Category: Politics

  • চীনের ‘গায়েব’ কালচার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিন গ্যাং

    চীনের ‘গায়েব’ কালচার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী চিন গ্যাং
    গৌতম দাস

    ২৯ জুলাই ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4LB

     

    Where is China’s foreign minister?

     

    চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী একমাস গায়েব ছিলেন; মানে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে গেলেও মাফ পান নাই। তিনিও ডিসাপিয়ার্ড [dissappeared]  হতে পারেন এবং হয়েছেনও। ‘পার্টি’ যে কাউকে এমন শিকার হতে বাধ্য করতে পারে!!!  কী ‘সুন্দর’ একটা প্রাকটিস তাই না!!! এটা চরম ভীতিকর, অগ্রহণযোগ্য! এটা রাজনীতি হতে পারে না!  সেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পর্কে সরকার থেকে গত ২৫ জুলাই এরপর জানালো হল যে তিনি সদ্য অপসারিত হয়েছেন। আর সেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম চিন গ্যাং [QIN GANG]। উনার সরকারী বায়োডাটা উনার নামের সাথে দেয়া লিঙ্কে বা এখানে পাওয়া যাবে।   চীনা শব্দের সঠিক উচ্চারণ নিয়ে বিতর্ক সবসময় হয়। তারা নিজেরাই দুবার উচ্চারণের স্টাইল বদলিয়েছে এটাও  এর এক কারণ। যেমন মাও সে তুং [ইংরেজি: Mao Zedong ] আর হবে না, মাও জে দং বলতে হবে, এ’হলো এমনই এক বদল। তবে এখানে এখন যে তত্ব ফলো করেছি সেটা হল চীনা শব্দ যেটা ইংরাজি ‘Q’ শব্দ দিয়ে করা হয় এর (ফোনেটিক্যাল) উচ্চারণ করতে হবে চ [ch]। আর এই সুত্রে নামটা চিন গ্যাং [QIN GANG] লিখেছি। যদিও অনেকে ইংলিশ ফোনেটিক বা আক্ষরিক উচ্চারণের নীতি অনুসরণ করলে বলবেন এটা কুইন [QIN]। নাম বা উচ্ছারণের প্রসঙ্গের এখানেই ইতি টানছি।

    এই অপসারণের মাধ্যমে চীনা কমিউনিস্টদের কালচার-চর্চার বিরুদ্ধে যে কঠোর সমালোচনা দুনিয়া জুড়ে চালু বা অগ্রহণযোগ্যতা আছে তাতে এখন আরেকটা বাজে উদাহরণ বা কলঙ্কের মুকুট যোগ হলো। বুঝা গেল এমন কলঙ্কের ঘটনা সহসা বা সহজেই চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে ছেড়ে যাচ্ছে না। চীনা কমিউনিস্টদেরও এথেকে মুক্তি নাই। বদনাম যা হয়েছে  ও দাগ যা লেগেছে তা আরো বয়ে বেড়াতে হবে।

    কেন এটা কলঙ্কঃ
    চিন গ্যাং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন মাত্র সাত মাস আগে। রয়টার্সের এক বিস্তারিত রিপোর্ট চিন গ্যাং এর ঠিকুজি মানে জন্ম ও কর্ম-বৃত্তান্ত সব ছাপিয়ে দিয়েছে। রয়টার্সের সেই রিপোর্টের শিরোনাম – “চীনা চিন গ্যাং এর উল্কাগতিতে উত্থান ও মুহুর্তেই পতন” [China’s Qin Gang had meteoric rise and swift removal]।  সেখানে দেখা যাচ্ছে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে এক বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় আছে University of International Relations [UIR] এই নামে। বুঝাই যাচ্ছে এটা ‘আই আর’ মানে ‘ইন্টারন্যশনাল রিলেশনস’ বা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক; মানে যা কেবল বা মূখ্যত বৈদেশিক বা পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক স্টাডির এক বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয়। রয়টার্সের ভাষায়, এটা খুবই প্রেস্টিজিয়াস [prestigious] বা উচ্চমানের বিশ্ববিদ্যালয়।  চিন গ্যাং সেখান থেকে গ্রাজুয়েশন করেই সরকারের কুটনীতিক সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন। সেই থেকে টানা দীর্ঘদিন পররাষ্ট্র বিভাগেই দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পোস্টিং পেয়ে চলেছেন। এতে তিনি দুইদুবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হয়েছিলেন, দুবার ওর প্রটোকল অফিসারও। শেষে বৃটেনে চীনা রাষ্ট্রদুত ছিলেন। আর একেবারে শেষে গত ডিসেম্বর ২০২২ সালে মানে এখন থেকে সাতমাস আগে, খোদ চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিশাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। আর এর ঠিক আগে পর্যন্ত ছিলেন আমেরিকায় চীনা রাষ্ট্রদুত।
    বলা হয়েছে ৫৭ বছর বয়স্ক তিনি এপর্যন্ত চীনের সর্বকনিষ্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। আবার কমিউনিস্ট পার্টি রেওয়াজের কারণে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে যাওয়াতে পরে আরেক গুরুত্বপুর্ণ পদ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পলিটবুরোর মেম্বার হয়ে যান চিন গ্যাং। যা পার্টির সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর সক্রিয় কমিটি।   তাঁর নিয়োগের পর থেকেই মিডিয়ায় বলা শুরু হয়, তিনি বর্তমান চীনা প্রেসিডেন্ট শি এর নেকনজরে আছেন; তাই  চিন গ্যাং এর এই খাঁড়া উত্থান। প্রেসিডেন্ট শি তুলনায় কমবয়সীদের সুযোগ দিতে চান – এর সুবিধাগুলো কাজে লাগাতে চান তাই নাকি ‘এই উত্থান’। এমনকি অনেক বিশ্লেষক বা বিশেষজ্ঞরাও অনুমান করে বলা শুরু করেছিল যে , চীন-আমেরিকার সম্পর্ককে শক্ত ও গঠনমূলক স্থিতিশীলতা [to help stabilise relations with the U.S] দেওয়ার জন্যই নাকি প্রেসিডেন্ট শি এর এই  পরিকল্পনা। বিশেষ করে অ্যামেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেনের সাথে তাঁর প্রথম লম্বা বৈঠকের পরেই এই জল্পনাকল্পনা শুরু হয়েছিল।

    কিন্তু হায়! সব ভুল প্রমাণিত হয়ে গেল। সব মিথ্যা আর সবকিছুই ‘না’ করে দিয়ে, মাত্র সাতমাসের মাথায় সব ভেঙ্গেচুড়ে ছাড়খার হয়ে গেল। গত ২৫ জুনের পর থেকেই চিন গ্যাং “জনসমক্ষে অনুপস্থিত” হতে থাকলেন।  চীনা গায়েব হয়ে যাওয়ার সেই ট্রাডিশন আবার চালু হয়ে গেল।  কেউ তাঁকে আর জনসমক্ষে দেখতে পেল না। তবে একবার গায়েব ঘটনার কেবল দুসপ্তাহ পরে (১১ জুলাই) তাঁর মন্ত্রণালয় জানালো যে অজানা স্বাস্থ্যগত কারণে তিনি নাকি তার পুর্ব নির্ধারিত ইন্দোনেশিয়া সফরে যাচ্ছেন না। এতটুকুই।  এরপর?

    এরপর আকাশ থেকে ফেলে দেওয়া। মানে তিনি মোট প্রায় এক মাস গায়েব থাকার পরে,  গত ২৫ জুলাই এর সরকারী ঘোষণায় জানানো হল যে চিন গ্যাং-কে অপসারণ করা হয়েছে। আর এর সাথে জানানো হয়েছিল যে আগের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই [Wang Yi ] কে আগের জায়গায় মানে নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে স্থলাভিসিক্ত করা  হয়েছে। এভাবে চীনের মানে, কমিউনিস্টদের এই কলঙ্ক বাড়ছে তো বাড়ছেই।

    কমিউনিজম আর ইনসাফ কী পরস্পরবিরোধীঃ
    কমিউনিজম আর ন্যায় (বা ইনসাফ) এর ধারণা এদুটো যেন একসাথে চলতেই পারবে না, এরা পরস্পর বিরোধী।  সম্ভবত কমিউনিস্ট পার্টির কাছে তাই। সেই যে লেনিনের [Vladimir Lenin] হাতে দুনিয়াতে প্রথম (১৯১৭) কমিউনিস্ট বিপ্লব ঘটেছিল কিন্তু তা সত্বেও ন্যায়ের ধারণা কমিউনিস্টদের হতে পারল না। সেসময়ই বিপ্লবী লেনিন প্রথম যে হোচট খান তা হল, তারা বলশেভিক বিপ্লবীরা বা তাদের বলশেভিক পার্টি বিপ্লবের প্রথম গণভোটেই ফেল করেছিলেন। আর সেই থেকে পাবলিক ধারণাটার উপরেই কমিউনিস্টদের বিতৃষ্ণা এসে যায়। বলা যায় “পাবলিক” এই কনসেপ্ট এটা সেই থেকে পার্টি ও সারা দুনিয়ার কমিউনিস্টদের জন্য আর আপন হয় নাই ও ক্রমশ পাবলিক বা জনস্বার্থ ধারণাটা অপ্রয়োজনীয় হয়ে থেকে যায়। অবস্থা হয় এমন যেন – “হারামজাদা জনগণ তোরা থাক, আমরা চললাম সুন্দরবন”।  এমনিতে এই সোভিয়েত বিপ্লবের আগে থেকেই,  তাত্বিকভাবে বললে কমিউনিস্ট থিওরিতে কার্যত ‘পাবলিক’ বা জনগণ ধারণাটাই নাই। কথাটা শুনে অনেকের অদ্ভুত লাগতে পারে, অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। মনে হতে পারে আমি মিথ্যা বলছি বা প্রপাগান্ডা করছি। কিন্তু আপনারা কমিউনিস্টেরা নিজেই নিজেকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন। কেবল আগেই ধরে নিবেন না যে পাবলিক বা জনগণ ধারণাটা আছে; বিশেষত বিপ্লব বা ক্ষমতাদখলের পরে।  কিন্তু কেন নাই?

    কী জিজ্ঞাসা করবেনঃ
    ছোট্ট উত্তর – জনগণ ধারণাকে কমিউনিস্টেরা ‘শ্রেণী’ বলে এক ধারণা দিয়ে বদলে নিয়েছে কেন, তা জিজ্ঞাসা করবেন। 
    ‘সমাজটা শ্রেণীতে বিভক্ত’
    – এটা কমিউনিস্টদের খুবই কমন কথা। আর খুবই ডিপ রুটেট – মনের গভীরে ঢুকে থাকা তাদের এক ধারণা এটা। এমনকি এটা তাদের গর্ব করার এক ধারণা।   “তাই সবকিছুকে শ্রেণী দিয়ে, শ্রেণীর ভিত্তিতে বিচার করে দেখতে হবে”; এই হল কমিউনিস্টদের দাবি ও অনুমান।  অর্থাৎ কমিউনিস্টেরা বলছে – শ্রেণী নির্বিশেষে –  সাধারণভাবে জনগণ বলে কিছু নাই। বরং আছে কেবল শ্রেণী। কথা বলতে গেলে মানুষকে কোন না কোন শ্রেণীর পক্ষেই কথা বলা হয় বা হয়ে যায়, যাবেই – বলে কমিউনিস্টেরা বিশ্বাস করে। এটাই কমিউনিস্টদের আদি ও মৌলিক বক্তব্য অবস্থান। তা নিশ্চয় কমিউনিস্টেরা অস্বীকার করবেন না।  যেমন পাবলিক ইন্টারেস্ট বা গণমানুষের স্বার্থ, গণস্বার্থ বলে তাই শ্রেণী-বুঝের কমিউনিস্টদের কাছে কিছুই নাই। গণস্বার্থ নয় তাদের আছে শ্রেণী স্বার্থ ধারণা। ঠিক কিনা নিজেকে জিজ্ঞাসা করে নেন, একান্তে।  যারা সতর্ক কমিউনিস্ট তারা পাবলিক আর শ্রেণী ধারণার ফারাকটা স্বযত্নে মনে রাখেন।

    কিন্তু এই শ্রেণী ধারণার কারণেই এরপরে আর পাবলিক বলে কোন ধারণা কমিউনিস্ট সাহিত্য বা ভোকাবুলারি থেকে বাদ হয়ে যায়। ( এখানে পাবলিক, মাস পাবলিক (mass public), জনগণ বা আম-জনতা ইত্যাদি এসব ধারণাগুলোকে এককথায় পাবলিক বলা হয়েছে)। কেন বলছি? কারণ পাবলিক কথাটার অর্থ শ্রেণী নির্বিশেষে আম-জনতা।  আবার আরো আগিয়ে জনগণ বলতে যদি সিটিজেন বা নাগরিক ধারণাটার দিকে যদি আগাই তাহলে নাগরিক কথাটাও আর কমিউনিস্টদের থাকে না;  আসলে নাইও। কমিউনিস্টরাই উলটে নাগরিক ধারণাটাও তাদের বলে দাবি ছেড়ে দিয়েছে; তাদের কঠোর শ্রেণীবোধ এর কারণে। এককথায় কমিউনিস্ট চিন্তায় শ্রেণী ধারণাটা সব ধারণার আগে বা সেন্ট্রাল করে রাখাতে এই  পাবলিক বা নাগরিক ধারণা কমিউনিজমে নাই; তারা আর থাকতে পারে নাই এমন হয়ে গেছে। মূলত সোভিয়েত বা রাশিয়ান বিপ্লবের পরেই এমনটা স্পষ্ট করেই হয়ে গিয়েছে।
    যদিও পরে ১৯৪৯ সালের মাওয়ের চীন বিপ্লবের বেলায়ও শ্রেণী ধারণাটা সেন্ট্রাল শুধু না, সম্ভবত আরও কড়াভাবে সেন্ট্রাল বা মুখ্য করা হয়। যেমন মাওবাদীদের ক্ষেত্রে সবধারণার শুরু শ্রেণীদ্বন্দ্ব ধারণা থেকে আর শ্রেণীদ্বন্দ্ব ধারণা দিয়ে। তাই এখানেও বাস্তবত  পাবলিক বা নাগরিক ধারণা চীনা কমিউনিজমেও নাই।  কিন্তু তবু একটা কিন্তু করে রাখা হয়েছে। ডেকোরেটিভ (decorative) বা অর্নামেন্টাল (ornamental) অর্থে  মানে বাংলায় বললে, কেবল অলংকারে সাজানো অর্থে  পিপলস [peoples] শব্দটার ছড়াছড়ি আছে চীনে।  যদিও এটা ঠিক পাবলিক বা জনস্বার্থ বলতে যা বুঝাই পিপলস এর অর্থ এখানে ঠিক তা নয়। খুব সম্ভবত দুনিয়ায় দ্বিতীয় কমিউনিস্ট বিপ্লব হিশাবে চীনা বিপ্লব; ফলে রাশিয়ান বিপ্লবের অনেক কিছুর দায় বা সাথে মিলিয়ে চীনের নিজের বিপ্লবকে ব্যাখ্যা করতে হয়েছিল। তাতে সোভিয়েত শব্দ ও ধারণাটা যেটা রাশিয়ান বিপ্লবের মুখ্য বৈশিষ্ট – যার একচুয়াল অর্থ পাড়া মহল্লা বা এলাকার প্রতিরোধ কমিটি। বাংলাদেশের সাথে তুলনায় আমাদের যেকোন আন্দোলনে যেটা আমরা বলি “সংগ্রাম পরিষদ” – এটাই সেই সোভিয়েত ধারণার বাংলাদেশীকরণ। [এটাই দাদা সিরাজুল আলম খানের এক সুচিন্তিত অবদান]।
    রাশিয়ান বিপ্লবে লেনিন ও সহযোগীদের সমস্যা ছিল এটা কেমন বিপ্লব বলে তারা পরিচয় করাবে? তাদের বহুকাঙ্খিত রাশিয়ান কমিউনিস্ট বিপ্লবকে [তাঁরা ইউরোপে যেমন হয়েছিল রিপাবলিক বিপ্লব মানে রাজা-বাদশার শাসনের বিপরীতে প্রথম জনগণের শাসন বা পিপলস রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠন বলে থাকে] – যেটাকে আবার কমিউনিস্টেরা তাদের চোখে বুর্জোয়া বিপ্লব বলে চিনিয়ে এসেছে – তাই তারা কোনভাবেই রাশিয়ান কমিউনিস্ট বিপ্লবকে এসব পুরানা শব্দের কোনটাই ব্যবহার করে চিনাতে চায় নাই। আর সত্যি সত্যি রাজধানী ক্রেমলিনের এলাকা এলাকায় প্রতিরোধ কমিটি বা সোভিয়েত গড়ে তুলেই এই বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল বলে এই সোভিয়েত বা প্রতিরোধ কমিটি গড়া ও নাম দেয়ার রেওয়াজ শুরু হয়েছিল যেটা থেকে কমিউনিস্ট সাহিত্যে একে সোভিয়েত বিপ্লব বলে চিনানোর।
    কিন্তু এটাই আবার সমস্যা হয়ে যায় চীনের বিপ্লবের বেলায়। কারণ, চীনের ক্ষমতাদখলের ক্ষেত্রে তাদের স্টাইলে কোন প্রতিরোধ কমিটি বা সোভিয়েত গড়ে তা আগিয়ে নিয়ে এটা সম্পন্ন করা হয় নাই। তাই চীনে ‘সোভিয়েত’ শব্দের বিকল্প হিশাবে ‘পিপলস’ শব্দটা চালু করা হয়েছিল। আর মনে রাখতে হবে – এই পিপলস এর অর্থ ঠিক  পাবলিক বা নাগরিক ধারণা একেবারেই নয়। কেন নয়?  কারণ,  শ্রেণী নির্বিশেষে কোন পাবলিক বা নাগরিক ধারণা কমিনিজমে নাই, শ্রেণী আছে।  আর কমিউনিস্ট পার্টি তো কেবল শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার্তে রাষ্ট্র কায়েম করেছে বলে পার্টি মনে করে।

    আর এসব কারণেই,  যেকোন কমিউনিস্ট ক্ষমতা দখলের পরে সবকিছুর মূলকর্তা হয়ে যায় পার্টি – মানে কেবল  শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ (আম-জনতার স্বার্থ নয়) রক্ষার জন্য ক্ষমতাদখল করেছে যে  পার্টি।  । তাও আবার এই মূলকর্তা বলতে কতদুর বুঝিয়েছি ? আসছি সেখানে, তবে এর আগে কিছু কথা।  কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে একারণেই নাগরিক সবারই কিছু মৌলিক ও কমন স্বার্থ রক্ষার জন্য বা সবারই মৌলিক অধিকারগুলো রক্ষার জন্য (রিপাবলিক) রাষ্ট্র গঠন করা হয় – এধারণাটাই কমিউনিজমে নাই, তাদের রাষ্ট্রে নাই।  আছে কেবলমাত্র শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার কথা। সবকিছু তাই সেখানে শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থের জন্য। এখন এতে আরেক সমস্যা তাহলে হাজির হয় যে তাহলে  কেবল শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থের রাষ্ট্রে কোনটা শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ তা বুঝা যাবে কী করে? এর জবাব থেকেই পার্টি ধারণাই মুখ্য কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ধারণা হয়ে যায়। কেন? যেটা শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি বলবে, সাব্যস্ত করবে সেটাই কেবল শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ বলে বুঝতে হবে।
    আর এভাবে সাব্যস্ত করাতেই কমিউনিস্ট সমাজে এরপর থেকে বিচার, ন্যায়বিচার, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, বিচার প্রক্রিয়া ইত্যাদি যত সম্পর্কিত শব্দ আছে এর সবকিছু নাই ও বাতিল হয়ে যায় অথবা পার্টির হুকুমের অধীনে হয়ে যায়।  কিন্তু ইনসাফ বা ন্যায় জিনিষটাই এমন যাকে স্বাধীন থাকতেই হয় নইলে তা ইনসাফ নয়। বিশেষ করে শাসক-ক্ষমতার অধীনে যে যেতেই পারে না। কারণ সেক্ষেত্রে এটা শাসকের ইচ্ছাই হয়ে যাবে। ইনসাফ-বিচার কখনই শুধু শাসক কেন, কারো অধীনের যেতে পারে না। তাহলে সেটা আর ইনসাফ-বিচার একেবারেই নয়। এটাই প্রিযুডিস।  একারণেই, সেপারেশন অব পাওয়ার না থাকা, প্রিযুডিস (prejudice) হয়ে থাকে বা  কোন আগাম অনুমান মাথায় নিয়ে বিচারক বিচার এজলাসে বসলে সেটা আর বিচার-ইনসাফই নয়, হবে না। অথচ কমিউনিস্ট দেশে খোদ পার্টি মানে শাসন ক্ষমতাও যার হাতে সেই-ই হয়ে আছে কার্যত বিচারকের ভুমিকায়। এজন্যই পার্টিই বিচারক বা রায় দাতা যে কে শ্রমিক শ্রেণী আর কে বুর্জোয়া তা কেবল পার্টিই বলে দিতে পারে!  তাই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এর অপরাধ কী? কে তার বিচার করেছে আর কিসের ভিত্তিতে এসবে বিচার সাব্যস্ত হয়েছে এনিয়ে চীনা পার্টি নিরুত্তর। কোন জবাব তারা দিবে না এটাই কমিউনিস্ট কালচার। ক্ষমতা চর্চার কালচার!। সবচেয়ে লোমহর্ষক কালচার!!!  দুঃখের কথা, এটা রিপাবলিক বা মর্ডাণ যুগের রাজনৈতিক মুল্যবোধ চিন্তা ও চর্চা তো নয়ই এটা এরও পিছনের দিনের কোন মনার্কি [ monarchy] রাজতন্ত্র বা  কোন রাজা-বাদশার কালেও যেটুকু বিচার ব্যবস্থা ছিল কমিউনিজম সেটুকুওও নয়। বরং এরও পিছনের পর্যায়ের কোন সমাজের চিন্তা ও চর্চার কাহিনী!!!

    যেকোন মানব সমাজ জন্মানো শুরু হয় ন্যায় বা ইনসাফের ভিত্তি থেকেঃ
    এটা বহু আগেকার প্রতিষ্ঠিত ও ব্যবহারিক সত্য যে যেকোন সমাজ জন্মানো শুরু হয় ন্যায় বা ইনসাফের ভিত্তিমূলক ধারণা থেকে। কথাটা আরও ভালভাবে বুঝবেন যেমন ধরেন কেউ কোন কাজ বা সেই কাজটা করে ঠিক করেছে কিনা এটা সেই সমাজ কী দিয়ে সাব্যস্ত হবে? সমাজ কী দিয়ে কিসের ভিত্তিতে তা সাব্যস্ত করবে? গায়ের জোর নাকি ন্যায় ইনসাফের ধারণায়? – এটা যেকোন সমাজের জন্য খুবই ফান্ডামেন্টাল প্রশ্ন!!  অর্থাৎ – ন্যায়বিচার সংক্রান্ত মুল্যবোধ দিয়ে নাকি যার গায়ের জোর যার বেশি সেই সঠিক বলছে ধরে নিতে হবে?  মনে রাখতে হবে ন্যায়বিচার সংক্রান্ত মুল্যবোধ বা ইনসাফের ধারণা এখানেই ধর্মতত্বেরও এক বিরাট প্রভাবক ভুমিকা আছে এবং থাকবেই। কাজেই এসব দিকগুলোকে একটা সংজ্ঞায়িত করা নাই এমন ক্ষমতা দিয়ে – পার্টিক্ষমতা দিয়ে সব রিপ্লেস করে ফেলবেন – এটা কখনও ঘটবে না,চলবে না!  এটাই কমিউনিস্ট ক্ষমতার ফান্ডামেন্টাল ত্রুটি ও অযোগ্যতাই হয়ে আছে ও থাকবে; এই ত্রুটি প্রকাশ করতেই থাকবে।
    তাই আমরা জোর দিয়ে বলতে পারি যে একটা নুন্যতম বিচার-ইনসাফ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে – এই ইনসাফের ভিত্তিতে দাড়িয়েই কেবল সমাজ শুরু হয় হয়েছে এবং আছে।  না হলে মানুষ এতদিন সকলকেই কেবল সারাদিন ডন-বৈঠক করে জিমে কাটিয়ে গায়ের জোরের চর্চা করত! কারণ অর্থ-সম্পত্তি ও ঘরের মেয়েদের রক্ষা করতে হবে তো!
    এখন ইনসাফ প্রতিষ্ঠা মানে কী ধরণের বিচার ব্যবস্থা ও পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা – সেটা কী কাজী ব্যবস্থা বা রোমের বিচার ব্যবস্থারই আধুনিকায়ন করে নেয়া কোন ব্যবস্থা – এমন যেকোন কিছুই হতে পারে।  মানে বলতে চাচ্ছি মানুষের সমাজ আর এর সাথে একটা না একটা বিচার ব্যবস্থা একেবারে হাতে হাত ধরে হেঁটেচে তবেই কেবল আমাদের সমাজ সভ্যতাগুলো একালে পৌছিয়েছে।

    আবার এর ভিতর একটা বড় তর্ক ছিল যে কেউ অপরাধ করেছে কীনা এটা কে সাব্যস্ত করবে? যে কেউ আঙুল তুললেই হবে? নাকি সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কথা, শাসক যদি আঙুল তুলে তাহলেই তা কী কেউ অপরাধী সাব্স্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে?  এরাই সদুত্তর ছিল না, বরং একটা  বিচার ব্যবস্থা দাড় করাতে হবে। শুধু তাই না, সেই  বিচারব্যবস্থার উপর শাসকের খবরদারি রোধ করে রাখা হয়েছিল। এটাই ইউরোপের অর্থে সেপারেশন অফ জুডিশিয়ারি তর্ক।

    কিন্তু সরি! কমিউনিস্ট সমাজ বা কমিউনিস্ট আন্ডারস্টান্ডিং ঠিক এরকম এর ধারেকাছেই নয়। যেটা এতক্ষণ বললাম,   এর মূলে আছে একদিকে এর কথিত শ্রেণী ধারণা আর অন্যদিকে পার্টিই সর্বময় ধারণা। আর এতে কোন বিচারবিভাগ নয়, পার্টিই সাব্যস্ত করে দিবে কেউ অপরাধী কিনা!
    এমনিতেই কে কোন শ্রেণীর লোক তা সে নিজে বললে হবে না। পাটি যদি বলে কেউ বুর্জোয়া তো সে বুর্জোয়া। দ্বিতীয়ত, কমিউনিস্ট চিন্তা বলে কয়েই শুরু করে থাকে যে সে নিজে এক একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা। আর এই একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা বলতে তা এমনই যে যাকে সে বুর্জোয়া মনে করবে তার সাথে সে বলে কয়ে বৈষম্য করবে – সমান আইনি সুযোগ বা ন্যায়বিচার তাকে দিবে না। এটাই তার একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা।  প্রথমত কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ধারণায় নাগরিক মাত্রই সবাই সমান অধিকারের নাগরিক – এই ধারণা সেখানে কাজ করে না, নাই। কারণ, কমিউনিজমে নাগরিক বলে কোন ধারণাই নাই।  আছে কেবল শ্রেণী ধারণা; তাও সেটাও একমাত্র পার্টি ঠিক করে দিবে যে কে কোন শ্রেণীর লোক।  তাই নাগরিক অধিকার বলেও কোন ধারণাই নাই। যদিও পাবলিক শব্দের ব্যবহারে যথেচ্ছচার আছে। যেমন আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংক যা সাধারণ ভাবে আমাদের সেন্ট্রাল কন্ট্রোলিং ব্যাংক- এর ধারণা।  চীনে এর সমতুল্য ব্যাংকের নাম PBOC। মানে হল পিপলস ব্যাংক অব চায়না।  এমনকি দেশের নাম পিপলস রিপাবলিক অব চায়না [PRC]। সেনাবাহিনীর নাম পিপলস আর্মি ইত্যাদি। 

    আসল সমস্যাটা হল, পার্টি সবক্ষমতার অধিকারী এটা যতটা কনসেপ্টের সমস্যার এর চেয়েও বেশি সমস্যা তা হল, পার্টি কিসের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সে পাবলিককে বলবে না; জনসমক্ষে বলবে না।  বিচারক যেমন রায় লেখার সময় তাকে রায়ের পিছনের সাফাইটা কী বা কোন আইনে দেয়া ক্ষমতা অনুসারে সে ঐ এই রায় দিচ্ছে সেই সাফাই, সেই ব্যাখ্যা লিখিত রায়ের সাথে জুড়ে দিতেই হবে। আর ঐ রায় তো ওপেন। তাই যে কেউ রায় যাচাই করতে পারে। কিন্তু কমিউনিস্টদের বেলায় তা এটা মানে না। অথচ এমনিতেই পার্টি হল শাসক তাই শাসক নিজেই আবার একই সাথে বিচারক হতেই পারে না। কোন প্রধানমন্ত্রী যদি প্রকাশ্যে ও সরাসরি বিচারকের ভুমিকা নেয় – এটা তেমনই এক ঘটনা হবে তাহলে।  অথচ এটা তো কোন এথনিক-কালচারাল সমাজের সাধারণ ন্যায়বোধও অনুমোদন করে না।   কিন্তু কমিউনিস্টদের বেলায় তারা এই “সেপারেশনের” ধারণা দূরে থাক তারা কোনকিছুই মেনে চলে না। তাদের শ্রেণী ধারণা এমই ঘামন্ডি, গোয়াড় একচোখা ও উদ্ধত!! আসলে এটা শুনতে খারাপ লাগলেও এটা মূলত এক বেইনসাফ বা অবিচারের ধারণা।  এর উপর আবার পার্টি কোন আইনে বা কিসের ভিত্তিতে রায় দিচ্ছে সেটাও ত বলবেই না।

    আর জনসমক্ষে পার্টির এই বলতে না পারার যে প্রাকটিস এরই বাইরের প্রকাশটা হল হঠাত করে লোকটার জনসমক্ষ থেকে গায়েব ডিসাপিয়ার্ড [dissappeared] হয়ে যাওয়া বা গায়েব করে দেওয়া। এজন্য হাসিনা আর কমিউনিস্টদের সখ্যতার ভিত্তি এটাই।  কিন্তু একালে আসলে এটা কী চলে? চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বেলায়, এই গায়েব রাখার এসময়ে পার্টি তাকে বলপ্রয়োগ করে বাধ্য করেছে একটা স্বীকারোক্তি দিতে যে সেই দোষী বলে পদত্যাগ করছে বা সব মেনে নিচ্ছে। আর এই স্বীকারোক্তি পেলে এবার আবার তার জনসমক্ষে হাজির হওয়া তবে সব ক্ষমতা পদ নাই হয়ে থাকা অথবা পার্টি যা শর্ত দিয়েছে সে অনুযায়ী কিছু একটা তার নাই হয়ে যাওয়া বা থাকা।
    এককথায় জনসমক্ষে কোন ন্যায়ের ধারনা পার্টি চর্চা করে না বা করতে পারে না বলেই এই গায়েবী কালচার!!!

    এখন লেনিনের আমলে মানে, আজ থেকে একশ বছর আগে যা পার হয়ে গেছে যখন এই পার্টি ধারণা ও এর চর্চা শুরু হয়েছিল। এখন  জনসমক্ষে এবং কোন ন্যায়ের ধারণার চর্চা ছাড়া কোন রাষ্ট্র প্রসঙ্গে ধারনা অচল ও অগ্রহণযোগ্যই হবে অবশ্যই। এর উপর আবার চীন যদি আগামিতে আমেরিকার মত না হলেও অন্তত কেবল অর্থনৈতিক অর্থে গ্লোবাল নেতা হতে চায় তাহলে এটা হবে নেতার  গ্লোবাল পাবলিক বা সারা দুনিয়ার চোখে সবচেয়ে অগ্রহণযোগ্য স্বভাব-বৈশিষ্ট! এককথায় বললে, পার্টি-ক্ষমতা এই বিষয়টাকে এর – ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা এক ক্ষমতা – এভাবে হাজির করতেই চায় না।  যা আসলে একটা কোটারি-ক্ষমতা মানে এক অলিগর্কি ক্ষমতা [oligarchy]  করে রেখে দিতে চায়। একারণে, এটা বারবার  কমিউনিস্ট ক্ষমতার ধারনা “এক অন্যায্য ক্ষমতা” – আনজাস্টিফায়েড ক্ষমতা হিসাবেই হাজির হতে থাকবে।  আর এভাবে ক্রমশ চরম ভাঙনের দিকেই যেতে থাকবে; সোভিয়েত ক্ষমতা যেভাবে গিয়েছে।

    জ্যাক মা সমস্যাঃ
    জ্যাক মা রাজনীতিবিদ বা রাষ্ট্র অথবা ক্ষমতা  সংফশ্লিষ্ট কেউ না; তিনি ব্যবসায়ী। নয়া আইডিয়ায় গ্লোবাল মার্কেটিং ব্যবসা এটা। এখন হতেই পারে তিনি অসৎ সুযোগ নিয়ে দেশের নয়ম ভেঙ্গে কোন ব্যবসায়িক ততপরতা করেছেন। কিন্তু তাকেও মাসের পর মাস গায়েব ডিসাপিয়ার্ড [disappeared] করে রেখে দেয়া হয়েছিল। এর অর্থ আইনিভাবে জ্যাক মা কে নিয়ন্ত্রণ করার কোন মেকানিজম চীনা কমিউনিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থায় নাই। তাই নয় কী? চীনা রাষ্ট্রে এমন প্রকাশ্য আইনি বিচার ব্যবস্থা তাহলে নাই!  তাই কী? তার মানে এই  ডিসাপিয়ার্ড [disappeared] করে রাখার ব্যবস্থা – এটা তো কোন রাজা-বাদশার সমাজ-শাসন ব্যবস্থাতেও অচল। হয়ত কোন এক গোত্র-সমাজের ব্যবস্থায় তা ছিল!!  এভাবে কিছুদিন পরপর ডিসাপিয়ার্ড [disappeared] করে রাখার ব্যবস্থা করে হবু গ্লোবাল নেতা চীনের কী ইমেজ বাড়তেছে?  এর অর্থ চীনের রাষ্ট্র একটা নুন্যতম “স্বাধীন বিচার সিস্টেম” দাড় করাতে সবসময়ই অপারগ থেকে যাবে। এতে পার্টি মানে তাদের শ্রেণী-চিন্তায় এটা পারমিশেবল নয়, অ-অনুমোদিত থেকেই যাবে! চীন অন্তত তার চীনের ‘গায়েব’ কালচার দিয়ে কোন গ্লোবাল নেতা হতে পারবে না! তা এখনই বলে দেয়া যায়!

