Tag: চীন

  • নেহেরু থেকে প্রণব বা মোদীর জাতিসঙ্ঘ পাঠ

    নেহেরু থেকে প্রণব বা মোদীর জাতিসঙ্ঘ পাঠ

    গৌতম দাস

    ০৫ অক্টোবর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3cY

    প্রতি বছর ২৫ সেপ্টেম্বরের আগে-পরের দিনগুলোতে সাধারণত দেখা যায় সরকার প্রধানেরা নিউইয়র্কমুখী হচ্ছেন। তখন তারা জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের [UNGA, UN General assembly] সভায় যোগ দিতে ব্যস্ত দিন কাটান। সাধারণ পরিষদের সভা মানে, বছরে এই একটাই গুরুত্বপুর্ণ অনুষ্ঠান যা সব সদস্যরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্র এখন প্রায় ১৯৩ টি। এখানে সবার হাজিরা বাধ্যতামূলক না হলেও জাতিসঙ্ঘের এই জমায়েতেকে যেন এক ‘বিশ্বসভা’। মানে যা দুনিয়ার সব জনগোষ্ঠীর হাজির থাকার এক প্রতিনিধিত্বমূলক বিশ্বফোরাম বা বিশ্বদরবার ধরনের ধারণা – সেটা কোথাও ঘোষণা করা না থাকলেও, ক্রিয়াশীল থাকে বলে মনে করা যায়, এখানেই এর গুরুত্ব। এ’বছরও সেপ্টেম্বরে এর ব্যতিক্রম হয়নি। যদিও ফারাক এতটুকুই ছিল যে এবার কোন সরকারপ্রধানই কোভিডের কারণে জাতিসংঘে নিজ সশরীরে হাজির হননি, আগাম রেকর্ড করা বক্তব্য পাঠিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদীও বক্তব্য পাঠিয়েছিলেন।

    জাতিসঙ্ঘ কেমন ধরনের প্রতিষ্ঠান আর কী তার ক্ষমতার এখতিয়ার ও সীমা? এটা কী পারে বা পারে না? এ নিয়ে সাধারণ্যে প্রচুর বিভ্রান্তি আছে, এমনকি সরকারপ্রধান বা অনেক দেশের একাডেমিক পর্যায়েও।

    সাধারণত কোনো পাবলিক প্রতিষ্ঠান আর সাম্য ধারণাটা প্রায় হাত ধরাধরি করে চলে। এজন্য সংগঠন বা সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান মানেই তা মাস (ইংরেজি mass বা বাংলায় গণ) অর্গানেইজেশন বলে ধরে নেয়া হয়। আর কোন গণসংগঠন মানেই সেখানে সদস্যরা সবাই সমান; এমন সাম্যতাই সেখানে ভিত্তি বলে সবাই মেনে নিয়ে থাকে। তবে গণপ্রতিষ্ঠান মানেই সবাই সেখানে সমান – এটা আধুনিক কালের ধারণা। কিন্তু এটারইবা আসল মানে কী?

    তা হল, যখন রাজা বা সম্রাটের শাসন বা রাজবংশের দিন ফুরিয়েছে আর এর বিপরীতে পাবলিক বা জনগণের শাসন বলে ধারণার উদ্ভব ঘটেছে। কোনো ব্যক্তি বা রাজা নয়, সব রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস পাবলিক বা জনগণ।  প্রতিটা নাগরিক তবে সম্মিলিতভাব ক্ষমতার উৎস, একথা থেকে যেখানে সবকিছুর শুরু। আর ঐ সমাজে ও সংগঠনে ‘রাজকীয় মর্যাদার’ কোন বিশেষ বলে কেউ থাকে না। বরং পাবলিকের রাষ্ট্রটাই হল সমাজের সবচেয়ে বড় বা প্রধান গণপ্রতিষ্ঠান। তাই কোন ব্যক্তি বা রাজার খামখেয়ালি না, পাবলিক আর পাবলিকের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব মাধ্যমে এখানে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। অন্তত হওয়ার কথা।
    এই সূত্রে পাবলিকের রাষ্ট্র বা ‘রিপাবলিক’ [republic] কথাটা এসে গেছে সেখানে রাষ্ট্রসহ যেকোনো গণপ্রতিষ্ঠান মানেই ধর্ম নির্বিশেষে নাগরিক সবাই সমান, এমন বৈষম্যহীনতার এক সাম্য ধারণা ও নীতি বজায় থাকতে হবে।

    এখন এই বিচারে তাহলে ১৯৪৫ সালে জাতিসঙ্ঘের ম্যান্ডেট লিখে যখন জন্ম হয়েছিল সেকালে এর সব সদস্য রাষ্ট্রই সমান এমন ধারণার ভিত্তিতেই একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটা যাত্রা শুরু করেছিল। যদিও ব্যতিক্রম আছে। যেমন- সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সদস্যরা সবাই সমান আর সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। কিন্তু জাতিসঙ্ঘেরই আরেকটা ফোরাম আছে নিরাপত্তা পরিষদ [UNSC, UN Security Council] যা এক অর্থে সাম্যনীতির ফোরাম নয়। তাহলে কী এটা পাবলিক প্রতিষ্ঠানের নীতি ভঙ্গ করে গড়া হয়েছে? জবাব হবে, না। ঠিক তা নয়; আর সেটা জরুরিও নয়। তাহলে? ব্যাপারটা কী, কিভাবে এটা ব্যাখ্যা করব?

    আমরা এ বিষয়ে অনেক ফতোয়া পাবো, এমনকি অনেক একাডেমিক প্রতিষ্ঠানেও; যেখানে হয়ত স্টুডেন্টরা শিখছে – জাতিসঙ্ঘ ‘অগণতান্ত্রিক’ প্রতিষ্ঠান। গণতান্ত্রিক শব্দটা এখানে আনলাম অনেকে ব্যবহার করে বলে।  প্রথমত ‘গণতন্ত্র’ খুব ভালো শব্দ নয়, বরং চাতুরীর শব্দ।
    পাবলিকের ক্ষমতার রাষ্ট্র বা রিপাবলিক ধারণার বিকল্প বা সমতুল্য ধারণা ‘গণতন্ত্র’ নয়। যেমন এতে অনেকে কোন একটা দেশের বেলায় হয়ত বলবে,  “সেদেশে নির্বাচন হয়, চাইকি সেটা নিশীথভোট হয়ত, অতএব গণতন্ত্র আছে” – টাইপের কথা বলে রিপাবলিক ধারণাকে অর্থ তাৎপর্যহীন করে ফেলতে পারে। তাই এখানে দুটি পয়েন্টে কথা বলব।

    প্রথম পয়েন্টঃ আমরা জাতিসংঘের প্রসঙ্গে কথা বলছি মানে প্রসঙ্গটা এখানে ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রবিষয়ক; আর আমরা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে একাকার করে দেখছি। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই এক করে দেখলেও কোনো ভুল হয় না, এ কথাও সত্যি। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক ভুল হয় ও হবেই। লক্ষ্যণীয়, এছাড়াও আমরা নিরাপত্তা পরিষদ নিয়ে কথা বলছি মানে এটা একটা রাষ্ট্রের ভিতরের বা অভ্যন্তরীণ দিক নিয়ে কথা বলছি না, বলছি রাষ্ট্রের বাইরে বা ঊর্ধ্বের বিষয় নিয়ে। রাষ্ট্রের বাইরে বা ঊর্ধ্বের বিষয় মানে এখন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কথা খেয়াল রেখে তা লঙ্ঘন যাতে না হয় এভাবে কথা বলতে হবে। সোজা কথাটা হল, জাতিসঙ্ঘ বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর কোনো সমিতি বা এসোসিয়েশন এমনটা বুঝে নিয়ে,এরপর প্রশ্ন হল,  জাতিসঙ্গে বসে নেয়া সবার সিদ্ধান্ত কী কোনও একটা সদস্য রাষ্ট্রের উপর প্রয়োগ করা যাবে? কারণ তা করতে গেলে তো ঐ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হবে? এজন্য, যেকোনো রাষ্ট্রের ওপর আরেক রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রগুলোর কোনো সিদ্ধান্ত যেমন কার্যকর মনে করা যায় না, তেমন জাতিসঙ্ঘেরও। অর্থাৎ সার্বভৌম বাংলাদেশের উপর জাতিসংঘ কোন সুপার-স্টেট হতে পারে না; কিংবা আরেক বড়ভাই রাষ্ট্র বলে কিছু থাকতেই পারে না। (তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে করা যায়।) কাজেই ব্যক্তিদের নিয়ে একটা সমিতি বা ক্লাব ব্যক্তির উপর ক্লাব বা দলের সিদ্ধান্ত দিতে পারলেও এই ব্যাপারটা রাষ্ট্রের বেলায় খাটতে পারে না। রাষ্ট্রগুলোর কোনো সমিতি বা কোন জাতিসংঘ তার কোন সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করতে পারে না। রাষ্ট্রই শেষ কথা এর উপর আর কেউ কর্তা থাকতে পারে না। তাই, এখানে এসে যা ব্যক্তির বেলায় সত্য ও প্রযোজ্য মনে করা যায় তা রাষ্ট্রের বেলাতেও সত্য ও প্রযোজ্য বলে একাকার করে দেখা যাবে না, ভুল হবে।

    তাহলে কী জাতিসঙ্ঘের কোন সিদ্ধান্ত সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সদস্য রাষ্ট্রের  উপর প্রযোজ্য নয় বা করা যাবে না? তাহলে হয়ে আছে কী করে? সেটা বুঝার জন্য সার্বভৌমত্ব কথাটা খেয়াল রেখে – একটা কায়দা করা হয়েছে – সেদিকে তাকাতে হবে। যেমন ধরা যাক, সব রাষ্ট্র বসে কোন নতুন আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন তৈরি করতে লাগলো। বাংলাদেশের প্রতিনিধি ধরা যাক তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দলিল প্রস্তুত শেষে ওই দলিলে স্বাক্ষর দিয়ে এলেন। এখন ঐ আইন মানতে বাংলাদেশকে বাধ্য করানো কী যাবে? কারণ সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হবে। আমাদের সংসদের বাইরের কোন আইন আমাদের কেন মানতে হবে? তাই এই জটিলতা এড়িয়ে যেতে বা এথেকে বিরত থাকতে যা করা হয় তা হল, জাতিসংঘের ঐ মিটিংয়ে পাশ হওয়া ওই আইন বা কনভেনশনটাই এবার দেশে নিয়ে এসে সরাসরি আমাদের সংসদে পেশ করা হয়। যেন আমরা আমাদের সংসদে কোনো প্রস্তাব পেশ করছি এভাবে। এইবার সেই প্রস্তাব আমাদের সংসদে পাস হওয়ার পর সেটা আর জাতিসঙ্ঘের আইন বা কনভেনশন বলে বাংলাদেশ মেনে চলছে এমন নয়। সেটা আমাদের সংসদে পাস হয়ে যায় যদি তবে তা আমাদের সংসদে গৃহীত আইন বলে মানতে কোন আর অসুবিধা নাই। এই প্রক্রিয়াটাকেই র‌্যাটিফিকেশন [ratification] বা অনুসমর্থন করে নেয়া বলে।  আর এই হল সার্বভৌমত্ব বাঁচিয়ে আর জাতিসঙ্ঘের সাথে দেশের সম্পর্ক রক্ষার সমাধান।

    দ্বিতীয় পয়েন্টঃ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ১৯৩৩-১৯৪৫ সালের এ সময়ে একনাগাড়ে চারবারের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। জাতিসঙ্ঘের আইডিয়া বা ইমাজিনেশনের উদ্গাতা মূলত তিনি। এর পেছনের কারণ, তিনি হলেন সেকালের কলোনি শাসন উচ্ছেদ করে দেয়ার পক্ষের লোক। যাতে এরপর স্বাধীন হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রগুলো নিজ অর্থনীতি পরিচালনা করতে গিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে আমেরিকান পুঁজিবাজারের ঋণখাতক হতে চাইলে হতে পারে। মানে নিজ প্রয়োজনীয় ঋণের গ্রহীতা অর্থে পুঁজিবাজারের ক্রেতা হয়ে উঠে। যাতে দুনিয়ায় কলোনি দখল শাসনের চেয়ে তুলনামূলক অনেক ভাল স্বাধীন রাষ্ট্রের ব্যবসা-বাণিজ্যের এক আন্তঃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। একাজে তিনি আবার যুদ্ধের বিপক্ষের লোক। এজন্য সবাইকে নিয়ে আগে আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন তৈরি করে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্বার্থ বিরোধ মীমাংসার ব্যবস্থা হিসেবে জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ার পক্ষের লোক। কারণ তাঁর অনুমান যুদ্ধে পুঁজি-সম্পদ বিনষ্ট হয় মারাত্মক, তাই এমন বাস্তবতা থেকে তিনি সরতে চাচ্ছিলেন। [যদিও তার স্বপ্ন বা আইডিয়া আর পরবর্তিতে বাস্তবের আমেরিকা ১৯৫৩ সাল থেকেই আর এক থাকে নাই। তবে তা নিয়ে কথা আজকের প্রসঙ্গ নয়।] যদিও সেকালে তার প্রস্তাব ইউরোপের নেতারা সহজেই মেনে নিয়েছিল কারণ হিটলারের আক্রমণের মুখে  তাদের তখন  আমেরিকার অধস্তন হয়ে পড়া এবং পুরা মুখাপেক্ষি হয়ে থাকার দশা তাই। কিন্তু তখনকার  সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্তালিন তা মানতে চাননি। স্তালিনের সোজা আপত্তির দিকটা ছিল, যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য রাষ্ট্রের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয় ও  চলে এমন এক জাতিসঙ্ঘ গড়ার পর ঐ প্রতিষ্ঠান আমেরিকান কলকাঠির প্রভাবে কোন সময় সেই জাতিসঙ্ঘ তার কোন সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত যদি সংখ্যালঘু বলে সোভিয়েত ইয়নিয়নের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে তখন কী হবে?
    আবার স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সোভিয়েত রাষ্ট্র ওর ঊর্ধ্বে বা বাইরের জাতিসঙ্ঘ বলে কারো সিদ্ধান্ত কেন বাধ্য হয়ে মানবে? অতএব স্তালিন তা একেবারেই মানতে নারাজ।

    ভেটো ধারণার আবির্ভাবঃ
    এই জটিলতা সমাধান করতেই আসে ‘ভেটো’ সিস্টেমের আইডিয়া। এর সোজা ব্যবহারিক মানে হল, সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই ভেটোওয়ালা সদস্য রাষ্ট্রের একটাও যদি আপত্তি করে, না ভোট দেয় (না-ভোটটাই ভেটো) তবে সেটা আর সিদ্ধান্ত হতে পারবে না। সেজন্য এটা আলাদা করে নিরাপত্তা পরিষদ এই ফোরাম, এখানে পাঁচ রাষ্ট্রের একটাও যদি কোন ইস্যুতে আপত্তি করে তাতে আলোচনার প্রস্তাব ভোটাভুটির আগেই বাতিল হয়ে যাবে। তবে এটা গেল ভেটো ব্যবস্থার নেগেটিভ দিক থেকে ব্যাখ্যা। এটাকে উল্টা ইতিবাচক করে বলা যায়, উপস্থিত দুনিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতাগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পাঁচটা পরাশক্তি বা বিশেষ রাষ্ট্র একমত না হলে সেটা নিয়ে এরপর আর সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত হতে পারবে না। দুনিয়ার ক্ষমতা-ভারসাম্যের জন্য সবার আগে পাঁচটা বিশেষ রাষ্ট্রের একমত হয়ে থাকা জরুরি একথাটা সবার মেনে নেওয়ার ভিত্তিতেই আসলে জাতিসংঘের জন্ম। এই আইডিয়া হাজির করেই রুজভেল্ট স্তালিনকে নিজের নৌকায় তুলতে পেরেছিলেন, জাতিসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়িত হয়েছিল।

    মফস্বলি মোদীর এবারের জাতিসংঘঃ
    এবারের সেপ্টেম্বরে মোদি নাকি খুবই সফল এক প্রধানমন্ত্রীর মত জাতিসঙ্ঘে বক্তৃতা রেখেছেন। অন্তত কলকাতার আনন্দবাজারের চোখে তাই। উগ্র হিন্দুজাতিবাদী অবস্থানের আনন্দবাজার এবার প্রকাশ্যেই হিন্দুত্ব জাতিবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।  ভারতের “সীমান্ত সঙ্ঘাতের” এই “মোক্ষম সময়ে” প্রধানমন্ত্রী মোদী নাকি ভারতের “নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা আরো জোরালো ভাবে তুললেন”- এভাবে লিখেছে আনন্দবাজার। মানে আনন্দবাজারের কথা শুনে মনে হচ্ছে রুজভেল্টসহ সবাই নিজের নিজের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা আরো জোরালো তুলেছিল” বলেই যেন জাতিসঙ্ঘ গড়ে উঠেছিল! মফস্বলি আর কাকে বলে! আনন্দবাজার আর, নেহেরু থেকে প্রণব মোদী এভাবে সকলেই যদি মফস্বলি হয়ে যায় তো ভারতের ভবিষ্যত কী? একটু পড়াশুনা ও তথ্য সংগ্রহ আর বুঝাবুঝি ভারতকে কে করাবে? কঠিন এক পরিস্থিতি! আনন্দবাজারসহ এসব উগ্র হিন্দুজাতিবাদের ধারণা হল যে ঐ নিজের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা এক উদগ্র হিন্দুজাতি হয়ে মোদীর মত যুদ্ধবাজ-দেশপ্রেমিক [jingoist] নেতার নেতৃত্বে জোরালো করে তোলা – এটাই হল চাবিকাঠি! যেটা একেবারেই হিটলারের জর্মানির নীলচোখের জর্মান জাতশ্রেষ্ঠত্ব চিন্তা। সে ভিত্তিতেই এবারের মোদীর বক্তৃতার স্ক্রিপ্ট [Full text of PM Modi] লিখেছেন সম্ভবত হিটলারকে গুরু মানা কোন আরএসএস নেতা!

    কিন্তু জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি কী? কোন বক্তব্য? আর সেটা ভারতের কোনো রাজনীতিবিদ, কী মিডিয়া ঠিক কী বুঝেছে এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে কেবল আনন্দবাজারও বুঝেনি তাও নয়। আসলে এযুগে এখনো যারা “জাতিরাষ্ট্র চিন্তার” রাজনীতিতে আছেন কোন জাতিসংঘ বা এর চেয়েও কোন উন্নত প্রতিষ্ঠান বা দুনিয়া গড়া তাদের বুঝের বাইরেই থেকে যাবে, আমরা ধরে নিতে পারি। এছাড়াও উলটা এরা যদি হিটলারের মত আরো উগ্র-জাতি চিন্তার কেঊ হন তাহলে তো কথাই নেই। যেমন ছিল জাতিসঙ্ঘে মোদীর এই বক্তব্য। বাস্তবত জন্ম থেকেই ভারত জাতিসঙ্ঘ কী তা বুঝে উঠতে পারে নাই। অন্তত নিচের কয়েকটা পয়েন্ট থেকে তা বুঝে নেয়া যায়।

    এক. জাতিসঙ্ঘের জন্ম হল সেই পথচিহ্ন-মার্ক যখন “জাতিরাষ্ট্র” [nation state] ধারণার নিকৃষ্ট পরিণতি হিসেবে হিটলারের জার্মানির উত্থান ও যুদ্ধের ধ্বংসলীলা যা সারা ইউরোপ দেখেছিল। দেখার পরে জাতিসঙ্ঘের জন্ম ততপরতার সমান্তরালে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্র এক কনভেনশন ডেকে (১৯৫০ সালে স্বাক্ষর নেয়া শুরু আর ১৯৫৩ সালে কার্যকর) জাতিরাষ্ট্রভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র ত্যাগ করে অধিকারভিত্তিক ও নাগরিক বৈষম্যহীনতার প্রতিশ্রুতিতে নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছিল। আর ভারতের কোনো রাজনীতির ধারাই বা রাজনীতিবিদ তা টেরও পায়নি। একাডেমিকরাও এর খবর এখনো পেয়েছেন এমন জানা যায় না। বরং উলটা ভারতে ‘জাতীয় স্বার্থ’ কথাটা রীতিমত দানব হয়ে উঠেছে। এই শব্দ দিয়ে আপনি প্রধানমন্ত্রী বা সম্পাদক যেকোনো ডাহা মিথ্যা বলে যেতে পারেন। কেবল জাতীয় স্বার্থের খাতিরে এটা বলছেন এই সাফাই দিলেই সব জায়েজ থাকবে। এমনকি মুসলমান বা দলিতের ওপর সব জুলুম অত্যাচার হত্যা সব করতে পারবেন। এই হলো বর্ণহিন্দুর চরম রেসিজমের একালের ভারত। হতে পারে এই ‘জাতীয়স্বার্থ’ ভঙ্গের ভয়ে একাডেমিকেরাও ভারত জাতিরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু বলতে চান না।

    দুই. জাতিসঙ্ঘ জাতিরাষ্ট্র ধারণার ওপর কখনোই দাঁড়ানো নয়। এজন্য জাতিসঙ্ঘ কাশ্মিরের সমাধান করতে বলেছিল রাজার ইচ্ছা নয়, কোন কথিত জাতির ভিত্তিতেও নয়। কাশ্মির ভূখন্ডের বাসিন্দা নির্বিশেষে তাদের ভোটের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য, রায় দিয়েছিল। নেহেরু তা করেন নাই, মোদি পর্যন্তও তা কেউ করেন নাই। সারা ভারতের রাজনীতি মনে করে হিন্দুত্ব ও জাতিরাষ্ট্র ধারণার উপর ভিত্তি করেই তাদের রাজনীতি ও মহান ভারত রাষ্ট্র খাড়ায় আছ। রাম মোহন রায় থেকে শুরু করে (হিন্দুত্বের) জাতিরাষ্ট্র এখনও তাদের রাজনীতির মূলভিত্তি। তাতে কেউ হিন্দুত্বের ভিত্তি কথাটা গলা নামিয়ে বলে বা মুখে উচ্চারণ না করেও ধরে নিয়ে কথা শুরু করে। আর মোদীর মত যারা এরা সবাই গলা চড়ায় প্রকাশ্যে বলে, এই যা ফারাক। নেহেরুও তাই কাশ্মীরের রাজা খুজে বের করেছে। অথচ কাজটা সহজ ছিল কাশ্মীরের ধর্ম নির্বিশেষে সব ধরণের জনগণের কাছে এপ্রোচ করতে পারতেন, তাদের সমর্থন চাইতেন যেই রাজনীতিতে নেহেরু যেতেই পারেন নাই, বা করতেন না।
    আর এছাড়া সুযোগ পেলেই অন্য বা পড়শি রাষ্ট্রকে অধস্থন কলোনিকৃতের মত রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। কলোনি করে নেয়া ছাড়াও যে দ্বিপাক্ষিক ব্যবসা বাণিজ্য করে লাভবান হওয়া যায় এটা ভারতের বুঝে দেখা হয় নাই। কলোনিচিন্তাই তার কাছে পথ থেকে গেছে। ভারতের ধারণা এটাই নিজরাষ্ট্র পরিচালনার খাসনীতি (নেপাল-ভারত চুক্তি এর খাস উদাহরণ)। অথচ এর উলটা কলোনিদখল হারাম – এই ধারণার উপর জাতিসংঘ দাঁড়ানো।

    তিন. একালের জাতিসঙ্ঘে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার লোভ জেগেছে ভারতের। আর মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে তা জাগিয়েছে আমেরিকা। চীন ঠেকানোর খেপ মারতে ভারতকে নিয়োগ করার জন্য এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমেরিকা। তামাসা হলো ভারত সেটা বিশ্বাস করেছে। কারণ ভারত খবরই রাখে নাই যে আমেরিকার সেই মুরোদ এখন আর রাখে না। যা ছিল জাতিসঙ্ঘের জন্মের আগে। যা এখন আর কিছুই নাই। এখন কেউ কাউকে সদস্যপদ পাইয়ে দিতেই পারে না।
    তাই আমেরিকান ঝুলানী মুলা খেয়ে বিশ্বাস করেছিল প্রণব মুখার্জি। গত ২০১০ সালে হাসিনার প্রথম ভারত সফরের যৌথ ঘোষণায় প্রণব তাই লেখিয়ে নিয়েছিল যে বাংলাদেশ ভারতে ভেটো সদস্যপদ পায় যেন তা সমর্থন করে। প্রণবের জাতিসঙ্ঘ পাঠ এমনই যে তিনি বুঝেছিলেন হাসিনার মত অনেক দেশের সমর্থন বাগানো যেন জাতিসংঘে ভারতের ভেটোসদস্যপদ হাসিলের উপায়।
    ব্যাপার হল, ভেটো সদস্যপদ দেয় কে? ব্যাপারটা ভারতের আর জানাই হলো না। একালে মোদীও তাই বিশ্বাস করে বলছেন, “আর কত দিন রাষ্ট্রপুঞ্জের সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়ার বাইরে থাকবে ভারত?”। মোদী পুরাই বেকুবি আরো ধারণাটা হল, এই কথাটা জোর দিয়ে উদগ্রভাবে বললে বোধহয় কেউ শুনবে বা কাজ হবে। মোদী বক্তৃতায় এবার সেটাই করেছেন। আর আনন্দবাজার আরেক বেকুব হয়ে এটারই প্রশংসা করে ছেয়ে ফেলেছে। কিন্তু কথা হল, মোদী এটা কার কাছে চাচ্ছেন? জাতিসঙ্ঘ না আমেরিকা নাকি চীন? নাকি কারও কাছে এটা চাওয়ার জিনিষ কিনা সেটা মোদী বা তার পরামর্শকেরা নিশ্চিত হয়েছেন? উগ্র জাতিবাদীর কাছে আসলে সব কিছুই জোর দাবি করে নেওয়ার জিনিষ! এর বাইরে কোন ভাবনা তাদের কাজ করে না!

    প্রথম কথা, এটা এককালের মানে জাতিসঙ্ঘের জন্মের আগের সময়ের কোন রাষ্ট্রের মুরোদের প্রশ্ন  ছিল যে কে কাকে সদস্যপদ দিতে পারে। যা সেকালে একমাত্র আমেরিকারই ছিল। এমনকি সেকালের স্টালিনেরও ছিল না। ইউরোপেরও কারোই না; তারা হিটলারের মার খেয়ে ১৯৪১ সালের আগষ্টের পর থেকে একেবারেই আমেরিকার মুখাপেক্ষি। ফলে এরা নিজের ভেটো সদস্যপদটা ঠিকঠাক মত হাসিল হয়েছে কিনা কেবল এতেই সন্তুষ্ট ছিল। যেমন পঞ্চম দেশ চীন এর মধ্যে ঢুকে নিজ ভেটো সদস্যপদ পেয়েছিল কী করে?

    [যারা পড়তে কম সময় দিতে চান তারা নিচের প্যারাটাই বাদ দিয়ে পড়তে পারেন।]

    চীন কিভাবে ভেটো সদস্যপদ পেয়েছিলঃ
    এর জবাবটা একালে যে জানে সে-ই সেকালের পুরা ব্যাপারটা বলতে পারবে। চীন আসলে ছিল সেকালের পুরা সময়জুড়েই  জাপানের কলোনি, পুরাটা না হলেও চীনের অন্তত ২৫% এর মত ভুমি সমসময়ই জাপানের দখলে ছিল।  বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের জর্মান ইতালি ও জাপানের বিরোধী যে মিত্রশক্তিজোট গড়ে উঠেছিল আমেরিকার রুজভেল্ট তার মূলনেতা হিসাবে নিজ স্বপ্নের আগামি দুনিয়া যার হবু গ্লোবাল নেতা হবে আমেরিকা, সেই দুনিয়ায় এশিয়ান কলোনিশক্তি হিসাবে জাপানকে ধবংস করে চীনকে এশিয়ার হবু নেতা ও আমেরিকার পক্ষের দেশ হিসাবে দেখতেন তিনি। মূলত রুজভেল্টের সে স্বপ্ন-কল্পনার কারণে চীন ভেটো সদস্যপদ পেয়ে গেছিল। এমনকি এটা চীনও তা চেয়েছিল বা কল্পনা করেছিল কখনও তা জানা যায় না।
    কিন্তু একটা আসল কথা এখনও এখানে বলা হয় নাই। আমাদের জেনে নিতে হবে। আমরা এতক্ষণ  যে চীনের কথা বলছি সেটা মাওয়ের চীন নয়। মাওয়ের চীন তখন উদয় হয় নাই, হয়েছিল আরও চারবছর পরে ১৯৪৯ সালে। তাই এতক্ষণ চীন বলতে বুঝিয়েছি – চীনা ন্যাশনালিষ্ট রাজনীতির নেতা চিয়াং কাইসেকের চীনের কথা। কিন্তু রুজভেল্ট ও কাইসেকের কপাল পোড়া দুঃখটা হল, ১৯৪৫ সালে কলোনিশক্তি জাপানের পতন হলে এর মাত্র চারবছর পরেই ১৯৪৯ সালে মাওয়ের বিপ্লব চীনে ক্ষমতা দখল করেছিল। আর চিয়াং কাইসেক পালিয়ে সেকালেও চীনেরই ভুখন্ড কিন্তু আলাদা দ্বীপ তাইওয়ানে, আশ্রয় নিয়েছিল। এরপর একদিকে মাওয়ের বিল্পবীদের লংমার্চের ক্লান্তি অন্যদিকে সেকালের হবু বিশ্বশক্তির দুই নেতা স্তালিন ও প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান (১৯৪৫ সালে রুজভেল্টের স্বাভাবিক মৃত্যু হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট এই ট্রুম্যান প্রেসিডেন্ট হন) এদের চাপাচাপিতে “যুদ্ধের বদলে শান্তির” কথায় মাও আর ফিরে তাইওয়ান দখলে যান নাই, পরে দেখবেন বলে ছেড়ে দেন। এতে পরবর্তিতে চিয়াং কাইসেক তাইওয়ানেই ঘাটি গেড়ে বসে যায়। যেটা এখনও আছে। এটা পরে আরও পোক্ত হয়ে যায় আমেরিকার কারণে। কারণ মাওয়ের চীনই আগের জাতিসংঘে রেজিষ্টার করা ভেটো সদস্যপদের চীন হিসাবে নিজের প্রতিনিধিত্ব চাইলে আমেরিকা এতে সমর্থন দিতে এবার গড়িমসি শুরু করেছিল। স্তালিনও কিছুই করতে পারে নাই। মাওয়ের চীন নিচু স্বরে মনে করে স্তালিন চায় নাই তাই হয় নাই। তবে সেসময় মাও চাইলে হয়ত আলাদা নতুন চীন হিসাবে সদস্যপদ পেতে পারত কিন্তু সেক্ষেত্রে আগের ভেটো সদস্যপদ চিরদিনের মত হাতছাড়া হয়ে তাইওয়ানে হাতে থেকে যেত। তাই মাওয়ের  চীন এরপর জাতিসংঘের সদস্যপদ নাই এভাবে এমন চীন হয়েও রয়ে গেছিল। কিন্তু কতদিন?
    একনাগাড়ে (১৯৪৯-১৯৭১) এই সময়টা। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর অর্থাৎ যখন আমরা উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে আশ্রিত, খাওয়া না খাওয়া হয়ে আছি আর নির্যাতন, হত্যায় নিত্যসঙ্গি হয়ে দিন যাচ্ছে; ১৯৭১ মার্চের পরের সেই ঐবছরেরই সেপ্টেম্বরের  জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ঘটেছিল প্রকাশ্যে অনেক কিছু। সেখানে এক প্রস্তাবে উপর ভোটের সময় সংখ্যাগরিষ্টতার ভোটে “এতদিনের তাইওয়ানের ভোগ করা ভেটো সদস্যপদ” এর আসল হকদার মাওয়ের চীন বলে ঐ সিদ্ধান্ত প্রস্তাব পাশ হয়ে যায়। আর এর চেয়েও বড় কথা এটা সম্ভব হয়েছিল কারণ ঐ ভোটাভুটির সময়ে আমেরিকা ছিল আধারাজি কিন্তু আবার বাধাও দেয় নাই, এমন অবস্থান নিয়েছিল সেকারণে। কেন? এর পিছনের লম্বা কারণ হল, এটাই ছিল বিগত ১৯৬৮ সাল থেকে চলে আসা গোপনে চীন-আমেরিকান আলোচনা-বুঝাবুঝি-আলাপের প্রথম প্রকাশ। যেটা সেসময়ে ঘটেছিল পুর্ব পাকিস্তানের স্বার্থের বিনিময়ে, আয়ুব-ইয়াহিয়ার শাসন কাল জুড়ে তাদের মধ্যস্ততায়। আর সাথে আরও সবচেয়ে নির্ধারক ঘটনাটা ছিল – ১৯৭১ সালের এপ্রিলে কিসিঞ্জার পাকিস্তান সফরে যাচ্ছেন একথা বলে মাঝের দুদিন গোপনে কিসিঞ্জার সেই প্রথম মাওয়ের চীন সফর করেছিলেন। সেসময়েরই একমত হওয়া ডিলের প্রথম সাক্ষাত আলাপ ও আতাঁত ছিল সেটা। মূলত মাওয়ের চীন আমেরিকান পুঁজি ও ব্যবসা বাণিজ্য চীনে প্রবেশ করতে দিবে যদি নিক্সনের আমেরিকা বিনিময়ে  চীন নামের ভেটো সদস্যপদ তাইওয়ানের বদলে এটা তখন মাওয়ের চীনের হাতে এনে দিবে তাতে রাজি হয়। এই ছিল ডিল। এভাবেই মাওয়ের চীন জাতিসংঘের ভেটো সদস্যপদ লাভ করেছিল। আর মাঝের সময়ে লম্বা আলোচনা ও বুঝাবুঝি করে নেওয়ার পর ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকা পরস্পরকে স্বীকৃতি দিয়ে উভয় দেশে এমবেসি খুলে গভীর বাণিজ্য সম্পর্ক শুরু করেছিল।

    গ্লোবাল নেতা হিসাবে আমেরিকা আর কাউকে এখন ভেটো সদস্যপদ পাইয়ে দিবার বা এমন কোন নেতাগিরি মাতব্বরি করারই মুরোদ রাখে না; সব এখন প্রায় শুকিয়ে আসছে। এটা বুঝা কী খুব কঠিন? দ্বিতীয়ত আগামিতেও  জাতিসংঘের কোন সংস্কার হওয়া অথবা এমনকি ভেটো সদস্যের পাঁচ দেশের তালিকাও বদলাবে না,  যতক্ষণ না নতুন গ্লোবাল নেতা কেউ এসে বসছে। সেটা এখনই বলে দেয়া যায়। কারণ, এটা হবে সেই হবু নেতার নতুন করে জেগে উঠা প্রভাব ইচ্ছা বা এখতিয়ার। অন্যভাবে বলা যায়, তার সাথে অন্যরাষ্ট্রের সম্পর্কের মাত্রার ওপর নির্ভর করবে আর কোন রাষ্ট্র নতুন করে জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা পাবে, নাকি কেউই পাবে না অথবা বাদ যাবে। এখন যদি হবু সে নেতা চীন হয়, তবে তাই! সমস্যা হচ্ছে জাতিসংঘের উত্থানের সময়ের ঘটনাবলী নিয়ে আপনার স্টাডি বা পরিস্কার বুঝাবুঝি না থাকলে আপনি মফস্বলি চিন্তাই তো করবেন, আমেরিকার টাউটারি মিথ্যা আশ্বাসই আপনার  কাছে সত্যি মনে হবে। আর এই বেপুথে যেতে আপনাকে আরও টানবে আপনার জাতিরাষ্ট্র চিন্তা। অথচ ১৯৪৫ সালের পর থেকে এই কলোনিচিন্তাটাই, এই জাতিরাষ্ট্র চিন্তা যে  মৃত সে খগবর আপনি রাখেন নাই।

    আজকের ভারত মানে এই হিটলার-অনুসারি হিন্দুত্ববাদী ভারত, একে  চীন আগামিতে নতুন নেতা হলে  কেন একে ভেটো সদস্যপদ দিতে যাবে, না অন্য কেউ দিবে? আর এমন সদস্যপদ পাওয়ার প্রাথমিক যোগ্য হবার জন্য তবু অন্তত কিছু রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও কমিটমেন্ট তো ভারতের লাগবে! কেবল হিন্দুত্বের জন্য যে ভারত নিজ দেশের অন্যান্য অ-হিন্দু সকল নাগরিকের প্রতি চরম বৈষম্য করে, কোন সাম্য আচরণের কথা চিন্তাও করতে পারে না সেই ভারতকে কে এবং কেন ভেটো সদস্যপদে টেনে তুলবে?

    আবার মোদীর ধারণা দেখেন, তিনি বক্তৃতায় বলেছেন, ‘জাতিসঙ্ঘ এবং ভারতের মূল আদর্শ নাকি এক।’ ‘বসুধৈব কুটুম্বকম (গোটা বিশ্বই আত্মীয়) এই মন্ত্র রাষ্ট্রপুঞ্জের সভায় বার বার’ নাকি জাতিসঙ্ঘে উচ্চারিত হয়ে থাকে। অথচ মোদীর ভারত হল এমন, যে হিন্দু নয় বা যার হিন্দুত্ব নাই এমন কাউকে সে সহ্য করতে পারে না। সেই মোদী এমন ফাঁপা আওয়াজ দিচ্ছে!
    দেখা যাচ্ছে এটাই এখনও ভারতের জাতিসঙ্ঘ রিডিং!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৩ অক্টোবর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “মোদি-প্রণবের জাতিসঙ্ঘ পাঠ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • দশক আগেরটা নয়, সংশোধিত আমেরিকায় কিছু সম্ভাবনা

    দশক আগেরটা নয়, সংশোধিত আমেরিকায় কিছু সম্ভাবনা

    গৌতম দাস

      ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:৩৮

    https://wp.me/p1sCvy-3ce

    Bangladesh-US political relationship

    গ্লোবাল নেতৃত্ব বিশেষত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের নেতা হওয়ার লড়াই এবার সম্ভবত তুঙ্গে উঠতে যাচ্ছে। এটা ফাইনাল লড়াইও হয়ে উঠার লক্ষণ সম্পন্ন। আমেরিকার আসন্ন নভেম্বর নির্বাচনের জন্যই যেন সবাই অপেক্ষা করছে; রাষ্ট্র হিসেবে আমেরিকাও মরণপণ লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মোটাদাগে আমেরিকার দিক থেকে এই লড়াই হবে বাই-পার্টিজান। মানে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান দু’দলই এমন লড়াইয়ের পক্ষে। যদিও ফারাক শুধু এখানেই যে নির্বাচনে যে জিতবে সে নিজের কায়দায় ও কৌশলে এ লড়াইয়ে নামবে, নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু তবু দু’দলে অনেকগুলো মিলও আছে। এর একটা হল যেমন,  এ’দুই দল যেন চাইলেই খোদ আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতৃত্বের আসনে ধরে রাখতে পারবে, এই মিথ্যা কথাটা দুদলই সত্যি ধরে নিয়েছে। “আমি সরব না” বললেই যেন গ্লোবাল এম্পায়ারের নেতার আসন ধরে রাখা যায়। যেমন অনেককে আবার দেখছি সামরিক শক্তির বিচারে চীন আমেরিকার কত পেছনে সেটা মেপে দেখিয়ে আর্টিকেল লিখে দাবি করছে, আমেরিকাকে কেউ নেতাচ্যুত করতে পারবে না। তাহলে সোজা আরেক কমন দিক হল, এ দু’দলই মনে করে  – গ্লোবাল এম্পেরা’র (সাম্রাজ্যশাসক) নেতা থাকার ব্যাপারটা আমেরিকার ইচ্ছাধীন।

    অথচ কেউ আর চাইলেও গ্লোবাল লিডার বা এম্পেরা’র ভূমিকায় আমেরিকাকে রাখতে পারছে না বা পারবে না, এটাই বাস্তবতা।  আবার সেই আমেরিকা আজ কোথায় – যে আমেরিকা আগে গত সত্তর বছর ধরে নিজেই ছিল গ্লোবাল নেতা, অর্থনৈতিক গ্লোবালাইজেশনের লিডার, পণ্য বিনিময় ব্যাপকভাবে দুনিয়ার কোণে কোণে ছড়িয়ে এক গ্লোবাল বিনিময় লেনদেনের ব্যবস্থা বা অর্ডার গড়ে তোলার কাজে ছিল যার লক্ষ্য ও যে ছিল নেতা? সেই আমেরিকা তো এখন এখন ফিরে গ্লোবালাইজেশনের লিডার হওয়া ছেড়ে বুড়ো বয়সে এসে কেবল ‘আমেরিকান জাতির’ নেতা হওয়ার চেষ্টা শুরু করেছে! তা সত্বেও আবার এটা অবশ্যই ব্যর্থ হবে। কারণ যে দুনিয়া একবার কথিত ‘জাতি’ থেকে গ্লোবালাইজড বিনিময়ের এক ব্যবস্থা বা অর্ডারে ঢুকে গেছে সে আর ফিরে ঘরোয়া একা একা নিজ সীমানার ‘জাতি ব্যবস্থায়’ ফিরে যাবে না, চাইলেও পারবে না। গত ২০১৪ থেকে অনেককে বলার চেষ্টা করেছিলাম দুনিয়াতে আবার ভুয়া “জাতি” হবার একটা জোয়ার উঠানো আনার চেষ্টা হচ্ছে ও উঠবে। এরা বাস্তবতা না বুঝে মনে করেন জোর করে বা জোয়ার তুলে হলেও আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার ভুমিকায় রাখা যাবে এবং এটা সম্ভব। এটা অনেকটা যেন সেই স্বপ্ন যে দুনিয়াটাকে আবার যদি কলোনিদখল ব্যবসা ও ব্যবস্থার যুগে ফেরত নেয়া সম্ভব হত! সেই আলোকে এবার তাই আমরা দেখছি ট্রাম্পের এডভাইজার স্টিভ ব্যাননদের [Steve Bannon] আবির্ভাব কিংবা হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের উত্থান; এসবই কিছু সেই নমুনা। তবু বলাই বাহুল্য এরা সমূলে ব্যর্থ ও নির্মুল বা উন্মুল হয়ে যাবেই।  তবে এর আগে আরো বহুবিধ ধ্বংস ঘটিয়ে এরপরে তা বিলীন হবে হয়ত। নরওয়ে বা নিউজিল্যান্ডের মুসলমান বা ‘বিদেশি’ হত্যার ঘটনাগুলো আমরা এখানে মনে করতে পারি। গত সপ্তাহে আমেরিকান হোমল্যান্ড সিকিউরিটির প্রধান – মানে যে প্রতিষ্ঠান মুসলমানেরাই আমেরিকান প্রধান শত্রুজ্ঞান করে জন্ম দেয়া হয়েছিল – তিনি  আমেরিকান কংগ্রেসের (বা সংসদীয় কমিটির) এক শুনানিতে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন  আমেরিকা রাষ্ট্রের জন্য এখনকার সবচেয়ে বড় হুমকি হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের নিয়মিত চরমপন্থা বা এক্সিমিজম। এসব ততপরতা এখন বাড়ার আরেক বড় কারণ অবশ্য খোদ ট্রাম্পেরই পেটি-ক্ষুদ্র স্বার্থ বা লাভালাভে এসব গোষ্ঠিকে পরোক্ষে বা কখনও প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়া বা নেয়া।

    তবু ‘জাতি ব্যবস্থায়’ ফিরে যাওয়ার চেষ্টা ট্রাম্পের গত চার বছরের ধরে তৎপরতা হয়েই ছিল। আজকের আমেরিকান প্রশাসন সেই আকার পেয়েছে বা দেয়া হয়ে গেছে যা ট্রাম্পের ততপরতার কিছু প্রত্যক্ষ ফসল। শুধু তাই নয়, এতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবস্থা এমন জায়গায় চলে গেছে যে, বাইডেন জিতলেও ট্রাম্পের এক্সিকিউটিভ অর্ডার বা পলিসিগুলো আর বদলাতে বা পুরনো ট্রাম্প-পুর্ব জায়গায়  নিতে পারবেন না। বাইডেনকে ট্রাম্পের কাম-আকাম বহুকিছুই অনুসরণ করে যেতে হবে। আর এভাবেই যেন আমেরিকা ক্রমশ শেষ হয়ে যেতে চাওয়ার রাস্তায় উঠে গেছে; শেষ দিনগুলোতে যতদিন না গ্লোবাল নেতা আমেরিকা এভাবে ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিজেকে বিলীন হওয়ার দিকে নিয়ে চলে যায়। চলতি সপ্তাহের (১৯ সেপ্টেম্বর) ‘ইকোনমিস্ট’ ট্রাম্পের এমন নীতিগুলোর একটা তালিকা তৈরি করে রেখেছে, যার শিরোনামঃ How would Joe Biden change America’s trade policy?। আগ্রহিরা তা পড়তে এই লিঙ্ক অনুসরণ করতে পারেন।

    কিন্তু এব্যাপারে আমেরিকার জন্য বাস্তব অসুবিধা হল, কেউ গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হবে কি না এটা তার নিজের খেয়ালে নেয়া ইচ্ছায় সিদ্ধান্তের বিষয়ই নয়। অন্যভাবে সরাসরি বললে, মূল কথাটা হল- অর্থনৈতিক কারণে কোনো রাষ্ট্র যখন গ্লোবাল সারপ্লাস সঞ্চয় বা পুঞ্জীভবনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়, এটাই সেই পূর্বশর্ত যে, সে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হচ্ছে বা হবে কি না।

    এক্ষেত্রে চিন্তার জগতের বাস্তব সমস্যটা হল, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও গ্লোবাল অর্থনীতি বিষয়টা নাড়াচাড়া করার জন্য যাদেরকে একাদেমিক বা প্রফেশনাল দিকের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব মনে করা হয় এরা হল মূলত যাদের “আন্তর্জাতিক সম্পর্ক” বিষয়ে ডিগ্রী আছে। অথচ গ্লোবাল অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজমকে বুঝা আর সাথে গ্লোবাল রাজনীতিতে এর প্রভাবকে বুঝতে পারার জন্য অর্থনীতির নুন্যতম ধারণা দরকার হলেও এটা তাদের জানা বা পড়ার সিলেবাসেই নাই। ভরসা একমাত্র কেউ যদি আলাদা করে অর্থনীতিও পড়ে নেন বা ডিগ্রী থাকে।  একারণে কেউ গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা থাকবে কিনা এটাও যেন সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব কারো আছে কিনা আর সাথে ইচ্ছা থাকলেই এটা সম্ভব বলে মনে করতে থাকেন এরা। অথচ ঘটনার অবজেকটিভ দিক বা বাস্তব দশা পরিস্থিতিটা তাদের নাগালের বাইরেই থেকে যায়।

    ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে গ্লোবাল অর্থনীতির প্রভাবঃ
    যেমন ধরা যাক, আমেরিকা এখন খুবই আগ্রাসী হয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক জোটের কথা তুলে এগিয়ে আসছে। সম্ভবত তাতে ভারত যতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে মাঠে আমেরিকাকে পাশে পেতে আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়েছে তা এর চেয়েও বেশি আগ্রাসী। কিন্তু তবু আমরা দেখছি ফাইনালি মোদী চীনের সাথে আপস করতেই ছুটে চলে গেলেন। কেন?

