Tag: চীন

  • হালকা, আবছার উপর ঝাপসায় মারা কমিউনিস্ট বিবৃতি

    হালকা, আবছার উপর ঝাপসায় মারা কমিউনিস্ট বিবৃতি
    গৌতম দাস

    ০২ মে ২০২৩  মধ্যরাত ০০ঃ০১
    https://wp.me/p1sCvy-4oK

     

    United Communist League of Bangla Desh

    দেশে না জেনে আন্দাজের উপর কথা বলা লোকের সংখ্যা বাড়তেছে। গত ২৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ত্রিদেশীয় জাপান-আমেরিকা-যুক্তরাজ্য সফর শুরু করেছিলেন। আর এরপরেই ২৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় সিপিবি-র এক জ্ঞানী বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি পরের দিনও তাদেরই “বাম গণতান্ত্রিক জোট” একই ইস্যুতে বিবৃতি দিয়েছিল। সরকারকে অভিযুক্ত করার ভাবে তেমনই টোনে এসব বিবৃতি। যেমন সিপিবির বিবৃতির শিরোনাম – ‘প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে যেন জাতীয় নিরাপত্তা বিকিয়ে দেওয়া না হয়: সিপিবি’। আর জোটের বিবৃতির শিরোনাম – ‘তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের চুক্তি প্রকাশ করার দাবি’।
    যারা এতদিন মানে, কম করে ধরলে গত পনেরো বছর ধরে ‘সরকারের বিকল্প দেখে নাই’ তারা আজ হঠাত এত কড়া অভিযোগে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে গালি দিয়ে হুঙ্কার দিচ্ছে – এটা কেন?  তার মানে, বামেরা কী মনে করে সরকারের কী তবে আয়ু শেষ? তাই বিপ্লবীপনায় ফিরে যেতেই…!  সম্ভবত একারণেই, সবার আগে বামেরা তাই হাসিনার দায়দায়িত্ব আর এতদিনের সমর্থন ও ঘষাঘষি সম্পর্ক এখন থেকে  মুখে অস্বীকার করে ডিস্ট্যান্স তৈরি করে দূরে দাড়ানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে মনে হচ্ছে!

    তাই দেশে এখন একটা “হালকা, আবছার উপর ঝাপসা মারা বিবৃতি” ও তা নিয়ে পত্রিকা রিপোর্ট করা শুরু হয়েছে; যে ঘটনার  শুরু প্রধানমন্ত্রীর এবারের জাপান সফর থেকে, সফর শুরুর দিন থেকে। সেদিন আবার দৈনিক যুগান্তরেও একটা খবর ছাপা হয়েছিল যার শিরোনাম, “গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান মার্কিন কোম্পানি এক্সন মবিল কাজ পাচ্ছে”। একইদিনে মাদারবাড়িতে জাপানের গভীর বন্দর নির্মাণ আর ভারতকে চট্টগ্রামের পরে এবার মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে দেয়ার রাজস্ব বিভাগের খুটিনাটির নির্দেশ জারি এবং বাংলাদেশেরও আগে ভারত প্রায়োরিটিতে যেন বন্দর ব্যবহার করতে পারে ইত্যাদি এসব বিষয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। আর তা থেকে বাম-বিপ্লবীপনার জোয়ার ছড়িয়ে পরা শুরু হয়েছে। যা অন্যান্যদের রাজনীতিকেও বিভ্রান্ত-প্রভাবিত করেছে স্বাভাবিকভাবেই। কারণ, মনিষীরা বলে গেছেন – বিভ্রান্তিই ছোঁয়াচে রোগের মত যা সহজেই ছড়িয়ে পরে; তুলনায় যা ‘জ্ঞানবুদ্ধির’ কথা তা সুস্বাস্থের মত। মানে যা ছোঁয়াচে নয় বলে মানুষের মধ্যে সহজে ছড়ানো যায় না। আর তাতে বর্তমান রাজনৈতিক জ্ঞানগম্যি-তথ্য-পরিস্থিতি বুঝতে সবাই ছুটছে “তেল-গ্যাসের মধ্যে’।

    মানুষ মানে কী কেবল অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিতসা-বাসস্থান? তাহলে রাজনৈতিকতা কীঃ
    কমিউনিস্টেরা আজও – রাজনীতি- এই শব্দের অর্থ আমল করতে চাইলো / পারলো না। মানুষের বৈষয়িক স্বার্থ আর রাজনৈতিক স্বার্থ যে দুটা আলাদা জিনিষ ও আলাদা চাহিদা তা তারা হদিশ জানলো না। মানুষের কেবল তাঁর তনু বা দেহ বাঁচায় রাখলেই, কেবল এতেই সতুষ্ট থাকলেই চলে না। প্রাণ শুধু জৈবিক না – এর স্পিরিচুয়ালিটি বা রাজনৈতিক দিকের মত বহু আরও দিকে এর উন্মেষ দরকার হয়। অথচ এরা মানুষকে কেবল বৈষয়িকতায় সীমাবদ্ধ [reduced] করে রাখতে চায়, এভাবে কল্পনা করতে চায়। অথচ আমাদের শুধু অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিতসা-বাসস্থান এসব বৈষয়িক চাহিদার দিক পূরণ হলেও মানুষের একেবারেই চলে না। কারণ, এসব ছাড়াও মানুষ তো অন্তত রাজনৈতিক মানুষ!  বৈষয়িকতা ছাড়িয়েও যে মানুষ আছে তাঁর  আরও যেসব চাহিদা আছে তা কমিউনিস্টেরা কখনও বুঝতে চাইলো না। আর এরই পরিণতি হল একালে; যেমন, তাঁর রাষ্ট্র কী তাকে গুম-খুন-অপহরণ ইত্যাদি করতে পারবে? রাষ্ট্রে জায়েজ আছে, থাকবে? কথিত শ্রেণী শাসনের একনায়কতন্ত্রের রাষ্ট্রে সব কী জায়েজ, এর নামে?  এসব প্রশ্ন, মানুষের ‘রাজনৈতিকতার’ প্রশ্ন – যা কমিউনিস্টেরা আমল করতে জানে না। অধিকার কী, নাগরিক কী – এসব ধারণা তাদের ভোকাবুলারিতেই নাই।  অথচ এদের জবাব  জানা না থাকা, এসব নাগরিক মানুষের ধারণা ও প্রশ্ন সম্ভবত একালে ভাতের প্রশ্নের চেয়েও বেশি জরুরি!

    কিন্তু তবু এরা “সরকারের বিকল্প দেখে” না। খুঁজে পায় না। আর  না পেয়ে সেজন্যই কী এরা “তেল-গ্যাসের বৈষয়িকতার মধ্যেই’ কেবল মানুষকে দেখতে চায়। এভাবে খুঁজতেই যেন মানুষকে আবার ঠেলতে শুরু করেছে কিছু বামেরা।
    তেল-গ্যাস বা মাটির নিচের সম্পদ নিয়ে কথা উঠলেই দেশের বামপন্থিরা মনে করে এটা তাদের একচেটিয়া এক সাবজেক্ট  আর তাঁরা নিজেকে এর বিষয়ের চ্যাম্পিয়ান মনে করে। আর তাতে তারা ইস্যু্টার অলিগলি বা রাজনীতি জিনিষটা বুঝুক আর নাই বুঝুক। তারা মনে করে তেলের খনির ইস্যু উঠলেই তারা একে এক মুখস্ত শব্দ ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে গালি দিয়ে দিলেই বা ‘সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র’ বলে এক অর্থহীন ফতোয়া বিবৃতি দিয়ে দিলেই তারা এই ইস্যুতে চ্যাম্পিয়ান হয়ে যাবে। সব রাজনৈতিক দায় অবস্থান হাজির করে ফেলতে পারবে, আর এতেই তাদের কথিত “রাজনীতি-বোধ”  প্রকাশের কাজ হাসিল হবে? তাই কী?

    সরকার আমেরিকান ব্কেযক্তি কোম্পানিকে তেল অনুসন্ধানের কাজ দিয়ে দিলেই কী আপোষঃ
    সরকার আমেরিকান কোন কোম্পানিকে  তেল অনুসন্ধানের কাজ দিয়ে দিলেই কী আপোষ, মানে সরকার টিকে যাবে? কথিত কোন ডিল হয়ে যাবে?  দৈনিক যুগান্তরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান মার্কিন কোম্পানি এক্সন মবিল কাজ পাচ্ছে  ধরণের রিপোর্ট ছাপা হবার পর থেকেই বামপন্থিরা এমন অনুমান ও গুজব ছড়িয়েছে। যার মূল কারণ সম্ভবত, তারা মনে করে আমেরিকা রাষ্ট্রের রাজনীতিক স্বার্থ মানে কেবল বৈষয়িক স্বার্থ – কয়েকটা তেলের খনি হস্তান্তর।
    প্রথমত, এটা গত পনেরো বছরে লটকে থাকা একটা তেল অনুসন্ধানের কাজ বিতরণের ঘটনা যার কিছুই অন্ত নাই, দেখা যাচ্ছে না। কারণ, এটা “তেল আছেই” এমন জানা কোন ভুখন্ডের কোন অনুসন্ধান নয়। খুব সম্ভবত এর প্রাপ্তির সম্ভাবনা কম বা অনিশ্চিত মানে একটা এমন ঘটনার নুন্যতম নিশ্চয়তা্র প্রাইমারি থ্রেসহোল্ড [Primary Threshold] যদি না থাকে তাতে ঐ কাজে অর্থ ঢালার আগ্রহ কম হবেই, সক্রিয় প্রতিযোগিতায় উতসাহ কমে যায় এটা তেমন।  তাই ব্লক বিতরণ পনেরো বছরে লটকে আছে।  এতে নয়া উতসাহ পেতে এবার কোম্পানি প্রস্তাব করছে যে ১৫টা ব্লক-ই তাকে দিতে হবে। অথবা নয়া উতসাহ দেখা যেতে পারে হয়ত আগামিতে কোন কারণে গ্লোবালি তেল-গ্যাসের দাম আকাশ্চুম্বি হলে, উতসাহ বাড়তে পারে। কিন্তু সেসব যাই হোক না কেন বেশিরভাগ ব্লকে এক্সপ্লোরশনে কিছু পাওয়া না গেলেও গড়ে তা লাভজনক হয়ে যায়। অর্থাৎ উতসাহের অভাব দূর না করতে পারলে কেউ আসতে চাইবে না।
    তবে সেসব যাই হোক ঘটনার মূল পয়েন্ট সেটা না। বরং ধরা যাক, এখানে তেল-গ্যাস পাওয়া একেবারে নিশ্চিত সেক্ষেত্রে কে “লাভবান” হবে? আমেরিকা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বার্থ নাকি এক্সন মবিল? যদি ধরে নেই ‘লাভবান” বলতে রাজনৈতিক স্বার্থ  বলে কিছু নাই সবটাই বৈষয়িক স্বার্থ তাহলে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ এখানে কোন খাতক নয়। মূল সম্ভাব্য খাতক এক্সন মবিল [Exxon Mobil Corporation] কোম্পানি একা আর এর উচ্ছিষ্ট কুড়াবে বাইডেন প্রশাসনের কেউ কেউ বড় জোর। সোজা কথা আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ এতে কোন  লাভালাভ পাবে না।
    এর মানে হল – আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ কী – এটা যারা বুঝতেই পারে না, এটা হল সেই কমিউনিস্টদের বয়ান! অর্থাৎ ঐ ১৫টা ব্লকে যদি তেল উপচিয়ে পড়া নিশ্চিত ব্লকও হয় তবু আমেরিকা-হাসিনা সরকারের এখন এথেকে  সমঝোতার সংকট তা কাটার কোন সম্ভাবনা নাই।  অথচ এই শতকের শুরু থেকেই আমেরিকার প্রধান সংকট গ্লোবাল পালাবদলে চীনের সাথে প্রতিযোগিতার নিজের আগের গ্লোবাল নেতৃত্ব ও প্রভাব আগের মতই পক্ষে ধরে রাখা। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, ২০১৫ সালে ওবামা আমল থেকে এশিয়ায় চীনকে হারানো ও প্রভাব বাড়াতে না দেওয়া ইত্যাদি করতে যতগুলো কর্মসুচি আমেরিকা নিয়েছে তার কোনটাই ফলাফল আনে নাই। সাউথ চায়না সি – কে কেন্দ্র করে মালাক্কা প্রণালি বাধা তৈরির সম্ভাবনা থেকে শুরু করে কোয়াড আর সর্বশেষ ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্রাটেজি ইত্যাদি  কোনটাই আমেরিকাকে জুতমত চীনের উপরে কোন মাইলেজ দেয় নাই। সব উদ্যোগই ফেল করেছে বা করছে ক্রমশ। মূলত আশিয়ান দেশগুলোর [ASEAN] অনাগ্রহের জন্যই, তা বিশাল ফ্যাক্টর হয়ে থাকছে! আমেরিকান নীতিনির্ধারক ও থিঙ্কট্যাংকগুলো আশিয়ান দেশগুলোর স্বার্থ বা আগ্রহকে ছুতেই পারে নাই। তারা কেবল নিজ-রাষ্ট্রস্বার্থের দিক থেকে লাভালাভ আশিয়ান সদস্যেদের উপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। তাই  কোনভাবেই আমেরিকা তাদের হিলাতে পা্ররে নাই, পারার সম্ভাবনাও নাই।  ওতএব নয়া উদ্যোগে আমেরিকার জন্য নয়া কর্মসুচি হল বার্মা দখল বা রেজিম চেঞ্জ; আর এতে এবার যদি আমেরিকার কোন ভাগ্য খুলে…! এগুলোই হল আমেরিকা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বার্থ বা রাষ্ট্রস্বার্থ।  এখন কমিউনিস্টেরা যদি  দশ-পনেরোটা তেল-গ্যাসের উপচে পড়া খনি পাবার স্বার্থ দিয়ে আমাদেরকে ইস্যুটা ব্যাখ্যা করতে চায় বা বুঝতে বলে তাহলে আমরা কী বুঝব? এরা কী কোন রাজনৈতিক দল, কমিউনিস্ট ? এসব পেটি মধ্যবিত্ত, এরা কারা?
    যারা গ্লোবাল নেতৃত্বে –  প্রতিযোগিতা ও স্বার্থ-সংঘাত দিকটা আমল করার যোগ্যই নয় – বড় জোর তেলের খনি আর সবকিছুকেই বস্তুস্বার্থ দিয়ে বুঝে তাই সবকিছু তেলগ্যাসের বুঝ দিয়েই বুঁদ হয়ে থাকে তবে এদের লইয়া আমরা কী করিব!!

    সিপিবির এক ফাঁকা বিবৃতিঃ
    সিপিবির বিবৃতির এক উল্লেখযোগ্য প্যারাগ্রাফ হল –

    বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’ এশিয়াভিত্তিক সামরিক অভিলাষ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইন্দো–প্যাসিফিক কৌশলগত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চট্টগ্রামের মাতারবাড়ীতে জাপান যে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করেছিল, সেটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং এর সহায়ক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ইচ্ছানুযায়ী বাংলাদেশে একটি মার্কিন নৌঘাঁটি স্থাপন ইত্যাদি বিষয় জাপান সফরকালে আলোচিত হবে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এটি হলে তা হবে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য বিরাট হুমকিস্বরূপ। এ ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী।

    প্রথমত এটা আমেরিকার নেহায়েতই কোন “সামরিক অভিলাষ” -মাত্র নয়।  ঠিক যেমনটা আমরা কোল্ড-ওয়ারের (১৯৫৩-৯১) আমলে সোভিয়েত-আমেরিকান ঝগড়ায় আমরা সবকিছুকেই ‘সামরিক’  বলে বয়ান করতে সোভিয়েত  বয়ানের মধ্যে দেখতাম। এছাড়া এমনকি সত্তর-আশির দশকের বয়ান দিয়েও বিশেষত,  কোল্ড-ওয়ারের চিন্তা ফ্রেমে একালে কিছুই ব্যাখ্যা বর্ণনা করা যাবে না। নিজেকে বোকা প্রমাণ করা ছাড়া ওতে আর কোন লাভ হবে না।
    দুই. ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি এটা কোন আমেরিকান প্রকল্পই নয়। বড়জোর একটা কনসেপ্ট মাত্র। আর তা হল,  চীন নাকি কোন আন্তর্জাতিক রুল, নিয়ম-কনভেনশন মানে না, রুল বেজড নয়। বিশেষ করে আড়ালে বলতে চায় চীন নাকি  জাতিসংঘের [UNCLOS – The United Nations Convention on the Law of the Sea] মানে, সমুদ্রসীমা নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আরবিট্রেশন (যা ঠিক বিচার নয় তবে সালিশীর মত জাতিসংঘের অধীনে এক  মিটমাট ব্যবস্হা) মানে না। এই অজুহাতে চীনকে একঘরে করে আমেরিকা – ভায়েরা আসেন একটা কনসেপ্ট তৈরি করি যার যার কনসেপ্ট অবস্থান বলি বললে যেমনটা হত – এটাই আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি বাতচিত।  এই লক্ষ্যে, সবদেশের একেকটা স্ট্রাটেজি প্রকাশিত হোক এটাই আমেরিকার ইচ্ছা। আর এর বিরুদ্ধে চীনা রাষ্ট্রদুতের অভিযোগ ওরা সুনিদির্ষ্ট করে একটা দেশকে (মানে চীন)  বাদ দিয়ে একটা কোন ইন্টারন্যাশনাল জোট কনভেনশন করতে পারেন না। তবে মূলকথাটা বা বটম অব দা ফ্যাক্টস হল, চীন কখনও এপর্যন্ত সে – জাতিসংঘ মানে না বা UNCLOS মানে না বা আইনের শাসন মানবে না ইত্যাদি বলে কোন বিবৃতি বা ধারণা দেয় নাই। ফলে এমন অভিযোগ গ্লোবাল নেতৃত্ব নিয়ে অ্যামেরিকান একটা চীনবিরোধী ক্যাম্পেইন মাত্র। যদিও একথা ঠিক, সাউথ চায়না সি (যেটা চীন থেকে সমুদ্র পথে বের হলেই যে নৌ-অঞ্চল)  -তে চীন তার প্রায় সকল পড়শির সাথেই সমুদ্রসীমা বিতর্কে আছে।
    তিন. মাতারবাড়ি জাপান যে গভীর সমুদ্রবন্দর এর সাথে “ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত” -এসবকথা কোথায় পেল সিপিবি? হঠাত এনিয়ে মাঠে উদিত হল কোথা থেকে – এই কমিউনিস্টেরা ভারতের উত্তর পুর্বাঞ্চল রক্ষার দায়ীত্ব কাধে নিল কেন?  মাতারবাড়ি মূলত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের (যা মাতারবাড়ি প্রকল্পের আরেক অংশ) জন্য বড় বাল্ক জাহাজে করে কয়লা (ছোট লাইটার জাহাজ না) সরাসরি বিদ্যুৎ প্রকল্প পর্যন্ত প্রবেশ সহজ করতে পারার এমন উপযোগী করে নির্মিতব্য এক গভীর সমুদ্রবন্দর। আর এতে আমেরিকার নৌঘাঁটি করার খায়েস এর পথে তা সাহায্য হতে পারে তাই এটা জাপানকে সামনে রেখে ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার তা করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল। আর এসবের বিপরীতে বাংলাদেশের জন্য মূল বা বাণিজ্যিক গভীর সমুদ্রবন্দর করার স্টাডি-পরিকল্পনা করা হয়েছিল পাশে মহেশখালির সোনাদিয়াতে। যেটা চীন (কুনমিং), বাংলাদেশ ও বার্মায় পণ্য আনা-নেওয়া জন্য ব্যবহার করা যায় – সাথে আর চাইলে ভারতও তা ব্যবহার করতে পারবে;  এতে তাহলে এর নির্মাণ খরচ সহজেই বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনা করে উঠে আসবে।  কিন্তু ভারতের আপত্তি ও ফুসলানিতে এই প্রকল্পই ২০১৫ সাল থেকেই বাগড়া, শেষে সরকার বাদ দিয়ে দেয়। আর আজকে পট উলটে যাওয়ায় সিপিবি  ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য রক্ষার গল্প ও কান্নাকাটি নিয়ে এসেছে! এটাই ভাগ্যের পরিহাস! কিন্তু এখন কেন?  ভারতের পিঠে আমেরিকার হাত থাকাতেই এতদিন ভারত-আমেরিকান স্ট্রাটেজিক বন্ধু  এই গর্বে মাটিতে পা না পড়া ভারত এতেই কী বাংলাদেশকে করদ রাজ্যের মত ব্যবহার করে আসে নাই???  তখন সিপিবি ও বামেরা কারদিকে কোথায় ছিল??? কোন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে ছিল???
    চার. বাংলাদেশ সরকার শেষ পর্যন্ত তার “ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি” পাবলিক করেছে। এনিয়ে বিবিসির রিপোর্টের শিরোনাম হল – “ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখা: চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বে ভারসাম্যের নীতি নিয়েছে বাংলাদেশ”। মানে হাসিনার বাংলাদেশ চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বে কোন পক্ষ নিবে না, বরং ভারসাম্যের নীতি বজায় রাখবে – যেকোন কারণেই হোক এটা সঠিক পদক্ষেপ। এটা ২০২০ সালে বা তারও আগে থেকেই হাসিনার একই অবস্থান – মানে এটাই হাসিনার নিজেকে ক্ষমতায় রাখার দিক থেকেও বরং উপযুক্ত বলে তাঁর নিজস্বার্থ ও  বিবেচিত। আর তা তিনি বজায় রেখেছেন। তাহলে হাসিনার এই চলতি ত্রিদেশীয় সফরে আমেরিকান সাথে আতাঁত আপোষ হয়ে যাচ্ছে বলে ভয় দেখানোর সুযোগ কই???
    অতএব,  হাসিনার এই ত্রিদেশীয় সফর নিয়ে আমরা বড়জোর বলতে পারি এটা হাসিনার শেষ চেষ্টা কোন “ওয়ার্কেবল রিলেশন” বের করার তবে সেটাও যদি লাইগা যায় ধরণের, তবে তুকতাকে বিশ্বাসের। তুকতাক বললাম এজন্য যে মানুষ সব হারালে তুকতাকে বিশ্বাস করতে চায়। মানে, মনে হয় না হাসিনা লজিক্যালি এমন কোন সম্ভাবনা দ্যাখেন।
    সারকথায় তাহলে, সিপিবির তরুণ নেতাদের নতুন করে পড়াশুনা করতে হবে। পুরানা সত্তর-আশির দশকের ভাবনা একেবারেই অচল, মুখস্থ কথা অচল হয়ে গেছে। কমিউনিস্ট চিন্তা একালে ঢেলে সাজাতেই হবে – মার্কস যাকে নিরন্তর পর্যালোচনা বা নিজেকেই ক্রিটিক [Critique] করতে বলতেন। রিভিউ [Review] বা ঢেলে সাজানো এটাই। এই মুরোদ ছাড়া সব পন্ডশ্রম, সময় নষ্ট – এই পথেই যাচ্ছে কমিউনিজম, যাবেই!

     

    কমিউনিস্টদের সাম্রাজ্যবাদঃ
    সিপিবি’র বিবৃতির একটা বাক্য হল এরকম, “সিপিবি মনে করে, শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকতে ‘সাম্রাজ্যবাদী শক্তির’ কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বিকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা কখনো শুভ হবে না” ।
    এখন একথার মানে কী?  তাহলে বাংলাদেশে গত পনেরো বছরে কী হয়েছে? এসময়ে “ক্ষমতায় টিকে থাকতে ‘সাম্রাজ্যবাদী শক্তির’ কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বিকিয়ে দেয়া” – বলতে কিছুই ঘটে নাই? এটাই কী সিপিবি মনে করছে? তাহলে এতদিনে হাসিনার বিকল্প নাই কথা এখন ফেলে ত্যাগ করে সরকারের সমালোচনায় আসার ভাব দেখানোর দরকার কী?
    ‘সাম্রাজ্যবাদ’ শব্দটা কমিউনিস্ট ভোকাবুলারিতে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে চালু হয়েছিল কমিউনিস্টদের এক গুরু-নেতা লেনিন এর ১৯১৬ সালে লেখা বা প্রকাশিত ‘সাম্রাজ্যবাদ’ নামের বই থেকে। আর ওর পরের বছরই ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় রুশবিপ্লব বা দুনিয়ায় প্রথম এক কমিউনিস্ট বিপ্লব সংঘঠিত হয়েছিল। যেটা পরে  ১৯২২ সালের পর থেকে – সোভিয়েত ইউনিয়ন – এই নয়া নামে ১৫টা আলাদা মোটা জাত-ভুখন্ডের এক সমাহার রাষ্ট্র হিশাবে তা পুণর্গঠিত হয়েছিল। এভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়তে গিয়ে তা ১৯৫০ এর দশক পর্যন্ত তাতে নয়া দেশ যুক্ত করা তখনও চালু ছিল। সবচেয়ে বড় কথা কবে থেকে কমিউনিস্টেরা আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে ট্যাগিং বা নাম দেওয়া বা নিচা দেখানি শুরু হয়েছিল এর হদিস খুব কম কমিউনিস্ট দিতে পারবে। তাদের বেশির ভাগেরই এনিয়ে ধারণাটা আবছা, তবে তারা সারকথায় বলবে হয়ত কমিউনিজমের জন্ম থেকে আমেরিকাকে “সাম্রাজ্যবা্দী” বলে কমিউনিস্টেরা ডাকে, যা একেবারেই ভুল। ফ্যাক্টস হল লেনিন সাম্রাজ্যবাদ নামে নয়া ধারণা আনতে বই লিখলেও ঐ বইয়ের ভিতরে অন্তত আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদ বলা হয় নাই। বরং ওখানে প্রসঙ্গ ছিল সেকালের জর্মানি। লেনিন ১৯১৭ অক্টোবরের রুশবিপ্লবের পরে বেঁচেছিলেন মাত্র আরো প্রায় ছয় বছর, ১৯২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। আর ওদিকে আমেরিকা ১৯৪৫ সালে মানে বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির আগে গোনায় ধরার মত কেউ কিছু ছিল না, মানে গ্লোবাল নেতা বলেও কিছু ছিল না। যখন সারা দুনিয়া ছিল কেবল ইউরোপ-কেন্দ্রিক কলোনি দখলদারদের হাতে বা নেতৃত্বে। কাজেই সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকার মধ্যে কোন বিশেষ বিরোধ-সংঘাত বা শত্রুতা কিছুই ছিল না।

    তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদি দেশ বলা শুরু করেছিল কবে থেকে? স্বভাবতই সেটা ১৯৪৫ সালের পরের পঞ্চাশের দশকে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, ১৯৫৩ সাল থেকে জব্বর ভাবে। ওদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে স্তালিন তো প্রেসিডেন্ট রুজভেন্টের ঘনিষ্ট বন্ধু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অ্যামেরিকান নেতা রুজভেল্টের ডানে-বায়ে থাকা আরো দুই ঘনিষ্ট দেশবন্ধুর একজন ছিলেন খোদ স্তালিন, আর তাতে অপরজন ছিলেন  বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল। এই তিন নেতা ১৯৪২ সালের পর থেকে একসাথেই বিভিন্ন দেশ নানান ইস্যুতে নেতৃত্ব দিতে ভ্রমণ করতেন। পরে ১৯৪৫ সালে রুজভেল্ট এর হঠাত স্বাভাবিক মৃত্যু হলে পরে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান যিনি রুজভেল্টের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন ও একই নীতি অনুসরণ করতেন। ফলে তাঁর সাথে স্তালিনের সম্পর্কও প্রায় একই ছিল – সো নো সাম্রাজ্যবাদ ট্যাগিং!
    পরের রিপাবলিকান আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে শপথ নিলে সোভিয়েতের সাথে আমেরিকান সম্পর্ক একেবারেই বদলে এনিমি হয়ে যায় যা যাওয়াই স্বাভাবিক ছিল। যেমন, সিআইএ দল পাঠিয়ে আইসেনহাওয়ার এর ইরানের সরকার বা রেজিম চেঞ্জ, যেটা ইরানে মোসাদ্দেক সরকারকে  উপড়ে ফেলা ও তেলের খনির দখল নেয়া এমনকি আবার ওদিকে, চীনের তিব্বতে নেহেরুর ভারতের সাহায্যে ভারতে সিআইএ ঘাটি করে একই কাজ করা এর আরেক উদাহরণ। এখান থেকেই দালাইলামাদের তিব্বত ত্যাগ, ভারতে আশ্রয় আর পরিণতিতে শাস্তি হিশাবে চীন কয়েকদিনের জন্য সারা আসাম দখলে রেখে দেয়া ঘটিয়েছিল যা ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ বলে বাইরে থেকে বিবেচিত।  ভারত-চীনের সম্পর্ক তিতা সেই থেকে আর যা এনিমি হয়ে যায়।

    অন্যদিকে মনে রাখতে হবে লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ ধারণা ও প্রসঙ্গ এর সাথে ১৯৫৩ সালের সোভিয়েত ইউনিয়নের আমেরিকাকে ট্যাগ লাগানো সাম্রাজ্যবাদ ধারণা – এদুটো ঠিক একই নয়।  মনে রাখতে হবে,  এমনিতেই রাষ্ট্র মাত্রই তা এক একান্ত স্বার্থ। এবং যা বাকি সব রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়ে আলাদা ও অপর [Other] গণ্য করা; এবং সবকিছুর উর্ধের নিজস্বার্থ – এক স্বার্থপর স্বার্থ। এবং এমন এক একান্ত স্বার্থ এটা যে অন্য কোন অপর রাষ্ট্রকে নিজ স্বার্থে অবলীলায় ব্যবহার করে ফেলতে পারে।  তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়ন যতই কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হোক না কেন অন্যান্য কমিউনিস্ট রাষ্ট্র বা বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টি  যতই সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে নিজেদের আদর্শগত মিল আর হরিহরাত্মা এক দেহ-বোধ দেখাক না কেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজ একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থের প্রশ্নে সে সবকিছুর উর্ধে এক নিরঙ্কুশ আত্মস্বার্থ দিয়েই পরিচালিত স্বার্থ। কাজেই আইসেনহাওয়ারের আমল থেকে আমেরিকা-সোভিয়েতের যে বৈরিতা তাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজের সেই একান্ত চোখেই দুনিয়ার সকল কমিউনিস্ট দেশ ও পার্টি আমেরিকাকে দেখুক সেটাই হবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি। আর এই পররাষ্ট্রনীতি,  আবার এর ভিতরে যদি আরেক কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র তার নিজস্বার্থের বেলায় তারও একান্ত স্বার্থ বের করে তাহলে?? তাতে অন্তত আমারও একান্ত স্বার্থ বইলা সেটা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে একটু আলাদা তো হতেই পারে। কিন্তু সেই ভিন্নতা কী সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি এলাও করবে বা শ্বাস নিতে দিবে???  তাই একই কমিউনিস্ট আদর্শের হওয়া সত্বেও দুই কমিউনিস্ট রাষ্ট্রস্বার্থের ভিন্নতার বিরোধ কমিউনিজমে কখনও রিসলভড বা সমাধা করা হয় নাই বা যায় নাই। মূল কারণ, দুই রাষ্ট্রের আদর্শ একই – এর মানে তাদের রাষ্টস্বার্থও এক  – এই অনুমান ভিত্তিহীন। মূলত দুই রাষ্ট্রস্বার্থ কখনও এক হতেই পারে না। এমন হওয়া মানে তারা তো এক-রাষ্ট্র হয়ে যেত!!!  তাই সাম্রাজ্যবাদ ট্যাগ কতটা কমিউনিস্ট  আদর্শগত ধারণা আর কতটা সোভিয়েত রাষ্ট্রস্বার্থের একান্ত পররাষ্ট্র নীতি তা ভেদজ্ঞানে আলাদা করতে জানতে হবে। একারণে ১৯৫৮ সালের মাওয়ের  চীনা সাংস্কৃতিক বিপ্লব এই নয়া ধারা  ডাকার কারণে পরে চীনও সোভিয়েত হামলার ভয়ে উলটা সোভিয়েত ইউনিয়নকে  সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ বলে ট্যাগ দিয়েছিল; যেটা পরে ১৯৯২ সালে  সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্র ভেঙ্গে যায় বলে এই ট্যাগিংয়ের সমাপ্তি ঘটে আর দরকার থাকে নাই।

    তাহলে একালে কে সাম্রাজ্যবাদ?
    কাকে কে, কেন সাম্রাজ্যবাদ বলবে সে ব্যাপারটা  নতুন করে পরিস্কার ঝালাই করে নিবার সময় এটা। যেমন ধরেন আজকের গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠতে শুরু করা চীন-কে সিপিবি বা কোন কমিউনিস্ট পার্টি কী আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদ ট্যাগে ডাকার মত চীনকেও সাম্রাজ্যবাদ বলে ডাকবে? কেন ডাকবে আর কেন ডাকবে না এর ব্যাখ্যা-বুঝ একালের বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের লাগবে। নয়া পক্ষে বা বিপক্ষে যে যেদিকেই থাক সে সাফাই লাগবে। কোল্ডওয়ার আমলের বুঝ ব্যাখ্যা ও বাস্তবতার রিভিউ ঢেলের সাজানো আগে করে নিতে হবে। এই বুঝাবুঝির আবার যোগ্য হতে হবে।  সত্তর-আশির দশকের মুখস্ত ধারণা দিয়ে চলবে না। সোভিয়েত ভেঙ্গে গড়া ১৫ দেশই এখন আইএমএফের সদস্য, বলা ভাল যে দুনিয়ায় কে এখন আর আইএমএফের সদস্য নয় তাই এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না। আবার আনরিয়েলিস্টিক [অবাস্তব] ও আইডিয়েল [আদর্শগত] ধারণা আঁকড়ে কথা বলার মানে হবে না। তাহলে আইএমএফ প্রতিষ্ঠানটা বুঝতে হবে আগে, বুঝাবুঝিতে ভুল কী ছিল  এর জানাবুঝা শুরু করতে হবে সেখান থেকে।   ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানটা জন্ম নেওয়ার সম্মেলনে তখন জীবিত স্তালিন; তিনি সেই জন্মসভায় সোভিয়েত প্রতিনিধিও পাঠিয়েছিলেন। যদিও পরে যখন চাঁদা পরিশোধ করে আইএমএফের সদস্যপদ নিবার কথা তখন যোগাযোগ ত্যাগ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু ঠিক কী কারণে? স্তালিনের বুঝ কী ছিল তা নিয়ে কোথাও তিনি কিছুই লেখেন নাই।  আজকের আধা-বুঝের কমিউনিস্টেরা অবশ্য মনে করেন তারা এই প্রতিষ্ঠানটা বুঝেন? যেন তারা স্টাডি করেছেন? অথচ তারা বলতেই পারবেন না যে কী ধরণের প্রতিষ্ঠান এটা, ম্যান্ডেট কী? যেমন তারা কী বলতে পারবেন – বাংলাদেশ যদি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্যপদ ত্যাগ করে তাহলে বাংলাদেশের  লাভ বা ক্ষতি কী কী হবে? বাংলাদেশ বা যেকোন দেশ আইএমএফ এর সদস্য না হয়ে অর্থনীতিতে টিকে থাকতে পারবে কিনা, এনিয়ে কমিউনিস্টদের বক্তব্য কী??
    ক্যাপিটালিজমকে কমিউনিস্টরা যদি পাপ মনে করে সেক্ষেত্রে এটা তো এক এথিক্যাল বিবেচনা মাত্র – সে বোধ কী  কমিউনিস্টদের আছে – যদিও তাদের এই বিচারে বাংলাদেশের বা সেই অর্থে দুনিয়ার সব মানুষই পাপী। এমনকি যেসব অর্থনীতির শিক্ষক ও কমিউনিস্ট  বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তারাও সমান পাপী। কারণ তারাও ক্যাপিটালিজমের বাংলাদেশ সরকার ও সমাজের থেকে বেতন নিচ্ছেন – তাদের  ভাত গলার নিচে যাওয়া এমন প্রতিটা ভাত – এর সবই ক্যাপিটালিজম পাপের ভাত। তাহলে পাপের বাইরে কে?

    “জনগণের শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত করলেই” এসব পাপের মুক্তি ঘটবে – এই অনুমানও এক স্বপ্ন-কল্পনা। কারণ এগুলাও আর বাস্তবে রিয়েলিজমে নাই।

     

    আরেক বিপদ কমিউনিস্টদের সার্বভৌমত্ব ধারণাঃ
    সবশেষের এক প্রসঙ্গ; বাংলাদেশে আরেক  বয়ান তৈরি করছেন  সিপিডি [CPD] এই প্রতিষ্ঠানের ডিস্টিঙ্গুইশুড ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। যা খুবই বিপদজনক ও এথিক্সের ভয় সৃষ্টিমূলক।
    সার্বভৌমত্ব বা সভরেনিটি [Sovereignty] নিয়ে এথিক্যাল বুঝকে রাজনীতি বানিয়েছে কমিউনিস্টেরা। আমাদের মত রাষ্ট্রগুলো কলোনিদখল মুক্ত স্বাধীন ফলে সার্বভৌম হয়ে গেল কেমনে আর তা থেকে একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডার বা জাতিসংঘ দুনিয়াতে কোথা থেকে হাজির হল যারা এর কিছুই জানে না – এরাই আবার কিছু হলেই দেশের সার্বভৌমত্বের বুঝ হাজির করবে। যেমন দাবি করবে বাংলাদেশে সার্বভৌম তাই বাংলাদেশ নিজ ইচ্ছায় এটা সেটা কত কী করতে পারে। মনে মনে ভাব নিবে প্রবোদ দিবে যে এসব প্রশ্ন তোলা বুদ্ধিমানেরা যেন আমেরিকাকে কত্তবড়ই না বিপদে ফেলতে পারছে!
    না ভাই সরি, আপনারা পারেন নাই। আসলে বাংলাদেশের মত দেশগুলো কী করে কী অর্থে সভরেন তা আপনি আজও জানেন না। মানে কী? মানে হল, এটা আমেরিকারই অবদান যে সে দুনিয়ার কোন রাষ্ট্রের অন্যদেশকে কলোনিদখল করে রাখা এই কাজটা অন্যায়, অবৈধ বলে – এই ভিত্তিতে এক জাতিসংঘ বানিয়েছিল – এটা অ্যামেরিকান আইডিয়া ও তাদের একক অবদান। এতে আমাদের মত দেশগুলো তাই ১৯৪৫ সালের পর থেকে কলোনিদখল মুক্ত স্বাধীন ও জাতিসংঘের সদস্যদেশ হয়েছে; তাই এই অর্থে সে সভরেনও। কলোনিদখল হারাম কাজ –  এটাই দুনিয়াতে প্রথম এক গ্লোবাল অর্ডার তৈরি করেছিল, আর তারই রায় এটা। যদিও এর আর অনেক কিছুই এখনও পূরণ হয় নাই, খামতিতে আছে অনেক; কথা সত্য কিন্তু দয়া করে এই অর্জন টুকুকে তুচ্ছজ্ঞান করেন না।  কারণ, সার্বভৌমত্ব এটা আসলে কী ও কতটুকু হয়েছে তা নিয়ে কমিউনিস্টেরা এখনও বেখবর।

    এখন আরো একটা কথা মনোযোগে শুনেন।
    এরপরেও যে  সার্বভৌমত্ব বা সভরেনিটির ধারণা যা তবুও আপনি শুনে ফেলেছেন তা কোথা থেকে  এলো বাংলাদেশ সভরেন দেশ বলে বিবেচিত হল তা না জানা সত্বেও –  একথা সত্য যে এই সার্বভৌম ধারণাটা আসলে এক আইডিয়াল [IDEAL] ধারণা। মানে তা রিয়েল [REAL] বা বাস্তবে দেখানো যাবে, এমন সত্য করে দেখানো যাবে – এমন ধারণা নয়।এটাই আইডিয়েল ধারণা। আর আইডিয়েল বলতে বুঝতে হবে – হওয়া উচিত – ধরণের ধারণা যেটা কাগজে বা খাতায় থাকা ধারণা মাত্র। সেকালে জন্ম নেয়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল অর্ডারটা অতটুকুই আপনাকে দিতে পেরেছে। এখন আপনি কতটুকু বাস্তবে সভরেন সেটা তো আপনার রাষ্ট্রকে  -হয়ে উঠে  মানে, মুরোদ অর্জন করে দেখিয়ে দিতে হবে।  অর্থাৎ আপনার রাষ্ট্রকে রিয়েলি [really] -ই সত্য করে দেখাতে হবে যে এটা সার্বভৌম। চীন বা ভারত যেমন আজকাল – রাশিয়াল তেল বুক ফুলিয়ে আমদানি করে দেখাচ্ছে, আমেরিকাকে অবজ্ঞা করছে। আমরা অবশ্যই তা পারি না। এমনকি  রুপপুরের রাশিয়ান প্রকল্পের পেমেন্ট রাশিয়াকে বাংলাদেশ ইউয়ানে শোধ করতে পারব কিনা তা নিয়েও আমেরিকারআপত্তি শোনা যাচ্ছে। এসব শুনতে বা আমাদের রাষ্ট্রকে আমল করতে হচ্ছেই। মানে হল রিয়েল সার্বভৌমত্ব বা মুরোদ দেখানোর মত সভরেনিটি হতে পারি নাই। কারণ, এটাও না-বুঝার কারণ নাই যে এসব জায়গায় – আমরা সভরেন দেশ – বলে বোকার মত বীরত্ব দেখাতে যাওয়ার মানে হয় না, অবশ্যই!

