Tag: চীন

  • চীন-ইরান প্যাক্ট থেকে গ্লোবাল পালাবদল শুরু হবে

    চীন-ইরান প্যাক্ট থেকে গ্লোবাল পালাবদল শুরু হবে

    গৌতম দাস

    ২০ জুলাই ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-36q

     

    https://www.dailymail.co.uk/news/article-3413556/

    চীন-ইরান এলায়েন্স থেকে গ্লোবাল পালাবদলের শুরু হবে,
    আর ইউরোপের চীনের দিকে ঝুঁকবার সম্ভাবনা বেড়ে গেলঃ

    বিশ্ব-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যাকে আমরা অনেকে “গ্লোবাল অর্ডার” বলে বুঝে থাকি, এর আসন্ন পালাবদলে [Global Economic Order] নির্ধারক এক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। চীন ও ইরান এক দীর্ঘমেয়াদি এবং ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক উন্নতিকে ফোকাস করে এক স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ চুক্তি করতে যাচ্ছে। এটা হবে দীর্ঘস্থায়ী  ও স্ট্র্যাটেজিক সাথে বাণিজ্যিকভাবেও এদুই দেশের গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া। অবস্থা এমন হয়ে যাবে যাতে ইরানের গায়ে কেউ ফুলের টোকা দিলেও সেটা চীনের গায়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, চীনের স্বার্থের উপর এর প্রভাব থাকবে, এমন অবস্থা হয়ে যাবে। অর্থাৎ এদুই দেশ স্বার্থের প্রশ্নে তারা বহুদূর কমন স্বার্থ হয়ে হাঁটবে। তাতে এ নিয়ে তাদের মধ্যে আলাদা করে কোনো ‘প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত থাকুক আর নাই থাকুক।

    এনিয়ে মিডিয়ায় দুনিয়াজুড়ে  মন্তব্যের ঢল বইছে। মন্তব্যগুলো মূলত আমেরিকা ও ভারতের ব্যর্থতা বা অকর্মন্নতার  দিকে আঙুল তুলছে আর বলছে এরা দুই হল হারু পার্টি – They are the losers। যদিও লুজার শব্দটা কারোরই শুনতে ভাল লাগে না। তবু তেমনটাই কয়েকটা পত্রিকা লিখছে – ১।  ট্রাম্পের মহাকাব্যিক পরাজয় । ২। এই পার্টনারশিপ আমেরিকার জন্য ভয় পাইয়ে দিবার মত ওয়ার্নিং দিচ্ছে। ৩। এই প্যাক্ট এশিয়া্র সাথে আমেরিকার ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করে। আবার বোকা গাড়োলের মত এক মন্তব্যও আছে আর এটা সম্ভবত এই প্যাক্ট নিয়ে আমেরিকার প্রথম সরকারি মন্তব্য। বর্তমানে ইরানের উপর অস্ত্র-ক্রয় বিষয়ে জাতিসংঘের এক নিষেধাজ্ঞা দেয়া আছে যেটা আগামি তিন মাস পরে অক্টোবরে শেষ হয়ে যাবে। সেদিকে তাকিয়ে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের (বিদেশমন্ত্রী) মাইক পম্পেও বোকার মন্তব্য করেছেন – “এই প্যাক্টই বলে দিচ্ছে আমাদেরকে আবার একটা শক্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে“। ঘটনা হল, জাতিসংঘের কাঠামোতে ভেটো ক্ষমতাওয়ালা যেকোন একরাষ্ট্র  না-ভোট দিয়ে দিলে এরপরে ঐবিষয়ে আর কোন সিদ্ধান্ত হবার সুযোগই নাই। চীন ইতোমধ্যেই সে ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে। এখন এখানে ভেটো ক্ষমতাধর চীন থাকার পরেও এতে পম্পেও-এর এমন আওয়াজ ছাড়ার কোন অর্থ আছে?
    আচ্ছা, আপাতত আর এদিকে আগে না গিয়ে, প্যাক্ট বা চুক্তিপত্রের ভিতরে প্রেবেশ করি।

    চুক্তির খসড়া দলিল তৈরির কাজ শেষ। তবে এখানে খসড়া কথার মানে হল, এর  অনুমোদনের অংশ বাকি বা প্রক্রিয়াধীন যা দুদেশের পার্লামেন্টে আলোচনা ও পাস হওয়া এরপর রাষ্ট্রপ্রধানদের  অনুমোদনের ধাপ আছে তা সমাপ্ত করার প্রক্রিয়া অচিরেই শুরু হবে বা কিছু শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু এরই ফাঁকে প্যাক্টটাকে আমেরিকার দিক থেকে দেখলে, তাদের এক সফল গোয়েন্দাগিরি সম্পন্ন হয়েছে, বলতে হয়। আর চীন-ইরানের দিক থেকে দেখলে কোনো বিশ্বাসঘাতক, হলুদ কাগজের ১৮ পৃষ্ঠার এই খসড়া দলিলটা্র কপি চুরি করেছে আর পরে নিউ ইয়র্ক টাইমস সেটা হাতে পেয়ে ছেপে দিয়েছে। পত্রিকাটার দিক থেকে দেখলে, হাতে পেলে তো তারা ছাপবেই। যদিও চুরি করে পাওয়া একটা দলিল ছাপানোতে, এতে  গোপন রহস্য ধরনের ভাব তৈরি হয়েছে যেনবা চীন-ইরান কোনো অপরাধ করছিল যা (নিউ ইয়র্ক) টাইমস প্রকাশ করে দিয়েছে, এই ভাবের। না, কোনোভাবেই এটা তেমন কিছুই নয়। কোনো ধরনের অপরাধ তো নয়ই। ট্রাম্পের আমেরিকা এপর্যন্ত  ইরানের উপর দীর্ঘদিন ধরে  যেসব সীমাহীন অবরোধ চাপিয়ে রেখেছে তাতে ইরান একেবারেই কোণঠাসা, অর্থনীতি ধুঁকছে, এই করোনাকালে ইরানিদের জীবন থমকে গেছে যেখানে। তবে ট্রাম্পের এসব অবরোধ আরোপের নেতি উদ্দেশ্য আর এতে কৃত আসল অপরাধ হল ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের হয়ে ভাড়া খাটা আর শত্রুতামূলক কাজ করা। যদিও এই অবরোধ জাতিসঙ্ঘের নয়, কেবল আমেরিকার আরোপিত বলে তা মানতে কোনো দেশের উপর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু টেকনিক্যালি আমেরিকা আমাদেরকে বাধ্য করতে পারে এসুযোগ আমেরিকার হাতে আছে।

    তবে অবশ্যই, আমেরিকার অবরোধ আরোপ মানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ডলারের অপব্যবহার করা হচ্ছে এখানে। মূলত “আমেরিকান অবরোধ আরোপ” কথার প্রাকটিক্যাল মানে হল, আমেরিকার ইরানকে নিষেধ করে দেয়া যে তুমি আমেরিকান ডলারে কোন আন্তর্জাতিক কেনাবেচা করতে পারবে না। কারণ দুই দেশ ডলারে কোন বেচাকেনা করলে “আমেরিকান কোন ব্যাংকের” কাছে যাওয়া ছাড়া এই লেনদেনের একাউন্ট ট্রান্সফার সম্পন্ন হবে না।   অতএব এর প্রতিকারের ব্যাপারটা এখন গায়ের জোর। এই অবস্থায় গায়ের জোরের মুরোদে কুলালে সবার আগে ঐ আমেরিকান অবরোধ উপড়ে ফেলে দেয়াটাই হবে খুবই জায়েজ কাজ।  সেটা কেমন, সেদিকে যাব।

    চুক্তিটা ঠিক কী নিয়েঃ
    সামগ্রিকভাবে উপর থেকে দেখলে, ইরানের এটা চীন থেকে পুঁজি আর টেকনোলজি ধার নিয়ে নিজের অবকাঠামো, শিল্প আর সাথে সামরিক ব্যবস্থাদিতেও সহযোগিতা নিয়ে সেসব গড়ে নেয়া। (নিউইয়র্ক)  টাইমসের ভাষায়, ইরান ব্যাংকিং, টেলিকম, বন্দর, রেলওয়েসহ আরো ডজনখানেক প্রকল্প হাতে নিবে; এছাড়া সামরিক সহযোগিতা, গবেষণা, ট্রেনিংসহ এসব বিষয় দেয়ানেয়া করবে। এভাবে ইরান নিজেকে সবল বাণিজ্যিক পার্টনার হিসাবে গড়ে তুলবে। আর নেয়া ঐ ঋণ শোধ দিতে চীনকে ইরানের তেল-গ্যাস সরবরাহ করবে। ফলে মোট ২৫ বছর এনার্জি দিয়ে বিনিময়ে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও টেক পাওয়ার চুক্তি এটা।  টাইমসের ভাষায়, এজন্য এটা এক ‘বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার’ প্যাক্ট [Economic and Security Partnership]। একটা তুলনা দিয়ে বলা যাক এটা কত বড় অঙ্কের অর্থ। বিশ্বব্যাংক  সবখাতক রাষ্ট্রের জন্য অবকাঠামো খাতে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার মোট বাজেট হল বছরে ৫০-৬০ বিলিয়ন। আর তুলনায় ইরানের এই ঋণ হল গড়ে একাই কেবল নিজ-রাষ্ট্রের জন্য প্রতি বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার করে, এবং তা ধারাবাহিক ২৫ বছর।

    ইরানের কাছে এই ঋণের গুরুত্ব কীঃ
    কম করে বললে সেই ১৯৫৩ সাল থেকে ইরান ধুঁকে মরছে, লড়ছেও। আমেরিকা যখন ফিজিক্যালি সিআইএ এজেন্ট পাঠিয়ে (যেটা একালে (2013) আমেরিকান সরকারের স্বীকার করার কারণে প্রতিষ্ঠিত সত্য) ইরানের নির্বাচিত মোসাদ্দেক সরকারকে ফেলে দিয়ে শাহকে ক্ষমতায় বসিয়ে চার দেশ মিলে ইরানের তেল লুট করে নেয়ার চুক্তিটা করে নিয়েছিল, সেই থেকে। এর চেয়ে প্রকাশ্যে সম্পদ লুণ্ঠনের ঘটনা আর কী হতে পারে! এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৯ সালের খোমেনির বিপ্লব সফল হয়েছিল। এক সবল পালটা থাপ্পর।  আর তাতে লুটেরাদের হাত থেকে ইরান নিজের সার্বভৌমত্ব সামলে ছিল কিন্তু সেটাকে সংহত সুরক্ষিত করতে গিয়ে ইরানিদের অর্থনৈতিক জীবনটা আর কখনো স্থায়িত্ব দেয়া, একটু থিতু হওয়া আর কখনই সম্ভব করতে পারে নাই। প্রধান সঙ্কট থেকে গেছে, প্রয়োজনীয় পুঁজি-বিনিয়োগে ঘাটতি ও টেকনোলজি পাওয়া আর ওদিকে নিজের এনার্জি পণ্য, অবরোধের কারণে বিক্রি করতে না-পারা, সবসময় এগুলোই তাদের বেঁধে রেখেছে। এই যে চার দিকে নেই নেই অথচ দেশের প্রয়োজনীয় সম্পদ আছে গরিব দেশ নয় – এঅবস্থা থেকে ইরান সম্ভবত এবার মুক্তি পেতে যাচ্ছে। এই প্রথম ইরানের বিনিয়োগে খরা কাটতে যাচ্ছে। ইরানের শিক্ষিত বা সক্ষম মানুষেরা কাজ পায় না বেকার, সে দুঃখ সম্ভবত  ঘুচবে এবার।

    উপচে ওঠা প্রভাবঃ
    হবু এই চুক্তি নিঃসন্দেহে ইরানের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি আনবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবু সাধারণভাবে দেখলে মনে হবে এটা আর পাঁচটা দেশের বড় অবকাঠামো বিনিয়োগের মতই কিছু ঘটনা হয়ত। কিন্ত তাই কী? আর এতটুকুতেই কি সীমাবদ্ধ থাকবে? অবশ্যই না। কারণ, এতে বেশ কিছু প্রভাব তৈরি হবে তা অন্যান্য প্রভাবের উপর পড়বে আর তাতে প্রভাবগুলোর মোট যোগফল বা কিউমিউলেটিভ ফলাফল পরিণতি হবে গভীর। আর এটাই “গ্লোবাল অর্ডারে” বড় ধরনের পালাবদল ঘটিয়ে ফেলবে। সব গ্লোবাল উত্তেজনা তাই এখানেই। খুব সম্ভবত আগামী ইতিহাসে, কোন কোন ঘটনা থেকে পালাবদলে গ্লোবাল অর্ডারের নেতৃত্ব পুরানা স্থিতি ছেড়ে চীনের হাতে চলে এসেছিল – এর অন্যতম হিসেবে চীন-ইরানের এই হবু চুক্তির কথা লেখা হবে। এই চুক্তি এমনই বড় প্রভাবশালী হয়ে উঠতে যাচ্ছে এবং হওয়ার মতই প্রবল পটেনশিয়াল।

    যেমন একটা পটেনশিয়ালিটি বা সম্ভাব্য আড়ালে থাকা ক্ষমতার কথা বলি। এক কথায় বললে, আমেরিকার ইচ্ছামতো যাকে খুশি যেকোনো দেশের উপর “অবরোধ আরোপ করে” তাকে ডলারে কেনাবেচার সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে পারে। এর টেকনিক্যাল সুযোগ সে পড়ে পাওয়া চার আনার মত পেয়েছে ও নিয়েছে। ১৯৪৪ সালে আইএমএফের জন্মের সময় এর সদস্যরা একমত হওয়াতে একমাত্র আমেরিকান ডলারকেই (এবং এটাই তখন সব শর্তপুরণ করতে পারে এমন একমাত্র যোগ্য মুদ্রা ছিল) আন্তর্জাতিক বিনিময় মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। কারণ মুদ্রার বাস্তব অসুবিধা হল, কোন না কো রাষ্ট্রীয় মুদ্রাকেই একই সাথে তাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলেও গ্রহণ করতেই হয়। কোন রাষ্ট্রীয় মুদ্রার বড় ইতিগুণ হল, এটাই একমাত্র বাস্তব কার্যকর ও ব্যবহারিক মুদ্রা। ফলে যা লোকাল একটা দেশের মুদ্রা যে মুদ্রার নিয়ন্ত্রণ ওই দেশের হাতে তাকেই উপায়হীন হয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলেও গ্রহণ করতেই হয়েছিল। এটাই মুদ্রার গুণ-বৈশিষ্ট্যের ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা। মুদ্রার এই সীমাবদ্ধতা কাটানোর কোনো সমাধান এখনো দুনিয়াতে নাই।
    তাই  আইএমএফ-স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে যদিও ডলারে কেনাবেচা করতে ইরানকে কেউ বাধা দিতে পারে না। কারণ ইরানও আইএমএফের সক্রিয় সদস্য। কিন্তু আমেরিকা এর বিপরীতে বলবে সে নিজের রাষ্ট্রীয় মুদ্রা হিসেবে যে ডলার সেই ডলারে বেচাকেনা করতে ইরানকে বাধা দিতেই পারে। এই এক্তিয়ার তার আছে। সোজা কথা, মুদ্রার গুণগত সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা বাড়তি এই ক্ষমতাটা অপব্যবহার করে থাকে। আমেরিকার এই অপব্যবহার এতই মারাত্মক যে গত ২০০৮ সাল থেকে বারো বছর ধরে রাশিয়াকে সে আজও ডলার-অবরোধ দিয়ে রেখেছে। পরিণতিতে রাশিয়ান মুদ্রা রুবলের মূল্য অর্ধেক হয়ে আছে।
    শেষে প্রায় ইরানের মতনই রাশিয়াও সেকালে চীনের সাথে এক এনার্জি চুক্তি করে এর বিনিময়ে নিজ অর্থনীতি সামলিয়েছে। অবশ্য এছাড়াও ওদিকে ব্রিটেন রাশিয়ান গ্যাস ব্যবহার করে আর সেই গ্যাসের মূল্য থেকে পাওয়া আয় রাশিয়া আবার ব্রিটিশ বাজারে বিনিয়োগ করে রেখেছে বলে ব্রিটেনের বিশেষ অনুরোধে আমেরিকা কেবল এই অর্থটা অবরোধ আরোপের বাইরে ছাড় দিয়ে রেখেছে। তবে মূলত চীনের সাথে লেনদেনের ভরসায় রাশিয়া বাজারে টিকে আছে। মনে রাখতে হবে, অবরোধের আরেক ব্যবহারিক মানে হল গ্রামে কাউকে যদি একঘরে করে রাখা হয় – এর প্রভাব একটা রাষ্ট্রের উপর তেমনই। সেটা যাই হোক, এটাই আবার চীন-রাশিয়ার বর্তমান বিশেষ সম্পর্ক ও  এলায়েন্সের আসল ভিত্তি। তাদের আমেরিকাবিরোধী অবস্থানের গোড়ার কথা এটা। যদিও কেউ কেউ এখনো ভুল করে ‘কমিউনিস্ট ইডিওলজি’ এদের সম্পর্কের ভিত্তি মনে করে; যা একেবারেই ভিত্তিহীন। আর ইডিওলজির সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে আজকে নয় সেই ১৯৫৮ সাল থেকেই তা ভেঙে চুকেবুকে গেছে। বরং আমেরিকার ডলার-অবরোধের ক্ষমতা ভাঙতে চীনের মিত্র হিসাবে সবচেয়ে আগ্রহী শক্তি রাশিয়ার পুতিন। অতিরিক্ত ছটফটে পুতিন পারলে এখনই কিছু করে এমন যেকোনো কিছু করতে রাজি। তবে এ নিয়ে চীনের সাথে রাশিয়ার লম্বা যৌথ পরিকল্পনা আছে।

    ডলারের অবরোধ আরোপের ক্ষমতা ভেঙে দেয়া মানে কীঃ
    আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাপারটা কী তা কমিউনিস্টদের আজো ঠিকমতো বোঝা হয়নি। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাটা ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের চালু ও দাঁড়িয়ে আছে এটাই তারা রিয়েলাইজ করে না। এই ব্যবস্থাটা চালু হয়ে গেলেও কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো তখন এতে অংশ নেয় নাই (আবার আমেরিকাও নেতিবাচক মনোভাব রাখাতে যেমন, সুনির্দিষ্ট করে পোল্যান্ডের সদস্য-পদলাভের আবেদন না করে দিয়েছিল আমেরিকা)।  কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো সেই থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক ছাড়াই বিকশিত হয়েছিল। তবে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমিতভাবে বার্টারে কিছু পণ্য বিনিময় হত। কিন্তু এভাবে কতদিন?  এভাবে ১৯৯২ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙে যাওয়ার আগে পর্যন্ত। এরপরে এরা সবাই আইএমএফের সদস্যপদ পায় ও নেয়। তত দিনে দুনিয়ার বাণিজ্যে কেনাবেচা প্রধানত ডলারেই সম্পন্ন হওয়া প্রবলে  শুরু হয়ে গেছে। প্রধানত মানে? মানে হল, অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে  আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের  সত্তর ভাগের বেশি লেনদেন যদি কোন একক মুদ্রায় সম্পন্ন হয় তাহলে সেটাই প্রধান আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে ধরতে পারি। এটা অনেকটা খুব চালু দোকানের খাবারের মত। খুব চালু বলেই ওর খাবার সবসময় টাটকা ও ভেরাইটি থাকে। ফলে ওর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অন্য দোকান কেউ দাড়াতেই পারে না। কিন্তু একবার যদি তার বিক্রি পড়ে যায় তবে ঐ দোকান শেষ। একইভাবে, ডলারের ক্ষেত্রে, ওর প্রতিদ্বন্দ্বী মুদ্রা গ্লোবাল লেনদেনের মুদ্রা হিসাবে একবার সত্তর ভাগের কাছাকাছি চলে গেলে ডলারের দফারফা হয়ে যাবে। এটাই ডলারের অবরোধ আরোপের ক্ষমতা ভেঙে দেয়া। এদিকে ইতোমধ্যে  চীনা ইউয়ান শর্ত পূরণ করাতে পারায় গত ২০১৫ সাল থেকে ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে আইএমএফের স্বীকৃতি পায়। আর সেই থেকে রাশিয়ার সাথে চীন পরিকল্পনা করে করে আগাচ্ছে।

    চীনের জ্বালানি কেনাকেন্দ্রিক পরিকল্পনা নিয়ে আগানোঃ

    China's annual average crude oil imports

    Source: China General Administration of Customs, based on Bloomberg, L.P.

    এখনকার মুল পরিকল্পনাটা হল, চীনের জ্বালানি কেনাকেন্দ্রিক। বড় অর্থনীতি বলে চীনকে প্রচুর জ্বালানি কিনতে হয় [World’s largest Importer]  …..more than 10 million barrels a day last year। মানেই তার পরিশোধ করা এক বড় পেমেন্ট হল জ্বালানির মূল্য শোধ করা। অতএব হিসাবটা হল, এই পেমেন্ট যদি সে ডলারে না করে নিজ মুদ্রা ইউয়ানে করে তাহলে ঐ ৭০% গ্লোবাল লেনদেন থেকে ডলারকে হটানোর পথে অনেক দূর আগিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু এত দিন এই পরিকল্পনা ছিল মধ্যপ্রাচ্যের বাদশা বা গালফকেন্দ্রিক, বাদশাহরা যদি আমেরিকার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে একবার রাজি হয় ভরসা করে – এভাবে। কিন্তু এর ভিতরে  ইরানকে নিয়ে গোনায় ভাবা হয়নি। কারণ ইরান আজকের হবু সম্পর্কের মধ্যে আসতে চায় এমন আগ্রহ আগে কখনও  দেখায়নি। আর ইরানের কাছে চীনের দেয়া প্রস্তাব ছিল সামগ্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী, এখনকার হবু চুক্তির মত হতে হবে এই শর্তের।  ইরানের আগে অনাগ্রহটা কেন ছিল তা বুঝতে ইরানের বিরোধী নেতা আহমদিনেজাদের প্রতিক্রিয়া অনুসরণ করা যেতে পারে। তিনি বলছেন, এই চুক্তি হলে আমরা অনেক বেশি চীনা নির্ভরশীল হয়ে যাব। বাইরে থেকে দেখলে তিনি সম্ভবত আগামী নির্বাচনে লড়ার কথা ভাবছেন। তবে প্রশ্নাতীতভাবেই ইরান চীনা নির্ভরশীল তো হবেই, কথা সত্য। কিন্তু প্রশ্ন সেখানে নয়। প্রশ্ন হল ইরানের হাতে এর বিকল্প আর কী আছে? ব্যাপারটা হল, পোলাও পাতে আসার অপশন যদি নাই থাকে তবে পোলাও খাবো কি না সেই বাছাবাছির অর্থ কী! এই হল ইরানের বাস্তবতা। যদিও ইলেকশনি ইস্যু হিসেবে দেখলে আহমদিনেজাদের বক্তব্যের গুরুত্ব বুঝা যেতে পারে।

    সেটা যাই হোক, এবারের সর্বশেষ ২০১৯ সালের মে মাসের শুরু থেকেই ট্রাম্প আরো  কড়া অবরোধ আরোপ করেছিলেন। এতে এক চীন আর ভেনিজুয়েলা (একে তেল পাঠানো রি-সেল করার জন্য) ছাড়া কোথাও ইরানি তেল বেচা যায়নি। ভারত এই প্রথম কোন তেল কিনে নাই। তাও সেটা আবার সকলকেই  কনসেশন রেটে আর ইরানি নৌবাহিনীর পাহারায় নিজ ট্যাংকার-ক্যারিয়ারে করে তা পাঠাতে এবার ইরানি-অফার ছিল তা সত্ত্বেও। ফলে ইরানের পাবলিক তাদের জীবনযাত্রায় আর কত গভীর চাপ, আর কত দিন সহ্য করতে পারা সম্ভব- এটাও মুখ্য বিবেচনার দিক হয়ে উঠেছিল এখানে। সম্ভবত সে কারণে এর আগে সহসা ইরান রাজি হতে পারেনি এমন হলেও এবার বাধ্যবাধকতা বেশি অনুভব করায় রাজি হয়েছে। এতে গালফ বাদশাহদের ইউয়ানের চীনা তেলের পেমেন্ট নেয়াতে রাজি করানো যতটা কঠিন ছিল এখানে সে কাজ অনেক সহজেই সম্পন্ন হয়েছে, দেখা যাচ্ছে। কারণ খসড়া চুক্তিতে দেখা যাচ্ছে সব লেনদেন হবে চীনা ইউয়ানে, একথা ইতোমধ্যেই লেখা আছে। সুতরাং এটা একটা বিরাট অগ্রগতি। অর্থাৎ পালাবদলের ধাক্কা দেয়ার ক্ষেত্রে এক বিরাট পদক্ষেপ হয়েছে এটা। অর্থাৎ এই চুক্তির ইমপ্যাক্ট কেবল ইরানের কী লাভ-সুবিধা হল ততটুকুতেই নয় বরং নতুন এক চীনা গ্লোবাল ক্ষমতায় প্রভাব প্রতিপত্তিতে হাজির হতেও বড় ভূমিকা রাখবে। যেখানে ইরান সেই নতুন ক্ষমতার পাশে বুক ফুলিয়ে হাটবে তা বলাই বাহুল্য!  এজন্যই বলা হচ্ছে এই চুক্তি পালাবদলের শুরুর ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে।

    সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্তদের অন্যতম হবে ভারতঃ
    ভারতে চিন্তাবিদরা এখন বিরাট প্রশ্নের সম্মুখীন ও প্রকাশিত যে, তাদের চিন্তার ক্ষমতা-সামর্থ্য কত সীমিত! এই চিন্তাবিদ বলতে নানান রঙের কথিত থিংকট্যাংক বা একাডেমিক বা কনসাল্টিং ফার্মের কথা বলছি। এক কথায় বললে, এই চুক্তি ভারতকে ভারতের স্বার্থ একেবারে ধসিয়ে দিবে, দিশেহারা করে দিবে। অথচ, এর আগাম কোনো হদিস এই কথিত চিন্তাবিদরা ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের দিয়েছে প্রমাণ জানা যায় না।  বরং আমরা বিস্মিত হই দেখে যে, হবু-চুক্তি প্রকাশ হবার পরে সবচেয়ে বেশি অহেতুক বাজে কথা বলা হামবড়া লোকটাই এখন সবার আগে মাথা নিচা করেছে। বিসিসিকে এরা যা বলেছে এর সারকথাটা হল, তারা হেরে সব মেনে নিয়েছে। বিবিসি লিখছেঃ

     “ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক সাবেক সচিব পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীও কার্যত মেনে নিচ্ছেন, চাবাহারে ভারত বিপুল পরিমাণ লগ্নি করার পরও এই বন্দরের নিয়ন্ত্রণ হয়তো শেষ পর্যন্ত চীনের কাছেই হাতছাড়া হয়ে যাবে। মি. চক্রবর্তীর কথায়,”ইরান বলছে ওই রেল প্রকল্পে ভারত ঠিক সময়ে টাকাপয়সা দেয়নি। আমরা যেটা দেখছি,চাবাহার নিয়ে ভারতের মধ্যেও এখন একটা দ্বিধা কাজ করছে – কারণ ওই প্রকল্পে চীনের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।” “আমার ধারণা চাবাহার বন্দর প্রকল্পে শেষ পর্যন্ত ভারতেরও শেয়ার থাকবে – কিন্তু চীনই শেষ পর্যন্ত ওখানে সবচেয়ে বড় প্লেয়ার হিসেবে উঠে আসবে।”
    —এরপর আর আমাদের কিছুই কী বলার আছে!

    এর মানে, এই চুক্তির কারণে ভারত মূলত ইরান, আফগান বা সেন্ট্রাল এশিয়া জোনে ব্যবসা বাণিজ্য সহায় সমর্থনহীন অবস্থায় পড়ে সব গুটিয়ে নিয়ে বাসায় ফিরতে মানসিকভাবে তৈরি। কিন্তু ভারতের দুর্দশা তো এতেও শেষ হবে না। এই হবু চুক্তির আয়োজনের ফলে ভারতকে চীন এমন কঠিন এক  দুর্দশা পরিস্থিতিতে ফেলে দেবার মুখে নিয়ে যাবে যেখানে – ভারতকে এখন খোলাখুলি চীন অথবা আমেরিকা কোনো একটা পক্ষকে বেছে নিতে হবে। অর্থাৎ সেই সময় এসে গেছে যখন ‘এ-ও হয় ও-ও হয়’ বলে দু’দিকেই নৌকায় পা দিয়ে থাকার সুবিধা এনজয় করার দিন শেষ। এতে ভারত যদি আমেরিকা ক্যাম্পে যায় তা গেলে হয়ত সামরিক দিকে কিছু সুবিধা হতে পারে। কিন্তু সাথে খামোখা অনেক দায় আসবে যেগুলো  আসলে হুদাই পশ্চিমের ব্যাগেজ টানা হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে  সবচেয়ে বড় ক্ষতি যেটা হবে বাইরে থেকে সব অর্থনৈতিক সাহায্য সমর্থন পাওয়ার দিন শেষ হবে। আর যদি চীনের ক্যাম্পে মাথা নিচু করে ফিরে তবে চীনের টার্মেই ফিরতে হবে। কম দরে বিক্রি হতে হবে।

    আবার উপরে এই যে অবলীলায় বলছেন,  “ভারতেরও শেয়ার থাকবে” – এই কথা কয়টা তো মারাত্মক ভীতিকর। মানে ব্রিকস ব্যাংক বা এআইআইবি ব্যাংক ইত্যাদি এমন সবখান থেকে ভারত গুটিয়ে যাবে কেবল নিস্ক্রিয় পার্টনারের মত  শেয়ার মালিকানা নিয়ে থাকবে – তাই কী? তার মানে গত এক সপ্তাহের মধ্যে কথার চাপা আর তুবরি ছুটানো লোকগুলো সব হার মেনে নিয়ে গুটিয়ে যাচ্ছে  -সেলফ, নিজ উদ্যোগে??

    আবার যে কথাটা বলছিলাম ভারতীয় চিন্তার সামর্থ্য – এখন এটা ভারতের রাজনীতিক ও চিন্তাবিদদের জন্য প্রমাণ করা খুবই কঠিন যে, চীন-ইরান যে এমন একটা দীর্ঘস্থায়ী এলায়েন্স করে বসতে পারে তা তারা বিন্দুমাত্র আগে জানত। অর্থাৎ ইরানি তেল না কিনলে মুখ ঘুরিয়ে নিলে যে ভারতেরই বহুমুখী স্বার্থ  যে মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হবে সেটা তারা আগে দেখতেই পায়নি, টেরই পায় নাই! তাদের চোখে “মেরা ভারত মহান” হয়েই ছিল বা “অনেক ক্ষমতাবান” হয়েই ছিল! তার মানে দাঁড়াল ভারতে শুধু উদ্বৃত্ত বা বিনিয়োগের বিপুল ঘাটতি আছে তাই নয়, চিন্তার সামর্থের দিক থেকেও  বহু পিছনে আছে। আমেরিকান থিংকট্যাংকের পাল্লায় পড়ে তাদের স্ব-ক্ষমতাটাও শেষ।

    ভারত ইরানের জাভেদ জারিফকে প্রবল হতাশায় ফে্লে এর পরিণতি খাটো করে দেখেছিলঃ  
    আবার ঘটনা দেখেন সেদিন কীভাবে ঘটেছিল। তেলকেনা বিষয়ে ভারতের পিছলানির আলাপ সেই ২০১৮ জুনে নিকি হেলির ভারত সফরের সময় থেকে শুরু আর মোচরানি দিতে শুরু করেছিল। ভেবেছিল কী জানি বিরাট ক্ষমতাবান এক ভারতীয় পাঞ্জাব অরিজিনের মানুষ হাতে লেগে গেছে, ভারতকে আর পায় কে!  তাই সেসব মোচরানি! এছাড়া  সর্বশেষ যেদিন ১৩ মে ২০১৯ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ [Mohammad Javad Zarif] এক দিনের ঝড়ো সফরে ভারত এসেছিলেন এবং খুবই মনোক্ষুন্ন হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। কারণ এর আগেই ২ মে ২০১৯ থেকে ইরানের অনুরোধ ফেলে মাড়িয়ে ভারত ইরানি তেল কেনা বন্ধ করে দিয়েছিল; আমেরিকান অবরোধের অজুহাত দেখিয়ে। অথচ  চীন তখনও তেল কিনা জারি রেখেছিল। বিশেষত সেবার যেখানে তেল ইরানি পাহারায় ইরানি ট্যাঙ্কারে ভারতের তীরে পৌছে দেওয়ার সস্তা অফার ছিল। তবু ভারত এই প্রথম মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। তাই অন্তত শেষবারের মত “ফাইনাল ওয়ার্ডস” শুনতে এসেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ। এমনকি পরিষ্কার করে বলেছিলেন, ঐ আমেরিকান থিংকট্যাংক- সিএসআইএস [CSIS] -তোমাদের ডুবিয়ে ছাড়বে, এদের পাল্লায় পড়ো না। কিন্তু কেউ তার কথা শোনেনি। এমনকি পরের ২ অক্টোবর ২০১৯ এ আমেরিকায় মিডিয়াকে জয়শঙ্কর দাবি করে বুঝাচ্ছিলেন [Iran not disappointed with India for not buying oil from Tehran: Jaishankar] তেল কেনা বন্ধ করে দেয়ায় ইরান ভারতের ব্যাপারে হতাশ হয়নি। আরো ভয়ঙ্কর সাফাই দিয়ে বলেছিলেন, [we frankly understand each other’s compulsions and possibilities,] – “যার যার দেশের বাধ্যবাধকতা আছে আর (আরেক দিকের) সুবিধাও আছে”। এর মানে তাহলে এখন চীন-ইরান নতুন চুক্তির পথে চলে যাওয়ায় নিশ্চয় ভারতের কোনো ক্ষতি বা অসুবিধা হয়নি, তাই নয় কি? বুঝে শুনেই তো যার যার লাভালাভের সন্ধানে ভারত ইরানকে ছেড়ে আমেরিকাকে বেছে নিয়েছিল! তাহলে চার দিকে আজ চীন-ইরান চুক্তির খবরে মিডিয়ায় ভারতের নাকিকান্না কেন? জয়শঙ্করের সম্ভবত অনুমান এই যে আমেরিকার CSIS থিঙ্কট্যাঙ্কে দাওয়াত পেলে জাতে উঠা যাবে।  কিন্তু গ্লোবাল সিস্টেমটাকে বুঝবার  যে দুনিয়াদারি সেখানে আমেরিকার নেতৃত্বের পুরানা গ্লোবাল অর্ডার যে ভেঙ্গে পড়েছে  এটা তো নিজের যোগ্যতায় জেনে নিতে হয়, আর ঠিক করতে হয় কী কী করব না!
    যদিও বেশির ভাগ মিডিয়া ভারতের ক্ষতিটা ঠিক কী হয়েছে সেটাও বুঝেনি মনে করার কারণ আছে। যেমন দ্য হিন্দু। এটাকে অনেক বুদ্ধিমান অগ্রসর মিডিয়া বলে মানুষ মানে। কিন্তু ওর শিরোনাম দেখুন, “ইরানে চাবাহার রেল প্রজেক্ট থেকে ভারতকে বের করে দিয়েছে ফান্ড দিতে ভারতের দেরি দেখে”। এর মানে ঘটনাকে কত ক্ষুদ্র সংকীর্ণ জায়গা থেকে দেখছে। ভাবছে ব্যাপারটা হল ভারতকে কেবল একটা রেল প্রজেক্ট থেকে বের করে দেওয়া।  ঠিক একই নাদান বুঝ  বিবিসিকে দিয়েছে ভারতের এক সাবেক ভাইস অ্যাডমিরাল শেখর সিনহা। বলেছেন তাদের ঠিকাদার কোম্পানিটা আসলে নাকি ঢিলা!  কিন্তু ঘটনাটা কী এতই সহজ আর এতটুকুই! অথচ হিন্দুর ঐ রিপোর্টেই ভেতরে ঐ চীন-ইরান চুক্তির সবকিছুর উল্লেখ আছে। ভারতকে যে  মূলত ইরান, আফগান বা সেন্ট্রাল এশিয়া জোনে ব্যবসা-বাণিজ্যে সহায়শুণ্য বের করে দিবে সেদিকটা দেখতেই পায় নাই। এছাড়া নিজে  অন্তত অবকাঠামো বিনিয়োগে ঘাটতি  সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে সেসব তো আছেই।
    এর সোজা মানে হল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদকে হতাশায় ফিরিয়ে দেয়াকে তারা দেখেছিল – আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক এত বিশাল কিছু আর এতে ভারতের জন্য অর্জন এতই বড় যে, ভারতের এর বিপরীতে ক্ষুদ্র ইরানের কথাগুলো নিয়ে ভাবা অপ্রয়োজনীয়, খুবই স্মল। কাজেই তখনকার এসব অনুমানের উপর খুশিতে ডগমগ আত্মতুষ্টিতে থাকা ভারত এখন কিভাবে অনুসিদ্ধান্ত টানে যে এখন ভারতের যা ক্ষতি তাতে সব দোষ চীনে্র? বড়ই বিচিত্র ভারতের ভিকটিমহুড মন!
    যেমন দেখেন এনিয়ে আরো কিছু মিডিয়ায় শিরোনামঃ ‘”চাবাহার প্রকল্পে ধাক্কা ভারতের, নেপথ্যে চিন”, “ইরানের একটি বড় প্রকল্প থেকে ভারতকে বাদ” – এটা নাকি আবার আমাদের প্রথম আলোর সারা দুনিয়ার মিডিয়া ঘেটে করা এক ডেস্ক রিপোর্ট।  বুঝেন অবস্থা তাদের চোখ কত সংকীর্ণ। আবার “চীন-ইরান দোস্তি, যুক্তরাষ্ট্রে অস্বস্তি”। কিন্তু ট্রাম্প বাবাজি অস্বস্তিতে পড়বে কেন? তিনি কী ইরানের সাথে পারমানবিক চুক্তি কেন ভেঙ্গে দিয়েছিলেন?  অর্থাৎ এর মানে হল,  এই চুক্তির বড় পিকচার বা গ্লোবাল প্রভাবের দিকটা তিনি আমল করতে পারেনি।  আসলে এখনও অনেকেই ব্যাপারটাকে নেহাতই একটা ইরানি প্রকল্প থেকে ‘চীনের প্রভাবে’ ভারতকে বের করে দেয়া হিসেবেই বুঝেছে। এভাবে চীনকে দোষারোপ করে নিজেদের চিন্তা করারও অযোগ্যতা তারা ঢাকতে চাচ্ছে। আবার ভারত আমেরিকান সখ্যকে অতিগুরুত্ব দিয়ে তারা বলতে চাচ্ছে  – ভারত চাইলে  ইরানি তেল কেনা বন্ধ করতে পারবে কিন্তু ইরান ভারতকে কোন প্রজেক্ট থেকেই বাদ দিতে পারে না! আহা কী সুবিধা!

    এর চেয়ে বরং কংগ্রেসে আমরা কিছুটা বুদ্ধিমান লোকজন আছে মনে হচ্ছে। তারা বলেছে,‘চীন বেটার ডিল দিয়ে ইরানকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে অথচ মোদী সরকার সেটা আগে বুঝতেই পারেনি।’ অর্থাৎ  কংগ্রেস অন্তত বিনা প্রসঙ্গে চীনকে দোষী করার দিকে যেতে চায়নি; বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখেছে।

    মাথা নিচা ভারতের বুদ্ধিমানেরাঃ
    তবে এই প্রথম আমরা এক নতুন ধরণের ভারতকে দেখতে পাচ্ছি যারা চীন-ইরান হবু চুক্তির কথা প্রকাশিত হবার পর একেবারেই চুপসে গেছে, যেন তাদের দম্ভ কমেছে অন্তত কিছুটা। বিশেষ করে থিঙ্কট্যাকের সাথে সংশ্লিষ্ট আছেন যারা এমন ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে। বিশেষত বাংলাদেশের ১/১১ এর সময়ের ভারতীয় রাষ্ট্রদুত  পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর পরিবর্তন অবাক করার মত। ওআরএফ – এই থিঙ্কট্যাঙ্কের সাথে  সর্বশেষ জড়িত এই সাবেক কূটনীতিক, যেখানে সেখানে কটু কথা বলার ক্ষেত্রে খুবই খ্যাত, তিনি বিবিসির সাথে যেভাবে কথা বলেছেন তার ইঙ্গিতটা হল যেন বলা যে, আমরা চীন-ইরান চুক্তির কাছে হেরে গিয়েছি আর তা মেনে নিচ্ছি বলেই আমাদের স্বর এমন নরম হয়ে বদলে গেছে। তবে  স্বর বদলে  নরম করে নেয়া প্রসঙ্গে পিনাক রঞ্জনকেও ছাড়িয়ে গেছেন আরেক নারী ব্যক্তিত্ব, তিনি  দিল্লিতে ইনস্টিটিউট অব চায়না স্টাডিজ নামে আরেক থিঙ্কট্যাঙ্কের ফেলো অধ্যাপক শ্রীমতি চক্রবর্তী। বিবিসির কাছে তিনি প্রায় সব প্রশ্নেই ভারতের দোষ দেখেছেন বা হার স্বীকার করে নিয়েছেন। যেমন তিনি  “ভারতকে সরানোয় চীনের ভূমিকা আছে কি না তা বলা মুশকিল”  বলেছেন। এছাড়া বলেছেন, “ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা জারির পর তেহরান দিল্লির কাছ থেকে যে ধরনের সমর্থন আশা করেছিল, সেটা তারা পায়নি তাতেও কোনও ভুল নেই!”।  মানে একদম গুলে গিয়ে সবাই যেন মোম হবার দশায়।  যদিও তিনি বলছেন, “ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর আমেরিকার সঙ্গে ইরানের যে সংঘাত চরমে উঠেছে, চীন খুব ভালভাবেই তার অ্যাডভান্টেজ নিচ্ছে”। মনে হতে পারে তিনি এখানে পরোক্ষে হলেও চীনকে দায়ী করছেন সুবিধা তুলে নেওয়ার জন্য। যেখানে ব্যাপারটা হল আপনি আপনার প্রতিদ্বন্দ্বিকে যদি বোকা হয়ে সুবিধা করে দেন সেক্ষেত্রে সে সুবিধা তো নিবেই। গ্লোবাল নেতৃত্ব দখলের দিনগুলোতে সামলে না চললে প্রতিদ্বন্দ্বি সুবিধা ত নিবেই। সেখানে প্রেসিডেন্টের নানান ক্ষমতার মর্ম ও ওজন বুঝে না এমন কোন দেউলিয়া ব্যবসায়ী যদি হঠাত করে আমেরিকান প্রেসিডেন্টের আসনে বসে পড়ে তবে তার ‘কেলাসনেস’ বা অযোগ্যতা আমেরিকার ক্ষতি তো করবেই। গ্লোবাল ক্ষমতার পালাবদলের সময়ে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বি এভাবেই সুযোগ নিয়ে নিয়ে সামনে ধেয়ে আসছে এবং আসবেই – এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। আর এদিকে ভারতের ক্ষেত্রে তার চিন্তা করার প্রকৃত সামর্থ ও যোগ্যতা তার যে লেবেল বা মানের তাতে শেষে আজ সে ঠিক সেই মাপের বামন হয়ে গেছে।  ইরানকে গুরুত্ব দিয়ে না দেখা খাটো করে দেখা বা ইরানের তেল না কিনলে ভারতের কিছুই হবে না এই হামবড়া ভাব – এভাবে ট্রাম্প আর মোদী মিলে ধারাবাহিক ভাবে ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করে যেন ইরানকে ঠেলতে ঠেলতে চীনের কোলে ফেলে দিয়েছে। এখন এর কাফফারা দিতে দিতে এরা কোথায় গিয়ে ঠেকে তাই দেখার বিষয়!

