Category: Politics

  • বিডিনিউজ বা চন্দন নন্দীর নাদানি

    বিডিনিউজ বা চন্দন নন্দীর নাদানি
    গৌতম দাস
    ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4WN

                                                                                         Caught in a cleft stick

    [রাজশাহী অঞ্চলের কিছু বিশেষ এক্সপ্রেশন-শব্দাবলী আছে – “মামু, কাকে লেড়েছো? সে খবর লিয়েছো?”
    খুবই কমিউনিকেটিং একটা আঞ্চলিক পদবাচ্য বটে! মানে হল, যা যথেষ্ট বুঝো নাই তা নিয়ে কথা বলতে গেছো কেন? এমনই কিছু অর্থ বিতে পারে এই ভাষ্য!
    চন্দন নন্দীর লেখার দশা হয়েছে তাই। তিনি এক অনিয়মিত সাংবাদিক, যার একটা লেখা আমাদের বিডিনিউজ২৪ মিডিয়া ছাপানোর পরে সবই ব্লক করে রাখা আছে। আজকের লেখা সেই প্রসঙ্গের ভাল-মন্দ দিক নিয়ে।
    বিডিনিউজ সরকার বা ভারতের ঘনিষ্ট বলে এমন এক পরিচিতি কারো কারো চোখে থাকা সত্বেও – এটা বিডিনিউজের দ্বিতীয়বার ব্লকড হওয়া, প্রথমটা ২০১৮ সালের। কেউ কোন একটা লেখা নিয়ে আসলেই সেটা বিডিনিউজ ছেপে দিবে তা হওয়ার কথা না। যেকোন লেখাই লেখা ছাপবার অনেক দায়দায়ীত্ব আছে। সেসব পূরণ ও পালন হচ্ছে কীনা সেসব দেখাও যেকোন দায়ীত্বশীল মিডিয়ার কাজ।  আবার কোন মিডিয়া বন্ধ করে দেয়া – এটাও খুব ভাল লক্ষণ না। ভাল সামাজিক প্রাকটিস নয়! তবে বাংলাদেশে আমরা এখন এমনই খারাপ অবস্থায় যে কোন নীতি-পলিসি বা তত্বকথা শুনার সময় নাই কারো। সবাই ক্ষমতা কেন্দ্রিক চিন্তা  ও ততপরতায় ব্যস্ত! এই অবস্থায়, চন্দন নন্দীর লেখা আলোচনার প্রসঙ্গ!]

    গত কয়েকদিন ধরে অনেক বিদেশী পত্রিকা, যার একটা বড় অংশই ভারতের মিডিয়া, তারা যা কিছুই লিখছে তাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছু থাকছে। ফলে চরম উন্মুখ উৎকন্ঠায় থাকা এখনকার বাংলাদেশের মানুষ সবকিছুর উপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে, তাদের কান খাড়া সবদিকে! তাই মুহুর্তেই সব ব্যক্তি জানাজানি সামাজিক হয়ে যাচ্ছে। এমন লেখাগুলো  যাদের মধ্যে নিউইয়র্ক টাইমসে মুজিব মাশাল [Mujib Mashal] নামের একজন যার লেখার শিরোনাম “নীরবে ধ্বংস করা হচ্ছে একটি গণতন্ত্রকে, বাংলাদেশে কাঠগড়ায় মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ [Quietly Crushing a Democracy: Millions on Trial in Bangladesh]”। যেটা আবার আমাদের মানবজমিন অনুবাদ করে ছেপেছে (লেখকের মুজিব মাশাল নামের বাংলা বানান আমি মানবজমিন -এরটাই অনুসরণ করেছি)।
    এই মুজিব সাহেবের লেখার প্রসঙ্গ তেমন কিছুই নতুন না, আমাদের আদালত পাড়ারই ঘটনা যা আমরা ফাঁসি ফাঁসি, ফাঁসি চাই এর সেকাল থেকে এপর্যন্ত  সব দেখছি, সহ্য করে চলছি। তবে এখন নতুন কেবল এতটুকুই যে এই মুজিব সাহেব এবার এদিকে চোখ ফিরিয়েছেন। কাজেই এনিয়ে আমাদের মন্তব্য একটাই যেটা উনি নিজে নিজেকেই জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন যে উনি এখন কেন, কী মনে করে এদিকে ফিরলেন!  তার সব প্রশ্নের জবাব ওখানেই আছে!!  আর আমরা ভিকটিম এর বেশি কী বলতে পারে!! শুনেছি ভিক্ষার চালের গুনাগুণ নিয়ে আলোচনা চলে না। অতএব আমাদের এমন সময়ে আমাদের নিয়ে, মনোযোগ ফিরানো সবাইকেই স্বাগত!

    সাথে আরও আছে; মানে আছে ভারতীয় এক চন্দন নন্দীর লেখা। এ’লাইনে পুরানা লোক; ২০১৮ সালের আগে বাংলাদেশ নিয়ে এখনকার মত বেশ ততপরতা দেখিয়েছিলেন। অনেকের মনে হত, তিনি ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের সাথে কানেকটেড লোক তবে, পুরানা কংগ্রেসি কোণায় পরে থাকা ধারার। আর সবচেয়ে বড় কথা সাংবাদিকতার চেয়ে পাগলামি করেন বেশি। আর তাঁর পাগলামিটাই অপ-সাংবাদিকতা হয়ে যায়।  তার এবারের লেখার শিরোনামঃ বিভক্ত দুপথের মাথায় আটকে যাওয়া [Caught in a cleft stick]। ঐ লেখার শুরুতেই দাবি করা হয়েছে এই লেখা আগে বাংলাদেশের বিডিনিউজ২৪ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। [যে ভার্সানটা আমার হাতে তা নর্থ-ইস্টের এক ওয়েব-সাইট থেকে নেয়া। আর বলে রাখি ভারতের নর্থ-ইস্টের কোন ওয়েব-সাইট মানে এরা কম-বেশি গোয়েন্দা ফান্ডেড।] এই সাইটে লেখাটার শুরুতেই দাবি করা হয়েছে লেখাটা আমাদের বিডিনিউজে প্রকাশিত হবার দুঘন্টা পরেই নাকি বিডিনিউজের বাংলা ও ইংরাজি ওয়েব সাইট এটা আর বাংলাদেশ ও ভারতের দর্শকেরা কেউ দেখতে পারছে না, ব্লক করে দেয়া হয়েছে।  কথা কতদুর সত্য-মিথ্যা জানি না। তবে ভারত থেকে নয়,এমন, অন্য-বিদেশ থেকে অন্তত ইংরাজি বিডিনিউজ তারা দেখতে পাচ্ছে বলে জানিয়েছে।

    [This article by Chandan Nandy first appeared in Bangladesh’s premier news portal www.bdnews24.com earlier this morning. In less than two hours after the article’s publication, both the English and Bengali websites of bdnews24.com was blocked for viewers/readers in Bangladesh as well as India]

    তবে এটা বাংলাদেশে মানে আমাদের বিটিআরসি [BTRC] থেকে ব্লক করে দেয়া অসম্ভব নয়। বরং দেয়াটাই আমার কাছে স্বাভাবিক পরিণতি মনে হয়!

    চন্দন নন্দীর আরেক দিক থেকে পরিচয়ঃ
    বাংলাদেশে এটা প্রতিষ্ঠিত যে গত ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সেবার একটা নিশিভোট বা রাতের ভোট হয়েছিল। মজার কথা হল এনিয়ে চন্দন নন্দীর স্টেক কী? এই পাগলের হাল কী? মানে ঐ নির্বাচন নিয়ে এর ততপরতা বা বয়ান কী ছিল?  কারণ, আজকের মত ২০১৭ সাল থেকেই সে বাংলাদেশ নিয়ে সক্রিয় ছিল, কোন একটা  পত্রিকা [মালয়েশিয়া থেকে প্রকাশিত সাউথ এশিয়া মনিটর নামে। southasianmonitor.com] এর সাথে সম্পর্কিত থেকে। পত্রিকাটা এখন খোলা দেখালেও সাইটটা আপডেট হয়না এভাবে খোলা আছে।
    কিন্তু যেটা এখন  গুরুত্বপুর্ণ তা হল, ২০১৮ আলের নির্বাচন হয়েছিল ৩০ ডিসেম্বর। আর এর পরের দিন চন্দন নন্দী নিজের টুইট একাউন্ট থেকে একটা টুইট করেছিলেন ৩১ডিসেম্বর ২০১৮, যেটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। তার সে টুইট একাউন্ট এখন খোলা যায় না। কিন্তু সংগ্রহ করে রেখে দেয়া একটা স্ন্যাপ সর্ট এখানে দিচ্ছি। ছবিতেই যা কথা বলার বলে তাই কোন বর্ণনা দিলাম না।

    কেন চন্দন নন্দীর লেখা বা বিডিনিউজ ব্লকডঃ
    এককথায় বললে, চন্দন নন্দীর লেখা জার্নালিজম হয় নাই। মানে এর নুন্যতম নীতি অনুসরণ করে নাই। এই লেখাটা শুধু ভুয়া নয় বরং প্রমানিত মনে করা যায় এমন কোন সোর্সের উল্লেখ তিনি করতে পারেন নাই, অথচ যা খুশি লিখে গেছেন; সে কারণে।

    এখন পালটা অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন তাহলে কিছুদিন আগে আনন্দবাজারের অগ্নি রায় এর লেখা ও পরে যা ডয়েচ ভেলে তে ছাপিয়ে এরপরে তা প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারে ছাপা হয়েছিল – সেই লেখা ও ততপরতাগুলোও তো জার্নালিজম ছিল না। তাহলে তাদের বেলায় আমাদের সরকার ‘কোন ব্লক করা’ বা কোন বাধাই দেয় নাই কেন?  এককথায়, এনিয়ে অনুমান করা জবাব হল, অগ্নি-আলো-স্টার এভাবে – এই গোষ্ঠির ততপরতাটা ছিল সরকারের পক্ষে যায় এমন প্রপাগান্ডা, আর বুঝাই যাচ্ছিল যে এটা দুদেশেরই সরকারের “জানাশুনা” লোকের মাধ্যমে ঘটানো কাজ। কিন্তু সেই মিথা প্রপাগান্ডা বাংলাদেশের সরকারি দলের কর্মিদের মনোবল বাড়াবে – এই মশলা আছে মনে করেছিল বলেই সম্ভবত তা চলতে দেয়া হয়েছিল – এটাই সম্ভাব্য কারণ বলে অনুমান!

    অথচ বিপরীতে চন্দন নন্দী – সবকিছুতেই তিনি একা, একাই সব। এমনিতেই সব সময় তার ভিতর একটা ঝোঁক দেখা যায় যে “তিনি সাহসী – সাহসী জার্নালিজম করেন” – এই আত্মম্ভরিতা বা নিজের সম্পর্কে অতি আত্মবিশ্বাসী ও মিথ্যা উচু ধারণা পোষণ করে লিখে থাকেন। সম্ভবত এই ‘অতি আত্মবিশ্বাসী’ অথচ ভিত্তিহীন সাহস দেখাতে গিয়ে  তিনি আলোচ্য লেখাটা লিখেছেন বাংলাদেশ সরকারকেই অভিযুক্ত করে অথচ কোন প্রমাণ দেন নাই! এটা গোয়ার মানুষের অতি সাহসী বোকামি বলা হয় সম্ভবত! যেমন তার পুরা লেখাটাই দাঁড়িয়ে আছে,   “senior Awami League sources” এই অস্পষ্ট ও অর্থহীন “সুত্র” এর বরাতে!  আওয়ামি লীগের সরকারের বিরুদ্ধে ভুয়া এক “আওয়ামি বরাতে” – যা খুশি তাই বলে দিবেন – এটা তো এক আত্মহত্যা-প্রবণ গাধামি!!   প্রায় প্রতি প্যারার শুরুতে তিনি এই অর্থহীন কথিত এই একই সোর্সের বরাতে  যা খুশি লিখে গেছেন; বেপরোয়াভাবে। অতএব এমন কান্ডগুলোতে তার না জানার কোন কারণ নাই যে এটা নুন্যতম কোন নীতি মেনে সাংবাদিকতা নয়। এটা কোন সাংবাদিক রিপোর্টই নয়।

    তার বোকা সাহসের আরো নমুনা আছেঃ
    প্রথমত তিনি বাংলাদেশ নিয়ে লিখতে এসেছেন ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ কোলে বসে; তারা যে অংশেরই হোক! অর্থাৎ তাঁর কোন লেখাই সাংবাদিকতা হবেই না!  কিন্তু তিনি সম্ভবত ভেবেছেন, যেহেতু এ’লেখা হাসিনার মোদির ভারতকে ফেলে কথিত চীনের কোলের উঠে যাওয়ার গল্প – তাই তিনি বীরবেশে সব বাধা পার হয়ে যেতে পারবেন!  অথচ তিনি কোন যুক্তি বোধবুদ্ধি তে কাজ করতে পারেন না,  আবার এটা তিনি খেয়াল করেন না। তিনি চীনবিরোধী ভারতীয় দেশপ্রেমিক উগ্র জাতিবাদী হতে চেয়ে হাসিনাকেই অভিযুক্ত করছেন। তার মানে এলেখার টার্গেট পাঠক ভারতীয়রা। কারণ,  একটা কথিত “ভারতীয় দেশপ্রেমিক উগ্র জাতিবাদী” মনকে টার্গেট করে লেখা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠির কোন অংশ পছন্দ করার কোন কারণ নাই। তিনি আওয়ামি লীগের সুবিধাভোগী হলেও না। এমনকি বাংলাদেশের হিন্দুরাও ভয় ও দ্বিধা করবে!

    তাহলে এই লেখা সরাসরি বাংলাদেশেই ছাপতে চাওয়ার এত মরিয়া আগ্রহ কেন??? এত অর্থ একটাই তা হল, আমি একটা ভারতীয় এক বেপরোয়া হিন্দু-মন দিয়ে বাঙ্গলাদেশ তো বটেই সারা দুনিয়াকে দেখতে চান! শুধু তাই না আপনার এই দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান আপনি বাংলাদেশের মাথায় চাপায় দিতে চান! এমনকি এটা এতই বেপরোয়া যে তা আওয়ামি লীগ তো বটেই হাসিনাকেও বাধ্য করতে চান!   এটাই এক অন্ধ ও বোকার গাধামি সাহস!

    চন্দন নন্দী নিজেকে এতই অযোগ্য ভাবে তুলে ধরেছেন যে তিনি মনে করেন বা ধরেই নিয়েছেন যে  বাংলাদেশের কোন স্বার্থ নাই, এনিয়ে কোন স্বার্থবোধও নাই; শুধু তাই না। খোদ প্রধানমন্ত্রী হাসিনারও ক্ষমতায় টিকে থাকবারও যেন কোন স্বার্থ নাই!  কেবল ভারতের স্বার্থই আছে আর সেটাই সহি। আর তাই, বাকি আমাদের সকলকে ভারতের পক্ষে তাও সেটা আবার মুরোদহীন এক ভারত – এর পক্ষে জয়গান করতে হবে, সেটা করাই আমাদের কাজ! সহজ ভাষায় বললে এটা এক স্টুপিডিটি; আর তা এমনই স্টুপিডিটি  যা কোন সুস্থ মানুষ করে না!

    তবে চন্দন নন্দীর এমন তিনটা স্টুপিডিটি আছেঃ

    প্রথম স্টুপিডিটি বা গাধামিঃ
    সম্ভবত গাধাও একটা পর্যায়ের পর আর গাধামি করে না। কিন্তু চন্দন নন্দী তাতে থামতেও রাজি না, এমনই তার স্টুপিডিটির লেভেল! তার লেখায় নিচের এই বাক্যটা আছে সেখান থেকে উঠিয়েছিঃ

    “However, the only concession that the Awami League government
    is likely to make is to partially reduce the level of repression on
    opposition party leaders, cadres and supporters.”

    নন্দী বলছে, আওয়ামি লীগ এবার একটাই কনসেশন বা ছাড় দিতে পারবে সেটা হল level of repression। এইটায় একটু ছাড় দিতে পারবে। মানে এবার বিরোধীদেরকে গুম, খুন অপহরণ একটু কম করে করবে। মজা না। আমাদের তো একথা শুনে হাততালি দেয়া উচিত। আর চন্দন নন্দীর নামে জয়ধ্বনি!! তাই না??
    কিন্তু ঘটনা হল উলটা? হাসিনা সরকারের এতে প্রচন্ড ক্ষেপে উঠাই স্বাভাবিক। কেন???
    কারণ, এই বক্তব্য দিয়ে নন্দী স্বীকার করে ফেলেছেন যে এর আগে হাসিনার দল বিনা concession এর হেভি level of repression তাহলে আওয়ামি লীগ করেছিল। আর সে তুলনায় এবার কম করবে – এটাই তো নন্দীর ভাষ্য???
    এটা স্টুপিড চন্দন নন্দী খেয়াল নাই। তিনি খেয়াল করছেন না। কিন্তু হাসিনা সরকারকে অবশ্যই এই স্বীকারোক্তি অপসারণ করতেই হবে! কারণ, সে তো স্টুপিড নন্দী না; হওয়ার কোন সুযোগও নাই। তাই স্বভাবতই সে নন্দী-ভৃঙ্গী সবাইকে সাথে বিডিনিউজ কেও আগাছার মত উপড়ে ফেলে দিয়েছে!!!
    এখন তামসাটা হল, এতে নন্দীও বেজায় খুশি হয়েছে। কারণ, “কোন লেখা নিষিদ্ধ হওয়া মানেই তা নিশ্চয় খুব দামি লেখা????” আর এই দামি লেখাটা প্রসব করেছে নন্দী!  আর তাতে নিশ্চয় আমরা বুঝতে পারছি গাধা কত প্রকার ও কী কী!!!!

    দ্বিতীয় স্টুপিডিটি বা গাধামিঃ
    এবার দেখি পরেরটা।  তার লেখায় পরের আরেক বাক্য হল এরকমঃ

    This time around, there are few reports of “disappearance” of opposition party cadres.

    এবারও তিনি আরো বড় গাধা হয়ে আমাদেরকে আশ্বস্ত করছেন যে এবার বিরোধীদেরকে গুম বা অপহরণ কম হচ্ছে বা হবে।  চন্দন নন্দী হিউম্যান রাইট হিশাবে “অপহরণ” শব্দের  অর্থ তাতপর্য কোন্দিনই বুঝেন নাই তাই বুঝা যাচ্ছে। ঠিক যেমন আমাদের দিপু মনি তিনি ২০১৩ সালে তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জেনেভায় জাতিসংঘের  (UPR) সভায় খোলাখুলি বলেছিলেন বাংলাদেশের আইনে  গুম বা অপহরণ (disappearance) বলতে কোন অপরাধের কথা নাই। অতএব বাংলাদেশে কোন disappearance নাই! এতে যে যা বুঝছেন বুঝে নেন! আর এখানে চন্দন নন্দী দেখা যাচ্ছে আরেক কাঠি সরেস! তিনি সরকারের হয়ে আশ্বস্ত করছেন এবার disappearance হবে তবে কম হবে!!!
    অথচ ঘটনা হল, একটা disappearance এর ঘটনা যদি ICC তে প্রমাণ করা যায় তো হুকুমের আসামি হিশাবে প্রধান নির্দেশদাতার সর্বোচ্চ শাস্তি হয়ে যাবে! আমি নিশ্চিত এসব দিক এই চন্দন নন্দী কখনও খবর নেন নাই। তাই অবলীলায় বলে যেতে পারছেন এবার disappearance কম হবে। মানে যেন এবছরের ধানের ফলনের হিসাব দিচ্ছেন!!!
    তাই এক্ষেত্রেও হাসিনা সরকারকে অবশ্যই নিজ স্বার্থে নিজে স্টুপিড নন্দী না হয়ে নন্দী-ভৃঙ্গীসহ বিডিনিউজ কেও আগাছার মত উপড়ে ফেলে দেয়া ছাড়া পথ ছিল না!!!

    তৃতীয় স্টুপিডিটি বা গাধামিঃ
    এলেখায় তিনি, কোন রাষ্ট্রের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে  সেটা যে কোন ধরণের চাপবিহীন ও বিশ্বাসযোগ্য হতেই হয় এবং তা উল্লেখ করা লাগে নাই নইলে কে জনপ্রতিনিধি হল?  আর জনপ্রতিনিধিত্বই যদি ফেয়ার ভাবে না হয় তো ওটা তো কোন রিপাবলিকই না – গণপ্রতিনিধির রাষ্ট্র না, সমাজের কোটারি গ্রুপের ক্ষমতা হল সেটা এটাই তো ফ্যাসিবাদ হয়েছে বা হবে। অথচ এলেখায় চন্দন নন্দী সব সময় বলে গেছেন, নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার একটা রিলেটিভ ধারণা মাত্র। হাসিনাও  নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার করতে পারেন। সেটা পিটার হাসের মাত্রায়  ফ্রি ও ফেয়ার নির্বাচন না হলেও চলবে। এটা সোজাসুজি একটা শয়তানি। একেবারে যেকোন ধর্মতত্বে শয়তানের যে বর্ণনা আছে সেই দানব এই চন্দন নন্দী। তিনি ভারতের নির্বাচনে গইয়ে তার এই শয়তানি তত্ব ফেরি করে না কেন?  আগে তিনি সেটা করে আসেন এরপর ………।
    তাই এসব শয়তানি বক্তব্য দেয়া তা বলার কোন মানে হয় না। অথচ তিনি কী বলেছেন দে৪খেনঃ

    the Western bloc, including the US, seek to play a role “far stronger than India”
    in shaping the road for a relatively free and fair elections in Bangladesh.

    অর্থাৎ তিনি সুজাতা সিং এর ২০১৩ সালের হস্তক্ষেপটাকে জায়েজ করতে সেটা এবারের পিটার হাসের ভুমিকার সাথে তুলনা করে দিলেন। আর কৌশলে দাবি করলেন এটা একটা relatively free and fair elections – মানে তুলনামূলক ঘটনা মাত্র বলে দেখাতে চাইলেন। মানে এটা মাত্রাজ্ঞানের ব্যবপার যা একেক জনের একেক রকম হয় =- সেই মাত্রাজ্ঞান।   এটা যেন “far stronger than India” মাত্র এতটুকুই।
    তামাসার দিকটা হল, এই দানব নন্দীর একটা সাধারণ নির্বাচনকে খুবই হাল্কা ব্যাপার হিশাবে দেখা আর সেটা নেহাতই ফ্রি-ফেয়ার  এর মাত্রজ্ঞান এর ব্যাপার বলে চালানোর চেষ্টা এটা হাসিনাও হজম করতে চান নাই। এরই বহিঃপ্রকাশ হল আপন স্বার্থে নিজে কোন স্টুপিড নন্দী না হয়ে নন্দী-ভৃঙ্গীসহ বিডিনিউজ কেও আগাছার মত উপড়ে ফেলে দিয়েছে সরকার!

    হাসিনার পাঁচমন্ত্রীতে ভারতের কথিত আপত্তি প্রসঙ্গঃ
    প্রসঙ্গটা সবার আগে তুলে ছিলেন সুবীর ভৌমিক যে হাসিনার পাঁচমন্ত্রী নাকি পাকিস্তানপন্থী! তিনি নামও উল্লেখ করেছিলেন সেবার। কিন্তু অর্থহীন একটা বিষয়কে ঘটনা বানানো মনে হবে যেকোন সিরিয়াস পাঠকের কাছে। অন্তত দুটা কারণে এক. বিভিন্ন দেশের সরকারে মন্ত্রীদের মধ্যে সিরিয়াস গ্রুপিং চলে আর তা একেবারে মতাদর্শিক লেভেলে। কোল্ডওয়ারের আমলে ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রীসভায় মোরার্জি দেশাই – এসব আসলে সেকালে সোভিয়েত নাকি আমেরিকান এভাবে পন্থী পরিচয়ের আড়ালে দ্বিবিভাগে বা গ্রুপিং চলত। তবে অবশ্যই তা আন্ডার কারেন্ট। মানে মূল স্রোত বা মেন স্ট্রিম বা মূল ধারাতেই বভক্তি না অবশ্যই না। মানে ইন্দিরার ক্ষমতাকে মেনে নিয়েই এরপর দুই ধারার মত।  এমনকি আমাদের ৭১ যুদ্ধের সময়েও ইন্দিরার আমেরিকান ধারার মন্ত্রীরা বিরোধিতা করেছে। তো এই অর্থে কোন মন্ত্রীসভার ভিতরে গ্রুপিং এর কথা জানা যায়।
    কিন্তু হাসিনার মন্ত্রীসভার মধ্যে গ্রুপিং? এটা যে না বাংলাদেশ  না হাসিনা কাউকেই চিনেনা কেবল – মন্ত্রীসভায় গ্রুপিং থাকে – এই তত্বীয় ধারণা যা খুশি বলে এদের কথার নুন্যতম গুরুত্বও নাই। তাই এর আমলও নাই।  আসলে দলের ভিতর দুই মতামত নিয়ে আপোষে ফ্রি-ভাবে তর্ক-বিতর্কের সুযোগ থাকলে এরপরে মন্ত্রীসভা পর্যন্ত তা কল্পনা করা যেতে পারে। কাজেই সুবীরের এই কথিত গ্রুপিং এর ধারণা তুলে তিনি হয়ত অন্য কিছু বলতে চেয়েছেন তাই যেকোন সুস্থ মানুষ মনে করেছে। কারণ নিজ মন্ত্রীত্ব থাকলে বেচে গেলে সেটা মন্ত্রীর বাপের নাম দশা  সেখানে এই মন্ত্রীরা আবার গ্রুপিং করবে। গ্রুপিং শুনলেই তো গুষ্ঠিশুদ্ধ বের করে দেয়া সহ যেকোন শাস্তি খাবে যেকোন ব্যক্তি মন্ত্রী!  কাজেই পাঁচমন্ত্রীর গল্প – এটা বানানো গল্পই!
    আর দ্বিয়=তীয় কারণটা হল, হিন্দুত্ববাদী ভারতের পাকিস্তান ম্যানিয়া বাংলায় যাকে চুলকানি বলে। মুসলমান বা পাকিস্তান নিয়ে হিন্দুত্বের চুলকানি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নাই! বট্ম লাইনটা হল আমাদের যেকোন কারো ভিনদেশে আত্মীয় স্বজন থাকতেই পারে। সালমান এফ রহমানের অনেক কাছের আত্মীয়ই পাকিস্তানের – তা হলেই পারে। সেজন্য তিনি পাকিস্তানপন্থী – এটা মূলত রেসিজম! সালমান রহমান খারাপ ব্যবসায়ী হতে পারেন, লোন ডিফল্টার হতে পারেন, ইত্যাদি মেলা অভিযোগ থাকতেই পারে  কিন্তু সেজন্য তার বিরুদ্ধে করা কোন রেসিস্ট মন্তব্য জায়েজ হয়ে যাবে না! কিন্তু ভারতীয় হিন্দু-মন এতে অভ্যস্ত, এটাই দুঃখের ব্যাপার!
    আর মোমেন যখন যাকিছু বলেছেন ধরে নিতে হবে তাতে প্রধানমন্ত্রীর সায় আছে। কে কোন পন্থী সেটা বাসায় বউয়ের কাছে রেখে এসে তবেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অধীনে মন্ত্রীত্ব করা সম্ভব। এটা যারা জানে না তারা এখনও মায়ের গর্ভে আছেন! বিকশিত প্রস্ফুটিত হন নাই। আমরা কয়জন কজানি বা মনে রেখেছি যে মোমেনের আগে হাসিনার সব পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন নাম কাওয়াস্তে – লো প্রফাইল। তাঁর অফিসই তখন প্রায় সবক্কিছু নিজে সরাসরি তদারকি করত। অবজারভেশন বলে,  মোমেন দায়ীত্ব নিবার পরই তাঁর অফিস অনেক কিছুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলে আলাদা কাউকে নির্দেশ দিয়ে করান। ভারতের যারা মোমেনের বিরুদ্ধে  বা কথিত গ্রুপিং ধরণের যা মনে চায় বলছেন তারা অন্যকিছু মিন করছেন সম্ভবত!  বাংলাদেশের কেউই বিশ্বাস করবে না যে মোমেন কোন স্বাধীনপন্থা বা গ্রুপিংয়ে চলেন! আসলে এসব কথা যারা বলছেন তারা গত ১৫ বছরের সরকার কেমন কী তার ঝোঁক কিছুই অবজার্ভ না করেই বরং ভিন্ন কিছু বলতে চেয়ে এমন ভুয়া কথা ছড়াচ্ছেন!  আবার এসব কথার মানে এমনও না যে হাসিনা সরকার বা মোমেন এর কাজ ততপরতা খুবই জন আদৃত! এরা সবাই নির্দোষ! অথবা নিঃস্পাপ ধরণের ইমেজের অথবা এমন ব্যক্তিত্বের।

    চন্দন নন্দীর এলেখা মহা-চীনবিরোধী ভাবের উপর দাঁড়িয়ে লেখাঃ
    চন্দন নন্দীর এই লেখা মহা-চীনবিরোধী ভাবের উপর দাঁড়িয়ে লেখা।  ভারতের নিজ মুখের খাদ্য “বাংলাদেশ” একে চীন ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে যেন – এমন অনুভব এর উপর দাঁড়িয়ে এটা লেখা হয়েছে। আমি বার বার বলেছি হিন্দুত্ববাদের মত একটা উগ্র জাতিবাদী দেশের হিন্দু-মন এরা দ্বিন-দুনিয়া বুঝতে অক্ষম।  এদের সাংবাদিকতাও এমন দোষে দুষ্ট একপেষে হবে।  আগে ভারতের জাতিবাদ ছিল মুসলমান বা পাকিস্তানকে চরম শত্রু জ্ঞান করে দারাকনো। সেজায়গায় এখন বসেছে চীন। ভারতের সব নিয়ে গেল চীন। এর বাইরে দুনিয়ায় আর কোন ঘটনা -ফেনোমেনা আছে কিনা তা এরা জানে না। জানতেও চায় না।
    একবাক্যে একটা কথা বলে শেষ করব। বাইডেনের আমেরিকার নয়া নীতি-পলিসির কারণে মোদির ভারতের উপর তাদের চাপ ক্রমশ বেড়েই চলেছে।  এটা এমনই যে তা যদি খুবই খারাপ অবস্থায় পৌছায় – এশিয়ায় বাইডেনের সাথে ভারত নীতি সরাসরি বিপরীতমুখী হয়ে দাড়ায় সেক্ষেত্রে ঐ সামলাতে না পেরে খোদ ভারতই চীনের কোলে গিয়ে উঠতে পারে। খোদ মোদি-জয়শঙ্করের বিবৃতির অর্থ এমন – আর তা প্রকাশিত হয়ে আছে। এবিষয়ে কী চন্দন নন্দীরা অবগত????
    যারা আরো গভীরে যেতে চান, ভারতের NDTV তে ছাপানো এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন গত ১১ আগষ্ট যা ছাপা হয়েছিল। আর পরেরদিন বাংলাদেশ তা অনুবাদ করে মানবজমিন ছেপেছিল বাংলায়।
    যে ভারত নিয়মিত চীনকে অভিযুক্ত করে অন্যের ভুমি দখল করেছে বলে সে কেন আচমকা ফিলিপাইন-চীনের সীমানাবিরোধে তাদেরকে শান্তিপুর্ণ সমাধান বা “Resolve Peacefully,”  বলে হাঁক পাড়ছে??? এটা তো অন্তত ২০১৭  কোয়াডে [QUAD]  বা আমেরিকার আনা সাউথ চায়না সি – বিতর্কে ভারতীয় অবস্থান ফেলে পালানো মানে এসবের জন্মের পর থেকে এপর্যন্ত ভারতের অনুসরণ করা ভারতীয় অবস্থানের বিপরীত! সেটা কেন হল??
    কাজেই কে কখন চীনের কোলে গিয়ে উঠতে চায়, কেন চায় কী দশায় সে বুঝে শুনে এসব উগ্র জাতিব্বাদ দেখানো উচিত চন্দন নন্দীদের। নাদান মানুষে ভরে উঠছে দুনিয়া!!!


    সর্বশেষ আপডেটঃ  ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩  সকালঃ ০৭ঃ ৪৫


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • সৌম্যদের হিন্দুত্ববাদী উগ্র দেশপ্রেমের সাংবাদিকতা

    সৌম্যদের হিন্দুত্ববাদী উগ্র দেশপ্রেমের সাংবাদিকতা
    গৌতম দাস
    ২ সেপ্টেম্বর ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4VZ

     

    Xi G-20 summit

    [প্রথম কথা হল, আজকের লেখার প্রসঙ্গ এর দুইটা পার্ট আছে। এর প্রথম অংশটা আজকে যেখানে বাংলাদেশের সাথে সরাসরি জড়িত নয়ই বলা যায়। তবে অপর যে পার্ট বা অংশটা সেখানে বাংলাদেশ সম্পর্কিত তা কাল আনবো।  এখানে কেবল এখনকার অবস্থান হল, এটা কাশ্মীর ফোকাস ঘটনা কিন্তু তা মূলত জি-২০ এর সম্মেলন কেন্দ্রিক।  চীনের প্রেসিডেন্ট সি আর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন এরা দুজনের এই সম্মেলনে অনুপস্থিত থাকা অবস্থায় এবার জি-২০ সম্মেলন ভারতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।  আর এর পিছনের চীন-ভারত বিবাদই হল আজকের প্রসঙ্গ। যেখানে আমরা হিন্দুত্ববাদের আরেক ভয়ঙ্কর দিক দেখতে পাব। ]

     

     

    প্রথম আলোর দিল্লি প্রতিনিধি সৌম্য বন্দোপাধ্যায়, এবার এসেছেন নিজ দেশপ্রেমের উপর দাঁড়িয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং এর বিরুদ্ধে  অভিযোগ নিয়ে যে তিনি কেন জি-২০ সম্মেলনে ভারত সফরে আসবেন না, অপ্নুপস্থিত থাকবেন! তবে এটা জি-২০ সম্মেলন চীন বর্জন করছেন ঠিক তা নয়। তবে রাষ্ট্রপ্রধান হিশাবে সি আসছেন না, বদলে চীনা প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন, প্রতিনিধিত্ব করবেন। আগে বলেছি ভারতীয় জার্নালজমের সমস্যা হল তারা নিজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বেধে দেওয়া ব্রিফিং বা লাইনের বাইরে গিয়ে কিছু লিখতে পারে না। আর এতেই তারা অভ্যস্তও বটে। এছাড়া দ্বিতীয়ত, এক উগ্র জাতিবাদ (হিন্দুত্ববাদ) দেশপ্রেমের নামের কোনটা বর্জ্য আর কোনটা খাদ্য তাতে ফারাক করে না বা করতে অক্ষম – এটা সারা ভারত জুড়ে ছেয়ে আছে। আসলে ঘটনা হল তারা মোদি ও বিজেপির স্বার্থকেই দেশের স্বার্থ আর দেশপ্রেমিক কাজ মনে করে মোদির পায়ে পুজা দিয়ে চলেছে!
    যেমন এক মজার অভিজ্ঞতার কথা বলি। একবার এক লোক নেদারল্যান্ডে বেড়াতে গেছিলেন তার বউ সেখানে তখন স্কলারশীপে হায়ার স্টাডিতে সেখানে পড়তে গিয়েছিল সেই সুত্রে এই ভ্রমণ। আর ফেরার পথে সেই লোক কলকাতা হয়ে আসছিল। ইংরাজিতে সুভ্যেনির [Souvenir] বলে একটা শব্দ আছে যার সারার্থ হল, তা সংস্কৃত ঘেঁষা বাংলায় বললে হবে “নিদর্শন চিহ্ন”। মানে হল আপনি কোন এক বিদেশভুমিতে ভ্রমনের গেছিলেন; আর সেই সুখস্মৃতির চিহ্ন হিশাবে সেখানকার প্রতীকী কোন বস্তু বা পণ্য  তা কিনে বা সংগ্রহ করে “চিহ্ন” সাথে বয়ে এনেছেন। সেটা নিজে কিনে আনা হতে পারে, কেউ উপহার দিয়েছে তাও হতে পারে। এরপর দেশে ফিরে সেই নিদর্শন আপনি ব্যবহার করছেন অথবা নিজ ড্রয়িং রুমে শোকেসে সাজিয়ে রেখেছেন। এই হল, সুভ্যেনির কথার অর্থ-তাতপর্য।
    তো নেদারল্যান্ড থেকে কলকাতায় দুএকদিন স্টপ-ওভার করা সেই ব্যক্তির কলকাতায় প্রবেশের সময় তাঁর গায়ে ছিল একটা টি-শার্ট। নেদারল্যান্ডের বিরাট সংখ্যক মানুষ সাইকেলে চড়ে শহরে কাজে বের হয়, সাইকেলের জন্য রাস্তায় আলাদা লেন ইত্যাদি অনেক কিছু আছে। আর সেঘটনা বলছি গত নব্বই শতকের প্রথমার্ধের ঘটনা।  তো সেই লোকের গায়ের টি-শার্টে বুকের উপরে  খুবই আকর্ষনীয় এক সাইকেলের ছবি আর নিচে ইংরাজিতে নেদারল্যান্ড লেখা ছিল। এই দেখে ঐ লোকের এক পরিচিত কলকাতার স্থানীয় লোক খুব ক্ষেপে গেলেন। ঝারি দিয়ে বলতে শুরু করলেন, “মশায়, আপনি তো খুব খারাপ লোক; নিজে বাংলাদেশি হয়ে নেদারল্যান্ডের জামা গায়ে দিয়ে প্রচার করছেন। আপনার খারাপ লাগছে না, নিজদেশ ফেলে অন্যদেশের প্রচার করতে্‌…! ইত্যাদি”।
    এমন দেশপ্রেমের কোন ঝারি যে হাজির করা যেতে পারে সেটা বুঝতেই প্রথম কয়েক মিনিট যাওয়ার পর এবার সেই বাংলাদেশি অনেক ঠান্ডা মাথায় বললেন, “তার মানে আপনি সুভ্যেনির শব্দটা কখনও শুনেন নাই; তাই শব্দটার অর্থ কী তাও আপনি জানেনই না। এর মানে তো তাহলে পরদেশ ভ্রমণে যাওয়াটাও খুবই খারাপ, কারণ আপনার দেশপ্রেম আছে আর আপনি মহান দেশপ্রমিক! অথচ  আরও কড়া কথাটা হল যে তাহলে, আপনার প্রাণপ্রিয় দেশ-রাষ্ট্র ফেলে এর বাইরে ভিনদেশের কোন মানুষের সাথে আপনার কোন ধরণের “হিউম্যান রিলেশন” অনুভব করে ফেলা – এটা তো আরো বিরাট পাপ ও অন্যায় করা। নিজ দেশেওর বাইরে কোন মানুষ এমন মনুষ্য জীবনের প্রতি  কোন মানবিক টান অনুভব করা তো তাহলে খুবই অন্যায় কী বলেন? যে অন্যায়ের কোন সুযোগই নাই? সেটা দেশবিরোধী কাজ? যেন সে আপনার সাক্ষাত শত্রু মাত্র?” তাই কী? কী মনে হয় আপনার!
    এরপরের পর্ব সংক্ষিপ্ত। বাংলাদেশির শেষ ডায়লগ,   “যাক কী আর করা আপনি আপনার দেশপ্রেম বোধ নিজের কাছে যত্নে রাখেন! আমি সরি!!” এই বলে সেই পর্ব শেষ হয়েছিল। আর বুঝেছিলাম ভারতে একেবারে সবখানে ছেয়ে থাকা দেশপ্রেম-বোধ জিনিষটা কেমন! কত গাধা-গরুর কারবার! বলা বাহুল্য এরা একেকটা ঘৃণার ডিব্বা। মানুষ ও তার জীবন এবং এর অফুরন্ত সম্ভাবনার দিকটা সম্পর্কে এরা একেবারেই বেখবর! তাই একচোখা, একদেশদর্শী তাই সংকীর্ণ এমন চিন্তা!  যেন হিটলারের বাবা একেকজন এমনই উগ্রতম জাতিবাদি! অথচ নিজের স্বার্থ বা অস্তিত্বটা কী তাও বুঝে না!

    ভারতের জাতিবাদ ওদের নিজের জন্যই কত বিপদজনক, তাই এখানে আমল করার বিষয়। এদিকে আর ছয় মাসের মধ্যে ভারতে সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচন মানে মোদির “হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদকে” পাবলিকের মানে ভোটারের মুখোমুখি হতে হবে যে, সেটা আরও আয়ু পাবে কিনা।  নাকি মোদি-সহ তার শ্রেষ্ঠত্ববাদকে এই ভোট কোন ভাগাড়ে নিক্ষেপ করবে! তাই স্বভাবতই মোদির দিক থেকেও হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদ, উগ্র জাতিবাদ আর উগ্র দেশপ্রেম ইত্যাদি ধারণাগুলোর ইমোশনাল সুরসুরি তুলে এর সফল ব্যবহার করতে হবে যাতে এই আবেগে ভোটারেরা ভোটবাক্সে মোদির পক্ষে ভরিয়ে ফেলে। অর্থাৎ হিন্দুজাতি-ই দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ এমন উস্কানি চরমে তুলতে মোদি একে চরমে নিবার কোন কসুর ছাড়বে না – আগামি ছয়মাস এটাই আমরা দেখব!  কিন্তু সৌম্যের মত দেশপ্রেমিকেরা হয়ত ভাববে তা কেন আমরা তো মোদির মতই দেশপ্রেমিকতা দেখাচ্ছি! মোদির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং মেনে সাংবাদিকতা করছি অতএব আমাদের চেয়ে দেশপ্রেমিক আর কে আছে! অথচ তারা বুঝবেনই না বা বুঝতে চান না যে মোদির স্বার্থ আর দেশের স্বার্থ কখনো এক নয়!

    “অরুণাচল প্রদেশ” না কি “ঝাঙনান” – এই হল ক্যাচালঃ
    ঘটনা হল, ভারত-চীন সীমান্তে ভারতের চোখে যেটা অরুণাচল প্রদেশ চীনের চোখে সেই ভুখন্ড এর নাম ঝাঙনান [Zangnan]; যার সোজা অর্থ দাড়ায় এটা বিতর্কিত ভুখন্ড। আরো সহজ করে বললে এই ভুখন্ড নিয়ে ম্যাপ দু-রাষ্ট্রের কাছে দুরকম – একই কোন কমন ম্যাপের কপি দুদেশের কাছে নাই।  সৌম্য এই অরুণাচল নিয়ে একটা রিপোর্ট লিখেছে প্রথম আলোতে গত ৩১ আগষ্ট।  যার শিরোনাম “সির দিল্লি সফর এড়াতেই কি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করল চীন”।

    অরুণাচল নিয়ে সৌম্য লিখেছেঃ

    “মাত্র কয়েক দিন আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় জোহানেসবার্গে ‘ব্রিকস’ শীর্ষ সম্মেলনে সি চিন পিং যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর কিছুক্ষণ কথাও হয়। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিনয় কোয়াত্রা জানিয়েছিলেন, ওই বৈঠকে পূর্ব লাদাখের সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে তুলতে দুই নেতা সম্মত হয়েছেন।
    সেই আলোচনা চীন না ভারত, কার তাগিদে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তা নিয়ে পরে দুই দেশের মধ্যে বিতর্ক বাধে। এর চার দিন পর গত মঙ্গলবার চীনের পক্ষে থেকে এক নতুন মানচিত্র প্রকাশ করা হয়। তাতে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ ও আকসাই চীনকে সে দেশের অংশ দেখানো হয়েছে। এ নিয়ে পারস্পরিক চাপান–উতোরও অব্যাহত। ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ওই মানচিত্র নিয়ে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে”।

    এই বক্তব্য থেকে বুঝার উপায় নাই যে ভারতের দাবিকৃত অরুণাচল প্রদেশ চীনের সাথে একটা বিতর্কিত ভুমি। বরং এখানে উগ্র জাতিবাদী দেশপ্রেমিক সেজে এটা ভারতের ভুখন্ড ধরে নিয়ে এই বয়ানটা তৈরি করা হয়েছে। কোন ইঙ্গিতও নাই যে এটা বিতর্কিত ভুমি! তবে  চীন একটা “ডিস্টার্বিং দেশ” যে ভারতকে খালি যেন বিরক্ত করে এই বয়ান হাজির করা গেছে।

    লক্ষ্যণীয় যে সৌম্য লিখছেন, “ভারতের অরুণাচল প্রদেশ ও আকসাই চীনকে সে দেশের অংশ দেখানো হয়েছে”। যেন কোন কারণ ছাড়াই – মোদির ভারতের কোন অবদান ছাড়াই এমনটা হচ্ছে।  এই বাক্য লিখে সৌম্য অবলীলায় জার্নালিজম ত্যাগ করে এর উপর জায়গা দিয়েছেন নিজ হিন্দুত্ববাদী দেশপ্রেমিকতাকে! কেন এমন কথা বলছি?

     সাংবাদিকের কাজ কী? সাংবাদিকতা না দেশপ্রেমিকতাঃ
    অরিজিন থেকে যদি শুরু করি। কাশ্মীর এটা ভারতের না পাকিস্তানের ১৯৪৭ সাল থেকেই এটা অমীমাংসিত। বৃটিশ ভারতের কাশ্মীর রাজ্য ছিল একটা প্রিন্সলি স্টেট [Princely State] বা করদ রাজ্য। সংক্ষেপে বললে এর মানে, বৃটিশেরা ভারত দখলের পরেও কাশ্মীর ওর পুরান রাজাদের দ্বারাই শাসিত হতে থাকবে তবে শর্ত থাকবে বৈদেশিক ও সামরিক বিষয়-ইস্যুতে বৃটিশ রাজের কথাই শেষকথা মানতে হবে। আর কাশ্মীরের রাজা বছরে যা রাজস্ব উঠাবে এর একটা অংশ বৃটিশ রাজের সাথে শেয়ার করবে – এসব অর্থে বা শর্তে কাশ্মীর স্বাধীন রাজ্য। যার অর্থ এরা প্রিন্সলি স্টেট। বৃটিশ-ইন্ডিয়ায় এমন ৫৫০ এরও বেশি ছোট বা বড় প্রিন্সলি স্টেট ছিল।
    আবার এই প্রিন্সলি স্টেট গুলো নিয়েই ১৯৪৭ সালে আরেক বড় সমস্যা দেখা দেয়। এসময় বৃটিশেরা ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার আইনি মানে হল বৃটিশদের সাথে ঐ প্রিন্সলি স্টেট চুক্তির সমাপ্তি টানা। মানে হল এরপর ঐ রাজারা কোথায় – ভারতে না পাকিস্তানে যোগ দিবে এনিয়ে বৃটিশদের বলবার কোন রাইট নাই।
    কাশ্মীর এক মুসলমান জনসংখ্যা অধ্যুসিত কিন্তু হিন্দু রাজার দেশ! ১৯৪৭ সালের পরে কাশ্মীরের রাজা হরি সিং নেহেরুর সাথে এক একশেসন চুক্তি [ accession pact; রাজার রাজ্যকে কোন প্রজাতন্ত্রে অন্তভুক্তির চুক্তি] করার পর এরা উভয়েই দাবি করতে থাকে যে পুরা কাশ্মীর ভারতের হয়ে গেছে।
    উতসাহের ঠেলায় নেহেরু নিজে জাতিসংঘ কী তা না জেনে, নবগঠিত (১৯৪৫) জাতিসংঘের কাছে  মতামত চাইলে তারা জানায়, কোন রাজার করা একশেসন চুক্তি বৈধ নয়। কারণ জাতিসংঘের জন্ম ও গঠনভিত্তি অনুসারে কোন রাজা দেশ-ভুখন্ডের কেউ না। বরং ভুখন্ডের বাসিন্দাদের মতামত (রেফারেন্ডাম) ভোটে নির্ধারিত হতে হবে ভুখন্ড কিভাবে শাসিত হবে। তাই জাতিসংঘের রেকমেন্ডেশন যে, রেফারেন্ডাম করতেই হবে; যা আর আজও হয় নাই। অর্থাৎ কাশ্মীর ভারতের নয় লিগালি বা আইনত এটা তাই থেকে যায়। এই ক্ষত ঢাকতে নেহেরূ ভারতের নয়া কনষ্টটিউশনে ৩৭০ ধারা (সাথে ৩৫এ) ধারা যুক্ত করে কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদার রাজ্য (আইনত কভার না হলেও) বলে ভারতে যুক্ত করে নেয়।

    গত ২০১৯ সালের মে মাসে মোদি দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন। আর হবার পরই ৫ আগষ্ট ২০১৯ সংসদে  শুধু মাত্র এক ঘোষণা দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সারা কাশ্মীর ভারতের অংশ বলে একেবারেই গায়ের জোরের ঘোষণা দেন। ঘোষণা স্বপক্ষ্ব তিনি কোন কারণ উল্লেখ করেন নাই। মানে কেন কিভাবে কাশ্মীর ভারতের এর কোন ব্যাখ্যা অমিত শাহ দেন নাই। আর এই সারা কাশ্মীর মানে হল ভারতের অধীনে অংশ, পাকিস্তানের অধীনে অংশ এবং চীনের অধীনে অংশ মিলিয়ে পুরাটাই।
    এব্যাপারে পাকিস্তানের কোন নতুন প্রতিক্রিয়া ছিল না। তবে চীনের প্রতিক্রিয়া ছিল তবে সেটা এক বড় একশনে, কথায় না। এটাই পরের বছর (২০২০) শীত চলে গেলে মে-জুনের একশন যেখানে কমপক্ষে ২০জন ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছিল। তবু এটা বড় ঘটনা ছিল না।  বড় ঘটনাটা হল, চীন ১৯৬২ সালেরও আগে (১৯৫১-১৯৫৯ পর্যন্ত সময়কালের দখলি ভুখন্ড আর শেষে ১৯৬২ সালে আসাম দখলের পরের কিছু) তার নিজের দাবি করা যে সীমানা ছিল [যার অনেক অংশই ভারতকে আপোষে চীন হস্তান্তর করে দিয়েছিল] সেই ভিত্তিতে সব দখল করে নেয়। কিন্তু মজার কথা হল মোদির সরকার এরপর থেকে ভারতের সংসদে বলে আসছে চীন ভারতের কোন ভুখন্ড দখল করে নাই। কেন?

