ধে খোঁচাখুঁচি লাগানো যায় তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্ক করে তাদের দিন যাচ্ছে। এতে সবচেয়ে উপরের জনপ্রিয় আলাপটা হল, চীনের একচীন নীতি বা তিব্বত বা হংকং নীতি ভারত না মেনে ভাঙলে চীন কেমন শায়েস্তা হবে – এই হল তাদের আলোচনার প্রসঙ্গ। অর্থাৎ তাইওয়ান, হংকং বা তিব্বত এদেরকে স্বাধীন রাষ্ট্রের মত খাতির আচরণ করা বা মর্যাদা দেয়া। অথচ এতে প্রধান ভায়োলেশনটা হবে, চীন যেকোনো দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক পাতানোর আগে এক পূর্বশর্ত স্বীকার করিয়ে নেয় যে – তাইওয়ান, হংকং বা তিব্বত ইত্যাদি এগুলো কোনো স্বাধীন ভূমি নয়, চীনেরই অংশ বলে গণ্য করতে রাজি হতে হবে। অর্থাৎ এই বিদ্বানেরা বলতে চাইছেন; তারা মোদীর ভারতকে পরামর্শ দিচ্ছেন – যার সোজা মানে মোদী যেন চীনের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। কিন্তু এত দূর পরিণতি কী তারা মেপে কথা বলছেন? আমরা নিশ্চিত নই।

    যাই হোক, উপরে ভারতের চীনা রাষ্ট্রদূতের কথা বলছিলাম। তিনি ওই আলাপে এ প্রসঙ্গগুলো নিজেই এনে পরিস্থিতি সম্পর্কে পাকা বোঝাবুঝি রেখে কাজ করতে পরামর্শ রেখেছেন। ভদ্র ও বক্তব্য নরম রাখতে বলেছেন। উভয় পক্ষেরই উচিত হবে পরিস্থিতি সম্পর্কে উভয় পক্ষ (মানে চীনা পক্ষও) যেন ভালো আর পুরো বোঝাবুঝি করে এরপর পদক্ষেপ নেয়। তবে ভারতের সাথে সীমান্ত নিয়ে তিনি কিছু সোজা ইঙ্গিত দিয়েছেন, সে্টার প্রসঙ্গে বলেই আজকের লেখা শেষ করব।

    মায়েদের দুষ্ট সন্তানকে সামলানোঃ
    কথাগুলো অনেকটা দুষ্ট সন্তানকে সামলাতে মায়েরা অনেক সময় শর্ত দিয়ে কথা বলেন। বলেন যে, পায়েস তিনি আজ রেঁধেছেন, তুলেও রেখেছেন বাটিতে। কিন্তু শান্ত ও বুঝমান সন্তানের মত আচরণ যারা করবে তারাই কেবল ঐ পায়েসের বাটির হকদার হবে। ঠিক এইকথা মনে রাখলে আমরা চীনের পদক্ষেপগুলোর অর্থ বুঝতে পারব।
    চীনের সাথে ভারতের এবারের সঙ্ঘাত মূলত লাদাখ অঞ্চলে। কাশ্মীরেরই ভারত-চীন সীমান্তের অংশ এটা।  কিন্তু এখানেই কেন? কারণ ভারত গত বছর এই ৫ আগস্টই লাদাখেরই স্ট্যাটাস বদলিয়েছে। কেন? ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মির ভারতেরই অঙ্গীভূত করে নেয়ার সময়। এই ঘটনাটা বিজেপির হাতে পড়ে কাশ্মির মোদীর কাছে জাস্ট একটা হিন্দু পোলারাইজেশন ঘটিয়ে ভোট পাওয়ার ইস্যু। যাতে মোদী ব্যাপারটাকে ‘হিন্দুজাতির বীরত্ব’ হিসেবে দেখিয়ে আরো বেশি ভোট পেতে পারেন, এরই লক্ষ্য। এতে কাশ্মিরিদের কী পরিণতি হবে অথবা পড়শিদের কাছে কী ম্যাসেজ যাবে এ নিয়ে তিনি পুরো বেপরোয়া থাকবেন।

    যেমন ম্যাসেজ কী গেছে?
    চীন-ভারত যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৬২ সালে। ওই যুদ্ধের আগে ও পরে লাদাখ অঞ্চলের বহু অংশই চীন দখলে নিয়ে নিয়েছিল। পরে আস্তে আস্তে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করলে ১৯৯৩-৯৬  এই সময়টা ভারতের জন্য ছিল খুবই নির্ধারক। এ সময়কালেই লম্বা সময় ধরে চীন-ভারত সীমান্ত আলোচনা চলেছিল। পুরনো ১৯৫৮-৬০ সালের সেই এলএসি দেখিয়ে চীন যেসব ভূখণ্ড দাবি করত সেসব দাবির বড় বড় অংশ ১৯৯৩-৯৬ সালের আলাপের সময় চীন ভারতকে ছেড়ে দিয়েছিল। আসলে সেটা চীনের ভাষায়,  শান্ত ও প্রশান্তির কামনা ও আকাক্ষায় ভারতকে পেয়েছিল বলে  দুই দেশের সীমান্ত আলাপে এভাবে এগিয়ে এসেছিল চীন। কিন্তু গত বছর কাশ্মির ও লাদাখের স্ট্যাটাস মোদীর খেয়ালি একক ইচ্ছায় বদলে দেওয়াতে – এটা ওই ১৯৯৩-৯৬ আলোচনার সময়ে তৈরি হওয়া যে পারস্পরিক বোঝাবুঝি তা পুরো উপেক্ষা ও ভেঙে ফেলা হয়েছে বলেই চীন মনে করছে। আর ঠিক একারণেই এখন ১৯৫৮-৬০ সালের দাবির এলএসি মোতাবেক সব পুরানা ছাড় দেওয়া ভুখন্ড চীন আবার দখল করে নিয়েছে। সেই ধারণাতে ফিরে গেছে। তাই চীন এখানে পরামর্শে ও ইঙ্গিতে বোঝাতে চায় যে, ভারত যদি ফের শান্তি চায় বিশ্বাস করাতে পারে – আর যেসব বিষয়ে পারস্পরিক বোঝাবুঝিতে সম্পর্কের অনেক অগ্রগতি হয়েছিল তা ফিরিয়ে আনে, তবেই  চীন একমাত্র ১৯৯৩-৯৬ সালের বুঝাবুঝি সীমানা বা এলএসিতে আবার ফিরে চলে যাবে। ভারতকে ভূখণ্ড ছাড় আবার দেবে। নইলে না। আর যদি উল্টা ভারত আমেরিকার কোলে গিয়ে উঠে আর এক-চীন নীতি ভাঙাসহ নানা হুমকি দিতে থাকে তবে সীমান্ত ১৯৫৮-৬০ সালেরটাই বহাল থাকবে। শান্তি চাওয়া সৎ প্রতিবেশী হলে একরকম আর উল্টাটা হলে আরেক রকম। সারকথা, সিদ্ধান্ত ভারতের। ভারতকেই ঠিক করতে হবে সে কোন পথে যাবে, ঠিক কী চায়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৭ আগষ্ট ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “ভারতকে বেছে নিতে হবে কোনদিকে যাবে” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বিদেশিবিরোধিতা সস্তা মিথ, ‘গ্লোবাল অর্ডার’ বুঝেন

    বিদেশিবিরোধিতা সস্তা মিথ, ‘গ্লোবাল অর্ডার’ বুঝেন

    গৌতম দাস

    ২৭ জুলাই ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-37d

    Sharad Pawar: The God of Broken Mandates, YOUTUBE Rare Interviews, Crux Files

    আপনি যে ভুখন্ডে দাঁড়িয়ে আছেন চাইলে কেবল তার কথা মনে রেখে নিজের সম্পর্কে কথা বলতে পারেন। নিজের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারেন এভাবে। অথবা অন্যটা হল,  এই গ্লোব বা বিশ্বের যে অংশ আপনার ঐ ভুখন্ড, গ্লোবাল পটভুমির কথা খেয়ালে রেখে এবার আপনি আপনার ভুখন্ড সম্পর্কে অনুভবের কথা বলতে পারেন। এখানে খেয়াল করেন, দ্বিতীয়টাও কিন্তু আপনার সম্পর্কেই অনুভব। কিন্তু ফারাক হল, এখানে এক গ্লোবাল পটভুমিতে আপনি, এভাবে।  তাতে এই দুই ভাষ্য হবে দুরকম।  সেক্ষেত্রে প্রথমটাকে বলা হবে এক লোকাল ভাষ্য আর দ্বিতীয়টাকে গ্লোবাল ভাষ্য।  অর্থাৎ আপনারই  সম্পর্কে প্রথমটা হল এক সংকীর্ণ ভাষ্য আর পরেরটা পুর্ণ ভাষ্য। এই হল লোকাল বনাম গ্লোবাল ভাষ্যের ফারাক।
    [লেখাটা অনেক বড় হয়ে গেছে, এড়াতে পারিনি। তবে একটা উপায় আছে, যারা ছোট ভার্সানে পড়তে চান তারা কিছু প্যারা বাদ দিয়ে পড়তে পারেন। যে সব প্যারা এক ইঞ্চি জায়গা ছেড়ে শুরু এগুলোই সেই প্যারা। বাদ দিয়ে পড়া যায় এখানে এমন দুটা প্যারা আছে। এতে লেখাটা অনেক ছোট হবে। চেষ্টা করে দেখতে পারেন। ]

    গ্লোবাল প্রেক্ষিত বা দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়াই ভারতের প্রবীন রাজনীতিক শারদ পাওয়ার [Sharad Power] কথা বলেন। তবে তিনি একা নন বরং ভারতের প্রায় সব রাজনীতিকই এমন, তাই তাঁকে সব রাজনীতিকেরই প্রতীকী প্রতিনিধি হিসাবে ধরে নিয়ে কথা হবে। এঁদের দেশ বলতে একটা ‘লোকাল’ বুঝের ধারণায়,  আর এক কল্পনার জগতে বাস করা রাজনীতিবিদ। মানে গ্লোবাল প্রেক্ষিতে থেকে এবার লোকাল অনুভবটা করতে পারেন না এরা, মিসিং। এঁরা মনে করেন তারা ‘স্বনির্ভর’, ‘আত্মনির্ভরশীল’, ‘স্বদেশ’ ইত্যাদি শব্দের লোক। কিন্তু আসলে তাঁরা এসব শব্দের মিথ্যা ফুলজুড়ি বিলানো ধরনের রাজনৈতিক জগতের জন্য লড়ছেন। যদিও  এঁদের অনেকেই জানেন এটা বাস্তব নয়, বাস্তবে এসব নেই, পরাবাস্তবতা অস্তিত্বহীন। তবু এটা কেবল তাদের কল্পনায় আছে। রেখে দিয়েছেন। কারণ তারা মনে করেন হোক অবাস্তব তবু এর একটা ‘উপযোগিতা’ আছে।  বাস্তবায়ন অযোগ্য হলেও এটা তাদের লাগে পাবলিকের কাছে কিছু স্বপ্ন বিলিয়ে কল্পনায় জগতে পাবলিককে প্রবেশ করিয়ে যাতে আবেগী কিছু মিথ্যা কথা বলে তাদের সংযত রাখতে পারেন। আবার সময়ে উস্কে তুলতে পারেন – এমন কিছু শব্দ দিয়ে যেমন দেশপ্রেম, দেশভক্তি, হিন্দু জাতি মহান অথবা ভারতীয় জাতি মহান ধরনের অলীক এবং অর্থহীন। একদিকে এরা গ্লোবাল প্রেক্ষিত বা গ্লোবাল অর্ডার বলে দুনিয়াতে কিছু আছে কি না তারা খোঁজ করে দেখেননি। আবার অন্যদিকে তবু কেবল ভুয়া স্বদেশিপনায় অলীক স্বপ্নগুলোই তারা বিক্রি করেন, এটাই তাদের রাজনীতি। অন্তত ভোট যোগাড়ের কৌশল। এটাই ভারতের নেশন-স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র বাদীদের অনড় রাজনীতি। তাতে এরা হিন্দুত্বের জাতিবাদী বিজেপিই হোক কীংবা  সফট হিন্দুত্বের জাতিবাদী কংগ্রেস যেই হোক। জাতিবাদী সকল রাজনীতির বৈশিষ্ট এটা।

    কেন শারদ পাওয়ার প্রসঙ্গঃ
    শারদ পাওয়ার, ৮০ বছর বয়সী ভারতের প্রবীণ রাজনীতিবিদদের একজন, যিনি এখনো রাজনীতিতে সক্রিয়। মূলত মারাঠা জনবসতির রাজ্য মহারাষ্ট্র, যার রাজধানী মুম্বাই; আর এর এখনকার ক্ষমতাসীন রাজ্য-সরকার এক কোয়ালিশন সরকার। এতে শারদ পাওয়ার কেবল এক অংশীদার শুধু নন, অ্যাংকর বলা যায়, যিনি জোট ধরে রাখার ক্ষেত্রে এক বড় মুরব্বির ভূমিকা পালন করে থাকেন। এই রাজনীতিবিদ ১৯৬০ সালের দিকে ২০ বছর বয়সে প্রথম কংগ্রেস দলে নাম লিখিয়েছিলেন।  আর অনেক পরে, তিনি আসলে ভারতের এক সাবেক প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাওয়ের সমসাময়িক; এই অর্থে যে, ১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধী মারা যাওয়ার পর তাঁরা একসাথে দলের প্রধান পদের দাবিদার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের শিকা শেষে নরসীমার পক্ষে যায়। নরসীমা প্রধানমন্ত্রীও হন, আর শারদ পাওয়ার পান পরের ভারী পদ প্রতিরক্ষা মন্ত্রিত্ব। অবশ্য তিনি একবার কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রীও ছিলেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক জীবনে তিনি অন্তত পাঁচবার মুখ্যমন্ত্রী আর অনেকবার অনেক মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছেন।
    কিন্তু ১৯৯৯ সালে এসে পুরনো প্রতিযোগিতার লেজ ধরে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাঁকে আরো চাপের মুখে ফেলে হারাতে চেয়ে পাল্টা গান্ধী পরিবারের হাতে দলের সবক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার কৌশল নিয়েছিল। পরিণতিতে একপর্যায়ে তিনি কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে নিজেই নিজ আঞ্চলিক মারাঠাকেন্দ্রিক এক দল খুলে বসেন যার নাম- ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি বা এনসিপি। কিন্তু কংগ্রেসের প্রতি নিজের জন্ম-মোহটা থেকেই গিয়েছিল বলা যায়। তাই আমরা পরবর্তিতে দেখি প্রায় সব সময়ই তিনি কংগ্রেস দলের সাথে ঐক্যে নানান কোয়ালিশন করে ক্ষমতায় অথবা কখনো বিরোধী দলে থেকেছেন।

    শারদ পাওয়ার ভারতের রাজনীতিবিদদের এক সিম্বল বা প্রতীক ধরে নিয়েই আজকের কথা আগাবো আমরা। আমাদের আজকের লেখায় তাকে বেছে আনার গুরুত্ব হল – তার সমবয়সী ভারতীয় কোন রাজনীতিবিদ আর রাজনীতিতে প্রায় নেই বললেই চলে। তাঁরা অবসরে নয়ত মৃত। গান্ধী পরিবারে ক্ষমতা এক বংশ পরম্পরার মধ্যে কুক্ষিগত হওয়ায় একদিকে কংগ্রেসে আর অন্যদিকে মোদীর উত্থানের পর মোদীর দলেরও সিনিয়র প্রায় সব নেতাকে (ঘোষণা দিয়ে ৭০ বছর বয়স যাদের হয়ে গিয়েছে তারা সবাইকে) অবসরে পাঠিয়ে দেয়াতে, বলতে গেলে ভারতের সিনিয়র রাজনীতিকদের এক আকাল শুরু হয়েছে যার মধ্যে শারদ পাওয়ার সম্ভবত একমাত্র ব্যতিক্রম যিনি ৬০ বছর একটানা রাজনীতি করেও এখনো সক্রিয় রাজনীতিক। আমাদের দরকার ছিল একজন ভারতীয় রাজনীতিকের যিনি অন্তত টানা ৬০ বছর সক্রিয় রাজনীতি করেছেন এবং এখনো ভারতের রাজনৈতিক ঘটনাবলি বিশেষ করে বর্তমান চীন সম্পর্কে কী ভাবেন তা সেই নিজ বুঝটাই সরাসরি অবলীলায় তুলে ধরেন বা ধরতে রাজি আছেন। কারণ ভারতের রাজনীতিকদের চিন্তার ঝোঁক বা ট্রেন্ডের একটা উদাহরণ হিসেবে কাউকে পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল যাতে তাকে দেখিয়ে প্রতীক হিসেবে বাকিদেরই এক নমুনা হিসাবে তাঁকে তুলে ধরে কথা বলা যায়। আমাদের মনে হয়েছে শারদ পাওয়ার তেমনই একজন, ভারতীয় রাজনীতিকদের কমন ট্রেন্ডের প্রতীক।

    এক মুখপাত্র ‘সামনা’ ম্যাগাজিনঃ
    মুম্বাইয়ে এখন মূলত শিবসেনা দল ক্ষমতায়। কিন্তু তারা তাদের সাবেক জোটসঙ্গী বিজেপিকে বাদ দিয়ে এবার সাথে কংগ্রেস আর এনসিপিকে নিয়ে মিলে রাজ্যক্ষমতায় সরকার গঠন করে আছে। আর মুরব্বি হিসেবে পরামর্শ দিয়ে শারদ পাওয়ার এই জোটকে  ইতোমধ্যেই কয়েকবার সরকার-পড়ে-যাওয়া  সামলিয়েছেন। অনুমান করা হয়, শারদ পাওয়ারের এসব দিক ও গুরুত্ব বিবেচনা করে – শিবসেনা দলের মারাঠি ভাষায় প্রকাশিত এক দলীয় মুখপত্র পত্রিকা আছে নাম ‘সামনা’- (এর একটা ভাল বাংলায় অর্থ হবে সম্ভবত মুখোমুখি বা ফেস করা) এই পত্রিকায় শারদ পাওয়ারের এক লম্বা সাক্ষাৎকার নিয়ে ছাপা হয়েছিল। মারাঠি ভাষার সেই সাক্ষাৎকার পরে গত ১২ জুলাই আরেক (মূলত টিভি) মিডিয়া ‘নিউজ ১৮’ [NEWS18.COM]-এর ওয়েবে ইংরাজিতে অনুবাদ করে ছাপা হয়েছিল। যা আমাদের হাতে মানে নজরে আসে।
    সময়কাল হিসেবে এই সাক্ষাৎকার হল চীন-ভারত সীমান্তে সংঘর্ষ, উত্তেজনা ও অন্তত ২০ ভারতীয় সেনা মারা যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। ফলে সেসব ঘটনাকে পটভূমিতে রেখে পাওয়ার কথা বলে গেছেন।
    ভারতে কী রাজনীতি চলে আসছে? তা অন্তত গত ৬০ বছর ধরে যে চিন্তায় যে রাজনীতি তারা সব দলের সবাই যা করে এসেছেন এমন কোনো রাজনীতিকের নিজের মুখে এর স্বীকার করেছেন – এমনটা সহজে পাওয়া যায় না। আমরা এই সাক্ষাৎকারটাকেই নিব ভারতের দল নির্বিশেষে বিভিন্ন রাজনীতিবিদদের চিন্তার সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও ঝোঁক বা ট্রেন্ড কেমন, কী – সেটা বুঝতে ও রেফার করতে একটা উদাহরণ হিসেবে।

    লোকাল বনাম গ্লোবালঃ
    আমরা প্রায়ই বলতে শুনি, ভারতীয় রাজনীতিকদের গ্লোবাল প্রেক্ষিত বোধ একদমই নেই। এই কথাটা বলতে ঠিক কী বুঝব? শুরুতে যেটা বলছিলাম, তারা যে রাজনীতির বোধে অভ্যস্ত ও যাকে আদর্শ মনে করে বড় হয়েছে, সারা দেশে যেটা ব্যাপকভাবে আচ্ছন্ন প্রধান ধারার চিন্তা সেটা হল – এক পবিত্র দেশপ্রেম আর নেশন বোধ। মানে প্রবল জাতিরাষ্ট্র-বাদী বা সংক্ষেপে প্রবল জাতিবাদী এবং মূলত এক কাল্পনিক স্বদেশিপনা। আর সর্বোপরি এপ্রসঙ্গে উপরে যেভাবে বলছি, তাতে এ’এক “লোকাল” চিন্তা।  সম্ভবত এত প্রবল এর স্বদেশিপনা বলেই এরা এর মধ্যে আর গ্লোবাল প্রেক্ষিত বোধকে জন্ম নিতে দেয় নাই। বিজেপির মোদী অথবা শাওরদ পাওয়ার ইত্যাদি সবাই এই জায়গায় এক – কম অথবা বেশি স্বদেশিপনা আর আর লোকাল চিন্তাতেই সব সীমিত। আর এক কমন দিক এরা সকলে জাতি-রাষ্ট্র বাদী।
    সব রাষ্ট্র ব্যবস্থাই মূলত এক লোকাল ফেনোমেনা – এক স্থানীয় সিস্টেম। অর্থাৎ রাষ্ট্র একটা সিস্টেম – এক বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা, কিন্তু তা স্থানীয়। আর একে লোকাল বা স্থানীয় বলছি বলে এর সাপেক্ষে একটা গ্লোবাল বা বাইরের বলতে কিছু আছে। হা আছে। ঠিক যে অর্থে রাষ্ট্র মূলত আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা। তাহলে ওর বাইরের দিকের কী হবে? কোন বাইরের? কেবল নিজেরই বাইরের? না। সব রাষ্ট্রেরই কমন বাইরের দিক যেটা তা নিয়ে কথা বলছি। মানে কেবল একটা রাষ্ট্রের কথা আর বলছি না। একটা রাষ্টের মধ্যে প্রসঙ্গ আর নাই, বের হয়ে গেছি। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্তঃসম্পর্ক এখন প্রসঙ্গ। এই আন্তঃসম্পর্কঅকে একটা ব্যবস্থাধীন করার জন্য একটা সিস্টেম লাগবে মানে আরেক বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা লাগবে, এটার কী হবে? আসলে এটাকেই বলছি গ্লোবাল – এক গ্লোবাল সিস্টেম দরকার। গ্লোবাল অর্ডার, গ্লোবালি ছেয়ে থাকা এক বিধিবদ্ধ ব্যবস্থার কথা বলছি।
    তাহলে এখন সার করে বললে, রাষ্ট্র বলতে যদি স্থানীয় বা লোকাল পর্যায়ের এক আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা বুঝি তবে রাষ্ট্রগুলোর বাইরের দিকের জন্য আরেকটা ব্যবস্থা, এক গ্লোবাল সিস্টেম বা গ্লোবাল অর্ডার লাগবে। এটাই গ্লোবাল অর্ডার, এর কথা বলছি।
    দুনিয়ায় প্রথম এক গ্লোবাল অর্ডার স্থাপিত হয়েছিল আমেরিকার হাতে বা নেতৃত্বে। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে, এতে বিজয়ীদের হাতে ও নেতার নেতৃত্বে। এই প্রথম অর্ডার চালু করতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তা করা হয়েছিল। এমন সব গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর হয়েছিল ১৯৪৫ সালে। যদিও প্রস্তুতির কাজ ১৯৪২ সাল থেকে শুরু বলা চলে।
    তার মানে কী এর আগে কোন গ্লোবাল ব্যবস্থা বলতে দুনিয়াতে কিছু ছিল না?  হ্যাঁ ঠিক তাই। আসলে এর আগের দুনিয়া বলতে ১৬০৭-১৯৪৫ এই সময়কালটা কলোনি যুগ। মানে তা দখল শাসন ও লূটের যুগ। তখন কলোনি মালিকদের মধ্যে শত্রুতাই ছিল মুখ্য, তেমন কোন আন্তঃবাণিজ্য বা সম্পর্ক বলতে খুব তেমন কিছু ছিল না।
    আসলে গ্লোবাল অর্ডার বলতে এ্কটা একই সাথে এটা মূলত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বা অর্ডার বুঝায়।  আর এই তিনটাই প্রথম চালু হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে ১৯৪৫ সালের ঐ সময়ে। তাহলে এর আগের কালটাকে কি বলতে পারি? বলতে পারি সেটা ছিল একটা কলোনি যুগ যার মাধ্যমে একধরণের “কলোনি ক্যাপিটালিজম” বলতে পারি একে কিন্তু সাথে খুবই সীমিত বা তেমন কোন বাণিজ্যিক ব্যবস্থা ছিল না বলা যায়। এখন ৭৫ বছর পরে আমেরিকার নেতৃত্বের ঐ গ্লোবাল ব্যবস্থার যুগ ধীরে ধীরে শেষ হচ্ছে। আর সে জায়গা নিতে উঠে আসতে চাইছে চীনের নেতৃত্বের এক ভিন্ন গ্লোবাল ব্যবস্থা বা অর্ডার।

    গ্লোবাল অর্ডার বলতে মুখ্য ফোকাস আন্তর্জাতিক বাণিজ্যঃ
    গ্লোবাল ব্যবস্থার মুখ্য বা কেন্দ্রীয় ফোকাস বলতে সবসময়ই সেটা হল বাণিজ্য – আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। এই বাণিজ্যের এক সিস্টেম গড়ে তোলা ও নিয়ন্ত্রিত হয় মূল দুই নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে, আর সাথে বাণিজ্যিক বিষয়ে রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের পারস্পরিক বুঝাবুঝির প্রতিষ্ঠান হল ডাবলুটিও। আগেই বলেছি গ্লোবাল অর্ডার বলে যাই বুঝি না কেন এর মুখ্য জিনিষ হল এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা। গ্লোবাল পণ্য ও পুঁজির লেনদেন বিনিময় বাণিজ্য। যা আবার আসলে একটা মুদ্রা ব্যবস্থা – আন্তর্জাতিক  বেচাকেনা বিনিময়ের মুদ্রা ব্যবস্থা। কারণ প্রত্যেক রাষ্ট্রের সীমানা যেখানে শেষ সেই রাষ্ট্রের স্থানীয় মুদ্রা দিয়ে কেনাবেচা সেখানেই শেষ। তাই যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য হতে পারে যেকোন দু রাষ্ট্রের মানে সব রাষ্ট্রের কাছেই গ্রহণযোগ্য এক মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করতে পারা দিয়ে; মানেই এক আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করতে হবে আগে। নইলে পণ্য বিনিময় অচল। এই কাজটারই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ। আমরা বলি দুনিয়াটা বড়লোক দেশের দিকে ফেবার করে সাজানো। কথা সত্য। এরই আরেক অর্থ হল, আইএমএফ বড়লোক রাষ্ট্রগুলোর দিকে কান্নি মেরে কাজ করে ও সাজানো। কিন্তু সাবধান। এর মানে আইএমএফ “নিপাত গেলে” এটা কোন সমাধান নয়, হবে না। আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্ভব করতে চাইলে আইএমএফ ধরণের কোঅর্ডিনেশন ও নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠান আমাদের লাগবেই। তবে যাতে সে কান্নি না মারে – তা বন্ধ করার ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে। যদিও কান্নি মারা বন্ধ করতে সক্ষম হওয়া সেটা কিন্তু এক ক্ষতিগ্রস্থ-পক্ষদের গ্লোবাল ক্ষমতার অর্জন ও নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার প্রশ্ন। মানে এটা আইএমএফ “নিপাত” যাওয়ার প্রশ্ন নয়। আমরা যাই নতুন কিছু করি না কেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা চালু রাখা ও নিয়ন্ত্রণ – দুনিয়াকে চালু রাখার জন্য অনিবার্য প্রয়োজনীয়।
    অনেকে শ্লোগান দেন, বিদেশি পুঁজি, বিদেশি পণ্য ইত্যাদি সব হারাম – দেশি – স্বদেশিপনাই একমাত্র পথ। এরাই অবশ্য জাতি-রাষ্ট্র বাদী। আর এটাই কলোনি যুগের ধারণা। যখন আন্তর্জাতিক পণ্য বিনিময় বাণিজ্য ধারণাটাও ছিল না। ফলে স্বদেশি বা আত্নম্বভরিতা ধরণের ধারণা জন্মানোর জন্য উর্বর মাটি-পরিস্থিতি। আর রাজনীতি বা রাজনৈতিক ক্ষমতা মানেই অন্যদেশ ভুমি কলোনি-দখলের ক্ষমতা। এরচেয়েও বড় কথা “স্বাধীন রাষ্ট্র” বলে কিছু নাই। আছে কলোনি হয়ে থাকা রাষ্ট্রের ধারণা – মাই লর্ড বলে হাত জোর করে দাঁড়িয়ে থাকা। ফলে এই দশা-পরিস্থিতি জন্ম নেয়া রাষ্ট্র ধারণাটাই জাতি-রাষ্ট্র ধারণা। আর এদেরই অলীক কল্পনাটা হল অর্থনৈতিক স্বদেশিপনা, বিদেশি মানে হারাম ধারণা। পণ্য বিনিময় বানিজ্য ধারণাকে নিচে চাপা দিয়ে ফেলে রাখা। বলাই বাহুল্য এটাই এবসার্ড, অবাস্তব কথা বলা। বাস্তবে তাদের কথা মিলিয়ে দেখে এরপর তারা বলে না। আপনি নিজেই একটা কারখানা দিলেন কিন্তু সেটা চালাতে যদি অন্য দেশের একটা টেকনোলজি, একটা ধাতব অংশ যা খুবকম দেশে পাওয়া যায় ইত্যাদি এমন হয় (আর সব কিছুই – সেটা ধাতু বা কাঁচামাল সব দেশে পাওয়া যায় না, যাবে না বলে) সেক্ষেত্রে ঐ কারখানা চলবে না। কারণ,ধাতু বা কাঁচামাল বা টেক (বাজার না হয় না বললাম) ইত্যাদি পেতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময়ই ওর একমাত্র সমাধান। কিন্তু স্বদেশিপনা জাতিবাদী আপনি তো কিছুই বিদেশের কিনতেও চান না, বেচতেও চান না। অথচ এটাই আইএমএফ “নিপাত যাক” কথার ব্যবহারিক সত্যিকারের মানে।
    সারকথায়, এই জাতিবাদীদের জন্ম কলোনি যুগে যখন দুনিয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা বলতে কিছুই ছিল না। কিন্তু সেখান থেকে আজকের দুনিয়ায় একটা গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থার দুনিয়ায় রূপান্তরিত হয়ে গেল কেমন করে? কে করল তা এরা ‘কেউ’ জানে না।  এই কেউ বলতে জাতি-রাষ্ট্র বাদী আর কমিউনিস্ট দুই পক্ষকেই বুঝতে হবে। এই রূপান্তরটা সম্পর্কে এদুই পক্ষই অন্ধকারে। গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থা, খারাপ-ভাল ত্রুটিপুর্ণ যাহোক একটা গ্লোবাল অর্ডার কার্যকর হয়ে আছে এটা তারা জানে না। যদিও এটা থাকার সুবিধা গ্রহণ করতে তারা দ্বিধা করে না। ডলার কামানোকে কাঙ্খিত ভগবান পাওয়ার মতনই মনে করে। যদিও আবার যারা একটু সিনিয়র মোটামুটি বুঝতে পারে গ্লোবাল ব্যবস্থা একটা কিছু আছে তারা আবার সে ধারণায় পানি ঢেলে একে নেতি চোখে দেখে আর বলে ওটা “সাম্রাজ্যবাদী”। একারণে তারাও অন্ধকারে।
    কেউ বুঝুক অথবা সারাজীবন অন্ধকারেই থেকে যাক গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে কেন্দ্রে রেখে একটা গ্লোবাল অর্ডার দুনিয়ার কার্যকর আছে। আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে গড়ে উঠা যে ব্যবস্থাটা বয়স এখন প্রায় ৭৫ বছর। এদিকে আবার এই গ্লোবাল ব্যবস্থার নেতা আমেরিকাকে অন্তত অর্থনৈতিক দিক থেকে চ্যালেঞ্জ করে নেতৃত্ব নিতে চীনের উত্থান এখন আসন্ন। ধীরে ধিরে তা কার্যকর হওয়া শুরু করেছে। এটা যে আসন্ন তা চীন নিজে বলেছে বলে জেনেছি তা নয়। এটা আমেরিকান সার্ভে-স্টাডিতে পাওয়া রিপোর্টর ফাইন্ডিংস বলেছে।
    এখন সমস্যা কত গভীর হয়েছে দেখেন! যে জাতিবাদীরা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল সিস্টেম বা অর্ডার সম্পর্কে পুরাই অন্ধকারে থেকে গেছিল গত ৭৫ বছর ধরে তারা এখন কিভাবে বুঝবে যে এখন যে আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বটাই বদল হয়ে চীনের উত্থানের সময় হয়েছে?

