Category: Politics

  • বন্যার পানি বা পানি পাবার সমস্যা ভারতকে তোষামোদ-চাটুকারিতা করে মিটবে না

    বন্যার পানি বা পানি পাবার সমস্যা ভারতকে তোষামোদ-চাটুকারিতা করে মিটবে না
    গৌতম দাস
    ২৩ আগষ্ট ২০২৪
    https://wp.me/p1sCvy-5H2

                              বন্যা মোকাবিলায় বাংলাদেশ–ভারতের নতুন ব্যবস্থার প্রস্তাব প্রধান উপদেষ্টার

     

    সবার আগে এখন সারকথাটা বলিঃ
    আন্তর্জাতিক নদী আইন এর শুরু বহু পুরানা ১৮৮৭ সাল থেকে। আর একালে জাতিসংঘের জন্মের পরে ২০১৪ সাল।
    জাতিসংঘের কনভেনশন (২০১৪) অনুসারে অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশেরও সমান অধিকার আছে। তাই কমন বা অভিন্ন নদীতে উজানের দেশ এককভাবে নদীর প্রবাহে কোন বাধা সৃষ্টি (বাধ দিয়ে বাধা দেয়া আর যখন ইচ্ছা সেই বাধের পানি ছেড়ে দেওয়া; কখনো পানি প্রবাহের স্বাভাবিক গতিপথ ঘুরিয়ে দেয়া বা পানি অন্যদিকে টেনে নেয়া ইত্যাদি) করতে পারে না।  অথচ ভারত আমাদের  (৫৪ অভিন্ন নদীর প্রায় সব ) অভিন্ন নদীতে এমন নানান স্থাপনা নির্মাণ করেছে। আমাদের ভাটির দেশের অনুমতি না নিয়ে এবং একচেটিয়া যা খুশি করে।
    [অভিন্ন নদীঃ মানে ভারত-বাংলাদেশ হয়ে শেষে বঙ্গোপসাগরে মিলেছে যে নদী; আবার হতেও পারে তা প্রথমে ভারতে প্রবেশের আগে হয়ত চীনে উতপত্তি। কিন্তু যেটাই হোক, ভারত-বাংলাদেশ হয়ে শেষে বঙ্গোপসাগরে মিলেছে যে নদী সেটাই এখানে অভিন্ন নদী বলতে বুঝানো হয়েছে। আর ভাটির দেশ [RIPARIAN country] বলতে এখানে মানে হল যে নদী ভারত-বাংলাদেশের অভিন্ন নদী এবং এই কমন নদীর ভাটির দেশ হল বাংলাদেশ, উজানের দেশ হল ভারত। ]

    তাহলে এখন বাংলাদেশ সরকারকে  কী করতে হবেঃ 
    বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে জানতে চাইবে – ভাটির দেশ বাংলাদেশের অভিন্ন নদীতে কোন অধিকার আছে বলে কী ভারত মনে করে তাদের মনোভাব কী?
    স্বভাবতই ভারত বলবে (অনুমান করি) আমরা জাতিসংঘেরসহ এমন কোন কনভেনশনে স্বাক্ষর করি নাই। তাই বাংলাদেশের অধিকার নিয়ে আমাদের আন্তর্জাতিক বা অন্যকোন বাধ্যবাধকতা নাই।

    এখন আমাদের সরকারের করণীয় কী?
    আমরা তখন ভারতকে জানিয়ে দিতে পারি যে, যে ভারত ভাটির দেশ বাংলাদেশের অভিন্ন নদীতে কোন অধিকার স্বীকার করে না সেই বাংলাদেশ ভারতের সাথে কোন সম্পর্ক রাখবে না, সব ধরণের “বিনিময় সম্পর্ক” ছিন্ন করছে।
    এখানে এই বিনিময় বলতে বুঝতে হবেঃ ব্যক্তি সম্পর্ক থেকে পণ্য বিনিময়, বাণিজ্য ভাব ভালবাসাসহ সবকিছু। তবে বাংলাদেশের যারা ব্যক্তি ভাব ভালবাসা করতে চাইবে তারা তৃতীয় দেশে গিয়ে করতে পারে।
    আর সীমান্ত সিল করা থাকবে, পাঁচ কিমির মধ্যে বিডিআর-সেনারা ছাড়া কোন নাগরিক যাবে না। ইত্যাদি
    এমন এসব কিছু ভিন্ন আমাদের কী করার আছে অন্তত আমি দেখছি না।

     এখন ইউনুস সাহেব কী করছেনঃ
    গতকাল ভারতের রাষ্টদুত প্রণয় ভার্মার সাথে তাঁর যে বৈঠক তাদেখে বলা যায় তিনি ভেবেছেন এটা ভারতের পিঠে হাত বুলিয়ে তিনি পার পাবেন। অথচ প্রথম কথাটা হল তিনি সমস্যার গোড়াটাই এখনও জানেন না। কোন হোমওয়ার্ক করা নাই।
    তাই উনি চাচ্ছেন ভারত বাধ সহ যত রকমের বাধা অভিন্ন নদীতে দেয়া দিতেই থাকবে; বাংলাদেশের ভাটির দেশের পানিতে অধিকার ভারত পায়ে দলতেই থাকবে। কেবল বাধ খুলে দেয়ার (অটোমেটিক খুলে দেয়া সিস্টেমের বেলায় অটোমেটিক খুলে যাবে আর ভারত বলবে আমি বাধ খুলি নাই) আগে আমাদেরকে একবার জানিয়ে দায় খালাস করবে এই ব্যবস্থা চালু হোক।  আর আমরা পানিতে আমাদের অধিকার পাব না এটা চলতেই থাকবে। মোদি-মমতাও বলতে থাকবে আগে ভারতের লোক সব পানি তারাই কেবল করবে এরপর যদি বাচে তাহলে বাংলাদেশকে দেয়া যায় কিনা দেখা যাবে। আর বাধ দিয়ে তা ভেঙ্গে পড়লে বা আটকাতে নাপারলে ইচ্ছামত তা ছেড়ে দিয়ে আমাদের ভাসিয়ে দিবে। আর আমাদের ভারত-প্রেমি সেকুলার, কমিউনিস্ট, প্রগতিশীলেরা সাক্ষ্য দিয়ে বলতে থাকবে (এবারও অনেকে বলেছে) যে ভারতের কোন দোষ নাই!
    কিন্তু অভিন্ন নদীতে বাধ দেয়া হল কেন? বাংলাদেশের পানিতে অধিকার কোথায় গেল ইত্যাদি এসব নিয়ে ইউনুস সাহেব কথা তুলতে চান না। আর এখাবেই তাই অন্তর্বর্তীকাল উনি ভারতের দালালি করেই কাটিতে চাইতেছেন!

    আরও কিছু বাস্তবতাঃ
    কিছু ভারত-প্রেমী মানুষ, কিছু কথিত পানি বিশেষজ্ঞ, কিছু পানি ও নদী সম্পর্কিত কথিত পরিবেশবাদী এনজিও কর্তা থেকে শুরু করে প্রধান উপদেষ্টা ইউনুস সাব পর্যন্ত সকলেই গতকাল খুব ব্যস্ত দিন কাটিয়েছেন। জেনে বা না জেনে কিভাবে ভারতকে বেকসুর দায় খালাস দিবেন, এই মহা দুশ্চিন্তায়!  তবু দুই তরুণ মন্ত্রী সাহস করে পাবলিক সেন্টিমেন্ট আঁচ করে বলেছেন “বিনা নোটিশে” ভারতের পানি ছেড়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে; একে  “অমানবিক” বলেছেন। যদিও একথাটাও পুর্ণাঙ্গ না। উপরের কথাগুলো যদি বুঝে থাকেন তাহলে জানবেন! কেন তা বলছি।

    একটা দুঃখের কথা দিয়ে শুরু করিঃ 
    আজকে মানে এই ২০২৪ সালে, তো তবু ভারতের বিরুদ্ধে পানি বা সীমান্ত নিয়ে কিছু বলা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ নিজের তাগিদে বিক্ষুব্ধ হচ্ছে, ফুঁসে উঠেছে কিন্তু যারা সত্তর-আশির দশক দেখেছেন তারা মনে করে দেখতে পারেন সেকালে এমন কথা মুখে আনলে টিএসসি এর মোড় থেকে জীবন নিয়ে ফিরে আসা অসম্ভব ছিল। কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা (তারাও মনে করে দেখতে পারেন) এরা আপনার উপর ঝাপায় পড়ত সেকালে  ‘আপনি সাম্প্রদায়িক” একথা বলে! অর্থাৎ বাংলাদেশের নিজ স্বার্থে বাংলাদেশের কেউ ভারতের বিরুদ্ধে আপত্তি তুললেই আপনাকে বলা হত আপনি “সাম্প্রদায়িক”! এমনই ভারত-পুজারি ছিল এসব কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা!
    এই পরিস্থিতির প্রথম বদল এসেছে ২০১৩ সালে ৫ মে এর পরে – শাহবাগীদের শাহবাগ আন্দোলন যখন প্রথমবারের মত পরাস্ত হয়েছিল; ধাক্কা খেয়ে চ্যালেঞ্জড হয়েছিল।
    সেই থেকে আজকের অবস্থার তুলনা করেন। আসেন আপনাদেরকে একটু সাহায্য করি।

    আজ (২৩ আগষ্ট) প্রথম আলোতে ছাপা হওয়া একটা বিবৃতির শিরোনামঃ

    ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বাঁধ খুলে দিয়েছে: বাম গণতান্ত্রিক জোট

     কারা এই বাম জোট?
    আসেন পরিচয় করায় দেই। ঐ বিবৃতির শেষ প্যারাটা হল এরকমঃ “বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদের সমন্বয়ক ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ, সিপিবির সভাপতি শাহ আলম, সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন (প্রিন্স), বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদের (মার্ক্সবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক পার্টির নির্বাহী সভাপতি আবদুল আলী গণমাধ্যমে এ বিবৃতি পাঠিয়েছেন”।

    এরা সবাই কমবেশি আমার পরিচিত; সেকালের সেকেন্ড বা তার নিচের ক্যাডার ছাত্র সংগঠন লিডারশীপ; কথাগুলো ১৯৮৫ সালের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রেক্ষিতে যদি চিন্তা করি। ১৯৮৫ বললাম এজন্য যে সেটা ছিল আমাদের গোপন জীবন, গোপনে কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের মিটিং করে বেড়াতে হত সেকালে এরশাদের শাসনে অত্যাচারে। এরশাদের পুলিশ আর জাতীয় পার্টি বা জাতীয় ছাত্র সমাজের অত্যাচার এমন তীব্র ছিল তখন!  আর সাথে ছিল এরশাদের পক্ষে আওয়ামি লীগের কামাল হোসেনের দালালি; আর এরপক্ষে ছাত্র ইউনিয়নের সেক্রেটারি  আনোয়ারুল হকের দালালি! এতটুকু বললাম যাতে তারা স্মৃতি হাতড়ে দেখে সেই আয়নায় নিজেকে দেখে “সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ” তুলে ভারতের দালালিতে তারা কিভাবে সেসব দিন কাটিয়েছিল তা মনে করতে পারেন!

    আর এবার তুলনা করে দেখতে পারে তাহলে এখন ২০২৪ সালেএই বিবৃতি দিতে বাধ্য হচ্ছেন কেন?
    বিবৃতিতে লিখেছেন, ……”জোটের নেতারা বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী উজানের কোনো দেশ নদীর ওপর দেওয়া বাঁধের গেট খুলে দেওয়ার ৭২ ঘণ্টা আগে ভাটির দেশকে জানানোর কথা। কিন্তু এবার পূর্বসতর্কতা ছাড়াই ডুম্বুর ও কলসি বাঁধ খুলে দেওয়া হয়েছে”।
    এথেকে একটা জিনিষ পরিস্কার যে সেকালে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ তুলে ভারতের পক্ষে দাঁড়ানো সেটা তাদের দালালিই ছিল! এটাই এখন পরোক্ষে হলেও তারা স্বীকার করছেন। নাকি ভুল বললাম?
    কিন্তু সরি কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল ভায়েরা আপনারা এখনও কী করতে হবে বা বলতে হবে তা জানতে অক্ষম হয়েই আছেন।

    আপনারা আর ইউনুস সাহেব একই কাতারেঃ
    আপনারা এখনও ভারতের পিঠে হাত বুলিয়ে সময় পার করতে চান। অভিন্ন নদীতে ভাটির দেশের যে অধিকার আছে তা বুঝেন নাই! যদি ভারত-মাতার বিরুদ্ধে কথা বলার হেদায়েত আপনাদের হয়ে থাকে অথবা মুলকথাটা – জমিদার হিন্দুর স্বার্থের বিরুদ্ধে তাদের আধিপত্যের বয়ান এখনও যদি ছিড়ে বের হয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বার্থের পক্ষে না দাড়াতে পারেন তবে আমরা এখনও বাংলাদেশের নাগরিকই না! এমন হয়ে আছেন বুঝবেন!

    যে মানুষ অভিন্ন নদীতে ভাটির দেশ বাংলাদেশের যে অধিকার আছে তা বুঝেন নাই তারা বুঝে বা না-বুঝে ভারতের দালাল বা ভারতের স্বার্থের ধ্বজাধারী হয়েই থেকে যাবেন।

    যদি আগ্রহ থাকে তবে কিছু পড়াশুনা করতে পারেনঃ
    সেক্ষেত্রে বাংলায় আপাতত একটাই পেলামঃ এখানে খুব পরিস্কার না হলেও স্কুপ হিসাবে অনেক তথ্য পাবেন। “ফারাক্কা লংমার্চ এবং অভিন্ন নদীতে ভাটির দেশের অধিকার” ; আজাদ খান ভাসানী প্রকাশ: ১৫ মে ২০২১ | ১০:৫৪ | আপডেট: ১৫ মে ২০২১ | ১০:৫৬

     

    একইরকম পাকিস্তানের ডন পত্রিকার এক রিপোর্ট দেখতে পারেন কারণ সিন্ধু নদ নিয়ে তাদের ভারত-অভিজ্ঞতাও আমাদের মতনই।

    আর ২০১৪ সালের জাতিসংঘের কনভেনশন টা সম্পর্কে একটাই রেফারেন্স আছে এখানে।  যার আবার ফারদার মানে বিস্তারিত ওর সাথে নাই।

    কিন্তু আমার অবস্থান একেবারে সোজা ভারত কোন অভিন্ন নদীতে ভাটির দেশ বাংলাদেশের যে অধিকার আছে  এমন কনভেনশনে সই না করে থাকলে আম সেই ভারতের সাথে বাংলাদেশের কোন সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগ দেখি না।
    আর কনভেনশনের কথা বাইরে রাখেন, ভারত যদি অভিন্ন নদীতে ভাটির দেশ বাংলাদেশের অধিকার না দিতে চায় এমন ভারত আমাদের কেউ না, এটা যত তাড়াতাড়ি আমরা বুঝতে পারব ততই ভাল ……।

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ      ২০২৪  রাত
    শেষ আপডেটঃ    ২০২৪, সকাল 

     

     

     

  • ভারতের নির্বাচনঃ কংগ্রেসও সরকার গড়ে ফেলতে পারে

    মোদি হেরেছেন আগামিতে কী?
    এর অর্থ, তাতপর্য ও মূল্যায়ন” –

     

    ভারতের নির্বাচনঃ কংগ্রেসও সরকার গড়ে ফেলতে পারে
    গৌতম দাস
    ০৫ জুন ২০২৪ সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৭
    https://wp.me/p1sCvy-5Fv

    নরেন্দ্র মোদি ও রাহুল গান্ধী

     

    প্রথম আলোসহ অনেক মিডিয়ায় আজ ভোরবেলায় দেয়া রিপোর্টের শিরোনাম –   ৫৪২ আসনের চূড়ান্ত ফল: বিজেপি ২৪০, কংগ্রেস ৯৯ আসন। এটা অবশ্য একা প্রথম আলো না, এমনকি সারা ভারতের ইংলিশ পত্রিকাগুলোরও প্রায় কমন শিরোনাম এটাই!
    কিন্তু এই ফলাফলের এমন উপস্থাপন আমাদের দেশে এতে অর্থ খোলসা হবে না। বলা যায় কিছুই বুঝা যাবে না। কিন্তু যদি একই তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে করা বা দেয়া অন্য শিরোনামটা হয় এমন যে – “বিজেপি একা সরকার গড়তে পারছে না – আবার কংগ্রেসও গড়ে ফেলতে পারার দাবিদারও” – তাতেও এই নয়া শিরোনামও সঠিকই থাকে মানে, একই তথ্য-সম্মত রিপোর্টের শিরোনামই  থাকে।  আর সেক্ষেত্রে আমাদের লাভালাভ হত এই যে আমরা ভারতের এবারের নির্বাচনী ফলাফলের অর্থ-তাতপর্য সহজেই ধরতে পারতাম!  কারণ এমন নয়া শিরোনাম শুনলে বাংলাদেশীরা সবাই নড়েচড়ে বসবেন।  হ্যা, কথা একেবারে সত্য! এতটুকু বাড়িয়ে বলা হয় নাই;  আর এতে কোন যদি-কিন্তুও নাই।

    এবার একটু খুলে বলা যাক, তবে স্বল্প কথায় বললে, ভারতে সরকার গড়তে কোন দলকে ২৭৩+ আসনে বিজয়ী হতেই হয়। আর বিজেপি এবার পেয়েছে ২৪০ আসন। অর্থাৎ মোদির বিজেপি তাই এবার  ৩২-৩৫ আসনের ঘাটতিতে আছে। একথার অর্থ হল বিজেপি কোনভাবেই একা সরকার গড়তে পারছে না। এই অর্থে বিজেপি এবারের ফলাফল হল, বিজেপি হেরে গিয়েছে।  সেজন্যই  গতকাল সকাল দশটার পর থেকেই বিজেপির সুর বদলে ফেলেছে। মোদি আর নিজ দলের সকলেই বিজেপির নাম মুখে নেয়া বন্ধ করেছে; এর বদলে তারা তাদের রাজনৈতিক জোট এনডিএ [NDA, National Democratic Alliance] এই নাম বলা শুরু করেছে। যেমন দাবি করছে, এনডিএ (বিজেপি নয়) আবার ক্ষমতায় আসতেছে। আসলে বিজেপি যে একা আর সরকার গড়তে পারছে না সেটা মোদির অজানা ছিল না। কিন্তু আগের মতই হামবড়া “ভাব” বজায় রাখতে না পারলেও কর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে এই “সুক্ষ্ম কারচুপি” বা কথার ফাঁকি তৈরি করেছে যে বিজেপি নয়, এনডিএ আবার ক্ষমতা আসতেছে!

    বিজেপি এখন নিজের নাম ভুলে কেবল এনডিএ এনডিএ করছে, কেনঃ
    আসলে এতদিন মানে পিছনের দুবারই সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজেপিই সরকার গঠন করে থেকেছে। তাই বিজেপি যা চায় তাই জোটের বাকি সকলকে মেনে চলতে হয়েছে। এতে আবার, এতদিন এনডিএ আছে ঠিকই কিন্তু তেমন উচ্চারিতই নয়, এমন দশা হয়েছিল !  এছাড়া সবচেয়ে বড়কথাটা হল বিজেপির সবসময় যে  প্রধান নীতি মেনে চলেছে তা হল অন্যের দল ভাঙ্গিয়ে প্রার্থীকে নিজদলের প্রার্থী করা; আর তা করে গেছে অর্থ বা যেকোন “অবৈধ সুবিধার” লোভ দেখিয়ে। তাতে সেটা এনডিএ জোটের ভিতরের কেউ হতে পারে আবার বাইরেরও! কোন পরোয়া করে নাই। আর মোদির এসব কাজের অর্থের যোগান? সেটাও কোন অসুবিধাই নয়; কারণ, দলের ফান্ডের ভান্ডার আদানি বা আম্বানিরা তো আছেই! এরই পরিণতি হচ্ছে এনডিএ জোটের প্রায় সকল দলই (যাদের এবার মোট আসন হল ৫২) বিজেপি বা তাদের নিজ এনডিএ জোটের প্রতি আনুগত্যহীন! এতে সারকথাটা দাড়িয়েছে এই যে – না মোদি না তাঁর এনডিএ জোটের কেউ – কারোরই কোন স্থির কমিটমেন্টে আর কেউ নাই। সব পক্ষই যখন তখন অন্য জায়গায় সুবিধা দেখলেই এনডিএ জোট ভেঙ্গে ত্যাগ করে চলে যায় অথবা সময়ে জোটে ফিরে আসে  – এটাই এতদিনের কমন প্রাকটিস!  গতকাল সন্ধ্যা থেকেই তাই মোদির প্রধান দুর্দশাটা হল – বিজেপি এই নাম ভুলে গিয়ে এই জায়গায় এনডিএ জোটের নাম বসিয়ে উচ্চারণ।  এছাড়াও আরও সিরিয়াস দিক মানে, মোদির গত দশবছরের ইজ্জত ধুলায় মিটানোর মত দুর্দশা হল যে মোদিকে এখন থেকে দুই এন বা N  দিয়ে যাদের নাম নাইডু আর নীতিশ – এদের মন যুগিয়ে চলতে হবে, পা-ধরতে হবে।

    আজ ভোর থেকেই নিশ্চিত হওয়া এই কঠিন বাস্তবতা হল, মোদিকে এখন নিশ্চিতভাবেই এই ৫২ জনের হাত-পা চাটতে হবেই। আর তিনি তা ইতোমধ্যেই শুরু করে দিয়েছেন! যেমন এই ৫২ জনের মধ্যে বড় আসন ওয়ালা দুই এনডিএ জোট সঙ্গী দল হল – টিডিএ [তেলেগু দেশম পার্টি TDP] যেটা অন্ধ্রপ্রদেশ (হায়দ্রাবাদ) রাজ্যের দল; আর এরই মূল নেতা চন্দ্রবাবু নাইডু [Nara Chandrababu Naidu ]। আর আরেকজন হলেন বিহারের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার; দেখুন “এবার খেলা দেখাবেন নীতীশ কুমার, কার্ড তো তাঁর হাতেই, তাকিয়ে গোটা দেশ”। সবচেয়ে মজার কথা হল, কংগ্রেসসহ অন্যান্য মোদিবিরোধী দলের বর্তমান জোট ইন্ডিয়া [I.N.D.I.A] এর জন্ম বলা হচ্ছে মাত্র ১১ মাস আগে (July 2023)। আর এই জোট গঠনের উদ্গাতা ও প্রথম উদ্যোগীদের একজন হলেন কিন্তু এই নীতিশ কুমার; যিনি পরে আর এই জোটে আর থাকেন নাই কারণ, তিনি এসেছিলেন মোদির এনডিএ জোট ভেঙ্গে আর মোদি আবার তাকে বড় কোন “সুবিধার” বিনিময়ে আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন।  এককথায় গত দশবছরের মোদি জমানায় তিনি সমসময় মোদির পক্ষে, আর না-হয় মোদিবিরোধী  এদুই জোটের কোন একটার সাথে বারবার বদলাবদলিতে থেকেছেন।

    যদিও নীতিশের তুলনায় নাইডু – তিনি অনেক স্থির। বেশির ভাগ সময় তিনি কংগ্রেস ও তার বন্ধুদলের সাথে জোটের সঙ্গি থেকেছেন; কেবল এবারই সম্ভবত তিনি মোদির কোলে। তিনিই ইন্ডিয়ার আইটি খাতে যা সুনাম এর জনক! এককথায় গ্লোবাল আইটি খাতে একদিকে আমেরিকান গবেষণায় বুদ্ধি-পরিকল্পনা-ডিজাইন ইত্যাদি সবই তাদের আর অন্যদিকে তাতে ভারতের সস্তা কিছুটা এডুকেটেড শ্রমের অংশটা মাথা হল চন্দ্রবাবুর অন্ধ্রপ্রদেশ-হায়দ্রাবাদ রাজ্য। তাই ভারতের গৌরবজনক টেক সিটি [Tech city] বলতে এই হায়দ্রাবাদ।
    ওদিকে অন্ধ্রে কেন্দ্রের নির্বাচনের দিনই রাজ্য সরকারেরও নির্বাচন হয়ে যায় একই সাথে প্যারালাল, এমন চারটা রাজ্যের একটা সে। গতকাল পাঁচ বছর পরে নাইডু আবার রাজ্য নির্বাচনে (বিজেপির সাথে করা জোটে) বিপুল ভোটে ফিরেছেন। আর এদিকের হিসাবে, এবার নীতিশ-নাইডু মিলিয়ে তাদের মোট আসন প্রায় ২৮; নীতিশ ১২ আসন আর নাইডু ১৬ আসন। ফলে বুঝতেই পারছেন বর্তমানে এনডিএ জোটে থাকা  নীতিশ-নাইডু মোদির কাছে কত গুরুত্বপুর্ণ। যেমন নাইডুর বিজয়ে ইতোমধ্যেই নাইডুকে মোদি তোয়াজ করতে চলেছেন; বিজয়ে ফোন করেছেন। আগামি নয় জুন নাইডু নয়া মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিবেন আর তাতে উপস্থিত থাকবেন সম্ভবত মোদি স্বয়ং! দেখেন,  অন্ধ্র প্রদেশের বিধানসভায় শপথ নেবে, তখন সেখানে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং!  এর পরিকল্পনা চলছে।

    কিন্তু মোদির দিক থেকে দেখলে ভয়ঙ্কর কথাটা হল, বিজেপি জোটের নীতীশ-নাইডুর সঙ্গে যোগাযোগ করছে কংগ্রেস। খবরটা হিন্দুস্তান টাইমসের আমি নিজেই গতকাল রানিং এনডিটিভিসহ স্থানীয় হিন্দি চ্যানেলে দেখেছিলাম; তখন নির্বাচন নিয়ে কংগ্রেসের প্রেস ব্রিফিংয়ের পরে এই সংবাদ জেনেছিলাম। আর আজকে সব মিডিয়া লিখছে সব ছোট বড় দল এখন দিল্লিমুখি – মানে ধরাধরি পায়ে পরার কেনা বেচা এখন তুঙ্গে চলবে। আমাদের টিডিএস পত্রিকা সেগুলারই একটা সাম-আপ ছেপেছে – “মোদির ‘প্লেন’ ছেড়ে বিরোধী ‘প্লেনে’ নিতিশ? মাঝ-আকাশে জল্পনা তুঙ্গে!” । মানে হল নীতিশ কুমারকে নিয়ে টানা হেচড়া দরাদরি সম্ভবত চরমে উঠেছে।

    এসবের অর্থ কী?
    অর্থ খুব সোজা। মোদি একা (মানে কেবল বিজেপি) সরকার গড়ার দাবিদার নন; কারণ তাদের মোট আসন ২৪০ মাত্র, এটাই সব কিছু স্বাক্ষ্য! আর দ্বিতীয় কথা, আরো যে ৩২-৩৫ আসন মোদিকে যোগাড় করতেই হবে (যার মধ্যে নাইডু-নীতিশ মিলে ২৮ আসন থাকবে তা ধরে নেয়া আছে); আর এছাড়াও ৭-১০ জন আরো এমপি লাগবে; সাথে স্টান্ড-বাই আরো কিছু এমপি লাগবে। মজার কথা হল, এতে সব খুচরা আসন পাওয়া দলই এখন অনেক দাম হাকাবে। সবচেয়ে বড় কথা অলক্ষ্যে কংগ্রেসের ইন্ডিয়া জোটও যদি এতে মোদির চেয়ে বেশী সংখ্যায় এমপি যোগাড় করতে পারে তবে মোদিও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বাদ যাবেন। তাঁর তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার শখ খতম! যদিও ভারতের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রী হবার প্রথম সুযোগ ও আহবান মোদিই পাবেন; কারণ তার দলের অবস্থান ২৪০ এমপি।
    এমনকি আগামি দশদিনের মধ্যে যদি মোদি আপাতত এমপি যোগাড়ে সফলও হয়ে যান তবুও পরের দুমাসের মধ্যে আবার ক্রাইসিস দেখা দেওয়া – সেটাও অসম্ভব নয়। মোদির যোগাড় করা এমপিগুলো আগামি দিনগুলোতে নিজেই ভেগে যাবে বা কংগ্রেস ভাগায়ে নিয়ে যাবে – এমন শঙ্কার মধ্যেই কাটবে! এককথায় নিয়মিত এক ভাঙ্গাগড়ার ভিতর দিয়ে দুর্বলভাবে খাড়া করা কোন সরকারই বারবার গঠন হতে থাকবে!  এজন্য শিরোনামে বলেছি কংগ্রেসও দাবিদার হয়েই থাকবে। এনিয়ে আরো একটু বিস্তারে যাব পরবর্তিতে এলেখার শেষের দিকে।

    তাহলে আগামিতে ভারতে কী হতে যাচ্ছেঃ এক.
    আপাতত পয়েন্ট দুইটা।
    ১। ভারতের মোদির হিন্দুত্ববাদ এখানেই আটকে গেল; আরও আগানোর সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। ভারত হিন্দুত্ববাদ মুক্ত হতে থাকবে এখন থেকে; অন্তত উচ্চারিত হবে না আর! এটাকে বলা যায় হিন্দুত্ববাদের দিন শেষ; এর শুরু হল এখন থেকে!
    ২।  প্রমাণিত হল, হিন্দুত্বের সুরসুরি দিয়ে মানুষের পেটের ক্ষুধা বা কাজ না পাওয়া বেকারত্ব-কে ঢাকা দিয়ে সাময়িক চলতে পারলেও শেষে মোদি ফেল করতই; সেটা এবারই ঘটে গেল!

    হিন্দুত্ববাদের দিন শেষঃ
    গতকালই কলকাতা থেকে প্রথম আলোতে লিখেছে, নীতিশ-নাইডুর হাতে এখন বিজেপির বাঁচা-মরা। এটা আসলে খুবই কম করে বলা। কেন?
    গতকাল থেকেই কলকাতার আনন্দবাজার একেবারে মমতার পক্ষ আঁকড়ে ধরা অবস্থান নিয়ে ফেলেছে। আর কোন এদিক-ওদিক তাকানোর অবস্থায় নাই এই পত্রিকা! আজকেও এরা এক মুল্যায়ন রিপোর্ট লিখেছে। নিচে দেখেন।

    “ভোটের ফলপ্রকাশের পর মঙ্গলের সন্ধ্যায় ‘জয় জগন্নাথ’ দিয়ে মঙ্গলবার বক্তৃতা শুরু করলেন নরেন্দ্র মোদী (ঘটনাচক্রে, এ বার ওড়িশায় বিপুল জয়
    পেয়েছে বিজেপি)। দেশে তৃতীয় বার এনডিএ কেন্দ্রে সরকার গড়ার জাদুসংখ্যা পেরিয়ে যাওয়ার পর মোদীর ৩৪ মিনিটের বক্তৃতায় এক বারও
    ‘জয় শ্রীরাম’ শোনা গেল না। রামমন্দিরের কথা বললেন যদিও। বিজেপি নয়, জোর দিলেন এনডিএ নামক জোটের উপর। তাঁর ভাষণে বার বার
    শোনা গেল এনডিএ-র কথা”।

    আনন্দবাজারের অবজারভেশন তাতপর্যপুর্ণ! মোদির মুখে আর ‘জয় শ্রীরাম’ শোনা গেল না, নাই।  জোর দিলেন বিজেপি নয়, জোর দিলেন এনডিএ নামক জোটের উপর। আর এই কথাগুলোই আমিও উপরে বলেছি। কেন এমন হচ্ছে? এককথায় কারণটা হল, মোদির এখনও আবার প্রধানমন্ত্রী হবার সুযোগ থাকলেও সেটা অবশ্যই হতে হবে এক কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী!! আর কোয়ালিশন সরকার মানেই হল, বিজেপির শ্লোগান ও কর্মসুচী বা দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে চলবে না। এরই এককথায় বলা অর্থ হল, মোদির হবু কোন কোয়ালিশন সরকারে হিন্দুত্ববাদের বয়ান, বক্তব্য শ্লোগান চলবে না। এটা বলাই বাহুল্য।  হিন্দুত্ব বা হিন্দুত্ববাদের দাগ বা গন্ধ মোদির কোয়ালিশন শরীক কোন দলই নিতে চাইবে না। কারণ, বিশেষত মোদির চেয়েও কংগ্রেসের থেকে কখনও বেশী দাম পেতে কখন কোন শরীক দলকে কংগ্রেসের জোটের দরজায় টোকা দিতে হয় তা কে জানে? তাই ছোট দলগুলোর কেউই আগাম নিজ দলের সম্ভাবনা নষ্ট করতে চাইবে না! তাি মোদি এসব নিজেই বুঝে, আগাম নিজেই ঠান্ডা পায়ে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছেন!!! এটা বেশ মজার না?
    কে ভেবেছিল যে খোদ মোদিকেই হিন্দুত্ববাদ বা জয় শ্রীরাম ত্যাগ করে একদিন এসবকেই এড়িয়ে চলতেই হবে!! এর চেয়ে বড় তামাসা আর কী হতে পারে??? যদিও এরপরেও কোন কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কোন নিশ্চয়তা মোদির হাতে নাই!

    দুই. পেটের ক্ষুধা বনাম হিন্দুত্বের সুরসুরিঃ
    এটা ঠিক যে উগ্র জাতিবাদ মানে যেটা খোলাখুলি নিজ জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদ এর কথা সগর্বে বলে। তাও আবার সেই উগ্র জাতিবাদ  (ভাষা, ভুগোল বা অন্যকিছু ভিত্তিক জাতিবাদ না হয়ে যেটা ধর্মীয় জাতিবাদ) যদি ধর্মভিত্তিক উগ্র জাতিবাদ হয় সেক্ষেত্রে এমন উগ্র জাতিবাদী অনুসারী মাত্রই এক কমন সমস্যার মুখে তাদের পড়তে দেখা যায়। সেটা হল ধর্মবোধ এমনই উচ্চে উঠে যায় যে তিনি নিজ শরীরের কথা ভুলে যান বা অস্বীকার করতে বসে যান। অথচ কোন রক্তমাংসের মানুষের পক্ষে কী নিজ শরীরের কথা চাহিদা ভুলে যাওয়া সম্ভব? মানে হল, মানুষ মাত্রই সে বৈষয়িক; মানে সে রক্ত-মাংসের শরীর, তার ক্ষুদা লাগে। আর এই নানা ধরণের শারীরিক ক্ষুধা এটা সারাদিন ধর্মবোধে ডুবে বুঁদ হয়ে থাকলেও কমবে না, ক্ষুদা পুরণ হবে না। এটাকেই বলে নিজ শরীরের চাহিদা বা ক্ষুধা অস্বীকার করে কারও স্পিরিচুয়াল  বা ধর্ম-ভক্ত হয়ে উঠার সুযোগ নাই!  মানুষ আগে শরীর টিকায়ে বেঁচে থাকতে পারলে এরপরই কেবল সে স্পিরিচুয়াল  বা ধর্ম-ভক্ত হয়ে উঠতে পারে! অর্থাৎ আগে শরীর (মানে চাকরি বা কাজ) পরে হিন্দুত্ববাদ!

    এখন এখানে এককথায় বললে, শাসক হিসাবে মোদি অযোগ্য কারণ তিনি গত দশ বছরে দেশে নুন্যতম সংখ্যায় কাজ সৃষ্টি করতে পারেন নাই; এমন কোন অর্থনীতি খাড়া করতে পারেন নাই।  [একই সমস্যা ছিল মোদির আগের কংগ্রেস কোয়ালিশনের (২০০৪-১৪) দশ বছরেও]। ফলে এবার নির্বাচনের আগে এমন বহু সাধারণ মানুষ বা পাশ করা বেকারদেরকে নিয়ে ছোট ইন্টারভিউ দেখেছি তারা বলছেন, মোদির হিন্দুত্ববাদ তাঁদের ভাল লাগে [হিন্দুত্বের  জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদের সুরসুরি যেহেতু]; কিন্তু একই নিশ্বাসে তিনি বলছেন তিনি বেকার; এটা তাঁর খারাপ বা অসহ্য লাগে।
    মোদির হিন্দুত্ববাদ যাদের ভাল লাগে, মোদির এমন সাপোর্টার সবাই এবার মোদিকে ছেড়ে যান নাই; যদিও গেছেন কেবল একটা অংশ। ফলা ফল তাই বলছে! কিন্তু তাতেই মোদির এমন ভরাডুবি! শারীরিক ক্ষুধা সবসময়ই এমনই ধর্মবোধেরও  উপরে আগে বা প্রায়োরিটিতে অবস্থান করে থাকে! এর আরেকটা প্রমাণ হল, এত ঢাকঢোল পিটিয়ে সুপ্রীম কোর্টকেই হাত করে রায় নিয়ে মোদি বাবরি মসজিদের উপর রামমন্দির নির্মাণ শেষ করলেন। ভেবেছিলেন এটা তাকে এবার ভোটে ব্যপক মাইলেজ দিবে; তিনি ভোটে অনেক আগিয়ে থাকবেন। অথচ ঘটেছে উলটা।
    এবার উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টি (কংগ্রেসের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে) যে মূল শ্লোগান দিয়েছে তা আসলে এটাই যে হিন্দু-মুসলমানের অমীমাংসেয় ক্যাচাল উস্কে ঝগড়া বিতর্ক কিংবা রামমন্দির নির্মাণ ইস্যু এসব পাশে রাখেন, আগে কাজ সৃষ্টি করেন – মানুষ ক্ষুধার্ত সেদিকের তাকান!  সেদিকটা নিয়ে সরকারী কর্মসুচী, প্রকল্প তৈরি করেন আগে। আর এটাই এই দলকে পপুলারিটি দিয়েছে। মোদি-যোগীকে ভেঙ্গে তছনছ করে দিয়েছে। উত্তরপ্রদেশের মোট আশি আসনের ৪৪ টাই নিজেরা পেয়েছে সমাজবাদী দলের জোট!
    ঠিক একই জিনিষ ঘটেছে মমতার পশ্চিমবঙ্গে। মুসলমান প্রধান আসনগুলোতে বিজেপির বিরুদ্ধে মমতার শ্লোগানও ছিল একই। বুঝা গেল ধর্মবোধ গুরুত্বপুর্ণ অবশ্যই, কিন্তু শারীরিক ক্ষুধা চাহিদা ভুলে সম্ভবত দশ বছরের বেশী সমাজের একটা বড় অংশ এভাবে চলতে পারে না! মোদির বা হিন্দুত্ববাদের হার হয়েছে এখানেই!

    তাহলে কী দাড়ালো?
    মূলকথাটা হল ভারতের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে – রাইজিং ইন্ডিয়া হতে – ইন্ডিয়া এখনও অনেক দূরে। এবারের নির্বাচন যেন এমনই এক ম্যাসেজ বা রায় চোখ আঙুল দিয়ে দেখাল।  গালগল্প তুলে আর এক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের চাপাবাজির দক্ষতা দিয়ে রাইজিং ইন্ডিয়া হওয়া যায় না। দেশে কাজ সৃষ্টি করতে হয়! টানা দশবছর হিন্দুত্ববাদের উত্থান দেখে যারা এতদিন এটাকেই ভারত শ্রেষ্ঠ, উগ্র হিটলারি হিন্দুত্ববাদী জাতিবাদই ভরসা আর এগুলোই ভারতের অর্থনীতি রাইজিং ইন্ডিয়াতে পৌছে যাবার লক্ষণ মনে করেছিল – তারাই সেই আম জনতাই আবার ফিরে গেল তাদের মনে পড়ল তারা ভুল আর মোহ এর মধ্যে আটকে গেছে। তাদের পেটে ক্ষুধা চিনচিন করছে!  কারণ তাদের কাজ নাই, অর্থনীতি নাই মানে কাজ নাই! এবার প্রায় ১৮০০ কোটি রুপী খরচ করে বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। এটা ‘ফৈজাবাদ’ কনষ্টিটুয়েন্সী যার নাম বদলে অযোধ্যা করা হয়েছে। এই কথিত অযোধ্যেতেই বিজেপি হেরে গেছে, ৪৮ হাজারেরও বেশী ভোটে সমাজবাদি পার্টির কাছে।

    এতে ভারতের আগামি পরিণতি কী হতেপারেঃ
    আমি আগে অনেকবারই বলেছি নেহেরুর হাতে ভারত এই রাষ্ট্রগঠন – এটাই মারাত্মক ত্রুটিপুর্ণ। কারণ, “কেন্দ্র নামে” এই ভুতুড়ে ক্ষমতা-প্রতিষ্ঠানের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখে ভারতরাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল। আসলে বৃটিশ আমলেও ভারত বলে একই প্রশাসনের শাসনের অধীনে চলা কোন ভুখন্ড বলতে কিছুই ছিল না। ছিল কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক হেড কোয়ার্টার। আর এই কোম্পানি হেড কোয়ার্টার এর অধীনে আলাদা আলাদা কিছু রাজ্য এবং এরই পাশাপাশি ৫৫০ এরও বেশী আলাদা আলাদা করদ রাজ্য। এমন রাজ্য-প্রদেশ বা করদ রাজ্য এরাও আবার কেউ কারো অধীনে শাসিত নয়। সবাই আলাদা আলাদা ভাবে  এক কোম্পানি হেড কোয়ার্টার এর অধীনে শাসিত! তাই এক ভারত বলে কিছুইর অস্তিত্ব ছিল না। তাই নেহেরু একেবারে গায়ের জোরে সবকিছুকে এক ভুতুড়ে কেন্দ্রের অধীনে করে একটা ভারতরাষ্ট্র গড়তে গেছিলেন। আর এটাই আজ কাল হয়েছে।  এতে সবচেয়ে খারাপ ও বিপদের কথা হল, এই কেন্দ্র জিনিষটা আসলে কী? এটা কেমন ধরণের রাষ্ট্রচিন্তা? তা কখনই আমল করা হয় নাই। একাদেমিকেরাও না, রাজনীতিবিদেরাও না। এমন না হবার পিছনের মূল কারণ হল কমিউনিজম বা সবরোগ-হর সমাজতন্ত্রী ধারণা;  আর সমাজতন্ত্রী মানে সমাজের এক অংশ অপর অংশের উপর দাবড় দিয়ে রেখে চলে থাকে; ফলে চলতেই হবে – এমন ঘোষিত এক একনায়কতান্ত্রিক ধারণা। বিপরীতে এখানে রিপাবলিক বা পাবলিক ধারণাটাই অনুপস্থিত। পাবলিকের ক্ষমতা, গণ বা নাগরিক অধিকার ধারণাটাই অনুপস্থিত। এমনকি আমেরিকা কেন ফেডারল রাষ্ট্র -এর অর্থ বৈশিষ্ট কী তাও ভারতের কেউ, নুন্যতম কোন একাদেমিশিয়ান বুঝতে গেছেন জানা যায় না।   সবাই বড় জোর বাচ্চাদের মত করে আধো আধো বোলে (কেন্দ্রিয় সরকার না বলে) উচ্চারণ করে ইউনিয়ন গভর্মেন্ট। অথচ রাষ্ট্রই বুঝে না!