    কোন রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি পর্যন্ত যুক্ত হতে চায় না চীনঃ
    অনেকের মত আমারও ধারণা ছিল এই যে, গ্লোবাল নেতা হতে চায় চীন তাতে কোন অসুবিধা কী! কিন্তু এর মানে এই না যে আমেরিকার মত চীনকেও কোন রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি পর্যন্ত ঢুকে পড়তে হবে, হতেই হবে; এই অনুমান তো অবশ্যই ভুল।  চীন তেমন হতে চায় না। অন্তত এখনই। কিন্তু টের পাচ্ছি  আমাদের এই ধারণায় ক্রমশ চির ধরাচ্ছে চীন নিজেই।  প্রথমত, কম্বোডিয়া। এটা খুবই এক বাজে উদাহরণ হয়ে উঠে এসেছে।
    টানা গত ৩৮ বছর ধরে হুনসেন ক্ষমতায় আছেন। মানে খেমার রুজদের তান্ডব শ্রেণী শত্রুর নামে নির্বিচারে (পাঁচশ টাকার টংয়ের দোকানিকেও মালিক)  বুর্জোয়া বলে হত্যার কমিউনিজমের শেষ পর্বে ১৯৮৫ সাল থেকে তিনি ক্ষমতা নিয়েছিলেন। এরপর [1991 Paris Peace Agreements] জাতিসংঘের অধীনে শান্তি চুক্তি এর সুবিধার সব মাখনটাও তিনি খেয়ে প্রধানমন্ত্রী থেকে গেছিলেন। কিন্তু ২০১২ সালের পর থেকে তিনি আরেক ত্রাস হয়ে উঠলেন।
    গত ২০১৩ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় থেকে অনেক প্রত্যক্ষভাবে  লক্ষ্য করছি কম্বোডিয়ার সব বিরোধীদলীয় নেতাদেরকে জেলে রাখা হয়েছে বা বিদেশে আশ্রয়প্রার্থী হতে বাধ্য করা হয়েছে। অথবা নানা উসিলায় দল নিষিদ্ধ বা নানা শর্ত আরোপ করে রাখা হয়েছে। সেসময়ের হংকংয়ের এক মানবাধিকার সম্মেলনে তাদের কয়েকজন প্রতিনিধি সাথে সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। জেনেছিলাম তাদের একদলীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিরোধীদল শুন্য হয়ে থাকার ইতিকথা। এরপরে ২০১৮ সালের আর একবার একদলীয় নির্বাচন; পরে এবার  ২০২৩ সালের একইভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।  কিন্তু পরিস্থতির কোন উন্নতি বা পরিবর্তন নাই।  বরং এবার আরো নিম্নমুখি অবস্থাটা হল, এতদিন হুনসেন তার ছেলেকে সেনাপ্রধান করে রেখেছিলেন। আর এবার এখন তিনি নিজে পদত্যাগ করে ঐ সেনাপ্রধান ছেলেকে প্রধানমন্ত্রী পদে বসাবেন; এর পরিকল্পনাতেই এবারের কথিত নির্বাচনটা হয়েছে। যা আমাদের পরিস্থিতির সাথে বহুলাংশে মিলে! যেটা বুঝে আসে না – কেন চীনকে আরেকটা দেশের একটা খেলনা নির্বাচনে জড়িত হতেই হবে। এত নিচে নেমে চীনের স্বার্থ উদ্ধার করতে হবে? চীনের এত কী ঠেকা?  চীন কোন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মাথা ঘামায় না – এটা কী এর উদাহরণ আর থাকলো?  আর এভাবেই কম্বোডিয়া যেন চীনের যেন লাগাতর নিজ প্রভাবাধীন করে রাখতেই হবে সেও ব্রত পূরণ করবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে – এই বেপরোয়া চীন এটা কেন???
    মূল কথাটা হল,  এতে কোন একটা দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতা সুস্থভাবে গড়ে না উঠে একে বরং মারাত্মক ব্যহত করে দেয়া হচ্ছে। এজায়গায় কম্বোডিয়ার সাথে বাংলাদেশের মিল আছে। এটা খুবই ভয়ংকর টেনডেন্সি। কম্বোডিয়া বা বাংলাদেশের মত দেশগুলো তাদের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ুক, এসব দেশগুলোর আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতবদলের ব্যবস্থা অসুস্থ হয়ে পড়ুক – সেটা কী চীনের কাজ এক্তিয়ার হতে পারে – এটা তো একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয় বা কাম্যও নয়। তাতে সেটার জন্য দায়ী চীন অথবা আমেরিকা অথবা উভয়ের অসুস্থ প্রতিযোগিতা যাই হোক না এটা  গ্সরহণ হ্য করা যায় না। নুন্যতম গ্রহণযোগ্যতা থাকতে পারে না।  অন্তত এটা চীনের জন্য এক বিরাট আত্মঘাতি কাজ হচ্বেছে ও হবেই; যার অনেকটাই সম্ভবত ঘটা শুরু হয়ে গেছে। মাত্রার দিক থেকে বাংলাদেশের তুলনায় আগানো কম হলেও কম্বোডিয়া ইতমধ্যেই মারাত্মক বিপদজনক জায়গায় চলে গেছে। খুব সম্ভবত চীন অতিরিক্ত রিস্ক নেয়ার পথে হাটা শুরু করে দিয়েছে।
    এটা হবু গ্লোবাল নেতা চীনের জন্য কোন পথ বা পদ্ধতি হতে পারে না। এটা চীনের জন্যই আত্মঘাতি ও নিজেকেই ক্ষতিগ্রস্ত করার পদক্ষেপ হয়ে দাঁড়াবে, দাঁড়াতে বাধ্য। একটা গ্লোবাল অর্ডার – রাষ্ট্রব্যবস্থায় উন্নতির বদলে একে আরও নিম্নগামি করা হবু নেতা চীনের আচরণ হতে পারে না; কাম্যও নয়। আমরা আমাদের দেশকে গুম-খুন আর অপহরণের দেশ করে গড়তে পারি না! কাউকে এলাও করতে পারি না।  সেটা যেই বহিঃশক্তিই – চীন বা আমেরিকা – একাজে দানব সরকারকে সহায়তা করুক!

    জঙ্গীদমনের নামে আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া যেমন গ্রহণযোগ্য নয় ঠিক তেমনই,  শ্রেণী শাসনের নামে চীন এর বাংলাদেশকে  গুম-খুন আর অপহরণের দেশ বা সম্পদপাচার লন্ডারিংয়ের দেশ হওয়ার দিকে ঠেলে দেওয়া এটাও গ্রহণযোগ্য নয়।  এসব থেকে তাদের অবশ্যই দূরে থাকতেই হবে। এটা কোন উদাহরণ হতে পারে না।  আগে যেকোন বহিঃশক্তিকে এসব থেকে দূরে যেতে হবে।  এরপরেই আমরা অর্থনীতি, বাণিজ্য, উন্নয়ন, অবকাঠামো ঋণ সহায়তা ইত্যাদি দিকে সবার সাথেই একমাত্র সম্পর্কিত হতে চাইবে।

    এছাড়া নয়া কোন গ্লোবাল নেতা মানেই আমাদের বুঝতে হবে এর শুরুতেই খোদ জাতিসংঘের একটা সংস্কার হতে হবেই। আর তাতে কী এমন হস্তক্ষেপ এটাই নয়া জাতিসংঘের রেওয়াজ হবে???? আমাদের মত দেশগুলো চীনা সমর্থনে  গুম-খুন আর অপহরণের দেশ হয়ে উঠবে??? বুঝাই যাচ্ছে চীন এসব বিষয়ে এখনও নাদান!
    যারা বাংলাদেশকে ইতোমধ্যেই গুম-খুন আর অপহরণের দেশ বা সম্পদপাচার লন্ডারিংয়ের দেশ বানিয়েছে অথবা যারা এতে সমর্থন দিয়ে নিজের ভাগ্য গড়েছে সেসব দলগুলোর সাথে চীনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো আমরা খেয়াল করেছি। দেশে রাতের ভোটে ক্ষমতাসীন হবে আর চীন তাদের এই কথিত ভোটের খরচ যোগানো দেশ হয়ে উঠবে এটা চলতে পারে না, এটা কাম্য নয়। তার মানে –  আভ্যন্তরীণ রাজনীতি পর্যন্ত চীন যুক্ত হতে চায় না – এটা আর সেই চীন নয়। এটাই হতে যাচ্ছে। তাই যথেষ্ট ভেবেচিন্তে এবিষয়ে চীনকে সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ  নিতে হবে। বলাই বাহুল্য এমন পদক্ষেপ এগুলো একেবারেই কাম্য নয়! আর এতে চীনের কোন গ্লোবাল সম্ভাবনা কিছু ঘটবার আগেই সব ভেঙ্গেচুড়ে মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য!!!

    এককথায় চীন নিয়েও একালে এখন আমাদের পশ্চিমাদেশের মত উদ্বিগ্নতা বাড়ছেই! যা চীনের জন্য ভাল লক্ষণ নয়!!!

    আপডেটেডঃ    ০৬ আগষ্ট ২০২৩; দুপুর ১১ঃ০২
    আপডেটেডঃ     ২০২৩;

    >>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • অজ্ঞতায় থেকে কথা বললে নুইসেন্স তৈরি করবে

     

    অজ্ঞতায় থেকে কথা বললে নুইসেন্স তৈরি করবে
    গৌতম দাস
    ২৭ জুলাই ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4Kk

     

                    পরাশক্তিগুলোকে আর কী দেওয়ার আছে, 

    বামপন্থী নুইসেন্সেঃ
    চলতি নয়া শতকের রাজনৈতিক ঘটনা ফেনোমেনাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে চাইলে গত শতক (২০০০ সাল) পর্যন্ত যেসব টুলস বা  ব্যাখ্যার হাতিয়ার আমাদের হাতে এসেছিল তা এই নয়া শতকের একেবারেই কাজে আসবে না; নতুন নতুন মেজর ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে আমরা সক্ষমতা দেখাতে পারব না। বিশেষ করে না-বুঝ বা অবুঝ কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল নামে পরিচিত ধারণাগুলোর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সবার আগে সচেতন হতে হবে। এরপর একালে সেসবের পুরাপুরি একটা রিভিউ বা পুনর্মুল্যায়ন আগে করে না নিয়ে সেসব পুরানা ধারণা এই শতকে ব্যবহার করতে গেলে একটা বিপর্যয় আসতে বাধ্য।  আর এ’থেকে  সকলের পরিত্রাণের  একমাত্র উপায় নিজ চিন্তাকে নয়া হাতিয়ারে সাজানো, চিন্তার নয়া যোগ্যতা, নয়া দক্ষতা মানে সক্ষমতায় যোগ্য হয়ে আমাদের উঠতেই হবে; এটাই এথেকে বের হবার একমাত্র  পথ।
    কাজেই উপায় একটাই, নিজ সক্ষমতা সম্পর্কে আগে মুল্যায়ন ও সঠিক মাপামাপি-এস্টিমেট করে নেন – যাদের সক্ষমতা নাই টের পান তারা নিজ দায়িত্বে নিজ খামতি পূরণে রত হন। কিন্তু তবু এই পরিস্থিতিতে  দয়া করে পরিপুর্ণ না জেনে নিশ্চিত না হয়ে কোন সন্দেহ বা ষড়যন্ত্র তত্ব দিয়ে পুরান কথা ও অনুমানগুলোই আবার অবলীলায় ব্যবহার ও বলতে শুরু করলে সেটা শুধু ভুল না, অপরাধ হবে। এছাড়া এমন করলে সেটা একটা বিপর্যয়কর ও বিব্রতকর অবস্থা –  একটা নুইসেন্স তৈরি সে তো হবেই।
    যেমন কেউ মনে করতেই পারে যে সে ন্যাংটা হয়ে মাঝরাস্তা দিয়ে আমি হাঁটবে, এটাই নাকি তাঁর অধিকার! মানে সমাজের জন্য নুইসেন্স তৈরি করাটাই যেন তাঁর অধিকার – এমনটা ভাবলে নগরের বাকি মানুষের আর কী করার থাকবে!!

    বিডিনিউজ২৪ লিখেছে, “সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু সম্মেলন কক্ষে ছাত্র ইউনিয়নের একাংশ আয়োজিত ‘দক্ষিণ এশিয়ার ভূ–রাজনৈতিক বাস্তবতা ও পুঁজির পরিবর্তিত বৈশিষ্ট্য: বামপন্থীদের করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা হয়েছে”। সেখানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ও  ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক প্রতীপ চট্টোপাধ্যায় বক্তা ছিলেন।
    কেউ গত শতকে যা বলতেন সেই একই কথা চলতি শতকেও কোন রিভিউ ছাড়াই আগের মত বলে গেলে একটা বিপর্যয়কর ও বিব্রতকর অবস্থা তৈরি হবেই। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার প্রায় ত্রিশ বছর পার হয়ে গেল এরপরে যেন কিছুই ঘটে নাই ধরে নিয়ে আমরা পুরান কথা চালায় যেতে পারি না।

    BRICS বলে একটা ধারণা  ও প্রতিষ্ঠান ২০০৯ সাল থেকে মানে গত ১৪ বছর ধরে এসে গেছে। আজকের ইউক্রেন যুদ্ধ ও বাইডেনের যথেচ্ছভাবে স্যাংশন প্রয়োগের পটভুমিতে ব্রিকস এবার দ্রুত বিকাশের জন্য সচল ও সক্রিয় হতে চেষ্টা করতে শুরু করছে।  এই সময় অধ্যাপক প্রতীপ চট্টোপাধ্যায় বলছেন, “বর্তমানে কোয়াড ও ব্রিকস নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য পদ পাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আমার কাছে এগুলো আধিপত্যবাধের আরেকটা নতুন রূপ। “এগুলোতে আপনি দেখবেন না শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশকে মুখ্য ভূমিকায় আনতে। বৈদেশিক শক্তি বা আমাদের অঞ্চলের বাইরের ক্ষমতাশালী দেশগুলো কিন্তু এই অঞ্চলে এসে তাদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। এটা বিভিন্ন সময় নাম বদলাচ্ছে।”  –

    “বর্তমানে কোয়াড ও ব্রিকস নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য পদ পাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আমার কাছে এগুলো আধিপত্যবাধের
    আরেকটা নতুন রূপ
    । “এগুলোতে আপনি দেখবেন না শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশকে মুখ্য ভূমিকায় আনতে। বৈদেশিক শক্তি বা আমাদের অঞ্চলের বাইরের ক্ষমতাশালী
    দেশগুলো কিন্তু এই অঞ্চলে এসে তাদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। এটা বিভিন্ন সময় নাম বদলাচ্ছে।
    ”  – অধ্যাপক প্রতীপ চট্টোপাধ্যায়

    কোন কমিউনিস্ট-বামপন্থীর পক্ষেই এমন না জেনে বলা বক্তব্য দেয়া সম্ভব। ব্রিকস সম্পর্কে কারও না জানা বা কম জানা থাকতেই পারে। কিন্তু তা সত্বেও নিজের অজ্ঞতাকে বুক ফুলিয়ে জানানো এটাকেই ‘বোকার সাহস’ বলে!
    এমনিতেই গত শতকের সমস্যা হল, স্তালিন-সহ পরের বাংলাদেশে পর্যন্ত কোন কমিউনিস্ট এর আর আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক জিনিষটা কী  তা জানা হয় নাই। দুইটা বিশ্বযুদ্ধ শেষে গত ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়াতে এই প্রথম একটা গ্লোবাল ইকোনোমিক সিস্টেম ও একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম গড়ে উঠেছে। হতেই পারে যে আপনার চোখে এটা ভুল কাজ হয়েছে, ভুল রাস্তায়। তাই আপনি তা পছন্দ করেন নাই, অনুমোদন করেন না। কিন্তু তাতেও আপনি ওসব প্রতিষ্ঠানগুলো কী, ঠিক কী করে থাকে ইত্যাদির কোন বেসিক তথ্য না জেনে অন্ধকারে থেকে মন্তব্য করা কী ঠিক?

    কঠিন সত্যি বা ফ্যাক্টস টা হল, কোন কমিউনিস্টই দুনিয়া যে ১৯৪৫ সালের পরে সেই প্রথম একটা গ্লোবাল ইকোনোমিক সিস্টেম ও একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম মানে এর প্রতিষ্ঠান হিশাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এবং দ্বিতীয় পলিটিক্যাল সিস্টেমের জন্য জাতিসংঘ গড় তুলেছে – এদিকটা টের পায় নাই।  স্থানীয়ভাবে একটা দেশ-ভুখন্ডে যেমন রিপাবলিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেচে তেমনই গ্লোবাল পরিসরে (তবে সীমিতভাবে) গ্লোবাল এক রাষ্ট্রব্যবস্থার মতই জাতিসংঘ গড়ে উঠেছিল – যার ভিত্তি হল, কোন ভুখন্ডের বাসিন্দাদের কলোনিদখল করা অবৈধ কাজ। এই ভিত্তিতে জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণায় ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারিতে প্রথম যে চার রাষ্ট্র স্বাক্ষর করেছিল তার একটা হল স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন।  এই ফ্যাক্টস ও এর তাতপর্য কমিউনিস্টেরা বুঝেছে বা জানে  তা নিয়ে সন্দেহ করার জেনুইন কারণ আছে। খোদ স্তালিন কী মনে করতেন এনিয়ে তার কোন লেখা বা উচ্চবাচ্যের কথাও জানা যায় না।
    দ্বিতীয়ত, ১৯৪৪ সালে আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের এই হোটেলে এক সম্মেলনে [Bretton Woods Conference] টানা ২২ দিন ধরে চলা আসর থেকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক নামের দুই প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল। একটা গ্লোবাল ইকোনোমিক সিস্টেম দাঁড় করানোর জন্য। যাতে দুনিয়াব্যাপী “আন্তঃরাষ্ট্রীয় এক বাণিজ্য” ব্যবস্থা চালু করা যায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট স্তালিনের প্রতিনিধি ঐ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। তবে প্রতিষ্ঠান দ্বয়ের জন্ম ম্যান্ডেট যে কেন কী উদ্দেশ্যে এটা জন্ম দেয়া হচ্ছে, এর এক্তিয়ার কী ইত্যাদি সেসব রচনার পরে সেই সম্মেলন শেষ হয়ে যায়।  এরপরের কাজ ছিল প্রত্যেকটা রাষ্ট্রের চাঁদা পরিশোধ সাপেক্ষে ওদুই প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ লাভের আবেদন করা ও সদস্যপদ নেয়া। এই অংশে কোন সোভিয়েত প্রতিনিধি আর সেখানে হাজির হন নাই।  সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ অংশ হল এটা। কিন্তু কেন স্তালিন সদস্যপদ নেন নাই, কারণ কী – অথবা  দুই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তার ধারণা অনুমান কী অথবা আপত্তি কী ইত্যাদি এসব নিয়ে তিনি কোথাও কিছু লিখেছেন জানা যায় না।

    পরবর্তিতে কমিউনিস্ট জগতেও এনিয়ে কোন আলোচনা উচ্চবাচ্য কোথাও শুনা যায় নাই। বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের পরিচালিত ১৯৮২ সালের প্রশাসনিক সংস্কার চলার সময় সরকারি পাটকলের শ্রমিকেরা চাকরিচ্যুত হলে সেই প্রথম আমাদের কমিউনিস্টেরা এদুই প্রতিষ্ঠানের নাম জানতে পারে। তারা এদুই প্রতিষ্ঠানের নামে – নিপাত যাক – শ্লোগান দেয়া সেই থেকে চালু হয়। অতটুকুই; তবু এদুই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানাশুনা তখনও আর কিছু হয় নাই বা আগায় নাই।
    ওদুই প্রতিষ্ঠানের জন্ম পরবর্তিতে সোভিয়েত ব্লক বলে কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫৩-৯১) আমেরিকা বনাম সোভিয়েত – এই ব্লক রাজনীতির কালে সোভিয়েত ব্লকের কোন রাষ্ট্র ওদুই প্রতিষ্ঠানের সসস্যপদ গ্রহণ করে নাই। বা পায় নাই। এটা প্রমাণ করে যে  এর মানে এই ব্লকের রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের মধ্যেও কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা বলতে কিছু ছিল না।  তবে গুরুত্বপুর্ণ হল, ১৯৯১ ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পরেই ১৯৯২ সালেই ভেঙ্গে তৈরি হওয়া ১৫ রাষ্ট্রের সকলেই ওদুই প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ গ্রহণ করেছিল।

    এসবই হোল বেস ফ্যাক্টস [Base Facts]। এবার আসি ব্রিকস [BRICS] প্রসঙ্গে। একবাক্যে শেষ করব।  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে উঠেছিল আমেরিকার নেতৃত্বে। এর অর্থ তাতপর্য  করা যেতে পারে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর গঠন ছিল শেয়ার মালিকানার কোন ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের মত, যেখানে আমেরিকার এত বেশি শেয়ার যা অন্যেরা মিলিতভাবে চ্যালেঞ্জ উপযোগী নয়।  আর ব্রিকস হল সেই উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান  যার লক্ষ্য হল চীনের নেতৃত্বে এবার নয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সমতুল্য প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া।

    কাজেই গত প্রায় আশি বছর ধরে চলা গ্লোবাল অর্ডার হিশাবে নয়া প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাটাকে [এর সীমাবদ্ধতা বা বড়লোক দেশগুলোর দিকে কান্নি মারা বিষয়ক খামতি সহ ] যে বুঝেই উঠতে পারে নাই, জানার [মানার কথা বলি নাই] চেষ্টা করে নাই,  সে একালে গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের কালে ব্রিকসের উত্থানকে কিভাবে বুঝবে? আবার তেমন জানাবুঝা নাই একারণেই হয়ত এটা বলাও সহজ মনে হতে পারে যে কোন রাষ্ট্রের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্যপদ না নিলে যেন ঐ রাষ্ট্রের লাভ-ক্ষতি নাই!!! সদস্যপদ না নিয়েও যেন দুনিয়ায় অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকা যাবে!!! তাই কী??? এরা তাই মনে করে। জানাবুঝা না থাকার এই এক বিরাট সুবিধা; যাখশি বলা যায়। আজকের দুনিয়াতে অন্যকোন দেশের সাথে আমদানি-রপ্তানিতে না জড়িয়ে কী অর্থনীতি টিকানো সম্ভব? মনে হয় না এনিয়ে কেউ ভেবে একথা  বলছে!!!

    আনু মুহম্মদের বক্তব্যঃ
    কিছু কঠিন বাস্তব সত্য হল,  খোদ কার্ল মার্কস বা লেনিন তাদের বইতে কী লিখে গেছেন সেটা নয়। সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্র কী সেটা স্তালিন যেটা ব্যবহারিক ভাবে মানে করেছিলেন সেটাই  কমিউনিজম বলে দুনিয়ায় পরিচিত হয়ে আছে। সে বাস্তবতায়, স্তালিন প্রবর্তিত – উতপাদন ব্যবস্থা থেকে ব্যক্তিমালিকানা উচ্ছেদ করে উতপাদন করলেই “বাড়তি মূল্য ফেরত”-সহ সবকিছু সমাধান – এটাই কমিউনিস্টদের সমাজতন্ত্র।

    কিন্তু এটা কী বাস্তবে ‘বাড়তি মূল্য ফেরত’ করেছিল কিনা এমনকি এই সমাজতন্ত্র নিজে কী ভায়াবল এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা? নিজে টিকে থাকতে পেরেছিল কিনা এটা নিয়ে চিন্তা করতেও রাজি না এই কমিউনিস্টেরা।
    এছাড়া স্তালিনের সমাজতন্ত্র  বাড়তি মূল্য ফেরত দেয়ার সুরাহার ব্যাপারটা ছাড়াও মৌলিক যেসব সমালোচনা মুখোমুখি তা হল – এটাও কী আরেক ক্যাপিটালিজম নয়, এক রাষ্ট্রীয় বা স্টেট ক্যাপিটালিজম! যা ক্যাপিটালিজমের চেয়ে বাইরে নয়। ফলে এতে জমা হওয়া বাড়তি মূল্য সেটাও কী শ্রমিক ফেরত পেয়েছে? পায় নাই, কারণ, পার্টি মালিকানায় চলে গিয়েছে। তাই তা ভোগ করেছে পার্টি এলিট – উপর মহলের নেতা কর্তা ও তাদের পরিবারেরা!
    সবচেয়ে বড় কথা এটা ছিল চরম অদক্ষ উতপাদন ব্যবস্থা – প্রত্যকেটা উতপাদিত পণ্যে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অদক্ষ বাড়তি শ্রমের বোঝা চাপানো। ম্যানেজমেন্ট বলে কোন ধারণা সেখানে কাজ করত না।

    স্তালিনের আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ধারণাঃ
    বাণিজ্য হারাম নাকি হালাল মানে জায়েজ কিনা, বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পর্যায়ের কমিউনিস্ট এরাও বলতে পারে না; অস্পষ্ট হয়ে থাকে। কারণ বাণিজ্য করতে গেলে তো মুনাফা করা হয়ে যাবে! মুনাফা করা কী জায়েজ? এটা তো আরো বড় অস্পষ্ট জায়গা! এর উপর আবার আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য? ফলাফলে কমিউনিস্টেরা স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারে না।

    ফ্যাক্টস হল, স্তালিন ব্যক্তি-মালিকানাহীন সমাজতন্ত্রী তো বটেই এছাড়াও তিনি যে অর্থনৈতিক (সমাজতন্ত্র) ভাবনার অনুসারী, সেটা মূলত এক উগ্র অর্থনৈতিক-জাতিবাদী ধারণা। সেটা এই অর্থে যে মনে করে আমার দেশের মানুষ যা কিছু ভোগ ব্যবহার করবে তা কেবল দেশেই তৈরি হতে হবে – এমন এক ইকোনমিক ন্যাশনালিস্ট এরা।
    অনেকের কাছে একালেও যথেষ্ট চিন্তাভাবনা না করে মনে হতে পারেন, এটা খারাপ কী!
    এর খারাপটা হল, সবদেশই সোভিয়েত ইউনিয়নের মত বিশাল বড় ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর নয়। এছাড়া, সবদেশ সব ধরণের পণ্য উতপাদ্নই আসম্ভব নয়, এছাড়া সমান দক্ষ নয় সে তো আছেই। দক্ষতার উপর পণ্যমুল্য নির্ভর করে। আমি যে দেশ যে পণ্য উতপাদনে দক্ষ সেটা নিজে ভোগ ও রপ্তানি করে অন্যের ভাল দক্ষ্যতায় তৈরি পণ্য আমদানি – এই নীতি সবচেয়ে কাজের।
    কিন্তু  মোদির মত উগ্র অর্থনৈতিক জাতিবাদীরা এক ফলস দেশপ্রেম কপচাবে চীনা টিভি ভাঙছে দেখাবে কিন্তু ভারতের ৭০% চীনা মোবাইল ব্যবহার করবে সস্তা বলে; ভারতের ওষুধ কোম্পানিগুলো ৪০% চীনা কাচামাল ব্যবহার করে ওষুধ বানাবে।

    স্তালিন যে বাণিজ্যবিরোধী ও সমাজতন্ত্রের নামে মূলত এক ‘উগ্র অর্থনৈতিক জাতিবাদী’ ছিলেন এর প্রমাণ কী? কিসের ভিত্তিতে একথা বলছি? বলছি এজন্য যে সোভিয়েত ব্লকে নিজেদের মধ্যে কোন  আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাই ছিল না। কেন? সেটা বুঝতে চেয়াষ্টা করেন জেনে যাবেন। সবচেয়ে বড় কথা একটা নিজেদের মত করে  হলেও আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সমতুল্য প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোন “আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা” গড়া সম্ভবই নয়। সোভিয়েতে ব্লকের এই তাগিদই ছিল না।

    সোভিয়েত ব্লক ব্যবস্থাটাও টিকতে না পারার এটাই কারণ।
    গত ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে ঐ সোভিয়েন ইউনিয়ন রাষ্ট্রই একেবারে ভেঙ্গে যায়। মানে, বাইরের কারও আক্রমণ ছাড়াই নিজগুনে নিজেকে রক্ষা করতে না পেরে কথিত সোভিয়েত রাষ্ট্র  – এই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে অকেজো ও টুকরা হয়ে পরেছিল। তাই ভাঙনের পরে তারা আপোষে ১৫টা দেশে (রাশিয়া-সহ) নিজেরা নিজেকে বিভক্ত করে নিয়েছিল। পরের বছর ১৯৯২ সালের মধ্যেই রাশিয়াসহ ১৫টা রাষ্ট্রই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্য হয়ে নিয়েছিল।

    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কী, কেমন প্রতিষ্ঠান সেসব না জানা থাকলে যা ইচ্ছা তাই বলে ফেলা, মাইক কাপানো ইত্যাদি তো অবশ্যই সম্ভব। গত ১৯১৬ সালে লেনিন “সাম্রাজ্যবাদ” বইটা লিখেছিলেন। লেখার পরে ক্যাপিটালিজম ইস্যুতে মুখ্য করে লেখা রচনা আর নাই। ১৯২৪ সালের জানুয়ারিতে তিনি মারা যান। ঐ বইয়ে তিনি লগ্নি পুঁজির ধারণা ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু দুনিয়া কী আজও সেই জায়গায় আছে? লেনিনের দেখা দুনিয়া ছিল কলোনি হয়ে থাকা দুনিয়া। কলোনিদখল অবৈধ ঘোষণা যে হয়েছে, এর উপর ভিত্তি করে জাস্তিসংঘ প্রতিষ্ঠান হয়েছে তা কয়জম=ন কমিউনিস্ট জানে। খোদ স্টালিনই আমল করেন নাই। আর একালের ১৯৪৫ সালের পরে যে গ্লোবাল অর্ডার চালু হয়েছিল তা আপনার অপছন্দের এবং অনুমোদিত হতে পারে; অবু এর সম্পর্কে এই নয়া দুনিয়া সম্পর্কে আপনার অজ্ঞ থাকা গ্রহণযোগ্য নয়। আপনি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সুদের হার সম্পর্কেই খবর নেন নাই। অথচ বলে দিলেন এগুলো হল লগ্নি পুজি। মানে পুঁজি খাতায় সুদ খাবার ব্যবস্থা।  অথচ বিশ্বব্যাংকের সুদের হার হলো – বিনাসুদে এবং আসলও ফেরত দিতে হবে না এমন অনুদান এখান থেকে শুরু করে ০.৭৫% মানে ১% এর নীচে সুদে এবং চল্লিশ বছর ধরে আসল ফেরত যার আবার প্রথম দশবছর সুদ আরোপ হবে না – এসব কী লগ্নি পুজি? টাকা খাটিয়ে সুদ খাবার কারবার??? না জেনে আমরা কেন কথা বলব?

    আব্বার তাই বলে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কী খুবই বাংলাদেশের ফেবারেবল সংগঠন? অবশ্যই না।  কিন্তু ঠিক কোথায় সেটা? এসব জেনে এরপরেই কেবল মুখখোলা উচিত নয় কী?

    আনু মুহম্মদ ঐ সভায় বলেচ্ছেন, পুঁজিবাদের আধিপত্য প্রতিহত করতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে ‘সাউথ এশিয়ান ইউনিয়ন’ গঠন করতে বামপন্থিদের কাজ করতে হবে। “দক্ষিণ এশিয়ায় যে পুঁজির আধিপত্যের মধ্যে আমরা আছি, সেখান থেকে বের হতে গেলে পুরো দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে আমাদের একটা ভিশন চিন্তা করা উচিৎ। এই ভিশনটা একমাত্র বামপন্থিরাই ধারণ করতে পারে।”

    পুঁজিবাদের আধিপত্য – এটা কী জিনিষ? এর তো কোন মানুষ-কর্তা নাই দেখা যাচ্ছে। মানে অবজেকটিভ? আবার ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ভেঙ্গে যাবার পরে দুনিয়ার কোথাও কী ক্যাপিটালিজম ছাড়া অন্য কোন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আছে? বাস্তব সেটা?  আবার চীন যে বহু আগেই স্তালিনের স্টাইলের কথিত সমাজতন্ত্র ছেড়ে দিয়েছে  শুধু তাই না, যে ১৯৩০ সালের মধ্যে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে দুনিয়ার এক নম্বর অর্থনীতি হতে চলেছে এই ফেনোমেনা কে কেমনে ব্যাখ্যা করবো? কথিত পুঁজিবাদ-বিরোধিতা জিনিষটা এক কল্পনা হয়ে থেকে গেছে। বাস্তবতার সাথে যার কোন সম্পর্ক নাই। এই বাস্তবতায় ‘সাউথ এশিয়ান ইউনিয়ন’ পুঁজিবাদ-বিরোধিতার এজেন্ডা কার? কে সেই ফোর্স? দক্ষিণ এশিয়ার কোন দেশ? এমনকি শুধু বাংলাদেশেও এরা কারা? এমন কে আছে? তাহলে এই যে “দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে আমাদের একটা ভিশন চিন্তা” বলা – একটা স্বপ্নে পোলাও খাওয়াও তো এত খারাপ নয়!!!

    বিএনপি এর চেয়ে বেশি কী দেবেঃ
    রাজনীতি বা ক্ষমতা মানেই দেশের তেল-গ্যাস সম্পদ বিদেশিদেরকে দিয়ে দেয়া – এভাবে রাজনীতি ও ক্ষমতাকে ব্যাখ্যা করা এই হাতুড়ে গিরি আর কতদিন? এথেকে বুঝা যায় ‘রিয়েল’ কোন ক্ষমতা পাওয়া বা দখল সম্পর্কে তার কোন ধারণাই নাই।   বিএনপি কোন বিপ্লবী দল নয়, কিন্তু তাবলে তা কল্পনায় পোলাও খেয়ে চলা বামপন্প্নথী চেয়ে বেতার নয় কী? এই অর্থে যে বিএনপি রিয়েল পাওয়ার নিয়ে ডিল করে থাকে!  আনু মুহম্মদ কী বলতে পারবেন বিএনপির ক্ষমতা পেতে বাধা কী কী অথবা হাসিনার ক্ষমতা ধরে রাখতে চ্যালেঞ্জ কী কী? বাস্তব ক্ষমতা কী, কী তার সমস্যা ও সম্ভাবনা বামপন্থীদের কখনও জানা হয় নাই।  আবার, ভারতের সাথে বিএনপির  সম্পর্ক কেমন কী? কোন ধারণা আছে? কিছুই ধারণা নাই। । ক্ষমতা বুঝতে গেলে আগে ক্ষমতার লবি সম্পর্কে অন্তত জানা থাকতে হয়। লবি – হোটেলের লবি যে অর্থে। ক্ষমতার করিডোর যেখানে ক্ষমতা ঘুরাফিরা করে – এর ধারণা যে কখনও ক্ষমতায় যায় নাই অন্তত একবার তার কোন ধারণা থাকবে না। আর না জানা থাকার বিরাট সুবিধাটা হল না জেনে সহজে অবলীলায় সব বলে দেয়া যায়।
    আসলে এক “সারপ্লাস ভ্যালু থিওরি” নিয়ে কিছু বুঝ ছাড়া বামপন্থীরা বাস্তবের ক্ষমতা বা রাজনীতি সম্পর্কে আর কী জানে?  এভাবে আর কতদিন?

    আরো কিছু ধারণাঃ
    “পরাশক্তিগুলোকে আর কী দেওয়ার আছে, তাই খুঁজে পাচ্ছে না বিএনপি: আনু মুহাম্মদ” – এটা বিডিনিউজের রিপোর্টের শিরোনাম। আচ্ছা এই পরাশক্তি মানে কী সোভিয়েত বনাম আমেরিকা? মানে সে জায়গায় রাশিয়া বনাম আমেরিকা?  নাকি চীন বনাম আমেরিকা?
    এছাড়াও এই পরাশক্তি মানে কী সামরিক ক্ষমতা?

