Tag: চীন

  • ফ্যাসিবাদ-মুক্ত হবার শর্ত কী আমেরিকার বার্মা দখলে সামিল হওয়া!

    ফ্যাসিবাদ-মুক্ত হবার শর্ত কী আমেরিকার বার্মা দখলে সামিল হওয়া!

    গৌতম দাস

    ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

    https://wp.me/p1sCvy-4fa

     

        আমেরিকান কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যান – রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করার প্রস্তাবক

    সারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ পর্যন্ত খুঁজছে বার্মা থেকে বাংলাদেশে গোলা এসে পড়ার পিছনের ঘটনা কী? সাধারণ মানুষের উদ্বেগের প্রধান দিকটা হল, এমনিতেই ডলার সংকট আর চরম মুদ্রাস্ফীতিতে ডুবে থাকা আমাদের অর্থনীতিতে তাদের নাভিশ্বাস উঠা জীবনে, বাংলাদেশ কী কোন যুদ্ধে জড়িয়ে যাচ্ছে? আমরা কী এবার অন্যের যুদ্ধস্বার্থে বলি হতে যাচ্ছি? কারণ সাধারণভাবে বাংলাদেশের নুন্যতম অবস্থান হল যুদ্ধের বাইরে থাকা অর্থে যুদ্ধবিরোধিতা, শামিল না হওয়া। সেখানে বলাই বাহুল্য এসময়ের যেকোন যুদ্ধ যাতে জবরদস্তিতে বাংলাদেশকে সামিল করা হবে আত্মঘাতি বিশেষত তাতে যেখানে এখন অন্তত মারাত্মক খাদ্য সংকট বা দুর্ভিক্ষাবস্তা তৈরি করবে বলে আশঙ্কা আছে!

    ঘটনাটা প্রথম প্রকাশ ছিল একটা পুরানা ঘটনা যার শুরু এক আমেরিকান উদ্যোগ থেকে। গত ২০১৯ সালের হাসিনা যেটাকে বলেছিলেন দুর্বৃত্বপনা; বা দুর্বৃত্বের প্রস্তাব [flagitious proposition]।  আমেরিকান বেনার নিউজের ভাষায়, আমেরিকার এক “গর্হিত কাজ”।


    সেই প্রস্তাবটা কী আর তা কোথা থেকে উদয় হয়েছিল?

    এটা উদয় হয়েছিল আকাবাকাঁ ভাবে; মানে প্রথম যুগে আমেরিকার বার্মার জেনারেলদের পক্ষ নিয়ে কথা বলা যেটা পরে জেনারেলদের নির্মুলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে।একালের বার্মার দিকে আমরা প্রথম খোঁজ নিতে আকৃষ্ট হই ২০১৭ সালে, রোহিঙ্গা উচ্ছেদ আর বাংলাদেশে তাদের আশ্রয়প্রার্থিতা থেকে। কিন্তু একালের বার্মার পরিবর্তনের শুরু ২০০৭ সাল থেকে।
    ভারত সরকার যেন বার্মার জেনারেলদেরকে খুব সুবুদ্ধি দিচ্ছে এমন ভাব ধরে দেয়া উস্কানিতে জেনারেলেরা মুসলমান বলে বার্মার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে ২০১৭ সালে নিশৃংসভাবে হত্যা আর ভয়ের খেলা দেখিয়ে বাংলাদেশ পাঠিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মজার কথা হল রোহিঙ্গা খেদানোর পক্ষে জেনারেলেরা যে সাফাই ব্যাখ্যা দিয়েছিল তা আমেরিকা, ভারত, ও চীন কেউ বাদ যায় নাই, সকলের মেনে নিয়েছিল ও তাদেরও অবস্থানও সেটাই হয়ে দাড়িয়েছিল। সারকথায় সেই ভাষ্যটা হল, আরসা (ARSA, Arakan Rohingya Salvation Army) বলে এক ‘কল্পিত বাহিনীর’ কথা তুলেছিল। আরসা নাকি বার্মিজ নিরাপত্তা বাহিনীর উপরে ৭০টা স্থানে হামলা করেছিল। আর তা প্রতিরোধ করতে ধাওয়া করতে গেলে রোহিঙ্গাদের আবাসস্থলের বাসিন্দারা ভয়ে ডিসপ্লেসেড বা ঘর ছেড়ে আশ্রয়ে ভাগতে যাওয়াতেই নাকি বাংলাদেশ সীমান্তে রোগিঙ্গা ঢল উঠার কারণ। সারকথায়, দেখা যায় জেনারেলেরা তাদের যে সব দানবীয় আচরণের দায়স্বীকার করতে পারবে না তা এই “কল্পিত আরসার নামে” তারা হাজির করে থাকেন। পরিণতিতে এখন সংশ্লিষ্ট সবদেশেরই একটা করে আরসা আছে। আমেরিকান পাসপোর্টধারী আরসাও আছে বলে শুনতে পাই!!

    এককথায়, ২০০৭ সালের পর থেকে বার্মা গ্লোবাল লাইম লাইটের ইস্যু হয়ে আসার পিছনের মূল কারণ হল এর আগে মোটামুটি ১৯৮৯ সাল থেকেই ক্রমান্বয়ে বার্মা জাতিসংঘের অবরোধ আর পরে আমেরিকান বা পশ্চিমা অবরোধে পর্যদুস্ত হয়েছিল। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মত চীন-বার্মা সীমান্ত এটাও শতছিদ্র [perforated] সীমান্ত বলা হয়। সেই সুযোগ এর ভিতর দিয়ে এটাই বার্মার বাহিরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগের একমাত্র সীমান্ত বা উপায় হয়ে উঠে; কিন্তু এর সবটাই ইনফরমালি ফরমাল ধরণের বাণিজ্যের লেনদেন। ফলে অন্যভাবে দেখলে বার্মার উপর সব স্যাংশন বা অবরোধের ফলে পরিণতিতে এর মাখন গিয়ে উঠছিল একা চীনের ঘরে।

    এটা ভাঙতেই নেপথ্যে ভারত উদ্যোগ আহবানে সারা দিয়ে পশ্চিম সামিল হওয়াতে বার্মা  গ্লোবাল লাইম লাইটটে আস্সেতে শুরু করেছিল। এরই প্রকাশ্য চিহ্ন হল বা  এক রফার দলিল হল ২০০৮ সালের বার্মার কথিত নয়া কনষ্টিটিউশন ২০০৮। কিন্তু “কথিত” কারণ, বার্মা এরপরেও আসলে কোন রাষ্ট্র নয় – একটা আর্মি ক্লাবের মালিকানায় একটা ভুখন্ড মাত্র। এনিয়ে বিস্তারে দেখতে এখানে।   যা হোক এনিয়ে কথা আর বাড়াবো না কারণ, ২০২০ সালের নির্বাচনের পরে জেনারেলেরা বুঝে যায় ও সিদ্ধান্ত নেয় যে এই পশ্চিমা-ফর্মুলায় বাইরের দুনিয়ায় আসাটা ভুল ও তা অকার্যকর,তাতে ব্যাপারটা ক্ষমতা জেনারেলদের হাতে রাখার দিক থেকে।

    কিন্তু ঘটনা এর আগেই দুনিয়ার অন্যান্য ঘটনায় অন্যদিকে রওনা দিয়েছে। আমেরিকা-চীনের গ্লোবাল পালাবদলের গোপন-প্রকাশ্যের লড়াইয়ে আমেরিকা আবিস্কার করেছিল যে বার্মার অবস্থান আসলে চীন-ভারতের দিকে ভারি ফলে বড় মাখন সব তাদের দিকে চলে যাচ্ছে। এমনকি সেটার মধ্যে আবার বার্মা না চাইলেও তার অতি চীন-নির্ভরতা যা সীমাহীন বলে আর লম্বা সময় ধরে তা চীনমুখি করে শুরু থেকেই দীর্ঘদিন সাজানো বলে সব মাখন এমনিতেই চীনের ঘরে উঠেই চলছে।

    তাই ২০১৯ সাল থেকেই এনিয়ে আমেরিকার বিকল্প ভিন্ন পরিকল্পনা উন্মোচিত হতে শুরু হয়েছিল। এই আমেরিকান পরিকল্পনাটা সংক্ষিপ্ততম ভাষায় বললে তা হল,  ‘বার্মা দখল’। এটা হল, আমেরিকার ‘বার্মা দখল’ পরিকল্পনা।  কিন্তু এই ভাষায় নয়; বরং ভিন্নভাবে। তাহলে দখলের সেই সাফাই-ভাষ্যটা কী? সাফাইটা হল, আমেরিকা রোহিঙ্গা সমস্যা্র সমাধান করতে চায়, এই ছলে। সোজাসাপ্টা বললে, রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধানের উছিলায় বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ( মোটা দাগে সম্ভাব্য আমেরিকান এয়ার কাভারে বাংলাদেশের পদাতিক বাহিনী মুভ করিয়ে ধরণের কিছু করে) বার্মা দখল।

    কিন্তু এসব কথাগুলো আমাদের সামনে হাজির করা হয়েছিল ভিন্নভাবে, ভিন্ন ভাষায়। কীভাবে এবং কোথায়?

    বলা হল এটা যেন রুটিন আমেরিকান কংগ্রেসের (সংসদ) এক ততপরতা। যেখানে সংসদীয় কমিটি তো থাকবেই। তেমনই ওর পররাষ্ট্র উপকমিটির এশিয়া অংশের নেতা বা কংগ্রেসম্যান হলেন ব্রাড শেরম্যান। একথা সর্বজন বিদিত যে রোহিঙ্গারা মুসলমান বলে বার্মিজ জেনারেলদের এথনিক ক্লিনজিং ঘটে চলছে।  আর তারা কখনই বাধ্য না হলে রোহিঙ্গাদের  আগামিতে ফেরত নিতেই চান না। তাই এই পরিস্থিতিকে উছিলা করে এইবার শেরম্যান সামনে এসে তিনি নিজ উপকমিটির এশিয়ার বাজেট প্রসঙ্গে আলোচনার সময় বলছেন, বার্মার রাখাইন প্রদেশকে কেটে এনে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে হবে।

    এশিয়ায় আমেরিকান রণকৌশলগত স্বার্থ রক্ষার্থে ও প্রভাবিত করতে দুইটা মিডিয়া ও ওয়েব সাইট খুলেছে। এর একটা হল বেনার নিউজ [BENAR News]  আরেকটা ডিজিটাল লাইব্রেরি ধরণের যার নাম ‘রোর বাংলা’ [roar.media]। এগুলো ২০১৭ সালের শেষের দিকে চোখে পড়তে শুরু করেছিল। ব্যানার নিউজের ক্যারেকটার হল অনেকটা সোভিয়েত-আমেরিকা রেষারেষির যুগের মত তখন আমেরিকা সোভিয়েতের বিরুদ্ধে কোন প্রতিষ্ঠান খাড়া করলেই সেখানে একটা শব্দ কমন থাকতে দেখা যেত –  ফ্রি [Free] এই শব্দটা; যেমন ফ্রি নিউজ বা ফ্রি মিডিয়া। বুঝাতে চাইত যে রাশিয়া ফ্রি স্পিচ বা ফ্রি মিডিয়া বলে কিছু নাই। এর উল্টাটা তাই আমেরিকায় যেটা আছে। তাই অনেক সময় বেনার নিউজেও ফ্রি শব্দটা দেখা যায়। [কিন্তু দুঃখের বিষয় এই ওয়েব বাংলাদেশের ভিতর থেকে হলে এখন বিআরটিএ তা আটকে রেখেছে। ফলে ভিপিএন [VPN] দিয়ে ঢুকতে হবে। তবে বিদেশ থেকে স্বাভাবিকভাবেই ঢুকা যাবে।]

    সেই ব্যানার নিউজে ব্রাড শেরম্যান এর ‘রাখাইন প্রদেশকে কেটে আনা” এই খবরটা কিভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল? গত ৮ জুলাই ২০১৯ প্রকাশিত এর হুবহু সে রিপোর্টের প্রথম বাক্যটা তুলে আনছি … “রোহিঙ্গাদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করার যে প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যান দিয়েছেন তা প্রত্যাখ্যান করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এ ধরনের প্রস্তাবনা একটি ‘গর্হিত কাজ’  ”। পরেরদিন ৯ জুলাই ২০১৯ একই খবর আমেরিকান ভোয়াবাংলার [VOA] নিউজও ছিল এরকমঃ ……“রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের অস্থিতিশীল রাখাইন রাজ্যকে বাংলাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত করতে মার্কিন কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যানের দেয়া প্রস্তাবের কড়া সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা”।

    রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করার যে প্রস্তাবঃ
    তাহলে এবার আমরা ২০১৭ সালের জেনারেলদের কোলে বসে থাকা তিনদেশের আমেরিকা, ভারত ও চীন – এখানে একটা বদল হতে দেখছি। এদের মধ্যে আমেরিকা সরে এসে যেন পল্টি মারতে চাইছে। বলছে বার্মাকে ভাগ করে “রাখাইন প্রদেশকে কেটে আনতে হবে”। এখানে আরো একটু আলো ফেলব। পটভুমিটা হল,  এটা বার্মিজ জেনারেলদের বৈশিষ্ট যে তারা গ্রহিতা দেশকে অনুগ্রহ লাভের ভুমিকায় রেখে দিয়ে তাদের উপর নিজ কমান্ড বজায় রাখার ক্ষমতা রাখে, নিজ দাতা অবস্থান তারা সহসা হারায় না; যেভাবেই হোক তা ধরে রাখতেই সক্ষম হতে দেখি আমরা। তাহলে, আমেরিকা কী এই জেনারেলদের কমান্ড থেকেই বের হতে চাচ্ছে? না, ঠিক একদম তা নয়।  সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

    কখন ও কোথায় এবং  কোন ভাষায় আমেরিকা এটা প্রথম প্রকাশ্যে এনেছিল? এটাই ২০১৯ সালের জুনের শেষে-আগষ্টের প্রথম সপ্তাহের দিকে, আমেরিকান কংগ্রেসে (আমেরিকান সংসদে) তা আমরা দেখলাম। আর এর চেয়েও বড় কথাটা হল, আজকের বার্মিজ গোলা এসে বাংলাদেশে কেন এসে পড়ছে এর পিছনের পোলারাইজেশনে মানে আমেরিকা, চীন ও ভারত এবং একালে যুক্ত হওয়া রাশিয়ার মধ্যে এখন  কোনদেশ কে কোন দিকে এখন আছে তা আসলে সেকালে ২০১৯ সালেই স্পষ্ট ছিল। সেটা কীভাবে??

    ২০১৯ সালের রোহিঙ্গা বা বার্মা ইস্যুতে ভারত-চীন একসাথে আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থানেঃ
    ঐ ২০১৯ সালেই ব্রাড শেরম্যান এর কথিত আমেরিকান প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল ভারত ও চীন একসাথে। এরই একটা ঝলক দেখেছিলাম তখন। যদিও তা তখন যথেষ্ট খোলাখুলি ছিল না বলে তত আমল হয় নাই।  সেটার প্রমাণ পাওয়া যায় কীভাবে এই খবর আমাদের কাছে তখন এসেছিল তা ফিরে অনুসরণ করলেই।

    যেমন ব্রাড শেরম্যান প্রথমবারের মত আমেরিকান কংগ্রেসে রাখাইন প্রদেশ কেটে আনার কথা বলেছেন ১৩ জুন ২০১৯।  আর তা আমরা প্রথম জানতে পারি একমাত্র ভারতীয় টাইমস অব ইন্ডিয়ায় (TOI-ET) প্রকাশিত এক রিপোর্টের কল্যাণ্যে; তাও আবার সেই রিপোর্ট শেরম্যানের বক্তব্যের প্রায় ১৭ দিন পরে, ১ জুলাইয়ে। এবং দ্বিতীয় আর কোন মিডিয়ায় এই খবর ছাপা হয়েছে জানা যায় না।

    This proposal was made on June 13 during a hearing on the State Department’s budget for the South Asia, according to a US media report.

    এমনকি TOI-ET নিজের খবরের সোর্স হিসাবে জানাচ্ছে সেটা আমেরিকার স্থানীয় রিপোর্ট (according to a US media report)। অর্থাৎ খুব অস্পষ্ট; সুনির্দিষ্ট  করে কোন সোর্স এর কথা বলা নাই। কিন্তু তাই বলে খবরটা কী দুর্বল বা ভুয়া? না; অবশ্যই তা একেবারেই নয়। কেন, কী প্রমাণ আছে এর?

    প্রথম প্রমাণ হল,  এই খবরের প্রতিক্রিয়ায় যেসব খবর তৈরি হয়েছে, আমেরিকান দুই মিডিয়া বেনার নিউজ আর ভোয়া,  তা অবলীলায় নিজেরাই ছেপেছে। এভাবে এরা পরোক্ষে TOI-ET এর খবরের সত্যতার সাক্ষ্য দিয়ে ফেলেছে। মানে আমেরিকান কংগ্রেসে এমন আলোচনা হয়েছে তা স্বীকার করে নিচ্ছে।

    আর দ্বিতীয় প্রমাণ আরও অনেক বেশি সাক্ষ্য -প্রমাণ। এর সবচেয়ে বড় প্রভাবটা হল, TOI-ET তে ছাপা হওয়া ঐ রিপোর্টের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হাসিনা খুবই কড়াভাবে আমেরিকাকে ধোলাই করে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। আর তা বাংলাদেশে তো বটেই, ভারতে ব্যাপকভাবে এবং এশিয়ায় অনেকদেশের মিডিয়ায় গুরুত্ব পেয়েছিল। ফলে TOI-ET তে ছাপা হওয়া খবরের সত্যতা নিয়ে আর কোন প্রশ্ন থাকে নাই। তবে এসব সত্বেও ভারত-চীন যে এক অবস্থান নিয়ে আমেরিকার বিরোধিতা করেছিল সে অংশটা ভারত কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণে হাজির রাখতে চায় নাই; তাই যাকিছু প্রমাণ তা পরোক্ষে প্রমাণ, এখানে তা লুকায় নাই।

    এমনকি আরেকটা তথ্য খুব গুরুত্বপুর্ণ ছিল সে সময়ে। ১ জুলাই ২০১৯ TOI-ET প্রথম খবরটা চাউর করেছিল। আর এর প্রায় এক সপ্তাহ পরে ৯ জুলাই হাসিনা এক সাংবাদিক সম্মেলনে হাসিনা আমেরিকা ও কংগ্রেসম্যান  ব্রাড শেরম্যানকে খুবই কড়া ্সমালোচনা করেছিলেন।
    তবে, সবচেয়ে বড় কথা হল ঐ সাংবাদিক সম্মেলন ছিল আসলে হাসিনার ২০১৯ সালের ৩-৮ জুলাই এই পাঁচদিনের চীন সফর শেষে দেশে ফিরার পরের দিনের রেগুলার প্রেস ব্রিফিং। আমরা জানি সাধারণত হাসিনার চীন সফরের সময়কালে ভারত টেনশনে থাকে যে কোন কোন নয়া চীনা প্রকল্পে না হাসিনা একমত হয়ে এলেন!!! যা হোক, সেবার ঘটেছিল উলটা। ভারত-চীন মিলে একসাথে হাসিনার মাধ্যমে আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের জবাব দিয়েছিল। যেমন বেনার নিউজের এর শিরোনাম করে ছিল, “রাখাইনকে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করতে বলা অন্যায়ঃ শেখ হাসিনা”। ভোয়ার শিরোনাম ছিল, “কংগ্রেসম্যান ব্রাড শেরম্যানের কড়া সমালোচনা করলেন হাসিনা”।

    এখন ২০১৯ সালের ঠিক এই পুরান জিনিষটাই আবার নতুন করে এখন উঠে আসছে।  যদিও আগে কংগ্রেসম্যানের প্রস্তাবটা এসেছিল ট্রাম্পের আমলে। কিন্তু এবার (২০২২) সেটাই আরো সংগঠিতভাবে বাইডেনের প্রোগ্রাম হয়ে এসেছে। আর এতে বাংলাদেশের নিজ রাষ্ট্র-রাজনীতি ও  সাধারণ মানুষের দিক থেকে যদি বলি, তবে এটা এখন আমাদের ১৪ বছরের ফ্যাসিবাদি-কর্তৃত্ববাদী সরকার উতখাতেই বিষয়, যেটার স্বপক্ষে আমাদের মানুষেরা আশা করে যে আমেরিকা এতে সমর্থন দিবে।  আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট ফোরামগুলোতে আমাদের পাশে নিঃশর্তে দাঁড়াবে এটাই আশা করে। কিন্তু ক্রমশ যে ইঙ্গিত আমরা দেখছি সেটা হল,  ব্রডম্যানের “রাখাইন প্রদেশ কেটে আনা” – সেই ব্যাগেজ এটাই যেন  বাইডেনের শর্ত হিসাবে আমাদের কাধেঁ লটকে বসে যেতে চাইছে।

    একদম খাড়াভাবে বললে, বার্মা একটা স্বাধীন সার্বভৌম জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র তাতে সে আমাদের জন্য যতই রোহিঙ্গা সমস্যা তৈরি বা মুসলমান ক্লিনজিং এর নায়ক হোক না কেন!  তাই, “রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের সাথে যুক্ত করার আমেরিকার প্রস্তাব – এটা একটা ক্রিমিনাল প্রস্তাব। এটা কোনদিনই কোনভাবেই জাতিসংঘ টপকিয়ে পাশ হতে পারবে না। যেমন,  ইরাকের সাদ্দামের স্বাধীন কুয়েত রাষ্ট্রকে দখলের পরিণতিতে জাতিসংঘ নিন্দা প্রস্তাব যেমন প্রবল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাশ হয়েছিল, সবকিছু সাদ্দামের বিরুদ্ধে গেছিল। এটাই সাদ্দামের প্রথমত বিশাল নৈতিক পরাজয় ঘটিয়েছিল আর এর সুযোগ নিয়ে বুশের ইরাক দখল সহজকেই ঘটে গিয়েছিল।

    আসলে বাইডেন বার্মা দখল করতে চান যাতে আমেরিকা-চীন এদের যে গ্লোবাল নেতৃত্বের ঝগড়া আছে তাতে আমেরিকার নিজের বিজয় ও স্বার্থ তাতে মিটে। মূলত এশিয়ায় বার্মা, যতই জেনারেলদের ক্লাব সেটা হোক, সেই জেনারেলেরা পরাজিত হয়ে সেটা “বাইডেনের বার্মা” হয়ে যাবে এটা পড়শি ভারত ও চীনের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন।
    বলা যেতে পারে পরিস্থিতি এখন ভারত-আমেরিকার গত ২০ বছরের ঘনিষ্ট সম্পর্কের সবচেয়ে ভাটার সময়, দূরে সরে যাবার সময়!! আমেরিকা ইতোমধ্যেই পাকিস্তানকে ভারতের বিরুদ্ধে দাড় করিয়েছে!!

    আমরা সবাই জানি যে,   গত কমপক্ষে প্রায় ২০ বছর ধরে ভারত আমেরিকার হয়ে এশিয়ায় চীন ঠেকানোর দাড়োয়ান হতে চেয়ে ভুমিকা রেখে গেছে। তবুও ভারতের নিজ কোরস্বার্থ  হল বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সেভেনফ্লিট নোঙর করার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অথবা ভারতের যেকোন পড়শিদেশে আমেরিকার গেড়ে বসার বিরোধিতা করা যেটাতে সে আপোষ করে নাই।  চীন হল ভারতের ন্যাচারাল পড়শি (যা বদলানো যাবে না) যার তুলনায় আমেরিকার নতুন করে এশিয়ার কোথাও কোন পড়শি দেশে গেড়ে বসতে দেয়া ভারতের জন্য আপত্তির। এই হল ভারতের কোরস্বার্থের সারকথা।

    কাজেই বার্মা প্রশ্নে ভারতের অবস্থান এটা চীনা অবস্থানের পক্ষে সমর্থন হয়ে উঠবে; ন্যাচারাল কারণে।

    ওদিকে রাশিয়া, ইউক্রেনের যুদ্ধ সাত মাস শেষ করেছে যা আগামি নভেম্বরের আগে কোন মোড় বদল বা মোচড় নিবার সম্ভাবনা নাই বলেই মনে হয়। এঅবস্থায় রাশিয়া না চাইতেই আমেরিকা বিরোধী জোট বা ফ্রন্টের সামনের স্থানের রাষ্ট্র। তাই ভারত ও চীনের সমর্থনে রাশিয়া বাইডনের বার্মার দখলের স্বপ্নের বিপরীতে তবে এই উসিলায় সরাসরি এশিয়ায় পা-রাখতে চাওয়া আমেরিকার বিরোধিদের প্রধান ভুমিকায় হাজির হচ্ছে।

    কিন্তু বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে এসবই তো গ্লোবাল নানা দেশেরস্বার্থ ও পরিস্থিতি।  আর বাংলাদেশের নিজস্ব চাওয়া যেখানে হাসিনার পতনে একটা প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ও রাজনীতি কায়েম; এভাবে কর্তৃত্ববাদ-ফ্যাসিবাদ হটানো। এই কাজে আমরা আমেরিকাসহ দুনিয়া সকল রাষ্ট্রের সমর্থন চাই; সকল ফোরামে সমর্থন চাই। কিন্তু তাই বলে আমরা না আমেরিকা না চীন বা ভারতের স্বার্থের কোন যুদ্ধে সামিল হতে পারব না। আমরা কারো ব্যাগেজ বইতে পারব না, কোন সামরিক সংশ্লিষ্ঠতায় সামিল হতে চাই না, পারব না। এটা বাংলাদেশের কোরস্বার্থের বিরোধি!

    আমরা হাসিনার ক্ষমতা আকড়ে থাকার প্রবল বিরোধী; সরকারের কাঠামো, জবাবদিহিতা  ভেঙ্গে ফেলা এর চরমবিরোধী;  বিচার বিভাগ তো বটেই খোদ কনষ্টিটিউশনই এখন নির্বাহি ক্ষমতার অধীনে। এসবই অগ্রহণযোগ্য যার আমুল পরিবর্তন এখন আমাদের নুন্যতম কাম্য। তাতে হাসিনা ২০১৯ সালে যতই  সঠিকভাবে আমেরিকা ও কংগ্রেসম্যান শেরম্যানের সমালোচনা করে থাকেন না কেন!

    আমরা কী শেষে আমেরিকা না চীনের পক্ষ নিবঃ
    এখন বাংলাদেশ বলতে দুটা প্রতিনিধিত্ব হতে দেখা যাচ্ছে। একটা হাসিনা-মোমেনের।  যেমন হাসিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন, বার্মার বাংলাদেশে বোমার গোলা ফেলা প্রসঙ্গে বলছেন এটা নাকি বার্মার ‘অনিচ্ছাকৃত’। অর্থাৎ একদিকে বার্মার গোলা পড়তেছে এটা বাস্তবতা। কিন্তু সেটাকে  কৌশলে নরম করে দেখিয়ে কসরত করে মোমেন অস্বীকারের চেষ্টা করছেন; এটাকে প্রলেপ দিয়ে হাজির করতে চেষ্টা করছেন। এটা হল আসলে হাসিনার বাইডেনবিরোধি রাশিয়া-চীন-ভারতের জোট বা মেরুতে বাংলাদেশকে ঢুকাতে, অবস্থান নিতে চাইছেন।  আর এজায়গায় বাংলাদেশের কমন স্বার্থ ও আকাঙ্খাকে হাসিনা প্রতিনিধিত্ব করেন না। মানে তিনি সেই আকাঙ্খাকে নিজের সাথে রাখতে পারেন নাই বলেই আমার ধারণা।  আসলে হাসিনার স্বার্থ আর আমাদের কমন স্বার্থ এক নয়। এককথায় বাংলাদেশের স্বার্থ হল, কোন দেশ বা ব্লকে না সামিল হওয়া। সেটা বাইডেনের বার্মা দখলের পক্ষে বা বিপক্ষে  কোন যুদ্ধেই সামিল না হওয়া।

    বাংলাদেশ শেষে বাস্তবে কোন সিদ্ধান্তের দিকে যায় সেটা আগামি বাংলাদেশের জন্য খুবই নির্ধারক!!

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • বার্মার গোলা এসে পড়া কিসের ইঙ্গিত

     

    বার্মার গোলা এসে পড়া কিসের ইঙ্গিত
    গৌতম দাস

    https://wp.me/p1sCvy-4eU

    ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০০ঃ০১ রাত

    সীমান্তে মর্টারশেলের অবিস্ফোরিত গোলা

     

    চীনা নেতৃত্বে দল পাকানো বা জোট গঠন আর আমেরিকার নেতৃত্বে পুরানা ও নয়া জোট গঠন এদুই কাজ যেন সাম্প্রতিককালে ভীষণ দ্রুত আগানো শুরু হয়েছে। এরই এক প্রকাশ হল বার্মাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নড়াচড়া। দু-চারটা মর্টার বা গোলা বাংলাদেশের সীমান্তের ভিতরে এসে পড়া বা এতে বাংলাদেশের দু-চারজন করে আহত-নিহত হওয়া – এসবই মূল ঘটনার খুবই ক্ষুদ্র কিছু বাইরের দিক।

    চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা বা রেষারেষি ট্রাম্পের আমলে (২০১৭-২০) যেমন ছিল – একে যদি বলি আমেরিকার তার গ্লোবাল নেতৃত্বের ততপরতা বা দায়ভার ফেলে তা  ট্রাম্পের ঝেড়ে অস্বীকারের অবাস্তব পথ ধরে চীন ঠেকাতে আভ্যন্তরীণমুখি ও জাতিবাদি হয়ে উঠার চেষ্টা; তাহলে পরবর্তিতে মানে চলতি বাইডেনের আমলটা হল, প্রকাশ্যে চীনবিরোধী করে নানান গ্লোবাল জোট পাকানো ও তা দিয়ে আগ্রাসী হয়ে যুদ্ধ-সহ সব সক্রিয় ততপরতা করা্র যুগে তিনি দুনিয়ার সবাইকে টেনে নিতে চাইছেন।

    বিপরীতে চীনের দিক থেকে প্রতিক্রিয়ায় এসবের পালটা যেসব ততপরতা চীন ঘটিয়ে চলেছে সেসবের প্রতিষ্ঠান হিসাবে বললে তা মূলত দুইটা সংগঠনকে কেন্দ্র করে বা মাধ্যমেঃ এক. এসসিও [SCO] আর দুই.  ব্রিকস [BRICS] নামে ততপরতা।

    চীনা ততপরতাঃ
    এসসিও [SCO] – এটা এক আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র-জোট যার নাম-সংক্ষেপ কে ভেঙ্গে বললে এর পুরা নাম ‘সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন’; তাই সংক্ষেপে SCO।  সাধারণত যেকোন আন্তর্জাতিক জোটকে মূল যে দুই ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়; আর তা হল অর্থনৈতিক অথবা স্ট্রাটেজিক এভাবে। আর এই স্ট্রাটেজিক শব্দটাকে বাংলা করে বললে “কৌশলগত” এমন কোন জোট বলতে  বুঝতে হবে মূলত এটা সামরিক ও রাজনৈতিক (ছদ্ম-পলিটিক্যাল) বৈশিষ্ঠের জোট। এভাবেই তা হাজির হতে চেষ্টা করছে। যদিও বেশিরভাগ জোটই মূলত অর্থনৈতিক ক্যাটাগরির জোট হয়ে থাকে যেমন আসিয়ান, সার্ক ইত্যদি।

    নয়া ধারার জোটঃ
    কিন্তু যদি সুস্পষ্ট করে একালে বলি, ধরাধরি শুরু হয়ে গেছে মানে বলতে চাচ্ছি  কোন দেশ  – চীন না আমেরিকা – কার সাথে বিশেষ ঘনিষ্ট হয়ে জোটবদ্ধ হয়ে গেছে এই অর্থে, আরেক ধরণের নয়া ধারার জোট হতে দেখা যাচ্ছে। আর তা হচ্ছে চীনা না হয় আমেরিকান জোট।

    নয়া ধারার জোট, মানে কী বলতে চাচ্ছি। যেমন আগে মানে গত শতকের নব্বই দশক জুড়ে তখনও জোট হত মূলত অর্থনৈতিক। যা এরপর থেকে ক্রমশ মুল উদ্দেশ্য আড়ালে রেখে (চীনের দিক থেকে বললে) তা চীনের নেতৃত্বে নয়া ধারার জোট গঠন বা গঠনের ইঙ্গিত শুরু হয়েছিল। আর এতে ‘মুল উদ্দেশ্য আড়ালে’ বলতে বুঝিয়েছি তা যে আসলে আমেরিকাবিরোধী সেটা প্রকাশ্যে কোথাও উল্লেখ না রেখে ততপর হওয়া। তুলনায় যেমন – ১৯৪৫ সালের পর থেকে সব জোট বা সব আন্তর্জাতিক ততপরতাই আসলে বাই ডিফল্ট হয়ে যেত কার্যত আমেরিকান উদ্যোগে বা আমেরিকান নেতৃত্বের জোট। আর ঠিক এর বিপরীতে সোভিয়েত যুগ শেষে একালে  নয়া ফেনোমেনা হিসাবে হাজির হয়ে চলছে চীনের উদ্যোগে বা নেতৃত্বে জোট গড়ে তোলা।
    তবে  চীনের দিক থেকে সেটাকে স্পষ্ট করে আমেরিকাবিরোধী সেটা উল্লেখ না করেই তা করা শুরু হয়েছিল যেমন এই এসসিও জোট গড়া থেকে। এর আনুষ্ঠানিক জন্ম ২০০১ সালে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এটা ২০০১ সালের হলেও তা ঐবছরেরই সেপ্টেম্বরে টুইন টাওয়ারে আল-কায়েদা হামলার বেশ কয়েকমাস আগের ঘটনা। ফলে কোনভাবেই সম্পর্কিত নয়। কিন্তু এটা ছিল এক অঘোষিতভাবে আমেরিকাবিরোধী জোট।  যা মূলত চীন ও রাশিয়ার সেই প্রথম কাছাকাছি আসা।  আর এটা ছিল ১৯৫৮ সালের পরে সেই প্রথম চীন-রাশিয়ার কাছাকাছি আসা যখন ঐ ১৯৫৮ সালের আগে দুদেশই “স্টালিনবাদী কমিউনিস্ট” দেশ ছিল। আর এর চেয়েও বড় কথা ২০০১ সালে এসে তারা দুদেশের কেউই আর কমিউনিস্ট দেশ নয়।
    কেউ কোনদেশ আর কমিউনিস্ট কিনা এর একটা ভাল মাপকাঠি হতে পারে, সে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য কিনা। সদস্য না হলে সে তখনও কমিউনিস্ট – এটা একটা ভাল মাপকাঠি। বিশেষ করে যদি আমরা এই ফ্যাক্টস মনে রাখি যে,  পুরানা সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ এর ডিসেম্বরে ভেঙ্গে গেলে এরপরে রাশিয়াসহ মোট ১৫ রাষ্ট্রে তারা আলাদা বিভক্ত হয়ে যায়। আর এরপরেই রাশিয়াসহ ১৫ রাষ্ট্র সকলে এই প্রথম আবেদন করে আইএমএফের সদস্য হয়ে গেছিল। আর ওদিকে মাওয়ের নেতৃত্বের চীন (বা নয়া চীন) মানে চীন-আমেরিকার পারস্পরিক কূটনীতিক অস্বীকৃতির চীন ছিল সেটা – সেই চীনে  ১৯৭১ সালেই কিসিঞ্জারের প্রথম গোপন চীন সফরের পরে চীন-আমেরিকার ডিল শুরু করেছিল। আর পরে এথেকেই ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক কূটনীতিক স্বীকৃতি ঘটে – ইত্যাদি এসব ঘটে যাবার পরে তখন ১৯৮০ সাল থেকেই নয়াচীনও প্রথম আইএমএফের সদস্য হয়ে নিয়েছিল।

    এসব কথাগুলো মনে রাখলে আমরা সহজেই মানব যে আইএমএফের সদস্যপদ নেওয়া মানে সে আর কমিউনিস্ট দেশ নয় হয়ে যাওয়া – এর একটা ভাল মাপকাঠি।
    এই বিচারে  চীন ও রাশিয়া প্রথম জোটবদ্ধ দেশ হচ্ছে এসসিও [SCO]-তে ২০০১ সালের শুরু থেকে আর যখন এদুই দেশ কিন্তু আর কমিউনিস্ট দেশ নয়। এরচেয়েও বড় কথা আমাদের মনে রাখতে হবে যে তারা কার্যত আমেরিকাবিরোধি হলেও এর কারণ তারা আগে ‘কমিউনিস্ট ছিল’  এমন কোনই কারণে নয়। মুলকথা এই শতকেও যারাই আমেরিকানবিরোধি ফলে  তারা নিশ্চয়ই কমিউনিস্ট – এমন ভুল ধারণ অচল তাই এই ভুল অনুমানকে যেন আমরা জেনে-না জেনে আমাদের চিন্তার ভিত্তি না বানায় ফেলে থাকি, এই সতর্কতা দরকার।

    যদিও শুরুতে এসসিও এর জন্মানোর ভিত্তি ছিল যে – সেন্ট্রাল এশিয়ার ছয়টা দেশকে নিরাপত্তার দিক থেকে পুরানা স্টাইলে রাশিয়া-নির্ভরই তারা যেন থেকে যায়, পশ্চিমা-প্রভাবে না চলে যায়। যেমনটা পোল্যান্ড, রুমানিয়া ইত্যাদি সোভিয়েতের বাইরের কিন্তু যারা কমিউনিস্ট দেশ – এদের বেলায় ঘটেছে এমন না হয়ে যায়।
    অন্যভাবে বললে, সেন্ট্রাল এশিয়া বলতে পাঁচ দেশকে বুঝায় এর মধ্যে আবার যারা রাশিয়া অথবা চীন এদের কোন একটা দেশের সীমান্ত লাগোয়া দেশ এদেরকে নিয়েই এসসিও গঠন করা হয়েছিল। শুরুতে চীন-রাশিয়া ছাড়া আরো তিন (কাজাখ, কিরঘিজ, তাজিক এই এথনিক-ভিত্তির দেশ) এভাবে পাঁচ দেশ; আর পরে  উজবেক এই এথনিক দেশ মিলে মোট ছয় দেশ নিয়ে এসসিও গঠিত হয়েছিল। যেটা থেকে রাশিয়া ক্রমশ একালে এসে ইউরোএশিয়া [euroasia] বলে একটা নয়া ধারণা চালু করেছে। অনেক পুরানা কমিউনিস্ট তাই ইউরোএশিয়া শব্দটা বেশি ব্যবহার করে কথা বলে। অথচ একালে পুতিনের রাশিয়ার কোন আমেরিকাবিরোধি পদক্ষেপকে কমিউনিস্ট বলে সহি মনে করে কথা বলা বা গর্ব করা অর্থহীন!

    তবে যেটা বলছিলাম, এই এসসিও জন্ম থেকেই তারা অনুল্লেখ রাখা আমেরিকাবিরোধী জোট অবশ্যই। তবে এরচেয়েও বড় কথা একালে মানে ধরা যাক গত সপ্তাহে উজবেকিস্তানের রাজধানী সমরখন্দে এবছরের এসসিও সম্মেলন হয়ে গেল গত ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর ২০২২; এই সম্মেলন বলছে তাদের সদস্য সংখ্যা ক্রমশ  বাড়ছে। যেমন শুরুতে ছয় দেশের এসসিও  ইতোমধ্যে ২০১৭ সাল থেকে ভারত ও পাকিস্তান এদুই রাষ্ট্রকে একসাথে পুর্ণসদস্য করে নেয়া হয়ে গেছে। এবছর থেকে ইরানও পুর্ণসদস্য হওয়াতে মোট পুর্ণসদস্য নয় রাষ্ট্র। আর তুরস্কও সদস্য হতে আগ্রহ প্রকাশ করাতে ব্যাপারটা আর সেন্ট্রাল এশিয়া কেন্দ্রিক অথবা যাদের চীন বা রাশিয়ার সাথে সীমান্ত আছে এমন কেন্দ্রিক বলে থাকছে না। কী হচ্ছে তাহলে?