    কিন্তু দেবব্রত ভট্টাচার্য বিজ্ঞের মত বলেছেন,  “আইএমএফ ঋণ নেওয়ার মাধ্যমে আমরা অন্তত কিছু নীতি সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ করেছি। আমরা তাদের শর্তাবলি মেনে নিয়েছি”। আচ্ছা কারও ঋণ শর্ত মেনে নিয়ে ঋণ নিলেই তাহলে আমাদের সার্বভৌত্ব চলে যাবে, ঢিলা হয়ে যায়। তাহলে মানুষের ব্যক্তি বা ব্যবসার জন্য ব্যাংক ঋণ নিলেই ইজ্জতের মত আমাদের সার্বভৌমত্ব চলে যাবে! কেন?  আইএমএফ এর ঋণ নিলে সার্বভৌমত্ব চলে যাবে কেন?   আইএমএফ কী তাহলে কোন পাপী সংগঠন।  দেবব্রত কী জানেন খোদ আমেরিকান রাষ্ট্র মানে যেটাকে আমেরিকা রাষ্ট্রের নেয়া  সভরেন লোন বলে, সেটা ৩১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে [দেখুন, On December 16, 2021, lawmakers raised the debt limit by $2.5 trillion to a total of $31.4 trillion.1 ] ; এবছর আরো ঋণসীমা বাড়ায়ে  নিতে হবে? আবার ওদিকে জাপান নিজ রাষ্ট্রের সভরেণ লোন (দেশি-বিদেশি বাজার থেকে খোদ রাষ্ট্রের  নেয়া ঋণ এটাই সভরেন ঋণ)  হল তা ইতোমধ্যেই ঐদেশের বাৎসরিক জিডিপির ২০০% এর বেশি?  তাহলে এদুই দেশের সভরেনিটিও কী নাই ধরতে হবে?? আর যারা ঋণ দিয়েছে তারা আমেরিকা বা জাপানকে কী বিনাশর্তে এসব লোন দিয়েছে? তাই কী? দেবব্রত ভট্টাচার্য কী বলেন!!

    আবার,  আচ্ছা দেখেন; আইএমএফ কী  হাসিনার বাংলাদেশকে বাধ্য করেছিল যথেচ্ছারে রিজার্ভ খরচ করতে, ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ এর দেশ হতে, ডলারে সম্পদ পাচার করতে – রিজার্ভ ভেঙ্গে সঙ্কটে পড়তে? এমনকি শেষে আইএমএফের কাছে ঋণ চাইতেও কী আইএমএফ আমাদের সরকারকে বাধ্য করেছিল? এমন তো কোন সরকারি বা খাতক ভাষ্য জানা যায় না। তাহলে রিজার্ভ খুইয়ে আইএমএফের কাছে ঋণ চাইতে গেলে সেটা আইএমএফেরই দায় ও দোষ জ্ঞান করে কমিউনিস্টেরা কেন?  নিজেই দেশকে বিপদে ফেলে এরপরে নিজেই আইএমএফের কাছে আমাদের শাসকেরা যায় কেন, এমন তো কোন বাধ্যবাধকতা নাই! কিন্তু কমিউনিস্টেরা এমন প্রপাগান্ডায় বিশাল জ্ঞানী সাজতে চায় কেন???
    সাধারণ ফেনোমেনা হল, যেখান থেকেই কোন লোন নেন না কেন, তা আপন ভাই হলেও – সেই ভাইয়েরও কিছু সুবিধা-অসুবিধা বা স্বার্থ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। যেমন কবের মধ্যে ভাইয়ের থেকে নেয়া ঋণের অর্থ ফেরত দিতে হবে অন্তত এমন কথা তো থাকবেই। এখন এমন শর্ত দিলে কী সেটা নিজ ভাইয়ের কাছে আমার সারর্ভৌমত্ব চলে যাবে? কেন এই আজিব ভাবনা?
    তাহলে “শর্তাবলি মেনে নিয়েছি” একারণে, “আইএমএফ এর কাছে কিছু নীতি সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ” – মনে করছেন কেন দেবব্রত?? এত পাপবোধের অতিশুদ্ধতা কেন? অতিভক্তি কেন? রাজনীতিতে পাপপুণ্যের ধারণা মানে এই এথিক্স রাজনীতিতে নাই। তবে ধর্মতত্বে আছে। দেশীয়  কমিউনিস্ট কাছে ক্যাপিটালিজম বা সেই সুত্রে আইএমএফ এর ধারণা একেবারেই এমন ভুতুড়ে ধারণা! এর চেয়েও তা পাপ আর ছুয়াছুয়িতে শুদ্ধ-অশুদ্ধতার ধারণায় ভরপুর। এজন্যই তাদের কাছে  আইএমএফ ঋণ   মানে যেন শুদ্ধতা খুইয়ে আত্মসমর্পণ করা!  কমিউনিস্ট  মস্কোর পিএইচডি হলে কী এমন ভেট দেয়া বয়ান দিতেই হয়?  মা কালীর ভোগ চড়ানোর মত!!!

    আচ্ছা গত ওয়ান ইলেভেনের সময় ভারতের নর্থ-ইস্টকে সব ধরণের করিভোর দিয়ে দেওয়ার পক্ষে সিপিডি আদাজল খেয়ে লাগা ততপরতা দেখেছিলাম আমরা; সেটা কী বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য করা হয়েছিল??  এমনকি যারা সিপিডির বিরোধিতা করবে তারা মুর্খ অশিক্ষিত বলতেও সিপিডির মালিক মহাজনদের সেসময় মুখে আটকায় নাই। আর ভারতকে করিডোর দিলে এর আয়ে নাকি আমরা সিঙ্গাপুর হয়ে যাবার কথা কারা বলেছিল?  এসব গুলো কী ছিল? ভারত-স্বার্থের পক্ষে ওপেন  দালালি নাকি সার্বভৌমত্ব রক্ষার উদাহরণ?   এগুলো কী আমাদের “অন্তত কিছু নীতি সার্বভৌমত্বের ধরে রাখার” কাজ? কোন ধরণের “আত্মসমর্পণ না করার” উদাহরণ এগুলো?? বাহরে নন্দলাল…!! মারহাবা!

    সর্বশেষ এডিটঃ সকাল ০৯ঃ৫৭, ৩মে ২০২৩
    ____
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

  • ডলার-স্যাংশনের সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে জেনেট ইয়েলেন 

    ডলার-স্যাংশনের সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে জেনেট ইয়েলেন
    গৌতম দাস

    ২৮ এপ্রিল ২০২৩      ০০ঃ ০১
    https://wp.me/p1sCvy-4nV

     

          What Janet Yellen Can Do……..

    ঠিক দুদিন আগে গ্লোবাল নেতৃত্ব ও বিদেশি পুঁজি প্রসঙ্গে – এই শিরোনামে  একটা লেখা দিয়েছিলাম। অর্থাৎ এর ঠিক আগের লেখা ছিল সেটা।  আজকের প্রসঙ্গ সেই লেখাটার উপর দাঁড়িয়ে লিখবো। সেখানে আগের “গ্লোবাল নেতা” ধারণাটা আরো অনেক বেশি বিস্তারে ব্যবহার করব। একটা দেশে সবচেয়ে বড় রাজনীতি ও ক্ষমতা-কাঠামোর প্রতিষ্ঠান হল ঐ দেশের রাষ্ট্র মানে ওর রাষ্ট্র ব্যবস্থা। যেটাকে আমরা ওর State System বা Political Order & System বলে বুঝি। এখন এটাকে যদি লোকাল বা স্থাণীয় পর্যায়ের ঘটনা বলে বুঝি তবে ঠিক তেমনি দুনিয়াজুড়ে ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল অর্ডার ও সিস্টেম  বলে কিছু একটা আছে; যার মুখ্য পলিটিক্যাল প্রতিষ্ঠানটা হল জাতিসংঘ।  এটাই লোকাল রাষ্ট্রগুলোর বিপরীতে গ্লোবাল ইন্সটিটিউশন। আর যে রাষ্ট্র এমন গ্লোবাল ইন্সটিটিউশন-গুলোর উপর এর সকল সিদ্ধান্ত-ততপরতার উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ও আধিপত্য রাখে সেটাই গ্লোবাল নেতা-রাষ্ট্র বলতে পারি।
    এই সুযোগে এটাও বলে রাখি গ্লোবাল নেতা ধারণাটা সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করে ছড়িয়ে পড়েছে ১৯৪৫ সালের পরে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এই দুই অর্থেই গ্লোবাল নেতা ধারণাটা বিস্তার ঘটিয়ে দুনিয়ায় ছেয়ে বসেছিল আমেরিকাকে কেন্দ্র করে। মানে দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতা বলে ধারণাটা ১৯৪৫ সালের আগে তেমন বিস্তারিত কিছু ছিল না। যদিও ইউরোপের কলোনিদখলদার হিশাবে টপ পাঁচটা দেশ (বৃটিশ, ফ্রেঞ্চ, ডাচ, পর্তুগীজ ও স্পানিজ) এর মধ্যে বৃটিশেরা ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী, যাদের প্রধান অর্থনীতি বা ব্যবসা ছিল অন্যদেশকে কলোনিদখল করা – ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির মত কোম্পানি খুলে বা বিনিয়োগ করে কলোনিদখলে বেরিয়ে পড়া।  সেকালের ভাষায় এমন দখলদার শক্তিগুলোকে  ‘সাম্রাজ্য’ বলার চল ছিল। যেমন গর্ব করে সেকালে বলা হত – “বৃটিশ সাম্রাজ্যের সুর্য কোনদিন অস্ত যাবে না, ঢুববে না”। এমন গর্বে ফেটে পড়া বাক্য থেকে অনেক কিছু বুঝা যায়। যদিও কোম্পানি-সাম্রাজ্যের এই দুনিয়া টিকে থাকতে পারে নাই, ১৯৪৫ সালের মধ্যে সব শেষ হয়ে যায়।

    সংক্ষেপে বললে বিশ্বযুদ্ধে ১৯৪০ সালের জুনে হিটলারের জর্মানির হাতে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড ও লুক্সেমবার্গ দখল হয়ে যায়, পজর্মান সেনাবাহিনী নিজ প্রশাসন বসিয়ে এসব দখলি ভুখন্ডে শাসন শুরু করেছিল। এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা এজন্য যে সামরিক ও অর্থনৈতিক দখলদার শক্তি হিশাবে  ইউরোপের বৃটিশের পরেই ছিল ফ্রান্সের অবস্থান। সেই ফ্রান্সই হিটলারের জর্মানির দখলে চলে যাওয়া ছিল তাই তাতপর্যপুর্ণ ও ইঙ্গিতময়। আর তা দেখে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল নিজেদেরও একই ভবিষ্যত এঘটনার মধ্যে  দেখতে পেয়ে যায়। কারণ সাউদার্ণ ইংল্যান্ড আর নর্দার্ণ ফ্রান্স এদের মাঝে মানে এই দুই ভুখন্ড মাত্র এক ইংলিশ চ্যানেল দুরত্বে। কাজেই হিটলারের ইংল্যান্ডে আসতে আর কতক্ষণ – এই ছিল চার্চিলের মুখ্য ও চরম উদ্বিগ্নতা। এই চিন্তা করে চার্চিল সব ধরণের সাহায্য লাভে আশায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের দারস্থ হওয়া ছাড়া বাঁচবার উপায় দেখেন নাই। আর ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলেও রুজভেল্ট তখনও যুদ্ধে কোন পক্ষ না নিয়ে নিজেকে বাঁচিয়েই চলেছিলেন।  আর অপেক্ষা করছিলেন ইউরোপের মাথা গ্লোবাল নেতারা কবে সাহায্যের জন্য তার পায়ে পড়েন। সেবার চার্চিল কার্যত নিজ কলোনিসাম্রাজ্যের মালিক গর্ব বা সমস্ত ভ্যানিটি ভুলে নিজেকে লুটিয়ে সারেন্ডার করেছিলেন। আর তা থেকে সাহায্যদাতা আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল নেতা আর যুদ্ধে সকলের (নিজ মিত্রশক্তির)খরচদাতা হয়ে উঠেছিল। এটা ১৯৪১ সালের আগষ্টের সিদ্ধান্ত। চার্চিল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এরপর যুদ্ধে হিটলারকে হারাবার পরের নতুন দুনিয়াটা হবে কলোনিদখল-মুক্ত এক দুনিয়া।  এটাই হয়েছিল রুজভেল্টের আমেরিকা ও এর ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ ব্যবসায়ী প্রধান চাওয়া ও তা অর্জনের সাফল্য। স্বভাবতই এই সুফল আমরাও পরে নিয়েছিলাম। বৃটিশ-মুক্ত স্বাধীন হয়েছিলাম।  কিন্তু এর আগে রুজভেল্ট-চার্চিল চুক্তির পরে এর চারমাসের মাথায় ১৯৪২ জানুয়ারি এক জানুয়ারিতে, স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নও একই পথ অনুসরণ করে মানে, আমেরিকান নেতৃত্ব মেনে চুক্তিস্বাক্ষর করেছিল। কমিউনিস্টেরা এই ইতিহাস স্মরণ করতে চায় না; বরং না জেনে থাকতে চায়। তারা হিটলারের হাত থেকে সোভিয়েত দেশ বাঁচানো এক বীর হিশাবে স্তালিনের জয়গান দিয়ে বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের বয়ান সাজায়। অথচ আমেরিকার নেতৃত্বে মিত্রশক্তিতে স্তালিন যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল বলেই আর এতে, যুদ্ধের খরচ হিশাবে আমেরিকান অর্থসাহায্য  না পেলে বীর স্তালিনের সোভিয়েত দেশ বাঁচানো কি করে সম্ভব হত – সেদিকটা ভুলে চুপ থাকতে চায়।
    তবে  মোটামুটি ১৯৫০ সালের পর আর ১৯৫৩ সালের পরে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে যায়। সুনির্দিষ্ট করে স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বলা শুরু করেছিল; যেখান থেকে আমেরিকা-সোভিয়েত কোল্ডওয়ার [Cold War] এরও যাত্রা  শুরু মানা হয়। কারণও ছিল এই যে আমেরিকান রাজনীতিতে টানা ২০ বছর পরে ১৯৫৩ সালে এসে প্রথম কোন রিপাবলিকান আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট পদে উঠেছিলেন; তিনি হলেন আইসেনহাওয়ার, তাঁর বিজয় ঘটেছিল। আর তাতে এতদিনের আমেরিকার সে গ্লোবাল ইমেজ যে আমেরিকা  বিশ্বযুদ্ধে জিতিয়ে দুনিয়াকে গড়া নতুন রূপ দেয়া, জাতিসংঘ এর জন্ম দেয়া, আইওএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মত গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান গড়া যে ইতিবাচক উজ্জ্বল আমেরিকান ভুমিকা ছিল এর পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। কারণ আইসেনহাওয়ার আমেরিকা তখন এক নয়া আমেরিকা যে এক নয়া ফেনোমেনা চালু করেছিল – সিআইএ দল পাঠিয়ে রেজিম চেঞ্জ, দেশ দখল বা তেলের খনির মত সম্পদের দখল নেয়া ইত্যাদি বহু কিছু শুরু হয়েছিল, সে আরেক প্রসঙ্গ।

    কিন্তু এত পরিবর্তনের মাঝেও পরবর্তিতে কমিউনিস্ট চিন্তা ও ভুমিকা ততই  সব মিলিয়ে আরো পিছিয়ে পড়তে শুরু করেছিল। যেমন “গ্লোবাল নেতা” বা একটা নয়া “গ্লোবাল অর্ডার”  বলে দুনিয়ায় এতবড় পরিবর্তন নয়া গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম চালু হওয়াকে কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন আমল না করার পথে চলে যায়। অথচ নয়া দুনিয়ায় নয়া বিশ্বব্যাবস্থা যেটা তখন হাজির হয়েছিল যার ভিত্তি হল, কাউকে কলোনিদখল হারাম এটা মানতে আমেরিকার সারা ইউরোপকে লিখিতভাবে বাধ্য করা থেকে ইত্যাদি এসব দিক গ্লোবাল কমিউনিস্ট রাজনীতিতেই আর কখনও আমল হয় নাই। অথচ স্তালিনের নয়া ভাষ্যটা হল সেটা নাকি নয়া-উপনিবেশবাদি দুনিয়া। তাহলে ১৯৪২ সালের পয়লা জানুয়ারিতে স্তালিন কোন দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন??  যেটা জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা ১৯৪২ এর দলিল?

    এই প্রসঙ্গটা নানাভাবে বহুবার আমার লেখায় যুক্ত করেছি। কিন্তু খুব একটা প্রভাব পরেছে টের পাইনি। আগে খাড়া রেফারেন্স দিয়েছিলাম ইংরাজি ডকুমেন্ট থেকে। সম্প্রতি একটা বাংলায় করা পিডিএফ পেয়েছি। সেখান থেকে ওর সপ্তম পাতা থেকে নিচার অংশ তুলে এনেছি। আগ্রহিরা পুরা পিডিএফ ডকুমেন্ট এখানে পেতে পারেন। এটা সম্ভবত স্কুলের বাচ্চাদের জন্য বাংলায় করা।

    অথচ কমিউনিস্টেরা জানতেও পারে নাই বা জানতে চায় নাই যে কলোনিদখল ব্যবস্থার উতখাত ও নিষিদ্ধ এই ঘোষণা দিয়েই জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা, যার মধ্যে স্তালিনও একজন স্বাক্ষরকারি।
    এভাবে কমিউনিস্টেরা কখনই জানতেই পারে নাই, চায় নাই যে  গ্লোবাল নেতা বা গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম চালু ফেনোমেনাগুলো আসলে কী? অথচ আজ দুনিয়া ১৯৪৫ সালের পরে আমেরিকান নেতৃত্বে ৭৮ বছর পার করছে আর সবচেয়ে বড় কথা এটা এখন সেই গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল আসন্ন এর সময়। কমিউনিস্টেরা এখানে এনিয়ে এখনও বেখবর। খাড়া বলতে গেলে, কমিউনিস্টেরা আসলে  এরপর থেকে বিশেষত চলতি শতকের দুনিয়ার ঘটনা-ফেনোমেনা গুলোকে ব্যাখ্যা করতে পারছে না। পিছিয়ে অযোগ্য হয়ে গেছে। যার মূল কারণ, ১৯১৬ সালের পরে কমিউনিস্ট চিন্তায় আর কোন আপডেট বা কোন ব্যবহারিক ভাষ্য আর নাই, আসে নাই।

    তবে এখানে আরেকটা কথা বলে রাখি, ১৯৪৫ সালের আগের যতটুকু গ্লোবাল নেতার ধারণা ছিল সে ধারণা মতে গ্লোবাল নেতা সেটা মূলত সামরিক শক্তি গত ধারণা বলেই বুঝা হত। বিপরীতে  ১৯৪৫ সালের পরে একালের গ্লোবাল নেতা বলতে আরও অনেক দিকে ধারণাটা ছড়িয়েছে। যেমন এর একটা বড় অনুষঙ্গ অংশ বা দিক হল গ্লোবাল কমিউনিটিতে দান বা লিল্লাহ। জাতিসংঘের দিক থেকেই যদি বলি মূল জাতিসংঘের অধীনে আরেক এজেন্সি প্রতিষ্ঠান হল ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম [WFP] বা বাংলায়, বিশ্ব খাদ্য  কর্মসুচি। এটাই হল দুনিয়ার ভুখা মানুষকে দানের খাদ্য পৌছে দেওয়া। আমাদের যুদ্ধের পরে ১৯৭২-৭৩ সালে আমরা এই WFP এর ভরসাতেই বেচে গেছিলাম। ১৯৭৪ সালে আর পারি নাই, সে আরেক কাহিনী, তা পরে কখনও।  গুলশান ধরণের জায়গা বাদে ঢাকার বাকি এলাকায় কমিউনিটি বা মহল্লা সেন্স কাজ করে প্রবল্ভাবে। দেখা যাবে মহল্লার কোন মুরুব্বি প্রায়ই ডেকচি বসিয়েছেন – খিচুরি-বিরিয়ানি কিছু একটা রান্না করে গরীব বস্তিতে বিলাচ্ছেন। WFP এই অর্থে লিল্লাহ সংগঠন যেন। এখন WFP এর সাথে গ্লোবাল নেতার কী সম্পর্ক? WFP-কে বড় চাঁদাটা দেয় কে? কেউ গ্লোবাল নেতা হতে চাইলে সবচেয়ে বড় চাঁদাদাতা হতেই হয়। এমনকি সরকারি অর্থের ঘাটতি থাকলে রাষ্ট্রীয় ঋণ করে হলেও গ্লোবাল নেতাকে WFP-কে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারতে হয়। গতবছর আফগানিস্তানে খাদ্য সংকট হয়েছিল চরমে। জাতিসংঘ নয়া সরকারকে এখনও স্বীকৃতি না দিলেও খাদ্য সাহায্য যোগাড় করে দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্পণ্য করে নাই। সারকথায় মানবিক সাহায্যের এক সেফটি নেট এক নয়া প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ১৯৪৫ সালের এই দুনিয়া হাজির এবং তা খুবই সুসংগঠিত এক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম হিশাবে তা স্বীকৃত।

     

    সরাসরি ব্যবহারিক বাস্তবতায়, বাইডেনের আমেরিকাঃ
    বাইডেন ২০২১ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন মূলত একথা বলে যে গ্লোবাল নেতা হিশাবে আমেরিকার এখনও কতসব হাতিয়ার বা টুলস আছে যা অন্য বিশেষ করে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টেরা কখনও এক্সপ্লোর বা হাতড়ে খুজে দেখেনই নাই।  এগুলো ব্যবহার করে আমেরিকা এখনও চীনকে ছাড়িয়ে গ্লোবাল শীর্ষনেতা থেকে যেতে পারে। তাই তাঁর ক্ষমতামলের বৈশিষ্টই হবে আমেরিকার সেসব পড়ে থাকা মারাত্মক হাতিয়ার প্রয়োগে আনতে হবে।  যেমন, তিনি এমন দুটা হাতিয়ার এর কথা বললেন – শত্রু বা বেয়াড়া দেশের বিরুদ্ধ্বে মানবাধিকার লঙ্ঘণের অভিযোগ এনে তাকে পর্যদুস্ত করে ফেলা। এমনি আরেকটা অস্ত্র হল অবরোধ বা স্যাংশন [Sanction] আরোপ করা।

    চলতি প্রেসিডেন্ট বাইডেন ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। তিনি তাই তাঁর পুর্বসুরি ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান আর তিনি ডেমোক্রাট, আর নিজে ডেমোক্রাটে বলে তারা আতেঁল ও বুদ্ধিমান, বুদ্ধির চর্চা করে চলে থাকেন এটা রিপাবলিকানদের উপর ডেমোক্রাটদের চিরাচরিত উচা ও গর্বের ধারণা! তাই ‘বোকা’ ট্রাম্পের উপর তাদের বুদ্ধির ছটা দেখাতেই যেন তিনি যে নীতি-পলিসি নিয়ে সামনে এসেছিলেন তা হল এরকম যে, আমেরিকা কেন চীনের কাছে হারবে যেখানে আমেরিকার এখনও অঢেল বাড়তি সুবিধার হোল্ডার! বাইডেন যেন বলতে চান যে বোকা ট্রাম্পের মত লোকেরা ঝটাপট প্রেসিডেন্ট হয়ে গেছে – তাই চীনের উপর আমেরিকার হাতে থাকা বাড়তি সুবিধাগুলো কী কী তা এদের ‘জানাই নাই’! আর এসব বাড়তি সুবিধার দুটা বাইডেন বের করে দাবি করলেন যে তিনি এমন দুইটা কে তাঁর নীতি-পলিসি করে হাজির করছেন। যা অন্যদের বা শত্রুদেশকে বিপদে ফেলতে সক্ষম আর তা থেকে তাদেরকে আমেরিকার হাতে একধরণের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তেমনই এক মোক্ষম অস্ত্র হল তাদের ‘হিউম্যান রাইট’ ভায়োলেশনের প্রশ্ন তুলে তাদেরকে বেকায়দায় ফেলা। অন্যভাষায় বললে, এজন্যই বাইডেন-ব্লিঙ্কেন ঘোষণা দিয়েছিলেন যে ‘হিউম্যান রাইট’ কমপ্লায়েন্সের প্রশ্ন তোলা তাঁদের বৈদেশিক নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

    বিগত ভারত-আমেরিকার স্ট্রাটেজিক জোটঃ
    বিগত বাইশ বছর ধরে মানে চলতি শতকের শুরু থেকে  ভারত-আমেরিকার স্ট্রাটেজিক জোট বা ঐক্য যা আমরা এতদিন কাজ করতে দেখেছিলাম সেই প্রেসিডেন্ট বুশের আমলের শুরু থেকে, মনে হচ্ছে তা এই ২০২৩ সালে এসে এবার ক্ষান্ত দিতে চাইছে বা থেমেছে; যে স্ট্রাটেজিক ঐক্যজোটের অকার্যকারিতা বা স্তব্দ হয়ে যাওয়া এখন প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে না বললেও প্রায় সবটাই এখন কার্যত প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে। আগামি নির্বাচনে মোদি সরকার যেন জিতে আসতে না পারে সেকাজে বাইডেন কমবেশি প্রকাশ্যে উঠেপড়ে লেগে পড়েছে। অথচ গত বাইশ বছর ধরে এই চীন-ঠেকানোর ঐক্য বা চায়না কনটেইনমেন্ট [China Containment] এর ঐক্য যেন চিরকালের তাই অনেকের মনে হচ্ছিল। মোদি এখন ক্রমশ বাইডেনের ‘হিউম্যান রাইট’ অস্ত্রে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ছেন। বার্মায় রেজিম চেঞ্জ প্রশ্নে আলাদা স্বার্থ বা আলাদা রাস্তার দুই দেশ হয়ে উঠছে।

    বাইডেনের ব্যবহৃত আরেক অস্ত্রের নাম ‘ডলার অবরোধ’ অনেকে যেটাকে অনেক সময় “ইকোনমিক স্যাংশন”[Economic Sanction] আরোপ বলছেন.  এর সোজা মানে হল ডলারে কোন বাণিজ্য বা বেচাকেনা করা যাবে না অথবা আমেরিকান কোন ব্যাংকের সুইফট কোড ব্যবহার করা যাবে না আমেরিকান সরকারের নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে। আন্তর্জাতিক দুনিয়াজুড়ে যত বাণিজ্য বা পণ্য কেনাবেচা হয় এর সত্তরভাগের বেশি বাণিজ্য-লেনদেন হয় আমেরিকান ডলারে। অর্থাৎ পণ্যমুল্য ডলার এই মুদ্রায় লিখে ইনভয়েস তৈরি করা হয়। আর সেকারণে এই লেনদেন সম্পন্ন হতে হলে প্রক্রিয়ার মাঝে কোথাও কোন আমেরিকান ব্যাংকের সংশ্লিষ্টতা বা সাহায্য লাগবেই। আর এখানেই আমেরিকান স্যাংশন মানে আপনি (যেমন তেল-বিক্রেতা রাশিয়া হলে) আমেরিকার ব্যাংকের সুবিধা ব্যবহারে অযোগ্য।

    এখন এটা হল দুইধারী তলোয়ারের মত। কারণ, এটা ঠিক যে কোনদেশের উপর আমেরিকান ব্যাংক ব্যবহারের বিরুদ্ধে নিষধাজ্ঞা যেটা স্যাংশন নামে পরিচিত এবং তা আমেরিকান সরকারের পক্ষে বাস্তবায়নও সহজ। কারণ আমেরিকান বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এই নির্দেশ পাঠিয়ে তা বাস্তবায়ন করানো সম্ভব। আর নির্দেশ অমান্য করলে ব্যাংকগুলো দুই বিলিয়ন ডলার ফাইন করারও উদাহরণ আছে। ইরানের উপর নিষধাজ্ঞার বেলায় হংকং ব্যাংকের উপর এমন দু বিলিয়ন ডলার ফাইন করা হয়েছিল। কিন্তু দিনকে দিন এই ইচ্ছামত ডলার অবরোধ অপব্যবহার আমেরিকার বিরুদ্ধে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। যেমঞ্চীনের সাথে বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যও এখন উঠতি ট্রেন্ড। মানে আসলে বলতে চাচ্ছি ডলারের পাশাপাশি চীনা ইউয়ানেও বাণিজ্য বাড়ছে। অর্থাৎ যত বেশি ডলার ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে ততই এথেকে ছুটকারা পেতে প্রচেষ্টাও প্রবল হবে। আর এতে এখন গ্লোবাল মোট বাণিজ্যিক লেনদেন তা ডলারে লেনদেন এর ৭০-৯০% ডলারে  হয়ে থাকে। তা একবার ৭০% এর কাছাকাছি হতে শুরু করলে এই ঝোঁক স্থায়ী হতে চাইবে। মানে অবরোধের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি বিপুরীতে কাজ করবে।
    একথাটা যেকোন ভাবেই হোক মিডিয়ার সামনে এসে গেছে। আমেরিকান অর্থ-ট্রেজারি মন্ত্রী হলেন জেনেট ইয়েলেন [Janet Yellen]। সিএনএন এর ফরিদ জাকারিয়ার সাথে এক আলাপ তিনি মন্তব্য করে বসেন যে অপর দিকটা হল,  “আমরা যখন কোন দেশের বিরুদ্ধে স্যাংশন ব্যবহার করি যা ডলারের ভুমিকার সাথে সম্পর্কিত – এতে এমন রিস্কও থেকে যায় যাতে তা ক্রমশ ডলারের আধিপত্য ক্ষুন্ন করে ফেলতে পারে”।  তিনি আরও বলেন, “এভাবে ডলার অবরোধের যথেচ্ছ ব্যবহার  এটা অবশ্যই চীন, রাশিয়া বা ধরেন ইরাণকে ডলারের বিকল্প খাড়া করার জন্য প্রবল আকাঙ্খার জন্ম দেয়”।  অর্থাৎ আমেরিকাও রিস্কের পথে হাটছে তা জেনেট স্বীকার করে নিয়ে বলেই ফেলেছেন ।

    “There is a risk when we use financial sanctions that are linked to the role of the dollar that over time it could undermine the hegemony of the dollar,” “Of course, it does create a desire on the part of China, of Russia, of Iran to find an alternative,” 

    আরো কিছু প্রতিক্রিয়াঃ
    এদিকে এখনকার পাকিস্তান খুব ভাল উদাহরণ হয়ে উঠেছে। আগের ইমরান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ব্যাপারে ডোনাল্ড লু এর ভুমিকা নিয়ে অনেক কথা উঠেছিল। সেটা যাই হোক, তাতে ইমরানের ক্ষমতাচ্যুতি এড়ানো যায় নাই। পরিবর্তে শাহবাজ শরীফ ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু ক্ষমতা পেলেও  সরকার চালাতে গেলে খারাপ অর্থনৈতিক দুর্দশায় পড়া পাকিস্তানের প্রয়োজনীয় ডলারের ব্যবস্থা যদি আমেরিকা না করে দিতে পারে; নিদেনপক্ষে বিশ্বব্যাংককে দিয়েও যদি আমেরিকা ব্যবস্থা এরেঞ্জমেন্ট না করে দিতে পারে তবে আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্ব ক্রমশ প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে যাবে। পাকিস্তানের নিয়মিত অর্থসংকট এমন ইঙ্গিত দেয়। আবার এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে যদি চীনের কাছ থেকে নিয়মিত লোন দেরিতে পরিশোধে ছাড় রোল আউট[Roll Out] বা নয়া ঋণ চাইতে হয় তবে এটা তা আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের জন্য ভাল সংবাদ নয়।  মানে ইমরানও তার আমলে ক্ষমতা ছাড়ার দুমাস আগে এমন রোল আউট নিয়েছিলেন।

    আবার রয়টার্সের এক নিউজ যা প্রথম আলো অনুবাদ করে ছেপেছে ওর শিরোনাম হল, রাশিয়ার তেলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় ক্ষতিতে ইউরোপ, লাভ তুলছে এশিয়া। মানে হল ডলার অবরোধ কাজ করছে না। আর শুধু আমেরিকা না বলে পশ্চিমা অবরোধ মানে হল এখানে আমেরিকার মত করেই ইইউ জোটেরও আলাদা অবরোধ দেয়া আছে। এমনকি এশিয়ার জাপান বা অষ্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশেরও একই অবরোধ দেয়া ছিল।

    অন্যদিকে, জ্বালানি তেল প্রসঙ্গে আরো দুর্দশার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। যেমন, আমেরিকা রাশিয়ার উপর তার তেল বিক্রির লেনদেনে ডলারে করার উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।  এতে ভারত হয়ে উঠেছে রাশিয়ান ক্রুড ওয়েল আমদানি করে পরে নিজে রিফাইন করে তা পুণ-রফতানীর প্রধান দেশ বা  রাশিয়ান তেল রপ্তানির সেকেন্ডারি উৎস দেশ।  অথচ আমেরিকা এতে বাধা দিতে পারছে না। বা অন্তত দিচ্ছে না তাই আমরা দেখছি যার অন্তত একটা বড় কারণ হল অর্থনৈতিক লেনদেন ডলারে হচ্ছে না। এতে ফলাফলে রাশিয়ার উপর অবরোধ কার্যত এখানে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। সর্বশেষ অবস্থা হল এতে বিপদ ক্রমশ আরো বাড়ছে। কারণ পাকিস্তানের কথাই যদি ধরি,  ইতোমধ্যে এবার পাকিস্তানও দুই চালান এমন রাশিয়ান অশোধিত তেল যা ভারত শোধন করে রপ্তানি করছে তা ভারত থেকেই আমদানি করে ফেলেছে পাকিস্তান।  শুধু তাই না, এবার সরাসরি রাশিয়া থেকেই (তবে অশোধিত) রাশিয়ান তেল আমদানি করে ফেলেছে পাকিস্তান, পরে নিজ রিফাইনারিতে শোধন করে ব্যবহার করবে বলে। আর এতে কোন মুদ্রায় তা আমদানি করেছে তা মিডিয়ায় পাকিস্তানের মন্ত্রী অপ্রকাশ্য রেখেছেন। অর্থাৎ ধরে নিতে পারি তা ডলারে অবশ্যই নয় এবং সম্ভবত তা ইউয়ানে।
    এতে নিট ফলাফলে, রাশিয়ার উপর আমেরিকান অবরোধের পরিণতি যা দেখা গেল তা নিঃসন্দেহে বিব্রতকর!  মানে হল একদিকে, আমেরিকা নিজ সমর্থনের শাহবাজ সরকার যে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল বিদেশি মুদ্রার অভাবে মারাত্মক ভুগছে – এই বাস্তাতবতায় আমেরিকা শাহবাজ সরকার রাশিয়ান তেল যেন না কিনে তা করতে চাপ দিতে পারছে না। অপরদিকে চাপ দিতে না পারায় রাশিয়ার উপর আমেরিকান অবরোধ অকার্যকর হয়ে থাকছে। এভাবে আমেরিকার যদি সকল দেশকেই নানান অজুহাতে ছাড় দিতেই হয় তাহলে অবরোধ-শ্যাংশন কথাটা অর্থহীন!!  এসবই কী আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের সক্ষমতার বিরুদ্ধে ইঙ্গিত হয়ে উঠবে!!!  মানে হল শুধু রেজিম চেঞ্জ নয় সাথে নয়া সরকার চালানোতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থা করে দেওয়ার আমেরিকান সক্ষমতাতেও সে যেন শর্টেজে না থাকে তা,  একালে আমেরিকার গ্লোবাল ভুমিকার জন্য সমান গুরুত্বপুর্ণ  এসেনশিয়াল বলে হাজির হচ্ছে!!