    চিন্তায় অযোগ্য আর বেপরোয়া মানুষেরা এমন কাফফারা দিতে দিতেই শেষ হয়ে যায়! দিন সবারই একদিন আসে, আগে আর পরে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত ১৯ জুলাই ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  ঐদিনই প্রিন্টেও  “চীন-ইরান এলায়েন্স,পালাবদলের শুরু” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কাজে লাগাতে জানলে চীন অ্যাসেট, না হলে দায়

    কাজে লাগাতে জানলে চীন এসেট, না হলে দায়

    গৌতম দাস

    ১৩ জুলাই ২০২০, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-35Y

     

    RESET CN-IND Relation – GTimes

    কখনো কখনো এমন সময় আসে যখন বাইরে মার খেয়ে এলেও ঘরে এসে তা বলে না। এতে আরো ক্ষতি কম হবে এটাই থাকে  পিছনের বুঝাবুঝি। নরেন্দ্র মোদীর অবস্থা এখন সেরকমই। তাঁর – আমাকে কেউ মারে নাই; ভূমি বা বর্ডার-পোস্ট কেউ দখল নেয় নাই ধরণের বক্তব্যটা সে রকমের। তবে ওটুকু বলাতেই ব্যাপারটা মিটে যায়নি। ইতোমধ্যে এর আরো বর্ধিত রূপও এসে গেছে। তাতে ভ্যানিটি বা অহঙ্কার আরো যা ছিল তা-ও ফুটা হয়ে, মাথা নিচু হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। গত ৬ জুলাই সকাল থেকেই পরিষ্কার প্রকাশ হয়ে পড়ে যে, লাদাখে গালওয়ান উপত্যকা এটা পুরাই চীনের অংশ বলে মোদী মেনে নিয়েছেন। তাতে মাথা যত নিচে গিয়েই ঠেকুক, চীন তাঁর হাত-পা বেধে ফেলেছে, তাই। আর এই মেনে নেয়ার বিনিময়েই ডিসএনগেজমেন্ট বা উভয়পক্ষের সেনা প্রত্যাহারের আপসটা সম্পন্ন হতে পেয়েছে। দু’পক্ষই সেনা প্রত্যাহার করে নিতে একমত হলে এর প্রথম পর্বের বাস্তবায়নও ইতোমধ্যে সমাপ্ত হয়ে গেছে।

    মোদীর ‘মন কী বাত’ মিথ্যাঃ
    ভারতীয় আর্মির সাবেক এক আর্টিলারি  অফিসার প্রবীন সায়নি [Pravin Sawhney], এখনকার সময়ে তিনি একজন খুবই পরিচিত প্রতিরক্ষা বিষয়ক অ্যানালিস্ট, ‘ফোর্স’ নামে এক ভারতীয় প্রতিরক্ষাবিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও কিছু বই লেখক। এছাড়া এককালের জেন্স ইন্টারন্যাশনাল সাপ্তাহিক ডিফেন্স ম্যাগাজিনের দিল্লিস্থ দক্ষিণ এশিয়া সংবাদদাতা ছিলেন। চলতি এই সময়ে তাঁর প্রতি লোকজনের আগ্রহের মূল কারণ হল, তাঁর খাড়া কথা খাড়া বলতে পারা এবং “জাতীয় স্বার্থের নামে মিথ্যা অপেশাদারিত্বের আবেগ”-এর বাইরে চীন-ভারত সামরিক উত্তেজনাকর পরিস্থিতি মূল্যায়ন এক পদ্ধতি ধরে এগিয়ে চলা। তিনি নিয়মিত ওয়েবে প্রকাশিত ‘ওয়্যার’ (WIRE) পত্রিকায় আর্টিকেল লিখছেন। সেখানে তিনি প্রশ্ন তুলে লিখেছেন, লাদাখে চীন-ভারতের এলএসি (LAC, Line of Actual Control) নামের সীমানা ঠিক কোনটা? কারণ, এর সবচেয়ে পুরনো এলএসি টা হল ১৯৫৯-৬০ সালেরটা। এছাড়া পরে ১৯৯৩, ১৯৯৬, ২০০৫, ২০১২, ২০১৫ সালের বলে ইত্যাদি আরও অনেক আছে। প্রভীন বলছেন, চীন এবার সেই ১৯৫৯-৬০ সালেরটার ভিত্তিতেই সব এলাকা মাপছে আর ওই ম্যাপ অনুসারে এলাকা নিজের দখলে নিয়েছে। তবে এটাও অস্থায়ী সীমানা। আর অস্থায়ী সীমানা মানেই এলএসি।
    এলএসি [LAC] শব্দের ‘এ’ হল, এটা ‘অ্যাকচুয়াল’ শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ, যার অর্থ ‘এখন যেভাবে যার দখলে’ আছে। সবচেয়ে বড় কথা, চীন ভারতকে এবার ১৯৫৯-৬০ সালের ভিত্তিকেই সীমানা মানতে চাপ দিয়ে আসছিল। আর মোদী চীনের সেই দাবি মেনে নিয়ে এখন বলছেন, আমাদের কোনো ভূখণ্ড কেউ নেয়নি। আমাদের এলএসি আমাদের ঠিকই আছে। কিন্তু সেটি কী করে সত্যি হয়? তাই  প্রভীন সোয়ানি লিখছেন, “মোদী ভারতে একটা ধারণার আবহ তৈরি করে চলতি জটিলতা পার হয়ে যেতে চান। সে প্রসঙ্গে দুটো কথা  হল, “১. এলএসি অমান্য করা যায় না। আর ২. ভারতের কোনো ভূখণ্ড চীনা সেনাদের কাছে ভারত হারায়নি”। কিন্তু এই বক্তব্যের মধ্যে এবার মোদীর কথায় ফাঁকির দিকটা উন্মোচন করছেন প্রবীন।  বলছেন, “তাতে সেটা অবশ্য আরেক কথা যে, কে আর এরপরে জিজ্ঞাসা করতে আসছেযে , এই “লাইন” মানে এলএসির লাইন, এটা কোন সালেরটা? ১৯৯৩ সালের এলএসি লাইন নাকি ১৯৬০ সালের দাবি করা চীনের এলএসি লাইন?” – কোনটা? [It’s another matter that no one bothered to ask which ‘line’ he was referring to — the 1993 LAC, China’s 1960 claim line or the one that is going beyond that.] এই প্রশ্নটাকে উহ্য রেখেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁর অভ্যন্তরীণ ভোটার বা শ্রোতাদের সাথে চাতুরীটা করেছেন। কারণ, তিনি আসলে এলএসির লাইন বলতে চীনের কাছে ১৯৬০ সালের হিসাবে গলওয়ান উপত্যকা ছেড়ে দিয়ে এসেছেন। কিন্তু ভাব ধরছেন যেন এটা ১৯৯৩ সালের এলএসির লাইন বুঝাচ্ছেন! অথচ কথাটা সত্যি না।
    এভাবে আপাতত নিজের মুখ রক্ষা করেছেন। তাই তিনি গালওয়ান উপত্যকা ও টহল দেয়ার ভূখণ্ডপথ ছেড়ে চলে এসেছেন। কেবল মুখরক্ষার একটা কথা বলে বেড়াচ্ছেন যে, এটা ‘সাময়িক’, অস্থায়ী। তবে প্রভীন এমনকি আরো একটা মারাত্মক তথ্যের কথা বলছেন যে, মোদীর যে নিয়মিত মাসিক রেডিও অনুষ্ঠান ‘মন কী বাত’, সেখানেও গত ২৮ জুন মোদি দাবি করেছেন- ‘গালওয়ান যুদ্ধ জয় করা গেছে’, মুখের উপর উপযুক্ত জবাব দেয়া গেছে ইত্যাদি সেই ; “A befitting reply has been given to those who cast an evil eye on Indian territory in Ladakh. Our brave soldiers have shown that they will never allow the honour of mother India to be hurt,” । আর বেশির ভাগ মিডিয়াই সরকারের ‘এই লাইন’ তোতা পাখির মতো আউড়িয়ে যাচ্ছে।
    গত ৬ জুলাই বেলা ১:২০টায় প্রবীন সায়নির টুইটারে আর বিকেলে ওয়্যার ওয়েব পত্রিকায় তার লেখা আর্টিকেলে তিনি পরিষ্কার করে এসব কথা লিখেছেন। মোদীর এসব চাপাবাজি কাণ্ড ফাঁস করে দিয়েছেন।

    হতাশা বাড়ছেঃ
    এতে আমরা না হয় সবাই সত্যটা জানলাম। কিন্তু এরপর কী? বলাই বাহুল্য, এরপরের ঘটনা হল – নিম্নচাপ বা ডিপ্রেশন। মানে প্রবল হতাশা নেমে আসা, আর তা এসেছে। এতে ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হতাশায় প্রভাবিত অংশ হল সাংবাদিক আর পড়ালেখা জানাদের মধ্যে যারা এই খবরাখবরগুলো রাখেন তারা।
    আর সাধারণ মানুষের মধ্যে যে হতাশা তা কাটাতে অন্তত কিছু ক্ষোভ প্রকাশের একটা ব্যবস্থা করা হয়েছে। তা হল চীনের তৈরি প্রায় ৫৯টা মোবাইল ‘অ্যাপ’ বা অ্যাপ্লিকেশন ভারতের সরকার ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। আর এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রপাগান্ডা হয়েছে এমন যেন, এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েই চীনের ওপর কিছু ‘গোলাবর্ষণ করা গেছে’। যদিও এতে সবচেয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া এসেছে টিকটক অ্যাপ বন্ধ হওয়াতে। কারণ, এটা ব্যবহার করে ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ বাসায় বসে তৈরি করা যেত, যা ফেসবুকে প্রকাশ করলে ওর বিজ্ঞাপনের আয় থেকে তরুণেরা হাতখরচের পয়সা জোগাড় করতে পারত। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় তারা বলতে চেয়েছে, দেশের যুদ্ধ বা স্বার্থ নিয়ে সরকারের যা মন চায় করুক তাদের কোনো আপত্তি নেই; কিন্তু তারা যা থেকে কিছু অর্থ আয় করত তার ওপর হাত দেয়া কেন? সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় তাদের স্বার্থের কথা কেউ আমলে নেয়নি কেন? এছাড়া মোদী নিজেই চীনা সোশাল মিডিয়া এপ উইবো ব্যবহার করতেন আর তা নিষেধাজ্ঞা জারির পরে ছেড়েছেন বলে এটা নিয়ে রিপোর্ট মানুষের ক্ষোভ প্রকাশের একটা উপায় হয়ে হাজির হয়েছিল। ওদিকে প্রাচীন দক্ষিণী ইংরাজি দৈনিক ‘দ্যা হিন্দু’ ” নিষিদ্ধ (ডিলিট) করেন না, নিয়ন্ত্রণ করেন” শিরোনামে  সম্পাদকীয় লিখে মন্তব্য করেছে। সারকথায় বললে, মোদীর পারফরমেন্স প্রশংসিত হয় নাই বা আপ-টু-দা-মার্ক নয়।

    কেন মোদী আজকের অবস্থায় পৌছালোঃ
    এক কথায় বললে মোদীর এমন অবস্থায় পৌঁছানোর পেছনের মূল কারণ, এক ‘নেশন’ ধারণ। কিছু বাতিওল হয়ে পড়া ধারণা। যেমন, হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের ধারণা, যা হিন্দুত্ববাদ বা উগ্র জাতিবাদ এর উতস। এছাড়া এর অনুরূপ কিছু অর্থনীতিগত ধারণা যেমন কথিত ‘স্বদেশি’ বা একালের শব্দ “আত্মনির্ভর” এসব ধারণাগুলো অবসলিট বা অচল ধারণা। উলটা ফল দিবে এমন ধারণা।
    কিন্তু কেন মোদীর কাছে এগুলো জরুরি? তাঁর কাছে এটা শুধু জরুরিই নয়, এর ওপরই মোদীর রাজনীতি ও ক্ষমতা নির্ভরশীল করে সাজানো এবং সামগ্রিকভাবে নির্বাচনে ভোট জোগাড়, পোলারাইজেশন সব কিছু এমন জাতিবাদনির্ভর। এটাই তো হিন্দুত্ব।  যেমন, কাশ্মিরের ৩৭০ ধারা বাতিল করে দিয়ে জবরদস্তি একে ‘ভারতের অংশ’ বলে দখল করে নেয়া – এর একদম রুট কারণ হল হিন্দুর নামে একজোটে ভোট নেয়া, হিন্দু পোলারাইজেশন, হিন্দুত্বের মহিমা বিক্রি করে ক্ষমতায় যাওয়া ইত্যাদি এগুলো সব করা যায় এতে আর  তাতে সত্যমিথ্যা সবকিছুই বলা যায়। সে কারণে সংসদে অমিত শাহ দাবি করে বলে দিলেন যে, পাকিস্তান ও চীনের অংশের কাশ্মিরও ভারত দখল করবে। মোদী-অমিত তা করতে যান আর নাই যান বেপরোয়াভাবে তারা এটা বলে ফেলতে পারলেন।
    আসলে কাশ্মির সমস্যার রূট বা সার কথা হল, এতে কাশ্মির কার অথবা এর সীমানা কার অংশ বা এটা স্বাধীন রাষ্ট্র কি না এসব অমীমাংসিত থেকে যাওয়া। কাশ্মির পুরা ব্রিটিশ আমলজুড়ে করদরাজ্য ছিল বলে কখনোই পড়শির সাথে এর কোনো সীমানাই  চিহ্নিত করা হয়নি, পরস্পর বুঝে নেয়া, কমন ম্যাপ আঁকা হয় নাই। আর এ থেকে কাশ্মিরের ভারত-চীন-পাকিস্তান অংশ কখনোই এদের মধ্যেও পারস্পরিক স্বীকৃত সীমানা নয়। তাই এখন বলা হচ্ছে, এর বাউন্ডারি নেই। যার যা “দখলে” (অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলে) আছে, এই হল সীমানার ভিত্তি। সেখান থেকেই তো LAC, Line of Actual Control ধরণের ধারণার উতপত্তি।
    কিন্তু তবু আরেকটা ইতিবাচক বিরাট অর্জনও ছিল। ১৯৬০ সালের পর থেকে কাশ্মিরের সীমানা নিয়ে আর বড় বদবদল হয়নি। বিশেষ করে ২০১৯ সালের আগস্টে ভারতের সংসদে বসে ৩৭০ ধারা উঠিয়ে কাশ্মিরকে ভারতের অংশ বলে দাবি করার আগে পর্যন্ত।ীকারণে ৩৭০ ধারা উঠানো – এই পদক্ষেপ এটাই তাই বাকি দুই রাষ্ট্রের কাছে ছিল ভারতের সবচেয়ে আস্থাভঙ্গের মেসেজ; যে গত ৬০ বছরের যার যার দখলে থাকা সীমানায় বড় কোনো ভাঙচুর হয়নি, এটাই ৬০ বছরের এক ধরনের আস্থাটা ছিল যে তিন টুকরা হওয়ার পরেও কাশ্মির আর যেন ভাঙবে না। কিন্তু মোদী-অমিত যেমন হিন্দুর নামে ভোট পাওয়ার জন্য যা ইচ্ছা তাই বলা কোনো ব্যাপার নয়, ঠিক তেমনি পাকিস্তান ও চীনের থেকেও তাদের কাশ্মির অংশ ছিনিয়ে নিব অথবা একক-ইচ্ছায় যেকোন পদক্ষেপ নিতে পারে ভারত – এক কথাটাই অবলীলায় এটা বলে বসেন। চীন এ থেকে কী মেসেজ নেবে সেদিক সম্পর্কে তারা বেপরোয়া, এটাই মোদি-অমিত জানিয়ে দিয়েছিলেন। তাই ১৯৬০ সালের এলএসি ভুমি আবার ফিরে দাবি করে চীন যেন বুঝিয়ে দিল চীনও তাহলে ফিরে আবার যা খুশি অংশ দাবি করতেই পারে।
    আমরা লক্ষ করলে দেখব, কোথাও কোন দেশে সরকার বদল হলে বিশেষত সামরিক আইনের সরকার বা বিপ্লবীদের ক্ষমতা দখলের ক্ষেত্রে দখলকারীরা ক্ষমতায় এসে প্রথমে যে ঘোষণাটা দেন তা হল, তার ক্ষমতাকে দেশের কোন আদালতে চ্যালেঞ্জ করা নিষিদ্ধ (এটা আগে করতেই হয়)। আর দ্বিতীয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হল, তার রাষ্ট্র এর আগে অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে বিভিন্ন সময়ে যেসব চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল তার নতুন সরকার সেসব চুক্তি মেনে চলতে অঙ্গীকার করছে। এমন ঘোষণার মূল কারণ অন্য রাষ্ট্রের আস্থা অর্জন যে নতুন সরকার আইন-নিয়ম মানে। তাই আগে যা কিছু কৃত চুক্তি ও আস্থা স্থাপন হয়ে আছে সে সেটার ধারাবাহিকতা মেনে চলতে চায়।, তা মেনে চলার অঙ্গীকার করার মানে এ থেকে ইচ্ছা মত এবং একতরফা সরে আসা যায় না – এই আন্তর্জাতিক নীতির সাথে নতুন সরকার একমত। তাই কেউ যেন সন্দেহবশত বিরূপ আচরণ না করে। নতুন সরকার কোনো ঝামেলা চাচ্ছে না। কিন্তু এর মানে কী সে কিছুই বদলাতে পারবে না?
    অবশ্যই পারবে। কিন্তু ধাপগুলো হল, প্রথমত পুরনো সব চুক্তি মানতেই হয়। আর এরপর উপযুক্ত আইন ও সম্পর্করক্ষার পদ্ধতি মেনে (খামখেয়ালি নয়, একপক্ষীয় নয়) নোটিশ দিয়ে উভয়পক্ষের আলোচনাকারীকে ডেকে বসার পর সেখানে প্রস্তাব করে অবশ্যই পুরনো যেকোনো চুক্তি রদ করা যাবে, ইচ্ছা করা যাবে। আন্তর্জাতিক আইনকানুন মেনেই তা করতে হবে। সোজা কথা ক্ষমতায় থাকাকালে খামখেয়ালি নয়, একপক্ষীয় নয় এমন কাজ করা নিষিদ্ধ যা থেকে প্রতিপক্ষ ভুল মেসেজ পাবে। কিন্তু ঠিক এই নাদানিটাই করেছিলেন মোদি-অমিত।
    অথচ তাঁরা আচরণ করেছে ঠিক যেমন মোদী-অমিতের ইচ্ছা হল তো তাদের জন্য কোন মুসলমান নাগরিককে ‘জয়শ্রীরাম বলতে বাধ্য করানো’ এটা কোন ব্যাপারই নয়। ্স্বভাবতই, ঐ নাগরিক তা করতে কথা শুনতে রাজি হবে না। এরপর তখন তাকে মাটিতে শুইয়ে ফেলে সেই শরীরের ওপর লাফ দিয়ে ওর বুকের ওপর চড়ে বসা, বুকের হাড়গোড় ভেঙে দেয়া – এগুলো কোনো ব্যাপারই নয় যেন। কোন আদালত, কোন পুলিশ কোথাও এর কোন রেকর্ড হবে না। তারা যা ইচ্ছা তাই করতে পারবেন। কোথাও কিচ্ছু হবে না। ক্ষমতাকে তারা এতই সহজ হাতের মোয়া মনে করেন। তাই মোদী-অমিত বলে দিয়েছিলেন, তেমনি সহজ করেই অবলীলায় বলে দিয়েছিলেন যে চীন ও পাকিস্তানের কাশ্মির অংশও তারা দখল করবেনই। তাতে এটা যে তাদের কথার কথা; আর পাঁচটা কথার মতোই চাপাবাজি তা তো চীন মানেনি, এ দিকটাও তারা আমল করেননি। রাষ্ট্র বা ক্ষমতা খুবই হালকা জিনিস, তাদের কাছে মুসলমানকে জবরদস্তিতে “জয়শ্রীরাম বলানোর” মতই সহজ!
    কিন্তু মোদী কী এখন বুঝেছেন কেন চীন আজ হঠাৎ বা কোন ইচ্ছায় ১৯৬০ সালের এলএসি, সেটাই মানতে বাধ্য করাচ্ছে আর কোন খেয়ালে? তার চেয়েও বড় কথা, মোদি এখন কাকে জিজ্ঞাসা করবেন চীন কেন খামখেয়ালি আচরণ করছে? আসলে মানতেই হচ্ছে এটাই মোদীর প্রাপ্য ছিল। কারণ, মোদি কি নিজ দেশের কনস্টিটিউশন অথবা আন্তর্জাতিক আইন বা রীতি রেওয়াজ মেনে চলতে অভ্যস্ত রাজনৈতিক নেতা? মোদি বা তার দল কি এটা দাবি করতে পারবেন? দুনিয়াটা ‘হিন্দুত্ব’ দিয়ে, কিংবা খামখেয়ালি দিয়ে চলে; এটাই ভেবেছিলেন মোদী!
    তবু সেই হিন্দুত্ব এখনো বর্তমান এবং মোদী-অমিতের একমাত্র আশ্রয়। তাই হতাশ ভারত, হতাশ রাজনৈতিক নেতারা এখন আরো ভয়ঙ্কর হতে চাইবে। নিজের হতাশায় তারা আরও ডুবে যাবার মত পদক্ষেপ নিয়ে বসতে পারে। তবু আগামী বছরের এপ্রিলের আগে সম্ভবত ভারতের কোনো রাজ্য নির্বাচন হচ্ছে না, কোভিড পরিস্থিতিও এর আরেক কারণ। এটাই হয়ত সাময়িক একটু স্বস্তি। না হলে জনগোষ্ঠীগত হতাশা আরো বাড়িয়ে মোদির তাণ্ডব ভোটের বাজার কাঁপাত।

    না, তবু এত ভরসা করার কিছু নেই। কেন?
    কারণ, ইতোমধ্যে আরেক ভীষণ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত- এই নেশন স্টেট বা জাতিবাদীরা নিয়ে বসে আছেন। উপরে টিকটক এপ বন্ধ করে দেয়াতে তাদের কথিত গর্বের কথা বলছি। মোদির আরেক হামবড়া ভুয়া গর্বের সিদ্ধান্তের কথা জানা যাচ্ছে। তা হল, নানা দেশের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক বা বাণিজ্যিক জোট হতে দেখা যায়।
    কিন্তু মোদী সম্প্রতি তাঁর নেয়া এমনই এক সিদ্ধান্তের কথা জানাচ্ছেন যে, কোনো বাণিজ্যিক জোট যেখানে চীন সদস্যরাষ্ট্র হয়ে আছে এমন হলে ভারত ওই জোটে আর সদস্য হবে না। অথচ এই সিদ্ধান্তটাই প্রমাণ করে, এটা আগা-পাশতলা না ভেবে নেয়া জিদের সিদ্ধান্ত।  যেমন কেউ কম্বলের লোম বাছবার আর তা বেছে তুলে ফেলে দিয়ে এরপর তা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে যায় না, এটা তেমনি অবিবেচক সিদ্ধান্ত। মোদীর এই সিদ্ধান্তের অর্থ কি তাহলে – ব্রিকস [BRICS] ব্যাংক উদ্যোগ, এআইআইবি [AIIB] ব্যাংক অথবা সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশন [SCO] ইত্যাদি সব সাংগঠনিক উদ্যোগ থেকে ভারত এখন বের হয়ে আসবে? যদিও ভারত এখনো কোথাও তা পরিষ্কার করে বলেনি। এ ছাড়া ভারতের অবকাঠামো খাতে যত বিদেশী ঋণ নেয়া আছে, এর বেশির ভাগ হল চীনা ঋণ। এগুলোর কী হবে? নিশ্চয় ভারত কোনো অর্থপূর্ণ সিদ্ধান্তই নিতে চাচ্ছে আমরা ধরে নিতে পারি। মানে বলতে চাচ্ছি – ঝোল খাবো, কিন্তু গোশত খাবো না – ধরনের হাস্যকর বা নামকাওয়াস্তে কোনো সিদ্ধান্ত নিশ্চয় হবে না!  এছাড়া আরও আছে। চীনা পণ্য ভারতে আমদানি বছরে প্রায় পঞ্চাশ বিলিয়ন, আর চীনে রফতানি প্রায় ১৫ বিলিয়ন। এগুলোতেও যদি মোদীর কথা মেনে চলা হয় তবে দু’পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা বলাই বাহুল্য।
    কিন্তু চীনা সস্তা পণ্যের উপর, গড়ে প্রায় ৪০ ভাগের মতো কাঁচামাল বা তৈরি পণ্যে ভারতের নির্ভরশীলতা তাতে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারত। ব্যাপারটা মেনে চলা একেবারেই সহজ হবে না। মূলত এ ব্যাপারে ‘নেশন’ বা জাতিরাষ্ট্রবাদীদের ধারণাটাই গড়বড়ে; তা একেবারেই প্র্যাকটিক্যাল নয়, বরং ফ্যান্টাসিতে ভরা। এর বিকল্প মোদীর হিন্দুত্ববাদী আরেক অচল স্লোগান হলো ‘আত্মনির্ভরশীলতা’। এটাও একটা ফ্যান্টাসি, অবিবেচক ও হুদাই গা-গরম করা ধারণা। কারণ, আপনি সারা দিন যা ভোগ করেন তার সবই নিজেই উৎপাদন করে নেয়া হতে হবে এমন জিদ ধরতে পারেন না।  কারণ এই স্লোগান খুবই অ্যাবসার্ড, বাস্তবায়ন অযোগ্য আর ফ্যান্টাসিতে ভরপুর, অবিবেচক ধারণা। এর চেয়ে বরং আরো বেশি করে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও পণ্য বিনিময়ের সম্পর্ক- এমন পারস্পরিক নির্ভরশীলতাই উত্তম সমাধান, যাতে কেউ খেয়ালে যা ইচ্ছা করে তাই সিদ্ধান্ত না নিতে পারে। “স্বদেশী পণ্যের” ধারণা আজীবনই অকার্যকর ও অপরীক্ষিত ধারণা ছিল।
    সেকালের বৃটিশ আমলে খুবই অবিকশিত বিনিময় লেনদেন ব্যবস্থা থাকায় ছিল বলে সাময়িক কিছু ফল দেখা দিয়েছিল। কিন্তু একালে এটা একেবারেই অসম্ভব, অচল। ‘কোল্ড ওয়ার’ আমলে আমেরিকা-সোভিয়েত এভাবে দুই ব্লক রাজনীতি চলতে পেরেছিল। এর মূল কারণ এ দুই ব্লকের দেশের মধ্যে কোন কমন লেনদেন-বিনিময় বাণিজ্য শুরু থেকেই চালু ছিল না। অর্থাৎ শুরুরও আগে থেকেই কোনো নির্ভরশীলতাই ছিল না বলেই এটা ৪০ বছর চলতে পেরেছিল। যেমন খুব কম লোকই খেয়াল করেছেন যে, একালে পুতিনের রাশিয়া আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মতন একেবারেই নয়। সেটা এ জন্য নয় যে, রাশিয়া ‘পুঁজিবাদী কী পুঁজিবাদী নয়’। বরং এই পুজিবাদী কিনা এগুলো নিজেই খুবই অবুঝের প্রশ্ন। বিষয়টা হলো রাশিয়া কী গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময় বাণিজ্য ব্যবস্থা (যেটা সোভিয়েত ব্লকের দেসাহগুলোকে বাইরে রেখেই দাঁড়িয়ে গেছিল এখনকার রাশিয়া এখন এর কোন সদস্যরাষ্ট্র হয়ে যেতে পেরেছে না বাইরেই আছে – এই হলো মুখ্য প্রশ্ন। রাশিয়া, সোভিয়েত ভেঙ্গে যাবার পরের রাশিয়া এখন গ্লোবাল বিনিময় লেনদেন চলে এমন ব্যবস্থার ভেতরের রাষ্ট্র। যদিও তা হওয়া সত্ত্বেও অনেক পরে আবার আমেরিকা রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করে রেখেছে, ফলে রাশিয়া ডলারে কেনাবেচা করতে পারে না। এটুকুই বাধা আছে।
    কিন্তু তবুও ওদিকে সারা ইউরোপে রাশিয়ার গ্যাস বেচে চলেছে। এতে ব্রিটিশ সম্পদ, শেয়ার বা নানান তৈরি পণ্য কিনে মালিক হচ্ছে পুতিনের রাশিয়া। এতে রাশিয়া যতটুকু অন্য রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হতে পেরেছে, বিকশিত করতে পেরেছে ততই রাশিয়ানদের জীবনযাপন সহজ হয়েছে, হওয়ারই কথা। কারণ, সোজা ফর্মুলাটা হলো যত “পারস্পরিক নির্ভরশীলতা” [inter-dependent] ততই জীবন সহজ। ততই আপনার শ্রম দক্ষ, ততই বেশি উতপাদন, বেশি ভোগ। যদিও আবার এটাও ভোলা যাবে না যে, ইউরোপে বেচতে পারে, বাজার চাহিদা আছে বলেই সাইবেরিয়ার গ্যাসের মূল্য আছে। চাহিদা ইউরোপে আছে বলেই গ্যাস বেচা যায় বা বেচে অর্থ পাওয়া যায়। এছাড়া আবার আপনাকে গ্লোবাল বাজার-বিনিময় ব্যবস্থার বাইরে বের করে দেয়নি বলেই এখনো গ্যাস বেচতে পারেন।
    নইলে একেবারেই একঘরে হয়ে কোনায় পড়ে থাকতেন। স্বদেশিয়ানা বা ‘আত্মম্ভরিতার’ নামে নিজে নিজেই একঘরে হয়ে থাকা খুবই আদর্শ বলে মনে হলেও পুতিনের রাশিয়া বা একালের ইরান নিশ্চয় খুশিও হত! তা তো নয়। বাণিজ্যবিনিময় ব্যবস্থার এই গ্লোবাল দিকটা ব্যবহারিক কমিউনিস্টরা কখনো বুঝতে পারেনি। বরং এদের না বোঝাটাই গান্ধীর স্বদেশিয়ানা বা বিজেপি-আরএসএসের স্বয়ংসম্পূর্ণতার মিথ্যা ধারণাটাকে অপরীক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও টিকে থাকতে সাহায্য করে চলেছে। হিন্দু হলেই কেউ হিন্দুত্ব কিংবা ‘আত্মম্ভরিতা’ বা আত্মনির্ভরশীলতা বুঝি বলে দাবি করতে পারে সহজেই। কিন্তু তাতে গ্লোবাল বিনিময়ব্যবস্থা বোঝা আর হয় না! ভারতের অন্তত দুটা প্রফেশনাল ব্যক্তিত্ব মোদীকে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক ত্যাগ আর আত্মনির্ভরতার নামে গ্লোবাল বাণিজ্যবিনিময় ব্যবস্থা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে মোদীকে সাবধান করেছেন। এদের একজন ভারতের পরিকল্পনা কমিশনের প্রাক্তন ভাইসচেয়ারম্যান অরবিন্দ পানাগোরিয়া। তিনি সুনির্দিষ্ট করে চীনের সাথে কোন বাণিজ্যযুদ্ধের শুরু করার বিপদ থেকে সাবধান করে দিয়েছেন। এনিয়ে তাঁর সাক্ষাতকার এখানে পড়া যেতে পারে। আর দ্বিতীয়জন অর্থনীতিবিদ স্বামীনাথন আয়ার। তিনি ভারতের ইকনমিক টাইমসেরও পরামর্শদাতা সম্পাদক। তিনি অনেক আগে থেকেই বলছেন নেহেরুর ভুল দ্বিতীয়বার যেন মোদী আবার না করে বসেন। তিনিই পরিস্কার করে বলছেন, অথাকথিত আত্মনির্ভরতা ভুল, এর বদলে পরস্পরের উপর পরস্পরের নির্ভরশীলতা এটা সঠিক পথ [This means no self-sufficiency, it means interdependence]। তাঁর বক্তব্য পাওয়া যাবে এখানে।

    জয়শঙ্কর নয়, দোভাল – এর তাতপর্য কীঃ
    গত ১৫ জুন অন্তত ২০ ভারতীয় সেনা চীনের হাতে মারা যাবার পর থেকে চীন-ভারত পরস্পর ভাল-মন্দ বা কূট কথা চালাচালি করে আসছিল দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে। ভারতের জয়শঙ্করকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ঈ-এর সাথে তিতা বড়ির শর্ত মেনেই  কথা চালিয়ে যেতে হচ্ছিল। কিন্তু ৬ জুলাইয়ের ডিসএনগেজমেন্টের আপোষ রফায় দেখা গেল এবার এই রফা করা হয়েছে ভারতের নতুন মুখ অজিত দোভালের মাধ্যমে, জয়শঙ্কর নাই। আগের লেখায় বলেছিলাম জয়শঙ্কর হল মোদীর আমেরিকার পকেটে পৌছানোর হাতিয়ার। তাই অনেকের মতে, জয়শঙ্কর আমেরিকান লো্ক, তারা এভাবে বলেন। এর মানে দাঁড়ালো মোদী গলওয়ান উপত্যকা চীনকে ছেড়ে দেওয়ার রফা টা করলেন অজিত দোভালের মাধ্যমে। অর্থাৎ মোদী এই জায়গায় এসে আমেরিকাকেই এড়ালেন! এন্টি-আমেরিকান প্রাক্তন কূটনীতিক ভদ্রকুমারের মতে, দোভালই এখানে সঠিক লোক। ভদ্রকুমারও আস্থা রাখেন দোভালের উপর, কারণ তাঁর যুক্তি, দোভাল জাতিবাদি আবেগী নন, দেশের প্রাকটিক্যাল স্বার্থ ব্যাপারটা মাঠের চোখে বুঝেন।  কিন্তু ভদ্রকুমার একটা কড়া কথা লিখেছেন, এই আপোষনামার ব্যাখ্যা কী হবে তা  ঠিক করে দিবার চেষ্টা করছে আমেরিকান লবিস্টরা [ US lobbyists set the Indian narrative on China border]।

    যা হোক, চীনের সাথে ভারতের বাণিজ্য-সম্পর্কহীনতাবিষয়ক চিন্তা, এককথায় অবিবেচক ও অভিমানঘটিত চিন্তার অধিক কিছু নয়। ফলে এটা অবাস্তব, আর ভারতীয়দের জীবনযাপনকে আরো কষ্ট করে তোলার এক চিন্তার নামান্তর। তবে এটা এড়ানোর একটা সহজ পথ আছে। যেমন, মোদী বলেছেন বলেই তিনি তা আসলে বাস্তবায়ন করবেনই তা তো বলেননি, এমন মানে করে বসতে পারে্ন তিনি। ব্যাপারটা কেবল প্রপাগান্ডা বা ক্যাম্পেইন হিসেবে থেকে গেলেই, মোদী এভাবেই তাঁর সব দিক সামলানো সহজ করে ফেলতে পারেন! কে বলতে পারে যে, এটা এমনই হবে না?

    তাই সারকথা, কাজে লাগাতে জানলে ভারতের কাছে চীন অ্যাসেট হবে, না হলে দায়; কিন্তু কী হবে মোদীই জানে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১১ জুলাই ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “কাজে লাগাতে জানলে সম্পর্ক অ্যাসেট, না হলে দায়“– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • চীন-ভারত যুদ্ধ কী না চাইতেও লেগে যাচ্ছে

    চীন-ভারত যুদ্ধ কী  না চাইতেও  লেগে যাচ্ছে

    গৌতম দাস

    ০৬ জুলাই ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-35o

     

                               Global times Editor – Hu Xijin, @HuXijin_GT   আর বাংলা অনুবাদ নেয়া হয়েছে এখান থেকে

    চীন-ভারত যুদ্ধ কী লেগে যাবে? মোদী মনের মধ্যে যুদ্ধ চাই না এই বাসনা রাখা সত্বেও? যদিও ইতোমধ্যে সাধারণ তবে শিক্ষিত মানুষ যারা এতদিন দূর থেকে দেখে একটু মজা পাচ্ছিল তারা এখন যুদ্ধের টেনশনটা দীর্ঘ হচ্ছে দেখে এবার নিজের জন্য একটু উদ্বিগ্ন হয়ে যাচ্ছেন যে, নিজের জন্য আমল করার মত এখানে কোন লুকিয়ে থাকা হুমকি বা বিপদ হঠাৎ হাজির হতে পারে কি না(!), তাই এনিয়ে ভাবা শুরু করেছেন। গত ১৫ জুন চীনা হামলায় কমপক্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা মারা যাওয়ার পর থেকে এই টেনশনটা এভাবে ক্রমেই সত্যি বলে হাজির হচ্ছে।

    অপমানিত ‘ভারত-নেশন’ থেকে নিজেকে আলাদা করার দৌড়াদৌড়িঃ
    পুরা ব্যাপারটা শুধু ভারতীয় সেনা মারা যাওয়ার মধ্যেই শেষ বা  আটকে থাকলে তাও হয়ত চলত। কিন্তু সর্বদলীয় বৈঠকের ব্রিফিংয়ে ভারতের কেউ যা কল্পনাও করেনি তাই ঘটে গেছে। গত ছয় বছরে সবসময় ছাপান্ন ইঞ্চি বুকের ছাতি দেখিয়ে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওই সভায় বলে বসেন, “সীমানা পেরিয়ে কেউ ভারতে ঢুকেনি। ভারতের কোনো সেনা চৌকিও অন্য কারো দখলে নেই”। এর সোজা মানে দাঁড়ায়, ওই ২০ ভারতীয় সেনা চীনের ভূখণ্ডে গিয়ে মার খেয়ে মরেছে। আর সহযোদ্ধা-সেনারা তাদের লাশ বয়ে ভারতে এনেছে। এতে ব্যাপারটা এতই শকিং আর বেইজ্জতির প্রশ্ন হয়েছে যে, বিরোধীরা বুঝে যান এ নিয়ে কথা বাড়ালে সারা ভারত আরও অপমানিত হবে। তাই ভারতের এক সাবেক রাষ্ট্রদূত নিজের কলামে লিখছেন, কোনো বিরোধী নেতা সভার ওই অবস্থায় আর যুদ্ধে যাওয়ার পক্ষে মুখ খোলেনইনি। কিন্তু কিছু “সাহসী” সাংবাদিক বা সাবেক কূটনীতিক যারা নিজেদের খুবই ‘সাচ্চা ন্যায়পরায়ণ’ মনে করেন তারা তাদের “ভারত-নেশন” আরো অপমানিত হবে, সে সম্ভাবনার দিকটা ভুলে বা পেছনে ফেলে বরং প্রধানমন্ত্রী মোদীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার কর্তব্য পালনে খুবই ব্যস্ত। আসলে তারা “নেশনের” অপমানের দায় থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে বরং এর দায় মোদীর ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন সফলভাবে। সুতরাং অন্তত নিজেরা আর অপমানিত বোধ করছেন না। ভারতের সাংবাদিক করণ থাপার আর সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাওয়ের সাক্ষাৎকার দেখে তাই মনে হয়েছে। যেন তারা জানেন না যে, মোদীর রাজনীতি উগ্র হিন্দু-জাতিবাদী এবং তার বিজেপি দল মিথ্যা বলতে বলতে পুরা দেশকেই প্রায়ই অপমান করে ফেলে থাকেন। তারা ভারতের মুসলমান নাগরিকদের সীমাহীন নিপীড়ন নির্যাতন হত্যা করে থাকে। আর এজন্য নিয়মিত দুনিয়ার হিউম্যান রাইটস সংগঠনগুলো এসব কাজ তুলে ধরে মোদী সরকারের নিন্দা করে। তাতেও এরা কেউ বিজেপির মতোই কোন অপমান বোধ করেন না।
    আসলে তারা “নেশন-স্টেট” বা জাতি এই বোধছাড়া কোন রাজনীতি হতেই পারে না বলে মনে করে নিশ্চিন্তে এতেই ডুবে থাকেন। অথচ এরাই আবার বাস্তবে অন্যের হাতে অপমানিত হলে বা মার খেলে তখন ওই কথিত নিজ জাতি-দেশ থেকে নিজেকে মুক্ত বলে কল্পনা করতে থাকেন। এরাও জানেন এতে অপমান বা সমস্যা যাবে না; তবু নিজেকে একটা সান্ত্বনা দিতে তারা এসব হাসির কাণ্ড করে থাকেন। কিন্তু তবু এরা ‘নেশনের’ রাজনীতিই যে ‘উগ্র জাতিবাদ’ তা বুঝেও এর প্রতি তাদের ভালোবাসা থেকে একটু হিলবেন না। তাদের বিশ্বাস এমনই শক্ত।

    নতুন মরীচিকা দেখতে পাওয়াঃ
    এরই মধ্যে গত সপ্তাহে এই ব্যক্তিবর্গরা আরেকটা আশার আলো দেখে ফেলেছিলেন। এরা আলোর মরীচিকায় বিশ্বাস করেন, আর ওর পেছনে ছুটতে রাজি থাকেন। এরা জানেন এটা মরীচিকা এবং নিছক আলো নয়, এরপরেও নিজের প্রবল হতাশা ঠেকাতে মনকে বুঝ দেন যদি ওটা সত্যিই আলো হয়েই যায়! এমন ব্যক্তিরা বিশেষ করে মিডিয়াকর্মীরা আশার আলো জাগাতে বলতে শুরু করলেন, আমেরিকা নাকি ভারতের সমর্থনে সৈন্য সরিয়ে আনছে জার্মানি-ইউরোপ থেকে এশিয়ায়। বাংলাদেশেও আমেরিকান বা ভারতীয় স্বার্থ দেখা থাকতে চাওয়া মিডিয়ার কেউ কেউ এই খবরটাকে টুইস্ট করে প্রচার করেছে।
    ঘটনা হল, যুদ্ধ করে নগদ বা বাকি কোনো রিটার্নই নাই – আমেরিকা নিজের জন্য তা আনতে পারেনি। অথচ এক বিপুল বেহুদা সামরিক খরচ করে ফেলেছে। সেটা কোথায় আর কবে? আপনারা অনুমান করলেই তা মিলে যাবে। জবাব হল, ইরাক ও আফগানিস্তানে। এই বেহুদা খরচের কারণে দুর্বল আমেরিকার অর্থনীতি আরো ডুবেছে, ২০০৭-৮ সালে গ্লোবাল মহামন্দা হয়েছে।  এসব বাস্তবতায় সেই ২০১০ সাল থেকে লিয়ন পেনেত্রা, চাক হেগেল বা এশ কার্টার এভাবে পরপর যারা ডিফেন্স সেক্রেটারি ছিলেন তারা সবাই খরচের সেই দায়্ভার ভুলতে হাতের কাছে ইউরোপকে দেখে, ন্যাটোর মিটিংয়ে “ইউরোপ কোনো খরচ দেয় না” বলে প্রবল সরব থেকেছেন। আর প্রকাশ্যে মিডিয়ায় অভিযোগ তুলেছেন এই অনুমানে যে, অপমান করলে বোধহয় ইউরোপ যুদ্ধের এই ভাটির দিনে এসে কিছু খরচের দায় নেবে। কিন্তু না, প্রশ্নই আসে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকান সেনারা (যখন সেটা আমেরিকার এম্পায়ার উত্থানের যুগ, ফলে বহু খরচের দায় নিজেই এককভাবে নিয়ে নিয়েছিল) আর কখনও ইউরোপ থেকে ব্যারাক গুটিয়ে নিজ দেশে ফেরেনি বরং জার্মানিতেই ঘাঁটি গেড়ে থেকে গিয়েছিল। আর ন্যাটো গঠিত হলেও এর ৯৫ শতাংশ পরিচালন খরচের দায়ভার আমেরিকা একা বহন করে গেছে। যদিও ইরাক ও আফগানিস্তানেও আমেরিকা এক ব্যর্থ যুদ্ধে খরচ করে গেছে, তবু মনকে সান্ত্বনা দিতে – ইউরোপ ন্যাটোর খরচ দেয় না – বলে ইউরোপকে ঝাড়ি দিয়ে গেছে সেই থেকে।

    যুদ্ধের বেহুদা খরচ সামলাতে না পেরে গ্লোবাল মহামন্দাঃ
    আসলে আঁচ লাগা শুরু হয় ইরাক আফগানিস্তানে ওয়ার অন টেররের পরাজয় থেকে। একটা কমিটি বসেছিল ২০০৬ সালে যার পরিষ্কার রিপোর্ট ছিল যে, আমেরিকা যুদ্ধে হেরে গেছে এই অর্থে যে, আমেরিকা এমন এক অনন্ত যুদ্ধে আটকে গেছে যা থেকে বিজয় লাভ অসম্ভব; আবার ছেড়ে পালিয়ে যাওয়াও খুব সহজ না। অথচ এ থেকে নিয়মিত যে খরচ বেড়েই চলেছিল, তাতেই মূলত আমেরিকান অর্থনীতির ভেঙে পড়া আর বেসামাল অবস্থার শেষে ২০০৭-০৮ সালের দুনিয়া মহামন্দা হাজির হয়েছিল। আর তখন থেকেই চীনের সাথে তুলনায় অর্থনীতিতে ক্রমশ আমেরিকার পিছিয়ে পড়ার শুরু। ওবামা আমলে তার প্রশাসন তাই এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, ইরাক-আফগান যুদ্ধে বিজয়ের চিন্তা তো আর নয়ই বরং,  ২০১০-১৪ ধরে সময়কালের মধ্যে সব সৈন্য ফিরিয়ে আনতে হবে। এই ছিল সবচেয়ে নির্ধারক সিদ্ধান্ত। এটা বাইপার্টিজান সিদ্ধান্ত। আর সেটার তলানি অংশটাও গুটিয়ে ফেলা হলো এবার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে, এটাও বাইপার্টিজান মানে দু-দল মিলে নেয়া সিদ্ধান্ত। তাই আফগানিস্তান ছেড়ে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার জন্য তালেবানদের সাথে ট্রাম্পের মরিয়া চুক্তি হল। ওদিকে ৭৫ বছরের আগের সিদ্ধান্ত বদলানো যে (ন্যাটোর অধীনে), ইউরোপে থাকা সেনা প্রত্যাহার, যা নিয়ে আবার ইউরোপের এখন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া।
    লক্ষণীয় যে, এই ফেরত আনা সেনা এশিয়ার কোথার মোতায়েন হবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। কিন্তু সেনা প্রত্যাহারের যতগুলো কারণ ছিল তার মধ্যে মোদীর মতোই চাপাবাজি করে “চীন-ভারতের সামরিক টেনশনও একটা বাড়তি কারণ” বলে এই শব্দ কয়টা সেখানে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে।

    ওবামার এশিয়ান পিভোট (২০১০) এটা আগেই ব্যর্থ হয়েছিল তবু সেটাই আবার আনা হচ্ছেঃ
    তবু আমাদের মনে রাখতে হবে, এটা একটা পুরানা ব্যর্থ উদ্যোগ। কেন? ওবামা আমলে খুবই জোর দিয়ে বলা হয়েছিল যে এটা হল ওবামার এশিয়া ‘পিভোট’ [Pivot] পলিসি। ওবামা আমলে অনুমান-পরিকল্পনাটা ছিল এমন যে, আমেরিকার অনুমিত ও কথিত চীনের “আগ্রাসী নীতির” কারণে ভয়ে আশ্রয় লাভের জন্য ইস্ট এশিয়া বা সাউথ চায়না সি- এর সংশ্লিষ্ট দেশগুলো (ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম…) নিরাপত্তা খুঁজতে আমেরিকার কোলে এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আর আমেরিকা ভারসাম্য রক্ষাকারী (পিভোটাল) ভূমিকায় নেমে কথিত আগ্রাসী চীনের হাত থেকে এদের সবাইকে রক্ষা করবে। এই ছিল মোটামুটি মূল অনুমিত ধারণা-পরিকল্পনা। আর এরই অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় একটা স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি বানানো ও উদ্বোধন করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের মধ্যেই জানা হয়ে যায় যে এই পরিকল্পনাটাও ব্যর্থ ও পরাজিত হচ্ছে। কারণ এশিয়ার সাউথ চায়না সি- এর সংশ্লিষ্ট কেউই আমেরিকার কাছে নিরাপত্তা খুঁজতে যায়নি। জাপানের প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংক পত্রিকা ‘ডিপ্লোম্যাটের’ মতে সেকালে তারা লিখেছিল এটা ওবামার চরমতম ভুল [The Pivot to Asia Was Obama’s Biggest Mistake]।
    কারণ সাউথ চায়না সি নিয়ে এশিয়ার এদিকে টেনশন আছে, অসন্তোষ আছে কথা সত্য। কিন্তু সেজন্য কোনো যুদ্ধজোটে যোগ দেয়া সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর কাছে তপ্ত কড়াই থেকে চুলার ভিতরে ঝাঁপ দেয়ার শামিল বলে তাদের মনে হয়েছিল। তাই তারা সামরিক প্রশ্নে চীন বা আমেরিকা কোন দিকে যায়নি, দূরে ছিল। বরং অর্থনীতির প্রশ্নে চীনের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করে গেছে। এক কথায় এটা আমেরিকার জন্য এক “বিগ মিস-ক্যালকুলেশন”। তবে নতুন করে যুদ্ধে কোন রিটার্ন আনা ছাড়াই আবার অর্থ নষ্ট হয়েছিল। মাঝখান থেকে অস্ট্রেলিয়াও ঘাঁটি বানাতে উৎসাহ ভরে যতটুকু নিজের অর্থ ঢেলেছিল সেটাও লস। যেটার জন্য বুক চাপরানি এখনও সে করে মাঝে মাঝে।
    তাহলে এখন জার্মানি থেকে সেনা প্রত্যাহারের নামে সেই পতিত প্রকল্পে আবার হাওয়া, নাড়াচাড়া দেয়া কেন? প্রথমত আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, এর সাথে এসময়ের  চীন-ভারতের উত্তেজনার কোনই সম্পর্ক নাই। কারণ চীন-ভারত উত্তেজনা শুরুর বহু আগে থেকেই এই সেনা প্রত্যাহারের নড়াচড়ার শুরু। আসলে এর কারণ মূলত হংকং। আর সাথে কিছু আলাদা টেনশনে থাকা তাইওয়ান। এক-চীনের দাবিতে চীন কবে তাইওয়ানে হামলা করে, আর তা থেকে নিজের নিরাপত্তার জন্য তাইওয়ান একেবারেই আমেরিকার হাতে বাঁধা। তাইওয়ানের কেসটা না হয় বুঝা গেল কিন্তু হংকংয়ে নতুন টেনশনটা কী?