    এটাই চীন-কেন্দ্রিক আমেরিকাবিরোধি প্রধান জোটের আকার নিচ্ছে। যেমন ইতোমধ্যেই এসসিও-এর দাওয়াতি বা অবজারভার সদস্যদেশ হয়েছে আফগানিস্তান, বেলারুশ ও মঙ্গোলিয়া। আর ওদিকে এক নয়া এক ক্যাটাগরি ‘ডায়লগ মেম্বার’ হয়ে যুক্ত হয়েছে  – আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, কম্বোডিয়া, ইজিপ্ট, নেপাল, কাতার, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা ও তুরস্ক – এমন এরা আরো নয় দেশ।

    আলাপ আবার একটু পিছন থেকে শুরু করছি। চীন-কেন্দ্রিক বা আগামি গ্লোবাল নেতা চীন এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে জোট ততপরতা কবে থেকে শুরু হয়েছিল তা যদি খুঁজতে যাই তবে এর প্রকাশ্য শুরু হল ২০০৯ সাল থেকে। যদিও তখনও চীন-আমেরিকার মধ্যে বাণিজ্যিক স্বার্থ ও সম্পর্ক যথেষ্ট ভাইব্রেন্ট  মানে খুবই সচল ইতিবাচক ও সক্রিয় ছিল যা উভয় দেশেরই মুখ্য-স্বার্থ বলে বিবেচিত হয়ে চলছিল। এছাড়া মনে যাই থাক, কোন প্রকাশ্যবিরোধ বা কারো মৌলিক ভিন্নস্বার্থের উপস্থিতি তখনও উদয় হয় নাই।
    এই বিচারে ইতিহাসের ফ্যাক্টসের ভিত্তিতে বললে, ২০০৯ সালের আগে পর্যন্ত চীন-আমেরিকার সম্পর্ক একরকম গভীর সহযোগিতামূলক ছিল যা আগের ত্রিশ বছর মানে  ১৯৭৮- সাল থেকে যা যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু এই প্রথম তা তাল কেটে যায়, ২০০৯ সাল থেকে। সেটা ছিল আগের মতই সম্পর্ক সহযোগিতামূলকভাবে একসাথে বেড়ে উঠা সত্বেও এবার বাড়তি আরেক উলটা ফেনোমেনা ডালপালা গজিয়ে বেড়ে উঠা শুরু করেছিল – যেটাকে আমরা স্বার্থ যার যার – এমন এক নয়া ফেনোমেনার যুগের শুরু বলতে পারি।

    ২০০৯ সালের কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে যা শুরু হয়েছিল যার প্রধান ও মুখ্য ঘটনাটা হল চীনের ব্রিকস [BRICS] ব্যাঙ্কের ধারণা নিয়ে সামনে আগিয়ে যাওয়া, যেটা কার্যত সরাসরি আমেরিকাবিরোধি। তবে এটা ঘটবার কারণ আমেরিকা নিজেই। বলা যায় আমেরিকা নিজেই চেয়েছিল এভাবেই বিষয়টা আগে বাড়ুক। নইলে আমেরিকার জন্য তার দিক থেকে অন্য অপশনগুলো হত আরো নিজ স্বার্থবিরোধি হত। মানে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর মালিকানা শেয়ার চীনকে ছেড়ে দিতে হত।
    তাই ঘটনাবিরোধের শুরু, চীনের বিশ্বব্যাংকের নিজের মালিকানা শেয়ার বাড়ানোর আবেদন, এখান থেকে।  যা আগেই সে করেছিল আর আমেরিকা সেটা ২০০৯ সালে কার্যত প্রত্যাখান করেছিল। এর অর্থ, এথেকে গ্লোবাল পুঁজিবাজার বুঝেছিল যে এটা যেন চীনকে বলা যে পারলে তুমি চীন আমেরিকার মতই সর্বোচ্চ মালিকানা শেয়ারধারী হতে  আরেকটা  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে নিতে পারলে কর। অর্থাৎ বর্তমান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এ আমেরিকান শেয়ার মালিকানা সর্বোচ্চ; যার সোজা অর্থ আমেরিকাই ইচ্ছাই শেষ কথা। এদুই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা যেকোন বাণিজ্যিক ব্যাংক ব্যবস্থাপনা-মালিকানার কাঠামোর মত করেই তৈরি। তাই চীনকে উপস্থিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর মধ্যে মালিকানার ভাগ বাড়াতে না দিয়াটাই আমেরিকার জন্য তুলনামূলক সবচেয়ে ভাল অপশন। কারণ এই প্রত্যাখানের ক্ষেত্রে, চীনকে নতুন করে বিকল্প আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে নেওয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছিল আমেরিকা।

    আর এখান থেকেই আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ আর ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ আলাদা হয়ে যায়।   তাই ওয়াল স্ট্রীটের লিডিং এক কোম্পানির (গোল্ডম্যান স্যাসে goldmansachs.com ) এর চীফ ইকোনমিষ্টের পাবলিক পরামর্শ রেখেছিলেন যাতে চীন এগিয়ে আসে। আর চীন যেন সেই পরামর্শকেই মুল্য দিতে এগিয়ে আসে। আর গড়ে নেয়া নয়া এমন চীনা-বিকল্প  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠানই হল ‘ব্রিকস ব্যাংক’ [BRICS Bank]। মূলকথায়, বিগত ১৯৯০ সাল থেকেই দুনিয়ার এমন নতুন দিকে মোচড়ের পিছনের মূল কারণ মনে করা হয়, চীনা অর্থনীতির ব্যাপক উত্থান – রাইজিং ইকোনমির ধারণা এখান থেকেই শুরু। অন্য ভাষায় বললে, চীনের অর্থনীতিতে ক্রমশ বিপুল পরিমাণে পুঞ্জিভূত সঞ্চিত পুঁজি (accumulated surplus capital)। যা নিজেই তখন থেকেই অন্যান্য দেশে মানে সারা দুনিয়ার সবদেশেই – ‘অবকাঠামো’ ও ‘বিনিয়োগ পুঁজি’ হিসাবে হাজির হবার যোগ্যতা-সক্ষমতা নিয়ে হাজির হবেই। ঠিক যেমনটা ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াতে আমেরিকা ঘটিয়েছিল।  এটাকেই আমরা অন্যদেশের উপর  “প্রভাব বিস্তারের” মুল উপাদান হিসাবে এককালে আমেরিকার আর একালে চীনের সক্ষমতায় দেখি। তাই, প্রভাব বিস্তারি ক্ষমতার পুর্বশর্ত হল নিজ অর্থনীতি যদি বিপুল পুঞ্জিভূত সঞ্চিত পুঁজি – গড়ে তুলতে শুরু করা। এটাই আসল কারণ বলে বুঝতে পারি।

    আরেক অর্থে এটাই আসলে কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল নেতা অথবা পরাশক্তি হয়ে হাজির হওয়ার মূল শর্ত। অনেকে এই ব্যাপারটাকে সামরিক সক্ষমতা ভেবে ভুল করি। যদিও মূল ফ্যাক্টর বা উপাদান হল, অর্থনৈতিক সক্ষমতা। যা থাকলে গ্লোবাল দুনিয়াকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তো হবেই আর সেই অর্থনৈতিক সক্ষমতা মানে এবার তা নিজদেশে সামরিক খাতেও ব্যয় বাড়ানোরও সক্ষমতা হয়ে উঠা স্বাভাবিক যা কেবল কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

    আর এটাই একালের দুনিয়ায় ঘটে গিয়েছে বলে গ্লোবাল পরিবর্তনের আরেক পর্যায়ের মুখে এখন আমরা সকলে।  যখন চীন ও আমেরিকার উভয়েই জোট পাকানো বা নিজ নিজ পক্ষে প্রকাশ্যেই নানান দেশকে সামিল করার প্রচেষ্টা যুগের শুরু হয়ে গিয়েছে বলতে পারি। তাই এটাকেই ঠাট্টা করে বলেছি “ধরাধরি শুরু” হয়ে গিয়েছে।

    তবে খুবই সাবধান, এই নয়া ফেনোমেনা সাবজেকটিক না। মানে আমি সাবজেকটিভ ভাবে আমাদের দেশে এটা ব্যাখ্যা করে বলেছি বলে এটা তাই হয়েছে তা একেবারেই নয়।  বরং চীনের অর্থনৈতিক উত্থান বা  পুঁজির সারপ্লাস সঞ্চয় ব্যাপক হবে কিনা, হয়েছে কিনা এটা বলার ক্ষেত্রে আমার ভুমিকা আসলে এক আবহাওয়াবিদের মত দর্শক-অবজারভার মাত্র; যে বিভিন্ন লক্ষণ ও দাটা মেপে ঘুর্ণিঝড় আসতেছে একথা আগাম বলে; কিন্তু কোনভাবেই যে নিজে ঘুর্ণিঝড়ের সৃষ্টকর্তা নয়।

    আবার আমি কমিউনিস্ট কিনা অথবা রশিয়া-চীন কমিউনিস্ট বলে হয়ত  এদের পক্ষ টেনে আমি একথা বলছি – এমন ধারণা প্রসঙ্গেঃ

    প্রথমত আমি একেবারেই কোন কমিউনিস্ট নই। সবকিছু সরকারি মালিকানাভিত্তিক যে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের ধারণা আছে আমি এই চিন্তার অনুসারি একেবারেই নই। এছাড়া উপরে বলেছি, চীন-রাশিয়া কেউই আজ আর কেন কমিউনিস্ট নয়। চলতি কমিউনিজম আমার ইডিওলজি নয়। এছাড়া বর্তমান চীন-রাশিয়ার সখ্যতা যা আমরা দেখছি সেটা তারা কমিউনিস্ট ছিল বলে এখন এমন দেখা দিয়েছে একথা মিথ্যা। মূলত তাদের কমন প্রতিদ্বন্দ্বি বা বাধা এক্টাই সেটা আমেরিকা; এটাই তাদের সহমর্মিতা ও সখ্যতার মূল ভিত্তি। এটাই তাদের যেকোন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বা ফোরামে পরস্পরকে সাহায্য ও সমর্থন করার চেষ্টায় কমন অবস্থান নিবার আসল কারণ। মনে রাখা দরকার আজ যা চীন করছে ঠিক সে কাজটাই এককালে আমেরিকা করেছিল – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াকে নিজ ক্ষমতায় করে সাজিয়ে নিবার ক্ষেত্রে।  আর  আমেরিকার সেদিনের উত্থানের বর্ণনার সময় আমি অকাতরে আমেরিকাকে পজিটিভ ভাবেই ব্যাখ্যা করে থাকি। কারণ দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন নিষিদ্ধ করে দেওয়ার নায়ক অবশ্যই আমেরিকা, তা সে যে কারণেই করে থাকুক। আমেরিকার সেই অবস্থান ও সিদ্ধান্ত দুনিয়ার আগিয়ে যাবার জন্য এক লম্বা ইতিবাচক পদক্ষেপ ছিল।   আসলে সাধারণভাবে বললে, কমিউনিস্ট ধারণা ও চিন্তায় দুনিয়ার সেই পরিবর্তনকে  আজও তাদের উপলব্দিতে আসেনি, নিতে পারে নাই। এটা তাদের চিন্তা ও পদ্ধতির দুর্বলতা।

    তাহলে এখন আমরা কে কিভাবে ব্যাপারটাকে দেখব? যেমন একটা খুব কমন ও পপুলার পথ হল, আমরা কে কোন রাজনৈতিক আদর্শ বা চিন্তাকে সহি মনে করি সেই ভিত্তিতে কেউ চীন আর কেউ আমেরিকার পক্ষ নিয়ে কথা বলা শুরু করা। এক্ষেত্রে আমার বলার কথা একটাই যে আমরা কে চীনকে ভালবাসি আর কে আমেরিকাকে সেই ভিত্তিতে দুনিয়ায় পরিবর্তনের ঘটনাবলিকে দেখা ও ব্যাখ্যা করা এটা তো কোন চিন্তার মেথডলজি হতে পারে না।

    সারকথায়, আমার এই কথাগুলো বুঝতে সবচেয়ে সহজ হবে যদি আমরা ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়া কিভাবে নতুন করে সাজানো হয়ে উঠেছিল সেই ইতিহাসের মোটা মোটা ফ্যাক্টসগুলো যদি আগাম মনে রাখি বা সুযোগ পেলেই তা পড়ে রপ্ত করে আসি।  কারণ, এটা যার যত সম্যক বিস্তারিক স্টাডি থাকবে তার পক্ষে একালকের ঘটনাবলিকে ব্যাখ্যায় তিনি আগিয়ে থাকবেন।

    এবার আমেরিকার অভিমুখ সম্পর্কেঃ
    উপরে চীন-রাশিয়ার অভিমুখ নিয়ে কথা বললাম; তাহলে এরার আমেরিকার অভিমুখ সম্পর্কে। তবে লক্ষণীয় যে উভয় পক্ষই যে নাট্যমঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের জোট পাকাচ্ছে এর দুটোই বৃহত্তর এশিয়াতেই। মানে মধ্যপ্রাচ্য এবং সেন্টাল এশিয়ায় যে এশিয়ার ব্যপ্তি।  এই বিচারে আমেরিকার সাজানো নাট্যমঞ্চের নাম ‘এশিয়া প্যাসিফিক’ বা ‘কোয়াড’।  কথাগুলো তাই শেষের দিকের আমেরিকান ততপরতাকে মাথায় রেখে ইঙ্গিতে বলব।

    বার্মার গোলা বাংলাদেশে এসে পড়তেছেঃ
    গত কয়েকদিন ধরে বার্মার গোলা বাংলাদেশে এসে পড়তেছে আর সম্প্রতি আমেরিকান  সেনাবাহিনীর প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান জেনারেল চার্লস এ ফ্লিন বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। ফেসবুকে বাংলাদেশ আর্মির যে পেজ আছে সেখানে দেয়া তথ্য এটা। জেনারেল ফ্লিন আমাদের সেনাপ্রধানের সাথে মিটিং করছেন এমন অনেক ছবিও সেখানে দেয়া হয়েছে। আর পিছনে টাঙ্গানো ব্যানারে লেখা আছে “৪৬তম ইন্দো-প্যাসেফিক আর্মি ম্যানেজমেন্ট সেমিনার,  IPAMS 2022”।
    এতে অন্তত যেসব কৌতুহল সৃষ্ট হয়েছে সেগুলো একেবারেই আমাদের আর্মিকে নিয়ে নয়। মূলত তা ঐ ব্যানারে লেখা  ইন্দো-প্যাসেফিক এই শব্দটাকে কেন্দ্র করে। আর তা থেকে “বাংলাদেশ কী কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক জোটে জয়েন করে ফেলেছি”? কবে থেকে? এসব।
    এগুলো নিয়ে যারা যতটুকু জানেন তাদের কেউ কেউ বলছেন,  না – বাংলাদেশ জয়েন করে নাই। কিন্তু তাহলে ব্যানারের কথাগুলোর ব্যাখ্যা কী? এই কৌতুহল অবশ্য  কেউ মিটাতে পারে নাই। এটাকে কৌতুহল বলছি বটে তবে এটা আসলে যুদ্ধে জড়িয়ে পরার ভয় মিশানোও বটে!

    আবার একথাও সত্য যে বাংলাদেশ আর্মির সাথে আমেরিকার সবচেয়ে বড় ওয়ার্কিং রিলেশন হল জাতিসংঘ মিশনকে কেন্দ্র করে। আর ঐ ফেসবুক পেজে তাই যেমনটা লেখা আছে –  “……বৈঠকে “ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহযোগিতা বাড়াতে সামরিক কূটনীতি” বিষয়ে আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারী সামরিক নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও সম্মেলনে অংশগ্রহনকারী অন্যান্য সদস্যগণ “বলিষ্ঠ শান্তিরক্ষা মিশন ও এর করণীয়” শীর্ষক ব্রেক আউট সেশন এবং জুনিয়র নেতৃবৃন্দ পেশাদারিত্বের উপর পৃথক পৃথক আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন।  এটা খুবই স্বাভাবিক।
    তবে তারা কক্সবাজার সফরে গিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভিজিট ও কথাও বলেছে।  আর এর সাথে জুড়ে তাই উঠে আসছে রোহিঙ্গা বা বার্মা নিয়ে আমেরিকান পরিকল্পনার কথা।  আমেরিকার রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান চিন্তার সারকথা হল, বার্মার আরাকান প্রদেশকে কেটে এনে বাংলাদেশের সাথে জুড়ে দিয়ে সমাধান টানা। এতে বলাই বাহুল্য এটা একটা সামরিক পরিকল্পনা।
    আর তাতে ব্যাপারটা দাড়াচ্ছে এমন যেন,  এখন আমরা ইন্দো-প্যাসিফিকে যোগ দেই আর না দেই বাংলাদেশের এই ‘সামরিক পরিকল্পনায়’ জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কী আসন্ন?
    আর সেজন্যই কী বার্মিজ গোলা এসে পড়ছে? আসলে এনিয়ে সরকারি ভাষ্য-অবস্থান নিয়ে কোন ব্রিফিং খুবই কম। তাই, সবকিছু প্রশ্ন কৌতুহল হয়ে আছে যার জবাব নাই। এটা যতই উহ্য থাকবে কৌতুহলের ডালপালা তত বাড়বে। মূল কারন বাংলাদেশ কোন যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে কীনা এটা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত তাদের জীবনযাত্রার মৌলিক ইস্যু। কারণ সবাই জানে বর্তমান দ্রব্যমুল্য বৃদ্ধি ইনফ্লেশনের মধ্যে আবার একটা যুদ্ধ কল্পনার মানে কী!

    আসলে বড় পিকচারের দিক থেকে বললে,  এখনকার সব  আলোচনায় প্রধান যে ব্যক্তিত্ব তিনি হলেন ডোনাল্ড ল্যু [U.S. Assistant Secretary of State Donald Lu] যিনি  আমাদের অঞ্চলে বাইডেনের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী। যিনি সম্প্রতি ‘বিক্ষুব্ধ’ ভারত সফরে এসেছিলেন। এর চেয়েও বড় হল, পাকিস্তানে ইমরান সরকারকে ফেলানোর মূল নায়ক বা এক্সিকিউটর তিনি বলে মনে করা হয়। সাথে আরো কথা হল, আমেরিকা পাকিস্তানকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্রচুক্তি করছে যার মধ্যে এফ-১৬ এর যন্ত্রপাতিও সংশ্লিষ্ট আছে। এবিষয়ে ভারতের মিডিয়ার খবর এখানে দেখা যেতে পারে।  তাই ঐ সফরে ভারত খুবই কড়াভাবে এতে “আপত্তি” জানিয়েছে।

    সংশ্লিষ্টদের ধারণা অনুমান হল, চীনের এসসিও-এর মধ্যে পাকিস্তান-ভারত দুদেশই আছে। তাই আমেরিকার পরিকল্পনা হল, এফ-১৬ ইস্যুতে পাকিস্তান-ভারত এর দুরত্ব বা কথার যুদ্ধ অন্তত শুরু করে দেয়া যাক। আর এভাবে তাহলে পাকিস্তান ইস্যুতে ইঙ্গিত হল, ইমরানকে জেলে যেতে হচ্ছে, তা সম্ভবত আসন্ন! আর এভাবেই শাহবাজ সরকারকে নির্বাচিত বা অনির্বাচিতভাবে ভারসাম্যহীন এক প্রো-আমেরিকান  করে সাজানোর পরিকল্পনা এই ডোনাল্ড ল্যু এর।
    এই সুযোগে  কিছু কথা বলে রাখার সুযোগ নেয়া যাক।  সাম্প্রতিককালে আমাদের মত দেশের নিজে বাঁচার পথ হচ্ছে চীন-আমেরিকা (ব্রাকেটে ভারত) কারও দিকে এককভাবে আমরা যেন কোনভাবেই না ঝুকে গিয়ে নিজ পায়ে দাঁড়ানো দাঁড়ানো। একটা ভারসাম্য তৈরি করা  – আর এর মূল সুত্র হচ্ছে একেবারে নিজের স্বার্থের ভিত্তিতে মেপে পথ চলা। যদিও তা তখনই সম্ভব হতে পারে যখন নিজেকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র নিজের জনগণের সমর্থনের উপর শাসক দাড়ানোর মুরোদে থাকে। এটা একেবারে প্রাইমারি। যে-ই ক্ষমতায় থাকতে  চীন-আমেরিকা (ব্রাকেটে ভারত)ীদের পিছনে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকবে সে নিজের তো বটেই বাংলাদেশকেও গর্তে ডুবাতে নিয়ে যাবে।
    তাই ফ্যাসিবাদ হটাতে চাইলে কি আমাদেরকে কারো যুদ্ধ পরিকল্পনার অংশ ও সমর্থক হতেই হবে – সকল ভয় ও কৌতুহলি প্রশ্নের কেন্দ্র এটা!!!!

  • কেন ভারত সফর

    কেন ভারত সফর
    গৌতম দাস

    ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২  0৮ঃ৫৫ সকাল

    https://wp.me/p1sCvy-4eE

     

    Bangladesh PM Sheikh Hasina Arrives In Delhi For 4-day Visit

    হাসিনার সদ্য সমাপ্ত ভারত-সফর নিয়ে সফরের আগে থেকেই দেশে হাইপ [hype] বা মিথ্যা উচ্ছ্বাস তোলার চেষ্টায় কমতি ছিল না। মনে করা হয় আওয়ামি যুগ্ম বা সহ-সম্পাদক এর নিচের নেতাকর্মিমহলে ভারতের সাথে হাসিনা সরকারের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ট এটা দেখাতে পারলে, এরা বিরোধিদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে  নির্দয় মারপিট করতে জোশ পায়, চাঙ্গা হয়ে উঠে। অনেকে তাই হাইপ তোলাটাকে এখান থেকে দেখেছে।  তবে এর আগে বাংলাদেশের কোন প্রধানমন্ত্রীর কোন সফর নিয়ে এমন হাইপ তোলার চেষ্টা আমরা দেখিনি। সেদিক থেকে একটা বাড়াবাড়ি ত অবশ্যই ছিল।

    অন্যদিকে, এই সফর কেন, কী এর মুখ্য উদ্দেশ্য এর একটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সরকার বা দল হাজির করার ক্ষেত্রে ব্যাপক খামতি দেখা গেছিল।  এরা কেউ বলতেই পারে নাই বা চায় নাই যে এই সফরের উদ্দেশ্য কী বা মুখ্য ইস্যু কী?  এটা ঢাকতেই যেন হাইপ তোলা হচ্ছে তা মনে হয়েছে। কিন্তু মুল বিষয়,  দেশের সরকার প্রধান কোন সফরে কেন যাচ্ছেন এর গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে অসুবিধা হবে কেন – এটাই তো আসলে অকল্পনীয় এবং অবিশ্বাস্য! কিন্তু তাই হয়েছে।

    ভারত-বাংলাদেশের বর্তমান বা চলমান সম্পর্ক নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে গত ১৪ বছরে ব্যাপক অস্বচ্ছতা ও নিরুত্তর সব প্রশ্ন ক্রমেই তৈরি করে ফেলা হয়েছে।  সরকার এদিকটা কোনই আমল করে নাই অথবা আমল করা অবস্থায় ছিল না। যেমন, “ভারতকে বলেছি শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখতে হবে” – পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন একথা বলে ১২ ঘন্টাও টিকতে পারে নাই। এই উদাহরণটা আমরা মনে রাখতে পারি। এছাড়া দিনকে দিন ভারতের সাথে আমাদের নানান পাওনা নিয়ে গত ১৪ বছরে (যেকালে ভারত আমাদের চরম বন্ধু সরকার বলে দাবি জারি আছে) অমীমাংসিত ইস্যুর সংখ্যা বেড়েছে বৈ কমে নাই। আর পানির মত ন্যায্য পাওনার ইস্যুগুলোর সমাধান ভারত আরো জোর জবরদস্তিতে করে তা না দিয়ে চলতে চেয়েছে। আর আমাদের সরকার বরং সেগুলো পাশ কাটিয়ে সবসময় চেষ্টা করেছে উলটা ভারতের খাতিরদারি আর তোয়াজ করে চলতে।  তাই এটা আশা করা অস্বাভাবিক ছিল না যে যেহেতু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ইন্ডিয়া সফর তাই এই সফরের অন্তত প্রধান ফোকাস ইস্যুটা কী এনিয়ে সরকার স্পষ্ট করে বলে রাখবে। কিন্তু তাও এবার সরকার করে নাই।

    তুলনায় এর আগে যেমন ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের জটিলতা বা অস্বাভাবিকতা যাই থাক তা সত্বেও তো উভয় দেশ থেকেই  উভয় দিক থেকে সরকার প্রধানের সফর ঘটেছে। কিন্তু কখনই এবারের মত এই সফরে ইস্যু কী – তা উহ্য রাখা হয় নাই। অথচ এবার নুন্যতম ফোকাস ইস্যুটা কী তা কেউ জানে না। সরকার স্পষ্ট করে বলতে পারে নাই – এমনটা হয় নাই।

    তাই উপায় না পেয়ে এমনকি প্রো-সরকারি মিডিয়াগুলোও পাবলিককে সন্তুষ্ট করতে যাকে পেয়েছে তাকেই ধরে নিয়ে এসেছে কিছু বলার জন্য। আর তাতেও দেখা গিয়েছে বিশেষত সাংবাদিক, সাবেক কূটনীতিক বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপকেরা হিমশিম খেয়েছেন। প্রশ্নের জবাবের চেয়ে আরো নতুন নিরুত্তর প্রশ্নগুলো সামনে এসে হাজির হয়েছে।  আর এতে সব আলোচনাতেই মুখ্য প্রসঙ্গ হয়ে ছেয়ে গেছে যে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক কতটা একপক্ষীয় – বাংলাদেশের দিক থেকে কেবল দিয়ে যাওয়া অথচ বাংলাদেশের প্রতিটা ন্যায্য পাওনার যেখানে হদিস নাই। এক্ষেত্রে অবশ্য আমরা ২০১৮ সালের ৩০ মে হাসিনার নিজের মুখের আক্ষেপের কথা মনে রাখতে পারি যে তিনি বলেছিলেন,  “ভারতকে যা দিয়েছি তা তারা সারাজীবন মনে রাখবে” – শেখ হাসিনা।

    ‘ক্ষমতায় থাকতে ভারতের সমর্থনের’ উপরই নির্ভরশীলঃ
    এবার সফরে মূল ইস্যু না জানা থাকাতে দীর্ঘ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়েই আমাদের সমাজে আলোচনার চেয়ে সমালোচনা হয়েছে বেশি।  তাই শেষে এর একটাই ব্যাখ্যা আপনাতেই  সামনে হাজির গেছে যেন আমাদের সরকার ক্ষমতায় থাকতে ভারতের সমর্থনের উপরই নির্ভরশীল তাই তার পক্ষে বাংলাদেশের পাওনা বা স্বার্থের দিকটা নিয়ে কথা বলার, তুলে ধরার সুযোগ ও সক্ষমতা তার নাই, সে হারিয়েছে।
    এছাড়া এমন আপনা হাজির ব্যাখ্যার পক্ষে আরো উস্কানি তোলা আগুন ধরিয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনের বক্তব্য। হাসিনার ভারত সফরের দু-সপ্তাহ আগে চট্টগ্রামে স্থানীয় হিন্দুদের এক জমায়েতে দেয়া , “বাংলাদেশের সরকারকে টিকানোর জন্য ভারতকে বলেছি” – এই বক্তব্য। মোমেনের বক্তব্যের কারণেই ‘ভারতের সমর্থনের উপরই নির্ভরশীল” আছে এই সরকার এরপক্ষে সরকারি অনুমোদন পোক্ত হয়েছে বলে সমাজ দেখেছে। যদিও ঐদিন সন্ধ্যা হতেই খারাপ প্রতিক্রিয়া টের পেয়ে সাধারণ সম্পাদক কাদেরকে দিয়ে ঐ বক্তব্য “দল বা সরকারের নয়” বলে অস্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু দলনেত্রীর হুকুমছাড়া  – মোমেন, কাদের বা পরবর্তিতে আব্দুর রহমান এর মত নেতারা কেউ কথা বলেছেন এটা বিশ্বাস করা কঠিন!!
    আর এথেকেই আগামি বছর নির্বাচনের কথা খেয়াল রেখে সাধারণ মানুষের অনুমান যে আসলেই আগামি নির্বাচনেও সরকার ভারতের সক্রিয় সমর্থন কামনা করছে। যেন ভারতের অবস্থান  হাসিনা সরকারের পক্ষেই থাকে, অন্যদলের দিকে না যায় – এটা নিশ্চয় এবারের হাসিনার ভারত সফরের মূল উদ্দেশ্য!!

    তিস্তা নদীর পানি ইস্যু অমীমাংসিত সকল ইস্যুর চেয়ে আলাদা, কেনঃ
    তিস্তা নদীর পানি ইস্যু ভারতের সাথে অমীমাংসিত সকল ইস্যুর চেয়ে আলাদা। অথচ এবার সরকার না চাইতেও তিস্তা নদীর না-পাওয়া পানি ইস্যু এই সফরকে কেন্দ্র করে ভারতের গায়ের জোরের নীতি-পলিসি  আরো উন্মোচিত হয়েছে।  তাই, সাংবাদিক, সাবেক কূটনীতিক বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপকেরা এনিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অস্বস্তিতে পরেছে।  আর তিস্তা নদীর পানি ইস্যু ভারতের সাথে অমীমাংসিত সকল ইস্যুর চেয়ে আলাদা। কেন?
    গত ২০০৯ থেকে চলে আসা টানা ১৪ বছরের সরকার মূলত ভারতের নর্থ-ইস্ট বা আসামের সব চাহিদার ইস্যু বা দুঃখ ঘুচিয়ে দিবে যেন এই প্রতিজ্ঞা করে ক্ষমতায় এসেছিল। এককথায় বললে, সারা নর্থ-ইস্ট বা আসাম, ত্রিপুরা ২০০৯ সালের পর থেকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে সব ধরণের অবাধ করিডোর সুবিধা নিবে এর বিনিময়েই যেন তখন সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। মনে হয়েছে যেন আমরা এখনও “অখন্ড বৃটিশ-ইন্ডিয়ায় ১৯৪৭ সালের আগেই আছি”। এই অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তাই ভারতের একক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে অবাধে বাংলাদেশের ভুখন্ডের উপর দিয়ে সব করিডোর সুবিধা নেওয়া হয়েছে। আর তা যোগানোই যেন আমাদের সরকারের কর্তব্য!!

    এখন ২০০৭ সালের পরিকল্পনা মতে,  ভারত এভাবে একপক্ষীয় ভাবে সকল সুবিধা নিবে এটা দেখতে খারাপ লাগে তাই, ভারতের দিক থেকে দুইটা অমীমাংসিত ইস্যু তারা বাংলাদেশকে সমাধান করে দিবে বা ছাড় দিবে – এমন একটা ধারণা আমরা কার্যকর থাকতে দেখেছিলাম। এর একটা হল “ছিটমহল বিনিময়” যা সেই শেখ মুজিবের আমল থেকে চুক্তি করেও ফেলে রাখা ছিল।  যেটা সেই আমল থেকে আমরা আমাদের ভুমি ভারতকে ছেড়ে বসে আছি কিন্তু ভারতের খবর নাই – অবস্থায় ছিল; এই ছিটমহল প্রশ্নের সমাপ্তি টানবে। আর দ্বিতীয়টা ছিল, তিস্তার পানি বন্টন চুক্তির উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন। এই কারণে বলা যায়, তিস্তা ইস্যু হল স্পেশাল যা ভারতের দিক থেকে নয়া হাসিনা সরকারকে আপোষে দেয়া প্রতিশ্রুতি।
    অথচ আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদি সশস্ত্র আন্দোলন সমস্যা মিটিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে আসামের পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, আকাশ-স্থল-পানি ইত্যাদি সব মাধ্যমে করিডোর যোগাযোগ সুবিধা কী নয় – এমন সবকিছু ভারতকে দেওয়ার পরও আমাদের সরকারের হাত শুন্য – আশ্বাস ছাড়া সেখানে কিছুই নাই!!
    আর এখন এসব সত্বেও আমাদের বেচারা সাংবাদিক, কূটনীতিক বা অধ্যাপকেরা তবু আশার বাণী শুনাচ্ছেন যে এই সফরে তিস্তা ইস্যু নাকি আলোচনার বিষয় হবে – অথচ এনিয়ে কোথায় কোন আলাপ নাই।
    এমনকি কেউ কেউ যুক্তি দিয়েছেন যে মোদি সরকার তো পানি দিতেই চায় কিন্তু মমতা চায় না তাইতেই  নাকি সব সমস্যা হয়েছে। আচ্ছা যদি সমস্যাটা তাই হয় এসব বক্তারা কী একবার ভেবে দেখেছেন এর অর্থ কী? এর অর্থ হল, তাদের মোদি-জী আসলে একটা খামোখা!!! মুরোদ নাই, অক্ষম; তাই তিনি কেউ নন। তাহলে ভারতের সরকার কাঠামো অনুসারে এখানে  মোদি সরকারের যদি মুখ্যমন্ত্রীর উপরে মুরোদ নাই হয়ে থাকেন মানে পানি দেওয়ার ক্ষমতা যদি মোদির না মমতার হাতে থাকে তাহলে আমরা মোদির সাথে কেন ডিল করতে বা চুক্তি করতে চাচ্ছি বা গিয়েছি কেন??? মোদি তাহলে কে আমাদের কাছে??? জয়শঙ্করের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে আমরা কথা বলছি বা বলব কেন??? কোন মুরোধীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের যাওয়ার দরকারই বা কী??

    একারণেই বাংলাদেশে একথার প্রতি বিশ্বাস বাড়ছে যে আমাদের সরকার ভাবছে তার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারতের সমর্থন জরুরি আর একারণেই বলাই বাহুল্য ভারত তাই যেচে আমাদের কোন ন্যায্য পাওনা দিতে মনোযোগ দিবে কেন?

    ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলা ছেড়ে, প্রসঙ্গে আসতে হবে – কেন ভারত সফরঃ
    উপরে এতক্ষণ ঘুরায় ফিরায় আমরা অনেক কথায় গেলাম। কিন্তু মূল বিষয় যে ভারত সফরের উদ্দেশ্য কী তা জানা হল না। এককথায় বাংলাদেশে বা দেশের বাইরের মিডিয়ায় যাকিছু প্রকাশিত আলোচনা তারা কেউই সফরের উদ্দেশ্য কী তা স্পষ্ট জানাতে পারে নাই। শেষে অনেকে হাল ছেড়ে দিয়ে লিখেছে এই সফরের উদ্দেশ্য নাকি “রাজনৈতিক”। ‘রাজনৈতিক’ মানে?? সেটা আবার কী??  আসলে সেটা হল  মানুষ যখন বুঝে যায় তার কথার কোন মানে হচ্ছে না তখন কিছু অর্থহীন অবুঝ শব্দে (vague) মানে আন্দাজে অস্পষ্ট শব্দ নিয়ে আসে। এখানে ‘রাজনৈতিক’ শব্দের অর্থ তাই। ঠিক যেমন অনেকে নিজ বুদ্ধিতে না কলিয়ে দুনিয়ার নানান ফেনোমেনো ব্যাখ্যা না করতে পারলে বলে – এটা ‘ভূরাজনীতি’ বা ‘ভূরাজনৈতিক প্রভাব’। এই “রাজনৈতিক” শব্দের আমদানিও সেরকম। অর্থাৎ যেটা নিজেই বুঝে নাই, সেটা অন্যকে বুঝাতে লজ্জা ঢাকতে গিয়ে যে শব্দ তুলে আনা হয়।

    তাহলে আবার পুরানা প্রশ্ন, এই ভারত সফরের উদ্দেশ্য কী? এবার আর রহস্য না করে বললে সোজা জবাবটা হল – ভারত সফরের উদ্দেশ্য ‘চীন’! সেটা আবার কী? যেখানে সফরে যাচ্ছে ভারতে তাহলে সেখানে উদ্দেশ্য চীন – একথার মানে কী?

    মানে হল, গত দুমাস ধরে বাংলাদেশের মিডিয়ায় লাগাতর যে প্রধান খবরে ডুবে ছিল ও আছে তা হল, রিজার্ভ সংকট। মানে সরকারের কোষাগারে দেশচালানোর মত  যথেষ্ট ডলার নাই। গড়ে প্রতি মাসে আমদানি আয় ও রপ্তানিতে ব্যয়ের ঘাটতিতে একে রেমিটেন্স ও ইত্যাদি আয় দিয়ে পূরণ করার পরও ব্যালেন্সে ঘাটতি গড়ে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার। আর সামাজিক বাস্তবতার দিক দিয়ে যদি ব্যাপারটাকে বর্ণনা করি তা হল,  আমাদের নিয়মিত কমপক্ষে দুঘন্টা লোডশেডিং হয় আর সারা দেশের মানুষের সরকারি-বেসরকারি  ওয়ার্কিং আওয়ার  ৩ ঘন্টা কমানো হয়েছে, মূলত বিদ্যুতের চাহিদা কম রাখার জন্য। আর এদুটা হল আমাদের ডলার সঙ্কট কত তীব্র তা বুঝবার জন্য বাইরের মাত্র দুটা প্রকাশিত চিহ্ন। এছাড়া চারিদিকে মুদ্রাস্ফীতি যা মূলত উদ্ভুত হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে দেড়্গুণ বাড়িয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে। এতে বাজারে ডলার কেনাবেচার রেট ১২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। এসবই হল মারাত্মক গভীর সব সংকটের বাইরের দুচারটা লক্ষণ। আবার সেই থেকে আইএমএফের কাছে বিশেষ ঋণের আবেদন করা হয়েছে, সে খবরের উদ্ভব। তবে আপাতত দেখা যাচ্ছে ডলার সংকট নিয়ে উদাম খবরগুলো আর বাইরে আসছে না। নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কিছু লাগামও টানা হয়েছে। কিন্তু সংকট যে আগের মতই আছে সেটাও পরিস্কার!
    এসবের সারকথা হল, আমরা গভীরভাবে ডলার বা রিজার্ভের সংকটে আছি।

    আমাদের দেখা উদাহরণ বলছে, এমন ডলার সংকটে আইএমএফ সংকটের সুরাহা দেয় কিন্তু  তা প্রথমত, অন্তত ৪-৫ মাস লেগে যায় তাতে। আর, তবে এর আগেই বাছবিচারহীনভাবে খামোখা সব ভর্তুকি তুলে নেওয়ার দাবি করে আইএমএফ মুদ্রাস্ফীতি চরমে তুলে দেয়। (তবে আমাদের সরকার কেউ না বলতে আগাম নিজেই তেলের দাম দেড়্গুণ বাড়িয়ে সমস্যাকে ঘোলাটে করেছে।) দ্বিতীয়তঃ  সব চেয়ে বড় কথা আইএমএফ এক্ষেত্রে চলতি সরকারের সাথে চুক্তিই করে না। যদিও হবু নয়া ঋণচুক্তি নিয়ে আলোচনা ও শর্তাবলি কী হবে তা নিয়ে আলোচনার সবই করে। কিন্তু শেষে চুক্তি করার আগে বলে থাকে চলতি সরকারের সাথে না, পরবর্তি সরকারের সাথে সে চুক্তি করবে। এর মানে যে যা বুঝার বুঝে নিতে পারেন। আর শ্রীলঙ্কায় ঠিক এই জিনিষটাই সম্প্রতি ঘটেছে।

    তাহলে এর থেকে সরকারের নুন্যতম বিকল্প বা পরিত্রাণ কি?  তা হল, চীনের মত দেশ থেকে বড় নগদ ঋণ নেয়া। চীনের নাম নেয়া এজন্য যে বাকি যারা দেশ তাদের সামর্থের প্রশ্ন আছে আর এরচেয়েও বড় হল, কোন ‘ক্যাম্পের’ তারা ইত্যাদি এসবের প্রশ্ন আছে। তবে আইডিয়ালি বললে, আইএমএফের লোন পাওয়া নিশ্চিতের বা পাওয়ার পরেও একই সাথে সাথে চীনা ঋণও পাওয়ার দরকার থাকে। আমাদেরও আছে। মূল কারণ, আইএমএফ লোনের পরিমাণ কম হলেও এর উদ্দেশ্য বা আমাদের লাভ ও দরকার হল দেশি-বিদেশি পুঁজি বাজার ও ব্যাংক ব্যাবসাকে আশ্বস্ত করা যে আইএমএফ (সে বাজারের চোখে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ) নিজে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা চেক করেছে। আর চীনের ঋণ দরকার রিজার্ভের ঘাটতি পূরণে। তবে আলোচ্য ক্ষেত্রে সম্ভবত সরকার বেছে নেয়া লাইনটা হল, আইএমএফের  ঋণ পাওয়া যা হবে হোক, আগে চীনা লোন নিশ্চিত করা যাক!

    কিন্তু তাতে আবার সমস্যা কীঃ
    তাতে সমস্যা কী? নয়া চীনা লোন নিলেই তো হয়। আর এর সাথে আবার হাসিনার ভারত সফরে যাওয়ার কী সম্পর্ক?

    বিরাট সম্পর্ক। আর সেটা দশহাত শাড়ি পড়ার মত, যে ডানদিকটা ভালমত ঢাকলে তাতে বাদিকটা উদাম হয়ে যায়। সেটা আবার কী? এখন চীনেরও সদ্য পুরান  কিছু ক্ষোভ আছে। আর চীনের স্বভাব হল ক্ষুব্ধ হলে সে ঐ দেশ ছেড়ে চলে যায় না। বরং বিপদে পড়া দেশটাকে আরও সাহায্য করে ঠিকই কিন্তু এবার আরো কড়া সব শর্ত আরোপ করে।

    এক্ষেত্রে আমরা স্মরণ করতে পারি গত ২০২১ সালে আমাদের করোনা টিকা পাওয়ার কাহিনী। আজ বাংলাদেশে দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার মধ্যে সবার চেয়ে আগিয়ে ৭৩.৭% সফল তিন ডোজ টিকাদান করা দেশ। কিন্তু এই মিরাকল কেমনে সম্ভব হল কেউ খবর নেই নাই। ভারত আমাদের সাথে শর্তভঙ্গ করে আমাদেরকে টিকা না দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে পাপনের প্রকাশ্যে ভারতকে গালাগালি করা আমরা দেখেছি। এরপরও, এখন এই অর্জন সম্ভব করা গিয়েছে। কারণ, এখন আমাদের টিকা পাওয়ার মূল চালান চীনের দেয়া আর সেটা প্রায় বিনা পয়সায়। ঢাকা শহরের মধ্যে বিতরণ করা  (জাতিসংঘের হু এর দানে দেয়া কিছু টিকা) বাদে এর বাইরের সব টিকাই চীনা টিকা। কিন্তু কিসের বিনিময়ে সরকারকে এই টিকা পেতে হয়েছে আমরা সাধারণ্যে খবর নেই নাই।

    খুব সম্ভবত আজকের ডলার সংকটের ক্ষেত্রেও ক্ষুব্ধ চীনের শর্ত মেনে আমাদের লোন পেতে হবে। গত ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট এর ঢাকা সফরের পর থেকে আমরা প্রথম চীনা অবকাঠামো ঋণ পেতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু এই ছয়বছরে নিতে চাওয়া বহু অবকাঠামো প্রকল্প শেষে আমরা নিতে পারি নাই। কারণ, চলতি ১৪ বছরের টানা সরকারকে ভারতের সমর্থনের (ভারতের সমর্থনে সরকার বিষয়ক মন্তব্য করে মোমেন যেকারণে নিন্দিত) ব্যাপারটাকে সবার উপরে সবসময় আমল ও মনোযোগ দিতে হয়েছে। খুব সম্ভবত এবার চীনা নগদ ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের আপত্তিতে আগে যেসব চীনা-প্রকল্প বাদ দিতে হয়েছে এর সিঙ্ঘভাগে এবার ফিরে গ্রহণ করতে বাংলাদেশকে রাজি হতে হবে।

    আর এতে ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া অনুমান করে আগেই ভারতের সাথে কথা বলে অন্তত যথাসম্ভব তা জানিয়েই কাজ করতে মনস্থ করেছে সরকার। অতএব সেখান থেকেই এই ভারত সফর। এনিয়ে একমাত্র সমকাল পত্রিকায় সঠিকভাবে সম্প্রতি কিছু রিপোর্ট এসেছে। স্বভাবতই খবরের সোর্সের নাম আড়াল করে ছাপানো  “তাসনিম মহসিন” এর লেখা সমকালের কিছু রিপোর্টে তা এসেছে। এর মধ্যে গত ৯ সেপ্টেম্বর   ‘ঢাকার মধ্যপন্থায় আশ্বস্ত দিল্লি’ শিরোনামে লেখাটা সবচেয়ে (তবে যতটা সম্ভব ইঙ্গিতে বলা) বিস্তারিত।  যদিও আসলেই কী ভারত এতে আশ্বস্ত হবে? এর জবাবটা ঘুরিয়ে দিতে হবে! বলতে হবে, কেউ আশ্বস্ত হবে কিনা সেটাই তো ওর নিজ যোগ্যতার উপর নির্ভর করে! তাই না!!

    যেমন ধরেন টিকা প্রসঙ্গে মানে, দিব বলে চুক্তি করে না দেওয়া এটা ভারতের ছেঁচরামো – এর পরিণতি কী হয়েছে? পরিণতি হল কক্সবাজারের কিছু স্থাপনা বাংলাদেশ চীনকে করতে দিয়েছে। মানে যেমন বিমানবন্দর-রানওয়ে ও ‘ইত্যাদি’ নির্মাণের কাজ দেয়া। এখন এতে ভারত অস্বস্তিবোধ করে তো লাভ নাই। এটাই তো টিকা না দেওয়ার  কাফফারা!! নয় কি? ভারতের নাই মুরোদ বা যোগ্যতা তবু তাকে চীন-বাংলাদেশ প্রথম টিকা-চুক্তিতে বা-হাত ঢুকাতেই হবে। চীনা টিকার  গবেষণায় থার্ড ফেজে বাংলাদেশ অংশ নেওয়ার বিনিময়ে  চীনা টিকা পাওয়া বন্ধ করে দিতে হবেই!!! এই ছিল অক্ষম মুরোদধীন ভারতের কূটনীতি! এতে পরিণতি কী হয়েছে সেটাই দেখব!

    অর্থাৎ সেই ভারত যোগ্য হয় নাই এখনও।  অন্যকে অবকাঠামো ঋণ দেবার মুরোদ হয় নাই। ভারতের অর্থনীতি সে জায়গায় উন্নিত নয়। আর পছন্দের দেশকে ‘অবকাঠামো ঋণ দেবার মুরোদ” যখন হয়, এটাই কোন দেশের গ্লোবাল নেতা হবার বা কার্যত দাবি করার বা উঠে দাড়ানোর মুল লক্ষণ চাবিকাঠি।  এভাবেই  দাপটের সাথে গত পচাত্তর বছর ধরে আমেরিকা এভাবেই মুরোদ দেখিয়ে এসেছে। যেটা এখন শীর্ণ প্রায়, বুড়া সিংহের মত।  এটাই অন্যদেশের উপর প্রভাব বিস্তারের আসল  সক্ষমতা ও যোগ্যতা।  যা এখন আমেরিকার জায়গায় দেখাচ্ছে চীন। আর ভারতের সে মুরোদ হতে এখনো ধারে কাছেও নাই; তবে হয়ত হবে। অথচ এখনই বিরাট হা-করা আশার জিহবা বের করে ভারত বসে গিয়েছে। যেন কুঁজোর চিত হয়ে শোয়ার শখ জেগেছে!!