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • গ্লোবাল নেতৃত্ব ও বিদেশি পুঁজি প্রসঙ্গে

    গ্লোবাল নেতৃত্ব ও বিদেশি পুঁজি প্রসঙ্গে
    গৌতম দাস
    ২৬ এপ্রিল ২০২৩    ০০ঃ০৫

    https://wp.me/p1sCvy-4nv

     

    US-China Split Could Hinder Foreign Investment, Lower Global GDP, IMF Warns - BloombergUS-China Split 

     

    গ্লোবাল নেতা মানে গ্লোবাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতা হিশাবে, দুনিয়ায় আমেরিকা প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে ১৯৪৫ সাল থেকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে এর পরিণতি বা ফলাফলে। যদিও অনেকের ধারণা এই অবস্থান যেন অফুরান বা অনন্তকাল ধরে চলবে। কিন্তু যার শুরু কিভাবে, কবে ও কী পরিস্থিতিতে আর যদি তা তা জানা-বুঝা যায় সেক্ষেত্রে তার শেষও আমাদের জানা থাকবে ও যাবে। এর মানে তাহলে বুঝতে হবে যে  সেটা আসলে আর অনন্তকালের কোন ঘটনা-ফেনোমেনা নয়। এছাড়া অনেকের আরও একটা ভুল ধারণা করেন যে গ্লোবাল নেতা ধারণাটা যেন সামরিক শক্তির, মানে সামরিক দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের। ফলে যেন কোন দেশ  পরাশক্তির [Superpower] দিক দিয়ে কতবড়  এর দ্বারাই বোধহয় নির্ধারিত হয়েছে কে গ্লোবাল নেতা বা কে নেতা নয়। না, সরি; এই ধারণাটা একেবারেই ভিত্তিহীন। বরং এককথায় বললে, কোন দেশকে গ্লোবাল নেতা বলতে যে সক্ষমতা বা যোগ্যতা কথা বলা হয় এটা মৌলিকভাবে  মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতা। দুনিয়াতে একেকটা দেশ একেক সময়কালে নানান কারণে নিজ অর্থনীতিতে বাড়তি সঞ্চয়ে তা উদ্বৃতের (সারপ্লাস) পাহাড় হয়ে হাজির হতে দেখা যায়। এটাই ঐ দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বা স্ট্রাটেজিকসহ সব ধরণের সক্ষমতার আদি উৎস। অর্থাৎ মূলত অর্থনৈতিক সক্ষমতাটাই ঐদেশের বাকিসব সক্ষমতার উৎস হয়ে হাজির হয়।  আর উত্থিত অর্থনীতির দেশ তা থেকেই অন্যদেশ বা বাকি দুনিয়ার উপর (ইতি বা নেতি আধিপত্য) এবং প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হয়ে হাজির হয়। তাই অর্থনৈতিক বিপুল উত্থান থেকে  তা সবদিকে বিকশিত হয়ে উঠলে তা থেকেই ক্রমশ একটা দেশ গ্লোবাল নেতা হয়ে হাজির হয়ে উঠে।  তাই বটম লাইনটা হল, গ্লোবাল নেতা মানে আসলে প্রাথমিকভাবে অথবা ওর প্রাথমিক রূপ হল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠা। একারণে চীনের অর্থনীতি কবে আমেরিকার ছাড়িয়ে আরো বড় অর্থনীতি হয়ে উঠে আসছে সেদিকে দুনিয়ার অভিমুখ বুঝতে চাওয়া লোকেদের, এমন সব এনালিস্টেরা আগ্রহের ফোকাস।

    তবে সাবধান গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠার ফেনোমেনাটা সাবজেকটিভ বা কোন কর্তা-মানুষের সিদ্ধান্তমূলক নয়। বরং তুলনা করে বললে,  যেমন সাবজেকটিভের বিপরীত শব্দ হল অবজেকটিভ। সেদিক থেকে  বলা যায়  ‘বিপ্লব’ [Revolution] ধারণাটাই  সাবজেকটিভ বা কর্তাবাচক। সক্রিয় মানুষ চাইলে বা করার চেষ্টা করলে তবেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে বা ঘটতে পারে; নইলে নয়। বিপরীতে প্রাকৃতিকভাবে কোন ‘বিপ্লব’ ঘটে না অথবা বলা যায় যা প্রাকৃতিক বা নেচারাল তা বিপ্লবী ঘটনা নয়। প্রাকৃতিকভাবেও অবশ্যই দুনিয়াতে হাজারো পরিবর্তন ঘটে থাকে এখনও ঘটে চলেছে তবে সেগুলো বিপ্লব বা বৈপ্লবিক ঘটনাবলী নয়, মনে করা হয় না। তাই প্রাকৃতিক মানে অবজেকটিভ।  আর প্রাকৃতিক পরিবর্তনকে ইংরাজিতে তাই বলে ইভোলিউশন [Evolution]। মানে সেটা রি-ইভোলিউশন [Re-evolution বা Revolution (বিপ্লব)] জাতীয় কিছু  নয়। এই পরিবর্তনগুলোকে তাই ‘অবজেকটিভ’ ঘটনা বলা হয়। এখানে কোন কর্তা থাকেনা, এটা প্রাকৃতিক।
    অর্থাৎ আমাদের এখানকার আলোচনার প্রেক্ষিতে তাই, কোনদেশের গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠা তাই ঠিক কোন সাবজেকটিভ ঘটনা নয়; যে তা  ঐ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের ইচ্ছাপ্রসুত এমন। বরং অবজেকটিভ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মত; মানে মানুষের ইচ্ছায় যেমন কোন জলোচ্ছাস বা ভুমিকম্প ইত্যাদি দুর্যোগ আসে না, তেমনই।

    আবার অনেককে আরেক মিথ্যা অনুমান পুষে নিয়ে থাকতে দেখা যায় যে বড় জনসংখ্যার দেশ হলেই যেনবা সে দেশ গ্লোবাল নেতা হবেই; এমন মনে করে থাকে। এমন ধারণা ভুল। তাদেরকে বরং মনে রাখতে হবে আমেরিকার জনসংখ্যা কখনও চীন বা ভারতের মত ১৪০ কোটির আশেপাশেও ছিল না, এখনও নয়। আমেরিকা এখনও কেবল আমাদের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ জনসংখ্যার, যা প্রায় ৩৩ কোটি মাত্র।  আর এই জনসংখ্যা দিয়েই  আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল এবং এখনও আছে বা শেষ যুগ পাড় করছে বলা যায়। তবে গ্লোবাল নেতা বা বড় অর্থনীতির দেশ হতে গেলে জনসংখ্যার অধিক্য একটা পজিটিভ ফ্যাক্টর বা উপাদান অবশ্যই। তবু, সাবধান বড় জনসংখ্যা মানেই তা গ্লোবাল নেতা বা বড় অর্থনীতির দেশ; তা এমনটা নাও হতে পারে। নির্ভর করে নিজ ঐ বড় জনসংখ্যাকে উপযুক্ত পরিকল্পনা ও ম্যানেজ করে কাজে লাগিয়ে বড় অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে তারা কতটা সক্ষম আর কপালও ভাল কিনা – এর উপর। যেমন, ভারত ও চীনের জনসংখ্যায় প্রায় কাছাকাছি, এখন ভারত বরং একটু বেশি। কিন্তু ভারতের অর্থনীতি এখন ৩.২ ট্রিলিয়ন ডলারের যেখানে চী্না অর্থনীতি প্রায় ১৮ ট্রিলিয়নের আর আমেরিকা এখনও ২৩ ট্রিলিয়নের, মানে চীনের চেয়ে বড়। তবে এখনকার  আরেক অনুমান হল আগামি ২০৩০ সালের দিকে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে,  এনিয়ে হাতের কাছের ভোয়ার [VOA] এক রিপোর্ট  দেখে নেয়া যেতে পারে।
    এসব সত্বেও ভারত ব্যাপারটাকে নিজ উগ্র জাতিশ্রেষ্ঠত্বের [হিন্দুত্ববাদের] ধারণা দিয়ে দেখে থাকে। মনে করে সে চীনের চেয়ে কম কিসে, সেও চীনের সাথে এব্যাপারে সমতুলনীয়; এমন ধারণার প্রাবল্য অবশ্য ২০১৩-১৪ সালের ফেনোমেনা। বিশেষ করে উগ্র হিন্দুজাতিবাদ বা হিন্দুত্ববাদ শানিয়ে মোদি যখন ২০১৪ সালের পর থেকে নিজ-প্রচার শুরু করেছিল যে ভারত নাকি একটা ‘পরাশক্তি’ হয়ে গেছে!  এই ব্যাপারে অন্তত একটা ফ্যাক্টস বা ঘটনা মনে রাখলেই এর কারণ অনেকটাই বুঝা ও ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

    বিদেশি পুঁজি নিয়ে কমিউনিস্ট ও জাতিবাদি চিন্তায় বেশি-বুঝের মিথঃ
    এককথায়, বিদেশি পুঁজি নেয়া না-নেয়া প্রসঙ্গে ব্যবহারিক কমিউনিস্টেরা আসলে একেবারেই উগ্র জাতিবাদিদের অনুসারী।  যেমন বিদেশি পুঁজি নেওয়া বা দেশে আসতে দেয়া দেশের জন্য কী হারাম না হালাল? এনিয়ে উগ্র-জাতিবাদি একরোখা ধারণাটাই কমিউনিস্টদেরও ধারণা। এরা উভয়েই মনে করে বিদেশি বিনিয়োগ পুঁজি দেশে আসতে দেয়া হারাম, তাই তা দেশে আনাই যাবে না।  আর এপ্রসঙ্গে বাস্তবতার আমল-মুল্যায়নহীন জাতিবাদিদের একচেটিয়া হারাম ধারণাটাই আরও পোক্ত করেছে কমিউনিস্টেরা; তাদের ‘শোষণ’ ধারণা দিয়ে।

    যদিও এটা তো বলাই বাহুল্য আইডিয়ালি বললে যে বিদেশি পুঁজি এনে শিল্প-ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান গড়ার চেয়ে বরং নিজ দেশের বিনিয়োগ সক্ষমতায় এগুলো করা তো নিঃসন্দেহে ভাল; এনিয়ে কোন প্রশ্নই নাই। কিন্তু বাস্তবতা তো এখানে না অন্যখানে! মানে তর্কটা এখানে না।
    তাই আরেকটু আগিয়ে এর পক্ষে বলি। দুনিয়ার যেকোন দেশের অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজমে, যদি বাইরের হস্তক্ষেপ করতে না দেয়া যায় তবে, ঐদেশের অর্থনীতি বিকশিত হতে যত যা বিনিয়োগ লাগে তার সবটাই ঐ দেশীয় অর্থনীতি নিজেই আভ্যন্তরীণভাবে সংগ্রহ করতে পারবে, এবং তা সম্ভব; ইতিহাসে এটা প্রমাণিত সত্য। যেমন সারা ইউরোপে একেবারে শুরুর দিকে  মানে ১৬০০ সালের পর থেকে যখন তাদের কলোনি দখল ব্যবসা শুরু হয়েছিল এর আগের কালে, তাদেরকে কোন বাইরে থেকে পুঁজি বা সম্পদ লুটে  আনতে হয় নাই। নিজ অর্থনীতিতেই নিজ সঞ্চয় উদ্বৃত্ব ব্যবহার করেই নিজে বিকশিত হতে পেরেছিল; সম্ভব করেছিল। আমাদের মত দেশের যেমন বিনিয়োগ আনার জন্য “পশ্চিম আছে”,  সে তুলনায় সেকালে পশ্চিমের জন্য ১৬০০ সালের আগে তাদের জন্য কোন “পশ্চিম” বা বিনিয়োগদাতা বলে কেউ ছিল না।
    ১৬০০ সালের আগে-পরে বলে কথা টানছি এজন্য যে ১৬০৭ সালে ইউরোপ প্রথম কলোনিদখলে বেরিয়েছিল।   আর যাদেরকে কলোনিদখল করতে বেরিয়েছিল প্রথমে তারা এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকা মহাদেশ এর কোনটাই নয়।  সেটা ছিল উত্তর আমেরিকা যা এখন ইউএসএ বা আমেরিকা নামে পরিচিত। গত ১৬০৭ সালে প্রথম কলোনিদখল করা ভুখন্ড বা দেশ হল আজকের আমেরিকার ভার্জিনিয়া রাজ্য। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, ভার্জিনিয়া রাজ্যের জেমসটাউন [Jamestown, Virginia] সর্বপ্রথম কলোনিদখল হয়ে যায়।  যারা দখল করেছিল তাদেরকে বৃটিশ বা ইংলিশ সেটেলার বলা হয়েছে। এর রেফারেন্স দেখতে এখানে[Colonial America (1492-1763)] আমেরিকান সরকারি লাইব্রেরিতে যেতে পারেন। এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকাকে কলোনিদখল করা হয়েছিল এরও পরে নানা সময়ে।

    কিন্তু সর্বশেষ আমাদের মত এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকায় যারা ইউরোপের কলোনি হয়ে থেকেছিলাম পরের অন্তত টানা দুশ বছর তারা ১৯৪৫ সালের পরে স্বাধীন মুক্ত দেশ হয়ে গেলেও এরপরে আমাদের নিজ অর্থনীতির বেলায় একই ফর্মুলা কাজ করে নাই যে আমাদের অর্থনীতিও নিজ বিনিয়োগ পুঁজি বা অর্থনৈতিক উদ্বৃত দিয়ে নিজের অর্থনীতির বিনিয়োগ চাহিদা মিটাতে পারবই। তা হয় নাই আর এটা করবেও না। আমরা পুষ্টির অভাবে ভুগা শিশুর মত বিনিয়োগ পুঁজির অভাবে ভুগবোই। কারণ অন্তত টানা দুশ বছর ধরে লাগাতর ইউরোপের কলোনিদখলদারেরা আমাদের মত দেশের অর্থনীতিতে সেকালের আগে থেকে যাকিছু  সারপ্লাস জমা হয়েছে তা উঠিয়ে দখলদারেরা নিজ নিজ দেশে লুট করে নিয়ে গেছিল। এতে তৈরি হওয়া গভীর স্থায়ী ক্ষত বা বিনিয়োগ পুঁজির ঘাটতি সেটা ১৯৪৫ সালের পরে আমরা স্বাধীন মুক্ত দেশ হলেও তা আপনাতেই নিজ নিজ অর্থনীতিতে পূরণীয় করা যায়নি কারণে এত অধিক লুট আর পূরণীয় নয়। বিশ্বযুদ্ধের পরে এই ছিল আমাদের জন্য সেই নয়া বাস্তবতা যে আমাদের বিনিয়োগ পুঁজি লুট হয়ে গেছে অথচ আমরা রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন অন্তত কাগজে কলমে ।

    অতএব ঐ খারাপ সময়ে  বিদেশি পুঁজি নেওয়া হারাম এই ফতোয়া যা এখনও তাদের মুখে বর্তমান, এসব কথা ছিল একেবারেই চরম অবিবেচক ও আত্মঘাতি। কার্যত এটা ছিল একদিকে চিন্তার মারাত্মক এক অক্ষমতা অন্যদিকে তা বাস্তবতাবিমুখ ভরপুর এক  বিশুদ্ধবাদিতা। ‘খাঁটি’ থাকতে চাওয়ার স্টুপিডিটি! যেন সাময়িক বিদেশি পুঁজি গ্রহণ করলে আমরা অশুদ্ধ হয়ে যাব!! আমাদের এদিকে এমন এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ ভারতের জওয়াহরলাল নেহেরুর চিন্তা ও তাঁর অর্থনীতি। তিনি মারা গেছিলেন ১৯৬৪ সালে। কিন্তু তার কমিউনিস্ট অরিয়েন্টেড ইকোনমির চিন্তা বিশেষত বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ প্রসঙ্গ এটা চালু থেকেই গেছিল ১৯৯০-৯১ সাল পর্যন্ত।   যেটা ১৯৯০ সালে এসে ঐ নেহেরু-ইজমের অর্থনীতি তা একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছিল।  সেকালে চন্দ্রশেখরের কোয়ালিশন সরকার অর্থের অভাবে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতিতে যা মূলত  balance of payments বা বৈদেশিক মুদ্রার আয় কম ও ব্যয় বেশিতে ঘাটতিতে পরা থেকে সৃষ্ট – এই কারণে তিনি বাজেট পেশ করতে ব্যার্থ হয়েছিলেন।  আর  balance of payments এর নিয়মিত ঘাটতি হলে একটাই এর ওষুধ, আইএমএফ-এর কাছে ঘাটতি পুরণে ঋণে বৈদেশিক মুদ্রা পেতে হাত পাতা। আর এর পুর্বশর্ত হচ্ছে এতদিনের আয়েসি আন্দাজি বিশুদ্ধবাদিতা ছেড়ে এবার বাস্তবতায় ফিরে আসতে অর্থনীতি ঢেলে সাজানোর সংস্কার করতে বাধ্য হওয়া।  ঠিক কী ঘটেছিল এনিয়ে আইএমএফ-এর একটা ভাষ্য এখানে অন্য আরও ভাষ্য এখানে পাওয়া যেতে পারে।  সে সময়ে সব ব্যর্থতায় দায়ভার চন্দ্রশেখরেরর উপর যদিও এসেছিল কিন্তু নেহেরুসহ সকল পুর্ব-সরকারগুলোই এজন্য দায়ী ছিল। চন্দ্রশেখর সে যাত্রায় পদত্যাগ করলে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের নভেম্বরে যা থেকে কংগ্রেসের নরসীমা রাও ক্ষমতায় আসেন। আর তাঁর নয়া অর্থমন্ত্রী হন  মনমোহন সিং, যিনি আইএমএফ-এর সাথে মিলে অর্থনৈতিক সংস্কারটা সম্পন্ন করেছিলেন।  তবে মনে রাখতে হবে এঘটনার সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের কোন সম্পর্ক নাই। মানে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার সমাজতন্ত্র ভেঙ্গে পড়ার সাথে (যা ভেঙ্গে গেছিল ১৯৯১ ডিসেম্বরে ) ভারতের এই অর্থনৈতিক পতন ও সংস্কারে বাধ্য হওয়ার কোন সম্পর্ক নাই।   কারণ ভারতে তা ঘটেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আগেই ১৯৯০ সালেই।

    ভারত ছেড়ে এবার বিদেশি পুঁজিতে চীন প্রসঙ্গেঃ
    কম কথায় সেরে ফেলতে এভাবে বলি, চীন ১৯৭৮ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদেশি বা আমেরিকান পুঁজি দেশে আসতে অনুমতি দান শুরু করেছিল। যদিও এর আগে ১৯৫৮ সাল থেকেই মাও সেতুং আর সোভিয়েত বা স্তালিনীয় পথ বা আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে বিদেশি পুঁজি গ্রহণ প্রসঙ্গে ভিন্ন পথ গ্রহণ করা শুরু করেছিলেন মাও। অফিসিয়াল ডকুমেন্টে যদিও এটা চীনের “সাংস্কৃতিক বিপ্লব, ১৯৫৮” বলে পরিচিত। এসব রাখডাক বা ভিন্ন শব্দে নাম দেয়া খুব সম্ভবত ছিল বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়ানোর জন্য। কারণ,  আদতে এটা ছিল চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম ও বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণের পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত।  আজকের দিনেও যারা কমিউনিস্ট সমালোচক তারা মাওকে তাদের হিরো বলে আপন করে রেখে দিয়েও সব দায় ও এর ভিলেন হিশাবে দেখাতে চায় দেং জিয়াও পিং-কে। তা যাক সে তর্ক অন্যখানে, করেছিও। এখানে যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল, মাও-এর অর্থনৈতিক সংস্কার,  কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম ও বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণের পথে যাত্রা ইত্যাদি এসব নিয়ে কমিউনিস্টেরাসহ যেকারও  স্তালিনীয় সমাজতন্ত্র বুঝের দিক থেকে যত সমালোচনাই থাক এক জায়গায় গিয়ে সেসবের সবকিছু বেকার হয়ে গিয়েছে। সেটা হল, চীন এই সংস্কারে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগ অনুমতি দিয়ে একে আপন করে নিয়েছে; মানে  নিজ অর্থনীতিতে আমেরিকার ওয়াল স্টিটের জন্য উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার করে দিয়েছে। শুধু তাই না পরে শুরুর দিকে এসব বিনিয়োগ চীন সুদসহ ফেরত দিয়ে দিয়েছে। তবে চীনা শিল্প-বাণিজ্যে বিদেশি বিনিয়োগে তারা এখন তাদের পার্টনার। আর এ সবকিছুই ঘটেছে উল্লেখযোগ্য কোন সংঘাত বা ফ্রিকশন ছাড়াই। সেটাও না মূল প্রসঙ্গ হচ্ছে চীন আজকে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় পাহাড়সম উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের অর্থনীতির দেশ – চীন নিজেই আজ গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হবার পথে। এদিকটার তাতপর্য সেটাও কোন দিক দিয়েই অস্বীকার করা যাচ্ছে না। কিন্তু সেই গ্রহিতা  চীন নিজেই এখন দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বড় অবকাঠামো উন্নয়নের ঋণদাতা প্রধান দেশ। বিশ্বব্যাংকের এখানে সারা বছরের ঋণদানের বাজেটের চেয়েও এক চীনের বাজেট অনেক বড়। সারকথায় চীন প্রমাণ করে দিয়েছে বিদেশি পুঁজি বা বিনিয়োগ নেয়া খারাপ কিছু নয়। বিদেশি পুঁজিতে বিকশিত হয়েও পরে গ্লোবাল নেতা হিশাবে উঠে আসা খুবই সম্ভব।

     সারকথায়, চীন প্রমাণ করে দিয়েছে বিদেশি পুঁজি বা বিনিয়োগ নেয়া খারাপ কিছু নয়। বিদেশি পুঁজিতে বিকশিত হয়েও পরে গ্লোবাল নেতা হিশাবে উঠে আসা খুবই সম্ভব। 

    চীন ১৯৭৮ সালেএর জানুয়ারি থেকে আমেরিকার সাথে  আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক স্বীকৃতি ও এমবেশি খোলা দিয়ে শুরু করেছিল।  পরে আমেরিকান বিনিয়োগের আসা বা প্রবেশ শুরু হয়েছিল। আর চীনের বড় অর্থনৈতিক উল্লফন ঘটেছিল (ডাবল ডিজিট জিডিপি) (১৯৯০-২০১০) মোটামুটি এই বিশবছরের সময়কালে।  তুলনায় ভারত ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিদেশি পুঁজি আসতে দেয়া হালাল কিনা তখনও সেই সিদ্ধান্তেই আসতে পারে নাই। তাই ১৯৯১ সালকে মানা হয় ভারতের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার বছর, যখন ভারত বৈদেশিক মুদ্রা আয়-ব্যয়ের ঘাটতিতে মিটাতে ব্যর্থ (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ঘাটতিতে) হয়ে আইএমএফের সাহায্য পেতে দ্বারস্ত হয়েছিল। ফলাফলে সেই প্রথম নেহেরু কথিত ও প্রচলিত কমিউনিস্ট ইকোনমি ১৯৯১ সালেই খোলনলচে বদলায় বাধ্য হয়ে মনমোহন সিং এর অর্থনৈতিক সংস্কারে ঢেলে সাজানো শুরু হয়েছিল – যা নিয়ে উপরে অনেক বলেছি।

    তবে এসব নিয়ে কথা বলাও বিপদের। আপনার কোন পছন্দের রাজনীতি বা আদর্শ থাকতেই পারে। কিন্তু সাবধান। বাস্তব ঘটনা পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে ও পেতে গিয়ে একাজে নিজ রাজনীতি-আদর্শকে শ্রেষ্ঠ মানতে হবে বা দেখাতেই হবে এই জিদ সবার আগে ত্যাগ করেন।  কারণ আপনি তখন আসলে তো বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে গেছেন, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা বা বুঝাবুঝি আপনার অস্তিত্বের মত জরুরি। আর এটাই প্রধান ও আপনার আসল কাজ। কাজেই আপনার পছন্দের রাজনীতি-আদর্শ দিয়েই কেবল তা পারতেই হবে এই জিদ ও চিন্তা ভুল। যেখানে আপনার দরকার বাস্তবতাকে বুঝবার জন্য একটা চিন্তা বা পদ্ধতিতে তা করতে সক্ষম হওয়া। যে চিন্তা বা পদ্ধতি এটা করতে সক্ষম তাই আপনাকে কাজে লাগাতে হবে, আপন করতে হবে। এরপরে বা বাইরে প্রেমিকার মত আপনার পছন্দ বা বিশেষ নেকের একটা রাজনীতি বা আদর্শ আছে থাক না। কাজ না পারলেও জোর করে  আপনার পছন্দের রাজনীতি-আদর্শ এর পক্ষে  ঢোল পিটানো তো সহি হতে পারে না! এরপর এবং সেই সাথে এবার কেন আপনার রাজনীতি-আদর্শ ঘটনা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের উপযুক্ত টুলস হতে পারে নাই সেটা খুজে বের করেন। সংশোধন করে নেন।
    অনেকবার বলেছি চলতি শতক শুরুই হচ্ছে গ্লোবাল নেতা বদলের পালাবদলের সময়কাল হিশাবে যেটা আমরা পছন্দ করি নাই। বরং ঘটনা-ফেনমেনাই আমাদেরকে এটা দেখতে বাধ্য করেছে। এখন এতে আমেরিকান প্রভাবের ক্রমপতন আর চীনের প্রবল উত্থান যদি বাস্তবতা হয় – অবজেকটিভ বাস্তবতা হয় তা হলে এনিয়ে আমার কথা বলা মানে তো এটা নয় যে আমি চীনের দালাল। অথবা আমি চীনকে পছন্দ করি তাই এটা করছি। অথবা চীন কমিউনিস্ট তাই চীন আমার পছন্দ এটা  ধরে নিতেই হবে!!! অথচ আমেরিকা কী করে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভুমিতে সেই ব্যাপক ইতিবাচক ব্যাখ্যা -বিশ্লেষণ আমার চেয়ে বেশি এবং ভাল করে কেউ করে নাই। একাজের সময় আমাকে কেউ আমেরিকান দালাল বলে না কেন?
    বাস্তবতা হল, নিজ পছন্দের আদর্শ দিয়ে ঘটনা না মিললেও জোর করে তেমন ব্যাখ্যা দেওয়াটা বোকামি; কারণ জরবরদস্তি পাঠক পছন্দ করবে কেন! কাজেই নিজ পছন্দের আদর্শের ভিত্তিতে কথা বলার দিন শেষ।  আর শেষ কথা হল আমি কোন কমিউনিস্টই নই। এছাড়া চীন    কমিউনিস্ট কিনা সেটাও কমিউনিস্টদের মধ্যেই অর্ক সাপেক্ষ, যা নিয়ে আমার মাথাব্যাথা নাই। গ্লোবাল পরিবর্তনগুলোকে কতটা উপযুক্তভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হচ্ছি সেটাই মুখ্য দিক!  সেদিকটা ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হচ্ছি কিনা সেটার পরীক্ষায় উতড়ানো বা সফলতাই একালের মাপকাঠি।

    এখানে আমাদের পাঠকের সমস্যা হল, তারাও সময়ে বিভ্রান্ত হয়ে সময়য়ে সোভিয়েত বনাম আমেরিকা এমন কোল্ডওয়ার এর তর্কের ফাদে আটকে যান। অথচ সেই কোল্ডওয়ার এর যুগ এখন অতীত, সেসব ভাবনা এখন অকেজো। তবুও কেউ কমিউনিস্ট না আমেরিকা-বাদী এমন কথিত একটা ধারণার আগে চালু করে পরে  পাঠক কোন মানুষ ও তার ব্যাখ্যাকে আমল করা শুরু করে থাকে। এটা খুবই ভুল পদ্ধতি।  আশা করব পাটঘক কমিউনিস্ট লুপ-হোল এগুলোর ব্যাপারে সচেতন হবে ও বাঁচিয়ে চলা শিখে যাবে!


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক 

    [উপরের এই লেখা আসলে দুদিনের মধ্যেই পরবর্তি যে লেখা দিব তার আগাম অংশ। তাই বুঝাই যাচ্ছে পরের লেখাটা চলতি এই রচনার উপরে দাড়িয়েই লেখা হবে। পরের রচনাকে তাই এলেখারই দ্বিতীয় অংশও বলা যেতে পারে।]

  • আইপিএস-এর অংশ হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ

    আইপিএস-এর অংশ হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ

    গৌতম দাস

    ২৬ জানুয়ারি ২০২৩

    https://wp.me/p1sCvy-4mg

     

     

    Fact Sheet: Indo-Pacific Strategy of the United States – U.S. Embassy in the Philippines

    বাইডেনের আমেরিকা সব তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। বেচারা হয়ে গেছে! তাঁর কোন নীতি-পলিসিই কাজের না, ফলে আনতে পারছে না। তাতে সেটা হোক ইউক্রেন ইস্যু অথবা বাংলাদেশের মত ছোটদেশের উপর আমেরিকান প্রভাবের ক্ষেত্রে; সব অকার্যকর। ফলে শেষে কেবল বকোয়াজ আর বোলচালে ভরপুর এক আড়াল তুলে দাঁড়িয়ে থাকছে তাঁর প্রশাসন। ব্যাপারটা হল কেবল ফাঁকা দাবি না,  ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুলনায় তিনি ভাল বিকল্প – সেটা নিজ আমেরিকান জনগণের কাছে তো  অন্তত প্রমাণ করতে হত; এখন এশিয়ায় বা বাংলাদেশের মত দেশের ক্ষেত্রেও তিনি নিজেকে  মূলত যেন এক ‘খামোখা’ বলেই পরিচিতি তুলে ধরছেন। বাংলাদেশের যারা হাসিনার শাসন এই ফ্যাসিজম থেকে মুক্ত হবার স্বপ্ন দেখছিলেন যেখানে আমেরিকার একটা ভুমিকা থাকার সম্ভাবনা দেখছিলেন অনেকে, তারাও সমুলে হতাশ হয়েছেন।

    যেমন ধরা যাক, বাইডেন তাঁর শাসনের শুরুতেই বলেছিলেন, ‘হিউম্যান রাইট’ বা মানবাধিকার নাকি তাঁর পররাষ্ট্রনীতির অঙ্গ। যারা পোড় খাওয়া ‘আমেরিকা অবজারভার’ তারা বিশ্বাস করেন নাই; কিন্তু এটাই পরিণতি তা দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি ছিলেন। যেমন বাইডেনের শাসনকে বলা যায় “স্যাংশনের রেজিম’ বলা যায়। যা কিছুই বাইডেনের অপছন্দের বা আমেরিকান স্বার্থের বিরোধী বলে তিনি মনে করেছেন তাতে সেখানেই তিনি যেন এক স্যাংশন আরোপের রাজা বনে গিয়ে অবিরাম সেসবের উপর স্যাংশন আরোপ করে গেছেন। এসবের মধ্যে কোথাও সত্যিই হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের ঘটনাবলীও মাখামাখি করে আছে, অবশ্যই। যেমন বাংলাদেশের গুম, খুন হত্যা, অপহরণ, গায়েব, ‘ক্রশফায়ারের’ নামে হত্যা ইত্যাদি যতধরণের অপরাধ আছে তা গত পনেরো বছরে ঘটে চলেছে। নিঃসন্দেহে এগুলো হিউম্যান রাইট চরম ভায়োলেশনের ঘটনা। যেসবের উপর আমেরিকা স্যাংশন আরোপ করেছে। আবার একই নিঃশ্বাসে যেমন, রাশিয়া তার জ্বালানি তেল বিদেশে বেচতে পারবে না – এজন্য সে একই স্যাংশনও যথেচ্ছাচারে আরোপ করে চলেছে। যা মানবাধিকারের ইস্যুওই নয়; বরং খাসা একান্তই আমেরিকান ব্যবসা-বাণিজ্যিক স্বার্থ বৈ আর কিছু না – এমনটাও আছে।

    ঠিক যেমনি বাংলাদেশে হাসিনা রেজিমের তার রাজনৈতিকবিরোধীদের নির্বিচার দমনকে জঙ্গীবাদ দমনের নামে চালিয়ে দেয়াতে –  এর বিরুদ্ধে হাসিনার র‍্যাবসহ নানা ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের উপর স্যাংশন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ইতিবাচক বলে দেখে বিশ্বাস করতে চেয়েছিল। কিন্তু না – পরিশেষে আমেরিকা সবকিছুকেই তার চীনবিরোধী বাণিজ্যিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থ বলে যে মনে করে সেকথা আর লুকায়ে রাখল না বা পারল না!

    এককথায় বললে, ঢাকার শাহীনবাগে গুন-খুনের ভিকটিমদের সাথে দেখা করতে রাষ্ট্রদুত পিটারহাস উপস্থিতের সাথে সাথে হাসিনা যে মৃদ্যু পরোক্ষ বাধার পালটা অবস্থান দেখিয়েছিল তাতেই আমেরিকার নিজের আগানোর পথ নিয়ে রিভিউ-এ বসেছিল। এই আদ্যোপ্রান্ত পর্যালোচনা থেকেই আমেরিকার পথ চলায় গিয়ার বদল! মানে যেটারই পরিণতি আমরা দেখলাম ডোনাল্ড ল্যু এর বাংলাদেশ সফর। আর সেখান থেকে বাইডেনের মতিগতির ল্যাংটা হয়ে পড়া! কেমন সেটা?
    সেটা হল ‘মানবাধিকার-স্যাংশন’ এসব বাইডেন প্রশাসনের কাছে কিছু না! তারা এসবের আসল ভক্ত না। সিনসিয়ার বা সিরিয়াস কোনটাই না! বকোয়াজ মাত্র!! বাইডেনের আসল স্বার্থ সারা দুনিয়ায় যেমন, তেমন এশিয়াতেও তার প্রতিযোগী ও প্রতিদ্বন্দ্বি নয়া উত্থিত হতে থাকা চীন; এই চীনবিরোধীতায় নিজ স্বার্থ উদ্ধার এটাই বাইডেনের মুখ্য নীতি-পলিসি। আর সেকাজ তার বাকি সব ততপরতা বিক্রিযোগ্য! যেমন এসময়ের এশিয়ায় বাইডেনের স্বার্থ সোজা  ভাষায় যা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি (আইপিএস) নামে পরিচিত।

    একালের “যেকোন জোট গঠনের” মুল সমস্যাঃ
    এই ফাঁকে বলে নেয়া যাক, এই আইপিএস (IPS) বা আগের কোয়াড (QUAD) গঠন – এদুইয়ের সম্পর্কই বা কী? প্রথম সমস্যা আমাদের মিডিয়া রিপোর্টার লেবেলেই ব্যাপারটা নিয়ে অস্পষ্টতা আছে। এর উপর আবার ইন্দো-প্যাসেফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক (IPEF) বলে আরেক ফেকড়া বা বাড়তি দিক (এক্সটেনশন) বা নয়া খাতা আছে।
    খুবই অল্প কথায় বললে, কোয়াড [QUAD] বা চারদেশীয় জোট (আমেরিকা, ভারত, জাপান ও অষ্ট্রেলিয়া)  যেটা ছিল তা কার্যত অকেজো। হাত লাগলেই ভেঙ্গে যাবে, সম্ভবত ভারত বেরিয়ে যাবে; এরকম! মূলত, একালের “যেকোন জোট গঠনের” মুল সমস্যাকে না বুঝা থেকে এই সমস্যা। আমেরিকা বরাবর এব্যাপারে ফেল করছে এজন্য যে তাদের মাথায় জোট বলতে সবসময় কোল্ডওয়ার কালের (১৯৫৩-৯১) সোভিয়েত (ব্লক) বনাম আমেরিকা (পশ্চিমা জোট) এর স্বপ্ন মাথায় ঘুরে থাকে। এই স্বপ্নকল্পনার কারণে আমেরিকার মনে ইচ্ছা করে আগের সোভিয়েতের মত যদি একালে চীনবিরোধী এক পশ্চিমাজোট (মূলত আমেরিকা ও ইইউ এর সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী জোট) গড়তে পারা যায়।
    অথচ এই স্বপ্নটা একেবারেই অবাস্তব, অথচ সেটা আমেরিকার ডেমোক্রাট বা রিপাবলিক দুদলের কোন প্রেসিডেন্ট যারা হয়ে আসছেন তাদের  নীতি-পলিসিতে এটা প্রতিফলিত নাই। কিন্তু কেন অবাস্তব বলছি? সেকথা বললেই বাকি সব কথা পরিস্কার হয়ে যাবে। যাকে সোভিয়েত ব্লক বলছি এদের মূল ও কমন পরিচয় এটা না যে তারা কমিউনিস্ট অর্থনীতির চক্করে আটকে থাকা দেশ ছিল তাই। তাদের মুল পরিচয় আসলে তারা কেউই আইএমএফের [IMF] সদস্য ছিল না; তবে সেটা দু’এক রাষ্ট্র হতে চেয়েও সদস্যপদ পায় নাই বলে, আর বাদ বাকিরা, বেশির ভাগই রাশিয়ার স্টালিনের  অবস্থানের কারণে নিজেরাও সদস্য হতেও চায় নাই, একারণে। কিন্তু সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রগুলো আইএমএফের সদস্য ছিল না তাতে কী?

    এর এককথায় উত্তর হল, আইএমএফের সদসদ্য নয় একথার ব্যবহারিক মানে হল এসব রাষ্ট্র অন্যকোন রাষ্ট্রের সাথে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্পর্কে যুক্ত হতে পারবে না বা পারত না। এই কারণে তখনকার মানে কোল্ডওয়ারের  [Cold War]আমলে যেকোন জোট মানে কার্যত তা সামরিক-স্ট্রাটেজি অথবা রাজনীতিক আদর্শ কেন্দ্রিক জোট হত।  এর চেয়েও বড় কথা সেকালের ‘জোট ধারণা’ একালের ‘জোট ধারণা’ একেবারেই এক নয়। মানে কী?

    মানে হল একালের জোটে যার সাথে সামরিক-স্ট্রাটেজিক অথবা এমনকি অর্থনৈতিক স্বার্থের গভীর বিরোধ আছে তারই সাথে আবার একালে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঘটে আছে। ফলে সামরিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থ গভীরবিরোধ থাকলেও তারই সাথে আবার গভীর বাণিজ্যিক লেনদেন ও পরস্পর গভীর নির্ভরতা তা শুধু সম্ভবই নয় একেবারে প্রধান বাস্তবতা। চীনের সাথে আমেরিকা, চীনের সাথে ভারত, চীনের সাথে জাপান, চীনের সাথে অষ্ট্রেলিয়া এমন প্রায় সকলের সাথেই চীনের যে  গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং এতে পণ্য-পুঁজির গভীরতম বিনিময় ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা – এটাই বাস্তবতা। এই নির্ভরশীলতার সম্পর্ক এতই প্রধান যে একই সাথে চীনবিরোধী কোন সামরিক-স্ট্রটেজিক বা রাজনৈতিক জোট গড়া তা প্রায় অসম্ভব হয়ে আছে; এতে হয়ত তা গড়া হয়েছে ঠিকই, কার্যত যা অকেজো! যেমন সর্বশেষটা হল, অষ্ট্রেলিয়া বা জাপান। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় স্কট মরিসনকে হারিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন অ্যান্থনি আলবানিজ। স্কট মরিসনের দল লিবারেল পার্টি। আর নয়া প্রধানমন্ত্রী হলেন লেবার পার্টির অ্যান্থনি আলবানিজ। অষ্ট্রলিয়া-চীন বিরোধে চীনে অষ্ট্রেলিয়ার সব রপ্তানি সুবিধা  প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছিল।  অষ্ট্রেলিয়ায় নতুন দলের প্রধানমন্ত্রী এখন আগের দলের উপর দোষচাপিয়ে আগের মতই চীনে রপ্তানির সুযোগ কতটা পুনরুদ্ধার করা যায়, চীনের সাথে সেসব সম্পর্ক ও চুক্তি নিয়ে আলোচনায় গভীরভাবে ব্যস্ত।  আবার ওদিকে জাপান; চীনে কোভিডের কারণে চীনের অর্থনীতির অনেক খাত ঝুলে পড়াতে জাপানের র্অথনীতি সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত ও এর ধাক্কার শিকার দেশ হয়ে উঠেছে। আবার কোয়াডকে আমেরিকা সামরিক অভিমুখী করে ঘুড়িয়ে দিতে চাইলে সবার আগে পিছটান দিয়েছে ভারত; ভারত কারও সাথে সামরিক জোট করতে চায় না, তাই। তাই বাইডেন আর কোয়াড নিয়ে সমস্ত নাড়াচাড়া স্তব্দ করে রেখেছেন।

    আর তাতেই আইপিএস (IPS) নামে আমেরিকা নয়া এক খাতা খুলেছেন বা এদিকে জোর দিয়েছেন। কিন্তু আইপিএস কী কেন? বলা হচ্ছে এটা কোয়াড থেকে আলাদা। জিজ্ঞাসা করলে বলে এটা কোন রাষ্ট্রজোট নয়, ডোনাল্ড ল্যু এবারের বাংলাদেশ সফরে যেমন পাবলিকলি বলেছেন। তাহলে এটা কী? বলছেন এতে নাকি সবদেশই ইন্দো-প্যাসেজিক জোন প্রসঙ্গে নিজের নিজের স্ট্রাটেজি জানাবে। কিন্তু কেন বা কী উদ্দদেশ্য? এখানেই কবি একটু নিরব! মানে প্রথমত এটা কী কোন একটা দেশের বিরুদ্ধে বাণিজ্য স্ট্রাটেজি বা কৌশল? নাকি যুদ্ধ কৌশল, না সামরিক স্বার্থের কৌশল, নাকি রাজনৈতিক, না অর্থনৈতিক – এসব এই প্রশ্ন আছে। তা কেউই প্রকাশ্যে পরিস্কার করছে না। দ্বিতীয়ত, এখানে শত্রুদেশটা কে? এটা সবচেয়ে নির্ধারক প্রশ্ন! এটা লিখিত ভাষায় বা রেকর্ডে না বলে চর্চায় তারা বলে থাকে; ফলে মনে মনে ধরে নেয়া সেই শত্রুদেশ হল চীন!

    তাহলে কী দাড়ালো এটা?  যেখানে আমেরিকাসহ সকল দেশই চীনের সাথে বাণিজ্য- অর্থনীতিতে পুঁজি-পণ্য বিনিময়ে গভীরভাবে সম্পর্কিত সেখানে একই সাথে চীনবিরোধী আইপিএস (!) এটা কেমন স্ট্রাটেজিক জোটের কল্পনা???  আমেরিকা ঠিক চাইছেটা কী???  এর বাস্তব দিকটা তো খোদ আমেরিকার কাছেই অপরিস্কার!! তবু আমেরিকা চাইছে এশিয়ার সবদেশ তো বটেই কানাডাকেও কার্ড দেখাতে হবে! বা কানাডার কাম্য ইন্দো-প্যাসেজিক স্ট্রাটেজি কী তা লিখে জানাতে হবে। মানে হল কতটা সে চীনবিরোধী তা দেখাতে বলতে হবে! আর ঠিক এর মতই হাসিনার বাংলাদেশেকেও মূলত সেকথা বলতেই এসেছিলেন ডোনাল্ড ল্যু। তিনমাস মানে মার্চ মাসের মধ্যেই তা আমেরিকাকে জানাতে হবে। এদিকে আরও প্রসঙ্গে একটু পরে আসছি।

     

    ওদিকে আইপিএস, এর আরেক বাড়তি ঝালড় আছে – সেটা হল, ইন্দো-প্যাসেফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক (IPEF)। মানে এটাই আসল অর্থনৈতিক জোটের কল্পনা। কিন্তু সমস্যা হল, এটা টু লেট (too late)!! কেন?

    কারণ ইতোমধ্যেই চীনা আগ্রহের আরেক এবং আরো গুছানো এক অর্থনৈতিক জোটের জন্ম ও ততপরতা গত ২০২০ সাল থেকে শুরু হয়েই আছে যার নাম RCEP। বাংলা লিখলে, রিজিওনাল কম্প্রিহেন্সশীপ ইকোনমিক পার্টনারশীপ [RCEP]। যেটা আসলে কালজয়ী; কারণ এটা জোটদেশগুলোর যেকোন উতপাদিত পণ্যে সদস্য সবদেশেরই শ্রম যুক্ত করার সুযোগ (shared value addition) রাখা হয় ও তাতে সকলেই এই পণ্যের ভোক্তা-ক্রেতা। যেমন জাপান, অষ্ট্রেলিয়া দুই কোয়াড সদস্য এমনকি আমেরিকা প্রভাবিত দক্ষিণ কোরিয়াও এই জোটের সদস্য হতে মিস করে নাই। জন্ম থেকে এরা সবাই সদস্য, তাতে কোয়াড বা IPS বলে কিছু গঠিত থাকুক আর নাই থাকুক!

    তাহলে এতদিনে  IPEF খাড়া করার আমেরিকান নয়া বাসনা কেন আর কতটুকু এটা নতুন কিছু করতে পারবে? যদিও এটা RCEP এর নকল করে তার চার বৈশিষ্টের একটা হিশাবে supply chains বলে একটা ধারণা রেখেছে যেটা shared value addition ধারণার ধারেকাছের নয় বলেই অনুমান। কারণ, shared value addition এটা আমেরিকান কনসেপ্ট নয়। বরং উঠতি অর্থনীতি বা ‘প্রাক্তন কমিউনিস্ট’ দেশ হলে এনিয়ে তাদের নিরীক্ষায় আগ্রহী দেশ হতে দেখা যায়। কারণ এখানে লেবার মানে ভ্যালু এডিশন“ভাগাভাগির” প্রশ্ন জড়িয়ে আছে।
    কিন্তু সেটাই মূল ইস্যু বা প্রধান বাধার দিক নয়। প্রধান বাধার দিক হল, আমরা যদি IPEF-এ যোগ দেই তবে আমাদের  কারখানা পুঁজি (ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ) এবং  অবকাঠামো পুঁজির উতস কে হবে?

    একাজে আমেরিকা বুড়া সিংহ, আর বিপরীতে চীনকে উঠতি বাঘ বলা যায়। উদাহরণ, এই বুড়া বয়সে বাইডেনের আমেরিকা উঠে দাড়ানোর সখ করেছিলেন। বর্তমানের চীন দুনিয়ার আমাদের মত সবদেশের জন্যই অবকাঠামো পুঁজির ঋণদাতা ভুমিকায় একছত্র হয়ে উঠে আছে। এমন এক অর্থনীতিকে আমেরিকার বাইডেন এই বুড়া বয়সে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। দেখা গেলে এতে তারা সবাই মিলে মাত্র ৬০০ বিলিয়ন ডলারের কমিটমেন্টের জোগাড় করতেই তাদের হিসশিম। এছাড়া এখনও এই সংগ্রহ হাতে আসা ও কাজে নেমে পড়ার ততপরতার কোন কিছুই শুরু করতে পারেন নাই। তাই খুব সম্ভবত ২০২৪ সালে বাইডেন ক্ষমতা ত্যাগের পরে এই উদ্যোগ্রটারও মৃত্য সংবাদ আমরা পাব!!!  তাহলে IPEF-এ যোগদানে আমাদের কী হবে????