    প্রথম কেন চীন ১৯৬২ সালের আগের সীমানায় ফিরে গেল? আর এমন প্রতিক্রিয়ার অর্থই বাকী ছিলঃ
    সবার আগে, কেন চীন-ভারত সীমানা বিতর্ক? – তা নিয়ে একটা তথ্য বেস ফ্যাক্টস জানায় রাখি। বৃটিশ-ইন্ডিয়া  সারা ভারত ভুখন্ড-কে অবিতর্কিত রাখতে একটা ব্যবস্থা নিয়েছিল। তা হল, অখন্ড ভারতের পড়শি তা সেকালে যে দেশেরই হোক তার সাথে বসে আপোষ মীমাংসায় ভুখন্ড চিহ্নিত করে এরপরে সেই সীমানা ম্যাপে পর্যন্ত পৌছে যেত।  যার একই কপি দুইটা ফটোকপির মত করে দুই দেশের কাছে তা রেখে দেয়া হত। এরপর যেহেতু দুপক্ষের কাছে একই ম্যাপের দুইটাকপি তাই এরপর আর সীমানা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ মেরে রেখে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু একটা ব্যতিক্রম – প্রিন্সলি স্টেট বা করদ রাজ্যগুলোর বেলায়। যেহেতু আইনত করদ রাজ্য গুলো কার্যত স্বাধীন তাই তাদের বেলায় (যাদের ক্ষেত্রে পড়শি বলতে বৃটিশ ভারতের বাইরের কোন দেশ ছিল); এমন কোন বহিঃর্দেশ থাকলে সেক্ষেত্রে আর বৃটিশ রাজ  প্রিন্সলি রাজ্যগুলোর বেলায় কোন যৌথ সীমানা টানার কাজ করে নাই। কারণ  এ’দায়ভার ঐ করদ রাজার। আর ঠিক এরই ফাঁদে পড়েছিল কাশ্মীর (লাদাখসহ) আর ওপারের চীন। একইভাবে যেটাকে ভারতের দিকে অরুণাচল বা চীনের তীব্বত এর সাথে  এভাবে সকল সীমান্ত।  এল্ককথায় চীন-ভারতের সীমান্ত বৃটিশ আমল থেকেই পরস্পর সম্মতিতে কখনই মাপাজোখা করা হয় নাই। একারণে, একটা শব্দ চালু আছে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি বা LAC)। উগ্র জাতিবাদি ভারতের সরকারগুলো পাবলিকের মনে এটা খুব পবিত্র শব্দ এধারণা দিয়ে রেখেছে। যেন লড়কে লেঙ্গে বলে সীমানা আকড়ে দাড়ানোটাই দেশপ্রেম – এই হল উগ্র জাতিবাদী স্বভাব ও চিন্তা। অথচ দেশের সীমানা নিয়ে পড়শির সাথে আপোষে সীমানা চিহ্নিত করে নেয়াটাই যে সবচেয়ে উচিত কাজ ও পথ – এটা উগ্র জাতিবাদের ডিকশনারিতে নাই। এর বদলে ভারতে বিশেষ করে মোদির ভারতের আছে উলটা অবস্থান। মোদি এখানে এই ইস্যুতে প্রপাগান্ডায় মেতে উঠতে চায়। আর এই উগ্র (হিন্দুত্ববাদি শ্রেষ্ঠত্বের) জাতিবাদের লাইনে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করে মোদির বুকের ছাতি ফুলিয়ে যেন সে আজই অন্যের কাছ থেকে ভুখন্ড ছিনিয়ে নিয়ে আনবে সে এত বড় বীর, “দেশমাতার সম্মান” একমাত্র মোদিই রক্ষা করেছে কাজেই মোদিকে এইবার আপনার ভোট টা দেন – এই হল নির্বাচন আসলেই মোদির উগ্র উসকানির বয়ান ও কৌশল!
    যেন যুদ্ধ বা যুদ্ধ-ধরণের বিরোধ সংঘাত এড়িয়ে সাজানো বিদেশনীতি ভাল না, এমন ডিপ্লোমেসি বলে দুনিয়াতে কিছু নাই – সেসবই যেন কাপুরুষের কাজ। এটাই উগ্র (হিন্দুত্ববাদি শ্রেষ্ঠত্বের) জাতিবাদের লাইন ও এর বেকুবি চিন্তা। কিন্তু এর লক্ষ্য একটাই – সেটা নিজ ভুখন্ড আদায় করে আনে সেটা অবশ্যই নয়; তাহলে? বরং কথিত দেশপ্রেমের উসকানি সুরসুরি তুলে নিজ ভোটের বাক্স ভরিয়ে ফেলা এই মোদির উদ্দেশ্য!   একারণে, ভোটের আগে ভারতে এমন উস্কানি বেড়ে যায়।  তাহলে, চীন কেন ৬২ সালের আগের সীমান্তে ফিরে গেল, এর ব্যাখ্যা কী?

    চীন কেন ১৯৬২ সালের আগের সীমান্তে ফিরে গেলঃ
    মোটামুটি ১৯৭৮ থেকে ১৯৯০ এটাকে বলা হয় চীনের নিজ অর্থনীতিতে প্রথম ডাবল ডিজিট জিডিপির প্রথম দশক। নিজ সেই অভিমুখ টের পেয়ে চীন ১৯৯১ সাল থেকে আপোষে ভারত-চীন সীমান্ত চিহ্নিত করে নিবার প্রস্তাব দেয় ভারতকে। মানে চীন কোন যুদ্ধে জড়িয়ে নিজ উন্নয়ন বা পুঁজির সক্ষমতা নষ্টের বিরুদ্ধে – এটাই এর ভিতরের সুপ্ত ম্যাসেজ। সীমানা বিরোধকে যুদ্ধের দিকে ঠেলা  যে গাধামি তা সে জানে। তাই এখানে চীনের ডিপ্লোমেসি ছিল আপোষে সীমানা চিহ্নিত করে নেয়ার দিকে।  সাথে যে নীতি চীন অনুসরণ করে তা বলার আগে এলএসি বা LAC কথাটা ভেঙ্গে নেই। ১৯৪৭ সালের স্বাধীন ভারত আর ১৯৪৯ সালের মাওয়ের বিপ্লবের পরের চীন, উভয়  পক্ষই সেসময় টের পায় যে তাদের অচিহ্নিত সীমানা আছে। আর তাই যার চোখে যে অঞ্চল স্ট্রাটেজিক্যালি গুরুত্বপুর্ণ মনে হয়েছে সে অংশ তার বলে সে দাবি টাঙ্গিয়েছে (মূল কারণ এগুলো বেশি অংশই জনবসতির এলাকা নয় ) – তার মানে সেটা ছিল মূলত আমার দখলে ওটা আছে বলে দাবিটাঙ্গানীর পর্যায় সেটা। এটাই পরবর্তিতে ডকুমেন্টে বা পরসপরের মধ্যে চিঠি চালাচালিতে এলএসি এই শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করা হত বা হয়েছিল।  যার আসল মানে হল, “ঐ অঞ্চল তার সেটা উভয় পক্ষ একমতে না মানলেও এখন ওটা তার দখলে” – এই অর্থে। কিন্তু ভারতের উগ্র জাতিবাদ যে ক্ষতিটা করেছে যে, পাবলিক পর্যায়ে এটাই তাদের আসল সীমানা এই ধারণা দিয়ে পাবলিকের মধ্যে উস্কানি তুলে গেছে। এখনও করছে যেটা সৌম্যের লেখাতেও বর্তমান।

    এখন সোজা প্রসঙ্গে ঢুকবো।  চীন ১৯৯১ সালের ওই আপোষে ভারত-চীন সীমান্ত চিহ্নিত করার প্রস্তাব থেকেই এই প্রথম সীমানার অনেকগুলো ভুখন্ড অংশের দাবি  সেটেলমেন্টে একমতে পৌছেছিল। এক্ষেত্রে চীন যে নীতি নিয়েছিল বলে মনে করা হয় তা হল, যেসব ভুখন্ড চীনের কাছে স্ট্রটেজিক্যালি তেমন গুরুত্বের নয় আর তাতে যদি ভারতের দাবি থাকে তবে তা ভারতের অনুকুলে চীন ছেড়ে দিয়েছে। একারণে এসময়েই এলএসি  কথাটা আরো মিনিংফুল ও চালু হয়েছিল। এভাবে ১৯৯৪-৯৬ প্রতিবছর নতুন নতুন ভুখন্ড ভারতের অনুকুলে চীন ছেড়ে দিয়েছিল।

    কিন্তু, ২০১৯ সালের ৫ আগষ্ট সংসদে ভারতীয় কনষ্টিটিউশনের ৩৭০ ধারা বাতিল বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ঘোষণা করা ও সারা কাশ্মীরই ভারতের বলে দাবি – এটা চীনকে অসন্তুষ্ট করেছিল মারাত্মকভাবে। কারণ, উপরে যেভাবে বললাম – “এভাবে ১৯৯৪-৯৬ প্রতিবছর নতুন নতুন ভুখন্ড ভারতের অনুকুলে চীন ছেড়ে দেয়া” – এভাবে আলাপ-আলোচনা করে কাশ্মীরের লাদাখ সীমান্তের  সীমানা বিতর্ক সমাধান মানে তো যে কিছু কিছু বিতর্কিত ভুখন্ড চীন ভারতকে ছেড়ে দিচ্ছে। চীন-ভারত আপোষ হয়ে গেছিল।  যার সোজা মানে ওসব  ভুখন্ড তাহলে অবশ্যই আগে চীনের ছিল – এটা ভারত চীনের কাছে স্বীকার করে নিয়েছিল!   তাহলে ভারত চীনের সাথে আপোষ আলোচনা করে ভুখন্ড নিবে আবার দাবিও করব যে সারা কাশ্মীরই ভারতের – এ তো স্ববিরোধী কথা; এদুই কথা তো একসাথে চলবে না! কিন্তু মোদি-অমিতের উগ্র জাতিবাদের উস্কানিতে এমন দাবি করেছিল! একারণেই চীন ১৯৬২ সালের আগের চিহ্নিত ও ভারতের দখলে থাকা চীনা সীমানায় ফিরে তা বার দখল করে নিয়েছিল। আর একারণেই চীন মোদিকে বাধ্য করেছিল যে চীন কোন ভুখন্ড নয়া দখল করতে নাই। আর সেকথাটাই – নিজের ইজ্জত বাঁচাতে – মোদি ভারতীয় সংসদে বলেছিল যে চীন কোন ভুখন্ড ফিরে সেবার (২০২০ সালে) দখল নেয় নাই। কারণ যদি বলে নিয়েছে তবে তাকে সে ভুখবন্ড উদ্ধারে তাকে যুদ্ধে যেতে হয়। আর এর চেয়েও বড় কথা ৫ আগষ্ট্রে সংসদে ঘোষণা করার কারণেই যে এইভারতের এই দুর্ভোগ তা প্রকাশ হয়ে পরত – সেটাই মোদি লুকাতে একাজ করেছিল।

    এককথায় বললে, সেই থেকে চীন-ভারত সীমানা বিষয় প্রসঙ্গে চীন আর কখনও মোদি সরকারের কোন কথাই মানে না, বিশ্বাস করে না। বরং সামরিক চাপের মধ্যেই রেখে চলেছে। আর মোদির নিজ ডেকে আনা এই দুর্ভোগ আর অপমান! আর একারণেই আবার চীন ‘অরুণাচল’   একইভাবে পুরাদমে দখলে রেখে দিল।
    এখন অবস্থা হল, ভারতের কোন সাংবাদিকের বলার সাহস নাই যে বলতে পারে, ২০১৯ সালের ৫ আগষ্টে সংসদে অমিত শাহের ঘোষণা সব সমস্যা অসন্তোষের মূল কারণ! এছাড়া এটাও সাংবাদিকদের মুরোদ নাই যে বলে, বুকের ছাতই দেখিয়ে বিতর্কিত সীমান্ত দখলের পক্ষে নির্বাচনের আগে সবসময় বিজেপির  উগ্র-দেশপ্রেমের কথা বলে ভোটারদেরকে জজবা-জোশ তুলে ভোটের বাক্স ভরাবার কৌশল – এটাই বিজেপি-আরএসএস লক্ষ্য ও কাজ। আর এটাই দেশ্বের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর কাজ ও ততপরতা! কাজের মোদির আমলের সরকার কখনও সীমান্ত সমস্তা মিটাতে আগ্রহী না, মিটাবে না! কিন্তু ভোটের বাক্সে তা অপ-ব্যবহার করবে – এই হল তাদের নীতি!
    অথচ সৌম্যও এসব কথা বলতে পারে না কারণ উলটা উগ্র জাতিবাদিরা তাকে দেশদ্রোহি বা দেশপ্রেম নাই বলে প্রপাগান্ডা করতে পারে – এই ভয় আছে। তাই সৌম্য বরং নিজের গা ভাসিয়ে আরেক প্রপাগান্ডায় যোগ দিয়েছে। বলছে  “… হয়তো শি জিন পিং ভারতে না আসার একটা কারণ খোঁজার চেষ্টা করছেন”।  অথচ ব্যাপারটা একেবারেই সত্যি না।

    ফ্যাক্টস হল,  প্রায় সাড়ে তিন মাস আগে গত ২০ মে এই সৌম্য-এর  আরেকটা রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল প্রথম আলোতেই। যার শিরোনাম হল, “কাশ্মীরে জি–২০ বৈঠকে আসছে না চীনও” । কারণ কি?
    কাশ্মীর বিতর্কিত ভুমি সেখানে ভারতের আন্তর্জাতিক সম্মেলনের একটা পর্ব (ট্যুরিজম) ডাকা মানে ঐ বিতর্কে জি-২০ অংশগ্রহণকারীদের দেশগুলো যেন তারা ওর ভুমি বিতর্কে ভারতের পক্ষ নিল – এমন ইঙ্গিত ভারত দাবি শুরু করতে পারে!  আর তাতে কাশ্মীরের ভুমিতে অংশ নেয়া দেশ অপ্রয়োজনে  সে বিতর্কে প্রবেশ করে ফেলবে।  স্বভাবতই এসব অসৎ ও কূটবুদ্ধির ভারতিয় ততপরতার সাথে চীন যুক্ত হতে চাইবে না। সৌম্য ঐ রিপোর্টে নিজেই লিখেছিল, “চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন গতকাল শুক্রবার এ খবর জানিয়ে বলেন, চীন ওই সম্মেলনে যোগ দেবে না। এর আগে চীন অরুণাচল প্রদেশের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনেও যোগ দেয়নি”। আর এখন একদম ভোলেবাবা সেজে সৌম্য উলটা চীনা প্রেসিডেন্ট সি এর উপর দোষ চাপিয়ে উগ্র জাতিবাদি  এক ভারতীয় দেশপ্রেমিক সাজতে চাইছে!!!

    কী অদ্ভুত এই মানসিকতা! এক অদ্ভুত উগ্রতার হিন্দুত্ববাদি শ্রেষ্ঠত্ব বোধ!
    ঘটনা হল, ভারতের এই উগ্র হিন্দুত্ববাদি দেশপ্রেম ভারতের সাথে অন্যদেশের কোন সীমান্ত বিরোধ থাকলে খুশি হয়! কেন?  কারণ এটাকে লড়কে লেঙ্গে ভাব-জোশ তুলে সেই দেশপ্রেমের আবেগকে বেচাবিক্রি করে হিন্দুত্ববাদিরা তা ভোটের বাক্স ভরাতে চায়। এই হল মোদির  বুকের ছাতি দেখানো দেশপ্রেমে; এটাই বিজেপি-আরএসএস এর রাজনীতি।  কিন্তু মজার কথা হল এরা সত্যি সত্যি বাস্তবে দেশের জন্য প্রাণ দেয়ার জন্য প্রস্তুত না, সেটা তাদের লক্ষ্যি নয়। একারণে, সত্যি প্রাণ দিবার অবস্থা তৈরি হলে তারা কেটে পড়ার তালে থাকে।    আর সীমানা-বিরোধে চীণের  সামরিক মারের খাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে দ্রুত আপোষ করে নেয়।  এনিয়ে ২০২১ সালের এমনই এক আপোষ নিয়ে আমার পুরানা লেখায়  এখানে দেখতে পারেন।  আমার আর্টিকেলের তথ্যের সোর্স ভারতের এক অবসরে যাওয়া লে জেনারেল পানাগ [Gen. Panag] । তিনি প্রায়ই পত্রিকায় কলাম লিখেন।  আর চীন-ভারত লাদাখে সুনির্দিষ্ট যে ভুখন্ড নিয়ে বিতর্ক সেটার নাম ‘প্যাংগং সো (Pangong Tso) ।  এটা চীন-ভারতের লাদাখ এলাকার একটা বিতর্কিত ভুখন্ড। সেখানে চীন আগে ভুখন্ড এলাকা ভারতের হাতে ছেড়ে দিলেও ২০২০ সালে চীনেরর দাবিকৃত পুরানা ১৯৫৯ সালের সীমানা অনুসারে ভারতের হাতে ছেড়ে দেয়া এলাকা পুনঃদখল করে বসে।  আর চীনের সেই দাবি অনুসারে সেটা মেনেই সেবার ২০২১ সালে মোদি চীনের দাবি আপোষে মেনে  নেওয়ার শর্তে উভয় পক্ষ সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। সেই প্রসঙ্গ নিয়েই জেনারেল পানাগ বলছেন, মোদির ভারত এটা মেনে নিয়েছে কারণ, ভারতের সামরিক যোগ্যতা-সক্ষমতা নাই এই পরিস্থিতিকে বদলে দিতে [  because India has no military capability to alter the situation….it is “good for the long term peace”]। তাহলে মোদি দেশপ্রেমের জিগির তুলে চীনের সাথে লাগতে গেছিলেন কেন? কারণ, ভোটের বাক্সের হিসাব। দেশপ্রেমের জিগির জোশ বেচে ক্ষমতায় আসীন হবেন মোদি! কিন্তু ঘটে গেছিল উলটা…।।

    সৌম্য এসব ঘটনার কী ব্যাখ্যা দিবেন?  আসলে সবই জানেন তারা কারণ জেনারেল পানাগ এর ঐ বক্তব্য টাইমস অব ইন্ডিয়ার ইকোনমিক টাইমসে ছাপা হয়েছিল। একটা লোক টু শব্দ করে নাই তাতে।  অর্থাৎ এটা জানা সত্বেও উগ্র জাতিবাদি হিন্দুত্বের দেশপ্রেমের তলেই সৌম্যসহ সকলেই আশ্রয় নিবেন। আর এখন সব দোষ চীন বা অন্য পড়শি রাষ্ট্রের বলে দায় চাপাবেন। অসততার সাথে হিন্দুত্ববাদের এই খেলা আর কতদিন?
    ইতোমধ্যে ভারতের মিডিয়া জগতে একই ভাবে মোদি-ই সত্য এবং সহি বলে জয়গান করে মোদির থেকে ফান্ড হাতানোর এক ধরণের সাংবাদিকতাও শুরু হয়েছে। একাজে নামকরা “দ্যাপ্রিন্ট” গ্রুপের সম্পাদক শেখর গুপ্তা অগ্রগামী। তিনি বিতর্কিত কাশ্মীরে জি-২০ এর ট্যুরিজম সেশন অনুষ্ঠানের যে স্থান ফেলেছেন তাই এটার সমর্থনে এটা দেশপ্রেমিক কাজ বলে সম্পাদকীয় কলাম লিখেছেন। দাবি করেছেন এতে চীনসহ কিছু ইসলামি দেশ যোগ দিতে অস্বীকার করলেও সেটা ভারতের আমলে নেওয়ার কিছু নাই। কারণ মোট অংশগ্রহণকারি দেশের এটা মাত্র ২০% দেশের অনুপস্থিতি!!! বলাই বাহুল্য এমন কথা বিশ্বাস করা কোন সুস্থ মানুষ বলে না তার কাজ না। তবে, বলে কোন ফান্ডের ইশারায়!

     

     

     

     

  • গ্লোবাল অর্ডার কী

    গ্লোবাল অর্ডার কী
    গৌতম দাস
    ৩০ আগষ্ট ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4SG

     

                      Locking China Out of the Global Order Could Backfire

    এবারের ব্রিকস এটা ১৫তম সম্মেলন; মানে হল এটা ২০০৯ সালে প্রথম তার জন্ম সম্মেলন করে যাত্রা শুরু করেছিল। গত ২৪ আগষ্ট এর ১৫তম সম্মেলন দক্ষিণ আফ্রিকায় শেষ হল। কিন্তু এই প্রথম এই সম্মেলন দুনিয়াটাকে ঝাঁকি দিয়েছে – এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় সবচেয়ে বেশি। আর ততধিক বেশি করে পশ্চিমা দুনিয়া (ইউরোপ-আমেরিকা) প্রকাশ্যে নিশ্চুপ কিন্তু তাদের সবগুলো ইন্দ্রিয়ই খাঁড়া; কি জানি হচ্ছে সেদিকে কান খাড়া। এর আগে কোন বিষয় নিয়েই এত করে সবার এন্টেনা খাঁড়া করতে তাদের দেখা যায় নাই। অন্যদিকে আবার, এমনকি আমাদের মত দেশ থেকে যারা গত ২০-২২ বছরের সময়কালে আমেরিকাসহ পশ্চিনা দেশে গিয়ে থাকবার রেসিডেন্স পারমিট যোগাড় করে নিয়েছে এরাও (মানে ব্ল্যাক-ব্রাউনেরা) সাদাদের সাথে মিলে এই প্রথম তাদের সব ইন্দ্রিয় খাড়া করেছে। অথচ এরা দুচার বছর আগেও যেমন ধরেন ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে প্রবল তর্ক করেছে যেন তারা পুর্ণমাত্রায় পশ্চিমা অরিজিনের নাগরিক হয়ে গেছে ফলে তাদের  স্বার্থও পশ্চিমারাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে এলাইনড, এক লাইনে। তাই তাদের স্বপ্ন-কামনার আমেরিকা বা পশ্চিম কত মহান, কত স্টেবল কত সম্ভাবনাময় আর তা তাদের স্বপ্ন-কল্পনা পূরণের জন্য পারফেক্ট!  ফলে চীন-রাশিয়া বা জাতিসংঘের ভাষার গ্লোবাল সাউথ [global south] – এরা তাদের স্বপ্নকল্পনা পুরণের পথে বাধা হয়ে জামা টেনে ধরছে যেন – এই মনোভাব দেখছিলাম আমরা। এরাও কানখাড়া! এমন পরিস্থিতিতে এই পটভুমিটা মাথায় রেখে এবার যদি ব্রিকস এর ১৫তম সম্মেলনের দিকে তাকাই তাহলে বলতে হয়, এবারের সম্মেলন সারা দুনিয়াকে এমন এক মজার জায়গায় নিয়ে ফেলে দিয়েছে; আর যেন বলছে এখন নতুন করে হাটা শিক্ষা কর!! আগের জানাশুনায় আর চলবে না, কাজ হবে না। তাই নতুন করে আগে হাঁটতে শিখে নে তাড়াতাড়ি!  বলতে চাচ্ছি, গত প্রায় আশি বছরের  আমেরিকান নেতৃত্বের যে পরিচিত দুনিয়া – সেটায় ফাটল ধরেছে। আগের মত থাকছে না। তাই অনেক নয়া জানাশুনা, পড়াশুনা  লাগবে!   এটাই হল, এবারের ব্রিকস [BRICS] সম্মেলনের নিরবে দুনিয়ার সবার বিশেষত আমাদের মত দেশগুলোসহ সবার কাছে ম্যাসেজ!

    ব্রিকস জন্ম নিয়েছিল সেই ২০০৯ সালে, কিন্তু কেন কী পরিস্থিতিতে কি দরকারে এর জন্ম তা বাংলাদেশের একাদেমিক বা মিডিয়া জগত এখনও বেখবর আছে। এর মূল কারণ, ব্রিকস জিনিষটা কী অথবা কেন সেটাই এখনও পুরাপুরিই স্পষ্ট হয় নাই আমাদের দেশের ‘জানার’ জগতে।  বিশেষ করে এই সম্মেলন নিয়ে বাংলাদেশের বাংলা মিডিয়াগুলোর রিপোর্ট দেখলে তা বুঝা যায়। তবে ইংরাজি মিডিয়া গুলো একটু ব্যতিক্রম। কারণ ইংরাজি রিপোর্ট এর সুবিধা হল কপি-পেস্ট বা অনুবাদ করে তারা কোনভাবে চালিয়ে দিতে পারেন। যদিও তাতেও তাদের দুর্বলতাও অপ্রকাশ্য নয়)। কারণ, সবচেয়ে মুখ্য প্রশ্ন, কেউ জানেই না বলতে পারছে না বাংলাদেশ কেন ব্রিকস থেকে বাদ??? গত ২৪ আগষ্ট (ব্রিকস সম্মেলনের শেষ দিন) পর্যন্ত সব রিপোর্টের এই এক দশায়। এমনকি ২৪ আগষ্ট রাত বারোটা মানে ২৫ আগষ্ট তারিখের শুরুতে যাদের হুশ হয়েছে জেনেছে তারাও ঘটনা বুঝে উঠে এরপর সেই ভিত্তিতে রিপোর্টে হাজির করতে গিয়ে কেউই ২৫ আগষ্ট সন্ধ্যার আগে পারে নাই। বিশেষ করে সে খবরটা কোথায় আছে, আবার তা পেলেও কী এঙ্গেলে তা দেখতে হবে এটাই তাদেরকে বেশি ভুগিয়েছে। কারণ রয়টার্স কী-কোথায় এটা তাদের অজানা নয় – হলেও সুনির্দিষ্ট হওয়া সহজ ছিল না।  তাতে  এরপরেও দেখা যায় কোন কোন মিডিয়া হাল ছেড়ে দিয়েছে। তাই তারা ২৫ তারিখে আর ব্রিকস নিয়ে হাজিরই হয় নাই। এরা যে হাল ছেড়ে দিয়েছে তা বুঝা যায় তারা এবার ব্রিকস নিয়ে মহা মাতবর তাদের কূটনীতিক সেকশন কে ক্ষমা দিয়ে দিয়েছে। আর  ২৫ তারিখ থেকে তাদের অর্থনীতি সেকশন থেকে ব্রিকস ইস্যুতে কিছু খবর ছেপেছে। এজন্যই বাংলাদেশে সবার রিপোর্টই তাই কমবেশি হালকার উপর ঝাপসায় মারা ধরণের বক্তব্য জুড়ে দেয়া।

    আমরা নতুন কোন কিছু দেখলে বা একে চিনতে চেষ্টা করলে বা কাউকে চিনাতে গিয়ে, – ঐ নতুনের সাথে কিছু তুলনীয় এমন কিছুর সাথে তুলনা করেই  নয়া ধারণাটা পরিচিত করাতে যাই। তাতে  যতটা সমতুল্য যতটা কাছের সদৃশ্য এমন কিছু পাওয়া যায় যা আবার ইতোমধ্যেই সমাজে অনেক পরিচিত থাকে; তবেই নতুন কাউকে এর পরিচয় দেয়া সহজ হয়। মুলকথা একমাত্র কাছাকাছিও  জানা কিছুর সাথে তুলনা করেই নয়া বিষয়কে মানুষ পরিচিত করাি আমরা।
    কিন্তু ব্রিকস এর বেলায় একে চিনাবো কী করে?  আর এর কাছাকাছি ঘটনা ফেনোমেনাই বা কী – তাই তো আমাদের অনেকের জানা নাই! মূলস্মস্যাটা ছিল আসলে এখানে!

    ব্রিকস এর বেলায় একে চিনাবো কী করেঃ
    আমি আগে বহুবার বলেছি ব্রিকস যা হতে যায় করতে চায় সেই উদ্দেশ্য হল – আমেরিকার নেতৃত্বে যে গ্লোবাল অর্ডারটা কায়েম আছে এখনও (যেটাকে বেশির ভাগই  আমরা ভুল করে একে আমেরিকান “পরাশক্তি” বলে বুঝি বা ডাকি) এই গ্লোবাল অর্ডারের মধ্যে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান থাকে বা আছে।
    ঠিক যেমন একটা দেশ-রাষ্ট্রে  ‘স্টেট ইন্সটিটিউশন’ [রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান] থাকে এটা তেমনই। আসলে  (গ্লোবাল অর্ডারের জায়গায়) “লোকাল অর্ডার” বললে সেটাই দেশ বা রাষ্ট্র ধারণা হয়ে যায়।  কারণ, রাষ্ট্র মানে সেটা নিজের বা স্থানীয় এই অর্থে রাষ্ট্রকে গ্লোবাল অর্ডারের সাথে তুলনায় লোকাল অর্ডার বলেছি। আর অর্ডার মানে মূলত নিয়ম-শৃঙ্খলায়  সাজানো বা বিন্যাস্ত করা।  তাই লোকাল অর্ডার বলতে বুঝা যেতে পারে নিজস্ব রাষ্ট্রের নিয়ম-শৃঙ্খলা  মানে, বুঝতে হবে তা একটা দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা বা রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে।  তবে লোকাল বলাটা অবশ্যই গ্লোবাল এই ধারণার সাপেক্ষে, এটাও মনে রাখতে হবে। কারণ লোকাল শব্দটা নানান অর্থের ব্যবহার হতে পারে। আর অর্ডার [order], এই অর্ডার বলতে অনেক সময় নির্দেশ বা হুকুম দেয়া অর্থ হলেও এখানে অর্ডার কথাটার মানে নিয়ম-আইন-শৃঙ্খলাময় একটা  সিস্টেম [system] যা বাংলায় ব্যবস্থা। যে অর্থে পুলিশ-কে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বলা হয়।
    ঠিক সেরকম ১৯৪৫ সাল থেকে দুনিয়া আমেরিকার নেতৃত্বে এক গ্লোবাল অর্ডার (সেবারই প্রথম) চালু হয়েছিল যেন, তা এক ‘গ্লোবাল রাষ্ট্র ব্যবস্থা’। আর এটাকেই “গ্লোবাল অর্ডার” বলছি। তবে শুধু আমি না, বুঝমান একাদেমিকেদের দেয়া ভাষা এটা; ফলে তাদের থেকে নেয়া এই শব্দ ও এর ব্যবহার। আবার রাষ্ট্রে যেমন অনেক ‘স্টেট ইন্সটিটিউশন’ [রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান] থাকে  যেমন সংসদ, নির্বাহি বিভাগ (মানে প্রধানমন্ত্রীর অফিস; আর যার অন্তর্গত থাকে এডমিনিস্ট্রেশন, অর্থ বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা ইত্যাদি মন্ত্রণালয়-বিভাগ ) আর বিচার বিভাগ ইত্যাদিতে একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় তেমন, গ্লোবাল অর্ডার এর বেলায় সেটাও কিছু “গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের” উপর দাঁড়িয়ে থাকে। এমন গ্লোবাল রাজনৌতিক প্রতিষ্ঠানটা হল জাতিসংঘ আর গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক । মূলত এইদুটো দিয়েই ১৯৪৫ সালে গ্লোবাল অর্ডার খাঁড়া করা; তা  যাত্রা শুরু হয়েছিল । তবে এগুলোকে “গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের” এর জায়গায় যেমন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর বেলায় এগুলো মাল্টিলেটারাল বডিও [multilateral body] বলা হয়। কারণ,  এখানে  মাল্টিলেটারাল বলতে তা ‘বহুরাষ্ট্রীয়’ ফলে তা  ‘বহুপক্ষীয়’ এমন বুঝানো হয়। তবে মাল্টিলেটারাল বলতে আক্ষরিক বাংলা অর্থ হল,  বহু-বাহুবিশিষ্ট। পরবর্তিতে জাতিসংঘ বা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ছাড়াও ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন (WTO) অথবা একালে পরিবেশ প্রসঙ্গে [ UNEP], হিউম্যান রাইট [UNHRC] ইত্যাদি নানান মুখ্য গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়ে নেয়া হয়েছে। আর এমন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো মিলিয়েই সমন্বয় করেই একটা “গ্লোবাল অর্ডার”  বা বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হয়ে আছে।  তবে সাবধান আমি গ্লোবাল অর্ডার [Global order] বলেছি কোন জিও [Geo-Order] বলি নাই। এমনকি জিও-পলিটিক্স [Geo-politics] -ও বলি নাই। একালে মানুষ যখন একটা কিছুকে বুঝতে পারে না বা ব্যাখ্যা করতে পারে না তখন এটাকে বলে জিও-পলিটিক্স  বা ভূরাজনীতি। তাই কেউ যখন বলবে, “সবই ভুরাজনীতির খেলা” এর মানে হল, বক্তা বুঝতে পারছেন না এটা কিভাবে ব্যাখ্যা করে বলবেন!! এটাই বুঝতে হবে!! যার মানে হল –  যা “আমি যা জানি না, বুঝি না” সেটাই ভুরাজনীতি।

    কিন্তু আমরা ‘গ্লোবাল অর্ডার’ ধারণাটা – সেটা বহুল প্রচলিতভাবে জানি নাই কেন?
    মূল কারণ কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা; যার আদিগুরু সেকালের (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯৪৫) সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট, প্রধান কমিউনিস্ট নেতা জোসেফ স্তালিন। যিনি পরে মারা যান ১৯৫৩ সালে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রধান গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠেছিল আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। ঐ যুদ্ধে ১৯৪২ সাল থেকে হিটলারের অক্ষশক্তি [Axis powers] বিরোধি মিত্রশক্তি [Allied powers] – এভাবে যুদ্ধের দু-পক্ষ; আর হিটলারবিরোধী মিত্রপক্ষের মূল নেতা ছিলেন রুজভেল্ট।  তিনিই মিত্রশক্তি নামে জোটবদ্ধতার প্রথম উদ্যোক্তা, মিত্রশক্তির সকলের হয়ে যুদ্ধের মূল মোটা খরচগুলোর একা বহনকারি দেশ, সারা পশ্চিম ইউরোপ মানে যারা সেকালের সারা দুনিয়ার কলোনি দখলদার শক্তি কিন্তু সকলেই এরা যুদ্ধের ব্যয় যোগাতে গিয়ে অর্থ সঙ্কটে দেঊলিয়া অবস্থায় – এঅবস্থায় এদের সকলকেই নিজ অধীনে আনার বা  ঐ যুদ্ধে বিজয়ী হলে শেষে তারা সকলেই কলোনি দখল ত্যাগ করতবে এই শর্তে বাধ্য করে রুজভেল্ট এদের সবার সাথে চুক্তি করেছিল। এভাবে  বাগে আনা ইত্যাদির মূল কারিগর হলে আমেরিকার নেতা রুজভেল্ট। তাই এই যুদ্ধে রুজভেল্টের প্রধান নেতা হিশাবে উত্থান এভাবেই, এসব কারণেই।
    পশ্চিম ইউরোপ মানে যারা কলোনিদখলদার ব্যবসায়ী এদের দেশ সেটা আর এরা, যুদ্ধের ব্যয় যোগাতে বাধ্য হয়ে রুজভেল্টকে নেতা মেনে নিয়েছিল তা বুঝা গেলেও সোভিয়েত ইউনিয়নও কেন এর ভিতরে একইভাবে ঢুকে গেছিল?  কারণ, হিটলারের হাত থেকে বাঁচতে চাওয়া স্তালিন যিনি দেখতেছেন হিটলারবিরোধী একটা জোট হচ্ছে আর আবার সেই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট যুদ্ধের মুখ্য খরচগুলো বইবেন – কাজেই  হিটলারের হাত থেকে বাঁচতে এত ভাল সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেন নাই। তিনিও তাই রুজভেল্টের নেতৃত্বের মিত্রশক্তিতে যোগ দিতে দেরি করেন নাই। আসলে, মূল পলিটিক্যাল চুক্তি মানে যুদ্ধ শেষে আমরা একটা জাতিসংঘ গড়ব – এই চুক্তিতেই ভিত্তিমূলক সবকথা লেখা ছিল যা ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যা এখন ইতিহাসে “জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা”
    এমনকি যুদ্ধ শেষে দেশগুলোর পুনর্গঠনের অর্থও ঋণ হিশাবে দিয়েছিল আমেরিকা। বিশ্বব্যাংকের জন্মের পরে এই প্রতিষ্ঠানে মুখ্য ততপরতা ছিল ইউরোপের পুনঃর্গঠন। আর বিশ্বব্যাংক[WB] যার পুরা নাম হল ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংক ফর রিকনষ্ট্রাকশন এন্ড ডেভলবমেন্ট [International Bank for Reconstruction and Development (IBRD)] –  এই নামের মধ্যে রিকনষ্ট্রাকশন [বা বাংলায়] পুনর্গঠন এই শব্দটাই বিশ্বব্যাংকের জন্ম ও শুরুর কর্মের ইতিহাস এখনও বয়ে বেড়াচ্ছে। কারণ, বিশ্বব্যাংক যেখন আমাদের মত দেশে দেশে অবকাঠামো গড়তে নামমাত্র সুদে ঋণ দেয় – সেই কাজটা তো পুনর্গঠন নয়। মানে অবকাঠামো (কোন ব্রিজ বা রাস্তা অথবা কারখানা) আগে  ছিল যুদ্ধে বা কোন কারণে ভেঙ্গে গেছে এমন নয়, বরং এই প্রথম বারের মত গঠন। তা সত্বেও বিশ্বব্যাংক-কে তার জন্মের দাগ পুনর্গঠন বা রিকনষ্টাকশন শব্দটা নামের মধ্যে বয়ে বেড়াচ্ছে।
    স্তালিন কত রুজভেল্টের ঘনিষ্ট ছিলেন, ১৯৪২-৪৫ এই তিন বছর তা বুঝার একটা ভাল উপায় হল, এই তিন বছরে যত দেশ রুজভেল্ট ভ্রমন করেছেন সেখানে তার দুই বগলে সঙ্গে থাকতেন দুই নেতা স্তালিন আর চার্চিল (সেকালের বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী)। কিন্তু যুদ্ধ শেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন – এই যুদ্ধে রুজভেল্টের  এমন নির্ধারক অবদান যতটা কম পারা যায় এমনভাবে সোভিয়েত ইতিহাসে ছাটাই করে দেয়া হয়। যাতে মনে হয়, স্তালিনের একক কারিশমাতেই তিনি হিটলারের হাত থেকে সোভিয়েতকে বাঁচিয়েছেন। [আমাদের মত দেশগুলোর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা কেবল লিখিত সোভিয়েত-রুশ ইতিহাসই, সহি বলে পড়ে থাকেন। আমার বহু সিনিয়র (কমিউনিস্ট)-কে এমন ইতিহাসই বলতে শুনেছি।  এছাড়া তাদের আরেকটা রুল হল,   যা কিছু লাল বইয়ে তাই তাদের জন্য সহি (খাঁটি সত্য) ও শ্রেণীর ইতিহাস। আর লালবইয়ের বাইরের সব “বুর্জোয়া” বা “সাম্রাজ্যবাদের” ইতিহাস – মানে মিথ্যা এই বিবেচনা।]

    পরবর্তিতে বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইতিহাসের এভাবে সাফল্যের ব্যাখ্যাটাই জোরদার হয়ে দাড়ায় ও আরেক সাফাই দেওয়ার সুযোগ পেয়ে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। রুজভেল্ট মারা যান ১৯৪৫ সালের আগষ্টে। আর ১৯৫৩ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে নয়া প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার এর আমেরিকা সেটা এবার আর আগের মত “গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান” গড়া অথবা গ্লোবাল জনগণের জন্য কাজ ও ইমেজ গড়ার যে আমেরিকা সেটা  বদলে হয়ে যায় এক লুটেরা স্বার্থের আমেরিকা। যা শুরু হয়েছিল সিআইএ দল পাঠিয়ে ইরান দখল দিয়ে। তখন থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম আমেরিকাকে “সাম্রাজ্যবাদ” বলে খেতাব দেয় বা ডাকা শুরু করেছিল।  অথচ আজ দুনিয়ার খুব কম কমিউনিস্টই বলতে পারবে কবে থেকে কমিউনিস্ট চোখে আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদ হয়েছে? বরং প্রায় শতভাগই সম্ভবত বলবে জন্ম থেকে!!! ্ওযডী সেটা আবার কার জন্ম সোভিয়েত ইউনিয়ন নাকি আমেরিকা!!! সে আরেক ঝামেলা!!!   আর এই সুযোগেই সোভিয়েত ইতিহাস থেকে বিশ্বযুদ্ধের নির্ধারক আমেরিকা বা প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকেই মুছে ফেলার সুযোগ পোক্ত হয়ে নিয়েছিল!

    আবার একটু পিছনে যাই, ওদিকে (১৯৪২-৪৫ এই সময়কালে) মিত্রশক্তির নেতা রুজভেল্টের দেয়া সুবিধা স্তালিন নিতে গিয়ে  আমেরিকার প্রস্তাবিত গ্লোবাল অর্ডার গড়ার পরিকল্পনায় সামিল হতে স্তালিন বাধ্য হয়েছিলেন, তা বলা যায়। সেই সাথে ১৯৪৪ সালের দিকে রুজভেল্ট প্রথম তার জাতিসংঘ ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়ার ধারণা স্তালিনসহ সেকালের প্রধান মিত্রদের কাছে হাজির করেছিলেন। ভেটো সদস্যপদ রাখার ব্যবস্থা চালু করে স্তালিনের মূল সব আপত্তি সামলিয়েছিলেন রুজভেল্ট। এরপরে এবার স্তালিনকে ঘনিষ্টভাবে পেয়ে নিজ “গ্লোবাল অর্ডার” গড়ার স্বপ্ন-পরিকল্পনায় স্তালিনকে সামিল করে নিয়েছিলেন।  এতে স্তালিন একসাথে রুজভেল্টের সাথে মিলে  গ্লোবাল পলিটিক্যাল প্রতিষ্ঠান জাতিসংঘ গড়তে রাজি তো হয়েছিলেনই।  জাতিসংঘ গড়ে গড়ে উঠতে পেরেছিল। এমনকি গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়তে ১৯৪৪ সালে এর যে জন্মসভা বসেছিল তাতে প্রতিনিধিও পাঠিয়েছিলেন। সেই প্রতিনিধি ২২দিন ব্যাপী লাগাতর চলা জন্মসভায় হাজির থাকলেও এরপর প্রত্যেক রাষ্ট্রের চাঁদা পরিশোধ করা সাপেক্ষে সদস্যপদ গ্রহণের প্রসঙ্গ আসা ও সময় থেকে সোভিয়েত প্রতিনিধি অনুপস্থিত হয়ে যায়। সেই থেকে গ্লোবাল অর্ডার তৈরির উদ্যোগের সাথে কার্যত স্তালিন থেকেও না-থাকা হয়ে যায় – জাতিসংঘ গড়তে হ্যা কিন্তু  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়তে না – এভাবে। কিন্তু এনিয়ে সোভিয়েত পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে  কোন আপত্তি অথবা উচ্চবাচ্য কিছু শুনে নাই।  কেন স্তালিন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক না গড়ে ফিরে এলেন – এনিয়ে কোন আর্টিকেল লেখা বা এটা আমেরিকানদের খারাপ কাজ এমন কোন বক্তব্য আনা এমন কোনকিছুই করা বা বলা হইয়েছে জানা যায় না। এমনকি ১৯৫৩ সালে প্রথম রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় এলে আইসেনহাওয়ার – তিনি আমেরিকার ভোল বা ইমেজ বদলানো ততপরতা শুরু করেছিলেন যেটা থেকে সোভিয়েত প্রতিক্রিয়া হল যে আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদ। কিন্তু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সম্পর্কে কোন ভাল-মন্দ মুল্যায়ন বা নাম নেয়া ইত্যাদি সোভিয়েত সরকারের দিক থেকে হয়েছে, নেতারা কখনও করেছেন এমন কিছু জানা যায় না।
    সব মিলিয়ে এসবে রুজভেল্ট-স্তালিন মিলে যে অভিমুখ একটা গ্লোবাল অর্ডার চালু করার যতটুকু একসাথে করার যাচ্ছিল বা পরিকল্পনা ছিল তা ১৯৫৩ সালের পরে শুকিয়ে মারা যায়, কোন চিহ্নই থাকে নাই। পরের সোভিয়েত নেতৃত্ব নিকিতা ক্রুশ্চেভ থেকে ব্রেজনেভ বা গর্বাচেভ পর্যন্ত কেউ কখনও নির্দিষ্ট করে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক নিয়ে কিছু বলেছেন জানা যায় না। তবে আমেরিকা ওটা “পুঁজিবাদী সমাজ বা ব্যবস্থা” ফলে যেন তা তাদের জন্য অগ্রহণযোগ্য ও পাপকাজ এমন অনুমান থেকে কথা বলা, খারাপ চোখে দেখানো এটা বজায় ছিল সব সময়েই। কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিশাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সমালোচনা জানা যায় না।

    কিন্তু কেন এমন ছিল?  আর এর চেয়ে বড় কথা যে সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রগুলোকে (মোট প্রায় ২৫-৩০ রাষ্ট্র) আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্য করে না  নেওয়াতে বা তারা না হওয়াতেই কী আমেরিকান নেতৃত্বে পশ্চিম  এরা কী একটা গ্লোবাল অর্ডার খাড়া করতে ব্যার্থ হয়েছিল বা থমকে দাড়িয়ে গেছিল? সোজা জবাব হল, একেবারেই না।  বরং গ্লোবাল অর্ডার  নিজের মত করে বিকশি হয়েছে আর এখন অনেক ডালপালা গজিয়ে আরো বিস্তৃত হয়েছে। তবে অবশ্যই এই বিকাশ আদর্শ নয়, দোষত্রুটি আর সীমাবদ্ধতা ও খামতিও প্রচুর। কিন্তু সাফল্যও ফেলনা নয়।
    কিন্তু মজার কথাটা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে (১৯৯১) গেলে তা থেকে আলাদা হওয়া ১৫ রাষ্ট্র আর এই সোভিয়েতের প্রভাবাধীন বা বাফার রাষ্ট্র হিশাবে যেমন পোল্যান্ড, রোমালিয়া ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ২৫-৩০ রাষ্ট্র ছিল যারা সকলে ঐ ১৯৯২ সালেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্যপদ নিয়ে নিয়েছিল। এখন ছোটখাট পাঁচটা দেশ বাদে দুনিয়ার সকলেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্য। মানে ১৯৩ রাষ্ট্রের জাতিসংঘের বিপ্রীতে আইএমএফ সদস্য ১৮৮, তাই।  এখনকার দুনিয়া গ্লোবাল অর্ডার বানানোর দিক থেকে অনেকটাই অগ্রসর হয়ে গেছে। তবে আগেই বলেছি অবশ্যই দোষত্রুটি প্রচুর। সেসব সংস্কার করে যেতেই হবে প্রত্যেক কালের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যতটা একে এলাও করে।

    কিন্তু আমাদের মত দেশের বেলায়, তারা ১৯৯১ সালের আগের সোভিয়েত অনুসারি কমিউনিস্ট হয়েই থেকে গেছেন। এরা নিজেদের জন্য আর আমাদের মত দেশের একাদেমিক জগতে তাদের প্রভাবের কারণে এরা না নিজেরা কিছু জেনেছে না কাউকে জানতে দিয়েছে যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ঠিক কী ধরণের প্রতিষ্ঠান। কারণ, তাদের আপত্তি এক জায়গাতেই যে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উতপাদন না হওয়া – মানে তাদের সমাজতন্ত্র না হওয়া মানেই এগুলো পাপের ফসল তাই অগ্রহণযোগ্য!!! এই হলো তাদের মূলকথা।
    এতে তাদের আপত্তিটা দাড়িয়েছে এমন যদি কোন আওয়ামীলীগ নেতাকে জিজ্ঞাসা করা হয়  যে বিএনপি কে নিয়ে তোমাদের আপত্তিটা ঠিক কী? আর তাতে যদি লীগ নেতা জবাব দেয় যে ওরা আওয়ামীলীগ নয় এবং  ওরা আওয়ামীলীগ করে না – তাহলে এটা যেমন জবাব হবে এটা তাই!!