    যেমন উপরে উল্লেখিত সমকালের তাসলিম মোহসিনের ঐ লেখার একটা অংশ হল এরকমঃ “…সাবমেরিন বিষয়ক সামরিক প্রশিক্ষণে বঙ্গোপসাগরে চীনা উপস্থিতির বিষয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থাপনা সরবরাহ নিয়ে করা সমঝোতার দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সমুদ্রে নিরাপত্তা নজরদারি জোরদারের জন্য রাডার সিস্টেম দেবে ভারত।  এ কারণে দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় রাডার ব্যবস্থাপনা সরবরাহ নিয়ে করা সমঝোতার দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে জোর দেওয়া হয়েছে”।  এটাই হল, – কুঁজোর চিত হয়ে শোয়ার শখ – এর পারফেক্ট উদাহরণ। ভারত যেন বলতে চাইছে – মাংস খেতে না পারলাম একটু ঝোল তো পেতে পারি।  আসলে যে মাংস পাবার যোগ্য নয়, হয়নি সে ঝোলও কেন পাবে???  আগে নিজের অবকাঠামো নির্মাণের সব প্রয়োজন পুর্ণ কর – এরপরেই না অন্যদেশে অবকাঠামো ঋণ দিতে শুরু করা!  মানে গ্লোবাল প্রভাব তৈরি করতে, ছড়িয়ে দিতে শুরু করা এসব কাজের যোগ্য হওয়া আর এজন্য  ছেঁচরামো শুরু করা কি এককথা?? আর এসব করে শেষে লাভটা কী হয়?

    কাজেই এখন ভারতের মুরোদহীন আপত্তি উপেক্ষা করে চীন-বাংলাদেশের পুরানা বাদ-পড়া চীনা প্রকল্পগুলো আবার চালু করতে হাসিনার সামনের ভারতীয় বাধা কাটাতেই, মানে অন্তত মুখরক্ষা করতেই হাসিনার এবারের ভারত সফর ঘটেছে। এটাই মূল কারণ। আর লাভের লাভ যে ভারতীয় কোন আপত্তি যে হাসিনা আমল বা শোনার অবস্থায় নাই সেটা বলে দিয়ে এসে সব বাধা কাটিয়ে আনতে তিনি সফল – এই অর্থে তার সফর সফল বলে সরকার দাবি করছে। আর তা যাওয়ারই কথা। আর এর সাথে পাশাপাশি চীনা  কিছু নগদ ঋণের সংস্থানও হাসিনা করার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে অবশ্যই যাতে তাঁর চেপে বসা ডলার সংকটের কিছু সুরাহা হয়।

    কিন্তু হাসিনার ভারত সফর সফল “হবারই কথা” বলছি কেন?
    বলছি কারণ ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ঢলে গেছে তা একেবারে ভেঙ্গে না গেলেও। ফলে ভারত যেন হাসিনার জন্য আমেরিকার কাছে কোন সুপারিশ নিয়ে যাক, এমন উদ্দেশ্য হাসিনার এই সফরে ছিল না।  কারণ, এখন আর আমেরিকার কাছে  ভারতের সেই মুল্য বা গুরুত্ব নাই।  একারণেই রাশিয়ান তেল বা জ্বালানি নিয়ে সেসব বকোয়াজি এটা শাহরিয়ার আলমের নিজের কল্পনা। যতদুর জানা যায় এটা আপার ফরমাইস ছিল না।

    কিন্তু  এখন কী দাড়ামো? এর মানে কী এই যে সরকারের ডলার সংকট সমাধান হয়ে যাচ্ছে? না, এখনো অনেক সবুর করতে হবে। এছাড়া সবটা  না হলেও সরকার কিছু আলো দেখতে পাবে অবশ্যই। তাও যদি এখন চীনের সাথে নয়া কিছু চুক্তি সম্পন্ন-সহ সেসব কাজকে বাস্তবে করে দেখাতে পারে তা পরিকল্পনা-মত সফল হতে হবে আগে।

    পুরা ডলার সংকট সমাধান কী হবেঃ
    কিন্তু কেন পুরা ডলার সংকট সমাধান হয়ে যাবে বলে আশা জাগাতে পারা যাচ্ছে না? মূল কারণ সংকটটা কৃত্রিম। মানে হল, গত ১৪ বছর যে পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা সরকারি অর্থ লোপাট হয়েছে এরা সবাই চাচ্ছে তাদের টাকা ডলারে রুপান্তর করে নিতে। এটা বাস্তবত অসম্ভব। কারণ, এই চাহিদা অস্বাভাবিক। এটা বাংলাদেশের স্বাভাবিক অর্থনীতি থেকে উঠে আসা কোন চাহিদা নয়। এটা আলটপকা এবং লুটেরাদের চাহিদা। যা স্বাভাবিক অর্থনীতিক চাহিদার বাইরের ঘটনা আর বাইরের লোকেদের। আমাদের স্বাভাবিক অর্থনীতি কখনও আমাদের অর্থনীতিতে সচল সব স্থানীয় মুদ্রা টাকাকে ডলারে রুপান্তরিত করার কোনই চাহিদা তৈরি করে না।  কাজেই এখন দেখা দেওয়া সব চুরির টাকার ডলারে রুপান্তরের চাহিদা এটা স্বাভাবিক ও আমাদের অর্থনীতির পক্ষে তাদের চাহিদা মিটানো এবসার্ড! ফলে সোজা কথা,  চোরদের তৈরি করা “ডলার চাহিদার” উপর রাষ্ট্রের একশন লাগবে – সক্ষমতা লাগবে, একে কঠোর দমন করা লাগবে, যদি  সে মুরোদ থাকে!

    এই পরিস্থিতিতে জীবন নাভিস্বাসে উঠে যাওয়া মানুষের ক্ষোভ বাড়তেই থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। আর সাথে এখন থেকে অর্থনীতি ক্রমশ স্থবির হতে চাইবে – এমন দশা স্পষ্ট হইয়ে উঠবে। যা ব্যাপক অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করবে। তাই সাধারণ মানুষের এই ক্ষোভকে ঠিকমত কাজে লাগিয়ে বিরোধী রাজনীতির সামনে চলে আসা, প্রধান ফেনোমেনা হয়ে উঠা  – এটা এক খুবই বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে, যেখানে তাদের আমেরিকান সমর্থনও পাওয়ার কথা।  বাকিটা আগামিতে…।

     

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • এবার জয়শঙ্করের ‘ভেটো’ আলোচনা!

    এবার জয়শঙ্করের ‘ভেটো’ আলোচনা!

    গৌতম দাস

    ২২ আগষ্ট  ২০২২   ০০ঃ০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4dq

     

        EAM Jaishankar

    কেন শিরোনামটা এমন? ভেটো মানে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) ১৫ সদস্যের যার ১০ আসন অস্থায়ী এবং বিভিন্ন মহাদেশের কোটা থেকে দুবছরের জন্য নির্বাচিত করে নেয়া হয়। আর পাঁচ টা আসন এগুলো স্থায়ী-আসন বলা হয় শুধু তাই না এই পরিষদে আলোচনার  জন্য হাজির করা যেকোন প্রস্তাবের উপর আলোচনার আগেই এই পাঁচ সদস্যের যেকোন একজন ভেটো বা আপত্তি দিতে পারে। আর তা দিলে ঐ প্রস্তাব পাশ হওয়া দূরে থাকে ঐ প্রস্তাবই বাতিল বলে গণ্য হবে।  এই পাঁচ ভেটোধারী ও স্থায়ী সদস্য হল আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া আর চীন।  গত ২০ বছরে ভারত অনেকবার এমন ভেটোধারী সদস্য হবার চেষ্টা করেছে, আমেরিকার দ্বারা সমর্থিত হবে বলে আশ্বস্ত হয়েছে। কিন্তু বারবার সে আলোচনা চাপা পরে হারিয়ে গেছে। এবার জয়শঙ্কর যিনি এখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী – তার মুখ দিয়ে আবার প্রসঙ্গটা আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে তাঁর এক বক্তৃতার ইউটিউব ক্লিপ ভারতের মিডিয়ায় অনেক ছড়িয়েছে।

    জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে (এরপর থেকে এ’লেখায় শুধু পরিষদ লিখব) ভারতের স্থায়ী আসন বা ভেটো ক্ষমতা পাওয়ার স্বপ্ন বহুদিনের। কিন্তু স্বপ্ন দেখনেওয়ালাদেরও দুইটা ধরণ দেখা যায়। এক হল যারা স্বপ্ন দেখতেই থাকে, পেলে কী করবে সেই হিংসাতেও তাদের বুক জ্বলে কিন্তু যোগ্যতার অভাবে স্বপ্ন বাস্তব করতে পারে না।  ফলে ধান্দাবাজ লোক ধরে যাদের মিথ্যা প্রলোভনের পিছনে তারা বছরের পর বছর ঘুরেই চলে, বেখবরে। কিছু আগালো কিনা সে মুল্যায়নও করে না।
    আরেক দল আছে যারা স্বপ্ন কিভাবে বাস্তবায়িত করা যাবে এজন্য বাস্তবিক সমস্যা, বাধাগুলোকে স্টাডি করে আর একটা করে বাধা অপসারণ করে করে আগায়। তবে এরা অবশ্যই সবার আগে দেখে নেয় সেটা বাস্তবায়নযোগ্য স্বপ্ন কিনা। যদি হয় তবেই সে আগায়। এজন্য এদেরকে বলে রিয়েলিস্ট; মানে, যারা বাস্তবের চোখে দেখে স্বপ্ন বিচার করে।  কেবল স্বপ্নেই পোলাও খেয়ে চলে না!  এদুই ক্যাটাগরির বিচারে ভারত হল প্রথম ধরণের। তাই, আমেরিকার মিথ্যা আশ্বাসের পিছনের সে ঘুরতেই আছে এই ভরসায় যে আমেরিকা তাকে ভেটোক্ষমতা এনে দিবে।
    অথচ একটা সহজ ভাবনা-কল্পনায় যদি দেখি জাতিসংঘের বর্তমান ওরিয়েন্টেশন মানে যেভাবে এটা সাজানো আছে এভাবেই যদি তাকাই তাহলে দেখব একা আমেরিকা নতুন কারও কোন ভেটোক্ষমতা পাইয়ে দিবার ক্ষমতা নাই বা রাখে না। কারণ, একা আমেরিকা না, পাঁচ ভেটোসদস্যই যদি ভারতকে ভেটোক্ষমতা দেওয়ার ব্যাপারে একমত হয় তবেই তা হতে পারে। চীনসহ যেকোন এক ভেটোসদস্য আপত্তি করলেই সব শেষ। তাহলে একা আমেরিকার আশ্বাসের উপর ভারতের অপেক্ষা তো অর্থহীন!! অথচ  গত বিশ বছর ধরে এটাই ভারতের আশ্বাসের  ভিত্তি হয়ে আছে, খামোখা।

    একালের হিসাবে যদি বলি তবে প্রণব মুখার্জির আমল এই আশ্বাসের ভরসা শুরু হয়েছে। মোটামুটিভাবে ২০০৭ এর পরে মানে যখন থেকে আমেরিকা বিশেষ করে বুশের আমল শেষে ওবামা চীন ঠেকানো বা China Containment এর ঠিকাদারি ভারতকে দিতে এসেছিল।

    তাই ওবামা যখন বুশের চেয়েও বড় করে মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিল (যে ভারতের স্থায়ী আসনের দাবিকে আমেরিকা সমর্থন দিবে) প্রণবের সরকার তা বেশ জোশের ঠেলায় বাস্তবতার দিকে তাকানোর বদলে স্বপ্নে ভাসতে শুরু করে দিয়েছিল। ভারত কতদুর নিজেকে নিচে নেমেছিল, বোকা চিন্তাশুন্য বানিয়েছিল তা বুঝা যায় যখন,  ২০০৯ সালে থেকে শুরু হওয়া হাসিনা সরকার পরে প্রথম ভারত সফরে গিয়েছিল এক বছরের মধ্যে ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি। সে সফরে প্রণব মুখার্জি লিখায়ে নিয়েছিল যে বাংলাদেশও (যে ঘরকা মুরগি ফলে যত খুশি জবেহ দেয়া যায়) ভারতের স্থায়ী আসনের দাবি সমর্থন করবে! সফরের শেষে যে ‘যৌথ ঘোষণা’ বের হয় তাতে একথা লেখা আছে। অথচ বাংলাদেশের সমর্থন তো কোন রিকয়ারমেন্ট নয়!

    জাতিসংঘ কী আর কী নয় তা বুঝাবুঝিতে খামতিঃ
    সবকিছুর গোড়ায় আছে আসলে জাতিসংঘ কী আর কী নয় তা বুঝাবুঝিতে খামতি – এই বিষয়টা। জাতিসংঘ এক আজিব জিনিষ; সেটা এই অর্থে যে এটা ঠিকঠাক বুঝলে তো বুঝছেনই। আর না বুঝলে তেজপাতা; মানে সারাজীবন আমি-আপনি সব বুঝিছি ভান করেই কাটিয়ে যেতে পারব। তাতে আপনি প্রণব মুখার্জি বা জয়শঙ্কর যাই হোন না কেন!! আপনার পদ-পদবি অনেক উচুঁতে হতে পারে কিন্তু তাতেও কোন নিশ্চয়তা নাই যে আপনি জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠানটা বুঝেছেন বা বুঝবেনই! যেমন বেশির ভাগ মানুষের ধারণা এটা একটা ‘গণতন্ত্রী’ প্রতিঠান; অথচ এরা খেয়াল করেন না যে পাড়ার ক্লাবের ক্ষেত্রেও এর মেম্বারেরা সবাই-ই দেখতে সমান মনে হলেও সবাই সমান ক্ষমতার হয় না।

    প্রথমত জাতিসংঘ অবশ্যই এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু একটা দেশের পার্লামেন্টের মত সব সদস্যের সমান অধিকার, বা এক ভোট –  না জাতিসংঘ এমনটা নয়। বরং অসম ক্ষমতার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও আবার বড় ক্ষমতার রাষ্ট্রগুলোর কেউ যেন বেশির ভাগকেই নিজ দলে নিয়ে জোট পাকিয়ে অন্য আরেক বড় ক্ষমতার উপর চড়াও না হয়; এটাই জাতিসংঘ গড়ার সময়ের মুখ্য বিবেচনা ছিল। যেমন আমেরিকা যেন কমিউনিস্ট স্তালিনের সোভিয়েন ইউনিয়নের উপর কোন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কোন কিছু চাপিয়ে না দিতে পারে তা নিশ্চিত করা এমন প্রতিষ্ঠানই হল ভেটোক্ষমতার জাতিসংঘ। এটাই নিশ্চিত করার উপায়ের নামই ভেটো পদ্ধতি। যাদের “এভিন্ন” অন্যভাবে বুঝ থেকে ভুল ধারণা আছে তারা এখনই তা কারেক্ট করে নিতে পারেন। সোজাকথা জাতিসংঘ কোন সাম্যের প্রতিষ্ঠান নয়। ্তাই এর সব সদস্যের ভোটের ক্ষমতা একরকম নয়। যেমন এমন ক্ষেত্রে মানে কোন সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে কোন সিদ্ধান্ত এই পাঁচ ভেটোসদস্যের উপর চাপিয়ে দেয়া অসম্ভব।  যেমন, এমন হলে একা সোভিয়েত-ইউনিয়ন নিজের ভেটোটা প্রয়োগ করতে পারবে।  যার মানে হল, স্টালিন যা চায় না তেমন প্রস্তাব নিয়ে পরিষদে কোন আলোচনাই হবে না। সেক্ষেত্রে, আমেরিকা তখন আনা আগের প্রস্তাব চাইলে আবার তা সংশোধন করে হাজির করতে পারবে। তবে কীভাবে প্রস্তাব লিখলে পরে সোভিয়েতরা আর ভেটো দিবে না সেভাবে জেনে প্রস্তাব সংশোধন করে আবার তা উপস্থাপন করতে পারে। এভাবেই ভেটোক্ষমতা কার্যকর আছে।

    মুখ্য বুঝাবুঝির জায়গাটা হল জাতিসংঘ গড়ার উদ্দেশ্য কী ছিল, সেখানে ফোকাস করাঃ
    তাহলে জাতিসংঘ গড়ার উদ্দেশ্য কি ছিল? উপরের কথা থেকে পরিস্কার এটা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কোন ‘সাম্যের’ পার্লামেন্ট ধরনের কিছু নয়ই। এর উদ্দেশ্য ছিল ‘নেতা’ রাষ্ট্রগুলোর সক্ষমতা ও নানাবিধ চিন্তায় বিভিন্নতা থাকা সত্বেও তারা একটা ‘গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা’ কায়েম করতে পারে কিনা সেই চেষ্টা। এবং কোনমতে তারা সেতা পেরেছিল। আর এরই উদ্যোগ ও মুখ্য আইডিয়াটা ছিল মূলত আমেরিকার মানে ততকালীন টানা চারবারের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট-এর।

    তাঁর মূলকথাগুলো খুব সিম্পল। সেকালে (১৬০৭-১৯৪৫) দুনিয়া মানে চার-পাঁচটা রাষ্ট্র তারা দুনিয়ার বাকি দেশ-ভুখন্ডকে কলোনি করে রেখেছিল – আর জবরদস্তিতে শাসন ও লুট করে সম্পদ নিজ দেশে নিয়ে চলছিল। আমেরিকা এই স্টাইলে চলা দুনিয়াটার অবসান চেয়েছিল তবে নিজ স্বার্থে; মানে “দুনিয়ার ভাল হবে” ঠিক এমন কোন কারণে না। তাই এনিয়ে আমেরিকার মূল ভাষ্যটা হচ্ছে – দেশভুখন্ড ও তার বাসিন্দা কেন্দ্রিক; যেখানে আবার বাসিন্দারাই মূল ফ্যাক্টর ও নির্ণায়ক। বলা হয়েছে, “কোন ভুখন্ডের বাসিন্দারাই একমাত্র নির্ধারক হবেন যে তাদের বসবাসের ভুখন্ড কার হাতে শাসিত হবে” 

    Third, they respect the right of all peoples to choose the form of government under which they will live; and they wish to see sovereign rights and self government restored to those who have been forcibly deprived of them;

    স্বভাবতই বাসিন্দারা কেউ বিদেশি কলোনি শাসক বা লুটেরা শাসক চাইবে না। অর্থাৎ এই মূল বাক্যটাই দুনিয়া থেকে সব কলোনি শাসন উতখাত করার রাস্তা খুলে দিয়েছিল। আর এই মূল বাক্য বা শর্ত মানলে তবেই আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পক্ষ ও অংশগ্রহণ করবে; এই ছিল আমেরিকান অবস্থান। কবে থেকে কতদিন?  এখানে বলে রাখা ভাল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ১৯৩৯ সালে শুরু হলেও ১৯৪২ সালের জানুয়ারির আগে আমেরিকা তাতে কোন অংশ বা পক্ষ নেয় নাই। এনিয়ে যদিও কমিউনিস্টদের না-জানা এক প্রপাগান্ডা ব্যাখ্যা আছে। সেই অনুমিত প্রপাগান্ডাটা হল, আমেরিকা ব্যবসা করার লোভে যুদ্ধে কোন পক্ষ নেই নাই। এটা শতভাগ মিথ্যা অনুমান তা জানা যাবে যখন  পরে ১৯৪১ সালের আগষ্ট থেকে আমেরিকা বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের সাথে চুক্তি (আটল্যান্টিক চার্টার চুক্তি) করেছিল। এই চুক্তি থেকেই পরিস্কার রুজভেল্ট কেন যুদ্ধে যোগ দিতে দেরি করছিল্বেন। আর এই চুক্তি থেকেই বিশ্বযুদ্ধে জোটবদ্ধ দুই পক্ষ-বিপক্ষ স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। আবার আমেরিকার অর্থনীতিক সক্ষমতা দিকটা যদি দেখি, এর প্রায় পঞ্চাশ বছর আগেই ততদিনে সবচেয়ে বড় অর্থনীতির বৃটিশ কলোনি সাম্রাজ্যকে আমেরিকা ছাড়িয়েছে । ফলে সঞ্চিত সারপ্লাস সম্পদের কারণে যেকোনদিকে বিনিয়োগ সক্ষমতায় সে আনপ্যারালাল। তাই ঐ যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারণে অনেক আগে থেকেই আমেরিকা ছিল নির্ধারক; অথচ ১৯৪২ সালের ১জানুয়ারির আগে সে কোনদিকের হয়ে যুদ্ধে নামে নাই।

    তাই প্রথমে ১৯৪১ সালের আগষ্টে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে তিনি তাঁর শর্তে দাসখত দিতে [আটল্যান্টা চার্টার চুক্তির মাধ্যমে] বাধ্য করেন। আর আটল্যান্টা চার্টার চুক্তিই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান মিত্রপক্ষ জয়লাভ করলে পরের সেই  দুনিয়া থেকে কলোনি দখল ও শাসন চির উচ্ছেদের প্রথম দলিল। একারণেই হিটলারবিরোধী যুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ সাজানোও আসলে সম্পন্ন করা হয় ঐ একই শর্তে। এরই ফলাফল হল, সাড়ে চারমাস পরে ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি, ঐ একই দলিলের ড্রাফটে কিন্তু এবার রুজভেল্ট ও চার্চিল ছাড়াও আরো দুই দেশের প্রধানকর্তা এতে স্বাক্ষর দিচ্ছেন। এরা হলে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্টালিন আর চীনের প্রেসিডেন্ট চিয়াং কাইসেক (নতুন দুজন, ব্যক্তি হিসাবে নয় তারা প্রতিনিধি পাঠিয়ে স্বাক্ষর করেছিলেন)।  আর এই চারদেশের স্বাক্ষরের দলিলটাই হল জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণার দলিল বা ডিক্লারেশন [Declaration by the United Nations, January 1, 1942] । যদিও পরে অন্যান্য প্রায় ২১টা দেশ এতে প্রতিস্বাক্ষর করেছিল।
    এদিনে রুজভেল্ট যুদ্ধে পক্ষ-বিপক্ষের কথা পরিস্কার করেন। তাঁর পক্ষের দেশগুলোর নাম দেন “মিত্র-শক্তি” যা্দেরকে পরবর্তিতে তিনি “ইউনাইটেড নেশন্স” (UNITED NATIONS বাংলায় জাতিসংঘ) বলে চিহ্নিত করেছেন। আর বিপক্ষ অক্ষশক্তি বলতে হিটলারের জর্মানি সাথে ইটালি ও জাপান এভাবে।

    কিন্তু তখন থেকেই জাতিসংঘ কী কেন – মানে কী ভিত্তিতে এটা গড়ে উঠেছিল সেসব কথা ক্রমশ পিছনে চাপা পড়ে থেকেছে আর প্রধান হয়েছে হিটলারের বিরুদ্ধে জোট হয়েছে এই খবর। এতে জাতিসংঘের জন্মের খবর যতটুকু পড়ালেখা জানা লোকেরা জেনেছে তাও আবার তারা বুঝেছে একটা বিজনেস এসোসিয়েশন বা সমিতি যেমন [যেন একটা FBCCI] হয় তেমন কিছু এক তবে এটা যেন “রাষ্ট্র  সমিতি” বলে মনে করা হয়েছে। অথচ এর জন্ম ঘোষণা ভিত্তি সবসদস্যই মেনে নেওয়ার ভিত্তিতেই কিন্তু এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি সব সদস্যের সমান একভোট এই ভিত্তিতে নয়; বরং ভেটো পদ্ধতি।
    সবচেয়ে কেন্দ্রীয় ঘটনাটা হল, এই  জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণার ভিত্তি হল দুনিয়া থেকে কলোনি উচ্ছেদ।  আর সেই সাথে তা এই অর্থে ও শর্তে তা লেখা হয়েছে যার আরেকটা মানে হয়ে গেছে এতে রাজতন্ত্রের কোন সুযোগ নাই। সদস্য রাষ্ট্রকে রিপাবলিক হতেই হবে। কারণ দেশ-ভুখন্ড এর বাসিন্দা যারা তারা নিজেরাই কথা বলবেন, সবকিছু নির্ধারণ করবেন। ফলে কলোনি দখলদার শাসকের সাথে রাজার ভুমিকাও বাদ হয়ে গেছে। এরা কেউ না হয়ে গেছে।

    কিন্তু এত সমস্যার আরেক দিকটা খুবই জটিল হয়েছিল। তা হল সঠিক বুঝাবুঝি। এটা এমনকি জওয়াহরলাল নেহেরু যিনি স্বাধীন  ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী –  তিনিও জাতিসংঘ জন্মানোর ভিত্তিমূলক দিকটা বুঝেন নাই।  না, তাঁকে ছোট করার জন্য এটা বলা হচ্ছে না। যেমন দেখেন, এরই সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল, কাশ্মির ইস্যু। তিনি ভেবেছিলেন কাশ্মির কার – এই প্রশ্নে যেহেতু কাশ্মিরের রাজা হরি সিং নেহেরুর সাথে –ভারতভুক্তির- চুক্তি করেছেন অতএব কাশ্মির নিশ্চয় ভারতের অংশ হয়ে গেছে। এটা মনে করে তিনি এর স্বপক্ষে এই দাবির উপর  জাতিসংঘের সম্মতির সিল-ছাপ্পড় নিশ্চয় পেয়ে যাবেন মনে করে ঐ ভারতভুক্তি-পত্র জাতিসঙ্ঘের মতামত চেয়ে পাঠিয়েছেন। অথচ তিনি জাতিসংঘের জন্মভিত্তিই জানেন না যে সেখানে একটা দেশের হকদার-নির্ধারক কোন রাজা নয় বাসিন্দারা, তাদের গণ-সম্মতিকেই ভিত্তি মানা হয়েছে। ফলে নেহেরুকে ফেরত পাঠানো জাতিসংঘের রায় ছিল “কাশ্মিরে গনভোট আয়োজন করে সিদ্ধান্ত” নেওয়ার।  যা পরে তিনি কখনই এটা করেন নাই। আর সেই নেহেরু থেকে একালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর পর্যন্ত কারও জাতিসংঘ প্রতিষ্টানটা কী বৈশিষ্ঠের, কী উদ্দেশ্যের তা কখনই তাদের পড়ালেখা করা হয়ে উঠে নাই।

    সম্প্রতিকালে জয়শঙ্করের বক্তৃতার এক ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়েছে। সম্ভবত তা ভারতের কোন এক একাদেমিক প্রতিষ্ঠানের যেখানে তিনি স্টুডেন্টদের –  ভারত কবে জাতিসঘের স্থায়ী বা ভেটোধারী সদস্যপদ পাবেন – এই প্রশ্নে কথা বলছিলেন। জয়শঙ্কর আমাদের বিসিএস-ক্যাডার দেয়ার মতই ভারতের সমতুল্য ফরেন ক্যাডারের লোক; সেখান থেকে পেশাদার কূটনীতিক জীবনের অবসরে, এখন মন্ত্রী হয়েছেন।  তিনি সম্ভবত নিজেকে স্মার্টভাবে হাজির করতে চেয়েছেন। তিনি এক কড়া শব্দ প্রয়োগ করেছেন সেখানে সমালোচনায়। শব্দটা হল জাতিসংঘের “ক্রেডিবিলিটি” [Credibility] কী আছে, ইত্যাদি। এখানে ক্রেডিবিলিটি বলতে এর বিশ্বাসযোগ্যতা বা গ্রহণযোগ্যতা কী, এটা বলতে চেয়েছেন। তার মূল অভিযোগ জাতিসংঘ প্রতিনিধিত্বশীল নয়। শব্দটা অনেক কর্কশ এবং একই সাথে তার প্রতিষ্ঠানটার গঠন, উদ্দেশ্য ও ভিত্তি সম্পর্কে যে কোন ধারণা নাই সেটাও প্রকাশ করে দিয়েছে।

    প্রথমত জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠানের যে অঙ্গের কথা বলা হচ্ছে সেটা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বা সিকিউরিটি কাউন্সিল [UNSC] যেটা মূলত রাজনৈতিক বিষয়াদি দেখাশুনা করে।  শুরুতে বলেছি এটা মূলত ১৫ সদস্যের প্রতিষ্ঠান যার পাঁচটা ভেটোধারী সদস্যপদ আর বাকি দশটা অস্থায়ী (দুবছর) রোটেশনাল সদস্যপদ যা মহাদেশভিত্তিতে প্রতিনিধিত্বশীল করে বেছে পূরণ করে নেয়া হয়ে থাকে। কাজেই এটা প্রতিনিধিত্বশীল করে সদস্যপদ গড়া হয় নাই এই অভিযোগ ভিত্তিহীন।

    তবে উনি সম্ভবত বলতে চাইছেন পাঁচ ভেটোসদস্যপদ এটা প্রতিনিধিত্বশীল করে গড়া নয় বা বিতরণ হয় না। হ্যা সে কথা সত্য এবং এটা গ্লোবাল জনসংখ্যার ভিত্তিতে বা কোন প্রতিনিধিত্বশীল ভিত্তিতে বেছে পাঁচসদস্যকে দেয়া হয় নাই। আসলে তা হতেই হবে এই অনুমানই ঠিক না, এটা ভিত্তিহীন। যেমন এই পাঁচ স্থায়ীসদস্যের মধ্যে আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার কখনই কেউ নাই। [এই প্রতিনিধিত্বশীল করার দিকটা সম্পন্ন ও নিশ্চিত করা হয়েছে অস্থায়ী সদস্যপদ নেয়া বা বিতরণের বেলায়। ] আবার চীনকে নেয়া হয়েছে এর জনসংখ্যা ভারতের চেয়েও অনেক বেশি একারণেও না। কাজেই জাতিসংঘের জন্ম ইতিহাস না জেনে এমন অনেক কথাই বলা যায়।
    মূলত ভেটোসদস্যপদ দেয়া হয়েছে কারা ততকালীন সময়ে সামরিক সক্ষমতার দিক দিয়ে বড় বা পরাশক্তি এদের কথা ভেবে (তাও চীনের বেলায় সেটাও নয়)। সামরিক বা পরাশক্তি বলে বিবেচনা করতে হয়েছিল রুজভেল্ট-কে। সেটা এজন্য যে পুরা জাতিসংঘের আইডিয়াটা রুজভেল্টের। তার এই আইডিয়াটা বাস্তবায়নে এরা যাতে বাধাগ্রস্থ না করে সেকথা ভেবেই।

    সাধারণভাবে বললে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে খরচ (সোভিয়েন ইউনিয়ন-সহ সকল পক্ষশক্তিকে) এককভাবে যোগানো এমনকি যুদ্ধপরবর্তি পুনর্বাসনের শিল্প ও অবকাঠামোতে অর্থবিনিয়োগ এবং তা যুদ্ধের হেরে যাওয়া পক্ষের দেশগুলোকেও সহায়তা দেয়া সহ – দিয়েছিল আমেরিকা। সেকালের আমেরিকার একক সামর্থ ছিল বলেই তা থেকে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব পাওয়ার জন্য সব বিবেচনার উপরে উঠে যায় যা একটা কঠিন বাস্তবতা হয়ে দাড়িয়েছিল।

    আরও আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তো বটেই দুই বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই আমেরিকা দুনিয়াকে যুদ্ধের বাইরে নিয়ে যাওয়া মানে, – যুদ্ধ এড়িয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধগুলো মীমাংসার কোন উপায়, কোন রাজনৈতিক মৌলিক বক্তব্য অবস্থানের ভিত্তিতে – এক প্রতিষ্ঠান – গড়ে তুলে তা করা যায় কীভাবে এটা আমেরিকার মাথায় সবার আগে এসেছিল। তখনকার আমেরিকান সমাজ এধারণা প্রচলিত হয়ে উঠেছিল যে কোন যুদ্ধই মূলত দেশের পুঁজি বা সঞ্চিত সম্পদ ধংস করে দেয়; তাই এটা এড়ানোর উপায় খুঁজতে হবে। মনে করা হয় যে আমেরিকানরাও মূলত সাদা ককেশীয় হলেও তাঁরাও এশিয়ায় আমাদের মত এক শ্রেণীর বৃটিশ কলোনি শাসকের অধীনে শাসিত নিষ্পেষিত। আমেরিকান ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতা বলতে বৃটিশসহ অন্যান্য ইউরোপীয় কলোনি শাসকের থেকে সামরিকভাবে লড়াই করে মুক্ত হওয়া ছিল।  ফলে অন্য কাউকে কলোনি করার বিরুদ্ধে এক শক্ত অভ্যন্তরীণ জনমত পরবর্তিতে আমেরিকান-সমাজে কাজ করত, সক্রিয় ছিল। তাই ল্যাটিন আমেরিকান অনেক ছোট দেশ দুতিন বছরের বেশি পরবর্তিতে আমেরিকা সেখানে কলোনি দখল চালিয়ে রাখে নাই, বা পারে নাই। এমন ব্যাকগ্রাউন্ডের আমেরিকাি আবার  প্রচুর সঞ্চিত সারপ্লাস (আজকের চীনও যেদিকে আগাচ্ছে) ছিল বলে এটাই বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকাকে নেতৃত্বের আসনে বা কমান্ডের পজিশন সহজেই পেতে সাহায্য করেছিল।

    তা সত্বেও যে জাতিসংঘ আমেরিকা প্রস্তাব করছিল তা না মানতে চাওয়ার সামর্থ তো কেবল তখনকার বিচারে তখনও যারা সামরিকভাবে সক্ষম এমন রাষ্ট্রগুলোকেই বুঝতে হবে। এই বিচারে এদের জন্য ভেটোসদস্য পদ রাখার প্রস্তাব করেছিলেন রুজভেল্ট। যাতে সামরিকভাবে সক্ষম বা পরাশক্তি দেশগুলো প্রস্তাবিত জাতিসংঘের ভিতরেই ধরে রাখা থাকে। নইলে জাতিসংঘ আইডিয়া কখনই কার্যকর হতে পারত না।
    মানে রাখতে হবে স্তালিন ছিলেন রজভে্লটের জাতিসংঘ আইডিয়ার প্রথম বিরোধিতাকারি। তাকে ঠান্ডা করতে বা তার ভয় দূর করতেই রুজভেল্ট ভেটো আইডিয়াটা আনেন। যার মূলকথাটা হল, সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আমেরিকা যেন পরাশক্তি অন্য দেশগুলোর উপর কিছু চাপিয়ে দেওয়ার মতলবে জাতিসংঘ গড়ার কথা বলছেন না, সেটা স্পষ্ট রাখা যায়; তাদের আস্থা আসে। এই বিচারে এই পাঁচ সদস্যপদ কোন বিজনেস এসোসিয়েশন সমিতি বা এফবিসিসিআই এর মত নয়; সাম্যও নয়। বরং একেবারেই বিশেষ। এদিকটা না বুঝলে জাতিসংঘ কেন বা কীরকম তা জানা যাবে না।

    এমনকি আগামিতে জাতিসংঘের সংস্কার বা পুনর্জন্ম হওয়া অস্বাভাবিক না; বিশেষ করে গ্লোবাল নেতৃত্ব (শুধু গ্লোবাল অর্থনৈতিক না রাজনৈতিকও) বদল এলে সেটাই একমাত্র জাতিসংঘের অন্তত ওরিয়েন্টেশনে তো বটেই আরো বহু খোলনলচেও বদল আসাটা অসম্ভব নয়।  তবে ভারত সবসময় যে কল্পনাটা করে এসেছে তাতে ধরে নেয়া থাকে যে আমেরিকা আজীবন যেন নেতা আছে থাকবে। ফলে জাতিসংঘের (কোন সংস্কারেও) আসন বন্টনের ক্ষমতা যেন আমেরিকার একচেটিয়া সম্পত্তি হয়ে থাকবে!!! যেটা এখনও না, আগামিতেও হবে না।
    সে যাই হোক, জাতিসংঘের কোন নিয়মটা কেন ওরকম বা সেরকম তা বুঝতে চাইলে জাতিসংঘ জন্মকালীন পটভুমিতে রূজভেল্ট কী কী ব্যবহারিক সমস্যার মোকাবিলা করে আগাতে হয়েছে তা বুঝতেই হবে। নইলে কোনকিছুই বুঝা প্রায় অসম্ভব! এমনকি আগামিতে জাতিসংঘের কোন পরিবর্তনে কী কী হতে পারে সে তা ইমাজিন করা সহজ হবে!!
    আবার পুরানা কথায় ফিরে যাই।  মুলকথা, সেকালে রুজভেল্ট ভেটোসদস্যপদ দিয়েই রাশিয়া, বৃটেন, ফ্রান্সকে রাজি করিয়েছিলেন। ফলে আগামি দিনেও এমন কতকিছু দিয়ে হয়ত চীনকে প্রতিদ্বন্দ্বি বা সহযোগীদেরকে সামলাতে হতে পারে।
    আবার লক্ষ্য করতে হবে সেকালে আমেরিকাকে মানে রুজভেল্টকে  চীনের ব্যাপারটা  আলাদা করে বিশেষ সুবিধা দিতে চেয়ে আলাদাভাবে চেয়ে নিতে হয়েছিল। সেক্ষেত্রে রুজভেল্টের যুক্তি ছিল তিনি এশিয়ায় হিটলারের একমাত্র বন্ধু  জাপান যে পরাজিত করেছেন বটে তা হয়ে গেলেও এর পুনরুত্থান ঘটতে পারে বলে আমেরিকা ভীত ছিলেন। আর কলোনি দখলদার জাপান ছিল উভয় কোরিয়া আর চীনের (কিছু অংশের) দখলদার। তাই বিশ্বযুদ্ধ পরের পরিস্থিতিতে জাপানের বিপরীতে চীনকে এক বিশেষ শক্তি হিসাবে উঠিয়ে আনতে রুজভেল্ট  এশিয়ার একমাত্র চীনকে ভেটোসদস্যপদ দিতে বাকিদের রাজি করিয়েছিলেন। যদিও কাজটা কঠিন ছিল না কারণ –  রাশিয়া, বৃটেন, ফ্রান্স এরা নিজেরা নিজেদের ভেটোসদস্যপদ পাবার পরে আর কোনদিকে আপত্তি তুলতে আর আগ্রহি ছিল না।

    তাই জন্মগঠন ইতিহাস সে সময়ের পরিস্থতি ও বিবেচনার ফ্যাক্টরগুলো কী কী ছিল তা না জেনে একালে জাতিসংঘের বিরুদ্ধে তো অনেক কথা বলাই যায়। তাতে জয়শঙ্করের মত দেশের ভিতরের  অনেক হাততালিও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এগুলো আসলে নিজেরই অজ্ঞতা আর ইতিহাসবোধের অভাবই নির্দেশ করে এমন হয়ে যেতে পারে।

    তবে, এককথায় বললে, আমেরিকা বা রুজভেল্টের সঞ্চিত সম্পদ ব্যয় করার সক্ষমতা মূলত এটাই আমেরিকার হাতে দুনিয়া নতুন করে উঠে দাড়াতে ও আমেরিকান বক্তব্য গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল।

    তাই আজকের মোদির ভারতের জয়শঙ্করের জন্য একটাই বিকল্প হল, ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দেখানো। এটাই একমাত্র তাদের ভারতের ইচ্ছামত এক নয়া জাতিসংঘ তারা গড়ে নিতে পারলে হয়ত পারতেও পারে। আবার তখনকার “বাকিরা” তাতে রাজি হবে কিনা তাদেরকে রাজি করাতে ভারতকে কী কী নয়া প্রস্তাব দিতে হবে সেজন্যও ভারতকে বা জয়শঙ্কদেরকে রেডি থাকতে হবে। এরপরে তখন হয়ত তারা বুঝতে পারবেন কেন স্থায়ী ভেটোসদস্যপদগুলো দেশের ‘জনসংখ্যা আনুপাতিক’ ভাবে বেছে নেওয়া হয় নাই।

    আবার ধরেন,  না-বুঝা লোকেদের নিয়ে চলতে সমস্যা অনেক। জয়শঙ্কর অনেকবার ঐ বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন ভারত তৃতীয় বড় অর্থনীতির দেশ। একবার বলেছেন “এমন একদিন আসবে”। সেটা আসুক আগে, তাই না!!! এপর্যন্ত ইকোনমিক বা স্টাটিস্টিক্যাল ডাটা নিয়ে স্টাডির ফোরকাস্ট হল সেটা ২০৫০ সাল নাগাদ হলেও হতে পারে। তাহলে এর ত্রিশবছর আগেই এজন্য হুড়োহুড়ি কেন?

    আবার মোদির বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা সর্বনিম্ন। এটা ভারতের মুসলমান কুপিয়ে কতটা কী ঢেকে রাখা যাবে? ভারতের “হিন্দুত্ববাদ” এই রাজনীতিই এটা চলতে থাকলে তা ভারতকে যতটুক্তু সম্ভাবনা আছে সেতাও হতে দিবে না।  বারবার এমন কোন অর্থনৈতিক লক্ষ্য পূরণ হতে দিবে না।

    আবার এটাকে তামাসাই বলতে হবে যে, জয়শঙ্করেরও ধারণা আমেরিকার সমর্থনে তিনি ভেটোক্ষমতা পেতে চান বা পাবার উপায় দেখেন। এটাও জাতিসংঘ না বুঝার আরেক প্রমাণ। কারোণ বর্তমান এই জাতিসংঘের মধ্যে চীনের হাতে ভেটোক্ষমতা আছে ফলে আমেরিকার যেকোন সমর্থনের বিরুদ্ধে চীনা এক ভেটো ভোটই সব আশা ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এটা তো জয়শঙ্করের না বুঝার কিছু নাই?? যার মানে  ভারতকে কেবল আমেরিকাই না অন্তত চীনের কাছেও প্রিয়পাত্র হতে হবে। কিন্তু ভারত তো মনে করে নিজেকে নিজে নিজেই “পরাশক্তি” ঘোষণা দিয়েই সব সমস্যা মোদি মোকাবুলা করতে পারবেন।

    অতএব জয়শঙ্করের ভারতের প্রথম কাজ হল, জাতিসংঘের জন্ম উত্থান নিয়ে স্টাডি করা। সাথে অন্তত ১৯৩৩-৪৫ এই সময়কালে পাশ হওয়া আমেরিকান আইন যেগুলো গ্লোবাল প্রভাবের জন্য তৈরি হয়েছিল, সেগুলো নিয়ে স্টাডি করা। এর আগে চাপাবাজির মুখ খুললে বারবার বেইজ্জতি হতে হবে!!

    গ্লোবাল নাকি জিওঃ
    এটা আসলে হল, গ্লোবাল ফেনোমেনাকে না বুঝতে পেরে একে জিও বলে ডাকাডাকি!!
    এলেখায় অনেকবার “গ্লোবাল” শব্দটা ব্যবহার করেছি। এর অর্থ-তাতপর্য বুঝতে হবে। এই শব্দের উত্থান হয়েছে ১৯৪৫ সালের পরে।  আর ব্যতিক্রম কিছু ছাড়া প্রায় সবাই গ্লোবাল শব্দটার (যেমন গ্লোবাল পলিটিক্স বা গ্লোবাল ইকোনমি ইত্যাদির) বদলে ব্যবহার করে জিও (geo) যেমন জিও পলিটিক্স  শব্দটা ব্যবহার করে থাকে। আবার বুঝা যায় তারাও এই ব্যবহারে সন্তুষ্ট না, এক অস্বস্তি আছে তাদের মধ্যে।
    এক। উতপত্তি কাল হিসাবে দেখলে জিও-এই ধারণার উদ্ভব ও চর্চার শুরু (১৯১৮-৩৯) মানে দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়টাতে। এটাই ব্রিটানিকার ধারণা অনুসারে।
    আর এর বিপরীতে আইএমএফের জন্মের (১৯৪৪) পরেই কেবল সম্ভব হয়েছে গ্লোবাল পলিটিক্স বা গ্লোবাল ইকোনমি ইত্যাদি ধরণের ধারণাওগুলোর।

    জিও দিয়ে যেকোন ধারণা (যেমন জিও-স্ট্রাটেজি বা জিও-পলিটিক্স) এদের মুল বক্তব্য জিও মানে কোনদেশের ভৌগলিক অবস্থান যখন ফ্যাক্টর, নির্ধারক উপাদান। এজন্যই জিও [Geo-, জিওগ্রাফি থেকে]। এসবই হল জিও+ ।
    আর আইএমএফ এর জন্ম মানে হল গ্লোবাল বা দুনিয়াব্যাপী যখন বাণিজ্য সম্ভব হয়েছে – ফলে গ্লোবাল অর্থনীতি বলে কোন ধারণার উদ্ভব ঘটেছে। শুধু তাই না। যখন গ্লোবাল অর্থনীতির কারণে সবকিছুর গ্লোবাল ভার্সান দেখতে পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

    কাজেই গ্লোবাল ধারণার বিকল্প কখনই জিও+ (জিও-পলিটিক্স)  হতেই পারে না।

    আর সবশেষে আসল সত্যি কথাটা বলে ফেলা যাক। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে আমেরিকান নেতৃত্বের কারণে সবকিছু গ্লোবাল হয়ে উঠতে চাচ্ছে। ততদিন এর বাধা ছিল দুনিয়াজুড়ে থাকা কলোনি দখল-শাসন সম্পর্ক। যেটাকে একমাত্র আমেরকাই উচ্ছেদ করে দিয়েছে; বাধ্য করেছে। আসলে (১৯১৮-৩৯) মানে দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়টাতে – এটাই ছিল আসলে দুনিয়া গ্লোবাল হয়ে উঠা, গ্লোবালি সম্পর্কিত হয়ে উঠার (গ্লোবাল বাণিজ্যের মাধ্যমে) আগমন বার্তা দেওয়ার কাল। আর সেটাকেই না বুঝতে পেরে ভুল করে জিও বা ভৌগলিক অবস্থান ফ্যাক্টর বলে মনে করা হয়েছিল। এককথায় তাই,  জিও বা ভৌগলিক অবস্থান ফ্যাক্টর বলে অনুমান এটা এক ভুল ধারণা। “গ্লোবাল” ফেনোমেনাকে বুঝতে না পারার খামতি। ভবিষ্যতে বিষয়টা নিয়ে আরো বিস্তার করে লিখার আগ্রহ রেখে আপাতত শেষ করছি।

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • অর্থমন্ত্রীর কথিত সাক্ষাৎকার, ভারতের হাতে ব্যবহৃত!