    অতএব চীন বা আমেরিকেকেও ভারত বিবেচনা করছে গ্লোবাল অর্ডারের হবু অথবা পুরান নেতা হিসাবে নয়। বড় জোর আর পাঁচটা পড়শি রাষ্ট্রের মতই যেখানে এরা দুজন হয়ত কিছু বাড়তি ক্ষমতাধর রাষ্ট্র, এরকম। গ্লোবাল সিস্টেম বলতে মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আর তাকে কেন্দ্র করে পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক সিস্টেম এক গ্লোবাল ব্যবস্থা বলে যে কিছু আছে এসব তাদের নলেজ-অনুমানের বাইরে মনে হচ্ছে। একটা জাতিসংঘ বলে কিছু আছে তা জানে। কিন্তু কে বানালো এটা, কেন বানাতে পারল, সেসব জানা এসব গ্লোবাল প্রেক্ষিতের ভিতর দিয়ে ভারতের দুনিয়াকে জানা – না, জাতি-রাষ্ট্রের রাজনীতির জন্য এসব জানা জরুরি নয়। এসব বিষয় সবচেয়ে ভাল্ভাবে ধরা পড়ে জাতিসংঘের ভেটো-মেম্বার হওয়ার জন্য তাদের বোকার আকুতি দেখলে। বুশ আমলের শেষে ওবামার শুরুতে ওবামা ভারতকে চীন ঠেকানো বা চায়না কনটেইমেন্ট কাজের ঠিকা দেওয়ার কথা পাকা করেছিল। আর তখন টোপ দিয়েছিল যে বিনিময়ে আরেকটা মুলা দিবে। সেটা হল ভেটো-মেম্বার পদ। আর প্রণব মুখার্জি তা বিশ্বাস করেছিল এতই দৃঢ়ভাবে যে ২০১০ সালে হাসিনার ভারত সফরে হাসিনাকে দিয়ে দাবি তুলিয়েছিল যে ভারতকে ভেটোক্ষমতা দিতে হবে! জাতিসংঘের জন্ম কেন হয়েছিল কী করতে হয়েছিল আর কেনই বা এই ভেটোক্ষমতার ব্যবস্থা্র জন্ম তা প্রণব বুঝেন এরপর আর তা মনে হয় না। যদি হত তাহলে ওবামা আশ্বাস যে ফাঁকা ধুর্তমি তা ধরতে পারতেন। ভেটো কথাটার ব্যবহারিক মানে কী তাই তো তিনি বুঝেন নাই, দেখা যাচ্ছে। কথা হল পাঁচ ভেটো মেম্বারের কেবল একজন যদি ভেটো দেন মানে না করে দেন তবে সেই সিদ্ধান্ত হবে না। কাজেই ওবামা চাইলেই ভারতকে নতুন সদস্যপদ দিতেই পারবেন না। অন্তত চীনকেও পক্ষে নিতে হবে। তা যদি বুঝতেন তাহলে তো চীনকেই আগে সন্তুষ্ট করতে যেতেন। আসলে সেটাও কম বোকামি হত না। কারণ, আমেরিকা নেতা ছিল বলেই ডিকটেট করে ঐ পাঁচজনকে ভেটো ক্ষমতা দিয়ে হলেও একটা জাতিসংঘ গড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। দুনিয়ার নেতা বদলালে পরে তার ডিকটেটের ক্ষমতা কী মাত্রায় হবে সেটার উপর নির্ভর করে তিনি জাতিসংঘ-২ বলে কিছু শুরু করতে পারবেন কিনা! এতা গ্লোবাল সিস্টেম সম্পর্কে বুঝাবুঝির মামলা। তবে সাবধান তা আবার ইউরোপের কোন দেশের বই-পুস্তক পড়ে জানা যাবে না। অর্থাৎ সারা ভারত এই অতি জাতি-রাষ্ট্রবাদ এটাই তাদের গ্লোবাল প্রেক্ষিত থেকে ভারতকে অস্তিত্বের তাতপর্য ও সম্ভাবনা কখনও বুঝতে পারেন নাই। গ্লোবাল প্রেক্ষিত সম্পর্কে দুর্বল বুঝাবুঝির উতস এখানেই। মজার কথা কলোনি আমলের ও ঐ আমলের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ ধারণা বলে কলোনি শাসনের সমাপ্তিতে সারা ইউরোপের সকল রাষ্ট্র এটা ১৯৫৩ সালের মধ্যে ত্যাগ করে, বাতিল করে দেয়। সেটা রাজনীতিকরা তো নয়ই, ভারতের একাদেমিকরাও টেরও পেয়েছে জানা যায় না।
    সাধারণভাবে ভারতের রাজনীতিক্বেওর পর্ব এখানেই শেষ করে এবার শারদ পাওয়ারের পর্ব।

    সুনির্দিষ্ট শারদ পাওয়ারের লেখা থেকেঃ
    বয়ান একঃ ঐ সাক্ষাৎকারে শারদ পাওয়ারের বক্তব্য, ‘চীন সামরিক সক্ষমতা ভারতের চেয়ে দশ গুণ বড়। কাজেই পাকিস্তানের চেয়ে চীন আমাদের বড় শত্রু ও হুমকি”। কিন্তু এর মানে কী যারাই ভারতের চেয়ে সামরিক দিক দিয়ে বড় তারা সবাই ভারতের শত্রু? তাই নয় কী?
    অর্থাৎ তাহলে তো আমেরিকা ভারতের জন্য চীনের চেয়েও আরো বড় শত্রু; মানতে হবে। কারণ আমেরিকা সামরিক দিক দিয়ে এখনো চীনের চেয়ে বড়। কিন্তু পাওয়ার-সহ ভারতীয় নেতা ও পাবলিক কি তাই মনে করবে? ট্রাম্প পুজা করা বিজেপি তো অবশ্যই না। তার মানে ভারতের চেয়ে সামরিক সক্ষমতায় বড় হওয়াটাই ভারতের কেউ শত্রু হবেই। এটা ভিত্তিহীন তাই কারো মানার কোন কারণ নাই!
    আবার তিনি বলছেন, ‘শত্রুর কথা উঠলেই আমাদের পাকিস্তানের কথা মনে আসে। কিন্তু না, পাকিস্তান নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। বরং সামনে চীন আমাদের প্রধান শত্রু, কারণ ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করার চীনের ক্ষমতা আছে, আর আছে দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচি”।

    পাওয়ারের এই বোঝাবুঝিও ভুল। কারণ একই যুক্তিতে তো তাহলে আমেরিকাও ভারতের শত্রু হয়ে উঠতে পারে। মানে উঠবেই। এই যে ‘ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ’ কথাটা- এখানে কে শত্রু হবে আর কে মিত্র হবে এটা বুঝবার ভিত্তি কী?
    আসলে শারদ পাওয়ার বা তার মত করে ভাবা (জাতি ভাবনার) মোদীর মধ্যে কোনো ফারাক নেই। তারা সবাই একই চিন্তা ফ্রেমের লোক যেটা পুরনো ফ্রেমের কলোনি আমলের ফ্রেম ও সে আমলে সারা ইউরোপ এভাবেই চিন্তা করত। যার সার কথাটা হল – বিদেশী মাত্রই আমার শত্রু। আমার দেশে আমরা এক জাতি আর এর বাইরে সবাই ‘বিদেশী’ যার মানেই ওরা সবাই আমার শত্রু। এটাই জাতি-রাষ্ট্রের ধারণার চিন্তা ফ্রেম। য়াগে বলেছি এটা অবশ্য সারা ইউরোপ ১৯৫৩ সাল থেকে বাদ দিয়েছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, বিদেশী মাত্রই শত্রু এ কথা সবসময় ঠিক নয়। বরং বিদেশীর সাথে ‘বাণিজ্যও’ করা সম্ভব আর তা দুদেশের জন্য বিরাট লাভজনক হতে পারে। বাণিজ্য মানে পণ্য বিনিময়, লেনদেন- এক পণ্যের বিনিময়ে অন্য পণ্য দেয়া। যেটা নিজ নিজ দেশের হাটবাজার-গঞ্জে করে থাকি, সেটাই তবে কিছু ভিন্ন রূপে বা ভিন্ন শর্ত-পরিস্থিতিতে।

    যদিও আন্তঃরাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক পরিস্তিতিতে সেখানে আরেক বাস্তব টেকনিক্যাল সমস্যা আছে। সেটা হলো মুদ্রা। একটা দেশের সীমানার মধ্যে ওই দেশের মুদ্রা- এটাই পণ্য বিনিময় বাণিজ্যে বিরাট ও মূল ভূমিকা রাখে। কিন্তু সমস্যা অন্যখানে, আপনি পকেটে টাকা নিয়ে সারা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত চষে বেড়াতে পারবেন, যা মনে চান আর যা সেখানে পাওয়া যায় সব কিনতে পারবেন। কিন্তু দেশের সীমান্ত পার হলেই বাংলাদেশী মুদ্রা আর কাজ করবে না। আপনি বাধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বেন। অর্থাৎ সীমান্ত ছেড়ে যাওয়া মানে তখন পড়শি দেশের মধ্যে একটা বিনিময় বাণিজ্যের অবস্থা। সেক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশে বেচাকেনা মানে কেবল সে দেশের মুদ্রাই চলবে। তাই আপনার সে ক্ষেত্রে বাড়তি দরকার পড়বে একে তো মুদ্রার বিনিময় হার জানা আর মুদ্রা বিনিময় করে দিতে রাজি থাকা একটা দোকান বা ব্যাংক। আরো কথা আছে- আলোচ্য দুই দেশকে আইএমএফের সদস্য হতে হবে। নইলে বিনিময় হার জানাসহ আরো বহুবিধ জটিলতার মুখে পড়বেন। কেনাবেচা লাটে উঠবে। কিন্তু একটা বিশাল ঘটনা এখানে ঘটে গেছে। তা হল, এই দুই দেশের বাণিজ্য মানে জাতিরাষ্ট্রবাদী রাজনীতিবিদরা জন্মের পর থেকে দেখে আসছেন একটা গ্লোবাল বাণিজ্যের ব্যবস্থা চালু হয়েই আছে। তাই তারা ধরে নেন, এই ব্যবস্থাটা দুনিয়ার জন্ম থেকে নিশ্চয়ই ছিল।
    এটাই শতভাগ মিথ্যে অনুমান। আইএমএফেরই জন্ম এইমাত্র ১৯৪৪ সালে। এর মানে এর আগে বিনিময় বাণিজ্য খুবই কঠিন না প্রায় ছিলই না, দরকারও কম ছিল, সে অন্য কারণে। এক কথায় আজ আইএমএফ যা করে এই পুরোটাই সেকালে করত মাত্র এক ব্যক্তির মালিকানার এক ব্যাংক আর ইউরোপের আর তিন-চার শহরে বসে থাকা তার তিন-চার ছেলে মিলে। সেদিকে এখন আর যাবো না। আরো যাবো না কমিউনিস্ট রহস্য-গল্প দূরে রাখার জন্য।
    যে কথা বলছিলাম, তার মানে যেকোনো দুই দেশের মধ্যে পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য মানে হল – আইএমএফের জন্ম এর আগেই হয়ে গিয়েছে আর এই বাণিজ্য আর কেবল দুই দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বা ‘লোকাল’ ঘটনা একেবারেই নয়। একটা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা দুনিয়ায় চালু থাকা। তাতে জাতিবাদী মন যতই মনে করুক পড়শি দেশের সাথে বাণিজ্য একটা লোকাল ঘটনা, এটা কিন্তু একেবারেই সত্য নয়।
    গত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই গ্লোবাল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থাবলির পুরো কাঠামোই যে তৈরি হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে সেটা আমরা টের না পেয়ে বিদেশী পুঁজি, বিদেশী ঋণ ঘৃণাকারী যেই হই না কেন। একটা গ্লোবাল সিস্টেম আছে বা ১৯৪৫ সালে চালু হয়েছিল বলেই মোদী বা শারদ পাওয়ারের ‘দেশী অর্থনীতি’ নামক কল্পনা চালু আছে। নইলে তো বাণিজ্যের অভাবে না খেয়ে রাজনীতিবিদিদের মুখ দিয়ে কথাই বের হত না!

    কাজেই আমাদের একটা বড় অবজারভেশন ও দাবি যে, ভারতের রাজনীতির সাধারণ ধারা হল তাদের এক প্রবল মিথ্যা অনুমান যে সব কিছুই ‘লোকাল’। তারা ‘বিদেশী’ বিরোধী। বিদেশী মাত্রই ভারতের স্বার্থবিরোধী ইত্যাদি যত সব মনগড়া কল্পনা আছে। মানে ভারতের অভ্যন্তরীণ চোখে দুনিয়াটাকে দেখা। কিন্তু এর বিপরীতে আমাদের মত রাষ্ট্রগুলোর উপরে একটা প্রবল প্রভাবশালী গ্লোবাল ব্যবস্থা বা গ্লোবাল অর্ডার কার্যকর থাকে ও সক্রিয় কাজ করে থাকে। সেই গ্লোবাল অর্ডারের অধীনে আমাদের অভ্যন্তরীণ বা লোকাল ঘটনাবলিগুলো তৈরি ও কার্যকর হয় ও ক্রিয়াশীল থাকে। কিন্তু আমরা তা টের পাওয়ার যোগ্য না হলে মনে হবে গ্লোবাল সিস্টেম বলে কিছু নেই। ভার্তে যা ঘটে তার সবই যেন তার অভ্যন্তরীণ স্বার্থ বা ইচ্ছা দিয়েই ঘটায়। সার কথায়- গ্লোবাল প্রেক্ষিতই বড় প্রভাব বিছিয়ে ঠিক করে দেয় লোকাল ঘটনাবলি কেমন ঘটবে। কাজেই স্থানীয় স্বাধীন কোন প্রেক্ষিতে লোকাল ঘটনাবলি ঘটে না, ঘটবে না। চীন পালটা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ার উদ্যোগ ও এক নয়া গ্লোবাল ব্যবস্থা খাড়া করতে চায় বলে, চাইতে পারে বলেই ভারতের কাছে অফার আসতে পারে আসবে। আবার ভারত যদি ঠিক করতে বসে আমেরিকার চীন ঠেকানোর ঠিকা নিয়ে আমেরিকার সাথে ভাগ্যকে বেধে ডুবতে বসা সিস্টেমের নায়কের সঙ্গি হবে নাকি নতুন গ্লোবাল অর্ডার যে ঠিক করবে যে দুনিয়ার ভবিষ্যত ঠিক করবে তার সাথে যাবে – এটা কে বেশি সুবিধা দিবে সেই মামলা একেবারেই নয়। ভারতের ভবিষ্যত নতুন গ্লোবাল অর্ডারের ভিতরে – যদি গ্লোবাল অর্ডার জিনিষটা বুঝতে সক্ষম হন।
    বয়ান দুইঃ শারদ পাওয়ার বলছেন, “ভারতের জন্য সত্যিকারের হুমকি হলো চীন, যে চীন ভারতের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে গেছে। অতএব, ঐ চীনের সাথে, কমরেডদের সাথে আমাদের খুব গলাগলি আছে, (যেমন একই দোলনায় বসে মোদি-শিং দোল খাচ্ছে আর কথা বলছে) এমনটা এই ছবি দেখিয়ে য়ামাদের মাঝে যে শত্রুতা এর মোকাবিলা হবে না। মোদি হাত মিলাচ্ছে বা কুলাকুলিতে জড়িয়ে ধরছে প্রেসিডেন্টকে শি কে এটা হতে পারে না”।
    এর চেয়ে জাতিবাদী বক্তব্য আর কী হতে পারে?
    শারদ পাওয়ারের এসব কথা তাকে আরো নাদান কম চিন্তা ও সঙ্কীর্ণ বুঝের লোক বলে পরিচিত করবে। তার প্রথম সমস্যা শত্রু আর প্রতিদ্বন্দ্বী শব্দ দুটোকে মাখিয়ে ফেলা। যেমন ক্লাসের দুই ফার্স্ট-সেকেন্ড স্টুডেন্টের মধ্যে যেটা হয় সেটাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলে, শত্রুতা নয়। স্পোর্টসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় কিন্তু কেউ কারো শত্রু নয়।
    সোভিয়েত ইউনিয়ন-আমেরিকার মধ্যে শত্রুতা ছিল তা সত্ত্বেও কোনো কোনো ফোরামে একসাথে বসে কথা বলা ও কাজ করার মতো বন্ধুত্ব থাকতেই হত। কিন্তু কোন বাণিজ্য সম্পর্ক, পণ্য লেনদেন ছিল না, গ্লোবাল বাণিজ্য সিস্টেমের সুবিধাও কার্যকর ছিল না। কিন্তু এটা ১৯৪৫-৯২ সাল পর্যন্ত। আর এর পর থেকে রাশিয়ার পুতিনসহ নিজেকে কমিউনিস্ট মনে করা (আজ অথবা আগের) সব রাষ্ট্রই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে গেছে। মানে দুনিয়াটা এখন একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে এসে গেছে। যেটা এখনো আমেরিকার একার পকেটে সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণে। আর এটাই ভেঙে পড়ছে ধীরে ধীরে আর চীনের নেতৃত্ব নতুন একটা ব্যবস্থা গড়তে, বদল ঘটাতে এগিয়ে আসছে। মোদী বা শারদের মত কথিত দেশী জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকরা আগেই আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্ডারের মধ্য থেকেও এর সম্পর্কে বেখবর থেকেছে। নিজের স্বনির্ভর-অর্থনীতি নামে সোনার-পাথর বাটি ধরণের কাল্পনিক ধারণার মধ্যে বসবাস করে গেছে বলে গ্লোবাল অর্ডারের পালাবদল ব্যাপারটা কখনও বোধগম্য হয় নাই। বাস্তবতা হল – ভারত চাইলেও পুরনো আমেরিকার নেতৃত্বের পুরনো অর্ডারের মধ্যে বসবাস করতে পারবে না। খোদ আমেরিকাকেও চীনের নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারের মধ্যে ঢুকতে হবে। কারণ একসাথে দুনিয়াতে দু’টি অর্ডার চালু থাকতে পারবে না। দুইটা আইএমএফ চালু থাকতে পারবে না।

    একাধিক বিশ্বব্যাংক  যদিও থাকতে পারবে। তাহলে কেন চীন ভারতের শত্রু? আবার খেয়াল করতে হবে যে, চীন শত্রু না হলেও খুবই খারাপ প্রতিদ্বন্দ্বী সেই চীনই আবার বাণিজ্যের পার্টনার হতে পারে, পুঁজি বিনিয়োগদাতা ইত্যাদি এসবই একালে সম্ভব। কারণ কোল্ড-ওয়্যারের আমলে সোভিয়েত-আমেরিকা কোন একই বাণিজ্য ব্যবস্থার সদস্য ছিল না। সোভিয়েতরা বৈদেশিক বাণিজ্যে বিশ্বাস করত মনে হয় না। অন্তত এনিয়ে তাদের তাত্বিক অবস্থানও নাই। এটাই সেকালে শত্রুতা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হওয়া সম্ভব ছিল। সেটা একালে আর সম্ভব নয়। কারণ এখন চাল-ডাল মিলে গেছে, এখন আলাদা করা তত্বে সম্ভব বলে যদিও দেখাতেও পারে বাস্তবে এটা প্রায় অসম্ভব।
    আবার ঘটনা হল, চীনের সাথে ভারতের নতুন ও পাল্টা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক নির্মাণ প্রকল্প ব্রিকস, সেটা এতদিন ঠিকই চলছিল। এর মানে কী তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শত্রুতা মিলিয়ে গেছিল, তা ছিল না? বিস্মিত হতে হয় শারদ পাওয়ারের চিন্তা না করে কথা বলে বসা দেখে। অথচ প্রতিদ্বন্দ্বিতা শত্রুতা যাই বলেন তা অবশ্যই ছিল। কিন্তু সবাই নখ লুকিয়ে ফেলা শত্রুতা সামনে না নিয়ে আসা অর্থে একটা কার্যকর লেনদেনের সম্পর্কের মধ্যে ছিল। এটা সম্ভব। আর এটাই একালের গ্লোবাল সিস্টেমের বৈশিষ্ট। যেটা জাতি ধারণা নিয়ে ধরাছোয়া যাবে না। সবই উলটাপালটা মনে হবে। কাজেই ভারতের সব দুর্দশার রুট কারণ এসব জাতিবাদী, বিদেশবিরোধী আজিব চিন্তা যা এদেরকে গ্লোবাল সিস্টেম বুঝতে সবসময় বিরাট বাধা হয়ে থেকেছে!

    মোদী বা শারদের বিদেশ-নির্ভরতা বিরুদ্ধে কথা বলাটা ভুল। বিদেশের সাথে পণ্য-বিনিময় বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়া মানেই তা  বিদেশনির্ভরতা নাও হতে পারে। যদি ব্যাপারটাকে ইন্টারডিপেন্ডেন্সি –পরস্পরের উপর পরস্পর নির্ভরশীল হওয়া, একপক্ষীয় না এভাবে সাজানো যায়। আর ব্যাপক বৈদেশিক বাণিজ্যে জড়িয়ে যাওয়া মানে কিছু কিছু রপ্তানি পণ্যে মাস্টার উতপাদক হয়ে যাওয়া। মানে সবচেয়ে দক্ষ উতপাদক মানে সবচেয়ে কম শ্রমে তা উতপাদন করতে পারা নায়ক হওয়া। এসব নয়া ধারণা, বিদেশ-নির্ভরতা বিরুদ্ধবাদীদের মাথায় ঢুকবে না!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ২৫ জুলাই ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “শারদ পাওয়ার সবার প্রতিনিধি” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মোদীকে আচ্ছা শিক্ষা দিল এক দুবাই রাজকুমারি

    মোদীকে আচ্ছা শিক্ষা দিল এক দুবাই রাজকুমারি

    গৌতম দাস

    ১১ মে ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Zt

    কিছুই নজর এড়াবে না, দুবাইয়ের রাজকীয় থাপ্পড় ThePRINT_

    তেজস্বী সূর্য [Tejasvi Surya] – এটা ভারতের এক তরুণ বিজেপি এমপির নাম, যার বয়স এখন সবে ২৯ বছর। পুরা নাম Lakya Suryanarayana Tejasvi বা লক্ষ সুর্যনারায়ন তেজস্বী। নামগুলো এখানে বাংলা উচ্চারণ  অনুসরণ করলে যেমন হয় মানে বাংলা ফোনেটিক করে লেখা হয়েছে। তিনি দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী বেঙ্গালুরু এর এমপি। অর্থাৎ কর্ণাটক রাজ্য মানে ভারতের ‘কন্নড়’ নামের জনগোষ্ঠী ও তাদের  কানাড়া ভাষা , এই দ্রাবিড়ীয় ভাষাভাষীদের রাজ্য।  গত বছর ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রের নির্বাচনে তিনি দক্ষিণ ভারতের দক্ষিণ বেঙ্গালুরু থেকে  এমপি বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে মাত্র এক বছরের মধ্যে  তিনি ভারতের বাইরে বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বড় এক ‘কুখ্যাতি’ কামিয়ে ফেলেছেন। ভারতের যারা বাইরে দুনিয়াদারির খবর রাখেন তারা বুঝে যান যে, তেজস্বীর পাশে দাঁড়ানো যাবে না বরং ওর দায় না নিয়ে তাকে নিন্দা করতে হবে। ওর থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। আর ভারতের যারা বিজেপি দলের প্রভাবে ইতোমধ্যেই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণায় অন্ধ হয়ে গেছেন এবং হিটলারি জাতিবাদী-বর্ণবাদী উগ্র চিন্তা ধারণ করেন তারা মনে করেন তেজস্বীর বদনামের প্রতিশোধ নিতে ভারতের মুসলমানদের উপর আরো চাপ সৃষ্টি করতে হবে। যদিও ব্যাপারটা মোটেও ঢিল-পাটকেলের মত পাল্টাপাল্টি ইস্যু ছিল না বা নয়।

    এমনিতেই ভারতের অর্থনীতির ঢলে পড়ার খবর গত বছরের শেষ থেকে উদাম প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল ( গত ২০১৯ মে এর নির্বাচন পর্যন্ত ওই সব তথ্য  প্রকাশ বহুকষ্টে মোদী ঠেকিয়ে রেখেছিলেন) যে,  ভারতের অর্থনীতি ইতোমধ্যেই খুবই খারাপ দিকে মোড় নিয়ে ফেলেছে। এর উপর আবার নতুন বছরের শুরু থেকেই অর্থনীতির আরও ঢলে পড়া স্পষ্ট হতে থাকে, করোনার কারণে অর্থনীতি আরেক বড় ধাক্কা খেতে যাচ্ছে তাই। এই খারাপ ধাক্কায় সরকার অজনপ্রিয় হতে পড়তে যাচ্ছে, তা টের পেয়ে মোদি মুসলমানবিদ্বেষী কড়া হিন্দুত্ববাদে উসকানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। যেমন এখন আবার গত কয়েকদিন ধরে পাকিস্তান সীমান্তে  উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।   যাতে মুসলমানদের উপরে হিন্দুরা শ্রেষ্ঠ – এমন সুপ্রিমিস্ট চিন্তার উসকানি ও বর্ণবাদী নাগরিক ভেদাভেদ-চিন্তা ছড়িয়ে তাদের মধ্যে একটি জোশও এনে দেয়, আর তা দিয়ে পাবলিক লাইফে মোদীর অর্থনীতির চাপ ও কষ্ট থেকে তাদেরকে যতটা ভুলিয়ে রাখা যায় আর কী!