    এক কথায় বললে ভারতের কোথাও কোনও কোণায় না রাজনীতিক পাড়ায় না একাদেমিক পাড়ায় – রাষ্ট্রচিন্তা ও এর অলিগলি নিয়ে কোন ধারণাই নাই। তাই আপনা থেকে ভারতরাষ্ট্রের এই আদি ও মৌলিক ত্রুটি কখনও কাটবে না। আসলে সেই ১৯৮৯ সালে রাজীব গান্ধীর শেষ আমল থেকেই এটা পরিস্কার হয়ে উঠেছিল, নেহেরুর তৈরি কেন্দ্রের নামে জবাব্দীহিতা হীন একটা কথিত কেন্দ্রের হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রিভুত করে রাখা ভারতরাষ্ট্র এর দিন শেষ হয়েছে। এতে হয়েছে যেটা সারা ভারত শাসন করতে গেলে প্রথম শর্ত হল সারা ভারতে স্থানীয় কমিটি সংগঠন আছে (এটাকে ভারতে সর্বভারতীয় দল বলা হয়) এমন একটা কেন্দ্রীয় দল থাকা। নেহেরু মারা যান ১৯৬৪ সালে, আর ১৯৮৯ সালে এসে রাজীবের হাতের কংগ্রেস বুঝে যায় যে তারা আর সর্বভারতীয় দল নয়। সম্ভবত রাজীব মারা (১৯৯১) যাবার আগেই বুঝে গেছিলেন এই সংকটের কথা। সেজন্যই কী তিনি বিজেপিকে একটা সুযোগ দিতে গেছিলেন? যেটা প্রথমে ১৯৮৯ সালের কাশ্মীরের নির্বাচনে কারচুপি করে কাশ্মীরের ইসলামি রাজনীতিকে ভোটের রাজনীতি থেকে সশস্ত্র পথে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন; পরে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গাকে কেন্দ্র করে বিজেপির উত্থানের রাস্তা খুলে গেছিল সেদিকে ঠেলে দিছিলেন? কিন্তু তাতেই মোদির দশবছরের শাসন শেষেও বলা যায় বিজেপিও সর্বভারতীয় দল হতেই পারে নাই। এরই সোজা সাপ্টা মানে হল, এখন এর এক মাত্র  বিকল্প হল কোয়ালিশন সরকার!

    মোদির এবারের হারের তাতপর্য- এক. কোয়ালিশন সরকারঃ
    রাজীব গান্ধীই ছিলেন শেষ স সরকারের শাসন। যেন সেটা টের পেয়েই বিজেপির জন্য রাস্তা খুলে দিছিলেন তিনি। আর আজ এর পরিণতি হল, মোদির এবারের হারের ভিতর দিয়ে শুধু মোদির এবারেরই নয় আগামিতেও ভার শাসিত হতে থাকবে এক কোয়ালিশন সরকারের মাধ্যমে। মানে বিজেপি বা কংগ্রেসকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের কোয়ালিশন।  এটাই আবার আস্ত আস্তে বিজেপি বা কংগ্রেস দল দুটো আরো ছোট হতে হতে সেগুলো প্রভাব হারিয়ে ভারতের রাজনীতি হয়ে যাবে আঞ্চলিক দলগুলোর দলগুলোর কয়েকটা স্থায়ী জোটের সরকার। এমন কয়েকটা আঞ্চলিক দলের আঞ্চলিক জোটের কথা ভেবেই বলেছিলাম এমন প্রধান তিনটা আঞ্চলিক দলের জোট হবে সম্ভবত। যেমন দক্ষিণ ভারতীয় জোট, উত্তর ভারতীয় জোট আর পুর্ব ভারতীয় জোট ইত্যাদি।

    মোদির এবারের হারের তাতপর্য- দুই. দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকারঃ
    দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার – এটাই হয়ে উঠবে বাকি সবকিছুকে ছাপিয়ে প্রধান বৈশিষ্ঠ। এটা এবার থেকেই শুরু হয়ে যাবে। যে৪মন উপরে দেখিয়েছিম কেন খোদ মোদিকে ইতোমধ্যেই হিন্দুত্ববাদ বা রামমন্দির এসব ইস্যু নিয়ে কথা নিজের পেটেই দাফন করে দিতে হবে। কারণ কোয়ালিশন সরকারে শরীকের মন যুগিয়ে চলতেই হবে।
    এছাড়া আরো কথা আছে। যেমন ইতোমধ্যেই গতকাল বিকালে ভারতের হিন্দি নিউজ চ্যানেলে উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ সৃষ্টির কথা শোনা গেছে। এতদিন এই ব্যাপারটা ছিল বড় জোর রাজ্য সরকারের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে। মানে শরীক দলকে মন যুগাতে উপ-মুখ্যমন্ত্রী পদ সৃষ্টি করে তাদের আসন দেয়া হয়েছে। কখনও সেটা আবার আরো দু-তিনটা উপ-মুখ্যমন্ত্রী দেখা গেছে। এবার সেই একই ভাবনা থেকেই সবচের‍্যে বেশী পিছলা শরীক বিহারের নীতিশকে উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ অফার করা হতে পারে। আর সেক্ষেত্রে হায়দ্রাবাদের নাইডু সাহেব কেন বাদ পড়বেন? সেক্ষেত্রে তিনিওও আরেক উপ-প্রধানমন্ত্রীর হকদার হয়ে যেতে পারেন।
    অনেকের কাছে ব্যাপারটায় ব্যাপক তামাসার দিক নজরে পড়লেও একটু সিরিয়াস দিকে যাওয়া যাক। এই উপ-প্রধানমন্ত্রী বানানোর যে অভিমুখ এর সোজা মানে হবে সেই কোয়ালিশন সরকার যেকোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এটা মতভেদে ডুবে থাকবে। এককথায়, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয় সেসব ইস্যুতে সে ব্যাপারে একেবারেই অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়ে যাবে।  তাই দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার এর খাঁড়া অর্থ হল সিদ্ধান্তহীনতার অকেজো সরকার!

    মোদির এবারের হারের তাতপর্য- তিন. ‘র’-এর মত প্রতিষ্ঠান দুর্বল ও অকেজো হতে থাকবেঃ
    অনেকে ব্যাপারটা খেয়াল করেছেন অথবা না। সামরিক বা ইল্টেলিজেন্স ধরণের প্রতিষ্ঠান; এগুলোর জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম এমন সরকার হতে হয়।  যেকোন সরকারী প্রতিষ্ঠানকেই কোন না কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে হতে হয়। আবার মন্ত্রণা লয়ের অধীনে চলে যাওয়া মানে দীর্ঘসুত্রিতা; কারণ মন্ত্রণালয় থেকে পরে আবার প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌছানি আর সিদ্ধান্ত ফাইনাল করা এটাই দীর্ঘসুত্রিতা। এজন্য ‘র’-এর মত প্রতিষ্ঠান এটা সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অধীনে সেটা একই সাথে হ্যা আবার না। আসলে দীর্ঘসুত্রিতা এড়াতে মাঝখানে কোন মন্ত্রী নাই ঠিকই কিন্তু অজিত দোভাল-কে উপদেষ্টা করে রাখা হয়েছে। তাঁর মাধ্যমেই এটা দ্রুত প্রধানমন্ত্রীকে জানানো বা অনুমোদনের ব্যাপারগুলো দ্রুত সেরে নেবার ব্যবস্থা সম্পন্ন। এটাই হল আদর্শ রূপ!

    কিন্তু সমস্যা হল যখন কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় থাকে বিশেষত যখন শরীক দলও অনেক প্রভাবশালী বা ওজনদার – মানে কথা না শুনলে সরকার ভেঙ্গে যেতে পারে এমন। সেক্ষেত্রে একই প্রধানমন্ত্রী কিন্তু কোয়ালিশন সরকারের বলে তিনি আগেই প্রতিজ্ঞা করেছেন পার্টনারের কাছে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও পার্টনার বা  উপ-প্রধানমন্ত্রীকে না জানিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিবেন না।

    এখন ধরা যাক, একটা আন্তরাষ্ট্রীয় অপহরণ ও গুমের কেস। অন্যদেশ থেকে এনে ভারতের কোন রাজ্যের সড়কে তাকে ফেলে রেখে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পরে ঐ শহরের এসপি গিয়ে সেটা উদ্ধার দেখানো হবে। এখন এতে র-কে জড়িত হতে হলে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন স্বাক্ষর লাগবে – অফিস বা বিজনেস অর্ডারে মনে করেন এভাবেই নির্দেশিকায় লেখা আছে। এখন সেই ফাইল প্রধানমন্ত্রীর অফিসে পড়ে আছে কিন্তু কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন নাই। কেন?
    কারণ, গতবার এমনই এক সিদ্ধান্তগ্রহণের বেলায় এক উপ-প্রধানমন্ত্রীকে রাজী করানো হয়েছিল এভাবে যে তিনিও একটা বিজনেস ডিলে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন চান। প্রধানমন্ত্রী সেটা দিতে রাজি হলেই তবেই তিনিও আগের সিদ্ধান্ত অনুমোদন দিতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে নানান প্যাচে আর ঝামেলায় পড়ে প্রধানমন্ত্রী নিজ প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেন নাই। কাজেই এখন র-এক্ষেত্রে এক-দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করলেও প্রধানমন্ত্রী তাদেরকে অনুমোদন দিবার অবস্থায় নাই!

    এতে ফলাফল কী হবে?
    ‘র’-এর মত প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল ও অকেজো হতে থাকবে। একদিক দিয়ে এটা ভাল হয়ত। যে র যেভাবে বেপরোয়া কানাডা-আমেরিকার মত দেশে গিয়ে গুম-খুন করে আসছে বীরদর্পে – সেগুলো ভারতে কোয়ালিশন ধরণের সরকারের কারনে সিদ্ধান্তহীনতায় দুর্বল ও অকেজো হতে থাকবে; এমন ততপরতা কমে আসবে।  অবশ্য অনেকে বলেন, এনিয়ে এক লেখা বইয়ে ভারতের অশোক রায়না এমনই ধারণা পোষণ করেছেন। 
    কিন্তু সাধারণভাবে যে কোন রাষ্ট্রস্বার্থ এমন হয় যেটা এমন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করতেই হয় যেমন অন্যদেশের জাশুশি-গোয়েন্দাগিরি ঠেকানো। সেক্ষেত্রে ঐ রাষ্ট্রের কোয়ালিশন সরকার রাষ্ট্র-কাঠামো ও এর ততপরতাকেই স্থবির করে দিতে পারে।

    এককথায় বললে, সিদ্ধান্তহীনতা যে কোন রাষ্ট্রের অস্তিত্বরক্ষার বা নরমাল ফাংশনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা। আর নিয়মিত কোয়ালিশন সরকার মানেই সিদ্ধান্তহীনতা।
    এজন্যই বলেছিলেম এভাবে চললে ভারত রাষ্ট্র এভাবে ক্রমশ স্থবির হতে থাকবে সম্ভবত তিনটা আঞ্চলিক রাজ্য জোটে বিভক্ত হয়েও টিকতে না পেরে।

    মোদির এবারের হারের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বড় তাতপর্য এটাই!

    আর সবশেষে বলাই বাহুল্য, ভারতে যতই দুর্বল আর কোয়ালিশন সরকার গঠিত হবে ততই সেই সরকার দুর্বল হয়ে পড়বে বাংলাদেশের উপর তার অযাচিত সব হস্তক্ষেপ, সব প্রভাব ও আধিপত্য ঘটানোর ক্ষেত্রে !! নিজ মাথার ঘাঁয়ে পাগল এমন সরকার বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সময় দিতে চাইবে না। এমনকি ভারতের কোটারি সমর্থন স্বার্থের ও সহায়তার উপরে দাঁড়ানো বাংলাদেশের যেকোন সরকারো দুর্বল হয়ে পড়বে!

     

     

     

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ      ২০২৪  রাত
    শেষ আপডেটঃ   জুন মে ২০২৪, সকাল 

  • বেনজীর-আজিজদের ‘প্রটেকশন’ দেয়া বা না দেয়ার তর্কের ফাঁকে আলী রীয়াজ!

    বেনজীর-আজিজদের ‘প্রটেকশন’ দেয়া বা না দেয়ার তর্কের ফাঁকে আলী রীয়াজ!
    গৌতম দাস
    ৩০ মে ২০২৪
    https://wp.me/p1sCvy-5E3

    ‘বেনজীর-আজিজকে সরকার প্রটেকশন দেবে না’

    তামাসাটা বেশ ভাল জমেছে! বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোতে একটা নতুন পপুলার শব্দ চালু হয়েছে আজিজ-বেনজীর। এমন এই খবরের শিরোনাম হল আজিজ-বেনজীর এর “প্রটেকশন”! আবার পাঠকও ধরে ফেলেছে এই নয়া শব্দের অর্থ কী; যদিও এখনও বিশ্বাস করে নাই। এমনিতেই, “প্রটেকশন” – এটা সঠিক শব্দ একেবারেই নয়। তবু সরকারের মন্ত্রী-উপদেষ্টা যারাই “প্রটেকশন” শব্দটা ব্যবহার করছেন। আর এতে তাদের ধরে নেয়া হয়ে গিয়েছে যেন এই সরকারের স্বাভাবিক কাজ হচ্ছে অসৎ, দুর্নীতিবাজ, পাবলিক মানি লুটেরা সরকারী কর্মচারীদেরকে “প্রটেকশন” দেয়া। যার মানে হল, আদালতসহ রাষ্ট্র-সরকারের যেসব প্রতিষ্ঠান অসৎ, দুর্নীতিবাজ, পাবলিক মানি লুটেরাদের আইনের আওতায় আনার জন্য বিচারের দায়ীত্বপ্রাপ্ত এবং স্টাডিং অর্ডারে দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় অফিসগুলো – এরা যেন ততপর না হয়, দেখেও না দেখে বা কেউ “মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী” এই পক্ষের সদস্য বলে অজুহাতে ছাড় দেয় বা এড়িয়ে যায়; এভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে  খামোশ করে রাখাই যেন সরকারের কাজ। আর তাই এইবার আজিজ-বেনজিরের কেসে তারা ব্যতিক্রম করবে। তারা আজিজ-বেনজিরকে এবার বাঁচাতে যাবে না। যার সোজা অর্থ হল, গত ১৬ বছর সরকার এভাবে চলেছে বলেই  এই “প্রটেকশন” শব্দের উতপত্তি। নইলে দুদক বা আদালত ধরণের প্রতিষ্ঠান এরা তো কনষ্টিটিউশন অনুযায়ী ‘চোর’ ধরার স্টাডিং অর্ডারে দায়িত্বপ্রাপ্ত; মানে এরা এসব অপরাধের বিরুদ্ধে ততপর হতে চাইলে তো কোন মন্ত্রী বা সরকার আদেশ-নির্দেশ দিছেন কিনা সেজন্য অপেক্ষার দরকার নাই। অর্থাৎ এখানে কাউকে অপরাধ থেকে বাঁচাবে, আড়াল করবে যেটাকে “প্রটেকশন” শব্দ ব্যবহার করে তারা বুঝিয়েছেন, কথা বলছেন – এই শব্দ ব্যবহারের তো কোন জায়গাই নাই। কিন্তু গত ১৬ বছর সরকার এভাবেই মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী বা চেতনা শ্রেণী নামে অথবা এই শ্রেণীকে রক্ষার নামে আজিজ-বেনজীর টাইপের লোকেরা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি – এরা যেন কার্যত আইনের উর্ধে – এই ধারণাই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে!  আর তা হয়েছে বলেই এই “প্রটেকশন” শব্দের উতপত্তি হয়েছে। গত ১৬ বছর যে সরকার এমন প্রাকটিস চালু রেখেছে – ত যেন সরকার এভাবে “প্রটেকশন” শব্দ ব্যবহার করে সরকার তার সেই অসৎ প্রাকটিসকেই স্বীকার করে নিল! সরকারের কাজের স্টাইল ও অভ্যাসই আছে বলেই এবার, আজিজ-বেনজির কেসে বলছে তারা “প্রটেকশন” দিবে না! তাই এককথায় সরকারের “প্রটেকশন” শব্দ ব্যবহার  করে সরকারের অসৎ প্রাকটিসকেই যে স্বাভাবিক গণ্য করে ফেলেছে সেটা পরোক্ষে-অজান্তে বলে ফেলেছে। সারকথায় এবারের আজিজ-বেনজির কেসে সরকার যে – অসৎ প্রাকটিসকেই স্বাভাবিক ধরে নিয়ে চলেছে- সেটা করবে না। মানে ব্যতিক্রম করবে, এই হল সরকারের “প্রটেকশন” শব্দের অর্থ ও ম্যাসেজ!

    আবার শব্দের আরো মারপ্যাচ আছে। যেমন উপরে যা লিখলাম সেখানে “প্রটেকশন” শব্দটা নেগেটিভ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ নাগরিক ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে “প্রটেকশন” খুবই ইতিবাচক শব্দ। রাষ্ট্র নাগরিককে সুরক্ষা বা “প্রটেকশন”[protection] দিবে এটাই তো রাষ্ট্রের কাজ। এই মুখ্য উদ্দেশ্যেই তো নাগরিকেরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। অর্থাৎ লক্ষ্যের দিক থেকে “প্রটেকশন ইজ ফান্ডামেন্টাল” – চাওয়াটা এমন। অথচ বাস্তবে এখানে “প্রটেকশন” শব্দটা নেগেটিভ অর্থে ব্যবহার করেছে – অসৎ প্রাকটিসকেই স্বাভাবিক – মনে করা সরকার।  আর তাই, এবার এখান থেকেই  অনেকে দাবি তুলেছে যে অসৎ প্রাকটিস বাদ রেখে ফেলে দিয়ে নাগরিক সুরক্ষাই বরং সরকারের কাজ। এমনকি একটা ব্যক্তি-নাগরিকের নামে বড় শাস্তিযোগ্য অপরাধের অভিযোগ এসেছে এমন যদি হয়ও সেক্ষেত্রেও, ঐ অভিযুক্ত ব্যক্তিকেও “প্রটেকশন” দেয়াই সরকারের কাজ! আর এটাই “প্রটেকশন” শব্দের ইতিবাচক, সঠিক ও উপযুক্ত ব্যবহার। নাহলে কী হবে?
    সরকার যদি সেক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তিকে কোন ফিজিক্যাল আক্রমণ থেকে প্রটেকশন দিয়েই ঐ ব্যক্তিকে আদালতে বিচারের মুখোমুখি না করে তবে তো আবার পাবলিক বিক্ষুব্ধ হবে। আর এক পর্যায়ে পাবলিক হয়ত  নিজেই ঐ অপরাধী-অত্যাচারীকে শাস্তি দিবার জন্য প্রকাশ্যে নিজ হাতে পাবলিক লিঞ্চিং [public lynching]. যাকে আমরা হাটুরে মার বা গণপিটুনি বলি তেমন একটা কিছুতে কথিত অপরাধীর মৃত্যু হয়ে যেতে পারে; যেটা একেবারেই কাম্য নয়।

    আবার একটু পিছনে ফিরব। নয়া মিডিয়া শব্দ আজিজ-বেনজীর এর অর্থ অনেকেই জানলেও এখানে সব পরিস্কার রাখাই ভাল। এখানে আজিজ মানে হল, ২০১৮ সালের হাসিনাকে বিজয়ী ঘোষণার নির্বাচন ঘটানোর নায়ক সাবেক এই সেনাপ্রধান, জেনারেল আজিজ আহমেদ আর, বেনজির মানে হল সাবেক র‍্যাব প্রধান ও পরে পুলিশ প্রধান হয়ে অবসরে যাওয়া বেনজির আহমেদ।  আর এই আজিজ-বেনজীর শব্দযুগল মানে যেন এক দড়িতে ফাঁসি চাওয়া হচ্ছে এমন এক ইঙ্গিতও আছে!  এদুই নামের বিরুদ্ধে কমন অভিযোগটা হল এরা সীমাহীন দুর্নীতি, অবৈধ আয় লুটপাট ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারকারী। যেন এরা, হাসিনার জন্য কিছু বিরাট কাজ করে দিয়েছে আর এরই কিছু “বিনিময়-মুল্য” নিয়েছে তাঁরা!  আজিজের বেলায়, তিনি সেনা প্রধানের পদ-পদবী ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজ সব অপরাধী ভাইদেরকে  নিজ বাপ-মায়ের নামসহ একেবারেই সব ডাহা মিথ্যা তথ্য দিয়ে ন্যাশনাল আইডি আর পাসপোর্ট বানিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন যা, কোন ছোটখাট না মারাত্মক অপরাধের অভিযোগ। এছাড়া পদ-পদবির জোরে যদি এমন করাই যায় তবে আর কোটি কোটি টাকা খরচ করে সরকারের আইডি আর পাসপোর্ট প্রকল্প করার দরকার কী ছিল? আর এর চেয়েও বড় কথা আজকাল আমাদের গ্রামগুলোর যেকোন মানুষও সম্ভাব্য বিদেশগামী প্রবাসী। এই অর্থে দেশ-বিদেশে এর ফারাক অনেক কমে গেছে। মানে হল, “আইডেনটিফিকেশন” – আপনি দেশ বা বিদেশে যেখানেই থাকেন না কেন – আপনি কে, পরিচয় বা রাষ্ট্রীয় আইডেনটিটি কী? এটা এখন একালে খুবই গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের রাষ্ট্র যদি নাগরিক-ব্যক্তির আইডেনটিটির নিশ্চয়তার দিবার অথরিটির ভুমিকার ক্ষেত্রে শৈথিল্য  মানে  ন্যাশনাল আইডি আর পাসপোর্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে দেশ-প্রশাসনেরই বিশ্বাসযোগ্যতাই নিচে নামিয়ে ফেলে ধুলায় মিশায়ে নষ্ট করে ফেলেন তবে যেকোন বিদেশি রাষ্ট্রই আমাদেরকে আর গ্রহণ করবে কেন? তারা তো প্রবেশ করতেই দিবে না। সন্দেহ করবে আর সেখান থেকে শুরু হবে আমাদেরকে আরো নিচা চোখে দেখা! আমি নিশ্চিত জেনারেল আজিজ এসব গভীর দিকের নজর করেন নাই; বরং সারা দেশের প্রতিটা মানুষের মৌলিক স্বার্থ পায়ে দলেই কেবলমাত্র নিজ অপরাধী ভাইদের রক্ষাই তাঁর একমাত্র স্বার্থ-জ্ঞান করে সেনাপ্রধান হয়েও এসব কাজ করেছেন।
    আর ওদিকে বেনজির এর কথা বলে শেষ হবে না। কেবল এবার দুদকের আদালতে যে মামলা তাতে অবৈধ অর্থে ৬২১ বিঘার জমির মালিকানার কথা আছে; সাথে অন্যান্য প্রায় সব ধরণের দেশে-বিদেশে সম্পদের কথাও!

    বিবিসি লিখেছে, “আইনজীবীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এখনও পর্যন্ত আদালত বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের যে সব সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজকরার নির্দেশ দিয়েছেন তার মধ্যে আছে ঢাকার গুলশানে চারটি ফ্ল্যাট, ৩৩টি ব্যাংক হিসেব, তিনটি শেয়ার ব্যবসার বিও অ্যাকাউন্ট, প্রায় ৬২১ বিঘা জমি, উনিশটি কোম্পানির শেয়ার এবং ত্রিশ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র”।

    আবার, এছাড়া আদালতের মুল আবেদনে বলা হয়েছে, বেনজির তার সারা চাকরি জীবনের বেতন ও সুবিধাদি সব মিলিয়ে কোন ব্যয় ছাড়াই মোট আয়ের মুল্যমান ২ কোটি টাকার নীচে। অথচ তাঁর যে সম্পত্তির কথা বলা হচ্ছে এর মুল্য কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকারও বেশী। এটা কিভাবে সম্ভব?

    সেখানে বলা হয়, অথচ ৩৪ বছর সাত মাসের দীর্ঘ চাকরিজীবনে বেনজীর আহমেদ বেতন-ভাতা বাবদ মোট
    আয় করেছেন
    এক কোটি ৮৪ লাখ ৮৯ হাজার ২০০ টাকা। এর বাইরে পদবি অনুযায়ী পেয়েছেন আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা।

    বেনজীর ও আজিজদের বিচারের মুখোমুখি করছে আওয়ামী লীগঃ
    এবিষয়ে গতকাল ছিল খুবই এক সিরিয়াস দিন, তা বলা যায়। কেন তা বলছি?
    বেনজিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে রিপোর্ট করেছিল বসুন্ধরা গ্রুপের কালের কন্ঠ, সেই গত ৩১ মার্চ ২০২৪।  তখনও কিছুই জানা যায় নাই যে এই রিপোর্ট থই পাবে কিনা!! এরকম হাইকোর্টের নির্দেশ এস আলমের নামেও এসেছিল। কিন্তু দুসপ্তাহ পরে তা উর্ধতন কোর্টে খারিজ করে দিয়েছিল। কাজেই এসব যে আস্থা বিশ্বাস রাখার মত ঘটনাবলী নয়, আম-পাবলিকের অনুমান এরকমই। এককথায় তারা এটাকে বলে আই-ওয়াস!  কিন্তু এরপরেই এলো জেনারেল আজিজের উপর আমেরিকান পদক্ষেপ এর নিউজ। আর তা থেকেই এক-পা দুই-পা করে আগাতে আগাতে  ওবায়দুল কাদেরের বিবৃতি আসল যে এতে লীগের কোন দায় নাই কারণ তারা অবসরপ্রাপ্ত। কিন্তু সপ্তাহ দুই পরে দেখা গেল অন্যকিছুর ইঙ্গিত! সেটা এলো আবার নয়া অর্থমন্ত্রীর মুখ দিয়ে। এবারের অর্থমন্ত্রী পেশাগত ভাবে কূটনীতিক ক্যাডার, পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন। কিন্তু এবার তিনি অর্থমন্ত্রী কারণ সরকার ডলার বা বৈদেশিক মদ্রা সংকটে। তাই সারাদিন কাটে তাঁর আমরা পাবলিকলি তাকে দেখি একটা সোফায় তিনি বসে আছেন বা কথা বলছেন দেশি-বিদেশিদের সাথে। অর্থাৎ ডলার আনার কূটনীতি ততপরতায় আছেন তিনি।   এদিকে বাজেটসহ অর্থ-মন্ত্রণালয়ের বাকি কাজে আমরা দেখছি একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তিনিই সামলাইতেছেন। মানে কাজ ভাগ করা হয়েছে। তা হোক, কিন্তু আমাদের আগ্রহ অন্য জায়গায়। গত ২৬ মে এই অর্থমন্ত্রী একটা কথা বলেছেন বাজ পড়ার মত। কিন্তু মন্ত্রীর লো প্রফাইল, অরাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্টডের জন্য সম্ভবত সেটা আম-পাবলিক লেবেল আমল করতে রাজি হয় নাই।
    এমনিতে, অর্থমন্ত্রী হিসাবে তাঁর জেনারেল আজিজকে নিয়ে আমেরিকান নিষধাজ্ঞা বা পদক্ষেপ যা নিয়েছে তাতে এর অর্থ তাতপর্য কী – এটা ঠিক অর্থমন্ত্রীর ইস্যু না। আর জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ ঠিক অর্থমন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ এক্তিয়ার না। বরং দুদক ও আদালত ধরণের অফিসের ইস্যু। কিংবা বড় জোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কিছু যদি নিজের ইস্যু আছে মনে করে। অথচ তিনি বলেছেন – ‘সরকার কিছু করেনি মানে সেনাবাহিনী কিছু করবে’, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ সম্পর্কে  এটা ছিল অর্থমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া এবং এটাই মিডিয়ার শিরোনাম হয়েছিল!
    সত্যি বলতে কী খবরটা পড়ার পর কিছুটা বিরক্ত লেগেছিল।  কারণ খবরের শুরুর নাইনটা হল, “অবসরে যাওয়ার পরও বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী ব্যবস্থা নেবে”। কথা হল, সেনাবাহিনী যদি ব্যবস্থা নেয়ও তো এই সেনাবাহিনী কী অর্থমন্ত্রণালয়ের অধীনে? অবশ্যই না। তাহলে?
    এর মানে অর্থমন্ত্রীর কথা এরপরেও যদি সত্যি হতে হয় তবে এর একটাই অন্য সুযোগ আছে। তা হল, প্রধানমন্ত্রী আর সাথে পুরা ক্যাবিনেট অথবা বিশেষ দু-চারজন মিনিষ্টার মিলে (অর্থমন্ত্রী যাদের একজন) কোন আসরে বসে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। যেটার মুখপাত্র অর্থমন্ত্রী হলে বা না হলেও অর্থমন্ত্রীই সেসব কথার উপর দাঁড়িয়ে হয়ত একথাগুলো বলছেন। এমন কথা মনে হবার পিছনে আরেকটা কারণ আছে। প্রথম আলোর ওই রিপোর্টের পরের বাক্য দেখেন। বলছে, “ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়ে” অর্থমন্ত্রী আজ রোববার দুপুরে সচিবালয়ে … কথা বলছিলেন। এছাড়া ঐ একই রিপোর্ট আরেক স্থানে অর্থমন্ত্রী বলছেন,  ‘এখন ঋণখেলাপিদের ধরতে হবে”।

    অর্থমন্ত্রী নিজেই হঠাৎ বলেন, ‘এখন ঋণখেলাপিদের ধরতে হবে।’ এ বাক্য শেষ করার পর চুপ থাকলে সাংবাদিকেরা তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘পারবেন? ঋণখেলাপিরা তো অনেক শক্তিশালী।’ তখন তিনি বলেন, ‘দেখা যাক পারি কি না।
    আপনারা দেখছেন, সাবেক পুলিশপ্রধানের (বেনজীর আহমেদ) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাঁর কি ক্ষমতা কম ছিল?’

    এমনকি তিনি বেনজিরের বিরুদ্ধেও একই ধরণের কথা বলেছেন যে “…সাবেক পুলিশপ্রধানের (বেনজীর আহমেদ) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাঁর কি ক্ষমতা কম ছিল?”।
    এথেকে একটা অনুমান হচ্ছিল যে কিছু একটা হতে যাচ্ছে। কিন্তু অন্তত প্রধানমন্ত্রী নিজে বা না হলে ওয়ায়দুল কাদের এনিয়ে একই ধরণের কিছু বলেন কিনা সেদিকে লক্ষ্য রাখা! হা ঠিক তাই! গতকাল বুধবার ছিল সেই দিন। ওবায়দুল কাদের বলেন,.”..বেনজীর ও আজিজদের বিচারের মুখোমুখি করছে আওয়ামী লীগ: ওবায়দুল কাদের” । আওয়ামী লীগ বিচারের মুখোমুখি করছে – এটা তো একেবারেই নতুন ডায়লগ। কারণ সপ্তাহ-দশদিন আগে এনিয়ে কাদেরের বক্তব্য ছিল, ওরা দুজন এখন অবসরে যাওয়া ফলে সরকারের দায়দায়িত্ব নাই – ধরণের।
    এবং একই দিনে একটিভ আরেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানও একই কথা বলেছেন; আরো তিন মন্ত্রীর সাথে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সভা শেষে মিডিয়ার কাছে। সালমান বলেছেন, (তিনি কাদেরের রেফারেন্সেও কিছু কথা বলেছেন), “বেনজীর আহমেদ ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদকে সরকার কোনো ধরনের প্রটেকশন [সুরক্ষা] দেবে না এবং দেশের আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে“।

    সালমান রহমানের গুরুত্ব কী ও কেনঃ
    সুনির্দিষ্ট এক্ষেত্রে সালমান রহমানের গুরুত্ব কী? যেখানে বাকি আরো অনেক সালমানের মত উপদেষ্টারা পাবলিক ডিল কমই করেন? এক্ষেত্রে সম্ভাব্য জবাবটা হল, যেকোন কারণেই হোক আমেরিকার সাথে হাসিনার যেকোন ডিল বা কী দিলে কী পাব ধরণের প্রস্তাব চালাচালিটা দৃশ্যতঃ সালমানের মাধ্যমেই করার একটা চর্চা তৈরি হয়েছে। এবং উভয়দেশ বা পক্ষই এটা ব্যবহার করতে আগ্রহী তা দেখা যায়। এটাই সালমনের গুরুত্ব অনেক মন্ত্রী বা ওবায়দুল কাদেরের থেকেও অনেক সময় বেশী ওজনদার হতে দেখা যায়। তাহলে কী দাঁড়ালো?

    দাঁড়ালো যে আজিজ-বেনজীর  এর পক্ষে “নো প্রটেকশন” এর আওয়াজ – এটা খুব সম্ভবত এদেরকে বলির পাঁঠা বানিয়ে ফাঁসিয়ে বা ডুবিয়ে দিয়ে সরকার ভেসে উঠতে চায়, নিজের ক্রেডিবিলিটি বা বিশ্বাসযোগ্যতা ও সক্ষমতা দেখাতে চায়। আর এটার বিনিময়ে আমেরিকার কাছে তাদের কিছু চাওয়ার আছে সম্ভবত!
    যেমন এবার ল্যু এলে পরে সরকার র‍্যাবের [RAB] নিষেধাজ্ঞা তুলতে কী একশন সরকারকে করে বা নিয়ে দেখাতে হবে যেন তাই জানার মহড়া হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। বেনজিরের বিরুদ্ধে একশন এবং সরকার একেবারেই যদি তাঁর হাত ছেড়ে দেয় – এটা তো একটা ভাল পদক্ষেপ হিসাবে সরকার আমেরিকার কাছে তখন এটা বেচতে বা তুলে ধরতে পারে। ওদিকে আবার র‍্যাবের প্রধান বদলাতে আগ্রহ হয়েছে সরকারের। আর কাকে করা হবে তাতে দেখা যাচ্ছে যে আমেরিকার স্যাংশনে খেয়ে বড় দাগী যে সেই-ই যেন বড় ক্যান্ডিডেট – এই নীতি এবার ব্যত্যয় ঘটেছে। নিষেধাজ্ঞা খাওয়া (তখন তিনি পুলিশ প্রধান) বেনজিরকে জাতিসংঘ ভিজিটে যাচ্ছে এই উসিলায় সরকার স্যাংশন খাওয়া বেনজিরকে আমেরিকা ঘুরিয়ে এনে তাতে নিজের সাফল্য দেখেছিল। যার নিট লাভ হলো স্থানীয় আওয়ামী লীগারদের নিয়ে তাঁর এক হোটেল-সভা করা। অথচ তিনি তো তখনও সরকারী কর্মচারি!!! অবশ্য সাথে আর সাথে দাবি করা যে সরকার আমেরিকান স্যাংশন কেয়ার করে না। আমেরিকাকে উপেক্ষা এই ছিল এতদিন সরকারের মূলনীতি! সেজন্যই কী এবার এক ব্যারিষ্টারকে র‍্যাবের প্রধান করা? সংস্কার করা বলে দেখানো?? আমেরিকার সাথে নুন্যতম একটা ওয়ার্কিং রিলেশনে পৌছানো যার লক্ষ্য? তাই কী?  আমরা এটা নিশ্চিত না; তবে এদিকে কী হচ্ছে তাতে চোখ রাখতে পারি।

    এনিয়ে কিছু সহায়ক তথ্য দেইঃ
    আমেরিকান ফরেন পলিসি পত্রিকায় এশিয়া নিয়ে বাইডেন প্রশাসনের পক্ষে সব ঠিকঠাক চলছে কিনা এনিয়ে এক সাপ্তাহিক রিপোর্ট লিখে থাকেন মাইকেল কুগেলম্যান। তিনিও বর্তমানে আলী রিয়াজের জায়গায় তবে বেশী গুরুত্ববাহী আরেক থিঙ্কট্যাংক ফেলো!  তিনি আজ মানে গত ২৯ মের রিপোর্ট শুরুই করেছেন এমন কিছু তথ্য দিয়ে। যেমন তাঁর প্রথম লাইনটা হল, Hasina makes pitch for U.S. investment. হাসিনা আরো আমেরিকান বিনিয়োগ [FDI] চান! তিনি লিখছেন, হাসিনা যতই আমেরিকার উপর সবসময় রাগ ঝারেন না কেন, তিনি আমেরিকান ব্যবসায়ীদের চান, commercial partnership with Washington এর পক্ষে তিনি এখন; দেশের আগামি সত্তর বছরের বার্ষিকী (২০৪১ সালে) আমেরিকান ব্যবসায়ীদের হাত ধরে উঠে উতযাপন করতে চান! [এটাই কী গত সেপ্টেম্বর ২০২৩ সালের ইন্ডিয়া-আমেরিকান পরিকল্পনা ছিল? ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ এর পরের বাইডেনের প্রস্তাব ছিল? ]
    তবে কুগেলম্যান লিখছেন, হাসিনা আমেরিকান ব্যবসায়িক বিনিয়োগ সহায়তা [ এতে ডলার আসবে অন্তত] চান বিশেষত রিনিউএবল এনার্জি, শিপবিল্ডিং, ফার্মাসিউটিক্যাল ও মেডিকেল যন্ত্রপাতি উতপাদনের খাতে! “হাসিনার এই আবেদনের মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আবেদন আছে বলে মনে করছেন কুগেলম্যান! হাসিনা বাংলাদেশের রপ্তানিতে গার্মেন্টেসের ভিত্তি আবার ফিরিয়ে আনতে চান। আমেরিকান বাজার ধরতে চান আগের মত করে ট্যাক্স মুক্ত বা ছাড়দেয়া কিছু ট্যাক্সে রফতানি সুবিধা চান! যেন এটা বড় রপ্তানি খাত হিসাবে আবার উঠে দাঁড়ায়। [আগ্রহিরা বিস্তারিত দেখে নিতে ফরেন পলিসির সাইথ এশিয়া ব্রিফ থেকে।]

    From South Asia Brief:
    “However, Hasina has always strongly backed commercial partnership with Washington, and on Monday she made a strong pitch for greater investment to a visiting delegation of the U.S.-Bangladesh Business Council. Hasina called on U.S. business leaders to help make Bangladesh a “smart nation” by 2041, referring to a developed country driven by innovation and competition. (The year will commemorate 70 years since Bangladesh’s independence.)”
    “Hasina seeks to expand Bangladesh’s export base, and she singled out investment-ready “high-potential sectors,” including renewable energy, shipbuilding, pharmaceuticals, and medical equipment. Such appeals have both economic and political motivations. One of South Asia’s economic success stories, Bangladesh has suffered a slowdown in the past few years, and economists warn that it’s not sustainable to rely so heavily on garment exports.”

    এখানে বলে রাখা ভাল, হাসিনা সরকার বেনজির-আজিজ নিয়ে ঠিক কী করতে চাইছেন, কেন এবং ঠিক কী লক্ষ্যে তা সুনির্দিষ্ট করে আমরা জানি না। আমি কেবল সম্ভাব্য কিছু তথ্য দিলাম এখানে।

    শুধু ডলার সংকটই নয়, আরেক বড় সংকট হল খেলাপী ঋণ সংকট কীভাবে মিটবেঃ
    দুইটা আলাদা ইস্যু – মানে সরকারের ডলার সংকট কোন একশনে মিটে গেলে তাতেও খেলাপি ঋণ সংকট মিটাবে না। কারণ দুটা সংকট আলাদা। সরাসরি ব্যাপারটা ঝেড়ে বলে ফেলতে হবে। খেলাপি ঋণের একমাত্র সমাধান হচ্ছে খেলাপি ঋণ গ্রহিতাকেই ধরে এনে ঋণ আদায় করা। তাঁর যা সম্পত্তি পাওয়া যায় তা আদালতের মাধ্যমে ক্রোক করা – এরপর অর্থঋণ আদালতের কাছ থেকে নির্দেশ ও রায় নিয়ে সম্পত্তি নিলামে তুলে অর্থ আদায় করতে হবে। যারা বিদেশে পাচার করেছে সেসব দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করে নিয়ে সেসব নিয়োজিত অর্থ দেশে ফিরানোও সম্ভব। একমাত্র এটাই উপযুক্ত পথ।
    যদি এপথে না যাওয়া হয় তবে এর দায় খেলাপী ঋণের অর্থ এই দায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘাড়ে উঠবে। যার অর্থ আরো টাকা ছাপানো যার সোজা মানে আরো মুদ্রাস্ফীতি। যেটা ১৫% ছাড়ায় কোথায় যায় তা অকল্পণীয়। যার পরিণতি হতে পারে গরীব মানুষের খাদ্য কেনার মত সামর্থ বা অর্থ না থাকা, মানে দুর্ভিক্ষ!!! আর ওদিকে অনিয়ন্ত্রিত গণ ক্ষোভ বিক্ষোভ, বিদ্রোহ ইত্যাদির সম্ভাবনা -শ্রীলঙ্কান পরিস্থিতি্র মত ইত্যাদি!!
    কাজেই দুএকটা  আজিজ-বেনজির নয় সবার বিরুদ্ধেই কোনরূপ ফেবার বা ব্যতিক্রম ছাড়াই ব্যবস্থায় নিতে যেতে হবেই। আবার এটা হাসিনার জন্য উভয় সংকট অবশ্যই! যাদের “বঙ্গবন্ধু জিন্দাবাদ” ধ্বনি শুনে হাসিনা ও তাঁর দল আত্মতৃপ্তি নিয়েছেন এরাই তো সেই ঋণ খেলাপী! যতবড় ঋণ খেলাপী তত তার গলায় জোর, উচ্চস্বর!!! কাজেই ঋণ খেলাপীর বিরুদ্ধে একশন মানে এক অর্থে নিজ দলের বিরুদ্ধে হয়ত একশন হবে সেটা!! তাহলে এখন হাসিনা কী এমন একশনে যেতে পারবেন? আমরা কিছুই জানি না। তিনি হয়ত বেছে বেছে আগানোর পথ নিতে পারেন; যেমন বেছে বেছে কিছু লোকের উপরে একশন। কিন্তু এটা একেবারেই ফল দিবে না। কারণ এটা আই-ওয়াশের ইস্যু নয়; মেজর খেলাপী বা পাচারকারিদের অর্থ ফেরত এনে দেখানোর বিষয় এটা। আর এর উপর নির্ভর করছে অর্থনীতি আবার ফিরবে কীনা, কী সে? নাকি এটা মুদ্রাস্ফীতি আকাশ্চুম্বি করবে!!
    অনেক শক্ত হাতে, লম্বা হাতের ডিসিশন লাগবে – হতে হবে এটা!!!