    অর্থমন্ত্রীর কথিত সাক্ষাৎকার, ভারতের হাতে ব্যবহৃত!

    গৌতম দাস

    ১৫ আগস্ট ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4cM

     

         Chinese loans: Developing countries must ‘think twice’

    গ্রামদেশে একটা শব্দ চালু আছে “ভাঙরি” দেয়া; মানে বিয়ে ভাঙরি দেয়া বা বিয়ে ভেঙে দেয়া। এর মানে, গ্রামের কোনো দুই পরিবারে হয়ত বিয়ে ঠিক হয়েছে; প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু সব গ্রামে কিছু লোক থাকে যাদের কাজ হল, বিয়ে ভাঙরি দেওয়া। হতে পারে, তাদের বেশির ভাগ নিজের জীবন নিয়ে প্রচণ্ড হতাশ। হতে পারে তারা অবিবাহিত বা চিরকুমার ধরনের যাদের বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে, তাই জীবনের আশা দুর্বল। এরা ছেলের পরিবারে গিয়ে রটায় মেয়ের চরিত্র খারাপ অথবা মেয়ের পরিবারে গিয়ে বলে, ছেলের আগে একবার বিয়ে হতে গিয়েছিল বা হয়েছিল – এ ধরনের গল্প-গুজব ছড়ানো এদের কাজ!

    ভারতের এখনকার অবস্থা এই হতাশ ভাঙরি দেয়া মানুষের মত। উঠেপড়ে লেগেছে ‘চীন কত খারাপ’- সত্য-মিথ্যা যেভাবে পারে, তা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কান ভারী করতে। আর ভারতীয় মিডিয়া এই প্রপাগান্ডার উপর ভর করেই দেশ এক দেশপ্রেম-জাগরণের জোশ রচনায় অস্থির হয়ে উঠেছে।  আবার আমাদের সরকারও সময়ে প্রলোভনে পড়ে ভারতের প্রপাগান্ডা শুনতে চাওয়ার ভান করতে গেছে – “যদি কিছু লাইগা যায়” ভেবে। মূলত চুরির অর্থ ডলারে পাচার করতে গিয়েই এই ডলার সঙ্কট যা থেকে এক চরম অস্থির-অনিশ্চয়তা আমাদের অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে। আর তাতে অসহায় বোধ করে সরকার কোথায় কী পাওয়া যায় যেন সব উলটা দেখতে চাইছে; অথচ আগেই জানে ওখানে কিছু পাওয়া যাবে না।

    ঘটনা হল, আমাদের সরকারের অর্থমন্ত্রী এ এইচ এম মুস্তফা কামাল কথিত এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ফাইনান্সিয়াল টাইমস [Financial Times, (FT)] পত্রিকাকে। সেখানে তিনি চীনা ঋণ কত খারাপ ও কেন বিপজ্জনক, তা বর্ণনা করেছেন বলে দাবি করেছে পত্রিকাটা। FT বা এফটি-এর গত ৯ আগস্ট প্রকাশিত ওই রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী চীনা বেল্ট ও রোড ঋণ নেয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন’ [Bangladesh’s Finance minister warns on Belt and Road loans from China]। এটা মনে করার ‘যথেষ্ট’ কারণ আছে যে, এই কথিত রিপোর্টের সাথে ভারতের ইন্টেলিজেন্সের সংশ্লিষ্টতা আছে। কারণ পরের দু’দিন ধরে ভারত এই কথিত রিপোর্ট-কে দিয়ে দিনরাত তার চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা চালিয়েছে। যেটা একটা দেশের পরিচালকদের যারা মানসিকভাবে সুস্থ তাদের পরিচালিত কোন কাজ ও তার নীতি-পলিসি হতে পারে না।

    ভারতে অন্তত দশটা পত্রিকায় [ economic Times India ,  AsiaFinancial ,   Swarajyamag , Hindustantimes ,  market.businessinsider , Newsonair , Theweek , Wionews ,  Sentinelassam , NewsBharati , Statecraft , News18 , OWSA , ANI  ……….. আরও আছে] ছেপে মিথ্যা প্রপাগান্ডার মাতম তুলে ফেলেছে।

    সবগুলো নিউজই একই Financial Times  এর বরাতে ছাপা হয়েছে যদিও সেসবের ভাষ্য, নতুন আরো শব্দ ঢুকানো বা লেখার ভলিউম ছোটবড় করা অথবা শিরোনাম আলাদা করা বা নয়া শব্দ ঢুকানো ইত্যাদি করা হয়েছে; যার মূলকথা হল, রিপোর্টটা স্পষ্ট করে চীন কত খারাপ, চীন বিভিন্ন দেশকে “ঋণের ফাঁদে” ফেলে আয় করে চলা একটা দেশ যেন এই টাউটারি-ই চীনের প্রধান আয়ের উতস আর এছাড়া , শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটে চীন দায়ী – এসব অর্থ করে এভাবে সাজিয়ে লেখা।
    এভাবে পরবর্তীতে ভাষ্যগুলোর লিড আসে হিন্দুস্তান টাইমস থেকে [Bangladesh minister warns against China’s BRI lending, cites Sri Lanka’s example]। যেখানে শিরোনামের সাথে এবার বাড়তি শব্দ যোগ করা হয়, ‘শ্রীলঙ্কার উদাহরণের পরিপ্রক্ষিতে’ বা cites Sri Lanka’s example – এ বাড়তি শব্দগুলো। আর দশ তারিখ বিকালে বাংলাদেশের ‘মানবজমিন’ পত্রিকাও হিন্দুস্তান টাইমসের ভাষ্যটার বাংলা অনুবাদ করে ছাপে। মানে যেন ঘর পোড়ায় আলু পোড়া দিয়ে কিছু পয়সা কামানোর সুযোগ কেউ ছাড়ে নাই।

    এফটি [FT]-এর রিপোর্ট ছাপা হওয়ার পরে, প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পরে অর্থমন্ত্রী ও তার মন্ত্রণালয় এবার এক রিজয়েন্ডার [rejoinder] বা প্রতিবাদলিপি পাঠান; যা এমরা ১১ আগস্ট সন্ধ্যার পরে একমাত্র টের পাই। কিন্তু মন্ত্রীর প্রতিবাদলিপির ঠিক-ভাষ্যটা কী তা তখনও জানা যায় নাই। কেবল বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল একপ্রেস পত্রিকা একটা সংক্ষিপ্ত ভাষ্য পাওয়া গেছিল। ফাইন্যান্সিয়াল একপ্রেস ওই রিপোর্টে জানায়, মন্ত্রী এক প্রতিবাদ দিয়েছেন যা তারা জেনেছে, “এক অফিস-কর্তার (অনুমান করছি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাউকে বুঝিয়েছে) কাছ থেকে যে বিষয়টা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল [‘the official aware of the rejoinder told the FE.’]“। অর্থাৎ এর সোর্স তখনও খুবই দুর্বল।

    তবে এর পরের দিন ১২ আগস্ট ভোরবেলা বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টার একটু আগে, FT এবার অর্থমন্ত্রীর ওই প্রতিবাদলিপির মূল ভাষ্য প্রকাশ করে। অর্থাৎ আরো প্রায় ১২ ঘন্টা পরে, এর আগে পাবলিকলি কেউ জানতে পারে নাই যে প্রতিবাদলিপিতে কী ছিল। ্কিন্তু এতেই ভারতীয় সকল মিডিয়া আন-মুভড থাকে। মানে কেউই তাদের মিথ্যা প্রপাগান্ডা বন্ধ করে নাই। মানে  ১২ আগস্ট সারা দিন ভারতীয় পত্রিকাগুলো যারা এফটি-এর বরাতের নামে খবর ছেপেছিল এই প্রতিবাদলিপির কথা তারা সবাই চেপে গিয়েছে। এমনকি প্রভাবশালী দ্য প্রিন্ট; যার প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্ত যিনি নিজে নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন আর সাথে ঐ লেখার এক ভিডিও ক্লিপ-ভাষ্য তিনি নিজে তৈরি করে ইউটিউবে প্রচার করে থাকেন। তিনিও এফটি বরাতে কিন্তু হিন্দুস্তান টাইমসের ভাষ্যটার ওপর ভিত্তি করে তার ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করেছেন। সেটা চালিয়ে গেলেন প্রতিবাদ আসার পরেও; যা একটি খাসা চীনবিরোধী “দেশপ্রেমিক” ভারতের প্রপাগান্ডা হয়েছে অবশ্য। অর্থমন্ত্রীর প্রতিবাদলিপিটা ছাপানোর বদলে শেখর গুপ্ত বরং তার প্রপাগান্ডা ক্লিপটাই ১২ আগস্ট সারা দিন প্রচার করে গিয়েছেন, এমনই দেশপ্রেমিক তিনি!!!

    কী ছিল মন্ত্রী প্রতিবাদলিপিতেঃ
    সার কথায় তিনি লিখেছেন, এরিপোর্টে “মন্ত্রীর প্রকৃত অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেনি” [does not properly reflect the minister’s actual position.]। কিন্তু মন্ত্রীর ‘প্রকৃত’ অবস্থানটা কী ছিল তাহলে? পরের প্যারায় মন্ত্রী প্রতিবাদলিপিতে লিখছেন, ‘The report mentioned Sri Lanka’। মানে যেন তিনি না রিপোর্টটা শ্রীলঙ্কার কথা এনেছে!! তাই কী? এমরা নিশ্চিত নই। যদিও এরপর মন্ত্রী শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণ উল্লেখ করেছেন।    উল্লেখ করে বলেছেন – যে (মূলত) “সভরেন লোন নেয়ার কারণে গত মে মাসে শ্রীলঙ্কা ডিফল্টার হয়ে গেছে এবং পরে আইএমএফ এর সাথে চুক্তিতে গিয়েছে”। মন্ত্রীর এই দাবিটা সত্য। আর মন্ত্রী তাই এখন দাবি করেছেন এই রিপোর্ট লিখেছে, বিআরআই (চীনা বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ লোন) লোনের কারণে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সঙ্কট চরম খারাপ হয়ে গেছে’- এটা তিনি বলেন নাই। অর্থাৎ চীনা লোনের কারণে শ্রীলঙ্কা ডিফল্টার হয়েছে এটা বলেন নাই; বরং আসলে ‘সভরেন ঋণের কারণে সমস্যা হয়েছে’।

    পরের প্যারায় মন্ত্রী বলছেন, ‘ চীনা লোন নেওয়ার ব্যাপারে (কাউকে) তিনি সতর্ক করেন নাই”। এ ছাড়া সবশেষে তিনি একটা তথ্যের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘২০২১ সালের হিসেবে আমাদের মোট বিদেশী ঋণ ৫১ বিলিয়নের মধ্যে মাত্র ৪ বিলিয়ন হচ্ছে চীনা লোন।’

    অর্থাৎ মন্ত্রী বলতে চাইছেন, বাংলাদেশের কোনো অর্থনৈতিক ক্রাইসিস চীনা লোনের কারণে নয়।
    তবে বাংলাদেশের টিবিএস পত্রিকা তারাও মনে করে মন্ত্রীর বক্তব্য  বদলানো (ডিস্টোর্ট distort) করা হয়েছে। তারা লিখেছে, “London-based daily Financial Times (FT) published a report recently distorting statements made by Finance Minster“। তাদের রিপোর্টের প্রথম বাক্য হল এটা। 

    মন্ত্রীর এ প্রতিবাদলিপিতে আমাদের প্রাথমিক মন্তব্যঃ
    দেখা যাচ্ছে এফটির রিপোর্টার হেরেও হার মানতে রাজি নয়। তিনি প্রতিবাদলিপিটা ছাপবার সময় একটা নয়া শিরোনাম দিয়েছেন, Letter: Why Bangladesh minister is phlegmatic on BRI loans , যেখানে একটা বাঁকা শব্দ তিনি ঢুকিয়েছেন – phlegmatic। অক্সফোর্ড যে শব্দের অর্থ করে আবেগশুন্য unemotional, মানে এক উচ্ছ্বাসশুন্য অবস্থা।  মানে বিআরআই ঋণ নিয়ে মন্ত্রী আবেগশুন্য কেন? এধরণের একটা ভাব বা বক্তব্য এর লেখক বেঞ্জামিন পারকিন দিচ্ছেন। এটা অন্যায় ও অসততা। কারণ প্রথমত একজন মন্ত্রী বলছেন তার কথা বিকৃত বা ডিস্টোর্ট করা হয়েছে। যেটা Financial Times (FT) ও এর রিপোর্টারের জন্য খুবই অসম্মানজনক অভিযোগ। যেটা আসলে বলা হচ্ছে এই পত্রিকা ও এর রিপোর্টার অসৎ ও বিশ্বাস করা যায় না- ইন্টিগ্রিটির অভাব আছে। যেটা একটা মারাত্মক অভিযোগ। অথচ রিপোর্টার সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে ফাজলামো করছেন। কেন? এইক রিপোর্ট-টা ইংল্যান্ডের এই অর্থনৈতিক দুর্দিনে কেউ পয়সা দিয়ে করিয়েছে??? তাই মন্ত্রীর এত মারাত্মক অভিযোগ শুনেও এক ইউরোপীয় মন অনড়, প্রতিক্রিয়াশুন্য??? তিনি তো অন্তত বলবেন যে মন্ত্রীর অভিযোগ সত্য না!!! নাকি??? সত্যি এটা এক অদ্ভুত সাংবাদিকতা!!!

    কিন্তু মন্ত্রীর এ প্রতিবাদলিপি-ও যেসব প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেঃ
    ১। প্রথমত এ প্রতিবাদলিপিতে এটা এখন সন্দেহতীতভাবে পরিষ্কার যে, মন্ত্রী এফটি-এর সাথে কথা বলেছেন যেটাকে তারা ইন্টারভিউ বলছে।

    ২. কিন্তু কোন দেশের মন্ত্রী সাক্ষাৎকারে বা সাংবাদিকের সাথে আলাপে কোনো একাডেমিক বা ইন্টেলেকচুয়াল আলাপ কথোপকথনে লিপ্ত হন না, হওয়ার কথা না। এটা তার করণীয় কাজ বা সাবজেক্ট না, এখতিয়ারও না। ফলে শ্রীলঙ্কা কেন সঙ্কটে ডুবেছে এ প্রসঙ্গে তিনি কথা বলবেন কেন? শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের মন্ত্রীর এক্তিয়ারের বাইরে – এটাও কী মন্ত্রী জানা নাই? শ্রীলঙ্কা এনিয়ে কোন আপত্তি বা ব্যাখ্যা চেয়ে বসলে তো আমাদের সরকার কঠিন বিব্রত হবে, মাফ চাইতে হবে??   মন্ত্রী বড়জোর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে কথা বলবেন। এটাই তার এখতিয়ার। বাংলাদেশে চীনা লোন নিয়েও কথা বলবেন যতটুকু একটা বিদেশি মিডিয়ার সাথে কথা বলার সময় মন্ত্রী হিসেবে তাঁর এখতিয়ার। তবুও সাবধান যে সেটাও – শ্রীলঙ্কা চীনের ঋণ নিয়ে ডুবেছে কিনা – এ বিষয়ে কোনো জবাব না দিয়ে, এড়িয়ে যাওয়া বক্তব্য হতে হবে। শ্রীলঙ্কায় তাদের সমস্যা কার জন্য কী হয়েছে, এর ব্যাখ্যা দেয়ার কাজ আমাদের মন্ত্রীর কোনভাবেই নয়। কোন বিদেশী সাংবাদিক তাকে তবু যদি উস্কানিতে শ্রীলঙ্কা চীনের লোনে ডুবেছে কিনা – এনিয়ে মন্তব্য জানতে চায় তাহলে, অর্থমন্ত্রীর উচিত হবে, ঠাণ্ডা মাথায় ভদ্রভাবে ঐ সাংবাদিককে বিদায় করে দেয়া। আর সাংবাদিককে মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে যে, তিনি অর্থমন্ত্রী –  বাংলাদেশের কোনো পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল না; তাই রিপোর্টার যদি আরও  প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন না করতে পারেন বা প্রশ্ন না থাকলে তিনি কথোপকথন শেষ করবেন। কিন্তু জানা যাচ্ছে, মন্ত্রী সেটা করেননি, সাংবাদিকের সাথে মেতেছিলেন। আর রিপোর্টার নির্লজ্জের মত তাঁকে বিক্রি করে দিয়েছে!!

    ৩। বাংলাদেশের চলতি সরকারের একটি নিয়মিত সমস্যা দেখা গিয়েছে যে, কেন সে চীনের সাথেও সম্পর্ক রাখছে তা ভারতকে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া। তবু এই কান্ড যদি সরকার টু সরকার পর্যায়ে হয় যেখানে ফরমাল-ইনফরমাল বহু দিকেই আলাপ হয়ে থাকে যা স্বাভাবিক, সেখানে এমন কিছু হতে পারে। কিন্তু পাবলিকলি বা প্রকাশ্যে মিডিয়া-সাংবাদিকতায় এ্টা একেবারেই কাম্য নয়। কেননা তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ভারতকে ট্যাক্স দিয়ে আমাদের যেন চলতে হচ্ছে!!!

    ভারতও প্রায়ই এমন দাবি করে থাকে যে, তার পড়শি দেশগুলো যেন ভারতের নিজ বাসার পিছনের বাগানবাড়ি সে দেশগুলো যেখানে ভারত ইচ্ছামতো হাত ঢুকাতে পারে, ফুল তুলে আনতে পারে ইত্যাদি। [এনিয়ে আমার পুরানা কয়েকটা লেখা আছে যার একটা লেখা “এক মফস্বলী জেনারেল” দেখা যেতে পারে।] এই ধারণার আদিগুরু হলেন জওয়াহের লাল নেহরু। তিনি মনে করতেন মানে ভাব করতেন, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে ফিরে গেলেও ওর বদলে তখন থেকে নেহরু হলেন রানীর নয়া ‘ভাইসরয়’ বা প্রতিনিধি। ফলে ভারতের পড়শি দেশ যারাও ভারতের সাথে বা অংশ হয়ে ব্রিটিশ কলোনির অংশ ছিল, কিন্তু এখন এসব স্বাধীন দেশ হলেও সেই সূত্রে নেহরুর নয়া “কলোনি-অধীনস্থতা” তাদের মানতে হবে।

    ভারত এ কথাগুলোই রিপিট করা শুরু করেছিল যখন চলতি শতকে চীনা অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়ে যাওয়াতে এশিয়া-আফ্রিকা সবখানেই এর চীনা প্রভাব বাড়ছিল। ফলে  ভারতের পড়শি দেশগুলোর উপরও চীনা প্রভাব স্বাভাবিকভাবে বাড়ছিল। কিন্তু ভারত চীনের মতই পালটা নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা দিয়ে না, যে মুরোদ তার এখনো হয় নাই তাই, বরং নেহরুর সামন্ত-কলোনি স্টাইল দিয়ে কিছু করার খামোখা চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর আমাদের সরকারের নিজ দুর্বলতার কারণে বিদেশী সাংবাদিক বা ভারতীয় সাংবাদিক পেলেই তাকে তোষামোদ করতে চেষ্টা করা থেকে এসব সমস্যা তৈরি হয় বলে অনেকে অনুমান করে। খুব সম্ভবত এমন কিছুর ফ্যারে পড়েই মন্ত্রীর এই বিপর্যয়!

    ৪।  তবে কোন সূত্রে (FT)এফটির প্রতিনিধি অর্থমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছাতে অ্যাকসেস বা প্রবেশ-অনুমতি পায় ও কথা বলতে পেরেছিল সেটা এক বিরাট কৌতুহল ও রহস্য। অবশ্যই। কারণ মন্ত্রী এই সাংবাদিকের সাথেই চীন কেমন, শ্রীলঙ্কার সঙ্কটে চীনা ঋণের স্বভাব খাসলত কেমন ইত্যাদি যেন এটা তাদের খোশগল্প-আলাপের সাবজেক্ট ছিল, মন্ত্রী সে আলাপ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে করেছেন! আর এমন বিশেষ আগ্রহ বিচার করলে এটা তো ভারতের পলিসি যে চীনকে এক দানব বলে তুলে ধরতে চায়। এছাড়া যেন এই চীন এমন যে, যার বাসার ভাত চড়ে অন্যদেশকে ‘ঋণের ফাঁদে ফেলে – বিভিন্ন দেশ থেকে লুটে আনা পয়সায়’!
    কাজেই Financial Times (FT) সাথে অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎ দেয়ার পেছনের ঘটনার সাথে ভারত আছে, তার ইন্টেলিজেন্স আছে এমন অনুমান প্রবল। বিশেষ করে, বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর মুখ দিয়ে চীনা ঋণের বিরুদ্ধে বলানো, আর এরপর সেটাকে আরেক দফায় ভারতের আরো দশটা পত্রিকায় আরো কঠোর চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা ভাষ্য হিসাবে দ্রুত উপস্থাপন যেখানে আবার সেন্ট্রাল রোলে হিন্দুস্তান টাইমসকে রাখা- এ এক বিরাট খবর ম্যানিপুলেশন, প্রপাগান্ডা-হিন্দুত্বের জাতিবাদী চীনবিরোধী জোশ তৈরি করে ভারতের এক মহা-প্রপাগান্ডা তৎপরতা অবশ্যই!  সেটা ভারত করলে করুক যা ভারত আর চীনের ব্যাপার; কিন্তু ভারত এই প্রপাগান্ডা করেছে আমাদের অর্থমন্ত্রীর কাঁধে বন্ধুক রেখে। যেটা অবশ্যই আমাদের সবার জন্য বদারিং পয়েন্ট! এটা ইনসাল্টিং; বিব্রতকর! তাতে এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, তিনি চীনা ঋণের নিন্দা করেন আর নাই করেন তার চেয়ে বড় ঘটনা হল, তিনি ভারতের হাতে ব্যবহৃত হয়ে গেছেন। এবং সেটা জেনে বা না-জেনে!

    ৫। এফটির রিপোর্টের শিরোনামে একটি শব্দ হল, ‘বিআরআই’ [BRI] লোন মানে বেল্ট-রোড প্রকল্পের লোন। অর্থাৎ এখানে ধরে নেয়া হয়েছে চীনা লোন মানেই যেন তা বিআরআই!  না, তা একেবারেই না। এটা ভারতীয় অনুমান এবং এটা মিথ্যা অনুমান। এর কারণ যখন বেল্ট-রোড প্রকল্প যার শুরুতে ২০১৩ সালে নাম ছিল ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড; আগে কয়েক বছর তা চলার পরে ২০১৭ সালে বিআরআই [Belt road Initiative] নাম দিয়ে সম্মেলন ডাকা হয়েছিল কেবল তখনি ভারত বিআরআই প্রকল্পের প্রকাশ্য বিরোধিতায় নেমেছিল। ভারতকেও দাওয়াত দেয়া হয়েছিল আর তাতে অপারগতা প্রকাশ করতে গিয়ে ভারত প্রথম তার বিরোধিতা প্রকাশ্যে এনেছিল। কাজেই সবকিছুকে  ‘বিআরআই’ বলে হাজির করা নিজের ঘৃণা-বিরোধিতা প্রকাশ এটাই তো ভারতের অবস্থান!
    আরেক মজার দিক হল, মোদির ভারতে কি চীনা অবকাঠামো ঋণ নেই? মোদি মূলত ২০১৪ সালের আগে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ই চীনা সখ্যতা, চীনা অবকাঠামো ঋণের পথ খুলেছিলেন। আর সেটাই তিনি প্রধানমন্ত্রী হবার পরে বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। কাজেই চীনা অবকাঠামো ঋণ  অবশ্যই আছে; মোদির প্রথম পাঁচ বছরে এ সখ্যতা ছিল ঘোরতর। ভারতের রেলওয়ে আধুনিকায়ন (স্টাফ ট্রেনিংসহ), এছাড়া ভারতের অন্তত পাঁচটা শহর আধুনিক অবকাঠামো নতুন করে গড়ে দেয়াসহ আরো অনেক অবকাঠামো প্রকল্প সেখানে নেয়া ছিল। কিন্তু বিআরআই বিরোধিতার পর থেকে ভারতে চীনা ঋণ বিষয়ে সব পাবলিক ইনফরমেশন সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে এখানের জন্য সার কথা হল, চীনা ঋণ মানে বিআরআই নয়। যেমন বাংলাদেশের বেশির ভাগ লোন বরং নন-বিআরআই।  যদিও কোনো নন-বিআরআই লোন পরে বিআরআই হিসেবে উভয়পক্ষ মেনে নিয়েছে এমনও হয়েছে। আবার পদ্মা সেতুকে বিআরআই বলে দেখাতে রাজি হননি হাসিনা।
    আবার যদি আরেকটু আগাই তবে  চার দেশীয় চীনের কুনমিং-বার্মা-(কক্সবাজার) ঢাকা-কলকাতা [BCIM] যে রেলপথ পরিকল্পনা ছিল সেটা এখন সেভাবে নাই, পরিত্যক্ত। এর বদলে সেটা এখন কুনমিং-বার্মা-(কক্সবাজার) ঢাকা বলে কাজ চলছে। তাতে ভারত সরে গেছে মানে ঢাকা-কলকাতা পদ্মার রেলপথ হলে সেটা দিয়ে কানেক্ট করার কথা ছিল; তা আবার আলাদাভাবে শুধু ঢাকা-কলকাতা হয়ে আছে। ফলে চার দেশীয় ঐ প্রকল্প ছিল সত্যিকার বিআরআই। কারণ কোন প্রকল্পকে BRI বলার প্রধান নির্ণায়ক হল যে মূল বিআরআই এর সাথে তা যুক্ত হবে কীনা!!  যেকোনো অবকাঠামো যা ইউরোপ থেকে সেন্ট্রাল এশিয়া হয়ে চীন হয়ে (সাথে অবশ্য সমুদ্রপথে আফ্রিকা যুক্ত) এরপর এশিয়ায় ছড়িয়ে বিভিন্ন দেশে – এটা হল সেই মূল বিআরআই। এমন মূল বিআরআইয়ে যুক্ত নয় তেমন চীনা প্রকল্পও বাংলাদেশে অনেক আছে। কাজেই সাধারণভাবে চীনা ঋণ না বলে সব ঋণ কে বিআরআই বলার মানে হল যেটা  একমাত্র ভারতই যার সুনির্দিষ্ট করে বিরোধিতা করে!

    কেন এসময়ে ভারতের বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগান্ডাঃ
    আগে যেমনই হোক, গত প্রায় দুই মাস ধরে ভারত বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগান্ডা  বাড়িয়েছে। এর প্রধান দুটা কারণ মনে করা হয়। প্রথমটা হল, গত এক দেড় বছর ধরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে বেশি; এটা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের ডাটা থেকে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এই ফিগার নিয়ে ভারতে মোদিবিরোধীরা মোদির অর্থনীতি খারাপ চলছে, ফেল করেছে এর প্রমাণ বলে পাবলিক পর্যায়ের সমালোচনা তুলে ধরে এসেছে। সেটা ভোটে প্রভাব ফেলেছে বা আরো ফেলবে বলে মোদির আশঙ্কা। কিন্তু এখন বাংলাদেশ ডলার সঙ্কটে বা আইএমএফের কাছে হাত পেতেছে – এ তথ্য ব্যবহার করে ও ব্যাপক প্রচার করে মোদি তার অভ্যন্তরীণ ভোট-কাটা বিরোধীদের সোজা বা শায়েস্তা করতে চান, এ কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট নিয়ে ভারত ব্যাপক প্রপাগান্ডা করে তুলে ধরছে।

    দ্বিতীয় কারণটাও ভারত এর সাথে যুক্ত করেছে। সেটা হল, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণ হল চীনা ঋণ – এই কথাটা মিথ্যা হলেও ভারতের খায়েস – মিথ্যা প্রপাগান্ডা দিয়ে এটা ছেয়ে ফেলা যাতে ভারত তার চীনবিরোধী প্রচারের সব কাজ সেরে ফেলতে পারে।

                                   Chinese naval Hi-tech Tracking Ship Yuan Wang 5 docking at Sri Lanka’s Hambantota Port

    এদিকে আমাদের সরকারের এখনকার চাওয়া হল, আমেরিকান অবরোধের চাপের সাথে সে এখন ডলার-অর্থনীতির সঙ্কটে পড়েছে, এখানে ভারত তাকে সহায়তা করুক। চাইছে গত ২০১৩-১৪ সালের মত, বাংলাদেশের ওপর আমেরিকান চাপ ভারত সামলে দিক। কিন্তু কঠিন বাস্তবতাটা হল, ভারত আর আমেরিকা বা বাইডেনের সম্পর্ক আর সেখানেই নাই; ভারত আর সেই প্রিয়পাত্র নাই। আসলে আমেরিকা আর ভারত, এদের উভয়ের স্বার্থ উভয়ের মৌলিক বিরোধী হয়ে দেখা দেয়া শুরু হয়ে গেছে। যদিও তাই বলে এখনই সম্পর্কচ্যুতির ঘোষণা দিলে তা আরো ক্ষতিকর হবে, তাই এটা রুটিন সম্পর্ক করে ফেলে রাখা হয়েছে; যদিও এখনকার পরিস্থিতিটা এমন যেমন,  মূল ফ্যাক্টর ভারত যতই রাশিয়ার সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে যাবে তত দ্রুত ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক সব ভেঙে পড়বে। যেমন সর্বশেষ উদাহরণটাই দেয়া যাক। গতকাল রয়টার্সের নিউজ হল – ভারত রাশিয়ার অশোধিত তেল গোপনে এনে শোধন করে অন্যদেশকে সরবরাহ করছে – U.S. says India hid Russian origin of fuel shipped to U.S.,] এতে স্বভাবতই বাইডেন ক্ষুব্ধ।
    কাজেই এঅবস্থায় আমাদের সরকারের আকাঙ্খা মোতাবেক ২০১৩-১৪ সালের সুখস্মৃতিতে ফিরে যাওয়া অসম্ভব। কিন্তু সব জেনেও এবাস্তবতা মানতে সরকারের মন সায় দেয় না। বিশেষ করে তার ভয়, সে একেবারে একা হয়ে যাচ্ছে। তাই বারবার হাত বাড়ায় আর একটা করে ভারতের ঝাপ্টা খাচ্ছে।
    বাংলাদেশ সরকারের এ’আকাঙ্খা ন্যূনতম কোন বাস্তব রূপ দিতে ভারত অক্ষম বটে কিন্তু তাতে কী বাংলাদেশকে লুটে খাওয়া, অপব্যবহার করা এটা এখন ভারতের একটা বড় সুযোগ ও কাজে দাঁড়িয়ে গেছে।

    তাহলে অপর কাজটা কী?
    পুরানা কাহিনী হল,  চীন-আমেরিকার সম্পর্ক ২০১০ সালের পর থেকে প্রথম তিতা হতে শুরু করেছিল। অন্যভাবে বললে, প্রেসিডেন্ট ওবামা যতই এটা টের পাচ্ছিলেন, ততই বেশি করে চীনকে – বাণিজ্যিক সুবিধায় ছাড় দিতে হবে – ওবামার এদাবিকে জায়গা করে দিয়ে চীন আমেরিকাকে ম্যানেজ করছিল। কিন্তু এটাও অকার্যকর হতে শুরু করে পরে স্পষ্টত ট্রাম্পের দ্বিতীয় বছর থেকে। তবু চীন যেটা মেইন্টেন করে গেছে তা হল – সে দ্বিপাক্ষিক ডায়লগের রাস্তা শক্ত মনোযোগে খোলা রেখে চলতে পেরেছিল। কিন্তু চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে স্পীকার পেলোসির তাইওয়ান উত্তেজনা সব ওলট-পালট করে দিয়েছে। তাতে চীন এখন বাইডেনের ওপর এত ক্ষুব্ধ যে, পাবলিকের ভাষায় বললে, চীন আমেরিকার ফোন ধরছে না। মানে সোভিয়েত ইউনিয়ন-আমেরিকাও, সেকালে কখনো দু’পক্ষ এমন ফোনের নাগালের বাইরে থাকেনি। কারণ এমন বাইরে থাকা মানে তাতে অনিচ্ছাতে বড় সামরিক সঙ্ঘাত যেকোনো সময় টার্ন নিতে পারে, যখন দু’পক্ষের হাতেই কঠিন মারণাস্ত্র মজুদ!

    এদিকে এ’পরিস্থিতিতে চীনের একটা হাই-টেক ট্র্যাকিং জাহাজ হাম্বানটোটা বন্দরের দিকে আগাচ্ছিল বন্দর থেকে রিফুয়েলিং ইত্যাদি রুটিন সুবিধা গ্রহণের জন্য। এটা অসামরিক গবেষণা মনিটরিং-এর  এক হাইটেক জাহাজ নাম “ইউয়ান ওয়াং ৫“। রয়টার্স লিখেছে, ” Foreign security analysts describe the Yuan Wang 5 as one of China’s latest generation space-tracking ships, used to monitor satellite, rocket and intercontinental ballistic missile launches.”
    কিন্তু চীন নিয়ে মানসিকভাবে ম্যানিয়াক ভারত তবু এটা নিয়ে হাইপ বা হৈচৈ তুলবেই। তাই ভারত ততই আমেরিকার মনোযোগ আকর্ষণে যেন এনিয়ে তীব্র আপত্তি হইচই ভারতের অভ্যন্তরীণ মিডিয়ায় তুলেছিল; যদিও ভারতের শেষ লক্ষ্য এসবের কোন কিছু নয়।  আসলে শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সঙ্কটে ভারত নিজের ক্ষুদ্র সক্ষমতার ব্যবহার করে (নগদ বৈদেশিক মুদ্রায় লোন দেয়া নয়); তবে ভারতের ভেতরের বাজার থেকে যা যা রুপিতে কেনা যায় এমন প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার মূল্যের চাল-গম ধরনের খাদ্য আর তেল-গ্যাস জ্বালানি ইত্যাদি লোন হিসেবে শ্রীলঙ্কাকে পাঠিয়েছিল। এখন শ্রীলঙ্কায় আপাতত ভারত বা ভারতের সাথে চীনের কোন প্রতিদ্বন্দ্বিমূলক এন্ট্রি নেই; বরং আমেরিকা একা মাতবরি করছে আর সেই খুশিতে ভারত মেটেরিয়াল লোন-সহায়তা নিয়ে এগিয়েছিল। কিন্তু রনিল বিক্রমাসিং নয়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে গেলে ভারতের ভাগে অন্তত সাহায্য-সমতুল্য কর্তৃত্ব-প্রভাব কোন কিছুই আসেনি। কিন্তু এ্টা ভারত আশা করছে। সেই  মনোযোগ আকর্ষণের জন্য আমেরিকার চেয়েও উচ্চৈঃস্বরে চীনা জাহাজের এসফরের বিরোধিতা ও আপত্তি দায়ের করেছিল শ্রীলঙ্কার কাছে। কিন্তু আমেরিকা ভারতের সাথে মিলে শ্রীলঙ্কার সাথে দেনদরবার কিছু করতে যায় নাই। যা করেছে একাই।  ফলাফলে গতকাল সকালেও ভারতের মিডিয়া ভারত কত শক্তিশালী আর চীন কত দুর্বিনীত তার ঢাক পিটাচ্ছিল যেন, ভারত চীনকে ঠেকিয়ে দিয়েছে আর পারলে সে চীনা জাহাজ আর বন্দরের মাঝে ভারতীয়-নৌবাহিনী দাঁড় করিয়ে চীনকে ভাগিয়ে দেয়।
    আসলে এনিয়ে গত তিন দিন ধরে ভারতীয় মিডিয়ায় মোদি সরকারের চীনবিরোধী ‘দেশপ্রেম’ আর দেশের কত স্বার্থসচেতন তারা এরই মহিমা প্রদর্শিত হচ্ছিল। এজন্য এর সাথে মিলিয়ে, বাংলাদেশের মন্ত্রীকে ব্যবহার করে “চীন কত খারাপ” এটা তুলে ধরাটা এক বিরাট প্রপাগান্ডা মিডিয়া উচ্ছাস ঘটিয়েছিল।

    কিন্তু হায়! ভারতের এক পত্রিকা WIRE গত ১২ আগষ্ট সন্ধ্যায় ভারতের সব উত্তেজনায় ঠান্ডা পানি ঢেলে লিখেছে, শ্রীলঙ্কা সরকার চীন জাহাজকে বন্দরে ভিড়তে অনুমতি দিয়েছে। কারণ, চীন ও আমেরিকার এ বিরোধিতা কেন তারা করছে এর সপক্ষে  যুক্তিগ্রাহ্য যথেষ্ট কারণ তারা দেখাতে পারেনি। আসলে এই ঘটনায় শ্রীলঙ্কা দেখিয়ে দিল এখনও সে ভাত-আমেরিকার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম!!!

    সাংবাদিক না দেশপ্রেমিক, কেবল একটাই বেছে নিতে হবেঃ
    এটা এক তত্বকথার ‘হেদায়েত’ বাণী! কী হতে চান, সাংবাদিক না দেশপ্রেমিক? তার মানে হল যেকোন একটা নিতে হবে। দুটোই এক সাথে হওয়া যাবে না। হ্যাঁ, ঠিক তাই। কিন্তু জাতিরাষ্ট্রবাদী উগ্র দেশপ্রেমিকরা হিন্দুত্ববাদীদের মতই ব্যাপারটা বুঝতে নারাজ। আসুন,  তা নিয়ে আলাপ করি। সাংবাদিকতার প্রথম শর্ত হল, ফ্যাক্টস। এতা ফ্যাক্টস বেসজড হতে হবে! একেবারে অবিকৃত বা এদিক-সেদিক মানে করা নয় বা ইঙ্গিত করে বলিয়েছেন, ফেবার করেছেন ইত্যাদি, এমন করা যাবে না। ফ্যাক্টের ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করতে হবে।

    এখন এভাবে চললে এর অনেক কিছু আপনার দেশের স্বার্থের বিপক্ষে যেতেও পারে। তবু, বাস্তব-সত্য তো সত্যই তা ময়ানতেই হবে। এখন তাহলে আপনি কী চান? যদি সাংবাদিকতা চান তাহলে দেশপ্রেম প্রদর্শন তা হোক না-হোক তা পাশে ফেলে রেখে আপনাকে সাংবাদিকতা বা সাংবাদিক স্বার্থকে উপরে তুলে ধরতে হবে। জার্নালিজমকে ফাংশন করতে দিতেই হবে।
    কিন্তু ভারতীয় বর্ষীয়ান সম্পাদক শেখর গুপ্তা সাংবাদিকের আগে দেশপ্রেমিক হতে চান। তাই বাংলাদেশের এই মন্ত্রী-উপাখ্যান নিয়ে ভারতের  তার নির্মিত ভিডিও ক্লিপে তিনি কড়া দেশপ্রেমিক সেজেছেন। অথচ ভারতের পাঁচজন সিনিয়র সাংবাদিকের নাম নিলে তিনি নিজে একজন হবেন। এই হল, ভারতের সাংবাদিক দুর্দশা! সাংবাদিকতাকে চিপায় ফেলে দেশপ্রেমিকের মিথ্যা প্রপাগান্ডায় নেমেছেন তিনি! দেখুন তার ইউটিউব! 