    টার্গেট মওলানা সা’দ, মুসলমানেরা নিচা জাতঃ
    ভারতে লকডাউন পালন কার্যত শুরু করা হয়েছিল গত ২৩ মার্চ বিকেল থেকে। আর এবছরে দিল্লির তাবলীগ জামাত সমাবেশ শুরু ও শেষ হয়েছিল এর অন্তত ১০ দিন আগেই; অর্থাৎ এর আয়োজনে কোনো আইনভঙ্গ করা হয়নি, বরং সরকারি অনুমতি নিয়েই ঐ সমাবেশ করা হয়েছিল। লকডাউন শুরু হওয়ার পর কারা কারা করোনা সংক্রমণে আক্রান্ত সমাজের বিভিন্ন কোণে এদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল। ফলে সমাবেশফেরত কিছু মুসল্লিদেরকেও (সমাজের আর সব কোণের মত) অনুসন্ধানে তাদের বাড়ি বাড়িতে অনেকের মধ্যে (বিবিসির ভাষায় অন্তত তিনশো জনের শরীরে করোনা সংক্রমণ পাওয়ার পরে……) করোনা পজিটিভ পাওয়া গিয়েছিল।  কিন্তু এতে এবার বিজেপি এ ঘটনাকে তাদের মুসলমানবিদ্বেষী প্রচারণার বিষয় – এই প্রপাগান্ডা-হাতিয়ার বানিয়ে নিয়েছিল। তারা বলা শুরু করেছিল যে, মুসলমানদের জীবন আচার-অভ্যাসই নীচু ধরনের, ওরা খারাপ, তারা নিম্ন কালচারের, ধর্মীয় জাতিগতভাবে তারা নীচুসহ প্রভৃতি এমন সব বয়ান তৈরি করে জাতবিদ্বেষী, প্রবল রেসিজমের এক জোয়ার তুলেছিল সামাজিক নেটওয়ার্কজুড়ে।

    মানুষ ও প্রকৃতিঃ মাঝখানে চামচ কেন
    প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কী ও কেমন এটা কমবেশি সব ধর্মতত্বেরই মুখ্য বিষয়। এনিয়ে শিক্ষালাভের এক সহজ ও প্রধান উতস আমাদের ধর্মতত্বগুলো। যেসব সভ্যতা আধুনিকতার নামে এসব দিকর কিছু বুঝেই নাই বা অবজ্ঞা করেছে তারাই বিজ্ঞানবাদী হয়ে কথিত শিল্প-বিপ্লবের নামে  প্রকৃতি ধবংস করে এখন হাহুতাশ করছে। যা ক্ষতি করে ফেলেছে তা এখন আরেক পরিবেশবাদ বলে কিছু একটা বুঝে ছুটা ছুটি করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু শান্তি হচ্ছে না।  তবু মানুষ-প্রকৃতির সম্পর্ক ধরতে পারার এরা ধারেকাছেও আসতে পারে নাই। প্রাণ কোথায়, কী খুজে পায় না! কারণ স্পিরিচুয়ালিটির কোন ধারণা নাই, আকাঙ্খা নাই, চাহিদাও নাই – সেটা না দার্শনিক জ্ঞান চর্চায় না ধর্মতাত্বিক চর্চা দিক থেকে। অথচ এগুলো আমাদের সমাজের স্বাভাবিক চর্চা থেকেও অন্তত কিছু জেনে নেওয়া যায়।
    আমরা চামচ দিয়ে খাওয়া অভ্যাস রপ্ত করলাম না কেন? কেন সরাসরি হাত দিয়ে খাই? একেবারে হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে অনুভব করে ধরে সম্পর্ক পাতিয়ে স্পর্শ, গন্ধ স্বাদ সব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জানতে হবেই আমাকে তবেই তা প্রকৃতির সাথে সম্পর্কের আকাঙ্খা পূরণ হবে – এভাবে। এটাই ছোট থেকেই আমাদের শিক্ষা , ওরিয়েন্টেশন।  তাতে কেন এটা করতে হবে তা বুঝি আর না বুঝি। আর সেটা বড় হয়ে নিজে চিন্তা করলেই অনেক কিছু কারণ বুঝে যাওয়া যায়, আমরা বুঝি। প্রকৃতির যা খেলাম তাই তো আমার শরীর হয়? আমি হই! তাহলে প্রকৃতি কে, কী হয় আমার?  এসব নানান প্রশ্ন আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশীয়, ইসলামেরও। যার অনেক জবাব নির্দেশ রূপে আমরা পেয়েছি ইসলাম থেকেও। আঙুল দিয়ে খাব কেন, চেটে চেটে প্লেট থেকে খাব কেন? এর ভিতর সেসব ইঙ্গিত বা  ম্যাসেজ আছে। এখন আপনি যদি বিজ্ঞানবাদী বা হঠাত ‘সাহেব’ বনে গিয়ে আমাকে বলেন আমি ‘নোংরা’, আমার খাওয়ার স্বভাব আচার খারাপ, আমি নিচা  তাহলে আসলে অজ্ঞ কে? আপনি যে প্রকৃতি চিনেন না, সম্পর্ক বুঝেন না সে আপনি না আমি? আপনি যে বুঝের জায়গায় উঠেন নাই সেতাই আপনি বুঝেন না!
    আসলে আপনি মোদী ও ভগত এখন মুসলমান ঘৃণা ছড়িয়ে মিথ্যা এবং বিপদজনক হিন্দু-জাত-শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা কায়েমের উদ্দেশ্যে এগুলো করছেন। অথচ সিভিলাইজেশন অর্থে প্রাচীন হিন্দুরীতিতে প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক পাতানোর অনুভব আর ইসলাম থেকে পাওয়া রীতির মৌলিক অমিলটা কোথায়? এবিষয়ে আমরা কী ইসলাম থেকেও সমৃদ্ধ হই নাই!  প্রাচীন হিন্দুরীতি অনুযায়ী  আঙুল দিয়ে খাওয়া, চেটে খাওয়া ইত্যাদি কী নাই, প্লেট চাটাও কী নাই? অথচ এই নব্য হিন্দুত্ববাদীরা দাবি করছে তারা নাকি হিন্দুকালচারের রক্ষক! তারাই আবার প্লেট চেটে খাওয়াকে নিচা কালচার বলতে চাইছে! অদ্ভুত? তাদের মুসলমান বিদ্বেষে এতই প্রবল ঘৃণায় মারাত্মক যে তারা এখন সাহেব বা বিজ্ঞানবাদী হয়ে হলেও মুসলমান কোপাতে উঠেপড়ে লেগেছে!

    হিন্দু-জাত-শ্রেষ্ঠত্ব কায়েমের উন্মাদনায় ঘৃণা ছড়ানোটা বিজেপি সংগঠিত ও প্রবলভাবে করেছিল তাদের আইটি সেল ও ক্যাম্পেইনের প্রধান অমিত মালব্যের নেতৃত্বে। এটা ঠিক যে ভারতে ইতোমধ্যে কবে থেকে করোনাভাইরাস সমাজে প্রান্তরে  ইতোমধ্যেই প্রবেশ করে ফেলেছে তা সরকারের জানা ছিল না। এখন বুঝা যাচ্ছে ভারতে লকডাউনের সিদ্ধান্ত আরও আগেই নেয়া উচিত ছিল।  সেটা সরকারেরও বুঝতে অজানা থেকে গিয়েছিল, আর এতে শুধু মুসলমান নয় হিন্দু ধর্মের নানা সমাবেশকেও  তাই একইভাবে সরকার অনুমতি দিয়েছিল। সুতরাং আইনি দিক থেকে দেখলে তাবলিগ জামাত কোন আইনভঙ্গ করে নাই তাই দোষীও নয়। তাবলীগের সমাবেশ মানেই বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে আসা মানুষের সমাবেশ। যদিও তারা দলবদ্ধভাবে নিজেরা বিভিন্ন দেশের ঘটনার প্রতি লক্ষ্য রেখে নিজেরাই স্বেচ্ছায় আগাম সতর্কতা হিসাবে সমাবেশ করা থেকে এবার বিরত বা দেরি করতে পারলে এর সুবিধা সবাই পেতে পারত। এতটুকুই।  কিন্তু  আবার বলছি, এটা তাবলীগের কোন ক্রাইম নয়। বিদেশ থেকে উড়ে জাহাজে কী আর লোক আসেনি? অন্য ধর্মীয় সমাবেশ কী হয় নাই। কাজেই একমাত্র উতস তাবলীগ তা তো নয়। আর অন্যদেশ থেকে বিমানবন্দরে তাবলীগের লোকদেরকে বাধা দিয়ে কোয়ারানটাইনে না রেখে বাধাহীন সমাবেশে যেতে দেওয়ার দায়ভার অবশ্যই সরকারের সংশিষ্ট অফিসের। তবে যা কেউই ইচ্ছা করে করে নাই। ভারতে  তাহলে তো মোদী সরকারই সবচেয়ে বড় ক্রিমিনাল যে সে লকডাউনের সিদ্ধান্ত  দিতে দেরি করেছে। তবে অনেক নামাজি মুসলমানেদের বা আল্লার পথে থাকা মুসলমানদের কোরোনা ধরে না – এই জাতীয় নামাজি আবেগ ভরা কথা আমরা শুনেছি, এগুলো তাদের কোন কাজে আসেনি। উলটা অন্যের খোঁচাখুচি বা টিটকারি করে বলা কথাবার্থা শুনার কারণ হয়েছে। আবার নিশ্চয় যারা নামাজি হয়েও আবার করোনা আক্রান্ত হয়েই গেছেন তারা এজন্য কাউকে দোষারাপ করতে আগ্রহী হবেন না। কারণ, এগুলো এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের।
    আসলে ভারত জুড়ে মুসলমান ঘৃণা ও বিদ্বেষ তো কেবল আজকের ঘটনা নয়, বিশেষত গত  শতকের শুরু থেকেই তা চলে আসছে।  দুর্জনের ছলের অভাব হয় না। এরই প্রভাব এখনও আছে আর তাতে এখন ভাল করে হাওয়া দিচ্ছে বিজেপি-আরএসএস। দেখেন, এরই প্রভাবে এক সময়ে কলকাতার বাংলা সিনেমার (উত্তম কুমারের শেষ আমলের) নায়িকা এখন বামপন্থিদের সাথে নানান সামাজিক ইস্যুতে সচেতন হিসাবে বিবৃতিদাতা অপর্ণা সেন, তিনি এবার ধরা পড়ে গেছেন।  তিনিও হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদের জোশে ভেসে গিয়ে “ভারতের তাবলীগ জামাতকে ভারতে করোনাভাইরাস বৃদ্ধির জন্য দায়ী করে শনিবার (৪ এপ্রিল) টুইট করে” বসেছেন।  এটা ঠিক ইদানিং মোদীর বিপক্ষে জনস্বার্থের নানান ইস্যুতে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের বিপুল চাপ এমনকি মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছিল অপর্ণা সেনদের গ্রুপটাকে। তাই হয়ত ভেবেছিলেন এ সুযোগে না জেনে বুঝে মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের গান একটু গেয়ে দিলে মোদী হয়ত তাদের প্রতি নরম হবেন। তিনি তাবলীগ জামাতের কাজকে ‘ক্রিমিন্যাল অ্যাক্ট’ বলে তাদের কঠোর শাস্তি দাবি করেন। এতে বুঝা গেল তার মেন্টর বা বুদ্ধিদাতারই আইনি জ্ঞানে বিশাল ঘাটতি আছে আর অপর্ণা সেন  সেই ফাঁদে পড়ে গেছেন। এছাড়া ঐ বিবৃতির পরে, সোশাল মিডিয়ায় অপর্ণা সে্নের বিরুদ্ধেই প্রশ্ন উঠতে থাকে যে তিনি কেবল মুসলমানদের জমায়েত করার দিকে এর বিরুদ্ধে বলছেন কেন? প্রায় একই সময়ে হিন্দু ধর্মীয় জমায়েতগুলোও কী হয় নাই? পত্রিকাটা লিখেছে  “অপর্ণার এমন মন্তব্য করে নেটিজেনদের তোপের মুখে পড়েন। কেউ অপর্ণাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, ‘শুধু জামাত নিয়ে কথা বলে কী হবে? মন্দির বা রামনবমী নিয়ে বলছেন না কেন?’ অপর্ণা সরাসরি সমস্যার গভীরে না গিয়ে শুধু মন্তব্য করে ‘মাঙ্কি ব্যালেন্সিং’ করছেন।’ বলেও মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ”।

    তবে অমিত মালব্য এন্ড গংদের মিথ্যা কিন্তু সংগঠিত প্রপাগান্ডা শক্ত ছিল। কারণ, এমনিতেই করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে  দুর্বিষহ কষ্টকর জীবনে ছিল, ভারতের সাধারণ মানুষ, তাদেরই মনে সেই সুযোগে এই ঘৃণা ঢুকানো হয়েছিল। এতে ভারতজুড়ে হিন্দুজাত শ্রেষ্ঠত্বের সুপ্রিমিস্ট ধারণা, এক গভীর রেসিজমে ভারতকে ঢেকে ফেলেছিল। বিজেপি-আরএসএস তাদের এমন ‘পারফরম্যান্স’ দেখে বেজায় খুশি। কিন্তু ধর্মের কল বাতাসে নড়ে! পাপ বাপকেও ছাড়ে না!

    বিজেপির তরুণ এমপি তেজস্বী সুর্য-এর বেয়াদবিঃ
    বিজেপির তরুণ এমপি তেজস্বী সূর্য, তার এমন এক ‘পুরনো পাপের ঘটনা ছিল গত ২০১৫ সালে মার্চের। তিনি আরব নারীদের সম্পর্কে খুবই আপত্তিকর ও অসম্মানজনক মন্তব্য টুইট করেছিলেন তখন। লিখেছিলেন, “৯৫ শতাংশ আরব নারী যৌন-সন্তুষ্টি জিনিসটাই জীবনে বুঝেন নাই। তাদের প্রতিটি মা ভালোবাসায় যৌন-সন্তুষ্টির দিকটা কী তা না বুঝেই খালি বাচ্চা পয়দা করে যাচ্ছে”। বলাবাহুল্য, আরব নারীদের সম্পর্কে   ইতরচিতজ্ঞানে এর চেয়ে অপমানজনক মন্তব্য সম্ভবত আর হয় না। এর মানে, যার মনে যেই-ই তার মত নয় – এক অপর – এমন তাদের প্রতি দগদগে ঘৃণা চুড়ে দেয়া ছাড়া তার আর কাজ নাই।  নিজেদের জাতশ্রেষ্ঠত্বের অসুখে ভোগা এক গভীর বর্ণবাদ বা রেসিজম এটা।

    মানব জনগোষ্ঠী দুনিয়ার বসতি স্থাপন করে যাত্রা শুরু করেছিল দুনিয়াটার নানা কোণে ছড়িয়ে ছিটিয়েই, আর শুরুতে তা ছিল পরস্পর একেবারেই যোগাযোগবিহীন। এ ছাড়া সবাই দুনিয়াতে একসাথেই বসতি স্থাপন শুরু করেনি, আগে-পিছেও আছে।  আবার ভুমিগঠন, মাটি প্রকৃতি আর আরহাওয়া মানুষের প্রতি ফেবার সবার বেলায় একই রকম ছিল না। ফলে প্রত্যেকেরই জীবন অভিজ্ঞতা বৈচিত্রে ভরা। তবু নৃতত্ত্ববিদদের কড়া মন্তব্য হল, দুনিয়ার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রতিটি মানবসভ্যতা তার নিজের বিকাশে সবাই শ্রেষ্ঠত্বের গুণসম্পন্ন হওয়ার সক্ষমতা নিয়েই বেড়ে উঠে। প্রকৃতির সাথে নানানভাবে সম্পর্ক পাতে, অদ্ভুত বৈচিত্রের ভিন্নতায় জীবনের নানান রূপ হাজির করে থাকে। কিন্তু পরে নানা দখলদার সভ্যতার চাপে নিজেদের আর আলাদা বৈশিষ্ট্যে ও অভুতপুর্ব সম্ভাবনাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে পারে না, অবিকশিত থেকে যায় বা চাপা পড়ে থাকে। আর এই দখলদার সভ্যতাগুলোই নিজেদের বেইনসাফি জুলুমের কাজগুলোকে সাফাই দিতেই জাতশ্রেষ্ঠত্বের ধারণার মিথ্যা সাফাই নিয়ে আসে।
    মানে সারকথায় তাঁরা বলতে চেয়েছেন; কাজেই সভ্যতার বিকাশে বড় ছোট বলে কিছু নেই, সবাই নানান দিকে শ্রেষ্ঠ হওয়ার সম্ভাবনাময় হয়েই জন্মায়। বরং পরে এমন জাতশ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে যারা মানে, আসলে এবাই অন্যায় কলোনি দখলের পক্ষেই মিথ্যা সাফাই দেয়া। অথবা ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে নিজেদের জুলুমকেই বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে থাকে। তবে খুশির কথা, দুই বিশ্বযুদ্ধ মানুষকে কঠিন শিক্ষা দিয়ে গেছে, অনেক কিছু শিখিয়েছে। বিশেষ করে হিটলারের চরম বর্ণবাদ দেখার পর থেকে বর্ণবাদবিস্তারে এসবের বিরুদ্ধে গ্লোবাল মানুষ নানা আন্তর্জাতিক আইন ও কনভেনশন তৈরি করে ফেলেছে। চলতি শতক থেকে একে জাতশ্রেষ্ঠত্বের বর্ণবাদ বা রেসিজম বলে চিহ্নিত করে  একে বড় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন আদালত- সবই এখন অনেক শক্ত বুঝাবুঝির ভিতের উপরও প্রতিষ্ঠিত এবং জনমতও প্রবল সোচ্চার।
    কিন্তু ২০১৫ সালে করা তেজস্বী সূর্যের ঘৃণামূলক মন্তব্য নিয়ে সে সময়ে ততটা প্রতিবাদ না হলেও এবার ২০২০ সালে তা ফিরে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছে। এর মূল কারণ ইতোমধ্যে “তাবলিগের কারণেই ভারতে করোনা ছড়িয়েছে” অথবা “মুসলমানরা নীচু ধর্মীয় ও সভ্যতার আচার ও কালচারের মানুষ” এসব প্রপাগান্ডা করে ঘৃণা ছড়ানোর কাজ এবার ভারতে মোদীরা প্রবল করাতে এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে না চাইতেই এক বিরাট রেজিষ্ঠান্স বা প্রতিরোধ সংগঠিত হয়ে গেছে।
    মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শহরে কাজ করে  মোটাদাগে এমন নিম্ন আয়ের শ্রমদাতা অথবা হোয়াইট কলার ম্যানেজার, সেমি ম্যানেজার ধরনের সব পদই ভরিয়ে রেখেছে ভারতীয়রা। যেমন কোন রেসিডেন্সিয়াল হোটেলে কেবল মালিক বা মালিকেরাই হয়ত আরব। কিন্তু এছাড়া এর নিচের সমস্ত নির্বাহী থেকে মিডলসহ তারও নিচের সব লেভেলের ম্যানেজার পর্যন্ত এরা সবাই প্রধাস্নত একচেটিয়া দক্ষিণ ভারতের। আর এরও নিচের স্টাফ বাকি সবাই – নিচের দারোয়ান পর্যন্ত সকলেই এশিয়ান আর সব দেশের। তাই এবার করোনাকালে মধ্যপ্রাচ্যের ঐসব ভারতীয়দের সবার মন-মানসিকতাতে ভারত থেকে আমদানি করা চিন্তার প্রভাবে যে মুসলমানদের ওপরে হিন্দুজাত শ্রেষ্ঠত্বের মিথ্যা বয়ান তা সহজেই স্থান পেয়েছিল। আর সেখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সোশ্যাল মিডিয়ার হিন্দু ভারতীয়রা তাদের বিভিন্ন স্ট্যাটাসে যেহেতু আরবরাও মুসলমান, ফলে তাদের সম্পর্কেও অবাধে হিন্দুশ্রেষ্ঠত্বের বোধে বিভিন্ন বর্ণবাদী মন্তব্য লেখা শুরু হয়ে যায়।  তারা ভুলে গেছিল তাদের ভাত-কাপড় যোগান দিচ্ছে কে?  আর এ সময়েই একপর্যায়ে একজন ২০১৫ সালে তেজস্বী সূর্যের ঐ পুরানা আবার মন্তব্যও সামনে নিয়ে আসে একজন। আর এভাবে পুরো ব্যাপারটাতে শুরু হয় আরব সমাজ ও সরকারগুলোর কড়া প্রতিরোধ ও অ্যাকশন। তারা মন্তব্য নিয়ে ঐ মন্তব্যকারীদের অফিসকে  নোটিফাই করাতে এবার ঐ অফিস থেকে তাদের চাকরিচ্যুতির এবং দেশ থেকে বের করে দেয়ার নোটিশ হাতে ধরিয়ে দেয়া শুরু করেছিল।
    কারণটা হল, কোন বনেদি ব্যবসায়ী কখনই চাইতে পারে না যে তার ক্রেতা কেবল একটা ধর্মের লোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকুক। এটা বাণিজ্য বিকাশের পরিপন্থি। কারণ ক্রেতা কম হবে, সীমিত হয়ে যাবে। তাই ধর্ম নির্বিশেষে সকল ক্রেতাই তার কাছে কাম্য ও  আদরণীয় হয়। এমনকি তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোন্ ধর্ম বা ভুগোলের মানুষকে তেমন পছন্দ না করলেও সেকথা চেহারায় কোনভাবেই ফুটে উঠতে দেন না, একান্ত ব্যক্তিগত করে রেখে দেন বরং কার্যকর চেহারাটা হল  তিনি সবার সহবস্থানই পছন্দ করেন। তাই তিনি মুসলমানদেরকে গালি দিচ্ছে, নিচা দেখাচ্ছে এমন ভারতীয় কর্মচারিকে সবার আগে চাকরিচ্যুত করবেন, এরপর ঐ কর্মচারির জন্য  দেশত্যাগ করানোর একশন নিয়েছেন সেটাই দেখাতে চাইবেন যাতে সকল ক্রেতাদের আস্থা বাড়ে ও অটুট থাকে। তাই এককথায় দুরতক চিন্তা করা বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী মাত্রই তিনি সহবস্থান-বাদী।  মোদী ও তার দলের চরম বেকুবি আত্মঘাতি অবস্থানটা এখানেই। এটাই এখনকার স্টান্ডার্ড গ্লোবাল বিজনেস কালচার। মোদী ও তার দল  যেখানে তুলনায় ঘোরতর  মফস্বলি সংকীর্ণ এক নাদান বালক! কুয়ার ব্যাঙ মাত্র!

    ভারতের দ্যা প্রিন্ট পত্রিকা বলছে, অ্যাকশন শুরু হয়েছিল দুবাইয়ের এক আরব নারী ব্যবসায়ীর উদ্যোগ থেকে [Among the first to call out Surya was Dubai-based businesswoman Noora AlGhurair,…]। তিনি প্রথম এক টুইটে লিখেছেন, ‘করুণা হয় সেই শিক্ষাকে যা তোমাকে নারীদের অসম্মান করতে শিক্ষা দিয়েছে” [“pitied his upbringing that has taught him to disrespect women”.।’ এ ছাড়া তিনি “আরব দেশের ভিসা নিয়ে ঘুরে বেরিয়ে আবার আরব নারীদের অপমান করার ব্যাপারে” সতর্ক করে, এমপি সূর্যের পুরনো টুইটটাকে সাথে গেঁথে দিয়ে নতুন করে টুইট করে দিলেন। স্বভাবতই এবার এটা ভাইরাল হয়ে যায়। তিনি আসলে একই সাথে ভারতে মুসলমানদের সাথে অসাম্য ও অধস্তন আচরণের ব্যাপারে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেন।

    “করুণা হয় সেই শিক্ষাকে যা তোমাকে নারীদের অসম্মান করতে শিক্ষা দিয়েছে” – Noora AlGhurair

    দ্বিতীয় উদ্যোগ বা সতর্কবাণী আসে আরেক আরব নারীর কাছ থেকেও। তিনি দুবাই রাজপরিবারের রাজকুমারী এক বিদুষী, হেন্দ আল কাসেমি [Princess Hend Al Qassimi]। তিনি সতর্ক করে বলেন, “যারা এই খোলাখুলি রেসিজম এবং মানুষে মানুষে বৈষম্য সৃষ্টির চোখে দেখে মন্তব্য করছেন যা দুবাইয়ের আইন অনুসারে জরিমানাযোগ্য অপরাধ এবং এ কারণে দেশ থেকে বের করে দেয়া হতেও পারে”। Anyone that is openly racist and discriminatory in the UAE will be fined and made to leave. তিনি আরও হুমকি দিয়ে বলেন “এসব ইসলামফোবিক কাজের প্রত নজর রাখা হবে”।  এর পর থেকে এক চেইন রিঅ্যাকশনে মধ্যপ্রাচ্যের শহরগুলো থেকে প্রতিক্রিয়া ও অ্যাকশনের ঝড় বইতে শুরু করে। অনেকেই চাকরি হারায় এবং অনেককে দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়। অনেকেই সরাসরি মোদীকে “একশন দেখতে চাই বলে”  টুইট করেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোদি এর প্রতিক্রিয়ায় মুখরক্ষার দায় ঠেলা এম মন্তব্য করেন টুইটে বলেন,  করোনা কোনো ধর্ম মানে না। তাই সংক্রমণে আক্রান্তের জাত ধর্ম বিচার ঠিক নয়।’অথচ বাস্তবে মোদীর দলের নেতাকর্মীরা মুসলমানদের নীচু দেখানো আর করোনা সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য দায়ী করে আগের প্রপাগান্ডা চালাতেই থাকেন।
    এদিকে ভারতের এক নারী তেজস্বী সূর্যকে উদ্দেশ করে আর্টিকেল লিখে তাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি বলেন, নারী-পুরুষের সম্পর্কের সমস্যাটা কোন আরব-অনারবের সমস্যাই নয়। তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, ভারতীয় নারীদের অবস্থা কী, সেটা খুঁজে না দেখে সে সমস্যা কেবল আরব নারীদের বলে দাবি করতে গেছেন কেন? এটাই তো বর্ণবাদ।
    কিন্তু প্রশ্ন জাগে এই তরুণ সূর্য আরব নারীদের অপমান করে নীচু করছেন কেন? বিশেষত পাঁচ বছর আগে তিনি যখন মাত্র ২৪ বছরের তরুণ?
    এর সম্ভাব্য কারণ হল, প্রথমত এই তরুণ কেবল বিজেপির নয়, একেবারে আরএসএসের “স্বয়ংসেবক” সদস্য। মানে এর কোর মেম্বার ও প্রশিক্ষিত ভলিন্টিয়ার। কোন প্রশিক্ষণ? গত ১৯২৫ সালে আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা মাধব সদাশিব গোলওয়ালকার যিনি হেডগেওয়ারের পরে আরএসএসের পরবর্তী সর্বোচ্চ প্রধান নেতা হয়েছিলেন, তিনি হিটলারের বর্ণ-বিশুদ্ধতার মতবাদে অনুপ্রাণিত ছিলেন। তাদের হাতে এই প্রশিক্ষণের মূল নীতি নির্ধারিত হয়েছিল। হিটলার বেঁচে থাকা অবস্থায় এরা হিটলারের এসব তত্ব শুনে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তাই হিটলারের জাতের ‘খাঁটিত্ব’ তারাও মানতেন। আর সেখান থেকে এটা তাদের প্রশিক্ষণের ম্যানুয়াল ও গাইডলাইনে উঠে বসে। এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের জাতবর্ণবাদী বক্তব্যের উত্থান এবং পতন এবং ফিজিক্যালি তার মৃত্যু ও বিনাশ এসব মিলিয়ে সারা ইউরোপ এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে তাদের রাষ্ট্রের গঠনভিত্তিটাই বদলে নিয়েছিল। সারা ইউরোপের গঠন ভিত্তি বলতে মোটামুটি (১৬৫০-১৯৫০) তিনশ বছর ধরে একই গড়ন। সেটা হল এরা সব রাষ্ট্র গুলোই ছিল আসলে জাতি-রাষ্ট্র বা নেশন স্টেট। অর্থাত সেগুলো আধুনিক রিপাবলিক বলে নিজেদের দাবি করলেও আদতে সেগুলোর মূল বৈশিষ্ঠ ছিল নেশন স্টেট। সারকথায় ‘জাতের ধারণা’ ফলে জাতিঘৃণাও প্রবল এমন এক ‘জাত-রাষ্ট্র (nation state) সেগুলা। আর এখান থেকেই এর সবচেইয়ে চরম রূপটাই হল হিটলারি জাতশ্রেষ্ঠত্ব, এক রেসিজম। তাই এই ভিত্তিটাকেই বদলে নিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল ইউরোপ। ১৯৫৩ সাল ইউরোপের ৪৭ টা রাষ্ট্র তাদের গঠনভিত্তি বদলাতে এক কনভেনশনে মিলিত হয়েছিল। যেখান থেকে নেশনস্টেটের বদলে তাদের প্রত্যেক রাষ্ট্রের গঠনভিত্তি হয় নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র। আর এর গৃহিত কনভেনশনটা সদস্য সকলে মানছে কিনা তা তদারকের জন্য, এবং তা সকলের জন্য মানা বাধ্যতামূলক এমন একটা সুপ্রীম কোর্ট গঠন করে নেয়া হয়েছিল।

    কিন্তু বিজেপি ইউরোপের এসব  সংশোধণ আর এসব শিক্ষানেয়ার তাতপর্য কখনও বুঝেও নাই, গ্রহণও করে নাই। তবে এই সমস্যাটা একা বিজেপি-আরএসএস নয় সারা ভারতের নেহেরু-গান্ধী বা কোন কমিউনিস্টসহ সব রাজনৈতিক দলের ভিতরই রাষ্ট্রধারণা বলতে nation state ধারণাটাই শুরু প্রবল নয় বরং একমাত্র অর্থ হয়ে গৃহিত থেকে আছে। ততফাত সম্ভবত এতটুকুই যে বিজেপি-আরএসএস সবসময়ই তাদের উগ্র জাতিবাদ প্রকাশ্যে বলে চর্চা করে। আর কমিউনিস্টসহ অন্যেরা সকলেই কঠিন জাতিবাদী। কিন্তু মুলকথাটা হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের চরম উত্থান-পতন থেকে জাতি রাষ্ট্র ধারণা একেবারেই পরিত্যাগ করার যে শিক্ষা দিয়ে গেল, ইউরোপ অন্তত তাদের রাষ্ট্রের গঠন ভিত্তি বদলে যেটার স্বীকৃতি দিয়ে গেল – এই শিক্ষার কোন প্রভাব – কোন জানাশুনা, কোন আলোচনা কোথাও নাই। এমনকি কোন একাদেমিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব ধারণা এসেছে আমাদের জানা নাই। এছাড়া সুনির্দিষ্ট করে কমিউনিস্টদের দায় হল, তারা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে নয়, এর ব্যাপারেই সিরিয়াস নয় শুধু তাই নয়। কখনও এটা স্টাডির বিষয়ও করে নাই। বরং এমনকি অধিকার বা রাষ্ট্র ধারণা এগুলো তার রাজনীতিও নয় কোন এজেন্ডাও নয় মনে করে থাকে এখনও। একমাত্র ব্যতিক্রম সম্ভবত নতুন নেপাল। অথচ ্মনের ভিতরে সকলেই কোর ধারণায় একেকজন nation state বা জাত-রাষ্ট্রবাদী। মজার কথা আমাদের বাঙালি জাতিবাদও একই nation state বা জাত-রাষ্ট্রবাদী।  এমনকি পাহাড়িভায়েরাও এর বাইরে নয়। জুম্মু জাতিবাদও একই nation state বা জাত-রাষ্ট্রবাদী। আসলে কেউই চোখ খুলে তাকায় দেখে নাই, দুনিয়া যুদ্ধের পর কোনদিকে গিয়েছে, আবার কেমন করে দেখতে হবে তাও কখনও জানা হয় নাই। বরং সারা ইউরোপের যে তিনশ বছরের জাতিরাষ্ট্র ধারণা চ্চালু ছিল, চোখ বন্ধ করে সেটাই কপি করে চলেছে এরা।
    তাহলে দাড়ালো চিন্তা ও চর্চার সমস্যার সংকীর্ণতা এটা একা বিজেপি-আরএসেওএসের না। যদিও বিজেপিত-আরএসএসের বেলায় তা সবচেয়ে উগ্রভাবে প্রকাশিত।  তাদের ট্রেনিং সিলেবাস এমন চিন্তা এক খোলাখুলি বিষয়। যার পরিণতি এখন হাতেনাতে মোদী পাচ্ছেন। যদি মোদী এখন থেকে কোন শিক্ষা পাবেন সে সম্ভাবনা দেখা যায় না।
    যদিও উগ্র জাতি রাষ্ট্র মানা না মানার ব্যাপারে আরএসএসের চেয়ে বিজেপিতে শিথিলতা কিছুটা রাখা হয়েছে। এ কারণে যারা সরাসরি আরএসএসের সদস্য তারা এত কট্টর বেশি। তেজস্বী সূর্য আরএসএসের সদস্য হিসেবেই সবিশেষ প্রশিক্ষিত। এ ছাড়া তেজস্বী সূর্য বেঙ্গালুরু বিজেপির আইটি সেলের প্রধান।  যে আইটি সেল মানে হল অমিত মালব্যের অধীনে মূলত মুসলমানবিদ্বেষী প্রপাগান্ডা সেল। গত বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক তদন্ত করেছিল ইউরোপের ভিতরে বসে ভারতের কারা মুসলমান নাম নিয়ে ফেক ওয়েবসাইট চালায়। তাতে যাদের নাম প্রকাশিত হয়েছিল তাদেরই একজন হল তারেক ফাতাহ।  এখানে একটা রিপোর্টে তার নাম ও ছবি আছে। তিনি মূলত পাকিস্তানি-কানাডিয়ান। তিনি বিজেপিকে ভুয়া ওয়েবসাইট আয়োজন করে দিয়ে অর্থ কামিয়ে নিয়ে থাকেন। এতাই তার পেশা।
    এখানে এক মজার দিক হল  তেজস্বী সূর্য যে টুইট করে কুখ্যাতি পেয়েছেন,  সেটা এবার ভাইরাল হয়ে গেলে পর তিনি দাবি করেছেন- এই ভাষ্য তার নয়। এটা নাকি ওই (ভাড়াটে) তারেক ফাতাহ  মন্তব্য। যা হোক এই মন্তব্য অন্যের নামে চালিয়ে এমপি সুর্যের কোন অসতকাজের দায়ে পড়েনি বলে মনে করছেন। কারণ তিনি মূলত যেন নাম ভাড়া দেয়া অথবা ফেক ওয়েব সাইট ভাড়া দেয়া ভাড়াটঙ্কে কিনেছেন।  অমিত মালব্যের সাথে তারেক ফাতাহ এর সম্পর্ক এই সুত্রে, অমিত হল ক্রেতা এবং ফেক মুসলমানবিদ্বেষী খবরের অর্ডারদাতা। আর সেখান থেকেই তারেক ফাতাহ আর তেজস্বী সূর্য-এরা হয়ে যান নানান ছোটবড় ছিচকে কিন্তু ঘৃণিত অপধাধের সাগরেদ। তেজস্বী সূর্য তারেক ফাতাহ এর নামে নিজের অপরাধ চালিয়ে দিলেও কেন তিনি ভাড়াটের মন্তব্য ব্যবহার করলেন , সে জবাব দেননি।
    এখন এ দিকে সর্বশেষ  হল, দুবাইয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত পবন কাপুর ঐ ২১ এপ্রিলই বুঝেছিলেন মোদী ও তার দল যাই করুক অফিসিয়ালি তাকে ভারত রাষ্ট্রের হয়ে কিছু একশনে যেতে হবে। তাই তিনি ঐদিনই ভারতীয়দের সতর্ক করতে টুইট করে বলেছেন, ‘ভারত ও আরব আমিরাত (দুবাই) একই নাগরিক বৈষম্যহীনতার নীতিতে বিশ্বাসী [India and UAE share value of non-discrimination, says ambassador] ফলে সবাই যেন সতর্ক থাকেন”। এই শুকনা কথায়ই কি মধ্যপ্রাচ্য রাজি হবে, বিশ্বাস করবে, অপমান ভুলতে পারবে? স্বভাবতই তা হবার কথা না। তাহলে?

