Tag: বিজেপি

  • ভারত নাই, আমেরিকার নয়া সামরিক জোট

    ভারত নাই, আমেরিকার নয়া সামরিক জোট

    গৌতম দাস

    ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3IU

     

              AUKUS : security pact leaves Australia exposed

    [সার-সংক্ষেপঃ আমেরিকা এশিয়ায় এবার এক নতুন জোট খুলেছে। এটা সামরিক জোট নাম AUKUS। অস্ট্রেলিয়া, ইউনাইটেড কিংডম আর ইউনাইটেড স্টেটস – এই তিন দেশের ইংরাজি নামের আদ্যক্ষর দিয়ে, ত্রিদেশীয় এই নয়াজোটের নাম ঠিক করা হয়েছে।  এটা যতটা না সামরিক জোট তার চেয়ে বেশি অষ্ট্রেলিয়াকে চীনের মুখে ফেলে দিয়ে আমেরিকা-বৃটেনের ওর ঘাড়ে চড়ে পিছনে দুরে বসে থেকে পরমাণূ অস্ত্রের ব্যবসা করে নেয়া। এছাড়া আবার এটা এমনই অষ্ট্রেলিয়া যার ভৌগলিক অবস্থান চীনের হাতের নাগালেই আর তার চেয়েও বেশি বিপদের হল অষ্ট্রেলিয়ার ইকনমি দাঁড়িয়ে আছে চীনে রপ্তানি করতে পারার উপরে। তবে গত ২০১১ সাল থেকে আমেরিকার এটা চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে খামোখা লড়বার তৃতীয় উদ্যোগ।  আগের ‘পিভোট এশিয়া’ আর ‘কোভিড’ এর ব্যর্থতার পরে এটা আরেক নয়া উদ্যোগ। এটাও ব্যর্থ হবে, কারণ এশিয়ার চীনের সাথে সীমান্তবিরোধ যাদের আছে তারাই যুদ্ধ চায় না, সমাধান মনে করে না। কাজেই চীনের সাথে সীমান্তবিরোধের কথা তুলে এর আড়ালে আমেরিকান যেকোন স্বার্থ আদায় করা অসম্ভব। এর উপর তা যদি যুদ্ধ-কেন্দ্রিক আমেরিকান বুদ্ধি হয় তবে এর কোনই ভবিষ্যত নাই।
    এবার সরাসরি যদি প্রশ্নটা করা হয় এই জোট মানে অর্থনৈতিকভাবে, এটা ৫০-৯০ বিলিয়ন ডলারের এক ঋণশোধের দায় যা একা অষ্ট্রেলিয়ার উপর চাপিয়ে  দেওয়া হল। তাহলে এই অর্থনৈতিক দায়ের রিটার্ণটা কোথা থেকে আসবে? সেপ্রশ্ন এখনও উহ্য থেকে গেছে। এছাড়াও উলটা এই জোট নুন্যতম ফাংশনাল হলেই চীনে যতটুকু রপ্তানি বাজার অষ্ট্রেলিয়ার এখনও যা আছে সেটাও বন্ধ হয়ে যাবে বা অন্য কেউ তা দখলে নিবে। এতে অষ্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি আরো দ্বিগুণ চাপে পড়বে। তখন অষ্টেলিয়াকে উদ্ধার করবে কে? কেউ জানে না। অর্থাৎ মাটিতে পা রেখে এসব দায় অষ্ট্রেলিয়া প্রধানমন্ত্রী মাথায় নিয়েছে মনে হয় না।
    অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিরোধ বা প্রভাব সামরিক সক্ষমতা দিয়ে জিতে যাওয়া বা টপকে গিয়ে সমাধান করা যায় না। এছাড়া পারমাণবিক টেকনোলজি মানবজগত থেকে প্রত্যাহার করে ফেলার যুগে নতুন করে এশিয়ায় পারমাণবিক সাবমেরিন দিয়ে যুদ্ধ সাজানোর প্রচেষ্টা একেবারেই চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন। একদিন এজন্য বাইডেন আর বরিস কাঠগড়ায় উঠবেন, অবশ্যই! ]

    _

    মূল লেখা শুরু এখান থেকেঃ

    ইংরেজি ওভারল্যাপ [overlap] মানে একজনের কোলে আরেকজন। মানে যেমন একটা জোটে থাকা অবস্থায় সেখানেই আরেকটা আরো কিছু অন্যদের সাথে জোট খুলে বসাটা হবে ওভারল্যাপিং জোট। হ্যাঁ, ঠিক তাই ঘটিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। এশিয়ায় আগের কোয়াড জোটের বাইরে আরেকটা ত্রিদেশীয় জোট খুলেছেন। আর এই ঘটনাটা আমাদের দিক থেকে দেখলে,  এতদিনে এনিয়ে আগ্রহীরা যখন জানল, কোয়াড জোট মানে কী ও কারা এরা। এ ছাড়া সবাই যখন ভাবছিল তারা এশিয়ার গ্লোবাল মেরুকরণ বুঝতে শুরু করেছে। ওদিকে আমেরিকা যখন আমাদের বাংলাদেশকে কোয়াডে ঢুকানোর জন্য চাপাচাপি করছিল এরই মাঝে ঠিক এমন সময় আরেক ফ্যাসাদ হাজির হয়েছে। বাইডেন নতুন আরেক জোটের ঘোষণা দিয়েছেন গত বুধবার ১৫ সেপ্টেম্বর যার বিস্তারিত ঘোষণা এবং তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া দেয়া এখনো শেষ হয়নি। এরপর বিস্তারিত তথ্য আর বুঝাবুঝি শেষে তাৎপর্য বর্ণনা পশ্চিমেই এখনো তেমন শুরুই হয়নি। এমনই প্রাথমিক অবস্থায় এখন আমরা।

     AUKUS বা এইউকেইউএসঃ
    AUKUS এই হলো নয়া জোটের নাম। যে নামটা ভেঙে ভেঙে লিখলে হয় A-UK-US; মানে হল অস্ট্রেলিয়া, ইউনাইটেড কিংডম আর ইউনাইটেড স্টেটস – হল সেই ত্রিদেশীয় এক নয়াজোট। সবচেয়ে বড় কথা, জন্ম-ঘোষণার শুরু থেকেই এরা পরিষ্কার যে, এটা সামরিক জোট।  মানে যেমন অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ইন্ডিয়া আর আমেরিকা – এই চার দেশীয় ‘কোয়াড’ নামের জোটের মত – এবার নতুনটা সামরিক নাকি বাণিজ্যিক জোট এ নিয়ে কোনো তর্কই নেই। কোয়াড নাকি কোনো সামরিক বা বাণিজ্যিক কোনোটাই নয়, এমন না  না করতে করতে এখন বলে এটা এক স্ট্র্যাটেজিক জোট। এসব ধানাই-পানাইয়ে এই নয়া জোটের বেলায় নাই। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে এটা অস্ট্রেলিয়াকে সাবমেরিনে সমৃদ্ধ করতে  নয়াজোটের বাকি দু’দেশ বৃটেন-আমেরিকা  ভুমিকা নিবে; এমন করে যাত্রা শুরু করার এক জোট হবে এটা; এমনটাই তাদের আপাতত বলতে শোনা যাচ্ছে। তবে তাও আবার ডিজেলে চলা ও ধোঁয়া ছাড়া সাবমেরিন নয়, এটা নাকি একেবারে পরমাণু অস্ত্র ও জ্বালানিতে চালানো এমন সমৃদ্ধ সাবমেরিন বহর হবে। অর্থাৎ এটা নিউক্লিয়ার সাবমেরিন (n-sub) হতে যাচ্ছে যেটা আবার নিউক্লিয়ার বোমা বিবার অপশন থাকলেও আপাতত তেমন কোন বোমা থাকবে না অষ্টেলিয়া জানিয়েছে।   SSBN বা নিউক্লিয়ার ব্যালেস্টিক অস্ত্র বহণকারি গোত্রের।

    ইতোমধ্যেই পশ্চিমা এক্সপার্টেরা অল্প ক’জন যারা এই জোট নিয়ে মুখ খুলেছেন তারা বলা শুরু করেছেন যে এতে এশিয়াতে এখন আগের অন্যান্য জোট উদ্যোগগুলো মিলিয়ে যাবে আর এই নয়া জোটকে কেন্দ্র করে এশিয়ামুখী পশ্চিমা দেশেরও ব্যাপক মেরুকরণ শুরু হবে; যদিও যারাই ইতোমধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তাতে লক্ষণ তেমন নয়।

    এর প্রথম তাৎপর্য হল, যে ওভারল্যাপিং-এর কথা বলছিলাম, আগের কোয়াড যা এখনো বেঁচে আছে বলে জানি, তা থাকা সত্বেও পুরান কোয়াডের দুই সদস্য অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকা এই নয়া সামরিক জোট খুলেছে দেখা যাচ্ছে তবে সাথে ব্রিটেনকে নিয়ে। তাতে এখন বাকি দু’জন কোয়াড সদস্যের কী হবে?

    কৌতুকের কথা হলো, কোয়াড এমন এক জোট যার সদস্য দেশের চার প্রধান কখনো একসাথে মুখোমুখি মিটিংয়ে বসেননি। কেবল এই গত মার্চ ২০২১ তে একবারই বসেছিলেন অন-লাইনে, মানে ভার্চুয়ালি। তবে এবার  আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর মানে এ’মাসেই  আমেরিকায় হোয়াইট হাউজে প্রথম মুখোমুখি কোয়াড রাষ্ট্রপ্রধানরা বসতে যাচ্ছেন। এই মিটিংয়ের সেই অভাব সম্ভবত পূরণ হতে যাচ্ছে। তবে সেটা কারো কারো জন্য শেষ মিটিংও হতে পারে। অনুমান করা হচ্ছে বাইডেন সেখানে বৃটেনসহ তাদের গড়া নয়া জোটে যোগ দিতে কোয়াডের বাকি দু’দেশকে আনুষ্ঠানিক দাওয়াত দেবেন। তবে জাপানের কনস্টিটিউশনে ও ১৯৬০ সালের আমেরিকার সাথে করা এক সিকিউরিটি চুক্তি অনুসারে জাপানের পারমাণবিক তৎপরতায় যুক্ত হতে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেয়া আছে বলে সম্ভবত জাপান এমন জোটের সদস্য হতে বাধা পাবে। তাহলে আর ভারতের বেলায় কী হবে?

    ভারত কী করবে?
    কিন্তু আগেই এ নিয়ে আমাদের বোঝাবুঝির কাজ কয়েক ধাপ এগিয়ে রেখেছে এক রাশিয়ান মিডিয়া স্পুটনিক [SPUTNIK] । স্পুটনিকের সে নিউজের শিরোনামটাই অনেক সাংঘাতিক। শিরোনাম হল – “ভারতের জন্য বার্তা? নয়া জোটের ঘোষণায় কোয়াডের অস্তিত্ব আর আমেরিকার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক উঠেছে” [Message for India? AUKUS Announcement Sparks Debate About Relevance of Quad, Reliability of US]।  কিন্তু স্পুটনিক কেন এমন শিরোনাম করল? কারণ, স্পুটনিক লিখেছে এই নয়া জোটের খবর ভারতের বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোড়ন ও তর্ক তুলেছে। তারা ভালোভাবে নেননি। কিন্তু এত তর্ক উঠছে কেন?

    কারণ তাঁরা সবাই ভারতের মনের আসল ইচ্ছাটা আগে থেকেই জানেন। আর তা হল, যতই মুচড়ামুচড়ি করুক, শেষে ভারত কারো সামরিক জোটে কখনো যাবে না। তাই তারা বলছেন, এই  “অনিচ্ছুক” [New Delhi’s “reluctance”] ভারতের খবর তো বাইডেনের আমেরিকার অজানা নয়। তাহলে বাইডেনের এই নয়া জোটের ঘোষণার অর্থ তাঁরা করছেন এভাবে যে, বাইডেন তাহলে ভারতকে ছেড়ে অন্যান্য সম্ভাব্যদের নিয়ে এশিয়ায় অন্য কিছু খুঁজতে নেমে গেলেন। তবে, স্পুটনিক এখানেই না থেমে আরেক ধাপ এগিয়েছে। ভারতের এক সাবেক নেভি অফিসার শেষাদ্রি ভাসান [Seshadri Vasan] যিনি এখন চেন্নাইভিত্তিক এক থিংকট্যাংক [Chennai Centre for China Studies (C3S)] পরিচালনা করেন, তার সাথে এ নিয়ে কথা বলে তাঁর বয়ান সংগ্রহ করেছে। শেষাদ্রি স্পুটনিককে বলছেন, “ভারত বারবার জানিয়েছে, সে কোয়াডকে কোনো সামরিক জোট হিসাবে দেখে না, বড় জোর এক নিরাপত্তা স্বার্থবিষয়ক গ্রুপ হিসাবে ভারত দেখতে চায়”। এছাড়া তিনি বর্ণনা করে বলেছেন যে যেমন “তাইওয়ান প্রণালী বা দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে কোনো সামরিক সঙ্ঘাত দেখা দিলে ভারত সেক্ষেত্রে আমেরিকার সাথে কোনোরকম সামরিকভাবে জড়িত হতে অনিচ্ছুক” […also shown its reluctance to get militarily involved on the side of the US in case there is any conflict in the Taiwan Strait or the South China Sea for that matter]। তাই তাঁর ধারণা আমেরিকা নিশ্চয় (ভারতকে ছাড়া) অন্য আগ্রহী পার্টনার খুঁজছিল।

    আসলে সত্যিকারভাবে বললে, ‘ভারতের অবস্থান সবসময়ই ছিল এমন যে “মাংসের ঝোল খাবো কিন্তু মাংস খাবো না” ধরণের। অর্থাৎ নিরাপত্তাবিষয়ক গ্রুপ- জোটে থাকব কিন্তু ‘সামরিক অ্যালায়েন্স’ এমন জোটে থাকব না। তাহলে নিরাপত্তাবিষয়ক কোনো গ্রুপের জোটেই বা ভারতের থাকার দরকারটা কী? আবার বাস্তবে  তাহলে কোয়াডের অধীনে সদস্য রাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়ায় ভারতের অংশ নেয়ারইবা দরকার কী? এর অর্থই বা কী? এটা কি সামরিক তৎপরতায় যোগ দেয়া হয়ে যায়নি?

    এমনকি সাউথ চায়না সি-কেন্দ্রিক কোয়াড জোট যে এলাকার সমুদ্রসীমা বিতর্ককে উসিলা করে গড়ে তোলা হয়েছে সেটা ভারতের কোনো সীমান্ত বা ভুমির কাছাকাছিও নয়, কোনো স্বার্থও নাই সেখানে। সেই কোয়াড জোটে তাহলে ভারত যোগ দিতে দৌড়াল কেন? আসলে কোয়াডকে একটা চীনবিরোধী জোট দেখেই ভারত ছুটে গিয়েছিল। কিন্তু ওদিকে এবার ‘শুধু ঝোল খাবার পণ’ করে রাখাতে এখন ভারতের মনে যা ছিল-আছে তা বাইরে উদাম হয়ে বের হয়ে আসছে।

    তবে শেষাদ্রি আরেক মন্তব্য করেছেন, যা থেকে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভারত কোয়াডে থাকবে না। তাই তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন কোয়াড ত্রিদেশীয় নয়া জোটে বিলীন হচ্ছে তাহলে ভারত সেখানে থাকতে পারছেই না। তবে তিনি কথাটা ঘুরিয়ে বলেছেন, “কোয়াড আগামীতেও হয়তো নিজেকে দরকারি করে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। কারণ নতুন ত্রিদেশীয় জোট তো প্রতিরক্ষাভিত্তিক”। অর্থাৎ তিনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন কোয়াডই ত্রিদেশীয় জোটে রূপ নিতে যাচ্ছে।

    তবে ঐ একই স্পুটনিক রিপোর্টে  আরেক প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের বয়ান এসেছে যার নাম অনিল ত্রিগুণায়াত [Anil Trigunayat]। এছাড়া এমনকি বর্তমান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করসহ আরো অনেকের উদ্ধৃতি তুলে এনেছে স্পুটনিক। তবে তাদের সবার মূল কথাটা হল আসলে ভারতের কোয়াড  জোটে থাকতে পারছে না বলে তা নিয়ে নিজেদেরকে দেয়া “সান্ত্বনা”। ভারতের ‘মন খারাপের কিছু নেই’ ধরনের বা ‘হতাশ হবার কিছু নেই’ এরকম [I don’t think New Delhi needs to feel threatened or disenchanted…… ]। যেমন একজন বলছেন, এখন থেকে ভারতের আলাদা আলাদা করে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত।

    ওই সাবেক রাষ্ট্রদূত কথা বলতে গিয়ে তিনি যেসব সংগঠনে ভারতের কদর আছে বলে গৌরব করে তা জানিয়েছেন যেমন ব্রিকস [BRICS] এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠান আর এসসিও [SCO] (সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশন) এর কথা। কিন্তু এখানে ব্যাপার হল ভারত যে এক অকর্মণ্য “বেচারা” তাই প্রমাণ হল। কারণ, এদুটো প্রতিষ্ঠানই আসলে চীনা উদ্যোগের জোট যেখানে চীনের মূলত প্রধান পার্টনার হলো রাশিয়া। আর ভারতকে চীন দয়া করে রেখেছে, নিজের উদারতায়; প্রতিদ্বন্দ্বি বা শত্রু হিসাবে দেখলে জোটে নিত না।  একটা ফেয়ার এপ্রোচ বা ন্যায্যতাবোধে নেয়া চীনের এই সিদ্ধান্ত, যে লম্বাদুর পর্যন্ত চিন্তা করতে সক্ষমতা ও সাহস রাখে। এর সোজা অর্থ হল, রাষ্ট্রদূত অনিল ত্রিগুণায়াত এরই কথা অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমা দুনিয়ায় ভারতের ভাত নেই, পাত্তাই নাই। তারা নিজেকে নিয়ে আছে। আর ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার তালে আছে কেবল। এর বাইরে ভারতের কোথাও পাত্তা নাই। তাই অন্য জায়গা ভারতের গুরুত্বের কথা বলতে গেলে যতটুকু যা আছে তা নয়া নেতা চীনেরই উদ্যোগের ভিতরের কথাই উল্লেখ করতে হচ্ছে। যে চীনকে আবার আপাতত দেখা যাচ্ছে, ভারত শত্রু মনে করছে। কিন্তু চীন ব্যাপারটাকে দেখছে এক অবজেকটিভ ফেনোমেনা আকারে। আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমে গেলে সেই দুনিয়াতে নেতা থাকবে চীন আর চীনের পিছনে উঠে আসতে পারে ইন্ডিয়া (যদি সে অপ্রয়োজনীয় মুসলমান ঘৃণা চিরদিনের জন্য ত্যাগ করে সরে আসে, এই অঞ্চলকে শান্তি দেয়, অর্থনীতিতে মন দেয়)।  আর চীনের দিক থেকে, চীন আগেভাগেই ভারতের সব সম্ভাবনাগুলোকে নিজের ইচ্ছায় নাকচ করতে পারে না। এই অসততা উলটা চীনকেই একসময় ক্ষতিগ্রস্থ করবে। অবজেকটিভ ফেনোমেনাকে রুখে দেয়া যায় না। রুখে দিবার চিন্তা করে বোকা-হিংসুক আর গর্দভেরা। বুদ্ধিমানেরা সাগরে ঘুর্ণিঝড় দেখা দিলে ওর সাথে লড়তে যায় না, খাপ খাইয়ে নেয়া আর কম ক্ষতি কিসে হবে সেই পথে ঝড়ের সামনে যায়।

    তবু বহুবার লিখেছি ভারতের ন্যাচারাল ফ্রেন্ড মানে বিষয়-আশয় বা অর্থনৈতিক স্বার্থবিষয়ক কমন ও প্রধান পার্টনার হবে চীন। এটাই অবজেকটিভ নিয়তি।  (অবজেকটিভ [objective] বলতে যেটা কোন কর্তা-মানুষ ঠিক করে নাই। ন্যাচারাল ভাবে হয়েছে। যেটাকে আমরা অনেক সময় বলি আল্লায় ঠিক করেছে।) আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রেখে ভারতকে ‘মুই কি হনু রে’ অবস্থা করে এই নিয়তি থেকে দূরে ঠেলে সরিয়ে রাখা নিশ্চিত করতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে; সেটা এই শতক মানে গত বিশ বছর ধরে। কিন্তু সবক্ষেত্রেই ফলাফল আমেরিকা আ ভারতের জন্য শুণ্য। তবু, ভারত আমেরিকান আকাঙ্খা মোতাবেক নিজেকে সেই বাক্সে ঢুকিয়েছে। ভেবেছে, সে পরাশক্তি হয়ে গেছে বা যাচ্ছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বা জয়শঙ্কর ইত্যাদি এরা “কথিত পরাশক্তি হয়ে যাবার” এই মিথ্যা কল্পনা ইলিউশন মায়ায় ভারতের মিডিয়াকে (প্রতীকীভাবে দৈনিক দাহিন্দু এর সুহাসিনী হায়দারের কথা ভাবা যায়) প্রভাবিত করে চলেছিল দশক ধরে। কিন্তু এবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সব ন্যাংটা হয়ে যায়। এই ভারত তার নাগরিককে করোনায় বেড দূরে থাক অক্সিজেন দিতে পারে নাই। মরলে সৎকার বা সাধারণ মাটি দিবার ব্যবস্থাটুকুও করতে পারে নাই, ব্রীজের উপরে নিয়ে বা নদীতে নিয়ে ফেলে দিয়ে নুন্যতম মানুষের মর্যাদা নষ্ট ও অপমান করেছে। তাই সুহাসিনী আর তাকে দেখানো পরাশক্তির স্বপ্ন তিনি বইতে রাজী হয় নাই। সে উলটা এখন ঐ মিথ্যা স্বপ্নকে প্রকাশ্যেই প্রশ্ন করে থাকে। তবু কারো কারো হুশজ্ঞান কখনই হয় না। যেমন দ্যাপ্রিন্টের ফরেন ডেক্সের নয়নিমা বসু [NAYANIMA BASU]।  তালেবানদের কাবুল  দখলের আগে তাকে ভারতীয় সামরিক বিমানে এমবেডেড জার্নালিজম করতে আফগানিস্তানে নেয়া হয়েছিল। সে এখন  তালেবান ইস্যুতে মোদী সরকারের পারফরমেন্সের পক্ষে প্রধান ভক্ত-প্রচারক; একেবারে – ফ্লায়িং হাই মানে আকাশে উড়ছেন অবস্থা!। অথচ খোদ জয়শঙ্করই এখনই বুঝে গেছে কত ধানে বড় জোর কত চাল হয়। সে ইতোমধ্যেই জানান দিচ্ছে ভারত কোন যুদ্ধে-টুদ্ধে নাই। জয়শঙ্কর এখন গ্লোবালাইজেশন ও গ্লোবাল বাণিজ্যের ভক্ত। বলছেন, সব দেশই একালে একসাথে (বাণিজ্য নিয়ে) কাজ করতে বাধ্য [……  globalisation. It reflects the compulsions of countries to work together. ]।  কিন্তু নয়নিমাদেরকে কে এসব বুঝাবে।

    এটাই গত বিশবছর ধরে চলে আসছে। প্রণব বা মোদি কারো আমলেই ভিন্ন কিছু হয়নি। বুশ-ওবামা আমলে এই ব্যক্তিত্বরা ১৬ বিলিয়ন ডলারের আমেরিকান রফতানির বাজার সুবিধা ভারতকে দিয়েছিলেন আর তাতেই এটা আমেরিকান বিদেশনীতির অঙ্গ অংশ হয়ে গেছিল। আর তাতেই জাতিবাদী ভারত কেঁচো হয়ে, চীনের বিরুদ্ধে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অপরের জন্য ভারতীয় শের হয়ে গিয়েছিল। এমনকি ট্রাম্প ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় এসেই সেসব রপ্তানি সুবিধা বাতিল করে দিলেও ভারত আর আমেরিকার হাত ছাড়তে পারেনি। অথচ এখন দাবি করছে তারা আমেরিকার সাথে সামরিক জোটে যাবে না! এ জন্যই এটাকে মাংস খাব না কিন্তু ঝোল খাবার লোভ বলেছি। ফলে এখনো আমরা আসলেই জানি না যে যদি বাইডেন ১৬ না হোক ১০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি সুবিধা ভারতকে এখন দেন সেক্ষেত্রে ভারত কি বাইডেনের সামরিক জোটে যাবে না বলতে পারবে? আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না। এই হল পরাশক্তি ভাবধরা ভারতের নিজ সম্পর্কে  বিবেচনাবোধ!

    বুদ্ধিমানরা জানে একসাথে সব দ্বন্দ্বের মীমাংসা করতে যাওয়া যায় না। কারণ এটা কার্যকর পদ্ধতি নয় আর, তা সফল করাও যায় না। প্রত্যেকবারে নতুন জেগে থিতু হয়ে উঠা প্রধান দ্বন্দ্বটারই কেবল মীমাংসা করে করে আগাতে হয়; যেমন এখনকার মূল দ্বন্দ্ব চীন-আমেরিকার। ফলে ভারতের দিক থেকে তা মোকাবিলার এটিচুড হতে হবে চীন-ভারত এক দিকে বনাম আমেরিকা, এভাবে দ্বন্দ্বের পক্ষ-বিপক্ষ সাজানো। এরপর তা সমাধান হয়ে গেলে বা এই দ্বন্দ্ব-নিরসন বা বিনাশ হয়ে গেলে তখন আবার মুখ্য দ্বন্দ্ব হিসেবে তা চীন-ভারত দ্বন্দ্ব হতে পারে। ততদিনে ভারতের অর্থনৈতিক মুরোদ অন্যকে বলার মতো করে বাড়িয়ে নেয়া যাবে আর তা দরকারও; যদিও এমনটা অর্জনের আগে দুটা আরো অভ্যন্তরীণ সংস্কার ভারতকে করতেই হবে। এক. হিন্দুত্ববাদ ত্যাগ করে দেশের সবাই নাগরিক ও সমান অধিকারের – এমন এই পরিচয়ে নাগরিক অধিকারভিত্তিক এক নয়া ভারতরাষ্ট্র তাকে গড়ে নিতেই হবে। আর দ্বিতীয়টা প্রথমটারই অনুষঙ্গ। তা হল নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র ধারণা সমুলে ত্যাগ করা। ফলে হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দু জাতিবাদ বাদ দিতে হবে। এমনকি নাদান অবুঝ ট্রাম্পের মত অর্থনৈতিক জাতিবাদও বাদ দিতে হবে। কারণ ইতোমধ্যে আমরা সবাই এক গ্লোবাল বাণিজ্য লেনদেনের যুগে একেবারে ঢুকে গেছি। আর এটা ‘ওয়ান ওয়ে’।

    এই ‘পুলসিরাত’ পার হতে পারলে ভারত পরে সবকিছু হতে পারবে। নইলে ‘কিছুই নয়’। এর আগে আগামি ভারতের ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি হেরে গেলে নতুন যারাই কোয়ালিশনে ক্ষমতায় আসুক তারা সম্ভবত চীনের অর্থনৈতিক পার্টনার হওয়ার পথ ধরবে। আর তাতে অর্থনৈতিকভাবে ভারত আরো দ্রুত সক্ষম হওয়ার পথ ধরবে। কিন্তু তবু আমেরিকার থেকেই ভারত সামরিক সরঞ্জাম কিনবে। কারণ ভারতের পারসেপশন হল তার সম্ভাব্য প্রধান শত্রু চীন। তাই ভারত চীনের থেকে অনেক কিছু কিনলেও অস্ত্র কিনতে পারে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা চীনের সাথে সম্পর্ক ক্ষতি করবে না।  কাজেই ভারতে এমনটা ঘটার সম্ভাবনার দিকে এখন পরিস্থিতি যাবে বলে অনুমান করছে অনেকে। আর সেক্ষেত্রে আপাতত ভারতকে কোয়াড থেকে বের করে দিলেও আমেরিকার সাথে মোদীর ঘনিষ্ঠতা থেকে যেতেই আমরা দেখব। আমেরিকার ভারতকে দরকারের চেয়ে মোদীর ভারতের আমেরিকাকে বেশি দরকার, পারসেপশন এমনই নানান কারণে। তবে বর্তমান হিন্দুত্ববাদের ভারতের নেতৃত্বের উপর আমেরিকারও তেমন আস্থা নেই।  অর্থাৎ চাইলে ভারতের জন্য বিকল্প পথ  আছে, এটার রেকর্ড  থাকল এতে!

    ‘আটলান্টিক’ আওয়াজটা আবার বেশি উঠছেঃ
    আটলান্টিক [Atlantic] এক মহাসাগরের নাম, যা মূলত আমেরিকাকে ইউরোপ থেকে আলাদা করেছে মনে করে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়। সেদিকে তাল রেখে ‘আটলান্টিক’ অনেক কিছুরই নাম রাখা হয়ে থাকতে দেখা যায়। এমনই প্রতীক বা ইঙ্গিত অর্থে ‘আটলান্টিক-এর একটা মানে হল – যা কিছু আমেরিকা ও ব্রিটেন (ইউরোপ) মিলে অন্যদের বিরুদ্ধে তাই ‘আটলান্টিক’। এখন এখানে আলোচ্য ইস্যুতে, আমেরিকা ও ব্রিটেন দু’দেশ মিলে অস্ট্রেলিয়াকে জাপটে ধরে তাকে এশিয়ায় সামরিক কেন্দ্র বানাতে চাচ্ছে। তাও আবার পরমাণুকেন্দ্রিক সামরিকতা। ফলে এটাও যেন এক আটলান্টিক সামরিকতা! এই হল আমেরিকার এই নয়াজোটের তাতপর্য।

    কিন্তু বাইডেন বেখবর হয়ে আবার  নিজেকে পুরানা  স্টাইলে প্রভাবশালী  ক্ষমতাবান  ‘বীর’ সাজতে চাইছে।  কারণ মূলত দুনিয়াতে ইতোমধ্যে সামরিক অস্ত্রে পরমাণু টেকনোলজির ব্যবহার বন্ধ করা, নাহলে নুন্যতম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সবাই নানান রিজিওনাল চুক্তি করছে। এবং ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে যেমন জ্বালানি ও বিদ্যুতের উৎস হিসেবে পরমাণু টেকের ব্যবহার কমানোর দিকে সারা দুনিয়া ঝুঁকে পড়েছে, জনমতও সেদিকে। অথচ এমনকালেই বাইডেন-বাবাজি পরমাণু-সাবমেরিন (SSBN) দিয়ে কী করে এশিয়ার যুদ্ধের নাট্যমঞ্চ সাজাতে আসে? সে কেমন কথিত এই আটলান্টিক শক্তি?

    এ পেছনের মুল কারণ সম্ভবত এটাই যে কথিত এই আটলান্টিক শক্তির উদ্যোগ আসলে অন্যের ঘাড়ে মানে ও অষ্ট্রেলিয়ার উপর দিয়ে যাবে। বাইডেনের “আটলান্টিক শক্তি” এশিয়াতে আসছে একারণে যে, এর যুদ্ধের নাট্যশালা থেকে আমেরিকা-বৃটেন থেকে অনেক দূরে? তাই কী? আপাতত বাইডেনদের তাই মনে হচ্ছে বটে কিন্তু তাই কি? না। অচিরেই বাইডেন এর বিরোধিতা সামলাতে হয়রান হয়ে যাবেন!

    ফ্রান্স প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ কেন?
    এই ত্রিদেশীয় সামরিক চুক্তি ও জোট খুলে বসাতে ইউরোপের দ্বিতীয় শক্তি ফ্রান্স প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছে। কেন? এর কারণও সাবমেরিন। যে সাবমেরিনভিত্তিক জোটের কথা আমরা এখন শুনছি – আমেরিকা-ব্রিটেনের  আর সাথে আলাপ আলোচনার কালে সমান্তরালে তবে অনেক আগে থেকে অস্ট্রেলিয়া ফ্রান্সের সাথেও তাদের থেকে সাবমেরিন কিনবে বলে আলোচনা প্রায় সমাপ্ত করে এনেছিল। ত্রিদেশীয় চুক্তিতে যেটা  আছে তাতে আগামি ১৮ মাসের মধ্যে কয়েকটা নয়া পরমাণু-সাবমেরিন আমেরিকা-ব্রিটেন বানিয়ে দিবে। আর এজন্যই ত্রিদেশীয় চুক্তি হয়েছে, এটাই ওর মুলকথা। কিন্তু বেশি বুদ্ধিমান বলে অষ্ট্রেলিয়া আসলে সে ভীষণ বোকা আর লোভী। তার স্বপ্ন যে সে ঐ অঞ্চল সাম্রাজ্য খুলে বসবে আর আমেরিকা-বৃটেন তাকে দূরে বসে সহায়তা দিবে আর লভ্যাংশ গুণবে। এই লোভীর খবরই নাই যে  “সাম্রাজ্যরূপে দোকান” খুলে বসার দিন ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে গেছে। দুনিয়াতে কেউ কারো আর  এখন সাম্রাজ্য খুলা বাস্তবতা নাই, সব দোকান বন্ধ। অটোমান, জার কিংবা বৃটিশ বা ফরাসী ইত্যাদি সব কলোনি সাম্রাজ্য একালে নাজায়েজ, আর এটাই জাতিসংঘের জন্মভিত্তি।  যদি সাম্রাজ্য ব্যবস্থা ফিরিয়ে দেখতে চান তো দুনিয়াকে ১৯৪৫ সালের আগের দুনিয়ায় ফিরাতে হবে। পারবেন?

    তাহলে এযুগে কী সম্ভব? অর্থনৈতিক শক্তি জোট হওয়া সম্ভব। চীনের বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্প যেমন এমন জোট সহজে সম্ভব। এমনকি বিনিয়োগের মুরোদে দেখাতে পারলে বাইডেনও পালটা আরেক কোন মহাপ্রকল্প জোট খাড়া করতে পারেন। [যদিও বাইডেনের সক্ষমতায় ঐ বিনিয়োগের মুরোদটাই অনিশ্চিত]। তো অষ্ট্রেলিয়া নিজ কোন মুরোদ দেখিয়ে ঐ অঞ্চলে সবার উপরের এক ‘সাম্রাজ্য’ নেতা হবেন?  বিপুল কোন বিনিয়োগ সক্ষমতা আছে তাঁর? নাকি লেটেস্ট পরমাণু-সাবমেরিন? এই অসারবস্তু চিন্তাটা বুঝবার মত কেউ কী অষ্টেলিয়ায় নাই? অবিশ্বাস্য! ঘটনা আরো আছে।

    কিন্তু ফরাসিদের হারিয়ে কথিত আটলান্টিক জোটের আমেরিকা ও ব্রিটেন কোন কারণে এগিয়ে গেল? কারণ বাইডেনও তো খুবই বুদ্ধিমান। তার এখন নিজেকে বাঁচাতে অস্ত্র বিক্রি বাড়াতে চান, অর্থাৎ নিজরাষ্ট্রের দায় ও পরিচালন ব্যয় কমানোই মুল লক্ষ্য। তাই অষ্ট্রেলিয়ার এই দিবাস্বপ্ন জানলেও পরমাণু-সাবমেরিন বেচাই তার একমাত্র লক্ষ্য। অষ্ট্রেলিয়া বুদ্ধিমান সাজতে গিয়ে আমেরিকার পাশাপাশি ফ্রান্সের কাছ থেকে বিকল্প হিসাবে রেডিমেড তৈরি থাকা সাবমেরিন কিনবার সম্ভাবনা যাচাই করেছিলেন। যার মুল্য ছিল প্রায় ৯০ বিলিয়ন (ভারতীয় ঐ নেভি অফিসারের মতে)। আর এখানেই দাও মারেন বাইডেন আর আরেক চাপাবাজ প্রধানমন্ত্রী বরিস। তারা অষ্টেলিয়াকে বুঝান যে এটা তারা অষ্টেলিয়াকে নতুন বানিয়ে দিলে অনেক কম খরচে হবে। আর এতেই ফরাসী ম্যাঁক্রোর কাস্টমার ছুটে যায়। বলা যায় বাইডেন লোভ দেখিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে গেছেন বলে ফ্রান্স মনে করে।

    ফলে মুলকথা আমেরিকা-বৃটেন অস্ট্রেলিয়াকে নিজেদের কোলে তুলে নিতে সক্ষম হয়। আর এতে ক্ষুব্ধ ফ্রান্সের প্রতিক্রিয়া হয় দেখার মত। ফ্রান্সের ক্ষুব্ধ কূটনৈতিক মন্তব্য- ওরা ‘পিঠে ছুরি মেরেছে’ [“It’s a stab in the back. We had established a trusting relationship with Australia, and this trust was betrayed,” ],  মানে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ইউরোপীয় মিডিয়া বলছে এটা ৫০ বিলিয়নের বেশি ইউরোর ডিল […France-slams-australia-us-e50b-submarine-deal…]। ভারতের ঐ থিঙ্কট্যাংক বলেছে এতা ৯০ বিলিয়ন ডলারের ডিল [Australia’s decision to scrap its $90 billion nuclear submarine contract with France’s Naval Group ]।
    আর ফরাসী প্রধানমন্ত্রী ম্যাঁক্রোর এমন প্রতিক্রিয়া বলছে এটা আসলে যতটা সামরিক জোটের ঘটনা বলে দেখানো হচ্ছে এটা এর চেয়েও বেশী অস্ত্র ব্যাবসায়িক। 

    তাই ঘটনার আসল দিক অন্যখানে।  ফ্রান্সের এই প্রতিক্রিয়া থেকে পরিষ্কার যে, এটা নেহাত সামরিক জোটের মামলা নয়। কারণ এটা আসলে যুদ্ধজোট নয়, ৯০ বিলিয়ন ডলারের এক বিনিয়োগ ও লাভালাভের প্রকল্প! তাই তো নাকি? এটা অর্থনৈতিক লাভালাভেরই জোট। অন্য দেশকে লুটে যে অর্থনৈতিক লাভালাভ হবে, এরও ভাগাভাগি করে খাওয়ার জোট। ভারতীয় নেভি অফিসারও এই ইঙ্গিতই দিয়েছেন। অতএব ফরাসিদের তাড়িয়ে এটা তাহলে আমেরিকা-ব্রিটেন সে প্রকল্প নিয়ে নিয়েছে এর ঝগড়া। সেটা হোক! কিন্তু কথা হল, এটা এখন কী ধরনের আটলান্টিক জোট হল? ফরাসিরা নিশ্চয় ভেসে আসেনি, ভেসে যাবেও না! তবে অবিলম্বে এখানে ন্যাটোকে ভেঙে নতুন পরিস্থিতির উপযোগী করে সাজানোর ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। আটলান্টিক শব্দটা বেশি উঠে আসার কারণ এসবেরই পেছনে লুকানো। ওদিকে ইতোমধ্যে ক্ষুব্ধ ফরাসী প্রধানমন্ত্রী ম্যাঁক্রো অষ্টেলিয়া ও আমেরিকা থেকে রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহারের ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ ব্যাপারটা খুব সহজে মিটছে না।

    চীনের প্রতিক্রিয়া:
    নতুন AUKUS জোট, দক্ষিণ চীনসাগর ঘিরে এশিয়ায় এই আরেকটা সামরিক জোট হচ্ছে, এতে চীনের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া হবে তা স্বাভাবিক। তবু চীনের প্রতিক্রিয়া অতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। যেমন, চীন এক শব্দের এক ছোট মন্তব্য করেছে – ‘ইরেসপন্সিবল’ মানে দায়িত্বজ্ঞানহীন [‘Aukus’  security pact irresponsible]। খুবই গভীর অর্থবোধক মন্তব্য সন্দেহ নেই। কেন?