    তিনি শেখর গুপ্তা এখানে দুইটা বড় মিথ্যা বলেছেনঃ
    এক। হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর নিয়ে, এর নির্মাণ ব্যয় নিয়ে এখন শ্রীলঙ্কা সরকারের উপর এই পয়সাও ঋণের বোঝা নাই। কারণ, চীনা সরকারি ঋণের অর্থে এটা নির্মাণের পরেই শ্রীলঙ্কায় এক প্রো-ইন্ডিয়ান সরকার এসেছিল।  তারা দাবি করতে থাকে যে সরকারের পক্ষে এর ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। এটাই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে চীনা সরকারকে জানায়। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাড়ায় এমন যেন চীনক্বে এখন শ্রীলঙ্কাকে দেয়া ঋণ ফেরত নিয়ে নিতে হবে। ফলে দুপক্ষের আলাপ-আলোচনায় এটা সাব্যস্ত হয় যে তাহলে চীনা সরকার এক প্রাইভেট চীনা কোম্পানী যোগাড় করে দিবে যে নির্মিত হাম্বানটোটা বন্দর কিনে নিবে আর এই বন্দরের আয় থেকে নিজের এই বিনিয়োগ ধীরে ধীরে তুলে নিবে। এটা সাব্যাস্তের পরে নতুন বিতর্ক উঠে বন্দরের কতভাগের মালিক হবে নয়া ক্রেতা। যেহেতু সব প্রকল্পেই অন্তত প্রকল্পের জায়গা-জমি দেয়া বা যাদেরকে সরিয়ে ঐ জায়গায় বন্দর নির্মাণ হয়েছে তাদের পুণর্বাসন ইত্যাদিতে সরকার খরচ করে বলে যেকোন বড় প্রকল্পের ৩০% এর শেয়ার মালিকানা সরকারের হয়-ই। তাই ঐ চীনা প্রাইভেট কোম্পানির শেয়ার মালিকানা এখন প্রকল্পমূল্যের ৭০%।  আর ঠিক একারণের শ্রীলঙ্কা সরকার  হাম্বানটোটা বন্দরের মালিকও নয়, এনিয়ে কোন চীনা ঋণপরিশোধের দায়ও সরকারের নাই। অর্থাৎ শ্রীলঙ্কা সরকার অর্থনীতি ফেল করার পিছনে হাম্বানটোটা বন্দরের কোন ভুমিকাই নাই। অথচ শেখরগুপ্তা হাম্বানটোটা বন্দর নিয়ে চীনবিরোধী মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালিয়েই যাচ্ছে।
    দুইঃ অন্যান্য চীনা ঋণ শ্রীলঙ্কাকে গছিয়ে দেওয়ার ভারেই ওদেশের অর্থনীতি ঢুবে গেছে?
    এটাও শতভাগ মিথ্যা।  এনিয়ে আমার আগের  ১৬ মে ২০২২ তারিখে লেখা শ্রীলঙ্কার দুঃখের নাম ‘ডলার সভরেন  বন্ড’ এখানে বিস্তারিত আছে। শেখর গুপ্তা দাবি করছেন চীনা ঋণই শ্রীলঙ্কার অর্থনঈতি ফেল করার কারণ। অথচ তিনি ফ্যাক্টস অনুসরণ করতে রাজি না। ্তিনি শ্রীলঙ্কা সরকারের দেয়া কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠানের কাছে কত ঋণ এই ফ্যাক্টস শীট অনুসরণ করে কথা বলতে চান না। সেটাই নিচে আবার তুলে এনেছি।

    এখানে শ্রীলঙ্কার সরকারের দেয়া তথ্য মতে, দেখা যাচ্ছে তাদের নেয়া মোট বিদেশি ঋণের মাত্র ১০% হল চীনা লোন। এজন্য যদি চীনকে দায়ী করা হয় তাহলে শ্রীলঙ্কায় জাপানের ঋণও ১০%, বিশ্বব্যাংকের আরেকটু কম ৯% এছাড়া এডিবিও আরেকটু বেশি ১৩% – এদের সকলকেও দায়ী করতে হয় সমানে!!!। কিন্তু তা না করে কেবল চীনকে দায়ী করা মিথ্যা ও খারাপ উদ্দেশ্যমূলক অবশ্যই, সেটাই শেখর গুপ্তা ও ভারত করে চলেছে।
    আর বাস্তবে শ্রীলঙ্কার দুর্দশা বা ডিফল্ট হবার মূল কারণ, নেয়া মোট ঋণের ৪৭%, এক বিশেষ ঋণ। যেটাকে বলে সভরেন ঋণ [Sovereign loan ] যার মানে হল শ্রীলঙ্কা সরকারের ডলার বন্ড বাজারে ছেড়ে বিদেশ (যারা মূলত ব্যক্তি বিনিয়োগকারি) থেকে ডলার সংগ্রহ করেছিল। [সভরেন লোন মানে সরাসরি রাষ্ট্রকেই বন্ধক রেখে ডলার বন্ড ছেড়ে নেয়া লোন।] আমাদের মত দেশের কিছু অতিচালাক নেতা-মন্ত্রীর কাছে এভাবে ডলার বন্ড ছেড়ে ডলার সংগ্রহকে খুব লোভনীয় খুব আরাম ও মজার মনে হয়। কিন্তু তা সব সময়ই ভীষণ রিস্কি এদিকটা তারা ভুলে থাকতে চায়। কারণ এই ঋণ ফেরত দেওয়ার যে কিস্তি তা প্রায়ই সরকার সময়ে ফেরত দিতে পারে না ফলে ডিফল্টার হয়ে যায়। যা থেকে গ্লোবাল ঋণ-বাজারে বদনাম ছড়ায় ব্যাপকভাবে! আর এটাই হয়েছে শ্রীলঙ্কার বেলায়। আর শ্রীলঙ্কার সভরেন বন্ড ছেড়ে নেয়া ঋণ সবচেয়ে বেশি ৪৭%। আর একারণে শ্রীলঙ্কা ডিফল্টার হয়ে আইএমএফের কাছে সারেন্ডার করে লোন চাইতে গেছে। যা বাংলাদেশের বেলায়, সে এখনও কোন ডিফল্টার নয় তবে আইএমএফের কাছে আগেই সারেন্ডার করে লোন চেয়েছে। মন্ত্রী নিজেও তাঁর প্রতিবাদলিপিতে ঠিক এদিকটায় দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এদিকটা  অর্থাৎ শেখর গুপ্তা একজন মিথ্যা প্রপাগান্ডার লোক যিনি নিজেকে কোন সম্পাদকের দাবি দূরে থাকে তিনি নিজেকে কোন সাংবাদিকই দাবি করতে পারেন না।

    সবশেষের কথা হল, বাংলাদেশের আইএমএফের কাছে চাওয়া ঋণ পেলেও আমাদের আরো ঋণ লাগবে যার সম্ভাব্য দাতা এক চীন ছাড়া সরকার কারো কথা ভাবতে পারছে না। এমনকি আইএমএফ দেরি করলেও এ ঋণ প্রয়োজনীয় বেশি। কিন্তু এ ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সম্ভবত চীনের শর্ত হতে যাচ্ছে, যেসব চীনা প্রকল্প আগে ভারতের আপত্তিতে বাদ পড়েছে বা ঠেকিয়ে রাখা আছে – সেসব এবার আমাদের সরকারকে অনুমোদন দিতে হবে। ভারত সম্ভবত সে জন্য এমন আগ্রাসী! কিন্তু অক্ষম ডেস্পারেট! তাহলে, অর্থমন্ত্রী কী বুঝে এফটি-কে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন? যা তাঁকে আবার ফিরিয়ে নিতে হয়!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা দৈনিক “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার ১৩ আগষ্ট ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে “অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার“ এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • ইরান সফরে পুতিন-এরদোগান, রাইসির সাথে বৈঠক

    ইরান সফরে পুতিন-এরদোগান, রাইসির সাথে বৈঠক

    গৌতম দাস

    ০১ আগষ্ট ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4bH

     

      Russia, Turkey and Iran have in recent years been holding talks as part of the so-called ‘Astana peace process’ to end more than 11 years of conflict in Syria [File: Reuters]

     

     

    ঠাণ্ডা পানিতে গোসল, মানে “নো হিটার” গোসল; কখন? যখন তাপমাত্রা শূন্যের দিকে ধাবমান বা মাইনাসে চলে গেছে। যেকোন কারও জন্য এটা অবশ্যই একটা বড় রকমের শাস্তি। অথচ তা শুরু হয়ে গেছে!

    সারা ইউরোপেই কমবেশি আগস্ট থেকেই তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রির নিচে নামতে শুরু করে আর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে চরমে ওঠে, মানে এটা শূন্য বা মাইনাসে নেমে যায়। আর এর সাথে পাল্লা দিয়ে যেন রাশিয়া এখন থেকেই ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ কমানো শুরু করেছে। বিশেষ করে জার্মানির অবস্থা ভালো না।

    বিবিসি জার্মানির হ্যানোভার শহর নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে “কোল্ড শাওয়ার [Cold showers ]” শিরোনাম দিয়ে; মানে গোসলখানায় ঠাণ্ডা পানিতে গোসল নিয়ে। রিপোর্টের সারকথা, এখন থেকেই  রাশিয়ান গ্যাস সরবরাহের অভাবে ইউরোপে জ্বালানি মিতব্যয়িতা শুরু হয়ে গেছে। হ্যানোভার সিটিতে সব পাবলিক গোসলখানায় পানির হিটার বন্ধ করা হয়েছে। রুম হিটার সীমিত করা হয়েছে। এমনকি হাতে করে বয়ে নিয়ে বেড়ানো এসি, হিটার বা রেডিয়েটর ধরণের সবকিছুই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মূল কারণ,  ইউরোপে রাশিয়া তার গ্যাস সরবরাহ ইতোমধ্যেই অর্ধেক করে দিয়েছে। সামনে আরো কী করে কেউ জানে না। এদিকে ২৭ রাষ্ট্রের জোট ইইউর সম্মিলিত সিদ্ধান্ত রাশিয়ান গ্যাসের অভাবে তারা সবাই গ্যাসের ব্যবহার এবার শীত সিজনে কমপক্ষে ১৫% কম করবে। এসব থেকেই বিবিসির এ রিপোর্ট ‘কোল্ড শাওয়ার’। প্রশ্ন হচ্ছে, ইউরোপ কি এবার ‘কোল্ড শাওয়ারের’ শাস্তি সহ্য করতে সক্ষম হবে?

    না ব্যাপারটা এমন নয় যে, রাশিয়ার গ্যাস ছাড়া ইউরোপের কোনো বিকল্পই নেই; ঠিক তা নয়, কিন্তু অন্য যেকোনো বিকল্প জ্বালানি পাওয়ার জন্য কোনো চুক্তি করা দিয়ে শুরু করতে হবে। এরপর সবচেয়ে কষ্টকর অংশ হল, সেই জ্বালানি বয়ে আনতে প্রয়োজনীয় নয়া বিনিয়োগ করে নয়া অবকাঠামো গড়ে সেই জ্বালানি এনে এবার তা ব্যবহার-উপযোগী করে ঘর গরম বা পানি গরমের জায়গায় নিতে সব মিলিয়ে কমপক্ষে পাঁচ বছর সময় লাগাতে হবে। এটাই ইইউ এতদিন বহুভাবে বাইডেনকে বুঝাতে চেয়েছে, পারেনি। তাহলে আগামী ২০২৭ সালের আগে পর্যন্ত তারা চলবে কী করে? নাকি আগামী ডিসেম্বরের (২০২২) আগেই বাইডেনের হাত ছেড়ে ইইউ পুতিনের হার ধরে আপস করে ঘর গরম, পানি গরমের সুখ নিতে মরিয়া হয়ে উঠবে! সেটাই এখন দেখার অপেক্ষায়!
    বিবিসির ওই রিপোর্টের শেষ বাক্যটা হল, ‘ইউরোপে রাশিয়ান গ্যাস সরবরাহ যুদ্ধের আগে ছিল মোট চাহিদার অর্ধের বেশি একা রাশিয়ান গ্যাস এখন যা এক-চতুর্থাংশের কম’।

    “Russian gas supplies now account for about a quarter of the nation’s needs, compared with more than half before the war.”

    রাশিয়ার গা-ঝাড়া দিয়ে উঠাঃ
    দুনিয়ায় অন্য দিকের সব ঘটনাবলিতে রাশিয়া যেন গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে। পুতিন বিদেশ সফরে বের হয়েছেন, তিনি ইরান সফরে গেছেন। রাশিয়ার ওপর ডলার-ইউরো-ইয়েন ইত্যাদিসহ আরো কয়েকটা মুদ্রার অবরোধে রাশিয়া যেন টুপ করে ভেঙে পড়বে! বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তির [Western bloc] এই ছিল প্রবল বিশ্বাস ও আকাঙ্খা যাতে তারা দেখতে পাবে পুতিন সারেন্ডার করে মাফ চাচ্ছে! কিন্তু সরি, তা বাস্তবে ঘটেনি তা তো আমরা সবাই দেখতে পাচ্ছি। উল্টো দুনিয়াজুড়ে গ্লোবাল মুদ্রাস্ফীতিই শুধু নয়, এখন বিশ্বব্যাংকই দাবি করছে, গ্লোবাল বাণিজ্য-অর্থনীতিতে মহামন্দা আসন্ন, তা এলো বলে। সাথে নিয়ে আসছে খাদ্যাভাব দুর্যোগে এলেমেলো করে দেয়া মানুষের জীবনযাত্রায় প্রবল ধাক্কা! গ্লোবাল জিডিপি ২.১% এ নেমে যাবে এ বছর আর আগামী বছর ২০২৩ সালে যা আরো নেমে ১.৫% হয়ে যেতে পারে।

    “In a news conference, World Bank President David Malpass said global growth could fall to 2.1% in 2022 and 1.5% in 2023, driving per capita growth close to zero, if downside risks materialized.” – REUTERS

    বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস এক সংবাদ সম্মেলন করে সাবধান করছেন যে, “অনেক দেশই এই ধাক্কা এড়াতে পারবে না”।  তিনি এই সঙ্কটের নামকরণ করেছে ‘মন্দা-মুদ্রাস্ফীতি’ বা ‘স্টাগ-ফ্লেশন’ [stagflation]।

    এদিকে খোদ আমেরিকার প্রথম তিনমাস বা প্রথম কোয়ার্টারের জিডিপিতেই যেখানে টানাটানিতে তা ছিল মাত্র ১.৬%। সেটা দ্বিতীয় কোয়ার্টারে আরো কমে হয়েছে  ১% এরও নিচে, তা ০.৯%। গত পরশু মানে ২৮ জুলাই তা প্রকাশিত হয়েছে। যেটাকে আমেরিকা অর্থনৈতিক মহামন্দা আসা নিশ্চিত হবার লক্ষণ বলে আমেরিকান অর্থনীতি ও বাজার জুড়ে ছড়িয়ে পড়া ধারণা বলে তা হাজির হয়েছে।

    Real gross domestic product (GDP) decreased at an annual rate of 0.9 percent in the second quarter of 2022, following a decrease of 1.6 percent in the first quarter. The smaller decrease in the second quarter primarily reflected an upturn in exports and a smaller decrease in federal government spending. – BEA.GOV

    কিন্তু তবু বাইডেন নির্বিকার। তিনি ইউক্রেনকে আরো ভারী অস্ত্র ও অর্থ সরবরাহ আর সেই সাথে, ইইউর উপর রাশিয়ান জ্বালানি নেওয়ার চেষ্টা না করতে চাপ দিয়েছেন। আপস না করতে চাপ দেয়া চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনোভাবেই এরা যেন পুতিনের সাথে রফা না করে ফেলে তার হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছেন।

    তাই, এসব চাপ যে, রাশিয়ার উপর কাজ করছে না তা দেখাতেই যেন রাশিয়া গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে। সেকারণে, পুতিন পাল্টা পশ্চিমের অবরোধে যারা কষ্টভোগী তাদেরকে সাথে মিলে নয়া জোট করে উঠে দাঁড়ানো চেষ্টা করছেন – এমনই কিছু লক্ষ্যে পুতিন ইরান সফরে গিয়েছিলেন গত ১৯ জুলাই। আসলে ইরানে এটা ছিল এক ত্রিদেশীয় সামিট। কারণ, তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এরদোগানও একই সাথে একই দিনে ইরান সফরে আসাতে তিন সরকারপ্রধানের এক সামিট মিটিংও অনুষ্ঠিত হয়েছে সেখানে। কিন্তু কী ছিল এই সফরের উদ্দেশ্য বা মতিগতি বা আলোচ্যসূচিইবা কী কী ছিল- তা জানতে [তা বুঝতে বাংলাদেশে খুব সিরিয়াস ডেফিনেশন নয় বরং হালকাভাবে যাদের ‘ইসলামিস্ট আকাঙ্খা’ বলে বুঝা হয়, এমন] তরুণদের ভিতর আগ্রহ তৈরি হয়েছে। যেমন একজন লিখছে, “পুতিনের ইরান সফর এবং বাইডেন কেন সৌদিতে, এই দুটো বিষয় নিয়ে একটা লেখায় দেখতে চাই”।

    এমনিতে কোন “আকাঙ্খাই” দোষের নয়, কেবল যদি খেয়াল রাখা থাকে যে, তা কতটা কল্পনার রঙের বা ইউটোপিয়াতে দেখা হয়েছে আর কতটা তা বাস্তবসম্মত। যেমন মুসলমান প্রধান দেশগুলোর সরকার একটা গ্লোবাল ইসলামিক স্বার্থের পক্ষে একত্রে  কাজ করবে – এই হল এমনই একটা আকাঙ্খা। এখন এই আকাঙ্খা তা কতটা বাস্তব আর কতটা কল্পনার রঙে দেখা হয়েছে তা কী দিয়ে মাপব? যেকোনো দেশের সরকারকে দেশের বৈষয়িক-অর্থনৈতিক স্বার্থ- এটাকেই সব বিবেচনার শীর্ষে রাখতেই হয়। এ দিকটাই ভারী থাকে; কারণ এগুলো মানুষের বেসিক চাহিদাসংশ্লিষ্ট। আর এর পরে এসে থাকে কোনো চিন্তা-আদর্শ অনুসরণ বা হেদায়েতের কথা।

    প্রথমত, ইরানে ওই তিন সরকার প্রধানের সফর ছিল অনেক উদ্দেশ্য বা ইস্যুতে। তবে প্রত্যেকটা ইস্যুই আবার তিন পক্ষের সবার জন্য নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা ছিল দ্বিপক্ষীয়। যেমন তিনপক্ষীয় বড় বা একটাই প্রধান ইস্যু ছিল – সিরিয়া বা আসাদ সরকার প্রসঙ্গ বা বিবিসির ভাষায় “সিরিয়ায় সহিংসতা কমানোর” ইস্যু যেটাকে আরো একদম সুনির্দিষ্ট করে বললে, সিরিয়ান কুর্দি সশস্ত্র গ্রুপ ওয়াইপিজিকে [YPG] নিয়ে দুটো ভিন্ন মত এই তিন রাষ্ট্রের কথা বলা। এরদোগান চান এদের সামরিকভাবে হামলায় দমন-উতখাত করতে। কিন্তু রাশিয়া-ইরান চায় আলোচনায় সমাধান।

    আসলে এরদোগানের জন্য যেকোনো কুর্দি ন্যাশনালিজমের বা কুর্দি-জাতিরাষ্ট্র চিন্তার দল তা সে ইরাকি কুর্দি কিংবা সিরিয়ান কুর্দি অথবা টার্কিশ কুর্দি যেই হোক, “এই রাজনীতি” তিনি ধ্বংস করে দিতে চান ফিজিক্যালি। কারণ সত্যি সত্যিই এই তিন দেশের কুর্দিদের নিয়ে একটা নতুন কুর্দি জাতিরাষ্ট্র করতে চাওয়া এর ব্যবহারিক মানে হল এই যে,  এটা ‘কুর্দি-জাতিরাষ্ট্রীয় রাজনীতি’। মানে এতে (ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্ক) এই তিনটি দেশই ভেঙে যাওয়া যা যদি ঘটে তবে এই তিন দেশের কোনো শাসক সরকারই নিজ নিজ দেশের বাকি মানুষের কাছে মুখ দেখানোর লায়েক থাকবে না। যার সোজা মানে তারা আর ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।

    এ ছাড়া তিন দেশের কুর্দিদের জন্য তাদের নিয়ে  -একটা নয়া জাতিরাষ্ট্রই একমাত্র বা সব সমাধান – এ কথাও তো সত্যি নয়। কারণ তাতে “প্রতিটা কুর্দির রাজনৈতিক অধিকারের প্রসঙ্গটা”  তা সে তারা এখনকার যে রাষ্ট্রেরই বাসিন্দা হোক না কেন এতে, জাতি ধারণার নিচে সব চাপা পড়ে আড়ালে চলে যাবে, যেমন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটাই হয়েছে। অর্থাৎ জাতি-ধর্ম পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেকেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইডেনটিটি নির্বিশেষে তারা সকলেই নাগরিক এবং সমান অধিকারের নাগরিক  – এভাবে আর দেখা হয় নাই। চাপা পড়ে গিয়েছে। বাঙালি জাতিরাষ্ট্রে ধারণাটা প্রবল হওয়াতে এর নিচে সবার নাগরিক অধিকার এবং সমান অধিকারের “সাম্য” প্রসঙ্গটা চাপা পরে গিয়েছে। সবমিলিয়ে ফলাফল এই যে বাংলাদেশ বলে রাষ্ট্র কায়েম হয়েছে ঠিকই কিন্তু নাগরিক অধিকার প্রশ্নে বা নাগরিক বৈষম্যহীনতার প্রসঙ্গের দিক থেকে রাষ্ট্র হয়ে গেছে খামোখা।
    তাই এক নয়া জাতিরাষ্ট্র কায়েম করার রাজনীতি এটা কোন সমাধানই নয়। বরং ইরাক, সিরিয়া ও তুরস্ক এই প্রতিটা রাষ্ট্রকেই নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র করে গড়ে তোলা আর জাতি নির্বিশেষে সেখানকার সবাই সমান অধিকারের নাগরিক – এই ভিত্তিতে তা বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করার ভেতরেই আছে সব সমাধান। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বার্নিং অবস্থায় আছেন এরদোগান। কারণ আমেরিকার অবস্থান কুর্দিদের পক্ষে। এটা এরদোগানের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রশ্নই আসে না। কুর্দিদের অধিকার বা তাদের ভিকটিম হয়ে থাকার প্রতি সহানুভুতিশীল হওয়া কারো জন্যই অবশ্যই কোন দোষের নয়।  কিন্তু এই সুযোগে তাদের তিনটি রাষ্ট্র ভেঙে এক নয়া কুর্দি জাতিরাষ্ট্র গড়তে সমর্থন দেয়া অপরাধ।

    আসলে রাশিয়া-ইরানকে এরদোগান বলছেন তোমাদের সাহায্য আমার লাগবে না। তুরস্ক একাই ওয়াইপিজিকে দমন করতে পারবে। তবে দ্বিতীয়ত, রাশিয়া-ইরানের মতে সফট লাইনে এদের বুঝানো বা পিঠে হাত বুলিয়ে কাজ হবে বলে এরদোগান মনে করেন না। তাহলে এবারের ইরান-আলোচনায় ফলাফল কী হল? ফলাফল এই যে, তবুও তিনপক্ষই অন্তত একমত যে, কুর্দি ইস্যুতে আমেরিকাকে দূরে রাখতে হবে।
    ওদিকে ওই আলোচনায় রাশিয়া-ইরানের স্বার্থ ছিল সিরিয়াকে এক স্থিতিশীল রাষ্ট্র আর এর সব ভূখণ্ডই আসাদের নিয়ন্ত্রণে আছে তা দেখাতে চাওয়া। এ ছাড়া সিরিয়ায় বিভিন্ন সশস্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদী বা ইসলামী গ্রুপগুলোর তৎপরতা লোপ পেয়ে যাক যাতে সব কিছুর ওপর আসাদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসে। তাই এই সুযোগে তুরস্ক প্রস্তাব রেখেছে যে, তুরস্ক-সিরিয়ান বর্ডারে, মাঝখানে একটা ৩০ কিলোমিটারের সেফ জোন বা নিরাপত্তা জোন তৈরি করা হোক। এটা তিনি চাইছেন মূলত যাতে দুই দেশের কুর্দিরা অবাধে যাতায়াত আদান-প্রদানে করে চলে ঘোট না পাকাতে পারে!

    যখন আলোচনার বিষয় ড্রোনঃ
    তেহরানে ড্রোন আলোচনার ইস্যু হলেও এটা ছিল কেবল দ্বিপক্ষীয়- মানে রাশিয়া আর ইরানের মধ্যে আলোচনার ইস্যু। এটা এরদোগানের জন্য আলোচনার ইস্যু নয়। কারণ তিনি আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে উল্টো ইউক্রেনকে ড্রোন সরবরাহকারী। মানে ইউক্রেনের হাতে যে টার্কিশ ড্রোন ব্যবহৃত হচ্ছে তা হচ্ছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ও উপরে। তবে ইউক্রেনের হাতে থাকা সব ড্রোনই টার্কিশ নয়। বড় অংশই বরং আমেরিকার সরবরাহ করা। আর ওদিকে রাশিয়ার সব ড্রোনই ইরান থেকে নেয়া নয়। রাশিয়ার নিজস্বও আছে। যা হোক, এই ইরানিয়ান ড্রোন রাশিয়াকে সরবরাহ নিয়েই রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বিপক্ষীয় আলাপ হয়েছে এবার।

    ইউক্রেনের শস্য রফতানি ইস্যুঃ
    এটাও আরেক দ্বিপক্ষীয় ইস্যু। তবে এবার তা রাশিয়া আর তুরস্কের মধ্যে। যদিও সেটাও আবার সরাসরি রাশিয়া আর তুরস্কের স্বার্থে নয়। কেন?  মূলত বিভিন্ন সময়ে ইউক্রেন-রাশিয়া এদের মধ্যে আপোষ আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছে তুরস্ক, এমনকি কখনো এরদোগান নিজে উপস্থিত থেকেই তা ঘটিয়েছেন। তাই শস্য ইস্যু যেটা হল আসলে – যুদ্ধের কারণে, ইউক্রেন শস্য রফতানির বড় দেশ হওয়া সত্বেও এ পর্যন্ত ইউক্রেনের সব শস্য রফতানি বন্ধ করে রেখেছিল  নিজ সাইলো গুদামে, যা প্রায় ২২ মিলিয়ন টন। গ্লোবাল বাজারে খাদ্যশস্যের (গম) দাম আকাশচুম্বী হওয়ার অন্তত একটা কারণ এটাকেই মনে করা হয়। তাই জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল (António Guterres ) আর এরদোগান – এরা দু’জন নিজে উপস্থিত থেকে রাশিয়া আর ইউক্রেনের মধ্যে শস্য রফতানিতে রাশিয়ান সহযোগিতা করবে – এমন এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল  [Ukraine, Russia sign grain export deal]। যদিও তা স্বাক্ষরের পরেই ইউক্রেনের ওডেসা বন্দরে এক বোমা পড়ায় রফতানি আশঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। তাই এরদোগান ইরান সফরের সময়ে এই সুযোগে পুতিনের সাথে কথা বলে রফতানি যেন ঠিকমত বাধাহীন চালু হতে পারে এর আশ্বাস নিয়েছেন পুতিনের কাছ থেকে।

    বাইডেনের মধ্যপ্রাচ্যে সফরে ইসরাইলের সাথে তাঁর অসৎ ঘনিষ্ঠতাঃ
    গত ১৯৭৯ সালে খোমেনির ইরান বিপ্লবের সংঘটিত হবার পর থেকে আমেরিকা ইরানকে শুধু স্বীকৃতি দেয়নি তাই নয়, ইরানের বিরুদ্ধে নানান স্যাবোটাজ করে গেছে নিয়মিত। অথচ ইরান বিপ্লবের অপরাধ কী? অপরাধ হল এই যে, ১৯৫৩ সালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ারের অপরাধের বিরুদ্ধে উঠে দাড়িয়েছিল, বিপ্লব করেছিল। আইসেনহাওয়ার সিআইএ পাঠিয়েছিলেন; পপুলার ইরানি সরকারকে ফেলে দেওয়া, ইরানের সব তেলের খনি দখল আর এক পুতুল সরকার হিসেবে শাহ পাহলভিকে ক্ষমতায় বসানো ইত্যাদি যা যা অপরাধ ঘটিয়েছিলেন, এঘটনাগুলোর ২৬ বছর (১৯৫৩-৭৯) পরে এর পরিসমাপ্তি টানা এবং ইরানিদের নিজেদের জন্য নিজেদের দেশ ও সরকার কায়েম করা। এতাই ইরানের অপরাধ!!! এরপর থেকে আমেরিকার সাথে বিল্পবী বা খোমেনির ইরানের সাথে আমেরিকার কখনো ন্যূনতম সম্পর্ক বা স্বীকৃতি বিনিময় ঘটেনি। আমেরিকান ভুল নীতি-পলিসির কারণে  অন্যকিছু ঘটবার সুযোগও ছিল না। কিন্তু ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট ওবামা বিড়ালের গলায় এক ঘণ্টা বেঁধেছিলেন ২০১৫ সালে!

    যদিও এই ওবামাই আইএস-এর উত্থানে সহায়তাকারী, পরে আইএসকে দিয়ে গাদ্দাফিকে হত্যাকারী, এরাই বেনগাজীতে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতসহ সব আমেরিকান স্টাফের হত্যাকারী; শেষে সিরিয়ার আসাদেরও একই পরিণতি ঘটাতে সিরিয়াতে  গিয়েও তা ব্যর্থ-অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু সেই আইএস এরপর ইরাকে ফিরে গিয়ে নিজ নামে হাজির হয়ে গেলে, তাতে পাল্টা ইরাকের ক্ষমতা তাদের হাতে প্রায় দখলের উপক্রম হয়ে গেলে এবার ওবামা ভীষণ বিপদে পড়ে ধরা খেয়ে যান। কারণ, কথিত ওয়ার অন টেররে যেসব যুদ্ধক্ষেত্র বুশের আমেরিকা জন্ম দিয়েছিল, ২০১৪ সালেই ওবামা সেসব স্থান থেকে আমেরিকান সৈন্য তুলে ফেলেছেন। ইরাকেরসহ মেজরিটি সংখ্যক [মোট দশ হাজার রেখে বাকি সব ফেরত] আমেরিকান সৈন্য দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন। কারণ একটাই, সমাপ্তিহীন অন্তহীন যুদ্ধের ব্যয় বইবার  সক্ষমতায় আমেরিকা-রাষ্ট্রের অপারগতা, অযোগ্যতা!!

    অথচ পরের বছরই ইরাকে আইএস হাজির হয়ে গেলে তাদের তাড়াতে গেলে তো আবার প্রয়োজনীয় সৈন্য আমেরিকা থেকে ফেরত আনতে হয়, যা বিরাট খরচের দায়ভার!!কিন্তু আমেরিকার ব্যয়-নির্বাহের মুরোদ নাই। অতএব উপায় না দেখে ওবামা এই প্রথম ইরানের সাথে আপসের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ইরাক থেকে ইরান নিজ সামরিক শক্তি ব্যবহার করে আইএস মুক্ত করে দিবে। আর এতে বিনিময়ে আমেরিকা ইরানের উপর নিজের আগে থেকে দেয়া সব স্যাংশন প্রত্যাহার করে নিবে। আর ওদিকে কেবল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা থাকবে যদিও তা দিয়ে অস্ত্র তৈরি না করে আইনি মাত্রায় আটকে রাখবে আর তা জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে নিরীক্ষিত হবে – এই শর্তে এক চুক্তি হয়েছিল। ইরানের সাথে ২০১৫ সাল থেকে যা কার্যকর চুক্তি তার নাম ‘জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ [Joint Comprehensive Plan of Action, JCPOA] ; যাকে অনেকে ইরানের সাথে পি৫+১ চুক্তিও বলে থাকে। কারণ এটা ছিল জাতিসঙ্ঘসহ তার নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য ও সাথে জার্মানিকেও নিয়ে করা। তাই (পি৫+১) বলা।

    কিন্তু পরবর্তিতে  ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে সব উল্টে দিয়েছিলেন। ২০১৭ সালেও ‘ইরান যথাযথভাবে চুক্তি মেনে চলছে’ বলে ট্রাম্প প্রশাসন রিপোর্ট দেয়া সত্ত্বেও ২০১৮ সালের ৮ মে এই চুক্তি থেকে “আমেরিকা নিজেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে” বলে ট্রাম্প ঘোষণা দেন এবং পুরানা অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ আবার ফিরিয়ে এনেছিলেন। মূলত ইসরাইলকে ফেভার বা খুশি করতেই তিনি এসব করেছিলেন।

    যদিও সে সময়ে ডেমোক্র্যাটরা এমনকি ইইউও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা ও সমালোচনা করেছিল। অথচ এখন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বাইডেন সেই ট্রাম্পের পথ ধরেছেন। তিনি উসিলা খুঁজছেন কিভাবে পুরানা (JCPOA) বা ‘ইরান ডিল’ চুক্তি ফিরে তাকে না করতে হয়। সম্প্রতি সিনেটে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান মিলে আরো শর্ত চাপিয়ে একটা বিল পাস করিয়েছে যাতে সহজেই নয়া কোনো “ইরান ডিল” স্বাক্ষরিত না হয়। এটা ছিল এক রিপাবলিকান প্রস্তাব অথচ বাইডেনের দল তাতে সমর্থন দিয়েছে। এ ছাড়া বিশেষত এবার জুলাইয়ে বাইডেনের ইসরাইল সফর ও ঘনিষ্ঠতা এই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।

    এসব মিলিয়ে পুতিনের ইরান সফর নিয়ে করা বিবিসির রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, “উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে ইসরাইলের মাখামাখি যেভাবে বাড়ছে এবং তারা ইরানের বিরুদ্ধে জোট বাঁধছে, সেটা ইরানকে উদ্বিগ্ন করছে। তাদের আশঙ্কা, এটি মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তাদের বিপক্ষে নিয়ে যেতে পারে। কাজেই ইরান চেষ্টা করছে, রাশিয়ার সহায়তায় পাল্টা কিছু করা যায় কিনা”।

    এখন একটি সাম-আপ যদি করি তাহলে দেখব, প্রতিটা রাষ্ট্রই বিভিন্ন ইস্যুতে এনগেজ হয়ে থাকলেও; একটা রাষ্ট্র অন্য আরেক রাষ্ট্রের থেকে ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ নিয়ে বসে আছে। এগুলোকে একই জায়গায় আনা খুবই কঠিন, কখনো প্রায় অসম্ভব। এর ভেতর আবার দুটো মুসলমান প্রধান দেশ হলেও বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের স্বার্থ-অবস্থানে বিরাট ভিন্নতা দেখা যাবেই। এটাই স্বাভাবিক। যেমন এখানে ইরান ও তুরস্ক উপরে যে দুটো ইস্যুতে আলাপ করেছি, দেখা যাচ্ছে তারা একই অবস্থান নিতে পারছে না। আসলে কার্যত দেশ দুটো হলেই আর তাদের এক অবস্থান নেয়াটাও সহজ কাজ নয়। এই বাস্তব দিকটা মনে রেখে আমাদের চলতে হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ৩০ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “পুতিন, এরদোগানের ইরান সফর“ এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

     

  • ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি কী এই শীতের আগে-পরেই!

    ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি কী এই শীতের আগে-পরেই!  

    গৌতম দাস

    ২৫ জুলাই ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4ba

     

    How Will the Ukraine War End? 10 Experts Weigh In

    ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি আর বাইডেনের অপ্রয়োজনীয় বাহাদুরি দেখানোর নীতি-পলিসির পতন – এসব ব্যর্থতা কি আসন্ন? অবস্থা যেন ক্রমেই সেই অভিমুখেই হাঁটছে! ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কি স্টেজে নাটক করতে করতে স্বপ্ন-কল্পনা দেখিয়ে তাদের পপুলার ভোটে ক্ষমতায় এসে পড়েছেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে এখনও নাটক করছেন। ভেবে নিয়েছেন মানুষের জীবন রক্ত-মাংসের বাস্তব মানুষের নয়। এদিকে সাতাশ রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ),  তাদেরকেও সাদা এথনিক-জাতের দুনিয়া শাসনের “শ্রেষ্ঠত্ববাদ” পেয়ে বসেছে। জেলেনেস্কি আর ইইউ-কে বাস্তবতা ফেলে চটকদার স্বপ্ন-কল্পনা দেখানোর নায়ক যাদুগর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। সকলেই এক ব্রেকডাইন পয়েন্টের দিকে চলেছেন যেটা সম্ভবত চলতি বছরের শেষভাগে!!   গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল আসন্ন, কঠিন ভাবেই আসন্ন!! বাইডেনের “ওয়েস্টার্ণ ফোর্স” তা স্বীকার করুক আর নাই করুক কিছু যায় আসে না! বাস্তবতা অস্বীকার করে কেউ টিকে নাই। আপনার-আমার পছন্দ-অপছন্দের উর্ধে থাকে যেটা সেটাই বাস্তবতা!

        Biden’s Dangerous New Ukraine Endgame: No Endgame   – Foreign Policy

    ওয়্যার অন টেরর কুখ্যাত বুশের সাগরেদ টনি ব্লেয়ার সবার আগেই ভেঙ্গে পড়েছেনঃ
    ইউক্রেন যুদ্ধকে, ইইউ-এর নেতারা গত ২৪ ফেব্রুয়ারি এটা শুরু হওয়ার পর থেকে একে “রাশিয়ান আগ্রাসনের যুদ্ধ” বলে আসছেন। কিন্তু টনি ব্লেয়ারের কথা আমরা নিশ্চয় ভুলে যাইনি। এককালে যার প্রধান পরিচয় হয়ে উঠেছিল আমেরিকান প্রেসিডেন্ট (২০০১-৮) জুনিয়র বুশের কুখ্যাত ওয়্যার অন টেররের কালে ইনি তার ঘনিষ্ঠতম সাগরেদ; সহযোগী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী (১৯৯৭-২০০৭) ছিলেন এই টনি ব্লেয়ার। তারা যৌথভাবে ইরাকে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে মিথ্যা অস্ত্র মজুদের কথা বলে “রেজিম চেঞ্জ” তত্ত্বে ইরাকে হামলা ও দখল করেন; পরে সাদ্দামকে ক্ষমতাচ্যুত করেন ও ফাঁসিতে ঝোলান।

    “After Ukraine, What Lessons Now for Western Leadership?” –  Tony Blair

    পশ্চিমা আধিপত্যের দিন শেষ হওয়ার পথেঃ
    সম্প্রতি সেই টনি ব্লেয়ার এবার আবার রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। তাঁর এক নয়া বক্তৃতামালার  “‘ইউক্রেনের পরে, পশ্চিমা নেতৃত্বের জন্য কী শিক্ষা হলো?’ [“After Ukraine, What Lessons Now for Western Leadership?” ]; এই শিরোনামে ব্রিটেনে আহূত এক সভার বক্তৃতায় টনি ব্লেয়ার বলেছেন, “ইউক্রেন যুদ্ধ দেখাল দুনিয়ার ওপর পশ্চিমা আধিপত্যের দিন শেষ হওয়ার পথে যেহেতু দুনিয়াতে নয়া সুপার পাওয়ার হিসেবে চীনের উত্থান ও আসীন হওয়া ঘটছে; এই চীনের পার্টনার হলো রাশিয়া। তবে এই শতাব্দীর এটি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মোড় পরিবর্তন” [ “The Ukraine war shows that the West’s dominance is coming to an end as China rises to superpower status in partnership with Russia at one of the most significant inflection points in centuries”, former British Prime Minister Tony Blair said.]।
    টনি ব্লেয়ারের বক্তৃতার ইউটিউব লিঙ্ক এখানে।

    তিনি যেন সব খোলাখুলি বলে ফেলতে চাইছেন, আর মিথ্যার টেনশন নিতে পারছেন না। তাই স্বীকার করে বলছেন, “দুনিয়ার ইতিহাস এক মোড় পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে পৌঁছে গেছে যা একমাত্র তুলনা করা সম্ভব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ বা সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে পড়ার সাথে। শুধু ফারাকটা এই যে, পশ্চিম আর এবার উপরে উঠছে না, বরং পরিষ্কারভাবেই পতিত, নিচে নামছে। পরিষ্কারভাবেই আমরা পশ্চিমারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পতনের প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছি” [The world, Blair said, was at a turning point in history comparable with the end of World War Two or the collapse of the Soviet Union: but this time the West is clearly not in the ascendant.]।

    সেই ২০১৪ সাল থেকে এই কথাগুলোই আমি এতদিন আমার লেখায় বলে আসছি। আর বলেছি, ‘এই মোড় পরিবর্তন ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী হিসেবে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বে উত্থান যেমন ঘটেছিল কেবল তার সাথেই তুলনীয়। তবে টনি ব্লেয়ার একে বাড়তি ভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে পড়ার সাথেও তুলনা টেনেছেন। এই তুলনা ভুল, সমতুল্য ঘটনা নয় বলে।  তাই এটা তিনি না তুললে তাঁর জ্ঞানবদ্ধি সম্পর্কে পাঠকের ধারণা ভাল থাকত। যাই হোক, আজ আমেরিকান নেতৃত্ব লাভের ৭৫ বছর পরের এঘটনা; এর সাথে পার্থক্য কেবল আমেরিকার জায়গায় এবারে চীনের উত্থান ঘটছে। সাথে এটাও বলেছিলাম, এসবের মূল কথাগুলো আমার কথা একেবারেই নয়। বরং আমেরিকান নিজস্ব সার্ভে-স্টাডি রিপোর্টের ফাইন্ডিংস থেকে পাওয়া।

    লক্ষণীয়, এখানে আমি ‘চীনের ফাইন্ডিংস’ বলিনি। তবু আমেরিকান-প্রীতিতে থাকা লোকেরা এর অর্থ করেছিল যে, আমি  নিশ্চয় আমেরিকাকে দেখতে পারি না আর ওদিকে, কমিউনিস্ট বলে চীনকে পছন্দ করি, তাই আমি এসব বলেছি।

    তাই আমি আবার এও বলেছিলাম, কোনো রাষ্ট্রের এমন গ্লোবাল নেতৃত্বে অর্থনৈতিক উন্নতি; এটা একেবারেই অবজেকটিভ (objective) ঘটনা। মানে, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা ভূমিকম্প যেমন অবজেকটিভ ঘটনা, এগুলো কর্তা-মানুষের ইচ্ছায় ঘটে না।  যুদ্ধ লাগাব বা লড়ব বলে ঝাঁপিয়ে পড়া যেমন সাবজেকটিভ বা কর্তা মানুষের কাজের ঘটনা- এটা তেমন নয়। কোনো দেশের শাসককুল আগ্রহ করে যুদ্ধ লাগাতে পারে কিন্তু বাস্তব সুযোগ থাকাসহ অনেক কিছুই আলোচ্য ঘটনাবলিতে অবজেকটিভ বাস্তবতা হয়ে থেকে যায়। তাই সবকিছুই মানুষের ইচ্ছাধীন নয়। আর সবচেয়ে বড় কথা, গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হওয়া এটা কোন মানুষের ইচ্ছায় তার  সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপার নয় বরং ‘বাস্তব করে দেখানোর’ ব্যাপার মানে কষ্ট করে বাস্তবে গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা হয়ে দেখানোর ব্যাপার।

    সে যাই হোক, আমরা দেখছি বুশের সহযোগী ব্লেয়ার, এখন আগেভাগেই সব স্বীকার করে নিলেন (তার পুরা বক্তৃতা এখানে)। বিশেষত মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন যখন এখনও তাঁর জিদ আর সাদা শাসন চালিয়ে যাবার স্বপ্নে বিভোর আছেন! ওদিকে পরিচিত আর বড় নেতাদের মধ্যে যারা এর আগে ব্লেয়ারের মতই স্বীকার করে নিয়েছিলেন তিনি হলেন – জিমি কার্টারের আমলের আমেরিকান এক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা সেক্রেটারি অব স্টেট (১৯৭৭-৮১) ব্রেজনেস্কি (Zbigniew Brzezinski)। আমার জানা মতে তিনিও প্রথম এমন স্বীকারোক্তি করেছিলেন।  কারণ তাঁর জমানাতেই চীন-আমেরিকার পারস্পরিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান ঘটেছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে পরস্পরের দেশে অফিস চালু হয়েছিল ১ জানুয়ারি ১৯৭৮ থেকে।   আগ্রহিরা দেখতে পারেন Surveying a Global Power Shift নামে তাঁর বইতে, নিউইয়র্ক টাইমস এর রিভিউ দেখা যাবে এখানে। 

    মনে হচ্ছে, টনি ব্লেয়ার এক্ষেত্রে সমসাময়িকদের চেয়ে এগিয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন? তিনি ব্লেয়ারের উল্টা! জিদ ধরলেন; আর যদিও ইতিহাস বলে এগুলো একেবারেই জেদাজেদি বা প্রতিহিংসার বিষয়ই নয়। বাইডেনের ক্ষমতায় আসার আগের তাঁর বোকা ও অবাস্তব সাফাই-যুক্তি ছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্প (তাঁর চেয়েও) বোকা, গোঁয়ার ও আরেক জেদি, তাই ট্রাম্প নাকি  চীনসহ অন্যান্যদের শায়েস্তা করতে এখনো আমেরিকার হাতে কী কী অস্ত্র মজুদ আছে তাই-ই জানেন না। বিপরীতে, বাইডেন যেন তা জানেন। আর সেগুলো ব্যবহার করে বাইডেন দুনিয়াকে দেখিয়ে দিতে চান ও পারবেন যে, আমেরিকার দিন শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু আমেরিকার হাতের কী বিশেষ অস্ত্র যা তাকে এখনো গ্লোবাল নেতৃত্বে আসীন করে রাখবেই বলে তার নিজের অনুমান?

    বাইডেন ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে (যদিও মনে খায়েশ ছিল যদি রাশিয়াকে বাঁচাতে চেয়ে চীনও সাথে নেমে যায়) নামিয়ে এরপর আমাদের দেখালেন তার চোখে আমেরিকার সঞ্চয়ে থাকা বিশেষ অস্ত্রগুলো কী কী? তিনি খুলে দেখালেন ‘ডলার অবরোধ’ আর মানবাধিকার– এই দুটো আমেরিকার হাতের অস্ত্র বলে মনে করেন বাইডেন; যা আমেরিকান প্রতিদ্বন্দ্বীদের উপর (অবশ্যই তা অপব্যবহার, তাহলেও) তিনি তা প্রয়োগ করে তাদের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কাবু করে ফেলে, সারেন্ডার করতে বাধ্য করে জিতে যাবেন। মোটামুটি এই হল তার মূল তত্ব!!!

    এখানে ‘ডলার অবরোধ’ মানে হল, বাইডেন মনে করেন তিনি ‘প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিপক্ষ দেশকে মার্কিন ডলারে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে না দেয়া বা ওসব দেশের নাগরিকদের ব্যক্তিগতভাবেও ডলারের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে ওই রাষ্ট্রের অর্থনীতিকেই বাইডেন সহজেই ধসিয়ে দিতে পারেন। যেহেতু ডলার গ্লোবাল বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ও চালু মুদ্রা, তাই তিনিই সফল হবেন।’ এই ছিল বাইডেনের মূল অনুমান!