    আসলে, কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক এসব শব্দ দিয়ে এপর্যন্ত আমেরিকান পেসিডেন্টেরা পিসমিল একমুঠো করে যা কিছু করে যাচ্ছেন এসবের কিছুই টিকবে না, শুরুতে কার্যকরই হতে পারবে না। তবুও  RCEP এর সমান্তরাল আরেকটা IPEF বলে জোট অবশ্যই খাড়াতে পারে তবে এর অন্যতম শর্ত হতে হবে যে এসব কোন অর্থনৈতিক জোটই বিশেষে দেশের (যেমন চীন অথবা আমেরিকা্র বিরোধী হতে পারবে না। ফলে একই দেশ সুযোগ-সুবিধা পাওয়া সাপেক্ষে ইচ্ছা মত একই সাথে দুইটা জোটের মধ্যেই থাকতে ও সদস্য হতে পারবে, এমন জট হতে হবে। একটা জোটের মধ্যে সবাই থাকবে তাও হতে পারবে। কিন্তু কোন ভাবেই প্রকাশ্যে বা গোপনে আমরা চীনবিরোধী স্ট্রাটেজিক জোট করতে চাই, এমন করা যাবে না – এসব চিন্তা অবাস্তব, অকেজো। ঘৃণা ছড়াতে পারবে কিন্তু নিজে কার্যকর কিছুই হতে পারবে না। মুল কারণ আমরা সবাই একই [IMF] আইএমএফের সদস্য। মানে আমরা সকল রাষ্ট্র একই গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার অংশ ফলত আমরা মূলত একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অংশ।  ক্যাপিটালিজমে “কোটারি” হয় না; সব ক্যাপিটালিজমই পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে  যাবেই; এভাবেই সে টিকে থাকে যা এর মৌল স্বভাব!

    চীন একারণের এটাকে নিন্দা করতে বলে, বাইডেনের ‘কোল্ডওয়ার মানসিকতা’।  এমনকি বাংলাদেশের চীনা নয়া রাষ্ট্রদুতই এসব ধারণা আড়াল নিয়ে বলেছেন “কোনো দেশের বিরুদ্ধে জোটের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে: চীনের রাষ্ট্রদূত”। ওথবা “কোনো দেশকে বাদ দিয়ে গড়া জোটে যোগদানে সতর্ক থাকতে হবে”।

    এখনও তিনটা কথাঃ
    প্রথমত, আমেরিকা ল্যু এর সফরে মার্চের মধ্যে হাসিনা সরকারকে নিজদেশের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি তৈরি করে তাদের জানাতে বলে গেছে বলে জানা যায়। কিন্তু এটা কেন?
    ল্যু যেটা বলতে চাইছেন এর সারকথা হল, বাংলাদেশ যেন চীনের সাথে সম্পর্ক বিশেষত অর্থনৈতিক যেটা যেমন প্রধানত, চীনা অবকাঠামো ঋণ ও চীনের উপর নির্ভরশীলতা না করে চলা। এছাড়া চীনা অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জামও মানে করে থাকতে পারে। এছাড়া সাউথ চায়না সি নিয়ে আমেরিকা যে গায়ে পড়া ঝগড়া-বিরোধ বানিয়ে রেখেছে তাতে আমেরিকার পক্ষ নেয়। বাংলাদেশ যেন এমন অবস্থান নেয়!

    আমরা উপরে দেখেছি, আমেরিকান এই আকাঙ্খাটা আনরিয়েলিস্টিক; বাস্তবে তা সংঘটন বা করে দেখানোর কারও কোন সম্ভাবনা নাই বা সম্ভাবনাচ্যুত! তাহল এটা নিয়ে এই জিদ ধরার অর্থ কী?

    দ্বিতীয়ত, আমেরিকা বা এমনকি সে বগলে জাপানকে নিয়েও যে আমেরিকা সে আমাদের অবকাঠামো ঋণের চাহিদা মিটানোর যোগ্য কোন দেশ নয়। যদিও এটা ঠিক ওয়ার্ল্ডব্যাংকের যেকোন ঋণপ্রকল্পে ওপেন টেন্ডার হতেই হয়।  যমুনা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের তরফে সিংহভাগ লোন দিয়েছিল জাপান। অথচ ১৯৯৭ সালে এই সেতু নির্মানে জাপান কোন অংশের কাজই পায় নাই। আর একালে, বাংলাদেশে চীনাঋণের প্রকল্পের কমিশন সরাসরি সিঙ্গাপুরে জমা হয়ে যায়, এটা এক বিরাট সমস্যা হয়ে আছে। কাজেই তরুণ উঠতি আকাঙ্খার ঋণ আকাঙ্খার বাংলাদেশকে আমেরিকা নিজ বাহুডোরে আটকে রাখার খায়েস; অর্থহীন!  তবে বাংলাদেশে নয়া এক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা ভিত্তিক নুন্যতম কিছু সংস্কার করতে পারলে এর অনুষঙ্গ হিশাবে চীনাঋণের কমিশন সমস্যার সমাধান সম্ভব। কারণ, চীনা সরকার আমাদের মত দেশে নুন্যতম সাধু বা সীমাহীন চরম চোর নির্বিশেষে সব ধরণের সরকারের সাথে কাজ করে থাকে।

    তৃতীয়ত,
    আমেরিকা কেন ডোনাল্ড ল্যু পাঠিয়ে এখন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি (আইপিএস) যোগদানের জন্য হাসিনা সরকারকে জোরাজুড়ি করছে?
    প্রায় ছয় মাস আগে থেকে বিএনপির এবারের আন্দোলন শুরু হয়েছিল। বলাই বাহুল্য এবারের আন্দোলন শুরুর পিছনে গত ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ১০ তারিখে সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উপর আমেরিকান স্যাংশন আরোপের একটা সরাসরি সম্পর্ক আছে।  কারণ এবারের আন্দোলন শুরুর প্রথম দিকে সরকার আগের মত অভ্যাসে গুম-খুনের ভয় দেখিয়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝতে পারে যে এতে আগে থেকেই দেয়া স্যাংশনের চাপ আরো বাড়ছে ও বাড়বে। আর সরকারের এমন ততপরতা সব মনিটরিংয়ের অধীনে। তাই বলা যায় আমেরিকান অপ্রত্যক্ষ ইঙ্গিত ছিল এই আন্দোলন শুরু করার। শুধু তাই না, গত ১০ ডিসেম্বর ২০২২ ঢাকায় গোলাপবাগে বিএনপির লাখো সমাবেশের পরে প্রথম দেশে-বিদেশে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়  যে হাসিনা সরকারের দমননীতির বিরুদ্ধে এবার সত্যিই গণভিত্তি পেয়ে এক আন্দোলন উঠে দাড়িয়েছে। এরপর আসে পিটার হাসের আরেক স্টেপ আগানো। তিনি হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের ভিমটিমদের ভিজিট করতে শুরু করে সরকারের দিক থেকে কিছু পরোক্ষ বাধার সম্মুখীন হন। আর এরপরেই আমরা দেখি পরিস্থিতি ক্রমশ আমেরিকার সাথে সরকারের “বাতচিত, ঝুলাঝুলি ঢাকা সফর” ইত্যাদির দিকে যাচ্ছে। স্যাংশন আরোপের দিক থেকে বললে এটা নিঃসন্দেহে আমেরিকার পিছনে হাটা। কারণ, হাসিনা সরকারের সাথে যা যা ডায়লগ প্রয়োজন আমেরিকা মনে করে সেরকম  “বাতচিত ঝুলাঝুলি ঢাকা সফর ইত্যাদি শেষ হবার পরই তা থেকে আমেরিকার প্তেরাপ্তি মনে করা যায় এমন  “কোন রফা” বা ভদ্র ভাষায় কোন অগ্রগতি না হলে এরপরই তো আমেরিকার স্যাংশন আরোপের দিকে যাবার কথা! এটাই অনুমান করা যায়!
    তার মানে আমেরিকা এই উলটাপালটা করে আগে-পিছে মানে এক-পা আগে পরে দুই-পা পিছের কূটনীতি করতে গিয়েছে! কেন? অনুমান করা যায় তাদের ধারণা এতে হাসিনার উপর  চাপের প্রভাবটা বেশি হবে!!

    কিন্তু আসলেই কী এটা আমেরিকাকে বেশি চাপের সুবিধা দিবেঃ
    প্রশ্নই আসে না। কিন্তু সেকথায় যাবার আগে অন্য কিছু কথা।
    তাহলো এর মানে বাইডেনের মানবাধিকার ও স্যাংশন তার পররাষ্ট্রনীতির কোন পলিসি তা একেবারেই নয়। বাইডেন মূলত মানবাধিকার ব্যবসায়ী হিশাবে নিজেকে হাজির করেছেন।
    এর মূল কারণ,  হাসিনা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি পেশ করবেন কিনা বা আমেরিকার নেতৃত্বে চীনবিরোধী কোন এক কমন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির অংশ হবেন কিনা অথবা ক্রমশ  ইন্দো-প্যাসেফিক ইকোনমিক ফ্রেমওয়ার্ক(IPEF) এ যোগ দিবেন কিনা অথবা চীনের সাথে অবকাঠামো ঋণসহ অন্যান্য প্রকল্প সুবিধা ও সম্পর্ক করা সব গুটিয়ে নিবেন কিনা ইত্যাদি এসবের সাথে  সমান্তরালে হাসিনার মানবাধিকার ভায়োলেশনের রেকর্ডের কী সম্পর্ক??? মানে হাসিনা চীনের থেকে সরে আসলে তার সব মানবাধিকার অপরাধ আর অপরাধ মনে করা হবে না???? তাই কী?
    ধরা যাক হাসিনা-সরকারের কাছে আমেরিকার যা কিছু খায়েস এর প্রায় সবকিছুতেই হাসিনা একমত হলেন। তাহলে  মানবাধিকার ভায়োলেশনের  অভিযোগ এর রেকর্ড কী সব তখন থেকে ইতিবাচক বলে বিবেচিত হবে??? আমাদের জানা মতে, ভায়োলেশনের অভিযোগ নিস্পত্তি হতে পারে একমাত্র উপযুক্ত আদালতে এর বিচারের পরে। এরপরেই কেবল অভিযোগ বা স্যাংশন উঠিয়ে নেওয়ার প্রশ্ন!  তাহলে???

    তাহলে এই পরিস্থিতিতে এখন সরকারের সাথে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি ইস্যুতে আমেরিকার কথা বলা, সময় দেয়া কেন? আবার আমেরিকান সব প্রস্তাবে যদি সরকার একমত হয় তবে তাতে দেশে একটা বিশ্বাসযোগ্য জনপ্রতিনিধিত্ব নির্বাচন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সেই সাথে সেই নির্বাচনে এই সরকারকে পুনরায় জিতবার নুন্যতম নিশ্চয়তাও তাতে ব্যবস্থা কী থাকবে?? আমেরিকা কীভাবে হাজির করবে তা? নাকি তা সম্ভব? আর এসব নিশ্চয়তা না থাকলে সরকার কেন আমেরিকার এত কথা শুনবে, বা মান্য করবে? এমনিতেই হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে একটা বিশ্বাসযোগ্য জনপ্রতিনিধিত্ব নির্বাচন ঘটানো – এমন সমীকরণ অসম্ভব। এর উপর হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে কোন নির্বাচনে বিএনপিকে সামিল করা আরেক  অসম্ভব।

    অর্থাৎ বাংলাদেশের এক্ষণকার বাস্তবতা হল আগামি নির্বাচন পার হবে কীকরে আর  সাথে  মানবাধিকার ভায়োলেশনের অভিযোগ নিস্পত্তি এদুইয়ের কোনটাকে বগলে নিয়ে আমেরিকার ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি-তে বাংলাদেশের এলাইনমেন্ট করে নেয়া নিয়ে কথা তোলা – এটা একদিকে আন-এথিক্যাল অন্যদিকে এমনটা ঘটবার কোন বাস্তবতাই নাই। আর সবার উপরে এসব ডিল বা সমঝোতা-অযোগ্য আইটেম। সেটা আমেরিকা বা হাসিনা সরকার দুদিক থেকে এটা ডিল অযোগ্য ইস্যু।
    যেমন গত পনেরো বছর ধরে বাংলাদেশে মানবাধিকার ভায়োলেশন চরমে উঠে আছে।  আর ওদিকে এই লম্বা সময়কালগুলোতে অভিযোগ সবকিছু জানা সত্বেও আমেরিকা এনিয়ে নিঃশ্চুপই ছিল। তাই বাইডেন ক্ষমতার শপথ নিবার পরেও যদি এনিয়ে ধারাবাহিক নিশ্চুপ থাকত তাহলে একরকমের পরিস্থিতি হত। কিন্তু ঢাকঢোল পিটিয়ে “মানবাধিকার ও স্যাংশন” নিজের পররাষ্ট্রনীতির নীতি-পলিসি বানানোর ঘোষণার সাথে সামঞ্জস্য আচরনের পথে আর বাইডেন প্রশাসন যে নাই তাই তো উন্মোচিত!!  এককথায় “মানবাধিকার ও স্যাংশন”  এর পলিসি ঘোষণা ও স্যাংশন আরোপের পরে এটা  ডিল অযোগ্য ইস্যু হয়ে গেছে।
    আবার একটা মজার তথ্য হল, এখন ভারতও চায় না যে হাসিনা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি তে সামিল হয়। প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদুত একথা বলেছেন বিবিসির সাথে এক সাক্ষাতকারে!

    আবার হাসিনার দিক থেকে যদি দেখি, কোন কিছু পাবার বিনিময়েও হাসিনার চীনের হাত ছেড়ে দেওয়ার যোগ্য থাকবে না। কারণ, সরকারের উন্নয়নের ঢোল পিটানোর সঙ্গে সামনজস্যপুর্ণ কাজ হল এই ধরণের ঋণপ্রাপ্তির ধারাবাহিকতা ও তা থেকে চুরির অব্যবস্থাপনা জারি রাখতে হবে। কারণ নাহলে দলের যারা এর বেনিফিসিয়ারী এরা কেউ আর দলের সাথে থাকবে না। অথচ সরকার চীনের হাত ছেড়ে দিলে  আমেরিকা-জাপানের পক্ষে হাসিনা সরকারকে ঋণপ্রাপ্তির ধারাবাহিকতা একই লেভেলে জারি রাখা অসম্ভব।
    মূলত এই প্রধান কারণেই আমেরিকার পক্ষে দাঁড়িয়ে হাসিনা সরকারের চীনবিরোধী কোন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি তৈরির ততপরতায় সামিল হওয়ার বাস্তবতা নাই। এছাড়া আবার এটাই ছিল ২০২১ সালে হাসিনা সরকারের চীনকে দেয়া প্রতিশ্রুতি; আর সেই সৌজন্যেই আমরা সে সময় বিনা পয়সায় আমাদের সমস্ত চীনা টিকা প্রাপ্তি ঘটেছিল!

    কাজেই সব ব্যাপারেই অবজেক্টিভিটি বা কঠিন বাস্তবতাই হয়ে উঠেছে একমাত্র নির্ধারক! আমেরিকা বা হাসিনা সরকার ডিল অযোগ্য বা সমঝোতায় আসা অযোগ্য এসব বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়ে আছে!
    তাই, আইপিএস (ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি) বা এর সংশ্লিষ্ট কোনও ততপরতায় হাসিনা সরকারের যোগদানের সম্ভাবনা ক্ষীণ! এছাড়া, বাংলাদেশের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে আছে; এতে একমাত্র রাস্তার আন্দোলনের দিকেই এই পরিস্থিতি থেকে বের হবার অভিমুখ রাস্তা!

     

    লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ডোনাল্ড ল্যু ও তাঁর সফরের পরে!

     

    ডোনাল্ড ল্যু ও তাঁর সফরের পরে!

    গৌতম দাস

    ১৮ জানুয়ারী  ২০২৩

    https://wp.me/p1sCvy-4m2

     

        What is the message Donald Lu left for Bangladesh? Daily Star

    ডোনাল্ড ল্যু ঢাকা সফর শেষে চলে যাবার পরে আমাদের সমাজের প্রায় সব কোণে বিস্তর আলাপ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা শুরু হয়েছে এই বলে যে হলো-টা কী বা ব্যাপারটা কোথায় দাঁড়ালো – এধরণের!
    তবুও এটা এখন কমবেশি পরিস্কার – যেটা সোজাসাপ্টা বললে, ডোনাল্ড ল্যু কিছুটা  পিছু হটাছেন অথবা এক দিশা হারানো বাইডেন প্রশাসনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এবং সেই অনুসারে তাদের এখনকার অবস্থানই যেন জানাতে এসেছিলেন।  তারা যে তাদের আগের অবস্থান থেকে অন্তত কিছুটা সরে গেছেন সেই পিছু হটা অবস্থান অনুসারে বাকি সবকিছু এডজাস্ট করে নিতে বা সে অনুযায়ী একটু ঢেলে সাজিয়ে নিতে এসেছিলেন তিনি।  যদিও মনে রাখতে হবে এই “পিছু হটা’ – এটা সাময়িক হতে বাধ্য! আমার বিচারে এটা স্থায়ী অবস্থা হবে না, বরং সাময়িক হতে বাধ্য।  মানে বলতে চাচ্ছি ল্যু ও তাঁর ভাই-বেরাদরেরা তাদের এই পিছু হটা অবস্থানও ধরে রাখতে ব্যর্থ হবে; ফলে আবার আগের জায়গায় যেতে তাদের চেষ্টা করতে হবে! এজন্যই এটাকে ‘সাময়িক’ বলছি। কিন্তু এখন অবশ্যই এটা কিছুটা হলেও পিছু হটা !

    কথাটা সম্ভবত আরেকভাবে বলা যায়। যদি অনুমান করে নেয়া যায়, বাইডেন প্রশাসনের ভিতরে দুটা ধারা আছে বা হয়ে গেছে।  যার একটা ধারা যেটাকে আমরা এতদিন একমাত্র জ্ঞান করেই এসেছি সেটা হলঃ বাইডেন প্রশাসন ‘মানবাধিকার-স্যাংশন’ এই অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে যেতে আর এভাবেই এশিয়ায় চীনবিরোধি আমেরিকান স্বার্থগুলো ভাল আদায় হবে বলে এতদিন মনে করে এসেছে এরা। এই ধারারই বাংলাদেশে সর্বশেষ পদক্ষেপ হল রাষ্ট্রদুত পিটার হাসের গুম-খুন-অপহরণ-গায়েবের যেসব ভিকটিম আছে তাদের সাথে দেখা করার প্রোগ্রামে শাহীনবাগে যাওয়া। আর তা থেকেই হাসিনা সরকারের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক সরাসরি কিছুটা সংঘাতময় হয়ে উঠতে শুরু করেছিল।

    অন্যদিকে, প্রশাসনের দ্বিতীয় ধারাকে চিনাতে বলা যায়, এরা মনে করে “মানবাধিকার ও স্যাংশন” এর কথা তুলে হাসিনা সরকারের উতখাতের ঝামেলায় যাবার দরকার নাই। অন্যভাবেই তাদের উদ্দেশ্য সাধিত হতে পারে…।

    সেক্ষেত্রে তাহলে জানতে হবে বা শুরু করতে হবে যে তাহলে বাইডেনের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল? এখান থেকে শুরু করতে হবে। কিন্তু এমন চিন্তা করা বা পিছু হটার কথা সহজেই  বলতে পারছে কেন? আর কীইবা সেই উদ্দদেশ্য??
    বাইডেন প্রশাসনের আসল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে “মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করা’ একেবারেই নয়। বরং সে জায়গায় তাদের মূল উদ্দেশ্য ‘বার্মা দখল’! কিন্তু  সেক্ষেত্রে  ‘বার্মা দখল’ করতে চাইলে হাসিনা উতখাতের দায় সাথে নিয়ে আগানো কেন? সেকথায় পরে আসছি।

    আসলে প্রথম ধারার পথে চলতে গিয়ে এটা এখন অনুমানে বলাই যায় যে বাইডেনের আমেরিকার নিজ ‘বাংলাদেশ স্ট্রাটেজি” ধরে আগাতে গিয়ে এমনভাবে হাসিনা সরকারের সাথে মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়ে যাবে এটা তাদের কল্পনায় ছিল না। আগের দিনের মত সবই চুপচাপ পাড়িয়ে যেতে পারবে! কারণ, বিগত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকা গ্লোবাল নেতৃত্বে আসীন হবার পর থেকে প্রায় ৭৮ বছর হতে চলল – সেই অভ্যাস মতে আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকান প্রভাবে তারা যা করতে চেয়েছে মোটামুটি তাই হয়েছে ও পেয়েছে।

    কিন্তু বারে বারে বলেছি এটা “পালা-বদলের কাল” যখন আমেরিকাকে চীনা চ্যালেঞ্জ ও প্রতিযোগিতায় মোকাবিলা করতে হবেই ও হচ্ছে। পালা-বদল” মানে যেটা গ্লোবাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেতৃত্ব বদলের এটা সময়কাল। যেটাকে অনেকেই বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে পারে না অক্ষম বলে তারা তাদের চিন্তার অসক্ষমতা, দুর্বলতা ঢাকতে “ভূরাজনীতিক” বলে একটা আবছা অর্থহীন শব্দ ব্যবহার করে নিজের অস্পষ্ট চিন্তার প্রকাশ ঘটায়ে থাকে। এই পালাবদলে “ভূ-” বা কোন দেশের বিশেষ “ভৌগলিক অবস্থানের” জন্য এসব ঘটছে তা একেবারেই নয়; তা ভাবার কোন সুযোগও নাই। ভুরাজনীতি শব্দটার ব্যবহার ও আবির্ভাব প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়ে তবে এর শেষের দিকে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল ১৯৪৪-৫ সালে জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম ও উত্থান ঘটে যাবার পরে  মানে এই তিন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্ম ও উদিত প্রভাবের পরে  ‘ভুরাজনীতি’ শব্দটা সেবার হারিয়েই যায়। এর মূল কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে, কেন আমেরিকা এর একছত্র নেতা হিশাবে উঠে আসবে আর এই তিন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক নয়া এক গ্লোবাল অর্ডার [new Global Order] বা বিশ্বব্যবস্থার শৃঙ্খলা চালু হবে সেটা কোন দেশেরই বিশেষ “ভৌগলিক অবস্থানের” কারণে-পরিণতিতে এমনটা  ঘটে নাই। সে জন্য যারাই এই তিন প্রতিষ্ঠানের উত্থান ও এদের সেকাল থেকে নয়া ভুমিকা ও তাতপর্য ব্যাখ্যা করতে অপারগ তারাই geo- বা ভ্যু- বলে একটা পরাজিত ধারণাকে ধুয়ে মুছে আবার একালে খাড়া করে নিজেদের অকর্মণ্যতা আড়াল করে থাকে।

    তবে এখন যেটাকে পালাবদল  বলছি এতেও এমন অনুমান ভুল হবে যে, এতে আমেরিকা যেভাবে সেকালে গ্লোবাল নেতা হয়েছিল চীনও একইভাবে একই ধরণের নেতা হবে। এই অনুমান অতি সরলিকরণও হবে। তাই সাবধান থাকতে হবে। তবে জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রিক যে বিশ্ব ব্যবস্থা তখন জন্ম নিয়েছিল ও এখনও ধুকে হলেও চলছে – এখন পালাবদলে যেটা কেবল আমেরিকার জায়গায় চীনা নেতৃত্ব হয়ে যাবে এমনটা হল এক কপি-পেস্ট ধারণা। দুনিয়ায় কোন ঘটনাই একই রকমভাবে দ্বিতীয়বার ঘটে না। যদিও জাতিসংঘ এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ত আবার পুনর্গঠিত হবেই।

    আবার, এসব পালাবদল প্রসঙ্গে খোদ আমেরিকানদের কোন স্টাডি নাই বা ফেনোমেনাটা জানা নাই তা একেবারেই নয়। তবু তারা যেন নানার আমলে খাঁটি ঘি খাবার অভ্যাসে এখনও সহজেই আগের মতই তুড়ি বাজানোর চেষ্টা করে ও ফেল মারতে থাকবে। কারণ পরিস্থিতি যে আর আগের মত একই রকম নাই তাই তারা সময়ে ভুলে যায়। আর বার বার পরাজিত হয়। এধরণের উদাহরণের অভাব নাই। যেমন ২০১২ সালে বাংলাদেশের একটা ঘটনা। সে সময় আমেরিকা-বিশ্বব্যাংকের আগ্রহে তারা হাসিনার বিরুদ্ধে পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলা। এই দুর্নীতির মামলা সত্যি হোক বা না হোক, এটা মনে করা ভুল হবে না যে এমন মামলা করার পিছনের তাদের অপর উদ্দেশ্যের দিক ছিল। সম্ভবত তা হল, যাতে আরো ভাল করে আমেরিকার অধীনস্ততায় আনা যায় যাতে হাসিনা আরো অনুগত হয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় আমেরিকান বেকুবিটা হল দুর্নীতি মামলাটা যখন আনলই তখন কয়েক বছর পরেই আবার শেষে আদালত থেকে ঐ মামলাটাই বিশ্বব্যাংক প্রত্যাহার করে নিয়েছিল কেন? অথচ তাতে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব নয়া এক হারুপার্টিতে পরিণতি পেল!  সেটা কিভাবে?

    বিশ্বব্যাংক মানে হল নানান অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে কম সুদে যে ঋণদাতা – তা ছোট বড় সব প্রকল্পে সে এমন ঋণ দিয়ে থাকে। আর এথেকেই “পড়ে পাওয়া বাড়তি চার আনার মত ঘটনাটা হল – আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকার প্রভাব বেড়ে যাওয়া।
    তাহলে দুর্নীতির মামলা এনে পরে পিছু হটে যাওয়ার আমেরিকানদের পরিণতি কী হয়েছিল? হয়েছিল এই যে নয়া ঋণদাতা উতস হিশাবে ‘অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণদাতা’ হতে অপেক্ষা করছিল চীন বা প্রতিদ্বন্দ্বি হতে চেয়ে অপেক্ষা করা চীন এই ফাঁকে সে বাংলাদেশে প্রবেশ ও নিজের হাজিরা নিশ্চিত করে ফেলেছিল। যেটা এরপর হাসিনার চীন-সফর আর পরে ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট  সি জিনপিংয়ের ঢাকা সফর শেষে ২০ বিলিয়ন ডলারের অধিক (যেটা পরে ঠেকেছিল ২৬ বিলিয়নে) প্রকল্পের বন্যা বাংলাদেশে বয়ে গেছিল।

    তাহলে চীনকে অবকাঠামো ঋণদাতা হয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে রাস্তা করে দিয়েছিল কে??? এটাই আমেরিকান বেকুবি!!   অথচ ঋণদাতা মানেই ওর ঋণগ্রহিতা দেশের উপর দাতার প্রভাব হাজির হওয়া বা বেড়ে যাওয়া। অনেকে আমাদের মত দেশের উপর আমেরিকার প্রভাব বলতে পরাশক্তির ‘সামরিক ক্ষমতা’ বলে বুঝে থাকে। এটা ভুল মিথ্যা। গ্লোবাল নেতা দেশের প্রভাব-আধিপত্য বলতে সেটা প্রধাণত নেতা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মানে যেমন তার ব্যাপক ‘ঋণদানের সক্ষমতা’ একেই বুঝায়।  তাহলে দাড়ালো যে আমেরিকা সেই বার নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছিল আর তাতে চীন উত্থান বা চীনা প্রভাব কমানোর বদলে তা বাড়িয়ে দিয়েছিল। সম্ভবত এবারও দ্বিতীয়বারও এমন কিছু একটা ঘটতে পারে সে ইঙ্গিত ফুটে উঠছে!!

    এবার বাইডেন প্রশাসন শপথ নিবার পর থেকে আমরা দেখছি তিনি আরেক “বাংলাদেশ প্রকল্প” খুলতে চাচ্ছেন – যেটাকে আমরা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” প্রকল্প বলে চিনাতে পারি। বাংলাদেশের মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘণ অবস্থায় উঠেছে এব্যাপারে সন্দেহ নাই।  কিন্তু প্রশ্ন হল বাইডেন কী আসলেই বাংলাদেশের মানবাধিকার চরম লঙ্ঘণ নিয়ে উদ্বিঘ্ন? মিন করেন? ঠিক তাই বুঝাতে চান???

    না একেবারেই না। তা সরাসরিই বলা যায়। যেমন এবার বাংলাদেশের বা হাসিনার দুর্নীতি নিয়ে কথা বলার পিছনে আমেরিকার দ্বিতীয় বা সেকেন্ডারি উদ্দেশ্যটা কী সেদিকে মনোযোগ দেই।  বাইডেনের আরেক উদ্দেশ্য বা মুল উদ্দেশ্য ছিল ও এখনও আছে – তা হল ‘বার্মা দখল”। এটাই তার মুখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু এটাকে পরোক্ষে বা পিছনে লুকিয়ে রেখে বাইরের প্রকাশ্য উদ্দেশ্যটা বাইডেন মিথ্যা করে জানিয়ে চলছিলেন যে বাংলাদেশের হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া তার প্রধান উদ্দেশ্য। আবার হাসিনার গুম-খুন-অপহরণ উঠায়ে নেয়া- ক্রসফায়ার ইত্যাদিতে মহামারি লাগিয়ে দেয়া এগুলোও বাস্তব ও সত্য। অর্থাৎ বাইডেনের “মানবাধিকার ও স্যাংশন” প্রকল্প তো বাস্তবতার উপরেই দাঁড়ানো। হা অবশ্যই তাও সত্য । কিন্তু যদি প্রশ্ন করেন গত পনেরো বছরের যেগুলো হাসিনা গুম-খুনের মহামারি হয়ে চলছিল তা তো আমেরিকা অজানা ছিল না। তবুও তখন কোন আমেরিকান প্রশাসন এদিকে মনোযোগ দেয় নাই – আসে নাই বা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” নিয়ে তাদের কোন কথা ছিল না কেন? যেটা আসলে অন্ধ ও নিশ্চুপ হয়ে পরোক্ষে হাসিনাকে সমর্থন দেয়া – তা করে গেছিল কেন? এর জবাব মিলে না!  কবি নীরব এখানে!
    এর জবাব হল, ডোনাল্ড ল্যু যতই বলুক যে আমেরিকার ফার্স্ট এমেন্ডমেন্টে [1st amendment of US constitution, 1791] যে পাঁচ মৌলিক অধিকারের কথা দেয়া বা বলা আছে এনিয়ে আমেরিকা দেশে দেশে কথা বলবেই – সেকথা সবটা সত্যি না। সত্যিটা হল, ঐ পাঁচ মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘণ হলেই হবে না সাথে ঐ লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে তখনই প্রশাসন কিছু বলবার পক্ষ নিবে যখন আমেরিকান রাষ্ট্র নিজের গভীর স্বার্থ ওর মধ্যে দেখবে বা থাকতে হবে তবেই আমেরিকা আগাবে এবং “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে আগাবে।  আর আমেরিকান রাষ্ট্রের গভীর স্বার্থগুলোকে আড়ালে ও পরোক্ষে রেখে দিবে। তাহল বাংলাদেশেও  হাসিনার বিরুদ্ধে “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড নিয়ে এগিয়ে আসার পিছনের আমেরিকান গভীর স্বার্থটা কী?

    গোড়ার স্বার্থ আমেরিকা চায় ‘বার্মা দখল’ করতেঃ
    হা, আমেরিকা চায় ‘বার্মা দখল’ করতে আর এটাই তার গোড়ার গভীর স্বার্থ। কিন্তু তাতে বাংলাদেশকে জড়ানো কেন? বা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার বাসনা পর্যন্ত উঁকি মারা কেন? কী দরকারে?

    আমেরিকার বার্মা দখলের বাসনা বলতে এমনকি আবার সেটাও ঠিক যে এটা শুধু- সু চিকে মুক্ত করা বা বার্মিজ জেনারেলদের উতখাত ও শায়েস্তা করা নয়। এগুলো পরোক্ষ উদ্দেশ্য। আর মুখ্য বা প্রধান উদ্দেশ্য হল এশিয়াতেই চীনবিরোধীতা [কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির খাড়া করার মতই তবে আরেকটা পদক্ষেপ] ও চীনকে চ্যলেঞ্জ করে নয়া কল্পিত হবু বার্মায়  আমেরিকান উপস্থিতি ঘটিয়ে দেখানো।

    কিন্তু বার্মা দখল মানে তো নুন্যতম একটা সেনা সমাবেশ ঘটানোর ব্যাপার। হা তাই। তবে দখল কাজটা কম পয়সা খরচে, নিজ সেনা কম করে জড়িয়ে ও আয়েসে এই দখল ঘটাতে গেলে আমেরিকান স্টাইলটা হল, নিজ দেশের “এরিয়াল সাপোর্ট”[aerial support] দেয়া আর এই ছায়ায় সম্ভাব্য কোন দেশের (বাংলাদেশের!) একটা পদাতিক বাহিনী মার্চ করিয়ে বার্মা দখল নেয়া।  তাই হাসিনাকে সরানো দরকার – এইছিল এতদিনের বাইডেনের গৃহিত লাইন এবং মূল স্বার্থ। কারণ তাহলে  সহজেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তিকালীন সময়ের পদাতিক বাহিনীকে দিয়ে বার্মা দখল সহজ!  যেটা “মানবাধিকার ও স্যাংশন” এর কথা তুলে বাইডেন সেরে ফেলতে চেয়েছিল।

    এরিয়াল সাপোর্ট মানে কী?
    আরেক ভাষায় বললে এর অর্থ বার্মার নিজের আকাশ সীমানার উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ। সেটা এই বলে যে, বার্মিজ বিমান বাহিনী যেন কোন উড়া-নড়াচড়া না করতে পারে এই মর্মে বার্মিজ বিমান বাহিনীর উপর এক  ‘নো ফ্লাই জোন’ ঘোষণা করে দেয়া। সেটা আবার কী? মানে হল, বার্মার আকাশ-সীমার উপর আমেরিকার ‘নো ফ্লাই জোন’ঘোষণা বা দাবি জানিয়ে দেয়া।  আর তাতে এরপরে বার্মীজ কোন আকাশযান মানে কোন সামরিক-এয়ারফোর্স সক্ষমতা যাই থাক – বার্মার কোন হেলিকপ্টার বা যুদ্ধবিমান বার্মার নিজ আকাশের উপর দিয়ে উড়তে চাইলেও সেই বিমানের উপর আমেরিকান কোন জেট সেটার উপর বোমা ফেলে  গুড়িয়ে দিবে এই হুশিয়ারি আগাম দিয়ে রাখা।

    এতে সুবিধা হল, যেহেতু বিমান সক্ষমতা বার্মার থাকলেও সে ব্যবহার করতে পারবে না বা করলে তা মোকাবিলা করবে কোন আমেরিকান জেট ফলে সেই আড়ালে একেবারে সহজেই কেবল একটা পদাতিক বাহিনী মার্চ করিয়ে বার্মা দখল করে নেয়া সহজ। এই কারণে “বাংলাদেশের পদাতিক বাহিনীই” বাইডেনের আকাঙ্খা ও মূল কাম্য এবং টার্গেট। আর সে প্রয়োজনেই মূলত হাসিনার অপসারণ বা না-অপসারণের ‘এদুই লাইনের’ মাঝে দোল খাচ্ছে বাইডেন প্রশাসন।

    আর বরং হাসিনাই যদি বাইডেনের বার্মা দখল আকাঙ্খায় পদাতিক বাহিনী সরবরাহকারি হিশাবে সামিল হতে রাজি হয়ে যায়??? এরাই হল সেকেন্ড অপিনিয়নধারী!!!! বা দ্বিতীয় ধারা!
    কিন্তু “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে এর আড়ালে তো বাইডেন ভালই আগাচ্ছিল, এখন নয়া এপথের উত্থান হল কেন? দুইটা কারণে।

    কী সেই দুই কারণঃ
    এক. মূলত বার্মা দখলের আমেরিকার এই আকাঙ্খাটাই অবাস্তব। মনে হচ্ছে এনিয়ে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক আগে করে নেওয়ার দিক থেকে আমেরিকার ঘাটতি আছে!  যেমন যেটা আমেরিকার প্রাথমিক অনুমান যে সরাসরি “বার্মা দখল” এই ভাষায় না বলে ‘আরাকান ভুখন্ড’ দখল করে বাংলাদেশকে দিয়ে দেয়া – এমন মানে জুড়ে দিয়ে কথাটা তারা বাংলাদেশকে বলতে চেয়েছিল। মনে করেছিল – এভাবে বললে নিশ্চয় বাংলাদেশ খুব খুশি হয়ে সামিল হতে চাইবে! বা পদাতিক বাহিনী নিয়ে সামিল হবে!!!  সেই কূটচাল এই হাসিনাই বহু আগেই (২০১৯ সালেই) প্রত্যাখান করে দিয়েছিলেন খুবই সঠিক ও কঠোর ভাষায়।
    কারণ কোন দেশের ভুখন্ড আমেরিকা অপর দেশের সাথে জুড়ে দিবার ক্ষেত্রে কে??  কেউই নয়! আমেরিকার কোন এক্তিয়ারই নাই। কোন দেশই একাজ করতে পারে না, ক্ষমতা রাখে না। জাতিসংঘের চোখে এটা গর্হিত ও অপরাধ্মূলক কাজ।

    একারণেই বার্মার ক্ষমতাসীন জেনারেলদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করার আড়ালে আমেরিকা আমাদেরকে বলতে চায় এতে আমাদের রোহিঙ্গা সমস্যা মিটিবে বলে আমেরিকার ধারণা আমরা খুশি হব এতে। অথচ এই অনুমান ভিত্তিহীন। যদিও ২০১৯ সালে হাসিনার এই আমেরিকান প্রস্তাব প্রত্যাখানের ক্ষেত্রে  মুল চালিকা ছিল চীনের এব্যাপারে আমাদের সাহায্য চাওয়া; শুধু তাই না ভারতও আমেরিকার এই খায়েশের বিরুদ্ধে ছিল। ওদিকে আমেরিকানদের ধারনা তারা বার্মার দখল নিয়ে কোন এক পছন্দের জেনারেলকে বা সুচি-কে বসিয়ে নয়া বার্মা সরকার চালু করতে পারলে সেটা এক প্রো-আমেরিকান পুতুল সরকারই হবে! কিন্তু বলাই বাহুল্য ঠিক এই দিকটার কারণের ভারত ও চীন ঘোরতরভাবেই এই ইস্যুতে আমেরিকার চরমবিরোধী অবস্থান নিয়েছিল। বার্মাদেশের সাথে চীন ও ভারতের লম্বা সীমান্ত আছে তাই এদুই দেশ কিছুতেই বার্মায় এক  প্রো-আমেরিকান পুতুল সরকার দেখতে চাইতে পারে না। এটাই স্বাভাবিক!