    চীন-আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতাই মূল দ্বন্দ্ব বা বিরোধ; মানে গ্লোবাল সিস্টেমের নেতৃত্ব হল বিরোধের কেন্দ্র। যা মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতা কেন্দ্রিক- আর সেই নেতৃত্বের অবস্থান থেকে আমেরিকা ক্রমেই ঢলে পড়ছে; বিপরীতে চীন উঠে আসছে। এই হলো বাস্তবতা। তার একটা বড় প্রকাশ হল, ইন্ডেপেন্ডেন্ট স্টাডি রিপোর্টগুলো থেকে পাওয়া –BBC REPORT অথবা  REUTERS  বলছে আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এখানে  খুবই খেয়াল করে লক্ষ্য করার ব্যাপারটা হল, এখানে অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে কথা হচ্ছে, কোনো সামরিক সক্ষমতা নয়, কোনো রাজনৈতিক চিন্তার বিরোধ বা সক্ষমতাও নয়। অর্থাৎ এটা একেবারেই অবজেকটিভ সক্ষমতা, সাবজেকটিভ একেবারেই নয়। এর মানে হল, আমেরিকা এই যুদ্ধ করে এই যুদ্ধে জয়লাভ করলেও তাতে চীনের চেয়ে আমেরিকা অর্থনৈতিক সক্ষমতায় সমান হতে পারবে না।

    অর্থনৈতিক সক্ষমতা যুদ্ধে অর্জনের বিষয়ই নয়। তাহলে আমেরিকা-ব্রিটেন সাথে এক অস্ট্রেলিয়াকে – এভাবে নিয়ে তারা যুদ্ধজোট সাজাচ্ছে কেন? যুদ্ধে জিতলে অস্ট্রেলিয়াও কি চীনের সমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করবে? কোনই সম্ভাবনা নাই। এছাড়া এটা কলোনিদখলের যুগ আর নয় যে অষ্ট্রেলিয়া বাইডেনের সহায়তা কোন দেশকে দখল করে তার সম্পদ বৈধ বলে নিজের দাবি করতে পারবে। অথবা যারা সাবমেরিন সাপ্লাই দিয়েছে তাদেরকে চুরি লুটের কোন ভাগ দিতে পারবে।

    এছাড়া আরো মারাত্মক দিক হল,  এই সামরিক জোট চুক্তিটা করা হল আবার একটা পরমাণু-যুদ্ধের হুমকি তৈরি করে। এটার সাফাই ন্যায্যতা কী? এবার এমনকি যুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া বিজয়ী হলেও কি সে নিজ অষ্ট্রেলিয় বাসিন্দাদের জীবন রক্ষা করতে পারবে? তারা পরমাণুর রেডিয়েশনের মধ্যে বেঁচে থাকবে কী করে? যারা চুক্তিটা নিয়ে খুবই ব্যস্ত এই শাসক রাজনৈতিক নেতারা তাদের বাঁচাবেন কী করে? এবার আমেরিকা-ব্রিটেনের কি এ ব্যাপারে অস্ট্রেলিয়াকে ঠে্লে দেওয়ায় ওসব নাগরিকদের প্রতি তাদের কোনো দায় নেই?

    কেউ  নিজেকে “মানুষ” বলে দাবি করলে, তাঁর ন্যূনতম দায়িত্বজ্ঞান বোধ থাকলে এমন সিদ্ধান্ত তিনি নিতে পারে না; যেখানে পরমাণু শক্তির বাণিজ্যিক বা সামরিক সর্ববিধ ব্যবহার বন্ধ করা, ন্যূনপক্ষে একেবারে কমানো – এটাই এখনকার মুখ্য গ্লোবাল ট্রেন্ড এবং প্রবল গ্লোবাল জনমতও বটে।

    চীনের সাথে কোন দেশের বিরোধ করার, বিশেষ করে রাজনৈতিক বিরোধিতা করার জন্য পশ্চিমের বহুবিধ জেনুইন বিষয় আছে। আর তা দোষের কিছুওও নয়। তাই সেগুলো নিয়ে সদর্পে লড়া তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক ফোরামে বাধা দেয়া দরকারও সম্ভবত যাতে চীন তা অন্তত অনেকটাই গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। কেবল ব্যাপারটাকে ডায়লগের মধ্যে রাখতে পারতে হবে। তা অবশ্যই আমেরিকা করতেই পারে। কিন্তু তাই বলে এই বাধা দেয়া আমেরিকার AUKUS জোট করবে পারমাণবিকভাবে? এরা হিটলারের চেয়েও ঘৃণিত ব্যক্তিত্ব হবে!  তাও আবার একটা অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিরোধে? এতে এমনকি পশ্চিম বা আটলান্টিকের বাসিন্দাদেরকেও দায় নিতে হবে! তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরকে ঠেকানোর দায়িত্ব তাদেরও আছে। এই ইস্যুতে আজীবন তাদের জবাবদিহিতা করতে হবে।

    এশিয়ায় বাংলাদেশসহ আমরা কেউ অবশ্যই কোনো অর্থনৈতিক জোটের বাইরে অন্য কোনো সামরিক বা যুদ্ধজোটে যুক্ত হতে পারি না। কমবেশী আমাদের সবার মনোভাব যুদ্ধজোট বিরোধী। ওবামার ‘এশিয়া পিভোট নীতি’ ফেল করেছিল একারণেই। পরের কোয়াডও প্রায় ফেলের পথে একই কারণে। সাউথ চায়না সি-এর আশপাশের (অস্ট্রেলিয়া জাপান ছাড়া) যেমন আসিয়ানভুক্ত কোনো দেশ এসব কোন উদ্যোগ না জোটে অংশ নেয়নি। অর্থাৎ যাদের সাথে চীনের সমুদ্রসীমা বিরোধ আছে এমন কোনো দেশ আমেরিকার কোন জোটে কখনো অংশ নেয়নি, আশ্রয় নেয় নাই। অর্থাৎ তারা ন্যায্যভাবে তাদের চীনের সাথে বিরোধের অবশ্যই মীমাংসা চায়; কিন্তু আমেরিকার কোলে চড়ে নয়, কিংবা আমেরিকার পাতা কোনো যুদ্ধজোটে যোগ দিয়ে নয়।  একারণের আমেরিকান সব উদ্যোগ মূলত ফেল করছে একের পর এক। আমেরিকার এই ব্যর্থতাই কি যথেষ্ট প্রমাণ নয় যে, ঐ অঞ্চলের কেউ ওখানে কোনো যুদ্ধজোট গড়ার দরকার মনে করে না?  এর পরেও আমেরিকা ছাড়েনি। এবার পারমাণবিক  যুদ্ধের দামামা নিয়ে ব্যবসা করতে এগিয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে আবার এশিয়ার জন্য এক মহাদুর্যোগ সামনে! এটাও আমাদেরকে অবশ্যই পার হতেই হবে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৮ সেপ্টেম্বর আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “ভারত নয়, আমেরিকার ত্রিদেশীয় সামরিক জোট “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • প্রথম আলো কী নিজেই নিজেকে মৃত ঘোষণা করতে চাইছে?

    গৌতম দাস
    ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১,  ১০.৫৬ সকাল
    প্রথম আলো চরমতম বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আমাদের জানামতে এর অফিস কাওরানবাজারেই ছিল। কিন্তু গত দুমাসের রিপোর্টিং মান, ধরণ ও ততপরতায় তাতে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। মনে হচ্ছে এটা বোধহয় কোন ভারতীয় পত্রিকা। যার অফিস ভারতের কোন শহরে!
    এমনিতেই ভারতীয় পত্রিকায় জার্নালিজম থাকে না। থাকে জাতিবাদ-দেশপ্রেমিকতা। মানে খবর যেভাবে পেশ করলে ভারত রাষ্ট্রের প্রতি দেশপ্রেম প্রকাশ পাবে সেটাই করতে হবে। তাতে নিউজ মিথ্যা হলেও অসুবিধা নাই। অর্থাৎ জার্নালিজমের নীতি ও সততা এর গাইডলাইন নয়, বড়জোর সেকেন্ডারি। অর্থাৎ দেশপ্রেমের নামে খাড়া মিথ্যা প্রপাগান্ডাও জায়েজ। আর কথিত এই দেশপ্রেমের নিচে যদি কিছু জায়গা ত্থাকে তো সেখানে জার্নালিজমকে ফেলে রাখা যেতে পারে। এককথায় কথিত তাদের ‘ন্যাশনাল ইন্টারে্স্টটের’ সাংবাদিকতা। ফলে এরপর আর খবরের সত্য-মিথ্যা জাহান্নামে!
    কথা এখানেই শেষ না। দল বিজেপি যেহেতু এখন ক্ষমতায়। তাই মোদীর
    আরএসএস –বিজেপির রাজনীতি এবং স্বার্থটাই ভারত দেশপ্রেমের মাপকাঠি এবং তাদের কথা-ই ভারতের ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’। তাই শেষে এটাই প্রথম আলোরও খবর প্রকাশের গাইড লাইন হয়ে দাড়িয়েছে। কারণ প্রথম আলোর খবরের সোর্স বলা হচ্ছে ভারতে প্রকাশিত কোন পত্রিকার খবর।
    আগেও বলেছিলাম “ডেস্ক নিউজের” নামে প্রথম আলোতে আরেক চাতুরি চলে। তা হল, খবরের উতস-এর পরোয়া না করে অনুবাদের নামে যা ইচ্ছা তাই রিপোর্ট করা। যেন ‘অনুবাদক’ বলে আরেক ক্যাটাগরির কর্মী প্রথম আলো নিয়োগ দিয়েছে বা দেখতে পাওয়া যাবে। যারা সাংবাদিকতার সব দায় কর্তব্যের উর্ধে। খবরের উৎসে কোন কথা বা শব্দ থাক আর নাই থাক তিনি যেকোন শব্দ খবরের মধ্যে ঢুকাতে পারেন, বেপরোয়া। কারণ ওটা নাকি ‘ডেস্ক নিউজ’। ফলে যেন খবরের সত্যতার দায় প্রথম আলোর নাই।
    এর উপর আবার গতমাস থেকে এখন শুরু হয়েছে ‘বান-তালে’ (শব্দ উলটে নিয়ে পড়তে হবে) জার্নালিজম’। মানে যারা কা=বু=লে ক্ষমতা দখল করেছে। তাদের নিয়ে ভারতের জার্নালিজম। খবরের সোর্স না থাকলেও বানিয়ে এই নতুন শাসকদের বিরুদ্ধে লিখতে হবে ও সেটাই জার্নালিজম বলে মানতে হবে। নয়া শাসক আসাতে ভারতের স্বার্থের ক্ষতি হয়েছে। তাই এই ইস্যুতে ভারতের জার্নানিজম বাপ-মা হারা বেপরোয়া হয়ে গেছে। বেঁচে আছে কেবল কথিত ভারতীয় জাতীয় স্বার্থের সাংবাদিকতা, তাই দেশপ্রেমের ভারে, উৎস না থাকলেও যা খুশি লিখে দিবার স্বাধীনতা।
    আর এতে প্রথম আলো হয়েছে আরো স্বাধীন বেপরোয়া। ভারতের যেকোন মিডিয়ায় প্রকাশিত এসব প্রপাগান্ডা গারবেজকে প্রথম আলো তার প্রকাশিত নিজ খবরের সোর্স বলে দাবি করছে। পেগাসাস এই ইসরায়েলি আড়িপাতা সফটওয়ার মোদী কিনেছে, ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে, আর বিরোধী রাজনীতিক এমনকি নিজ সরকারের সচিব ইত্যাদির উপর তিনি তা ব্যবহার করে আসছেন। এটা নিয়ে ভারতের সুপ্রীম কোর্টে মামলা চলছে। সংসদে হৈ চৈ চলছে। অথচ এখনও না সরকার বা সফটওয়ার কোম্পানী (এনএসও) স্বীকার করেছে যে মোদী এই সফটওয়ার কিনেছে। আদালতে দেওয়া সরকারের এফিডেফিট ইতোমধ্যে দুবার বদলিয়েছে। এমনকি কিনে নাই সেটাও বলছে না। পিছলে বেড়াচ্ছে। অথচ এনিয়ে যে রিপোর্ট প্রথম আলো ২৪ জুলাই ছেপেছে তা আসলে কোম্পানী এনএসও এর পক্ষের এক সাফাই। সেজন্য শিরোনাম হল এই আড়িপাতা সফটওয়ারের কারণে নাকি “লাখ লাখ মানুষ রাতে ভালো ঘুমাতে পারে”।
    এএনআই – এটা নিজেকে ভারতের এক প্রাইভেট নিউজ এজেন্সী বলে দাবি করে। বস্তুত এটা ফেক নিউজের একটা আড়ত। ইইউ এর এক গবেষণাালব্দ ফল থেকে পাওয়া অভিযোগ এটা। (EU DisinfoLab report) গুগল সার্চ দিয়ে আগ্রহিরা খুজে নিতে পারেন। আর এই কথিত এজেন্সীর উপরে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের হয়ে যেসব ফেক নিউজ করার দরকার হয় তা করে দেওয়ার বা হালাল করে দেওয়াই এই এজেন্সীর কাজ। অথচ এই এএনআই এর নিউজকেই উৎস মেনে পিআলো তা ছেপে চলেছে।
    যেটা গত পরশু একেবারেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে সেটা হল, একটা কথিত নিউজ;
    এতে উল্লেখিত খবরের সোর্সগুলো এরকমঃ
    ১। ……বলে সরকারি সংস্থাগুলো মনে করছে
    ২।…… বিভিন্ন সূত্রের খবরে জানা গেছে।
    ৩……… বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
    ৪।……… বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী,
    ৫। ……… পাকিস্তানের নাম জড়িয়ে পড়ার কথা শোনা যায়।
    ৬।………… পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রচার রয়েছে।

    ৭।………… ঢাকার বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী

    ৭৫০ অক্ষরের এই কথিত নিউজে খবরের সোর্স এই সাতভাবে বলা আছে। এটা কী জার্নালিজম? তাও প্রথম আলোর?
    প্রথম আলো এভাবে নিজেকে নিচা করে নামিয়ে কথিত খবর ছাপছে কেন?
    অর্থ সংকট? পাকিস্তান আমাদের কারও অপছন্দের দেশ হতেও পারে। কিন্তু সেজন্য এর বিরুদ্ধে এমন প্রপাগান্ডা ছাপিয়ে নিজের অর্থ সংকট মিটাতে হবে? ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ বা নয়াদিল্লির অর্থ নিয়ে? তাই কী?
    এমন গারবেজ অসততার জিনিষগুলো প্রথম আলোতে ছাপার আগে এই পত্রিকার সম্পাদকের আত্মহত্যা করাই অনেক সম্মানের হত!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • আফগানিস্তান সবাইকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে

    আফগানিস্তান সবাইকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে

    গৌতম দাস

    ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

    The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.” –Josep Borrell, ইইউর ফরেন পলিসি চিফ, the European Union’s top diplomat;

     

    গত ৩১ আগষ্টের দুদিন আগেই শেষ পর্যন্ত আমেরিকা আফগানিস্তান ছেড়ে গুটিয়ে চলেই গেল; আর তা পক্ষ-বিপক্ষের সবাইকে অবাক করে। বিশেষ করে পক্ষের লোকেরা নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, আমেরিকারও দিন শেষ হয় তাহলে! এবার এতে সবাই বুঝে গিয়েছিল এটা শুধু আফগানিস্তান ছেড়ে আমেরিকার গুটিয়ে চলে যাওয়া বা পালিয়ে যাওয়া নয়। এটা শুরু। এটা শুধু আমেরিকার আগফানিস্তান ছেড়ে যাওয়া নয়, এটা গত কমপক্ষে ৫০০ বছরে ধরে অন্যের দেশে গিয়ে সে দেশ দখল, লুটপাট, ক্ষমতার রুস্তমি দেখানো আর সভ্যতা শেখানোর যে ভণ্ডামি চলেছিল, এখন থেকে এই পুরো প্রক্রিয়াটারই গোটানো, বন্ধ বা সমাপ্তির ইঙ্গিত করছে এটা। আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের দিন শেষ – মানে পশ্চিমের নেতৃত্বের দিনও শেষ! এটাই হল সেই অবিশ্বাসের ঘটনা যা এখানে বাস্তবায়িত হয়ে গেছে!

    “রাষ্ট্র আর রাজনীতি” সাধারণত আমার লেখার মূল প্রসঙ্গ হয়ে থাকে। তবে রাষ্ট্র আর রাজনীতির দেশীয় দিকের চেয়ে বৈদেশিক বা গ্লোবাল দিকটা এ লেখায় অনেকসময় ভারী থাকে বলে অনেকে আমাকে আন্তর্জাতিক ইস্যুর লেখক বলে মনে করে; যদিও আমার লেখার মূল প্রসঙ্গ রাষ্ট্র আর রাজনীতিই।

    গত ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তির প্রভাব’ নিয়ে একটা সিরিজ লিখেছিলাম। ফলে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন আমি আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে লিখছি। আসলে তখন থেকেই মূলত যে কথা বলতে চেষ্টা করেছি তা হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দুনিয়ায় প্রথম একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম তৈরি হতে সুযোগ পেয়েছিল, আমেরিকা যার প্রথম নেতা। যদিও এই সিস্টেমে কে নেতৃত্ব দেবে তা নির্ভর করে অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্নে সেসময়ের যে দেশ শীর্ষে থাকে তার ওপর। আবার যতই এই শীর্ষ অবস্থান ঢলে পড়ার দিকে যেতে থাকবে ততই তার নেতাগিরির দিনও শেষ হবে। আবার ওই ঢলে পড়া শীর্ষ অবস্থান বিপরীতে ক্রমেই অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে, যার দখলে যাবে, সেই-ই নতুন গ্লোবাল নেতার আসন নেবে। তবে সাবধান, অর্থনৈতিক সক্ষমতার বৃদ্ধির ব্যাপারটা সামরিক ক্ষমতার বলে অর্জনের বিষয়ই নয়। আমার লেখার প্রসঙ্গ ঠিক এই গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলও নয়। বরং জানা যে, এই পালাবদলের কালে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী কী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে অথবা নতুন কী কী ফ্যাক্টরের আবির্ভাব হয়ে থাকবে, এসব।

    ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে এ কথাগুলোই আমি বলে আসছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, মানুষের পুরনো চিন্তার ফ্রেম তাকে আমার কথাগুলো বুঝতে বাধা দিয়ে গেছে। বিশেষত যেমন এক প্রধান বাধা হল কমিউনিস্ট চিন্তার ফ্রেমে ফেলে আমার কথা বুঝতে চাওয়া। দুই. যারা আবার নিজেদের কমিউনিস্ট ফ্রেমের বাইরের চিন্তার লোক মনে করেন তারাও আমার কথা মানতে চাননি। কারণ আমি বারবার দেখিয়েছি, এখনকার পালাবদলে আমেরিকার অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর ওদিকে তাদের আমেরিকা-প্রীতি বা শক্ত আস্থা ততই দুর্বল হলেও তারা আমার কথা অস্বীকার করে থেকেছে। যদিও সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হয়েছে এক প্রপাগান্ডা যে, আমি ‘চীনের পক্ষের লোক’; অতএব এ কারণে নাকি আমি আমেরিকাবিরোধী। আমি যতই বলি, আমি অবজেকটিভ দর্শক-পূর্বাভাসদাতা মাত্র। তারা মানেনি। বিশেষ করে ভারতের প্রপাগান্ডা যে, আমারটা নাকি চীনা ভাষ্য।

    অথচ একমাত্র আমিই গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম তৈরি হওয়ার ইতিহাসটা প্রসঙ্গ করে সবার সামনে এনেছি। এভাবে গ্লোবাল নেতৃত্ব ব্যবস্থা, আবার এই নেতৃত্বের পালাবদলের প্রসঙ্গটাও এনেছি। ইতিহাসে এ ঘটনাটা প্রথমে ঘটেছে আমেরিকার নেতৃত্বেই। ফলে অকৃপণভাবে বাস্তবের সেই আমেরিকান গৌরবের কথাই আমাকে সতভাবে তুলে ধরতে হয়েছে। বাংলাদেশে আমার চেয়ে বেশি সেই ইতিহাসের আমেরিকান গৌরবের কথা আর কেউ তুলে আনেনি, তাদের এটা অজানা থাকার কারণে। কলোনিয়াল কারণে আমরা ইউরোপিয়ান-ব্রিটিশ ইতিহাস পড়ে ও ফলো করে অভ্যস্ত, আমাদের একাডেমিগুলোতে পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসুচিও তাতেই ভারাক্রান্ত। যেমন অনেক কমিউনিস্টকে দেখেছি, যারা এখনও মনে করেন গ্লোবাল নেতা বা  এক নম্বর পরাশক্তি হল নাকি ব্রিটিশ রাষ্ট্র, আমেরিকা নয়।

    যাই হোক, আমার দিক থেকে সেটা ছিল গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমটা (ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতাসহ) তৈরির পেছনে আমেরিকান অবদানটাকে তুলে এনে ওর জন্ম ইতিহাসের দিকটা দেখানো। কিন্তু সেটা আমেরিকান-প্রীতি দেখানো জন্য অবশ্যই নয়। ইতিহাসের ফ্যাক্টস বলার জন্য বলতেই হয়েছিল। আবার উল্টো দিকে পালাবদলে চীনের নেতা হওয়ার ক্ষেত্রে তার যোগ্যতা-সহ বড় অযোগ্যতাগুলো কী – এর তালিকা আমিই সবার আগে ও বিস্তারে লিখেছি। কারণ মূল বিষয়টা আমেরিকা বা চীন এর কোনটাই একেবারেই না। ব্যাপারটা হল – আমাদের সময়কালকে আমরা ঠিকভাবে বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে পারছি কি না! এটাই মূল বিষয়। কিন্তু সেসব প্রসঙ্গ এখানে আবার কথা তুলেছি কেন?

    ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস এর সাক্ষাৎকারঃ
    বাইডেনের আমেরিকার আফগানিস্তান ছেড়ে পালানো দেখে বর্তমান ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস [Ben Wallace ]  দ্বিতীয় বিশযুদ্ধের পরে এই প্রথম  সবদায় আমেরিকা ঘাড়ে ফেলে হাত ধুয়ে ফেলেছেন।  অথচ ওয়ার অন টেররের শয়তানির প্রথম যুগে, প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে এক নিশ্বাসে যার নাম উচ্চারণ হত তিনি হলেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার! মিঃ ওয়ালেস কী এখন এই মিথ্যাবাদী [সাদ্দামের ইরাকের কাছে weapon of mass destruction (WMD) আছে এই মিথ্যা কথা ] প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার এর দায় নিতে চাচ্ছেন না।  ঐ  সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী ওয়ালেস  বলেছেন, তিনি “আমেরিকাকে আর কোনো পরাশক্তি মনে করেন না” [It is certainly not a global force, it’s just a big power,]। কেন? আসলে সাক্ষাৎকারটা নিয়েছিল ব্রিটিশ ‘স্পেকটেটর’ নামে ম্যাগাজিন। সেটি নিয়ে লন্ডন ‘গার্ডিয়ান’ পরে এক রিপোর্ট করেছে। মূল সাক্ষাৎকারে ব্রিটিশ মন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘গ্লোবাল রঙ্গমঞ্চে আফগানিস্তান থেকে প্রস্থানটা ব্রিটিশ শক্তিরও সীমাবদ্ধতা প্রদর্শন করে কি”? [whether the exit from Afghanistan demonstrated the limits of British power on the world stage] মন্ত্রী এই জিজ্ঞাসার জবাবে প্রথমে স্বীকার করে নেন যে, ‘ব্রিটেন স্পষ্টতই একটি পরাশক্তি নয়”। এরপর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে মনোযোগ দিয়ে চেপে ধরেন। ওয়ালেস বলেন, ‘যে দেশ বা শক্তি যেকোনো একটা কিছু করব বলার পরে আর সেটি করবেই বলে আঁকড়ে থাকার মুরোদ রাখে না সে আসলে পরাশক্তিই নয়।’
    কিন্তু এত কঠিন করে আমেরিকাকে নিচু দেখানো কথা মন্ত্রী বললেন কেন?

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) মাঝামাঝি ১৯৪২ সাল থেকে ওই যুদ্ধসহ গ্লোবাল নেতৃত্বই আমেরিকার হাতে চলে গিয়েছিল। আমেরিকা-পরাশক্তি হওয়ার দিকে যাত্রা তখন থেকে। অর্থাৎ ১৯৪২ সালের আগের টানা ৩০০ বছর সারা দুনিয়া ছিল ইউরোপের কলোনি; ইউরোপের পাঁচ রাষ্ট্রের অধীনে কলোনি দখলে চলে যাওয়া দেশ। আর এই পাঁচের মধ্যে ব্রিটিশ-ফরাসি ছিল সেরা – যে দুয়ের মধ্যে আবার ব্রিটিশরা সবার সেরা। আর বিশ্বযুদ্ধ শেষে সারা ইউরোপকে স্বেচ্ছায় কলোনি শাসন ত্যাগ করতে হয়েছিল। কারণ আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

    তবু বিশ্বযুদ্ধের পরে পরাশক্তি  আমেরিকার আড়ালে থেকে তারই ছোট পার্টনার হিসেবে অন্তত ব্রিটিশ-ফরাসি ভাব ধরে চলেছে। কিংবা ন্যাটো-জোটের সদস্য হিসেবে থাকার কারণে তারাও পরাশক্তি ভান করার সুযোগ পেয়ে এসেছে। করে গেছে। অথচ এসব কমন বাহিনী (যেমন- ন্যাটো) অথবা জার্মানি, জাপানে বা দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যারাক গড়ে সেখানে আমেরিকান সেনাবাহিনী পেলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেই ১৯৪৫ সাল থেকে এসবের খরচের বেশির ভাগ এখনো একা আমেরিকা বহন করে আসছে। খুব সম্ভবত আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের পরে এখন আমেরিকা এসব খরচ বইতে অপারগতা দেখাবে, ফলে ইউরোপের যে ক্ষমতার জৌলুস সেসব কিছুতে এখন টান পড়বে।

    ইইউর ফরেন পলিসি চিফঃ
    তাই ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফরেন পলিসি ও নিরাপত্তা পলিসি ইস্যুতে প্রধান প্রতিনিধি জোসেপ বোরেলের [Josep Borrell] মন্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলছেন, বাইডেনের দুর্বল পরিকল্পনায় আফগানিস্তান ত্যাগ করার পর সারা মহাদেশজুড়ে এ নিয়ে সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। ‘এটা পশ্চিমা দুনিয়ার জন্য বিরাট পরাজয় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে সবকিছু ওলটপালট করে খেলা বদলে দেয়ার মতো এক ঘটনা। “ইইউ’র এখন ‘আপন স্বার্থ বুঝে নিতে সক্ষম হতে নিজেই এগিয়ে আসা ও সক্ষম হওয়া উচিত, বিশেষত যখন আমেরিকা আর সংশ্লিষ্ট থাকতেই চাচ্ছে না” [The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.]”।

    But after Biden’s ill-planned exit from Afghanistan, criticism exploded across the continent. “It’s a failure of the Western world and it’s a game-changer for international relations,” said Josep Borrell, the European Union’s top diplomat. “The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.”

    আর ওদিকে বাইডেন সম্ভবত ভাবছেন, ‘গত ৭৫ বছর ধরে তোমরা কেউ খরচের দেও নাই। কাজেই যেখানে আমেরিকার একার পক্ষেই আর খরচ বইবার ক্ষমতা নেই সেখানে তোমাদের সাথে কথা বলে আমার কী লাভ?’
    কথাগুলো সত্য বটে! কিন্তু ট্রাম্প যখন আগে একইভাবে ও ভঙ্গিতে ইইউ এবং ন্যাটো পর্যায়ে কথা বলেছিলেন; আর ট্রাম্পের আমল থেকেই ইতালি-জার্মানি ও পরে ফরাসিদের উদ্যোগে সারা ইইউ-ই চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে ফেলেছিল। আর তাতে ইইউ-চীনের কম্প্রিহেনসিভ ইনভেস্টমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট [EU – China Comprehensive Agreement on Investment (CAI)] স্বাক্ষর শেষ হয়ে গিয়েছিল। অথচ বাইডেন শপথ নেয়ার পরই ইইউ’র সাথে ট্রাম্প সম্পর্ক খারাপ করে ফেলেছেন – একথা বলে অভিযোগ তুলে এরপর দাবি করেছিলেন, তিনি ২০০১ সালের আগের আমেরিকা-ইইউ পারস্পরিক সম্পর্কের সবকিছুই তিনি আবার গড়বেন – এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কেন? আর ইইউ এই প্রতিশ্রুতিতে এতই আস্থা-বিশ্বাস রেখেছিল যে, চীনের সাথে তাবত চুক্তি ও কথাবার্তা সবকিছু [(CAI) চুক্তিসহ] সেই মুহুর্ত থেকে স্থগিত রাখা হয়েছিল ; তারা এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল চীনকে! এখন সেসবের তাহলে কী হবে?

    অর্থাৎ বুঝাই যাচ্ছে, ইইউ-আমেরিকা  সম্পর্কের পারস্পরিক আস্থা কত নিচে নেমে গেছে। আসলে মূল ঘটনা হল  – বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একাই। ব্রিটেন বা ন্যাটোকেও সাথে নেননি, একবার জিজ্ঞাসাও করে নাই। কেবল প্রত্যাহারের শেষদিন, ৩১ আগস্টের কদিন আগে জি-৭ পর্যায়ে একটা নামকাওয়াস্তে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছিল। যেখানে ইউরোপের কোন সদস্যের কারো কোনো অনুরোধ-পরামর্শ বাইডেন একেবারেই আমল করেননি।

    এক কথায় বললে, কার্যত দু’দিন আগেই আমেরিকা সব ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাওয়ার পর সারা পশ্চিমা দুনিয়ায় প্রচণ্ড হতাশা আর ক্ষোভ নেমে আসে এবং সর্বগ্রাসী এক ‘লস্ট’ [LOST] মানে সব হারানো অনুভব তাদের সবাইকে একেবারে ‘খেয়ে ফেলেছিল’। ফলে এসব চরম হতাশামূলক বক্তব্য-মন্তব্য সেসবেরই বহিঃপ্রকাশ। এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস কত চেষ্টা করেছিলেন,এসময়ে তার সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম সফরকে বিরাট হাইলাইট করবেন। কিন্তু আফগানিস্তানের পরাজয়সম প্রত্যাহার সব কিছুকেই ছাপিয়ে গিয়েছিল, আর তাতে গ্লোবাল মিডিয়া থেকেই এই সফর আউট হয়ে গেছে। গ্লোবালি বাহাদুরি করে বেড়ানো আমেরিকা এমন হতাশায় হারিয়ে যেতে পারে এটা এর আগে কেউ কল্পনাও করেনি।

    সবার নিচে খারাপ অবস্থায় ইন্ডিয়াঃ
    “অবশেষে সব দোলাচল, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও দোটানার অবসান। ঢাকঢাক গুড়গুড়ের ঘোমটা সরিয়ে গত মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় ভারতীয় দূতাবাসে তালেবানের মুখোমুখি হলেন রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তাল এবং ভারতের ‘উইশ লিস্ট’ বা ইচ্ছা তালিকা তিনি পেশ করলেন। গোপনীয়তার ঘেরাটোপ সরিয়ে নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে তা প্রচারও করল। সন্ত্রাস বন্ধে সন্ত্রাসীদের সাথে সরাসরি দর-কষাকষির এক নতুন অধ্যায়ও শুরু হলো। ‘আগামী দিনে এই গতিপথের চরিত্র কী হবে, এখনই অনুমান করা কঠিন”।

    উপরের প্যারাটা – না এটা কোন অ-ভারতীয়ের লেখা নয়। বরং, বাংলাদেশী প্রথম আলো পত্রিকায় দিল্লির প্রতিনিধি সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এর পাঠানো রিপোর্ট এটা। যিনি সব সময় ভারতীয় উগ্র দেশপ্রেমের রঙে লেখা লেখা পাঠিয়ে থাকেন। অথচ এই লেখায় তিনি মোদির ভারতের দেউলিয়া হয়ে পড়া “আফগান নীতি” থেকে নিজের দূরত্ব রচনা করে, এরপর লিখেছেন। তার সব চেয়ে কড়া সমালোচনার বাক্য ওই “সন্ত্রাস বন্ধে সন্ত্রাসীদের সাথে সরাসরি দর-কষাকষির এক নতুন অধ্যায়ও শুরু হল” [ভারতকে নীতি বদলাতে বাধ্য করল তালেবান]।

    সৌম্য এমন করে কেন লিখেছেন? কারণ আট বছরে পা দেয়া মোদি সরকারের পাকিস্তান-আফগানিস্তান নীতি হল – মুসলমানবিদ্বেষ; একে ততই চরমে নাও আর মুসলমান ঘৃণা ছড়াও যত বেশি সম্ভব। কারণ এতে ততই হিন্দুত্ববাদ ফলবতী হয়ে ভোটবাক্স ভরাবে। কিন্তু এটা করতে গিয়ে ভারত-রাষ্ট্রের ক্ষতি হলেও সে্টা সেকেন্ডারি ও তুচ্ছ। কারণ সহজে ক্ষমতায় থাকতে পারাটাই মোক্ষ!

    এখান থেকেই সাজানো মোদি-নীতি নাকি হল, “সন্ত্রাসবাদী সংগঠন বা ব্যক্তি বলে ভারত সরকার যাদেরকে ঘোষণা করেছে তাদের সাথে কোনো কথা বা যোগাযোগ করা যাবে না”।  কিন্তু এই নীতিই মোদির গলায় এখন ফাঁস হয়েছে। মোদী সরকার এতদিন এই নীতির কারণে, তালেবানের সাথে কোনো ফরমাল ডায়ালগ করতে পারছিল না। কারণ তারা আগেই তালেবানকে “সন্ত্রাসবাদী” বলে নিষিদ্ধ করে রেখেছে। সেই ২০১৪ সালে সুষমা স্বরাজ যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী!

    কিন্তু গত আগস্টের শুরুতে বা তারও আগের দু-একবার তাই ভারত কাতারে তালেবানের সাথে কথা বলার সুযোগ নিয়েছে। কিন্তু প্রকাশ্যে তা কখনো স্বীকার করেনি। ফলে ডায়ালগের বড় কোনো কার্যকর ফল ভারত পায়নি। আবার গত ১৫ আগস্ট তালেবানদের কাবুল দখলের পর এয়ারপোর্ট পার হতে গিয়ে আটকেপড়া ভারতীয়রা বুঝে যায়, ভারতে‘মোদিকে ফোন করে কান্নাকাটি করেও কোনই লাভ হচ্ছে না। এর চেয়ে কাছের তালেবান কমান্ডারই নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য আসল ভরসা।’ তা ইতোমধ্যে  আমরা কলকাতার বাঙালি তমালের ভাইরাল হওয়া বয়ানে দেখেছি। কাজেই এখানেও প্রমাণিত যে, ইসলামবিদ্বেষ বা তালেবান-ঘৃণা ভারতেরই নিজস্বার্থের বিরোধী। কাজেই চরম নিরুপায় হয়ে আর নিজের পায়ে দেয়া নিজের বেড়ি ভেঙে এবার কাতারে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তাল তালেবান নেতা শের মোহাম্মদ আব্বাস স্ট্যানিকজাইয়ের সাথে বৈঠক করেছেন, প্রকাশ্যেই। তবে যে উসিলায় বৈঠক করেছেন তা ঝুটা। কারণ ঐ রিপোর্টার লিখেছেন, “জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ৩-২ বিভাজনে যে প্রস্তাব পাস করে…’, এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা। কারণ, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সাজানো হয়ে আছে এভাবে যে  এর পাঁচ ভেটো সদস্যের যেকোনো এক সদস্য যদি ভেটো দেয় তো ওই যেকোন প্রস্তাব বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ একটা না-ভেটো ভোটই সভার সবকিছু উলটে দিবার জন্য যথেষ্ট। সোজা কথা, চার ভেটো সদস্য একদিকে ভোট দিয়েও  বিপক্ষে এক না-ভোট কে উল্টাতে পারবে না। এমনকি তাতে মোট ১৫ সদস্যের ১৪ সদস্য কোন প্রস্তাবের পক্ষে আর এক ভেটো-সদস্য বিপক্ষে থাকলেও ওই প্রস্তাব গৃহীত হবে না। এটাই তো ‘ভেটো’র অর্থ। অথচ লেখা হয়েছে ‘জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ ৩-২ বিভাজনে যে প্রস্তাব পাস করে’, অর্থাৎ যেন পাঁচ ভেটো সদস্যের তিন সদস্য পক্ষে আর দুই সদস্য বিপক্ষে থাকলেই প্রস্তাব পাস করা যায়; যেন নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটো-সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই প্রস্তাব পাস হয়। আসলে এ কথাটাই ভিত্তিহীন। কাজেই দীপক মিত্তাল নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া কোনো প্রস্তাবের ভিত্তিতে তৈরি করা ভারতের কোনো দাবিনামা নিয়ে তালেবান নেতার সাথে দেখা করতে যাননি। দেখা করেছেন, ভারতের নিজের এক কামনা-নামা নিয়ে।

    তবে জেনে না জেনে ওই রিপোর্টার পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, আফগানিস্তানে আমেরিকার স্বার্থ আর ভারতের স্বার্থ একেবারেই আলাদা। তাই আমেরিকা তালেবানের সাথে ডিল করেছে এবং চুক্তি করে তা বাস্তবায়ন করেও ফেলেছে। অথচ ভারতের সামনে কোনো দিশা নেই। আসলে ভারতই এখনো তালেবানদের সাথে সম্পর্ক করবে কি না, সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

    আর ভারতের সিদ্ধান্ত না নিতে পারার প্রধান কারণ ইসলামবিদ্বেষ ও গভীর মুসলমান- ঘৃণা। কারণ এ দু’টাকে মোদি ও তার দল, হিন্দুত্ববাদের পক্ষে ভোট জোগাড়ের চাবি বলে ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছে এবং সহসাই এখান থেকে সরে আসতে পারবে না, তা চায় না।

    যদিও মুখে বলছে তালেবানদের হাক্কানি গ্রুপে তার আপত্তি, কারণ এরা পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত। বাস্তবতা হল – তালেবান মূল লিডারের তিন ডেপুটি আছেন যার একজন হাক্কানি গ্রুপের প্রধান সিরাজুদ্দিন হাক্কানি। আর ভারত দাবি করছে যে, তাকে মানে ওই গ্রুপকেই বাদ দিতে হবে! অর্থাৎ ভারত নিজেকে তালেবানদের কাছে নিজেকে এতই ওজনদার মনে করে?
    আসলে ঘটনাটা উল্টো। ভারত তালেবানদের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। ফলে কোনো গ্রুপ-কে বাদ দেয়ার কথা তালেবানদেরও ভাবতেই হবে না।

    তালেবানের নিজের সমস্যাঃ
    ‘তালেবানের নিজের সমস্যা অন্যখানে এবং সেটা হল, আফগানিস্তানে রাষ্ট্রপ্রধান কেউ থাকল নাকি ১০ জনের কোন কমিটি ক্ষমতায় থাকল তা একেবারে নয়। মূল কারণ, এগুলো তো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাদের নিয়ে, কেমন হবে সেনিয়ে প্রশ্ন। এমন সরকার গঠিত হলে সেটা  সাময়িক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলে তা তো এক-দু’বছর ক্ষমতায় থাকতেই পারে – তাতে কোনটা একা প্রেসিডেন্ট  কেউ অথবা একটা কমিটি যাই হোক। মূল সমস্যাটা হল – এরপর স্থায়ী সরকার যেটা হবে সেটা কেমন হবে ব- এটা আগে বলতে পারতে হবে!