    হংকং নতুন ফোকাসঃ
    মূল টেনশনটা হল, হংকংয়ের তরুণেরা তারা চীনের থেকে আপোষে যা পেতে পারে সেই অর্থে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা হল আরও এক  স্বায়ত্তশাসনের চেষ্টা করা; কিন্তু ঘটনা সেদিকে মুভ করেনি। বরং ‘চীনের থেকে স্বাধীনতা’ মানে হংকংকে চীন থেকে আলাদা করার পরিকল্পনা – এদিকে তারা আগিয়েছে। এটা অবশ্যই তাদের স্বার্থ-বুঝ ও ইচ্ছা কী নিয়ে তারা আগাবে। তবে এটা ব্রিটিশ-আমেরিকান স্বার্থ-পরিকল্পনার দিকেও ঝুঁকে পড়া। মানে, এর ভিতরে নিজেদের স্বাধীনতার স্বার্থকে প্রোথিত করা। এখন হংকংয়ের বাসিন্দাদের জন্য এদুই পথের কোনটা ভালোমন্দ, ব্যাপারটা সেভাবে দেখার চেয়ে যেমন পথ তেমন ওটা মিস্টি না তিতা, এভাবে বলাই সঠিক হবে। তারা যেপথ বেছে নেবে তার সমান মূল্য তো দিতে হবেই। যদিও চরম আত্মাহুতি দিলেই হংকংয়ের স্বাধীনতা মিলবে এমন নিশ্চয়তা নাই, বেইজিংয়ের তিয়েনআনমিন স্কয়ারের অভিজ্ঞতা তাই বলে। সবচেয়ে বড় কথা, হংকং ইস্যুকে কোন সাধারণ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলে মনে করা হবে অতি সরলীকরণ হবে। ফলে তা হবে মারাত্মক ভুল বিবেচনা।
    এছাড়া যেমন, হংকংয়ের ব্যবসায়ীরা যাদের স্বার্থ এক বিরাট ফ্যাক্টর যে তারা কী ছাত্র-তরুণতরুণীদের সাথে স্বাধীন হবার আন্দোলন পর্যন্ত যেতে চাইবে কী? সেটা এখনো পুরাই অনিশ্চিত। কারণ হংকং হচ্ছে চীনা পণ্য বাইরে বিক্রির দিক থেকে এক বড় আড়ত বা ‘হাব’ [hub], দুনিয়াজুড়ে চীনা পণ্য পৌঁছে দেয়ার পাইকারি বাজার। কাজেই এই ব্যবসায়ীদের স্বার্থ কতটা চীনবিরোধী হবে, তারা কতটা সাড়া দিতে আগ্রহী হবেন এখনও বলা মুশকিল। আবার এটা ১৯৮৯ সালও নয়। ফলে  তিয়েনআনমিনের মতই ব্যাপক ম্যাসাকার এবারও চীন করে ফেললে তা সামলানো চীনের জন্যও খুবই কঠিন এক ঘটনা হবে, অন্তত দ্রুত এক  ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হবে, তা বলাই বাহুল্য। এসব মিলিয়ে চিন্তা করে এতে চীনা তাতক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হল, আইনি প্রস্তুতি নেয়া। চীন ইতোমধ্যে ৩০ জুন একটা নতুন নিরাপত্তা আইন পাস করেছে (Hong Kong  national security law)। যার কারণে, কেউ রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রাম যত যাই করুক, কিন্তু তা ছাড়িয়ে “হংকংয়ের স্বাধীনতা চাই” ধরনের স্লোগান দিলে, এটর্নি অফিস এর ভাল প্রমাণ পেলে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের শাস্তি’ মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে। এই আইনে ইতোমধ্যে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের স্বাক্ষর হয়ে গেছে। যদিও এখন পর্যন্ত চীনের জন্য এর একটা দুর্বল পয়েন্ট হল, আইনটা পাস হয়েছে মেইনল্যান্ড চীনে, যা পরে হংকংয়ের আইনসভাতেও তা এনডোর্স করে নেয়া হয়নি। নিলে ভালো হত। যদিও এর পক্ষে চীনের জন্য কোন আইনগত বাধ্যবাধকতা আছে কি না আমরা পরিস্কার নই।
    ঘটনা হল এ নিয়ে আমেরিকার প্রতিক্রিয়া কী হবে? ঘটনা সেখানে। একটা দুরবর্তি সম্ভাবনা কারও মনে হতে পারে যে চীন আমেরিকার সহায়তা নিয়ে এই বিক্ষোভকারীদের সাথে নিগোশিয়েট করে ফেলল। এর সম্ভাবনা খুবই কম কারণ চীন চাইবে না এভাবে আমেরিকাকে দেবতা বা গুরুত্বপুর্ণ বানানো। বরং নিউইয়র্ক টাইমসের ভাষায় এই আইন ইতোমধ্যেই আমেরিকা ও তার বন্ধুদের জন্য এক হুশিয়ারি সঙ্কেত (The law sends a warning to the U.S. and other countries.)।

    অল-আউট অবরোধ, মানে কীঃ
    তাই আমরা বরং অন্য দিকগুলো দেখি।  যেমন, প্রত্যক্ষ সূত্র নেই; কিন্তু “হতে পারে” ধরনের আধাগুজব, মিডিয়ায় নিউজ ছিল যে, চীন এই আইন চালু করলে আমেরিকা নাকি চীনের ওপর ‘অল-আউট’ অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করার পরিকল্পনা নিয়ে রেখেছে। এর তাৎপর্য হল, চীন আমেরিকান ডলারে কোনো কিছু কেনাবেচা করতে পারবে না। বেচাকেনার কোন দলিল-ইনভয়েজ ডলারে হতে পারবে না। হলে তা ভাঙিয়ে  এর অর্থ নিজের কারেন্সি ও একাউন্টে আনতে কোন না কোন আমেরিকান ব্যাঙ্কের কাছে যেতেই হবে। আর কোন আমেরিকান ব্যাঙ্কের জন্য এদেরকে সাহায্য করা হবে নিষিদ্ধ কাজ করা, ফলে দুই বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত জরিমানা দিতে হতে হয়েছে অতীতে হংকং ব্যাঙ্ককে, আমরা দেখেছি। এদিকে চীনের ‘হংকং নিরাপত্তা আইন’ পাস হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিক্রিয়ায় ইতোমধ্যে আমেরিকার অল-আউট কোন অবরোধ আরোপ করা হয়নি। যদিও ছোটখাটো (যেমন ভিসা রেস্ট্রিক্টকশন ধরনের) অবরোধ, আপত্তিগুলো কার্যকর হতে যাচ্ছে।
    অল-আউট অবরোধ আরোপ কথাটা শুনতে ভালো লাগে, আমেরিকা তা হয়ত ঘোষণা করে দিতেও পারে যদি, তাতে সে এখনো অনেক পাওয়ারফুল বল মনে হবে হয়ত। কিন্তু তাতে বাস্তবতা পুরো উলটো হয়ে যাওয়ারও প্রবল সম্ভাবনা। কারণ চীন এই সুযোগে তার কারেন্সি ইউয়ানকেই (ডলারের জায়গায়) চীনের আমদানি-রফতানিতে লেনদেনের মুদ্রা হিসাবে বসানোর চেষ্টা করতে পারে। যেমন শুধু যদি  সে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল কিনে এর দাম যদি ইউয়ানে পরিশোধ করতে পারে, তবে ডলার ফেলে ইউয়ানই দুনিয়ায় লেনদেন প্রধান কারেন্সি বলে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যেতে পারে। এই সম্ভাবনা আছে – তখন কী হবে?
    আর এথেকেই বাজারে অল-আউট অবরোধের গুজব আর সামরিক প্রস্তুতির সম্পর্কটা বোঝা যেতে পারে। কিন্তু সাবধান। আমেরিকা যদি যুদ্ধ-বেচার ক্ষেত্রে হেরে যাওয়া পার্টি হয়ে থাকে আর সেজন্য গত ১০ বছরে সে যদি প্রধানত খরচ কমানোর পার্টি হিসেবে নাম লিখিয়ে থাকে, তাহলে এখন আবার হংকং ইস্যুকে কেন্দ্র করে অল-আউট যুদ্ধের প্রস্তুতি নিবে এ কথাতো ঠিক মিলছে না, মানে কথা হয় না। সম্ভবত সেজন্যই এখনো পরিস্থিতি “ছোটখাটো অবরোধের” মধ্যে আটকে আছে। এই হল, জর্মানি থেকে সেনা প্রতাহারে ঘটনার পিছনের সত্যি কথাটা। চীনও আমেরিকার দিক থেকে এমনকি সাউথ চায়না সি তে কোন প্রতিরোধ দেখছে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু তা বলে হম্বিতম্বি করা, ট্রাম্প মোদীর মতো চাপাবাজি করতে যাবে না, তা তো নয়। দেখা যাক! অর্থাৎ ব্যাপারটা নিয়ে এখন পর্যন্ত নিট লাভালাভ হল মিডিয়া হাইপ বা উত্তেজনা তোলা, এর মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে।
    মিডিয়ায় উত্তেজনা তোলা সেটাই সম্ভবত আপাতত করা হচ্ছে বা চলবে। কিন্তু মোদীর আমেরিকার পকেটে হাত ঢুকিয়ে থাকার কাজ-সার্ভিসটা করে দেয় কে?  সম্প্রতি এনিয়ে নেপাল ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক এক আর্টিকেল লিখে বলেছেন, এই কাজের হোতা মূলত সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর, তিনি ভারতের এখনকার বিদেশমন্ত্রী। মোদীর সাথে তাঁর সম্পর্ক আমেরিকায় রাষ্ট্রদূত থাকার শেষজমানায়, তাঁর অবসরে চলে যাওয়ার আগে আগে, সেই ২০১৪ সালে। কিন্তু সেটা ছিল মোদীর ক্ষমতায় আসারও বছর। মোদী যখন আমেরিকার সাথে সম্পর্ক কীভাবে শুরু করবেন, কোন দিক দিয়ে আগাবেন, এসব দুশ্চিন্তায় বে-দিশা হয়েছিলেন, তখন রাষ্ট্রদূত জয়শঙ্করের আগেই করা কিছু হোমওয়ার্ক [আমেরিকান কিছু ডিপ্লোম্যাটদের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক বা র‍্যাপো(rapport) ও তাদের থেকে আমেরিকান মনোভাবের খোঁজখবর রাখা] মোদীর কাছে খুবই কাজের মনে হয়েছিল ও কাজে লেগেছিল। সেই থেকে জয়শঙ্কর মোদীর ‘আমেরিকান পকেটে হাত ঢুকানো’র বিশেষ দূতের ভূমিকায় আছেন। কারণ, আমেরিকান ডিপ্লোমেটদের কারো কারো সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক দু’পক্ষই খুবই কাজের জিনিস বলে মানতে শুরু করেছিল। আর একারণে সেই রাষ্ট্রদূত থেকে জয়শঙ্কর এখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

    জয়শঙ্কর মোদীর কে লাগেঃ
    বলা হয়ে থাকে, চাপাবাজি বিষয়ক মোদীর সু অথবা কু পরামর্শ জয়শঙ্করই বয়ে নিয়ে যেয়ে থাকেন আমেরিকান সেক্রেটারি অব স্টেট পম্পেও-এর কাছে। আর সেখান থেকেই ট্রাম্প আরো নানা চাপাবাজির উদ্যোগ নিয়ে থাকেন। মাইক পম্পেও জার্মানি থেকে আমেরিকার সৈন্য স্থানান্তরের কারণগুলোর মধ্যে একটা কারণ হিসেবে “চীন-ভারত টেনশন” কথা কয়টা ঢুকিয়ে দেন। আর তাতেই কিছু ‘পেইড মিডিয়া’ এ নিয়ে হইচই ছড়ানো শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে তামাশার দিকটা হল, মোদী সরকারের কেউ এ নিয়ে কোথাও কোন ইতি বা নেতি মন্তব্য করেননি। কারণ তাঁরা এই চাপাবাজিটা থেকে কিছু লাভালাভ তুলে নেয়ার চেয়েও বড় টেনশনে আছেন যে, চীন আবার এই চাপাবাজির খবরে ক্ষেপে গিয়ে কিছু না করে বসে।

    কিন্তু এতে চীনা প্রতিক্রিয়াটা ধরা পড়ে যখন চীনা গ্লোবাল টাইমসে এক প্রফেসর আর্টিকেল লিখে বলেন, ভারতের প্রধান সমস্যা হল ‘উগ্র জাতিবাদ’। মানে তিনি বলতে চাইছেন মোদী সরকার চীনের বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে  – এই করে ফেলবে, সেই করে ফেলবে, বোমা মেরে উড়িয়ে দেবে, মুখ তোড়া জবাব দিব অথবা একমাত্র ৫৬ ইঞ্চি ছাতির মোদী এমন জবাব দিতে পারেন – ইত্যাদি এ ধরনের ‘উগ্র জাতিবাদ’ উস্কানি দিয়ে ভোটের ইস্যু বানানোতে মোদী এক ওস্তাদ লোক অথচ পুরো ব্যাপারটাই বানোয়াট। এতে সমস্যা হল, যদি কখনো সত্যিকার পরিস্থিতি আসে আর মোদী কিছুই করতে পারেন না অবস্থা হয়, তা হলে মোদী ইজ্জত-সম্মান হারানো এক ভয়ঙ্কর লোক হিসেবে হাজির হয়ে যান ও যাবেন। তাই ব্যাপারটা নিয়ে চীন এতই বিরক্ত যে, এবারের বিশ ভারতীয় সেনার বিপরীতে চীনা আহত-নিহতের ফিগারটা কী তা সে এখনও একেবারেই প্রকাশ করেনি। যেন মোদী ও তাঁর দল এনিয়ে কোন নির্বাচনী বীরত্বগাথা গল্প তৈরি না করতে পারে সেজন্য। যেমন লাদাখে যারা মার খেয়েছে তারা ভারতের বিহার রেজিমেন্টের। তাই ভারতের অন্তত একজন পত্রিকা সম্পাদক ইতোমধ্যে টুইটে বলে বসেছেন আগামি বছর বিহারে রাজ্য নির্বাচন – তাই সেখানে যেন ঐ বিহার রেজিমেন্টের ‘উগ্র জাতিবাদী মিছা বীরত্বের গল্প” নির্বাচনে ভোট পাবার ইস্যু না করা হয়।

    ঘটনা হল, মোদীও জানেন চীনের বিরক্ত হওয়ার বিষয়টা। সম্ভবত এজন্যই মোদী স্বীকার করে নিয়ে বলেছিলেন যে, “ভারতীয় ভূখণ্ডে কেউ ঢুকেনি”। এর উদ্দেশ্য ছিল চীনকে ঠাণ্ডা ও খুশি করা। বরং এতে সম্ভবত চীনের মনে এখন ধারণা এই যে মোদী উগ্র জাতিবাদী রাজনীতির লোক হিসেবে ভোটের লোভে যেকোনো গল্প বানাতে মিছা মিছা যুদ্ধ লাগিয়ে এই সেই জয় নিয়ে আসছেন বলে কোনো মকারি-যুদ্ধ খাড়া করে ফেলতে পারেন। অতএব এবার তাই সত্যিকার ভয় দেখাতে চীন সেনা সমাবেশ করেছে। এর পালটা ভারতও করেছে। তাই সত্যিকার যুদ্ধের মুডে কেউ নেই বলেই মনে হয়। যদিও একটা ভয় থেকেই যায় মোদী কখন না আবার  “নেশনকে দেখানোর মুডে” বা মোডে চলে যান। বিশেষত এই কোভিড ভাইরাসে কাবু হয়ে থাকার কালে।

    মোদী লাদাখ সফরেঃ
    সম্প্রতি মোদী লাদাখ সফরে গিয়েছিলেন; সেখানে গিয়ে আবারও হম্বিতম্বি। কড়া কথার মধ্যে তিনি চীনকে পরোক্ষে “আগ্রাসনবাদী” বলেছেন। অর্থাৎ নাম না নিয়ে বলেছেন।  যেটা নিয়ে ভারতেরই কিছু বুদ্ধিমান সম্পাদক তা নাকচ করে দিয়েছেন।  বিশেষ করে আবার চীনও এর পালটা প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, চীনের ১৪ প্রতিবেশি রাষ্ট্রের মধ্যে  ১২টার ক্ষেত্রেই আপোষে সীমানা চিহ্নিতকরণ সুষ্টভাবে সমাপ্ত হয়ে গেছে। তাই মোদীর দাবি মিছা কথা, প্রপাগান্ডা। কিন্তু তাতে বাকী ঐ দুই রাষ্ট্র কারা? ভারতেরই আরেক সম্পাদক [এখানে তার কথার[এখানে ভিডিও ক্লিপ আছে ইউটিউবের] তিনিও মোদীর “চীন আগ্রাসনবাদী” – এই মন্তব্য পছন্দ করেন নাই। তিনি বলেছেন ঐ দুই রাষ্ট্র হল এক ভারত। আর দুই হল, ভারতেরই প্রভাবের কারণে ভুটান। এখন পাঠক বুঝে নেন আগ্রাসনবাদী তাহলে কে দাঁড়ালো!
    আবার সেনাদের সামনে মোদীর  গরম জাতিবাদী বক্তৃতা  – “ভারত কখনো মাথা নত করেনি। এখানেও করবে না”। ধরনের গা গরম করা কথা বলেছেন। সেনাদের উত্তপ্ত করতে আর মনোবল ধরে রাখতে এমন কথা রাজনৈতিক নেতারা বলেই থাকেন বা বলতেই হয়।  তবে সাবধান! মোদী এরপর কিভাবে পদক্ষেপ-আচরণ করেন তা দিয়ে তার এই কথার অর্থ তৈরি হবে।
    কিন্তু চীন ইতোমধ্যেই একটা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ভারত যেন কোনো স্ট্র্যাটেজিক মিস-ক্যালকুলেশন [Avoid miscalculation, says China ] বা ভুল হিসাব না করে বসে। এই কথাকে কলকাতার এক বাংলা নিউজ এর বাংলা করেছে।  সেটা এই রচনা শুরুতে যেটা টাঙানো হয়েছে। অর্থাৎ মোদীর কথা নেহায়েত কথার কথা হিসাবে থাকাটা ভাল হবে, চীনা সম্পাদক এটাই বুঝিয়েছেন।
    মোদীর আরেক জাতিবাদী তত্ত্ব কথায় বলেছেন, “দুর্বলরা নাকি শান্তি স্থাপন করতে পারে না”। তাই তিনি “সাহসী” হতে বলছেন। কিন্তু কথা হল, দুর্বল শব্দের উল্টা হল সবল হওয়া; কিন্তু মোদী খামোখা উল্টাপাল্টা সাহস দেখাতে গিয়ে না ডুবে যান, সে শঙ্কাও হাজির হচ্ছে দেখা যাচ্ছে।
    আগামী দিনে মোদী আবার “আমাকে কেউ মারে নাই” ধরনের মেসেজ দিয়ে নিজেকে কারেক্ট করেন কিনা কিংবা কী বলে বসেন তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। “উগ্র জাতিবাদ” এই হিন্দুত্ব আসলেই এক গভীর সমস্যা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৪ জুলাই ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “চীন-ভারত কি যুদ্ধ বাধার দিকে হাঁটছে”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভুখন্ড ফেরত ব্যাপার না, আওকাত বুঝে চল

    ভুখন্ড ফেরত ব্যাপার না, আওকাত বুঝে চল

    গৌতম দাস

    ২৯ জুন ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-350

     

    সবার শেষে বলতে আসলেন নরেন্দ্র মোদী, তিনি বলে উঠলেন – “না, সীমান্ত পেরিয়ে কেউ ঢুকতে আসেনি। ভারতের কোনো সেনা চৌকিও অন্য কারো দখলে নেই। লাদাখের কোনো বর্ডার পোস্ট অন্যের দখলে যায়নি”। এভাবেই মার খেয়ে মার হজম অথবা কান্না হজম করতে হয়েছে মোদীকে! চীনের হাতে কমপক্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনার মৃত্যু নিশ্চিত করার পরে ডাকা ভারতের সর্বদলীয় সভাতে তিনি এভাবেই তার কথা শুরু করেছিলেন। এ যেন দুই বারো-চৌদ্দ বছরের বাচ্চার মারামারি আর তাতে দুই বাচ্চার বাবারা যখন সালিশ মিটিংয়ে বসেছে সেখানে হঠাৎ মার খাওয়া বাচ্চার বাবা বলে বসলেন, ‘আমার ছেলেকে কেউ মারেইনি”। স্বভাবতই এরপর আর অন্য কারো কিছু বলার থাকে না, মিটিংও ডিসমিস হয়ে যায়। অর্থাৎ কঠিন মার হবে কিন্তু আওয়াজ বের হবে না সিচুয়েশন। কিন্তু মোদী এমন বললেন কেন? যেখানে ঐ মিটিংয়েরই প্রথম দিকের বক্তৃতায় এমনকি মোদীর মন্ত্রীরা বলেছেন, চীনা সৈন্যরা ভারতের ভূমি দখল করেই তাদের সেনাদের হত্যা করেছে!

    রাষ্ট্র বলতে একটা নেশন-স্টেট বা জাতি-রাষ্ট্র বুঝ, এক ফান্ডামেন্টাল সমস্যা
    মোদী কেন এমন বললেন, এই প্রশ্নের জবাবের আগে আমাদের অন্য কিছু সিরিয়াস আলাপ সেরে নিতে হবে। আমাদের মত দেশগুলোতে রাষ্ট্র বলতে জাতিরাষ্ট্র বুঝা হয়ে থাকে যেটা আসলে একটা ধর্মীয়-জাতি ধারণাই; যদিও এখানে সেটা ‘ধর্মীয়’ কিনা এর চেয়ে কথিত ‘জাতি” এই ভুতুড়ে ধারণাটাই মুল সমস্যা। আর এই ‘নেশন’ কথাটাকে সবাই কথার কথা হিসাবে রাষ্ট্র বলেও ডাকে। দুনিয়াতে প্রথম কলোনি দখল শুরু হয়েছিল সতেরো শতকে।  এমন দখল করা প্রথম ভূমি হল ভার্জিনিয়া, আমেরিকায় এই উপনিবেশ, যা ১৬০৭ সালে ব্রিটিশদের হাতে দখল হয়েছিল। আর সেই থেকে শুরু হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত (প্রায় টানা ৩০০ বছর) সারা দুনিয়ায়ে কলোনি দখল টিকে ও চালু ছিল। আর, এরপর থেকে কলোনিমুক্ত স্বাধীন করে দেয়া শুরু হয়েছিল। এই লম্বা কলোনি যুগের দখলদার রাষ্ট্রের কাজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিজদেশের রাষ্ট্র-কাঠামোই হল নেশন-স্টেট [nation-state] ও এর ধারণা। সেযুগে দখলে বের হওয়া কোম্পানির (যেমন ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি) সামরিকভাবে সজ্জিত জাহাজ নিয়ে বের হয়ে পড়া ছিল ঐ সময়ে ওসব সমাজের সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় ও প্রধান ব্যবসা।

    জনপ্রতিনিধিত্বের রিপাবলিক রাষ্ট্র কেমন হওয়ার কথা ছিলঃ
    ইংল্যান্ডের কথাই যদি ধরি, রাজতন্ত্র [monarchy] [মানে একটা রাজবংশ বা ডায়নেস্টির শাসন যে, রাজার ছেলে রাজা হবে] ভেঙে প্রথম রিপাবলিক বা জনপ্রতিনিধিত্বের রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা হিসাবে দেখা হয় ইংলিশ রেভোলিউশনকে (১৬৪২-৬০) [English Revolution]। যারা রেভেলিউশন বলতে চায় না এদের অনেকে এটাকে “ইংলিশ সিভিল ওয়ারও” বলে থাকে। এ্মন জনপ্রতিনিধিত্বের রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গঠন কাঠামো হওয়ার কথা এমন যে এটা  একটা রাজনৈতিকতা বা পলিটি [Polity] প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হব্ব। যেখানে সমাজের সব অংশকে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সমাজের সকল অংশকে জায়গা দিতে হবে, কথা বলতে দিতে হবে, সবাইকে শুনতে হবে ইত্যাদি। এভাবে সবার জন্য যা ভাল হবে এমন এক “কমন গুড” এর পক্ষে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে এর লক্ষ্য। এভাবে এক “পলিটিক্যাল কমিউনিটি” অর্থে রাষ্ট্রগঠন, এই ছিল এর উদ্দেশ্য।

    কিন্তু সেসময়ের বৃটিশ সমাজের সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী ব্যবসা ছিল কলোনি দখল কোম্পানির মালিক হওয়া। তাই ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির মত ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলোর স্বার্থে “পলিটিক্যাল কমিউনিটি” গঠনের সব চিন্তা সবকিছু উলটে দিয়ে বাস্তবে যে প্রথম রিপাবলিক গড়েছিল তাই ছিল নেশন-স্টেট।
    অর্থাৎ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গঠন কাঠামোটাই পলিটিক্যাল কমিউনিটি হিসেবে গঠিত আর হলো না। এর বদলে রাষ্ট্রের বাইরের দিকে তাকিয়ে এক রাষ্ট্র গড়া হল। যেমন ঐ কলোনি দখল ব্যবসা কোম্পানিগুলোর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ইউরোপের পড়শি রাষ্ট্রের (যেমন ফরাসি বা ডাচ রাষ্ট্রের) সমতুল্য কোম্পানি – যেমন ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বী হল ডাচ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি, এরকম। তাই ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো নিজের স্বার্থে চাইল এই নেশন-স্টেট। যাতে সকল ব্রিটিশ মানুষ কথিত ‘এক জাতির’ আওয়াজ তুলে অপরাপর ডাচ বা ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির বিরুদ্ধে নিজ দেশের ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে বিনা-বিভক্তিতে সকলে খাড়া হয়ে যায়। এতে কলোনি দখলের কোম্পানিগুলোর স্বার্থই যেন সব ব্রিটিশ নাগরিক-মানুষের স্বার্থ বলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এতে সকল বৃটিশ নাগরিক বিশেষত যারা প্রান্তজন, গরীব বা কম আয়ের মানুষ – তারা কী চায়, তাদের সমস্যা কী সেটা আর তাদেরকে বলতে সুযোগ দেয়া হল না, শুনাও হল না। এককথায় “কমন গুড” আর হল না।  কলোনি দখল আর দাস ব্যবসায়ীদের স্বার্থটাই কথিত “নেশনের স্বার্থ” বলে চালিয়ে দিতে তা সবার উপরে চেপে বসল, চাপিয়ে দেওয়া হল। নেশন স্টেটের কাজই হল এই চাপিয়ে দেয়াটা নিশ্চিত করা।

    রেনেসাঁর ধারণার মূলকথা হয়ে যায় জাতিরাষ্ট্রঃ
    রিপাবলিক বলতে নেশন-স্টেট ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাওয়ায় মূলত যে দুই নিট ক্ষতি হয়ে যায় তা হল – এক. রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গঠন কাঠামোটা পলিটিক্যাল কমিউনিটি হলে সব পক্ষকেই শুনার যে বাধ্যবাধকতা থাকার কথা তা হারিয়ে যায়। দুই. অন্যের দেশ কলোনি-দখল করা ও সম্পদ লুট করে আনা বৈধ হয়ে যায়। রাষ্ট্র সব জায়েজ করে দেয়।  আর সবচেয়ে ভয়াবহ তৃতীয় ক্ষতিটা হল, রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিকল্প হিসাবে রিপাবলিক বা গণপ্রতিনিধিত্বের রাষ্ট্র বলতে আসলে নষ্টা নেশন-স্টেট রূপটাই রেনেসাঁ চিন্তার সর্বোত্তম উপহার দাবিতে হাজির হয়ে যায়।

    রেনেসাঁর আদিগুরু রামমোহন রায়ের হাতে ব্রাহ্মধর্মীয়-জাতিরাষ্ট্রের মশালঃ
    কমিউনিস্টদের দাবি রামমোহন রায় ভারতে রেনেসাঁ এনেছেন মানে, প্রগতিশীলতা এনেছেন। বাস্তবত কথা মিছা নয়। কিন্তু প্রগতির ঐ রেনেসাঁতে রিপাবলিক রাষ্ট্র বলতে  ‘নেশন-স্টেট’ (জাতি-রাষ্ট্র) ধারণাই। অর্থাত জাতি-রাষ্ট্র ধারণা রেনেসাঁর ভিতর দিয়ে  রামমোহন রায় ভারতে এনেছেন। কিন্তু এর উপর আবার তাঁর দেখা ও বুঝের ব্রিটিশ জাতি-রাষ্ট্র বলতে একে তিনি বুঝেছিলেন, ধর্মভিত্তিক একটা জাতি-রাষ্ট্র হিসাবে। মানে তাঁর বুঝাবুঝিতে  কথিত বৃটিশ জাতিরাষ্ট্রকে তিনি এভাবেই বুঝেছিলেন; এক  “এংলো ক্যাথলিক ক্রিশ্চান ব্রিটিশ” জাতি, এভাবে। এখানে ‘এংলো ক্যাথলিক’ বলতে সেটা ক্যাথলিক ক্রিশ্চান ধর্মটাই কিন্তু ইংলিশ রাজপরিবার এর যে ভাষ্যটা মানে কেবল সেই রূপ ও ভাষ্যটা।   কিন্তু এদিকে রামমোহনের  নিজ ভারতের বেলায় এখানে দুটা বড় ধর্ম হিন্দু-মুসলমান ছাড়াও ছোট সংখ্যায় পালিত আরও অনেক ধর্ম আছে, টের পেলেন। তাই তিনি স্বাধীন ভারত একটা “জাতি-রাষ্ট্র” গড়ার প্রধান সমস্যা সমাধানের জন্য সবার আগে সবাইকে একই একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত করতে মনস্থ করলেন। তাই তিনি ১৮১৫ সালে ব্রাহ্ম ধর্ম চালু করেন। কিন্তু এরপর তিনি মাত্র আর ১৮ বছর বেঁচে ছিলেন। তিনি বেঁচে থাকতেই যেসব বাধা ও সমস্যার তিনি মুখোমুখি হচ্ছিলেন তা তিনি মারা যাবার পরে আরও বিরাট আকার ধারণ করে। শেষে তাঁর ব্রাহ্মসমাজ দুটো ধারাতে ভাগ হয়ে যাবার পর ক্রমশ তারা সকলেই অকেজো, স্থবির হয়ে যায়।  এই প্রকল্প ব্যর্থ হলে আর তিনি মারাও গেছেন বলে এরপরে বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখের হাত ঘুরে এই প্রকল্প যেন “ব্রাহ্ম জাতি-রাষ্ট্র” হতে পারল না বলে নেহায়তই ‘না-পারতে’,  এটা এক ‘হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র’ প্রকল্প হিসাবে মানিয়ে নেয়ানোর চেষ্টা হিসেবে হাজির করেন, এরা সকলে। ততদিনে কংগ্রেস দলের জন্মানোর সময় হয়ে গেছিল। তাই  ১৮৮৫ সালের কংগ্রেস দলের জন্মের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হিসাবে  ‘হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র ধারণাই হাজির হয়েছিল। বলাই বাহুল্য এটা মুসলমানদের জন্য অস্বস্তিকর। কংগ্রেসের মুসলিম সদস্যরা তো বটেই সমাজেও মুসলিমদের থেকে আপত্তি প্রবল হয়ে থাকে। এটা না হবার কোন কারণ ছিল না। কারণ, একটা রাষ্ট্র গড়তে চায় বলে  জনগণকে একটা ধর্মে আসতে হবে – এটা কী কোন পুর্বশর্ত হতে পারে?  কাউকে আরেক ধর্মে যেতে ফোর্স করা যায়? না সম্ভব?  এটাই তো বড় জুলুম, চরম অন্যায্য!
    মুসলমানদেরকে হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্র মেনে নিতে বলা হচ্ছিল – কেন? গান্ধী ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে  মরবার আগে পর্যন্ত  এমন আবেদন একাজ করতে গিয়ে  “হিন্দু-মুসলমান এক” হতে বলে চলেছেন, অসহায় পাগলের মতন। কারণ ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হতেই ব্যাপক দাঙ্গা ছড়িয়ে পরেছিল। কিন্তু তাতে কী? বাস্তবে গান্ধী টের পেয়েছেন তার এই আবেদন কতটা অবসার্ড, উদ্ভট। কোন মানুষের কাছেই স্ব স্ব ধর্মত্যাগের আহবান খুবই অস্বস্তিকর। মানুষ একটা রাষ্ট্র গড়তে চায় বলে তাদের সবাইকে এক ধর্মে যেতে হবে, এক হতে হবে – এর কী সম্পর্ক?  অথচ সব জটিলতার, সব এবসার্ডিটির উতস হল একই ধর্মের এক জাতিরাষ্ট্র গড়ার কল্পনা – রাষ্ট্র সম্পর্কে এমন উদ্ভট ইমাজিনেশন থেকে। অথচ সহজ সমাধানটা হল, কে কোন ধর্মের তাতে কিছু এসে যায় না, সবাই নাগরিক। কিন্তু সমান নাগরিক। সমান অধিকার-সম্পন্ন নাগরিক। অধিকারের বৈষম্যহীন নাগরিক। কাজেই এরপর কে কোন এক না ভিন্ন ধর্মের নাগরিক তাতে কিছু এসে যায় না। কাউকে ধর্ম বদলাবার আহবান অথবা তথাকথিত হিন্দু-মুসলমান’  “এক হবার আবেদন” করতে মারা যাবারও কোন দরকারই পরে না। কারণ সেক্ষেত্রে সবাই সমান অধিকারের নাগরিক।  কিন্তু গান্ধী-নেহেরুর কংগ্রেস নিজেদের এই উদ্ভট চিন্তার পরাজয় ঢাকতে হিন্দু শব্দটা লুকিয়ে ফেললেন কিন্তু সেই  হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্র – এটাকেই কায়েম করতে সচেষ্ট থেকে গেলেন।
    কংগ্রেসের জন্মের পর মুসলমানেরা দীর্ঘ ২০ বছর অপেক্ষার দেন-দরবার চালিয়েছিলেন। এরপর ১৯০৬ সালে বাধ্য হয়ে মুসলমান জাতি-রাষ্ট্র প্রকল্প হিসাবে মুসলিম লীগের জন্ম হয়ে যায়।
    কিন্তু এখানে মজার ব্যাপার হল, মুসলিম লীগ “মুসলমান” জাতি-রাষ্ট্র কথাটা প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেই বলতে হয়েছিল যাতে সে মুসলমানদের এতে, এদলে ডেকে আনতে পারে। কারণ, তাদেরকে “মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট অঞ্চলগুলোকে নিয়েই” আলাদা রাষ্ট্র চাই একথা বলা ছাড়া উপায় ছিল না।  আর এই সুযোগে কংগ্রেসিরা নিজেদের হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্রের লোক – তাদের এই পরিচয় লুকিয়ে ফেলে দাবি করতে থাকে তারা কেবল জাতি-রাষ্ট্রের লোক এবং তারা প্রগতিশীল। কারণ তারা রেনেসাঁ মানা-বুঝা লোক। আর এখান থেকেই এক পর্যায়ে আর জাতি-রাষ্ট্র কথাটাও না বলে তারা  বলতে থাকে তারা জাতীয়তাবাদী।  যেন নেশন-স্টেট ধারণা থেকে জাতীয়তাবাদী ধারণাটা আলাদা।  তাই এই “জাতীয়তাবাদ” এক প্রগতিশীল ধারণা হয়ে যায়।
    আর এর বিপরীতে মুসলমানেরা ধর্মের রাষ্ট্র চায়, রেনেসাঁ মানে না- তাই তারা হয়ে যায় পশ্চাৎপদ – এই হয়ে যায় তাদের যুক্তি। বিশেষ করে পাকিস্তান রাষ্ট্র আলাদা হয়ে যাওয়ার পর জমিদার-হিন্দুরা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে  নিজেদের ক্ষমতা জমিদারি হারানোর বদলা নিতে গিয়ে এই “পশ্চাৎপদ-প্রগতিশীলতার” ভুয়া তর্ক ও যুক্তিটা তুলে ধরেছিল। আর সেই সাথে জাতি-রাষ্ট্র কথাতে যে তার হিন্দুজাতি্রাষ্ট্র আকাঙ্খা পরিচয় যাতে ধরা না পড়ে যায় তাই “জাতি” শব্দটা ভেঙে এবার ‘জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র’ বলা শুরু করল; যেন এটা জাতি-রাষ্ট্র থেকে এটা  ভিন্ন কোন ধারণা। এই রেনেসাঁ আর প্রগতিশীলতা এটাই ড; সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বুঝের ‘রেনেসাঁ’ আর ‘প্রগতিশীলতা’ ধারণার উতস। জিন্নাহ’র উপরে কুপিয়ে গেছেন অথচ নেহেরু-গান্ধীর হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্রের কংগ্রেস এটা চোখে দেখেন নাই। ভাবেন – এটা ভারতীয় রেনেসাঁ ফলে প্রগতিশীলতা , এই বলে কাভার দেন – এসব হল “জাতীয়তাবাদ”।

    ইউরোপের জাতিরাষ্ট্র চিন্তার পরিণতিঃ
    ভারত-পাকিস্তানের পরিণতি জানলাম এখন ইউরোপের পরিণতি দেখা যাক। মূলত দু’কারণে সারা ইউরোপ. (৪৭ টা রাষ্ট্রের এক জোট হয়ে) ১৯৫৩ সালে জাতি-রাষ্ট্র ধারণাটা ত্যাগ করেছিল।  তারা ঐ ৪৭ রাষ্ট্র একটা সম্মেলন ডেকে “পুর্ণ-স্নান সেরে” নিয়ে নিজেদের শুদ্ধ করে  নিয়েছিলেন। স্ব স্ব রাষ্ট্র পুণর্গঠন করে নিয়েছিলেন যে জাতি-রাষ্ট্র আর না, সবারই এটা এখন  নাগরিক অধিকার ভিত্তিক রাষ্ট্র।  কারণ এক. দ্বিতীয় বিশযুদ্ধে ইউরোপে জাতি-রাষ্ট্র চিন্তার সবচেয়ে খারাপ পরিণতি ও প্রোডাক্ট হল জার্মানির হিটলার ও তাঁর শাসন।  হিটলারের উত্থান ও তাঁর নীলচোখের শ্রেষ্ঠ “জার্মান নেশন” – এই জাতগর্বের চরম বর্ণবাদী ভয়াবহতা দেখতে হয়েছিল সারা দুনিয়াকে।  এটা ছিল নিজেদের জাতি-রাষ্ট্র ধারণার সবচেয়ে কদর্য ও চরম রূপ। সারা ইউরোপ কোনমতে এটা থামাতে পেরেছিল তবে নিজের মুরোদে না। মূলত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের দেয়া অর্থ ও সামরিক সহায়তায় তাঁরা সক্ষমতা দেখিয়ে  জিতেছিল । অতএব এরপর জাতি-রাষ্ট্র ধারণাটা ফেলে দেয়া এটা ফরজ হয়ে যায়।  আর দ্বিতীয় কারণ, ঐ মার্কিন সহায়তা যেটা না পেলে সারা ইউরোপই  হিটলারের পদানত হয়ে যেত, ঐ সহায়তাটা পেতে শর্ত হিসাবে সারা ইউরোপকে দাসখত দিতে হয়েছিল যে, তারা দুনিয়া থেকে কলোনি দখল ব্যবসা বন্ধ করে দেবে এবং কলোনিকৃত রাষ্ট্রগুলোকে মুক্ত স্বাধীন করে দেবে। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট দ্বিতীয় বিশযুদ্ধ বিজয় পরবর্তী দুনিয়ায় রাষ্ট্রের যে ধারণা আঁকছেন, তবে তা তিনি করছেন মূলত একটা জাতিসঙ্ঘের রূপ কাঠামো বর্ণনা করে। সে কাঠামোটা হল অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের এসোসিয়েশন হিসেবে জাতিসঙ্ঘ। অতএব রাষ্ট্র হতে হবে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র  এই বাধ্যবাধকতাও ছিল।

    এই বাধ্যবাধকতায় জাতিসঙ্ঘের রূপ কাঠামোটা কী ছিলঃ
    রূপ্টা কী ছিল তা বুঝার সবচেয়ে সহজ প্রমাণ হল আমাদের সবার পরিচিত কাশ্মির। কাশ্মিরের রাজা হরি সিং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নেহরুর সাথে অন্তর্ভুক্তি চুক্তিতে [Accession Treaty বা ইন্সট্রুমেন্ট অব একসেশন] (যদিও অস্থায়ী) স্বাক্ষর করেছেন তাই কাশ্মির ভারতের অংশ হয়ে গেছে – এই দাবি নিয়ে নেহরু ব্যাপারটায় ভারতের পক্ষে রায় আনতে  জাতিসঙ্ঘে দরবার করতে যান। খুশি তিনি, কারণ তার চোখে এত সহজ এই মামলা, অতএব রায় তার পক্ষে আসবেই। এই যে আস্থা আর নেহরুর রাষ্ট্র বোঝাবুঝি এটাই প্রমাণ করে যে, তিনি প্রবল জাতিরাষ্ট্র-বাদী। আর সেই সাথে জাতিসঙ্ঘের গঠনভিত্তি কী তিনি এর কিছুই জানেন না, অজ্ঞ। কখনো খেয়াল করেন নাই, বুঝতেও যান নাই। তাই তিনি বোকা হয়ে দেখলেন, জাতিসঙ্ঘ কাশ্মিরে গণভোটে আয়োজন করতে বললেন। আর সে ভোটের রায় নিয়ে সে ভিত্তিতে কাশ্মির কার থাকবে – ভারত বা পাকিস্তানের না স্বাধীন কাশ্মির হবে, কোনটা – তা ফয়সালা করতে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। ভুখন্ডের বাসিন্দাদের সিদ্ধান্ত যে শাসক কে হবে তা বেছে নিবার নাগরিক অধিকার, পাবলিক ভোট  – এই হল ভিত্তি।

    কেন জাতিসঙ্গ এমন রায় দিয়েছিলঃ
    কেন এমন রায়? কারণ সেকথাটাই জাতিসঙ্ঘেরও জন্মভিত্তি। এর মানে হল নেহরু জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি জানতেন না। নেহেরু তো রাজা নিয়ে এসেছিলেন, ভেবেছিলেন রাজার সইয়ের হুকুমে কাশ্মির ভারতের।  কাশ্মির ভুখন্ডের বাসিন্দাদের সিদ্ধান্ত – এরাই যে ক্ষমতার উতস তা নেহেরু জানতেন না। জানলে তো রাজার কাছে ছুটতেন না।  জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি কলোনি দখল ‘হারাম’। তাই যেকোন ভুখন্ডের বাসিন্দারাই সিদ্ধান্ত নিবার হক রাখেন যে তারা কার দ্বারা শাসিত হবেন – এটাই, জাতিসংঘেরও জন্মভিত্তি। কোন ভূখণ্ড কোথায় কার সাথে যুক্ত হবে, কাদের দ্বারা শাসিত হবে, এর সিদ্ধান্ত নেবার একমাত্র এখতিয়ার কোনো রাজা নয়, কোনো সম্রাট বা সুলতানও নয়। সেই সিদ্ধান্ত নেবে ওই ভূখণ্ডের বাসিন্দা জনগণ। এটা তাদের নাগরিক অধিকার।
    খেয়াল করুন কোনো, “জাতি”গোষ্ঠী নয়, কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের গোষ্ঠীও নয়। কোনো ‘নেশন’ নয়। আর এই যুক্তির ভিত্তিতেই জাতিসঙ্ঘ কলোনি দখল করা অবৈধ জ্ঞান করে। কাজেই রাজা-সম্রাটেরা কেউ কিছুই নয়। বাসিন্দা নাগরিকেরাই সব, তারাই ক্ষমতার উৎস। এ কারণে রাজা হরি সিংয়ের চুক্তিতে স্বাক্ষরের কোনো মূল্য নেই। তাই কাশ্মির সেকালের নেহরুর ভারতের নয়, একালে ৩৭০ ধারা বাতিল করে দিলেও তা মোদীর ভারতের নয়। মোদীর কাশ্মিরকে ভারতে অন্তর্ভুক্তি করে নেওয়াও একই কারণে জাতিসঙ্ঘের চোখে অবৈধ। অর্থাৎ কাশ্মির ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের ‘নাগরিক অধিকারই’ মূল কথা; যেটা জাতিরাষ্ট্র বুঝের নেহরু বুঝেন নাই বলেই ধরা খাইছিলেন। তিনি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র সম্পর্কে নির্বোধ ও উদাসীন। তাই এর বাস্তবায়কও নন। তিনি আসলে এক জাতি-রাষ্ট্রের শাসক ও তেমনই রাজনীতিক। তিনি জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি জানতেন না বলেই কাশ্মির ইস্যুতে ‘বোকার সাহস” করে জাতিসঙ্ঘের রায় আনতে গেছিলেন। ধরাও খেয়েছিলেন।

    তাহলে এখন চীন-ভারত বিবাদের মধ্যে এসব কথার গুরুত্ব কী?
    আমরা আসলে এতক্ষণ ছিলাম রাষ্ট্রের ‘লোকাল’ দিকের আলোচনায় যে রাষ্ট্র জাতিভিত্তিক না নাগরিক ও নাগরিক অধিকারভিত্তিক হতে হবে এই প্রসঙ্গে। এখন আমরা যাব এর ‘গ্লোবাল’ দিকে।
    রুজভেল্ট শুধু রাষ্ট্রের ভিত্তি কী হবে সেকথাই সবাইকে নিয়ে সে সময় ঠিক করে দিয়েছিলেন তাই নয়। তিনি রাষ্ট্রের গ্লোবাল দিক কী হবে সেটাও ঠিক করেছিলেন।

    গ্লোবাল দিক মানে হল মূলত “আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের” দিক – যেটা মূলত গ্লোবাল রাজনৈতিক অর্ডার এবং গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার এসব দিক। আমরা এখন ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলতে আরেকটা শব্দ ব্যবহার করব। ইংরাজি ‘অর্ডার’ শব্দটা নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষা বা চালু করা  অর্থে ব্যবহৃত হয়। সময়ে এটা আইন প্রণয়ন অর্থেও।  মানে রাষ্ট্রের গ্লোবাল দিক বলতে আমরা বুঝাতে ও বুঝতে বলছি গ্লোবাল অর্ডার এর দিক।  অর্থাত এবার আর রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ নয়  মূলত বাইরের এই অর্থে যে এতক্ষণ যদি রাষ্ট্রের ভেতরের অর্ডার নিয়ে কথা বলে থাকি তবে এখন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার, বাইরের বা পারস্পরিক সম্পর্কের নিয়মশৃঙ্খলা ও আইন অর্থে এক অর্ডার নিয়ে কথা বলব। তাই কথাটা এখানে গ্লোবাল অর্ডার বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকের মত বিষয়গুলোতে পারস্পরিক সম্পর্কের নিয়ম-শৃঙ্খলার  বা সুশৃঙ্খলা বিন্যাস ঘটাতে একটা অর্ডার।।

    আগেই বলে নিয়া যাক েই গ্লোবাল অর্ডার স্থাপন আপনাতেই বা কর্তা ছাড়া হয় নাই। এই কর্তা হলেন চারবারের (১৯৩২-৪৫) লাগাতর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডেলোনো রুজভেল্ট [Franklin Delano Roosevelt  বা FDR]। দুনিয়াকে একটা গ্লোবাল অর্ডারে সাজানোটা আমেরিকান প্রেসিডেন্টের হাতে হওয়াটা জায়েজ হয়েছে কী না – তা নিয়ে কথা বলা এখানকার প্রসঙ্গ নয়। সেটা খোলা রেখেই আমরা ইতিহাসে যা ঘটেছিল তা নিয়েই আগাচ্ছি।  তবে কোন সাবজেকটিভ কর্তা ছাড়া একাজ সম্ভবত হতই না।  রুজভেল্টের আমেরিকা বিশ্বযুদ্ধ শেষে গ্লোবাল অর্ডার কী হবে এর এক নির্ধারক হয়ে উঠেছিলেন। গ্লোবাল অর্ডার  বলতে যেমন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কী হবে, কিভাবে হবে এর নির্ধারক হয়ে উঠেছিল আমেরিকা। অথবা আরো সরাসরি বললে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নীতি নিয়ম, মুদ্রা কী হবে তা প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঠিক হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারে। এই গ্লোবাল অর্ডারটা খাড়া হয়ে ছিল বা আছে মূলত তিনটা প্রতিষ্ঠান জাতিসঙ্ঘ, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকে। অবশ্য সাথে আরো কিছু অনুষঙ্গ প্রতিষ্ঠান থাকলেও এরাই মুখ্য। গত সত্তর বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্ডারটা চালু থেকেছে। আর তা ভালো ও খারাপ দু অর্থেই। কিন্তু এখন এই প্রথম ক্রমশ অন্তত অর্থনৈতিকভাবে চীন আরো প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে উঠে আসছে। ফলে এবার চীনের নেতৃত্বের নতুন এক গ্লোবাল অর্ডার একে বদলে ফেলতে উঠে আসছে।

    তৈরি হন, গ্লোবাল অর্ডারে পরিবর্তন আসছেঃ
    কিন্তু এর প্রমাণ কী? এই বক্তব্যের ভিত্তিই বা কী? কারো খেয়ালে বা নেহায়তই অনুমানে এমন কথা নিশ্চয় লেখা যায় না।  আসলে প্রথমে কথাটা কিছু লক্ষণ দেখে বলাবলি শুরু হয়েছিল ২০০২ সালের দিকে, কিছু পশ্চিমা মিডিয়ায়। পরে আমেরিকা নিজেই সরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে স্টাডি করে গ্লোবাল অর্ডারে পরিবর্তন আসছে তা নিশ্চিত হয় ও আমাদেরকেও নিশ্চিত করে। এর রিপোর্ট ওয়েবে পাবলিক করে দেয়া ডকুমেন্ট আর যা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ সালে। শিরোনাম ছিল “২০২৫ সালের দুনিয়া দেখতে কেমন হবে” [“NIC Global Trends 2025 | (Published in- 2008)| ]। শুধু তাই নয়, পরেও এই স্টাডি চালিয়ে যাওয়া হয়। আরো দুটা রিপোর্টে – ২০৩০ সালে কেমন “NIC Global Trends 2030″| (Published in- 2012)| আর শেষেরটা ২০৩৫ সালে কেমন হবে [“NIC Global Trends 2035″| (Published in- 2017) ] এভাবে। সবগুলোরই একই রেজাল্ট আসে, আমেরিকা ডুবে যাচ্ছে চীন ভেসে উঠছে – নতুন নেতা চীন। বাস্তবে চীনের নেতৃত্বের এই স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে লিড নেয়া শুরু হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে।

    ঐ স্টাডিতে চীনের পিছনে পিছনে আর কার অর্থনীতি উঠে আসার সম্ভাবনা আছে, এরও স্টাডি-ডাটা সেখানে ছিল। এ থেকেই বুশের আমল থেকে আমেরিকা নিজের করণীয় ঠিক করে যে, ভারতের পিঠে হাত রেখে কাছে টেনে একে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা – এটা তার কৌশল হবে। আর তা থেকেই বাজারে ভারতের গুরুত্ব বাড়ে। এমনিতে ভারতের অর্থনীতি খুব গরিবই; বিশেষ করে অবকাঠামোগত সক্ষমতার দিক থেকে। তবুও চীনের কাছাকাছি জনসংখ্যার বলে এর পটেনশিয়াল বা সম্ভাবনা আছে এমন “রাইজিং অর্থনীতি” মনে করা হয়। ইতোমধ্যে ২০০৯ সাল থেকে  চীনের নেতৃত্বে পালটা আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক ধরনের কিন্তু নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রিকস [BRICS] ব্যাংক জন্ম নেয়। ভারত সেখানে যুক্ত হতে অফার পেলে যোগ দেয়। চীনও তার বিনিয়োগ সক্ষমতা থেকে ভারতের চাহিদামত ঋণ বিশেষত অবকাঠামোগত ঋণ প্রদান করতে থাকে। কিন্তু ততই আমেরিকার কাছে ফিরে ফিরে যাওয়ার ঝোঁক ও আমেরিকার অফার করা সুবিধা নেওয়ার ঝোঁক তার বাড়তেই থাকে। যদিও ট্রাম্প আমলে এসে আমেরিকা মনে করে, ভারতকে চীনের পেছনে লাগানো বৃথা। কারণ এটা তেমন কোনো ফলদায়ক নয়, তেমন রেজাল্ট নাই।

    কিন্তু ভারতের আচরণ এমন হয়ে যায় যে, সে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে থাকে যে, সে যেন চীন ও আমেরিকার মাঝে দুটার সাথেই স্মার্ট প্লে করে দু’জনের থেকেই নিজের সুবিধা আদায় করে ফুলে উঠতে পারবে। বর্তমান ভারত-চীন দ্বন্দ্ব-সংঘাত হল,  সেই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী মোদীর ভারতকে নিজ প্রকৃত সক্ষমতার দিকে হুঁশ-নজর করিয়ে দেয়ারই চীনা-উদ্যোগ, বলা যায়।

    ব্যাপারটা অনেকটা কাউকে মারধর দেয়ার পরে আবার যেমন বুঝিয়ে দেয়া যে কাঁদলে আবার আরো মার খাবি। কথিত বিশ ভারতীয় সেনা মারা যাওয়ার পর চীন সাবধান করে দেয় যেন ভারত নতুন টেনশন আবার সৃষ্টির চেষ্টা না করে। তাই অবশেষে মোদীর সবল অবস্থান ঘোষণা যে “কেউ ভারতের মাটিতে আসেনি”। খুব সম্ভবত ভারতকে সামরিকভাবে আরো হেস্তনেস্ত করবে আর বুঝিয়ে দিবে যে চীন-ভারত বাণিজ্যিক সম্পর্ক ত্যাগ করলে ভারতেরই বেশি ক্ষতি শুধু নয়, তার অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকা মুশকিল হয়ে যাবে, সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া থেকেই মোদির এমন হঠাত বক্তব্য – ‘কেউ ভারতের মাটিতে আসে নাই।’

    কিন্তু ভারতের কেন এমন হল কেনঃ
    ভারতের কোনো রাজনীতিক বা একাডেমিক বা নীতিনির্ধারক চলতি পুরা ইস্যুটাকে “গ্লোবাল অর্ডারের” দিক থেকে দেখেছেন এমন কোন মিডিয়া রিপোর্ট নজরে আসেনি। এর ওপর আছে ভারত মানেই আসলে এক নেশন-স্টেট ভাবনায় ডুবে থাকা ভারত। এর প্রধান স্বাক্ষ্য হল হিন্দুত্বভিত্তিক রাজনীতি একমাত্র নেশন-স্টেট ভাবনার উপরেই নিজে দাড়াতে পারে।  মোদীর তথাকথিত বয়কট বা স্বদেশি অর্থনীতির ধারণাও বোকা বোকা কথার নেশন-স্টেট ভাবনার উপরেই জন্মাতে পারে।

    তাই এবার আরো সরাসরি বলে, যদি প্রশ্ন করা যায়, গ্লোবাল অর্ডার নিয়ন্ত্রণের লিডার প্রশ্নে ভারত কার সাথে থাকতে চায় নিজের ভবিষ্যত ভাল হবে বলে মনে করে – আমেরিকা না চীনের সাথে? এখন পর্যন্ত ভারতের আচরণ থেকে এর জবাব হল ভারত জানে না। এবং না জেনেই এমন ফেলে রেখে থেকে যেতে চায়।

    অথচ এর সহজ জবাব হবে আমেরিকার বিরুদ্ধে এবং সেটা এজন্য যে, যে নেতার যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে সে আমেরিকা, সে ক্ষয়িষ্ণু শেষ হয়ে যাচ্ছে – তাই সে দুনিয়ার অতীত নেতা; বিপরীতে ভারত নিঃসন্দেহে নিজেই প্রধান নেতা হতে চায় অথবা অন্ততপক্ষে আগামী নেতা চীনের প্রধান সহযোগীর ভূমিকায় দেখতে চায়। তাই এটাই হতে হবে। এসবের বাইরে অন্য কিছু তো হতে পারে না। তাহলে সে বারবার অতীতের মধ্যে মানে আমেরিকার ভেতর আশ্রয় খুঁজছে কেন, তাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইছে কেন?