    কিন্তু না সরি, এটা এখনকার তো নয়ই, সোভিয়েত আমলেরও বয়ান নয়। সেকালেও “পরাশক্তিগুলোকে আর কী দেওয়ার আছে” এমন, বলা হত না। কারণ সোভিয়েত বা চীন তো কমিউনিস্টদের ঘরের জিনিষ তাই এভাবে তারা বলত না।  তবে হ্যা পরাশক্তি বলতে  সোভিয়েত বনাম আমেরিকাকে যেটা বুঝানো হত সেখানে পরাশক্তি বলতে সামরিক শক্তিই বুঝা বা বুঝানো হত।

    ১। তবে একালে এসে এটা এখন পরিস্কার যে পরাশক্তি মানে সামরিক শক্তি নয়। বরং পরাশক্তি মানে অন্য রাষ্ট্রের উপর প্রভাব বিস্তার বা তার সিদ্ধান্তের উপর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা বুঝায়।  এখানেই শেষ নয়।  অন্য রাষ্ট্রের উপর প্রভাব বিস্তার এর ক্ষমতা এটাই বা আমেরিকার হাতে আসে কেন? আমেরিকার সামরিক শক্তির ভয়ে? না, একেবারেই না।  বাংলাদেশের মত দেশের সাথে আমেরিকার সামরিক ক্ষমতার তুলনা অবান্তর। তাহলে অ্যামেরিকান ক্ষমতাটা কী থেকে এসেছে?  এটা অর্থনৈতিক সক্ষমতা। আরো স্পষ্ট করে বললে বাংলাদেশের মত দেশকে আমেরিকার খুবই কম সুদের বিনিয়োগ পুঁজি (অবকাঠামো ও ডাইরেক্ট বিনিয়োগ দুটাই) যোগান দিবার ক্ষমতা।
    হা আমি উলটা করে বলছি, কমিউনিস্টেরা যা বুঝে এর উলটা। কমিনিস্টদের জানাই নাই যে গত দুশবছরের কলোনি শাসনাধীনে থাকায় তা  আমাদের অর্কেথনীতিকে ব্যপকভাবে পুঁজির অভাবে বুভুক্ষ এক দেশ করে দিয়ে গেছে। পুঁজি নাই তো নয়া কাজ সৃষ্টি নাই। তাতে আপনি পুজিবাদ নাকি কথিত সমাজতন্ত্র যাই করেন। কমিউনিস্টেরা একথাটাই উলটা বুঝছে – তারা বিনিয়োগ নেয়াকে হারাম বুঝেছে।  ভারতের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক সমস্যার মুলে হল এই ভুল ধারণা। নেহেরু ১৯৬৪ সালে মারা গেলেও তার পুঁজিবিরোধী ভারতের অর্থনীতি টিকে ছিল ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। যখন এটা নিজ গুনেই ভেঙ্গে পড়ে আইওএমএফের কাছে হাত পেতেছিল ও সংস্কার করেছিল। কমিউনিস্ট উলটা বুঝের মারাত্মক সমস্যাগুলো এটাই। বাংলাদেশে আমরা সংস্কার করে নিয়েছিলাম ১৯৮২ সালেই।  যেকোন আধা বুঝ আরো বেশি স্মস্যা তৈরি করে। আবার ভারতকে পরাশক্তি বানায় দেয়া হয়েছে। কোন যুক্তিতে ভারত পরাশক্তি?
    যেকথা বলছিলাম পরাশক্তি আসলে একটা বিনিয়োগ দেয়া বিশেষত অবকাথামো মানে কম সুদে বিনিয়োগ দিবার ধারণা। আর কোন দেশের অর্থনীতি যখন বিপুল সারপ্লাস জমার মত অর্থনীতি হয়ে উঠতে পারে সেটাই ও পরাশক্তি হয়ে উঠার পুর্বাভাস। যে ক্ষেত্রে চীন এখন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছে।      কাজেই “পরাশক্তিগুলোকে আর কী দেওয়ার আছে” মানে পরাশক্তিগুলোকে তেল–গ্যাস উপ্টৌকন দিলে তবেই ক্ষমতায় যাওয়া যায় এটা আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়ার গত সত্তর বছর ফেনোমেনা কোথাও ছিল না। এখনও চীন  নাকি আমেরিকাকে তেল-গ্যাসের খনি দিলে তবে ক্ষমতায় যাওয়া যায় এটাও বাস্তবতা নয়। কেবল ২০১৮ সালের পরে কোয়াড বা কে কন দেশের দেশের বলয়ে যাবে এনিয়ে ইন্দো-প্যাসেফক স্তাতেজি বিষয়ক আলাপ উঠেছে। তাও সেটা আবার কোন অ্যামেরিকান প্রেসিদেন্ট এনিয়ে কী অবস্থান নেয় তার উপর নির্ভরশীল। কাজেই আন্দাজি কথা বলা ত্যাগ করাই ভালো।

    ২। এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাঃ
    কথাটা আলোচনার শিরোনামে আছে। কিন্তু ভুরাজনীতি জিনিষটা কী? কেউ এনিয়ে কথা আগায় নাই। এছাড়া এখন একালে মানে আরো ছট করে বলা যায় ২০১০ সালের পরে আগে নয়, এই শব্দটার ব্যবহার চালু হল কেন? কী বুঝাতে চায়? কোন খবর নাই। বরং একটা সহজ নির্ণায়ক দেই । দেখবেন কেউ যদি ভুরাজনীতি শব্দতা ব্যবহার করে তো বুঝবেন যা সে বলছে  তার এনিয়ে জানার মধ্যে কোথাও অস্পষ্টতা আছে। আর এই অস্পষ্টতা ডাকার মোক্ষম শব্দ হল ভুরাজনীতি। শব্দটা কেবল সেই বিষয় নিয়ে কথা বলে যখন কোন দেশের ভৌগলিক অবস্থানই ঐ দেশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপুর্ণ করে তোলে কোন বিশেষ কালে। এজন্যি ভূ বা জিও [GEO] শব্দটা। শব্দটা ১৯৪০ দশকে স্বল্প সময়ের জন্য চালু হয়েছিল। পরে যুদ্ধ শেষের গ্লোবাল পরিবর্তনে নয়া সিস্টেমে শব্দটা অপ্রয়োহনীয় হয়ে যায়। প্রতীক চট্টোপাধায় বলছেন, ” ভূ-রাজনীতি এখন জটিল অবস্থায় আছে। সেখানে পুজির স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে, নির্দিষ্ট জাতি রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে”। এটা ব্যাপক এক জ্ঞানের কথা বলেছেন মনে হলেও এটা অর্থহীন কিছু কথা।  ভূ-রাজনীতি জিনিষটা কী? কেন তা এখন জটিল এর কোন মা-বাপ নাই। শেষে এলো পুঁজির স্বার্থ। আচ্ছা বলেন তো দুনিয়ায় এখন কোন অর্থনৈতিক ততপরতাটা পুঁজির নয়? কাজেই এসব বকোয়াজি কেন?

    সবশেষ  প্রতীক চট্টোপাধায় দেখা যাচ্ছে অজ্ঞতার সীমা ছাড়িয়ে গেলেন। বলছেন, প্রতীক চট্টোপাধায় বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বটি মেকি আখ্যায়িত করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই শিক্ষক বলেন, “গত পরশু হেনরি কিসিঞ্জার চীন ভিজিট করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের কোনো ঝামেলা নাই। এগুলো হচ্ছে আইওয়াশ”।

    ৩। যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বঃ
    প্রতীক সাহেবকে সবার আগে বলতে হত যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্ব এটাকে তিনি কী বলে বুঝেছেন? যেটাকে আবার তিনি ঝামেলা নাই-ও বলছেন?  কিভাবে বুঝলেন? এরপরেই কেবল আমরা শুনতাম কেন এটা তিনি মেকি বলছেন? তিনি তো জানেনই না তাদের দ্বন্দ্ব না হলেও ঝগড়া বিরোধটা কী নিয়ে? এছারা আবার হেনরি কিসিঞ্জার চীন ভিজিট করতে গিয়ে কে কী বলেছে তিনি কী জানেন ফলো করেছেন? কমিউনিস্টদের স্মস্যা হচ্ছে সারপ্লাস ভ্যালু নিয়ে কথা তোলা – এটা ছাড়া ছাড়া বাকি সব প্রসঙ্গই ভুয়া মেকি ইত্যাদি। এজন্য তারা জবরদস্তিতে হলেও যেকোন সমস্যা-জটিলতাকে সারপ্লাস ভ্যালুর সমস্যা বলে রিডিউস করে নাস্মিয়ে দেখাতে ভালো বাসে। একদম গরুর রচনা করে ছাড়ে সবকিছুকে! এভাবে নিজেকে অর্থহীন কথাবলার লোক হিশাবে তুলে ধরেন কেন? মফস্বলের চা দোকানে বসে চাঁদে যাওয়াকে মিছা কথা বলে তুমুল তর্কের মত!

     

     

    আপডেটেডঃ  ২৭  জুলাই ২০২৩; রাত
    আপডেটেডঃ     জুলাই ২০২৩;

    >>>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

     

     

     

  • একালেও কিসিঞ্জার আমেরিকা-চীনের জন্য দরকারি সফরে

    একালেও কিসিঞ্জার আমেরিকা-চীনের জন্য দরকারি সফরে
    গৌতম দাস

    ২৩ জুলাই ২০২৩  মধ্যরাত ০০ঃ ০৩
    https://wp.me/p1sCvy-4Jj

    Henry Kissinger with President Xi Jinping

     

    হেনরি কিসিঞ্জার এর কথা বাংলাদেশের মনে থাকার কথা। তাঁর বয়স এখন একেবারেই শত বছর। ফলে ব্যক্তিগত সবকাজেই এইড[aid]  বা সাহায্যকারীর সহায়তায় চলে তার জীবন। কিন্তু তবু  তাঁর এই জীবন খুবই সচল ও সক্রিয় এক জীবন। মানে বেড-রিডেন [bed-ridden] বা বিছানায় বেশিরভাগ সময় কেবল শুয়েই কাটায় বলতে সিনিয়র-বয়স্ক সিটিজেনদের যেমন কাটে তাঁর বেলায় এটা ঠিক তেমন নয়। যেমন কম করে গত বিশবছর যদি ধরি তো তিনি নিজ লিখা লিখেন না টাইপও করে লিখেন না। বরং মুখে বলে ডিকটেশন [dictation] দিয়ে লেখান – এইডদের সহায়তায়।
    হেনরি কিসিঞ্জার এখন রীতিমত বিমানে উড়ে  চীন সফরে এসে গেছেন। তবে যতগুলো পশ্চিমা মিডিয়া রিপোর্ট পড়েছি – CNN, REUTERS, BBC, BLOOMBERG ইত্যাদি এমনকি চীনা জিনহুয়া কোথাও উল্লেখ করা নাই  যে কিসিঞ্জার কারও আমন্ত্রণে চীন গিয়েছেন কিনা! বরং সব জায়গায় লেখা আছে যে কিসিঞ্জার চীন সফরে গেছেন; অর্থাৎ নিজেই গিয়েছেন এবং গত শনিবার তিনি প্রেসিদেন্ট শি এর সাথে মিটিং করেছেন। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্ররা জানাতে ভুলেন নাই যে এই সফর ব্যক্তিগত; মানে তিনি বাইডেনের কোন দুত হিশাবে যান নাই। অথবা কেউ জানিয়েছেন, “কিসিঞ্জার অবশ্যই কোন সরকারি পদ বা প্রশাসনকে প্রতিনিধিত্বকারি কেউ নন”। হোয়াইট হাউজের বাইডেন প্রশাসনের স্টাফদের ভাষায়, তিনি ‘এখন এক প্রাইভেট সিটিজেন এবং সে হিসাবেই তিনি চীন সফরে’ আছেন।
    তবে বেশিরভাগ মিডিয়া রিপোর্ট শুরু হয়েছে প্রেসিডেন্ট শি অথবা হেনরি কিসিঞ্জার এদুইয়ের কেউ না কেউ অথবা উভয়েই কী উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন তা দিয়ে। যেমন  রয়টার্স লিখেছে, প্রেসিডেন্ট শি কিসিঞ্জারকে শুধু পুরানা বন্ধু-ই [old friends] বলেন নাই সাথে বলেছেন, তাঁর মত পুরাতন বন্ধুকে কখনও ভোলা যাবে না। […Chinese President Xi Jinping told Henry Kissinger that “old friends” like him will never be forgotten,…।]  একইভাবে বিবিসি লিখেছে, আমাদের পুরানা বন্ধুকে আমরা কখনো ভুলতে পারি না এবং চীন-আমেরিকার (প্রথম কাছে আসা) বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে কিসিঞ্জারের ঐতিহাসিক অবদান আমরা ভুলব না –[ “We will never forget our old friends, and will not forget your historical contributions to develop US-China relations and friendship]। এছাড়া বিবিসি অবশ্য কিসিঞ্জারের এই সফরকে সাপ্রাইজ সফর বলেছে আর শিরোনামে বলেছে, আমেরিকা চাচ্ছে,  চীনের সাথে সম্পর্কের বরফ ভাঙতেই কিসিঞ্জার আসুক তাই তিনি  এসেছেন […US seeks to defrost China ties]।

                                KISSINGER & MAO 1971

    কেন কিসিঞ্জার বিখ্যাত – ব্যাকগ্রাউন্ড অবদানঃ
    কিসিঞ্জার নিয়ে কোন কিছু পড়ার সময় সংক্ষেপে আমাদের দুটা জিনিষ অবশ্যই মনে রাখতে হবে যা আমাদেরকে তাঁকে বুঝতে সহায়তা করবে। প্রথমত.  আমজনতা হিশাবে আমরা ১৯৭১ সালের কিসিঞ্জারকে চিনব যিনি সেসময় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধী মানে আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে ভুমিকা রাখেন নাই। যদিও হবু বাংলাদেশকে রিলিফ অর্থে সাহায্য-সহায়তা চালু রেখেছিলেন। এসব কথা সত্য হলেও খেয়াল রাখতে হবে এসবই এখনকার প্রাসঙ্গিক আলাপের বিষয়ের দিক থেকে এক লোকাল বা স্থানীয় ঘটনা। আর এই লোকাল দিকটার বাইরে আরেক গ্লোবাল দিক আছে – যেটা আমাদের এখনকার আলোচ্য মূল বিষয়। তাই গ্লোবাল ভুমিকার দিক নিয়ে আমরা এখন কথা তুলব।  যখন ঐ একই ১৯৭১ সালের তো বটেই সাথে সেই সত্তর দশক জুড়েই কিসিঞ্জারের ভুমিকা ছিল গ্লোবাল রাজনীতিতে তাতপর্যপুর্ণ।
    তিনি প্রেসিডেন্ট নিক্সন আর পরের প্রেসিডেন্ট ফোর্ড এই দুজনের আমলেই (১৯৬৯-১৯৭৭) এই পুরা সময়কাল জুড়ে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (মন্ত্রী) ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (মন্ত্রী) [ সেক্রেটারি স্টেট ডিপার্টমেন্ট] ছিলেন এবং এই আট বছর ধরে তিনি সবকিছু কাঁপিয়ে বেরিয়েছেন তাঁর সারা জীবনের গুরুত্বপুর্ণ সময়কাল হিশাবে। মূলত এসময়কালে তিনি দক্ষ নিগোশিয়েটর বা মধ্যস্ততাকারী পরিচয়ে মুখ্য অবদান রেখেছেন। যেমন দাবি করা হয় তিনি আমেরিকার সেনা প্রত্যাহার করিয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধকে সমাপ্তির দিকে নিতে বিবদমান সবপক্ষের জন্য কাজ করেছেন। যেটা অন্যভাবে বললে সেকালের অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্টকেও মানাতে পেরেছিলেন যুদ্ধ আর আগালে সেটা আমেরিকার পক্ষে যাবে না। তবে মূলকথা এসবই আসলে অ্যামেরিকান দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে কথা বলা এক কিসিঞ্জারের অবস্থান। ভিয়েতনাম ইস্যুটা ছাড়াও আমেরিকার জন্য আরেক বড় অর্জন হল – সেটা ছিল কিসিঞ্জারের আরেক ধাক্কা তৈরি করা ঘটনা যা সাধারণ্যে চীন-আমেরিকার পারস্পরকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দান ও ঘনিষ্ট সম্পর্ক ঘটানো।
    যার ভিতরের মূল ঘটনাটা হল, ১। চীনের মাও তার বিপ্লবের দশবছরের মধ্যে বা পরে টের পান যেভাবে ভাবা হয়েছিল কথিত সমবায়ে কৃষি উতপাদন সেভাবে বাড়ছে না। ২। কৃষিসহ সবখানেই মালিকানা যেমনই হোক বিনিয়োগ পুঁজির স্বল্পতা এক বড় ফ্যাক্টর জ্ঞান করেন। তাই তিনি নয়াপথ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম করাকে সঠিক জ্ঞান করে সিদ্ধান্ত নেন।  যদিও এই নয়াপথে যেতে নিজে পার্টি সংগঠন কে ঢেলে সাজাতে গিয়ে মাও-কে কমপক্ষ ২০ বছর সময় ব্যায় করতে হয়েছিল। ৩। এর শেষ দশ বছর মাও আমেরিকার সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে ব্যয় করেছিলেন। হবু বাংলাদেশের স্বার্থকে তাই নিজ চীনের এই নয়াস্বার্থে বলি দিয়ে দিছিলেন। খুবই সংক্ষেপে শিরোনামে বললে, এই প্রথম ১৯৭১ সালে চীন জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করেছিল এবং সেটা ভেটোক্ষমতা-সহ সদস্যপদ। যা জাতিসংঘ জন্মের সময়ে চীনকে দেয়া হলেও ১৯৭১ সালের আগে পর্যন্ত তা (১৯৪৯ সালের চীনাবিপ্লবের পর থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত) ব্যবহার করত শুধু তাইওয়ান। সেটাই তখন তাইওয়ানকে বাদ দিয়ে -সমগ্র চীন বলতে – সেটা মাওয়ের চীনই জাতিসংঘ স্বীকৃতি করে আর বিচ্ছইন্ন হয়ে যায় অফিসিয়ালি ও জাতিসংঘের চোখেও ঐ মাওয়ের মূল চীনের অংশ।  এই বিষয়টাকে সংক্ষেপে মাওয়ের চীনের একচীন নীতি বলে আখ্যায়িত করা শুরু হয়েছিল; আর আমেরিকা তখন এটাই এটাই তার নীতি-অবস্থান বলে ঘোষণা করেছিল।  েসব কিছু শেষ করতে মাওয়ের ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যায়।  পরে ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পুর্ব-ঘোষণা দিয়ে দিয়ে উভয় দেশ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দান করে অর্থনৈতিক-সহ বাকি সব পারস্পরিক ততপরতা শুরু করেছিল।

    কিন্তু এতে আমেরিকার কী লাভ হয়েছিল?
    গত ১৯৭৮ সাল থেকে পরের অন্তত ৩২ বছর মানে ২০১০ সাল পর্যন্ত ডাবল ডিজিট জিডিপির চীনা অর্থনীতি গড়তে  যত বিনিয়োগ পুঁজি লেগেছিল এর মাখন অংশ সবই আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট [wall street] এই গ্লোবাল পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ-পুঁজি। এসবের মধ্যে কাজের সবচেয়ে জটিল অংশটা ছিল চীন-আমেরিকার প্রতিটা পদে পদে পারস্পরিক স্বার্থ-ঝগড়ার ইস্যুগুলোকে আপোষ মীমাংসায় পৌছানোর নিগোশিয়েশন – এরই প্রধান নায়ক উদ্যোক্তা ছিলেন হেনরি কিসিঙ্গার। মানে একদিকে অ্যামেরিকান রাজনীতির পক্ষগুলো ও সরকার-প্রশাসনকেই শুধু আস্থায় নেয়াই নয় আবার সাথে অন্যদিকে ওয়াল স্ট্রিট ব্যবসায়ীদেরকেও তাদের স্বার্থের দিকটা-সহ আস্থায় নেয়া – এসবই ঘটাতে পেরেই এর পুরা নিগোশিয়েশনটা সম্পন্ন করতে হয়েছিল কিসিঙ্গার-কে।  ক্যাপিটালিজমের আদি-সংকট হল দুদিন পরপর পুঁজি বিনিয়োগের বাজার সঙ্কুচিত হয়ে যায় আর তা থেকে তৈরি হয় ব্যাপক সংকট হাহাকার।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সফলভাবে নিজের পক্ষে পরিসমাপ্তি দেয়া যা ছিল প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট- ট্রুম্যানের এক ব্যাপক অর্জন। কারণ, তা এই প্রথম (অন্যান্যদিকে আর যাই হোক)  ১৯৪৫ সালের পর থেকে অন্তত আমেরিকাকান ওয়াল স্ট্রিট এর গ্লোবাল পুঁজিবাজারের জন্য এক ব্যাপক গ্লোবাল বিনিয়োগ বাজার যোগাড় করে এনে দিয়েছিল। সেবার চীন স্বীকৃতিতে ১৯৭৮ সালে আরেকবার প্রায় একইভাবে আরেকবার ওয়াল স্ট্রিটকে  ব্যাপক গ্লোবাল বিনিয়োগ বাজার যোগাড় করে দিয়েছিল – মানে আবার নয়া বাজার খুলেছিল কিসিঞ্জারের হাত দিয়ে অ্যামেরিকান প্রশাসন।

    আমেরিকা কী জানত না যে এতে এই চীন এককালে [৩০-৫০ বছরের মধ্যে] আমেরিকারই প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠবে? জবাবটা ধরে নেয়া যাক তারা জানত! কিন্তু তাতে কী? কারণ গ্লোবাল পুঁজি বিনিয়োগের বাজার তার নিয়মিত বাজার ফুরিয়ে আসার সংকট বাসঙ্কুচিত হওয়া এভাবেই – ‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও’ আর ‘বাকিটা বা পরেরটা আবার পরে দেখা যাবে’ – এভাবেই পথ মারিয়ে চলে থাকে। তাই অনুমান করা হচ্ছে ২০৩০ সালের আশেপাশে চীনা অর্থনীতি আমেরিকাকেই ছাড়িয়ে যাবে  – যা হলেও কিছুই করার নাই!!! এটা তখনও কিছুই করার ছিল না, এখনও নাই।  এরই এক ভাল উদাহরণ হল, ২০০৯ সালে চীনকে ব্রিকস [BRICS] উদ্যোগে নতুন করে চীনা নেতৃত্বে রাইজিং অর্থনীতিগুলোকে নিয়ে নয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা শুরু করার পরামর্শটা দিয়েছিল এই ওয়াল স্ট্রিট থেকেই।

    আমরা এখানে সীমাবদ্ধ থাকব কিসিঙ্গার প্রসঙ্গের মধ্যে। তাহলে কিসিঙ্গারের ঐ সময়টা গুরুত্বপুর্ণ ছিল কারণ, নিগোশিয়েশন দক্ষতা – এটা অ্যামেরিকান অর্থনীতিকে আরেক প্রাণ দিয়েছিল। আবার সেটাই পুরানা চীনকে আজকের চীন বানানোর সুযোগ এনে দিয়েছিল। এই অর্জন এটাই এক খ্যাতিমান কিসিঞ্জার এর জন্ম দিয়েছিল। এছারা দ্বিতীয়ত, কিসিঞ্জার খ্যাত হয়েছেন আরেক কারণে। তা হল, তাঁর এই  নিগোশিয়েশন দক্ষতা  ও কর্ম আমেরিকায় তো বটেই সারা একাদেমিক জগতে সাড়া ফেলে ও তত্বায়িত করা হয়ে গেছে, নিবিড় পাঠের জন্য। বিশেষ করে অ্যামেরিকান প্রফেশনাল ডিপ্লোম্যাট, আমলা, স্ট্রাটেজিস্ট, নীতি-নির্ধারক, কনসালটেন্ট ইত্যাদি সকল পেশাদারদের কাছে তিনি কিসিঞ্জার নিজেই হয়ে উঠে আছেন এক পাঠযোগ্য সাবজেক্ট [reading material]  হিশাবে।  এটাই কিসিঞ্জার খ্যাতিমান হয়ে উঠার দ্বিতীয় কারণ।
    পাঠকদের প্রতি অনুরোধ – খুঁটিয়ে কিসিঞ্জার পাঠ করতে মনোযোগী হতে।  এটা একেবারেই ভুল পথ যে তাই ভুলে যান যে আপনি আমেরিকা নাকি চীনের সমর্থক।  আপনি কার সমর্থক তা জাহির করে এরপর কিছু বুঝতে-পড়তে শিখা এটা সবচেয়ে কমকথায় বললেও এক পন্ডশ্রম – গাধামি! বরং আপনার লক্ষ্য হতে হবে ঘটনা-ফেনোমেনা চীন নাকি আমেরিকার তাতে কিছুই এসে যায় না, আপনাকে তা যতটা সম্ভব স্পষ্ট বুঝতে ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে দেখানোর ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এই সক্ষমতাই আপনার নীট অর্জন যা আপনাকে সম্মান ও গুরুত্ব এনে দিবে। কেবল বোকারাই সমর্থক হবার জন্য লাফালাফি করে সময় নষ্ট করে।

    একালের কিসিঞ্জারও গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠছেন কেনঃ 
    এই সময়কালে বিশেষত, বাইডেনের বর্তমান আমলে চীন-আমেরিকান সম্পর্ক সম্ভবত শীতলতম বলা যায়!  এদিকে ব্যক্তিটা কিসিঞ্জার বলেই হয়ত অনেক বেশি (প্রায় দশটা মিডিয়ায়) পশ্চিমা ও চীনা ভাষ্য পড়তে হয়েছিল। আর তাতেই লক্ষ্যণীয় যে  চীন-আমেরিকান সম্পর্ক সম্ভবত শীতলতম হওয়া সত্বেও এসময়ে সব মিডিয়া গুরুত্ব দিয়েছে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সহ সকলেই কিভাবে কিসিঞ্জারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন।  এখন চীনের দিক থেকে দেখলে কিসিঞ্জারকে নিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর উচ্ছসিত বা কিছু আবেগী মন্তব্য প্রকাশ – এটা বাস্তবতই তাই কারণ সেসময়ে কিসিঞ্জারের “ঐতিহাসিক অবদান ভুলা যায় না” কথাটা চীনের দিক থেকে আজও বাড়িয়ে বলা নয়। কিন্তু তাই বলে সবটাই কী চীন বা শি জিনপিংয়ের আবেগ আর উচ্ছাস????
    সম্ভবত একেবারেই না। বরং চীন আর আমেরিকা এই উভয় পক্ষই – ইনফরমালি ফরমাল – এই ভঙ্গিতে সব জানে এবং সবটাই পরোক্ষে। তবে সেটা যাই হোক বিবিসি ইতোমধ্যে চীন-আমেরিকার সম্পর্কের ঢলে পরা সম্পর্ককে উন্নতি ঘটাতে  কিসিঞ্জারের ভুমিকা রাখার সম্ভাবনা দেখে এক ম অন্তব্য করেছে। বিবিসি বলেছে কিসিঞ্জার যত বড় ব্যক্তিত্ব তাতে তিনি পিছনের ঘরের মাধ্যমে আমেরিকা-চীনের এর আলাপ-আলোচনা রফায় পৌছানোর পক্ষে ভুমিকা রাখতে পারেন  […But given his outsized stature in China, he could act as a backchannel for US-China negotiations.]।
    কিন্তু কী সেটা, বা এর সাবজেক্ট বা লক্ষ্য কী? লক্ষ্য হল, বাইডেন তিন বছরের প্রান্তে এসে তাঁর আর সময় আর অনেক কমই বাকি। এই অর্থে যে আর ১৬ মাসের মধ্যে (নভেম্বর ২০২৪) তাঁকেও পরবর্তি  নির্বাচন ফেস করতে হবে।   তাই নির্বাচনের আগের করণীয়ের জন্য যে এক বছর সময় লাগে বা পাওয়া যায় মানে [নভেম্বর ২০২৩ – নভেম্বর ২০২৪] – এই সময়কাল এর জন্য কিছু প্রস্তুতিতে তিনি ঘাটতিতে আছেন।

    ২০২৪ নির্বাচনে বাইডেনের অন্তত দুইটা ইস্যুতে চীনকে তাঁর দরকারঃ
    প্রথম শিরোনাম হল, বাইডেন ইউক্রেন ইস্যুতে সময় আর অর্থ দুটাই যথেষ্ট বেশি ব্যবহার করে ফেলেছেন; কথাটা নির্বাচনী প্রেক্ষিতে বুঝতে হবে যা বাইডেনের জন্য যথেষ্ট নেতিবাচক। এমনিতেই প্রতি দশবছরের আগেই অ্যামেরিকান রাষ্ট্র যে অন্তত েকবার করে  থেকে ঋণ করে খোদ রাষ্ট্রের ঋণগ্রহণের সীমা বাড়িয়ে তবেই  [৩১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার পার হয়ে গেছে] তার ব্যয়নির্বাহ করে চলছে – এই আমেরিকা রাষ্ট্রকে ঋণ করার অনুমতি বা সিনেট-সংসদের দেয়া সিলিং তাকে বার বার বাড়িয়ে নিতে হচ্ছে।  তাই আমেরিকা নিজে ধার করে সেই অর্থে ইউক্রেনের মানুষ ও অথনীতি বাঁচিয়ে রাখা আবার এই যুদ্ধের ব্যয় মিটানো – এটা একটা তিতা সীমায় পৌছে গেছে। আগামি সেপ্টেম্বরের আগে ইউক্রেনকে আবার দেওয়ার মত কোন ঋণের বিলে সেনেটে আসছে না। এরপরে কী হবে সেটাও এখন অনিশ্চিত।  অথচ এই যুদ্ধ চালানো অবস্থায় অ্যামেরিকান নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এটা বাইডেনের প্রার্থীতার বিরুদ্ধে যাবে বলেই অনুমান। তাই নির্বাচনের আগেই যুদ্ধের শেষ হওয়া দরকার!
    কিন্তু ইতোমধ্যেই তাইওয়ান ইস্যুতে স্পিকার, সংসদ নেতা বা সদস্য পাঠানোকে কেন্দ্র করে চীনের সাথে সম্পর্ককে তিতা করে ফেলা হয়ে গেছে। বাইডেনের একালে স্যাংশন শুধু রাশিয়া বা বাংলাদেশ না, খোদ চীনের উপরেও কোন কম হয় নাই! আগের ট্রাম্পের আমল থেকেই মধ্যবিত্ত ভোক্তা যেসব চীনা হাউজহোল্ড আইটেম কিনতে আস্থা পায় এর উপর ৯০% পর্যন্ত বাড়তি শুল্ক  আরোপ করে রেখে গেছিলেন; তা বাইডেন হাত দেন নাই। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়এ পরোক্ষে হলেও চীনের সাথে টেনশন কম নাই।  এককথায় গত তিনবছরে চীনের সাথে নুন্যতম ওয়ার্কিং রিলেশন থাকছে বা থাকবে কিনা এটা চিন্তা না করে বেপরোয়া হয়ে বাইডেন সব পদক্ষেপ নিয়ে গেছেন। এসবই এখন থামাতে বা কমাতে চাইছেন!!  আর সেটা অন্তত নিজ নির্বাচনী কাজে লাগবে এমন কৌশল ও কাজের খাতিরে।
    এবারের ঋণ সিলিংয়ের ব্বিল পাশ হয়েছিল গত ৩ জুন আর এরপর থেকেই বাইডেন চীনের সাথে কিভাবে দরজা খুলে নেয়া যায় তা ভাবতে থাকেন।  আর প্রায় একই সময়ে [২-৪ জুন ২০২৩] এবারের সিঙ্গাপুরের সাংগ্রিলা নিরাপত্তা সম্মেলন   অনুষ্ঠিত হয়। এটা হল, চীন-আমেরিকা সহ প্রায় সকল মুখ্য প্রভাবের রাষ্টড়্গুলোর সিকিউরিটি ইস্যুতে পরস্পরের অবস্থানকে বুঝাবুঝি বাড়ানোর এক ব্যতিক্রম সম্মেলন।  বাইডেন চীনের সাথে এতদিনের বেপরোয়া দুরত্ব তৈরির প্রয়াস এবার ক্ষান্ত দিতে চাচ্ছিলেন এই সাংগ্রিলা সম্মেলন থেকেই।  অ্যামেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন চেয়েছিলেন উপস্থিত চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে সাইডলাইনে বৈঠকে বসেন। কিন্তু চীনামন্ত্রী এই আগ্রহে ঠান্ডা পানি ঢেলে দেন। পিছনের কারণ যা জানা গেছিল তা হল বর্তমান চীনামন্ত্রীর বিরুদ্ধে অ্যামেরিকান স্যাংশন আরোপ করা আছে – চীন কিছু রাশিয়ান অস্ত্র আমদানি করেছিল বলে।
    তবে আমেরিকা ঐ ব্যর্থতা সত্বেও  প্রচেষ্টা অব্যহত রেখেছিল। তাই কিছুদিনের মধ্যেই ব্লিকেনের চীন সফর ঘটেছিল। কিন্তু এত শীতল সফর কেউ আগে দেখেনি যেন; কোন মিডিয়াতেই এই সফর থেকে নুন্যতম আশাবাদ  রাখার কিছু নাই এটাই বর্ণনা করেছিল; হয়েছিলই তাই। কিন্তু ব্লিঙ্কেনের সফরের পরে আসেন আমেরিকার অর্থমন্ত্রী জেনেট ইয়েলেন।  এবার এতে দেখা যায় চীনারা কিছু মুখ খুলেছে – অন্তত কিছু ইস্যুতে সবটা না হলেও অনেক অগ্রগতির দেখা মিলেছিল। যদিও সফর প্রথম দিনেই জেনেট ঝাড়ি দিয়ে কথা বলে শুরু করেছিলেন। এজন্য যে চীন কেন অ্যামেরিকান কিছু

    ইয়েলেন এর সফর নিয়ে আলাদা বিস্তারে লিখতে হবে। তবে এখনকার প্রাসঙ্গিকতা হল, কিসিঞ্জার ইয়েলেনের এই এপ্রোচ এর সমালোচনা করেছেন। তবে ইয়েলেনের কথায় পরিস্কার যে বাইডেনের আগামি নির্বাচন তিনি লড়বেন অন্তত দুটা এজেন্ডাকে সামনে নিয়ে – জলবায়ু-পরিবেশ আর গ্লোবাল অর্থনৈতিক পুনর্গঠন । এই ধারণাওটা পাওয়ায় আযায় ইয়েলেনের সফরের বক্তব্য থেকে। তিনি গত ৯ জুন থেকে শুধু চীন সফরে গেছিলেন তাই না। তিনি এরপরে ভারতের গুজরাতে  -জি২০- অগ্রসর অর্থনৈতিক দেশের জোট    এর সভায় যোগ দিতে গেছিলেন। সেখানেই তিনি জানান বাইডেন সরকারের এদুই পরিকল্পনার কথা [দেখেন ……Yellen ‘eager’ to work with China on debt, other global challenges।]।
    আর জলবায়ু প্রসঙ্গে আলাপ করার জন্য এরপরে বাইডেন প্রশাসনের জলবায়ু বিষয়ে বিশেষ দুত জন কেরি চীন গেছিলেন। খুব সম্ভবত রিপাব্লিকান প্রার্থী হিশাবে ট্রাম্প বা অন্য যেই আসেন তাদের জলবায়ু প্রোগাম নিয়ে নির্বাচনী ইস্যু নাই থাকতে পারে, ট্রাম্পের মতন। আর এই সুযোগটাই সম্ভবত নিতে চান বাইডেন।
    আর ঋণ পরিশোধিত না হওয়া গরীব দেশের ঋণকে রি-শিডিউল  বা ঢেলে সাজাতে গেলে এরজন্য অর্থের চাপ নিবার ক্ষমতা চীনের বেশি বলে আমেরিকা এই ইস্যুতে চীনের সাথে গাটছাড়া বাধতে চায়।  যার মানে চীনা ঋণের ফাঁদ এই বক্তব্য এখন হজম করে লুকিয়ে ইয়েলেন এখন চীনা এলায়েন্স গড়ে তুলতে চাইছে।

    তাই এসব কাজে হেনরি কিসিঞ্জার ভুমিকা রাখেন যেন এটা বাইডেনের পরোক্ষে চাওয়া।
    এটা ঠিক ততটা পরোক্ষে থাকবে না। কারণ কিসিঞ্জার আগেই ঘোষণা দিয়েছেন যে আমেরিকা ফিরে গিয়ে তিনি নিজেই বাইডেন প্রশাসনকে এনিয়ে ব্রিফ করবেন। আর ওদিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে বাইডেন মটিঙ্গোয়ে বসে সম্পর্ক আবার ঘনিষ্ট করতে চান স্টা বাইডেন জানিয়ে দিয়েছেন। খুব সম্ভবত বাইডেন ইউক্রেন যুদ্ধের শেষ চান আর যেকাজে চীন মধ্যস্থকারির ভুমিকা নেক – এটাই হবে সম্ভবত বাইডেনের চাওয়া।মটা দাগে এসবই হোল আগামি দিনের চীন-আমেরিকার সম্পর্কের রূট বা অভিমুখ। এখন প্রশ্ন হল যত সহজে এটাকে গত প্রায় তিনবছর ধরে ডিকাপলিং [decoupling] বা বিচ্ছিন্নতার লাইনে বাইডেন ঠেলেছেন তাতে এখন চাইলেই কী স্বাভাবিক সম্পর্কে ফেরা যাবে – এটাই বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। আস্থা ভাঙ্গা যত সহজ তত সহজে তা আবার গড়ে নেয়া যায় না!!!