    তো সে যাই হোক তাদের আপত্তি তাদের সাথে থাকুক সেটা কোনই সমস্যা নয়।
    কিন্তু তাদের প্রভাব আমাদের মত দেশের একাদেমিক জগতে গ্লোবাল সিস্টেম বা অর্ডারটা কী এসম্পর্কে বেখবর করে রেখে দিয়েছে। এদিকে আমেরিকার নেতৃত্বে এক অর্ডারের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থা মানে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এটা তো বহাল হয়ে এর বয়স  প্রায় আশি বছর হয়ে গেছে। আর ওদিকে রাইজিং চীন যে অন্তত অর্থনৈতিক দিক থেকে নেতৃত্ব নিতে উঠে চলেছে (যদিও আরো সময় লাগবে)। ফলে নেতৃত্বের পালাবদলটাই আসন্ন হয়ে উঠেছে আর তাতে চীনা নেতৃত্বের  নতুন গ্লোবাল (যা আপাতত কেবল) অর্থনৈতিক অর্ডারটা কেমন হতে পারে – এটা নিয়ে লড়াই ঝগড়ায় তা কোথায় গিয়ে থিতু হবে – এরই সময়কাল চলছে। এখন। একথা শুনে মনে করার কারণ নাই যে এটা কেবল চীন-আমেরিকার লড়াই। তা একেবারেই নয়।
    বরং উভয় পক্ষই বাংলাদেশকে নিজের যেদিকে সুবিধা মনে হয় সেদিকে টেনে নিয়ে যেতে চাইবে,চাচ্ছে। কিন্তু আমরা কোন্দিকে যাব বা এই তানাতানি কিভাবে সামলাবো এর প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে গ্লোবাল অর্ডার জিনিষটা কী তাই তো বুঝিনাই!! গ্লোবাল শুধু আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরণের প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক যে গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার এটাও তো বুঝি নাই!! কমিউনিস্ট জ্ঞানিদের তো আরো ধারণা নাই। তাহলে? বাংলাদেশের একাদিমিক জগত বা সুনির্দিষ্ট করে আই আর বা অর্থনীতি কেউই তৈরি নয় – প্রয়োজনটাই বুঝে সারতে পারে নাই অবস্থা!!!!
    তাদের আল টপকা কথা হল, হাসিনা চাইলে ব্রিকসে যোগ দিতে পারে!!! যেন বিরাট এক জ্ঞানের কথা বলেছে!!

    আমরা নিজের জন্য কী করতে পারিঃ
    এদিকে গ্লোবাল পালাবদলে এতদিনের আমেরিকান নেতৃত্বের অবস্থানে চীন উঠে আসতে চলেছে। অথচ কমিউনিস্টেরা ১৯৪৫ সালে দুনিয়ায় কী গুরুত্বপুর্ণ বদলে এসেছে তা খেয়াল করে নাই। শুধু তাই না, দেশের একাদেমিক জগতকেও এটা খেয়াল করা বা বুঝার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নেতি ধারণাই দিয়েছে।  তাই  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কী ধরণের প্রতিষ্ঠান ও কেন, তা নিজেও জানে নাই, অন্যদেরও জানা হয় নাই। তাহলে এখন যখন প্রায় আশি বছর পরে আমেরিকান নেতৃত্বের বিকল্প হিশাবে চীনের নেতৃত্বের ব্রিকস খাড়া হতে চলেছে আর এরই প্রথম অর্থপুর্ণ কিছু পদক্ষেপ চীন নিয়ে ফেলেছে তখন এই ঘটনা-ফেনোমেনা নিয়ে আমাদের একাদেমিক বা কমিউনিস্টেরা কীভাবে আর কথা বলবে, যেটা সে আগে খেয়ালই করে নাই, প্রস্তুতি নেয় নাই?
    এজন্যই বলেছি আমেরিকান নেতৃত্বের যে পরিচিত দুনিয়া – সেখানটায় ফাটল ধরেছে। তা আগের মত থাকছে না। তাই অনেক নয়া জানাশুনা, পড়াশুনা  লাগবে!   এটাই হল, এবারের ব্রিকস [BRICS] সম্মেলনের নিরবে দুনিয়ার সবার বিশেষত আমাদের মত দেশগুলোসহ সবার কাছে ম্যাসেজ!
    ফলে কী কী ও কেমন ধরণের বদল আসন্ন তাতে সম্ভাব্য প্রভাবগুলো কী কী হতে পারে সেসব বুঝাবুঝির তরিকা জানতে হবে, পদ্ধতি জানতে হবে – দেখার নতুন অভ্যাস চর্চা লাগবে ইত্যাদি…। তবে সাবধান এটা ১৯৪৫ সালের মত রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নেতৃত্বে বদল যেমন ঘটেছিল এবার আগে থেকেই পরিস্কার যে এটা কেবল চীনের নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতিক এক অর্ডার আসতে পারে মাত্র।  ফলে ডলারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য কমে যাবে হয়ত কিন্তু নাই হবে না।  আবার গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতৃত্ব সহসাই আমেরিকার হাত থেকে যাচ্ছে না। আবার রাজনী আর  অর্থনৈতিক গ্লোবাল নেতৃত্ব যদি আলাদা হয় তবে কেমন ফিট করবে্‌, কার্যকরভাবে চলতে পারবে কিনা সেটা এক বিরাট প্রশ্ন যার জবাব অজানা!
    সবচেয়ে বড়কথা এই পালাবদল যদি আপোষে না হয়ে যুদ্ধ লেগে যায় বা এড়াতে না পারে মানে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ফয়সালার দিকে চলে যায় তাহলে কী হবে! আর এতে সব পক্ষের জন্যই তা মারাত্মক ক্ষতি বয়ে আনবে সন্দেহ নাই।  এর একটা চিহ্নের কথা বলা যায়। তা হল, আগামি বছর শুরুতে যদি ইউক্রেন যুদ্ধ না থামে তবে সেটা হবে খুবই খারাপ চিহ্ন। কেননা এর মানে হবে আমেরিকার আগামি নির্বাচন যেটা ২০২৪ সালের নভেম্বরে হওয়ার কথা সেটাও যুদ্ধের মধ্যেই হবে??
    আর সেসব নিয়ে বুঝাবুঝি আর তাতে গ্লোবাল স্বার্থের ঝগড়াগুলোর মাঝে নিজ-রাষ্ট্রের ভালমন্দ বুঝবার জন্য আমরা কতটুকু যোগ্য হয়ে উঠব? যতটুকু পুরান কমিউনিস্ট প্রভাবের মধ্যে আমরা যে যেমন থেকে যাব তারা তক্তি গভীর অবুঝ থেকে যাব। এর বিকল্প হল, একটা ফ্যাক্টসকে আদর্শগত পক্ষপাতিত্বের ভিত্তিতে গ্রহণ করা বা ব্যখ্যা করা বা ব্যাখ্যা দেয়া ত্যাগ করতে হবে।  সেক্ষেত্রে বুঝতে হবে ঐ আদর্শগত বুঝাবুঝিতে খামতি আছে। সেই খামতি পূরণ করে বরং সামলানো – নিজের চিন্তাকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।   একথাটাই আরেকভাবে বললে, আমি কমিউনিস্ট তাই কমিউনিস্ট-চিন্তা-ফ্রেমে ফেলেই আমাকে যেকোন ঘটনা ব্যাখ্যা করতে হবে – এই জিদ ত্যাগ করতে হবে।

    আপডেটেডঃ    আগষ্ট  ২০২৩; 

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ব্রিকসে নয়া ছয় সদস্য, বাংলাদেশ বাদ; এর অর্থ তাতপর্য কী

    ব্রিকসে নয়া ছয় সদস্য, বাংলাদেশ বাদ; এর অর্থ তাতপর্য কী
    গৌতম দাস
    ২৭ আগষ্ট ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4SM

     

                  BRICS new six Members

    ব্রিকস সম্মেলনের শেষদিনের সিদ্ধান্ত হল, নয়া ছয় দেশকে [সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, ইথিওপিয়া ও আর্জেন্টিনা], তারা এই প্রথম তাদের জোটকে সম্প্রসারিত করে নয়া সদস্য করতে চাইলো। কিন্তু বাংলাদেশ? এত ঢাকঢোল পিটানো বাংলাদেশ যে এই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব হাজির রেখেছিল সেই-ই  বাদ হয়ে গেছে; সে এই ছয় রাষ্ট্রের মধ্যে জায়গা পায় নাই! কিন্তু ঠিক কেন? ব্যাপারটা বড়ই অদ্ভুত! আমার আগের লেখায় শিরোনাম ছিল “মোদির আনা শর্ত ও পরিণতিতে বাংলাদেশ ব্রিকসে নাই’। কিন্তু ঠিক কীভাবে তা কার্যকর হয়েছিল তা বুঝতে একটু গভীরে যেয়ে এবার কথা বলব।
    ইতোমধ্যে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করা সুবীর ভৌমিক, সেও গতকাল (২৫ আগষ্ট) আবার বাংলাদেশকে নিয়ে এক লেখা দিয়েছে; যার শিরোনাম India, US narrow differences over Bangladesh ahead of elections]। । কিন্তু সুবীরের এই অবস্থান চারদিন আগের আনন্দবাজারের অগ্নি রায় বা দেবদীপ এদের অবস্থান থেকে একেবারে উলটা দিকে। তা একেবারে ভুতের মুখে রামনামের মত!  সুবীর লিখেছে,  বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের ইস্যুতে “সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে” দেখা আমেরিকান অবস্থান যে এদেশে একটা অবাধ ও সুস্থ নির্বাচনই হতে হবে – এই বিষয়ে অনেক আলাপ আলোচনার পরে ভারত আমেরিকার অবস্থানের পক্ষে সায় দিয়েছে […India has agreed to the US stand of putting “absolute priority” on a free and fair parliamentary election due in January 2024.] সত্যিকরে বললে, এটা আবার অগ্নি রায় বা দেবদীপ পুরোহিত-দের প্রপাগান্ডার উলটা আরেক প্রপাগান্ডা নিঃসন্দেহে। কিন্তু অগ্নিদের মতই সুবীরও কোন প্রমাণ বা কোন সোর্স উল্লেখ করা ছাড়াই আরেক চাপাবাজি বক্তব্য। ফলে এ’বক্তব্যের কোনই মুল্য নাই। তবে এটা নিঃসন্দেহে সত্যিকথা যে ভারতীয় কারও – সে মোদি-ই হোক বা যেই কেউ  – এদের কারও আর বাংলাদেশে কোন বিশ্বাসযোগ্যতা অবশিষ্ট নাই।  আমরা এখন বড় জোড় তাদের কথা শুনব – আর পাশে আবর্জনার ড্রামে তা ফেলে রাখব; কারণ আমরা তাদের কাউকেই বিশ্বাস করি না।

    আমার আগের লেখায় বলেছিলাম রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে যে ভারতের আপত্তিতে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বাদ পড়েছে।  গত ২৩ আগষ্ট রয়টার্সের সেই রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ব্রিকসের সম্প্রসারণ শেষ মুহুর্ত এসে ব্রিকসের আভ্যন্তরীণ বিভক্তির মুখে আটকে গেছে; BRICS expansion faces eleventh hour hurdle as divisions persist। এটা হল,  ব্রিকসের ভিতরের খবর বের করে এনে তাদের লিখা। বলেছে ভারতের মোদি-ই  নিজেই শেষ মুহুর্তে নয়া দুই শর্ত  শেষে হাজির করেছে ।

    ঐ রিপোর্ট বলেছে ইলেভেন্থ আওয়ারে মানে শেষ মুহুর্তে ভারত নয়া সদস্য নেয়া হবে কী ভিত্তিতে মানে কী শর্তে এই বিষয়ে কিছু বক্তব্য পেশ করেছিল। শুধু তাই না একথাগুলো লেখা হয়েছিল “LAST-MINUTE SPOILER” এই নামের রয়টার্সের লেখার এক উপ-শিরোনামের নিচে। যার  অর্থ হল, শেষ মুহুর্তে যিনি সব ভন্ডুল [SPOILER] করে দেন। আর বলাই বাহুল্য সেই SPOILER হলেন ভারতে প্রধানমন্ত্রী মোদি।

    ঐ রিপোর্ট লিখেছিলঃ
    “but the source said it had been delayed after
    Indian Prime Minister Narendra Modi
    introduced new admission criteria.”

    কিন্তু কী ছিল সেই নয়া দুই শর্ত?
    “The BRICS country official said that admission criteria
    India’s Modi proposed included requiring members
    not be the target of international sanctions,
    ruling out potential candidates Iran and Venezuela.
    Modi was also pushing for a minimum per capital GDP requirement”

    কথাগুলো সোজা করে বাংলায় বললে, হবু ব্রিকস সদস্য হতে হলে – এরা কেউ আমেরিকান স্যাংশনের খাওয়া দেশ হতে পারবে না। তিনি অবশ্য আমেরিকা শব্দটা লুকিয়ে সে জায়গায় আন্তর্জাতিক লিখেছিলেন। আর দ্বিতীয় শর্তটা হল, ঐ হবু সদস্য দেশের অর্থনীতিতে  ওর নুন্যতম অর্জিত জিডিপি থাকতে হবে।

    এখন আমরা দেখব ব্রিকসের সদস্যপদ লাভে মোদির প্রথম শর্ত প্রসঙ্গেঃ
    মোদির একথার কোন মানেই হয় না যে হবু সদস্য দেশ আন্তর্জাতিক স্যাংশন খাওয়া দেশ হতে পারবে না। কারণ, স্যাংশন বা আন্তর্জাতিক স্যাংশন খাওয়া দেশ মানে কী? মানে আমেরিকার যথেচ্ছারে স্যাংশন চাপানো যেটা ঐ দেশের ডলারে বাণিজ্য এর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। কিন্তু আমেরিকা এমন স্যাংশন দেয়ার কে? কী তার অথরিটি? এটা লুকাছাপার কিছু নাই যে এবারের বাইডেন প্রশাসন ইচ্ছামত যার উপরে আরোপের ইচ্ছা এভাবে স্যাংশন আরোপ করে গিয়েছেন। কারণ, আমেরিকান ডলার আমেরিকা রাষ্ট্রের নিজের মুদ্রা হওয়াতে যে পড়ে পাওয়া সুবিধা আমেরিকার হাতে তাতে যেকোন দেশ যেন ডলারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় কেনা-বেচা না করতে পারে এই বাধা দিবার সুযোগ আমেরিকার হাতে আছে। আর আমেরিকা তার এই সুযোগ এর অপব্যবহার করবে না – এটাই আশা করা হয়েছিল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম-সভায়।  কিন্তু তা ছিল ভদ্রলোকি চুক্তির মত ঠিক আইনি বাধা নয়; আর সে অনুমানটাকেই আমেরিকা অমান্য করে চলেছে।  “পরে পাওয়া” সুবিধাটাই খেয়ে চলেছে।
    আর ওদিকে, ব্রিকস তৈরি হয়েছে যেসব রাষ্ট্র নিয়ে বা হবু সদস্যদের নিয়ে হতে চাচ্ছে তারা আমেরিকার এই অত্যাচার, যথেচ্ছাচারে অতিষ্ট হয়েছে বলেই তো নয়া ব্রিকস এর সদস্য হতে এসেছে। কাজেই আমেরিকান স্যাংশন কারো উপর  আরোপিত হলে সেই দেশকে আবার সদস্যপদ না দেয়ার মানে হল যেন, আমেরিকান ইচ্ছায় ব্রিকসের সদস্যপদ দেয়া। মানে ব্রিকস চালাবে যেন আমেরিকা – এমন অবস্থা তৈরি করা!  মানে কার্যত ব্রিকস-কে আমেরিকার খামখেয়ালি ইচ্ছার অধীনস্ত প্রতিষ্ঠান করে ফেলা।  আর এভাবেই ভারত যদি ব্রিকসের নয়া সদস্যপদ লাভের শর্ত করতে চায় তাহলে আর এদের ব্রিকস গড়ার দরকার কী?
    অথবা আরেকটা দিক আছে! তাহলে, চীনের মুদ্রা ইউয়ান ভিত্তিতে যদি ব্রিকস প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে তাহলে চীনও কী আমেরিকার মতই যেকোন ব্রিকস সদস্য দেশের উপর চীনা খামখেয়ালি রুস্তমি শুরু করতে পারবে?   আর ভারত সেটা মান্য করে চলবে? মোদি তার মানে এটাই চাইছেন???? তাই কি??? মোদি সাব কী বলেন!!! 

    আর তামাসার কথা যে, ভারত কী নিশ্চিত যে ইউয়ান-ভিত্তিক ব্রিকস এরপর ভারতের উপরেই চীন সেই প্রথম  (ইউয়ান) স্যাংশনটা আরোপ করবে না? কাজেই “স্যাংশন খাওয়া দেশ সদস্যপদ পাবে না” এই শর্ত তো ভারতের জন্যই সবচেয়ে বড় আত্মঘাতি হয়ে উঠতে পারে!!!  তাহলে ভারতের এই  গদগদ হওয়া “আমেরিকা তোষণ” এর মানে কী? এমন আত্মভোলা ছাগলামির মানে কী?

    আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে ভারত  ” আমেরিকান স্যাংশন খাওয়া দেশকে” – সদস্যপদ দিয়ে ঐ দেশের সাথে আমেরিকান  ক্যাচাল-সংঘাতের দায়গুলো ব্রিকসে আনতে চাচ্ছে না, এড়াতে চাইছে মানে এই প্রশ্নে আমেরিকার বিরাগভাজন হতে চাচ্ছে না। কিন্তু সেটা হলেও এভাবে আমেরিকার খামখেয়ালিপনা আমল করে এর ভিত্তিতে একটা  ব্রিকস খাড়া করা কী সম্ভব, নাকি এটা বাস্তব? বা এর কোন দরকার আছে? যেমন ধরেন এখনই সবচেয়ে বড় স্যাংশন খাওয়া দেশ হল খোদ পুতিনের রাশিয়া। তাহলে মোদির প্রস্তাবিত শর্ত অনুসারে তো রাশিয়াকেই ব্রিকসের সদস্যপদ থেকে বাদ দিতে হয়! অথবা ধরা যাক, কোন কারণে ভারতের উপরেই কোন আমেরিকান স্যংশন যদি আরোপিত হয় তাহলে কী ভারত সরল বালকের মত নিজেই ব্রিকসের বাইরে গিয়ে বসবে? তাতে রাজি থাকবে তো??? একথার মানে হল, যে আপনার বাসায়  আপনি নিজে ঢুকতে পারবেন কিনা সেটা আর কেউ না একেবারে কোন বাইরের লোক বা পড়শি তার খামখেয়ালি ইচ্ছার কথা আপনি মেনে চলবেন? আর তা মেনেই আপনি আপনার নিজের বাসায় ঢুকবেন, ঢুকতে হবে? অথচ সেটাই মোদির ভারত প্রস্তাব করছে? এটা এবসার্ড[absurd] অর্থহীন; আজীব ও অবাস্তব ঘটনা! ভারতের এটা এক আজীব আমেরিকা প্রীতি! যেটার কারণে ভারত খোদ নিজেই আমেরিকার কাছে নিজের অস্তিত্ব নিজেই বিলীন করতে হতে পারে তা জেনেও ভারত তা করতে এক পায়ে খাড়া!!!!  তাই কী?  এটা মানে হয় না এমনই এবসার্ড অবিশ্বাস্য ঘটনা!  যা বাস্তব পরিস্থিতিতে ভারত নিজেই অমান্য করবে!

    মূল কথাটা খেয়াল রাখতে হবে। ব্রিকসের সকল রাষ্ট্র যদি নাও চায়, তাহলেও ডলারের পাশাপাশি ডলারের বিকল্প কারেন্সি-ভিত্তিক (ধরা যাক চীনা ইউয়ান) ব্রিকস নামের আরেক অর্থনৈতিক  গ্লোবাল অর্ডার খাড়া করার চেষ্টা করার অর্থ হল ডলারের একছত্র অধীপতি থাকাকে টেনে নিচে নামানো। তাই ব্রিকস খাড়া করব এই মজা লুটতে এলাম  অথচ আমেরিকা বা তার ডলারের সাথে প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব না, এড়ায় চলতে পারব, চ্যালেঞ্জ করব না এই অনুমান ভিত্তিহীন এবং তা অর্থহীনও!! বোকার স্বর্গে বসবাস! মানে হল, মোদির ভারতের দশা হয়েছে সে  আমেরিকা ডাকলেই যদি তার বাসায় গিয়া ভারতকে পাশে  শুইতেই হয়, সঙ্গ দিতেই হয় –  তাহলে আর ঐ ভারতের আবার ব্রিকস নামের নয়া বিয়ে করতে যুক্ত হতে এসেছে কেন, দরকার কী?

    আসলেই মোদি এক আজব লোক!!!  সত্যি মোদি সাব পারেও বটে!!!
    [একটা ঘোষণাঃ উপরে যে গ্লোবাল অর্ডার কথা বা ধারণাটা  উল্লেখ করেছি – এটা খুবই ফান্ডামেন্টাল কনসেপ্ট।  তাই এনিয়ে আলাদা করে একটা লেখা প্রায় রেডি আছে, ‘ফাইনাল টাচ’ দিয়ে একদিন পরেই পোস্ট করব।]

    মোদির দ্বিতীয় শর্ত প্রসঙ্গেঃ
    এছাড়া  দ্বিতীয় শর্তও প্রায় একই রকমের অর্থহীন! মূল কারণ হল, ব্রিকস যদি পুরানা আইএমএফের বিকল্প প্রতিষ্ঠান হয়ে গড়ে উঠতেই চায় তাহলে হবু সদস্যদেশের নুন্যতম জিডিপি থাকতে হবে এমন শর্ত এর অর্থ কী? আমার দেশের নুন্যতম জিডিপি কেন উল্লেখযোগ্য কোন জিডিপি নাই বলেই তো আমি সদস্য হতে এসেছি, নাকি তামসা করতে? আর মূলকথায়, আইএমএফের জন্মের সময় কী সে এমন শর্ত দিয়ে নয়া সদস্য নিয়েছিল? দেয় নাই তো? তাহলে এখনই বা কেন এটা মোদির প্রস্তাব??  মোদির কনসালটেন্টেরা কি তাহলে গাধা-গরু, পড়াশুনায় ফাঁকি দেয়া ছাত্র যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক স্টাডি করে নাই? নাকি মাদী ব্রিকস-কে বড়লোক রাষ্ট্রগুলোর ক্লাব বানাতে চাইছে? কিন্তু তেমন ক্লাব হিশাবে জি৭ – গ্রুপ  প্রথম বড়লোক রাষ্ট্রের ক্লাব তো আছেই – মোদি সেখানে না গিয়ে ব্রিকসে এসেছে কেন?

    ন্যায্যতার প্রশ্ন ফান্ডামেন্টাল, তাই সবার আগে এই প্রশ্ন তুলতেই হবেঃ
    অর্থনীতিতে বঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রগুলোকে অন্তত সুযোগের দিক থেকে সাম্য – সবাই সমান সুযোগ পেয়েছে – এতটুকুই যদি না করতে পারে তাহলে নয়া ব্রিকস খাড়া করার দরকার কী? এর সাফাই ন্যায্যতা কী? আমেরিকা্র খামখেয়ালি মত একালে আর কাকে কোন কোন দেশকে এমন সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবে দুনিয়া?  এমন সুবিধা ব্রিকসের চীন বা চীনের মত অন্য কোন ব্রিকস সদস্যের হাতে যেন না থাকে, না উঠে সেজন্যই তো ব্রিকস এর প্রয়োজনীয়তা! নাকি??  ব্রিকস তখনই তো কেবল নুন্যতম ইনসাফের প্রতিষ্ঠান বলে দাবি করতে পারবে; নাকি? আর আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি মোদির ভারতের মত যারাই বে-ইনসাফিতে অন্যের জন্য গর্ত খুড়ে রাখলে সে অনেক সুবিধা খেতে পারবে মনে করছে – এরা নিজেরাই আগামিতে সেই গর্তে পড়বেই! এটাই ইনসাফের মহিমা! 

    তাহলে কী দাঁড়ালো, এটাই কী আগামি ব্রিকসের মাতবর সদস্য হিশাবে মোদির ভারতেরআমেরিকার মত এক খামখেয়ালি ক্ষমতার হাতা হয়ে উঠার খায়েসের ইঙ্গিত দিচ্ছে?  ্মানে বগলে ইট নিয়ে মুখে শেখ ফরিদ!!! আসলে এটাই তো বৃটিশ কলোলিদখলদারেরা চলে গেলে বা এর অবসান হলেও সেই বৃটিশ দখলদারের স্বভাব নিজে পেতে চাওয়া “নেহেরুর ভারত” হওয়ার পুরানা খায়েস!!!

    বাহা রে নন্দ! বাহ রে মোদি! তোর খায়েসের বলিহারি!! মোদি আসলেই পারে! এই দুনিয়ায় অসাম্যের নিয়ম-আইন কানুন যেখানে সমান থেকে উন্মুক্ত করার দাবি উঠছে, এই মোদি সেখানে যে নিজেকে অবলীলায় এর ভায়োলেটর (violator) অমান্যকারি এক দানব হিসাবেই পরিচিত করতে চাচ্ছে!

    যাহোক উপরে আমরা মোদির  হবু সদস্যদের সদস্যপদ লাভের শর্ত নিয়ে মোদির প্রস্তাবের পর্যালোচনা করলাম, দেখলাম। কিন্তু ফাইনালি ব্রিকস কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?  মানে কলোনিদখলদারি মনের মোদির ভারত নয়া শর্ত  জুড়ার যে প্রস্তাবই আনুক না কেন, শেষে ব্রিকসের এই সম্মেলন এবিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?  নয়া সদস্যপদ লাভের কীশর্ত ঠিক করেছিল?

    ব্রিকসে নয়া সদস্যপদ লাভের শর্ত কী ঠিক হয়েছেঃ
    সেটা ব্রিকস ঠিক খোলাখুলি আমাদের জানায় নাই। বলা ভাল ব্রিকস আসলে  তা খোলাখুলি না বলার পরোক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা বে-ইজ্জতি হতে যায় না, তাই এতে বুঝা গেছে !

    কিন্তু নয়া ছয় সদস্য কারা হবে আর তাতে বাংলাদেশ নাই – এই সিদ্ধান্তের তাতপর্য কী?
    এই তাতপর্য ব্যাখ্যা করতে পারলেই বুঝা সহজ যে ব্রিকস এর সদস্য হবার ফাইনাল ক্রাইটেরিয়া বা শর্ত এখন কী দাঁড়িয়েছে।

    “সদস্য হতে শর্ত” শেষে কী দাঁড়ালো ও এর তাতপর্য কি; ঘটনা যখন ইরানঃ
    ব্রিকসের  সদস্যপদ লাভের শর্ত কী তা তারা প্রকাশ্যে জানায় নাই। কিন্তু তাদের কার্যকলাপ দেখে বুঝা সম্ভব যে তারা ঠিক কী চেয়েছে এবং হয়েছে বা হচ্ছে।  যেমন কারা এই ছয় রাষ্ট্র এর প্যাটার্ন যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখি ইরান এই রাষ্ট্র সদস্যপদ লাভ করেছে; যেটা একটা বিশেষ প্যাটার্ণ নির্দেশ করে। কী সেটা?  ইরানের অর্থনীতি সেই জন্মের সময় ১৯৭৯ সাল থেকেই আমেরিকার নিয়মিত ও অসংখ্য স্যাংশনে জর্জরিত। মানে ইমাম খোমিনীর বিপ্লবে স্বাধীন ইরান জন্ম থেকেই সে আমেরিকান খামখেয়ালিপনার শিকার হয়ে আছে। কিন্তু সেই ইরান এবার ব্রিকস এর সদস্যপদ পেয়েছে। যার সোজা মানে হল, এতদিন কেবল চীন বুক ফুলিয়ে ইরানের তেল কিনার ২৫ বছরের চুক্তি করেছিল। আজ ব্রিকস জানিয়ে দিল তারা ইরানের মুখের উপর যে অন্যায় লাগাম টেনে ধরার আমেরিকান খায়েস ছিল যা ইরানের অর্থনৈতিক সব সম্ভাবনাকে স্তব্ধ করতে রেখেছিল – তা ব্রিকস অন্যায় মনে করছে।  ব্রিকস অন্তত (আমেরিকান স্যাংশন) যে মানতে চাচ্ছে না এটাই পরিস্কার হয়ে গেছে ব্রিকসের এই সিদ্ধান্ত থেকে। মনে রাখতে হবে  এক, খোদ ভারত ট্রাম্পের সময় থেকে ইরানের তেল যেন কেউ না কিনে তা বাস্তবায়নের বাধা হিশাবে যে স্যাংশন-শর্ত দিয়েছিল সেবারই প্রথম- মোদির ভারত তা মেনে নিয়েছিল। ট্রাম্পের জাতিসংঘ প্রতিনিধি Nikki Haley এর সেসময়ের এমন মন্তব্য নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্ট দেখতে পারেন এখানে।  এমন অন্যায়-বেইনসাফি ভাবে সেকালে ভারতের বিক্রি হয়ে যাওয়াতে  ট্রাম্পের কাছ থেকে ভারত কী গোপন সুবিধা পেয়েছিল আমরা জানি না। তবে এরপর থেকে ভারত আর ইরানি তেল কিনে নাই, সস্তায় দিলে এমনকি নিরাপদে তেল ইরান নিজেই পৌছে দিলেও না করেছিল ভারত। আর মনে রাখতে হবে, এখনও  ব্রিকসের কোন সিদ্ধান্ত নিবার পদ্ধতি হল সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেদিকে তা নয়, বরং সর্বসম্মতিতে। এর মানে এবার মোদি সজ্ঞানে মেনে নিলেন যে ভারতও এবার ব্রিকস-এ ইরানের নয়া সদস্যপদ অনুমোদন করছে ভারত। অর্থাৎ ব্রিকসের সদস্যপদ লাভের নয়া শর্ত  যা মোদি আরোপ বা হাজির করতে প্রস্তাব করেছিল তা হাওয়া হয়ে গেছে। মোদি নিজেই  সেকথা আর আঁকড়ে ধরে বসে নাই; বরং নিজেই ফাইনালি আর কার্যকর করতে চায় নাই। কিন্তু কেন? আর তাহলে এসব ভুয়া শর্ত প্রস্তাব করেছিল কেন?

    কারণ, এককথায় মোদির আনা শর্ত ছিল ভুয়া ওজনহীন!  এই শর্ত সে প্রয়োগ হোক তা চায় নাই বরং অন্য কোন উদ্দেশ্য এর ছিল। সেকথায় পরে আসবো।

    “সদস্য হতে শর্ত” শেষে কী দাড়ালো ও এর তাতপর্য কি; ঘটনা যখন সৌদি, ইউএই (UAE) এবং মিসরঃ
    নয়া ছয় সদস্য এরা আর কে কে এর অর্থ তাতপর্য খুঁজলে পাই সেখানে আরেকটা প্যাটার্ণ। সেটা হল, আরও তিন রাষ্ট্র – সৌদি আরব, ইউএই আর এমনকি সাথে মিসর। [এখানে UAE বলতে যার সাত ভুখন্ডের বৃহত্তম ফলে বড় প্রভাবশালী হল দুবাই; তবে রাজধানী হল আবুধাবি]।  এছাড়া  মধ্যপ্রাচ্যের এই তিন রাষ্ট্রের সাথে ইরানও আছে (উপরের অর্থে নয় আরও অন্য অর্থে) – এটা যদি মনে রাখি তবে এর আরও অন্যান্য অর্থ-তাতপর্য আছে সে ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। তাই এখানে আবার ইরানের উল্লেখ সেটা প্রথম তাতপর্য হিশাবে উপরে যা লিখেছি এরও বাইরের ইরান। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিপ্লবের পর থেকে এতদিন কেউ কাউকে সহ্য করে না এমন প্রবল দুই প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল ইরান বনাম সৌদি। আর এই দ্বন্দ্ব লাগিয়ে রাখার বড় ফ্যাক্টর এই প্রধান শক্তি ও সমর্থক এবং সুবিধাভোগী হয়ে  সুবিধা খেয়ে গেছিল আমেরিকা।  কাজেই এখানে ইরান-সৌদি একসাথে ব্রিকসের সদস্যপদ লাভ – এই আলাদা বৈশিষ্ঠকে আমল করা চোখে তা দেখতে হবে।  এর পিছনের ঘটনা হল, সম্প্রতি  ইরান-সৌদির পুরানা সেসব বিবাদ পাশে সরিয়ে রেখে এদুই শক্তির হাত মিলিয়েছে; আর এভাবে চলার উদ্যোক্তা-মধ্যস্থতাকারি হল চীন। এতে প্রকাশিত চীনের এই সক্ষমতার কথা পশ্চিমের কেউ অস্বীকার করছে না। বরং চোখ বড় বড় করে ভীত ঈর্ষান্বিত চোখে হলেও তাদেরকেও ইরান-সৌদি ঐক্য, হাত মিলানোকে স্বাগত জানাতেই হচ্ছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ-কে ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন ও বিদ্রোহকে সৌদি দমন থেকে যা এতদিন এক মহা মানবিক সমস্যা তৈরি হয়ে ছিল তা মিটমাটের রাস্তা খুলে দিয়েছে। হুতি ইস্যু ও এর বিবাদ থেকে বের হবার – এই ইস্যু অবসান হতে যাবার সুযোগ আসাতে প্রবল প্রশংসা করতেই হয়েছে সংশ্লিষ্ট সকলকে।  কারণ কেউই নিজেকে বিবাদ পছন্দ করা মানুষ বলে হাজির করতে পারে না।    আর  ইউএই (UAE) যার সাত ভুখন্ডের বৃহত্তম ও প্রভাবশালী হল দুবাই – ওর আমীর ও তার বড় সন্তান হল বর্তমানে সৌদি আরবের MBA [প্রিন্স সালমান যিনি কার্যত সৌদি শাসক] এর সবচেয়ে কাছের বড় সমর্থক ও চিন্তা শেয়ার করা বন্ধু। অর্থনৈতিক অর্থে মধ্যপ্রাচ্যের বাদশা দেশগুলোতে আধুনিকতার সংস্কার আনার জন্য এদুই প্রিন্স নিজ উদ্যোগ ও কাজের জন্য যারা গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছেন।  একসাথে করতে একাজে এমনকি সৌদি যেসব কাজ করতে চায় কিন্তু নিজ নামে করতে চায় না তা করে দেয় দুবাই প্রিন্স – এমনটাও দেখা গেছে। বিশেষ করে বর্তমানে সৌদিতে যে অর্থনৈতিক সংস্কার বা ঢেলে সাজানো চলছে তাতে এদুই প্রিন্সের ভুমিকা খুবই গুরুত্বপুর্ণ।

    তাহলে সৌদি-দুবাই আর ইরান – এ তিনের মাঝে আবার চীন, এর এক আলাদা বিশেষ তাতপর্য আছে। কী সেটা?
    এটাই নব উত্থিত ব্রিকস  এই বিকল্প ব্যবস্থা কায়েমের পথে চীন প্রথম অর্থপুর্ণ পদক্ষেপ। আগে অনেকবার বলেছি ১৯৪৫ সালে আমেরিকান নেতৃত্বে এক গ্লোবাল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক গ্লোবাল অর্ডার চালু হয়েছিল । ইতোমধ্যে প্রায় আশি বছর এটা চলতে পেরেছে, আজও চলছে কিন্তু এখন আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা যত কমছে এর চেয়ে বহু গুণে চীনের সক্ষমতা বেড়ে সে আমেরিকাকে জিডিপিতে  ছাড়িয়ে এক নম্বর অর্থনীতির দেশ হওয়ার পথে।  দুনিয়ার সবদেশকেই একেবারেই কম বা না সুদে অবকাঠামো বিনিয়োগ যোগানোর সক্ষমতা – এটাই কোন দেশের গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হওয়ার একেবারে প্রাথমিক যোগ্যতা। কারণ এমন বিনিয়োগ দানের সক্ষমতা যখন কোন দেশের অর্থনীতির হয়, এটাই দুনিয়ায় বেশির ভাগ দেশের উপর ঐ সক্ষম দেশের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হয়ে দাড়ায়, দাঁড়াবেই। আমেরিকার বদলে ওর এতদিনের গ্লোবাল নেতৃত্বের জায়গায় চীন উঠে আসতেছে, দখল করতেছে – এভাবেই দিন কে দিন দৃশ্যমান হাজির হয়ে উঠছে।ঙ্কারণ,  গরীব তো বটেই এমনকি মধ্যম আয়ের দেশগুলোও (যেমন আশিয়ান জোটের দেশগুলো) যারা অবকাঠামো ঋণ পেতে ৩% পর্যন্ত সুদ দিতে প্রস্তুত (কারণ, আমেরিকার নেতৃত্বের পুরানা ব্যবস্থাটা মানে বিশ্বব্যাংক এমন সরকারগুলোকে অবকাঠামো ঋণ আর দেয়ই না তবে এসবদেশের প্রাইভেট কোম্পানিকে হলে দিতে রাজি। এই নীতি ফলো করে বিশ্বব্যাংক।) তাই, এদের কাছে চীনা অবকাঠামো ঋণ খুবই কাম্য। ইতোমধ্যেই বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য চীনের AIIB -এই ব্যাংক তাই মধ্যম আয়ের দেশগুলোর কাছে খুবই আদরণীয়!   আর মনে রাখতে হবে, এখনকার চীনের মত একটা দেশ যখন একবার অর্থনৈতিক সক্ষমতার চরম বৃদ্ধির স্তরে পৌছে [মানে নিজ অর্থনীতি বিপুল সারপ্লাস জমা করতে থাকে বা উদ্বৃত্ব সম্পদে ভরে উঠে ] এমন হয়ে যাবার অর্থ হল এরপরের দশ বছরের মধ্যেই ঐ দেশ সামরিক শক্তি হিশাবে সে হাজির হতে, দৃশ্যমান হতে শুরু করতে পারে।  আর এসব সম্ভাবনা ও সুবিধার কারণে চীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বে আমেরিকার জায়গায় বসে যাবার সুযোগ পেতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে, আর তা কমবেশি খোদ আমেরিকাই মেনে নেওয়া বা রেফার করে কথা বলা শুরু করে দিয়েছে।
    এটাকে আমি বারবার গ্লোবাল পালাবদল বলছি। আর এটা নিয়ে একদল আছে যাতা এটাকে কথিত ভুরাজনীতিক ঘটনা বলে পরিচয় করাতে চাচ্ছে। এভাবে নিজের অজ্ঞতা ঢাকার কিছু নাই, এটা অপ্রয়োজনীয়। ভূরাজনীতি বা জিও-পলিটিক্স  এই শব্দের মধ্যে যে ভূ [geo- জিও] শব্দটাই তো সঠিক নয়। কারণ এটা গ্লোবাল অর্ডার এরই নেতৃত্বের মধ্যে পালাবদলের ঘটনা।  যেখানে রূট শব্দ ও ধারণাটা হল গ্লোবাল [Global]। যা ভূ [geo- জিও] একেবারেই না। কারণ,  গ্লোবাল আর জিও- একই শব্দ না, এক অর্থও না। তবে গ্লোবাল না বলে অনেক বাংলায় “বিশ্বব্যবস্থা” লিখে; সেটা চলতে পারে।  এটা বোকা বোকা অবুঝ শব্দ  ভূ [geo- জিও]  বলার চেয়ে ভাল!

    নয়া গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠছে চীন – এই লক্ষ্যেই চীন পুরানা  গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট করে কেবল গ্লোবাল মুদ্রা ও বাণিজ্য ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক আইএমএফ আর অবকাঠামো ঋণ দেবার বিশ্বব্যাংক – এই দুই গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের পাল্টা ও বিকল্প সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়তে উদ্যোগ নিতেই এমন এক জোট খাড়া করেছে যাকে আমরা ব্রিকস বলে চিনছি।
    তবে আইএমএফ আর বিশ্বব্যাংক এর সমতুল্য (কিন্তু চীনা নেতৃত্বে) এমন বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়া সহজ কাজ নয়। এছাড়া গড়ার কাজটা চীনের বেলায় শুরুতে সে কিছু দেশকে সাথে নিয়ে বসে কথা শুরু করেছে।  বৈঠকে বসে শুরু করলেই তা খাড়া হয়ে বা কার্যকর হয়ে যাবে না।  সে পথের প্রধান বাধাথল – এখনকার ব্যবস্থায় আমেরিকান ডলারেই বেশির ভাগ আন্তঃরাষ্টীয় লেনদেনবিনিময় বাণিজ্য  (আমদানি-রপ্তানি) সম্পন্ন হওয়া। আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা একেবারেই কমে গেলেও এ’জায়গায় ডলারের উপর ব্যবহার কারি দেশ ও মানুষের পুরানা আস্থা অভ্যাস সহসা বদলে দেয়া যায় না একারণে। ইতোমধ্যে বাইডেন প্রশাসন  স্যাংশন দেয়ার অতিব্যবহারের কারণে একটা বড় সংখ্যাক দেশ চাইছে ডলার নির্ভরতার বিকল্প – এমন দেশগুলোর শীর্ষে আছে রাশিয়া। হাসিনার বাংলাদেশও অতি আগ্রহী। কিন্তু আগেই বলেছি এটা ঘরে বসে বিকল্প খাড়া করে দিবার বিষয় নয়। তাতে রাশিয়া বা বাংলাদেশ এর মত দেশগুলো যতই ছটপট করুক! তাহলে ডলার মুদ্রা ভিত্তিক বাণিজ্যের আধিপত্য একে পিছনে ফেলে মানে ডলারে ব্যবসাকে সেকেন্ড অবস্থানে নামিয়ে দিয়ে, পরের সবচেয়ে চালু মুদ্রা ইউয়ান, একে সামনে আনার উপায় কী?

    গত ২০১৫ সালে চীনা ইউয়ান মুদ্রাকে আইএমএফ অনুমোদিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিশাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তার আগে এমন আইএমএফ অনুমোদন দেয়া মুদ্রাগুলো হল (শুরুতে মার্কিন ডলার ছাড়াও) বৃটিশ পাউন্ড, জাপানিজ ইয়েন, ইইউ এর ইউরো। আর এসবের সাথে সেবার পঞ্চম কারেন্সি তখন হয়েছিল ইউয়ান[Yuan]। কিন্তু ইউয়ান ইতোমধ্যেই লেনদেনের মুদ্রা হিশাবে ডলার বাদে বাকি মুদ্রাগুলোকে ছাড়িয়েছে।  তাই এব্যাপারে চীনা গবেষণা অনুমান যা পরোক্ষে প্রকাশিত – এর ভাষ্য অনুযায়ী এমন চাবিকাঠিটা হল চীন প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কিনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে দ্বিতীয় বড় অর্থনীতির দেশ হিশাবে। তাই সুস্থির চীন আর সাথে অস্থির রাশিয়া উভয়েই মনে করে যে এসব জ্বালানি ক্রয়ের পেমেন্ট যদি ডলারের বদলে ইউয়ানে বদলে দেয়া যায় তাহলে মার্কিন ডলার ডমিনেন্সের উপর এক বড় ধাক্কা দেয়া সম্ভব। আর তাতেই ইউয়ান হয়ে যেতে পারে গ্লোবাল বাণিজ্য-লেনদেনের প্রধান মুদ্রা । মানে গ্লোবাল বাণিজ্য ঘটবার প্রধান মুদ্রা হয়ে উঠতে পারে ইউয়ান।  যেটা গ্লোবাল বাণিজ্যে  মোটামুটি ৬০% এর বেশি হয়ে কোন মুদ্রা পৌছাতে পারলে তবে এরপর তা ক্রমশ বাড়তে থাকে  – আর তাকে সহসাই নামানো যায় না।  যে পথে এখন ডলার উত্থিত হয়ে আছে! চীনা ইউয়ান উত্থানে এক নম্বর মুদ্রা হয়ে উঠতে এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য পরিকল্পিত পথ এটাকেই মনে করা হয় – তাত্বিক ও অর্থনীতিবিদ পর্যায়ের ধারণায়। আর, এপথেই চীন আগাচ্ছে বলে মনে করা হয়। এনিয়ে গত ২০১৫ সালে আমারই অনেক লেখা আছে।

    কাজেই এটা এখন বলাই বাহুল্য যে এই পথে গ্লোবাল বাণিজ্যকে ঠেলে দেবার ক্ষেত্রে সৌদি আরব কেন চীনের কাছে গুরুত্বপুর্ণ ও অন্যতম এক নির্ধারক শক্তি।  ইউএই(UAE) এর তেলবিক্রির সক্ষমতা খুবকিছু না থাকলেও সে সৌদির যেকোন কাজ-উদ্যোগের এক নম্বর সহযোগী-সমর্থক। আর এবার এদের সাথে ইরান,  যে ১৯৭৯ সাল থেকেই জ্বালানি বিক্রি সক্ষমতা থাকা সত্বেও গরীব দেশ হয়ে আছে, ইরানি অসুস্থ বাচ্চার জন্য ওষুধ কিনে দিতে অর্থনীতি অক্ষম হয়ে পড়ে ছিল – সেই ইরান গত ৪৪ বছরে খুব কম সময়েই সে নিজের তেল বিক্রি করতে পেরেছে। এই ইরানও এবার যুক্ত হয়ে গেছে যেটা এর আগে সৌদি-ইরান বিরোধ লাগিয়ে রাখার জন্য ইরান আরো অসহায় হয়ে ছিল। এখন হবে উলটা। এবার ঠিক তেল বিক্রি না তবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির গ্লোবাল ভুমিকার নায়ক হয়ে উঠবে এই তিন দেশ।  আমরা মনে রাখতে পারি ইরান-চীন ২৫ বছরের বাণিজ্য-বিনিয়োগ চুক্তির কথা। যার সার কথা ইরানের তেলের বিনিময়ে চীনা ঋণ, বিনিয়োগ টেকনোলজি আর চীনা বাজার সবই উন্মুক্ত হবে ইরানের কাছে।   এছাড়া এর আরো সম্ভাবনা – মানে কোন দিকে সম্ভাব্য কী হতে পারে সেদিকে তাকালে পাই তুরস্কের এরদোয়ান-কে। যদিও তিনি শুরুতেই যোগ দিতে অপারগ হবেন। তা হলেও এটা বলাই যায় যে ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্য এখন চীনের পক্ষে ও হাতে চলে গেছে।  তাই সৌদি, ইউএই (UAE) এবং মিসর কে ব্রিকসের সদস্য করে নেয়া এটা ছিল চীনের  কাছে বিরাট প্রায়োরিটি; অন্তত বাংলাদেশের তুলনায়। যদিও বাংলাদেশ চীনের জন্যও খুবই গুরুত্বপুর্ণ – এখানে ভারতের চেয়েও চীনকে প্রভাবশালী হয়ে উঠতেই হবে! কিন্তু বর্তমান অস্থিরতায় সে হাসিনার টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে দেখে – আর তা বুঝা যায় কেন সে বাংলাদেশের চেয়েও মধ্যপ্রাচ্যকে প্রায়োরিটীতে উপরে রাখলো

     এতদিন মিসর ছিল আমেরিকান সক্ষমতার এক প্রধান হাতা, এক নির্ভরশীল ফ্যাক্টর। এখন কী হবেঃ
    মূলকারণ, ১৯৭৮ সালে আমেরিকান মধ্যস্থতায় ইসরায়েলকে মিসরের সাথে ক্যাম্প-ডেভিড চুক্তি করতে বাধ্য করেছিল আমেরিকা। আর এর মাধ্যমেই কিসিঞ্জারের মধ্যপ্রাচ্য পলিসির (তেলের উপর খবরদারি সহ) [Kissinger ME policy] এতদিন প্রধান পশ্চিমা-নীতি মধ্যপ্রাচ্যে কার্যকর হয়ে ছিল। আর এর সুযোগেই আমেরিকা ইসরায়েলকে দিয়ে বারবার ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ হাতে পেয়েছে, ব্যবহার করে। মধ্যপ্রাচ্য আমেরিকার হাতের মুঠোয় হয়ে যাওয়ার  চাবি কাঠি হয়ে ছিল এতদিন। আমেরিকার এই বিশেষ প্রভাব ও সক্ষমতাটাই এখন দুর্বল হয়ে শুরু করবে; চীনা প্রভাব এর উপরে জায়গা নিবে। এটাই গ্লোবাল অর্থনৈতিক পালাবদল বা এর আরেকটা প্রকাশের দিক!
    কিন্তু এবার চীনা মধ্যস্ততায়  সৌদি, ইউএই (UAE) এবং ইরানের সাথে মিসরও এসে যাওয়াতে ইসরায়েল – সেও এখন আমেরিকার চেয়েও সরাসরি চীনের সাথে যোগাযোগ করে নিজ নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা খুঁজে নিতে বাধ্য হবে। ইরানকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আক্রমাণাত্মক অবস্থান যদি কমাতে চায় তবে চীনের কাছে যেতে হবে। চীনের মাধ্যমে ইরানের কথা শুনতে হবে।  ক্রমশ মধ্যপ্রাচ্য মানেই  চীনই সেখানকার একমাত্র কার্যকর শক্তি ও জায়গা  – এমন বলে মেনে নিতে হবে  – যারই মধ্যপ্রাচ্যে স্বার্থ আছে এমন সকলকেই  – ঘটনা ফেনোমেনোর অভিমুখ এখন সেদিকে আগিয়ে গেল। আমেরিকার চেয়ে চীন এখন ইসরায়েলের কাছে নিজ নিরাপত্তার নিশ্চিত করার স্বার্থে অনেক বেশি ওজনদার প্রভাবের দেশ হয়ে উঠার সম্ভাবনা। এককথায় ইসরায়েল-মিসর সহ সারা মধ্যপ্রাচ্যে চীন এখন আমেরিকার চেয়ে শক্তিশালী ও বড় প্রভাব নিয়ে হাজির হতে থাকবে। আর এসব ততপরতা পিছনের এক  নয়া গ্লোবাল অর্থনৈতিক ভিত্তির যোগানদার হয়ে হাজির হবে ব্রিকস ও চীনা নেতৃত্ব।