    শুধু তাই না বাইডেন এমন এক সময়য়ে তার বার্মা দখলের খায়েশের পিছনে ছুটছে যখন আমেরিকান এই খায়েসের বিরুদ্ধে শুধু চীন-ভারতই না রাশিয়াও (ইউক্রেন যুদ্ধের পুটভুমিতে) খুবই সবল বিরোধীতা করতে আসবে। গত ২০১৯ সালের দিকে পরিস্থিতি ছিল একরকম কিন্তু এখনকার পটভুমিতে আমেরিকান নো ফ্লাই ছত্রছায়ায় যেকোন দেশের পদাতিক বাহিনী সীমানা অতিক্রম করে বার্মায় প্রবেশ মানে সেটা এক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত যুদ্ধের ঘটনার সম্ভাবনা তৈরি হবে; বলে আমেরিকা এতই প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হবে।
    মানে হল, আমেরিকার বার্মা দখলের উদ্দেশ্য হল চীনকে দুর্বল করা, চীনের ঘাড়ের উপর নিশ্বাস ফেলা মত কাজ। অথচ এখন এই আকাঙ্খা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা মাত্রই চীন দুর্বল হবার পরিবর্তে উলটা আমেরিকার তিন শত্রুদেশ (চীন-ভারত-রাশিয়া) একজোট হয়ে যাবে। একেবারে হিতে-বিপরীত অবস্থা। একারণের পিটার হাসের শাহীনবাগ ততপরতায় কিছুটা বাধা পেয়ে আমেরিকান প্রশাসন আভ্যন্তরীণ রিভিউয়ে বসলে সেই উসিলায় প্রশাসনের এসব দুর্বলতার দিক সামনে চলে এসেছিল বলে অনুমান করা যায়। আর তাতেই এই ডামাডোলে দ্বিতীয় ধারা যারা হাসিনাকে “মানবাধিকার ও স্যাংশন”এর সাইনবোর্ড টাঙিয়ে অপসারণের পক্ষে কাজ করতে চায় না – এই ধারা উপরে উঠে বা সামনে চলে আসে।

    পরে তাদের প্রস্তাব হল, তাহলে বাইডেনের এক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকারকে [Director for South Asia Rear Admiral Eileen Laubacher] পাঠানো।  উদ্দেশ্য খোদ হাসিনাকেই বার্মা দখল প্রোগ্রামে সামিল করা বিনিময়ে তার ক্ষমতাচ্যুতির প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে রাখা হবে – এই প্রস্তাব কতটা কার্যকর করা যায় তা দেখতে।

    আদর্শ উদাহরণ মাইকেল কুগেলম্যানঃ
    এই প্রসঙ্গে আগ্রহিরা কুগেলম্যানের লেখা ও আরেক সাক্ষাতকার পড়ে দেখতে পারেন।  মাইকেল কুগেলম্যান [Michael Kugelman] হচ্ছেন মূলত এক থিঙ্কট্যাঙ্ক উইলসন সেন্টারের [WILSON Centre] ফেলো। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সাউথ এশিয়ান ডিরেক্টর। কিন্তু অন্য থিঙ্কট্যাঙ্কের চেয়ে এই সেন্টারের ফারাক হল এই প্রতিষ্ঠানটা সেমি-গভর্মেন্ট। মানে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ফান্ড সরকারের দেয়া। এমনকি ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের অনেক কথা বলার সুযোগ বা পছন্দ প্রকাশের সুযোগ আছে। ফলে কুগেলম্যান-কে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বাইডেন ক্ষমতাসীন হবার পরে পরেই; আর তা এই চিন্তা করে যে কুগেলম্যান সাউথ এশিয়ান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বাইডেনের চোখের দেখে তাঁর অবজারভেশন ফরেন পলিসি [Foreign Policy] পত্রিকায় নিয়মিত লিখবেন। যা বাইডেন প্রশাসনের জন্য হবে এক ভাল ফিডব্যাক। এককথায় কুগেলম্যান অনেক বেশি বাইডেন প্রশাসন ঘনিষ্ট ব্যক্তিত্ব। এখন আসল কথাটা হল যে কুগেলম্যান গত তিনমাসের বিএনপির আন্দোলন নিয়ে নাখোস! বিএনপির জনসমাবেশকে তাই তিনি লাখে নয় হাজারে গুনে বলা উচিত বলে দাবি করেছেন। তিনি আসলে প্রায় একজন – বাইডেনের ওবায়দুল কাদের। মানে হাসিনার জন্য একটা ওবায়দুল কাদের অবশ্যই সামঞ্জ্যপুর্ণ যেটা বাইডেনের জন্য বা এক্ষেত্রে একটা ভাঁড় অবশ্যই। তিনি পরিস্কার বলছেন বাংলাদেশ যত খারাপ কিছুই (অনুমান করি তিনি গুম-খুনের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ইঙ্গিত করছেন) ঘটে চলুক…… হাসিনাকেই ক্ষমতায় রেখেই অনেক কিছু তার দিবার আছে ……  the bottom line is that there is still a lot for the government in Bangladesh which helps it sustain a significant level of success and there are people who see reasons to support it. বাংলাদেশে এই লেখা ইংলিশ এবং বাংলায় ছাপা হয়েছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন।

    তিনি পরিস্কার বলছেন বাংলাদেশ যত খারাপ কিছুই (অনুমান করি তিনি গুম-খুনের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ইঙ্গিত করছেন) ঘটে চলুক…… হাসিনাকেই ক্ষমতায় রেখেই অনেক কিছু তার দিবার আছে,
    ……  the bottom line is that there is still a lot for the government in Bangladesh which helps it sustain a significant level of success and there are

    people who see reasons to support it.।

    কুগেলম্যান এর এই অবস্থান এটাই বাইডেন প্রশাসনের দ্বিতীয় ধারা। এটা প্রমাণ করে “মানবাধিকার” বাইডেনের ইস্যুই না; এটা কেবল  হাসিনার মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকটাকে পুঁজি করে তাকে ক্ষমতাচ্যুতির ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করা বাইডেনের লক্ষ্য।

     


    তাহলে  আইলিন লা বাকারকে পাঠিয়ে তাদের কী লাভ বা অগ্রগতি হলঃ

    মূলত তিনি এসেছিলেন দুটা সমর বিষয়ক চুক্তিতে বাংলাদেশকে সামিল করা যায় কিনা, তা দেখতে। নাম হিশাবে এরা হল General Security of Military Information Agreement (GSOMIA) and the Acquisition Cross-Servicing Agreement (ACSA)। তবে প্রথমটার ব্যাপারে আমেরিকা খুবই আগ্রহি, এটা সামরিক তথ্য সুরক্ষা ও শেয়ার বিষয়ক। যেটা ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে এর আগেও বাংলাদেশের সামনে এনে রাখা হয়েছিল। আর এবার এনিয়ে আলোচনার ফাঁকে হাসিনা সরকার বার্মায় পদাতিক বাহিনী পাঠানোতে আগ্রহি হতে পারে কিনা সে চেষ্টাও বাজিয়ে দেখা হয়েছিল বলে অনুমান করা হচ্ছে।

    আবার অনুমান করা হয় যে এই একই অনুমানের কারণেই চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ভোর রাতে এসে হাজির  হয়েছিলেন। যতটুকু জানা যায় যে সরকার চীনের সাথে কোন প্রতিশ্রুতিতে যায় নাই। এতে বলা যায় অসন্তুষ্ট হয়েই চীনা মন্ত্রী মাত্র আধাঘন্টা মিটিং করে ঐ রাতেই চলে যান। কিন্তু এর মানে আবার আমাদের সরকার আইলিন লা বাকার-কেও কোনই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বা করেছেন তাও না। কিন্তু তাতে পুরা আসরের সব পক্ষগুলো পরস্পরের প্রতি পরস্পর সন্দেহ করে গেছেন, তা এড়ানো যায় নাই।
    বাংলাদেশের যেকোন রাজনীতি বা রাজনীতিবিদ তাতে সে সরকার বা বিরোধী যাই হোক এদের সবার জন্য যেটা নো-গো এরিয়া [no-go area] তা হল, সামরিকভাবে কোন দেশের পক্ষে বা বিপক্ষের সাথেই না জড়ানো; এটা করাই যাবে না। এমন ভিমরতি যেন কাউকে না ধরে। আর একটা দিক হচ্ছে চীন ও আমেরিকা প্রসঙ্গে তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ক্যাচালে আমাদের (লীগ বা বিএনপি) কোন দলই যেন এদুই দেশের মধ্যে একেকটা দেশের পক্ষে একেকটা দল তাদের এজেন্ট এর ভুমিকা না নিয়ে বসে। যেমন লীগ যদি এই সীমারেখা না মেনে আমেরিকার এজেন্ট হয়ে বসে তবে সিওর বিএনপি তখন চীনের এজেন্ট হয়ে বসবে – অথবা ঠিক এর উলটা বা ভাইস-ভারসা! তাই সীমারেখা লঙ্ঘনের পরিণতি কী হবে তা সবার আগে থেকে জানা থাকতে হবে; কেউ যেন না বলে আমি আগে বুঝি নাই। এই সুযোগ নাই।  আজকের শ্রীলঙ্কা এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। ক্ষমতায় থাকার লোভে তারা এই সীমারেখা ভেঙ্গে এখন পস্তাচ্ছে! এই সীমা ভাঙ্গার কাজ করা যাবে না।

    তাহলে ডোনাল্ড ল্যু এর ভারত সফরের অর্থ-তাতপর্য কীঃ
    আসলে পিটার হাসের শাহীনভাগ সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলীর  পরে হোয়াইট হাউজের রিভিউ মিটিংয় থেকে সবাই বুঝে যায় বার্মা দখল বা হাসিনা মানবাধিকার লঙ্ঘণের বিরুদ্ধে ততপরতার কথা তাদের যেভাবে ভাবা হয়েছিল সেভাবে আগায় নাই। মূল কারণ, বার্মা দখল এর চিন্তাটাই যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করে করা হয় নাই। তাই বার্মা দখলের খায়েসে তা চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকা এক মোক্ষম জবাব হবার পরিবর্তে তা উলটা হয়ে গেছে; তা হয়ে গেছে আমেরিকার তিন শত্রু চীন-ভারত-রাশিয়াকে কাছাকাছি ঘনিষ্ঠতায় এনে দেওয়া। যা বার্মা দখল নিয়ে ফারদার চিন্তা পরিকল্পনাটাকে অসম্ভব, অকেজো করে তুলেছে।
    এই কারণে,  ডোনাল্ড ল্যু ভারত এসেছিলেন ভারতকে ঐ ‘ঘনিষ্ঠতা’ থেকে আলাদা করা যায় কিনা তা যাচাই করতে। ডোনাল্ড ল্যু এর সাথে NDTV এর এক সাক্ষাতকার প্রচারিত হয়েছে। সেখানে ল্যু ব্যাখ্যা করছিলেন তার সফরে আসার কারণ ও কী তিনি ভারতকে অফার করতে চান।
    বুশ ২০০৬ সালের মার্চে প্রথম ভারত সফরে এসেছিলেন। গত ২০০১ সাল থেকে ওয়ার অন টেররের প্রধান এলায়েন্স পার্টনার হিশাবে ভারতকে আরও কাছে টেনে চীনের উত্থান ঠেকানোর কাজে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে আমেরিকা ব্যবহার করতে চাওয়ার খায়েস থেকে। তখন থেকে বুশ অফার করেছিলেন বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার জিএসপি এক্সপোর্ট সুবিধা ভারত পাবে তাতে। যে সুবিধাটা ট্রাম্পের আমলে ২০১৭ সাল থেকে তিনি তা নাকচ করে দেন। এরই এক্সটেনডেড অংশ হল ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশকেও   ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।  ল্যু বলছিলেন আগের দেয়া ঐ এক্সপোর্ট সুবিধা আবার ভাববার কথা। ল্যু এর কথাবলার স্টাইলও ছিল এপিজিং [appeasing] বা তেলানোর…। ওদিকে ল্যু এর সারকথা ছিল ভারত যদি আমেরিকার বার্মা দখলে আমেরিকার পক্ষে থাকে তাহলে সে কৃতার্থ হয়……।

    এনিয়ে সুবীর ভৌমিক কী বলেছেনঃ
    সেকথারই আরো বিস্তার পাওয়া গেছে সুবীর ভৌমিকের লেখায়। বলা যায় এই লেখায় সুবীর আমাদের অনুমানগুলোকেই যেন বাস্তবতা দিয়েছে।
    উপরে বার্মা দখল প্রশ্নে বাইডেনের যে এরিয়াল সাপোর্টের কথা বা নো ফ্লাই জোন বানানোর কথা বলেছিলাম,  সুবীরও সেই কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন। সুবীরের লেখার শিরোনাম – “ আমেরিকা কী বার্মা-কে বসনিয়া বানাবে? নো ফ্লাই জোনের পরিকল্পনায় ভারত সামিল হবে” [Will US do a Bosnia on Myanmar? No-fly-zone move may involve India]? ক্লিনটনের আমলে বসনিয়াকে রক্ষার জন্য তিনি বসনিয়ার আকাশের উপর এমন “নো ফ্লাই জোন” ঘোষণা করেছিলেন। বাবা অথবা সিনিয়র বুশ এবং ক্লিনটনও ততকালীন সাদ্দামের ইরাকের উপরে “নো ফ্লাই জোন” ঘোষণা দিয়ে সাদ্দামকে অকেজো করে দিয়েছিলেন।  তো বুঝা যাচ্ছে যে ল্যু এর ভারত সফরের উদ্দেশ্য হল, ভারতকে নো ফ্লাই জোন আরোপে আমেরিকার সাথে সামিল করে বার্মা দখল পরিকল্পনায় সম্ভাব্য জোটবদ্ধ করে নেয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই। যাতে “চীন-রাশিয়া-ভারত” এই জোট থেকে ভারতকে আলাদা করার চেষ্টা করে দেখা যায়। যদিও দিনকে দিন এটা পরিস্কার হচ্ছে যে বার্মা দখল পরিকল্পনা নিয়ে দুর্বল হোমওয়ার্কের কারণে এই আমেরিকান পরিকল্পনাটা পরিত্যক্ত হবার দিকে আগাচ্ছে!

    যদিও ভারতীয়দের মধ্যে এমন ধরণের একটা ভ্যানিটি ভেসে থাকতে দেখা যায় যেন লেখক (সুবীর) বলছে চান যে “দেখেছো চীন-আমেরিকার আমাকে নিয়ে কাড়াকাড়িয়ে আমার দাম কত উপরে উঠেছে?” – সুবীরের আলোচ্য লেখাটাও আসলে এদিক থেকে কোন ব্যতিক্রম নয়। আসলে ভারতের ইন্টেলেক্ট বা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই বলে একটা ভাবনা কার্যকর থাকতে দেখা যায় যে সে আর চীন বা আমেরিকা কোন একটার পক্ষে সহসা ঝুকবে না। কেবল নিজের দাম বাড়িয়েই চলবে যাতে এক পর্যায়ে এই উত্থিত দামকে ব্যবহার করে সে চীন-আমেরিকারও উপরে উঠে যেতে পারে!! এমন ভাবনার বিষয়টা অবশ্যই আবেগে টইটম্বুর বা স্বপ্নে পোলাও খাওয়ার মত, বিশেষত যখন আমার জানাই নাই যে পোলাও কী করে পেতে হয়, রান্না করতে হয় ইত্যাদি। গত ২০১৩ সালে চীনা বেল্টরোড উদ্যোগ প্ররকল্পের প্রথম সম্মেলনের সময়ে ভারতকে চীনা দাওয়াত দেওয়ার পরে ভারত এভাবে বলেই তা প্রত্যাখান করেছিল।

    তবে সেসব যাই হোক ভারত এখন একালে বাইডেন আর পুতিনের তুলনায় অনেক বেশি পুতিনের দিকে থাকতে মন বেধে ফেলেছে। যদিও মুখে বলছে রাশিয়ার উপরে ভারতের গোলাবারুদে ৬০% নির্ভরশীলতার কারণে সে এই পথ সে নিয়েছে। কিন্তু কার্যত দেখা যাচ্ছে রাশিয়ার সস্তা তেলের সরবরাহ পাওয়া এর পিছনের কারণ। এমন কী তৃতীয় দেশে তা পাচার করার সুবিধাও ভারত পাচ্ছে। যেমন খোদ বৃটেনের ঋষি সুনাক তিনিও গোপনে রাশিয়ার তেল কিনছে ভারতের মাধ্যমে। আসলে খারাপ গ্লোবাল অর্থনীতি অ এতে ধস নামার সময়ে সস্তায় রাশিয়ান তেল পাওয়াকে সকলেই বিশাল রিলিফ বলে গণ্য করছে!! আর সাধারণভাবে ভারত আবার  আমেরিকার ঘনিষ্ট হবে কিনা সেই সিদ্ধান্ত ভারত তলে রেখেছে – ২০২৪ সালের নভেম্বরের নির্বাচনের পরে, দেখে শুনে তখন তারা সিদ্ধান্ত নিবে!

    সবশেষে বলি, লেখা অনেক বড় হয়ে গেছে। তাই সংক্ষেপে।
    তাহলে কী ল্যু এর পিছু হটা বা  বিশেষ করে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকার হাসিনাকে টলাতে ফেল করার পর ল্যু যা প্রলেপ দিয়ে গেলেন যেটাকে অনেকেরই কল্পনায় ধরা আছে দেখা যাচ্ছে। যে কল্পিত  হাসিনা ও ল্যু এর মধ্যে কোন রফা হোক আর নাই হোক আর তাতে আমেরিকার সাথে বিএনপির সম্পর্কের মধ্যে এখন কোন দুরত্ব বোধ আমরা কেউ দেখতে পাই আর নাই পাই  – আগামিতে সম্ভবত মাস খানেকের মধ্যে ল্যু বা বাইডেন প্রশাসনে আবার পল্টি আসবে। প্রথম ধারা আবার জেগে উঠার সম্ভাবনাই বেশি নানান কারণে।  মানে মানবাধিকারকে কেন্দ্র করে নিয়ে আগের মতই বাইডেন প্রশাসন আবার স্পষ্ট করে সোচ্চার হবে, এমন অনুমান করছেন অনেকেই!!

     

    লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সকালঃ ০৭ঃ৩০

     

  • দুবছর যেতেই বাইডেনের নীতি-পলিসির গুটিয়ে যাওয়া, চীনের সাথে নয়া আপোষের পথে 

    দুবছর যেতেই বাইডেনের নীতি-পলিসির গুটিয়ে যাওয়া,
    চীনের সাথে নয়া আপোষের পথে

    গৌতম দাস
    ১৫ নভেম্বর ২০২২  রাত ০০ঃ১৫

    https://wp.me/p1sCvy-4k2

        কয়েক ঘন্টা আগের ছবিঃ US President Joe Biden, left, arrives with Chinese President Xi Jinping for a meeting on the sidelines of the G20 summit meeting, November 14, 2022, in Bali, Indonesia [Alex Brandon/AP Photo]

    আগে কিছু বিষয়ের সংজ্ঞা দিতে দিতে আজকের কথা শুরু করব। পশ্চিমা দেশ বা পশ্চিম অথবা ইংরাজিতে West – এসব শব্দ বলতে একালে বুঝতে হবে সারা ইউরোপ ও সাথে আমেরিকাও। সাধারণত, কালচারাল অর্থে অবশ্য এনিয়ে আরেকটা শব্দও আছে – ‘পাশ্চাত্য’। অর্থাৎ পশ্চিমা সভ্যতা বলতে যেমন ‘পাশ্চাত্য সভ্যতা’ শব্দটা এভাবে, ব্যবহার করে অনেকে। ঠিক পশ্চিম এর বিপরীত শব্দ পূব তেমন, পূর্ব বা এশিয়ান কালচার বা সংস্কৃতি বুঝাতে অরিয়েন্টাল [oriental] বা বাংলায় ‘প্রাচ্য’ সভ্যতা বলার চল আছে। মানে পশ্চিম বা ইউরোপের বিপরীতে পুব-কে প্রাচ্য বা এশিয়া বলে বুঝানো।
    ওদিকে ভৌগলিকভাবে আটল্যান্টিক মহাসাগর ইউরোপ আর আমেরিকার মাঝে অবস্থিত  হয়ে থেকে এদেরকে দুই পাড়ে বিভক্ত করে রেখেছে। এমনভাবেও অনেকে ব্যাখ্যা করে থাকেন। এই অর্থে তাই ট্রান্স-আটল্যান্টিক মানেও পশ্চিম; যার অর্থ হল ইউরোপ আর আমেরিকার মাঝে আটলান্টিক মহাসাগরটা যেন অবস্থিত নাই বরং তারা লাগোয়া বা পাশাপাশি – এই কল্পনাতে তৈরি শব্দটা হল ট্রান্স-আটল্যান্টিক [trans-atlantic]। তাই ইউরোপ আর আমেরিকাকে অন্তত এথনিক কালচারাল অর্থে তারা এক, এভাবে একসাথে বুঝাতে অনেকে “আটল্যান্টিক” শব্দ দিয়ে সেটা বলে বুঝাতে চায় অনেকে। যেমন, সামরিক জোট ন্যাটো [NATO] এর ভিতরের ক্যাপিটাল  ‘A’ এই অক্ষরটা আটল্যান্টিক বুঝাতে ব্যবহার হয়। মানে ন্যাটো হল ইউরোপ আর আমেরিকার মিলিত সামরিক জোট; তাই এটা এক আটল্যান্টিক জোট। আবার ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’ বলে অনেক কিছুরই নাম রাখা হয়; যেমন এ’নামে এক থিঙ্ক ট্যাংক আছে। আবার একইভাবে, সারা দুনিয়ার জন্য নির্ধারক ও সবচেয়ে বিখ্যাত হিটলারবিরোধী ১৯৪১ সালের হবু জোটের পক্ষে প্রথম যে চুক্তি হল সেটার নাম আটল্যান্টিক চার্টার ট্রিটি বা ইংরাজিতে Atlantic charter Treaty । যেটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে বিরোধী এলাইড ফোর্স বা ‘পক্ষ শক্তি’ নামে জোট গড়ে তোলার লক্ষ্যের পিছনের ভিত্তি, এমন এক প্রধান চুক্তি। এটাই ছিল হিটলারের ‘এক্সিস ফোর্স’ নামে জোটের বিরোধী জোট।

    আবার আমেরিকান ভুমির মূল এথনিক  জনগোষ্ঠি অর্থে  জাতি [নেশন], এই অর্থে বিচার করে বললে, এখনকার আমেরিকা এটা ইউরোপের কোন এথনিক জনগোষ্ঠিরই জন্মভুমি ছিল না। বরং ১৬০৭ সাল থেকে বৃটিশ-ফ্রেঞ্চ-ডাচ ইত্যাদি কলোনিদখলদারেরা তাদের জন্মভূমি ইউরোপ থেকে গিয়ে আমেরিকাকে কলোনিদখল করে নিজেদের ভুমি হিসাবে দাবি করে সেখানেই থেকে যাওয়া ও স্থায়ী বসবাস শুরু হয়েছিল। আর এতে সেখানকার মূল আদিবাসিদের উতখাত বা তাদের আরো গহীন বনে চলে যেতে ঠেলে বাধ্য করে দেয়া হয়েছিল। আর এতেই ওসব আদিবাসিদেরকে পশ্চিমারা নাম দিয়েছিল “রেড ইন্ডিয়ান” বা  তাদেরকে এই নামে ডাকা চালু হয়েছিল। সেই থেকে ইউরোপের বা পশ্চিমা দেশান্তরি বা মাইগ্রেন্টরা [migrants], এরাই যেন আমেরিকার মূল বাসিন্দা এমন হয়ে বসবাস শুরু করেছিল। ফলে সেই থেকে আমেরিকা কার্যত ইউরোপীয় মাইগ্রেন্টদের শহর হয়ে যায়। একইভাবে ঠিক যেমন অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড অথবা কানাডা এই দেশগুলো ইউরোপীয়দের হাতে কলোনিদখলের পরে এখন এরা মাইগ্রেট করা ইউরোপীয়দেরই শহর -যেন নিজস্ব দেশ- এমন হয়ে গেছে।

    কেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসনের নীতি-পলিসিকে এত পুরানা কথাঃ
    কেন একালের প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসনের নীতি-পলিসিকে ব্যাখ্যা করতে এত সব পুরানা কথাকে তুলে আনছি; এর কারণ হল ২০২১ সালে বাইডেনের ক্ষমতাসীন হলে পড়ে সে নীতি-পলিসি নিয়ে তিনি এসেছিলেন সেটা আসলে এক আটল্যান্টিক ফর্মুলা। যার আরেক নাম ‘সাদা ককেশীয় শাসন’ চালু রাখার স্বার্থ।
    তাই বর্তমানের প্রাসঙ্গিক কথাটা হল, বাইডেনের আমলে তিনি কার্যত যে ‘পশ্চিম’ এর সংজ্ঞার উপর নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন যেটা হল প্রধানত -হোয়াইট সুপ্রীমিস্ট -, অথবা সাদা ককেশীয় এথনিক আইডেনটিটি এক ততপরতা। আর মূলত এসব পরিচয় খাড়া করার উদ্দেশ্য একটাই তা হল, চীনা অর্থনৈতিক উত্থান যা আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে যা, ১৯৪৫ সালের পর থেকে গত ৭৭ বছর ধরে রাজ [rule] করে এসেছে ও এখন ক্লান্ত হয়ে শেষ প্রান্তে ঠেকেছে – এই উত্থিত চীনা অর্থনৈতিক উত্থান-আগমনকে আর যতদিন সম্ভব ঠেকিয়ে দেয়া, অন্তত দেরি করিয়ে দেয়া সম্ভব – এরই এক মরিয়া প্রচেষ্টা।
    তাই একালে পশ্চিমা দেশ বা পশ্চিম অথবা ইংরাজিতে west শব্দের এক বিশেষ অর্থ হয়েছে যে যারা গত প্রায় ছয়শ ধরে দুনিয়াকে কলোনিদখল করে শাসন করে আসছিল আর সুনির্দিষ্ট করে ১৯৪৫ সাল থেকে  আমেরিকার নেতৃত্বে পরিচালিত হতে শুরু করেছিল ; যার প্রথম ও সবচেয়ে ইতিবাচক এক নয়া পদক্ষেপ ছিল  চলে আসা পুরানা সাড়ে তিনশ বছরের কলোনিদখল ব্যবস্থাকে আমেরিকা তুলে দিয়েছিল – এরাই সেই থেকে নয়া ‘পশ্চিমা ব্যবস্থা’।

    তবে একালে বাইডেন যে নয়া নীতি-পলিসি সাথে যোগ করেন এই ততপরতার পরিচয় হল এটা এখন ‘সাদা ককেশীয় এথনিক আইডেনটিটি’ পুনর্বার খাঁড়া করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ এর) সাথে গাটছাড়া বেধে সারা পশ্চিমাদের ‘ইউক্রেনের যুদ্ধে’ সারা দুনিয়াকে নামানো। তাদের অনুমান ছিল ইউক্রেনকে প্রক্সি বা ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে তারা পশ্চিমারাই ইউক্রেনের পিছনে থেকে পুতিনের রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়ে রাশিয়াকে ধংস করতে সক্ষম হবে। এছাড়াও তাদের সহ-অনুমান ছিল যে এতে রাশিয়ার সমর্থনে একসময় নিশ্চয় চীন রাশিয়াকে ‘সামরিক সমর্থন’ করে পাশে দাঁড়িয়ে যাবে। আর এভাবেই তারা চীনকেও এই যুদ্ধে জড়িয়ে চীনা অর্থনৈতিক উত্থানকে গলা টিপে মেরে ফেলতে পারবে। যার ফলাফল হতে পারে, তাদের গত ছয়শ বছরের সাদা ককেশীয় এথনিক আইডেনটিটির শাসন আরো অন্তত শ বছর চালিয়ে যেতে পারবে! এই ছিল আশা।

    কী করে বুঝব তিনি পরাজয় স্বীকার করছেন, তোওবা পড়া শুরু করেছেনঃ
    বাইডেনের শাসনের প্রথম দুবছরে মাপার আরেক সহজ উপায় হল আমেরিকান মিড-টার্ম ইলেকশন; যা গত সপ্তাহে ৮ নভেম্বর এই নির্বাচন হয়ে গেল। তবে বাইডেন এটাকে নিজ পরাজয় ঢাকার উপায় হিসাবে ব্যবহার করতে নেমে গেছেন, নভেম্বরের শুরু থেকেই। যদিও এমনিতেই যেকোন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট তার শাসনের মিড-টার্মে মানে চারবছর শাসনের দুবছর পুর্তিতে আগের দুবছরে গৃহিত নীতি-পলিসির রিভিউ বা পুনঃমুল্যায়নের সুযোগ নিয়ে থাকেন।  সেটা বাইডেনের সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে হয়ে যাচ্ছে একেবারে উলটা গান। মানে চীনবিরোধী একে পিষেমারার নীতির বিপরীতে একেবারে উলটা সহযোগিতামূলক সহ-অবস্থান; মানে পরস্পরকে বিকাশ-বৃদ্ধিতে জায়গা করে দেয়া; এরই প্রাইমারি আলাপ করতে যাচ্ছেন বাইডেন।    কিভাবে?

    এর পরের সপ্তাহ মানে আগামিকাল থেকে, ১৫-১৬ নভেম্বর ইন্দোনেশিয়ার বালি শহরে এবারের G20 সম্মেলন মানে, ১৭তম জি২০ [G20 Countries] বার্ষিক স্মমেলন অনুষ্ঠান শুরু হবে।  আর এই সম্মেলন উপলক্ষ্যে এরই আড়ালে মানে এই সম্মেলনের  সাইড লাইনে বসে বাইডেন সরাসরি চীনা প্রসিডেন্ট শি জিনপিং এর সাথে বৈঠকে বসবেন তা ঠিক করেছেন। এই পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল জর্মান চ্যান্সেলার ওলাফ শলৎজ [Olaf Scholz] এর গত পাঁচ নভেম্বর ২০২২ এর চীন সফর থেকে; যেখানে তিনি বলেছিলেন তিনি G7 group দেশগুলোর প্রতিনিধি হিসাবে প্রেসিডেন্ট শি এর সাথে কথা বলতে গিয়েছেন। কিন্তু G7 এর পক্ষ থেকে জর্মানিই কেন?  এর জবাব হবে সম্ভবত জর্মানিই হল G7 গ্রুপের একমাত্র দেশ যে তার আগের চ্যান্সেলার মার্কেল এর কৃতিত্ব হিসাবে ইউরোপের বাকি সবার আগে চীনবিরোধী না হয়ে উলটা চীনকে জর্মানির অর্থনৈতিক পার্টনার হিসাবে ইন্ডাস্টিয়াল সহযোগিতা সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। আর পরে সেটাই গত দুবছর ধরে বাইডেনের সাদা শাসন বাচিয়ে রাখার নীতি-পলিসির কারণে ভেঙ্গে পড়ার দশায়।  এখানে বলে রাখি যে, G7 বলতে Canada, France, Germany, Italy, Japan, UK, and US এসব রাষ্ট্রগুলোর জোট বুঝানো হয়।

    আমার এর আগের লেখায় শিরোনাম করেছিলাম – “মিডটার্মঃ ইউক্রেন নিয়ে বাইডেনের পশ্চিমা-অপসারণ কী শুরু”। সেখানে পশ্চিমের তিনটা রেফারেন্সের কথা উল্লেখ করেছিলাম; যার একটা ছিল জর্মান চ্যান্সেলার শলৎজ এর চীন সফর। রয়টার্সের রিপোর্ট  প্রথম আলোতে অনুবাদ করে ছাপা রিপোর্টে শলৎজের এই সফরে আকাঙ্খা প্রসঙ্গে; যার শিরোনাম হল – ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়াকে চাপ দিতে চীনকে পাশে চায় জার্মানি।
    দ্বিতীয় রেফারেন্স দিয়ে লিখেছিলাম বাইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন এর মন্তব্য যেটাতেও রয়টার্সের শিরোনাম হল, ব্লিঙ্কেন বলেন “চীনের সাথে সমন্বয়ে এক তালে [need to align] থাকাটা জরুরি এসম্পর্কে  G7 group পরিস্কার” [Blinken says G7 is clear-eyed about need to align on China]। অর্থাৎ বিগত দুবছরের অনুসরণ করা বাইডেনের নীতি-পলিসি  এখন ময়লার বাক্সে ফেলে বাইডেন-ব্লিঙ্কেন আপোষের জন্য তৈরি হচ্ছেন। অথচ এই বক্তব্য বাইডেন প্রশাসনের আগের দুবছর ধরে দেয়া চীনকে একঘরে করার আকাঙ্খায় দেয়া বক্তব্যের বিপরীত।
    তৃতীয় রেফারেন্স দিয়েছিলাম, এনিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট এর শিরোনাম আমেরিকা ইউক্রেনের কানে কানে বলেছে সে যে রাশিয়ার সাথে আপোষ করতে চায় এমন ইঙ্গিত প্রদর্শন করে চলতে [U.S. privately asks Ukraine to show it’s open to negotiate with Russia]। অর্থাৎ সবমিলিয়ে এক পরিস্কার আপোষের বার্তা যে জি৭ গ্রুপ নামে “সাদা শাসন ওয়ালারা” তাদের চীনবিরোধিতা ত্যাগ করে আপোষের জন্য রেডি। তবু এত সত্য কথা বলা তাদের জন্য একটু অস্বস্তিকর। তাই যেন একটু আড়াল নেয়া যে এই আপোষের পথে তারা বাড়ছেন যেহেতু এক গ্লোবাল মহামন্দা (recession) আসন্ন সেই বিবেচনায়!
    তাই চতুর্থ রেফারেন্স হিসাবে বলেছিলাম যে,  বলেছিলাম যে “আল জাজিরা এবার এই প্রথম পশ্চিম থেকে
    তারা দুরত্ব রচনা করতে চাইছে। তাদের এ’প্রসঙ্গে  রিপোর্ট এর শিরোনামঃ  ইউরোপের মুদ্রাস্ফীতি এতই চড়া যে সম্ভবত এবার তারা ইউক্রেনের সঙ্গে কাপাকাপি শুরু করবে …as inflation rises, could European support for Ukraine wobble?  আর সাথে ভিতরের খবরে লিখছে, এসব কিছুই আগামি শীতে ফকফকা পরিস্কার এক পরীক্ষা হয়ে যাবে!”।

    বাইডেন-শি বৈঠক, জি২০ গ্রুপের ইন্দোনেশিয়ায় বৈঠকের উসিলায় সাইড লাইনেঃ
    এখন জি২০ গ্রুপের আসন্ন ইন্দোনেশিয়ায় বৈঠক উপলক্ষ্যে বাইডেন আরো খোলাখুলিভাবে চীনের সাথে আপোষের কথা আগিয়ে নেওয়ার কথা বলছেন।  যেমন, সির সঙ্গে অল্প ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে বললেন বাইডেন – প্রথম আলো।  এই খবরটা অরিজিনালি এএফপি এর যা প্রথম আলো অনুবাদ করে ছেপেছে। কিন্তু ঠিক কী প্রসঙ্গকে মাথায় রেখে বাইডেনের এমন অল্প আগের শত্রুর প্রতি এমন মধুর পিঠে হাত বুলানো ভাষণ?
    সেটা আমরা জানতে পারি রয়টার্সের আরেক রিপোর্ট থেকে। সেখানে শিরোনাম হল – “চীন-আমেরিকাঃ আসন্ন শি-বাইডেন বৈঠকের আগেই সবার চোখ “রেড লাইন” এর উপরে” [China-U.S. ‘red lines’ in focus ahead of expected Xi-Biden meet] ।  এখন এখানে  -রেড লাইন- সেটা আবার কী?
    আসলে তাদের আলোচনা অনেক দুর-ই আগিয়ে গেছে। আগে বাইডেন বলত চীন নাকি গ্লোবাল অর্ডারের আইন শৃঙ্খলা রীতিনীতি কিছু মানে না। না, বাইডেন এখন সেখান থেকে সরে গিয়েছেন। আর বাইডেনের নয়া অবস্থান হল, শি-বাইডেন এরা উভয়েই পরস্পরের কাছে বলে নিবেন কোথায় কতদুর অপর পক্ষ যেতে পারবে বা পারবে না, কথা তুলতে পারবে না ইত্যাদি – যেটা বিপক্ষের জন্য সেনসেটিভ। যেমন যদি ধরি তাইওয়ান ইস্যু। চীন বলবে, এক চীন নীতি মানতে হবে। যেটা আমেরিকা, ভারত সহ প্রায় সব দেশই ফরমালি মানে কারণ, তাদের সাথে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক  এর উপরে দাড়িয়েই অনেক আগেই স্থাপন হয়ে আছে। আর সেখানে তাদের চীনকে দেয়া স্বীকৃতি মতে তাইওয়ান চীনের অংশ বলে তারা মনে করে। কাজেই এখন তাইওয়ানের পক্ষে দাঁড়িয়ে চীনকে বিরক্ত বা খোচাখুচি করা এসব বন্ধ করতে হবে। যার মানে তাইওয়ান নিয়ে ইচ্ছামত খোচাখুচি করা নতুন ইঙ্গিত দেয়া এইটা  – রেড লাইন এলাকা। তাই, রেড লাইন তালিকায় সেটা উল্লেখ থাকবে। অর্থাৎ অযথা একাজে খোচাখুচিতে সময় নষ্ট না করে পরস্পর উভয়ের গঠনমূলক কাজে ব্যায় করবে।   তবে কী কী রেড লাইন তালিকায় উঠবে মূলত তা নিয়ে আপোষ আলোচনায় সেটা সাব্যস্ত হবে মনে হচ্ছে!!

    তাহলে বুঝা যাচ্ছে চীন-আমেরিকা আপোষ আলোচনা আগিয়ে নিবার জন্য অনেক প্রস্তুতি ও ফর্মুলা নিয়ে কাজ আগিয়ে রেখেছে। হা ঠিক তাই।  তবে “ভুল বুঝাবুঝি” সরানো বা সরিয়ে ফেলা একথা  বা এই keyword ধরেই যে আপোষটা হবে তা প্রায় স্পষ্ট। যেমন বাইডেন একাই বলেন নাই যে  “সির সঙ্গে অল্প ভুল বোঝাবুঝি” রয়েছে। পালটা এমনকি চীনও একই কথা বলেছে।  যেমন চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, আমেরিকার উচিত হবে চীনের সাথে এক্সঙ্গে কাজ করা যাতে ভুল বুঝাবুঝি ও ভুল বিচার-মুল্যায়ন এড়ানো যায়।
    চীনা মুখপাত্র আরো বলেন, “চীন আমেরিকার সাথে শান্তিপুর্ণ সহ-অবস্থান বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদিও তাইওয়ান প্রশ্ন আসলে চীনাস্বার্থের কেন্দ্রে এটা মনে রাখতে হবে”।

    The United States should work together with China to avoid misunderstandings and misjudgments, a Chinese foreign ministry spokesman said on Thursday, when asked about reports of the meeting. For his part, U.S. President Joe Biden said on Wednesday he was not willing to make any fundamental concessions when he meets with counterpart Xi Jinping.
    China is committed to realize peaceful co-existence with the United States, but the Taiwan question is at the core of its interests, the spokesman, Zhao Lijian, said at a regular briefing in Beijing.

    আসলে, বাইডেন ও তাঁর ইউরোপীয় বন্ধুরা “সাদাবাদি” হয়ে রাশিয়ার সঙ্গে লাগতে গিয়ে উলটা নিজেরাই এখন এমন ছেড়াবেড়া অবস্থায় পড়েছে যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার পুতিনকে মানানোর জন্য তাদের হাতে এখন একটাই শেষ অস্ত্র। তা হল,  চীনকে ছাড় দিয়ে হলেও  কিছুটা পক্ষে টানা। যাতে সেই চীনকে দিয়ে ক্ষুব্ধ পুতিনকে তারা ঠান্ডা করতে সক্ষম হতে পারে। যা দিয়ে একটা নুন্যতম কার্যকর সম্পর্ক যেন গড়ে তোলা যায়।  এব্যাপারে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, পুতিন অবশ্যই চীনের অনুরোধ রাখার চেষ্টা করতেও পারে। কিন্তু সেটা আগামি জানুয়ারির ১৫ তারিখের পরেই। যেন -৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে ইউরোপ বসবাসের জন্য কেমন স্থান সেটা দিয়ে তাদেকে শিক্ষা দেয়া যাতে আর কখনও পরিণতি না বুঝে কেউ এদিকে যেন পা না বাড়ায়!!

    তাহলে শি-বাইডেন  এর হবু বৈঠকের উপর আমেরিকার মিড-টার্ম নির্বাচনের কী কোন প্রভাব নাইঃ
    অবশ্যই আছে। এখন পরররযন্ত প্রকাশিত ফল অনুযায়ী বাইদেনের ডেমোক্রাট দল কংগ্রেস বা সংসদে হেরে গেছে। মানে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। তবে সিনেট বা সংসদের উচ্চকক্ষে শেষ পর্যন্ত নিজ ডেমোক্রাট দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৫০-৪৯) এভাবে  ফিরে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যদিও একটা আসনের ফলাফল প্রকাশিত হয় নাই এখনও। তবু সেই আসনের ফলাফল যেদিকেই যাক সিনেটে ডেমোক্রাটেরা সংখ্যাগরিষ্ঠায় থেকে যাবে। এই খবরটা শোনার পরে বাইডেনের প্রতিক্রিয়া যা ছিল সেখানেই বাইডেনের সব মনোভাব লুকিয়ে আছে। তিনি বলেছেন তিনি শক্তিশালী বাইডেন বলে অনুভব করছেন।   দেখেন মিডিয়া রিপোর্ট।
    প্রেসিডেন্ট বাইডেন রবিবার বলেন, মিড-টার্ম নির্বাচনে ডেমোক্রাট দলের আশা করা হয় নাই [unexpected] এমন জয়ে প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে বৈঠকে তাকে এক শক্তিশালী হয়ে বসতে [stronger position] সাহায্য করবে [US President Joe Biden said Sunday that the Democrats’ unexpected midterm election successes sent him into crunch talks with China’s Xi Jinping in a stronger position. আর ওদিকে প্রায় একই ভাষ্য নিয়ে ব্লুমবার্গের (Bloomberg) রিপোর্টে শিরোনাম হল, Biden Says Senate Victory Gives Him ‘Stronger’ Hand with Xi।  মানে টা হলে এই সিনেটে বিজয় নাহলে তিনি প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে আলোচনায় বসতেন ঠিকই কিন্তু নিজের মনে প্রশ্ন থাকত যে তিনি তো আমেরিকান সংসদের উচ্চ বা নিম্নকক্ষের সমর্থহীন এক প্রেসিডেন্ট। ফলে ছোট মনে হত নিজেকে।  আর সবচেয়ে বড় কথা নির্বাচনের সংসদের কোন কক্ষেই যে তিনি বিজয়ী হতে পারছেন না এটা তিনি মেনেই নিয়েছিলেন।

    তাহলে কীসের ভিত্তিতে বাইডেনের দল গোহারা হারতে যাচ্ছেন এই জল্পনা গড়ে উঠেছিল? এর জবাব দিয়ে এক বিশেষণ রিপোর্ট করেছে রয়টার্স যার বাংলা অনুবাদ ছাপা হয়েছে প্রথম আলোতে। যার সারকথা হল, এই সমস্যাটা তৈরি করেছেন খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প-ই। মধ্যবিত্ত ভোটারের ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব বা তার রাজনীতি ও কাজ পছন্দ করেন না। তাই যেসব প্রার্থী ট্রাম্পের বেছে নেয়া বা দেয়া বলে ভোটারেরা জেনেছেন তারাই প্রার্থীরাই আসলে হেরে গেছেন। অর্থাৎ রিপাবলিকান দলের পক্ষে জনস্রোত থাকলেও (যেটা বাইডেনও মেনে নিয়েছিলেন আমরা দেখতে পাচ্ছি) ব্যক্তি ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব সবকিছু উলটে দিয়েছেন। এর মানে হল আগামি ২০২৪ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান নমিনেশন পাবার ক্ষেত্রে এঘটনা এক শক্ত রেফারেন্স হয়ে বাদা হয়ে সামনে উঠে আসবে। যার অর্থ হল, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প বা বাইডেন কেউ না, বরং  নয়া কোন প্রার্থিরই সম্ভবত প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে দেখব আমরা। আর সেই সাথে সাদাবাদিদের আন্দোলন হতে পারে বলে যে আশঙ্কা আমেরিকায় উঠেছিল তা এখন অনেকটাই ম্রিয়মান হয়ে যাবে। সারকথায়, আমেরিকান মধ্যবিত্তের পছন্দই ট্রাম্পের উত্থান বা সাদাবাদি সুপ্রিমিস্টদের উত্থান ঠেকায় দেবার ক্ষমতা রাখে, সেই ইঙ্গিত-ই আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি!!