    কারণ নরেন্দ্র মোদীর জন্য আবার ঠিক এর উলটা আরেক ফ্যাক্টস হল, তিনি জানেন তাঁর দরকার এখন বিপুল  বিনিয়োগ। করোনা শুরুর আগেও এ সমস্যা ছিল আর করোনার প্রভাবে পরে ভারতের অর্থনীতি এখন একেবারে তছনছ হয়ে গেছে। অথচ এখনও করোনায়  প্রতিদিন নতুন একলাখ জনসংখ্যা আত্রান্ত হচ্ছে আর এক হাজার মারা যাচ্ছে। কাজেই মোদীর ভারতের এখন দরকার বিনিয়োগ – সেটা অবকাঠামো আর এফডিআই (বা সরাসরি প্রাইভেট ব্যবসায়িক বিনিয়োগ) এদুটো অর্থেই। যার একটা – এফডিআই, এটা আমেরিকা এক বিশেষ শর্ত (যা ভারতের স্বার্থের জন্য খারাপ) সাপেক্ষে হয়ত দিতে সক্ষম। সেই এমন বিশেষ সুবিধার শর্ত হল যে, আমেরিকান ব্যবসায়ীদেরই সরাসরি ব্যবসা, কারখানা নিয়ে ভারতে বসতে দিতে হবে। আর অন্যটা মানে, অবকাঠামো বিনিয়োগ, সেটা এখন আর আমেরিকা দিতে অপারগ।  কাজেই এই আমেরিকাকে নিয়ে মোদি কী করবেন? কোন কাজে আসবে? আর এটাই হল, যে রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বিপুল সারপ্লাস এখনও জমছে আর যে রাষ্ট্র এখন সেসব দিন পার হয়ে ফুরিয়ে এসেছে – এদুইয়ের সিরিয়াস ফারাক।

    কাজেই সোজা ভাষায় বললে,  আমেরিকার কোন প্রশাসন কত আন্তরিকতা আর মানসিক দৃঢ়তার শক্তিতে ইন্দো-প্যাসিফিক জোট নিয়ে এগিয়ে আসছে – কত জোরে দৌড়ে ভারতের দিকে ছুটছে – এতে মোদীর কোন দুঃখ আমেরিকা ঘুচাতে পারবে না। আবার এটা মোদীও জেনে গেছেন। অথচ এই সক্ষমতাটার সবই চীনের আছে।ঙ্কিন্তু ভারতের অন্যান্য চীনা-ভীতি বা সীমান্ত বা নেহাতই ঈর্ষা ইত্যাদি চীনকে নিয়ে ভারতের  মনে মনে যাই থাক, মোদীসহ ভারতের সিরিয়াস যেকোন ব্যক্তিত্বই অস্বীকার করে না চীন ভারতের জন্য কত দরকারি ও উপযুক্ত। এবং পারফেক্ট চয়েস।  এমনকি ভারতের এই প্রয়োজনের কাছে চীনের বদলি জাপানও ন্‌ তাও ভারত টের পায়। এটাই ভারতের জন্য এক উভমুখি বা কন্ট্রাডিকটরি সমস্যা ও বাস্তবতা। এর পিছনের মূলকথাটা হল, আমেরিকা ভারতের কাছে এক অতীত আর চীন হল আগামি। আর তা গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা অর্থেও। কিন্তু তবু ভারতের সকল রাজনৈতিক নেতার চোখে অর্থনৈতিক অর্থে চীন খুবই কাম্য হলেও (যেটা মোদীর চোখে চীন সবার চেয়ে বেশি কাম্য। মোদীই প্রথম চীনকে ভারতের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগে ডেকে এনেছিলেন। ) কিন্তু ঠিক এর উল্টাভাবে গ্লোবাল রাজনৈতিক অর্থে ভারতের চীনা ভীতি ও নিরাপত্তা নিয়ে ট্রমার কারণে আমেরিকা তার এক নম্বর কাম্য। এছাড়া গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতার পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিষয়টাকে দেখা ও বুঝার মত কোন নীতিনির্ধারক পর্যায়ে কেউ আছেন তা জানা যায় না।  কারণ উগ্র বিধ্বংসী হিন্দু ‘জাতি’ বোধ আর অকার্যকর স্বদেশিপনা ভারতের সংকট থেকে বের হয়ে আসার সব সম্ভাবনাকে কুড়ে কুড়ে খেয়ে ফেলছে।

    অর্থাৎ বলাই বাহুল্য এই আমেরিকা আর গ্লোবাল নেতার ভুমিকা নয়। অন্তত দৃশ্যত ভারতের কাছে। কিন্তু তা নয় বলে তাতে আমেরিকা মুখে যতই দাবি করুক করলেও কিছু হচ্ছে না, কিছু এসে যাচ্ছে না। এমনকি আমেরিকার সা্থে মোদীর ভারতের মিলন আকাঙ্ক্ষা থাকলেও তা কাজ করতে পারছে না। বরং আর আমাদের সবার মাথার উপরে টিকটিক করা ঘটনাটা হল,  আমেরিকায় যারা এটা মানছে না এরা এই অসম্ভব জিনিসটা মেনে নিতে না পেরে পরিস্থিতিকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়ে নিজেদের ও দুনিয়াকে আরো দুস্থ অবস্থায় ফেলে দিতে পারে।

    আমেরিকান গ্লোবাল ভুমিকার পরে এবার আমেরিকান লোকালঃ
    লন্ডন ইকোনমিস্ট সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন বাংলাদেশ নিয়ে গত ১৯ সেপ্টেম্বর এক আর্টিকেল ছেপেছে। এর একটা অনুবাদ এখানে পাওয়া যেতে পারে। যার শিরোনাম – “ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক দুর্বল বলে চীনের সাথে বন্ধন শক্তিশালী হচ্ছে”। ইকোনমিস্টের লেখাটায় কোনো লেখকের নাম নেই, কোন ছদ্মনামও নাই। যদিও লেখা পড়ে মনে হয়, প্রো-ইন্ডিয়ান মনের বাংলাদেশের কোন সাংবাদিকের সহযোগিতায় কোন ইন্ডিয়ান বা পশ্চিমা সাংবাদিক এটা লিখেছেন। তবে লেখক যেই হন, তিনি বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক কেন দুর্বল হল অথবা চীনের সাথেই বা কেন সবল হল এর কোন ব্যাখ্যা দেননি। এমনকি তিনি ধরে নিয়েছেন, ভারতের সাথে এখন যে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে গেছে বলছেন তা আগে এটা সবল ছিল। কিন্তু আগেই বা এটা সবল ছিল কেন অথবা কবে থেকে সবল ছিল এরও কোনো ধারণা বা ব্যাখ্যা দেয়া নেই এখানে। তবে পুরো রিপোর্টে একটা দুঃখবোধ চারদিকে ছড়িয়ে আছে যে, ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কটা ঢিলা হয়ে গেছে।

    আবার  শুরুর প্যারায় লেখার প্রসঙ্গ হল, সিলেটের এয়ারপোর্ট নির্মাণের টেন্ডারে ভারতের এক কোম্পানি হেরে গেছে, আর চীনের এক কোম্পানি কাজ পেয়েছে। কিন্তু এটা কী করে চীন বা ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের দুর্বল বা সবল হওয়ার উদাহরণ হয়? এটা লেখক বলেননি। একটা টেন্ডারে ভারত হেরে গেলে কার কী করার আছে? এটা তো বাংলাদেশের কারো সাথে সম্পর্ক সবল নাকি দুর্বল এর প্রমাণ হতে পারে না। ফলে পাঠকদের মনে এই প্রশ্ন উঠতেই থাকবে বা থেকেই যাবে।

    আবার বলা হয়েছে, গত জুন মাসে চীন বাংলাদেশের চীনাপণ্য আমদানিতে ৯৭ ভাগ পণ্যে ডিউটি ফ্রি সুযোগ দিয়েছে। অথচ বটম লাইন ফ্যাক্টস হল, এটাও ঠিক এখন কোন দেয়া সুবিধা নয়। এসব প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল ২০১০ সালে ‘কম্প্রিহেনসিভ কোঅপারেশন’ নামে যে আলাপ শুরু হয়েছিল শেখ হাসিনার প্রথম চীন সফরের সেই সময় থেকে। আর পরে, এতে ২০১২ সালে এ নিয়ে ডেইলি স্টারে চীনা রাষ্ট্রদূতের বিস্তারিত সাক্ষাতকার ও রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল। সেসব চীনা প্রস্তাব এই প্রথম এখন কিছুটা কার্যকর করা হয়েছে দেখা যাচ্ছে, এই আর কি।  এ ছাড়াও ইকোনমিস্টের  লেখায় বলা হয়েছে – বাংলাদেশে কিভাবে ভারতের দখলদারসুলভ দম্ভ ও খারাপ আচরণে বাংলাদেশীদের মধ্যে ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট বাড়ছে।

    মজার দিকটা হল, আসলে ইকোনমিস্টের ওই রিপোর্ট অনেক জায়গাতেই নানাবিধ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। আর তা যে যার মত করে নিজের কাজে লাগাচ্ছে। যেমন বিবিসি বাংলা পরোক্ষে ওই রিপোর্ট নিয়ে আরেকটি রিপোর্ট করেছে। যেন ইকোনমিস্টের ঐ রিপোর্ট নিয়ে কংগ্রেসের কী প্রতিক্রিয়া সেটা জানা এর উছিলা। সেখানে ফোকাস বক্তব্যটা হল – আসলে ভারত না – আবার কংগ্রেসও না, মোদী সরকারের কারণেই বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক ঢিলা হয়ে গেছে। আর সম্পর্ক যে ঢিলা হয়েছে এর প্রমাণ হল ইকোনমিস্টের ঐ রিপোর্ট। রাহুল গান্ধীও ইকোনমিস্টের ওই রিপোর্টের বরাতে মোদীর বিরুদ্ধে লম্বা টুইট করেছেন।

    তবে এখানে লেখকের প্রো-ইন্ডিয়ান ঝোঁক-অবস্থান সবচেয়ে ভালোভাবে ধরা পড়েছে। যেমন তিনি লিখছেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়াটাকে বলেছেন, “ভারতের অবদান”। আর দাবি করছেন সেই থেকে নাকি “দুই দেশের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে আছে”। অথচ এটাই সবচেয়ে ধুর্ত ভারতীয় বয়ান। যদিও এ’কথাটা কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বুঝেন, এমন লেখক বলতে পারেন না। তবে রাস্তার ধারে টংয়ের চা দোকানে বসে গুলতানির আলাপ হতে পারে হয়ত। কারণ দুই রাষ্ট্রীয় কোনো সম্পর্কের ভিতরে কখনও দয়া বা দান-ধ্যান ধরনের আলাপ-ধারণা থাকে না। দুই রাষ্ট্র দু’পক্ষের কোনো বিষয়ের মধ্যে উভয়েই নিজের নিজের স্বার্থ দেখতে পেলে একমাত্র তখনই তারা ঐ প্রসঙ্গে একসাথে কাজ করে, পদক্ষেপ নেয়। পরস্পরের পক্ষে খাড়া হতে সম্মত হয়। স্বার্থ কমন না হলে এটা করতেই পারে না, ঘটেও না। তাই এখানে কেউ কাউকে ‘দয়া’ করার কিছু নেই। বাংলাদেশকে সহায়তা করতে ভারতেরও স্বার্থ ছিল। আর থাকলেই একমাত্র এমন করা সম্ভব। বিশেষত এতে ভারতের অবস্থান পাকিস্তানের উপর আরো শক্ত হবে, সীমান্ত ইস্যু এবং কূটনীতিক সভা ও ফোরামগুলোতে ভালো অবস্থান সৃষ্টি হবে – এসব স্বার্থেই ভারত বাংলাদেশকে সেসময় সহায়তা করেছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে তখনকার পাকিস্তানের অর্ধেকের বেশি সীমান্তে পাহারার দায় ও টেনশন কমে যায়। এটাও ভারতের এক বিরাট লাভ, যা বাংলাদেশের অবদান! তাই তো হয় নাকি? কাজেই দয়া করে বাংলাদেশের জন্ম দিয়ে দিলাম টাইপের কথা এগুলো হীন মানুষের বাংলাদেশকে নিচা দেখানোর চেষ্টা মাত্র।

    আবার এরপরে,  ১৯৭২ থেকে “দুই দেশের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে আছে” এটা অবাস্তব ও অমূলক কথা। অন্তত যদি তাই হত তবে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের মৃত্যুর পরে আমাদের পাহাড়িদেরকে ফুসলায়ে ভারতে নিয়ে এরপর তাদেরই হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে আবার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সীমান্তে হামলা করতে পাঠিয়েছিলেন কেন? এটা কোন মনগড়া ক্যাম্পেইন নয়। এ্টাই সুবীর ভৌমিকের পিএইচডি থিসিস এর কনক্লুশন বা উপসংহার; যা পরে বই আকারেও প্রকাশিত।

    এছাড়াও হার্ড ফ্যাক্টস হল, ২০০৭ সালে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে “তুলে দিয়েছিল”; আমেরিকার পক্ষে চীন ঠেকানোর জন্য ভারতের কাজ করে দেয়ার বিনিময়ে ‘উপহার’ হিসেবে। কাজেই ২০০৯ থেকে ২০১৯ মোটামুটি এই সময়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতের নিজের জন্য তা স্বর্ণযুগ বিবেচনা করা হয়, যেটা এর আগে কখনো বা ১৯৭২ সালেও ছিল না। আর ফাইনালি এখন সেটাই নানান কারণে চলতি বছর থেকে নানান সমীকরণে ক্ষমতাসীন সরকার আবার অনেক বেশি চীনমুখী হয়ে থাকাটা পাবলিকের স্বার্থ হোক আর নাই হোক, সরকারের ক্ষমতায় থাকার জন্য জরুরি মনে করা হচ্ছে।

    কিন্তু এ নিয়ে কোন রিপোর্ট লিখতে বসে, ভারতমুখী করে যা ইচ্ছা ব্যাখ্যা দেয়া তো অর্থহীন। বরং এতে ইকোনমিস্ট গ্রুপের সম্মান ইজ্জত ও ইন্টিগ্রিটি বা সততাকে ধুলায় লুটাবে। আমাদের কী মনে নেই, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে, যেটাকে দেশের মানুষ ‘নৈশভোটের নির্বাচন’ বলে চিনে, তাকে ইকোনমিস্ট গ্রুপের ‘ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ প্রেডিকশন দিয়েছিল যে ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ ‘লীগ সরকার পুনর্নির্বাচিত হবে’ বলে। অথচ এটা কেমন নির্বাচনী পূর্বাভাস বা ইন্টেলিজেন্স? এর মানে কি ইকোনমিস্ট জানত যে, এটা নৈশভোট হবে? তাই কী? ইকোনমিস্ট গ্রুপ কখনো এ নিয়ে অন্তত লজ্জা পেয়েছিল বলে শুনিনি।
    আবার লেখকের কাণ্ডজ্ঞান দেখে আমাদের অজ্ঞান হওয়ার দশা। তিনি আরো ঐ রিপোর্টের সাথে বাংলাদেশে চীনা ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের এক তুলনামূলক গ্রাফ দিয়েছেন। আচ্ছা, দুনিয়ার কোনো দেশে বিদেশী বিনিয়োগকারী হিসেবে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কি খুব নামডাক? তারা কি খুবই যোগ্য আর অতুলনীয়? তাও আবার প্রবল উঠতি অর্থনীতির হবু নেতা চীনের সাথে তুলনায়? আবার তামাসাটা হল, তাতে ফলাফল কী দেখানো হয়েছে? বলা হয়েছে যে, এটি ১:১২ অনুপাতে। মানে, ভারতের এক হলে চীন এর ১২গুণ বিনিয়োগকারী, চীনের আধিপত্যে। তাহলে এটা দিয়ে কী বুঝানো গেল? আর এতে কি উল্টা ভারতকে তুচ্ছ দেখানো হয়ে গেল না?
    লেখক বলছেন “চীনা মুগ্ধতা দেখানো অশোভন ইঙ্গিত” [Cue a Chinese charm offensive]। কেন, তা কিছুই বোঝা গেল না। কেবল পরের বাক্যে তিনি বলছেন, চীন বাংলাদেশকে সাম্প্রতিককালে সাতটি ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ বানিয়ে দিয়েছে। হ্যাঁ দিয়েছে, এগুলাই বুডিগঙ্গা ফ্রেন্ডশীপ ব্রিজ। আর এর সাথে একটি আধুনিক অডিটোরিয়ামও তৈরি করে দিয়েছে (আগারগাঁওয়ে যা বঙ্গবন্ধু অডিটরিয়াম), আর সবই বিনা পয়সায়। প্রথমে চীনারা তা বানিয়ে দিয়েছিল ঋণের অর্থে, পরে সব ঋণ তারা মাফ করে দিয়েছে অনুদান হিসেবে।

    সর্বসাকুল্যে এর খরচ সেকালের হিসাবে মাত্র কয়েকশ’ মিলিয়ন ডলার। আর এছাড়া তা সাম্প্রতিককালের ব্যাপার নয় আর বাংলাদেশের দুই দলের সরকারের আমলেই ঘটেছে এমন পুরনো ঘটনা এগুলা। কিন্তু মূল কথাটা হল, যে চীন আমেরিকার বদলে গ্লোবাল এম্পায়ারের আসনে বসতে যাচ্ছে তার জন্য বাংলাদেশেও প্রভাববিস্তারের দরকার, এটাই স্বাভাবিক। আর সেজন্য কয়েকশ’ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা কি বেশি ব্যয়? গত ৭২ বছরের নেতা আমেরিকা কি এমন কয়েকশ’ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে পরে মাফ করেনি, অনুদান দেয়নি? এশিয়া আফ্রিকায় এমন কতগুলো দেশের নাম চান? গুগলে (HIPC) heavily indebted poor countries  লিখে সার্চ দিলেই টের পাবেন। এখনও অন্তত ৩৯ টা দেশের নাম পাবেন।  গ্লোবাল আম্পায়ার হতে গেলে এমন অনেক খরচ করতেই হয়। গত সত্তর বছর ধরে এটাই আমেরিকান প্রাকটিস, তাই নয় কী?

    আসল ঘটনা  বা কথা অন্য জায়গায়। এককথায় বললে,  আমেরিকা বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক করার কৌশলেও চীনের কাছে হেরে গেছে। আর তা মূলত আমেরিকার তথাকথিত ‘বাংলাদেশী এক্সপার্টদের’ ভুয়া আকামের পরামর্শের কারণে।

    আমেরিকা একে তো বিনিময়ে কিছু না পেয়ে বাংলাদেশকে তারা ভারতের হাতে “তুলে দিয়েছে”। আর শুধুমাত্র এ’জন্যই আমেরিকা বাংলাদেশ থেকে চির-বিতাড়িত হয়ে যেতে পারে। সেজন্য অন্তত কারেকশন হিসেবে আমেরিকার একবার মাফ চেয়ে আবার শুরু করা উচিত। দেখানো উচিত, আশস্ত করা উচিত সে শিক্ষা নিয়েছে – সংশোধিত হয়েছে। এখনো বাংলাদেশে তার পজিটিভ রাজনৈতিক ভূমিকা রাখার সুযোগ সম্ভবত সব শেষ হয়নি, যদিও ইতোমধ্যেই তা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমেরিকা নিজেই নিজেকে ডুবিয়েছে। আর বাকিটা তার কথিত  “বাংলাদেশ এক্সপার্ট” আর ইউএসএইড ফান্ডেড দেশী ‘বোকা’ এনজিও কর্তাদের কারণে। এরা এখন দাবি করেন, চীন-ভারত নাকি বাংলাদেশের সব ক্ষতি করে ফেলছে। এরা এখন টের পেয়েছেন, ভারতই নাকি বাংলাদেশে পাকিস্তানের চেয়েও বড় শোষক ইত্যাদি…। আসলে এরা না বাংলাদেশের জন্য না আমেরিকার জন্য প্রয়োজনীয়, বা কোনো কাজের ভূমিকা রাখতে পারছেন।

    চীন নিজের কাজ ও লক্ষ্য ঠিকমতোই বুঝে। কাজেই চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও টেলিকম ইত্যাদি সব খাত দখলে নিয়েছে বলে এখন আপসোস করার কী আছে? যেটা ঐ রিপোর্টে করা হয়েছে। চীন যে বাংলাদেশে ব্যবসায় বিনিয়োগ-বাণিজ্য ও প্রভাব চায়, আর তা কী করে নিজে পেতে হয় – প্রতিযোগিতার এই যুগে চীন তা ভালোই জানে আর প্রয়োজনীয় হোমওয়ার্কসহ সবকিছু তারা করে এসেছে। চীনের দিক থেকে এটাই তো স্বাভাবিক। এনিয়ে চোখ টাটানোর কী আছে? হবু গ্লোবাল ইকোনমিক এম্পায়ার চীনকে তো এমনই তো হতে হবে। ঠিক আমেরিকা যেমন তার উত্থানের কালে গ্লোবাল এমপের’র (Emperor) হয়েই গত ৭২ বছর ধরে রাজত্ব করেছে, আমেরিকা তো এমনি এমনিতে টিকে ছিল না! কিন্তু ‘শেষ বয়সে’ তার বাংলাদেশে নেয়া পদক্ষেপগুলো ছিল ধারাবাহিকভাবে ভুল আর ভুল। যেমন দেখেন, পদ্মা সেতুর দুর্নীতি ইস্যুতে বিশ্বব্যাংক যদি প্রশ্নই তুলে থাকে, তবে প্রশ্নের মীমাংসা করল না কেন, শেষ করল না কেন? প্রমাণ করল না কেন? উল্টা মামলাটাই প্রত্যাহার করে সব ছেড়ে পালাল কেন? আর এমনভাবে ও এমন সময়ে পালাল যাতে বিশ্বব্যাংকের প্রতিযোগী ও বিকল্প হিসেবে চীনের নিজেকে হাজির করা যেন তাতে সবচেয়ে সহজ হয়ে গেল। এটা তো হাস্যকর ভাবে “করিয়া ভাবিবার” আদর্শ লক্ষণ হয়ে গেল!

    আজকের চীন বিশ্বব্যাংকের চেয়েও অনেক বড় ও সক্ষম বিনিয়োগ বা অনুদান দাতা। সেই সাথে সে উদীয়মান, পরিকল্পিত ও স্ট্র্যাটেজিক এবং সর্বোপরি তার প্রকল্পে লোকাল এজেন্ট বা কমিশন ব্যবস্থা সে রাখে। যে গ্রহীতা সরকার যেভাবে সন্তুষ্ট হয় সেটাই সে অনুসরণ করে। এটা কি ২০১৩ সালের আগে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বা বিশ্ব ব্যাংকের স্ট্র্যাটেজিস্টরা বুঝেন নাই যে, প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে চীন এসে যাচ্ছে? যদি না বুঝে থাকেন এটাই তো প্রমাণ, চীন উত্তম ও যোগ্য গ্লোবাল ইকোনমিক এমপেরর হয়ে উঠেছে, যার সাথে তুলনায় আমেরিকার দিন ফুরিয়ে গেছে।

    আবার গ্লোবাল রাজনৈতিক দিক, যে খাতে চীনের দেয়ার কিছুই নেই বরং আমেরিকান রাজত্ব আছে। অথচ আমেরিকার কথিত এক্সপার্টদের কারণে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে আজ আমেরিকার কোনো আবেদন নেই। এর এক নম্বর কারণ খোদ আমেরিকায় – মুসলমানদের সাথে তার বিদ্বেষী আচরণ। আমেরিকান রাষ্ট্র আর তার বেকুব প্রশাসন – বুশ থেকে ট্রাম্প পর্যন্ত – এরা সকলে ভুলে গিয়েছিল আমেরিকান রাষ্ট্রের মানবাধিকারের প্রতি কিছু প্রতিশ্রুতি আছে যা রক্ষা করতে পারলেই কেবল সে আমেরিকা রাষ্ট্র আর, গ্লোবাল পলিটিক্যাল লিডার হয়ে টিকে থাকতে পারে। নইলে সব মিথ্যা আর ফাঁকা আওয়াজ হয়ে যায়!

    মূল কথাটা হল, যারা আমেরিকান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নেয় কেবল সেই ব্যক্তিরাই আমেরিকান রাষ্ট্রের শত্রু। এটা খুবই কমন কথা। দুনিয়ার সব ধরণের রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনে এই একই কথাটাই লেখা থাকে ও থাকতেই হয়। কিন্তু আমেরিকান হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এর অর্থ করেছে – না “মুসলমানরা” আমেরিকার শত্রু। অথচ কনষ্টিটিউশনের মতে তারা মুসলমান বলে আমেরিকার শত্রু নয়, একেবারেই নয়। কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার জন্য তারা এনিমি অব দা স্টেট। সেজন্য যা বিচার হয় তারা করুক। কিন্তু মুসলমানবিদ্বেষী প্রপাগান্ডা কেন? এটা তো রাষ্ট্রের কাজ না। অথচ হোমল্যান্ড এটা ছড়িয়েছে যে  ‘মুসলমানরা’ আমেরিকার শত্রু। আর এতে কোনপক্ষই আবার এটাকে ভুল বলে আপত্তিও তুলে নাই।  এভাবে যেখানেই মুসলমান পেয়েছে তারা কিছু করুক আর নাই করুক সবাইকে হোমল্যান্ড উঠিয়ে এনেছে। নির্যাতন, কথা আদায় সবই করেছে। অথচ আর সবার মত দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের ও পেশার মুসলমানেরা ভাগ্য অন্বেষনে আমেরিকায় এসেছিল ন্যাচারালাইজড আমেরিকান সিটিজেন হয়ে যেতে। তাদের সকলের স্বপ্ন গুড়িয়ে দিয়ে রাষ্ট্র দানব হয়ে হাজির হয়েছে, তাতে দাড়িয়েছে যেন মুসলমান হওয়াটাই তাদের অপরাধ।  এভাবে বুশের আমল থেকে এ পর্যন্ত ভুল পথে আমেরিকা হাঁটছে। এতে আমেরিকান রাষ্ট্রের ‘কবর’ ঐদিন থেকেই দেয়া হয়ে গেছে। এটা হয়ে গেছে, কারণ মুসলিমবিদ্বেষী আর নাগরিক বৈষম্যের কোন রাষ্ট্র যে নিজের প্রতিশ্রুতি বা কনস্টিটিউশনই ধরে রাখতে পারে না, মানে না; সে তো আসলে মৃত।

    আবার আমাদের এদিকে এশিয়াতে তারা ভারতের সাথে কৌশলগত মিত্রতা করেছে। এই ঐক্যের ভিত্তিও এ’দুই রাষ্ট্রের মুসলিমবিদ্বেষ, যারা মুসলমানদের নিজের রাষ্ট্রের শত্রু মনে করে থাকে। এটা তো হতেই পারে না। যা সবার জন্য সমান রাষ্ট্র নয়, সেটা আদতে কোন রাষ্ট্র নামে ডাকার যোগ্য নয়। কারণ, রাষ্ট্র নিয়ে মৌলিক বোঝাবুঝিটা হচ্ছে, যেকোনো জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য বা অসাম্য করা, এটা নিজ রাষ্ট্রকে বিলুপ্ত করে ফেলার সামিল। তাই আমেরিকা বা ভারত মুসলিমবিদ্বেষী রাষ্ট্র বলে নিজ বিলুপ্তির পথে কয়েক ধাপ আগিয়ে যেতে বাধ্য, হয়েছেও তাই।
    আমেরিকার আত্মস্বার্থও যারা বুঝে না আর মনভর্তি মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা নিয়ে আছে যারা; এমন কিছু আমেরিকান প্রজন্ম চলতি শতকের শুরু থেকেই আমেরিকার প্রশাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

    এবার, যারা আমেরিকার চোখে “বাংলাদেশ এক্সপার্ট” বা আমেরিকার বন্ধু ও কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেন তাদের দিকে দেখি। তারা মনে করেন, একজন ইসলামিস্ট কতদূর সেক্যুলার বা আধুনিকতা থেকে দূরে আছে তা মেপে রায় দেয়াটা তার কাজ। এর অর্থ, তাহলে একজন আল্লামা আহমদ শফী হুজুরকেও যেন তিনি মেপে বলতে আহ্বান জানাচ্ছেন যে, দেখুন তো, আমি আমেরিকান এক্সপার্ট কতটুকু ইসলামিস্ট হয়েছি। তাই নয় কী? বলাই বাহুল্য, এতে শফী হুজুরের মত কোনো আলেমকে দাওয়াত দিয়ে আনা আর তাকে দিয়ে বলানো যে, আমি তো আপনার মতো কওমি মাদরাসায় পড়িনি তাই আমি আধুনিক বলে আমাকে নাকচ করে দেন। অথচ এটাও কোনো ইসলামিস্টের কাজ নয়।
    ব্যাপারটা হল, আমরা কেউ আরেকজনকে তার ইডিওলজি মেনে নিতে বা নিয়ে চলার দাওয়াত দিতে বা দাবি করতে পারি না। কারণ এগুলো একটাও আমাদের কারোই কাজ নয়। হতেই পারে না। বরং সব ইডিওলজির লোকেরা যেন পাশাপাশি বৈষম্যহীনভাবে সমান ও একই সুযোগসুবিধাসহ বসবাস করতে পারি এমন নীতি ও অধিকারভিত্তিক একটা রাষ্ট্রের জন্য সবাই ঐক্যমত্য হওয়া, কাজ করা ও গড়ে তোলা, এটাই আমাদের সবার কাজ। এতে এরপর থেকে সবাই ঐ  রাষ্ট্রের কমন নীতিগুলো মেনে চলা সাপেক্ষে সবার নিজ মতাদর্শ সবাই কারো সাথে একমত না হয়েই বাধাহীনভাবে চর্চা করতে পারব।

    অথচ তারা খুঁজতে গেছে কওমিরা কীংবা ইসলামিস্টরা কত খারাপ, কত পশ্চাদপদ, কতটা তাদের মত নয় এইসব। বরং নুন্যতম কী না হলে সকল ইডিওলজি বা ধারা একই রাষ্ট্রে থাকতে সমস্যা হবে, আর তা কেন হবে, এর সমাধান কী ইত্যাদি সেসব নিয়ে আলোচনা তর্ক এবং মীমাংসায় পৌছানোর চেষ্টার চেয়ে ইসলামিস্টদের কথিত ‘সেকুলার’ বানানো যেন তাদের কাজ এমন গোঁ ধরে তারা।

    মানে কথিত এক্সপার্টরা আসলে নিজের আসল কাজটা কী তাই তো বুঝেননি। তারা ভেবেছেন, একজন ইসলামিস্ট যে প্রগতিশীল নয়, কথিত সেকুলার নয় হতেও চায় না এই ফতোয়া দেয়া ও জারি রাখাই তার কাজ। ইসলামিস্টরা কত পশ্চাদপদ তা দেখিয়ে প্রপাগান্ডা করাই যেন তার কাজ। ফলে এরই পরিণতি হল ঘৃণা, ঘৃণা আর ঘৃণার চর্চা বাড়িয়ে চলা।

    আয়না-ছবিঃ
    আমেরিকার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি যে মুসলমান সেগরিগেশন বা বিচ্ছিন্নকরণ ও বিদ্বেষী ততপরতা শুরু করে দিয়েছিল এরই আরেক অর্থ হল, আমেরিকানদের মনে দুনিয়ায় কোন মুসলমান নাই বা না থাকে যেন – এমন এক অবাস্তব দুনিয়ার আকাঙ্খা জাগিয়ে তোলা।  এর তামশার দিকটা হল আমেরিকায় আঁকা আকাঙ্খিত সেই দুনিয়াটাই যখন পরে সে বাংলাদেশের মত মুসলমান-অধ্যুসিত দেশে দেখতে পায়, [তবে বাংলাদেশেরটা আসলে আমেরিকারই এক ‘আয়না-ছবি’ – মানে ঠিক আপনি না তবে, আপনি আয়নার সামনে দাঁড়ালে যে ছবিটা আয়নায় ফুটে উঠে সেটাই আপনার আয়না-ছবি] – বাংলাদেশে সেই ছবিটাই ফুটে উঠলে এবার আমেরিকা আঁতকে উঠেছে।

    কারণ বাংলাদেশের ছবিটা হল এবার কেবল মুসলমানেরাই আছে এমন এক দুনিয়া পাবার আকাঙ্ক্ষার ছবি। এটা বাংলাদেশে এখন অনেক বেড়েছে আপনি আমেরিকা দাবি করবেন বা দেখাতে পারবেন হয়ত। আপনি আমেরিকান শাসক – এটা দেখে হয়ত ভাববেন দেখেছো তারা কত খারাপ। তারা প্লুরাল (plural) না, এই ইসলামিস্টরা এদের স্বভাব হল যারা তাদের মত না এমন কাউকে তারা সাথে নিতে একসাথে বসবাস করতে চায় না। বরং নির্মুল করতে চায়, তারা inclusive না; তারা সেকুলার না। ইত্যাদি এমন কতকিছু অভিযোগ আপনার থাকবে হয়ত।

    এখন বুঝেন আপনি যদি মুসলমান-ছাড়া এমন কোন দুনিয়ার কল্পনা করতে পারেন তাহলে এটা পরিণতিতে কেবল মুসলমানেরা আছে এমন এক দুনিয়া পাবার আকাঙ্ক্ষা যাদের আপনি ইসলামিস্ট বলছেন, তাদেরই হাতে আপনার এমন এক আয়না-ছবিই কী আপনি দেখবেন না? এটা তো আসলেই আপনারই আয়না-ছবি! কাজেই এদের দেখে আপনি আঁতকে উঠেন কেন? বরং নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন সাহস থাকলে যে, আপনি নিজে কেন এমন? অধঃপতিত! কেন হয়েছিলেন? তাই, কারও দিকে আঙুল তোলার আগে নিজেকে জিজ্ঞাসা করেন ব্যাপারটা আপনারই তৈরি বা এক ‘আয়না ছবি’ নয়ত?

    কাজেই এখন দেখেন আপনি আসলে ঠিক কী হতে চান? এবার জেনেশুনেই ঠিক তাই হতে চান, না উলটা তওবা পড়বেন! মাফ চেয়ে নিয়ে নতুন কিছু করার শপথ নিবেন? সিদ্ধান্ত আপনার!

    আমেরিকা আবার উঠে আসার চেষ্টা করছে আমরা টের পাচ্ছি। হিউম্যান রাইটের উপর শক্তভাবে হয়ত দাঁড়াতে ইচ্ছা করবে, পারব কতটুকু সেটাই প্রশ্ন ! বাংলাদেশে আমেরিকা তার প্রভাব ফিরুক, এটা সে চাইবে সম্ভবত, অনুমান করি। কিন্তু সেটা কী ফিরবে?  কিন্তু এর আগে আমেরিকা কি নিজেদের সংশোধন করে হাজির করতে সক্ষম হবেন? আমরা অপেক্ষা করব দেখার জন্য! তবে তারা কিছু মাত্রায় সংশোধন হয়েছেন কিনা এর একটা চিহ্ন হবে মনে হয় যে তারা তাদের এক্সপার্ট ও এনজিও ব্যক্তিত্ব বদলে নিইয়েছেন কিনা! যারা বাংলাদেশের মানুষের চাওয়া ও স্বার্থটাই বুঝেন না তারা আপনাদের পরামর্শক হবেন কী করে?

    তবে ইকনোমিস্ট ঐ লেখায় সব শেষে তাদেরই এক রিডিং জানিয়েছে। বলেছে, “চীনের কাছে খুব বেশি দায়বদ্ধ হয়ে যাওয়া নয়, আবার ভারতের প্রতি অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ না করা নিয়ে সতর্ক বাংলাদেশ” [It is wary of becoming too indebted to China, and is careful not to snub India. ]।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “সংশোধিত আমেরিকা দেখব কি? ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • “সারা কাশ্মিরই ভারতের” দাবির পরিণতিতে লাদাখে হাতছাড়া

    “সারা কাশ্মিরই ভারতের” দাবির পরিণতিতে লাদাখে হাতছাড়া

    গৌতম দাস

     ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3bw

    India-China joint statement

    আকসাই চিন [Aksai Chin] যেটা ভারতের ভাষায় ‘লাদাখ’ তা নিয়ে  চীনের সাথে ভারতের কোন একবার সীমান্ত ভুখন্ড চুক্তি করা বা এলএসি টানতে সমঝোতা করার মানেই এরপর ‘সারা কাশ্মিরই ভারতের’ এই দাবি করার ভারতের আর সুযোগ নাই। কারণ চুক্তি করা বা এলএসি টানা মানেই আকসাই চিন চীনেরই ভুখন্ড তা মেনে নিয়েই চুক্তি করতে যাওয়া হয়েছিল। তাই চীন-ভারতের ১৯৯৬ সালের এলএসি সমঝোতা চুক্তি মানেই আকসাই চিন চীনের বলে স্বীকার করে নেওয়া। কাজেই এরপর অমিত শাহের সংসদে লোকসভায় (৫-৬ আগষ্ট ২০১৯) “সারা কাশ্মিরই ভারতের” বলে ঘোষণা করা মানে এটা আগের – ১৯৯৬ সালের এলএসি সমঝোতা চুক্তিকে একপক্ষীয়ভাবে অস্বীকার বা বাতিল করা। এভাবে মোদী-অমিত প্রমাণ করেছে ভারত এক অশিষ্ট রাষ্ট্র (rogue state)।

    দুই পড়শি রাষ্ট্রের সীমান্ত [border] জিনিষটা খুবই অদ্ভুত। সীমান্ত একার হয় না। আপনার নিজ রাষ্ট্র-সীমানা কতদুর – সেটা হল আপনার পড়শির সাথে আপনি আলোচনা করে, সেখানে নানান পুরানা ম্যাপ বা যুক্তি-কারণ দেখিয়ে একটা ঐক্যমত্যে এটা যতদুর বলে আপনারা পরস্পর সাব্যস্ত করেছেন। আর সেই ঐক্যমত্যের সীমানা এরপরে একটাই ম্যাপে তা চিহ্নিত [demarcate] করেছেন। এবার সেই একই ম্যাপের দুইটা কপি দুই রাষ্ট্র নিয়ে রেখে দিয়েছেন। অর্থাৎ পুরা প্রক্রিয়াটা দুই রাষ্ট্র মিলে; যার সোজা মানে সীমান্ত একা চিহ্নিত করা যায় না।

    আচ্ছা সীমান্ত একা একাই দাবি করলে মানে যেকোন কিছু একটাকে নিজের সীমানা বলে দাবি করলে কী হবে?
    এর উত্তরটা খুব সহজ। সেটা ডিমার্কেটেড সীমানা হবে না। তা না হলেই বা কী অসুবিধা? সেক্ষেত্রে প্রথমত সেটাকে বলা হবে – “বিতর্কিত সীমান্ত” – মানে হল অপর পক্ষ সেটা মানে না। একমত না কারণ তার ধারণা ভিন্ন। আর সেখান থেকেই এবার লাইন অব কন্ট্রোল অথবা লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল বা এলএসি ধরণের নতুন নতুন শব্দের উতপত্তি। আর বলাই বাহুল্য অনবরত সীমান্ত টেনশন। আর সেখান থেকে কখন না যুদ্ধ লেগে যায় অবস্থা, মাথার উপর টিকটিক। আর এর উলটাটা হল, একবার যদি ঐক্যমত্যে ম্যাপ এঁকে তা শেয়ার করে নেওয়া যায় তো সব ঠান্ডা। সম্ভবত সেকারণে, কলোনি শাসিত হবার একটা ইতিবাচক দিক আছে।  সেটা হল সব কলোনি শাসকই সর্বপ্রথম পুরা কলোনি রাষ্ট্রের সীমানা পড়শিদের সাথে বসে ডিমার্কেটেড করে নিতেন। তাদের চোখে একাজের পিছনেই বিনিয়োগ যথার্থ কারণ এর বিকল্প হল, অযথা যেকোন সময় যুদ্ধের রিস্ক বা খরচের দায় নিতে রেডি থাকা। তাহলে মনে হচ্ছে,  সব সুবিধা আর লাভালাভই ডিমার্কেটেড সীমান্ত করে নেওয়া দুই পড়শিরাষ্ট্র দুজনের পক্ষে।
    তাই কী? হা মোটাদাগে তাই। কোন নেগেটিভ দিক কী এতে নাই। হা অবশ্যই আছে। এক বিরাট অসুবিধা আছে। অসুবিধাটা হল, একবার কমন ম্যাপ করে ফেলার পর আর পড়শির দখলে থেকে যাওয়া কোন ভুমি আপনার বলে আর দাবি করতে পারবেন না। করলে কী হবে? করলে এবার লিগ্যালি মানে আইনত আপনি ডিফল্টার বা অনুপ্রবেশকারী মানে অপরাধী বলে চিহ্নিত হবেন। ঠিক সে ঘটনাটাই ঘটেছে মোদী-অমিতের কপালে! কিভাবে?