    অন্য দিকে, মানবাধিকার বলতে, বাইডেন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বি রাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলবেন। ভিন্ন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কেউ কারো জেনুইন  মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলতেই পারে। এর উপযুক্ত ফোরামও আছে, সেটা হল জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার অফিস। কিন্তু এখানে বাইডেন তা তুলবেন নিজ রাষ্ট্রের তরফে আর মানবাধিকারকে নিজ পররাষ্ট্রনীতির অংশ করে নিয়ে, আর এর শাস্তিও দেবেন নিজেই। তাই সত্যিই ওই রাষ্ট্র মানবাধিকার চরম লঙ্ঘনের দেশ হলেও- আমেরিকার এই অভিযোগ তোলার স্বচ্ছতায় সমস্যা তাতে থেকেই যায়। মানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ জেনুইন হলেও এই অভিযোগ তুলে একে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করে ফায়দা তোলা – বাইডেন এই অপব্যবহারের দিকটাই এখানে প্রধান।

    এছাড়া বাইডেন তো পরিষ্কার করেই জানাচ্ছেন, চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ও গ্লোবাল লিডারশিপ ক্রমেই আসন্ন হয়ে উঠলেও তিনি তা মানবেন না। উল্টা, চীনা উত্থান  ঠেকানোর জন্য লড়বেন।

    অর্থাৎ তিনি অপব্যবহার করবেন। কিন্তু লক্ষণীয় যে, এই চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ও গ্লোবাল লিডারশিপে বদল আসন্ন হয়ে উঠা – এই বিষয়গুলো কী কোন আমেরিকার সরকারি দলিলে স্বীকার করা হয়েছে? কোনো আমেরিকান সরকারই বা কি এটি স্বীকার করেছে?

    বাস্তবতা হল, হ্যা অবশ্যই স্বীকার করেছে। শুধু তাই নয়, এ নিয়ে সার্ভে-স্টাডি রিপোর্ট প্রকাশ করে আসছে গত ২০০৮ সাল থেকে নিয়মিতভাবে। গ্লোবাল ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস নামে যেমন শুরু হয়েছিল গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০০৮ নামে ২০২৫ [Global Trends 2025: A Transformed World] সালের দুনিয়া কেমন দেখতে হবে এ নিয়ে, এটা আমেরিকান প্রথম সরকারি দলিল। আবার, গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০১২ নামে ২০৩০ সালের দুনিয়া কেমন, গ্লোবাল ট্রেন্ড ২০১৭ নামে ২০৩৫ সালের দুনিয়া কেমন এভাবে নিয়মিত রিপোর্ট বের হয়ে এসেছে। আর মজার কথা হল, এসব কোনো রিপোর্টেই, এই ট্রেন্ড বা গ্লোবাল অভিমুখগুলোকে গায়ের জোরে কোন আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কি রোধ করতে বা ঠেকাতে যাওয়া উচিত অথবা যাওয়া সম্ভব?

    না, তা একেবারেই ওসব রিপোর্টে উৎসাহিত করা হয়নি। বরং অবজেকটিভ ঘটনা হিসেবে সেগুলো উপস্থাপিত হয়েছে। যদিও বুশের আমল থেকে শুরু করে শেষে ট্রাম্প এবং বাইডেন পর্যন্ত এই আসন্ন বদল বা চীনা উত্থানকে উল্টে দিতে সব প্রেসিডেন্টেই চেষ্টা-পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছেন, আমরা দেখছি। যেমন বুশের আমল ২০০৬ সাল থেকে চীনের উত্থান ঠেকাতে ভারতকে সুবিধা, পিঠ চাপড়ানি দিয়ে ভারতকে ব্যবহার করার পলিসি বাস্তবায়ন করেছেন তিনি। চীন ঠেকাতে ভারতকে ঠিকা দাও, এই নীতিকে বুশসহ পরবর্তী সব আমেরিকার প্রেসিডেন্ট অনুসরণ করে চলে এসেছেন। কিন্তু তাতে আবার কোন ফলাফল না দেখে ভারতকে সুবিধাদি দেয়া বন্ধ করেছিলেন (২০১৭) একমাত্র ডোনাল্ড ট্রাম্পই। আর বাইডেন এসে ভারতের বিরুদ্ধে নানাবিধ মানবাধিকারের লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। যদিও তা মুখেই কিন্তু কোন অবরোধ আরোপ কখনোই করেননি এখনও।

    সারকথায়, চীনা অর্থনৈতিক উত্থান কোন কিছুতেই ঠেকবে না- তা জেনেও সব মার্কিন প্রেসিডেন্টই কমবেশি ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে লেলানো-সহ নিজেই চীনের বিরুদ্ধে নানা কিছুই করে গেছেন, যাচ্ছেন যার আবার বিশেষ একটা হল, বাংলাদেশকেও ভারতের হাতে তুলে দেয়া যাতে ভারত আরামে আমাদের ছিঁড়ে খেতে পারে এমন সরকারও বসিয়ে দিয়েছে। আর বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেন ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে নামিয়ে এরপর আমাদের দেখাতে চেয়েছিলেন রাশিয়ার ওপর ইউরোপের ইউরো আর আমেরিকান ডলার অবরোধ করে কত সহজেই তিনি রাশিয়াকে পরাস্ত করে ও মাফ চাওয়াতে বাধ্য, তারা ঘটাতে পারেন। কিন্তু হায়! রাশিয়ান অর্থনীতি সস্তায় সহজেই ডুবে যাওয়ার বদলে রাশিয়ান মুদ্রা রুবল এখন উল্টা শক্তিশালী হয়েছে। অর্থাৎ ইইউ-আমেরিকা এদের মিলিতভাবে, বাইডেনের ভাষায় তারা ‘ওয়েস্টার্ন ফোর্স’, বিজয়ের বেশে হাজির হবেন- এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন দূরে থাক এখন নিজেদের ইজ্জত বাঁচানোই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

    ইইউর এই ব্যর্থতার মূল কারণ হল – সারা ইউরোপের রাশিয়ার উপর তেল-গ্যাসের জ্বালানিনির্ভরতা, যা  সীমাহীন এবং অন্তত আপাতত বিকল্প-হীন এক দশায় তারা । এটা এক কঠিন বাস্তবতা। আর এটাই তারা স্বীকার না করে গায়ের জোর দেখাতে গেছেন। এই কঠোর বাস্তবতার কারণেই বাইডেনের সব বাহাদুরি এক ফাজলামিতে পরিণত হয়েছে। বহুবার বহুভাবে ইইউ নিজে এই নির্ভরতার দিকটা বাইডেনের সামনে তুলে ধরে দেখিয়েছেন। বলেছেন, এখন এই নির্ভরতা কাটাতে উদ্যোগ নেয়া শুরু করলেও ২০২৭ এর শেষেই একমাত্র ফল পাওয়া মানে ইইউর রাশিয়ানির্ভরতা কাটতে পারে। যদিও তেল-গ্যাস জ্বালানি জিনিষটা এমন প্রাচুর্যের না যে “আরেক দোকান থেকে কিনলাম”।  কিন্তু বাইডেনের জিদের কাছে ইইউও হার মেনেছে, অসহায় হয়ে থেকেছে। ইইউ জোটের ২৭টা রাষ্ট্র ঠিক কী কারণে কোন জাদুতে বাইডেনের কথার উপরে কথা বলার ‘ভয়েজ নাই’ হয়ে গিয়েছিল ও আছে তা সত্যিই বিস্ময়কর লাগে!!!

    অনুমান করা হয়, চীন গ্লোবাল নেতা হয়ে গেলে দুনিয়া থেকে গত পাঁচ-ছয় শ’ বছরের টানা সাদা চামড়ার শাসন আধিপত্য ও দখল এবং অন্যদিকে যা এক সাদা ককেশীয় শাসন, এমন এথনিক বর্ণবাদের আধিপত্য লোপ যাতে না পায় এই লোভ দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করেছেন বাইডেন। ফলে ইইউকে বাইডেনের আমেরিকার সাথে বেঁধে নিয়ে জিদের ঝড় তোলেন – মানে ইইউর এসব রাষ্ট্র এথনিক বর্ণবাদ (তাদের সাদা ককেশীয় জাত শ্রেষ্ঠত্ব) এই আধিপত্য দেখানোর লকলকে লোভে পড়েছিলেন! আর এটা এতই তীব্র যে, ২৭ রাষ্ট্রের ইইউর সবাই লোভে পড়ে বোকা আর বোবা হয়ে গেল – এটা ভাবতেও হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়! অথচ এরাই এই কথিত ‘ওয়েস্টার্ন ফোর্স’ গত মাসেও তাদের মূল্যবোধ নাকি শ্রেষ্ঠ; (আর চীন-সহ আমরা বাকি এথনিক দুনিয়ার বাসিন্দারা যেন নিচা) এই বলে খুব গর্ব দেখিয়েছে! অথচ আগামী শীতে ইউরোপ জ্বালানি কোথা থেকে পাবে এর কোনো সংস্থান কথিত ‘ওয়েস্টার্ন ফোর্স’ এখনো করতে পারেনি। অর্থাৎ আগামী উইন্টারে [Winter] প্রতিটা ইউরোপবাসীকে ঘর গরম রাখার সংস্থান হয়নি বলে ঠাণ্ডায় ঠকঠকিয়ে কাঁপতে হবে নয়তো ঘরবাড়ি ছেড়ে গরমের সন্ধানে ভেগে যেতে হবে।

    বাইডেনের গত সপ্তাহের মধ্যপ্রাচ্য সফর থেকে শুণ্য হাতে ফেরাঃ
    বড় হামবড়া মুখের বাইডেন তাই জ্বালানি যোগাড়ে নিজেই মধ্যপ্রাচ্য সফরে গিয়েছিলেন গত ১৬ জুলাই। সৌদি আরবের জেদ্দাতে আরব দেশসহ মোট দশ দেশের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ছিল বাইডেনের সেই বৈঠক। ১০ আরব দেশ বলতে সৌদি, ইউএই [UAE]সহ ছয় গালফ স্টেট আর সাথে মিসর, জর্দান ও ইরাক এবং বাইডেনের আমেরিকা তো ছিলই যার আবার সাথে ফেউ এর মত দ্বিপাক্ষিকভাবে আমেরিকা-ইসরাইল আলাপ হয়েছে।

    বাইডেনের মুল উদ্দেশ্য ছিল দুটা। এক. মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপের জন্য বাড়তি তেল-গ্যাস জ্বালানির ব্যবস্থা করা যায় কি না! আর সাথে দুই. গ্লোবাল জ্বালানি তেল-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে লাগাম দেয়া যাতে দুনিয়াব্যাপী যে মুদ্রাস্ফীতি জাগিয়ে বাইডেন ‘কৃতিত্ব’ রেখেছেন এর দায়দায়িত্ব তিনি এখন কিছু লাঘব করতে পারেন কিনা; যাতে তাঁর জিদ্দি অবিবেচক সিদ্ধান্তের দায়ভার কিছুটা কমে। কিন্তু হায়, সেটাই ব্যাক-ফায়ার করেছে। সৌদি আরবের বর্তমান বাদশা বেঁচে থাকলেও ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (সংক্ষেপে এমবিএস বা MBS ডাকা হয়) কার্যত তিনিই সৌদি আরবকে এখন নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। এখানে নিচে সেই সভায় এমবিএস যে জবাবটা দিয়েছিলেন সেই বক্তৃতার সারাংশ নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের, আমার নিজের করা অনুবাদ তুলে এনেছি। ভুল অনুবাদের দায় আমার তবে পাঠকের কোনখানে সন্দেহ হলে মূল টেক্সট দেখে নিতে পারেন।

    গত ১৬ জুলাইয়ে রয়টার্স লিখছে : “সৌদি যুবরাজ ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান শনিবার বলেছেন, ফসিল ফুয়েল (মাটির নিচের তেল) খাতে আরো বিনিয়োগ প্রয়োজন ও গ্লোবাল চাহিদা মেটানোর মত শুদ্ধ (clean) জ্বালানি টেকনোলজি দরকার এবং বলাই বাহুল্য কোন, অবাস্তব জ্বালানি নিঃসরণ পলিসি নিলে তা আমাদের অকল্পনীয় পর্যায়ের মুদ্রাস্ফীতির দিকে নিবে; জ্বালানির মূল্য বাড়িয়ে দিবে, বেকারত্ব বাড়াবে এবং সমাজ ও নিরাপত্তার প্রশ্নকে আরো দুর্বল (vulnerable) করে ছাড়বে”।

    এরপর ” সৌদি যুবরাজ তাঁর দেশের তেল উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বলেন, এটা ২০২৭ সালের মধ্যে দৈনিক ১৩ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত বাড়বে যা এখন ১২ বিলিয়ন সক্ষমতায় আছে। আর এরপর আমাদের কিংডমের আর বাড়ানোর কোনো সক্ষমতা অবশিষ্ট থাকবে না”।

    তিনি এসব কথা বলছিলেন জেদ্দায় আমেরিকা ও আরবদের নিয়ে এক শীর্ষ সম্মেলনে যেখানে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন উপস্থিত ছিলেন। বাইডেন আসলে আশা করে এসেছিলেন, সৌদি আরব ও তার ওপেক পার্টনাররা বাজারে আরো বেশি তেল ছাড়ুক যাতে জ্বালানি তেলের মূল্য নেমে আসে, যাতে এর প্রতিক্রিয়ায় চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে উপরে উঠে যাওয়া আমেরিকান-সহ সারা দুনিয়ার মুদ্রাস্ফীতি নেমে আসে, জীবন সহজ হয়। এমবিএস স্পষ্টতই দুনিয়াব্যাপী চরম মুদ্রাস্ফীতির জন্য বাইডেনকেই দায়ী করেছেন। আর তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, আপনাদের সেই ভুল নীতির দায় আপনারা কেন আরবদের ওপর চাপাতে এসেছেন?

    এক কথায় বললে, এই রিপোর্টের মূলকথা হল, খুবই নরম উপস্থাপনায় কিন্তু কঠোর কূটনৈতিক ভাষায় তিনি বাইডেনের পলিসিকে বোকা জিদ্দি বলেছেন। বলেছেন, বাইডেনের চিন্তা-পলিসি অবাস্তব ফলে অকেজো! অর্থাৎ, আসলে একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের এটাও দেখতে বাকি ছিল!!!

    সেকালে ১৯৪৫ সালের বিচারে গ্লোবাল নেতা আমেরিকা আর সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্কের সূচনা করেছিলেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, ৭৫ বছর আগে বাদশাহ আবদুল আজিজের সাথে সাক্ষাৎ দিয়ে। আর সেই সাক্ষাৎটা ঘটেছিল মিসরে। আজ যেমন মিসর সৌদিতে এসে দেখা করেছে বাইডেনের সাথে। সেকালে ১৯৪৫ সালে বাদশাহ আজিজ উজিয়ে মিসর গিয়ে রুজভেল্টের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন । সে বছরই রুজভেল্ট গ্লোবাল নেতা হিসেবে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত হন। আর আজ প্রেসিডেন্ট বাইডেন সৌদি সফর করে আমেরিকান মুকুট ধুলায় লুটিয়ে দিয়ে গেলেন। কারণ, সব আলাপ শেষে, এমবিএস বাইডেনকে কোনো কিছুরই প্রতিশ্রুতি দেয়নি ।

    রয়টার্স তাই শেষে লিখছে, বাইডেনের ওই সফর শেষে “কোনো আশ্বাস বা সৌদি প্রতিশ্রুতির কোনো যৌথ ঘোষণা ছাড়াই আলাপ শেষ’ হয়েছে […but there was unlikely to be any bilateral announcements from the talks.] । তাতে সারা দুনিয়া দেখেছে এমবিএসের যেটুকু বাস্তবতা জ্ঞান আছে এই বিচারে বয়োবৃদ্ধ বাইডেন হেরে গেছেন; জিদ্দি গোঁয়ার বয়স্ক মানুষ কেউ দেখতে পছন্দ করে না। বরং আশা করে, আমাদের মুরুব্বিরা অবশ্যই আমাদের চেয়ে ধৈর্যশীল স্থির এবং অভিজ্ঞতাব্ধতায় আমাদের ছাড়িয়ে যাবেন, সর্বোপরি আমাদের সবার চেয়ে বড় বিবেচক হবেন। কিন্তু হায়! বাইডেন সবাইকেই হতাশ করেছেন! একারণে বেশির ভাগ মিডিয়ার এ নিয়ে রিপোর্টের শিরোনামের সাধারণ সুরটা হলঃ  “আরব শীর্ষ সম্মেলনে তেল চুক্তিতে ব্যর্থ বাইডেন, ফিরলেন ‘শূন্য হাতে’।”

    তাহলে কি আগামী নভেম্বরে আমেরিকান মিড টার্ম নির্বাচনে বাইডেনের ডেমোক্র্যাটিক পার্টি শুধু গো-হারা হারবে? তাই নয়। আরো অনেক ব্যর্থতাও বাইডেনকে সম্ভবত আঁকড়ে ধরবে, পিষে ফেলবে!! ফলে ইউক্রেনকে রাশিয়ার সাথে আপস করার মুখে ফেলে কী বাইডেন হয়ত পালিয়ে যাবেন? আর সব দিকের বিপদ টের পেয়ে সবার আগে ইইউ কী বাইডেনের হাত ছেড়ে এবারের শীতকাল শুরুর আগেই রাশিয়ার দিকে হাত বাড়াবেন? সবাইকেই বাস্তবতার সামনে মাথা নামাতেই হয়, এই বাণী দিতে দিতে?

    এদিকে ইতোমধ্যেই বাইডেনের ইউক্রেন যুদ্ধ লাগানো এটাকে মিসক্যালকুলেশনে ব্যর্থ উচ্চাশা বলা শুরু হয়েছে; ওয়াল স্ট্রিট এর দিক থেকে [President Joe Biden’s administration faces a double disaster after its Ukraine miscalculation, namely a US recession and a second strategic humiliation……] । এমনকি এটা তার স্ট্রাটেজিক মানহানিকর নাকানি বলছে। 

    কেন এমন কড়া কথা বলছিঃ
    গত ১৯ জুলাইয়ের খবর হল ইইউ ইতোমধ্যেই ‘অধোমুখ’ মানে মাথা নিচু করে ফেলেছে। অর্থাৎ ‘রাশিয়ার সাতটি ব্যাংকের উপর অবরোধের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে ইইউ’– এই হল সংবাদ শিরোনাম। এটাও রয়টার্সের খবর যে এক ‘ বৈঠকে রাশিয়ার সাতটি ব্যাংকের ফ্রিজ করা অর্থ ছাড় দেয়ার ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন তারা। ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিটিবি, সোভকোম ব্যাংক, নোভিকোম ব্যাংক, অটক্রিটি ব্যাংক, প্রমসভায়াস ব্যাংক ও ব্যাংক রাশিয়া। তবে রুশ বৃহত্তম ব্যাংক সেবার ব্যাংকের সম্পদ ছাড়ের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন এক ইইউ কর্মকর্তা।

    আবার আরেক হট নিউজ দিচ্ছে রয়টার্স। সৌদি আরব নিজের তেলের বিশাল রফতানিকারক হওয়া সত্ত্বেও উল্টা রাশিয়ান তেল আমদানি শুরু করেছে কয়েক সপ্তাহ হয়ে গেল। কেন?

    কারণ, রাশিয়া সৌদি আরবকে ডিসকাউন্ট মূল্যে তেল বিক্রি করছে [Russia has been selling fuel at discounted prices after international sanctions over its invasion of Ukraine left it with fewer buyers. ]  বলে সৌদি আরব এই তেল আমদানি দ্বিগুণ করেছে যে তেল দিয়ে সে আসন্ন শীতে নিজের পাওয়ার স্টেশনের জ্বালানি চাহিদা মিটাবে। এতে তার নিজের বেঁচে যাওয়া জ্বালানি তেলও যার দাম বেশি তা তাকে বাড়তি সুবিধা দেবে।

    এসব খবর বাইডেনের দিক থেকে দেখলে তার জন্য আত্মহত্যামূলক বলতেই হয়! গত দুই বছরে তার নেয়া সব সিদ্ধান্ত, সব পলিসিই কি তাহলে মুখ থুবড়ে পড়তে যাচ্ছে? ইউক্রেন যুদ্ধ  কী তবে থেমে যাচ্ছে!!!

    সর্বশেষ, গতদিনের খবর হল, বাইডেন ইউক্রেনের উপর কড়া শর্ত আরোপ করে রেখেছেন এই বলে যে, তারা যেন রাশিয়ার সাথে কোনো বিষয়ে আপসের কোনো আলাপই না করে। অথচ ইউক্রেন খাদ্য রফতানির দেশ হওয়া সত্বেও যুদ্ধের মধ্যে রাশিয়ান বাধায় গত ফেব্রুয়ারি থেকে ২২ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য গুদামে আটকে আছে। গত এক মাস ধরে জাতিসঙ্ঘ আর তুরস্কের মধ্যস্থতায় এবং ফাইনালি এবার সেক্রেটারি জেনারেল গুতেরেস ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগানের উপস্থিতিতে ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে যাতে আটকে থাকা খাদ্য ইউক্রেনের ওডেসা বন্দর দিয়ে বের হতে পারে। এটাও কি বাইডেনের জন্য ভালো লক্ষণ? সম্ভবত তার কপালই ভালো জানে!

    আর আজকের খবর হল, যুদ্ধে ইউক্রেনের ওডেসা বন্দরে রাশিয়ান এক গোলা গিয়ে পড়েছে (যদিও রাশিয়া আজ তা অস্বীকার করেছে)। ফলে কার্যত রপ্তানি কার্যক্রম থমকে দাড়িয়েছে। ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কি মন্তব্য করেছে তারা জানতেন পুতিন এমন একটা অজুহাত বের করবেন!!! যুদ্ধে কোনপক্ষই এথিক্যাল যুদ্ধ করে না, বরং সুযোগ পেলেই ভাঙ্গে। তবে কষ্ট করে যুদ্ধের আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে চেষ্টা করে। আসলে কেউই প্রতিপক্ষের উপর সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। কাজেই জেলেনেস্কির উচিত হবে বাইডেনের পুতুল হয়ে থাকার দিন শেষ করা। কারণ, শেষে বাইডেন তাকে ফেলে পালাবেই!!! তাই, বেটার আগেই নিজের ভাগ্য গুছানো!!   ওদিকে ইউরোপিও ইউনিয়নও মুচরানো শুরু করেছে [নিজেদের আর্থিক সংকটের অজুহাতে ইউক্রেনকে সাহায্য পাঠানো বন্ধ করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন]।

    সবশেষে লেটেস্ট বিদ্রোহের খবরঃ বিদ্রোহীর নাম ইটালি সাথে আছে পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরি যারা ইইউ এর গ্যাস ব্যবহার ১৫% কমানোর বিপক্ষে। ওদিকে পর্তুগাল ও স্পেন পাবলিকলি এই পরিকল্পনার বিরোধিতা শুরু করেছে। ইটালির প্রেসিডেন্ট বক্তৃতা দিয়ে বিরোধীতা করছে। যেটা দুদিন আগে আমাদের সময় টিভিতে দেখানো একটা নিউজ ক্লিপে প্রচারিত হয়েছে। এদিকে আজ আমাদের এনটিভি এই একই নিউজ টেলপে প্রচার করেছে। এখনই হাতের কাছে নাই তাই লিঙ্ক দিতে পারলাম না। পরে পারব। আর বিদ্রোহের মূল খবরটা আছে ব্লুমবার্গ নিউজে এখানে শিরোনাম Italy, Poland Raise Concerns About EU Proposal to Cut Gas Use.।

    ।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২৩ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটছে?” এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • ‘ইকোনমিস্টের’ খায়েশ কী পূরণ হতে পারে

    ‘ইকোনমিস্টের’ খায়েশ কী পূরণ হতে পারে

    গৌতম দাস

    ১৮ জুলাই ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4aK

     

     

    [ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিন চলতি আমেরিকা নিয়ে কিছু আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছে। আর তা করতে গিয়ে আমেরিকায় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট কত গভীর এর আভাস দিয়ে ফেলেছে। আজকের প্রসঙ্গ এনিয়ে। ]

    অরিজিনালি এর পরিচয় ছিল “সাপ্তাহিক লন্ডন ইকোনমিস্ট” বলে। বিগত ১৮৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ‘ইকোনমিস্ট’ পত্রিকা একালে এসে তা আমেরিকাতেও নিজের বিস্তার ঘটিয়েছে – এমনকি ‘কোর এডিটরিয়াল অফিসটা’ এই আমেরিকা থেকেই পরিচালিত। আবার এখন এক ওয়েব ভার্সনও বের করেছে যাতে সে যেন এক দৈনিক পত্রিকাও হয়ে গেছে। কারণ, কী আর করা! শক্ত প্রতিযোগিতায় মিডিয়া বলতে একালে তাতে  “লোকাল” বলতে কিছু নাই কারণ সবই তা অনলাইনের দুনিয়া হয়ে গেছে। ফলে সাপ্তাহিক বলে কেউ এক সপ্তাহ হাতগুটিয়ে বসে থাকলে সেই মিডিয়ার বাজার তাতে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর দখলে চলে যেতে পারে। অতএব অনলাইনে হলেও দৈনিক উপস্থিতি বা হাজির নিশ্চিত করতে হয়েছে সকলকে।

    অবশ্য এর পিছনে অন্য আরেক বড় কারণ আছে। সেটা আমেরিকার এক সরকারি সার্ভে রিপোর্টের ভাষায় বললে, ‘গ্লোবাল পুঁজিপ্রবাহের অভিমুখ’ প্রসঙ্গে, যা দুনিয়ার বাকি সবকিছুর প্রবাহ – এদের অভিমুখ নির্ধারণ করে দিচ্ছে।  ঐ রিপোর্ট বলেছিল, গ্লোবাল বিনিয়োগপুঁজির প্রবাহের অভিমুখ একালে পশ্চিম থেকে পুবে মানে এশিয়ামুখী হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়; এই এশিয়ামুখী অভিমুখ আপাতত যেটা ফিক্সড বা এমন স্থিরতা লাভ করে অবস্থান নিয়ে ফেলেছে যে তা আর আগামীতে আবার কখনোই তা উলটে পশ্চিমামুখী হবে না;  অর্থাৎ এটা ই-রিভার্সিভ্যাল [irreversible] হয়ে গেছে। ঠিক যেভাবে লাগাতার গত ৪০০ বছর ধরে এটা পশ্চিমমুখী হয়ে কেন্দ্রীভূত ও সঞ্চিত হয়ে চলেছিল। সারা দুনিয়াকে কলোনি বানিয়ে লুট করে ইউরোপ নিজের হাতে দুনিয়ার সব অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত পশ্চিমমুখী করে কেন্দ্রীভূত ও সঞ্চিত করে নিয়েছিল। সেটাই এখন উল্টা, স্থায়ীভাবে এশিয়ামুখী হয়ে গেছে। আর এভাবেই উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের এক নয়া-কাল হতে শুরু করে দিয়েছে। এশিয়ান এক চীনা উত্থানে এসব উল্টে গেছে; যেটাকে অনেকে অবজেকটিভ বা প্রাকৃতিক প্রতিশোধের এক নয়াকাল বলতে শুরু করেছে।

    আমেরিকান ঐ সার্ভে রিপোর্টের মূল অর্থ-তাৎপর্যের আলোকে এখন গ্লোবাল মিডিয়াকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব। প্রায় ২০০ বছর আগের প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমা মিডিয়াগুলো একালের এই ‘অভিমুখ বদলের’ ব্যাপারটা তৎক্ষণাৎ বুঝে না ফেলার কোনো কারণ নাই, তারা বুঝে গেছিল। আর তারই প্রতিক্রিয়াজাত সিদ্ধান্তে পশ্চিমের প্রতিটা মিডিয়া হাউজ দুনিয়া থেকে হারিয়ে যাওয়ার আগেই টিকে যাবার জন্য, এশিয়ামুখী হয়ে নয়া অবস্থান সূচনা করে দিয়েছে। যেমন তাদের ফোকাস এখন এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রভাবশালী পাঠক বা প্রতিষ্ঠান কারা [মানে কাদের পাঠ এশিয়ার সমাজগুলোকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে] – দ্রুত এমন তাঁদেরকে খুঁজে বের করা আর নিজ নিজ মিডিয়া প্রডাক্ট এসব ব্যক্তিদের হাতে তুলে দিয়ে তাদের প্রভাবিত করতে না পারলে এশিয়া-কেন্দ্রিক নবউত্থিত গ্লোবাল-বাজার ওসব পশ্চিমা মিডিয়ার হাতছাড়া হয়ে যাবে; আর,  তাতে প্রভাবশূন্য হয়ে যেতেও পারে, তা বলাই বাহুল্য। ঠিক এটাই ঘটতে শুরু করেছে। এমনিতেই আমেরিকার ওয়াল স্ট্রীটের বাইরে সিঙ্গাপুরকেন্দ্রিক নয়া গ্লোবাল পুঁজিবাজার এর এক্সটেনশন –  এই শিফটিং অনেক আগেই ঘটে গেছে। সেই সাথে গত ১৪ বছর ধরে এখন হংকং, সিঙ্গাপুরকেন্দ্রিক নয়া মিডিয়া হাউজগুলোরও দ্রুত উত্থান হচ্ছে।  যেমন এশিয়া টাইমস অথবা সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্ট ইত্যাদি সেন্ট্রাল ভুমিকা নিয়ে নিয়েছে।  অতএব, ইকোনমিস্টও এখন অনলাইনে হলেও দৈনিক ভার্সনে হাজির!

    ইকোনমিস্টের এমনই এক অনলাইন দৈনিকের ভার্সন, আমার মত অনেকের ই-মেল বক্সেও এসেছে এই সপ্তাহে। সেখানে গত ১৬ জুলাই সংখ্যা এর এক প্রধান আর্টিকেলের ছোট শিরোনাম হল – ‘ওয়েক আপ, ডেমোক্রাটস’ [Wake up, Democrats! (উপরের ছবিতে দেখেন)]! বাংলা করে বললে, “আমেরিকান ডেমোক্র্যাট দলের লোকেরা, এবার জেগে ওঠো!” নিচে যার আবার বড় আরেক শিরোনাম দেয়া আছে। সেটা হল এমন, “ডেমোক্র্যাটদের জেগে ওঠা দরকার আর তাদের অ্যাক্টিভিস্টদের চরমপন্থী খায়েশে সব তছনছ হয়ে যাওয়া বন্ধ করা উচিত” [The Democrats need to wake up and stop pandering to their extremes]।’ আবার একটা সারকথা শেষে লিখে দিয়ে বলেছে, ‘আমেরিকার ভালোর জন্য শাসক দলের জরুরিভাবে নিজ দলের অ্যাক্টিভিস্টদের নিয়ন্ত্রণ নেয়া উচিত” [For the good of America, the governing party urgently needs to take on its own activists] !’ বলাই বাহুল্য, কী সাংঘাতিক এসব কথা! কিন্তু ইকোনমিস্ট কেন এত গরম কথা বলছে? সেটা দেখা যাক।

    এরপর ঐ আর্টিকেলের প্রথম কয়েকটা বাক্য আমি এখানে তুলে আনছি। লিখছে, আমেরিকার “প্রত্যেক প্রেসিডেন্টের আকাঙ্ক্ষা থাকে, তিনি এক ঐতিহাসিক কালের প্রেসিডেন্ট হবেন। তবে সেটা যেন অবশ্যই জো বাইডেনের মত ঐতিহাসিক প্রেসিডেন্ট নয়”। পরের বাক্যে লিখেছে, “এপর্যন্ত বাইডেনের প্রেসিডেন্টগিরিতে দেখা যাচ্ছে, তাঁর পাবলিক রেটিং বা গ্রহণযোগ্যতা ১৯৫০ সালের পরে সর্বনিম্ন”। ইকোনমিস্ট কেন এমন লিখল, কারণ রয়টার্সের ১৩ জুলাই প্রকাশিত এক সার্ভে বলছে – বাইডেনের গ্রণযোগ্যতা মাত্র ৩৯%। আর বাইডেন “সরাসরি ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রকাশিত মতের” পাবলিক হল ৫৫%।

    Every president yearns to be historic—but not historic like Joe Biden. At this point in his presidency Mr Biden’s singular achievement is to have the lowest approval rating of any incumbent since the 1950s. Even among Democrats, 67% think the economy is doing poorly, 78% think the country is heading in the wrong direction and 64% want another presidential candidate on the ticket in 2024.

    এরপরে আরেকটা তথ্য যোগ করেছে ইকোনমিস্ট, যেটা আরো মারাত্মক! লিখছে, ‘এমনকি ডেমোক্র্যাট দল মানে বাইডেনের নিজ দলের ভেতরে তার গ্রহণযোগ্যতাবিষয়ক তথ্যে দেখা যাচ্ছে – ৬৭% দলীয় কর্মী মনে করেন বাইডেনের অর্থনীতির পারফরম্যান্স খুবই খারাপ। এমনকি “৭৮% পাবলিক মনে করেন দেশ ‘ভুল পথে’ চলছে আর সে কারণে, ৬৪% মনে করেন আগামি ২০২৪ সালের নির্বাচনে বাইডেন নয় ভিন্ন প্রার্থী খোঁজা দরকার”।

    গতবছর ক্ষমতাসীন হওয়ার সময়  মানে ‘১৮ মাস আগে বাইডেন জনগণকে একটু শান্তি দেবেন, ভালো দিন দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন”। কিন্তু ঘটেছে উল্টা। তাদের সব সুখ ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। চরমতম মুদ্রাস্ফীতি, সব সদিচ্ছা সু-বোধ সব হারিয়ে গেছে। এক গ্লোবাল মুদ্রাস্ফীতিই যেন সবকিছু খেয়ে ফেলেছে। আমেরিকার মুদ্রাস্ফীতি এখন ৯.১%। যেখানে কোন দেশে্র  মুদ্রাস্ফীতি ৫-৬% এর উপরে দেখা দিলে – ব্যবসায়ী নয়, তবে চাকরি করেন বা ছোট ব্যবসায়ী যারা, এমন সব নিম্নআয়ের মানুষের কাছে এমন মুদ্রাস্ফীতি খুবই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ, এটা তাদের ছোট ছোট সঞ্চয়ের উপর তারা সাধারণত যে ব্যাংক ইন্টারেস্ট পান, মুদ্রাস্ফীতি তাকেই ছাপিয়ে যায়, নেগেটিভ করে দেয়। এতে এককথায় সঞ্চয়ের মূল্য নেগেটিভ হয়ে যায় মানে, যেন সঞ্চয় ক্ষয়ে যায়।

    কাজেই আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আসন্ন মিড-টার্ম নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা গো-হারা হারবে তা নিয়ে তাদের নিজেদের আর কোনো সন্দেহ নেই। সার্ভে রিপোর্টগুলোও তা বলছে। এই ফাঁকে বলে নেয়া যাক, আমেরিকার মিড-টার্ম নির্বাচন মানে হল, তাদের চার বছরের প্রেসিডেন্ট টার্মের ঠিক প্রথম দু’বছর পূর্তিতে নয়া যে নির্বাচন। না, তাই বলে মিড-টার্ম এটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কিছুই নয়। যেমন, এখানে এবারের মিড-টার্মে ডেমোক্র্যাটরা হেরে গেলে তাতে প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে পদত্যাগ করে বাসায় চলে যেতে হবে না। তিনি বরং ২০২৪ সাল পর্যন্ত আগের মতই প্রেসিডেন্ট থেকে যেতে পারবেন। আসলে এই নির্বাচন হল, কংগ্রেস (আমাদের তুলনীয় ভাষায় বললে সংসদ) ও সিনেট (বা দ্বিতীয় সংসদ) এই দুই জায়গাতেই হবু নির্বাচন। তবে সব আসনে নয়, মিড-টার্মে কেবল এক-তৃতীয়াংশ আসনেই নতুন নির্বাচন হবে। আর সার্ভে প্রেডিকশন বলছে, এবারের মিড-টার্ম নির্বাচনে বাইডেনের পাপে ডেমোক্র্যাট দল বেশির ভাগ আসনেই গো-হারা হেরে যাবে। আর এতে পরবর্তীতে ফল হবে এই যে, পরে বাইডেন সরকার চালাতে গিয়ে পদে পদে বাধা পাবে। কারণ, ন্যূনতম সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে না বলে বাইডেন যাই করতে যাবেন তাতে আইনি সহায়তার দরকার হলে তাতে কংগ্রেস বা সিনেটের অনুমোদন না পেয়ে এর জ্বালায় প্রেসিডেন্টকে ভুগতে হবে।

    এরপর এক কড়া নেতিমানের মন্তব্য জুড়ে দিয়েছে ইকোনমিস্ট। শব্দটা হলো জেরোন্টো-ক্রাটিক [Geronto-cratic]। একে খাস বাংলা করে বলতে হয় – ‘বুইড়াদের’ শাসন বা সরকার। কেন এমন কথা? মানে ক্ষমতার শপথ নেয়ার পর থেকেই বাইডেন যে এক অনেক বয়স্ক ব্যক্তি একথাটা এর মধ্যে অনেকবারই প্রকট হয়ে উঠতে দেখা গেছে। বিশেষত, এক অসুস্থতায় বাইডেনকে ল্যাবটেস্ট করাতে গিয়ে তাকে ‘আংশিক অচেতন’ হতে হত। তাই ল্যাবে যাওয়ার আগেই তিনি ভাইস প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতা দিয়ে এরপর ল্যাবটেস্টে গিয়েছিলেন।

    আর এই ব্যাপারটাতে “প্রেসিডেন্ট আসলে অনেক বুইড়া” অথবা “এর বেশিদিন আয়ূ নাই”  এ্ধরণের কথা যেন নগদে প্রমাণ হিসেবে পাবলিকলি হাজির হয়েছিল। আবার ওদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প তিনিও যথেষ্ট বুড়া সেকথাটাও সত্যি বটে; আবার পাবলিক পারসেপশনেও তাই। একারণেই ইকোনমিস্ট মন্তব্য করেছে, যেন বুইড়া বাইডেন আগামী দু’বছর আরো খারাপ সরকার চালিয়ে শেষে সেই কারণেই না আবার আরেক বুইড়া ট্রাম্প – একেই না প্রেসিডেন্ট বানিয়ে নিয়ে হাজির করেন! অবশ্য মূল কথাটা এখানে আসলে আমেরিকান আম-মানুষের মধ্যে হতাশা, এক গণহতাশা এসে গেছে!  মানে সামনে আমেরিকানদের ভাগ্য বদলের কোনো আশা নেই – তাই খায়েশ হল একেই ঠীকঠাক করতে হবে; এটাই হল ইকোনমিস্টের মূল মেসেজ!

    আবার ইকোনমিস্ট আগেই ডিসক্লেমার করে বলে নিচ্ছে, ‘রাজনৈতিক দলকে পরামর্শ দেয়া এই পত্রিকার কাজ বা দায়িত্ব নয় [This newspaper does not usually hand out advice to political parties, but America’s sickly democracy requires urgent repair.]।’ এখন স্বভাবতই প্রশ্ন আসে তাহলে যে ইকোনমিস্টের এই আর্টিকেল ছাপানোর দরকার কী? তাই এর উত্তরে আগাম তারা বলে রাখছে, ‘আমেরিকার অসুস্থ গণতন্ত্র এর জরুরি মেরামত দরকার’ তাই এ বিশেষ ব্যবস্থা।

    তবে উপরে যে হতাশার কথা বলা হল সেটা অবশ্যই রেগুলার বা সাধারণ হতাশা একটা সমাজে যেমন দেখি তেমন বলে বুঝলে ভুল হবে। কেন?
    এর জবাব পাওয়া যাবে ইকোনমিস্টের কিছু আকার ইঙ্গিতে বলা পরের মন্তব্য থেকে।  যা আসলে বর্তমান আমেরিকান সমাজের অভ্যন্তরীণ গাঠনিক তন্তুতে দুর্বলতা ও নুন্যতম সামাজিক ঐক্যের অভাবে যা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ছোট ছোট শিরোনাম আকারে ইকোনমিস্ট তা উল্লেখ বা একটা তালিকা করে বলেছে  যেমন – ১. “ডি-ফান্ড দ্যা পুলিশ” মুভমেন্ট [a movement to “defund the police”, abolish immigration enforcement, ]; মানে হল পুলিশ যদি সমাজের ঐক্য ধরে রাখতে কাঙ্খিত ও প্রয়োজনীয় কর্তব্য পালন না করতে পারে তাহলে পুলিশ বাহিনীতে ফান্ড দেয়া বন্ধ করতে হবে – বলে গড়া এক সামাজিক আন্দোলনের কথা বলা হচ্ছে এখানে। এ ধরনের, অনেক আন্দোলনের কথা তুলেছে ইকোনমিস্ট। যেমন আরো আছে – ২। সীমান্তে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা কার্যকর না করে তুলে দেয়া বা ‘abolish immigration enforcement’; অথবা মেয়েদের জন্মদাত্রী মানুষ হিসেবে তুলে ধরার আন্দোলন [relabel women as birthing people]; অথবা ক্লাসরুম থেকেই ছাত্রদের অ্যান্টি-রেসিজম শেখানো (আসলে বলতে চাইছে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী চিন্তায় সমাজ ছেয়ে গেছে তাই এর বিরোধিতার কথা) ইত্যাদি। লক্ষ্য করার বিষয় এসব প্রতিটা দাবিই মূলত সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদিরা তুলে থাকে এমন দাবি।

    “……a movement to “defund the police”, abolish immigration enforcement, shun capitalism, relabel women as birthing people and inject “anti-racism” into the classroom……”

    আসলে সার কথায় অপ্রত্যক্ষভাবে ইকোনমিস্ট বলতে চাইছে, রিপাবলিকানরা একালে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারায় বিভিন্ন সামাজিক ঝোঁক বা তা থেকে ওঠা অসন্তোষকে উসকে দিচ্ছে। তাই ইকোনমিস্ট চাইছে ডেমোক্র্যাটদের এর বিরোধিতায় পাল্টা এথিকস, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে কাজে উঠে আসতে হবে – এই হল ইকোনমিস্টের বাসনা। যদিও এমন আকাঙ্খা পূরণ হতে হলে এর  মূল  সমস্যা হল, বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বাঁধবে কে?

    কারণ, খোদ বাইডেনই আরেক ধরনের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী [Colonial White Supremist Global Power হতে চায়] – যাকে হয়ত বলা যায় ‘গ্লোবাল সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী’। এই কায়দাতেই তিনি ইউরোপকে সাথে নিয়ে চীনবিরোধী এক আটল্যান্টিক জোট গড়তে নেমে পড়েছেন। বাইডেন তার “পশ্চিমা শক্তি” – ইউরোপ-আমেরিকা মিলে যে পশ্চিমা-মন, এই মনকে সুরসুরি দিচ্ছেন যে চীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বে এসে গেলে গত পাঁচ-ছয়শ বছর ধরে দুনিয়ার উপর সাদা মানুষের শাসন যা এখন প্রান্তে এসে ঠেকেছে এই রামরাজত্ব উবে যাবে। একে হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। তাই যেন তারা চীনবিরোধী সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী জোট গড়ে লড়তে এগিয়ে আসে। এভাবেই পশ্চিমা-মনকে উস্কে সকলকেই তিনি এক বর্ণবাদি-রেসিজমের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তিনি গ্লোবাল – এখানেই তিনি কেবল ট্রাম্প থেকে আলাদা। তাহলে  ডেমোক্কেরাট না রিপাবলিকান? কে কাকে নৈতিকতা শেখাবেন?