     

    আপডেটেডঃ  ২৩  জুলাই ২০২৩; রাত ০২ঃ ০৮
    আপডেটেডঃ     জুলাই ২০২৩;

    >>>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!

     

    বাংলাদেশ প্রসঙ্গেঃ
    ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!

    ১৪ জুলাই ২০২৩   মধ্যরাত ০০ঃ ০৫
    https://wp.me/p1sCvy-4In

     

                        VOA  –  MODI & BIDEN

     

    “বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমেরিকা আর ভারতের কথা শুনে কোন সিদ্ধান্ত নিবে না!” – সেসব দিন শেষ হয়েছে। হ্যা কথা এটাই; যদিও কথাটা আমার নয়। কথাটা বলেছেন এসএনএম আবদি; ভারতীয় সাংবাদিক!  আবদি লিখেছেন “Heart of the Matter: India, US not on the same page in Bangladesh” আক্ষরিক অর্থে বললে, আবদি বলছিলেন “ঘটনার মূলে হল – ভারত ও আমেরিকা আর একমতে বাংলাদেশের কোন কিছুকে দেখছে না”।

    হা বাংলাদেশ নিয়ে ভারত-আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি আর এক নয়ঃ
    আবার এসএনএম আবদি [SNM Abdi] ভারতীয় সাংবাদিক;  এক দৈনিকের সাবেক  সম্পাদক এসএনএম আবদি চলতি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আবার লিখেছেন। প্রায় একমাসের বেশি কিছুদিন আগে তাঁর লেখা নিয়ে আমার আলোচনা-মন্তব্যে তাঁর পরিচয় নিয়ে অনেক লিখেছি। তাই এবার আবার সেদিকে যাচ্ছি না। তবে দৃশ্যত আবদি আর সুবীর ভৌমিক (যিনি আবদির মত গত শতকের আরেক সাংবাদিক), এরা দুজনেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ও সম্ভবত এঁরা তাদের মিডিয়া উইংয়ে কাজ করেন বলে মনে করা হয়। অনেকে যারা ভারতের রাজনীতির উত্থান-পতন ও ট্রেন্ড-অভিমুখ মনিটর করেন, খেয়াল রাখেন এটা তাদের ধারণা বা মতামত। এদের দুজনেরই তাই একই সমস্যা যে তাঁরা পাবলিকলি বলতে পারেন না যে তাঁরা এখন কী করেন বা কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে আছেন বা কাজ করেন! কোন প্রতিষ্ঠানের বেতনের লিস্টে বা পে-রোলে তাদের নাম আছে! ইত্যাদি!

    আবদি আবার বাংলাদেশ প্রসঙ্গে লিখেছেন গত ১০ জুলাইয়ে, ভারতের ফ্রি-প্রেস-জর্নাল নামে এক বহু পুরানা ইংরাজি পত্রিকাতে, যার শিরোনাম “Heart of the Matter: India, US not on the same page in Bangladesh” । আমাদের মানবজমিনও আবার সে লেখা অনুবাদ করে চাপিয়েছে – “বাংলাদেশ বিষয়ে ভারত থেকে আলাদা যুক্তরাষ্ট্র, নিতে চায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত” – এই শিরোনামে। ফলে পাঠক যারা বাংলা বা ইংরাজি যেটা থেকেই পড়তে চান পড়তে পারেন।

    আমার এলেখার বড় শিরোনাম,  “বাংলাদেশ-আমেরিকা প্রসঙ্গঃ ভারতের কথা শুনে আমেরিকার সিদ্ধান্ত নিবার দিন শেষ!”। যেটা আবদির শিরোনামের কথাটাই তবে আমার ভাষায় লিখা বলা যায়।  আমরা বলে এসেছি, ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ওয়ান ইলেভেনের ক্ষমতা দখলের পরে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। আমরা একথা বহুবার বলেছি।  ভারত কে দিয়ে আমেরিকার চীন ঠেকানোর কাজের বিনিময়-মজুরি হিশাবে। কিন্তু তা কি চিরদিনের জন্য নাকি কতদিনের জন্য??

    এই প্রশ্নে বাংলাদেশে হাসিনাবিরোধী একাংশের ধারণা এটা যতদিন হাসিনা ক্ষমতায় থাকবেন ততদিন। যদিও বাস্তবে ঘটনাটা এমন না। এভাবে ঘটে নাই। অপ্নতত এখন তো একেবারেই পরিস্কার যে দিন ফুরিয়েছে। তবুও যেমন এক. ২০১৮ সালের শেষের নির্বাচনে হাসিনা চেয়েছিল ভারত ২০১৪ সালের মত খোলাখুলি ন্যাংটা হয়ে হাসিনাকে সমর্থন জানাক! কিন্তু মোদির ভারত বুদ্ধিমান হতে চেয়েছিল সম্ভবত! তাই এত দায় না নিয়ে দূরে দাঁড়ায় কেবল মাখনটা উঠিয়ে খেতে চাওয়া এক অবস্থান নিয়েছিল। আর এতে হাসিনা ক্ষেপে গিয়ে এক প্রকাশ্য হুঙ্কারে যে  বয়ান দিয়েছিলেন “ভারতকে যা দিয়েছি সারা জীবন মনে রাখবে: শেখ হাসিনা” –  রিপোর্ট্ টা তখনকার বাংলা ট্রিবিউনের। কিন্তু তাতে কী এরপর ভারত-বাংলাদেশ স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক কী নাই হয়ে গেছিল? না ঠিক তা নয়। তবে এই ভাষায় ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাবে না। যদি বলি এরপরে মানে ২০১৯ সাল থেকে হাসিনা-মোদি সম্পর্কে আর কোন নয়া চুক্তি হয়েছে কিনা – এই বিচারে বলা যায় হাসিনা-মোদি এরপর আর কোন চুক্তি হয় নাই অথবা নয়া চুক্তি করে কিছু দেয়া হয় নাই। তবে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আগের করা চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন অর্থে ২০১৯ সালের পরেও অনেক কিছুই দেয়া হয়েছে, হচ্ছে। আর সবসময়ই একটা রুটিন সম্পর্ক তো আছেই যেটা অবশ্যই বেশ ঘনিষ্ট। এমনকি যতটা ঘনিষ্ট সময়ে এর চেয়েও বেশি করে তা দেখানোও হয়েছে। এছাড়া সম্প্রতিকালে যত অ্যামেরিকান চাপ বাড়ছে ততই ভারতের মুরোদ থাকুক আর নাই হাসিনা সরকার ততই ভারতের কোলে মুখ-গুজে – “দেখেন না কিছু করতে পারেন কিনা” টাইপের  চাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে এমন রিপোর্ট ভারতীয় পত্রিকায় বেশি দেখা যাচ্ছে; যা প্রথম আলো একেবারে লজ্জ্বার মাথা খেয়ে হলেও তাদের বরাতের উপর চড়ে মিথ্যা করে ভারতীয় করিতকর্মের মিথ্যা বয়ান তৈরি করে চলেছে।   যদিও এর মানে এমনটা একেবারেই নয় যে ভারতের সাথে হাসিনার খাতিরের সম্পর্কটা অটুট আছে বা ধরে রাখা গেছে! সেটা একেবারেই নয়; বাস্তবতাই সেটা নয়। মূলকথা আমেরিকাকে সুপারিশ করে ভারতের সেই মুরোদই হারিয়ে গেছে!

    কিন্তু হাসিনার সাথে ভারতের সম্পর্কটা কী বা কেমন আর সবচেয়ে বড় কথা ভারত-বাংলাদেশের এই বিশেষ খাতিরদারি সম্পর্কটা ২০০৭ সালে কেন হতে পেরেছিল? তা নিয়ে আমাদের আম-জনতা লেবেলে জানা-বুঝা কম। বরং তর্ক হতে দেখা যায় এটা ভারত অধীনস্ত এক সরকার কীনা এনিয়ে; এবং বলাই বাহুল্য তর্কে দেখা যায় সংখ্যাগরিষ্ট অংশই মনে করে এটা ভারত অধীনস্ত এক সরকার। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন হল কেন এটা হতে পারল? এককথায় এর জবাব হল, এটা আমেরিকার কারণে। অন্যভাবে বললে বড়ভাই আমেরিকা এশিয়ায় নিজস্বার্থে চীন-ঠেকাতে ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল। আর তাতেই ভারতের ‘মুই কি হনু’ এমন এক অবস্থা তৈরি হয়েছিল। শুরুতে সে নিজেকে অ্যামেরিকান বরকন্দাজ-প্রতিনিধি বা আমেরিকার লোকাল এজেন্ট ভাবা শুরু করেছিল। আর অন্তত টানা দশবছর এটা সে উপভোগ করেছিল যতক্ষণ না ট্রাম্প এসে  ২০১৭ সালে আমেরিকার আগের সরকার-প্রশাসন গুলোর দেয়া বিশেষ সুবিধা ট্রাম্প সেবার সব কেড়ে নিয়ে বাতিল করেছিল। যদিও সেটা ছিল আসলে আগের দেয়া অর্থনৈতিক সুবিধা প্রত্যাহার, রাজনৈতিক নয়।

    আর এবার সব রাজনৈতিক সুবিধা প্রত্যাহার – এটাই ঘটেছে একালে বাইডেন ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতাসীন হওয়ার শুরু থেকেই একট একটু করে। একমাত্র একালে যা সুনির্দিষ্ট আকারে দৃশ্যমান হচ্ছে!  মূলত ভারতীয় মুসলমানদের উপর নিপীড়ন নির্যাতন, বৈষম্য আর সাধারণভাবে মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের অভিযোগ; যেটা প্রতিবছরের ধর্মীয় স্বাধীনতা [Freedom of religion or religious liberty – OHCHR] লঙ্ঘনের সুচকে প্রতিফলিত এবং এর  আমেরিকান কমিশনার প্রতিবছর প্রেসিডেন্টের কাছে সুপারিশ করে গেছে প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু এবার এসব কিছুকে ছাড়িয়ে বাইডেন মোদির বিরুদ্ধে কত সিরিয়াস আর কত আগিয়ে গেছে তা প্রকাশ হয়ে পরে যখন দেখা যায় মোদির বিরুদ্ধে বাইডেন প্রশাসন মোদিবিরোধী সকল গোষ্ঠির নেতা হিশাবে  কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীকে সহায়তা করছে। সেটা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে,  গুজরাত হত্যার বিবিসিতে প্রচারিত ডকুমেন্টারি থেকে শুরু করে  আদানির শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি ফাঁস ও ধ্বস নামিয়ে দেয়া, আদানিকে তুলাধোনা করে জর্জ সোরেস (গ্লোবাল শেয়ার মার্কেটে হেজ ফান্ড বা hedge fund এর এক কুতুব শেঠ) এর পাবলিক বক্তৃতা ইত্যাদিতে প্রকাশিত। এরপরে রাহুল গান্ধীর প্রথমে লন্ডন ও পরে আমেরিকা সফর আর সেখানে গিয়ে সবখানেই থিঙ্কট্যাংক ও মানবাধিকার গ্রুপের সাথে দিনরাত বৈঠক – ইত্যাদি এঘটনা থেকেই প্রথম পরিস্কার হয়ে যায় যে ভারতের পিঠে হাত রাখার দিন এবার শেষ হয়েছে! ২০০৭ সালে  বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া নিয়ে আমেরিকা যেভাবে অভিযুক্ত যাই হোক না – মূল ভারত-আমেরিকান সম্পর্কই এখন আর সেই আগের জায়গায় নাই হয়ে গেছে। কারণ, বাইডেন এখন ভারতের আগামি নির্বাচনে মোদিকে আর দেখতে চান না মর্মে অবস্থান নিয়ে ফেলেছেন আর বলা যায় তা প্রকাশ্যও হয়ে গেছে। শুধু তাই নয় এটা এখন পরিস্কার যে সেজন্য আইন বাঁচিয়ে দুরত্বে থেকে বাইডেন যতটা সম্ভব সব ভাবেই মোদি বিরোধীদের জোটের রাহুলকে নেতা মেনে গড়ে উঠার পক্ষে আগিয়ে গিয়ে সহায়তা করেছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা দেখতে পারেন এখানে।  তবে আমার আমেরিকা-ভারত দুরত্বের কথা লেখাতে অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে তাহলে, সম্প্রতিকালে মোদির আমেরিকা সফর এটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করব?

    স্বল্পে মূলকথায় বললে, এবারের মোদির সফর ছিল একেবারেই অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক সফর। যেটাকে টেনেটুনে বড়জোড় সামরিক অস্ত্র কেনা-বেচা বা কিছু সামরিক ইকুইপমেন্ট ভারতে  উতপাদন করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও টেকনোলজির চুক্তি হয়েছে বলা যেতে পারে। এমনকি এই সফরে গ্লোবাল বা আঞ্চলিক কোন ভারত-আমেরিকা স্ট্রাটেজিক আলোচনা বা আমরা “কমন স্ট্রাটেজিক বন্ধু” জাতীয় কোন কথাবার্তাও হয় নাই।  তবে এশিয়ায় ভারত ও আমেরিকা উভয়েই চীনবিরোধি নিজ নিজ স্ট্রাটেজিক অবস্থানের রাষ্ট্র। যদিও তাদের মধ্যে কোন কমন জীবিত কোন প্লাটফর্মও [কোয়াডের মত যা এখন মৃত অকার্যকর অর্থে]  অবশিষ্ট নাই বা বেঁচে নাই। ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি [নন অফিসিয়াল জোট ধরণের] উদ্যোগ বলে এতে ভারত-আমেরিকা চীনবিরোধী হয়ে আছে ধরে কিছু কথা হয়; তাও সেটা যৌথতায় নয়! এছাড়া ভারত কোন সামরিক জোট করতে চায় না – এই নীতির দেশ বলে এনিয়েভারতের নুন্যতম উচ্ছসিত হওয়ার বাস্তবতাই নাই। অর্থাৎ মোদির ঐ সফরটার একমাত্র ফোকাস বাণিজ্যিক। কোন রাজনৈতিক আলোচনায় সেখানে হয় নাই। বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা তো অনেক দুরের বাত!

    তাহলে হানিমুন শেষঃ
    হা শেষ! ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন ঘটিয়ে যেটা শুরু হয়েছিল – আমেরিকা বড় ভাই ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল বলে ভারত নিজেই ‘হাসিনার বাংলাদেশের’ মালিক হয়ে গেছে বলে যে ভাব নিয়ে চলছিল এর অবসান হয়েছে। এটাকে আবদি তার এবারের লেখায় বলেছেন বাংলাদেশ নাকি ভারতের প্রভাব বলয়ের দেশ [… Bangladesh is in India’s zone of influence, New Delhi is mum on the sudden proactive US role in Bangladesh’s internal affairs. ] অথবা কখনও বলেছেন হাসিনা হলো ভারতমুখাপেক্ষী সরকার [pro-India Prime Minister Sheikh Hasina-led Awami League …।]।  এবং এভাবেই ভারত এতদিন নিজেকে ভুয়াবাজি মিথ্যা করে হলেও পরাশক্তি ভাব ধরে চলেছিল – এরই সমাপ্তিকাল!
    এর মূল কারণ, এখন বাইডেন প্রশাসন মোদি-যুগের অবসান দেখতে মনস্থ করেছে।  মোদির মুসলমান বিদ্বেষ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন কে ব্যবহার করে বাইডেন তাই এপ্রসঙ্গকে সামনে উঠিয়ে ফোকাসে এনেছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ এটাই। এতে ইতোমধ্যেই মোদিবিরোধী জোট সবল হচ্ছে – নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিভেদকে সেকেন্ডারি করে কার্পেটের নিচে তা চাপা দিতে পেরেছে – মিডিয়াও মোদিবিরোধীয় সরব হয়ে উঠছে। এমনকি এর ছাপ আদালত পাড়াতেও পড়েছে যে মোদির বিরুদ্ধে রায় দেয়া যেন এখন সহজ ও সম্ভব।   কেন্দ্রীয় ক্ষমতার হাতে থাকা প্রতিষ্ঠান সিবিআই, ইডি, রাজ্যপালের অফিস বা আয়কর বিভাগ লেলিয়ে দিয়ে  বিরোধীদের শাসিত রাজ্যে মোদি নিজ ক্ষমতার অপব্যবহার চরমে উঠেছে – আর এর অবসানে বিরোধীরা জোটবদ্ধ ও নিজেরা ভোকাল হওয়া সম্ভব বলে মনে করতে শুরু করেছে –  বাইডেনের একটু দুরবর্তি সহায়তাতেই!
    এসবের সারকথা হল, যদি ২০২৪ সালে মোদি যদি পুনরায় নির্বাচিত হতে না পারেন তবে মোদিবিরোধী সেই ভারতের উপর অ্যামেরিকান প্রভাব অনেক বেশি হবে।  চাই কী সেই ভারত, আমেরিকার এশিয়া নীতি যেমন বার্মা নীতির সাথে এলাইন [align] বা সমপাতিত করে নিজেকে পুনর্গঠিত হতে পারে বলে আমেরিকার মনে আশা জাগতে পারে।  আর সেই আমেরিকা হবে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমেরিকা যেকথা বলবে সেটাই শেষ কথা! এনিয়ে ভারতের সাথে কোন আলোচনাই নয়।  ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক সেই অভিমুখেই ইতোমধ্যে   রওনা দিয়ে দিয়েছে – এটাই আবদির এই নয়া লেখার প্রধান দাবি!!

    এজন্যই আবদি বলছেন, বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমেরিকার হঠাত সক্রিয় ভুমিকার বিরুদ্ধে ভারত বোবা হয়ে গেছে ও আছে [… New Delhi is mum on the sudden proactive US role in Bangladesh’s internal affairs]। বাংলাদেশের ভিতরেও যতটা শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ যেভাবে নিজস্বার্থ উপযোগী করে আকার দিয়ে, এজেন্সি দিয়ে দাঁড় করিয়ে এতদিন রাজত্ব করছিল এমন সবকিছু থেকে আপাতত গুটিয়ে প্রত্যাহার শুরু হয়েছে।  আর হয়ত তা সীমিত করে পুনর্গঠিত করার ইচ্ছায়ও হতে পারে। এসবেরই সোজা মানে হল,  যেই “বাবা আমেরিকা” ভারতকে পড়শিদের উপর কিছু মাতব্বরি করার ক্ষমতা দিয়েছিল  সেই বাবা এখন ভারতের সব ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ভারতকে ফকির করে দিচ্ছে।

    যে রাশিয়ান জাহাজের মালামাল খালাসের মুরোদ ভারতের হয় নাইঃ
    আবদি তার লেখার শেষের দিকে বাংলাদেশের রূপপুরে পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কিছু রাশিয়ান ইকুইপমেন্ট নিয়ে বাংলাদেশে আসতে চাওয়া এক রাশিয়ান জাহাজ-কে কিভাবে মাল খালাস না করে তা রাশিয়ায় ফেরত নিয়ে যেতে হয়েছিল এর বর্ণনা দিয়েছেন – একটা বড় উদাহরণ হিশাবে।  ঘটনা হলো রাশিয়ান জাহাজটা ছিল আমেরিকার স্যাংশন খাওয়া তালিকায়।  তাই ঐ জাহাজে বাংলাদেশে ভীড়তে গেলে আমেরিকা তা রোধ করতে বাংলাদেশকে আগাম তথ্য জানিয়ে সতর্ক করেছিল। এতে প্রতিক্রিয়ায়  রাশিয়া ও বাংলাদেশের সাথে আলাপ করে ভারত লিড নিয়ে রাজি হয়েছিল যে ঐ নিষিদ্ধ জাহাজ সে কলকাতার হলদিয়ায় ভিড়িয়ে মালামাল নামিয়ে সহজেই সড়ক পথে সেসব মালামাল বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিবে। কিন্তু বিধি বাম! কারণ সেদিন শেষ হয়েছে। তাই আমেরিকা ভারতকেও তার আপত্তির কথা জানিয়ে দেয় যাতে সে নিষিদ্ধ জাহাজ নোঙ্গর না করায় কলকাতা। আবদি লিখছে, আমেরিকা আপত্তির পদক্ষেপে এগিয়ে এলে ভারত পিছু হটে যায়!

    শুধু তাই নয় ঐ লেখার শেষে আপনি একটা মরাল লিখেছে এভাবেঃ
    এই গল্পের শেষে প্রকাশিত নৈতিক ভাষ্যটা হল, আমেরিকা এখন মনে করে তার কথাই শেষ কথা – এর উপর কোন কথা নাই। এবং পুরান দোস্ত ভারত অ্যামেরিকান এই নয়া অবস্থান পছন্দ বা অপছন্দ যাই হোক ভারতকে এমন অ্যামেরিকান ইচ্ছাকে মেনেই বেচে থাকা অভ্যাস করতেই হবে!  [“The moral of the story is that the US believes in having the last word, and even allies like India must learn to live with it whether they like it or not.”। মানে মোদিকে এমন অপমান হজম করতে শিখতে হবেই!

    কেন আবদি এমন সংবাদের বাহক হলেনঃ
    ব্যাপারটা হলো, এই নতুন অভিমুখ সম্পর্কে অনেকদিন ধরেই বলছি। কিন্তু ভারতের  কেউ এসব কথাকে সত্যি বলে বলে আমাদেরকে জানায় নাই। বরং উলটা প্রপাগান্ডা করতেই দেখেছি। তাহলে এই অসহায় ভারত – আমেরিকার সামনে গড়াগড়ি খাওয়া এই ভারতের ইমেজ আমাদের সামনে আনার দায়িত্ব আবদি কেন নিলেন? আগে উপরে লিখেছি বাংলাদেশে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের ততপরতা অন্তত আপাতত গুটিয়ে রাখার কথা কানে আসার কথা বলেছি। আবদির এই লেখা কানে আসা সেসব সংবাদ নিয়ে নিশ্চয়তা যোগালো বলা যায়।  তার মানে ভারত এই খবর নিশ্চয়তা দিয়েই ছড়িয়ে দিতে চাইছে?? মানে বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গ্রুপ বা গোষ্ঠিতে ভাঙ্গা-গড়া না হোক অন্তৎ ক্রমশ এদের ভাঙ্গার কথা নিয়মিত শুনব আমরা – তাই কি???

    যাকিছু আপোষে নিজ ইচ্ছায় আসতেই আছে ও থাকবে  তা সাদরে গ্রহণ কর জনগণ! জনগণ বুদ্ধিমান!

    সবশেষে আবদির কিছু সত্যবচনঃ
     আবদি এখানে যে অবস্থান নিয়ে লিখেছেন তা হল বাংলাদেশে হাসিনার ২০১৪ আর ২০১৮ সালের নির্বাচনে কারচুপি আর গুম খুন হত্যায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের যত অভিযোগ সেসবকেই তিনি সত্য বলে গ্রহণ করে নিয়ে কথা বলেছেন। এসব পাশ কাটিয়েও তিনি সদর্পে বলছেন হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় রাখতে হবে! কেন? তার একটাই সাফাই আর তা হল, বাংলাদেশে ভারতের গভীর স্বার্থ আছে যে হাসিনা-ই রক্ষা করে দিতে পারবে।  অর্থাৎ কোন ন্যায়-ইনসাফ বা আন্তর্জাতিক আইনের ন্যায্যতা নয়। শ্রেফ ভারতের স্বার্থ – কাজেই আব্দি ভারতের সেই স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন????? বড়ই অদ্ভুত না! মানে কোন মানুষ কী কোন ন্যায়-ইনসাফের ভিত্তি ছাড়াই – আমার  ওইটা ভাল লাগে বা ওইটা আমি খাবো আমাকে এনে দেও ইত্যাদি এভাবে কথা বলতে পারে???

    তিনি এটাও পরিস্কার করেই বলছেন তাই এই চাওয়া – ভারতের স্বার্থ বলে তা পেতে চাওয়া এটা হাসিনারও (বেইনসাফি) উচ্চাঙ্খা বটে; এমনকি এর মানে হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মই থেকে ছিটকে পিছলিয়ে পড়ে যাওয়া এমনকি যেটা বাংলাদেশকে এক দলের ও এক নেতার বাংলাদেশে পরিণত করবে…। [That would no doubt serve India’s national interests; and of course, fulfil Hasina’s ambitions; but would also mean ignoring the democratic backsliding that has reduced Bangladesh into a one-party, one-leader nation.]

    তবুও এটাই তাঁর আকাঙ্খা! কি তামসা!

     

     

    আপডেটেডঃ  ১৪  জুলাই ২০২৩; রাত ০২ঃ ০৮
    আপডেটেডঃ     জুলাই ২০২৩;

    >>>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

     

     

  • ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ -কেন মোদি আর সিপিবির একই দাবি!

    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ -কেন মোদি আর সিপিবির একই দাবি!
    গৌতম দাস

    ৯ জুলাই ২০২৩  ভোর ০৩ঃ  ৫৪
    https://wp.me/p1sCvy-4Hx

     

     

     

     

    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ কথাটা ভেঙ্গে সরাসরি উদোম করে দেখালে এর মানে হল, নাগরিক রাষ্ট্রে কোন ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা রাখাই যাবে না। বিশেষ করে ইসলামি বিয়ে। এর বদলে ধর্ম নির্বিশেষে সকলকের জন্য একই (তাই ইউনিফর্ম বা সার্বজনীন বলা) এবং একমাত্র ‘রাষ্ট্রীয় বিয়ের আইনেই’ বিয়ে করতে হবে। এই হোল সিভিল কোড বুঝনেওয়ালাদের দাবি।   তাদের সার্বজনীন ‘রাষ্ট্রীয় বিয়ের আইন’ মানে হল, কোন  বিয়েকে ধর্মের সংশ্লিষ্টতাহীন করে সাজাতে হবে; যেটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। এবং ধর্মীয় বিয়ে আর রাষ্ট্র আমল করবে না; এর বদলে নাগরিক হিশাবে দুই পুরুষ-নারী নাগরিকের মধ্যে বিয়ের আইন করা হবে।
    একথা শুনে অনেকের মনে হতে পারে বা ভালই তো!!! ধর্ম বা হিন্দু-মুসলমান নিয়ে ক্যাচালের চেয়ে এই ‘রাষ্ট্রীয় বিয়ের আইন’ তো খুবই ভালো!!! এর মধ্যে বেশ প্রগতিশীলতা আর এডভ্যান্সমেন্টও দেখে ফেলতে পারে কেউ!!! ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশংসায় আমরা কাউকে খুশিতে উত্তেজিতও হয়ে উঠতে দেখতে পারি। আর পোগতিশিল=হিন্দুত্ববাদীরা খুশিতে নেচে উঠতে পারে এই বলে যে এবার ‘মুসলমান কোপানির’ একটা ভাল অস্ত্র পাওয়া গেছে!!
    হ্যা ঠিকই তাই। ‘ইউনিভার্সাল সিভিল কোড’ এর দাবিদারেরা অসৎ মনে ও উদ্দেশ্যে ইসলামের সাথে রাষ্ট্রের একেবারেই অপ্রয়োজনীয় বিরোধ খাড়া করতে, মুসলমান কোপাতেই এই দাবি করে থাকে। তাই এনিয়ে একটা মজার দিক বা মিলের দিক দেখিয়ে দেই তাহলে অনেক কিছুই পরিস্কার হয়ে যাবে।
    বাংলাদেশে ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এর দাবি সবচেয়ে উচ্চকন্ঠে করে থাকে কমিউনিস্ট পার্টি, সিপিবি। এর খাস প্রমাণ  পাওয়া যাবে এখানে  ২০২৩ সালে সমাপ্ত সিপিবি এর দ্বাদশ কংগ্রেসে গৃহীত ও প্রকাশিত প্রস্তাব যা সাপ্তাহিক একতা  পত্রিকায় ছাপা হয়েছে সেখান থেকে। তাতে ১২ নম্বরে যার উপশিরোনাম [১২. নারীর প্রতি সহিংসতা সম্পর্কে] এর অধীনে চার নম্বর দাবিতে লেখা আছে দেখেন  [৪.      ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।] ।    এবং বলাই বাহুল্য তার নারী (এনজিও) সংগঠন মহিলা পরিষদও এই দাবি করে থাকে। অন্যদিকে,  আগামি বছরে মানে ভারতের আবার কেন্দ্র সংসদ নির্বাচন আসন্ন। তাই মোদি বা বিজেপির এবারেরও মুসলমানদেরকে কোনঠাসা করে রাখার সফল নেতা হিশাবে মোদির  অন্যতম নির্বাচনী ইস্যুও হল এই ‘‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ কায়েম।

    তাহলে সিপিবি আর মোদির মধ্যে মিলটা কোথায় আর কেনইবা এই মিল দেখছি আমরা???   বলাই বাহুল্য এই মিল হল একই ইসলামবিদ্বেষ আর মুসলমান কোপানির খায়েসজাত – এটাই তাদের মধ্যে কমন;  তাই এই লক্ষ্যের ঐক্য!!
    তবে যারা এখনও প্রগতিশীল আর সাথে বাড়তি হিশাবে যাদের কেউ কেউ হয়ত নারীবাদিও তাদের জন্য বলে রাখি যদি তারা সাদা মনে – শ্রেফ বুঝবার জন্য মানার জন্য না – যারা জানতে চান যে কেন ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ দাবিটা ভুল তাহলে তা এলেখার শেষের দিকে “আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথার কী হবেঃ”  – এই উপ-শিরোনামে লেখাটা পাবেন; পড়ে নিতে পারেন।

    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ যখন হাতিয়ারঃ
    ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এই শব্দ কয়টা শুনলে অনেকের কাছে পবিত্র বা উচ্চমার্গীয় মনে হতে পারে, তাই অনেকের ক্ষেত্রে কিছুটা ভক্তিতে অজান্তে মাথা ঝুঁকেও যেতে পারে; সেটা এই বলে যে এটা একটা খুবই ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট খচিত’ কোন পরম জ্ঞান হবে নিশ্চয় যা কোন প্রগতিশীল সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় খুবই কাজের ও উপাদেয়!!!

    কিন্তু  আমি দুঃখিত পাঠক। এই অনুমান একেবারেই মিথ্যা শুধু না বরং উলটা। এটা আসলে মন ভর্তি যাদের ইসলাম বিদ্বেষ, যারা তক্কে তক্কে থাকে কিভাবে মুসলমানদেরকে সমাজে নিচা দেখাবে –  মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়ানি বা জাগানি কিছু প্রগতিশীল ভাব ধরাদের কারবার এটা; যারা আসলে হিন্দুত্ববাদী। তাদের কাছেই – মুসলমান কোপানির এক ভাল হাতিয়ার হল এই শব্দগুচ্ছে – ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’।

    শব্দগুলো ইংরাজিতে যার বাংলায় ইতিবাচক অর্থে সারকথা হল,  একটা রাষ্ট্রে ধর্মের বাইরে বিয়ে সংক্রান্ত আইনী ধারা।

    রিপাবলিক রাষ্ট্রমাত্রই কী তা ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’এর পরিণত হবেঃ
    না একেবারেই না। তবে মুসলমানবিদ্বেষ যদি আপনার গোপন খায়েস হয় তবে এমন জাতিরাষ্ট্র বা রিপাবলিক রাষ্ট্রকে আপনি মুসলমান কোপানি বা বৈষম্য তৈরিতে উপযোগী করে হাজির করবেনই। আর সেজন্য  ‘‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এই হাতিয়ার তুলবেনই। ফলে এই অসততার এমন আউটকামই আমরা হয়ত দেখব। তাই এককথায় বললে, রিপাবলিক রাষ্ট্রমাত্রই তা গড়ার মূল উদ্দেশ্যই তো হল নাগরিক বৈষম্য দূরে রাখা। ধর্মীয় বা যে কোন পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিক অধিকারে সকলেই সমান – এই নীতির বাস্তবায়ন। কাজেই মুসলমান বা ধর্মীয় বিয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র অবস্থান নেয়া অপ্রয়োজনীয়; আর তাতে এতে  বৈষম্য তৈরিতে উপযোগী করে যে কোন রাষ্ট্র গড়া বা রূপ দেয়া হবে যেটা অগ্রহণযোগ্য ও প্রতিরোধযোগ্য হ্যে দাঁড়াবে যা কাম্য নয়।   

    একথা সত্য যে, একটা রিপাবলিক রাষ্ট্র ধর্ম বা অন্যকোন পরিচয় নির্বিশেষে বৈষম্যহীন ভাবে তার সকল নাগরিকের সকল ‘মৌলিক নাগরিক অধিকার’ সুরক্ষা দিবার প্রতিশ্রুতিতেই কেবল জন্ম নিতে পারে বা হওয়ার কথা।
    কিন্তু বাংলাদেশ মানে যে পুরাতন অখন্ড ভারত ভেঙ্গে আজ যে তিন রাষ্ট্র হয়েছে  এর একটা রাষ্ট্র – এই বাংলাদেশে (সাথে হিন্দুত্ববাদি ভারতেও) কিছু পোগতিশিল কমিউনিস্টের এই ধারণা যে – না এভাবে চলবে না। রাষ্ট্রকে ইসলাম কোপাতেই হবে। মুসলমান বিদ্বেষী ও মুসলমানের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানি ইত্যাদি এমন বৈশিষ্ট তাদের “কল্পিত আধুনিক রাষ্ট্রের” থাকতেই হবে। নাইলে আর সেটা তাদের জাতিরাষ্ট্র হয় কী করে – এতে তো “মজা” নাই। অথচ এটা আধুনিক রাষ্ট্রের কাজ বা এক্তিয়ারই নয়; বা উদ্দেশ্যই নয়। কারণ এমন রাষ্ট্রে মুসলমান নাগরিককে যদি চিন্তায় খাটো আর নিচা সংস্কৃতির বলে মিথ্যা হলেও তুলে ধরতে করে তবে তা এক চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রই হবে!  তবে বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রই যদি তাদের মজা পাবার উপাদান হয় তো বলার কিছু নাই!  অতএব একারণেই ভারতে ১৯৪৭ সালের পরে সম-নাগরিক অধিকারের নয় বরং হিন্দু আধিপত্যের ভারতবর্ষ মানে হিন্দু জাতশ্রেষ্ঠত্বের এক ভারত জাতিরাষ্ট্র সেখানে গড়ে উঠেছে। আর তাই-ই হয়েছে আমাদের বাস্তবের ভারত! আর এর প্রভাবে অন্য দুই রাষ্ট্রও তাই একই!