    পাঁচদফার যৌথ ঘোষণা আবার পেন্ডুলামওঃ
    সীমান্ত বিরোধ সংঘাত নিয়ে চীন-ভারতের পাঁচ দফা ঐকমত্যের যৌথ ঘোষণা রাশিয়ার মধ্যস্থতায় গত ১০ সেপ্টেম্বর মস্কোতে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু খবর কী শুধু এতটুকুই? না, এর মধ্যেই সব আছে মনে করলে ভুল হবে, আর সেটা দুই কারণে। প্রথমত, পরের দিনই ১১ সেপ্টেম্বর বা সময় হিসাবে কয়েক ঘণ্টা পরই ছিল আমেরিকার সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের (সাথে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংকে নিয়েও) গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন বা ভার্চুয়াল মিটিং। এটাকে দেখে এক পলিটিক্যাল কমেন্টেটর মন্তব্য করেছেন, ভারত পেন্ডুলামের মতো আমেরিকা না চীন এই করে দোল খাচ্ছে, এর প্রতীকী চিহ্ন এটা [India swings like a pendulum between China and US]। কথা হয়ত মিছা নয়। আমরাও গত সপ্তাহের লেখায় বলেছিলাম “তামাশা হল আমেরিকার সাথে এক মিটিংয়ে খাওয়া ডিনারের ঢেঁকুর জয়শঙ্কর চীনের সাথে মিটিংয়ে গিয়ে তোলেন”। কাজেই মোদীর ভারতের কঠিন ডিলেমা মানে ‘এধার না উধারের দু নৌকায়’ পা দেয়ার সঙ্কটটা এখানেই।
    তবুও দ্বিতীয়ত, সার কথায় বললে আমেরিকার সাথে ১১ তারিখের মিটিংটা বড়ই আজিব, এমনকি নামের দিক থেকেও। এ নিয়ে একটা বড় রিপোর্ট করেছে ভারতের দ্যাপ্রিন্টের নয়নিমা বসু। আর তিনি তা করেছেন এই বিশ্বাস করে যে, কোনো যুদ্ধে ভারতের পক্ষে আমেরিকার দাঁড়িয়ে যাওয়ার দলিলটাই যেন লেখা হচ্ছে বা হবে এখানে। কাজেই ভারতের আর যেন চীনভীতির কিছু নেই! থাকবে না! কিন্তু নয়নিমার রিপোর্টিংয়ে সাজানো এই মেজাজ ও অনুমানগুলোর আলোকে তাঁর লেখা পড়া ভুল হবে।

    ১১ সেপ্টেম্বর ভারত-আমেরিকার মিটিংটা ছিল মূলত আমেরিকার অস্ত্র বিক্রির; আর তা এই বিক্রির পদ্ধতিগত বিস্তারিত দিক নিয়ে মিটিং। ঐ মিটিংয়ের নাম – ‘ভারত-আমেরিকার ২+২ মিনিস্টরিয়াল ডায়লগের ইন্টারসেশনাল মিটিং” বা ইংরাজিতে [“Intersessional Meeting of the U.S.-India 2+2 Ministerial Dialogue”]। বেকায়দার নাম শুনেই ঘাবড়ানোর কিছু নেই। অস্ত্র বিক্রি করতে বিস্তারিত আলাপের জন্য এটা দু’পক্ষেরই দু’টা করে মন্ত্রী মিলে বৈঠক, আর দু’পক্ষের পররাষ্ট্র আর প্রতিরক্ষা মন্ত্রীরা এখানে উপস্থিত থাকবেন – তাই ‘২+২’ বলা। আর এখানে অস্ত্র বিক্রি বলতে, একে৪৭ বা মেশিনগানের মতো সিম্পল অস্ত্র নয়; বড়, জটিল ও হাইটেক বায়ুযানবিষয়ক ব্যাপার। তাই এমন ক্ষেত্রে আমেরিকার কমন প্র্যাকটিস হল, ওসব অস্ত্র বা যন্ত্র প্রভৃতি বিক্রির আগে সব ক্রেতাকে অবশ্যই অনেকরকম চুক্তি করিয়ে নেয়া যে, কী কী শর্তে এগুলো ভারত ব্যবহার করতে পারবে, ট্রেনিং কী হবে, যন্ত্রাংশ সরবরাহ কেমনে কী হবে, স্টক কী করে রাখতে হবে, দক্ষভাবে এর ব্যবহার কী করে করতে হবে, সাথে ইনটেলিজেন্স কী লাগবে, তার ট্রেনিং কে দেবে প্রভৃতি খুঁটিনাটি বিস্তারিত দিক থাকে এর মধ্যে। এ ছাড়া অস্ত্র বিক্রি কোনো সাধারণ পণ্য নয়। তাই দুদিকের দুজন মন্ত্রী লাগে। আর সাথে এত পদ্ধতিগত বাধা পার হতে হয়। এমনিতে আমেরিকার দিক থেকে নিজেদের অস্ত্র বিক্রির দায় ও ক্রেডিট পেন্টাগনের। কিন্তু স্ট্র্যাটেজিক ও পলিটিক্যাল দিক এর সাথে জড়িয়ে থাকে বলে তাদের ফরেন অফিসকেও সাথে নিয়ে নামতে হয়। এরপর সেসব ‘পদ্ধতিগত দিক’ ফাইনাল করে চুক্তিতে পৌঁছানোই ছিল ঐ সভার উদ্দেশ্য। এমন পদ্ধতি মানতে হয় আরেক কারণে। যেমন, ভারতের সাথে রাশিয়ার খাতির খুব কম নয়। তাই ভারত যদি আমেরিকার কোনো অস্ত্র বা সামরিক যন্ত্র কিনে আর তা রাশিয়াকে দেখতে দেয় যাতে সে  ভেঙেচুরে তার সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে শিখে ফেলতে পারে! তাই এটা ঠেকানোই এসব চুক্তির আসল উদ্দেশ্য যাতে অস্ত্র বা সামরিক যন্ত্র তৃতীয় দেশের হাতে না যায়।

    তবে বলাই বাহুল্য, কোনো অস্ত্র বিক্রেতা দেশ আপনার দেশকে অস্ত্র বিক্রি করেছে – এখন এর মানেই আপনার কোন শত্রুর সাথে আপনার যুদ্ধ লাগলে তখন আপনার পাশে মাঠে এসে অস্ত্র বিক্রেতাও দাঁড়িয়ে লড়বে – এমন গ্যারান্টিও সে ক্রেতা দেশ দিয়েছে  – যারা এটা মনে করে তাদের অবশ্যই তা বিরাট আহাম্মকি কান্ড বুঝতে হবে। এদের থেকে দূরে থাকতে হবে। যদিও কোনো অস্ত্র বিক্রি মানে, সেটা দু’দেশের মধ্যে এক ধরনের ছোটখাট ‘সামরিক চুক্তি’ মনে করা দোষের হবে না। আবার আমেরিকার সাথে সামরিক চুক্তি হচ্ছে বলে এটুকু পড়ার পরই গা-গরম করে ফেলা যাবে না, কারণ এর মানে হয় না। তবে একবার (১৯৬২) চীনের হাতে মার খাওয়াতে ভারতের নেতাদের যে মানসিক ট্রমা হয়েছে তা থেকে উদ্ধার পেতে অজান্তে বা জেনেই যাতে কিছু সান্ত্বনা পাওয়া যায় এমন ইঙ্গিত রিপোর্টে থেকে যেতেই পারে। তবু আমাদের বুঝাবুঝিতে পরিষ্কার ফারাক রাখতে হবে – অস্ত্র বিক্রির চুক্তির সাথে সামরিক-স্ট্র্যাটেজিক জোটে ঢুকে পড়ার চুক্তির কোনো সম্পর্ক নেই; দুটো আলাদা।

    তবু নয়নিমা এমন বিভ্রান্তি তৈরির পক্ষে অজ্ঞাত ও ‘নাম বলতে না চাওয়া’ সরকারি কর্তার কথা বলে আড়ালে দাবি করেছেন, মোদী সরকার নাকি সামরিক-স্ট্র্যাটেজিক জোটে ঢুকে পড়তে গভীর আগ্রহে আছে তাই দুটাকে এক করে দেখছেন নয়নিমা।

    কিন্তু কথিত অজ্ঞাত বলে যাই দাবি করুন, বেজ ফ্যাক্টস হল, মোদির নীতি-নির্ধারকেরা পরিষ্কার যে, তারা আমেরিকার সাথে ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে উঠতে পারছেন না। ট্রাম্পের আমেরিকা অবশ্য আরো সরেস হয়ে দাবি করছেন এই জোট হবেই আর যেন এর নাম হয়ে যাবে ‘এশিয়ান ন্যাটো’। যদিও এমন দাবির বিরুদ্ধে জয়শঙ্কর আগেই দায় ঝেড়ে ফেলতে বলছেন, “ভারত জোটনিরপেক্ষ অবস্থানেই” থাকবে। কিন্তু আবার পরিষ্কারও করেন না যে, তাহলে মোদীসহ অমিত-মাধব [রাম মাধব বিজেপির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল ও আরএসএস এর খাস নেতা ] সবারই মনে যুদ্ধের মাঠে আমেরিকা ভারতের পাশে খাড়া হবে এমন আশার বাতি কেন জ্বালিয়ে রাখেন তারা, নিভান না কেন?

    কেউ মনে আশার আলো জ্বালিয়ে রাখলে আর কী করা, মনের উপর হাত চলে না। তবে মোদির নীতিনির্ধারকরা পরিষ্কার যে, তারা ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে উঠতে পারছেন না। এর অন্তত একটা প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। সেটা হলো চীনের সাথে পাঁচ দফা ঐকমত্য করতে মোদীর রাজি হওয়া। এর অন্তত প্রথম দুটো দফা এর প্রমাণ। পুরা পাঁচ দফা এখানে। ওর প্রথম দফা লিখেছে (এখানে বাংলাটা ভারতের সরকারি ওয়েবসাইটের করা, ওর পিডিএফ সেখান থেকে নেয়া)  –  …… “‘ভারত-চীন সম্পর্কের বিকাশে নেতাদের ঐকমত্যের শৃঙ্খলা থেকে উভয় পক্ষের পথনির্দেশিকা গ্রহণ করা উচিত”।
    এর মানে ভারত-চীন সম্পর্কের ভিত্তি হল, দু’দেশের যেগুলো এখন ঐকমত্য হয়েছে এমন পয়েন্ট; তাই দাবি করা হচ্ছে। কিন্তু তাহলে এর এখন মানে হয়ে গেছে যে, ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট লোকসভায় কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত ৩৭০ ধারা জবরদস্তি বাতিল করে দেয়া ভুল হয়েছে। কারণ অমিত শাহের এই বাতিল করে দেয়ার ভিত্তিতেই পরের দিন তিনি আলাদা ও পরিষ্কার করে  ঘোষণা করে দেন, সারা কাশ্মিরই এখন একমাত্র ভারতের অংশ। অর্থাৎ পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মিরের অংশ ও চীনের অধিকৃত কাশ্মিরের অংশ (আকসাই চীন) ইত্যাদি সবই ঐদিন থেকে ভারতের বলে অমিত শাহ ঘোষণা করে দিয়েছিলেন [PoK, Aksai Chin integral part of J&K, can die for it: Amit Shah in Lok Sabha]।

    “Kashmir is an integral part of India, there is no doubt over it. When I talk about Jammu and Kashmir, Pakistan occupied Kashmir and Aksai Chin are included in it and can die for it,”  -Amit Shah, 06 August 2019 in the parliament

    আসলে ঐদিনের ঘটনায় মোদী-অমিত যে রাষ্ট্র-রাজনীতি বিষয়ে কত নাদান, তাই স্পষ্ট হয়েছিল। কারণ এই ঘোষণার সোজা মানে, ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ থেকে ওই ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ৭২ বছরে যা কিছু সীমান্ত-ভূমি বিষয়ে ভারত-চীন সমঝোতা ও চুক্তি আছে বা হয়েছিল – এর সবকিছু ভারত সেদিন সংসদে একাই একপক্ষীয়ভাবে বাতিল বলে ঘোষণা করে দিয়েছিল। কারণ অমিত শাহ বলছেন  কাশ্মীরের চীনের অংশ (আকসাই চিন) আর পাকিস্তানের অংশ সহ পুরা কাশ্মীরই ভারতের ইন্টিগ্রাল বা অবিচ্ছেদ্দ অংশ। কারণ অমিত শাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে ভারতীয় কনষ্টিটিউশনের ৩৭০ ধারা বাতিলের বিল পাশ করাতে পুরা কাশ্মীর এরপর থেকে সরাসরি  ভারতের  অবিচ্ছেদ্দ অংশ হয়ে গেছে।  এতে আরো মানে হল লাদাখে ভারত চীনের সাথে সীমান্ত আলোচনায় (১৯৯৩-৬) কাশ্মীরের যেসব ভুখন্ড চীনের কাছ থেকে ছাড় পেয়ে নিজের এলএসি বলে ১৯৯৬ সাল থেকে যা নিজের ভুখন্ড বলে দাবি করছিল সেসব চুক্তির আর কোন মূল্য নাই। তা অকেজো ও বাতিল।  কারণ ৫-৬ আগষ্ট ২০১৯ থেকে সারা কাশ্মীরই ভারতের কারণ অমিত শাহ সেটা সংসদে ঘোষণা দিয়েছে – এটাই এর একমাত্র ভিত্তি। পুরা আকসাই চিন যদি অমিত শাহের ভারতের হয়ে যায় তাহলে আবার মাত্র ১৯৯৬ সালের একমতের এলএসি পর্যন্ত ভারতের সীমানা – এই দাবির মানে কী? এই দাবি স্ববিরোধী।

    কোনো দু’দেশীয় চুক্তি হওয়ার পর এবার কোনো একটা পক্ষ একাই তা বাতিল বলে ঘোষণা করে দিলে জেনেভা কনভেনশন চালু হওয়ার পর থেকে এমন বাতিলকারী রাষ্ট্রকে অশিষ্ট রাষ্ট্র [ROGUE State] মনে করা হয়। ইংরেজি এই শব্দের মানে হল, যে নিয়ম বা আইন মানে না, শয়তান বা চিট করে চলা লোক বা রাষ্ট্র। অর্থাৎ অমিত শাহের ঐ ঘোষণা ভারতকে অশিষ্ট রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
    কেন এমন খারাপ কথা? তাহলে কী দুদেশের কোন ‘হওয়া’ চুক্তি আর কখনো বাতিল করা যাবে না? তা নয়; অবশ্যই যাবে। কিন্তু পদ্ধতি মেনে তা করতে হবে। “অশিষ্ট” হয়ে নয়, একপক্ষীয় খেয়াল খুশিতে নয়। বাতিলের ইচ্ছা প্রকাশ করে অপরপক্ষকে নোটিশ দিয়ে আলোচনার তারিখ নিয়ে এবার আলোচনায় বসতে হবে। সাধারণত সব চুক্তিতেই কিভাবে ঐ চুক্তি বাতিল করা যাবে তাও লেখা থাকে। কাজেই সে মোতাবেক ঐ মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত হিসাবে চুক্তি বাতিল করা যাবে। কিন্তু মোদীর ভারত একেবারে গায়ের জোরে তাই করেছে।
    মোদী-অমিতের চোখ নিবদ্ধ ছিল ৩৭০ ধারা বাতিল আর পুরা কাশ্মীর এরপর থেকে সরাসরি  ভারতের  অবিচ্ছেদ্দ অংশ – এই ঘোষণার লাভালাভের দিকে। তারা উগ্র জাতিবাদী ধারণায় এই ঘোষণার ফলাফল পরিণতি হিসাবে এরপর থেকে সমস্ত হিন্দু ভোট জাতগর্বে উঠে দাঁড়াবে আর বিজেপির পক্ষে ভোটের বাক্সে চলে আসবে – এই অনুমানের দিকে ছিল তাদের মূল দৃষ্টি।  কিন্তু তাদের ঘোষণা যে এতদিন   চীন-ভারতের সব সীমান্ত ভূমিবিষয়ক চুক্তি ও এলএসিগুলোকেও বাতিল করে দিচ্ছে সেদিকটা একেবারেই আমল করেন নাই।

    তাই অমিত শাহের ঐ ঘোষণার পর চীনা প্রতিক্রিয়া কী ছিল তাও মোদী সরকার আমলে নেয়নি। কিন্তু ২০১৯ সালে ৩১ অক্টোবর বেইজিংয়ে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেগুলার প্রেস ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে সে কড়া প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছিল। বলেছিল, “ভারত একপক্ষীয়ভাবে খেয়াল খুশিতে নতুন করে জম্মু-কাশ্মির ও লাদাখ বলে তাদের দুটা ইউনিয়ন টেরিটরি ঘোষণা করেছে যার মাধ্যমে আসলে চীনা টেরিটরিকে ভারতীয় প্রশাসনের অন্তর্গত বলে দাবি করা হয়েছে। এতে চীনা সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে”।

    কেন এত কড়া চীনা প্রতিক্রিয়া?
    এর পেছনের লম্বা ইতিহাসের সংক্ষেপটা হল, কাশ্মিরের এই চীন-ভারত সীমান্তটাই পূর্ব লাদাখ যা ব্রিটিশ আমল থেকেই কখনোই উভয়পক্ষের সম্মতিতে সীমান্ত চিহ্নিত করে নেয়া হয়নি এমন সীমান্ত। ব্রিটিশেরা তার কলোনি পড়শিদের সাথে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ার ডিমার্কেটেড ম্যাপ তৈরি করত। কিন্তু করদ রাজ্যগুলো মানে ওর সীমানাগুলোকে বাদ দিয়ে। কারণ আইনত প্রিন্সলি বা করদ স্টেটগুলো বৃটিশদের ঠিক কলোনিভুমি নয়। আর কাশ্মির ছিল করদরাজ্য। সেজন্য কখনোই লাদাখ সীমান্ত চীন-ভারতের বসে একমত হয়ে চিহ্নিত করে নেয়া কোন সীমান্ত নয়। তাই সর্বপ্রথম চীন ওই এলাকায় কতদূর নিজের এলাকা বলে দাবি করে বা এলএসি দাবি করে তা ঘটেছিল ১৯৫৯ সালে। এটাই ১৯৫৯ সালের এলএসি [LAC]। পরবর্তিতে ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের পরে চীন তা আরো পোক্ত করে নেয়। কিন্তু পরবর্তীতে একালে চীন-ভারত সম্পর্কের উত্থান-পতনে যখন তা ভালো হয়েছে তখন সীমান্ত আলোচনায় বসার মত অবস্থায় ১৯৯৩-৯৬ সালের এই চার বছরে বিস্তীর্ণ এলাকা চীন ভারতের পক্ষে ছেড়ে দেওয়ার চুক্তি করেছে। কারণ, চীনের সেসময় নীতি ছিল – কোনো এলাকা স্ট্র্যাটেজিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ মনে না হলে আর সে এলাকা নিয়ে ভারতের দাবি থাকলে তা ভারতের কাছে ছেড়ে দেয়া। কারণ ভারতের সাথে অন্যসব সম্পর্কের লম্বা এনগেজমেন্টে চীনের অনেক গভীর স্বার্থ আছে। তাই আস্থা সম্প্রসারণ চীনের জন্য জরুরি মনে হয়েছিল। এ কারণে ১৯৯৩ সালের এলএসিতে ভারত প্রথম বিস্তীর্ণ ভূমি ছাড় পায় যা ১৯৯৬ সালে ভারত পায় চীনের আরো চরম ছাড়ে। সেজন্য চীন-ভারত লাদাখ সীমান্ত বলতে ভারত সর্বশেষ ১৯৯৬ সালের এলএসিকে মূল ভিত্তি মনে করে এসেছে। কিন্তু অমিত শাহের ৫-৬ আগস্টের ঐ ঘোষণা যে এসব (১৯৯৩-৬ সালের) চুক্তি আর বুঝাবুঝিকে নাকচ করে দিচ্ছে – এটা তারা টেরও পয় নাই। এমন মেসেজ যে মোদী সরকার চীনকে দিয়ে ফেলছে সেটাও তারা বুঝেছেন বলে মনে হয় না। আবার অমিত যে সারা কাশ্মিরকেই ভারতের একক অংশ বলে দাবি করছেন সেটা সচেতনভাবেই করছেন। কিন্তু আইনিচুক্তি ও কূটনৈতিক কনসিকোয়েন্স-পরিণতি না বুঝে। তাই চীনের বক্তব্য, তাহলে অমিতের  ঐ (৫-৬ আগষ্ট ২০১৯) ভাষ্য বলছে – আমাদের দু’দেশের আলোচনা, চুক্তি ও এলএসি আর সব বুঝাবুঝি বাতিল ও ভুয়া। কারণ অমিত শাহ একপক্ষীয়ভাবে দাবি করেছেন “পুরা কাশ্মিরই ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ”।

    কাজেই এখনকার সীমান্ত সংঘাতে চীনা ভাষ্য ও চীনের পালটা সামরিক ততপরতার ব্যাখ্যাটা হলঃ  চীন বলতে চাইছে,  অমিত শাহ যদি একপক্ষীয়ভাবে সব ভুখন্ড দাবি করেন, এর মানে তিনি নিজেই ১৯৯৩-৯৬ সালের সব চুক্তি ও এলএসি বাতিল বলে দাবি করছেন। তাই ভারতের সাথে এবারের সীমান্ত সংঘাতে “আমরাও ঐ পালটা গায়ের জোরে ১৯৫৯ সালের এলএসিকে ভিত্তি মেনে সব ভূমি নিজেদের দখলে নিয়ে নিয়েছি”। কোন ভারতীয় এলএসি কে মান্য করি নাই। কারণ যে এলএসি অমিত শাহই বাতিল করে দিয়েছেন তা মানবার কোন দায় আমাদেরও নাই। এমনকি এক সামরিক চাপ ফেলে এরপর মোদী সরকারকে দিয়ে ‘চীন ভারতীয় কোনো ভূমি দখল করেনি বলিয়ে নিয়েছি”। অর্থাৎ মোদিকে দিয়ে মানিয়েছি, ১৯৯৬ সালের এলএসিকে ভিত্তি ধরে নয়, ১৯৫৯ সালের এলএসিকে ভিত্তি ধরলে চীন ভারতের কোনো ভূমি দখল করেনি। আর মোদী তাই মেনে নিয়েছেন।

    তাহলে এখন পাঁচ দফা ঐকমত্যের যৌথ ঘোষণার মানে কীঃ
    অতএব এখন পাঁচ দফা ঐকমত্যের যৌথ ঘোষণার মানে হল উপরের পুরা চীনা ভাষ্যটাই মোদীর মেনে নেওয়া। কারণ অপশনগুলোর মধ্যে এটাই মোদীর জন্য সবচেয়ে কম ক্ষতির ও বহনযোগ্য। যেমন  পাঁচ দফা ঐকমত্যের প্রথম দফার অর্থ হল – আবার আমরা স্বীকার করছি, চীন-ভারতের আলোচনায় যেকোনো ঐকমত্যই আমাদের সম্পর্কের সবকিছুর ভিত্তি হবে। অমিত শাহ বা কোনো মন্ত্রী কোথায় কী বলেছেন, সেটা নয়।

    পাঁচদফার প্রথম দফাঃ

    1. The two Ministers agreed that both sides should take guidance from the series of consensus of the leaders on developing India-China relations, including not allowing differences to become disputes.

    এমনকি এ কারণে দ্বিতীয় দফা খেয়াল করা যাক। ওখানে বলা হয়েছে, ‘দুই বিদেশমন্ত্রী সহমত হয়েছেন যে, সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি কোনো পক্ষের জন্যই ভালো নয়। তার জন্য তারা সহমত হয়েছেন যে, উভয়পক্ষের সীমান্ত বাহিনীর উচিত তাদের আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাওয়া, দ্রুত সৈন্য সরিয়ে নেয়া, সঠিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং উত্তেজনা প্রশমিত করা।’ অর্থাৎ প্রথম দফা মেনে নেয়া সাপেক্ষে দ্বিতীয় দফায় উভয়পক্ষ সৈন্য ফিরিয়ে নিতেও একমত। এতেই তাদের স্বার্থ!

    2. The two Foreign Ministers agreed that the current situation in the border areas is not in the interest of either side. They agreed therefore that the border troops of both sides should continue their dialogue, quickly disengage, maintain proper distance and ease tensions.

    অতএব ভারত-চীন সম্পর্কের নতুন ভিত্তি এখন থেকে পারস্পরিক আলোচনায় ঐকমত্য। আর এটাই মোদী মেনে নিয়েছেন বলেই পাঁচ দফার ঐকমত্য টানা  সম্ভব হয়েছে আর এটাই এখন সবকিছুর ভিত্তি। তাই পুরা পাঁচ দফায় ‘এলএসি’ বলে কোনো শব্দই রাখা হয়নি। মানে সীমান্ত আলোচনা বলতে কিছু থাকতে গেলে তা নতুন করে ‘ফির সে শুরু’ করতে হবে। আর ফের আলোচনায় ঐকমত্য হলে সবই ভারতের, আবার তা হতেও পারে। কিন্তু এর আগে পর্যন্ত সব ভূমি চীনের দখলে থাকবে। তাই যেন ‘এলএসি’ শব্দের আর দরকার কী? ভারত ভালো মানুষ ও রাষ্ট্র, চীনের মনে এমন আস্থা জমলে আবার সবকিছু সে ফেরত দিতে পারে। এমন কী, আরো বেশি ভুমি চীন ফেরত দিয়ে দেবে – পাঁচ দফায় যা লেখা নেই এমনও হতে পারে; কিন্তু ইঙ্গিত আছে এই হলো তার মূল কথা।

    মোদি এটা মেনে নিলেন কেন?
    প্রধান কারণ নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই সব ভারতীয় সেনাদের লাদাখ থেকে মোদীকে ফেরত আনতেই হবে। শীতকাল শুরু হয়ে যাবে, ঠান্ডা ছেয়ে যাবে। কারণ ভারতের অর্থনীতি এমন যে, ঐ বরফজমা ঠাণ্ডার মধ্যে তাদের সেখানে  গরম ঘরে রাখার মত খরচ জোগানোর সামর্থ্য ভারতের নাই। একথা কয়েক সপ্তাহ আগে সাবেক এক পররাষ্ট্র সচিব ও উপদেষ্টা শ্যাম সরন বলেছিলেন। যা মোদী তাকে দিতে বলিয়েছে বলে অনুমান করা হয়। ফলে এমনিতেই তাকে সেনা প্রত্যাহার করতেই হতো।

    Shyam Saran also said, “My sense is, if this, for example, continues during the winter — which would be very difficult because this area is very inhospitable during winter – it would require a considerable investment in setting up heated dwelling units, making certain you have enough equipment for use during very very severe winters.” – ইকোনমিক টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়া

    এ ছাড়া আরো অন্য কারণ হল, মোদী আমেরিকার ওপর আস্থা রাখেন না যদিও মনের কোণে একটা স্বপ্নদেখার মত খায়েসের বাতি তিনি জ্বালিয়ে রেখেছেন। যদিও বাস্তবত হুঁশের-মোদী বুঝেন, সেটা সত্যি নয়। মোদি আসলে অসহায়। চীনের কাছে ভালো মানুষের পরীক্ষা দেয়া ছাড়া তার হাতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। কাশ্মীর পুরাটাই সরাসরি ভারত অংশ এই উগ্র হিন্দু জাতিবাদের জোশ তুলতে পারলে পরের সব নির্বাচনে ভোটের বাক্সে ভারতের সব হিন্দু ভোট ঢেলে বিজেপির ভাগে আসতেই থাকবে – এই অনুমান ও প্রচন্ড লোভে পড়ে গত ৫ আগষ্ট ২০১৯ থেকে তিনি যাই করতেছেন তাই এখন বুমেরাং হয়ে তার গলায় আটকেছে। তবে এদিকে আবার খুব সম্ভবত তিনি অনুভব করেন যে, এমন দশায় আমেরিকার ওপর আস্থা রাখা মানে নিজের পছন্দের হিন্দুত্বের রাজনীতি কখনো ভারতীয় জনগণের হাতেই প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আগেই আমেরিকারই হুকুমে ত্যাগ করতে হবে। এ ছাড়া ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্য আমেরিকান ব্যবসায়ীদের আধিপত্যে খুলে দিতে হবে তাকে- এভাবেই তথাকথিত ‘ওপেন মার্কেট’ করে সংস্কার করতে হবে ভারতের অর্থনীতি ও বাজার। এগুলো মোদীর জন্য ‘আরো বড় আত্মহত্যা’। মোদির ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যবসায়ী। মানে গুজরাটি বেনিয়া। মোদি শব্দের অর্থও তাই। কাজেই আমেরিকার এসব আবদারের অর্থ তার না বুঝার কিছু নেই। সম্ভবত সে জন্য তিনি আমেরিকার কাছে যেতে পারছেন না।

    পাঁচ দফা ঐকমত্য বিষয়টা ভারতের পাবলিককে কীভাবে বলবেনঃ
    বলাই বাহুল্য এটা এক পাহাড় ডিঙ্গানো, মোদীর নিজের ফাদে আটকানো।  যে মোদী-অমিত ‘সারা কাশ্মিরই ভারতের’ একথা বলে হিন্দুত্বের বুকের ছাতি ফুলাতে গেছিলেন তারা এখন কীভাবে বলবেন চীনের কাছে উলটা লাদাখের ভূমি খুইয়ে এখন নতুন করে সমঝোতার মাধ্যমে সেই ভুমি ফেরত আনতে যাচ্ছেন তিনি?

    তাই এনিয়ে আরো দুটা কথা আছে। যার মূল বিষয় চীনের সাথে করা পাঁচ দফা ঐকমত্য কেন করছেন এনিয়ে তিনি পাবলিকের সামনে কী বলবেন? এসব ব্যাপারে মোদীর কিছু ধুর্ত বুদ্ধি আছে।  সেজন্যই তিনি জয়শঙ্করকে দিয়ে করা আরেকটা ভাষ্য প্রকাশ করিয়েছেন। যেমন লক্ষ্য করেন, আনন্দবাজারের ১১ সেপ্টেম্বরের শিরোনাম : ‘মস্কোয় দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। আগে সেনা সরাক চিন : জয়শঙ্কর’। অর্থাৎ এখানে ভারত কী সাংঘাতিক বিপ্লবী!  এখানে ভারত বিরাট শক্তি, এমন দাবি করা হচ্ছে উগ্র জাতিবাদী ঢংয়ে।     এছাড়া, আগে চীন কী করে দেখি, এরপর ইচ্ছা হলে ভারত করবে – এমন ডাটদেখানোর এক ভাব তৈরি করা হয়েছে। মোদির ভারত এমনই শক্তিশালী! এটা কেমন কী হল?
    না, খুব সহজ। যৌথ ঘোষণাটাকে অগুরুত্বপূর্ণ করে পেছনে ফেলে রাখতে জয়শঙ্কর তাই এর পরেও আরেকটা ভাষ্য তৈরি করে সে ভিত্তিতে বিদেশ মন্ত্রণালয় থেকে আরেকটা আভ্যন্তরীণ মিডিয়া ব্রিফিং সহ বিবৃতি দিয়েছেন; ঠিক যেমনটা মিডিয়া শুনতে চায়, পাবলিককেও শুনাতে চায়, সেভাবে। এখানে সবচেয়ে বড় কথা ভারতের হিন্দুজাতিবাদী মিডিয়াও এমন ভাষ্যই চায়। এরা ‘ন্যশনাল ইন্টারেস্ট বা কথিত হিন্দুজাতির স্বার্থের নামে গু-গোবর সব হালাল করে তারা চালিয়ে দিবে।

    কেউ কেউ ‘বিশেষ’। কারা এরা?
    কিন্তু এর পরেও কথা আছে। সবাই তো আবার আম-পাবলিক নয়। কেউ কেউ ‘বিশেষ’। কারা এরা? যেমন সাবেক সামরিক জেনারেল অশোক মেহতা। তিনি নিজের লেখার শিরোনাম দিয়েছেন, “যৌথ-বিবৃতিতে কী মিসিং আমাদের সেদিকে তাকানো উচিত” [We Need to Look at What Was Missing in the India-China Joint Statement]।

    তিনি বলতে চাইছেন যেমন, ‘এলএসি’ শব্দটা যৌথবিবৃতিতে নাই। এ ছাড়া আরো বড় জায়গার গ্যাপ তিনি ধরেছেন। যেমন সীমান্তে “আগে যে যেখানে ছিল সেখানে ফেরত যাবে” এমন শব্দগুলো সব সময় থাকত কিন্তু এবার তা কোথাও নেই। এছাড়া এখন ‘এলএসি’ শব্দটার বদলে লেখা হয়েছে ‘বর্ডার এরিয়া’। এছাড়া তিনি বেইজিংয়ের গ্লোবাল টাইমসের একটা টুইটের ছবি তুলে এনে দেখাচ্ছেন। যেখানে লেখা আছে, “ভারত শান্তি চাইলে ভারতকে ১৯৫৯ সালের ৭ নভেম্বরের এলএসি মেনে নিতে হবে। আর যুদ্ধ চাইলে চীন যুদ্ধ করবে। দেখা যাক কোন দেশ শেষে টিকে”। বলাই বাহুল্য এসব কথা জেনারেলেদের আত্মসম্মানে লাগে তাই ভাল কথা না। বলাই বাহুল্য, জেনারেলদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে এসব লেখায় বাধা দিলে বাহিনীতে প্রভাব পড়বে। এর চেয়ে উপেক্ষাই মোদির জন্য একমাত্র কৌশল। একই রকম প্রশ্ন তোলা আরো লেখকের লেখা আছে। যেমন আরেক প্রাক্তন সামরিক কর্তা ও বর্তমান সামরিক সাপ্তাহিকের [editor of FORCE magazine] সম্পাদক প্রবীণ সোয়েনি শিরোনাম দিয়ে লিখছেন, ‘যৌথ বিবৃতি থেকেই বুঝা যাচ্ছে ভারত কী হারিয়েছে”।

    কিন্তু এসব সামরিক লোকেদের ভুলটা কোথায়?
    তারা বলতে চাইছেন, ভারতের আগে ১৯৯৬ সালে এলএসি অনুযায়ী সীমান্ত ছিল এখন মোদী সেটা চীনের কাছে খুইয়ে এসেছেন কেন? এটাই তাদের সবার সার বক্তব্য। অথচ তারা একটু কষ্ট করে আরো বিস্তারে আরো বিশাল ভুখন্ড পাওয়াটা দেখতে চাইছেন না। সেটা হল ৫-৬ আগষ্ট ২০১৯ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে তো তাদেরকে  “‘সারা কাশ্মিরই ভারতের’ বলে আরো বড় ভুখন্ড এনে দিয়েছেন – সেদিকে দেখেন না কেন? এতে এটা বুঝতে তাদের অসুবিধা কোথায় অমিত শাহই তো সেদিন  -১৯৯৬ সালে এলএসি- মানেন নাই। বাতিল বলেছেন বলা যায়। কারণ আকসাই চিনসহ সারা সারা কাশ্মিরই যদি ভারতের’ হয় তবে ওর ভিতরের কোন ভুখন্ড -১৯৯৬ সালে এলএসি – নিয়ে চীন-ভারতের সমঝোতা তো অমিত শাহকে সবার আগে অস্বীকার বা বাতিল মনে করতেই হবে।

    অতএব সবার আগে এসব জেনারেলদেরকে বুঝতে হবে অমিত শাহের দাবির অর্থ কী। ফলে চীন না, সবার আগে “১৯৯৬ সালে এলএসি” অমান্য বা বাতিল করছে খোদ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আর তা করেছেন সংসদে মানে লোকসভাতে।  কাজেই চীনের আর সেটা মান্য-অমান্যের দায় কী? তাই জেনারেলদের অভিযোগ যাওয়া বা জবাবদীহিতা চাওয়া উচিত মোদী-অমিতের কাছে। মোদী সেকারণের সংসদের এনিয়ে কোন আলোচনা হতে দেন নাই।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “‘সারা কাশ্মিরই ভারতের’ দাবির পরিণতি ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।   এছাড়া  আমার আরেকটা লেখা যেটা  ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, প্রায় একই কাছাকাছি শিরোনামে, “চীন-ভারতের সীমান্ত বিরোধ” নামে। পরবর্তিতে ঐ দুই লেখাটাকে একত্র করে  এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আমেরিকা ভারতকে হবু চীন-বিরোধী জোটে পাচ্ছে না

    আমেরিকা ভারতকে হবু চীন-বিরোধী জোটে পাচ্ছে না

    গৌতম দাস

    ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3aW

     

    চীন মনে করে ইন্দো-প্যাসিফিক বলে কিছু দাঁড়াবে না, কারণ এটা একটা ডেড এন্ড।Hegemonic nature of US Indo-Pacific Strategy exposed – Global Times

    [সার সংক্ষেপঃ আমেরিকা চীন ঠেকানোর (Containment) লক্ষ্যে জোট গড়তে চায়, ইন্দো-প্যাসিফিক জোট। সেটাই পরিস্কার করে বলছে এখন।   কিন্তু এই জোটের বৈশিষ্ট্য কী হবে সেটাসহ এর চেহারা গত দুই দিনে অনেকটাই পরিষ্কার করে ফেলেছে। কিন্তু তাদের জন্য খারাপ খবর হল, সে জোটের ‘নৌকায়’ তারা চাইলেও ভারতকে তুলে নিতে পারছে না। ব্যাটে-বলে হচ্ছে না। তারা যেমনভাবে ভারতকে চায় আর বাস্তবের যে ভারত সেদুটোতে মিল নাই। এক নয়, তাই মিলছে না।  গত ৯-১০ সেপ্টেম্বর তাদের নিজেদের মনের কথাগুলো নিয়ে প্রকাশিত কয়েকটা আর্টিকেলে তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। ফলে তাদের কথাগুলো  দু’টি শর্ত যুক্ত করে তারা বলছে।  আর ভারতকে সেই শর্তপূরণ সাপেক্ষে ঐ নৌকায় তুলে নেয়া যেতে পারে বলে ঐ আর্টিকেল সিদ্ধান্ত টেনেছে। শর্ত দু’টি হল – যদি ভারতের পতিত অর্থনীতি উঠে দাঁড়ানোর জন্য আবার জোয়ার আনা যায় আর দুই, বর্তমান ভারত রাষ্ট্র, রাজনীতি ও দলে ‘লিবারেল বৈশিষ্ট্য’ হাজির থাকতে হবে – যার মানে হল মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো মোদীকে বন্ধ করতে হবে। আর প্লুরাল বা একাধিক মুখ ও ধারার রাজনীতি যেখানে পাশাপাশি চলতে পারে এমন সমাজ গড়তে রাজি হয়ে ভারত যদি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়। তবে এটাও পরিষ্কার যে, সাধারণভাবে ভারত তো বটেই বিশেষত মোদীর সরকার এদুই শর্ত কোনো দিনই পূরণ করতে পারবে না। কাজেই সাত মণ ঘি ঢালা হচ্ছে না, রাধাও নাচবে না। কারণ এই শর্ত পূরণ করার অন্তত একটা অর্থ হল, বিজেপি-আরএসএসকে ভাল হয়ে যেতে হবে;  নাম ও রাজনীতি পরিত্যাগ করতে হবে।
    সে জন্যই কি আমরা আরেকটা ডেভেলপমেন্ট দেখছি, খুব সম্ভব তাই। রাশিয়ার পুতিনের মধ্যস্থতায় সীমান্ত ইস্যুতে চীন-ভারত ‘”পাঁচ দফা ঐকমত্যের” এক যৌথ বিবৃতির ঘোষণা প্রকাশ করেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর রাতে মস্কোতে এমন সভা সমাপ্ত হয়েছে। রয়টার্সের নিউজ ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টায় এই খবর হোস্ট করেছে। এর ফলে পরবর্তী বিস্তারিত দিক বিশেষত ভারতে চীনা বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর প্রায় সবকিছুতে যে অবরোধ এবং ঘোষিত-অঘোষিত বাধা আরোপ ও প্রপাগান্ডা চালু করা হয়ে আছে এসবের এখন কী হবে, আমরা এর সম্পর্কে এখনো কিছুই জানি না। তবে বিবিসি ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্যের এ দিকটার করুণ অবস্থা নিয়ে “উঠতি বহু ব্যবসার চোখে অন্ধকার”’ শিরোনামে এক রিপোর্ট করেছে।]

     

    আমেরিকা তাদের হাতের কার্ড দেখিয়ে ফেলেছে। চীন ঠেকাতে আমেরিকা কী করতে চায় বা কী আশা করে – তা আর্টিকেল লিখে প্রকাশ করে ফেলেছে। অনেকে এ পর্যন্ত এটা-সেটা বলে পেটের কথা বাইরে আনতে চেষ্টা করেছে বিভিন্ন সময়ে। ফাইনালই তারা এখন উপস্থাপনের একটাই ভাষ্য ঠিক করেছে। গুছিয়ে থিতু হয়ে বলা সেই ভাষ্যটা হল – এশিয়ার দেশগুলো কোনদিকে যাবে; চীনের বেল্ট-রোডে নাকি আমেরিকান ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে, সেটা তাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বাংলাদেশের চ্যানেল২৪ টিভি একটা নিউজ প্রচার করছে, [এটা ছোট করে আর ওর বাংলা ভার্সানটাই লিঙ্ক দিয়েছি। আগ্রহীরা ‘মুখোমুখি | আর্ল মিলার-যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত’ এই শিরোনামের মূল পুরা ভিডিওটা ইউটিউবে দেখে নিতে পারেন।] এখানে বাংলাদেশে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত মিলার আগেই বলে নিয়েছেন, “চীন আমেরিকার শত্রু না, প্রতিদ্বন্দ্বি”। তবে বাংলাদেশ এটা না ওটা নেবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে এখানে ‘চোঙ্গা ফুকতে’ দেখা গেল। তবে বাংলাদেশের কোনোটাই না নেয়ার অপশন আছে কি না স্পষ্ট বোঝা যায়নি।
    এছাড়া এই উপস্থাপনে সবচেয়ে বড় অসঙ্গতিটা হল, চীনা বেল্ট-বোড প্রকল্পের সাথে আমেরিকার “ইন্দো-প্যাসিফিক জোট” – এদুটার মধ্যে তুলনা টানা চলে না, এরা সমতুল্য বিষয়ই নয়।  বেল্ট-রোড মূলত একট প্রজেক্ট যাকে বড়জোড় বহুদেশকে সামিল করে নেয়া চীনের এক অর্থনৈতিক মেগাপ্রকল্প বলা যেতে পারে।  বিপরীতে প্রথমত, ইন্দো-প্যাসেফিক জিনিষটা কি তা এখনও স্পষ্ট না। যেমন রাষ্ট্রদুত মিলার চ্যানেল২৪-কে বলেছেন ইন্দো-প্যাসেফিক ‘নেশনস্‌ মানে রাষ্ট্রের জোট।  কিন্তু সেক্ষেত্রেও কথা হল এটা কী সামরিক জোট না অর্থনৈতিক জোট, তা অস্পষ্ট। অন্তত অর্থনৈতিক তো নয়ই।  আহলে বেল্ড-রোড এর সাথে এটা তুলনীয়ই নয়। তবে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো সময়ে ইন্দো-প্যাসেফিক বলতে এক যুদ্ধজোটে সামিল করা্র কথা বুঝিয়েছে। যে জোটের ভিতরে আবার আছে কোয়াড [QUAD] জোট। কোয়াড মানে আমেরিকা জাপান, অষ্ট্রেলিয়া ও ভারত এই চার রাষ্ট্রকে নিয়ে কথিত চীনবিরোধী যুদ্ধজোট। যেটা আবার এখনও পর্যন্ত গত সর্বশেষ পাঁচবছর ধরে – এক পা আগে তো দু’পা পিছে এমন হয়ে আছে। তাহলে কথা দাড়ালো,  ইন্দো-প্যাসেফিক এই শব্দগুলো মিলারের ভাষার ‘নেশনস’ হোক কিংবা অন্যদের ভাষ্যে সেটা ‘যুদ্ধজোট’  যাই হোক তা অন্তত বেল্ট-রোড – এই অর্থনৈতিক প্রকল্পের সাথে তুলনা করা যায় এমন সমতুল্য কোন বিষয় বা ফেনোমেনা হতেই পারে না।
    আবার চ্যানেল২৪ নিজে এটাকে ইন্দো-প্যাসেফিক “করিডোর” বছে।  কেন বলছে এর কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে সবমিলিয়ে  যারা ভেবেছিলেন বাংলাদেশে ‘চীনা প্রভাব’ ছুটানোর জন্য ভারতের সর্বাত্মক তৎপরতা চীন-ভারতের লাদাখ সীমান্ত সংঘর্ষের কারণে হাজির হয়েছে, তাদের অনুমান ‘ভুল’। বিষয়টা আসলে হল – এশিয়ার চীনের বিরুদ্ধে একটা শেষ লড়াই লড়ার খায়েশ এখন আমেরিকান নির্বাচনের আগে আমেরিকার দুই দলেরই (বাই-পার্টিজান) খায়েশ হয়ে দাড়িয়েছে, এই হল বাস্তবতা। খালি তফাত এটুকুই যে, ট্রাম্প জিতলে একটু কৌশলে ভিন্নতা থাকবে যেটা বাইডেন জিতলে তুলনামূলকভাবে সফট কৌশল হবে। অর্থাৎ এশিয়ার চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকান লড়াইয়ের চেষ্টা শুরু  হবে আসন্ন আমেরিকান নির্বাচনের পরের বিজয়ী প্রশাসনের হাত দিয়ে। কিন্তু লড়াই একটা কমবেশি হবে সেটা নিশ্চিত।
    সেটা হলেও এটাকে শেষ লড়াই বলছি এ জন্য যে, ঠিক এটাই ওবামার প্রথম টার্মে ২০১১ সালে চেষ্টা করা হয়েছিল , ‘এশিয়া পিভোট’ নাম দিয়ে যা ওবামার সেকেন্ড টার্মেও বিস্তৃত থাকলেও বোঝা গিয়েছিল যে, এটা অকেজো, কাজ করছে না; মানে ভুয়া চেষ্টা। ব্যাপারটা সার কথায় বললে, ‘পিভোটে’ অনুমানে ধরে নিয়েছিল এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো মনে করে, চীন এক আগ্রাসী শক্তি। আর তাই এই শক্তির বিরুদ্ধে এশিয়ার দেশগুলোকে একটা চীনবিরোধী সামরিক জোটে আমেরিকা শামিল করতে পারবে বলে ধরে নিয়েছিল। কিন্তু এই অনুমান সঠিক ছিল না। তাই এটা ফেল করে যায়, কারণ এশিয়ার দেশগুলো বলতে চায় – চীনের অনেক কিছুতেই তাদের বিরোধিতা বা অপছন্দ থাকলেও সে জন্য আমেরিকান নেতৃত্বে কোনো চীনবিরোধী জোটে বা যুদ্ধজোটে তাদের ঢুকতেই হবে, এটা হবে আত্মঘাতী। এতে ‘ওভার অ্যাক্ট’ করা হয়ে যাবে। এর চেয়ে চীনের সাথে যদি কোনো দেশের সীমান্তবিরোধ থাকে তা নিয়ে আপত্তির কথা নিয়মিত বলে যাওয়া ও ডায়ালগের চেষ্টা (এব্যাপারে আদর্শ উদাহরণ সম্ভবত প্রেসিডেন্ট দুতের্তো-র ফিলিপাইন) করে যেতে হবে।
    আর একই সাথে, উঠতি অর্থনীতির চীনের সাথেই অর্থনৈতিক (পুঁজি-পণ্য বিনিময়ের গভীর ) সম্পর্ক জোরদার করা হবে নিজ দেশ পরিচালনার সঠিক কৌশল। এর বিপরীতে কোনো যুদ্ধের সম্ভাবনার মধ্যে নিজ দেশকে ফেলে দেয়ার মানে হবে অর্থনৈতিকভাবে নিজ দেশকে শেষ করে দেয়া। কাজেই ঐ আমেরিকান কৌশলের পক্ষে প্রায় কেউই নামেনি। তাই ওবামার শেষ বছর, পুরো ২০১৬ সালটাই ছিল আসলে তার ‘পিভোট’ গুটানোর বছর। কিন্তু পরে ট্রাম্প আমলে নিজের টার্মে চীনবিরোধিতাও তিনি অবশ্যই করেছেন, কিন্তু নিজে জাতিবাদী আমেরিকান হিসেবে আর অবশ্যই তা চীনবিরোধী কোনো জোট গড়তে অনাগ্রহী থেকে। এর ফলে আগে ‘চীন ঠেকানোর’ রাজনৈতিক তৎপরতার ধারা জারি রাখা বা আমেরিকান থিঙ্কট্যাংকগুলোর জন্য গাইড হিসেবে যে ভূমিকা রাখছিল ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে এসে পেন্টাগন বা স্টেট ডিপার্টমেন্ট সে কাজ থেকে নিজেদেরকে  প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়। এ কারণে গত দুই বছর ধরে কিছু আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক আবার নিজেরাই ‘চীন ঠেকানোর’ লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছিল। এবারের এই মিশনের মুখ্য ভূমিকায় ছিল ও আছে থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’ [www.atlanticcouncil.org]। এর মূল ভূমিকাটা হল যেন, মোদীর ভারতকে আমেরিকান নৌকায় তোলা, এটাকে সর্বক্ষণের ধ্যানজ্ঞান করা। একাজে তাদের জন্য  মূল গুরুত্বপুর্ণ প্রিয় ব্যক্তিত্ব এস জয়শঙ্কর, তিনি মোদীর এখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। যার সাথে  প্রায় সর্বক্ষণ যোগাযোগের মাধ্যমে মোদী সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখছে। কারণ আবার উল্টাদিকে মোদীর এক ট্রমার নাম হল চীন। চীন আবার কোন সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে ১৯৬২ সালের মত ভারতকে মার দিয়ে যায় কি না!  এরই কাউন্টার হিসাবে নিজের নিরাপত্তাবোধ, সেফবোধ করার জন্য বিশেষত মোদীকে আমেরিকা যতই তুচ্ছতাচ্ছিল্য অথবা কেবল নতুন নতুন আমেরিকান অস্ত্র কিনবার জন্য চাপ সব সহ্য করে হলেও আমেরিকা পাশে আছে এই বোধটা মোদী পেতে চেয়ে এসছেন। আর মোদীর ধারণ তার মনোবাসনা সবচেয়ে ভালভাবে আমেরিকায় ঠিক ঠিক জায়গায় কানে তুলতে পারেন একমাত্র জয়শঙ্কর। তাই ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’  আর মোদী এই দুজনের মাঝে জয়শঙ্কর, দুদিকেই দুজনে দুজনার। যদিও  ‘আটল্যান্টিক কাউন্সিল’ ছাড়াও অন্য আরোদিকে ভূমিকা রাখছিল আরেক থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘কার্নেগি এন্ডোমেন্ট’  [Carnegie Endowment[ আর কার্ণেগি ইন্ডিয়ার ওয়েবপেজ এখানে।