    এ পর্যন্ত দুনিয়ায় দেখা গেছে, শাসনক্ষমতা হয় মূলত দু-ধরণের, হয় রাজতন্ত্রের না হয় রিপাবলিক (প্রজাতন্ত্র)। সাধারণত রাজতন্ত্রগুলো তাকে শাসনক্ষমতা কে দিয়েছে তা বলতে পারবে না, এমন ধরনের হয়। যেমন কোন আমিরের আমিরাত তেমনই এক শাসনক্ষমতা যা আসলে এক ‘রাজতন্ত্র’, যদিও শব্দটা ব্যবহার করেনি। তবু এটা রাজতন্ত্র বা মনার্কিই। এমনকি সমাজের কিছু এলিট যেমন ধরুন গুলশান-বারিধারার বাসিন্দাদের নিজেদের মধ্যে ঠিক করা এক শাসনক্ষমতা বা সরকার – এরাও কে তাদের ক্ষমতা দিয়েছে তা বলতে পারবে না বা ফলে চায় না।

    আসলে কে তাদের ক্ষমতা দিয়েছে বা দিবে- এই প্রশ্নের জবাব তাদের কাছে থাকতে হবে। নিজেকেই নিজে দিতে পারতে হবে। এর জবাব যার কাছে নেই, দিতে চায় না; এর মানে হবে এটা রাজতন্ত্র অথবা একটা এলিট গ্রুপ এদের রাজতন্ত্র।

    তবে এই প্রশ্নটারই আরেকভাবে জবাব দেয়া যেতে পারে। তা হল, শাসন ক্ষমতায় ঐ দেশে পাবলিক বা জনগণের ভূমিকা কী হবে? সরকারের সাথে পাবলিকের সম্পর্ক কী হবে কিভাবে হবে? পাবলিক কি ভোট দিতে পারবে? ভোটের ব্যবস্থা কি আদৌ  ঐদেশে থাকবে? (কারণ, রাজার দেশে ভোট দেয়া থাকে না।) এসব প্রশ্নের জবাব থাকতেই হবে।

    নিজেকেও প্রশ্ন করা যেতে পারে, আমাদের দেশে রাতের ভোটের সরকার হলে আমরা এতে আপত্তি দেখাই কেন? সরকারের জবাবদিহিতা না থাকলে, ইচ্ছামতো গুম-খুন করা হলে আপত্তি করি কেন?

    আর আরেক বড় সমস্যা হল, নিজেকে  রিপাবলিক রাষ্ট্র ও সরকার বলে নিজেকে ঘোষণা না করলে জাতিসঙ্ঘের অনুমোদন পাওয়া অসম্ভব। তাতে ‘ইসলামী রিপাবলিক’ ঘোষণা দিলেও ওসুবিধা হবার কথা না।  ইরান বহাল তবিয়তে এক ইসলামি রিপাবলিক যে জাতিসঙ্ঘের সদস্যও।  এটা না হলে, ক্রমশ উঠে যাওয়া অজস্র প্রশ্নের ঠেলায় বিভেদ শুরু হবে। যারা আমেরিকা বা পশ্চিমের বিরুদ্ধে তালেবানদেরকে চীন-রাশিয়াসহ  যারা স্ট্রং সমর্থন জানিয়ে আসছে, তারাও দুর্বল হয়ে যাবে একপর্যায়ে।

    আসলে ব্যাপারটা হল,  আ্মরা যেমন ইচ্ছা তেমন শাসনক্ষমতার রাষ্ট্র ও সরকার গড়তে পারি না। এর আরেক মূল কারণ, একালের গ্লোবাল বাণিজ্য। আপনার দেশকে গ্লোবাল বাণিজ্যে অংশ নেয়া সদস্য হতে হবে। না হয়ে দেশ চালানো একালে খুবই কঠিন। অনেকটা অবরোধে পড়ে থাকা ইরানের তেল আছে; কিন্তু তা অন্যদেশে বেচে আরেক অন্য দেশ থেকে অন্য পণ্য কিনতে পারবে না – এ ধরনের সমস্যা হবে; যেটা মারাত্মক। এটা অনেকটা গ্রামে আপনাকে একঘরে করে ফেলে রেখে দেয়ার মতো হবে। আপনার দেশের মাটির নিচে বহু কিন্তু হবু  মুল্যবান সম্পদ থাকতে পারে। কিন্তু যখন আপনি তা কাউকে বেচতে পারেন না, তখন আর সেটা সম্পদ নয়। ওটা আর মুল্যবান নয়।

    তবে এরপরেও যদি এতে আপনার কোনো সমস্যা না হয়, সহ্য হয়, তবে ঠিক আছে। আপনার যা ইচ্ছা শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে অন্য দেশ থেকে কিছুই কিনতে বেচতে পারবেন না যার সোজা মানে, গ্লোবাল পণ্যবিনিময় মানে মুদ্রাব্যবস্থায় আপনি সদস্য না হয়েই থাকতে চাওয়ার পথ বেছে নিলেন। একবার করে দেখতে পারেন, জীবন যাপনের কষ্টটা জানা থাকা খারাপ না, খারাপ কেন হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৪ সেপ্টেম্বর আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “আফগানিস্তান নিয়ে সবাই প্রশ্নের মুখোমুখি “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কাশ্মীরে ফেল হিন্দুত্ববাদ, মোদীর দায় হয়ে উঠবে

    কাশ্মীরে ফেল হিন্দুত্ববাদ, মোদীর দায় হয়ে উঠবে
    মারবে আফগানিস্তানে লাশ পড়বে ভারতের কাশ্মীরে!

    গৌতম দাস

    ২৯ জুন ২০২১, ০০:০৬ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Ca

    Imageমোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    [সারকথাঃ  “মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে”
    গতমাসে কলকাতায় রাজ্য নির্বাচনে এককালের নকশাল পরে অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী বুড়া বয়সে ছেলেকে বাচাতে বিজেপিতে জয়েন করেছিলেন।  তাতে ঢলে পরা যৌবনের জোশ জজবা আনতে  এই ফাঁপা ডায়লগ চালু  করেছিলেন   “মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে”। তো মোদীর এখন সেই দশা! আফগানিস্তান থেকে বাইডেনের অ্যামেরিকা ফিরে যাচ্ছে নিশ্চিত, তা বুঝে মোদী টের পেয়ে গেছেন যে তার হিন্দুত্ববাদের চরম ক্রাইসিসটা এখন আফগানিস্তানে নয়, কারণ  লাশ পড়বে এখন কাশ্মীরে! ভারত এবার কাশ্মীর ধরে রাখতে পারবে কীনা সেই সঙ্কট আসন্ন! তাই আজকের আসল শিরোনামটা হওয়া উচিত ছিল সম্ভবত   “মারবে আফগানিস্তানে লাশ পড়বে ভারতের কাশ্মীরে!  
    বিজেপি-আরএসএস এতদিন মনে করে এসেছে যে কংগ্রেস ও নেহেরু হিন্দু-শ্রেষ্ঠ জাতিবাদে বিশ্বাস করে ঠিকই কিন্তু এদের ঈমান খুবই দুর্বল। জোর খাটাতে জানে না। তাই এরা হিন্দুত্ববাদের উদগ্র ও  নৃশংস-ক্ষমতার দিকটা পুরা ব্যবহারে নিতে পারেন নাই কখনও। একারণেই একচেটিয়া এক হিন্দু ভোট মেরুকরণের এর ব্যাপক সক্ষমতাটা ব্যবহার করতে পারে নাই। এখানেই বিজেপি কংগ্রেসের চেয়ে আগিয়ে ও শ্রেষ্ঠত্ব। আর তা থেকে ভারত রাষ্ট্রের অনেক অক্ষমতার মতই কংগ্রেস কাশ্মীরকেও ভারত নিজের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারে নাই। এতে নেহেরুর সবসময় পা-কাঁপেছে। বিজেপির চোখে এর বড় প্রমাণ হল, ভারতের কনষ্টিটিউশনে ৩৭০ ধারা যোগ করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ও স্বায়ত্বশাসনের রাজ্য বলে স্বীকার করে এরপর কাশ্মীরের উপর ভারতকে অধিকার নিয়েছিলেন।
    বিপরীতে মোদীর বিজেপি-আরএসএস মনে করে এসেছে তারাই হিন্দুত্ববাদের পুর্ণ ঈমানদার। কিন্তু কখনই ক্ষমতায় যেতে পারে নাই বলে আগে এই ঈমান ব্যবহারে নিতে পারে নাই, সবাই সাফার করেছে। তাই মোদীর সেকেন্ড টার্ম ২০১৯ সালের মে মাসে শুরু হবার পর  এবার তারা হিন্দুত্ববাদের শক্তি সক্ষমতা ও মাহাত্ব প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।  তিন মাসের মধ্যে, ৫ আগষ্ট ২০১৯ সালে মোদী-অমিত ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা করে কাশ্মীরকে ভারতের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে বলে মনে করতে থাকে। শুধু তাই না কাশ্মীর কোন রাজ্যই নয় সরাসরি কেন্দ্রের অধীনস্ত মানে মোদী-অমিতের অধীনস্ত প্রত্যক্ষ শাসনের ভুখন্ড করে নিয়েছিল।  এককথাট এটাকেই “কলোনি দখল” বলে। কারণ এতে কাশ্মীরের বাসিন্দাদের কোন মতামত শুনার কোন জায়গা বা ব্যবস্থাই রাখা হয় নাই। এভাবেই চলছিল এতদিন!
    কিন্তু এভাবেই মাত্র দুবছরো চলতে পারে নাই। হঠাত গত ২৪ জুন মোদী কাশ্মীরের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সাথে দিল্লিতে নিজ বাড়িতে এক বৈঠকে বসেছিলেন। সেখানে মোদী বলেছেন, অচিরেই সময় মত কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদা ফেরত দিতে তিনি তিনি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে চান। অনেকে বলছেন, মোদীর এই পশ্চাদ অপসারণ বাইডেনের পরামর্শ বা চাপ। এমনিতেই কাশ্মীর নিয়ে ভারত বাইডেনের সঙ্গে হাটতে পারছিলেন। মোদীর ভয় কাজ করত কখন বাইডেন কাশ্মীর প্রসঙ্গ তুলে বসেন।
    কিন্তু ইতোমধ্যেই মোদীর এই পদক্ষেপ প্রমাণ করেছে যে অন্তত কাশ্মীরে “হিন্দুত্ববাদ” ব্যর্থ ও পরাজিত।  হিন্দুত্ববাদের সিদ্ধান্তকে ফেলে মোদীর কাছে এখন বাইডেনের পরামর্শ শিরোধার্য। মানে প্রকারন্তরে মোদীকে বলতে হচ্ছে  – কাশ্মীরকে ভারতের জবরদখল ব্যর্থ। কেন? কারণ মোদী স্বীকার করে নিলেন  কাশ্মীর কার ও তা পরিচালিত হবে কীভাবে এই ব্যাপারে কাশ্মীরী বাসিন্দারাই আসল অথরিটি। তাদের সাথে কথা বলেই যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতে হিন্দুত্ববাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন জায়গা নাই। তাই কাশ্মীরের আইনি রাজনৈতিক দল যারা তাদের সাথেই মোদীকে কথা বলতে বসতে হল।
    আফগানিস্তানে আমেরিকায় পরাজয় বাকি সব পরাজয়ের ভাগ্যলিখন হতে যাচ্ছে।  সেকারণে বলেছি হিন্দুত্ববাদ ক্রমশ মোদীর জন্য দায় উঠবে।  মোদীকে এখন হিন্দুত্ববাদের জন্য কাফফারা দিতে পারতে হবে। কেন?
    লক্ষণীয় যে মোদীর সাথে কাশ্মীরের প্রায় সব আইনি রাজনৈতিক দলের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। তারা প্রায় ১৪ জন সিনিয়র মোস্ট নেতারা তাতে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু একটা দল বাদে। সে দলটার নাম বিজেপি।  বিজেপির প্রতিনিধি থাকলে ঐ ১৪ জনের কেউ আসত না। তাই এই ব্যবস্থা। অর্থাৎ মোদীর হিন্দুত্ববাদ করার এক কাফফারা মোদী ইতোমধ্যেই চুকালেন!]

    মোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    মোদীর টুইট থেকে নেয়া 

    শুরুর কথাঃ
    আমেরিকা এ বছরই আগামী নাইন-ইলেভেনের মানে ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও জানিয়েছে এবং সে মোতাবেক সিরিয়াস প্রস্তুতি নিচ্ছে।

    কেউ মানতে চায়নি, কে আর মানতে চায় সাজানো বাগান ফেলে একদিন চলে যেতে হবে? না, দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার কথা বলছি না। বলছি, এত দিন মানে গত ৭৫ বছরের দুনিয়া বলতে যেটা ছিল আমেরিকান ইচ্ছায় সাজানো একটা দুনিয়া, আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের সেই দুনিয়া, তার কথাই বলছি। এরই অবসান হতে চলেছে। আর আপনি সেই সাজানো আমেরিকান দুনিয়াতেই থাকতে বাধ্য ছিলেন। আবার বিপরীতে যারা ছিল সেই আমেরিকার সভাসদ মানে আমেরিকার শাসন-সভায় একটা আসন পাওয়া দেশ যেমন ধরেন “ভারত” – তাহলে সেই ভারত কেন বিশ্বাস করতে চাইবে যে, আমেরিকার সাজানো দুনিয়া, ভারতের প্রিয় সেই দুনিয়াটা ক্রমেই শেষ হতে যাচ্ছে, একদিন আর থাকবে না!

    কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেটাই ঘটতে এবার সব নড়েচড়ে উঠেছে। এর যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে সম্ভবত আফগানিস্তান থেকে। কলকাতার ভাষাতেই যদি বলি ‘আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সব গুটিয়ে ছেড়ে যাওয়া নিয়ে ভারতের কপালে এবার বড় ভাঁজ পড়েছে।’ কেন? ভাঁজ পড়ার কী আছে?

    দাবুদ মোরাদিয়ান (Davood Moradian) একজন তাজিক বংশোদ্ভূত আফগান ও হেরাত প্রদেশের বাসিন্দা। [তার নাম বাংলায় ঠিকমত উচ্চারণ করলাম কি না জানি না। কারণ এটা আফগান এবং বিশেষ এথনিক নাম। তাই আগেই মাফ চেয়ে রাখলাম।] একাডেমিকভাবে তিনি ইউকে মানে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ও স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি। কাজ হিসেবে তিনি বর্তমান কাবুল সরকারের পররাষ্ট্র বিভাগের পরামর্শদাতা ও এক থিংকট্যাংকের আফগান শাখার ডিরেক্টর। তিনি সম্প্রতি এক প্রবন্ধ লিখেছেন, যা ছাপা হয়েছে ভারতের ‘দ্য প্রিন্ট’ পত্রিকায়। সেই শিরোনামটা বাংলায় বললে হয়, “আফগানিস্তানের সাথে জড়িয়ে থাকবে কি থাকবে না তা ভারতের জন্য কোনো সহজ প্রশ্ন নয়”। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা, তার লেখার ভিতরের একটা বাক্য আবার এ রকম – ‘আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে পালিয়ে যাওয়া এখন নয়াদিল্লির জন্য একটা পলিসি অপশন তো বটেই; ঠিক যেমন ১৯৬২ সালের মত, চীনের সাথে যুদ্ধের পরে ভারত তিব্বতের লাসায় থাকা ভারতের কনস্যুলেট জেনারেল অফিস গুটিয়ে নিয়েছিল। ভারত অবশ্য আগে ইতোমধ্যেই আফগানিস্তানের হেরাত ও জালালাবাদে ভারতের দুই আফগান কনসুলেট অফিস গুটিয়ে নিয়েছে”।

    কিন্তু মজার কথা হল, দ্য প্রিন্ট পত্রিকা লেখার সারাংশ হিসেবে এই প্রথম বাক্যটা- “আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে চলে যাওয়া নয়াদিল্লির জন্য একটা পলিসি অপশন তো বটেই; ঠিক যেমন ১৯৬২ সালের মত” – এতটুকুই তুলে নিয়ে সেঁটে দিয়ে রেখেছে।

    আমেরিকায় নাইন-ইলেভেন হামলার এক মাসের মধ্যে ততকালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ পালটা প্রতিশোধে আফগানিস্তানে সামরিক হামলা চালিয়ে সরকার ও প্রশাসন নিজ দখল নিয়েছিলেন। সে সময়ই আমেরিকার বিদগ্ধজন আপত্তি তুলে বলেছিলেন, এটা অপ্রয়োজনীয় ও বাড়াবাড়ি। মশা মারতে কেউ কামান বের করলে তার উদ্দেশ্য খারাপ বলতেই হয়। কিন্তু আফগানিস্তানে সামরিক হামলা করে ফেলার পরে আমেরিকার জন্য এই হামলার পক্ষে বিশ্ব-জনমত জড়ো করা আর এই হামলাকে সমর্থক রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়ানোর ছাড়া অন্য কিছু করার সুযোগ ছিল না। গ্লোবাল ডিপ্লোম্যাসিতে ভিন্ন কিছু করার আর সুযোগ ছিল না। সেই সূত্রে এশিয়ায় এক বড় জনসংখ্যার রাষ্ট্র ভারতল এর সমর্থন আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর এখান থেকেই ভারতও নিজেকে উল্টা এক ভিক্টিম বা ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি হিসেবে সাজিয়ে আমেরিকার কাছ থেকে সহানুভূতি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

    আর এখান থেকেই কথিত জঙ্গিবাদ বা টেররিজমের ব্যাখ্যা ও যুদ্ধ প্রসঙ্গে ভারত-আমেরিকার এক ‘আনহোলি অ্যালায়েন্সের’ [Unholy Alliance বা অশুভ বন্ধুত্বের] যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু যা এখন থেকে ক্রমেই অন্তত খোদ ভারতের বিপক্ষে তো যাবেই মনে হচ্ছে! কেন?

    আমেরিকায়  নাইন- ইলেভেনের হামলা ও প্রতিক্রিয়ায় আফগানিস্তানে আমেরিকার পালটা হামলা ও দখল এসব তো ছিল অ্যামেরিকা বা আফগানিস্তানের ভিতরের ঘটনা। কাজেই এর সাথে ভারতের নিজেকে ভিক্টিম মনে করার কী হল?

    সেকালে ভারতের দিক থেকে কথিত জঙ্গিবাদ বা টেররিজম নিয়ে যে ব্যাখ্যা বয়ান ও সাফাই দেয়া হত তাতে, বিরাট এক মিথ্যা কথা ছিল।  ‘সবচেয়ে বড় সেই ‘মিথ্যা ঘটনাটা” হল –  কংগ্রেসের ১৯৮৭ সালের ভারতীয় কাশ্মিরের রাজ্য নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি করেছিল। এই ব্যাপক কারচুপি থেকেই কাশ্মিরের রাজনীতি  ক্ষুব্ধ  জনগণের মন উঠে যায়। আর তাতে  এরপর কাশ্মীরের “সশস্ত্র পথ” জন-সমর্থন পেয়ে সংঘাতের রাস্তায়  রওনা দিয়েছিল।  কেন কোন দেশের রাজনীতি সশস্ত্র সংঘাতের পথে রওনা দেয় –    ভারতের দেশে-বিদেশে এনিয়ে অনেক রিপোর্ট প্রকাশিত আছে। এমনকি এপ্রসঙ্গে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক গবেষণায় প্রাপ্ত অনেক রিপোর্টও পাওয়া যায় যেখানে বলা সারকথা ছিল, “কোনো দেশের জনপ্রতিনিধিত্ব বা প্রতিনিধি নেতা নির্বাচন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করার বিপদ কী, কেন একাজ করলে এরপর পরিস্থিতি সশস্ত্র রাজনীতির পথে চলে যায় এর ‘ক্লাসিক উদাহরণ হল’ ১৯৮৭ সালের ২৩ মার্চের কাশ্মিরের নির্বাচনের ব্যাপক কারচুপি।’’ অর্থাৎ পাবলিককে তার কথা বলা বা তার মতামত প্রকাশের পথ বন্ধ করে দিলে, প্রকাশিত হতে না দিলে, নির্বাচিত হতে না দিলে- দমবন্ধ সেই পরিস্থিতিই এরপর  একে সশস্ত্র পথে যেতে আহ্বান রাখলে সে সহজেই সে পথ সমর্থন করে এগোবেই।

    কাশ্মির প্রসঙ্গে  শুরু থেকেই নেহরুর অপরাধের শেষ নেই। প্রধানতম অপরাধ, তিনি জাতিসঙ্ঘের রিকমেন্ডেশনে “গণভোটের” পথে যাননি। তবু চক্ষুলজ্জায় তিনি ভারতের কনস্টিটিউশনে লিখার সময়ে তাতে এক ৩৭০ ধারা যুক্ত করে কাশ্মিরকে ‘বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদার রাজ্য’ হিসেবে ভারতের মধ্যে যুক্ত করে নেয়াটাকে জাস্টিফাই করতে চেয়েছিলেন; যদিও সেসব বিশেষ মর্যাদাও পরবর্তি বছরগুলো  কিছুদিন পরপর একটা করে খুলে নেয়া হয়েছিল। তবু রাজ্য নির্বাচনী ব্যবস্থাটা কোনোমতে টিকে ছিল। আর সেটাও ১৯৮৭ সালের মার্চে শেষ করে দেয়াতেই কাশ্মির সশস্ত্র পথে চলে যায়। সরকারি হিসাবে কাশ্মিরের সশস্ত্র পথে যাত্রা জুলাই ১৯৮৮ সাল থেকে বলা হয়ে থাকে।

    ভারতের ক্যারাভান ম্যাগাজিনকে ধরা হয় হাতেগোনা ‘নিরপেক্ষ ও পেশাদার জার্নালিজমের অন্যতম এক উদ্যোগ’ হিসেবে। গত ২০১৬ সালের তাদের প্রকাশিত এক রিপোর্টে  [শিরোনাম ছিল How Mufti Mohammad Sayeed Shaped the 1987 Elections in Kashmir]  – এই প্রসঙ্গগুলোই বিস্তারে তুলে এনে এক রিপোর্ট করা হয়েছিল। খুবই সংক্ষেপে বললে পেছনের সেই কাহিনীটা হল – রাজীব গান্ধী ও ফারুক আবদুল্লাহর মধ্যে নাকি বন্ধুত্ব খুবই মারাত্মক সলিড ছিল। বাস্তবত ফারুক আবদুল্লাহর বাবা শেখ আবদুল্লাহ ছিলেন মূলত নেহরুর এক কাশ্মিরি প্রডাক্ট বলা যায়। কংগ্রেসের “নেহরুর কাশ্মিরি ভার্সন”। যে কাজ নেহরু নিজে করতে পারতেন না সেটা তিনি অনায়াসেই শেখ আবদুল্লাহকে দিয়ে করিয়ে নিতে পারতেন, এতটাই অনুগত ছিলেন শেখ আবদুল্লাহ। আসলে কাশ্মিরের রাজা হরি সিং ও তাঁর প্রশাসনিক চিফ সেক্রেটারিকে [Narasimha Ayyangar Gopalaswami] মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে নেহরুর হাতিয়ার হয়ে থাকতেন এই ফারুক আবদুল্লাহ। ফলে রাজীব গান্ধী ও ফারুক আবদুল্লাহর মধ্যকার ‘সলিড বন্ধুত্ব’ বুঝতে আমাদের কষ্ট করতে হয় না। কিন্তু কত দূর এর সীমা? নির্বাচনে জবরদস্তি করে বন্ধুকেই জিতিয়ে এনে দেখাতেই হবে? বন্ধুত্ব কত গভীর? এত দূর?

    ‘ক্যারাভান’ বলছে ওই বন্ধুত্বের মাঝেই বাধা হয়ে [Gandhi and Abdullah’s friendship came in the way of Sayeed’s ambition to become chief minister] এসে গিয়েছিলেন  কাশ্মীরের আরেক নেতা মুফতি সাঈদ। যিনি আসলে ভারতীয় কাশ্মিরের কয়েকটা ইসলামী দলের অ্যালায়েন্সে গড়া এক দলের মূল নেতা, যে দলের নাম মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট [Muslim United Front (MUF)]। কারণ তিনি জিতে যাচ্ছিলেন ওই নির্বাচনে।

    আমাদের বর্তমান লেখার প্রসঙ্গ তো আফগানিস্তান; সেখানে এর মধ্যে কাশ্মির প্রসঙ্গ ঢুকে গেল কোথা থেকে? আসলে,  উপরে কথা বলছিলাম ভারতের নিজেকে এক ভিক্টিম বা ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি হিসেবে সাজিয়ে বুশের ওয়ার অন টেররের প্রোগ্রামে ঢুকে পড়া আর সহানুভূতি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কথা। ১৯৮৭ সালের ওই নির্বাচনী কারচুপি যা থেকে পরে ১৯৮৮ সাল থেকে ভারতীয় কাশ্মিরের রাজনীতি সশস্ত্র পথে যাত্রা করেছিল, কংগ্রেস ও পরে বাজপেয়ীর বিজেপি কাশ্মীরের নির্বাচনী ব্যাপক  কারচুপির এই ঘটনা লুকিয়ে উলটা – কাশ্মিরের সশস্ত্রতার উতস নাকি  ‘সীমা পারকে আতঙ্কবাদ’ বা পাকিস্তান থেকে আসা টেররিজম বলে পাল্টা মিথ্যা বয়ান খাড়া করেছিল; যাতে অর্থ হয়ে যায়, সীমা পার মানে পাকিস্তান থেকে বা পাকিস্তানি কাশ্মির থেকে আতঙ্কবাদ বা জঙ্গিদের আসার কারণেই নাকি ভারতের কাশ্মিরের রাজনীতিতে সশস্ত্রতার সমস্যা শুরু হয়েছিল। আর সর্বশেষে আফগানিস্তানে বুশের দখলি হামলার পরে বুশ-বাজপেয়ী একমত হয়ে যান যে, তারা “একই সন্ত্রাসবাদের” শিকার হয়েছেন। আসলে ভারত নাকি আগে থেকেই ইসলামী জঙ্গি সন্ত্রাসবাদের শিকার (নির্বাচনী কারচুপির প্রতিক্রিয়া নয়)- এ কথাটা বুশের আমেরিকা থেকে স্বীকার করিয়ে নেয়ার বিনিময়েই ভারত স্বীকৃতি দিয়েছিল যে, আমেরিকাও ‘একই সন্ত্রাসবাদের’ শিকার। অতএব ওয়ার অন টেরর-ই সবার উপরের সত্য এবং ভারত-আমেরিকা তাই দু’জনে দু’জনার। আর সেই থেকে উল্টা আফগানিস্তান ইস্যুতে ভারতও [তারা নাকি টেররবিরোধী]  বিরাট এক   আমেরিকান পার্টনার হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

    আবার আমেরিকার আফগানিস্তানে বোমা ফেলতে, হামলা চালাতে গেলে পাশের দেশে একটা সামরিক ঘাঁটি তো খুবই দরকার হয় যাতে সেদেশ থেকে মানে পাকিস্তানকেই আমেরিকার  লঞ্চিং প্যাড হিসেবে – ঐ পাকিস্তানকেই আমেরিকার দরকার। অতএব এই যুদ্ধে আমেরিকার পক্ষে পাকিস্তানকে শামিল থাকতেই বাধ্য করা হয়েছিল। নইলে পাকিস্তানকেই আমেরিকার বোমা হামলা খেয়ে পুরান প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী [Deputy Secretary of State during President George W. Bush] পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফকে ফোনে হুমকি দিয়ে রাজি করিয়েছিলেন। সে কথা প্রেসিডেন্ট  মোশাররফ ‘ইন দা লাইন অন ফায়ার’ বইয়ে উল্লেখ করে রেখেছেন। আর এখান থেকেই আমেরিকা সবসময় উল্টা ভারতকে দিয়ে পাল্টা অভিযোগ তুলিয়ে গেছে যে, খোদ পাকিস্তানই এক সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র। সেজন্যই চারতের কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ এসেছে। অর্থাৎ ভারতকে আমেরিকা ব্যবহার করেছে পাকিস্তানের উপর চাপ রাখতে।

    আসলে দিন সবারই একদিন আসে! তাহলে এটা কি সেই বিশেষ মুহূর্ত? দিন বদলানোর দিন? দিন সবারই একদিন আসে!  মেরা দিন ভি আয়েগা একদিন!  সেরকম? কেন এমন বলছি?

    সর্বশেষ এক্সিওস [AXIOS] ম্যাগাজিনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাক্ষাৎকার (যেটা বহুল প্রচার করা হয়েছে বাংলায়; প্রথম আলোতে অনুবাদও হয়েছে) এর কথা ধরি তবে বুঝা যায় – ইমরানই আমেরিকার শেষ ভরসা- এই মনে করে বাইডেন প্রশাসন তাঁকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। কিন্তু ইমরান ততই শক্ত করে বলছেন, পাকিস্তানে আমেরিকার কোনো ঘাঁটি করতে তিনি দেবেন না। ওদিকে তালেবানেরাও আমেরিকার সবচেয়ে ছোট কোনো সামরিক স্থাপনাও আগেই নাকচ করে দিয়েছে।

    Pakistan will not allow the CIA or U.S. special forces to base themselves inside his country ever again, he told Axios.

    এর সোজা অর্থ আমেরিকা তাহলে কোথায় যাবে? তাহলে আলকায়েদা বা অন্যান্য ছোট বা বড় সশস্ত্র গ্রুপ যারা এত দিন আমেরিকান নানা ধরণের বোমা হামলা ড্রোন হামলা খেয়েও চুপ ছিল, চেপে থাকা এদের সাথে আমেরিকার যে সম্পর্ক ও ক্ষমতার সাপ্রেসড  ভারসাম্য এত দিন ছিল, এর কী হবে? সেটা তো আর আগের ভারসাম্যে থাকবে না। সব ঢলে পড়তে বাধ্য! এটাই এখন দিন কে দিন প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে চাইবেই! এবং এটাই হয়ে উঠতে পারে প্রেশার কুকারের ঢাকনা খুলে যাবার ঘটনা! আর তা হবে আফগানিস্তান থেকে কাশ্মীরসহ সবদিকে! এটাই মোদীর কাশ্মীরসহ এমনকি গত সাত বছরে মোদীর হিন্দুত্ববাদ ও এর সব পাপ সবকিছু উপড়ে ফেলে দিতে চাইতে পারে! অবস্থা এমন হবারও সম্ভাবনা যে মোদী বলতে পারেন – আমি হিন্দুত্ববাদ ত্যাগ করছি আমাকে ক্ষমতাচ্যুত করো না!

    বাস্তবতা হল, সময় এখন আমেরিকার পক্ষেও না! আমেরিকার সাথে আর কেউ নতুন করে গাঁটছড়া বাঁধা দূরে থাক কোনো সম্পর্কই রাখতে চাইছে না।  পাকিস্তান বা তালেবানদের  আমেরিকার প্রতি অনাগ্রহ ও তুচ্ছাতিতুচ্ছ করার মনোভাব – আমেরিকার জন্য খুবই খারাপ ইঙ্গিত! এটাই প্রমাণ করে, আমেরিকার গ্লোবাল নেতা বা পরাশক্তি থাকার দিন আজ কোথায় ঠেকেছে। অতএব এমন আমেরিকার আড়ালে থেকে যে ভারত আমেরিকাকে সার্ভিস দিয়ে গত ২০ বছর মাখন খেয়ে গেছে, এর এখন কী হবে?

    এ অবস্থায়, আফগান ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার অবস্থান এখন যার যার নিজেকে বাঁচাও, নিজে বাঁচলে বাপের নাম! খুব সম্ভবত, আমেরিকার সাথে আগের মত গাঁটছাড়ায় থাকলেই হয়ত ভারতের বিপদ বেশি বলে ভারতের রিডিং। দিন এখন ভারতের পক্ষে আর নয়! আবার তাহলে ভারত কি এখন একেবারেই সবদিক থেকে হাত গুটিয়ে নিবে, এই ইস্যুতে অন্তত আমেরিকা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন না করলের এক দুরত্ব রচনা করবে? সেটা ভারত বাস্তবায়ন করতে পারলে হয়ত এখন বেঁচেই যেত! এ কথার মানে কী? এর বাস্তবায়নও ভারতের হাতে আর নেই, তাই কী? হ্যাঁ, ঠিক তাই। কেন?

    ভারতের মানে, সুনির্দিষ্ট করে এটা মোদির জন্য একেবারে বিজেপি-আরএসএস গোষ্ঠী ও তার হিন্দুত্ববাদের পাপ। তার ৫ আগস্ট ২০১৯ সালের ঐ ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মিরকে একেবারে গায়ের জোরের ভিত্তিতে মানে ‘আইনগতভাবেই এর সংজ্ঞা দখলদার’ সেই হিসেবে পুরো কাশ্মিরই দখল করে ভারতের অংশ বলে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করে  ফেলেছিল। কারণ ঐ দিন ভারতীয় সংসদে অমিত শাহ পাকিস্তান ও চীনের কাশ্মির অংশও ভারতের বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন হিন্দুত্ববাদের প্রবল জোশে। বিজেপি-আরএসএস বলতে চেয়েছিল ১৯৪৭ পরবর্তি বছরগুলোতে তারা ভারতের ক্ষমতায় আসীন থাকলে  এই ২০১৯ সালের মত করে – সারা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিত এবং নেহেরুর তা করা উচিত ছিল।  নেহেরুর কার্ট দুর্বল, হিন্দুত্বের জোশ ব্যবহারের মোদী-অমিতের মত যোগ্য নয় বলে তারা সেসময় এটা করতে পারে নাই।  সেই থেকে কাশ্মির ভারতের প্রত্যক্ষ অঙ্গ ভুখন্ড বলে মোদী সরকার হাতে বিবেচিত শুধু নয় কাশ্মীর আর প্রশাসনিক স্টাটাস হিসাবে ভারতের কোনো রাজ্যের মর্যাদাতেও নেই –  এখনো ঘোষিত হয়ে আছে ।

    অথচ প্রধানমন্ত্রী মোদির কানে এখন পানি ঢুকেছে মনে হচ্ছে! তিনি টের পেয়েছেন আমেরিকার আফগানিস্তান দখলের আগামী ২০তম বার্ষিকীতে আমেরিকা আফগান ছেড়ে একেবারে চলে গেলে, এর পরে সংশ্লিষ্ট যেসব গোপন ও সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতার ছড়িয়ে পরার সম্ভাবনা, এটাই জাতিইসংঘের আশঙ্কা [আফগানিস্তানে তালেবানের অগ্রযাত্রায় শঙ্কিত জাতিসংঘ]  এদের বিরুদ্ধে ভারত একেবারেই ডিফেন্সলেস।  এটা আবার ভারতীয় কাশ্মিরকে বড় সশস্ত্রতার পথে যেতে উসকে তুলতে পারে। মূল কারণ গত দুই বছরের মোদি সরকারের সাপ্রেশন ও এর প্রতিক্রিয়া!

    এদিকে ইতোমধ্যেই ভারতের দিক থেকে উদ্বেগজনক খবর হল, ইতোমধ্যে গত ২৭ জুন ভোর-রাতে ভারতের সামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলার খবর এসেছে।  অনেকে এটাকে কী পরিস্থিতি সামনে অপেক্ষা করছে এর ইঙ্গিত বলছেন।

    তাহলে ভারতের দিক থেকে দাঁড়াল, এক দিকে সেই আমেরিকার  মুরোদ আর নেই, আবার মোদি ইমরানের পাকিস্তানের সাথেও এত দিন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে, উল্টা বোমা হামলার নাটক করেছে চরমে। সরাসরি প্রচার করেছে ‘পাকিস্তান ঘৃণা’। আর এসব ঘৃণা-বিক্রি করে হিন্দুত্বের জিগির জাগিয়েছে আর তা দিয়ে নির্বাচনে হিন্দুভোট মেরুকরণ করেছে। অথচ এতদিনের পাকিস্তানের আগের দুই শাসক দল ও নেতাদের তুলনায় সবচেয়ে বিচারবিদ্ধিসম্পন্ন নেতা হলেন ইমরান খান। কারণ তিনি পেটি-পকেট স্বার্থ দিয়ে চলেন না। যার লঙ-টার্ম ভিশন এবং নয়া এপ্রোচ আছে। অথচ মোদী এসবের এক তিলও সুবিধা ভারতের স্বার্থ নিতে পারলেন না। কারণ, মোদীকে পাকিস্তান বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে তিনি বীর এই মেরু করণ জোয়ার তুলে ভোটে জিততে হবে, তাই মোদীর এই সংকীর্ণ স্বার্থের নিচে ভারতের সামগ্রিক স্বার্থ চাপা পড়ে গেছে ও আছে। একারণে,  ইমরানের পাকিস্তানের সাথে ন্যূনতম আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক মোদী করতে বা দেখাতে চায়নি। কারণ চরম মুসলমান বিরোধী ঘৃণা জাগানো- এটাই তো মোদির জন্য ভোটে হিন্দু ভোট মেরুকরণের একমাত্র কৌশল। কাজেই পাকিস্তানের সাহায্য চেয়ে একবার হাত বাড়িয়ে বসলে কী ডায়লগে গেলে এরপর মোদির নির্বাচনে জেতার বয়ানের কী হবে?