    সর্বশেষটা দেখতে পাচ্ছি আজকে। মোদী আপোষ প্রস্তাব দিচ্ছেন।  এতদিন  দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজ মসজিদে তাবলিগ জামাতের প্রধান মওলানা সা্দকে  হয়রানি আর হেস্তনেস্তের চরমে নেয়া হচ্ছিল। মুসলমানেরা নিচাজাতের বলে সারা ভারতজুড়ে জাতঘৃণাটা এই মওলানা সাদের কান্ধে বন্ধুক রেখে  ঐ মামলার ভয় দেখিয়ে চাপে ফেলে করা হচ্ছিল। দিল্লি পুলিশের প্রচার তুঙ্গে উঠেছিল মওলানা সা’দ নাকি পরিকল্পিতভাবে ভাইরাস ছড়িয়েছেন আর এর ভিডিও ফুটেজ আছে পুলিশের কাছে। অথচ আজকের রিপোর্ট হল সেই দিল্লি পুলিশই বলছে, মাওলানা সা’দের নামে প্রচারিত সেই অডিও ক্লিপ ভুয়া, এডিট করা, ফেক ভিডিও।  এর মানে হল, মোদী-অমিত এখন সা’দের বিরুদ্ধের  মামলাকে ফেক বলে স্বীকার করে তা উঠিয়ে নেওয়ার বিনিময়ে সওদা করতে চাইছেন, এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর এখন তিনি চাইবেন বিনিময়ে মওলানা সা’দ ও তার বন্ধুরা যেন এখন মধ্যপ্রাচ্যের সমাজ ও  শাসকদের কাছে মোদী সরকারের পক্ষে সুপারিশ করেন। যাতে ইতোমধ্যে ভারতীয়দের যা ক্ষতি হয়ে গেছে গেছে তবে তা আবার স্বাভাবিক পুরানা সুবিধাদির জায়গায় যেন ফিরে আসে। ইতোমধ্যে গত পরশুদিন টুইটারকে মোদী সরকার সরকারি তরফ থেকে এক চিঠি দেয়া হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে ইতোমধ্যে যে ১২১ টা টুইট করা হয়েছে মোদীর দলের নেতা এমপি বা মন্ত্রীর তরফ থেকে, মওলানা সা’দকে টেররিস্ট বলে অথবা ইসলামের বিরুদ্ধে নন্দা বা আপত্তিকর শব্দে – যেন এসব টুইট মুছে সরায়ে বা মুছে ফেলা হয়। কিন্তু এতে কার ভাগ্য খুলল টুইটারের বা মোদীর? আসলে মোদী এখানে নিজের ইজ্জত রক্ষার্থে এই পদক্ষেপ নিল। তাহলে এতদিন সা’দের বিরুদ্ধে এগুলো চলতে দিয়েছিলেন কেন? এটা কী  সরকার চালানোর কোন নীতি হতে পারে? এত নিলজ্জ ও ইতরচিত! তাহলে শিক্ষাটা কী এখানে? শিক্ষাটা হল দুবাইয়ের একজন রাজকুমারিও জানেন কোনটা রেসিজম-জাতবর্ণবাদ এবং কেন এটা পরিত্যাজ্য ও অপরাধ। অথচ একজন প্রধানমন্ত্রী মোদী ও তার দলবল আরএসএস পর্যন্ত এর সাগরেদেরা – এদের কেউই তা জানে না, শিখতে পারলও না! হায়্ হিন্দুত্ব!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৯ মে ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টে  আর “বিজেপির শ্রেষ্ঠত্ববোধ বিপদে” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

     

  • ভারতের বাংলাদেশে ‘সৈন্য পাঠানো’ শখ

    ভারতের বাংলাদেশে ‘ সৈন্য পাঠানো’ শখ

    গৌতম দাস

    ২৭ এপ্রিল ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Yj

     

    গত ২১ এপ্রিল ভারতের অনেক  প্রিন্টেড মিডিয়া তাদের সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআই এর বরাতে একটা রিপোর্ট ছাপায় যে ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা করছে। পরে তৃতীয় দিনে ২৩ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার সাংবাদিকদের কাছে সেখানকার ভারতীয় হাইকমিশন জানায় যে এই খবরটা মিথ্যা (This claim is false )।

    পিটিআই এর এটাকে বলে স্রেফ ইতরামো – মোদী সরকার, তার সরকারী বার্তা সংস্থা আর তার গোয়েন্দা বিভাগের সবচেয়ে দায়ীত্বজ্ঞানহীন ও নিচু একটা কাজ তারা করেছে।  দেখা যাচ্ছে ভারতের সবচেয়ে বড় সরকারি বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই), এরা বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগান্ডায় নেমেছে, বাংলাদেশে কথিত ভারতীয় সেনা পাঠানোর প্রপাগান্ডায় নেমে এনিয়ে বানানো খবর ছেপে দিয়েছে। যাতে বাংলাদেশকে নিচা দেখানে যায় আর তাতে তাদের দেশ ও দেশপ্রেমের ভারতকে যেন দেখানো যায় অনেক উপরে।  বাংলাদেশকে মোদীর অধীনস্ত করে দেখালে তাতে নরেন্দ্র মোদী ভারতকে অনেক উপরে উঠায়ছেন দেখান যাবে এই হল তাদের বিশ্বাস। তাই, প্রচারিত সেই খবরটা হল ভারত নাকি “বাংলাদেশে আর্মি পাঠাচ্ছে” [Indian Army to send teams to Sri Lanka, Bangladesh, Bhutan & Afghanistan to fight Covid-19]। আর এই মিথ্যা খবরটা ছড়িয়েছে সরকারি সংস্থা পিটিআই।

    এই খবরের ভাষ্যে ভাবটা এমন যেন ভারত যেন তার পড়শি ‘কলোনিগুলোকে’ দেখভাল ও  রক্ষার্থে এসব দেশে সৈন্য পাঠাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপারটা হল প্রপাগান্ডা। কিন্তু এই পিটিআই কী জানে না কোনটা নিউজ আর কোনটা ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডা? এটা অবিশ্বাস্য তাই, একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশেষত করে ভারতে প্রায়ই সে দেশের গোয়েন্দা বিভাগের কাছে “পেজ-বিক্রি” করা খবর ছাপা হয়, এটা যদি মনে রাখি। অনেকের মতে, ভারতে মিডিয়ায় এখন একটা রেওয়াজ হয়ে গেছে, কোনো পত্রিকার ফাইন্যান্সিয়াল অবস্থা যত খারাপ গোয়েন্দা বিভাগের কাছে সে তত বেশিবার নিজেকে বিলিয়ে দিবে, ‘পেজ বিক্রি’ করে অর্থ বা সুবিধা সংগ্রহ করবে।  আর সেক্ষেত্রে বিনিময়ে গোয়েন্দা বিভাগ যেভাবে যা খুশি ছাপতে চায়, সেভাবে তা যেন ছাপাতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতার নামে এই ইতরামো করে চলতে প্রায়ই দেখি আমরা। আর ভারতের গোয়েন্দাবিভাগকেও এদের এই দুরবস্থার সুযোগের সদব্যবহার করতে প্রায়ই দেখা যায়। গোয়েন্দাবিভাগেরও হাতেও মিডিয়া-বাজেট মানে মিডিয়াকে প্রভাবিত করার বাজেট থাকে সেটাই এখানে ব্যবহৃত হয়। ছপ্পড় ফেরে এই বাজেটের লোভ লাগিয়ে দেয়া হয়। ভারতে প্রধানধারার বাইরের অনেক ইন্ডেপেন্ডেন্ট মিডিয়া দাঁড় করার উদ্যোগ আছে, যেমন থাকে সবদেশেই.  যেমন, WIRE, SCROLL, CARAVAN ইত্যাদি। কিন্তু অনেককে দেখি হঠাত করে একটা ‘খেপ’ মেরে বসেছে। যেমন ২০১৪ সালে অমিত শাহের মমতার বিরুদ্ধে জঙ্গি প্রপাগান্ডা ও আক্রমণ। দাবি পশ্চিমবঙ্গের “বর্ধমানে জেএমবি বোমা হামলা ঘটনা” পাওয়া গেছে। আর এতে তখনও কিছু মিডিয়া পয়সা কামিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু তারপর দেখা গেলে মোদীর অফিসের প্রতিমন্ত্রী জীতেন্দ্র সিং ‘এসব কিছু না’ বলে হঠাত ঘটনায় ঠান্ডাপানি ঢেলে দিয়েছিলেন। এটাই  ভারতের দুস্থ মিডিয়ার এই সাধারণ ঝোঁক যেটা সব সময় দেখা যায়।

    আলোচ্য ঘটনাটা আরো অনেক বড় গুরুত্বের এজন্য যে, দেখা যাচ্ছে এবার সরকারি পিটিআই নিজেও এই বানোয়াট খবরের ব্যবসায় এসে গিয়েছে অথচ, পিটিআই ভারতের সরকারি বার্তা সংস্থা। শুধু তাই না আরও দিক আছে।  যেমন একটা বার্তা সংস্থা বানোয়াট প্রপাগান্ডার কনট্যাক্ট নিউজ বা চুক্তিতে ছাপানো খবর ডেস্কে রাখলেই তা ঐ সংস্থার সব “প্রাহক মিডিয়া” যেমন ধরা যাক ওয়েব পত্রিকা “দ্যাপ্রিন্ট” – তাকেও নিউজটা  গ্রহণ ও নিজ পত্রিকায় তা ছাপাতেই হবে ব্যাপারটা এমন একেবারেই নয়। উলটা এমনকি “দ্যাপ্রিন্ট” চাইলে এর পালটা নিজস্ব ইনভেস্টিগেটিভ রহস্যভেদী কোন রিপোর্টও ছাপতে পারে। কিন্তু ঘটেছে উলটা। দাপ্রিন্ট প্রপাগান্ডা খবরটা যত্ন করে ছাপিয়েছে।

    তাহলে শেখর গুপ্তা যিনি এতই  বর্ষীয়ান সম্পাদক, ভারতের অনেক কয়টা প্রধান দৈনিকের প্রাক্তন সম্পাদক  ও তাঁর ইন্ডেপেন্ডন্ট মিডিয়ার বড়াই – বর্তমানে “দ্যাপ্রিন্ট” এর চেয়ারম্যান ও প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্তা, তাঁর এত বড় বড় কথা বলে লাভ হল কী?   সেই “দ্যাপ্রিন্ট”-ও পিটিআইয়ের প্রপাগান্ডা নিউজটা ছেপেছে  এবং সবার চেয়ে হুবহু বেশি আর নিষ্ঠার সাথে।  তাকেও কী দিয়ে ব্যাখ্যা করব? শেখর গুপ্তের নিজের পত্রিকা ‘দ্য প্রিন্ট’- তারও এই দশা কেন? এমনকি এই নিউজ প্রসঙ্গে ‘দ্য প্রিন্ট’-এর চেয়ে ‘দ্য হিন্দুর’ প্রেজেন্টেশন অনেক শোভন। কিন্তু ‘দ্য প্রিন্ট’ পড়ে মনে হয় পিটিআইয়ের ভাষ্যটা হুবহু না তুলে  লিখলে যেন ‘দ্যাপ্রিন্ট’ পেমেন্ট কম পাবে, এই ভয়ে আছে। তাই আলোচ্য কেসটা আসলেই আরো বড়। আচ্ছা, ভারতীয় হাইকমিশন এখন  জানিয়ে দিছেন যে পিটিআইয়ের এই  খবরটা মিথ্যা – “This claim is false. There is no decision to send the Indian army …,”।  – এখন মিডিয়ার স্বাধীনতা ইনডিপেন্ডেন্টস নিয়ে মুখের ফেনা তোলা শেখর গুপ্তারা কী বলবেন? কী বা কোন “দেশপ্রেমের” আড়ালে নিজেকে  লুকাবেন? বলবেন যে “ভারতীয় হিন্দুজাতির স্বার্থে রাষ্ট্রের দেশপ্রেমে এক মিথ্যা প্রপাগান্ডা হলেও সরকারের পক্ষে থাকতে হয়েছিল! হায় রে দুস্থ হাভাতে হতভাগার দেশপ্রেম!

    বাংলাদেশের মিডিয়া নিয়ে ওয়াকেবহাল যারা পিটিআইয়ের বানোয়াট কারবারটা দেখেছেন ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বুঝতে  তাদের বাড়তি কিছু মনোযোগ দিতে হতে পারে।  আমাদের বার্তা সংস্থা বাসস বা ইউএনবিকে দিয়ে ভারতের পিটিআই এর ধারণা নেয়া যাবে না। কারণ এদের তুলনায় পিটিআই মহীরূহ প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও, ভারতের মিডিয়া ব্যবসায় খবর সংগ্রহের খরচ কমানোর জন্য এত বড় ভারতজুড়ে নেটওয়ার্ক ছড়ানো আছে একমাত্র পিটিআই এর। এ কারণে ভারতের সব রাজ্যের সব পত্রিকার প্রধান ও প্রায় একমাত্র খবরের উৎস এই প্রতিষ্ঠান। এর বিপরীতে বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে  কোন বার্তা সংস্থার ভূমিকা অনেক কম। কারণ আমাদের এখানে বাংলাদেশের প্রতিটা মিডিয়া হাউজেরই সবার মূলত নিজস্ব আলাদা  রিপোর্টার স্টাফ সেট থাকে। তবে তাদের সংগৃহীত খবরের খুব ছোট একটা অংশ তারা সরকারি-বেসরকারি বার্তা সংস্থা থেকেও নিয়ে থাকেন। প্রত্যেকেরই নিজস্ব বিটের সাংবাদিক আছে।  অর্থাৎ সরকথায় ভারতের নিউজ মিডিয়া জগতে বার্তা সংস্থা হিসাবে পিটিআই-এর ভুমিকা অনেক বড় প্রভাবের।

    নিউজমিডিয়ায় বার্তা সংস্থার খবর ছাড়া আর এক ধরনের ‘উৎস’ থাকতে দেখা যায় – যেমন ‘আমাদের “নিজস্ব সোর্স” বা সূত্র বলেছে’। যদিও কখনওবা কথিত ‘সোর্স’ অথবা ‘সূত্র মোতাবেক’ এর কথা বলে আড়ালে গুজব বা প্রপাগান্ডাও চালিয়ে দেয়া হয়। ভারতে পেজ বিক্রি এভাবেই হয়ে থাকে। তবে “নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক” বা ‘প্রত্যক্ষদর্শী’ সোর্স-এগুলো বিশ্বাসযোগ্যও হয় অনেকসময়। তবে পিটিআইয়ের ‘আমার সোর্স বলছে’ বা ‘সূত্র মোতাবেক’ বলে এমন উৎসের খবর ছাপানোর সুযোগ কম। মূল কারণ এটা সরকারি তো বটেই; এছাড়া একটা বার্তা সংস্থা সাধারণত ‘সূত্র-খবরের’ উপরে কাজ করে না। এছাড়া ‘সূত্র-খবরের’ ধরনের কাজগুলো মূলত ব্যক্তি বা গ্রুপ মালিকের পত্রিকাগুলোর জন্যই যেন মূলত বরাদ্দ। এই সূত্রে আমরা কোনো কোনো দেশের গোয়েন্দা বিভাগকে সে দেশের কম-প্রচারিত পত্রিকাগুলোর সাথেই মূলত সরাসরি ‘কেনাবেচা’ করতে দেখি।

    এসব বিচারে ‘ভুয়া সোর্সের নামে’ পিটিআই ভারতে ‘পেজ বিক্রি’ করেছে- এমন আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এগুলো প্রাইভেট মিডিয়া আউটলেট এরাই মূলত করে থাকে। কিন্তু এবারই প্রথম আমরা দেখলাম সরকারি পিটিআই এমন প্রপাগান্ডায় লিপ্ত হয়েছে।

    ঐ রিপোর্টে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও আফগানিস্তান এই চারটা দেশের নাম উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে- ভারতীয় সৈন্য এসব দেশে আলাদা আলাদা গ্রুপে পাঠাতে প্রস্তুত করা হচ্ছে [The sources said the teams for Sri Lanka, Bangladesh, Bhutan and Afghanistan are being readied ]। আর তাতেই চার দেশের মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম- এই প্রপাগান্ডা খবর অস্বীকার করেছে [Dhaka needs no Indian army ……] দৈনিক নিউ এজ -কে  বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে এ মোমেন। এর পরে তা করেছেন আরেকটু পরিষ্কার ও কঠোরভাবে শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা সচিব অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল কমল গুণরত্নে [No need of military assistance from other countries… ]। শ্রীলঙ্কার বক্তব্য বেশি ক্যাটাগরিক্যাল এবং বোল্ড। তিনি বলেছেন, “সৈন্য পাঠানো প্রসঙ্গে দু’রাষ্ট্রে আমাদের মধ্যে কোনো ডায়লগও হয়নি” [there was no such dialogue that had taken place between two nations.]। অর্থাৎ তিনি বুদ্ধিমানের মত প্রকারন্তরে যেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, শ্রীলঙ্কা সার্বভৌম দেশ। ফলে কোন ডায়লগ ছাড়া আমি রাজি না হলে আপনি মোদী আমার দেশে সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আপনি কে? মনে হচ্ছে আমাদের অবশ্য এত সাহস হয় নাই।  মানে শ্রীলঙ্কা তার প্রতিক্রিয়া অন্যদের চেয়ে আরেকটু কড়া বা জোরদার করতে পেরেছিল বলা যায়। কারণ শ্রীলঙ্কার অন্তত দু’টি মিডিয়া এখবরের সত্যতা নিয়ে কলম্বোর স্থানীয় ভারতীয় হাইকমিশনের কাছে প্রশ্ন করলে (যেমন, শ্রীলঙ্কার ‘ডেইলি মিরর’ পত্রিকাকে)  ভারত জানিয়েছে এমন ‘খবর মিথ্যা’ (“This claim is false. ) বলে খবরটাকে অস্বীকার করেছে।

    এখন এখানে এক মজার তামাশা দাঁড়িয়ে গেছে। এর অর্থ হল, ভারত সরকারের একটি অফিস আরেকটি অফিসের দাবিকে ‘মিথ্যা বলছে’, অস্বীকার করছে। শ্রীলঙ্কার ভারতীয় হাইকমিশন মানে হল ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের অংশ প্রতিষ্ঠান। কাজেই তাদের বক্তব্য ওজনদার। কাজেই এখন এর একমাত্র ফয়সালা প্রধানমন্ত্রী মোদীই করতে পারবে সম্ভবত!
    এর মানে হল, পিটিআইয়ের ইজ্জত-লজ্জা কিছু থাকলে তাদেরই এখন ‘ঝুলে পড়া উচিত’। কারণ শ্রীলঙ্কার ভারতীয় হাইকমিশনই বলেছে তারা মিথ্যা বলেছে। অথচ পিটিআইয়ের দাবি এমন খবর নাকি “বিশেষ সূত্রের খবর”। এই বিশেষ সুত্র এরা তাহলে এখন কোথায়? তাহলে এমন ঘটনা ঘটে গেল কী করে? সবচেয়ে তামাসাটা হল এমন নিউজ প্রকাশের জন্য পিটিআই কোন জবাবদীহি করেছে আমরা এখনও শুনি নাই।  সরকার বা পিটিআই কাউকে ‘সরি’ বলে নাই।
    এর মানে প্রমাণ হল  পিটিআই-এর এডিটরের পক্ষে দিল্লির কোন একটা প্রত্যন্ত গ্রামে বসেও কোন টংয়ের দোকান চালানোর যোগ্যতাও তাঁর নাই।  মোদীকে কাপড় পড়ায়ে ঢাকতে গিয়ে পিটিআই-এডিটর নিজেই ন্যাংটা হয়ে গেছেন!  অবস্থা এখন এমন  কোন ভারতীয় হাইকমিশন মানে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বলছে,  পিটিআই-এডিটর এক ভুয়া নিউজ করেছে। এর চেয়ে অপমানজনক মন্তব্য পিটিআই-এডিটর এর জন্য আর কী হতে পারে?

    তাহলে এমন ঘটনা ঘটে গেল কী করে?
    খুব সম্ভবত এটা নেপথ্যে প্রধানমন্ত্রী মোদী আর বিজেপির ইমেজ বাড়ানোর কোনো অ্যাসাইনমেন্ট ছিল। আর এদিকে একাজ করে দিয়ে অর্থ বা পদ-পদবির লোভ ভারতের কিছু সরকারি কর্মচারী সামলাতে পারেননি, এরা তাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আর ব্যাপারটাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য হয়ত (মোদী সরকারের বিশেষ স্বার্থ বা দেশপ্রেম বলে ভুয়া কথার আড়ালে) গোয়েন্দা বিভাগ আর পিটিআইকে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছিল। যার মূল ভাষ্যটা হল- এটা দেখানো যে এই মোদী সরকার এতই উঁচুতে ভারতকে নিয়ে গেছে যে, পড়শি চার-চারটা রাষ্ট্রকে এখন মোদী পকেটে রেখে চালায়। আর প্রধানমন্ত্রী মোদীকে সেগুলো দেখভাল আর ঠিকঠাক করে রাখতে হয়”। এই ভাষ্যটা যেন বলতে চাইছে, ওসব দেশে সরকার বা প্রধানমন্ত্রী এক আধজন থাকে বটে তবে মোদীই সেগুলোকে মূলত চালায়ে থাকেন। – মোটামুটি এটাই সম্ভবত ছিল গগন-ফাটানো “মোদীগল্প”। আর এদিকে আমরা হয়েছি যেন মোদীগল্প বাস্তবায়ন করে দেয়ার চাকর-বাকর; কিন্তু তাতে আমরা অস্বস্তিহীন হয়ে গেলাম কিনা সে খবর নাই। “ভারতের ব্যগেজ” বইতে বইতে আমাদের মান-ইজ্জত বলে আর কিছু নাই। থ্যাঙ্কস টু শ্রীলঙ্কান জার্নালিস্ট!

    পিটিআইয়ের ঐ প্রপাগান্ডা রিপোর্টে একটা বাক্য ছিল যে অংশটা কোনো পত্রিকা কপি করতে  বাদ দেয়নি। বাক্যটা হল, “সার্ক রিজিয়নে করোনা মহামারী ঠেকানোর জন্য একটা কমন ফ্রেমওয়ার্ক গড়ার কেন্দ্রীয় ভূমিকায় এগিয়ে রয়েছে ভারত  [New Delhi has also been playing a key role in pushing for a common framework in dealing with the crisis.]”। কিন্তু মোদীকে এই – “প্লেয়িং কী রোল” –  করতে তারে কে এত ডাকতেছে?
    আচ্ছা মোদীর সাথে আমাদের প্রধানমন্ত্রী  সার্কের করোনা বৈঠক করতে গেছিলেন কেন? এই কী রোল দেওয়ার জন্য নয় তো? চাঁদাই বা দিয়েছিলেন কেন? মোদীকে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করতে দেয়া- ‘প্লেয়িং কী রোল’ করার জন্য নয় নিশ্চয়? কিন্তু এতে খুশি হয়ে তিনি যখন খুশি তখন, কোন আলাপ আলোচনা ছাড়াই কিছু দেশে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দিতে পারেন? তাই কী? সত্যি অবিশ্বাস্য! অথচ ‘সার্বভৌমত্ব’ বলে একটা শব্দ আছে! মনে হয় না ভারতের কেউ শব্দটা শুনেছে!