    তবে বিশেষ করে পাকিস্তান কায়েম হওয়াতে ১৯৫১ সালে জমিদারি উচ্ছেদ আইন পাশ হবার পরে জমিদারি হারানো জমিদার হিন্দুরা প্রতিশোধ নিতে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিল। এই ভেবে যে এই পার্টি ধর্মবিরোধী; কাজেই এদের ধর্মবিরোধী রাজনৈতিক ধারার আড়ালে বসে তারা মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণাছড়ানি বয়ান প্রগতির বয়ান বলে হাজির করতে পারবেন। প্রগতিবাদিতার আড়ালে এরা রাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইসলামের সাথে সংঘাত বাধাতে আর রাষ্ট্রকে দিয়ে ইসলাম কোপাতে বা এভাবে রাষ্ট্রকে সাজাতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। যদিও এতে কারও লাভ হয় নাই। কারণ, প্রতিশোধ নেয়া মানুষের করণীয় কাজ হতে পারে না। তবু এই ততপরতাকেই আমরা  এই অঞ্চলে চিনি পোগতিশিলতা-কমিউনিস্ট বলে। তারা আমাদেরকে ধর্মচিন্তা-মুক্ত বিশেষত ইসলাম-চিন্তা মুক্ত এক সমাজ-রাষ্ট্র হাজির করতে চায়; আর এভাবে তারা তাদের জমিদারি হারানির ক্ষোভের প্রতিশোধ নিতে তারা কায়েম করতে বদ্ধপরিকর! তাই তাদের এক নম্বর কৌশল হল আধুনিক রাষ্ট্রকে অপ্রয়োজনীয় বা গায়ে পড়ে ভাবে হলেও ইসলামের বিরুদ্ধে খাড়া করে হাজির করা।

    আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথাঃ
    আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা তেমনই এক ইস্যু যা দিয়ে পোগতিশিল-কমিউনিস্টরা রাষ্ট্রকে মুসলমান কোপানোর কাজে ব্যবহার করতে চায়; আর তা পারবে বলে তারা মনে করে। তারা অপ্রয়োজনীয়ভাবে ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা বিশেষত ইসলামি ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা ভেঙ্গে চুরমার করতে চায়।
    আর এটাকেই তারা ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট খচিত’ তাদের কথিত উচ্চমার্গীয় জ্ঞান জাত ততপরতা বলে আড়াল নিয়ে দাবি করে থাকে! কিন্তু আড়ালে কেন?
    কারণ, প্রগতিবাদীদের ৯৯.৯৯% এর ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট” জিনিষটা কী এসম্পর্কে পড়াশুনা-বুঝাবুঝি একেবারেই নাই। বেশির ভাগই এর নাম শুনে নাই।  তবে এর অন্তত একটা কারণ হল, মার্কসের কোন রচনায় রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট বা আধুনিকতা বা রিপাবলিক রাষ্ট্র ইত্যাদি সেখানে কোন প্রসঙ্গই নয়, হয় নাই। আবার এমনকি তাদের মধ্যে যারা অতি দিগগজ  মানে ধরেন যারা লন্ডনে গিয়ে ইংরাজী সাহিত্যে পিএইচডি করে এসেছেন – এরাও অন্তর্ভুক্ত মানে একই অবস্থা তাদের! তাই এরা কখনও ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট’ নিয়ে দুপাতা লিখেছেন জানা যায় না। ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট’ কে প্রগতিশীলতা-কমিউনিস্ট এর সাথে রিলেট করে কিছু ব্যাখ্যা করেছেন জানা যায় না।  অর্থাৎ কার্যত যেহেতু তাদের চিন্তার মুরোদ নাই – অক্ষম উত্থানরহিত; তাই ‘রেনেসাঁ- এনলাইটেনমেন্ট’ নিয়ে তাদের হাউশ তাদের খায়েসের বাতচিত তারা কেবল তাদের মধ্যেই এক আড়ালের মধ্যে রেখে দিয়েছেন। এবং অলিখিত আলোচনাতেই আটকে রাখেন!
    অথচ এরা প্রত্যেকে আধুনিক রাষ্ট্রকে দিয়ে ইসলাম কোপানির অগ্রসেনানী সৈনিক! রাষ্ট্রকে তারা তাদের ইসলামবিদ্বেষ এর খায়েস পূরণের হাতিয়ার করে অপব্যবহার করতে চায়!

    ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা ও রিপাবলিক রাষ্ট্রঃ
    আপন ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – একে একটা নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য অধিকার হিশাবে দেখা এটা ইউরোপের কোন দেশে নাই; কিন্তু একমাত্র কেবল আমেরিকান কনষ্টিটিউশনে এটা পাওয়া যাবে। পিছনের অনেক কারণের মধ্যে মূল কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান বা ওসমান সাম্রাজ্যের পতনের পরে এই সাম্রাজ্য-ভুখন্ডকে কার্যত বৃটিশ ও ফরাসীরা  নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া থেকে। এরপর এরা ওসব ভুখন্ডের মুসলমান বাসিন্দাদেরকে শাসন করতে গিয়ে – পুরানা ক্রুসেডে ইউরোপের হারের কথা না মনে পড়ে যায় – এটা একটা ভয়ের কথা ছিল। এজন্য যে নতুন শাসন-তত্ব শাসক বৃটিশ ও ফরাসীরা ১৯১৮ সালের পরে ওসমান সাম্রাজ্য ভুখন্ডে  চালু করেছিল তা হল, কথিত নয়া রাষ্ট্রে, রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করা নামে এক অদ্ভুত বায়না সেখানে তারা হাজির করেছিল। গত ১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফিলিয়া সম্মেলনের কখনও অথবা ক্লাসিক্যাল ইউরোপীয় রাষ্ট্র-চিন্তায় কখনও এমন কথা শুনা যায় নাই।  বরং উল্টা আমেরিকা নিজে ১৭৭৬ সালে কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশ হবার পরে পনেরো বছরের মধ্যে ১৭৯১ সালের ডিসেম্বরে প্রথম কনষ্টিটিউশন সংশোধনী আনা হলে সেখানে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো কী কী তা বর্ণনা করতে গিয়ে সেখানে এই প্রথম কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার বলতে তাতে ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – এটাকেও এক নাগরিক অধিকারের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। আর এথেকে এটা প্রমাণ করেছে যে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারনার সাথে ধর্ম পালনের কোন বিরোধ নাই। তাই রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে আলাদা করার কথা বুজরুকি ও শয়তানি!
    কিন্তু এই শয়তানিটাই আপন হয়ে দাড়ায় আমাদের এই অঞ্চলে হিন্দু জাতিরাষ্ট্রের অনুসারি, হিন্দুত্ববাদিদের কাছে।   ফলে তা প্রগতিশীল ও কমিউনিস্টদের কাছেও।

    সব সিভিলাইজেশনই ধর্মতত্বের হাত ধরেই আগিয়েছেঃ
    কিছু কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। সারা দুনিয়াতে মানব সভ্যতার বয়স  ধরা হয় প্রায় ছয় হাজার বছরের বেশি। ইতিবাচক অর্থে মানব সভ্যতা (human Civilization) এর সোজাসাপ্টা মানে হল যখন থেকে মানুষ যাযাবর জীবন, ফলমূল খাবার টোকায়া খাওয়ার জীবন ছেড়ে এবার কৃষিকাজ শিখে চাষাবাদ শুরু করেছিল। আর চাষাবাদের জীবনের পুর্বশর্ত হল, থিতু হয়ে কোন এক নদীবিধৌত উর্বর ভুখন্ডে বসতি স্থাপন করে বসে যাওয়া  – আগের কোন যাযাবর জীবনের বিপরীতে।  যেটাকে আমরা একালে এমন একেক ভুখন্ডে গড়ে উঠা বসবাস যা থেকে আসলে নানান এথনিক [ethnic] বৈশিষ্টে ভিন্নতায় আমাদের নিজ সভ্যতায় বসবাস শুরু হয়েছিল – আর এটাকেই আমরা সিভিলাইজেশন অর্থে সভ্যতা বলছি।  যা আসলে মূলত এথনিক অর্থে জাত-সভ্যতা! আর  এই এথনিক পরিচয় বলতে যার ভিতরের এক প্রভাবশালী উপাদান হল ধর্মতাত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়!  আর প্রগতিশীলতার নামে আমাদের অনেকের মনে বৈষম্যহীন অধিকারের রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চেয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে এরা  ধর্মতাত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এর সাথে সংঘাত বাধানোকে অনিবার্য মনে করে থাকে। আর এখান থেকেই সব বিরোধের উতপত্তি।
    এখন এই ছয় হাজার বছরের মধ্যে প্রায়  দুহাজার বছর আগে যীশুর জন্ম।  এর মধ্যে নবীর যুগও এসেছে। আর এই সময়কালে সবসময়ই আমরা অনেকগুলো মানে কোন না কোন একটা ধর্মতত্বের হাত ধরেই হেটেছি। আমাদের হাত খালি থাকে নাই। আর ইতিবাচক অর্থে দুনিয়ায় আমাদের সকল সভ্যতা ধর্মতত্বের হাত ধরেই এপর্যন্ত হেটে এসেছে। পরবর্তিতে ১৪৫০-১৫৫০ এই সময়কালকে বলা হয় বিজ্ঞানের যুগ শতবর্ষ – যখন একনাগাড়ে বিজ্ঞানের গুরুত্বপুর্ণ আবিস্কার গুলো ঘটেছিল। কিন্তু এরপরেও এসময়ে “বিজ্ঞান” এসে যাওয়াতে দুনিয়া থেকে কোন ধর্মতত্ব  তো নাই হয়ে যায় নাই! বরং বলা যায় বিজ্ঞানকে পাশে জায়গা ছেড়ে দিয়ে ধর্মতত্ব তার জায়গাতেই আছে। মাঝে একটু কেবল সময় লেগেছে এডজাস্ট হতে পরস্পরকে জায়গা করে দিতে।  তাই শেষ বিচারে  মানুষের এখনকার চিন্তা-চর্চার রূপ যেখানে গিয়েই ঠেকুক চিন্তা-চর্চার শুরুর দিকে সবকিছুই ছিল ধর্মতাত্বিক বৈশিষ্ঠের। কাজেই ধর্মতত্ব জিনিষটা গায়ের জোরে ত্যাগ করার বিষয়ই নয়! আর কাকে ত্যাগ করব আমাদের সকলের আদি না হলেও পুরাতন সব প্রজন্মকে??? এটা কী সম্ভব?? কাজেই  ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – একে মৌলিক নাগরিক অধিকার হিশাবে রিপাবলিক রাষ্ট্রে রেখে দেওয়া একটা খুবই উপযুক্ত এপ্রোচ বা আগানোর উপায়। কিন্তু কাজ আরও আছে আর তা করতে হবে বুদ্ধিমান হয়ে!

     

    তাহলে আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথার কী হবেঃ
    খুবই সহজ!
    ১। সবার আগে আমাদের মনের ভিতরের যেকোন ধর্মের প্রতি সমস্ত বিদ্বেষ, ঘৃণা ইত্যাদি বাইরে বের করে ফেলে দিতে হবে; তাতে আমরা যার যার ধর্মপালনের লোক হই আর নাই হই না কেন! ধর্মপালন বা মানা না মানা আপনার নিজস্ব বিষয়। কিন্তু ধর্মের প্রতি সমস্ত বিদ্বেষ, ঘৃণা ইত্যাদি ত্যাগ করতেই হবে! নাগরিক যার যার ইচ্ছা হবে তাকে তার ইচ্ছানুযায়ী ধর্মপালনের স্বাধীনতা – একে মৌলিক নাগরিক অধিকার সুরক্ষার ব্যবস্থা রাষ্ট্রকে করতে হবে। আর আমরা তার ফেলো বা পাশের নাগরিকেরা আমাদের দায়িত্ব হবে আমরা নিজেরা যেই ধর্মই পালন করি অথবা কোন ধর্মই পালন না করলেও ফেলো নাগরিকের অধিকার রক্ষায় আমাদের সহযোগিতামূলক অবস্থানে যেতে হবেই।
    ২।  আমাদের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা মানেই যেগুলো বহু পুরানা ট্রাডিশন হিশাবে কোন না কোন ধর্মতত্বের ঘরে বসে, হাত ধরেই শুরু হয়েছিল। ধর্মীয়-কালচারাল ও সামাজিকতায় মাখামাখি হয়ে থাকা এই ট্রাডিশনে হস্তক্ষেপ বা ভেঙ্গে দেয়ার চেষ্টা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়; আর এটা রাষ্ট্রের কোন কাজ বা এক্তিয়ারই নয়। বিশেষত এক হিশাবে দেখলে এসব ট্রাডিশন মানা না মানা তো পারসোনাল ইস্যু।  তবে রাষ্ট্রের দায় আছে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো সুরক্ষা দেওয়ার। তাই সেই কর্তব্য পালন করার প্রয়োজনে ট্রাডিশনাল বিয়ের প্রথায় কোন হাত না লাগিয়ে রাষ্ট্র বরং কিছু বাড়তি কাজ করণীয় বাধ্যতামূলক করে দিতে পারে। যেমন বিয়ে ধর্মীয়-সামাজিক রীতিতেই ট্রাডিশন মেনেই চলবে। তবে এর আর বাড়তি দিকটা হতে পারে হলঃ ক. এই বিয়েটা সরকারি লাইসেন্স নেয়া কাজি বা রেজিষ্টার্ড কাজির কাছে লিপিবদ্ধ (রেজিষ্ট্রেশন) করাতেই হবে। যেই কাজিই আবার বিয়ের সাতদিন বা একমাসের মধ্যে (যেভাবে বলা থাকবে) সরকারি ডাটাবেজে এই বিয়ের সব তথ্য ফিড করা হয়েছে তা নিশ্চিত করবে – ঐ বিয়ের ডকুমেন্টে বা কাবিনে ডাটাবেজ সংরক্ষকের প্রতিস্বাক্ষর যুক্ত করে দিবে। এতাই মূলত রেজিস্টার্ড কাজির রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মূল করণীয় কাজ হবে।
    একচুয়ালি, এটাই বাংলাদেশের বর্তমান কাজি অফিসের কাজের প্রচলিত নিয়ম; যেটা ইতোমধ্যেই চালু হয়ে আছে ১৯৮৮ সাল থেকে মানে, এরশাদের আমলে। এবং সেসময় আমাদের রাষ্ট্রের ধর্মীয়-সামাজিক বিয়ের প্রথা তো ভেঙ্গে ফেলতে বা হস্তক্ষেপ করতে হয় নাই। বরং সেসময় মূল কনসার্ণ ছিল পুরুষেরা যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে আর যেকোন মনের দশা খেয়ালে থাকা অবস্থায় তাঁর নারীকে তালাক দিয়ে দিচ্ছিল। এই দায়িত্বহীন কাজগুলোকে শৃঙ্খলা আনতে গিয়ে দেখা গেল ১৯৮৮ সালের আগে বিয়ে হত পাড়ার মসজিদের মোয়াজ্জিন কে ডেকে এনে দুজন দোস্তকে সাক্ষী রেখেই বিয়ে সম্পন্ন মনে করা হত। কিন্তু কোথাও এই বিয়ের তথ্য সংরক্ষণ করার কোন সিস্টেমই ছিল না।  আর তাই দায়িত্বহীন তালাক তখনই শৃঙ্খলে আনা সম্ভব হবে যখন বিয়েটা যে হয়েছিল এর ডাটাবেজ সংরক্ষিত থাকবে ও সার্টিফাই বা সার্টিফিকেট দেবার ব্যবস্থা থাকবে। এসব কারণেই ১৯৮৮ সাল থেকে বিয়ের ডাটাবেজ সংরক্ষণ ভিত্তিক কাজি-রেজিষ্টার্ড বিয়ে ব্যবস্থা চালু করা গেছিল। তবুওও এতে এখনও  যেটা অসম্পুর্ণ অংশ তা হল, মুসলমান বাদে অন্য নাগরিকদের  বেলায় এমন কোন রেজিষ্ট্রশনের সহজ ব্যবস্থাটা এখনও নাই।  অথচ রাষ্ট্রের দিক থেকে দরকারি হল, কোন ধর্মীয় ট্র্বেডিশনের বিয়ে সেটা হোক বা না হোক – সমান্তরালভাবে সকল নাগরিক মাত্রই সবার বিয়ে রেজিষ্টেশনেরে ব্যবস্থা থাকতেই হবে। কারণ, এটা না থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে নারী নাগরিকেরা। নিশ্চয় আমরা সকলে মানব যে বিয়ের পরে সামাজিক পারিবারিক দায়ীত্ব ফেলে পুরুষেরা সোজা হেটে চলে যেতে খুবই ওস্তাদ!

    অতএব, কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রে ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ ব্যবস্থা চালু একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। সকল নাগরককে একই খুড়ে মাথা কামিয়ে দিতে হবে কেন? মানে ধর্মবিহীন বিয়ের ব্যবস্থা কায়েমই একমাত্র রাষ্ট্রের করণীয় এটা ভিত্তিহীন কথাই শুধু নয়, এই বক্তব্য ধর্মবিদ্বেষী যা মূলত ইসলামবিদ্বেষী ঘৃণাজীবীদের অসৎ কাজ হবে। এককথায় ‘ইউনি্ফর্ম সিভিল কোড’ এর উদ্দেশ্য মুসলমান কোপানি আর ঘৃণাচর্চার দোকান খুলে বসার সামিল! আর  মূলত  ধর্মপালনের কাজ স্বাধীনভাবে করার সুযোগ করে দেয়া রাষ্ট্রের কাজ তাতে ধর্ম তার এক্তিয়ারের মধ্যে কাজ করবে আর রাষ্ট্র নাগরিক অধিকার রক্ষার পক্ষে তার এক্তিয়ার ও দায়ীত্ব পালন করে যাবে। এখানে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অসততায় ইসুলাম বা মূসলমান এর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে খাড়া করা শুধু অন্যায় নয়, এটা অপরাধও!

    তাহলে মোদি এখন কী করছেনঃ
    মোদি গত কয়েক বছর ধরে ভারতীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে আরেক বৈষম্য চালু করতে পায়ে পারা দিয়ে হলেও জবরদস্তিতে  ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ চালু করার হুমকি দিয়ে চলেছেন। তাঁর এই ইসলামবিদ্বেষকে আড়াল করতে এখানে এসে তিনি মর্ডানিস্ট হবার ভান করছেন। যাতে মুসলমানেরা আরও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়।  কিন্তু ভারতের অনেক পুরানা রাষ্ট্র বলে এর কিছু সুবিধাও আছে।  তাই তাদের বিচার বিভাগের অংশ প্রতিষ্ঠান ‘আইন কমিশন’ এর মতামত যথেষ্ট শক্তিশালী।  এমনকি কোন আইন বদলাতে গেলে সেবিষয়ে আইন কমিশনের মতামত ভালই গুরুত্ব পায়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

    কলকাতার আনন্দবাজার ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ এর বাংলা করেছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। ইলেকশনের আগে আর পিছনে অ্যামেরিকান সমর্থনে রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধীদল এখন একজোট হচ্ছে বলে  অনেক কিছুতেই আর মোদির টাকা খেয়ে মিডিয়া কাজ করছে না। তাই আনন্দবাজার নিজেই জানাচ্ছে ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ নিয়ে ভারতের আইন কমিশনের মতামত কী? নিচের সেই পুরা প্যারাগ্রাফটাই আনন্দবাজার থেকে তুলে আনা হয়েছে দেখেন।

    “কী বলেছিল ২১-তম আইন কমিশন?”
    সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বলবীর সিংহ চৌহানের নেতৃত্বাধীন ২১-তম আইন কমিশনের মত ছিল, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকারের মতো পারিবারিক বিষয়ে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিষ্টান, পার্সি, জৈন সকলের একই আইন চালু করার প্রয়োজন নেই। পারিবারিক আইনে সংস্কার নিয়ে কমিশনের বক্তব্য ছিল,“সংঘাতের সমাধান ফারাক মুছে ফেলা নয়। অধিকাংশ দেশ এখন ফারাককে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে এগোচ্ছে। ফারাক থাকাটাই মজবুত গণতন্ত্রের প্রতীক। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এখন কাঙ্ক্ষিত নয়, প্রয়োজনও নেই। তার বদলে যেখানে বৈষম্য রয়েছে, সেগুলো দূর করা উচিত।”

    অর্থাৎ এককথায় বললে আইন কমিশন প্রধানমন্ত্রীর সাথে নাই। তবু মোদি ডেসপারেট ভাবে আগাচ্ছেন। আর ওদিকে এতদিন কংগ্রেস-কমিউনিস্টেরা ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ কে মুসলমানেদেরকে প্রগতিশীলতায় শিক্ষিত করার আইন মনে করত। কিন্তু এখন?
    এখন এরা মোদিবিরোধী প্রায় সকলেই অবস্থান বদলে নিয়েছে। তারা এখন আইন কমিশনের বক্তব্যকেই নিজেদের বক্তব্য বলে প্রচার করতে নেমেছে। সিপিএম এর পরিবর্তিত অবস্থান পাওয়া গেছে তাদের গণশক্তি পত্রিকায়। নিচে সে অংশ তুলে আনা হয়েছেঃ

     সিপিএম এর অভিন্ন দেওয়ানি বিধি 
    বিবৃতিতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে তৎপরতার বিরোধিতা করে পলিট ব্যুরো বলেছে, এই বিষয়ে ফের আলোচনা শুরু করেছে বর্তমান (২২তম) আইন কমিশন। অথচ এর আগের আইন কমিশন (২১তম) বিষয়টি নিয়ে নানা পর্যায়ে আলোচনা করে ২০১৮ সালেই বলেছিল, ‘‘এখন অভিন্ন দেওয়ানি বিধির না প্রয়োজন আছে, না এই বিধি কাম্য।’’ সিপিআই(এম) এই অবস্থানকে সমর্থন করে। অভিন্নতা আর সমতা এক নয়। পার্টি সমস্ত সম্প্রদায়ের মহিলাদের সমানাধিকারের পক্ষে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত ও প্রথাগত আইনগুলিকে সংস্কারের মাধ্যমেই সেই লক্ষ্যে সব থেকে ভালভাবে এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে, যে প্রক্রিয়ায় সক্রিয় গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ থাকবে ওই সম্প্রদায়গুলির সমস্ত মহিলা ও পুরুষের।

    কংগ্রেসের অবস্থান এখানে পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের প্রগতিশীলদের অবস্থান আগে যাই থাক তাদের উচিত হবে ভেবে চিন্তে তাদের আপডেটেড অবস্থান দেখানো।
    আশা করব সমাজের সকল অংশ ইতিবাচকভাবে নিজ নিজ দায়-অবস্থান দায়ীত্বের সাথে তুলে ধরবেন; তাতে আগে আমরা যে অবস্থানেই থাকি না কেন! ঘৃণা-বিদ্বেষ আমাদের কারও জন্যই কোন সমাধান-অবস্থান নয় হতে পারে না! এটুকু আমাদের না বুঝার কিছু নাই!

    আপডেটেডঃ ০৯ জুলাই ২০২৩;  দুপুর ১২ঃ ৫৮
    আপডেটেডঃ ১০ জুলাই ২০২৩;  দুপুর ০৩ঃ ৩৩

    >>>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • জয়শঙ্করের কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’!

    জয়শঙ্করের কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’!
    গৌতম দাস

    ০৬ জুলাই ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4Gw

     

     

     

    সময়ে কারও কাছে আঙুর ফল খুবই টক মনে হয় কারণ আঙুর হাতের নাগালে না আসা বা লাভ করা দুষ্প্রাপ্য বা নিজ অযোগ্যতা; তাই এমন কথা বলে চালিয়ে দেওয়া। ঠিক যেমন  ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’ হয়ে গেছে ।
    তিনি দাবি করেছেন, “নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বকালে “প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত সবচেয়ে কম জড়িয়েছে“। প্রতিবেশীদের কাছে এখন ভারতের পরিচয় স্থিতিশীলতার স্থায়ী প্রতীক হিসেবে”। মানে জয়শঙ্কর এখন আমাদের বিশ্বাস করতে বলছেন যে মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বকালে মানে গত নয় বছরে  অন্তত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মোদি ভারত সবচেয়ে কম জড়িয়েছে!!!!! আচ্ছা, এ তো বড় আজিব বাত! 

    তাহলে মোদির সাম্প্রতিক আমেরিকা সফর যা ছিল ২১-২৪ জুন – এই সময়কালের সপ্তাহেরও বেশি আগে থেকেই, ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের প্রমোটেড  ঘরে বসে বানানো রিপোর্ট ভারতে যারা ছাপে (মূলত হিন্দুস্তান টাইমসের রেজাউল লস্কর অথবা শিশির গুপ্তা এবং টাইমস অব ইন্ডিয়ার দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী) আর বাংলাদেশের প্রথম আলোও – এরা সকলে মিলে অন্তত তিনবার ঝলক উঠিয়ে কেন প্রপাগান্ডা করল যে বাংলাদেশের হাসিনার ভাগ্য নাকি মোদির আমেরিকা সফরে মোদি-বাইডেনের এর আলাপের মধ্যেই নির্ধারিত হবে????

    এখন প্রশ্ন হল কে মিথ্যা বলছে?
    দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী লিখেছিল, “ভারতের দুই প্রতিবেশি দেশ বছর শেষে নির্বাচনে যাচ্ছে। ভারত চায়, আমেরিকা এমন কোন উদ্যোগ যেন না নেয় যাতে ভারতের নিজস্বার্থ তাতে ক্ষুন্ন হয়ে যায়”। ভারতের নিজস্বার্থ মানে – আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে হাসিনাকে আরেকবার জবরদস্তিতে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার উপর বাধা সৃষ্টি – এটা বুঝতে হবে। কারণ, ভারতের সব মিডিয়া এই অবস্থান নিয়েই খোলাখুলি লেখা ছেপে চলেছে। আর আমেরিকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি উপদেষ্টা (NSA) জ্যাক সুলিভান [Jake Sullivan] ভারতে এসে ভারতের NSA অজিত দোভালের সাথেকার আলোচনায় নাকি এমন আলোচনা হয়েছে বলে দীপাঞ্জন দাবি করেছেন।

    “Two of India’s neighbours –Maldives and Bangladesh will go to polls later this year and early next year respectively. India is of the opinion that no initiatives should be launched in its neighbourhood that impacts its national interests adversely.”

    হিন্দুস্তান টাইমসের রেজাউল লস্কর লিখেছেন, “বাংলাদেশ-আমেরিকার সম্পর্ক একটা চাপের মধ্যে ঝাকুনিতে পড়েছে। রাষ্ট্রদুত পিটার হাস বারবার করে আগামি নির্বাচন যেন অবাধ ও স্বচ্ছ হয় এর আহবান জানাচ্ছে।”  [“…Peter Haas, repeatedly calling for the holding of a free and transparent general election”] যখন ইতোমধ্যেই আমেরিকা বাংলাদেশের উপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত যে নিজেকে এই অঞ্চলের এক পরাশক্তি বলে মিথ্যা করে হলেও ফুটানি করে ভাব দেখাতে চায় – সেই ভারতের কাছে নাকি হাসিনার সাহায্য চেয়েছে। [“Bangladesh has sought India’s assistance to tide over a rough patch in its relations with the US, especially over the conduct of elections in the neighbouring country, people familiar with the matter said on Tuesday.”]

    প্রথম আলোর প্রচেষ্টাঃ
    আর  রেজাউল লস্করের এই রিপোর্টারই উধৃতি দিয়েই আমাদের প্রথম আলো এক রিপোর্ট ছেপেছিল। যেন বাংলাদেশের সরকার ও তার সমর্থক এবং যারা ভারতের স্বার্থের ভিতরেই নিজস্বার্থ দেখে অথচ থাকে বাংলাদেশে – এমন গোষ্ঠিগুলোকে মিথ্যা করেই আস্থার কথা শোনাতে চেয়েছিল – এই অপ্রমাণিত কেবল জল্পনা-কল্পনার খবর (?) ছেপে উত্তেজনা সৃষ্টি করার মাধ্যমে!
    তবে এখানে ভারতের জ্ঞোয়েন্দা বিভাগ ও প্রথম আলোকে দেয়া তাদের এসাইনমেন্ট এর উদ্দেশ্য খুবই পরিস্কার। যেমন প্রথম আলো লিখছে, “…হিন্দুস্তান টাইমসের সূত্র বলছে, নয়াদিল্লির সঙ্গে আলোচনায় একটি মুক্ত ও সমৃদ্ধ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের গুরুত্বের দিকে ইঙ্গিত করেছে ঢাকা। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশকে চীনের দিকে ঠেলে দিতে পারে—এমন সম্ভাবনার ওপরও আলোকপাত করেছে তারা“।
    অর্থাৎ ভারত আমেরিকাকে  চীনা জুজুর ভয় দেখাচ্ছে যে, যদি আমেরিকা তোমরা বাংলাদেশের আগামি নির্বাচন যেন অবাধ ও স্বচ্ছ হয় – এই উদ্দেশ্যে হাসিনা সরকারকে ভিসা নিষেধাজ্ঞা-সহ নানান উপায়ে চাপ সৃষ্টি করতেই থাকো তাহলে নাকি হাসিনা চীনের কোলে গিয়ে উঠে পড়তে পারে!  মানে আরেকবার রাতের নির্মাবাচন করতে দাও – এই হলো ভারতের অদ্ভুত আবদার!!!  ভারত এই কথিত চীনা-জুজুর মিথ্যা ভয়ের কথা ছড়িয়ে হাসিনাকেই আরেকবার ক্ষমতায় রেখে দিবার পক্ষে কথা তুলতে চাচ্ছে।
    আচ্ছা তাহলে এটাই কী জয়শঙ্করের কথিত  ” প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত সবচেয়ে কম জড়ানো – কী তামাসা! আমরা কী প্রথম আলোর পারফরমেন্সে অভিভুত – এটা বলে উঠব!!!

    আরো আছেঃ
    প্রথম আলোর নয়াদিল্লির প্রতিনিধি সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সৌম্যের লেখা প্রথম আলোতে কখন কী পরিচয়ে ছাপা হবে এর তাল-ঠিকানা পাওয়া মুশকিল। যেমন কখনও তাঁর লেখা ছাপা হচ্ছে মতামত হিশাবে, কখনও নাম ছাড়াই শ্রেফ ‘নয়াদিল্লির প্রতিনিধি’ এভাবে পরিচয় লিখে; নয়ত প্রকাশ্যে নিজের নাম উল্লেখ করেই!!  গত ১৮ জুন সৌম্যের একটা লেখা ছাপা হয়েছিল; মানে মোদি-বাইডেন সরাসরি বা সামিট বৈঠক হয়েছিল ২৩ জুন – এর পাঁচদিন আগের ঘটনা সেটা। অর্থাৎ মোদির আমেরিকা রওয়ানা দিবার আগেই। সে লেখার সারকথা ছিল মোদি-বাইডেন বৈঠকে নাকি বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গ উঠছেই। এমনকি এভাবে লেখা হয়েছিল যে, “……সন্দেহ নেই, মোদি-বাইডেন বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের মন বোঝার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে বাংলাদেশের নির্বাচনী গতিপ্রকৃতি”। অর্থাৎ সোজাকথায়, বাংলাদেশের বা হাসিনার নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারিত হবে মোদি-বাইডেন বৈঠকে!!!!!

    সৌমের ১৮ জুনের লেখায় আরো বলা হয়েছিলঃ

    এক.
    “দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই চুক্তির দিকে দুই দেশের নজর যতটা নিবদ্ধ, ততটাই আগ্রহে এই সফরের দিকে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ। সে দেশের জাতীয় সংসদের নির্বাচন ‘সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ’ করে তুলতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নতুন যে ভিসা নীতি ঘোষণা করেছে, যা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি এই মুহূর্তে সরগরম, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি”।

    দুই.
    “নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নিরন্তর চাপ, নতুন ভিসা নীতির মধ্য দিয়ে যা প্রতিফলিত, বাংলাদেশ তো বটেই, ভারতকেও তা খানিকটা অস্বস্তির মধ্যে ফেলেছে। ওই নীতির রূপায়ণ, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে তার সম্ভাব্য প্রভাব এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন ভারতের অস্বস্তি ও চিন্তার কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের এই নয়া ফরমান নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহল পরস্পরের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছে। বাংলাদেশকে এই বিষয়ে আশ্বস্তও করা হয়েছে যে আসন্ন সফরে এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদি অবশ্যই মতবিনিময় করবেন”।

    তাহলে আজ ৫ জুলাই মানে মোদির সফর শেষে ১১/১২ দিন পরের।  তবু ২৩ জুন মোদি-বাইডেন বৈঠক শেষ হয়ে গেলেও এরপর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মোদি-বাইডেন বৈঠকে আসলেই কী আলোচনা হয়েছিল এসব নিয়ে ভারতের সকল মিডিয়া বা আমাদের প্রথম আলো …… অথবা কেউই না; সবাই চুপ হয়ে আছে আর মুখে কুলুপ! না সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এর কোন লেখা ??? সবাই মুখে কুলুপ এঁটে গায়েব, ডিসাপিয়ার্ড!!

     

    তবু ২৩ জুন মোদি-বাইডেন বৈঠক শেষ হয়ে গেলেও এরপর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে মোদি-বাইডেন বৈঠকে আসলেই কী আলোচনা হয়েছিল এসব
    নিয়ে ভারতের সকল মিডিয়া বা আমাদের প্রথম আলো …… না সবার মুখে কুলুপ; না সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এর কোন লেখা ??? সবাই মুখে কুলুপ এঁটে গায়েব, ডিসাপিয়ার্ড!!
    আগের দুসপ্তাহ ধরে মিথ্যা চাপাবাজির সব রিপোর্ট ছাপিয়ে ২৪ জুন থেকে আজও সবাই লুকিয়ে পড়ে আছে!!! আহা! কী সুবিধা!!!