    অতএব মোদী এখন অস্থিরঃ 
    অতএব মোদী এখন অস্থির; তার খারাপ দিনগুলো সামনে সম্ভবত আসন্ন। এই আশঙ্কায় তিনি অস্থির। এমনকি ইতোমধ্যে মোদি উল্টা রাস্তা ধরতে চাইতেছেন মানে তিনি হিন্দুত্ববাদ একেবারে ত্যাগ না করলেও যদি একটু ঢিলা করে দেন তাহলে কী পরিস্থিতি কিছুটা নিজ নিয়ন্ত্রণ ফিরবে? ইতোমধ্যেই তিনি এই ইঙ্গিত কাশ্মীরের রাজনীতিতে শো করে দিয়েছেন। আর এতেই তিনি নিজ কাশ্মিরের ব্যাপারে কত উদ্বিগ্ন; তা প্রকাশিত হয়ে গেছে। তিনি পরিষ্কার করেই কাশ্মিরি রাজনীতিবিদদের সাথে একটা বৈঠক করে ফেলেছেন। মোদী দিল্লিতে তার সরকারি বাসায় মিটিং আয়োজন করে ফেলেছেন।  যার একেবারে মূল উদ্দেশ্য হল, তিনি আবার কাশ্মীরে নির্বাচনি রাজনোইতিক ততপরতা ফেরত আনতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন – এই ম্যাসেজটা ছড়িয়ে দেয়া। কেন?  কারণ কাশ্মীর যে এখন নয়া তালেবান প্রভাবের আফগানিস্তানের কারণে সসগস্ত্র রাজনীতির পথে জোরদার হয়ে যাচ্ছে এটা মোদী স্বীকার করে নিচ্ছেন।  আর এবার সেই সশস্ত্র ধারাকে ফিরাতে ্মোদীর এক অসহায় পদক্ষেপের নাম হল এই বৈঠক।      কাশ্মির আবার রাজ্য স্ট্যাটাস ফেরত পেতে পারে মানে সারকথায় তিনি হয়তো আর কঠোর দমননীতি নয়, আবার নির্বাচনী জানালা খুলতে চাচ্ছেন যদি পোষায়, এমন ইঙ্গিত দিতে চাচ্ছেন!

    কিন্তু মূলকথা, ভারত আফগানিস্তান থেকে নিজেকে একেবারেই প্রত্যাহার করে নিলেই কি ভারতের কাশ্মির মোদির নিয়ন্ত্রণে থাকবে? সোজা জবাব হল, এর ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকুও নেই। হিন্দুত্ববাদের এমনই মহিমা। ভারতের কাছে এখন শুধু বাইডেনের আমেরিকাই নয়, ক্রমেই খোদ হিন্দুত্ববাদই এক লায়াবিলিটি হয়ে উঠতে চাইছে যেন।

    অতএব আফগানিস্তান ইস্যুতে ভারতের জন্য কোনো অবস্থানই আশাপ্রদ নয়। সে কারণে সম্ভবত আফগান অ্যাকাডেমিক মিঃ দাবুদ মোরাদিয়ান এভাবে বলেছেন। ভারতের জন্য ন্যূনতম নিশ্চয়তাও কোথাও নেই। আবার ইরানের সাথে ভারতের সম্পর্কও খুবই খারাপ মাত্রায়। ইরানকে চরম অপমানজনক অবস্থায় ফেলার পরে আমেরিকার কথা শোনা ভারত আর ইরানের সাথে সম্পর্ক রাখতে চায়নি, ছুড়ে ফেলেছে। আজ এখন ভারতেরই মুখ নেই যে, ইরানের সাথে আবার কথা বলে আফগান ইস্যুতে কিছু পরামর্শ নেয় অথবা ওই অঞ্চলে ভারতের কোথাও পা দেয়ার জায়গা অন্তত ফেরত পায়। মনে হচ্ছে, কূটনৈতিক সব ইস্যুতে মোদির এখন সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে হাজির হবে এত দিনের হিন্দুত্ববাদী পদক্ষেপগুলো!

    ওদিকে আমেরিকা এখনো আশা করে আছে যে, অন্তত গোপন ঘাঁটি বা গোপন তৎপরতা চালানোর মতো কিছু জায়গা ইমরানের পাকিস্তান আমেরিকাকে দেবে!

    সত্যি দুনিয়া বড়ই অদ্ভুত জায়গা! কখন যে কার দিন আসে। সে কারণেই সম্ভবত দুঃখের দিনের ভিতরে সবাই শান্ত্বনায় বলে ওঠে- হামারা দিন ভি আয়েগা! সব জুলুম বে-ইনসাফের বিচারের দিন হয়ে যায় যেন সেটা! মসানুষ এমন ভরসাতেই তো এখনও বাঁচে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৭ জুন  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “হিন্দুত্ববাদই কি মোদির প্রধান শত্রু হবে?“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারত নাকি সুপারপাওয়ার, এখন তৃতীয় বিশ্বে

    ভারত নাকি সুপারপাওয়ার, এখন তৃতীয় বিশ্বে

    গৌতম দাস

    ১০ মে ২০২১, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3wM

     

     

    India not really a Superpower

    গত ২ মে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি কলকাতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস দলের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। বিজেপির ৭৭ আসনের বিপরীতে তৃণমূল ২১৩ আসন পেয়ে বিধানসভায় জিতেছে। কিন্তু আরএসএস-বিজেপি ব্যাপারটাকে যেন ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট ও সরকারের নির্বাচনের মত পর্যায়ের  বিশাল গুরুত্বের বানিয়ে ছেড়েছিল। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতায় থাকায় বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারি প্রশাসনকে দুমড়ে মুচড়ে কিভাবে সেই ক্ষমতাকে এক রাজ্যের নির্বাচনে চরম অপব্যবহার করতে গিয়ে হারতে পারে এরই নজির হয়ে থাকবে এই নির্বাচন!

    মোদীর কাছে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন কেন গুরুত্বেরঃ
    আরএসএস-বিজেপি এই রাজ্য নির্বাচনকে এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা এবং এতে সম্ভবত সর্বোচ্চ অর্থকড়ি ও সময় ঢালার পেছনের কারণ কী?  যেমন একমাসেরও বেশি সময় ধরে  আটপর্ব এইনির্বাচনের শ্লট বানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আর কোথাও আট পর্বে তা হয় নাই। আবার আটপর্ব যে অপ্রয়োজনীয় ছিল এর প্রমাণ কমিশন অজান্তে নিজেই তুলে ধরেছে। পাঁচপর্ব নির্বাচনের পর কোভিড ভাইরাসের প্রভাব বেড়ে যাওয়াতে কমিশন সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছিল। সেখানে বাকি সবভোট একদিনে নিয়ে সব শেষ করার জন্য মমতা প্রস্তাব দিলে  কমিশন টেকনিক্যাল আপত্তির কথা তুলে তা নাকচ করেছিল।  তা হল, একদিনে ভোট নিতে গেলে মোট যে পরিমাণ ফোর্স লাগবে তা এখন সংগ্রহ করার সময় নাই। তাদের এই কথায় প্রমাণিত যে এত মাস জুড়ে নির্বাচন আয়োজনের দরকার ছিল না। কেবল সময় থাকতে ফোর্স সংগ্রহ করলেই হত। তাহলে  নির্বাচনের মাঝের দিনের গ্যাপ এত বেশি রাখা হয়েছিল ইচ্ছা করেই। আর এই “খেয়ালি” ইচ্ছাটা কার খেয়ালে?  এটাই এখন স্পষ্ট এক রাজ্যের নির্বাচনে  মোদী  নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করে রেকর্ড গড়েছেন। যাতে তিনি একমাসের মধ্যে মোট ১৮ দিন কলকাতায় সভা করতে পারেন এবং তা করেছেন। এটাই ক্ষমতার অপব্যবহার আর পশ্চিমবঙ্গের  এবারের  নির্বাচনকে আরএসএস-বিজেপি  কী মাত্রার গুরুত্ব দিয়েছে তার প্রমাণ। তাহলে কথা সোজা, দেখা গেল এবার ‘কলকাতা দখলকে’ আরএসএস-বিজেপি মাত্রারিক্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু সেটাই বা কেন?

    সবাই রাম-পুজারী হিন্দু না, বিজেপির দরকার একই হিন্দুঃ
    ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক দিক থেকে বললে ভারত মানে বৃহত্তর উত্তরপ্রদেশের হিন্দু ভারত- এমন ভাবনার আধিপত্য চলে আসছে।  ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার উপর ভারতের জন্ম থেকেই এই আধিপত্য সবসময় ক্রিয়াশীল থেকে আসছে।  আর তাই এর সাথে দক্ষিণ ভারতের বিরোধের কথা আমরা অনেকে কম-বেশি শুনেছি। দক্ষিণ ভারত হিন্দি জানলে বুঝলেও হিন্দি ব্যবহার করে না চল নাই – একথাও আমরা শুনেছি।
    হায়দরাবাদের (বা অন্ধ্রের) পরে তেলেঙ্গানা থেকে কর্নাটক, তামিলনাড়ু হয়ে কেরালা পর্যন্ত এই দক্ষিণী অঞ্চল একে ভারতের ভাষায় দাক্ষিণাত্য (ডেকান বা Deccan) বলা হয়।  দক্ষিণদিক কথার সংস্কৃত উচ্চারণ ‘দাক্ষিণাত্য’ আর এই খটমটে শব্দ বৃটিশেরা ইংরেজিতে সহজে উচ্চারণ করতে গিয়ে ‘ডেকান’ বানিয়ে ফেলেছে। ভাষার দিক থেকে এই অঞ্চলের চারটা ভাষাকে একসাথে একে দ্রাবিড়ীয় ভাষার অঞ্চল বলে। এটাই হিন্দিবিরোধী ও আর্যবিরোধী দ্রাবিড় সমাজ অঞ্চল। আসলে দাক্ষিণাত্য বলতে বুঝায়, ভারতের দক্ষিণের পুর্ব ও পশ্চিম উপকুল এবং এক বিস্তৃর্ণ উচু মালভুমি ও পর্বতমালা (plateau and mountain ranges) যার সর্বোচ্চটা আনাইমুদি (২৬৯৫ মিটার), এভাবে এই পুরা অঞ্চলকে।  আর এই বিস্তৃর্ণ মালভুমি ও পর্বতমালা এলাকা টপকাতে পারে নাই বলেই উত্তরের আর্য আক্রমণ ও সম্ভাব্যদখল থেকে দক্ষিণ বেঁচে যায়। প্রাচীনকালের সেই লড়াই প্রতিরোধ এবং এর ফলাফল এখনও সক্রিয় ও কার্যকর ফলে ঐতিহাসিক গুরুত্বের। ফলে দক্ষিণ-ভারতের হিন্দি না-বলা এটা শ্রেফ শখ বা কারও খেয়াল মোটেও নয়।
    এছাড়া আরও আছে।  যেমন, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনের পর থেকেই এই দ্রাবিড় সমাজ “ব্রাহ্মণ তাদের সমাজে অপ্রয়োজনীয়” বলে এক সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন করেছিল। ব্রাহ্মণ ছাড়াও বিয়ে করা যাবে বলে আইনও তৈরি করেছিল, যা এখনো চালু আছে। এরই উত্তরসুরি আঞ্চলিক ডিএমকে ও আন্না-ডিএমকে দল। ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার আন্দোলনও করেছিল এই রাজ্যগুলো যার কেন্দ্র ছিল তামিলনারু। [আগ্রহিরা  E V Ramaswami (EVR or “Periyar”) এই ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্ট যেকোন ইতিহাস পড়তে পারেন।] এছাড়াও ১৯৬২ সালে হিন্দিভাষা চাপানোবিরোধী আন্দোলনে জীবন দিয়ে রুখে দেয়ার কারণে আজও ভারতের সুপ্রীম কোর্টের ব্যাখ্যায় ভারতের কনষ্টিটিউশনে উল্লেখিত কোনো “রাষ্ট্রভাষা” নেই – এমন করে রাখা হয়েছে। তবে সরকারি দাপ্তরিক ভাষা আছে আর তা হিন্দি (ঠিক হিন্দি নয় হিন্দুস্থানি) এবং ইংরাজি।  আর্য-হিন্দির আগ্রাসন দক্ষিণে এমন প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। আর একইভাবে  একই রকম আর্য-হিন্দির আগ্রাসন  প্রতিরোধ পেয়েছিল বিহার পেরিয়ে বাংলায় প্রবেশমুখে। তাই বাংলাভাষা টিকে যায়, যদিও প্রাচীন বাংলা অঞ্চলের সেই প্রতিরোধ ভারতের দক্ষিণের মত পর্যায়ের প্রবল ছিল না বলে এর প্রচারও কম হয়েছে। এসব প্রতিরোধের চিহ্ন হয়েই এবং সে কারণে এখনও ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয় বৈশিষ্ট বলতে মেজর তিনটা ধারা দেখতে পাওয়া যাবেই – উওর, দক্ষিণ ও পুর্ব  ধারা বা ঘরানার সঙ্গীত ও নৃত্যধারায়।  অবশ্যই এগুলো এথনোলজি  অর্থে [ethnological] ভারতীয় জাতিবৈশিষ্ঠের ভিতরের মৌলিক ভিন্নতা।  এই ভিন্নতা বলতে আলাদা আলাদা ভাষা, খাদ্যাভাস ইত্যাদিতে এথনিক-ধরণের ভিন্নতাগুলো তো  বটেই এছাড়া আরও ভালভাবে  এই ভিন্নতা  সাংস্কৃতিকভাবেও ধরা যায় যেমন নাচ-গানে, বাদ্যযন্ত্রে, ঘরানায় স্পষ্ট সাংস্কৃতিক ট্রেডিশনের ভিন্নতায়।  তাই এককথায় বললে, তামিলনারুর মত কলকাতাও আর্য-হিন্দিবিরোধী আরেক হাব। এজন্য পশ্চিমবাংলা আরএসএস-বিজেপির আরেক মাথা ব্যাথা।  মূল কারণ আগেও বলেছি বিজেপির রাজনৈতিক এজেন্ডা হল ভারতের রাজ্যগুলোতে এথনোলজি-সাংস্কৃতিক অর্থে তারা ভিন্ন ভিন্ন হিন্দু। বিজেপি সেগুলোর উপর এক রাম-পুজারী হিন্দুত্ব চাপিয়ে দিয়ে সবাইকে বেধে এক হিন্দুত্বের জাতিরাষ্ট্র কায়েম করতে চায়।  হিন্দুত্ববাদের আরএসএস-বিজেপি এবার কলকাতায় রাজ্য নির্বাচনে সেই ‘বাংলা’কে বিজয় মানে, জবরদস্তিতে উপর থেকে এক ইউনিফর্ম হিন্দুত্ব চাপানোর খেয়ালে কলকাতায় এসেছিল। এবং পরাজিত হয়ে গেল। বিজেপির যে হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্বের জাতিবাদ – এটা তারা সারা ভারতে কায়েম করতে চায়। অর্থাৎ এখনকার ভারতের ২৮ রাজ্যের মোট ৮০ শতাংশ জনগোষ্ঠী সনাতন ধর্মাবলম্বী বলা হলেও এরা সাংস্কৃতিক-এথিনিক অর্থে সবাই একই ধরনের হিন্দু নয়। কিন্তু বিজেপির ভাষায় বললে, তারা ভারতের সব রাজ্যের হিন্দুকে “রামের অনুসারী” হিন্দু বানাতে চায়, এমন এক পরিচয়ে বাঁধতে চায়। যাতে এর ফলে ভারত এক হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠত্বের জাতিরাষ্ট্র হয়।

    Supremacist বা শ্রেষ্ঠত্ববাদিতাঃ
    সারা দুনিয়ায় আমিই সুপ্রীম বা শ্রেষ্ঠ এমন শ্রেষ্ঠত্ববাদি [Supremacist] – এই চিন্তার প্রাবল্য জেগে উঠা দেখেছিলাম আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে জর্মান, ইটালি ও জাপানের মধ্যে যার প্রধান ভোকাল নেতা ছিলেন হিটলার।  আমার জাতটা শ্রেষ্ঠ এই জাতগর্ব বা রেসিজম [Racism] – এই হল সমস্যা ও সংঘাতের শুরুর ভাষ্য বা মিথ্যা সাফাই।  কারণ এরপরেই বলা হবে যে আমিই শ্রেষ্ঠ অতএব তাই আমার কথা তোমাকে শুনে চলতে হবে, আমার অধীনতা মানতে হবে, আমি তোমাকে পুড়িয়ে মারব, গ্যাস চেম্বার করব, তোমাকে কলোনিদখল করব ইত্যাদি। অনেক সময় আবার এই জাত বলতে নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব যেটা হিন্দু বা মুসলমান বা অন্যকোনটা হতে পারে অথবা ‘গায়ের রং’ যেমন হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার – ইত্যাদি হয়ে পারে। এগুলো আমরা কমবেশি দেখেছি বা পরিচিত।
    কিন্তু সাবধান – কেউ হিন্দু মানেই সে রেসিস্ট বা শ্রেষ্ঠত্ববাদি (হিন্দুত্ববাদী) হবেই এমন নিশ্চিত ধরে নেয়াটা খুবই ভুল হবে। কারণ নাও হতে পারে। েকইভাবে, কেউ মুসলমান মানেই সে রেসিস্ট নাও হতে পারে। পাকিস্তানি পাঞ্জাবী মানেই সেও ব্যক্তি হিসাবে রেসিস্ট নাও হতে পারে। উলটা আমি বাঙালি জাতিবাদি এই ভাব ধরে যখন পাকিস্তানিদের “পাকি” বলে ডাকব – এটাই রেসিজম হবে। তাহলে মূল কথাটা হল কেউ কী করে নিজেকে  প্রেজেন্ট বা হাজির করছি, কী দাবি করছি;  বিশেষ করে দলবদ্ধ হয়ে বা রাজনৈতিক দিক থেকে  – এর উপরই নির্ভর করবে  কেউ  শ্রেষ্ঠত্ববাদি বা রেসিস্ট কিনা।  এই বিচারে  আরএসএস-বিজেপির হিন্দুজাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা রেসিজমের দল যারা এখন ভারতে ক্ষমতায়।  আর লক্ষ্য করেন, চেক করে দেখেন সেখানে শ্রেষ্ঠত্ব – আমিই শ্রেষ্ঠ, আমারটাই শ্রেষ্ঠ ইত্যাদি ধরণের ভাব বা ধারণা আছে কি না? যদি থাকে তবে অন্যকে নিন্দা করার আগে নিজেকে সংশোধন করে নেন। অনেক সময় আমরা না-বুঝে, না খেয়াল করে অসচেতনে অনেক কিছু করে বসি।

    আবার আরেক চিহ্ন হল,  রেসিজমের মধ্যে –  শ্রেষ্ঠত্ব, মহান বা বেস্ট এসব শব্দ বা ধারণা থাকবেই। ফলে এখান থেকে বের হতে হবে বা এড়িয়ে থাকতে হবে আমাদের।  বিশ্বযুদ্ধের পরে জাতিসংঘের জন্মের ভিতর দিয়ে এই প্রথম আইডিয়া বা  বয়ান হিসাবে শ্রেষ্ঠত্ববাদ বা রেসিজমকে ক্রিমিনাল অপরাধ মনে করা হইয়েছে আর তা বলা বাহুল্যই  নিন্দনীয় করা হয়েছে। কিন্তু তবু ব্যবহারিক চর্চায় মনের কোণায় ছোট রূপে হলেও তা এখনও থেকে গেছে শুধু না, তা আরো  প্রকাশ্য হবার চেষ্টা অনেক প্রবল হয়েছে। যার পিছনের মূল কারণ মনে করা হয় যে সময়টা এখন  -“গ্লোবাল সিস্টেমে নেতৃত্বে পালাবদলের”।  সারা দুনিয়া এতদিন বেশিরভাগ সময়েই বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবেই জনবসতি বা সিভিলাইজেশনগুলো শাসিত ও পরিচালিত হয়ে এসেছে। কেবল শেষ প্রায় পাঁচশ বছর বলা যায় কলোনিদখল সুত্রে দুনিয়া পশ্চিমের সিভিলাইজেশনের অধীনে সংগঠিতভাবে অধীনস্ততা চলে গেছিল।  এরই ভিতর আবার য়ারও শেষের ইমিডিয়েট ৭৫ বছর তা দুনিয়ার আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বে কেটেছে। আর এটাতেই পালাবদল আসন্ন হয়ে উঠেছে। কিন্তু এতে  বদল অনিবার্য জেনেও পুরানা শাসনের সুখ যাদের ছাড়তে ও নতুনকে মেনে নিতে ইচ্ছা করছে না এদেরই একটা অংশ এক সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ আকড়ে উঠে দাড়াতে চাইছে। পুরানা গল্পের উস্কানি  – যে আমাদের কতকিছুতে শ্রেষ্ঠত্ব ছিল – এই কথিত অতীত মহান, গ্রেট, বেস্ট এসব শব্দ দিয়ে – এক শ্রেষ্ঠত্ববাদ খাড়া করার জন্য তারা প্রাণপণ চেষ্টা শুরু করেছে। যদিও তারা জানে কারণ আমেরিকান সরকারি গবেষণার সবগুলো ফাইন্ডিংসই (২০০৮ থেকে সর্বশেষ ২০২১ সালেরটা) তাদের জানিয়েছে এই পালাবদল অনিবার্য অবশ্যই কিছুই তারা ঠেকাতে পারবে না কারণ এই পরিবর্তন অবজেকটিভলি নির্ধারিত। সাবজেক্ট বা মানুষের নিয়ন্ত্রণে আর নয়।  কিন্তু তবু মরিয়া হয়ে সাময়িক বিশৃঙ্খলা তৈরিতে কেউ কেউ এগিয়ে আসা বন্ধ করে নাই।

    কেন বিজেপির হিন্দুত্ব বা এক হিন্দু-ভারতের কথিত এক জাতিরাষ্ট্র গড়তে ব্যর্থ হবে?
    এর মূল ব্যবহারিক সমস্যাটা হল,  ভারতের সব রাজ্যের বাসিন্দারা শ্রীরামকে তাদের প্রধান দেবতা মানে না বা তাকে ঘিরে প্রধান দেবতাপূজা বা প্রধান উৎসব উদযাপন করে না। যদিও আবার শ্রীরামকে তারা অমান্য করে ঠিক তাও নয়। অর্থাৎ প্রায় সব রাজ্যেই তাদের নিজস্ব ‘প্রধান দেবতা’ ও সে অনুযায়ী এক প্রধান বার্ষিক উৎসবও আছে। ফলে বাংলায় দুর্গা বনাম রামের একটা প্রধান ভিন্নতা আছে এবং এটা প্রধান বাস্তবতা। শুধু তাই নয়, মনে রাখতে হবে, এটা অন্য কারো দেবতাকে অমান্য করা এর মূল বিষয় নয়। কিন্তু নিজ ভাষা, নিজ শিল্পকলা, নিজ গাথাগল্প সাংস্কৃতিক এ ট্র্যাডিশনে অন্য কোনো রাজ্যের, ন্যূনতম অন্যের হস্তক্ষেপ বা আধিপত্য অথবা ডিকটেট, সামান্য চুল পর্যন্ত কোনো বদল আনা এরা একে অন্যের বেলায় বরদাশত করতেই পারবে না। কারণ এভাবেই তো ভারতে একেকটা রাজ্য স্ব স্ব ভিন্নতা নিয়ে হাজির ও ঐক্য হয়ে হাজির আছে। এভাবেই এরা একেকটা  ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’ অর্থে ভিন্ন ভিন্ন জাতি। যেমন, বাঙালি, উড়িয়া, গুজরাতি, মারাঠি রাজস্থানী  ইত্যাদি এরা ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’ জাতি। ঠিক যেমন কলকাতার বাঙালি ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’  জাতিবোধ নিয়ে তারা সবসময় নিজের মতো হয়ে থাকতে ও উঠতে চাইবে। অথচ সবাই মূলত হিন্দু হলেও এই কালচারাল গভীর ভিন্নতা এটাই বার বার বলছে   আরএসএস-বিজেপির রাজনীতি ভুল ও অকেজো অবাস্তব বলে তা ব্যর্থ হবেই। আর সবচেয়ে বড় কথা এটা অপ্রয়োজনীয়।
    কিন্তু  তবু আরএসএস-বিজেপি  হিন্দুত্বভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের ভারত গড়ার জিদে আটকে থাকা দল, তারা এমন ভারত গড়ে নিজ একক রাজনীতি ও নিয়ন্ত্রণে ভারতকে আনবেই এই জিদের প্রচেষ্টার দল। তাই আরএসএস-বিজেপি বলা যায়, এই রাজ্য নির্বাচনকে এই প্রথম নিয়েছিল দুর্গার ওপর রামের আধিপত্য কায়েম করা যায় কি না এর উদ্যোগ হিসেবে। সেক্ষেত্রে মমতার দলের বিজয়ের তাৎপর্য হল, বাংলা তার দুর্গা আঁকড়ে ধরে বিজেপির হিন্দুত্ব এবং তার রাজনৈতিক ‘রামকে’ পরাজিত করল। এই অর্থে পুরনো আর্য-বাংলা ঐতিহাসিক লড়াইটা আবার বাংলা জিতে রিনিউ করে নিলো।

    এ জন্যই এই নির্বাচন নিয়ে কলকাতার বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নির্বাচনে কেবল তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরাই তৃণমূলকে ভোট দেননি। অর্থাৎ তৃণমুলের  হিন্দু-মুসলমান সমর্থকেরা  মিলেই কেবল তৃণমূলকে ভোট দেননি। এর সাথে আরো আছে বাঙালি অর্থে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট; এমনকি বিজেপির সমর্থকদের একটা বড় অংশ যারা নিজ দল ছেড়ে মমতাকে মানে ‘এথনিক-সাংস্কৃতিক’ বাঙালির পক্ষে ভোট দিয়েছে। এই বিশ্লেষকদের দাবি এটা হয়েছে বলেই মমতার পক্ষে মোট প্রায় ৪৮.৫% ভোট পড়েছে দেখা যাচ্ছে। যেমন আনন্দবাজার লিখেছে, “দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন প্রাপ্তি এবং ভোট শতাংশের হিসেব কষে নির্বাচনী বিশ্লেষকদের একাংশের ব্যাখ্যা, বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-রও একটা অংশের সমর্থন গিয়েছে মমতার ঝুলিতে”।
    এবারের নির্বাচন তাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিজেপির হিন্দুত্বের আধিপত্যের কাছে নত না হওয়া বরং, হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র গড়ার প্রপাগান্ডায় কলকাতার বাঙালিদের সেই পাল্লায় না পড়া। তারা নিজ বাংলা এথনিসিটির অর্থে জাতি রক্ষার লড়াইয়ে রাজনৈতিক শ্রীরামকে পরাজিত করতে এগিয়ে এসেছিল। এই অর্থে বাংলার সাথে লেপ্টে লেগে থেকেছে, তাকে ছেড়ে যেতে রাজি হয়নি। অথচ ব্যাপারটা হলো, বিজেপির ভাষ্যের এক আর্য-হিন্দির রাজনৈতিক ‘রাম’-এর ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র; এ নিয়ে জোরাজুরি করাতেই মমতার জন্য অনেক কিছুই সহজ হয়ে যায় রাজনৈতিক ‘রাম’কে হারানো।

    কিন্তু একারণেই আবার অনেকেই আশঙ্কা করছেন এখন; অনেকে বলছেন এটাই বিজেপির হামলার শেষ নয়। আরএসএস-বিজেপির স্টাইল এভাবে হার স্বীকার করে নেয় না। প্রতিশোধ নিতে তারা ফিরে আসে। সাধারণত এরপর আসে মুসলমান হত্যা-নিপীড়নের হুজুগ নিয়ে। মুসলমান নির্যাতন, দাঙ্গা হত্যা নিপীড়ন করা খুবই সহজ – এই সুযোগ নিয়ে তারা কৌশল সাজিয়ে আসে। কারণ দেখা যায়, আরএসএস-বিজেপির একটা স্থির ধারণা হল যে, ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গায় এক চরম মার-হত্যা-নিপীড়ন দাঙ্গা ঘটানো- এই ‘ভয়ের রাজনীতি’ কায়েম করা তাদের হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের জিগির তোলার উস্কানি ও সাংগঠনিক শ্রীবৃদ্ধির প্রধান অস্ত্র ও উপায়। এটা তারা বিশ্বাস করে থাকে। তাই যখনই ভোটে পরাজয় হয় তখনই তারা এ কৌশলের কথা চিন্তা করে। কারণ নিজেদের পরাজয়ের হতাশাকে তারা প্রতিহিংসা দিয়ে পূরণ করে এগোনোকেই সঠিক কৌশল মনে করে।

    ঠিক যেমন সর্বশেষ দিল্লির রাজ্য নির্বাচনে সেটাই আমরা দেখেছিলাম। সে সময় নাগরিকত্ব ইস্যুতে দিল্লির নির্বাচনে মুসলমানরা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টিকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করলে এরপরে দিল্লিতে মুসলমান পাড়াগুলোতে পরিকল্পিতভাবে দাঙ্গা ও হত্যা, তথা ম্যাসাকার হয়েছিল। দিল্লির কোর্ট-হাইকোর্ট আজো সেসব মামলায় কোনো প্রতিকার করতে পারেনি। অথচ মূল নেতা ‘মিশ্র’ সব ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন। বাংলায় মমতার বিজয়ের পরে এ হামলা হবেই এমন বলার কোন মানে নাই; তবে এটা হবেই না – তা বলাও অবশ্যই ভুল। বরং সব দিকে সচেতন ও সোচ্চার থাকাই সঠিক কাজ।
    কিন্তু বাংলাদেশে একটি ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে ‘কেন্দ্রীয় শাসনের হস্তক্ষেপ’ চেয়ে চার-পাঁচজনের একটা গ্রুপকে মানববন্ধন নামে দাড়াতে দেখছি আমরা। অনেকটা ‘হিন্দুদের জন্য হিন্দুরা’- টাইপের যুক্তিতে এসব আজব দাবি; যেখানে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বাংলাদেশের কেউ কোনো পক্ষের নয়। তাই কলকাতার আরএসএস-বিজেপি ঢাকায় এসে ব্যানার নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে দাঁড়ানো – এগুলো অবশ্যই কোনো ভালো লক্ষণ নয়। ফলে অবিলম্বে সরকারের এ বিষয়ে সতর্কতা, পদক্ষেপ নেয়া ও নজর দেয়া উচিত। কারণ সবশেষে এরা সবাই সংখ্যালঘু অজুহাতে ভিকটিম সেজে নিজেদের সব আকাম কাজের দায় চাপাবে আমাদের সরকারের উপরেই!

    পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের অভিনন্দনঃ
    এদিকে আমাদের প্রথম আলোর দিল্লি সংবাদদাতা সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জয়ের পর দলনেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাঠানো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের অভিনন্দন বার্তা যথেষ্ট আগ্রহ সঞ্চার করেছে। কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, মোমেনের ওই চিঠি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও শাসক দলের অনুসৃত নীতির বিরুদ্ধেও এক প্রচ্ছন্ন বার্তা”। কিন্তু তিনি লিখেছেন এই প্রথম নাকি ভারতে “রাজ্যের নির্বাচনকে ‘ধর্মীয় আধারে’ করার চেষ্টা হয়েছিল। বিজেপি নেতারা ভোট প্রচারে নাকি সরাসরি ‘বিভাজনের নীতিকে’ প্রাধান্য দিয়েছেন”।
    সরি, আপনার দাবি গ্রহণ করতে পারলাম না। প্রথমত, ‘বিভাজনের নীতিকে’ প্রাধান্য দেয়া অথবা ‘ধর্মীয় আধারে’ ভারতের রাজ্য নির্বাচন বিজেপির এটিই প্রথম নয়। কলকাতা তো বটেই এমনকি রাজস্থানের নির্বাচনেও বাংলাদেশের মুসলমানদের ভারতে অনুপ্রবেশের ভুয়া অভিযোগ তুলে ‘তেলাপোকা’ বলা হয়েছে। আজ হঠাৎ করে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পাওয়ার মত অনুভব হতে পারে কারও; তবু এসব একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। বিজেপি কখনো কি লুকিয়েছে যে, সে প্রায়ই মুসলমানদের জন্য দাঙ্গা ও হত্যার আজাব হয়ে আসে না? তার দলের রাজনীতিই তো হল , হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ব বা হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠা এবং ভারতের রাজ্যগুলোর সবাই প্রধান জনগোষ্ঠী হিসেবে সনাতন হিন্দু বলে পরিচিত হলেও বিজেপিসহ যেকোনো শ্রেষ্ঠত্ববাদী দলের এই কমন ফিচার হয় যে, তারা এক একক পরিচয়ে সবাইকে বাঁধতে চাইবেই – এক জাতশ্রেষ্ঠত্ব কায়েম করার চেষ্টা করবেই। যা এক পন্ডশ্রম যদিও! বিজেপি তো এগুলো লুকায় না! কিন্তু যাদের এসব নজরদারি করার কথা সেই নির্বাচন কমিশন বা ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এখানে নজর দিতে রাজি নয়। অথচ ধর্মীয় আধারে বা বিভাজনের নীতিতে ভোট চাওয়া – এটা বিজেপির জন্য দল নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার মত কৃত অপরাধ, তবু  তা তারা করেই চলছে, অবলীলায়। এখন এসব রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের পরিচালকেরা খোদ নিজেদেরই যদি নিজেদের ভারতের নাগরিক নয়, হিন্দু হিসেবে আবিষ্কার ও গর্ব করে থাকেন ও চলেন তবে ভারতের কনস্টিটিউশনে কী লেখা থাকল তাতে কিছুই আসবে যাবে না। উল্লিখিত ব্যক্তিদের মত সাংবাদিকের চোখেও এগুলো কোনো বড় সমস্যা হিসেবে ধরা পড়বেও না।

    উনি আরো লিখেছেন, কলকাতার “ভোটে বিজেপির বিপর্যয় ও তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জয়ের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পাঠানো অভিনন্দন বার্তায় সেই স্বস্তির ছোঁয়া স্পষ্টতই পরিলক্ষিত। সেটাই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্তরে আগ্রহ জাগিয়েছে”।
    তাঁর এ’কথাতে বলা যায়, সেটা কলকাতায় যা হয় হোক কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন এ ছাড়া আর কী বলতে পারতেন? তবে তার অবশ্যই ভারতের কাছ থেকে কোনো কিছু আশা করার মত বোকামি করার কিছু নেই! আবার এতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রটোকলের যে ব্যত্যয় নেই তা তো কূটিল কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেছেন আর নিজেই সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন যে, ‘মোমেনের অভিনন্দন বার্তা কূটনৈতিক প্রটোকলের দিক থেকে নিখুঁত”। কাজেই এনিয়ে আমাদের কী আর বলার আছে!

    মোদির বিজেপি ভারতে ক্ষমতাসীন আছে ও নির্বাচন করে যাচ্ছে সাত বছরের বেশি ধরে। তিনি যে ‘এক শ্রীরামের নামে’ [শুধু হিন্দু হলে হবে না] এমন এক পরিচয়ে ভারতের সব রাজ্যের হিন্দুকে নিয়ে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র কায়েম করতে চান সেই মেরুকরণের চেষ্টা তিনি সবসময় করে চলেছেন। কিন্তু সাত বছর ধরে, দেব মুখার্জির মত অনেকেই ব্যাপারটাকে প্রশ্রয়ের চোখেই দেখে এসেছেন।

    বরং এমন ভারতের সাংবাদিক, কূটনীতিক বা একাডেমিশিয়ানের বিরাট কুল – তাদের চোখে  মোদী এখন ‘বিরাট সফল নেতা’। কারণ এদের চোখে তিনি নাকি ভারতকে এক “পরাশক্তির প্রায় কাছাকাছি’ পর্যায়ে নিয়ে গেছেন বলে অনেকেই মনে করছেন। তাই সেই মোদী বাঙালির দুর্গার উপর ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদী’ চাপালেন কি না বা কোনো ‘ধর্মীয় বিভাজন’ টেনে ভোটের জোশ তৈরি করলেন কি না তাতে তাদের কী আসে যায়! বরং মোদী বলতে চেয়েছেন – ন্যায়-অন্যায় ইনসাফ বোধ এসব কোনো ভিত্তি নয়। বরং অন্যায়কারী হিন্দু হলেই সে আপনার ভাই, তার পাশে দাঁড়াতে হবে। এই হলো মোদীর আরএসএস-বিজেপির রাজনীতির ভিত্তি।
    এতে মোদীর এই রাজনীতিতে যদি কলকাতায় একটি দাঙ্গা ও হত্যাযজ্ঞের আয়োজন করে ফেলতে পারে , তাতে বাংলাদেশের হিন্দুদের কোন স্বার্থটা উদ্ধার পাবে? নিজেকে রক্ষা পারবে কেন? কার দয়ায়? না, এ নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা নেই। চিন্তা করতেই রাজি না। এছাড়া কোনো কেন্দ্র থেকে কোনো মোদি কি তাদের বাঁচাতে আসবেন? আর আমাদের সরকার এ-কোন মোদীর ভারতকে করিডোরসহ অসংখ্য সুযোগ সুবিধা খুলে দিবে যে কলকাতায় একটা দাঙ্গা ও হত্যার আয়োজন করতে চায়?

    অতএব যেখানে বসে যে যা বলছেন তা চিন্তা করে দায়-দায়িত্ব নিয়েই মুখ খুলবেন – এটাই আমরা সকলকেই আগাম সতর্ক করতে পারি!

    বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো এবং বাংলাদেশ পর্যবেক্ষক শ্রীরাধা দত্ত। যতটুকু শুনেছি এটা  আরএসএস-বিজেপির দল ও চিন্তা প্রভাবিত একটি থিংকট্যাংক। সেখানকার শ্রীরাধা বলছেন, ‘ভারতের অঙ্গরাজ্য হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের এক আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিই প্রধান বিবেচ্য।”
    এসব মুখস্থ আপ্তবাক্য বা কথার কথা ভারতে অনেক লেখা হয়েছে। তাই এসব শুনলে আমাদের অস্বস্তি লাগে। পারলে বিজেপির ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদ’ অথবা ‘ধর্মীয় বিভাজন’ রাজনীতি- এর বিরুদ্ধে লিখে দেখান। পারলে পক্ষেও লিখতে পারেন। কিন্তু চুপ থাকবেন না। এ সময় লিপ সার্ভিস দিয়ে পরিবর্তন আসবে না যদিও বাংলাদেশে আমরা আপনাদের উপর আশা রাখি না। আপনাদের মোদীর ভারতরাষ্ট্র ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদ’ থেকে ‘ধর্মীয় বিভাজন’-এর রাজনীতি করে যাবে আর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সব আশা জিইয়ে রাখবেন এটা আর কত চলবে? বা চলতে পারে?  না, চলতে পারে না। এসব বুঝা কী খুব কঠিন!

    ‘পরাশক্তি’ ভারতঃ
    এখন ভারতের সাংবাদিক, কূটনীতিক বা একাডেমিশিয়ানের এক বিরাট দল সব প্রসঙ্গ ছেড়ে এমন প্রচন্ড মোদীভক্ত হয়ে উঠেছেন যে দেখার মত! কেন? তারা কিভাবে মোদীভক্ত হয়েছেন? তাতেই বাকি সবাই নিজে নিজেই বুঝে যাবেন।
    ভারতের এখন বিভিন্ন রাজ্যে করোনা মহামারীতে রোগীদের অক্সিজেনের অভাবে বহু লোকের প্রাণ যাচ্ছে। এছাড়া সরঞ্জাম বেড এমনকি মৃত সতকারে শ্বশানেও পর্যাপ্ত  জায়গা পাওয়ায়ো কঠিন হয়েছে। অর্থাৎ মোদী যে ‘সরকার চালাতে’ গিয়ে একেবারেই ব্যর্থ হয়ে গেছেন – এখানে এসে তা আর কারো থেকে তিনি লুকিয়ে রাখতে পারেননি। এ ব্যাপারটাকে ‘সরকার চালাতে’ না বলে ফরমাল ভাষায় বলা হয় ম্যানেজমেন্ট ফেইলিওর; যার চেয়ে দুনিয়ায় আর বড় ফেল বা পরাজয় নেই।

    ভারতে গত ১৬ বছরের এক ভ্যানিটি বা অহমিকা ভারতের আমলা-রাজনীতিবিদরা চালু করে রেখেছিলেন যে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও বিদেশী সাময়িক সাহায্যও নেয়া যাবে না। কিন্তু কেন কংগ্রেস-বিজেপিসহ সব আমলা-রাজনীতিবিদ সাহায্য না নেয়ার এমন জিদ করেছিলেন? মিলিয়ে দেখুন, ১৬ বছর মানে হলো ২০০৫ সাল থেকে। তার সোজা মানে হলো, বুশের আমলে ভারত যখন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার থেকে ‘চীন ঠেকানোর’ ঠিকা পেয়েছিল, সে সময়ের সিদ্ধান্ত এটা। বাংলাদেশকে অ্যামেরিকার ভারতের হাতে  তুলে দিবার সিদ্ধান্তও এর একটু পরে ঘটেছিল। কিন্তু ভারত সিদ্ধান্ত নেয়, এ সুযোগে নিজেকে এক ‘পরাশক্তি’ হিসেবে অসত্য হলেও তুলে ধরবে, দেখাবে। তাই তারা ১৬ বছর আগে মুরোদে না কুলালেও দুর্যোগেও বিদেশী সাময়িক সাহায্য নেয়া নিষিদ্ধ করেছিল।
    তা হলে এখন সে কথা কেন তুলছি?

    কারণ অক্সিজেন সঙ্কটের শুরুতেই মোদি আর (সাহায্য না নেয়ার) ‘ফুটানিকা ডিব্বা’টা বহন করতে রাজি হননি কিংবা বলা ভালো এটাই তা ত্যাগের মোক্ষম সময় যে এই সুযোগে তিনি ভ্যানিটি ছেড়ে পালিয়ে বাঁচার সুযোগ নিয়ে ফেলেন। সে কারণের যেন মোদী এবার মোট ২০টি দেশের কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণ করেন, যার মধ্যে চীন আছে। এমনকি ক্ষুদ্র ভুটানও।

    আর এতেই তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে সাংবাদিক-ইন্টেলেকচুয়ালরা। এ নিয়ে তাদের মনোভাব সবচেয়ে ভালো পাঠ করা যায় দ্যা প্রিন্টে ছাপা এক আর্টিকেলে। ওর শিরোনামটাই তাদের চিন্তা পাঠ করার জন্য যথেষ্ট। ওই আর্টিকেলের শিরোনাম হল, ‘ভারত কি তৃতীয় বিশ্ব হয়ে ফেরত গেল? মশকরাটা হল, আমাদের পরাশক্তির আকাঙ্খাটা এভাবে কোভিডের হাতে পড়ে ন্যাংটা হয়ে গেল”  [Is India back to being ‘Third World’? Irony of an aspiring superpower exposed by Covid crisis]।

    একই মনোভাব ‘দ্যাহিন্দু’র সুহাসিনী হায়দারের। তিনি প্রায় চ্যালেঞ্জের মত মোদিকে লিখেছেন তিনি কেন বিদেশী সাহায্য নিতে গেলেন? [Why has India accepted foreign aid after 17 years?]  এভাবে লিডিং সাংবাদিককুলের মধ্যে হতাশার ছায়া নেমে আসতে দেখছি আমরা।

    মূল কথাটা হলো, মোদীর ‘শ্রীরামের হিন্দুত্ববাদ’ থেকে ‘ধর্মীয় বিভাজন’- এসব দিকের জন্য তারা মোদীকে কাঁধে বসিয়ে তুলে ধরতে কোনোই শরম বোধ করেন না। কারণ এই হিন্দুত্বের মোদী তাদের মিথ্যা হলেও পরাশক্তির স্বাদ চাটিয়েছে বলে মনে করে তাঁরা। এখন মোদী সেই মিথ্যা গর্ব বা ভ্যানিটিটা কেড়ে ফেলে দেয়ায়ই তাদের এত হইচই।

    কাজেই হিন্দুত্ব কলকাতায় মার খেয়ে গেল কি না আর তাতে দিল্লির মত কলকাতার মুসলমান মারার উৎসব আসন্ন কি না!  না, এগুলো তাদের অ্যান্টেনার নজরে আসার যোগ্য হয়নি। এই জয় শ্রীরামের জয়জয়কার থেকে ভারতকে কে বাঁচাবে?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৮ মে  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “ভারত এখন তৃতীয় বিশ্ব ” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে,  পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • মমতার উত্থান ও মোদীর হিন্দুত্বের পরাজয়ের তাতপর্য

    মমতার উত্থান ও মোদীর হিন্দুত্বের পরাজয়ের তাতপর্য

    গৌতম দাস

    ০৪ মে ২০২১, ০০:০৩ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3we

     

    ভারতের পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল যার মধ্যে আবার দুই রাজ্য হল আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ, যারা বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব আর পশ্চিম সীমানাজুড়ে। এর মানে হল গত পুরা মে মাসে আমাদের হিন্দুত্বের প্রবল প্রপাগান্ডার ভেতরে বসবাস করতে হয়েছিল। তবে এই নির্বাচন শেষে গণনা ও সব ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে, পাঁচ রাজ্যের একই সাথে ২ মে সকাল থেকে। যা এখন প্রায় সব রাজ্যে রাজ্যের পুর্ণফল প্রকাশিত।
    আর  গতকাল ২মে দুপুর তিনটা নাগাদ পরিস্কার হয়ে যায় যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ক্ষমতাসীন তৃণমুল কংগ্রেস দল মোট ২৯৪ আসনের মধ্যে এককভাবে দুশ-এর বেশি আসন নিয়ে আবার ক্ষমতায় ফিরতেছে।  সর্বশেষ সোমবার রাত সাড়ে সাতটায়, তৃণমূল ২১৩ আর বিজেপি ৭৭ আসন এভাবে আনন্দবাজার ফলাফল দেখাচ্ছে। এদিকে মমতার নিজের নন্দীগ্রাম আসনে তিনি হেরেছেন বলা হচ্ছে। যা তিনি আপাতত মেনে নিয়েছেন তবে আপত্তিসহ এবং তিনি সুপ্রীমকোর্ট পর্যন্ত যাবেন সে হুশিয়ারি দিয়েছেন। এদিকে মমতা আজ সন্ধ্যায়  বলছেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আগামি বুধবার শপথ নেবেন। রাজ্যের প্রাদেশিক সংসদ মানে বিধানসভায় বিজয়ী সদস্য না হলেও ছয় মাস পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী থাকা যায় অস্থায়ীভিত্তিতে। আর যেখানে ঐ ছয়মাসের মধ্যে কোন আসন খালি হলে (মানে  দলের কাউকে পদত্যাগ করিয়ে খালি করে নিয়ে) সেই উপ-নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে এলেই স্থায়ী ও রেগুলার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া যায়।
    ওদিকে ৩মে বিকাল পাঁচটায় খবর ছিল, মমতা সাংবাদিক বক্তৃতায় জানিয়েছেন মোট বিজয়ী আসন হতে যাচ্ছে সম্ভবত ২২১। মানে এমন আসন সংখ্যা বা এর কাছাকাছি দেখতে চাওয়া মমতার অনুমান।

    এই ফলাফলের তাতপর্যঃ
    আমাদের সাধারণ মন্তব্য এককথায় বললে সেটা হবেঃ  সারা ভারত না হোক, এটা হল – অন্তত পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদের পরাজয় এবং আরএসএস- বিজেপির হিন্দুত্বকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পাবলিক প্রত্যাখ্যান।  কিন্তু কেন এমন হল এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ চারদিক থেকে শুরু হয়ে গেছে, যা হওয়াই স্বাভাবিক। কলকাতার আনন্দবাজার এমনই একটা ভারতীয় বিশ্লেষণ তুলে এনেছে দেখা যাচ্ছে  যা ঠিক তার নিজের নয় তবে সংগৃহীত। নিচে সেটাই এখানে হবহু তুলে  দিচ্ছিঃ
    তৃণমুল দলের “দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন প্রাপ্তি এবং ভোট শতাংশের [এখন পর্যন্ত যা প্রায় ৪৮%] হিসেব কষে নির্বাচনী বিশ্লেষকদের একাংশের ব্যাখ্যা, বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-রও একটা অংশের সমর্থন গিয়েছে মমতার ঝুলিতে। বিজেপি যখন রাজ্যে ধর্মীয় মেরুকরণের প্রচার চালাচ্ছে, মমতা তখন মধ্যবিত্ত, মহিলা এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের একত্রিত করে ফেলেছেন বলেই বিশ্লেষকদের একাংশের মত। তা না হলে এই জয় এবং ভোট শতাংশ তৃণমূলের ঝুলিতে আসা সম্ভব নয় বলেই তাঁদের ধারণা। কারণ, তৃণমূলের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভোট শতাংশপ্রাপ্তি এ বারই”।

    এখানে বিশ্লেষক বলতে যারা বুথফেরত ভোটারদের সাথে কথা বলে একটা জরিপকাজ সমাপ্ত করে থাকেন আর সেই ফলাফলের বিশ্লেষণ হাজির করেন – এনিয়ে তারা পেশাদার কাজ করেন। উপরে তাদের সারকথা হল, মমতার দল কেবল তার রেগুলার সমর্থক ভোটারদেরই ভোট পান নাই। সেটা ছাপিয়েও তিনি অবশ্যই যারা বাম, কংগ্রেস এবং বিজেপি-রও একটা অংশের ভোটার এদের অনেকেরও ভোট পেয়েছেন।  কেন পেলেন আর কেন তারা এমন কথা বলছেন কিসের ভিত্তিতে? কারণ তাদের ভিত্তি হল, এমনটা হয়েছে বলেই মমতার দল  এত ভোট (এখনই এটা প্রায় ৪৮% যা গণনার শেষপর্যন্ত ৫০% এর কাছে যাবে বলে অনুমান ) ও আসন পেয়েছেন।

    অনেকে জানেন শুধু পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনেই  মোট মুসলমান ভোটার প্রায় ২৭-২৮% হয়ে থাকে। আর এর মধ্যের আবার  বড় অংশটাই ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে তৃণমুল একাই পেয়ে আসছে। তাহলে  মমতার দলের বাক্সে এখনকার সম্ভাব্য  মোট ৫০% ভোটপ্রাপ্তি হতে যাচ্ছে একথার  মানে হল –  মমতা নিজ দল ও সমর্থকদের ভোট ছাড়াও প্রায় সব ধর্মের সমান সংখ্যক সমর্থক ভোটারদের ভোটও মমতার দল যোগাড় করতে এবার সক্ষম হয়েছে।  আর এতেই  মমতা ও তার দল হল পশ্চিমবঙ্গে ধর্ম নির্বিশেষে সেই প্রতীক যারা একটা কমন ধারা, তৃণমুল দলে ভিতর “যাদের ইচ্ছা” সমবেত হয়ে – এমন একটা “মেজরিটি ম্যান্ডেট” তৈরি করেছে। আর মমতা হলেন যে ম্যান্ডেটের বাহক নেতা। তাহলে কী কারণে মমতা নিজ দল ও সমর্থকদের বাইরের ভোটারদেরও টানতে পারলেন?

    অন্যদিকে আরও প্রশ্ন, তাহলে তৃণমুলের নিজে বিজয়ের মধ্য দিয়ে ঠিক কাদেরকে  প্রত্যাখান করলেন? আর কীইবা এই বিজয়ের তাতপর্য?

    ঠিক অখন্ড ভারত না,  আজকের রাজনৈতিক ইন্ডিয়া, এই রাষ্ট্র ২৮ রাজ্যের সমাহার।  কালচারাল দিক থেকে বললে ভারতের মেজরিটি বা ৮০ ভাগ নাগরিক সনাতন ধর্ম অনুসরণ করে থাকেন। কিন্তু তবুও কোন একক “দেবতার” (মানে সবাই একই দেবতার) অনুসারি-পুজারি তারা নয়। বরং রাজ্য-ভিত্তিতে দেখা যায় তাদের  একেক আঞ্চলের আলাদা ‘প্রধান দেবতার পুজার” প্রচলন আছে। এমনকি সেই দেবতার পুজা উতসবকে ঘিরেই আলাদা আলাদা বার্ষিক প্রধান ধর্মীয় উতসব ঐ রাজ্যে পালিত হয়।  অর্থাৎ কলকাতার মত সব রাজ্যে বা সবার প্রধান উতসব ‘দুর্গাপুজা” নয়। কিন্তু এটার সুবিধা-অসুবিধা কী? এটা নিয়ে কথা বলছি কেন?
    কারণ আর কারোই তেমন কোন অসুবিধা না হলেও,  আরএসএস- বিজেপির এতে বিরাট অসুবিধা। কেন? কারণ এরা  যারা রাজনৈতিক এক “হিন্দুত্ব নির্মাণ” করতে চায়, এজেন্ডা নিয়েছে  এবং “হিন্দুত্বের এক জাতিরাষ্ট্র” খাড়া করা ইমাজিন করে; এই নামে ভারতীয়দের সকলকে বাধতে চায় তাদের এমন ২৭ রকম রাজ্য বা  হিন্দুত্ব হলে চলে না।

    তাদের দরকার একটাই রকমের হিন্দুত্ব, প্রাকটিস। তাই আরএসএস- বিজেপির রাজনৈতিক স্ট্রাটেজি ও ব্যাখ্যা হল, ভারতের উত্তরের ওপারে (কথিত আছে ইউরোপ বা জার্মান এরিয়ান থেকে আসা ধারা) সেখান থেকে এসেছে সেই এরিয়ান রেস যা ভারতের আর্য প্রজাতি বলে দাবি করে তারা। আর এমন দাবি করলে সুবিধা হল তাতে সবাই একই উৎসের বলে এই অজুহাতে সকলকে এক সুতায় বাধা যায়, সহজেই। যদিও এই ভারতেই আবার মোট তেত্রিশ কোটি দেবতার বয়ানও বিদ্যমান। আর বড় কঠিন বাস্তবতা হল,  আলাদা আলাদা রাজ্যে প্রধান উতসবের ভিন্নতা – এসবই  আরএসএস- বিজেপি র রাজনৈতিক ব্যাখ্যার পক্ষে মানে কোন একক হিন্দুত্ব তৈরির পক্ষে সায় দেয় না।  যেখানে এমনকি কালচারালি ভাষার ভিন্নতায় প্রত্যেক রাজ্য ভিন্ন। সেটা তো বটেই এছাড়া আবার যেমন কালচারাল  গান-নাচের বৈশিষ্ঠে তা  মৌলিকভাবেই আলাদা আলাদা ঘরানার। একেবারে বাদ্যযন্ত্রগুলোই আলাদা, রাগ আলাদা স্ব স্ব বৈশিষ্ঠের মহিমায় মহিমান্বিত। যা স্বভাবতই  কোন রাজ্য পরশি কারও তারা অস্বীকার বা অভারল্যাপ হওয়া বা আড়ালে পড়ে যাওয়ার ব্যাপারে খুবই সেনসেটিভ।  এককথায় তারা আঞ্চলিকতার বৈশিষ্ঠে ভরপুর এবং সেদিক থেকেই আলাদা। আর তাতে অন্তত কম করে হলেও মূল তিনটা ভাগে যা ভাগ করা যায়।

    কিন্তু  অন্যদের উপরে উত্তরভারত কেন্দ্রিক আর্য চিন্তাচর্চার জীবন ধারার প্রভাব  প্রাচীনকালে অখন্ড ভারতের আমল থেকে এই উত্তরের  অগ্রযাত্রা ছেয়ে বসলেও ভারতেরই   দুঅঞ্চলে বা জায়গায় প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। যে প্রতিরোধ সে আর পাড় হতে পারে নাই। এক হল দাক্ষিণার্তে [Decan] “দ্রাবিড়ীয়” [Dravidian] প্রতিরোধ আর এদিকে তাদেরই আরেক ধারার মারাঠা-বিহার পেরিয়ে আরো পুবে “বাংলার” প্রবেশমুখে প্রতিরোধ। এি প্রতিরোধ টিকে যাওয়া তাদের আগে থেকে চলে আসা  ভিন্নতার রূপবৈশিষ্ঠের ছাপটাই তাই প্রবল্ভাবে এখনও গান-নাচের ক্লাসিকাল চর্চাতেও স্পষ্ট। ভাষা তো আছেই। কিন্তু এসব ন্যাচারাল হিস্টোরিক্যাল অমিল-বেমিলগুলোকেই আরএসএস- বিজেপি  জবরদস্তিতে অস্বীকার করে এক দাবি করতে চায়, এক বলে দেখাতে চায়। আসলে চায় কথিত এক আর্য-চিন্তা (যা আসলে আরএসএস- বিজেপি এর) এরই আধিপত্য।

    দুনিয়ার সব (ভিতরে ভিতরে বা বাইরেও) জাতিবাদী বা জাতি-রাষ্ট্রবাদীরাই এই একই ভুল করে। এমন পথেই যায়। তারা সবাইকে এক ভাষায় কথা বলাতে চায়, নয়ত একই কালচারে বা একই ধর্মে বা একই দেবতায়। তাদের একেবারেই ভিত্তিহীন কিন্তু তবু দৃঢ় বিশ্বাস এভাবেই মানুষকে নাকি কেবল এক রাষ্ট্রে ধরে রাখা যায় – এক জাতি-রাষ্ট্রে। অথচ দেখা যায় এর বিপরীতে আমেরিকার বয়স আড়াইশ বছর আর সে জাতি-রাষ্টর  নয়।  বরং এটাই এক প্রথম ও সবল এক ফেডারল রাষ্ট্র। যা পঞ্চাশটা বড় বড় সাইজের রাষ্ট্রের ভিন্নতার সমাহার। কাজেই আগের সব জাতি-রাষ্ট্র পরিশেষে যেমন ফেল করেছে ভেঙ্গে গিয়েছে ; আরএসএস- বিজেপি র একই আর্য-হিন্দুত্বে (রামকে প্রতীক করে) এক হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা এটাও প্রত্যাখ্যাত হবে। প্রায় কাছাকাছি সমস্যা কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের। যখন ১৯৯২ সালে ভেঙ্গে ১৫ টুকরা হল তাতে বুঝা গেল কী জবরদস্তি না চলেছিল। যেমন একটা জবরদস্তি হল, সবাইকে রুশ ভাষা শিখানো।

    এমনিতেই বেশীরভাগ  দেশি-বিদেশি মানুষ আরএসএস- বিজেপির  এক হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা এমন প্রজেক্টের কথা জানে না, ধরতেই পারে না।  বিজেপি তাদের চোখে এক আম রাজনৈতিক দলই মনে হয় তাদের কাছে। কলকাতায় কংগ্রেস বা নানা ধরণের বাম যখন একে একে ভেসে গেছে আর একই সাথে আরএসএস- বিজেপির হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনায় প্রবল অর্থ ও রিসোর্স খরচ করে হিন্দুত্বের রাজনীতি সব ছেয়ে ফেলতে সে যখন মরিয়া – এমন সব রাজনীতিকেই এবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিনে রুখে দিয়েছেন একা মমতা।  কেন একা মমতা বলছি? কারণ মমতার বিশ্বস্ত কমরেডদেরকে যখন বিজেপি প্রলোভন দেখিয়ে কেড়ে নিয়ে গেছে ফলে তৃণমুল – সেই দল মানে আক্ষরিক অর্থেই একা মমতা হয়ে গেছে।  একটা তথ্য দেখেন অনেক অর্থ তাতপর্য বুঝা যাবে তাতে। এই নির্বাচনে এবার একা মোদী এক মাসেই ২২ বার এসে জনসভা করেছেন।  মানে প্রায় প্রতিদিন একটার কিছু কম। এথেকে বুঝা যায় কলকাতার এই নির্বাচন মোদী ওতার দলের কাছে কী! সেই নির্বাচনে মমতা এদের সবাইকে পরাজিত করে দিয়েছেন।
    কিন্তু প্রশ্ন হল, মমতা তাহলে তিনি হারালেন কাকে? তিনি হারিয়েছেন উতখাত ও প্রত্যাখান করেছেন – মূলত আরএসএস- বিজেপিকে সাথে তাদের যে হিন্দুত্ব-ভারতের স্বপ্নকল্পনা আছে সেটাকেও। যেটা গত সাত বছরে ক্রমশ ধেয়ে আসছিল, ছেয়ে বসছিল। কোথাও তেমন কোন শক্ত প্রতিরোধ কেউ তৈরি করতে পারে নাই।  এমনকি দ্রাবিড়িয় এলাকায় অন্তত কোয়ালিশনে হলেও বিজেপি থাকার চেষ্টা করে গেছিল। এজন্যই এটা শ্রেফ একটা তৃণমুল দলের না, একজন মমতার বিজয় নয়। এটা ভারত রাষ্ট্রকে হিন্দুত্বের নামে হিটলারের মত এক তান্ডবের হাত থেকে প্রাথমিকভাবে রক্ষা করা।

    যারা মমতার তিন তারিখে বিকেলের কালিঘাটে তার বাড়ির পাশের সাংবাদিক সম্মেলন দেখেছেন (ফেসবুকে ক্লিপে দেখেছি আমি) তারা খেয়াল করবেন মমতাও এবিষয়ে সেখানে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন এই বিজয় ভারতের জনগণকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কী থেকে? এক উদগ্র হিন্দুত্ব, এক হিন্দুত্বের রাষ্ট্র, সবাই একই এক  টাইট  ইউনিফর্ম-এ – এমনই কিন্তু নতুন করে আরেক নীলচোখের আরিয়ান উগ্র জাতিবাদ, আরেক জার্মান হিটলারের উত্থান হতে চাচ্ছে যেন ! – এসব কিছু থেকে ভারতকে বাঁচিয়ে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, মমতা তাই এই জনগণকে বারবার সালাম আর থ্যাঙ্কস দিচ্ছিলেন। বিপরীতে মমতা বলতে চাচ্ছিলেন সবাইকে একই রকম হিন্দু [আরএসএস- বিজেপির হিন্দু] হতে হবে কেন?

    অথচ ভিন্নতার ঐক্যের হিন্দু হলে অসুবিধা কী? সবাইকে ইউনিফর্ম হিন্দু হতে হবে কেন?  আর জবরদস্তি কেন? এছাড়া হিন্দু ছাড়াও তো অন্যধর্মের নাগরিক আছে, অনেক হিন্দু আরএসএস- বিজেপির হিন্দু নাও হতে চাইতে পারেন, এমনকি কোন রাজনৈতিক হিন্দু হতেই নাও চাইতে পারেন! তারা কোথায় যাবে? অথচ সকলকে নিয়েই এক রাজনৈতিক সাম্যে –  এমন বৈচিত্রগুলোর ঐক্যের এক ভারতীয় নাগরিক হলে হতে চাইলে পারবে না কেন?

    রাজনৈতিক সাম্য মানে নাগরিক হিসাবে সবাই সমান, সম অধিকারে সমান। ধর্ম, বর্ণ, নারী-পুরুষ, গায়ের রং, সমতলি-পাহাড়ি সব ধরণের পরিচয় নির্বিশেষে সমান অধিক্কারের নাগরিক – এই ভিত্তিতে ঢেলে সাজাতে হবে রাষ্ট্রকে। এটাই জাতি-রাষ্ট্রের বিপরীতে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র। সব ভিন্নতাগুলোর ঐক্য গড়ার প্রাথমিক ভিত্তি।

    এদিকে কোভিড সমস্যা মোকাবিলা করতে গয়ে মোদী প্রশাসনের ম্যানেজমেন্ট ব্যর্থতা, এই পটভুমিতে ভারতকে নতুন দিশা আর ঐক্যের পথ দেখানোর সুযোগ ……

    এসব দিকগুলাই হল, তৃণমুলের টানা তৃতীয় বা এবারের বিজয়ের গভীর তাতপর্য।

    গৌতম দাস
    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    ০৪ মে ২০২১

  • না চিকিৎসা না পেটে কিছু – হিন্দুত্ব এখন সব ব্যর্থতাই ঢাকতে অক্ষম

    না চিকিৎসা না পেটে কিছু – হিন্দুত্ব এখন সব ব্যর্থতাই ঢাকতে অক্ষম

    গৌতম দাস

    ২৬ এপ্রিল ২০২১, ০০:০৮

    https://wp.me/p1sCvy-3vl


    সরকার সঙ্কটে। মোদী সরকারের  নির্বাচন কমিশন, সুপ্রীমকোর্ট , মিডিয়া ইত্যাদি এমন প্রধান সব ইনস্টিটিউশনগুলো কোভিড ক্রাইসিসের সময় ভারতকে নিচে নামিয়ে, অকার্যকর করেছে। এক সাক্ষাতকারে এমন মন্তব্য করেছেন ভারতের সুপ্রীমকোর্ট বার এসোসিয়েশনের সাবেক এক প্রেসিডেন্ট, দুষ্মন্ত দুবে।
    আর নিচের ছবিতে, ডঃ রামচন্দ্র গুহ একজন স্বনামধন্য ইতিহাসবিদ তিনিও এক সাক্ষাতকারে বলছেন, মোদী ক্ষমতা-লোভী অসুস্থ [megalomaniac]; আর এটাই  কোভিডকালে ভারতের প্রশাসনিক মিস-হ্যান্ডিলিং পিছনে মোদীর নেতৃত্বের স্টাইল, এটাই প্রধান কারণ। এখানে সাথে দেয়া লিঙ্কগুলো আসলে সাক্ষাতকারের ইউটিউব লিঙ্ক, পাঠক খুলে দেখতে পারেন।

    চারদিকে “হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ব” – এই সুরসুরি  বেচে ক্ষমতা দখল আর এভাবেই ২০১৪ সাল থেকে এতদিন করে খেয়ে আসছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।  কোন ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ববাদ অথবা এমন ধর্ম-ভাষা ইত্যাদির সুরসুরি তুলে নানা কিসিমের জাতিবাদগুলো এভাবেই মানুষের উপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাজত্ব করে থাকে। তবে আগে ছিল সেটা মোদীর উত্থানের সময়। আর এখন পতনের সময় এর চেয়েও ভয়াবহভাবে তিনি হঠাত পড়তে শুরু করেছেন। ভারতের কোভিড ভাইরাস মোকাবিলা করতে গিয়ে এই দ্বিতীয় ঢেউ [মাল্টিপল  বংশ-প্রজাতির ভাইরাস [variant] একসাথে আবির্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে] এর কালে মোদী সরকারের হিন্দুত্বের চাপাবাজি ও উন্মাদনা তুলে  এবার আর কিছুই ঢাকতে পারছে না। সব ম্যানেজমেন্ট অক্ষমতা আর ব্যর্থতা উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। উপরের সাক্ষাতকারের বক্তাদের বক্তাদের বক্তব্যের সারকথা এটাই।

    A Naga Sadhu, or a Hindu holy man, waves the Indian flag as he takes a dip in the Ganges river during the first Shahi Snan at “Kumbh Mela”, or the Pitcher Festival, in Haridwar, India, March 11, 2021. REUTERS/Anushree Fadnavis

    এদিকে, এটা উত্তরাখন্ড প্রদেশের (আগের উত্তর প্রদেশের অংশ) “হরিদ্বারে কুম্ভমেলা্র” ছবি। এসব ধর্মীয়-স্নান জাতীয় ততপরতার সাথে  [সাধু আর পতাকা এদুই এর মিলন এটা খুবই তালমিল-হীন ] ভারতীয় পতাকার কোন সম্পর্ক এর আগে কখনও দেখা গেছে বলে মনে পড়ে না। সম্ভবত, এটা বিদেশিদেরকেও দেখানো [এই ছবিদুটা আলজাজিরা ও জাকার্তাপোস্ট পত্রিকা থেকে নেয়া] যেন এর উদ্দেশ্য।  এছাড়াও আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হিন্দুত্বের জোশ-জজবা তুলে ভোট আদায়ের সাথে, মানে হিন্দুত্বের রাজনীতির সাথে সাধুগিরির সামাজিক ততপরতা একে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে বলে এমন; যা আগে পুরানা দিনে কখনও দেখা যায় নাই। এখন হচ্ছে এটাই  হিন্দুত্বের ভারতের মোদীর বিরাট নেতি অবদান।  মোদীর আরো বড় অবদান হল কোভিড দ্বিতীয় ঢেউ এর মধ্যেই অভয়দান করে এমন লাখ লাখ লোকের জমায়েতের আয়োজন করতে উতসাহ দেয়া। এই মেলায় এমনকি, এখানে কোন লালার স্যাম্পেল না দিয়েই আপনি কোভিড নেগেটিভ বলে সার্টিফিকেট পেতে পারেন, সে ব্যবস্থা আছে [Testing negative without even giving a sample]। মোদী এখন বুঝতেছেন নিশ্চয়, এখানে কে কাকে আসলেই ফাঁকি দিতে পেরেছিল!

    আবার এর বিপরীতও আছে। কিছু আনন্দবাজারি মাথাব্যাথাও দেখে গিয়েছিল যে,  এক সাধু অভয় দিচ্ছিলেন – ভগবান আছে সব নাকি তিনিই রক্ষা করবেন……“It’s the voice of god, who says nothing will happen. God won’t let anything happen to us. I have full faith,” said Baba Prakash Puri Maharaj।
    আবার মেলার আয়োজক প্রধান  বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বলেছেন, “আমাদের কাছে বিশ্বাস সবথেকে বড়। মা গঙ্গার উপর মানুষের বিশ্বাস রয়েছে বলেই তো এত মানুষ এখানে স্নান করতে এসেছেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন মা গঙ্গা তাঁদের এই অতিমারির হাত থেকে বাঁচাবেন”। এমনকি উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী তীর্থ সিংহ রাওয়াতও বলেছিলেন, ‘‘মানুষের স্বাস্থ্য অবশ্যই গুরুত্ব পাবে। তাই বলে ধর্মকে অবহেলা করতে পারব না”। ভোটের বাজার এতই চড়া।  কারণ, এবার হিন্দুত্বকে পিছনে ফেলে ছাপিয়ে উঠেছে কোভিড পরাক্রমশালী। মানে কোভিডে মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা ফেল করায় আবার গরীবের কাজ ও পেটের বন্দোবস্ত করতে মোদী সরকার ফেল করায়।   অথচ ঠিক উলটা হয়েছিল গতবছর লকডাউনের আগে মারকাজের ইসলামি জমায়েতের বিরুদ্ধে সরকারি একশনে। বিবিসি লিখছে “প্রসঙ্গত, গত বছরের মার্চে দিল্লির নিজামুদ্দিনে তাবলীগ জামাতের যে মারকাজে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার মুসুল্লী জড়ো হয়েছিলেন, সেটিকে করোনা সংক্রমণের একটি ‘সুপার স্প্রেডার’ ইভেন্ট হিসেবে সরকারি কর্মকর্তারাই চিহ্নিত করেছিলেন”। যা মুসল্লিদেরকে সাজা খাটতে হয়েছিল, আদালতে দারস্ত হয়ে কোনমতে বাঁচতে হয়েছিল।  যদিও ইসলামবিদ্বেষ উঠানো হয়েছিল চরমে এই বলে যে প্রজাতি হিসাবে মুসলমান মাত্রই তাঁরা নিম্নস্তরের জীবন-অভ্যাসের মানুষ এই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগ ও ঘৃণা ছড়িয়ে ।

    এটা এক প্রভাবশালী সাংবাদিক-সম্পাদক রাজদীপ সারদেশাই এর ভাবনা বলা যায়। তিনি বলতে চাইছেন, “অনুপযুক্ত শাসকের [inappropriate Governance] জন্যই কী ভারতের এই পরিণতি হল?

    এসব নিয়ে এখন সারকথায় বললে, এতদিন মোদী ও তার হিন্দুত্ব নাকি খুবই পপুলার, মারাত্মক জনপ্রিয়, এসব শুনতে শুনতে কাল ঝালাপালা অবস্থায় ছিলাম আমরা। কিন্তু এবার হঠাত করে মনে হচ্ছে সবার কানে পানি ঢুকে গেছে। কারণ, একেবারে উলটা গান শুরু হয়ে গেছে। মোদী আর হিন্দুত্ব নিয়ে নাকি ভারত আর ভাল নাই। মোদীর জনপ্রিয়তা হঠাত করে ব্যাপক ধ্বসের মুখে!  ভারতে এখন প্রতিদিনে কোভিডে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা তিন লাখের উপরে। আর সাথে মৃত্যুর সংখা ২৬০০ এর উপরে। কোন কোন রিপোর্ট দাবি করছে টুইটারে  হ্যাশটাগ #ResignModi এখন ক্রমশ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।  অর্থাৎ ঠিকমত চিকিতসা না পাওয়া – যেমন টিকা বা অক্সিজেনের অভাবে থাকা চিকিতসালয়  আর কাজ না পাওয়ায় মানুষ প্রত্যেকের পেটে টান দেওয়াতে এবার মোদী আর আর তাঁর হিন্দুত্বকে পরাজিত করে সবার উপরে জোয়ার বা প্রভাব বিস্তার করেছে মানুষের বৈষয়িক জীবন  – যেমন স্বাস্থ্যসেবা আর কাজ পাওয়া। এই বেসিক বাস্তবতা। এতদিন মোদী ও তার বন্ধুরা ভেবেছিল তাঁরা হিন্দুত্ব এই জোশ বা আবেগ দিয়েই বাকি দিনও চালিয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু এই প্রথম  হিন্দুত্বের উপর কোভিড ক্রাইসিসে মোদীর ব্যর্থতা প্রধান ইস্যু হিসাবে উঠে আসছে। মানুষের বৈষয়িক জীবনের নুন্যতম চাহিদাটুকুও পুর্ণ না হওয়া – এটাই হিন্দুত্বের মোদীকে ধাওয়া করে পরাজিত করতে চাইছে।

    হিন্দুত্ব ফেল করেছে কেন?
    আগে বলেছি মানুষের বৈষয়িক জীবনের নুন্যতম চাহিদাটুকুও পুর্ণ না করেও মোদীর হিন্দুত্ব বিজেপিকে গত সাতবছর ধরে কেবল সার্ভিসই দিয়ে যেতে পেরেছিল। কিন্তু সম্ভবত আর না। সেই রাতারাতি নোট বাতিল (পাঁচশ ও হাজারের নোট বাতিল) সিদ্ধান্তের সময় থেকেও যদি ধরি। মানুষের সহ্যক্ষমতা অপরিসীম তা বলাই বাহুল্য।  আজ রিপোর্টারেরা লিখছে, তারা ভেবেছিল, মোদী এটা বেচতে সক্ষম হয়েছিল  যে হিন্দুত্বের ঐক্য – এই জাতিবাদ মানুষের জন্য অনেক কিছু এনে দেবে, অনেক সমস্যার সমাধান আনবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য  সাধারণ মানুষের। তারা তখনও প্রতারিত, এখনও। এটা তখনও সত্যি ছিল এখনও সত্যি যে মানুষের বৈষয়িক জীবনের নুন্যতম চাহিদাটুকুও পুর্ণ করতে যেমন এক নুন্যতম দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন প্রয়োজন, মোদী এর কখনই উপযুক্ত নয়, ছিল না। কিন্তু কোভিড ক্রাইসিস এখন চরমে উঠার মাধ্যমে এই ম্যাসেজ কী পাবলিকের কাছে পৌছাবে? আমরা এখনও নিশ্চিত নই।  তবে গণহারে পাবলিক যে এক বিরাট ধাক্কা খেতে যাচ্ছে, এটা প্রায় নিশ্চিত।  যেটা আরও ভয়াবহ ঘটনা হবে, দরজায় কড়া নেড়ে অপেক্ষা করছে তা হল, কোভিডে ঢলে পড়া অর্থনীতি যা নেগেটিভ প্রবৃদ্ধিতে চলে গেছে ও আছে দেড় বছর ধরে তা কী এই দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় আদৌও সামলাতে পারবে? এটাই হয়ে উঠতে পারে হিন্দুত্বের উপর প্রধান নির্ধারক ধাক্কা।  ভারতের বাজেট-বর্ষ শু্রু হবার মাস বা কাল হল ১ এপ্রিল। অথচ ভারতের উভয় সঙ্কটটা হল যে, এখনই লকডাউন আরোপ না করলে কোভিড একেবারেই আরো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। আবার উল্টা দিকটা হল, এখন লকডাউনের দিলে এর ধাক্কা সামলানোর মত অর্থনীতি আর চালু থাকবনে না। এছাড়া, মানুষের সুস্থ থাকা ও কাজ থাকার বাস্তবতা আরও শুকিয়ে মরবে। এমন বাস্তবতায় গত সাতবছরে মোদীর হিন্দুত্ব ভারতের জন্য আরো কী কী হারানোর কারণ হয়েছে তা নিয়ে কিছু কথা বলব।

    ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কঃ
    রাজনীতিবিদ অপেক্ষাকৃত তরুণ কেউ হলে একটা বাড়তি সুবিধা কখনো পেতে বা নিতে দেখা যায়। সেই হল, এপ্রোচ বা আগানোর ধরণ। মানে কোন মনোভাব থেকে বসে একটি সমস্যাকে নেতা দেখবে? তাঁর আগের রাজনীতিক নেতারা যেভাবে দেখে এসেছেন সেভাবেই? নাকি নয়া উদ্যোগে? কোনো নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা বিকল্প পথ খুঁজে দেখে তাতে সমাধান বা অবস্থা বদলের চেষ্টা করবেন? দেখা যায়, রাজনৈতিক নেতা বা প্রধানমন্ত্রী নতুন বা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী হলে তিনি অনেক ভিন্ন দিক থেকে সমাধান খুঁজতে চাইছেন, যা আগে ভাবা হয়নি। সমস্যা বা বিরোধগুলোকে বিপক্ষ অংশের সাথে বসে মানে তাদের চোখেও দেখে এক নয়া এপ্রোচে নতুন পথে সমাধান বা বিপক্ষকে মানানোর বা পরস্পরের সমস্যাটা ঠিক কোথায় তা ঠিকঠাক বুঝে এগোনোর পথ এক্ষেত্রে খুঁজে থাকেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তেমনই এক ব্যক্তিত্ব!