    সব শেষে আলী রিয়াজ প্রসঙ্গঃ
    আলী রিয়াজ আরেক আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাংক ফেলো; যিনি স্পষ্ট করতে চান না যে তিনি বাংলাদেশ নয়, বরং আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, কথা বলেন। তিনি গত ২৬ মে দেশে এই বেনজির-আজিজ ইস্যুর মুখে কিছু মন্তব্যসুচক বক্তব্য রেখেছেন যেটা প্রথম আলো মতামত-কলামের ঢংয়ে ছেপেছে। পাওয়া যাবে এখানে, আওয়ামী লীগকেই দায় নিতে হবে – এই শিরোনামে।আলী রীয়াজের কথা ঠিকই আছে, এনিয়ে আপত্তির কিছু নাই। কিন্তু তাঁর কথাটা অসম্পুর্ণ। ঘটনার জন্য কী কেবল আওয়ামি লীগই দায়ী? নাকি থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো আলী রীয়াজ-সহ ২০০৭ সাল থেকে সকল আমেরিকান প্রশাসন ও প্রেসিডেন্ট সকলেই দায়ী?   এর উত্তর না দেওয়াতে বা বিবেচনায় না নেওয়াতে যেন তিনি নিজেকে ও আমেরিকাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন এই লেখা দিয়ে এমন দাড়িয়েছে ব্যাপারটা।
    আলো রীয়াজ যদি বুঝে থাকেন এর দায় আওয়ামী লীগেরই তবে তিনি তো বহু আগে থেকেই জানতেন বা না জানার কোন কারণ নাই যে এর দায় তাঁর এবং আমেরিকান প্রশাসনেরও!
    আবার যেহেতু সেসময় থেকেই তিনি জানতেন তাহলে এনিয়ে কী কিছু লিখেছেন তিনি? জানিয়েছেন তার পাঠককে আজকের মত যে কে  কে দায়ী?
    বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে একটা গভীর গুম,খুন, অপহরণ এর রাষ্ট্র হিসাবে হাজির করা ; সরকারবিরোধী যেকোন ব্যক্তি নাগরিক ও রাজনীতিককে গুম, খুন করা, ভয় দেখানো আর এসবই করা হয়েছে সেই ২০০৭ সাল থেকে; এদের সকলকে কোন প্রমাণ ছাড়াই বাচবিচারহীন এরা সশস্ত্র ইসলামি রাজনীতির লোক অথবা জঙ্গী সন্ত্রাসী বলে ট্যাগ লাগিয়ে দিয়ে। আর হাসিনা যে ২০০৯ সাল থেকে এটাই করবে এই নীতিতে চলবে তাতো আমেরিকা ২০০৮ সালেই হাসিনার স্টেট ডিপার্টমেন্ট সফরের সময় থেকেই জানত। এমনকি হাসিনার ক্ষমতা চর্চার সবঘটনাই তো আমেরিকা প্রশাসন দেখেছে, জানে ও ওয়াকিবহাল থেকেছে কিন্তু মুখে কুলুপ এটে চলেছে। বাংলাদেশের আমেরিকান রাষ্ট্রদুতের আমেরিকার বদলে ২০১৩ সালে ভারতে গিয়ে ব্রিফ নিয়ে আসার কথা কে না জানে? এই ভারত প্রীতির কাফফারা আমেরিকা আজ এড়াবে কী করে?  পরে ঐ ২০১৩ সালের শেষের দিকে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশ সফর আর এরশাদকে বিরোধি দল বানিয়ে দিয়ে যাওয়া ইত্যাদি করে প্রত্যক্ষ্য ভারতীয় হস্তক্ষেপ এটাক কী তখন আমেরিকার চোখের সামনে ঘটে নাই? এসব সময়ের ঘটনাবলীতে বেনজির-আজিজদের ভুমিকা কী ছিল? এরা কারা ছিল তা কী আমেরিকা প্রশাসন তখন দেখে নাই জানে না? সব আমেরিকান প্রশাসন হাসিনা সরকারের এসব কাজকে – জঙ্গী দমন- বলে কী জায়েজ করে নাই? এসবই কী অর্থহীন ও আত্মঘাতি ইসলামবিরোধীতা, ইসলামবিদ্বেষের ততপরতা আর নয়া ঘৃণা ছড়ানোর ততপরতা ছিল না?  সবচেয়ে বড় কথা এর কোনকিছুই হাসিনা একা করে নাই। সব সময় সে পশ্চিমা অনুমোদন পেয়ে গিয়েছে।  কথিত থিঙ্কট্যাঙ্ক ও আমেরিকান প্রশাসনের এর সবকাজেই প্রকাশ্যে বা গোপনে অনুমোদন ছিল না কী? ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে অংশগ্রহণে প্রলুব্ধ করে টেনে আনা অথচ হাসিনার সাথে তাদের কী গোপন ডিলে আমেরিকান রণে ভঙ্গ ঘটলো? কী কারণে? কেন আমেরিকান রাষ্ট্রদুত অসময়ে ঢাকা ছেড়েছিলেন,  ঐ নির্বাচনের আগে  আচমকা রাষ্ট্রদুত বদল ঘটেছিল কেন?  সেকথা আমেরিকার চেয়ে ভাল কে জানে?
    কাজেই আলী রিয়াজ যেটা বলছেন, আওয়ামী লীগকেই দায় নিতে হবে – সেটা ঠক আছে হয়ত কিন্তু  থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো গং এবং সব আমেরিকান প্রশাসন এর দায় থেকে দূরে থাকবেন কীভাবে, কেন?

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ     মে ২০২৪  রাত
    শেষ আপডেটঃ   ০২ জুন মে ২০২৪, সকাল ১০ঃ ৫৭

  • জেনারেল আজিজের উপর আমেরিকান নয়া ‘পদক্ষেপ’ কেন?

    জেনারেল আজিজের উপর আমেরিকান নয়া ‘পদক্ষেপ’ কেন?

    গৌতম দাস
    ২১ মে ২০২৪
    https://wp.me/p1sCvy-5DG

     

    ছবি ডেইলি স্টার থেকে নেয়া 

     

     

    গতকাল দুপুর থেকেই খবরটা  ঢাকায় ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়ছিল যে সাবেক এক ‘বাংলাদেশ আর্মি চীফ’ জেনারেল আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে আমেরিকান অসন্তোষ বা এনিয়ে তাদের “নয়া পদক্ষেপ” এর খবর। আজ ডেইলিস্টার লিখেছে, “আমেরিকা আজিজ আহমেদ ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের উপর [“United States has imposed sanctions on former chief of Bangladesh Army Aziz Ahmed and his immediate family…”] স্যাংশন  দিয়েছে। এলেখায় বেশির ভাগ সময় জেনারেল আজিজকে নিয়ে আমেরিকান বিবৃতিকে  আমি “আমেরিকান পদক্ষেপ” বা শুধু “পদক্ষেপ” বলে চিহ্নিত করব। যদিও ডেইলি স্টার সহ অনেক মিডিয়াই এটাকে স্যাংশন আরোপ করা বলেছে। আর এর বিপরীতে আমেরিকান বিবৃতিতে স্যাংশন শব্দটা দেখিনি। তাই, এই বতর্ক থেকে দূরে থাকতে  একে “আমেরিকান পদক্ষেপ” বলব এখানে।

    “আমেরিকান পদক্ষেপ” বলতে শব্দে যাই থাক, বাংলাদেশে সামাজিকভাবে এক বড় খুশির প্রতিক্রিয়া হয়েছে দেখার মত। এতে লক্ষ্যণীয় যে,  বিগত দুবছরের সরকারবিরোধী আন্দোলনকালে যারা আমেরিকান সাপোর্ট ও সহায়তার ব্যাপারে গভীরভাবে বাইডেন-লু এর আমেরিকার উপর “রাজনৈতিক আস্থা” রেখেছিল; গভীর নির্ভরশীলতায় আপন বোধ করত প্রবল খুশির প্রতিক্রিয়া এসেছে মূলত তাদের থেকে।  কিন্তু এসব সত্বেও , সেসময়ে এরাই আবার বাধ্য হয়েছিল নির্বাচনের আগে যখন আমেরিকা  নিজেই নিজ কমিটমেন্টের উলটা ঘুরে গিয়ে বাংলাদেশকে ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল শুধু না, একেবারে “বিজয়ী” হাসিনার কোলে গিয়ে উঠেছিল; আর তা দেখে লজ্জায় মারা গিয়েছিল যারা মূলত তারাই এবার জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে আমেরিকান পদক্ষেপ দেখে আর নিজেদের চাপা কষ্ট বা প্রতারিতবোধের কষ্ট আর লুকিয়ে রাখতে পারে নাই। বাংলাদেশের এই “আমেরিকা সমর্থক গোষ্ঠি” লজ্জায় মরমে মরে গিয়েছিল, নির্বাচন ঘটে যাবার পর থেকে এতদিন পর্যন্ত। বিশেষ করে এখন বাইডেন-হাসিনা নাকি “কেমন জানি বন্ধু” যা নিয়ে আবার মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উচ্ছ্বাস জানিয়ে বিএনপিকে টিটকিরি দিয়ে কথা বলে চলেছে। এদিকে আমেরিকার ধারণা তারা একসাথে বাইডেন-হাসিনা ‘কী জানি’ [ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি] উতযাপনও শুরু করে দিয়েছিল ইত্যাদি!  তাই গত চার-পাঁচ মাস “আমেরিকা সমর্থক গোষ্ঠি”দের কেটেছে এসব নখড়া দেখতে দেখতে!  অতএব পালটা এবার এদের উচ্ছ্বাসের প্রতিক্রিয়াই ছিল আজ দেখার মত। যেন তারা বলতে চাচ্ছে – তাদের প্রিয় আমেরিকা অনেক সুইট – এরা বিট্রে করে না, ফেলে পালায় না ইত্যাদি। মানে যেন সিনেমার ডায়লগের ভাষায়,   উদ্ধার করতে ‘মেরা অর্জুন [এখানে আমেরিকা] জরুর আয়েগা”। কিন্তু আসলেই কী তাই? এটার মানে কী আমেরিকার ফিরে এসেছে?   আমেরিকা কী ফিরে এসে গেছে? বা আসবে?

    বলা বাহুল্য উচ্ছ্বসিত এই আমেরিকা সমর্থকেরা কঠোর সরকারবিরোধী; তারা সরকারের পতন দেখার জন্য উন্মুখ বহুদিন থেকেই জেনুইনলি। কিন্তু তারা সকলে কী তা এবার দেখতে পাবে?
    এনিয়ে আমার মন্তব্য ও পরামর্শ হবে – এখনও উচ্ছ্বসিত না হয়ে “ধীরে চলেন”। প্রচুর [if, not, but’] এসবের যদি, কিন্তু আছে সামনে; সেসব ব্যাপারে – আমেরিকা কী অবস্থান নেয় সুযোগ থাকে; পরিস্থিতি কতটা আমেরিকার ফেবারে থাকে বা আমেরিকা চায় তা এখনও অনিশ্চিত। আর সবচেয়ে বড় কথা আমেরিকা যাদের ভরসায় বা যাদের সমর্থন পেতে বা খুশি করতে চেয়ে বা লক্ষ্য করে এই “পদক্ষেপ ঘোষণা” নিয়ে থাকুক না কেন বাংলাদেশের সেই রাজনৈতিক অংশ কী আমেরিকাকে আগের মতই গ্রহণ করবে? এটাই এখন একেবারেই অনিশ্চিত। যেমন, মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়া দেখা যাক!

    আজ বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়াঃ
    আজকে বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, “আজিজ আহমেদের নিষেধাজ্ঞা আরেকটা বিভ্রান্ত করাঃ মির্জা ফখরুল”। এর সোজা মানে হল, আমেরিকা আগেও বিভ্রান্ত করেছে তাই আবার আরেকটা বিভ্রান্তি আনা বলেই দেখতে চাচ্ছে বিএনপি – আমেরিকান এই পদক্ষেপকে!  কেন তিনি এমনটা বললেন সেটা বুঝার চেষ্টা করতে পারেন আমেরিকা সমর্থকেরা। উচ্ছ্বসিত আমেরিকা সমর্থকদের মত করে, আলমগীর সাহেবেরও তো অন্তত ইতিবাচক মন্তব্য করার কথা! কিন্তু এই মন্তব্য অন্তত নেতিবাচক! কিন্তু সেটাই বা কেন?  এছাড়া আরেকটা কথাও তিনি ওখানে বলেছেন।  আলমগীর সাহেব বলছেন – “নিজের ঘরকে যদি নিজে সামলাতে না পারি, অন্য কেউ সামাল দেবে না। নিজের শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে হবে, নিজের শক্তি দিয়ে তাদের (আওয়ামী লীগ) পরাজিত করতে হবে”। এই বাক্যের মূল শব্দ নিজের শক্তিতে দাঁড়ানো, আমেরিকার না। এদিকটা মনোযোগ দিয়ে বুঝতে হবে।
    কাজেই আমার মন্তব্য ও পরামর্শ হবে – বাংলাদেশের “উচ্ছ্বসিত আমেরিকা সমর্থক”, আপনারা একেবারেই ধীরে চলেন; স্থির হয়ে নেন আগে! আর সমস্ত স্ব-সক্ষমতা  দিয়ে পরিস্থিতি বুঝতে ও ব্যাখ্যা পেতে চেষ্টা করেন সবার আগে। এর আগে কোন মুভ করলে ভুল হবে।

    এখন কেন এই আমেরিকান পদক্ষেপঃ  
    জবাবটা এবার এখানে খাড়া বলে ফেলি। ভারতের নির্বাচনে মোদি নাকি এবার হেরে যাবেন। আমেরিকান এই পদক্ষেপ এমন এই অনুমানের উপর নির্ভর করে নেয়া হয়েছে; যেটা এখনও ঘটে নাই। আগামি ৪ জুনে প্রকাশিতব্য ভারতের নির্বাচনী ফলাফলে মোদি হেরে গেছে – এটা আমেরিকাসহ আমরা সকলেই শুনতে পাব হয়ত। এই হল সেই অনুমান। সোজা কথা এটা এখনও ঘটে নাই; ঘটতেও পারে!

    তাই বলাই বাহুল্য যদি উলটা হয়। মানে মোদি যদি নিজেকে বিজয়ী বলে ঘোষণা দেখাতে পারেন তবে সেক্ষেত্রে বলাই বাহুল্য – “আমেরিকার পদক্ষেপের” এখানেই আপাতত ইতি হয়ে যাবে।
    তবে মির্জা ফকরুলের নেতি-প্রতিক্রিয়ার কারণ ভিন্ন। এর সাথে আমরা যেন আবার আমেরিকার ভাবনা বা অনুমানের সাথে সম্পর্কিত করে না দেখি; এটা সম্পর্কিত নয় তাই। সেটা বিএনপির নিজস্ব আলাদা কারণ।

    এখন আমার অনুমান হাসিনা বা মোদি সরকারও খুব নিশ্চিত নন যে আমেরিকা বা বাইডেন-লু ঠিক কী বুঝে এমন বেমাক্কা এক পদক্ষেপ হাঁকালেন?  বিবৃতির কাগজে আমেরিকা  “ডেজিগনেশন” [designation] এই শব্দটা ব্যবহার করেছে। মানে নামকরণে সাবেক জেনারেল আজিজকে অপরাধী বলে চিহ্নিত করে ফেললো।
    তবে আমি মন্ত্রী হাসান মাহমুদ যে কথা বলেছেন যে আমাদের সরকার জানত দুদিন আগে বাংলাদেশের আমেরিকার এমবেসিকে বাইডেন প্রশাসন জানিয়েছিল, এনিয়ে কিছু বলছি না।

    আরেকটা কথা, হাসান মাহমুদ যে কথা বলেছেন যে – এটা “ভিসা স্যাংশন নয়” – একথা কিন্তু সত্য [US sanction on Aziz not under visa policy: foreign minister]। বরং অরিজিনাল স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতিতেও স্যাংশন বলে কোন শব্দই নাই। এছাড়া আমেরিকার ঐ বিবৃতিতে আজিজ ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের  – আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ বা সম্পত্তি বায়োজাপ্ত ইত্যাদি কোন শব্দাবলীও নাই।

    কেবল একটাই শব্দ আছে “ডেজিগনেশন”। মানে, বাংলায় বললে “চিহ্নিত করা” ধরণের বা নামকরণ করা যেন। তাই বলছে, আমেরিকান প্রশাসন সাবেক জেনারেল আজিজকে দুর্নীতিবাজ যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধবংস বা বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছে। এই হলো অভিযোগ ও নামকরণ। একথা অবশ্যই বেশ ওজনদার!  কিন্তু সেজন্য আমেরিকার দিক থেকে শাস্তি কী বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ কী আরোপ করা হবে – এধরণের কোন বাক্য আর সেখানে নাই। তবে কোন আইনে এই ডেজিগনেশন এর একটা ধারা নম্বরউল্লেখ করা আছে; তা হল  [7031(c)] ।  হতে পারে ঐ ধারার বিস্তারে কোন শাস্তির কথা লেখা আছে। তবে আপাতত আমরা তা জানি না।

    তাই,  উপরে আমি লিখেছে, জেনারেল আজিজের উপর স্যাংশন আরোপ করা হয়েছে। হা বলেছি তবে নিজ বরাতে না। বলেছি ডেইলিস্টারের বরাতে। বিবৃতিতে স্যাংশন শব্দটাই নাই আগেই বলেছি; আমি গত রাতে পড়েছি। তাই ঢাকার মিডিয়ায় কীভাবে আসছে এমনকি হাসান মাহমুদ তিনিওও স্যাংশন আরোপ হয়েছে বলেছেন।

    তাহলে মূলকথাটা হল, আগামী ৪ জুন ভারতের নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের দিন। এদিন যদি মোদিই হেরে গেছেন বলে প্রকাশিত হয় তবেই আমেরিকান বিবৃতি আরো পাতা খুলে ফুলে-ফলে বিকশিত হয়ে উঠতে চাইবে। এবং সেক্ষেত্রে খুব দ্রুতই বহু বহু সব ঘটনা ঘটবে।   ইতোমধ্যেই অবশ্য ভারতে রাষ্ট্রক্ষমতার করিডোরে প্রবল আলোড়ন বয়ে যাচ্ছে যে মোদি এবার হারছেন। ভারতের যত জুয়ার আড্ডা আছে বড় বড় সব বিখ্যাত ডেরা সেখানে মোদি হেরে যাওয়ার পক্ষে বাজি ধরা জুয়ারি লোকের সংখ্যাই বেশী, রেটও হাই। এটা একটা খুবই তাতপর্যময় তথ্য! ইতোমধ্যে ভারতীয় শেয়ার বাজারও সব বিক্রি করে দাম ফেলে মানে আগে নিজ বিনিয়োগ বাচাও – এমন জোয়ার তুলেছিল আমরা দেখেছি।  আার অন্যদিকে, ভারতে ভোটপ্রদানের % যদি ৬০ এর নিচে যায় তবে মনে করা হয় এটা মোদির হারার লক্ষণ! সেটাও চারপর্বের পর থেকে দেখা যাচ্ছে!
    তবুও আমার শেষ কথা, এমন যত আলামতই দেখা যাক না কেন –  মোদির হাতে থাকা “ভোট বাক্সকে সফটওয়ার ম্যানিপুলেশনের সক্ষমতা” যদি অকার্যকর হয়ে থাকে তবেই একমাত্র তবেই, উপরে যা বলেছি তা সত্য হতেও পারে, নইলে মোদি নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করবেনই আগেরবারের মতই!!
    এবার এক বাক্যে বলি,  যদি মোদি হেরে যায় তবে সবচেয়ে কঠিন সঙ্কটে পড়বে হাসিনা সরকার! আর হবু সেটাই আমেরিকার পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য!
    নিচে আমেরিকান বিবৃতিটা সেঁটে দেয়া হলঃ

    Designation of Former Bangladesh Official for SIGNIFICANT Corruption:

    The U.S. Department of State announced today the public designation of former General Aziz Ahmed, previously Chief of the Bangladesh Army Staff, due to his involvement in significant corruption.  His actions have contributed to the undermining of Bangladesh’s democratic institutions and the public’s faith in public institutions and processes.

    Aziz Ahmed engaged in significant corruption by interfering in public processes while helping his brother evade accountability for criminal activity in Bangladesh.  Aziz also worked closely with his brother to ensure the improper awarding of military contracts and accepted bribes in exchange for government appointments for his personal benefit.

    This designation reaffirms the U.S. commitment to strengthening democratic institutions and rule of law in Bangladesh.  The United States supports anticorruption efforts in Bangladesh through assistance to make government services more transparent and affordable, improve the business and regulatory environment, and build capacity in investigating and prosecuting money laundering and other financial crimes.

    These public designations are made under Section 7031(c) of the annual Department of State, Foreign Operations, and Related Programs Appropriations Act.  This action renders Aziz and his immediate family members generally ineligible for entry into the United States.

     

     

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ    ২১ মে ২০২৪  রাত ১১ঃ ২৬
    শেষ আপডেটঃ   ২৩ মে ২০২৪, ভোর  ০৫ঃ ৪৬

  • ভারতের নির্বাচনী তামাসা ও আগামি দক্ষিণ এশিয়ার হবু চিত্র!

    ভারতের নির্বাচনী তামাসা ও আগামি দক্ষিণ এশিয়ার হবু চিত্র!
    গৌতম দাস
    ১৭ মে ২০২৪  সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫৪
    https://wp.me/p1sCvy-5Cc

     

       “ভারতের নির্বাচন কমিশনের ‘হাঁটু কি এখন দুর্বল’?”  – এটা গত ২০১৯ সালের ভারতের নির্বাচনের সময়ের বিবিসির রিপোর্ট। যা ভারতের নির্বাচনি তামাসা বুঝবার জন্য এখনও গুরুত্বপুর্ণ।

     

    ভারতের নির্বাচনী তামাসা!
    ভারতে এখন নির্বাচন চলছে। মানে সাতপর্বে ১৯ এপ্রিল থেকে ০১ জুন পর্যন্ত সাতটা আলাদা আলাদা দিনে বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মূলত মোট একই সিকিউরিটি ফোর্স বারবার কিন্তু নানান আসনে ব্যবহারের সুবিধা পাবার জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। নইলে, যেটা একই দিনে সব আসনে নির্বাচন হলে আসন প্রতি ফোর্সের সংখ্যা কমাতে হত, তা এখানে এড়ানো সম্ভব। আজ ১৭ মে ২০২৪;  মানে ইতোমধ্যে ভারতের চার পর্বেই নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেছে। এখন বাকি আছে ২০ মে, ২৫ মে আর ০১ জুনের নির্বাচন। মানে ০১ জুনেই সাত পর্বের নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে যাবে। এরপর দুদিন গ্যাপ দিয়ে ফলাফলের জন্য ৪ জুন সকাল থেকে সব ভোটের বাক্স নানা রাজ্যে একই দিনে একসাথে গণনা শুরু হবে। আর ঐদিনই দুপুর ১২ টার মধ্যে মিডিয়ায় বিশেষত টিভিগুলোতে কে কোথায় আগিয়ে আছে এই ট্রেন্ড [trend] বা অভিমুখ অনুমানের সুযোগ দর্শক-পাবলিকের কাছে এসে যাবে। যদিও সব ভোট গণনায় আরো সময় লাগবে। এরপর ঐদিনেই সন্ধ্যা সাতটার পর থেকে ক্রমশ আরো স্পষ্ট হতে থাকবে; ভোটের ফলাফলের আরো স্পষ্ট  অভিমুখ কোনদিকে। আর ঐদিনই রাত বারোটার মধ্যে অভিমুখ তো বটেই ফলাফলেও একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে কোন দলের জোট বিজয়ী হতে যাচ্ছে।  এই হলো এবারের ভারতের নির্বাচনি দিন-তারিখ!

    এবারের ভারতের নির্বাচন নিয়ে আমি  এপর্যন্ত এবারের হবু বা ইতোমধ্যেই ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী যা আসছে ও ঘটবে এসবের অর্থ তাতপর্য অথবা বিশ্লেষণ নিয়েও কিছুই লিখি নাই। তুলনায় গতবার মানে গত ২০১৯ সালের নির্বাচনের বেলায় সম্ভবত মোট আট / দশটা লেখা দিয়েছিলাম। তাহলে এবার দূরে আছি কেন?
    মূল কারণ, ২০১৯ সালে পুরা নির্বাচনের সময়ের ঘটনাবলীর খুবই কমই মনিটর করতে বাদ রেখেছিলাম। যেমন ভোটের আগের অন্তত তিনটা সার্ভে গ্রুপের সার্ভে সম্পর্কে স্টাডি ও ফলো করেছিলাম। যারা আবার একই সাথে  “বুথ ফেরত ভোটারদের” সাক্ষাতকার নিয়ে সার্ভে রিপোর্ট নিয়েও আমার স্টাডিতে অনেক সময় দিয়েছিলাম। শেষের দিকে ভারতের অনেক মিডিয়ার সাথে আমিও ধারণা দিচ্ছিলাম যে মোদির দল বিজেপি ও তাদের জোট[এনডিএ] সম্ভবত নির্বাচনের হেরে যাবে। কিন্তু না। মোদি-অমিত শাহের হাতে ভোটের বাক্স ম্যানিপুলেশনের [অবৈধ হাত ঢুকিয়ে ফলাফল উলটানো] ব্যবস্থা আছে। এবং তা খুবই সুনির্দিষ্ট করে ফল আনতে পারে এমন বা  যেখানে যতটুকু ফলাফল পালটানো দরকার তা করার ক্ষমতা সম্পন্ন। এদিকটা তখন আমল করা হয় নাই। তাই বিপত্তি। আর এবারও অনেক কিছুই পরিবর্তন হলেও মোদি-অমিত শাহের হাতে ভোটের বাক্স ম্যানিপুলেশনের ব্যবস্থা বহাল ও অটুট আছে বলেই জানি। তাই এবার দূরে থেকেছি লিখা থেকে যদিও, এবারেরও খবরাখবর রাখছি কিন্তু কিছু লিখি নাই।

    গতবারও এমন সব পর্বের নির্বাচনের পরে গণনার দিন শুরুর আগে এমন চারদিনের গ্যাপ ছিল। মনে করা হয় ঐ গ্যাপের দিনগুলোই মোদি-অমিতের চোখে এসব ম্যানিপুলেশনের উপযুক্ত সময় আর তা তখনই করা হয়ে থাকে বলে এপর্যন্ত যতটুকু জানা যায়। যেমন দেখেন, উপরে যে ছবিটা ব্যবহার করেছি সেটা ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিবিসির একটা রিপোর্ট থেকে নিয়েছি। যেখানে তখনকার শিরোনাম ছিল কত এগ্রেসিভ বা উদগ্র আক্রমানাত্মক! শিরোনাম লিখেছিল – “ভারতের নির্বাচন কমিশনের ‘হাঁটু কি এখন দুর্বল’!!!
    সেসময়ের অমিত শাহ যিনি এখন কেন্দ্র-সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (তখন তিনি কোন মন্ত্রীই ছিলেন না, কেবল ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক) তিনি তখন এক টিভি লাইভ শোতে এসে বলেছিলেন বিজেপি ৩০০ পার করবে। ভারতে সরকার গড়তে ২৭২+ আসনে বিজয়ী হতে হয়। তো ৩০০ পার মানে হল ৩০০ এর বেশী আসন পাবে। সত্যিই তাই ঘটেছিল। ২০১৯ সালে, একা বিজেপির মোট আসন পেয়ে হয়েছিল ৩০৩।  মোদি সেসময় মানে ঐ টিভি শো এর দিন কাশী (উত্তরপ্রদেশের খুবই গুরুত্বপুর্ণ হিন্দুদের এক তীর্থস্থান মনে করা হয়) থেকে ফিরেছেন। সেখানে নাকি তিনি কয়েকদিনের ধ্যানে বসেছিলেন!!! সেবারের নির্বাচনের শেষদিনের আগেই  মোদি কাশীতে গিয়ে ধ্যানে বসেছিলেন তাঁর হরেক রকমের রংঢঙ আর প্রপাগান্ডার অংশ হিসাবে। তাই সেই শো তে তিনি অমিত শাহের পাশে বসে থাকলেও বেশী কথা বলছিলেন না। তবে অমিত শাহের সেদিনের ঘোষণা ছিল যে তারা ৩০০ আসন পার করবেনই, এটা শোনার পর থেকে আমার মনে গভীরতম সন্দেহ শুরু হয়েছিল যে অমিত শাহের কথাই সম্ভবত সত্য হতে যাচ্ছে! আমি বোকা হয়ে যাচ্ছি!

    আগেই বলেছি অমিত শাহের কথা সত্য হয়েছিল; নিজ দলের আসন ছিল ৩০৩ আর সাথে বিজেপির নিজ জোট [NDA] এর আসন সহ মোট আসন হয়েছিল ৩৫৩। সেবারের মূলত এমন ম্যানুপুলেটেড বা হস্তক্ষেপ করা ফলাফলের কারণেই এবার ভারতের নির্বাচন নিয়ে কোন ধরণের লেখা লিখিই নাই। এড়িয়ে গিয়েছি। আর তাই এবার এটাই প্রথম লেখা। তাহলে আবার কেন ভোট পর্বের মাঝামাঝি সময়ে এখন লিখতে আসলাম?
    সেসব আরেক কাহিনী যা বাংলাদেশেও ছড়িয়েছে। ছড়িয়েছে কারণ এবার এক প্রবল অনুমান হল, মোদি এবার নির্বাচনে নাকি হেরে যাবেন। আর তাতে কংগ্রেসের রাহুল এন্ড গং মানে তাদের জোট ক্ষমতায় আসলে আমেরিকার সাথে তাদের বিশেষ সম্পর্কের সরকার হবে সেটা।  তাই বলাই বাহুল্য এর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের আয়ুসহ আনাচে কানাচে। সেকারণে এখন বাংলাদেশে যাই ঘটছে বা ঘটবে সেসকল ঘটনার সাথেও এইসব (মোদি হারবেন ধরণের) কল্পিত-অনুমিত ঘটানাবলীর মিল আছে কিনা সেই জল্পনা-কল্পনাও প্রবলে উঠেছে।

    যদিও এমন বহু ঘটনা – গুজব, আধা গুজব, আধা সত্যি  ইত্যাদি সবই কানে আসছে। তবুও ভারতের এবারের নির্বাচন নিয়ে আমার নিজ অবস্থান হল, মোদি-অমিত শাহের হাতে বাক্স ম্যানিপুলেশনের মেকানিজম নাই তা খর্ব বা অকেজো হয়ে গেছে একথা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত  শেষ বিচারে মোদির হারের কোন সম্ভাবনা (অন্তত আমার কাছে) নাই আর তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। যদিও এবার ইতোমধ্যেই এমনকি এখন ভারতের ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান -র- বলতে সেটা,  ‘মোদির র’ আর ‘কংগ্রেসি র’ বলেও ভাগের কথা উঠে গেছে, এমনটা সত্বেও!

    এমনিতে রাহুলের কংগ্রেস বা তাদের জোটের [I N D I A] পক্ষে বাইডেন প্রশাসন এবার দাঁড়িয়েছিল বেশ আগেই।  আর তাতেই  মোদিকে বিপুল অর্থদাতা ও তাঁর অবাধে খরচে উৎস যে আদানি গ্রুপ; আর এর বিরুদ্ধে বাইডেন প্রশাসনের লেগে পড়াতেই তাতে এই গ্রুপের শেয়ারে ধ্বস নামিয়ে দিয়েছিল, বলে মনে করা হয়। ওপেন সোসাইটি খ্যাত বা হেজ ফান্ড ব্যবসায়ী জর্জ সোরেস নিজেই [একালে বিভিন্ন দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমেরিকান হস্তক্ষেপের ধারা বজায় রাখতে যে অর্থের প্রয়োজন হয় তা যোগাতে আমেরিকা প্রশাসন আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে গেছে; তাই সেই অভাব পূরণে অর্থের চালান যোগাতে এখন সবচেয়ে বড় যোগান দাতা হয়েছে এই ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন নামের থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান। পুরানা সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙ্গে গেলে তা যে ১৫ রাষ্ট্র হয়েছিল এমন সব রাষ্ট্রেই আমেরিকান (এনজিও) হস্তক্ষেপ এর উসিলায় অর্থ ঢেলেছে এই প্রতিষ্ঠান। এটাকে তারা অরেঞ্জ রেভেলিউশন বলে ডেকে থাকে। ]
    বাইডেনের হয়ে ভারতে  আদানির বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিলেন জর্জ সোরেস; এক পাবলিক বক্তৃতা দিয়ে তিনি নিজে আদানির বিরুদ্ধে মার্কেট তাতিয়ে  ছিলেন। কিন্তু এতকিছু করে বাইডেন প্রশাসন আগিয়েও মাঝে হঠাত কংগ্রেসী রাহুলদের সব ততপরতায় ভাটা দেখতে পাই আমরা। রাহুলের জোটও অসংলগ্ন বা আভ্যন্তরীণ দ্বিধায় শ্লথ হতেই দেখেছিলাম। কিন্তু এবার ডোনাল্ড লু এর সফর [তিনি এমাসে বাংলাদেশে আসার আগে ভারত পরে শ্রীলঙ্কা সফর করে এসেছিলেন।] যেটা  বাইডেন প্রশাসনেরও ভাটা বা শেষ সময়ে সফর এটা; এবার তাঁর রুট ছিল ইন্ডিয়া-শ্রীলংকা হয়ে বাংলাদেশ।  আর লু এর এবারের ভারত সফরের পরে আমরা দেখি যে ‘ইন্ডিয়া’ জোটে সরব বা চাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। ওদিকে ভোট প্রদান চতুর্থ পর্বে এসে অবজারভেশন বলছে, ভোটপ্রদানের হার নিম্নমুখি। আর ভারতের ভোট বিশ্লেষকেরা একমত যে  মোট ভোটপ্রদানের নিম্নহার (%) মানে তা মোদির ভোট  কম  হবার লক্ষণ।  আবার ওদিকে ইরানের সাথে মিলে চাবাহার [Chābahār ] সমুদ্র বন্দর চালু ও ব্যবহারের ততপরতা শুরু করেছে ভারত বহুদিন এই প্রকল্প পরিত্যক্ত থাকার পরে। যদিও আবার ততপর হওয়াতে বাইডেন প্রশাসন ভারতকে থ্রেট করেছে, নিষেধাজ্ঞা বা ব্যবস্থা নিবার হুমকি দিয়েছে।
    ইত্যাদি এসব কিছু নতুন সব ঘটনাবলীতে মুল ঘটনা হয়ে উঠে আসছে বাইডেন প্রশাসন ও কংগ্রেসের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা অনেকদূর আগিয়ে গিয়েছে। আর তা থেকেই নিট ফলাফল হল, মোদির এবার হেরে যাওয়ার আলাপ, সম্ভাবনা বা গুজব উঠে আসছে তা বলা যায়। এককথায় বললে, বাইডেন প্রশাসনের কাছে, চলতি নির্বাচনে এক প্রো -আমেরিকান নয়া সরকার দেখতে চাওয়া হল তাদের প্রায়োরিটি। এই আকাঙ্খাটা খুব একটা কোথাও লুকানো ঠিক তা নয়। বরং কোথাও কোথাও এনিয়ে গভীর সব পরবর্তি পরিকল্পনা করতে বসে গেছে সংশ্লিষ্ট অনেকেই।  এমনকি তাতে কথিতভাবে মোদি আর অমিত শাহের মধ্যে গভীর দ্বন্দ্বের কথাও আবিস্কার করে রেখেছে অনেকে। অথচ এরা জানেনা মোদি-অমিত এরা দুজন ‘হরি আর হর এর মত’ হরিহরাত্মা!
    আর এই মিলিত-আত্মার জন্ম হয়েছিল ২০০২ সালে গুজরাত কিলিং  বা মুসলমান নিধনের কালে যখন গুজরাটি মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মোদি আর তাঁর ডানহাত ছিল এই অমিত শাহ, যিনি ছিলেন আবার ঐ মোদির রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! এই যুগল একসাথে আরএসএস-কে হাত করে, প্রভাবিত করে বিজেপি থেকে – লাল কৃষ্ণ আদভানি এবং অন্য দু’জন নেতা মুরলী মনোহর যোশি ও উমা ভারতী (এরা তিনজন হলেন আদালতের খাতায় বাবরি মসজিদ ভাঙার মূল আসামি) সহ অন্যান্য সব বুড়াদেরকে বয়সের অজুহাত তুলে দলের সব কমিটি থেকে বিদায় করে দিয়েছিল!  এরপর গত দশবছর ভারতের ক্ষমতায় থেকে তারা যা যা করেছে তা কেবলমাত্র এদুই জনের আজীবনের প্লান ও খায়েস বলে মনে করা হয়। এদের মাঝে আর কেউ নাই। তবে লিডার কেবল মোদিই। কাজেই যারা মোদি- অমিতের বিচ্ছেদ বা দ্বন্দ্বের কথার গল্প ছড়াচ্ছেন এই বিচারে তারা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এখনও শিশু!
    এছাড়াও, সবকথার শেখ কথা হল, মোদি-অমিতের হাতে যতক্ষণ ভোটবাক্স ম্যানিপুলেশনের সক্ষমতা আছে ততক্ষণ সব জল্পনা-কল্পনা অনুমান লু-তত্ব সবই ভুয়া আর অকেজো বলে হাজির হবেই বলে আমার ধারণা। মোদি আবার বিজয়ী হবেনই, সম্ভবত এভাবেই। এপ্রসঙ্গ আরেকটু কথায় শের দিকে আবার আসব। এর আগে উপরের কথা শেষ করে নেই।

     

    সফটওয়ার ভিত্তিক বাক্স ম্যানিপুলেশনঃ
    ততদিনে কানে আসছিল অন্য আরেক দিকের তথ্য, (দেশি-বিদেশি) ইন্টেলিজেন্স ইনফরমেশন যে মোদি ভোটের বাক্স বা ইভিএম বাক্স ম্যানিপুলেট (বাইরে থেকে প্রোগ্রামিং ব্যবহার করে ফল গণনা শুরুর আগেই হবু ফলাফল উলটে রাখা) করার সফটওয়ার সংগ্রহ করেছেন। অনুমান করা হয়ে থাকে এটা জুয়ারি শহর ম্যাকাও [Macao] আর- উত্তরকোরিয়া ভিত্তিক সফটওয়ার গ্রুপ যারা সাহায্য করছে বা করে চলেছে। অনেকে এমনকি এটাও মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ হ্যাকিংয়েও এই গ্রুপের কেউ কেউ টেকনিক্যাল কাজ ও দিকে এসব অর্থে ও সুত্রে জড়িত ছিল। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটা হল, এদিকটা নিয়ে মানে ভারতের নির্বাচনে ভোটের বাক্সের স্বচ্ছতা রাখা নিয়ে যত আবেদন  বা দাবি এপর্যন্ত তোলা হয়েছে এর সবই হয় ভারতের নির্বাচন কমিশন নিজে বা সুপ্রীম কোর্ট – এরা সেসব নাকচ করে ফেলে রেখেছে। কখনও সুপ্রীম কোর্ট বলেছে এটা কমিশনের কাজের উপর হস্তক্ষেপ হবে তাই তারা কিছু করবে না; আবার কখনও  (নির্বাচন) কমিশনের  কাছে মামলা ফেরত পাঠিয়ে হাত ধুয়ে ফেলেছে। আর নির্বাচন কমিশন বেশির ভাগ সময় যেকোন পাবলিকের আবেদনের ক্ষেত্রে জবাবই দেয় নাই বা নাকচ করে ফেলে রেখেছে। এনিয়ে আমার অন্তত তিনটা পুরানা লেখায় এসব নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছি। বেশিরভাগ সময় ফেরত পাঠানোর যুক্তিতে বলা হয়েছে যে এতে নির্বাচন ব্যবস্থা ফলাফল দিতে দেরি করবে বা ম্যানুয়াল ভোটের মত হয়ে যাবে তাই এতে হাত দেয়া যাবে না। অর্থাৎ যেন স্বচ্ছ নির্বাচন করা এটা প্রধান বিবেচনা নয়; এর বদলে অস্বচ্ছ ও কারচুপির সুযোগ রেখে দেওয়া আর এভাবেই তাড়াতাড়ি ফল আসার নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তোলাটাই আদালত ও কমিশনের কাছে লক্ষ্য!
    মজার কথা হল, এই অবস্থা সত্বেও কয়েকমাস আগে ভারতের প্রধান বিচারপতি বাংলাদেশে এসেছিলেন আমাদেরকে সবক শিখাতে যে ভারতের বা কোন দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায়  সুপ্রীম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের ভুমিকা কতই না মহান ও পবিত্র! আগ্রহিরা দেখতে পারেন এনিয়ে আমার পুরানা লেখা।

    যেটা অনুমান করা যায় সারকথায়,  মোদির তৈরি এটা একটা বিরাট র‍্যাকেট; অর্থ ও নানান ব্যক্তিগত সুবিধার আয়োজন ঘটিয়ে এই সিস্টেমটা দাঁড় করানো হয়েছে মোদি আর অমিত শাহের জুটিতে।  এবং ততই খোলাখুলি তাদের কাজের ধরণ। যেমন ২০১৯ সালের নির্বাচনে আইনভঙ্গের জন্য অনেক প্রার্থীকে সতর্ক করে ফাইন বা শাস্তি দিয়েছিল কমিশন। কিন্তু মোদির নামে বহু অভিযোগ জমা পড়লেও বা স্থানীয় নির্বাচনী কমিশন কর্তারা একশনের অনুমতি চাইলেও কমিশনারেরা তাতে অনুমতি দেয় নাই। অর্থাৎ প্রার্থী মোদি বিরুদ্ধে নির্বাচনি আইন ভঙ্গের সব অভিযোগই ব্যবস্থাহীন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থেকেছিল সেবার।  ভারতের নির্বাচন কমিশন প্রধান-সহ তিন সদস্য বিশিষ্ট। এটা সব সময় তাদের দুই-এক ভোটে এমন সিদ্ধান্ত দিয়েছিল সেসময়। আর তৃতীয় সদস্য অশোক লাভাসা, তাঁর আপত্তি ভোট সবসময় সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখিয়ে উপেক্ষা করা হয়েছে। সেই নির্বাচন শেষে কয়েক বছরের মধ্যে শেষে অশোক লাভাসাকে কমিশন ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। আপোষ করে তিনি এখন ম্যানিলায় বিশ্বব্যাংক সমতুল্য এডিবি-তে ভারত সরকারের প্রতিনিধি হয়ে লটকে আছেন। মানে নির্বাচন কমিশন থেকে তাঁকে বের করে দেয়া হয়েছে কায়দা করে।
    এমনকি এখনকার যে নির্বাচন কমিশন তা এবারের নির্বাচনী তারিখ ঘোষণার আগের সপ্তাহেও হয়ে পড়েছিল, এক সদস্য বিশিষ্ট; মানে কেবল প্রধান কমিশনার বিশিষ্ট। কারণ, আভ্যন্তরীণ আয়োজনে মোদি বাকি দুজনের পদত্যাগ করায়ছেন যাতে মোদি নয়া দুজন নতুন পছন্দের কমিশনার নিতে পারেন। তাই-ই হয়েছিল। আর এরপর তিন-সদস্য বিশিষ্ট হয়েই দুদিন পরে ঐ কমিশন এবারের নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করেছিল। আমাদের দুদকের মত তথাকথিত এমন নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান মোদির হাতে অনেকগুলো। যেমন সিবিআই [Central Bureau of Investigation], ইডি[Enforcement Directorate] ,  এনআইএ [National Investigation Agency], আইবি [Intelligence Bureau (India]; এছাড়া আয়কর বিভাগ আছে। আর এর বাইরে যে আর কত এমন প্রতিষ্ঠান আছে অগুনতি। কিন্তু সারকথা হল, বিভিন্ন রাজ্যের বিরোধীদলের বিরুদ্ধে মোদি্র এদের লাগিয়ে দেয়া, হয়রানি করা, বিজেপির সাথে আপোষে আসতে বাধ্য করাই এদের মুল লক্ষ্য হয়ে আছে মোদির ইচ্ছায়। এসবই মূলত পলিটিক্যাল স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহার।
    আর এর বাইরে গত পাঁচ বছরে ধরে চলেছে মোদির আরেক মারাত্মক ব্যবস্থা। এর আনুষ্ঠানিক নাম ইলেকটোরাল বন্ড [electoral bonds] স্কিম। সরকারী ব্যাংক স্টেট ব্যাংক [SBI] থেকে এটা কেবল যেন বিজেপি-কে চাঁদা আদায়ের এ’এক আজিব ব্যবস্থা। এই ব্যাংক আসলে বড় ব্যবসায়ীদেরকে এই বন্ড বিক্রি করে থাকে; কিন্তু কে কিনল সে পরিচয় পাবলিকলি দেখায় না। আর বিজেপি সরকার উপরে যে দুদক সমতুল্য প্রতিষ্ঠানের কিছু নাম দেখালাম, এদেরকে দিয়ে হয়রানির ভয় দেখিয়ে ঐ ব্যাংকে চাঁদা জমা করে আসতে মানে বন্ড কিনতে বাধ্য করে থাকে। এখাতে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুসারে প্রায় একমাত্র সুবিধাভোগী হল বিজেপি। আর মোট এমন বন্ডের পরিমাণ ১২ হাজার কোটি রুপীরও বেশী। গত ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে থেকে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। এটা পাঁচ বছর লুটপাট করতে দিবার পরে এবার নির্বাচনের আগে সুপ্রীম কোর্ট বীর হয়ে উঠেছিল। তারা ওসব চাঁদাদাতা সবার নামের তালিকা চলতি নির্বাচনের কয়েকদিন আগেই একদিনের মধ্যে  প্রকাশ করতে “স্টেট ব্যাংক-কে পালনীয় বাধ্যতামূলক” বলে নোটিফাই করেছিল। আর তাতেই সব নাম বের হয়ে আসে। অথচ পাঁচ বছর আগেই একাজ তারা করতে পারত।
    সবচেয়ে বড় কথা উপরে যেসব ইনভেস্টিগেশন প্রতিষ্ঠানের অল্পকিছু তালিকা দিয়েছি সেগুলো অপব্যবহার করেই বিজেপি সব বিরোধীদল আর ব্যবসায়ীদেরকে সাইজ করে গেছে যাচ্ছে। অথচ না সুপ্রীম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন এদিকে তাকায়-ই নাই। এটাই মূলত মোদির নামে এখন ফ্যাসিজমের অভিযোগ তুলেঅনেককে আগিয়ে আসতে দেখছি। কিন্তু এমন অভিযোগ তোলার ক্ষমতা এখনও যেন তাদের দেশের বাইরে – বাইডেন প্রশাসনের হাতে! এমনই দুর্দশা!