     

    এখানেই শেষ নয়ঃ
    এরপর আবার সেই সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনি হাজির! কিন্তু নতুন বেশভুষায়!
    আর এবার একই প্রথম আলোতে গত ২ জুলাই তার লেখার শিরোনাম কিন্তু এবার একেবারে উলটা কথায় –  “প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে, বললেন জয়শঙ্কর”। আর সবচেয়ে বড় কথা এটাও ঘরে বসে এক বানানো খবর! আচ্ছা কন তো সৌম্য এটা একটা কথা হইল? নিজের মান-সম্মান বিশ্বাসযোগ্যতা এগুলো কিছুই না??? টাকাই সব!
    আপনি সৌম্য এতদিন কইলেন বাংলাদেশের বা হাসিনার নির্বাচনী ভাগ্য নির্ধারিত হবে মোদি-বাইডেন বৈঠকে! – মানে ২৩ জুনের বৈঠকে, মানে প্রধানমন্ত্রী মোদির সরাসরি বাংলাদেশের বা হাসিনার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করবেন!! আর এখন এখানে কইতেছেন,জয়শঙ্কর বলেছেন – প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে…।

    তাইলে সৌম বা প্রথম আলো আপনারা বলেন আপনাদের কোন কথাটা সঠিক????
    আপনাদের দুইটা কথার একটা তো অবশ্যই মিথ্যা কথা, এটা নিশ্চিত!

    কোনটা নিশ্চিত মিথ্যাঃ
     প্রথম আলোতে ২ জুলাই ছাপা হওয়া সৌমের লেখাটার শিরোনাম – প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে  – গুগল সার্চে দেখা গিয়েছে এটা ভারতে কোথাও ছাপা হয়েছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায় নাই।  আর এই বানানো খবরটা বাংলাদেশে কেবল যুগান্তর, কালবেলা আর মানবজমিনে মাত্র; মানে বাংলাদেশেও আর কোন মিডিয়ায় ছাপা  হয় নয়। আর এরচেয়েও তাজ্জব ব্যাপারটা হল, এটা প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছে নয়াদিল্লি প্রতিনিধি হিশাবে সৌমের নিজস্ব রিপোর্ট হিশাবে। মানে সৌম নিজেই সোর্স!  তাহলে সে একই লেখা যুগান্তর, কালবেলা [পরে আবিস্কার হল যে সে স্বীকারোক্তি দিয়েছে যে তার খবরটা প্রথম আলোরটাই মানে ওটার কপি] আর মানবজমিনে ছাপা হয় কী করে???  খবর ছাপলে যে সোর্স বলতে হয় যেন তারা এটা জানেই না। তাই যেন এরা এই দুই মিডিয়া কেউই তাদের খবরের সোর্স কী তা লেখেই নাই।  বাংলাদেশের জার্নালিজমে সবচেয়ে বিপদজনক এক ধারা শুরু হয়েছে সোর্স-রেফারেন্স ছাড়া রিপোর্ট ছাপা অথবা আরো বিপদজনক এক শব্দ তারা লিখে  – “ডেস্ক রিপোর্ট”! অথচ  জার্নালিজমে ডেস্ক রিপোর্ট(!) বলে কিছু  কী আছে? হতে পারে না। তবে বাংলাদেশে এর মানে হল, অন্য মিডিয়া থেকে কপি করে এনেছে কিন্তু অসততা করে দেশি-বিদেশি সেই মিডিয়ার নামটাও বলতে চায় না। তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিকটা হল – ডেস্ক রিপোর্ট মানে খবরের সোর্স বলে কিছু নাই (মানে পুরাটাই মিথ্যা বা গুরুত্বপুর্ণ কোন শব্দ বা বাক্য বদলে দেয়া টুইস্ট নিউজও তা হতে পারে) অথচ একে মিডিয়া রিপোর্ট আর জার্নালিজম বলে চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে!! আর প্রথম আলো এই নষ্ট-সাংবাদিকতার নেতা উদ্গাতা!

    আরো গভীরে যাইঃ
    সৌমের প্রথম আলোতে ২ জুলাই ছাপা হওয়া লেখা এটা কী এর আগের দিন বা আগের এক সপ্তাহের মধ্যে ঘটে যাওয়া ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কোন প্রেস ব্রিফিং বা কোথায় দেয়া বক্তব্য???
    জবাব হল – না একেবারেই না। সৌম্য রিপোর্টে কেবল লিখেছেন, “……রাজধানী দিল্লির ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে নরেন্দ্র মোদির শাসনের ৯ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশের ‘সাফল্য’ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। কিন্তু কোথাও কবে  জয়শঙ্কর একথা বলেছেন সে প্রসঙ্গে সৌম লিখেছেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গত শুক্রবার এ মন্তব্য করেন।  কিন্তু গুগল সার্চে এই রিপোর্টটা এক প্রথম আলোতে সৌম্যের লেখা  ছাড়া আর কেউ লিখে নাই বা কোন পত্রিকা নিজে রিপোর্ট লিখে ছাপে নাই। আর আগেই বলেছি বাংলাদেশের যেদুই একটা মিডিয়া এটা ছেপেছে তা তারা প্রথম আলোর নাম উল্লেখ করে বা না করে মানে সোর্স উল্লেখ না করেই ছেপে দিয়েছে। আর কোন “এরেঞ্জমেন্ট” থাকলে সেটা গোপন রেখে দিয়েছে।

    কেন আর কোথাও (ভারতে বা বাংলাদেশে) সৌম্যের লেখা এই রিপোর্ট এর বিষয়ে রিপোর্ট নাইঃ
    ভারতের কেন্দ্র সরকার বা সংসদের নির্বাচন আর সাত-আট মাস বাকি; মোটামুটি বললে আগামি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এর শুরু হতে পারে।  ফলে জয়শঙ্কর-মোদি সহ সরকারের সকলের সব কাজকর্ম এখন নির্বাচন-মুখি বা মোদির ইমেজ বাড়ানোকে লক্ষ্য করেই আগাচ্ছে।  তাই গত নয় বছরে দেশে-বিদেশে মোদির সাফল্য কী – দেশের মুখ-উজ্জ্বল কী করেছেন এনিয়ে প্রপাগান্ডায় নেমে গেছেন জয়শঙ্কর! তাই তিনি এক বক্তৃতা আয়োজন করেছিলেন। আর সেখানেই দিয়েছিলেন এমন কিছু বক্তব্য। কিন্তু প্রথম কথা সেটার তারিখ কবে??? ওর তারিখ ছিল ৮ জুন। কীভাবে বের করলাম?
    অনেক খুজাখুজির পরে দেখা গেল মোদির নয় বছরের সাফল্য  আর জয়শঙ্করের বক্তব্য এদুই শব্দে মিল আছে এমন একটাই ইংরাজি রিপোর্ট আছে – যা ভারতের প্রায় সবাই ছেপেছে। যদিও স্বভাবসিদ্ধ ভাবে মোদি-বিজেপি এই প্রপাগান্ডা খবরটাকে টুইস্ট করেছে কুখ্যাত ANI কে দিয়েও। অনেকে সেটাই ছেপেছে। যেমন দ্যাপ্রিন্ট এর লেখা। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস্র লেখা। ইত্যাদি। আর এর বাইরে এক মিডিয়া যা আমার নজরে এসেছে তা হলো “লাইভ-মিন্ট” – এই কম চলা পত্রিকার রিপোর্টটা ভাল- এটা সরকারি এজেন্সি পিটিআই এর নিউজ।  কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ হল এসব খবরই ভারতে প্রকাশিত হয়েছে  ৮ জুন তারিখের; মানে যেদিন জয়শঙ্কর তা বলেছেন।
    তাহলে কী ৮ জুন তারিখে প্রকাশিত জয়শঙ্কর এর বক্তব্য প্রসঙ্গে কী জয়শঙ্কর আবার পরবর্তিতে পয়লা জুলাই তারিখে এসে তিনি একই বিষয়ে মিডিয়ায় কথা বলেছেন??? কারণ সৌম্যের রিপোর্টের দাবি এই তারিখ ১ জুলাইয়ের!!!! এটা একেবারেই অবিশ্বাস্য!!!  কারণ, যে প্রশ্নের উত্তর নাই তা হল,  সেক্ষেত্রে কেন ভারতের আর কোন মিডিয়ায় জয়শঙ্করের এই কথিত ১ জুলাইয়ের মিডিয়ার সাথে কথা বলা নিয়ে ভারতে কোন রিপোর্ট কেউ ছাপে নাই কেন??? এটা বেশ অস্বাভাবিক, বিশ্বাস অযোগ্য!!!

    তাহলে সৌম্য বন্দোপাধ্যায়  ১ জুলাই জয়শঙ্কর এমন সব কথা বলেছেন বলে দাবি করে রিপোর্ট লিখলেন কেন??? এর কোন ব্যাখ্যা নাই।
    তবে, খুব সম্ভবত একাজ করার কারণ হল কংগ্রেস দল।  আসলে জয়শঙ্কর খুব সম্ভবত আবার একই প্রসঙ্গে – ফিরে নতুন করে কিছুই বলেন নাই। কিন্তু কংগ্রেস দল চায় জয়শঙ্করের বক্তব্যকেই একটু সমালোচনা করতে যা বাংলাদেশে প্রকাশিত হবে। আর তাই সৌম্যের ঐ ভুয়া রিপোর্টে  যার মধ্যে (বাড়তি হিশাবে) কলকাতার বাঙালি এক সাবেক কূটনীতিক দেব মুখোপাধ্যায়  এর বরাতে কিছু সমালোচনা ছাপা হয়েছে। যেখানে তিনি “তিস্তা চুক্তি না হওয়া” আর “অখণ্ড ভারতের মানচিত্র” মোদি প্রকাশ করেছে বলে –  এনিয়ে অসন্তোষ উষ্মা প্রকাশ করেছেন। যদিও ফ্যাক্টস হল, ভারত বাংলাদেশ থেকে করিডোর নিয়েছে কিন্তু প্রতিশ্রুতি দিয়েও তিস্তা পানি আজও  দেয় নাই – এর প্রথম ভায়লেটর (২০১১ সালে বাংলাদেশে সফর) বা লঙ্ঘনকারী সেসময়ে কংগ্রেসেরই প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। তাঁর ক্ষমতাকালের ও ২০১১ সালে মনমোহনের বাংলাদেশ সফরকালে এটা উন্মোচিত হয়েছিল যে ভারত তিস্তা পানিচুক্তি ভঙ্গ করছে। দেখুন সেসময়ের বিবিসি রিপোর্ট।    আর সেই একই ভায়োলেটর পরের প্রধানমন্ত্রী মোদি – এই ফ্যাক্ট তো লুকানো যাবে না। সে যাই হোক তাহলে, সৌমের এই রিপোর্ট কী মোদির নয়, কংগ্রেসের অর্থে লেখানো??? প্রথম আলো অর্থের লোভে এই জুয়াচুরি-সাংবাদিকতা করেছে???

    শেষ কথাঃ প্রথম আলোতে ছাপা সৌম বন্দোপাধ্যায়ের ২ জুলাইয়ের এই রিপোর্ট  অস্পষ্ট রহস্যময়ই থেকে গেল!

    আপডেটঃ ৭ জুলাই ২০২৩; দুপুর ১২ঃ ৩৪

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ২৩ জুন পালন

    ২৩ জুন পালন
    গৌতম দাস

    ২৭ জুন ২০২৩    দুপুর ০২ঃ ৪৫
    https://wp.me/p1sCvy-4Gi

    আমাদের সমস্যার শেষ নাই।
    এবারের ২৩ জুন পার হয়ে গেল; আজ ২৭ জুন।
    এই ২৩ জুন এদিন কেউ লেখেন ‘পলাশী দিবস’ কেউ ঐতিহাসিক ‘পলাশী দিবস’। এমনকি প্রথম আলোও লেখেছে – ‘ইতিহাসের এই দিনে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন’ হয়েছিল। আর বেশির ভাগ উতযাপন কর্ণারে দেখা যায় নবাব সিরাজুদ্দৌলার একটা ছবি।
    হা কথা ঠিক, এদিন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনে বৃটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির বিজয় ঘটেছিল। আমাদের কলোনিদেশ হওয়ার পথ সুগম হয়েছিল।
    তবে ইদানিং এদিন পালনে যেটা বাড়ছে তা হল, নবাবের বন্দনা। নবাব সিরাজকে এক ধরণের হিরো-ভাবে দেখানো – ঠিক আছে এমনটা তো হবেই। কিন্তু এখানে কিছু “অতিরিক্ত” হয়ে যাচ্ছে। অসতর্কে হয়ত মানে যথেষ্ট ভেবেচিন্তে তা করা হচ্ছে না বলে।
    যেমন ধরেন এই ২৩ জুন ১৭৫৭ – এটা প্রায় তিনশ বা পোনে তিনশ বছর আগের ঘটনা। আর সেটা ছিল নবাবের আমল আর আজ হাসিনার আমল। হাসিনার নামে যতই ভটচোরের প্রমাণ বা অভিযোগ থাক হাসিনাকে কিন্তু স্বীকার করতে হয় যে তাঁর ক্ষমতার উৎস জনগণ। যেটা নবাব সিরাজের বেলায় তার সম্পর্কে যতই ইতিবাচকভাবে লিখি তাঁর ক্ষমতার উৎস জনগণ নয়।
    হাসিনাকে মিথ্যা করে হলেও দাবি করতে হয় “জনগণ তাকে ভোট দিয়েছে” – সেজন্যই তিনি নাকি ক্ষমতায়! বিপরীতে নবাব সিরাজের বেলায় “জনগণ তাকে ভোট দিয়েছে” এরকম কোন ধারণাই তখন ছিল না। কারণ তখন না জনগণ বলে ধারণার জন্ম হয়েছিল, না ভোট বা রিপ্রেজেন্টেশন বলে কোন ধারণা। আমরা বড়জোর ছিলাম নবাবের প্রজা। কোন নবাবী বা নবাবগিরি আমাদের ফেরত আনবার ব্যবস্থাই নয়। আমাদের কাজও নয় – এটা যেন না ভুলি!
    মানে এক রিপাবলিক দুরত্বে এ’দুই শাসন ব্যবস্থা। আমরা আগামিতে হাসিনাকে সরিয়ে বা পরাজিত করে এক নয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা ও জনগণের শাসন বা জনশাসন ব্যবস্থা চালু করব। আর নিশ্চয় সেটা কোন “নবাবী শাসন ব্যবস্থা” হবে না। আর মূলকথা হল কোন নবাবী শাসন ব্যবস্থা কায়েম নবাবের প্রজাদের কাজই নয়। এজন্যই তা নবাবী শাসন মানে এক মনার্কি বা রাজ-শাসন ব্যবস্থা। আর প্রজা সে তো নবাব বা রাজার অধীনস্ত প্রজা-ই। আর বিপরীতে জনগণ মানে স্বাধীন জনগণ, যা নবাবের আমলে কেউই নয় – অস্তিত্বই নাই; হয়ে উঠতে পারে নাই।
    কোন ২৩ জুন দিবস পালনের সময় – এই “নবাবী সীমাবদ্ধতা” -এটা যেন আমারা খেয়াল রাখি। সবার আগে নাগরিক, সিটিজেন, পাবলিক ইত্যাদি শব্দগুলোর অর্থ বুঝেন – ঠিক বুঝেছেন কিনা নিশ্চিত হন – নিজেকে ঝাকায় জিজ্ঞাসা করেন!
    নিচে একটা পুরানা লেখার লিঙ্ক দিলাম। সাপ্তাহিক দেশকাল এরা কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল ম্যানেজমেন্ট ও স্টাফ দিয়ে পরিচালিত। কিন্তু তারা আমার একটা লেখা দুদুবার ছেপেছিল কি বুঝ থেকে দুই ভিন্ন প্রায় বছর খানেকের ফারাকে; আর দুই ফর্মে তা আমার জানা নাই। দ্বিতীয়বার সেটা আবার বড় করে লেখার পরে। কেন তাদের এলেখা এত পছন্দের তা আমি বলতে পারবে না। সেই লেখার শিরোনাম “সাতচল্লিশের দেশভাগের তাৎপর্য, অতঃপর …” । নিচে লিঙ্ক……।
    এর বড় ভার্সানটাই এখানে আবার পাঠককে পড়তে দিলাম। তবে জানিয়ে রাখা ভাল এই লেখাটারই আরো বিস্তার ঘটিয়েছিলাম আরো পরে – তবে সেটা দুই পর্বে, ছাপা হয়েছিল আমার নিজস্ব ওয়েব সাইটে তখন আবার এই শিরোনামে “ ‘৪৭এর দেশভাগ – সকলেই সুবিধাভোগী, দায় নেয়নি কেউ”।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ব্রিকস বুঝাবুঝিতে পিছিয়ে – আমার কেন আদার বেপারী 

    ব্রিকস বুঝাবুঝিতে পিছিয়ে – আমার কেন আদার বেপারী
    গৌতম দাস

    ২৫ জুন ২০২৩  সকাল ০৮ঃ ০৪

    https://wp.me/p1sCvy-4EQ

     

              BRICS

    আবার ব্রিকস [BRICS]! বাংলাদেশে এনিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে! তাতে এর সবটা না হোক মূল বিষয়টা কী তা বুঝি -না-বুঝি, অনেকেই এতে মেতে উঠেছে এই মনে করে যেন এটা বাইডেনের আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনের এক কড়া সিদ্ধান্ত-পদক্ষেপ।  আর হাসিনা বাংলাদেশকে ব্রিকসে নিয়ে উঠালে মানে সদস্য  করে ফেললে তা বাইডেনের আমেরিকাকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। অথবা বাইডেনকে যেন এক কড়া জবাব দেয়া হবে। এই ভুল অনুমানের উপর মিডিয়া গরম!  কারণ ব্রিকস মানে যেন একটা অর্থনৈতিক পক্ষ-জোট!  এই এজাম্পশন বা ধরে নেওয়া অনুমান একেবারেই ভিত্তিহীন! এক ভুল অনুমান!  দাঁড়ানো এক ভুল বুঝাবুঝি! 

    কথা আরো আছে তাহলে ব্রিকস যদি নেহায়তই এক আমেরিকাবিরোধী অর্থনৈতিক জোট হয় আর এর জন্ম মাত্র ২০০৯ সালে – সেটা কী ২০০৯ এর জায়গায় গত শতকে ধরা যাক ১৯৯০ এর দশকে হত তবে কী এটা আমেরিকাকে আরো আগে বধ করে ক্ষতিগ্রস্থ করে দিতে পারত না? ব্যাপারটা কী তাই?  তাহলে তো এই প্রশ্নেরও জবাব পেতে হবে যে ব্রিকস উদ্যোক্তারা সেটা করে নাই কেন?  সারকথায় ব্রিকস কখন কার্যকর হবে – খুলবে  সেই সময় নির্ধারণ – সেটা কী উদ্যোক্তাদের ইচ্ছাধীন? নাকি অন্য কোন শর্ত (অবজেকটিভ) বা কিছু পুর্ব-প্রস্তুতি পূরণ  আগে হতে হবেই যেটা চীনের ইচ্ছাধীন নয়?  এই জবাবটা এখনই দিয়ে নেই। এটা চীন বা আমেরিকাবিরোধী কারও ইচ্ছাধীন নয়। বরং বেশকিছু বিষয়কে বাস্তবে যোগ্য হয়ে উঠতেই হবে, পেকে উঠতে বা যোগ্য- ম্যাচিউরিটি -তে পৌছাতে হবেই! যা এখনও হয় নাই। তবে হওয়ার দিকে হাঁটছে! এছাড়া আগেই বলেছি এটা কোন অর্থনৈতিক জোট একেবারেই নয়। কোন আশিয়ান [ASEAN] অথবা RCEP [Regional Comprehensive Economic Partnership ] ধরণের বিশেষ অর্থনৈতিক জোট একেবারেই নয়! তাই এটা ঠিক কে অ্যামেরিকান আর কে চীনের পক্ষ নিয়ে কথা বলব আর এই ভিত্তিতে কাকে সঠিক বলব ব্যাপারটা মোটেও তা নয়!  

    অতএব, এমনই অনেকগুলো ভুল বুঝাবুঝির মধ্যে প্রথম এক সমস্যা হল ব্রিকস নিয়ে রিপোর্টিংয়ের। যেমন বাংলাদেশে বেশির ভাগ মিডিয়ায় শিরোনাম – বাংলাদেশ ব্রিকসে যোগ দিতে যাচ্ছে – ধরণের। একথার মানে কী? বাংলাদেশ চাইলেই কী ব্রিকসে যোগ দিতে পারবে? নাকি আগে দাওয়াত আসতে হবে? মানে তারও আগে ব্রিকস নিজেরা কোন নয়া সদস্য নিতে চায় এমন এক তাদের আভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত হতে হবে। মানে ব্রিকস এর পক্ষে এটা এমন পরিপক্ক হয়েছে বসে সিদ্ধান্তে আসতে হবে! কিন্তু এসব প্রশ্ন এখনও এখানে সবটা পরিস্কার ঠিক তা নয়।

    তবে তুলনায় আপাতত এখানে ডেইলি স্টারের রিপোর্ট অনেক স্বচ্ছ ও সাবধানী। মানে যা জানে না, তা নিয়ে আগায় নাই; অনুমান করে ইচ্ছামত লিখে নাই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনকে কোট করে তারা লিখেছে, “We will surely join once they invite us. We have yet to receive any formal letter…. । বাংলা করলে হয়, “আমাদের একবার দাওয়াত করলেই আমরা নিশ্চয় সেখানে যোগ দিব। (এর আগে) আমাদেরকে এখনও তাদের আনুষ্ঠানিক (দাওয়াতের) চিঠি পেতে হবে”।  মানে আশা করা হচ্ছে যে আগামি আগষ্টে তাদের এবারের ব্রিকস সম্মেলনের আগে তারা নয়া সদস্য হতে আগ্রহী বা যাদেরকে তারা সদস্য হিশাবে নিতে আগ্রহী তারা দাওয়াত পত্র পেতে পারে। এরপরেই যোগ দেয়া না দেয়া নিয়ে নড়াচড়া শুরু হবে।

    ব্রিকস নিয়ে বিভ্রান্তিই বিভ্রান্তিঃ
    ব্রিকস নিয়ে যেকোন কিছুতেই বিভ্রান্তির শেষ নাই। এর এক অন্যতম কারণ, ব্রিকস যাদের লেখার বিষয় হয়েই যায় যেমন, মিডিয়া রিপোর্টার বা যারা কলাম লিখেন কমবেশি এদের সকলের মধ্যেই বিভ্রান্তি ঢুকে আছে, তা বর্তমান। যেমন ধরণ হিশাবে ব্রিকস কেমন সংগঠন – এই প্রশ্ন কে কিভাবে নাড়াচাড়া করছে কি লিখছে তাতেই বুঝা যায় যে তারা প্রায় সকলেই বিভ্রান্ত; মানে নিশ্চিত জানা নাই। প্রথমত, মিডিয়ায় অনেকেই “ব্রিকস-কে অর্থনৈতিক জোট” ভেবেছে।  যেমন প্রথম আলোর এক ‘বিশেষ প্রতিনিধি’ লিখছে,  “ব্রিকস হচ্ছে পাঁচ দেশের একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট”।  অর্থাৎ এই বিশেষ প্রতিনিধি ব্রিকস-কে শুধু অর্থনৈতিক জোট-ই না একে এক আঞ্চলিক জোটও বানিয়েছে। কিন্তু ব্রিকস আর যাই হোক কোন আঞ্চলিক বা ভৌগলিক জোট একেবারেই নয়। কোথায় দক্ষিণ আফ্রিকা আর কোথায় রাশিয়া আর কোথায় ভারত বা চীন – এসব একটা অঞ্চল বা একটা মহাদেশেই সব সদস্য তা তো নয়; কাজেই একটু কল্পনা করে দেখলেই তো এমন ভুল করার কথা না!
    আবার দ্যা বিজনেস স্টান্ডার্ড এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান- পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক ড. এম এ রাজ্জাক এর বরাতে জানাচ্ছে,  তিনি বলছেন – ‘আমাদের স্মরণে রাখতে হবে এটা কোনো বাণিজ্য জোট নয়, তাই যোগ দিলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে না।’  আবার ঐ একই রিপোর্ট,  এবার আরেক বরাতে জানাচ্ছে, – “যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির ব্রিকসকে একটি ‘শিথিল ধরনের অর্থনৈতিক জোট’ বলে অভিহিত করেন, যেখানে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা রয়েছে”।  এটাও এক শতভাগই ভুল অনুমান।
    জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বিডিনিউজও লিখেছেন, –  ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের অর্থনৈতিক জোট ব্রিক এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলন হয় ২০০৯ সালে। এটা তো এক ভিত্তিহীন ভুল অনুমান যে ব্রিকস এক অর্থনৈতিক জোট!
    আবার এক কলাম লেখক ব্রিকসকে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের জোট মনে করে – ধরে নিয়েই লিখেছে “বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্যঘাটতি, যেখানে আমদানি রপ্তানির চেয়ে অনেক বেশি, সেখানে ব্রিকসের সুবিধা আদায়ে একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে”;  তিনি আরও একই লেখায় অন্যখানে লিখেছেন, “…… ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য বিষয়ে উদারতার অভাব আছে“।
    অর্থাৎ সবার ভিতরেই দেখা যাচ্ছে একটা বিভ্রান্তি কাজ করছে যে ব্রিকস [BRICS] কী ধরণের জোট – এই প্রসঙ্গে। অনেকের লেখার রেফারেন্স আনলাম এবং অবশ্যই এসব কাউকে খাটো করার জন্য না। বরং একধরণের সার্ভের মত করে কয়েকজনের লেখা এনে দেখলাম যে সমাজে বিষয়টা নিয়ে আলোচনায় ভুল কোথায় হচ্ছে। সমস্যাটা কোথায়! আর এখন এই বিভ্রান্তি কাটাতে আমার বক্তব্য কী সেটাই নিচে বলব।

    ব্রিকস কোন অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট একেবারেই নয়ঃ
    হ্যা একথা সত্য যে ব্রিকস কোন অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট একেবারেই নয়। এই বুঝাবুঝি ভিত্তিহীন ও ভুল।  কথাটা যদি এভাবে বলি যে আইএমএফ [IMF] বা বিশ্বব্যাংক [ WB or IBRD] বা এডিবি [ADB] বা আইডিবি [Islami DB] এআইআইবি [AIIB] বা এনডিবি [NDB] ইত্যাদি – এরা হল কোন অর্থনৈতিক জোট অথবা কোন বাণিজ্য জোট তাহলে বুঝাবুঝিতে যে কঠিন সমস্যা সৃষ্ঠি হবে – এটা সেধরণের ভুল। দুনিয়ার প্রায় ১৯২+ রাষ্ট্র জাতিসংঘের সদস্য। আর এদের মধ্যে প্রায় সকল রাষ্ট্র-ই  আবার IMF ও WB এদুই প্রতিষ্ঠানের সদস্য। কিন্তু তবু কোন যুক্তি বা বাস্তবতাতে IMF ও WB কোন  অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট একেবারেই নয়।

    বরং সোজাসাপ্টা বললে,   দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের পরিস্থিতিতে ১৯৪৪ সালে Bretton Woods সংগঠন বলে এক গ্লোবাল কনফারেন্সে IMF-WB এদুই গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া হয়েছিল। আবার এদেরকে ঠিক কোন জোট বা সমিতি বলা হয় না। বলা হয় মাল্টি ল্যাটারাল [multi-lateral] বা বহু-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।  আর এসব বহু-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মূল উদ্দেশ্য হল, একটা আন্তরাষ্ট্রীয় ও গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সিস্টেম গড়ে তোলা। অনেক সময় যেটাকে Global Econimic order  – এক শৃঙ্খলাবদ্ধ নিয়মের ব্যবস্থা বলা হয়। আর তা গড়তে Bretton Woods সেই সভায় তাতে স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন এর মত দেশের প্রতিনিধি সহ অন্য আমেরিকাসহ লিডার দেশ এবং আমাদের মত ছোট দেশের প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত ছিল। এটা নিউ হ্যাম্পশায়ারের  Bretton Woods এলাকায় Bretton Woods নামে হোটেলে জন্ম নেয়া এক ঘটনা।  উদ্দেশ্য ছিল  – জাতিসংঘকে যদি বলি এক গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেম কায়েম ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান ঠিক সেই রকম IMF-WB হল এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম কায়েম ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান কায়েম করা যাতে একটা গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বা সিস্টেম চালু করা যায়।

    তাহলে ব্রিকস কীঃ
    ব্রিকস হল সেকালের জায়গায় একালে আরেকটা উদ্যোগের নাম যাদের লক্ষ্য একাল এখন গ্লোবাল নেতৃত্বে এক পালাবদলের যুগ – সেই পালাবদলে মূলত চীনের নেতৃত্বে সেকালে  IMF-WB এর মতই তবে একালে এবং  আগামিতে বিকল্প এক গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বা সিস্টেম কায়েমের লক্ষ্যে কাজ শুরু করা। আর সেকাজের উদ্যোক্তা সংগঠন হল ব্রিকস [BRICS] যার জন্ম ২০০৯ সালে।  তবে পরিস্কার থাকতে হবে ব্রিকস  নিজেই কোন বিকল্প  IMF অথবা WB সমতুল্য প্রতিষ্ঠান তা একেবারেই নয়। বিকল্প  IMF ও WB ধরণের প্রতিষ্ঠান হাজির করা একাজে অবশ্যই লম্বা প্রস্তুতি ও সময় লাগবে; আর তা করার জন্য উদ্যোক্তা তাও আবার একেবারে প্রাথমিক উদ্যোক্তা সংগঠন হল ব্রিকস। যেটা ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকা – এই পাঁচদেশের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে তৈরি এক প্রাথমিক উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান মাত্র।  আর এই মাত্র পাঁচদেশ সদস্য থাকা অবস্থাতেই বিকল্প  IMF-WB গড়ার আগ্রহ থাকলেও কেবল বিকল্প WB গড়ার লক্ষ্যের এক ভ্রুণ প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে ইতোমধ্যেই তারা চালু করেছে গত ২০১৫ সালে। এর নাম নিউ ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক [NDB  বা এনডিবি], যেটাকে বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান বলে গণ্য করতে পারি। আর এই প্রথম ব্রিকসের সদস্য দেশ সম্প্রসারণের কালে ২০২১ সাল থেকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই এর সদস্য হয়ে গেছে। প্রথম আলো লিখেছে, ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্রিকস-ব্যাংকের সদস্য হয়। যদিও আমার ধারণা এভাবে  ব্রিকস-ব্যাংকের সদস্য লিখাটাও এক ভুল বুঝাবুঝির উৎস বা ভুল হবে। বরং যদি বলা যেত ব্রিকস উদ্যোগের বিশ্বব্যাংক অথবা আরেকটু পরিস্কার করে ব্রিকস উদ্যোগের বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান – তাহলে এসব কথা নয়া ভুল বুঝাবুঝি তৈরি করত না। মূলকথা ব্রিকস-কে কখনই  অর্থনৈতিক জোট অথবা কোন বাণিজ্য জোট হিশাবে তো নয়ই এমনকি ব্রিকস নিজেই এক আইএমএফ অথবা বিশ্বব্যাংক হতে যাচ্ছে এভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়া যাবে না। তা ভুল হবে।

    মূলকথা ব্রিকস-কে কখনই  অর্থনৈতিক জোট অথবা কোন বাণিজ্য জোট হিশাবে তো নয়ই;
    এমনকি ব্রিকস নিজেই এক বিকল্প আইএমএফ [IMF] অথবা বিশ্বব্যাংক [WB] হতে
    যাচ্ছে এভাবেও পরিচয় করিয়ে দেয়া যাবে না। কারণ সেটাও ভুল। 

    বরং ব্রিকস হল স্রেফ উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান যার ইচ্ছা আছে আগামি দিনের দুনিয়াতে
    বিকল্প  IMF এবং WB প্রতিষ্ঠান গড়ে নিয়ে এক
    নয়া  গ্লোবাল  সিস্টেমের জন্ম দেয়া।
    আর ‘ব্রিকস উদ্যোগ’ যেন জন্ম নিয়ে নেয়, গড়ে উঠে – আমেরিকা নিজেই পরোক্ষে ইস্যুটাকে এদিকে ঠেলে দিয়েছে।    

     

    আমাদের বুঝাবুঝি পরিস্কার না থাকার পিছনের অন্তত দুই সমস্যাঃ
    যতদুর লিখেছি তাতে অন্তত এতটুকু পরিস্কার যে আমাদের সমাজে বুঝাবুঝিতে ব্যাপক সমস্যা আছে। এদিকে, আমরা চাই বা না-চাই আমাদের পরিচিত দুনিয়াটাতে ব্যাপক বদল ঘটে যাচ্ছে এটা অন্তত আমাদের টের পাবার কথা। এব্যাপারে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একেবারেই অপ্রস্তুত। পাবলিক বা সরকারি হলে সেখানকার মূল ইস্যু লীগ বা বিএনপি কোনটা ভাল!!!!! কে কোনদিকে!!
    অথচ হওয়া উচিত ছিল ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াকে বুঝব কী করে এবং গ্লোবাল সিস্টেম প্রতিষ্ঠান যেগুলো সেই ১৯৪৫ সালে যাত্রা শুরু করেছে এদের ততপরতায় যে দুনিয়ায় নয়া ব্যবস্থা চালু হয়েছিল একে বুঝবার উপায় কী? সেগুলোর ভাল-মন্দ দিক নিয়েও আলোচনা হতে পারত। আর সেকাজে তরুণদের যোগ্য করে  গড়ে তোলা এটাই হতে হত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনার মূল লক্ষ্য। কিন্তু তা হয় নাই। আমরা এর বদলে কেন কমিউনিজম বা কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদিতায় ঈমান আনতেও হবে এবং এটাই নাকি সবচেয়ে “অগ্রসর জ্ঞান” তা মনে করে আমরা বাস্তবতা বা বাস্তব জীবনের বাইরে থাকতে চেয়েছি।  যেটা এখন পরিস্কার যে আমাদের এই অঞ্চলে কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদিতাই আসলে এক হিন্দুত্ববাদী মাত্র। আর এটাই আমাদেরকে ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়ায় যে নয়া ধারা একটা গ্লোবাল সিস্টেম-ব্যবস্থা খাড়া হয়ে গেছে তা বুঝতেই দেয়নি।

    বরং ব্যাপারটা হয়েছে এমন যেন, একটা জিনিষ বাঘ না বিড়াল সেটা বুঝব শিখে ফেলব কী করে সেই বুঝাবুঝির ক্ষমতা শানানো বা চর্চা করা নয়; এর চেয়ে আমরা ভাগ হয়ে গেছি এভাবে যে আমাদের মধ্যে কে কে এটাকে বাঘ বলার পক্ষে আর কে কে বিড়াল বলার পক্ষে। ফলে এরই নিট ফলাফল হল আমরা কোন পক্ষই আজ দুনিয়াকে এসব ফেনোমেনাগুলোকে বুঝতে আমরা কেউ-ই সক্ষম নই, হই নাই।
    তাই, আমাদের বোকা বোকা প্রশ্ন হল জাতিসংঘ কেন “গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান” নয়। কেন কেউ কেউ ভেটো সদস্যধারী? এই খায়েস শুনলে মনে হবে প্রশ্নকর্তা খুবই বোদ্ধা! কিন্তু আসলে সে একটা পড়ালেখা না করা চটকদার তার্কিক! আবার অগ্রসরতার দাবিদার কমিউনিস্ট তাদেরও জাতিসংঘ  মানে, এই গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কোন ধারণা নাই।  আর  IMF-WB  সম্পর্কে ধারণা সেটা আরো করুণ অবস্থা। কমিউনিস্টদের চোখে এগুলো হলো “নিপাত যাক প্রতিষ্ঠান”।   মানে যেকথা বলছিলাম বাঘ না বিড়াল এর বুঝাবুঝি ও ফারাক করতে শিখা ও জানা – এসব জানার পদ্ধতি শিখার কাজ যেখানে মুখ্য হওয়া উচিত ছিল সেসব ফেলে আমরা হয়ে গেলাম কে বাঘকে বিড়াল বলে বা কে বিড়ালকে বাঘ বলবে এনিয়ে দুপক্ষের লড়াইয়ে বিভক্ত। IMF-WB “নিপাত যাক প্রতিষ্ঠান” -এধরণের হতেও পারে! কিন্তু এর আগে এসব প্রতিষ্ঠানকে চিনব কী করে, কী করে চিনতে হয় এর জানার পদ্ধতি-উপায় কী আমরা জানলাম না। এর ম্যান্ডেট কী, এটা কী করে, কী করার উদ্দেশ্যে জন্ম আমরা কমিউনিস্টেরা তা জানি না। প্রথমে তাদের বলতে দেখলাম এরা নাকি সুদ খেতে আসছে এমন লগ্নি প্রতিষ্ঠান!!!!!  এর সোজা মানে হল IMF-WB এদের সুদহার কত তাই কোন খবর কমিউনিস্টেরা জানেই না।  আবার আচ্ছা  IMF-WB “নিপাত যাক প্রতিষ্ঠান” মানে হল বাংলাদেশ যদি এদুই প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ ত্যাগ করে তাহলে কী বাংলাদেশ মানে ধরা যাক বাংলাদেশের অর্থনীতি কী টিকে থাকতে পারবে? কেন পারবে অথবা পারবে না তা আমাদের কমিউনিস্টেরা বলতে পারবে, মনে হয় না।  তাহলে?