    তাহলে মোদির দেয়া সদস্যপদ লাভের শর্তের কী পরিণতি হলঃ 
    এক বা্ক্যে  সারকথাটা বললে, মোদির ভারত চেয়েছে হাসিনার বাংলাদেশ যেন অন্তত এবার ব্রিকস সদস্যপদ লাভ নাকচ হয়ে যায়। আর সেটাই মোদি ঘটিয়েছে বিনিময়ে, চীনের অন্যস্বার্থে সে সম্মতি দিবে এই কৌশল করে। এটাকে আপাতত মোদি নিজের বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য মনে করতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এতে সারা বাংলাদেশ এখন মোদির ভারতকে প্রবল বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী এক দানব রাষ্ট্র যাকে পরাজিত করতেই হবে বলে গণ্য করা শুরু করে দিয়েছে পপুলার বাংলাদেশ। এতে বলাই বাহুল্য বাংলাদেশে ভারতের নুন্যতম প্রভাবও যেন না থাকে এটাই তারা আগামি যেকোন সরকারের কাছে দেখতে চাইবে। আর এটা ভারতের যেকোন শাসক শত কান্নাকাটি অথবা শত ষড়যন্ত্র করেও ফিরাতে পারবে না।
    শেষ বিচারে মোদি তাই এতে ভারতের লাভের চেয়ে বরং বিশাল ক্ষতি ডেকে আনলেন। মোদি সেই কাজটাই করলেন! যেটা অন্যের জন্য খাল কাটা! আগামিতে বাংলাদেশে কোন দলের পপুলার ক্ষমতার উপর ভর করে আসার একনম্বর ফ্যাক্টর হয়ে গেল ভারতের প্রভাবশুন্য করার নীতি-পলিসি দেখানো।

    বাংলাদেশ যেন অন্তত এবার ব্রিকস সদস্যপদ লাভ নাকচ হয় এটা মোদি ঘটিয়েছে বিনিময়ে, চীনের অন্যস্বার্থে সে সম্মতি দিবে এই কৌশল করে।
    এটাকে আপাতত মোদি নিজের বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য মনে করতে পারে।
    কিন্তু মনে রাখতে হবে এতে সারা বাংলাদেশ এখন মোদির ভারতকে প্রবল বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী এক দানব রাষ্ট্র যাকে পরাজিত করতেই হবে
    বলে গণ্য করা শুরু করে দিয়েছে পপুলার বাংলাদেশ। এতে বলাই বাহুল্য বাংলাদেশে ভারতের নুন্যতম প্রভাবও যেন না থাকে এটাই তারা আগামি
    যেকোন সরকারের কাছে দেখতে চাইবে। আর এটা ভারতের যেকোন শাসক শত কান্নাকাটি অথবা শত ষড়যন্ত্র করেও ফিরাতে পারবে না।
    শেষ বিচারে মোদি তাই এতে ভারতের লাভের চেয়ে বরং বিশাল ক্ষতি ডেকে আনলেন। মোদি সেই কাজটাই করলেন! যেটা অন্যের জন্য খাল কাটা!
    আগামিতে বাংলাদেশে কোন দলের পপুলার ক্ষমতার উপর ভর করে আসার একনম্বর ফ্যাক্টর হয়ে গেল ভারতের প্রভাবশুন্য করার নীতি-পলিসি দেখানো। 

     

    কিন্তু আপাতত বাংলাদেশের হাত ছাড়তে কেন চীন এতে রাজি হলঃ
    এর উত্তরটা, প্রশ্নটাকে আরেক ভাবে বুঝে বা পেশ করে দেয়া যাক। ছয়টা দেশ এবার সদস্যপদ লাভ করলো – এর সোজা অর্থ তাহলে এর স্বপক্ষে মোদির ভারতও সমর্থন দিয়েছে নইলে তা সর্বসম্মত হত না – তা পাশও হত না।  আর মোদি এই সমর্থন দিয়েছে – অবশ্যইচীনের সাথে একটা কিছুর বিনিময়ে। আর এটাই বাংলাদেশে সদস্যপদ সওদা [bounty] হয়ে যাওয়া!
    আসলে, চীন বাংলাদেশ বাদে যাদেরকে সদস্যপদ এবার দিতে চায় তাতে মোদির সম্মতি কিনে নিয়েছে। আর এই কেনা-বেচার সওদা হয়েছে বাংলাদেশের সদস্যপদ না পাওয়া। বাংলাদেশ যেন সদস্যপদ না পায় এতে চীনকে রাজি করিয়ে বিনিময়ে মোদি ঐ ছয় রাষ্ট্রের সদস্যপদ লাভে নিজ অনুমোদন দিতে রাজি হয়েছে। বলা যায় এই হল, চীনের সাথে মোদির ডিল বা গিভ এন্ড টেক!  কাজেই এখানে মোদি এখানে ব্রিকসের নয়া সদস্যপদ লাভের শর্ত যাই পেশ করুক প্রকৃতপক্ষে সবই ছিল ভুয়া, দেখাইন্না এক বাহানা মাত্র। আর ওদিকে সবকিছু শেষ হয়েছে এই ডিলের মাধ্যমে! কিন্তু মোদি কেন এমন চরম হাসিনাবিরোধি অবস্থান নিল?
    এটা কমবেশি অনেকের  কাছেই পরিস্কার যে ২০১৯ সাল থেকে হাসিনা ভারতের চেয়ে অনেক বেশি চীনের সাথে কমিটেড। ২০১৮ এর নির্বাচন যেমনই হোক, কথিত ঐ নির্বাচনের ব্যয় চীন যোগানোর মাধ্যমে এই সম্পর্ক যাত্রা শুরু করেছিল। সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর বা চীনা তিস্তা প্রকল্প ইত্যাদি চীনের আগ্রহ যেগুলোতে বিশেষ করে যেগুলো ভারতের আপত্তি বা হাসিনাকে ফুসলিয়ে নিজের পক্ষে নিয়ে এতদিন যেসব প্রজেক্ট ভারত হাসিনাকে নিতেই দেয় নাই। নাকচ বা বন্ধ করে দিয়েছে মূলত সেগুলোতেও তখন থেকেই চীন চেয়েছে হাসিনাকে সিদ্ধান্ত নিতে রাজি করানো – এটাই ছিল চীনেরর মূল লক্ষ্য।  আর এগুলো সবকিছুর উপর যেকোন উপায়ে বাধা দেয়া – এটাই গত সাড়ে চার বছর মোদির ভারত চেষ্টা করে গেছে। যেমন, চীনা তিস্তা প্রকল্পে ভারতের সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের দিকে ১৬ কিমি পর্যন্ত চীনারা কোন কাজ করতে পারবে না বলে ভারত আপত্তি  তুলে রেখেছে।  তিস্তার মত প্রকল্পগুলোতে চীনকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন না দেয়ার পিছনে এমন ভারতীয় আপত্তিকে উপেক্ষা করে হাসিনা কাজ করতে পারে নাই। তবে সব প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন এগিয়ে যেতে পারে নাই আর বাধা সৃষ্টি করে রাখার বেশি কিছু ভারত করতে পারে নাই – এই হল এক খামোখা ব্যলেন্সিং পয়েন্ট এমন হয়ে থেকেছে। কিন্তু আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে পরিকল্পনা হল আগামিতে হাসিনা যদি নিজেকে আবার বিজয়ী বলে যেভাবেই হোক ঘোষণা করতে পারে তাহলে এরপরেই ভারতের আপত্তিগুলো পায়ে মারিয়ে চীনের সাথে হাসিনা এগিয়ে যাবে এই ছিল চীনের সাথে সরকারের বুঝাবুঝি – অনুমিত ধারণাটা এরকম। পশ্চিমা গোয়েন্দা ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট গুলোও এরকম ধারণা দিচ্ছে। অথচ অন্য কোন কিছু দিয়ে হাসিনাকে ফিরাতে মোদি ব্যর্থ হয়ে থাকছিল।  এতে হাসিনার যুক্তি ছিল সে চীনের সাথে এমন ডিল না করলে ক্ষতায় ফিরতে পারবে না – আমেরিকান চাপ ফেরানো অসম্ভব। আর মোদির যুক্তি হাসিনা-চীনের এই ঘনিষ্ঠতা মোদির ভারতের কাছে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।  এই ত্রিভুজ সংকট পরিস্থিতিতে না পেরে মোদি হাসিনাকে থামাতে গিয়ে শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করেছে – মোদি খোদ চীনের সাথেই ডিল করে বসেছে।
    তাহলে চীনের দিক থেকে – সেই-ইবা কেন মোদির প্রস্তাবে রাজি হল?

    চীনকে দেয়া  মোদির ডিল-প্রস্তাব যে হাসিনার হাত ছেড়ে দিতে হবে – এতে চীন কেন রাজি হল?
    এখন এটা তো সবাই জানে দেখাই যাচ্ছে যে বাস্তবতা হল,  চীন ও মোদি উভয়েই  বা এরা দুপক্ষই  হাসিনার হাত ছেড়ে দিয়েছে। বা বাংলাদেশকে ব্রিকসের সদস্যপদ না দিতে তারা এক ঐক্যমত্য কায়েম করেছে।  এর মানে মোদির ডিল-প্রস্তাবে চীন হ্যা দিয়েছে। তাহলে চীন এমন করল কেন? বাস্তবত  চীনের এতে রাজি হয়ে যাওয়া এটাই সব বলে দিচ্ছে যে খুব সম্ভবত চীনের  ক্যালকুলেশন-অনুমান হল, হাসিনা আর আগামিতে ক্ষমতায় থাকতে বা ফিরতে পারছে না। তাই, মোদির ডিল-প্রস্তাব চীনের মেনে নিয়ে হাসিনাকে ছেড়ে দেয়া আর বিনিময়ে বাজি ছয় রাষ্ট্রকে সদস্যপদ দেওয়া প্রশ্নে মোদির ভারতকে দিয়ে সমর্থন দেওয়ানো – এই ডিল গ্রহণই চীনের জন্য সহি বেটার ডিল এবং সবচেয়ে লাভজনক!

    অর্থাৎ মোদি যা চেয়েছিল তা পেয়ে নিয়ে বাসায় গেছে। চীনও যেটা বেশি লাভজনক তাই পেয়ে নিয়ে ফিরে গেছে। মাঝখানে হাসিনা এদুইয়ের বেচা-বিক্রির ডিলের মধ্যে পরে সবই হারিয়েছে।
    এছাড়া চীনের দিক থেকে দেখলে  তার ইউয়ানকে ডলারের স্থান নেওয়ার  পক্ষে  কাজ শুরু করার  স্বার্থ মানে এর পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যকে কাজে লাগানো এটা অনেক বেশি অর্থপুর্ণ। ও বড় প্রায়োরিটি। সেটাই সে পেয়ে গেছে।

    শেষ করব তাহলে ইথিওপিয়া আর আর্জেন্টিনা কেন সদস্যপদ পেলো এর তাতপর্যঃ
    ইথিওপিয়া সম্পর্কে  বাইরের বিশেষ করে এশিয়ার মানুষের ধারণা খুবই কম। সৌভাগ্যবশত আমার প্রায় তিন বছর ওর রাজধানী আদ্দিস আবাবা-তে বসবাসের অভিজ্ঞতা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করেই কিছু কথা বলব।
    ইথিওপিয়ার বৈশিষ্ট একঃ
    বাইরের দুনিয়া থেকে বা অন্য মহাদেশ থেকে আফ্রিকার প্রবেশের গেটওয়ে মূলত তিনটা। বিশেষ করে বাণিজ্যিক বিমানের রূটগুলো লক্ষ করলে বুঝা যায়। আপনাকে সবার আগে কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা আর না হয় ইথিওপিয়াতে ঢুকতে হবে।  এসব ফ্লাইট নিতে হবে। পরে যে আফ্রিকান দেশে যেতে চান  সেদেশের ফ্লাইট বদলে নিতে হবে কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা আর না হয় ইথিওপিয়া থেকে। মানে এই তিন দেশই হয়ে উঠেছে আফ্রিকার যেখানে যেতে চান এরই হাব বা প্রথম মোকাম দেশ।
    ইথিওপিয়ার বৈশিষ্ট দুইঃ
    আফ্রিকা থেকে কলোনি দখল উঠে গেছে এশিয়ার পরেপরেই – ১৯৬০-৮০ এই সময়ের মধ্যে  ব্যাতিক্রম কেবল সাউথ আফ্রিকা ১৯৯৪।  আর একেবারেই ব্যতিক্রম হল ইথিওপিয়া যে কখনও কলোনিদখলও হয় নাই। শুধু তাই না, পুরা দুই বিশ্বযুদ্ধের সময় ইথিওপিয়া রাজা হাইলে সেলাসি শাসিত দেশ ছিল। রাজা ক্ষমতায় ছিল ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। যতক্ষণ তা এক সোভিয়েত কমিউনিস্ট সমথিত  সামরিক ক্যু ঘটেছিল হাইলে মেঙ্গাস্তু [Mengistu Haile Mariam] -র হাতে। আরও পরে ১৯৯১ সালে চীনাস্ইটালে গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে ফেলার মত আরেক কমিউনিস্ট গ্রুপ এখন ক্ষমতায়। আর সেনাবাহিনী হল ঐ গেরিলা বাহিনীর সদস্যরা।
    সারা আফ্রিকার আর বড় পিছনে পড়ে অক্ষমতা হল, নুন্যতম পুজি বিকশিত বা শহরায়ন ঘটবার আগেই কলোনিদখল হয়ে যাওয়া। কথাটা অন্যভাবে বললে, সারা আফ্রিকার মানুষ আগে শহর কী জিনিষ তা দেখেনি। কলোনি মাস্টারেরা দখলের পর তারাই শহর গড়েছিল – মানে এসব মাস্টারের হাত ধরেই আফ্রিকার মানুষ শহর কী তা চিনেছিল। তুলনায় ভারতে বৃটিশেরা দখল নিবার আগেই আমাদের অন্তত তিনটা বড় বড় সমৃদ্ধ শহর (লক্ষ্ণৌ, হায়দ্রাবাদ আর দিল্লি) গড়ে উঠে গিয়েছিল।  আর এসব শহরের শহুরে পোষাক-ই হলো পাঞ্জাবি, এজন্য এটা কোন ধর্মের পোষাক নয়। শহরের প্রতীকী পোষাক বলে তা এখনও ভারতের সামাজিক অনুষ্ঠানে বা বিয়ের মুখ্য পোষাক!
    আফ্রিকার এই মারাত্ম পিছনে পড়ে থাকা এটা এতই মারাত্মক যে কলোনি শাসকেরা ফিরে গেলে সাধারণ ট্রেডিং  মুদিখানা বা পষাকের মত নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ট্রেডিং – এটা শুরু করার মত মধ্যবিত্ত আফ্রিকার প্রায় সব দেশেই গড়ে উঠে নাই। আর এজায়গাটাই দখল করে আছে বৃটিশদের হাত ধরে আফ্রিকার মাইগ্রটেড ভারতীয় শ্রমিক পরিবারেরা। অথচ এই কমন চিত্রের একমাত্র ব্যতিক্রম হল ইথিওপিয়া।
    একালে অবকাঠামো পুঁজি ও সাথে FDI বা বিদেশি কারখানা পুঁজিও চীনের চীনের কারণে পাওয়া সহজ হয়েছে বলে এমন পুঁজি কাজে লাগানোর সক্ষমতা ইথিওপিয়ার সবচেয়ে বেশি। একারণের চীনের চোখে এক গুরুত্বপুর্ন গন্তব্য হল ইথিওপিয়া! মানে এটাও আফ্রিকায় চীনেরই বড় স্বার্থের দেশ যাকে চীন ব্রিকস এর সদস্য করে নিল!

    সবশেষে আর্জেন্টিনাঃ
    গত কমপক্ষে সাত বছর ধরে লাগাতর আর্জেন্টিনা অর্থনৈতিক অবস্থা ডুবন্ত। যার মুদ্রাস্ফীতি ১০০% এর বেশি আর ৪০% এর বেশি লোক দারিদ্র সীমার নিচে চলে গেছে। এঅবস্থায় ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা  আর্জেন্টিনার কেস ব্রিকসে নিয়ে আসে, বিশেষ করে চীনের নজর ও বিবেচনায়।  ভেনেজুয়েলা যেমন সেবার চীনের কাছে কিউবান সুপারিশ  পেয়েছিল।  তেমনই আর্জেন্টিনাওপক্ষে পাওয়া শক্ত সুপারিশের কারণে চীনের নজরে আসায় এর পরিণতিতে র্আজেন্টিনাও এবার ব্রিকসের সদস্যপদ লাভ করে যায়। আর এতে চীনের আরেক বড় লাভ হয় নিজের পক্ষে ব্রাজিলের সমর্থন ও আস্থা আরো পোক্ত হল।

    তাহলে এককথায় বললে ছয় নয়া সদস্যই অনুমোদন পেয়েছে মূলত চীনের আগ্রহ ও সমর্থনের কারণে।  কারণ,  মোদি যতই ভাব দেখাক ব্রিকস বলতে এর মূল সক্ষমতা তো চীনের।  একমাত্র চীনেরই আমাদের মত দেশকে অবকাঠামো বা অন্যধরণের পুঁজি ঋণ দিবার সামর্থ আছে। তাতে ব্রিকস এর উদ্যোক্তা সদস্য আরো চার রাষ্ট্র হলেও এরা হল ডেকোরেশন!  বাস্তবত কার্যত চীনই মূল চালিকাশক্তি। তাতে ভারতের মোদি যতই ভাব দেখাক! বাংলাদেশকে ব্রিকসের বাইরে রাখুক!
    এরই রিফ্লেকশন ঘটতে বা ছাপ পড়তে দেখেছি আমরা এবারের নয়া সদস্যপদ বিতরণে!

    আপডেটেডঃ  ২৮  আগষ্ট  ২০২৩; রাত ২ঃ ১৩
    সর্বশেষ  আপডেটেডঃ  ২৯ আগষ্ট ২০২৩;  সকাল ০৮ঃ ১১ 

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • মোদির আনা শর্ত ও পরিণতিতে বাংলাদেশ ব্রিকসে নাই

    মোদির আনা শর্ত ও পরিণতিতে বাংলাদেশ ব্রিকসে নাই
    গৌতম দাস
    ২৫ আগষ্ট ২০২৩      মধ্যরাত ০০ঃ ০৪
    https://wp.me/p1sCvy-4Ro

     

    আজ বাংলাদেশের বিকেল পাঁচ টার দিকে বিবিসি জানায় “ব্রিকসে যোগ দিতে ছয় দেশকে আমন্ত্রণ, ডাক পায়নি বাংলাদেশ“। অথচ যারা ভারতের অর্থে নিজ মিডিয়া বাঁচিয়ে রেখেছে তারা নিঃশ্চুপ। তারা এনিয়ে সরাসরি নিউজ করে নাই। তবে ডেইলি স্টার এনিয়ে তবে  UNB বরাতে এনিয়ে আড়ালের নিউজটা ছেপেছে। এমনিতেই UNB প্রো-গভর্মেন্ট এজেন্সি অবস্থান নিয়ে চলেছে।  যেটা ছেপেছে চীন বাংলাদেশের সদস্যপদ চাওয়া সমর্থন করবে, [“China to support Bangladesh in joining BRICS, XI tells Hasina।] কিন্তু এটা এখন হাফ ট্রুথ। মানে কথা অসত্য না, কিন্তু অর্ধসত্য বলে অকার্যকর। চীনের এই সমর্থন তখনই এর মানে হবে যখন বাংলাদেশ সদস্যপদ পাবার শর্ত পূরণ করবে। আর বাংলাদেশ মোদির আপত্তিতে তা পূরণ করতে পারবে না – মানে সাতমণ তেল ঢালাও হবে না, রাধাও নাচবে না – এমন দশা হবে। এনিয়ে বিস্তারিত আরো পরে এনেছি।

    দক্ষিণ আফ্রিকার ১৫তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন চলছে ২২-২৪ আগষ্ট। এছাড়া এই সম্মেলন থেকেই ব্রিকসে নয়া সদস্যরাষ্ট্র যুক্ত হবার কথা ছিল। মানে জন্মের সময় থেকেই এর উদ্যোক্তা সদস্য পাঁচ রাষ্ট্র ছিল, তা এবারই প্রথম বাড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু বড় ধরণের বিতর্ক দেখা দেওয়াতে তা এবার আর হচ্ছে না। এছাড়া আর ব্রিকসের সিদ্ধান্ত নিবার পদ্ধতি হল কেবল – সদস্যরা সবাই এক হলে তবেই সেটা সিদ্ধান্ত – এই নীতিতে চলে বলে এব্যাপারে একমত হতে তাদের আরো সময় লাগবে। অর্থাৎ এবারের সম্মেলন থেকেই নয়া সদস্য নেয়া হচ্ছে না। এটা ইতোমধ্যেই ব্রিকসের মূল অফিসিয়াল ভার্সান কেউ না দিলেও  “ভিতরের খবর” হিশাবে গত ১৭ আগষ্ট এই আভ্যন্তরীণ সমস্যার দিকটা মিডিয়ায় এসে পড়েছিল। হংকংয়ের সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্টের বরাতে প্রথম আলো খবরটা দিয়েছিল। শিরোনাম ছিল, ব্রিকসে নতুন সদস্য চায় চীন, তবে ‘সতর্ক’ অবস্থানে ভারত ও ব্রাজিল।  আর গত ২৩ আগষ্ট নিউ ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক যেটা বিশ্বব্যাংক সমতুল্য ব্যাংক হিশাবে ব্রিকসের বিশ্বব্যাংক হিসাবেও পরিচিত; এই ব্যাংকের প্রধান ফাইন্যান্স অফিসার [CFO, Chief Financial Officer Leslie Maasdorp] তাঁর বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে। এই ছিল ২৩ আগষ্ট পর্যন্ত ঢাকায় পাওয়া ও জানতে পারা ঘটনাবলী।

    কিন্তু  এবারের ব্রিকস সম্মেলন ঘটনাবহুল। যতটা লিখতে পারা যায় তার চেয়েও দ্রুত ঘটনা বদলাচ্ছে। এর উপর আজ ২৪ আগষ্ট পর্যন্ত সম্মেলন কার্যকর আছে তাই নয়া ঘটনা সিদ্ধান্তঅও আসছে। সেসব ত্নফরমেশন ও সাথে ব্যাখ্যা করতে কয়েক পর্বে লিখতে হবে।  তাই আজ এখানে কেবল সংক্ষিপ্ত একটা ভাষ্য লিখব।

    এক.
    যেমন প্রধান এক ঘটনা হল, ২২ আগষ্ট সাউথ আফ্রিকার দৈনিক ম্যাভেরিক [maverick] পত্রিকা জানাচ্ছে সেই খবরের শিরোনাম হল, “ত্রিভুজ প্রে্মের কঠিন ক্যাচালঃ সাউথ আফ্রিকা প্রেসিডেন্ট রামফোসা চীনা প্রেসিডেন্ট শি এর দিকে ফোকাস দেওয়াতে মোদির হাত-পা ছুড়ে ক্ষোভ প্রকাশ, ‘আমি কী ভাইসা আইছি’ বলে রাগ, তিনি প্লেন থেকে নামবেনই না” [Tough Love Triangle: While Ramaphosa focused on Xi, Modi threw a tantrum and refused to get off his plane]। শেষে অবশ্য মোদি আউথ আফ্রিকার ভাইস প্রেসিডেন্টের সাথে প্লেন থেকে নেমে গার্ড অফ অনার নিয়েছেন। অন্তত ছবি দেখে যা বলা যায়।
    তবে এর পিছনের মূল কারণ ঐ পত্রিকা ব্যাখ্যা করেছে। সেটা হল, প্রেসিডেন্ট শি ব্রিকস সম্মেলন শুরুর আগেই সাউথ আফ্রিকা এসেছেন আগের দিন। কারণ তার সফর ছিল  সাউথ আফ্রিকার সাথে প্রথমত দ্বিপাক্ষিক। সেটা শেষ হলে পরের দিন তিনি যোগ দিয়েছিলেন ব্রিকস  বৈঠকে। তাই তাকে রিসিভ করেছিলেন প্রেসিডেন্ট রামফোসা। যদিও পত্রিকা জানাচ্ছে তার মনে ইচ্ছা ছিল মোদির বেলায়ও তিনিওই আসবেন কিন্তু শিডিউল মিলাতে পারেন নাই। এছাড়া ঐ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ছিল সাউথ আফ্রিকার জন্য খুব গুরুত্বপুর্ণ বাণিজ্যিক বৈঠক। এজন্য যে চীনে সাউথ আফ্রিকার সোনাসহ অন্যান্য মূল্যবান ধাতু রপ্তানি এবং আরো গিউরুত্বউর্ণ  মাংস রপ্তানি যেটা এতদিন বন্ধ ছিল এসব বাজার খুলবার চুক্তি সই ছিল এই সফরের বড় গিরুত্বপুর্ণ অংশ। এসব মিলিয়ে প্রেসিডেন্ট শি এর গুরুত্ব অন্য যেকোন কিছুর চেয়ে হয়ে উঠেছিল বেশী মুল্যবান অতিথির আগমন। আর এটার সাথে অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিজ তুলনা করতে গিয়ে ভারতের মোদি হাত-পা ছুড়েছিলেন কিন্তু লাভ হয় নাই।
    এবারের সফরের আগে-পড়ে ভারত প্রতিটা পদে পদে অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিজেকে চীনের সাথে তুলনীয় করে হাজির করতে গিয়েছে আর পিছু হটেছে বা আরো মলিন্মুখের  ইমেজ নিতে বাধ্য হয়েছে।

    দুই. মূলত মোদির ভারতের কারণে বাংলাদেশের ব্রিকস সদস্যপদ আটকে যাচ্ছেঃ
    ঘটনা উপস্থাপনটা বাংলাদেশের দিক থেকেই করা যাক!  ইতোমধ্যেই প্রথম আলো সুর বদলে লিখেছে আসলে আবেদন ছাড়া কিছুই করেনি বাংলাদেশ। ওর রিপোর্টের প্রথম প্যারাটা এরকমঃ

    আসলে আবেদন ছাড়া কিছুই করেনি বাংলাদেশ। যদিও বাংলাদেশের
    নীতিনির্ধারকেরা ব্রিকসের নতুন সদস্যপদ পাওয়া নিয়ে বিশেষভাবে
    উৎসাহী ছিলেন। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে ভিন্ন এক ভূরাজনৈতিক
    পরিস্থিতিতে ব্রিকসের সদস্যপদ পেলে তা বাংলাদেশের জন্য নতুন
    এক মাত্রা যোগ করত বলেই ধারণা করা হচ্ছিল।

    দ্রুত মূল কথাটায় চলে যাই। সবাই জেনেছিলেন যে নয়া সদস্য করতে গিয়ে নয়া ক্রাইটেরিয়া মানে শর্তাবলী কী হবে একথা বলে ব্রিকসের ভিতরে বিতর্ক শুরু হয়েছিল গত শেষ দশদিন ধরে। রয়টার্সের ভাষায় সবই ঠিক চলছিল কিন্তু শেষ সময়ে এসে মোদি সদস্যপদ দিবার ক্ষেত্রে কিছু নয়া শর্তের কথা তুলে ধরেন।

    An agreement had been meant to be adopted following a
    plenary session
    earlier on Wednesday, but the source said
    it had been
    delayed after Indian Prime Minister Narendra Modi introduced new admission criteria.

    যেমন তিনি বলেন,  যেসব দেশের উপর অ্যামেরিকান স্যাংশন নাই – এটাই একটা শর্তাবলী হতে হবে …requiring members not be the target of international sanctions।।  এটা রয়টার্সের ২৩ আগষ্ট ২০২৩ এর প্রকাশিত রিপোর্ট। আর  বাংলাদেশের ২৫ আগষ্ট তারিখ গননা শুরুর রাত বারোটা থেকে  পিছনের প্রায় ১৮ ঘন্টা আগে ছাপানো রিপোর্ট।

    “The BRICS country official said that admission criteria India’s Modi proposed
    included requiring members not be the target of international sanctions,
    ruling out potential candidates Iran and Venezuela.”

    “Modi was also pushing for a minimum per capital GDP requirement”.

    এখানে,  রয়টার্স যদিও সদস্যপদ পাবে না এমন রাষ্ট্র বলতে উদাহরণ হিশাবে ইরান ও ভেনিজুয়েলা বাদ পড়ার কথা তুলেছে। কিন্তু  মজার কথা হল তাহলে তো খোদ রাশিয়াও বাদ পড়ে যাবার কথা। কারণ, সবচেয়ে বড় অ্যামেরিকান অর্থনৈতিক স্যাংশন খাওয়া দেশ হল রাশিয়া। এছাড়া বাংলাদেশও শ্যাংশন খাওয়া দেশ বটে – এই বিচারে তো বাংলাদেশও ব্রিকসের সদস্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বাদ পড়ে যায় ও যাবে।
    যদিও এসব ইজ্জতের কথা ঢেলে ফেলার জন্য আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন এক সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন। এর রিপোর্ট UNB এর বরাতে ডেইলি স্টার ছেপেছে। যার শিরোনাম হল, China to support Bangladesh in joining BRICS, XI tells Hasina। এটা দেখে মনে হতে এই তো চীন আমাদের সদস্যপদ পাওয়া সমর্থন করে দিবে বলেছে। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক সেরকম নয়। তবে এটাই ব্রিকসে গিয়েও ভারতের চীন ঠেকানোর ততপরতা বলা যায়।
    প্রথমত, সদস্যপদ দেওয়ার শর্তাবলী কী হবে এনিয়েই ব্রিকস আটকে গেছে যা এবার আর ছুটছে না।  সময় লাগবে। সম্ভবত এমনটাই যে পরিণতি হবে সেটা অনুমান করে প্রেসিডেন্ট শি এই সাউথ আফ্রিকা সফরে পৌছানোর শুরু থকেই সরব। তিনি বারবার বলছেন, “যত ধরণের বাধাই আসুক ব্রিকস বেড়ে চলবেই [Xi said BRICS would continue to grow “whatever resistance there may be.]”  এছাড়া ব্রিকসে তার আনুষ্ঠনিক মূল বক্তব্যে তিনি বলেছেন ব্রিকস গ্রুপের সদস্যপদ বাড়াতে আহবান জানিয়ে কথা বলেছেন, [ Xi Jinping called for the acceleration of the expansion of the BRICS group…]।  তাই সারকথা হল, আপাতত বাংলাদেশের সদস্যপদ আটকে গেলো মোদির ভারতের কারণে।

    তিন. এটা কেমন ভারত যে হাসিনার সদস্যপদ আটকে দেয়ঃ
    গত চারদিন ধরে আমরা মথ্যা প্রপাগান্ডার তোলপাড় দেখেছি যে ভারত নাকি হাসিনাকে ফিরে ক্ষমতায় রেখে দেওয়ার জন্য আমেরিকাকে কূটনীতিক বার্তা পাঠিয়েছে – এই ভুয়া খবরের।  তাহলে সেই ভারত এখন হাসিনা সরকারের ব্রিকস সদস্যপদ আটকাচ্ছে কেন?
    প্রথম আলোই কিন্তু ডয়েচ ভেলের ভুয়া মিথ্যা প্রপাগান্ডাটা ছাপীয়েছিল বীরদর্পে। আমরা ভুলি নাই। তাহলে এখন ব্রিকসে বাংলাদেশের সদস্যপদ পাওয়া নিয়ে প্রথম আলোর  আসলে আবেদন ছাড়া কিছুই করেনি বাংলাদেশ। এই বিরাট জ্ঞানী মন্তব্যটা কেন? ভাতার ভারতেরও মন রক্ষা করতে হবে? এজন্য? যাতে দেনা-পাওনা চালু থাকে?
    এর মানে ভারত বাংলাদেশকে যে অবস্থায় ফেলে দেয় সেটাই ভাল মনে করে, সেটার পক্ষে দাড়ায় প্রথম আলো!!! সব দোষ বাংলাদেশের, তাই না? তবে মোদির এই হাসিনাবিরোধি অবস্থান এটাও প্রমাণ করে যে ভারতের কথিত কূটনীতিক বার্তার খবরটাই ডাহা মিথ্যা কথা ছিল!

    চার. মোদির ভারত কেন ব্রিকসে এই অবস্থান নিলঃ
    নিঃসন্দেহে মোদির ভারতের ব্রিকসে এই অবস্থান নেয়া এটা শুধু চীনবিরোধি বা ব্রিকসের সম্প্রসারণ-বিরোধীই শুধু না এটা খোদ ব্রিকসেরই বিরোধী। মানে যা ব্রিকসের ভারতের জন্য আত্মঘাতি। কেন?

    হংকংয়ের সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্টের একটা লেখা মন্তব্য প্রতিবেদন এরকম যে,  ভারত সম্ভবত শিগগিড়িই – হয় ব্রিকস না হয় পশ্চিম (আমেরিকা) একটা বেছে নিতে হবে এমন অবস্থায় পড়তে যাচ্ছে [India may soon be forced to choose between Brics and the West]।  প্রথম কথা হল, ভারত নিজে এখন ব্রিকসের উদ্যোক্তা সদস্য। এমন সদস্য থাকা অবস্থায় মোদির ভারত যখন বলেন, অ্যামেরিকান স্যাংশন খাওয়া দেশ সদস্যপদ পাবে না  – এর অর্থ ভারত  ব্রিকসে আছে আর এভাবে থাকা অবস্থাটাকেই সে আমেরিকার কাছে বিক্রি করতে চায়, সুবিধা চায়। এজন্যই চীন বলছে ব্রিকসের সম্প্রসারণ করতে হবে আর ভারত বলছে আমেরিকা আপত্তি দেওয়া দেশকে ব্রিকসে নেয়া হবে না।
    এর আরো ভয়াবহ অর্থ আছে।
    যেমন ধরেন ইরানঃ এই ইরান জন্মের সময় থেকে ১৯৭৯ সাল থেকেই আমেরিকান বাধা সয়েই লড়াই করে নিজ অর্থনীতি টিকে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। বাইডেনের সময়ে এবার এটা আরেক চরমে উঠেছে।  স্যাংশন মানে হল ডলারে বাণিজ্য করা যাবে না, তেল বিক্রিতে ডলারে ইনভয়েজ [invoice] লেখা যাবে না, ডলারে পেমেন্ট নেয়া যাবে না। সোজা কথায় বিক্রি যগ্য পণ্য থাকা সত্বেও না খেয়ে বিনা চিকিতসায় মরতে হবে  – এমনই এক আন্তঃরাষ্ট্রিয় বাণিজ্য ব্যবস্থায় ইরানকে ঠেলে দেয়া হইয়েছে। এখন ব্রিকস হলে এর সদস্যপদ পেলে ডলারের সমান্তরাল গ্লোবাল বাণিজ্যের আরেক কারেন্সি ব্যবহারের সুবিধা ঐ ইরানের কাছ থেকে কেড়ে নেয়ার পক্ষে – এমন আমেরিকান দালালির পক্ষে মোদি দাঁড়িয়ে গেলেন।

    কিন্তু একটা কথা পরিস্কার করে দেই।  সবার আগে। ব্রিকস নিয়ে নানাবিধ ভুল অনুমান আছে আর তা বেশির ভাগ একাদেমিক, অধ্যাপক, প্রাক্তন আমলা-সচিব আর সাথে আমেরিকান চাপে থাকা হাসিনা সরকারের মত লোকজনও আছেন।
    কথাগুলো হলঃ
    ১।  ব্রিকস চল্লিশ বা এরও বেশি নয়া সদস্য নিয়ে কার্যকর হলেও এসব নয়া দেশগুলো আর ডলারে বাণিজ্য করবে বা এমনকি আমেরিকার সাথেও আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্পর্ক সব বন্ধ হয়ে যাবে এমন অনুমান অবাস্তব, মিথ্যা।  এখন অল্পকথায় বললে, ডলার আন্ত্রররজাতিক কারেন্সি বলে আইএমএফ চালু হয়েছিল ১৯৪৫ সাল থেকে। কিন্তু এর আগের বৃটিশ সাম্রাজ্য (যাদের সাম্রাজ্যে নাকি কোনদিন অস্তে যায় না যাবে না – এমন গর্বের) – সেই বৃটিশ পাউন্ডে  আন্তঃরাষ্ট্রিয় বাণিজ্য কী এরপর থেকে বন্ধ হয়ে গেছিল??? বাস্তব চন্তা করতে সক্ষম হতে হবে। আমাদের সংকট এখানেই।
    ২। আমি বারবার বলেছি, ব্রিকস কোন অর্থনৈতিক জোট একেবারেই নয়। যেমন আইএমএফ কে আমরা কোন অর্থনৈতিক জোট বলি না। আসলে  এসব শির ভাগ একাদেমিক, অধ্যাপক, প্রাক্তন আমলা-সচিব এরা কী বলতেন তাই তারা জানেন না। আসলে এরা কখনওই খেয়াল করেন নাই যে আইএমএফ জিনিষটা কী?  আর তাই বলে খোদ ব্রিকস আবার নয়। তবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর বিকল্প গড়ার উদ্যোক্তা পাঁচ দেশের জোট।
    ৩।  প্রায় আশি বছর হয়ে গেল এক নয়া গ্লোবাল অর্ডার (দুনিয়া পরিচালনের গ্লোবাল-রাষ্ট্র ব্যবস্থা যেন) চালু হয়েছে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক  উভয় অথেই আমেরিকাকে কেন্দ্রে রেখে। এখনও Global Order  জিনিষটা কী আমাদের বেশির ভাগ একাদেমিকেরা জানলেন না।  আমলে নাই। তারা এখন হঠাত করে একটা শব্দ শিখেছেন ভুরাজনীতি (Geo-politics).। আজকাল গুগল নেটের যুগে নিজে নিজেই তো কতকিছু জেনে নেওয়া যায়। তারা খেয়ালই করেন না যে Global আর Geo এদুটা একই শব্দ তো নয়ই, একই অর্থ তো নয়ই! 
    ৪। এখন তাই দিতে হচ্ছে কাফফারা। কারণ, এইকালটা পালাবদলের – অন্তত অর্থনৈতিকভাবে আমেরিকার বদলে চীনের নেতৃত্ব আসন্নের। কাজেই আমেরিকার নেতৃত্বে উত্থানের সময়টাকে যারা কহ্নও আমল করেন নাই অথচ একাদেমিক তারা এই পালাবদলকে বুঝবে ব্যাখ্যা করবে কীভাবে???   অথচ এবার ব্রিকসের সম্মেলনের আগে বাংলাদেশে কোথাও কোথায় একাদেমিক আলোচনা হতে দেখা গেল ঠিকই কিন্ত্য সেসব এতই পুওর যে হতাশা ছাড়া আর কিছু জন্মায় নাই।
    ৫। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হয়ে গেলেই হাসিনার বাংলাদেশ আমেরিকাকে বুড়া আঙুল দেখাতে পারবে এই অনুমান একেবারেই ভিত্তিহীন।  এসবই রাশিয়ার মতই অস্থিরআর “এখনই বিকল্প চাই” এমন বোকা কথা বার্তা।  প্রথম কথা ইউয়ান-কে ডলারের বিকল্প প্রধান কারেন্সি বলে হাজির করা – এটা কোন ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না – এই বিচারে এটা অবজেকটিভ ঘটনা। অন্যভাষায় বললে, এটা বাস্তবে করে দেখাতে হবে, বা হয়ে দেখাতে হবে। যা সিদ্ধান্ত নিলেই হয়ে যাবে না। কাজেই চিন বা প্রেসিডেন শি অথবা পুতিনের আর আমেরিকান স্যাংশন সহ্য হচ্ছে না ভাবলেও হবে না।
    ৬। এই ব্যাপারগুলো পরিস্কার বুঝতে গেলে আইএমএফের জন্মের ইতিহাস জানতে হবে। পারলে আমেরিকার ১৯১৪-১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস-সিনেটে যেসব আইন পাশ হয়েছে সেগুলোকে স্টাডিতে নিতে হবে। সবচেয়ে ভাল হয়, আমেরিকান ইতিহাস এর এই (১৮৮০-১৯৫৮) কালপর্বটা পাঠক পড়ে নিতে পারেন। history.com ধরণের যেকোন ওয়েব থেকে শুরু করতে পারেন। পরে নিজের নয়া ফারদার কৌতুহলের বিষয়গুলোকে ফলো করে আগাতে পারেন। খুব কঠিন কাজ নয়। নেটেই সব পাওয়া যাবে। কিন্তু ঠিক কী জানতে হবে এনিয়ে গাইড লাগবে, তাবেই অল্প কষ্টে আর বাস্তবে এসব জানা হতে পারে।
    ৭।  ভারতের আজকের এই দশা হবে সেটার মূল কারণ ভারত কেন ব্রিকসে গিয়েছে সেতা কখনই তাদের কাছেই ইমাজিনেশনে নাই। মূল কারণ, ভারতের একেদেমিকেরাও ব্যাপারটাকে মোটাদাগে মোদির মতই উগ্র অর্থনৈতিক জাতিবাদ এর চোখে দেখে থাকে।  ঘটনা হল যারা উগ্র অর্থনৈতিক জাতিবাদী মানে যারা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য অপ্রয়োজনীয় গণ্য করে, যার তার দেশের মানুষ যাকিছুই ভোগ-উপভোগ করবে তা সবই নিজ দেশে উতপাদন করতে হবে এই অকেজো অনুমানের উপর দাঁড়ানো। অথচ এরা  আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের প্রথম আন্তঃরাষ্ট্রীয় মুদ্রা ব্যবস্থা  কায়েম ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান আইএমএফের সদস্য তো হয়েছেই এরপর এখন আবার ব্রিকসেরও উদ্য্যোক্তা রাষ্ট্র হবার সুযোগ পেয়েছে, নিয়েও নিয়েছে।  অথচ উগ্র অর্থনৈতিক জাতিবাদীদের  জন্য তো কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বা মুদ্রা ব্যবস্থাই দরকার থাকার কথা নয়।  এই স্ববিরোধটাই প্রমাণ যে তারা আইএমএফ বা ব্রিকস কী তা বুঝে নিয়ে আসে নাই। তবে তাদের আছে দুনিয়ায় এক শ্রেষ্ট দেশ-রাষ্ট্র হতে হবে এই বাসনা। কিন্তু কিভাবে আর কী সেটা সেটা আবছা।
    ৮। কিন্তু তা সত্বেও তারা এটুকু বুঝেছিল যে তাদেরকে চীন আর আমেরিকার মাঝে কখনও এটাকে কখনও এটাকে ব্যবহার করেই তারা নাকি ২০৫০ সালের মধ্যে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় বড় জিডিপির অর্থনীতি হয়ে যাবে, এই হল তাদের অনুমান। এসব বোকা বোকা একেবারেই আবছা ধারণাটা মোটামুটি বাইরে এসে পড়েছিল ২০১৩ সালে। গত ২০০৯ সালে ব্রিকসের জন্ম হলেও ২০১৩ সালে চীনের বেল্ট এন্ড রোড (গ্লোবাল অবকাঠামো প্রকল্প) এর প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই সম্মেলনের আমন্ত্রণ ভারত কেন গ্রহণ করবে না সেই সিদ্ধান্ত এর পিছনের বাইরে এসে গেলে ভারতের এমন ভাবনা প্রথম বাইরে এসে পড়েছিল।  ভারত আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক কে চালাকির সম্পর্ক মনে করে এটাই মূল সমস্যা।
    ৯। ভারতের অনুমান চীনের সাথে হাসিনা সরকারের বিশেষ পরিকল্পনা হয়ে আছে যা যদি হাসিনা সরকার আগের মত এবারও যদি নিজেকে বিজয়ী দেখাতে পারে তবে তা কার্যকর হতে চাইবে। ভারত এই সম্পর্ক ও পরিকল্পনার ঘোরতর বিরোধী। অনুমান করা হয়, তাই এর বিরুদ্ধে যতটা সম্ভব তা ভন্ডুল করা যায় সেই পদক্ষেপই হল বাংলাদেশ বাদে অন্য ছয় রাষ্ট্রের ব্রিকস সদস্যপদ লাভের পক্ষে সর্বসম্মত অনুমোদন লাভের ডিলে যোগদান।
    ১০। তবে এই অবস্থা বদলে যাবে, সামনে এটা থিতু হতে থাকবে। এবার আগষ্ট মাসে ১৫ তম ব্রিকস সম্মেলন হল। অর্থাৎ আগামি ১৬তম ব্রিকস সম্মেলনে সম্ভবত দেখা যাবে বদল শুরু হয়েছে। আর আগামি বছর মানে ২০২৪ নভেম্বরের মধ্যে অনেকটাই এমন বদলে যাবে যে ওর আগামির অভিমুখ দেখতে পাওয়া যাবে বা অনেকটাই স্পষ্ট আন্দাজ করা যাবে। ভারতের মোদি অবস্থান থাকতে পারবে না।
    ১১। আমাদের একাদেমিক সমাজ এরা ব্রিকস ফেনোমেনা বুঝতে অক্ষম হবার পিছনে আছে আমাদের অবুঝ কমিউনিস্ট ভায়েরা।  তাদের ধারণা সারপ্লাস চুরি হল দুনিয়া একমাত্র ইস্যু।  আর  এই ঘ্যাঘের ওষুধ একটাই এর সমাধান হল রাষ্ট্রীয় মালিকানার সমাজতন্ত্র। কাজেই সব মানুষেরই একই রোগ তাই ওষুধ এক – সবাইকেই প্যারাসিটামল…।।  এরা নিজে জানবে না আর এমনই প্রভাব তৈরি করে রেখেছে যা অন্যকেও জানতে দেয় নাই!  তাই ব্রিকসও নিশ্চয় তাদের চোখে সারপ্লাস চুরির ঘটনা…। তাই কী?

     

    সর্বশেষ আপডেটেডঃ  ২৫ আগষ্ট  ২০২৩; রাত ০১ঃ ২৬
    আপডেটেডঃ  আগষ্ট ২০২৩;  সকাল 

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • বাংলাদেশে ‘মুসলিম জাতিবাদ’ মানে কী ও কেন

    বাংলাদেশে ‘মুসলিম জাতিবাদ’ মানে কী ও কেন
    গৌতম দাস
    ২৪ আগষ্ট ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4Rc

     

    ভারত-বাংলাদেশের মিলে কিছু আওয়ামি সাংবাদিক একটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছড়িয়েছিল যে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন অ্যামেরিকান চাপে ফেয়ার নির্বাচন হতে গেলে হাসিনা বিজয়ী হবে না, আর সেটা ভারত-আমেরিকার জন্য অলাভজনক, ক্ষতিকর স্বার্থের হবে। তাই, মোদি সরকার এনিয়ে  নাকি আমেরিকাকে কূটনীতিক নোট পাঠিয়েছে!!! যার কোন সত্যতা পাওয়া যায় নাই। কিন্তু  এই প্রপাগান্ডার চাপের মধ্যে বক্তব্য দিয়ে গিয়ে এর মধ্যে জড়িয়ে বিএনপির সেক্রেটারী মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর আগ বাড়িয়ে বলেছিলেনঃ

    ‘আমরা এ কথা খুব স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, কোনো মৌলবাদী দল
    এখানে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ দেশের ৫২ বছরের
    ইতিহাসে দেখা গেছে, কখনোই কোনো মৌলবাদী দল ক্ষমতায়
    আসতে পারেনি। বরং তাদের যে শক্তি, সেই শক্তি ক্ষীয়মাণ হয়ে এসেছে”
    ।

    সার সংক্ষেপঃ  [সেখান বর্ণনা করা এই মৌলবাদ মানে কী? এর অনুষঙ্গি অর্থ ও সাথে জড়ানো আরো অর্থ নিয়ে আলোচনা বিস্তার ঘটাতে গিয়ে অনুষঙ্গী হিশাবে মুসলিম জাতিবাদ ধারণাটা সেখানে এনেছিলাম। আমার সেই আগের বা পুরানা লেখাটা (এখানে লিঙ্ক) থেকে  মুসলিম জাতিবাদ  ধারণাটা আলাদা করে তুলে এনে তা আলাদা লেখা হিশাবে এখানে ছাপাচ্ছি। কারণ, মুল ধারণাটা প্রথমে অনেক সংক্ষেপিত ছিল। পরবর্তিতে, ওখানে দুদিন পরে ঐলেখার অনেক স্থানে স্থানে নয়া সংযোজনে বহু বিস্তার ঘটিয়েছি। যেটা হয়ত প্রথম দিনের পাঠকেরা পরে আর দেখেন নাই বা খেয়াল করেন নাই। তাই এখন সকলের চোখে পরার জন্য  কেবল “মুসলিম জাতিবাদ” অংশটাই এখানে আলাদা করে উঠিয়ে এনেছি।]


    মির্জা ফকরুল এর এই মৌলবাদ বক্তব্য এটা আত্মঘাতি, নিজেকেই নিজে অপমান করা এই বক্তব্য। কেন?