    এখানে আলোচ্য পিটিআইয়ের ঐ মিথ্যা রিপোর্টের কিছু অসংলগ্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যাকঃ
    একঃ  পিটিআইয়ের ওই রিপোর্টে মাত্র চারটি দেশের নাম আছে। কিন্তু পাকিস্তান বা নেপালের নাম নেই কেন?  ভারত বা মোদীর কী নাম নিতে ভয় লেগেছে! না কোনো ‘ঝাপ্টা’ খাওয়ার সম্ভাবনা ছিল? সার্কের সদস্য তো অন্তত সাত রাষ্ট্র।

    দুইঃ ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘মোদি সরকারের বন্ধুত্ব-সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করে মহামারী সামলাতে ৫৫টা দেশে অ্যান্টি-ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন পাঠানো হয়েছে, আর তা আমেরিকাতেও” [As part of its policy to help friendly countries to deal with the pandemic, India is also supplying anti-malarial drug hydroxychloroquine to 55 countries] । কিন্তু ঘটনা হল, এই তথ্য অর্ধসত্য অথবা কোথাওবা পুরাটাই অসত্য। যেমন, এই ওষুধ ভারতের প্রয়োজনের তুলনায় দশ গুণ উৎপাদিন হওয়া সত্ত্বেও গত সপ্তাহে ভারত থেকে তা রফতানি নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। গোঁফে তা দিয়ে যেন দাম বাড়াবার আনন্দ উপভোগ করতে চায় ভারত। কিন্তু পরে ট্রাম্পের হুমকি-ধমক খেয়ে তৎক্ষণাৎ সব রফতানি বাধা খুলে দিয়েছিল মোদী সরকার। শুধু তাই নয়। এরপর থেকে মোদি দাবি করছেন, এখন তিনি উদার হয়ে গেছেন, ৫৫টি দেশে ভারতীয় ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন  পাঠাবেন।

    তিনঃ কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ সত্য ও তথ্য হল, হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন করোনাভাইরাস নিরাময়ের কোন ওষুধই নয়। এটা মূলত ম্যালেরিয়া তাড়ানোর ওষুধ। অথচ ভারত সরকার গত দুই সপ্তাহের বেশি ধরে এমন ভাব আনছে যেন ক্লোরোকুইনই করোনাভাইরাসের ওষুধ এবং ভারতই এই মহা-ওষুধের আবিষ্কারক, অথবা যেন এবারই এটা প্রথম আবিষ্কার হল। অথচ এই কথাগুলোর কোনটাই সত্য নয়। অনেক আগেই এই ওষুধ আবিষ্কৃত আর ভারতের ম্যালেরিয়া রোগীর জন্য তাদের নিজেদেরই এটা অনেক লাগে, তাই অনেক প্রস্তুত করা হয়ে থাকে। কিন্তু তবু এটা আগে বা কখনো করোনার ওষুধ হিসেবে অনুমোদিতই নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO  বা হু) ’র কাছেও অনুমোদিত নয়।

    চারঃ ঐ একই রিপোর্টের পরের বাক্যও অসত্য।
    যেমন পরের বাক্যে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন অ্যামেরিকান ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশনের দ্বারা করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য ট্রিটমেন্ট বলে চিহ্নিত করা হয়েছে…”। এটা শতভাগ মিথ্যা তথ্য – [ Hydroxychloroquine has been identified by the US Food and Drug Administration as a possible treatment for COVID-19] ।

    মজার কথা হল, মিথ্যা করে হলেও ২১ এপ্রিলের এই রিপোর্টেই প্রথম অ্যামেরিকায় যে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) বলে ওষুধের অনুমোদনদাতা বা অথরিটি প্রতিষ্ঠান বলে কেউ আছে, তা নিয়ে প্রথম ভারতের মিডিয়ায় কোন স্বীকারোক্তি পাওয়া গেল। কারণ, গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ভারতের প্রতিটি দৈনিকসহ মিডিয়ায় ম্যালেরিয়ার ওষুধ ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন নিয়ে তুঙ্গে তুলে আলাপ করা হচ্ছিল এভাবে যে ১. ভারতেই করোনার ওষুধ পাওয়া গেছে। ২. তা ভারতের হাতেই আছে। ৩. তা বিশাল ‘গেম চেঞ্জার’, ‘ভারত খেলা বদলে দিতে পারে’ ইত্যাদি। কিন্তু এসবের বাইরে আসল কথাটা যে এই ওষুধের এফডিএ অনুমোদন নাই – এটা কোন মিডিয়ায় উল্লেখ করা হচ্ছিল না। অর্থাৎ প্রমাণিত কার্যকারিতার প্রমাণ  বা অনুমোদনই নেই এবং কার্যকারিতা প্রমাণিত নয় – এ দিকটা ভারতের সব মিডিয়া চেপে চলেছিল।

    কেন?
    প্রথমত এর জন্য মূলত দায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আর সেই আড়ালে লুকাতে চেয়েছে ভারতের ব্যবসায়ী-মহলসহ ক্ষমতাসীন মোদীর দলবল। তাই তারা এই ওষুধ একবার ব্যবহারে শুরু হয়ে গেলে তারা সবাই কত বিলিয়ন ডলারের মুনাফায় লালে লাল হয়ে যাচ্ছে- এই লোভে মশগুল ছিল।  ট্রাম্পের ঘনিস্ট বন্ধুরা এবং তিনি নিজেও এই ওষুধের প্রস্তুতকারি কোম্পানির SONAFI এর কিছু শেয়ারের মালিক বলে, ট্রাম্প এই ওষুধের পক্ষে একটা প্রপাগান্ডা বলয় গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলেন।

    সবচেয়ে বড় কথা –  শুরু থেকেই প্রমাণিত যে, এই ম্যালেরিয়ার ওষুধ হার্টের রোগীর জন্য  নিষিদ্ধ ও ব্যবহার মারাত্মক হতে পারে। বিশেষত অসংলগ্ন অস্থির হার্টবিটের চাপের মুখে রোগী পড়ে যেতে পারেন। অথচ তা ভারতের কেউ বলছেন না। তবে ট্রাম্প এই ওষুধের গ্লোবাল কোম্পানি সানোফির শেয়ারের মালিক বলে তিনিও এটাকে ‘প্রমাণিত’ ওষুধ বলে চালিয়ে দিয়ে চান। এফডিএ-এর ওপর তিনি চাপ দিয়ে যতটুকু করতে পেরেছেন, তা সত্ত্বেও এখনো ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’কে  এফডিএ এখনও করোনার ওষুধ হিসেবে অনুমোদন দেয়া হয়নি। তবু এটা বাজারে পাওয়া যায়। তবে সেটা ম্যালেরিয়ার ওষুধ হিসেবে। কোনো ডাক্তার এই ওষুধকে কেবল ‘অফ ড্রাগ’ হিসেবে ব্যবস্থা দিতে পারেন শর্তসাপেক্ষে। সেটা কেবল মরণাপন্ন করোনা রোগীর ক্ষেত্রেই। তবে রোগীকে জানিয়ে ব্যাখ্যা করে ‘সজ্ঞান-সম্মতি’ লিখিতভাবে নিয়ে, রোগী যদি রিস্ক নিতে রাজি থাকেন কেবল এমন বিশেষ পরিবেশে ও শর্তে তা সম্ভব বলে ডাক্তার ব্যবস্থাপত্র দিতে পারে। এটাও ট্রাম্প করেছেন এফডিএ’র কমিশনারের ওপর চাপ সৃষ্ট করে। এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত গত সংখ্যায় লিখেছিলাম।

    সবচেয়ে বড় কথা মাত্র গত ২৩ এপ্রিল ভারতের প্রথম যে পত্রিকা ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধের অনুমোদনহীনতার কথা ভারতে প্রকাশ করে দিয়েছে –   মিথ্যা লোভ ভেঙেছে ও রিপোর্ট করে দিয়েছে- সেটা কলকাতার ইংরেজি ‘টেলিগ্রাফ’। এর রিপোর্টের বাংলা শিরোনাম- ‘লোভ-লালসার ড্রাগ থেকে সাবধান হয়ে যান’ (ওয়ার্নিং অন কাভেটেড ড্রাগ, Warning on coveted drug)।  এতে যে খবরটা আগেও সত্য ছিল তা ভারতের ভিতরেই আরও মেলে তুলে ধরেছিল কলকাতা টেলিগ্রাফ।  ঐ রিপোর্ট আমেরিকার ভার্জিনিয়া স্কুল অব মেডিসিনের স্টাডি-গবেষণার ফলাফলের রেফারেন্স উল্লেখ করে বলছে, ‘এজিথ্রোমাইসিন নামে অন্য ওষুধের সাথে অথবা একা –  ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’ এই ম্যালেরিয়া ওষুধের করোনাভাইরাসের নিরাময়ে কার্যকারিতার কোনো প্রমাণ নেই” [……had found no evidence that hydroxychloroquine (HCQ), used with or without the antibiotic azithromycin, reduced mortality or the need for ventilation in hospitalised Covid-19 patients.]।

    কিন্তু তবু আজ ২৬ এপ্রিল ভারত নিজেদের তৈরি ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন যা আসলে করোনার জন্য অনুমোদনহীন, আ বাংলাদেশকে হস্তান্তর করা হয়েছে।

    তাহলে ৫৫টা দেশে ভারতের অকার্যকর ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’ এই ম্যালেরিয়া ওষুধকে পাঠাবার মোদীর উদ্দেশ্য তাহলে কী?  এই প্রশ্ন থেকেই যায়। অকার্যকর ওষুধ পাঠিয়ে বাজার ধরা? মোদী তো দেখা যাচ্ছে একদম ট্রাম্পের পারফেক্ট শিষ্য!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৫ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টে  আর “প্রসঙ্গ : বাংলাদেশে ‘ সৈন্য পাঠানো’ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বিচারপতি গগৈ বিজেপির সাথে আসাম মিশনে

    বিচারপতি গগৈ বিজেপির সাথে আসাম মিশনে

    গৌতম দাস

    ২৩ মার্চ ২০২০, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Vh

     

    মোদী ও গগৈ_

    আজব খবরটা হল, ভারতের সদ্য অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ ভারতের দ্বিতীয় পার্লামেন্ট বা উচ্চকক্ষ বলে পরিচিত- রাজ্যসভার সদস্য মনোনীত হয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণও করেছেন। তিনি প্রধান বিচারপতি ছিলেন ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত; সব মিলিয়ে এক বছরের কিছু বেশি সময়। অর্থাৎ গগৈ মাত্র চার মাস আগেও ভারতের প্রধান বিচারপতি ছিলেন ।

    একজন বিচারপতির সাথে  পার্লামেন্টের কোন এমপি বা আইনপ্রণেতার সম্পর্ক হল – আইনপ্রণেতা কনস্টিটিউশন মেনে আইন প্রণয়ন করছেন কি না, সেটা সুনিশ্চিত করার দায়িত্ব বিচারপতির। অর্থাৎ একজনের কাজে চেক এন্ড ট্র্যাকে আনার দায়িত্ব অন্যজনের। কাজেই কোনো বিচারপতি  অবসরে গিয়ে নিজেই আইনপ্রণেতা হয়ে যেতে পারেন এটা অকল্পনীয়। এসব বিচারে কোন বিচারপতিরই অবসরে যাবার পরেও নির্বাহী বিভাগের ভিতরে কাজে ঢুকে পড়া, কর্মচারি হয়ে পড়া ইত্যাদি এগুলো এড়িয়ে চলা উচিত। ঠিক যেমন একজন বিচারপতি যে কোন সামাজিক আসরে এমনকি কখনও কখনও পারিবারিক আসরে অংশও নিতে পারেন না, কারণে সেখানে এমন কোন লোকের সাথে সাক্ষাত হয়ে যেতে পারে যিনি আদালতে বিচারাধীন কোন মামলায় কোন পক্ষের লোক। এটা কোন অযাচিত সন্দেহ সৃষ্ট করে ফেলতে পারে। তাই এমন আসর তার এড়িয়ে চলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করা হয়।  হয়ত তিনি বাস্তবে খুবই সৎ তবুও নিজে থেকেই কারও কোন সন্দেহের উর্ধে থাকতে ও এড়াতে এসবের বাইরে হাত পরিস্কার থাকতে তাকে সাহায্য করে। এভাবে অনেকেই বিচারকদের এসব  এড়িয়ে চলাই সঠিক মনে করেন।  প্রশ্নটা বিচারকের ব্যক্তিজীবনের অধিকারের প্রশ্নের চেয়েও নিজেকে যেচে স্বচ্ছ ও পরিস্কার রাখার প্রশ্ন।

    তবু অনেকে মরিয়া আর গোয়াড় হয়ে তর্ক তুলেছেন ক্রিকেটার সচিন তেন্ডুলকারও তো রাজ্যসভার মনোনয়ন গ্রহণ করেছেন। তাহলে প্রধান বিচারপতি গগৈর এর বেলায় দোষ কী? এখানে আসলে যারা রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ আর বিচার বিভাগের আলাদা রেখে দেওয়ার কারণ সম্পর্কে ধারণা রাখেন না তাদেরকে এসব বুঝানো যাবে না।   একজন ক্রিকেটারের নির্বাহি বিভাগের সাথে লাভজনক সম্পর্ক তেমন কোনই সমস্যা তৈরি করতে পারে। কিন্তু যেমন একজন বিচারক এটা একেবারেই পারেন না। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে আইন করেই বিচারককে এজন্য দূরে রাখা হয়েছে।

    রঞ্জন গগৈকে রাজ্যসভার সদস্য পদে মনোনয়ন দিয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। ভারতের রাজ্যসভা বা কাউন্সিল অব স্টেটস ( রাজ্যসভার অফিসিয়াল ইংরাজি নাম Council of States) হল রাজ্যগুলোর স্বার্থের একধরণের পরামর্শক সভা-প্রতিষ্ঠান।  রাজ্যসভার সদস্যরা মূলত ভারতের মোট ২৮টা রাজ্যের (সাথে কিছু কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলেরও) বিধানসভার মাধ্যমে মনোনীত হয়ে থাকেন। যেখানে বিধানসভা মানে ভারতের রাজ্য (প্রাদেশিক) পার্লেমেন্ট। রাজ্যসভার জন্য মনোনীত এমন মোট সদস্য ২৩৮ জন। এর সাথে আরও সর্বোচ্চ ১২ জন থাকেন প্রেসিডেন্টের মনোনীত। ভারতের কনস্টিটিউশনের ৮০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী – সাহিত্য, বিজ্ঞান, কলা এবং সামাজিক বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোন ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্টের হাতে রাজ্যসভার সদস্য পদে মনোনীত করার কথা বলা হয়েছে। এই যুক্তিতে একজন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতিকে প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রপতি মনোনীত করতে সরাসরি আইনগত বাধা না থাকলেও এই মনোনয়ন মরালিটির কিংবা রাষ্ট্রের ন্যায়-নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ও দায়ের দিক থেকে স্ববিরোধী। সাবেক বিচারপতিরা অবসরে যাওয়ার পরে সরকারি পদে নিয়োগ বা সুযোগ সুবিধা নিতে পারবেন না – এমন কথা রাজ্যসভার রাষ্ট্রপতির মনোনয়নের বেলায় স্পষ্ট করে আইনে উল্লেখ না থাকাতেই এখানে গগৈ-এর মনোনয়ন পাবার সুযোগ দেয়া ও নেয়া হয়েছে। যেমন, রঞ্জন গগৈ শপথ গ্রহণের পরে সাফাই গেয়ে বলেছেন, “প্রেসিডেন্টের অনুরোধ তিনি ফেলতে পারেন নাই” [President requests for your services, you don’t say no.]। এই অজুহাত খুবই হাস্যকর ও তাঁর অসততার পক্ষে সাফাই। গগৈ কী জানেন না রাষ্ট্রপতির এসব মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে একাজের পরামর্শ সরাসরি নির্বাহি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আসে। সেই মর্মে প্রধানমন্ত্রী অফিস থেকে পরামর্শের ফাইল প্রেরণ করা হয়। এবং তা অনুসরণ করা প্রেসিডেন্টের কনষ্টিটিউশনাল বাধ্যবাধকতা!  কাজেই নমিনেশন দানের জন্য এভাবে প্রেসিডেন্টকে ভগবানের আসনে বসানো অপ্রয়োজনীয়। বাস্তব নানা স্বার্থের দুনিয়ার ঘটনায় কোন ‘পবিত্রতা’ আরোপ ভাল লক্ষণ বা কাজ না।

    রাজ্যসভার কিছু বৈশিষ্ঠঃ
    রাজ্যসভা প্রসঙ্গে সারকথাটা হল, রাজ্যসভার সদস্যরা ভারতের প্রাদেশিক বা রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের দ্বারা মনোনীত হয়ে থাকেন। মানে রাজ্যসভার সদস্যরা নাগরিকদের ভোটে সরাসরি নির্বাচিত হন না; তারা রাজ্য বিধানসভার সদস্যের ভোটে নির্বাচিত/মনোনীত হন। তাই রাজ্যগুলোরই এক অ্যাসোসিয়েশন বা পরিষদ হল এই উচ্চকক্ষ। উদ্দেশ্য, লোকসভা বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টের সাথে রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতা কমানো। তাই এর ইংরেজি নাম কাউন্সিল অব স্টেটস। ভারতের কয়টা রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের দল রাজ্য-ক্ষমতায় নির্বাচিত থাকে – এভাবে বেশির ভাগ রাজ্য সরকারে যারা ক্ষমতায় সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার একটা বড় প্রভাব থাকে রাজ্যসভায়। অবশ্য রাজ্যসভার নির্বাচনগুলো কখনই লোকসভার সাথে মিলিয়ে একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয় না। তাছাড়া, আরও ব্যাপার আছে।  রাজ্যসভার মোট ছয় বছরের মেয়াদে প্রতি দুই বছর পরে পরে নির্বাচন অনুষ্ঠুত হয়  আর সেক্ষেত্রে কেবল এর খালি আসনগুলোর নির্বাচন হয়ে থাকে। আবার ভারতের রাজ্যসভা ব্যবস্থাকে আমেরিকার সিনেটের সাথে তুলনীয় বলে যেন আমরা বিবেচনা না করি। মূল কারণ, ভারত কোন ফেডারেল রাষ্ট্র নয়; বরং এককেন্দ্রিক বা কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার এক রাষ্ট্র। যদিও ভারতে ইউনিয়ন রাষ্ট্র, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। তবু  ‘ফেডারেল’ শব্দের কোনো ব্যবহারই এর কনস্টিটিউশনে নেই। কাজেই রাজ্যসভা ভারতের (আমেরিকার সাথে তুলনীয় অর্থে) কোন সিনেট  নয়। আর একটা বিষয় – অর্থবিল ছাড়া অন্য সব বিলের বেলায় তা দুই সংসদেই (লোকসভা ও রাজ্যসভা দুটোতেই) বিল আকারে পেশ করা ও পাশ হওয়া ছাড়া তাতে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর সাপেক্ষে তা কখনও আইনে পরিণত হয় না।

    “সেপারেশন অব পাওয়ার”
    ইতিহাসে আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন ও চালু হওয়ার বহু আগে থেকেই ‘সেপারেশন অব পাওয়ার’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ও ইস্যু হয়ে আছে। অর্থাৎ সমাজে ইনসাফ নিশ্চিত করতে চাইলে বিচার বিভাগকে রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অথবা প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতার বাইরে স্বাধীন ও মুক্ত রাখতে হবে; যাতে নির্বাহী ক্ষমতা কোন বিচার প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে না পারে। কারণ এতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গিয়ে আদালতকে নির্বাহী ক্ষমতার কোনো হস্তক্ষেপ বা চাপের মধ্যে পড়তে হয়। তাই আদালতগুলো ‘ইন্ডিপেনডেন্ট’ অর্থে স্বাধীনভাবে নিজের বিবেচনা প্রভাবহীনভাবে প্রয়োগ করে কাজ করার পরিবেশ থাকা চাই। যদিও শেষ কথা হল, বাস্তবে যতটুকু সেপারেশন সম্ভব  ও নিরপেক্ষতা সম্ভব – এমন রিয়েলিস্টিক অর্থে, বাস্তবে বাস্তবায়ন যোগ্য অর্থে কথাগুলো নিতে হবে।

    এ জন্য কোনো আদালতের উপর নির্বাহী ক্ষমতার হস্তক্ষেপ করার সুযোগ হাতের নাগালে আসার একটি  অবস্থা আসে বিচারকেরা  অবসরে যাওয়ার পরে যদি তাঁরা আবার কোনো সরকারি ও লাভজনক পদে নিয়োগ পাওয়া বা সরকারি সুবিধা নিতে চায় বা দেয়া হয়। আসলে এমন নিয়োগ বা অযাচিত সুবিধা নেয়া মানেই, নির্বাহী ক্ষমতার অনুগ্রহ লাভ করা এবং সুনজরে পড়া। আর এখান থেকেই কথা উঠে – “বিচারক থাকাকালে সরকারের পক্ষে ফেভারেবল রায় দিয়ে যাও আর অবসরে যাওয়ার পরে এর বেনিফিট তুলে নাও”। এটাই সেই নীতি। বাংলাদেশের সুপ্রীমকোর্টের পঞ্চম সংশোধনীবিষয়ক রায় দেয়ার ক্ষেত্রেও এমন অভিযোগ আছে। এমন অভিযোগ মোকাবেলা করতেই ‘অবসর-পরবর্তীকালীন লোভ-লালসার সুযোগ থাকা ও নেয়া থেকে বিচারকদের বিচ্ছিন্ন ও সুরক্ষিত’ করে রাখার জন্য আলাদা আইন দরকার বলে অনেকে উল্লেখ করে থাকেন। এটাকে insulated from ‘post-retirement allurements’ ধরনের আইন বলা হয়ে থাকে।

    রঞ্জন গগৈ-এর এবার ভারতীয় রাজ্যসভার পদ গ্রহণের পরপরই এমনই এক মামলা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা হয়েছে। সেখানে আবেদন করা হয়েছে “বিচার বিভাগের স্বাধীনতা’ সম্মুন্নত রাখতে এব্যাপারে আদালত যেন নির্দেশনা দেয়। এ ছাড়া, ভারতের মিডিয়া ও আদালতপাড়া সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরাও ইস্যুটা নিয়ে সোচ্চার। অর্থাৎ একটা ন্যায়নীতি বা ন্যায়ের দণ্ড পিছলিয়ে হাত থেকে পড়ে গেছে, ধুলায় গড়াগড়ি যাচ্ছে – এমন অনুমান থেকেই এসব আপত্তি। রঞ্জন গগৈ ইতোমধ্যেই রাজ্যসভায় শপথ নেয়া শেষ করেছেন। আর সেখানে তাকে নিয়ে টিটকারি দেয়া আর হইচই হয়েছে। একজন বিচারপতি রাজনৈতিক দলাদলি ও টিটকারির মধ্যে পড়েছেন, এটা কেউ আশা করে না আর এটা তাঁর জন্য বিরাট অসম্মানের; যদি আত্মসম্মানবোধ তখনো তাঁর শক্ত থাকে। একজন বিচারকের আসলে নিজের কাছে আজীবন শপথ থাকার কথা যে – রাজনৈতিক ক্ষমতা বা বিতর্ক থেকে তিনি দূরে থাকবেন।  কারণ ইঙ্গিতেও যেন বিচারককে নির্বাহী ক্ষমতার সাথে মিশে যাওয়া বা সম্পর্ক পাতিয়েছেন এমন কোনো ইমেজ তার জীবনে না থাকে। কোনো নির্বাহী ক্ষমতা বা এর ছায়া কোনো বিচারক শেয়ার করতে পারেন না, আজীবন। এতে ন্যায়বিচার প্রদান এবং এর নিরপেক্ষতার প্রশ্নে আপস করা হয়ে যেতে পারে। যদও অনেক দেশেই উল্টাটা পাওয়া যায়। তাই তারা এমন বাক্য লেখা দেখে হেসে উঠতে পারেন। কথা সত্য, অনেক দেশেই বিভারপতিরা বুক ফুলায় নির্বাহি ক্ষমতার অনুগ্রহ নিয়ে নেন। অথবা নির্বাহি প্রধানমন্ত্রী বিচারক প্রভাবিত করে নিজের ক্ষমতার ব্যপ্তি ও সক্ষমতার তারিফ করে থাকেন।

    তবে  রঞ্জন গগৈর রাজনৈতিক পদ গ্রহণ থেকে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য যে, তার সময়কালে সেনসিটিভ চূড়ান্ত রায় যেগুলো তিনি দিয়েছেন, সেগুলো কি তাহলে ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষে অনুগ্রহ প্রদানে করে মানে ফেবার[favor] করে দেয়া হয়েছে? এর বিনিময়ে প্রাপ্ত ‘চেক’ এখন তিনি অবসরে ক্যাশ করছেন কি না!  তাঁর দেয়া গুরুত্বপূর্ণ ও সেনসিটিভ  কিছু রায়গুলো হল – অযোধ্যা (বাবরি মসজিদ ভেঙে মন্দির গড়ার দাবির ক্ষেত্রে মন্দিরকে জায়গা দেয়া আর মসজিদকে দূরে বাইরে জায়গা করে দেয়া রায়), শবরীমালা (কেরলের এই মন্দিরে মেয়েদের, মূলত গর্ভবতীদের বেলায় চালু থাকা প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়া রায়) এবং রাফায়েল (ফ্রান্সের ‘রাফায়েল’ বিমান কেনায় দুর্নীতির মামলা থেকে সরকারকে খালাস দেয়া) মামলা। এছাড়া, সবচেয়ে বিতর্কিত রায় হল আসামের এনআরসি ইস্যু। আদালতের সরাসরি অধীনে এর বাস্তবায়ন কাজে নেমে পড়ার পক্ষে ২০১৩ সালের রায় দিয়েছিলেন এবং শেষে ২০১৮ সালে এসে পারসেপশনের উল্টা ১৪ হাজার হিন্দু ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলেও- মেনে নিতে বাধ্য করে দেয়া রায়।

    আতাঁত? কিন্তু কোন আঁতাতের কথা বলা হচ্ছেঃ
    তাই এখন সবাই প্রশ্ন তুলছে- ২০১৩ সাল থেকেই বিজেপির সাথে আঁতাত করে এনআরসি বাস্তবায়ন নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর একটা কাজ হলেও গগৈ তা নিজ আদালতের মানে, নিজের অধীনে নিয়েছিলেন। মূলত তিনি আসামের এক কট্টর অসমিয়া জাতিবাদী  এবং জাতিবাদী জগতে বুদ্ধিজীবী এলিট ও গণ্যমাণ্য ব্যক্তি বলে পরিচিত।  দাবি করা হয় তিনিই প্রথম ভারতের নর্থ-ইস্ট অঞ্চল থেকে  প্রধান বিচারপতি হয়েছেন। ফলে সব অসমিয়া জাতিবাদীর মতো তারও দৃঢ় বিশ্বাস বা পারসেপশন হলো মুসলমান বা বাংলাদেশের বাঙালিদের কথিত অনুপ্রবেশই অসমিয়াদের সব দুঃখ ও কষ্টের কারণ। অথচ আসল কারণ ভারতের তথাকথিত কেন্দ্রের মিলিটারি স্ট্রাটেজি।  তাই বিচারপতি হওয়া সত্ত্বেও তিনি এনআরসি বাস্তবায়নের নির্বাহী কাজ নিজের অধীনে সম্পন্ন করার পক্ষে ২০১৩ সালে রায় দিয়েছিলেন। এ কাজে বিজেপির হিন্দুত্ব আর অসমিয়া জাতিবাদ ষড়যন্ত্রে হাত মিলিয়েছিল এবং ‘বুঝাপড়া’ করে নিয়েছিল বলে মনে করা হয়।  এর এক বৃহত্তর বহিঃপ্রকাশ হল, অসমিয়া জাতিবাদ মনে করে বাংলাদেশি আর  হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিরা আসামে অনুপ্রবেশে করেছে। ফলে তাদের বের করে দিতে এনআরসি বাস্তবায়ন ততপরতা দরকার।  বিপরীতে বিজেপির রাজনৈতিক লাইন হল বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিরা নয় কেবল বাংলাদেশের মুসলমানেরাই অনুপ্রবেশকারি। এই দুই ধারার বয়ান হাত মিলিয়েছিল। অসমিয়া জাতিবাদীরা নিশ্চুপ থেকে বিজেপিকে ওয়াকোভার দিয়েছিল ২০১৬ সালের আসাম রাজ্য নির্বাচনে। এভাবে  ২০১৬ সালে মুসলমানবিদ্বেষী প্রচারণা তুঙ্গে তুলে আসাম রাজ্য নির্বাচনে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল। এভাবে এই আঁতাত খারাপ চলছিল না।  কিন্তু এনআরসির চূড়ান্ত গণনায় দেখা গেল  – ১৯ লক্ষ মোট অপ্রমাণিত নাগরিকের মধ্যে ১৪ লক্ষই হল হিন্দু। [এখানে ভুল করে নয়াদিগন্তের ছাপা ভার্সানে লক্ষের জায়গায় ‘হাজার’ লেখা হয়ে গেছিল। পত্রিকার পাঠকেরা আমাকে এ’ভুলের জন্য মাফ করবেন। ]  আর এটা প্রকাশ পাওয়াতেই অসমিয়া জাতিবাদী পারসেপশন মিথ্যা ও ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়ে যায়।  অর্থাৎ তাদের মুসলমান ও বাংলাদেশি বিদ্বেষ পুরাপরি ন্যাংটা হয়ে ধরা পড়ে যায়।  উপায়ান্তর না পেয়েও গগৈ নতুন কোনো ষড়যন্ত্র করতে রাজি হননি।  অথচ বিজেপি ওপেন আদালতেই প্রস্তাব দিয়ে চেয়েছিল যে, বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে মুসলমানদের গণনা সঠিক হয়নি বলে দাবি করে মুসলমানদের নাগরিকত্ব প্রমাণিত পাওয়া যায়নি বলে পুরায় গণনা চালানোর অনুমতি। যাতে তাতে বেশিরভাগ  মুসলমানই নাগরিকতে প্রমাস্ন করতে পারেন এমন ফাইনাল রিপোর্ট দেয়া যায়। কিন্তু এত বড় জুয়াচুরিতে গগৈ রাজি হননি। তাই নাগরিক গণনা্র আগের লিস্টই ফাইনাল বলে তিনি রায় দিয়ে দিলেন। তাতে ব্জেপি নাখশ হয়। তাই থেকে বিজেপি গণনা ও ফলাফলের সব দায় কিছুটা আদালতের আর পুরাটা  সমন্বয়ক আমলা প্রতীক হাজেলার ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজ ইমেজ বাঁচাতে নেমে পড়েছিল। আর তখন থেকে অসমিয়া জাতিবাদের সাথে হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী বিজেপির আঁতাত দুর্বল হয়ে যায়।

    পরিণতিতে অসমিয়া জাতিবাদীরা ১৯৮৫ সালের স্টাইলে আবার মাঠের আন্দোলন শুরু করে দেয়, কিন্তু এবার বিজেপির বিরুদ্ধে। এরই ফলে বিজেপি রাজ্য সরকারে এখনো ক্ষমতায় বহাল আছে বটে, কিন্তু মিটিং-মিছিল করতে পারে না; জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ওদিকে অসমিয়া জাতিবাদীরা আবার বিদেশবিরোধী পুরনো স্লোগান তুলে অসমিয়া সমাজে ও মাঠে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। আর বিজেপি একেবারে কোণঠাসা। এর মধ্যে মোদী তিনবার আসাম সফরের কর্মসূচি ঠিক করেছিলেন এই ভেবে যে নতুনভাবে অসমিয়া জাতিবাদের সাথে একটা আপোষ প্যাচআপ করা যায় কিনা! কিন্তু অসমিয়া জাতিবাদের তাজা অসন্তোষের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে শেষে তিনবারই তা বাতিল করে দিয়েছেন। কেবল একবার আসামের বোড়ো অঞ্চলে বোড়ো ইস্যুতে সংক্ষেপে সফর সেরে এসেছিলেন। এদিকে আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পরই অথবা একই সাথে আসামেও আবার রাজ্য নির্বাচন হবে ২০২১ সালের মে মাসের দিকে। তাই রঞ্জন গগৈকে রাজ্যসভায় সদস্য করে দেয়া – এটাকে মোদী সরকারের  আবার নির্বাচনের আগে নতুন করে অসমিয়া জাতিবাদীদের সাথে বিজেপির আঁতাতেরই এক মরিয়া চেষ্টা হিসেবে দেখতে হবে। এ প্রসঙ্গে আরেক খবর হল, রঞ্জন গগৈর ছোট ভাই হলেন অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল অঞ্জন গগৈ। তাকেও দুই মাস আগে রঞ্জন গগৈর মতোই মোদীর সরকার ‘নর্থ-ইস্টার্ন কাউন্সিল’ বলে স্থানীয়দের সংযুক্ত করে এক আঞ্চলিক সরকারি পলিসি সুপারিশের প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ওয়্যার [WIRE] পত্রিকায় ‘দুই গগৈ ভাইয়ের নিয়োগের গল্প’- এই রিপোর্ট পাঠ করা যেতে পারে।  অতএব, বিচারপতি রঞ্জন গগৈর নিয়োগ বিজেপির নতুন আসাম মিশনেরই অংশ। রঞ্জন গগৈর ডিগবাজি খাওয়া দেখে তারই এক কলিগ আরেক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কুরিয়ান জোসেফ খুবই কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন [‘Surprised How Ex-CJI Compromised on Judiciary’s Independence’, Says Justice Kurian Joseph]।  তিনি বলেন, রাজ্যসভার সদস্যপদ গ্রহণ করে গগৈ ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা’- নীতির সাথে এক বিরাট আপস করলেন [“According to me, the acceptance of nomination as member of Rajya Sabha by a former CJI, has certainly shaken the confidence of the common man on the independence of judiciary……]। অথচ আমরা চার বিচারক একবার একসাথে জনগণের সামনে এ নিয়ে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলাম।