    আর এমন মোদি-ব্যবস্থার মধ্যেই আবার এবারের নির্বাচন হচ্ছে! আর কোর্ট বা কমিশন এব্যাপারে নির্বিকার! দেখেন এটা কমবেশি এখন সবাই জানে যে সরাসরি মুসলমানবিদ্বেষ করে ঘৃণা জাগিয়ে মোদি ভোটের প্রপাগান্ডা পরিচালনা চালিয়ে যাচ্ছে! অথচ এটা ঠেকানোই ছিল কোর্ট এবং কমিশন   এর মুখ্য দায়ীত্ব! কিন্তু এরা নির্বিকার! এটাই প্রমান করে ভারত কোন চুলায় মাথা লুকায়েছে! অথচ সমাজ অসহায়! এমনকি মোদিকে ফ্যাসিবাদ বলতেও যেন সাহস করছে না!

    এখন দুইটা শেষ কথাঃ
    অনেকাংশেই কথাগুলো বলব ভারত-ইরানের চাবাহার পোর্ট কে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি ইরান-ভারত চুক্তি হয়েছে। আর তাতে পোর্ট পরিচালনা ভারতকে দেয়া হয়েছে। আর তাতেই আমেরিকা ভারতকে কড়া স্যাংশনের হুশিয়ারি দিয়েছে।

    ১। এই নির্বাচনে মোদি ফিরে জিতুক কিংবা বিরোধি কোয়ালিশন জিতুক – একটা মূল কথা হল, ভারত ক্রমশ আমেরিকা থেকে দূরে যেতে থাকবে।  মানে ততই ভারত একেবারে চীনের কোলে উঠে না গেলেও অন্তত নিউট্রাল বা একধরণের গভীর ব্যবসায়িক সম্পর্ক করতে অনেক ধাপ আগিয়ে যাবে। এককথায় বললে, চীন-ভারত উভয়ের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ বিষয়ক দুরত্বটা ফিকে হতে থাকবে। আর ব্যবসায়িক স্বার্থ ততই ওর জায়গা নিবে।
    বাংলাদেশের গত কথিত নির্বাচনের কয়েকদিন আগে আমি লিখেছিলাম আমেরিকা আমাদেরকে রাস্তায় ফেলে চলে গেলে তা এশিয়া থেকেই আমেরিকার বিদায়ের সুত্রপাত ঘটবে। এখানে সেই কথাটাই বলছি তবে আরেক ভাবে আরেক দিক থেকে। এবার মোদি ক্ষমতায় নিজেকে বিজয়ী দাবি করে টিকে গেলে ইন্ডিয়া-আমেরিকার সম্পর্কের পতন ও পারস্পরিক দুরত্ব ঘটবে খুবই দ্রুত। আর যদি কংগ্রেস এন্ড গং জিততে পারে তবে সাময়িক এই নয়া সরকার আমেরিকা-ঘনিষ্ট বলে নিজেদের দেখানো শুরু করবে। কিন্তু সেটা হবে সাময়িক ক্ষীণ আয়ুর এক ঘটনা। মানে জমবে না। অচিরেই একেবারে সাধারণ ব্যাবসায়িক স্বার্থের বিরোধ বাধা হবে।
    যেমন ধরা যাক, ভারত-ইরানের চাবাহার পোট [Chabahar Port ]। এটা এদুই দেশের জন্যই গুরুত্বপুর্ণ , তবু ভারতের জন্য বেশী।  পাকিস্তানের গোয়াদর গভীর সমুদ্র বন্দর ভারত পুরানা ক্যাচালের কারণে ব্যবহার করতে পারবে না। এর মানে হল, সেন্ট্রাল এশিয়া বা আফগানিস্তানে (ল্যান্ডলক দেশ) পণ্য পাঠাতে অসুবিধায় পড়তে হবে। অথচ ঐ রুটে শুধু গোয়াদরের সুবিধা না। আর গোয়াদর ব্যবহার করতে পারলে এরপর ওদিকে চীনের বেল্ট-রোধ ধরে একদিকে একেবারে ইউরোপ পর্যন্ত ট্রেন বা সড়ক পথে পরিবহনের যে সুবিধা; অন্যদিকে ইরান থেকে পুবে সেন্ট্রাল এশিয়া আফগানিস্থান যে সড়ক ও রেল সুবিধা তৈরি হয়েছে তা থেকে ভারত বঞ্চিত হয়ে আছে।  এসব কিছুরই অন্তত এক ছোট বিকল্প হলেও চাবাহার ভারতের জন্য এক ভাল বিকল্প ও বাস্তবতা।
    কিন্তু আমেরিকা ইরানের সাথে কোন সম্পর্কই রাখা যাবে না কেউ রাখলে তার উপর স্যাংশন দেয়া হবে – এই হুশিয়ারিই আমেরিকার এশিয়া থেকে বিদায় হয়ে যাবার পথেই তাকে কয়েক ধাপ ঠেলে দিবে। কারণ, ভারতে মোদি অথবা রাহুল যাদের সরকারই আসুক কারোই চাবাহারের পক্ষে না থাকার বিকল্প নাই। কারণ, এটা ভারতের জন্য বিরাট এক বাণিজ্যিক সুযোগ। কাজেই আমেরিকা বিরোধিতার পথেই ভারতকে যেতে হবে।

    আবার সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ  আরেকদিকের কথা বলিঃ
    ইরানের ভারতকে দেয়া এই অফার – এবিষয়ে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি এতে চীনের সম্মতি আছে। আর আছে বলেই ইরান সহজেই এতদুর আগিয়ে পোর্ট পরিচালনার ভার ভারতকে দিয়ে দিয়েছে। যেখানে আমেরিকান সুবিধা খেতে ট্রাম্পের আমলে ভারত ইরানের হাত ছেড়ে পালিয়েছিল। সেসময় ইরান তেল ভারতে পৌছে দিতে চেয়েছিল তাও ভারত ইরানের তেল কিনতে রাজি হয় নাই। বরং রাজি না হয়ে এই সিদ্ধান্তকে বিক্রি করে আমেরিকার থেকে সুবিধা নিয়েছিল। সেই থেকে চাবাহার প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে গেছিল। কিন্তু প্রতিশোধ ভুলে এখন ইরানের আবার আগানো এটা চীনের আগ্রহ ও প্ররোচনাতেই বলে অনুমেয়। চীনের ক্যালকুলেশন পাকা যে ইরান এই সুবিধা দিলেই ভারতের আমেরিকার বিরোধিতা বাস্তবতা হয়ে উঠবে।  আর সেটা দেখতেই ইরানকে দিয়ে এই অফার। বাণিজ্যিক দিক থেকে এতে ইরানেরও তো ক্ষতি নাই।
    আবার এ’ঘটানার মাধ্যমে চীন ভারতের কাছে ম্যাসেজ দিয়েছে যে ভারতেরও বাণিজ্য সুবিধা কার্টেল / ছেটে ছোট করা চীনের নীতি নয়, তাতে চীন-ভারত যতই বিরোধ থাকুক। আসলে চীন ভারতকে বলতে চায় ভারতও গোয়াদর ডিপ পোর্ট হয়ে বেল্ট-রোড ধরে সেন্ট্রাল এশিয়া বা আফগানিস্থানে বা অন্যদিকে, ইউরোপ পর্যন্ত চীনা বেল্ট-রোডের রেল ও সড়ক ফেসিলিটিজও ব্যবহার করতে পারে। চীন এনিয়ে বাধা তৈরির বদলে পজিটিভলি আহবান জানাচ্ছে। ভারতের অর্থনীতি বিকাশে চীনের ক্ষতি নাই, লাভ আছে। এছাড়া সবচেয়ে বড় লাভ দক্ষিণ এশিয়া থেকে আমেরিকাকে আউট করা হবে তাতে। কারণ, আমেরিকা ভারতে পা রাখতে সুযোগ পায় বলেই বার্মা, বাংলাদেশের মত দেশে যা খুশি করার চেষ্টা করে থাকে।
    এখন মোদি ক্ষমতায় ফিরলে আমেরিকা-ভারতের সম্পর্কের ইতি দ্রুত ঘটবে। আর আমেরিকা ভারতের উপর স্যাংশন দিলে তাতে ভারতও দ্বন্দ্ব ভুলে বাধ্য হয়ে ডলার ফেলে ইউয়ানে বাণিজ্য শুরু করে দিবে।  আবার যদি কংগ্রেস কোয়ালিশন ক্ষমতায় আসে তাহলেও এটাই ঘটবে। হয়ত শুরুর এক বড় জোর দুই বছর একটু আমেরিকান-ভারত (কংগ্রেস) ঘষাঘষি জারি থাকবে। আর ক্রমশ সেটা ভারতের বাণিজ্য স্বার্থেই হবু কংগ্রেস সরকারও একই পথ ধরবে। খুব সম্ভবত সেক্ষেত্রে মোদির চেয়ে দ্রুতই কংগ্রেস চীনের কোলে গিয়ে উঠার সুযোগ নিতে চাইবে।

    ২। মোদি যদি ক্ষমতায় ফিরতে পারেনঃ
    সেক্ষেত্রে এটা চরম দানব এক মোদি হবে। বিরোধী বলে কারো অস্তিত্ব নিয়ে টিকাই মুশকিল হয়ে যাবে। ইতোমধ্যেই কানাঘুষা তিনি ভারতের কনষ্টিটিউশনেও হাত দিবেন।  এই ধারা যতই তীব্র হবে হিন্দুত্ববাদী – এই উগ্র জাতিবাদি মোদির ভারত ততই পরিণতিতে বিচ্ছিন্নতা বাদের মুখোমুখি হবে। আর তা ঘটে গেলে ভারত মেজর তিন টুকরা হবে। মোদি এখন ক্ষমতায় টিকে আছে ভারতরাষ্ট্র গঠনগত দিক থেকে এক সেন্ট্রালাইজড কুক্ষিগত ক্ষমতার আর এর উপর আবার উগ্র হিন্দু-জাতিবাদি রাষ্ট্র বলে। আবার এটাই আবার মোদির আগামিতে ক্ষমতায় উত্থান ঘটলে এই গঠন বৈশিষ্টই মোদির ভারতকে ভাঙ্গনের দিকে নিয়ে যাবে দ্রুত!

    সব মিলিয়ে ভারতের প্রতিটা পরিবর্তনের ধাক্কা চাপ (এমনকি শরণার্থীর) বাংলাদেশে এসে আছড়ে পড়তে পারে সেক্ষেত্রে! বাকি যা কিছু পাঠক আন্দাজ করে নিয়েন। এই হল, আগামি দিনের দক্ষিণ এশিয়ার কিছু বিচ্ছিন্ন চিত্র!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ    ১৭ মে ২০২৪  সন্ধ্যা ০৭ঃ ১৮
    শেষ আপডেটঃ   ২৪ মে ২০২৪  বিকাল ০৩ঃ ৫৫

  • দুটাই গায়েবি দাবি, ডেইলি ষ্টার – প্রথম আলোর পাল্টাপাল্টি

    দুটাই গায়েবি দাবি, ডেইলি ষ্টার – প্রথম আলোর পাল্টাপাল্টি
    গৌতম দাস
    ১৪ মে ২০২৪ সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫৪

    https://wp.me/p1sCvy-5B6

     

    একই মিডিয়া গ্রুপের দুই সম্পাদক

    এটা একটা বেশ তামাসার ঘটনা! একই মিডিয়া মালিক গ্রুপ –  “মিডিয়া স্টার লিমিটেডের” দুইটা পত্রিকা প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার, এরা পরস্পরের পাল্টাপাল্টি রিপোর্ট করেছে দুদিন আগে পরে। যেভাবেই হোক যা খুশি লিখে টাকা কামাইতে হবে। কাস্টমার নাকি লক্ষী!  অর্থের বরকত দেয়! তাই মোটা তহবিলের দেশি-বিদেশি কাষ্টমার যা চায় সে ফরমায়েশ পূরণে তাই করে দিতে এদুই পত্রিকা এক পায়ে খাড়া তাতে, ডেইলি স্টারের খবরের বিরোধী করে প্রথম আলোকে যদি কিছু গারবেজ ছাপতে হয় তো অসুবিধা কী তাদের! এটাই এখন শুরু হয়েছে!!

    আর জার্নালিজম???
    সেটা কোথায় আশ্রয় পাবে? হিমঘরে?
    হা অবশ্যই তাই। এদুই পত্রিকার মূল কাস্টমার আর পাঠক যেহেতু নয়; তাই তাদের আর জার্নালিজমের দরকার কী? পত্রিকার ততপরতায় সেটাতে আর নুন্যতম জার্নালিজম হল বা থাকল কিনা এদের কাছে তার কী এসে যায়? এর বদলে আসল ভগবান / ক্রেতা হল দেশি / বিদেশি রাষ্ট্রস্বার্থ;  এদের কাছে নিজেদের বিক্রি করেই একে নিজেদের জন্ম সাফল্য ভাবছে!

    ঘটনা হল, সামনে হাসিনার কথিত চীন সফর নিয়ে একই মিডিয়া মালিক গ্রুপ – “মিডিয়া স্টার লিমিটেডের” দুইটা পত্রিকা প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার পাল্টাপাল্টি রিপোর্ট করেছে দুদিন আগে পরে। পরস্পরবিরোধী সব দাবিতে এদুই পত্রিকা দুদিন আগে পরে লেখা প্রকাশ করেছে। এই বেপরোয়া কেন? এদের এই ততপরতা প্রমাণ করেছে দেশে সম্ভবত সরকার নাই হয়ত সরকারী প্ররোচনা আছে এখানে? আর দেশের নাগরিক ও পাঠক এদেরকে কোন গোনায় ধরতে চায় না এরা!

    ডেইলিস্টার এর দাবিঃ
    ডেইলিস্টার রিপোর্ট করেছিল – Beyond Dollar: Bangladesh to seek over 36b yuan in Chinese loans এই শিরোনামে ৮ মে ২০২৪। এবং তা ছিল এক অনামি-বেনামি সোর্সের নামে। আর বুঝা যাচ্ছিল চীনা ঋণ (“বাজেট সহায়তার” নামে যেটা ক্যাশ ডলার / ইউয়ান পাওয়া) – এক বেপরোয়া কিন্তু অকার্যকর পথ এটা।
    কিন্তু ডেইলি স্টার কোন প্রমাণ ছাড়া দাবি করেছিল যে এটা নাকি আবুধাবীতে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ থেকে কয়েকদিনের WTO এর এক বাণিজ্যসভা চলাকালে, ওরই সাইড লাইনে বসে কথিত এই আলাপ হয়েছিল; চীনা “প্রতিপক্ষের” [counterpart] সাথে। অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় আড়াই মাস আগের ঘটনা ছিল সেটা। যদিও এমন কথা যে হয়েছে এর প্রমাণ কী, তা জানা যায় না। কারণ, পুরা রিপোর্টটাই বেনামি। যেমন বলা হয়েছে, ১। According to highly placed sources in the government, ২।  Sources in the finance and commerce ministries ৩।  According to the sources। অর্থাৎ খবরের সোর্স গায়েবী। সবচেয়ে বড় কথা, আড়াই মাস আগের এই গায়েবি রেফারেন্স এখন হাজির হয়েছে কেন, তা এরা বলছে না।   আর বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী যে এমন বলছে এর কোন প্রমাণও রিপোর্ট-এ নাই।   নিচে ডেইলি স্টারে ঐ রিপোর্ট থেকে আমাদের বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রীর প্রমাণহীন বরাতের  বক্তব্যে অংশটা নিচে এখানে তুলে এনেছি।

    “State Minister for Commerce Ahasanul Islam Titu brought up the loan issue
    during bilateral talks with his Chinese counterpart on the sidelines of the
    13th Ministerial Conference of World Trade Organisation in Abu Dhabi
    between February 26 and March 2″.

    কেন সোর্সের এত জরুরি বা সন্দেহজনক? একটা দিনকাল সময় ছিল যখন মিডিয়াকে অবিশ্বাস করারই কিছু ছিল না। মূল কারণ, তারা নাগরিক-পাঠকের বিশ্বাস-আস্থাও রক্ষক হয়ে থাকবে না কেন – আমাদের সমাজেরও এই কমান্ড তখন কাজ করত। আর এখন সব পক্ষই নিজ নিজ হীন ও সংকীর্ণ স্বার্থে এই বিশ্বাস-আস্থাটাই ভেঙ্গে দিয়েছে, পত্রিকাগুলো জার্নালিজমকেই নিলামে তুলেছে। তাই একালে এমন ঘটানাও ঘটছে যে সরকার দাবি করছে ওমুক দেশের সাথে এই আলাপ হয়েছে। কিন্তু  নাগরিক-পাঠকের তা বিশ্বাস হচ্ছে না। তারা অপেক্ষা করছে যতক্ষণ সে কথিত দেশও বিবৃতি দিচ্ছে!
    তাতেও সমস্যা আছে। আজকাল অনেক দেশের রাষ্ট্রদুত মনে করেন তাদেরকে নিয়ে করা সরকারের দাবির বিরোধিতা করে বিবৃতি দেয়া মানে তো প্রকাশ্যে সংঘাতে জড়ানো। যেমন চীন সেই টিকা পাওয়া নিয়ে কূটকাচালি নোংরামির সময়। আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ভারতের সহায়তায় কলকাতা রয়টার্সের রুমা পালের কাছে দাবি করেছিল যে চীন নাকি তাদের টিকা গবেষণার তৃতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশের সামিল করে নিতে বাংলাদেশের কাছে অর্থ চেয়েছিল। অথচ ব্যাপারটা ছিল, সামিল করার চীনা প্রস্তাব বিনা পয়সারই ছিল এমনকি লব্ধফল ব্যবহার করে নিজের প্রয়োজনীয় টিকা বাংলাদেশ নিজেই কোন ল্যাবকে নিয়ে বানিয়ে নিবার রাইটও পাবার কথা ছিল। কিন্তু ভারত তার এষ্ট্রোজেনিক টিকা কিনলে ক্রেতারা ব্যক্তিগত কমিশন পাবার সুযোগ আছে, এই লোভ দেখালে আমাদের সরকার চীনের প্রস্তাবে সময়মত তার সম্মতিপত্র চীনের কাছে পাঠায় নাই।   পরে যখন পাঠায় তখন ঐ চীনা সিংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান জানায় বাংলাদেশ সময়ে সম্মতি না পাঠানোতে আর তাদের দেরির সুযগ ছিল না বলে তারা এই অফার ইন্দোনেশিয়াকে দিয়ে দিয়েছে।
    এরপরেও বাংলাদেশ অনুরোধ ঝুলাঝুলি শুরু করল তারা জানাই তাদের নয়া বাজেট নাই; মানে একটা অতিরিক্ত দেশকে নতুন করে অন্তর্ভুক্তিতে যে বাজেট প্রয়োজন তা তাদের পরিকল্পিত বাজেটে বরাদ্দ নাই। তাই নিতে পারছে না। মানে কেউ যদি বলে বলে তাঁর কাছে বরাদ্দ নাই তাহলে এর মানে করা হয়েছে সে অর্থ চেয়েছে।
    মজার কথা হল, ঐ ঘটনায় রুমা পালই আইসিডিডিআরবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের (এই প্রতিষ্ঠান স্থানীয়ভাবে চীনা টিকার তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা পরিচালনার জন্য চুক্তিবদ্ধ স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ছিল) সাথে যোগাযোগ করে চীন অর্রথ চেয়েছে কিনা জানতে চাইলে তারা কোনই মন্তব্য করে নাই। এমনকি ঢাকার চীনা এমবেসিও “নো কমেন্টস” বলে ফিরিয়ে দেয়।  কিন্তু আল্লার মাইর বলে কথা। ভারত টিকা দিবে না জানিয়ে দেয় আর বাংলাদেশকে ফের চীনকে ধরাধরি করে টকা পাবার ব্যবস্থা করতে হয়। কিন্তু কিসের বিনিময়ে চীন সেবার তাতে রাজি হয়েছিল সে আরেক উপাখ্যান। আমরা সেদিকে যাচ্ছি না।

    সারকথাটা হল, চীনা কূটনীতিক অভ্যাস বা স্টাইল হল, তাদের নামে বা স্থানীয় রাষ্ট্রদুতের নামে হোস্ট সরকার মিছা কথা বললেও বা মিথ্যা দাবি  করলেও তারা রা কারে না – জবাব দেয় না। মুখোমুখি বাকযুদ্ধের সংঘাত এড়ায় চলে। আর ভাল সময়ের জন্য অপেক্ষা করে; বলে আমার ধারণা। কাজেই আমাদের সরকার সাংবাদিকদের দিয়ে বা সাংবাদিক নিজে খেপ মারতে চীনা দের রেফারেন্সে গায়েবি তথ্য দিলেও চীনা না তাতক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নাও দেখাতে পারে।

    এখন আসি প্রথম আলোর দাবিঃ
    ডেইলি স্টারের একই এবিষয়ে প্রথম আলো রিপোর্ট ছাপা হয় ১২ মে ২০২৪। মানে, ডেইলিস্টারের তিনদিন পরে। শিরোনাম হল, – ইউয়ানে ঋণ দিতে চায় চীন, নিতে আগ্রহী ডলার–সংকটে থাকা বাংলাদেশও এর। প্রতিবেদক জাহাঙ্গীর শাহ। আগে ভাবতাম লোকটা বোধহয় জন-বিশ্বাসযোগ্যতা রাখতে চায়। নিজ ক্যারিয়ার ইমেজ এর দিকে খেয়াল রাখে। এই রিপোর্টের পরে আমি শকড ও হতাশ! কেউ জার্নালিস্ট হতে চায় না, কেবল অর্থ চায়। যাক সেকথা।

    প্রথম আলোর প্রধান (ডিইলিস্টার-বিরোধী বা) কন্ট্রাডিকটরি দাবি  যা তা শিরোনামেই আছে।  ইউয়ানে ঋণ দিতে চায় চীন – এইটা। যেখানে ডেইলিস্টার লিখেছিল, আবুধাবীতে মূল সভা না সাইড লাইনে বসে আমাদের বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী চীনা মন্ত্রীকে ঋণ (স্টারের ভাষায় ‘কাউন্টারপার্ট’) ঋণ দিতে [ভাষা লক্ষ্য করুন ……Titu brought up the loan issue…] কথা তুলেছিল। আর বিপরীতে এখন প্রথম আলোর দাবি হল, চীনই [ ইউয়ানে ঋণ দিতে চায় চীন] দিতে চেয়েছে।  এমনকি প্রথম আলো আরো লিখেছে,
    ১। “চীন চাইছে ইউয়ানে ৫০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ ঋণ বাণিজ্য–সহায়তা (ট্রেড ফ্যাসিলিটি) হিসেবে দিতেঃ…।

    ২। [পঞ্চম প্যারায়] – ” চীনের কাছ থেকে ইউয়ানে ঋণ দেওয়ার আগ্রহ এমন সময় প্রকাশ করা হয়েছে,”… 

    ৩। [নবম প্যারায়]  এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব তপন কান্তি ঘোষপ্রথম আলোকে বলেন, ডলারের চাপ সামলে রিজার্ভ বাড়ানোর জন্য চীনের আমদানি ব্যয় ইউয়ানে মেটাতে এই ঋণ নেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। এই ঋণ কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা ঠিক করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণের সার্বিক দিক পর্যালোচনা করতে শিগগিরই একটি কমিটি গঠন করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়” –……[কিন্তু সরি প্রথম আলো, সচিব এটা কোথায় বলেছেন? রেফারেন্স কী? বলেছেন এর প্রমাণ কী এর কোন হদিস রেফারেন্স নাই গায়েবি]

    অর্থাৎ প্রথম আলোর স্পেশালিটি হল, সে দাবি করে চলছে যে বাংলাদেশ সরকার বা এর কোন মন্ত্রী নয়; বরং চীনই গায়ে পড়ে বাংলাদেশকে পাঁচ বিলিয়ন সমতুল্য অর্থ ঋণ দিতে চাচ্ছে। এটা এক হেভভি মজার দাবি! এমনকি এটা ডেইলি স্টারকেও নাকচ করে দিয়েছে। কারণ, ডেইলিস্টার তবু দাবি করছিল যে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী টিটোর চীনার মন্ত্রীর কাছে ঋণের অনুরোধ থেকে ঘটনা শুরু।

    কিন্তু এবার একেবারে বেপরোয়া প্রথম আলোঃ
    তার নতুন তথ্য হল, টিটোর সাথে আবুধাবিতে চীনা মন্ত্রীর বৈঠক চলাকালে ঢাকায় কী ঘটেছিল? নিচে প্রথম আলো থেকে তুলে আনা অংশ দেখেন। সেই বৈঠক চলাকালেই নাকি ঢাকার দৃশ্যপটে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদুত ইয়াও অয়েন নিজে যেচে ৫ বিলিয়ন ডলার (৫০০ কোটি ডলার) নিএই আগ্রহ করে ঋণ দিতে চেয়েছিল। আর  চীনা রাষ্ট্রদূতের এই আগ্রহ প্রকাশের পর আমাদের আমলারা ততপর হয়েছে ঋণ পেতে…।

    “…বৈঠক চলাকালে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি
    মোকাবিলায় বাণিজ্য
    –সহায়তা বাবদ ৫০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ ইউয়ান

    ঋণের প্রস্তাব দিতে অনুরোধ করেন। চীনা রাষ্ট্রদূতের এই আগ্রহ প্রকাশের পর এ নিয়ে ঢাকায় আলোচনা শুরু হয়”…।

    সত্যিই মজার গল্প!
    বাংলাদেশ নিজে চায় নাই চীন নিজেই ঋণ দিতে চেয়েছে – এর চেয়ে মজার গল্প আর কী হতে পারে! তাও আবার এই ররণ যে সে ঋণ নয়! এটা বাজেট সহায়তা ঋণ; মানে হল, ক্যাশ বৈদেশিক মুদ্রা (ডলার / ইউয়ান) পুরাটাই এবং একবারে এটা হস্তান্তর হবে।
    এর আরো মানে হল, এটা প্রকল্প ঋণ নয়। সোজা মানেটা হল, কোন ঋণদাতাই ক্যাশ (ডলার / ইউয়ান) দিতে চায় না।
    কারণ, ৫ বিলিয়ন ক্যাশ ডলার মানে হল এটা দিয়ে ৫০ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প দেয়া সম্ভব। [তুলনা করে নেন ২০১৬ সালে চীন ২৬ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছিল। অনুমোদিত হলেও এর অর্থ ছাড় ও বাংলাদেশে তা খরচ করা যায় নাই। কারণ অর্থ ছাড় ততটুকুই হয় বা আগায় যতটুকু কাজ প্রতিবছর বাস্তাবায়িত হয়। আর এতে এখনও অর্ধেক অর্থ পেন্ডিং। ] এসবের সোজা অর্থ হল, চীন বাংলাদেশকে একটা প্রকল্পই যদি মোট দশ বিলিয়নেরও হয় তবু বছরে হাফ থেকে বড় জোর এক বিলিয়ন ডলার অর্থই কেবল ঐ প্রকল্প ছাড় করাতে সক্ষম হবে মানে চীনকে এতটুকু ডলারই কেবল সরবরাহ করতে হবে।  অথচ প্রথম আলো দাবি করতেছে চীনা রাষ্ট্রদুত নাকি নিজেই যেচে ৫ বিলিয়ন ক্যাশ ডলার দিতে চেয়েছে…। আমার মনে হচ্ছে না ৫ বিলিয়ন ক্যাশ ডলার মানে কী তা নিয়ে রিপোর্টার জাহাঙ্গীর শাহের কোন ইমাজিনেশন / অনুমান আছে!

    এবার এই রিপোর্টে প্রথম আলোর চাতুরির দিকটা বলি।
    এই রিপোর্টের শুরুতে তিনটা বুলেট পয়েন্ট বা সারাংশ লিখে শুরু হয়েছে। তার আবার প্রথম বুলেট পয়েন্টটা হল এরকম –

    • দুই দেশের মধ্যে ১৯০০ কোটি ডলার বাণিজ্যঘাটতি।

    আসলে সাবধান হতে হয় যখন কোন রিপোর্টে কেউ বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে কথা তুলে। কেন? কারণ, এটা কিছুই মানে করে না আবার ইঙ্গিত টা বুঝা যায়। বাংলাদেশ চীন থেকে প্রচুর পণ্য আমদানি করে তুলনায় নিজে রফতানি করে ১০% ও না। এমন হতে পারে। কিন্তু সব্দেশ মিলিয়ে আমি কত রফতানি করি আর সবদেশ মিলিয়ে কত আমদানি করি – এমন গ্রস ফিগারটা অনেক গুরুত্বপুর্ণ যে আমার অর্থনীতি মোটা দাগে ভাল না খারাপ। তাহলে শুরুতেই চীন-বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি ১৯ বিলিয়ন ডলারের এই তথ্য প্রথম আলো হাজির করল কেন?
    এক. খুব সম্ভবত প্রথম আলোর রিপোর্টটা দিল্লির দিক থেকে করা; সেক্ষেত্রে ডেইলি স্টারেরটা আমাদের সরকারের।
    দুই. ইন্ডিয়া কঠর অর্থনৈতিক জাতিবাদি; তাই তাদের কাছে বাণিজ্যঘাটতি – এই শব্দ ও ধারনাটা একটা ভাল টুল। যা দিয়ে আপাতভাবে প্রতিপক্ষকে ভড়কে দেয়া যায়।
    তিন. এখানে চীনেরই যেচে হাসিনাকে ডলার দেওয়া উচিত কারণ চীনের থেকে বাংলাদেশের আমদানি বেশি প্রায় ১৯ বিলিয়ন – এই আর্গুমেন্ট দিয়ে চীনকে দায়ী করা হয়েছে।
    চার. এখন এই দাবি যদি মেনে নেই তাহলে, ভারত-চীনের বেলায় ফিগার হল, ভারত ১০১ বিলিয়ন ডলার চীন থেকে আমদানি করে আর রফতানি করে এক মাত্র ৮-৯% মাত্র। দেখা যাচ্ছে এই বাণিজ্য ঘাততি তো আমাদের চেয়েও বড়! তাহলে এই ঘাটতি পূরণে কী চীণ-ভারত ঋণ ক্যাশ ডলারের আলোচনা চলছে নাকি??? নাই কেন??
    পাঁচ. ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ বাণিজ্যে, ভারতের রপ্তানি প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার (২০২২ সালের) তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি ২ বিলিয়নের নিচে। মানে সাত গুণ বাণিজ্য ঘাটতি।  তাহলে ভারত কেন বাংলাদেশকে ক্যাশ ডলার ঋণ দিচ্ছে না?

     

    তাহলে কী দাঁড়ালোঃ
    প্রথম আলো কারও স্বার্থে [সম্ভবত ভারত] এই প্রপাগান্ডা রিপোর্টটা করেছে। আর তাতে এতে দাবি করা বক্তব্য তিনদিন আগের ডেইলি স্টারের সাথে কনট্রাডিকটারি হয়ে গেলেও। মানে প্রথম আলোর দাতা-কাস্টমারের মোটা এমাউন্ট বিষয়টাকে তারিত করেছে। তাতে ঘরের ভাই বেইজ্জতি হলে হোক; অর্থ তো মিলবে! আর তা থেকেই সম্ভবত একই মিডিয়া গ্রুপের দুই ভাইয়ের পরস্পরের দাবির (গায়েবি সুত্রে)  পাল্টাপাল্টি; আর এই তামাসা আমাদেরকে দেখতে হচ্ছে।
    সবচেয়ে বড় কনট্রাডিকশন হল, ডেইস্টার দাবি করছে আমাদের মন্ত্রী অর্থ-ঋণ চেয়েছে। আর পালটা প্রথম আলোর রিপোর্ট দাবি করছে ঢাকার চীনা রাষ্ট্রদুত নিজেই দিতে চেয়েছে; মানে, অর্থ দিতে চেয়ে বাংলাদেশের কাছে প্রস্তাব চেয়েছে।

    এই ঘটনা, বাংলাদেশের অর্থনীতির দুর্দশা আর আমাদের মিডিয়ায় “দাতা-কাস্টমারের” অর্থের দাপটের জার্নালিজমের এক ভাল উদাহরণ হয়ে থাকবে, নিঃসন্দেহে!
    আর প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার নিজেরা বসে ঠিক করুক – সবার আগে চীনই কী ৫ বিলিয়ন ডলার সমতুল্য অর্থ দিতে চাইছে? নাকি এর আগেই বাংলাদেশ থেকে অর্থ চাওয়া হয়েছে? এনিয়ে তাদের দুই অবস্থান নিয়ে পালটা পাল্টির তো কোন মানে হয় না।  আর সবচেয়ে বড় মিথ্যা চীন এই অর্থ দিতে নীতিগতভাবে রাজি এই কথার প্রমাণ কি?

    এদিকে ডোনাল্ড ল্যুঃ
    ঢাকার কিছু মিডিয়া জানাচ্ছে ঢাকায় এসে গেছেন ডোনাল্ড লু। কিছু মিডিয়া তো ইতোমধ্যেই সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বরাতে লিখেছে, ডোনাল্ড ল্যু নিজ দেশের এজেন্ডা বাস্তবায়নে আলোচনা করতে এসেছেন: ওবায়দুল কাদের। এখন এর প্রথম মানে হল, কাদের আশাহত অন্তত। কারণ, এসময়ে সরকারের একটাই এজেন্ডা বৈদেশিক মুদ্রা যোগাড়। তাই কাদেরের কথার অর্থ কী এটা যে ডোনাল্ড ল্যু এব্যাপারে কোন সাহায্য করতে পারছেন না; বা করবেন না? ল্যু এর নিজ দেশের এজেন্ডা নিয়ে আসা মানে তো এটাই হয়!
    অবস্থায় পাঠকদেরকে বলব ডলার যোগাড়ে ল্যু এর দৌড় বড়জোর আইএমএফ পর্যন্ত, আমেরিকা সরকার নিজের থেকে কাউকে ক্যাশ দিবার অবস্থায় এই শতকেই আর উদাহরণ নাই।  আর আইএমএফ এর বেলায়, সে নগদ ডলার সহায়তা এটা কাউকে দেয় বা দিয়েছে আমার মনে পড়ে না। তবু ধরা যাক খুবই জবরদস্ত অনুরোধ করেছেন ল্যু! এটাও যদি ঘটে তবে এই অর্থের পরিমান হাফ বিলিয়নের (৫০০ মিলিয়ন মাত্র) আশে-পাশে থাকবে। যেমন প্রথম যখন এসেছিলেন তখন তার অনুরোধেই চলতি ৪.৭ বিলিয়ন আইএমএফ সাহায্য যেটা প্রতি ছয় মাসে  অগ্রগতি দেশে ছাড় হয় যা বছরে গড়ে ৭০০ মিলিয়নের মত। সবচেয়ে বড় কথা গত অর্থমন্ত্রী ঠাট্টা করে বলেছিলেন এমন ছোট অর্থ – “তিনি নিজেই ধার দিতে পারেন”।
    কাজেই এখানে লীগ বা সরকারের এমন আশাহত বক্তব্যই তো বের হবে।
    আবার ল্যু-কে আসলে দেখতে হবে – এবারের বাইডেন সরকারের মুখ্য সব ব্যর্থতার প্রধান নায়ক হিসাবে। ল্যু এর প্রধান এজেন্ডা ছিল ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি যার বাংলা মানে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে চীন হঠাও। সেটা অবকাঠামো ররণ, স্ট্রাতেজিক উপস্থতি সহ যে কোন উপস্থতি।অথচ এশিয়ার একটা দেশেও তা নুন্যতম সফলতার আলো দেখে নাই। গত একবছর বাইডেন-ল্যু এটা আর উচ্চারণ করাই ছেড়ে দিয়েছে।
    একচুয়ালি ল্যু-এর করুণ পরিণতির বেস্ট উদাহরণ হল পাকিস্তান! শুরু ইমরান সরকারকে উতখাত দিয়ে আর চোর দুই মার্কা মারা নওয়াজ ভাইকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। পরে পাকিস্তানের নির্বাচনের ইতিহাসে এই ওপেন কারচুপিতে তারা অভ্যস্থ ছিল না, এই প্রথম দেখলো যে এবার আর্মিই সেকাজে ল্যু এর হয়ে প্রধান হোতা। কিন্তু ঝগড়া লাগলো নির্বাচনের পরের ঘটনাবলীতে, কেউ আর এর দায় নিতে চাইলো না যখন আমেরিকা নিজেকে এই কথিত বিজয় থেকে কারচুপি থেকে নিজের দায় অস্বীকার করে বসল। এত নির্বাচন কমিশ্ন বিভক্ত হয়ে গেলে নওয়াজ শরীফো কারচুপির দায় আর নিতে চাইলেন না, ফলে প্রধানমন্ত্রী হতে অস্বীকার। ফলে ল্যু এর ক্রেডেনশিয়াল সুনাম কেমন হয়েছে বুঝতেই পারছেন! কিন্তু শেষেরটা আর মজার। তারা কিছু করতে বাকি রাখে নাই। পাকিস্তান-ইরান সীমান্তে ট্রাইবাল (একই ট্রাইব দুদেশের আছে) ইস্যুতে যুদ্ধ লাগায় দিতে চেয়েছিল আমেরিকা। কিন্তু পাকিস্তান-ইমরান তা তে নিজেদেরকে সামলে সম্বরণ-ই শুধু করেন নাই। পরে ইরানী প্রেসিডেন্টের পাকিস্তানী সফর ঘটা শুরু হলে তাতে তারা যেন বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর না করে এজন্য বাইডেন প্রশাসন ল্যু ভাইয়া হুমকি দিতে থাকলেন! কী মজা! পাকিস্তান কী এমন একটা ল্যু দেখতে চেয়েছিল? নাকি ল্যু-ভাইয়া এমন একটা শাহবাজ শরীফ দেখতে চেয়ে ইমরানকে ক্ষমতাচ্যুত করা, হস্যকর অভিযোগে তাঁকে জেলে দেওয়া আর শেষে এমনকি ইতিহাস ছারানো নির্বাচনী কারচুপি করতে গেছিলেন?  তাহলে ল্যু ভাইয়াকে বাইডেনের বা পাকিস্তানের আর দরকার কী? ল্যু পাকিস্তান থেকে বাইডেনের জন্য কী নিয়ে গেলেন? নিজের তৈরি প্রধানমন্ত্রীকেই যদি স্যাংশন আরোপের ভয় দেখায়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় তাহলে ল্যু ভাইয়াটা কার কে??? কায় না মাথায় দেয়? হা হা হা।
    সেই ল্যু ভাইয়া এখন ঢাকায়; আমাদের যে কী মজা  লাগছে তা আর কী বলব!!!! নিশ্চয় তিনি তাঁর ক্যারিসমা দেখাবেন, সব মুসকিল আসান করবেন! আমরাও প্রীত হবই!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ     এপ্রিল ২০২৪  সন্ধ্যা 

     

  • হাসিনা কী আদৌ চীন সফরে যেতে পারবেন?