    ১। মির্জার মৌলবাদি দল টা কে? মির্জার জানা উচিত এই শব্দের উতপত্তি। এই শব্দ কারা ব্যবহার করে আর এখন তা ফকরুল সাহেব ব্যবহার করলে এর ইম্পিকেশন [implication] বা আরো সংশ্লিষ্ট ও সংযুক্তভাবে জড়ানো আরো অর্থ কী দাঁড়াবে তা তাঁর খেয়াল করা উচিত ছিল।
    এটা কোল্ড ওয়ার যুগ (১৯৫৩-৯১) এর শেষ আমলের শব্দ। সুনির্দিষ্ট করে  ১৯৭৯ সালে ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল। কারণ, ঐ বছরই খোমেনির ইরানের বিপ্লব সংগঠিত হওয়াতে নিজ সেন্ট্রাল এশিয়া ভুখন্ডও না ঐ বিপ্লবের প্রভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এই ছিল সোভিয়েত শাসক ব্রেজনেভের ভয়। তিনি আফগানিস্তানকে দখল নিয়ে বাফার স্টেট [buffer state] বা ‘মাঝের পাহারাদার ভুখন্ড’ করতে চেয়েছিলেন। আর এর থেকে পরবর্তিতে পাকিস্তানকে সামনে রেখে এর মাধ্যমে আমেরিকা ঐ দখল হয়ে থাকা আফগানিস্তানে  সোভিয়েত এর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের দিয়ে (মোজাহিদ যার বড় অংশই পাঠান বা পশতুন গোষ্ঠি) সশস্ত্র প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিল। তাই দেশে দেশে সোভিয়েত সমর্থক বিশেষ করে আমাদের মত দেশের কমিউনিস্টেরা এই মোজাহিদ প্রতিরোধকে মুসলমান বলে নিচা দেখাতেই “মৌলবাদ” শব্দ চালু করেছিল; আর তা মূলত পৃষ্টপোষক হিশাবে আমেরিকার বিরুদ্ধে।  এটা তো স্বাভাবিক আফগানিস্তানের মানুষ মানেই মূলত মুসলমান বা ইসলাম অনুসারি। কাজেই দখলদার সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তাদের যেকোন প্রতিরোধ হলেই সোভিয়েত-প্রীতিতে কমিউনিস্টেরা তাদের আজীবনের ইসলামবিদ্বেষ এর ঝোলা মেলে বের করে সামনে আনবে; মুসলমানদেরকে বা তাদের ধর্মকে এথনিক পরিচয়কে নিচা দেখাবে ইত্যাদি; অথচ এটাই বর্ণবাদিতা। এটা সিম্পল এক গালাগালিতে – “অপর” ধর্মীয় এথনিক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে ঘৃনা-বিদ্বেষ ছড়ানোর রেসিজম।   আর এই রেসিজম-মূলক মূল শব্দটাই হল “মৌলবাদ”। পরে আমেরিকা সমর্থিত [মূলত উচ্চমাথায় টেকনিক্যাল অস্ত্র স্ট্রিনজার (Stinger missiles) রকেট যা কাঁধে নিয়ে ছুঁড়ে হেলিকপটার ফেলে দেয়া যায়]  মোজাহিদ প্রতিরোধে টিকতে না পেরে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান ত্যাগ করে ফিরে চলে যেতে বাধ্য হয়।  কিন্তু  এক বাক্যে মৌলবাদি বলতে মূলত সেটা ছিল কোল্ড-ওয়ার যুগের আমেরিকার বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট বা “প্রগতিবাদী” অভিযোগ, কালি লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

    পরবর্তি ঘটনা সংক্ষেপ হল, বাধ্য হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিরে চলে যাওয়াতে আমেরিকা পরে আফগানিস্তানে আগ্রহ হারায়; ঐ যুদ্ধবিধস্ত দেশ এরপরে যেখানে খুশি যাক মনে করতে শুরু করেছিল। শুধু তাই না এর পরবর্তিতে সেখানে কী হবে সেসব দায় ফেলে আমেরিকাও নিজেকে  গুটিয়ে ফেলেছিল।  এতে মারাত্মক এনার্কিজম আর তাতে আইন-শৃঙ্খলা ভেঙ্গে চরমে যায় শুরু হয় লুটপাট আর তা ঠেকাতেই তালেবান মানে মাদ্রাসার ছাত্রের নিয়ে মোল্লা ওমরের প্রতিরোধ দাঁড়িয়ে যায়।  পরে ওর ভিতরেই পুষ্ট হয়ে গড়ে উঠেছিল আলকায়েদা মুভমেন্ট, যার প্রথম প্রকাশ হতে হতে পরবর্তি শতক এসে যায়, আর সেটাই নাইন-ইলেভেন। লক্ষণীয় যে মৌলবাদ শব্দটা এতে মলিন হয়ে পিছনে পড়ে যায় [নতুন শব্দ আলকায়েদা, আই-এস ইত্যাদি আরো অনেক কিছু এসে যাওয়াতে], আর ব্যবহার কমে গেলেও আমাদের দেশের কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা আগের মতই মুসলমানবিদ্বেষ থেকে মৌলবাদ শব্দটা ব্যবহার চালু রাখে। শেষে আমাদের এদিকের যেকোন মুসলমান জনগোষ্ঠির প্রতিরোধ ততপরতাকেই ভারত সরকার আর এদেশের কমিউনিস্ট বা “প্রগতিবাদী” গোষ্ঠি এরা মানে, পিছনের উৎস পদচিহ্ন খুঁজে বের করলে,  জমিদার হিন্দুর সেট করা স্বার্থবোধ ও ভাষ্যকে যারা একালেও নিজ স্বার্থ ও ভাষ্য মনে করে – এরাই মৌলবাদ শব্দটা চালু রেখেছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য মির্জা ফকরুল সেই শব্দটাই হাতড়ে খুজে বার করে এনেছেন। ভেবেছেন মৌলবাদী শব্দটা বললে সেই আমেরিকা ও ভারত বিএনপির উপর সদয় ও খুশি হয়ে উঠবে – এটা এক পরিহাস!!!
    মির্জা ফকরুল জানেনই না যে তিনি আসলে আমেরিকাকেই গালি দিচ্ছেন। আর চীন ঠেকাতে ঠিকা পাওয়া ভারত, এনিয়ে জোট বন্ধুত্বের সেই ভারত-আমেরিকা আর স্ট্রাটেজিক কমন সম্পর্কে নাই, বা সেই অর্থে বাংলাদেশ নিয়ে স্ট্রাটেজিক বন্ধু বা কমন স্বার্থ নাই। “ওয়ার অন টেরর” বলে ভাষ্য মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি থেকে ট্রাম্প আমলেই বাদ গেছে।  

    একটা মজার কথা হল, বাংলাদেশে মৌলবাদ বলে গালি দেয়া ব্যাপারটা দুর্বল ও কমে গেলেও ভারতের আর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট- প্রগতিবাদি জগতে মৌলবাদ শব্দটা কোন কোন পকেটে এখনও চালু বিশেষ করে (তাদের সমর্থকের একাংশ যারা অতৃপ্ত হিন্দু-মনের এরা এখনও মৌলবাদ বলতে পছন্দ করে সুখ পায়) – অথচ তাদের কাছে মোদির বিজেপি নিয়ে কোন আপত্তি, অস্বস্তি ইত্যাদি কিছুই নাই; মৌলবাদ-বোধ নাই।  অথচ বিজেপির হিন্দুত্ববাদ যা বাংলাদেশে এমনকি ইসকন নামে বিস্তৃত অথচ এদের ততপরতাকে  বাংলাদেশের কমিউনিস্ট- প্রগতিবাদিদের মৌলবাদ-বিরোধি চোখে কোন খারাপ কিছু বা আপত্তির নয়। এটা কোন “হিন্দু মৌলবাদ” ধরণের কিছু নয়, রাজনীতিতে ধর্ম আনা নয়, হিন্দুধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বা রাজনীতির আপত্তিকর ততপরতা নয়। তাদের চোখে হিন্দুত্ববাদ-কে তারা মৌলবাদ মনে করে না !!! ব্যাপারটা ভালো মজার না!

    বিএনপি কাদের দল, ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি – মুসলিম জাতিবাদঃ
    এক বিপরীত বাংলাদেশের ঘটনা হল, ভোটারের টাইপ মানে ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি হিশাবে যদি বলি সেই বিচারে তবে ” মুসলমান জাতিবাদি” সমর্থক চিন্তা ধারা – এমন ভোটারেরা এক বড় অংশ বিএনপিকেই ভোট দিয়ে থাকে। তবে সাবধান এদের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক দিকের সাথে নব্বই এর দশকে উত্থিত তালেবান বা পরবর্তিকালের সশস্ত্র যেকোন ইসলামি রেডিকেল ধারা এদের কোনই সম্পর্ক নাই। মিলায় ফেলবেন না।  অন্তত ভোটার গোষ্টির টাইপ বিচারে। কারণ ইসলামি রেডিকেল কোন ধারাই ঠিক কোন ভোটার গোষ্টি নয়, ভোটের রাজনীতিটা তাদের নয়। বৃহত্তর অর্থে বললে,  এই “মুসলমান জাতিবাদি” ক্যাটাগরির ভোটার বাংলাদেশে নুন্যতম ৩৫% ধরা হয়, যার বাকি সমর্থক উঠানামা করা ভোটার।  আবার এমনকি রাজনৈতিক চিন্তা হিশাবে  “মুসলমান জাতিবাদি” চিন্তার কর্মি আওয়ামি লীগের ভিতরেও পাওয়া যাবে।
    খোদ হাসিনার কথাই দেখেনঃ
    ভাল করে একটু খুঁজলে দেখা যাবে সব সচেতন বাংলাদেশীর ভিতরেই কিছুটা হলেও “মুসলিম জাতিবাদ” আছে। অন্তত মনের কোন কোনায়। কথাটার মানে কী? কী বলতে চাইলাম?  শেখ হাসিনার কথাই ধরা যাক। আমার ধারণা তিনিও এর বাইরে নন! কেন?
    তিনি কিভাবে এর বাইরে থাকবেন? খোদ শেখ মুজিব কী এর বাইরে? তিনি তো কলকাতায় পড়ালেখার সময় থেকে তো বটেই এর আগের জমানা থেকেই মুসলিম জাতিবাদী – সেকালে এর প্রকাশের নাম ছিল মুসলিম লীগ!    আর সবচেয়ে বড় কথা খোদ শেখ হাসিনা তাঁর বাবার এই মুসলিম লীগার নেতার পরিচয় একটুও লুকান নাই, মুঝে ফেলেন নাই বা আড়াল করে দেন নাই। গর্বের সাথেই অবলীলায় ছাপতে বলে দিয়েছেন! হাসিনার তত্বাবধানে প্রকাশিত শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী হাসিনা কোথাও এডিট করে কিছুই একালে বাদ দিতে দেন নাই।  প্রফেসর আনিসুজ্জামান সহ যারা এডিটরিয়াল বোর্ডে ছিলেন তারা সুপারিশ করলেও হাসিনা তাদের কথা শুনেন নাই।  এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে!! যদিও ১৯০৬ অথবা ১৯৪৭ সালের মুসলিম লীগ আর ১৯৫৪ সালের পর থেকে হয়ে যাওয়া মুসলিম লীগ আর এক থাকে নাই; ১৯৭১ সালে যেটা একেবারেই পুর্ব-পাকিস্তান অথবা বাংলাদেশ-বিরোধিই হয়ে গেছিল – সেসব কথা আলাদা। অন্যভাবে বললে এক. মুসলিম জাতিবাদ  এই কনসেপ্ট-টা সব সময় একই বা একটাই সাংগঠন এর মাধ্যমের প্রকাশিত বা প্রতিনিধিত্ব হয় নাই!  আর দুই. এটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ। ভারত এপর্যন্ত যা করেছে – হিন্দুত্ববাদ কে যেমন যতটা তীব্র অথবা সফট মাত্রায় হাজির করেছে বা বাংলাদেশ সম্পর্কে যা নীতি-পলিসি নিয়েছে আর তাতে বাংলাদেশ এরই যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে এর  নাম হচ্ছে “মুসলিম জাতিবাদ”; তবে এটা অবশ্যই প্রতীকী নাম!
    আর সম্ভবত এজন্য বলা হয়, আমরা নিজেরাই আমাদের শত্রু বা অপছন্দের ব্যক্তিত্বের আকার-বৈশিষ্ট কেমন হবে এরই মূল জন্মদাতা!

    আমাদের আদি পাপ  আমাদের বাধাঃ
    কনষ্টিটুয়েন্সি
    শব্দটার আক্ষরিক অর্থ ভোটার – জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে যারা সেই ভোটার। আবার এর আরেক বাংলা ভাষ্য আছে। যেমন আমরা বলে উনি কোন আসনথেকে দাড়িয়েছেন। কথ্য ভাষার এই আসন শব্দটাই নির্বাচন কমিশনের খাতায় লেখা আছে কনষ্টিটুয়েন্সি বলে।তসিকমিশন বলবে উনি কোন কনষ্টিটুয়েন্সি থেকে দাড়িয়েছেন। মূল বা রূট শব্দ কনষ্টিটুট [constitute] শব্দের অর্থ হল গঠন করা; সেখান থেকে এখানে রাষ্ট্রগঠনসম্পর্কিত আলাপ করছি আমরা। তাই কনষ্টিটুয়েন্সি মানে যারা রাষ্ট্রগঠন করে সেই ভোটার।
    এবার তাহলে বিএনপি এই দলের ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি কারা? এই প্রশ্নের অর্থ হল সমাজের কোন ধরণের ভোটার বিএনপি-কে ভোট দিয়ে থাকে – এমন কোর [core বাংলায় শাঁস] সমর্থক আমাদের সমাজের কোন গোষ্ঠির মানুষেরা? তাই এই প্রশ্নের জবাব হল, বিএনপি হল কোর কনষ্টিটুয়েন্সি মুসলিম জাতিবাদ।  কোর মানে যাদের ভোট নড়চড় হয় না বিএনপিতেই আসে; আর এদের ছাড়াবা  বাদে বাকি ভোটার হল ফ্লোটিং। যারা যখন পক্ষে কখনও বিপক্ষে ভোট দিয়ে থাকে। 

    এখন “প্রগতিশীলতার” প্রভাবে পড়ে মুসলিম জাতিবাদ মানে মুসলিম শব্দটা শুনেই ঝাপিয়ে পড়বেন না বা দুরত্ব তৈরি করবেন না। কেবল খেয়াল করে দেখেন, বৃটিশ ভারতে প্রথম রাজনৈতিক দল কংগ্রেস এটাকে তো হিন্দু জাতিবাদি দলই বানানো হয়েছিল। যার রূট খুঁজলে ১৮১৫ সালের রাম মোহন রায়ে যেতে পারেন। পরবর্তিকালে গান্ধী-নেহেরুরা একাজই করেছে; হিন্দু জাতিবাদকে সাফাই দিয়ে গেছে।  অথচ  হিন্দু জাতিবাদ শব্দটা শুনলে আপনার মনে দুরত্ব তৈরি করার কোন প্রতিক্রিয়া না হলে বুঝবেন আপনি প্রগতিশীল এবং মুসলমানবিদ্বেষী। একথাত বিরুদ্ধে সাফাই হিশাবে আপনার মনে হতে পারে যে আপনি তো আসলে ধর্মীয় জাতিবাদের বিরোধিতা করছেন! কিন্তু না; করছেন না।  করলে তো হিন্দু জাতিবাদ শুনলেও একই দুরত্ব তৈরির প্রতিক্রিয়া হত!! তা তো হয় না। বরং প্রগতিশীলেরা কংগ্রেস দলকে আপন মানে। অনেকটা নিজেরই তবে আপনি তো জাতে উঁচা আর এরা হল আম “পপুলার অংশ”। আর তা মনে করে সাথেই রাখেন, আপন মানেন। অথচ মূল কথাটা হল, আপনি সংখ্যাগরিষ্ট এই যুক্তিতে হিন্দু জাতিবাদ এর দল খুললে এটা অবশ্যই প্রতিক্রিয়ায় একটা মুসলিম জাতিবাদি দলও অবশ্যই তৈরি হবে।  কারণ,  হিন্দু জাতিবাদ দল খুলে আপনি মুসলমান নাগরিকদেরকে একা, বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন, ঠেলে দিয়েছেন মুসলিম জাতিবাদ করতে। বুঝিয়ে দিয়েছেন তারা আপনার সমান নয় – নিচা, আপনারই অধীনস্ত, পায়ের নিচের লোক!  আর এই হল আমাদের আদি পাপ!!!
    এরই সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ১৮৮৫ সালে জন্মানো কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়ায় ২০ বছরের মধ্যে ১৯০৬ সালের মুসলিম লীগ!  কারণ, ব্যাপারটা হল, আপনি যদি অপরের এক ধর্মকে নিচা দেখান, গালমন্দ করেন – মনে রাখবেন সব ধর্মের চোখেই অপর সবগুলো ধর্মই মিথ্যা, তাদের ritual-রিচুয়াল  (শরীয়তি আচার নিয়মগুলো) অর্থহীন – কোন মানে হয় না – বুজরুকি ভন্ড ইত্যাদি মনে হতেই পারে। আসলে আপনি আপনার ধর্মের রিচুয়ালের সাথে মনে মনে তুলনা করছেন আপনারটাই  সবচেয়ে সহি  এই বিবেচনায়!  কিন্তু পরক্ষণেই আপনার বিবেকবান হওয়ার কথা।  সে কারণে, বুদ্ধিমান লোকেদের বুঝ এখানেই থামবে না। কারণ, সে সাথে সাথে বুঝে যায় যে তাহলে তো অপর ধর্মের লোকেরাও আমার ধর্মকেও একই নিচা বা ‘মানে হয় না’ এমন আরেক  নিচা ধর্ম ও রিচুয়ালের লোক হিশাবে দেখছে!!!  সেটাও তো আপনার কাম্য হতে পারে না! তাহলে  এথেকে মুক্তি বের হবার পথ কী? 

    খুবই সহজ।  পথটা হল যে, কারোরই অপরের ধর্ম-রিচুয়াল-কে নিচা দেখানো উচিত না।  নিজের ধর্ম  সেফ রাখা বা বাঁচানোর জন্য।  তাহলেই সকল ধর্ম অপমান, নিচা দেখানো ইত্যাদির হাত থেকে বাঁচতে পারে। এজন্যই সকলের চোখে নিজ নিজ ধর্ম শ্রেষ্ঠ এই বোধ থাকলেও কোন বুদ্ধিমান মানুষ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ববোধ অন্যকে মানতে বাধ্য করে না, চাপায় দিতে যায় না অথবা মানতে হবে বলে দাঙ্গা বাধায় দিতে যায় না। এটা সে করতে পারে না। একমাত্র এমন হলেই সকল ধর্মই আপন আপন জগতে শ্রেষ্ঠ থাকতে পারে। কোন সমাজে এমন বোধ বেশিরভাগ মানুষের ভিতর এলে তবেই একটা রাষ্ট্রগঠন সম্ভব। যে রাষ্ট্রকে অবশ্যই  সবার  ইচ্ছামত নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা  নিশ্চিত করতে হবে – নাগরিক অধিকারের বিচারে নাগরিক মাত্রই সকলের অধিকার সমান; কোন বৈষম্য করা যাবে না – এই নীতিতে  তা গড়ে তুলতে হবে।  কিন্তু মনে রাখতে হবে আদি পাপ  আমাদের বাধা দিয়ে রেখেছে; যেটা সবার আগে পাশ কাটাতে হবে!!    

    আমাদের মূল আলোচ্য প্রসঙ্গে ফিরছিঃ
    ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সির বিচারে বিএনপি এই দলের কোর সমর্থক ভোটার বেজ হল  “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার। বিপরীতে আওয়ামি লীগেরও বাঙালি জাতিবাদি কোর ভোটার ঐ ৩৩% এর আশেপাশে তবে এসবই ২০০৯ সালের আগের হিসাব ও অনুমান।  ভোটার হিশাবে সমর্থদের  এই মৌলিক ভিত্তিগত ফারাকের কারণেই আওয়ামি লীগ কখনও বিএনপি হতে পারে না, পারবে না; বিপরীতে বিএনপিও লীগ হতে পারবে না।  তাহলে, মির্জা আলমগীরের এই আল-টপকা মৌলবাদ শব্দের ব্যবহার এর মানে কী? নিজের পায়ে কুড়াল  মারা? হা ঠিক তাই! মানে সিপিবির কোন নেতার যেন বিএনপির সেক্রেটারি হয়ে যাবার দশা??? এমন আনফিট এক দশা-পরিস্থিতি! আচ্ছা, তাই  বিএনপি ভোটের রাজনীতিতে যে  “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটারদের দল, সে  কি করে কথিত “মৌলবাদবিরোধি” হয়! কারণ ভারতের চোখে আর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের চোখে খোদ বিএনপি তো মৌলবাদি দল!!!  আর আমরা ভারতের অযাচিত প্রভাব বিরোধী ফলে প্রতিরোধী যেকেউই তো আসলে ভারতের চোখে মৌলবাদী ট্যাগপ্রাপ্ত!! মানে   মূলত মুসলিম জাতিবাদী ভোটারের দল বিএনপি কিভাবে  নিজ সমর্থক ভোটারের বিরুদ্ধে যাবে? চাইলেও কী যেতে পারবে? [ তবে বছর দুয়েক সময় পেলে পারবে হয়ত কিন্তু তাতে চিত্রটা দাঁড়াবে এভাবে যে “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার ভিত্তিক আরেকটা নয়া দল গড়ে উঠেছে। ফলে আজকের বিএনপি পরিণত হয়ে উঠতে পারে এক কথিত মৌলবাদিবিরোধী বিরুদ্ধে নয়া এক প্রগতিবাদি বিএনপি হতে চেষ্টা করতে পারে; যেটা হবে আসলে ভারতের পছন্দের এক আওয়ামি বি-টিম যার কোর সমর্থক হতে পারে বড়জোর ১০%।

    মুসলিম জাতিবাদ আসলে কী কেন তা টিকে থাকতে থাকবেঃ
    একালের এর পিছনের মূল কারণ গত পনেরো বছরের হাসিনা শাসনের আড়ালে ভারতের লুটপাট  – বিনাপয়সার করিডোর থেকে শুরু করে ভারতের বাংলাদেশ থেকে যা তাদের নেয়া দরকার সবই তারা নিয়ে যাচ্ছে। খোদ হাসিনার ভাষাতেই বললে তিনি আমাদের  জানিয়েছেন, “ভারতকে যা দিয়েছি ওরা আজীবন মনে রাখবে”। তাই এখনকার বাংলাদেশ হল, ভারতবিরোধিতা এক টইটম্বুর – চরমে উঠা বাংলাদেশ – মনে রাখতে হবে এটা খোদ ভারতেরই সৃষ্টি – ভারতের এই লুটপাট সব কাজে ভারতের স্বার্থ এর প্রায়োরিটি – এসবই করে চলেছে গত ১৫ বছর ধরে। সবচেয়ে বড় কথা রাষ্ট্রের শাসনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর সুযোগ বন্ধ! যার সোজা অর্থ ভারতের এই হিন্দুত্ববাদি চোখ বাংলাদেশের নিজ স্বার্থকে ভারতের পায়ের নিচে নেওয়া এর বিরুদ্ধে নিরব জন-প্রতিরোধ বা রেজিসট্যান্স [resistance]   – এর প্রতীকী নামই মুসলিম জাতিবাদ। এটাই একালের মানে! অতএব ভারতের হিন্দুত্ববাদি ‘বাংলাদেশ নীতি’ এরই ডেকে আনা বিপরীতের নাম  “মুসলমান জাতিবাদি” প্রতিরোধ; তাই এই পরিচয় নিয়েই তাদেরকে আরো থাকতে হবে। তাতে বিএনপি তাদের প্রতিনিধিত্ব করবে বা যোগ্য থাকবে কিনা সেটা বিএনপি-কেই নির্ধারণ করতে হবে। ভোটার গোষ্ঠি অবস্থাকেই পুষ্ট করার জন্য নয়া কোন দল হাজির হওয়া বা আগিয়ে আসা – এসব সেক্ষেত্রে কোন অসম্ভব বা দুরের কিছু না।

    আপডেটেডঃ
    সর্বশেষ আপডেটেডঃ  

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • বিএনপির আত্মহননের সহজ পথ, মির্জা ফকরুলের ‘মৌলবাদ’

    বিএনপির নিজেকে খতমের সহজ পথ, মির্জা ফকরুলের ‘মৌলবাদ’
    গৌতম দাস
    ২২ আগষ্ট ২০২৩  মধ্যরাত  ০০ঃ ০২
    https://wp.me/p1sCvy-4Q3

     

     

                                     Fundamentalism

     

    আনন্দবাজার-অগ্নি রায় এর “দাগী অপরাধী” ততপরতা শেষ হচ্ছে না বা থামছেই না। বরং  সেটা এতই ক্ষমতাধর যে একদিনের মধ্যে বিএনপি সেক্রেটারি মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর-কে একেবারে মৌলবাদবিরোধি করে ছেড়েছে! যত্তবড় মৌলবাদবিরোধি সিপিবি কেন কোন কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল কেউ এতদিন হতে পারে নাই!  নিশ্চয় এতে প্রগতিশীল ও সাহিত্য-সাংস্কৃতি জগতের যারা এতদিন আওয়ামি লীগ ওবস্থা ভাল না বুঝে ছুড়ে ফেলে বিএনপিকে প্রগতিশীল বানানোর কাজে লেগে পড়েছিল তারা তাদের পড়ে পাওয়া সাফল্য দেখে ব্যাপক খুশি হয়ে উঠেছেন!
    দেখা যাচ্ছে, এতে সর্বশেষ যোগ দিয়েছে দক্ষিণ-ভারতের দ্যা হিন্দু মিডিয়া গ্রুপের এক নয়া প্রপাগান্ডা-ময় ফ্রি পত্রিকা যার নাম “ফ্রটলাইন” [Frontline]।  মূল মিথ্যা কথাটা ছিল, বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে নাকি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমেরিকার কাছে এক ‘কূটনৈতিক নোট’ বা “বার্তা” পাঠানো হয়েছে। যেটা পুরাটাই মিথ্যা।  কোন প্রমাণ ছাড়াই এধরণের মিথ্যা প্রপাগান্ডার দাবি প্রথমে ভারতের একটা বা দেড়-টা মিডিয়া থেকে ছড়ানো হয়েছে। মূল অপরাধী আনন্দবাজার-অগ্নি রায়দের আর, সেই কথিত মিথ্যা বার্তা-কে একটু ঘুড়িয়ে-ফিরিয়ে কিন্তু একইভাবে কোন প্রমাণ বা খবরের উৎস কে তা না জানিয়ে পরে তা প্রচার করেছে ডয়েচ ভেলে। তবে এটা নয়াদিল্লির ডয়েচ ভেলে। আর পরে প্রথম আলো-স্টার এই ডয়েচ ভেলের মিথ্যা রিপোর্টের বরাতে সেই চোথা-কপিটাই ছেপেছিল। একাজটাও সমান অপরাধের এজন্য যে  এরা তো দেখতেই পাচ্ছিলেন ডয়েচ ভেলের লেখাটা কোন “নিউজ” না। এটা এক “দাগী [despotic] ততপরতা” কারণ এতে তথ্যের কোন উৎস জানানো হয় নাই। তাই এটা কোন  “নিউজ” হয় নাই বরং একথা গুলো ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালইয়ের কে ও কবে বলেছে এর কোন প্রমাণ সাথে না দিয়েই উলটে  আনা হয়েছে – এক গায়েবী “কূটনৈতিক নোট” এর দাবি। এই অপরাধী কাজ তো জার্নালিজমের লোক ও চোখ হিশাবে প্রথম আলো-স্টারের বুঝতে না পারার কোনই কারণ নাই। কিন্তু তা সত্বেও এই অপরাধী কাজে তারাও সামিল হয়েছে।

    তবে ফ্রন্টলাইন অথবা ডয়েচ ভেলে বা প্রথম আলো-স্টার  এরা সকলেওই ভেসে গিয়ে এক লোভে। লোভটা হল, বাংলাদেশের এখন যে অবস্থা যে রাজনৈতিক গুমোট অবস্থা তাতে সবচেয়ে “পাবলিক নজরদারিতে আছে ইন্ডিয়ান সরকার; মানে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতের মিডিয়া। এখন মিডিয়া বাণিজ্যিক চোখে দেখলে, এটাই বাংলাদেশ-ইন্ডিয়ান মিডিয়ার চোখে এটা সবচেয়ে লোভনীয় – নিজ নিজ মিডিয়া রিচ [media reach] বাড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ। যার সোজা মানে যত বেশি ভিউ ততই অর্থলাভ। এছাড়াও এই মিথ্যা প্রপাগান্ডার রাজনৈতিক লাভালাভ উঠবে ভারত ও বাংলাদেশের চলতি সরকারের ঘরে। তাই তাদের থেকেই আরেক অঙ্কের অর্থ পাবার সম্ভাবনা। আর বলাই বাহুল্য এতে বড় ফান্ডটা হওয়ার কথা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার মিডিয়া ফান্ড। এসব চিন্তা থেকেই মনি-কাঞ্চনের চকচকে লোভে এসব মিডিয়ার চোখে; তাতে এই কথিত “ভারতীয় বার্তা” অসত্য বা বাপ-মার হদিস হলেই বা কী? চকচকে লোভের কাছে এই হদিস-হীনতা মামুলি!!!
    এর একটা প্রমাণ দেয়া যাক।

    “দ্যা হিন্দু” মিডিয়া গ্রুপের আরেক সাবসিডিয়ারি বা সহায়ক কোম্পানি তবে, প্রপাগান্ডা পত্রিকা হল ফ্রন্টলাইন। কেন এমন বিশেষণ লাগিয়ে বলছি? কারণ, মূল ‘দ্যা হিন্দু’ পত্রিকা এই ইংলিশ ডেইলি এখন আগে অর্থ পরিশোধ পে [pay] করলে তবেই পড়তে দিবে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া তাদেরই আরেক ব্যবসা বিষয়ক বা শেয়ার মার্কেট মুখ্য করা আরেক পত্রিকা বিজনেস লাইন আরো আগেই পে [pay] পত্রিকা করা হয়েছে। তাতে বলাই বাহুল্য পাঠক কমে গেছে। তাই সমান্তরালে “ফ্রটলাইন” কে সামনে আনা হয়েছে যেটা ওপেন মানে পয়সা লাগবে না। ফ্রন্টলাইন পত্রিকা থেকে উপরের ছবিটা নেয়া হয়েছে বাংলাদেশের ২১ আগষ্ট সকাল পোনে আটটায়।  আর এতে তখনও দেখা যাচ্ছে “ফ্রটলাইন”  খবরের প্রধান হেড লাইন হল আগের দিনের মানে, ২০ আগষ্ট সকাল নয়টায় ছাপানো বা হোস্ট করা বাসি ও মিথ্যা প্রপাগান্ডা স্টোরিটা। অথচ আজকাল নেট বা ওয়েব পত্রিকার যুগের কোন মিডিয়ায়  মুখ্য হেড লাইন নিউজের জায়গায় কোন খবরকে কী ২৪ ঘন্টা লটকায়ে থাকে? না রাখা উচিত, না বাস্তব সম্মত?? প্রশ্নই আসে না। তাহলে ফ্রন্টলাইন কেন রেখেছে? কারণ, এই প্রপাগান্ডা মিছা খবরটা “পয়সার মাল”। এটা এখনও পত্রিকার রিচ বাড়াবে বা বাড়ছে বলে ম্যানেজমেন্টের বুঝ! পাঠক টানবে, আনাগোনা হবে সেটাই তাদের অন্যসব আজকের টাটকা নিউজের চেয়েও সর্বোচ্চ হিট দিবে! সেই বিবেচনায় এই ২৪ ঘন্টা পুরানা চোথা-কপিটা টাঙ্গিয়ে রাখা হয়েছে। এ’থেকে অবশ্য এটা কেমন মান ও পাঠক আদরের পত্রিকা তা ঠাহর করা যাচ্ছে, সেটাই উদাম হয়েছে। যদিও সারকথাটা হল, এখানে মিডিয়া বা জার্নালিজম বলে কিছু নাই, সবটাই ব্যবসা আর অর্থের লোভই মুখ্য!!!

    ওদিকে কথিত ‘কূটনৈতিক “বার্তার” কারণে অবস্থা এমন হয়েছে যে এই গল্পের কোন সত্যতা নাই সেই গল্প নিয়ে লীগ-বিএনপি রাজনৈতিক নেতারা বিবৃতি দেয়া শুরু করেছে। বলছে, “যদি ভারত এমন বক্তব্য” দিয়ে থাকে অথবা “যদি এমন ভারতীয় বার্তা” মানে কূটনীতিক নোট বলে কিছুর অস্বিত্ব থেকে থাকে – এভাবে “যদির কথা” তুলে যার যার মনের খায়েস বা বাকযুদ্ধ চালানো হয়েছিল গতকাল সারাদিন।
    এভাবে যদির উপর দাঁড়িয়ে কথা বলাটা চরম বোকামি শুধু না বরং বেইজ্জতি হবার সম্ভাবনা!  কারণ, এখন যদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর এবার  সোজা বিবৃতি দিয়ে বা সাংবাদিক ডেকে জানায় যে বাংলাদেশকে নিয়ে ভারত আমেরিকাকে কথিত কোন বার্তাই পাঠায় নাই – তখন কী হবে!!!  সেটা হবে অনেকটা এরকম যে সমাজে কেউ কাউকে যদি বলে [যেটা বাস্তবে কেউ করে না] আপনি আমাকে যদি গালি দিয়ে থাকেন তবে আমি আপনাকে জুতা দিয়ে মারব। আরে বাবা আমি গালি দিয়েছি কিনা সেটা তো আগে নিশ্চিত হবে আপনাকে, নাকি? যদি গালি না দিয়ে থাকেন তখন তো নিজেকেই লজ্জা পেতে হবে!  এছাড়া এসবের মধ্যে কূটনীতিক রীতিনীতি শিষ্টাচার এর ব্যাপার আছে। তাই সেটা হবে কোন ঘটনা বাস্তবে ঘটার আগেই “যদি তা ঘটত” এমন কাল্পনিক ধরে নিয়ে মারামারি শুরু করে দেয়া।  স্বভাবতই এতে মানুষ সবার আগে “যদি দিয়ে কথা বলা” লোকটাই মূল উস্কানিদাতা বলে সাব্যস্ত করবে!  কারণ,  “যদি দিয়ে কথা বলা” মানে পায়ে পারা দিয়ে ঝগড়া শুরু করা।  অথচ সেটাই ঘটেছে।
    এব্যাপারে অন্তত কিছু শোভন এবং কূটনীতিক (কোন বাংলাদেশি) এক খসড়া বক্তব্য হতে পারত যদি বলত – “এ দেশের মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন বিদেশি শক্তি কথা বলতে পারে না, অশ্রদ্ধা করতে পারে না – এটা সবার মনে রাখা উচিত”।  “জনগণের ইচ্ছা” এটাই আমাদের সার্বভৌমত্ব,  জনপ্রতিনিধিদেরকে দেয়া ম্যান্ডেট। কাজেই, কোন বিদেশি  শক্তির আমাদের জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার নুন্যতম সুযোগ নাই। এমন যে কোন ততপরতাকে আমারা প্রতিরোধ করতে বাধ্য। তাই কোন বিদেশি শক্তির এমন ততপরতা হবে খুবই দুঃখজনক ঘটনা।  আমরা আশা করব সকলেই এব্যাপারে নিজেকে সংযত করে নিবেন!

    কিন্তু এক্ষেত্রে বিএনপি আরো এক ধাপঃ
    যেমন বিএনপি “যদি দিয়ে কথা বলে” থেমে গেল তাও একটা মানে হত। কিন্তু মির্জা ফকরুল এরপর যেন একেবারে যেন  নিজে নিজেকেই বিব্রত করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি আরও আগ বাড়িয়ে বলেছেন,  ‘আমরা এ কথা খুব স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, কোনো মৌলবাদী দল এখানে ক্ষমতায় আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ দেশের ৫২ বছরের ইতিহাসে দেখা গেছে, কখনোই কোনো মৌলবাদী দল ক্ষমতায় আসতে পারেনি। বরং তাদের যে শক্তি, সেই শক্তি ক্ষীয়মাণ হয়ে এসেছে”।


    মির্জা ফকরুল এর এই বক্তব্য এটা আত্মঘাতি, নিজেকেই নিজে অপমান করা এই বক্তব্য। কেন?

    ১। মির্জার মৌলবাদি দল টা কে? মির্জার জানা উচিত এই শব্দের উতপত্তি। এই শব্দ কারা ব্যবহার করে আর এখন তা ফকরুল সাহেব ব্যবহার করলে এর ইম্পিকেশন [implication] বা আরো সংশ্লিষ্ট ও সংযুক্তভাবে জড়ানো আরো অর্থ কী দাঁড়াবে তা তাঁর খেয়াল করা উচিত ছিল।
    এটা কোল্ড ওয়ার যুগ (১৯৫৩-৯১) এর শেষ আমলের শব্দ। সুনির্দিষ্ট করে  ১৯৭৯ সালে ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল। কারণ, ঐ বছরই খোমেনির ইরানের বিপ্লব সংগঠিত হওয়াতে নিজ সেন্ট্রাল এশিয়া ভুখন্ডও না ঐ বিপ্লবের প্রভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এই ছিল সোভিয়েত শাসক ব্রেজনেভের ভয়। তিনি আফগানিস্তানকে দখল নিয়ে বাফার স্টেট [buffer state] বা ‘মাঝের পাহারাদার ভুখন্ড’ করতে চেয়েছিলেন। আর এর থেকে পরবর্তিতে পাকিস্তানকে সামনে রেখে এর মাধ্যমে আমেরিকা ঐ দখল হয়ে থাকা আফগানিস্তানে  সোভিয়েত এর বিরুদ্ধে স্থানীয়দের দিয়ে (মোজাহিদ যার বড় অংশই পাঠান বা পশতুন গোষ্ঠি) সশস্ত্র প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিল। তাই দেশে দেশে সোভিয়েত সমর্থক বিশেষ করে আমাদের মত দেশের কমিউনিস্টেরা এই মোজাহিদ প্রতিরোধকে মুসলমান বলে নিচা দেখাতেই “মৌলবাদ” শব্দ চালু করেছিল; আর তা মূলত পৃষ্টপোষক হিশাবে আমেরিকার বিরুদ্ধে।  এটা তো স্বাভাবিক আফগানিস্তানের মানুষ মানেই মূলত মুসলমান বা ইসলাম অনুসারি। কাজেই দখলদার সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তাদের যেকোন প্রতিরোধ হলেই সোভিয়েত-প্রীতিতে কমিউনিস্টেরা তাদের আজীবনের ইসলামবিদ্বেষ এর ঝোলা মেলে বের করে সামনে আনবে; মুসলমানদেরকে বা তাদের ধর্মকে এথনিক পরিচয়কে নিচা দেখাবে ইত্যাদি; অথচ এটাই বর্ণবাদিতা। এটা সিম্পল এক গালাগালিতে – “অপর” ধর্মীয় এথনিক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে ঘৃনা-বিদ্বেষ ছড়ানোর রেসিজম।   আর এই রেসিজম-মূলক মূল শব্দটাই হল “মৌলবাদ”। পরে আমেরিকা সমর্থিত [মূলত উচ্চমাথায় টেকনিক্যাল অস্ত্র স্ট্রিনজার (Stinger missiles) রকেট যা কাঁধে নিয়ে ছুঁড়ে হেলিকপটার ফেলে দেয়া যায়]  মোজাহিদ প্রতিরোধে টিকতে না পেরে ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান ত্যাগ করে ফিরে চলে যেতে বাধ্য হয়।  কিন্তু  এক বাক্যে মৌলবাদি বলতে মূলত সেটা ছিল কোল্ড-ওয়ার যুগের আমেরিকার বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট বা “প্রগতিবাদী” অভিযোগ, কালি লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

    পরবর্তি ঘটনা সংক্ষেপ হল, বাধ্য হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিরে চলে যাওয়াতে আমেরিকা পরে আফগানিস্তানে আগ্রহ হারায়; ঐ যুদ্ধবিধস্ত দেশ এরপরে যেখানে খুশি যাক মনে করতে শুরু করেছিল। শুধু তাই না এর পরবর্তিতে সেখানে কী হবে সেসব দায় ফেলে আমেরিকাও নিজেকে  গুটিয়ে ফেলেছিল।  এতে মারাত্মক এনার্কিজম আর তাতে আইন-শৃঙ্খলা ভেঙ্গে চরমে যায় শুরু হয় লুটপাট আর তা ঠেকাতেই তালেবান মানে মাদ্রাসার ছাত্রের নিয়ে মোল্লা ওমরের প্রতিরোধ দাঁড়িয়ে যায়।  পরে ওর ভিতরেই পুষ্ট হয়ে গড়ে উঠেছিল আলকায়েদা মুভমেন্ট, যার প্রথম প্রকাশ হতে হতে পরবর্তি শতক এসে যায়, আর সেটাই নাইন-ইলেভেন। লক্ষণীয় যে মৌলবাদ শব্দটা এতে মলিন হয়ে পিছনে পড়ে যায় [নতুন শব্দ আলকায়েদা, আই-এস ইত্যাদি আরো অনেক কিছু এসে যাওয়াতে], আর ব্যবহার কমে গেলেও আমাদের দেশের কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা আগের মতই মুসলমানবিদ্বেষ থেকে মৌলবাদ শব্দটা ব্যবহার চালু রাখে। শেষে আমাদের এদিকের যেকোন মুসলমান জনগোষ্ঠির প্রতিরোধ ততপরতাকেই ভারত সরকার আর এদেশের কমিউনিস্ট বা “প্রগতিবাদী” গোষ্ঠি এরা মানে, পিছনের উৎস পদচিহ্ন খুঁজে বের করলে,  জমিদার হিন্দুর সেট করা স্বার্থবোধ ও ভাষ্যকে যারা একালেও নিজ স্বার্থ ও ভাষ্য মনে করে – এরাই মৌলবাদ শব্দটা চালু রেখেছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য মির্জা ফকরুল সেই শব্দটাই হাতড়ে খুজে বার করে এনেছেন। ভেবেছেন মৌলবাদী শব্দটা বললে সেই আমেরিকা ও ভারত বিএনপির উপর সদয় ও খুশি হয়ে উঠবে – এটা এক পরিহাস!!!
    মির্জা ফকরুল জানেনই না যে তিনি আসলে আমেরিকাকেই গালি দিচ্ছেন। আর চীন ঠেকাতে ঠিকা পাওয়া ভারত, এনিয়ে জোট বন্ধুত্বের সেই ভারত-আমেরিকা আর স্ট্রাটেজিক কমন সম্পর্কে নাই, বা সেই অর্থে বাংলাদেশ নিয়ে স্ট্রাটেজিক বন্ধু বা কমন স্বার্থ নাই। “ওয়ার অন টেরর” বলে ভাষ্য মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি থেকে ট্রাম্প আমলেই বাদ গেছে।  

    একটা মজার কথা হল, বাংলাদেশে মৌলবাদ বলে গালি দেয়া ব্যাপারটা দুর্বল ও কমে গেলেও ভারতের আর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট- প্রগতিবাদি জগতে মৌলবাদ শব্দটা কোন কোন পকেটে এখনও চালু বিশেষ করে (তাদের সমর্থকের একাংশ যারা অতৃপ্ত হিন্দু-মনের এরা এখনও মৌলবাদ বলতে পছন্দ করে সুখ পায়) – অথচ তাদের কাছে মোদির বিজেপি নিয়ে কোন আপত্তি, অস্বস্তি ইত্যাদি কিছুই নাই; মৌলবাদ-বোধ নাই।  অথচ বিজেপির হিন্দুত্ববাদ যা বাংলাদেশে এমনকি ইসকন নামে বিস্তৃত অথচ এদের ততপরতাকে  বাংলাদেশের কমিউনিস্ট- প্রগতিবাদিদের মৌলবাদ-বিরোধি চোখে কোন খারাপ কিছু বা আপত্তির নয়। এটা কোন “হিন্দু মৌলবাদ” ধরণের কিছু নয়, রাজনীতিতে ধর্ম আনা নয়, হিন্দুধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বা রাজনীতির আপত্তিকর ততপরতা নয়। তাদের চোখে হিন্দুত্ববাদ-কে তারা মৌলবাদ মনে করে না !!! ব্যাপারটা ভালো মজার না!

    বিএনপি কাদের দল, ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি – মুসলিম জাতিবাদঃ
    এক বিপরীত বাংলাদেশের ঘটনা হল, ভোটারের টাইপ মানে ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি হিশাবে যদি বলি সেই বিচারে তবে ” মুসলমান জাতিবাদি” সমর্থক চিন্তা ধারা – এমন ভোটারেরা এক বড় অংশ বিএনপিকেই ভোট দিয়ে থাকে। তবে সাবধান এদের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক দিকের সাথে নব্বই এর দশকে উত্থিত তালেবান বা পরবর্তিকালের সশস্ত্র যেকোন ইসলামি রেডিকেল ধারা এদের কোনই সম্পর্ক নাই। মিলায় ফেলবেন না।  অন্তত ভোটার গোষ্টির টাইপ বিচারে। কারণ ইসলামি রেডিকেল কোন ধারাই ঠিক কোন ভোটার গোষ্টি নয়, ভোটের রাজনীতিটা তাদের নয়। বৃহত্তর অর্থে বললে,  এই “মুসলমান জাতিবাদি” ক্যাটাগরির ভোটার বাংলাদেশে নুন্যতম ৩৫% ধরা হয়, যার বাকি সমর্থক উঠানামা করা ভোটার।  আবার এমনকি রাজনৈতিক চিন্তা হিশাবে  “মুসলমান জাতিবাদি” চিন্তার কর্মি আওয়ামি লীগের ভিতরেও পাওয়া যাবে।
    খোদ হাসিনার কথাই দেখেনঃ
    ভাল করে একটু খুঁজলে দেখা যাবে সব সচেতন বাংলাদেশীর ভিতরেই কিছুটা হলেও “মুসলিম জাতিবাদ” আছে। অন্তত মনের কোন কোনায়। কথাটার মানে কী? কী বলতে চাইলাম?  শেখ হাসিনার কথাই ধরা যাক। আমার ধারণা তিনিও এর বাইরে নন! কেন?
    তিনি কিভাবে এর বাইরে থাকবেন? খোদ শেখ মুজিব কী এর বাইরে? তিনি তো কলকাতায় পড়ালেখার সময় থেকে তো বটেই এর আগের জমানা থেকেই মুসলিম জাতিবাদী – সেকালে এর প্রকাশের নাম ছিল মুসলিম লীগ!    আর সবচেয়ে বড় কথা খোদ শেখ হাসিনা তাঁর বাবার এই মুসলিম লীগার নেতার পরিচয় একটুও লুকান নাই, মুঝে ফেলেন নাই বা আড়াল করে দেন নাই। গর্বের সাথেই অবলীলায় ছাপতে বলে দিয়েছেন! হাসিনার তত্বাবধানে প্রকাশিত শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী হাসিনা কোথাও এডিট করে কিছুই একালে বাদ দিতে দেন নাই।  প্রফেসর আনিসুজ্জামান সহ যারা এডিটরিয়াল বোর্ডে ছিলেন তারা সুপারিশ করলেও হাসিনা তাদের কথা শুনেন নাই।  এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে!! যদিও ১৯০৬ অথবা ১৯৪৭ সালের মুসলিম লীগ আর ১৯৫৪ সালের পর থেকে হয়ে যাওয়া মুসলিম লীগ আর এক থাকে নাই; ১৯৭১ সালে যেটা একেবারেই পুর্ব-পাকিস্তান অথবা বাংলাদেশ-বিরোধিই হয়ে গেছিল – সেসব কথা আলাদা। অন্যভাবে বললে এক. মুসলিম জাতিবাদ  এই কনসেপ্ট-টা সব সময় একই বা একটাই সাংগঠন এর মাধ্যমের প্রকাশিত বা প্রতিনিধিত্ব হয় নাই!  আর দুই. এটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ। ভারত এপর্যন্ত যা করেছে – হিন্দুত্ববাদ কে যেমন যতটা তীব্র অথবা সফট মাত্রায় হাজির করেছে বা বাংলাদেশ সম্পর্কে যা নীতি-পলিসি নিয়েছে আর তাতে বাংলাদেশ এরই যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে এর  নাম হচ্ছে “মুসলিম জাতিবাদ”; তবে এটা অবশ্যই প্রতীকী নাম!
    আর সম্ভবত এজন্য বলা হয়, আমরা নিজেরাই আমাদের শত্রু বা অপছন্দের ব্যক্তিত্বের আকার-বৈশিষ্ট কেমন হবে এরই মূল জন্মদাতা!