    এই ‘কার্নেগি এন্ডোমেন্ট’ (সংক্ষেপে এন্ডোমেন্ট বলব)  সেই বুশের আমলে ২০০৬ সাল থেকে এই কাজে ভারতে ভূমিকা রেখে চলেছে। তবে রেজিস্ট্রার্ড ইন্ডিয়ান শাখা হয়েছে অনেক পরে আর, তবে সেটা সম্ভবত এনজিও হিসাবে। ভারতের চীনবিরোধী বয়ান ভাষ্য যাই আমরা ভারতে চালু থাকতে দেখি বিশেষত, সকল ভারতীয় থিঙ্কট্যাংকের ফান্ড পাওয়া এবং তাদের যে কমন এক বয়ানে অবস্থান, এটাকে সাজিয়ে দিয়েছে  মূলত এই কার্নোগি এন্ডোমেন্ট। যেমন, “চীন ভারতকে মুক্তমালার মতো ঘিরে ফেলছে” অথবা চীন “ঋণের ফাঁদে” সবাইকে ফেলছে ইত্যাদি।  এন্ডোমেন্টের আরেক বড় ফান্ড দিবার খাত হল তরুণ গ্রাজুয়েটদেরকে  মাস্টার্স পড়তে বা পিএইচডি করতে পশ্চিমে যেতে স্কলারশীপ দেওয়া। আসলে এর বিনিময়েই তাদেরকে আমেরিকান বয়ানে দীক্ষা নিতেই হয়।  তাই কার্নোগি এন্ডোমেন্ট এর প্রধান কাজ আমেরিকান বয়ান ছেয়ে ফেলা, খাড়া করা ও নিয়ন্ত্রণ করা। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর নিজের জাতিবাদী রাজনীতিতে নিজেকে হাজির করার আগে পর্যন্ত এন্ডোমেন্ট প্রবলভাবে ভারতে নিজের ফান্ড ঢেলে তৎপর ছিল। নিয়মিত তরুণদের মাস্টার্স বা পিএইচডির জন্য স্কলারশিপ বরাদ্দ করেছে আর ওসব বয়ান মুখে তুলে দিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের অবস্থান তাদেরকে এরপর থেকে তৎপরতা ছোট করে আনতে বাধ্য করেছিল। আগে এর বড় কর্মকর্তা  ছিলেন সি রাজামোহন। তিনি সম্ভবত এখন এটা ছেড়ে সিঙ্গাপুরের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু একটা মজার তামাশা ঘটেছে। রাজামোহন অনেক আগে থেকে নিয়মিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় সাপ্তাহিক কলাম লিখে থাকেন। লাদাখে চীনা হামলায় অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা মারা যাবার পরে তাঁর লেখা একটা কলামের শিরোনাম মোদীর উচিত চীনকে এক পরাশক্তি বলে মেনে নেওয়া। মানে মোদীকে এককালে আমেরিকান বয়ানে সাজিয়ে এখন মোদীকে উলটা পরামর্শ দিচ্ছেন চীনকে মেনে নিতে।

    সেই কার্নেগি এন্ডোমেন্টে এখন আরো অনেক ততপর।  এন্ডোমেন্টের পক্ষ থেকে এশলে জে তাল্লিস [Ashley J. Tellis,, Tata Chair for Strategic Affairs; মানে হল তাল্লিসের কাজের চেয়ারের জন্য ফান্ড দেয় ভারতের টাটা কোম্পানি]। তিনি আমেরিকান আগামী সম্ভাব্য অবস্থানের ডকুমেন্টটা তৈরি করেছেন। লেখাটা এখানে পাবেন।  এই লেখাকে কার্নেগি এন্ডোমেন্টের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক পলিসি ব্রিফিং হিসেবে দেখতে বলে – উল্লেখ করে হিন্দুস্তান টাইমসে একটি আর্টিকেল ছাপানো হয়েছে। সেটা আবার লিখেছেন মঞ্জরি চ্যাটার্জি মিলার, যিনি বোস্টন ইউনিভার্সিটির পারদি স্কুলের [Frederick S Pardee School of Global  Studies] অধ্যাপক। তিনি নিজের লেখাটা আনাদেরকে  পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এভাবে – “আমেরিকার দীর্ঘ দিনের এক খায়েশ, ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে এশিয়ায় কাউন্টার-ওয়েট হিসেবে কাজে লাগায়। ভারত কী তা করবে?’ [The United States has long wanted it to act as a counterweight to China. Will Delhi do so?]
    ঐ পুরো লেখাতেই গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হল এই ‘কাউন্টার-ওয়েট’ [Counterweight to China], বাংলায়, চীনের পাল্টা ওজন বা বাটখারা।  এশলের এই লেখাটা ছাড়াও অধ্যাপক মঞ্জরি আরেকটা লেখার কথা তুলেছেন। তা হল- ড্যানিয়েল টেনরিরো [DANIEL TENREIRO] এর লেখা; যার শিরোনাম ‘এশিয়ায় চীনের পাল্টা বাটখারা হিসেবে ইন্ডিয়া’ [India as Counterweight to China in Asia]।

    ড্যানিয়েলের লেখাতে পরিষ্কার যে, ভারতকে চীনের কাউন্টার-ওয়েট হিসেবে এশিয়ায় পাওয়া- এর প্রয়োজনটা ভারতের নয়। বরং, খোদ আমেরিকার ও ড্যানিয়েলের মতো স্ট্র্যাটেজিস্টদের। তাই ড্যানিয়েল বা মঞ্জরি আশা রাখছেন, ভারত কি আমেরিকার হয়ে কাউন্টার-ওয়েট বা চীন ঠেকানোর  ভূমিকায় নামবে? কিন্তু কেন?

    কারণ স্ট্র্যাটেজিস্টদের মনের খায়েশ হল – চীনের পাল্টা ওজনদার রাষ্ট্রটাকে (ভারতকে) হতে হবে আমেরিকার হাতের পুতুল। চীনের মত না হলেও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাময় হতে হবে। আর মি. এশলে কোনো লাজলজ্জার বালাই না রেখে বলেছেন, ভারত বা সেই পাল্টা ওজনদার রাষ্ট্রটাকে দু’টি শর্ত মানতে হবে- ‘ইকোনমিক অগ্রগতি’ [‘economic momentum’ ] ফেরত আনতে হবে আর ‘লিবারেল বৈশিষ্ট্যের’ [‘liberal credentials’] হতে হবে।

    কথাটাকে বাংলাদেশিদের বুঝার মত করে বলতে গেলে এভাবে বলা যায়, বাংলাদেশকে যেমন ২০০৯ সাল থেকে ভারতের জন্য “ওপেন মার্কেট” আর ভারতের চোখে যথেষ্ট  “লিবারেল” বৈশিষ্টের মনে হয় এমন করে সাজিয়ে দেয়া হয়েছিল বা বাংলাদেশ ভারতের জন্য এমন দুটা শর্ত পূরণ করা হয়েছিল। ঠিক সেই রকমই এবার আমেরিকারও খায়েস হল, ভারতেকে আমেরিকার জন্য “ওপেন মার্কেট” আর আমেরিকার চোখে ভারতকে  যথেষ্ট  “লিবারেল” বৈশিষ্টের মনে হয় এমন করে সাজানোর শর্ত পূরণ করা হোক – এই হল এশলে, মঞ্জরি বা ড্যানিয়েলের মত স্ট্রাট্রজিষ্টদের আমেরিকার জন্য খায়েস ও প্রেসক্রিপশন। তবে বাংলাদশের বেলায় যেমন একজন প্রণব মুখার্জি ছিল আমেরিকার বেলায় নিশ্চয় একটা সাদা চামড়ার প্রণব মুখার্জি থাকবে, সেটা কে তা এখনও জানা যায় নাই।

    কিন্তু কেন এশলে কে ভারতের নাম এমন শর্ত আকারে বলতে হল? এশলে লেখাটার শিরোনামের দিকে তাকালে দেখি তা হল,  ‘বড় লীগে যোগ দিতে হলে ভারতের রাস্তা’ [India’s Path to the Big Leagues]। এর মানে আসলে এশলে তার লেখাটা শুরুর আগেই বুঝে গেছেন, ভারত চীনের পাল্টা তাদের পেয়ারের কাম্য  হবু ওজনদার দেশটা হচ্ছে না। হতে পারছে না। পারবে না। তাই তিনি তখন সরাসরি লিখতে বসেছেন- ‘কেন ভারতকে দিয়ে হবে না’। সে কারণে উল্টা করে লিখতে বসেছেন কোন শর্ত পূরণ করলে হবে। যেখানে এশলে জানেন, এই শর্ত ভারত পূরণ করতে পারবে না। তাই তিনি শর্ত লাগিয়ে বলছেন।

    আবার সমালোচকের চোখ দিয়ে দেখে বললে, এশলে অ্যান্ড গং-এরা চীনের কাউন্টার-ওয়েট বলে কাউকে খুঁজেই পাবে না। যদিও ভারতের প্রবল আর বিশেষ ‘খামতি’ আছে। কিন্তু ভারতের খামতি না থাকলেও এশলেরা ভারতকে বেছে নিতে পারতেন না। কেন?

    কারণ আমেরিকার দরকার এমন এক ভারত যাকে সে চীনবিরোধী তাদের মডেল দেশ হিসেবে তারা তুলে ধরতে পারে। চীন খারাপ, চীন আদর্শ না, চীন কথিত লিবারেল দেশ নয়, ইত্যাদির বিপরীতে যেন তারা এমন ভারতকে তুলে ধরতে পারে – যে ভারত আমেরিকার চোখে আদর্শ ও কাম্য দেশ, এভাবে। কিন্তু তাহলে আবার ভারতকে এমন আদর্শ দেশ বলে ফুলানোরই বা আমেরিকার কেন বা কী দরকার? দরকার এ জন্য যে, ভারত লিবারেল- এই প্রশংসা করে এর বিনিময়ে ভারতের ওপর মাতব্বরিটা  আমেরিকা নিজের হাতে তুলে নিতে চায়, ভারত না আমেরিকার জন্য বিপুল বিনিয়োগ আর লাভালাভের কেন্দ্র বানাতে চায় ভারতকে। সে জন্য ভারতে তাদের “ইচ্ছামতো একটা সংস্কার” করে সাজিয়ে নিতে চায়। কিন্তু এখানে সাবধান। এখানে কথাটা এভাবে বলাতে ভারতের অর্থনীতিকে ভারতের নিজেরই জন্য কোন সংস্কার দরকার নাই, এটা বুঝে বা ধরে নেওয়া চভুল হবে। ভারতের অর্থনীতির সংস্কার দরকার অবশ্যই আছে। কিন্তু এর মানে “আমেরিকার স্বার্থে ভারতের অর্থনীতির সংস্কার” – এমন বুঝা বিরাট ভুল ও ভিন্ন অর্থ হবে।

    যেমন- এশলের লেখায় আরো দু’টি বিশেষ শব্দ আছে- ‘ফাস্ট-গ্রোয়িং ‘ফ্রি মার্কেট ডেমোক্র্যাসি’[fastest-growing free market democracy]। এর মধ্যে সোনার পাথরের বাটি ধরণের অর্থহীন শব্দটা হল – “ফ্রি মার্কেট ডেমোক্র্যাসি”। এখানে ‘ফ্রি মার্কেট’ শব্দের সাথে ‘ডেমোক্র্যাসি’ শব্দের কী সম্পর্ক? এসবের অর্থহীন কথা ও শব্দের ভজকট মিশাল দিয়ে তারা খাড়া করেছে যাতে তাদের স্বার্থটা সহজে বুঝা বা ধরা না যায়। অথচ এর ভেতর দিয়ে তারা বুঝাতে চায়- ভারতকে আমেরিকার ডমিনেটেড বাজার ব্যবস্থা করে গড়ে পেতে চায় তারা। কিন্তু জবাব দিতে চায় না ভারত কেন এটা আমেরিকাকে দেবে? ইন্ডিয়ান পুঁজি আর ব্যাবস্থাপনা দক্ষতা কী নাই? পুঁজি ঘাটতি থাকতে পারে কিন্তু তা বলে ভারত সব আমেরিকার হাতে ছেড়ে দিয়ে অধস্থন নিতে হবে কেন?  এসব বিদ্যানেরা সংস্কার আর লিবারেল – এসব শব্দের আড়ালে আমেরিকান স্বার্থটা হাসিল করতে চায়।
    যে কথা বলছিলাম, ভারতের নিজস্ব অন্য খামতি যে নাই তা নয়। যেমন ভারতের রুট সমস্যা তথাকথিত স্বদেশিয়ানা বা অর্থহীন ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ ধরণের কথাবার্তা। মোদীও বলতে ভালোবাসেন, তিনি “আত্মনির্ভর অর্থনীতির” লোক। ভালো কথা। তার যা ইচ্ছা হতে চান, হবেন। কিন্তু মোদী তাহলে আবার রফতানি করতে ডলার গুনতে ভালোবাসেন কেন? ওসব ডলার পেয়ে জমিয়ে তিনি কী করবেন? ডলার জমানো মানেই তো তিনি আমদানিও করবেন! তাহলে উনার ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ কোথায় রইল? আবার মোদীর খুব খায়েশ দুনিয়াটা এমন হয়ে যাক যেন তিনি কেবলই রফতানি করতে পারেন। যেন সবাই তাকে রফতানি করতেই দিক! অথচ এটা তো অসম্ভব কল্পনা। তবু ভারতের খায়েশ, দরকার হলে সুযোগ পেলে অন্যকে পুরনো কায়দায় কলোনি করে শাসন করা। তবে ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ তার বাস্তবে যতটা না দরকার এর চেয়ে বেশি শব্দটা প্রপাগান্ডা হিসেবে দরকার। কারণ উগ্র হিন্দু জাতিবাদের জোশ তুলতে তথাকথিত স্বদেশিয়ানা বা অর্থহীন ‘আত্মনির্ভর অর্থনীতি’ শব্দগুলোর প্রপাগান্ডা-মূল্য অনেক। তবে আবার সাবধান এই কথিত জাতিবাদী স্বদেশিয়ানার উদ্ভট ধারণা – এসব  বিজেপির একার নয়, নেহরু আমল থেকেই ভারতের সব রাজনৈতিক দলের কমবেশি অবস্থানই এটা;  এটা একই সমস্যা ভারতজুড়ে।

    মজার ব্যাপারটা হল, একমাত্র চীন-ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বেলায় এই সমস্যাটা তুলনায় কম। কারণ চীন ব্যাপারটা দেখে এ জায়গা থেকে যে, তার পার্টনার দুনিয়ার সব সমস্যারই ডিপো হতে পারে। হলে তা হোক। তাই এটা ধরে নিয়েই চীন পার্টনারের সমস্যা কী সেদিক থেকে না গুনে বরং প্রাকটিক্যালি মাঠে ঠিক কী হলে চীন কাজ করতে পারে সেটা পূরণ আছে কি না সেদিক থেকে মাপা শুরু করে। নইলে বলে দেয়, সে পারবে না। এ জন্য চীনের সাথে ভারতের কাজের সম্পর্ক তুলনায় ভালো। আর চীনের অ্যাপ্রোচ ব্যবহারিক দিক থেকে বলে ভারতীয়রাই বদলে যায়; মেনেও নেয়। কারণ তারা দেখে তারা এই ব্যবহারিক বদলটা না করলে চীনের সাথে সম্পর্ক বা ডিলটাই হবে না। চীনাদের এই অ্যাপ্রোচে সুবিধার দিক হলো –  পার্টনারের নিজস্ব  প্রবলেমটা কী এটা নিয়ে আগেই তারা ঝগড়া শুরু করে না। যাই হোক, সার কথাটা হল – আমেরিকানদের সাথে কোনো ভারতীয় জাতিবাদীর কিল হওয়া একেবারেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাতে দোষ কার অথবা কে কতটা ভালো-মন্দ সে আলাপ উঠায় রাখি।

    তাহলে এখন কী হবে?
    বাস্তবতা হচ্ছে, আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ কাজে কাউন্টার ওয়েট হিসেবে ভারতকে ব্যবহারের পক্ষে ভারতের সাথে কোনো সম্পর্কই কার্যকর হচ্ছে না; যদিও এমন ভাব নেয়ার অঙ্গভঙ্গি সম্ভবত জীবিত ও জারি থাকবে। অনেক সময় মানুষ তা চায় না বলে কোন প্রমাণিত সত্য জিনিস মেনে নিতেও তার কষ্ট হয়। তেমন অবস্থার উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর মোদীর কাছে  এখন সম্ভবত এটা প্রমাণিত যে, চীন তার হিন্দুত্বের রাজনীতির জন্য তুলনামূলক ভালো বিকল্প। তবু চীনের বেলায় যেটুকু সঙ্ঘাত বারবার সামনে এসে পড়বেই সেটা বারবার এড়িয়ে হলেও মোদী চলতে পারবেন। কিন্তু যেটা সহসা চীন-ভারত সম্পর্ককে আগের জায়গায় ফিরতে দেবে না তা হলো- সারা ভারতে ‘চীন আমাদের শত্রু’ বলে যে ক্যাম্পেইন মোদী চালিয়েছেন তা সহসাই লোপ পাবে বা উধাও হবে না।

    আবার অন্য দিকে, আমেরিকা ও তার বন্ধুরা যেটাকে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক জোট’ বলে ড্রাম পিটাচ্ছে এই প্রপাগান্ডাও সহসাই থেমে যাবে না; তাতে ভারতের সাথে আমেরিকার কোন সম্পর্ক হোক আর নাই হোক তা জারি থাকবে। দ্বিতীয়ত, এি জোটের আরেকটা নাম আছে, এশিয়ান-ন্যাটো। মানে ইউরোপে যেমন ১৯৪৫ সালের পরে সোভিয়েতবিরোধী সবাইকে ন্যাটো সামরিক জোটে জড়ো করা হয়েছিল, সেই ন্যাটোই যেন এবার এশিয়ায় জাগতে যাচ্ছে, এমন ভাব শুরু করা হয়েছে। মোদীর প্রো-আমেরিকান মন্ত্রী জয়শঙ্কর তাই একবার বলেন, ভারত জোটনিরপেক্ষ দেশ; আরেকবার বলেন, জয়শঙ্করদের এশিয়ান ন্যাটোর স্বপ্নের কথা। ব্যাপারটা নিয়ে জয়শঙ্করের সবচেয়ে বড় সমালোচক হলেন প্রচণ্ড ক্ষেপা এমকে ভদ্রকুমার, তিনি এক সিনিয়র সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক রাষ্ট্রদূত ও বর্তমানে দুহাতে লেখা এক কলাম লেখক।https://www.reuters.com/article/us-india-china-idUSKBN262039তামাশার দিকটি হল – এই জয়শঙ্করই আবার মস্কোতে সাংহাই করপোরেশনের মিটিংয়ে হাজির হওয়ার উছিলায়  মস্কোর মধ্যস্থতায় চীন-ভারত যে পাঁচ দফা আপস সমঝোতা করল সেখানে ভারতের প্রতিনিধি। জয়শঙ্করের গা থেকে তখনো আমেরিকান কোনো ডিনারের ঢেঁকুর উঠছিল হয়ত। তবে রয়টার্সই একমাত্র এর ব্যাপক রিপোর্টিং করেছে। তাতে তারা দু’টি ছবি ছেপেছে যেখানে রাশিয়া, চীন ও ভারতের তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফানি পোজ দিয়ে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু তিনজনই ‘ফানি’ভাবে নানা অঙ্গভঙ্গি করে ছবি তুলেছেন, যেটা অবশ্যই কূটনৈতিক আচরণ না হলেও; একটু ইনফরমাল মুড প্রকাশ করেছে যেন, আমেরিকাকে তিনজনে ঠাট্টা করতে এসব করেছেন। এর বটম লাইনটা হল, চীন-ভারতের সম্পর্ক  আবার আগের বন্ধুর মুড়ে ফিরে যাওয়া শুরু করবে হয়ত। কিন্তু তা কতটা? মনে হয় না খুব সহসাই সেটা আগের লেভেলে ফিরে যাচ্ছে। আর দ্বিতীয়ত, চীন ঠেকানোর কাজে ভাটা পড়লে আমেরিকা তো কাজের অভাবেই মারা যাবে! একমাত্র একটু ভরসা, নির্বাচনে বাইডেন যদি জিতেন। সে ক্ষেত্রে চীনের থেকে বাণিজ্যে আমেরিকার জন্য অনেক বড় ছাড় আনতে পারবেন তিনি। ফলে ট্রাম্প আমলের বাণিজ্যযুদ্ধের অনেকটাই স্মৃতিতে পেছনে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু হিউম্যান রাইট ইস্যুতে বাইডেন অনেক বেশি চীনকে ঘায়েল করবেন। কমবেশি আমরা নিশ্চিত। এ ব্যাপারে ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার সেক্রেটারি অব ডিফেন্স মার্ক এস্পারের আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোনকল করেছেন যেটা অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। ঢাকার অভ্যন্তরীণ মিডিয়া ‘রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সহায়তার’ ওপর জোর দিলেও ঢাকার দূতাবাসের বিবৃতিতে “একটি অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের প্রতি তাদের যৌথ প্রতিশ্রুতির” কথা বলে সেখানে জোর দেয়া হয়েছে। রাষ্টড়দুত মিলারের “বাংলাদেশের জন্য ইচ্ছা কোনদিকে যাবে – এই ভাষ্যের তুলনায় এসপারের ভাষ্য অনেক এগ্রেসিভই বলতে হয়।  এর অভ্যন্তরীণ আমেরিকান মেসেজটা হল – যেন বলতে চাচ্ছে, আমরা চীন ও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে হিউম্যান রাইট ইস্যুতে শক্তভাবে চেপে ধরতে আসছি। ফলে আমরাও আপনার কাছে গুরুত্ব চাই। ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে তাই আমাদের ক্যাম্পে আসুন। অর্থাৎ ভারতকে আমেরিকা পাচ্ছে না, আপাতত এটাই সারকথা মনে হলেও মিয়ানমার বা ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে বাংলাদেশের জন্য এগুলো ডমিনেটিং বিষয় হতে যাবার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গেল। তবে বাংলাদেশের সাথে আমেরিকান প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক জোট কোথায় সম্পর্কিত তা এই ফোনকল স্পষ্ট করতে পারেনি।  হাসিনা চাইবে আমেরিকা, চীন ও ভারত স্কলকেই পাশাপাশি রেখে দিয়ে একটা নিউট্রাল অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে। বাংলাদেশের জন্য সেটাই সঠিক ও আদর্শ অবস্থানই হত, অবশ্যই। কিন্তু তা হাসিনার জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জিং, কারণ তার মূল জিনিষটাই নাই। পাবলিক সাপোর্ট বা রেটিং।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “আমেরিকা ভারতকে হবু জোটে পাচ্ছে না” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]
  • বাংলাদেশের উপর ভারতের প্রভাব কিভাবে এলো

    বাংলাদেশের উপর ভারতের প্রভাব কিভাবে এলো

    গৌতম দাস

    ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3ay

     

    আরেক দেশের উপর যদি কোনো দেশের প্রভাব থাকে বা বাড়ে তা হলে এর ‘রুট-কজ’ হল প্রভাবশালী ঐ দেশের মূলত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিজাত সক্ষমতা। সেখানে অন্যান্য কারণও যদি কিছু থাকে সেটাও মূলত অর্থনৈতিক কারণেরই কিছু উপজাত। কিন্তু বাংলাদেশে বড় পড়শি ভারতের সাম্প্রতিক প্রভাবটা যেন গায়েবি! এটা কোথা থেকে এল কেউ জানে না। সবাই জানে এটা আছে মানে প্রদত্ত [given]; আর সবাই ভাব করে যেন এটা বাংলাদেশের জন্ম থেকে!

    ভারতের এক থিংকট্যাংকের গবেষক স্মৃতি পট্টনায়ক সম্প্রতি বলছেন, তিনি বিস্মিত হন এটা ভেবে যে, “যে দেশকে ভারত সবচেয়ে বেশি সহায়তা দেয়, সেই দেশেই বিরোধিতার মাত্রা সবচেয়ে বেশি!”।  তাঁর ভাষায়, “এ এক অদ্ভুত পরিহাস!”। এর মানে বাংলাদেশে দানধ্যান দেয়া বা অবকাঠামো বিনিয়োগে সবচেয়ে বেশি অর্থ ঢালে ভারত। তাই পট্টনায়ক দাবি করছেন,  “ভারত সবচেয়ে বেশি সহায়তা দেয়”। এটা ত  সাংঘাতিক ব্যাপার! তাহলে ভারত এখন নিজেই এক দাতা দেশ হয়ে গেছে, কী বলেন? ভারতের এত উন্নতি হয়েছে আমরা তো তা জানিই না! একেবারে পশ্চিমা দেশের মত? নাকি তাদেরকেও ছাড়িয়ে, কে জানে? যদিও আরেকটা সম্ভাবনা আছে।  আসলে এই মহিলা সম্ভবত ইদানীং কোনো কারণে সংসার নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকেন। তাই ইকোনমিক ডাটা, পরিসংখ্যানের পাতা বা দুনিয়ার ভালোমত খোঁজখবর নেয়ার সময় পান না। ফলে না দেখেই মনগড়া যা মনে চায় অনেক কথা বলতে হয়।  ব্যাপার হল, যে ভারত বাংলাদেশ থেকে যে করডোর সুবিধা নিতে চাইছে বিনা পয়সায় আর এর সুবিধাদি গড়তে যে  অবকাঠামো বিনিয়োগ সেটাও বাংলাদেশের পাবলিকের ঘাড়ে চড়ে তাদের নামে নেয়া ঋণে – সেই ভারত বাংলাদেশকে  বিনিয়োগ ফান্ড দাতা হবে কীভাবে? কোথা থেকে? এটা তো দিবাস্বপ্নেও সম্ভব নয়, ফলে সত্যি নয়।  এখন এই মহিলা যিনি নাকি গবেষকও বলে জানা যাচ্ছে তাকে আমাদের উপেক্ষা করে ফেলে রাখা ছাড়া আর কী করতে পারি! প্রথম আলোর দিল্লির প্রতিনিধি সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় পট্টনায়কের এই বক্তব্য তিনদিন আগে তুলে এনেছেন।

    হর্ষবর্ধন শ্রিংলার বাংলাদেশ সফরের দুই সপ্তাহ হয়ে যাওয়ার পরও এর দুঃখ আর শোক নিয়ে ভারতের হাহুতাশ যাচ্ছেই না। সম্ভবত এর মূল কারণ, এবারের এ সফরের এলোমেলো আউটকাম আর লুকানোই যাচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি যেটা বিঁধেছে তা হল, এ সফরকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে “আনুষ্ঠানিক” বলে কোনো সিলমোহর দেয়া হয়নি। এমনকি ঐ অফিস থেকে কোনো বিবৃতি বা ব্রিফিং ধরনের কোন কিছু প্রেসকেও পাঠানো হয়নি। অর্থাৎ এই সফরে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত যাকিছু তা “অফিসিয়ালি” কোনো কিছুই ঘটেনি। সবটাই ব্যক্তিগত পর্যায়ের ঘটনা, সরকারি আনুষ্ঠানিক কোনো কিছু নয়। গত ২১ আগস্ট বিবিসি লিখেছে, “কিন্তু সেই রাতে প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কোনো বৈঠক বা সাক্ষাৎ হয়নি। ফলে সাক্ষাৎ হয়েছে কি না- এ নিয়েই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল”।
    বিবিসির এই শেষের বাক্যটাই বরং অযথা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে লেখা হয়েছে।  তামাসাটা হল বিবিসি নিজেই আগের বাক্যে লিখেছে, মুখপাত্র জানিয়েছিল, “ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কোনো বৈঠক বা সাক্ষাৎ হয়নি”।  তাহলে বিবিসির বিভ্রান্তির উতস আর কোথা থেকে?  কূটনীতিতে কোনো সরকারি অফিস যখন বলে ‘প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কোনো বৈঠক বা সাক্ষাৎ সেদিন হয়নি’ – এর মানে তো সোজা। তা হল, প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কোনো “আনুষ্ঠানিক” বৈঠক বা সাক্ষাৎ সেদিন হয়নি। এটি যারা বুঝতে পারেনি বলে ‘বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল’ লেখে, এরা কার স্বার্থ রক্ষা করছেন? এরা ভারত বা শ্রিংলার হয়ে তাদের মুখরক্ষার দায়িত্ব নিজেরাই নিয়ে ফেলেছে; তাই ওমন ভান করছে! এগুলো ভাল সাংবাদিকতার উদাহরণ অবশ্যই নয়।
    এটা তো পরিষ্কার যে, এ’অবস্থায় ভারতীয় সরকারি পক্ষও যেখানে কোথাও দাবি করছে না বা করতে পারছে না যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে শ্রিংলার “আনুষ্ঠানিক” সাক্ষাৎ হয়েছে বা কোনো কর্মসূচি ছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশে রওনা হওয়ার আগে কর্মসূচিটা “আনুষ্ঠানিক” কিনা তা নিশ্চিত না করে নিতে পারার দুর্বলতা রেখেই শ্রিংলা বাংলাদেশে এসেছিলেন। সম্ভবত নিজেকে ওভার এস্টিমেট করেছিলেন এই বলে যে, নিজের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দিয়ে তিনি সব ঠিক করে ফেলবেন। কারণ তিনি এই সে দিন বাংলাদেশে তিন বছর কাটিয়ে গেছেন – কত কিছু ঠিক করে গেছেন, লোক সেট করে গেছেন ইত্যাদি।  অর্থাৎ নিজের উপর এই খামোখা কিন্তু অগাধ অতি-ভরসা করেই তিনি এসেছিলেন। কাজেই এর একটা মাশুল তো তাকে এখন দিতেই হবে! তবে ভারতের বিদেশ মন্ত্রনালয় এখানে গত বছরের ডিসেম্বরের হাসিনা সফরের এই রিপোর্টটা একটু চোখ বুলিয়ে নিতে পারে, তাতে তাদের সব বহু কিছু মনে পড়ে যাবে।

    তাই, শ্রিংলাসহ ভারতীয় স্টাবলিশমেন্টের বোঝা উচিত হাসিনার এই মনোভাব তো আকস্মিকও নয়। ২০১৮ নির্বাচনের সময় থেকেই তিনি পরিষ্কার করে বলছিলেন, তিনি ভারতের জন্য কি না করেছেন, কত কী দিয়েছেন তা ভারতকে স্মরণে রাখতে হবে। এ ছাড়া গত  মার্চে বাংলাদেশে লকডাউন শুরুর আগে থেকেই বাংলাদেশের মন্ত্রী-স্পিকারদের ভারত-সফর বাতিল করা নিয়মিত ঘটনা হয়ে গিয়েছিল। শেখ হাসিনা পরিষ্কার করেই বলছিলেন, নরেন্দ্র মোদীর মুসলমানবিদ্বেষী কর্মকাণ্ড ও ঘৃণা ছড়ানো তিনি পছন্দ করছেন না। তবে তিনি বরং বুঝানোর স্বরে বলেছিলেন – তাঁকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান বাংলাদেশের মানুষ নিয়েই চলতে হয়, তাদের সেন্টিমেন্টের দিকটা মোদী সরকার যদি আমলে না নেয় তবে আর কিছু করার থাকবে না। কিন্তু তবু ভারত নিজের ওপর অতি আস্থা রেখে বেপরোয়াই থেকে গিয়েছিল। শ্রিংলাও যেটা সবচেয়ে বেশি খাটো করে দেখেছেন তা হল, ২০১৮ সালের ‘নির্বাচনের হাসিনা’ আর ২০২০ সালে হাসিনা আর একই রকম নাই। বিশেষ করে ২০১৯ সালে নতুন সরকার গঠনের সময় যেভাবে কথিত কিছু অতি প্রো-ইন্ডিয়ান ও ‘প্রগতিবাদী’ মন্ত্রীদের তিনি দূরে রেখে দেন, সেই ইঙ্গিত তারা আমলে না নিলে কে আর তাদের বুঝিয়ে বলতে পারবে! তবু ভারতীয় পক্ষের মধ্যে এনিয়ে কোনো বিকার হতে দেখা যায়নি বললেই চলে। এর কারণ কী?

    ছোট্ট কিছু শব্দে এর এক কারণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন এক প্রাক্তন কূটনীতিক সেরাজুল ইসলাম [M Serajul Islam]। সেটা হল – no alternative। মানে, “ভারত ছাড়া হাসিনা সরকারের গতি নাই” – ভারতের এই মনোভাব। তিনি বলছেন, [New Delhi made no effort to bring Dhaka back confident as Dhaka would come back on its own because it had no alternative to India. That did not happen.]  ভারতীয় রিডিং ছিল, তারা ২০১৮ নির্বাচনে ভারত প্রকাশ্যে সমর্থন না দিলেও বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের ভারতকে ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই। কাজেই তাদের ভারত তুচ্ছ বা অবজ্ঞা করে বা-হাতে ফুল দিলেও যাই করুক তা হাসিনাকে মেনে নিতেই হবে – এটাই ছিল ভারতের অনুমান আর সেই অনুমানের ওপর ভর করেই ভারত তখন থেকে হেঁটে এসেছে। আর ২০১৯ সালের শুরু থেকে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান হল যে, তারা এতটা ঠেকে নাই, কারণ বাংলাদেশেরও বিকল্প আছে। ভারতের সমর্থন পেলে ভালো কিন্তু তা এত জরুরি নয়। আর সব টানা-হেঁচড়া লড়াই  এর শুরু এখান থেকেই। অথচ শ্রিংলা এই পরিবর্তনটাকে আমলে না নিয়ে অতি-আস্থা দেখাতে গিয়েই নিজের জন্য বিপদ ডেকে এনেছেন।

    তবে পুরো ভারতীয় স্টাবলিশমেন্ট বুঝে যায় ও আভ্যন্তরীণভাবে স্বীকার করে যে, তারা বড় একটা হোঁচট খেয়েছেন। তবু তারা সিদ্ধান্ত নেয়, উঠে ধুলা ঝেড়ে যেন ‘কিছু হয়নি’ ভাব দেখিয়ে সব নরমাল আছে এটা দেখানোই তাদের উচিত হবে। আর এখান থেকেই গত প্রতি সপ্তাহে তারা দু-তিনটি করে প্রোগ্রাম করেছে, আর নিজেকেই সান্ত্বনা দিয়েছে যে, বাংলাদেশ তাদের ছেচা দেয়নি, ভারতের কিছু হয়নি, সব ঠিক আছে আগের মতই।

    বিবিসি ছাড়াও আরও কিছু অতি-সার্ভিস দাতাঃ
    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এক অধ্যাপক বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সাক্ষাৎ বা বৈঠক নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য না দেয়ায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে”। এটা আরেক মামাবাড়ির আবদার! এটাকে বলা যায়, ভারতকে এক অতি উৎসাহীর দেয়া ‘সার্ভিস’। এমনকি একথা বলে তিনি নিজের একাডেমিক ইজ্জত-সম্মান কিছু থাকলে সেটাও লুটিয়েছেন, সেই খবর নাই।   আচ্ছা, প্রধানমন্ত্রীকে কেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সাক্ষাৎ বা বৈঠক নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দিতে হবে? তা ছাড়া বৈঠকটা যদি হয়ে থাকে গায়েপড়ে ইনফরমালি নেয়া? অর্থাৎ সারকথায় অনানুষ্ঠানিক? শ্রিংলা যদি নিজের গণ্ডিতে থাকতে না চান, ওভার-ইনফ্লুয়েন্সি দেখাতে চান তবে তার “পদের” অপমান তো তাকে সহ্য করতেই হবে! অধ্যাপক বলছেন, “ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের যথেষ্ট তথ্য বা ইনফরমেশন নেই, এটি পরিষ্কার। তার ফলে বিভিন্ন ধরনের স্পেকুলেশনের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। নানা কথাবার্তা ডালপালা মেলছে। এটি তো খুব একটা হেল্পফুল না”।
    সরকারপ্রধানের অফিস থেকে যদি দেখাতে চাওয়া হয় যে শ্রিংলার সাথে এই সাক্ষাৎ ব্যক্তিগত, আনুষ্ঠানিক সফর নয়, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার তারা তো যেচে এটাই দেখাবেন যে, এই পদ্ধতিতে সফর জোগাড় করা “খুব একটা হেল্পফুল নয়”। অধ্যাপককে  একটা প্রধানমন্ত্রীর অফিসের কূটনৈতিক ইঙ্গিত ও পরিভাষা কে শিখাবে? অধ্যাপক আরো বলেছেন, “সেখানে তো আলোচনার একটা এজেন্ডা থাকবে। কিন্তু সে এজেন্ডা আমরা দেখিনি। প্রধানমন্ত্রীর সাথে যে দেখা হয়েছে, সেটা সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কারভাবে কিছু বলা হয়নি”।  পরিষ্কারভাবে যখন কিছু বলা হয়নি তার মানে এর অনানুষ্ঠানিক – এটা বুঝতে অধ্যাপকের অসুবিধা হচ্ছে কেন?
    একটা আনুষ্ঠানিক আলোচনা হবে বলে যখন কিছুই  সাব্যস্তই হয়নি, তখন সেখানে এজেন্ডা থাকতেই হবে কেন? কিভাবে থাকবে?  এতো দেখি মহা আবদার!  বরং অধাপকসহ যেন সকলেই  বুঝেন এটা অনানুষ্ঠানিক; এর জন্য  প্রধানমন্ত্রীর কী ঠেকা লাগছে?

    এর চেয়ে বরং আসেন যিনি ভারত বা শ্রীংলাকে তাঁর কোন অতি সার্ভিস দেয়ার দায় নাই তাই তিনি কোন কোনো জিদ নিয়ে আসেননি – এমন এক ব্যক্তিত্বের বক্তব্য শুনি। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেছেন, “সফরটাও তো ভারতের উদ্যোগ থেকে, সেটা বোঝা যাচ্ছে। ভারতের দিক থেকে উদ্যোগেই হয়েছে। ভারতের দিক থেকে কিছু একটা বক্তব্য আছে বা বার্তা আছে, সেই বার্তাটা পৌঁছে দেয়ার জন্য তার আসা এবং সেই সুবাদে [আমাদের] পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে বৈঠক হয়েছে”।
    ‘এখন যদি তাদের বার্তা থাকে, তারা হয়তো বার্তা দিয়েছেন। আমরা বার্তাটা শুনেছি। আমাদের দিক থেকে হয়তো সেটার ব্যাপারে এখনো কোনো বক্তব্য নেই। সে জন্য আমরা জানাচ্ছি না। এটাও হতে পারে”। এই হলো অন্তত নিউট্রাল বা অবজেকটিভ একটা মূল্যায়ন। এটাই প্রফেশনাল কূটনীতিকের মত কাজ ও ব্যাখ্যা।

    সরকার চীনের দিকে  অনেক ঝুঁকবার সক্ষমতা দেখাচ্ছেঃ
    অবশ্য এটাও ঠিক ভারতের ইচ্ছা বা মত শুনে পরিচালিত হয়ে বাংলাদেশ এর আগে চীনের অনেক প্রস্তাব অবজ্ঞা করা হয়েছে, যেমন সোনাদিয়ার বন্দর প্রস্তাব ফেলে রাখা হয়েছে [এখন তো পুরাই বাতিল]। আর পায়রা যেটা আসলে কোনো বন্দরই নয়; না বড় জাহাজ ভেড়ানোর জন্য, না অন্য কিছু। সব চেয়েও বড় কথা, জন্ম থেকেই সারা বছর এই বন্দরকে নাব্য রাখতে হলে নিয়মিত ড্রেজিং করেই যেতে হবে। ন্যায্য প্রমাণ করা কঠিন, অপ্রয়োজনীয় এই অপচয় করে যেতে হবে। অথচ ভারতের ইচ্ছায় আমরা এতে বিনিয়োগ করছি আর এটা প্রকল্প ফেল করবে জেনেও এমন একটা প্রকল্পের দায়ভার নিচ্ছি।
    তবে এখন অবশ্যই দিন আর আগের মতো নেই; বদলেছে, অন্তত কিছুটা। সেটা উপরে বর্ণিত কারণে অবশ্যই। তবে এর বাইরেও আরো নতুন কারণ আছে। সেটা হল সরকারের ‘উন্নয়নের’ অর্থ পাওয়ার সঙ্কট। বিশেষ করে এবারের বাজেটের অর্থ সংগ্রহকাল থেকেই সঙ্কটটা আনেক মারাত্মক। খুবই কষ্ট হয়েছে, এখনও কষ্ট করে মিলানোর চেষ্টা চলছে। সব মিলিয়ে তাই সরকারের আরো বেশি চীন ঘনিষ্ঠ হওয়াটাই স্বাভাবিক। আগে চীনের দেয়া অনেক প্রজেক্ট ভারতের কারণে সরকার না করে দিয়ে এসেছে, এখন সে অবস্থায় সরকার নাই। কিন্তু আগে প্রায়োরিটি দিয়ে ভারতের স্বার্থের কথা শোনাতে ভারতের একটা ধারণা হয়েছে, শ্রিংলা এসে কথা বললেই কোনো চীনা প্রকল্প নেয়া থেকে তিনি হাসিনা সরকারকে বিরত রাখতে পারবেন।

    দুই সপ্তাহ ধরে শ্রিংলা সফরের দুঃখে মলম লাগানো হচ্ছে অথচ প্রথমতঃ কাউকেই দেখা যাচ্ছে না এটি ব্যাখ্যা করতে যে ভারতের বাংলাদেশের উপরে এত প্রভাব  এলো কোথা থেকে এবং কবে থেকে কিংবা কেন? সবাই এটা ধরে নিয়ে আলাপ শুরু করতে চান যে, বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব একটা আছেই। কিন্তু কেন, কিসের প্রভাব এটা? এরই মধ্যে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি মারা গেছেন। তাকে বাংলাদেশের উপর প্রধান প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তিনিও ২০১২ সালের লেখা বইয়ে নিজেকে বিরাট প্রভাবশালী এবং সব কিছু তিনি ঠিক করেন এমন ভাব দেখিয়ে নানান কথা লিখেছেন। কোন রাষ্ট্রের আরেক রাষ্ট্রের উপরে প্রভাব বাড়ে মূলত নিজের অর্থনৈতিক বিরাট উচ্চ অবস্থার কারণে। কিন্তু ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা কী উল্লেখযোগ্য কোন উচ্চতার শিখরে?  না এমনটা আমাদের জানা নাই। ভারতও তা  দাবি করে নাই কোথাও।  আর আমরা প্রতিনিয়ত নিউজ শুনি যে ভারত, চীন বা জাপান; বিশেষত চীনের মত দেশ থেকে বিপুল অবকাঠামো ঋণ নিয়ে চলেছে।  আবার ভারত দান বা বিনিয়োগের অর্থ বলে কী কিছু বাংলাদেশের কাছে তেমন গোনায় ধরা? না তাও না।  সেটা এমনকি ভারতের প্রণব মুখার্জিসহ কেউ কোনো দিন দাবি করেননি। তা হলে?