    এদিকে রাজ্যসভায় শপথ গ্রহণ শেষ করা পর রঞ্জন গগৈ এসব বক্তব্যের পালটা প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সাক্ষাতকার দিয়েছিল।  সেখানে তিনি মিডিয়ার বিভিন্ন সমালোচনার বিরুদ্ধে সাফাই হাজির করতে চেয়েছেন। কিন্তু পেরেছেন কী?  এক মিডিয়ায় মন্তব্য হল গগৈ “quid pro quo” করেছে, যে প্রবাদের মানে হল  “কোন কিছুর বিনিময়ে কোন কিছু” দিয়েছেন। তিনি এই অভিযোগের সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানে করেছেন যে তিনি অর্থের বিনিময়ে ফেবার করেছেন। অথচ অর্থ এর একমাত্র অর্থ নয়। তিনি দাবি করেছেন রাজ্যসভার সদস্য হয়ে অর্থগত লাভালাভ একজন প্রধান বিচারকের আয়ের মতই। তার এটা নাকি প্রমাণ যে তিনি সওদা করেন নাই। রঞ্জন গগৈ বোকাবোকা কথা বলে নিজেকে বাচাতে চাইলেন। খুব সম্ভবত বিজেপির সাথে বিনিময় বা সাওদাটা অরথের অবশ্যই নয় বরং অহমিয়া জাতিবাদী স্বার্থে তার পুরানা পদকে বিজেপির সাথে ব্যবহার ও বিনিময়-সওদা।  তার মনের সাফাইটা হল তিনি তো বিজেপির সাথে এর পক্ষে কাজ করে মানে সওদা করে অর্থ নেন নাই, বরং অহমিয়া স্বার্থের লাভালাভ পেতে বিনিময় করেছেন। সুতরাই এটা সৎ বা ব্যক্তিস্বার্থ নয়।  অথচ ফ্যাক্টস হল, তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার স্বার্থ নির্বাহি মোদী সরকারের কাছে বেঁচে দিয়েছেন।  আর এতে স্বার্থ বা লাভালাভ গেছে গগৈ-এর পেয়ারের তথাকথিত অহমিয়া জাতের পক্ষে।  এই প্রীতি মারাত্মক অগ্রহণযোগ্য ও না-জায়েজ।

    তিনি সেখানে আরও দাবি তুলেছেন যারা (মানে তিনি যোসেফ কুরিয়ানকে বুঝিয়েছেন) এমন বিবৃতি দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে আদালতের অবমাননার মামলা করবেন বলে তিনি আশা করেন [he hoped the Supreme Court will initiate contempt proceedings ]। তিনি এতটুকু বলেই থামেন নাই। আরও বলেছেন, যে তিনি মনে করেন শেষে দেখা যাবে সুপ্রীম কোর্ট এমন মামলা করবেনই নাই [“I don’t think it’ll happen, though it should happen,”] ।  গগৈ-এর এই মন্তব্য ভারতের বিচারক পাড়াকে সোজা আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের রাজনৈতিক মেরুকরণে দ্বিবিভক্ত করে দিয়েছে।

    এ লেখা পড়ে অনেকের মনে হতে পারে বিজেপিই বোধহয় একমাত্র রাজনৈতিক দল যারা বিচারপতিদের লোভ-লালসায় ফেলে দিয়েছে। এ কথা ভুল, রঞ্জন গগৈর ঘটনাটা সম্ভবত পঞ্চম ঘটনা। আগের তিনটি ঘটনা কংগ্রেসের আমলের। বিচার বিভাগকে আলাদা রাখা, হস্তক্ষেপ না করা, যাতে সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত থাকে- এ ব্যাপারে বিজেপির মতো কংগ্রেসেরও কমিটমেন্ট নেই। আর বিজেপি অনেক সোজাসাপ্টা, তারা পাবলিকের কাছে রাষ্ট্র এমন তেমন স্বচ্ছ হবে বলে কোনো প্রতিশ্রুতিই দেয় না। কারণ বিজেপির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কেমন হবে বা সে নির্মাণ করবে কত ভাল ও মহান হবে সেয়া  এমন ব্যাপারে তার কোনো বিশেষ চিন্তা বা ফোকাসই নেই। ভারতকে হিন্দুত্বের রাষ্ট্র হতে হবে, সম্ভব হলে হিন্দুরাষ্ট্র গড়তে হবে- বরং এই হল তার প্রতিশ্রুতি। এর বিপরীতে কংগ্রেস মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিবে এবং সেই প্রতিশ্রুতি আবার অবলীলায় ভাঙবে।  এই হল কংগ্রেস। যেমন রঞ্জন গগৈর ঘটনায় কংগ্রেস খুবই সোচ্চার ও নিন্দা জানিয়েছে। অথচ নিজেদের আমলের একই ব্যত্যয়ের ঘটনা সম্পর্কে তারা একেবারে নিশ্চুপ। ভারত রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ার এটাও একটা বড় লক্ষণ।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা গত ২১ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে  “বিচারপতি গগৈ বিজেপির আসাম মিশনের অংশ“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভাঙনের দিকে ভারত রাষ্ট্র আরও এগিয়ে গেল

     ভাঙনের দিকে ভারত রাষ্ট্র আরও এগিয়ে গেল

    গৌতম দাস

     ০২ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2TE

     

    মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা যুবায়ের – রয়টার্স

    দিল্লির ম্যাসাকার বা নির্বিচার হত্যাকান্ড ভারত-রাষ্ট্রকে ভেঙে পড়ার দিকে কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। রাষ্ট্র ‘ভেঙে পড়া’ মানে অকার্যকর হয়ে পড়া বা টুকরো হয়ে যাওয়া। সেই পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন মানে, সিএএ’র বিরোধিতা আর দিল্লি রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির শোচনীয় হার এসবের বদলা-প্রতিশোধ নিতে মোদী-অমিত বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।  দিল্লি জ্বলছে, ইতোমধ্যে কমপক্ষে ৪২ জন এই জিঘাংসার বলি।

    বৈষম্য বা রাগবিরাগের প্রধানমন্ত্রী মোদী
    মোদী-অমিতের মনে কী আছে তা উন্মোচিত হয়ে পড়েছে এবার। ভারত-রাষ্ট্রের মুখ্য দায়ীত্বে থাকা ব্যক্তিদুজন যে কতটা নৃশংস হয়ে উঠতে পারে সেটা এখন প্রমাণসহ হাজির হয়ে গেছে।  যেমনঃ জেলা শহরের ছোট এক হাসপাতাল [Al Hind Hospital, a nursing home] থেকে কয়েকজন মুসলমান রোগীকে আরও চিকিৎসার প্রয়োজনে বড় হাসপাতালে [GTB বা Guru Tegh Bahadur Hospital ] স্থানান্তর করতে পুলিশ প্রটেকশনের অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে দরখাস্ত দেয়া হয়েছিল। পুলিশ তা সন্ধ্যা পর্যন্ত করেনি। এ দিকে বিবিসির এক ভিডিও রিপোর্টে দেখা গেছে, রোগী বহনরত অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সের ওপর হামলা করা হয়েছে। রড দিয়ে গ্লাস ভেঙে ফেলা হয়েছে আর এক মেডিক্যাল কর্মী আবেদন করে বলছে – “এটা তো সরকারি অ্যাম্বুলেন্স। তাই হিন্দু-মুসলমান যেই হোক সবার প্রয়োজনে আমাদের সাড়া দিতে হবেই। কাজেই আমাদের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ার তো কিছু নেই”।
    এসব বিবেচনা করেই রোগীর আত্মীয়স্বজনরা উকিলের মাধ্যমে সন্ধ্যার পর দিল্লি রাজ্য-হাইকোর্টের  প্রধান বিচারপতি এস মুরলীধর [ঐ মামলার পর এখন বদলি করে দেয়া হয়েছে] এর সাথে যোগাযোগ করেন। বিচারক তৎক্ষণাৎ আদালত বসানোর ব্যবস্থা করে রিট আবেদন শুনে এর নিষ্পত্তি করে পুলিশ প্রশাসনকে অবিলম্বে সহযোগিতা করার আদেশ দেন। কিন্তু তাতে মোদী সরকার এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঐ বিচারককে পাঞ্জাব-হরিয়ানার হাহকোর্টে বদলি করে দিতে, পেন্ডিং এক বদলির আদেশ চাঙ্গা করে আর প্রেসিডেন্ট কোবিন্দ তাতে সই করেছেন। আর তা তৎক্ষণাৎ কার্যকর করতে নির্দেশ জারি হয়েছে। পরদিন মোদীর এক মন্ত্রী এ ঘটনায় সাফাই দিয়ে বলেছেন, এটা রুটিন বদলি।
    মোটেও তা নয়। বরং মোদী সরকারই প্রধান দোষী। অসুস্থতার চিকিৎসায় মানবিক কারণেই রোগীকে সরকারের আগ বাড়িয়ে সহায়তা দেয়া উচিত ছিল। এটা ছাড়াও, নাগরিকের চিকিৎসাকাজে সহায়তা পাওয়া, রোগী মুসলমান হন আর না হন তা রোগীর নাগরিক অধিকার। অথচ তার প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে, মূলত মুসলমান বলে। এভাবে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হয়েছে। একজন বিচারপতি এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক আদেশ দিয়েছেন। অথচ সরকার তাকেই বদলি করে দিয়েছে।
    অনুমান করি, আসলে মোদী সরকার ভয় পেয়েছে যে সরকারের বিরুদ্ধে এই বিচারক মুরলীধর এর এমন আদেশ দেয়া চালু রাখলে অমিত শাহের দিল্লির পুলিশের প্রটেকশনে মুসলমানদের উপর হামলার বিরুদ্ধে সবাই দলে দলে ঐ আদালতের দ্বারস্থ হওয়া শুরু করতে  পারে। কারণ ইতোমধ্যে ঐ রাতেই ঐ একই আদালত আরো দু’টি রিট মামলার নিষ্পত্তি করে রায় দেন। সে কারণেই সকালে যেন ঐ বিচারক আর আদালত বসাতে না পারেন, সে ব্যবস্থাটাই বন্ধ করে দিয়েছে মোদী সরকার। সারা দুনিয়ার অধিকার প্রসঙ্গে সংবেদনশীল কোনো প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ধরনের নাগরিক বৈষম্য ও প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ নেয়ার করা চিন্তাই করতে পারে না। অথচ মোদী-অমিত নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করা ও নাগরিককে নিরাপত্তাদানের জন্য শপথ নিয়েও তা ভঙ্গের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন কেন? এটাই তাদের মন যে রিরি করা ঘৃণায় পরিপুর্ণ হয়ে আছে এরই প্রমাণ।
    অমিত-মোদী এখানেই থামেন নাই।  তারা বিচারক মুরলীধরের সিদ্ধান্ত ক্ষুব্ধ হয়ে তাতে আরও বাধা সৃষ্টি করেছেন। হাসপাতালে পৌছানোর পথে পুলিশ বসিয়ে আবার বাধা দিয়েছে। আর এর শক্ত প্রমাণ এর হল দুটা ভিডিও ক্লিপ যা ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে আছে।  আর বড় হাসপাতালে [GTB] রোগীদের সাথে যেতে আলহিন্দ হাসপাতাল থেকে আসার সময় একজন ডেন্টিস্ট ডাক্তার তাদের সবাইকে এসকর্ট করে সাথে আসছিল। সে ডাক্তারের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষ্যের বর্ণনা ইংরাজি টেলিগ্রাফ পত্রিকায়  পয়লা মে “Eyewitness account: Delhi Police beat up wounded riot victims, said ‘if he dies, he dies’ ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছে। তাতে ঐ ডাক্তার [তাঁর নাম, ডাঃ মেরাজ বিন একরাম] ঘোষণা দিয়েছেন তাঁকে যদি আবার সরকারের দিক থেকে বাধা দেওয়া হয় তবে যেকোন পরিণতি মোকাবিলা করতে তিনি প্রস্তুত। [Ekram added: “This is the truth. If I have to face consequences for telling the truth, I will.”]।

    বাংলাদেশে যেমন ফেক বা ভুয়া নিউজ চেক করে সত্যতা যাচাই করার ওয়েব গ্রুপ আছে “ফ্যাক্ট চেক” [Fact Check] নামে; সেরকম ভারতের একটা গ্রুপের নাম অল্ট. নিউজ [Alt.News]। তারা আরও একটা প্রায় একই রকম ভিডিও দেখে বিচার করে নিশ্চিত করে দিয়েছে যে ভাইরাল হওয়া আগের ক্লিপটা ফেক নয়, বরং জেনুইন। ইংরাজী টেলিগ্রাফ পত্রিকা  আরও জানিয়েছে,  তারা পুলিশের মুখপাত্রকে এনিয়ে করা ফোনের বা টেক্স ম্যাসেজের কোন সাড়া তিনি দেয় নাই।  আসলে পুলিশের গ্রুপ যেটা রোগীদের হাসপাতালের পৌছানোর পথে এই গুন্ডামি – অসুস্থ, মৃত্যু পথযাত্রী বা অজ্ঞান রোগীকে আবারও রড দিয়ে পিটিয়ে জাতীয় সঙ্গিত গাইতে বাধ্য করা ইত্যাদির ন্যুইসেন্স করছিল  সেটা ছিল একটা হাইরাইজ আবাসিক বিল্ডিং এর নিচের রাস্তায় দাঁড়িয়ে। আর ঐ বিল্ডিংয়ের দুই বাসিন্দাই উপর থেকে মোবাইলে ঐ ভিডিও ধারণ করেছিল।  তাই, পুলিশের কাছে এর সেখবরই ছিল না। সে কারণে এই অকাট্য প্রমাণ রয়ে গেছে।
    এই ঘটনা ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণ সাথে থাকায় শুধু দিল্লি পুলিশের প্রধানই নয়,  এই মারাত্মক অপরাধের সাথে কমিশনার ও পুলিশ প্রধানের সরাসরি বস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শাহের বস প্রধানমন্ত্রী মোদীসহ জড়িত সকলের নাম জড়িয়ে গেছে এখন। অথচ নাগরিক বৈষম্য দূর করা রিপাবলিক ভারতরাষ্ট্রসহ যেকোন রাষ্ট্রের প্রধান কর্তব্য ও রাষ্ট্রবৈশিষ্ট্য। ঘটেছে উলটা – বৈষম্য করা বা রাগবিরাগের বশবর্তী হয়ে পরিচালিত হওয়ার অপরাধ করে বসেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের মন্ত্রী। এটা যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক ও অকার্যকর হয়ে পড়ার আগের লক্ষণ।

    এটা দাঙ্গা নয়, পরিকল্পিত ম্যাসাকার
    লক্ষণীয় যে, দিল্লির এই ম্যাসাকারগুলো হয়েছে গত দিল্লি নির্বাচনে হাতেগোনা যে ক’টা আসনে বিজেপির প্রার্থীরা জিতেছে কেবল এমন কনস্টিটুয়েন্সিতে। তবুও দিল্লিতে এই ম্যাসাকার, এটা কোনো দাঙ্গা ছিল না। এটা ছিল একপক্ষীয়ভাবে মুসলমানদের ওপর হত্যা ও নির্যাতন করে জিঘাংসা চরিতার্থ করা, যাতে তারা ভয়ে চুপ করে আরও মার্জিনাল হয়ে বসবাস করতে শুরু করতে বাধ্য হয়, মেনে নেয়। এনিয়ে আনন্দবাজারের এক রিপোর্টের শিরোনাম, – “গুজরাতের মতো দাওয়াই না দিলে চলবে না! শাসানি দিল্লিতে”। অর্থাৎ এটা ছিল গুজরাট স্টাইলে দাওয়াই – দাবড়ে দেয়া!
    আগেও বলেছি, প্রশাসনিক কাঠামো হিসাবে  দিল্লি একটা রাজ্য হলেও এটা আবার ভারতের রাজধানী বলে কনস্টিটিউশন অনুসারে দিল্লির পুলিশ প্রশাসন সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অধীনে। তাই  অন্যসব রাজ্যে তাদের মুখ্যমন্ত্রীর অধীনে রাজ্য পুলিশ প্রশাসন থাকলেও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিলালের অধীনে কোন পুলিশই নাই। এটাকেই সুযোগ হিসাবে নিয়ে সদ্য দিল্লি রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি শোচনীয় হেরে গেলেও এই অমিত শাহ দিল্লির ওপর ছড়ি ঘুরাতে, ম্যাসাকার করতেই বেছে নিয়েছিলেন এক পুলিশ প্রধান হিসাবে, কমিশনার ‘অমূল্য পট্টনায়েককে’। উনি ইতোমধ্যে রিটায়ার্ড অথচ তাকে এক মাসের এক্সটেনশন দিয়ে অ্যাকটিভ করে দিল্লির পুলিশ কমিশনার করে রেখে দেয়া হয়েছে, কুকামগুলো সম্পন্ন করে নেয়ার জন্য। ইতোমধ্যে তিনি অবসরে চলে যাওয়াতে এখন ঘটনার দায় ঢাকতে সুবিধা হবে – এই হল অমিত শাহের অনুমান।  কয়েক দিন আগে কাপড়ে মুখ ঢেকে জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে [JNU] (ও জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও) একইভাবে পুলিশের প্রটেকশনে বিজেপির কর্মীদের হলে ঢুকতে দিয়ে, সব বাতি নিভিয়ে দিয়ে এই পট্টনায়েকই হামলা করিয়েছেন বিজেপিবিরোধী ছাত্র সংসদের সদস্যদের ওপর। হামলা সম্পন্ন করার পর পুলিশি প্রটেকশনে হামলাকারি বিজেপির ছাত্র সংগঠনের কর্মিদের বের হয়ে চলে যেতে দেন। এরপর রাস্তার বাতি ফিরে জ্বালিয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছিল।
    দিল্লির চলতি ম্যাসাকারের বেলাতেও এই কমিশনারের পুলিশি প্রটেকশনে বিজেপি-বজরং-হিন্দুসেনা কর্মিদেরকে নিরাপত্তা এসকর্ট দিয়ে এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর তাদের দিয়ে বেছে কেবল মুসলমানদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা নির্যাতন আর তাদের বাড়িঘর, সম্পত্তি লুটপাট ও জ্বালিয়ে দেয়ার তাণ্ডব ঘটিয়েছেন তিনি। দিল্লিতে আক্রমণ চালাতে গিয়ে যেসব ও যে পরিমাণ উপাদান বা অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে তা দেখে এক পুলিশ অফিসারের মন্তব্য, এগুলো সংগ্রহ করতে কমপক্ষে দু’সপ্তাহের প্রস্তুতি লেগেছিল। অর্থাৎ এটা একটা পরিকল্পিত হামলা।

    গঙ্গাজল
    নৃশংসতা নিয়ে ভারতের বিহারের একজন প্রযোজক-পরিচালক একটা সিনেমা বানিয়েছিলেন – নাম ‘গঙ্গাজল’। সেখানে ‘গঙ্গাজল’ বলতে এসিড বুঝানো হয়েছিল। মানে, নৃশংসতা হিসেবে জীবন্ত মানুষের চোখ এসিড ঢেলে পুড়িয়ে দেয়া। দিল্লির হামলাতেও বিজেপির কৌশল ছিল ‘গঙ্গাজলের’। এ পর্যন্ত অন্তত চারজন নিরীহ মুসলমানকে হাসপাতালে কাতরানো অবস্থায় পাওয়া গেছে, যারা এখনো বেঁচে আছেন কিন্তু তাদের চোখ এসিড ঢেলে গলিয়ে দেয়া হয়েছে। ভিন্ন ঘটনায়, এসিডসহ এর বহনকারী চার বজরং কর্মীও আটক হয়েছে যারা সিএনজিতে চড়ে যাচ্ছিল [অটোর ভিতর থেকে অ্যাসিডের বোতল-সহ আটক করা হয়েছে চার যুবককে]।

    আশ্রয় ও নিরাপত্তার খোঁজে – আনন্দবাজার

    এদিকে প্রায় সপ্তাহজুড়ে হামলা শেষে দিল্লিতে এখন শুরু হয়েছে মাইগ্রেশন। মুসলমানেরা বাড়িঘর ছেড়ে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পরিবার নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। ভিন্ন শহরের পাড়া বা কনস্টিটুয়েন্সিতে বন্ধু-আত্মীয়ের বাসা খুঁজে ফিরছে।
    এসিড হামলা নিয়ে আনন্দবাজার লিখেছে এক লোমহর্ষক রিপোর্টঃ

    “…আর একটি উদ্বেগজনক বিষয়, মুস্তাফাবাদ থেকে আজ বেশ কিছু আহত এসেছেন হাসপাতালে। তাঁদের অনেকের চোখে অ্যাসিড ঢালা হয়েছে। দৃষ্টি হারিয়েছেন চার জন। খুরশিদ নামে এক জনের দু’চোখই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তেগ বাহাদুর হাসপাতাল থেকে লোকনায়ক জয়প্রকাশ হাসপাতালে আসার জন্য অ্যাম্বুল্যান্সও পাননি তিনি। গিয়েছেন রিকশায়। দুই চোখ-সহ পুরো মুখ ঝলসে গিয়েছে ওয়কিলের। …এটা স্পষ্ট, আগুন লাগানো, পাথরবাজি, গুলির সঙ্গে ‘গঙ্গাজল (অ্যাসিড)’-এরও আয়োজন করা হয়েছে রীতিমতো  আট ঘাট বেঁধে।”

    আবার অমিত শাহের কৌশল ইতরামিতে এতই প্রখর যে আগেভাগেই আদালতে  মোদীর সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা … দিল্লি হাইকোর্টকে জানিয়েছেন, “পুলিশকে নাকি অ্যাসিড হামলার মুখে পড়তে হচ্ছে”। মানে আগেই হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন তিনি।

    মোদী-অমিত বিপদঃ
    পাবলিকের উপস্থিতি যেখানে মদী-অমিতকে চেহারা দেখাতেই হয় সেসব কিছু এড়িয়ে পালিয়ে ফিরছে মোদী-অমিতও।  এই সময়টা মোদী-অমিত বিরাট বিপদের সুতার উপরে হাঁটছেন। ঘটনা-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া বাড়ছে দেখে মোদী-অমিত ভয়ও পেয়েছেন মনে হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সফর ছিল ২৪ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি। তাও ২৪ তারিখটা সরাসরি গুজরাটে নেমেই। আর ২৫ তারিখটা তিনি ছিলেন দিল্লিতে রাতে ডিনার শেষ করা পর্যন্ত। কিন্তু এটা আর এখন লুকানোর কোনো সুযোগ নেই যে, অমিত শাহ পরিকল্পিত হামলা শুরু করিয়েছিলেন নিজ দলের কপিল মিশ্রকে সামনে রেখে। মিশ্র বড় প্রভাবশালী নেতা হওয়ার উচ্চাকাক্ষী হলেও এবারের দিল্লি নির্বাচনে পরাজিত এক রাজ্য এমএলএ। অমিত শাহ  নিজেকে সুরক্ষিত ও আড়ালে রাখতে তাই কপিলের মুখ দিয়ে বলিয়েই প্রত্যক্ষ হামলার হুমকি দেয়ার বে-আইনি  কাজটা করিয়েছেন।
    উত্তরপূর্ব দিল্লি জেলার জাফরাবাদে, যেটা মূল হামলার কেন্দ্র, সেখানে শাহীনবাগের মতই এক অবস্থান ঘর্মঘট চলছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে। পুলিশের এক সহকারী কমিশনারকে সাথে নিয়ে কপিল ২৪ তারিখে এখানে এসে অন ক্যামেরায় হুমকি দেন যে, “পুলিশ এই স্থানীয় অবস্থান সমাবেশ ভেঙে না দিলে তিনি নিজে ট্রাম্পের চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা নাও করতে পারেন। তিনি এটা ভেঙে দেবেন”। এই হুমকির ভিডিও ক্লিপ এখন  ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেছে। এরপর সে রাতেই ঐ সমাবেশের আশপাশে তিনি এক ট্রাক পাথর আনলোড করিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেন। পরদিন সকালে এই পাথর দিয়েই হামলা শুরু হয়েছিল। নিজের হাতে আইন তুলে নেয়া আর পুলিশের উপস্থিতিতে এই হুমকি দেয়া স্পষ্টতই কপিল মিশ্রের করা একটি ক্রিমিনাল অফেন্স।
    অথচ প্রকাশ্যে এই ঘোষণা না দিয়েও বিজেপি একই হামলা ও ম্যাসাকার তো করতে পারত। তাহলে ঘোষণা দিয়ে করার মানে কী? তা হল- আমিই (বিজেপি) ক্ষমতা- এই দম্ভ দেখানো; যাতে হামলা খেয়ে ভয়ে মুসলমানেরা এই ক্ষমতার কাছেই নতজানু হওয়া লুটিয়ে পড়া উপায়হীন শ্রেয়কাজ মনে করে। একইভাবে গত নির্বাচনের সময় অমিত শাহ এই কপিলকে দিয়েই মুসলমানরা ‘দেশদ্রোহী’, তাদের ‘গোলি মারো’ বলে স্টেজ থেকে বিবৃতি পড়ে শুনিয়েছিল। অমিতের ধারণা এই হুঙ্কার দেয়ার কাজটা তিনি নিজে না করে কপিলকে দিয়ে করালে তিনি কপিলকেও প্রটেক্ট করতে পারবেন আর নিজেকেও হুকুমদাতা সংগঠক মূল নেতা হয়েও আড়ালে রাখতে পারবেন। কিন্তু বিপরীতে, নিজে করলে আদালতে প্রমাণসহ দায়ী বলে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। আর তাতে বলা যায় না, মোদীও অমিতের সাথে সহমরণ থেকে সেক্ষেত্রে সম্ভবত খুব বেশি দূরে থাকতে পারবেন না। এসব বিবেচনা থেকেই মোদী ও অমিত দিল্লির হামলা ইস্যুতে পাবলিক এড়িয়ে চলা বা কোন ঘরোয়া সমাবেশে সামনে নিজেরা মুখ খোলা এড়িয়ে যেতেই ‘কপিল মিশ্র’ ধরনের উচ্চাকাঙ্খী লোকদের সামনে আনছেন।

    মানুষের অসহায়ত্ব আর হতাশা – গার্ডিয়ান

    এদিকে ম্যাসাকারের চতুর্থ দিনেও মোদী (বা অমিত) মুখ না খুললেও ম্যাসাকার বেশি হয়ে গেছে কি না এই ভীতি থেকে মোদী ঐদিন প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালকে দিল্লির ‘স্বরাষ্ট্র ইস্যু’ দেখতে দায়িত্ব দিয়ে ঘটনাস্থলে পাঠান। কিন্তু প্রথম আট-দশ ঘণ্টা দোভাল প্রকাশ করেননি  ঠিক কী পরিচয়ে তিনি দিল্লিতে তদারকি কাজে নেমেছেন। ইতোমধ্যে  মিডিয়ায় জল্পনা রিপোর্ট প্রকাশ হয়ে যায় যে, তবে কি এটা ” দিল্লি পুলিশের দায়ীত্বে থাকা মন্ত্রী অমিতের উপর মোদীর অনাস্থার প্রকাশ”? এই জল্পনা আরো বাড়িয়ে দেয় সে সময় সোনিয়া গান্ধীর এক প্রেস কনফারেন্স। তিনি দাবি করেন, দিল্লি্কে রক্ষার ব্যর্থতায় অমিতকে পদত্যাগ করতে হবে। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার সারা দিন ড: মনমোহন সিং অমিতের পদত্যাগ দাবি করেছেন সেটা ভারতের টিভিগুলোর টেলপে স্ক্রল করে দেখিয়ে গেছে। ওদিকে দোভালের বিপদ হল, প্রেসকে যদি বলেন মোদী তাকে পাঠিয়েছেন তাহলে প্রশ্ন উঠবে, অমিত শাহ কি ব্যর্থ? তাই তিনি বলে বসেছেন যে, না অমিত শাহও তাকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু তাতেও কিছু ঢাকা পড়ে নাই।
    কিন্তু দোভালের দিল্লির দায়িত্ব নেয়া বা পাওয়া, এটা আবার তাঁর পদ-পদবির দিক থেকেও মিলে না। প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাগিরি করা মূলত বহিঃরাষ্ট্রবিষয়ক কাজ অথবা বড়জোর ‘র’সহ গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তদারকি পর্যন্ত। কিন্তু ভারতের কোন ধরণের সশস্ত্র  “বাহিনীর বা ফোর্সের” উপর কমান্ড করা তার কাজ নয়। কাজেই দিল্লি পুলিশের তাঁর উপর মাতব্বরির দায় নেয়া কাজটা মিলে না। এছাড়া হামলাকারির মূলনেতা অমিত নিজেই যদি দোভালকে এখন সেই হামলা ঠেকাতে পাঠায় তবে এই পরস্পরবিরোধী একই অমিতের মনের কারণে দোভালের কাজে এর ছাপ পড়ারই কথা। যেমন দিল্লির অলিগলিতে একটা বাচ্চা মেয়ের অভিযোগে তিনি বলে বসেন ‘‘যো হো গ্যায়া হো গ্যায়া।… আর এনিয়ে মিডিয়ায় সোরগোল এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা বলা পুলিশের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির মুখে মানায় না।। আসলেই তাই। পুলিশ বলবে আমরা তাকে গ্রেফতার করে আদালতে তুলব – এমন একশনের কথাই হতে হয় পুলিশের কথা।
    সম্ভবত এসব বিবেচনায় মোদী-অমিত এক কানপড়া রিপোর্ট ছাপিয়েছেন দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় “বেনামি সূত্র” থেকে  পাওয়া খবর বলে। দাবি করা হয়েছে ‘ট্রাম্পকে বিদায় দেয়ার পর থেকে মোদী নাকি খুবই আপসেট। মোদী মনে করছেন, দেশে-বিদেশে তার ইমেজ ইজ্জত গেছে।’ [ Upset with how the Hindu-Muslim riots in Northeast Delhi overshadowed the visit of US President Donald Trump to India, Prime Minister Narendra Modi ]  গোপন সুত্রের এই দাবির সত্য-মিথ্যা যতটুকুই হোক মোদী-অমিতের এখন উভয় সঙ্কট হল, প্রকাশ্যে দিল্লি ম্যাসাকার ইস্যুতে মিডিয়ার সামনে মুখ খুললেই সরাসরি এর দায় তাঁদের ওপর এসে পড়বেই। কারণ দিল্লি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব এবং দিল্লি পুলিশের বস হলেন অমিত। বলতে গেলে এর দায়িত্ব মোদীর মন্ত্রীসভার। সে জন্য মিডিয়া এড়িয়ে চুপ করে চলতে চাইছেন মোদী-অমিত দু’জনই। এজন্য  দোভালকে দিল্লি পাঠিয়েই দিল্লির অলি-গলিতে দোভাল যাচ্ছেন এর লাইভ ছবি টিভিতে ব্যাপক প্রচার করা হয়েছে। আর  এতে দেখাতে চেয়েছেন মোদী-অমিত অনেক ব্যস্ত মানুষ তাই অজিত দোভালকে পাঠিয়ে ঠিকই খবরাখবর নিচ্ছেন। কিন্তু এর আবার বিপদ হল, বাজারের মোদী-অমিতবিরোধী যেসব বয়ান বা কানাঘুষা চলছে এর বিরুদ্ধে মোদী-অমিত নিজের বয়ান ও গল্প ঠিকঠাক তাঁরা নিজে পাবলিকলি হাজির থেকে তা প্রকাশ করে পালটা সুযোগ নিতে পারছেন না।