    ইমরান যখন ২০১৮ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেন, তখন ভারতে বিজেপির মোদীর প্রথম টার্মে ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে চার বছর পার করে ফেলেছেন তিনি। মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী ২০১৪ সালের মে মাস থেকে। মানে পরের বছর ২০১৯ সালের মে মাসে মোদী আবার নির্বাচনে দাঁড়ানোর কথা তখন। মোদী দ্বিতীয়বার দাঁড়িয়েছিলেন এবং তিনিই ‘বিজয়ী’ বলে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু ইমরান খান পাকিস্তানের আগের যেকোনো প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে নয়া এপ্রোচ, নয়া উদ্যোগ নেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন অপেক্ষাকৃত কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই। কিন্তু সার কথাটা বললে, নয়া উদ্যোগের প্রধানমন্ত্রী ইমরানের থেকে মোদীর ভারত নয়া উদ্যোগ বা অ্যাপ্রোচের কোন সুবিধা পেতে বা নিতে চান বা নিয়েছেন; এমন আমরা দেখিনি। কেন?

    প্রথমত, এটা ঠিক মোদীর বিরুদ্ধে যতটা অভিযোগ, এর চেয়ে বরং বলতে হবে মোদির পক্ষে আসলে এমন কোনো আশা দেখতে পাওয়া বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার নয়া উদ্যোগর পথে আগোনো অথবা ইমরানকে উৎসাহ দেয়া ইত্যাদি কোনটাই আসলে মোদির পক্ষে সম্ভবই ছিল না। সেই প্রসঙ্গেই এখানে বলব।

    তবে এর আগে সাধারণভাবে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান এই তিন দেশের দুর্ভাগ্য যেখানে আটকে গেছে ও আটকানো শুরু হয়েছিল তা নিয়ে দু’টি সাদা কথা বলে নেব।

    ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় বিরোধের ইস্যুগুলো এমন যে, এর অন্তত কিছু গূঢ়-ইস্যু নিয়েই অনন্তকাল বিবাদ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। মানে কোন সমাধানের দেখা পেতে এখানে কতগুলো প্রজন্ম লাগবে এর হদিস কেউ জানে না। কাশ্মির ছাড়াও জন্ম থেকেই বিরোধের সূত্রপাত এমন অনেক ইস্যু আছে।

    কিন্তু এসব বিরোধের আসল উৎস কী তা স্বল্প কথায় বললে – এর প্রধান উৎস হলো ব্রিটিশরা কলোনি-ইন্ডিয়া ত্যাগ করে চলে গেলে কলোনিমুক্ত ভারত কেমন রাষ্ট্র হবে এ নিয়ে অপরিপক্ব জবাব দেয়ার চেষ্টা এবং রাষ্ট্র নিয়ে খাটো চিন্তা-ধারণা হাজির করা থেকেই আজকের ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান- এ তিন দেশ সেই থেকে সাফার করে আসছে, ধুঁকে মরছে।

    সমাজের কোন একদল নিজ ধর্মীয় বা যেকোনো আইডেনটিটিরই এক জাতি-রাষ্ট্র করবে বলে, বুঝে বা না বুঝে যদি গোঁ ধরে তবে এর পরিণতিতে তা বাকি সব পক্ষই আরেকটা করে ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম বা ভাষা অথবা অন্য যেকোনো ভিন্নতার আইডেনটিটির ভিত্তিতে জাতি-রাষ্ট্র গড়তেই তো চাইবেই। সব বিবাদের শুরু এখান থেকে, আর এথেকে নানান দিকে তা যাবেই। এটাই অনিবার্য আর তাই হয়েছিল। এই সরল সত্য ও বাস্তবতা বোঝার যোগ্যতা যারা প্রধান নেতৃত্ব দাবি করেছিল তাদের কারো ছিল না; বরং সবাইকে একটা আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্রে আনতেই হবে আর সেটা হতে হবে এক হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রই; এভাবে তা বাকি সবার ওপরে চাপিয়ে দিয়ে হলেও যেন ‘এটাই হতে হবে’। কংগ্রেসের এই জবরদস্তি, এ থেকেই সব বিরোধের আরো ডালপালায় বিস্তার এখনো চলছে। এর শুরু বা আদিপাপের রচয়িতা-কর্তা মুসলিম লীগ বা জিন্নাহ একেবারেই নয়। এই মিথ্যা প্রপাগান্ডাও চালু আছে। তবে এরা অবশ্যই নিরুপায় হয়ে অনুসারী মাত্র। সেই মূল রচয়িতা-কর্তা হলেন রাজা রামমোহন রায়;  এবং বিগত ১৮১৫ সাল থেকে শুরু করা তাঁর ব্রাহ্মসমাজ গড়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা। এই ব্যর্থতা থেকেই পরে বঙ্কিম-প্রমুখেরা এক “হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের” জন্ম দেয়া বা গড়াই কংগ্রেসের লক্ষ্য সেট করেন।  আর তাতে সব বিবাদের শুরু হয় এখান থেকে।  রামমোহন, তিনি বোকা নাকি ইসলামবিদ্বেষী? সে যাই হোক, পাঠক বিচার করবেন, তবে কমিউনিস্টদের চোখে রামমোহনকে তারা মানেন ‘বেঙ্গল রেনেসাঁর আদিগুরু’ হিসাবে! এখন তাহলে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরাই ব্যাখ্যা করে দেন যে, কমিউনিস্টদের চোখে ধর্মচর্চা তো এখনোও খুবই খারাপ কাজ। অথচ এই বহু কথিত রেনেসাঁর আদিগুরু রামমোহন, তিনি কী করে নতুন একটা আস্ত ধর্ম – ব্রাহ্মধর্ম চালু করেছিলেন? এ কোন বিপ্লবীপনা? আবার এটা নিয়েইবা সব রেনেসাঁবাদী কমিউনিস্টরা আজও বেমালুম চুপচাপ নির্বিকার কেন? কিভাবে? এর সাফাই কী এবং কৈ? তারা কেউ বলেন না! কেন?

    আমাদের অনেকের মনে হতে পারে, ভারত-পাকিস্তানের ক্যাঁচাল থেকে বাংলাদেশ এখন স্বাধীন হয়ে অনেক দূরে গিয়ে বেঁচেছে। কিন্তু তা একেবারেই না। এমন মনে হলেও এটা সত্য নয়। কারণ অখণ্ড ভারতে আমাদের মূল বিবাদ ছিল, ভাষা বা ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতিরাষ্ট্র খাড়া করে সমাধা পাওয়ার খায়েশ থেকে শুরু হওয়া নানা লড়াই থেকে বিভক্তি। তাতে বাংলাদেশে আমরা এখন ভৌগোলিকভাবে ভারত-পাকিস্তানের কেউ না বলে তাদের ক্যাঁচালের কেউ না – এই আত্মপ্রসাদ পেতে চাইলেও যা আমরাও সাথে নিয়েই হাঁটছি তা হল, বাংলাদেশ এখনো একটা ভাষা বা ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্রই। সেই আদিপাপ আমরা ত্যাগ করতে পারিনি। বাংলাদেশ বাংলা ভাষাভিত্তিক আইডেনটিটির এক জাতি-রাষ্ট্র। আর তা কোন ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র থেকে কোন অর্থেই আলাদা কিছুই না? মূল কারণ যেকোনো আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র মাত্রই একটা অস্থিতি ও নতুন বিবাদের উৎস হয়ে তা থেকে যাবে বলে এ থেকে বের না হতে পারার বিবাদ থাকবে। যেমন বাংলাদেশের কেউ কেউ মুসলিম জাতিরাষ্ট্র হতে চাইবে। পাহাড়িরা যেমন জুম্মু জাতিরাষ্ট্র। এ কারণে হিন্দু-মুসলমান নিয়ে বিবাদে আমরা এখনো সবাই প্রায়ই আক্রান্ত হই,আটকে আছি।  আর এতে সামাজিক-অর্থনৈতিক সব অর্জনই সময়ে ম্লান হয়ে যায়।

    বাংলাদেশ এখনো একটা ভাষাভিত্তিক  আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্রই। সেই আদিপাপ আমরা ত্যাগ করতে বা বের হতে পারিনি। বাংলাদেশ বাংলা ভাষাভিত্তিক আইডেনটিটির এক জাতি-রাষ্ট্র। আর তা কোন ধর্মীয় আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র থেকে কোন অর্থেই আলাদা কিছুই বা বিবাদের বাইরে না? মূল কারণ যেকোন আইডেনটিটির জাতি-রাষ্ট্র মাত্রই একটা অস্থিতি ও নতুন বিবাদের উৎস হয়ে তা থেকে যাবে বলে – এ থেকে বের না হতে পারার বিবাদ থাকবে। যেমন বাংলাদেশের কেউ কেউ মুসলিম জাতিরাষ্ট্র হতে চাইবে। পাহাড়িরা যেমন জুম্মু জাতিরাষ্ট্র চাইবে। এসব কারণে হিন্দু-মুসলমান নিয়ে বিবাদে আমরা এখনো সবাই প্রায়ই আক্রান্ত হই,আটকে আছি।  আর এতে সামাজিক-অর্থনৈতিক সব অর্জনই সময়ে ম্লান হয়ে যাবে। অথচ দরকার ছিল নন-আইডেনটিটি ও এক; সবাই সমান নাগরিক এই ভিত্তিতে এক “রাজনৈতিক সাম্য”; মানে সমঅধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র।

    এখন আমাদের প্রসঙ্গ মোদী-ইমরানের মধ্যে সীমিত করব। ভারত-পাকিস্তানের অবস্থা এখন এমন যে, সবাই ন্যূনতম এক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চায় হয়ত; সব পক্ষেরই কাম্য।  কিন্তু একই সাথে এর সমস্যা অন্যখানে। কারণ এক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এমনকি বিজেপি-আরএসএসের মোদীরও হয়ত অকাম্য নয়। শান্তি পেয়ে গেলে তা মোদীর জন্য খারাপ কিছু হতো না। কিন্তু সমস্যা হল প্রায়োরিটির, অর্থাৎ মোদীও পাকিস্তানের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চান না অথবা কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী ইমরান ক্ষমতায় এসেছেন তার সাথে নতুন উদ্যোগ নিতে চাইবেন, তা করতেও মোদির কোনো আপত্তি আছে – ব্যাপারটা তা নয়, তা একেবারেই নয়। সমস্যা হলো প্রায়োরিটির।

    মোদির প্রায়োরিটি হল মানে এসবের আগে আরেকটা কাম্য জিনিষ আছে। সেটা হল,  ভারতের নির্বাচনে ‘হিন্দু-ভোটের মেরুকরণ’ হতে হবে, পরিস্থিতিকে এমন হতে বাধ্য করতে হবে, যাতে সব হিন্দু-ভোট বিজেপির বাক্সমুখী হয়, এমন এক জজবা-উত্তেজনা সৃষ্টি করা। কারণ ইমরান ক্ষমতায় আসার পরের বছর ২০১৯ সালের মে মাসে মোদীকে আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার নির্বাচনে জিততে হবে। তাই পাকিস্তানের সাথে মিথ্যা করে হলেও সীমান্ত-উত্তেজনা সৃষ্টি করা, সেভাবেই ভারতের সেনা ও সিভিল প্রশাসনকে সাজানো আর ঠিক নির্বাচনের আগে এই সীমান্ত বিবাদকে কোন একটা উসিলায় চরমে তোলা- এটাই হয়ে পড়েছিল মোদীর প্রায়োরিটি। যার মূল্কথা, পাকিস্তানের ইমরানের সাথে ভাল সম্পর্কের খারাপ সম্পর্কই মোদীর জন্য বেশি ফলফায়ক। এমনকি সম্পর্কখারাপ এতা দেখানোতেই বেশি ফলদায়ক হবে – এই ছিল মোদীর চাওয়া। অর্থাৎ ভোটের বাক্সে হিন্দু মেরুকরণের ভোট, এটাই মোদির সবার উপরের প্রায়োরিটি হয়ে পড়েছিল। তাই ছদ্মযুদ্ধ লাগানো, পাকিস্তানে ভারতের মিথ্যা বোমা ফেলে আসার দাবি বা ছলনা তৈরি, ইত্যাদিই খুবই টপ প্রয়োরিটি ছিল মোদির কাছে। আর ৩৬ ইঞ্চি ছাতি দেখিয়ে মোদীই একমাত্র ভারত রক্ষাকারী নায়ক – এই ইমেজ ছিল নাকি ভোটে মোদীর ‘তুরুপের তাস’!

    অন্য ভাষায় বললে, মোদির হিন্দুত্ব মানে হিন্দু জাত-ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব- এমন দাবি করে যে রাজনীতি মোদী খাড়া করতে চান, অর্থাৎ কেউ হিন্দু হলেও বাস্তবত বরং সে হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার নাও হতে পারে, এমন হিন্দুত্বের রাজনীতির বাহক তিনি নাও হতে চাইতে পারেন – কিন্তু এটাই মোদী কখনোই এটা হতে দিতেই চান না, পারেন না। পরিষ্কার করে, মোদী মানে দিতে চান উল্টা। বলতে চান, কেউ হিন্দু মানেই সে মোদীর হিন্দুত্ব রাজনীতির বাহকও। এই একমাত্র অর্থ এবং ব্যাখ্যা ও বয়ানে মোদী পুরা ব্যাপারটাকে  আটকে রাখতে চান। এটাই বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি এবং এটা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্ববাদ। এটাই হিটলারের জার্মানি আর্য-নীল চোখের শ্রেষ্ঠত্ববাদ অথবা ট্রাম্পের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ – এদের সবারই আরেক ভাই হিসেবে মোদী হিন্দুত্বের এক উত্থান ঘটাতে চেয়ে এসেছেন।

    মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইতিহাসে ইমরান খানই প্রথম প্রধানমন্ত্রী – যিনি পাকিস্তানের তরুণ; নতুন করে যারা পাকিস্তানকে নিয়ে চিন্তা করতে চান এরই প্রতীক হলেন ইমরান। ইমরানই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, পাকিস্তানি নাগরিক সে যে ধর্মেরই হোক – পাকিস্তানের সব নাগরিকের মতই সবার সমান অধিকার আছে। ব্লাসফেমি আইন – যেটা মূলত এতদিন  জমিজমার দখলের সঙ্কীর্ণ স্বার্থ উদ্ধারের কাজে করা মামলা হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে, এমন আসামিদের মামলার বিচারে সুপ্রিম আদালত যাকে খালাস দিয়েছে, নির্বাহী সরকারপ্রধান হিসেবে ইমরান তার মুক্তি নিশ্চিত করেছেন ; ইচ্ছামতো দেশ-বিদেশ যাওয়া বা চলাচলের অধিকার। ইমরান এটাকেই তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের জন্য কর্তব্যজ্ঞান করেছেন।

    অথচ চরম সঙ্কীর্ণ ও হিন্দুত্বের ভোট জোগাড়ে ব্যস্ত বিজেপির মোদী এমন ইমরানের কাছ থেকে ভারতের জন্য কোনো সুবিধাই চাইতে বা নিতেই পারেননি। কারণ মোদীর লক্ষ্য অন্য সংকীর্ণ কিছু। মোদীর লক্ষ্য মুসলমান-পাকিস্তানের সাথে টেনশন তুলে বা জিইয়ে রেখে সেই ইত্তেজনা নিজ দেশের নির্বাচনে হিন্দুভোট পোলারাইজ করতে ব্যবহার করা।  তাই ভারত-পাকিস্তানের বিবাদের ইস্যুগুলোর কোনো একটার বেলায় কিছু হাল করতে বা উদ্যোগী হতে পারেননি মোদী।  মোদীর সবার আগে দরকার বা প্রায়োরিটি হল, ইমরানকে মুসলমান দেশের নেতা ফলে শত্রু হিসাবে চিত্রিত করণ। এতেই মোদী তার সব ফয়দা দেখেছিলেন। যেমন এই আমলে,  ভৌগোলিকভাবে পাকিস্তানে পড়েছে যে কার্তারপুর-এর শিখ গুরুদুয়ারা, তা ভারতের পাঞ্জাবের শিখরা এখন যেকোন ভ্রমণকারীর মত মাত্র ২০ ডলার ফি দিয়ে ভ্রমণ করে আসতে পারেন। মানে গুরুদুয়ারা তীর্থ করে আসতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী ইমরানের কারণে এটি সহজেই বাস্তব হয়ে গেছে।

    পরাক্রমশালী করোনার সামনে মোদীর হিন্দুত্বও খাটোঃ
    কিন্তু পরাক্রমশালী করোনাভাইরাস মোদীর মত যারা হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতিক তাদেরকেও সোজা করতে পারে। অনেক কিছুই করতে বাধ্য করতে পারে, তাই মনে হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় মুখে স্বীকার না করেও মিডিয়া রিপোর্ট হাজির হতে দিচ্ছিল যে ভারত-পাকিস্তান আলোচনা চলছে কখনো গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আর ‘র’-এর মধ্যে। অথবা প্রশাসনিক কর্তা পর্যায়ে এবং মিডিয়া থেকে দূরে থেকে। এমন আলাপ আগের কংগ্রেস বা বিজেপি আমলেও হয়েছে, আর সেসব হয়েছিল মূলত ব্যাংককে। এবারো তা ব্যাংককে বা দুবাইয়ে হচ্ছে বলে মিডিয়া রিপোর্ট দিচ্ছে।

    কিন্তু কেন তারা এত লুকোচুপি করে আবার দেখাও করছে? এবং তা নিজ নিজ দেশের বাইরে করছে? কেন?

    একমাত্র কারণ মোদীর ‘ভোটবাক্স’ প্রায়োরিটি, যা আগে বলেছি। ভারতের কল্পিত বিরাট শত্রু মুসলমান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মোদী একাই লড়ে ভারতের হিন্দুস্বার্থ রক্ষা করে চলেছেন, এই ইমেজ মোদীর ভোটবাক্সের জন্য খুবই দরকারি। কিন্তু এর অবস্থা এখন খুবই সঙ্গীন। যেমন কাশ্মিরে লাদাখ সীমান্তে যখন চীনের সাথে ভারতের সামরিক টেনশন চলছিল তখন মোদীর-সেনাদের টেনশন বাড়ছিল যে, কখনো যেন ভারতকে চীনের পাশাপাশি পাকিস্তান – এই দুই দেশের সাথে না তাদের নিজ নিজ সীমান্ত দুটা যুদ্ধক্ষেত্রে লড়তে না হয় এটাই নিশ্চিত করা। তাই সে সময় চীনের পাশাপাশি পাকিস্তানের সাথেও কথা বলে ভারত ধারণা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় যে, ভারত পাকিস্তানের সাথেও সঙ্ঘাত চায় না। এটা অবশ্যই ভারত পাকিস্তান দুই দেশের জন্যই লাভজনক ছিল। কারণ যুদ্ধের ফ্রন্ট খুললে তা পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য কোনো ইতিবাচক ঘটনা ভাবার কারণ নেই। আর এ বাস্তবতার সুবিধাটাই ভারত উঠিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু পাবলিকলি দেখা করলে মোদীর ভোটবাক্সে টান পড়বে। আর সে কারণেই এত লুকোচুরি।

    এখানে কোভিডের আরেক সুবিধা বা অসুবিধার কথাও বলা দরকার। গত দেড় দুই বছরে মিডিয়া প্রশ্নে মোদী সরকার বিরাট সুবিধা ভোগ করে চলেছে। ভারতের লিডিং প্রায় সব মিডিয়া এখন মোদীর অনুগত, পায়ের কাছে ঘুরঘুর করার অবস্থা! কেন? কোন মন্ত্র বলে? কারণ প্রতিটি মিডিয়া কোভিডের ঠেলায় বিক্রি ও বিজ্ঞাপন কমে এক অর্থনৈতিক টানাটানিতে ডুবে গেছে। ফলে কর্মীদের ৪০ শতাংশ বেতন দেয়ার প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করতে মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট হিমশিম খাচ্ছে। এ অবস্থাটাই বোঝা যাবে এটা দেখলে যে, ধনী-গরিব প্রতিটি মিডিয়াই এখন পাবলিক ডোনেশনের চাঁদা চেয়ে নোটিশ টাঙ্গিয়ে রেখেছে। কাজেই সবাই এখন একমাত্র ও সহজ উপায় হিসেবে দেখছে বিজেপির রাজনীতির পক্ষে সাফাই দেয়ার কাজকে। এমন মিডিয়া হয়ে যাওয়ার বিনিময়, সরকারি দল বা সরকারি ফান্ড হাতিয়ে নেয়া – এভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টাই এখন সব মিডিয়ার প্রধান ট্রেন্ড বা ধারা। তবে মিডিয়াগুলো আরেক নয়া কৌশল ধরেছে। তারা বলতে চাচ্ছে, তারা আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্ববাদের ঠিক প্রমোটর নয়। কিন্তু তারাই আবার দাবি করছে, তারা আসলে সেটা করেনি। তারা বরং হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্রের সরকার, সরকার যেই হোক তাকে সমর্থন দেয়া এটাই দ্য হিন্দুর সুহাসিনী হায়দারের কর্তব্য, অথবা দ্য প্রিন্টের শেখর গুপ্তের কর্তব্য – এরা এই আড়াল টেনে কাজটা করে যাচ্ছে।

    কিন্তু তবু সম্প্রতি আরো কিছু উইকেটের পতন ঘটেছে। এটা শ্রুতি কপিলা [SHRUTI KAPILA] নামে এক লেখকের দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় এক মন্তব্য-রিপোর্ট। তিনি বলছেন, টুইটারে ‘রিজাইন মোদি’ এই হ্যাশট্যাগ পপুলার ভিত্তি পেয়ে উঠছে [The trending of #ResignModi on Indian Twitter…… ]। তিনি দাবি করেছেন, এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কোভিড মহামারী এবার এই প্রথম ‘রাজনৈতিক’ হয়ে উঠছে। [It finally signalled that the Covid pandemic had become political.] মানে, রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠছে।

    তিনি লিখছেন, “গত বছরের এনিয়ে বিপর্যয়ের সময়ও মহামারী ছাপিয়ে উঠা সত্ত্বেও নিজ পপুলারিটি নিয়ে ‘চির-স্ট্রং’ মোদী এসবের ঊপরে থাকতে চেয়েছিলেন। বহু সার্ভেতেই দেখা গেছে, তিনি উপরে আছেন”। মিস কপিলা এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলতে চান, গত বছরের কোভিড পরিস্থিতি কোনোভাবেই কম চ্যালেঞ্জিং ছিল না। কিন্তু জনগণ এরপরও সম্মিলিতভাবে মোদীর উপর (তাঁর হিন্দুত্বের উপর) আস্থা রেখেছিলেন যে, তাদের হিন্দুত্বের ঐক্যবদ্ধতার কারণে মোদী সবাইকে রক্ষা করে নেবেন।

    মিস কপিলা আরো লিখছেন, ‘ভারতে এখন প্রতিদিন নতুন আক্রান্ত কোভিড-রোগী ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৬৯১ জনের; এমন সংখ্যা এটাই সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আর মাফ করতে পারছে না। কমতেছে। টুইটারে প্রকাশিত ট্রেন্ড, ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া হতাশা, এগুলোই সম্ভবত মোদীর হিন্দুত্বের সমর্থন হারিয়ে ফেলার প্রথম ইঙ্গিত! এখন ক্রমেই তাদেকে দেখা যাচ্ছে ভয়ের  বদলে ‘বিক্ষুব্ধ’ হয়ে উঠাকে প্রাধান্য দিতে। সম্ভবত এদিকটা খেয়াল করেই, মোদি সম্প্রতি পাবলিককে ডিসিপ্লিন থাকার জন্য আকুল আবেদন করেছেন”।’

    তাহলে দেখা যাচ্ছে এবারে মোদীর হিন্দুত্ব – এটা আর মহামারীর কারণে সরকারের উপর পাবলিকের আস্থার সঙ্কট কমে যাবার  বিপর্যয় ঠেকাতে পারছে না? কোভিডের মহামারীতে চিকিৎসার অভাব আর পেটের টানের বিরুদ্ধে এবার ‘হিন্দুত্ব’ আর কিছুই ঢেকে ফেলতে পারছে না! হিন্দুত্বের জোশ আর কি কাজ করছে না? মোদী এবার সব লুকিয়ে আগলে রাখতে কি ফেল করবেন! মোদি কী পাবলিকের আস্থাহীন নেতা হয়ে যাবেন? দেখা যাক! পানি কতদুর গড়ায়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৪ এপ্রিল ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিন প্রিন্টেও  “হিন্দুত্ব ফেল, কোভিডে চিকিৎসাস্বল্পতা ও পেটের টানে” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে,  পাঠক থিতু ভাষ্য বলে গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ঐ লেখাকে এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া ও রবি কান্তের হতাশা

    ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া ও রবি কান্তের হতাশা

    গৌতম দাস

    ২৮ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3jP

    India’s Prime Minister Narendra Modi addresses party workers during the celebrations after the victory in Bihar assembly election BJP headquarters on November 11, 2020 in New Delhi, India. (Photo by Mayank Makhija/NurPhoto)

    ইভিএম মেশিন বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন নিয়ে বিতর্ক শুধু বাংলাদেশে না, ভারতেও খুবই ব্যাপক। আর ভারতে এর ব্যবহার প্রায় শতভাগ আসনে, মানে ভারতের নির্বাচন বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি ইভিএম নির্ভরশীল। এই মেশিনের বিরুদ্ধের ব্যাপক অভিযোগগুলো আসলে ওর প্রোগ্রামিংকে বাইরে থেকে ম্যানিপুলেট করে কারচুপি করার সুযোগ নেওয়ার জন্য।  এসব অভিযোগগুলোর মধ্যে  গত ২০১৯ সালের মে মাসের কেন্দ্রের নির্বাচনের ফলাফল থেকে সর্বশেষ এই বছর গত অক্টোবর মাসে বিহারের রাজ্যনির্বাচন পর্যন্ত প্রায় ভারতের সব নির্বাচনেই মেশিন কারচুপির অভিযোগ অনেক জোরদার হয়ে উঠেছে।
    বিশেষত ২০১৯ সালের নির্বাচনে যা সেসময় অনুষ্ঠিত হয়েছিল সাত পর্বে। এর শেষ পর্বের নির্বাচনের আগের দিন অমিত শাহ আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এক যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। হিমালয়ের এক হিন্দু তীর্থস্থানে মোদী ধ্যানে বসেছিলেন, শেষ নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের আগে। সেটা শেষ করে এসেছেন- এই অজুহাতে মোদী ঐ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকলেও সৌজন্যমূলক কিছু কথা ছাড়া আর কিছুই বলেননি। পুরো অনুষ্ঠানে অমিত শাহ একাই কথা বলেছিলেন। অমিতের কথার মূল ফোকাস ছিল কত আসনে বিজেপি জিতবে, এর আগাম অনুমান দেয়া। তিনি দাবি করেছিলেন, মোট ৫৪৩ আসনের মধ্যে বিজেপি একাই তিনশ-এর বেশি আসন পাবে। হয়েছিলও তাই, পেয়েছিল ৩০৩ আসন; যেটা গত ২০১৪ সালের নির্বাচনের চেয়ে আবার ৩৬ আসন বেশি। বিজেপি জোট হিসাবে পরের ২০১৯ সালে মোট পেয়েছিল ৩৫৩ আসন। আর এখান থেকেই কারচুপি বা সফটওয়ার প্রোগ্রাম ম্যানিপুলেশন করার অনুমান জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে যায় যা এখন ক্রমশ বাড়ছে। সে সময় মূলত দুটি কারণে অভিযোগ, সন্দেহ জোরদার হয়েছিল, এক. অমিত শাহের মোট আসনের প্রেডিকশন বা অনুমিত প্রাপ্ত আসন সংখ্যা আর ২০১৪ সালের চেয়ে বেশি আসন পেয়ে বিজয়ী হওয়া, যেটা অস্বাভাবিক ঠেকেছিল। কারণ, ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় আগের কংগ্রেস সরকারের সময় অর্থনীতির দশা প্রবল খারাপ হওয়াতে তরুণেরা ব্যাপক চাকরি হারা হচ্ছিল। আর সেই হতাশায় আর সেটা মোদী এড্রেস করাতে তারা মোদীর উপর আশায় বুক বাঁধতে ঝুকেছিল। তাই মোদী বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু পরে ২০১৯ সালের সময় ফেলে আসা পাঁচ বছরের মোদী শাসনে ইতোমধ্যে আরো তিতা হয়ে গেছিল। কারণ ভারতের অর্থনীতি ডুবেছিল এবার অনেক বেশি; যা আবার মোদীর দীর্ঘদিনের পরিসংখ্যান লুকানোর প্রবল চেষ্টার পরেও তা উন্মোচিত হয়ে পড়েছিল। আর এই পতন মূলত শুরু হয়েছিল মোদীর ২০১৬ সালের নভেম্বরে পাঁচশ ও এক হাজার রুপির নোট হঠাৎ বাতিল ঘোষণার ধাক্কায়। ভারতের অর্থনীতির বড় অংশটাই হল ইনফরমাল অর্থনীতি। অর্থাৎ মূল কারখানা উতপাদনের “কাজ সৃষ্টি” নয়। বরং সীমিত কিছু এমন মুল কাজ সৃষ্টির ফলে এবার তাকে সহায়তা করতে যেয়ে আধপেটে খাওয়া কিছু শ্রমিক-ফেরিওয়ালার (বা কারখানা শ্রমিকদের জন্য ভাত রেধে দেয়া বুয়ার কাজ টাইপের) জন্য যে কাজ সৃষ্টি হয় – এটাই ইনফরমাল অর্থনীতি বা কাজ সৃষ্টি।  আর এই অংশের উপরেই নোট বাতিলের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি পড়াতে তাও তখন একেবারে গুটিয়ে যাওয়া; এটা ঘটেছিল মারাত্মকভাবে। তাই পরের ২০১৯ নির্বাচনে বিজেপির আসন কমে হেরে যেত অথবা কম মার্জিনে বিজেপি জিতলে হয়ত এসব সামঞ্জস্তপুর্ণ হত, কিন্তু হয়েছিল এর উল্টা। উল্টা আসন বেড়ে গেছিল। সন্দেহ-অবিশ্বাসের শুরু সেই থেকে।

    একজন রবি কান্তের দুঃখ ও হতাশাঃ
    একজন রবি কান্তের দুঃখ ও হতাশার শুরু এখান থেকেই। কিন্তু এই রবি কান্ত [Ravi Kant] আসলে কে?
    রবি কান্ত ভারতের একজন কলামিস্ট, জার্নালিস্টও বলা যায়। তার লেখার মূল আগ্রহের বিষয় অর্থনীতি। আর মূলত ভারতের বাইরের পত্রিকায় তিনি লেখেন যদিও তাঁর নিজেরই ভাষ্যমতে তিনি টেকনোলজি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা সাইবার-সিকিউরিটি নিয়ে লিখতে পছন্দ করেন। এই লেখায় তাঁর এবারের উদ্বেগ এই সাইবার সিকিউরিটির প্রশ্নে।

    এদিকে “এশিয়ান টাইমস” [Asian Times] হংকং থেকে প্রকাশিত ওয়েব ভিত্তিক একটা দৈনিক; সাম্প্রতিককালে যার আরেকটা সিস্টার কনসার্ন আরেক ওয়েবভিত্তিক দৈনিক প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়েছে – ‘এশিয়ান টাইমস ফাইন্যান্সিয়াল’ নামে। রবি কান্ত ভারতের মিডিয়ায় বিশেষত ভারতের “ইকোনমিক টাইমস” ধরনের অর্থনীতিভিত্তিক পত্রিকায়ও বেশি সময়ে লিখে থাকেন। তিনি এশিয়ান টাইমসেও একটা আর্টিকেল লিখেছেন যেখানে তার লেখার বিষয় “ভারত-রাষ্ট্র ভেঙে পড়ছে” [Systematic collapse of the world’s largest democracy] বলে তাঁর হতাশা আর দুঃখ!

    ‘ভেঙে পড়ছে’ মানে কী অর্থে?
    একটা রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে ও দীর্ঘস্থায়ী হয় স্থায়ী ও সুগঠিত কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কারণে। সে হিসেবে, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগ আর সংসদীয় (জনপ্রতিনিধিদের) ক্ষমতা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাদার ও প্রাতিষ্ঠাকীকরণ রূপে হাজির হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর বলে মানা হয়। যেখানে বিভিন্ন মতামতকে জায়গা করে দিয়ে একটা সমন্বিত ব্যবস্থা ও আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে একে অভ্যাস ও চর্চাকে সবল করা ও নিয়মিত রেওয়াজে নিয়ে যাওয়া হয় ইত্যাদি।

    গায়ের জোর খাটানোর অথবা কখনো চাতুরীর সুযোগ পেয়ে বা বের করে আপনি যখন রাজনৈতিক বিরোধীদের দাবড়িয়ে কোণঠাসা করে রাখবেন আর সেটিই মূলধারার প্রাকটিস বানিয়ে ফেলবেন – এটাই হল এর উল্টা কাজ। গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এবার দুর্বল ও অসংগঠিতভাবেই বেড়ে উঠবে। এতে দুর্বল ও অসংগঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো আপাতত ও খুবই সাময়িক আপনার বিরাট বিজয় এনে দিচ্ছে মনে হলেও নিশ্চিত থাকতে পারেন, অচিরেই আপনি আপনার রাষ্ট্রকে ক্রমেই ভেঙে পড়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন; সেদিকে নিয়ে যাচ্ছেন এবং যাবেনই। সেটা তখন কেবল সময়ের ব্যাপার হয়ে যাবে যে, আপনার রাষ্ট্রটা কখন ভেঙে পড়বে! অকেজো হয়ে যাবে!  আবার যেমন ধরেন ক্ষমতাসীন আপনারই সংসদীয় বিরোধী দলের নেতা – তাঁকে আপনি খুন করানোর সুযোগ পেলেন। আর সেটা আপনি না, অন্য কেউ তার নিজের স্বার্থে বাস্তবায়ন করে ফেলবে জেনে তাতে আপনি বেজায় খুশি হয়েছেন। এখন আপনি কী করবেন?  ক্ষমতাসীন আপনি মনে করলেন আমি তো হত্যাকান্ড করছিনা তাই  অন্যের হাতে  বিরোধীনেতার মৃত্যুর সুবিধা পেতে ও নিতে অসুবিধা কী? না, আপনি বিরাট ভুল করবেন। তাই এটা উলটা বিরাট অসুবিধা তৈরি করবে। এমনিতেই ক্ষমতাসীন সরকারে আপনি বলে বিরোধীনেতার নিরাপত্তা দেওয়ার দায় সরাসরি মূলত আপনার। তবু সেটা যদি বাদও রাখি তবে আপনি এতে নিজের  ও রাষ্ট্রের যে ক্ষতিটা করবেন তা হল, এখানে এরপর থেকে ক্ষমতাসীন ও বিরোধিরা পরস্পর পরস্পরকে খুন করার রেওয়াজ চালু করে ফেলবে, আর সেটার শুরুও আপনিই করলেন। ফলে এখন প্রতি মুহুর্তে বিরোধীদের হাতে নিজে খুন হয়ে যেতে পারেন সে আশঙ্কায় বসবাস করতে থাকেন। আর এর ব্যাপক মানেটা হবে যে – ক্ষমতায় থাকার সময়সীমা শেষে আইনমাফিক পরবর্তি নির্বাচিত ক্ষমতাসীনের হাতে নিরুপদ্রব ক্ষমতা-হস্তান্তরের রেওয়াজ চালু হতে আপনি আর দিলেন না। ফলে আপনার বেলাতেও তা হবার নিশ্চয়তা নষ্ট করে দিলেন। এগুলো কাজেরই নিট ফলাফল  দুর্বল ও অসংগঠিতভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে খাড়া করা। ফলে ধীরে ধীরে এই রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়ার দিকেই যাবে।
    এসব দিক থেকে দেখে বিবেচনা করে তাই রবি কান্তের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আর অনুষঙ্গ হিসেবে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও – এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। আর এ নিয়েই তার যত আশঙ্কা ও যেটা তাঁর হতাশার মূল প্রসঙ্গ!