    আমাদের আদি পাপ  আমাদের বাধাঃ
    কনষ্টিটুয়েন্সি
    শব্দটার আক্ষরিক অর্থ ভোটার – জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে যারা সেই ভোটার। আবার এর আরেক বাংলা ভাষ্য আছে। যেমন আমরা বলে উনি কোন আসনথেকে দাড়িয়েছেন। কথ্য ভাষার এই আসন শব্দটাই নির্বাচন কমিশনের খাতায় লেখা আছে কনষ্টিটুয়েন্সি বলে।তসিকমিশন বলবে উনি কোন কনষ্টিটুয়েন্সি থেকে দাড়িয়েছেন। মূল বা রূট শব্দ কনষ্টিটুট [constitute] শব্দের অর্থ হল গঠন করা; সেখান থেকে এখানে রাষ্ট্রগঠনসম্পর্কিত আলাপ করছি আমরা। তাই কনষ্টিটুয়েন্সি মানে যারা রাষ্ট্রগঠন করে সেই ভোটার।
    এবার তাহলে বিএনপি এই দলের ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সি কারা? এই প্রশ্নের অর্থ হল সমাজের কোন ধরণের ভোটার বিএনপি-কে ভোট দিয়ে থাকে – এমন কোর [core বাংলায় শাঁস] সমর্থক আমাদের সমাজের কোন গোষ্ঠির মানুষেরা? তাই এই প্রশ্নের জবাব হল, বিএনপি হল কোর কনষ্টিটুয়েন্সি মুসলিম জাতিবাদ।  কোর মানে যাদের ভোট নড়চড় হয় না বিএনপিতেই আসে; আর এদের ছাড়াবা  বাদে বাকি ভোটার হল ফ্লোটিং। যারা যখন পক্ষে কখনও বিপক্ষে ভোট দিয়ে থাকে। 

    এখন “প্রগতিশীলতার” প্রভাবে পড়ে মুসলিম জাতিবাদ মানে মুসলিম শব্দটা শুনেই ঝাপিয়ে পড়বেন না বা দুরত্ব তৈরি করবেন না। কেবল খেয়াল করে দেখেন, বৃটিশ ভারতে প্রথম রাজনৈতিক দল কংগ্রেস এটাকে তো হিন্দু জাতিবাদি দলই বানানো হয়েছিল। যার রূট খুঁজলে ১৮১৫ সালের রাম মোহন রায়ে যেতে পারেন। পরবর্তিকালে গান্ধী-নেহেরুরা একাজই করেছে; হিন্দু জাতিবাদকে সাফাই দিয়ে গেছে।  অথচ  হিন্দু জাতিবাদ শব্দটা শুনলে আপনার মনে দুরত্ব তৈরি করার কোন প্রতিক্রিয়া না হলে বুঝবেন আপনি প্রগতিশীল এবং মুসলমানবিদ্বেষী। একথাত বিরুদ্ধে সাফাই হিশাবে আপনার মনে হতে পারে যে আপনি তো আসলে ধর্মীয় জাতিবাদের বিরোধিতা করছেন! কিন্তু না; করছেন না।  করলে তো হিন্দু জাতিবাদ শুনলেও একই দুরত্ব তৈরির প্রতিক্রিয়া হত!! তা তো হয় না। বরং প্রগতিশীলেরা কংগ্রেস দলকে আপন মানে। অনেকটা নিজেরই তবে আপনি তো জাতে উঁচা আর এরা হল আম “পপুলার অংশ”। আর তা মনে করে সাথেই রাখেন, আপন মানেন। অথচ মূল কথাটা হল, আপনি সংখ্যাগরিষ্ট এই যুক্তিতে হিন্দু জাতিবাদ এর দল খুললে এটা অবশ্যই প্রতিক্রিয়ায় একটা মুসলিম জাতিবাদি দলও অবশ্যই তৈরি হবে।  কারণ,  হিন্দু জাতিবাদ দল খুলে আপনি মুসলমান নাগরিকদেরকে একা, বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন, ঠেলে দিয়েছেন মুসলিম জাতিবাদ করতে। বুঝিয়ে দিয়েছেন তারা আপনার সমান নয় – নিচা, আপনারই অধীনস্ত, পায়ের নিচের লোক!  আর এই হল আমাদের আদি পাপ!!!
    এরই সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ১৮৮৫ সালে জন্মানো কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়ায় ২০ বছরের মধ্যে ১৯০৬ সালের মুসলিম লীগ!  কারণ, ব্যাপারটা হল, আপনি যদি অপরের এক ধর্মকে নিচা দেখান, গালমন্দ করেন – মনে রাখবেন সব ধর্মের চোখেই অপর সবগুলো ধর্মই মিথ্যা, তাদের ritual-রিচুয়াল  (শরীয়তি আচার নিয়মগুলো) অর্থহীন – কোন মানে হয় না – বুজরুকি ভন্ড ইত্যাদি মনে হতেই পারে। আসলে আপনি আপনার ধর্মের রিচুয়ালের সাথে মনে মনে তুলনা করছেন আপনারটাই  সবচেয়ে সহি  এই বিবেচনায়!  কিন্তু পরক্ষণেই আপনার বিবেকবান হওয়ার কথা।  সে কারণে, বুদ্ধিমান লোকেদের বুঝ এখানেই থামবে না। কারণ, সে সাথে সাথে বুঝে যায় যে তাহলে তো অপর ধর্মের লোকেরাও আমার ধর্মকেও একই নিচা বা ‘মানে হয় না’ এমন আরেক  নিচা ধর্ম ও রিচুয়ালের লোক হিশাবে দেখছে!!!  সেটাও তো আপনার কাম্য হতে পারে না! তাহলে  এথেকে মুক্তি বের হবার পথ কী? 

    খুবই সহজ।  পথটা হল যে, কারোরই অপরের ধর্ম-রিচুয়াল-কে নিচা দেখানো উচিত না।  নিজের ধর্ম  সেফ রাখা বা বাঁচানোর জন্য।  তাহলেই সকল ধর্ম অপমান, নিচা দেখানো ইত্যাদির হাত থেকে বাঁচতে পারে। এজন্যই সকলের চোখে নিজ নিজ ধর্ম শ্রেষ্ঠ এই বোধ থাকলেও কোন বুদ্ধিমান মানুষ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ববোধ অন্যকে মানতে বাধ্য করে না, চাপায় দিতে যায় না অথবা মানতে হবে বলে দাঙ্গা বাধায় দিতে যায় না। এটা সে করতে পারে না। একমাত্র এমন হলেই সকল ধর্মই আপন আপন জগতে শ্রেষ্ঠ থাকতে পারে। কোন সমাজে এমন বোধ বেশিরভাগ মানুষের ভিতর এলে তবেই একটা রাষ্ট্রগঠন সম্ভব। যে রাষ্ট্রকে অবশ্যই  সবার  ইচ্ছামত নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা  নিশ্চিত করতে হবে – নাগরিক অধিকারের বিচারে নাগরিক মাত্রই সকলের অধিকার সমান; কোন বৈষম্য করা যাবে না – এই নীতিতে  তা গড়ে তুলতে হবে।  কিন্তু মনে রাখতে হবে আদি পাপ  আমাদের বাধা দিয়ে রেখেছে; যেটা সবার আগে পাশ কাটাতে হবে!!    

    আমাদের মূল আলোচ্য প্রসঙ্গে ফিরছিঃ
    ভোটার কনষ্টিটুয়েন্সির বিচারে বিএনপি এই দলের কোর সমর্থক ভোটার বেজ হল  “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার। বিপরীতে আওয়ামি লীগেরও বাঙালি জাতিবাদি কোর ভোটার ঐ ৩৩% এর আশেপাশে তবে এসবই ২০০৯ সালের আগের হিসাব ও অনুমান।  ভোটার হিশাবে সমর্থদের  এই মৌলিক ভিত্তিগত ফারাকের কারণেই আওয়ামি লীগ কখনও বিএনপি হতে পারে না, পারবে না; বিপরীতে বিএনপিও লীগ হতে পারবে না।  তাহলে, মির্জা আলমগীরের এই আল-টপকা মৌলবাদ শব্দের ব্যবহার এর মানে কী? নিজের পায়ে কুড়াল  মারা? হা ঠিক তাই! মানে সিপিবির কোন নেতার যেন বিএনপির সেক্রেটারি হয়ে যাবার দশা??? এমন আনফিট এক দশা-পরিস্থিতি! আচ্ছা, তাই  বিএনপি ভোটের রাজনীতিতে যে  “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটারদের দল, সে  কি করে কথিত “মৌলবাদবিরোধি” হয়! কারণ ভারতের চোখে আর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের চোখে খোদ বিএনপি তো মৌলবাদি দল!!!  আর আমরা ভারতের অযাচিত প্রভাব বিরোধী ফলে প্রতিরোধী যেকেউই তো আসলে ভারতের চোখে মৌলবাদী ট্যাগপ্রাপ্ত!! মানে   মূলত মুসলিম জাতিবাদী ভোটারের দল বিএনপি কিভাবে  নিজ সমর্থক ভোটারের বিরুদ্ধে যাবে? চাইলেও কী যেতে পারবে? [ তবে বছর দুয়েক সময় পেলে পারবে হয়ত কিন্তু তাতে চিত্রটা দাঁড়াবে এভাবে যে “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার ভিত্তিক আরেকটা নয়া দল গড়ে উঠেছে। ফলে আজকের বিএনপি পরিণত হয়ে উঠতে পারে এক কথিত মৌলবাদিবিরোধী বিরুদ্ধে নয়া এক প্রগতিবাদি বিএনপি হতে চেষ্টা করতে পারে; যেটা হবে আসলে ভারতের পছন্দের এক আওয়ামি বি-টিম যার কোর সমর্থক হতে পারে বড়জোর ১০%।

    তাহলে মির্জা এত দ্রুত এমন “মৌলবাদ-বিরোধী” বক্তব্য কেনঃ
    মূল কথাটা হল, মির্জা নিজেই আল-টপকা  “মৌলবাদ-বিরোধী”বা পক্ষ বলে তর্কটা নিয়ে গেছে।  অথচ কোন মৌলবাদ-তর্ক তো হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে ইস্যু ছিল না!
    যদিও গত ২০১৫ সাল থেকেই বিএনপির মধ্যকার এক বেহুশ আর পোলাপানি চিন্তা দেখা দিয়েছিল যে,  প্রগতিবাদিদের মত মৌলবাদ-বিরোধি বক্তব্য দিতে পারলে দল ভারত ও পশ্চিমা শক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য হবে – যেন আওয়ামি সমতুল্য হবে দল!  মানে এরা সেই থেকে বেমালুম অসতর্কতায়  নিজ “মুসলমান জাতিবাদি” কোর সমর্থক গোষ্ঠিরই বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চেয়ে চলেছে। কিন্তু কেন? কারণ, বিএনপির অস্থির কথিত তরুণ নেতাদের অপুষ্ট বুঝের বোকা-অনুমান হল ভারতের সমর্থন ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়া যাবে না। আওয়ামি লীগকে দেখেই তাদের এই সর্টকাট অনুমান!  অথচ মূল কথাটা হল, বাংলাদেশের উপর ভারতের কর্ত্ত্বত্ব ও প্রভাব ভারতের নিজ মুরোদে সৃষ্ট হয় নাই। আসে নাই। এটা এককালে আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল তাই। কিন্তু এখন বাইডেন প্রশাসন ভারতের সাথে সেই বিশেষ [চীন ঠেকানোর ঠিকাদারির দায় থেকে ভারতকে মুক্ত করে দিয়েছে]। শুধু তাই না, এরপর বাংলাদেশের উপর পুরানা ভারতীয় প্রভাব ভেঙ্গে দিয়ে বাইডেন নয়া সম্পর্ক গড়তে নয়া পলিসি-অবস্থান নিয়েছে। যেটা শুধু বাংলাদেশের উপর ভারতের মাতব্বরি উপড়ে ফেলাই নয়,  ভারত-আমেরিকার পুরানা সম্পর্কে-কেও বদলে নিবে!  এবার গত জুনে ২২-২৪ মোদির বাইডেন সফর তাই  সেই সফর ছিল মূলত সামরিক ক্রেতা-বিক্রেতার সাক্ষাত-সফর। যা মূলত ভারতে (যুদ্ধ বিমানের ইঞ্জিন বানানোর কারখানা বসানোতে) আমেরিকার বিনিয়োগ সংক্রান্ত…। এর সাথে রাজনৈতিক বা স্ট্রাটেজিক কোন ইস্যু নাই, আলোচনার এজেন্ডা বা তালিকায় তা ছিল না।

    কিন্তু লেটেস্ট ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক বিষয়টা – এসব পরিস্কার জানা সত্বেও মোদি-হাসিনা ভান করতে চায় যে যেন ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক আগের মতই আছে। ফলে মোদিও যেন আমেরিকার কাছে হাসিনার সুপারিশকারিই এখনও আছে। এই ভান এর উপর ভিত্তি করে গত দুদিনের মিথ্যা প্রপাগান্ডা চলছে, আওয়ামি কর্মিদের মনোবল বাড়াতে! আর তাতেই এক সিপিবি কর্মি যেন বিএনপির সেক্রেটারি হয়ে বসে গেছে অবস্থা!! রাজনীতির খোঁজ-খবর বা অভিমুখ না জেনে না রেখে রাজনীতি করা যায় না। মির্জা ফকরুল-সহ তাদের নীতিনির্ধারকদের ভুল-অনুমান হল, এভাবে মৌলবাদের কথা তুললে নিশ্চয় আমেরিকা বা পিটার হাস খুব সন্তুষ্ট হবে আবার ওদিকে মৌলবাদবিরোধি গলা চড়ালে মোদির হিন্দুত্ববাদও বেজায় খুশি হবে। অথচ ওরা খবর নেয় নাই সেকালে নব্বইয়ের দশকে মৌলবাদ বলতে এর প্রধান পৃষ্টপোষক বলতে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা আমেরিকাকেই বুঝাত – এতে তাদের সেই বয়ান হল,  “মৌলবাদ উত্থান” ঘটার জন্য প্রধান অভিযুক্ত আমেরিকা!
    মির্জা ফকরুলের মুখ দিয়ে বের হওয়া যে বয়ান হাজির হয়েছে এটা চলতে থাকলে ক্রমশ এটা এমন নয়া বাস্তবতায় পৌছাবে সেটা হল  বাংলাদেশের “মুসলমান জাতিবাদি” ভোটার সমর্থকদের দল হিশাবে বিএনপি তার স্থান হারাবে।  আর তাতে ভিন্ন এক নয়া দল গঠিত হয়ে এর উপর ভর করে নয়া এক ‘মুসলিম জাতিবাদি’ কনষ্টিটুয়েন্সির দল হাজির হতেও পারে। যা বলাই বাহুল্য বর্তমান বিএনপিকে শুকিয়ে ফেলবে।

    মুসলিম জাতিবাদ আসলে কী কেন তা টিকে থাকতে থাকবেঃ
    একালের এর পিছনের মূল কারণ গত পনেরো বছরের হাসিনা শাসনের আড়ালে ভারতের লুটপাট  – বিনাপয়সার করিডোর থেকে শুরু করে ভারতের বাংলাদেশ থেকে যা তাদের নেয়া দরকার সবই তারা নিয়ে যাচ্ছে। খোদ হাসিনার ভাষাতেই বললে তিনি আমাদের  জানিয়েছেন, “ভারতকে যা দিয়েছি ওরা আজীবন মনে রাখবে”। তাই এখনকার বাংলাদেশ হল, ভারতবিরোধিতা এক টইটম্বুর – চরমে উঠা বাংলাদেশ – মনে রাখতে হবে এটা খোদ ভারতেরই সৃষ্টি – ভারতের এই লুটপাট সব কাজে ভারতের স্বার্থ এর প্রায়োরিটি – এসবই করে চলেছে গত ১৫ বছর ধরে। সবচেয়ে বড় কথা রাষ্ট্রের শাসনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর সুযোগ বন্ধ! যার সোজা অর্থ ভারতের এই হিন্দুত্ববাদি চোখ বাংলাদেশের নিজ স্বার্থকে ভারতের পায়ের নিচে নেওয়া এর বিরুদ্ধে নিরব জন-প্রতিরোধ বা রেজিসট্যান্স [resistance]   – এর প্রতীকী নামই মুসলিম জাতিবাদ। এটাই একালের মানে! অতএব ভারতের হিন্দুত্ববাদি ‘বাংলাদেশ নীতি’ এরই ডেকে আনা বিপরীতের নাম  “মুসলমান জাতিবাদি” প্রতিরোধ; তাই এই পরিচয় নিয়েই তাদেরকে আরো থাকতে হবে। তাতে বিএনপি তাদের প্রতিনিধিত্ব করবে বা যোগ্য থাকবে কিনা সেটা বিএনপি-কেই নির্ধারণ করতে হবে। ভোটার গোষ্ঠি অবস্থাকেই পুষ্ট করার জন্য নয়া কোন দল হাজির হওয়া বা আগিয়ে আসা – এসব সেক্ষেত্রে কোন অসম্ভব বা দুরের কিছু না।

    তবে ভারত যে মিথ্যা “কূটনীতিক বার্তার” কথা তুলে আওয়ামী কর্মিদের হতাশা ভেঙ্গে মন চাঙ্গা করতে চেষ্টা করেছে সেটা এখন কমবেশি পরিস্কারঃ
    আর এতে ভারতীয়  “সাফাই ভাষ্য” চরমভাবে দুর্বল।  তারা বলছে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে হাসিনা ফিরে ক্ষমতায় না থাকলে ভারতের স্বার্থ বিঘ্নিত হবে – এটাই কথিত সেই ভারতীয় বার্তা। এখন একবার ভেবে দেখেন, দুনিয়ার কোন নির্বাচন কমিশন অথবা আদালতের কাছে এটা তো বলাই যায় না যে আমি ওমুককে বিজয়ী দেখতে চাই। অথবা (আদালতের কাছে) ওমুকের ফাঁসির রায় চাই। একথা বলার মানে হয় না। কারণ এটাই তো নিশিভোট! কোন নির্বাচন ফলাফল কেমন হতে হবে তা আগাম দাবি করে বলার মানে হল সেটা আর নির্বাচনই নয়। অথবা শাহবাগের মত দাবি – আগাম ফাঁসির রায়ই হতে হবে বয়ে রায় চাই একথা বলার মানে হল সেটা আর বিচার নয় বা আদালতের রায় নয়। এছাড়া ভিন্ন একটা দেশ, বাংলাদেশের নির্বাচনে হাসিনাকেই বিজয়ী দেখতে চাই এটা কী বলা যায়? মানে হয়? নাকি এসব কথা  জনসমক্ষে প্রচার হয়ে যাবার পর আমেরিকার পক্ষে ইচ্ছা থাকলেই কী এসবের বাস্তবায়ন বা মেনে নিতে পারবে???

    সারকথায় এটা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আমেরিকা দিবার মত কোন “ভারতীয় বার্তাই” হয় নাই – কোন কূটনীতিক বার্তা হওয়া দূরে থাক!   এটা “শাহবাগী ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই” – এর চেয়েও ন্যাংটা উলঙ্গ এক বর্বর ভাষ্য! যেমন, আমরা কী বলতে পারি যে আমরা ভারতের আগামি নির্বাচনে মোদিকেই আবার ক্ষমতায় দেখতে চাই; এটাই বাংলাদেশের স্বার্থ!!!!!
    এধরনের বাচালদের কাজ কামে আমেরিকার জড়িত হবার নুন্যতম সম্ভাবনা নাই। বাইডেনের আমেরিকা অন্য নানান ইস্যু পদক্ষেপে ভুল করতে পারে, অন্যায় করতে পারে। কিন্তু তারা বোকা নয়।  তাহলে এসব কথিত ভারতীয় বার্তার একমাত্র লক্ষ্য হল, ভেঙ্গে পড়া আওয়ামি কর্মিদের চাঙ্গা করারই এক অকেজো চেষ্টা মাত্র!

    আপডেটেডঃ    ২২ আগষ্ট ২০২৩;  সকাল ০৭ঃ ৩৫
    সর্বশেষ আপডেটেডঃ  ২৩ আগষ্ট ২০২৩;  সকাল ০৮ঃ ২৫

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • আনন্দবাজার-অগ্নি রায়ের গায়েবী “সুত্রে” যা খুশি লিখা 

     

    আনন্দবাজার-অগ্নি রায়ের গায়েবী “সুত্রে” যা খুশি লিখা
    গৌতম দাস
    ২০ আগষ্ট ২০২৩   মধ্যরাত ১২ঃ ৩৬

    https://wp.me/p1sCvy-4Ox

     

            হাসিনাকে দুর্বল করলে ক্ষতি সবার, বার্তা আমেরিকাকে

     

    ঘটনা বড়ই অদ্ভুত! ভারত বাংলাদেশ বা হাসিনা সরকারকে নিয়ে তাদের ভাষায় “বাংলাদেশের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের বার্তা”  এমন কোন বার্তার অস্তিত্ব আদৌ আছে কিনা এর কোন খবর নাই। আনন্দবাজার, ডয়েচ ভেলে, প্রথম আলো অথবা  ওবায়দুল কাদের (সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী) এমন কারো কাছেই এমন খবরের নিশ্চয়তা নাই; কেউই নিশ্চিত করেন নাই বা এমন খবরের রেফারেন্স কী তা বলেন নাই। অথচ গতকাল থেকে এখনও কথিত এই ভারতীয় বার্তা নিয়ে প্রায় সব পক্ষই কথা বলে চলেছে। “ভারতীয় বার্তা” বলে কিছুর অস্বিত্ব কী? তা না বলে  যারা এনিয়ে কথা বলছেন তারা অন্যায় করছেন।  এভাবে “ভারতীয় বার্তা” বলে কিছু থাকলে তার কথা এই…... এভাবে শর্ত সাপেক্ষে নিজের কথা বলছেন। অথচ এভাবে কথা চলতে পারে না, মানে হয় না। খুব সম্ভব কয়েকদিনের মধ্যে ভারতের এক সরকারী ভাষ্য এখন আসন্ন যেখানে তারা বলবেন –  না তো এমন কোন ভাষ্য তো আমরা দেই নাই!!!!!
    অথচ এবার আনন্দবাজারের সাথে একইভাবে খবরের উৎস কী সেটা উল্লেখ না করে গায়েবী লিউজ ছেপেছে ডয়েজ ভেলে।  আর এই মিথ্যা গায়েবী খবর প্রথম আলো ডয়েচ ভেলের বরাতে ছেপেছে।  দাবি করেছে “কূটনৈতিক নোটে ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার দুর্বল হয়ে পড়লে ভূরাজনৈতিক দিক থেকে তা ভারত এবং অ্যামেরিকা কারও পক্ষেই সুখকর হবে না”। কিন্তু কোথায় ভারত এমন  কূটনৈতিক নোটে জানিয়েছে এর কোন হদিস নাই। মানে এরাও প্রথম আলো, স্টার, আনন্দবাজার এর মত একই দলে যোগ দিল। এতে বলাই বাহুল্য ডয়েচ ভেলে কেও মূল্য চুকাতে হতে পারে।   যেন সকলে এরা হাই স্টেকে জুয়ারি জুয়া খেলতে নেমেছে সাংবাদিকতা নামে!!!!

    আনন্দবাজারের অগ্নি রায় যা শুরু করেছিলেনঃ
    প্রথম কথা হল আজকের আনন্দবাজারে অগ্নি রায়ের লেখাটা এটা কোন সাংবাদিকতা-ই নয়। এটা আসলেই এক বাজারি লেখা যার পায়ে কেবল ঘুঙ্ঘুরটাই নাই!  একটা মনগড়া  আর কোন রেফারেন্স ছাড়া কিছু  রচিত বাক্যের গল্প বলা যায় একে বড় জোর। যেমন এই বানানো গল্পটা মোট ৪৪৪ শব্দের। কিন্তু তাতেই এর ভিতর অগ্নি রায় চার বার  “সুত্র বলছে” ব্যবহার করেছেন। মানে সোজাসাপ্টা এটা গায়েবী কথাবার্তা যার বাপ-মা নাই।  আর এধরণের চাপাবাজি শব্দ আর মিথ্যা কথাই সেখানে আছে। তবে আনন্দবাজারি লেখায় “সুত্র” মানে তা ইংরাজি সোর্স [source] এর বাংলা করেছে তারা এভাবে। আর এভাবে কথিত “সুত্র” এর কথা বলে আনন্দবাজার সাংবাদিকতায় খবরের সোর্স বলার বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যেতে চায়। এটাই অসৎ জার্নালিজম!   জার্নালিজমে নুন্যতম ফেয়ার [fair] বা সৎ জার্নালিজমের প্রধান ও নুন্যতম শর্ত হল খবরের সোর্স উল্লেখ করতেই হয়; পাঠক-কে জানাতেই হয়। অথচ এই ৪৪৪ অক্ষরের গল্পটার মধ্যে কোন উপযুক্ত সোর্সের কথা উল্লেখ নাই। অথচ সমানে যা খুশি তাই দাবি করে চলা হয়েছে। অথচ আনন্দবাজার প্রবর্তিত সেই অস্তিত্বহীন কথিত “ভারতীয় বার্তা” প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের আর মির্জা ফকরুল পর্যন্ত কথা বলে ফেলেছেন!!
    তবে আরো সব প্রসঙ্গে ঢুকবার আগেই পাঠককে মনে করিয়ে দেই। বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের এবার এখন একেবারে ঘুম নাই অবস্থা তৈরি হয়েছে। সেকথা ভারতের ভাষাতেই বললে, ভিসানীতি ধরণের স্যাংশন দিয়ে হাসিনাকে নির্বাচন করতে বাধ্য করা হলে সেটাতে নাকি ভারতের স্বার্থ খুন্ন হবে। এটা আবদি বা সুবীর ভৌমিক আমাদেরকে খোলাখুলিই জানিয়েছে।  যার মানে হল, হাসিনাকে ভোট কারচুপি বা রাতের ভোট করতে দিলেই একমাত্র ভারতের স্বার্থ রক্ষিত হবে।  যার সারকথাটা হল, নির্বাচন এর নামে যা হবে হোক কিন্তু শেষে হাসিনাকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে নাহলে নাকি ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ ক্ষুন্ন হবে। এমনকি তাদের বিদেশ মন্ত্রণালোয়ের মুখপাত্রও অরিন্দম বাগচি আমাদেরকে কনষ্টিটিউশন মাফিক মানে হাসিনার মাপে চলতে হেদায়েত করেছে।

    এখন এসবের সারকথাটাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভারতের মিডিয়ায় লেখা হচ্ছে। এবং খুব সম্ভবত এটা চলতি বছরের দ্বিতীয় বড় ঢেউ তোলা ফাঁপা উচ্ছ্বাস এর চেষ্টা।  যার প্রথমটা তোলা হয়েছিল মোদির আমেরিকা বা বাইডেন সফরের কালে (২১-২৪ জুন ২০২৩), আগে ও পরের সময়ে। কিন্তু এসব মিথ্যা হাইপ তোলার দায় দায়িত্ব না নিয়ে ও অস্বীকার করে ভারতের বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর ২ জুলাই জানায়ছিলেন একেবারে উলটা কথা – যে ভারত নাকি “প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে”।  [এপ্রসঙ্গে আমার সেসময়ের লেখা – “জয়শঙ্করের কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’!” – লেখাটার লিঙ্ক এখানে]।  তার মানে অগ্নি রায়দের মত মিথ্যা প্রপাগান্ডা লেখকদের পরিণতি মাত্র গত মাসেই আমরা দেখেছি; যখন জয়শঙ্কর এসবের কোন দায়দায়িত্বই নেন নাই। অথচ তাসত্বেও  আনন্দবাজার ও অগ্নি রায়েরা এবার আবার দ্বিতীয় বড় ঢেউ তোলা ফাঁপা উচ্ছ্বাস শুরু হয়েছে।

    তবে খুব সম্ভবত এবারের পটভুমি হল আগামি মাসে [৯-১০ সেপ্টেম্বর] অনুষ্ঠিতব্য ভারতে G20 নেতাদের সম্মেলন। নিচে সংক্ষেপে G20 জিনিষটা কী তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যাদের হাতে সময় কম তারা এটা পার হয়ে এরপরের প্যারাতেও চলে গিয়ে সেখান থেকে পড়া শুরু করতে পারেন। ভারতের জনসংখ্যা এখন চীনের চেয়েও বেশি। ফলে সে পটেনশিয়াল বা সম্ভাব্য বিনিয়োগ গ্রহিতা। তাই এবারের সম্মেলন সেখানে।

    G20 নেতাদের সম্মেলন কীঃ
    দুনিয়াতে যেসব রাষ্ট্রের জিডিপি সবার চেয়ে উপরের দিকে এমন টপ ২০টারাষ্ট্রের  কমন অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে কথা বলার এক জোট হল এই G20। প্রতিবছর নানান দেশে এর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এটা গড়ে উঠার ইতিহাস হল, এক কথায়, এটা মূলত ওয়াল স্ট্রিট [wall Street]  নিউইয়র্ক,  এর আগ্রহ ও আবেদনে গঠিত ও সৃষ্ট।  ওয়াল স্ট্রিট এক প্রতীকী নাম বা শব্দ যার অর্থ এটা বিরাট বিরাট পুঁজি (ঋণ দেয়া) বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠান। এর এতই বড় প্রতিষ্ঠান যা কমিউনিস্টদের কল্পনাতেই নাই। নাই কারণ, এবিষয়ে তাদের প্রধান গুরু জোসেফ স্তালিনেরও কোন ধারনা ছিল না। কিন্তু তামাসাটা হল,  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রধান যুদ্ধের খরচ যোগানদার ও নেতা ছিলেন অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। রুজভেল্টের অর্থনৈতিক-সহ সবধরণের সহযোগিতাতেই স্তালিন তার সোভিয়েত ইউনিয়নকে হিটলারের জার্মানির হাতে আক্রান্ত ও পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এখানে আসল কথাটা হল, রুজভেল্টের পিছনে ছিল এই ওয়াল স্ট্রিট -ই। ওয়াল স্ট্রিট এর বৃহত ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে করিতকর্মা ও দক্ষ কর্মিরাই ছিল রুজভেল্টের মন্ত্রী, প্রশাসক, পরামর্শদাতা, বিভিন্ন সরকারি কমিশনের প্রধান ইত্যাদি সবকিছুতে...। আর স্তালিন মারা যান ১৯৫৩ সালে, মারা যাবার আগে তিনি জানতেন যে ওয়াল স্ট্রিট  কী জিনিষ এমন প্রমাণ কেউ দেখে নাই।  সম্ভবত একারণেই, পরবর্তিতে স্তালিনের অনুসারি কমিউনিস্টদের কল্পনায় সবচেয়ে বড় পুঁজির কারবারী  হল, বহুজাতিক কোম্পানি [MNC: Multi National Corp.] বা কর্পোরেট হাউজগুলো। আর আমাদের মত দেশের কমিউনিস্টেরা অনুসরণ করে ইউরোপীয় কমিউনিস্টদের। যেখানে ইউরোপীয় কমিউনিস্টদের চোখেও ওয়াল স্ট্রিট বলেই কিছু নাই। তাই বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের তো খবরই নাই।
    এই MNC দেরই বাপ হল ওয়াল স্ট্রিট। সেটা এই অর্থে যে MNC গুলোকেই  বড় বড় পরিমাণ পুঁজি ঋণ বা বিনিয়োগ হিশাবে দেয় ওয়াল স্ট্রিট; মানে ওয়াল স্ট্রিটের বড় বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো।  তাই ওয়াল স্ট্রিট শব্দের আলোচ্য প্রসঙ্গে মানে হল যাদেরকে বিনিয়োগ পুঁজির বাজারকে বাড়াতে সব সময় নয়া বাজারের খোঁজে বেরাতে হয়। এজন্য এরা প্রভাবশালী রাষ্ট্র বা অর্থনীতিগুলোকে তারা চাপ দিয়ে বেড়াতে হয়।  ওয়াল স্ট্রিট এর আবেদন ও দাবি হল, তোমরা  G20 দেশগুলো বছরে একবার করে নিজেদের মধ্যে বসে সমন্বয় বাড়াও, এতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য আরো বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাধাগুলো কী তা নিয়ে আলাপ করে বড় ২০ দেশ কোঅর্ডিনেটশন বাড়াও। কারণ, একমাত্র তাহলেই ওয়াল স্ট্রিট এর বাজার বাড়বে; মানে এতে তোমাদের অর্থনীতিও বাড়বে দ্রুত।  এই হল সংক্ষেপে G20।

    কিন্তু মোদির ছেঁচড়ামো গেল না। ভারতের জনসংখ্যা এখন চীনের বেশি হয়ে গেছে বলে ভারত এখন চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া অর্থনীতি যেন হয়ে গেছে  তা একেবারেই নয়। তবে ওয়াল স্টিটের চোখে ভারত পটেনশিয়াল রাইজিং বলে সে  বড় জোর সম্ভাব্য পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে বিনিয়োগ ঋণ গ্রহিতা। এতটুকুই। আর মোদিকে এই সম্ভাবনাটাকেই বাস্তব করে দেখাতে পারতে হবে, ভারতের অর্থনীতিকে  বাস্তব গতি দিতে পারতে হবে। মানে ভারত জি-২০ সম্মেলন করেছে বলেই ভারতের অর্থনীতি তেমন উচা হয়ে গেছে তা একেবারেই নয়। কিন্তু মোদির ছেচরামি হল, তাকে ভারতের অর্থনীতি সে জায়গায় উচা করার আগেই এর ফায়দা নিতে হবে – এই লাইনে রওনা দিয়েছে। আর সেই সাথে ভাব করতে হবে ভারত যেন পরাশক্তি। তবে এই ভাব-ভাষ্যটাই মোদি আভ্যন্তরীণ ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার করে ভোট তুলতে চায়।  আর এরই সাথে হাসিনার বাংলাদেশ জি-২০ দেশগুলোর ধারেকাছেরও কেউ না হওয়া সত্বেও মোদি হাসিনার বাংলাদেশ তার অধস্থন  হাতা-ল্যাসপেন্সার এই অপমান করার বিনিময়ে হাসিনাকে  জি-২০ এর দাওয়াত করে এনে দেখাতে চায়। তার নিজ দেশে দেখাতে চায় যে মোদির ভারতেরও অধস্থন এক  হাতা-ল্যাসপেন্সার দেশ-সরকার আছে!!! এটাই মোদির ছেচরামি!!! অথচ কার্যত অনাহুত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে আমরা ঐ সভায় কী সম্মান পাবো সেখানে??  বড়লোক বন্ধুর বিয়েতে যেতে পেরেছি তা অনেক গরীর বন্ধু এক বিরাট অর্জন বা জাতে উঠা বলে মনে করতে পারে, এটা সেরকমই কিছু একটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি!!!

    সেটা কী দাঁড়াবে তা দেখা যাবে। এর আগে অনেক কিছুই ঘটবে। তবে এনিয়ে আপাতত আনন্দবাজার ও অগ্নি রায়েরা এবার আবার দ্বিতীয় বড় ফলস এক ঢেউ তুলতে চাইছে।   যেমন শিরোনাম থেকেই বিশ্লেষণ শুরু করা যাক। অগ্নি রায় বলছে “হাসিনাকে দুর্বল করলে ক্ষতি সবার, বার্তা আমেরিকাকে”। এখানে সবারটা কে কে? একা মোদির ভারত ছাড়া তো কেউ নাই। আমেরিকাই তো ভারতের সাথেই নাই। অগ্ন রায় যেটা এককালে ছিল যেন সেটা এখনও আছে এই মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে একথা বলছেন। মানে ২০০৭ সালের যে আমেরিকা বাংলাদেশে হাসিনাকে বসিয়ে সেই বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল – সেই আমেরিকা তো এখনকার আমেরিকা নয়। দেখাই যাচ্ছে হাসিনা সরকারই বলতেছে, আমেরিকা তাকে উতখাত করতে চায়। সর্বশেষ ১৬ আগষ্ট সরকার বলছে, আমাকে সরানোর চেষ্টা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী, লিঙ্ক দেখেন। অথচ অগ্নি রায় গল্প ফেঁদেছে হাসিনা সরকার দুর্বল হলে নাকি সেটা আমেরিকারও ক্ষতি?? মানে সোজাসাপ্টা একটা আরেকটার বিপরীত কথা!
    এরপরে স্টোরির শুরুতে অগ্নি রায়ের প্রথম বাক্য “বাংলাদেশে হাসিনা সরকার দুর্বল হলে তা ভারত এবং আমেরিকা কারও পক্ষেই সুখকর হবে না বলে মনে করে নয়াদিল্লি”। যেটা নিয়ে আমরা উপরে দেখলাম এটা এক ভারতের ছাড়া আর কোন দেশের স্বার্থ নয়।  এরপর পরের বাক্যঃ

    “কূটনৈতিক সূত্রের খবর, একাধিক স্তরের বৈঠকে নয়াদিল্লি
    এ কথা জানিয়েছে বাইডেন প্রশাসনকে।
    সূত্রের খবর— বাংলাদেশের
    আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আমেরিকার বর্তমান ভূমিকায় ভারত যে খুশি নয়,
    ওয়াশিংটনকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে সেই বার্তাও”।

    এটা অগ্নি রায়ের সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী মন্তব্য।  গত জুনেই মোদির আমেরিকা সফরে এটা ফকফকা স্পষ্ট হয়ে যায় যে বাইডেনের সাথে মোদির, বাংলাদেশ নিয়ে কোন কথাই হয় নাই। এছাড়া পরে জয়শঙ্কর উলটা ক্রেডিট নিয়েছে এই বলে যে প্রতিবেশি দেশে ভারত কম জড়াচ্ছে। তাহলে এসব সুত্রের খবর বলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা কেন??  ফ্যাক্টস হল, ত এনিয়ে ওয়াশিংটনকে ভারত কিছুই জানায় নাই। কারণ বাংলাদেশকে নিয়ে একই স্বার্থের পাটাতনে ভারত-আমেরিকা আর নাই।   ভারতের সাথে মিলে আমেরিকার এশিয়াকে দেখার দিন শেষ হয়েছে। বাইডেনের আমেরিকা এখন এশিয়াকে দেখতে চায় ভারতকে ছাড়াই। বরং ভারতের স্বার্থবিরোধি অবস্থান নিয়ে।  আর তা শুধু আগামিতে মোদিকে হারিয়ে রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোটকেই ২০২৪ সালের ক্ষমতায় দেখতে চাওয়া  এতটুকুই নয়। আরো আছে!  কী সেটা?

    বাইডেনের আমেরিকার নয়া এশিয়া নীতি-পলিসি সেখানে কেবল রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোট এর ভারত নয়, সেই ভারত এমন হবে যে হবে যে হবে সম্ভাব্য সারা দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকার পদচারণা করতে চাইছে সেই আমেরিকাকেই সমর্থন করবে, এমন এক অধস্তন অনুসারী ভারতকেই আমেরিকা দেখবার আকাঙ্খা করছে। আরো আছে – আর তা শুরু বাইডেনের বার্মা পলিসি-ই নয়; মানে বাইডেন যেমন আগামি বার্মা দেখতে চায় সেটাকেই ভারত সমর্থ করবে মানে, ওর বিরোধিতার বদলে বরং অ্যামেরিকান স্বার্থের ভিতরেই ভারত নিজের স্বার্থ খুজে নিচ্ছে বা খাপ খাইয়ে নিচ্ছে এমন হতে হবে – শুধু তাও নয়।  এটা হল, সপ্তম নৌবহর কেবল বঙ্গোপসাগরে নয় আন্দামানেও হাজির থাকতে চায়।

    ঠিক যেমন বাংলা ট্রিবিউন লিখেছে, 
    ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে নানা খেলা চলছে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই এলাকাটাকে
    নিয়ে নানা ধরনের খেলার একটা চক্রান্ত। যেহেতু আমি জানি
    , আমি বুঝি যে কীভাবে আমাকে ক্ষমতা থেকে
    সরাবে। তাদের কিছু কেনা গোলাম আছে
    , পদলেহনকারী আছে, তাদের বসিয়ে এই জায়গাটাকে নিয়ে খেলবে।
    সেটাই হচ্ছে প্রচেষ্টা। সেটা আমি ভালোভাবে বুঝতে পারি”।

    কিন্তু হাসিনার এসব বক্তব্যের কারণে কিছুই বদলাবে না। যেমন, ২০০৬ সালের শেষে যদি ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন নিয়ে,  আজ সরকার যেমন বক্তব্য রাখছে, তখনকার  বিএনপি যদি একই রকম বক্তব্য দিত তাতে ওয়ান-ইলেভেন ঘটা বা কিছুই ঘটা আটকাতো না। তখনও ভারত মহাসয়াগরের কথার মত অন্য কথাও তো ছিল। যেমন যদি বিএনপির দিক থেকে  বলা হত এভাবে  যে,  আমাদের বদলে আমেরিকা আওয়ামী সরকারকে ক্ষমতায় আনবে, বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিবে ……ইত্যাদি! তাতে কী কিছু ওয়ান-ইলেভেন ঘটা আটকাতো? মোটেও না।
    এসরের মূল ইস্যুটা হল জনপ্রতিনিধিদের গণবিচ্ছিন্নতা।   এমনকি আজ গণ বিচ্ছিন্নতার দিক থেকে আজকের  হাসিনা সরকারের সেকালের বিএনপির চেয়ে বেশি গণবিচ্ছিন্ন। সেটা এই অর্থে যদি অন্তত একটা ফ্যক্টর বিবেচনা করি যে আমাদের মত দেশে জনপ্রতিনিধিদের অন্তত কিছুটা ভয় বা লজ্জা থাকে যে দিন শেষে আমাকে আবার জনগণের কাছেই ভোট চাইতে যেতে হবে। কিন্তু সেটা এখন থাকত হয়ে গেছে।  গত ১৫ বছর ধরে  সরকার প্রশাসন আমলা পুলিশ এমনকি যেকোন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি তা একেবারে আওয়ামি মাঠকর্মীটারও আর সেসবের পরোয়া করা বালাই নাই। কারণ, সেটাও ম্যানেজ করার মেকানিজম মাঠকর্মী-নেতাদের হাতে পর্যন্ত এসে গেছে। জনপ্রতিনিধিদেরকে ভোট চাইতে আর পাবলিকের কাছে যেতে হয় না – এটাই সে মেকানিজম।  কাজেই  এখন ক্ষমতাসীনদে্রা এখন আম-জনতাকে সব ধরণের পরোয়ার বাইরে বা উর্ধে উঠে গেছেন। এরই উলটা দিকটার নামই হল এক  “জনবিচ্ছিন্ন জনপ্রতিনিধি ব্যবস্থা” যা জন্ম দিয়েছে এক গণবিচ্ছিন্নতার দল ও সরকার ব্যবস্থার রাজনীতি।  তাই আগেই বলা যায় এসব “ভারত মহাসাগরের গল্প” বলে এবারও আরো কিছুই ফিরানো যাবে না।

    সারাংশটা হল্‌  এখন কেন আমাদের মত দেশে কেন কিছু “ফিরানো” যায় না – এর আসল কারণ পাওয়া যাবে একজন জনপ্রতিনিধির আবার গণবিচ্ছিন্নতা কী? এটা তো স্ববিরোধি কথা!!! হা এই স্ববিরোধের আরেক নাম নিশিভোট!  এথেকে সে কেন গণবিচ্ছিন্ন এর অর্থ  কিছুটা হলেও বুঝা যাবে।  আবার, মূলত  এখনকার বাংলাদেশের রাজনীতির এই – গণবিচ্ছিন্নতা বৈশিষ্ট – এর কারণেই এখন গণ-অভ্যুত্থানের কথা বকোয়াজ, ফাকা-আওয়াজে উলটা বরং তা জুতসই “ভারতের দালালি” করার বক্তব্য হয়ে থাকবে।  যেটা অনেকেই গণ-অভ্যুত্থানের কথার আড়ালে তা করছেন।  আর এতেই কার্যত তৃতীয় শক্তির হস্তক্ষেপ জাতীয় কথা ও শব্দাবলী এসবই মুখ্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়,  দাঁড়াবেই! সেটা আমরা পছন্দ করি বা নাই করি!

    ভারত জামাতে ইসলামি বলে কী বুঝাতে চায়ঃ
    আনন্দবাজার বা অগ্নি রায় তাদের এই ৪৪৪ শব্দের লেখায় প্রথম ১১৫ শব্দের পরের ১৮০ শব্দ কেবল ব্যয় করেছে জামাতে ইসলাম বলে এক শব্দ আর ধারণা নিয়ে। এনিয়ে সবার আগে পাঠককে একটা সাবধান করে দেই। ঐ লেখায় “জামাতে ইসলাম” লেখা হলেও এশব্দ শুধু রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলাম  বুঝান হয় নাই। এটা একটা দলের নাম করার আড়ালে একটা প্রতীকী শব্দ হিশাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এশব্দ দিয়ে বুঝতে হবে বাংলাদেশে ইসলাম সম্পর্কিত যেকোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ – এর কথা বুঝানো হয়েছে।   এভাবে জামাতে ইসলাম বলে সব জিঘাংসা বিদ্বেষ উগড়ে দেওয়ার শুরু ২০০৮ সাল থেকে, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে যারাই গেছেন সকলেই  জামাতে ইসলাম এদুটো শব্দ দিয়ে গত ১৫ বছর ধরে  জিঘাংসা বিদ্বেষ ছড়িয়ে কথা বলে গেছেন।  ভারতও সেটাই রপ্ত করে কথা বলছে। এটা হল ভারতের কাছে অনেকটা ১৯৪৭ সালের আগের জমিদারি শাসনে শাসিত পুর্ববঙ্গে ফিরে যাবার (মৃত) আকাঙ্খার মত। এটাই জামাতে ইসলাম শব্দে এর বিরুদ্ধাচারণ।
    কথাটা স্পষ্ট হবে, যদি উত্তর খুঁজি যে ভারত বা  আনন্দবাজার বা অগ্নি রায় এরা জামাতে ইসলাম শব্দগুলো বলে কীসের বিরোধিতা করছে? অথবা আরো স্পষ্ট করে তারা এর বদলে কী দেখতে চাইছে?

    এরা সকলেই [এবং এমনকি খুব সম্ভবত বাংলাদেশের এখনকার বেশির ভাগ হিন্দু-সহ প্রগতিশীলেরা ] এদের কাছে যে আদর্শ বাংলাদেশ কাম্য সেটা হল ১৯৪৭ সালের আগের জমিদার হিন্দুর আধিপত্যের যে পুর্ববঙ্গ – সেটাই, সেখানে যদি ফেরত যাওয়া যেত। ভেঙ্গে বললে সেটা হল কোন নাগরিক সাম্য নয়, আইনের চোখের ধর্ম-নির্বিশেষে সব নাগরিক অধিকারে সাম্য নয় বরং জমিদার হিন্দু আধিপত্য করবে আর ইসলাম-মুসলমানের কোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ – সেটাকে অবশ্যই দমানো হবে শুধু না এদের সকলকে জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স মেনে নিতে হবে।
    এক্ষেত্রে মুসলমানদেরকে কী কী মেনে নিতে হবে? সেই তালিকার নাম সেটা অন্য শব্দে বললে তা হল – মুসলমানদেরকে অসাম্প্রদায়িক-  হয়ে থাকতে হবে। এটা শুধু বাংলাদেশের বেলায় নয়, এখনকার সারা ভারতের – মানে কেবল মোদির ভারতের না বা হিন্দুত্ববাদের ভারতের নয় – সারা ভারতের বেশীর ভাগ হিন্দু নাগরিকের আকাঙ্খা। এমন এক ভারত রাষ্ট্রই এদের কল্পনা।  আসলে যেকোন থিওলজি-তে দাঁড়িয়ে কল্পনায় যে কোন মর্ডার্ণ রাষ্ট্রের অনুমান এমন হয় ও হবেই।  আসলে যেকোন এথনিক বৈশিষ্ট ভিত্তিক আধিপত্যের কল্পনা এটা দিয়ে জাতিরাষ্ট্র কায়েম হবে হয়ত কিন্তু তা রিপাবলিক রাষ্ট্র হবে না যেটা ‘নাগরিক সাম্য’ অথবা “ধর্ম-নির্বিশেষে সব নাগরিক অধিকারে সাম্য” এটা হবে না।
    এককথায় বললে, ভারতের হিন্দুত্ববাদ (সাথে একালের ওয়ার অন টেরর) এটাই কিন্তু বাংলাদেশে  -ইসলাম সম্পর্কিত যেকোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ  জোরেসোরে ঘটিয়েছে।  এটা হল হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ।  অথচ তামাসাটা হল, হিন্দুত্ববাদের ভারত বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ ঘটিয়ে যে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ সেটাকেই “জামাতে ইসলাম” বলে প্রতীকী নামে বিরোধিতা করছে!
    আর ঐ যে জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স এর চিহ্ন ও নমুনা হিশাবে মুসলমানদেরকে “অসাম্প্রদায়িক” হয়ে থাকতে বলার দাবি ও বয়ান এটাই সবচেয়ে বেশি করে বয়ে বাংলাদেশের নিয়ে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ ফেরত মুসলমানেরা
    ।  কারণ কলকাতায় থাকার সময়ে এসব মুসলমানেরা অসাম্প্রদায়িক থাকবে এই শর্তেই তো শিক্ষিত হতে সুযোগ পেয়েছিল।    অথচ বাংলাদেশে ফিরে এরাই প্রগতিবাদের নামে হয়ে গেল হিন্দুত্ববাদের (জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স ধারণার) ক্যারিয়ার।
    তবে এত শব্দ থাকতে বাংলাদেশের চেতনাবাদী বা “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি” কেন ইসলাম কোপাতে “জামাতে ইসলাম” বলে প্রতীকী শব্দটা বেছে নিল?  এর কারণ হল, “জামাতে ইসলাম” নামে ডেকে কাউকে কোপানো এর  পরে এমন নৃশংসতার পক্ষে কোন সাফাই হাজির করা ওদের জন্য খুবই জরুরি।  আর ইসলাম কোপানোর স্বপক্ষে সেই সাফাই বয়ানটা হল, যে এটা সাধারণ ভাবে “বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশকে” কোপানোর নৃশংসতা করা নয়; বরং এটা যেনবা  ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামের অপরাধের বিরোধিতা করা হচ্ছে। 

    কঠিন সত্যিটা হল,   বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক যেকোন প্রকাশকে কোপানোর নৃশংসতা করা – এটা তো রেসিজম। ঘোরতর এক Racism; এক নির্মুল আকাঙ্খা।  এক এথনিক[ethnic] জাত-ধর্ম বিদ্বেষ – ইসলামবিদ্বেষ! এথনিক ক্লিনজিং [ethnic cleansing] বা অন্যের জাত-ধর্ম নির্মুলের ভয়াবহ আকাঙ্খা!!   অথচ এটাই প্রগতিশীলতা বলে চালানোর চেষ্টা  চলছে।

    তাহলে আনন্দবাজার কেন এখানে জামাতে ইসলাম শব্দ দিয়ে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ নিল?
    কারণ, সে আমেরিকাকে ভয় দেখাতে চায় যে হাসিনা আগামিতে ক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশে ইসলামিজম ছেয়ে যাবে। কাজেই হাসিনাই ক্ষমতায় থাক! এই হল তাদের ছদ্ম-পরিচয়ে থেকে বলা সাজেশন!