    এর জবাব ভারতের কাছে নেই। কেন নেই?
    মূল কারণ, গ্লোবাল দিকটা সে বুঝতেই পারে না। মূল কারণ, হিন্দুত্ববাদী জাতি-রাষ্ট্র বুঝের লোক। এর বাইরে তার দৃষ্টি যায় না, প্রয়োজনও দেখে না। গ্লোবাল বলে কিছু দেখতেই পায় না। তাদের দুনিয়া স্বদেশিপনাতেই!

    যেমন আমাকে একজন বলছিল, পাকিস্তান যদি চীন ও আমেরিকার সাথে একই সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে তাহলে ভারতও চীন ও আমেরিকার সাথে একই সাথে সম্পর্ক রাখলে সেটা দোষের হবে কেন? বা পারবে না কেন?

    প্রথম কথা, আমরা গ্লোবাল অর্ডার নিয়ন্ত্রণকদের সহযোগী (মূল নেতার সাথে প্রভাবশালী ভূমিকায়) কেউ একজন হওয়ার প্রসঙ্গে কথা বলছি। স্রেফ দুটা রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখা না রাখার বিষয় নয় এটা। পাকিস্তান গ্লোবাল অর্ডার নিয়ন্ত্রণকারীদের কেউ নয়, সহযোগী হয়ে ওঠার তালিকাতেও কেউ নয়। পাকিস্তান অর্থনীতিগতভাবেও তেমন কোনো শক্তিশালী দেশ নয়। তাই বলছি গ্লোবাল অর্ডার বা এর নিয়ন্ত্রক বলতে কী বুঝিয়েছি সেটা আমল করাই হয় নাই, এই প্রশ্নের মধ্যে। অর্থাৎ এই প্রশ্নকর্তা যেন ভারত নিজেই!

    হিন্দি বা উর্দুতে একটা কমন ফিল্মি ডায়লগ আছে- “আওকাত দেখা দিয়া” না! মানে কারও বাস্তব মুরোদ বা স্টাটাস কি ও কেমন সেটা কোনো হামবড়া লোককে মনে করিয়ে বা দেখিয়ে দেয়া। চীন ভারতকে তার আওকাত মনে করিয়ে দিয়েছে; যদিও তার মিডিয়া ও বিরোধী দল, এমনকি তার নিজ দল পুরানা স্টাইলে এখনো ভাব দেখিয়ে যাচ্ছে! অর্থাৎ তারা ধারণাও করতে পারছে না চীন মোদীকে ঠিক কী দেখিয়ে দিয়েছে!

    কারো কোনো সামরিক বা অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা নিশ্চয় দোষের নয়। তবে না থাকলে কেমন আচরণ করতে হয় সেটাই আলোচ্য। যতদিন সেটা অর্জিত না হয় ততদিন ভারত চীনের সাথে সংঘাতবিহীন সম্পর্ক রেখে বা সংঘাত এড়ানোর বুদ্ধিতে চলাই তার জন্য “সোজা রাস্তা” । আসলে চীন বুঝিয়ে দিচ্ছে মোদী তোমার হিন্দুত্ব, তোমার জাতি-রাষ্ট্র ধারণার বাইরের সবকিছুতে অবুঝ থাকা আর তোমার হামবড়া ভাব- এগুলো অচল! এভাবে চললে তুমি মরে যাবা – তাই এসব ছাড়তে হবে।

    চীন কী আগ্রাসনবাদী হয়ে উঠছেঃ
    নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, “চীন যা করছে তা পড়শিকে দেয়া উস্কানি মনে হলেও এতে ম্যাসেজ দিয়েছে আমেরিকাকেই”।  আমেরিকান ডিপ্লোম্যাটরা গালওয়ানের হত্যার ঘটনাকে “চীনের আগ্রাসন” বলছে।  কিন্তু ভারতের এক রিটায়ার্ড লে জেনারেল বলছে, “কে ক্ষমতায় বস – এটা ভারতকে চীনের দেখানো শেষ হয়েছে মনে হয়ে গেলে সে সব ভুমি ফেরত দিয়ে চলে যাবে”।

    একথার সাথে সম্ভবত আরেকটা কথা যোগ দিতে হবে – ততদিনে সম্ভবত চীন  সাথে – এক ডিসিপ্লিন্ড  অনুশাসন মেনে চলা – সুবোধ বালক, এমন ভারতকেও দেখব আমরা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৭ জুন ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “ভূখণ্ড ফেরত আনা ব্যাপার নয়”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারতের জয়িতা ভট্টাচার্য কী চায়, জানে?

    ভারতের জয়িতা ভট্টাচার্য কী চা্‌য়, জানে?

    গৌতম দাস

     ২২ জুন ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-34w

     

    ভারত ও বাংলাদেশের সরকার এরা নাকি পরস্পরের খুবই ঘনিষ্ঠ। এমন একটা অনুমান-পারসেপশন অনেকের মধ্যে আছে। একথার হয়ত কিছুটা সত্যতাও কেউ কেউ দেখাতে পারবেন। এরপরেও  সেটা যত ঘনিষ্ঠই কল্পনা করা যাক না কেন, শেষ বিচারে আমরা ভুলে যেতে পারি না যে এরা দুটো একেবারেই আলাদা রাষ্ট্র।  আমের মওসুম এটা, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে যেন এখন – সবার কুড়ানো আম ফেলে দেওয়ার একটা গল্প আছে, তাই যেন কেউ আনতে চাইছে।

    সবার কুড়ানো আম ফেলে দেওয়ার গল্পঃ
    ছোটবেলায় বৈশাখ মাসের ঝড়ে আম কুড়াতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা একালের ঢাকা শহরে যারা বড় হচ্ছেন তাদের জীবন-অভিজ্ঞতার সাথে মিলবে না হয়ত। তবে যারা পুরনো দিনের বা জেলা শহরে বা গ্রামে বড় হয়েছেন তাদের এমন অভিজ্ঞতা আছে। তেমনি এক কালবোশেখি ঝড়ে আম কুড়ানোর বিকেলের ঘটনা। আট-দশ বছর বয়সের বন্ধুবান্ধবরা সবাই মিলে বিকেলে ঝড় উঠতেই আম কুড়াতে ছুটছে। বাগানে গিয়ে আম কুড়ানোর ধুম লেগেছে। কিন্তু বন্ধুদের একজনের যেন কোনো ঘুম নেই। দেখতে-শুনতেও সে অন্যদের চেয়ে একটু যেন আলাদা, সবার চেয়ে লম্বাতেও হয়ত একটু বেশিই হবে। সে আম কুড়াচ্ছে না।
    কিন্তু আবার প্রচণ্ড ব্যস্ত। কারণ সে বরং সবাইকে আম কুড়াতে বাধা দিয়ে বেড়াচ্ছে – “এই আম নিবি না, রাখ” – বলে হাত থেকে আম কেড়ে ফেলে দিয়ে পরের জনেরটা কাড়তে যাচ্ছে। এভাবে সবার হাত থেকে আম ফেলে দিচ্ছে। আর মুখে বলে চলছে, “আমার খালাত দুলাভাইয়ের চাচার বাগানের আম, তোরা কেউ আম নিবি না”। কিন্তু এখানে সমস্যাটা হল, বাধাদানকারী একজন আর কুড়ানেওয়ালা বাকি সবাই। ফলে সবাই বিকল্প উপায় খুঁজতে গিয়ে কিছু সুযোগ পাচ্ছে। অন্যকে বাধা দেয়ার সময় কিছু না কিছু ফাঁকফোকর পেয়েই যাচ্ছে। সেই ফাঁকে দু’চারটা করে আম কুড়িয়ে নিচ্ছে। এদিকে একসময় ঝড় থেমে গেছে। সবাই যার যার বাড়ির পথে। কিন্তু অবাক ব্যাপার। দেখা গেল সবারই হাতে-কোচড়ে দু-চারটা করে আম আছে। বাধাদানকারী মেয়েটার ভাগে একটাও আম নেই! কারণ সে যখন পুরো সময়টা সবাইকে বাধা দিতে গিয়ে নষ্ট করেছে, অন্যরা প্রত্যেকে সেই ফাঁকে দু-চারটা করে আম সংগ্রহ করে নিতে পারলেও সে নিজে কিছুই পায়নি।
    গল্পটার মরাল হলঃ হিংসা বা ঈর্ষা না, এর ইতিবাচক ফল নাই; তাই বরং কিছু অর্জন করার লক্ষ্যে নিজ শ্রম-উদ্যোগ কাজে লাগালে ভাগ্য কিছুটা ফিরতেও পারে।

    থিংকট্যাংকের মাহাত্ম্যঃ
    কথাগুলো মনে হল ভারতের এক জয়িতা ভট্টাচার্যের একটা রচনা দেখে। যেন তিনি সেই ঝড়ের সময় সবার কুড়ানো আম ফেলে দিয়ে বেড়ানো ছোট মেয়েটা। জয়িতা ভারতের ‘ওআরএফ [ORF]’ মানে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন নামে এক থিংকট্যাংকের ফেলো। সম্ভবত আসামের শিলচরের মেয়ে তিনি, আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পিএইচডি করেছেন।

    আমেরিকান সমাজের পলিটিক্যাল কালচারে রাষ্ট্র-সরকারের নীতিনির্ধারণে বা পলিসি সাব্যস্ত করতে পক্ষ-বিপক্ষের পয়েন্টগুলোকে নিয়ে গুছিয়ে জোরালো করে তুলে ধরতে অনেক স্টাডি ও গবেষণা করতে হয় অথবা কখনও কনসেন্সাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কাজটা – আমেরিকান সমাজ সেগুলো থিংকট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই করে থাকে। এমন প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত দাতব্য প্রতিষ্ঠান বা নন-প্রফিট ফাউন্ডেশন টাইপের কাঠামোর হয়ে থাকে। যদিও একটা দুর্ভাগ্য যে, একালে এসে লক্ষ করা যাচ্ছে অনেক সময় থিংকট্যাংক গড়ার নামে এক প্রপাগান্ডা প্রতিষ্ঠান গড়া ফ্যাশন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আমেরিকা চলতি শতকে এসে যখন এখাতে ভারতের দিকে তাকিয়ে বিপুল অর্থ ঢালতে শুরু করেছে। এমনিতেই আরেক দেশের অর্থে থিংকট্যাংক গড়া- এটা থিংকট্যাংক ধারণার মৌলিক ভিত্তিরই বিরুদ্ধে। কারণ থিংকট্যাংক তো গড়া হবে নিজ দেশেরই নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি গবেষণার জন্য। কাজেই এ’খাতে অন্য-রাষ্ট্রের যেচে অর্থ দিতে আসা মানে এতে দাতাদেশের সরাসরি স্বার্থ ও চিন্তায় প্রভাব ছড়ানো শুধু নয়, এটা প্রায় ঐ দাতা দেশের ফরেন পলিসির বাস্তবায়ন করা। কিন্তু তামশার দিকটা হল প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে সবখানে এক “আত্মম্ভরিতা” মানে স্বনির্ভরতার গল্প বলে বেড়ানো ভারত সে-ই, প্রথম রাষ্ট্র যে আমেরিকার টাকায় ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখা খুলে ভরিয়ে ফেলেছে। কিন্তু কেন?

    সোজা কথাটা হল, চীন-ভারত দুরাষ্ট্র যেন পরস্পর থেকে দূরে থাকে, পরস্পরকে চরম ও একমাত্র ‘শত্রুজ্ঞান’ করে দূরে থাকে এটাই আমেরিকা নিশ্চিত করতে চায়। এদের পারস্পরিক প্রবল রেষারেষি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যেন এরা লিপ্ত ও ডুবে থাকে, ঈর্ষায় থাকে এটাই আমেরিকান স্ট্র্যাটেজি। আমেরিকা এখনও বর্তমান গ্লোবাল লিডার যদিও দ্রুত এটা শুকিয়ে আসছে, ক্ষীয়মান। আর বিপরীতে চীন উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি, নেতৃত্বের জায়গাটা সে দখল করবে এটাই এর অভিমুখ। এখন ভারত যদি চীনের পাশে দাড়ায় তবে এই  অনিবার্য রদবদলটা ঘটবেই তবে এবার দ্রুত হতে থাকবে।  আমেরিকা যদি ডুবতে বসা এক বর্তমান হয় তবে চীন পাশে ইন্ডিয়া এক সম্ভাব্য আগামি। এখন  আমেরিকার গ্লোবাল অর্থনৈতিক সামর্থ্য বা সক্ষমতায় পতন আর চীনের উত্থানের একালে তাই আমেরিকার চাওয়া ও তার ভয় হল যে চীন-ভারত যেন আমেরিকান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আগামীর নেতৃত্ব হয়ে একজোটে দাঁড়িয়ে না যায়। ফলে এর সোজা হিসাব হল, চীন-ভারত যেন রেষারেষির সম্পর্কে খাড়া হয়ে থাকে সবসময়। আর এখানে সবচেয়ে বড় ইনপুট যেটা দিয়ে রাখা হয়েছে যে, ২০৫০ সাল নাগাদ ভারতের অর্থনীতি নাকি সবার চেয়ে (চীনের চেয়েও) উপরে যাবে এমন কথা ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। আর তাই ভারত, বাস্তবতার সাথে মিল না পেলেও ‘যদি লাইগা যায়’ এই লোভে, ভারত চীনের সাথে সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ নিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে বরং অস্থিরতায় একধাপ আগালে তিনধাপ পিছিয়ে যায়। এ কাজগুলোই নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে করিরে নিচ্ছে আমেরিকার কিছু থিংকট্যাংক যারা ভারতে এর শাখা খুলেছে।

    আবার এটাও খুবই সম্ভব যে ভারত বিরাট কিছু হওয়ার লোভ করতে গিয়ে আমেরিকান পরামর্শের ফাঁদে পড়ে , ভারত আর হয়ত চীনের সহযোগী আগামির স্থানটাও নিতে পারল না। বরং আমেরিকান লোভ-উস্কানি বা পরামর্শে ডানে-বায়ে চীনের বিরোধিতা করতে গিয়ে যেটুকু সফল হওয়ার ভারতের সম্ভাবনা ছিল সেটুকুও ভেসে গেল। এমনও ঘটে যেতে পারে। এটা অসম্ভব নয়। কারণ, ভারত যদি দুনিয়ার আগামি বা আগামির মূল সহযোগী বলে নিজেকে মনে করে তবে ভারতকে অবশ্যই মানতেই হবে আমেরিকা তার পথে বাধা অর্থে এনিমি। কারণ আমেরিকার বর্তমান অবস্থান থেকে সে যদি চ্যুত না হয় তবে ভারতের ভাগ্য খুলতে পারে না। অথচ তামশাটা হল, ভারত আমেরিকার হাত জড়িয়ে ধরে বসে থাকতে চাচ্ছে, আর মিথ্যা স্বপ্ন দেখছে কিছু একটা হওয়ার। যেটা আমেরিকার হাত ধরে অর্জন তো হবারই নয়।

    আমেরিকা যেমন চীনকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে তেমন ভারতের কাছেও আমেরিকা নিশ্চয় হারতে চাইবে না। অথচ এ কথাটা ভারতের কানে নিচ্ছে না, কোনো আমলই করে না। বরং ধরে নিয়েছে আমেরিকা তার বন্ধু থাকবে। এসব কারণেই ভারতের কোন ধরণের কোন অর্থনৈতিক শক্তির কিছুই না হয়ে ফলাফলে, কোনো উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে না ওঠার সম্ভাবনাও প্রবল। এছাড়াও ভারতের আভ্যন্তরীণ রাষ্ট্র-কাঠামোগত  দুর্বলতার দিক  আছে যেমন অভ্যন্তরীণ গঠন দুর্বলতা হল কেন্দ্র বনাম রাজ্যের দ্বন্দ্ব। মানে এক রাজ্য আরেক রাজ্যের ঘাড়ে উঠে থাকতে চায় – ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার নামে।

    তবে ভারতের বিপুল এক ভোক্তা জনগোষ্ঠী আছে, যা তার নিজের জন্যই এটা চীনের মতোই বিশাল তবে তুলনায় একটু ছোট) এক বিরাট সম্ভাব্য রেডি বাজার। এই ফ্যাক্টরটা ছাড়া ভারতের সব কিছুই প্রায় নেগেটিভ জোনে। কাজেই কনস্ট্রাকটিভ (গঠনমূলক) আর পজিটিভ এটিটিউড লাগবে, খুবই জরুরি এটা। অন্যের ক্ষতি করে বেড়ানো কারও অন্তত ভারতের বেলায়, তার জনজীবনের লক্ষ্য হতেই পারে না। এটি কী সবার আগে ভারত বুঝবে? দেখা যাক!

    আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখাগুলো যা ভারতে খোলা হয়েছে এরা আবার কাঠামোর দিক থেকে বিদেশী এনজিও গোত্রের। আর ভারতে ওদের বড় অফার হল, ভারতীয় স্টুডেন্ট-একাডেমিকদের পিএইচডি বা মাস্টার্স বিদেশে পড়তে স্কলারশিপ দেয়া। এটা ভারতের বুদ্ধিবৃত্তির উপর একে প্রলুব্ধ করে বিপথগামি বা বিভ্রান্ত করে ফেলার বিরাট পদক্ষেপ। আমেরিকা বিগতা অর্থনৈতিক শক্তি। অথচ এর স্বপক্ষে ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক মনকে কব্জা করে সাজিয়ে নেয়া, মূল লক্ষ্য ভারতীয় মনকে কনফিউজ করে রাখা। । এর কাজ হল  ক্যারিয়ারের লোভে এরা ভারতে বা জাপানে বসে চীনা তৎপরতার এটা বা সেটা খারাপ, চীনা লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য খারাপ এসব কথা প্রচার প্রপাগান্ডামূলক কাজ অথবা  ক্যাম্পেইন-মূলক গবেষণা স্টাডিতে এসব ভারতীয়দেরকে এনগেজ করে রাখা। গত ২০০৬ সালে বুশের ভারত সফর থেকে এসব কাজের ধারা শুরু হয়েছিল। পরে ওবামার আমলে তুঙ্গে উঠেছিল ডালপালা বিছিয়ে। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে এসে ২০১৭ সাল থেকে ট্রাম্পের আধাখেচড়া জাতিবাদী  ধারণার ধাক্কায়  আমেরিকান থিংকট্যাংকগুলোর  আগের প্রায় সব অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায়। আর সেই সাথে, ভারতকে দেয়া আমেরিকায় বিশেষ রফতানি সুবিধা (যেন চীনবিরোধী হওয়ার বুকিং মানি) যা কিছু আগে ওবামা আমলে দেয়া হয়েছিল সব গুটিয়ে ফেরত নেয়া হয়। সারকথা ট্রাম্পের আমেরিকা এ ব্যাপারে আমেরিকানদের কোন লাভ হচ্ছে কিনা এনিয়ে হতাশ ও হয়রান, সন্ধিহান হয়ে উঠেছিল। থিংকট্যাংক এনজিওগুলো তাই ট্রাম্প আমলে এসে ফান্ড অনেক গুটিয়ে ফেলেছে। তবে “চীনা ঋণের ফাঁদ”, “চীনা ঋণের শোষণ” ইত্যাদি এসব ক্যাম্পেইনগুলো এখনও এরা চালিয়ে যায়।

    তবে ওআরএফ এর গঠন ঠিক একইরকম নয়, ব্যতিক্রম। ওআরএফ এটাও দাতব্য অবশ্যই, তবে মুখ্যত স্থানীয় ব্যবসায়ী – রিলায়েন্স গ্রুপেরই প্রায় একক দানের অর্থে পরিচালিত। কিন্তু আমেরিকান  থিংকট্যাংকগুলোর সাথে ওআরএফ এর সবচেয়ে কমন মিল ও সম্পর্কের দিকটা হল, ওআরএফসহ সব থিংকট্যাংক পরিচালিত হয় ওই একই আমেরিকান চীনবিরোধী বয়ানভাষ্য ও নীতির অধীনে। আমেরিকার তৈরি যে অভিমুখ। আমেরিকান মাদার থিংকট্যাংকগুলোতে বসে যেসব চীনবিরোধী যুক্তি বয়ান তৈরি হয় সেগুলো সারা ভারতের সব থিংকট্যাংকই আউড়িয়ে যেতে থাকে। তবে লক্ষণীয় যে ভারত সরকার বেশির ভাগ সময়ই নিজের সরকারি ভাষ্য বা অবস্থানে ওইসব বয়ানকে য়ানে না, মূলত এড়িয়ে চলে। এর সম্ভাব্য কারণ, এই চীনের সাথেই তো ভারত সরকারের যৌথভাবে ব্রিকস [BRICS] ব্যাংক, এআইআইবি ব্যাংক [AIIB]  অথবা সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন [SCO] ধরনের জোট তৎপরতায় অংশ নিয়ে থাকতে হয়।

     ওআরএফ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এখন কেনঃ
    সারা দুনিয়ার মত করোনাভাইরাসে বাংলাদেশেও খারাপভাবেই আক্রান্ত। এখন পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে। করোনাভাইরাসের টেস্ট করার সুযোগহীনতা বা চিকিৎসাহীনতার চরম দিনগুলো পেরিয়ে বাংলাদেশ যখন প্রায় ৬০টির মতো টেস্ট-সেন্টার খুলতে সক্ষম হয়েছে তত দিনে আবার এখন দিনকে দিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ডেড সংখ্যাটাই বিপজ্জনকভাবে বাড়তে শুরু করে দিয়েছে। হাসপাতালগুলো রোগীতে উপচে উঠছে। হাসপাতালে একটা সিটের খোঁজে পাঁচ-ছয় হাসপাতাল ছোটাছুটি করতে করতেই রোগী মরে শেষ এমনই অবস্থা। এমনিতেই আমাদের সরকারের ম্যানেজমেন্ট সামর্থ্য সামলিয়ে যতটুকু যা রিসোর্স বা স্বাস্থ্য বাজেট আমরা জড়ো করতে সক্ষম সেটাও দুর্নীতির কারণে লোপাট হচ্ছে। যার সারকথাটা হল, এক চরম ম্যানেজমেন্ট ফেল করা অবস্থার মধ্যে আমরা আছি। বের হওয়ার উপায় নেই। হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা সমস্যার কারণে ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ, ট্রেনিং বা দক্ষতা বাড়ানো পর্যন্ত আমাদের রিসোর্স পৌঁছাতে পারে না। করোনার আবির্ভাব আমাদের সবাইকে উদাম করে ছেড়েছে, নিজেদের অযোগ্যতায় নিজেরাই এখন চরম বিপদে পড়েছি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীই হুমকি দিচ্ছেন ‘এভাবে চলতে থাকলে হাসপাতালে জায়গা দিতে পারব না।’ এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের হাসপাতাল ব্যবস্থা যদি চূড়ান্ত ফেল করে তবে এরপর পুরা আইনশৃঙ্খলাই ফেল করতে আর সময় লাগবে না।

    দেরিতে হলেও করোনা মোকাবেলায় একশন গত মার্চের শেষে আমরা যখন শুরু করি তখনই অনেকে জানতেন যে আমাদের জন্য সামনে অনেক রিস্ক অপেক্ষা করছে, আমরা ঢুকছি। যারা দূরেরটা আগে দেখতে পেয়ে যান; তাদের বলাবলি করতে শুনেছি যে, আমরা কঠিন বিপদে পড়ে গেলে শেষ পর্যায়ে আমাদের এ যাত্রায় টিকে যাওয়ার একটাই সম্ভাবনা আছে যে চীনের সাহায্য সহায়তা যদি পেয়ে যাই, দুয়ার খোলে যদি । কারণ করোনা যা দাবি করে আর আমাদের যা সামর্থ্য এ দুইয়ের গ্যাপ মিটাতে সক্ষমতা নিয়ে পাশে দাঁড়াতে পারে সম্ভাব্য একমাত্র চীনা সহায়তা।
    ঘটনাচক্রে সেটাই এখন বাস্তব, আমরা তারই মুখোমুখি। আমাদের সরকারপ্রধান চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনে কথা বলেছেন, ইতোমধ্যেই চীনা সাহায্যকারী টিমও এখন ঢাকায়।

    আমরা উদ্যোগ নিতে পেরেছি এটা ভালো খবর অবশ্যই। সব সরকারই কোনো খারাপ অবস্থায় হাতের কাছে যা আছে ও সম্ভব তার সবই কাজে লাগাতে চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক। নিশ্চয় আমরা এমন কোনো সরকার দেখার আশা করি না যারা বুঝছেন তাদের কোনো ভুল বা ব্যর্থতায় বা কোনো গ্যাপে শেষে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে পারে, অথচ তারা সেটা দাঁড়িয়ে কেবল দেখছেন! এটা তো হতে পারে না!

    তবে এরপর আরেকটু আছে, চীনেরই আরেকটা প্রোগ্রাম আছে ‘সিস্টার সিটি অ্যালায়েন্স’ [China wants ‘sister cities’ in Bangladesh]। পত্রিকার ঐ রিপোর্ট বলছে, চীনা টিম আমাদের ঐ এলায়েন্স প্রোগ্রামে আমরা যুক্ত হতে পারি বা চাই কিনা এর দাওয়াত দিয়ে রেখেছে। তা নিয়ে সরকারি নানা পর্যায়ে কথাবার্তা এখনো চলছে।

    কিন্তু জয়িতা ভট্টাচার্যের লেখা দেখে বুঝা যাচ্ছে, এনিয়ে তাঁরা খুবই ক্ষেপে উঠেছেন।, ওই চীন-বাংলাদেশ সরকারপ্রধান পর্যায়ে টেলিফোন আলাপ ঘটার পর থেকেই। যেন তিনি বলতে চাইছেন আমার “দখলি প্রিয়া” কেন অন্যের সাথে কথা বলল। কিন্তু
    সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশটা ইন্ডিয়া নয়। কাজেই তাদের চোখ দিয়ে চীনের টিম বা উহান সিটির কর্তাদের আমরা কেন দেখব?  আমরা দেখতে পারব না। আমাদের প্রয়োজনের চোখ দিয়েই আমরা দেখব?

    বলা বাহুল্য, করোনা প্রসঙ্গে আমাদের সক্ষমতা সামর্থ্যরে সীমা কী তা জানতে আমাদের আর বাকি নেই। তাই চীনা বন্ধুদের আমরা দেখব আমাদের খারাপ সময়ের  সহায়তা-দাতা হিসেবেই। এই দাতা যাদের নিজ শহর সামলানোর অভিজ্ঞতা আছে, দক্ষতা আছে, দক্ষ জনবল আছে, সব রিসোর্স আছে যারা আমাদের শিখিয়ে নিতে দিতে সহায়তা করতে পারবে। আর সর্বোপরি যাদের আগ্রহ আছে। এখন খাদের কিনারায় ঠেকে যাওয়া আমরা কোন ‘সিটি অ্যালায়েন্স চুক্তি’ তে যুক্ত হই আর নাই হই – করোনা সঙ্কট মোকাবেলায় আমাদের চীনা সহযোগিতা খুবই দরকার। এ হলো বাস্তবতা। তাহলে আমরা কেন তা নেবো না?

    ভারত পছন্দ করছে না তাই?
    কোনদিক দিয়েই  ভারতের অবস্থান ও সক্ষমতা কোনোভাবেই চীনের কাছাকাছি নয়। না রিসোর্সের সক্ষমতায়, না অভিজ্ঞতায়। এর উপর ভারতেরই এখন অথবা আগামী মাসে করোনা সংক্রমণের পিক সময়কাল আসে কিনা এ নিয়ে তারা চরম এক হিমশিম অবস্থায়। এছাড়া আরো বিরাট এক সমস্যা আছে। ভারত থেকে সহায়তাকারী কোনো টিম এসেছে এমন যদি হয় তবে ওই টিমকে সাধারণ মানুষই গ্রহণ করবে না, এটা আমাদের আগে খোদ জয়িতাই জানেন! তিনিই লিখেছেন আমরা ভারতীয়দের পছন্দ করি না। তাহলে?

    পাবলিকের উপর গোসসা করা  – যারা পাবলিক নিয়ে ডিল করেন যেমন কোন গবেষক তিনি কখনই তা করতে পারেন না। কারণ তিনি জানেন পাবলিকের উপর রাগ করা গোসসা দেখানো তার কাজ এক্তিয়ার একেবারেই নয়। কাজেই সাবধান! জীবনে ভাল সফল গবেষক হতে চাইলে তার উচিত হবে বরং পাবলিক কেন ওরকম বা সেরকম হয়েছে বা আচরণ করছে সেটা খুজে বের করা, এটা বের করতে জীবন লাগিয়ে দেয়া। সস্তা দেশপ্রেমিক হবেন না।

    ইন্ডিয়ার সমস্যা এটা যে, নিজের আকার আকৃতি বা অবস্থানের ব্যাপারেও তার সঠিক ধারণা নেই। তাই ভান করে যেন সে এক পরাশক্তি। যেমন দেখেন, বাংলাদেশের এক পত্রিকা মালিক সম্পাদকের উপজেলার পৌরসভায় পানীয় জলের ব্যবস্থার জন্য প্রজেক্টে ভারত তাতে মাত্র কয়েক কোটি টাকার অনুদান দিয়েছে। অথবা ধরেন মফস্বলের একটা কলেজের কয়েকটা ঘর দোতলা করতে হবে তাকে এক কোটি টাকা অনুদান দিয়ে দিল। আর ভারতের হাইকমিশনার সেটা আবার ঘটা করে উদ্বোধনও করতে গেছেন। ভারতের ধারণা এতে এবার ভারতকে দাতা দেশের আসনে বসতে জায়গা দেয়া হবে। অথচ বুঝতে চেষ্টা করল না যে, সব রাষ্ট্রেরই অনুদান দেবার সক্ষমতা থাকতেই হবে এর তো কোনো মানে নেই। কিন্তু কোন ঘটনাটা নিজেকে অপমানের মধ্যে ফেলবে এটা তো সকলেরই অবশ্যই বুঝার ক্ষমতা থাকা উচিত! তাই না!
    আবার দেখেন, এবার করোনা শুরু হলে সার্কের নামে একটা ফান্ড তৈরি করতে হবে বলে হইচই করা হল। কেন? সত্যিই অর্থপূর্ণ সাঙ্ঘাতিক কিছু কী তারা করতে চেয়েছিল?
    ভারতের হাইকমিশনার বাংলাদেশকে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন (যেটা ম্যালেরিয়ার ট্যাবলেট) এটা করোনার ওষুধ বলে যা এখনও প্রমাণিত নয় – অথচ এটাকেই মোদীর পক্ষ থেকে করোনা নিরাময়ের ওষুধ বলে দান করে গেলেন। শুধু তাই নয়, জানিয়ে গেলেন ওই ওষুধের দাম মোদীর দেয়া চাঁদার ভাগ থেকে কাটা যাবে। বুঝেন মোদী-ফান্ডের কী মহিমা! এতে দুটো ঘটনা ঘটল। এর একটা অপরাধ। কারণ আমাদের ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদনহীন একটা ওষুধ আমাদের দেশে আমদানি করা হল। আবার এটা তো ডাক্তারেরা ব্যবহার করতে বলতে পারবেন না। অন্তত আইনি ঝামেলায় পড়বেন। আর এটা করোনার বিরুদ্ধে কাজ করবে এর কোন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালই এখনো শেষ হয়নি,  ফলে প্রমাণিত কোনো ওষুধ নয় এটা। ফলে আমাদের ওষুধ প্রশাসনেরও কোন অনুমোদন দেয়ার সুযোগই নেই। মানে যেন দাওয়াত দিয়ে কাউকে গরম ভাতের বদলে পান্তা খেতে দেয়া যায়? আপনি তাই করলেন।

    এদিকে, জয়িতা বলতে চাইছেন এই ‘সিটি অ্যালায়েন্সের’ অফারের মধ্যে চীনা “বেল্ট-রোড প্রকল্পের” সম্পর্ক আছে। আর এটাতে “চিনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য আছে”।  আসলে দুনিয়ার অনেক সমস্যারই জন্ম হত না। হয়েছে এস্টিমেশন থেকে মানে নিজেকে মাপতেই শিখে নাই। শিক্ষা নেয় নাই কখন। বিশেষ করে দুচারজন  বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার এরকম। এরা পোস্টিং পেয়েই মনে করা শুরু করে তারা বাংলাদেশের রাজা না হলেও কিছু অংশের মালিক হয়ে গেছেন!  আচ্ছা ধরা যাক, বাংলাদেশে “চিনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য আছে””  [The Chinese motivation exceeds the promotion of cultural ties and it has a larger Geo-strategic objective…]।  আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে বেল্ট-রোড প্রকল্প – এই ট্রিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের চীনা “চিনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য নাই।  কিন্তু সাবধান প্রশ্নটা “আছে কিনা” এর নয়, এটা একেবারে মুরোদের প্রশ্ন। এজন্য বাইরের কারও দিকে তাকানোর আগে নিজের মুরোদ চেক করা উচিত! তাই না! তাই প্রথম প্রশ্ন হল,  তাতে ভারতের কী সমস্যা? যার মুরোদ নাই আসলে তার কোন সমস্যা কী আমলযোগ্য? ভারতই বলুক! আচ্ছা এছাড়া আরও কাহিনী আছে! দেখেন  অফার তো বাংলাদেশকেই করেছে তাই না? ভারতকে তো করে নাই? নাকি? কাজেই প্রতিক্রিয়া যা দেখানোর তা বাংলাদেশই দেখাক। অন্তত বাংলাদেশকে দেখাতে দেয়া উচিত। এজন্যই বলে ওভার-এস্টিমেশন একটা গভীর অসুখ!

    আসলে, বুঝা গেছে সমস্যার গোড়াটা মেন্টরের। জয়িতার মেন্টর-মুরুব্বি সম্ভবত বলে দিতে ভুলে গেছেন যে বাংলাদেশ কোন স্বাধীন রাষ্ট্র নয় এমন ধারণা জয়িতার মুখ দিয়ে প্রকাশ পেলে  লোকে জয়িতাকেই বেকুব বলবে!

    আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি। ভারতে কী চীনা ঋণে নেয়া কোনো অবকাঠামো প্রকল্প চালু নেই? খোদ মোদীই মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় থেকেই একাজে দক্ষ্মহস্ত নয়?  ভারতে কোনো নতুন শহরের অবকাঠামো নির্মাণ অথবা রেলের অবকাঠামো বা রেলকর্মী ট্রেনিং ইত্যাদি? এগুলো কাদের বিদেশি অবকাঠামো প্রকল্প? এখানে ভারতে চীনা রাষ্ট্রদুতের একটা সাক্ষাতকার আছে ২০১৫ সালের এপ্রিলের সেকালের চীনা প্রজেক্টের হদিশ মিলবে এখানে।  এটাই  মোদীর ক্ষমতায় আসার পরে চীনা বিনিয়োগ প্রকল্পে ঝাপিয়ে পড়া ছিল।  আমরা এই একটা নমুনা থেকে অ-নে-ক নিশ্চয় জানবে পেরে স্বর নিচা করব! এখন কথা হল,  তাহলে সেগুলোতে কী “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য আছে” তা ভারতের মনে হয়নি? নাকি সব জিও-স্ট্র্যাটেজিক ব্যাপার কেবল বাংলাদেশের চীনা প্রকল্পের বেলায়? যত্তসব বিরক্তিকর কাণ্ড!

    আর জয়িতা “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য” খুজতে বাংলাদেশে এসেছেন? ভারতের মিডিয়া খবর লিখছে ভারতের ওষুধের বাজারের ৪০% কাচামাল বা তৈরি ওষুধ আমদানির দিক থেকে নির্ভরশীল।  সেই চীনের কাছে গালয়ানে মার খেয়ে এসে এখন চীনাপণ্য বয়কট আউড়াইতেছেন, “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য বুঝতে আইছেন?  তো চীনা ওষুধ বা কাঁচামাল কী এখন আমদানি বন্ধ করতে পারবেন? এই আপনাদের স্ট্রাটেজিক বুঝ?  যে চীন ভারতের প্রথম সম্ভাব্য এনিমি তার কছেই আপনি ওষুধের মত জীবনরক্ষাকারি পণ্যে নির্ভরশীল। আর মুখে সেই গান্ধীর আমল থেকে আউড়াইতেছেন আত্মনির্ভরতা? অথচ এই আত্মনির্ভরতা শ্লোগানটাই বহু আগে থেকেই ভুয়া ও অপ্রয়োজনীয় বলে প্রমাণিত। অথচ ভারতের রাজনীতিকদের সে হুশই নাই।  আপনারা আসলে কাকে ফাঁকি দেন? চীনা ওষুধ বা কাচামাল সবচেয়ে সস্তা আর এই সস্তা থুয়ে অন্য জায়গায় যাবার মুরোদ কী ভারতের আছে, কেমনে সে মুরোদ অর্জন ক্রতে হয় তাও তো জানেন না। সস্তা দেখলে যেখানে কাপড় ঠিক রাখা মুশকিল – এমনই অর্থনীতি আপনারা বানাইছেন? আবার এই অবস্থায় আইছেন আমাদেরকে “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য” বুঝাইতে? হা হা হা কী তামশা……

    আবার কিছু কথা তো একেবারেই পরিষ্কার। যেমন বেল্ট-রোড প্রকল্পে বাংলাদেশ তো প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়ে যুক্ত আছে সেই ২০১৬ সাল থেকে। এটা তো লুকানো নয়। এ নিয়ে একবার আমাদের অবস্থান ইন্ডিয়াকে জানান দিতে গিয়ে য়ামাদের পররাষ্ট্র সচিবের সাথে ছোটখাটো একটা বিতর্কও হয়ে গিয়েছিল সে সময়। অর্থাৎ এই ফ্যাক্টসটা প্রতিষ্ঠিত। তবে ভারতের নিজের জন্য এই বেল্ট-রোড প্রকল্প হারাম বলে মনে করতেই পারে ভারত। এটা তাদের সিদ্ধান্ত। ভালো, তা করুক। কিন্তু তাহলে ভারতের জন্য যা হারাম তা আমাদের ওপরও হারাম বলে চাপানোর চেষ্টা কেন?

    এখন চীনের ‘সিটি অ্যালায়েন্স প্রকল্পের’ সাথে যদি বেল্ট-রোড প্রকল্প যুক্তও থাকে আর তাহলে তা ভারতের জন্য “সন্দেহের উদ্রেক” [raised suspicions ] করলেও বাংলাদেশের তাতে কী? কারণ আমরা তো বেল্ট-রোড প্রকল্পের অংশ হয়েই ঢুকে আছি। কাজেই ভারতের ‘সন্দেহের উদ্রেক’ আমাদের ঘাড়ে চড়াবার তো সুযোগ নেই। ভারতের নিজের ঘাড়েই এটা রাখতে হবে জয়িতাকে। তিনি নিশ্চয় আশা করবেন না যে আমাদেরও চীনকে নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক করতে হবে! আশা করি জয়িতা পরিষ্কার থাকবেন, নাকী!

    জয়িতার চীনা শোষণ তত্বঃ
    আবার আরেক বিপদ। জয়িতার দাবি বেল্ট-রোড প্রকল্প বিভিন্ন রাষ্ট্রকে এতে ঢুকিয়ে নেয়ার এটা নাকি বিভিন্ন রাষ্ট্রকে চীনা ঋণগ্রস্ত করে ‘ঋণের বোঝা’ চাপানোর আর ‘শোষণের’ প্রকল্প [debt burden and the exploitation by China]। কিন্তু জয়িতা ভট্টাচার্য তাহলে বলেন, ভারতও কেন নানা ধরনের চীনা অবকাঠামো ঋণ নিয়ে চলে সেটা আবার কোন চীনা শোষণের পাল্লায় পড়ার জন্য? আমি অবশ্য ভুটানে ইন্ডিয়ান লোন কত তানিয়ে কিছু বলছি না। জয়িতা নিজের ক্রাইটেরিয়াতে নিজেই চেক করে দেখতে পারেন।

    আবার এখানেই শেষ নয়। চীনা-বিশ্বব্যাংক এআইআইবি-তে সেখানে চীনা (শোষকের) সাথে ভারতই তো প্রধান পার্টনার-মালিক হয়ে আছে। আবার ভারত একই শোষক চীনের সাথে ব্রিকস ব্যাংক খুলেছে? এর মানে কী, তাহলে কি ভারতও শোষক? বলেন কী? না না – জয়িতা আপনাকে অনেক পড়াশোনা নিয়ে বসতে হবে!