    হাসিনা কী আদৌ চীন সফরে যেতে পারবেন?
    গৌতম দাস
    ১০ মে ২০২৪  সন্ধ্যা ১৮ঃ ৫৩
    https://wp.me/p1sCvy-5zZ

     

    আমেরিকা আর ভারত দুই সরকারই ক্ষেপে উঠেছে। এরই মধ্যে ডেইলি স্টারকে দিয়ে বা ডেইলি স্টার একটা রিপোর্ট ছেপেছে যেটাকে “গাছে কাঁঠাল গোফে তেল” – রিপোর্ট বলতে পারে কেউ। মানে এটা একটা হবু বা WOULD BE – রিপোর্ট। যেমন আমি আজ দেশের রাজা হলে কী হত – এধরণের রিপোর্ট। গত ৮মে ২০২৪ এর এই রিপোর্টের শিরোনাম “Beyond Dollar: Bangladesh to seek over 36b yuan in Chinese loans” । শিরোনামের শুরুর দুই শব্দ [Beyond Dollar] বোকামির নিদর্শন। এখানে ধরে নেয়া হয়েছে যে চীনের কাছে হাসিনা ডলার ছাড়িয়ে মানে ডলারে নয় ইউয়ানে ঋণ চাওয়ার কথা ভাবছে। আর এখানে ডলার না চাওয়াটা খারাপ বা নেতি দিক। এমন মন্তব্য জুড়ে দিয়ে বা ইঙ্গিত দিয়ে এমন শিরোনাম দেওয়ার দরকারটা কী?  এটা কী ডেইলিস্তার বুঝাতে চায় যে তারা মূলত ইন্ডিয়ার পোঁ-ধরা মিডিয়া ও এমন ফান্ডে চলা মিডিয়া হলেও সরকারের হয়ে এই রিপোর্টটা করছে বলে যেন কেউ এটা তার “সুনামের” বিরুদ্ধ কিছু বলে না মনে করে? এরকম?
    এখানে দুইটা কথা। এক. এটা সোর্স উল্লেখ করে একটা রিপোর্ট মানে সোর্সের মা-বাপ হীন। তার উপর এটা এখনও হয় নাই হতে পারে ধরণের রিপোর্ট। চীনা ইউয়ানে নগদে পাঁচ বিলিয়ন ডলার সমতুল্য অর্থ আদৌ চীন দিতে রাজি হয়েছে কীনা তা আমরা নিশ্চিত না, স্পষ্টও না।  রিপোর্টটা তা দাবি করেও বলতে পারে নাই। বরং এনিয়ে “হবু কথা ও নিগোশিয়েশনে” বাংলাদেশ কী বলবে তা নিয়েই এই (সোর্স ছাড়া) রিপোর্ট। এমনকি যেখানে চুক্তি করতে বসলেও শেষে চুক্তি নাও হতে পারে।  এই সোর্স হীন রিপোর্টই লিখেছে, Chinese minister said his government in principle agreed to it and asked Ahasanul to proceed. মানে চীনা মন্ত্রী নাকি ঋণদানের প্রস্তাব নীতিগতভাবে একমত হয়েছেন। কিন্তু একথা আমাদের যে মন্ত্রীর নামে লেখা হচ্ছে তা আমাদের মন্ত্রী পাবলিকলি বলেন নাই – কয়েকজন সাংবাদিকের সামলে বা সাংবাদিক সম্মেলনেও বলেন নাই। ফলে বিশ্বাসযোগ্যতা কম। মানে মন্ত্রী অস্বীকার করলে কিছুই করার নাই।
    কথা দুইঃ বাংলাদেশের রিজার্ভ যে তলানিতে ফলে সংকটে তাতে এটা ইউয়ান না ডলার মুদ্রা তা বাছার অবস্থায় সে নাই। যে ভিক্ষা নিতে বের হয় সেই ভিখারির কাছে চালটা অনেক জরুরি; সেটা ময়মন্সিঙ্ঘ না চট্টগ্রামের চাল তাতে কিছু যায় আসে না। তাইলে ডেইলিস্টারের কাছে ইউয়ান আমাদের সরকারের “ডলার ছাড়াইন্না” চাওয়া কিনা একথা মনে করিয়ে দেয়া কেন? এত ডলার ভক্ত রিপোর্টার তাহলে দেখাক,  নগদ পাঁচ বিলিয়ন ডলার কোন দেশ দিতে সক্ষমতা রাখে? বাজারে ডালের দাম যদি চড়া হয় তবে ভাতের প্লেটে ছোট গর্ত করে এরপর ডাল নিতে হয়। তাই না?
    এখন মুল প্রসঙ্গে ফিরব; এর আগে আমার ব্যক্তিগত অনুমান হল, চীন নগদ ইউয়ানে পাঁচ বিলিয়ন ডলার সমতুল্য অর্থ বাজেট সহায়তা দিতে (নীতিগতভাবেও) রাজী হয়েছে এটা এখনও বিশ্বাস-আস্থায় নিবার মত সংবাদ হয়ই নাই। বরং আগামিতে এর সত্য হবার সম্ভাবনা খুবই কম! চীনের হাত ছেড়ে আবার এখন তার কোলে উঠে বসতে চাইলেই তা ঘটার সম্ভাবনা তো প্রায় নাই-ই হবে!

    এসব সত্বেও ডেইলিস্টারের উড বি রিপোর্টের আগে ও পরে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকা আর ভারত দুই সরকারই ক্ষেপে উঠেছে। ভারতের সচিব কোয়েত্রা আর আমেরিকার সহকারিমন্ত্রী ডোনাল্ড ল্যু এদের ঢাকা সফর হাসিনার কথিত চীন সফরকে কেন্দ্র করেই বলে অনুমান হয়। পুরান কথাটা হল, ২০২৩ এর কথিত নির্বাচনের আগে এদুই দেশ একসাথ হয়েছিল; হাসিনাকে অবাধে নির্বাচনি প্রহসন করতে দিয়েছিল। নির্বাচনে যাই হোক, হাসিনা নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিল আর এই দেশদুটো তা আয়েশ করে তা দেখে মজা নিয়েছিল। এদের উদ্দেশ্য একটাই যে, কথিত নির্বাচনের পরে – হাসিনার সাথে চীনের কোন সম্পর্ক, ঋণ, প্রভাব কিছুই থাকবে না; তা বাস্তবায়নের কাজে এদুই শক্তি নেমে পড়েছিল।

    আর হাসিনার জীবনের সবচেয়ে বড় নিজেরই পায়ে কুড়াল মারা কাজটা তিনি করে ফেলেছিলেন তখনই। তিনি সেই টোপ খেয়েছিলেন।  এখন তিন মাস যেতেই সেসব বেড়িয়ে আসছে। হাসিনা এখন হাহাকার করছেন চীন, চীন করে! তিনি নাকি চীন সফরে যাচ্ছেন, অথচ কোনপক্ষের  সরকারী ভাষ্যে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু দেখি নাই। কেবল ভারত বলছে তাই বাংলাদেশে  আমরা জেনেছি, আর জপ করতে দেখছি। ভারত কায়দা করে নিজেদের গুরুত্ব জাহির করতে আমাদের জানিয়েছে  এভাবে যে “চীন সফরে যাবার আগে” হাসিনা ভারতে যাচ্ছেন। তো সেটা “চীন সফরে যাবার আগে” কিনা সেটা কী ভারতের বলার কথা? এর এক্তিয়ারই বা কী? এছাড়া অনেকটা যেন ব্রিফ করতে ও অনুমতি নিতে যাচ্ছেন হাসিনা এমনভাবে কথা ছড়ানো হচ্ছে যে কোন সীমার মধ্যে হাসিনাকে চীনের সাথে কথা বলতে / থাকতে হবে? এছাড়াও হাসিনা যে চীন যাচ্ছেনই তা ভারতকে কে নিশ্চিত করল? কেউ জানে না। এমনকি চীনও কী আশা করছে যে এক্সপেকটেড বা আগ্রহি যে তারা হাসিনাকে অতিথি হিসাবে দেখতে চাচ্ছেন? তাও সরকারিভাবে চীনও তা এখনও নিশ্চিত করে নাই। সম্ভাব্য আলোচনার ইস্যু কী হতে পারে তাও কেউ জানে না। তবে ভারতের মুখ দিয়ে প্রচারিত হচ্ছে যে এটা নাকি হবে তিস্তা প্রকল্পের কথা!

    মনে রাখতে হবে গত ২৮ জানুয়ারি ২০২৪ এর পরে চীনের সাথে আমাদের সরকার প্রধান বা উচ্চমহলে কোন দেখা সাক্ষাত আলাপ হয়েছে এমন কেউ জানে না। কেবল গতমাসে একটাই শীতল আলাপের কথা জানা যায় তাও আমাদের সরকারী মিডিয়া সুত্রে। গত ৩ এপ্রিল ২০২৪, চীনা রাষ্ট্রদুত নাকি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে না বাসায় এক আমন্ত্রণে দেখা করতে গেছিলেন। যা নিয়ে সরকারী বাসস এর লেখা একটা ভাষ্য “দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে চীনের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী” – এই শিরোনামে কয়েকটা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। সেই বাসসের ভাষ্যেও লেখা আছে যে জবাবে “চীনের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন”। যার অন্তর্নিহীত অর্থ হল, বুরোক্রাসির লাল ফিতা; মানে,  আগে ফরমালি অনুরোধ পাঠান এরপর আমরা লাল ফিতায় বাধা ফাইল চাপা দিয়ে সেটা ফেলে রাখব হয়ত!

    কেন বাসসের এই খবরটায় যা কিছু দাবি করা হয়েছে এর বিশ্বাসযোগ্যতা কম?
    মানে এটা ঘরে বসে বানানো ধরণের। কারণ, এর একটা উপ-শিরোনাম আছে – “পায়রায় একটি গভীর সমুদ্র বন্দর হবে এবং চীন সে সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে।” – এটা বাংলাদেশের দিক থেকে বলা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, পায়রায় কোন গভীর সমুদ্র দূরে থাক – চট্টগ্রামের মত ড্রাফটের ছোট জাহাজের বন্দরের জন্য এই লোকেশন উপযোগী না। সেটা সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিত নিজেই মিডিয়ার সামনে বলে গেছেন। মূল কারণ, ঐ বন্দর এলাকায় পানি নাব্যতা খুবই কম আর এরচেয়েও বড় কথা যতটুকু এখন আছে এটা বজায় রাখতে হলেও সবসময় ড্রেজিং করাতে হবে। এই লোকেশনে বন্দর নির্মানে মূল উতসাহি ছিল ভারত। অথচ বিনিয়োগ দেওয়ার কথা উঠলে ভারত ভেগে যায়। আবার চীনা ঋণ যাতে পায়রা প্রকল্পে না ঢুকে এব্যাপারে ততপর ছিল ভারত। শেষ আমাদের রিজার্ভ ভেঙ্গে এই প্রকল্প শেষ করতে হ্যেছে। এই হল গাছে তুলে মই কেড়ে নেওয়া। তাহলে এই মিছা কথা যে পায়রাতে এখন  গভীর সমুদ্র করার উপযোগী – এই মিছা কথা বলা আর তাতে এখন চীনকে বিনিয়োগের জন্য কথিত ডাকাডাকি এটা কী সত্যি?  আমাদের বিরাট সন্দেহ রাখার সুযোগ আছে।

    যাই হোক হাসিনার কথিত চীন সফর – এনিয়ে ভারতের লাফালাফিটাই বেশ বেশি,  যা অনেকটা এমন যেখানে, যাদের বিয়ে তাদের খবর নাই – অবস্থা। মানে হাসিনার কথিত চীন সফর নিয়ে চীন বা বাংলাদেশের এনিয়ে তেমন সরকারি ভাষ্য নাই অথচ পিনাক রঞ্জনকে দিয়ে এতদিন এতে ভারতের চাহিদা কী তা নিয়ে প্রপাগান্ডা চালানোর [আর আমাদের মানবজমিন এসব গারবেজকে মিথ্যা গুরুত্বের hype তুলে রিপ্রিন্ট করেছে ] পরে; এখন ভারতের পররাষ্ট্র সচিবই বাংলাদেশে হাজির যে তারা চীন সফরের আগে হাসিনাকে ভারত সফরের দাওয়াত দিতে এসেছেন। আর চীনের বদলে তারাই তিস্তা প্রকল্প করে দিতে চান এই প্রস্তাব নিয়েও হাজির।

    হাসিনার এখন তিস্তা প্রকল্প বা এমন কোন প্রকল্প নয় দরকার ৫ বিলিয়নের নগদ ঋণ বা বাজেট সহায়তাঃ
    হাসিনার জন্য এখন কঠিন ও নেতি বাস্তবতাটা হল, তাঁর সরকার চরম রিজার্ভ সংকটে। এছাড়াও আবার আদায় অযোগ্য প্রায় প্রত্যেক আওয়ামি ব্যাংকের খেলাপী ঋণের ভারে ব্যাংকগুলোসহ খোদ অর্থনীতিটাই ভেঙ্গে পড়ার অবস্থায়!  কাজেই হাসিনা সরকারের এখন তিস্তা প্রকল্প বা এমন কোন প্রকল্প নয়, দরকার ৫ বিলিয়নের নগদ ঋণ বা বাজেট সহায়তা। এই সুনির্দিষ্ট দিকটা  ভারত বা আমেরিকার অজানা থাকার কোনই কারণ নাই। অথচ তাদের ভাল-ভনিতা দেখেন!  আবার তারা ভয়ে আছে যদি হাসিনা চীনকে তিস্তা প্রকল্প দেওয়ার শর্তে ঋণ নেয়!    মানে হল, হাসিনার দিক থেকে দেখলে  বৈদেশিক মুদ্রার এই কঠিন সংকটে এখন গত তিন মাসে ভুল ও লোভি সিদ্ধান্তে সব হারানো উপলব্দি করে আবার হাসিনা চীনের কথা তোলাতেই এর প্রতিক্রিয়ায়, ভারত আর আমেরিকা দিশাহারা ছোটাছুটিতে ক্ষেপে উঠেছে। এদিকে তাই ডোনাল্ড ল্যু তিনিও আসতেছেন।
    মূলকথাটা হল, ক্যাশ বা নগদ বৈদেশিক মুদ্রা লাগবে হাসিনার বাংলাদেশের; নুন্যতম ৫বিলিয়ন ডলার; যা দশ বিলিয়ন হলে একটা অর্থনৈতিক পুণরুদ্ধারে দিক থেকে ভাল স্টার্ট হয়।  কিন্তু না আমেরিকা না ভারত এদের সেদিকে মন নাই। আর না আছে তাদের মুরোদ বা যোগ্যতা যে এমন বড় অর্থ তারা দিতে পারে অথবা এমনকি এটা আইএমএফ এরও সামর্থ নাই; কাউকে দিয়েছে এমন রেকর্ড আছে জানা যায় না। তাহলে এরা কেন আসতেছেন? হাসিনা চাহিদা আর এই দুই দেশের আনা-গোনা বকোয়াজি তো এক নয়, এক সুরেরও কথা না।
    সবচেয়ে বড় কথা এদুই দেশ আসতেছে হাসিনাকে চীন যাওয়া ঠেকাতে! অথচ হাসিনা কী আসলেই চীন যেতে পারতেছেন? চীনও কী তাকে স্বাগত জানাতে রাজি হয়েছে? কোনটারই কোন নিশ্চয়তা কোথাও নাই! তবুও ভারতের কোয়াত্রা গেলেন, এবার ল্যু আসতেছেন! আর এদের দুজনের কমন দিকটা হল, কারোরই মুরোদ নাই হাসিনাকে কোন নগদ বৈদেশিক মুদ্রা দিবার।

    এবার বিস্তারিততে যাবঃ
    বাংলাদেশকে চীনের প্রভাবশুণ্য করা মানে বাংলা ভাষায়,  চীন ঠেকানো বা বাংলাদেশ থেকে চীন খেদানো – এই হচ্ছে তাদের বিশেষত আমেরিকার মুখ্য টার্গেট আর এই লক্ষ্য পুরণের উপায় সেই “ঘ্যাগের ওষুধ” নাকি এরা পেয়ে গিয়েছে! আর এই খুশিতে আমেরিকা তার ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার’ প্রতিষ্ঠা আর সাথে ‘স্যাংশন আরোপ’ এর ফরেন পলিসি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রয়োগ ভুলে গিয়ে, ফেলে দিয়ে বরং আমেরিকা হাসিনাকে অবাধে নির্বাচনি প্রহসন করতে গত বছর শেষের দিকে সেই সুযোগ দেওয়ার রাস্তা ধরেছিল। এভাবেই বাংলাদেশকে আবার ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল।

    অথচ গত ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে আমেরিকা সারা দুনিয়াকে জানিয়ে বিশাল হুঙ্কার তুলেছিল যে বাংলাদেশে তারা ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার’ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। একাজ করে আমেরিকা সারা দুনিয়াকেই ফকফকা পরিস্কার করে জানিয়ে দিয়েছিল যে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার’ আর সাথে ‘স্যাংশন আরোপ’ এসবই নাকি আমেরিকার টার্গেট।

    অথচ এটা মিথ্যা কথা; এটা বাইডেনের ক্ষমতায় আসার আগে পরে এবং গত দুবছর সবসময়ও ছিল ডাহা মিথ্যা কথা। কারণ, আমেরিকার মূল লক্ষ্য আমাদের মত দেশে দেশ উঠতি চীনের প্রভাব ঠেকানো। অথচ এই চীনের প্রভাব ঠেকানো অসম্ভব কারণ এটা অবজেকটিভ – ঘুর্ণিঝড় জলোচ্ছাসের মত ঘটনা।  ইতিহাসের এক একটা সময়ে একেকটা দেশের অর্থনীতি চরমভাবে উদ্বৃত্বের দেশ বা সারপ্লাসের অর্থনীতির দেশ হিসাবে বেড়ে উঠে্ছে। এই সারপ্লাস সম্পদই সে দেশ তখন অন্যান্য দেশে অবকাঠামো ঋণ-অনুদান দাতা ও বিনিয়োগ দাতা হিসাবে হাজির হয়েই যায় – অপ্রতিরোধ্য ভাবে। এটাই আরেক অর্থে আমরা তখন সেই দেশকে গ্লোবাল নেতা, বা গ্লোবাল প্রভাব-ধারী নেতা, ইত্যাদি নানান ভাবে ডাকি। এভাবে ১৯৪৫ সালের পর থেকে আমেরিকা ছিল সেই গ্লোবাল প্রভাবের নেতা। একইভাবে সময় এসেছিল জাপানেরও একসময়, সেই ১৯৬৫ সালের পর থেকে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সে আমেরিকান অনুগত থাকতে বাধ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান হারুপার্টি বলে আর পরে এর পুণর্গঠনে আমেরিকান কমসুদের বিনিয়োগ সহায়তার জন্য। তাই জাপানের রাজনৈতিক শক্তির দিক আমরা অনুভব করি নাই। বরং অর্থনৈতিক প্রভাবটাও আমেরিকারই যেন – এভাবেই তা প্রকাশিত ছিল। আমরা এমনকি খেয়ালও করি নাই যে এডিবির [ADB] বড় মালিকানা কার?
    আর একালে একই ভাবে এখন এটাই চীনের উত্থানের কাল! তাতে আমরা আমেরিকাকেই ভালবাসি নাকি চীন-কে সহ্যই করতে পারি কিংবা পারি না,  তাতে কোনটাতেই কিছু আসবে যাবে না। এটা চীনা প্রভাব বিস্তারের কাল, এই হল অবজেকটিভ ফ্যাক্টস। কারণ এটা চীনা ঋণ-বিনিয়োগের কাল। এমনকি বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প চীন মাঙনা করে দিতে পারে নিজ স্ট্রাটেজিক স্বার্থে ও সুবিধা হবে বলে। যেমন পাকিস্তানের গোয়াদর গভীর সমুদ্র বন্দর এটা আসলে চীনের স্ট্রাটেজিক প্রকল্প। এটা পাকিস্তানকে সে মাঙনায় করে দিলেও চীনের তাতেও অমুল্য সুবিধার স্ট্রাটেজিক লাভ হবে। কারণ, চীনের একমাত্র বন্দর কেবল পুব দিকে যেটা মালাক্কা প্রণালি বন্ধ করে দিলে চীনের সব শেষ। তাই সে পুরা উলটা পশ্চিমদিকে যেটা আসলে ১৮ হাজার ফুট উচু পর্বতমালায় ঘেরা সেটা ফুঁরেও চীন গোয়াদর গভীর সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের সুযোগ লাভ করে ফেললো। অথচ আমেরিকাই প্রথম মালাক্কা প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে বলে আলাপ তুলেছিল। নিজ সিনেটে (মানে প্রকাশ্যেই পবেষণা পেপার পড়া হয়েছিল) আলোচনা করেছিল। কিন্ত এতে শেষ কার লাভ হল?

    অথচ আমেরিকা জিদ ধরেছে যে চীনের উত্থিত এই প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতার কালে আমেরিকা তার অর্থনৈতিক মুরোদ নাই হয়ে গেলেও নিজ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করা  ও সামরিক সক্ষমতা দিয়ে নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা সে পূরণ করতে পারবে!! কিন্তু জিদ আর বাস্তবতা এক না। হাসিনার আজকের দুর্দশা আমেরিকান এই জিদ এর পরিণতি।  গত ২৮ জানুয়ারি থেকে আমেরিকা ভারতকে সাথে নিয়ে হাসিনাকে প্রলুব্ধ করতে পেরেছিল দুইটা জিনিষ দিয়ে। একটা হল খুব সম্ভবত ২০৪৫ সাল পর্যন্ত সম্ভবত তাঁকে ক্ষমতায় রাখার লোভ দেখানো। আর দুই, অর্থনৈতিক সংকট যা আছে (যে সংকটটা নিয়ে হাসিনা পরিপুণ্য সজ্ঞান ছিলেন বলেই এবারের নির্বাচনের পর থেকে ১২-২৮ জানুয়ারি চীনের সাথে সখ্যতা ও সফর নিয়ে কথা বলে গেছিলেন। এমনকি – “বাংলাদেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে পাশে থাকবে চীন— রাষ্ট্রদূত”; এমন কথাও উঠেছিল তখন)। কিন্তু এত সবকিছু জানা থাকা সত্বেও – কথায় আছে লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু দশা হয়েছিল হাসিনার। তিনি সম্ভবত সুখস্বপ্ন দেখেছিলেন যে, ২০১৩-১৮ সাল ধরে যেভাবে তিনি ভারতের মাধ্যমে আমেরিকান চাহিদা মিটিয়েছেন; ডিল করে টিকে থেকেছেন তেমন এক স্বর্ণ না হলেও “তামার যুগে” তিনি আবার আরামে থাকতে পারবেন! অথচ তিনি ভুলে গেছিলেন তার অর্থনীতি সংকটে, যাতে নগদ বৈদেশিক মুদ্রা এক প্রধান চাহিদা! যা স্বচ্ছন্দে পুরণ করে দিতে পারবে চীন! কিন্তু সেই চীন কী আর হাসিনার বাংলাদেশের জন্য আছে? না, হাসিনা নিজে সেই হাসিনা আছেন

    তাই বেশী না মাত্র তিন মাস! এই তিন মাসের মধ্যে হাসিনা আর সাথে ভারত-আমেরিকা সবপক্ষকেই বাংলাদেশের অর্থনীতির দুর্দশার সামনে এখন হাজির করে দিয়েছে।  যেটাকে  ২৮ জানুয়ারির পরে ভারত-আমেরিকা নানান চাপাচুপা মেরে হাসিনাকে ভুলিয়ে প্রলুব্ধ করে রেখে দিতে তখন সক্ষম হয়েছিল ; আর হাসিনাও তাতে মিথ্যা ক্ষমতার স্বর্গসুখে  ‘বহল গয়া’ মানে  আউলায়ে ভেসে গেছিল! কিন্তু এখন? ডোনাল্ড ল্যু আসতেছেন তিনি কী করবেন? তিনি কী হাসিনাকে অন্তত ৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা যোগাড় করে দিতে পারবেন? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউএস-এইড এর কোন প্রকল্প কী এমন বড় পরিমাণের বা যা হাসিনা সরকারের জন্য এখন চালু আছে? আমেরিকা লাস্ট কবে কাকে এমন বড় পরিমানের প্রকল্প দিয়েছে?  মনে রাখতে হবে হাসিনার কিন্তু প্রকল্প দরকার নাই, নগদ বৈদেশিক মুদ্রা যা বাজেট সহায়তা নামে আসে তা হতে হবে। আছে আমেরিকার মুরোদ?
    এর সোজা মানে হল, হাসিনা এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি – এরা সকলে ডুবে মরে যায় যাক; আমেরিকার টার্গেট একটাই বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ, ঋণ বা প্রভাব ইত্যাদি এসব সে কিছুই দেখতে চায় না!  সে নিজস্বার্থ, নিজ টার্গেট নিয়েই ব্যস্ত থাকতে থাকবে!!!!

    অথচ আমেরিকা ঠিকই জবরদস্তিতে বা প্রলুব্ধ করে হাসিনাকে চীনের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করাতে চায় এটাই আমেরিকার একমাত্র টার্গেট ও বিদেশনীতি।
    একারণের গত বছর মোটামুটি সেপ্টেম্বর থেকেই তাই দানব হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখে দিলে যদি আমেরিকা মনে করে তার লক্ষ্য হাসিল হবে তো সেই করবে – আর এটাই সে করেছিল! তাতে বিগত দুই বছর সে বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনকে প্রচ্ছন্নে সমর্থন করে চললেও সে এটা ত্যাগ করে চলে গেছিল!  কারণ, শুরুর দিকে আমেরিকার মনে হয়েছিল হাসিনাকে উতখাত করলে তার বাংলাদেশে ‘চীন ঠেকাও’  – এই লক্ষ্য পূরণ হবে। কিন্তু মোটামুটি সেপ্টেম্বর ২০২৩ সালের পর থেকে আমেরিকা বাংলাদেশকে হাসিনার শাসনেই থাক বলে ফেলে পালিয়েছিল। এটা ভারতের নিরন্তর ঘ্যানর ঘ্যানর এর জন্যই হোক অথবা আমেরিকা নিজ লক্ষ্য অর্জন (‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার’ প্রতিষ্ঠা নয় কিন্তু বরং চীন ঠেকানো) অসম্ভব জ্ঞান করাতে মানে তা যেটাই হোক;  আমেরিকা আমাদের ফেলে পালিয়েছিল।

    এক নিঃশ্বাসে বলা পরের ঘটনাবলী হল, ৭ জানুয়ারির কথিত নির্বাচন, পরে ১১ জানুয়ারির মধ্যেই নয়া এমপি, নয়া মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের শপথ গ্রহণও সমাপ্ত। এরপর থেকে ২৮ জানুয়ারি সকাল পর্যন্ত প্রতিদিনের মিডিয়া হেডলাইন ছিল হাসিনার সাথে চীনের সম্পর্ক নিয়ে। নগদ ডলার (বাজেট সহায়তা) সংকট, তিস্তাসহ নতুন চিনা প্রকল্প ইত্যাদির কিছু বাকি ছিল না যা নিয়ে কথা উঠে নাই। আর এর প্রত্যেকটাতেই চীনারা হাসিনা সরকারকে সহায়তা করতে রাজি – এই ছিল সারকথা। এজন্য এমনকি হাসিনা চীন সফরে যাচ্ছেন এর জন্য চীনা আমন্ত্রণও দেয়া হয়ে গেছিল।
    কিন্তু হায়! ঐ ২৮ জানুয়ারির বিকেল থেকেই পরিস্থতি একেবারে উলটা হয়ে যায়। ঐ সন্ধ্যায় ওবায়দুল কাদেরের সাথে দেখা করেছিলেন ভারতীয় রাষ্ট্রদুত প্রণয় ভার্মা। তিনি আসলে সেদিন একা ভারত না ‘আমেরিকার এডভান্স পার্টি’ হয়েও কথা বলেছিলেন। মানে হল, আমেরিকা আমাদের ফেলে পিছটান দিছিল ভারতের সাথে শলাপরামর্শ করে আর তাতে তারা কী সাব্যস্ত করেছিলেন তা বয়ান করেছিলেন। এরপরের এক সপ্তাহের ঘটনা হল, অজিত দোভালের সরকারিভাবে অস্বীকৃত থেকে যাওয়া ঢাকা সফর আর শেষ ৪ ফেব্রুয়ারি হাসিনাকে লেখা নয়া উদ্যোগে একসাথে কাজ করার আগ্রহ জানিয়ে  বাইডেনের চিঠি -ঢাকায় হস্তান্তর।

    আলী রিয়াজের এসাইনমেন্টঃ
    অনেকদিন পরে দেখলাম তিনি ডিপ্লোম্যাটে লেখা ছেপেছেন গতকাল। যার সারকথা একটাই চীনারা খারাপ!
    পুরানা কথা, চীনা ঋণ কত খারাপ আর পরিশোধ অযোগ্য হয়ে গেছে ইত্যাদি।
    আমার মনে হয় না, আলী রিয়াজ কখনও আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের দেয়া ঋণ তলিয়ে গেছে; কেউ শোধ দিতে পারে নাই – এমন একটা ক্যাটাগরির দেশের লিসট আছে যা তিনি স্টাডিকরেছেন। এর নাম HEAVILY INDEBTED POOR COUNTRIES (HIPC) । নেটে সার্চ দিলে পাবেন। যেমন এমনই একটা সাইট হল, এখানে DEBT RELIEF UNDER THE HEAVILY INDEBTED POOR COUNTRIES (HIPC) INITIATIVE।
    এর কথা এখানে আনার মানে হল, এমন অবকাঠামো ঋণ বিতরণ করতে গিয়ে সবারই ব্যর্থতা আছে। কিন্তু সেজন্য যে ঋণ ব্যবসায়ী বা ঋণের জ্বালে ফাঁসানোর দেশ – এসব প্রপাগান্ডার মানে হয়। মানে আমি বলতে চাই, HIPC এর এক্টিভিটি দেখে আলীরিয়াজ নিশ্চয় বলবেন না যে তাহলে  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কোন “ঋণ ব্যবসায়ী বা ঋণের জ্বালে ফাঁসানোর” প্রতিষ্ঠান। হাল্কা মন্তব্য না করাই ভাল।

    আলী রিয়াজের লেখার আরেক সারকথা এখানে,

    “China’s influence on Bangladesh increased remarkably after 2009 when the
    relationship between India and Bangladesh has been described as a “golden era.”
    This development juxtaposed with the upcoming joint military exercise of
    Bangladesh and China, and the possibility of Chinese involvement in the 
    Teesta project, indicates that the geopolitical great game in Bangladesh
    will be more intense.”

    তিনি আসলে আমেরিকান স্বার্থের চোখ দিয়ে দেখে লিখেছেন। নিশ্চয় আমাদের রাষ্ট্রস্বার্থ আলাদা; এর উপর আবার হাসিনা নিজেও নিজের ক্ষমতায় থাকবার স্বার্থও এর মধ্যে পাঞ্চ করবেন।

    চীনা ঋণের সাথে চীনের পলিটিক্যাল এজেন্ডা থাকে তাই এটা খারাপ, আর আমেরিকান ঋণ সুচিশুভ্রঃ
    ব্যাপারটা কী তাই?  চীনা ঋণের সাথে চীনের পলিটিক্যাল এজেন্ডা থাকেই আর আমেরিকান স্বর্ণ যুগে যখন সে একাই দুনিয়ার ঋণদাতা ছিল সেই ঋণ সুচিশুভ্র? কোন পলিটিক্যাল এজেন্ডা ছিল না? তাই কী আলী রিয়াজ বলতে চাইছেন?
    তিনি লিখেছেন,  Loans and investments from China, particularly the former, come with a political agenda of increasing its sphere of influence.
    আমারটাই শ্রেষ্ঠ – এই মনোভাব ধারণ করলে এমন সবাইই নিশ্চিহ্ন হবে। শ্রেষ্ঠত্বই হিটলারিজম। এথনিক নির্মুলের পক্ষে আমাদের নিয়ে ফেলবে। কাজেই সাবধান। ঋণ-বিনিয়োগ দিবার সক্ষমতা নিয়ে উপরে অনেক বলেছি। পরিস্কার করে বলেছি সবধরণের ঋণ-বিনিয়োগ দিবার সক্ষমতা এটাই যেকোন দেশের অন্যের উপর কম-বেশি খারাপ-ভাল এবং তা নানান মাত্রার এটা হাজির হবেই। এখানে রাজনৈতিক প্রভাবের বেলায় আমার হলে সেটা ভাল আর চীনের হলে সেটা খারাপ এটাই শ্রেষ্ঠত্ববোধের সমস্যা হয়ে হাজির হবে।
    তবে মজার কথা হল, এই চীনেরই অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে উত্থান এর পিছনে আছে আমেরিকান বিনিয়োগ – ওয়াল স্টিট বিনিয়োগ – যারা সবচেয়ে বেশী এর সুবিধাভোগী;  এখনও চীনের প্রতি তারা উদার। বিশ্বব্যাংকের সস্কারের প্রস্তাব তাদেরই। চীনের নেতৃত্বে ব্রিকস গঠনের বুদ্ধি পরামর্শ রেকমন্ডেশন ছিল তাদেরই।
    তাহলে তখন নিশ্চয় চীনের উপর আরেরিকারও রাজনৈতিক এজেন্ডা ও প্রভাব ছিল? তাহলে সেগুলোচীন টপকাতেও পেরেছিল! সেটা এভাবে বা সেভাবে? কাজেই এগুলো শেষ কথা নয়। আবার ভাল করেলক্ষ্য করবেন রৃণদাতা আর গ্রহিতার মধ্যকার সম্পর্কও আগের মত না। অনেক বদল এসেছে তাতে। যেমন চীনের এব্যাপারে ডায়লগ হল এটা উইন-উইন সিচুয়েশন। না এতা একদম পবিত্র তা বলা আমার উদ্দেশ্য না। আমি কেবল এটুকু বলছি এটা অন্তত আমেরিকার যুগের মত নয়!
    এখন ঋণ নেয়া ছাড়া আমরা প্রাক্তন কলোনি দেশের বিকল্প কী আছে? যেখানে আমাদের নিজস্ব সারপ্লাস দখলদারের লুটে নিয়ে গেছে। আবার আমাদের শাসকেরা ঋণের নয়ছয় করবে সেতা কতটা কম রাখা যায় এভাবেই আমাদেরকে আগাতে হয়। এছাড়া আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের আমেরিকা-চীনের কিনে নেওয়ার অভ্যাস-রেওয়াজও তো আছেই!

    GOLD BACKED CURRENCY -ইংরাজি কথাটার মানে হল, শুরুতে ডলারসহ সব দেশের মুদ্রাই গোল্ড ব্যাকড ছিল। শুরুতে মানে সব মুদ্রাই জন্ম থেকেই। আর এটা ছিল ফিক্সড মুল্যমানের। মানে, আমেরিকান ডলার এর মান ছিল – এক আউন্স সোনা সমান ২৫ ডলার – এই স্থায়ী মূল্যের। ফলে এখনকার মত আজকের ডলারেররেট কী – এমন প্রশ্ন কেউ করত না। আর ডলার ছাপাবনার আগে সেই ব্যাংককে নিজ ভল্টে প্রতি ২৫ ডলার পরিমান নোট ছাপবার আগে এক আউন্স করে সোনা রাখতেই হত। কারণ যেকোন নোতধারী এসে ব্যাংকে সোনা ফেরত চাইলে তা দিতে বাধ্য থাকতে হত।
    আমি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের নামে রেফারেন্স দিয়ে কথা বলেছি বহুবার। আজ আবার একটা দিতে হচ্ছে।  তিনি জিতেছিলেন প্রথম ১৯৩২ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে। পরের ১৯৩৩ সালের ২০ জানুয়ারি শপথ নিবার পরে তিনিওই প্রথম প্রেসিডেন্ট ডলারের অবমুল্যায়ন করার ঘোষনা দেন। তাতে এক আউন্স সোনার মূল্য হয় ৩৫ ডলার। তাঁর যুক্তি ছিল কথা সত্যও বটে সারা ইউরোপঅই ইতোমধ্যে নিজ নিজ মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটিয়ে ফেলে৪ছে। মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের খরচ মিটাতে না পেরে। আর তা থেকেই ১৯৩০ সালের দুনিয়াব্যাপী যে প্রথম মহামন্দা দেখা দিয়েছিল তা থেকেই সারা ইউরোপের প্রত্যেকটা দেশ এই অবমূল্যায়ন ঘটিয়েছিল। রুজভেল্টের পয়েন্ট হল, তিনি ইউরোপের মুদ্রাগুলোর সাথে নিজ ডলারকে সামতুল্য করতে এই পদক্ষেপ নিয়েছেন।
    পরে এই মুল্যাও স্থিত্মুল্য হয়ে যায়। এমনকি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ১৯৪৫ সালে জন্মের সময়ও এই ৩৫ ডলার স্থায়ীমুল্য ধরে প্রতিষ্ঠান দুটা যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু ১৯৫৮ সালে এসে হঠাত আমেরিকা ঘোষণা দেয় যে সোনা ভল্টে জমা রাখার নিয়ম বাধ্যবাধকতা সে মানে নাই অনেক দিন ধরেই। আর এখন তার আর কিছুই করার নাই।

    সারা দুনিয়া পড়ে এক বিরাট গর্তে। এরই উপায়হীন সমাধান হিসাবে আসে নয়া নিয়ম, মুদ্রার বাজার দর ব্যবস্থা। মানে প্রতিদিনের (সেকালে টপ লেনদেনের) চারটা কারেন্সির মুল্য গড় করে তা আবার ডলারে প্রকাশের এক ব্যবস্থা চালু হয়। যেটা আবার আইএমএফের কারেন্সি [SDR]তে প্রকাশ করা হয়। প্রতিদিনের আইএমএফের সাইটে পাওয়া যায় আজকের কারেন্সি রেট কী। আর এসব নয়া নিয়ম সামলাতে নতুন করে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর ম্যান্ডেট লিখতে হয়েছিল সত্তরের দশকের শুরুতে।
    এখন  আমেরিকা রাষ্ট্রের সারা দুনিয়ার কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ – এটা কী আলী রিয়াজ শুনেছেন কখনও! আমেরিকান এই প্রতারণা নিয়ে তাঁর মন্তব্য কী?

    ১/১১ কী? তা বাংলাদেশের সবাই জানে। কিন্ত্য এই ক্ষমতাদখল ঘটিয়ে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল কেন? তাঁর নিজেরও প্রথম ফেলো হিসাবে নিয়োগ সেসময়কালেরই ঘটনা।  কাজেই বাস্তবসম্মত ও একাদেমিক  থেকে কথা বলাই ভাল। নইলে তো ভাড়াখাটা ভাড়াটে মনে হবে। আলোচনা আর আলোচনা থাকবে না।
    কাজেই আমেরিকা সব সততার দৃষ্টান্ত – এমন মনোভাবে না লিখাই ভাল। অবশ্য আপনাকে লেখার এসাইমেন্ট দিলে আর আপনি কী করবেন!!!!
    কী আর করার; বুদ্ধিমান হন, ঠিক কাজটা করেন!

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

  • রেহমান সোবহান কেন বললেন – জিয়া ঋণ খেলাপীর জনক; কথাটা কী সত্য?

    রেহমান সোবহান কেন বললেন – জিয়া ঋণ খেলাপীর জনক; কথাটা কী সত্য?
    হাসিনা থেকে পদক, সম্মাননা পেতে তিনি এত মরিয়া কেন?
    গৌতম দাস
    ২৯ এপ্রিল ২০২৪  সন্ধ্যা ১৮ঃ ৪৬
    https://wp.me/p1sCvy-5xj

     

    দেশে খেলাপি ঋণের জনক জিয়াউর রহমান: রেহমান সোবহান

     

    [রেহমান সোবহান কেন বললেন – জিয়া দেশে ঋণ খেলাপীর জনক; কথাটা কী সত্য?
    এছাড়া তিনি হাসিনা থেকে পদক সম্মাননা পেতে এত মরিয়া কেন?]

    বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সিপিডি [CPD] এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান ও চেয়ারম্যান হলেন অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান,  যার বয়স এখন ৮৯ বছর। ভেবেছিলাম এই বয়সে আর তাঁকে নিয়ে কিছু বলব না; অন্তত তিনি মুরুব্বি বয়সের, এই খাতিরে! কিন্তু না। তিনি নিজেই যেন তা হতে দিতে চান না! মানুষের জীবনকালের কাজে-কর্মে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় ভুল শুদ্ধ বহু কিছুই হয়, হতেই পারে। কিন্তু জীবন সায়হ্নে এসেও স্বাভাবিক বাস্তবতা থেকে পালিয়ে কেউ যখন নিজেকে ভুলহীন বিশুদ্ধজ্ঞানে উপস্থাপন করতে চায় অথবা এদিকটা যেন বুঝেবই নাই, খেয়াল করেন নাই অথবা নিজ কৃতকর্মের কোন দায় নিতে চায় না ইত্যাদি আচরণ করে বসে,  এটা খুবই পীড়াদায়ক!  একারণেই মনে হচছে, এই শেষ জীবনে এসে এখন তিনি যেন “বাঙালি জাতিবাদের” এক ভগবান হয়ে উঠতে চাইছেন। যিনি আবার যেন সব ভুল-শুদ্ধের উর্ধে! অন্যদিকে আবার হাসিনার এই পনেরো-ষোল বছরের শাসনের দিকে তাকালে দেখতে পাই – যারা হাসিনার বাবার আমলে মানে তাঁর বাবার সাথে কাজ করেছেন, স্মৃতি আছে তাদের অনেকের প্রতি হাসিনা বিশেষ “আনুকুল্য” দেখিয়েছেন। পদক প্রদান, বিশেষ সম্মাননা থেকে বৈষয়িক লাভালাভ পাইয়ে দেয়া ইত্যাদি্র ভাল-মন্দ তিনি করেছেন।  আর এটাই আবার অনেকের ক্ষেত্রে কাল হয়ে দাড়িয়েছে যে জীবন সায়হ্নে এসে হলেও যেভাবেই হোক হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে কিছু একটা উসিলায় হাসিনার আনুকুল্য আদায় করে তবেই বাকি জীবন শেষ করতে চান!
    যদিও এই দৃষ্টি-আকর্ষণ করে সুবিধা নেয়ার ফেনোমেনা – এটা আবার দেখা যায় সুবিধা-বাদিদের কেবল শেষ জীবনের আকাঙ্খার বিষয় না। যেমন উপরের দিকের সরকারী আমলারা জেনে গেছেন যে নিজ পরিবারের কেউ আওয়ামি লীগ করতেন বা তিনি নিজে ছাত্রলীগ করেছেন এটা বেচে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ আছে; এমন অনেকেই সচিব হওয়া বা ভাল পদোন্নতি নিয়েছেন এটা তো হাসিনার এই আমলে ডাল-ভাতের রেওয়াজ।  এমনকি সারা জীবন জাসদ বা বাসদ করেছেন অথচ এখন হাসিনার ছাত্রলীগ করেছেন বলে দেখিয়ে দাবি করে সচিব বা সমতুল্য পদোন্নতি নিয়েছেন এমন অনেক পরিচিত, সহপাঠি বা অপরিচিতকেও চিনি। এসব এখন খুবই কমন! এটাকেই অনেকে আবার মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী এখন ক্ষমতায় অথবা এটাই ‘চেতনার” রাজনীতিক ক্ষমতার মহিমা ও তাতপর্য বলেও  এক নামি কমিউনিস্ট একবার আমাকেই বুঝিয়েছিলেন!

    বাংলাদেশ যাত্রা শুরু কথিত এক  “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” দিয়ে, কারা ছিলেন এর মূল কারিগরঃ
    বাংলাদেশে জন্মযাত্রার শুরুতে কথিত এই  “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির” এক অন্যতম কারিগর ছিলেন রেহমান সোবহান। তবে কমিউনিস্ট-সমাজতন্ত্রীদের আবেগ-বিবেকের তর্কের চক্কড়ে না পড়ে, ব্যাপারগুলো আরেক দিক থেকে দেখব ও দেখাব।  বাংলাদেশের ইতিহাসে কমিউনিস্টদের কমিউনিস্ট ভাবনা থেকে আনা গজব, সবচেয়ে ক্ষতিকর ব্যবহারিক কাজ হল কথিত এই  “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি”; ১৯৭২ সাল থেকেই যার নেতৃত্বে ছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ – ততকালীন অর্থমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রী ও পাট মন্ত্রী এসবগুলোই ছিলেন তাজউদ্দিন একাই। তাঁর নেতৃত্বেই কথিত “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” কায়েম করতে যাওয়া হয়েছিল। যার করুণ পরিণতিই হল ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ! এমনকি এখান থেকেই যে শেখ মুজিবের হত্যা বা মৃত্যুর পরিস্থিতি যে আসন্ন হয়ে উঠবে এমনটা খুব কেউ বুঝেনই নাই। তবে তখন এমন অনুঘটক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পিছনের মূল কারণ কিন্তু এই কথিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির ডেকে আনা  দুর্ভিক্ষ – এই করুণ পরিণতি, সেটা বলাই বাহুল্য! তবে এই কথিত সমাজতন্ত্রের সারকথা বা মুখ্য বাণী-টা ছিল যে, দেশের কারখানাসহ “সকল উতপাদন ব্যবস্থাকে সরকারী মালিকানায়” নিয়ে যেতে পারলেই নাকি মোক্ষলাভ ঘটবে!

    এমনিতেই কোন প্রতিষ্ঠানের ‘ম্যানেজমেন্ট’ মানে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ব্যবস্থা যা ঐ প্রতিষ্ঠান/অফিসের, দক্ষতার সাথে উতপাদন ব্যবস্থার জন্য খুবই জরুরি; আর এছাড়া, প্রতিষ্ঠানটা টিকতে পারবে কিনা এর জন্য ভাইটাল বিষয়। কিন্তু সোভিয়েত কমিউনিজম এর চোখে ম্যানেজমেন্ট ধারণাটাই নাকি এক “শোষণ ব্যবস্থার” ধারণা; তাই এটা তাদের চক্ষুশুল ছিল!  অর্থাৎ ম্যানেজমেন্ট মানে দক্ষ উতপাদক হওয়া এটা নাকি বুর্জোয়া ধারণা; আর এটা নাকি তাই শোষণের হাতিয়ার!

    কোন নীতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় তা কাজ করছে আগাচ্ছে যেটা বুঝার ঊপায় কিঃ
    তবু এসব কথা এখন থাক; এসব কথা এখন পাশে ফেলে রেখে যদি একটু আগাই তবে, একটা দেশের সমগ্র অর্থনীতিক পরিকল্পনা নিয়ে আগানো (তা বিশেষ “পবিত্র জ্ঞান করা” সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি বা যেকোন অর্থনীতিই হোক না কেন)  বা বাস্তবায়নে চলে গেলে এরপর এই অগ্রগতি কাঙ্খিতভাবে চলছে কীনা এটা দেখার কোন ব্যবস্থাও সাথে থাকাটা খুবই প্রয়োজনীয় একটা দিক। এটাকেই বলে মনিটরিং বা অগ্রগতি মনিটর ব্যবস্থা যার থাকাটা খুবই এসেনশিয়াল আর প্রফেশনাল কাজের পুর্বশর্ত। এখান থেকেই মনিটরিং এর ইন্ডেক্স [index] বাংলায় যেটাকে আমরা সূচক বা নির্দেশক নামে চিনি বা বলি – তা খুবই গুরুত্বপুর্ণ!  কারণ কী দেখে বুঝব অগ্রগতি  পরিকল্পনা মাফিক ও দিকে চলছে কিনা?   কারণ না হলে যদি পরিকল্পনাটা পাঁচবছরের হয় তাহলে কী কেবল পাঁচবছরে পরেই জানা যাবে যে পুরা পরিকল্পনাটাই আসলে ফেল করেছে? অথবা সফল হতে যাচ্ছে?  নাকি প্রকল্প শুরু হওয়ার সুনির্দিষ্ট সময় পরে পরে যেমন ধরা যাক,  প্রতি তিনমাস পরে কখন কী কী  অগ্রগতি ও লক্ষণ-সুচক দেখা যাবে; এভাবে বা ওভাবে কখন কী দেখা যেতে  হবে  – এটাই সুচক ইন্ডেক্স এর মাপামাপি।  অর্থনীতির অভিমুখের সিগনাল দেয় এটা!   কিন্তু যদি অন্তত শুরুর একবছর পরেও এমন কোন রেজাল্টই না দেখা যায় তবে আগেই বুঝে নিতে হবে যে এই প্রকল্প ফেল করতে যাচ্ছে, ইত্যাদি। এগুলোকেই মোটাদাগে – অগ্রগতি মনিটর ব্যবস্থা- বলে বুঝা হয়।

    এখন তাজউদ্দিনের সেই “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি”  কায়েমের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অপরাধ ও অঘটনমূলক ঘটনাটা ছিল যে, তারা সমাজতন্ত্র  প্রতিষ্ঠার এই “পবিত্রকাজে” রওনা করার পরে মানে একেবারে আড়াই বছর পরেই দেখলেন ও জানলেন যে এটা নুন্যতম সফলতা দূরে থাক তাদের এই পবিত্র অর্থনীতি দেশে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ডেকে এনে সব শেষ করে দিয়েছে। রাষ্ট্র-সরকার মুখ থুবড়ে পড়েছে। এই ফলাফল দেখে আমাদের অনুমান কোন মনিটরিং ব্যবস্থার সুচক সেখানে রাখা হয় নাই; বরং বিপ্লবী রাজনৈতিক আবেগে সবাই ভরপুরভাবে ডুবে ছিল!!

    আর এই পরিণতি  দেখে সবার আগে এসব “অকর্মা সমাজতন্ত্রীদের” সকলকে পদত্যাগ করিয়ে সরিয়ে দিয়েছিলেন ক্ষুব্ধ শেখ মুজিব।  শুধু তাই না, ঐ ১৯৭৪ সালেরই সেপ্টেম্বরে (সেবারের জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানের উসিলায়) আমেরিকা গিয়ে কিসিঞ্জারের সাথে প্রথম দেখা করেছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য সেই প্রথম বিশ্বব্যাংক-কে সংশ্লিষ্ট করা; মানে দ্রুত অনুদান, ঋণ জোগাড়। গত ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ লাভ করলেও মুজিব সরকার বা অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সাথে কার্যকরি কোন সম্পর্ক করতে যান নাই; তাঁরা সম্পর্ক না রাখাটাই বিপ্লবীপনা বলে বুঝেছিলেন!  ফলে আমাদের অর্থনীতিতে বিশ্বব্যাংকের অনুদান, সাহায্য যোগাড় ধরণের কোন খাতাই খোলা হয় নাই। কারণ এই মন্ত্রী তাজউদ্দিন ও তাঁর সহ বিপ্লবীরা কেনিয়াতে ১৯৭৩ সালেও সে সময়ের বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের [রবার্ট ম্যাকনামারা] সাথে আলোচনার প্রস্তাব (পরিচিতি ও সৌজন্য সাক্ষাত) পেলেও এই সোভিয়েত বিপ্লবীরা তা প্রত্যাখ্যান করে ফেলে রেখেছিলেন। প্রতি পরের-বছর বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন হয় দুনিয়ার নানান দেশে; সেটাই সেবার হয়েছিল KENYA 1973 হিসাবে; এখানে এক আর্কাইভ লিঙ্ক দেওয়া হল যারা এবিষয়ে আরও গভীরে যেতে চান এমন আগ্রহিদের জন্য। আবার একালেও অনেক বিপ্লবীকে (আনু মোহম্মদ ও তাঁর বন্ধুদের) দেখা যায় বিশ্বব্যাংককে এই প্রত্যাখানকে নিয়ে গর্ব করতে।  আসলে না জানার অনেক সুবিধা যা খুশি বলা যায়!!!  এছাড়া যদিও এর আগে ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট ম্যাকনামারা বাংলাদেশে এসে শেখ মুজিবের সাথে দেখা করে একই প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এছাড়া, VOA এর এক ভিডিও তে দেখা যায় তাজউদ্দিনও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

    এবার মূল প্রসঙ্গে আসি;  রেহমান সোবহান ক্রমশ চরম বিপদজনক হয়ে উঠছেন। যেন দেশ জাহান্নামে গেলেও মৃত্যুর আগে তাঁকে হাসিনার থেকে পদক-সম্মাননা পেতেই হবে! জীবন সায়হ্নে হাসিনার দৃষ্টি ও আনুকুল্য পেতে যাতে তিনি “বাঙালি জাতিবাদের” এক ভগবান হিসাবে কোন পদক বা সম্মাননা পেতে পারেন যেন একারণেই মরিয়া হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশ জন্মের পরে সেই ১৯৭২ সাল থেকেই তিনি কথিত “পরিকল্পিত ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” কায়েমের কালে টপ তিন-চারজনের একজন ছিলেন। তিনি ছিলেন স্বাধীনতা পরবর্তি সেকালের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য।  আবার মনে রাখতে হবে সেকালের পরিকল্পনা কমিশন মানে সাংঘাতিক ব্যাপার, আজকের মত গুরুত্বহীন না। এর মূল বৈশিষ্ট বুঝতে হবে এভাবে যে, সেকালে সমাজতন্ত্র মানেই হল পরিকল্পিত অর্থনীতি এমনটাই গর্বের সাথে বুঝা হত;  আবার এর অর্থনীতিক পরিকল্পনা হত পাঁচসালা, পাঁচ বছরের জন্য। তাই সব সময়ই দেশের অর্থনীতি এক চলমান পাঁচসালা পরিকল্পনার অংশ হয়ে থাকত। কিন্তু ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রের এসব ভংচং সবকিছুই নিজ গৌরবে খতম হয়ে গেলেও এই পাঁচসালা পরিকল্পনার রেওয়াজটা পরেও কিছুদিন চালু ছিল।। স্মরণ হাতড়ে বলছি ১৯৮০ এর দশকে এটা লুপ্ত হয়ে যায়। কাজেই রেহমান সোবহানের সেকালে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য থাকা ছিল অনেক ভারী জিনিষ। একালে দেখছি সিপিডি থেকে প্রকাশিত তাঁর বায়োডাটায় ব্যপারটা লেখা আছে এভাবে ……He served as Member, Bangladesh Planning Commission, in charge of the Divisions of Industry, Power and Natural Resources, । সেই সাথে ওখানে আরো লেখা আছে যে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্টের এডভাইসারি কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন যার এক্তিয়ার বা কর্মক্ষেত্র ছিল পরিকল্পনা বিভাগ ও অর্থনীতির ইআরডি [ERD] বিভাগ। এখানে  পাঠককে জানিয়ে রাখা ভাল যে বাংলাদেশে বাকশাল শাসন (২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫) কায়েমের পর থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত দেশে প্রেসিডেন্সিয়াল সরকার ব্যবস্থা চালু ছিল।  যার সারকথা হল সেটা প্রধানমন্ত্রী ব্যবস্থা নয় বরং প্রেসিডেন্টই সব ক্ষমতার উতস ও সরকারের প্রধান নির্বাহি ক্ষমতাধারী; মানে কোন প্রধানমন্ত্রী নয় বরং প্রেসিডেন্টের হাতেই সব ক্ষমতা ন্যস্ত ছিল। তাই রেহমান সোবহানের ১৯৯১ সাল পর্যন্ত – প্রেসিডেন্টের এডভাইসারি কাউন্সিলের সদস্য- কথার মানে ও ওজনদার তাতপর্য, সেটা আমাদের বুঝতে হবে। আর তা জিয়া ও এরশাদ এদুই প্রেসিডেন্টের আমল জুড়ে সেটাও বুঝতে হবে।

    আবার সম্প্রতি দেখলাম সম্ভবত রেহমান সোবহান তার জীবনী প্রকাশ উপলক্ষ্যে তিনি যা বলছেন এর সারকথা হল, বৃটেনে থাকার সময়ের লেবার পার্টি করেই তিনি ‘কমিউনিজম’ শেখেছেন। কি সাংঘাতিক কথা আর, কী সহজ তাই না!!  এর মানে কার্ল মার্কসের কোন মূল লেখা বই বা কোন গুরুত্বপুর্ণ আর্টিকেল পাঠ নিয়ে কিছু জেনেছেন – এভাবে এটা তাঁর জানবার পথ ছিল না। এখন তাই তাঁর নিজেই নিজেকে মুল্যায়ন করা উচিত যে, শুধু এটুকু দিয়ে “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” করতে যাওয়া কী ঠিক হইছে? বাংলাদেশের প্রতিটা সাধারণ মানুষ যার দ্বারা এফেক্টেড ও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল??? এটা কী কোন ছেলেখেলার বিষয়?  বিশেষ করে বৃটিশ লেবার পার্টি মানে তো ওয়ার অন টেররের কালে প্রেসিডেন্ট বুশের সহযোগী প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার এর পার্টি! এছাড়া বড় জোর ওর জ্ঞানের দৌড় হল এক ট্রেড ইউনিয়নিস্ট এর যেমন থাকে! লেনিন কেন নিজ পার্টিরই কোন ট্রেড ইউনিয়ন করার বিরুদ্ধে ছিলেন, আগ্রহিরা সেটা জেনে নিতে পারেন!

     রেহমান সোবহানের “ভ্যালু এডিশন” বুঝঃ
    আমি অনেকবার বলেছিল রেহমান সোবহান হলেন, বাংলাদেশে বসে ভারতের স্বার্থরক্ষা ও দেখার কনসাল্টেন্ট। বাংলাদেশের ঘাড়ে চড়ে ভারতকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার ইন্ডিয়ান এজেন্ট হল রেহমান সোবহান ও তাঁর এইকাজের প্রতিষ্ঠানটাই হল সিপিডি। উলটা করে বললে, সিপিডির সর্ববৃহত ক্লায়েন্ট হল ভারত সরকার বা তার গোয়েন্দা বাহিনী। যদিও তিনি নিজে এটাকে “প্রগতিশীল আর ইতিবাচক” কাজ হিসাবেই গণ্য করে থাকেন!!!
    Regional Comprehensive Economic Partnership (RCEP) is a free-trade agreement (FTA) – এদুই ধারণার মধ্যে FTA সারকথায় এর মানে হল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যে একে অপরের বাজারে পণ্য নিয়ে ঢুকলে কত কী শুল্ক ছাড় দিবে বা শুল্কই আরোপ করবে না এরই ছুক্তি। এমন FTA বানিজ্য জোটের ভিতর আবার RCEP একেবারেই নতুন ধারণা। আর এই RCEP এটাই হল এক “ভ্যলু এডেড চেইন” এই ধারণার ভিত্তিতে পণ্য উতপাদন ও ভোগ – তা শেয়ার করার ব্যবস্থা। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ধারণা হল ভ্যলু (value); এই ভ্যালু আসলে কী? মনে রাখতে হবে মার্কস সারপ্লাস ভ্যলু তত্বের জন্য বিখাত আর এটাই তাঁর জীবিনের মুখ্য অবদান মানেন অনেক। তাই ভ্যলু (value) সম্পর্কে তার বিস্তারে লেখা রচনা আছে। একেবারেই সার কথায় ভ্যলু (value) মানে হল কোণ পণ্য উতপাদনে একদিকে থাকে কাঁচামাল আর এই কাঁচামালের উপর মানুষের শ্রম যোগ করেই পণ্য উতপাদন করা হয়। এই শ্রম যোগ করা এটাই ভ্যলু (value) এডিশন। একারণের উতপাদিত পণ্যের মূল্য কাঁচামানের মুল্যের চেয়ে ছাড়িয়ে। কাজের উতপাদনে শ্রম যোগ করাই ভ্যালু এডিশন। এখন কয়েকটা দেশ মিলে কোন অর্থনৈতিক জোট যদি কোন পণ্য উতপাদনের ক্ষেত্রে যে দেশ যে অংশটায় দক্ষতার সাথে ভ্যালু এড করতে পারে তা করে ফাইনালি কোন একটা দেশে যদি তা এসেম্বল করে ফিনিস প্রডাক্ট-টা তৈরি হয় আর এবার ঐ পণ্য যদি জোটের সব দেশ কিনে ও ভোগ করে তবে ঐ উতপাদিত ঐ পণ্য হল  “ভ্যলু এডেড চেইন” পদ্ধতিতে উতপাদিত ও ভোগ্য এক পণ্য। আর বলাই বাহুল্য এই পণ্য যেহেতু সবদেশেরই শ্রম আছে তাই কেউই আর এর প্রবেশের উপর শুল্ক-আরোপ করে না আর সুবিধাটা সদস্য সকল দেশ পাবে। এমনই চীনা উদ্যোগের প্রথম জোট হল RCEP  যা পুর্ব-এশিয় আশিয়ান দশ দেশ ও এর বাইরে ঐ অঞ্চলের আরো ছয় FTA সদস্য দেশ; যাদের মধ্যে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড, অষ্টেলিয়াও আছে। আইডিয়াটা হাজির করা হয় ২০১১ সালে।
    এমন জোট বাস্তবায়িত হয় ২০২০ সালে। কিন্তু ভারতের স্বার্থ-ধর রেহমান সোবহান ব্যাপারটা জানার পর সম্ভবত ভেবেছিলেন তাঁর ক্লায়েন্ট ভারতকে সুবিধার হাড়ি খুলে চমকে দিতে হবে। তিনি ক্লায়েন্ট ভারতকে খুশি করতে বিবেচনাবোধ হারিয়ে দাবি তুললেন ভারত-বাংলাদেশকে মিলে  “ভ্যলু এডেড চেইন” পণ্য উতপাদনে যেতে হবে।

    আবার ভারতও সব শুনে মনে করেছিল রেহমান সোবহানের কাছে খুবই জ্ঞানের এক কথা তারা শুনলেন। কারণ ভারত ভেবেছিল এটাকরতে পারলে তাহলে ভারতও তো চীনের সমতুল্য এক বিরাট দেশ হয়ে যাবে!!  তারা রাজি হয়ে যায়।  রেহমান সোবহান ঠিক করে দেন এই জ্ঞানের আলোচনাটা ঢাকায় হবে আর এটা ডেইলি স্টারের নামে আয়োজন করা হবে। তাই হয় আর এতে ভারত সরকারের হুকুমে ভারতীয় আমলারা দল বেধে অংশ নিয়েছিল।  এটাসি ঘটেছিল ২০১৬ সালে তিনি ডেইলি স্টারকে দিয়ে আয়োজিত সেমিনারে ভারতীয় আমলাদেরও ঢাকায় জড়ো করেছেন – উদ্দেশ্য “ভ্যলু এডেড চেইন” শিখাবেন।

    ‘ভ্যালু এডিশন চেইনে’ উতপাদন, উগ্র অর্থনীতিক জাতিবাদ এর জন্য হারামঃ 
    চোথা মারা মানের অপরের ধারণা বুঝে বা বুঝে টুকলিফাই করা – ব্যাপারটা শেষে তাই হয়েছিল। গোড়ার ফ্যাক্টস হল, রেহমান সোবহান ‘ভ্যালু এডিশন চেইন’ জিনিষটাই ঠিকমত বুঝেন নাই; এছাড়া মার্কসের ভ্যলু সম্পর্কেও প্রাথমক কিছু ধারণা থাকতে হবে। তিনি ভেবেছিলেন চীন বা RCEP এর ধারণাটা তিনি সহজেই ক্লায়েন্ট ভারতের কাছে বেচে দিতে পারবেন। কিন্তু ফাঁকি বা চোথা মারা ধারণার কারণে ভ্যলু এডিশনের সাথে শুল্ক-আরোপের সম্পর্ক কী তিনি জানেন নাই। আবার মনে রাখতে হবে বিদেশি পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করা আর এভাবেই বিদেশি পণ্যের প্রবেশ ঠেকিয়ে দেয়া ১৯৪৫ সালের পরে জাতিবাদি ও কলোনিমুক্ত দেশগুলোতে খুবই পপুলার পদক্ষেপ ছিল। এটাকেই ইকোনমিক ন্যাশনালিজম বলে।  সব জাতিবাদিরাই ইকোনমিক ন্যাশনালিস্ট, মোদির মত উগ্র হলে তা আরও বেশী। এমনকি স্তালিন ও তার কমিউনিজম ও আসলে ইকোনমিক ন্যাশনালিস্ট।  মুল কারণ, এরা বা এই চিন্তার মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ধারণাটাই নাই। আর একারণেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য না হয়েও সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৫-১৯৯১ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল। এমনকি সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যাবস্থা ছিল না;  আসলে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য না হলে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যই সম্ভব নয়।

    কিন্তু রেহমান সোবহান এসব জানতেন পড়াশুনা আছে তা তাঁর কাজদেখে এমন জানা যায় না। যেমন ধরেন, তিনি কী জানেন উগ্র জাতিবাদী রাষ্ট্র ভ্যালু এডিশন বুঝতেই পারবে না।  গ্রহণ করবে না বা সম্ভব না? কারণ এই রাষ্ট্র-সরকার উগ্র জাতিবাদী মানে সে ইকোনমিক ন্যাশনালিজম করে বেড়ায় – মানে অন্য দেশের পণ্যকে সে কড়া ট্যাক্স বসিয়ে নিজ সীমান্তের বাইরে রাখাটাই সঠিক মনে করে। নিজ অদক্ষপুর্ণ দামে প্রস্তুত পণ্যকে যে এভাবেই প্রটেক্ট করে; আর দেশের মানুষকে তাই কিনতে বাধ্য করে থাকে। এটাই তো ইকোনমিক ন্যাশনালিজম । তাহলে তিনি মোদীর ভারতকে ভ্যালু এডিশন বুঝাবেন কেমন করে? রেহমান সোবহান সেদিকটা না বুঝেই বাগড়ম্বরা করতে গেছেন ইন্ডিয়া বাংলাদেশের পাটের উপর, ব্যাটারির উপর, বাথ সোপের উপর এরকম ট্যাক্স বসিয়ে রেখেছে। আর রেহমান সোবহান বলছেন ভারত-বাংলাদেশ নাকি “ভ্যলু এডেড চেইন”  এর যৌথ পণ্য উতপাদন করতে যাওয়া উচিত!!! এই হল প্রগতিশীল বিরাট বুঝমান রেহমান সোবহান!    দেখেন এখানে এনিয়ে ২০১৬ সালের ডেইলিস্টারের রিপোর্ট। এছাড়া এসব ইস্যু নিয়ে আমার পুরানা লেখা আগ্রহিরা এখানে  আর এখানে দেখতে পারেন।

    কিন্তু তবু এত ক্ষমতাধর রেহমান সোবহান কখনও ১৯৭৪ এর কথিত সমাজতন্ত্রী অর্থনীতির পরাজয় ও দেশকে একটা দুর্ভিক্ষে নিয়ে ফেলা এজন্য কোন দায় কখনও নেনই নাই। কোন একাদেমিক আলোচনাও টেনেছেন জানা যায় না।  এমনকি যদি কেন ঐ অর্থনীতি ফেল করেছিল এনিয়ে কোন সৎ মূল্যায়ন বা তাঁর কোন সৎ অনুভবও কোথায় আলোচনা করেছেন জানা যায় না।

    বিআইডিএস ও রেহমান সোবহানঃ
    বিআইডিএস [BIDS] কী তা এই প্রজন্ম কমই জানে, আমার অনুমান। আসলে বাংলাদেশের রাজনীতিক চিন্তা ও সক্রিয়তায় কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা যেভাবে এখন উপেক্ষিত কোনঠাসা, গুরুত্ব-প্রভাবহীন নিস্তেজ হয়ে গেছে বিআইডিএস এই প্রতিষ্ঠানের দশাও তাই। আমাদের প্রজন্মের একাদেমিক যৌবনে বিআইডিএস – একে দেখা হত এক বিরাট প্রগতিশীল জ্ঞান ও গবেষণার প্রতিষ্ঠান।  বিআইডিএস সরকারী ফান্ডে চলা এক আধা-সরকারি বা স্বায়ত্বশাসিত এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। অরিজিনালি বিআইডিএস এর জন্ম পাকিস্তান আমলে করাচিতে; আর নাম ছিল পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট ইকনোমিকস বা পাইড [PIDE]। ১৯৭১ সাল ঘুরে,  একে বাংলাদেশে এনে ১৯৭৪ সালে এসে এর নাম হয় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ  বিআইডিএস [BIDS]। বিস্তারে গিয়ে কথা না বললেও, অরিজিনালি করাচিতে এটা আমেরিকা প্রভাবিত এক প্রতিষ্ঠান ছিল; মানে কমিউনিস্ট ভাবাদর্শী নয়।  কিন্তু বাংলাদেশে এসে এটা হয়ে যায় কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের প্রতিষ্ঠান; এমনকি এখনও প্রচ্ছন্নে এটা তাই মানা হয়। দুই বাক্য উপরে ডেভেলবমেন্ট শব্দটা আমি সবুজ রঙ দিয়েছি; আর BIDS শব্দের D যার প্রতীক! ক্রিটিক্যালি বললে এই ডেভেলবমেন্ট বা বাংলায় উন্নয়ন – এই শব্দ ও ধারণাটাই এন্টি কমিউনিস্ট।  কেন? ডেভেলবমেন্ট মানে হল – মানে এর পুরা কথাটা হল “ইনফ্রাস্টাকচার ডেভেলবমেন্ট” – কিন্তু একে সংক্ষেপে বলতে শুধু ডেভেলবমেন্ট শব্দটা নেয়া হয়েছে। আর বাংলাতে বললে এটা অবকাঠামো উন্নয়ন [Infrastructure Development] যাকে সংক্ষেপে আমরা শুধু উন্নয়ন বলি।  ১৯৪৫ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর জন্মের সাথে সম্পর্কিত এক মুখ্য কনসেপ্ট হল এই “ইনফ্রাস্টাকচার ডেভেলবমেন্ট”। মনে রাখা যেতে পারে বিশ্বব্যাংক এটাও এর সংক্ষিপ্ত নাম। আর এই প্রতিষ্ঠানের পুর্ণনাম হল, International Bank for Reconstruction and Development (IBRD)।

     কমিউনিস্টদের কাঙ্খিত ক্যাপিটালিজমের বিনাশ বা পতন এখনও হয় নাইঃ
    খুবই সংক্ষেপে বললে, খোদ কার্ল মার্কস সহ কমিউনিস্টদের আকাঙ্খা ও অনুমান ছিল যে দুনিয়াতে ক্যাপিটালিজম টিকবে না; টিকতে পারবে না। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিজ গুনেই ভেঙ্গে পড়বে। কার্কস তাঁর সারপ্লাস ভ্যলু তত্বের প্রেক্ষিত এমনটা মনে করতেন। তাই এই আকাঙ্খা-বিশ্বাস খোদ মার্কসের (১৮১৮-১৮৮৩) ছিল; একইভাবে লেনিনেরও (১৮৭০-১৯২৪) ছিল। ফলে পরবর্তি প্রায় সকল কমিউনিস্টদেরও। কিন্তু কমিউনিস্ট অনুমান বা ভবিষ্যতবাণীকে মিথ্যা প্রমাণ করা এক্ট বা এমন প্রধান ততপরতা মনে করা হয় – এই ১৯৪৫ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম হওয়া।  যেটা লেনিন পরবর্তিতে ১৯৪৫ সালের এসে সোভিয়েত  প্রেসিডেন্ট জোসেফ স্তালিন চেয়ে চেয়ে দেখেছিলেন যে  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম হচ্ছে। কিন্তু তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসেছিলেন। কোন প্রতিক্রিয়া দেন নাই, দেখান নাই, কিছু লেখেনও নাই। সম্ভবত তিনি অস্পষ্ট ছিলেন, নিশ্চিত ছিলেন না যে কী বলা ঠিক হবে! অন্যদিকে এদুই প্রতিষ্ঠানের জনক  বা ফাউন্ডিং ফাদার মনে করে খোদ আইএমএফ-ই নিজের ওয়েব সাইটে লিখে রেখেছে যাদের নাম – এমন দুজন হলেন, বৃটিশ অর্থনীতিবিদ কেইনস [John Maynard Keynes ]  আর অপর জন হলেন সেকালে আমেরিকান ট্রেজারি মন্ত্রণালয়ের চীফ ইকোনমিস্ট ডেক্সটার [Harry Dexter White]। এরা মূলত দুনিয়ায় উন্নত দেশ মানে অর্থনীতিতে সারপ্লাসের দেশ থেকে গরীব দেশের জন্য অবকাঠামোগত ঋণ এর ব্যবস্থা করে দুনিয়াকে এক নয়া গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের পথে সাজিয়ে ফেলেছিলেন। এদিকের ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়া জুড়ে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশের এক দুনিয়া হয়ে উঠেছিল। তাই, সারপ্লাস অর্থনীতির বড় দেশগুলো তাদের সম্পদের একটা ছোট অংশ আমাদের মত দেশে অবকাঠামোগত ঋণ (প্রায় নাই সুদে) দেওয়ার একটা গ্লোবাল কাঠামো ও প্রতিষ্ঠান (আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক) গড়াতে এদুই প্রতিষ্ঠান শুরুতে খুবই প্রাণবন্ত ও সচল এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম চালু করতে পেরেছিলেন। এটাই অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থনীতি। সংক্ষেপে উন্নয়নের অর্থনীতি।  মজার কথা হল জনবহুল চীন এই অর্থনীতির সুবিধা নিবার পথ ধরেই আজ প্রায় খোদ আমেরিকাকেই ছাড়িয়ে যাওয়া দুনিয়ার বড় অর্থনীতি যা আগামিতে পালাবদলে নেতা আমেরিকার স্থান নিবার পথে উঠে  আসছে!  অর্থাৎ অবকাঠামো উন্নয়নের ধারণাটাই কমিউনিস্ট আগের ভবিষ্যতবাণীকে আপাতত নাকচ করে রেখেছে, এটা এক কঠিন বাস্তব সত্য।  আর একারণে বলাই বাহুল্য যে “উন্নয়ন”, এটা এন্টি কমিউনিস্ট ধারণা; যা কমিউনিস্ট প্রেডিকশনকেও নাকচ করে রেখেছে।

    এজন্যই BIDS [প্রাক্তন নাম PIDE] কে বলেছি এটা আমেরিকা প্রভাবিত ধারণা। আবার তামাসাটা হল, এই BIDS ১৯৭৪ সালের পর থেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের গবেষণা প্রতিষ্ঠান হয়ে যায়; যা এখনও কম-বেশি তাই।  আর রেহমান সোবহান প্রগতিশীল পরিচয়েই অবসরের (১৯৯২) আগে পর্যন্ত এই BIDS এর  ডিজি বা প্রধান ছিলেন।  সারকথায়,  ১৯৭৪ এর আগে পর্যন্ত রেহমান সোবহান বাংলাদেশে “সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি” গড়ার বিরাট কুতুব কারিগর; আবার ১৯৭৪ সালের পরবর্তিতে BIDS জেগে উঠলে মানে পুঁজিতান্ত্রিক অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থনীতি শুরু হলে পরে (১৯৮০) তিনিই আবার BIDS এর প্রধান হয়ে বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের উন্নয়নের অর্থনীতিরই মুল্যায়নকারী, প্রকল্পের গবেষক! ব্যাপারটা হেভি মজার নিঃসন্দেহে। তবে একটা বাক্য পাওয়া যায় উইকিতে যেটা রেহমান সোবহানের  বায়ো বা পরিচিতি্র অংশ। সেই বাক্যটা এরকম, …… After the liberation of Bangladesh in 1971, Sobhan was appointed a member of the Planning Commission. He quit when he, along with others, fell from the grace of Sheikh Mujib in 1975. । বাংলায় বললে, ১৯৭৫ আসতে আসতে শেখ মুজিব কমিশনের সকলকে বের করে দেন; তারা সকলে নিজে পদত্যাগ করতে বলেন  আর এভাবেই তাঁরা শেখ মুজিবের অনুগ্রহ বা গুড-বুক থেকে  সকলে ঝড়ে পরেছিলেন।

    অথচ, ১৯৭২ সাল থেকেই এই প্রগতিশীল কথিত “কমিউনিস্ট অর্থনীতির গোষ্ঠির” এরা আমাদের দেশে বিশ্বব্যাংক সাহায্য করতে বা অনুদান দিতে অথবা প্রায় না সুদে ঋণ দিতে চাইলেও এরা তা ঠেকিয়ে রেখেছিল। যেটার জন্যই  শেখ মুজিবকে পরে তবে ঐ ১৯৭৪ সেপ্টেম্বরেই নিউইয়র্ক গিয়ে কিসিঞ্জারের সাথে দেখা করে প্রথম বিশ্বব্যাংকের সাহায্য নিতে তাঁর আগ্রহ তিনি পুনরায় প্রকাশের সুযোগ নিয়ে তা নিশ্চিত করে এসেছিলেন।   কিসিঞ্জার তাতে একমত হলেও তা বাংলাদেশে আসার প্রস্তুস্তি শেষ করে আসতে আসতে ১৯৭৬ সালের বাজেট বছর শুরু হতে সময় লেগে যায়। আর ততদিনে শেখ মুজিব নিহত, এই কাফফারা দিতে হয়! বিশ্বব্যাংক সেই প্যাকেজে প্রথমে অনুদান (যার সুদ-আসল কিছুই ফেরত দিতে হয় না ) সাহায্য আর পরে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (প্রায় না সুদের ০.৭৫%) ঋণ দেয়া শুরু করলে এর স্থানীয় ইভ্যালুয়েটর ও সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনার কনসালটেন্সি পায় কিন্তু আধা-সরকারি বিআইডিএস [BIDS] আর এই বি আইডিএসের প্রধান ছিলেন রেহমান সোবহান। মানে দাড়িয়েছিল এমন যে, দুভিক্ষ লাগানো কথিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির এক কর্তা তখন হয়ে গেছেন বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংক প্রকল্পের ইভ্যালুয়েটর!!!

    এখন পুরাই বিষটাকে যদি ইতিবাচকভাবে দেখি তবে এটা ছিল রেহমান সোবহানের জন্য একটা খুবই ভাল সুযোগ। তিনি এই দুই প্রচেষ্টা [কথিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি আর পরে বিশ্বব্যাংকের উন্নয়নের অর্থনীতি ]  এই দুই অর্থনীতির ব্যবহারিক তুলনা (আতলামো না) এমন ভালো-মন্দের মুল্যায়ন মন্তব্য তিনি নিজ সৎ -অভিজ্ঞতা আকারে হলেও লিখে যেতে পারতেন! যা নিঃসন্দেহে পরবর্তি প্রজন্মের জন্য এক মৌলিক সোর্স হতে পারত!  কিন্তু হায়! কিছুর বলার নাই। রেহমান সোবহান এখন একালে বাংলাদেশ যেন ভারতকে  করিডোর দেয় – এই জবরদস্তি ও বিনা পয়সায় তা দেওয়ার দালাল হয়েছেন!

    এমনিতেই ২০০৭ সাল থেকে (আসলে ২০০৪ সালে সিপিডির সৎপ্রার্থী আন্দোলনের সময় থেকেই) তিনি বাংলাদেশে ভারতের লুটে নেয়া স্বার্থ হাসিল বা পাইয়ে দিবার ক্ষেত্রে সরাসরি এজেন্টের ভুমিকায় নেমে গেছিলেন। যেটা এখনও নানা উছিলায় ও ডালপালায় সক্রিয় আছে। যেমন বাংলাদেশ থেকে ভারতকে বিনা পয়সায় আর বাংলাদেশের স্বার্থ ত্যাগ করে কেবল একচেটিয়া ভারতের স্বার্থে ভারতকে করিডোর পাইয়ে দিবার পক্ষে তিনি এক নম্বর ওকালতকারি।  এমনকি যারা ভারতকে করিডোর দিবার বিপক্ষে তাদেরকে তিনি প্রকাশ্য সভায় ‘অশিক্ষিত’ বলেছেন; এতই ঘামন্ডি আত্মদর্পী তিনি। দেখুন ১। ট্রানজিট বিরোধিতাকে ‘অশিক্ষিতদের বিতর্ক’ বললেন রেহমান সোবহান; ২।  “Bangladesh is the only country to see debate over transit, which is very usual through borders,” ……“I think it’s a debate of ignorant people,”। 

    এগুলো হল এখন তাঁর ক্রেডেনশিয়াল; বিরাট অর্জন!!! বাংলাদেশে এই লবি আর দালালি করে দিয়েই তিনি শেষ জীবনে সিপিডি [CPD] কে খাড়া করেছেন। এটা নাকি তাঁর যোগ্যতা!! আর প্রতীকিভাবে বললে যেমন ধরেন মুচকুন্দ দুবে যিনি ভারতের এক সাবেক আমলা কূটনীতিক; বাংলাদেশে এক সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদুত ও বলা যায় যিনি প্রো-কংগ্রেসী। তিনি একালে ঢাকা আসলে পরে রেহমান সোবহান তাঁকে নিয়ে যেন পবিত্র তীর্থে যাচ্ছেন এভাবে তাঁরা দুজনে প্রথম আলোর অফিসে এসে মতিউর রহমানের সাথে মোলাকাত করবেন! আবার অনেকে বলেন, প্রথম আলো আর সরকারের মধ্যে যে টেনশন বা যেমন প্রধানমন্ত্রীর অফিসে অনা-আমন্ত্রণ বা ঢুকতে না দেওয়া এসব পেরিয়ে তাদের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারি হলেন রেহমান সোবহান! ইত্যাদি।

    কিন্তু কেন এই লেখাঃ
    উপরে এতক্ষণ যা যা লিখেছি তা বলার জন্য  মূলত এলেখা লিখতে বসি নাই।  সেগুলো পটভুমি মাত্র! আর এখন সেই মূল প্রসঙ্গে যাব।  সম্প্রতিকালে রেহমান সোবহান এক মহৎ কর্ম করেছেন!!
    গত দুবছর একটু একটু করে এবছরে এসে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে গভীর দুর্দশায় নিমজ্জিত; এটা সারা দেশের লোক টের পাচ্ছে। বিশেষ করে প্রত্যেকটা বাণিজ্যিক ব্যংক ব্যাপক অনাদায়ী খেলাপি ঋণ এর ভারে ডুবে আছে। যদিও কম বেশী আছে যা থেকে দুর্বল আর সবল ব্যাংক এর ধারণা টানা হয়েছে। যেখান থেকে মূল সমস্যাটা হল, প্রত্যেকটা ব্যাংক তার আমানত মানে আম পাবলিকের জমা টাকা খেয়ে ফেলেছে – অনাদায়ী খেলাপি ঋণ এর সংকট কথাটার প্রকৃত অর্থ এটাই। তাই মিডিয়া রিপোর্ট আসছে যে প্রায় প্রত্যেকটা ব্যংকই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে টিকে আছে, প্রতিদিনের দায় মিটাচ্ছে। এই সময় রেহমান সোবহান এক সভায় বক্তৃতায় বলেছেন, “দেশে খেলাপি ঋণের জনক জিয়াউর রহমান: রেহমান সোবহান”। খোজ নিয়ে জানা গেল এমন কথা তিনি ২০১৮ সালেও একবার বলেছেন। দেখুন, ঋণ খেলাপির সংস্কৃতি জিয়ার আমলে শুরু: রেহমান সোবহান।

    কোন একাদেমিক বা গবেষকের জন্য এমন বক্তব্য অপরাধমূলক; এক ক্রিমিনাল বক্তব্য। জনমানুষকে বিভ্রান্তকারি বক্তব্য। কেন এমন বলছি??