    ব্যাপারটা হলো চীনা অর্থনৈতিক উত্থান ঠেকানোর লক্ষ্যে, তার প্রভাবশালী হয়ে উঠা যদি কিছুটা ঠেকিয়ে দেয়া যায় এশিয়ায়  আমেরিকার এই স্বার্থপূরণ করে দেওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল আমেরিকা। এটাই ছিল ওয়ান-ইলেভেন ক্ষমতা দখলের মূল উদ্দেশ্য। তামাশার দিকটা হলো, যারা ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকার এই কাজের সহযোগী ও সমর্থক তারা এই আত্মবিক্রির কাজের কোনো দায়ই টের পান না। তারা তখন মনে করতেন, বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত আর জঙ্গিমুক্ত করতে তারা দেশপ্রেমিকের কাজ করছেন, তাই ‘১/১১’ সরকার তারা এনেছেন। অথচ এরা সবাই মিলে যে কাজটা করেছেন তা হল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া। যাথেকে ভারতের প্রথম নগদ প্রাপ্তি হল বিনা পয়সায় করিডোর আর পোর্ট দখল নেয়া।  আবার দেখেন, তাদের কথিত সেকালের শতকোটির দুর্নীতি নির্মূল করতে নাকি টিআইবিসহ তারা এ কাজ করেছিলেন। আর তাতে দুর্নীতি এখন কমা দূরে থাক, একালে দুর্নীতি মাপা হয় এখন শ’কোটির বদলে হাজার কোটি দিয়ে। অথচ আমেরিকার ফান্ড বা ইউএসএইডে চলা এনজিওসহ  নানান মিডিয়া – এসব প্রতিষ্ঠানের কারো এখনও এনিয়ে বিকার নেই। তারা সেদিন ঠিক কী করেছিলেন যে আজ বাংলাদেশ ভারতের কবলে পড়েছে? আর আজ একেকটা দুর্নীতি মানেই হাজার কোটি টাকায় তা মাপতে হবে- এ বিরাট অগ্রগতিগুলো কেন হলো, কেমন করে? তারা কি এটাই করতে চেয়েছিলেন? তাদের আমেরিকান মুনিব যে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিতে যাচ্ছে সেটা তারা জানতে পারেননি কেন? কোনো বাধা দেননি কেন? আজ তারা যখন জানছেন তখন নিজেকে কি জবাব দেবেন?

    অথচ তারা এখন গা বাঁচাতে সব দোষ হাসিনার ওপর চাপাতে চান। অথচ সত্যি কথাটা হল তাদের আমেরিকান মুনিব, তাদেরকে ব্যবহার করে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। বাংলাদেশে ভারতের প্রভাবের শুরু এখান থেকেই।

    প্রথম আলোর দিল্লি প্রতিনিধি সৌম্য “দিল্লির দৃষ্টিতে বাংলাদেশ- সোনালি অধ্যায়ে...’” নামে একটা আর্টিকেল লিখে শ্রিংলা-বেইজ্জতি বিষয়টা ডাকা দিয়ে রাখতে প্রচেষ্টা নিয়েছেন, আলোচনা শুরু করেছেন – তার আলাপটা যেন এমন- শ্রিংলাকে কী কেবল মেরে তক্তা বানানো হয়েছে, নাকি কাপড়ও খুলে নিয়ে গেছে! এ বিষয়ে সেখানে আলোচকদের সিদ্ধান্ত যে, না, জুতার দাম নেয়নি। বাংলাদেশে এখনো প্রণবের অনেক নাকি প্রভাব! আর ঐ লেখাটা ছাপবার পরে কিছুটা দায় মিটাতে প্রথম আলো নিজেও পাল্টা আরেক “ঢাকার দৃষ্টিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক” লিখতে গেছে। কিন্তু এদুই লেখাতেও সকলেই যার যার কথা বলে গেলেও কেউ বলছেন না যে, বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিলো কে? তারা বুঝতেও পারেননি প্রণব মুখার্জি এত বড় প্রভাবশালী হয়ে উঠলেন কার ক্ষমতায়? কোন সূত্রে? কে তাকে ক্ষমতাবান বানাল? – না, কারো মুখে এ নিয়ে রা নেই। যেন বাংলাদেশের ওপর ভারতের কর্তৃত্ব বাংলাদেশের জন্মের পর থেকেই? নাকি বাংলাদেশের জন্মেরও আগে থেকে এসব বুজরুকি চলছে।

    আমেরিকান অর্থ বা প্রভাবে চলে এমন এনজিওসহ সব প্রতিষ্ঠান নিজেই নিজের অযোগ্যতায় নিজের বিরুদ্ধে কাজ করেছে- বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে অথচ ভাবটা হলো তারা এটা জানে না, নয়ত নির্বিকার। বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তারাও তুলে দিল কিভাবে?  তাদের কোন আত্মজিজ্ঞাসাও আমরা দেখিনি। এটা নিয়ে কোনো আত্মবিশ্লেষণেও তারা যেতে চান না। বরং সব দোষ শেখ হাসিনাকে দিয়ে নিজেরা হাত ধুয়ে ফেলতে চান। আর তারা অভিযোগ করেন, হাসিনা তাদের ফান্ড এনজিও ব্যুরো পার হতে দেয়া হয় না। কিন্তু আসলে কেন দেয়া হবে?
    আমেরিকার যদি সক্ষমতা থাকে ‘১/১১’ সরকার কায়েম করার তা হলে যেকোন সরকারকে সরানোর ক্ষমতাও তার থাকবে, এটি তো সাদা কথা। কাজেই আমেরিকার এই ক্ষমতাকে ঠেকাতে বাধা দিতে  হাসিনা ঐসব এনজিও সৈন্য সামন্তদের ব্যুরোসহ যেখানেই পাবেন আটকে রাখবেন  – ঠিক কী না? এটাই তো স্বাভাবিক। এটাই তো সেলফ-ইন্টারেস্ট বুঝা লোকের কাজ! তবে এখানে হাসিনা তো অন্তত নিজের ক্ষমতা বা স্বার্থের চিন্তা করেছেন। কিন্তু এই সৈন্য-সামন্তরা? আমেরিকা ভারতের হাতে বাংলাদেশকে তুলে দিলে তাদের কী লাভ – এটা কি তারা চিন্তা করেছিল, না এই যোগ্যতা তাদের ছিল? উত্তর হল, না, কারণ তারা ছিল অনুভূতিহীন মাংসপিন্ড। তাই টেরও পায়নি। ‘ওস্তাদের খেপ মেরে দেয়া’ ছাড়া যারা আর কোন কর্ম করতে কিছু বুঝতে পারে না। যারা সেলফ-ইন্টারেস্টেও বুঝে না। তাই এখন আমরা শুনি টিআইবির সুলতালা কামাল নয়া শোষণ তত্ব দিয়েছেন। সারা জীবন ভারতের স্বার্থে খেদমত আর রাজনীতি করে এরা  এখন বলে  ‘ভারত বাংলাদেশকে নাকি পাকিস্তানের চেয়ে বেশি শোষণ করছে।’ এই নয়া তত্ত্ব¡ খুব একটা কার্যকারিতা দেখা যায়নি, সম্ভবত সমাজে  তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে গেছে বলে। এছাড়া কারণ অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভারতের হাতে বাংলাদেশকে কে তুলে দিল – এনিয়ে কথা তোলার  সাহস ও যোগ্যতা যাদের নেই, তারা এখন নয়া শোষণ তত্ত্ব দিলে লাভ কী? মানুষ তাই বলবে কারা এরা? তবে মুরোদ থাকলে এখন আত্মসমালোচনা করে অন্তত পুরো ঘটনাকে এরা মূল্যায়নেও সক্ষম কি না সেটি করে দেখাক। এরা তো নিজের কৃতকর্মের ভয়াবহতার দিকটাও  বুঝতে পারে না!

    যা হোক আবার মূল প্রশ্ন- বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিলো কে- প্রথম আলোতে ঐদুই লেখায় যাদের বক্তব্য নেয়া হয়েছে যেসব ব্যক্তিত্বরা এরাও কেউই এই প্রশ্ন নিয়ে নাড়াচাড়া করতে সাহস করেননি। সবাই ধরে নিয়েছেন বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার ব্যাপারটা যেন আকাশ থেকে পড়েছে। বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব যেন জন্ম থেকেই এবং গিভেন!

    তবে এখন আর সম্ভবত এসব সত্যি থাকছেনা। যেকোনো কারণেই হোক বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব আদৌ থাকবে কি না, চীনা প্রভাবইবা কতটা থাকবে এর আপাত নির্ধারক সরকারপ্রধান নিজেই। আর রুট ফ্যাক্টস হল, বাংলাদেশে চীনের প্রভাব আগামী দিনেও বাস্তবতার কারণে গভীরই থাকবে। না আমেরিকা না ভারত, এটা আর তারা নির্ধারণ করতে পারবে; সে বাস্তবতাই শুকিয়ে আসছে। আমরা তাদের সব মুরোদ দেখে ফেলেছি। সব বন্ধন ছিন্ন হয়ে বাস্তব এলোমেলো হয়ে গেছে, যেকারণে আর কোনো পুরান বাধনে আবার আটকানো যাবে না।
    এ ছাড়া বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা নয় যে এর একেকটা দল চীন, ভারত বা আমেরিকা এভাবে সবাই  কারো না কারো লেজ ধরে চলে। যেকোনো কারণেই হোক, আজকের বাংলাদেশটা এমন নয়। এর অন্য অনেক খামতি থাকা সত্বেও। তাই বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা নয়।  এছাড়া এখন অন্তত বাংলাদেশের মানুষ নিজে ক্রমেই আরেকটা ফ্যাক্টর হয়ে উঠছে। যেটা শ্রীলংকায় নাই। এই প্রশ্নে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকবে। বাংলাদেশের মানুষের নিজেদের পজিশন আছে, জনমতে তা ক্রমশ শক্ত হচ্ছে যেটা আমল করা ছাড়া সামনে কিছুই হবে না।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “বাংলাদেশের ওপর ভারতের প্রভাব” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ‘লিবারেল ডেমোক্র্যাসি’ দেউলিয়াত্ব নিয়ে হাজির

    ‘লিবারেল ডেমোক্র্যাসি’ দেউলিয়াত্ব নিয়ে হাজির

    গৌতম দাস

    ৩১ আগস্ট ২০২০, ০০:০৬ সোমবার,

    https://wp.me/p1sCvy-3a7

     

    Canadian & Chinese Foreign Ministers met in Rome।

    কানাডা আর চীনের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী তৃতীয় দেশ ইতালির রোমে গত ২৫ আগস্ট এক বৈঠকে বসেছিলেন। তৃতীয় দেশে যখন বসতে হচ্ছে তখন কিছু জটিল সমস্য আছে বুঝাই যাচ্ছে।  বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের কানাডিয়ান মন্ত্রী (Francois-Philippe Champagne) বলেছিলেন, “চীন যেকোনো বলপ্রয়োগের কূটনীতি করে কোনো কাম্য ফল পাবে না [I was very clear [with him] that coercive diplomacy is not going to lead to the desired outcome]। আর যাকে তাকে ধরে ডিটেনশন দেয়াটাও রাষ্ট্র দুটোর মধ্যে সম্পর্কের জন্য ভালো নয়”। আর সব শেষে বলেছেন, “এটি নেহায়ত-ই দুইজন কানাডিয়ানের চীনে ডিটেনশনে আটকে থাকা নয়। এরা দুইজন লিবারেল ডেমোক্র্যাসির নাগরিক এবং প্রতিটি লিবারেল ডেমোক্র্যাসির দেশ চীনের বলপ্রয়োগের কূটনীতির ব্যাপারে উদ্বিগ্ন”।’ এই হলো মূল ডায়ালগ। কিন্তু ঘটনা কী, চার্জ তো সাঙ্ঘাতিক! চীন নিজের মতো সংজ্ঞায় ‘কমিউনিস্ট’- আমরা জানি, সেটা এখানে সম্পর্কিত নয়। কিন্তু তাই বলে চীন কি এতই অভিযোগে অভিযুক্ত? ব্যাপারটা কী?

    ঘটনাটা শেষের দিক থেকেই শুরু করা যাক। হ্যাঁ কথা সঠিক, দুইজন কানাডীয় নাগরিক যারা চীনের বেইজিং হয়ে কোনো তৃতীয় দেশে সফর করছিলেন, তাদেরকে চীনা সরকার বেইজিং এয়ারপোর্টে পেয়ে গ্রেফতার করে চীনের কোনো জেলে ডিটেনশন দিয়ে ফেলে রেখেছে সেই ২০১৮ সাল থেকে, আমরা জানি। এই দুইজনের একজন এক সাবেক কানাডীয় কূটনীতিক মাইকেল কোভরিগ [Michael Kovrig]। তিনি বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ- এই নামের এক থিঙ্কট্যাঙ্কের কর্তাব্যক্তি। যেকোন দেশের কোনো রাজনৈতিক সঙ্কটে যদি তা জাতিসঙ্ঘ পর্যন্ত গড়ায় আর তাতে যদি ইস্যুটা নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক পর্যন্ত চলে যায় তবে ওই বৈঠকে পশ্চিমা শক্তিগুলো সবাই মিলে কী সমন্বিত অবস্থান নিতে পারে এরই আগাম খসড়া গ্রাউন্ডওয়ার্ক তৈরি করা – এই কাজটাই ক্রাইসিস গ্রুপ নিয়মিত করে থাকে। এই প্রতিষ্ঠান পশ্চিমাস্বার্থ সংশ্লিষ্টদের সাথে আগাম কথা বলে লবি করে এক সমন্বিত অবস্থান রেডি করে রাখে, যাতে পশ্চিমা অবস্থান একটাই হয়। চীন সরকার এই “ক্রাইসিস গ্রুপের” এক কর্তাব্যক্তিকেই গ্রেফতার করে গত ডিসেম্বর ২০১৮ সালে। এছাড়া এর কয়েক দিন পরে আরেক শাঁসালো কানাডীয় ব্যবসায়ীকেও [Michael Spavor]  গ্রেফতার করেছিল চীন সরকার। চীনের অফিসিয়াল অভিযোগ – এ দুইজন কানাডীয়  চীনে “গোয়েন্দাগিরিতে লিপ্ত” ছিলেন। এখনো তারা দুইজন চীনের জেলে আটক।  তা হলে অভিযোগ সত্য। কিন্তু চীন কেন এমন বেমক্কা গ্রেফতার করতে গেল?

    কারণ চীন সরকারের এ’দুই কানাডিয়ানকে ‘ইচ্ছামতো’ গ্রেফতার ছিল এক পাল্টা ব্যবস্থা। কিন্তু কিসের পাল্টা ব্যবস্থা?

    এবার আমরা মূল ঘটনায় প্রবেশ করব। চীনা বিখ্যাত মোবাইল কোম্পানি হুয়াওয়ে [Huawei]। কোন মোবাইল কোম্পানির ব্যবসা বলতে তা তিন ধরণের হতে পারে। আমাদের পরিচিত একটা ধরণ যেমন – গ্রামীণফোন বা বাংলালিংকের মত মোবাইল কোম্পানি। এরা আসলে এন্ড-ইউজার বা প্রান্তিক ফোন ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের কাছে ইন্টারনেট ডাটা ও ফোনসার্ভিস বিক্রি করে থাকে এমন কোম্পানি। আবার এসব কোম্পানিকে মূল টেকনিক্যাল যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা আরেক ধরনের মোবাইল কোম্পানি হয় যারা গ্রামীণফোন ধরনের কোম্পানিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে  টেকনিক্যাল দিক থেকে সাজিয়ে দেয়, টিকিয়ে রাখে বা খাড়া করে দেয় যাতে তারা ফোনসার্ভিস বেচতে সক্ষম হয়। যেমন- হুয়াওয়ে, নোকিয়া, এরিকসন, এলকাটেল প্রভৃতি। অর্থাৎ এরা মূল যন্ত্রপাতি ও টেকনোলজি উৎপাদন, প্রস্তুত ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। আবার তৃতীয় আরেক ধরনের মোবাইল কোম্পানি হতে পারে যারা এন্ড-ইউজার যে ফোনসেট ব্যবহার করে, কেবল সেই ফোনসেটের উৎপাদন ও সরবরাহকারী। যেমন- অ্যাপল, স্যামসাং, অপ্পো, হুয়াওয়ে, নোকিয়া প্রভৃতি।
    তার মানে মোবাইল ব্যবসা বলতে ব্যাকটেক (ব্যাকগ্রাউন্ড টেক যন্ত্রপাতি), ফোনসেট আর সার্ভিস – এই তিন ধরনের কোম্পানি হতে পারে। আর হুয়াওয়ে হল  ব্যাকটেক আর ফোনসেট এদুই ধরণের পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের কোম্পানি। বলাবাহুল্য, এরা শ’ শ’ বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি। এমনকি ব্যাকগ্রাউন্ড টেক যন্ত্রপাতির কোম্পানি হিসেবে হুয়াওয়ে তার সমতুল্য নোকিয়া, এরিকসন ইত্যাদি সব কোম্পানির চেয়েও অনেক বড়। বিনিয়োগের আকার, বড় মার্কেট শেয়ার ও টেকনিক্যাল দিক থেকেও উঁচু প্রভাবশালী কোম্পানি। তবে হুয়াওয়ের সমতুল্য আরেক চীনা কোম্পানি আছে জেডটিই (ZTE), যেটা আবার চীনা সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি।

    হুয়াওয়ে ও ফাইভ-জিঃ
    বাংলাদেশে ফোন সার্ভিসে ব্যবহারকারীদের কাছে  টু-জি, থ্রি-জি ও ফোর-জি সার্ভিস দেয়া হচ্ছে বলে কোম্পানিগুলো দাবি করে থাকে। তাতে কিছুই ফারাক বোঝা যায় না। কারণ সার্ভিস কোম্পানির বসানো সব টাওয়ার থেকেই ফোর-জি উচ্চমানের গতির সার্ভিস দেয়া হচ্ছে বাস্তবে এমন কোন কোম্পানি বাংলাদেশে নেই। এমনকি সব টাওয়ার থ্রি-জি পর্যায়ের কি না সেই নিশ্চয়তাও নেই। লোক দেখানোর জন্য কয়েকটা টাওয়ার এমন থাকে আর যা থেকে মিছা দাবি করে কোম্পানিগুলো টিকে আছে। কিন্তু যেসব দেশে এসব ধাপ্পাবাজি নেই, যা সার্ভিস দেবে বলে দাবি করে তাই দিতে হয়; এর জন্য তদারকি মনিটরিং ও শাস্তিবিধান আছে সেখানে টু-জি, থ্রি-জি না ফোর-জি – কত স্পিডের সার্ভিস তা গুরুত্বপূর্ণ। সেই জগতেরই লেটেস্ট টেকনোলজি হল – ফাইভ-জি টেকনোলজি। ফাইভ-জি একেবারেই ব্যতিক্রমী ও আলাদা; এমনকি ফাইভ-জি ফোন সেটও আলাদা হবে, যা এখনো বাজারে আসেনি।
    কেন আলাদা? কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা [artificial intelligence, AI] বা এআইয়ের কথা শুনেছেন অনেকে। তারা বুঝবেন আগামী দিনে কারখানা ম্যানুফাকচারিং থেকে শুরু করে অটো ড্রাইভিং মোডে গাড়ী চালানো এমনকি রেস্টুরেন্টে খাবার বিতরণের কাজ করবে রোবট। দূর থেকে বা নির্দিষ্ট রেঞ্জের মধ্যে বসে দূর থেকে রোবটকে নির্দেশ দিয়ে চালাতে হলে যে হাইস্পিডের মোবাইল টেকনোলজি লাগবে সেটাই ফাইভ-জি পর্যায়ের হতে হবে। আর হুয়াওয়ে হল ফাইভ-জি টেকনোলজিতে সবার চেয়ে আগে বা পাইওনিয়ার কোম্পানি।  আর এক্ষেত্রেই টেকনোলজিতে এবং বিনিয়োগ অর্থে আমেরিকাঙ্গেই প্রথম কয়েক বছর পেছনে পড়ে গেছে, কিছু টেকনোলজি-বিষয়ক সিদ্ধান্ত সময়মত আমেরিকান রাষ্ট্র ও এই খাত নিতে না পারায়। তাই এই খাতে ইউরোপীয় অরিজিনের নোকিয়া, এরিকসন, এলকাটেল কমবেশি থাকলেও আমেরিকান অরিজিন কোনো কোম্পানি এখন আর প্রতিযোগিতাতেই নেই। এর কারণ হিসেবে আমেরিকাতেই বলা হয়, মূলত সেখানকার কোম্পানিগুলো একসময় তাদের সবাইকে একই টেকনোলজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলতে হবে এমন সরকারি বাধ্যবাধকতা বা স্ট্যান্ডার্ড বলে কিছু  থাকা উঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।
    গত নব্বই এর দশক জুড়ে এর সুযোগে জিএসএম, সিডিএমএ প্রভৃতির অন্তত পাঁচ ধরনের টেক স্ট্যান্ডার্ড একই সাথে আমেরিকায় ব্যবহৃত হত বা চালু হয়েছিল। এরই খেসারত এখন আমেরিকাকে দিতে হচ্ছে। কেন?  বাংলাদেশে আমাদের গ্রামীণসহ সব কোম্পানিই এখন এই জিএসএম [GSM] স্ট্যান্ডার্ড, আর  এখন বন্ধ হইয়ে যাওয়া কোম্পানি কেবল আমাদের সিটিসেল ছিল সিডিএমএ[CDMA] স্টান্ডার্ড। এখন এক দেশে স্ট্যান্ডার্ড ভিন্ন ভিন্ন হওয়া – এতে অসুবিধা হল , মোবাইল টেকে ক্রমাগত গবেষণা ও উন্নয়নে প্রচুর বিনিয়োগ লাগাতে হয়। নইলে আপটুডেট থাকা যায় না। অর্থাৎ একটা দেশে টেক স্ট্যান্ডার্ডের বালাই না থাকলেতসে দেশে পাঁচ ধরনের টেক স্ট্যান্ডার্ডের প্রচলিত থাকা মানে হবে, নতুন গবেষণা ও উন্নয়নে পাঁচগুণ বিনিয়োগ লাগবে। অথচ দেশের মোট বাজার তো একই, বাজার তো পাঁচগুন হবে না। অথচ দেশে একটাই স্ট্যান্ডার্ড মানতে সবাইকে বাধ্যতামূলক করে দেয়া থাকলে গবেষণা ও উন্নয়নে ওই একই বিনিয়োগ পাঁচ কোম্পানি শেয়ার করে নিতে পারত। আমেরিকায় পুরো নব্বইয়ের দশক এই স্ট্যান্ডার্ডহীন থাকার সুযোগে বা দুর্যোগেই কোম্পানিগুলো কমতে বা ডুবতে থাকে। একপর্যায়ে ইউরোপের নকিয়া বা এরিকসন ধরনের কোম্পানির মধ্যে বিক্রি হয়ে এরা সবাই বিলীন হয়ে যায়। এককথায়, স্ট্যান্ডার্ডের বালাই না থাকাটাই এর খরচ বইবার অক্ষমতাই এক পর্যায়ে আমেরিকার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর ঠিক এর উল্টোটা করে উঠে আসে হুয়াওয়ে, যে আমেরিকার ওই পিছিয়ে পড়াটাকেই টার্গেট করেছিল। আজ অবস্থা এমন যে, নোকিয়া বা এরিকসনও কিছু কিছু যন্ত্রাংশে হুয়াওয়ের ওপর নির্ভরশীল। কারণ বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, এর অন্যতম কারণ হুয়াওয়ের যন্ত্রাংশ দামে অনেক সস্তা।  তাইই নিজে সব ধরণের যন্ত্রাংশ উতপাদন না করে নোকিয়া বা এরিকসনও কিছু কিছু যন্ত্রাংশে হুয়াওয়েরটা ব্যবহার করে থাকে[Ericsson, Nokia are more Chinese than meets the eye]। কারণ মূল সুত্রটা হল, ব্যবসায় কোন পণ্য শস্তায় পাওয়া গেলে সেটা না কিনে এর লোভ সামলানো খুবই কঠিন।
    মনে করা হয়, আমেরিকার মোবাইল খাতে পিছিয়ে পড়া ব্যবসায়ীরাই নিজেরা প্রবল দুর্দশায় পড়ে মার খেয়ে এরপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘাড়ে এক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে সওয়ার হয়েছিলেন। তত্ত্বটা হল, হুয়াওয়ে চীনা সরকারের পক্ষে গোয়েন্দাগিরি করে, বিশেষত গোপনে হুয়াওয়ের যন্ত্রপাতি দিয়ে। এই ভুয়া তত্ব তারা ট্রাম্পকে খাওয়াতে সক্ষম হয়েছিল। তাই আমেরিকার সরকারি কোনো ক্রয়ে হুয়াওয়ে বা জেডটিই কোম্পানির থেকে কোন কিছু কেনা নিষিদ্ধ করে ট্রাম্প আইন করেছেন। আর এ নিয়ে এরপর ইউরোপের সাথে দ্বন্দ্ব শুরু হয় ট্রাম্প প্রশাসনের। এক্ষেত্রে মূলত সবচেয়ে ভোকাল ছিলেন জার্মান চ্যান্সেলার এঞ্জেলা মার্কেল। তিনি দাবি করেন আমেরিকা যদি চীনা গোয়েন্দাগিরির কোনো প্রমাণ দেখাতে না পারে তাহল ইউরোপ ট্রাম্পের দাবি মানবে না। ইউরোপ-আমেরিকার এই বিবাদে ইউরোপও শেষে আর একতাবদ্ধ থাকতে পারেনি। মূলত সস্তা হুয়াওয়ের টেকনোলজি কেনার হাতছানি এক দিকে। অন্য দিকে নাকি নিজেদের বিনিয়োগে যেতে হবে এর অনিশ্চয়তা, আর যতই দিন চলে যাচ্ছে ততই তারা ব্যবসায় পিছিয়ে পড়ছেন – এভাবে সব মিলিয়ে গ্লোবালি এই খাত এক ব্যাপক এলোমেলো বিশৃঙ্খলায় এখনো ডুবে আছে, আরো যাচ্ছে ক্রমেই।

    হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আরেক অস্ত্রঃ
    কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন শুধু এখানেই নয়, আরো এক অস্ত্র ব্যবহার করেছে হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে। বলা উচিত- অপব্যবহার করেছে। হুয়াওয়ে তার টেকনোলজি আর সবার কাছে যেমন তেমন ইরানের কাছেও বিক্রি করেছে। আর স্বভাবতই এতে আমেরিকার মাতব্বরি হিসেবে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ ভঙ্গ করে তা হয়েছে। কিন্তু আমেরিকা অবরোধ আরোপ করার কে? তার কী আন্তর্জাতিক অথরিটি আছে?   জবাব হল – সে কেউ নয়, এর কোনো বৈধ অথরিটি তার নেই। কোন আন্তর্জাতিক আইন নাই ফলে অথরিটি নাই – ইরান-চীন পণ্য বিনিময়ে। যেকোনো দুই দেশের পণ্য কেনাবেচায় আমেরিকার বাধা দেয়ার কোন অথরিটি নাই, এক্তিয়ার নাই। জাতিসঙ্ঘের দিক থেকে ইরানের ওপর যে পুরানা এক অস্ত্র ক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা ছিল তার মেয়াদও সম্প্রতি শেষ হলে একা আমেরিকা ছাড়া আর কেউ আবার নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার পক্ষে ভোট দেয়নি। ফলে এখন জাতিসঙ্ঘের কোনো ধরণের অবরোধই আর ইরানের উপর নাই।
    কিন্তু  পড়ে পাওয়া এক অসৎ সুযোগ নিচ্ছে আমেরিকার।  যেহেতু ডলার একই সাথে আমেরিকান রাষ্ট্রের মুদ্রা, এটাই সেই পড়ে পাওয়া অসৎ সুযোগ।  কারণ ইরান-চীন কোন পণ্য বিনিময়ের ইনভয়েস যদি ডলার মুদ্রায় করে থাকে তবে সেটা করতে মানে ঐ পেমেন্ট ডলারে ক্যাশ করতে একটা বাধা দিবার সুযোগ আমেরিকার হাত এসে লেগে যায়। কারণ আমেরিকান সরকারের সমস্ত আমেরিকান ব্যাঙ্কের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ঐ পেমেন্ট ডলারে ক্যাশ করা অবৈধ বা নিষেধ করা কাজ বলে ঘোষণা করতে পারে।

    কিন্তু হুয়াওয়ে আর ইরানের কেনাবেচা ডলারে করা হয়েছে আর হুয়াওয়ের নামে না করে অন্যনামে তা করা হয়েছে এই অজুহাতে হুয়াওয়ের কর্মীদের বিরুদ্ধে আমেরিকা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে রেখেছিল।
    হুয়াওয়ে কোম্পানির জন্ম ও বিকাশও বড়ই নতুনত্বের। এখানে সকল এমপ্লয়ীই কোম্পানির কিছু না কিছু শেয়ারের মালি হয়ে যায়; তিনি স্রেফ কর্মচারীওই না। আবার এটা চলে একোটা চেয়ারম্যান প্যানেলের মাধ্যমে, এতে ঘুরে ঘুরে প্যানেলের সকলেই একবার করে কিছুদিন চেয়ারম্যান থাকেন। যদিও এর মূল উদ্যোক্তা চেয়ারম্যান একজন, তিনিও আছেন অবশ্যই। আর তারই মেয়ে মেং ওয়ানজু; তিনি হুয়াওয়ের প্রধান ফাইন্যান্স অফিসার [CFO]। তিনিi গত ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার হয়ে অন্য কোথাও ল্যাটিন আমেরিকায় যাচ্ছিলেন। ভ্যাঙ্কুভার ছিল তার উড়োজাহাজ বদলানোর জায়গা বা এয়ারপোর্ট। আর এই সুযোগে কানাডা সরকার ট্রাম্প প্রশাসনের হয়ে তাকে গ্রেফতার করে ঐ ডিসেম্বর ২০১৮ সালে। সেই থেকে সব ঘটনা- দুর্ঘটনার সূত্রপাত। কানাডার সাথে আমেরিকার এক্সট্রাডিশন চুক্তি আছে, যার বলে কানাডা সরকার কানাডার আদালতের অনুমতিসাপেক্ষে, কাউকে আমেরিকার হয়ে গ্রেফতার করে আমেরিকার কাছে তাঁকে হস্তান্তর করতে পারে। হুয়াওয়ের প্রধান ফাইন্যান্স অফিসার মেং ওয়ানজু তাকে গ্রেফতারের পরে কানাদার আদালতে হাজির করলে আদালত তাকে আপাতত জামিন দেয় কিন্তু কানাডাতেই থাকতে হব এই শর্তে। তাই এখন তিনি কানাডাতেই জামিনে আছেন। আর কানাডার আদালত এখনো সিদ্ধান্ত দেয়ার অপেক্ষায় বিচারাধীন যে, আমেরিকায় তাকে হস্তান্তর করা হবে কি না!

    এটা পরিষ্কার, ওই দুইজন কানাডীয়কে ইচ্ছামতো উঠিয়ে আনা আর ডিটেনশন দিয়ে ফেলে রাখা- এটা চীন সরকার করেছিল পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে, মেং ওয়ানজুকে কানাডায় আটকের ৯ দিন পরই। যদিও ঐ দুজনকে গ্রেফতার কেন করা হয়েছে এর কারণ হিসাবে  একটা আবছা অস্পষ্ট [Vague] কারণ দেখিয়ে বলেছে তারা “চীনে গোয়েন্দাগিরি” করছিল। এসব পালটা ব্যবস্থা নিবার ক্ষেত্রে কোন রাষ্ট্র এমনই আবছা কারণ দেখিয়ে থাকে।
    তবে এই প্রথম না হলেও দ্বিতীয় এনিয়ে রোমে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক। এই ইস্যুতে কথাবার্তা, ডায়ালগ করা খুবই ঠিক কাজ হয়েছে। সন্দেহ নাই। কারণ এটাই এমন পরিস্থিতি থেকে উভয় রাষ্ট্রের বের হওয়ার একমাত্র পথ। কিন্তু গোল বাধিয়েছে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি চীনের বিরুদ্ধে দাবি করতে গিয়েছেন যেআমেরিকা-কানাডার কাজ ও পদক্ষেপ যা কিছু নিয়েছে তা খুবই ন্যায়সম্মত ও আদর্শ – আর সেই আদর্শ হল নাকি কথিত “লিবারেল ডেমোক্র্যাসি”!  যারা নিজ অযোগ্যতাকে গর্বের বিষয় মনে করে তাদেরকে কী বলা যায়?

    কানাডিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাঙ্কো-ফিলিপ, তিনি জ্ঞানবুদ্ধিতে এতই নিচা যা অকল্পনীয়!  ‘লিবারেল ডেমোক্র্যাসি’ নিয়ে এসব তথাকথিত জ্ঞানের কথা, দর্শনের সাফাই- এগুলো আসলে ছেঁদো কথা। ফুটা হয়ে যাওয়া কথা। এগুলো খুবই বিরক্তিকর, এসব তাদের বাদ দেয়া উচিত। আর এটাই বুঝি তাদের লিবারেল ডেমোক্র্যাসি?

    আচ্ছা, ইরানের সাথে ব্যবসা করা যাবে না, পণ্য লেনদেন কেনাবেচা করা যাবে না, এটা কি লিবারেল ডেমোক্র্যাসি? ইরানের ওপর অবরোধ আরোপে আপনারা কারা? না এটা লিবারেল, না এটা কোনো ডেমোক্র্যাসির কিছু। এর মধ্যে তো কোনো আইনেরই কিছু নেই, ন্যায্যতা নাই। পড়ে পাওয়া সুবিধা নেয়া আছে যেটা ঘোরতর অসততা। আপনারা একটা অসততাকেও অস্ত বলে বুঝতে পারেন না! স্বীকার করতে পারেন না, এতই নিচে নেমে গেছেন আপনারা! ফলে এটার স্বপক্ষে কোন আন্তর্জাতিক আইনি সাফাই-ই নাই।  তো  কোন আইনে এই অবরোধ আরোপ করা হয়েছে? এর এখতিয়ার কে দিয়েছে? এটা তো সবাই মানে, কিংবা মানতে বাধ্য এমন কোনো আন্তর্জাতিক আইন-ই নয়? আর কানাডীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসেছেন এটাকে ‘লিবারেল ডেমোক্র্যাসি’ বলে দাবি করতে? আর এই দুস্থ রাজনীতি দিয়ে আপনি দুনিয়ার মন জয় করবেন? আপনাদের চিন্তার এতই দেউলিয়া অবস্থা?

    ডলারকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ১৯৪৪ সালে আইএমএফের জন্মের সময় গ্রহণ করা হয়েছিল। কাজেই আইএমএফের সব সদস্য রাষ্ট্রই ডলারে কেনাবেচা করার এখতিয়ার রাখে। কিন্তু ডলার আমেরিকার নিজেরও রাষ্ট্রের কারেন্সি বলে এটাকে সেই সুযোগ হিসেবে নেয়া, ডলারে কেনাবেচার ওপর অবরোধ দেয়া – এটি তো পুরোপুরি অপব্যবহার! আর এই অপব্যবহার করে, এর পক্ষে সাফাই দিয়ে এটি কোন লিবারেল ডেমোক্র্যাসি কায়েম করতে এসেছেন কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী? আগামি দিনে যখন কোনদিন ডলার প্রধান আন্তরজাতিক মুদ্রার মর্যাদা হারিয়ে ফেলবে তখন আপনারা কোথায় মুখ লুকাবেন?

    আমেরিকা মোবাইল ব্যবসায় প্রতিযোগিতায় হেরে গেছে যেকোনো কারণে, এটাই এক কঠিন এবং বাস্তব সত্য। এটা মেনে নিতে শিখেন, অন্তত! কিন্তু আপনারা এখন সেটাকে কাভার দিতে, লুকাতে চেয়ে আপনারা  ‘ডলার অবরোধ’ দিবেন – এটি কোন লিবারেল ডেমোক্র্যাসি? কোন মুল্যাবোধ এটা? ধিক্কার দেই আপনাদের এমন লিবারেল ডেমোক্র্যাসিকে! এটা কী কোন সুস্থ বা লিবারেল প্রতিযোগিতা? এরা তো মুক্ত ব্যবসার প্রতিযোগিতাই মানে না, দেখা যাচ্ছে!

    সোজা কথাটা হল – পশ্চিমা মন রাজনৈতিক চিন্তায় দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। কাজেই আবার “লিবারেল ডেমোক্র্যাসির” গান গেয়ে – এই দেউলিয়াত্ব ঘুচবে না। এভাবে আমেরিকার পতন ঠেকানো যাবে না।  এভাবে আমেরিকা বা কানাডা সারভাইভ করবে না।  ন্যায় মানে ন্যায় এবং ন্যায্য – এখানে ফাঁকি চলে না। এজন্য এটা কোন ভিত্তি হতে পারবে না।   আমেরিকান অর্থনৈতিক দিকের পতনকে রাজনৈতিক দিকেরও পতন বানায়েন না, অন্তত! বরং ইতিবাচকভাবে নেন। নতুন করে সবাইকে দুনিয়ার সব কর্ণারকে কাভার করে নিয়ে দুনিয়ার নতুন ভিত্তি তৈরি করার কথা চিন্তা করেন। এটাই একমাত্র পথ বা সমাধান!। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নতুন ন্যায়ের ভিত্তি লাগবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  গত  ২৯ আগষ্ট ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “‘লিবারেল ডেমোক্র্যাসি দেউলিয়াত্ব” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • সচেতন হল, না ‘রক্তের সম্পর্কেই’ রইল

    সচেতন হল, না ‘রক্তের সম্পর্কেই’ রইল

    গৌতম দাস

    ২৪ আগস্ট ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-39x

     

    ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রীংলা হঠাত করে বাংলাদেশ সফরে আসছেন বলে ঢাকঢোল পিটানো হচ্ছিল গত ১৮ আগষ্ট সকাল থেকে। এটা নাকি তাঁর দুদিনের ঝটিকা সফর। বরাবর প্রো-ইন্ডিয়ান জায়গা থেকে নিউজ করা প্রথম আলো এখানেও তা করতে ব্যতিক্রম করে নাই। তাই ভারতীয় উতস ব্যবহার করে বানানো খবর দিয়ে রিপোর্ট করে গেছে।  অথচ অন্তত একবার পালটা উতস থেকে খবরটা পরীক্ষা করে নেয়া জরুরী ছিল। এমন বেপরোয়া ভুয়া খবর প্রথম আলো যেমন লিখেছে,

    আজ ঢাকায় অবস্থানের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা গণভবণে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এ ছাড়া তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

    কিন্তু না। মঙ্গলবার রাত না যেতেই সবাই বুঝে যায় “ডাল মে কালা” আছে। প্রথম আলো ঢাকার উতস দিয়ে পালটা যাচাই করে নাই।  যেমন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন শ্রীংলা ঢাকায় নামা সত্বেও মঙ্গলবার সকালে তিনদিনের সফরে সিলেট চলে গেছেন। মতিউর রহমান চৌধুরী লিখেছে, “পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন কেন তিনদিনের সফরে সিলেট চলে গেলেন তা নিয়েও বিস্তর আলোচনা চলছে” ।

    আবার প্রথম আলোর ঐ প্রো-ইন্ডিয়ান ভাষ্য যে এটা নাকি শ্রীংলার দুদিনের ঝটিকা সফর, না সে কথা মানতে চান নি আমাদের পররাষ্ট্র সচিব।  এনিয়ে  মানব্জমিন লিখছে, সফরটি ঝটিকা নয় বরং রেগুলার বা নিয়মিত বলে দাবি করেছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন।

    এছাড়া,  বিবিসি বলছে, ‘…বাংলাদেশ সরকার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সাক্ষাতের বিষয়টি স্বীকারই করেনি”। আরো লিখেছে, “ সেই রাতে প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কোন বৈঠক বা সাক্ষাৎ সেদিন হয়নি”।

    এতে সব মিলিয়ে দেখা গেল শ্রীংলার  বাংলাদেশ সফর  একটা অপমানজনক অভিজ্ঞতা হিসাবে শেষ হয়েছে। যদিও বাংলাদেশের প্রো-ইন্ডিয়ান এজেন্টদের দিয়ে বহু প্রপাগান্ডা প্রটেকশনের চেষ্টার কমতি করেন নাই শ্রীংলা। তবু এটা একটা শিক্ষা যে শ্রিংলার মানসম্মানবোধ থাকলে সহসাই আর দাওয়াত না নিয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অফিসমুখী হবেন না কখনো?

    তিস্তা ইস্যুর শুরু কীভাবেঃ
    গত ২০০৯ সালের ভারত-বাংলাদেশের যে বুঝাবুঝি যেখানে মূল বিষয় ভারত আসাম-ত্রিপুরার জন্য বিনা পয়সায় করিডোর নিয়ে যাচ্ছে।  এটাই ছিল ভারতের মূল টার্গেট।  কিন্তু ব্যাপারটা দেখে খারাপ লাগবে তাই একটা কাভার দরকার ছিল যাতে মনে হয় একটা বিনিময় হইতেছে। আর সেই বিনিময় হিসাবে ভারতের প্রস্তাবে তিস্তা ইস্যুওটা লটকে যায়।

    কিন্তু তিস্তার পানি কী ভারতের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ইস্যু?  এটা কী ভারতের দিক থেকে বিনিময়ে বাংলাদেশকে কিছু দেয়া বলে আমলযোগ্য? প্রশ্নই আসে না। কারণ আন্তর্জাতিক নদী আইনে তিস্তার পানি পাওয়া বাংলাদেশের অধিকার। তাই এটা ভারত দিতে বাধ্য।  অথচ বাংলাদেশের এই অধিকারের দিকটা উপেক্ষা করে তিস্তার পানি একটা বিনিময়ের আইটেম  – মানে আমরা করিডোর দিলে এর বিনিময় হিসাবে ভারত তিস্তার পানির সাথে এর বিনিময় করছে – এমন আবহ তৈরি করেছিল।

    অথচ এটাও ছিল ভারতের দিক থেকে চরম ফ্রড একটা কাজ।   কারণ, তিস্তা একটা ‘ডেড ইস্যু’ ভারতের কাছে, ২০০৯ সালের বহু আগে থেকেই।  কেন ডেড কেন?  কারণ, তিস্তা থেকে আসলে ভারতের কাউকে কিছু দেয়ার নেই। উৎস থেকে যা নেয়া সম্ভব এমন সব পানি আন্তর্জাতিক নদী আইন ভঙ্গ করে বহু আগেই টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়। ২০০৯ সালের আগেই ভারতের এসব কাজ সম্পন্ন হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও শেখ হাসিনার কাছে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল যে, তিস্তা চুক্তি হবে।  এমনকি আজও সেই মিথ্যা  বলে যাওয়া হচ্ছে। অন্তত গজলডোবায় অন্যায়ভাবে  যে পানি টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এটাও ভারতের পক্ষে কোথাও আলোচনার ইস্যুওও নয়।

    আজ আবার ভারত যখন শুনেছে, চীন-বাংলাদেশ তিস্তা নিয়ে নতুন করে এক প্রকল্পের কথা ভাবছে তাতে অস্থির হয়ে ছুটে এসেছেন হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। যাদের না শক্তি না আত্মসম্মানবোধ কোনোটাই থাকে না, তারাই এভাবে আসে আর ‘ফুটা’ হয়ে যান।

    দাওয়াত খেতে এসে দেখছেন, হোস্ট নিজের শ্বশুরবাড়ি রওনা দিচ্ছে- এর মানে হলো, আপনি নিজেই নিজেকে অপমানের মধ্যে ফেলেছেন, কারণ আপনার দাওয়াতই ঠিকমতো নেয়া হয়নি, কেউ দেয়নি বা দাওয়াত ছিল না। আপনি সৌজন্যও বোঝেন না, বা সৌজন্য সাক্ষাতের সময় কোলাকুলির নামে অস্বস্তিকরভাবে জড়িয়ে ধরতে চান। এতে একসময় সবাই আপনাকে কিন্তু এড়িয়েই চলবে। কিন্তু আপনার মনে ধারণা, আপনি নিজে বিরাট একটা কিছু। ভারত বিরাট কিছু একটা গুরুত্বপূর্ণ দেশ হয়ে গেছে যেন। তাই কি? কোনো দেশের জন্য বিরাট কিছু হওয়ার মানে একটাই- প্রথমত অর্থনীতিতে বিরাট কিছু হওয়া। কিন্তু ভারত কি অর্থনীতিতে বিরাট কিছু হতে পেরেছে? না তা ভারতও কখনো দাবি করেছে বলে শুনিনি। তাহলে এই আত্মপ্রবঞ্চনা কেন?