    আবার দ্বিতীয় সমস্যাটা হল, একালে বিশেষ করে হাসিনার ১৫ বছরে অনেকেই আমেরিকায় বসবাসের রেসিডেন্ট পারমিট পেয়েছে। কিন্তু তাতে আবার এরা একটা কমপ্লেক্সে মানসিক জটিলতায় পড়েছে।  তারা চীন ভাল না আমেরিকা ভাল এই তর্কে অংশ নিতে চায়। তা খুবই ভাল কথা কোন অসুবিধা নাই। কিন্তু তাদের যে দ্বিধা তা হল, তাদের কী আমেরিকা ভাল – একথার পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বলা উচিত নয়!!!!  অর্থাৎ জাতিবাদের সমস্যায় পড়েছেন তারা; যেটা অবশ্য একেবারেই অপ্রয়োজনীয় বিবেচনা। আর আমেরিকা তো  হাসিনার বাংলাদেশ নয়।  তবুও কেউ কেউ আরেক ধাপ উপরে। তারা মনে করে তারা যদি অ্যামেরিকান প্রশাসনের অবস্থানের পক্ষ নিয়ে কথা না বলি তাহলে কী এটা পরে কখনও তাদের রেসিডেন্ট পারমিট বাতিলের পক্ষে যুক্তি হয়ে হাজির হয়ে যাবে? এসব!! “এক্ষেত্রে কে কী পক্ষ-বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন তা নিয়ে আমার বলার নাই। কিন্তু যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল, যেমন ব্রিকস বুঝাবুঝির ক্ষমতা বাড়ানো বা বুঝাবুঝির পদ্ধতিটাই জানা এদিকে কারও আগ্রহ নাই।   বরং বাঘকে বিড়াল বলে বা কে বিড়ালকে বাঘ বলে চালিয়ে দিবে কিনা – কোনটা করবে এটা হল তাদের তর্ক। যা খুবই হতাশজনক!
    তাহলে কথা ছোট করি এখন। তাহলে যারা ১৯৪৫ সালের পরের গ্লোবাল সিস্টেমটা কেন এমন হয়ে খাড়া হয়েছিল তা বুঝতেই অক্ষম – বরং কেবল পক্ষ-বিপক্ষ হয়ে থাকতে চায় বা এসেছে তারা কীভাবে ব্রিকসকে ব্যাখা করতে পারবে বুঝাবুঝি শানাতে পারবে!
    আবার  কমিউনিস্টরা মনে করেন ক্যাপিটালিজম করা অথবা মুনাফা কামানো খারাপ কাজ। কিন্তু বাস্তবতা হল সেই রাম বা অযোধ্যা কোনটাই নাই, টিকে নাই। পুরানা চীনও নাই। সোভিয়েতেরও আগে সেই ১৯৫৮ সালের পর থেকে পুরান চীন নাই।   কাজেই সোভিয়েত বুঝ দিয়ে সোভিয়েতের বাইরের দুনিয়াকে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া কেন? তাতে তো বাইরের সবাইকেই পাপী মনে হবে। কারণ ‘বাইরের দুনিয়া” যেটা সেটাই এখন বাস্তব দুনিয়া। কাজেই সোভিয়েতের টুলস দিয়ে ব্রিকসকে বুঝবার চেষ্টা অর্থহীন!  তাইতারা তো ব্রিকস আলোচনায় ঢুকতেই সক্ষম হবেন না; তাদের অপ্রয়োজনীয় এবং নিপাত যাক অবস্থানের কারণে! তাই ব্রিকস বুঝাবুঝি তাদের জন্য নয়!

    এজন্যই বলছিলাম, যারা বুঝতে চান তাদের জন্য তাহলে সারকথায় এর মানে আমরা এখন আরেক সমস্যায় পড়লাম যে তাহলে আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক কেমন ধরণের সংগঠন যারা সেই ১৯৪৪ সালে একই [ Bretton Woods] বৈঠকে জন্ম নিয়েছিল, তা বুঝতে হবে আগে। আবার, তারা একই বৈঠকে জন্ম নেয়া হলে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক নামে আলাদা দুইটা হবার দরকার হল কেন? এসব দিকগুলো আমাদের জানতে হবে নইলে ব্রিকস উদ্যোগের কিছুই স্পষ্ট বুঝা যাবে না।  আরেকভাবে বললে, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক এদের ম্যান্ডেট বা কী দরকারে জন্ম দেয়া হয়েছিল সেসব কাহিনী ঘাটতে হবে। হ্যা কিছু করার নাই। কারণ, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক তাহলে কী ধরণের প্রতিষ্ঠান – কোন অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট কী? না অবশ্যই না।  তাহলে কেমন প্রতিষ্ঠান এরা? এই হল মুখ্য জানবার প্রশ্ন!

    একটা ক্লু দিয়ে শুরু করা যাক!
    লক্ষ্য করলে দেখব এক আইএমএফ ছাড়া বাকি বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি – এসব প্রতিষ্ঠানের নামের শেষে ব্যাংক বা “ইংরাজিতে B” আছে। কাজেই নামের শেষে ব্যাংক আছে এমন প্রতিষ্ঠানকে  অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট মনে করা অবশ্যই অর্থহীন বা মিলল না – এটুক তো বুঝাই যায়! এরপর আরও ইতিবাচকভাবে বুঝতে চাইলে লক্ষ্য করব এসব প্রতিষ্ঠানের নামে ইংরাজিতে B লেখা থাকার আগে বা পরে দেখেন D আছে,  যেখানে D  হল ডেভেলবমেন্ট শব্দের আদ্যক্ষর।  মানে হল বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি ইত্যাদি এরা সবাই আসলে ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক ধরণের প্রতিষ্ঠান; মানে বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি  এরা কোন অর্এথনৈতিক জোট নয়, একেবারেই নয়। তবে এরা ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক অবশ্যই।

    আচ্ছা,  ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক বলতে ঠিক কী বুঝবঃ
    এর জবাব হল, ব্যাংক বলছে যেহেতু ফলে ঋণ দেয় তা হয়ত অনুমান করা যায়। কিন্তু এই অনুমান কী সঠিক? হ্যা একেবারে সঠিক।  কিন্তু এটা অবশ্যই আমাদের দেশের  প্রাইভেট ন্যাশনাল ব্যাংক বা সরকারি সোনালি ব্যাংকের মত ব্যাংক নয়। এটা হল ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক যেখানে ডেভেলবমেন্ট এর মানে করতে হবে ইংরাজিতে যেটাকে ইনফ্রাস্টাকচার ডেভেলবমেন্ট [অবকাঠামো উন্নয়ন] বলে। আর সেখান থেকে ছোট করে নেয়া শব্দ শুধু ডেভেলবমেন্ট কথাটাই বাংলায় উন্নয়ন।

    আর ইনফ্রাস্টাকচার বা অবকাঠামো শব্দের ব্যবহার অবকাঠামো ব্যাঙ্ক [DB] এভাবে এই শব্দের ব্যবহার ও ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। অনেকে মার্শাল প্ল্যান কথাটা শুনে থাকবেন। বিশ্বযুদ্ধে যেহেতু তাই সেখানে রাস্তাঘাট কারখানা বাড়িঘ্অর বা পানি-বিদ্যুতের উতপাদন অবকাঠামোর এসব দিক থেকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ জর্মানিসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের অবকাঠামোগুলো পুণঃর্গঠন ও উন্নয়ন [reconstruction & Development (RD)] জন্য নয়া উদ্যোগ পরিকল্পনার নামই মার্শাল প্ল্যান । এখানে আমেরিকা একাই মানে  অ্যামেরিকান প্রশাসনের দিক থেকে যে বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল সেটাই মার্শাল প্ল্যান নামে পরিচিত।  সেসময়ে (RD) খুবই এক চালু শব্দ ছিল। যেকারণে আজকের বিশ্বব্যাংকের (WB) মূল পুরা নাম হল [IBRD – International Bank for Reconstruction & Development ]।  আর অবকাঠামো [Infrastructure] বলতে ঠিক কী বুঝব? কোন দেশের অর্থনীতি চালু ও সরগরম থাকার পুর্বশর্ত হচ্ছে ভাল অবকাঠামো থাকা। মানে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট, পানির সাপ্লাই, নিস্কাষণ ব্যবস্থা, কারখানার বর্জ্য রিসাইক্লিং, নগর অবকাঠামো, শিল্পাঞ্চল অবকাঠামো, গ্রামীন রাস্তাঘাট ইত্যাদি গড়তে হয় আগেই। তবেই অর্থনীতি চাঙ্গা হতে পারে। আর সবচেয়ে বড় শর্ত হচ্ছে এসব গড়তে হবে নামমাত্র বা কমসুদের (১% এরও কমে) ঋণে।  সেসব অবকাঠামো গড়তে নামমাত্র সুদে সরকারকে ঋণ দেয়াই  বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি – এসব ডেভেলবমেন্ট ব্যাংকের ম্যান্ডেট বা মুখ্য কাজের লক্ষ্য। এককথায় এগুলো কর্মাশিয়াল বা বাণিজ্যিক ঋণ নয়, তাই সুদ নামমাত্র। এটা ডেভেলবমেন্ট ব্যাংকের মুখ্য বৈশিষ্ঠ। এটাই  যদিও অর্থনীতি উঠে দাড়ালে মাথাপিছু আয় বাড়তে শুরু করলে সরকারকে দেয়া এই ঋণের সুদ বেড়ে ৩% পর্যন্ত হতে পারে!
    তাহলে আমাদের মূল আলোচ্য প্রসঙ্গ – বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি এই ধরণের প্রতিষ্ঠান কোনভাবেই কোন  অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট নয়। এমন মনে করা ভুল, ভিত্তিহীন। এগুলো আসলে ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক ধরণের প্রতিষ্ঠান।

    তাহলে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা যেটা এখন আছে আগে তা বুঝলে পরে, আগানো যাবে ব্রিকস কীঃ
    নয়া প্রসঙ্গে যাবার আগে একটা সাবধানতাঃ
    ঘরে ঢুকার আগে বাইরে জুতা খুলে ঢুকার মত পাঠকেরা দয়া করে আপনি কোন পন্থী – প্রো অ্যামেরিকান নাকি প্রো চীন অথবা ধরেন কোল্ডওয়ার কালের মত আপনি সোভিয়েত না অ্যামেরিকান পন্থী – ইত্যাদি এসব ভাগ ও আলাপ গুলো এই আলোচনা পাঠের আগে বাইরে রেখে আসেন। তাহলে এই আলোচনার কথাগুলো বুঝতে সুবিধা পাবেন।  কারণ এখানে কথাগুলো যে পন্থীরই হোন এমন সবার জন্য লেখা হয়েছে। বরং আপনি নিজেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল বলে মনে রেখে পড়তে বসলেই বুঝতে ঝামেলা হতে পারে। পরে আরো বিস্তার করব সেসব কথা।

    তাহলে ব্রিকস কী ? কেমন ধরণের প্রতিষ্ঠান?
    এটা খুবই প্রতিষ্ঠত এক সত্য যে ১৯৪৫ সাল নাগাদ বিশ্বযুদ্ধে শেষে (কমিউনিস্ট নেতা স্তালিন সহ) সকলে মেনে নিয়েছিল যে আমেরিকাই গ্লোবাল নেতা। এর মূল কারণ হল বা তখনকার বাস্তবতা ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রপক্ষের সকলের প্রধান খরচ এককভাবে সকলকে  যুগিয়েছিল একনাগারে চারবারের (১৯৩২-১৯৪৪) নির্বাচিত অ্যামেরিকান  প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। অর্থাৎ মিত্রপক্ষ এই জোটের একমাত্র নেতা হয়ে দাড়িয়েছিলেন রুজভেল্ট। শুধু তাই নয় যুদ্ধে শেষে আবার ইউরোপের নানান দেশের ( এমনকি এবার কেবল মিত্রপক্ষের দেশগুলোকেই নয় সাথে হিটলারের পক্ষের দেশগুলোসহ) অবকাঠামোগুলো পুণঃর্গঠন ও উন্নয়ন এর খরচও যোগান  বা অবকাঠামো ঋণ হিশাবে দিয়েছিল ঐ আমেরিকা একাই। এজন্য আমেরিকা বাদে ইউরোপীয়-সহ প্রায় সকল দেশই পরে আমেরিকাকে ধরেছিল  একটা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা দাঁড় করানোর জন্য উদ্যোগ নিতে। যত সহজে এই গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা কথাটা লিখলাম ততই কঠিন অনেকের জন্য এটা বুঝা বা ইমাজিন করে বুঝা কঠিন। বিশেষ করে কোন কমিউনিস্টের পক্ষে কমিউনিস্ট থেকে গিয়ে এটা বুঝা কঠিন হবে। এর অন্তত একটা কারণ হল, কমিউনিস্ট বুঝাবুঝিতে বাণিজ্য বিশেষ করে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য  (এবং গ্লোবাল বাণিজ্যও) একটা অপ্রয়োজনীয় বিষয়! কারণ যতই নিজেদের এরা কমিউনিস্ট বলে দাবি করুক এরা মূলত উগ্র জাতিবাদীদের মত গভীর অর্থনৈতিক জাতিবাদিও। মানে কোনকিছুই আমদানি করা যাবে না; পারলে অন্যদেশে কেবল রপ্তানি করেন – এমন চিন্তার। স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আজ ১৫ টা আলাদা রাষ্ট্র হয়েছে – এটা এত বড়। তাই ভিতরে প্রায় সব ধরণের প্রয়োজনীয় পণ্য একই নিজ সোভিয়েত দেশেই উতপাদন সম্ভব ছিল। যেটা আমাদের মত দেশের বেলায় অসম্ভব।  এই সুযোগে কমিউনিস্টদের  (অবাস্তব বা আইডিয়েল) অনুমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য  (এবং গ্লোবাল বাণিজ্যও) অপ্রয়োজনীয়। এছাড়া, বাণিজ্য মানে তো মুনাফা কামানো যা তাদের চোখে হারাম কাজ!  অথচ খোদ কার্ল মার্কস এর কাছে এক্সচেঞ্জ [exchange] (বাংলায় বিনিময় যেমন পণ্য বিনিময় থেকে প্রেম বিনিময় বা সম্পর্ক) কেন এত গুরুত্বপুর্ণ ও প্রায় সর্বব্যাপী এক ধারণা কেন?
    অথচ আবার খেয়াল করেন মোদি যে এক উগ্র অর্থনৈতিক জাতিবাদী এবং কট্টর চীনবিরোধী। অথচ ভারতে যে মোবাইল ব্যবহার হয় এর ৭৩% মার্কেট শেয়ার হল একা চীনের। আমি জানি না কমিউনিস্টেরা এই ফেনোমেনাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন! কেন এটা ঠেকানো যাচ্ছে না?

    তাই আরেক সাবধানতা -দুই বলে রাখি। গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা জিনিষটা কী তা নিয়ে আলাপেঃ
    মূলত এটা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাই তবে এরচেয়েও বড় এরই গ্লোবাল রূপ।  আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা মানে যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বানিজ্য যাতে চলতে পারে এর একটা সিস্টেম গড়ে তোলা। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে এত জটিল সিরিয়াস ভাবা কেন? যদি এর মূল সমস্যাটা বুঝতে পারি তাহলে সবকিছু বুঝব।
    যেমন আপনার দেশীয় মুদ্রায় কেনা-বেচা আপানার দেশের সীমানার ভিতরেই কেবল চলতে পারে। সীমানা পার হয়ে গেলে আপনার পকেটের আপনার দেশীয় মুদ্রা ভিনদেশে আর গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই কিছুই কিনতে পারবেন না।তাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে ধারণা লাগবে, একটা সিস্টেম লাগবে। এর চেয়েও বড় কথা কোন প্রতিষ্ঠান লাগবে যার কাজ হবে যেকোন দেশের মুদ্রার প্রতিদিনের বিনিয়ময় হার কী হবে তা জানানো। আর একাজ সে টেকনিক্যাল ও ইম্পারশিয়াল নিউট্রাল কোন পদ্ধতি দাড় করিয়ে সে ভিত্তিতে প্রকাশ করবে। আর যে গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান এই কাজ করবে – সেই প্রতিষ্ঠানটারই নাম হল আইএমএফ।  এসব দিকের বিপরীতে কমিউনিস্টেরা মনে করে  আইএমএফ হল নাকি কেবল শর্ত দেওয়ার প্রতিষ্ঠান। না বুঝে কত কথাই না বলা যায়! কমিউনিস্টদের আরেক ভুয়া অনুমান হল, আইএমএফ এমন শর্ত দেয় বেশি মুনাফা কামানোর জন্য। এজন্য যে হাসিনা সরকার পরিণত হয়েছে বিদেশে অর্থপাচারের সরকারে ফলে হাতে ডলার শুণ্যতার সরকার, কমিউনিস্টেরা তাকে সাফাই যোগাতে চেয়ে বলছে ডলার সংকটের সব দোষ নাকি আইএমএফ এর।  কারণ নাকি আইএমএফ খালি শর্ত দেয়। আর এই ভুয়া আলাপের লেজ ধরে অর্থমন্ত্রীও সাফাই দিয়ে বলে সরকার  “আইএমএফ এর শর্তের কথা ভেবে” মানে আমল করে এবারের বাজেট দেয় নাই। মানে খুবই বিপ্লবী সরকার এটা! আর তা শুনে কমিউনিস্টেরা হাততালি দিয়ে উঠেছে।

    যে আলাপ তুলি নাইঃ
    প্রশ্ন হল ব্রিকস এক উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান বলছি যার লক্ষ্য আগামি দিনে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থার বিকল্প সিস্টেম আনা। এই ব্রিকস তাহলে নিজ জন্মের ১৪ বছর পেরিয়ে গেছে এখনও আইএমএফ নিয়ে কিছু করছে না কেন, অগ্রগতি ধীর কেন?  জবাবটা আপাতত এক বাক্যে শেষ করব। জবাব হল, চলতি গ্লোবাল অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থাটা অ্যামেরিকান ডলার কেন্দ্রিক। মানে এখন দুনিয়ায় বৈদেশিক বাণিজ্যে ৭০% এর বেশি পণ্য কেনাবেচা হয়, ইনভয়েস লিখা হয় অ্যামেরিকান ডলারে। সবার আগে এখানে বদল ঘটতে হবে; ঘটাতে হবে। অন্য মুদ্রা ইউয়ান অথবা  অন্যদেশের মুদ্রায় হতে হবে। এটাই সেই পুর্বশর্ত যা না হলে ব্রিকস উদ্যোগের সফলতা দেখাতে পারবে না। কিন্তু একালে আবার বাইডেন ডলারে বাণিজ্য করতে পারবে না এমন ডলার স্যাংশন যেকোন ব্যক্তি বা সরকারের উপর জারি করছে যথেচ্ছভাবে তা প্রয়োগ হচ্ছে। এটাই পরোক্ষে ব্রিকসকে আশা জাগানো হয়ে যাচ্ছে, বা সাহায্য করছে। যেটাকে আমেরিকার দিক থেকে দেখলে উপস্থিত লাভালাভ পেতে গিয়ে বাইডেন অপব্যবহার করে ফেলছেন – বলবেন অনেকে। এমন ডলারের সুবিধা অপব্যবহারের বিপদ বাড়ছে কথাটা সম্প্রতিকালে বাইডেনের  ট্রেজারি মন্ত্রী স্বীকারও করেছেন Yellen Says Sanctions May Risk Hegemony Of US Dollar।

    তাহলে আদার ব্যাপারী কথা তুললাম কেনঃ
    কথাটা আমার না স্বয়ং শেখ হাসিনার। বিডিনিউজের রিপোর্টার লিখছেন, প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক আরও জানতে চেয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক কোনো মুদ্রা চালু করার পরিকল্পনা বাংলাদেশের আছে কি না। উত্তর দিতে গিয়ে মুচকি হেসে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আদার ব্যাপারি জাহাজের খবর নিতে বলছেন”।

    এইকথাটাই প্রমাণ করে যে হাসিনা নিশ্চিত যে ব্রিকসের সদস্য হলে সেটা বাইডেনের আমেরিকাকে ছেড়ে যাওয়া বা বুড়া আঙুল দেখানো এসবের কোনটাই নয়। তিনি তো আদার ব্যাপারী, তাই এটা তিনি বুঝেন। এটা কেবল একটা ভাব ধরা যে ব্রিকসে যোগ দিয়ে হাসিনা বাইডেনের প্রভাবের বাইরে চলে যাবেন বা বাইডেনকে যেন একটা উচিত শিক্ষা দিলেন। তবে এসব কথা দলের কর্মীদের মনোবল বাড়াতে কাজে আসবে এতটুকুই মাত্র।

    এছাড়া সকল পাঠককে আরেকটা কথা মনে করিয়ে দিয়ে শেষ করব। ব্রিকসের জন্মদাতারা সহ সকল রাষ্ট্র আজও আইওএমএফ ও বিশ্যাব্যাংকের সদস্য হয়েই আছে। ছাড়ে নাই। কোনদিন যদি চীন আমেরিকার জায়গায় গ্লোবাল নেতার প্রতিষ্ঠা পায় কেবল তখনও হয়ত অনেক বিশ্বব্যাংকের মত সমতুল্য প্রতিষ্ঠান থাকলেও দুনিয়ায় আইএমএফ হবে একটাই; তবে অবশ্যই সেটা হবে ঢেলে সাজিয়ে নেয়া এক নয়া আইএমএফ!

    আপডেটঃ ২৫ জুন ২০২৩  সকাল ১০ঃ ১২
    আপডেটঃ ২৫ জুন ২০২৩  বিকাল ০৫ঃ ৫৫

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • মোদি-বাইডেন সাক্ষাতে কি হবে তা এখনই জেনে নেন

    মোদি-বাইডেন সাক্ষাতে কি হবে তা এখনই জেনে নেন
    গৌতম দাস

    ২২ জুন ২০২৩      সকাল ০৯ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-4E8

     

                   Biden hosts Indian Prime Minister Modi at White House

     

    মোদির বাইডেন সাক্ষাত হবে আজকে। কিন্তু এর আগেই ভারত একটা হাইপ [HYPE] তুলেছে মানে মিথ্যা প্রপাগান্ডার ‘ওভার-পাবলিসিটি’ শুরু করেছে গত কমপক্ষে প্রায় দশদিন ধরে।
    এর উদ্দেশ্য দুইটা। এক.  আভ্যন্তরীণভাবে ভারতের ভোটারদের দেখানো যে মোদি এক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব পরাশক্তি নেতা হয়ে গেছে। আর দুই. বাংলাদেশে হাসিনা সরকার টিকবে কিনা সেই নির্ধারক ভাগ্যবিধাতা হলেন মোদি, সেটা সত্য-মিথ্যা যাই হোক এই ইমেজ তিনি গড়তে চান।
    ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ২১-২৪ জুন তার আমেরিকা সফরে ইতোমধ্যেই আমেরিকায় পৌছেছেন। আজ ২২ তারিখ প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সাথে তার সাক্ষাতের কথা।
    এদিকে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য অ্যামেরিকান নয়া ভিসা পলিসিতে দেয়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর থেকে, বাংলাদেশে ভিতর সরকার বা বিরোধী দলগুলোর যেখানে আমেরিকান এই নীতির বিরুদ্ধে কোন আপত্তি জানিয়ে বক্তব্য প্রায় নাই বললেই চলে; বরং এর চেয়ে এই নিষেধাজ্ঞা অপর দলের জন্য কত খারাপ হয়েছে  আর তাতে অন্যদলটা কত বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে এনিয়ে সরকারি  প্রপাগান্ডাটাই মুল আসর দখল করেছে; যদিও এতে ব্যাপারটা মানুষ তামাসা হিশাবে দেখেছে। অন্তত ফেসবুক কে যদি আমার সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জানার (সোশাল মিডিয়া) উৎস বলে  ধরি তাহলে  এমনটাই সোশাল মিডিয়ার ডমিনেটিং মুড।  আর মানুষের কাছে যে ওয়েলকামিং মেসেজ গেছে তা হল, অ্যামেরিকান ভিসা পলিসি এবার মানুষকে একটা ভাল কিছু দিবে কারণ, এটা হাসিনা সরকারের উপর মারাত্মক চাপ তৈরি করতে শুরু করেছে!
    ওদিকে আবার ভারতের প্রতিক্রিয়া হয়েছে উলটা। ভারতের মিডিয়া, কলাম লেখক, একাদেমিক বা থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ইত্যাদিতে যুক্ত যারা তাদের সবার একই ভাষ্য আমেরিকা “কত্ত-ই না খারাপ দেশ” – যে তারা বাংলাদেশের উপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে! আর এতে বাংলাদেশের উপর ভারতের আলগা খবরদারি মানে তাদের ভাষায় “বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ” সেটা আর কিছুই এখন উসুল করা যাবে না; আগের সাজানো বাগান থেকে কত সহজেই না লুট ততপরতা চালানো যে অবারিত সুযোগ ছিল যেন সেটা এখন বন্ধ বা ক্ষুন্ন হতে যাচ্ছে আর এই ম্যাসেজ তারা পাঠ করে ফেলেচ্ছে। আর একারণে তারা রীতিমত কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে।
    এতে সবচেয়ে অসুবিধা যেটা তা হল তাদের স্বার্থের পক্ষে ন্যায্যতা কী? সাফাই বয়ান কী? এমন কিছু তো একটা থাকতেই হবে। নইলে “বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ” হারিয়ে যাচ্ছে বললেই এর অর্থ হবে সেটা অবৈধ স্বার্থ নয়, ন্যায্য স্বার্থ অথবা হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার বিনিময়ে নেয়া কোন অসম চুক্তি বা ঘুষের চুক্তি নয় এমন একটা নুন্যতম বয়ান অবশ্যই হতেই হবে। আর এখানেই অসাঞ্জস্যতা এক বিরাট ঘাটতি ভারতের সব বক্তব্য বা দাবিকে দুর্বল করে রেখেছে।

    পেড মিডিয়া প্রপাগান্ডাঃ
    এই সুযোগে প্রথম আলোর মত পত্রিকাগুলো যারা ভারতের গোয়েন্দাবিভাগের মিথ্যা সাজানো প্রপাগান্ডা খবর নিজেরা একে সত্যি বলে নিজ পত্রিকায় খবর ছাপে; তাদের এই দালালি ততপরতারর রেট মনে হচ্ছে বেড়ে গেছে। অথবা গোয়েন্দাবিভাগ নিজেরাই যেচে রেট বাড়িয়ে দিয়েছে হয়ত যাতে  মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছাপতে এরা আরো দুঃসাহসী হয়ে উঠে, লোভনীয় পরিমাণ অর্থের লোভে অস্থির, ডেসপারেট। বেচাইন হয়ে যায় যেন!
    সম্ভবত সেকারণেই আমরা  নিউজ দেখছি প্রথম আলোতে যেখানে মরিয়া হয়ে বিপদে পড়বে জেনেও এসব প্রপাগান্ডার আবর্জনা  তারা খবর বলে ছাপছে। ধরা পড়লে শিরোনাম বদলে লঘু করার চেষ্টা করছে তবু প্রপাগান্ডা কাজ চালিয়েই যাচ্ছে। এসব মিথ্যা খবর তৈরির ভঙ্গিটা হল এমন দাবি করা যেন ভারতের মোদিই হচ্ছে বাংলাদেশে বাপ! তাই যেন বাংলাদেশে কী ঘটবে এর একমাত্র নির্ধারক ও ভাগ্যবিধাতা হলেন মোদি! মোদি যেন বাংলাদেশকে তাঁর কোন বাপের তালুক হিশাবে পেয়েছেন। তাই মোদিই একমাত্র হাসিনা সরকারকে ভিসা নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদির অ্যামেরিকান চাপ থেকে বাঁচাবেন, উদ্ধার করবেন। এই হল এসবের সারকথা!

    যেমন, গতকাল ২১ জুন সকাল থেকে দেখা গেল আরেক প্রপাগান্ডা যে বাংলাদেশ মানে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন নাকি জয়শঙ্কর বা ভারতকে অনুরোধ করেছে যেন মোদি তার আমেরিকার সফরে বাইডেনের কাছে হাসিনার জন্য কিছু সুপারিশ করে। যার সার ইঙ্গিতটা হল, লেম্যানের ভাষায় বললে মোদি যেন হাসিনা সরকারকে আরেকবার রেখে দেয়ার বন্দোবস্ত করে দেয়, আমেরিকাকে বলে!

    ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বারানসিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ ভুক্ত
    দেশগুলোর
    মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকের ফাঁকে গত ১২ জুন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে
    বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
    এ কে আব্দুল মোমেনের সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে। সূত্র বলছে, বিভিন্ন
    পর্যায়ে ভারতের কর্মকর্তাদের কাছে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বিষয়টি তুলেছেন।

    যদিও ভারতের মিডিয়ার এই দাবি আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন ও সেতুমন্ত্রী কাদের অস্বীকার করেছেন। তার মানে ভারতের দাবি একপক্ষীয়, সকলেই বিনা তর্কে গ্রহণ করে এমন দাবি নয়।
    আর এটাই ছিল ২১ জুন সকাল থেকে প্রথম আলোর প্রপাগান্ডা এসাইনমেন্ট। অথচ প্রথম আলোর এই কাজটা এক মারাত্মক জার্নালিস্টিক অসততা। কেন?

    বর্তমান বাংলাদেশ প্রশ্নে, আমাদের মোমেন অথবা আমেরিকা সফররত মোদির ভারত এদের যে কেউ নানা প্রপাগান্ডা করতেই পারে যার সোজা অর্থ ফ্যাক্টস লুকাইতে পারে। তাহলে এক্ষেত্রে প্রথম আলোর অবস্থান হওয়া উচিত অন্তত নিজে ফ্যাক্টস না লুকানো বা কাউকে লুকাতে না দেওয়া বা সাহায্য না করা। এই সাপেক্ষে মানে এটা করার পরেই কেবল ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার অর্থের ভান্ডে প্রথম আলো একটু-আধটু মুখ দিতে পারে; যতটুকু যা পায়। কিন্তু প্রথম আলো – খোদ জার্নালিজম – এই কাজটাই ত্যাগ করে চলে গিয়েছে।

                                                                TIMES

    যেমন, ভারতের কিছুপক্ষের নানান দাবি বা মোমেনের দাবিতে তা সব তোলপাড় করে ফেলতে পারে, এমনকি মোদির অ্যামেরিকান সফরকে কেন্দ্র করে মিথ্যা আশা বা প্রপাগান্ডা যে হাসিনা আবার টিকে যাচ্ছে বলে হৈচৈও শুরু করতে পারে। আর এক্ষেত্রে মোদি ও বিজেপির প্রধান লাভের লক্ষ্যটা হল মিথ্যা হলেও এটা দিয়েই মোদির ইমেজ গড়া; মানে মোদিকে এক পরাশক্তি নেতা হিশাবে তুলে ধরা যে বাংলাদেশে সরকারকে বাঁচায় – এই ইমেজ গড়াটাই বিজেপির সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ। তাতে এটা পুরাটাই মিথ্যা  হয় যে বাইডেন মোদির কথা শুনবেই না অথবা আদৌও এনিয়ে মোদি-বাইডেন হয়ত আলাপই হবে না – এমন হলেও ক্ষতি নাই। কারণ মোদির এই পরাশক্তি বা মিথ্যা গ্লোবাল নেতার ইমেজ – এটাই আগামি ভারতের নির্বাচনে বিজেপি ব্যবহার করবে আর দাবি করবে মোদির নেতৃত্বে ভারত কত উঁচুতে উঠেছে। আর এতে হাসিনা মিথ্যা আশা আকাঙ্খা তৈরি করে এর ছলনায় আরো হতাশ হয়ে যাবে কিনা সেটা তো মোদির বিবেচনাই নয়!
    অতএব এই ভুয়া উচ্ছাস তুলে হলেও ভারত মরিয়া হয়ে হাসিনার -জান যাওয়া অবস্থায়- এই মিথ্যা পরাশক্তি নেতার ইমেজ কামাতে নেমেছে। এমনকি পরোক্ষে তিনি হাসিনাকেও ট্রাপে ফেলেছেন, তা হলেও।
    আর এই পরিস্থিতিতে এখানে প্রথম আলো যেপথ নিল, তা হল এর মধ্যে ফ্যাক্টস বা সত্যটা কী? সেটা বের করতে না যাওয়া।  মোদি কী আসলেই বাইডেনকে বলে হাসিনার সব বালা-মুসিবত মানে আরেকবার ক্ষমতায় থেকে যাবার বন্দোবস্ত করে দিতে পারবেন? নাকি এর কোন আদৌ সুযোগই নাই?
    না, প্রথম আলো এবিষয়ে ফ্যাক্টস উদ্ধার সেদিকে গেল না – বরং সে গেল মোদির মিথ্যা প্রপাগান্ডাকে হাইপ বা উচ্ছাস তোলা বা যোগানো – যেটা সরাসরি একটা প্রতারণা???
    অথচ জার্নালিজমে সৎ থাকলে প্রথম আলোর ন্যায্য কাজ হত ফ্যাক্টসের সন্ধানে যাওয়া; যে অন্তত মোদির আদৌ কিছু করার সুযোগ আছে কিনা! সেটা যাচাই করে আসা!