    তাঁর লেখার শুরুতে প্রথম-অর্ধে তিনি ভারতের “গণতন্ত্র” কত মহান, তা নিয়ে প্রায় অর্ধেক জায়গাই ব্যবহার করে ফেলেছেন। যেমন তাঁর লেখার মূল শিরোনাম দিয়েছেন, ‘বিশ্বের সর্ববৃহৎ ডেমোক্র্যাসিকে সিস্টেমেটিকভাবে ভেঙে ফেলা” হচ্ছে। এখানে যদিও আমরা বড় খারাপ চিহ্ন হিসাবে মনে রাখতে পারি যে, কেউ যখন “গণতন্ত্র” এই শব্দ ও ধারণা দিয়ে কোন রাষ্ট্ ও ক্ষমতাকে ব্যাখ্যা করে বা তুলে ধরে তবে এই মানে হল, ঐ লেখক রাষ্ট্র ও ক্ষমতা সম্পর্কে বা  রাষ্ট্রের গঠন প্রকৃতি-বৈশিষ্ট প্রসঙ্গে জানাশুনা তার জানাশুনা খুবই কম ও দুর্বল। আর ঠিক সেকারণে,  অনেক পাঠক এই ‘সর্ববৃহৎ ডেমোক্র্যাসি’ ধরনের ফাঁকা ও খামোখা প্রশংসা শুনেই বিরক্ত হয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারেন এবং সেটাই উচিত সম্ভবত। কারণ শব্দটা বাগাড়ম্বর ধরনের। এমনিতেই, শুধু ‘ডেমোক্র্যাসি’ শব্দ ব্যবহার করে কেউ ফাঁপা গর্ব করা কথা বললে সেটা বাকচাতুরীতে প্রতারণা ও ফাঁকির আয়োজন হচ্ছে বলে সন্দেহ হতে শুরু হয়। কারণ একটা দেশে নির্বাচন হলেই সেখানে ডেমোক্রাসির জয়জয়কার চলছে বলা বা মনে করা ভিত্তিহীন ও তা চাতুরি। ফলে সেখান থেকে অসততার ইঙ্গিতের শুরু। এটা এক বাগাড়ম্বর আর প্রপাগান্ডা। অথচ ওর ভিতরে খুঁজে দেখলে হয়ত, মানে পাওয়া যাবে যে, সবচেয়ে জঘন্য নাগরিক বৈষম্যের রাষ্ট্র হয়ত সেটাই; অথচ সেদিকটার খবর নাই।  আবার কেউ যখন মহান বা শ্রেষ্ঠত্ব ধরণের শব্দ ব্যবহার করে নিজের রাষ্ট্র সম্পর্কে কথা বলে যেমন “মেরা ভারত মহান হ্যায়” – তাহলে বুঝতে হবে তিনি যে বর্ণবাদী এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে বিশাল ক্ষতিকর চিন্তার ধারক তা তিনি নিজেই বুঝেন না। এমনই ডাম্ব বা ভোতা চিন্তার লোক তিনি।  এ ছাড়াও ‘ডেমোক্র্যাসি’ শব্দ ব্যবহার করে যারা নিজেকে প্রকাশ করতে ভালোবাসেন এদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে সবল অভিযোগ হল, রাষ্ট্রের আসল গুণ-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে এদের ন্যূনতম জ্ঞান ও ধারণা নাই বা থাকে না। কারণ রাষ্ট্রের মুখ্য গুণ-বৈশিষ্ট্য সংশ্লিষ্ট অরিজিনাল শব্দ ও ধারণাটা “গণতন্ত্র” নয় বরং শব্দটা হল  “রিপাবলিক” রাষ্ট্র।
    এর প্রমাণ একমাত্র রাজা-বাদশাদের রাজতান্ত্রিক দেশ ছাড়া, বাকি প্রায় সব রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নামের মধ্যে কমন যে শব্দটা সবাই বয়ে বেড়ায়, তা হল ‘রিপাবলিক’। তাতে সেই রাষ্ট্র কমিউনিস্ট কী ইসলামিস্ট কিংবা আধুনিক রাষ্ট্র যাই হোক না কেন! এসব রাষ্ট্র যখন প্রথম কায়েম হয়েছিল – এমন সবখানেই নামের মধ্যে রিপাবলিক শব্দ থাকতে দেখা যায়, এটা এমনই কমন। তাহলে এই ডেমোক্রেসি শব্দটার উদয় হল কোথা থেকে?
    আসলে ডেমোক্রেসি শব্দটার পেছনে বড় সক্রিয়তা ছিল আমেরিকার – তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে বেকায়দায় ফেলার আমেরিকার “দরকারি” স্বার্থে। কারণ সোভিয়েত ইউনিয়নও নিজেকেও জন্ম থেকেই এক ‘রিপাবলিক’ রাষ্ট্র মনে করে ও দাবি করে এবং শব্দটা তার রাষ্ট্রের নামের  মধ্যেই জন্ম থেকে দেয়া হয়েছিল। ওর পুরা নাম ছিল ইউএসএসআর এবং এই ‘আর’ মানে হল রিপাবলিক। কিন্তু কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নে জন্ম থেকেই ওপেন সার্বজনীন অবাধ নির্বাচন অথবা পাবলিক রিপ্রেজেন্টেশন (জনপ্রতিনিধি নির্বাচন) বলতে কিছুই ছিল না। রাখা হয় নাই। জন্মের পর দেওয়া গণভোটের ফলাফল বিপ্লবের পক্ষে তা আসাতে ঐ ফ্লাফল আর কোনদিন সরকারি স্বীকৃতির আলো দেখে নাই। আর নির্ধাচন ধারণাটাই উঠে যায়। আর সেটাকেই পুঁজি করে একে নেতিবাচক হাইলাইট করতে আমেরিকার গণতন্ত্র শব্দটাকে সামনে আনা যে, সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের মতোই এক রিপাবলিক রাষ্ট্র বলে দাবি করতে পারে; কিন্তু এখানে তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’ নেই – মানে নির্বাচন নাই; দেখ! অর্থাৎ আমেরিকার দাবি হল রাষ্ট্রের নামে রিপাবলিক শব্দ থাকলেও এদের রাষ্ট্রে তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’ নাই।
    এ কারণে, জেনে না জেনে ভারত মুল কনসেপ্ট রিপাবলিক বা রিপ্রেজেন্টেশন ইত্যাদি ধারণা থুয়ে “গণতন্ত্রঃ শব্দটা দিয়ে সব ঢেকে ফেলা আর এইশব্দটাকে  পপুলার করার দিকে যাওয়ার শুরু। আর তা থেকে ভারত  ‘সর্ববৃহৎ ডেমোক্রাসির’ দেশ বলে গর্ব করা – এটা হচ্ছে ভারতে নাগরিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয় কি না, এটা নাগরিক নির্বিশেষে সকলে সমান মর্যাদা ও অধিকারের রিপাবলিক কি না এসব দিক বাদ দেয় ও অগুরুত্বপূর্ণ মনে করে ফেলে দেওয়া। আর ভারতে কেবল একটা নির্বাচন হয় কি না এটাই একমাত্র বিবেচ্য করাই হচ্ছে এই ‘সর্ববৃহৎ ডেমোক্র্যাসি’ বলার না-বুঝ বা অবুঝদের বলাবলি। অথচ স্বাধীন ভারত জন্ম থেকে তো বটেই, এমনকি অখণ্ড ভারতের রাষ্ট্রবিষয়ক চিন্তার প্রথম উন্মেষের সময় (১৮১৫) থেকেই রাষ্ট্র বলতে বুঝা হয়েছিল কেবল এক হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র ধারণাকেই। অর্থাৎ শুধু জাতি-রাষ্ট্র নয়, বরং এখানে ‘জাতি’ বলতে মনে করা হয়েছে একটা ধর্মীয় জাতি, একটা হিন্দু-জাতির রাষ্ট্র – এভাবে । ফলে এরপর এই রাষ্ট্রের নাগরিকের তো আর সার্বজনীনভাবে এবং সমান নাগরিক-অধিকারের নাগরিক হওয়ার আর সুযোগ থাকেনি। বরং এটা বৈষম্যমূলকই হবে, এবং তা হয়েছিল এবং আজও হয়েই আছে। এক কথায়, ভারত জন্ম থেকেই সম-নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র নয়। কারণ হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র করে গড়ে তোলা রাষ্ট্র মানে, তা আর নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র হবার সুযোগ নাই। এ কারণে সেই হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র ধারণাকেই আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে সেকালে হবু পাকিস্তানকেও যেন ঠেলে দেয়া হয়েছিল আরেক ধর্মভিত্তিক জাতি-রাষ্ট্র হতে; বাধ্য করা হয়েছিল। আর একারণের আমার আবেদন থাকবে গণতন্ত্র শব্দটার ব্যবহার এড়িয়ে চলা। এটা পাবলিকের বা গণ-ক্ষমতার রাষ্ট্র, রিপাবলিক রাষ্ট্র বা জনপ[রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্র ইত্যাদি শব্দ ও ধারণা ব্যহার করা যেতে পারে।

    অথচ এই চরম বৈষম্যমূলক অসম-নাগরিকের এই রাষ্ট্রেও যেহেতু নিয়মিত নির্বাচন হয় কাজের এটা দুনিয়ার ‘সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের’ বলে মিথ্যা ঢোল পেটানোর সুযোগ নেয়া চলছেই সেই থেকে। আরএসএস বা বিজেপির মত দল ভারতে চালু করে ফেলা যাচ্ছে সহজেই, বিনা বাধায়। ভারতের কনস্টিটিউশন, আদালত অথবা নির্বাচন কমিশনের কোনো আইনি বাধা ছাড়াই গুজরাটের মুসলমান গণহত্যাকারি মোদীর মত লোক দল খুলছেন, প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। অথচ কেউ মুসলমান নাগরিক হলে তাকে রাস্তায় ফেলে মাটিতে শুইয়ে বুকের খাঁচার ওপর লাফ দিয়ে উঠে তাকে নির্যাতন-জবরদস্তিতে ‘জয় শ্রীরাম’ বলাতে চেষ্টা করছে বিজেপি-আরএসএস। এই হল ‘সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের’ ভারত।

    তবু এত সমালোচনার পরও –  আমরা এখানে এখন রবি কান্তের দুনিয়ার ‘সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের’ রাষ্ট্র বলে করা অন্ধ প্রশংসাকে পাশ কাটিয়ে যাবো, মূল প্রসঙ্গে প্রবেশ করার খাতিরে। রবির মূল অভিযোগ হল, কোনো রাষ্ট্র মুখ্য যেসব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত প্রতিষ্ঠানের উপরে ও কারণে টিকে থাকে, যেমন বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি; ভারতে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর আর পাবলিক বিশ্বাসযোগ্যতা নেই, শেষ হয়ে গেছে (বলেছেন, ডেথ অব ইন্ডিয়াস ক্রেডিবল ইনস্টিটিউশন্স, The death of India’s credible institutions)। কেন?

    ইভিএম রেজিমঃ
    ভারত এখন ইভিএম রেজিম এর যুগে এসে পড়েছে।  ভারতে নির্বাচন কমিশনের শতভাগ ভোট নেয়ার পদ্ধতি ইভিএম বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনভিত্তিক। এই মেশিন নিয়ে কারচুপির অভিযোগ অনেক দিনের, বিশেষ করে মোদী সরকারের ক্ষমতায় আসার পর থেকে বেশি করে এই সন্দেহ-অভিযোগ আরো সুনির্দিষ্ট। তাই আগামীতে হঠাৎ কোন একদিন যদি গত ২০১৯ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সাধারণ নির্বাচনে মোদী ইভিএম মেশিন ম্যানিপুলেট করে ক্ষমতায় এসেছিলেন বলে প্রমাণ সামনে হাজির হয়ে যায়, তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

    আগামীতে হঠাৎ কোনো একদিন যদি গত ২০১৯ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সাধারণ নির্বাচনে মোদি ইভিএম মেশিন ম্যানিপুলেট করে ক্ষমতায় এসেছিলেন বলে প্রমাণ সামনে হাজির হয়ে যায়, অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

    ‘মোদির নির্বাচনী সফলতার গোপন দিক’ এই উপ-শিরোনামে রবি কান্ত লিখছেন, “সাম্প্রতিককালে নির্বাচন কমিশন ও ইভিএমের বিরুদ্ধে তোলা সব অভিযোগ কমিশন কেবল ভিত্তিহীন বলেই ঝেড়ে ফেলে দিয়েছে। কোন আমল করেন নাই, পদক্ষেপ নেয়নি”। এতে সর্বশেষ বিহারের নির্বাচনে (অনুষ্ঠিত হয় গত অক্টোবর শেষে, যার ফলাফল আসে ১০ নভেম্বর) কমিশনের ওপর মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কমিশন আর নিরপেক্ষ কোন প্রতিষ্ঠান কিনা সেটা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। এই নির্বাচনে বিজেপি ও তার জোট ছাড়া প্রায় সবাই ব্যাপক ভোটবাক্স কারচুপির অভিযোগ তুলেছিল। এখানে আগে ক্ষমতাসীন ছিল মুখ্যমন্ত্রী নীতিশের স্থানীয় বা আঞ্চলিক ‘জনতা দল’ তবে এর সাথে বিজেপির জোট মিলে তারা বিহারে ক্ষমতায় ছিল। আর এবার কারচুপির অভিযোগ নিয়ে নীতিশের দলের জোট জিতেছে বলে দেখানো হয়েছে এভাবে যে, নীতিশের দলে হারের ঢল নেমেছে কিন্তু একা বিজেপি এবার ঐ আসন হারের চেয়েও একাই বেশি সংখ্যক আসন পেয়েছে। তাই জোট হিসেবে নীতিশ  আবার মুখ্যমন্ত্রীও হয়েছেন। এদেখে এবার রবি কান্ত প্রশ্ন তুলেছেন, নীতিশের দল ভোট না পেয়ে গোহারা হারলে সেই ভোট কিভাবে একই জোটসঙ্গী কেবল বিজেপি একাই ততোধিক আসন পেয়ে যায়? [If the people of Bihar were openly opposing Nitish, then why would they vote for his coalition partner the Bharatiya Janata Party (BJP), which would again make him the chief minister? ]

    তাই রবি কান্ত ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে বলছেন, “ভোটিং মেশিনের সবচেয়ে অস্বচ্ছ অংশটা হল ওর সফটওয়্যার যা টেকনিক্যাল, জটিল ও প্রায়ই যাচাই পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ নেই”।  কিন্তু সদিচ্ছা থাকলে উপায় বের হয়।  কারণ এরপরেও এর স্বচ্ছতা নিয়ে বহু কিছু করার আছে যা ভারতের নির্বাচন কমিশনের [এখন থেকে  একে শুধু ‘কমিশন’ লিখব]। আসলে প্রত্যেকটা সফটওয়্যার মানে, ওর সোর্স কোড থাকবেই। আর সোর্স কোডে কে কে ঢুকেছে, হাত ঢুকিয়েছে (এর অটো রেকর্ড থেকে যায় তাই) [… source-code audit reports] তা দিয়ে জানা যাবে কে কে এ মেশিনে হাত ঢুকিয়েছে। এ কারণে রবি এক তুলনা টেনে বলছেন, “উন্নত দেশে নির্বাচনী মেশিনের সফটওয়্যারের সোর্স কোড কে কে হাতিয়েছে, মানে  একসেস নিয়েছে এর নিরপেক্ষ বিশ্বাসযোগ্য একটা অডিট করা হয় কোন থার্ড পার্টিকে দিয়ে। আর সেই ইন্সপেকশন করিয়ে এরপর ঐ থার্ড পার্টি তাঁদের ইস্যু করা যে  রিপোর্ট ইস্যু করে থাকে সেই রিপোর্টটাই  এবার কমিশনের সাইটের প্রথম পাতায় লটকে দেয়া থাকে। এর সোজা মানে হল, পাবলিক কেউ না চাইতেই কমিশন নিজেই দায়িত্ব অনুভব করে নিজের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার প্রমাণ প্রকাশ্যে হাজির করে রেখেছে। আর ঠিক একাজটাই ভারতের কমিশন করতে দায়ীত্ব অনুভব করে নাই। এরা এমনই স্বঘোষিত অসৎ!

    রবি কান্তের তাই দাবি, “ভারতের ইভিএম প্রচণ্ড মাত্রায় এক অস্বচ্ছ ব্যবস্থা” [Indian electronic voting system is highly opaque]। এ কারণে ‘এখানে এসব অডিট রিপোর্টের কোনো হদিসই নেই, পাবলিককে কোনো তথ্যও দেয়া হয় না’- এটা চলতে পারে না। ভারতের নির্বাচন কমিশন এটা করতেই পারে না।

    সুপ্রিম কোর্টে একটা মামলার পরিণতিঃ
    “সম্প্রতি এ নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটা মামলা হয়েছিল যে, এসব ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য কোনো থার্ড পার্টিকে দিয়ে ইন্সপেকশনের ব্যবস্থা করানো ও সেই রিপোর্ট প্রকাশ না করাতে কমিশনের স্বচ্ছতা নিয়ে নির্বাচনী বিধি ভঙ্গ করা হচ্ছে – এই হল মূল অভিযোগ কারণ এতে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে। আর এটা না করাতেই ইচ্ছামত নির্বাচনী ফলাফল বের করার সুযোগ রেখে দেয়া হয়েছে”।

    রবি বলছেন, “অথচ এত শক্ত যুক্তি তুলে ধরার পরও সুপ্রিম কোর্ট ঐ আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। আর এরপর, নির্বাচন কমিশনের  উপর “করণীয় বলে” কোনো আদেশ না দিয়েই বরং উল্টা ঐ মামলার আবেদনকারীকে আবার নির্বাচন কমিশনের কাছে ফিরে যেতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীকে কোর্ট পরামর্শ দিয়েছিল, কমিশনকে নিরপেক্ষ অডিট করানোর আর ফলাফল পাবলিক করতে যেন তিনি (মামলার আবেদনকারী) কমিশনের কাছে আবেদন করেন। সারকথায়, কোর্ট বাদীকেই ফিরিয়ে দিয়েছে এই বলে যে, বাদি যেন কমিশনের কাছে আবার আবেদন জানায়। আর এতে কমিশনের ব্যবস্থা নিলে আর তা থেকে নতুন যে ফলাফল প্রকাশিত হবে এর তিন সপ্তাহের পরে আবেদনকারী চাইলে আবার আদালতে এসে কোনো আবেদন করতে পারবে”। তাই এবার রবি কান্ত পিনপয়েন্ট করে অভিযোগ করেছেন, কিন্তু সেই থেকে বাদি কমিশনে আবেদন করলেও ‘আজ পর্যন্ত কমিশনই এ নিয়ে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। এতে কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে”।

    এখানে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি কেমন লোক, কেমন ব্যক্তিত্বের – এরকিছু আলামত নিয়ে কথা বলা যাক। তিনি শরদ অরবিন্দ ববদে (Sharad Arvind Bobde)। যার আপন বাবা চাচারা হাইকোর্টের উকিল বা এটর্নি জেনারেল ছিলেন; মানে তারা ল প্রফেশনের এক ফ্যামিলি। তবু শরদ ববদে-এর আচরণ  খুবই অস্বচ্ছ। মানুষের অনেক কিছুরই শখ বা প্রচন্ড আগ্রহ বা স্বপ্ন থাকতেই পারে। তবু একজন জাস্টিসের আচার আচরণ আপোষের জীবন হতে পারে না।  তাঁর শখ হল, বিশেষ ধরণের মটর সাইকেল চালানো বা চালিয়ে দেখা। এমনিতেই বিচারকেরা কী ধরণের সামাজিক জমায়েতে যাবেন বা যাবেন না – আর কোন সংসর্গ এড়িয়ে চলবেন এর গাইড লাইন আছে। অথচ তিনি এক বিজেপি এমপির এমনই এক বিশেষ মটর সাইকেল চড়ে শখ মিটানোর জন্য তার মটর সাইকেল চেয়ে নিয়ে প্রকাশ্যে শহরে চড়ে বেড়িয়েছেন।  শুধু তাই না। এরপর এই প্রসঙ্গে জনস্বার্থের দিক থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে আদালত ও জনগণকে সচেতনতা বাড়াতে যিনি কাজ করে যান স্বেচ্ছায় এবং নিজ খরচে মামলা করে থাকেন এমন সুপ্রীম কোর্টের এক উকিল হলেন প্রশান্ত ভূষণ। তিনি এনিয়ে আপত্তিকর পয়েন্টগুলো তুলে এক আর্টিকেল লিখলে তার বিরুদ্ধে চীফ জাস্টিস ববদে আদালত অবমাননার মামলা করে দেন।   আর ঐ মামলায় রায়ে তিনি তাঁকে এক রুপীর টোকেন ফাইন করে রায় দিয়ে দেন। যাতে তার উকিলি সার্টিফিকেট প্রশ্ন বা বাতিলের মুখে পড়ে যায়। যদিও তিনি এখন কোনমতে ঐ ফাইন-শাস্তির আদেশের বিরুদ্ধে একটা আপিল করে শাস্তির কার্যকারিতা সাময়িক স্থগিত করাতে পেরে টিকে আছেন। এ’থেকে এখন পাঠকেরা যা বুঝার বুঝে নেন!

    এ দিকে আরেক ঘটনা হল, গত প্রায় তিন-চার বছর ধরে বিশেষ করে গত ২০১৯ সালের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের একমাত্র এক কমিশনার অশোক লাভাসা তিনি বাকি কমিশনারের সাথে দ্বিমত পোষণ করে প্রায় সব সিদ্ধান্তে “নোট অব ডিসেন্ট” দিয়ে নিজের আপত্তির রেকর্ড রেখে যাচ্ছিলেন। ইস্যুটা ছিল, ২০১৯ সালের নির্বাচনে মোদী-শাহের বিরুদ্ধে উঠা নানান নির্বাচনী আইন ভঙ্গের কমপ্লেন যার বেশির ভাগের উপর বাকি কমিশনাররা মোদি-শাহকে ক্লিনচিট দিলেও লাভাসা তাদের এসব কাজের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে চলছিলেন, উপনির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা। আর এতেই ক্ষুব্দ মোদী সরকার লাভাসার স্ত্রীর যিনি সরকারি স্টেট ব্যাংকের কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে ভারতের সিবিআই (আমাদের দুদকের মত তবে অনেক বড় ক্ষমতার ও সিরিয়াস ভার্সান বলা চলে) লাগিয়ে হেনস্তা করতে থাকেন। এছাড়া আয়কর বিভাগ তাকে নোটিশ পাঠিয়ে নাস্তানাবুদ করে চলেছেন। এখন এ বছর জানা যাচ্ছে শেষে  নিজেকে বাঁচাতে নির্বাচন কমিশনার লাভাসা এবার কমিশন ছেড়ে অন্য সমতুল্য সরকারি পোস্টে ট্রান্সফার নিয়েছেন। মানে আর বাঁশ বলে কিছুই থাকল না, নাই; তাই বাসুরিয়া বলেও আর কেউ থাকল না!

    আর এখান থেকেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, আগামী বছর (সম্ভবত এপ্রিলে) পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে কারচুপি হবে এবং মোদীর বিজেপি জিতেছে এমন ফলাফলই প্রকাশিত হবে। কারণ এই অবস্থায় একই কারচুপির কায়দায় এরপর আগামী বছরের সম্ভবত এপ্রিলে কলকাতায় রাজ্য নির্বাচনে যদি মোদী রাজ্য সরকারে নিজ দলকে বিজয়ী দেখান তাতে অবাক হওয়ার কিছু কি থাকবে?

    দেখা যাচ্ছে, রবি কান্তের ভারত, যেটা ‘সর্ববৃহৎ ডেমোক্র্যাসির’- এমন ফুটা গর্ব যা-ই থাক সেই গৌরবের ভারত নিয়ে তিনি এখন কী করবেন সে এক বিরাট প্রশ্ন হয়ে উঠে আসছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৬ ডিসেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “রবি কান্তের হতাশা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • গান্ধীর সত্য মানে ‘ট্রুথ’ নয়, ফ্যাক্টস

    গান্ধীর সত্য মানে ‘ট্রুথ’ নয়, ফ্যাক্টস

    গৌতম দাস

    ১২ নভেম্বর ২০২০, ২১:৩৬

    https://wp.me/p1sCvy-3i5

    অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে অনেকের মূল্যায়ন আমরা দেখে থাকি; কিন্তু কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গেলে, সেখানে অন্তত কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে তা করা হচ্ছে – তা নিয়ে আমাদের পরিষ্কার থাকা উচিত। না হলে তা যথার্থ মূল্যায়ন বলে বিবেচিত না হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার কোন মানদণ্ডটা সঠিক? সেটা কী এমন যে চোখে আঙুল দিয়ে পাঠককে দেখাতে হবে? না, ব্যাপারটা ঠিক তাও না। কারণ কোন মানদণ্ড অনুসরণ করে মুল্যায়ন করা হলে বুদ্ধিমান পাঠক তা অবশ্যই ধরে ফেলতে পারবেন। কাজেই কী মানদন্ড ব্যবহার করা হয়েছে তা চোখে আঙুল দিয়ে পাঠককে দেখানোটা জরুরি নয়। কিন্তু পরিস্কার মানদন্ড বজায় থাকতে হবে।

    আমাদের পড়া অনেক মূল্যায়নই, সেটা গান্ধীকে (মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী) নিয়েও হতে পারে – তা এমন মানদণ্ডের সমস্যার জালে আটকে থাকতে পারে। তবে গান্ধীর  একাডেমিক লাইফের দুর্বল দিক নিয়ে অনেক নেতি কথা প্রচলিত আছে- যা অনেকের লেখায় আমরা দেখতে পাই। তবে গান্ধী নিজেও বলে গেছেন, তিনি ছাত্র হিসেবে খুবই মধ্যমমানের [mediocre] ছিলেন, মেধাবি ছিলেন না। তবে সেক্ষেত্রেও কারও শিক্ষাগত যোগ্যতা কত দূর, তা জানা দিয়ে তাকে মূল্যায়ন করা সঠিক পদ্ধতি না।

    গান্ধী ব্যারিস্টার ছিলেন। সে জন্য কী তাকে বড় বিদ্যাধারী মানতে হবে? না এমন কোনো মানে নেই। এর চেয়ে বরং ব্যারিস্টার কথাটা আমাদের আর কী ধারণা বা চিন্তার আবহাওয়া তৈরি করে দেয় সে দিকে যাওয়া যেতে পারে। মনার্কি বা রাজতন্ত্রের যুগে কেউই ব্যারিস্টারি পড়েনি, আমরা ধরে নিতে পারি।  কারণ, রিপাবলিক না  অধিকারের ধারণার তখন চল ছিল না; শুরু হয়নি বলে চাইলেও পড়া যেত না। এটা বুঝলে ও মানলে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারি। কারণ ব্যারিস্টার মানে হল সেটা আর রাজতন্ত্র না, তা ছিল আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের যুগের কথা। যেখানে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও উৎস জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার হাতে। মানে সব রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস ওই পাবলিক- এটা শুরুতেই স্বীকার না করে উপায় নেই। এখন গান্ধী মর্ডান রাষ্ট্র, রিপাবলিক ও রিপ্রেজেন্টেশন ধারণাগুলো কতটা বুঝতেন ও মানতেন এগুলো হতে পারে গান্ধীকে মূল্যায়নের একটা পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া।

    দ্বিতীয়ত, গান্ধী সবসময় পকেটে এক খণ্ড গীতার কপি নিয়ে ঘুরতেন বলে জানা যায়। মূলত গীতার ‘সত্য’ তার আকর্ষণের বিষয় ছিল; কিন্তু এই ‘সত্য’ নিয়ে তার বাড়াবাড়ি থেকে বোঝা যায়, তিনি দর্শন পর্যন্ত বা চিন্তার পদ্ধতি কী – ইত্যাদি বিষয়গুলো পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি বা এসব বিষয়ে তার আগ্রহ ছিল এমন ধারণা দেয় না।

    যদিও ‘গীতা’ যাকে আমরা সাধারণভাবে এক থিওলজিক্যাল এক্সপ্রেশন বলে দেখতে ও বুঝতে পারি, সেখানকার কোনো বক্তব্যের ‘সত্য’ মানে এটা আবার  থিওলজির ‘সত্য”। মানে সেটা আইডিয়েল অর্থে ‘সত্য’- ‘কী হওয়া উচিত’ এই অর্থে। কারণ ধর্মতত্ব আইডিয়েল (ideal বা আদর্শ) বিষয় নিয়ে নাড়াচাড়া করে থাকে।

    ইংরাজি ভাষায় ট্রুথ[Truth] আর ফ্যাক্টস[Facts] এই দুটা শব্দেরই আমরা বাংলা করি “সত্য”। যদিও ফ্যাক্টস মানে সত্য – এখানে সত্য বর্ণনা অর্থে সত্য। মানে ঠিক বলছি কীনা এই অর্থ ‘সত্য’ ধারণা।  আর ট্রুথ শব্দটা ধর্মতত্বের সত্য ধারণা।   এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে আমাদের জন্য লক্ষ্যণীয় যে, গান্ধীর ‘সত্য’ আর গীতার ‘সত্য’ ধারণা ও প্রসঙ্গ এক না। বরং গান্ধীর সত্য হল “ফ্যাক্টস”। কাজেই এ নিয়ে এত হৈ চৈ ফেলানোর কিছু নেই। অর্থাৎ কোনো মানুষের চিন্তা যখন খুবই প্রাথমিক স্তরে থাকে, তখনকার আলাপ এগুলো বলা যায়। অথচ এটা নিয়ে গান্ধীর ‘সত্যাগ্রহ’ আন্দোলন বলে বুঝে-না বুঝে কত আড়ম্বর করা হয়েছে। আর তাতে গান্ধীর ‘সত্যের’ সীমাবদ্ধতাই প্রকাশ পেয়েছে আরও ভালোভাবে। কারণ গান্ধীর ‘সত্য’ থিওলজির ধারণার মতো নয়। তাতে পকেটে গীতা রাখা, না রাখায় কোনো ফারাক নেই। তাই বলা যায় গীতার সত্য মানে কোনো থিওলজি বা ধর্মতত্ত্বীয় সত্য ধারণা নিয়ে গান্ধী নাড়াচাড়াই করেননি।

    প্রসঙ্গ আরও আছে। গান্ধী সারাজীবন হিন্দুধর্ম গ্রন্থগুলো থেকে এর নানা তাফসির বা ব্যাখ্যাকর্তা হিসেবে সমাজে হাজির থাকতে চেয়েছেন; কিন্তু এতে ঘোরতর সমস্যাটা হলো যে, আপনি কোন ধর্মের তাফসিরকারী আর রাজনীতিবিদ একই সঙ্গে এটা হতে পারে না। দ্বিধা তৈরি হবে। রাজনীতিবিদ মানেই আপনি সব নাগরিকের জন্য নেতা হয়েছেন, ধর্ম নির্বিশেষে সবাই আপনার ‘কনস্টিটুয়েন্সি’ এটা মেনে নিয়েই রাজনীতিতে যেতে হয়। ‘কনস্টিটুয়েন্সি’ মানে হলো আপনি তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি বা নেতা হতে চান। এই ‘কনস্টিটুয়েন্সি’কে এক সঙ্গে বাঁধা ও গড়াই তো রাজনীতি; কিন্তু গান্ধী ‘কনস্টিটুয়েন্সি’ ভঙ্গ করেছেন। হিন্দুধর্ম গ্রন্থগুলোর তাফসিরকারী হয়ে বক্তৃতা দিয়ে বুঝিয়েছেন যে, তিনি কেবল হিন্দুদের জন্যই রাজনীতিবিদ। তাও আবার হিন্দুদের সবাই নয়। কেন? সেখানেও বিভক্তি টেনেছেন। কেবল সেসব হিন্দু যারা তার করা তাফসিরের অনুসারি ভক্ত বা সঠিক মনে করেন, কেবল তাদের। কাজেই তিনি ভারত স্বাধীনকারী রাজনীতিবিদ হতেই পারেন না। এ ক্ষেত্রে তিনি ন্যূনতম ধরনও মানেননি। ফলে তিনি এ সেক্টরে অযোগ্য।

    তাহলে কী আমি ধর্ম আর রাজনীতি আলাদা করতে পরামর্শ দিচ্ছি? একেবারে তা না কিন্তু। সোজা জবাবটা হল, যে কোনো থিওলজি মানেই হলো তা আর রাজনৈতিক পরিভাষায় হাজির থাকে না। এছাড়া কোন একটা থিওলজি মানেই হল তা আর সার্বজনীন অর্থাৎ ধর্মনির্বিশেষে সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। তা কেবল নির্দিষ্ট কোন ধর্মের অনুসারীদের জন্য প্রযোজ্য। তবে থিওলজির গভীর জ্ঞানের কথাগুলোকে ঠিক রেখে শুধু পরিভাষা বদলে নতুন করে রাজনৈতিক পরিভাষায় স্থাপন করে সার্বজনীন রূপে সব নাগরিকের জন্য অবশ্যই হাজির করা যাবে। বা তা করা উচিত; কিন্তু এমন কোন যোগ্যতা গান্ধীর ছিল বলে আমার জানা নেই।

    সবশেষে বলবো গান্ধীর যুগের সবাই ডুবেছিল জাতি বা নেশন ধারণার কারণে- যা তাদের অযোগ্য করে দিয়েছিল। এ নিয়ে সংক্ষেপে বলব। তারা সবাই আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র বলতে এই জাতিরাষ্ট্রই বুঝতেন। তাও আবার নেশন বলতে কোনো না কোনো ধর্মীয় অর্থে জাতি, যেমন ব্রিটিশ জাতি মানে তারা বুঝতেন ‘এঙলো ক্যাথলিক খ্রিস্টান’ ধর্মীয় নেশন। তাই এরই অনুকরণে তারা ভারতেও হিন্দু ধর্মীয় জাতির এক জাতিরাষ্ট্র- এমন এক রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্ন মনের ভেতরে পুষে নিয়েছিলেন।

    তবে ব্যাপারটা আরও একশ’ বছরের পুরনো। গান্ধী ভারতের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ১৯১৪-৫ সালের দিকে। এর একশ’ বছর আগে ১৮১৫ সালে রামমোহন রায় প্রথম ভারতে জাতিরাষ্ট্রের ধারণা নির্মাণ করেছিলেন। তিনিই প্রথম ব্রিটিশদের বুঝেছিলেন ‘এংলো ক্যাথলিক খ্রিস্টান’ ধর্মীয় নেশন হিসেবে। তবে এর অনুকরণে আগে তিনি ভারতের সবাইকে একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম ধর্মে দ্বীক্ষিত করতে ১৮১৫ সালে ব্রাহ্ম-ধর্ম প্রকল্প নিয়ে ব্রাহ্ম সমাজ গড়ে তুলেন। এর মাত্র আঠারো বছরের মধ্যে ১৮৩৩ সালে রামমোহন মারা যান। পরে অনেক চেষ্টা করেও ব্রাহ্ম সমাজ আর এগোতে পারেনি, উল্টা তা দুই/তিন ধারায় বিভক্তও হয়ে যায়। আর তাতে হিন্দু নেতারা সবাই এবার ব্রাহ্মধর্ম ফেলে হিন্দুধর্মীয় এক জাতিরাষ্ট্র গড়া ছাড়া উপায় নেই যুক্তিতে গোপনে বা প্রকাশ্যে তৎপরতা শুরু করেন।  অর্থাৎ অখন্ড ভারতের জন্য এক হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্র কায়েম করাকে জায়েজ মানা শুরু হয়েগেছিল। আর এতেই বলা বাহুল্য  এজন্য এটাই এখনো ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের আদি পাপ হয়ে আছে। বিশেষত নেহেরু-গান্ধীও হিন্দুধর্মীয় এক জাতিরাষ্ট্র রাজনীতির অনুসারী হয়ে উঠেন। স্বাধীন ভারতের চূড়ান্ত রূপ দেয়া হয়েছে- এ দুই নেতার হাতে। আর এ কারণে এখন কম-বেশি ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সবাই অস্থিরতা ও সংঘাতে রয়েছে।

    জাতিরাষ্ট্র চিন্তার বিকল্প দুনিয়া এখন হাজির; কিন্তু কেউ সেদিকে আগ্রহ দেখায় না। অন্তত ভারতের কেউ করে না। বরং আরও জোরেসোরে জাতির স্বার্থ বলে এক শব্দে হিন্দুধর্মীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণাটাকেই আবার হাজির করে। আরএসএস-বিজেপির রাষ্ট্রচিন্তা হল এই হিন্দু জাতি রাষ্ট্র ভারতেরই আরও দানব ভার্সন।

    লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

    [এই লেখাটা  গত ২৮ অক্টোবর ২০২০, সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “গান্ধীকে নিয়ে মূল্যায়ন” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • “সারা কাশ্মিরই ভারতের” দাবির পরিণতিতে লাদাখে হাতছাড়া

    “সারা কাশ্মিরই ভারতের” দাবির পরিণতিতে লাদাখে হাতছাড়া

    গৌতম দাস

     ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3bw

    India-China joint statement

    আকসাই চিন [Aksai Chin] যেটা ভারতের ভাষায় ‘লাদাখ’ তা নিয়ে  চীনের সাথে ভারতের কোন একবার সীমান্ত ভুখন্ড চুক্তি করা বা এলএসি টানতে সমঝোতা করার মানেই এরপর ‘সারা কাশ্মিরই ভারতের’ এই দাবি করার ভারতের আর সুযোগ নাই। কারণ চুক্তি করা বা এলএসি টানা মানেই আকসাই চিন চীনেরই ভুখন্ড তা মেনে নিয়েই চুক্তি করতে যাওয়া হয়েছিল। তাই চীন-ভারতের ১৯৯৬ সালের এলএসি সমঝোতা চুক্তি মানেই আকসাই চিন চীনের বলে স্বীকার করে নেওয়া। কাজেই এরপর অমিত শাহের সংসদে লোকসভায় (৫-৬ আগষ্ট ২০১৯) “সারা কাশ্মিরই ভারতের” বলে ঘোষণা করা মানে এটা আগের – ১৯৯৬ সালের এলএসি সমঝোতা চুক্তিকে একপক্ষীয়ভাবে অস্বীকার বা বাতিল করা। এভাবে মোদী-অমিত প্রমাণ করেছে ভারত এক অশিষ্ট রাষ্ট্র (rogue state)।

    দুই পড়শি রাষ্ট্রের সীমান্ত [border] জিনিষটা খুবই অদ্ভুত। সীমান্ত একার হয় না। আপনার নিজ রাষ্ট্র-সীমানা কতদুর – সেটা হল আপনার পড়শির সাথে আপনি আলোচনা করে, সেখানে নানান পুরানা ম্যাপ বা যুক্তি-কারণ দেখিয়ে একটা ঐক্যমত্যে এটা যতদুর বলে আপনারা পরস্পর সাব্যস্ত করেছেন। আর সেই ঐক্যমত্যের সীমানা এরপরে একটাই ম্যাপে তা চিহ্নিত [demarcate] করেছেন। এবার সেই একই ম্যাপের দুইটা কপি দুই রাষ্ট্র নিয়ে রেখে দিয়েছেন। অর্থাৎ পুরা প্রক্রিয়াটা দুই রাষ্ট্র মিলে; যার সোজা মানে সীমান্ত একা চিহ্নিত করা যায় না।

    আচ্ছা সীমান্ত একা একাই দাবি করলে মানে যেকোন কিছু একটাকে নিজের সীমানা বলে দাবি করলে কী হবে?
    এর উত্তরটা খুব সহজ। সেটা ডিমার্কেটেড সীমানা হবে না। তা না হলেই বা কী অসুবিধা? সেক্ষেত্রে প্রথমত সেটাকে বলা হবে – “বিতর্কিত সীমান্ত” – মানে হল অপর পক্ষ সেটা মানে না। একমত না কারণ তার ধারণা ভিন্ন। আর সেখান থেকেই এবার লাইন অব কন্ট্রোল অথবা লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল বা এলএসি ধরণের নতুন নতুন শব্দের উতপত্তি। আর বলাই বাহুল্য অনবরত সীমান্ত টেনশন। আর সেখান থেকে কখন না যুদ্ধ লেগে যায় অবস্থা, মাথার উপর টিকটিক। আর এর উলটাটা হল, একবার যদি ঐক্যমত্যে ম্যাপ এঁকে তা শেয়ার করে নেওয়া যায় তো সব ঠান্ডা। সম্ভবত সেকারণে, কলোনি শাসিত হবার একটা ইতিবাচক দিক আছে।  সেটা হল সব কলোনি শাসকই সর্বপ্রথম পুরা কলোনি রাষ্ট্রের সীমানা পড়শিদের সাথে বসে ডিমার্কেটেড করে নিতেন। তাদের চোখে একাজের পিছনেই বিনিয়োগ যথার্থ কারণ এর বিকল্প হল, অযথা যেকোন সময় যুদ্ধের রিস্ক বা খরচের দায় নিতে রেডি থাকা। তাহলে মনে হচ্ছে,  সব সুবিধা আর লাভালাভই ডিমার্কেটেড সীমান্ত করে নেওয়া দুই পড়শিরাষ্ট্র দুজনের পক্ষে।
    তাই কী? হা মোটাদাগে তাই। কোন নেগেটিভ দিক কী এতে নাই। হা অবশ্যই আছে। এক বিরাট অসুবিধা আছে। অসুবিধাটা হল, একবার কমন ম্যাপ করে ফেলার পর আর পড়শির দখলে থেকে যাওয়া কোন ভুমি আপনার বলে আর দাবি করতে পারবেন না। করলে কী হবে? করলে এবার লিগ্যালি মানে আইনত আপনি ডিফল্টার বা অনুপ্রবেশকারী মানে অপরাধী বলে চিহ্নিত হবেন। ঠিক সে ঘটনাটাই ঘটেছে মোদী-অমিতের কপালে! কিভাবে?