    এ জন্যই বলছিলাম, কেউ আজকাল ন্যূনতম হোমওয়ার্ক না করে লিখতে বসে না। থিংকট্যাংক বলতে আমেরিকানরা গবেষণা কাজ বোঝাত। অথচ আজকাল থিংকট্যাংক আর প্রপাগান্ডা কাজ সব একাকার করে ফেলা হয়েছে। যারা প্রপাগান্ডিস্ট তারাই গবেষক বলে নিজের পরিচয় দিচ্ছে। এমন দুর্দশার কথা কারে বলি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২১ জুন ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  সেদিনই প্রিন্টেও  “ভারতের জয়িতা ভট্টাচার্য”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নেপালে ভারতের জমিদারি আর ফিরবে না, পাশে মর্যাদা দেন

    নেপালে ভারতের জমিদারি আর ফিরবে না, পাশে মর্যাদা দেন

    গৌতম দাস

    ১৫ জুন ২০২০, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-33n

    _Nepal’s new territorial map, released earlier this week, has shown the area in the light red shade to be part of its territory, evoking strong reactions from India. This came after India, in its new maps released in November last year, showed the Kalapani area (marked in deep red) to be part of its territory. SCMP

    এশিয়ায় বিশেষ করে ভারতের পড়শি অঞ্চলের সকলেই অবাক হয়ে আগ্রহ নিয়ে লক্ষ্য রাখছে নেপাল কী করছে, কী করে ভারত মোকাবিলা করছে। প্রশ্নটা মোকাবিলার। নেপাল-ভারত সীমান্তে অসন্তোষ ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে প্রবল টেনশন উত্তেজনা গত কয়েক মাস ধরে বেড়েই চলছিল। এরই মধ্যে নতুন ঘটনা হল, গত ১২ জুন সকাল নয়টায় ভারতের বিহার রাজ্যের সীতামারহি [Sitamarhi] জেলার সীমান্তের ওপারে নেপালের অংশে তাদের সরলাহি [Sarlahi] জেলার সীমান্ত এলাকায় নেপালি সীমান্তরক্ষীর গুলিতে একজন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। সেই সাথে ঐ গোলাগুলিতে দুজন ভারতীয় গুরুতর জখম হয়ে ভারতের হাসপাতালে জীবন নিয়ে লড়ছে আর একজন ভারতীয় নেপালি হেফাজতে আটকা আছে, যাকে ঘটনাস্থল থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
    নেপাল-ভারতের সম্পর্কের মধ্যে এবারের উত্তেজনা ও অসন্তোষের  মূল ঘটনাটা মূলত ৮ মে থেকে; যখন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং (অনলাইনে ভার্চুয়ালি) একটি সড়কের নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন। বিবিসির ভাষায়, “ভারতের উত্তরাখণ্ড, চীনের তিব্বত আর নেপালের সীমানা যেখানে মিশেছে সেখানে হিমালয়ের একটি গিরিপথের নাম লিপুলেখ। ঐ গিরিপথের দক্ষিণের ভূখণ্ডটা ‘কালাপানি’ নামে পরিচিত- যে এলাকাটি ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও নেপাল তাদের অংশ বলে দাবি করে থাকে”। নেপালের দাবির পক্ষে যুক্তি এটাIndia and Nepal Treaty of 1950তে [Sugauli Treaty 1816]  এর রেফারেন্স আছে। সুগৌলি চুক্তি হল ১৮১৪-১৬ সালের এংলো-নেপাল যুদ্ধের শেষে উভয়পক্ষের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যেটা থেকে নেপালের সীমানার রেফারেন্স টানা হয়ে থাকে। এই চুক্তির পরবর্তিতে ব্রিটিশরা আরও তাদের দখল নেয়া এলাকা ছেড়ে দিয়ে তা লিপিবদ্ধ করতে ১৯২৩ সালে আরেক আপডেটেড নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি [Nepal–Britain Treaty 1923] করেছিল। আর এই চুক্তিতে উল্লেখিত মেয়াদ শেষেই ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তি [India and Nepal Treaty of 1950] স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা নিয়ে এখনকার নেপালের প্রবল আপত্তি উঠে আছে। চুক্তি নিয়ে একটা রিভিউ প্রক্রিয়া চালু আছে। যদিও চুক্তি এখনো বহাল আছে।

    সাবধান, প্রতিহিংসা এক নেতি এনার্জি, এটা উলটা আপনারই ক্ষতি ডেকে আনতে পারেঃ
    গত ১৯৯৬ সালে নেপাল মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলন শুরুর প্রাক্কালে এই ১৯৫০ সালের চুক্তি রিভিউ বা বাতিল অন্যতম দাবি হিসাবে তাতে যুক্ত করা ছিল। বিগত প্রায় দুশ বছর ধরে নেপাল-ভারত সব সময়ই কোন না কোন এক চুক্তি  গুরুত্বপুর্ণ হয়ে থেকেছে। অন্তত তা এজন্য যে নেপাল ভুমিবেষ্টিত বা ল্যান্ডলকড। নেপালের দক্ষিণে ভারত আর উত্তরে চীন এভাবে এইদুদেশ দিয়েই নেপাল ঘেরা। যদিও আবার দক্ষিণের ভারতের দিক দিয়ে নেপালে প্রবেশপথগুলো তুলনামূলক সহজ, অন্তত দক্ষিণদিকের পাহাড়ি এলাকা বা পথ কম উচ্চতার বলে আর এদিক দিয়ে কোন সমুদ্রবন্দরে পৌছানোর দুরত্ব তুলনায় কম বলে। আর প্রাচীনকাল থেকে এপথটাই আগে থেকে চালু হয়েছিল বলে। ফলে ১৯৫০ সালের চুক্তির মুখ্য প্রসঙ্গ সমুদ্রে যেতে ভারতের অনুমতি ও শর্ত এসব (অসম) চুক্তির মাধ্যমেই বলবত থেকেছে। তবে ভারতের ইচ্ছা-আকাঙ্খা প্রতিফলিত করে ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নেপালের নতুন কনষ্টিটিউশন রচনা ও ঘোষণা হয় নাই বলে, এরপর ভারত হয়ে পণ্য আমদানীর ঐ একমাত্র পথও ভারত অবরোধে বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ভারতের এই সিদ্ধান্তই নেপালের গরীব সাধারণ মানুষের জীবন বিশেষত জ্বালানির অভাবে ভীষণ রকম কষ্টে ফেলে দেওয়ার কথা, আর তা ফেলেছিলও তাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু সবশেষে এর ফলাফল হয়েছিল একেবারে উলটা।  সেটাই নেপালের জন্য নতুন দুয়ার, নতুন পথ খোলার শর্ত হয়ে বাস্তবতা হাজির হয়েছিল। ঐ অবরোধে নেপালে রান্নার জ্বালানিসহ সব ধরণের পণ্য আমদানি বন্ধ থাকায় মাস ছয়েক পরে  নেপাল চীনকে অনুরোধ করলে চীন সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে। চীন মানে চীনা-তিব্বতের সীমানা নেপালের আরও উত্তর দিকে যেটা আরও খাড়া পাহাড়ের দিক।  চীনা-তিব্বতের এদিকে  দুটো সীমান্ত চৌকি দিয়ে বের হওয়া যেত আগে। কিন্তু এপ্রিল ২০১৫ এর নেপালের ভুমিকম্পে সেগুলো ভারী পাথর চাপা পড়ে বন্ধ হয়ে যায় বা ভেঙ্গে যায় বলে ব্যবহার অযোগ্য হয়েছিল। তবুও বিকল্প সুবিধা একটাই ছিল যে ২০১৫ সালের আগে থেকেই চীন-তিব্বত অংশ থেকে সবচেয়ে কাছাকাছি (২০০০ কিমির বেশি) চীনের কোন সমুদ্রে পৌছানোর হেভিডিউটি রেললাইনের এক প্রকল্পে নতুন করে রেললাইন পাতা ইতোমধ্যেই হয়ে গেছিল। কিন্তু নেপাল এর ব্যবহারকারি হওয়ার কোনই আলাপ ছিল না বলে ঐ রেলপথ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে কমপক্ষে ১০০কিমি দূর দিয়ে চলে গেছিল। চীন তাই ঐ রেললাইন যেন নেপাল ব্যবহার করতে পারে এর ব্যবস্থা করতে ঐ প্রায় ১০০কিমির এক নতুন কানেকটিং রেল প্রকল্প নিয়ে নেপালকে সহায়তা করতে আসে। সেই কানেকটিং রেলপথ এখন চালু হয়ে গেছে। চীনের সাতটা বন্দর এখন নেপালও ব্যবহার করতে অনুমতিপ্রাপ্ত উন্মুক্ত। তাই নেপালের ভারত-নির্ভরতার দিন এভাবেই সমাপ্ত হয়ে যায় আর, এমন শাপে বর নিয়ে নেপাল তাদের ভাগ্য গড়ার দিকে রওনা দিয়েছে। কারও অসুবিধা বা খারাপ করতে চাইলে আপনার অজান্তেই এর পরিণতি তার জন্যই ভাল হয়ে যেতে পারে। এজন্য বলা হয়, খারাপ উদ্দেশ্য বা নেতি মন বা প্রতিহিংসা – এগুলো এর কর্তার বিরুদ্ধেই প্রযোজ্য হবাব সম্ভাবনা নিয়ে আসে! কাজেই সাবধান!

    ওদিকে লিপুলেখ নিয়ে নেপালের বিপরীতে ভারতের যুক্তি হল – এলাকাটা প্রায় ‘ষাট বছর’ আগে [মানে এরও আগে বা এর চেয়ে পুরানা কালে নয়] থেকেই তাদের দখলে আছে। তাই এটা তাদের। সাথে আরেকটা যুক্তি দেয় ভারত যে, ২০১৫ সালে এটা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময়ই দুই দেশ মিলে লিপুলেখে একটি বাণিজ্যিক পোস্ট খুলতে সম্মত হয়েছিল, যা তাদের যৌথ ঘোষণায় আছে। এ কথার বিপরীতে নেপালের বক্তব্য তাতেও নেপাল  ঐ ঘোষণা কখনোই মেনে নেয়নি বলে তখন থেকেই রেজিষ্টার্ড আপত্তি জানিয়ে আসছে। তাই এখন গত মাসে ৮ মে লিপুলেখে ভারতের রাজনাথ সিং সড়ক তৈরির কাজ উদ্বোধন করা থেকেই নেপালের পুনঃআপত্তিতে প্রবল উত্তেজনা শুরু হয়ে যায়। নেপালে প্রতিবাদের বিষয়টাকে পার্লামেন্টে আইন পাস বা কনস্টিটিউশন সংশোধনের পর্যায়ে পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

    সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দেব মুখার্জিও মোদীর বিরুদ্ধে নেপালের পক্ষে এক স্বাক্ষীঃ
    নেপালে একের পর এক ভারতের পরাজয়ের শুরু বলা যায় নেপালের রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে নতুন রিপাবলিক কনষ্টিটিউশন রচনার প্রথম উদ্যোগের (First failed Constituent Asembly was dissolved on May 28, 2012 ) ব্যর্থ হয়ে পড়া থেকে। নেপালের কোন রাজনৈতিক শক্তির উপরে ভারত কোন নিয়ন্ত্রণ আনতে না পেরে ঐ রচনা প্রক্রিয়া যেন ফেল করে সেদিকে ঠেলে দিয়েছিল। এতে হতাশায় ডুবে যাওয়া সারা নেপাল এরপর আবার বহু কষ্ট সহ্য করে (কারণ সবদলের একমত হওয়া খুবই কঠিন একটা কাজ) সর্বদলীয় আবেদন নিয়ে তাদের সুপ্রীম কোর্টে গেলে  কোর্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে তাদেরকে  নতুন করে রিপাবলিকের কনষ্টিটিউশন রচনার “কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলি গঠনের নির্বাচন” অনুষ্ঠানের অনুমতি দিয়েছিল। দুনিয়ার ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির খুব কমই আছে। কিন্তু দ্বিতীয় সুযোগে নেপালের প্রধান তিনটা দলই  আয়োজনের পুর্ণ সদব্যবহার করতে নিজেদের মধ্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে ভারত থেকে (দুই কমিউনিস্ট আর নেপালি কংগ্রেসও) প্রধান তিনদল নিজেদের দূরে নিয়ে যায়। এই তিনশক্তি মিলে নেপালের নতুন রিপাবলিক কনষ্টিটিউশন রচনা সমাপ্ত ও তাতে ভারতের প্রবল আপত্তি ও বাধা উপেক্ষা করেই ঐ নতুন কনষ্টিটিউশনের ঘোষণা দিয়েছিল ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫। তাদের তিন দলীয় প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও পূরণ করেছিল। কিন্তু এতে ভারত প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়াবহ জলুনির। তারা ভারতের উপর দিয়ে নেপালে সব ধরণের পণ্য আমদানিতে অবরোধ আরোপ করেছিল। কিন্তু এটাও ব্যর্থ হয়ে পড়া থেকেই চীন-নেপাল সম্পর্কের নতুন দিনের শুরু।  অথচ অন্তত দুশত বছরের ভারত-নেপাল সম্পর্কের মধ্যে চীন কখনও কোথাও হাজির ছিল না। ২০১৬ সাল থেকেই মাত্র নেপালের মঞ্চে চীনের প্রবেশ ঘটেছে।

    এককথায় বললে, তাই কাউকে দোষারোপের আগে ভারতের সংশ্লিষ্ট সব সরকারি কর্তা, রাজনীতিক বা একাদেমিকের নিজেদের লজ্জা ঢাকতে হলে  নিজেকেই দোষারোপ করা উচিত ছিল। হয়ত আত্মসমালোচনা করে এজন্য তারা কিছু অনুশোচনামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন এমন আমাদের দেখতে পাওয়া উচিত ছিল। সে যাই হোক, তবু কিছু প্রতিক্রিয়া হয়েছে। মোদী ২০১৪ সাল থেকে ভারতের ক্ষমতায়। তাই এদের মধ্যে একটা ঝোঁক উঠে এসেছে যে ভারতের আগের সব ব্যর্থতা মোদীর মাথায় ঢেলে দেওয়া। যদিও মোদীও, তার আমলে পুরান ঘটনা থেকে কোন শিক্ষা নিয়েছেন নীতি বদলিয়েছেন তা জানা যায় না।
    ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূতরা অবসরে যাওয়ার পরে সাধারণত কোন চলতি সরকারের অবস্থানের বিরোধিতা করে প্রকাশ্যে কোনো কথা বলেন না, এড়িয়ে যান। কিন্তু সাবেক ভারতীয় এক রাষ্ট্রদূত দেব মুখার্জি মনে হচ্ছে ব্যতিক্রম। তিনি রাজনাথের সড়ক নির্মাণ উদ্বোধন ঠিক পছন্দ করেননি। আর বিবিসিকে বলছেন, ‘রাস্তা উদ্বোধনের বিষয়টা অন্যভাবে করা যেতে পারত বলেও তার অভিমত”। দেবের অভিমত নেপালের আপত্তির মুখে মোদী সরকার নাকি বলেছিল, এ নিয়ে আলোচনা হবে। তাই বিবিসি লিখেছে দেব মুখার্জি বলেছেন, “… ভারত যখন নেপালকে কথা দিয়েছে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে, তখন বলা যায় না এটা আমাদেরই এলাকা – তোমাদের এ নিয়ে কিছু বলার হক নেই”। অর্থাৎ মোদী সরকারকে তিনি খুবই শক্ত হাতে আঘাত ও সমালোচনা করেছেন বলতেই হয়। এই ঘটনাকে আমরা বোধহয় দলবদ্ধভাবে না পারলেও ব্যক্তিগতভাবে করা দেব মুখার্জির প্রায়শ্চিত্ত বলতে পারি।
    আরেক দেশের নতুন কনস্টিটিউশন গৃহীত হওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি তোলার আমি কে? এনিয়ে আপত্তি তুলে নিজেকে হাস্যকর করার কোনো মানে হয় বলে এমন কাজ  আমরা কোন রাষ্ট্রকে করতে দেখি না। কিন্তু নেপালে সব হারিয়ে ভারত তাই করেছিল। যদিও সবকিছু উপেক্ষা করে নেপালে নতুন কনস্টিটিউশন গৃহীত ও ডিক্লারেশন বা ঘোষণা হয়েছিল। কিন্তু এর পরের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে এক ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকার ক্ষমতায় আসে সেটা ছিল নেপালের বড় দুই কমিউনিস্ট পার্টি মিলে এক দলের সরকার। আর একমাত্র নেপালি কংগ্রেস কোন মতে বিরোধী দলে জায়গা হয় আর সেই সাথে তার ভারতের সাথে সম্পর্ক রক্ষার কিছু সুযোগও সামনে আসে। কিন্তু এবার, নেপালের পার্লামেন্টে লিপুলেখ নিয়ে প্রতিবাদ ইস্যুতে আলোচনায় সেই নেপালি কংগ্রেসের এক এমপি পুষ্পা ভূষল গৌতম বলেন, “১৮১৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও নেপালের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাগাউলি চুক্তি অনুসারে ওই এলাকা সম্পূর্ণভাবে নেপালের”। অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে নেপাল কংগ্রেস দলও এখন কম ভারতবিমুখ নয়। এ থেকে নেপালের অভ্যন্তরীণ অবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা বেশ খানিকটা আন্দাজ পেতে পারি।
    নেপালের মাওবাদীরা তাদের সশস্ত্র বিপ্লব নিয়ে প্রথম যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৯৬ সালে। সেখানে নেপালে তাদের রাজার মূল সহযোগী বলে ভারতকে উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে ওই বিপ্লবের মূল শত্রু বলে তারা চিহ্নিত করেছিল ভারতের শাসকদের। বিশেষ করে ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তি বাতিলের প্রধান দাবি তারা সেই থেকে শুরু করেছিল। মাঝে ২০০৭ সালের দিকে নিজেরা কৌশল বদলে সশস্ত্র থেকে গণআন্দোলনে নেমে আসারকালে চুক্তি বাতিলের কথা কিছুটা ঢিলেঢালা ছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে চুক্তি রিভিউয়ের পক্ষে আনুষ্ঠানিক দাবি তোলার একপর্যায়ে ২০১৬ সালে এটা কাজ শুরু করলেও নেপালের মূল ফোকাস সরে যায় ভারতের বিকল্প হিসেবে চীনের ভেতর দিয়ে বাইরের দুনিয়াতে বের হওয়ার ব্যবস্থা ও কোনো নতুন চুক্তির পথ খুঁজে বের করা। তা এখন চীনের মাধ্যমে কার্যকর হয়ে গেছে। এরও প্রভাব এখন নগদ দেখা যাচ্ছে। সারা নেপালের চরম ভারতবিমুখ হয়ে পড়া চলছে ধরা যায় গত সাত বছর ধরে। কিন্তু এই লিপুলেখ সীমান্তের রাস্তা নির্মাণ কেন্দ্রে করে এবারের ভারতবিমুখতা বা বিরোধিতা অনেক বাস্তব হয়ে উঠেছে। চীন-নেপালের সাতটা সীমান্ত দিয়ে বাইরের সাথে যোগাযোগ, সম্পর্ক করার কথা নেপাল প্র্যাকটিক্যালি ভাবতে পারে এখন। এক কথায় মূল কারণ এটাই যে, ভারত ছাড়াও নেপালের অর্থনৈতিক জীবন এখন সার্ভাইভ করা বাস্তবে সম্ভব। এটাই হলো এবারের ভারতবিমুখতার বিশেষ দিক।

    ‘বিশেষ সম্পর্কের’ সমাপ্তি কি এখানেই ঘটবে?
    এছাড়া এরই আরেক ছাপ দেখা যাচ্ছে আবার এখন। যেমন গত ১১ জুন কাঠমান্ডু পোস্ট পত্রিকায় একটা কলাম ছাপা হয়েছে যার শিরোনাম- ‘বিশেষ সম্পর্কের’ সমাপ্তি কি এখানেই ঘটবে”? [Is this the end of the ‘special relationship’?] এখানে বিশেষ সম্পর্ক বলতে ভারত-নেপাল বিশেষ সম্পর্কের কথা বুঝানো হয়েছে। আর ঐ লেখায় কলকাতার হিন্দুস্থান টাইমসের এক সম্পাদকীয় আর এক প্রকাশিত রিপোর্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হিন্দুস্থান টাইমসের ঐ সম্পাদকীয় [The costs of anti-Indian nationalism in Nepal | HT Editorial] একেবারেই সাব স্ট্যান্ডার্ড; ওর নিম্নমান তাদের নিজের জন্যই লজ্জার। এত খারাপ তারা সাধারণত লিখে না। কিন্তু এখানে তারা নিজের দগদগে কিন্তু খামোখা “নেশনস্টেট বোধের” আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। আর কাউকে “কাজের ছেলে” গণ্য করে কোনো লেখা দাঁড় করালে যেমন হয় তারই ছাপ রেখে একটা লেখা হয়েছে এটা। ঐ সম্পাদকীয়-এরই আবার সাব-হেডলাইন হল, “কাঠমান্ডু (ভারতের সাথে) সম্পর্ক রিসেট করে ঢেলে সাজাতে চায়, এতে তারই স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে“। পত্রিকাটা অভিযোগ করেছে, নেপালে নাকি “গভীর এন্টি-ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম” ছড়িয়ে পড়েছে।
    আরো লিখছে, “নেপাল-ভারতের মধ্যে এক ‘বিশেষ সম্পর্ক’ আছে, অসন্তোষের গোড়াটা সেখানে”। লিখেছে, “বাস্তবে এর মানে ভারত-নেপালের সাথে খোলা সীমান্ত শেয়ার করে। ভারত নেপালিদের বিনা বাধায় ভারতে কাজ করতে এলাউ করে আর নেপালিরা (গুর্খা) ভারতের সেনাবাহিনীকে সেবা (কাজ) করে। এর বিপরীতে, নেপালিরা এ দুটোতেই রাজি আছে, পরোক্ষে ওরা নিজের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতকে একটা ভূমিকা দিয়েছে (এটা আর কোন সম্পাদকের আলাপ নয় রাস্তার চা দোকানের রকবাজের আলাপ হয়ে গেছে) আর নেপালিরা ভারতের নিরাপত্তার স্বার্থের ব্যাপারে সেন্সেটিভ হয়ে থাকছে। … ভারতও বিশেষ সম্পর্ক থেকে লাভবান হয়েছে। তবে এই বিশেষ সম্পর্ক রিসেট(reset) করলে নেপালকে এর মূল্য দিতে হবে”।
    “নেপালকে এর মুল্য চুকাতে হবে। এর মানে হবে কড়া সীমান্ত, এর মানে হবে নেপালিদের ভারতে অবাধে কাজ করা বন্ধ, এর মানে হবে নেপালের উন্নয়নের জন্য (ভারত থেকে) দ্বিপক্ষীয় জরুরি সহযোগিতার দ্রব্যাদি কমে যাওয়া, এর মানে হতে পারে, ত্বরাই মানে নেপালের দক্ষিণাঞ্চল থেকে যে রাজনৈতিক প্রতিরোধের ঝড় উঠবে (মানে ভারত উসকিয়ে তুলবে) তা সামলানো। কাঠমান্ডু কি এসবের জন্য তার একক সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও মূল্য চুকানোর জন্য তৈরি? এটা তো একটা পরিষ্কার প্রো-চায়না ঝোঁক ও এক আগ্রাসী ন্যাশনালিজম? এভাবে ‘বিশেষ সম্পর্ক’ সব নিঃশেষ করে দেয়া দুই দেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে, তবে নেপালের বেশি ক্ষতি হবে”।

    এখন এক কথায় বললে, হিন্দুস্থান টাইমসের এই ভাষ্য থেকে বুঝা যাচ্ছে অন্তত গত দশবছরে নেপাল-ভারতের সম্পর্কের ইতিহাস নিয়ে এদের কোন খবর নাই, মুল্যায়ন বা কমপক্ষে কোন রিডিং  নাই। তবে সেটা যাই হোক, হিন্দুস্থান টাইমস মুলত একটা মিডিয়া একটা দৈনিক, কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বের প্রতিষ্ঠান নয়। কাজেই মিডিয়া হিসাবে এই বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য। আর তাদের এই লেখার প্রেক্ষিতে মন্ব্যে বলতে হয়, কাউকে কাজের ছেলের মত ট্রিটমেন্ট আচরণ করে যদি বলা হয় “আমার পা-দাবানো ছেড়ে চলে গেলে তুই তো না খেয়ে মরবি”- এটা সেরকমের বক্তব্য।  এটা নেপালের জন্য অপমানজনক হবারই কথা। আসলে ভয় দেখিয়ে কাউকে জোয়ালে নিয়োজিত রাখার অনেক উপায় আমরা জানি, দেখেছিও। তবে এখানে দেখছি; এখানে বলা যে ‘আমারও একটু কষ্ট হবে তোর হাতে আমার পা-দাবানো পাব না, তবে তোরই না খেয়ে থাকতে বেশি কষ্ট হবে”। এটা এ ধরনের। এমনই নিম্নমানের।

    বলাই বাহুল্য, এটা কোনো পত্রিকার সম্পাদকীয় হতে পারে না। বাহ্যত উভয়ের সম্পর্ক যাই থাক, নেপাল-ভারত সম্পর্ক দুটো সমমর্যাদার রাষ্ট্রের, যেখানে কেউ কারো অধস্তন এমন মনে করাটাই অগ্রহণযোগ্য তো বটেই, বরং এভাবে বলা বা মনে এমন ধারণা পুষে  নিয়ে কথা বলাটাও অপরাধ। দুটো সমমর্যাদার রাষ্ট্রের এই সম্পর্ক-নীতির কথা মনে রেখে এই সম্পাদকীয় লেখা হয়নি। এজন্য এটা গর্হিত কাজ।

    জাতিসঙ্ঘ যেখানে ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্রের পড়শি দেশের উপর দিয়ে গিয়ে সমুদ্র ব্যবহারের একসেস পাওয়াকে অধিকার গণ্য করে রেজুলেশন তৈরির প্রক্রিয়ায় আছে, এরা তখন বেখবর হয়ে নেপালকে “এন্টি-ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম” করার মূল্য চুকাতে হবে বলে ভয় দেখাচ্ছে, হুমকি দিচ্ছে।

    এছাড়া, এটা আসলেই একটা হাসির কাণ্ড যে হিন্দুত্বের ভারত ও হিন্দুত্বের ন্যাশনালিজমের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে আমরা আরেকটা মানে নেপালের  ন্যাশনালিজম দেখে টিটকারি দিয়ে বিতৃষ্ণা প্রকাশ করতে দেখছি। আর সবচেয়ে ভয়াবহ হল নেপালের ত্বরাইবাসীরা ভারতের উসকানিতে নেপালের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে – ভারত-রাষ্ট্র তা করাবে বলে হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু হুমকি দিচ্ছেন এক পত্রিকার সম্পাদক! কোনো সরকারপ্রধান বা রাজনীতিক নয়। এখানে আবার পত্রিকার সম্পাদক এমনই জাতিবাদী হয়েছে যে, রাষ্ট্র বা সরকারের কেউ না হয়েই তিনি হুমকি দিচ্ছেন! এটা এমনই জাতিবাদিতা!   জমিদারের ছেলে যদি রেষ্টুরেন্টে গিয়ে পাশের টেবিলে বাসার এককালের কাজের ছেলেকে খেতে দেখে তাহলে যেমন জমিদার রোয়াব-ভ্যানিটি রক্ষার্তে তেলেবেগুনে ঝাপিয়ে পড়ে, হিন্দুস্থান টাইমসের সম্পাদকের অবস্থ হয়েছে তেমনই।  এই অবস্থায় সম্পাদককে একটাই কথা বলা যায় – মহাশয়, কুল ডাউন! আপনি শান্ত হোন! সাম্য, সম-মর্যাদা ব্যাপারটা বুঝেন?  আপনি বুঝে নেন জলদি, অবস্থা আরো খারাপ হবার আগেই! দেখছেন না ৪০০ বছরের আগের কালো-দাস-ব্যবসায়ী সেলিব্রেটি হয়ে এতদিন নিজের মুর্তি টাঙিয়ে খারায় ছিলেন! কিন্তু এখন? না আর না! এবার সময় হয়েছে আপনি মাটিতে, নদীতে লুটায় পড়তেছেন না? আর লুকায়ে স্বাভাবিক থাকতে পারছে না! আপনিও, কেউ বাদ যাবেন না!

    ওই সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিল গত ৮ জুন। আর নেপালে এর পালটা সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে ১১ জুন। এ থেকে নেপাল-ভারত সম্পর্ক কোন উত্তেজনায় আর কেমন পর্যায়ে আছে এরই কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।

    নেপাল সীমান্তে ভারতীয়দের উপর গুলিঃ
    তাহলে গত ১২ জুন নেপালি পুলিশের হাতে ভারতের এক নাগরিককে হত্যা, দুইজন ভারতীয় নাগরিকের মারাত্মক আহত ও একজনকে নেপালি পুলিশের গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে; এ ঘটনার কি নেপাল-ভারত সীমান্ত লিপুলেখ নিয়ে উত্তেজনার কোনো সম্পর্ক আছে? এর জবাব হল, পরোক্ষে সম্পর্ক অবশ্যই ভাল মতনই আছে, প্রত্যক্ষে সম্ভবত নেই। সাধারণ অবস্থায় নেপাল-ভারত  তো খোলা সীমান্ত, অবাধে দুদেশের নাগরিক যেতে পারে। বিশেষ করে বিহার জেলা সংলগ্ন এলাকায় সীমান্তের দুই পারের বাসিন্দাদের মধ্যে বৈবাহিক আত্মীয় সম্পর্কই প্রচুর। কিন্তু এখন নেপালে ১৪ জুন পর্যন্ত লকডাউন চলছে। নেপ[আলী সীমান্ত্রক্ষীর যুক্তি,  এসময় নেপালের মেয়ে বলে এক ভারতের বউমা অবাধে এখনই শ্বশুরবাড়ি অবাধে আসাযাওয়া করতে পারে না। লকডাউনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সেটা করতে যাওয়া থেকেই তর্কবিতর্কের শুরু। এরপর এই বাধা ভাঙতে ভারত থেকে লোকজন এনে (কমপক্ষে ৩০ জন) চাপ প্রয়োগ করতে চাইলে সীমান্তরক্ষীরা (মাত্র ৭ জন) ভয় পেয়ে ভারতীয়দের সামলাতে না পেরে গুলি ছুড়েছে। প্রথমে দশ রাউন্ড ফাঁকা ফায়ার। কিন্তু এতে কোন কাজ না হওয়ায় এবার নিচে ফায়ার করেছে। ভারতের প্রায় সব পত্রিকার বর্ণনার সারকথা এটাই। তবে নেপালের সীমান্ত সৈন্য বাড়ানোর প্রচেষ্টা আছে তা ভারতের ইকোনমিক টাইমস লিখেছে বলে কেউ কেউ লিখেছে। কাজেই পরোক্ষ লিপুলেখের টেনশন এখানেও আছে, বলা যায়। এখানে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি ভারত-নেপাল সম্পর্কের আগামি অভিমুখ সেদিকেই যাচ্ছে – মুক্ত অবাধ সীমান্ত আর থাকছেই না। চুক্তি বদল হচ্ছেই। তবে কতটা আপোষে সেটা এক বিরাট প্রশ্ন!

    তবে আমরা উপরে দেখলাম ভারতীয় সম্পাদকের মনোভাব। তিনি নেপালের এমন বেড়া দিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়া কী সহজে সহ্য করে নিবেন? সন্দেহ রাখার অবকাশ আছে অবশ্যই!   জমিদার-মন এসব সহজে নিতে পারে না। ‘বান্দি’ করে যাকে এতদিন দাবায় পায়ের নিচে রাখছিলেন তিনি, সে এখন আমারই পাশের চেয়ারে বসে কেমনে!   আর বিপরীতে ওদিকে নেপালির পত্রিকার কলামিস্ট চাইছেন নেপাল-ভারত সম্পর্ক রিসেট করা ঢেলে সাজিয়ে নিতে, যাতে অসাম্য, অমর্যাদার সম্পর্ক দূর হয়ে যায়। মানুষ না খেয়ে হলেও সম-মর্যাদার জন্য জীবন দিতেও উঠে দাড়াতে চায়। এটা কোন জমিদার মন বুঝে না। যার একটাই ওষুধ – রিপাবলিক মন – রাষ্ট্র, নাগরিক বৈষম্যহীনতা, মর্যাদা ইত্যাদি ঝাপ্টা দেওয়া।  অর্থাৎ কলামিস্ট তিনি বুঝাতে চাইছেন ১৯৫০ সালের চুক্তির বাতিল অথবা ন্যূনতম একটা রিভিউ করতে। আর বর্তমান সীমান্ত সমস্যার সমাধান চাইছেন। রিভিউ রিপোর্ট এসে গেছে। কিন্তু মোদী সময় পাচ্ছেন না বলে এড়িয়ে রেখেছেন।

    বোঝা যাচ্ছে, নেপালের সাথে ভারত তাদের সম্পর্কটা খামোখাই তিতা করে ফেলেছে, খুব সম্ভবত তাদের পুরাণা কলোনি আচরণ পছন্দ করে তা আকড়ে থাকার কারণে। আর এর তাবত দায় এখন চীনের ওপর চাপাতে চাইছে। যদিও রেকর্ড ও ফ্যাক্টস একেবারেই পরিষ্কার যে ২০১৫ সালের অক্টোবরের আগে নেপালে চীনের নামই কেউ জানত না। কোথাও উচ্চারিত হত না এমনই অপ্রয়োজনীয় মনে হত। তবে নিশ্চয় চীনও নিস্পাপ নয়। তবে সেটা এখানে প্রসঙ্গও নয়। বাস্তবতা হল, নেপালের প্রতিটা মানুষকে ভারতের চরম কষ্টকর জীবনের মুখে ফেলে দেয়া থেকেই এর ভিতরেই ত্রাতা হিসেবে হাজির হতে সুযোগ পেয়ে গেছিল চিং । যে সুযোগ সে না চাইতে পেয়েছিল এবং নিয়েছিল।  এরপর থেকে নেপালে চীনের আবির্ভাব ঘটা আর কেউ ঠেকাতে পারে নাই।  প্রতিহিংসা দিয়ে এর বিরুদ্ধে কিছুই করা যাবে না। নেপালের কিছুই করতে পারবে না, উলটা নিজের আরো ক্ষতি ছাড়া।

    ভারত কেবল নিজের আচরণ আর স্বভাবকেই দায়ী করতে পারে; আর যারা আগে সেসময় ২০১৫ সালে এটা দেখতে মিস করেছেন তাদের জন্যই সম্ভবত সেই প্রমাণ এখনো হিন্দুস্থান টাইমসের সম্পাদক আবার হাজির করেছেন!

    লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৩ জুন ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টেও  “নেপাল-ভারত সীমান্তে অসন্তোষ”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ব্যক্তি-লাভালাভের ফসল ট্রাম্প আর মোদীর ঘরে কী উঠবে

    ব্যক্তি-লাভালাভের ফসল ট্রাম্প আর মোদীর ঘরে কী উঠবে

    গৌতম দাস

    ০৮ জুন ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-32U

     

    মোদি ও ট্রাম্প – সংগৃহীত

    চীন-ভারত সীমান্তের পূর্ব-লাদাখ অংশে উভয়পক্ষের সামরিক প্রস্তুতি ও তৎপরতার কথা আমরা গত ২২ মে থেকে শুনে আসছি, যা গত সপ্তাহে একধরনের শঙ্কার চরমে উঠেছিল। এরপর গত ২৮ মে থেকে কানাঘুষা ব্যক্তিগত টুইট থেকে জানা যাচ্ছিল যে, মোদী সরকার দেশীয় মিডিয়াকে সীমান্তে সৈন্য সমাবেশের খবর কম গুরুত্ব দিয়ে বা কম কম ছাপতে গোপন প্রচার চালিয়েছে যাতে পাবলিক এই ইস্যুটাকে আর বিশেষ গুরুত্ব না দেয়। এরপর গত ২ জুন ভারতের নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা জানায়, সামরিক নেতৃত্ব পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সবশেষে গত ৬ জুন আলজাজিরা বলেছে যে ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শান্তিপুর্ণ সমাধানে তারা উভয়ে বিতর্ক নিরসনে কথা বলতে চায় [“……India and China have agreed to resolve a dispute over their shared border in the Ladakh region through “peaceful” diplomatic channels, according to the Indian foreign affairs ministry.”…]  আমাদের আজকের লেখার ইস্যু এ ঘটনায় সর্বশেষ অবস্থান প্রসঙ্গে যে, এটা এখন কোথায় কোন দিকে গেছে বা যাচ্ছে।

    এর আগের সপ্তাহে এই প্রসঙ্গে বলেছিলাম সীমান্তে চীন-ভারত সৈন্য মুখোমুখি অবস্থায় পৌছাবার পিছনের যতগুলো কারণ আছে এর মধ্যে অন্যতম হল মোদী-ট্রাম্পের আরেক শস্তা সমীকরণঃ। মানে এটা ট্রাম্প-মোদীর ব্যক্তিগত লাভালাভের স্বার্থ , ফলে এখানে ভাদের দুই সরকার বা প্রশাসনের অফিসিয়াল কোনো স্বার্থ বা ইস্যুই নয় এটা। যেমন ট্রাম্পের প্রয়োজন আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে নিজেকে আবার জিতিয়ে আনা। তাই ট্রাম্প তাঁর সম্ভাব্য ভোটারদের দেখাতে চান যে তিনি চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার সব ধরনের স্বার্থ নিয়ে লড়াকু এক বেস্ট ক্যান্ডিডেট। যেহেতু চীনের উত্থানেই আমেরিকার গৌরব সব ধূসর ও ম্লান হয়ে গেছে। কাজেই সেই চীন-ব্যাসিংয়ের কাজটা করতে সক্ষম একমাত্র ট্রাম্পই আমেরিকার জন্য বেস্ট ক্যান্ডিডেট। এভাবে তৈরি ইমেজটা দিয়েই ট্রাম্প তাঁর প্রপাগান্ডা মেসেজ চালাতে চাইছে। আর এই ইমেজ তৈরি করার ক্ষেত্রে মোদী ট্রাম্পের প্রধান সহযোগী হতে গেছেন। কারণ এতে বিনিময়ে তারও ব্যক্তি লাভ-স্বার্থ আছে। অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে করোনার আগে থেকেই ভারতের মোদী সরকার খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল। এর উপর এখন করোনার কারণে অবস্থা আরো খারাপ। কাজেই তাঁর সরকারের অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স এখন পাবলিকের কাছে বিরাট প্রশ্নবোধক ইস্যু। অতএব সরকারের পারফরম্যান্স ও যোগ্যতা নিয়ে পাবলিকের অভিযোগ-অসন্তোষের মন ও চোখ সরাতে, হয় পাকিস্তান অথবা চীনের সাথে কোনো সীমান্ত টেনশন তৈরি করা আর সেখান থেকে অবাস্তব হলেও, মোদী কোনোভাবে নিজেকে অন্তত একবার বিজয় অর্জনকারী বীরের ভূমিকায় হাজির করতে পারলে মোদী মনে করেন সেটা এক ‘বিরাট অর্জন’ ও সব অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ঢেকে ফেলার চাদর-কাভার হতে পারে। মোদীর তাই লক্ষ্য হচ্ছে, ট্রাম্পের হয়ে “খেপ মেরে” দেয়ার বিনিময়ে নিজের জন্য এই অর্জন নিশ্চিত করা।  চীন-ভারত সীমান্ত টেনশনে তাই তিনি ইতোমধ্যেই “ট্রাম্প মধ্যস্থতা করতে চান”- এই প্রস্তাব  ট্রাম্পকে দিয়েই বাজারে হাজির করিয়েছেন। যেন নিজ দেশে দেখাতে পারেন ট্রাম্প কতই না ভারতের পাশে আছে। যদিও সারা ভারতের লোক এর আগে ডোকলাম ইস্যুতে দেখেছে আমেরিকা সেবার আসে নাই, বরং না জড়িয়ে দূরে থেকেছে। এছাড়া এখনও ট্রাম্প যা কিছু করছে দেখাচ্ছে তা খোদ তাঁর অফিস হোয়াইট হাউজেরই কোন নীতি-পলিসির অংশ নয়। সবই তার ব্যক্তি-নির্বাচনি জয় লাভালাভের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অফিসিয়াল নয়, “ব্যক্তিগত টুইট” দিয়েই ট্রাম্প বাজিমাত করে চলছেন!

    তাই এসব মিলিয়ে পরিকল্পনা মতে, গত ২ জুন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ভারতের ‘নিউজ১৮’ টিভি কেই এক একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়ে বসেন। কিন্তু কেন নিউজ১৮ টিভি? ব্যাপারটাকে আমরা এভাবে পাঠ করতে পারি যে, রাজনাথের ঐ সাক্ষাৎকারটার মানে হল এই ম্যাসেজ যে, ইতোমধ্যে চীন-ভারত সীমান্ত টেনশন ইস্যুতে ভারত-আমেরিকান  আলোচনা সমাপ্ত হয়ে গেছে। সেখানে পরস্পরের অসুবিধা আর প্রয়োজনগুলো নিয়ে জানা-জানানো ও পরস্পরের পছন্দ হয় এমন কমন অবস্থানও সাব্যস্ত হয়ে গেছে। এখন ঐ আলোচনায় কী সাব্যস্ত হয়েছে মোদী সরকার কী মেনেছেন এর পরোক্ষ অফিসিয়াল স্বীকৃতি বা রেকর্ড তৈরি করে রাখতেই ঐ সাক্ষাৎকার দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাহলে সেটা কেবল নিউজ১৮ টিভিকেই দেয়া কেন? কারণ নিউজ১৮ আর সিএনএন কোনো কোনো ইস্যুতে প্রোগ্রামে, জয়েন্ট ভেঞ্চারে সম্পর্কে চলে। অর্থাৎ সিএনএনের ভারতে কোনো স্বার্থ থাকলে সেটা নিউজ১৮-ই কাভার বা দেখাশুনা করে থাকে। এই অর্থে রাজনাথের ওই সাক্ষাৎকারটা দেয়া হয়েছে পরোক্ষে আমেরিকান সিএনএনকে। যেন সেখান থেকে  ট্রাম্প প্রশাসন অফিসিয়াল ভার্সন সংগ্রহ করে নিতে পারে। অর্থাৎ এটা একটা সাক্ষাৎকারের পাবলিক ভার্সনই কিন্তু মুখ্যত সেই ভার্সনটাই আবার ট্রাম্প প্রশাসনের সংগৃহীত অফিসিয়াল ভার্সন।

    আরও একটা বড় দিক আছেঃ
    ধরা যাক, সীমান্ত সৈন্য সমাবেশ ইস্যুতে শেষে ভারতের সাধারণ জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে গেল যে মোদীর ব্যক্তি-লাভালাভ দেখতে যাবার কারণে ভারতের ৪০-৬০ বর্গকিমি  এলাকা চীনের কাছে সে হারিয়েছে। আর এতে দিনকেদিন মোদীর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়ে গেল আর তা এক পর্যায়ে আমেরিকাকেও দায়ী করা শুরু হয়েগেল যে ট্রাম্পও নিজের ব্যক্তি লাভালাভের জন্য মোদীর পিছনে আছে। তেমন পরিস্থিতি যদি উঠে আসে তাহলে কী হবে? বিশেষ করে বিরোধীদল সকলেই যদি মোদী ও আমেরিকার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তুলতে থাকে?
    তেমন পরিস্থিতির কথা ভেবেই এই সাক্ষাতকার নিয়ে রাখা হইয়েছে। যাতে আমেরিকা তখন অফিসিয়ালি বলতে পারে যে ট্রাম্প যা করেছে সেগুলো তার ব্যক্তি-নির্বাচনি লাভালাভের জন্য করেছে। আর ভারতের সীমান্ত ইস্যুতে এর সাথে আমেরিকার সরকারি নীতি অবস্থানের কোনই সম্পর্কে নাই ও ছিল না। এমনকি ট্রাম্পের “মধ্যস্থতার প্রস্তাব” (যা চীনও না বাস্তবের ভারতও না – উভয়ে এরা কেউই চাইবে না) হোয়াইট হাউজের নীতি-পলিসির সাথে এর কোন সম্পর্ক নাই। একথা চীনের গ্লোবাল টাইমস পত্রিকাও আগেই লিখে বলেছে ‘To what extent Trump’s personal Twitter account reflects the will of the White House remains to be seen’। এখানে পার্সোনাল টুইট একাউন্ট শব্দগুলো লক্ষণীয়।

    এসব কারণের মোদী-ট্রাম্পের ব্যক্তি লাভালাভের প্রয়োজনে  সীমান্তে টেনশন জাগানোর কাজটা যতদুর ঘটাবার ঘটানো হয়ে গেছে।  আর তা শেষ হয়ে গেছে বলেই এই  কারণে ঐ সাক্ষাৎকারে রাজনাথ মূল যে কথাটা বলেন তা হল, দু’পক্ষের সিনিয়র মিলিটারি অফিসারেরা বৈঠকে বসে এখন  ‘মতপার্থক্য’ দূর করে ফেলবে। ভারতের বেশির ভাগ পত্রিকার শিরোনাম কথিত এই মতপার্থক্য শব্দ দিয়েই লেখা। কিন্তু “কী নিয়ে” এই মতপার্থক্য যার জন্য তিন ডিভিশন করে সেনাসামন্তের সমাবেশ ঘটাতে হলো? মিডিয়া এটার নাম দিয়ে বলছে “সীমান্ত বিতর্ক’ বা “বর্ডার ডিস্পুট নিয়ে মতপার্থক্য”। আবার যেসব পত্রিকা  রাজনাথকে সরাসরি উদ্ধৃত করেছে তাদের লেখায় রাজনাথ কিভাবে সীমান্ত উত্তেজনাকে মোলায়েম করা ভাষায় তুলে ধরছেন তা লক্ষণীয়। প্রথমত, রাজনাথ এটাকে সীমানা বিষয়ে দু’দেশের দু’রকম ধারণাজাত [The difference arose regarding the perception of LAC..…. ] একেবারেই এক তুচ্ছ সমস্যা বলে দাবি ও চিহ্নিত করে সব উত্তেজনায় ক্রমাগত পানি ঢেলে গেছেন। বলেছেন, এলএসি (LAC) বা “দু’দেশের দখলে থাকা” ভূমির সীমানা নিয়ে আমাদের দু’দেশের যে পারসেপশন; এই পারসেপশনে ভিন্নতার কারণে আমাদের মতপার্থক্য। এরচেয়েও মোলায়েম ভাষ্য এরপরেও আছে। রাজনাথ বলছেন, “এতে চীনারা বেশ ভালো সংখ্যায় […Chinese have come in good number…]. অর্থাৎ তিনি চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন না, ঘটনার বর্ননা দিচ্ছেন কেবল – এতই উদার আর নিরপেক্ষ তিনি।  কারণ সীমান্তে টেনশন জাগাবার বিজেপির মূল উদ্দেশ্য পুরণ হয়ে গিয়েছে। তাই এর সাথে জুড়ে বলছেন ভারতও তাতে ‘প্রয়োজনীয় সংখ্যক’ (…India has also done whatever is required…… ) সৈন্য জমায়েত করেছিল”। কেন তিনি এত মোলায়েম ভাষায় কথা বলছেন সাথে এরও এক সাফাই যোগান দিতে গিয়ে বলছেন, “এমনকি আগেও যখনই সীমানা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে যেমন ওই ডোকলামে (ভুটানে চীনা সীমান্ত নিয়ে) তখনও আমরা সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে কথা বলেই মতপার্থক্য মিটিয়ে ফেলেছিলাম”। সারকথায় এখানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং কেবল বলতে বাকি রেখেছেন কিন্তু না বলে বুঝিয়ে দিয়েছেন যেন – ‘আমরা দুই রাষ্ট্র আসলে খুবই ভালো। আমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। ট্রাম্প-মোদীর যে ব্যক্তি-লাভালাভ এ’থেকে তুলে আনার কথা ছিল তা এখন পুর্ণ হয়ে গেছে। তাই আপনারা আর খামোখা চিন্তা করবেন না”।
    কিন্তু বাস্তবের ভারতের একেবারেই ভিন্ন। ভারতের মিডিয়াগুলো ক্রমশ অসন্তোষে ভরে উঠতে শুরু করেছে। আর তা ভরে তুলতে শুরু করেছে মূলত অবসরে যাওয়া সিনিয়র জেনারেল বা লেফটেন্যান্ট-জেনারেলদের মিডিয়ায় সরবে তাদের লিখে বলা সব অসন্তোষ। তাদের মধ্যে অন্তত দু’জন প্রকাশ্যেই তাদের অসন্তোষ, আপত্তি ও সরকারি ব্যাখ্যায় গরমিল নিয়ে প্রশ্ন আর সর্বোপরি চীন আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি ভূখণ্ড দখল করে ফেলেছে- এসব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এ’দু’জন ব্যক্তিত্ব হলেন- এক. সাবেক উত্তরের আর্মি কমান্ডার লে. জে ডিএস হুডা (রিটায়ার্ড) [Lt Gen. Hooda]। আর অপরজন হলেন লে. জে এইচএস পানাগ (রিটায়ার্ড) [LT Gen. H S PANAG]। মিঃ পানাগ আবার নানান রাষ্ট্রীয় চক্র-পদকধারী যেটা “পদ্মভুষণের” একধাপ নিচে।
    লে. জে পানাগ ক্ষুব্ধভাবে লিখছেন, “অফিসিয়ালি দু’পক্ষই বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা ও কূটনীতিক আলোচনায় বিবাদ মিটানোর উপর আস্থা প্রকাশ করেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, কূটনীতিক ও মিলিটারি পর্যায়ে আলাপ আগাচ্ছে। কেবল এলএসি’র ‘পারসেপশনে মতপার্থক্য’ শব্দটাকে কুপিয়েছেন তিনি [……While harping on “differing perceptions” about the Line of Actual Control (LAC), Singh said the Chinese presence along the LAC was in “achhi khasi sankhya (sizeable numbers)”. ]। আবার ‘আচ্ছা সংখ্যক’ চীনা সৈন্যের উপস্থিতির কথাও বলেছেন”।
    ইতোমধ্যেই মেজর জেনারেল পর্যায়ে ২ জুনই আলোচনা হয়ে গেছে। এখন ৬ জুন অসমাপ্ত আলোচনা আবার হবে। তবে এবার তা হবে লে. জে. অফিসার পর্যায়ে। আর এতেই তিনি অসন্তুষ্ট।

    লেফটেনেন্ট জেনারেলদের ক্ষোভ অসন্তোষঃ 
    লে. জে পানাগের আরও ক্ষুব্ধ আপত্তি হল, এবারের সৈন্য সমাবেশের পরিণতি নিয়ে। তিনি বলছেন, “ইতোমধ্যেই গত জুনের শুরুতে চীনারা বিভিন্ন জায়গায় ৪০-৬০ বর্গকিমির মতো এলাকা যা আগে ভারতের দখলে ছিল তা দখল করে নিয়ে গেছে। ফলে এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে এখন আলোচনার টেবিলে চীনারা কথা বলবে আপারহ্যান্ডে থেকে, গলা চড়িয়ে। ফলে হারানো ভূমি ফেরত পাওয়া ভারতের জন্য মুশকিল হবে। এটাই এই লে. জে-এর বিরাট আপত্তির জায়গা [Having seized the initiative by securing approximately 40-60 square km of Indian territory in three different areas, China will be negotiating from a position of strength and will try to impose unacceptable conditions–no further development of border infrastructure on the Indian side–to restore status quo on its own terms.]