    কিন্তু এনিয়ে অ্যামেরিকান অবস্থান কীঃ
    এটা বলাই বাহুল্য যেকেউই  ক্ষমতাসীন যখন থাকে তখন সে কখনই  বিরোধি যেকোন “রেডিক্যালিজম” মানে ক্ষমতাসীনকে সশস্ত্রভাবে উতখাত করতে চাওয়া যেকোন শক্তির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর বা নির্মমই হবে।  একারণের সবদেশের কনষ্টিটিউশনেই লেখা থাকে এসব “রেডিক্যালিজম”  করলে ওর শাস্তি হল মৃত্যুদন্ড। তাই  ইসলামি রেডিক্যালিজমের বিরুদ্ধে আমেরিকার অবস্থান থাকা তা কোন নতুন জিনিষ নয় বরং অনস্বীকার্য বা obvious ঘটনা অবস্থান। এছাড়া ওয়ার অন টেরর এর টানা বিশ বছর এর বেশি হয়ে গেল; এখন   আমেরিকার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা-শিক্ষা তো হয়েছেই ধরে নিতে পারি। সম্ভবত সেকারণের আমাদের মত দেশে অ্যামেরিকান নীতি এখন ইসলামি রাজনীতি মানেই এর বিরোধী হতেই হবে ঠিক তা নয়। মানে কোন মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রে ইসলামি রাজনীতি করা যাবে না ঠিক তা নয়। তবে মূল অবস্থানতা হল এই যে, নাগরিক অধিকারের দিক থেকে সব ধর্মের নাগরিকের অধিকার সমান বা সাম্য ধারণার মধ্যে থাকলে  ইসলামি রাজনীতি করতে কোন দলেরই সমস্যা নাই। তবে এর সাথে কথা আরো কিন্তু কথা বা ফারদার ব্যাখ্যা তারা সাথে দিয়ে বা করে থাকে। যেমন তারা সমাজে প্লুরালিজম [Pluralism]  থাকবে মানে হল,  ওদেশে বহু এবং বিরোধি মতামত-রাজনীতি থাকবে এটা মানতে রাজি থাকতে হবে। এছাড়া একথাটাই আরেকভাবে বলা ইনক্লুসিভ [Inclusive] বলে আরেক শব্দের কথা তারা বলে দেয়। যেমন যেকোন রাজনীতি-চিন্তাকে তার সকল বিরোধিতাকারীদেরকেও সাথে পাশাপাশি নিয়ে চল্তে পারতে হবে।  মানে কোন বিরোধি মতামত বক্তব্যকে চাপিয়ে কোনায় ফেলে দেয়া বা কোনঠাসা করে রাখা  – সেটা না করে বরং সবার বক্তব্যই বলতে দিতে হবে, তাতে শেষে কার বক্তব্য ও তা কতটুকু পাবলিক গ্রহণ করবে সেটাই হবে সবকিছুর নির্ধারক। এসবই মোটা দাগে অ্যামেরিকান অবস্থান। মানে সারাংশে বললে, ভারত বা আনন্দবাজারি গোষ্ঠি  ইসলামি রাজনীতি বা ইসলামি জুজুর ভয় দেখালেই আমেরিকা ভয় পেয়ে পালাবে বা হাসিনাকে ফরে ক্ষমতায় রেখে দিবে আর  এই বাজারি গোষ্ঠি এতে সফল হয়ে যাবে – এগুলা বেকুরি সর্টকার্ট ও ধান্দালি চিন্তা।

    এগুলো আসলে কলকাতার কিছু মফস্বলি চিন্তা।  তাদের দুনিয়া বলতে তা কলকাতার মধ্যেই আবদ্ধ বলে মনে করে – এরা আমেরিকাকে আন্ডার এস্টিমেট করছে খামোখা। এসব তো এমনকি জয়শঙ্করই আমল করবে না,  করার কথা না। মোদি-জয়শঙ্কর বরং  ভারতে বাইডেনের পলিসিকে  কৌশলে পাশ কাটিয়ে কিভাবে মোদিকে আবার ক্ষমতাসীন করবে – এই চিন্তায় নির্ঘুম! নিজ মাথার ঘায়ে তারা নিজেরাই পাগল অবস্থায়! যদিও হাসিনাকে জি-২০ এর সভায় ডেকে আনতে পেরেছে বলে এটা মোদি সরকারের বিরাট কূটনৈতিক  সাফল্য বা মোদি আন্তর্জাতিক জগতে এক বিশাল নেতা এসব কথা ছড়িয়ে ভোটের বাক্সে এর ইতি প্রভাব যেন পড়ে ইত্যাদি এসব কান্ড তো মোদি অবশ্য করবেনই!!  এমনকি বাইডেনও জি২০ এর সভায় আসতেছেন; তাই বাংলাদেশের হাসিনার জন্য মোদিই যেন বাইডেনের কাছে সুপারিশ করবেন বলে মোদি প্রপাগান্ডাও করবেন। সেটা নিজে বলবেন না অবশ্যই – তবে কয়েকটা মিডিয়ায় এমন জল্পনা-কল্পনা রিপোর্টও করাতে পারেন। যদিও তা অবশ্যই ওখানেই শেষ হবে; মানে সত্যিই মোদি কী বাইদেনের সাথে কথা বলেছিলেন তা নিয়ে আর কোন রিপোর্ট হবে না। ফুলস্টপ!

    হাসিনা জি-২০ মিটিংয়ে গেলেও বাইডেনের সাথে কোন সাইড-লাইন টকঃ
    আমরা এখনও কেউ জানিনা (এছাড়া এখনও সময় আছে) যে হাসিনা শেষে জি-২০ এর সভায় ভারত সফরে নিশ্চিত যাবেন কী না! ধরে নেয়া যাক তিনি যাবেন। যদি যানও তবু হাসিনার সরাসরি বাইডেনের সাথে বা মোদির মধ্যস্ততায় কোন কথা কী হবার সম্ভাবনা আছে? সাইড লাইনে? অনুমান হচ্ছে এর সম্ভাবনা খুবই কম। এর অন্তত একটা কারণ হল, আমেরিকার সাথে বসে কোন আর লাভ বা পরিস্থিতি হাসিনার পক্ষে আগাবে এমন বাস্তবতা সম্ভবত আর নাই। তা এখন ঢাকায় একেবারেই স্পষ্ট!  যেমন সর্বশেষ যে দুজন কংগ্রেস-ম্যান ঢাকা সফরে এসেছিলেন তা সরকারের জন্য কোন সুখকর কিছু ছিল না। এই সফরে কংগ্রেস-ম্যানদের বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জবাব ছিল এর এক মাপকাঠি। কারণ, মোমেনের জবাব দেখে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল যে কংগ্রেস-ম্যানদের প্রশ্নগুলো কাম্য বা ওয়েলকামিং  নয়! খাস বাংলায় বললে মোমেন -টেরা উত্তর- দিয়েছিলেন।  এছাড়া অতিথিরা ঢাকার পৌছানোর আগেই মোমেন অনেকবারই বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই আগমন ওয়েলকামিং নয়। তিনি বলে দিয়েছেন, নির্বাচনের আগে সরকার আমেরিকার সাথে আর কোন চুক্তিতেই যাবেন না।  অথবা হাসিনার নিজেরই ভারত মহাসাগরে কী ঘটতে যাচ্ছে সংক্রান্ত বক্তব্য থেকে বুঝা যায় তিনি আমেরিকার সাথে সম্পর্কের উন্নয়নের কোন আশা আর সম্ভবত দেখেন না।
    কাজেই এই পরিস্থিতিতে তিনি জি-২০ এর সভায় বাইডেন বা অন্য কারও সাথে কথা বলার আগ্রহে আছে – এটা আমাদের জন্য কষ্ট কল্পিত!
    আর এসব খুটিনাটি দিক বা এর ডেভেলবমেন্ট বিবেচনায় রেখে কথা বলা – এটা আনন্দবাজার বা অগ্নি রায়ের মুরোদের মধ্যে তা আছে এমন মনে হয় না। তার আসলে একটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালানো তাও আবার সেটা মফস্বলি বুঝাবুঝির উপর ভর করে করতে যাওয়া …… না এটাকে এখানেই ছেড়ে যেতে হচ্ছে আমাদের!

    আপডেটেডঃ    ২০ আগষ্ট ২০২৩;  রাত ০১ঃ ৫৩
    আপডেটেডঃ     ২০২৩;

    >>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • সভ্যতা মানে কী [দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব]

    সভ্যতা মানে কী
    সিন্ধু সভ্যতাঃ এই প্রেক্ষিতে [দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব]

    গৌতম দাস
    ১২ মে, ২০২২  ১৪ঃ৫২ বৃহস্পতিবার
    এই লেখাটা ফাইনালি আজ ১২ আগষ্ট ২০২৩ লোড/ প্রকাশ করলাম।  বিকাল ১৭ঃ০৯
    https://wp.me/p1sCvy-47s

    প্রথম পর্বের লিঙ্কঃ https://wp.me/p1sCvy-44A

     

          ছবিটা নেয়া হয়েছে আলজাজিরার এক রিপোর্ট থেকে

    দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব শুরু করছি এখান থেকে।
    দুনিয়াতে এক প্রজাতি [species] হিশাবে  মানুষ, উদ্ভবের শুরু থেকে কেমন ছিল আর পরে রূপান্তরিত হতে হতে সেখান থেকে সভ্যতা [civilization] মানে মানব সভ্যতা হয়ে উঠেছিল কী করে – এই ছিল প্রথম পর্বে আলোচনার প্রসঙ্গ। যেটা শুরুতে মিলিয়ন বছরের দীর্ঘ এক মনুষ্য জীবন ছিল আর সেটা অপর প্রান্তে এসে এখন থেকে শেষের মোটামুটি প্রায় ছয়হাজার বছর আগের জীবনকালকে মানূষের সভ্যতার জীবনের শুরু বলে চিহ্নিত করা হয়। অর্থাৎ যখন এর আগের ভরঘুরে যাযাবর [NOMAD life] , PASTURAL] জীবন ছেড়ে  মানুষের কৃষিকাজ-ভিত্তিক জীবন [ AGRARIAN life] শুরু করেছিল। তা হওয়াতে এটাকেই থিতু জীবন এর শুরু বলা হয়। থিতু জীবন এর মূলকথাটা হল, মানুষ যখন দুনিয়ার কোন সুনির্দিষ্ট ভুগোলের জমিজমার সাথে ঐ অঞ্চলের জমি-ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট-সহ, ঐ জমির সাথে নিজ জীবনকে একাকার অনুভব ও একাকার করে বেঁধে ফেলেছিল; সেকথা বলা হচ্ছে। এভাবেই প্রকৃতিকে মানুষের আরেকভাবে আরও ঘনিষ্টভাবে সচেতনে চেনার শুরু হয়েছিল। এটাই সভ্য হওয়া, যখন আপনি দুনিয়াতে মানুষের আবির্ভাবের অর্থ-তাতপর্য ও শর্ত  প্রথম কিছু বুঝাবুঝি শুরু ও সক্ষমতা দেখাতে শুরু করে দিয়েছেন। । আর এটাকেই আমরা মানুষের সভ্যতার [Human Civilization] শুরু, সভ্যতার জীবনের শুরু বলে বিবেচনা করি।

    কিন্তু সভ্য মানে গভীরের কথাটা কীঃ
    বাংলায় সভ্য কথাটা মূলত আমরা সচেতন বা আমাদের এওয়ারনেস [awareness] বুঝাতে ব্যবহার করি। এখানে সচেতনতা মানে রিলেশনাল (relational Awareness) সচেতনতা। কিন্তু কিসের রিলেশন বা সম্পর্ক?   প্রকৃতিতে মানুষ-প্রকৃতির সম্পর্ক, এনিয়ে আমরা সচেতনতা শুরু হয়েছে কিনা! এই সম্পর্ককেই আমরা বুঝতে বা সচেতন হতে শুরু করেছিলাম; তা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে হলেও। এটাই সভ্যতা আর এর শুরু। আর সংক্ষেপে আপাতত একটা বাক্য খরচ করে বলি, মানুষের ‘জাত বা জাতি”- এর ধারণার শুরু এখান থেকে। কিন্তু বাংলায় “জাত” মানে কী?
    ইংরাজি রেস [Race] এর বাংলা আমরা করি জাতি। আবার একই সাথে ইংরাজি এথনিক [Ethnic] এর বাংলাও করি জাতি। প্রথমটা মূলত রক্ত-সম্পর্কিত  বা পরম্পরা যে কারণে এটা রক্তের ডিএনএ [DNA] সংশ্লিষ্ট ধারণা। অর্থাৎ কেউ রেসিয়াল বাঙালি হলে তার রক্তে ডিএনএ-গত ভাবে অন্য বাঙালির সাথে মিল পাওয়া যাবে।  আর পরেরটা যেটা এথনিক জাতি মানে এটা হল  নৃ-বৈশিষ্ঠগত বা নৃতাত্বিক মি্লের দিক থেকে জাতি। রেস বলতে মাথার চুলের ধরণ, চুলের রঙ অথবা কোকড়া নাকি সোজা – এসব কেমন; এছাড়া গায়ের চামড়ার রঙ (যেমন সাদা না কালো) অথবা নাকের বৈশিষ্ট (চেপটা বা উঁচা শার্প) অথবা চোখের উপরের ঢাকনা (lead)  সেটা চোখ অর্ধেক ঢেকে ফেলা না পুরা খুলে রাখা কোন টাইপের; অথবা  নাক ও ঠোটের মাঝের অংশ – যেখানে মোঁচ হয় – তা কত চওড়া ইত্যাদি বৈশিষ্টগুলো রেসিয়াল বৈশিষ্টগিত মিল।  অন্যদিকে এথনিক বৈশিষ্টের মধ্যে পড়বে – কী কী খায়, প্রধান (staple food) খাদ্য কী। কী করে খায় মানে প্রক্রিয়া বা রন্ধন-প্রণালি। কোন বা কেমন ধর্মপালন চর্চা করে বৈশিষ্ট কী তার। সাংস্কৃতিক চর্চায় আচার আচরণ বৈশিষ্ট কেমন, মূল্যবোধ ইত্যাদি এগুলো এথনিক অর্থে জাত-বৈশিষ্ট। মানুষের এথনিক-জাতিগত পরিচয়টা –  এটা কেবল সভ্যতার শুরু থেকে প্রথম এর শুরু।

    এখানে এখন একটা বাড়তি কথা বলার সুযোগ নিব, প্রসঙ্গ উঠে গেছে তাই। কোন ভুখন্ডের জনগোষ্ঠির পরিচয় কী – এই অর্থে আমরা এর তিন রকম পরিচয় যাকে ইংরাজিতে আইডেনটিটি [Identity] বলা হয় তা দেখতে পাই। এগুলো হল রেসিয়াল, এথনিক আর পলিটি[Polity]। শেষটা পলিটিক্যাল কমিউনিটি অর্থে।  আর প্রথম দুটার সাথে তৃতীয়টার সাগর পরিমাণ ফারাক আছে বা বলা যায় কোন মিল নাই। সেই ফারাক হল এই যে রেসিয়াল এবং এথনিক পরিচয়টা মানে সব ধরণের  জাত-পরিচয়টা, এটা  “আগেই দেয়া থাকে”। মানে কী?   এখন আগেই দেয়া থাকে মানে কি? মানে হল যা [GIVEN]। যেটা যে কোন মানুষ জন্মানোর আগে দেওয়া থাকে বা নির্ধারিত থাকে। মানুষের জন্মের আগে থেকেই তাঁর  রেসিয়াল ও এথনিক পরিচয়টা কী হবে তা নির্ধারিত থাকে।  যেমন মানুষ যে ঘরে জন্মাবে সেটাই তাঁর  রেসিয়াল ও এথনিক পরিচয় হবে তাই,এটা পুর্ব-নির্ধারিত [GIVEN]। বাবা-মার ধর্ম তার ধর্ম পরিচয়। বাবা-মা বাঙালি হলে সন্তানের জাত-পরিচয় বাঙালি বলে বুঝতে হবে।  অর্থাৎ এখানে  মূলকথাটা হল, মানুষ নিজে জন্মাবার আগে নিজে ঠিক কোন রেসিয়াল ও এথনিক পরিচয়ের হতে চায় তা বেছে নেওয়ার কোন সুযোগ নাই। এজন্য বলছি এটা “আগেই দেয়া থাকে” [GIVEN] গিভেন বা বাংলায় ‘প্রদত্ত’ পরিচয়। তাই আমাদের রেসিয়াল-এথনিক পরিচয় আমরা বদলাতেই পারি না।  তাহলে আসলে আইডেনটিটি বা মানুষের পরিচয়নামা বলতে বাকি থাকল কেবল, পলিটিক্যাল পরিচয়। এটা আমরা সাবালক হয় নিজের বোধবুদ্ধির বলে নিজেই নির্ধারণ করতে পারি আমার রাজনৈতিক পরিচয় কী হবে।
    তাহলে উপনীত সিদ্ধান্তটা হল,  (রেসিয়াল ও এথনিক দুটাই) জাতি ধারণার সাথে রাজনীতি ধারনার মূলত কোন সম্পর্ক নাই। অথচ তাজ্জব ও অবুঝ বিষয়টা হল তবু “জাতিবাদের” নামে রাজনীতিও ভালই চলে!!! বাঙালী জাতিবাদের চেতনা বা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির হুঙ্কারে আমাদের এখন জান যায় অবস্থা।

    মুসলমানেরা কী বাঙালিঃ
    এখানে প্রসঙ্গের গোড়াটা উঠে গেছে তাই এই সুযোগে কম কথায় বলার সুযোগ নিতে চাই।
    কেউ বাঙালি কিনা প্রশ্নটা এথনিক-জাতি ধারণার মামলা; অর্থাৎ সভ্যতা যখন কৃষিকাজ শুরু করা দিয়ে শুরু হয়েছিল সেই সিভিলাইজেশন ধারণার অন্তর্গত ধারণা এটা।
    উপরে বলেছি এটা পুর্ব-নির্ধারিত [GIVEN]। মানে হল যে মানুষ জন্মায় তার জন্মের আগেই এটা নির্ধারিত হয়ে থাকে। অর্থাট কেউ বাঙালি কিনা সেটা কী বৃটিশ আমলের (১৭৯৩ সালের জমিদারি আইন চালু হবার পরের) নয়া তবে আলগা মোড়ল জমিদার হিন্দু, এরা ঠিক করে দিবে বা দিতে পারে যে “মুসলমানেরা বাঙালি কিনা”????? কাজেই তাদের ফতোয়া মুসলমানেরা বাঙালি নয়” – এটা আলগা মাতবরি,  ঐতিহাসিকভাবে ও নৃতাত্বিকভাবে তা কলকাতার জমিদার হিন্দুর এক্তিয়ার বহির্ভুত এবং তা নিকৃষ্ট ইসলামবিদ্বেষ। আসলে নিট ব্যাপারটা হল, রেসিয়াল বা এথনিক অর্থে জাতি পরিচয়ের কোন বাঙালি পরবর্তিতে ইসলাম গ্রহণ করলে তাতে ধর্মীয় পরিচয়ই বদল হয়ে যায়, কিন্তু এতে তার বাঙালি বলে জাত পরিচয় বদল হয়ে যায় না।   কেউ বাঙালি কিনা এটা “জমিদার হিন্দু” এই উপ-শাসকের হাতে ও ইচ্ছা-ফতোয়ায় নির্ধারিত হবে না। এই এক্তিয়ার তাকে কেউ দেয় নাই। অথচ এখনও কলকাতায় মুসলমানেরা বাঙালি নয়” এমন ফতোয়া দেওয়ার লোক বাড়ছে, বিশেষ করে হিন্দুত্ববাদ এর নয়া উত্থান কর্তা বিজেপি-আরএসএস এর প্ররোচনার কারণে। 
     

    আবার আগের প্রসঙ্গে ফিরে কথা বলব একটু।
    সচেতন বা এওয়ারনেস [awareness] এর কথা বলছিলাম। এই সচেতনতা বলতে আবার অনেক সময় আমরা consciousness বা সজ্ঞানতা শব্দটাও ব্যবহার করি। দুটারই মুলকথা বা রূট-শব্দ চেতনা বা সেন্স [Sense]। প্রথমটা মানুষের বাইরের বিষয়াদি মানে মানুষ যে কন্টেক্সট [context] -এ বা প্রাকৃতিক পরিবেশে মানে মানুষের বাইরের পরিবেশে বাস করে সে সম্পর্কে মানুষ প্রজাতির জন্ম থেকেই সে বংশ-পরম্পরায়  দিন-কে-দিন তাঁর (awareness ও consciousness) দুটাই বাড়তে থাকে। প্রজাতি হিসাবে মানুষ কতটা এদিক থেকে আগিয়েছে এর একটা বিশাল মাইলস্টোন বা পথচিহ্ন হল সভ্যতার শুরু। মানে যেটাকে উপরে বলেছি, যাযাবর-গিরির জীবন ত্যাগ করে থিতু হয়ে কৃষিকাজের জীবনে প্রবেশ করা।
    আসলে এই মাইলস্টোনটা মূলত মানুষের বোধবুদ্ধি বা জ্ঞানগম্যি কতটা বেড়েছে এর অগ্রগতিরই এক পরিমাপক। নজর করতে হবে শন্দটা বোধ-বুদ্ধি মানে বোধ যেটা সেনসুয়াসনেস [Sensuousness] আর সেই সাথে বুদ্ধিও [rationality or Science]। কাজেই বিজ্ঞান-মারানিরা যেন ঝাপায় না পড়েন; তাদের সাবধান হতে হবে। 

    সম্পর্ক বলতে প্রকৃতি আর মানুষের [Nature & Human] সম্পর্ক বুঝতে হবেঃ
    আরও লক্ষ্যণীয় এখানে সম্পর্ক বলতে প্রকৃতি আর মানুষের [Nature & Human] সম্পর্ক বুঝতে অনুরোধ করি। তবে এখানে  এর অভ্যন্তরের দুইটা দিক বা পর্যায় আছে।  এখানে প্রথমটা অনেকটাই নিজের সম্পর্কে নিজে জানা – মানে নিজেকে জানা বা এওয়ার হওয়া অর্থে – এ’সম্পর্কে সচেতনতা।   আর দ্বিতীয়টা আভ্যন্তরীণভাবে মানুষের সেন্স বা বোধসম্পন্ন হওয়া শুধু না বরং এর সাথে ‘আমার যে বোধ হয়েছে” সে বোধও যে আমার হয়েছে; মানে আমি কর্তা তা জানি-ও। এই হল মানে পরেরটা হল, কনসাসনেস (consciousness) অর্থে সচেতনতা। এটাকে আমরা তাই সজ্ঞানতাও বলি- এই পরম দিকটাকে অনেকে পরম প্রজ্ঞা [Spirit or Spirituality]।
    তাহলে এবার সারকথায় আবার বলি – রূটশব্দে সভ্য শব্দের মূল অর্থ হল সজ্ঞানতা। মানুষের জনগোষ্ঠিগত জীবন বিকাশের এক পর্যায়ে এসে সে সজ্ঞান-সচেতন হলে, যেটাকে আমরা কৃষিজীবন দিয়ে এর শুরু বলি – এটাই “সভ্য” হয়ে জীবন শুরু। তাই মানুষের সভ্যতার জীবনের শুরু।
    একটা গুরুত্বপুর্ণ সাবধানবাণীঃ  এখানে যদিও প্রকৃতি আর মানুষ কে আলাদা দেখতে বলছে; সেটা বলেছি প্রসঙ্গ দুইটার সম্পর্ক বুঝতে গেলে যতটুকু এরা আলাদা এমন অনুমান করে নিতেই হয় সেই অর্থে। কিন্তু এটা করতে গিয়ে আবার আমাদের ভুলে যাওয়া যাবে না যে খোদ মানুষও মূলত প্রকৃতিরই এক অংশ; তবে এক গুরুত্বপুর্ণ অংশ। এবং অন্তর্গত [integral] বা অবিচ্ছিন্ন অংশ। যেন সারা প্রকৃতির সচেতন অংশটাই হল মানুষ বা সচেতনতা নিয়ে যেখানে চর্চা হয়। এটাই তার ভুমিকা ও এসাইন্ড কাজ। এর সাথে ধর্মতত্বের সম্পর্ক নিয়ে পরে আসছি।]

     

    সভ্যতা ধারণার নেতি ব্যবহারঃ
    উপরে এতক্ষণ সবসময়ই সভ্যতা ধারণাটা খুবই ইতিবাচক এবং কাম্য ও কদর করা এক ধারণা এই অর্থে শব্দটার ব্যবহার ও আলোচনা করা হয়েছে।  কিন্তু একালে মানে মাত্র বড়জোর গত ছয়শত বছর থেকে [দুনিয়ায় কলোনিদখল শুরু হওয়ার পর থেকে] সভ্যতা ধারণার একটা বিশাল নেতি ব্যবহার শুরু হয়েছিল যেটা এখনও প্রায়ই হাজির হতে দেখা যায়।

    আমাদের একটা প্রসঙ্গে এখনও আসে নাই তবে পরে আছে – সেটা হল, উপরে অনেকবার ‘সভ্যতা’ ধারণাটা পরিচয় করিয়েছি কিন্তু বলি নাই আমরা দুনিয়ার সভ্যতাগুলোর মধ্যে  কোন সভ্যতার অংশ। আমরা সিন্ধু সভ্যতার অংশ।  এটা Indus Valley civilization বলে পরিচিত। এখানকার ভুগোল বিচারে এটার মূল অংশ পাকিস্তানে। সাথে অল্প কিছু অংশ ভারতে ও আরো উপরে কিছু অংশ আফগানিস্তানে পড়েছে।  বলা হয়ে থাকে অরিজিনালি পাকিস্তানের সিন্দু নদের তীরে এক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল তাই এটার নিজস্ব নাম সিন্ধু সভ্যতা। কিন্তু বিদেশি মানে পশ্চিমা এংলোফোন [anglophone] মানে যেমন বৃটিশ ইংরাজি ভাষ্যে সিন্ধু শব্দটা উচ্চারণে “ইনডাস” [Indus] হয়ে যায়।  আবার বাণিজ্য সম্পর্কে যাতায়াত থাকা আরবেরা ‘স’ এর জায়গায় ‘হ’ উচ্চারণ করাতে এটা তাদের উচ্চারণে সিন্ধু হয়ে যায় হিন্দু। অথবা সিন্দের জায়গায় হিন্দ – এভাবে এখান থেকে হিন্দু যেটা এখন ধর্মের নাম করা হয়েছে যেটা শুরুতে ছিল কেবল নিজ সভ্যতার নাম – সিন্ধু ( আরবের উচ্চারণে হিন্দু) সভ্যতা এভাবে। এই সিন্ধু সভ্যতার সময়কালীন আরও অনেক সভ্যতা ছিল বলে [পরে] আমরা জানতে পাই।  এভাবে সারা দুনিয়াতেই বলা হয়ে থাকে পুরানা অন্তত দশটা সভ্যতার কথা জানা যায়। যাদের মধ্যে আবার আটটা বেশি পুরানা।  যদিও গড়পরতা এগুলো ছয়হাজার বছরের পুরানা ধরা হয়। এখানে আমি ছয়হাজার বছর ধরেই কথা বলেছি। কিন্তু যেটা হয় হয়ত একালে ওসব সভ্যতার প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় বহু পুরানা একটা কোন নিদর্শন পাওয়া গেল। যার অনুমিত বয়স আবিস্কার হল হয়ত ছয়হাজার বছরের বেশি…। এভাবে নতুন তর্ক উঠেছে হয়ত। এজন্য ছয়হাজার বলাটা বেশি গ্রহণযোগ্য এই অর্থে এটাকে নেয়া।

    নিচে এমন আটটা সভ্যতার নাম দেয়া হলঃ
    ১। The Roman Civilization. …    ২। The Persian Civilization. …   ৩।  The Ancient Greek Civilization. …  ৪। The Chinese Civilization. … ৫। The Maya Civilization. …  ৬। The Ancient Egyptian Civilization. …   ৭।   The Indus Valley Civilization. Civilization Name: Indus Valley civilization. …  ৮। The Mesopotamian Civilization. Civilization Name: Mesopotamian civilization.

    এর আগে সভ্যতাগুলোর মধ্যে একে অন্যকে দখল পালটা দখল মারামারি হয় নাই। তা নয়। তবে এর আগে নিজে ছাড়াও “অন্য আরো সভ্যতা” বলতে যে কেউ আছে সেটা তাদের জানতে হয়েছিল। যদিও অনুমান করা হয় প্রথম পাঁচহাজার বছর পর্যন্ত সভ্যতাগুলো কেউ কাউকে চিনত-জানত না। আর তা মূলত পরস্পরের মধ্যে অনুপস্থিত যোগাযোগ ব্যবস্থা বা এর দুর্দশা ও বেহালের কারণে অথবা এনিয়ে সম্পর্কিত টেকনোলজি তখনো আবিস্কার হয় নাই বলে। এমন দখলদার মধ্যে আমাদের এদিকে মঙ্গোলীয় হালাকু খান [halagu Khan] এর কথা আমরা বেশি জানি। কারণ প্রায়  পাঁচশ বছরের পুরানা আব্বাসীয় শাসন আমল [Abbasid caliphate (750–1258)] ধ্বংস ও শেষ হয়েছিল ১২৫৮ সালে এই মঙ্গোলীয় আক্রমণে।
    এছাড়াও আরেক ধরণের আক্রমণও হয়েছিল [১৬০৭ সালের পর থেকে]। যেমন,  পশ্চিমা শক্তি বিশেষত ইউরোপের (বৃটিশ-ফ্রেঞ্চ-ডাচ-পর্তুগীজ-স্পানিজ) কলোনিদখল ব্যবসাকারিরা অন্যের দেশ দখল করে নিয়ে এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকায়  শাসন চালানো – এর সময়কালটা সুনির্দিষ্ট করে বলা যায় ১৬০৭-১৯৪৫ এই প্রায় সাড়ে তিনশ বছর সময়কাল।  ততদিনে অন্যের ভুমি-ভুখন্ড দখলের পরে আবার এর পক্ষে সাফাই দিবার যুগ হিসাবেই সেটা এসেছিল – সেটা এভাবে বলা যায়। অর্থাৎ অন্যের দেশ-ভুখন্ড দখলের পরে এর পক্ষে সাফাই দেওয়া – এটা এর আগে দেখা যায় নাই। কিন্তু  ইউরোপের (বৃটিশ-ফ্রেঞ্চ-ডাচ-পর্তুগীজ-স্পানিজ) কলোনিদখল এর পরে কলোনিদখলের পক্ষে এমন সাফাই দেওয়া শুরু হতে দেখা গিয়েছিল।  আর সেখান থেকেই সভ্যতা ধারণাটা নষ্টাভাবে নষ্টা বৃটিশ-ফ্রেঞ্চ-ডাচ-পর্তুগীজ-স্পানিজ কলোনিদখলদার হাতে ব্যবহার শুরু হয়েছিল। যেমন বৃটিশদের সেই নষ্টা ব্যাখ্যাটা হল,  বৃটিশ নৃ-জনগোষ্ঠি আমাদের (অখন্ড ভারতের) চেয়ে নাকি বেশি সভ্য – অতএব দখলদারেরা বেশি-সভ্য বলে নাকি তাদের হাতে ভারতের দখল হয়ে যাওয়াটা জায়েজ। এই হল সভ্যতা শব্দটার সবচেয়ে শয়তানি ও নেতি-ব্যবহার।  নৃতাত্বিক স্টাডিতে অবশ্য এমন  সব শয়তানি বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
    ক্লদ লেভিস স্ট্রাস [Claude Lévi–Strauss] একজন নামকরা নৃতত্ববিদ (anthropologist and ethnologist। তিনি তাঁর স্ট্রাকচারালিজম (structuralism and structural anthropology) তত্বের জন্য বেশি পরিচিত। তাঁরই  আরেক স্পষ্ট দাবি হল, আমরা বিভিন্ন সভ্যতার মানুষগুলো কেউ কারও চেয়ে বেশি সভ্য বা বেশি সম্ভাবনাময় এমন দাবি ভিত্তিহীন। বরং যেমন কলোনিদখলের মত ঘটনাগুলোর জন্যই মানে এক সভ্যতা আরেক সভ্যতার হারে দখল হয়ে যাওয়াতেই সভ্যতাগুলোর মধ্যে অসম বিকাশ বা অসম সম্ভাবনার সৃষ্ট হয়েছে। সবাই বাধাহীন আপন পটেনশিয়ালে বিকশিত হয়ে সুযোগ পেলে কেউ কারও চেয়ে কম সভ্য হবার কারণ নাই।
    অর্থাৎ আমাদের ভারতে বৃটিশদের সভ্যতা শিখানোর দাবি আসলে কলোনিদখল ব্যবসাকে জায়েজ করা সাফাই দেওয়ারই অপচেষ্টা। শুধু তাই না, এটা মূলত একটা গভীর রেসিজম এক নিকৃষ্ট জাত-শ্রেষ্ঠত্ব দাবি!!

    চলতি শতকে গত বিশ বছর আগে ২০০১ সালে আমরা জর্জ বুশের আরেক জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদি দাবি দেখেছিলাম। যেটা আরেক গভীর বর্ণবাদ বা রেসিজম। তিনি রেজিম চেঞ্জের তত্ব এনেছিলেন। তার রেজিম চেঞ্জের তত্ব  বলত যে তিনি বলপ্রয়োগের অন্যদেশের বিশেষত মুসলমান প্রধান জনগোষ্ঠির দেশে ইচ্ছামত সরকার বদলে পছন্দের সরকার বসাবেন। কারণ, এটা নাকি অসভ্য দেশকে সভ্য বানানোর তার মিশন! তিনি ফ্রিডমের কথা খুব বেশি বলতেন। আর এই ফ্রিডমের কথা বলেই তিনি অন্যদেশে অবাধ হস্তক্ষেপ করতেন। একাজগুলো নিরেট এক রেসিজম এক জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদি কাজ ছাড়া কিছুই না। 

    এভাবেই পশ্চিম উদাম হয়ে পড়েছিল তাদের দগদগে বর্ণবাদ বা রেসিজম সবাই দেখেছিল। এতে একটা বড় ক্ষতি হয়েছে যে এখন আর মানুষ সহজে কোথায় সভ্যতা বা সিভিলাইজেশন শব্দটার ব্যবহার দেখলেই সতর্ক হয়ে যায়। এই ভয়ে যে এটা নেতি ব্যবহারের পশ্চিমা রেসিজম কিনা আগে তাকে নিশ্চিত হতে হবে।  এইভাবেই খুবই ইতিবাচক “সভ্য ধারণাটা” একটু চোট খেয়ে গেছে।  তাই আগেই শব্দটাকে চেক বা পরীক্ষা না করে কেউ আর শব্দটাকে একালে সহজে গ্রহণ করতে চায় না।
    এই হল প্রথম পর্বের আরেকবার করা সারৎসার! এবার আমরা দ্বিতীয় ও শেষ পর্রবের অন্যান্য প্রসঙ্গ আমরা শুরু করব। যদিও তা কিছু আগের কথা থেকে তবে তা করব থিওলজি (Thelogy) এর পরিভাষা ব্যবহার করে।

    থিওলজি (Thelogy) বা ধর্মতত্ব-এর পরিভাষাঃ
    থিওলজির প্রিজাম্পশন [presumption] বা পুর্ব-অনুমানে সারকথাটা হল কানেকটেড[connected] বা সংযুক্তবোধ। সৃষ্টির সবকিছুর সাথে সংযুক্ত-বোধ। যে মানুষ নিজ সংযুক্তবোধ ও  সে সংক্রান্ত নিজ অনুভব আমল করে কথা বলা বা  চর্চা করবেন না – বা কখনই এদিকটা প্রবেশ করেন নাই সিদ্ধান্ত নিয়েই বা কোন কারণে, সাধারণত দেখা যায় এরাই আসলে তথাকথিত “বিজ্ঞানবাদিতার” [scientism] মানুষ।
    দুনিয়ার সব সৃষ্টি বস্তু-অবস্তু অথবা প্রাণ-অপ্রাণ সকলেই সবার সাথে কানেকটেড বা সংযুক্ত এই বোধ এখানে এক মৌলিক ভিত্তিমূলক ধারণা। তবে এসব সংযুক্তগুলো হয়ে আছে কেবল মাঝখানে এক আল্লাহ (ভগবান, ঈশ্বর, গড ইত্যাদি যার যেটাকে উপাষ্য মনে হয়) এমন এক ধারণার মাধ্যমে ও মধ্যস্ততায়। অর্থাৎ আল্লার মাধ্যমে আমরা সবাই অন্যের সাথে কানেকটেড বা যুক্ত। ফলে সবার সাথে এই সংযোগের কারণে একটা নিয়ম ও প্রতিষ্ঠিত ভারসাম্যে সৃষ্টিগুলো প্রতিপালিত ও সংরক্ষণ বা সংরক্ষিত হয়ে আসছে ও আছে। আল্লাহ’র প্রতিপালন গুণ (সম্ভবত সিফাত) সংরক্ষণ ও বজায় রাখার দায়ীত্ব আমাদেরও।  প্রকৃতির এই স্বভাব ও গুণাবলী সম্পর্কে বেখেয়াল থেকে বেপরোয়াভাবে মাত্রায় আমরা প্রকৃতিকে বদল করতে বা অন্যকে তা করতে দিতে পারি না। থিওলজির এই ভাষ্য – এমনই এক সীমার মধ্যে আমাদের থাকতে হবে এটাকেই অন্যভাষায় বা বিজ্ঞানের ভাষায় পরিবেশসম্মত বসবাস বলা হচ্ছে।

    এই যে সীমার মধ্য থাকা বা ভারসাম্যের কথা বলছি এর মানে কী?
    প্রকৃতিতে আমরা দেখব অনেক কিছুর একটা করে চক্র আছে। বা চক্রের কথা বলা হচ্ছে। যেমন কার্বন চক্র, নাইট্রোজেন চক্র, বা নানান জৈবপ্রাণপ্রজাতিরও অসংখ্য চক্র আছে। মূলকথা হল ক্ষয়-সৃষ্টি দুটাই এমন ভারসাম্য রেখে যেন চলে যেমন যাতে দুনিয়া কার্বন বা নাইট্রোজেন এর মত কোন কিছু যেন শুণ্য না হয়ে যায়। অথবা একটা জৈবপ্রাণপ্রজাতির চক্রের মধ্যে  অনেকগুলো প্রজাতি ক্রিয়াশীল থাকে। যদি এর একটা প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে এমন হয় তবে এরপর ঐ চক্রের বাকি সব প্রাণ বিলুপ্তির দিকে চলে যাবে। তাই এমন কিছু করা যাবে না যাতে চক্রের একটা প্রাণও বিলুপ্ত না হয়ে যায়। এজন্য নূহ-নবীর মত প্রাণ-প্রজাতি সংরক্ষণ জরুরি।  প্রকৃতি মিলিয়ন বছর ধরে চলতে চলতে প্রাকৃতিকভাবেই এই ভারসাম্য তৈরি করেছে বা একটা ভারসাম্যে এসেছে। এমন এভাবে অসংখ্য প্রাণ চক্র তৈরি করেছে। আর তা দিয়ে প্রকৃতিকে স্টেবল বা এক স্থায়ী রূপ দিয়েছে বলে এটা মিলিয়ন বছরেও বিলুপ্ত হয় নাই। ফলে মানুষ হিসাবে এটাকে এই ভারসাম্যকে এর রুল-গুলোকে বুঝাবুঝি শেষ করে এগুলোকে টিকানোই আমাদের স্বার্থ। থিওলজির ভাষায় এটাই  একটা সীমার মধ্যে থাকে।  আর এভাবে প্রতিপালকের প্রতিপালন সংরক্ষণের থিওলজিক্যাল অর্থ উপলব্দি করা।

    এভাবে কারা পুরানা প্রাচীন সভ্যতা হিসাবে আজও  পুরান ভুগোলের জায়গাতেই ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি দেখিয়ে টিকে গেছে বা এখনও আছে এই হিসাবে চারটা সভ্যতার কথা বলা হয়ে থাকে। এগুলো হল, সুমের বা মেসোপটেমিয়া সভ্যতা (4500 –1900 BC) , সিন্ধুনদের সভ্যতা  (3300 –1300 BC) প্রাচীন ঈজিপ্ট সভ্যতা (3150 – 31 BC). প্রাচীন চীন সভ্যতা (2100 – 221 BC)। তথ্য এখান থেকে নেয়া হয়েছে।

    এদের মধ্যে সুমের বা মেসোপটেমিয়া সভ্যতাকে সবার সুতিকাগার বলার পিছনের কারণ হল, যে ভৌগলিক অবস্থানে এর শুরু তা হল -টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস এই দু-দুটা নদীর মাঝখানের  উর্বর ভুমি, পলিমাটির স্তরে গঠিত নরম মাটির ভুমি যাকে  একটা সভ্যতা (কৃষিকাজ) গড়ে উঠার জন্য সবচেয়ে আদর্শ ভুমি মানা হয়। এছাড়া এমনিতেই সভ্যতা মাত্র  আমরা লক্ষ্য করলে দেখব তা শুরু বা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কোন না কোন বড় নদীর পাড়ে। এর কারণ, মানুষের বসবাসের জন্য দরকার মোটামুটি শক্ত উচু ভুমি আর ততধিক যেন দরকার পানি যার বেস্ট উৎস হতে পারে কোন প্রবাহমান বড় নদী। এটা চাষাবাদের জন্য পানি  আর  মানুষের মৌলিক প্রাণধারণ দুটার জন্যই অপরিহার্য। এছাড়া যতদুর নদী বিস্তৃত ততদুর মামামাল পরিবহণ সবচেয়ে উপযোগী, কম শ্রমের উপায় হল নদী। একারণে, নদনদীর তীরে ছাড়া কোন সভ্যতা কখনও গড়ে উঠেনি।  এমনকি একালের শহর নগর বা গঞ্জও।

    এতক্ষণ,সাধারণভাবে সব সভ্যতা প্রসঙ্গে কথা বলা হয়েছে। এবার আমরা সুনির্দিষ্ট করে সিন্ধু সভ্যতা প্রসঙ্গে কথা বলব। এই ফাঁকে বলে রাখি নদ আর নদী নিয়ে আমরা যেন কোন বিভ্রান্ত না হই। কোন কোন ভাষায় শব্দে লিঙ্গান্তর রূপ থাকে। যেগুলোকে ঐ ভাষায় পুংলিঙ্গ গণ্য করা হয়েছে সেসব নামে নদ; আর স্ত্রীলিঙ্গ গণ্যকরাগুলোকে নদী বলা হয়েছে। ফর্মুলা হল, নারীবাচক অর্থাৎ আ-কারান্ত বা ঈ, ই-কারান্ত যেগুলা তারা নদী। আবার ইংরাজিতে তাই নদ ও নদীর দুটারই ইংরাজি একই; সেই বিচারে তাই নদ-নদী দুটাই হল ইংরাজিতে রিভার (river)।

    সিন্ধুনদঃ
    অনেকে শুনে থাকবেন আমরা ‘সিন্ধু সভ্যতার’ অংশ। সেখান থেকে এসেছি। এসেছি বলছি কেন? কারণ সিন্ধু নদ (Indus) এখনকার বাংলাদেশের আশেপাশের নয়।
    বাংলাদেশ পেরিয়ে কেবল পশ্চিমেই যেতে থাকলে প্রথমে ভারত পড়বে। সেই ভারতও পার হয়ে গেলে আরও পশ্চিমে আমরা পাকিস্তানে পড়ব। এবার  সিন্ধু প্রদেশের (ম্যাপে) উপরে মানে এই প্রদেশের সর্ব-উত্তরে – এখানে এসে পাব আমরা পাঁচ নদীর মোহনা। যারা একে একে মিলেছে। সবচেয়ে উপরের যেটা সেটাই এখানে মূল যে সিন্ধুনদ (Indus) যার সাথে অন্য নদী এসে পড়ছে বা মিলছে সেই মুলনদ হল সিন্ধুনদ। যার উৎস  আরো উপরে পাকিস্তানের বাইরে এবং আগে চীনের তিব্বত সুউচ্চ মালভুমি থেকে যেটা আবার আরো অনেক উত্তরে।

    সিন্ধুনদ প্রধানত এটা হিমালয়ের এক হিমবাহ থেকে প্রধান উদ্ভব ঘটে,পরে যেটা চীনা ভুখন্ডের তিব্বত প্রদেশে আর পরে তা ভারতের মানস সরোবর। ওদিকে আরেক অংশ চীনের তিব্বতের গাড় সাংপো (Gar Tsangpo) নদীর সাথে মিলে শেষে সিন্ধুনদ নামে প্রবাহিত। সিন্ধুনদ পরে এখনকার পাকিস্তানের উপর দিয়ে প্রবাহিত।

    উপরে সে কথাই বলছিলাম যে মূল তিব্বত থেকে আসা সিন্দুনদ সবার আগে ভারতের ও পাকিস্তানের দখলে থাকা কাশ্মীরের অংশ হয়ে প্রবাহিত হবার পরে শেষে সিন্ধুপ্রদেশে এসে পড়েছে। এদিকে উত্তর-পুর্ব দিক থেকে পাঞ্জাবের পাঁচ নদী এসেও এবার ঐ সিন্ধুনদে মিলেছে। পাঞ্জাবের পাঁচ নদী ঝিলম,চেনব,রবি,বিয়াস ও সৎলুজ  সকলেই আগেপিছে সিন্ধুনদে মিলিত হবার পরে সকলেই  শেষে এক সিন্ধুনদ নামে এবার সর্বদক্ষিণে সমুদ্র, আরব সাগরের দিকে প্রবাহিত হয়েছে।
    তবে পাকিস্তানে যেখানে এসে অন্যান্য নদীর সাথে মিলেছে আইনত তা তখনও সিন্ধু প্রদেশ শুরু হয় নাই। একটু উপরে,মানে পাঞ্জাবের মিঠঠানকোট জেলায় সিন্ধুনদ অন্যান্য নদীর সাথে মিলেছে। সেটা আরো প্রবাহিত হয়ে সিন্ধুপ্রদেশে প্রবেশ করেছে। এরপর এই মিলিত সিন্দুনদের উপর ‘গুড্ডু ব্যারেজ’ নামে পানিবিদ্যুতের বাধ নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৯৫৭ সালে অর্থাৎ পাকিস্তানের জন্মের পরেই যা শেষ হয়েছিল ১৯৬২ সালে। যদিও সিন্ধুনদের নামে সিন্ধু প্রদেশ পাকিস্তানের একটা প্রদেশ মাত্র, আবার রাজনৈতিক ক্ষমতার দিক থেকেও সে পাঞ্জাব প্রদেশের পরে যেন দ্বিতীয়,এমন অনুমান দেখা যায় কিন্তু সিন্ধুনদ আসলে সারা পাকিস্তানকেই সব ধরণের পানি সরবরাহের প্রধান উৎস। যেমন,পানীয়,সেচ,বাধ-বিদ্যুৎ ইত্যাদি সবকিছুর প্রধান উৎস।