    অনেকের মনে সন্দেহ হতে পারে সেটা কী খুবই সহজ হবে? এমন ভেবে! হা এটা এখানে একেবারেই সহজ এবং তৈরিই ছিল। যেমন, মোমেন বা মোদির ভারতের অনেকের দাবির প্রসঙ্গ হল বাইডেন বা অ্যামেরিকান অবস্থা নিয়ে – মানে বাইডেন-মোদি সামিটে (বাংলাদেশ প্রসঙ্গে) বাইডেন কী অবস্থানে থেকে কথা বলবেন? তাতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আলোচনায় উঠে আসুক বা না আসুক – বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বাইডেনের অবস্থান আগে থেকেই কী জানা যায় না, সেই তালাসে যেতে হত।

    এই প্রসঙ্গে অথেনটিক নিউজ পাবার এক বেস্ট জায়গা ও এক ব্যক্তি হল জন কিরবি [John Kirby ]। যিনি হোয়াইট হাউসে বসেন কারণ তিনি হলেন হোয়াইট হাউসের ন্যশনাল সিকিউরিটির স্ট্রাটেজিক কমিউনিকেশনের কো-অরডিনেটর কাম মুখপাত্র [National Security Council coordinator]। যিনি নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং দিয়ে থাকেন। মোদির এই সফরটা দুই রাষ্ট্রের দুই এক্সিকিউটিভ হেড এর মধ্যে। মানে অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্টের সাথে। তাই কোন অথেনটিক নিউজ পেতে হলে, হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র এখান key personality বিবেচ্য হবে। আর জার্নালিস্ট তো বটেই এমনকি  যারা এডভান্স পাঠক  এটা এদের কারোরই অজানা নয়। আর বাংলাদেশে বসে তাঁর [কিরবি-র] যেকোন ব্রিফিং পাবার সবচেয়ে উপযুক্ত উপায় হল অ্যামেরিকান সরকারি ওয়েব সাইটে [সাধারণত যেটা https://www.state.gov] যাওয়া যেখানে সব বিস্তারিত থাকে। যেমন মোদি-বাইডেন হবু সাক্ষাত উপলক্ষ্যে আগাম যে ব্রিফিং সেটা ছিল ২০ পৃষ্ঠারো বেশি তাহলেও পুরাটাই ঐ ওয়েব সাইটে দেয়া আছে। এখন জার্নালিজম করতে চাইলে এসব খবর জানা ও সংগ্রহ করা ছিল প্রথম আলোর সরাসরি দায়ীত্ব!

    এখন দেখা যাক প্রথম আলো হিন্দুস্থান টাইমস এর যে প্রপাগান্ডা রিপোর্ট ২১ তারিখ ভোর থেকে লোড করেছে সেটার সময় হল আমাদের ভোর পাঁচটায়। অথচ জন কিরবি এর ব্রিফিং হয়ে গেছে অ্যামেরিকান ২০ তারিখ সকাল ১১টায়। মানে এর ব্রিফিং আমরা বাংলাদেশে বসে রিপোর্টটা সংগ্রহের যোগ্য হয়ে গেছিল  ঐদিনই (২০ জুন) তবে আমাদের মোটামুটি রাত বারোটার পর থেকেই।
    অর্থাৎ প্রথম আলো জন কিরবি এর ব্রিফিং বক্তব্য আমলেই নেয় নাই; নেওয়ার দরকারও মনে করে নাই। বলতে গেলে উপেক্ষা করে লুকিয়েছে আর বরং এরই পালটা প্রপাগান্ডা রিপোর্টটাই পরের (২১ জুন) ভোরবেলা থেকে প্রচারণায় এনেছে।

    জন কিরবি – তিনি কী বলেছিলেনঃ
    জন করবি এর ব্রিফিং সাধারণত অনেক লম্বা হয়, সারা দুনিয়ার নানান দেশ প্রসঙ্গ হিশাবে থাকে তাই! তাই এটা ছিল জন কিরবির বিশ পৃষ্টা জুড়ে দুনিয়ার প্রসঙ্গ এর ব্রিফিং এখানে পাবেন ;  তা হলেও ওর ভিতর বাংলাদেশ প্রসঙ্গটা আছে ওর চতুর্থ পৃষ্টায়। পুরাটা ডাউনলোড করে চতুর্থ পৃষ্টায় খুজেন। 

                         NSC Coordinator John Kirby


    জনকিরবি বলছেনঃ

    বাইডেন-মোদি হবু আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উঠুক বা নাই উঠুক; অথবা এমনকি মোদি সেখানে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে যাই বলেন না কেন –  বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অ্যামেরিকান অবস্থান আগে থেকেই নির্ধারিত। আর তা হচ্ছেঃ আমরা ইতোমধ্যেই পরিস্কার করে বলেছি যে আমরা চাইব বাংলাদেশে একটা ফ্রি ও ফেয়ার নির্বাচন হবে। আর আমরা ভিসা পলিসিতে ট্রাভেল নিষেধাজ্ঞা তো এজন্যই দিয়েছি যাতে কেউ এই ইলেকশনে যা ইচ্ছা তাই না করতে পারে। অতএব এপ্রসঙ্গে এভাবে আমি কেবল আমাদের অবস্থান থেকেই কথাগুলো বলে দিলাম। আর আপনারারো বুঝলেন আমাদের স্পষ্ট অবস্থানটা কী। আর আমরা এব্যাপারে একেবারের পাবলিক সামনে খোলাখুলিও তবে একই সাথে আমরা ভারতীয় সরকারকে তাদের বাংলাদেশ সরকারের সাথে যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সেটা যাই থাক সেনিয়ে চাইলে তাদের কথা বলতেই দিব বা আমাদের শুনাতেও পারবে।

    We have already made clear our desire to free and fair elections in Bangladesh, and you’re right, we adapted our visa policy to restrict travel to individuals who undermine Bangladeshi elections.  So I can only speak for ourselves.  You know where we are.  We’ve been pretty public about that, but we would let the Indian Government talk about their bilateral relations.

    মূল বিষয়টা হচ্ছে আগে বলেছি অ্যামেরিকান ভিসানীতি প্রকাশের পরে ভারত নিশ্চিত হয়ে যায় যে গত ১৫ বছর ধরে হাসিনাকে ক্ষমতায় সমর্থন জুগিয়ে বাংলাদেশ উপর যে জুলুম লুটপাটের রাজত্ব গড়ে যে সমস্ত অসম সুবিধা খেয়ে এসেছিল সেসবের ইতি হতে যাচ্ছে। তারা নিজেরাই লিখছে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের কথিত নির্বাচনে যেসব কান্ডকীর্তির ভোট করে বারবার নিজের ক্ষমতাকে হাসিনা বাড়িয়ে নিয়ে এসেছিলেন তা আর এবার আগামিতে হচ্ছে না। এটাই অ্যামেরিকান ভিসানীতির সবচেয়ে বড় ইম্পিকেশন বা খাঁড়া অর্থ। যেটা ভারত ও হাসিনার উপর ও বিরুদ্ধে সরাসরি প্রয়োগ হতে যাচ্ছে।
    ভারতীয় মিডিয়ায় সকলেই কমবেশি একথা ছাপছেঃ

    Washington’s intention is crystal clear. It has put Prime Minister Sheikh Hasina’s Awami League government on a tight leash to dissuade it from resorting to undemocratic, illegal, and extra-constitutional methods to win the upcoming general elections like the previous rigged elections in 2014 and 2018. But New Delhi, in contrast, wants Hasina to win by any means.    

    তাহলে, এই হলো দুধ আর পানির আলাদা হয়ে যাওয়া। কিন্তু প্রথম আলোর এই এভেলএবেল ফ্যাক্টস টা তুলে আনে নাই। বরং এর উলটা মিথ্যা প্রপাগান্ডাকেই গতকাল সকাল থেকে প্রচার করে গেছে।

    এখন এই প্রথম আলো; এই জার্নালিজম কী টিকে থাকতে পারবে? না পারে?

     

    আপডেটঃ ২৩ জুন ২০২৩ ০১ঃ ৫৪ am

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • কথিত “আদিপুরুষ” -সিনেমায় কী হচ্ছে

    কথিত “আদিপুরুষ” -সিনেমায় কী হচ্ছে
    গৌতম দাস
    ২০ জুন  ২০২৩   মধ্যরাত ০০ঃ ০২
    https://wp.me/p1sCvy-4Dk

     

                     MODI & MUNTASHIR

    ইংরাজিতে জাতি শব্দটা বুঝাতে মূলত দুইটা শব্দ হয় – Race ও Ethnicity। অর্থাৎ ইংরাজির Race ও Ethnicity এই দুটা শব্দকেই আমরা বাংলা করি জাতি বলে। খুবই সংক্ষেপে বললে এরমধ্যে Race অর্থে জাতি মানে যেটা  মানুষ প্রজাতির দুনিয়ায় আগমন বা উদ্ভব ঘটেছিল কয়েক মিলিয়ন বছর আগের ঘটনা যেটা; এই অর্থে তা মানুষ জাতি [Human Race]। এক মানুষ থেকে অন্য মানুষের রেস অর্থে বা রেসিয়াল বা জাতিগত ভিন্নতা – তা আবার বুঝা সম্ভব তার রক্তের ডিএনএ এর ভিন্নতা থেকে।

    বিপরীতে বাংলায় লেখা আরেক জাতি এই শব্দ ও  ধারণা হল যেটা Ethnicity অর্থে জাতি। যেটা একাল থেকে মাত্র মোটামুটি প্রায় ছয়হাজার বছরের পুরানা – এথনিক জাতি। মানুষ কালচারাল যা কিছু আছে তাতে ভাষা, ধর্মীয়, সামাজিক, প্রধান খাদ্য, রান্নার প্রক্রিয়া, বিশ্বাস মিথ ইত্যাদি সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত – এটাই এথনিক জাতি পরিচয়।  যেটাকে আমরা সভ্যতা বলি অথবা, অন্যভাষায় বললে দুনিয়ায় মানুষ যবে থেকে আগের যাযাবর জীবন ছেড়ে প্রথম কৃষিকাজ এর জীবন শুরু করেছিল। দুনিয়ার কোন এক ভুগোলে থিতু হয়ে বসে গিয়েছিল। আর তাতেই একেকটা সিভিলাইজেশন এর সুত্রপাত ঘটেছিল। এই অর্থে আমরা সিন্ধু সভ্যতার অংশ। এটাকেই বলে এথনিক জাতি পরিচয়।  আর পরে সিন্ধু সভ্যতারই উপবিভাগ মানে এরও আবার সাব-এথনিক জাতি পরিচয় হিশাবে আমরা বাঙালি।
    উপরের কথাগুলো হল জাতি ধারনাটার সবচেয়ে ইতিবাচক উপস্থাপন। আর এর বাইরে জাতি পরিচয়ের বা জাতি বা জাত পরিচয় নিয়ে কথাবার্তার সবটাই মূলত নেতিবাচক। কারণ সেসবগুলোতে জাত পরিচয় নিয়ে আলাপ মানেই জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ অন্য সকলকে ঘৃণা করা ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো। যেখানে মূল কথাটা হল আমার জাতই শ্রেষ্ঠ  – এই শ্রেষ্ঠত্ববোধ।
    এই ধারণার সবচেয়ে ক্ষতিকর ও বিপদজনক দিকটা হল – নিজেকে জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধে বলে উপলব্দি ও হাজির করা মানেই অন্য সকল জাত-পরিচয়ের মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা, নিচা দেখানো ইত্যাদি আর এখান থেকেই যেহেতু আমি শ্রেষ্ঠ কাজেই আমি অন্য সকল জাত (বা ধর্ম)-পরিচয়ের মানুষকে নির্মুল করতে পারব সেটা জায়েজ হবে মনে করা শুরু হয়। আর এই নির্মুল বলতে অন্য জাত-ধর্ম পরিচয়ের মানুষকে হত্যা, দখল করা নইজের পায়ের নিচে রাখা অধীনস্ত করে রাখা এমনকি কলোনিদখল করা ইত্যাদি এসব কাজকরার স্বপক্ষে নিজ জাতশ্রেষ্ঠত্ব বোধকে সাফাই হিশাবে তুলে ধরা শুরু হয়। এটাই, এই প্রেজেন্টশন এভাবে বয়ান হাজির করা এটাই  মোদির হিন্দুত্ববাদ। এটাই হিটলারিজম – জর্মান জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ।

    তত্বকথা শেষ। এবার ব্যবহারিক কথাবার্তা। আর এর এক নয়া নমুনা হল ভারতের ‘আদিপুরুষ’ সিনেমা। যেটা গত ১২ জুন রিলিজ হয়েছে।  পাঠক সকলকে চিনে রাখতে বলব মনোজ শুক্লা নামের এই ব্যক্তিকে। যার ছবি উপরে দিয়েছি। অনেক স্ময় তাকে মনোজ মুন্তাশীর [Manoj Muntashir] শুক্লা নামেও চিনবেন।
    ইনিই হচ্ছেন এখন ভারতের সবচেয়ে বড় পেমেন্ট পান এমন  -সিনেমা, নাটক বা টিভি অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট রাইটার, ডায়লগ লেখক। বিশেষ করে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদ নামে পৌরাণিক বা মিথিক্যাল ঘটনাবলী যদি আপনার কাহিনীর চাহিদা হয়ে থাকে। এছাড়াও ভারতের জাতীয় দিবসগুলোতে সেদিনের টিভি প্রোগ্রামের স্ক্রিপ্ট লিখার কাজে। আর বলাই বাহুল্য এসব দিন মানেই ভারতের সেনাবাহিনীর বর্ণনা আর এখান থেকে সবচেয়ে সহজে এবং অবশ্যই থাকবে মানে এতে ভিলেন হয়ে যে জিনিষ থাকবে তা হল পাকিস্তান; মানে মুসলমান-ইসলাম। এবার হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধের বয়ান যেটা সেখানে হাজির থাকবে এরই পপুলার কঠিন সুরসুরি দেয়া আবেগের স্ক্রিপ্ট লেখক হিশাবে পাবেন এই মনোজ মুন্তাশীর-কে!

                                                                                 MANOJ MUNTASHIR SHUKLA

    এমনিতেই জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধের বয়ান জিনিষটাই থকথকে আবেগের; যা স্থির মনে মানুষকে চিন্তা করতে দেয়না বরং ক্রমাগত আবেগে ভেসে যেতে উস্কানি তুলে চলে। কোন র‍্যাশনালিটি বা যুক্তিবুদ্ধিও মানুষের মধ্যে কাজ শুরু করার আগেই ভোক্তা মানুষ বা ক্লায়েন্টকে মনোজ মুন্তাশীর তাঁর আবেগের সুরসুরি তুলে দখল নিতে হবে – এটা মনোজ খুবই ভাল বুঝেন এবং দক্ষ তিনি। ফলে এরপরে আবার মানুষের র‍্যাশনালিটি বা যুক্তিবুদ্ধিতে চিন্তা পেরিয়ে স্পিরিট বা স্পিরিচুয়াল স্তরে যেতে মানুষকে মনোজ কোন সুযোগই দেন না।এই হল  মনোজ মুন্তাশীর [Manoj Muntashir] শুক্লা। একালের হিটলার মোদি বা হিন্দুত্ববাদ এর মূলত সাফাই বয়ান লেখক। অথচ বাইরে যার পরিচয় পান্ডুলিপি – অভিনয়ের পান্ডুলিপি লেখক বা প্রণেতা।

    মনোজ মুন্তাশীর [Manoj Muntashir] শুক্লা তিনিই আদিপুরুষ সিনেমার ডায়লগের লেখক। যেমন বিডিনিউজ লিখেছে, “…এদিকে ‘আদিপুরুষ’ সিনেমার সংলাপ লেখক মনোজ মুন্তাশীর শুক্লা সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেছেন, যেসব সংলাপ দর্শকদের আঘাত করেছে, সেগুলো সংশোধন করা হবে”।
    আর প্রথম আলোও খুবই ইনোসেন্টলি ছেপেছে, “……এদিকে ‘আদিপুরুষ’ ছবির সংলাপ লেখক মনোজ মুন্তাসির শুক্লা টুইট করে জানিয়েছিলেন যে এই ছবির বিতর্কিত সব সংলাপ বদল করা হবে। মনোজ এক বড়সড় পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে লিখেছেন, ‘আমি এবং ছবির নির্মাতা আর পরিচালক মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে এই ছবির যেসব সংলাপ আপনাদের আঘাত করেছে, আমরা তা সব সংশোধন করব।’ আর এই সপ্তাহে তা ছবির সঙ্গে যুক্ত করা হবে”।

     

    সবাই নিস্পাপ, ইনোসেন্টঃ
    মনোজ মুন্তাশীর থেকে প্রথম আলো অথবা চাই কী দর্শকেরা যাদের ভিতর হিন্দুত্ব জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধের জোশ-চেতনা জাগরিত হয়েছে এরা সকলেই নিজেকে নিস্পাপ হিসাবেই দেখছেন। যাদের সবার কম কথাটা যেন এরকম – আমি কী করেছি, আমি তো সিনেমাটা দেখেছি কেবল – অথবা আমি কী করেছি, আমি তো সিনেমাটা খবরাখবর নিয়ে পত্রিকার বিনোদন পাতা চালিয়েছি যাতে ভারতীয় সেনিমাতার প্রচার প্রসার হয় এতটুকুই। এটা তো বিনোদনমূলক কাজ মাত্র। এভাবে ম্নোজও হয়ত বলবেন আমি কী করেছি, আমি তো সিনেমাটা যেন চলে প্রযোজক আমাকে টাকা দিয়েছে – তার সিনামাটা চালিয়ে টাকা উঠিয়ে দেয়াটাই আমার দেখার বিষয়। অর্থাৎ কেউ জানেই না যে তিনি একটা মারাত্মক অপরাধ ক্করছেন। নিজের জন্যও ক্ষতিকর একটা কাজ করেছেন।

    যদিও পুরা ঘটনা যেভাবে ঘটেছে তাতে অনেক মোচড় বা টুইস্টও আছেঃ
    সিনেমাটা মূলত তেলেগু (বৃহত্তর অন্ধ্রপ্রদেশ-হায়দ্রাবাদ) ডমিনেটিং অভিনেতা-প্রযোজকদের এক হিন্দি সিনেমা যার অন্য সব দক্ষিণী ভাষাতেই (তামিল, তেলেগু, কন্নড় ও মালায়লাম ভাষায় ) রিলিজ দেয়া হয়েছে। রিলিজের প্রথম দিনেই নাকি ১৪০ কোটি টাকার টিকেট বিক্রি হয়েছে।  আবার এককথায় বললে এটা হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ এর প্রচার ভিত্তিক এক সিনেমা ততপরতা যেটা একটা হিটলারিজম! কিন্তু এতে মজার টুইস্ট হল, আরএসএস-এর কিছু অঙ্গ প্রতিষ্ঠান এতে খুশি না। যেমন বিডিনিউজ লিখেছে, “মুক্তির আগে এবং পরেও এই সিনেমাকে ঘিরে অভিযোগ একটাই ‘হিন্দুধর্মের ভাবাবেগকে আঘাত করেছে আদিপুরুষের কাহিনি’। এমনকি সিনেমা থেকে কিছু দৃশ্য বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে দিল্লি হাই কোর্টে আর্জি জানায় হিন্দু সেনার দল।
    আবার আরএক রিপোর্টে লিখেছে, আদিপুরুষ: রামায়নের গল্পের ‘ইসলামাইজেশন’! – এই শিরোনামে। রিপোর্ট জানাচ্ছে, “…… সর্ব ব্রাহ্মণ মহাসভা পন্ডিতের জাতীয় সভাপতি পিটি সুরেশ মিশ্রের পক্ষে কমলেশ শর্মা এই উকিল নোটিস পাঠিয়েছেন পরিচালককে”। তাহলে কাহিনী কী এখানে?
    কাহিনী হল এটাও আসলে হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ এর উপর দাঁড়িয়ে আরেক ততপরতা; কিন্তু তা হলেও যেটা দেখে মনে হবে এটা তো সিনেমাটার বিরোধিতা করছে! সেটা কেমন করে?  এটা “হিন্দুধর্মের ভাবাবেগকে আঘাত করেছে” বলে অভিযোগটাই তো  হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ এর দাঁড়ানো।  তারা বলতে চাচ্ছে এটা মুসলমানেরা করেছে বা মুসলমানদের চিন্তার উপর দাঁড়িয়ে করা কাজ অথবা মুসলমান সংশ্লিষ্টতা বা তাদের প্রতি সহানুভুতিশীল হয়ে করা কাজ। আর সবচেয়ে বড় প্রমাণ বা অভিযোগ হল এখানে রামায়নের রাবনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাইফ আলী খান যিনি পতৌদির (এখন হরিয়ানা-দিল্লির এক অংশ হয়ে গেছে, সেকালে এক ছোট করদ রাজা ছিল) নবাবের বংশধর মুসলমান, ক্রিকেটার মনসুর আলো খান পতৌদির সন্তান। মূল ইঙ্গিত-বক্তব্যটা হল যেন এটা বলা যে – মুসলমানেরা হিন্দুদের সব ভাল ঐতিহ্য নষ্ট করে দিচ্ছে।
    পরের অভিযোগটা সর্ব ব্রাহ্মণ মহাসভা পন্ডিতদের। সেটা তো আরো সরাসুরি এটাক  বলছে এটা ” রামায়নের গল্পের ‘ইসলামাইজেশন’ করা হয়েছে।  তাই এখানে হনুমানের দাড়ি-গোফ রাখা হয় নাই।

    কোনো হিন্দু গোঁফ ছাড়া দাড়ি রাখে না, যেভাবে ভগবান হনুমানজিকে দেখানো হয়েছে।
    চলচ্চিত্রটি রামায়ণ এবং ভগবান রাম,
    মা সীতা, ভগবান হনুমানের সম্পূর্ণ ইসলামীকরণ হয়েছে।
    এমনকি আদিপুরুষে রাবণের ভূমিকায় অভিনয় করা
    সাইফ আলি খানও তৈমুর কিংবা আলাউদ্দিন খিলজির মতো দেখতে।”

    অথচ কেউ টেরই পাইলেন না যে এই সিনেমাকে কেন্দ্র করে ‘হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ দেখানোর’ এর যত ততপরতা – এটা একটা এতই উগ্র জাতি বা জাতিবাদি চিন্তা যে এটাই ভারতকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য যথেষ্ট। হিটলার হয়ত আপসোস করে বলবেন যে তিনি ও কেন এত উগ্র হতে পারেন নাই।
    আবার ওদিকে নেপাল তার দেশের সব সিনেমা থেকে  আদিপুরুষ সহ সব সিনেমাকে নামিয়ে দিয়েছে। দেখুন নেপালে হিন্দি ছবি প্রদর্শন বন্ধ ঘোষণা, নিষিদ্ধ ‘আদিপুরুষ’।

    আমাদেরকে মনে রাখতে হবে আর আট মাসের মধ্যে ভারতে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন। মানে মোদিকে এবার জততেই হবে; নইলে বাইডেনের আমেরিকা বসে আছে ঘাড়ের উপর। তাই ইতোমধ্যেই যা শুরু হয়েছে – মুসলমান কোপাও, জোরদার করো  – যাতে হিন্দু ভোট সব হিন্দুত্বের বড়াই ভ্যানিটিতে কেবল  মোদির বাক্সে ঢুকে, এরই নানান ততপরতা। এবারও মিথ্যা মিথ্য অভিনয়ে ভারেতের পাকিস্তান আক্রমণের নাটক হতে পারে। জয়শঙ্কর ও উঠতে বসতে কুটনৈতিক নর্মস রেওয়াজ ভেঙ্গে পাকিস্তানকে গালাগালি করছে, সোজন্যেবোধের হ্যান্ডশেক করবেন না জানাচ্ছেন। কারণ যত পাকিস্তানবিরোধীতা প্রদর্শন ততই মোদি নিজেকে হিন্দু-বীর হিশাবে হাজির দেখাতে পারবে – এই হল ভিতরের সাজেশন বয়ান। এছাড়া এসব হিন্দু সেনারা মামলা করলে সিনেমা প্রযোজকেরা অর্থের বিনিময়ে আপোষ করতেও চাইতে পারে। যা এসব লোকাল সংগঠনের আক আয়ের উৎস হতে পারে! কাজেই এগুলা টুইস্ট ঘটনা হিশাবে দেখা যাচ্ছে খারাপ নয়!

    কোন রাষ্ট্রই একালে টিকবে না যার নাগরিকেরা সবাই সমান অধিকারের নয়ঃ
    একালের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হল যে, এখন আমরা দুনিয়ার সকল রাষ্ট্র একই এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অন্তর্গত হয়ে গেছি বলে এক গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় সকল জনগোষ্ঠিই অপর (Others) জনগোষ্ঠির সাথে কানেকটেড। আর তা জীবনের সকল অর্থেই জীবনের সাথে আরেক জীবনযাত্রার ক্রমশ গভীর হয়ে উঠছে এই বিনিময়; যা কেবল পণ্যবিনিময় আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ  নয়।  কাজেই অন্য অপর জাতি জনগোষ্ঠির তুলনায় আপনি শ্রেষ্ঠ  এমন এক  হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ – এটা একালে অচল শুধু নয়; এটা আত্মঘাতি। কারণ, এতে ভারত উল্টা একঘরে হয়ে যাবে অন্য যেকোন রাষ্ট্র এই ঘৃণা-বিদ্বেষ অপছন্দই শুধু না – এই ভারতের সঙ্গে পণ্যবিনিময় আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যঅও করতে চাইবে না। কিছুদিন আগে কাতার লিড নিয়েছিল ওআইসির [OIC] হয়ে কঠর সমালোচনা করেছিল। জবাবে ভারতে বিদেশ মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি মুখরক্ষার একটাই শব্দ পেয়েছিল যে  OIC নাকি সাম্প্রদায়িক!!!!!!  এখানে দেখুন, জমিদারি-হিন্দুত্ব জাগিয়ে বলা ওআইসি ‘সাম্প্রদায়িক’!

    তাহলে এর সারকথাটা হল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কে ছেয়ে উঠার একালে, হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ এই বয়ান এই উগ্র জাতিবাদি রাজনীতি দিয়ে কোন রাষ্ট্র খাড়া করা আত্মঘাতি, অচল। এটা কাউন্টার প্রডাকটিভ! হিতে-বিপরীত কাজ! আর এরই অনুসঙ্গ আরেক চিহ্ন হল যে, আপনার রাষ্ট্রে বা কোন রাষ্ট্রই একালে টিকবে না যার নাগরিকেরা সবাই সমান অধিকারের নয়। কারণ, উগ্র জাতিবাদি রাজনীতিক ভিত্তি থলে তো ভিতরে নাগরিক অসাম্যই চর্চা হবে, মুসলমান কোপায়েই ভোট নিতে চাইবেন। এটাই হবে একমাত্র ততপরতা ও ভিত্তি! আর এঘটনায় আপনার পণ্যের ক্রেতা ভয় পাবে -অপছন্দ করা শুরু করবেই! এজন্যই বলছে একালে উগ্র জাতিবাদ –হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ – এক অচল আত্মফঘাতি রাজনোইতিক চিন্তা।  হিন্দুত্ববাদের ভারত তাই ক্রমশ ভেঙ্গে পড়বেই, একঘরে হয়ে যেতে বাধ্য
    একালে ধর্ম প্রচার, নিজ ধর্ম শ্রেষ্ঠ এজন্য অন্যের দেশ দখলে (ধর্ম প্রচার বা কলোনিদখলের জন্য) বেরিয়ে পড়বেন কিংবা এসব কাজকে  পুরানা দিনের রেফারেন্স দিয়ে জায়েজ বলে সাফাই বয়ান খাড়া করবেন – তা হবে না ! এটা কাজ করবে না। আর এরচেয়েও বড় কথা এটা আত্মঘাতি অচল ততপরতা! আপনিই একঘ্রে হয়ে যাবেন। সেটা সবার আগে বুঝবার চেষ্টা করেন!

    সবার আগে দুনিয়ায় বিশেষ করে চলতি নয়া শতকে কী কী  ও কেন বদলে গেছে সেসব কিছুকে আমল করেন।  নিজের ভাল চাইলে এর বাইরে কিছুই নাই!
    তাই একটা সিনেমা শুধু সিনেমা নয়, বহুকিছুই……।

    অথচ ভারত রাষ্ট্রের যেখানে দরকার একটা ফেডারেলিজম বা ফেডারল রাষ্ট্র কায়েম যাতে কেন্দ্র-রাজ্য বৈষম্য দূর হয়ে যায়, হিন্দুত্ববাদের জাত শ্রেষ্ঠত্বের বোধের রাষ্ট্র না হয়।
    তাই এ’রাষ্ট্র নিজেও ভুগবে পড়শি রাষ্ট্রদেরকেও ভুগাবে  আর সাথে সংঘাত হত্যা, ক্লিনজিং ডেকে আনবে সেই শঙ্কা প্রবল হচ্ছে!

    আপডেটঃ ২১ জুন ২০২৩  মধ্যরাত ০১ঃ ১৯
    আপডেটঃ ২১ জুন ২০২৩  ভোর ০৫ঃ ০৪
    আপডেটঃ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৪

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    গুরুত্বপুর্ণ হওয়াতে একটা পাঠক-প্রশ্ন নিচে তুলে আনলাম সাথে আমার জবাবঃ
    Anil Iftakher
    বিশ্বে যতো জাতি আছে,তাদের মধ্যে অনেকেই অন্যদের চেয়ে এগিয়ে আছে।যারা এগিয়ে আছে তাদের গর্ব করাটা কি অন্যায়? আমরা যে অনেক দিক দিয়ে পিছিয়ে আছি এটা নিয়ে কেউ খোচা দিলে কি তা অন্যা

    লেখকের জবাবঃ
    Anil Iftakher গর্বটা যখন করবেন “আমিই শ্রেষ্ঠ জাত” বলে দাবি করে তখন অন্যেরা বুঝবে যে এটা তার জন্য বিপদের কথা।
    তবে  এটা অন্যায় হবে মূলত এজন্য যে এরপরে আপনি আমার ঘাড়ে চড়বেন, আপনার পা টিপে দিতে বলবেন, আমার সম্পদ কেড়ে নিবেন, আমাকে উঠায় নিতে চাইবেন ইত্যাদি। আর এসবই করবেন যেহেতু – আপনিই শ্রেষ্ঠ – সেটা আগেই বলে নিছিলেন, তাই। অর্থাৎ আপনি যে জাত-শ্রেষ্ঠ এই বক্তব্যের দাম চাইবেন আপনি, আর আমাকে এর দাম চুকাতে বলবেন………।
    আর এখান থেকেই, অন্যের উপর আধিপত্য করা বা অন্যদেশকে কলোনিদখল করে নিবার পক্ষে যে সাফাই বয়ান, ন্যায্যতার বয়ান বা Justification  সেটা সাধারণত তৈরি হয়, হবে ঐকথার উপর দাঁড়িয়ে যে উনিই “শ্রেষ্ঠ জাত” তাই!
    – বৃটিশেরা আমাদের কলোনিদখল করে নিয়ে দাবি করত আমরা তো অসভ্য তাই সভ্যতা শিখাতে বৃটিশেরা আমাদের দখল করেছ।
    – বাংলায় জমিদার হিন্দুর আধিপত্যও এভাবে শুরু হয়েছিল যেহেতু তারা আগেই বলে নিয়েছিল যে ‘মুসলমানেরা বাঙালি নয়’ – তাই মুসলমানেরা বাঙালি হিন্দুর সমান নয়, নিচা ও অধস্তন। অতএব মুসলমানদের উপর জমিদার হিন্দু বাঙ্গালির আধিপত্য, দাপট দেখানো অথবা অসমান জ্ঞান করে মুসলমানদেরকে তাদের পায়ের নিচে রাখাটা জায়েজ! অথবা কী অর্থে তারা বাঙালি হিন্দু সমাজে প্রবেশাধিকার পেতে পারে সেই শর্ত তারা তাই হাজির করেছিল সেটা হল “অসাম্প্রদায়িকতা”। মানে মুসলমান-ইসলামিক চিহ্ন, অভ্যাস বা বৈশিষ্ঠ ত্যাগ করে বা লুকিয়ে রেখে, প্রকাশ্যে না দেখিয়ে তবেই হিন্দু সমাজে পিছনের বেঞ্চে বসার সুযোগ পেতে হবে!
    – হিটলারেরো জাত শ্রেষ্ঠত্ব বোধ থেকে সাফাই হচ্ছে তাই – জর্মান জাতি নীল চোখের এরিয়ান (Aryan referred to a racial category, বাংলায় আর্য) রক্তের তাই তারা শ্রেষ্ঠ। তাই ইউরোপের বাকি সবাইকে তাদের অধীনস্ততা করতে হবে। আর এথেকেই হিটলারের  ইহুদিদেরকে  গ্যাস চেম্বারে পুড়িয়ে মারা জায়েজ ইত্যাদি।

    –  মোদি ভারতে মুসলমানদের নিচা দেখানো আর মোদির হিন্দু জাত শ্রেষ্ঠত্ব এর বড়াই দেখানোও একই কারণে। যেমন করোনাকালে মাঝে তারা বলেছিল তাবলীগ-মারকাজ এরা কালচারের দিক থেকে খুবই নিচু।  কারণ মুসলমানেরা নাকি আঙুল দিয়ে চেটে চেটে খাবার তুলে খায়। অথচ যেখানে ঘটনা হল, সারা অখন্ড ভারতই  এথনিক-জাত বৈশিষ্ঠ হিশাবে তারা সকলেরই খাদ্য গ্রহণ বা  খাওয়ার স্টাইল হল তারা চামচ দিয়ে তুলে খায় না। বরং হাতের পাঁচ আঙুল ব্যবহার করে, আঙুলে ধরে খাবার তুলে খায়। আবার খেয়ে বলতে চায় যে যে খাবারটা আমার শরীরের বাইরের – প্রকৃতির – কিন্তু তা আমার নিজ শরীর প্রবেশ করার পরে এক ‘প্রক্রিয়ায়’ সেটা আমার নিজ-শরীর হয়ে যাবে তাকে আগে থেকেই নিজ হাতে ছুঁয়ে ছেনে অনুভব করে আদরে আপন করে নিব না কেন! আমি আমার ঐ হবু খাদ্য বা শরীরকে আগেই তাকে স্পর্শে ফিল করতে চাই, এই অনুভুতি আমার জন্য খুবই জরুরি; অতএব হাত দিয়েই খেতে হবে!

    এথনিক জাত শ্রেষ্ঠত্ববোধ – তাই এক ভয়ঙ্কর ফেনোমেনা, ভয়ঙ্কর অসুখ, অসুস্থতা। আপনার যেকোন (অপর) বা আপনার পড়শিকে আপনি এটা ব্যবহার করেই তাকে সহজেই ‘নির্মুল” করার পক্ষে যুক্তি তুলবেন।  আর এটাকেই এথনিক ক্লিনজিং “Ethnic Cleansing” বলে।
    তাহলে আপনার কাছে যেটাকে খুবই সাধারণ – নিজেকে নিয়ে একটু গর্ব করা – বলে বুঝেছিলেন সেটা গত গভীর হিংস্র, নৃশংস এন্টি-হিউম্যান, এক কালো চিন্তা, despotic বা দাগী চিন্তা এখন তা বুঝতে চেষ্টা করেন। জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ এই  চিন্তার আসল রূপকে বুঝেন, চিনে নেন।
    একালের বাইডেন আর ট্রাম্প এদুই শাসকেরও দুই ব্যাখ্যার কিন্তু একই – হোয়াইট সুপ্রীজম বা White Supremacy – চিন্তা তারা ধারণ করে এসেছে। এনিয়ে আমার লেখাতে পাবেন। আর এখানে হোয়াইট বলতে পুর্ব ইউরোপীয় “সাদা ককেশীয়” [White CAUCASUS] এথনিক জাতের মানুষ বুঝানো হয়। মূল দিক গুলো তুলেছি এখন এবার বাকি অংশ বা আরো গভীরে যেতে গুগল সার্চ করে পড়াশুনা করে নেন।