    কারণ তিনি আরও ভয়ের কথা তুলে বলছেন, এখন আলোচনা যদি একেবারে ফেল করে যায় তবে চীন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে বলে একটা গ্যাঞ্জাম বা “সীমিত যুদ্ধ” লাগিয়ে এখন যা দখল করেছে সেসব দখল স্থায়ী করে ফেলতে পারে [If diplomacy fails, China has come prepared for a border skirmish or a limited war.]। এ কারণে এবার মোদীর বিরুদ্ধে তিনি নামধরে সরাসরি অভিযোগ এনে বলছেন, এই পরিস্থিতিতে “পরিস্কার কোন স্ট্রাটেজি নিয়ে না আগানোতে মোদী সরকার ও তাঁর সামরিক বাহিনী এসব অভিযোগ (ভূমি হারানোর অভিযোগ) ‘অস্বীকার’ (ডিনায়েল) করে আর ‘সীমান্ত পারসেপশনের ভিন্নতা’ আছে বলে পার পেতে চাইছে” [… rather than evolving a clear strategy and broadly sharing it with the nation, the Narendra Modi government and the military have gone into ‘denial’ about any loss of territory, attributing the present situation to differing perceptions about the LAC.]।
    তিনি আরো অভিযোগ এনেছেন যে, কিছু সাংবাদিককে সরকার নামিয়েছে ‘সীমান্ত পারসেপশনের ভিন্নতা’ বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য [Some journalists and activists are also busy peddling their interpretation ……]। তাই লে.জে পানাগের  সারকথা, এতে চীনাদের আর কী লাগে! ভারত এখন চীনাদের হাতে নাচা পুতুল হয়ে যাবে [. What else does China want? We are playing into its hands.]।
    এমনকি ঐ লেখাটা তিনি নিজের নামে দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় লিখেছেন, যার শিরোনামে আরো ভরপুর ক্ষোভ ও উসকানিমূলক শব্দ আছে। ভারত যে ভূমি হারিয়েছে বলে তিনি দাবি করছেন, তার স্যাটেলাইট ম্যাপের ছবি জোগাড় করে তা ঐ পত্রিকা-রিপোর্টে ছাপিয়ে দাবি করে লিখেছেন যে, ঐ হারানো ভূমির ছবি দেখতে হাতের আঙুলের মতোন। তাই নিজের লেখার শিরোনাম দিয়েছেন, “ভারতের আঙুল চীনের বুটের নিচে চাপা পড়েছে, ‘অস্বীকার’ করে লাভ হবে না [India’s Fingers have come under Chinese boots. Denial won’t help us]।”

    ঐ একই দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় স্নেহেশ এলেক্স ফিলিপ নামে আরেকজন রিপোর্টার বিভিন্ন সেনা কমান্ডারের মতামত সংগ্রহ করে আরেকটা রিপোর্ট লিখেছেন লে.জে পানাগের মতনই প্রায় একই ধরনের সব অভিযোগে। তিনি  “নজিরবহীন” [Unprecedented] শব্দটা ব্যবহার করে বলছেন, এই শব্দটা ভারতের জেনারেলদের বেশির ভাগই ব্যবহার করে তার সাথে কথা বলেছেন। তাদের দাবি চীন-ভারত সীমান্তবিরোধ মীমাংসার লক্ষ্যে ২০১৩ সালের চুক্তিতে দু’দেশের সেনাদের মধ্যে ডায়লগের যেসব প্রটোকল সাব্যস্ত হয়ে আছে সে অনুযায়ী লে. জে পর্যায়ের অফিসারেরা বৈঠকে যদি বসে তাতে প্রতিষ্ঠিত প্রটোকল ভঙ্গ করা হবে। কারণ প্রটোকলে লোকাল ট্যাকটিক্যাল কমান্ডার (পদবি মেজর জে. মর্যাদার) লেভেলে ডায়লগের করার কথা বলা হয়েছে […according to the established protocol, talks are held at the local tactical commander level. In the past, the highest level of talks have involved divisional commanders, who are major general-rank officers.]।

    “ফলে এখন ভারতের ১৪ কোর কমান্ডারকে চীনের মেলিটারি ডিস্ট্রিক কমান্ডারের সাথে বসতে হবে” [India’s 14 Corps Commander will meet the chief of China’s Southern Xinjiang Military District on 6 June in eastern Ladakh after the protocol in place ]। এ জন্য তাঁরা সকলে এটাকে “নজিরবিহীন” বলছেন। এই প্রসঙ্গে আরেকজন লে. জে ডিএস হুডা (রিটায়ার্ড) গত দিন এক অনলাইন সেমিনারে মন্তব্য করেছেন, তিনিও এমনটা জীবনে কখনো দেখেননি [“I have not seen Corps Commander level officers carrying out military talks,” ]। স্নেনেশ লিখেছে, এই প্রটোকল মানা না মানা নিয়ে গত দিনের অনলাইন সেমিনারে অন্য রিটায়ার্ড অফিসারদের মধ্যে অনেক তর্কবিতর্ক হয়েছে।

    এর মানে হল, তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের ব্যাখ্যা ও অনুমান সঠিক যে মোদী-ট্রাম্প তাদের ব্যক্তিগত লাভালাভের স্বার্থ মিটাতে চীন-ভারত লাদাখ সীমান্তে সেনা সমাবেশ ঘটানোর পক্ষে উসকানি তৈরি করেছে। কিন্তু এখন ঘটনাচক্রে লাভের পাল্লা চীনের দিকে চলে যাওয়া এই হাতছুট ঘটনা ঘটে যাওয়ায় সিনিয়র সামরিক অফিসাররা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন আর সাংবাদিকদের পর্যায়ে প্রবল হারু-পার্টি হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে হাহাকার উঠে আসছে। আর মোদীর পক্ষের লোকেরা ততই [denial] বা অস্বীকার করে ব্যক্তিপর্যায়ে লাভের ফসল ঘরে তুলতে চাইছেন – আর বিরোধ বেধেছে এখানেই।
    লক্ষণীয় যে, কোনো সিভিল কূটনীতিক লোক মোদি-রাজনাথের এখনকার পরিকল্পিত ডায়লগের কোনো পর্যায়ে আর যুক্ত নাই। এর মানে হারানো ভূমি উদ্ধারের দায় এখন পুরাটাই সামরিক অফিসারদের উপর। আর ভূমি উদ্ধার না হলে বা সীমিত যুদ্ধে তা স্থায়ীভাবে চীনের কাছে ভারত হারিয়ে ফেললে সে দায়ও হবে সামরিক অফিসারদের। এখন মোদী ব্যক্তিগত লাভালাভ তার ঘরে তুলে নেয়ার বিনিময়ে ভারত রাষ্ট্রকে এর কাফফারা দিতে হতে যাচ্ছে, খুব সম্ভবত। এটাই ব্যাপক উদ্বিগ্নতা সৃষ্টি করছে। এদিকে গত ৬ জুনের লে.জে অফিসার লেভেলের চীন-ভারত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েও কোন ফলাফল হাজির করতে পারে নাই। ফলে উত্তেজনা বেড়েই চলছে।
    শেষ পর্যন্ত কী ঘটে সেটি দেখতে সম্ভবত আর দু’দিন অপেক্ষা করতে হবে!

    ওদিকে মোদীর মতই ট্রাম্পও সম্ভবত আরো বড় বিপদেই পড়ে গেছেনঃ
    ওদিকে ট্রাম্পও প্রায় একই অবস্থায় ইতোমধ্যে পড়ে গেছেন। আগে থেকেই মোদি-ট্রাম্পের সখ্যতার ভিত্তি হল দু’জনই নিজ-রাষ্ট্রের অমীমাংসিত নানান রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে নাড়াচাড়া করবেন কোন সমাধান করার জন্য নয় বরং নিজেদের ব্যক্তি ইমেজ গড়তে এসব ঘটনাকে কাজে লাগাতে চান বলে। যেমন হংকংয়ের স্বাধীনতা নিয়ে চীন সমস্যায় আছে আর তা বেশ পুরানা। কিন্তু তা নিয়ে এই সময়ে চীনের বড় কোনো গোলযোগে পড়ার কথা নয়। কেবল,  ১৯৮৯ সালে চীনের তিয়েনানমেন স্কয়ার ম্যাসাকারের বার্ষিকীগত ছিল ৪ জুন ২০২০। হংকং আন্দোলনকারীরা সেটা পালন করতে চাইলে কিছু উত্তেজনা তৈরি হবে এই আশঙ্কায় স্বভাবতই হংকং সরকার ওই বার্ষিকী পালনে অনুমতি দিবে না। দেয়ও নাই। কিন্তু ট্রাম্প এটাকে নিয়েই নাড়াঘাটা করতে তার ব্যক্তিলাভের পরিকল্পনা সাজিয়েছিল। তিনি তাইওয়ানকে দিয়ে হংকংয়ের স্বাধীনতার দাবি সমর্থন করিয়ে উস্কানি বাড়িয়ে তুলেছেন। আর তাতেই উত্তেজনা আরো বড় করে দেখাতে মার্কিন নৌবহরের তাইওয়ানের দিকে টহলের আয়োজন শুরু করান ট্রাম্প। ব্যাপারটা হল, আজ হয়ত এই সন্দেহজনক ভাষায় এই বিষয়গুলো নিয়ে লিখতে বসতে হত না যদি ট্রাম্প এই কাজগুলো সিরিয়াস হয়ে করতেন, নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি হিসেবে করতেন। কিন্তু না, ট্রাম্পের উদ্দেশ্য এসব উত্তেজনাকে আমেরিকান নির্বাচনের আগে তিনি ‘চীন-ব্যাসিং লড়াকু প্রার্থী’ নিজের এই নির্বাচনী ইমেজ গড়তে কাজে লাগানো- এসবই দেখানোর একেকটা শো মাত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চান!

    কিন্তু অলক্ষ্যে ন্যায়ের ঘণ্টা সম্ভবত হেসে বেজে উঠেছিল। কে জানত ঠিক এ সময়েই কালো আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েড কালো বলে এক পুলিশের নৃশংসতায় খুন হয়ে যাবেন! আর আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমা দেশ ক্ষোভে রাস্তায় ফেটে পড়বে! এই লেখার কয়েক ঘণ্টা আগে প্রকাশিত আলজাজিরার একটা খবরের শিরোনাম পাঠ করে আগাবো, তাহলে কম কথায় ব্যাপারটা বলা যাবে। পেছনের মুলঘটনাটা হল, ফ্লয়েড মারা যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার রাস্তায় রাস্তায় কালো-সাদা নির্বিশেষ অংশগ্রহণে বিক্ষোভ শুরু হলে এতে ট্রাম্প খুবই খারাপভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান। এতেই তিনি ধরা পড়ে গেলেন যে তিনি ব্যক্তি মানুষ হিসেবে কেমন!

    একজন নির্বাচিত নির্বাহী প্রেসিডেন্ট আর পাবলিকের মধ্যে সম্পর্কটাই বা কী তা ট্রাম্প আজীবন বুঝতেই পারলেন না। বুঝতেও চাননি, খেয়াল করে দু’দণ্ড বুঝবার চেষ্টাও করেননি দেখা যাচ্ছে। অথচ পাবলিক তাকে  সমর্থন বা ভোট দিয়েছে বলেই তো তিনি প্রেসিডেন্ট এবং তিনি পাবলিকের সাক্ষাৎ রিপ্রেজেন্টেটিভ, প্রতিনিধি। ফলে পাবলিকলি তিনি আর যা খুশি করার ব্যক্তি এমন নিজ খেয়ালখুশির ইচ্ছাধীন নন যে, যা মনে চায় তা তিনি আর বলে ফেলতে পারেন না, করতে পারেন না! কারণ তিনি পাবলিকের সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিনিধি। অর্থাৎ যিনি রিপ্রেজেন্টেশন শব্দটার মর্মই সারা জীবনে বুঝতে পারলেন না তিনিই হয়ে গেছেন আমেরিকান এক প্রেসিডেন্ট। আমেরিকান জনগণের এতটাই দুর্ভাগ্য বলতে হবে! আবার সেই ট্রাম্প তিনিই হলেন ব্যক্তি ব্যবসায়ে অর্থকড়ি খোয়ানো হতাশ এক দেউলিয়া ব্যবসায়ী; মধ্যপ্রাচ্যের শেখেরা কোন এককালে যাকে দয়া করে তাদের পকেটমানির কিছু অংশ দিয়ে দানখয়রাত করে ট্রাম্পকে দেউলিয়ামুক্ত করে রেখেছিল। এমন চরম অরাজনৈতিক ও দুস্থ ব্যবসায়ী ট্রাম্প তাই অতএব ফ্লয়েডের খুন হওয়ার প্রতিবাদ মিছিলকে তিনি খামোখাই যেচে নিজের কান্ধে তুলে নিয়ে ব্যাপারটাকে দেখলেন এরা যেন তাঁর বিরোধী সব মানুষের তৎপরতা ও কাণ্ডকারখানা হিসেবে। কখনও খেয়ালই করেন নাই, নাগরিক ক্ষুব্ধ হলেই তারা রাষ্ট্রের প্রতিরূপ প্রেসিডেন্টের কাছেই আপত্তি অভিযোগ তুলে।

    অথচ তাই এখানে দরকার ছিল সিম্পল একটু সহানুভূতি আর জনমনের ক্ষোভে পাশে দাঁড়ানো! আপন করে নিয়ে দুটো কথা বলা। তিনিও ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে, এই কথাটাই নতুন করে আবার বললে সেটা অবশ্যই নাগরিকের মনে সাহস জোগাবে। তাই এমন কিছু শব্দে আবার সেসব কথাগুলোই ঘোষণা করতে হয়, প্রতিশ্রুতি পুণর্ব্যক্ত করতে হয়, শপথ নিতে হয়। কিন্তু উল্টো তিনি হম্বিতম্বি করা শুরু করলেন হাভাতে লোকের মত। ইনি ঘোষণা করলেন তিনি নাকি এবার সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে এই প্রতিবাদবিক্ষোভ ভেঙে দেবেন, ব্যবস্থা নেবেন ইত্যাদি। হাভাতে বললাম এজন্য যে প্রায় সময়ই তিনি এমন সব উদ্ভট প্রতিক্রিয়া দেখান, যেনবা তিনি এক প্রবল প্রতাপের রাজা! আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর ব্যাপক নির্বাহী ক্ষমতা আছে অবশ্যই। কিন্তু এসবই যেন তাঁর ব্যক্তিগত, তাঁর ব্যক্তি সম্পদের মত – এই হল ট্রাম্পের নিকৃষ্টতম অরাজনৈতিক অনুভব ও অনুভুতির প্রকাশ। কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই যেনবা এসব ক্ষমতা তিনি যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করতে পারেন!

    এখন আলজাজিরার প্রকাশিত রিপোর্টের  শিরোনামটা ছিল এমন– ‘জেনারেলেরা বিদ্রোহে: মার্কিন মিলিটারি নেতাদের ঝাঁজালো তাপ কেমন ট্রাম্প তা বুঝছেন”।

    [Revolt of the generals: Trump faces heat from US military leaders]

    বলাই বাহুল্য এটা ট্রাম্পের মুখে সরাসরি পাবলিকলি মারা একটা থাপ্পরের মত। সেই সাথে ঐ আলজাজিরা রিপোর্ট আরো বলছে যে, প্রেসিডেন্টের ডিফেন্স সেক্রেটারি (মন্ত্রী) মার্ক এসপার পেন্টাগণে উপস্থিত হয়ে বলেন , কনস্টিটিউশন মোতাবেক প্রেসিডেন্টকে পাবলিকলি মনে করিয়ে দিতে তিনি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন যে “একটিভ-ডিউটিতে আছে যেসব মিলিটারি সদস্য ফোর্স তাদের কাউকেই প্রেসিডেন্ট কোন “শান্তিপুর্ণ গণবিক্ষোভ-প্রতিবাদের” বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারেন না” [active-duty military troops should not be used to quell the protests]। সোজা কথায় এমন মিলিটারি ডাকার হুমকি প্রেসিডেন্ট দিতেই পারেন না। আর তাঁর এই কথা শুনে এবার পেন্টাগনের উপস্থিত জেনারেলরা ডিফেন্স সেক্রেটারির স্বপক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে্ন। মার্ক এসপার পরিস্কার করে দিয়ে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট করতে পারেন একেবারেই অন্য উপায়হীন হয়ে পড়লে, খুবই শোচনীয় পরিস্থিতিতেই একমাত্র, এসপার যোগ করেন।
    আর তাতেই এখনকার ট্রাম্প প্রশাসনের টপ জেনারেল মার্ক মিলি তিনিও এরপরে একই দিনে একটা পাবলিক ঘোষণা দেন। তাতে তিনি লেখেন যে, তিনি আমেরিকান মিলিটারি লিডারদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে কনস্টিটিউশনাল শপথ নেয়া বাক্য অনুসারে তাঁরা “জনগণের কথা বলার স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ জমায়েতের অধিকার রক্ষা” করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

    General Mark Milley, the top US commander, later the same day issued a memo to military leaders reminding them of their oaths to protect the US Constitution and the “right to freedom of speech and peaceful assembly”.

    এর সোজা মানে তারা সকলে মিলে  প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাপড় খুলে নিয়েছেন। আলজাজিরার ভাষায়, এটা বিরলদৃষ্ট এক দুর্ঘটনা! [A rare public rift has opened… ]

    এর মানে ট্রাম্পও কী মোদীর মতই নির্বাচনী বা ব্যক্তিগত লাভালাভ ঘরে তুলতে পারলেন না, ব্যর্থ হয়ে গেলেন? আসন্ন নভেম্বর নির্বাচনে ট্রাম্প ব্যাপকভাবে হারতে যাচ্ছেন?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৭ জুন ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “ট্রাম্প-মোদি দু’জনই কি সব হারাবে”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • চীন কী মোদীর ভারতকেও নেহেরুর মতই শিক্ষা দিবে

    চীন কী মোদীর ভারতকেও নেহেরুর মতই শিক্ষা দিবে

    গৌতম দাস

    ০১ জুন ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-31G

    ইন্ডিয়া-চায়না বর্ডারে মুখোমুখি ২০২০_

    এই মুহূর্তের দুনিয়ায় বিশেষ করে এশিয়ায় সবচেয়ে উত্তেজনাকর, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে করোনাভাইরাস ইস্যুকে ছাড়িয়ে উত্তেজনাকর- এমন খবর হল, লাদাখে চীন ও ভারতের মুখোমুখি সৈন্যসমাবেশ, গায়ে হাত না লাগিয়ে ধাক্কাধাক্কি ইত্যাদি। তা একটা নদীর [Galwan River valley, Pangong Lake and other areas] দু’পারে বিমানবাহিনীর সমাবেশ ঘটানো পর্যন্ত এগিয়ে গেছে। এসব ঘটনা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার নিউজে অথবা  সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও ক্লিপে ছড়িয়ে পড়েছে, আমরা দেখতে পাচ্ছি। এসব দেখার পরেও চীন-ভারত যুদ্ধ লেগে যাচ্ছে কি না, এ নিয়ে যাদের এর পরও বিশ্বাস করতে মন চায়নি; তাদেরও হিলিয়ে দেয়া ঘটনাটা হল, গত  ২৬ মে’র চীনা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখানো এক রিপোর্ট যা রয়টার্সের বরাতে বাইরের দুনিয়ায় আমরা জেনেছি। এটা মূলত অভ্যন্তরীণভাবে চীনা সেনাবাহিনী পিএলএ বা পিপলস লিবারেশন আর্মিকে উদ্দেশ করে দেয়া তাঁর নির্দেশ। তাদের বার্ষিক সভা চলাকালীন প্লেনারি সেশনের ফাঁকে দেয়া কমিউনিস্ট পার্টি সেক্রেটারি ও চীনা প্রেসিডেন্টের দেয়া বক্তব্য।
    সেখানে তিনি বলেন- ১. ‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে যেতে পারো তোমরা, এটা ধরে নিয়ে প্রস্তুতি নাও। ২. যুদ্ধপ্রস্তুতির ধাপ উপরে তুলো। ৩. নির্ধারকভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার প্রস্তুতি নাও ইত্যাদি ধরনের ‘সৈনিকদের উত্তেজিত করা’ বক্তব্য তিনি ব্যবহার করেছেন। হংকং থেকে প্রকাশিত এশিয়াটাইমস-এর ভাষায়, এটা ‘চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রতিবেশী ভারতকে লক্ষ্য করে বলতে সচরাচর দেখা যায় না এমন যুদ্ধবার্তা [an unusually belligerent message directed at neighboring India.]।

    [এই রচনার দৈর্ঘ অনেক বড় মনে হবে যেসব পাঠকের কাছে তারা নিচের প্যারার মত যেগুলো ডানদিকে চেপে অনেক ছোট করা আছে এমন প্যরাগুলো পুরা বাদ দিয়েই পড়তে পারেন। কম-চওড়ার এসব প্যারা মানে আসলে এই অংশ বিস্তারিত করতে লেখা হয়েছে। ফলে এই অংশগুলো বাদ দিয়েও কম দৈর্ঘে ফলে কম সময়ে লেখাটা পাঠ করে শেষ করা যেতে পারে।]

    Line of Actual Control (LAC) মানে, দাগ দেয়া নাই এমন অচিহ্নিত সীমান্তঃ
    আমাদের এদিকের বিশেষ করে ভারতের সকল মিডিয়া সারাদিন তার পাঠক-দর্শকদের কাছে রিপোর্ট করে যাচ্ছে যে এই চীনা হামলা শুরু হয়ে গেল কী না! এটা স্বাভাবিক কারণ ভারতের সব স্তরের মানুষের জীবন-অর্থনীতি এর সাথে জড়িত। তাদের জীবনে কী উলটপালট হতে চলেছে সেই খবর-ইঙ্গিতে জুড়ে থাকা উদ্বিগ্নতাও এটা বয়ে আনছে।  আর আমরাও তাদের উত্তেজনা ও অস্থিরতার প্রভাবে সেসব নিউজ প্রভাবের অন্তত কিছু অংশ আমরাও দেখতে পড়তে বাধ্য হচ্ছি।
    কিন্তু সেখানে গিয়ে অপরিচিত কিছু টার্ম বা শব্দের ব্যবহারের কারণে আমাদের অনেকের সম্ভবত বুঝতে কিছু সমস্যা হচ্ছে। যেমন, এলএসি (LAC বা লাইন অব একশন)। এই শব্দের উতপত্তি বা অর্থ কী? তা বুঝাতে খুব সংক্ষেপে বললে – চীন-ভারতের সীমান্তবিরোধের উতপত্তি কোথা থেকে এবং কেন, এই প্রশ্ন থেকে শুরু করব। আমাদের অনেকের বড় ভুল ধারণা হল, রাষ্ট্র, সীমান্ত বা সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি ধারণাগুলো বুঝি আজীবনই ছিল। অনেকে আবেগের ঠেলায় এটাকে দেড়-দুহাজার বছরের পুরানা আমলেও এমন ধারণা প্রচলিত ছিল বলেও মনে করে বসেন। কিন্তু ইতিহাস হল, এই তো মাত্র ১৬৪৮ সালে প্রথম রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ধারণাটা প্রচলন শুরু হয়েছিল। কিছু ছোট ছোট ঘটনা থেকেই এখনই এর প্রমাণ আমরা পেতে পারি। যেমন পুরানাকালে রাজধানীর নামই দেশ-ভুখন্ডের নাম বলে আমরা দেখে থাকি আমরা। যেমন সে আমলে ইরাক বলে কিছু নাই, কিন্তু বাগদাদে আব্বাসীয় খলিফা শাসন ছিল জানি। ইতালি নাই, কিন্তু রোম ছিল। সিরিয়া নাই কিন্তু দামাস্কাস ছিল। সারকথা, ঠিক রাষ্ট্র ধারণাটা তখন অত জরুরী না, বিকশিতও হয় নাই তেমন। মূলকারণ প্রায় সবই ছিল মুলকথায় একেকটা মনার্কি বা রাজতন্ত্র। অর্থাৎ পাবলিকের যে বলার কিছু থাকতে পারে বা ‘নাগরিক’ ধারণা আসে নাই বলে, নাগরিকই নির্ধারক এই বোধ তখনও গরহাজির, অবিকশিত।  তাই দেশ ধরণের ধারণা আছে কিন্তু তার সীমানা কতদুর সেটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না, এমন পরিস্থিতিই বজায় ছিল। তাই রাজধানী বা মূল শহরের নামই রাজার ভুখন্ডের নাম। এরপর প্রথম সীমানা ভাগ করে নেয়া বা সার্বভৌম ধারণার কথা উঠে ও প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় সারা ইউরোপের আপোষে ভাগ বাটোয়ারায়, ১৬৪৮ সালে। হলি রোমান এম্পায়ার (পুরান রোম-কেন্দ্রিক রোম সাম্রাজ্য নয়) ভেঙ্গে সীমানা চিহ্নিত করে ইউরোপে আলাদা আলাদা সব রাষ্ট্র হয়ে যাওয়া। খ্রীষ্টিয় ৮০০ সালে এর পত্তন ঘটেছিল [Charlemagne in the year 800]। এখানে সার্বভৌম কথার অর্থ হল, যতদুর ভুখন্ডের উপর সর্বময় ক্ষমতা কর্তৃত্ব ঐ দেশ-রাষ্ট্র বা সরকারের আছে বলে স্বীকার করে নেয়া হয়। কাজেই সার্বভৌমত্বের ধারণা আর দেশ-রাষ্ট্র সীমানা নিয়ে আমাদের সচেতন হয়ে উঠা একই ধারণা, একই সময়ের ধারণা। ইউরোপের এই ধারণাই আস্তে আস্তে সারা দুনিয়ায় পরে ছড়িয়ে পড়েছিল।
    তা না হয় হল, কিন্তু সেই ধানভাঙ্গার গীত এখানে কেন? আসলে এতক্ষণ হল পটভুমি গুছানো। এরপর এখন সরাসরি আমাদের  – রাষ্ট্র সীমানা বা বর্ডার  – প্রসঙ্গে ঢুকবো। দুনিয়ার বহু অসন্তোষের এক প্রধান উতস হল তিনশ বছরের কলোনি দখল ও শাসন।  তাই এই চরম অন্যায় জুলুম নির্যাতনের স্বপক্ষে আমাদের কোন সহানুভুতি থাকবার কোনই কারণ নাই, আগামিতে হবে না।  কিন্তু অনেক সময় “পড়ে পাওয়া” ঘটনা থাকে। মানে খারাপ করতে চেয়েও অজান্তে ফাঁক দিয়ে অনিচ্ছায় কিছু ভাল জিনিষ হয়ে যায়। একে “খারাপ উদ্দেশ্য অজান্তে কিছু ভাল কাজ ঘটিয়ে ফেলা” – বলতে পারি। যেমন বৃটিশ-ইন্ডিয়াতে বৃটিশ কলোনি শাসকেরাই প্রথম সে আমলের ইন্ডিয়ার “সীমানা চিহ্নিত” করিয়েছিল।  সীমানা চিহ্নিত করা কথাটায় গুরুত্ব দিতে বলব। এই কাজটা একা মানে একা কোন রাষ্ট্র করতে পারে না, তা করা ও মানাও হবে না বলে।  যেমন, নেপাল আর ভারতের সীমানা ঠিক কোথায় হবে সেটা একা নেপাল অথবা একা ভারত করলে লাভ হবে না। কারণ, সীমানা টানা মানে পড়শিরও সেই সীমানা মেনে নেয়া হতে হবে। এবং একই দলিল দুজনের কাছেই, একই কপি থাকতে হবে। যার অর্থ সব আগামি বিতর্কের মাথা মুড়ে দেওয়া হয়ে যাবে এতে। সীমানা তাই একসাথে বসে একমতে টানতে হয়। তবেই সেটা ডিমারকেশন হবে।  এভাবে পুরা বিষয়টাকে ডিমারকেশন [Demarcation] বা সীমানা চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া বলে বুঝতে হবে। এই কাজটাই, বৃটিশ-ইন্ডিয়ার বেশীর ভাগ অংশই এভাবে পড়শির সাথে ডিমারকেট করে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এটা খারাপ লোকের বিরাট ভাল কাজ বলছি কেন?
    কারণ গত তিনহাজার বছরের মানব ইতিহাসও যদি ধরি,   দেশ-রাজ্যের ভুগোল মানেই তা হল আসলে ক্রমাগত দখল আর পাল্টা-দখলে বিভিন্ন রাজ-রাজরা শাসনের ইতিহাস। এখন একালে বসে এতসবের মধ্যে কোন রাজার সময়ের সীমানাটাকে একালে সহি মানব? বিশেকরে একালের দুই দেশের বিতর্কে একেকজনে একেকটাকে সীমানার ভিত্তি বলে দাবি করতে থাকলে এনিয়ে বিতর্কের শেষ করে সমাপ্তি টানা কখনই সম্ভব হবে না।  আমরা জানি সীমান্তবিরোধ থেকেই অনেক বড় বড় যুদ্ধ লেগেছে। এইকথা মনে রেখে যুদ্ধ এড়ানোর লক্ষ্যে জাতিসংঘ ভুমি-নৌ-আকাশ সীমানা চিহ্নিত করার ভিত্তি কীহবে তা নিয়ে আন্তর্জাতিক নানান নিয়ম-কানুন কনভেনশন তৈরি করেছে। সেই ভিত্তি ঠিক করার পদ্ধতি নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রের কনভেনশনে সাব্যস্ত করা সর্বসম্মত পথ হল কলোনি আমলের চিহ্নিত বা তৈরি ম্যাপ বা কলোনি ডিমারকেশনেই সব পক্ষের কাছেই গ্রহণযোগ্য সীমানা বলে মেনে নেয়া হবে । অর্থাৎ আগে যা হয়েছে হয়েছে যেহেতু কলোনি আমলে একবার সবপক্ষকে নিয়ে বসে সীমানা টানা হয়েছিল আর এর রেকর্ড সবপক্ষের জন্য পাওয়া সহজ ও এভেইএবল, তাই ঐ ম্যাপই সবাই গ্রহণ করে চলবে। তাহলে এখন চীন-ভারত সীমানার কলোনিয়াল ম্যাপ নিশ্চয় আছে, তাহলে আর এখন  বিরোধ আবার উঠে আসছে কোথা থেকে?

    কারণ কলোনি শাসকেরা সকল সীমান্তের ম্যাপ টানেন নাই। তবে ঠিক ঢালাওভাবে নয়। কিছু কিছু পকেটে সীমানা-বিরোধ সেকালেও বিতর্কিত থাকাতে মিটানো যায় নাই বা হয় নাই। এছাড়া  কলীনি মালিকদের আগ্রহ বা দরকারের তীব্রতা না থাকায় বহু এলাকাতেই (পকেটে) কখনও সীমানা চিহ্নিত করার আসর বসেই নাই। এছাড়া এমন আরেক বড় সমস্যা ছিল কিছু এলাকায়। এমন ফাঁকা সীমান্ত হল কলোনি আমলের “প্রিন্সলি স্টেট” বা করদ রাজার রাজ্যগুলো। কারণ ইন্ডিয়া বলে একটা অখন্ড একটা দেশ বা রাষ্ট্র এমন ভারতবর্ষ বলে কোনদিনই কিছু ছিল না, বৃটিশ আমলেও না। লিগাল স্টাটাস বা মর্যাদা হিসাবে প্রিন্সলি স্টেট বৃটিশ-ইন্ডিয়ান ভুমি নয়। তবে কিছু বিশেষ শর্ত চুক্তিতে আবদ্ধ আগের মতই অনুগত রাজার রাজ্য ভুমি। তাই প্রিন্সলি স্টেট হিসাবে কাশ্মীর – এর কোন সীমানাই (যা এখন ভারত, পাকিস্তান বা চীন নিয়ন্ত্রিত তিন অংশ) তা কখনই ভারতের সাথে চিহ্নিত সীমানা নয়, হয়নি কখনও। এককথায় আন-ডিমারকেটেড সীমানা। তাহলে?

    কথা এরপরেও থাকে, অবশ্যই। যা আছে সেটা হল,  যার যেটা দাবি করা এলাকা অথবা দখলে থাকা এলাকা সেটা ত অন্যপক্ষ হানে, তা মানে আর নাই মানে। তাই এখন সীমানা নির্ধারণের কাজ নতুন করে শুরু করতে হবে, এটা একমত হয়ে কাজ শুরু করার আগে একটা স্থিতিবস্থা বজায় রাখা জরুরি। এটা যদি পক্ষগুলো মেনে নিতে পারে তাহলে সেখানে আর সেখানে একটা শব্দ উভয়ে একমত হতে হয় যে “যার যেটা দাবি করা এলাকা অথবা দখলে থাকা এলাকা বা ব্যবহার করছে এমন এলাকা” – এটাকেই অস্থায়ী সীমানা বলে ধরে নিয়ে থাকে তারা সাধারণত। আর এরপরেই স্থায়ী চিহ্নিত সীমানা টানার কাজে তারা সাধারণত বসে থাকে।  আর এই অস্থায়ী সীমানা টাকে তারা লাইন অন একচুয়াল কন্ট্রোল (Line of Actual Control) বা সংক্ষেপে এলএসি বলে ডাকে। কথাটার অর্থ হল স্থায়ী দুপক্ষের গ্রহণ করে নেয়া সীমানা নয়, বাস্তবের কাজ চালানো সীমানা।

    পুরাতন বিরোধ কিন্তু এখন তা কেন বাইরে এলোঃ
    কলোনি শাসনের সমাপ্তিতে এরপর গত সত্তর বছরের ইতিহাসে চীন-ভারত বিরোধ প্রকাশ্যে ছড়িয়ে পড়া প্রথম শুরু হয়েছিল ১৯৫৯ সালের মার্চে। মূল ঘটনাটা ছিল যদিও চীনের একেবারেই অভ্যন্তরীণ ঘটনা। মাও সে তুংয়ের চীনা বিপ্লব ও ক্ষমতা দখল সম্পন্ন হয়েছিল ১৯৪৯ সালের অক্টোবরে। আর তা থেকে শুরু অভ্যন্তরীণ ঘটনাটা হল, দক্ষিণ-পুর্ব চীনে তিব্বত স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল, এই তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের ‘গেলুগ’ নামের যে শাখাটি সেখানে অনুসরণ ও প্রচলিত আছে, তারই প্রধান ধর্মগুরুকে দালাইলামা নামে অভিহিত করা হয়। এর  নেতারা ধর্মীয়ভাবেই স্থানীয় কমিউনিটি প্রশাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করত। এদের নেতা  দালাই লামা চীনা কমিউনিস্ট নেতাদের সাথে বিরোধে জড়িয়ে সবশেষে চীনা কমিউনিস্ট সরকারের হামলার মুখে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, ঐ ১৯৫৯ সালে।
    আসলে দশ বছরে আগে ১৯৪৯ সালে চীনা বিপ্লবের সময়ে এই ঝগড়াটা এরানো গেছিল। পুরানা স্থানীয় ক্ষমতা ব্যবস্থাটা কমিউনিস্ট পার্টির সাথে কোন  প্রত্যক্ষ বিরোধ এড়িয়ে চলে, কোনমতে টিকে গেছিল ঠিকই। কিন্তু ১৯৫৮ সালে ক্ষমতার কেন্দ্রে  কমিউনিস্ট পার্টি  তারা এক সংস্কারি ক্ষমতাচর্চার নতুন পর্যায় শুরু করেছিল। কথাটাকে সম্ভবত এভাবে বলা যায়, মাও নিজেই পুরান মাও আর নতুন মাও বলে নিজেরই পুরান আর নতুন রাজনৈতিক অবস্থানে বিভক্ত হওয়াতে দল দুই তত্বীয় অবস্থানে ভাগ হয়ে গেছিলেন। বিরোধ শুরু হয়েছিল মাওয়ের পুরান অবস্থানের সমর্থকের বিরুদ্ধে মাওয়েরই নতুন অবস্থানের সমর্থকদের। পুরান অবস্থানের লোকেরা ‘বুর্জোয়া হয়ে গেছে’ বলে চিনিয়ে তাদের বিরুদ্ধেই এক “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” করতে আহবান রেখেছিলেন মাও। এটাই মাওয়ের পার্টির ভিতরে ১৯৫৮ সালের মাওয়ের ভাষায় চীনা “সাংস্কৃতিক বিপ্লব”। সেসময়ের নতুন মাও-অবস্থান যাদের এরাই শেষে জিতেছিল, আজকের যে চীন আমরা দেখছি এরাই তারা।  আজকের যে চীন আমরা দেখছি, এরাই সে সময়ের নতুন মাওয়ের অবস্থান। যদিও আমাদের এদিকের চীনপন্থি কমিউনিস্টদের ধারণা ও ব্যাখ্যা উলটা।  আসলে বিপ্লবের দশবছর পরেও সমবায় ব্যবস্থায় কৃষিতে কাঙ্খিত উতপাদন না আনতে পারায় কেবল মালিকানা উচ্ছেদ দিয়ে কিছু আগানো যাবে না এই সিদ্ধান্তে আসেন মাও। ফলে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বেই ও নিয়ন্ত্রণে কৃষিতে একটা কাপিটালিজমের বিকাশ ঘটানো তিনি অনিবার্য ভেবেছিলেন। সেকাজে দলে নতুন সমর্থকদের উপরে নেতৃত্বে  আনা, নতুন ধারার রাজনীতিকে হাজির এবং প্রধান ধারা করতে দল ঢেলে সাজানোর কাজটা তিনি “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” নামের আড়ালে শুরু ও সম্পন্ন করে নিয়েছিলেন। তবে এতে সোভিয়েত ইউনিয়নের থেকে কোনো বাগড়া বা হামলা হতে পারে, এই ভয়ে তিনি আগাম রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক আগেই ছিন্ন করে দিয়েছিলেন। তার এমন ভয়ের পিছনের বড় কারণ হল ইতোমধ্যেই সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা না শুনে নিজের মত চলতে চাওয়ায় ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন সেনা পাঠিয়ে তা্দের পছন্দের সরকার বসানো ঘটিয়ে নিয়েছিল। এছাড়া চীনে ১৯৫৮ সালে মাওয়ের নতুন তত্ব বা চলার পথ পরিবর্তনের পর  আরও পরবর্তিকালে ১৯৬৬ সালে চেকোশ্লোভিয়ায় একই সোভিয়েত হামলার ঘটনা আর এভাবে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তান স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টির উছিলায় ক্ষমতা দখল –  একই ধারাবাহিকতার এসব ঘটনা সোভিয়েত শাসনকালের মারাত্মক “ব্ল্যাক স্পট” হিসাবে থেকে গেছিল, তা আমরা দেখেছি। অর্থাৎ সোভিয়েত হস্তক্ষেপ সম্পর্কে  মাওয়ের অনুমান ভুল ছিল না আমরা বলতে পারি। সে যাই হোক, মাও ১৯৫৮ সালেই  ফতোয়া দিয়েছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নও এক “সাম্রাজ্যবাদী” রাষ্ট্র। তবে ওরা কমিউনিস্ট বলে সাথে আরো একটা নতুন বিশেষণ যোগ করে বলেছিলেন, তারা “সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী”। তবে সোজা কথার প্রশ্নটা হল, একদেশের কোন কমিউনিস্ট পার্টি আরেক দেশের কমিউনিষ্ট পার্টি বা সরকারের উপর (অথবা স্থানীয় পার্টির নামে) হস্তক্ষেপ করতে পারে কিনা? এই প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়নের রেকর্ড খুবই খারাপ – ডেসপটিক, কালোদাগ লাগানো। হয়ত চীনের বেলাতেও তা কম সত্য নয়। কিন্তু আপাতত সেদিকে্র তর্কে এখন আর যাব না।
    চীনের ঐ সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আমলে পরের বছর ১৯৫৯ সালে এসে তিব্বত আর দালাই লামাদের হাতে আগের মত থাকতে পারে নাই। এবার মাওয়ের নতুন লাইনের পার্টি-নেতৃত্ব আর তিব্বতের স্থানীয় লামাদের ধর্মীয়-ক্ষমতা-প্রশাসন সহ্য করতে চায় নাই বা পারে নাই বলতে পারি। এতেই ধর্মীয় নেতা বলে এখন আমরা যাকে ‘দালাই লামা’ বলে জানি, তিনি ১৪তম দালাই লামা – তার নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে লামাদের প্রতিবাদ আন্দোলন পার্টি গুঁড়িয়ে এসেছিল। আর দালাইলামা ঐ চীনা হামলা থেকে রক্ষা পেতে ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেন ৩০ মার্চ ১৯৫৯ সালে। তিনি আসামের দিশপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। ঘটনা শুধু এতটাতে সীমাবদ্ধ থাকলে আজ বহু কিছুই হয়তো অন্য রকম থাকত। কিন্তু বাস্তবের ঘটনাতে আরও অনেক বড় বড় “মোচড়” ছিল।

    এশিয়াকে অ্যামেরিকান পরিকল্পনায় সাজানোটা মাও উলটে দিয়েছিলেনঃ
    তা কিভাবে ঘটেছিল সেদিকে যাব। কিন্তু তার আগে কিছু কথা। দালাইলামার ভারতে হিজরতের ঘটনায় প্রথম ‘মোচড়’ হলেন জেনারেল আইসেনহাওয়ারের হস্তক্ষেপ। এই জেনারেল যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে আমেরিকা-রাশিয়া-ইংল্যান্ড ইত্যাদির ‘মিত্রশক্তির’ যে সামরিক জোট গড়া হয়েছিল এর প্রধান কমান্ডার ছিলেন। তিনিই বিশ্বযুদ্ধ জয়লাভের শেষের দিক থেকে – পরের দুই টার্ম ১৯৪৪ আর ১৯৪৮ সালের আমেরিকান নির্বাচনেরও পরেরবার, ১৯৫২ সালের নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হন আর শেষে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে যান। শপথ নেন ২০ জানুয়ারি ১৯৫৩ সালে। আর এতে তিনিই হলেন ১৯৩২ সালের পর থেকে আমেরিকায় একনাগাড়ে পাঁচবার ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টের পরে ষষ্ঠবারে এসে প্রথম রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট। এছাড়া  তিনি আবার পরপর দুবারের (১৯৫৩-৬১ পর্যন্ত) নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

    শুধু তাই নয়, আরো বড় ঘটনা আছে। কমিউনিস্টরা তো আমেরিকাকে “সাম্রাজ্যবাদ” বলে তা এখন আমরা সকলেই জানি। আবার তা দেখে একালে ইসলামিস্ট ভাবাপন্ন কেউ কেউও রাগে ক্ষোভে সেও আমেরিকাকে “সাম্রাজ্যবাদ” বলে। কিন্তু আমরা কি জানি, কমিউনিস্টরা কবে থেকে আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলা শুরু করেছিল? এর জবাব হল,  খুব কম কমিউনিস্টই জানে অথবা বলা যায় জানে কি না বলে বাজি রাখা যায়! নিশ্চয়ই বিশ্বযুদ্ধে স্টালিন যখন আমেরিকার কাঁধে কাঁধ মিলানো মিত্রশক্তি, তখন তিনি অবশ্যই আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদ বলতেন না, ধরে নিতে পারি। ঘটনাটা ঘটেছিল আসলে এই আইসেনহাওয়ারের [Dwight D. Eisenhower] আমল থেকেই, রাশিয়া “আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ” কথাটা বলা শুরু করেছিল।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট, তিনিই জাতিসঙ্ঘ’ ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়ার আইডিয়ার জনক।  আর নিজ আইডিয়ার নৌকায় তুলতে তিনি “ভেটোক্ষমতার জাতিসংঘ” এর কথা বলে নিজ প্রস্তাবে  স্তালিনকে রাজি করিয়েছিলেন। কিন্তু শুরু থেকেই পাঁচ ভেটোক্ষমতাওয়ালার মধ্যে চীন কী করে জায়গা পেয়েছিল? গোনায় ধরার মত কোন সামরিক শক্তিও তো সেকালের চীন ছিল না। আসলে রুজভেল্ট তার শত্রু হিসাবে সাজিয়েছিলেন জর্মানির হিটলার, ইতালির মুসোলীনি আর? এই তৃতীয়টাই গুরুত্বপুর্ণ। এথেকে তাঁর পুরা মনোভাব ধরা পড়বে। তৃতীয়টা হল এশিয়ার একমাত্র মার্শাল তেজোর জাপান।  এই তিনদেশ বা শক্তিকে গুড়িয়ে দিয়েই রুজভেল্ট ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কারণ ঐ জাপান ছিল তখন এশিয়ার কলোনি দখলদার শক্তি আর, চীন ও (একই) কোরিয়া ছিল জাপানের কলোনি। কাজেই চীনকে হবু এবং কাম্য (পরাশক্তি না হলেও) সামরিক শক্তি গণ্য করেছিল রুজভেল্টের ইমাজিনেশন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার (যদিও তিনি মারা যান ঐ ১৯৪৫ সালেই), কেউ বুঝতেও পারে নাই যে চার বছরের মধ্যে ১৯৪৯ সালে  কমিউনিস্ট মাও এর এক চীন – ক্ষমতা দখল করতে আসতেছে।  তাই এককথায় মাওয়ের চীনের উত্থান অ্যামেরিকান স্বপ্নে ঠান্ডা পানি ঢেলে দেওয়া হয়েছিল। বলা বাহুল্য আমেরিকান হতাশা ছিল তাতে।
    তাই পরবর্তিতে ১৯৫৩ সালে ডেমোক্রাট প্রেসিডেন্ট থেকে এক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের বদলটা সাধারণ বদল ছিল না। প্রথমত, এই প্রথম আইসেনহাওয়ারের হাতে এসে আগের চারবারের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের আমেরিকার নীতিতেই বড় রকমের নির্ধারক বদল তিনি ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও আইসেনহাওয়ারের আগের প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান তিনি রুজভেল্টের একই নীতির অনুসরণকারী ও তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান বলে (১৯৪৫-১৯৫২ মোট সাড়ে সাতবছরের প্রেসিডেন্ট) তিনি জাতিসংঘকে দেখেছিলেন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে স্বার্থবিরোধ যেন যুদ্ধ এড়াতে পারে এর নিগোশিয়েশন ও মধ্যাস্থতা করাই প্রতিষ্ঠান হিসাবে। তাই তেলের খনির মালিকানা প্রশ্নে বৃটিশ-ইরান বিরোধে তিনি ১৯৫২ সাল পর্যন্ত নানানভাবে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করে গেছিলেন।  ইরানের তেল উত্তেলনের চুক্তি আমেরিকার নিজে পাওয়া বা দখলের চেষ্টা তার ছিল না। কিন্তু আইসেনহাওয়ার ১৯৫৩ সালে শপথ নেয়ার কয়েক মাসের মধ্যে প্রথম একদল সিআইএ অপারেটিভ এজেন্ট পাঠিয়ে ইরানে প্রধানমন্ত্রী ডা: মোসাদ্দেককে ক্ষতাচ্যুত করেন, সরকার ফেলে দিয়ে শাহের হাতে রাজতন্ত্রের ক্ষমতা আবার চালু করেন। এভাবে ইরানি তেলের খনি ব্রিটিশ, ফরাসি, ডাচ আর আমেরিকান কোম্পানির মধ্যে ভাগ করে নিতে তিনি এ কাজ করেছিলেন।

    তাহলে আইসেনহাওয়ারের সিআইএ দল পাঠিয়ে ক্ষমতা দখলের ও ব্যবসা দখলের যে স্টাইলের চর্চা তিনি শুরু করেছিল এটা আমেরিকার বিশ্বযুদ্ধের নীতির মারাত্মক বরখেলাপ ও পুরাপুরি উলটা। যেমন  রুজভেল্ট বলেছিলেন ও কল্পনা করতেন যুদ্ধপরবর্তীকালে কলোনিমুক্ত স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের এক দুনিয়া গড়তে হবে, যেখানে ওই স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর সাথে আমেরিকার বিনিয়োগকারীদের সম্পর্ক হবে ঋণদাতা-খাতকের, পণ্য বিনিময় সম্পর্কের। ওপেন ও স্বাধীন ব্যবসায়িক সম্পর্ক।  সেখানে এর ১২ বছরের মধ্যে আইসেনহাওয়ার বলতে চাইলেন, তিনি ইরানের সাথে সিআইএ অপারেটিভ পাঠানোর “সম্পর্ক” করবেন। জবরদস্তিতে ক্ষমতা দখল করে কাজ-ব্যবসা বাগাবেন। এমন দুনিয়াই গড়বেন।’ এবং  চাইলেই যেন তিনি সিআইএ দল পাঠাইতেই পারেন, গুম-হত্যা করতেই পারেন।

    কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ নয়, শুরু। আর পাঠক সাবধান হন, এতদূর পড়েই কমিউনিস্টদের সাধুবাদ জানাতে যাইয়েন না। কারণ, কেউ কম যায়নি। এ দিকে সোভিয়েতরা ইরানের তেলের কিছুই না পেয়ে (তারা চেয়েছিল ব্রিটিশের বদলে তাদের দিয়ে জ্বালানি তেল তোলা হোক) এই ঘটনায় প্রতিপক্ষ আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে গালি দেয়ার শুরু তখন থেকে, এতে মনের দুঃখ মিটিয়েছিল অবশ্যই। কিন্তু ইরানে কোনো কমিউনিস্ট বিপ্লব চিরদিন রহিত হয়ে গেছিল সেই থেকেই। খোমেনির বিপ্লব বিনা কারণে হয়নি। ইরানি বিপ্লব আমাদের দুনিয়ায় এক গ্লোবাল-ঐতিহাসিক ঘটনা। এটা অবশ্যই একটা লোকাল বিপ্লব, খোমেনির ক্যাসেট বিপ্লব অথচ এর তাৎপর্য গ্লোবাল। আর সেই থেকে অ্যামেরিকা দুনিয়াকে এমনি এমনি ‘ওয়ার অন টেররের’ নোংরামি পর্যন্ত আনেনি। তাই ধীরেসুস্থে বুঝেশুনে পরে যাকে খুশি সাধুবাদ দিয়েন। আগে বুঝাবুঝি শেষ করে নেন। যদিও আপাতত আমরা সেদিকে যাচ্ছি না। কিন্তু দালাই লামার গল্পে কেন এত দূর এলাম?