    শেষ কথাঃ  স্থানীয় বা বাংলাদেশ প্রসঙ্গ;  বাইডেন-শি এর আপোষ আলাপ আর তা থেকে  ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি আসা মোটেও আর অসম্ভব নয়। সেটাই ফুটে উঠছে। আবার আমেরিকার মিড-টার্মের ফলাফল যা এসেছে তা আর যাই হোক এথেকে বাংলাদেশের রাজনীতি প্রভাবিত হবার কোন সম্ভাবনাই নাই। সরকারবিরোধী আন্দোলন থেমে যাওয়ারও কোন সম্ভাবনা নাই। মানবাধিকার প্রশ্নে, যেমন গুম খুন অপহরণ বা উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি ইস্যুতে পশ্চিমা দেশগুলোর থেমে যাওয়া বা পথ পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনাই নাই।   বরং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সমাপ্ত হয়ে গেলে সরকারের এই যুদ্ধের আড়ালে নিজের সরকার পরিচালনার ব্যার্থতা আড়ালের যে চেষ্টা আছে তা আরো উন্মোচিত হয়ে পড়তে পারে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • মিডটার্মঃ ইউক্রেন নিয়ে বাইডেনের পশ্চিমা-অপসারণ কী এখন শুরু হবে

     

    মিডটার্মঃ ইউক্রেন নিয়ে বাইডেনের পশ্চিমা-অপসারণ কী শুরু

    গৌতম দাস
    ০৯ নভেম্বর ২০২২  মধ্যরাত ০১ঃ০০

    https://wp.me/p1sCvy-4iM

     

                                                                                    Russia news: Rattled Putin warns US ‘entering Ukraine

     

    মঙ্গলবার, আট নভেম্বর ২০২২। আমেরিকার ৮ নভেম্বর শুরু হবে আজ আমাদের মধ্যরাত থেকে। এরপরেই আমেরিকায় শুরু হবে তাদের মধ্যবর্তি নির্বাচন মানে, মিডটার্ম ইলেকশনের ভোটাভুটি। যদিও মিডটার্ম বলতে তা প্রেসিডেন্ট বাইডেনের চারবছরের মেয়াদের এতে প্রথম দুবছর বা মধ্যমেয়াদ[midterm] তিনি পার করলেন, এটাই বুঝায়। এই অর্থে তাই মিড [mid] বা মধ্য। কিন্তু এদিন যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সেটা হল আসলে ৪৩৫ আসনের কংগ্রেস (আমেরিকান সংসদ) এর সব আসনেরই নির্বাচন। শুধু তাই না এটা একই সাথে আমেরিকান সিনেট বা উচ্চকক্ষেরও নির্বাচনও বটে। তবে সেখানে মোট ১০০ আসনের সিনেটের কেবল এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হবে; মোটা দাগের হিসাবে এবার মাত্র ৩৫ আসনে নির্বাচন হবে।

    এখন এই ভোটের ফলাফল কেমন হতে পারেঃ
    ফলাফল নিয়ে আগাম-অনুমানি পোল-সার্ভে, তা বহু আগে থেকেই অনেকগুলোই পরিচালিত হয়ে আসছে। সেই নির্বাচনি সার্ভে থেকে প্রকাশিত অনুমিত-ফলাফল বলছে বাইডেনের ডেমোক্রাট দল গোহারা হেরে যাবে। অর্থাৎ কংগ্রেস ও সিনেট দুই কক্ষেই বাইডেন সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবে।  আর এমন পরিণতি, তা মূলত বাইডেনের অর্থনৈতিক পারফরমেন্সের কারণে; অন্যভাবে বললে আমেরিকান মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের জীবনমান বা লিভিং স্টান্ডার্ডকে বাইডেন নিচে থেকে আরো নিচে নিয়ে ফেলেছেন সেকারণে। তবে এটা ছাড়াও দ্বিতীয় কারণ আছে যে, আমেরিকান ডলারের মান বা উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে ফেডারল রিজার্ভের চেয়ারম্যান, তাঁর একশনে সুদের হার টানা ছয়বার লাগাতর বাড়িয়েও এতে লাগাম টানা যায় নাই। বরং সবমিলিয়ে আগামি বছর (২০২৩) একটা গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা [recession] একেবারেই আসন্ন – ওয়ার্ডব্যাংক এনিয়ে ইতোমধ্যেই ব্যাপক সরব!  ওদিকে আগে ট্রাম্পের শেষ আমলে তাঁর খামোখা জাতিবাদি জিদের বশে আরোপিত চীনা পণ্যের উপর যে বাড়তি শুল্ক (২৫% – ৬৬%)  আরোপ করা হয়েছিল বাইডেনও সেটা পলিসিই চালু রেখেছিলেন। আর এরই কার্যকর ধাক্কার ফল আসতে শুরু করেছিল বাইডেনের ক্ষমতার প্রথম ছয়মাস থেকেই লাগাতরভাবে।

    হাউজহোল্ড এপ্লায়েন্স [household appliance] – একথার মানে, আমেরিকান মধ্যবিত্তের সাধ্যের মধ্যে কেনা যায় এমন – ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, কুকার-ওভান বা মাইক্রোওভান ধরণের পণ্য। যেগুলো, মূলত চীন থেকে আমেরিকায় আমদানিকৃত পণ্য হয়ে থাকে। আর এসবের উপরেই ট্রাম্প আমলে মূলত এই বাড়তি শুল্ক লাগু করা হয়েছিল। আর তা থেকে বাইডেন প্রশাসনের ততপরতা শুরু হতেই বিমুখ হয়ে যায় আমেরিকান সব-ধরণের মধ্যবিত্ত। অথচ ভোটের বাজারে যারা ভোট দিতে আসেন তাদের এক বড় অংশই মানে ‘কার্যকর’ ভোটার হল এই মধ্যবিত্তই। কারণ অনেকবছর থেকেই আমেরিকান নির্বাচনি ট্রেন্ড হল, অন্যশ্রেণী থেকে ভোট দিতে আসা লোকের সংখ্যা আরো অনেক কম হয়ে থাকে।

    ইন্ডিপেন্ডেন্ট  বা স্বাধীন প্রভাবমুক্ত এনালিস্টদের অনুমান বাইডেনের ডেমোক্রাট দল এবার রেকর্ড তৈরি করে হারবে। তাই সিনেট বা কংগ্রেস এদুই কক্ষের কোথাও তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় থাকবে না। যার সোজা ফলাফল হবে বাইডেন অবশ্যই তার মেয়াদের বাকি দুবছরই বিনাবাধায় প্রেসিডেন্ট থেকে যাবেন; কোন প্রভাব পড়বে না। এমনকি আগের মতই প্রেসিডেন্টে হিসাবে তাঁর নির্বাহি ক্ষমতাবলে যেকোন আইনও জারি করে যেতে পারবেন। কিন্তু যেখানে বিলে অংশত বা পুরাটাই অর্থবিল থাকবে মানে যেসব আইনের মধ্যে কোন অর্থবরাদ্দ সংক্রান্ত অংশ আছে সেসব ক্ষেত্রে আইন পাস করতে চাইলে তা আগে ঐ অংশের জন্য  সিনেট এবং কংগ্রেস এদুই জায়গা থেকেই তা পাস করিয়ে নিতে হবে। অর্থাৎ সেগুলো আর পাস হতে হলে এখন রিপাবলিকানদের ইচ্ছা মুখাপেক্ষি হতে হবে বাইডেনকে। ফলে পাস না হবার সম্ভাবনা বাড়বে। যেমন চাইলেই ইউক্রেন যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কিকে (তার সীমাহীন আকাঙ্খা মিটাতে) দেয়া বাইডেনের অর্থবরাদ্দ এবার রুদ্ধ হয়ে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি।

    অর্থাৎ অন্যদিক থেকে বললে, এতে ইউক্রেন যুদ্ধ এবার বন্ধ হবার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হচ্ছে। অর্থাৎ ইউক্রেনে অর্থ ঢেলে বাইডেনের এই যুদ্ধ চাঙ্গা রাখার যুগের এবার একটা পরিসমাপ্তি ঘটতে পারে। এভাবে সবদিক থেকেই সব ফ্যাক্টরগুলো এই অভিমুখেই সচল হচ্ছে।  যদিও এমনিতেই একদিকে যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের নিজস্ব অর্থনীতিক ততপরতা স্থবির অবস্থায় ফলে সেজন্য ঘাটতির মুখ্য অর্থ সরবরাহগুলো করতে হচ্ছে বাইডেনকে; অন্যদিকে যুদ্ধের ব্যয়বহণ ও বিশেষ বিশেষ অস্ত্র সরবরাহ – সেটাও বাইডেনকেই করতে হচ্ছে। কিন্তু তবু তাতে প্রেসিডেন্ট জেলেন্সকির মুখের হা বন্ধ বা চাহিদা কম হচ্ছে না, উলটে তিনি প্রকাশ্যে বাইডেনের উপর সমালোচনা ঝাড়ছেন । তাই এনিয়ে প্রায় প্রকাশ্যে এসে পড়া বাইডেনের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি।


    কেন বাইডেনের কাছে মিডটার্ম বা ৮ নভেম্বর গুরুত্বপুর্ণঃ
    প্রেসিডেন্ট বুশের শেষ জমানায় এবং  ওবামা জমানা (২০০৯-২০১৬) থেকেই আমেরিকার কাছে এটা পরিস্কার হয়ে যে দুনিয়ায় পালাবদল আসন্ন; অর্থাৎ গ্লোবাল নেতৃত্ব ক্রমশ  আমেরিকার হাত ছাড়া হয়ে চীনের হাতে যেতে নিয়েছে। ওবামার যুগে এনিয়ে তাঁর প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়াগুলোকে বলা যায় অনেকটা “বড়-ভাইয়ের চাঁদা তোলার” মত। ওবামা বারবার চীনের কাছে দাবি করে নানান ব্যবসায়িক সুবিধা  বা ছাড় আদায় করে গেছিলেন। চীনও তা দিয়ে গেছিল, কো সংঘাত তখনই মুখোমুখি না করে এড়াতে পারলে নিজের জন্য ভাল হবে বিবেচনা থেকে। আর এদিকে, এশিয়ান পিভোট [Pivot to Asia] বলে হাল্কা চুলকানির মত একটা কিছু চীনবিরোধীদের জোট খাড়া করতে যা কল্পনা করেছিলেন তা বাস্তবে কোন পা ফেলতেই পারে নাই। পরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুগ শুরু হয়। তিনিও প্রথম বছরটা (২০১৭) ওবামার চাঁদা তোলার মতই ‘হপ্তা’ আদায়ের পথেই গিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সাল থেকে সরাসরি চীনবিরোধী তবে  তা আসলে এক আমেরিকান জাতিবাদি-অর্থনীতি কায়েম করতে এক পরিকল্পনা করেছেন মনে করে আদতে একটা ফ্যান্টাসি করেছিলেন। সেটারই এক পরিণতি ছিল যে আমেরিকায় চীনাপণ্যের উপর শাস্তিমূলক আমদানি শুল্ক বসানো। যেটা কার্যত লাগু হয়েছিল, সরকার-প্রশাসনের উপর নয়; বরং নাগরিক মধ্যবিত্ত অংশকেই ঐ বাড়তি শুল্ক যোগাতে হয়েছিল। যেটার প্রতিক্রিয়া পরিণতি এখন বাইডেন দেখবে।
    তবু এতে মূল সংকটটা এখানে নয়। বিশ্বব্যাংকের মধ্যদিয়ে  সুনির্দিষ্ট করে ১৯৮০ সাল থেকেই এক “গ্লোবালাইজেশন” – মানে এক পরিকল্পিত গ্লোবাল প্রডাকশন ও সাথে, এক্সচেঞ্জ [exchange] এরই গ্লোবাল বাজার বিনিময় ব্যবস্থা শুরু বা চালু করা হয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হল,  “গ্লোবালাইজেশন” শব্দটা অনেকে অনেক অর্থে ব্যবহার করে থাকে, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের অর্থটার বাইরেও। সেটা সমস্যা হত না; কিন্তু তাদের সেই “গ্লোবালাইজেশন” ধারণাটা নেগেটিভ। তবে ১৯৮০ সালের পর থেকে খুবই দ্রুত গ্লোবাল প্রডাকশন, এক্সচেঞ্জ বাজার ব্যবস্থা খাড়া হতে শুরু করেছিল। বাংলাদেশে এর প্রকাশটা কী ছিল এভাবে প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় আমাদের গার্মেন্টস (RMG) কারখানার দ্রুত বিস্তার লাভঃ “মাল্টিফাইবার এগ্রিমেন্ট” ইত্যাদিতে এটাই ছিল সেই গ্লোবাল ফেনোমেনার লোকাল প্রকাশ। তবে মূলত আমাদের সমাজের কোন অংশই পলিটিক্যালি এর তাতপর্য আমরা বুঝি নাই;  আমাদের সমাজের যারা অর্থনীতি-রাজনীতি বুঝার দিক থেকে ওস্তাদ-হাফেজ বলে  নিজেদের ইমেজ তৈরি করেছে সেই প্রগতিবাদি বামপন্থিরাও আসলে কিছুই বুঝে নাই। তাই ছিল তাদের চোখবন্ধ বিরোধিতা – নিপাত যাক!!  তবু তাদের অবস্থান ছিল “গ্লোবালাইজেশন” এক নেতিবাচক ফেনোমেনা; তাতে “গ্লোবালাইজেশন” জিনিষটাই মূলত কী তারা না বুঝলেও; তবে তাদের মত করে যেটুক আধাখেচড়া বুঝা তা ছিল খুবই নেগেটিভ। সম্ভবত এটাই কারণ কেন এখনও সমাজে “গ্লোবালাইজেশন” এর বুঝ  বলতে নেগেটিভ কিছু বুঝা হয়। যেটা কার্যত কিছুই না বুঝে ফেলে রেখে দেয়া।

    তবে একটা সিরিয়াস কারণ হল কমিউনিস্টরা যারা অর্থনীতি খুবই ভাল বুঝেন বলে মনে করেন, ক্যাপিটালিজমের সারপ্লাস ভ্যালু (surplus value) চুরি হয়ে যাওয়া  যেহেতু তারা বুঝেন বলে মনে করেন; যেটা তাদের শোষণ তত্বের ভিত্তি। ফলে তাদের ধারণা তারা অর্থনীতির বুঝ তাদের একচেটিয়া ও সবচেয়ে ভাল বুঝের লোক তারা। কিন্তু দুঃখের কথা হল, কার্যত ও প্রকৃত অর্থে (in reality) তারা আসলে এক জাতিবাদি-অর্থনীতির বুঝের অনুসারি। যার মৌলিক বৈশিষ্ট হল নিজ রাষ্ট্রসীমার বাইরে কোন পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য একতা ব্যবস্থা থাকা তাদের অনুমানে সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় বিষয়। কারণ,  নিজ কামাবো, নিজেই সবকিছু উতপাদন করব আর নিজেই খাবো বা ভোক্তা হব – তাই নিজ মুদ্রায় যতদুর বিনিময় বাণিজ্য হয় এর বাইরে যেমন কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের আর দরকার কী? এই হল তাদের কোর ভাবনা! অর্থাৎ এরা মনে করে কার্ল মার্কসও যেন এক্সচেঞ্জ (exchange) প্রসঙ্গটা নিয়ে যত কথা খরচ করেছেন তা যেন কেবল একটা রাষ্ট্রের ভিতরের ব্যাপার। যেটা যেন আন্তঃরাষ্ট্রীয় কোন পণ্য বিনিময় নয়। যদিও মার্কস শুধু পণ্য বিনিময় নয়,  বিনিময় বলতে  তিনি মানুষে মানুষের সবকিছুর বিনিময় বুঝাতে যে এক্সচেঞ্জ বিষয়টা নিয়ে এত পাতা খরচ করেছেন এই অর্থে যেন মার্কসের এক্সচেঞ্জ ধারণা যেন এটা একটা রাষ্ট্র বা জাতিসীমায় কাজ করে এমন একটা ধারণা!! তাই কী? আসলে ব্যবহারিক কমিউনিজমে সবচেয়ে অগুরুত্বপুর্ণ ধারনা হয়ে আছে এই  “এক্সচেঞ্জ”  ধারনা। আর জাতিবাদি-অর্থনীতির বুঝে মাত্রই সেই জায়গা যেখানে “এক্সচেঞ্জ”  ধারণাটার প্রায় গুরুত্ব নাই বললেই চলে।
    সম্ভবত একারণেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক গ্লোবাল বানিজ্য ব্যবস্থা যেটা দাঁড়িয়ে আছে তা কমিউনিস্টদের চোখে “নিপাত যাক” প্রতিষ্ঠান। আসলে না জানার সুবিধা অনেক!!! কোন প্রতিষ্ঠান সীমাবদ্ধতা বা কারও দিকে কান্নি মেরে থাকাটা আপনার চোখে বা বুঝে পরিস্কার থাকার মানেই এমন নয় যে আপনি ঐ প্রতিষ্ঠান নিপাত যাক বলতে পারেন। অথবা এমন বলাটা আপনার স্বার্থের পক্ষে যাবেই!!
    কাজেই গ্লোবালাইজেশন মানে গ্লোবালি পণ্যসহ সবকিছুর বিনিময়-বাণিজ্যের কল্পনা – সেটা মূলত স্তালিনসহ সব ব্যবহারিক কমিউনিস্ট চিন্তায় একেবারেই অনুপস্থিত; এবং বলাই বাহুল্য এটাই স্বাভাবিক।  এই কারণেই সম্ভবত  গ্লোবাইলাইজেশন সম্পর্কে তাদের বুঝ নেতিবাচক ও অস্পষ্ট। অথচ দুনিয়া এখন শেয়ার্ড ভ্যালু এডেড (shared value added) প্রডাক্ট এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট সব দেশ তো বটেই সকলের তা ভোক্তা ও ব্যবহারকারি হবেন উতপাদন এমনই গ্লোবাল ফেনোমেনা হয়ে উঠছে। চীনের নেতৃত্বে  RCEP (Regional Comprehensive Economic Partnership, RCEP)  যা মূলত আশিয়ান ও চীনের উদ্যোগে তেমনই এক নয়া জোট। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয়  ফেনোমেনা হল,  এই জোটে অষ্ট্রেলিয়া ও জাপানও এর অংশীদার পার্টনার হয়ে ঢুকে গেছে। অথচ এরা তো আমেরিকান ইন্দো-প্যাসেফিক বা কোয়াডের (QUAD) সদস্য।  যাই হোক, আমাদের মূল প্রসঙ্গে মনোযোগী হই।
    তাই এসব আসলেই বিস্ময়কর যে কেবল রাষ্ট্রসীমার মধ্যে কার্যকর থাকা কোন অর্থনৈতিক ধারণা-চিন্তা এমন চিন্তা কী একটা  আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বা গ্লোবালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-বিনিময় ব্যবস্থাকে কী ব্যাখ্যা করতে পারে? কিভাবে?

    গ্লোবালাইজেশন ও ডোনাল্ড ট্রাম্পঃ
    আশির দশকে গ্লোবালাইজেশন চালু হয়েছিল মূলত আমেরিকান উদ্যোগে। অথচ সেই আমেরিকার এক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই এবার ২০১৮ সালে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি আমেরিকাকে ফিরে এক জাতিবাদি-অর্থনীতিতে নিয়ে যাবেন। বলা যায় তার মূল উদ্দেশ্য চীনের হাতে গ্লোবাল নেতৃত্বে হারানোর বদলে যেন  – তাইলে যুদ্ধেই যাব না যেন এমন এক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন ট্রাম্প।  তবে চীনের কাছে হার এড়ানোর এই ফ্যান্টাসি – এক জাতিবাদি-অর্থনীতির দিকে চলে যাবার হুঙ্কার এটা কেবল আমরা ট্রাম্পের বেলায়ই দেখিনি। প্রেসিডেন্ট বাইডেন এর মধ্যে তা আছে, কিন্তু অন্যভাবে।  যেমন ট্রাম্প শুধু অর্থনৈতিক অর্থেই জাতিবাদি হতে যান তাই নন। তিনি রাজনৈতিক অর্থেই জাতিবাদি হতে চান। এটাই হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট [white Supremist] (সাদাবাদি, ককেশীয় উগ্র জাতিবাদি আরেক হিটলারিজম) মুভমেন্ট।  বাইডেন প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়েছিলেন ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারি। এর আগেই আমেরিকান প্রথা্তমোতাবেক – জয়েন্ট কংগ্রেস  (সিনেট ও কংগ্রেসের একসাথে) জয়েন্ট সেশন সম্মেলন হয় ৬ জানুয়ারি ২০২১। আর এদিনই ঐ “মুভমেন্টের” সমথর্কেরা মিছিল করে গিয়ে বাইডেনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের পক্ষে সংহতি জানিয়ে ঐ কংগ্রেস হলই সারাটা দখল করে বসেছিলেন, আমরা দেখেছিলেচিলাম মিডিয়ায়। সাদাবাদিদের মূল কথা হল, বাদামি ও কালোচামড়ার লোকেরাই তাদের সব দুঃখের কারণ। এভাবে চামড়ার কথা তোলা মানে, আরেক এথনিক জনগোষ্ঠিকে ঘৃণা করা; ঘৃণা ছড়ানো নিচা দেখানো আর নিজেদের শ্রেষ্ঠ ভাবা ইত্যাদি এসবই হিটলারিজম – এথনিক ঘৃণা ছড়ানো চরমতম ক্ষতিকর এক জাতবাদ। তাদের ভাষ্য হল, বাদামি ও কালোচামড়ার লোকেরাই পশ্চিমাদেশে ছড়িয়ে পড়ে সাদাদের কাজ চাকরি ছোট ব্যবসারইত্যাদির সব সুযোগ সুবিধা সব খেয়ে ফেলছে। এই বয়ান ভিত্তিহীন যদিও। কারণ সাদারা আমাদের কলোনি দখল ও লুটেরা শাসন করেছিল। অনেক পরে সেই সুত্রেই কেবল সস্তা শ্রমিকের লোভে ব্যবসা ভাল চলার সময় সাদারা বাদামি ও কালোচামড়ার লোকেদের তাদের দেশে নিয়ে গিয়েছিল।  কাজেই এখন তাদের অর্থনীতি খারাপ বলে,   তাই বাদামি ও কালোচামড়ার লোকেরাই সাদাদের দেশ থেকে বের করে দিতে হবে এটা কোন সাফাই হল না!! হতে পারে না।। অর্থাৎ চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় আজ ক্রমশ আমেরিকার অর্থনীতিতে সারপ্লাস সঞ্চয় (যা ফিরে পন্য-পুজির বিনিয়োগ ক্ষমতা হয়ে এতদিন হাজির হয়ে আসছিল ) আগের তুলনায় তা দ্রুত কমে যাচ্ছে। এই খারাপ সময়ে বহু পেশা বা কাজকে ঢেলে সাজানোর দরকার পড়ছে; এটাই এসব শ্রেণীর জন্য চীনবিরোধী হয়ে উঠা। আর আজ ব্যাপারটাকে তাদের নেতারা দেখে যে,  গত প্রায় ছয়শ বছর ধরে এই সাদা ককেশীরাই দুনিয়াকে কলোনি দখল ও শেষে আমেরিকান নেতৃত্বে শাসন ও শাসক হয়ে থেকেছে। কিন্তু আজ আর সেটা আর বজায় রাখতে পারছে না। কারণ, আজকের চীনা উত্থানের প্রথম অর্থ- তাতপর্য হল সেই সাদা সাম্রাজ্যের পতন।  এজন্যই তারা  হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট  মুভমেন্ট শুরু করেছিল   ট্রাম্প-কে মাথায় উপরে  উঠিয়ে রেখে যদিও সেটা  ট্রাম্পের অধীনেই এক এলায়েন্স গড়ে নিয়ে।

    মজার কথাটা হল, বাইডেনও আসলে হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট  মুভমেন্ট – এর মধ্যেই সমাধান দেখেন। যদিও ট্রাম্পের থেকে তার অনেক জায়গায় তফাত আছে। যেমন ট্রাম্প জাতিবাদি-অর্থনীতির দিকে এক অলীক চিন্তা নিয়ে এক ফ্যান্টাসি করতে চান। কিন্তু এখানে বাইডেনের চিন্তাটা হল, চীনের উত্থান ঠেকাতে সারা ইউরোপকে সাথে জোট গড়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ানো। সেখানে ঐ ঐক্যবদ্ধতা হতে হবে আসলে সাদাবাদের ভিত্তিতে; ছয়শ বছর ধরে চলে আসা দুনিয়াকে যে সাদা ককেশীরাই এতদিন শাসন করে আসছে, ফলে তাকে এখন হারতে না দেয়া। দরকার হলে চীন-রাশিয়াকে একঘরে করে নিজেদের এক আলাদা জগত নির্মাণ করতেও তারা রাজি; এবং তা গ্লোবাল অর্থনীতির একটা ভগ্নাংশ হলেও সাদাদের নেতৃত্বে বাকি যারা আসে কেবল তাদের নিয়ে এক ভগ্ন-গ্লোবাল অর্থনীতি করে টিকে থাকার চেষ্টা করতে হবে। মূলত ক্ষমতায় আসার আগে  থেকেই এটাই বাইডেনের মূল পরিকল্পনা।
    এই লক্ষ্যে তার হাতিয়ার রাষ্ট্র বা বলি হয়ে যাওয়ার মত রাষ্ট্রটাই হল ইউক্রেন। শুরুটা হবে ইউক্রেনের ঘাড়ে বন্ধুক রেখে রাশিয়াকে একঘরে করার উদ্যোগ নিয়ে। আর এতে চীন রাশিয়ার সমর্থনে এসে দাড়ালেই বাইডেন নিজ পরিকল্পনা মাফিক আগিয়ে যেতে পারবেন; এই ছিল অনুমান। কিন্তু হায়, বাইডেনের শাসনের আরো দুবছর বাকি থাকতেই, প্রথম দুবছরের মধ্যেই বাইডেন এখন হার স্বীকার করে পিছু হতে যেন উদ্যত তা দেখা যাচ্ছে। আলামত হল, বাইডেন পিছু হটতে একেবারে রেডি হচ্ছেন।

    ইতোমধ্যেই জর্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শুলৎজ [Olaf Scholz] এর চীনা সফর ছিল এর বড় ইঙ্গিত। তিনি এমাসেই ৪ নভেম্বর গত শুক্রবার চীনে গেছিলেন আর তার দাবি তিনি জি৭ ব্লক রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিত্ব করতে এসেছেন। জি৭ (G7 Group) যা আসলে এক পশ্চিমা এককালের ধনীরাষ্ট্র জোট যা জাপানকে সাথে নিয়ে থাকলেও কার্যত তা এখন সাদা ককেশীয় জোট হয়ে গেছে। চ্যান্সেলরের  সার-প্রস্তাব হল ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করা। আর সেকাজে তিনি চান চীন একটু রাশিয়া থেকে দুরত্ব- নিরেপেক্ষতা তৈরি করুক যাতে জি৭ – চীনের মাধ্যমে (পাগলা ও ক্ষিপ্ত পুতিনকে ঠান্ডা করতে) একসাথে কাজ করতে পারে। যদিও রয়টার্স লিখেছে, প্রেসিডেন্ট শি যদিও তাদের দুজনের সাক্ষাতে প্রতিউত্তরে – রাশিয়ার কোন সমালোচনা করেন নাই; অথবা রাশিয়ান সেনা প্রত্যাহার নিয়েও কোন মন্তব্য করেন নাই [……though he refrained from criticising Russia or calling on Moscow to withdraw its troops.]। তার মানে শুলৎজ এর এটা ছিল মিডিয়া প্রপাগান্ডা নিবার জন্য কাভারেজ।

    এখানে এনিয়ে এক এক করে  দুইটা রয়টার্সের নিউজ আগ্রহিরা দেখে নিতে পারেন।  একই সাথে এনিয়ে বাইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন এর ঘোষণা নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টও সাথে পাবেন। তিনি বলছেন যার খবরের শিরোনামঃ “জি৭ এখন পরিস্কার যে চীনের সাথে তাদের সমন্বয়-সমঝোতা করতে হবে এটা বুঝে গেছে” [Blinken says G7 is clear-eyed about need to align on China। 

    মজার কথা হল এই বক্তব্য বাইডেন প্রশাসনের আগের দেয়া চীনকে একঘরে করার বক্তব্যের বিপরীত।  শুধু তাই না ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইতোমধ্যে আমেরিকা ইউক্রেন সরকারকে পরামর্শমূলক বার্তা পাঠিয়েছে। এনিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট এর শিরোনাম আমেরিকা ইউক্রেনের কানে কানে বলেছে সে যে রাশিয়ার সাথে আপোষ করতে চায় এমন ইঙ্গিত প্রদর্শন করে চলতে [U.S. privately asks Ukraine to show it’s open to negotiate with Russia]।

    ইউক্রেন যুদ্ধে সবচেয়ে করুণ অবস্থান নেয়া মিডিয়া হল আজ-জাজিরা। আল-জাজিরা ২০০৫ সালে জন্মের সময় থেকে আমি ব্যক্তিগতভাবে একে ফলো করি। এটা অকল্পনীয় যে সে এই যুদ্ধে এক আমেরিকান পাপেট মিডিয়া হয়ে যাবে। যেমন রয়টার্স সেও তো এক পশ্চিমের সংবাদ সংস্থাই, তাই না। অথচ নিরপেক্ষ এবং জার্নালিজম বলতে যা হওয়া উচিত সেটাই রয়টার্স হয়ে থেকেছে। কিন্তু আলজাজিরার অবস্থা খুবই দুঃখজনক  ও করুণ। সেই আলজাজিরা এবার ইউক্রেন যুদ্ধকে রিপোর্ট করতে গিয়ে যেন ত্যার কাজ হল আমেরিকা বা পশ্চিমের করার ঠিকা পেয়েছে। যেন আল-জাজিরা এক ঠিকাদারের নাই যে আর “জার্নালিজম” করে না। অথচ এই প্রথম তারা পশ্চিম থেকে দুরত্ব তৈরি করতে চাইছে। তাদের রিপোর্ট এর শিরোনামঃ  ইউরোপের মুদ্রাস্ফীতি এতই চড়া যে সম্ভবত এবার তারা ইউক্রেনের সঙ্গে কাপাকাপি শুরু করবে As inflation rises, could European support for Ukraine wobble?  আর সাথে ভিতরের খবরে লিখছে, এসব কিছুই আগামি শীতে ফকফকা পরিস্কার এক পরীক্ষা হয়ে যাবে!

    কেন আগামি শীতে কীঃ
    আপাতত বাইডেনের সব পরিকল্পনা ফেল হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যেতে নিয়েছে। সেটা যে কারণে তা হল সারা ইউরোপই আসলে জ্বালানির প্রশ্নে মারাত্মকভাবে রাশিয়ান তেল-গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। বলা যায় ইউরোপ আসলে কার্যত রাশিয়ান জ্বালানির নির্ভর এক অর্থব্যবস্থা। এমন সবচেয়ে প্রভাবশালী ও কঠিন সত্যিটাই  আসলে বাইডেন এতদিন অস্বীকার করেছেন, তারমত করে নেয়া সাদা শ্রষ্ঠত্ববাদি কেন্দ্রিক এক পরিকল্পনায়। তিনি ভেবেছিলেন আমেরিকার ইউরোপের সাথে সাদা ককেশীয় ঐক্য আর সমস্বার্থ দিয়েই তিনি ইউরোপের  জ্বালানির নির্ভরতা-সহ সব বাধা পার হয়ে যেতে পারবেন। অথচ এটা ছিল চরমতম আবেগী কথা। হয়ত আবেগী বলেই তা ককেশীয় জাতিবাদি সুরসুরিতে  তারা জেগে উঠতে চাইছে সেটা জ্ঞাত থাকা ইউরোপকেও বাইডেনের মিথ্যা পরিকল্পনার পক্ষে থাকতে আগ্রহি করেও তুলেছিল। আর এই অবাস্তব দগদ্গে জাতিগত-আবেগেই পশ্চিমের মৃত্য ও পতনের কারণ হবে সম্ভবত!

    তাহলে বাইডেনের পশ্চাদ অপসারণ, পুতিনকে রাজি করানো কী সম্ভব হবে?
    তাতক্ষণিক জবাব হল, অবশ্যই না। পুতিন রাজি হবেন না। কিন্তু কতদিন ও কেন?

    পুতিন মোটা দাগে বললে,  জানুয়ারির ১৫ তারিখের আগে কিছুই থামাবেন না। কেন?

    সাধারণত ইউরোপের ক্ষেত্র গড় হিসাবে বললে, ১৫ ডিসেম্বর-১৫ জানুয়ারিতে অঞ্চলের তাপমাত্রা চরমে উঠে, সেটা মাইনাস ৪০ ডিগ্রির দিকেও চলে যায়। কাজেই বলাই বাহুল্য জ্বালানিহীন ঘর গরম রাখার ব্যবস্থাহীন ঘরবাড়ি  – এই ইউরোপের ইউরোপিয়ানেরা দেশ ছাড়বেন। বিশেষত কিয়েভবাসীরা [Kiev] তাদের দেশঘর ছেড়ে পাশের দেশে আশ্রয় নিতে ছুটবে। তখন পুতিন ইউরোপকে  এক পরীক্ষায় ফেলে দিতে চান। এটা দেখাতে যে তারা কেউই আসলে ইউক্রেনকে পছন্দই করেন না। তাই এই শীতে তারা মাইগ্রেট করতে ইউরোপের পড়শি বাকি দেশে ঢুকতে চাইলেও পারবেন না। প্রথমত তারা মাইগ্রেসনের জন্য উপযুক্ত ভিসা অনুমতি অন্তত সীমিত করে দিবে। ইতোমধ্যেই যা শুরু হয়েছে। ওদিকে ইতোমধ্যেই কিয়েভ-কে বসবাসের অযোগ্য করে ফেলা হয়েছে। কারণ, রাশিয়ান বোমায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র  (৩০%) অচল হয়ে অন্ধকার হয়ে গেছে। ইউক্রেনের বাইরের ইউরোপ যে ইউক্রেনের সাথে নিজ সংকীর্ণ স্বার্থে অভিনয় করে গেছে –  এই করুণ দৃশ্য সবার সামনে উন্মোচন করে না দিয়ে পুতিন যুদ্ধ থামাতে চান না। যদিও যুদ্ধ তিনি থামাবেন অবশ্যই তবে এর পরে।

    ওদিকে জাপানসহ  জি৭ গোষ্ঠি  চীনের কাছে আবেদনে যে যুক্তি তুলে ধরেছে তা হল, গ্লোবাল মহামন্দা ধেয়ে আসছে। যেটা অনেক আগে থেকেই বিশ্বব্যাংকের ফোরকাস্ট যে ২০২৩ সাল মহামন্দার বছর হবে। বহু দেশেরই খাদ্য যোগাড়ের অবস্থাই থাকবে না। আর ইতোমধ্যে ৯% এর আশেপাশে উঠে যাওয়া মুদ্রাস্ফীতি সহসাই কমছে না। বরং আসন্ন মহামন্দাটাই হয়ত  মুদ্রাস্ফীতি কমার একমাত্র উপায় হয়ে হাজির হবে!! কাজেই তা ঠেকাতে বা প্রভাব কমাতে, চীনসহ রাষ্ট্রগুলো একটা সম্মিলিত প্রচেষ্টা নিবার আবেদন করতে চাইছেন তারা।

    কথা সত্য অবশ্যই। তবে আসলে এই উছিলাতেই বাইডেন তাঁর ব্যর্থতার দায় আড়াল ও হাল্কা  করার সুযোগ নিতে চান। কারণ গত ছয় মাস ধরেই তো এটা সবার জানাই যাচ্ছিল যে এসব বিপদ দুনিয়াতে আসন্ন; তাহলে এখন এত দেরিতে একশন কেন? কারণ ৮ নভেম্বর মিডটার্ম! মিডটার্মের নির্বাচনে মানে এর ফলাফলে যেন বাইডেনের ব্যর্থতা যেন নয়া চাপ না হয়ে যায় – এই ছিল বাইডেনের সংকীর্ণ বিবেচনা।  কাজেই আটই নভেম্বরের পর থেকে বাইডেন এখন পুরাপুরি রিভিউ এর মুডে মানে গত দুবছর যে সব পলিসির মুডে ছিলেন সেসবেরই পুনঃ মুল্যায়ন  চলে যাবেন তিনি, বা ইতোমধ্যেই গেছেন। এসব কারণের ইউক্রেন যুদ্ধ এখন এতিম হয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • পাকিস্তান সেনাবাহিনী জনগণের মুখোমুখি 

    পাকিস্তান সেনাবাহিনী জনগণের মুখোমুখি

    গৌতম দাস

    ০৭ নভেম্বর ২০২২

    https://wp.me/p1sCvy-4hH

     

              COAS General Bajwa approached US after taking authorisation from PM Shahbaz Sharif

    [সারকথাঃ  একটা মনার্কি (monarchy) বা রাজতন্ত্রের বিপরীতে যেকোন রিপাবলিক রাষ্ট্র; এর ক্ষমতার একমাত্র উতস হল জনগণ। জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা-আকাঙ্খাই হল রাষ্ট্রক্ষমতার উতস! তাই, এমন রাষ্ট্র মাত্রই ওর যেকোন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আর সাথে এর নির্বাহি ক্ষমতার প্রশাসন বা বিচার বিভাগ বা সেনা প্রতিষ্ঠান সকলেই তাদের সকল নির্বাহী ক্ষমতা অবশ্যই সেই গণক্ষমতার অধীন। এই বিচারে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকেও জনগণের ক্ষমতার অধীনস্ততা মানতেই হবে। জনগণের কাছে,  গণক্ষমতার কাছে জবাবদিহিতায় ও অধীনস্ততায় থেকে কাজ করতেই হবে। কিন্তু বর্তমান পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেনাকর্তারা যেন মনে করতে চান যে তাদের কোন সদস্য বা জেনারেলের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সিভিল আদালতে মামলা করা যাবে না।
    এটা সত্যি যে সেনাসদস্যরা দেশ সুরক্ষা করার কাজে (যেমন কোন বিদেশি মানুষ খুনের মত) কোন অপরাধ করে বসলে যেটা সিভিল আইন আদালতের চোখে  ক্রিমিনাল অপরাধ হলেও এর জন্য তাদের কোন সদস্যের বিচার সিভিল আদালতে হবে না। এধরণের পেশাগত অপরাধের ক্ষেত্রে মনে করা হয় এমন বিষয়াদি সেনাদের “নিজস্ব কোর্ট মার্শাল” এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে আইন-অপরাধগত দিক পরীক্ষা করে দেখা হবে।  কিন্তু সাবধান এর মানে এই নয় যে সেনাসদস্যদের যেকোন অপরাধ দেশের প্রচলিত আইন-আদালতের উর্ধে ।  কোন সেনাসদস্য যদি কোন সিভিলিয়ান যেমন কোন রাজনীতিবিদকে খুন করে সেক্ষেত্রে কী তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ সিভিল প্রসাশন ও বিচার বিভাগের কাছে চাওয়া যাবে না! তাদের জন্য কী পুলিশ আদালত সব মাফ – এসব সিভিল প্রতিষ্ঠানগুলো সেনা সদস্যদের কোন সিভিল নাগরিকের বিরুদ্ধে করা অপরাধ আমল করতে পারবে না? সেনারা কী সবধরণের আইন-আদালতের উর্ধে???? এটা হতে পারে না।
    বর্তমান সেনাপ্রধান ও সেনাগোয়েন্দা (ISI) প্রধান নিজেদেরকে এমন সবকিছুর উর্ধে গণ্য করে ধমকিয়ে চলতে চাইছেন। এটা অগ্রহণযোগ্য; তারা কোন স্বয়ম্ভু ক্ষমতার অধিকারী নন। তারা এক মুহুর্তের জন্যও ভুলে যেতে পারেন না যে  রাষ্ট্র এর ক্ষমতার একমাত্র উতস জনগণ।  ফলে শেষ বিচারে কোন না কোন জনপ্রতিনিধি বা জনপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতায় ও অধীনস্ততায় থেকে কাজ করতেই হবে। জেনারেলদের এমন অনুমান যে তারা গণক্ষমতার উর্ধে, এই অনুমানে আচরণ – আর সেখান থেকেই সব সংকট এবং তা এক গভীর সংকট পাকিস্তানের আকাশে অন্ধকার হয়ে নেমে আসতে দেখা যাচ্ছে। ]

    ঘটনা সংক্ষেপ হলঃ
    পাকিস্তানের অন্যতম রাজনৈতিক দল ইমরান খানের পিটিআই দলের এক রাজনৈতিক কর্মসুচীতে মিছিলের উপরে আততায়ীর বড় রাইফেলসহ গোলাগুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছে।  এতে অন্তত একজন কর্মী নিহত হয়েছে সাথে সাতজন আহত। আর মুল লক্ষ্যবস্তু ছিল খোদ ইমরান খান। তাঁর উপর ছোড়া গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তাঁর পায়ে লেগেছে। তাও লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার কারণ এক পিটিআই কর্মী সময়মত পিস্তলের উপর থাবা দিয়ে ওর অভিমুখ বদলে দিয়েছিল – এর ভিডিও এখন দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে। এদিকে এটা রুটিন যে  প্রত্যেক গোলাগুলি ও খুনের ক্রিমিনাল ঘটনা পরবর্তিতে যে মামলা হয় (FIR)  তাতে ক্ষতিগ্রস্থ ও ভিকটিমেরা তাদের সন্দেহ যাদের উপর তাদের নাম উল্লেখ করে থাকে।  আততায়ীর এই জানের উপর হামলা থেকে বেচে যাওয়া ইমরান খান তিনজনকে মূল সন্দেহভাজন বলে চিহ্নিত করে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “এই বন্দুক হামলার পেছনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ফয়সাল দায়ী” ।  এটা যেকোন মামলায় সাধারণ প্রাকটিস যে ভিকটিমদের দেয়া সন্দেহভাজনদের নাম এফআইআরে লেখা হয়। আর এফআইআর মানেই প্রমাণিত অপরাধী নয়। ভিকটিমের সন্দেহ মাত্র। যা পরে ইনভেস্টিগেশনে পরিস্কার হবে ও এনিয়ে পরে বিচার শুরু হবে। অথচ সেনাপ্রধান ও সেনাগোয়েন্দা (ISI) প্রধান প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে  নানান ন্যাস্টি চাপ সৃষ্ট করে যাচ্ছেন যেন ঐ  এফআইআর গৃহিত না হয়। যেন সেনাবাহিনী সবকিছুর উর্ধে – তারা পাবলিকের জবাবদিহিতায় ও অধীনস্ততাতেও নয়। রাষ্ট্র সরকার প্রশাসন কিছুই তাদের উপরে কার্যকর নয়।  এই মনোভাব একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।
    উলটা করে বললে যেন সেনাসদস্যরা কেবল নিজেরা নিজেদের পরিচালিত কোর্ট মার্শালের অধীনে আর কোর্ট মার্শাল হয়ত সেনা প্রধানের অধীনে হলেও খোদ সেনাপ্রধান যেন নিজে আর কোন জনপ্রতিনিধির অধীনে নয়!!!
    প্রতিক্রিয়ায় ইতোমধ্যে এই প্রথম পাকিস্তানের আম-পাবলিক সেনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চলে গেছে। এখানে এই টুইটারে দেখা যাচ্ছে ক্ষুব্ধ পাবলিক কিভাবে এক পাকিস্তানি ট্যাংকের উপরে উঠে তাঁর ক্ষোভপ্রকাশ করছে। বলাই বাহুল্য এতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইমেজ কোথায় নেমেছে সেই খারাপ ইঙ্গিতও ফুটে উঠেছে। অথচ সেনাকর্তাদের মধ্যে এই গণবিচ্ছিন্নতার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন এর কোন প্রমাণ দেখা যায় নাই!