    মোদী-অমিতের পিছনে টিকটিক করা অন্য বিপদ – আদালতঃ
    অন্য দিকে, এই মুহূর্তে মোদী-অমিতের সবচেয়ে সম্ভাব্য বিপদ হল – আদালত।  ভিকটিম ও ক্ষতিগ্রস্থরা যতজন আদালত পর্যন্ত পৌছাতে পারবেন, প্রতিকার চাইবেন – সেটা কেবল শুধু মোদী-অমিত নয় আদালতের জন্যও যথেষ্ট পরীক্ষার। আদালতকে মোদী-অমিতের বিরুদ্ধে একশনে যাবার  তাকত দেখাতে হবে এই চাপ বাড়তেই থাকবে। সেটা আদালত এড়াবে কী করে? আদালত না চাইলেও এটা  যেকোন সময় যেকোন দিকে টার্ণ নিতে পারে।  তবে যেভাবে চাপ বাড়ছে সেটা অবশ্যই সব পক্ষের জন্য খুবই বিপদের ইঙ্গিত।  ইতোমধ্যে কপিল মিশ্রসহ অন্তত চারজন বিজেপির  ফেল করা বা প্রাক্তন এমএলএ-এর বিরুদ্ধে গত নির্বাচনী আইনভঙ্গের অভিযোগে ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল এরই পুর্ণাঙ্গ মামলায় মামলা রুজু [FIR] করার নির্দেশ দিয়ে দিল্লি ছেড়েছেন দিল্লির সাবেক প্রধান বিচারপতি মুরলীধর। তাতে ইতোমধ্যে মামলা রুজু করাও হয়ে গেছে। এবার যদি আরও উপরে সুপ্রিম কোর্টে কোনো রিট হয়ে যায়? এসব নিয়ে মোদী-অমিত চিন্তিত। তাই আদালতের ওপর  মোদী-অমিত নিজেদের লোকের মাধ্যমে প্রচণ্ড পাল্টা চাপ সৃষ্টি ও প্রভাবিত করার চেষ্টা করে চলেছেন।

    তাহলে কি মোদী-অমিত হেরে যেতে পারেন? পাবলিক রিয়াকশনের চাপ তীব্র হলে অবশ্যই হতে পারেন এবং তা খুবই সহজে। মিডিয়া যে চাপটা বাডাতে বড় ভুমিকা রাখছে। এমনকি এর সামান্য সম্ভাবনা থাকলেও তা খুবই বিপদের হবে ।  এখানে পরিস্কার করে একটা কথা বলে ও জেনে রাখতে হবে আমাদের।  এখানেই ভারত-রাষ্ট্র ভাঙনের উভয় সঙ্কটে। কারণ যে ম্যাসাকার ঘটে গেছে এতেই রাষ্ট্রের ভাঙন আরও নিশ্চিত করে গেছে। এখন আদালত যদি নুন্যতম প্রতিকারও না দেখায়, মোদী-অমিতের প্রভাবে বা ভয়ে ভীত হয়ে তাদেরকে মাফ করে দেয়, পালানোর সুযোগ করে দেয়;  তবে, এর সোজা মানে হবে আদালতও রাষ্ট্রকে ভাঙনের পথে আগানোকে আরও সহযোগিতা করল। এটাকে দ্রুত করে দিল। আবার যদি নুন্যতম কিছু একশন নেয় সেটাই মোদী-অমিতকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফেলবে। আর তাতেও ভারত ভাঙ্গন আগাবে। কারণ বিকল্প শক্তি নাই, তৈরি নাই বা হয়নি। যদিও গুজরাট ২০০২ সালের ম্যসাকারের অভিজ্ঞতা বলছে অনেক কষ্ট করে হলেও মোদী-অমিত নিজেদেরকে গুজরাটের মামলাগুলো থেকে শেষে মুক্ত করে ফেলেছেন। কাজেই এবারও পারবে না কেন?। কিন্তু অনেকে এখানে পালটা বলবেন মোদী-অমিত এখন আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়ীত্বে না। এখন তারা কেন্দ্রের সরকারের দায়ীত্বে। অতএব এর ওজন বেশি, সংশিষ্ট বিপরীত স্বার্থের পক্ষগুলো ও তাদের স্টেকও অনেক বেশি। কাজেই এবার একই রকমভাবে ঘটনা শেষে হবে না। না হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি হয়ত।

    ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়াঃ
    সারকথাটা হল, আদালত মোদী-অমিতের কোন অপরাধ আমল ও শাস্তির ব্যবস্থা না করতে পারলেও ভারতের ভাঙন তীব্রভা বাড়বে। তবে আদালত ব্যবস্থা নিতে পারলেও ভাঙন বন্ধ হবে না যদিও ভাঙ্গার তীব্রতা কমতে পারে। আসলে, একা আদালত ভারতের ভাঙন ঠেকাতে পারবে না। এছাড়া আরও  সবচেয়ে বড় পক্ষ বা ফ্যাক্টর হল অন্য বা বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি বা দলের অনুপস্থিতির কারণে ভাঙনের সম্ভাবনা বাড়বে। যেমন সিএএ ইস্যুতে এখনও এটা কোন বিকল্প রাজনৈতিক দলের  আন্দোলন নয়।  এটা মূলত বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক তরুণ মধ্যবিত্ত আর তাদের সহযোগী হল সরাসরি ভিকটিম মুসলমানেরা। (এর বিপরীতে মোদীর পক্ষে তরুণদের আরেক অংশ – মুলত “মফস্বলের তরুণেরা” এরাই বজরং দলসহ বিভিন্ন নামের সেনা এমন বিজেপির অঙ্গ দলগুলোর মুল শক্তি। এমনকি কপিল মিশ্র ধরণের উচ্চাকাঙ্খীদের বয়স লক্ষণীয়। )

    এছাড়া একটু দূরে আর কমপ্লেক্স ভাবে আছে আসাম বা নর্থইস্ট রাজ্যগুলো। যারা ঠিক ছাত্র ও ভিকটিম মুসলমানদের মতই সিএএ-বিরোধী কিন্তু  একইভাবে ও কারণে মোদী-অমিতের বিরোধী নয়, তবে নিজেদের অবস্থান হিসাবে বিরোধী। অর্থাৎ বিজেপির এই বিকল্প বিরোধীদের পরিচয়ই বলে তারা কোন সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হাতে বা রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত কেউ নয়।

    কংগ্রেস অথবা বিরোধী যেকোন আঞ্চলিক দল সিপিএম বা ডিএমকে, জনতাদল ধরণের যারা – এরা সকলেই মনে করে বিভিন্ন রাজ্যে নিজেদের ক্ষমতা পাওয়া যাবে কী করে সেদিক থেকে এই সাপেক্ষে বিজেপির বিরোধী সিএএ ইস্যুটাকে তাদের দেখতে হবে। যেমন পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম-কংগ্রেস জোট করে তৃণমুলের মমতার  বিরুদ্ধে মাঠে নেমে গেছে। প্রকাশ্যেই বলছে এটা মোদী-মমতার বিরুদ্ধে একসাথে  আন্দোলন। এই জোটের জন্য সবচেয়ে ভাল হয় যদি মিথ্যা করে হলেও তারা দেখাতে পারে যে মোদী-মমতার রাজনীতি বা লক্ষ্য এক। এই চেষ্টাটাই সিপিএম-কংগ্রেস জোটের মুল কাজ মনে করে করে যাচ্ছে। কারণ আগামি বছর কলকাতার রাজ্য নির্বাচন, সেখানে মমতাকে ফেলানো  এটাই সিপিএম-কংগ্রেস জোটের প্রধান লক্ষ্য।  মোদী-অমিতের প্রণীত সিএএ-এর বিরোধিতা এই জোটের কাছে এখানে তুলনায় কিছুই নয়। বড়জোর সেকেন্ডারি। এতে মোদী যদি ভারতকে মুসলমান শুণ্য করে ফেলেও দেয় তাতেও তাদের জোটের লক্ষ্য একই থাকবে। কারণ মোদীকে সরানো তাদের মুখ্য ইস্যু নয়, রাজ্যের ক্ষমতা পাওয়াই ইস্যু। এই একই অবস্থা কমবেশি সব আঞ্চলিক দলেরই।
    আবার এসবেরই কিছু উস্কানিমূলক প্রভাব হয়ত আছে ভারতের মুসলমানদের উপর। তারাও সিএএ কে কেবল মুসলমানদের ইস্যু হিসাবে দেখার পক্ষপাতি। যাতে এটাকে কারণ দেখিয়ে সিএএ-বিরোধিতা কেবল মুসলমানদেরই বিরোধীতা হিসাবে তুলে ধরতে পারে।  মুসলমানেরা সিএএ-বিরোধী  ইস্যুতে এলায়েন্স করতে কম আগ্রহী।  মুসলমানেরা ঠিক নাগরিক হিসাবে সিএএ এর বিরোধী হওয়ার চেয়ে বরং মুসলমান হিসাবে এর বিরোধীতার আন্দোলন করতে চায়। মুসলমানেরাই কেবল মুসলমানদের কজে[cause] বা কারণে সোচ্চার হবে – এই রাজনীতি করতে চায়। এটা নিঃসন্দেহে আত্মঘাতি । এই কৌশলের কারণে ভারতের মুসলমানেরা নিশ্চিন্ন হয়ে যেতে পারে। মূল কারণ, বিজেপি এটাই চায়। মুসলমান হিসাবে মুসলমানেরা সংগঠিত হচ্ছে এটা দেখিয়েই তার হিন্দুদের সহজে  ভয় দেখিয়ে ক্ষেপিয়ে তুলতে পারবে। বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি তো এটাই, ফলে তাদের ভোটের বাক্স ভরে তুলার কাজ সফল হবে বলে বিজেপির অনুমান।
    অন্যদিকে ভারতে মোদীর ম্যাসাকারের বিরুদ্ধে কোন বিকল্প ও সংগঠিত রাজনৈতিক দল নাই। কমন ইস্যুতে এলায়েন্স নাই।  রাজনৈতিক হবু শক্তি আছে, মানুষও আছে কিন্তু কাঠামো বা উপযোগী  রাজনীতি নাই। শক্তিজোট বা এলায়েন্স নাই। এজন্যই ভারত-রাষ্ট্রের ভাঙন অনিবার্য – তাতে তা ধীরে বা দ্রুত তা যাই হোক।  অথচ একেকটা অঞ্চলিক দলের কেবল রাজ্যকেন্দ্রিক ক্ষমতা পাবার পরিকল্পনা ও রাজনীতি আছে – এটাই তো ভারত ভেঙ্গে ফেলার পক্ষে কাজ করা। অর্থাৎ লড়াইটা আগাচ্ছে  “হিন্দুত্ব” বনাম রাজ্যক্ষমতা দখল – এদুই রাজনীতি; যেটা আসলে মূলত  ভারত ভাঙ্গনের সবচেয়ে বড় তোড়জোড় এক রাজনীতি! অবশ্যই এভাবেই এদিকেই তা যাচ্ছে!

    ট্রাম্পের সফরঃ
    অনেকে মনে করছেন ট্রাম্পের ভারত সফর সামগ্রিকভাবে মোদীর ম্যাসাকারের পক্ষে একটা আমেরিকান সমর্থন – এই ইমেজ সৃষ্টির আয়োজন করা। কিন্তু এই অনুমান ভিত্তিহীন; এমন মনে করার কারণ আছে। যদিও এমন ক্যাম্পেইন হয়, হতে পারে। এর আলাদা মুল্যও আছে।
    ট্রাম্পের এই সফর ছিল মূলত আসন্ন নভেম্বরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে  কিছু সম্ভাব্য বাড়তি মাইলেজ পাওয়া যায় কিনা এরই এক প্রচেষ্টা এটা। যাতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান প্রবাসীরা ট্রাম্পকে সমর্থন বা ভোট দিতে পারে। ঠিক মোদীর শেষ আমেরিকা সফরে “হাউডি মোদী” সমাবেশটা যেই লক্ষ্য হাসিলে আয়োজন করা হয়েছিল। আর বিপরীতে ট্রাম্পের সফরে মোদীর এখনকার লাভ হল যে,  মোদীর বিরুদ্ধে তার দেশের বিরোধীদের অভিযোগ যে, তিনি নানান বিতর্কিত আইন পাস করিয়ে বিদেশে ভারতের ইমেজ নষ্ট করেছেন, ভারতকে বন্ধুশূণ্য করে ফেলছেন ইত্যাদি – এসবের বিরুদ্ধে মোদীর সপক্ষে একটা ভালো জবাব হবে ট্রাম্পের এই সফর। দুই নেতার এমন পরস্পরের ব্যক্তিস্বার্থের, পরস্পর পরস্পরের পিঠচুলকে দেওয়ার – সেই সফর ছিল এটা। এ কারণে, হোয়াইট হাউজ থেকেই সফরের আগে ট্রাম্প নিজে এবং একজন স্টাফ অফিসার পরিষ্কার করে বলে রেখেছিলেন যে, এই সফরে কোনো বাণিজ্যচুক্তি হবে না। আর প্রকাশ্য অভিযোগ এনেছিলেন যে,  ভারত  “ভাল আচরণ করে না”।
    এছাড়া ট্রাম্পের একটু ক্ষ্যাপা কথাবার্তাও অশ্যই ছিল।  এমনকি হোয়াইট হাউজের এই উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা মিডিয়াকে জানিয়েছিলেন যে  “ট্রাম্প ভারতে গিয়ে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতার’ বিষয়টি জোরালো ভাবে তুলবেন। তাঁর কথায়,‘‘সব ধর্মকে সমান সম্মান দেওয়ার বিষয়টি ভারতের সংবিধানের অন্তর্গত। গোটা বিশ্ব এ ব্যাপারে ভারত কি করে সেদিকে তাকিয়ে আছে’’ ।

    এছাড়া, ভারতে এসে পাবলিক বক্তৃতায় ট্রাম্প মোদীকে প্রশংসার ছলে বলতে গিয়ে মোদীবিরোধী স্বার্থগুলোও আড়াল থেকে বাইরে এনে ফেলেছিলেন।  যেমন “মোদী ভাল লোক কিন্তু খুব টাফ”। এই টাফ বলতে আসলে এটা মূলত উভয় দেশেরই লেনদেন বাণিজ্যে বাড়তি ট্যারিফ আরোপের লড়াইয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি না হওয়াতে, সেব্যাপারে বলছিলেন মোদী টাফ। কিন্তু এই বাণিজ্যবিরোধ হাল্কা করার জন্য কোন পক্ষ থেকে  কোন কথাবার্তা চালানো এই সফরের কোনই লক্ষ্য ছিল না। সবকিছুই যেমন ছিল সেখানেই স্থবির হয়ে আছে তাই। এমনকি আমেরিকান নৌজাহাজ থেকে উড়তে পারে এমন হেলিকপ্টার কেনার কথাবার্তাও একইভাবে বিতর্কে স্থবির হয়েই আছে।

    কিন্তু যেটা প্রথমে ট্রাম্প ছাড় দিতে চান নাই যে, মুসলমানদের উপর নিপীড়ন বেড়েছে এ নিয়ে “ভারতে গিয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলবেন ট্রাম্প” এমন শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল সফর শুরুর আগের দিন।  কেননা এর বহু আগেই আমেরিকার ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন’ সিএএ ইস্যুতে মোদীর কঠোর সমালোচনা করেছিল। নাগরিক বৈষম্য করার অভিযোগ এনেছিল। কিন্তু মোদী ট্রাম্পের সফরের আগেই এমন মন্তব্য পেয়েই লবি শুরু করে দেন। শেষে মোদী একটি রফা করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, সফরকালে এনিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কোন কথা হবে না। সেটাই বজায় রাখা হয়েছিল আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু শর্ত অনুসারে  ট্রাম্পের বিদায়ের পরের দিনই “দিল্লিতে বেছে বেছে সংখ্যালঘুদের নিশানা করে হামলা চালানো” হয়েছে বলে অভিযোগ করে বসেছে আমেরিকার ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক কমিশন’।

    ভারতীয় মিডিয়াঃ
    মোদীর জাতিবাদী বা পাকিস্তানবিরোধী উস্কানির বিষয় না হলে ভারতীয় মিডিয়া এপর্যন্ত সময়ে সরকারের বিপক্ষে, সময়ে নিরাপদ দূরত্বে থেকে এখন শেষবেলায় পুরোপুরি মোদী সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। তা মোদী-অমিতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক এবং তাদের ‘ডুবিয়ে’ দেয়ার সামর্থ্য রাখে। এমনকি, আনন্দবাজার গ্রুপেরই ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ সবার আগে লিড নিয়েছে। ম্যাসাকারের দ্বিতীয় দিনেই সবার আগে তাদের মারাত্মক শিরোনামটা হল, “গুজরাটের মডেল দিল্লি পৌঁছিয়েছে তখন নিরো ডাইনিং-এ” [Neros dine as Gujarat Model reaches Delhi]।

    রোম পুড়ছিল আর নিরো বাঁশি বাজাচ্ছিল- এর অনুকরণে বা সেটা মনে রেখে এই শিরোনাম। আর ডাইনিং মানে এখানে ঐ ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতেই  দিল্লিতে আরেকাংশে  চলছিল মোদী-ট্রাম্পের নৈশভোজ; সেটাকেই ইঙ্গিতে বুঝানো হয়েছিল।  বুঝানো হয়েছিল মোদী আর ট্রাম্প দুজনেই এখানে উদাসীন, দায়ীত্বজ্ঞানহীন – রোমের নিরো।  আবার গুজরাট বলতে এখানে এই মোদী-অমিত জুটিই ২০০২ সালে গুজরাটে রাজ্য সরকারের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় প্রায় ২০০০ মুসলমানের হত্যা করিয়েছিলেন। তাই বলা হচ্ছে সেই গুজরাত মডেলের ম্যাসাকার দিল্লিতে এসে গেছে। টেলিগ্রাফের দেখাদেখি বহু পত্রিকাই পরের দিন একই লিড শিরোনামের রিপোর্ট করেছে। এ ছাড়া পরের দিনের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সরাসরিই লিখেছে ‘দিল্লির গণ-নৃশংসতার টার্গেট মুসলমানেরা’ [Express says Muslims target of mob violence in Delhi]।

    আনন্দবাজার  পত্রিকাও ছবিতে চিনিয়ে দিয়ে দেখিয়েছিল কিভাবে লাঠি-রড হাতে হামলাকারী আর পুলিশ একসাথে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বা সক্রিয় হয়ে হামলার পক্ষে কাজ ভুমিকা রাখছে। আর এমন সব রিপোর্টে  সকলেই দাবি করে বলেছে বা প্রমাণ দেখিয়েছে যে, “এই হামলা পুলিশের সহযোগিতায় ও প্রটেকশনে ঘটেছে”। ফলে মিডিয়ায় এই চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এমনকি ইনডিপেন্ডেন্ট অর্থে “স্বাধীন বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের কথাও” ফাঁক-ফোকরে উঠে আসছে। যেমন বিজেপির বিরুদ্ধে “হেট ক্যাম্পেইন” বা মুসলমানের বিরুদ্ধে সরাসরি ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য রাখা – এর ক্রাইম, এই অভিযোগ উঠেছে। তাই ২৮ ফেব্রুয়ারির দ্য প্রিন্ট ওয়েব পত্রিকায় দিল্লি বিজেপি সভাপতির বরাতে এক রিপোর্ট করে বলা হয়েছে, বিজেপি দিল্লি সভাপতি মনোজ তিওয়ারি বলছেন, “কোন কোন বক্তব্য হেট ক্রাইম বা ঘৃণা-ছড়ানোর তা মূল্যায়ন ও চিহ্নিত করতে একটা স্বাধীন কমিশন দরকার”।

    এসব কিছু মিলিয়েই ভারতের সরকারব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়ে পড়ার দিকে ধাপে ধাপে আগাচ্ছে!

     লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে “ভারত রাষ্ট্র কোন দিকে আরো আগাল“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

     

  • প্যান্ট খুলে চেক করার নাগরিকত্ব 

    ভারতে হচ্ছেটা কী?
    প্যান্ট খুলে চেক করার নাগরিকত্ব!

    গৌতম দাস

    ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ২১:০৯ বৃহস্পতিবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Tr

     

    ‘Are you Hindu or Muslim?’: TOI photojournalist

    সবাই জানত, অন্তত ভারতের সাংবাদিককুল! কিন্তু কেউ আমল করে নাই। সবাই ভেবেছিল আমি তো সাংবাদিক অথবা হিন্দুগোষ্ঠীর; কাজেই এটা আমার সমস্যা নয়।
    ঘটনা হল, টাইমস অব ইন্ডিয়ার ডিউটিরত এক ফটোসাংবাদিক অনিন্দ্য চ্যাটার্জিকে দিল্লিতে বজরং দলের গুন্ডারা প্যান্ট খুলিয়ে তাঁর “নাগরিকত্ব  টেস্ট” করেছে। এরপর সে “মুসলমান নয়” এটা নিশ্চিত হয়ে তবেই ছেড়ে দিয়েছে।

    গত সোমবার থেকে  রি রি করা ঘৃণা আর হিংসা ছড়ানোর হামলার আগুন লেগেছে  দিল্লিতে। বলা ভালো লাগানো গেছে। এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৪৪ ধারা বা কার্ফু জারি করেও এখনো তা পুরো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। পুলিশ আদৌ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী বা তাদেরকে দেয়া কাজের ব্রিফিং কী ছিল তানিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।  ভারতের মেনস্ট্রিম মিডিয়ার ভাষ্যে ইতোমধ্যে ছবি প্রমাণ ও ব্যাখ্যাসহ পুলিশের দিকে আঙুল উঠানো হয়ে গেছে।  এই নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও এতগুলো মৃত্যু; এর তত্ত্বাবধান ও দায় কার?

    ভারতের কনস্টিটিউশন অনুসারে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থতির সুরক্ষায় দায় রাজ্য সরকারের; কেন্দ্রের নয়। তবে কেন্দ্রের কাজ রাজ্য থেকে অনুরোধ পেলে কেন্দ্রের হাতে থাকা নানান নামের ‘বাড়তি রিজার্ভ ফোর্স’ রাজ্যকে ধারে সাময়িক সরবরাহ করা; কিন্তু এদের ওপরও নির্দেশ-পরিচালনার দায় রাজ্যের হাতে। তবে কোনো কারণে যদি রাজ্য একেবারেই ফেল করে সে ক্ষেত্রে পুরো রাজ্য সরকারই ভেঙে দিয়ে প্রশাসনের কর্তৃত্ব নিজের হাতে তুলে নিতে পারে কেন্দ্র। যদি না কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত আবার কখনো পরে আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে না যায়।

    কিন্তু দিল্লি এসব কিছুর ব্যতিক্রম। সেক্ষেত্রে এর সাফাইটা হল, দিল্লি একটা রাজ্য; কিন্তু একই সাথে এটা ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটাল অঞ্চল’ [NCT] মানে, কেন্দ্রের সরকার যেখানে বসে বা অবস্থিত।  এই বিশেষ আইনের কারণে দিল্লি পুলিশের কর্তৃত্ব দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর (বিজেপিবিরোধী কেজরিওয়ালের) হাতে নয়, খোদ কেন্দ্রের হাতে। যদিও এ নিয়ে পুলিশের ক্ষমতাহীন ঠুঁটো দিল্লি-মুখ্যমন্ত্রীর একটা মামলার ফয়সালা অপেক্ষায় আদালতে মুলতবি আছে।
    বিজেপি চলতি মাসেই শোচনীয়ভাবে দিল্লিতে হেরেছে । দিল্লি এই রাজ্য নির্বাচন শেষে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ফল প্রকাশিত হয়েছিল। শোচনীয় বলছি  এজন্য যে, ২০০২ সালে গুজরাটে প্রায় হাজার দুই মুসলমান মেরে ফেলা কৃতিত্বের(!) রাজ্যসরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এই অমিত শাহ। সেই ‘পারফরম্যান্স’ থেকে এ পর্যন্ত তবু তিনিই ক্ষমতার শিখরে চড়েই গেছেন। থামেননি। কিন্তু এই প্রথমবার দিল্লির নির্বাচনে তিনি মুসলমানবিদ্বেষী স্লে­াগান তোলা ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেন এবং টানা দুই দিন জনসমক্ষে আসেননি। কাজেই গত দু’দিনে দিল্লির জাফরাবাদের মুসলমান-টার্গেট করে করা হামলা ঘটানো এটা দিল্লি নির্বাচনে হারের প্রতিক্রিয়া। এক জিঘাংসা। এই বিশ্বাসে কঠিন অকল্পনীয় নির্যাতন আর চাপের মধ্যে ফেলতে পারলে বিজেপি-বিরোধিতা বন্ধ করার একটা উপায় হতে পারে।  মুসলমানবিদ্বেষী উত্তেজনা তুলে হিন্দু ভোট জড়ো করার মেরুকরণ, এটা বাদ রাখতে বা ভুল মনে করতেই পারে না। এটাই তো বিজেপি!
    গত তিনদিনের ঘটনার মূল কেন্দ্র বলা হচ্ছে উত্তরপূর্ব দিল্লি জেলার জাফরাবাদ ও মৌজপুর মেট্রোস্টেশনের আশপাশ। আর গত রাত থেকে ভাইরাল হয়ে গেছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক রিপোর্ট, যা বাংলাদেশের অনেক মিডিয়া রাতেই অনুবাদ করে ছেপেছে। ঐ রিপোর্টের লেখক এক ফটো জার্নালিস্ট। মিডিয়ায় তার কাজ রিপোর্ট লেখার নয় যদিও, তবুও কারণ, এই রিপোর্টটা খোদ ওই ফটো জার্নালিস্টকে নিয়েই।
    ইতোমধ্যে অবশ্য লক্ষণীয় ভাবে ভারতের মিডিয়ায় ‘ভাষা’ বদলানো শুরু হয়েছে। [যা আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে আবার সরকারবিরোধী হইয়ে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। ] দিল্লির এই ঘটনাকে সবাই রিপোর্ট করছে নাগরিকত্ব আইনের ‘বিরোধী’ আর ‘পক্ষের গ্রুপের’ লড়াই বলে। কেউ কেউ বুদ্ধিমানের মতো কোনো পক্ষ থেকে ‘মোদি মোদি’ বলে স্লে­াগান ওঠার কথা লিখেছে। মানে সরাসরি বিজেপির নাম নেয়া বন্ধ হয়েছে।
    ফটো জার্নালিস্ট হলেন কলকাতার বাঙালি অনিন্দ্য চ্যাটার্জি। সোমবার দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে প্রতি পদে নিজে হিন্দু কি না সেই পরিচয় দিতে দিতে তার কেটেছিল। বা বলা যায় বিজেপির ‘মেরুকরণের’ শিকার হতে বাধ্য হয়েছিলেন। মৌজপুর স্টেশনে এক ‘হিন্দুসেনা’ তাকে তাঁর কপালে তিলক লাগিয়ে দিতে চেয়েছিল। নাছোড়বান্দা হয়ে বলা সেই হিন্দুসেনার ডায়লগ ছিল, “তিলক লাগিয়ে নিলে আপনার কাজ করা সহজ হবে… আপনিও তো হিন্দু; কাজেই এতে ক্ষতি কী?”।
    সেই বিড়ম্বনা কাটিয়ে কিছু দূর এগিয়ে একটা আগুন লাগা বাসার দিকে যেতেই আবার বাধা। তিনি ছবি তুলতে যেতেই ওদের একজন বলে ওঠে, “আপনিও তো হিন্দু, কেন তবে ও-দিকে যাচ্ছেন? আজ হিন্দুরা জেগে উঠেছে’। এভাবে বাধা পেয়ে ঘুরে অন্য দিক দিয়ে স্পটে পৌঁছতে চেষ্টা করলে এবার আরেক দল লাঠি হাতে যারা তাকে ফলো করেছিল তাদের একজন বলে ওঠে “তুই তো দেখি খুবই চালাক! তুই কি হিন্দু, না মুসলমান?” এরপরই তাঁরা সাংবাদিক অনিন্দ্যর প্যান্ট খুলে ধর্মীয় চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করে। কোনোমতে বিনয় দেখিয়ে মাফ চেয়ে তিনি পালিয়ে আসেন।
    এর পরের বর্ণনা আরো চরমের। তিনি এবার ঐ এলাকা ছেড়ে পালানোর কথা ভাবছেন। একটা সিএনজি (অটো) পেয়ে তাতে চড়ে রওনা দেন। রাস্তায় চার তরুণ তাদের আটকে সিনজি থেকে জামার কলার ধরে টেনে-হিঁচড়ে বের করে তারা হিন্দু না মুসলমান জানতে চায়। তিনি নিজে নিরীহ সাংবাদিক বলে পার পেলেও ঘটনাচক্রে ড্রাইভার ছিল মুসলমান। বহু অনুনয় করে ড্রাইভার এক গরীব ছাপোষা বলে মন গলিয়ে তবেই সে যাত্রায় তারা পার পায়।
    উপরের চারটা বর্ণনায়, আপনি হিন্দু হলে মাফ, না হলে টর্চার, তাতে মৃত্যু হলেও এরা বেপরোয়া – এটাই বিজেপির মেরুকরণের রাজনীতি। শুরুতেই কপালে তিলক এঁকে দেয়ার অফার, এর মানে হলো সেই বুশের নীতি, হয় আপনি আমার পক্ষে না হয় আমার এনিমি’। আপনি হিন্দু হলে বিজেপির তিলক আপনাকে পরতেই হবে আর মুসলমান হলে নির্যাতিত বা মরণ সইতে হবে।

    এই রিপোর্টের শুরুতে, লেখক ওসব বিজেপি-সেনা কর্মীকে বর্ণনা করতে কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন তিনি। যেমন, এদের কারণেই দিল্লি “নিয়ন্ত্রণহীন” হয়ে গেছে। এরা “মিসগাইডেড ইয়ুথ”। “আইন হাতে তুলে” নিয়ে “ভায়োলেন্স” ছড়াচ্ছে। এরা “ধর্মীয় আইডেনটিটি” ভিত্তিক ভায়োলেন্স করছে। ইত্যাদি।

    কিন্তু প্রশ্ন হল, গত ছয় বছর ধরে এগুলোই কী মোদীর ভারতে চালু ছিল না? কেউ মুসলমান হলে নিপীড়ন করে “জয় শ্রীরাম” বলানোতে বাধ্য করা,  গরু ব্যবসায়ী হলে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা, এমন যে কাউকে মাটিতে শুইয়ে বুকের উপর লাফ দিয়ে উঠে জোড়া পায়ের লাথি মারার অজস্র ক্লিপ কী আমরা সোশাল মিডিয়ায় দেখিনাই?  অথচ সামাজিক প্রতিবাদ দূরে থাকে ঐ ঘটনাস্থলের চার দিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে নির্বিকার মজা দেখা এই কমন চিত্র কি অনিন্দ্যরা দেখেনি? এমনকি মোদীর সরকারের পক্ষ থেকে “এধরণের ঘটনাগুলো সব গুজব বলে” – এগুলোর কোন অস্তিত্ব নাই বলে মোদীর সংখ্যালঘু মন্ত্রীর বয়ান কী ভারতের মিডিয়া ছাপেনি? কোন মিডিয়াই কী মন্ত্রীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে একটা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম করেছিল? নাকি তখন কি কেবল মনে হয়েছিল “আমি তো সাংবাদিক অথবা হিন্দুগোষ্ঠীর!  কাজেই সমস্যাটা আমার না” – এমন মনে হয়েছিল তাই নয় কি? তাহলে আজ অনিন্দ্যদের দুঃখের কথা জানাতে চাচ্ছে কেন?  কে শুনবে? মোদী না অমিত শাহ? কী আশা করেছিলেন আপনি?