    তাঁর এই বক্তব্যকে দুভাবে দেখব। এক,  বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি এদের বিতর্ক-ঝগড়া কোন সিরিয়াস আলোচনায় আনার যোগ্য নয়। যদিও তাদের এমন ঝগড়া কালচারে পরিণত হয়েছে। আমরা এক্ষেত্রে বড়জোড় যা পারি তা হল, কোন সিরিয়াস আলোচনায় অথবা একাদেমিক টেবিলে বা জগতে এসব তর্ক-কে না আনতে পারি; এড়িয়ে যেতে পারি। অর্থাৎ ইতিবাচক  ও অর্থপুর্ণ আলোচনার তাগিদ থাকলে কোন একাদেমিশিয়ানের এই বিতর্ক-ঝগড়া সচেতনভাবেই টেবিলে আনার কথা না বরং এড়িয়ে চলার কথা। কিন্তু আমরা দেখছি রেহমান সোবহান এটা এনেছেন। ১৯৮০-৮১ সালের ঘটনাকে লীগ বনাম বিএনপির ক্যাচালের মত করে এখানে তুলে এনেছেন। কেন এনেছেন?

    কারণ দুই, তিনি বর্তমানে দুর্দশায় নিমজ্জিত অর্থনীতির এই কালে হাসিনার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ জনমানুষের ক্ষোভ বা তা থেকে উঠা হাসিনার সংকটকে লঘু করে দিয়ে চেয়েছেন। যেন বলতে চেয়েছেন যে খোদ জিয়াউর রহমানই যেহেতু এটা শুরু করেছেন আজ থেকে ৪৫ বছর আগে তাইলে আর একালে হাসিনার আর দোষ কী? কিন্তু আসলেই কী তাই যে, জিয়াই খেলাপী ঋণের কালচার সৃষ্ট করেছিলেন কী?

    অন্যদিকে আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখছি কথাটা হাসিনা, ওবায়দুল কাদের বা লীগের কেউ রেহমান সোবহানের এই চাতুরিকে প্রশ্রয় দেয় নাই, পিক-আপ করেই নাই। যাকে বলে লীগের কেউ এতে মাতে নাই!!! কেন? খুব সম্ভবত হাসিনা খেলাপি ঋণ নিয়ে আলোচনাতেই ঢুকতে চায় নাই। কারণ তিনি জানেন প্রায় প্রত্যেকটা ব্যাংকই অনাদায়ী খেলাপি ঋণের দুর্গতি আটকে আছে। শুধু তাই না এই খেলাপিরা সোজা বা ঘুর পথে সরকারী দলের বা আড়ালে থেকে সুবিধা খেয়ে নিয়েছে।  আসলে এগুলো আদায় করার মুরোদ সেটা সরকারেরও নাই!  আর সবচেয়ে বড়কথা ঋণগুলো যারা নিয়ে ভেগে গেছে এরা বেশির ভাগই তার দলীয় নেতা বলে সরকার এদের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারবে না। খুব সম্ভবত এটাই সরকারের মূল্যায়ন!

    কিন্তু রেহমান সোবহানের এনিয়ে এত তাগিদ উতলা কেন?
    এলেখাতেই শুরুতে বলেছি, হাসিনা তাঁর বাবার আমলের লোক, শেখ মুজিবের সাথে কাজ করেছেন স্মৃতি আছে এমন ব্যক্তিত্বদের একালে  পদক প্রদান, বিশেষ সম্মাননা থেকে বৈষয়িক লাভালাভ পাইয়ে দেয়া তিনি করেছেন। আবার আরেকটা ফ্যাক্টস হল, রেহমান সোবহানের পেশাগত এক বড়ভাই আছে। নাম প্রফেসর নুরুল ইসলাম (গতবছর ২০২৩ সালে মারা গেছেন)। যিনি ১৯৭২ সালে গঠিত সরকারী পরিকল্পনা কমিশনের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট। কথাটা একটু বুঝায়ে বলতে হবে। সোভিয়েত ভাষ্য বলে থাকে যে তারা পরিকল্পিত অর্থনীতি করে থাকে। তাই পরিকল্পনা কমিশন বা মন্ত্রণালয়, সেখানে এটা খুব গুরুত্বপুর্ণ। সেই আদলে, আমাদের পরিকল্পনা কমিশনের তখন একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট আর প্রেসিডেন্ট পদ ছিল। পদাধিকার বলে প্রধানমন্ত্রীই কমিশনের প্রেসিডেন্ট হতেন। আর এর প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন (একালের হিসাবে যেটা পরিকল্পনামন্ত্রী পদ) তবে এটা টেকনিক্যাল পোস্ট – আর এই নুরুল ইসলাম ছিলেন সেই ভাইস প্রেসিডেন্ট।

    এখন আওয়ামি আমলে কথিত আছে যে পাকিস্তান আমলে এই সিনিয়র অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলাম আর জুনিয়র রেহমান সোবহান এরাই নাকি শেখ মুজিবের ১৯৬৬ সালের ছয়দফার প্রনেতা বা ড্রাফটকারি। শুধু তাই নয় এরাই দুই পাকিস্তান অংশের অর্থনীতির দশা ইকোনমিক ডাটা ব্যবহার করে তুলে দেখিয়েছিলেন যে তুলনায় পুর্ব পাকিস্তান বঞ্চিত ও অসাম্যের শিকার!  সেকালের এসব ততপরতা থেকেই এরা নিজেদের হিরো ভাবতে ভালবাসেন আর তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে শেখ মুজিব ঘনিষ্ট ছিলেন। তাই সেকাল থেকেই এই ক্রেডিট কিছু বিনিময় মূল্য কিছু বিশেষ করে রাখা ইত্যাদি তারা তাদের শেষ জীবন্বের মরিয়া হয়ে চেয়ে থাকেন।  কিন্তু সমস্যা হল, আগেই বলেছি বাংলাদেশের শুরুতে কথিত ঐ  সমাজতান্তিক অর্থনীতি দুর্ভিক্ষ ঘটিয়ে শেষ হলে শেখ মুজিব তাজউদ্দিন সহ সকলকে পদচ্যুত করেন, মানে পদত্যাগ করতে বলেন। এতে তাদের স্বাধীনতা-পুর্ব সব ক্রেডিট কালো হয়ে যায়।  অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলাম এর কেসটা আবার আরো খারাপ। কারণ, তিনি সেকালের অর্থনৈতিক দুর্দশা আর দুর্ভিক্ষের মধ্যেই বা কিছুটা আগেই (সম্ভবত সেপ্টেম্বর ১৯৭৪) বিদেশে জাতিসংঘের [FAO] er চাকরি নিয়ে তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান। যেটা শেখ মুজিবকে আহত করেছিল। আবার বলা হয় একবছরের ছুটি নিয়ে গেলেও আর ফিরে আসেন নাই।
    অথচ বিদেশি চাকরি শেষ করে গত কয়েক বছর ধরে তিনি দেশে এসে হাসিনার মন, দৃষ্টি ও স্বীকৃতি পেতে কোন কিছুই করতে বাদ রাখেন নাই। উদ্দেশ্য একটাই হাসিনা যেন স্বাধীনতা-পুর্ব অবদানের ঘটনায় তাদের স্বীকৃতি দেন। কিন্তু তাঁর দেশত্যাগ ও শেখ মুজিবের আহত হওয়া; আর ওদিকে এমনকি অনেকে দাবি করেন ১৯৭৪ সালে তাজউদ্দিননের পদত্যাগ উত্তরকালে শেখ মুজিব নুরুল ইসলামকেই নাকি অর্থমন্ত্রী করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নুরুল ইসলাম তখন দেশত্যাগে ব্যস্ত। খুব সম্ভবত, সমাজতন্ত্রী করতে গিয়ে দেশকে দুর্ভিক্ষে ফেলা আর নুররুল ইসলাম-সহ এমন তাদের অন্যান্যা সহযোগী অনেকেই নিজ উন্নতির লক্ষ্যে হারিয়ে যান। (যেমন আনিসুর রহমান, মোসাররফ ইত্যাদি অনেকেই যেখানে একমাত্র ব্যতিক্রম  সম্ভবত প্রফেসর মোজাফফর আহমেদ যাকে জিয়া নিজ ক্যাবিনেটে শিল্পমন্ত্রী উপদেষ্টা করে রেখেছিলেন, যিনি বিশেব্যাংকের অনুদানে ঢাবিতে আইবিএ প্রতিষ্টান সাজিয়ে নেন। ) এসব বিবেচনা থেকেই শেখ হাসিনা সমাজতন্ত্রী অর্থনীতিবিদ এই গোষ্ঠির কাউকেই কোন আনুকুল্য বা কোন বিশেষ সম্মন্ননা জানাতে এখনও কারও প্রতি রাজি হন নাই। হাসিনার এই মুল্যায়ন খারাপ বা ভুল তা বলা কঠিন; বা অন্যভাবে বললে, এমন বলার মত যথেষ্ট পয়েন্ট আমাদের হাতে নাই। বিরাট জ্ঞানীরা দেশে দুর্ভিক্ষ লাগিয়ে দিয়ে কেটে পড়বেন বা কোন দায় নিবেন না, রিকভারিতে হাত লাগাবেন না – তো এরা তাহলে দেশের জন্য কারা? রেহমান সোবহানও পরের পাঁচ বছর বিদেশে চাকরিতে ছিলেন।

    তামাসার কথাটা হল, গত বছর নুরুল ইসলাম মারা [৯মে ২০২৩] যান, য়ার এতে সঙ্গীসাথীদের নিয়ে যে শোক সভা ডাকা হয়েছিল সেখানে উপস্থিত প্রগতিশীল গোষ্ঠির তরফ থেকে তাতে বক্তারা সবাই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে হাসিনাকে দুষে কথা বলেছিলেন। এখানে   এখানে  এখানে দেখুন।    এছাড়া দেশে ফিরার পর থেকে নুরুল ইসলাম মৃত্যুর আগে পর্যন্ত  তার আক্ষেপ ছড়িয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় সাক্ষাতকার দিয়ে গেছিলেন। যার সর্বশেষটা সম্ভবত এইটা। আর এতে লক্ষ্য করা যায় কেউই সমাজতন্ত্রী অর্থনীতির দুর্ভিক্ষ এই পরিণতি নিয়ে, এর দায় নিয়ে কোন প্রসঙ্গই তুলেন নাই। আমার ধারণা অন্তত একারণে, তারা কোন কিছুর বিশেষ প্রাপ্তির দাবিদার হওয়াটা নিজেরাই ম্লান করে দিয়েছেন! আবার নুরুল ইসলামের মৃত্যুর পরে খোদ রেহমান সোবহানের লেখাটাও এখানে দেখতে পারেন।

    তবু এই লেখায়  মুলকথাটা হল, রেহমান সোবহান এর ভাষায় তার “কমরেড” নুরুল ইসলামকে হাসিনার পাত্তা না দেয়া বা নিরুত্তাপ থাকা – এটা দেখার পরও মনে হচ্ছে রেহমান সোবহান হাসিনার মত পেতে হাল ছাড়তে রাজি না। তিনি সম্ভবত ভেবেছেন, তাঁর লাস্ট ট্রাম্প হল – দেশে খেলাপি ঋণের জনক জিয়াউর রহমান -একথাটা রটায় দিলে নিশ্চয় হাসিনা এবার তাঁকে কোলে তুলে নিবেনই!!! কিন্তু হায়!  রেহমান সোবহানের পোড়া কপাল, তেমন কিছুই ঘটে নাই! হাসিনাও একথা তুলে নিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে কোন ব্যাশিং করতে যান নাই!

    তবে মূল প্রশ্ন, আসলেই কী জিয়া ঋণ খেলাপীর জনক? নাকি এই বক্তব্য রেহমান সোবহানের এক অসৎ কাজ – এক ইন্টেকচুয়াল অসততা?
    প্রথম কথা হল জিয়ার আমলে ঋণ খেলাপীর ঘটনা ঘটেছে।  কিন্তু ফ্যাক্টস হল, এমন ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট জিয়ার ছিলই না।  এই সিদ্ধান্ত ছিল খোদ বিশ্বব্যাংকের।
    এর প্রমাণ, আমি নিচে বাংলা অর্থসুচক পত্রিকা থেকে রেহমান সোবহানের এই বক্তব্য নিয়ে ছাপানো রিপোর্ট উঠিয়ে এনেছি আর নিচে সেঁটে দিয়েছি।  ওখানে দেখা যাচ্ছে রেহমান সোবহান বলছেন, “বিশ্বব্যাংকই এই ঋণদানে চালিকাশক্তি। তাদের পরামর্শেই ওই সময়
    বেসরকারি খাতের উন্নয়নে বিপুল ঋণ দেওয়া হয়েছে”
    ।

    “সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে দেশে খেলাপি ঋণের জনক হিসেবে আখ্যা দিয়ে রেহমান সোবহান বলেন,
    ওই সময় বিশ্বব্যাংকও খেলাপি ঋণ তৈরিতে চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তাদের পরামর্শেই ওই সময়
    বেসরকারি খাতের উন্নয়নে বিপুল ঋণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকের ব্যালান্স শিটের দিকে তাকানো হয়নি।
    শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থার মাধ্যমে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়া হয়েছে। এরপর তাদের খেলাপি
    ঋণ বেড়ে গেলে বিশ্বব্যাংক একটি কথাও বলেনি, যদিও পরবর্তীকালে তারাই খেলাপি ঋণের বিষয়ে সোচ্চার…”

     

    পয়েন্ট দুইঃ
    রেহমান সোবহান কী চেক করেছেন কোন কোন ব্যাঙ্ক এমন ঋণ বিতরণ করেছে যা খেলাপি ঋণ হয়ে গেছিল?

    এর জবাবটা রেহমান সোবহান  নিজেই সম্ভবত অজান্তেই আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন।

    ১। সেকালের খেলাপি ঋণ যে ব্যাংকের সে ব্যাংকের কার আমানতের অর্থ এটা?
    রেহমান সোবহান নিজেই বলেছেন এগুলো – “শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থার মাধ্যমে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়া হয়েছে” -সেই ঋণ।  এখন শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থার যে ঋণ দিয়েছে খেলাপি হয়ে যাবার জন্য সেই অর্থ মানে ব্যাংকের আমানত কাদের অর্থ? কারা এদুই ব্যাংকে অর্থ রেখেছিল, অর্থ আমানত রেখেছিল যাতে তা ঋণ হিসাবে বিতরণ করা যায়? [যে ঋণ পরে অনাদায়ী খেলাপি ঋণ হয়ে যায়?]। এর জবাব হচ্ছে,  এই অর্থ আম পাবলিকের কারও না। সরকারেরও না।
    কারণ শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থা – এদুই নামে এরা ব্যাংক হলেও এদের গ্রাহক বা সেবা-ক্রেতারা সাধারণ মানুষ নয়। এদুই ব্যাংকে কোন সাধারণ মানুষ বা স্বল্প আয়ের মানুষের একাউন্ট নাই। তাই এমন আম নাগরিকের কোন অর্থ এখানে রাখা নাই, একাউন্ট খুলে দেয় না। এদুই ব্যাংক কেবল মাত্র যারা সম্ভাব্য উদ্যোক্তা যারা শিল্প- কারখানা গড়বেন তাদেরকে ঋণ দেওয়া ও ফেরত নেওয়ার ব্যাংক। কেবল এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আমানত ও একাউন্ট আছে। এককথায় এগুলো বিশেষায়িত ব্যংক। যাদের সার্ভিস-ক্রেতা জনসাধারণ নয়। কেবল সম্ভাব্য শিল্প উদ্যোক্তারাই এর খাতক। তাও আবার এই খাতকেরা কিন্তু এই ব্যাংকে তাদের নিজের অর্থ আমানত হিসাবে রাখতে আসেন নাই।

    এখন আসেন আরো সরাসরি প্রশ্ন তাহলে,  এই দুই ব্যাংক তাহলে ঋণ দিবার মত অর্থ কোথা থেকে পায়? কারা এই অর্থদাতা?

    এর জবাব হল, এই অর্থই বিশ্বব্যাঙ্ক আমাদের সরকারের মাধ্যমে দুই বিশেষায়িত সরকারী ব্যাংক শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থা কে দিয়েছে; যাতে এদুই ব্যাংক সিলেক্টেড উদ্যোক্তা যাদের ঋণের আবেদন অনুমোদিত হয়েছে তাদেরকেই কেবল বিতরণ করবে এমন ব্যাংক। এর মানে সোজা ভাষায় হবু শিল্প উদ্যোক্তাদেরকে বিতরণের জন্য দেয়া এই অর্থ যা, না আমাদের সরকারী অর্থ, না তা কোন সাধারণ মানুষের অর্থ। অর্থাৎ এই ঋণদান শেষে খেলাপি হয়ে গেলেও এর দায়ভার সরকারের নয়।  এসবের প্রকৃত কারণ এটা ছিল বিশ্বব্যাংকের এক এক্সপেরিমেন্ট প্রকল্প এর ঋণ যে বাংলাদেশের শিল্পায়ন ঘটাতে গেলে তাদেরকে কিভাবে আগাতে হবে এজন্য তাদের বুঝাবুঝি শক্ত করার প্রকল্প এটা।

    বিশ্বব্যাংক-কে বুঝাবুঝিঃ
    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে বুঝাবুঝির সমস্যা, এটা আসলে কী ধরণের প্রতিষ্ঠান, এর কাজ ও ম্যান্ডেট কী এটা নিয়ে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের বুঝা-পড়া সবচেয়ে করুণ!  ব্যাপারটা তাদের কাছে নিপাত যাক বলতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ!
    তবুও সেকালের বিশ্বব্যাংক কেন এমন করেছিল তা নিয়ে আরো বিস্তারিত বুঝাবুঝি যারা প্রবেশ করতে চান তাদেরকে সত্তর ও আশির দশকের বিশ্বব্যাংককে স্টাডির বিষয় হিসাবে নিতেই হবে। এছাড়া তাদের জন্য আরেক বড়কাজ হবে – ROBERT McNAMARA  (5th President of the World Bank Group, April 1, 1968 – June 30, 1981) – এই ব্যক্তিত্বকে জানতেই হবে; তার  কাজ ও জীবনী প্রক্রিয়াকে।  তবে সাবধান; তাঁর কাজ ন্যয়সম্মত নাকি অন্যায় এসব মুল্যায়ন পাঠকের হাতেই থাক! কিন্তু ফ্যাক্টসগুলো জানা থাকতেই হবে – তাতে বা পাঠকের কাছে নেতি বা ইতিবাচক যাই হোক! এটাই আমার আবেদন থাকবে।
    কেন তাকে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিল? তিনি ছিলেন আসলে আমেরিকান ফোর্ড মটোর কোম্পানির প্রেসিডেন্ট। পরে তাঁকে (১৯৬১-৬৮) আমেরিকান সরকারের নিরাপত্তা মন্ত্রী  [Defence Secretary] করা হয়। এরপর তিনি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিলেন। কিন্তু কেন? কী তার এক্সপার্টিজ যা তাঁকে নিয়ে এত চাহিদা তৈরি করেছিল? খুবই সংক্ষিপ্তভাবে একটু উত্তর দেই। তিনি তাঁর বিশেষ ম্যানেজমেন্ট কোয়ালিটি এই সক্ষমতার জন্য বিখ্যাত বলে নিয়োগদাতারা বিশ্বাস করতেন। তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রীর আমলটাই ছিল আসলে আমেরিকার ভিয়েতনাম যুদ্ধের কাল। আর সবশেষে বিশ্বব্যাংকে তাঁকে আনা হয়েছিল এটা মনে করে যে তাঁর আগমনের আগে বিশ্বব্যাংক এশিয়াতে এসে ভাল কাজ করতে পারছিল না। এর সুরাহা করতে। এশিয়ায় সরকারগুলোর সাথে মিলে কোন দেশের মূল অর্থনীতি খাঁড়া করলেও এর সুবিধা নিয়ে প্রান্তিক অঞ্চলের বহু গরীব লোককে তা স্পর্শ করতে পারছিল না। ঐ দেশের অর্থনীতিক কার্যক্রমে একেবারে প্রান্তিক গরীবদেরকে তাতে সামিল করতে পারছিল না। এটাই এককথায় বিশ্বব্যাংকের কর্মসুচি গ্রামের প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে সমস্যার  মুখোমুখি হচ্ছিল। এটা ভাঙতেই ম্যাকনামারার ম্যানেজমেন্ট বুদ্ধি কাজে আসবে মনে করা হয়েছিল।
    তাই ম্যাকনামারার টেকনিক অনুসরণ করতে গেলে এজন্য অর্থ অপচয় কিছু হলে হোক, এই নীতি নেয়া হয়েছিল। তিনি এক নয়া টার্গেট নেন প্রান্তিক অঞ্চলে যেভাবেই হোক কম সুদের ঋণ সহজলভ্য করতেই হবে – তাতে কিছু চোর বাটপার বিশ্বব্যাংকের অর্থ মেরে দিলেও ক্ষতি নাই। একবার প্রান্তিক অঞ্চলে অর্থ (ঋণ বা মূলধন) এভেলএবল করতে পারলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠি তাদেরকে ক্যাপিটালিজম এর অংশ করে ফেলতে পারলে পরে এরা নিজেরাই এগিয়ে আসবে। তাতে শুরুতে কিছু অর্থ ফেরত আসবে না, মেরে দিবে, অপচয় হবে তা হলেও কেবল শুরুতে এই পথেই আগাতে হবে। বিশ্বব্যাংক তাই অনুসরণ করেছিল। আর এসময়কালের অপচয় নিয়েই আনু মোহম্মদের মত অনেকেই সেকালের বাস্তবতায় লিখেছেন, এর অনেক অভিযোগ আছে। কিন্তু আশির দশকের শেষে বিশেষ করে ৯১ সালের পরে এসব এলোমেলো হয়ে থাকা অব্যবস্থা, ক্ষতি, অপচয় ইত্যাদি সবকিছুকেই কঠোর এক জবাবদীহিতার অধীনে আনা হয়। ইন্টিগ্রইটি [INTEGRITY] বা জবাবদীহিতা শাখাকে মূল আলাদা এক প্যারালাল শাখা তৈরি করা হয় যারা কেবল বিশ্বব্যাংকের বোর্ডের কাছে জবাবদীহিতা করবে। এভাবেই ম্যাকনামারার আমলের ইচ্ছা করে তৈরি কিছু আবর্জনা তখন সব সাফা করা হয়। এই পরীক্ষারই আরেক অংশ ছিল আমাদের শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থা মত  প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিল্পঋণ বিতরণ করার উদ্যোগ। যেখানে বিশ্বব্যাংকের অনেক অর্থেরই অপচয় হয়েছিল। এতে বলাই বাহুল্য এই সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট জিয়ার সরকারের নয়, তাই এতে অনাদায়ী খেলাপী ঋণের দায়ও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের উপর চাপায় নাই। কিন্তু সেকথা উল্লেখ না করে জিয়াকে দায়ী করে এমন বক্তব্য দেয়া ইন্টেলেকুচুয়ালি গ্রহণযোগ্য নয়! সৎ ততপরতা নয়!

    আরেকটা কথা বলে শেষ করব, এটা মার্কসের এক তত্ব যে যেকোন দেশের শিল্পায়নের শুরুতে যে পুঁজির যোগাড় তা এসেছে অন্যের অর্থ আত্মসাত করেই বা সরকারী ট্যাক্সের অর্থ না দিয়ে সেই অর্থ মেরে দিয়ে ইত্যাদি ধরণের সব অসদুপায় ব্যবহার করেই। এটাই মার্কসের আদিম পুঁজি সঞ্চয়ের তত্ব।  ম্যাকনামারার বিশ্বব্যাংক এটাকেই ইতিবাচকভাবে নিয়েছিল। তাই খেলাপি ঋণের নামে অর্থ লোপাট করতে দিয়েছিল।  যেমন একটা একসময়ের বিড়ি ফ্যাক্টরির কথা জানি যে ১৯৯৯ সালের ১০০ কোটি টাকা আবগারি টাক্স মেরে দিয়েছিল যা সরকারের প্রাপ্য ছিল। কিন্তু সে ছিল আসলেই ভাল উদ্যোক্তা। তাই সে মেরে দেওয়া সেই ১০০ কোটি সেকালের বিচারে অনেক টাকা। সেই অর্থ দিয়ে সে ছয়টা নতুন কোম্পানি খুলেছিল যার চাওরটাই ছিল কারখানা আর দুইটা মার্কেটিংয়ের। এবং সবগুলোই এখন খুবই ভাল চলে এখন সে শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবসায়ী। ম্যাকনামারা এই পথ ধরার পক্ষপাতি ছিলেন।
    কিন্তু ম্যাকনামারার শেষ জীবন কাটে হতাশায়। শেষ পনেরো বছর তিনি কারো সাথে দেখা করতেন না। কোন সাক্ষাতকারো না। এভাবেই তিনি ২০০৯ সালে মারা যান। কিন্তু কেন তিনি একান্তে চলে গেছিলেন সেটাই জানা জরুরি। তাঁর কোনকিছুই   গ্রহণ করে নিবার কথা আমি বলছি না। তবে তাকে বিস্তারিত জানা আমাদের অনেক কাজে লাগবে বলে আমি মনে করি।

    শেষ কথাটা হল, নিশ্চয় আমি রেহমান সোবহানকে এসব দিক জানাবার বা শিখাবার কেউ নই; আমি তুলনার অনেক ছোট্ট তুচ্ছ। তবে দাবি ও আশা করব অন্তত তিনি এসব জেনে নিয়ে তবেই না মূল্যায়ন করে মন্তব্য করবেন যে দেশে খেলাপি ঋণের জনক জিয়াউর রহমান – কথাটা সত্যি কিনা!! অবশ্যই আমি এবিষয়ে তাঁকে শিখাবার কেউ না, এটা আমার কাজও না। তাঁর প্রতি কোন উদ্ধত্ত দেখানো এটাও আমার জন্য হারাম। তিনি আমাদের কাছে সম্মানিত অবশ্যই! কিন্তু কম বা যথেষ্ট চিন্তা না করে কেউ একটা মন্তব্য বা কথা বলে ফেলবে এটাও আশা করি না!  অগ্রহণযোগ্য!

    ২।  এবার তুলনা করব। বাংলাদেশের এখন যে ঋণ খেলাপির ঘোরতর সমস্যা তা কী শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থার এর খেলাপি ঋণের মতন?
    প্রশ্নই আসেনা। পদ্মা ব্যাংকের কথাই যদি ধরি, পদ্ম্যা ব্যাংকের খাতক আর শিল্প ব্যাংকের সেবা খাতক এক নয়। সবচেয়ে বড়কথা আমানতের প্রশ্ন। পদ্মা বা ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানত সরাসরি দেশের আম জনতার। আপনার-আমার বাসায় গৃহিকর্মী হেল্পারের কাজ যারা করে এখন গরীব মহিলাদের অর্থ। যারা মাসে দুশ-পাচশ করে টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করে, তাদের কষ্টার্জিত আমানত করা টাকা। আর সে টাকাই ঋণ দিয়ে খেলাপী করা হয়েছে। তাই কোনভাবেই ন্যাশনাল ব্যাংক আর শিল্প ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এক বা তুলনীয় উদাহরণ নয়। কারণ, শিল্পব্যাংকের আমানত বিশ্বব্যাংকের দেয়া আর তারা জানে এটা তাদের এক্সপেরিমেন্ট; তাই অর্থ ফেরত নাও আসতে পারে।

    তাহলে এখন প্রশ্ন রেহমান সোবহানের মত এক ব্যক্তিত্ব তিনি ন্যশনাল ব্যাংক ধরণের ক্রাইসিসে পরা ব্যাংকের খেলাপি হওয়া আর শিল্প ব্যাংকের খেলাপি – এদুটাকে এক করে দেখলেন কেন? কীভাবে?  এ যেন “সোবহান” যার যার নামের সাথে আছে তারা সবাই কী একই রকম ব্যবহারের হবেই? তেমনই অনাদায়ী খেলাপি ঋণ মানেই কী এমন সব কেসগুলো একই?  তাহলে  এসব ফারাক বুঝা কী রেহমান সোবহান সাহেব এর জন্য কঠিন কোন কাজ? আমরা বুঝতে অক্ষম!

    একমাত্র পথ হল, ইন্টেলেকচুয়াল সততা বজায় রেখে আমাদের সকলের কাজ-মন্তব্য করা উচিত!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ     ০৩ এপ্রিল ২০২৪  সন্ধ্যা ৬ঃ ১৫
    এই আপডেটে মূলত -‘ভ্যালু এডিশন চেইন’ নিয়ে অংশটাই একটু বিস্তার ঘটানো হয়েছে।

     

     

     

  • ইরান-ইসরায়েল বিরোধের ইস্যুকে বুঝবার পদ্ধতি ও সাথে অন্যান্য

    ইরান-ইsরায়েল বিরোধে,
    এই ইস্যুকে বুঝবার পদ্ধতি ও সাথে আমার কিছু রিডিং
    গৌতম দাস
    ১৫ এপ্রিল ২০২৪   সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা

    https://wp.me/p1sCvy-5wh

     

    US will not take part in any Israeli retaliatory action against Iran

     

    ইsরায়েলের উপর ইরানের হামলা আসন্ন বলে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল আর এর আগে গাজায় লাগাতর ইরায়েলি ম্যাসাকার ঘটে চলা ইত্যাদি এসব কিছুর একটা পর্যায় সম্ভবত আমরা পার হতে যাচ্ছি। বিশেষত ইরানের হামলার পরে কী যুদ্ধ দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে যাবে – এই ছিল সারা দুনিয়া তো বটেই গ্লোবাল অর্থনীতি ও রাজনীতির মুখ্য টেনশন। এই টেনশন বা টান টান উত্তেজনার একটা আপাত পর্যায়কাল শেষ হল বলে সকলের ধরে নিচ্ছে।  বিশেষ করে খোদ ইsরায়েল বড় বাঁচা বেঁচে গেছি বলে দুর্ঘ্নিশ্বাস ফেলেছে। আর কথিত পশ্চিমা ওস্তাদদেরকে থ্যাঙ্ক জানিয়েছে। ……credited an international military coalition with helping thwart   .।
    কিন্তু আকাঙ্খা –  নানান মুসলিম-প্রধান দেশের মূলত তরুণদের পর্বত প্রমাণ ‘মুক্তির’ আকাঙ্খা মানে প্যালেসটাইনিদের জন্য সহমর্মীতা থেকে উতপন্ন যেসব আকাঙ্খা সেই আকাঙ্খা-চাহিদার তুলনায় বাস্তবে ইsরায়েলকে ইরানের শিক্ষা দেয়া মানে, মিসাইল ও ড্রোন নিয়ে হামলার কার্যকারিতা হয়ত তুলনায় কম মনে হচ্ছে! সেকারণে, অনেকেই অসন্তুষ্ট! অনেককে দেখেছি ফেসবুকে ইরানের উপরই ঝাল ঝেড়ে ক্ষোভ প্রশমণ করেছেন!
    এবারের গত বছর ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় হত্যার যে অসহনীয় পরিস্থিতি ও গাজাবাসীর আত্মত্যাগ তা কী এবারও ক্ষতি বেশী লাভ তুলনায় কম হয়েই থাকবে?

    আগেই মূলকথাটাই সরাসরি বলে নেয়া যাক; প্রসঙ্গের ভিতরে ঢুকে বিস্তারে যাবার আগেই। আরব-ইরায়েলের যুদ্ধ-দ্বন্দ্ব-রক্তাক্ত সংঘাত সেই ১৯৪৮ সালে ইsরায়েল – এই দানব রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই। অথচ প্রকৃত ও শুরুর দ্বন্দ্বটা ছিল ইsরায়েলের সাথে পশ্চিমাস্বার্থের, পশ্চিমা দেশগুলোর। বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে ইউরোপ থেকে ইহুদিবিরোধী চরম মনোভাব বা জর্মান-কেন্দ্রিক নির্মুলের [cleansing] মনোভাব থেকে।  তাই ইউরোপে ছড়িয়ে থাকা ইহুদি জনগোষ্ঠি শেষে সারা ইউরোপ ছেড়ে পুনর্বাসিত হতে  দখলীকৃত প্যালেস্টাইনী ভুমিতে ইsরায়েল রাষ্ট্র জন্মাক, গড়ে উঠুক – এটা চেয়ে আমেরিকার নেতৃত্বে সারা পশ্চিরা সরকারগুলো এই ভূমি দখলী কাজে ইsরায়েলকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহায়তা-সমর্থন করেছিল। এভাবেই নিজেদের পাপ ও অপরাধ তারা মুসলমান উপরে সঁপে দিয়েছিল!

    হিটলার ইউরোপ থেকে ইহুদি জনগোষ্ঠি নির্মুল-নিধনের এথনিক ক্লিনজিং [ethnic cleansing] এর অপরাধ করেছিলেন। এই নৃশংস ঘটনায় কোন মুসলমান-প্রধান রাষ্ট্র বা কোন মুসলমান জনগোষ্ঠি একেবারেই সংশ্লিষ্ট নয় বা কখনও  কোন দৃশ্যপটেই ছিল না। মূলত জর্মান থেকে তাদের নির্মুল ও বের করে দেওয়া হলেও যেহেতু আরব বা প্যালেস্টাইন ভুমিদখল করে তাদের ঘাড়ে চড়ে সেখানেই ইহুদিদের বসতি গড়তে ঠেলে দেয়া হয় তাতে ইহুদিরাও আর সারা ইউরোপ বা আমেরিকাকে আর শত্রু ঠাউড়ালো না। নয়া শত্রু ঠাউড়ালো আরব বা মুসলমানদের।  যে নয়া শত্রুর ভুমি ইহুদিরাই দখল করেছিল। আর দখলিকাজে পশ্চিমারা ইহুদিদের সাহায্য-সহায়তা তাদের করেছিল বলে ইহুদিরা নিজেদের আসল শত্রুদের ভুলে যায় ও মাফ করে দেয়। অথচ জন্ম থেকেই খৃশ্চান ধর্ম বা এর অনুসারীরা ইহুদিদের শত্রু হয়েই জন্মেছিল – ইহুদি-খৃশ্চান বিরোধ তাই তখন থেকেই।  তা সত্বেও  ওদিকে যারা কিছুই করে নাই সেই মুসলমান বা আরবেরা হয়ে যায় ইহুদিদের নয়া টার্গেট, নয়া মূল শত্রু!

    এ যেন বাইরে ব্যাপক মার খেয়ে এসে হতাশ পুরুষের বাসায় ফিরে মনের সুখে  বউ পিটানোর বিপ্লবীপনা!! ইহুদিরা যদি প্যালেস্টাইনিদের উপর তাদের ভুমিতে জবরদখলি করে পুনর্বাসিত না হয়ে যদি, ইউরোপের কোন ভুমিতেই নয়া আবাস গড়ত হত তাহলে যারা ইহুদি এথনিক ক্লিনজিং এর হোতা তাদের সঠিক ভাবে অপরাধের প্রতিকার হত!!
    অথচ নয়া ঠাউড়ানো শত্রু মুসলমানদের উপর দানব ইsরায়েল রাষ্ট্রের অত্যাচার এখনও চলছে; আর এটাই এখন আর কোন আরব রাষ্ট্রই দায় নিতে চায় না; একে কেকে সবাই কেটে পড়েছে আর যেন সব দায় সওয়ার হয়েছে ইরানের ঘাড়ে। আর সেটাই একালে ইরান-ইsরায়েল বিরোধ-সংঘাত হিসাবেই হাজির! গত ১৯৭৮ সালে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির পর থেকে কোন মুসলমান রাষ্ট্র আর প্যালেস্টাইনের পক্ষে লড়াইয়ে লক্ষ্যহীন হয়ে সক্রিয় থাকতে চায় নাই ; আরব জাতিবাদের পক্ষের রাষ্ট্র বলেও কেউ আর থাকতে চায় নাই। আরব জাতিবাদের পরিচয় ফেলে সবাই সেই থেকে নিজ নিজ আরব পরিচয় পিছনে ফেলে নিজ নিজ দেশ-রাষ্ট্রের জাতিবাদ [আরব জাতিবাদের বদলে সিরীয় বা মিসরীয় জাতিবাদ হয়ে গেছে] বলে পরিচয় বদলে নিয়েছিল। আর এঘটনারই আরেক ভাষ্য হল, আরাফাতের পিএলও [PLO] বা পিএফএলপি [PFLP] নামে যত বিপ্লবী যোদ্ধা ছিল সেসব হারিয়ে এখন মূখ্য নাম ইরান-সমর্থিত হামাস [HAMAS]! প্রথম দিকে হামাস এরা ইসলামি দল বলে প্রগতিশীলেরা নাক শিটকালেও এখন বাস্তবতা হল, হামাস ইসলামিস্ট কিনা সেই আপত্তি তলিয়ে গেছে – বাস্তবতায় মুরোদ দেখানোর সক্ষমতার বিচারে হামাস হল  এক সাহসী লড়াকুর নাম!  এরাই একমাত্র – ভুলে যাওয়া প্যালেস্টাইনদের লড়াইকে আবার চাঙ্গা করেছে! সামনে এনেছে! যদিও পথটা খুবই কঠিন ও চড়া মূল্যের। ইতোমধ্যেই তেত্রিশ হাজারের উপর জীবন, গাজাবাসীকে জীবন দিয়ে দিতে হয়েছে। কিন্তু তবু মুখ্য সাফল্য হল, ভুলিয়ে দেয়া লড়াইকে আবার সামনের কাতারে হাজির করা গেছে।  এবারের লড়াই-সংগ্রামের সবচেয়ে বড় সাফল্য এটাই। একে তুচ্ছ করা খাটো করে দেখা অপরাধ হবে! সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করব, আকাঙ্খার তুলনায় এই অর্জন হয়ত কম মনে হতেই পারে! কিন্তু দেখা-বিচারের ক্ষেত্রে একে যেন খাটো করে দেখা না হয়। ছোট করে না দেখা হয়। কারণ, এই অর্জনের তাতপর্য ব্যাপক!

    ইতোমধ্যে এতদিনে অন্যদিকের আরেক ডেভেলবমেন্ট হল, আমরা জানি চলতি নয়া শতকে মুসলমানেরা বঞ্চিত, উপেক্ষিত ও বৈষম্যের শিকার বলে একটা অনুভব ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে; এই বলে তাদের মুক্তি – গ্লোব-জুড়ে তাদের মুক্তির আকাঙ্খা এখন অনেক দূর ছড়িয়েছে। বিশেষ করে বুশের ওয়ার অন টেররের আমলে তাদের উপর আক্রমণ, সীমাহীন বৈষম্য অন্তহীন হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আমাদের মত দেশে মুসলমানেরা বঞ্চিত, উপেক্ষিত বলে তাদের মুক্তি চাই বলে যতই চিতকার উঠুক – তা বাস্তবায়িত হবে ততটুকুই যতটুকু  এখনকার দুনিয়ার মূল দ্বন্দ্ব-বিবাদে ও মেরুকরণে  ইসলামি আকাঙ্খা কতটা বাস্তববাদী হয়ে প্রধান দ্বন্দ্বে ভিতরে নিজেকে সফলভাবে গেঁথে দিতে / নিতে পেরেছে।

    প্রধান দ্বন্দ্ব বুঝতে পারা খুব গুরুত্বপুর্ণঃ
    ইরান কেন আরো বেশী করে ইসরায়েলের উপর আমাদের তরুণের আকাঙ্খা পূরণের মত আক্রমানাত্মক হতে পারলো না? – এটাই এখনকার  এক প্রধান জিজ্ঞাসা! অনেকে মনে করছেন ইরান ভিতু, কম মুরোদের কিংবা ওরা শিয়া বলে নেতৃত্ব দিতে পারল না!
    কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এগুলো একটাও সঠিক না। বিষয়টা সঠিক বুঝবার এপ্রোচ নয়!  তাহলে কীভাবে বুঝব কোনটা সঠিক? তরুণের আকাঙ্খা কী এভাবে মার খেতেই থাকবে?