    এটা ত একদিন হওয়ারই ছিল! কিছু কথা সরাসরি জিজ্ঞাসা করতে হয়। যেমন,  ভারতের সাথে বাংলাদেশের “অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ” বা “ঘনিষ্ট বন্ধুর” বা “রক্তের” সম্পর্ক কবে ছিল? মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে যা কিছু ছিল তবু সেটি কি গভীর কোনো ‘রক্তের সম্পর্ক’ না, তা কখনো বলা বা দাবি করা হতে দেখিনি আমরা। কেউ দাবি করেননি। তবে প্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠ তা অবশ্যই ছিল। আর পরে শেখ মুজিব দেশে ফিরলে সবকিছু তো আরো ফরমাল হয়ে যায়, অর্থনৈতিক দিক থেকে সময়টাও খুবই কঠিন ছিল। তেল অবরোধে পরে জ্বালানি তেলের দাম দশ গুণ হয়ে যাওয়াতে সবার অর্থনীতিরই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থায়। সবাই নিজেকে কোনো মতে টিকিয়ে রাখতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে কোনো ‘বাড়তি উচ্ছ্বাস প্রকাশ’ কি আদিখ্যেতা- কোনো পক্ষেরই ছিল না। আর মুজিবের মৃত্যুর পর সেই বাস্তবতাও অন্য দিকে চলে যায়।

    তাই, এটা কেবলমাত্র এই ২০০৯ সাল যখন থেকে ভিত্তিহীন সব কথার ফুলঝুরি শুরু হয়েছে, যার শুরু হয়েছিল দীপুমনির পররাষ্ট্র মন্ত্রী থাকার আমলে। তবে অবশ্যই এটা দীপুমনির কোন ক্রেডিট না। এটাই ছিল চীনা ঠেকানো [China Containment] ঠিকা ভারতকে দেওয়াতে প্রাপ্য তার উপহার।  উপহার পাওয়ার কথা ত ভারত পাবলিকলি দাবি করতে পারে না তাই এসব বন্ধুত্বের ভংচং, রক্তের সম্পর্ক এসব অর্থহীন বাতচিতের আমদানি করা।  এরই এক সারকথা হল –  ভারতকে ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ বলে দাবি করা। ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ শব্দটার ব্যবহার শেখের আমলেও কখনো ছিল না। এটা একটা ভংচং  কারণ এর মানে, এক ধরনের সোনার-পাথরের বাটি। বাটি হয় সোনার হবে না হয় পাথরের! সোনার-পাথরের বাটি কথাটা একটা ফ্রডারি। আর এই ফ্রড আর মিথ্যা কথা দিয়েই ২০০৯ সালে সম্পর্ক শুরু হয়েছিল।   আর ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে নির্বাচনের পরে আরো অপমানজনক শব্দ ‘স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক’, এটা নিয়ে আসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন। আর গ মাস থেকে আবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন শুরু করেছে ” আমাদের বিজয়,ভারতের বিজয়। আমাদের উন্নয়ন, ভারতের উন্নয়ন – এসব অর্থহীন প্রলাপ। কেন করেছেন?  কারণ, চীনের সাথে সরকারের নতুন ঘনিষ্ট সম্পর্ক করার দরকারে। কিন্তু তাতে ভারতের বারবার বাগড়া তোলাতে ব্যাপার রি-ডিফাইন  করে দিতে বলেছে –  “ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রক্তের সম্পর্ক। আর চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক”।  কিন্তু লাভ হচ্ছে না। এথেকেই শেষে শ্রিংলার কথিত ঢাকা সফর।

    কিন্তু ২০০৯ সালের বাংলাদেশকে ভারতের ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ বলে ‘সম্পর্ক’কে কেন দেখানো হয়েছিল? এটা কি ভারতের কোনো অর্থনৈতিক অর্জন? অথবা ভারত কোনো ইনফ্লুয়েনশিয়াল দেশ হয়ে উঠেছে সেই জন্য কি? না, এর কোনোটাই নয়। কারণ বড়ভাই পিঠে হাত রেখেছিল। গ্লোবালি নতুন নেতা হিসেবে চীনের উত্থান ঠেকাতে, ভারত ‘চায়না ঠেকানোর’ (চায়না কন্টেইনমেন্ট) কাজ করবে আর বিনিময়ে বাংলাদেশকে তার হাতে ‘তুলে দেয়া হবে’। আর এই থেকেই ভারতের ‘মুই কী হনু’-এর শুরু। আজ কংগ্রেসের এমপি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী শশী থারুর লিখে বলছেন, চীন ঠেকানোতে ক্ষেপ মারতে যাওয়া ঠিক হয়নি। ইতোমধ্যে আমেরিকার থিংকট্যাংকের মতামতেও টান পড়েছে; বলা হচ্ছে, চীন ঠেকানো প্রোগ্রাম নেয়া ঠিক হয়নি। কেন? কারণ এর কোনো কার্যকারিতা নেই। আমেরিকার কোনই লাভ হয় নাই।  কারো অর্থনৈতিক উত্থান ‘ঠেকানোর’ জিনিস এটা নয়। তবে বলাই বাহুল্য যারা ২০০৭ সাল থেকে চীন ঠেকানো প্রোগ্রামের ঠিকা ভারতকে দেওয়ার ক্ষেত্রে কনসালটেন্সি, বা “বাংলাদেশ এক্সপার্ট”,  কিংবা আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের “বাংলাদেশে শাখা দোকান” খুলেছিলেন – এদের কাউকে এখন পাওয়া যাবে না। কেউ দায় স্বীকার করবে না।

    অথচ এটাই তো আমেরিকাও মানতে চায়নি তখন।  আর হাভাতে বাংলাদেশের কনসালটেন্সদের কথা আর কী বলব!  নিজের বউ অথবা মাকে বিক্রি করে ঐ দালালি কথিত কনসালটেন্সিটুকু যোগাড় করাই তাদের যোগ্যতা ও মুরোদ। অবজেকটিভ বাস্তবতা বুঝা ও বিশ্লেষন করার যোগ্যতা তাদের কখনই ছিল না। অথচ ঘটনা হল,    চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ও প্রভাব বেড়ে যাওয়া এসব তো অবজেকটিভ বা বাস্তব অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা। যার মধ্যে কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছা নির্ভরতা নেই। ওবামা আমলের শেষেই এই অনুভব উন্মোচিত হয়ে পড়েছিল – যে চায়না কনটেনমেন্ট  প্রোগ্রাম ফেল করবেই। তাই ওবামার শেষ আমলে পুরা ২০১৬ সাল্টা সব শুনশান হয়ে গেছিল। তবে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ভাঙ্গার কাজটা করে ২০১৭ সালে ট্রাম্পের জাতিবাদ। তাই ট্রাম্প এসে অকার্যকর, চায়না ঠেকানো প্রোগ্রামে ভারতের সাথে সম্পর্ক ভেঙে দিয়ে দূরে চলে যান। অর্থাৎ চীনা উত্থান অবজেকটিভ। কাজেই এটা ঠেকানোর বিষয় নয় – এটা পরোক্ষে তিনি স্বীকার করে নিয়েছিলেন।

    এখন ভারতের মিডিয়া জগত ও এর সাংবাদিকেরা ২০০৯-২০১৭ সাল পর্যন্ত চীন ঠেকানোর কাজে ভারতের ফলস উত্থান এবং এর নায়ক নায়ক ভাব আর এসব ঘটনার উত্থান ও পতন যদি না বুঝেন আর যদি বিশ্বাস করতে থাকেন, ভারত পরাশক্তি হয়ে গেছে তাতে তাদের স্টুপিডিটি কে ঠেকাবে? বিদেশ মন্ত্রণালয়ে কিছু বাড়িয়ে বলা চাপাবাজি থাকে, মোদীর ভারত হঠাত করে বিরাট পরাশক্তি হয়ে গেছে – এটা ভারতের যে মিডিয়া আর সাংবাদিকেরা বিশ্বাস করে তাদের চিন্তা করার সক্ষমতা ও যোগ্যতা নিয়ে আর কী বলব? ভারত বাংলাদেশের জন্য একটা ডোনার কান্ট্রি- এসব কথা তাঁরা  বিশ্বাস করে। এখন ভারতের সাংবাদিকদের বিশ্বাস করা-না-করা ফেলে যাচাই ও ফ্যাক্ট জেনে রাখা কী তাদের দায়িত্ব ছিল না?  কিন্তু দ্য হিন্দু’র সুহাসিনী হায়দার বা কল্লোল ভট্টাচার্য বা একালে দ্য প্রিন্টের নয়নিমা বসু ইত্যাদি এরা যেন নিজেই নিজেদের মিথ্যা কথার ফাঁদ থেকে বের হতে পারতে চান না। তাদের কে বের করবে? এরা ভারতকে বাংলাদেশের জন্য অবকাঠামো ঋণদাতা ডোনার কান্ট্রি বানিয়ে ছেড়েছেন। অথচ ভারত কিসের ডোনার?

    ভারত মফস্বলের কোনো পৌরসভায়  পাচ লাখ টাকার চাপকল সরবরাহ করেছে, রাজশাহীতে ভারত তিন লাখ টাকা বৃত্তি দিয়েছে বা ছাগলনাইয়ার এক প্রাইভেট কলেজের চার লাখ টাকায় দোতলায় চার-পাঁচটা ঘর তুলে দিয়েছে ইত্যাদি। এসব হলো নাকি বাংলাদেশে  পরিচালিত ভারতের ‘উন্নয়ন কর্মসূচি’। অথচ আসাম-ত্রিপুরা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যে করিডোর সুবিধা নিচ্ছে এর জন্য অবকাঠামোর ঋণ ব্যায় হচ্ছে তা বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে নিজের জনগণকে বন্ধক রেখে নিয়েছে। যাদের নিজ করিডোরের অর্থনৈতিক দায় ও খরচ বইবার মুরোদ নেই তারা নাকি ঋণদাতা! পদ্মা সেতু এবং সেতুর রেল ব্যবহার করে ভারত কলকাতা-আগরতলা যোগাযোগ শক্ত করবে।

    ভারতের এসব মিডিয়া সাংবাদিকেরা, এরা ঠিকাদার আরা ঋণদাতাকে এক মনে করে থাকেন। সেকারণে, বাংলাদেশের অবকাঠামো প্রকল্পে ভারতকে চীনের পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে চায়, কাজ পেতে চায়। এরা ঠিকাদার আর ঋণদাতা চীনের এই দুই ভূমিকাকে গুলিয়ে ফেলে একাকার করে দেখেন আর ভাবেন, এটা আসলে কেবল চীনের ঠিকাদারি ভূমিকা। তাই ভারতকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো কোম্পানি মনে করেন। কিন্তু বুঝতেই পারেন না, চীন যদি ঋণদাতার ভূমিকাতে নাই থাকে তাহলে আর বাংলাদেশে ঠিকাদারের দরকার কী?

    তবে চীন ২০১৬ সালের আগে পর্যন্ত বাংলাদেশে কেবল ঠিকাদারই ছিল। আর ২০১৬ সাল থেকে কম সময়ে সবচেয়ে বড় ঋণদাতা হয়ে গেছে অবশ্যই। মাত্র তিন বছরে চীন ঋণ বিতরণ করেছে ২৬ বিলিয়ন ডলারের যেখানে প্রতিশ্রুতি ছিল ২০ বিলিয়ন ডলারের। এটা কত পরিমাণ অর্থ এর একটা ধারণা দেয়া যাক। এর আগে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে পাওয়া অবকাঠামো ঋণ; ধরা যাক ১৯৯১ সালের কথা। আমরা তিন বছরে এক বিলিয়ন মানে, বছরে ৩৩৩ মিলিয়নের মত অবকাঠামো ঋণ পেলেই মনে করতাম যথেষ্ট ঋণ পেয়েছি। কারণ তাতে আর ঐসব বছরগুলোতে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতির মোকাবিলায় পড়তে হত না। সুতরাং আমাদের তদানীন্তন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানেরা সন্তুষ্ট থাকতেন। আর এখন চীনা ঋণ তিন বছরে ২৬ বিলিয়ন, মানে গড়ে বছরে আট বিলিয়নের বেশি। অথচ ভারতীয় সাংবাদিকরা ভাবছেন,  কী সহজ বাংলাদেশে ভারত চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী দাতা দেশ হয়ে গেছে!

    আমাদের সরকারের সবচেয়ে বড় এক আত্মঘাতি ভুল হল ২০১৪ সালে, তারা ভারতের সমর্থন ছাড়া ক্ষমতায় থাকা অসম্ভব ভেবেছিল। ফলে ভারতের সমর্থনটাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ধারক বলে ভেবে নিয়েছিল।  এমনকি পরখও করে নাই।  এমনকি সেই অভ্যাসে পরের ২০১৮ সালেও ভারত এই সরকারকেই সমর্থন দিক, এটা চাইতে গিয়েছিল।  কিন্তু ‘জ্ঞানী’ দিগগজ ভারতীয়রা চিন্তায় পড়ে যায় যে, বাংলাদেশে যে সরকারের পাবলিক রেটিং-ই নেই সেই ব্যক্তি আবার পরের নির্বাচনে জিতে আসবেন কী করে? এই চিন্তা করে তারা বাংলাদেশের অনুরোধ রাখেনি। ঘটনা হল, ভারতের  গোয়েন্দা বিভাগ খুবই দক্ষ তো তাই  তারা বুঝতেই পারেনি যে, নিশীথ ভোটের সাথে রেটিংয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।

    সরকার তাই ২০১৯ সালে নিশীথ ভোটে বিজয়ী হয়ে শুরু থেকেই ভারতনির্ভরতা উপেক্ষা করে চীনের দিকে আরো ঘনিষ্ঠতার নীতি নিয়েছিল। যেগুলো এতদিন সেই ২০১৪ সাল থেকে ভারতের ধমকানি আর  বড়ভাই-ইচ্ছায় কেবল মাত্র যেসব চীনা প্রকল্প ভারত এলাও করেছে কেবল তার মধ্যে সরকারকে সীমাবধ থাকতে হত। সোনাদিয়া ফেলে পায়রা নিতে বললে তা যতই গলার কাটা কীংবা অকেজো হোক তাই নিতে হয়েছে।  গত নির্বাচনের পর থেকে এটাই বিরাট পরিবর্তন গয়ে সামনে আসতেছে, ক্রমশ ।   তাই হবার কথা কোন না কোন ইস্যুকে কেন্দ্র করে চীনের সাথে সম্পর্ক সবার উপরে প্রভাবশালী হয়ে হাজির হবেই।  বিনা অর্থনৈতিক সক্ষমতার ভারত আর কত ফলস মাতব্বরি চালাবে! ‘সামআপ’ করে বললে, বাংলাদেশে কেউ ক্ষমতায় থাকতে হলে তাকে ভারতের সমর্থন পেতেই হবে – এটা এখন একেবারেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। আর তাতেই মূলত ভারতের কপাল পুড়েছে!  তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গত চার বছরের নীতির পরোক্ষ কারণে মূলত এই অবস্থাটা তৈরি হয়েছে। আর তাই এবার নির্বাচনের পর থেকে শেখ হাসিনার সাহস করে চীনের পক্ষে ও সাথে দাঁড়ানো – এবং এটা কার্যকর আছে।।

    আবার হাসিনা নিজে নিজেই একটু কনজারভেটিভ থেকেই ইন্ডিয়া নিরভরতাওহীন থাকতে চেয়েছেন।  এর মানে হল, ভারতকে এতিম করে দেয়া নয় বা যা আগে দিয়েছেন, তা কেড়ে নেয়া নয়। কিন্তু ভারতকে  আর নতুন কমিটমেন্ট দেয়া হবে না, কোনো নতুন নির্ভরতার সম্পর্ক হওয়ার কথা না। কিন্তু এটা ভারতকে মানানো – এটাই হাসিনার সবচেয়ে বড় অস্বস্তি।  মোমেনকে টুঙ্গিপাড়া পাঠিয়ে খুবই গুরুত্ব দিয়ে স্পষ্ট করে  – ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রক্তের সম্পর্ক। আর চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক” – একথা বলার পরেও  কিন্তু লাভ হচ্ছে না। বান্দরকে একবার মাথায় তুললে এমন বিপদই হয়!
    আর এর ফাঁকে, চীন নিজেকে বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ক এবং বিশেষত এপর্যন্ত নেয়া বিভিন্ন প্রকল্প ইতোমধ্যে রিভিউ করে নিয়েছে। তাই আবার নতুন অবকাঠামো ঋণ দিতে চীন রেডি। সাথে এবার চীন কিছু হোমওয়ার্কও করে এসেছে।

    নতুন করে তিস্তা প্রসঙ্গঃ
    আগেই বলেছি ভারত যে বাংলাদেশকে তিস্তার কোনো কিছুই দেবে না- সেটি ২০০৯ সালের আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। পানি টেনে নিয়ে গিয়ে যেখানে ভারতের আর নতুন করে কিছুই করার নাই; যা নেয়ার তা সব করা হয়ে গিয়েছিল। সেখানে আর কোনো দিন ভারতকে হাত লাগাতে হবে না। তবু প্রণব মুখার্জি তিস্তা চুক্তি করবেন বলে বাংলাদেশকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এটাই হল সেই ঠান্ডা মাথার ফ্রডারি। তিনি চেয়েছিলেন হাসিনা সরকারের সাথে একটা চুক্তি সই করতে যার কোনো বাস্তবায়ন মূলত ভারত কোনো দিন করবে না। মমতা দোষ দেবেন কেন্দ্রকে আর কেন্দ্র দোষ দেবে মমতাকে- এভাবেই পার করে দেয়া হবে সময়।

    এ কারণে ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের নির্ধারিত ঢাকা সফরের তিন দিন আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব কলকাতায় সফরে গিয়েছিলেন। গিয়ে মমতাকে জানান, তিনি যেন কোনো আপত্তি না তোলেন তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে। কারণ তাকে বাংলাদেশকে ‘ত কোন পানি দিতে হবে না’। কিন্তু মমতা বলেন, এই অসততার চুক্তি করতে তিনি মনমোহনের সাথে বাংলাদেশে যাবেন না। বেকে বসেন, এমন কাজে তিনি সম্পৃক্ত হতে অপারগতা জানান। আর সেখান থেকেই সব দায় মমতার উপরে চাপিয়ে কংগ্রেস সরকার দায় সারে চলছে কংগ্রেস, বিজেপি সকলেই। আর এদিকে আমাদের গওহর সাহেব পন্ডিত মানুষ গভীর আস্থার সাথে চুক্তিটা ধরে বসে আছেন – আয়েগা কোন এক ছোটা প্রণব মুখার্জি আয়েগা, পানি লায়েগা!  উনি আজও বুঝতেই পারলেন না পানি দেওয়া আর একটা পানিচুক্তির কাগজ পুরাই সম্পর্ক হীন বিষয়। তিনি কোন ফ্রডের পাল্লায় পরেছেন সেটা আজও বুঝতে পেরেছেন মনে হয় না। যদিও পারা না পারায় আর কিইবা এসে যায়!  রের চেয়ে নেত্রীই ভাল – একশনে বিশ্বাসী। তাই নতুন তিস্তা প্রকল্পের দিকে রওনা দিয়েছেন।  অতএব হাসিনা নতুন তিস্তা প্রকল্পে আবার ভারতকেও ওয়াকেবহাল রাখবেন   শ্রিংলার এই মহান খায়েস?  – না না – এটা নেত্রিকে খুবই আন্ডার এস্টিমেট করা হবে। তাঁর দোষ আছে, ক্ষমতার জন্য যেকোন কিছু করতে চাওয়া আছে, বন্ধুত্ব কী স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের লমছোম কথা আছে – কথা সত্য। কিন্তু কে নিজেকে দেখতে চায় যে অন্যেরা তার মাথায় কাঠাল রেখে খাচ্ছে!

    চীন এ বিষয়ে ভারত-বাংলাদেশে কী ফ্রড করেছে তার পুরোটাই ওয়াকিবহাল। তাই সে বাংলাদেশকে এই প্রকল্প সাহায্য দিয়ে হাত বাড়িয়েছে। আর স্বভাবতই এই প্রকল্প বাই ডিফল্ট ভারতবিরোধী এবং বাংলাদেশে জনপ্রিয় হবে আর ভারতীয় চাতুর্যকে আরো ভালো করে সামনে তুলে ধরবে। এগুলোই চীনের হোমওয়ার্ক বা পুরনো প্রকল্প রিভিউ। অর্থাৎ এভাবে প্রায় আরো নয়টা নতুন প্রকল্প নিয়ে চীন আগাচ্ছে যাদের মোট মূল্য ৬.৪ বিলিয়ন ডলার। যদিও একটা বড় খচখচে কাঁটা আছে।  নতুন তিস্তা প্রকল্প পরিবেশগত দিক থেকে জবরদস্তি নয় সত্যিকারের  গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এখনও স্বচ্ছ নয়। যদিও প্রকল্পের ডিটেইল করতেই এখনও অনেক কিছুই বাকি।
    অতএব, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনরা ‘উন্নয়ন-ই’ দিতে গেলে, নিজের কর্মীদের খাওয়াতে গেলে, চীনই তাদের একমাত্র ভরসা। সেটা কিন্তু ফিকসড হয়ে আছে।

    চীনকে নতুন করে স্থানীয় মিডিয়ায় মুল্যায়নঃ
    ঢাকার কোনো কোনো রিপোর্টে চীনের এই ‘নতুনভাবে’ হাজির হওয়াটাকে চীনের বাংলাদেশে শুধু অর্থনীতির ক্ষেত্রে নয়, রাজনীতির ক্ষেত্রেও জড়িয়ে পড়া বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এটা একেবারেই ওভার-রিডিং বলে মনে করার শক্ত কারণ আছে। এ ছাড়া অনেকে আবার এখানে অনেকদিন আগে থেকেই ভারতের প্রভাব এবং তা ও আবার একচেটিয়া প্রভাব ছিল বলে অনুমান করে কথা বলছেন দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের অনুমানও ভিত্তিহীন। এরা চায়না কনটেনমেন্ট প্রোগ্রাম সম্পর্কে জানেনই না সম্ভবত। আর কনসালটেন্ট যারা জানেন তারা কোন সুখে নিজের দালালি জীবনের কথা শেয়ার করবেন?  ভারতের প্রভাব কোথা থেকে আসবে? ভারতের প্রভাব মানে সেটা তো অবশ্যই অর্থনৈতিক সক্ষমতা। তো ভারত কবে অর্থনৈতিক শক্তি ছিল, যার অর্থনীতি নুন আনতে পান্তা দুরায়? যারা এসব কথা বলেতারা কী বলছে নিজেরা দুদন্ড চিন্তা করে বলে না।
    এক কথায় বললে, প্রথমত চীনের বাংলাদেশে ‘রাজনৈতিকভাবে জড়িয়ে পড়া’ কথাটার কোনো ভিত্তিই নেই। এ জন্য যে, চীনের রাজনৈতিক ভূমিকা মানে কী- কোন টাইপের রাজনীতির প্রতি ফেভার দেখানো? যেমন আমেরিকান টাইপ হলে এর মানে হলো হিউম্যান রাইটস সুরক্ষা করতে হবে এবং প্লুরালিজম চর্চা করতে হবে- এরকম? কথা এরকম চিন্তা করে বলতে হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে চীনের এখনো এমন কোনো “বিশেষ পছন্দের’ টাইপের রাজনীতি নেই। মূল কারণ, হিউম্যান রাইটস এখনো কমিউনিস্টদের চিন্তার সাথে কম্পিটিবল বলে মনে করা হয় না।
    তবে কি চীনের রাজনীতি মানে আমাদের দেশে সুনির্দিষ্ট কোনো দলের প্রতি আগ্রহ?  না অবশ্যই না।  সে সুযোগও নেই। কারণ যে চীন গ্লোবাল নেতা হতে চায়, সে কেবল একটা নির্দিষ্ট দলের পক্ষ নিয়ে দাঁড়াতে পারে না। এটা আত্মঘাতী কারণ, চীনকে সবার নেতা হতে হবে।

    আর ওদিকে আগের আমেরিকার নেতৃত্বের জমানাতেও এশিয়ায় ভারতের কখনো একচেটিয়া প্রভাব ছিল বলে অনুমান- এসব কথা অমূলক। খুব সম্ভবত তারা ভারতের একালে চীন ঠেকানোর ‘ক্ষেপ’ নেয়ার কথা মনে রেখে এগুলো বলছেন।  কিন্তু সেগুলো অপ্রাসঙ্গিক ও অকার্যকর হয়ে গেছে। নিজেরাই প্রমাণিত হয়ে গেছে বলে, সেই ২০১৭ সালে। কাজেই আমেরিকার কাছে ভারতের আর কোন গুরুত্ব নাই।  ভারতও সেই আগের মতোই গুরুত্বহীন আম-ভারত হয়ে গেছে। কারণ, এতে আমেরিকার কড়া এক আক্কেল হয়ে গেছে। কারণ এর সুযোগে বাংলাদেশ থেকে আমেরিকাকেই বাইরে রেখে সব স্বার্থলাভের বাইরে রেখে ঢাকা-দিল্লি রুল করে গেছে। এছাড়াও এদিকে আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতাও নষ্ট হয়েছে প্রচুর। টিআইবি, আর সুলতানা কামালরা মিলে এখন এন্টি-ইন্ডিয়ান হয়েও সুবিধা করতে পারছে না। তারা এখন অভিযোগ করেছেন সবাই নাকি কয়লা বিদ্যুৎ করে পরিবেশ নষ্ট করছেন। তা ভালো। কিন্তু ভাসুরের নাম নেন না কেন? দোষ ধরেন চীন আর ভারতের। মাতারবাড়িতে জাপান আর তার সাথে আড়ালে আমেরিকা কী নাই? তারাও কী কয়লা বিদ্যুৎ করছে না? কাকে এগুলো মিথ্যা বলেন? কাজেই, এতে হবে না। ফ্রেশ সৎ ইমেজ লাগবে।

    তবে আগামীতে মানে নভেম্বরের পরে এবং জানুয়ারি থেকে আমেরিকা আবার নিজের গ্লোবাল ভূমিকা ফিরে পেতে চেষ্টা করবে। তা কতটা ফিরে পাবে তা দেখতে হবে। তবে আগামী দিনে ভারতকে আর আমেরিকার বগলে দেখা যাবে না এটা মোটামুটি নিশ্চিত।  আর যদি আবার এই ভুল করে তবে এবার প্রকাশ্যে মার খেতে হবে আমেরিকাকে!

    আর ভারত? বাংলাদেশে ভারতের দিন শুকিয়ে গেল। মনে হচ্ছে সরকারের মোহ কেটে গেছে। তাহলে কি একটা যুগ, একটা পর্বের সমাপ্তি ঘটল? আমাদের আক্কেল কী হয়েছে?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২২ আগষ্ট ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “বাংলাদেশ কি এবার সচেতন হতে পারবে?” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • কোল্ড ওয়ার ‘টু’ বলে কিছু ঘটবে না

    কোল্ড ওয়ার ‘টু’ বলে কিছু ঘটবে না

    গৌতম দাস

    ১৭ আগস্ট ২০২০, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-39k

     

    কোল্ড ওয়ার ‘টু’ সিনেমা

    ‘কোল্ড ওয়ার’ [COLD WAR]; যার সরাসরি আক্ষরিক বাংলা কেউ কেউ করেন “ঠাণ্ডা যুদ্ধ”। তবে তাতে এর অর্থ খুব একটা পরিষ্কার হয় না। এছাড়াও আরেকটা বাংলা অনেকে করেন – “স্নায়ুযুদ্ধ”। নার্ভে লাগে এমন টেনশন অর্থে নার্ভ বা স্নায়ুতে চাপ ফেলে যে যুদ্ধ। কিন্তু কোনোটাই অর্থ ঠিক পরিষ্কার করে না। তবে কেন কোল্ড ওয়ার নাম – এর ব্যাখ্যাটা একটা পাওয়া যায় যে, ‘যুদ্ধ’ বলতে আমরা যা বুঝি তাকে যদি ‘হট ওয়ার’ বলে বুঝি তবে যেটা ঠিক যুদ্ধ না হলেও যুদ্ধের মতই একটা রেষারেষি অস্থিরতা আর সব সময়ের জন্য লেগে থাকা টেনশন – এ অবস্থার নাম দেয়া যায় ‘কোল্ড ওয়ার’। এই হলো সূত্র। আর কোল্ড ওয়ারের মূল দুই বৈশিষ্ট্য হল যখন দুই দেশের মধ্যে ঠিক যুদ্ধ পরিস্থিতি বা সেনা সমাবেশ নয়, কিন্তু যুদ্ধকালীন সময়ের মত একটা বিরাট টেনশন সব সময় সক্রিয় থাকে। এছাড়া সব সময়ই একপক্ষের কোন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অপরপক্ষ এক পাল্টা পদক্ষেপের কথা চিন্তা করতেই আছে – এমন অবস্থা। তবে একটা কথা মনে থাকতে হবে যে, কোল্ড ওয়ার বলতে অবশ্যই আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার ব্যাপার হিসাবেই তা কেবল হাজির হয়েছিল। আর এই প্রতিযোগিতা মূলত পরাশক্তিগত লড়াই, গ্লোবাল ইকোনমিক ব্যবস্থা বা গ্লোবাল অর্ডারের নেতা হবার লডাই নয়। কারণ গ্লোবাল বাণিজ্যের কী হবে, চলবে কী করে কি ব্যবস্থায় এটা সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সারা কমিউনিস্ট জগতের কারই ভাববার এজেন্ডা নয় বা কমিউনিস্ট রাজনীতিই নয়।  কাজেই সাকথায় কোল্ড ওয়ার মূলত পরাশক্তিগত – গ্লোবাল ক্ষমতা বাড়ানোও প্রভাব বাড়ানোর লড়াই যা অর্থনীতিগত কোন কিছুই নয়।

    কেন এরকম?
    সোভিয়েত ইউনিয়নে লেনিনের রুশ কমিউনিস্ট বিপ্লব হয়েছিল ১৯১৭ সালে। এ সময়টা ছিল এমনই যখন সে দেশে কী হচ্ছে সে দিকে মনোযোগ দেয়ার অবস্থায় ছিল না ইউরোপের কেউ; মানে ইউরোপের কলোনি দখলদার মালিকদের কারো। কারণ এর চেয়েও বড় স্বার্থ নিয়ে তারা সবাই ডুবে ছিলেন। সেটা হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। মাতব্বরেরা সবাই যুদ্ধে যার যার স্বার্থ নিয়ে একেবারেই ডুবে ছিল, যে যুদ্ধ চলেছিল ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সময়কালজুড়ে। এই যুদ্ধে জার্মানিকে সামলাতেই ইউরোপের বাকিরা কঠিন হিমশিম অবস্থায় পড়েছিল। আর এ সুযোগ নিয়ে সবাব অলক্ষ্যে লেনিনের বিপ্লব বা ক্ষমতা দখল সম্পন্ন হয়ে যায়। সেই থেকে আলাদা রাজনৈতিক ব্যবস্থার দেশ বলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউরোপের ঘটনাবলি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই কাটিয়ে দিয়েছিল। এরপর ১৯৩২ সাল থেকে জার্মানিতে হিটলারের উত্থান আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) শুরু, এ দুই ঘটনার উদয় হওয়া পর্যন্ত ইউরোপের কেউ তাকিয়ে দেখার ফুরসত পাননি যে, সোভিয়েত ইউনিয়নে ঠিক কী ঘটেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে সোভিয়েত আর (হিটলারের) জার্মানির মধ্যে অনাক্রমণ চুক্তি থাকলেও হিটলার সোভিয়েত আক্রমণ করেছিলেন। তখনো আমেরিকা যুদ্ধে কোনো পক্ষেই অংশ নেয়নি। ফলে হিটলারবিরোধী অ্যালায়েন্স বা মিত্রবাহিনী যুদ্ধজোট জন্মের তখনো কোনো খবর ছিল না। যুদ্ধ শুরুর প্রায় তিন বছর পরে ১৯৪২ সালের জানুয়ারি থেকে সোভিয়েতরা আমেরিকার সাথে একই জোট পক্ষ হয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল ঠিকই।  কিন্তু ততদিনে হিটলারের হাতে সোভিয়েতের ক্ষয়ক্ষতি  হয়ে গিয়েছিল অনেক। তবু ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি মিত্রবাহিনী গঠনের শর্তাবলিতে স্বাক্ষর দিতে সোভিয়েত রাশিয়া ব্যাপারটাকে বিরাট সুযোগ হিসাবে নিয়েছিল। পরের চার বছরে ১৯৪৫ সালের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে এলে এবার সারা পশ্চিমের এই প্রথম নজরে আসে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি। সব কিছু সরকারি মালিকানায় আনতে হবে – আমেরিকা ও ইউরোপের সব রাষ্ট্রের কাছে এটাই মূলত ভীতি আর এটা একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে বলে এটাকে তারা হুমকিরূপে দেখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমের এসব আপত্তি  প্রকাশ্য না এনে বরং তারা বাইরে বলার সময়  বলত, কমিউনিস্ট দেশে নাগরিক অধিকার না দেয়া, মানুষকে কথা বলতে না দেয়া, দমিয়ে রাখা, ন্যূনতম স্বাধীনতা হরণ ইত্যাদি চাপের অভিযোগ তুলত।
    এমনিতেই অবশ্য ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে আমেরিকার সাথে সোভিয়েতের যুদ্ধজোটের সময়ের সম্পর্ক ঢিলা হতে শুরু করেছিল। এ ছাড়া প্রথম মনোমালিন্য দেখা দেয় জার্মানি ভাগ করা নিয়ে। এ ছাড়া যুদ্ধ শেষ হলে ইউরোপজুড়ে যুদ্ধে ভেঙে পড়া  অর্থনীতি – অবকাঠামো আর শিল্প-প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি পুনর্বাসনের জন্য আমেরিকা এক বিশাল, খুবই কম সুদের অবকাঠামো ঋণ প্রকল্প নিয়েছিল, যা ‘মার্শাল প্ল্যান’ নামে পরিচিত ছিল। আমরা বলতে পারি, বিশ্বব্যাংক জন্মের পরে কাজ শুরু করে প্রথম হাত পাকিয়েছিল এই মার্শাল প্ল্যান বাস্তবায়ন করেই। এরপর ষাটের দশকের শুরুর দিকে ইউরোপে অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রয়োজন পূরণ হয়ে গেলে তখন ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এশিয়ার দিকে মনোযোগ দিয়েছিল। কিন্তু মূল কথা হল,  মার্শাল প্ল্যানের ব্যাপারে স্টালিনের আপত্তি ও অস্বস্তি ছিল। স্বভাবতই অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগে যাওয়া মানেই ঐ সব ইউরোপীয় দেশে আমেরিকান প্রভাব বাড়বে, এটাই ছিল তার অস্বস্তির কারণ। কিন্তু এতে স্টালিনের বাস্তবে কিছুই করার ছিল না। কারণ যুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, রেল বা কলকারখানা ইত্যাদি নিয়ে ইউরোপের বসে থাকা বা ধুঁকে মরা তো চলতে পারে না। আবার কমরেড স্টালিনের মুরোদও ছিল না যে নামেমাত্র সার্ভিস চার্জের বিনিময়ে কোনো অবকাঠামো ঋণ দেয়। আবার ঋণ দেয়া তাদের চোখে ‘পুঁজিবাদী কারবার।’ ফলে তা কমিউনিস্টদের দৃষ্টিতে, পাপকাজ। এ অবস্থাটা ছিল ‘মিয়াবিবি রাজি’র মত। ঋণদাতা আমেরিকা আর গ্রহীতা ইউরোপ রাজি। কাজেই তা ঠেকাবে কে?
    ওদিকে ইরানের তেল তোলার কন্ট্রাক্ট পাওয়ার জন্য সোভিয়েতের সাথে আমেরিকার নেতৃত্বে ইউরোপের জোটের প্রতিযোগিতা নিয়ে টেনশনও শুরু হয়ে গিয়েছিল।
    কাজেই আমেরিকার সাথে স্টালিনের টেনশন বেড়েই চলছিল। এর মধ্যেই ১২ মার্চ ১৯৪৭ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান তার ‘ট্রুম্যান ডকট্রিন’ আমেরিকার কংগ্রেসে ঘোষণা করেছিলেন। এর সার কথা হল, ‘কমিউনিজম ঠেকানো [containment] – কমিউনিজম’ ঠেকাতে হবে। ট্রুম্যান বললেন, কোনো রাষ্ট্র কমিউনিজমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে চাইলে তিনি তাদের সাহায্য করবেন। এ কাজই তিনি ১৯৫২ সাল পর্যন্ত চালিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে এই প্রথম টানা ২০ বছর পরে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার ক্ষমতায় আসেন। তারা আরো সবলভাবে ‘কমিউনিজম ঠেকানো’ নীতি কার্যকর করে গেছেন। আর তখন থেকেই সোভিয়েত-আমেরিকান ঠাণ্ডা যুদ্ধ আরো প্রবলভাবে জেগে উঠেছিল। ১৯৯১-তে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তা বজায় ছিল। তার মূল কারণ হল, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্রের। আর সেখান থেকেই ঘটনা এবার তৃতীয় মাত্রায় উন্নীত হয়।
    আসলে, ততদিনে এ দুই রাষ্ট্রের হাতে দুনিয়াকে কয়েকবার নির্মূল করে দিতে সক্ষম, এমন পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ হয়ে গেছিল।

    কিন্তু তাতে আগে যেমন মনে হত  নানান কিসিমের অস্ত্রের  মজুদ হাতে আসা মানেই নিরাপত্তা বোধ জগত। কিন্তু তখন এই প্রথম মনে হতে লাগলে যে না অস্ত্রই নিরাপত্তাহীনতার কারণ। কারণ দুপক্ষই এই ভেবে  প্রচণ্ড মাত্রায় ভীত হয়ে পড়েছিল যে, কোনো ভুলচুক হয়ে গেলে বা ছোট ঘটনায় যথেষ্ট গুরুত্ব না দেয়ার কারণে একপক্ষ যদি অপরের ওপর বোমা ফেলে, তা হলে কী পরিণত হবে? এতে এবার কোল্ড ওয়ার শব্দটার উপর তৃতীয় আরেক বৈশিষ্ট্য আরোপ করেছিল। যুদ্ধ লেগে যায় কি না এ নিয়ে সর্বক্ষণ টেনশন ছিল আগের এই বৈশিষ্ট্ তো ছিলই। আর এখন কে কার মাথায় পারমাণবিক বোমা ফেলে দেয়; এমনকি ভুলেও যদি হয়ে যায়? সেই দুশ্চিন্তাই সেই তৃতীয় বৈশিষ্ট্য।
    একটা কথা বলে রাখি। স্টালিন বা পরবর্তীকালের সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধানরা যে নীতি অনুসরণ করে গেছেন তা হলো, মূলত আমেরিকা থেকে কোন অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং কোন ব্যবসায়িক পুঁজি (এফডিআই) নেয়া যাবে না এবং কেউ নিলে এর বিরোধিতা করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো কলোনি লুটেরাদের হাতে সব ফোকলা হয়ে যাওয়া আমাদের মত দেশের সম্পদ হারিয়ে যাওয়ার ফলে অবকাঠামোতে বিনিয়োগ পুঁজি পাওয়া এসব দেশের জন্য মৌলিক প্রয়োজন। অথচ এটাই সোভিয়েত বা কমিউনিষ্টরা মেনে নিতে চায়নি। তাদের পয়েন্ট হল, এতে আমাদের মতো দেশে আমেরিকান প্রভাব বেড়ে যাবে, তাই তারা এতে একমত নন। কিন্তু  তাহলে আমাদের পুঁজি পাওয়ার বিকল্প উপায় কী? না, এ নিয়ে সোভিয়েত নায়কদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না।
    কিন্তু এর একটা মজার পরিণতি ঘটে গিয়েছিল সত্তরের দশকে। আমাদের সবার লিডার হয়ে এখন সামনে হাজির হতে চাইছে চীন। এর আনুষ্ঠানিক শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সাল থেকে। যখন চীন আমেরিকান পুঁজি গ্রহণের দুয়ার খুলে দিয়েছিল। তবে এর অনেক আগে চীনকে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হয়েছিল, ১৯৫৮ সালেই। সোভিয়েত ইউনিয়নও ‘আরেক কিসিমের সাম্রাজ্যবাদী’ দেশ বলে চীন অভিযোগ তুলেছিল; যার নাম দিয়েছিল ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ’।
    আমরা আমাদের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এরপর পুরো আশির দশকটাতেই সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকারের আয়-ইনকাম রাজস্ব কমতে শুরু করেছিল, বিশেষ করে কারখানা উৎপাদন যেখানে মালিকানা মাত্রই সরকারি ছিল। মূলত উৎপাদনে অদক্ষতার দরুন এটা ভেঙে পড়া শুরু করেছিল। আর এই ধাক্কা সামলাতে না পেরে অন্য সব কিছু মিলিয়ে ফেল করাতে ১৯৯১ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। রাশিয়া বাদে আরো ১৫টি আলাদা রাষ্ট্রে সোভিয়েত মহারাষ্ট্র টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
    সবচেয়ে বড় কথা, কোল্ড ওয়ার জিনিসটারও পরিসমাপ্তি ঘটেছিল এতে।

    কোল্ড ওয়ার ২.০
    সেকালে কোল্ড ওয়ারের ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা একালে এখানে আবার বয়ান করতে নিশ্চয় বসিনি। তাহলে? অন্তত গত ছয় মাস ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উঠতে বসতে চীন-ব্যাশিং বা চীনকে গুঁতা দেয়া একবারে চরমে নিয়ে গেছেন। এ ছাড়া ট্রাম্পের পুরো চার বছর (২০১৭-২০) চীন বিরোধিতার বাণিজ্যযুদ্ধ সারা সময়ই কমবেশি ছিল। এমনকি এ বছরের শুধু চীন-আমেরিকার আপসী বাণিজ্যচুক্তির প্রথম ভাগও দু’পক্ষ স্বাক্ষর করে রেখেছে। কিন্তু আর কিছুই ডোনাল্ড ট্রাম্প করবেন না নির্বাচন পর্যন্ত। কারণ তার বিশ্বাস একমাত্র চরম ও কড়া চীনা ব্যাশিং করলেই তিনি ভোটে হেরে যাওয়ার অবস্থার মুখে, একমাত্র সম্ভাবনা হিসেবে পরিস্থিতি নিজের দিকে ঘোরাতে পারেন।
    সে যাই হোক, নির্বাচনে জয়-পরাজয় তো একটা হবেই। কিন্তু এর আগের যে ভাষ্যটা ক্রমেই প্রবল হচ্ছে সেটা হল, কোল্ড ওয়ার আবার নাকি ফিরে আসছে। দেশের-বিদেশের মিডিয়াতেও প্রায়ই এমন লেখা দেখা যায়। অনেক সিরিয়াস লেখক বা মিডিয়া এমন ভুল করতেছেন।  ইতোমধ্যে ২০১৬ সালে কোল্ড ওয়ার টু – এই নামে একটা প্রপাগান্ডা সিনেমাও হয়ে গেছে। তাই বুঝুক না বুঝুক পেটি মধ্যবিত্ত জোশও একটা তৈরি হয়েছে।  ্বসবের মুল বক্তব্যটা হল, যেহেতু  চীন-আমেরিকার মধ্যকার এবারের হবু টেনশন-সঙ্ঘাত ভালই চড়ছে দেখা যাচ্ছে তাই এর কোন বৈশিষ্ট লক্ষ্মণ বিবেচনা ছাড়াই নিজের আতলামি প্রকাশের জন্য এটা বলা শুরু করে দিয়েছে  যে কোল্ড ওয়ার ২.০ আসতেছে।

    এনিয়ে আমার প্রথম মন্তব্য হল, আমাদের পরিচিত একমাত্র দুনিয়াটাতে আবার নতুন করে কখনো কোথাও কারো সাথে কারো আর কোল্ড ওয়ার সম্পর্ক তৈরি হবে না, তা দেখা যাবে না।