    বরং নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন? কেন এতদিন চুপ ছিলেন? মুসলমানদের উপর হচ্ছিল বলে? তুচ্ছ করে? তাহলে আপনি কী?

    সারা ভারত আর সাথে এমনকি সুপ্রিম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন পর্যন্ত এই মুসলমান মারা বা নির্যাতন করার নষ্ট “মেরুকরণের” বিজেপিকেই রুখবার চেষ্টার দায়িত্ব পালন করেনি?  এটা ভারতের কনষ্টিটিউশন-বিরোধী ততপরতা – এই দায়ে বিজেপির উপর কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নাই। বরং নির্বাচন করতে, ক্ষমতায় যেতে জায়গা করে দিয়ে গেছে? তাই, আজ আঁতকে উঠে লাভ কী, অনিন্দ্য?  সবই তো শেষ!

    বলা হয়, বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলো বেশির ভাগই নির্দিষ্ট করে খুঁজতে গিয়ে তা আবিস্কার হয়েছিল এমন নয়। বরং অন্য কিছু খুঁজতে গিয়ে পথে পড়ে পাওয়া ধরণের আবিস্কার সেগুলো।। দেখা যাচ্ছে মোদি-অমিতও নাগরিকত্ব প্রমাণের যে পথ খুঁজছিলেন এই ঘটনাতে এর এক সহজ সমাধান পাওয়া গেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, প্যান্ট খুলে দেখা, চেক করাই “নাগরিকত্বের বেস্ট প্রমাণ”। কারণ কে মুসলমান কেবল এটা জানতেই তো বিজেপির এত আয়োজন। তাই নয় কী? তাহলে এত কাগজ এনআরসি, সিএএ বা এনপিআর ইত্যাদি এসবের আর প্রয়োজন কী!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও প্রিন্টে “‘নাগরিকত্ব প্রমাণের নতুন মডেল!” – এই শিরোনামে প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • দিল্লিতে নির্বাচনে মোদী-অমিতের পরাজয়ের তাৎপর্য

    দিল্লি নির্বাচনে মোদী-অমিতের পরাজয়ের তাৎপর্য

    গৌতম দাস

    ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2SL

     

    দিল্লি প্রাদেশিক বা রাজ্য নির্বাচনে মোদী-অমিতের বিজেপির শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে। আম আদমি পার্টি (আপ বা AAP) দলের আগের ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মতই এবারো অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে তারা ৭০ আসনের দিল্লির ৬০-এর বেশি আসন পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে। জার্মান সরকারের ডয়েচে ভেলে [Deutsche Welle] গ্লোবাল মিডিয়া হিসেবে অত জনপ্রিয় না হলেও ফেলনা গুরুত্বের নয়। সেই ডয়েচে ভেলের (ইংরেজি সংস্করণ) এক রিপোর্টের শিরোনাম, “দিল্লির নির্বাচনী হার : প্রধানমন্ত্রী মোদীর শেষ দিনের শুরু?” [Delhi election losses: The beginning of the end for PM Modi?]।

    এটা ঠিক যে, ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ (CAA) প্রায় সব প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশে এক ব্যাপক নাড়াচাড়া দিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ভারতের লোকসংখ্যা বা ভোক্তা বাজার প্রায় ১৩৬ কোটির; সে কথা পশ্চিমা বিশ্ব সব সময় খুবই মনে রাখে। তারা তাই এমন কিছুই বলতে চায় না পাছে তা এই বাজার হাতছাড়া হওয়ার কারণ হাজির করে ফেলে। কিন্তু মোদী-অমিতের বৈষম্যমূলক ও মুসলমানবিদ্বেষী করে সাজানো নতুন নাগরিকত্ব আইন পশ্চিমাদেশের জন্য ঐ ভোক্তা বাজারের লোভের চেয়েও আরো বড় বিপদের। সাধারণভাবে তারা আতঙ্কিত এ জন্য যে, তাদের আশঙ্কা এই আইন দুনিয়াতে বিপুল রিফিউজির ঢল তৈরি করতে পারে যারা আবার রাষ্ট্রচ্যুত। মোদীর এই আইন আগামীতে ভারতীয় মুসলমানদের রাষ্ট্রহীন রিফিউজির সারিবদ্ধ ঢল নামাতে পারে, যেটা সদ্য মোকাবিলা করা সিরিয়ান রিফিউজিদের চেয়েও হবে ভয়ঙ্কর। কারণ ভারতীয়দের ক্ষেত্রে বাড়তি বৈশিষ্ট্য হল, এরা হবে রাষ্ট্রহীন; ‘থেকেও নাই’ এমন রাষ্ট্রচ্যুত বলে তাড়ানো এক জনগোষ্ঠী।
    ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ‘এই আশঙ্কার’ ওপর দাঁড়ানো এক নিন্দা প্রস্তাব ইতোমধ্যেই আনা হয়েছিল আর যা এখন আগামি মধ্য মার্চ পর্যন্ত মুলতবি করে রাখা আছে। ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এনিয়ে কী রায় দেয় মূলত সেটা দেখতে আর মার্চে মোদী ইইউ সামিটে এসে কী প্রতিশ্রুতি দেন না দেখার জন্য। নতুন রিফিউজির ঢলের উদ্ভব বা মানবাধিকার রক্ষার দায় হিসেবে এর ভাগ বা দায়ভার গ্রহণ প্রশ্নে ইউরোপ আমেরিকার চেয়েও বেশি ভীত, বিশেষ করে গ্লোবাল অর্থনীতির স্থবিরতা দুনিয়াতে যখন প্রায় নিয়মিত হয়ে পড়া দশা সেই পরিপ্রেক্ষিতে। ডয়েচে ভেলের এই শিরোনাম এসব আশঙ্কায় আক্রান্ত বলে এমন হয়ে থাকতে পারে। তা আমরা অনুমান করতে করি।

    দিল্লির রাজ্যনির্বাচন শেষে ফল প্রকাশিত হয়েছে গত ১১ ফেব্রুয়ারি। বিজেপিবিরোধী মূলত দিল্লির এক আঞ্চলিক দল আম আদমি পার্টি (আপ) এবারের নির্বাচনে ৬২ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জিতেছে। আর সেই থেকে অসংখ্য কর্নার থেকে কেন ফলাফল এমন হল এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে মিডিয়াগুলো ভরপুর হয়ে উঠেছে। রাজ্য হিসেবে দিল্লি খুবই ছোট; যেখানে ভারতের পুরনো মাঝারি সাইজের রাজ্যগুলোতে ২০০ থেকে ২৫০-এর মধ্যে আসন থাকে। সেই বিচারে এগুলোর তিন ভাগের একভাগ সাইজের রাজ্য হল দিল্লি। তবুও দিল্লির এই নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় উৎসাহ অনেক বেশি। কেন?
    মূল কারণ, মোদী-অমিতের নাগরিক বৈষম্যমূলক সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ পাস করার পরের ভারতজুড়ে আপত্তি ও প্রতিক্রিয়া; আর তা নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যাওয়ার পর এটা ছিল কোন রাজ্যে অমিত শাহের প্রথম নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়া। এছাড়া এমনিতেও দিল্লির নির্বাচন পরিচালনায় মূল দায়িত্বে ছিলেন অমিত। যেমন শুরুতে বিজেপির নির্বাচনি প্রস্তুতিমূলক ভোটে কী হয়েছিল সে প্রসঙ্গে আনন্দবাজারের ভাষায়, “কিন্তু নরেন্দ্র মোদী, রাজনাথ সিংহ, জগৎপ্রকাশ নড্ডাদের সঙ্গে বৈঠকে শাহই আস্থা জুগিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দিল্লি বার করে নেবেন। মেরুকরণই হবে প্রধান অস্ত্র। তখনই স্থির হয়, শাহিন বাগই হবে প্রধান ‘প্রতিপক্ষ’। আর প্রচারে শাহ বলেছিলেন, ‘‘ইভিএমের বোতাম এত জোরে টিপুন যেন শাহিন বাগে কারেন্ট লাগে। “। তাই তখন থেকেই দিল্লি নির্বাচনে ঠিক কী বলে, কোন কৌশলে বিজেপি ভোটে অংশ নেয় আর তাতে ভোট প্রদানের ধরনের মধ্যে কী মেসেজ ফুটে ওঠে – এসব জানার জন্য সব মহলের ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, আর তা থেকেই এত বিশ্লেষণ।
    এসব বিশ্লেষণগুলোতে কমন ব্যাখ্যার ধারাটা হল, এটা ‘উন্নয়ন বনাম কেন্দ্রের ইস্যু’ – এরই লড়াই যেখানে ‘উন্নয়ন’ জিতেছে। কিন্তু এখানে ‘উন্নয়ন’ মানে কী? আমাদের দেশের মতই, হাসিনার ‘উন্নয়ন’ বনাম নাগরিক অধিকার, এর কোনটা চান- এর মত? না, ঠিক তা নয়। তবে হয়ত কিছু কাছাকাছি। দিল্লির বেলায় এর মানে হল, নাগরিক মিউনিসিপ্যাল সুবিধা ও সার্ভিসগুলো; যেমন পানি, বিদ্যুৎ, নিষ্কাশন, বাসভাড়া, শিক্ষা ইত্যাদিতে সার্ভিস ব্যবস্থাপনা আর এর স্বল্প চার্জ বা মওকুফ করা চার্জ- এভাবে আপ দলের মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল গত পাঁচ বছর কাজ করে সাফল্য এনেছেন। এটাকেই এখানে ডাকা হচ্ছে “উন্নয়ন” বলে। আর এর বিপরীতে ‘কেন্দ্রের ইস্যু’ জিনিষটা কী?
    এখানে কেন্দ্রের ইস্যু হল যেমন, সবচেয়ে জ্বলন্ত ইস্যু সিএএ বা এর সাথে এনআরসি; এ ছাড়া ধীরগতির ধসে পড়া অর্থনীতি, কাজ সৃষ্টি না হওয়া ইত্যাদি। এ ছাড়াও আরেকভাবে ব্যাপারটা বলার চেষ্টা আছে। যেমন নির্বাচনী ফলাফল কী হতে পারে সেই আগাম অনুমিত ফলাফল জানার লক্ষ্যে করা সার্ভেতে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সেটা হল, “জাতীয় নিরাপত্তা”। বলাই বাহুল্য, এটা খুবই প্রলেপ লাগানো শব্দ। আসলে কদর্য কিছু ধারণাকে লুকিয়ে রাখতে বলা এক ‘ভদ্র শব্দ’। কারণ এর পেছনের মূল কথাটা হল, ‘মুসলমানবিদ্বেষী উসকানি দিয়ে প্রচারণার” পক্ষে কারা। এটাকে আবার বিজেপি নিজেও আরেকটা শব্দ – ‘পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ’ বলে প্রকাশ করে থাকে। যেমন এই নির্বাচনে অমিত শাহ ও তার দলের বিদ্বেষী ভাষ্য হল, কেজরিওয়াল একজন ‘জঙ্গি’ নেতা, সে পাকিস্তানের বন্ধু, মুসলমান তোষণকারী ইত্যাদি। দিল্লির এক মুসলমান-প্রধান এলাকা শাহীনবাগ, এখানকার সিএএ-বিরোধীদের মূলত নারীদের একটা স্থায়ী প্রতিবাদ মঞ্চ আছে। এ সম্পর্কে অমিতের মন্তব্য এটা নাকি এক ‘মিনি-পাকিস্তান’। তাই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ কথাটার আসল মানে হল মানে, এই ক্যাটাগরিটা আসল অর্থ হল – বিজেপির হিন্দুত্ববাদী বয়ান ও এর প্রপাগান্ডাকে গুরুত্ব দিয়ে কারা বিজেপিকে ভোট দিয়েছে – তাদের কথা বুঝানো হচ্ছে। এরাই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ক্যাটাগরিতে দেয়া ভোটার। এমনকি আনন্দবাজারের ভাষাতেও – এটা হলো “বিজেপির (হিন্দু) জাতীয়তাবাদী প্রচার এবং হিন্দু ভোট একাট্টা করার কৌশল”। অর্থাৎ হিন্দুত্বের জোশ তুলে সব হিন্দু ভোট যেন বিজেপির বাক্সে আসে, বিজেপির নেয়া এই কৌশল । এটাও অনেকসময় আরেকটা সার শব্দে প্রকাশ করা হয় – পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ। “হিন্দুর হিন্দুকে ভোট দিতে হবে আর সেটা কেবল বিজেপিকেই” – এটাই হিন্দুত্ববাদী প্রচারণা কৌশলের সারকথা। এটাকেই বিজেপির হিন্দুত্ববাদ নিজেদের ‘পোলারাইজেশনের রাজনীতি’ অথবা এটা “বিজেপির কৌশল” বলে প্রকাশ্যেই দাবি করে থাকে।
    দিল্লির নির্বাচনের পরে ভারতের টিভির এক টকশোতে এসেছিলেন শেষাদ্রি চারি [SESHADRI CHARI]। তিনি হচ্ছেন, আরএসএসের ভাবাদর্শী পর্যায়ের এক নেতা , তিনি আবার আরএসএসের মুখপত্র এক প্রাচীন পত্রিকা ‘অরগানাইজার’-এর সাবেক সম্পাদক। তিনি বিজেপির এই ‘ঘৃণা তৈরির’ নিন্দনীয় কাজ ও ততপরতাকেও “অনৈতিক” বলে মানতে রাজি হননি। বরং দাবি করেছেন এটাই ‘বিজেপি রাজনীতির কৌশল’। দেখুন, “not hate politics but strategy”.।
    ভারতের কনস্টিটিউশন এবং নির্বাচনী আইন অনুসারে ধর্মের ভিত্তিতে ভোট চাওয়া বেআইনি। কিন্তু যেখানে সারা ভারতই এখন ‘হিন্দুত্বে’ ভাসছে সেখানে এর বিরুদ্ধে আপত্তি তুলবে কে? আর নির্বাচন কমিশন সেখানে কোনো প্রশ্ন না তুলে আরামে কাজ করার পথ ধরবে সেটাই তো স্বাভাবিক।
    ঠিক এ’কারণে বিজেপির অমিত শাহের ‘পোলারাইজেশনের রাজনীতি’ এবার কিভাবে কাজ করে, আদৌ করে কিনা, সেটি সবাই দেখতে চেয়েছিল। কঠিন বাস্তবতা হল, এবারই এটা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, খোদ অমিত শাহ এবার তা নিজ মুখে প্রেসের কাছে স্বীকার করেছেন।
    “ভারতে হিন্দুরাই রাজত্ব করবে, অন্য কারও কথা চলবে না। যারা অমান্য করবে তারা ‘দেশকে গদ্দারকো, গোলি মারো শালো কো’।  এভাবে বিজেপির সমাবেশ মঞ্চ থেকে স্লোগান দেয়া শুধু নয়, লিখিত বিবৃতি মানে ঠাণ্ডা মাথায় লেখা এমন এক বিবৃতি পাঠ করা হয়েছিল। কিন্তু ১১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকে দুদিন ধরে অমিত শাহের ‘পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স’ থেকে গায়েব ছিলেন। বেচারা অমিত “খুব শরমিন্দা আর শোকে” ভুগছে মনে হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের অফিসেও যান নাই। দু’দিন পরে ১৩ তারিখ সন্ধ্যায় এক টিভি অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রেসের সামনে তিনি বলেন, “গোলি মারো বলে বিবৃতি দেয়া অথবা ‘ইন্দো-পাক ম্যাচ’ ধরনের মন্তব্য করাটা আমাদের ঠিক হয়নি। আমাদের দল এসব মন্তব্য থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চায়”। এছাড়াও, তিনি স্বীকার করে নেন যে, খুব সম্ভবত এমন মন্তব্যের জন্যই “দিল্লিতে আমাদের পরাজয় ঘটেছে”। এর সাথে তিনি এটাও স্বীকার করে নেন যে, দিল্লি নির্বাচন সম্পর্কে “তার আগাম অনুমানে ভুল ছিল”। “ভেবেছিলাম, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাব। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, মূল্যায়ন ভুল হয়েছে। আমার বেশির ভাগ মূল্যায়ন ঠিক হয়,এ বার ভুল হল”। সাথে সাথেই অবশ্য বড় ধূর্ততার সাথে নিজেই বলে রাখেন – “কিন্তু তাই বলে ‘দিল্লিতে বিরোধীদের বিজয় সিএএ-এনআরসি বিরোধী কোনো গণরায় নয়”।

    এটা সে গণরায় কি না তা সামনে স্পষ্টই বুঝা যাবে। এখনই বুথ ফেরত জরিপে দেখা যাচ্ছে দিল্লি রাজ্যে মুসলমান জনসংখ্যা যেখানে ১৩% সেখানে মুসলমান ভোটারদের ৭৫% (আর এরই সাথে শিখ ভোটের ৪২%) আপ দলের পক্ষে ভোট দিয়েছে। [The AAP got the lion’s share of the Muslim vote, significant in a city-state with 13 per cent Muslims.] শাহীনবাগ যে কনস্টিটিউয়েন্সিতে পড়েছে এর নাম ‘ওখলা’ [Okhla]। সেখানে এবার ভোটারের উপস্থিতি রেকর্ডসংখ্যক। মোট উপস্থিত ভোটারের হার যেখানে ৬২% এর মতো সেখানে ওখলাতে তা ৬৬%-এর মত। আর ‘আপ’ দলের আমানতুল্লাহ খান এখানে জিতেছেন (1,30,367 votes) প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থীর (Braham Singh  58,540 votes) চেয়ে ডাবলের বেশি ভোটে।  এমনিতেও দেখা গেছে বেশির ভাগ আসনে ভোটাভুটির ফয়সালা হয়েছেও ষাট হাজার ভোটের কাছাকাছি।

    উত্তরপ্রদেশের ‘গেরুয়া মুখ্যমন্ত্রী’ যোগী আদিত্যনাথ যার একমাত্র যোগ্যতা মুসলমানদের মারব-ধরব বলে গালিগালাজ করা, তাকে উওরপ্রদেশ রাজ্যের পড়শি রাজ্য দিল্লিতে ভাড়া করে আনা হয়েছিল প্রায় ১৩টা বিজেপি কনস্টিটিউয়েন্সিতে প্রধান সমাবেশে বক্তৃতা করতে। তিনি কেজরিওয়ালকে “জঙ্গি মদদদাতা, দেশদ্রোহী গাদ্দার, পাকিস্তানের বন্ধু ইত্যাদি বলে বক্তৃতা করেছিলেন। ফলাফল নিম্ন চাপ!  ঐ ১৩ আসনের ১১টাতেই বিজেপি অনেক ব্যবধানেই পরাজিত হয়েছে।
    অনেকেই অমিত শাহের স্বীকারোক্তিকে তার দলের এই হারের ফলাফল পাঠ করে, করা মন্তব্য বলে দেখেছেন। এখন মূল প্রশ্ন হল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কি এখন থেকে তাহলে ভালো হয়ে গেলেন বলে আমরা ধরে নিতে পারি?

    অমিত শাহকে নিজ দলে “ম্যাজিসিয়ান” বলা হয়। গুজরাটের ২০০২ সালের দাঙ্গা থেকে এ পর্যন্ত দাঙ্গাতেই তার জয়জয়কার। তিনি নাকি যেটা চান তাই করে আনতে পারেন। দাঙ্গায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত আহত-নিহত হন, তাদেরও ভোট তিনি ব্যাগে ভরতে জানেন। ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে উত্তরপ্রদেশের মোজাফফরবাদের দাঙ্গায় তিনি তাই ঘটিয়েছিলেন।  সেই ‘দাঙ্গা-ওস্তাদ’ তিনিই এবার দিল্লিতে হেরে গেছেন। না, তবু এর পরেও তাঁর স্বভাব বদলাবে না। কারণ তিনি কেবল এই ‘দাঙ্গা’ কাজটাই ভালো পারেন।
    এ ছাড়া আরো বড় ফ্যাক্টর হল, ২০১৬ সালের নোট বাতিলের পর থেকে ডুবে যাওয়া অর্থনীতির চিহ্নগুলো মোদী লুকিয়ে রেখেছিলেন ২০১৯ এর প্রথমার্ধ নির্বাচন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। এরপর তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। তাই সেই থেকে “মোদী-ম্যাজিক” বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। অতএব, আগামী সব নির্বাচনে বিজেপির একমাত্র ভরসা হবে “হিন্দুত্ববাদ” এর জজবা বা মেরুকরণ। কাজেই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়েই তাকে আবার ভোট চাইতে যেতে হবে। হয়তো পরের বার আরো ভাল ও কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে ঘৃণা ছড়াবেন। এক কংগ্রেস নেতা ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, তার কাছে নাকি গোপন সংবাদ আছে, ‘‘পাকিস্তান এ বারে দিল্লি থেকে বিহারের পথে রওনা হয়েছে’’। কেন?  আগামী অক্টোবরে বিহারে রাজ্য নির্বাচন। দেখুন মেরুকরণের ভবিষ্যত।

    তাহলে, কেজরিলালের উন্নয়নের বিজয় কী জিনিষ ও তা কতটা সত্য?
    বড় সত্যটা হল, কোন রাজ্য নির্বাচনেই ভারতের কেন্দ্রীয় ইস্যুগুলো ভোটার-মানুষ ভুলে যায় না, যেতেই পারে না। যদিও এর পরেও এক্ষেত্রে একটা কিন্তু আছে। সেটা হল দিল্লির “গঠন প্রকৃতির” বিশেষত্ব। যেমন দিল্লি ছিল এক রাজধানী শহর কিন্তু আসলে ছিল এক জেলা শহর মাত্র। পরবর্তিতে তার পড়শি রাজ্য একদিকে পাঞ্জাব-হরিয়ানা (মানে মুল ভারতের পাঞ্জাব রাজ্য ভেঙে হরিয়ানা বলে আলাদা রাজ্য করা হয় ১৯৬৬ সালে। আর হরিয়ানাই দিল্লির লাগোয়া পড়শি। ) আর অন্য দিকে উত্তর প্রদেশ – এদুই রাজ্য থেকে কেটে আনা জেলা শহর নিজের ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে আজ দিল্লি রাজ্য হয়েছে – ১১ জেলা শহরের। এভাবে অন্তর্ভুক্তি আবার এক দিনে হয়নি, ১৯৯৭ থেকে সর্বশেষে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়ে। এর সোজা অর্থ, এই অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া জেলাগুলোতে  একটা রাজধানী শহরে  যেমন থাকা উচিত সেই পানি-বিদ্যুৎ-বাস-স্কুল টাইপের নাগরিক মৌলিক সুবিধাগুলোর কিছুই ছিল না। এসব অভাব চরমে  উঠা আর নাগরিক ক্ষোভ থেকেই একে পুঁজি করে আম আদমি পার্টির জন্ম ২০১২ সালে। আর গুছিয়ে ক্ষমতায় থেকে গত পাঁচ বছরে এই ব্যবস্থার চরম উন্নতি ঘটিয়েছে কেজরিলালের আপ দলটা। এই সময়ে রাজ্যের রাজস্ব আয় তিনি বাড়িয়েছেন ৩১%। আমাদের প্রথম আলোর দিল্লির তথ্য নিয়ে লিখেছে,

    ভারতের মহাহিসাব নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের উপাত্ত বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দিল্লির রাজস্ব আয় ৩১ শতাংশ বেড়েছে। আর এ আয় গেছে স্কুল ও হাসপাতালের উন্নয়নে। যদিও এ সময়ে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ ৭ শতাংশ কমেছে। দিল্লি ভারতের অন্যতম প্রধান রাজস্ব উদ্বৃত্ত রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

    কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এর নেতা কেজরিওয়াল আদর্শ মুখ্যমন্ত্রী। পদত্যাগী এই সাবেক আমলা ম্যানেজমেন্ট বোঝেন ভালোই। তিনি বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী বড়লোকদের বিদ্যুতের রেট তুলনায় বেশি ধরে সে আয় দিয়ে গরিব কম ব্যবহারকারীদের ভর্তুকির ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ফ্রি। একই ব্যবস্থা পানি ব্যবহারেও। আবার নারী বাসযাত্রীর ভাড়া ফ্রি। স্কুল ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন। তাতে ইংলিশ স্কুল ছেড়ে অবস্থাপন্নরাও সরকারি স্কুলে সন্তান নিয়ে ফিরেছেন। আজ আনন্দবাজার লিখেছে, মহিলা ভোটেই কুর্সিতে কেজরী, বলছে ফল-পরবর্তী সমীক্ষা। একারণে মূলত নারীরা তুলনায় আপ পার্টিকে ভোট দিয়েছে বেশি। এমনকি নাকি স্বামীরা বিজেপি-কংগ্রেসের সমর্থক হলেও স্ত্রীরা আপ দলকে ভোট দিয়েছে।  আর এসব ম্যানেজমেন্ট কৃতিত্বের মূল সুফলভোগী হল সরাসরি স্বল্প আয়ের মানুষ। এতে আপ দলের মূল ক্ষমতার ভিত্তি হয়েছে এই স্বল্প আয়ের লোকেরা।  নির্বাচনে কেজরিওয়াল নিজের এই সফলতাকেই তুলে ধরেছেন, আর প্রতিদান চেয়েছেন। এমনকি ভোটারদের বলেছেন, আপনি বিজেপি বা কংগ্রেসের সদস্য বা সমর্থক হয়েও থাকেন তবে দল ত্যাগ না করে আমার কাজের প্রতিদান ও আমাকে উৎসাহ দিতে আমার দলকে একটা ভোট দিন। আসলেই তো তিনি ‘স্বল্প আয়ের মানুষের বন্ধু’। না হলে দিল্লির মত ব্যয়বহুল রাজধানী শহরে গরীবদের বসবাস করা আরো কঠিন হয়ে যেত। কাজেই দিল্লির এই বিশেষ গঠন প্রকৃতি – এটা উন্নয়ন বনাম কেন্দ্রের ইস্যু – এই নাম দিয়ে ডাকা ও দেখা সবটা সত্যি নয়। আর এর মানে এই নয় যে, সিএএ-এনআরসি ইস্যু বা কাজ সৃষ্টির ইস্যুতে তাদের কিছু এসে যায় না।

    তবে সার কথা হল, দিল্লিই প্রথম কথিত ম্যাজিসিয়ান অমিত শাহ ও তার দলের যে সারা ভারতে “অপরাজেয়” ভাব তৈরি হয়ে গিয়েছিল সেই দর্প এবার চূর্ণ করে দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এই ভাঙা আত্মবিশ্বাস কতটা অমিতরা ফেরত আনতে পারেন তা এখন দেখার বিষয়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “‘দিল্লিতে পরাজয়ের তাৎপর্য” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]