    না, অবশ্যই না। তবে এসব ঘটনা বুঝবার পদ্ধতি না জানা থাকলে এমন অপ্রয়োজনীয় দোষারোপ চলতেই থাকবে।

    প্রধান দ্বন্দ্ব বুঝতে পারা এসব এক্ষেত্রে সঠিক পদ্ধতি। প্রধান দ্বন্দ্ব মানে?
    একটা সমাজ, রাষ্ট্রে বা এমনকি একটা পরিবারে অনেক ধরণের স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা সমস্যা থাকে। একটা পরিবার দিয়েই যদি বলি ধরা যাক – অনুমিত এমন পরিবারে ধরা যাক দু-তিন ভাইবোন আর বাবা-মা নিয়ে সংসার; যেখানে বাবা চাকুরিজীবী মানে যার আয়ে ঐ সংসার। এখন ঐ বাবার চাকরি টিকিয়ে রাখা, তিনার নিজে সক্ষম থাকা ফিট থাকা এটাই সেখানে প্রধান স্বার্থ। এর বাইরে ধরা যাক বড় ছেলে রাজধানীতে গিয়ে ইঞ্জিয়ারিং পড়তে চায় আর এই লক্ষ্যে কলেজ স্তরেই তাকে ভালো টিউশন শিক্ষক মানে পড়ালেখায় বিনিয়োগ দেয়া জরুরি।  কিন্তু এই চাহিদা-আকাঙ্খা কোনভাবেই বাবা কেন্দ্রিক প্রধান স্বার্থ যেটা ঐ পরিবারের এর চেয়ে বড় হতে পারবেই না। ছেলের স্বার্থই প্রধান এমন গুরুত্বপুর্ণ জিনিষ হতে পারবে না। একইভাবে অন্য ভাইবোনদেরও পড়ালেখা বেড়ে উঠার যেসব চাহিদা-আকাঙ্খা আছে সেগুলো পুরণ হওয়া এটাও বাবা কেন্দ্রিক প্রধান স্বার্থের চেয়ে বড় হতে পারবে না।  এমনকি মায়ের কোন অসুস্থতাও না। বাবার ফিট থাকা প্রধান স্বার্থ কারণ, বাবাটাই প্রধান বা পরিবারে একমাত্র আয় আনবার ব্যক্তি। বাবা না থাকলে পরিবার পথে বসবে।

    আমাদের বর্তমান দুনিয়া ইতিমধ্যে (মূলত অর্থনৈতিক কারণে) এতই পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে গেছে যে একালে যে কোন কিছুই আর লোকাল-আঞ্চলিক বিরোধ দ্বন্দ্ব নয়। সব দ্বন্দ্বই মিটাতে গেলে সমাধান পেতে চাইলে তা গ্লোবাল ইস্যু হয়ে যায়। কিন্তু গ্লোবাল ইস্যুতে প্রধান দ্বন্দ্ব আরেক জিনিষ, আরেকটা ইস্যু। তাই সব লোকাল ইস্যুকেই সবার আগে গ্লোবাল প্রধান দ্বন্দ্বে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিতেই হয় – এক মেরুকরণে অবস্থান নিতে হয়। প্যালেস্টাইন ইস্যু বা আরব স্বার্থ বা মুসলিম তরুণদের আকাঙ্খা যেটাই হোক তা মিটতে পারে তাই গ্লোবাল প্রধান দ্বন্দ্ব মিটা বা সমাধান কিভাবে হবে সেই সাপেক্ষে।  প্রধান দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে  মুসলিম তরুণদের আকাঙ্খা পূরন হতে পারবে না।

    গ্লোবাল পালাবদল এর সময়কালেঃ
    আসলে, গ্লোবাল ইস্যুতে প্রধান দ্বন্দ্ব-বিরোধ হল যে এটা পালাবদলের কাল, মানে গ্লোবাল নেতৃত্বেই এখানে পালা বদল আসন্ন। গত প্রায় আশি বছরে ধরে আমেরিকা যে গ্লোবাল নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে তা পরিবর্তিত হতে চাইছে – উদিয়মান চীনের হাতে। তাই চীনকে এখন এক নয়া গ্লোবাল মেরুকরণ ঘটাতে নামতেই হচ্ছে।
    মধ্যপ্রাচ্য নীতি বা মিডল-ইস্ট পলিসি অর্থে কথাটা তুলছি। ১৯৭৩ সালের শেষে কিসিঞ্জার আমেরিকান মিডল ইস্ট পলিসি দিয়েছিলেন যা এতদিন ধরে আমেরিকা নিজ স্বার্থ, রাজত্ব সামলিয়েছে। এটা মুখ্যত গালফ রাজতন্ত্রগুলোকে নিজের পক্ষে দাঁড় করিয়ে আমেরিকা এদের ব্যবহার করে গেছে।
    কিন্তু একালে কখন চীন মধ্যপ্রাচ্য এর ভিতরে ঢুকে গেছে আর সব মেরুকরণ উলটে দিয়েছে বাইডেনের আমেরিকা তা টের পাবার আগেই কাজ শেষ করেছে। আমেরিকান ব্যর্থতার শুরু এখান থেকেই। সবচেয়ে দৃশ্যমান হল, ইরান বিপ্লবের (১৯৭৯) পর থেকে লাগাতর সৌদি-ইরান বিরোধ। আমেরিকা এই বিরোধকে আরো উস্কে তুলে সৌদিদের সুরক্ষা দিচ্ছে এই ভান করে আমেরিকা নিজের পক্ষে মানে ইরানকে দাবড়ে বা বঞ্চিত রাখতে এর সুবিধা ব্যবহার করে গেছে। কিন্তু কখন চীনা মধ্যস্থতায় সৌদি-ইরান নুন্যতম একসাথে কাজ করতে সম্মত এমন কূটনীতি-ব্যবসা বিনিময়ে নয়া পথ খুলে ফেলেছে তা আমেরিকা যখন টের পেয়েছে তা অনেক দেরি হয়ে গেছে। চীনা নয়া মেরুকরণে, তুরস্ক, ইরান আর এদিকে মালয়েশিয়া ইত্যাদি মুসলমান-প্রধান রাষ্ট্রগুলো একটা কমন রাজনীতি নীতিমালা যেন অনুসরণ করতে পারে এমন কাছাকাছি চলে এসেছে।
    আবার ওদিকে নয়া আফগানিস্থানে দেখেন;  আমেরিকা বিতাড়িত করে সদ্য মুক্ত আফগানিস্তানে তা-লে-বা-নদের সাথে চীন নয়া ও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। আফগান মাটির নিচের কেবল দামি পাথর উত্তোলন ও তা বাজারজাতকরণ ঘটিয়েই চীন আফগান অর্থনীতি উজ্জ্বল করে দিয়েছে। যদিও বিনিময়ে চীনা রাজনৈতিক  চাহিদা ছিল একটাই যে,  আফগান শাসকদেরকে তাদের দেশের ভিতরে আশ্রয় নেয়া আইএস-কে [খোরাসান] দূরে ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। যারা মূলত সশস্ত্র চিনা উইঘুর গোষ্ঠির আশ্রয়দাতা ও পৃষ্ঠপোষক!  আর ওদিকে  আইএস-কে এখন প্রায়ই গোপনে আমেরিকা পক্ষ হয়ে (এমনকি সময়ে ভারতেরও হয়েও) খেপ মারা এসাইমেন্ট (বোমাবাজি বা হত্যার) করে দেয়। [সম্প্রতি রাশিয়ায় গানের কনসার্টে হামলার ক্ষেত্রে এরা সি আইএ এর হয়ে কাজ করেছে বলে পুতিনের অভিযোগ অনুমান।]।  হিলারি ক্লিনটনের আমলে এরাই একইভাবে ঠিকা নিয়ে লিবিয়াকে তছনছ করে রাস্তায় গাদ্দাফিকে লিঞ্চিং করেছিল। কিন্তু সবটা লাভ হয় নাই। এরাই শেষে বেনগাজি আমেরিকান এমবেসিতে রাষ্ট্রদুত-সহ সকল স্টাফকে হত্যা করে পালিয়ে গিয়েছিল!

    আবার দেখেন, বাইডেনের প্রথম তিন বছরে,  ইরানের উপর আমেরিকা নিরন্তর ডলার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইরানকে পঙ্গু করে রেখে দেওয়ার চেষ্টা করে গেছে। এর বিপরীতে চীন ইরানি তেল কেনার ২৫ বছরের চুক্তি করেছে, বিভিন্ন পণ্য বিনিময়, চীনা বিনিয়োগ আর চীনা ইউয়ান ব্যবহার করতে দিতে দিয়ে চীন ইরানকে এক বিকল্প দুনিয়ার সন্ধান করে দিয়েছে। সারকথায় সব মিলিয়ে এক নয়া ভারসাম্যে নয়া মেরুকরণের মধ্যপ্রাচ্য – এই অর্থে এক নয়া গ্লোবাল অর্ডারের ইঙ্গিতও এখানে আছে। আর এর ভিতর দিয়েই মধ্যপ্রাচ্য রাষ্ট্রস্বার্থগুলো যখন নিজেদের মধ্যেকার স্বার্থ-বিরোধকে যদি সামলে রাখতে পারে তরে সকল রাষ্ট্রই এক এক নয়া মুক্তির দিশা – টানেলের প্রান্তে আলো দেখতে পেতে পারে। এই হল এর সারকথা।   সৌদি আরবও তার ২০৩০ সালের মধ্যে বর্তমানের কেবল তেলবিক্রির উপর নির্ভরশীল এমন  একচেটিয়া নির্ভর করা দেশ নিজ অথনীতিকে তেলের বাইরে এক নয়া অর্থনৈতিক ভিত্তির সৌদি হয়ে উঠতে -যুদ্ধ সংঘাত টেনশেন ও অস্থিতিশীলতা পাশে ফেলে নিজ আকাঙ্খা পূরণ করতে পারে – চীনের নয়া মধ্যপ্রাচ্য নীতিকে সৌদি এখান থেকে দেখছে।
    একটা সাবধানবাণী দিয়ে রাখি।
    এটা চীনপন্থি হওয়া নয়; তা হয়েছে বা হতে ইঙ্গিতও দিচ্ছি না।  সারকথাটা হল, গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল হঠাত সহসা ঘটে না। তবে এখন এটা আসন্ন, তাই সবাই এর সুযোগ নিতে চাইছে – এতে আমেরিকার বিকল্প যে কোন নেতৃত্বের বেলাতেই এমনই ঘটবে। এতে সব রাষ্ট্রই পুরানা বৃত্ত পুরানা রেস্টিকশন বা টেনে দেওয়া সীমা ভেঙ্গে – নয়া কোন ভারসাম্য নিজের পক্ষে গড়ে নিবার সুযোগ হিসাবে দেখবেই। তাতে এই বিকল্প এটা চীন কী না – আমি বা আপনি চীনকে ভালবাসি পছন্দ না ঘৃণা করি বা ভক্ত? সেসব বিচার এখানে একেবারেই গৌণ! এককথায় একমাত্র নিজ নিজ রাষ্ট্রস্বার্থই এখানে প্রধান এক্টর!!
    শেষের ঘটনা দিয়েই যদি বলি, সংকীর্ণ আত্মস্বার্থে পলায়নপর গালফ স্টেট এর লজ্জাজনক ২০২০ সালের কাজ ছিল তথাকথিত আব্রাহাম একর্ড [Abraham accords ] নামে ইরায়েলের সাথে নিজ  নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের প্রটেকশন চুক্তিতে যাওয়া। দুবাই ও বাহারাইন [UAE and Bahrain ] প্যালেস্টাইনিদের ভুলে গিয়ে ই-রায়েলের সাথে এই আপোষ চুক্তি করেছিল।  যেখানে দুবাই ছিল আসলে সৌদি আরবের এডভান্স পার্টি। মানে সোদিদের এই আপোষপথ অনুসরণ করার কথা ছিল। এনিয়ে দ্বিপাক্ষিক সৌদি-ইওরায়েল বৈঠকও চলমান ছিল। কিন্তু গত বছর এপ্রিল ২০২৩ সালে সব উলটে যায়।

    The United Arab Emirates and Bahrain made peace with Israel in 2020 through
    the so-called ‘Abraham accords’ and Saudi Arabia was considering following
    suit in return for U.S. security commitments.

     

    সারকথায়, এই গ্লোবাল পালাবদল এই গ্লোবাল দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে উপেক্ষা করে কোন মধ্যপ্রাচ্য স্থিতিশীলতা দেখতে পাওয়া সম্ভব নয়। অর্থাত প্রধান দ্বন্দ্ব মীমাংসার অংশ নিতে হবে। আর এরই নয়া মেরুকরণের ভিওত্রে ঢুকে এর মধ্যে নিজ নয়া স্বার্থ বের করে আনতে হবে।
    আর একই কথা প্যালেসটাইনের মুক্তির প্রশ্নের নয়া ও বাস্তব দিশা!

    দানব ইসরায়েলি রাষ্ট্র গড় উঠেছে নেতা আমেরিকার প্রশ্রয়ে প্রটেকশনে এবং এখনও টিকে আছে আমেরিকান ডেমোক্রাট বা রিপাবলিক দুদল নির্রবিশেষে এদের প্রশ্রয়ে প্রটেকশনে। চীনের নয়া মধ্যপ্রাচ্য নীতি প্রতিক্রিয়ায় কার্যত ইসরায়েলকে আরো বেশী করে আমেরিকার কোলে উঠিয়ে দিয়েছে যেটা এখন ইউরোপের কোলেও তুলে দিবার সামিল। আর এতেই ওদের আসল নৈতিক সংকটকে উদাম করে দিয়েছে।
    ইসরায়েলকে এবারের ইরানের হামলা থেকে রক্ষা করতে এগিয়েছে কারা? বৃটিশ, ফরাসি আমেরিকা এরা? আর বলছে নাম প্রকাশ করতে চায় না এমন আরো কিছু দেশ! যে অন্যের ভুমি দখলকারি তার আবার নিরাপত্তা দিতে এগিয়ে এসেছে পশ্চিম, এই নৈতিক সংকট এতই দেউলিয়া এখানে!

    পুরানা প্রগতিশীল (ইসলাম কোপানো) ধারণার উপর দাঁড়িয়ে অনেকে বলে থাকেন, যে দানব ইsরায়েল রাষ্ট্রকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা আমেরিকা এনেছে এথেকে দুনিয়াকে মুক্ত হতে নাকি আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ লাগবে। মানে এদের সারকথাটা দাঁড়ায় সে এটা নাকি প্রায় অসম্ভব!!  কিন্তু না, সরি; এই চিন্তা অপরিপক্ক!
    ব্যাপারটা বিশ্বযুদ্ধ হতেই হবে তা না। বিষয়টা হল দানব ইসরায়েল টিকে আছে আর নিরন্তর নুইসেন্স করে যেতে পারছে কারণ একে প্রটেক্ট করছে আমেরিকা। কাজেই গ্লোবাল নেতা থেকে আমেরিকার সরে যাওয়া, চ্যুত হয়া দুর্বল হয়ে যাওয়া এটা ঘটে গেলেই – এটাই একমাত্র প্রয়োজনীয় শর্ত। এখন আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে চলে যাওয়া কী করে ঘটবে তা আমরা নিশ্চিত জাতি না। কিন্তু সেকারণে, এটা ঘটতে আরেকটা বিশ্বযুদ্ধই লাগবে এমন করে কথা বলাটা একেবারেই বোকামি; আর দানব ইsরায়েল রাষ্ট্রের বিলুপ্তি এর বাস্তবায়নের পথ কেবল এটাই বলতে পারা উচিত; দানব ইsরায়েলের বিলুপ্তি অসম্ভব – এমন মানে করা ইঙ্গিতপুর্ণ কথা বলার তো প্রয়োজন নাই। এর চেয়ে গ্লোবাল পালাবদলকে ফলো করা য়ার বুঝতে পারাই যথেষ্ট।

    আমাদের মত দেশের মুসলিম তরুণদের আকাঙ্খার কথা বলছিলাম।  তাদের আকাঙ্খায় থাকা কোন ইসলামি বিপ্লব বা রাজনীতি কতটা সঠিক বা ভাল সে বিচার-পর্যালোচনা এখানে এখন পাশ কাটাবো, প্রসঙ্গটা আলাদা বলে। তবে এর মধ্যে কেবল পরিবর্তনের  আকাঙ্খাটাকে নিয়ে কথা বলব। আর তা করতে চাইলে তাঁদেরকে অন্তত গ্লোবাল প্রধান দ্বন্দ্ব বা পালাবদলের ভিতর দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য নয়া নীতি নয়া মেরুকরণকে দেখতে পারতেই হবে। এটা কেবল ইরানের বা সৌদি রাষ্ট্রের বিচার-পর্যালোচনা নয়। মনে রাখতে হবে প্যালেসটাইন ইস্যু নিজে নিজেই দুনিয়ার প্রধান দ্বন্দ্ব নয়। আসন্ন  গ্লোবাল পালাবদল এই গ্লোবাল দ্বন্দ্বকে ঘিরে যে নয়া মেরুকরণ ঘটছে ঘটবে এই ভিতরেও প্যালেসটাইন ইস্যু বা দানব ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিনাস এই উপস্বার্থ-কে দেখতে পারতে হবে। আর তবেই সফলভাবে এর সমাধান বের করে আনা যাবে। অরুণদের আকাঙ্খাকে অস্থিরতা দিকে নয় বরং স্থিরতা ও গ্লোবাল পালাবদল এই গ্লোবাল দ্বন্দ্বকে বুঝাবুঝির সক্ষমতা অর্জন করতে হবে; কারণ এটাই এখানে মুখ্য হবে। সবচেয়ে বড় কথা চীনা নয়া মধ্যপ্রাচ্য নীতি আর একে ঘিরে মেরুকরণের সময় প্যালেসটাইন ইস্যুর সমাধান ও দানব ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিনাস এই উপস্বার্থ উপযুক্তভাবে প্রোথিত করে নিতে হবে।

    ইরানের এবারের ইসরায়েলে হামলা কেন সীমিত ছিল এর প্রধান কারণ, গ্লোবাল অর্থনীতি এমনিতেই নুব্জ হয়ে আছে বিশেষত করোনা ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বাইডেনের ভুল সিদ্ধান্ত ভুল যুদ্ধ ইউক্রেন থেকে এখন ক্রমশ আরো সব সঙ্কট ছড়িয়ে পড়ছে। গত সাড় তিন বছরে দিশাহীন ডলার অবরোধের নেতি প্রভাব এখন ক্রমশ আরো সবল হচ্ছে – ডলারের বদলে ইউয়ানে গ্লোবাল বাণিজ্যে অগ্রগতি ঘটে গিয়েছে যা খোদ বাইডেনের নীতির প্রতিক্রিয়া – নিজের পায়ে কুড়াল মারা হয়ে উঠতে শুরু করেছে। আমেরিকান মুদ্রাস্ফীতি গত তিনমাসে আরো বেড়েছে আর তাতে ইতোমধ্যেই বাণিজ্য ব্যবস্থায় শঙ্কা ছড়িয়েছে। এর মাঝে যদি ইরানের ইসরায়েল হামলা তীব্র হয় তবে এর ধকল কাটানো মুশকিল হবে। যেমন সবার আগে তেলের দাম বৃদ্ধি পাবে যা এত সংকটের মধ্যেই গড়ে আশি ডলারের মধ্যে ছিল যা এখনও আশি-নব্বই ডলারের মাঝে থাকছে – এটা উথাল-পাথাল হলে সবার আগে উতপাদন ও মুল্যবৃদ্ধিতে সব এলোমেলো অনিশ্চিয়তার পথে হাটবে – যেটা আরেক অর্থে পধান ইস্যু।
    এই স্বার্থেই ইনফরমালি হলেও চীন=-আমেরিকার ম্যাসেজ বিনিময় ঘটেছে।  মধ্যপ্রাচ্য লেবেল এনিয়ে ব্যাপক কটনীতি  কাজ করেছে। রয়টার্স এনিয়ে চারটা রিপোর্টে এসব দেখিয়েছে। এমনকি ইরানের ইওরায়েলে হামলার পরে ইওরায়েল কোন পালটা হামলার চিন্তা করলে তা এই দেশকে নিলে দায়ীত্ব ও পরিণতির দায় নিয়ে করতে হবে বলে বাইডেন হুশিয়ারি দিয়েছেন। ইসরায়েলের যুদ্ধ-ক্যাবিনেটও এখন নিজে একা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না বা চাচ্ছে না। সে বন্ধু-শ্যন্য হয়ে পড়েছে। তাই পশ্চিমা-বন্ধুদেরকেও আর হারাতে চাচ্ছে না বলে এই সিদ্ধান্ত। আর মুখে বলছে ইরানের হামলার পরে তা যতই ক্ষতি ইসরায়েলের হোক না কেন এর কোন প্রতিক্রিয়া তারা এখন না ভবিষ্যতে কখনও দেখাবে।

    আপাতত এতটুকুই!

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ    ১৫ এপ্রিল ২০২৪  রাত ৯ঃ ০০

  • জেনেট ইয়েলেনঃ চীন-আমেরিকার কাছে আসা কী এখন শুরু হবে?

    বাইডেনের আরেক হারঃ
    চীন-আমেরিকার কাছে আসা কী এখন শুরু হবে?
    গৌতম দাস
    ০৮ এপ্রিল ২০২৪   সন্ধ্যা ০৭ঃ ৫২
    https://wp.me/p1sCvy-5vk

     

           U.S. Treasury Secretary Janet Yellen meets with Wang Weizhong, deputy party secretary and governor of Guangdong, … in southern China’s Guangdong province, April 5, 2024. (Pool/AP)

     

    আমেরিকায় বলে ট্রেজারী সেক্রেটারি, ইংল্যান্ডেও বলে ‘চ্যান্সেলার অফ এক্সচেকার’ আর সমতুল্য ভাবনায় আমরা যাকে বলি অর্থমন্ত্রী। তবে অবশ্যই কড়া সমতুল্য বলে কিছু নাই। কারণ, কঠোর বিবেচনায় সবগুলো ধারণাই আবার আলাদা বলেও মানে ট্রেজারী সেক্রেটারি আর অর্থমন্ত্রী এক নয় বলেও প্রমাণ করা যাবে। আমরা এখানে  তুলনীয় অর্থে ট্রেজারী সেক্রেটারি বলতে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের অর্থমন্ত্রী ধরে নিয়ে এখানে কথা বলব। বাইডেনের বর্তমান অর্থমন্ত্রীর নাম জেনেট ইয়েলেন [Janet Yellen]।  নিয়মিত হুঙ্কার দেয়া বাইডেন এর এই অর্থমন্ত্রী জেনেট চীনের কাছে এক আর্জি নিয়ে চীন সফরে গেছেন ও আছেন। একলম্বা সফর এপ্রিল ৩-৯ জুড়ে [From April 3-9,…… ] চলবে এই সফর বলে জানিয়েছে চীনের অবস্থিত আমেরিকান এমবেসী। কেন এই সফর তা এককথায় বললে, আমেরিকান এক রাজ্য জর্জিয়ার সোলার বিদ্যুৎ কোম্পানীগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সোলার কোম্পানি বলতে যারা electric vehicles, solar cells and lithium batteries ইত্যাদি এসব সম্পর্কিত পণ্য উতপাদক! কেন, আর তাতে চীনের সাথে এর সম্পর্কটা কী?

    জেনেটের নিজ সরকারী বিবৃতির ভাষায় বললে, ……because it could not compete against large quantities of goods that China was exporting at artificially depressed prices. সারকথাটা বাংলা করে বললে – “  চীনে উতপাদিত এই পণ্য উতপাদনের বিপুল সক্ষমতা ও তুলনামূলক কম-মুল্যের সাথে সমতুল্য আমেরিকান কোম্পানিগুলো পেরে না উঠাতে[could not compete] “ –  আমেরিকান কোম্পানিগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
    পাঠককে পরিস্কার করে দেই এটা কোন নিউজ এজেন্সির রিপোর্ট থেকে কোট করি নাই। এটা জেনেটের নিজ মন্ত্রণালয় এর ওয়েব সাইটে প্রকাশিত জেনেটেরই বিবৃতি। তাই কোন ভিন্ন ব্যাখ্যা বা অর্থের ভিন্নতার সুযোগ নাই। আর, এখন আসি যে জেনেট ঠিক কী চাইতে চীনে এসেছেন? রয়টার্স লিখেছে, ...concerns are growing over the global economic fallout from China’s excess manufacturing capacity, বাংলায় সারকথা – এই পণ্যের গ্লোবাল মার্কেটে [এখানে গ্লোবাল মার্কেট বলতে মুলত আমেরিকান মার্কেটের উদ্বেগ বুঝতে হবে ] উতকন্ঠা বাড়ছে চীনের অতি-উতপাদন সক্ষমতার সাথে পারছে না বলে!!

    জেনেট কী আশা নিয়ে চীন সফরেঃ
    জেনেট কী আশা নিয়ে চীন সফরে তা বুঝবার সহজ পথ হল,  সফরে আলোচনা শেষে তিনি কী পেলেন এনিয়ে তার নিজের ওয়েব সাইটে প্রকাশিত বিবৃতি পাঠ – এটাই সবচেয়ে ভাল সোর্স। সেই বিবৃতিটা এখানে পাওয়া যাবে।  এই বিবৃতির শিরোনাম – Statement from Secretary of the Treasury Janet L. Yellen on Announcement of New U.S.-China Initiatives Following Meeting -। আর ওর ভিতরের অংশ ছোট ছোট করে তুলে এনে বাংলায় পাঠককে দেখাবো এখন।

    ভিতরের বক্তব্য ১ঃ
    উচ্ছসিত খুশি প্রকাশ করে জেনেট ইয়েলেন বলছেন,
    আমি খুবই খুশি যে আমরা (তিনি ও চীনা প্রতিনিধি) একমত হয়েছেন যে তারা দুইটা তাতপর্যময় নয়া উদ্যোগ চালু করতে পেরেছেন। এতে কী হবে? এতে “আমেরিকান শ্রমিক ও কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষা পাবে আর এতে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ রক্ষিত হবে” – জেনেট বলছেন। সারকথায় এতে চীন আমেরিকান কোম্পানিগুলোর জন্য গ্লোবাল বাজারের কিছু অংশের ভাগ আপোষে আমেরিকাকে ছেড়ে দিবে।  আর সেটাই জেনেট কথিত  “two significant new initiatives”, আর এটাই এই সফরে তাঁর চীনের কাছ থেকে অর্জন! 

    “I am pleased that we have agreed to launch
    two significant new initiatives that will advance
    the interests of American workers and firms
    and help protect U.S. national security.”

    ভিতরের বক্তব্য ২ঃ
    এক নম্বর অর্জন হল, জেনেট বলছেন যে, “এখন চীন-আমেরিকা তাদের আভ্যন্তরীণ ও গ্লোবাল অর্থনীতির ইস্যুতে এক ভারসাম্যপুর্ণ অর্থনৈতিক উন্নতি [মানে আমেরিকাকে ছুড়ে ফেলে একক চীনা উন্নতি নয়] পথে গভীর নিচ পর্যন্ত স্বার্থ-মতামত বিনিময় করতে পারব। আর এতে চীনের অতি-উতপাদন সক্ষমতায় ভারসাম্য টানাসহ সাথে আমি এখানে সুযোগ নিব যাতে আমেরিকান কারখানা আর শ্রমিকেরা চীনের কাছে থেকে একটা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিজেদের জন্যও পায় – এদিকে চীন যেন খেয়াল রাখে। আমি বিশেষ করে কিছু সুনির্দিষ্ট উদ্বেগ প্রসঙ্গে খেয়াল রাখব যেমন কিছু উতপাদন সেক্টরে সরকারী সহায়তায় চীনের অতিউতপাদন সক্ষমতার ধাক্কা যা আমাদের উপর পড়ছে আর এই ধাক্কা আমেরিকান অর্থনীতির উপর পড়ছে”।

    First, we agreed that the U.S. and China will hold intensive exchanges on balanced growth
    in the domestic and global economies. These exchanges will facilitate a discussion around
    macroeconomic imbalances, including their connection to overcapacity, and I intend to
    use this opportunity to advocate for a level playing field for American workers and firms.

    I am particularly concerned about the impact of Chinese industrial overcapacity in
    certain sectors as a result of government support, and the impact it could have on
    the American economy. 

    ভিতরের বক্তব্য ৩ঃ
    এটা হল জেনেটের বলা এই সফরে তাঁর দ্বিতীয় তাতপর্যপুর্ণ অর্জন প্রসঙ্গে। কী সেই অর্জন?
    চীন-আমেরিকা দুদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যায়ে গ্লোবাল অর্থনীতিক নিয়ন্ত্রণ আনার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা।  এখানে দুদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুঝাতেই শব্দদুটো হল, Treasury-PBOC Cooperation।  যেখানে টেজারি হল জেনেটের মন্ত্রণালয় আর PBOC  মানে হল পিপলস ব্যাংক অফ চায়না – চীনে আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংক সমতুল্য তাদের প্রতিষ্ঠানকে বুঝাতে তা PBOC নামে ডাকা হয়। এবং এই সহযোগিতা বিনিময় হবে বিদেশে অর্থপাচার বিরোধী কাজগুলোতে পারস্পরিক সহযোগিতা।

    Second, we agreed that the U.S. and China will start Joint
    Treasury-PBOC Cooperation and Exchange on Anti-Money
    Laundering to expand cooperation against illicit finance
    and financial crime.
     

    অর্থাৎ এই পুরা সফরটার একটাই উদ্দেশ্য ছিল – সেটা হল, চীন-আমেরিকান সহযোগিতা, বিরোধ না।  কিন্তু সেটা এত দেরিতে এই বোধোদয় এত দেরিতে কেন? 

    চীন-আমেরিকান বিবাদ কী ও কেনঃ
    শুরুতে এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি গত ৩ এপ্রিল ২০২৪ মানে জেনেটের সফর শুরুর একই দিনে তবে কিছু আগেই,  বাইডেন-শি এক গুরুত্বপুর্ণ টেলিফোন কথোপকথন করেছেন। শি  মানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং  [Xi Jinping]। এই কথোপকথন নিয়ে আগ্রহিরা এই দুটা রিপোর্ট দেখতে পারেন। APnews আর  REUTERS  এদুইটা হল বিখ্যাত তিন গ্লোবাল নিউজ এজেন্সীর অন্যতম দুই কর্ণাধার। এটা পাঠক যারা এই প্রসঙ্গের গভীরে ঢুকতে চান তাদের জন্য।  তবে সারকথাটা বলে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন তার চারবছরের ক্ষমতা-আয়ুর তিনবছর তিন মাস পার করে ফেলেছেন; এছাড়া আর ছয়মাস (নভেম্বর ২০২৪ এর প্রথম সপ্তাহে)  এর মধ্যে তাকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরীক্ষা দিয়ে নিজেকে পাস দেখাতে হবে।  আর মিডিয়ায় জোর অনুমান পরিস্থিতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে যাবে। সে যাই হোক এই সময়কালে বাইডেন গড়ে বছরে একবারের কিছু বেশী হয়ত চীনা প্রেসিডেন্টের শি সাথে এমন  ফোনালাপ করেছেন! অর্থাৎ বাইডেনের নীতি ছিল চীন-মার্কিন অসহযোগিতা। এর পিছনের মূল কারণ কী?

    এটা পালাবদলের যুগ চলছেঃ
    এর পিছনের মূল কারণ বলতে প্রথমে যা আমাদেরকে বুঝতে হবে এটা পালাবদলের যুগে প্রবেশ করেছি আমরা।  এটা পালাবদলের যুগ মানে হল, গত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকা সেই যে গ্লোবাল নেতা হয়ে বসেছিল সেটা এখন ফুরিয়ে আসছে আর বিপরীতে চীন সেই আসনে গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠে আসতে চাইছে। এখানে গ্লোবাল নেতা বলতে – কোন দেশের অর্থনীতি এখন সবাইকে ছাপিয়ে সারপ্লাস বা নয়া বাড়তিমূল্য নিজ অর্থনীতি জমা করতে পারছে – যার সোজা অর্থ হল অন্য দেশের অর্থনীতিকে ঋণ-বিনিয়োগ দিবার নেতা হয়ে উঠছে এরই হিসাবের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলা। আর বলাই বাহুল্য অন্যদেশকে বিশেষ করে আমাদের মত দেশকে অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় সুদহীন বিনিয়োগ দেয়া আর সাথে ডাইরেক্ট বিনিয়োগ হিসাবে বাণিজ্যিক পুঁজি ধার দেয়া  – একাজে এখন সবার উপরে সক্ষম রাষ্ট্র হল চীন। আমাদের মত কলোনি দখল হয়ে থাকা দেশ থেকে দখলদারেরা ২০০ বছরের সারপ্লাস সব লুটে নেয়া হয়েছিল। ফলে এই ঘাটতি যে রাষ্ট্র মিটিয়ে নয়া আশার আলও যে এগিয়ে আসে সেই চীনের প্রভাব আমাদের উপর থাকবেই!  এটাকে ইতিবাচক দেখা হবে, স্বাভাবিক! এটা পন্থি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না – যে আপনি কাউকে বলবেন যে উনি আমেরিকা ছেড়ে চীন-পন্থি বলেই নাকি তিনি দেশে চীনা বিনিয়োগ-সহযোগিতাকে ইতিবাচক দেখছেন। সবচেয়ে বড় কথা গত প্রায় ৮০ বছর এই ভুমিকাতেই আমেরিকা গ্লোবাল নেতা ছিল!
    এককথায় বললে, আমাদের মত সব গরীব খাতক-দেশকে  অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় সুদহীন বিনিয়োগ [development loan] আর সাথে ডাইরেক্ট বিনিয়োগ [FDI] যে দাতা দেশ দিতে পারে সেই-ই গ্লোবাল নেতা ধারণাটার সারকথা!
    উলটা দিকে চীনের এই উত্থান এটা ততই আমেরিকার গ্লোবাল নেতা স্টাটাস ও সক্ষমতা শুকিয়ে যেতে থাকছে ও থাকবে এটা স্বাভাবিক। এককালের এমন গ্লোবাল নেতা বৃটিশ সরকারেরও মুরোদ এভাবে শুকিয়েছিল বলে আমেরিকার উত্থান হয়েছিল।

    কিন্তু এটা আমেরিকার কোন প্রেসিদেন্ট (বিশেষ করে ২০০০ সালের পরের কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট) শেষে ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন নাই। ভেবেছেন তাদের সামরিক সক্ষমতা ও গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান সমুহকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা তো অটুট আছে – এই ভাবনা থেকে। তবে একটা লাইন টেনে বলা যায় ২০১৭ সাল পর্যন্ত আমেরিকান প্রতিটা প্রেসিডেন্ট যে নীতি অনুসরণ করেছেন তা হল, চীনের কাছে যাওয়া আর একটা না একটা সেক্টরে নিজের অর্থনীতির জন্য বাজার ছাড় চীনের থেকে নিয়ে এসেছেন।  সবচেয়ে বড় কথা চীনও এই সহযোগিতা করে গেছে। সবচেয়ে বেশী এখন সহযোগিতা নিয়ে এসেছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা (দুই টার্মের ওবামা ২০০৯-২০১৬ সময়কালে)। আর এটাই এই একই চীনা সহযোগিতা টোকাতে এখন বের হয়েছে এখনকার প্রেসিডেন্ট বাইদেন।

    এমনকি ডনাল্ড ট্রাম্প ২০১৭ সালে ক্ষমতায় এসে প্রথম বছরও একই নীতিতে চীনা বাজার সহযোগিতা টোকানো – তা এনেছেন। কিন্তু পরের বছর থেকে ট্রাম্পের নয়া রাস্তা হয়ে যায় অসহযোগিতা – মানে সংঘাতে মোকাবিলার পথে যাওয়া। শুরু হয় আমেরিকায় চীনা আমদানি নানা পণ্যের উপর ইচ্ছামত কর আরোপ – এটা ছিল ২৫% থেকে ৬৬% পর্যন্ত করারোপ। যদিও ট্রাম্পের শপথের পর থেকে যে নীতি ঘোষণা করেছিলেন তিনি তা হল অর্থনীতির গ্লোবালাইজেশন আর নয়। মানে ১৯৮০ সাল থেকে  অর্থনীতির গ্লোবালাইজেশন এর নেতা ছিল খোদ আমেরিকা। এটা ছিল তথাকথিত অর্থনীতিক জাতিবাদ – এই মৃতপ্রায় নীতির বিপরীতে অর্থনীতির গ্লোবালাইজেশন  এর পথে দুনিয়াকে সঠিকভাবেই ঠেলে দেওয়া। অথচ ট্রাম্পই প্রথম ২০১৭ সালে ক্ষমতার শপথের পর থেকেই পুরানা  অর্থনীতিক জাতিবাদ   কে কতটা ফিরিয়ে আনা যায় এই ব্যর্থ পথে তিনি ফিরে রওনা দিয়েছিলেন। যদিও এর মূলধারা হোয়াইট সুপ্রিমিজম [সাদা ককেশীয়রাই শ্রেষ্ঠ জাতি] ধারণা। একি কারণে, তিনি আমেরিকার একাই ন্যাটো [NATO] এর ৯৫% খ্রচ যোগানো ত্যাগ করার পক্ষে। তিনি কোন গ্লোবাল নেতা থাকার ব্যয়ভার বইতে রাজি ছিলেন না।
    বিপরীতে বাইডেনও তাই তবে একটু ঘুরিয়ে ভিন্ন পথে।
    যেমন চীনা পন্যে বাড়তু করারোপ যা ট্রাম্প করে গেছিলেন তিনি তা বন্ধ না করে সেটাই চালিয়ে গেছেন, এখনও চালু আছে। আর বাইডেনও  হোয়াইট সুপ্রিমিষ্ট নীতি নিয়েছেন। তবে তফাত হল, ট্রাম্প আমেরিকার ভিতরের সাদা বাদ বাদামি বা কালো লেবার তাড়িয়ে দিবার পক্ষপাতি – মেক্সিকো বর্ডার পারলে পুরা ল্যাটিন আমেরিকান বর্ডার বন্ধ করতে চান। বিপরীতে বাইডেন দেশের বাইরে হোয়াইট সুপ্রিমিষ্ট নীতি অনুসরণ করে গেছেন। সারকথায়, দুনিয়ায় সাদা ককেশীয় শাসন কলোনি দখলদারের হাতে যার বয়েস হয় প্রায় পাচশ বছর।  তিনি তাই  ইইউ-কে সাথে এই সাদা শাসন আরো চালিয়ে যেতে চান। কেন? চীন গ্লোবাল নেতার আসনে বসে যাওয়া মানে পশ্চিমা সাদা শ্রেষ্ঠত্ব এর শাসনের দিনের শেষ হবে। আর এখান থেকে ইউক্রেনকে সামনে রেখে রাশিয়ার সাথে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের লড়াই এর শুরু। তবে তাদের ময়ল আগ্রহ ছিল রাশিয়ার অবস্থা খারাপ হলে চীন তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসে সামরিকভাবে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের কাছে হেরে যাবে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে চীন গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠলেও এই কৌশলে চীন হেরে লোপাট হয়ে যাবে আর দুনিয়া সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের শাসন টিকে যাবে – চলতে থাকবে। যদিও চীন দূরে থেকেই রাশিয়াকে সহযগিতা দিয়্বে গেছে।  আর বাইডেনের ডলার অবরোধ কাজ করে নাই। উলটা ইন্ডিয়া রাশিয়াত সস্তা তেল নিয়ে রপ্তানিকারক হয়ে অর্থ লুটেছে আর ও দিকে রাশিয়াও বিদেশি মুদ্রার সমস্যায় না পরে উলটা রিজার্ভ বাড়িয়েছে সোনা কিনেছে।
    বাইডেনের টানা তিন বছর ছিল তথাকথিত গণতন্ত্র-মানবাধিকার এর পররাষ্ট্রনীতি আর সাথে ডলার অবরোধ সহ নানান ধরণেরস্যাংশন আরোপ করার নীতি। তিনি দাবি করে এসেছিলেন আমেরিকার এসব অস্ত্র লুকানো অবস্থায় পড়ে আছে আর তিনি এসব অস্ত্র ব্যবহার করে দুনিয়া থেকে চীনা প্রভাব কাটাবেন।
    এরই সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র ও প্রদর্শন স্থল ছিল সাউথ চায়না সি – অন্যভাষায় বললে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাতেজি দিয়ে চীনকে একঘরে করবার খায়েস। যেমন বাংলাদেশকেই চীনা বিনিয়গসহ সব ধরণের প্রভাব মুক্ত করা এর লক্ষ্য ছিল।

    কিন্তু গত সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে আমেরিকা আমাদেরকে পথে ফেলে চলে যায় শুধু তাই না। এবার আবার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে যায়।

    বাইডেন এখন চীনের সাথে ফিরে সহযোগিতার লাইনেঃ
    আর সব হারিয়ে অর্জন-শুণ্য বাইডেন এখন চীনের সাথে ফিরে সহযোগিতার লাইনে!!!! নিজ কারখানা-কোম্পানি বাঁচাতে এখন চীনের কাছেই হাত পাতা।
    সগযোগিতা অবশ্যই সঠিক ও বিনা-যুদ্ধের পথে স্বার্থ-দ্বন্দ্ব এর মোমাংসার পথ!! তার মানে বাইডেনের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাতেজি করে কোন লাভ হয় নাই। ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি একটা পুরাটাই ভুল পথ ভুল সিদ্ধান্ত ছিল!!!  সবটাই গচ্চা গেছে পানিতে। ডোনাল্ড ল্যু এই কথিত মহান ব্যক্তিত্বকে তাহলে আসলে বাইডেনের দরকার ছিল না, দুনিয়ারও না।  উনি তাহলে একতা খামোখা ছিলেন!!!! নাকি তাই তো? 

    তাহলে আমাদের আম-স্বার্থ, রাষ্টড় রাজনীতি ও অধিকার এসবের যে ক্ষতি বাইডেন করে গেলেন এর দায় কে নিবে এখন???
    এসবের সোজা মানে এক ভারত ছাড়া দুনিয়াতে কেউ আর আমেরিকাকে বিশ্বাস করবে না! 

    এরপরেও আবার বাইডেনের আয়ূ আর মাত্র ছয় মাস। যদি ট্রাম্প বাবাজি জিতে আসেন তো সেক্ষেত্রে কী হবে?
    কথা একটাই, আমাদের রাস্তা আমাদের স্বার্থ নিয়ে আমাদেরকেই ভেবে-চিন্তে  আর সর্বোপরি শত্রু-বন্ধু বুঝে ফারাক করে উঠে দাঁড়াতে হবে!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ     মার্চ ২০২৪    সন্ধ্যা
    আপডেটঃ     মার্চ ২০২৪   রাত