    ঘটনা বিস্তারেঃ
    পাকিস্তানের রাজনীতি আবার চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কার্যত এটা হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্লোবাল চীন-আমেরিকা দ্বন্দ্বের এক  লোকাল তবে নোংরা নাট্যমঞ্চ। কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে কেলেংকারির ঘটনাটা হল, পাকিস্তান আর্মি যেভাবে মরিয়া হয়ে নিজেকে ন্যাংটা করে মেলে ধরেছে। অনেকে বলেন পাকিস্তানের আর্মি হল, উপরে আল্লাহ’র পরেই যার স্থান। পরিণতিতে এবার এই প্রথম দেখা যাচ্ছে ক্ষুব্ধ পাকিস্তানি জনগণ নিজ আর্মির গাড়ি ভাংচুর করেছে, লাথি মেরেছে। যা কোনভাবেই কোন ভাল ঘটনা নয়! অর্থাৎ অন্যভাবে বললে, পাকিস্তানের আর্মির উপর  আমেরিকান চাপ ও তাদের রাজনৈতিক ইচ্ছার পক্ষে খেদমতে নামতে গিয়ে জেনারেল বাজওয়া ও অন্য জেনারেলেরা আবার গণবিরোধী অবস্থান  নিয়েছেন। গণ-ইচ্ছাকে পায়ে দলে আমেরিকান ইচ্ছার সাথে শাহবাজ ও জেনারেলদের সমন্বয়ে তৈরি হওয়া শাসকদের ইচ্ছা মাখিয়ে নিয়ে এক দাগী-আসামির মত দাগী-ক্ষমতা [despotic power] হয়ে জনগণের উপর চড়াও হয়েছে।

    পাকিস্তানে সেনাবাহিনীকে এখন পাকিস্তানের রাজনীতিতে “সেনাবাহিনী” নামে ডাকার রেওয়াজ নাই। খোদ সরকার বা বিরোধীদল একে স্টাবলিসমেন্ট (প্রতিষ্ঠান) বা ইন্সটিটিউশন বলে ডাকে ও এসব শব্দ ব্যবহার করে মিডিয়ায় সেনাবাহিনী শব্দটা বুঝানো ও লেখা হয়। যেন এটা একটা non-person তবে একটা প্রতিষ্ঠান মাত্র।   এতদিন এভাবেই সেনাবাহিনী ভয় উতপাদন করে চললেও মানুষজন এনিয়ে আর ঘাটাত না। কিন্তু এবার সেই সীমাটাও খোদ জেনারেল বাজওয়া এন্ড গং বিশেষ করে, তাদের সেনাগোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান আইএসআই [ISI] নিজেই ভেঙ্গে দিল।

    আমাদের মত দেশে সব সেনাগোয়েন্দা সংস্থা কেন্দ্রিক এক কমন প্রবলেম হল যেখানে প্রতিষ্ঠানটার ঘোষিত কাজ হল রাষ্ট্রকে বাইরের শত্রুদের হাত থেকে রক্ষার পক্ষে কাজ করা আর এজন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, তা বিশ্লেষণ ও প্রক্রিয়াজাত করে তা ব্যবহার করা। মূলকথা এর কাজ বাইরের শত্রুদের বিরুদ্ধে ততপরতা। মানে ধরে নেয়া আছে দেশের ভিতরের আপন জনগণ অবশ্যই কোন রাষ্ট্র-শত্রু নয় বরং আভ্যন্তরীণ জনগণ শত্রু হবে কেন?  তা হওয়ার কারণ থাকতে পারে না। তবে দেশের ভিতরে অপরাধী থাকতে পারে যাদেরকে সামলানোর জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে  আভ্যন্তরীণ নানা বাহিনীর পুলিশ প্রশাসন আছেই।
    কিন্তু না এই আদর্শ ধারণা বা কেমন হওয়া উচিত ধারণা আমাদের ম৫ত দেশে থাকে না। দেখা যায় সেনাগোয়েন্দা সংস্থা আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ঢুকে পরে আর আভ্যন্তরীণ সমাজও তার কাজের ক্ষেত্র; এমন মনে করতে শুরু করে থাকে। আর একাজে সাধারণত এই সমস্যাটা তৈরি করে থাকেন ক্ষমতার প্রধান নির্বাহি হিসাবে প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট যেই থাকেন তিনি। কারণ তিনি দেশে তাঁর সরকারের রাজনৈতিকবিরোধীকে খোদ দেশেরই বিরোধী যেন এভাবে  তারা  রাষ্ট্রবিরোধী বলে চালিয়ে দিতে চান। এখান থেকেই সব সমস্যার শুরু হয়। সব স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের জন্ম হয় এখান থেকে।  অথচ প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক-বিরোধীতা তা কোনভাবেই রাষ্ট্রবিরোধীতা নয়।
    আইএস এর ততপরতার যুগে সেনাগোয়েন্দা সংস্থা বড়জোর আভ্যন্তরীণ সিভিল গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে নিজ সংগৃহিত তথ্য শেয়ার করতে পারে, ব্রিজ-রিলেশন বা সমন্বয় করতে পারে।  কিন্তু সেই তথ্য সিভিল গোয়েন্দারা কিভাবে সিভিল জবাবদিহিতার সাথে ব্যবহার করবে এটা তাদের হাতেই ছেড়ে রাখতে  হবে। কিন্তু  সেনাগোয়েন্দা সংস্থা এখানে সিভিল নাগরিকদের সমাজেও ততপর থাকতে চায়। আর এখান থেকেই সমস্যা কঠিন ও জটিলতর সমস্যা হয়ে যায় যেটা তো হবেই; এতে প্রশাসনিক কাঠামো আর আইন ও বিধি (বিজনেস রুল) নির্ভর থাকবে না। ব্যক্তিইচ্ছা নির্ভর অপেশাদারিত্বে সব ভরে উঠবে।

    এই কমন সমস্যা আমাদের মত দেশগুলোতে কমবেশি সকল দেশেই বর্তমান। মূল সংকটটা হল, সিভিল প্রশাসনের অধীনের পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থার জবাবদিহিতা আলাদা হলেও আইডিয়ালি বা কি এর হওয়া উচিত এই অর্থে বললে, সিভিল জবাবদিহিতার ভিত্তি হল কনষ্টিটিউশনাল নাগরিক অধিকার রক্ষামুখি হয়ে ততপরতা ও তা মান্য করা এবং এই মান্যতায় এরা চলতে বাধ্য। অথচ সেনাগোয়েন্দা সংস্থার কাঠামো এমন নয়। কারণ তাদের প্রকৃত “ডিল করার সাবজেক্ট” তো আভ্যন্তরীণ জনগণই নয়; বরং দেশের বাইরের শত্রু। তাই উলটা বরং তাদের আভ্যন্তরীণ জনগণকে নিয়ে টানা-হেচড়া করাটাই অপরাধ। এটা তার নো গো [no go] এরিয়া। অথচ এই নো গো এরিয়াতে গিয়েই বারবার সেনাগোয়েন্দা সংস্থা ক্ষমতা অপব্যবহার করে আর হোঁচট খায়।

    পুরান তর্ক রাজনীতিতে সেনাবাহিনীঃ
    এই প্রসঙ্গটাকে অনেকে সামরিক শাসন অবৈধ আর বেসামরিক হলেই তা বৈধ – এমনই এক সামরিক-বেসামরিক তত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করত আমরা দেখেছি। যেমন শেখ মুজিবের বাকশাল ঘোষণা – তিনি নিজেই  আগে প্রধানমন্ত্রী থেকে পরে আপনাতেই এক প্রেসিডেন্ট হওয়াটাকে বৈধ বলা হয়েছিল; কারণ নাকি তিনি সিভিলিয়ান। আর ওদিকে ১৫ আগষ্টের ১৯৭৫ সালের পর থেকে যত সামরিক শাসন কায়েম সব অবৈধ – এই তত্বের জনক ছিল প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খান। তাঁর মৃত্যুর পরে দেখা যাচ্ছে এনিয়ে প্রবক্তাও এখন কম। যদিও রাষ্ট্র নিয়ে সিরিয়াস আলোচনার মুরোদ না থাকাতেই এধরণের নিম্নমানের আলোচনা চালু হয়েছিল। আসলে  রাষ্ট্রের ভাল-মন্দ কিভাবে বিচার করতে হয় কেমন করে এই বোধের মারাত্মক অভাব। বলা যায় এক শুন্যতা বিরাজ করে এখানে। যেমন কনষ্টুটিউশনে সংশোধনী এনে বাকশাল ঘোষণা করে দেওয়াতে মূল যে অঙ্গ-হানি যা করা হয়েছিল সেটা হল, আগের কনষ্টিটিউশনে দেয়া থাকা নাগরিকের রিট করার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল বাকশাল সংশোধনী ঘোষণাতে। সাথে আদালতেরও মানে বিচারকদেরও নাগরিকের রিট আবেদন শোনার অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল। আর নাগরিকের রিট করার অধিকার না থাকা মানে কার্যত সেটা আর কোন রাষ্ট্রই থাকে না। কারণ তাতে সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র নাগরিকের মৌলিক মানবিক অধিকারগুলো রক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আগে তা আইনতই আর কার্যকর না থাকা।  যার সোজা মানে ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রগঠন ও কনষ্টিটিউশনের সমাপ্তি টেনে দেওয়া হয়েছিল ঐ বাকশাল সংশোধনী এনে। অথচ বাকশাল –সমর্থকেরা আজও গলাবাজি করে। আর সমস্ত ক্ষোভ গিয়ে উগড়ে দেয় সেনাবাহিনীর উপর। যেন সেনাবাহিনীই বাকশাল কায়েম করেছিল। তবে লক্ষণীয় যে ২০০৭ সালের সেনাশাসনের সুবিধাভোগী বর্তমান সরকার ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা এখন সেনাবাহিনী নিয়ে একেবারে চুপ হয়ে গেছে।

    তাহলে আমাদের মত দেশে সেনাশাসন ঘটার মূল কর্তা কে?
    এককথায় এর উত্তর আমেরিকা; যেটা মূলত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ও তাঁর প্রশাসন। ইউজুয়ালি  এবং এখনো আমেরিকা সেনাশাসনের প্রধান পৃষ্টপোষক!  গ্লোবাল রাজনীতিতে সেকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর একালে চীনের বিপরীতে আমাদের মত দেশে প্রভাব-বিস্তারের ক্ষেত্রে আমেরিকার জন্য সহজ পথ এটা। তবে একটা মজার উদাহরণ হল, পাকিস্তানে ১৯৯৯ সালে জেনারেল মোশাররফের ক্ষমতা দখল। সেটাই প্রথম আমেরিকার ইচ্ছার বিরুদ্ধে পাকিস্তানে সেনা ক্ষমতাদখল। যদিও এই পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য দায়ী ততকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন যার আসকারায় প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের সেনা বিভাজনের নীতি-পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ঘটেছিল সেই ক্ষমতা দখল। তবে  ২০০১ সালের নাইন ইলেভেনে টুইনটাওয়ার হামলার পরে আমেরিকা আগের মতই সেনাশাসনকে আপন করে নিয়েছিল।

    সেনা প্রতিক্রিয়া অপেশাদারি,  অগ্রহণযোগ্যঃ
    বর্তমানের পরিস্থিতিতে  পিটিআই দলের নেতারা সরাসরি জেনারেলদেরকে অভিযুক্ত করছেন দেখা যাচ্ছে।  কিন্তু এর মানে কী এখন জবাবে জেনারেলদেরকে রাজনীতিকদের উপর প্রতিহিংসাপরায়ন হয়ে উঠতে হবে? তাদেরকে পালটা নিজহাতে শাস্তি দিতে দন্ড নিজ হাতে নিতে হবে?  এটা হতে পারে না। কিন্তু ঠিক এজিনিষটাই ঘটে গেছে।  “এই হামলাকে ইমরান খানের ‘তৎপরতার কারণে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়া’ পাকিস্তানের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের ‘চেষ্টা’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে ইমরানের লং মার্চ ও জনসমাবেশ ক্ষমতাসীনদের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। এরই মধ্যে তাঁর সমর্থকেরা ‘স্টাবলিশমেন্টের’ বিরুদ্ধে ইমরানকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁদের দাবি, এদের ষড়যন্ত্রের কারণেই ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন। ফলে ইমরান খানের ওপর এই হামলায় তার সমর্থকেরা আরও বিক্ষুব্ধ হবেন”।

    অথচ আইএসআইয়ের প্রধান নাদিম আনজুম, তিনি ইমরানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে অপেশাদারি কাজ করেছেন। এমনিতেই অতীত রেকর্ড বলছে এমন বক্তব্য সবসময় আইএসপিআর [ISPR] এর তরফ থেকে দেয়া হয় না। তাহলে এবার আইএসআই-এর প্রধানকে তা দিতে হল কেন? কোন দায়ীত্ববান মানুষের কাজ এটা হলে পারে না যে তিনি টেনশন বাড়ানো জন্য কোন কাজ করেন! তিনি সরকারি কর্তা অন্তত এটুকু তাঁর মনে রাখা উচিত ছিল।  তবে সবচেয়ে অন্যায় করেছেন তিনি পাবলিকের বোধবু্দ্বিতে আস্থা রাখেন নাই। তিনি কোন রাজনীতিকের সাথে সরাসরি অহেতুক বাকবিতন্ডায় গিয়েছেন। তিনি কোন অন্যায় অপরা্ধ না করে থাকলে তো নিজের উপর আস্থা রাখা উচিত ছিল।
                                                                                          আইএসআইয়ের প্রধান নাদিম আনজুম; তিনি প্রথা ভেঙে ইমরানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত

     

    এই প্রতিহিংসা অগ্রহণযোগ্য ও জেনারেলদের অসদাচরণের প্রমাণঃ
    পাকিস্তানের রাজনীতিতে মূল তর্ক মানে এর পিছনে যে গ্লোবাল রাজনৈতিক লড়াই – তাতে তা চীন-আমেরিকার লড়াই হয়ে আছে। যেমন সেটা হল, সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন [SCO] এর এবছরের সম্মেলন চীন-রাশিয়া-ভারত এই জোট মেরুকরণ হয়ে যায় যা বলাই বাহুল্য বাইডেনের চলতি ততপরতাগুলোরই প্রতিক্রিয়া। আর এখানেই পাকিস্তান ও ভারত (যারা দুই রাষ্ট্রই SCO এর সদস্য সেই সুত্রে)   দুই রাষ্ট্রই একসাথে ঐ মেরুকরণে সামিল হয়ে যায়।  ফলে এই মেরুকরণকে দুর্বল করতে বাইডেন প্রশাসন ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে খাড়া করার উদ্যোগ নিয়েছিল। এতে অন্তত ও আপাতত বাইডেন সফলতা দেখতে পাচ্ছে। কারণ, মুসলিম লীগ (নওয়াজ) আর পিপিপি বা ভূট্টোর দল যারা আবার ইমরানের দলের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ এরা, আগে থেকেই আমেরিকান সমর্থনে ইমরানকে ক্ষমতাচ্যুত করার অপ-ততপরতায় লিপ্ত ছিল। সেই এপিসোডে ইমরান খান সরাসরি দক্ষিণ-পুর্বএশিয়ার আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড ল্যু এর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নাক-গলানোর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ তুলেই ক্ষমতা ত্যাগ করেছিলেন। অর্থাৎ (নওয়াজ) আর ভূটোর দল যারা মূলত উভয়েই দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত আর নাহলে পেন্ডিং দুর্নীতির মামলার আসামি – অথচ আমেরিকাকে এই দুনীতিবাজ দুই দলকেই সঙ্গ দিয়ে তাদেরকেই বেছে নিতে হয়েছিল নিজস্বার্থ হাসিলের পথে আগাতে হয়েছিল।  সারকথায় আমেরিকাকে অনৈতিকতা সাথে নিয়ে হেটেছে আর সাথে সেনা প্রতিষ্ঠানকেই নিয়েছে নিজের অসৎ উদ্দেশ্যকে চরিতার্থ করতে। অথচ সেটা এমন এক সময়ে যেখানে সারা পাকিস্তানে ইমরান খান জনস্বার্থের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। আসলে বাইডেনের আমেরিকার রাজনীতি এতই দেউলিয়া দশা যে তাকে পাকিস্তানকে প্রভাবিত করতে হচ্ছে খারাপ রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে যাদের পাবলিক রেটিং সর্বনিম্ন!!! সেকারণে, প্রতি মুহুর্তে ক্ষমতাসীনেরা যত ষড়যন্ত্রমূলক আচরণ বা ততপরতা করছে এর দায়ভার  আমেরিকার উপরও বর্তাচ্ছে। এভাবে চলে পাকিস্তানে আমেরিকান স্বার্থ কতদুর কী হাসিল হতে পারে???

    ওদিকে সেনা প্রতিষ্ঠান যে অসদাচরণ ও প্রতিহিংসায় জড়িয়েছে এর একটা বড় প্রমাণ হল সিনেটর আজম সোয়াতি [Azam Swati ] এর সাথে জেনারেলদের আচরণ। আজম পিটিআই দলের সিনেটর। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ ও তার ছেলে অর্থপাচার মামলার আসামি ছিলেন। এর বিচার আদালতের শুরু হবার মুহুর্তে তিনি প্রথম প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন। এবং বিরোধীদের অনুমান ও অভিযোগ যে, ক্ষমতায় এসেই তিনি আমাদের দুদকের মত তাদের প্রতিষ্ঠান [FIA] কে প্রভাবিত করে নিজেরা বাপ-ছেলে ঐ মামলা থেকে নিজেদের মুক্ত বা জড়িত নয় বলে এফআইএ এর তরফ থেকে সার্টিফিকেট যোগাড় করে নিয়েছেন।
    ঘটনার শুরু এরপর থেকে এটা নিয়ে!  কারণ, সেনাপ্রধান বাজওয়া শাহবাজ বাপ-বেটার দায়মুক্তিতে তাদের কে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। আর এটা নিয়ে বাকা কথায় টুইটারে স্টাটাস দিয়েছিলেন এই  সিনেটর আজম সোয়াতি। আর এর প্রতিক্রিয়ায় সেনাপ্রধান বাজওয়া প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে উঠেন। তিনি আমাদের দেশের মত সাইবার মামলা দায়ের করান আজমের বিরুদ্ধে, শুধু তাই না। তিনি তাকে গ্রেপ্তার করান যেখানে “নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগও করেছেন সোয়াতি। অথচ মামলা যে তেমন সিরিয়াস কিছু নয় তা বুঝা যায় আদালত আজমকে প্রথমদিনই জামিন দিয়ে দেয়।

    কিন্তু প্রতিহিংসার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইতোমধ্যেই হাজির হয়ে গেছেঃ
    গত ৫ নভেম্বর এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসে সিনেটর আজম সোয়াতি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। কেন?
    তিনি কয়েকদিন আগে অন্য এক শহরে (কোয়েটা) গেছিলেন সস্ত্রীক। সেখানে এক সরকারি গেস্ট হাউজে ছিলেন।  আজম সোয়াতি জানাচ্ছেন তার স্ত্রীর কাছে  কেউ এক ভিডিও ক্লিপ পাঠিয়েছে। কেন? আর সেই ক্লিপ হল, তাদের স্বামী-স্ত্রীর অন্তরঙ্গ মুহুর্তের এক ভিডিও। আর এটা হল সেই গেষ্ট হাউজে থাকার রাতের ছবি। কোন দম্পতির রাতের সজ্জার অন্তরঙ্গ মুহুর্তের ছবি গোপনে রেকর্ড করা – এটা কোন সভ্যতা? কোন বাহাদুরি?

    তাহলে এখন এটা কেমন প্রতিহিংসামূলক আচরণ? এটা কী কোন দায়ীত্ববান ও নুন্যতম সেনসেটিভ ব্যক্তিত্বের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ? জেনারেলেরা নিজেদেরকে রাষ্ট্রের উর্ধে এক ব্যক্তিত্ব হিসাবে দেখতে চান! তাই সে প্রয়োজনে তারা পাকিস্তানের রাজনীতিকে আর কত নিচে নিবেন!  আর সবমিলিয়ে এতে আমেরিকা নিজ দায় ও সংশ্লিষ্ঠতা থেকে কী দূরে থাকতে পারবে!!!

    ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন তিনি প্রধান বিচারপতিকে লিখবেন এই জুডিশিয়াল এনকোয়ারির জন্য! কিন্তু এটা কী ক্ষমতাবানদের এই অসভ্যতা থেকে পাকিস্তান সমাজকে বের করে আনতে পারবে!!!!


    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • পাকিস্তানকে আমেরিকা কাছে টানার পরে, আবার বে-ইজ্জতি করা কেন?

    পাকিস্তানকে আমেরিকা কাছে টানার পরে, আবার বে-ইজ্জতি করা কেন?

    গৌতম দাস

    ১৭ অক্টোবর ২০২২  রাত ০১ঃ১৮

    https://wp.me/p1sCvy-4gb

     

           Pakistan’s Foreign Minister Bilawal Bhutto-Zardari speaks following his meeting with U.S. Secretary of State…..

     

    একটা দৃশ্যমান স্ববিরোধ বা পরস্পরবিরোধী ঘটনা আজকের লেখার বিষয়। কোথায় ঘটেছে এটা? বাইডেনের আমেরিকার বিদেশ নীতি-পলিসিতে বা তাঁর সাম্প্রতিক কিছু ততপরতায়।  কী সেই পরস্পরবিরোধী দুই ঘটনা?
    এক. মূল বিরোধের স্থান হল,  গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের যুগে চীন-আমেরিকার লড়াইয়ের পটভুমি। সেখানে ইউক্রেন যুদ্ধের ইস্যুকে কেন্দ্র করে ঘটনা গড়াতে গড়াতে এখন চীন-রাশিয়া-ভারত মিলে আমেরিকাবিরোধী এক মেরুকরণ ঘটিয়ে ফেলেছে। বিশেষত সর্বশেষ গতমাসে ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর চীনের সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও বা SCO) এর বার্ষিক সভা থেকে এই মেরুকরণ আরো দৃশ্যমান করে দেখানোর সুযোগ হিসাবে চীন-রাশিয়া-ভারত নিয়েছে। মনে রাখতে হবে, ভারত ও পাকিস্তান এর জন্মবিরো্‌ধ – এই প্রাচীনবিরোধকে উস্কে দিয়ে যেন আমেরিকা সেখান থেকে কোন নিজ সুবিধা বের করতে না পারে তাই ২০০১ সালে জন্ম নেয়া চীন-রাশিয়ার জোট এসসিও-তে ভারত-পাকিস্তান এদুইদেশকে একসাথে ২০১৫ সালে এসে একই দিনে SCO এর সদস্য করে নেয়া হয়েছিল। তা সত্বেও, বাইডেন ঐ মেরুকরণের পালটা প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের উপর সওয়ার হয়ে ভারত-পাকিস্তানের বিরোধ উস্কে তুলে দিল।
    সারকথায় বললে,  আমেরিকাবিরোধী চীন-রাশিয়া-ভারত মিলে তাদের নয়া মেরুকরণ-কে দুর্বল করতে সাম্প্রতিককালে আমেরিকা ভারত-পাকিস্তানের বিভেদ উস্কে তোলার কৌশল নিয়েছে। যেমন এর শুরুটা হল, পাকিস্তানকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশসহ অন্যান্য প্রায় আধা বিলিয়ন ডলারের সহায়তার জন্য বাইডেনের হাত বাড়ানো। স্বভাবতই এটা ভারত-পাকিস্তানের রেষারেষি উস্কে তুলতে যথেষ্ট। যদিও জয়শঙ্কর চেষ্টা করেছেন বিরোধটাকে ঠিক পাকিস্তান-ভারত নয় বরং  ভারত-আমেরিকার বিরোধ হিসাবে কেন্দ্রীভুত রাখতে। তিনি ভারতে বসে বা আমেরিকা সফরে গিয়ে এনিয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে  খুবই কড়া মন্তব্য বা অসন্তোষ ব্যক্ত করেছেন। [এখানে বিস্তারিত ] যদিও তাতে পাকিস্তানে ইমরানকে হটিয়ে আমেরিকার বর্তমান ক্ষমতাসীন শাহবাজ সরকারকে ক্ষমতায় আনা-কেন্দ্রিক ততপরতা অথবা তাতে যে আমেরিকা-ঘনিষ্টতা শুরু হয়েছিল তা এখন আপত্তিকর ‘অতি ঘনিষ্ঠতা’ হয়ে গেছে, যা আন-এথিক্যাল। কারণ এটা আর এখন পাকিস্তানের স্বার্থে যতটা নয়, তার চেয়ে আমেরিকার স্বার্থে শাহবাজ সরকারকে জবেহ দেওয়ার সামিল হয়ে গেছে। ভারতের সাথে পাকিস্তানের অমীমাংসিত বিরোধ আছে এটা সত্য। কিন্তু তাই বলে সেটাকে অপব্যবহার ঘটানো আর তাকেই আমেরিকা যেন একমাত্র, মুখ্য ও চোখা করে উঠিয়েছে এবং নিজ বাজে স্বার্থে!

    কিন্তু আসলেই কী আমরা বাইডেনের পদক্ষেপ-গুলো বুঝেছিলামঃ
    বাইরের আমরাও ভেবেছিলাম আমরা বোধহয় ঘটনা, মেরুকরণ ইত্যাদির গতিপ্রকৃতি বুঝেতেছি। কিন্তু না আবার কিছু নতুন ঘটনা হাজির হয়েছে যাতে আমাদের ঘটনা বুঝতে এখনো অনেক বাকি – এটাই সবার উপরে ভেসে উঠেছে।
    কিন্তু কী সেটা? সে ঘটনা আবার দুইটা। এক, শাহবাজের পাকিস্তান তো এখন থেকে বাইডেনকে ভালই সার্ভিস দিতে থাকবে, এটাই ধরে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু না। আমরা দেখলাম, বাইডেন হঠাৎ গত পরশু (১৪ অক্টোবর) পাকিস্তান সম্পর্কে খুবই কঠোর, কটু ও অমর্যাদাকর মন্তব্য করেছে। যার ফলে পাকিস্তানে আমেরিকান রাষ্ট্রদুতকে শাহবাজ সরকার ডেকে এনে তাঁর হাতে পাকিস্তানের কড়া আপত্তি ধরিয়ে দিয়েছে। তাহলে কী দাঁড়ালো এটা?  পাকিস্তান সম্পর্কে বাইডেন বলেছেন, “পাকিস্তান হচ্ছে সম্ভবত দুনিয়ার সেসব মারাত্মক ক্ষতিকর বিপদজনক রাষ্ট্রগুলোর একটা যার হাতে পারমানবিক অস্ত্র আছে কিন্তু দায়ীত্ববান নিয়ন্ত্রণ নাই”। “may be one of the most dangerous” countries in the world which had “nuclear weapons without any cohesion”. …।।

    আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে তাইঃ
    আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে – একথার মানে কী বা বলতে কী বুঝব? অথবা কতটুকুর বেশি বুঝলে ভুল হবে?
    একালের বিচারে সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া বলতে বুঝতে হবে, কোন দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলেও রুটিন কিছু সম্পর্ক তবুও থেকেও যাওয়া।  অর্থাৎ  ভেঙ্গে যাওয়ার আগে যে  সম্পর্কে ‘বিশেষ ঘনিষ্ঠতার’ জায়গাগুলো ছিল কেবল সেসব ক্ষেত্রগুলোর তাতে পরিসমাপ্তি ঘটা। কিন্তু এরপরেও কূটনৈতিক সম্পর্কসহ রুটিন যেসব সম্পর্কে ঐ দুই দেশের মধ্যে আগেও ছিল যেমন, এসবের মধ্যে পারস্পরিক পণ্য-বিনিময় বাণিজ্যিক সম্পর্ক যেগুলো ছিল সেগুলো সবই তা চলতে থাকবে। এটাকে বলছি ‘একালের বিচারের’ ঘটনা। কেন? কারণ,  এর আগে মানে ১৯৯২ সালের আগে আমেরিকা-সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার সম্পর্ক এর কথাই যদি ধরি – এটাই মুখ্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটা ধরণ এবং এতাই স্টান্ডার্ড বলে মনে করা হত। আর এর মূল বৈশিষ্ট ছিল আমেরিকা-সোভিয়েত এ’দুই ব্লক রাষ্ট্রের মধ্যে কোন – পারস্পরিক পণ্য-বিনিময় বাণিজ্যিক সম্পর্ক’ই ছিল না –  এমনকি ভাষা, কালচার বা শিল্পকলার বিনিময় বলতেও তেমন কিছুই ছিল না। যার সারকথাটা হল – ‘নো এক্সচেঞ্জ’। এটাই ছিল সেকালের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের স্টান্ডার্ড রূপ। আর এর ঠিক উলটা হল একালের বিচারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক যেখানে সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া বললেও বুঝতে হবে তবু একধরণের রুটিন সম্পর্ক যেমন সাধারণ বাণিজ্য সম্পর্ক তবু থেকে যাবে। বিস্তারে যাব না কেবল সংক্ষেপে বলব, একালের সম্পর্ক মানে সকলেই একই আইওএমএফের সদস্য তাই বাণিজ্য সম্পর্ক থেকে যাবেই। আর তাছাড়া একবার বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি ও শুরু করে ফেললে কিছু কিছু পণ্যে পারাস্পরিক ও আন্তঃনির্ভরতা তৈরি হয়ে যাবেই। এটাই মনে রেখে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া ধারণাকে একালে বুঝতে হবে।
    তাহলে একালের বিচারে  আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে বলতে কি বুঝায়, এর অন্তত কিছু বুঝলাম। আর তাতে ভারত যেসব সুবিধা হারিয়েছে সেগুলো হল যেমনঃ ১। আমেরিকার-ভারত একসাথে হয়ে আগে পাকিস্তান কোপাতে পারত। মানে আমেরিকার-ভারতের ইসলাম-বিদ্বেষকে তারা পাকিস্তানেরই দোষ বলে উলটা চাপিয়ে দিতে পারত। তাতে দাবি করত, পাকিস্তান একটা ‘নিচা’ দেশ – এরা পশ্চাদপদ, এরা জঙ্গী, আনকালচার্ড কিংবা এদের ধর্মটাই অপুষ্ট বা দুষ্ট ধরণের ঘৃণামূলক অবুঝ বা না-বুঝের কথাবার্তা  ইত্যাদি; এই ভাষ্যের উপর দাঁড়িয়ে এরা পাকিস্তানকে ডিকটেট করতেও সেকালে চাইতে পারত। বাস্তবত  আমেরিকার-ভারতই যে মূলত স্ব স্ব দেশে মুসলমানদের সাথে সীমাহীন বৈষম্য করে চলেছে, বৈষম্যের জাল ফেলে রেখেছে সেটাকে আড়ালে রেখে তাদের সব যৌথ ততপরতাই হল জঙ্গি, ইসলামি রাডিক্যালিজম নামে চালানো সব ঘটনার আদি উতস!
    সেটা যাক হোক,  আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক-জোট এলায়েন্স সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে আর এতেই ভারত আর যে পাকিস্তানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এই ‘বয়ানের জায়গা নাই হয়ে গেছে  পাচ্ছে না, চালু থাকতে পারছে না। এর এক সরাসরি ক্ষতি হয়েছে মোদি সরকারের। তিনি ভারত “পাকিস্তানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ” এই  ভুয়া বয়ানের উপর দাড়িয়েই ভারতের মুসলমানেরাই খারাপ বা যেন এজন্যই  এরা নিপীড়িত হবার যোগ্য এই সাফাই তৈরি করেই হিন্দুত্ববাদের জজবা তুলে সেই জোশগুলোকে ভোটের বাক্সে জড়ো করে নিজ ক্ষমতা টিকায় রাখতে ব্যবহার করে চলতে পারত। এটা মোদির এক সরাসরি ক্ষতি।

    তেমনই ভারতের আরেক ক্ষতি হল বাংলাদেশেঃ
    আমেরিকা আর বাংলাদেশ – এরা সরাসরি নিজেরা দুই দেশের স্বার্থের ভাল-মন্দ বা পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে নিজেরাই ডিল করুক – এভাবেই আমেরিকা-বাংলাদেশের সম্পর্ক গড়ে উঠুক?? তাতে ভালবাসা বা শত্রুতা করুক এটা ভারতের কাম্য নয়! না তা নয়। ভারতের ইচ্ছা বাংলাদেশ আমেরিকা-বাংলাদেশ এর সম্পর্কটাকে সরাসরি নিজেরা নয়; বরং ভারতের মাধ্যমে ডিল করুক। মানে আমেরিকা-বাংলাদেশের সম্পর্ক – এর লেনদেন, সম্পর্ক রক্ষা ইত্যাদি সবটা ভারতের মাধ্যমে ঘটুক। আর এভাবে ভারতকে একটা আলগা মাতবরি বা কুতুবি করতে দেক। যেটা আদতে বাংলাদেশের উপর ভারত একটা আলগা দালালি ও খামখা অভিভাবকগিরি হয়ে উঠুক। বিনিময়ে যেটা বাংলাদেশের উপর ভারতের প্রভাব বলে যেন ভারত দাবি ও উপভোগ করতে পারে!! গত ২০০৭ সাল থেকে এটাই কায়েম হয়ে ভারতের রুস্তমি রাজত্বের ভিত্তি হয়ে থাকা শুরু হয়েছিল। হাসিনা নিজ ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে এটা মেনে নিয়েছিল বলেই এটা চালু হতে পেরেছিল।

    কিন্তু  আমেরিকার ভারতের সম্পর্ক-জোট এলায়েন্স সম্প্রতি ভেঙ্গে যাওয়াতে এসব কিছুই একেবারেই দুর্বল হয়ে গেছে। এতে বাস্তবতা হল খুব সহসাই আবার  আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক নুন্যতম জেগে উঠুক বা উঠবে এর কোন সম্ভাবনাই নাই, বরং আরো শত্রুতামূলক হয়ে উঠার সম্ভাবনা। তাই এই পরিস্থিতিতে ভারত নতুন কিছু করে বাংলাদেশের সরকারের উপর প্রভাব সামান্যও যদি ফেরত পায় এমন সব চেষ্টা জারি রেখেছে। এরই একটা রিপোর্ট হল, “বাংলাদেশের ১৯৭১ সালে ঘটা নৃশংসতাগুলোকে আমেরিকান কংগ্রেসে ‘গণহত্যা’ বলে চিহ্নিত করে প্রস্তাব পাশ”  ‘Resolution in US house to recognise 1971 atrocities in Bangladesh as genocide’ ।

    ঘটনা পুরানা একাত্তর সালের কিন্তু এটা এখন শাহবাগী রাজনীতি।  সংক্ষেপে বললে বিষয়টা হল, কোন রাষ্ট্রীয় নৃশংসতার ঘটনাকে জাতিসংঘের সংজ্ঞায় ও সীমানায় জেনোসাইড বা ‘গণহত্যা’ বলে চিহ্নিত করানো ও স্বীকৃতির ইন্টারন্যাশনাল লিগাল মুল্য অনেক। এছারা এতে ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি দেওয়ার অনেক কাছে চলে যাওয়াও হয়। কিন্তু নানান টেকনিক্যাল কারণে, বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতার ঘটনা জাতিসংঘের চোখে গণহত্যা বলে স্বীকৃত নয়। এখন এই আলোকে আমেরিকান কংগ্রেস যদি  এমন গণহত্যা বলে স্বীকৃতি দেয় তবু সেটা অবশ্যই সমতুল্য কোন ঘটনাই নয়। তবুও এর কেবল কিছুটা ক্যাম্পেইন, প্রপাগান্ডা মুল্য মাত্র এতে থাকবে। এছাড়া এটা লিগাল রায় নয়। পক্ষ-বিপক্ষেরের রাজনৈতিক জোটের মতামত মাত্র।

    কিন্তু তা হলেও এমন মতামত আমেরিকান সংসদ বা কংগ্রেস থেকে উদিত হতে পারল কেন?  এটা তো সত্তরের দশকেও হয় নাই। তাহলে এখন কেন?

    আমেরিকা লবির দেশ, লবি করা বৈধঃ
    বহু দেশের নাগরিকই পরবর্তিতে মাইগ্রেটেড হয়ে আমেরিকার নাগরিক হয়। আমেরিকান নাগরিক মানে এটাই। এটাই আমেরিকান নাগরিক হওয়াদের প্রধান ধারা। ফলে কেউ পুর্ণ নাগরিক হয়ে গেলেও তারা স্ব স্ব অরিজিন দেশের স্বার্থের প্রেশার গ্রুপের ভুমিকার ভোটার-নাগরিক হয়ে যেতে পারে। তবে সেটা একমাত্র একই অরিজিন দেশের আমেরিকানেরা সংগঠিত হতে পারলে তবেই এরা সম্মিলিতভাবে ফেলে আসা দেশের পক্ষে বিশাল লবি গ্রুপ হয়ে উঠতে পারে।  বাংলাদেশেরও বহু মানুষ একালে আমেরিকার নাগরিক হয়ে গেছে। কিন্তু তারা এখনো বাংলাদেশ লবি গ্রুপ হবার পরিবর্তে  বরং দেশের মতই দ্বিদলীয় ভাগ হয়ে দলদাস হতেই আগ্রহি।

    কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে, তারা অনেক জনসংখ্যার বলে, সরকারের দিক থেকে আমেরিকায় এমবেশি থেকে পরিচালিত এটা সংগঠিত করে নেয়া বলে এটা সবসময় ক্ষমতাসীন দলের হয়ে তবে বিশাল লবি গ্রুপ – এক র‍্যাকেট হয়ে ততপরতা করে থাকে। কংগ্রেস সদস্যও নির্বাচন করে থাকে। কোন সিনেটরের পিছনের সাপোর্ট গ্রুপ হয়েও কাজ করে থাকে সময়ে। তবে কংগ্রেসম্যান বা সিনেটর এসব জনপ্রতিনিধি সবসময় সরাসরি ভারতীয় অরিজিনের এমন ব্যক্তি নাও হতে পারেন। তবে অবশ্যই তাদের কনষ্টিটুয়েন্সি ভারতীয় অরিজিন আমেরিকান ভোটাররাই হয়ে থাকেন। এছাড়া আরেক ধরণের জনপ্রতিনিধিকে দেখা যায় যারা আমেরিকায় ভারতের স্বার্থের পক্ষে কাজ করে থাকেন। এরা হল, আসলে কোন এক বা একদল হোয়াইট আমেরিকান ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি যাদেরকে ভারত তাদের দেশের ব্যবসা পাইয়ে দিয়েছে, সহজ করে দিয়েছে। আর বিনিময়ে তারা ভারতের পক্ষে ও স্বার্থে কাজ করবে এমন এক বা একাধিক জনপ্রতিনিধি জুটিয়ে দিয়েছে হয়ত।

    আলোচ্য ক্ষেত্রেও আমেরিকান কংগ্রেসে যে প্রস্তাব পাশ হয়েছে,  দুই কংগ্রেসম্যান এই প্রস্তাবটা তুলে এসে পাশ করিয়েছেন –  স্টিভ শ্যাবট [Steve Chabot ] ও আরও খান্না [Ro Khanna ] নামের দুই আমেরিকান কংগ্রেসম্যান। স্বভাবতই খান্না  এই পাঞ্জাবি টাইটেল এর  মানে তিনি ভারতীয় অরিজিন।

    তাহলে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট “এই প্রস্তাব” তাদের এত আগ্রহ করে আনার কারণ কী? কারণ এটাই মোদি সরকারের আগ্রহ। কিন্তু সরকারের আগ্রহ কেন? কারণ, এই প্রস্তাব মানে হল,  বাংলাদেশ-আমেরিকান সম্পর্ক সরাসরি না হয়ে সেটা ভারতের মাধ্যমে  বাংলাদেশ-আমেরিকান সম্পর্ক করার বা হবার লাইনের প্রস্তাব – এরই আকুতি। আর এটাই এতদিন হাসিনা সরকারের স্বার্থ ছিল। বা স্বার্থের গৃহিত লাইন ছিল। যেটা এখন অকার্যকর। হাসিনা মনে করে ভারত এব্যাপারে এখন মুরোদহীন; যার নিজেরই আমেরিকার কাছে বেইল নাই। আর খোদ আমেরিকাই এখন হাসিনা সরকারের উপর বিলা! কিন্তু তবু ভারত নাছোড়বান্দা। যেন দেখাতে চায় এখনো আমার কিছু আমেরিকান জনপ্রতিনিধির উপর প্রভাব আছে আর সেটা আমরাই বাংলাদেশে বেচতে চাই!!