    কারণ ১৯৫৯ সালের ৩০ মার্চ, দালাই লামাকে আসামের দিশপুর দিয়ে ‘হিজরত’ করিয়ে ভারতে এনে পৌছে দিয়েছিল সিআইএ’র কিছু অপারেটিভ এজেন্ট। অর্থাৎ কথায় কথায় সিআইএ পাঠানো  তখন আইসেনহাওয়ারের কাছে ডাল-ভাত হয়ে গেছিল। তিনি তাই ইরানে হাত পাকিয়ে এরপর আমারিকার পুরানা হাতছুট চীনের উপর প্রভাব-দখল বাড়াতে বা ফেরত পেতে দালাইলামাকে সহায়তা করার উছিলায় চীনের ঘটনায় বা’ হাত ঢুকাতে,  প্রবেশ করেছিলেন। বলাই বাহুল্য এতে মাও কেমন ক্ষুব্ধ হবেন!  এদিকে অতএব দেখা যাচ্ছে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নেহরু শুধু দালাই লামার আশ্রয়দাতাই ছিলেন না, এশিয়ায় এই অঞ্চলে আইসেনহাওয়ারের সহযোগী হতে লোভী হয়ে উঠেছিলেন।  সিআইএ অপারেটিভ এজেন্টের আনাগোনা আর আশ্রয়-প্রশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিতে সক্রিয় হতে গেছিলেন।  পারলে তেলের খনির মত এখানেও যা যা লাভ আসে এর বখরা পেতেও নেহরু মহা আগ্রহী ছিলেন বলে দেখা যাচ্ছে। তবে সিআইএ’র কিছু অপারেটিভের সহায়তায় যে দালাই লামা এসেছিলেন, এ তথ্য পাওয়া খুব সহজ নয়। অথচ ভারতের কূটনীতিকপাড়ার আলোচনায় মুখে মুখে এটা খুবই চালু। ভারতীয় চীনপন্থী কমিউনিস্টদের মহলেও খুবই চালু তথ্য এটা। তবু ভারতে একাডেমিক সার্কেলেও এর তথ্য পাওয়া মুশকিল, দেশদ্রোহিতার মামলা খাবার ভয়ে। তবু একটা সহজ রেফারেন্স দিয়ে রাখি। ‘উইকি’কে বিশ্বাস করতে বলছি না। কিন্তু উইকিপিডিয়াতে 14th Dalai Lama – বলে সার্চ দিলেই পাওয়া যাবে। ওর ভিতরে ৭৯ নম্বর রেফারেন্স। সেটা একটা বইয়ের নাম- যেটা হল, “সিআইএ-জ সিক্রেট ওয়ার ইন টিবেট’” কানসাস ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০২। সেখানে লেখা আছে, [At the outset of the 1959 Tibetan uprising, fearing for his life, the Dalai Lama and his retinue fled Tibet with the help of the CIA’s Special Activities Division,[79] crossing into India on 30 March 1959, reaching Tezpur in Assam on 18 April.[80] ]।

    কিন্তু দুর্ভাগ্য নেহরুর। মাওয়ের চীন সেকালের নিরীহ ইরানিদের মতো নয় যে, মোসাদ্দেকের ক্ষমতাচ্যুতিতে তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে। তাই, এর প্রতিশোধ নিতে আর শিক্ষা দিতে, ১৯৬২ সালে মাওয়ের চীন ভারত আক্রমণ করেছিল। একটা শিক্ষা দেয়ার জন্য এ হামলা। পুরো আসাম দখল করে নিয়ে কয়েক দিন-ঘণ্টা রেখে দিয়ে এরপর চীনা সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছিল। সামরিক ভাষায়, প্রতিপক্ষের এ রকম একটা পুরো শহর কিংবা খোদ রাজধানী অথবা একটা রাজ্য বা এলাকা দু-একদিন দখল করে রেখে দিয়ে বুঝিয়ে দেয়া যে কার মুরোদ কতখানি – এটাকে বলে ‘শিক্ষা দেয়ার’ হামলা। আমেরিকাকেসহ সব পক্ষকে শিক্ষা দিতে মাও এটা যেভাবে ভেবেছিলেন, আজ দেখা যাচ্ছে এটা সত্যিই কাজ করেছিল। আজও এটা ভারতের জন্য একটা ‘ট্রমা’ হয়ে আছে।

    নেহরুর প্রধানমন্ত্রিত্বের জীবনে পড়ালেখা না করা সংশ্লিষ্ট ঘটনা ফলে ঠিকঠাক বুঝতে বা ধারণা করতে না পারা দুটো মারাত্মক ভুল ঘটেছে।  যার ফলে তার চিন্তা করার অযোগ্যতাকে আঙুল তুলে প্রশ্ন করা যায়, এমন একটি হল – জাতিসঙ্ঘ কী, এর জন্মভিত্তিমূক ধারণা কী তা না বুঝেই কাশ্মির দখল ক্রতে যাওয়া। তাই তিনি কাশ্মিরের জনগণকে ফেলে রাজার ওপর ভরসা করতে গিয়ে সারা জীবন “ফাউলে খেলে” গোল দিয়ে গিয়েছেন। বিজেপি যেটাকে আরও চুড়ান্ত করছে।  আর দ্বিতীয়টা হল, আমেরিকান সিআইএকে ভারতের হোস্ট করতে যাওয়ার কুবুদ্ধি; এমন এম্পায়ারগিরিতে সামিল হয়ে উচ্ছিষ্ট খাওয়ার সীমাহীন লোভ করতে গিয়েছিলেন। – কিন্তু এতে কাকে লাড়তে গিয়ে কাকে লেড়ে দিয়েছেন খবর নেই। অথচ তিনি তো “শরণার্থীকে” কেবল আশ্রয়দাতার ভূমিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারতেন। এতে উল্টো তিনি ‘হিরো’ হতে পারতেন। কিন্তু আজীবন নেহরু এমন উলটা কাজ, ভুল ব্যাট হাঁকিয়ে গেছেন!

    মোদি কী দ্বিতীয় নেহরু হতে যাচ্ছেন?
    বাষট্টি সালের পর থেকে বলাই বাহুল্য, সারা ভারত জানত নেহরু পরাজিত হয়েছেন, কিন্তু কেউ এতে নিমক ছিটায়নি। তবে অনেকে মনে করেন এই ব্যর্থতার যে লজ্জা যে নিজস্ব একান্ত ‘শক’, তা খুবই মারাত্মক হয়েছিল বলেই তিনি দুই বছর পরই ১৯৬৪ সালে (হার্টফেল করে) মারা যান। আবার ভারতের চীনা কমিউনিস্টরা দেশদ্রোহিতার মামলা ভয়ে ইস্যুটা নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মূল্যায়ন তোলে না। এমনকি এ নিয়ে ভারতে কেউ একাডেমিক আলাপ বা স্টাডি করেছেন বলেও জানা যায় না। তবে সব কিছুই সামলানো হয়ে আসছে উগ্র (প্রকাশ্য বা ‘ছুপা’) হিন্দুজাতিবাদ দিয়ে। যেমন, সেই থেকে এখনো সব দল-পক্ষের মিডিয়াই সাধারণভাবে প্রবল অ্যান্টি-চায়না টোন বজায় রেখে চলছে।

    কিন্তু না, সরি ইন্ডিয়া! এটা আপনাদের জাতীয় চেতনায় এক হওয়া, ন্যশনাল ইন্টারেস্ট হতেই পারে না। এটা জাতিস্বার্থ নয়। আপনি আরেক দেশে সিআইএ অপেরেটিভ পাঠিয়ে সরকার ফেলায় দিবেন – এটা সমর্থন করবেন, সামিল হবেন – আর এটাই কী ভারতের ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট হতে পারে?  দুনিয়ার সমস্ত চোরামি শয়তানি অন্যায় কাজ সবকিছুকে কী জাতীয় স্বার্থ বলে শব্দের আড়ালে চালিয়ে দেয়া যায়? না যাবে? ভারতের মিডিয়ার এই ” জাতীয় স্বার্থ বলে শব্দের আড়ালে” সবকিছু চালিয়ে দেয়া আচরণ – এটাই তাদের আজীবনের কালো দাগ। আপনারা কোন পাপের দায় কাঁধে নিয়ে ঘুরছেন কোনদিন কী তা বুঝবেন মনে হয় না, রাষ্টটা ভেঙ্গে পড়ার আগে তা বুঝবেন বলে মনে হয় না। দুনিয়ার সবকিছুই রাষ্ট্রস্বার্থ নয়, হতে পারে না।

    কিন্তু বাস্তবের ভারতের ঘটনা হল, একালে চীনা পণ্য মানে চীন থেকে অনেক আমদানি পণ্য যা তুলনায় শস্তা, তাই মনে যতই এন্টিচায়না জাতিচেতনা থাকুক, তবু চীন থেকে ভারতের আমদানির পরিমাণ অনেক চড়া। দুই দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্য চলছে সমানে – বছরে ৭০ বিলিয়ন ডলারের। যার মধ্যে চীন থেকে আমদানিই প্রায় ৫৩ বিলিয়ন ডলারের।  এর বাইরে ভারতে বিপুল চীনা বিনিয়োগ, সেসব তো আছেই।

    আবার চীন-ভারত সীমান্ত নিয়ে টেনশনের প্রসঙ্গে আসি। তাদের সীমান্তবিরোধের  বড় কারণ তাদের সীমান্ন্তের অনেক অংশই চিহ্নিত বা ডিমারকেটেড নয়। অর্থাৎ  চীন-ভারত সীমান্তের বহু অংশই  পরস্পরের বসে উভয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য করে আঁকা হয় নাই।  নয়, অর্থাৎ দু’পক্ষই মানে এমন অনেকাংশই ডিমার্কেটেড সীমান্ত নেই। আর তা কেবল কাশ্মীরের অতীত প্রিন্সলি স্টেট ছিল বলে কাশ্মীর-সংশ্লিষ্ট চীন নিয়ন্ত্রিত এলাকা – আকসাই চীন, লাদাখ শুধু এদিকটাই নয়। বরং সাথে নেপাল, সিকিম বা ভুটান সংশ্লিষ্ট সীমান্তের বহু পকেট আছে যা বৃটিশ আমল থেকেই বিতর্কিত হয়ে পড়ে আছে।  এই আন-ডিমার্কেটেড অবস্থা নিয়ে সর্ব প্রথম বিরাট  ইতিবাচক  পদক্ষেপ,  গত ২০১৩ সালের অক্টোবরে এক বিরাট অগ্রগতি হয়েছিল।

    চীন-ভারত গত ২০১৩ সালের অক্টোবরে এক দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত চুক্তি করেছিল। তার মুখ্য বিষয় ছিল, পরস্পর কথা বলে আপসে এই নীতিতে ডায়ালগ নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে কার কোনটা সীমান্ত তা চিহ্নিত করে ফেলবে। এর জন্য অনেক বিষয়েই মোড ও প্রটোকল ঠিক করা হয়েছিল, ঐ সীমান্ত আলোচনায় দু’পক্ষেরই স্থায়ী প্রধান ব্যক্তি কে হবেন তাও ঠিক করে তা পরস্পরের কাছে জমা দেওয়ার নিয়ম করা হয়েছিল, যা এখন বাস্তবে করা আছে। এছাড়া মাঠপর্যায়ে সীমান্ত পোস্টের কমান্ডার পর্যায়ে টেলিফোন হটলাইন থেকে শুরু করে সার্বক্ষণিক ডায়ালগের সুযোগে থাকার সব বন্দোবস্ত ও মোড ঠিক করা আছে। যাতে ভুলেও কোনো পক্ষ গুলি তো দূরে থাক একটা হাতাহাতিও যেন হয়ে না যায়, এরই সব মোড আর প্রটোকল ঠিক করা আছে সেখানে। যেমন গত কয়েক দিন ধরে বিশেষ করে গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে বিপুল পরিমাণ ভিডিও ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় খেয়াল করে দেখেছেন অনেকে – অনুমান করছি। সেখানে দেখে থাকবেন, চীনা আর ভারতীয় সৈন্য ঝগড়া করছে, কথা বলছে কিন্তু কেউ কারো গায়ে হাত লাগাচ্ছে না, ওই প্রটোকলের কারণে যেখানে সেটা বারণ করা আছে। তাই বুকে বুক দিয়ে ঠেলাঠেলি আর ক্যামেরায় ছবি তুলে এ মর্মে প্রমাণ সংগ্রহ করে রেখে দেয়া যে, ‘আমি দোষী নই।’ কারণ ওই ঠেলাঠেলিই শেষ নয়, বরং পরস্পরের ক্যামেরায় তোলা ওইসব ছবি হয়ত, আগের কোনো ঐকমত্য হওয়া থাকায় তার প্রটোকল মেনে চলার প্রমাণ দেখাতে হতে পারে পরের কোনো যৌথ মিটিংয়ে।
    কিন্তু এত কিছুর পরও সীমানা চিহ্নিত করার মিটিংয়ে বসার অগ্রগতি খুবই কম। এর একটা কারণ অবজেকটিভ  ভাবে আমরা ধরতে পারি যে, দু’পক্ষই অগ্রগতি না হওয়ার মধ্যে এখানে দুপক্ষই কোনো-না-কোনো স্বার্থ দেখতে পাচ্ছে। তাই অগ্রগতি নাই। যেমন খুব সম্ভবত এটা হতে পারে যে, ‘ভারতের আশা- ভবিষ্যতে কখনও আমেরিকাকে যদি সে নিজের পক্ষে পাশে পেয়েই যায়, তবে নেগোসিয়েশনে সেটা তার জন্য ওজনদার শক্তি হিসেবে হাজির হতেও পারে। কাজেই অপেক্ষায় থাকি”।  আর এর বিপক্ষে চীনের অনুমান হয়ত ভারতের এমন আশা যতদিন সক্রিয় থাকবে ততদিন ভারতকে বলে বা চাপ দিয়েও কিছু করানো যাবে না। যখন এমন আশা শুকিয়ে মরবে কেবল তখনও ভারত সক্রিয় হতে পারে। সেপর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হবে।

    মোদী-ট্রাম্পের আরেক শস্তা সমীকরণঃ
    তবে এসবের বাইরে মোদি-ট্রাম্পের আরেক শস্তা সমীকরণ আছে। যা মূলত পারসোনাল স্বার্থে সরকার প্রধানের পদকে ব্যবহার ধরণের। এই বিশেষ ধরণের কারণে, খুব সম্ভবত আগামী নভেম্বর পর্যন্ত চীনবিরোধী এই টেনশন টেনে নিতে চাইবেন তারা দু’জন। ব্যাপারটা হল, ব্যক্তিগত লাভের নির্বাচনী স্বার্থ, মানে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার স্বার্থই এখানে প্রধান ভুমিকায়। এর আগে মোদী-ট্রাম্প দু’বার দুই দেশে আমেরিকার হিউস্টনে (সেপ্টেম্বর ২০১৯) আর ভারতের গুজরাতে (ফেব্রু ২০২০) পাবলিক সমাবেশে দুই নেতা পরস্পরকে ব্যক্তিগত নির্বাচনী সুবিধা করে দিতে হাজির হয়েছিলেন। আমাদের নিশ্চয়ই তা মনে আছে। এবার আগামি নভেম্বরের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্প তার সম্ভাব্য ভোটারদের দেখাতে চান যে তিনি চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার সব ধরনের স্বার্থ নিয়ে লড়াকু – এক বেস্ট ক্যান্ডিডেট। যেহেতু চীনের উত্থানেই আমেরিকার গৌরব সব ধূসর হয়ে গেছে। কাজেই সেই চীন-ধোলাই করতে সক্ষম, ডোনাল্ড ট্রাম্পই আমেরিকার জন্য বেস্ট ক্যান্ডিডেট। এই হল এর ম্যাসেজ।  এজন্য তিনি ম্যালেরিয়া ওষুধকে করোনার ওষুধ বলে খাওয়ানো থেকে শুরু করে, নিজে এই ভুয়া ওষুধ খাচ্ছেন বলে প্রচারণা, আর মূলত নিজের করোনা মোকাবিলার প্রস্তুতির ঘাটতি লুকানোর জন্য – চীন-ব্যাসিং;  চীন করোনা ভাইরাস এনেছে,  তথ্য লুকিয়েছে দাবি করা, হু [WHO]  এর বিরুদ্ধে কামান দাগানো, এই প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করা ইত্যাদি সবকিছু করে চলেছে।
    আর এই ইমেজ তৈরি করার ক্ষেত্রে মোদী হচ্ছে ট্রাম্পের প্রধান সহযোগী সাগরেদ। তিনি এই ইমেজ গড়তে বাতাস দিতে এগিয়ে এসেছেন। কারণ এতে বিনিময়ে তারও লাভ-স্বার্থ আছে। কারণ, অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে ভারতের মোদি সরকার খুবই খারাপ অবস্থায়। এর উপর এখন করোনায় কারণে অবস্থা আরো খারাপ। কাজেই তাঁর সরকারের অর্থনৈতিক  পারফরম্যান্স এখন পাবলিকের কাছে বিরাট প্রশ্নবোধক।  সরকারি সক্ষমতা আর ফান্ড বরাদ্দ নিয়ে প্রতিদিন কেন্দ্র আর রাজ্য সরকারের টানাটানি চলছে।  এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া মাইগ্রেন্ট শ্রমিক ফেরত আনার খরচ ও ব্যবস্থাপনার পরাজয় ব্যর্থতা চরমে উঠেছে। এ-ওর গায়ে দায় চাপাচ্ছে, এখানে এক চরম  মানবিক বিপর্যয়ে দেখা দিয়েছে। অতএব সরকারের পারফরম্যান্স ও যোগ্যতা থেকে পাবলিকের অভিযোগে অসন্তোষের মন ও চোখ সরাতে, হয় পাকিস্তান অথবা চীনের সাথে কোনো সীমান্ত টেনশন তৈরি করা আর সেখান থেকে, অবাস্তব হলেও, মোদি নিজেকে অন্তত একবার বিজয় অর্জনকারী বীরের ভূমিকায় হাজির করতে পারলে তিনি মনে করেন সেটা এক ‘বিরাট অর্জন’ ও সব অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ঢেকে ফেলার চাদর-কাভার হতে পারে সেটা। মোদির লক্ষ্য হচ্ছে, ট্রাম্পের ‘খেপ মেরে’ দেয়া’র বিনিময়ে নিজের জন্য এটা তিনি অর্জন করতে চান। তাই তিনি চীন-ভারত সীমান্ত টেনশনে ইতোমধ্যে “ট্রাম্প মধ্যস্থতা করতে চান”- এই প্রস্তাব বাজারে ট্রাম্পকে দিয়েই হাজির করাচ্ছেন। যদিও তিনি এটা আরো করাচ্ছেন নিজেরই উপর নিজ দেশের এলিট-মাতবর লোকদেরও অনাস্থা-ভয় কাটাতে। যেমন ভারতের কূটনীতিক মহলেই এখন খোলাখুলি টুইটের মাধ্যমে প্রস্তাব দেয়াদেয়ি চলছে যে, রাশিয়ার পুতিনকে দিয়ে এখন মোদী যেন চীনকে থামানোর চেষ্টা করেন, এতেই  চীনের সম্ভাব্য হামলা ঠেকানো যেতে পারে। অর্থাৎ সমাজের এই সেকশন ভয় পেয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক রিপোর্টে এই ভয়ের ছাপ প্রকাশ পেয়েছে […detailed analysis of satellite images has shown extensive deployment of towed artillery and mechanised elements on the Chinese side, ……]। অভ্যন্তরীণভাবে ভারতীয়দের মনে ভয় ও হেরে যাবার ইঙ্গিত ফুটে উঠেছে। ইংরাজি ওয়েব পত্রিকা WIRE এর এই আর্টিকেলে সেসবই ফুটে উঠেছে যে ইতোমধ্যেই ভারতীয় সেনারা কী কী ভুখন্ড হারিয়েছে, চারটা পয়েন্টে তাই প্রকাশ করা হয়েছে।

    কথা সত্য! আর বলাই বাহুল্য এটা খুবই ‘রিস্কি গেম’! কেন? কারণ খুবই সম্ভাবনা হল, চীন ১৯৬২ সালের মতো এবার লাদাখে আবার একটা “শিক্ষার আয়োজন” করে ফেলতে পারে। আসলে মোদী ব্যাপারটাকে নিয়েছেন নির্বাচনী ভোটার নাচানোর বিষয় মনে করে নিজের পক্ষে মিথ্যা হলেও একটা বিজয়ের গল্প পেতে। কিন্তু এটাতেই চীনারা সবচেয়ে অসন্তুষ্ট। তারা  সিরিয়াস বিষয় নিয়ে মস্করা খেলাপাতি খেলা কেন মনে করবে?  তারা বরং খেলার উপকরণ হিসেবেই যেন এটাকে দেখা বা দেখানোর সুযোগ না থাকে, চীন তাই চেয়ে বসতে পারে এবার।

    আর ঠিক এই মেসেজই পেয়ে গেছে ভারতের এলিট, বিরোধী দল, মিডিয়া- সবাই। তারা একেবারে অস্থির।  যদিও সবার আগে তাদের সকলের ভয় পাওয়াটা প্রকাশ করেছিল চীনে ভারতের সাবেক ও অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদুত গৌতম বাম্বালা। তিনি পরামর্শের ঢঙে বলে বসেন,  চীন-ভারতের ডায়লগে বসে যাওয়া উচিত। আসলে মোদীর আকাঙ্খার কথাটা তিনি নিজের ব্যক্তিগত মতামত হিসাবে তুলে ধরেন।  আর এদিকে বিরক্ত ভারতীয়দের মনের কথাটা – আনন্দবাজার পত্রিকা এই সঠিক জায়গাটা ধরে প্রকাশ্যে অন্তত দুটা আর্টিকেল লিখে বলতে চেয়েছে যে চীনের দখলে থাকা কাশ্মীরের অংশ নিয়ে দাবি জানানো এই উস্কানি তৈরির জন্য অমিত শাহ দায়ী। কাশ্মীর নিয়ে ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করার পর থেকেই ভারতের ওপর সব বিপদ-আপদ এসে হাজির হয়েছে। তিনি কেন লাদাখ কোনো রাজ্যের অংশ নাকি কেমন প্রদেশ, সেসব স্ট্যাটাস নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গেলেন? আনন্দবাজার লিখেছে,

    “গত বছর অগস্টে কাশ্মীর নিয়ে সিদ্ধান্তের পরেই সংসদে অমিত শাহ পাকিস্তান ও চিনের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যার ব্যাপারে চড়া সুরে বলেন,‘‘পাক অধিকৃত কাশ্মীর ও আকসাই চিনও ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।’’

    আনন্দবাজারের অভিযোগ আরও গভীরে – তাই লিখেছে,
    “গত কয়েক মাসে একাধিক বার বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল চিনা নেতৃত্বকে বুঝিয়ে এসেছেন যে জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা একান্তই ভারতের অভ্যন্তরীণ। কিন্তু পরিস্থিতি যে দিকে এগোচ্ছে তাতে স্পষ্ট, কূটনৈতিক দৌত্যে চিঁড়ে ভেজেনি”।

    সার অভিযোগ বিশেষ করে চীনের দখলে থাকা ‘কাশ্মিরের অংশও’ ভারতের বলে পার্লামেন্টে বিবৃতি দিতে গেলেন? আনন্দবাজার যেন বলতে চাচ্ছে, – “আসলে এ থেকেই তো সব কিছু অস্থিতিশীল হয়ে গেছে। আগে বহুকিছুই অমীমাংসেয় ছিল সত্য কিন্তু একটা স্থিতাবস্থা বজায় ছিল। সেটা উগ্র জাতিবাদ দেখাতে গিয়ে অমিত শাহ-ই নাড়িয়ে নষ্ট করে দিয়েছেন। তাই এই লাইনে ভারতের ভেতর থেকেই অমিত শাহের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক প্রকাশ্যেই শানিয়ে উঠছে সবার আগে”। বুঝাই যাচ্ছে, এরা শক্তের ভক্ত হয়ে অমিত শাহের হাত আগেভাগে ছেড়ে নিজেরা নতুন অবস্থান নিয়ে বাঁচতে চাইছেন। অর্থাৎ মোদির নির্বাচন বা ভোটার নিয়ে খেলা চালানোতে ভারতের এলিট, বিরোধী রাজনীতিক, মিডিয়া ইত্যাদি সবাই মোদির দায় ত্যাগ করে ফেলতে চাইছেন। এতে পুরাপুরি একটা মেরুকরণ ইতোমধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি ভারতের জন্য খুবই বিপজ্জনক।

    এখন যদি চীন মিথ্যা করেও একটা হামলার অবস্থায় যাচ্ছে দেখায় বসে তাতেও ভারতের সব ভেঙে পড়ে যেতে পারে। হয়তো দেখা যাবে, মোদীর বিরুদ্ধেই ‘দেশকে বিপদের মুখে ফেলার অভিযোগে’ মিছিল শুরু হয়ে গেছে। এ দিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী এই প্রথম সম্ভবত একটি দলের মান বাঁচানোর প্রোগ্রামে শামিল হয়ে গেছে। সেনাবাহিনীর ওপর দিকের নেতৃত্ব যেন বিজেপির কর্মী। এতে সেনা সদস্যরা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের দায়দায়িত্বের মধ্যে জড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে অবসরে যাওয়ার আগে-পরে নানান সুবিধার লোভে জেনারেলদের পা পিছলিয়ে যাচ্ছে। আর তাতে পুরো সেনা প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব ধুলায় লুটাচ্ছে। মোদি-ট্রাম্পের দলীয় বা ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থে বাহিনীর কোনো সংশ্লিষ্টতা- এগুলো খুবই বিপজ্জনক।

    এদিকটাই ফোকাসে এনেছে সর্বশেষ চীনা ‘গ্লোবাল টাইমস’ ম্যাগাজিন।  পরামর্শ দিয়েছে ভারত-চীনের ইস্যু থেকে আমেরিকাকে দূরে রাখতে। আর সেই সাথে ভারতীয়দেরকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে ট্রাম্পের মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব এটাও এমনকি হোয়াইট হাউসের বক্তব্যও নয়, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বক্তব্য।

    লিখেছে,  To what extent Trump’s personal Twitter account reflects the will of the White House remains to be seen…।

    অর্থাৎ যেন ট্রাম্পের “মধ্যস্থতার কথায়” ভারতীয়রা কোন আস্থা না রাখে, আস্থায় না নেয়। কথা সত্য এর আগে ডোকলামে চীন-ভারত মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাওয়ার সময়ও আমেরিকান প্রশাসন বরং নিজেদের নিরপেক্ষতা দেখাতেই ব্যস্থ হয়ে গেছিল।  এদিকে আজ ৩১ মে গ্লোবাল টাইমস আর একটা আর্টিকেল ছাপিয়েছে। যার বিষয়বস্তু হল উচু পাহাড়ি এলাকায় ব্যবহারের জন্য (advantage in high altitude arsenal possession ) বাড়তি সুবিধা পাওয়ার মত চীনা সেনাবাহিনী দখলে কী কী বিশেষ অস্ত্রশস্ত্র আছে এর তালিকা নিয়ে। এর একটা মানে হতে পারে হাল্কা করে দেখলে এটা শক্তি দেখানো। আর ভারি দিকটা দেখলে এর মানে এটা আক্রমণের ইঙ্গিত। তাহলে গ্লোবাল টাইমসের কথার মানে কী চীনরা এবারও আবার ‘শিক্ষা দেয়ার’ অ্যাকশনে যেতেও পারে? এটা কি সেই ইঙ্গিত?

    সবশেষে  এক ফাকে নেপালঃ
    ওদিকে নেপাল ইস্যু; বলাই বাহুল্য, এটা ‘মাছের তেলে মাছ ভাজার’ জন্য মোদীর কৌশল ও  চেষ্টা ছিল। কিন্তু সবার আগে সম্ভবত এখান থেকেই মোদী পিছটান দিতে যাচ্ছেন।  মোদি ও ট্রাম্পের নির্বাচনী ব্যক্তগত লাভালাভের খেলার বিষয়টাকে দেখিয়ে নেপালকে ভয় পাইয়ে দিতে চেয়েছিলেন মোদী। আর এই ফাকে মোদীর প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং  কোনো কথাবার্তা ছাড়াই লিপুলেখের ভূমি দখলটা সেরে ফেলতে পারবে অনুমান করে ভারত এগিয়েছিল। একাজে ভারত নিজেই উসকানি দিয়ে ভারতের সেনাপ্রধান বলেছেন, “নেপাল নাকি চীনা উসকানিতেই প্রতিবাদ” করছে। কথাবার্তা ছাড়াই নেপালের ভূমি দখল বিতর্ক শুরু করল ভারত, সেটা উসকানি নয়; বরং নেপালের প্রতিবাদ, সেটার উসকানিদাতা হলো নাকি চীন? এখন এই ইঙ্গিত বাড়ছে যে মোদীকে অপমানজনকভাবে  নেপালের ভুখন্ড ছেড়ে আসতে হবে। আগেই জানা যাচ্ছিল যে চীন-ভারত ইস্যু একটু হালকা হলেই নেপাল ইস্যুতেও ভারত হারবে এবং সবার আগে কূটনৈতিক পশ্চাৎ অপসারণ শুরু হবে সম্ভবত এখান থেকেই। আজ নেপালের পার্লামেন্ট আরও একধাপ এগেসিভ হয়ে তাদের প্রকাশিত ম্যাপ আজ পার্লামেন্টেও পেশ করেছে, যা সহজেই পাশ হয়ে যাবে বলে ভারতের মিডিয়ার ধারণা।  এর মানে এখন নেপালে মোদীর পিছুহটা আরও অপমানজনক হয়ে হাজির হবে।

    যেটা সিরিয়াস বিষয় তা নিয়ে নির্বাচনী খেলা খেলতে গিয়ে মোদী সম্ভবত  নিজের ‘পেটব্যথা’ ডেকে আনতে যাচ্ছেন। কারণ চীনারা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে খেলা-মসকরা পছন্দ করে না। মোদীর পরামর্শকেরাও সম্ভবত অযোগ্য বা মোদীরই মতন। তারা কী আগে যাচাই করছেন তারা চীনের কী নিয়ে খেলতে গেছেন। এটা শুরু লাদাখের কিছু পাহাড়ি হিমশীতল এলাকার ভুমি দখলে থাকার প্রেস্টিজ নয়। চীনা প্রেসিডেন্ট-সহ চীনের অর্থনীতির ভবিষ্যত ও সেই সাথে ভ্যানিটির প্রজেক্ট হল চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্প। প্রায় ৭০ টা দেশের অর্থনীতি এর সাথে ইতোমধ্যেই জুড়ে গিয়েছি এই গ্লোবাল মহা-অবকাঠামো প্রকল্প।  আর এই প্রকল্পকে চীনের ভুখন্ডের সাথে জুড়তে পাকিস্তান তার অধিকৃত কাশ্মীরের অংশের উপর দিয়ে অতিক্রম করতে দিয়েছে। চীনা জিনজিয়াং (বহুল প্রচলিত উইঘুর প্রদেশ) প্রদেশে প্রবেশের জন্য এটা সহজ রাস্তা হয়, রাস্তা ঘুরে আসতে হয় না তাই। কাজেই এটা নিয়ে কোন মসকরা বা কোন মসকারার ইঙ্গিতের মুল্য মোদীকে চুকাতে হতে পারে তা বলাই বাহুল্য। এখন মোদীর ছেলেখেলার জবাব ও শিক্ষা কী তিনি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নেহরুর চেয়েও খারাপভাবে নেবেন? সব কিছুই গভীরভাবে অস্থির ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ৩০ মে ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “মোদি কি নেহরুর মতো ‘শিক্ষা’ পেতে যাচ্ছেন?” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভেটো সদস্যপদ জাতিসঙ্ঘকেই না বুঝলে ভারত পাবে না

     ভেটো সদস্যপদ জাতিসঙ্ঘকেই না বুঝলে ভারত পাবে না

    গৌতম দাস

    ০৪ মে ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2YP

     

    Can-un-security-council-make-the-reform-happen-in-september

    _

    জাতিসংঘ [United Nations] সম্পর্কে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা অনেকে যা করেন অথবা এমন কিছু যা দৃঢ় আশা করেন  তা হল এই যে, এর সদস্যরাষ্ট্র সবার ক্ষমতা সমান আছে বা থাকবে। মানে, এখানে ইউনিভার্সালি সব রাষ্ট্রকে সমান ক্ষমতার সদস্যপদ দানের প্রতিষ্ঠান এমন বোধহয় এটা হয়ে আছে অথবা হওয়া উচিত। অথচ পপুলার শব্দে বললে এখানে “সমান ক্ষমতার গণতন্ত্র” বলে কোন ধারণা নাই। এমনকি আবার সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে এখানে সব (তবে কিছু হয়) সিদ্ধান্ত হয় না।

    এখানে প্রথম যে ব্যতিক্রম তা হল এর সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিবার কমিটি বা বডি কোনটা তা নিয়ে আর তা কিভাবে সিদ্ধান্ত নেয় সে প্রসঙ্গে। যেমন প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসে সাধারণত ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলো সকলে সমবেত হয় এক সাধারণ সভায় (General Assembly বা UNGA) তা এক অর্থে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ কমিটি। আর এর সিদ্ধান্ত হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে।  কিন্তু আবার না। কেন?  কারণ নিরাপত্তা পরিষদ বলে জাতিসংঘের আরও ক্ষমতাধর অন্য এক কমিটি আছে। আর তা সব সময় প্রতীকী ভাবে বসে থাকা অর্থে সাময়িক মূলতবিতে থাকে (যা যেকোন সময় ডেকে বসানো যায়), এটা এমন এক রাজনৈতিক কমিটি। এটাই যেকোন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিবার সর্বোচ্চ কমিটি, আর তা  অবশ্যই সাধারণ পরিষদের (UNGA) চেয়ে উপরে। এই রাজনৈতিক কমিটিই বা এই বডির নাম হল সিকিউরিটি কাউন্সিল বা বাংলায় নিরাপত্তা পরিষদ।  সাধারণ পরিষদ সভার সিদ্ধান্তের উপর দিয়ে চাইলে এই সিকিউরিটি কাউন্সিল (নিরাপত্তা পরিষদ) UNSC সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

    সবাই মিলে ১৯৩ বনাম ভেটো ৫
    জাতিসংঘে সাধারণ সভার সদস্য হল সবাই, যেকোন সদস্য রাষ্ট্রই, যা এখন মোট ১৯৩ টা রাষ্ট্র।  আর তুলনায় নিরাপত্তা পরিষদের মোট সদস্য মাত্র মোট ১৫ টা রাষ্ট্র।  অথচ নিরাপত্তা পরিষদ জাতিসংঘের সবগুলো কমিটির উপর দিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এছাড়া আরও কথা আছে। নিরাপত্তা পরিষদের মোট ১৫ সদস্যের আর এই পনেরোর অন্তত দশ সদস্য এরা প্রতিনিধিত্বমূলক বলে তারা দাবি করে।  মানে এই দশ রাষ্ট্র কেবল নিজেই নিজের প্রতিনিধি না বরং  নিজ মহাদেশের বাকি সবারও প্রতিনিধি আর নির্বাচনও হয় নিজ মহাদেশের অন্যান্য সদস্যবাষ্ট্রের ভোটে, লবিংয়ে। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল এই ১৫ রাষ্ট্রের  সবাই সমান ক্ষমতার নয় বরং এদের মধ্যে আবার ভাগ আছে। এখানে সবার ক্ষমতা সমান না। যেমন ঐ বডিতে যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তাব উঠলে ঐ ১৫ রাষ্ট্রের মধ্যে বিশেষ পাঁচ রাষ্ট্র আছে যাদের যেকোন একটা রাষ্ট্র আপত্তি দিলে ঐ বডিতে উঠা যেকোন প্রস্তাব নাকচ হয়ে যাবে, পাশ হয় নাই মনে করা হবে; এমনকি তাতে বাকি ১৪ সদস্যই প্রস্তাবের পক্ষে থাকলেও তা নাকচ বলে বুঝতে হবে। ঐ পাঁচ বিশেষ সদস্য হল আমেরিকা, রাশিয়া আর ইউরোপের দুই রাষ্ট্র যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স আর এশিয়ায় চীন। এরাই বিশেষ সদস্য বা ভেটোক্ষমতা সম্পন্ন সদস্য। মানে  যারা একাই আপত্তি দিয়ে যেকোন সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব গ্রহণ বাতিল করে দিতে পারে।  এটাই ভেটো [VETO] বা আপত্তি দেয়া।
    আরও একটা দিক হল, ঐ পাঁচ ভেটো সদস্যপদধারীরা স্থায়ী সদস্য। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের মোট ১৫ সদস্যের অবশিষ্ট দশ সদস্যপদ অস্থায়ী ও রোটেশনাল [rotational] মানে, ঘুরে ঘুরে একেকবার একেকজন। মানে এই দশ পদ মাত্র দুবছর মেয়াদের আর প্রতিদুবছর পর পর  তা আনুপাতিক হারে  বিভিন্ন মহাদেশের মধ্য থেকে নির্বাচিত করে নিয়ে পূরণ করা হয়।  মানে একবার এশিয়া থেকে ভারত বা জাপান সদস্য হলে দুবছর পরে, পরের বার হয়ত লবিতে বাংলাদেশ অথবা পাকিস্তানকে তাদেরকে পালটা নির্বাচিত করে দিতে হবে। এভাবে এশিয়া-আফ্রিকা মহাদেশ মিলে এখান থেকে পদ আছে মোট পাঁচটা, ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান রাষ্ট্রের জন্য পদ দুইটা, পুর্ব ইউরোপের জন্য একটা, পশ্চিম ইউরোপের ও বাকিরাষ্ট্রের জন্য দুইটা পদ, এভাবে মোট ১০টা অস্থায়ী পদ।

    কিন্তু  জাতিসংঘের গঠননীতিতে আপতিক দৃষ্টিতে সদস্যদের মধ্যে যা  “বৈষম্যমূলক মনে হচ্ছে” তা এমন কেন? প্রথমত, এটা সাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত কোন রাষ্ট্রজোট বা ক্লাব-সমিতি নয়। বরং জাতিসংঘ যে এমন সংগঠনই নয় সেটা নিয়েও কোন লুকাছুপিও নাই। তাহলে এমন সংগঠন গড়তে সদস্যরা রাজি হল কেন?

    বিচার ও সমাজের সম্পর্কঃ
    বিচার আর সমাজ শব্দ দুটোর মধ্যে সম্পর্ক হল, এরা পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক। যদি কোথায় কোন সমাজ গড়তে চাই তবে সেখানে আগে বিচার প্রতিষ্ঠা করে নিতেই হবে। অথবা এভাবে বলা যায় বিচার-ইনসাফ থাকলে বুঝতে হবে এবার এটা সমাজ হয়ে উঠতে পারবে। ঘটনা হল, মানুষ এক জায়গায় জড়ো হয়ে থাকলে সেখানে মানুষের মাঝে নানান পারস্পরিক স্বার্থবিরোধ দেখা দিবেই। এই বিরোধ মীমাংসা দুটা পথ হতে পারে। এক, গায়ের জোর খাটিয়ে মীমাংসা। যার গায়ের জোর বেশি সে ঐ জোর খাটিয়ে মীমাংসা নিজের মত করে করে নিবে, আর এতে “যার গায়ে জোর বেশি সেই সঠিক” – এই ভিত্তিতে এমন অবস্থাটাই বাকিদের মেনে নিতে হবে। আসলে বলা বাহুল্য, এখানে কোন ন্যায়-অন্যায় ইনসাফের ধারণা কার্যকর থাকবে না। আর অন্য দ্বিতীয় পথটা হল, অনেক পরিপক্ক ধারণা। এখানে বিরোধ মীমাংসা গায়ের জোরে বা সামরিক জোরে একেবারেই নয় বরং আগেই যেকোন বিরোধে মীমাংসা কোন নিয়মনীতিতে ফয়সালা করা হবে তা সকল সদস্যের মতামত নিয়ে ঠিক করে রাখা হবে। এগুলোকে কনভেনশন (Convention) বা আন্তর্জাতিক আইনে গৃহিত সকলের অবস্থান বলে বলা হয়। আর ঐ নিয়মনীতির ভিত্তিতে যেকোন রাষ্ট্রবিরোধ মীমাংসা করার চেষ্টা করা হয় এখানে। জাতিসংঘ এই দ্বিটিয় পথটা অনুসরণ করে আগানোর চেষ্টা করে থাকে।

    এই আইডিয়ার আলোকের গ্লোবাল প্রতষ্ঠান জাতিসংঘ গড়ার প্রস্তাবটাই করেছিলেন অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেন্ট ১৯৪২ সালে, সবার আগে রাশিয়ার স্টালিন আর বৃটেনের চার্চিলের কাছে। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দেয় তাঁরা এতে রাজি হবেন কেন? কেননা তাদের ভয় হয়েছিল, ধরা যাক সংখ্যাগরিষ্ট্রের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হবে যেহেতু তাতে, হবু রাষ্ট্রসমিতিতে আমেরিকা যদি বাকি গরীব সদস্য রাষ্ষ্ট্রগুলোকে ছলে বলে চাপে নিজের পক্ষে নিয়ে এবার রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোন সিদ্ধান্ত পাশ করিয়ে ফেলে তখন রাশিয়ার কী হবে? বিশেষ করে রাশিয়ার হাতে ত সামরিক শক্তি আছেই – কিন্তু এটা হাতে সাথে থাকা সত্বেও কেন সে অমন কোন  রাষ্ট্রসমিতির সদস্য হতে যাবে যারা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত রাশিয়ার উপর চাপিয়ে দিবে? অর্থাৎ প্রথম সমস্যা দেখা দেয় আমার হাতে সামরিক শক্তি থাকা সত্বেও কেন আমি অন্যের সাথে কোন কমিটিতে বাধ্যবাধকতার দায় নিয়ে বসতে যাব?  আর এতে যেখানে আমার হাত বাধা পড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকবে? তাই মূলত এটা সমাধান করতেই এবার প্রস্তাব সংশোধন করে ভেটো আইডিয়া এনে বলা হয় যে কোন সিদ্ধান্ত নিজের বিপক্ষে গেলে এই ভেটো-ক্ষমতাধর পাঁচ রাষ্ট্রের যে কেউ আগেই সেটা জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত নয় বলে ভেটো প্রয়োগ বা  সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিতে পারবে। তার মানে এতে দাঁড়াল ঐ পাঁচ রাষ্ট্র যেসব ইস্যুতে সকলেই একমত কেবল সেটাই জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত বলে পাস হতে পারবে। সেটা জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত বলে পাস হবার সম্ভাবনা। আর তাতে বাকি সকল সদস্যের সাথে নিতে দিবে বা পারবে।  যেকোন ইস্যুতে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত হতে হবে ঐ পাঁচ স্থায়ী সদস্যকে অবশ্যই ঐক্যমতে থাকতে হবে।   এই হল ভেটো বা স্থায়ী ইত্যাদি এসব শব্দগুলোর আসল অর্থ ও ব্যবহারিক তাতপর্য। রুজভেল্ট এভাবে সংশোধিত করে প্রস্তাব করতে পেরেছিলেন বলেই জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠান জন্ম হতে পেরেছিল।

    রুজভেল্টের ইচ্ছা উদ্দেশ্য ছিল কনভেনশন বা আন্তর্জাতিক আইন বলে গৃহিত আগাম নির্ধারিত নীতিগুলোর ভিত্তিতে দুনিয়ার সম্ভাব্য রাষ্ট্রবিরোধগুলো যতটা সম্ভব কমানো যায়, যুদ্ধ লাগা দেরি করিয়ে দেয়া যায় – এরই এক উদ্যোগ হবে জাতিসংঘ।  আর অবশ্যই এটা তখনকার মত করে করা এক উদ্যোগ বলে এটা তখনকার হিসাবে দুনিয়ায় কারা কারা সম্ভাব্য গ্লোবাল সামরিক  ও অর্থনৈতিক শক্তি বিবেচনা করা হয়েছিল – সেই ভিত্তিতেই ভেটো সদস্য দেয়া হয়েছিল ঐ ৫ রাষ্ট্রকে। যেটা এখন দিনকে দিন অনেক উত্থানপতন ঘটছে যেমন আমেরিকার জায়গা নেওয়ার দিকে ভেসে উঠছে চীন, এরকম আরও অনেক কিছু।  এজন্য এই পাঁচ কারা হবে এটাই আবার সেকালের জাতিসংঘ গড়ার প্রধান লিমিটেশন বা অস্থায়ীত্বের একটা বড় প্রমাণ।

    দ্বিতীয় পর্বঃ ভারতের ভেটো ক্ষমতার সদস্য হবার খায়েস
    শুধু খায়েশ বা আকাঙ্ক্ষা থাকলেই কিছু হয় না, স্বপ্ন দেখতে জানতে হয়, সেইসাথে সামর্থ্য আর বিস্তর ইতিবাচক ও ব্যাপারটা নিয়ে পুরাপুরি জানাশোনা হোমওয়ার্ক থাকতে হয়। শুধু ক্ষোভ থাকলে যে ভেটো ক্ষমতা  কিছুতেই পাওয়া যাবে না তা আগেই বলে দেয়া যায়। ভারতের হয়েছে এই দশা। এছাড়া আরেক প্রধান শর্ত হতে হয় যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের জাতিসংঘ সেকালের এই ফেনোমেনাটা – এমন এক প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য আমেরিকা কেন এত ডেসপারেট ছিল এসব কিছু বুঝতে হবে। মনে রাখতে হবে এটা কেবল একা রুজভেল্টের বাসনা নয়, বরং এটা ছিল এক পুরা আমেরিকান ড্রিম, বা বাসনা বলতে পারি। যেমন , প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) পরেও ততকালিন অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন তিনিও প্রায় একই স্বপ্ন দেখেছিলেন। আর তাঁর সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ হল – “লীগ অব নেশন”, এর জন্ম হওয়া।  লীগ অব নেশন (১৯২১) – এটাকে বলা যায় জাতিসংঘের আগের রূপ বা উদ্যোগ কিন্তু ব্যর্থ ভার্সান। এটা টিকে নাই, ১৯৩০  সালের পর থেকে এটা কার্যত নাই হয়ে গেছিল। কিন্তু এখনকার প্রসঙ্গের প্রাসঙ্গিক মুল কথাটা হল, ভারত জাতিসংঘ জন্মের ফেনোমেনা বুঝেছে, সে পরিপক্ক হয়েছে  এটা বিশ্বাস করা এখনও খুবই কঠিন হয়েই আছে। বিশেষ করে আগে সেকালে নেহেরু তো বটেই আর একালের মোদী কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে যেভাবে দায়ীত্বজ্ঞানহীন খেলা করছে।

    সৈয়দ আকবরউদ্দিন, ভারতের একজন পেশাদার আমলা ডিপ্লোম্যাট, মাত্র গত ৩০ এপ্রিল তিনি অবসরে গেছেন। জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি পদে থাকা অবস্থায় তিনি অবসরে গেলেন। আমলা চাকরিজীবীর এক ব্যক্তিদিক থেকে চোখ ফেললে, তাঁরা যত উপরের পদে আসীন হতে থাকেন ততই অশান্তি-অনিশ্চয়তা, কনুই মারামারিতে দিন কাটে তাদের। সেইসাথে একটা কথার সাথে ততই তাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে, কথাটা হল ‘কপাল’। সব প্রচেষ্টা ও উদ্যোগগুলোর উপরে দাঁড়িয়ে ভেসে থাকে এই ‘কপাল’। কপালে না থাকলে পোস্টিংয়ের ভাগ্যের চাকা ফিরবে না, তাই এসব বাক্যে ততই গভীর আস্থাভাজন হয়ে পড়তে থাকেন আমলারা। বিশেষ করে রাষ্ট্রটা যখন ভারত, যা চালায় বা চলে এসব মূলত পেশাদার শক্তিশালী আমলাগোষ্ঠির মাধ্যমে।