    পাঁচদফার যৌথ ঘোষণা আবার পেন্ডুলামওঃ
    সীমান্ত বিরোধ সংঘাত নিয়ে চীন-ভারতের পাঁচ দফা ঐকমত্যের যৌথ ঘোষণা রাশিয়ার মধ্যস্থতায় গত ১০ সেপ্টেম্বর মস্কোতে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু খবর কী শুধু এতটুকুই? না, এর মধ্যেই সব আছে মনে করলে ভুল হবে, আর সেটা দুই কারণে। প্রথমত, পরের দিনই ১১ সেপ্টেম্বর বা সময় হিসাবে কয়েক ঘণ্টা পরই ছিল আমেরিকার সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের (সাথে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংকে নিয়েও) গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন বা ভার্চুয়াল মিটিং। এটাকে দেখে এক পলিটিক্যাল কমেন্টেটর মন্তব্য করেছেন, ভারত পেন্ডুলামের মতো আমেরিকা না চীন এই করে দোল খাচ্ছে, এর প্রতীকী চিহ্ন এটা [India swings like a pendulum between China and US]। কথা হয়ত মিছা নয়। আমরাও গত সপ্তাহের লেখায় বলেছিলাম “তামাশা হল আমেরিকার সাথে এক মিটিংয়ে খাওয়া ডিনারের ঢেঁকুর জয়শঙ্কর চীনের সাথে মিটিংয়ে গিয়ে তোলেন”। কাজেই মোদীর ভারতের কঠিন ডিলেমা মানে ‘এধার না উধারের দু নৌকায়’ পা দেয়ার সঙ্কটটা এখানেই।
    তবুও দ্বিতীয়ত, সার কথায় বললে আমেরিকার সাথে ১১ তারিখের মিটিংটা বড়ই আজিব, এমনকি নামের দিক থেকেও। এ নিয়ে একটা বড় রিপোর্ট করেছে ভারতের দ্যাপ্রিন্টের নয়নিমা বসু। আর তিনি তা করেছেন এই বিশ্বাস করে যে, কোনো যুদ্ধে ভারতের পক্ষে আমেরিকার দাঁড়িয়ে যাওয়ার দলিলটাই যেন লেখা হচ্ছে বা হবে এখানে। কাজেই ভারতের আর যেন চীনভীতির কিছু নেই! থাকবে না! কিন্তু নয়নিমার রিপোর্টিংয়ে সাজানো এই মেজাজ ও অনুমানগুলোর আলোকে তাঁর লেখা পড়া ভুল হবে।

    ১১ সেপ্টেম্বর ভারত-আমেরিকার মিটিংটা ছিল মূলত আমেরিকার অস্ত্র বিক্রির; আর তা এই বিক্রির পদ্ধতিগত বিস্তারিত দিক নিয়ে মিটিং। ঐ মিটিংয়ের নাম – ‘ভারত-আমেরিকার ২+২ মিনিস্টরিয়াল ডায়লগের ইন্টারসেশনাল মিটিং” বা ইংরাজিতে [“Intersessional Meeting of the U.S.-India 2+2 Ministerial Dialogue”]। বেকায়দার নাম শুনেই ঘাবড়ানোর কিছু নেই। অস্ত্র বিক্রি করতে বিস্তারিত আলাপের জন্য এটা দু’পক্ষেরই দু’টা করে মন্ত্রী মিলে বৈঠক, আর দু’পক্ষের পররাষ্ট্র আর প্রতিরক্ষা মন্ত্রীরা এখানে উপস্থিত থাকবেন – তাই ‘২+২’ বলা। আর এখানে অস্ত্র বিক্রি বলতে, একে৪৭ বা মেশিনগানের মতো সিম্পল অস্ত্র নয়; বড়, জটিল ও হাইটেক বায়ুযানবিষয়ক ব্যাপার। তাই এমন ক্ষেত্রে আমেরিকার কমন প্র্যাকটিস হল, ওসব অস্ত্র বা যন্ত্র প্রভৃতি বিক্রির আগে সব ক্রেতাকে অবশ্যই অনেকরকম চুক্তি করিয়ে নেয়া যে, কী কী শর্তে এগুলো ভারত ব্যবহার করতে পারবে, ট্রেনিং কী হবে, যন্ত্রাংশ সরবরাহ কেমনে কী হবে, স্টক কী করে রাখতে হবে, দক্ষভাবে এর ব্যবহার কী করে করতে হবে, সাথে ইনটেলিজেন্স কী লাগবে, তার ট্রেনিং কে দেবে প্রভৃতি খুঁটিনাটি বিস্তারিত দিক থাকে এর মধ্যে। এ ছাড়া অস্ত্র বিক্রি কোনো সাধারণ পণ্য নয়। তাই দুদিকের দুজন মন্ত্রী লাগে। আর সাথে এত পদ্ধতিগত বাধা পার হতে হয়। এমনিতে আমেরিকার দিক থেকে নিজেদের অস্ত্র বিক্রির দায় ও ক্রেডিট পেন্টাগনের। কিন্তু স্ট্র্যাটেজিক ও পলিটিক্যাল দিক এর সাথে জড়িয়ে থাকে বলে তাদের ফরেন অফিসকেও সাথে নিয়ে নামতে হয়। এরপর সেসব ‘পদ্ধতিগত দিক’ ফাইনাল করে চুক্তিতে পৌঁছানোই ছিল ঐ সভার উদ্দেশ্য। এমন পদ্ধতি মানতে হয় আরেক কারণে। যেমন, ভারতের সাথে রাশিয়ার খাতির খুব কম নয়। তাই ভারত যদি আমেরিকার কোনো অস্ত্র বা সামরিক যন্ত্র কিনে আর তা রাশিয়াকে দেখতে দেয় যাতে সে  ভেঙেচুরে তার সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে শিখে ফেলতে পারে! তাই এটা ঠেকানোই এসব চুক্তির আসল উদ্দেশ্য যাতে অস্ত্র বা সামরিক যন্ত্র তৃতীয় দেশের হাতে না যায়।

    তবে বলাই বাহুল্য, কোনো অস্ত্র বিক্রেতা দেশ আপনার দেশকে অস্ত্র বিক্রি করেছে – এখন এর মানেই আপনার কোন শত্রুর সাথে আপনার যুদ্ধ লাগলে তখন আপনার পাশে মাঠে এসে অস্ত্র বিক্রেতাও দাঁড়িয়ে লড়বে – এমন গ্যারান্টিও সে ক্রেতা দেশ দিয়েছে  – যারা এটা মনে করে তাদের অবশ্যই তা বিরাট আহাম্মকি কান্ড বুঝতে হবে। এদের থেকে দূরে থাকতে হবে। যদিও কোনো অস্ত্র বিক্রি মানে, সেটা দু’দেশের মধ্যে এক ধরনের ছোটখাট ‘সামরিক চুক্তি’ মনে করা দোষের হবে না। আবার আমেরিকার সাথে সামরিক চুক্তি হচ্ছে বলে এটুকু পড়ার পরই গা-গরম করে ফেলা যাবে না, কারণ এর মানে হয় না। তবে একবার (১৯৬২) চীনের হাতে মার খাওয়াতে ভারতের নেতাদের যে মানসিক ট্রমা হয়েছে তা থেকে উদ্ধার পেতে অজান্তে বা জেনেই যাতে কিছু সান্ত্বনা পাওয়া যায় এমন ইঙ্গিত রিপোর্টে থেকে যেতেই পারে। তবু আমাদের বুঝাবুঝিতে পরিষ্কার ফারাক রাখতে হবে – অস্ত্র বিক্রির চুক্তির সাথে সামরিক-স্ট্র্যাটেজিক জোটে ঢুকে পড়ার চুক্তির কোনো সম্পর্ক নেই; দুটো আলাদা।

    তবু নয়নিমা এমন বিভ্রান্তি তৈরির পক্ষে অজ্ঞাত ও ‘নাম বলতে না চাওয়া’ সরকারি কর্তার কথা বলে আড়ালে দাবি করেছেন, মোদী সরকার নাকি সামরিক-স্ট্র্যাটেজিক জোটে ঢুকে পড়তে গভীর আগ্রহে আছে তাই দুটাকে এক করে দেখছেন নয়নিমা।

    কিন্তু কথিত অজ্ঞাত বলে যাই দাবি করুন, বেজ ফ্যাক্টস হল, মোদির নীতি-নির্ধারকেরা পরিষ্কার যে, তারা আমেরিকার সাথে ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে উঠতে পারছেন না। ট্রাম্পের আমেরিকা অবশ্য আরো সরেস হয়ে দাবি করছেন এই জোট হবেই আর যেন এর নাম হয়ে যাবে ‘এশিয়ান ন্যাটো’। যদিও এমন দাবির বিরুদ্ধে জয়শঙ্কর আগেই দায় ঝেড়ে ফেলতে বলছেন, “ভারত জোটনিরপেক্ষ অবস্থানেই” থাকবে। কিন্তু আবার পরিষ্কারও করেন না যে, তাহলে মোদীসহ অমিত-মাধব [রাম মাধব বিজেপির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল ও আরএসএস এর খাস নেতা ] সবারই মনে যুদ্ধের মাঠে আমেরিকা ভারতের পাশে খাড়া হবে এমন আশার বাতি কেন জ্বালিয়ে রাখেন তারা, নিভান না কেন?

    কেউ মনে আশার আলো জ্বালিয়ে রাখলে আর কী করা, মনের উপর হাত চলে না। তবে মোদির নীতিনির্ধারকরা পরিষ্কার যে, তারা ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে উঠতে পারছেন না। এর অন্তত একটা প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। সেটা হলো চীনের সাথে পাঁচ দফা ঐকমত্য করতে মোদীর রাজি হওয়া। এর অন্তত প্রথম দুটো দফা এর প্রমাণ। পুরা পাঁচ দফা এখানে। ওর প্রথম দফা লিখেছে (এখানে বাংলাটা ভারতের সরকারি ওয়েবসাইটের করা, ওর পিডিএফ সেখান থেকে নেয়া)  –  …… “‘ভারত-চীন সম্পর্কের বিকাশে নেতাদের ঐকমত্যের শৃঙ্খলা থেকে উভয় পক্ষের পথনির্দেশিকা গ্রহণ করা উচিত”।
    এর মানে ভারত-চীন সম্পর্কের ভিত্তি হল, দু’দেশের যেগুলো এখন ঐকমত্য হয়েছে এমন পয়েন্ট; তাই দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু তাহলে এর এখন মানে হয়ে গেছে যে, ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট লোকসভায় কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত ৩৭০ ধারা জবরদস্তি বাতিল করে দেয়া ভুল হয়েছে। কারণ অমিত শাহের এই বাতিল করে দেয়ার ভিত্তিতেই পরের দিন তিনি আলাদা ও পরিষ্কার করে  ঘোষণা করে দেন, সারা কাশ্মিরই এখন একমাত্র ভারতের অংশ। অর্থাৎ পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মিরের অংশ ও চীনের অধিকৃত কাশ্মিরের অংশ (আকসাই চীন) ইত্যাদি সবই ঐদিন থেকে ভারতের বলে অমিত শাহ ঘোষণা করে দিয়েছিলেন [PoK, Aksai Chin integral part of J&K, can die for it: Amit Shah in Lok Sabha]।

    “Kashmir is an integral part of India, there is no doubt over it. When I talk about Jammu and Kashmir, Pakistan occupied Kashmir and Aksai Chin are included in it and can die for it,”  -Amit Shah, 06 August 2019 in the parliament

    আসলে ঐদিনের ঘটনায় মোদী-অমিত যে রাষ্ট্র-রাজনীতি বিষয়ে কত নাদান, তাই স্পষ্ট হয়েছিল। কারণ এই ঘোষণার সোজা মানে, ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ থেকে ওই ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৭২ বছরে যা কিছু সীমান্ত-ভূমি বিষয়ে ভারত-চীন সমঝোতা ও চুক্তি আছে বা হয়েছিল – এর সবকিছু ভারত সেদিন সংসদে একাই একপক্ষীয়ভাবে বাতিল বলে ঘোষণা করে দিয়েছিল। কারণ অমিত শাহ বলছেন  কাশ্মীরের চীনের অংশ (আকসাই চিন) আর পাকিস্তানের অংশ সহ পুরা কাশ্মীরই ভারতের ইন্টিগ্রাল বা অবিচ্ছেদ্দ অংশ। কারণ অমিত শাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে ভারতীয় কনষ্টিটিউশনের ৩৭০ ধারা বাতিলের বিল পাশ করাতে পুরা কাশ্মীর এরপর থেকে সরাসরি  ভারতের  অবিচ্ছেদ্দ অংশ হয়ে গেছে।  এতে আরো মানে হল লাদাখে ভারত চীনের সাথে সীমান্ত আলোচনায় (১৯৯৩-৬) কাশ্মীরের যেসব ভুখন্ড চীনের কাছ থেকে ছাড় পেয়ে নিজের এলএসি বলে ১৯৯৬ সাল থেকে যা নিজের ভুখন্ড বলে দাবি করছিল সেসব চুক্তির আর কোন মূল্য নাই। তা অকেজো ও বাতিল।  কারণ ৫-৬ আগষ্ট ২০১৯ থেকে সারা কাশ্মীরই ভারতের কারণ অমিত শাহ সেটা সংসদে ঘোষণা দিয়েছে – এটাই এর একমাত্র ভিত্তি। পুরা আকসাই চিন যদি অমিত শাহের ভারতের হয়ে যায় তাহলে আবার মাত্র ১৯৯৬ সালের একমতের এলএসি পর্যন্ত ভারতের সীমানা – এই দাবির মানে কী? এই দাবি স্ববিরোধী।

    কোনো দু’দেশীয় চুক্তি হওয়ার পর এবার কোনো একটা পক্ষ একাই তা বাতিল বলে ঘোষণা করে দিলে জেনেভা কনভেনশন চালু হওয়ার পর থেকে এমন বাতিলকারী রাষ্ট্রকে অশিষ্ট রাষ্ট্র [ROGUE State] মনে করা হয়। ইংরেজি এই শব্দের মানে হল, যে নিয়ম বা আইন মানে না, শয়তান বা চিট করে চলা লোক বা রাষ্ট্র। অর্থাৎ অমিত শাহের ঐ ঘোষণা ভারতকে অশিষ্ট রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
    কেন এমন খারাপ কথা? তাহলে কী দুদেশের কোন ‘হওয়া’ চুক্তি আর কখনো বাতিল করা যাবে না? তা নয়; অবশ্যই যাবে। কিন্তু পদ্ধতি মেনে তা করতে হবে। “অশিষ্ট” হয়ে নয়, একপক্ষীয় খেয়াল খুশিতে নয়। বাতিলের ইচ্ছা প্রকাশ করে অপরপক্ষকে নোটিশ দিয়ে আলোচনার তারিখ নিয়ে এবার আলোচনায় বসতে হবে। সাধারণত সব চুক্তিতেই কিভাবে ঐ চুক্তি বাতিল করা যাবে তাও লেখা থাকে। কাজেই সে মোতাবেক ঐ মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত হিসাবে চুক্তি বাতিল করা যাবে। কিন্তু মোদীর ভারত একেবারে গায়ের জোরে তাই করেছে।
    মোদী-অমিতের চোখ নিবদ্ধ ছিল ৩৭০ ধারা বাতিল আর পুরা কাশ্মীর এরপর থেকে সরাসরি  ভারতের  অবিচ্ছেদ্দ অংশ – এই ঘোষণার লাভালাভের দিকে। তারা উগ্র জাতিবাদী ধারণায় এই ঘোষণার ফলাফল পরিণতি হিসাবে এরপর থেকে সমস্ত হিন্দু ভোট জাতগর্বে উঠে দাঁড়াবে আর বিজেপির পক্ষে ভোটের বাক্সে চলে আসবে – এই অনুমানের দিকে ছিল তাদের মূল দৃষ্টি।  কিন্তু তাদের ঘোষণা যে এতদিন   চীন-ভারতের সব সীমান্ত ভূমিবিষয়ক চুক্তি ও এলএসিগুলোকেও বাতিল করে দিচ্ছে সেদিকটা একেবারেই আমল করেন নাই।

    তাই অমিত শাহের ঐ ঘোষণার পর চীনা প্রতিক্রিয়া কী ছিল তাও মোদী সরকার আমলে নেয়নি। কিন্তু ২০১৯ সালে ৩১ অক্টোবর বেইজিংয়ে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেগুলার প্রেস ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে সে কড়া প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছিল। বলেছিল, “ভারত একপক্ষীয়ভাবে খেয়াল খুশিতে নতুন করে জম্মু-কাশ্মির ও লাদাখ বলে তাদের দুটা ইউনিয়ন টেরিটরি ঘোষণা করেছে যার মাধ্যমে আসলে চীনা টেরিটরিকে ভারতীয় প্রশাসনের অন্তর্গত বলে দাবি করা হয়েছে। এতে চীনা সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে”।

    কেন এত কড়া চীনা প্রতিক্রিয়া?
    এর পেছনের লম্বা ইতিহাসের সংক্ষেপটা হল, কাশ্মিরের এই চীন-ভারত সীমান্তটাই পূর্ব লাদাখ যা ব্রিটিশ আমল থেকেই কখনোই উভয়পক্ষের সম্মতিতে সীমান্ত চিহ্নিত করে নেয়া হয়নি এমন সীমান্ত। ব্রিটিশেরা তার কলোনি পড়শিদের সাথে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ার ডিমার্কেটেড ম্যাপ তৈরি করত। কিন্তু করদ রাজ্যগুলো মানে ওর সীমানাগুলোকে বাদ দিয়ে। কারণ আইনত প্রিন্সলি বা করদ স্টেটগুলো বৃটিশদের ঠিক কলোনিভুমি নয়। আর কাশ্মির ছিল করদরাজ্য। সেজন্য কখনোই লাদাখ সীমান্ত চীন-ভারতের বসে একমত হয়ে চিহ্নিত করে নেয়া কোন সীমান্ত নয়। তাই সর্বপ্রথম চীন ওই এলাকায় কতদূর নিজের এলাকা বলে দাবি করে বা এলএসি দাবি করে তা ঘটেছিল ১৯৫৯ সালে। এটাই ১৯৫৯ সালের এলএসি [LAC]। পরবর্তিতে ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের পরে চীন তা আরো পোক্ত করে নেয়। কিন্তু পরবর্তীতে একালে চীন-ভারত সম্পর্কের উত্থান-পতনে যখন তা ভালো হয়েছে তখন সীমান্ত আলোচনায় বসার মত অবস্থায় ১৯৯৩-৯৬ সালের এই চার বছরে বিস্তীর্ণ এলাকা চীন ভারতের পক্ষে ছেড়ে দেওয়ার চুক্তি করেছে। কারণ, চীনের সেসময় নীতি ছিল – কোনো এলাকা স্ট্র্যাটেজিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ মনে না হলে আর সে এলাকা নিয়ে ভারতের দাবি থাকলে তা ভারতের কাছে ছেড়ে দেয়া। কারণ ভারতের সাথে অন্যসব সম্পর্কের লম্বা এনগেজমেন্টে চীনের অনেক গভীর স্বার্থ আছে। তাই আস্থা সম্প্রসারণ চীনের জন্য জরুরি মনে হয়েছিল। এ কারণে ১৯৯৩ সালের এলএসিতে ভারত প্রথম বিস্তীর্ণ ভূমি ছাড় পায় যা ১৯৯৬ সালে ভারত পায় চীনের আরো চরম ছাড়ে। সেজন্য চীন-ভারত লাদাখ সীমান্ত বলতে ভারত সর্বশেষ ১৯৯৬ সালের এলএসিকে মূল ভিত্তি মনে করে এসেছে। কিন্তু অমিত শাহের ৫-৬ আগস্টের ঐ ঘোষণা যে এসব (১৯৯৩-৬ সালের) চুক্তি আর বুঝাবুঝিকে নাকচ করে দিচ্ছে – এটা তারা টেরও পয় নাই। এমন মেসেজ যে মোদী সরকার চীনকে দিয়ে ফেলছে সেটাও তারা বুঝেছেন বলে মনে হয় না। আবার অমিত যে সারা কাশ্মিরকেই ভারতের একক অংশ বলে দাবি করছেন সেটা সচেতনভাবেই করছেন। কিন্তু আইনিচুক্তি ও কূটনৈতিক কনসিকোয়েন্স-পরিণতি না বুঝে। তাই চীনের বক্তব্য, তাহলে অমিতের  ঐ (৫-৬ আগষ্ট ২০১৯) ভাষ্য বলছে – আমাদের দু’দেশের আলোচনা, চুক্তি ও এলএসি আর সব বুঝাবুঝি বাতিল ও ভুয়া। কারণ অমিত শাহ একপক্ষীয়ভাবে দাবি করেছেন “পুরা কাশ্মিরই ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ”।

    কাজেই এখনকার সীমান্ত সংঘাতে চীনা ভাষ্য ও চীনের পালটা সামরিক ততপরতার ব্যাখ্যাটা হলঃ  চীন বলতে চাইছে,  অমিত শাহ যদি একপক্ষীয়ভাবে সব ভুখন্ড দাবি করেন, এর মানে তিনি নিজেই ১৯৯৩-৯৬ সালের সব চুক্তি ও এলএসি বাতিল বলে দাবি করছেন। তাই ভারতের সাথে এবারের সীমান্ত সংঘাতে “আমরাও ঐ পালটা গায়ের জোরে ১৯৫৯ সালের এলএসিকে ভিত্তি মেনে সব ভূমি নিজেদের দখলে নিয়ে নিয়েছি”। কোন ভারতীয় এলএসি কে মান্য করি নাই। কারণ যে এলএসি অমিত শাহই বাতিল করে দিয়েছেন তা মানবার কোন দায় আমাদেরও নাই। এমনকি এক সামরিক চাপ ফেলে এরপর মোদী সরকারকে দিয়ে ‘চীন ভারতীয় কোনো ভূমি দখল করেনি বলিয়ে নিয়েছি”। অর্থাৎ মোদিকে দিয়ে মানিয়েছি, ১৯৯৬ সালের এলএসিকে ভিত্তি ধরে নয়, ১৯৫৯ সালের এলএসিকে ভিত্তি ধরলে চীন ভারতের কোনো ভূমি দখল করেনি। আর মোদী তাই মেনে নিয়েছেন।

    তাহলে এখন পাঁচ দফা ঐকমত্যের যৌথ ঘোষণার মানে কীঃ
    অতএব এখন পাঁচ দফা ঐকমত্যের যৌথ ঘোষণার মানে হল উপরের পুরা চীনা ভাষ্যটাই মোদীর মেনে নেওয়া। কারণ অপশনগুলোর মধ্যে এটাই মোদীর জন্য সবচেয়ে কম ক্ষতির ও বহনযোগ্য। যেমন  পাঁচ দফা ঐকমত্যের প্রথম দফার অর্থ হল – আবার আমরা স্বীকার করছি, চীন-ভারতের আলোচনায় যেকোনো ঐকমত্যই আমাদের সম্পর্কের সবকিছুর ভিত্তি হবে। অমিত শাহ বা কোনো মন্ত্রী কোথায় কী বলেছেন, সেটা নয়।

    পাঁচদফার প্রথম দফাঃ

    1. The two Ministers agreed that both sides should take guidance from the series of consensus of the leaders on developing India-China relations, including not allowing differences to become disputes.

    এমনকি এ কারণে দ্বিতীয় দফা খেয়াল করা যাক। ওখানে বলা হয়েছে, ‘দুই বিদেশমন্ত্রী সহমত হয়েছেন যে, সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি কোনো পক্ষের জন্যই ভালো নয়। তার জন্য তারা সহমত হয়েছেন যে, উভয়পক্ষের সীমান্ত বাহিনীর উচিত তাদের আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাওয়া, দ্রুত সৈন্য সরিয়ে নেয়া, সঠিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং উত্তেজনা প্রশমিত করা।’ অর্থাৎ প্রথম দফা মেনে নেয়া সাপেক্ষে দ্বিতীয় দফায় উভয়পক্ষ সৈন্য ফিরিয়ে নিতেও একমত। এতেই তাদের স্বার্থ!

    2. The two Foreign Ministers agreed that the current situation in the border areas is not in the interest of either side. They agreed therefore that the border troops of both sides should continue their dialogue, quickly disengage, maintain proper distance and ease tensions.

    অতএব ভারত-চীন সম্পর্কের নতুন ভিত্তি এখন থেকে পারস্পরিক আলোচনায় ঐকমত্য। আর এটাই মোদী মেনে নিয়েছেন বলেই পাঁচ দফার ঐকমত্য টানা  সম্ভব হয়েছে আর এটাই এখন সবকিছুর ভিত্তি। তাই পুরা পাঁচ দফায় ‘এলএসি’ বলে কোনো শব্দই রাখা হয়নি। মানে সীমান্ত আলোচনা বলতে কিছু থাকতে গেলে তা নতুন করে ‘ফির সে শুরু’ করতে হবে। আর ফের আলোচনায় ঐকমত্য হলে সবই ভারতের, আবার তা হতেও পারে। কিন্তু এর আগে পর্যন্ত সব ভূমি চীনের দখলে থাকবে। তাই যেন ‘এলএসি’ শব্দের আর দরকার কী? ভারত ভালো মানুষ ও রাষ্ট্র, চীনের মনে এমন আস্থা জমলে আবার সবকিছু সে ফেরত দিতে পারে। এমন কী, আরো বেশি ভুমি চীন ফেরত দিয়ে দেবে – পাঁচ দফায় যা লেখা নেই এমনও হতে পারে; কিন্তু ইঙ্গিত আছে এই হলো তার মূল কথা।

    মোদি এটা মেনে নিলেন কেন?
    প্রধান কারণ নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই সব ভারতীয় সেনাদের লাদাখ থেকে মোদীকে ফেরত আনতেই হবে। শীতকাল শুরু হয়ে যাবে, ঠান্ডা ছেয়ে যাবে। কারণ ভারতের অর্থনীতি এমন যে, ঐ বরফজমা ঠাণ্ডার মধ্যে তাদের সেখানে  গরম ঘরে রাখার মত খরচ জোগানোর সামর্থ্য ভারতের নাই। একথা কয়েক সপ্তাহ আগে সাবেক এক পররাষ্ট্র সচিব ও উপদেষ্টা শ্যাম সরন বলেছিলেন। যা মোদী তাকে দিতে বলিয়েছে বলে অনুমান করা হয়। ফলে এমনিতেই তাকে সেনা প্রত্যাহার করতেই হতো।

    Shyam Saran also said, “My sense is, if this, for example, continues during the winter — which would be very difficult because this area is very inhospitable during winter – it would require a considerable investment in setting up heated dwelling units, making certain you have enough equipment for use during very very severe winters.” – ইকোনমিক টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়া

    এ ছাড়া আরো অন্য কারণ হল, মোদী আমেরিকার ওপর আস্থা রাখেন না যদিও মনের কোণে একটা স্বপ্নদেখার মত খায়েসের বাতি তিনি জ্বালিয়ে রেখেছেন। যদিও বাস্তবত হুঁশের-মোদী বুঝেন, সেটা সত্যি নয়। মোদি আসলে অসহায়। চীনের কাছে ভালো মানুষের পরীক্ষা দেয়া ছাড়া তার হাতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। কাশ্মীর পুরাটাই সরাসরি ভারত অংশ এই উগ্র হিন্দু জাতিবাদের জোশ তুলতে পারলে পরের সব নির্বাচনে ভোটের বাক্সে ভারতের সব হিন্দু ভোট ঢেলে বিজেপির ভাগে আসতেই থাকবে – এই অনুমান ও প্রচন্ড লোভে পড়ে গত ৫ আগষ্ট ২০১৯ থেকে তিনি যাই করতেছেন তাই এখন বুমেরাং হয়ে তার গলায় আটকেছে। তবে এদিকে আবার খুব সম্ভবত তিনি অনুভব করেন যে, এমন দশায় আমেরিকার ওপর আস্থা রাখা মানে নিজের পছন্দের হিন্দুত্বের রাজনীতি কখনো ভারতীয় জনগণের হাতেই প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আগেই আমেরিকারই হুকুমে ত্যাগ করতে হবে। এ ছাড়া ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য আমেরিকান ব্যবসায়ীদের আধিপত্যে খুলে দিতে হবে তাকে- এভাবেই তথাকথিত ‘ওপেন মার্কেট’ করে সংস্কার করতে হবে ভারতের অর্থনীতি ও বাজার। এগুলো মোদীর জন্য ‘আরো বড় আত্মহত্যা’। মোদির ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যবসায়ী। মানে গুজরাটি বেনিয়া। মোদি শব্দের অর্থও তাই। কাজেই আমেরিকার এসব আবদারের অর্থ তার না বুঝার কিছু নেই। সম্ভবত সে জন্য তিনি আমেরিকার কাছে যেতে পারছেন না।

    পাঁচ দফা ঐকমত্য বিষয়টা ভারতের পাবলিককে কীভাবে বলবেনঃ
    বলাই বাহুল্য এটা এক পাহাড় ডিঙ্গানো, মোদীর নিজের ফাদে আটকানো।  যে মোদী-অমিত ‘সারা কাশ্মিরই ভারতের’ একথা বলে হিন্দুত্বের বুকের ছাতি ফুলাতে গেছিলেন তারা এখন কীভাবে বলবেন চীনের কাছে উলটা লাদাখের ভূমি খুইয়ে এখন নতুন করে সমঝোতার মাধ্যমে সেই ভুমি ফেরত আনতে যাচ্ছেন তিনি?

    তাই এনিয়ে আরো দুটা কথা আছে। যার মূল বিষয় চীনের সাথে করা পাঁচ দফা ঐকমত্য কেন করছেন এনিয়ে তিনি পাবলিকের সামনে কী বলবেন? এসব ব্যাপারে মোদীর কিছু ধুর্ত বুদ্ধি আছে।  সেজন্যই তিনি জয়শঙ্করকে দিয়ে করা আরেকটা ভাষ্য প্রকাশ করিয়েছেন। যেমন লক্ষ্য করেন, আনন্দবাজারের ১১ সেপ্টেম্বরের শিরোনাম : ‘মস্কোয় দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। আগে সেনা সরাক চিন : জয়শঙ্কর’। অর্থাৎ এখানে ভারত কী সাংঘাতিক বিপ্লবী!  এখানে ভারত বিরাট শক্তি, এমন দাবি করা হচ্ছে উগ্র জাতিবাদী ঢংয়ে।     এছাড়া, আগে চীন কী করে দেখি, এরপর ইচ্ছা হলে ভারত করবে – এমন ডাটদেখানোর এক ভাব তৈরি করা হয়েছে। মোদির ভারত এমনই শক্তিশালী! এটা কেমন কী হল?
    না, খুব সহজ। যৌথ ঘোষণাটাকে অগুরুত্বপূর্ণ করে পেছনে ফেলে রাখতে জয়শঙ্কর তাই এর পরেও আরেকটা ভাষ্য তৈরি করে সে ভিত্তিতে বিদেশ মন্ত্রণালয় থেকে আরেকটা আভ্যন্তরীণ মিডিয়া ব্রিফিং সহ বিবৃতি দিয়েছেন; ঠিক যেমনটা মিডিয়া শুনতে চায়, পাবলিককেও শুনাতে চায়, সেভাবে। এখানে সবচেয়ে বড় কথা ভারতের হিন্দুজাতিবাদী মিডিয়াও এমন ভাষ্যই চায়। এরা ‘ন্যশনাল ইন্টারেস্ট বা কথিত হিন্দুজাতির স্বার্থের নামে গু-গোবর সব হালাল করে তারা চালিয়ে দিবে।

    কেউ কেউ ‘বিশেষ’। কারা এরা?
    কিন্তু এর পরেও কথা আছে। সবাই তো আবার আম-পাবলিক নয়। কেউ কেউ ‘বিশেষ’। কারা এরা? যেমন সাবেক সামরিক জেনারেল অশোক মেহতা। তিনি নিজের লেখার শিরোনাম দিয়েছেন, “যৌথ-বিবৃতিতে কী মিসিং আমাদের সেদিকে তাকানো উচিত” [We Need to Look at What Was Missing in the India-China Joint Statement]।

    তিনি বলতে চাইছেন যেমন, ‘এলএসি’ শব্দটা যৌথবিবৃতিতে নাই। এ ছাড়া আরো বড় জায়গার গ্যাপ তিনি ধরেছেন। যেমন সীমান্তে “আগে যে যেখানে ছিল সেখানে ফেরত যাবে” এমন শব্দগুলো সব সময় থাকত কিন্তু এবার তা কোথাও নেই। এছাড়া এখন ‘এলএসি’ শব্দটার বদলে লেখা হয়েছে ‘বর্ডার এরিয়া’। এছাড়া তিনি বেইজিংয়ের গ্লোবাল টাইমসের একটা টুইটের ছবি তুলে এনে দেখাচ্ছেন। যেখানে লেখা আছে, “ভারত শান্তি চাইলে ভারতকে ১৯৫৯ সালের ৭ নভেম্বরের এলএসি মেনে নিতে হবে। আর যুদ্ধ চাইলে চীন যুদ্ধ করবে। দেখা যাক কোন দেশ শেষে টিকে”। বলাই বাহুল্য এসব কথা জেনারেলেদের আত্মসম্মানে লাগে তাই ভাল কথা না। বলাই বাহুল্য, জেনারেলদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে এসব লেখায় বাধা দিলে বাহিনীতে প্রভাব পড়বে। এর চেয়ে উপেক্ষাই মোদির জন্য একমাত্র কৌশল। একই রকম প্রশ্ন তোলা আরো লেখকের লেখা আছে। যেমন আরেক প্রাক্তন সামরিক কর্তা ও বর্তমান সামরিক সাপ্তাহিকের [editor of FORCE magazine] সম্পাদক প্রবীণ সোয়েনি শিরোনাম দিয়ে লিখছেন, ‘যৌথ বিবৃতি থেকেই বুঝা যাচ্ছে ভারত কী হারিয়েছে”।

    কিন্তু এসব সামরিক লোকেদের ভুলটা কোথায়?
    তারা বলতে চাইছেন, ভারতের আগে ১৯৯৬ সালে এলএসি অনুযায়ী সীমান্ত ছিল এখন মোদী সেটা চীনের কাছে খুইয়ে এসেছেন কেন? এটাই তাদের সবার সার বক্তব্য। অথচ তারা একটু কষ্ট করে আরো বিস্তারে আরো বিশাল ভুখন্ড পাওয়াটা দেখতে চাইছেন না। সেটা হল ৫-৬ আগষ্ট ২০১৯ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে তো তাদেরকে  “‘সারা কাশ্মিরই ভারতের’ বলে আরো বড় ভুখন্ড এনে দিয়েছেন – সেদিকে দেখেন না কেন? এতে এটা বুঝতে তাদের অসুবিধা কোথায় অমিত শাহই তো সেদিন  -১৯৯৬ সালে এলএসি- মানেন নাই। বাতিল বলেছেন বলা যায়। কারণ আকসাই চিনসহ সারা সারা কাশ্মিরই যদি ভারতের’ হয় তবে ওর ভিতরের কোন ভুখন্ড -১৯৯৬ সালে এলএসি – নিয়ে চীন-ভারতের সমঝোতা তো অমিত শাহকে সবার আগে অস্বীকার বা বাতিল মনে করতেই হবে।

    অতএব সবার আগে এসব জেনারেলদেরকে বুঝতে হবে অমিত শাহের দাবির অর্থ কী। ফলে চীন না, সবার আগে “১৯৯৬ সালে এলএসি” অমান্য বা বাতিল করছে খোদ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আর তা করেছেন সংসদে মানে লোকসভাতে।  কাজেই চীনের আর সেটা মান্য-অমান্যের দায় কী? তাই জেনারেলদের অভিযোগ যাওয়া বা জবাবদীহিতা চাওয়া উচিত মোদী-অমিতের কাছে। মোদী সেকারণের সংসদের এনিয়ে কোন আলোচনা হতে দেন নাই।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “‘সারা কাশ্মিরই ভারতের’ দাবির পরিণতি ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।   এছাড়া  আমার আরেকটা লেখা যেটা  ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, প্রায় একই কাছাকাছি শিরোনামে, “চীন-ভারতের সীমান্ত বিরোধ” নামে। পরবর্তিতে ঐ দুই লেখাটাকে একত্র করে  এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]