    তাহলে এখন এই লেখার মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সেটা হল, বাইডেন কেন চীন-আমেরিকার বিরোধ প্রসঙ্গে এখন ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে ব্যবহার কাজে লাগানো সম্পন্ন করেও আবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই পারমানবিক বোমার অধিকারি দেশ প্রশ্নে অযোগ্য [without any cohesion] রাষ্ট্র বললো?

    Biden in a speech said Pakistan “may be one of the most dangerous” countries in the world which had “nuclear weapons without any cohesion”.

    আসলে এর মূল কারণ, দুটা দুই কনটেকস্ট (context) বা পটভুমিতে। প্রথমটা ভারতের চীন-রাশিয়ার পক্ষে চলে যাওয়ার শাস্তি হিসাবে যেটা আগেই অনেক বলেছি। আর দ্বিতীয়টার হল, আমেরিকায় নির্বাচন আগামি ৮ নভেম্বর ২০২২, সেই প্রসঙ্গে ও পটভুমিতে। নির্বাচন মানে?

    বাইডেনের চার বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার দুইবছর বা অর্ধ-আয়ু পার হবার দিন হল আগামি ৮ নভেম্বর। আর ঐদিনই আবার আমেরিকান সিস্টেম অনুসারে এক-তৃতীয়াংশ সিনেট ও পুরা কংগ্রেসের সদস্যদের আসনে মেয়াদ শেষ ও নয়া-নির্বাচনের দিন। আরেকটু ভেঙ্গে বললে, আমেরিকার কংগ্রেসে (আমাদের ভাষায় সংসদে) সদস্যরা মাত্র দুবছরের জন্য নির্বাচিত হন। তাই প্রতিবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ও ওর সাথে একবার আর আরেকবার নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের দুবছর পার হলে পরে (যেটাকে মিড-টার্ম বলে) – এভাবে দুই সময়ে দুবছর পরপর আমেরিকান কংগ্রেস সব সদস্যদের (মোট ৪৩৫+২ ) আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

    আর আমেরিকান কংগ্রেসের নির্বাচনের সাথে একই সময়ে এভাবে সিনেটরদেরও নির্বাচন হইয়ে থাকে। যদিও এক্ষেত্রে এক জায়গায় শুধু একটু ফারাক আছে।   তা হল, সিনেটরেরা কংগ্রেসের মত দুবছরের মেয়াদে নয়, বরং টানা ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন। তবে প্রতি দুই বছর পরপর মোট আসনে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আসনে নয়া নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

    তাহলে সারকথায় মিড টার্ম নির্বাচন মানে কী দাড়ালো? তা হল, একঃ  সব কংগ্রেসের আসনেই (৪৩৫+২) নয়া নির্বাচন এর দিন সেটা। দুইঃ  সিনেটের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আসনে নয়া নির্বাচনের দিন সেটা। আর তিনঃ প্রতি নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের মেয়াদের অর্ধ-মেয়াদ বা দুবছর পার করার দিন সেটা। যদিও এই মিড-টার্মের নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের (বাইডেনের ডেমক্রাট) দলের জনপ্রতিনিধিরা কংগ্রেস ও সিনেটের যেকোন এক জায়গায় বা দুই জায়গাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও তাতে প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা হারাতে হবে না। মানে ডেমক্রাটেরা আগামি এই মিড টার্মে কংগ্রেস ও সিনেটের সবজায়গায় হেরে গেলেও বাইডেনই প্রেসিডেন্ট থেকে যাবেন। চারবছর পুর্ণ প্রেসিডেন্টই থেকে যাবেন।

    এবার আমাদের প্রাসঙ্গিক কথা হল, আসন্ন মিড-টার্মের নির্বাচনে ডেমোক্রাট কংগ্রেসম্যান যারা ভারত-প্রভাবিত তাদেরকে জিতাবার জন্যই বাইডেন পাকিস্তান-বিরোধী অমন কথা বলেছেন। অর্থাৎ এর সাথে ভারতের আমেরিকাকে ছেড়ে চীন-রাশিয়ার সাথে তাদের জোটে চলে যাবার কোন সম্পর্ক নাই।
    আমার একথা সবচেয়ে ভাল বুঝা যাবে বাইডেন কোথায় গিয়ে এইকথাগুলো বলছেন সেদিকে যদি খেয়াল করেন। লেখা আছে আসন্ন মিড-টার্ম নির্বাচন উপলক্ষ্যে ডেমোক্রাট কংগ্রেস প্রার্থীদের পক্ষে ক্যাম্পেইন শুরু করা হবে [……Biden made the comments during a reception of the Democratic Congressional Campaign Committee on Thursday ]। ঐ ক্যাম্পেইন শুরুর আগে ক্যাম্পেইন কমিটির সভায় তাদেরকে উতসাহ দিতে  বাইডেন সেখানে গিয়েছিলেন।  ঐ বক্তৃতাতেই তিনি পাকিস্তানকে ক্ষেপিয়ে ঐকথা বলেছেন।
    এককথায় বললে, যেমন  ডেমোক্রাট Ro Khanna [ROHIT KHANNA] এর মত ভারতীয় অরিজিন আমেরিকান কংগ্রেসম্যানদেরকে মিডটার্মে আবার জিতাবার জন্য বাইডেন পাকিস্তানকে ঠেস দেয়া বা নিচা দেখানো ঐ বক্তব্য দিয়েছেন। আবার যেমন Ro Khanna কে জিতাবার জন্য বাইডেন কাজ করছেন বলে এর মানে এমন নয় যে বাইডেন আমেরিকা-ভারতের ঘনিষ্ট আগেকার সম্পর্কটাই আবার ফিরিয়ে আনার পক্ষে কাজ করছেন। এমন বুঝা ভুল হবে!

    এই হল মূল কথা। আর এখন একটু বাড়তি কথা বলে নেই এই সুযোগে। এই মিড-টার্মে বাইডেনের দল ডেমোক্রাটেরা গোহারা হারবে বলে পুর্বাভাস বলছে। কারণ প্রায় ৯% মুদ্রাস্ফীতি আর এতে মিডল-ক্লাস ও নিম্ন মধ্যবিত্ত এরা প্রচন্ড ক্ষেপে ক্ষুব্ধ। এছারা প্রায় দেড় বছর ধরেই তাদের পছন্দের ও নাগালের মধ্যে মুল্যের চীনের তৈরি গৃহস্থলিতে ব্যবহার হয় এমন ওয়াসিং মেসিন বা এসি ইত্যাদি আমদানি পণ্যের উপর ২৫% বা এর উপরে কোথাও ৬৬% পর্যন্ত অতিরিক্ত ট্যাক্স বসানোতে ক্ষুব্ধ ছিল তারা। যদিও এই বাড়তি ট্যাক্স বসিয়েছিলেন ট্রাম্প তাঁর ক্ষতা ছাড়ার আগে কিন্তু এর এফেক্ট শুরু হয় বাইডেনের আমলে। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ট ভোটারেরা বাইদেনের দলের বিরুদ্ধে যাবে বলে অনুমান। এতে যদিও বাইডেন ক্ষমতাচ্যুত হবেন না। তবে, যেগুলো অর্থ-বিল মানে যেখানে প্রেসিডেন্ট কোথাও কোন দেশে অর্থ বরাদ্দ দিতে চান এমন প্রতিশ্রুতি দিতে চান সেগুলো আগে তাকে সংসদ-সিনেটে অনুমোদন নিতে হবে। আর এই অনুমোদন নিতে গিয়েই তিনি বাধার সম্মুখীন হবেন।

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

     

     

     

  • বড় নয়া মেরুকরণ শুরু, উভয় সঙ্কটে ভারত!

    বড় নয়া মেরুকরণ শুরু, উভয় সঙ্কটে ভারত!

    গৌতম দাস
    ০৪ অক্টোবর ২০২২;  Published on: Oct 4, 2022 at 00:03

    https://wp.me/p1sCvy-4fr

     

      External Affairs Minister S Jaishankar with United States Secretary of State Antony Blinken in Washington DC on Tuesday | ANI

    সরাসরি বললে, এতদিন এশিয়ায় এক মুখ্য (পুরানা) মেরুকরণ বিরাজ করছিল যেটার শুরু মোটাদাগে বললে চলতি শতকের শুরু থেকে। কিন্তু চিনব কী করে?  বাংলাদেশের গত ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন থেকে শুরু হওয়া আর পরিণতিতে ভারত-আমেরিকার বসিয়ে দেয়া হাসিনা সরকারকে আমরা অনেকে যেভাবে চিনি আর এটাই হল সেই মেরুকরণের ফলাফল বা ফসল। তাই পুরানা সেই মেরুকরণ বলতে বুঝিয়েছি বাংলাদেশের ওয়ান-ইলেভেন ও সাথের পরবর্তি সরকারকে। অর্থাৎ এই মেরুকরণে মূল বৈশিষ্ট ছিল যে পরিণতিতে এতে ‘আমেরিকা-ভারত-বাংলাদেশ” এরা জায়গা নিয়েছিল একই মেরুতে।  আজ সেই মেরুকরণ এখন ভেঙ্গে পড়ার মুখে; অন্তত আজ ৩ অক্টোবরের সকালের খবর পর্যন্ত; তা খুবই দ্রুত আগিয়ে যাচ্ছে। আর সংশ্লিষ্ট সব পক্ষগুলোরই ভাষা ও ভাষ্যও ক্রমশ বদলে যাচ্ছে!  তবে অবশ্যই এটা তা ভেঙ্গে-গড়া ধরণের। তাই আবার গড়তে বড় আরেক নয়া মেরুকরণ ঘটা শুরু হয়েছে; সেটা ইতোমধ্যে যাত্রা শুরু করে দিয়েছে। যদিও এর বড় ও স্পষ্ট প্রকাশটা ঘটতে আরেকটু সময় নিচ্ছে।

    মুখ্য তবে পুরানা মেরুকরণ এর বৈশিষ্ট কী ছিলঃ
    ঘটনার পিছনের দিক থেকে তাকিয়ে বললে, এর জন্ম জর্জ ডব্লিউ বুশ [George Walker Bush] বা জুনিয়র বুশের হাতে যার দুই টার্মের প্রেসিডেন্সি হল ২০০১-২০০৯, এই সময়কালে। তাতে আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্কের নয়া যুগের সুচনা করেছিল। দু-এক বাক্যে বললে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার (১৯৫৩-৬১) [Dwight D. Eisenhower] এর আমলে (১৯৫৯ সালের ডিসেম্বরে তাঁর প্রথম ভারত সফর), ততদিনে যিনি “সিআইও পাঠিয়ে বিভিন্ন দেশে সরকার ফেলানো” কুখ্যাত অভ্যাস চালুর নায়ক; এভাবে প্রথম “ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক” শুরু হয়েছিল সেই ১৯৫৯ সাল থেকে। যদিও ১৯৬২ সালের পর থেকে তা আর ভারতের জন্য সুখকর থাকে নাই। মুল কারণ দুটা।  একদিকে আমেরিকার হয়ে নেহেরুর ভারতের চীনে (তীব্বতের দালাইলামার দেশছেড়ে পলায়ন ও ভারতে আশ্রয় ইস্যুতে) ততপরতা ও আমেরিকার খেদমত করতে গিয়েছিলেন বলে (মনে করা হয় এটাই আইসেনহাওয়ার-নেহেরুর ১৯৫৯ সালের গোপন চুক্তি ); আর তাতে ক্ষুব্ধ চীনের হাতে ১৯৬২ সালে আসাম বেদখল ও মার খাওয়া ছিল ভারতের জন্য খুবই খারাপ অভিজ্ঞতা।
    আর এছাড়া অন্যদিকে পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে  মূলত, ভারত-পাকিস্তানসহ ছোট দেশগুলো যাতে নিজেরাই পারমাণবিক বোমা সংগ্রহ বা তৈরিতে না আগাতে পারে তাই, আমেরিকা-সোভিয়েত এই ইস্যুতে এক এলায়েন্স করেছিল; আর তাতে যৌথভাবে নানান নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল (যা শেষে NPT বা নন প্রিলিফারেশন চুক্তি পর্যন্ত হয়েছিল। এই NPT  চুক্তি ছিল আসলে, UN এর অধীনে এই চুক্তি সদস্যদের স্বাক্ষরের জন্য ওপেন করা হয় ১৯৬৮ সালে আর কার্যকর হয়েছিল ১৯৭০ সাল থেকে।) – আর এদুই ঘটনা থেকে পরবর্তিতে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক একেবারেই ঝুলে যায়, প্রায় ভেঙ্গে পড়ে। যা আর সতেজ থাকে নাই।
    তাই এর প্রায় ত্রিশবছর পরে  আর ইতোমধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইতোমধ্যে (১৯৯১ সালে) ভেঙ্গে যাবার সুবিধা নিতে, একমাত্র গত শতকের নব্বইয়ের দশকেরও শেষভাগে এসে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক আবার চালু করতে এবার দুপক্ষ আগ্রহি হয়েছিল। যদিও তা ২০০০ সালের জানুয়ারিতে বিল ক্লিনটনের ভারত সফরে ও তাঁর হাতে তবে ‘সুশীলভাবে’ ঘটেছিল;  আর ক্লিনটনের বিপরীতে তখন ভারতের বিজেপির বাজপেয়ীর প্রথম পুর্ণ প্রধানমন্ত্রী (১৯৯৯-২০০৪) জমানা ছিল সেটা।

    তবে ভারত-আমেরিকার সেই সম্পর্কের ভিত্তি ছিল  পরস্পরের পিঠচুলকানোঃ
    আর ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ২০০১ সেপ্টেম্বর নাইন-ইলেভেনের পরে তা মূলত উভয়ের  “মুসলমান কোপানো” সুবিধা নিতে তারা ‘জঙ্গী’ বয়ান খাড়া করে এরই মারামারি যুদ্ধের সম্পর্ক হিসাবে। আর তা প্রথম রূপান্তরিত হয়েছিল বুশের হাতে ওয়ার অন টেরর এর পলিসির অধীনে।  অর্থাত নয়া চলতি শতকে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক এর মুখ্য দিক বা ফোকাস ছিল আসলে এক ‘মুসলমান কোপানো্র’ এলায়েন্স। যেটা তাদের উভয়ের জন্য দরকারি ছিল এজন্য যে ১৯৮৯ সালে কাশ্মীরে ভোটে কারচুপি করে এথেকে সৃষ্ঠ ক্ষোভে কাশ্মিরের মুসলমান জনগোষ্ঠিকে প্রথমে কংগ্রেস পরে বিজেপির বাজপেয়ী আরও সুচারুভাবে সেই প্রথম সশস্ত্রতার দিকে ঠেকে দেওয়াতে উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবিলা। আর ওদিকে আমেরিকার দিক থেকে দরকার তাদের “ওয়ার অন টেররের পলিসির” পক্ষে ভারতের সম্মতি আদায় – এদুই স্বার্থের এলায়েন্স ছিল সেটা। পরবর্তিতে, আরো এগিয়ে ২০০৬ সালে বুশের ভারত সফরের ফলে, তা হয়ে দাঁড়ায় এমন যেটাকে বলা যায়,  ভারত আমেরিকার হয়ে ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ বা ‘চীন ঠেকানোর ঠিকা” নেওয়া সম্পর্ক। এটাই ভারত-আমেরিকার প্রথম ঘোরতর চীনবিরোধি এক স্ট্রাটেজিক এলায়েন্স ছিল। যা এবার সম্পুর্ণ উলটা দিকে টার্ণ নিতে শুরু করেছে আর এবার এই ২০২২ সালের শেষভাগে এসে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক আবার ভাঙ্গাচুড়ে, এক নয়া মেরুকরণ হতে যাচ্ছে। কোন কোন ইস্যু বা ক্ষেত্রে তা ইতোমধ্যেই  প্রবলভাবে শুরু হয়ে গেছে।

    ভারতের উপর আমেরিকার এবার প্রথম স্যাংশন জারি শুরু হয়েছেঃ
    ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক এবারের প্রকাশ্যে  ঢলে পড়ার ঘটনাটা হল, এই প্রথম ভারতের উপর আমেরিকার স্যাংশন জারি। যেমন, ভারতের প্রভাবশালী মিডিয়া দ্যা প্রিন্ট এর এক রিপোর্টের শিরোনাম করেছে – লিখেছে  “জয়শঙ্করের আমেরিকা সফরের পরেই, আমেরিকার প্রথম এক ভারতীয় কোম্পানির উপর, ইরানি তেল আমদানির সম্পর্ক করার জন্য, স্যাংশন আরোপ” [Days after Jaishankar visit, US imposes first-ever sanction on Indian firm for oil trade with Iran]।

    অর্থাৎ এর আগে ভারতকে দেয়া আমেরিকার বাণিজ্যিক সুবিধাসহ বিভিন্ন ফেবার পরে ছাটাই হতে হতে ক্রমশ নাই হয়ে যাচ্ছিল সেই ট্রাম্পের আমল (২০১৭) থেকেই। তবু ভারতের কোর কিছু স্ট্রাটেজিক সম্পর্ক  সে আমেরিকার সাথে বজায় রেখে চলছিল। এমনকি ট্রাম্প আমলের (২০১৯) শেষে যখন ইরান-আমেরিকান পারমানবিক চুক্তি সে [Joint Comprehensive Plan of Action (JCPOA)] ভেঙ্গে দিলে এরপরে ইরানের উপর নতুন করে স্যাংশন আরোপ করা হয়েছিল। আর তাতে ট্রাম্প ২০১৯ সালে ভারতকে ইরান থেকে সেবার তেল আমদানি বন্ধ করতে বাধ্যও করতে পেরেছিল। এছাড়াও একালে কোয়াডের ভিতর নানা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান নিয়ে বাইডেন প্রকাশ্যেই সমালোচনা করে যাচ্ছিল। ভারতে মোদির “মুসলমান কুপিয়ে নির্বাচনে জিতার” কৌশল নিয়ে বাইডেনের ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন’ স্যাংশন আরোপের সুপারিশ করে চলছিল লাগাতর। বাইডেন সেটা নিয়ে সাবধান করেছেন এমনকি, কাশ্মীরে মোদির নিপীড়নমূলক পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। কিন্তু স্যাংশন আরোপ করতে পারেন এমন ধারণা দিলেও বাইডেন এর আগে কখনও তা বাস্তবায়ন করেন নাই। অর্থাৎ প্রকাশ্য মুখে সমালোচনা করলেও বাইডেন প্রশাসন কখনও চরম পদক্ষেপ হিসাবে ভারতের উপর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কোন স্যংশন আরোপের মত ঘটনা ঘটান নাই।

    ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পরও আমেরিকান স্যাংশন-নিষেধাজ্ঞা খাওয়া রাশিয়া থেকে এতদিন ভারত তেল ও অন্যান্ত পণ্য আমদানি করে চলেছিল। তাদের গরীব অর্থনীতির দোহাই দিয়ে। এসব নিয়ে প্রকাশ্যে আমেরিকা আপত্তি বা অসন্তোষ জানালেও কখনই আমেরিকান পদক্ষেপ স্যাংশন আরোপ পর্যন্ত  গড়ায় নাই। কিন্তু এবার একই কাজ মানে ইরানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে এবং তা একটা ভারতীয় বেসরকারি কোম্পানি আমদানি করাতে আমেরিকা এবার সেই কোম্পানির উপর প্রথম আমেরিকা সরাসরি স্যাংশন আরোপ করেছে।

    আমেরিকার এই এক্টের মধ্যে দিয়ে একটা নিশ্চিত ম্যাসেজ হল, আমেরিকা তার আপত্তিসহ-ই রাশিয়া থেকে ভারতকে তেল আমদানি এলাও করলেও ইরান থেকে একই কাজ ভারত করতে চাইলে কঠোরভাবে তা দমন করবে তা বুঝিয়ে দিল।

    ওদিকে এনিয়ে মিডিয়া রিপোর্ট হল, এত পরেপরেই এবার জয়শঙ্করের আমেরিকা সফরে গত সপ্তাহের ২৭ সেপ্টেম্বরে ব্লিঙ্কের সাথে তাঁর বৈঠকে এসব বিরোধ নিয়ে ঠিক কী আলাপ হয়েছিল এর বিস্তারিত সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে, ভারতীয় মুখপাত্র জানান নাই। তাঁর “জানা নাই”, অজুহাতে। অর্থাৎ অনুমান করা হচ্ছে ভারতের মোদি সরকারকে এখন “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক নিয়ে” কিছু তিতা সিদ্ধান্ত আর না নিলেই নয় – এমন অবস্থায় পৌছেছে। আগামি দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে এর চিহ্ন-ইঙ্গিত আর অপ্রকাশ্য থাকবে না।  আসলে এবারের জয়শঙ্করের সফরের পরে আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক যে আর  অপ্রকাশ্য-বিরোধ হয়ে হাজির না হয়ে থাকবে না, এরই প্রবল অনুমান করা হচ্ছে। কারণ, কোন সম্পর্ক আরো কিছুদিন ইতিবাচক থাকার সম্ভাবনা থাকলে সেটা এতদিন প্রকাশ্যে এসে পড়ত।

    সম্পর্কবিরোধটা শুধু তেল আমদানি, অনেক গভীরেরঃ
    আসলে সম্পর্কবিরোধটা তো শুধু তেল আমদানি নিয়ে নয়; বরং সর্বত্র ও সব ইস্যুতেই। যার আরেক বড় প্রকাশ হল, আমেরিকান বার্মা দখলের খায়েস-পরিকল্পনা। যেটা নিয়ে আগের সপ্তাহে লিখেছি। বলেছিলাম ভারতের কোরস্বার্থ হল, বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সেভেনথ ফ্লিট নোঙর না করতে দেয়া আর এরই সাথে সর্বোতভাবে ” হবু “আমেরিকান বার্মা দখলের” বিরোধিতা করা। মানে কোন ‘বাইডেনের বার্মা’ দেখতে ভারতের না চাওয়া, এমনকি চীনের কোলে উঠে হলেও এর যতটা সম্ভব সরাসরি প্রকাশ্যে বিরোধিতা করা।
    আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি, তিন সপ্তাহ আগে গত ১২ সেপ্টেম্বর লাদাখ সিমান্তে চীন-ভারত ২০২০ সাল থেকে উভয় পক্ষ যে সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে রেখে ছিল এর অবসান ঘটিয়েছে উভয় পক্ষ। ভোজবাজির মত উভয়ের সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।  এমনকি চীন-ভারত কতটা কাছাকাছি চলে গিয়েছে আর তাতে ভারত কত মরিয়া হয়ে ছাড় দিচ্ছে এর এক প্রমাণও হাজির হয়েছে। এরপরেই গত ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর ছিল এসসিও (SCO) বার্ষিক সভা; সেখানে চীন এক আলোচনায় বর্ণনা তুলে ধরতে গিয়ে এমন এক ম্যাপ দেখিয়েছে যেখানে ভারতের দাবির খোদ লাদাখ ও অরুনাচল প্রদেশকে চীনের অংশ বলে দেখানো হয়েছে তবু মোদির ভারত কোন আপত্তি তুলে নাই – ভারতে বসে এনিয়ে অভিযোগ তুলেছে কংগ্রেস। এনিয়ে ভারতের এক মিডিয়া রিপোর্টের শিরোনামঃ
    “ভারতের মানচিত্র থেকে বাদ অরুণাচল, লাদাখ! এসসিও-তে ‘চিনা–কীর্তি’ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে” [লিঙ্ক পেতে এখানে ক্লিক করেন]

    আসলে, এখন যেভাবে আমেরিকার এমন খায়েস-পরিকল্পনা প্রকাশিত হচ্ছে এসবই চলতি শতকের শুরুতেও আগে থেকেই আমেরিকার ছিল। কিন্তু শতকের শুরুতে আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক কাজ করতে শুরু করাতে, বিশেষত – ‘চীন ঠেকানোর ঠিকা’ কাজ করছিল বলে আমেরিকার সেইসব খায়েস লুকিয়ে বা তুলে রাখা হয়েছিল তখন।  কিন্তু বর্তমানে  আমেরিকান বার্মা দখলের পরিকল্পনা আমেরিকা আর লুকিয়ে রাখতে চাইছে না। আর ওদিকে এই পরিকল্পনার পালটা পদক্ষেপ হিসাবে রাশিয়া-চীন-ভারত এক অঘোষিত মেরুকরণে রাশিয়াকে সামনে রাখতে ভারত-চীন আগ্রহি বলে আর রাশিয়ার বার্মার শাসকদের সাথে এলায়েন্স গড়াতেই বাংলাদেশে গোলা এসে পড়ছিল।

    আসলে কার্যত সবমিলিয়ে এতেই ‘নয়া মেরুকরণ’ আর অপ্রকাশ্যে রাখাতে সবপক্ষই অক্ষম হয়ে পড়ছে। আর এরই প্রথম বলি হয়ে যাওয়ার পথ ধরেছে আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক। সে কারণেই এসব আলামত আমরা দেখতে পাচ্ছি। তবে এসব আর আলামত হয়ে থাকবে না। প্রকাশ্য চিহ্ন-ইঙ্গিতেও নয়, বরং প্রকাশ্য নয়া মেরুকরণ, নয়া জোট হিসাবেই তা হাজির হতে যাচ্ছে।
    আর তা দেখার জন্য আমাদেরকে খুব বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। আসলে ইতোমধ্যেই মূল আমেরিকা-চীন গ্লোবাল নেতৃত্বের পালা বদলের লড়াই – এরই অংশ হিসাবে চীনা পক্ষের সম্ভাব্য মেরুকরণের মহড়াটা হয়ে গেছে এসসিও (SCO) বা সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন এর  গত-মাসের বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন থেকেই।

    তা সত্বেও এর বিপরীতে বাইডেনের আমেরিকা আর কোন দেশকে নিজের পক্ষে পেতে যাচ্ছে – বিশেষত ইইউ বা ইউরোপ কী বাইডেনের পক্ষে থাকতে পারবে কিনা এবং খোদ আমেরিকার আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর বাইডেনের কী নিয়ন্ত্রণ থাকছে না বাইডেনের হাত গলে তা বাইরে চলে যাচ্ছে – এসব কিছুই তা আগামি ডিসেম্বরেরই ফয়সালা হয়ে যাবে। খুব সম্ভবত নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তা ফুটে উটতে শুরু করবে।  আর তা অবশ্যই প্রকশ্যে; মানে গ্লোবাল মেরুকরণের আর কোন কিছুই অপ্রকাশ্য থাকবে না। যেমন,  ইউক্রেন যুদ্ধ এবার (নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে) শেষ হবে কিনা এবং তা, কোন মেরুকরণে তাও এবার নির্ধারিত হয়ে যাবে প্রকাশ্যেই, নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে।

    কিন্তু এতে বাংলাদেশে কীঃ
    বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঘটনাটা হল, গ্লোবাল রাজনৈতিক এই ঘটনাগুলোর পরিণতি বা ফলাফলে, বিশেষ করে নয়া গ্লোবাল মেরুকরণ তা বাংলাদেশে বড় প্রভাব ফেলবে। যদিও বাংলাদেশের চলতি ক্রমশ উত্তাল হয়ে উঠা রাজনৈতিক মোচড় ও গত পনেরা বছরের শাসন ঘটনাবলির একটা বড় অংশই মূলত লোকাল ঘটনা। তবু এই লোকাল ঘটনা্য়র মধ্যে এতদিন “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” ছিল এক বড় নির্ধারক উপাদান। তাই আমেরিকা-ভারত “সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” একেবারে ভেঙ্গে পড়া ও নয়া মেরুকরণের দিকে রওনা এর নিট ফলাফল হবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের আলগা মাতবরি ও প্রভাব সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যাবে। এবং তা ইতোমধ্যেই সেদিকে রওনা দিয়েছে। সেটা সম্ভবত ২০০৭ সালের ১/১১ এর আগের বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের জায়গায় ফিরে যাবে। অনেকে তাই দোরাইস্বামীর গতমাসের বিদায় ভাষণ কে স্মরণ করছেন; যেখানে তিনি বলছেন, বাংলাদেশে “ভারত নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির পাশে নেই” বা সাথে ছিল না। এর গুমোর ‘অর্থ’ বের করার চেষ্টা করছেন অনেকে।  সারকথায় বললে, আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা শুন্য হয়ে গেলে আর বাংলাদেশের উপর ভারতের প্রভাব বা গুরুত্বমূল্য আর কই থাকে?

    তবু শেষনিঃশ্বাস পর্যন্ত ভারত চেষ্টা করবে পুরানা কায়দা বজায় রাখতেঃ
    কিন্তু সাবধান শেষদিন পর্যন্ত ভারতের চেষ্টা বজায় থাকবে। কিন্তু কি করে বুঝব সেটা বজায় থাকার চেষ্টা করছে? সর্বশেষ সুলতানা কামালের লেখা যা প্রথম আলো ছেপে দিয়েছে – এটাই ঢলে পড়া পুরাতন ভারতের শেষ উঠার চেষ্টা। আমেরিকার স্যাংশন আরোপ আগামি ১০ ডিসেম্বর ২০২২ একবছর হবে। আর আলামত হচ্ছে সম্প্রতিকালে হাসিনার ক্ষমতা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। আর একাজে সম্মুখ সারির মিডিয়ার ভুমিকায় আগের মতই প্রথম আলো। এমনকি এই ততপরতা ইউক্রেন যুদ্ধের আমেরিকান প্রপাগান্ডা পর্যন্ত বিস্তৃত করে রেখেছে; অনেকে এটাকে প্রথম আলোর একেবারে উদাম হয়ে প্রো-আমেরিকান মিডিয়া হয়ে উঠার লক্ষণ হিসাবে দেখছে।
    যদিও মিডিয়া হিসাবে নিজের বেছে নেওয়া প্রথম আলোর কোর-ভুমিকা হচ্ছে ইন্ডিয়ান স্বার্থরক্ষা যেটাকে, সে আবার প্রগতিশীলতা, সংখ্যালঘুর স্বার্থরক্ষা বা অসাম্প্রদায়িকতা এসব শব্দের আড়ালে করে থাকে। কিন্তু  এখন সে যেন প্রো-আমেরিকান ভুমিকাটাকে এর উপরে রেখে চলছিল। এসব কথাগুলো গোয়েন্দা-পরিভাষায় বলা হয়, এতবছর সিআইএ র-কে আপারহ্যান্ডে রেখে নিজের কাজ চালাচ্ছিল। গত ১০ ডিসেম্বর ২০২১ স্যাংশন ঘোষণা দিয়ে সিআইএ নিজেই যেন নিজেকে আপারহ্যান্ডে উঠিয়ে নিয়েছিল। আর এখন? fall apart ! অর্থাৎ এক বছর না যেতেই এটা এখন ধর্ম ও স্বার্থ যার যার অবস্থায়!!  “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” ভেঙ্গে পড়া যেটা এতক্ষণ উপরে আলচনা করেছি তা যেন সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত হয়ে পড়েছে “এখানে”।  আর এর ঢলে পড়া বাংলাদেশে ভারতীয় প্রভাব – এথেকেই পালটা আবার উঠে দারানোরই এক উদ্যোগ প্রচেষ্টা হল সুলতানা কামালের ততপরতা, আর প্রথম আলোর এর পক্ষে দাঁড়িয়ে মরিয়া হয়ে সহায়তা দেয়া।
    মূলত ইডেনের “সেক্স  স্লেভারির ঘটনা” হাসিনা ও লীগের মরাল ভিত্তিতে প্রবল আঘাত হেনেছে। যেটা ক্ষমতাচ্যুত হবার আগেই যেন লীগের মরালি-চ্যুত হয়ে পড়া। আর একাজে লীগকে সহায়তা দিয়ে বিনিময়ে ভারত নিজের ঢিলা হয়ে পড়া ক্ষমতা আবার খাড়া করতেই এই সুলতানার প্রচেষ্টা। তিনি প্রবল চেষ্টা করেছেন ঘটনার দায় বিওএনপির উপর যতটা সম্ভব চাপিয়ে দিতে। এমনকি সুলতানার কাছাখোলা  সর্বশেষ প্রচেষ্টাটা এবার আর প্রথম আলোর পক্ষ কাঁধ দেয়া সম্ভব হয় নাই। তাই ভারতের প্রো-মোদি এক মিডিয়া ইন্ডিয়া টুডে সে দায় নিয়েছে। যাতে আমেরিকার কাছে বাংলাদেশে হারানো ভারতের প্রভাবেই অন্তত কিছুটা ভারত ফিরে পায়! কিন্তু এর পরিণতি হল সুলতানাকে এখন থেকে বাকি জীবন পাবলিক লাইফে নেপথ্যে বা বাইরে কাটাতে হবে। আর তিনি হিউম্যান রাইট ইস্যুতে কেউ না, আসলে ছিলেনও না এটাই এখন উদাম হয়ে গেল!! এত দ্রুত, অবিশ্বাস্য!!!
    তবে এই পতনের মূল জায়গাটা হল, “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” ভেঙ্গে পড়াকে পড়তে ব্যার্থ হওয়া। সুলতানা যে একজন ‘পুর্ণ অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব’ ছিলেন তা তাঁর জীবন সায়হ্নে এসে উদাম হয়ে গেল!

    মূল সমস্যা “আমেরিকা-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতা” পড়তে ব্যার্থতাঃ
    এমনই আরেক চরম ব্যর্থতার ঘটনা দেশের ভিতরেই ঘটেছে। দেশের ভিতরেই আমরা দেখছি হাসিনার ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করতে চায় যারা তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। আর সেকথাটাকে প্রথম আলোর রিপোর্টের ভাষায় বললে, “বিএনপিকে থামানোর পথ খুঁজছে আ.লীগ”। এই হল বাস্তবতা। অথচ দেখা যাচ্ছে অনেক তুলনামূলক ছোট রাজনৈতিক দল এই ফেনোমেনাটা পড়তে জানে না।  বলে এখন  এই শেষ জীবনে এসে আবার এদের অনেকে ভারতের সহায়তা পেতে চেষ্টারত; লিঙ্ক যোগাড়ের চেষ্টায় রত। তাদের বোকা আকাঙ্খাটা হল, ভারত যদি তাদের দলীয় রেজিষ্টেশন ইত্যাদি কোন সরকারি ফেবার পেতে সহায়তা করে তাহলে এটাই তাদের নিজদলের স্বার্থ হবে।  আগামি হবু নির্বাচনে এভাবেই তারা নিজ স্বার্থটা  বলে বিশ্বাস করছে। এদেরকে নিয়ে কী বলা যায়??
    তার মানে লীগ যেখানে নিজ ক্ষমতা ধরে রাখার অন্তত চ্যালেঞ্জ অনুভব করছে এই দলগুলো সেখানে তা দেখতেই পাচ্ছে না। শুধু তাই না, ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের ভাটাতে হওয়া সত্বেও এরা হাসিনার বাংলাদেশের উপর মোদির প্রভাব অটুট দেখতে পাচ্ছে!! তাদের প্রাণপণে ভারত লবি খুঁজার কথা জেনে-দেখে  বুঝা যাচ্ছে তাদের নাদানি কত গভীর!!! তারা শেষে এই ২০২২ সালে এসে প্রাণপণে ভারতের দালালি করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তারা জানেই না যে কোন সম্পর্কই আর আগের জায়গায় নাই; তা না থাকারই কথা! না গ্লোবাল রাজনীতির মেরুকরণের দিক না এটা একান্তই এর স্থানীয় রাজনীতির দিক। সে কেবল ভাল লবি খুজে ভারতের সেবা করে নিজের স্বার্থ অর্জন করতে নেমেছে!!! অদ্ভুত তাদের বুঝাবুঝির ভিত্তি!!
    রাস্তার আন্দোলন বা উদ্যোগ কোথায় পরিণতি বা ফলাফলে পৌচাচ্ছে তা দেখতে একটু অপেক্ষা করতেও তারা রাজি না। আবার ভারতের কাছে যা চাইতে নেমেছে তা মিনিংফুলি ভারতের দেওয়ার ক্ষমতা আছে কিনা তা চেক করতেও তারা রাজি না!! এই হল বাংলাদেশের কিছু রাজনীতিক!

    তাহলে এখন শুরুর  কিছু কথা আবার মনে করিয়ে শেষ করব।  বাংলাদেশের ওয়ান-ইলেভেন ও সাথের পরবর্তি সরকার এর অর্থ হল এতে যে গ্লোবাল মেরুকরণের ইঙ্গিতটা ছিল তা হল – ‘আমেরিকা-ভারত-বাংলাদেশ” এরা একই মেরুতে জায়গা নিয়েছিল। এখন বাংলাদেশের রাজনীতিক যারা  “এই মেরুকরণ”কে একেবারে স্থায়ী বলে মনে করবে; তারা রাজনীতি করার অযোগ্য যারা ধরে নিবে যে শুধু তাই না,  যারা মনে করবে ভারতের সাথে লবি করলে তবেই আমাদের সরকারের থেকে কিছু সুবিধা পাবার পথ এবং এই পথ স্থায়ী!!!সবশেষে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কটা কত দ্রুত গতিতে ভেঙ্গে পড়ছে তা বুঝতে সহায়ক এই রিপোর্টটা আগ্রহিদের পড়ে দেখতে রেফার করব। এটা ভারতের দ্যা প্রিন্টের নয়নিমা বসুর লেখা। তিন অক্টোবর সকাল আটটায় তা প্রকাশিত, ফলে তা লেটেষ্ট। বাংলাদেশের ভাষায় বললে তিনি ফরেন বিটের সাংবাদিক। তবে আমি নয়নিমাকে গণ্য করি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যেন সেই অ-সরকারি মুখপাত্র যার মুখ দিয়ে মন্ত্রণালয় নিজের মনের খায়েসের কথাগুলো বলে থাকে, যা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে নিজমুখে প্রকাশ্যে নানা সীমাবদ্ধতায় বলা সম্ভব নয়। তবে, এখানে নয়নীমা যেন ধরে নিয়েছেন ভারত-আমেরিকার পুরান সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছে!! এভাবেই লেখা!! আর এলেখা থেকে  পরিস্কার যে ভারত আর দুইনৌকায় পা-দিয়ে চলতে পারছে না। তাকে কোন একদিকে অবস্থান নিতেই হবে; মূলত আমেরিকা তাকে এঅবস্থায় দিকে ঠেলে দিয়েছে। এবং ইঙ্গিতে বলা অবস্থান হল চীন-রাশিয়ার দিকেই ভারতের সম্ভাব্য অবস্থান, যেমন এই রিপোর্ট লিখছে, এরকমঃ

    .…..well set the tone for the next meeting of Quad, but India — a neighbour of Beijing
    and a strategic partner of Moscow.….. 

    আমরা চীনকে ভারতের এই “পড়শি” বলে সম্বোধন এর আগে দেখেছি বলে মনে পরে না। এটাই কী এখন থেকে ভারতের চীন-ঘনিষ্ট হবার ইঙ্গিত!! কারণ, এতদিন তো চীনকে  ভারতের মিডিয়া ভারতের শত্রু বলেই আমাদের কাছে পরিচিত করিয়ে গেছে! যেকারনে, এখনো ভারতের পাবলিক পারসেপশন হচ্ছে চীন তাদের শত্রু দেশ। চীনের যেকোন কিছুই তাই ভারতের পাবলিক মাইন্ডে এখনো ঠাট্টার বস্তুই। তাহলে দাড়াচ্ছে যা তা হল, এটা ভারতের জন্য – কে ফ্রেন্ড আর কে এনিমি – তা রি-ডিফাইন করার জটিল বা উভয় সঙ্কটের সময়!  আর এর সাথে যায় এমন নতুন সেসব কিছু নয়া বয়ান তৈরি সহজ কাজ না হলেও সম্ভব বটে!

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com