    তাছাড়া মূল সমস্যা তো এগুলোর একটাও নয়। আমেরিকান সমাজে অনৈক্য কেন?
    এর কারণ খুঁজবে কে?
    যেমন, গত পঁচাত্তর বছর ধরে আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়ে আছে। আর সেই থেকে নিজ সমাজে আমেরিকানরা যেসব আয়েসী জীবনের সুযোগ সুবিধার জীবনভর উপভোগ করে আর  সেই সাথে দুনিয়ার উপর মাতব্বরি করে এসেছে – এক চীনা অর্থনৈতিক উত্থানেই তা এখন এলোমেলো হয়ে গেছে। তবে এতে পুরনো আমেরিকান সমাজ যেন এর ধাক্কায় ধসে পড়বে তা তো হওয়ারও কথা ছিল না। যদি আমেরিকানরা বুদ্ধিমানের মত চীনের সাথে প্রয়োজনীয় পজিটিভ ডিল করে কিছু প্রয়োজনীয় রি-অ্যাডজাস্টমেন্ট করে, মেনে নিয়ে এগিয়ে যেত। বৃটিশদের টপকে আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়ে যাওয়াতে তো সেই থেকে লন্ডন বসবাসের অযোগ্য শহর হয়ে যায় নাই!! তাই না!!  তাহলে?
    অথচ গত ছয় বছরে, না ট্রাম্প না বাইডেন কেউ চীনের সাথে সহবস্থান বা আপোষে প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থান খোঁজার পথে যায় নাই, সেদিকে যাননি। বরং ঘুরেফিরে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের নেতা হয়ে উঠতে চেয়েছে। যেন এই বর্টাণবাদি রাস্তাটাই তাদের কেবল চোখে পড়েছে আর খুবই পছন্দ হয়েছে। এখন নিজ সমাজকে সেদিকে ঠেলে দিয়েছেন। দুনিয়ার ওপর ছড়ি ঘুরাতে পারার ‘সীমাহীন লোভ’ তাদের চোখ-মুখে ঝিলিক দিয়ে গেছে, এখনো যাচ্ছে – বাস্তবে সব জায়গা থেকে নিজেরা হারিয়ে যাচ্ছেন এটা দেখার পরও।

    ফলে এখনকার আমেরিকান সমাজ হল সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের প্রতি ‘সীমাহীন লোভ থেকে জাত’ এক  অনৈক্ক্যযের সমাজ; এটা অনৈক্য কে কাটাতে আসবে, কে পাড়বে? কারণ, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দুই রাজনৈতিক ধারাই এখন সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের অনুসারি; কেবল, তাদের প্রকাশ ভিন্ন। এ অবস্থায় ইকোনমিস্ট প্রস্তাব করতে চাইছে ডেমোক্র্যাট দল কিছু এথিক্যাল দায়িত্ব পালন করুক।’ কিন্তু এটা কার্যত অসম্ভব! বরং আমেরিকান সমাজের খেয়াখেয়িই তাদের সমাজকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সেই ইঙ্গিত ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। যার মূল কারণ হচ্ছে আমেরিকান রাজনীতি এখন – ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান – বলে বিভক্ত নয় বরং তা পিছনে ফেলে ক্রমশ  – কে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ” আর কে এর বিপক্ষে – এই ভিত্তিতে দুইটা পক্ষ হয়ে উঠতে চাইছে। কিন্তু তাতেও সংকটটা হল, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান – দুইটা পার্টিই একে-অপরকে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের বিপক্ষের দল বলে দেখাতে চাইছে। এটাকেই ইকোনমিস্ট “সামাজিক অনৈক্য” বলে দেখাচ্ছে।

    “গ্লোবাল ক্ষমতার অপব্যবহারকারী” বাইডেনঃ
    সবচেয়ে বড় কথা, বাইডেন আসলে চীন ঠেকাতে  বেপরোয়াভাবে হলেও আরো বড় ধরনের এক ‘আমেরিকান যারা  “গ্লোবাল ক্ষমতার অপব্যবহারকারী’ হতে রওনা দিয়েছেন। যেমন ধরেন,  বাইডেনের অপছন্দ যেকোন দেশের উপর খেয়াল-খুশিমত  “ডলার অবরোধ আরোপ” করা – এটা তো অপব্যবহার। আইএমএফ  জন্মের সময় (১৯৪৪) আমেরিকান ডলারভিত্তিক এক গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা তৈরি করে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু আইএমএফ তো ছিল এর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। ফলে আইডিয়ালি আইএমএফের পূর্ব-অনুমোদন সাপেক্ষে  একমাত্র কোন রাষ্ট্রের উপর আমেরিকার “ডলার অবরোধ আরোপ” করা সঠিক বা জায়েজ হত। কিন্তু বাইডেন ক্ষমতা অপব্যবহারকারি হতেই বেশি পছন্দ করেছে, বেপরোয়া হয়েছে! কিন্তু তাতে “অপব্যবহারকারিই হয়ে উঠেছে!

    আমেরিকান ডলার যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা, তা তো আসলে একই সাথে আমেরিকার-রাষ্ট্র এর ন্যাশনাল বা রাষ্ট্রীয় মুদ্রাও। জন্মের সময় নিরুপায় হয়ে এই টেকনিক্যাল ফাঁক থেকে গেছে বলে এর সুযোগ নিয়ে আমেরিকা যেকোন রাষ্ট্রের ওপর যা তার খেয়াল-ইচ্ছা, সে নিজ ডলারকে অবরোধ আরোপে হাতিয়ার বানিয়ে অপব্যবহার করে যাচ্ছে। কাজেই আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, আগামীতে ডলারের বদলে অন্য যেকোনো মুদ্রা আন্তর্জাতিক মুল মুদ্রার জায়গা নিলে এর ‘কাফফারা’ তখন আমেরিকান ডলারকে দিতেই হবে।  আর আইএমএফ ভবিষ্যতে অবশ্যই পুনর্গঠিত করে নিতে হবে। কিন্তু সে উদ্দেশ্য তা করে নেয়া হবে নেয়া আইএমএফ অবশ্যই নতুন করে তখন গৃহীত যেকোন আন্তর্জাতিক মুদ্রার  উপর এই খেয়ালি অপব্যবহার বন্ধে শর্ত আরোপ করবেই। কাজেই বাইডেন এন্ড গং – এরা যতই অন্যান্য মুদ্রার রাষ্ট্রকে এখন অসন্তুষ্ট করবে ততই এখন থেকেই তারা ডলারকে এড়িয়ে এক নয়া বিশ্বব্যবস্থা গড়ার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাবেই। যার অর্থ বাইডেনের ডলার অবরোধ আসলে আমেরিকার স্থায়ী শত্রুর জন্ম দেয়াই হচ্ছে।

    বাইডেনেরই এমন আরেক অপব্যবহারের হাতিয়ারঃ
    আমাদের সরকার লুটপাটের সরকার করে, এতে জবাবদিহিতা নাই, জনপ্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা নাই; এগুলো সব ঠিক আছে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যে গ্লোবাল মুদ্রাস্ফীতি ছড়িয়ে পড়েছে, তা থেকে এটা এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক মহামন্দার দিকে ক্রমেই ঝুঁকছে। ফলে প্রত্যেক দেশের অর্থনীতি টালমাটাল আর তাতে নিজ ফরেন কারেন্সি রিজার্ভের অস্থিরতা ও সঙ্কটে ঢুকে পড়ছে। আর তাতে সকলে –  আমরা আগেই ব্যবস্থা নিতে চাই বা বিপদে পড়ার পরে হলেও নিতে চাই – তাই আইএমএফের সাথে কথা বলতে চাই বলে ভাবতে শুরু করেছে। আসলে ফরেন কারেন্সি রিজার্ভের সঙ্কট হলে, আমাদের কেবল আইএমএফের তত্ত্বাবধান আর আইএমএফের ঋণের শরণাপন্ন হতেই হয়, এর বিকল্প নাই। বলা যায়, আমরা বাধ্য। কেন?

    কথাটা এভাবে বলা যায়, ধরা যাক  যদি ১০ বিলিয়ন ডলার হলে আমাদের ফরেন কারেন্সি রিজার্ভের সঙ্কট মোচন হয় আর সেই অর্থ যদি আইএমএফ নয়, একা চীন থেকেই এনে নেই, তাহলেও আমাদের সঙ্কটমুক্তি ঘটবে না। কেন?

    এর মূল কারণ গ্লোবাল বাণিজ্য ও পুঁজিবাজারের অনাস্থা তাতে আমাদের অথনীতির উপর থেকে যাবে, তাই। যেমন এমনিতে চীন এখনো কমিউনিস্ট চীন। তাই চীনের যেকোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উপর হস্তক্ষেপ ঘটাতে কেবল চীনা সরকারের একটু ইশারাই যথেষ্ট বলে, গ্লোবাল লেনদেন জগতের বাণিজ্য বা পুঁজিবাজারের ধারণা। তবে  চীন ছাড়া অন্য অকমিউনিস্ট কোনো রাষ্ট্র এসব সাহায্য দিলেও তাতে বাজারের আস্থা আসবে কিনা বলা মুশকিল। তাহলে আস্থা কিসে আসবে? গত পঁচাত্তর বছর ধরে গ্লোবাল বাজারে আইএমএফ নিজের সম্পর্কে এই আস্থাটাই গড়ে তুলেছে বা নিয়েছে।  আসলে বাজার-বিনিয়োগে নিয়োজিত অর্থটা যার, একমাত্র  কেবল তারই আস্থায় আসতে হবে বাজারকে – এর কোনো বিকল্পও নেই। আর আপাতত বাজারের আস্থার একমাত্র প্রতিষ্ঠান হয়ে আছে আইওএমএফ, অন্য যেকোন বিকল্প প্রতিষ্ঠানের চেয়ে। এই হল বাস্তবতা!

    এখন আবার আইএমএফের সবচেয়ে বড় মালিক শেয়ারহোল্ডার আমেরিকা বলে এর ওপর আমেরিকার কর্তৃত্ব  সবার চেয়ে বেশি। এছাড়াও যেমন এখনকার বিশ্বব্যাংকের চেয়ারম্যান তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়োগ দেয়া, প্রায় তারই নিজ দোস্ত-জিগার তিনি। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি তিনি পেশাদার বুরোক্রাট নন, রাজনৈতিক বিচারে নিয়োগপ্রাপ্ত। যদিও কোনো দেশের রাজনীতিতে ন্যূনতম হস্তক্ষেপ ঘটানো আইএমএফের ম্যান্ডেট অনুসারে খুবই গর্হিত অপরাধ। কিন্তু এর পরেও বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্টকে হত্যায় মেরে ফেলার পরিকল্পক আইএমএফ, এমন রেকর্ড এর অভাব নাই।

    আর একালে আমরা ট্রাম্প-বাইডেনের আমলে দেখছি তারা (তাদের ভাষায় চীনের কর্তৃত্ব খর্ব করতে) আইএমএফকে দিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রে অ্যাবিউজ বা অপব্যবহার করছে। যেমন বর্তমানের কারেন্সি মজুদ সঙ্কটে – কোনো দেশে আইএমএফ পুরনো সরকারের সাথেই সব আলাপ শুরু করছে, চুক্তির শর্তও ঠিক করছে, ইত্যাদি সবকিছু। কিন্তু চুক্তি সম্পন্ন করছে না। বরং উপস্থিত সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে – এটা বলাচ্ছে বা নিজেই বলছে। এতে আভ্যন্তরীণ ও বাইরে থেকে যৌথ রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে সরকার ফেলে দিয়ে এরপর  নয়া সরকার না এলে চুক্তি করা বা পরে অর্থ ট্রান্সফার, কোনোটাই আইএমএফ করছে না। এভাবেই বাইডেনের ইচ্ছার বরকন্দাজ সেজে চলেছে আইএমএফ।  পাকিস্তানের ইমরান ২০১৮ সালে ক্ষমতায় এলে ট্রাম্প তার উপরও একইভাবে আইএমএফ-কে দিয়ে চাপ সৃষ্টি করেছিল। বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় গোটাবায়ে-কে ক্ষমতা ছেড়ে যেতে হল একইভাবে বাইডেনের আইএমএফ-কে ব্যবহারের কারণে। বাংলাদেশও একই ফাঁদে পড়ে গেছে বলে অনুমিত হয়। যদিও আমাদের সরকার ভাবছে ভারতীয় অরিজিন এমন আইএমএফের শীর্ষ  স্টাফদের মাধ্যমে তার কথা আগাচ্ছে ফলে গোতাবায়ের মত ভয়ের কারণ নাই। সরকারের এই অনুমান ভুল প্রমাণ হবার সম্ভাবনাই প্রবল!  মুল কারণ, আমরা আমেরিকার আইএমএফের মুরুব্বি হওয়াকে বাইডেনের অপব্যবহার – এই যুগে প্রবেশ করে ফেলেছি।

    এদিকে এবিষয়ে পাবলিক পারসেপশন আবার হাসিনার বিরুদ্ধে। তারা মনে করে হাসিনা অসহ্য এক টেরর ক্ষমতার মানুষ। ফলে বাইডেন  আইএমএফ-কে অপব্যবহার করলেও তাদের এখন এটা অনুমোদন করা উচিত।  তাদের এখন হাসিনার হাত থেকে মুক্তি দরকার, পরেরটা পরে!!!  এদেশের মত সরকারগুলোর প্রতি জনগণ অতিষ্ঠ থাকার কারণে এ অপব্যবহার বা হস্তক্ষেপের সুযোগটা বাইডেনের পক্ষে যাচ্ছে। যদিও এটা নিরেট বাইডেনের ক্ষমতার অপব্যবহার। তাই আজ বাদে কাল এই হস্তক্ষেপের ‘কাফফারা’ আমেরিকাকে  চুকাতে হবেই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৬ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “‘ইকোনমিস্টের’ খায়েশ অপূর্ণ থাকবে“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • বাইডেনের কলোনি ‘মূল্যবোধের’ বড়াই শুরু

    আটল্যান্টিক মানেই কলোনি,
    বাইডেনের কলোনি ‘মূল্যবোধের’ বড়াই শুরু

    গৌতম দাস

    ০৪ জুলাই ২০২২, ০০ঃ০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-49m

    NATO declares China a security challenge for the first time

     

    ন্যাটোঃ  এটা ইউরোপ-আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর এক বৃহৎ সামরিক জোট যার পুরো নাম- ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন’। গত সপ্তাহে ২৮-৩০ জুন ২০২২, স্পেনের মাদ্রিদ শহরে বহুদিন পরে ন্যাটো হৈচৈ ফেলে এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত করেছে, অথচ এতদিন এমন অনুষ্ঠানগুলো ন্যাটো যেন প্রায় সবার অলক্ষ্যেই কোনোমতে সেরে ফেলা হয়ে আসছিল। এখানেই শেষ না। আবার যেখানে একদিক থেকে দেখলে  ন্যাটো এখন ভেঙ্গে ফেলা উচিত; অথবা আমেরিকার ন্যাটো ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত – ধরণের কথাবার্তা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট এর মুখ দিয়ে উঠে আসা শুরু হয়েছিল সেখানে এখন উলটা হাওয়া। রাখঢাক ফর্মালিটি না করে সরাসরি বললে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন হঠাত ন্যাটো, জি-৭ ইত্যাদি পশ্চিমা রাষ্ট্রজোট খাড়া করে শেষ চেষ্টা হিসাবে উঠে দাড়াতে চাচ্ছেন। গ্লোবাল ইকোনমিক ও ততসহ এককথায় সংশ্লিষ্ট “প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্ব” কোন চিরস্থায়ী জিনিষ না। একটা সময়ের পরে এগুলোর আয়ু আপনাতেই শেষ হয়ে যায়। চাইলে তা বুঝাও যায়। জ্ঞানী ও বুঝমানেরা তা অনুসরণ করে সময় থাকতে উপযুক্ত জায়গা বেছে নিয়ে সরে যায়।  কারণ সামর্থ ও সক্ষমতা অনুসারে যথোপযুক্ত নেতৃত্ব-অবস্থান নিতে হয়, তার মধ্যে থাকতে হয়। নইলে শেষে অপমানিত হতে হতে পারে।  কিন্তু প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই প্রাকৃতিক দিকটা মানবেন না ঠিক করেছেন মনে হচ্ছে। যেন বলতে চাইছেন, বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা-শক্তি গ্লোবাল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নেতৃত্ব নিজের কোলেই রেখে দিবে। তারা ধরে নিতে চান আবার তাদের এনিমি (শত্রুতা বা মূলশত্রু) মূলত চীনের সাথে; ইউরোপের প্রেক্ষিতে যেটা রাশিয়ার সাথে। এই ধরে নেওয়ার ভিতরে একটু ভুল আছে। চীনের সাথে তাদের ঠিক এনিমিটি না প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। অনেকে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে জিদের চোখে দেখে একে শত্রুতা হিসাবে। এখানে তাই ঘটেছে।
    দুনিয়ার ইতিহাসের শেষ ৫-৬শ বছর ন্যায়-অন্যায় যেভাবেই হোক জনগোষ্ঠি হিসাবে পশ্চিমের সাদা ককেশীয়দের হাতে সারা দুনিয়া শাসিত হয়েছে; তারা দুনিয়ার উপর ঘুরে ফিরে রুল করে এসেছে, আধিপত্য বিস্তার করে এসেছে। ব্যাপারটাকে ঘটনাচক্র হিসাবে দেখাই সঠিক ছিল। দুনিয়াতে কোন ধর্ম-এথনিক জাতি দুনিয়া আজীবন শাসন করে যাবে এমন কোন চুক্তি বা শর্ত কোথাও লেখা নাই। অন্য এথনিক জনগোষ্ঠিও তা মেনে নিবার কোন কারণ নাই। কোন জনগোষ্ঠিরই এমন ধরে নিবার কোন ভিত্তি নাই যে যেহেতু তারা শাসক ছিল তাই তারা তা থেকেই যাবে আজীবন!   এই জবরদস্তির কর্তাগিরির চোখ সরিয়ে ব্যাপারটাকে অবজেকটিভ দিক থেকে যেমন বস্তুগত যোগ্যতা ও সামর্থ সক্ষমতার দিক থেকে দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ হত।

    কিন্তু বাইডেন বুদ্ধিমান হতে চান নাই। তিনি এবার এককালের বড় অর্থনীতির সাত দেশ যা জি-৭ বা গ্রুপ সেভেন কান্ট্রি – এই জোটকে আবার বুড়া হারে রঙ চড়িয়ে সাজাতে চেয়েছেন। তিনি এই জি-৭ আর ন্যাটো  কেগত সপ্তাহে সাজিয়ে এনেছেন, বুড়া হাড়েই জোর দেখাতে চেয়েছেন। অথচ  বাস্তবতা হল চলতি নয়া শতক থেকে জি-৭ নিজেকে বিগতযৌবনা বলে মেনে নিয়েছে। এটা আমার দাবি নয় বাস্তবতা। যেকারণে, এককালের জি-৭ গেলে তারা নিজেই এখন জি-২০ নামে নয়া গ্রুপ আকারে সাজিয়েছে। জি-২০ মানে যেখানে এই বুড়া সাত রাষ্ট্র আর সাথে নয়া রাইজিং অর্থনীতির দেশগুলোকে বেছে সাথে নিয়ে জি-২০ বানিয়ে নেয়া। মুল কারণ, বুড়া অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো স্থবির হয়ে গেছে। পুনরুতপাদন, পুন-বিনিয়োগের সক্ষমতা ও সামর্থ  অথবা কম্পিটিটিভনেস ঢলে পড়েছে। আর উলটা বসে বসে আয়েসে খাওয়া এমন ভোগের ঢিব্বা হয়েছে সেকারণে। “ওয়াল স্ট্রিট  বিনিয়োগ পাড়ার” কঠোর সমালোচনা এই বুড়ারা সহ্য করতে না পেরে অনেক আগেই তাই রাইজিং-দেরকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে জি-২০ গ্রুপ বানিয়ে নিয়্বেছিল। তাহলে  জি-২০ হিসাবে ঢেলে সাজানো ও এর উত্থানটাই কী যথেষ্ট প্রমাণ নয় যে জি-৭ গ্রুপ বা ন্যাটো এর নামে বাইডেন এর আবার আমেরিকার নেতৃত্বকে জাগানোর চেষ্টাটা একটা প্রতারণা!! অথচ বাইডেন চীন-কে বাইরে দূরে রাখতে চান। কেন? কী যুক্তি?

    আমেরিকার নেতৃত্বে ‘পশ্চিমা শক্তির’ ভ্যালুজ [Values] মানে মুল্যবোধ নাকি চীনের চেয়ে উন্নত!!! তারা উচুজাতের ও  জাত-শ্রেষ্ঠ তাই তারা চীন-রাশিয়া ইত্যাদিদের সাথে চলতে পারবে না। এককথায় বললে, অর্থনৈতিক ততপরতায় একুমুলেশন [accumulation] বা সঞ্চয় ও সম্পদ সৃষ্টির বিচারে  চীন এখন সবার উপরে – ঠিক যেমন এককালে আমেরিকা সারা ইউরোপকে ছাড়িয়ে উপর দিয়ে গেছিল। আর সেটাও ইউরোপের পছন্দ-অপছন্দ করার ব্যাপার ছিল না, থাকেও নাই। অথচ বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমাদেশ এখন অজুহাত তুলেছে তাদের খায়েশ তারা মূলত চীনকে একঘরে করবে। বাণিজ্য সম্পর্ক অর্থে কোনঠাসা বা একঘরে। যেখানে অজুহাত তাদের মুল্যবোধ নাকি নিচা!! আর এভাবেই তাদের ঢলে পড়া সামর্থ ও নেতৃত্ব তারা ছলনা করে হলেও ধরে রাখতে পারবে।

    কিন্তু নেতৃত্ব নিজের কাছে রেখে দেওয়া মানে কী? এটা কী সামরিক সক্ষমতার কথা বলছেন তারা? পশ্চিম এখানেই খোদ নিজেকেই বিভ্রান্ত করে রাখতে চায়। কোন রাষ্ট্রের মুল সক্ষমতা আসে অর্থনীতি থেকে। পরে ওর ভরসায় আরও আসে রাজনৈতিক, সামরিক, স্ট্রাটেজিক ইত্যাদি সবকিছু। যার আবার একমাত্র অর্থনৈতিকটাই অবজেকটিভ অর্থাৎ বস্তুগত সক্ষমতা। এটাকে কোন বা কর্তা ব্যক্তি-আমির ইচ্ছা মনে করাটা ভুল। অথচ বাইডেন এন্ড গং এটা জেনেও ভুল করেছে বলে দেখাচ্ছে। ওথচ সবাই জানে, কোন দেশ নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতাটা দেখাতে পারলে বা হাজির হয়ে গেলে এরপর এর ভরসায় অন্যান্য সব কর্তা বা ইচ্ছানির্ভর  যেমন  রাজনৈতিক, সামরিক, স্ট্রাটেজিক ইত্যাদি সব ইচ্ছা হাসিল করা যায়।  অথচ বাইডেন দেখাতে চাইছেন সবটাই তাদের যেন তাদের ইচ্ছা!!
    অতএব বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিম উন্নত মুল্যবোধের  – এই মিথ্যার আড়ালে,  নিজেদের হাতে দুনিয়ায় নেতৃত্ব ধরে রাখবে বলে হুঙ্কার তুলতে দেখছি আমরা!! গত ২৮-৩০ জুন ২০২২, এবারের  ন্যাটো সম্মেলনের তাতপর্য এটাই!!

    ন্যাটো উত্থানের পটভুমিঃ
    বাংলায় লেখা হয় ন্যাটো আর ইংরাজিতে NATO; অথবা খুলে ইংরাজিতে বললে তা – North Atlantic Treaty Organization।
    আর “পশ্চিমা” শব্দটা বলতে আমরা মূলত একটা জাতিগত পরিচয়কেই তুলে ধরতে চাই। যদিও সহসা সবাই তা বুঝি না, সাথে উহ্য থাকে বলে। কিন্তু কাদের? মূলত ইউরোপের যারা সবচেয়ে প্রভাবশালী এথনিক-জাতি মনে করা হয় তারা হল ককেশীয় [Caucasion]।  এসব মোটাদাগে বলা ভাষ্য; কোন গজ-ফিতা নিয়ে বসে মেপে বলা কথা নয়। কারণ ঐ একই ইউরোপে ককেশীয় ছাড়াও অসংখ্য এথনিক জনগোষ্ঠির বসবাস ছিল ও আছে। তবে যাদের প্রভাব বেশি এই অর্থে কথাটা প্রচলিত ও বলা। আসলে “আমরা সাদা চামড়ার লোক’ ফলে উন্নত – এই বলে অকথিত কিন্তু টের পাওয়া যায় যে আঁচ ও আওয়াজ এর কথা আমরা এশিয়া বা আফ্রিকার মানুষেরা জানি বা অভিজ্ঞতা রাখি, এগুলো সেসব কথা। এজন্য বলছি বাস্তবে গজ-ফিতা দিয়ে মেপে প্রমাণ পাওয়া যাবে না এসব উগ্রজাতিবাদি ভাষ্য। কিন্তু এসব ভাষ্য ও চর্চা আছে। বাইডেনের কথাগুলোর ভিতরে এর সুক্ষ ইঙ্গিত আছে!

    “…Beijing’s ambitions and its ‘coercive policies’ challenge the Western bloc’s ‘interests, security and values’ ”.  – aljazeera

    এখন এই ন্যাটো নিজেই নিজেকে চেনায় এই বলে যে তারা এক “পশ্চিমা ব্লক” রাষ্ট্র বা “পশ্চিমা শক্তি”। সর্বশেষ চলতি ন্যাটো সম্মেলনে এভাবেই তারা নিজেদেরজে পরিচিত করেছে “Western bloc’s” বলে।  আর এটা বলতে তারা আরো ভেঙ্গে বলে তারা হল সারা ‘ইউরোপ এবং আমেরিকা’ মিলে এক শক্তি। এই কথাটা ভৌগলিকভাবে ভেবে দেখলে বুঝা যাবে ইউরোপ এবং আমেরিকা বলতে এরা আসলে আটল্যান্টিক মহাসাগরের দুই তীর। একারণে লক্ষ্য করব ন্যাটো শব্দের ভিতরে ‘আটল্যান্টিক’ বলে একটা শব্দ আছে; ওর ‘এ’ -মানে আটল্যান্টিক। যদিও এর দুপাড়ের ফারাকটা হল  এক মহাসাগরের আর যার দৈর্ঘ গড়ে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার। অর্থাৎ যেকোন পুকুর বা নদীর দুপাড়ের মানুষের মধ্যে যেমন স্বভাব বা ভাষা ইত্যাদিতে মিল আমরা খুঁজে পাই তেমনই এক নিশ্বাসে – ইউরোপ এবং আমেরিকা – বলে মিল খুঁজা আমাদের করার কথা নয়।  কিন্তু আমরা খুঁজছি এমনকি কী খুঁজতে খুঁজতে আমরা ন্যাটো এসে পড়েছি! তাহলে মুখ্য প্রশ্ন দাড়াল, আমরা এক নিশ্বাসে – ইউরোপ এবং আমেরিকা  বলি কেন? মূলত কারণটা একেবারেই বাহ্যিক। অর্থাৎ আটল্যান্টিকের দু-পাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে বাইরে থেকে মিল ঘটানো হয়েছিল। কারণ তাদের মধ্যে কোন মিল থাকার কথা নয়, সুযোগও ছিল না। তাহলে সেটা কিভাবে?

    বেশিদিন আগের কথা নয়, এই তো মাত্র ১৬০৭ সাল থেকে। ইউরোপ এবং আমেরিকা, এভাবে প্রায়ই আমরা বলে ফেলি এর মুল কারণ হল – ইউরোপের প্রথম ও জবরদস্ত কলোনিই হল আমেরিকা। এমনকি ভারতবর্ষেরও আগে খোদ আমেরিকা ইউরোপের হাতে কলোনিদখল হয়েছিল। এটাই তাদের পারস্পরিক মূল সম্পর্ক।  আর এটাই ইউরোপের মূলত বৃটিশ-ফরাসিরা দখল করা শুরু করেছিল ১৬০৭ সাল থেকে শুরু করে; আজ যেটা আমেরিকার ভার্জিনিয়া রাজ্য সেটা দখল করার মাধ্যমে ১৬০৭ সালে। পরবর্তিতে আজকের আমেরিকার সব রাজ্য একইভাবে দখল হয়ে শেষে এককালে আমেরিকা (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) নামে আধুনিক রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল।  অর্থাৎ ব্যাপারটা এরকমঃ

    প্রথমে এক বৃটিশ, ধরা যাক নাম তাঁর কোন লর্ড ক্লাইভ, তিনি আজকের আমেরিকার কোন রাজ্য-ভুমি দখল করেছিলেন। যা আসলে ছিল আমেরিকার সেখানেকার স্থানীয় ট্রাইবাল বা এবরিজিন [aborigine] জনগোষ্ঠির বসবাসের ভুমি। কিন্তু পরবর্তিতে ক্লাইভ সাহেব জাহাজ ভরে গরীর বৃটিশ মানুষ নিয়ে গেছিলেন ভার্জিনিয়ায় এই বলে যে ওখানে গেলে তোমরা গরীব বৃটিশ বিনা পয়সায় বিস্তর জমি পাবে আর সাথে  উপকরণও দেয়া হবে। জমির লোভে তারা স্থানীয়দের মেরে-ভর্তা করেছে বা মাথা কেটে নিয়ে ফুটবল খেলেছে। আর নয়ত ভাল উর্বর জমিগুলো বৃটিশদের ছেড়ে দিয়ে  আরো গহীন বনে অনুর্বর জমিতে তারা নিজেদের স্থানান্তরিত করে নিতে বাধ্য হয়েছে।
    কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ে এই গরীব বৃটিশ কৃষক তারাই পালটা সমবেত প্রতিরোধ গড়ে ক্লাইভ এন্ড গং বৃটিশদেরকে আমেরিকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছিল। আর সেটাই ১৭৭৬ সালের আমেরিকান স্বাধীনতা। ঐ স্বাধীন আমেরিকানরাই আজকের আমেরিকান জনগোষ্ঠির এমনকি বাইডেন সাহেবের পুর্বসুরি। কেবল একটাই কালোদিক  থেকে গেছিল যেমন, এবরিজিন [aborigine] জনগোষ্ঠি তারা নিশ্চয় কোথাও চিপায় পড়ে থাকা মার্জিনালাইড হয়ে আছে।
    তবে এতে আরো কিছু নতুন মাত্রাও আঁকা হয়েছে বিশ্বযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশেষষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই সময়কালে আমেরিকাই উলটা এই প্রথম সারা ইউরোপের উপর প্রভাবশালী রাষ্ট্র অর্থনীতি ও জনগোষ্ঠি হিসাবে হাজির হয়েছিল। সেসময়ের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এর হাতেই সিদ্ধান্ত মেনেই সারা ইউরোপ এরপর তাদের বিশ্বযুদ্ধ কোন অভিমুখে গিয়ে শেষ হবে অথবা, পক্ষ-গুলো কেমন ও কে হবে তা নির্ধারিত হয়। কারণ যুদ্ধের খরচ যে যোগায় সেই তো এসব বিষয়গুলো নির্ধারণের কর্তা হয়ে যায়!  আর শুধু তাই না,  যুদ্ধ শেষে দুনিয়া থেকে কলোনি ব্যবস্থা ও শাসন  উচ্ছেদ এর কাজটা সারা ইউরোপ স্বেচ্ছায় প্রত্যাহার করে নেয়।  রুজভেল্টের শর্তে ইউরোপ দুনিয়াকে কলোনিমুক্ত করে দিয়েছিল।  সেই থেকে থেকে আমেরিকা গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার নেতা হিসাবে হাজির হয় যেখানে ইউরোপ আমেরিকান আধিপত্য মান্য করে নেওয়ার বিনিময়ে ছোট তরফের কর্তা হবার সুযোগ পায়। এরপরই  ইউরোপ এবং আমেরিকা শব্দদুটো পাশাপাশি লেখার রেওয়াজ শুরু হয়েছিল। কালক্রমে (১৯৪৯ সাল থেকে) সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধজোট হিসাবে ন্যাটো গড়ে তুলেছিল ছিল তেমনই একটা কাজ!

    এবার একালে আরেকটু বিস্তারে আগাই। একালে মানে পরে ১৯৯১ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবারও পরে চলতি শতকের কথা বলছি। বারাক ওবামা আমল থেকেই বলা যায় আগের মতোই একের পর এক আমেরিকান নয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন, আর আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের আয়ু আর কত দিন থাকবে এ-জাতীয় প্রশ্ন আকার-ইঙ্গিতে জবাব দেয়া শুরু হয়েছিল। এটা সেই আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পরিসমাপ্তিতে। তবে চলতি শতকের শুরুতে সেসব সময় থেকেই আমেরিকার জন্য এসব অস্বস্তিকর প্রশ্ন প্রবল হতে থাকে, বলা যায় যা প্রথম মুখোমুখি হয়েছিলেন ওবামা।

    কিন্তু তখন অথবা এখন, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট মানেই যেন তা একটা চরম অবস্থান! তখন মানে ২০১৯ সালের কথা বলছি আর এখন মানে ২০২২ সালের চলতি সময়। আর তখন ও এখন যে কমন প্রসঙ্গের কথা বলছি তা হল – এই ন্যাটো।  আগে বলেছি, ন্যাটো মানে আমেরিকা-ইউরোপ মিলে ১৯৪৯ সালে গঠিত এক যুদ্ধজোট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পরের নয়া পরিস্থিতিতে সোভিয়েত ও তার প্রভাবাধীন পূর্ব-ইউরোপ, এ অংশটা বাদ দিলে এর বাইরে আমেরিকার নেতৃত্বে বাকি ইউরোপীয় দেশের সামরিক জোট এটা। সংক্ষেপে বললে সেকালে (কোল্ডওয়ার আমলে [১৯৫০-৯১] ) যা আমেরিকা-সোভিয়েত লড়াই প্রতিযোগিতা, তাকে কেন্দ্র করে গঠিত পশ্চিমের মূল সামরিক জোট ছিল এটা। যদিও সেকালে ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তার পক্ষে সাফাই দিতে অনেকে একালে বলে থাকেন যে, সেকালের আমেরিকা-সোভিয়েত এ দুই জোটকে একটা “কোল্ডওয়ারের মধ্যে” আটকে রাখা সম্ভব হয়েছিল  নাকি এই ন্যাটো জোটের উপস্থিতির কারণে। মানে দুই পক্ষেই গোছানো সামরিক জোট-প্রস্তুতিতে ছিল বলেই নাকি ওই আমলে তারা মুখোমুখি কখনোই যুদ্ধে নামেনি বা করে নাই।

    যা হোক, ১৯৯১ ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ায়, এর পর থেকে ন্যাটো নিজেই কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ওবামার দ্বিতীয়বারের প্রেসিডেন্সির আমল (২০১৩-১৬) থেকে ন্যাটো মোচড় দিয়ে উঠেছিল – যেখানে মূল ইস্যুটা হয়ে উঠেছিল ন্যাটোর খরচ কে বইবে? যার মূল কারণ আসলে, আমেরিকার জন্য ন্যাটো-কে পরিচালনের ব্যয় তখন থেকে আমেরিকান অর্থনৈতিক  সামর্থ ও বা ইকনমির সক্ষমতার তুলনায় বিরাট বোঝা হয়ে গেছিল। কারণ ন্যাটো জন্ম থেকেই এর খরচের প্রধান দায়ভার আমেরিকা একাই ব্যয় করে আসছে; যেন অনেকটা আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা হিসেবে উত্থিত হওয়ায় ইউরোপের সবাই ধরে নিয়েছিল যে, ন্যাটো গঠনের সব উদ্যোগ ও খরচের ভার তো ‘ওস্তাদ’ আমেরিকাই নেবে। স্বাভাবিক। কিন্তু ওস্তাদ এখন বয়বৃদ্ধ, রমরমা অর্থনীতির সেই দিন আর নাই!

    ফলে  ন্যাটোর জন্মের সময় আমেরিকা যা হাসতে হাসতে নিয়েছিল তা ২০১৫ সালের আশাপাশের সময় থেকে আর একই না। আর সেই থেকে শুরু করে একেবারে ২০১৫ সালে ওবামার প্রথম প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল ন্যাটোর এক মিটিংয়ে ইউরোপকে খরচের দায় শেয়ার নেয়ার প্রসঙ্গ তুলে কড়া ভাষা ব্যবহার করেছেন, আর এতে পারস্পরিক খুবই মুখ কালো করা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল।

    কিন্তু অতটুকুই নয়, আমেরিকার জন্য আসলে খারাপ দিন ও যুগ এসেই পড়ছিল সেই থেকে। আর সেটা ওবামার পরে ট্রাম্পের আমলে এসে। ডোনাল্ড ট্রাম্প, তিনি সরাসরি ন্যাটো আর টিকিয়ে রাখার দরকার কী, এপ্রশ্নই তুলে বসেন; অন্য আরো অস্বস্তিকর বিভিন্ন আরো প্রশ্নের মত। এমনকি আফগানিস্তানের জন্যও আর ন্যাটো দরকার  নয় অথবা ‘ওয়ার অন টেররের’ জন্যও আর ন্যাটোর মতো প্রতিষ্ঠান রাখা ও এর খরচ বহনের প্রয়োজন তিনি দেখেন না বলে সরাসরি মন্তব্য করেছিলেন। পরে ২০১৯ সালে শুরু হয়েছিল লন্ডনে আরো মনকষাকষি তো বটেই।

    ট্রাম্প পার্সোনাল এক আলোচনায় বলেছিলেন, তিনি ন্যাটো থেকে আমেরিকার সদস্যপদ প্রত্যাহার করতে চান। নিউ ইয়র্ক টাইমসে তার এক সহকারীর বরাতে খবর ছাপা হয়েছিল, সেখানে তিনি ন্যাটো সম্পর্কে বলেছিলেন, এটি অবসলিট বা ‘পরিত্যক্ত বোঝা’। লাগাতার পঁচাত্তর বছরের গ্লোবাল নেতা আমেরিকা-এরই এক প্রতিনিধি ট্রাম্পের কথা ভেবে এসব শব্দ হজম করতে অনেকেরই এ কথা মানতে কষ্ট হয়েছিল। তাই অনেকেরই মনে হয়েছিল, এটি হয়তো একটা পাগলা ট্রাম্পের ‘চরমবাদ’।

    গত সপ্তাহে জুনের শেষ তিন দিনে এবার আমরা আবার আরেক চরমবাদের মুখোমুখি। এবার নায়ক জো বাইডেন- তিনি এবারের ন্যাটোর তিন দিনের সম্মেলনে আরেক চরমপ্রান্তে। ব্যাপারটা এক কথায় বললে, তা যেন আমেরিকার নেতৃত্বে ইউরোপ মানে সারা পশ্চিমা জগৎ যা চায়, এর বিরোধী বা তাদের পছন্দ নয় এমন কোনো কিছু চীন ও রাশিয়া করতে পারবে না। তাদের ভাবখানা এমন যে, তারা চাইলে তাদের ইচ্ছার বিরোধী চীনসহ সবাইকে তারা গ্লোবাল বাণিজ্যের বাইরে রেখে দিতেই পারে। এতই ক্ষমতা তাদের! যেনবা মাথায় করে এক ঝুড়ি গোবরও চীন-রাশিয়া চাইলেও বেচতে পারবে না!

    ওই ন্যাটো সম্মেলন থেকে এই প্রথম ঘোষণা দেয়া হয়েছিল যে, ‘চীন ন্যাটোর জন্য হুমকি’! আলজাজিরা লিখেছে, ন্যাটো মনে করছে, চীন তার জন্য হুমকি তাই সে চীনকে স্ট্রাটেজিক গুরুত্ব দিয়ে বলছে ‘চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ ও ‘চাপে ফেলে বাধ্য করার নীতি’- এগুলো ‘পশ্চিমা ব্লকের রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ, নিরাপত্তা ও মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ করছে’।

    NATO has listed China as one of its strategic priorities for the first time, saying Beijing’s ambitions and its “coercive policies” challenge the Western bloc’s “interests, security and values”.

    এরই মধ্যে ইউক্রেনের যুদ্ধ প্রায় চার মাস হল। এ প্রসঙ্গে বাইডেন পুরো ইউরোপকে তাতিয়ে রাশিয়াকেই এদের সবার শত্রু বলে হাজির করছিলেন। চীন এসব ক্ষেত্রেই আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। কিন্তু চীনকে আমেরিকার শত্রু বলা  আর প্রতিযোগী বলা এক অর্থ নয়। অথচ কেন ন্যাটো সম্মেলনে কোনো এক উছিলায় চীনকে ন্যাটোর হুমকিদাতা-শত্রু বলে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে এ কথারও কোনো যথোপযুক্ত সাফাই ন্যাটো এখনো হাজির করেনি? আবার এত দিন শত্রু দেখানো হচ্ছিল রাশিয়াকে, অথচ এখন হঠাৎ করে খোদ চীনকেই হুমকিদাতা বলা শুরু হচ্ছে।

    চীন বড় রাইজিং ইকোনমির দেশ। ফলে এখনো চীনে সবার চেয়ে পুঁজি সঞ্চয় ও সম্পদ গঠনের হার অনেক বেশি হবে। এর অর্থনৈতিক প্রকাশ ও প্রভাব তো প্রকাশিত হয়ে পড়বে এবং স্বভাবতই এর অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিদের মন খারাপ-অসন্তুষ্ট হবে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও এটা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, তাই এটা ফেয়ার। এছাড়া, এটা কোন সামরিক তৎপরতা নয়। তাহলে চীন চ্যালেঞ্জটা কোথায় করল? আর চ্যালেঞ্জমাত্রই তো খারাপ নয়। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কখনোই খারাপ নয়।

    তার মানে দাঁড়াল, চীন ‘কেন ন্যাটোর হুমকিদাতা’ তা বর্ণনা বা ব্যাখ্যা দিয়ে বলার আগেই চীনকে শত্রু বানিয়ে দেয়া হয়েছে!! এ ছাড়া মতবিরোধ মানেই কি শত্রু? এমনকি কোনো কাজে গিয়ে আমেরিকা চীনের সাথে মুখোমুখি হয়েছে সেই বিরোধের কথা কেউ জানায়নি! আবার যদি তা হয়ও চাইলে তা নিরসনের আইনি উপায়ও বের করে নেয়া সম্ভব। যদি চায়।

    অথচ ন্যাটোর সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত বোলচালে মনে হচ্ছে, বাইডেনের নেতৃত্বে মানতে রাজি হওয়া ইউরোপ-আমেরিকা এসেছে যেনবা বাইডেনকে সারা দুনিয়ার পালনীয় কর্তা বলে প্রতিষ্ঠিত করতে যা আমাদের যেন মানতেই হবে!

    বাইডেনের মনে রাখা উচিত ‘অবরোধ’ (মার্কিন ডলার ব্যবস্থার ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা) ও ‘হিউম্যান রাইটের’ কথা তুলে তিনি ইচ্ছামত যেসব দেশের উপর দাবড়ে বেড়াতে চাইছেন, তা আইনগতভাবে মানতে জাতিসঙ্ঘ-সদস্যপদপ্রাপ্ত কোনো দেশ মানতে বাধ্য? আইএমএফের চোখে এই অবরোধ বৈধ নয়, বড় জোর এটা আমেরিকার পড়ে পাওয়া অবৈধ কর্তৃত্ব। এটা আমেরিকা-রাষ্ট্রের নিজস্ব সিদ্ধান্ত কেবল। তাই এই অবরোধ আরোপ করার কারণে যারাই  ক্ষতিগ্রস্ত হবে ফলে আমেরিকা যা যা আচরণ ও অপব্যবহার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনীতির বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে, এর প্রতিটি আগামীতে আমেরিকার বিরুদ্ধে আরোপিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবেই।

    আমেরিকান মূল্যবোধঃ
    সবচেয়ে বড় কথা এটা কোন, কারও একার ‘মূল্যবোধের প্রশ্ন’ একেবারেই নয়। অর্থনৈতিক অবরোধ জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত হিসেবে কখনো আরোপিত হয় বটে। কিন্তু বর্তমানে বাইডেন প্রশাসনের দেয়া অবরোধ একান্তই আমেরিকার আরোপিত। সুযোগ পেলে ও মুরোদে কুলালে তা উপড়ে অন্য দেশ ফেলে দেবেই!