    কাজেই যারাই কোল্ড ওয়ারের কথা আবার তুলছেন, তারা সময় ও পরিবেশ মিলিয়ে যাচাই করে না দেখেই মুখস্থের মতো এসব কথা বলছেন। তাদের উচিত হবে, কেন সোভিয়েত-আমেরিকা একটা কোল্ড ওয়ার সম্পর্কে জড়াতে পেরেছিল, তার পেছনের অবজেকটিভ বা বাস্তব শর্ত কী ছিল আগে তা খুঁজে দেখা।
    কথাটা সরাসরি বললে, সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকার মধ্যে কোনো লেনদেন-বাণিজ্য বিনিময় ছিল না। এটাই হল সবচেয়ে নির্ধারক বাস্তবতা। এ কারণে কোল্ড ওয়ারের মতো চরম বিরোধাত্মক সম্পর্কে যাওয়ার বাস্তব শর্ত সেকালে তৈরী ছিল, যা এখন আর নেই। আর কখনো ফিরেও আসবে না। এর বিপরীতে আজকের পুতিনের রাশিয়া আর ভেঙে তৈরি হওয়া ১৫টি রাষ্ট্রসহ সব রাষ্ট্রই এখন একই গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার সদস্য। মানে একই আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের সদস্য।  যখন লেনদেন-বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল না বলেই  এক রাষ্ট্র অপরের রাজধানীতে বোমা ফেলে আসার কথা অবলীলায় ভাবা তখন সম্ভব ছিল। কারণ পরস্পরের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিল না বলেই অপরের মাথায় বোমা  নিজের ক্ষতিগ্রস্থ হবার সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু আজ আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট চীনের বাজারে বিনিয়োগ করে ছেয়ে আছে। তাই চীনের মাথায় বোমা মারতে হলে এর আগে য়ামেরিকাকেই অনেক কিছু ভাবতে হবে। নিজের স্বার্থের মাথায় কে বোমা ফেলে?কারণ আজ সেটা নিজ দেশের বা স্বার্থের প্রতিষ্ঠানের ওপরই বোমা মারা হয়ে যেতে পারে। কাজেই আজকের সম্পর্ক নতুন করে অন্য কিছু একটা হলেও হতে পারে; কিন্তু পুরনো কোল্ড ওয়ার আর হবে না।

    এছাড়াও ফারাক আরও অনেক আছে। সোভিয়েত বনাম আমেরিকার বিরোধ ছিল পরাশক্তিগত ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রতিযোগিতা। কিন্তু আজ চীন-আমেইরিকার বিরোধ গ্লোবাল অর্ডারের নেতৃত্বের যেখানে আমেরিকা নিজের গবেষণা থেকে জানে সে হারু পার্টি। কাজেই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে টেনশন দেখলেই সেটাকে কোল্ড ওয়ার বলে দিজ্ঞজি বুঝ তুলে কথা বলতে হবে,  এটা কোন ভাল কথা না।

    দুনিয়াতে কোল্ড ওয়ার আর ফিরবে না। এখন চাল-ডাল মিশে যাওয়ার মত অবস্থায় আমরা যখন একবার তা মিশিয়ে দিলে যেমন তা আবার চাল-ডাল আলাদা করা কঠিন, সেরকম আমরা সবাই গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থার অধীনে চলে গেছি বলে চাইলেই অনেক কিছু করা যাবে না। আবার পুজিঁ-পণ্য শ সবকিছু ভাষা পর্যন্ত লেনদেন বানিজ্য বিনিময়ে বন্ধের জায়গায় ফিরে যেতে পারব না। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্প বলছেন, তিনি সম্পর্ক ভালো করতে চীনের দিকে আগাবেন না। কিন্তু নির্বাচনের পরে ট্রাম্পই জিতে গেলে অথবা যেই জিতুক, আবার চীনের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক হওয়া খুবই সম্ভব। এই যে আগে-পিছে করার সুযোগ নিতে পারি এখন, এটা পুরনো কোল্ড ওয়ারের আমলে সম্ভবই ছিল না। কাজেই না-বুঝ অবুঝ কোল্ড ওয়ার নিয়ে কথা বলতে সাবধানতা   নিতেই হবে। যা মনে চায় বলা যাবে না, ভেবেচিন্তে বলতে হবে। কাজেই আমরা আশা করব সকলে এবিষয়ে দায়ীত্ব নিয়ে কথা বলবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৫ আগষ্ট ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “কোল্ড ওয়ার ‘টু’ হবে কি?” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • জাতিগিরির ‘স্বদেশী জাগরণ’ অচল ও পরাজিত

    জাতিগিরির ‘স্বদেশী জাগরণ’ অচল ও পরাজিত

    গৌতম দাস

    ১০ আগস্ট ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-38z

     

    Swadeshi Jagran Manch – स्वदेशी जागरण मंच, From Facebook

    প্রসঙ্গটা ভারত থেকে শুরু করছি এমন হলেও ব্যাপারটা কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এমন চিন্তার ফেনোমেনা আমাদের মত সব দেশেই কম-বেশি আছে। তাই এর প্রভাব সবখানে। কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীরাও এনিয়ে বিভ্রান্ত থাকে, তাই প্রচ্ছন্নে সমর্থনও করে। ‘জাতি’ বা ‘স্বদেশীপনা’ ইত্যাদি ধরণের শব্দ দিয়ে এরা নিজেদের তুলে ধরে। যদিও এগুলা একেবারেই ভুল চিন্তা। কী প্রেক্ষিতে এমন চিন্তা দুনিয়ায় উদয় হয়েছিল তা ভুলে বা আমল না করেই নকল বা ‘আউট অব কনটেক্সট’  এক চিন্তাধারা এটা। বিশেষ করে যেখানে দেশ বা রাষ্ট্র বলতেই মনে খামোখা ‘জাতি’ বলে ধারণা হাজির হয়। জাতি ধারণাটাই fetish বা ভুতুড়ে অস্পষ্ট চিন্তা। কিন্তু তাসত্বেও  আবার পরিস্কার থাকার দরকার আছে যে, ‘জনগোষ্ঠীগত কমন স্বার্থ’ অথবা ‘জনস্বার্থ’ বা ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট’- এসব ধারণাগুলো সঠিক,  ফলে এগুলো টিকে থাকবে। কারণ এধারণাগুলোর সাথে রাষ্ট্রে কোন ‘জাতি’ ধারণা থাকা না থাকার কোনো সম্পর্ক নেই, অনিবার্যও নয়।

    আসলে  কলোনি দখলবাজ ইউরোপের লুট করতে জাহাজ নিয়ে বেরিয়ে পরা ব্যবসায়ীরা এরা প্রতিদ্বন্দ্বি দেশের (যেমন ইংলিশের বিরুদ্ধে ফরাসি) দখলবাজদের বিরুদ্ধে নিজ নিজ দেশের কলোনি দখলবাজেরা এই জাতি ধারণা ছড়িয়েই  দেশের সবপক্ষের পুর্ণ সমর্থন যোগাড় করেছিল। এখানে বিদেশি বিরোধিতা খুবই মুখ্য জিনিষ। যেমন ফরাসিদের  বিরুদ্ধে ইংলিশ দখলবাজদের বিদেশিবিরোধিতা কথা তুলার তাগিদে যে তত্ব হাজির করেছিল এটাই জাতিবাদ বা জাতি ধারণার শুরু। এককথায়, অন্য (আমাদের মত দেশকে) কলোনিদখলকে সমর্থন আর এই অন্যায়কে দেশের ভিতর থেকে দ্বিধাহীন  সমর্থন আর সাফাই পাবার তত্ব হল জাতিতত্ব বা জাতি ধারণা। তাহলে দাঁড়ালো, জাতি ধারণা আবার কার্যকর পেতে হলে পুর্বশর্ত হল কলোনি ব্যবস্থা দুনিয়াই আবার চালু থাকতে বা করতে হবে। অথচ.১৯৪৫ সালের পরের কপিবাজেরা, এই  জাতিবাদীরা এটা কখনও খেয়াল করে দেখেনি।

    একারণেই বিজাতীয় বা বি-জাতির বিপরীতে জাতি ধারণা – সেটা পরবর্তিতে যতই অপ্রয়োজনীয় ও নেতি হলেও তা সেকালে মিথ্যা করে “নিজেদের” বলে একটা ধারণা হাজির করে টিকানো হয়েছিল। সেই সাথে, বিদেশী মানেই খারাপ, বিদেশের বিরুদ্ধে ‘আমরা’ অথবা ‘স্বদেশী’ ধরনের এক ধারণা হলো জাতি। এখান থেকেই স্বদেশী পণ্য ভালো, তা মোটা ভাত বা মোটা কাপড় হলেও ভালো ইত্যাদি বলে ভুয়া দাবি করা হয়।

    এ ছাড়াও ১৯৪৫ সালের পরের কলোনিমুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের ধারণা হচ্ছে, একটা “জাতিবোধ” ছাড়া “দেশ”, “রাজনীতি” বা “রাষ্ট্রের” কল্পনা অসম্ভব। অথচ এসব ভিত্তিহীন কথা। কাজেই একটা জাতিবোধ থাকতেই হবে আর সেই সাথে কথিত “জাতীয়” বা দেশীয় পণ্যের প্রতি ভালোবাসা আর বিদেশী পণ্যের প্রতি ঘৃণা, পারলে তা বর্জন; না হলেও অন্তত কম-ভালোবাসা থাকার ‘স্বদেশীপনা’ তো থাকতেই হবে! এগুলা জাতি ধারণার পক্ষে ভুয়া বয়ান!
    এখানে স্বদেশীপনা শব্দটা ব্যবহার করেছি নেতি ও ঠাট্টা অর্থে। অনেকটা ছেলেমিপনা, আদেখলাপনা বা পোলাপান শব্দের মত নেতিবাচক অর্থে। অর্থাৎ যাকে ‘স্বদেশী’ বলছি তা আসলে স্বদেশী বা দেশের জন্য ইতিবাচক নয়; সেটা বুঝাতে; আর আসলে তা নয় সেই হুঁশ আনার জন্যই এমন ব্যবহার।

    আলোচনার সমস্যাঃ
    এদিকে এ ধরনের আলোচনার সমস্যা হয় যেটা তা হল, ব্যাপারটা কী তা বুঝিয়ে বললেও এবং তা ভালই বুঝা গেলেও সেটা তত্ত্বগত ধারণার মত একটা দূরত্বেই থেকে যায়। তাই অবস্থা হয় – কথা সত্য কিন্তু মানতে পারব না- ধরনের। সেকারণে, আজ এখানে কোন তত্ব নয়, একেবারে বাস্তবে ঘটেছে, বাস্তব সমস্যা হিসেবে হাজির হয়েছে সেটা দেখিয়ে এখানে কথা বলে দেখাব যে, কথিত জাতিবোধের স্বদেশীপনা একটা ভুল ও অকার্যকর ধারণা। আর সেটা এখানে দেখাব ভারতের এখনকার বাস্তব সমস্যা বা উদাহরণের পরিপ্রেক্ষিতে।
    আরো আছে। যেমন সমস্যা হচ্ছে প্রায় সবাই স্বদেশীপনা শব্দের সাথে পরিচিত। ফলে ধারণাটা জানা আছে কিন্তু কেউ বাস্তবে একালের নিজ নিজ দেশে ধারণাটা পরখ করে দেখেনি। তবে একালে ধারণাটার সত্যতা না থাকলেও এর একটা প্রবল আবেগী দিক আছে; ভুয়া হলেও তা একটা আবেগী জোশ তুলতে পারে – যেমন ‘দেশের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া’ বা ‘কল্পিত বিদেশী বা শত্রুর বিরুদ্ধে এক হওয়া’ ধরনের; আর এটাই আমাদের মত দেশের রাজনীতিবিদেরা সবাই ব্যবহার করে গেছে এ পর্যন্ত করে চলেছে, আর সমানে ফায়দা তুলে গেছে। তাতে ধারণাটা সত্য না হলেও কোনো অসুবিধা হয়নি। যেমন ভারতে এমন আরেক চরম মিথ্যা আড়ালের শব্দ হল, “ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট”। আপনি সাংবাদিক আপনি জানেন কোন একটা কথা মিথ্যা। কিন্তু তবুও “ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট” এর নামে আপনি সেকথা সত্য বলে চালাচ্ছেন। এটা মূলত মিথ্যা বলে তা কোনভাবেই সাংবাদিকতাই নয় আপনি জানেন তবু আপনি তা সত্য বলে গ্রহণ করতে বলছেন!

    তাহলে মিথ্যা হলেও তা ব্যবহারের সুযোগ কেন পাওয়া যায়ঃ
    কেন এমন সুযোগ পাওয়া যায়? কারণ দুনিয়ার শুরুর দিকে পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেন অবিকশিত অবস্থায় ছিল এবং স্বাভাবিক। তাই ব্যাপারটা মনে রাখার জন্য একটা সহজ সুত্র হল – কমুনিকেশন বা যোগাযোগ শব্দটা। যত ভাল বা বিকশিত কমিউনিকেশন ততই ভাল পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেন।

    কমিউনিকেশনঃ
    ছোট একটা শব্দ কমিউনিকেশন, কিন্তু এর অর্থ অ-নে-ক গুলো। কমিউনিকেশনের অনেকগুলো রূপ। এখানে কমুনিকেশন শব্দের সঠিক মানে কোনটা? না সবগুলো, কোনটাই বাদ নয়।  যেমন রাস্তাঘাট বুঝাতেও আমরা কমিউনিকেশন বলি। বলি কমিউনিকেশন ভাল না বা কমিউনিকেশন মিনিষ্ট্রি। কিন্তু তাও আবার সড়ক নাকি রেল নাকি এয়ার বা এরোপ্লেনের কমিউনিকেশন, এমন অনেকগুলো ভাগ আছে। আবার কমিউনিকেশন মানে তো ভাষাও, ল্যাঙ্গুয়েজ। আরো আছে। কমিউনিকেশন মানে টেলিফোন, টরেটক্কা করে পাঠানো পুরানাদিনের টেলিগ্রাফ। এমনকি তা বেতার, এফএম রেডিও  অথবা পুলিশ-আর্মির ওয়ারলেস – রজারস। আবার কমিউনিকেশন মানে আইটি – এর নেটওয়ার্ক, ইমেল, ফেসবুক বা স্যাটেলাইট ইত্যাদি সব।  অর্থাৎ এক কমিউনিকেশন শব্দ দিয়ে অনেক কিছুই বুঝায়। তা বুঝাক কোনই অসুবিধা নাই।

    তবে আসল কথাটা হল, দুনিয়াতে এই কমিউনিকেশন যত বিকশিত ততই, পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেনও সে মাত্রায় ব্যাপক। আর যতদিন  দুনিয়ায় কমিউনিকেশন দুর্বল বা অবিকশিত বলে দুনিয়ায় কোণায় কোণায় থাকা মানুষকে চেনাজানাও দুর্বল থাকে; মানে মানুষে মানুষে পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেন বিকশিত নয় বা নাই । অথবা এক জনগোষ্ঠীর সাথে অন্য জনগোষ্ঠী এবং অন্য সব জনগোষ্ঠীর সাথে পণ্য বিনিময়-বাণিজ্য-লেনদেন নাই অথবা তেমন নাই অর্থাৎ ব্যাপক হয়ে না উঠেছে, তত দিন স্বদেশীপনা ধারণাটা যে মিথ্যা বা ধারণাটার যে সমস্যা তা টের পাওয়া যায় না।

    গত ১৬০৭ সাল থেকে ধরা হলে পরের প্রায় ৩০০ বছর ধরে  দুনিয়ায় চালু ব্যবস্থাটা বলি কলোনি যুগ; যখন দখলবাজ ছোটবড় পাঁচ-ছয় রাষ্ট্র বাকি প্রায় সব দেশকে দখল করে কলোনি বা উপনিবেশ যুগ কায়েম করেছিল। সে সময় কোনো দেশের বাইরে পণ্য বিনিময় লেনদেন বলতে ছিল  মুলত দখল-মালিক দেশ আর প্রজা দেশের মধ্যে; তাও আবার ছিল একপক্ষীয়- মূলত প্রজা বা দখলি-হওয়া দেশ থেকে লুটেরা সম্পদ দখল-মালিক দেশে নেয়া (যেমন ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া থেকে ব্রিটেনে) – এই রকম। এ ছাড়া ওদিকে পাঁচ-ছয়টা কলোনি দখলদার মালিকের নিজেদের মধ্যে লেনদেন – সেটাও ছিল প্রায় নাই না খুবই সীমিত পর্যায়ে। তাই জাতি ধারণা আর স্বদেশীপনা যে ভুয়া অচল ধারণা তা ইউরোপ কলোনিযুগে টের পায়নি। আবার কলোনি যুগের প্রায় ৩০০ বছর ইউরোপ ‘বিদেশী মাত্রই শত্রু’ গণ্য করা জাতি ধারণার জাতিরাষ্ট্র, নেশন-স্টেট ছিল। এটাই কলোনি-মালিক জাতি-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে লেনদেন ও বিনিময় বাণিজ্য প্রায় ‘নাই’ ধরনের সীমিত হয়ে থাকার আরেক কারণ। সুতরাং, এক কথায় ‘জাতি’ ধারণাটা বা দেশকে জাতি বলে বুঝা – এটা মূলত কলোনি দখল করা যেসব দেশের মূল ব্যবসা তাদেরই অনুসৃত ও প্রচলিত ধারণা। এদের চিনবার মূল বৈশিষ্ট্য হল এরা জাত বা জাতির বাইরে কারো সাথে লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় পছন্দ করে না, খারাপ মনে করে। তাই এখান থেকেই বিদেশির বিরুদ্ধে স্বদেশী বলে ধারণা জন্মানো সহজ ও সম্ভব।

    এজন্যই, স্বদেশী-জাতি-কলোনি যুগ এগুলো সম্পর্কযুক্ত শব্দ। কলোনি যুগেই জন্ম বলে জাতি বা স্বদেশী ধারণা সেখানে প্রথম পাওয়া যায়। দুনিয়াতে প্রথমত জাতি বা জাতিরাষ্ট্র ধারণাটার জন্ম বা পাওয়া যায় কলোনি যুগে; মানে ১৬০৭-১৯৪৫ অর্থাৎ প্রায় ৩০০ বছরের সময়কালের এবং মূলত ইউরোপে।

    কিন্তু পরবর্তিতে মানে কলোনি যুগ-পরবর্তী সময়কাল আগের কলোনি সময়ের তুলনায় অনেক ছোট, ৩০০ এর বিপরীতে মাত্র প্রায় ৭৫ বছর। এই পঁচাত্তর বছর, ১৯৪৫ থেকে একাল পর্যন্ত সময়টা কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার কাল। মোটা দাগে বললে সবার আগে কলোনি মুক্তি ঘটেছিল এশিয়ায়; পরে ল্যাটিন আমেরিকা আর শেষে ১৯৮০ সালের মধ্যে আফ্রিকা (সাউথ আফ্রিকা বাদে) সবাই প্রায় স্বাধীন হয়ে যায়। ফলে এবার সব রাষ্ট্রের সাথে সব রাষ্ট্রের লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় ব্যাপক রূপ নেয়া শুরু হয়। তবে কমিউনিস্টরা লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় ব্যাপারটা নিয়ে শুরু থেকেই অস্পষ্ট ও দ্বিধায় ছিল বলে তারা বাণিজ্যে রাজি হয়নি মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের কারণে। এছাড়া আর ১৯৫৩ থেকে ১৯৯১ সাল-  এই কোল্ডওয়্যারের যুগের কারণে। ফলে সোভিয়েতকে অনুসরণ করে পুরা কমিউনিস্ট ব্লক লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় করতে আসেনি, যোগ দেয় নাই। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেলে ১৯৯২ সাল থেকে সকলেইও অবশ্য বাণিজ্যে যোগ দেয়।

    কিন্তু এর আগেই সব অর্গল খুলে যায়। কারণ, আশির দশকের শুরু থেকেই গ্লোবালাইজেশন শুরু হয়ে গিয়েছিল। মানে যেকোনো দেশের সাথে যেকোনো দেশের লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হতে শুরু করেছিল। বাংলাদেশে আমাদের জন্য তা সহজে বোঝার চিহ্ন হল, যখন থেকে আমরা গার্মেন্ট এক্সপোর্ট শুরু করি এবং ক্রমে তা বাড়াতে থাকি।

    একটা পর্যবেক্ষণ হিসাবে বলা যায়, গত ৪০০ বছরের দুনিয়ায় দেশ (রাষ্ট্র)গুলোর মধ্যে লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় উন্মুক্ত ও পরিপাটি ব্যবস্তা ছিল মাত্র প্রায় পচাত্তর বছর। যার আবার সক্রিয় বাণিজ্য চালু ছিল কেবল  মাত্র শেষের চল্লিশ বছর। আর এর ইমিডিয়েট আগের ১৯৪৫ সালথেকে চালু হওয়া ব্যবস্থায় রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের কাছে  বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত থাকলে ব্যাপক লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় চালুর প্রস্তুতি নিতেই প্রথম ত্রিশ-পয়ত্রিশ বছর চলে যায়।  এখন একটা সাধারণ সূত্র হলো, লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় না থাকা মানেই সেটা হবে জাতি বা জাতি-রাষ্ট্র বা স্বদেশী চিন্তার কাল। আর যতই গ্লোবালাইজেশন, ততই লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময় ব্যাপকতর; ততই বাস্তবে জাতি বা জাতিরাষ্ট্র বা স্বদেশী চিন্তার অকার্যকারিতা বা বিলুপ্তির দিকে চলে যাবে।

    আবার মজার ফ্যাক্টস হলো, ইউরোপ ১৯৪৫ সালের পরে জাতি বা জাতিরাষ্ট্র বা স্বদেশী চিন্তা ত্যাগ করে সরে যায় অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে নিজেদের রূপান্তরিত করে নিয়ে।

    কিন্তু ট্রাজেডিটা হলো ইউরোপ রূপান্তরিত হয়ে গেলেও আমরা জানি না আর তাল বুঝি না বলে অবুঝ-নাবুঝ হয়ে আমাদের মত দেশের বেলায় রাষ্ট্রের মডেল হয়ে যায় ইউরোপের ফেলে দেওয়া ঐ ‘জাতি’ ধারণা। মানে, জাতিরাষ্ট্র বা স্বদেশী চিন্তা। এমন চিন্তার সপক্ষে কমিউনিস্টদের সাপোর্টও ছিল। কারণ তারাও বিভ্রান্ত। এখনো বেশির ভাগই জেনে না জেনে  জাতি-রাষ্ট্র করে থাকে। অথচ এটা স্ববিরোধী। কারণ জাতিরাষ্ট্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনীতি হল, কলোনি দখল যুগে থাকা এবং দখলবাজ হয়ে থাকা। আর অপর বৈশিষ্ট্য হল প্রায় নাই অথবা খুবই সীমিত বৈদেশিক লেনদেন-বাণিজ্য-বিনিময়ে থাকা। যার সোজা মানে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশগুলো জাতি বা স্বদেশিপনা ধারণাগুলো আকড়ে আপন করে নিয়ে থাকা এতা এক চরম স্ববিরোধিতা।  এজন্য এরা মুখে বলবে স্বদেশিপনা আত্মনির্ভরতা ইতাদি ছেদো কথা। কিন্তু ডলার দেখলে ডলার পেতে এক্সপোর্ট করতে লালা পড়বে। আপনি যদি স্বদেশি অর্থনীতির লোক তবে ঐ প্রাপ্ত ডলার দিয়ে কী করবেন?  বলাই বাহুল্য ঊনি আমদানিওও করবেন আর ঐ আমদানির মুল্য শোধ করতে ঐ ডলার ব্যভার করবেন। তাহলে কী দারালো আপনি আসলে সবটাতে সবখানেই আছেন। অথচ হুদাই স্বদেশিপনা বিদেশিবিরোধিতার ভাব ধরেন।

    এই স্ববিরোধিতা কী ধরনের সঙ্কট নিয়ে হাজির হয় তা এখন আমরা দেখব ভারতের ক্ষেত্রে। সেখানে ১৯৪৭ সালে জন্ম থেকেই এখানে জাতিরাষ্ট্র ধারণাকে খুবই শক্ত করে (অন্তত আমাদের চেয়ে অনেক বেশি) আঁকড়ে ধরা এক রাষ্ট্র গড়েছিল। এর উপর আবার ‘জাতি’ বলতে এটা হিন্দু-জাতির এক জাতিরাষ্ট্র বুঝে তারা। গত ২০১৪ সাল থেকে বিজেপি ক্ষমতায় আসাতে এই হিন্দু জাতিরাষ্ট্র বোধ সবার উপরে তাদের চাপানোর ঝোঁক আরো প্রবল। এখন চীনের সাথে সীমান্ত সঙ্ঘাতে ২০ সেনাকে হারিয়ে যতই স্বদেশীপনাকে নরেন্দ্র মোদী আঁকড়ে ধরতে চাইছেন ততই জাতিরাষ্ট্র, হিন্দুত্ব বা স্বদেশীপনা ধারণার অকার্যকারিতা আর ভুয়া আবেগসর্বস্বতা প্রকট হয়ে হাজির হচ্ছে।

    বাস্তব উদাহরণ হিন্দু জাতিরাষ্ট্র ও এর স্বদেশীপনাঃ
    ভারতের একটা মিডিয়া রিপোর্ট পড়ে শুরু করা যাক। দ্য হিন্দু পত্রিকার ঘরেরই আরেকটা পত্রিকা আছে যেটা ব্যবসা-বাণিজ্যকে প্রাধান্য দিয়ে প্রকাশিত হয়, এর নাম ‘হিন্দু বিজনেস লাইন’ [Hindu Business Line]। সে পত্রিকার ২৭ জুলাইয়ের এক লিডিং রিপোর্ট বলছে, জাপান ভারতের কাছে এক আজব অনুরোধ রেখেছে। ঐ খবরের শিরোনাম দেখেন,

    Japan to India: Don’t increase tariff on Chinese inputs used by Japanese firms

    যার বাংলা করলে মোটের উপর কথাটা হল,  ‘ভারত যেন চীন থেকে আসা পণ্যের ওপর বাড়তি ট্যাক্স এবং কোনো কোনো চীনা পণ্যের আমদানির উপরেই যে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা যেন আরোপ না করা হয়।’ জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ট্রেড প্রমোশন ডিপার্টমেন্ট এই অনুরোধ নিয়ে মোদী মন্ত্রিসভার দরবারে এসেছে তদবির করতে।

    এখানে পিছনের কথা আগে একটু বলে নেই। চীন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ, অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর পালটা প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে মোদি ভারতে সাথে চীনের বাণিজ্য সম্পর্ককে বিরূপ করে তুলতে সব মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই সাথে চীনা পণ্য বর্জনের রাজনৈতিক কর্মসূচিও নিয়েছিলেন। এই প্রপাগান্ডা কাজের জন্য আগে থেকেই বিজেপি-আরএসএস এর দলীয় এক অঙ্গ-সংগঠন তৈরি করাই ছিল, যার নাম ‘স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ’ [Swadeshi Jagran Manch ]। নাম শুনে নিশ্চয় বুঝা যাচ্ছে এর কাজ হল স্বদেশিপনা দেখানো। এখন দেশে-বিদেশে এই সংগঠনের তৎপরতাই জোরদার করা হয়েছে- চীনা পণ্য বর্জনের স্লোগান এদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে। যেমন ইন্ডিয়ান ক্রিকেটে এবারের কোন এক টুর্ণামেন্টে স্পন্সর হয়েছিল চীনা মোবাইল কোম্পানি ‘ভিভো’ [VIVO]।

    তবে বলাই বাহুল্য, এটা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সাথে মিলে চীনা ভিভোর সাবসিডিয়ারি কোম্পানি। এখন মোদী চীনা কোম্পানির উপর বৈষম্য বা বিরূপতা আরোপের নির্দেশ জারি করাতে ওই জাগরণ মঞ্চ ক্রিকেট বোর্ডের কাছে ভিভোকে বাতিল করার আবেদন নিয়ে যায় এই যুক্তিতে যে, এটা চীনা কোম্পানি বলে  এদেরকে স্পন্সর দেয়া  হয়েছে ‘জাতির বর্তমান মুডের বিরুদ্ধে’ বোর্ডের করা কাজ [because Vivo is a Chinese company and BCCI’s move goes against the “current mood of the nation”.]।
    এছাড়া ওদিকে সিনিয়র মন্ত্রী নীতিন গড়করি যিনি বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প দেখাশুনা করেন, তিনি গত ১ জুলাই ঘোষণাই করে দিয়েছেন কোনো চীনা কোম্পানি ভারতে টেন্ডারে অংশ নিতেই পারবে না [India to ban Chinese companies from highway projects, says Nitin Gadkari]। অর্থাৎ চীনা কোম্পানির সাথে segregation বা বিচ্ছেদ ইতোমধ্যেই মাঠে কার্যকর। একই হিসাব মতে, ম্যানুফাকচারিং খাতেও চীনা পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, না হয় শুল্ক এমন বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে যেন কেউ আমদানি না করে।

    অনেকেরই ধারণা, ভারতে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী জাপান। এছাড়া চীনবিরোধী চার দেশ জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকা- এদের জোট ‘কোয়াড’ যার মধ্যে জাপানও আছে [কোয়াড নিয়ে জানত আমার এক গতবারের লেখার  কোয়াড আসছে এই শিরোনামের প্যারাটা দেখে নেয়া যেতে পারে। ] । এবং  আমেরিকা আশা করছে তারা সামরিক জোট হিসেবে কাজ করার কথাও চিন্তা করবে; এদের তো এতে পোয়া বারো। তাহলে তো জাপানের এখন চার দিকে লাভ আর লাভ হওয়ার কথা।

    কিন্তু হতাশ করা কথা হল তা ঘটছে না! আমরা বরং দেখছি উলটা এই জাপানই তার ট্রেড প্রমোশন বিভাগ দিয়ে মোদীর কাছে  দেনদরবার করছে যেন, চীনা পণ্য আমদানি অটুট থাকে, কোন বাড়তি ট্যাক্স আরোপ না করা হয়; চীনকে ভারতে নিজ পণ্য রপ্তানীতে কোনো ধরণের বাধা না দেয়া হয়। কেন?

    এর সোজা মানে তাহলে ভারতের চীনা পণ্য বর্জনের দেশপ্রেম, স্বদেশীপনা বা জাতিগিরি ফলানো এগুলো অচল হয়ে যাচ্ছে।

    জাপানের চীনা পণ্যের প্রতিইবা এমন দরদি মায়া কেন?
    ভারতে গাড়ির কোম্পানির বেশির ভাগই জাপানি ব্র্যান্ডের সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার। অন্তত প্রাইভেট কার – এই গাড়ির মার্কেটে। কিন্তু তা হলে হবে কী, এর ম্যানুফেকচারিং ও অ্যাসেম্বলিতে যন্ত্রাংশ-স্পেয়ার – ভারত বা জাপান কেউই নিজেরা বানায় না। চীন থেকে কিনে আনে। আর অ্যাসেম্বল বা জোড়া লাগিয়ে জাপানি গাড়ি তৈরি করা হয়। কেন? কারণ ওসব পার্টস জাপানে তৈরি করলে গাড়ির দাম বেড়ে  যাবে। কারণ লিভিং কষ্ট বা লেবার কষ্ট বা ন্যূনতম মজুরি জাপানে অনেক বেশি। আবার ভারতেও তা তৈরি করতে গেলে সে ক্ষেত্রেও চীনের তুলনায় অদক্ষতার কারণে দাম বেশি পড়বে, কোয়ালিটিও খারাপ হবে সামগ্রিকভাবে মোট কথা জাপানি গাড়ি বিক্রির প্রফিটে টান পড়বে। অতএব চীনা পার্টস হলে কী হবে ওটাতেই মোক্ষ। এতে অবশ্য পিছনের একেবারে মুখ্য কারণ, চীনা যেকোনো ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানায় প্রোডাকশন লাইন সাজানোর নতুন কৌশল। এটা অ্যাডভান্সড ম্যানেজমেন্ট বুদ্ধিতে সাজানো। ফলে তা দক্ষ এবং কম উৎপাদন খরচ বলে সবার চেয়ে কমপিটিটিভ। আর সেটার লোভেই জাপানিরা কোয়াড জোটের কথিত সামরিকতার লোভ ভুলে উলটা মোদীর কাছে চীনকে ভারতে পণ্য রপ্তানিতে রেখে দেয়ার সুপারিশে লেগে পড়েছেন।

    ওদিকে অবশেষে ক্রিকেট বোর্ড ভিভো মোবাইলের কী অবস্থা বা পরিণতি?
    এটাকে বলে, “পুণঃ মুসিক ভব!”। মানে আবার ইদুঁর হয়ে যা। দয়াপরবশ হয়ে এক সাধু এক ইঁদুরকে  বিরাট ক্ষমতাবান বানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু মানুষ এত অত্যাচারিত হোয়ার অভিযোগ উঠতে থাকে যে বিরক্ত হয়ে সাধুকে বলতেই হয়,  “পুণঃ মুসিক ভব!”। মানে আবার ইদুঁর হয়ে যা।  ভিভোকে কিভাবে রেখে দেওয়া যায় এর তদবীর শুরু হয়েছে। কারণ এক. প্রতিবছর প্রায় ৪৪০ কোটি রুপী করে পাঁচ বছর ধরে টাকা দিয়ে আসছে। লোভ লাগার মত ভাল পরিমাণের টাকা, কারোণ এই চীনা মোবাইল ওয়ান অব দা টপ পছন্দের তাই বোর্ডকে অফার করার ক্ষমতাও প্রতিদ্বন্দ্বিদের চেয়ে বেশি। এছাড়া এখন ভিভোকে বাদ দিবার কথা তুললে উলটা ক্ষতিপুরণ দিতে হতে পারে। আর দুই. বোর্ড এখন অমিত শাহের ছেলের কর্তৃত্বে  ফলে তিনি ভিভোকে নিয়েই এগিয়ে যাবার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে এখন ঘটনা মোদীর হাতে তিনি নিশ্চয় শেষ মীমাংসাটা দিবেন। ভিভো-কে স্পন্সরশিপ থেকে বাদ দিতে গিয়ে দেখে তাদের প্রফিট মার্জিনে টান পড়ছে। কাজেই মোদীকে বলে, ভিভোকে রেখেই চলা যায় কিনা!

    অর্থাৎ সার কথা চীনাপণ্য ভারতের বাজারে ঢুকেছে নিজ যোগ্যতা ও পণ্য ক্রেতা মনোরঞ্জনের ক্ষমতার জোরে। এটাই হলো সরাসরি কথিত স্বদেশীপনা বনাম গ্লোবালাইজেশন। যে পণ্যে যে সবচেয়ে নিচের কম খরচে মানে কম শ্রমে ও দক্ষতায় বানাতে পারে, সবাই ওই পণ্য তার কাছেই কিনবে- এটাই হলো গ্লোবালাইজেশনের ভিত্তি। তাতে সে দেশী-বিদেশী না কোন দেশী সেটা কোনো বিবেচ্য নয়। ফাঁপা আবেগের দেশীবোধ বলে কিছু নেই। দেখাই যাচ্ছে এটা কাজ করছে না। অর্থাৎ গ্লোবালাইজেশনের এত ভিত্তি ও খেলার নিয়মে প্রত্যেক রাষ্ট্রকেই কোনো না কোনো পণ্যে বা ওর কোনো পার্টস উৎপাদনে সবচেয়ে কম শ্রমে ও বেশি দক্ষতায় বানাতে পারতেই হবে। তা হলেই ভ্যালু অ্যাডেড প্রোগ্রামে তাকেও অন্য সব রাষ্ট্র গোনায় ধরতেই হবে। চাইলেও বাদ দেয়া যাবে না। এভাবেই যা কিছু দেশটা ভোগ করে তার সব কিছুই আর স্বনির্ভরতা বা আত্মনির্ভরতার ভুয়া স্লোগান দিয়ে নিজের অদক্ষ হাতে বানাতে হবে না। বরং এর বিপরীত ‘গিভ অ্যান্ড টেক’। আরো বেশি করে পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতায় জড়িয়ে পড়তে হবে যাতে কেউ আলগা ‘ফুটানি’, বেশি দাম, বেশি গরজ তৈরি করতে না পারে। বরং সবাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
    তবে এখানে একটা মধ্যবিত্তের পেটিমনকে সামলাতে হবে যেন ছিঁচকে সমালোচনার চোখে না দেখা হয়।  যেমন কেউয়ু বলল চীন ছাড়া ভারতের চলেই না। না এমন খোটা দেয়া পেটি সংকীর্ণ চিন্তা। যদিও তা টংয়ের চা দোকানে চলবেই বন্ধ করা যাবে না।

    ব্যাপারটা হল গ্লোবালাইজেশন অন্যকে নিচা দেখানোর জন্য নয়।  বরং সবাই যেন কোন না কোন একটা পণ্য সবার চেয়ে বেশি দক্ষতায় উতপাদন করতে পারে – পারুক এই উদ্যোগ সফল হোক সেই কামনা। কারণ সে সফল হলে আমরা সবাই ঐ সফলতার ভাগ নিব। ব্যাপকভাবে পারস্পরিক পণ্যবিনিময়ে মেতে উঠব। একা একা কথিত স্বনির্ভরতা অর্জনের নামে আসলে অদক্ষতায় কোয়ালিটি খারাপ দাম বেশি এমন পণ্য গলাধকরণ করার বিপরীতে ব্যাপকভাবে নির্ভরশীলতা কিন্তু এটা একা না সবাই সবার উপর নির্ভরশীল এমন ইন্টার ডিপেন্ডেন্সি – তৈরি করার সম্পর্ক। যাতে কেউ একজন ডাট দেখানো,  বেশি অন্যায় সুবিধা না নিতে পারে তা কমে আসে – এটাই গ্লোবালাইজেশন । যাতে চাইলেই কেউ যুদ্ধ লাগিয়ে না দিতে পারে। কারণ যেখানে বোমা ফেলার কথা ভাবছে সেখানে ঐ শহরে নিজের স্বার্থও আছে।  আর কেউ নিজের মাথায় বোমা মারে না। কাজেই ডায়লগ আর বুঝমান হওটাটাই উভয়পক্ষের লাভ, সহজ রাস্তা।

    ভারতে চীনের রাষ্ট্রদুত সান ওয়েদং এক ওয়েবনিয়ার অন লাইন আলোচনায় এটাই মন্তব্য বা হেদায়েত করে ছেন। বলেছেন ভারত-চীনের অর্থনীতিতে বিচ্ছেদ আনা বা দুরত্ব তৈরি করা হবে একালের স্বাভাবিক স্রোতের উলটা হাটার চেষ্টা। এটা সফল হবে না। তিনি ঐ আলোচলায় ডাটা দিয়ে দেখিয়েছেন, স্পেয়ার পার্টস বা যন্ত্রাংশ কম্পিউটারে ৯২%, টিভিতে ৮২%, নেটওয়ার্কের  অপটিক্যাল ফাইবারে ৮০%, মটরসাইকেলে ৮৫% ইত্যাদি এভাবে চীনাপণ্য ভারতে আপদানি করা হয়ে থাকে।

    কিন্তু সাবধান এটা ভারতকে ছোট দেখানোর জায়গা থেকে পড়বেন না।  ভারতকে তার ভোগ্য সব পণ্য বানাতে হবে, আর সবখাতেই দক্ষ হতে হবে ইত্যাদি না একেবারেই না। এটাই জাতিচিন্তার লাইন। স্বদেশিপনার লাইন। বরং এসব উপেক্ষা করে এর বিপরীতে বরং ভারত কোন কোন পণ্য বানাতে পেরেছে আর এতে (হোক তা খুবই ছোট পণ্য) সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জন করাতে সেই পণ্যের উপর চীনের নির্ভরশীলতা তৈরি হচ্ছে, আর ঐ পণ্য চীনে আমদানি আস্তে আস্তে বাড়ছে – এসব নির্মাণ হল আসল পথ। ৈ যে বললাম হোক তা খুবই ছোট পণ্য এনিয়ে এই তাইওয়ানি উতপাদকের এক প্রবাদমূলক ব্রিলিয়ান্ট বয়ান হল, মাথা হতে হবে, হাতির মত বড় কিছুর মাথা না হতে পারলেও অসুবিধা নাই। কিন্তু মাথা হতে হবে। কিছু না পারলে মুরগীর মাথা হয়ে দেখান।
    এই হল কথিত জাতি বা মিথ্যা স্বদেশিপনা ধারণার বিপরীতে পারস্পরিক গভীর নির্ভরশীলতার সঠিক লাইন।

    কিন্তু গত লেখার শিরোনামেই বলেছিলাম ভারত এই বুঝ ধারণ  করতে বা সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। কেন?
    কারণ, সারা ভারতকে জন্ম থেকেই এই মিথ্যা অচল – ‘জাতি’ বা স্বদেশি ধারণায় বুঁদ করে রাখা হয়েছে। ডুবে আছে। একালে মোদী জমানায় একথাগুলোকেই  মিথ্যা হলেও আরও শানিয়ে তোলা হয়েছে। আর এর সাথেই তাদের হিন্দুত্বের ধারণা জুড়ে রাখা হয়েছে, হিন্দুত্ব কেন শ্রেষ্ঠ এর সাফাই টানা হয়েছে।  আর এই হিন্দুত্ব বিক্রি করেই, হিন্দুত্বের গর্ব উস্কানি দিয়েই এবার হিন্দুভোট তার ভোট সংগ্রহের বা ভোট টানার মূল মেকানিজম।  এজন্য বলেছি মোদী পারবেন না। কিন্তু সেটা তত্বকথা ঠিক আছে থাক। বাস্তবে মোদী কী করে তকার গভীর উভয় সঙ্কট সামলান, কী পরিণতি হয় সেটা দেকার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, তবে তা প্রত্যক্ষে দেখতে পাওয়া হবে আমাদের জন্য এক অর্জন।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৮ আগষ্ট ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “জাতিগিরির ‘স্বদেশী জাগরণ’ অচল” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

     

     

  • ভারতকেই পথ বেছে নিতে হবে, সে সম্ভবত ফেল করবে

    ভারতকেই পথ বেছে নিতে হবে, সে সম্ভবত ফেল করবে

    গৌতম দাস

    ০৭ আগস্ট ২০২০, ০০:০৭ শুক্রবার

    https://wp.me/p1sCvy-38a

     

           Chinese Ambassador in India, on Decoupling India-China Economy, YouTube

    ভারত-চীন সংঘাত বা বিতর্ক সহসা মিটছে না। তবে আস্তে আস্তে অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। আর কী হলে তা মিটতে পারে তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ভারত কী গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থার গ্লোবাল অর্ডারটা সম্পর্কে বুঝে? যদি বুঝতে পারে তবে এই অর্ডারের  নেতৃত্বে বদলের নির্ধারক সময়কাল হাজির হয়েছে। ভারত এর কোনদিকে থাকতে চায় – এনিয়ে ভারতকে এখনই সিদ্ধান্ত অবস্থান নিতে হবে। এতদিন ভারত দুদিকেই পা দিয়ে থাকার সুবিধা যা পেয়েছিল তা শেষ। তাই পুরানের সাথে গাটছাড়া বেধে শেষ হয়ে যাবে না নতুনের সাথে থেকে নিজের বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে এনিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদিও নতুন নেতা চীনের সাথে ভারতের না যাবার সম্ভাবনা এখনও বেশ বেশি দেখা যাচ্ছে। এর মূল কারণ ভারত “গ্লোবাল অর্ডার” জিনিষটা ধরতে পারে না। এর কারণ আবার হল, জাতি-রাষ্ট্র চিন্তায় বা এরই সহযোগী চিন্তা  – “স্বদেশীপনা” বা বিদেশী মাত্রই আমার অর্থনৈতিক শত্রু – এই চিন্তার উপর দাঁড়িয়ে রাজনীতি করা বিজেপি-আরএসএস, এরা কখনই গ্লোবাল অর্ডার বা খোদ গ্লোবাল শব্দটার অর্থ তাতপর্য কখনই বুঝতে পারবে না। কারণ তাদের ‘হিন্দুজাতি’ বা খোদ জাতি-রাষ্ট্র ধারণাটাই এক [fetish] কাল্পনিক রাজনীতি। এছাড়া এই “জাতি” ধারণার জন্ম ও বিকাশ ও টিকে থাকা সবই ঘটেছিল ইউরোপের কলোনি যুগে ও কলোনি শাসনের পুর্ব-পটভুমিতে। বিশ্বযুদ্ধের শেষে কলোনি শাসন লুপ্ত হয়ে গেলে এই জাতি-রাষ্ট্র ধারণা ফেলে দিয়ে ধুয়ে মুছে ইউরোপ অধিকার-ভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়ে যায়। কিন্তু কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রে অসামঞ্জস্যভাবে জাতি-রাষ্ট্র চিন্তাতে ভর করেই এগুলো বিকশিত হচ্ছে মনে করা হয়েছিল। আজ গ্লোবাল ইকোনমির প্রধান ধারা আরো বেশি করে  পারস্পরিক লেনদেন বিনিময় বাণিজ্যে গভীরে জড়িয়ে যাওয়া। কারণ এটা ভ্যালু এডিশন শেয়ারের যুগে প্রবেশ করছি আমরা। তাই এই যুগে ঐ পুরানা সুপ্ত “অসামঞ্জস্যতা” প্রকট ভাবে হাজির হচ্ছে। তাই এখকার দুনিয়ায় যে চীন-আমেরিকা বা চীন ভারত যা কিছু হবু সংঘাত  ও টেনশন – এটা জাতি-রাষ্ট্রবাদীদের চোখে নেহায়ত দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা।  এগুলো যে “গ্লোবাল” মাত্রার সমস্যা, কোন বাই-লেটারাল বা দ্বিপাক্ষিক জটিলতা নয় তা এরা টেরই পাবে না। সম্ভাবনা নাই।