    এসব আমলাজাত সমস্যা অন্যদের মত আকবরের ভাগ্যেও ঘটেছিল ব্যাপকভাবেই। গত ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সর্বশেষ যখন ‘তিস্তাচুক্তি না হওয়া-খ্যাত’ বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন তখন আকবর ছিলেন – ভারতের ফরেন অফিসের  মুখপাত্র ও নিয়মিত ব্রিফিংদাতা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রায় সব আমলারই এক লালিত স্বপ্ন থাকে চাকরির মেয়াদশেষে বিদেশমন্ত্রী হয়ে যাওয়ার। ভারতে অনেকে হয়েছেনও। আর সেটি না হতে পারলেও অবসরে যাওয়ার আগে যদি পররাষ্ট্রসচিবও না হতে পারেন তবে ‘জীবনই বৃথা’- ধরনের অনুভূতি হয় তাদের। গত ২০১৩ সালের কংগ্রেসের দুই টার্মের সরকার সমাপ্তিকালে আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি শুধু না তা একেবারে সঙ্ঘাতময় ‘টিট ফর ট্যাটও’  হয়ে উঠেছিল। টেনশন বেড়েই চলেছিল। তাই, পরের বছরে ২০১৪ সালে মে মাসে মোদীর প্রধানমন্ত্রী জামানার শুরুতে আমেরিকা ও ভারত উভয়েই প্রবল আগ্রহে দ্রুত খারাপ সম্পর্কটা কী করে মিটমাট স্বাভাবিক করে নেয়া যায়, কার্যকর রুটিনে ফিরে শুরু করা যায় তা করতে উভয়ে উদগ্রীব থাকায়,  তা সহজেই হয়েই গিয়েছিল। এদিকে চীনের সাথে ভারতের সম্পর্কও জটিল এবং “কন্ট্রাডিক্টরি অনেক ফ্যাক্টরে” প্রায় সবসময়ই পরিপূর্ণ থাকে। চীনের থেকে বিনিয়োগ পুঁজি পাওয়া, চীনের সস্তা পণ্য আমদানি করা, চীনের বাজারে প্রবেশ করতে পারা এসবই ভারতের কাম্য। আবার এই চীনই ভারতের চোখে সম্ভাব্য সামরিক হামলার হুমকি; ১৯৬২ সালে ভারতের আসাম দখল করাতে সেই চীনা হামলার ট্রমা ও এর খারাপ স্মৃতি এখনও ভারতের মনে টগবগে। তাই দেখা যায়, এদুই দেশ আমেরিকা ও চীন  ক্ষেত্রে ভারতের বেস্ট অবস্থানগুলো কীকী হতে পারে তা নিয়ে সবচেয়ে ভালো হোমওয়ার্ক করা থাকা ভারতের কূটনীতিকদের জন্য পদ পাবার আসল সিড়ি।  এই বিচারে সেকালের রাষ্টদূত সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর ছিল বাস্তবত সবার উপরে। সেই সূত্রে তিনি অস্থির মোদীর চোখে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। মোদী তাকে তাই সটান সব বাধা ভেঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব করে নেন। আর শুধু তাই না, জয়শঙ্করের অবসরে যাবার পর ২০১৯ সালে মোদীর দ্বিতীয় টার্মের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও হয়ে যান তিনি। আর এসবের ঝাপটা লেগে ততই আকবরউদ্দিনের “কপাল” ক্রমশ ঢলে পড়া। যদিও সচিব তিনি হতে পারেননি, তবে জাতিসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি হতে পেরেছিলেন; আর সেটিই ছিল তার চাকরির মেয়া্দে শেষ পদবি।

    ভারতের দক্ষিণের প্রাচীন ও বিখ্যাত ইংরেজি পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’ [THE HINDU], ব্রিটিশ আমলে ১৮৭৮ সালে এর জন্ম। এই ‘দ্য হিন্দুর’ আমেরিকায় স্থায়ী সংবাদদাতা রাখার সামর্থ্য আছে, তিনি হলেন শ্রীরাম লক্ষ্মণ। আকবরউদ্দিনের অবসরে যাওয়ার প্রাক্কালে শ্রীরাম নিজ পত্রিকার জন্য আকবরের এক বড় সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। সেখানে প্রসঙ্গের ফোকাস করা হয়েছে –  জাতিসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়া এবং এর সম্ভাবনা।

    জাতিসঙ্ঘ কী? কেন এবং ইতিহাসের কোন পটভূমি ও পরিপ্রেক্ষিতে এর জন্মচিন্তা এসেছিল বা জন্ম দেয়া দরকার হয়েছিল ও এর জন্ম হতে পেরেছিল, তা জানা ও নিজে ব্যাখ্যা করতে পারা, তাতপর্য বুঝা খুবই জরুরি। অন্তত আকবরুদ্দিনের। তাতে ভারতের রাজনীতিবিদেরা বেজার হলেও সত্য কথাটা তাকেই উচ্চারণ করতে হত।  ভারতে এই কাজটা রাজনীতিবিদ তো বটেই, কোনো একাডেমিকও সম্যক বুঝেছেন ও এর তাৎপর্য অন্যকে বুঝাতে পারেন এমন খুব কমই দেখা যায়। এমনকি জাতিসঙ্ঘের ভবিষ্যৎ কী, তাতে কোন দিকে আসন্ন কী অথবা এর সম্ভাবনা এবং লিমিটেশন কী, এসব নিয়ে কথা বলার মত ভারতীয় একাডেমিকও খুব বেশি দেখা পাওয়া যায় না। ভারতের আজন্ম ভুল হচ্ছে, হয়েছে কী তা বোল্ড মুখের উপরে উচ্চারণের লোক এখনও দেখা যায় নাই।

    এর মূল কারণ সেই ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে অল্প কথায় যা বলা যায়ঃ ইউরোপের লেখা ইতিহাসে জাতিসংঘের জন্ম তাতপর্য নিয়ে আলোকিত করার দিক, এ’ব্যাপারে আমেরিকার চেয়ে তারা সবসময় পিছিয়েই থেকেছে।  এর মূল কারণ, আসলে ইউরোপের দুনিয়ার উপর রুস্তমি নেতাগিরি-কলোনিগিরিটাই  হারানোর দাসখত লিখে দিয়েই জাতিসঙ্ঘের জন্ম ইউরোপকে মেনে নিতে হয়েছিল। ঐ দাসখতে, যুদ্ধ শেষে তারা আর কলোনিগিরি করবে না ছেড়ে দিবে  – এই বলে দাসখত দিয়েই জাতিসংঘকে তাদের মেনে নিতে হয়েছিল।  তাই জাতিসংঘের জন্মকে বেশি গ্লোরিফাই অন্তত আমেরিকার লেভেলে তুলে করা সম্ভব ছিল না। আর এসব কিছুর প্রভাব পড়েছিল ব্রিটিশ কলোনি ভারতেও, ভারতীয় এলিট ও রাজনীতিবিদদের উপরেও। কারণ এসব এলিটেরা দুনিয়া সম্পর্কে ধারণা হয়েছে বৃটিশ পত্রিকা বা বই পড়ে, য়ামেরিকান রাইটিংস তাদের তেমন লাগালেই ছিল না।  ইউরোপ কালচারালি আমাদের কলোনিয়াল কাজিন ও মাস্টার, ফলে  পথ প্রদর্শক।  সম্ভবত সেকারণে, জাতিসংঘের গ্লোরিফাই প্রশ্নে আমরা বৃটিশদের চেয়েও নিচে। ভারতের কোনো রাজনীতিবিদ বা একাডেমিকও তাই জাতিসঙ্ঘের বৈশিষ্ট্য, তাৎপর্য, সম্ভাবনা ও লিমিটেশন সম্যক বুঝেছেন বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ নেহেরু নিজে।  এমনকি নেহরু থেকে মোদী পর্যন্ত (ফাঁকে মন্ত্রী/রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রণব মুখার্জিও) ভারতের প্রধানমন্ত্রীরা জাতিসঙ্ঘ নিয়ে ঠিক কী বুঝতেন, কী ধারণা রাখেন এর ভাল প্রমাণ হল – জাতিসঙ্ঘের কাছে তারা কী চেয়েছেন, নিজ আমলে ঠিক কী আশা করেছিলেন এর মধ্যেই প্রকাশিত হয়ে আছে। আর সবার ক্ষেত্রেই এর সবচেয়ে ভাল আর স্থায়ী ও পোক্ত উদাহরণ হল কাশ্মির ইস্যু, যা ভারতের কপালে এক গভীর অবুঝ বা না-বুঝের লজ্জা হয়ে এখনও ঝুলে আছে।

    আলোচ্য সাক্ষাৎকারে আকবরউদ্দিনও ভারতকে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ দেয়ার দাবি করেছেন, যুক্তি তুলে ধরেছেন। যেখানে মুল যুক্তির পয়েন্ট ভারতের জনসংখ্যা বেশি। অথচ জাতিসংঘের গঠনভিত্তি্র বাক্য বা চিন্তায় কার জনসংখ্যা কী তা কোথাও একেবারেই ফ্যক্টর বা বিবেচ্য নয়। তবু তিনি তা করেছেন।   কিন্তু কার কাছে? স্থায়ী সদস্যপদ কী কারো কাছে দাবি করতে হয়? অথবা খোদ সদস্যপদ জিনিসটাই কী কারো থেকে দাবি করে নেয়ার বিষয়? তাহলে আরো গোড়ার প্রশ্ন, জন্মের শুরুতে জাতিসঙ্ঘের স্থায়ী সদস্যপদ যারা পেয়েছিলেন তারা কার কাছে দাবি করে পেয়েছিলেন? এমনকি তাদের সদস্যপদ লাভ বা অর্জন করার ভিত্তি কী ছিল? সেটি কি একালের আকবরসহ সেকালের নেহরুরাও জানতেন?

    এখানে প্রণব মুখার্জির কথা জুড়ে দিলাম এজন্য যে, তিনিও ভারতের জাতিসঙ্ঘের ইতিহাসবোধ কোন পর্যায়ে এর মস্ত উদাহরণ। গত ২০০৯ সালে শুরু হওয়া আওয়ামী রাজত্বের বর্ষপূর্তিতে পরের বছর ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা প্রথম ভারত সফরে গেলে সেটা ছিল ভারতের প্রধান “বাংলাদেশ-ডিলার” অর্থ/পররাষ্ট্র মন্ত্রী প্রণবের বোনা-ফসলের লাভালাভ বুঝে নেয়ার সময়। তখন ঐ সফর উপলক্ষে প্রায় ৫০ দফার দুদেশের এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত  হয়েছিল। ওর ৪৭ নম্বর দফা ছিল- “বাংলাদেশ জাতিসঙ্ঘে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ দাবি সমর্থন করছে” […Prime Minister of Bangladesh conveyed her country’s support in principle for India’s candidature for the permanent membership of the United Nations Security Council……]। তবে যদিও আমরা আজও ঠিক জানি না আমরা তা কেন সমর্থন করেছিলাম, কীইবা পেতে। তার চেয়ে বড় কথা, তখন বা এখন আমরা যেন হলাম ‘ঘরে বেঁধে রাখা প্রিয় মুরগি’, কিন্তু যখন খুশি যাকে জবেহ করে খেয়ে ফেলা যায়। সেই আমাদেরই আবার এই সমর্থনের ওজন কী এতটাই? কাজেই এতে ভারতের লাভ কী হয়েছে আমরা জানি না। তবে বান্ধা মুরগি আরেকবার জবেহ দেওয়া হয়েছে বলা যায়। আর বিরাট লাভালাভের দিকটা হল,  জাতিসঙ্ঘ সম্পর্ক প্রণব মুখার্জির জানাশোনা কেমন এতে তা প্রকাশ পেয়েছিল। আর এর মাধ্যমে জাতিসঙ্ঘ সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের মাত্রা ছড়িয়েছিলেন।

    জাতিসঙ্ঘ সম্পর্কে বলা যায়, এটা ছিল সেকালে গত শতকের চল্লিশের দশকে বসে “আমেরিকান সেঞ্চুরি কায়েম হবে” [টাইম ম্যাগাজিনের মালিক সম্পাদক ‘হেনরি লুস’ – এর হাউজ থেকে ১৯৪১ সালে প্রকাশিত নতুন পত্রিকা লাইফ এ প্রকাশিত একেমিকান সেঞ্চুরি নামের আর্টিকেল] আগ্রহিরা যোগাড় করে পড়তে পারেন। ] – এমন এক হবু দুনিয়া সম্পর্কে আমেরিকার স্বপ্ন, আইডিয়া ও ইমাজিনেশনের প্রকাশ – এই হল আমেরিকার জাতিসংঘ বিষয়ক স্বপ্ন। আর বিশেষ করে তা ব্যক্তি হিসেবে ততকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট (১৯৩২-৪৫) রুজভেল্টেরই আইডিয়া। আবার ইউরোপের সাথে এই আইডিয়ার সম্পর্ক হল – ইউরোপ এর সাথে একমত হয়ে যায় এজন্য যে, মানে রুজভেল্টকে ইউরোপ নেতারা (মূলত হিটলার বাদে বৃটিশ-ফরাসী) নেতা মেনে নিলে হিটলারের হাতে তাদেরকে আর বেঘোরে মারা যেতে হয় না এবং তা সমূলে ধ্বংসের হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার একটা বিরাট  পথ ও সুযোগ হতে পারে। এ কারণে জাতিসঙ্ঘ জন্মের প্রধান তাৎপর্য হল, মার্কিন নেতা ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের সাহায্য পাওয়ার লোভে ইউরোপ হিটলারকে পরাজিত করার পরবর্তী দুনিয়াতে নিজেদের কলোনি দখল-ব্যবসা ত্যাগ করতেও রাজি, এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেলেছিল।

    কিন্তু জওয়াহেরলাল নেহরুসহ ভারতীয় রাজনীতিবিদরা না এই ফ্যাক্টস জেনেছিলেন বা এর তাৎপর্য বুঝেছিলেন। এনিয়ে এখনো ভারতের কোনো মহলের স্টাডি আছে বলে জানা যায় না। তবে জানা যে নাই এর বড় প্রমাণটা হল- ভারতের এখনো – কাশ্মিরকে ভারতের বলে দাবি করার ভিত্তি তদানীন্তন রাজা হরি সিংয়ের স্বাক্ষর, তিনি অ্যাকসেশন (ভারতে অন্তর্ভুক্তি হতে দলিলে স্বাক্ষর) চুক্তিতে স্বাক্ষর দেয়াকে মনে করা হয়। জাতিসঙ্ঘের গঠনভিত্তি যে নীতি বা বাক্যের ওপরে দাঁড়ানো সে মূলনীতি অনুসারে, রাজা হরি সিংয়ের স্বাক্ষর মূল্যহীন বা কাশ্মিরের হয়ে কথা বলার আসল বা বৈধ কোনো অথরিটিই হরি সিং নন। কারণ, জাতিসঙ্ঘের জন্মনীতি অনুসারে- যেকোনো ভূখণ্ডের বাসিন্দা জনগোষ্ঠী সম্মিলিত মতামতই একমাত্র অথরিটি যারা বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে নির্ধারণ করবে তারা কিভাবে শাসিত হতে চান, কোথায় যুক্ত হতে চান অথবা আলাদা ভুখন্ড রাষ্ট্র থাকতে চান কিনা।

    সার কথাটা হলো – কলোনিমুক্তিতে ১৯৪৭ সালে জন্ম থেকেই ভারত জাতিসঙ্ঘের ভিত্তিনীতি জানে না বা সে অনুসারে এই নীতি আমলই করেনি। তাই, ১৯৪৮ সাল থেকে কাশ্মির দখল করে আছে অথচ প্রধানমন্ত্রী নেহরু নিজেই কাশ্মীর ইস্যুটা জাতিসঙ্ঘের কাছে  মীমাংসা করে দিতে  নিয়ে গিয়েছিলেন। অথচ জাতিসঙ্ঘ নিজের জন্মভিত্তি অনুসারে কাশ্মির ইস্যু মীমাংসার জন্য গণভোট করার রায় দিবে এটা  তো জানা কথা। অথচ, জাতিসঙ্ঘ যে এমন রায়ই তো দেবে, নেহরু এটা জানতেনই না। মানে জাতিসঙ্ঘের জন্মনীতি তার জানা ছিল না বলেই জানতেন না তাই তিনি জাতিসঙ্ঘে গিয়েছিলেন। সেই থেকে জাতিসঙ্ঘ সংক্রান্ত এর তাতপর্য ও জন্মনীতি বুঝাবুঝি ’ সারা ভারতের একাডেমিক, রাজনীতিবিদসহ সবার কাছে ‘নিজের চায়ের কাপ নয়’ হয়ে আছে। অর্থাৎ, ভারতের কথিত দেশপ্রেম যেটা আসলে হিন্দু-জাতিপ্রেমে হাবুডুবু খাওয়া রাষ্ট্রচিন্তা, গড়াগড়িতে ডুবে আছে বা বলা যায়, এসব চিন্তাভাবনা তলায় চাপা পড়ে আছে। কারণ জাতিসঙ্ঘের ভিত্তি বুঝে গেলে নিজ দেশের কাশ্মির নীতি ভুল এবং তা জাতিসঙ্ঘের মূল নীতিবিরোধী বলে অবস্থান নিতে হবে।

    মজার কথা হল – এই জাতিসঙ্ঘেরই স্থায়ী ভেটো সদস্যপদ লাভের জন্য ভারত আবার প্রবল আকাঙ্ক্ষী। যত তীব্র তার আকাঙ্ক্ষা, ততই তীব্র ও গভীর তার অজানা হল – ভেটো সদস্যপদ পাওয়া যায় কী করে! জাতিসঙ্ঘের জন্মের সময় ওই পাঁচ রাষ্ট্র তা পেয়েছিলই বা কী করে, তা কখনো জানা হয়নি।

    ‘সরি আকবর উদ্দিন! আপনিও ফেল করলেন’। কারণ তিনি ওই সাক্ষাৎকারে দাবি করছেন, যেহেতু ভারত দুনিয়ার বড় জনসংখ্যার দেশ, তাই তাকে ভেটো ক্ষমতা বা স্থায়ী সদস্যপদ দিতে হবে। বোঝা গেল, হোমওয়ার্ক তিনিও যথেষ্ট করেননি। তাই ফেল করলেন। সবার আগে জানতে হবে, ওই পাঁচ রাষ্ট্র স্থায়ী সদস্যপদ পেয়েছিল ঠিক কিসের ভিত্তিতে। তাই আপাতত আকবরের কথা ভারতের কারো কাজে লাগবে না, হিন্দুত্বের মোদীর কাছেও না। সুতরাং তার কপালও আর খুলবে না।

    আসলে মূল কথাটা হল যদি কখনো আবার দুনিয়ার বা গ্লোবাল নেতৃত্ব চেঞ্জ হয়, কখনো নতুন করে আরেক জাতিসংঘের জন্ম হয় অথবা সংস্কার করে আর একটা জাতিসঙ্ঘ গড়ার পরিপ্রেক্ষিত তৈরি হয়, সর্বোপরি গ্লোবাল পলিটিক্যাল নতুন কিছু কমন ভিত্তি তৈরি হয়, তবেই জাতিসংঘে এমন কোনো পরিবর্তন হতে পারে। এর আগে কিছুই ঘটবে না। যদি এর আগে এক খসড়া কমিটি আগে গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা এখন ফ্রিজে ঢুকে গেছে। ট্রাম্পের উত্থান ফেনোমেনা বলে এটা এমনই হওয়ার কথা। গ্লোবাল নেতা আমেরিকা এখন এক জাতিবাদী আমেরিকা হতে চাইলে সেটা মসকরা ছাড়া অন্যকিছু হবে না।  আর তত দিনে ভারতের কী হবে? ক্রমেই ভারত নিজ সংহতিতে টিকে থাকতে পারবে কি না সেই  চ্যালেঞ্জ বড় আর মুখোমুখি হতে থাকবে। সেটি সামলে ভারত টিকে থাকতে পারবে কি না, এটাই তার চ্যালেঞ্জ। মুরোদ থাকলে নতুন করে ভারতের সবাইকে ইনক্লুসিভ এক রাজনৈতিক ভিত্তি খাড়া করে ভারত গড়তে পারে কি না দেখা উচিত। এর ভিতরেই ভারতের আগামি ভারতের ভবিষ্যত এবং ভবিষ্যতের জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তি ঘটতে পারে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০২ মে ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টে  আর “জাতিসঙ্ঘের ভেটো সদস্যপদের আকাঙ্ক্ষা” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভাইরাসে টিকে গেলেও গ্লোবাল মহামন্দায় কী…

    ভাইরাসে টিকে গেলেও গ্লোবাল মহামন্দায় কী…

    গৌতম দাস

     ৩০ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2VO

    করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯। এখন কোনো দেশী অথবা বিদেশী মিডিয়া যেটাই খুলা যাক, দেখা যাবে কমপক্ষে ৯০ শতাংশ নিউজের বিষয়বস্তু কোনো না কোনোভাবে এই ভাইরাসের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। দুনিয়াতে এখন এই ভাইরাসের প্রভাব এতই মারাত্মক। আরেক অদ্ভুত দিক হল – যা আমাদের ঘরে ঘরে ঠিক তা দুনিয়াজুড়েও – আগে দেখা যায়নি এমন অদ্ভুত পরিস্থিতি।  শুধু আমরাই যার যার ঘরে বন্দি নয়, এটা সারা দুনিয়ারই চিত্র। ভাইরাস দাবি করছে “নো কনটাক্ট”, কোন যোগাযোগ লেনদেন ্সব বন্ধ করতে হবে। অথচ  ব্যবসা বাণিজ্য লেনদেন বিনিময়ের যোগাযোগই অর্থনীতি।  তাই সোজা মানে দাঁড়াল, আমরা ভাইরাস মোকাবিলায় যত সচেষ্ট ও সফল ততই যেন অর্থনীতি বিকল হবে – এ’এক অদ্ভুত সম্পর্কের মধ্যে এখন আমরা দুনিয়ার সকলে।  সামগ্রিক এই পরিস্থিতিই ইঙ্গিত দিচ্ছে আমরা একটা গ্লোবাল মহামন্দার দিকে যাচ্ছি, কেউ কেউ অবশ্য দাবি করছেন, আমরা ইতোমধ্যেই মন্দায় প্রবেশ করে ফেলেছি [Clear We Have Entered Recession That Will Be Worse Than 2009: IMF Chief]।

    জি৭  ও জি২০
    মহামন্দার শঙ্কা যে সবাইকে ভীত করে ফেলেছে এর সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ হল, অকালে প্রথমে ‘জি৭ [G7]’ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের  বৈঠক। আর পরে ‘জি২০’ [G20] অর্থমন্ত্রীদের বৈঠক। কিন্তু এর আয়োজনের ধরন বলে দিচ্ছে, এ ধরনের গ্লোবাল সামিট হচ্ছে যার যার দেশে বসে ভার্চুয়ালি মানে ভাবের মধ্যে, যা দেড় ঘণ্টার এক ‘ভিডিও কনফারেন্স’ মাত্র। এখনকার আরেক গ্লোবাল হয়ে ওঠা শব্দ হল ‘ডিস্টান্সিং’ [distancing]। এর মানে হল, কাছে এলেও দূরে দূরে থাকা। প্রথমত আইসোলেশন বা বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘরে বন্দী হয়ে বাস করতে হবে সবাইকে কিছু দিন বা হয়ত মাস। আর এ সময়ে জরুরি প্রয়োজনে যদি দেখা করতেই হয় তবে পাঁচ-সাত ফুট দূরে দূরে থেকে কথা বলতে বা লেনদেন করতে হবে। স্বভাবতই এমন গ্লোবাল পরিস্থিতিতে গ্লোবাল অর্থনৈতিক মহামন্দার ঘণ্টা বাজারই এমন সময়ে ইমার্জেন্সি গ্লোবাল সামিট হবে দেড় ঘণ্টার, এক ‘ভিডিও কনফারেন্স’ – এটাই স্বাভাবিক।

    রাষ্ট্রজোট জি৭ সদস্য রাষ্ট্রগুলো হল – আমেরিকা, কানাডা আর সাথে আরো চার ইউরোপীয় রাষ্ট্র ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি এবং এশিয়ার একমাত্র জাপান। এভাবে গ্লোবাল (মুলত) অর্থনীতিক পলিসিতে  সাত রাষ্ট্রের এক সমন্বয় গ্রুপ জি৭। এই সাত রাষ্ট্রের গ্রুপ জি৭-এর কোন রাজনৈতিক বা আইনগত ক্ষমতা না থাকলেও তারা এক বিশেষ ক্ষমতার। কারণ কোনো ইস্যুতে (সাধারণত অর্থনীতির ও গ্লোবাল ইস্যু) তারা একমত হয়ে গেলে এর প্রভাব বাকি সব রাষ্ট্রের উপর অনেক বড় ও নির্ধারক হয়ে ওঠে। এর একটা বড় কারণ হিসেবে যেমন বিশ্বব্যাংকের মালিকানাই ধরা যাক; জি৭ দেশগুলোর বিশ্বব্যাংকের মালিকানা সব মিলিয়ে মোট ৩৫% এর বেশি হবে, যেখানে আমেরিকার একা মালিকানা  ১৮% এর মত। ফলে স্বভাবতই তাদের ঐক্যমতের সিদ্ধান্ত বাকি সবার জন্য অনেক ভারী ও খুবই নির্ধারক।
    তবে উপরের কথাগুলো অতীত ঘটনা হিসেবে বলা সম্ভবত বেশি সঙ্গত।  কারণ এরা ‘পুরান জমিদার’, যার ঠাটবাট আছে কিন্তু বাস্তব মুরোদ আর নেই; শুকিয়ে ফোকলা হয়ে গেছে। পুরানা মাতবর আমেরিকার জায়গায় চীন এসে প্রবেশ করাতে আস্তে আস্তে অনেক দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে, রঙ ফিকে হয়ে পড়ছে। আর সেই সাথে নতুনের আভা দেখা যাচ্ছে।
    যদিও জি৭ নিয়ে অনেকে সবচেয়ে বিরক্তিকর ভাষায় বলার চেষ্টা করেন, এরা নাকি “সেভেন ডেমোক্রেসিজ”। কেন? চীনের বিরুদ্ধে পুরান ডাট দেখানোর জন্য। এমনিতেই ‘ডেমোক্রেসি’ শব্দটাই তৈরি করা হয়েছিল পুরানা সোভিয়েত ইউনিয়নকে কোপানোর জন্য   অ্যামেরিকান শব্দ হিসাবে। অরিজিনাল ক্লাসিক শব্দটা ছিল রিপাবলিক, এর বদলে ডেমোক্রেসি শব্দের আমদানি।  এছাড়া, একালে একা চীনা নেতৃত্বেই পাল্টা বিকল্প-আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক হতে চাইবার মত প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়ে গেছে। জি৭ বা এর সদস্যরা এখনো (মুরোদ না থাকলেও গুণ-মানে) চীনের চেয়ে তারাই ভাল, এমন ভাব ধরার জন্য এটা বলে থাকে। ফ্যাক্টস হল একা চীনের এখন ঋণ- বিনিয়োগ দেয়ার সক্ষমতা দুনিয়ার সবার চেয়ে বেশি। সে কারণে চীনা নেতৃত্বের নতুন নতুন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই মাথা তুলছে, প্রভাব বাড়িয়ে চলেছে। মূলকথা, ইতোমধ্যেই তারা বিকল্প হিসেবে নিজেদের হাজির করে ফেলেছে। যেমন এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চাইলে বিশ্বব্যাংকের বদলে সরাসরি চীনের বা চীনের ‘বিশ্বব্যাংকে’র কাছে অবকাঠামো ঋণ নিতে যেতে পারেন।
    আসলে লাশের বাক্সে শেষ পেরেকটা মেরেছে ‘ওয়াল স্ট্রিট’ [Wall Street]। মানে, গ্লোল্ডম্যান স্যাসের [Goldman Sachs] মত দানবীয় বড় বড় অর্থবিনিয়োগের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতীকী উপস্থিতি বা প্রধান অফিস যেখানে। গত ২০০৯ সালে তারা আওয়াজ তুলে বলেছিল জি৭ গুরুত্বহীন হয়ে গেছে। কারণ এদের অর্থনীতি আর আগের মতো নয়, তাকত নাই বরং ঢলে পড়েছে। আর পালটা ততই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়েছে “রাইজিং ইকোনমি” [Rising Economy] বলে পরিচিত আরেক ক্যাটাগরির দেশগুলো যাদের জিডিপি সবচেয়ে আকর্ষণীয়ভাবে দ্রুত বাড়ছে। কাজেই ‘তাদেরও পুরানা জি৭-এর সাথে মিশিয়ে নিয়ে আলাদা পরিসরে  জি২০ নামে জোট গড়া হোক। এই দাবি ছিল এমনই এক বাস্তবতা, যে তাই জি২০ গ্রুপ কার্যকর হয়ে যায়। অনেকে বলার চেষ্টা করেন এরা দুনিয়ার টপ ২০টা ইকোনমির একটা গ্রুপ। সেটা যতটা না সত্যি, এর চেয়েও সত্য হল, চীন মানে যার নিজের আছে ১৪০ কোটি জনসংখ্যার এক বিশাল অভ্যন্তরীণ ভোক্তাবাজার, সাথে আছে এর চেয়েও বড় উৎপাদন সক্ষমতা এবং অন্য দেশে ঋণ-বিনিয়োগদাতা হয়ে হাজির হবার সক্ষমতা; আর পাশে ভারত যার অভ্যন্তরীণ ১৩৬ কোটির বড় ভোক্তাবাজার আর, উৎপাদন সক্ষমতার পটেনশিয়াল আছে; এ ছাড়া ব্রাজিল ও সাউথ আফ্রিকা থেকে সৌদি আরব পর্যন্ত মিলে গঠিত হয়েছে এই জি২০। তাই গত সপ্তাহে (২৬ মার্চ) জি২০ এর ভিডিও কনফারেন্সের নয় দিন আগে (১৭ মার্চ) জি৭-এর একই কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হইয়ে যায়। বলাবাহুল্য, জি৭ জি২০ এর অংশ অবশ্যই। আর প্রতিটি জি২০ বৈঠকের আগে জি৭-এর সভা হয়ে যায়, যাতে ‘জি৭-ওয়ালা’রা মাতবরি নিবার সুযোগ পেয়ে গেলে জি২০-এর বৈঠকে একই স্বরে কথা বলতে পারে।

    এদিকে ভাইরাসের ব্যাপকতায় এখন আর লুকানো থাকছে না যে, আসন্ন এক গ্লোবাল মহামন্দার মখোমুখি হতে যাচ্ছি আমরা সকলে। তাই জি২০ অর্থমন্ত্রীদের ভিডিও কনফারেন্সের মূল কথাটা ছিল, তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন গ্লোবাল অর্থনীতিতে এমন অর্থ ঢালবেন যাতে গ্লোবাল বার্ষিক রাজস্ব ব্যয় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। এনিয়ে তাই রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম G20 leaders to inject $5 trillion into global economy in fight against coronavirus। জি২০ এর এখনকার চেয়ারম্যান সৌদি আরব। তার নেতৃত্বেই এ ঘোষণা দেয়া হয়। তারা দুনিয়ার মানুষের চাকরি আর আয়ের ক্ষতি থেকে তাদের রক্ষা ও তা ফিরিয়ে আনার জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দেন। আর এনিয়ে আলজাজিরার শিরোনাম হল, ‘কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে গ্লোবাল অর্থনীতিকে রক্ষার লড়াইয়ে জি২০-এর পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি [  G20 pledges $5 trillion to defend global economy against COVID-19]।

    কিন্তু তাহলে জি৭-এর বিবৃতি বা রিপোর্ট কই? সেখানে কী বলা হয়েছে?
    সরি, সেটা নাই। কেন?  এর কারণ আসলে জি৭-এর সভা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু সেখান থেকে কোনো যৌথ বিবৃতি দিতেই তাঁরা ব্যর্থ হয়েছে। আর বলতে গেলে, এর কয়েকদিন পরে জি২০ থেকে ব্যক্ত প্রতিশ্রুতি তাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।

    কেন জি৭ ব্যর্থ হল? কারণ, আমেরিকা একজন দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রেসিডেন্ট পেয়েছে।  তাই এর খাড়া জবাব হুল, ট্রাম্পের আমেরিকা এক দায়িত্বজ্ঞানহীন তৎপরতা এর জন্য দায়ী। সেটা কীভাবে? এবার জি৭-এর সভা ছিল মূলত পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের। তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হয়ে ঐ সভায় উপস্থিত মানে ভার্চুয়ালি ওয়েব কনফারেন্সে হাজির ছিলেন। আর তিনি যেন চাকরি রক্ষার্থে পাগলা প্রেসিডেন্টের আনুগত্যের এক চরম দশা দেখাতেই নিজের কোন বিদ্যাবুদ্ধিও খরচ করেন নাই। আর তাতেই বিবৃতি ড্রাফটের সময় তিনি গোঁ-ধরে বসেন যে, ভাইরাসটাকে করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ নয়, বরং ‘য়ুহান ভাইরাস’ বলতে হবে। আর এতে স্বভাবতই ইউরোপীয়সহ কোনো সদস্য রাষ্ট্রই তা মানতে রাজি না হওয়ায় সব নস্যাৎ হয়ে যায়। সদস্যরা আর একমত হতে পারে নাই। কারণ তারা মনে করেছিল যখন ভাইরাস সামলাতে ঐক্য দরকার তখন একাজ হবে বিভক্তি তৈরি করা  [viewed it as needlessly divisive at a time when international cooperation is required to slow the global pandemic …]। ফলে ড্রাফট আর ফাইনাল পর্যন্ত যায় নাই। তবে এতে পরবর্তিতে ট্রাম্পকেই এর সব ‘কাফফারা’চুকাতে হয় অবশ্য।

    আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আগামী নভেম্বর মাসে। আর ট্রাম্প এবারো এতে প্রার্থী। ট্রাম্পের ধারণা, তিনি চীনের বিরুদ্ধে এক বিরাট লড়াকু যিনি এই প্রথম জাতিবাদী-আমেরিকান হয়ে চীনের বিরুদ্ধে কথিত ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’ লড়ছেন। এ্মন ইমেজ আর প্রপাগান্ডা জোরদার করতেই তিনি কোভিড-১৯ কে ‘য়ুহান ভাইরাস’ [চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী য়ুহানে সর্বপ্রথম এই রোগের প্রাদুর্ভাব হয়] বলে ডাকার বালকসুলভ আবদার ধরে বসেন। কিন্তু সমস্যাটা হল, এমন প্রপাগান্ডায় কোন ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তা করতে ট্রাম্প পারেন নাই। অক্ষম; তা এখন প্রমাণিত। কেন?
    প্রথমত, সারা দুনিয়া মারাত্মকভাবে ভাইরাস আতঙ্কে ভুগছে; হিমশিম খাচ্ছে যে, কী করে নিজ নিজ দেশের মানুষকে বাঁচানো যায়, মৃতের সংখ্যা কমানো যায়। যাতে এতে ন্যূনতম সফলতা আসা শুরু হলেই, এরপর গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা যাতে ভাইরাসের ক্ষতির উপর বাড়তি প্রভাব ফেলতে না পারে তাই এর মোকাবেলা করতে ঝাঁপিয়ে পড়া যায়। অথচ ট্রাম্প এমন ক্রিটিক্যাল সময়ে তিনি আছেন তার ব্যক্তিগত সঙ্কীর্ণ স্বার্থ, তথা নির্বাচন নিয়ে। এছাড়া ট্রাম্পের এই অবস্থান নেয়া গ্লোবাল ঐক্যের বদলে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল।
    দ্বিতীয়ত, করোনাভাইরাসের জন্য চীনকে দায়ী করার জন্য ট্রানপের দাবিই তো ধারাবাহিক নয়। যেমন, ঘটনার শুরুর দিকে তিনিই বিবৃতি দিয়ে চীনের প্রশংসা করেছেন যে, চীন উদার হয়ে এই ভাইরাস সম্পর্কে সব তথ্য ও আপডেট খোলাখুলিভাবে আমাদেরসহ সবাইকে জানাচ্ছে শেয়ার করছে বলে। নিচের টুইট দেখেন।

    কিন্তু পরবর্তীতে হঠাৎ করে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এক রিপাবলিক সিনেটর টম কটন “করোনা চীনের জীবাণুযুদ্ধের অস্ত্র” যা “সম্ভবত হাত ছুটে বাইরে এসে পড়েছে” বলে অভিযোগ তোলেন। আর তা থেকেই ট্রাম্পের বয়ান ও অবস্থানও বদলে যায়। অথচ কটন তার অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি [Cotton provided no evidence for the claim and asserted that it was the Chinese government’s job to disprove it.]। বরং একটা ‘সম্ভবত’ বলেছেন। অর্থাৎ নিশ্চিত করে, এমন শব্দ দিয়ে নয়। এ নিয়ে ইতোমধ্যে চীনও আমেরিকাই এই জীবাণু চীনে ছড়িয়েছে বলে পাল্টা দাবি জানায়। এসব পাল্টাপাল্টি অভিযোগে সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এর মধ্যেই ট্রাম্প ‘য়ুহান ভাইরাস’ বলে তার প্রপাগান্ডা চালু করে দিয়েছিলেন। আর চীন এর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেয়া শুরু করে ছিল ১৭ মার্চ থেকেই।  কিন্তু ট্রাম্পের অবস্থানের অসঙ্গতি হল, তাহলে শুরুতে তিনি কেন চীনের প্রশংসা আর ভাইরাস সামলানো ও তথ্য সবার সাথে শেয়ার করার প্রশংসা করেছিলেন।
    ট্রাম্পের প্রপাগান্ডা করার ব্যাপারটাকে পাঠকের নিজেই বিচার ও বুঝে দেখার জন্য একটা ভিডিও এখানে আছে আগ্রহিরা এটা দেখতে পারেন।
    তৃতীয়ত, এ পরিস্থিতিতে ইউরোপ  অসংলগ্ন অবস্থানের ট্রাম্প-এর হাত ছেড়ে দেয়া ছাড়া নিজেরাই নিরুপায় বোধ করেছিল। সে কারণে ‘জি৭’ ভিডিও কনফারেন্স  হয়ে পড়েছিল অকার্যকর ও স্থবির। কিন্তু গ্লোবাল অর্থনীতির দুর্দশার মুখে নতুন উদ্যোগের এক ধারাও শুরু হয়েছিল। এর লিড নিতে আসে জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু [WHO, World Health Org]। সংস্থাটি পরিষ্কার করে বলেছে এভাবে ‘উহান ভাইরাস’ বলে চীন-এশিয়া বা কোনো অঞ্চলকে দায়ী করা ঠিক নয়। এ কারণেই আমরা এর নাম কোভিড-১৯ বলে স্থির করেছিলাম”। ’সবচেয়ে কড়া কথাটা বলে ট্রাম্পকে সাবধান করেছেন হু এর এক নির্বাহী পরিচালক ডঃ  মাইক রায়ান। তিনি বলেন, ভাইরাসের কোন রাষ্ট্রীয় সীমান্ত মানে না। আপনি কোন জাতি কোন রেস, গায়ের রঙ কী অথবা ব্যাঙ্কে আপনার কত টাকা আছে ইত্যাদি এসবের পরোয়া করে না। অতএব ভাষা ব্যবহারের সময় সাবধান – এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। আমরা এমন ভাষা ব্যবহার করতে পারি না যেটা কোন বিশেষ জনগোষ্ঠির জাত সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে উস্কানি তৈরি করে বসতে পারে”।

    “Viruses know no borders and they don’t care about your ethnicity, the color of your skin or how much money you have in the bank. So it’s really important we be careful in the language we use lest it lead to the profiling of individuals associated with the virus,”  Dr. Mike Ryan, the executive director of WHO’s emergencies program,

    বলতে গেলে ট্রাম্পকে তিনি একেবারে ছেঁচা দিয়ে যেন বলেছেন – আপনি কথা বলার আদব জানেন না; দায়ীত্বজ্ঞানহীন।  এযেন বলা আপনি ট্রাম্প এক রেসিষ্ট[racist], তাই আপনি চীন বা এশিয়ার কোন অঞ্চলের মানুষদেরকে নিচা দেখাতে তাদের দায়ী করছেন। আর এঘটনার পর সাংবাদিকেরা ট্রাম্পকে তাঁর রেসিজম বা বর্ণবাদী মন্তব্যের জন্য ছেঁকে ধরেন। উপরের লিঙ্কটা এক অ্যামেরিকান মিডিয়া CNBC থেকে নেয়া। ওখানে শুরুতে একটা ভিডিও ক্লিপ আছে আগ্রহীরা তা দেখে নিতে পারেন।

    এরপরেই আসলে দ্রুততার সাথেই অবশেষে একটা সন্ধি হয়। যার প্রকাশ ঘটানো হয় আমেরিকায় চীনের রাষ্ট্রদূত, অন্য কথা প্রসঙ্গে আমেরিকান এক প্রেসের কাছে কথা বলার সুযোগ নিয়ে “চীন-আমেরিকার পারস্পরিক অভিযোগ তোলা থেকে” তিনি “দূরে থাকতে চান” বলে জানিয়ে দেন।  এই কথাটাকে হংকং এর এক মিডিয়া লিখেছে, “এতে পরিপক্ক আচরণ আবার শুরু হয় যখন চীনা বিবৃতিতে আকুল আবেদন জানানো হয় যে প্যান্ডেমিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে, আর এতে ট্রাম্পও তারপর থেকে চাইনিজ ভাইরাস বলা বন্ধ করেন [Adult behaviour resumed as statements out of China urged the world to unify against the pandemic; Trump stopped calling it a “Chinese virus”.]।

    ট্রাম্প এবার ২৪ মার্চে  প্রেসের কাছে বলেন যে, “তিনি করোনার জন্য জন্য চীন বা এশিয়ার কেউ দায়ী বলে মনে করেন না”।  মানে পুরা উলটা সুর এবার।  আর তাতে কয়েকদিন কূটনীতিতেই জি৭-এর ব্যর্থতার পরও ২৬ মার্চ জি২০-এর ভার্চুয়াল সভা থেকে সাফল্য আসে, যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয়। সেখানে ভাইরাসকে সবার জন্য বিশেষ করে গ্লোবাল অর্থনীতিতে সবার জন্য ‘কমন হুমকি’ বলে উল্লেখ করে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। এভাবে আবার সব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে থাকে।  ইতোমধ্যে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান এক সাক্ষাৎকার দিয়ে ডলার ছাড় করার জন্য তার পরিকল্পনা এবং বিস্তারিত সাক্ষাৎকার দেন। এক কথায় বললে, ট্রাম্পকেই নিজের ফেলা থুথু চেটে তুলে নিয়ে বিতর্ক শেষ করতে হয়। আর এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো রিপোর্টিং করেছে হংকংয়ের ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’। তারা ট্রাম্পের কান্ডকারখানা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে তিনি কখন কী বলেছেন এনিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে।

    ঘরের খবরঃ
    এবার ‘ঘরের খবরে’র দিক। করোনাভাইরাস মানেই, এর একমাত্র প্রতিষেধক হচ্ছে, যা মানুষ জানে তা হল, মানুষকে আলাদা আলাদা করে রাখা বা থাকা। আইসোলেশন বা ঘরে বন্দী হয়ে থাকা। ছোঁয়াচে রোগের বিরুদ্ধে ছোঁয়া এড়িয়ে থাকা। কিন্তু এটা খুবই ব্যয়বহুল প্রতিকার। কেন?
    দেশের মানুষকে তিন সপ্তাহ থেকে তিন মাস (বা হয়ত এরও বেশি) একনাগাড়ে ঘরে বন্দী করে রাখার সোজা মানে হল, ওই সময়ের জন্য অর্থনীতি স্তব্ধ অচল করে রাখা। প্রতিটা স্থানীয় দেশের এবং গ্লোবাল দুই অর্থেই। অথচ সবার খরচ আগের মতোই। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের বা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষের জন্য এখানে পর্যাপ্ত সরকারি ভর্তুকি ঘোষণা করা ছাড়া উপায় নেই। যেমন এক এস্টিমেট হচ্ছে ভারতের ১৩৬ কোটি জনসংখ্যার ৮০ কোটিকেই তাদের ভর্তুকি বা পুরা রেশন সরবরাহ করতে হবে, তাতে ভারতের রাজস্ব আয়ের ঘরের অবস্থা যাই থাকুক না কেন [The government aims to distribute 5kg of wheat or rice for each person free of cost every month, with 1kg of pulses for every low-income family, helping to feed about 800 million poor people over the next three months.]। ওদিকে পাকিস্তান করোনায় আক্রান্তদের ১২ হাজার রুপি করে অনুদান দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
    এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ঘোষণা খুবই অপ্রতুল বা অগোছালো মনে হয়েছে। সব ঘটনা-দুর্ঘটনা একদিন না একদিন শেষ হয়েই যায়, করোনার প্রভাবও একদিন শেষ হবে। কিন্তু ততদিন আমাদের মানুষদের নিয়ে বেঁচেবর্তে থাকতে হবে। এভাবে এথেকে যদি টিকে যেতে পারি, তা হলে আবার নতুন উদ্যোমে অর্থনীতি চালু করার সংগ্রামে নামতে পারব। কিন্তু ততদিন (অন্তত তিন-ছয় মাস) নিম্ন আয়ের বা দিনে এনে দিনে খাওয়া মানুষের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা আমাদের করতেই হবে।  অথচ  আমাদের সরকার কেবল গার্মেন্টসশ্রমিকের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলেছেন। এর বাইরে শহরের রিকশাচালক থেকে গ্রামের দিনমজুর পর্যন্ত কথিত ইনফরমাল শ্রমিকদের কথা ভেবে আমাদের অবশ্যই পরিকল্পনা থাকতে হবে যা আমরা দেখছি না। যদিও বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত কিছু আছে হয়ত স্থানীয় উদ্যোগে। কারণ, তাঁরা যদি না খেয়ে ঘরে বা রাস্তায় মরে পড়ে থাকলে সেটা নিশ্চয় আমাদের জন্য ভাল অভিজ্ঞতা হবে না। বরং সেটা মহাবিপর্যয়কর কিছু একটা হবে। নিজের মুখ নিজেকে দেখানো  যাবে না এমন অবস্থা হবে। তাই যেভাবেই হোক এর জন্য ফান্ড জোগাড় করার  দায় আমাদের সরকারকে নিতেই হবে। অন্তত কথা বলতে হবে।
    ইতোমধ্যেই মোট প্রায় ১৯০ এর বেশি সদস্যের মধ্যে  ৮০টি সদস্যরাষ্ট্র আইএমএফের কাছে লোন চেয়েছে। এতে বিশ্বব্যাংকের পরিকল্পনা কী, ঋণ-অনুদানের ব্যবস্থা কী আছে, জানতে হবে। এসবের মধ্যেই পেটের দায়ে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়া লোকদের দুর্দশা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ওদেরকে পুলিশ দিয়ে লাঠিপেটা করে সামলানো যাবে না। এটা কোনো সমাধানই নয়। রাস্তায় গরীব মানুষ কাজে বা কাজের খোঁজে বেরিয়ে পড়লে কী করতে হবে এনিয়ে পুলিশের প্রতি নির্দেশ বাস্তবসম্মত, সম্মানজনক ও উপযুক্ত হতে হবে। এটা ২০২০ সাল। এখনো না খেয়ে মানুষ মরলে তা ঘটবে একমাত্র কুশাসনের কারণে। প্রধানমন্ত্রীকে ইনোভেটিভ হতে হবে। বিকল্প খুজতে হবে প্রোএকটিভ হয়ে। যারা বুড়া বয়েসে নির্বাহী প্রধানের ধামাধরা সুযোগ না পেলে নিজ উদ্যোগে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ কর্মসংস্থানের আর যোগ্যতা রাখে না এরা ইনোভেটিভ হবে এটা কষ্টকল্পিত। খেটে খাওয়া মানুষদের বাঁচাতে হবে। এটাই এক সফলতার চিহ্ন হবে। আর তা যদি সফল হই তবেই এরপরে আসন্ন গ্লোবাল মহামন্দা মোকাবিলার যোগ্য হব!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা গত ২৮ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে  “ভাইরাসে বেঁচে গেলেও গ্লোবাল অর্থনীতিতে কী হবে“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]