    ফিরে মূল্যবোধের কথা তুলা যাক, বর্তমান জাতিসঙ্ঘের এই রাষ্ট্রের দুনিয়ার এক রাষ্ট্রের সাথে অপর রাষ্ট্রের মূল্যবোধের সঙ্ঘাত দেখা দেয় তাহলে কী হবে?
    আসলে সব মূল্যবোধের পেছনেই থাকে ভিন্ন ভিন্ন ইডিওলজি, যে কারণে মূল্যবোধের ভিন্নতা দেখা দিতেই পারে। আর মূল্যবোধে ভিন্নতা দেখা দিলেও ভিন্নদের হলেই সেই মূল্যবোধটা খাটো আর নিজ মূল্যবোধটা শ্রেষ্ঠ এই আচরণ ও বয়ান এক কথায় বললে, তা এক রেসিজম বা ঘৃণিত জাতশ্রেষ্ঠত্ববোধ হতে পারে। আসলে এসব বকোয়াজ কথাবার্তা তাই সরিয়ে রাখাই ভালো! মূল কথাটা হল, জাতিসঙ্ঘ জন্মের আগেই বা এর সদস্যপদ নেয়ার ক্ষেত্রে মৌলিক কি কোনো মূল্যবোধ আছে? থাকলে কী? বা আদৌ বাইডেনের মূল্যবোধ যা সবাইকে মানতে হবে এমন কিছু ছিল নাকি? তাহলে আসেন প্রশ্ন তুলি, যেমন ইরাকের ওপর ২০০৩ সালে বুশের হামলা ও দখল – এটা আমেরিকা কোন মূল্যবোধ মেনে করেছিল? নিশ্চয় খুবই উন্নতমানের, বাইডেন বলতে পারবেন। বলা উচিত!

    প্রথম কথা, বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো এককভাবে এমনকি একত্রে কি জাতিসঙ্ঘের মা-বাপ বা মালিক? একেবারেই নয়। তবে আমেরিকার বাইডেনের যদি মনে হয়, অমুক দেশ মূল্যবোধ মানছে না, তাহলে কী হবে? তাহলে জাতিসঙ্ঘের উপযুক্ত স্থানে গিয়ে, যদি থাকে, সেখানে গিয়ে বাইডেন নালিশ রুজু করতে পারেন। সেটিই সমীচীন হবে। তাই না কি?? এর বাইরে পশ্চিমাদের আলাদা মুল্যবোধের স্টান্ডার্ড কী? তাতে কী এসে যায়?

    সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নঃ
    সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৫ সালের আগে, মানে সেই ১৯১৭ সাল থেকেই বিপ্লব করে ক্ষমতায় আসা কমিউনিস্ট দেশ ছিল। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এসব জানা সত্বেও তিনি সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্তালিনকে সম্মানের সাথে যুদ্ধে নিজপক্ষের পার্টনার হিসাবেই গ্রহণ করেছেন। কোন মুল্যবোধের সমস্যা দেখেন নাই। সোভিয়েত নেতা স্তালিন আপাদ্মস্তক এক কমিউনিস্ট এবং কমিউনিস্ট স্যহিরোমনি তি৯নি তাতে দুনিয়ার কারও কোন সন্দেহ নাই। তাহলে যুদ্ধে নিজপক্ষের এক পার্টনার গণ্য করতে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট তো কখনও কোন মুল্যবোধের অমিল বা অসুবিধার কথা কেউ শুনে নাই।স্তালিনের সাথে মিলেই হিটলারের বিরুদ্ধে রুজভেল্ট বিশ্বযুদ্ধ করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। এখন কি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেন আমাদের বলবেন, মূল্যবোধের সঙ্ঘাত তখন কোথায় ছিল? তাহলে এখন এসব নখড়া করছেন কেন?

    যুদ্ধ শেষে স্তালিনকে সাথে নিয়েই রুজভেল্ট ভেটো-সিস্টেম ওয়ালা এক জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং আলোচনায় স্তালিনকে রাজি করিয়ে জাতিসঙ্ঘ গড়ে নিয়েছিলেন। আর এতে জাতিসঙ্ঘ গড়ার যে ভিত্তি তখন উদ্যোক্তারা মিলে সেট করেছিলেন, সেটাই এখনো একই আছে। গ্লোবাল পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক সিস্টেমগুলোর মৌলিক কাঠামো হয়েই আছে; যদিও এতে এসব সিস্টেম ও কাঠামোগুলো সবই আমাদের একালের সব বিবাদ মেটাতে সক্ষম, তা নয়। খামতি আছে, ঘাটতি আছে, এসব নিয়ে আরো ও আবার কথা বলতে হবে, সামনে এগোতে হবে আর এসবই সবচেয়ে স্বাভাবিক।

    কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে আমেরিকা-ইউরোপ ভাব ধরছে, নেতা বাইডেনের সাথে তারা হলেন দুনিয়ার সবচেয়ে একচ্ছত্র মূল্যবোধ বা শ্রেষ্ঠ মূল্যবোধের কেউ একেকজন। অথচ এমন কথা ভিত্তিহীন ও গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল ধরণের। জাতিসঙ্ঘ বা কোনো গ্লোবাল সিস্টেম গড়ে তোলার পথ কখনো এটা ছিল না, নয়ও। তাহলে তো কমিউনিস্ট হওয়া সত্বেও স্তালিনের সাথে মিলে রুজভেল্ট জাতিসংঘ গড়তে পারতেনই না!!! তাহলে একালে বাইডেন এন্ড গং কোথা থেকে উদয় হলেন??  এরা আগেভাগে নিজের মূল্যবোধকে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করে একলাই রাজা হতে চান। তাতে অন্য কেউ তাদের মানুক আর নাই মানুক!! এরপর অন্যের ুপর নিজআধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করা- এটা একালের বাইডেনের ভুয়া পথ। অন্তত আমেরিকার অন্যতম ফোরফাদার রুজভেল্ট এমন নিকৃষ্ট কাজ বা পথে এগোননি – এসব নিয়ে তাদের পরামর্শকদের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

    সেকালের মাওয়ের চীনঃ
    আবার চীনের প্রসঙ্গটাই দেখেন। আজকের যা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চীন। এতে একালে অর্থনীতিতে গ্লোবাল নেতার হকদার বা দাবিদার তিনি। কিন্তু এর উত্থান এটা তো মাত্র ১৯৭৮ সাল থেকে উত্থিত।  আমেরিকার সাথে এই চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের যাত্রা শুরু ১৯৭৮ এর ১ জানুয়ারি থেকে। মাওয়ের চীন ১৯৪৯ সাল থেকেই চীনে (নয়াচীন) ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু তবু ১৯৭১ সালের অক্টোবরের আগে পর্যন্ত এই নয়াচীন জাতিসঙ্ঘের কেউ ছিল না। কারণ ১৯৪৯-৭১ এ বছরগুলোতে নয়াচীনের জাতিসঙ্ঘে সদস্যপদ ছিল না, স্বীকৃতি ছিল না। শুধু তা-ই নয়, চীনের নামে দেয়া জাতিসঙ্ঘের জন্ম থেকে বরাদ্দ ভেটোওয়ালা সদস্যপদটা ছিল তাইওয়ানের হাতে।

    আসলে মাওয়ের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই বিতর্ক ছিল জাতিসঙ্ঘে চীনের নামে দেয়া (ভেটোসহ) সদস্যপদের হকদার কে? তাইওয়ান না মাওয়ের বিপ্লবী নয়াচীন? নয়াচীন – মানে এটাকে এখনো অনেকে ‘মেনল্যান্ড চীন’ বলে থাকে। আর বস্তুত জাতিসংঘ সদস্যপদের হকদার কে এই প্রশ্নে আমেরিকা তাইওয়ানকেই হকদার মনে করত তখন। তাই আমেরিকার সেই অবস্থানের বিরুদ্ধে সবাই মিলে ভোট দিলেও আমেরিকার অবস্থানকে নাকচ করার সুযোগ ছিল না কারণ আমেরিকার হাতে ভেটো ক্ষমতা ছিল।  বলে যেকোন ভোটাভুটিতে আমেরিকার হকদার তাইওয়ানের পক্ষে; নয়া চীনের পক্ষে নয়।

    ২৫ অক্টোবর ১৯৭১, জাতিসঙ্ঘের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবঃ
    ১৯৭১ সালের অক্টোবরের জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ‘চীনা সদস্যপদটা কে পাবে’- এই প্রশ্নটা আবার এক ভোটাভুটিতে তোলা হয়েছিল।  সেবার কিন্তু হঠাৎ  ইস্কযুটা তোলা হয় নাই। তবে ততপরতা বা অগ্রগতিগুলো বেশির ভাগ ছিল আন্ডারগ্রাউন্ডে সঙ্গোপনে।

    ঘটনা সংক্ষেপে বললেঃ
    ১. মাওয়ের চীন, ১৯৫৮ সাল থেকে “কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব  এক ক্যাপিটালিজমের পথে”  –  যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আর এরই বাইরের ডাকনাম ছিল “১৯৫৮ সালের চীনা সাংস্কৃতিক বিপ্লব’। আমাদের এখনকার জন্য মূল প্রসঙ্গ – এসিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে চীনে ব্যাপক বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যা বলাইবাহুল্য। পশ্চিমা দেশের বা এক কথায় প্রতীকীভাবে আমেরিকার বিনিয়োগ পুঁজিবাজার ওয়ালস্ট্রিটের জন্য এটা ছিল এক বিরাট সুযোগ। আর এ সুযোগ দেয়ার আগে মাও এটা নিয়েই নিক্সন-কিসিঞ্জারদের সাথে দরকষাকষি করেন ও তাদের রাজি করান। মাও কী চেয়েছিলেন বিনিময়ে?

    জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ নয়া চীনের পক্ষে দিতে হবে, আমেরিকা ভেটোপ্রদান করতে পারবে না – এই দেয়ার মাধ্যমে তবেই মাওয়ের চীন আমেরিকার জন্য তিনি চীনে বিনিয়োগের দুয়ার খুলে দিতে রাজি হয়েছিলেন। এই ছিল ডিল!

    জাতিসঙ্ঘের ঐ ’৭১ সালের অক্টোবরে যে ভোটাভুটি হয়েছিল তাতে চীনে বাজার-বিনিয়োগে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ার লোভে আমেরিকা ভোটাভুটিতে ভোটদানেই বিরত ছিল; অর্থাৎ কোনদিকেই ভোট দেয় নাই। আর এতটুকু হলেই নয়া চীনের চলে। কারণ, এর আগে সবসময় সব ক্ষেত্রে আমেরিকা ভেটো দিয়ে তাইওয়ানকে ভোটাভোটিতে জিতিয়ে টিকিয়ে দিত। আর নয়া চীনের পক্ষে প্রস্তাব উঠলে আমেরিকার এক ভেটোতেই সব শেষ হয়ে যেত। এছাড়া আমেরিকা তার প্রভাবাধীন জাতিসঙ্ঘের সাধারণ সদস্যদের সেবার ১৯৭১ সালে আর বিরত থেকে নয়, বরং নয়া চীনের পক্ষে ভোট দিতে লবী অনুরোধ রেখেছিল।

    আর তাতেই মাও সেতুংয়ের চীনই আসল চীনের জাতিসঙ্ঘের (ভেটো ক্ষমতাসহ) সদস্যপদ একমাত্র হকদার, এ সিদ্ধান্ত পাস হয়েছিল ২৫ অক্টোবর ১৯৭১, ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবে। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে সাত দিনের চীন সফরে গিয়ে সব আলাপ-আলোচনা শুরু করেছিলেন, যা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে চীন-আমেরিকার সম্পর্ক স্বীকৃতি যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৭৮, ১ জানুয়ারি থেকে।

    তার সোজা মানে সেই ২৫ অক্টোবর ১৯৭১, ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাব থেকে তাইওয়ান-ই হয়ে যায় নয়া চীন- এই মূল ভূখণ্ডের অংশ। তাইওয়ান আর স্বাধীন নয়, কোনো আলাদা প্রদেশ নয়। কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামে তাইওয়ান স্বাধীন কোনো দেশ আর নয়। জাতিসংঘের চোখে, তাইওয়ান আইনত পিপলস রিপাবলিক অব চায়না (PRC) এর অংশ।

    এখন তাহলে তাইওয়ানকে নিয়ে বাইডেনের দরদ- এর অর্থ কী? এটা তো শঠতা! অবশ্যই তাই!

    এমনকি ১৯৭১ সালের পর থেকে চীন যখনই কোনো দেশের সাথে স্বীকৃতি বিনিময় করে সেখানে সে শর্ত রাখে যে, তাইওয়ান যে চীনের অংশ, এটা সে আগে স্বীকার করলে তবেই তারা পারস্পরিক স্বীকৃতি বিনিময় আরো আগিয়ে নিতে পারে। এটাকেই চীন ‘একচীন নীতি’ বলে থাকে। একচীন নীতি’ মেনে চলতে তাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বলে থাকে। সেই থেকে আমেরিকা একচীন নীতিতে স্বাক্ষর করা দেশ। কিন্তু তবু বারবার এটা নিয়ে সে প্রায়ই আমেরিকা উসকানি তৈরি করে চলছে। এমনকি গত বছর ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি,  বাইডেন ক্ষমতার শপথ নেয়ার পরও একই পিছলাপিছলি শুরু করেছিলেন। শেষে চীন হুমকি ও চাপ দেয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাইডেন আবার এবার সত্তরের দশকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে পাঠিয়েছিলেন।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০২ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “বাইডেনের মূল্যবোধ“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • ইউক্রেন যুদ্ধ পরিণতিতে অর্থনৈতিক মহামন্দার দিকে আগাচ্ছে!

    ইউক্রেন যুদ্ধ পরিণতিতে অর্থনৈতিক মহামন্দার দিকে আগাচ্ছে!

    গৌতম দাস

    ২৭ জুন ২০২২, ০০ঃ০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-490

    .  ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি ও উতপাদনে মহামন্দা আনতে, বিপর্যস্ত করে ফেলতে পারে – বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট  – Ukraine war is economic catastrophe, warns World Bank

    গ্লোবাল ব্যাঙ্ক ও বিনিয়োগকারি সিটিগ্রুপ, গ্লোবাল মহামন্দা এগিয়ে আসছে দেখছে– 

    গ্লোবাল মহামন্দা ধেয়ে আসার হুশিয়ারি উচ্চারণ হতে শুরু হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও এক বিনিয়োগ ব্যাঙ্ক সিটিগ্রুপ ইতোমধ্যেই সতর্কবার্তা জারি করেছে! কোভিডের অর্থনৈতিক বিপর্যয় দুনিয়া সামলে উঠা শেষ না করতেই বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমাওশক্তির সীমাহোন লোভের যুদ্ধ ইউক্রেন এই নয়া বিপর্যয়ের আগমনি ধ্বনির ইঙ্গিত দেয়া শুরু করেছে। 
    ইউক্রেন যুদ্ধের পরিণতিতে কি গত ২০০৮ সালের মত আবার এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক মহামন্দা?  বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়া? দুনিয়ায় ক্ষুধা-দারিদ্র্য আরো খারাপ ভাবে ছেয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটবে? এমনিতেই গত তিন বছর ধরে কোভিড ভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে ছেয়ে বসা এক মুদ্রাস্ফীতি দুনিয়ার সবদেশকেই মারাত্মক অর্থনৈতিক চাপে ফেলেছে। অর্থাৎ গ্লোবাল অর্থনীতি ও বাণিজ্যে কোভিডের প্রভাব এখনও মারাত্মক। আমরা তা কাটিয়ে উঠতে পারি নাই। কোভিডের আক্রমণও শেষ হয় নাই। তাই সব মিলিয়ে এবার খোদ আমেরিকাতেই এ নিয়ে ব্যাপক  জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে গেছে। ওয়াল স্ট্রিট পাড়া, গ্লোবাল পুঁজিবাজার, বিজনেস হাউজগুলো এ নিয়ে ভীত হয়ে পড়েছে।  অর্থনীতি ও বাণিজ্যের জগত জুড়ে বাইডেনকে ফিরে  তাই অভিযুক্ত করা শুরু করেছে – বিশেষত ইউক্রেন যুদ্ধে উস্কানি তোলার জন্য, অন্তহীন করে ফেলার জন্য। সব অভিযোগের গোড়া  – কাটার মত যা সবাইকে বিঁধছে তা হল জ্বালানি তেল মুল্যবৃদ্ধি যা ১২০ ডলারের উপরে উঠেছে। এটাই সবাইকে এখন ভীত করে তুলেছে!

    ইউক্রেন যুদ্ধের আপডেটঃ 
    জুন মাস শেষ হয়ে এল। অর্থাৎ ইউক্রেন যুদ্ধ টানা মোট চার মাস পেরিয়ে গেল যার মধ্যে সবচেয়ে বড় এক পরিবর্তন এখন দেখা যাচ্ছে তা হল –  আগে যেভাবে ……এই তো রাশিয়া হেরে যাচ্ছে কিংবা অবরোধে পড়ে রাশিয়ান অর্থনীতি এই ডুবে যাচ্ছে বলে অথবা সামরিকভাবে ইউক্রেন এই যুদ্ধে জিতেই যাচ্ছে – ইত্যাদি ধরনের পশ্চিমা নানা প্রপাগান্ডা রিপোর্ট যেটা চারদিকে ছেয়ে গিয়েছিল তাতে আজ ভাটা দেখা যাচ্ছে। একালে অনেক পশ্চিমা মনের সাফাই হল, নিজদেশের জন্য “কথিত দেশপ্রমের স্বার্থে মিথ্যা প্রপাগান্ডা’ জায়েজ আছে। আর এই সুত্র ধরে এর উপর আবার তবু  শুরু থেকেই পশ্চিমে বিশেষত ইউরোপে; বিশেষ করে যুদ্ধের নিউজ রিপোর্ট আর ‘কথিত দেশপ্রেমী প্রপাগান্ডা’ যে এক জিনিস নয় এর কোন হুশজ্ঞান কারও আছে মনে হচ্ছিল না। এমনিতে কোনো দেশের মিডিয়ায় নিজ দেশের যুদ্ধের খবরে কিছু মাত্রায় প্রপাগান্ডা থাকে এটা হয়ত খুব অস্বাভাবিক নয় যদিও একালে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার যুগে অন্তত পশ্চিমাদেশের মিডিয়াগুলোতে “নিজ দেশের মিডিয়া” বলে কোনো ধারণা কার্যকর থাকার কথা নয়। কারণ এত দিনে সবাই বুঝে গেছে যে – মিথ্যা প্রপাগান্ডায় দেশপ্রেম দেখাতেই হবে এটা কোনো কাজের কথা বা পদক্ষেপ নয়। আর সবচেয়ে বড় কথা মিথ্যা কথা আর জার্নালিজম  এম হওয়ার কোন সুযোগ নাই। শেষবিচারে মিথ্যা বলে কোনো দেশের আসলেই কোন লাভ হয় না। কারণ কিছুই শেষে লুকানো থাকে না।  তবু ইউরোপেই এবার বেশি দেখা যাচ্ছে লাগামছাড়া মিথ্যা প্রপাগান্ডা করতে। আর মিথ্যা হওয়াতেই সম্ভবত এই প্রপাগান্ডা চার মাসও টিকতে পারেনি। কারণ চার মাস ধরে কেউ যদি লাগাতার বলে চলে যে, আমরা খালি ‘জিততেই আছি’ অথচ বাস্তবতায় কোনো বদল, পরিবর্তন নাই – এতে এক পর্যায়ে সব প্রপাগান্ডাই মুখ থুবড়ে না পড়ার কোন কারণ নাই! তাই সবাই এখন প্রপাগান্ডা রেখে অন্তত চুপ হয়ে গেছে।

    তবে এ’অবস্থার  জন্য আরো কারণও আছে। একদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ, এটা শুরু থেকে কখনই রাশিয়া-ইউক্রেন এদুই দেশের কোনো লোকাল যুদ্ধ মানে, এটা কোন বুদ্ধিতেই এ দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ এমন কোন ধারণা দেয়া যায় নাই। বরং এটা সব অর্থেই সবদেশের উপরই একটা গ্লোবজুড়ে প্রভাব পড়া যুদ্ধ হিসেবে হাজির হয়েছে। আর এটা আগে বা শুরুতে এমনও ছিল না যে শুরুতে তে তা  দুই দেশের কোন লোকাল যুদ্ধ ছিল আর পরে তা গ্লোবালভাবে সবার ওপরে প্রভাব নিয়ে হাজির হয়েছে তা-ও নয়। এই যুদ্ধ শুরু থেকেই গ্লোবাল প্রভাবের। আর বাইডেনই এমন একটা যুদ্ধ হোক – এমনটা হ্ওয়ার ক্ষেত্রে  তাঁর কোন পরোয়া ছিল না, এটাই চেয়েছেন।

    যেমন- বাইডেনের হিসাব মতে, এটা তো সবসময়ই পরিস্কার থেকেছে যে যুদ্ধের প্রধান পক্ষাপক্ষ হোক সারা ইউরোপ আর আমেরিকা মিলে একসাথে; এভাবে সারা পশ্চিমজুড়ে এক নিজ পক্ষশক্তি খাড়া হোক। হয়েছেও তাই। আর তা না হয়ে অন্য কিছু হওয়ার সুযোগ ছিল না। প্রধানত ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো সবাই এমনকি খোদ আমেরিকাও কম বা বেশি পরিমাণে (কোন রাষ্ট্র ৫০ শতাংশের বেশি) রাশিয়ান তেল অথবা গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা তা কিনে চলত। তাই এটা রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে সীমিত একটা যুদ্ধের ঘটনা যতটা না এর চেয়েও কয়েকগুণ বেশি প্রভাবশালী ঘটনা হল, রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ। বাংলা ভাষায় বললে যার সারার্থ হল – রাশিয়াকে ‘ভাতে-পানিতে মারার’ পশ্চিমাশক্তির পরিকল্পনা ও যুদ্ধ বললে যা বোঝাবে ঠিক তাই।

    দুনিয়ার সবাই এখন এর আসল অর্থ বুঝে গেছে যে, এটা শুধু রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে সীমিত যুদ্ধ একেবারেই নয়। এটা মূলত বাইডেনের আমেরিকার (বগলে ইইউ-কে নিয়ে) পুতিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। তাই  ইইউ বা আমেরিকার যে কাউকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায়, রাশিয়ার সাথে আপনাদের বিরোধের ক্ষেত্রটা কী? ইউক্রেনের যুদ্ধভূমির ক্ষেত্রে নাকি রাশিয়ার ওপর সর্বাত্মক, সবাই মিলে অর্থনৈতিক অবরোধ (ডলার বা ইউরো মুদ্রার অবরোধ) আরোপে? পশ্চিমা কোনো রাষ্ট্র এর সঠিক উত্তর দিতে পারবে না। যেমন – এটা কি “ইউক্রেনের এই যুদ্ধে” জিতার জন্য রাশিয়ার ওপর মুদ্রা অবরোধের যুদ্ধ? শুরুতে এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা তারা করেছিল। কিন্তু এখন অন্য কাউকে বিশ্বাস করানোর আগে তারা নিজেরাই আর তা বিশ্বাস করে না। তাদের পশ্চিমাশক্তির লক্ষ্য এখন পরিষ্কার ও উদাম যে, তারা পুতিনের রাশিয়াকে নিজ রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থে ব্যবসায়-বাণিজ্য এমনকি কোনো স্ট্রাটেজিক স্বার্থ – এমন সব কিছু থেকে বঞ্চিত করাই পশ্চিমের লক্ষ্য। তারা রাশিয়াকে দেখতে চায় যেন সে ১৯৯১ সালের আগের মত এক সোভিয়েত ইউনিয়ন, যে রাষ্ট্রের সাথে দুনিয়ায় আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাংকের সদস্যরাষ্ট্র যারা তাদের কারো সাথে বলার মত কোন বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল না। এমনকি সেকালের সোভিয়েত ব্লকের বলে যেসব রাষ্ট্র ছিল যেমন – পোল্যান্ড বা রোমানিয়া এদের সাথেও সোভিয়েত ইউনিয়নের “বাণিজ্য-প্রধান” এমন কোন সম্পর্ক কখনও ছিল না। এসবের মূল কারণ – কোনো আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা ও এর সদস্যপদ নেয়া ছাড়া কোনো রাষ্ট্র আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য করতে পারে না। আর ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন বা কমিউনিস্ট ব্লকের কোনো রাষ্ট্রই আইএমএফ ধরনের কোনো আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থার সদস্য ছিল না।

    পরে সোভিয়েত ভেঙ্গে গেলে, ১৯৯২ সাল থেকে রাশিয়াসহ সব পুরানা কমিউনিস্ট ব্লকের রাষ্ট্রগুলো আইএমএফের সদস্য হয়ে যাওয়ার পরে এখন যেন বাইডেন চাইছেন পুতিনের রাশিয়ার সদস্যপদ শূন্য করে দেয়ার জন্য। পুতিনের রাশিয়া যেন সোভিয়েত ইউনিয়নের অবস্থায় ফিরে যাক! তাই যেন সে উদ্দেশ্যেই এখন (ডলার, ইউরো ইয়েন ইত্যাদি) অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। মানে বাইডেন আসলে যেন চান রাশিয়া আগের মতই কার্যত আইএমএফের সদস্যপদ না থাক। কিন্তু ভাগাড়ে গরু বেশি না কম মরে পড়ে থাকবে তা শকুনের অভিশাপের ওপর নির্ভর করে না – এটাই সমস্যা!!!

    রাশিয়া ইরান নয়ঃ
    পশ্চিমাশক্তির রাশিয়াকে শুরু থেকে ইরান-ই মনে করা এসেছে – যা ছিল মারাত্মক ভুল। অন্যভাবে বললে, হয়তো এটা আসলে নিজেদের বড় করে দেখা [over-estimation] বা মেপে নিজেকে বেশি করে বলা। এটাকেই আমরা অনেকে ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ’-এর প্রকাশ বলব। যেমন ধরেন এক সাদা ককেশীয় বলল, আরে আমরা তো দুনিয়াকে গত পাঁচশ বছর ধরে অধীনস্ত করে শাসন করে চলেছি। আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধি, চাতুরি বা শঠতার সাথে কি কেউ পারবে? তাই দুনিয়া আগামীতে চীনের নেতৃত্বে কেন, কারো নেতৃত্বেই যাবে না – গত পাঁচশ বছরের মত বরাবরই এটা আমাদের নেতৃত্বেই থেকে যাবে। তাই আমাদের আপাত লক্ষ্য রাশিয়াকে ভাত-পানিতে মারা; রাশিয়াকে ইউরোপে প্রভাবহীন করে কোণঠাসা ও বিতাড়িত করাই তাদের লক্ষ্য! ইউরোপের যেকোনো কর্নারে একেবারেই প্রভাবহীন করা, হাতে ভিক্ষাপাত্র ধরানো ও ফেলে রাখা। অনেকে অবশ্য প্রশ্ন করতে পারেন, রাশিয়া তো চীনের মত কোন হবু গ্লোবাল নেতা নয়! যদিও রাশিয়া স্বাধীন মর্যাদা নিয়ে দুনিয়ায় সামর্থ্য অনুসারে ব্যবসায়-বাণিজ্য করে চলতে চায়। পশ্চিমাশক্তির খায়েশ ছিল রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক-সামরিক সব রকমের চাপ সৃষ্টি করে তাকে কোণঠাসা, রিক্ত করে রাখা। আর এর সাথে তারা দেখতে চেয়েছিল রাশিয়ার এই কল্পিত দুস্থ দশা দেখে চীনের প্রতিক্রিয়া কী হয়!  চীন কী রাশিয়াকেই বাঁচাতে ছুটে যায় ও বিপদে জড়ায়, নাকি রাশিয়াকেই ফেলে চলে যায়! যদিও যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যে চীন পরিষ্কার করে নিজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে বলে দিয়েছিল – রাশিয়ার নিজ অর্থনৈতিক-সামরিক স্বার্থ যদিও চীনের স্বার্থ নয় তবু তারা আশা করে পশ্চিমের সাথে রাশিয়ার বিরোধে সব পক্ষই শান্তিপূর্ণ উপায়ে তা সমাধানের পথ বের করতে সফল হবে!’ তাহলে অবরোধ আরোপের বিচারে পশ্চিমাশক্তির রাশিয়াকে ইরান মনে করাকে মারাত্মক ভুল বলে কথা শুরু করলাম কেন?

    কারণ, আমেরিকান অবরোধ এর আগে বহুবার ইরানের ওপর দেয়া হয়েছিল, যা এখনো আছে। প্রায় একইভাবে রাশিয়ার উপরও তাই দেয়া হয়েছিল যা এখন সর্বব্যাপী অবরোধে এমনকি ইইউও রাশিয়ার ওপর এখন ‘ইউরো অবরোধ’ দিয়ে রেখেছে। আর এখান থেকেই আসছে রাশিয়ার সাথে ইরানের তুলনা। তবে রাশিয়া ও ইরানের আরেক মিলের দিকও আছে তা হল – এ’দুই দেশই তাদের তেল-গ্যাস আর কোনো দেশ কিনুক আর না কিনুক, এরা উভয়ই চীনে ২৫ বছর ধরে লাগাতার জ্বালানি সরবরাহ করতে চীনের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে আছে। আর এটাই এদুই দেশকে আমেরিকান অবরোধের হাত থেকে, এদুই দেশের অর্থনীতিকে অন্তত কিছুটা স্থায়ী রিলিফ দিয়ে থাকে।

    তবু ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে প্রধান ফারাক হল – সারা ইইউ রাশিয়ান তেল-গ্যাসের ক্রেতা হিসাবে খুবই নির্ভরশীল। ব্যাপারটা কেবল রাশিয়ার ঠেকা তা নয়; ক্রেতারও স্বার্থের ঠেকা কম বড় না। যদিও জো বাইডেনের পাল্লায় পড়ে তার মনরক্ষার্থে ইইউ বহু চেষ্টা এখন করে গেলেও তাতে সফল হতে পারে নাই। যেমন, সর্বশেষ রয়টার্সের খবর হল – ‘জার্মানি হঠাৎ করে বিশাল গ্যাস সঙ্কটের মুখোমুখি, রাশিয়া এক চলতি জুন মাসের ব্যবধানে ৬০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে [Germany is facing a sudden acceleration of its gas crisis. A 60% drop in Russian supplies since early June threatens to plunge Europe’s biggest economy into severe economic shock. ]।’ আসলে এটাকেই বলছিলাম রাশিয়ার পরিস্থিতি ইরানের চেয়ে আলাদা। কীভাবে? পণ্য কেনাবেচা না হলে রাশিয়ার বেলায় এর ক্ষয়ক্ষতি একপক্ষীয় নয় বরং বিক্রেতা (রাশিয়া) ও ক্রেতা (যেমন ইইউ রাষ্ট্রগুলো) উভয়েই তাতে অসুবিধায় পড়ে এখানে। আর এখানেই সুবিধায় রাশিয়া আছে। যেমনটা ইরানের বেলায় নাই। ইরানের বেলায় জ্বালানি বিক্রি না হলে এতে বিক্রেতা  ইরানের ক্ষতিটাই সবার চেয়ে বেশি।

    কেন ইউরোপে রাশিয়া সুবিধাজনক অবস্থায়? মূল কারণ- পূর্ব-ইউরোপ বলে বা কমিউনিস্ট ব্লকের দেশগুলোর নেতা বলে রাশিয়া দীর্ঘদিন বাকি-দুনিয়া থেকে বাণিজ্যবিচ্ছিন্ন ছিল, মানে  নিজ ব্লকের বাইরের অন্য কোনো রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিকভাবে কোন পণ্য লেনদেনের সম্পর্কে সে ছিল না ১৯৯১ সালের আগ পর্যন্ত। আর তাতে রাশিয়ান তেল-গ্যাস বাদে বাকি পুরো ইউরোপের মাটির নিচের সব তেল-গ্যাস ব্যবহার করে পশ্চিম-ইউরোপে তা শেষ করে ফেলা হয়েছিল। ফলে বর্তমান ইইউ রাষ্ট্রগুলো সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর সবাই তেল-গ্যাস প্রশ্নে সবাই একই রাশিয়ার তেল-গ্যাসের উপর সকলেই কমবেশি পরিমাণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে আছে সেই থেকে। যেখানে গ্যাস একদিকে তুলনামূলক ক্লিন এনার্জির উৎস। অন্যদিকে, ইউরোপ মানেই বছরের ছয় মাসের বেশি যেখানে ঘরগরম রাখতে জালানি না পুড়ালে ওসব দেশ বসবাসের অযোগ্য। ফলে ওই জীবনযাত্রা প্রচুর জ্বালানি খরচনির্ভর। এ কারণে, সেই থেকে একালে ইউরোপের কোন রাষ্ট্র রাশিয়ার তেল-গ্যাস কিনবে না এটা বললেই তাতে রাশিয়ার একটি বিকল্প জোগাড় করে ফেলাটা সহজ নয়। এজন্য তারা অনেকবারই বাইডেনকে বুঝিয়েছিল ও সিদ্ধান্তে এসেছিল যে, ২০২৭ সালের আগে তারা রাশিয়ার বিকল্প উৎসের কাছে যাবে না কারণ পাবে না। কিন্তু বাইডেনের চাপের মুখে ফিরে তারা অনেকেই অপারগতার কথা বাস্তব হলেও তা উচ্চারণ করতে চায়নি। আবার হাঙ্গেরি বা ইতালির মত কিছুদেশ খোলাখুলি চেঁচিয়ে বলে দিয়েছিল যে, রাশিয়ান গ্যাস ছাড়া তাদের অর্থনীতি চলবে না, তাই তারা কিনতেই থাকবে। অথবা গোপনে অসরকারিভাবে নগদ রুবল দিয়ে রাশিয়ান তেল-গ্যাস কিনে চলছে।

    আর এখন এমন অবস্থায় খোদ রাশিয়াই এবার গ্যাস বিক্রি বা সরবরাহ কমিয়ে দেয়ার কথা জানিয়েছে। অর্থাৎ ইউরোপ ইচ্ছা বা পছন্দমত রাশিয়ার উপর (ইউরো) অবরোধ করার বদলে উল্টা রাশিয়া নিজ রুবল মুদ্রার শর্তপূরণ হলেই কেবল গ্যাস বেচবে তা তো বটেই, আবার রুবল দিলেও অনেক ক্ষেত্রে রাশিয়া উল্টা কোন কোন ইউরোপীয় রাষ্ট্রকে পাল্টা চাপ দিবে বিপদে ফেলতে – গ্যাস সরবরাহ-ই করবে না। আর এ সূত্রেই বিপদে পড়েছে জার্মানি। রয়টার্সের রিপোর্টটা তা নিয়েই।

    অনেকের মনে হতে পারে, রাশিয়া গ্যাস বেচবে না? নিজে একথা বলার সামর্থ্য পেল কী করে? হ্যাঁ, রাশিয়ার সেই সামর্থ্য এখন হয়েছে। আমেরিকান মিডিয়া ব্লুমবার্গের উদ্ধৃতি, আর এনিয়ে বিবিসি এক লম্বা রিপোর্ট করেছে  দেখেন গত ২২ মে – “রুবল: ভ্লাদিমির পুতিনের যেসব কৌশলে রাশিয়ার মুদ্রার নাটকীয় উত্থান”।

    প্রথম কথা- রাশিয়ান অর্থনীতি এখন আমেরিকা ও ইইউ’র অবরোধের ঠেলায় কোণঠাসা হয়ে পড়বে বলে পশ্চিমাশক্তির মিডিয়া – প্রধান ও সোশ্যাল মিডিয়া দুটোতেই যে হইচই আতঙ্ক তুলে ফেলেছিল তা এখন উল্টে গেছে। বিবিসির এই রিপোর্ট বিস্তারিতভাবে রাশিয়া কী কী পদক্ষেপ নেয়ার কারণে তার রুবল এখন চাঙ্গা হয়ে গেছে এর বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে। এছাড়া আমেরিকান স্থানীয় ভোক্তা-শ্রোতার মিডিয়া সিএনবিসি [CNBC] আরেক দিক থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট করে [Russia’s ruble hit its strongest level in 7 years despite massive sanctions. Here’s why] জানিয়েছিল –  গত মার্চ ২০২২ যেখানে এক মার্কিন ডলার কিনতে রাশিয়ার ১৩৯ রুবল লাগত; তা এখন ৫২ রুবলে নেমে গিয়ে রুবলকে শক্তিশালী করেছে। অর্থাৎ উল্টা এটা নেমে ৫২ রুবলে ডলার হয়ে যায়। কিন্তু এটা বেশি নিচে নেমে যাওয়া দর মনে করে রাশিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কারণ এতে রাশিয়া রফতানি বাজারে বেশি রাশিয়ান পণ্য হারাবে মনে করে এতে এ্কটা ভারসাম্য আনতে তা এখন একটু বাড়িয়ে ৬২ রুবল / ডলার এই রেটের আশপাশে মূল্যস্থির ধরে রাখার মেকানিজম বের করার চেষ্টা করছে রাশিয়া।

    অর্থাৎ রাশিয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংক সঠিক নীতি-পলিসি প্রণয়নে সক্ষম ও সফল যে, অন্য দেশকে আগে রাশিয়ান রুবল কিনে পরে ওই রুবলে মূল্য পরিশোধ করার শর্তেই  রাশিয়ান তেল-গ্যাস কিনতে ক্রেতাকে বাধ্য করতে পেরেছে তারা। এটাই রুবলকে এখন এক চাঙ্গা চাহিদা সম্পন্ন  মুদ্রা, এটা খুবই দরকারি মুদ্রা হিসেবে বাজারে হাজির করেছে। আর এখানেই ইউরোপের জ্বালানি চাহিদায় রাশিয়ার বিকল্প নেই – এর সুবিধা তুলে নিতে পারাতেই এটা রুবলকে শক্তিশালী মুদ্রা করে দিয়েছে। আর এখান থেকেই রাশিয়া ইরান থেকে আলাদা হয়ে আপাতত নিজ ভাগ্য খুলে বসেছে।

    অথচ, যুদ্ধের শুরুতে আমেরিকার নেতৃত্বে ইউরোপ – এভাবে সারা পশ্চিমাশক্তির অনুমান-কল্পনা ছিল এটাই যেন রাশিয়ার উপর (অনেকটা যেমন ইরানের বেলায় তার অর্থনীতিতে করা হয়েছিল) আমেরিকান ডলার অবরোধ আরোপ করে ইরানের মতই রাশিয়ান অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত বা সঙ্কুচিত করার পথে সহজেই ঠেলে তা সফল করবে। কিন্তু এক কথায় বললে, বাইডেনের এখনকার প্রশাসন ও নির্বাচন-পূর্ব নির্বাচন পরিচালনা টিম আসলে প্রয়োজনীয় হোমওয়ার্কই করেনি। যেগুলোর বিষয়ে শক্ত ও নির্মোহ পর্যালোচনা করে হ্যাঁ বা না সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার ছিল সেসব ক্ষেত্রে তারা আবেগে সিদ্ধান্ত নিয়েছে; যেমন বিজয়ী হয়ে গেলে কী হবে সেই কল্পনা করে সেই সুখা-বেগে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইউরোপে রাশিয়ান তেল-গ্যাসের বিকল্প আছে কি না এর যাচাইও তারা আবেগ দিয়ে করেছিল বলেই রুবল আপাতত সারভাইভ করে গেল মনে হচ্ছে…!

    শুধু তাই তা, এতে সব মিলিয়ে এখন খোদ আমেরিকাতেই একটি অংশের মনে আমেরিকার যুদ্ধে হেরে যাওয়ার বাঁশি বেজে উঠছে। তারা বাইডেনের সমালোচনার দিকগুলো তুলে আনা শুরু করেছে। হংকং থেকে প্রকাশিত এশিয়ান টাইমস ওয়েবপত্রিকা এ নিয়ে এক কঠোর সমালোচক হয়ে উঠেছে [Neocon think-tanks are driving Biden’s Ukraine policy]। সেখানে তারা আরো এক রিপোর্ট লিখেছে, বাইডেন প্রশাসনকে ঘিরে থাকা ৩৬ এক্সপার্ট এক কোটারি গ্রুপের রেফারেন্স দিয়ে বলছে এরা সম্মিলিতভাবে এক চিঠিতে লিখেছে, ‘আমেরিকা ও ইউরোপকে অবশ্যই ইউক্রেনকে রাশিয়ার সাথে কোনো যুদ্ধবিরতির চুক্তি ঘটানো থেকে ফেরাতে হবে যা ইউক্রেনের যুদ্ধলক্ষ্য পূরণের চেয়ে খাটো এবং যা পরিণতিতে লাখ লাখ ইউক্রেনীয়কে রাশিয়ার অধীনস্থ করবে।’

    The letter says, in part: 
    “The United States and Europe must avoid the urge to encourage Kiev to negotiate a ceasefire that falls short of Ukraine’s goals and could consign millions of Ukrainians to Russian control.”

    আর এই চিঠিকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন পোস্ট ১৭ জুন প্রতিক্রিয়ায় আরেক রচনা ছাপিয়েছে। সেখানে প্রথম বাক্যেই বলা হয়েছে, ‘আমেরিকা ও এর সহযোগী দেশগুলো ইউক্রেনে এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেছে বলে জানিয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, বাইডেন প্রশাসন রাশিয়ান বিজয় যাতে না ঘটতে পারে তা থেকে রাশিয়াকে বঞ্চিত করতে চেয়ে কিয়েভে (ইউক্রেনে) সামরিক ব্যয় বিশাল বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে অথচ এতে যুদ্ধ বাড়িয়ে তোলাতে অস্থিতিশীলতা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে যার সোজা ফল হবে দুনিয়াতে তীব্র ক্ষুধার সঙ্কট ও গ্লোবাল অর্থনীতির সঙ্কট জটিলতর করবে”।

    “The United States and its allies are making preparations for a prolonged conflict in Ukraine, officials said, as the Biden administration attempts to deny Russia victory by surging military aid to Kyiv while scrambling to ease the war’s destabilizing effects on world hunger and the global economy.”

    এভাবে সবগুলো খবরকে উদ্ধৃতি করে আরেক থিঙ্কট্যাঙ্ক কর্তা ইভো দালদার [Ivo Daalder] লিখছেন, ‘আমেরিকান প্রশাসন উভয় সঙ্কটে পড়েছে- হয় ইউক্রেনে চলমান ব্যাপক রক্তপাতের পথ হলেও তাই ধরে বসে থেকে এর ভয়ঙ্কর রকম সব গ্লোবাল পরিণতি আপন করতে হবে আর নয়তো ইউক্রেনকে সমর্থন বন্ধ করে মস্কোকে বিজয়ী হতে সহায়তা করতে হবে। এ পরিস্থিতি সত্ত্বেও বাইডেন প্রশাসন দায়িত্বজ্ঞানশূন্য আচরণ করছে, ব্যর্থ পলিসি আঁকড়ে থেকে চলছে। অন্তত সৎ নাগরিকের উচিত হবে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা।’

    “Ivo Daalder, a former U.S. ambassador to NATO who now heads the Chicago Council on Global Affairs, said the battlefield impasse leaves the United States with a stark choice: either continue to help Ukraine sustain a potentially bloody status quo, with the devastating global consequences that entails; or halt support and permit Moscow to prevail.”

    আমেরিকান বিভিন্ন থিঙ্কট্যাঙ্কের কর্তারা এ নিয়ে অস্থির হয়ে উঠেছেন। কারণ ইতোমধ্যে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ বোর্ড অব গভর্নরের চেয়ারম্যান জেরোমে পাওয়েল [Jerome Powell ] আমেরিকান সিনেটের এক শুনানিতে সাক্ষ্য দিয়ে জবাব দিচ্ছিলেন যে, গ্লোবাল রিসেশন[recession] বা মহামন্দা এখন ২০০৭-৮ সালের মতো আসন্ন কি না এ প্রসঙ্গে। তিনি জবাবে তা আসন্ন নয়, তা বলতে পারেননি। অর্থাৎ এর সম্ভাবনা নাকচ করেননি [Powell says recession ‘a possibility’ but not likely]।

    আর এরপর থেকেই ব্যবসায় পুঁজিবাজার বা অর্থনীতির তৎপরতার কেন্দ্রগুলোতে আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে। তারা বাইডেনের থেকে নিজেদের দূরত্ব তৈরি করে ও অবিবেচক বলে তাঁর সমালোচনা করেছে, বিশেষত ইউক্রেন যুদ্ধ উসকে তোলার জন্য ও তা জোরদার করতে শুরু করেছে বলে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২৫ জুন  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ইউক্রেন যুদ্ধের পরিণতি কী মহামন্দা“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]