    কোন দুই দেশের সীমান্তঃ কিছু তত্বকথা
    এনিয়ে যে কথাগুলো আমরা প্রায়ই শুনে থাকিঃ সীমান্ত বা ম্যাপ কথার আসল মানে হল – সীমান্তের দুই পক্ষের ঐকমত্যে একটাই ম্যাপ যেখানে আঁকা হয় আর ঐ একই ম্যাপের দুটি কপি দুই পক্ষের হাতে ছাড়া তখন  অন্য কোনো ম্যাপ বা এলএসি [LAC] বলে আর কিছু  থাকে না। এটি সম্ভব যখন দুই পক্ষই সীমান্তে একটি শান্ত নীরবতা একটা প্রশান্তি অর্জনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে আর সেই মেজাজে আসবে। কারণ, অপরের ভুমি দখলের কলোনি যুগ বহু আগেই শেষ হয়েছে।  বিপরীতে কোনো পক্ষ যখন মনে করবে আমি যেটা আমার রাষ্ট্রসীমা বলে বুঝি সেটাই আমাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর অর্থ সেখানে সীমান্ত চিহ্নিত করা, একটাই ম্যাপ তৈরি কখনোই ঘটবে না। আর স্বভাবতই এতে দেশের অর্থনীতিতে মানুষের জীবনমানে বাড়াতে মনোযোগে দেওয়ার বদলে নিঃস্ফলা সীমান্তেই সব সময় কেটে যাবে। এটাই ঘটবে কারণ, আপনি অন্যের দাবি উপেক্ষা করে, এর সুসমাধা না করে কোনো ভূমি দখল করে শান্তিতে থাকতে পারবেন না। কখন টেনশন আসবে আমি জানবেনও না। এখানে চিহ্নিত বা ডিমার্কেশন শব্দের আসল মানে হল – নিজেই নিজের রাষ্ট্রসীমা বলে এককভাবে কিছু দাগানো- একবারেই নয়। বরং পড়শিকে সাথে নিয়ে দাগানো। যাতে দাগাবেন একবারই। এরপর এ নিয়ে কেবল শান্তি আর প্রশান্তিই অর্জন করবেন।
    এ লক্ষ্যেই আপনাকে কিছু হোমওয়ার্কও করতে হবে। কারণ ডিমার্কেশনের আলোচনা মানেই মূলত গিভ অ্যান্ড টেক। পেতে হবে আর ছাড়তেও হবে। কী কী আপনাকে পেতে হবে তা বাদে বাকি সীমানা-বিতর্কে সব খানেই ছাড় দিতে বা নিগোশিয়েট করতে রাজি আছেন এটি বুঝায় দেন। প্র্যাকটিশটা উভয়পক্ষ করলে সহজে কাজ শেষ করা সম্ভব। কিন্তু এটা তখনই সম্ভব যখন আপনি শুধু না, উভয়পক্ষেরই প্রশান্তি লাভ প্রধান লক্ষ্য। সত্যিকারের ডিমার্কেশনের লক্ষ্যে এগিয়ে এসেছেন। গিভ অ্যান্ড টেক শেষে একটি ম্যাপ আঁকতে এসেছেন। কারণ, সামরিক শক্তি দিয়ে ভূমি দখল করা যায়, ডিমার্কেশন করা যায় না।

    [একটু অফসাইডে এটা মূল প্রসঙ্গের বাইরের কিছু কথা। ফলে নিচের এই প্যারা আপনি বাদ দিয়ে রেখে ব্রাকেটের শেষে আবার পড়া শুরু করতে পারেন।]

    [ভারতে কিছু নতুন ডেভেলপমেন্টঃ আজকের কথা শুরু করার আগে ভারতে কিছু নতুন ডেভেলপমেন্ট, তাই গুরুত্বপুর্ণ কিছু বাড়তি কথা যোগ করব এখানে। যখন লিখছি তখন সময়টা ৫ আগষ্ট ২০২০ এর দিবাগত রাত পেরিয়ে মধ্যরাতের দিকে যাচ্ছে যাতে আইনত ৬ তারিখ শুরু হবে কিছুক্ষণের মধ্যে। আর আমার এই বাড়তি প্রসঙ্গ হল, আজকের ভারতের জন্য ঘটনাবহুল “৫ আগষ্ট”।  ৫ আগষ্ট উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জন্য নির্ধারক দুটা কারণে।
    এক, কাশ্মীর যে আইনি সুত্রে  ভারতের সাথে আগে একভাবে যুক্ত ছিল বলে মনে করা হত সেই ৩৭০ ধারা বাতিল করে মোদী-অমিত গতবছর এদিন থেকে সংসদীয় ততপরতা শুরু করেছিল। আর এরপর শ্রেফ গায়ের জোরে ঘোষণা করেছিল যে কাশ্মীর এখন থেকে ভারতের সরাসরি অংশ। অতএব এদিন হল দখলদারি ও নতুন হত্যার প্রথম বার্ষিকী। আর দুই, বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে সে জায়গায় রামমন্দির বানানোর জন্য এর ভিত্তিপ্রস্তত স্থাপনের দিন;  মোদী ও তাঁর দলবলেরা এই ৫ আগষ্টকেই এর দিন হিসাবে ঠিক করেছে, যার নাম দিয়েছে ‘ভুমি পুজার” দিন।
    কিন্তু এদুই দিক থেকে আজ এসবের মাহাত্ম বা তাতপর্য নিয়ে কথা বলব না, ঠিক সেটা আমার প্রসঙ্গ না।  প্রসঙ্গ হল, আমরা স্বীকার করি আর নাই করি ভারতের রাজনৈতিক জগতে বড় বড় কিছু গভীর রাজনৈতিক সংকট আছে। যেটাতে সময় না দিলে তা ভারতরাষ্ট্রের অস্তিত্বের সঙ্কট হয়ে হাজির হতে পারে।  যেগুলোকে শুধু সংকট বা ক্রাইসিস না বলেও কিছুটা ইতিবাচক শব্দে একে চ্যালেঞ্জ – ভারতের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বলা যেতেও পারে। সেই প্রেক্ষিতে, এই ৫ আগষ্টকে, ইতিহাসে লেখা হবে এই বলে যে যেদিন থেকে ভারতের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল (ও যারা এদের কোন একের সাথে জোটে সম্পৃক্ত) – বিজেপি ও কংগ্রেস এদের দিন শেষ তা লেখা হয়ে গেছিল। কী অর্থে? না, এদের হাতে আর ভারতের বর্তমান ও আসন্ন রাজনৈতিক সঙ্কটগুলোর মিটানো বা সমাধান করতে আর কোনই ভুমিকা থাকবে না, তাই নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার দিন। কেন?
    তত্বগত বা কিছুটা কঠিন ভাষায় বললে, বিজেপি চীনের সাথে কথিত সীমানা লড়াইয়ে হার স্বীকার করে  নেওয়াতে এনিয়ে কোন নির্বাচনে আর এটাকে ইস্যু করে সুবিধা হবে না। তাই ফেলে পালিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর বদলে “হিন্দুত্বের বিজয় ও গর্বের” উস্কানি তুলে আগামি ২০২৪ সাল পর্যন্ত সব নির্বাচনে ভোট চাইবে মোদী ও বিজেপি। অর্থাৎ এবার মাঠের ভাষায় বললে, মোদী ও বিজেপি  – চীন, পাকিস্তান বা সীমান্ত এসব ইস্যু আর ভোট-নির্বাচনে নিয়ে আসবে না, মোদী ভোট চাওয়ার ইস্যু করবে না।  তারা প্রধানত, রামের নামে (মসজিদের উপর রামের মন্দির নির্মাণের বিজয়-সাফল্য, ফলে তারাই আসল রামভক্ত, পুজারী ইত্যাদিতে মিথিক্যাল রামকে বাস্তব বানানোর কারবার), এভাবে ভোট চাইবার রাজনীতি শুরু করবে। মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের সাফল্য হবে বিজেপির প্রধান নির্বাচনি ফোকাস বা অর্জন বলে হাজির করা। এটাই এখন থেকে হিন্দুত্বের বা হিন্দু ভোট মেরুকরণের প্রধান ফোকাস হবে।
    ওদিকে ঠিক একারণের আমরা লক্ষ্য করছি এর বিপরীতে এবার, কংগ্রেসের তাতপর্যপুর্ণ সিদ্ধান্ত হল যে তারাও এখন থেকে  বিজেপির মত হিন্দুত্বের রাজনীতিই করিবে।  এনিয়েই প্রতিযোগিতায় নামবে। ৫ আগষ্ট উপলক্ষ্যে  মা সোনিয়া অথবা ভাই রাহুল নয়, প্রিয়াংকাকে দিয়ে  কংগ্রেস সিদ্ধান্ত জানিয়েছে যে মোদীর মসজিদ গুড়িয়ে এর উপর মন্দির নির্মাণের সাফল্যের  ‘ভুমি পুজার” দিন – এই হিন্দুত্বের ভাগ নিতে কংগ্রেসও এগিয়ে এসেছে। তাই কংগ্রেস মনে করছে, এদিন নাকি কথিত জাতির ইউনিটি, ভাতৃত্ব ও সাংস্কৃতিক সহমর্মিতা প্রকাশ ও উতযাপনের দিন – আর আনন্দবাজার লিখেছে প্রিয়াংকা বলছে রাম নাকি সবার করার দিন, তা সকলের উতযাপনের দিন এই ৫ আগষ্ট। সবচেয়ে ভয়ানক বোকার মত কথা তিনি বলেছেন,  ‘Rab is Ram’।

    “a celebration of national unity, fraternity and cultural affinity” – WIRE.  “রাম সবার” – আনন্দবাজার

    সোজা কথায় মসজিদ ভেঙ্গে দেয়া এখন থেকে কংগ্রেসের চোখে কথিত জাতীয় উতসব আবার ভাতৃত্বেরও নাকি দিন! এ কেমন জাতি? আর কাদের কাদের মধ্যেইবা ভাই গিরি? সে এক বিরাট বিস্ময়। মোদী-অমিত-মোহন ভাগওয়াত থেকে গোলঅওয়াকারও যেটা সাহস করে নাই, কংগ্রেস এখন থেকে সেই কথিত হিন্দু জাতি, হিন্দুত্ব এসবের ভিত্তিক রাজনৈতিক দল হিসাবে যাত্রা শুরু করল।  আর তাকে অনুসরণ করেছে আম আদমি পার্টিও। তাই ভারতের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে ভবিষ্যতে বিজেপির সাথে কংগ্রেসের কোন ভুমিকা থাকবে না তাই নির্ধারিত হয়ে গেল। আর মোদীর বিজয় হল এই যে এখন থেকে (মমতার মত দুএকজন বাদে) সবার রাজনীতির ভিত্তি হল সরাসরি হিন্দুত্ব। ]

    সম্প্রতি ভারতে চীনের রাষ্ট্রদূত সান ওয়েদং একটি ভার্চুয়াল বা অনলাইন কথোপকথনে অংশ নিয়েছিলেন। ‘ওয়াইর’[WIRE] ভারতের এক ইংরেজি ওয়েব পত্রিকা, যেটি একালে এক ব্যতিক্রম; উগ্র জাতিবাদী যুদ্ধবাজ চিন্তাধারী ও হিন্দুত্ববাদীদের ঠিক বিপরীতে সরকারবিরোধী অবস্থান নিয়ে রিপোর্ট করে যাচ্ছে। এই ওয়াইর পত্রিকাও উপস্থিত ছিল। তাদের বরাতে আমরা জানছি, রাষ্ট্রদূত সেখানে মোটাদাগে কী বলেছেন। সেই প্রসঙ্গে যাবার আগে অন্য কিছু কথা।

    ভারত-চীনের বাস্তব সীমান্তঃ
    সীমান্ত বা ম্যাপ নিয়ে তত্ত্বকথা থুয়ে বাস্তবে আসি।   ভারতের অভ্যন্তরে এখন প্রধান আলোচ্য বা তর্ক হল – প্রতিহিংসা – যে কী উপায়ে ‘প্রতিশোধ’ নেয়া যায়।  ভারতের ভাষায় “মুখ-তোর” বা বাংলায় বললে “দাঁতভাঙা” জবাব দেয়ার পথ খুঁজছে তারা। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, ভারতের চরম জাতিরাষ্ট্রবাদী রাজনীতির কারণে এর প্রতীক মোদী সরকারকে চীন একেবারে আউলায়ে দিয়ে চরম অপমানিত করে দিয়ে গেছে। যখন অন্তত ২০ সেনার নির্মম মৃত্যুর পর মোদীকে দিয়ে চীনারা বলিয়ে ছেড়েছে – ভারতের ভূমিতে (চীনারা) কেউ  আসেনি, বেদখল হয়নি। যার মানে দাঁড়িয়েছে অন্তত ওই ২০ জন সেনা চীনা ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করে চীনাদের হাতে মারা গেছে। এরচেয়ে বড় অপমান আর কী হতেপারে! এছাড়া এভাবেই গলওয়ান উপত্যকা পুরাটাই চীনাদের, তাও মোদীকে দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেয়া হয়েছে। যদিও আরও অন্যান্য ভূখণ্ডগুলো এখনো চীন ছাড়ল না কেন, কবে ছাড়বে, তাদের মুভমেন্ট কী – এ নিয়ে প্রতিদিন ভারতে মিডিয়া রিপোর্ট বের হচ্ছে, আর মোদীর উপর চাপ বাড়াচ্ছে। অথচ ভারতের সব মিডিয়াই জানে তারা একটা ‘জুয়াচুরি’ খেলছে। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য যদি হয় যে চীন, ভারতের কোনো ভূখণ্ডই দখল করে নাই। তবে এই যে প্রতিদিন রিপোর্ট লেখা হচ্ছে যে, চীন ভারতের ভূখণ্ড, অমুক লেক, অমুক ভূমি ছেড়ে যায়নি – এই এসবের কী কোনো মানে আছে? সত্যতা আছে?  প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষী যা দখলই হয় নাই তা আবার চীন ছেড়ে যাবে কী করে? দাবি করাই বা কেন?

    তাহলে কোনটা সত্য? চীন ভারতের কোনো ভূমি দখল নেয়নি? নাকি এখনকার মিডিয়া রিপোর্ট। ফ্যাক্টস হল, সারা ভারত জানে উগ্র হিন্দু জাতিবাদের মোদী এখানে সোজা  মার খেয়ে হেরে গেছে। জাতিরাষ্ট্রবাদী চিন্তায় যা এতদিন খুবই সহজ কাজ মনে করা হয়েছে যে যেকোন সীমান্তবিরোধকে আভ্যন্তরীণ নির্বাচনে “ভুয়া হিন্দুত্বের বিজয়” বা দেশপ্রেম হিসেবে দেখিয়ে হিন্দু পোলারাইজেশন ভোট ঘটানো চলে এসেছিল অথচ, আজ এখানে প্রমাণ হয়েছে এটা কত বড় আত্মঘাতী, এরই বড় প্রমাণ আমরা এখানে পাই।

    অথচ সীমান্তবিরোধকে তথাকথিত ‘জাতির’ হার-জিত হিসেবে দেখানোর কী আছে? সীমানা বিরোধকে মিটানোই দুই দেশের ডায়লগ সহ সবকিছুর লক্ষ্য, এটা তো কারো কোন “ভূমি বিজয়” একেবারেই নয়। দ্রুত যেকোনো সীমানা বিরোধ বা বিতর্ককে কথিত ‘হিন্দু জাতির’ হার-জিত হিসেবে দেখানোর মোদীর হিন্দুত্ব – এ ব্যাখ্যার কবলে পড়ে মোদীর অপমান এবং তার হিন্দুত্বের পতন বা মার খেয়ে যাওয়া এটাকেই এখন সারা ভারতের অপমান ও মার খেয়ে যাওয়া বলে হাজির করার কসরত চলছে। এছাড়া সারা ভারত জানে সামরিকভাবে  প্রতিশোধ নেয়ার অবস্থায় বা মুরোদে ভারত নাই। তাহলে?

    কোয়াড’ আসছেঃ
    অতএব  উপায়ন্তহীন মোদী এখন আরেক স্বপ্ন ছড়িয়েছেন – ‘কোয়াড’ [QUAD] আসছে। তারাই নাকি ভারতকে এবার প্রতিশোধ নিয়ে দেবে। এই কোয়াড কারা? কোয়াড শব্দের  এক সংস্কৃতিঘেঁষা বাংলা হবে চতুষ্টয় বা চারটা; মানে  চার মহাজন। তবে এখানে সুনির্দিষ্ট করে এর অর্থ চার রাষ্ট্রজোট – ভারত, আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু জন্ম থেকেই চলছে এর নানান উত্থান আর পশ্চাদ অপসারণ। জাপান এর জন্ম প্রস্তাব দিয়েছিল বাকিদের কাছে। কিন্তু তা দেয়ার পর ১০ বছর এর আর খবর ছিল না। এরপর ২০১৭ সালে যদিওবা এর জন্ম দেয়া হল, তাও সেটি কাকের ঘরে কোকিলের জন্মের মত করে। মানে ফিলিপাইনে ২০১৭ সালে উদ্যোক্তারা আরও অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে এক  ‘আসিয়ান সম্মেলন’ করতে এসেছিলেন। কিন্তু এর ফাঁকে মানে সাইডলাইনে বসে জন্ম দিয়ে ফেলেছিলেন কোয়াড নামে এক ব্লকের। কিন্তু তাতেও আবার জন্মাইছেন এ খবর সামনে আনতে প্রথম বিবৃতি দিতে গিয়েই ধরা। সেই মূল বিবৃতিটা চার দেশ চার রকমভাবে নিজেদের কথা ঢুকিয়ে এডিট করে ছেপেছিল। পরিণতি চারটি আলাদা ভার্সন এর, ২০১৭ সালে ভারতের দা হিন্দুর রিপোর্ট দেখেন এখানে। আর সেই সাথে এনিয়ে ততকালে আমার এক লেখা এখানে – “চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!”।

    তবু এদের মুখে কোয়াড নিয়ে হামবড়া গর্বের ফেনা তোলার শেষ নেই। বলা হচ্ছে – এটি নাকি ডেমোক্র্যাসি’স বা গণতন্ত্রওয়ালাদের জোট। আসলে তারা হল চীনবিরোধী, তাই। আমেরিকার ভাষায় চীনে তো ‘গণতন্ত্র’ নাই, তাই তাদের পোয়া বারো।  আর তাতেই চীনবিরোধী  বলে ঐ চার রাষ্ট্র নিশ্চয় “ডেমোক্রেসির চ্যাম্পিয়ান”।  নিজেরা কী তা বুঝানোর এটাই তারা তরিকা হিসেবে নিয়েছে। অথচ ঘটনা হল, জন্ম থেকেই এই ডেমোক্র্যাসি শব্দটা সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নকে খাটো বা নিচা করে দেখাতে আমেরিকা জন্ম দিয়েছিল। আর রাষ্ট্র বুঝাতে ক্লাসিক্যাল মূল শব্দটা হল – ‘মর্ডান রিপাবলিক’, কখনই যাকে ডেমোক্রাসি বলা হয় নাই। তা বাদ রেখে একটু সরিয়ে সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নকে খোঁচা দিতে এই শব্দ হাজির করা হয়েছিল। তো ভালো! কী আর বলব। হিন্দু উগ্র জাতিরাষ্ট্রবাদী মোদী আর তার অনুসারীরা যদি ভারতের কোন মুসলমান নাগরিকের বুকের ওপর উঠে; তাদের বুকের হার ভেঙ্গে দিয়ে জবরদস্তিতে তাকে দিয়ে জয় শ্রীরাম বলানোকে তাদের “ডেমোক্র্যাসির” বিরাট নায়ক বলে জাহির করতে থাকেন আর মোদী ঐ ডেমোক্রাসির বিরাট নেতা হন – তাহলে বলতে হয়, হে ডেমোক্র্যাসি দূরেই থাকো, আমার লাগবে না! তা তোমাদেরই থাক। আর অমন ডেমোক্রাসিকে ধিক্কার!
    এর মানে আবার অবশ্যই এও নয় যে, চীনারাষ্ট্র এর কোন অযোগ্যতা বা খামতি নাই। তবে অবশ্যই এই কথিত ‘ডেমোক্র্যাসি’র ফেরিওয়ালারা বিপজ্জনক ও ধান্দাবাজ। এমনই ধান্দাবাজ  যারা আবার নিজেরা চার রাষ্ট্র পরস্পরকেই বিশ্বাস করে না। তো এই ফেরিওয়ালারা ২০১৭ সালে জন্মের পর থেকে ঘুমিয়েই ছিলেন। কোন সক্রিয়তা ছিল না। কিন্তু গত এক মাসে আবার জেগেছে। তাতে চীনাদের হাতে অপমানিত ভারত ও মো্দী যেন তিন দিনের ক্ষুধার্ত লোক যে প্রথম রুটির দেখা পেল। সর্বস্ব হতাশায় ঢুবে যাওয়া ভারতের মনে এবার সবার মনে তাই আশা, এবার মনের জ্বালা মিটবে! কিন্তু আদৌ মিটিবে কী?
    সন্দেহ আছে প্রবল। যেমন জাপানের পত্রিকা নিক্কিই-এর উপ- শিরোনাম হল, Pompeo says ‘Quad is revived’ and calls for democracies to unite। আর শিরোমানে নিজেরাই সন্দেহ রেখে বলছে এটা এমবিশাস, মানে উচ্চভিলাসী – US seeks ambitious relationship with ‘global power’ India.।
    এদিকে চীন-ইরান ২৫ বছরের চুক্তি হচ্ছে এই খবর বাজারে এসে যাওয়ার পর ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (সমতুল্য) মাইক পম্পেও ইউরোপে গিয়েছিলেন। পরে অস্ট্রেলিয়াতেও যান। কিন্তু ২৯ জুলাই পম্পেওকে অষ্ট্রেলিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানালেন, “চীনবিরোধিতা প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়া আমেরিকাকে আংশিক সাপোর্ট দিবে” [Australia gives US partial support against China]। এই হল মিডিয়া শিরোনাম। শুধু তাই নয়, ভেতরে লিখছে পার্শিয়াল মানে কী। বলছে  – দক্ষিণ চীনসাগরে চীনবিরোধী জোটের মহড়ায় অস্ট্রেলিয়া যোগ দিবে না। আরো আছে। চীনের সাথে অস্ট্রেলিয়া গভীর বাণিজ্য সম্পর্ক সে অটুট […pursue policies independent of both the US and close trade ally China.] রাখবে। আর লাগে কিছু? বোঝা গেছে না!

    ঘটনাটি তাহলে কী? কোয়াড ব্লক দাঁড়ায় না কেন? অথচ ইন্ডিয়ানরা এত ভরসা করে বসে আছে! এমনকি ফিলিপাইনে থাকেন এক ভারতীয় অরিজিন হায়দারিয়ান সম্ভবত খ্রিষ্টান, তিনি এশিয়া টাইমসে লিখেন। তিনিও প্রবল উৎসাহে গত সপ্তাহে ২৭ জুলাই কোয়াড নিয়ে রিপোর্ট লিখছেন এক আকাশ ফাটানো শিরোণামে Quad alliance forms ‘arc of democracy’ around China। কিন্তু লেখার মাঝখানে নিজেই লিখছেন, কিন্তু চীনের সাথে ব্যবসায় লাভালাভের স্বার্থে ইন্ডিয়া আর অস্ট্রেলিয়া এরা কখনো চীনবিরোধী এই জোটে সক্রিয় হয়নি ……India and Australia were until now often reluctant to participate in an ostensibly anti-China alliance.।

    তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়?
    একটা মৌলিক দিক নিয়ে কথা তুলব। সে শব্দটা হল অবজেকটিভ। কিন্তু এর মানে কী? ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প কিংবা সুনামি এধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি জানি। কিন্তু মানুষ কি কখনো এর বিরুদ্ধে, যেন দুর্যোগ থামিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে লড়াই-এর চিন্তা করছে – এমন কী আমরা কখনো দেখেছি? অবশ্যই না। বরং আমরা সবসময় দেখি এধরণের খবরটা জেনে নিয়ে মানুষ এবার এর সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া যায় কী করে; যাতে লক্ষ্য থাকে কত কম ক্ষতিতে এটি পার করা যায় কিভাবে। মানে কোনো লড়াই নয়, বরং একভাবে একে স্বাগত জানানোই বলা যায়। এগুলোকেই আমরা অবজেকটিভ ঘটনা বলতে পারি। যা অবজেক্টের উলটা  সাবজেক্ট – মানে কর্তা মানুষের কারণে ঘটে না। (যদিও লোভে অজান্তে করে বসতে পারে।)  এগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা। এই অবজেকটিভ ঘটনাগুলোর প্রতি সাবজেক্ট মানুষের আচরণ সবসময় সব কালেই পুর্বনির্ধারিত। আর তা হল  অধস্থন, অবজেকটিভিটির বশ্যতা স্বীকার করে নেয়া।  অবজেকটিভ ক্ষমতার সামনে দাঁড়ানো বোকামি। তাতে সেটাকে প্রাকৃতিকতা বলেন কিংবা স্পিরিচুয়ালিটি বলেন – এমন কোন ফারাক নাই।  তবে এপ্রসঙ্গে একজনের নাম ও পরিণতি মনে করতে পারেন  – রবার্ট ম্যাকনামারা Robert S. McNamara । আমেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী (সমতুল্য) ভিয়েতনাম যুদ্ধের কু-নায়ক ও কেমিকেল অরেঞ্জ বোমা ফেলায় আজীবন সকলের বদ-দোয়া প্রাপ্ত খলনায়ক তিনি। যার কারণে এখনও ভিয়েতনামে বিকলাঙ্গ বাচ্চা পয়দা হচ্ছে, কেউ জানে না কার বেলায় কোন হবু বাচ্চার সেটা হবে।ম্যাকনামারা ছিলেন অবজেকটিভিটির সাথে লড়তে যাওয়া কুখ্যাত বোকা। অতএব, সব সমাজের দুরছাই নিন্দা এড়াতে জীবনের শেষ বিশ বছর তিনি নিজেকে ঘরে বন্দী করে কথা না বলে কাটিয়েছেন।
    তাহলে সারকথাটা হল, অবজেকটিভিটি প্রসঙ্গে সাবজেক্ট মানুষ হিসাবে আমাদের ভূমিকা নির্ধারিত। তা হল- কোনো লড়াই বা যুদ্ধ একেবারেই নয়, বরং পাশ কাটিয়ে থাকা যতটা সম্ভব যাতে ক্ষতি কম হয়। বলা যায়, তাই আমরা এ ধরনের অবজেকটিভ বা ‘প্রাকৃতিক’ ঘটনার সাথে আমরা ভুলেও লড়তে যাই না। এটি আমাদের কাজও নয়।
    ওদিকে আরেকটা ধারণা হল “গ্লোবাল”; মানে – একটি গ্লোবাল সিস্টেমের প্রয়োজন শুরু হয়; যেকোনো দুটি রাষ্ট্রের পণ্য বিনিময় বাণিজ্যের লেনদেনের প্রয়োজন মিটাতে। কেন? কারণ ওই লেনদেন বাণিজ্যে দুই রাষ্ট্রের কারো মুদ্রা দিয়েও বাণিজ্য চালানো যায় না। মুদ্রামান, বিনিময় হার জানা ছাড়া বিনিময় অসম্ভব। এখান থেকেই গ্লোবাল মুদ্রা, এর মান এক ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা’ কার্যকর থাকার প্রয়োজনীয়তা্র অনুভব ও তা মিটানোর শুরু।
    সময়কাল ১৬০৭-১৯৪৫, এই প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি দখলের আমলে ‘আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা’ খুবই সীমিত ছিল। তাই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক গ্লোবাল বাণিজ্যব্যবস্থা কার্যকর চালু ছিল না। কিন্তু এই ব্যবস্থা বা গ্লোবাল অর্ডার দুনিয়া প্রথম চালু হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে ১৯৪৫ সাল থেকে। আর ‘গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায়’ মেজর লেনদেনের মুদ্রা এখনো ডলার, আর এর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান মালিকানা শেয়ারও ঐ আমেরিকার হাতেই। বিগত ৭৫ বছর ধরে আমেরিকা নেতার অবস্থান নিয়ে আছে। যদিও এ প্রভাব ইদানীং কমে আসছে, বিপরীতে চীন সে জায়গা নিয়ে ক্রমেই উঠে আসছে। আমাদের বক্তব্যের ফোকাস হল – এই দুই দেশের উঠে আসা বা পড়ে যাওয়াটা যত না সাবজেকটিভ, এর চেয়ে ঢের ঢের বেশি এটা বস্তুগত, তাই অবজেকটিভ ঘটনা। দুনিয়ায় উদ্বৃত্ত সম্পদ বা পুঁজির সঞ্চিতি বা একুমুলেশন একেক সময় মুখ্যত একের দেশের হাতে, নানা কারণে ঘটেছে। এটা আবার সহসাই চলেও যায় না। আবার, কবে আসবে কবে নাগাদ যাবে তাও আন্দাজে বলা যায় না।  অতএব যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়ে চীনের উত্থান ঠেকানো যাবে না। চীনের উত্থানের বড় দিকগুলোই এক অবজেকটিভিটি।
    কিন্তু এরপরও মোদীরা জিদে ধরা যাক যুদ্ধের দিকে ঘটনা গড়িয়ে দিল। কিন্তু আর ঘটনা বৈশিষ্ট হল যতই নাবুঝা কল্পনায় বলি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা – এগুলো কিন্তু ভুয়া আর মিছা -পুরাটাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কল্পনায় ঠাসা যখন পারমানবিক অস্ত্র কথাটাই প্রচলিত ছিল না। কিন্তু এখন প্রধান বিবদমানদের হাতে পারমানবিক অস্ত্র আছে। অতএব এখন যুদ্ধ মানে সে্টা খুবই সীমিত পরিসরে রাখতে হবে; কারণ তা কোনোভাবেই যেন পারমাণবিক উস্কানির দিকে না যায় তা দুপক্ষকেই মনে রাখতে হবে। যতই জিদ উঠে যাক সীমিত যুদ্ধে থাকতেই হবে। সীমিত যুদ্ধ মানে তা আপস মিটমাটের রাস্তায় নিতে সচেষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু তাতেও সবচেয়ে বেশি অর্থনীতির ক্ষতি হবে চীন বাদে বাকি সবার। কারণ, চীনের ক্ষতি সামলানোর দিক থেকে সবার চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকবে। কিন্তু এরপরও ঘটনা এখানেই শেষ নয়। বলা যায় শুরু। কেন?

    কারণ, এই কথিত ডেমোক্র্যাসিসরা তাদের ভেঙেপড়া অর্থনীতি আবার চাঙা ও পুনর্বাসন করতে দুনিয়ায় সাহায্য পাবার মত একমাত্র শক্তি বেঁচে থাকবে চীনই। ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে দেখতে পারেন ঠিক এ ঘটনাই ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। যুদ্ধে হিটলারের জোটের বিরুদ্ধে যারাই আমেরিকার পক্ষে ছিল; সবাইকে যুদ্ধের খরচ দিয়েছে আমেরিকা, এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নকেও। আবার যুদ্ধ শেষে পুনর্বাসনের অর্থ জুগিয়েছে সকল্কে, ধার দিয়েছে সেও ঐ আমেরিকাই। এছাড়া সে যুদ্ধ শেষে আবার পরাজিত হিটলারের জার্মানি, তার বন্ধু জাপান বা ইতালি এদেরও পুনর্বাসনের অর্থ জুগিয়েছে ঐ আমেরিকাই। ইতালিতে তো দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। যে আমেরিকার বিরুদ্ধে মুসোলিনি যুদ্ধ করেছিল; ইতালীয়রা সেই আমেরিকার কাছেই ভিক্ষা চেয়েছিল, দুই হাত তুলে তাদের গডের কাছে মিনতি জানিয়েছিল আমেরিকাকে সুমতি দিতে এবং আমেরিকাও হাত খুলে সাহায্য এবং পুনর্বাসন সব কিছু অর্থ ঋণ-অনুদান দিয়েছিল। কাজেই……।

    দুনিয়া খুব কঠিন জায়গা। ইতিহাস পড়েন, একই ভুল দ্বিতীয়বার করার মানে হয় না। রেললাইনে মাথা দিয়ে আবার বুঝার দরকার নেই যে মাথা কাটা যাবেই। কাজেই প্রথম কাজ বুদ্ধিমান হন। জিদ ত্যাগ করেন, প্রতিশোধের স্পৃহা ত্যাগ করেন। এটি নেগেটিভ এনার্জি। এটা কমবেশি সবার ক্ষতি করবে। মূলকথা, মানুষের স্বভাব বা কাজ না অবজেকটিভিটির বিরুদ্ধে লড়া। নিজের স্বার্থের জন্য লড়বার আরো অনেক পথ আছে, সেগুলো খুঁজেন, ইনোভেটিভ হন। রাস্তা পাবেন। কেবল সতর্ক থাকেন কোনগুলো ধ্বংসাত্মক, তা এড়ায় চলেন। আর সবচেয়ে বড় কথা (থিওলজিতে বিশ্বাসী লোকেরা বলবে আল্লা চাহে তো) আস্থা রাখেন দিন আপনারও আসবে!

    কিন্তু এখনই একটি পরীক্ষা করে নেন। আমেরিকার ট্রাম্প যে কোয়াডের পিছনে তাল দিচ্ছেন তাতে তিনি নিজে থাকবেন তো? নাকি? ২০১৭ সালে জন্মের সময় ট্রাম্পের আমেরিকা কিন্তু পালিয়েছিল। কারণ সেবারই সবার আগে ট্রাম্পের চীন সফর ছিল। সমস্যা হয়েছিল চীন ঠিক কত কী বাজারসুবিধা দিতে রাজি; তা ক্যালকুলেট করতে সময় লাগছিল বলে তত দিনে ট্রাম্প ফিলিপাইনে এসে কোয়াডের জন্ম ঘোষণা করে দেয়ার পরই চীন থেকে বাজারসুবিধা দেয়ার তালিকা এসে পড়াতেই ট্রাম্প আর কোয়াডের পক্ষে থেকে শক্ত অবস্থান নিতে যা কথা হয়েছিল তা আর এমনকি যৌথ বিবৃতিতেও হাজির করতে রাজি থাকেননি। আর তা থেকেই অন্তত তাদের যৌথতায় – তাতে ভাঙনের একটি কারণ।

    তাহলে এবার? এবারো আমেরিকাকেই পরীক্ষা করতে বলছি। মূলত ট্রাম্প চীনবিরোধী যত গরম গরম কথা বলেছেন – সেগুলার মধ্যে আমেরিকার রাষ্ট্রের নীতি-পলিসি এর কোনগুলো বা কত শতাংশ আর কতটা ট্রাম্পের নির্বাচনী ভোট টানতে চেয়ে বলা হচ্ছে –  তা আগে পরিষ্কার হতে নেন। কেন?

    সাংবাদিকরা প্রশ্ন করে ট্রাম্পকে তাড়া করে বেড়াচ্ছেন যে “কিছু দিনের মধ্যেই লকডাউন থেকে তড়িঘড়ি করে সব খুলে ফেলার চাপের কারণেই মূলত ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে”। এ জন্যই দেড় লাখের বেশি আমেরিকানের মৃত্যু হয়েছে। এটা ট্রাম্পের চরম ব্যর্থতা কী না? তাই ট্রাম্প প[আলিয়ে বেড়াচ্ছেন।  ট্রাম্পের প্রতি ঠাট্টাগুলো লক্ষ্য করেন, আর কত লোক মরলে পরে আমেরিকা মহান (great) হবে?  আর ততই তিনি ভোটারদের মধ্যেও এই মনোভাব বেড়ে যাওয়ার কারণে তিনি এখন উঠতে বসতে  চীনবিরোধি গরম কথা বলছেন। “চীনা ভাইরাস” বলে নিজের সব দুর্ভাগ্যের জন্য সব কিছুর জন্য চীন দায়ী বলে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা তুঙ্গে নিচ্ছেন। কাজেই কোনটা চীনবিরোধী রাষ্ট্রের পলিসি অবস্থান আর কোনটা ট্রাম্পের ভোটের বাক্স ভরানোর প্রপাগান্ডা তা একমাত্র আলাদা হয়ে যাবে নভেম্বরের ৩ তারিখের নির্বাচনের পর। এর আগে পর্যন্ত এটা মাখামাখি হয়েই থাকবে।  কাজেই মোদী যে আমেরিকার উপর আস্থা বিশ্বাস রাখছেন ঢালছেন – এর ভিত্তি ঠিক আছে তো?

    আবার দেখেন ট্রাম্প সরকারের আয়ু মূলত আর তিন মাস। কারণ নির্বাচনী ফল হয়ে যাওয়ার পর সেটা মূলত রুটিন সরকার। তাহলে এই তিন মাসের জন্য পম্পেও এর এত দৌড়াদৌড়ি, কোয়াডের প্রপাগান্ডা এটি কি একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না, অসঙ্গতিপূর্ণ নয়? এগুলো একমাত্র সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে যদি এগুলো সবই নির্বাচনে ভোটারদের প্রভাবিত করতে করা হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে পম্পেওর দৌড়াদৌড়িও – সেটাও খুবই পারফেক্ট টাইমিং। কিন্তু মোদীর জন্য তাহলে কী হবে? হিন্দু জাতিবাদী মোদী ও তার সকল সমর্থকরা এদের জন্য কী হবে? হতাশায় আত্মহত্যা বাড়াবেন? এটা হতেও পারে!

    ওদিকে আরেক ঘটনা তৈরি হচ্ছে। এখন ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক জাতীয় বিদ্বানেরা কিভাবে চীনের বিরুদ্ধে খোঁচাখুঁচি লাগানো যায় তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্কবিতর্ক করে তাদের দিন যাচ্ছে। এতে সবচেয়ে উপরের জনপ্রিয় আলাপটা হল, চীনের একচীন নীতি বা তিব্বত বা হংকং নীতি ভারত না মেনে ভাঙলে চীন কেমন শায়েস্তা হবে – এই হল তাদের আলোচনার প্রসঙ্গ। অর্থাৎ তাইওয়ান, হংকং বা তিব্বত এদেরকে স্বাধীন রাষ্ট্রের মত খাতির আচরণ করা বা মর্যাদা দেয়া। অথচ এতে প্রধান ভায়োলেশনটা হবে, চীন যেকোনো দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক পাতানোর আগে এক পূর্বশর্ত স্বীকার করিয়ে নেয় যে – তাইওয়ান, হংকং বা তিব্বত ইত্যাদি এগুলো কোনো স্বাধীন ভূমি নয়, চীনেরই অংশ বলে গণ্য করতে রাজি হতে হবে। অর্থাৎ এই বিদ্বানেরা বলতে চাইছেন; তারা মোদীর ভারতকে পরামর্শ দিচ্ছেন – যার সোজা মানে মোদী যেন চীনের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেন। কিন্তু এত দূর পরিণতি কী তারা মেপে কথা বলছেন? আমরা নিশ্চিত নই।

    যাই হোক, উপরে ভারতের চীনা রাষ্ট্রদূতের কথা বলছিলাম। তিনি ওই আলাপে এ প্রসঙ্গগুলো নিজেই এনে পরিস্থিতি সম্পর্কে পাকা বোঝাবুঝি রেখে কাজ করতে পরামর্শ রেখেছেন। ভদ্র ও বক্তব্য নরম রাখতে বলেছেন। উভয় পক্ষেরই উচিত হবে পরিস্থিতি সম্পর্কে উভয় পক্ষ (মানে চীনা পক্ষও) যেন ভালো আর পুরো বোঝাবুঝি করে এরপর পদক্ষেপ নেয়। তবে ভারতের সাথে সীমান্ত নিয়ে তিনি কিছু সোজা ইঙ্গিত দিয়েছেন, সে্টার প্রসঙ্গে বলেই আজকের লেখা শেষ করব।

    মায়েদের দুষ্ট সন্তানকে সামলানোঃ
    কথাগুলো অনেকটা দুষ্ট সন্তানকে সামলাতে মায়েরা অনেক সময় শর্ত দিয়ে কথা বলেন। বলেন যে, পায়েস তিনি আজ রেঁধেছেন, তুলেও রেখেছেন বাটিতে। কিন্তু শান্ত ও বুঝমান সন্তানের মত আচরণ যারা করবে তারাই কেবল ঐ পায়েসের বাটির হকদার হবে। ঠিক এইকথা মনে রাখলে আমরা চীনের পদক্ষেপগুলোর অর্থ বুঝতে পারব।
    চীনের সাথে ভারতের এবারের সঙ্ঘাত মূলত লাদাখ অঞ্চলে। কাশ্মীরেরই ভারত-চীন সীমান্তের অংশ এটা।  কিন্তু এখানেই কেন? কারণ ভারত গত বছর এই ৫ আগস্টই লাদাখেরই স্ট্যাটাস বদলিয়েছে। কেন? ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মির ভারতেরই অঙ্গীভূত করে নেয়ার সময়। এই ঘটনাটা বিজেপির হাতে পড়ে কাশ্মির মোদীর কাছে জাস্ট একটা হিন্দু পোলারাইজেশন ঘটিয়ে ভোট পাওয়ার ইস্যু। যাতে মোদী ব্যাপারটাকে ‘হিন্দুজাতির বীরত্ব’ হিসেবে দেখিয়ে আরো বেশি ভোট পেতে পারেন, এরই লক্ষ্য। এতে কাশ্মিরিদের কী পরিণতি হবে অথবা পড়শিদের কাছে কী ম্যাসেজ যাবে এ নিয়ে তিনি পুরো বেপরোয়া থাকবেন।

    যেমন ম্যাসেজ কী গেছে?
    চীন-ভারত যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৬২ সালে। ওই যুদ্ধের আগে ও পরে লাদাখ অঞ্চলের বহু অংশই চীন দখলে নিয়ে নিয়েছিল। পরে আস্তে আস্তে সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করলে ১৯৯৩-৯৬  এই সময়টা ভারতের জন্য ছিল খুবই নির্ধারক। এ সময়কালেই লম্বা সময় ধরে চীন-ভারত সীমান্ত আলোচনা চলেছিল। পুরনো ১৯৫৮-৬০ সালের সেই এলএসি দেখিয়ে চীন যেসব ভূখণ্ড দাবি করত সেসব দাবির বড় বড় অংশ ১৯৯৩-৯৬ সালের আলাপের সময় চীন ভারতকে ছেড়ে দিয়েছিল। আসলে সেটা চীনের ভাষায়,  শান্ত ও প্রশান্তির কামনা ও আকাক্ষায় ভারতকে পেয়েছিল বলে  দুই দেশের সীমান্ত আলাপে এভাবে এগিয়ে এসেছিল চীন। কিন্তু গত বছর কাশ্মির ও লাদাখের স্ট্যাটাস মোদীর খেয়ালি একক ইচ্ছায় বদলে দেওয়াতে – এটা ওই ১৯৯৩-৯৬ আলোচনার সময়ে তৈরি হওয়া যে পারস্পরিক বোঝাবুঝি তা পুরো উপেক্ষা ও ভেঙে ফেলা হয়েছে বলেই চীন মনে করছে। আর ঠিক একারণেই এখন ১৯৫৮-৬০ সালের দাবির এলএসি মোতাবেক সব পুরানা ছাড় দেওয়া ভুখন্ড চীন আবার দখল করে নিয়েছে। সেই ধারণাতে ফিরে গেছে। তাই চীন এখানে পরামর্শে ও ইঙ্গিতে বোঝাতে চায় যে, ভারত যদি ফের শান্তি চায় বিশ্বাস করাতে পারে – আর যেসব বিষয়ে পারস্পরিক বোঝাবুঝিতে সম্পর্কের অনেক অগ্রগতি হয়েছিল তা ফিরিয়ে আনে, তবেই  চীন একমাত্র ১৯৯৩-৯৬ সালের বুঝাবুঝি সীমানা বা এলএসিতে আবার ফিরে চলে যাবে। ভারতকে ভূখণ্ড ছাড় আবার দেবে। নইলে না। আর যদি উল্টা ভারত আমেরিকার কোলে গিয়ে উঠে আর এক-চীন নীতি ভাঙাসহ নানা হুমকি দিতে থাকে তবে সীমান্ত ১৯৫৮-৬০ সালেরটাই বহাল থাকবে। শান্তি চাওয়া সৎ প্রতিবেশী হলে একরকম আর উল্টাটা হলে আরেক রকম। সারকথা, সিদ্ধান্ত ভারতের। ভারতকেই ঠিক করতে হবে সে কোন পথে যাবে, ঠিক কী চায়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৭ আগষ্ট ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “ভারতকে বেছে নিতে হবে কোনদিকে যাবে” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]