    সর্বপরি এই সিন্ধুনদের তীরেই গড়ে উঠেছিল অবিভক্ত ভারতবর্ষ যার আদি নাম সিন্ধু সভ্যতা। অবিভক্ত ভারতবর্ষের কথা বললে সে হিসাবে যখন আমরা তিন দেশ এক ভারতবর্ষে ছিলাম তখন তার এক খুবই গুরুত্বপুর্ণ সিন্ধুনদ হিমালয় থেকে আসা আরেক প্রভাবশালী নদী।

    সভ্যতা কী?
    আগে বলেছিলাম দুনিয়াতে জৈবপ্রাণ প্রজাতি হিসাবে মানুষ এসেছিল ছয় মিলিয়ন বছর আগে। কিন্তু স্রেফ আরেকটা জৈবপ্রাণ প্রজাতি হিসাবে মানুষের প্রকৃতিতে টিকে থাকা বা টিকে যাওয়ার লড়াইয়ে কেটেছে এক লম্বা সময়কাল। এসময়েই নিজের শারীরিক আকার বৈশিষ্টে মানুষকে ক্রমাগত বদল করে নিতে হয়েছে টিকে যাওয়ার জন্য। অন্যভাবে বললে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু অনুমান করা যায় সবচেয়ে দীর্ঘ সময়গুলো মানুষের কেটে গেছে নিজেকে প্রকৃতিতে টিকে যাওয়ার উপযুক্ত প্রজাতি হিসাবে গড়ে নিতে।

    মানুষ নিয়ে এসব হিসাবের বাইরে আরেক হিসাব করতে দেখা যায়, সেটা ‘সভ্যতা’র হিসাব। যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কথা যেমন বলা হল,গড় হিসাবে বললে ‘মানুষের সভ্যতার বয়স’ মাত্র ছয় হাজার বছর। অর্থাৎ এখানে আর মিলিয়নের হিসাব না। বরং শেষের দিক থেকে,মানে একালের দিকে তাকিয়ে বললে,সেই মিলিয়ন বছরের পুরানা আদিম মানুষই তো আজকের পরিণত মানুষ বা মানুষের সমাজ। তাই কথাগুলো আদি প্রজাতি হিসাবে মানুষের শুরু না বরং সভ্য বা ‘সভ্যতার’ সে মানুষ, সেই মানুষের দিক থেকে মানুষ ধরে নিয়ে পুরানা সেই আলাপ তোলা যাক। যেখানে ‘মানুষের সভ্যতার বয়স’ মাত্র ছয় হাজার বছর। অর্থাৎ স্রেফ প্রজাতি হিসাবে মানুষের বয়স নয়, ‘মানুষের সভ্যতার বয়স’ মাত্র ছয় হাজার বছর।

    এখন তাহলে চাষাবাদ বা উতপাদন মানে কী?
    এর সোজা মানে হল, প্রকৃতি [উপরে প্রকৃতি-মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে সেকথা বলেছি সেই আলোকে বুঝতে হবে] আমাদের জন্য বরাদ্দ আমাদেরকে কী কী খেতে দিবে, কতদিন দিবে, কতগুলা দিবে ইত্যাদি সবকিছু প্রকৃতির হাতে  এর উপর নির্ভরশীল হয়ে যে বাঁচা হয়ে চলছিল সেটা আর  নয়। যেমন যাযাবর জীবন শেষে কৃষিকাজের জীবন সেটাই যখন  ফলের গাছ লাগানো, গাছ পরিচর্যা করে ফল বের করে আনা নিজের খাদ্য যোগানো ইত্যাদির লম্বা প্রক্রিয়ার জগতে প্রবেশ করা।  এটাকেই বলে  চাষাবাদ শিখে যাওয়া বা নিজের “খাদ্য উতপাদন” বলে বর্ণনা করছি সেটা শিখে যাওয়া। এককথায় প্রকৃতি যা দেয় তাই নয়,প্রকৃতিতে না পেলে, না দিলে ছেড়ে অন্য অঞ্চলে চলে যাওয়া নয় চাষাবাদ বা উতপাদনের জগতে প্রবেশ করে যাওয়া।

    এখানে উদাহরণ দিতে গিয়ে খুব সহজে গ্যাদারিংয়ের সমাজ থেকে চাষাভবাদের সমাজে রুপান্তরিত কি করে হওয়া যায় বা পরিণত হয় তা বলে ফেললাম। বাস্তব এটা এত তাড়াতাড়ি ঘটে নাই যদিও। এছাড়া গ্যাদারিং সমাজের আরেক রূপও আছে এট হল হান্টিং এন্ড গ্যাদারিং সোসাইটি। মানে হল, শুরু ফল পেড়ে খাওয়া নয়,মাছ তো বটেই পশু শিকারও সুরু করে দেওয়া।

    কিন্তু তাহলে আগেই হান্টিং এন্ড গ্যাদারিং একসাথে বলি নাই কেন? কারণ, শিকারি সমাজ হয়ে উঠার আবার এক পুর্বশর্ত আছে যা আগে পূরণ না হলে শিকারি হওয়া যায় না। তা হল আগুনের আবিস্কার। কারণ পশু শিকারের পর আগুন না হলে কাচা পশু খাওয়া যাবে না।তাই ঐ সমাজে আগুনের আবিস্কার ও চল শুরু হওয়ার আগে শিকার শুরু হবে না।

    চাষাবাদ মানে কী?
    তাহলে চাষাবাদের অর্থ হল প্রকৃতি যেভাবে আমাদের জন্য প্রাকৃতিকভাবে খাবার তৈরি দেয় সেটা আর নয়। বরং ইতোমধ্যে আমরা পর্যবেক্ষণ শক্তি অর্জন করে বুঝেছি যে আমাদেরকে খাদ্য দেয় প্রকৃতির এমন উদ্ভিদগুলোকে আর প্রাকৃতিকভাবে নয় নিজের গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তির বুঝাবুঝি দিয়ে সেগুলোকে জন্মানো। এভাবে প্রকৃতিতে এক নতুন শর্ত চালু করা যে সবটাই প্রকৃতির ইচ্ছা বা খেয়াল নয় এর সাথে এবার মানুষের ইচ্ছাও মিশাল দেয়া। আর স্বভাবতই এতে মানুষের শ্রম শামিল করতে হয়। এটার নাম দিয়েছি আমরা চাষাবাদ বা কৃষিকাজ।

    এটা এক অর্থে প্রকৃতির স্বভাবকেই নকল করা যাতে মানুষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়। মানুষে খাদ্য-উদ্ভিদ্গুলো “জন্মানোর’ বেলায় তাতে মানুষের ইচ্ছা বা মাতব্বরি প্রাধান্য পায়। এই বাক্য জন্মানো শব্দটাকে লক্ষ করেন। এতে এই যে মানুষের ইচ্ছা বা মাতব্বরিকে  প্রাধান্যে নিয়ে আসা এটাকেই আমরা নতুন শব্দে বলছি জন্মানো।

    কিন্তু সাবধান আমাদের ভিতর যেন খোদার উপর বেকুব কোন খোদগিরি-বোধ না ভর করে।  কথিত “জন্মানো” এই ঘটনার তখন থেকেই “আমরাই” সব সৃষ্টি করছি’ টাইপের চিন্তা কিংবা মানুষই প্রকৃতির রাজা হয়ে গেছে টাইপের চিন্তা থেকে সাবধান। একেবারে সাত হাত দূরে থাকতে হবে আমাদের।

    আমরা কখনই প্রকৃতির মালিক বা ‘রাজা’ নই;  হই নাই অথবা আমরাই ‘সব সৃষ্টি করছি’ এটাও কখনই হবে না। এটা দম্ভোক্তি। তবু যদি এমন বেকুবি মানুষেরই কোন লোভী সদস্য যদি করেই ফেলে তাহলে বুঝতে হবে দুনিয়া থেকে মানুষ-প্রজাতির বিলুপ্তি আসন্ন। তাহলে মানুষের চাষাবাদ বা জন্মানো বলে কী কোন তাতপর্য    নাই?

    অবশ্যই আছে। কিন্তু সেটা সীমিত যেমন আমরা প্রকৃতিতে অবশ্যই বদল ঘটিয়েছি। তবে সেটা সেখানেই আর ততটুকুই যতটুকু প্রকৃতি আমাদের এলাও করেছে। বা অন্যভাষায় বললে যতটুকুতে প্রকৃতির মৌলিক স্বভাব আমরা বোকার মত বদলে দিতে যাই নাই। আর এতটুকু ঘটানোতেই প্রকৃতি অনেকটাই  এখন মানুষের খাদ্যদাতা হয়েই প্রকৃতি তার নিয়মিত বদলগুলোও ঘটিয়ে চলেছে।

    একারণের মানুষের চাষাবাদ শুরু অনেক কিছুর দিক থেকে প্রকৃতিতে খুবই গুরুত্বপুর্ণ এই পরিবর্তন। অর্থাৎ এই প্রথম যেন প্রকৃতির পাশাপাশি প্রকৃতিকে ‘বুঝে বুঝে চলার’ এই নতুন যুগের শুরু হয়েছিল। খেয়াল রাখতে হবে এটা ‘বুঝে বুঝে চলা’ কোন আলগা মাতবরি বা মিথ্যা রাজাবোধ মিথ্যা অহংবোধ আসাটা হারাম হবে। তা একেবারে আত্মধংসী ও পরিণতিতে মানুষের বিলুপ্তি। থিওলজিগুলোও বারবার নিজের মত করে এই সাবধানতার ব্যাপারে আমাদের সতর্ক করেছে নানাভাবে।

    আসলে কৃষিকাজ এর এই যুগে এসে মানুষো টের পেতে শুরু করেছিল যে এ’এক তাদের নতুন অভিজ্ঞতার জীবন। যখন মানুষ তার আরেক ফ্যাকাল্টি আরেক যোগ্যতা আরেক হাতিয়ারের ব্যবহার শিখে গেছে – এটাকে বলা যায় বুঝাবুঝির ফ্যাকাল্টি। তার পর্যবেক্ষণ ও অধ্যয়নের সক্ষমতা।

    নিশ্চয় আমরা এখন টের পাচ্ছি কৃষিকাজ মানেই আসলে একারণে সিভিলাইজেশন। মানুষ ধীরস্থির হয়ে ‘বুঝে বুঝে চলা’, বুঝাবুঝির ফ্যাকাল্টি মানুষের এই হাতিয়ার যোগ্যতাটাকেও ব্যবহারে নিয়ে আসা – মানুষ কয়েকদিনেই যেন বিরাট দায়ীত্ববান হয়ে উঠেছিল। একটা মেটাফোর বাক্যে বলা যায়, প্রকৃতি যেন তার বুঝাবুঝির কাজের ভার তখন থেকে পরিপক্কতা লাভ করা, ‘চাষাবাদ’ বা ‘জন্মানোর’ দক্ষতা সম্পন্ন এই নয়া মানুষকে শঁপে দিয়েছিল। মানুষ তখন থেকে দায়ীত্ববান মানুষ হতে শুরু করেছিল। এটাই মানুষের মধ্যে থিওলজিক্যাল চর্চা ও এমন জ্ঞানবুদ্ধি জাগবার শর্ত তৈরি হতে শুরু করেছিল।

     

    চাষাবাদ থেকে সিভিল বা সিভিলাইজেশনঃ
    উপরের এসবগুলো কথাগুলোর একটা ছোট শব্দে প্রকাশ আছে বা প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল অনুমান করি। সেই শব্দটা হল ইংরাজিতে সিভিল (civil)। আর এখান থেকেই সিভিলাইজেশন (civilization)বা বাংলায় সভ্যতা। বাংলায় সিভিলের প্রতিশব্দ অনেক। ওর মধ্যে একটা হল সভ্য। কিন্তু অসুবিধা হল মানুষ সভ্য শব্দের বিপরীত শব্দটা – অসভ্য। ইনফরমালি অসভ্য শব্দটা সভ্য শব্দের সব সিরিয়াস ধারণাকে লঘু করে দেয়। এদিকটা খেয়াল রাখলে আমরা ভাল করব। সভ্য বা সিভিল মানে হল

    যখন থেকে মানুষ তার সজ্ঞানে তার জ্ঞানবুদ্ধি তার বুঝাবুঝির ফ্যাকাল্টি এই হাতিয়ার বা যোগ্যতাও ব্যবহার শুরু করেছিল। অর্থাৎ যখন থেকে মানুষ শুধু খায় আর ঘুমায় আর মজা করে তাই নয়। বড় কথা, মানুষ চিন্তাও করে। এটা সেবুঝে যায়। আর মানুষের জীবনে এর প্রয়োগ শুধু মানুষই না সারা প্রকৃতিই এক নয়া রূপ পায়। নয়া রূপে প্রকৃতি হাজির হতে শুরু করেছিল। মানুষ, প্রকৃতির এক বর্ধিত অংশ মানুষ; মানুষই প্রকৃতির আরেক রূপ-চেহারা – সে যেন হয়ে উঠে এক রেজিষ্টার – যেন প্রকৃতি যাকে কার্যকারণ ঘটনাবলীর সবকিছুর ‘নোট’ নিতে বলে দিয়েছে। ফলে যেন তখন থেকে আর প্রকৃতিতে যত জ্ঞান কার্যকারণ তা আর হারিয়ে যাবার সম্ভাবনা কমে গেছিল। এতে এক নতুন সম্পর্ক, নতুন উন্মোচনের দুনিয়া হাজির হয়েছিল। একারণে মানুষের কৃষিকাজ শুরু করা, একে সিভিলাইজেশনেরও শুরু হওয়া ধরা হচ্ছে। আর মানুষের সিভিল বা সভ্য হয়ে বা এক সভ্য রূপ হাজির করছে।

    উপরে সিন্ধু সভ্যতার মত আরো কতগুলো সভ্যতা যা আমাদের মতই তবে আগে বা পরের এমন সভ্যতার নাম বলেছি। অর্থাৎ সরাসরি বললে, সব সভ্যতা একই সময়ে শুরূ হয় নাই। মানে দুনিয়া স্কল ভুমি বা ভুগোলের মানুষ একই সময়ে তার সভ্যতার যাত্রা শুরু করে নাই, আগে-পিছে আছে। আবার লক্ষ করলে দেখব সভ্যতাগুলো সবই প্রায় আমাদের সিন্ধু সভ্যতার কাছাকাছি। জায়গাটা হল এখনকার দিনের পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে তবে উপরে আফগানিস্তান আর নিচে ভারতের খুবই কম অংশ এই এলাকাটা নিয়ে। আবার সিন্ধু সভ্যতার আরও উত্তর-পশ্চিমে হল পারস্য সভ্যতা এবং আরও উত্তর পশ্চিমে হল বিখ্যাত সুমের বা মেসোপটমিয়া (এখনকার ইরাক)আবার আরও পুর্বে চীন সভ্যতা। তবে সবচেয়ে লক্ষণীয় দিকটা হল,এসব সভ্যতার নিদর্শন মানে হল, তাদের গড়ে তোলা এক বা একাধিক নগর গড়ে তোলা। যেমন পুরানা সিন্ধু সভ্যতা মানে হল সিন্ধুনদের তীরে গড়ে উঠা দুই নগর হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো নগর এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত। মাটি খুড়ে প্রত্নতাত্বিক (archiology) ভাবে তাদের সম্পর্কে যা জানার জানা যায়। অর্থাৎ আমরা হলাম ধ্বংসপ্রাপ্ত বা বিলুপ্ত রূপের বিচ্ছিন্ন ধ্বংসাবেশের কোন অংশ থেকে ধীরে ধীরে লম্বা সময় নিয়ে আবার জেগে উঠে রূপ।

    সিভিলঃ
    সিভিল [Civil]
    শব্দের আরেক অর্থ নগর যেখান থেকে একালে এসে নাগরিক শব্দটা। আর সিভিলের আরেক পুরানা বাংলা হল পুর বা পৌর। যেমন পুরকৌশলী মানে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। পুর এর আরেক মানে বসবাসের ঘরবাড়ি। পৌর মানে এখান থেকে পৌরসভা বা মিউনিসিপাল্টি। এছাড়া আরও বড় ঘটনা হিসাবে বললে তা ‘সিটি কর্পোরেশন’।

    সিভিল শব্দের অর্থের যেন শেষ নাই। যেমন সিভিল সার্ভিস। এখানে সিভিল মানে হল নাগরিক শব্দের সাথে জুড়ে তৈরি। নাগরিকদেরকে সেবা বা সার্ভিস দিবার সরকারি কর্মচারিদের চাকরি করা যারা নাগরিকদের বিভিন্ন সেবা দিবার জন্য কাজ করে থাকে। অর্থাৎ এখানে এটা আর শুরু মিউনিসিপাল্টির কর্মচারিই নয়, রাষ্ট্রের কর্মচারিদেরকেই বুঝায়।

    সিভিল থেকে আরেক শব্দ এসেছে সিভিক বা সিভিকস (civics)। স্কুলের ক্লাসে বাংলায় আমরা এটাকে বলতে শুনি ‘পৌরনীতি’। এটা আসলে পরবর্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যেটাকে রাজনীতি-বিজ্ঞান বা রাজনীতি বিভাগ হবে ওরই ছোট ভার্সান। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে বা আমরা টের পাচ্ছি সিভিল শব্দটাই ‘রাজনীতি’ শব্দটার এবং এই সাবজেক্টের দিকে মোড় নিবার একটা ঝোঁক আছে। হা অবশ্যই আছে। কিন্তু কেন?

    আসলে চাষাবাদ বা কৃষিকাজ মানুষ করবে মাঠে সেটা ঠিক আছে। কিন্তু বসবাস করবে কোথায়? এখনও আমাদের এদিকের গ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ বলে যে কাঠামো তা হল, চাষাবাদের জমির সাথে পাশেই বসবাসের ভিটা। সভ্যতাগুলোর বেলায় রূপটা তেমন নয়। বসবাসের যে রূপ-কাঠামো তা খুবই দলবদ্ধ এবং তা চাষাবাদের জমাজমির অংশ থেকে দূরে আর সকলের জন্য একসাথে। সকলের জন্য একসাথে যেখানে কমন ফেসিলিটি বা সুবিধাদি সব একই জায়গায় – এটাকেই নগর বলা হত।

    আসলে আরেকটা রূপ ছিল মাঝখানে। যেমন সিন্ধু সভ্যতার নগরদ্বয় হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো এর সম্পর্কে বলা হয় তা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আর টিকে নাই। একটা মতামত বলে সিন্ধুনদের এর  উতসের দিকের এক বড় নদী স্বরসতী কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে শুকিয়ে যেতে থাকে। আরেকটা মতামত বলে এক প্রলঙ্কারি বন্যায় নগরের সব ধুয়ে যায়। সেটা যাই হোক সারকথায় নগর দুটো আর টিকে নাই। এঘটনা অনুমান করা হয় মোটামুটি ১৯০০ খ্রীষ্টপুর্ব মানে জীশুর জন্মের ১৯০০ বছর আগের ঘটনা এটা।
    আসকো পারপোলা (Asko Parpola)তিনি একজন ফিনল্যান্ডের নাগরিক এবং তিনি সিন্ধু সভ্যতা ও সিন্ধুনদ বিষয়ে গবেষক ও এক্সপার্ট। তার মতে, হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর পড়শি আরো দুই সভ্যতা এর সমৃদ্ধির পিছনে ছিল। এরা হল মেসোপটমিয়া ও আরবদের সাথে তাদের গভীর বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল আর তা ছিল খ্রীষ্টপুর্ব 2600 and 1800 BCE এই সময়কালে। অর্থাৎ এই সভ্যতার ধ্বংস হবার আগে দিয়ে।

    অর্থাৎ ঐদুই নগর ধ্বংস হয়ে যাবার পরে আবার নতুন করে ধ্বংসাবশেষের বিচ্ছিন্ন অংশ থেকে আজকের আমরা। অর্থাৎ আবার সবকিছু সেই বিচ্ছিন্ন গ্রাম আর সেখান থেকে, নগর বন্দর জেলা রাজধানী ইত্যাদি সবকিছু পেরিয়ে আবার সব নতুন করে গড়ে উঠা জিনিষ।

    কাজেই সিভিল ধারণা এখনকার বাস্তবতায় যা আর তা আগে সেকালে যেমন ছিল তা ঠিক এক নয়। এখনকার সিভিল বা নাগরিক ধারণা এটা কলোনিয়াল উৎস থেকে শুরু। মোগল আমলেও এর হদিস তেমন জানা যায় না। যদিও মোগল আমলের অন্তত তিনটা নগর বা বড় শহরের কথা আমরা জানি – হায়দ্রাবাদ, লক্ষনৌ আর দিল্লি। কিন্তু বৃটিশ আমলে এসে সেসবের আর কোন ধারাবাহিকতা থাকে নাই। তাই বৃটিশ আমলের যে নগর বা সিভিল সোসাইটি ধারণা যতটুকুই তা ছিল সেটা বৃটিশদের থেকে পাওয়া। আর একালে যে সিভিল সোসাইটির কথা ফিরে এসেছে দেখি এটা একেবারেই পশ্চিমা উৎস থেকে। বিদেশি সাহায্য অনুদানে খোলা এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলো দেশীয় যারা পরিচালনা করে থাকে তা এদেরই বড় জোর একটা ক্লাব মাত্র।

    দলবদ্ধভাবে বসবাসের ধরণ থেকে অনেকে অনুমান করে যে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো রোম বা গ্রীকদের মত নগররাষ্ট্র ধরণের কিছু ছিল। যেখানে মূলত নগরের কমন ফেসিলিটি মানে নগরে বসবাসকারীদেরকে দেয় পানি বা পয়ঃ প্রণালি ধরণের বিষয়ে সুযোগ সুবিধাগুলো ও নগর পরিচালনার জন্য একটা পরিচালনা কাঠামো বা নগররাষ্ট্র ধরণের কিছু হয়ত সেখানে ছিল। তাই এতে পুরানা সিভিল ধারণার কোন ধারাবাহিকতা একালে আর নাই। একালের যা কিছু আছে এর উৎস কলোনি শাসক বৃটিশদের থেকে যা কিছু একালে পাওয়া গেছে।

     

    সিন্ধু থেকে হিন্দু বা ইংরাজিতে ইন্ডাস (indus):
    উপরে বলেছি সিন্ধু সভ্যতার মানুষদের সাথে আরবদের বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। বলা হয় যে উচ্চারণের দিক থেকে স কে হ উচ্চারণ করাতে সিন্ধু হয়ে যায় হিন্দু ফলে  অনেকের উচ্চারণে সভ্যতার নাম হয়ে যায় হিন্দু সভ্যতা। সিন্ধু উপত্যকা হয়ে যায় ইন্ডাস ভ্যালি (indus valley)। কিন্তু খুবই সাবধান। আমরা এখানে সভ্যতা নিয়ে কলা বলছি,ধর্ম নয়। ফলে হিন্দু ধর্মের জয়জয়কার ধরণের কোন সিদ্ধান্ত এখান থেকে আসার কিছু নাই।

    সভ্যতা আর ধর্মকে মিলিয়ে ফেলার এই বদ উদ্দেশ্য এগুলো কেবল বৃটিশ আমলে এই উনিশ শতকের ঘটনা। হিন্দু জাতি ধারণার রাজনৈতিক রূপ খাড়া করার উদ্যোগ যখন প্রবল হয়েছে তখনকার।

    সব সময়ই একটা ইসলামফোবিক বা বিদ্বেষ ছড়ানোর মুড এর ভিতর থেকে গেছে এটাই সব সংঘাত ও অসন্তোষের মূল উৎস। আর এটা প্রবল হয়েছে ১৯১৫ সালে হিন্দু মহাসভা (আরএসএস- বিজেপি এদুই সংগঠনের আগের রূপ ও নাম) গঠিত হয়েছিল। এরপর থেকেই এই বিদ্বেষী ততপরতা চরমে উঠা শুরু করেছিল। এরাই সভ্যতার নামকে ধর্মের নাম বলে চালানো শুরু করেছিল।

    কিন্তু সবসময়ই এক বাস্তবতা তাদেরকে বাধা দিয়েছে। সেটা হল,সিন্ধু সভ্যতার দুই নগরী হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো এদের কোনটাই এখনকার ভারতের কোন অংশ নয় নয়। বরং দুটার পুরাটাই এখনকার পাকিস্তানে পড়েছে।  তবু শব্দ চুরি করে একালের ইন্টারনেটের যুগে সিন্ধু সভ্যতাকে ইন্ডিয়ান সভ্যতা নামে ডেকে অযথা আরো বিভ্রান্ত ছড়ানোর চেষ্টাও দেখা যায়। যেখানো সাদা কথাটা হল সিন্ধু সভ্যতা হল অবিভক্ত ভারতবর্ষের (কেবল ভারতের না। বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য পুরানা নাম ভারতবর্ষ লেখা উচিত)প্রসঙ্গ। সারকথা, এসব বিভ্রান্তি ছড়িয়ে কোন কারও বিরুদ্ধে ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছড়ানো একেবারেই কাম্য নয়।

    তবে আমাদের সাথে সিন্ধু সভ্যতার সম্পর্ক কী – এনিয়ে আরো কিছু কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। আগে বলেছি মোটা দাগে আমাদের সকল সভ্যতা বা সিভিলাইজেশন-গুলোর বয়স গড়ে মনে করা হয় ছয়হাজার বছর।  আমরা বৃহত্তর সিন্ধু সভ্যতারই উপ-সভ্যতার মত। ঠিক যেমন এখনকার ভারতের ৩০টার মত রাজ্য আছে যার মধ্যে ১৭-২০ টা হল এমন সুনির্দিষ্ট করে আলাদা করা যায় এমন এথনিক -জাতি। যার একটা হল বাঙালি। আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ হল ঐ বাঙালি এথনিক-জাতির পশ্চিম অংশ যা হিন্দু প্রধান। আর বাংলাদেশ হল আলাদা রাষ্ট্র যা বাঙালি এথনিক-জাতির পুর্ব অংশ যা মুসলমান প্রধান। এসব বিচারে মূল সিন্ধু সভ্যতারই  উপ-সভ্যতা বলতে পারি আমরা  ভারতের ১৭-২০ টা আলাদা করে চিনা যায় এমন  বৈশিষ্টের এথনিক জাতি। এসব বিচারে আমরা বাঙালি হিশাবে সিন্ধু সভ্যতার উপ অংশ।

    সভ্যতা বা সিভিলাইজেশন শব্দের আরেক অপব্যবহারঃ
    সবশেষে সিভিলাইজেশন শব্দটাকে একালে চলতি শতকে বুশের আমলের অপব্যবহার নিয়ে কিছু কথা বলে শেষ করব। উপরে একটু ছুয়ে থেকে বলেছিলাম সিভিল শব্দের এক বাংলা হল সভ্য। আর তা থেকে বিপরীত শব্দ অ-সভ্য। এই অসভ্য শব্দটার অপব্যবহার হয় প্রচুর। যেমন সভ্য শব্দ থেকে কেউ “অসভ্য কিনা” তা বলবার জন্য সভ্য শব্দটা যদিও চালু হয় নাই। তবু এই অপব্যবহার অর্থে সভ্য শব্দের একটা ব্যবহার অনেকে করে থাকে। এবং এভাবে কাউকে সভ্য/অসভ্য বলার ভিতর দিয়ে তাঁকে উচা-নিচা দেখিয়ে ফেলার চেষ্টা দেখা যায়।

    কিন্তু এখান থেকেই সভ্য শব্দের আরেক ব্যবহার আছে। যেমন কেউ কাউকে কলোনি বা অধীনস্ত করে এরপরে ঐ কলোনিদখল করার পক্ষে সাফাই দিতে বা যোগাড় করতে গিয়ে বলতে দেখা যায় যে ‘কলোনিদখলদার যেহেতু অনেক বেশি সভ্য কাজেই তার দখলিকাজটা জায়েজ’। এমনই নষ্টা কথা আমরা অনেককে বলতে শুনি। বা অনেকে কায়দা করে বলে কলোনিদখলটা খারাপ কিন্তু সভ্য তো বানিয়ে তো দিয়ে গেছে। যেন তাকে ‘সভ্য’ বানানোর জন্য দাওয়াত দেয়া  হয়েছিল!

    এই ধরণের কাছাকাছি আর্গুমেন্ট চলতি শতকের শুরুতে প্রেসিডেন্ট বুশ নাইন-ইলেভেনের টুইন টাওয়ার হামলার পর থেকে দেয়া শুরু করেছিলেন। নাইন-ইলেভেন বা  ১১ সেপ্টেম্বর হামলার পরেই ২০ সেপ্টেম্বর এক সিনেট বক্তৃতায় [BUSH ..“told the nation Monday that the war against terrorism is “a struggle for civilization,”] তিনি স্পষ্ট করে বলেই বসেন “দিস ইস সিভিলাইজেশন’স ফাইট” মানে এটা নাকি সভ্যতার যুদ্ধ বা সভ্যতা প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। যেন কে কত সভ্য তা যুদ্ধে কে হারল বা জিতল তা দিয়ে নির্ণয় করা যায়,করতে হয়। আবার এর ভিতর বুশ ইঙ্গিত দিচ্ছেন তিনি মুসলমানদেরকে এবার সভ্যতা শিখাবেন। যেন একদল জনগোষ্ঠি অন্য দলকে সভ্যতা শিখাতে শিখাতেই আজকের দুনিয়া এজায়গায় এসেছে! এসব কথা বিস্তারে আগে বলেছি।

    বলাই বাহুল্য এতে সারা দুনিয়ার মুসলমানদের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ প্রথমত তিনি দুনিয়ার পুরা মুসলমান জনগোষ্ঠিকে নিচা দেখাতে আর অধীনস্ত দেখানোর কসরতে নামতে চাইছেন। দুই, তিনি এখান থেকে ব্যাপারটাকে ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ব’ প্রদর্শনের যুদ্ধ করতে চান, এই হুমকি তৈরি করেছেন। ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ব’ ভাবে ভাবা বা দেখানোর চেষ্টা এটাই ‘হিটলারিজম’। কেউ নিজে নাকি ‘জাত শ্রেষ্ঠ’ কাজেই অন্য কোন জনগোষ্ঠির সবাইকে দুনিয়া থেকে একেবারে নির্মুল করে দেয়ার কাজটা যেন জায়েজ। এই ঘৃণ্য ও বিপদজনক বয়ান এখানে হাজির করা হয়েছে। এই হল ভয়ংকর খুনির নৃশংসতার পক্ষে অদ্ভুত এক সাফাই এটা। হিটলার নিজেকে জর্মানেরা শ্রেষ্ট জাতি তাই তাদের নীল চোখ,তারা শ্রেষ্ঠ আরিয়ান জাতি ইত্যাদি সাফাই দিয়েছিলেন। সেজন্য তারা ইহুদিদেরসহ দুনিয়া যেকোন অন্য জাতিকে নির্মুল করতে পারে। এই হল হিটলারের বয়ানের সারকথা। এখান থেকেই পরবর্তিতে নুরেমবাগ ট্রায়াল ও সর্বশেষে আইসিসি ২০০১ (বা আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্ট এক্ট ২০০১) চালু হয়েছে। এই আইন অনুসারে কোন জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদী বা বক্তব্য বা কোন জনগোষ্ঠিকে নির্মুল করা বিষয়ক বক্তব্য দেয়া বা করা এমন যেকোন কাজ সর্বোচ্চ শাস্তিদন্ড দানযোগ্য কাজ।

    তৃতীয়ত,সব রাষ্ট্রের মতই আমেরিকান আইন অনুসারে, যে তার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে তাকে সে বিচার করে সর্বোচ্চ বা মৃত্যুদন্ড দিতে পারে। দুনিয়ার প্রায় সব দেশেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার শাস্তি এটাই। কিন্তু বুশের মারাত্মক অন্যায় অবিচারটা হল, নাইন-ইলেভেনের অপরাধীদের ধর্ম কী? প্রেসিডেন্ট বুশ অপরাধীদের ধর্ম – ইসলাম, এর বিরুদ্ধে প্রচার প্রপাগান্ডা নিয়ে মেতে উঠেছিলেন। এটা মারাত্মক বেআইনি। অপরাধীর ধর্মকে নিচা দেখানো এক মারাত্মক অপরাধ। আমরা এখানে সিভিলাইজেশন নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি। ফলে এর ফাঁকে আমরা যেন সতর্ক থাকি যে সভ্যতা বা ইংরাজিতে সিভিলাইজেশন শব্দটার অপব্যবহার সম্পর্কে। আমরা যেন সিভিলাইজেশন শব্দটার ব্যবহার কঠিন করে না দেই। আর মনে রাখতে হবে সভ্যতা অন্যকে শিখানোর জিনিষ নয়, যদি না সেটা স্বেচ্ছায় ঘটিত জেনে নেয়া ধরণের কোন ততপরতা হয়।

    গৌতম দাস
    ০৩ ডিসেম্বর ২০২১
    লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে এক প্রিন্টেড ভার্সান হিসাবে প্রকাশিত হয়েছিল। ছাপা হয়েছিল “ইসলামি শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন” – এই নামের ছাত্র সংগঠনের এক বার্ষিক সংকলনে। সেটা ছিল গত ২৪ ডিসেম্বর ২০২১, তাদের কেন্দ্রীয় সম্মেলন উপলক্ষ্যে প্রকাশিত “সভ্যতা ও সংস্কৃতি” এই শিরোনামে এক প্রকাশনায়। সেই প্রিন্টেড সংকলনে এ’লেখা্টার শিরোনাম ছিল  “সিন্ধু সভ্যতায়ঃ সভ্যতা মানে কী”।   যদিও দুঃখের বিষয় ঐ প্রিন্টেড সাময়িকীর কোন অনলাইন ভার্সান এখনও তাঁরা বের করে নাই।  হয়ত পরে করবে। তবে সেই পুরানা ছাপা লেখার একটা পিডিএফ কপির এখানে  লিঙ্ক দিলাম। এখানে পাওয়া যাবে।  এছাড়া  সেই লেখাটারই আরেক ফাইনাল ভার্সান যেখানে এখন প্রচুর সংযোজন-বিয়োজন ও এডিট করে নয়া ভার্সান হিসাবে তা এখানে প্রকাশ করা হল। তাতে আগের শিরোনাম যেটা ছিল তা একটু বদল করা হয়েছে।  আর এবার লেখাটা বড় হয়ে যাওয়াতে তা দুই পর্ব করে, এখানে আজ কেবল প্রথম পর্ব প্রকাশ করা হল।   আর এই লেখাটাই  ওর দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব আজ ১২ আগষ্ট ২০২৩ প্রকাশিত হল। ]

    আপডেটঃ ১২ আগষ্ট ২০২৩ রাত ১০ঃ১০
    আপডেটঃ ১২ আগষ্ট ২০২৩ রাত ১০ঃ ৪৬
    সর্বশেষ  আপডেটঃ ১৫ আগষ্ট ২০২৩ ভোর ০৬ঃ ১২

  • ঢাকার উপর ড্রাগনের নিশ্বাস ফেলতে দেখা সুবীর ভৌমিক!

    ঢাকার উপর ড্রাগনের নিশ্বাস ফেলতে দেখা সুবীর ভৌমিক!
    গৌতম দাস
    ০৮ আগষ্ট ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4MN

     

     

     

          Chinese special envoy Deng Xijun 

     

    বাংলাদেশে চীনের এক বিশেষ দুত আসা-যাওয়া করছেন। আর তা নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের হয়ে সুবীর ভৌমিক এক “ষড়যন্ত্র তত্ব” এর গল্প ফেদে এক রচনা লিখেছেন গত ৫ আগষ্ট। আর তা ভারতে ছাপা হয়েছে এখানে। এর শিরোনাম বাংলা করে লিখলে , ড্রাগন ঢাকার উপর নিঃশ্বাস ফেলছে? বাংলাদেশের সাথে চীনের বেড়ে চলা অভিসারে ভারত উদ্বিগ্ন [Dragon’s breath on Dhaka? Bangladesh’s growing Chinese rendezvous worries India]। ড্রাগন বলতে প্রতীকীভাবে চীনকে বুঝিয়ে থাকে, যেটা ভারতীয় মিডিয়ায় প্রায়ই দেখা যায়।

    এখন কাহিনীর পটভুমি আগে কিছু কথা একেবারে সরাসরি বলে নেওয়া যাক। চীনের এক বিশেষ দুত দেং শিজুন [Deng Xijun] বাংলাদেশ সফরে এসেছেন গত তিনমাসের ব্যবধানের আগে-পরে মিলিয়ে মোট দুবার। তিনি নীরবে মানে হৈ চৈ না করে এসেছেন কথা ঠিক, কিন্তু মিডিয়ায় রিপোর্টেড হয়েছেন আর যেখানে তাঁর সফরের উদ্দেশ্য কমবেশি পরিস্কারই লেখা হয়েছে।  যেমন এবারের সফর নিয়ে প্রথম আলোর রিপোর্ট চীনের বিশেষ দূত আবারও নীরবে ঢাকায়। আর এই সফরের উদ্দেশ্য হল, তিনি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করছেন। সেকথাআও প্রকাশ্যেই জানা যাচ্ছে।
    কিন্তু এব্যাপারে চীনা অবস্থানটাই খুব কার্যকর বা এফেকটিভ কিছু  নয় বা কাজেরই না; মানে ফল আনে না। এর পিছনের মূল কারণ, চীন যেন বুঝেও স্বীকার করতে বা থামতে চাচ্ছে না যে বার্মার জেনারেলদেরকে তেল মেরে বা পিঠে হাত বুলিয়ে রোহিঙ্গাদের সম্মানের সাথে গ্রহণ করতে জেনারেলদেরকে বাধ্য করা যাবে না। এটা চীনের কম্ম নয়! কিন্তু এই অকার্যকারিতার কথা জেনেও চীনা সরকারের তবু এতেই লেগে থাকার চেষ্টা,  এটাই খুবই বিরক্তিকর এক ঘটনা! কাজেই চীনের বিশেষ দুত প্রকাশ্যে না গোপনে এলো এটার কোন গুরুত্ব বা তাতপর্য নাই।

    আরো কঠিন সত্যিটাঃ
    আসলে আরও কঠিন আরেক সত্যি হল, আমেরিকা এই রোহিঙ্গাদের ফেরত না নেয়ার ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে বার্মার জেনারেলদের উতখাত করতে চায়। যেটাকে অনেকে বার্মায় রেজিম চেঞ্জের ঘটনা আসন্ন হতে পারে বলে মনে করছে। আর তা হলে সেটা স্বভাবতই কোন প্রো-আমেরিকান বার্মিজ জেনারেলকে বসিয়ে আমেরিকার পক্ষের এক ক্ষমতাদখল হবে বলে অনুমিত হয়।

    বার্মা বা মায়ানমার নিয়ে একালে এমন সব ঘটনার রূট হল ২০০৭ সালে বার্মার জেনারেলদেরকে  পশ্চিমের সহযোগিতা এনে দেয়া ভারতীয় পরিকল্পনা ও এরই কিছু প্ররোচনা।  এটা ছিল আমেরিকা-সহ পশ্চিমকে কথিত এক নয়া রাস্তা দেখানো যাতে চীনের পাশাপাশি আমেরিকাও বার্মায় ব্যবসা-বাণিজ্যে লুটেরা হতে পারে। সাথে ভারতের জন্যও কিছু দুয়ার খুলে। আমেরিকা সহ পশ্চিমকে বার্মার রাস্তা দেখাতে সেটা ছিল ভারতীয় পরিকল্পনা।

    এই নয়া রাস্তাটা কী ও কেন? গত ২০০৭ সালের আগের বিশবছরের  বার্মা ছিল জাতিসংঘ-সহ পশ্চিমাদেশের একেবারে কঠোর বাণিজ্য স্যাংশন খাওয়া এক দেশ। তাই বহিঃর্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ বলতে এক লাগোয়া চীনা সীমান্ত দিয়ে পরোক্ষে বার্মা যতটুকু যা বের হতে পারে, তাও আন-অফিসিয়ালি। সেটাই একমাত্র ছিল তার বহিঃর্বিশ্ব! এই ছিল খুবই সীমিত কেবল চীনের সাথে আন-অফিসিয়াল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের প্রায় একঘরে হয়ে থাকা বার্মা। সেটা ছিল আবার প্রায় ১৭০ ডলা্রে এক ব্যারেল জ্বালানি তেলের জমানা।  মানে, ২০০৮ সালের গ্লোবাল মহামন্দা তখনও আসে নাই, এর আগের ঘটনা।  তাই রাইজিং ইকোনমির চীন বা ভারতের মত দেশগুলোর জ্বালানি কিনে নিবার প্রতিযোগিতা চলত সেকালে যে, কে কোনদেশের মাটির নিচের  জ্বালানি আগাম কিনবার জন্য আগে বুকিং দিয়েছে বা চুক্তিই করে ফেলেছে। এমনই দিনকালের সেসময়ে এক বার্মিজ গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস ভারতের কিনবার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের উপর দিয়ে তা ভারতে নিবার কথাবার্তা ও তা নিয়ে কোন চুক্তিতে পৌছাবার আগেই  চীন বার্মার সেই গ্যাসক্ষেত্র কিনে নিয়েছিল। যা পরে পাইপলাইন বসিয়ে  এখন সরাসরি চীনের কুনমিং-এ যাওয়া চালু হয়েছে।

    এই পটভুমিতেই ভারত পশ্চিমকে বার্মায় ডেকে নিয়ে আসে এই ধারণায় যে এতে বার্মা অনেক বেশি সাথে ভারতের দিকেও ঝুকবে, চীনের শাস্তি বা কোনঠাসা হবে ইত্যাদি। তাই, ভারতীয় মধ্যস্থতায় ঐ প্রস্তাব ছিল আসলে বার্মায়  এক নাম-কাওয়াস্তে সংস্কার, নয়া কনষ্টিটিউশন (২০০৮) চালু , সু চি কে ছেড়ে দিয়ে জেনারেলদের নিয়ন্ত্রণে সু চিকে সংসদে বসানো ইত্যাদি ধারাবাহিকভাবে ঘটেছিল।  আর এটাকেই বার্মার জেনারেলেরা ভাল হয়ে গেছে বলে সার্টিফিকেট দিয়ে সব পশ্চিমা স্যাংশন তুলে নেয়া হয়েছিল।   এরপর আমেরিকা-ইউরোপ ঝাঁপিয়ে পড়ে বিনিয়োগ নিয়ে বার্মায় ঢুকে পরে লুট শুরু করেছিল। সেটা বার্মার জঙ্গলের দামি কাঠ থেকে শুরু করে মাটির নিচের যা আছে প্রায় সব। আর বলাবাহুল্য যেমন সেই প্রথম মোবাইলের মত পশ্চিমের নানান টেকনোলজির বার্মার বাজারে প্রবেশ করে সব বাজার ছেয়ে ফেলাও…।

    কিন্তু ভারতের জাত-স্বভাব হল, মুসলমান কোপানো – একটা জিঘাংসা, ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোতেই যেন সে আনন্দ খুঁজে পায়; সবকিছুর সাথে এটাও তার চাই-ই!  অথচ এটা সত্যিই আনন্দের কিনা, হিন্দুত্ববাদ করে এতে ভারতীয় রাজনীতির কী লাভ হয়েছে না উলটা স্থায়ী ক্ষতি – এসব ফিরে দেখে চেক করার থেকে সে ক্রমশ চরম দূরে সরে গেছে। অথচ এতেই সে মেতে থেকেছে। তাই রোহিঙ্গা মেরে খেদানোর কুবুদ্ধি উস্কানিটা এবার তারাই জেনারেলদেরকে দিয়েছিল। যেকাজ জেনারেলেরা আগেও প্রতি দশবছর পরপর একবার করে তারা করে  আসছিল। বুদ্ধিটা ছিল যে এবার যেহেতু সারা পশ্চিমাদেশ আর সাথে চীন ও ভারত মানে সবাইকেই বার্মার জেনারেলেরা ব্যবসা দিয়েছে – সবার গলায় ব্যবসার স্বার্থ আটকে আছে ফলে,  এটাই এবার রোহিঙ্গা মেরে খেদানোর সবচেয়ে ভাল সময়। কোন মানবাধিকার কোন আপত্তি এখন কাজ করবে না, এই ছিল পিছনের অনুমান। হয়েছিলোও তাই, এমনকি আমেরিকাসহ কেউই জেনারেলদের রোহিঙ্গা মেরে খেদানোর বিরুদ্ধে যায় নাই। কোন আপত্তিও দেয় নাই।  উলটে বরং ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা মেরে খেদানোর কাজটা জায়েজ করে দিয়েছিল,  আরসা [ARSA] নামে কথিত বাহিনীর বার্মা সেনাব্যারাক আক্রমণের গল্প দিয়ে যেটার পক্ষে  সেসময় বার্মায় বিদেশিস্বার্থের সকলেই সাফাই দিয়েছিল। বলেছিল জেনারেলদের রোহিঙ্গা খেদানী-নির্যাতনটা জায়েজ!

    কিন্তু একালে সব বদলে গিয়েছে। যদিও এর শুরু হয়েছিল ওবামা সেকেন্ড টার্ম (২০১৩) থেকে। ক্রমশ এটা এখন আমেরিকার “বার্মা এক্ট ২০২১” হয়ে পরিণতিতে হাজির হয়েছে।  বার্মার  জেনারেলদের বিরুদ্ধে আমেরিকা ক্রমশ সাঁড়াশির চাপ বাড়াচ্ছে আর সাথে দখল, সরকার বদল ইত্যাদি প্রায় সবকিছুই এজেন্ডায় আছে জানা যাচ্ছে। যেটা বাস্তবায়ন করতে পারলে একালে বার্মাই হয়ে উঠতে পারে আমেরিকার বহুদিনের খায়েস – এশিয়ায় অ্যামেরিকান পা-রাখার প্রধান দেশ-ভুখন্ড। আর স্বভাবতই এরই ঠিক বিপরীতে চীনের ততপরতাও উঠে এসেছে –  থাকবে ও আছেও যাতে অ্যামেরিকান পরিকল্পনাটা না ঘটে।  চীনের সে পালটা ততপরতার এক বড় অংশ হল চুইয়ে পড়া পানির মত ক্ষীণকায় ধারা হলেও পঞ্চাশ-একশজন করে রোহিঙ্গা ফেরত নেয়া যে শুরু হয়েছে এমন এই মিথ্যা ভাবটা তৈরি করা।
    কিন্তু চীনের এই অর্থহীন কূটনীতি মানে  নীতিহীনতার দুর্দশা এমনই তলানিতে ঠেকেছে যে এই লোকদেখানি কাজ সেটাতেও বার্মিজ জেনারেলদের রাজি করাতে চীন একেবারেই প্রায় অক্ষম হয়ে থাকছে। তোষামোদ করে চলার চীনা নীতিক্র জেনারেলেরা কেন পাত্তা দিবে?  অর্থাত একাজটায় চীনেরও মুরোদ নাই। সম্ভবত চীন বেশি চাপাচাপি করলে সেক্ষেত্রে হয়ত চীনের পাইপলাইন, গভীর সমুদ্রবন্দর, বিপুলভাবে  বার্মায় চীনের নানান বিনিয়োগ ইত্যাদিতে জড়ানো চীন-বার্মা  সম্পর্ক তাতে উলটে যেতে পারে।  সারকথায় চীন বিনিয়োগ-বৈষয়িকতা লোভে বা স্বার্থের জালে আটকে গেছে। আর যেটাকে চীনের সুবিধা মনে হয় – সে দেখাতে চায় যে তা অন্যদেশের রাজনীতিতে নাকি হস্তক্ষেপ করে না। কারণ এই ইমেজের আড়ালে বৈষয়িকতা লোভে বা স্বার্থের জালে নাক পর্যন্ত ডুবিয়ে রাখা বেশি সহজ। অথচ চীনের এই বৈষয়িকতা লোভে বা স্বার্থের জালে এটার কারণের কয়েক লাখ রোহিঙ্গা ধুঁকে মরলে চীনের কী কিছু আসলে এসে যায়???  কমিউনিস্ট চীনের বিনিয়োগ ব্যবসার স্বার্থই প্রধান, যেটাকে  “সে রাজনীতিতে নাকি হস্তক্ষেপ করে না” বলে চালিয়ে যেতে চায়!
    যদিও আসলেই কী  এটাই চীন বা যেকোন দেশের স্বার্থ হতে পারে??? মানুষ বাদ দিয়ে  কেবল ব্যবসা লাভালাভের বৈষয়িক স্বার্থ এগুলোই কেবল চীনের স্বার্থ???? সম্ভবত এনিয়ে সামনে চীনকে এক বিরাট ধাক্কা খেতে হতে পারে, তাতে কিছু আক্কেল হতে পারে!

    বার্মাকে ঘিরে আমেরিকা ও চীনের স্বার্থ ও ততপরতাগুলো দেখা যায়; কিন্তু ভারতঃ
    তবু যাক সেকথা; এখানকার মুলকথায় আসি। উপরে বার্মাকে ঘিরে আমেরিকা ও চীনের স্বার্থ ও ততপরতাগুলোকে দেখলাম। কিন্তু ভারত? যে ভারত ২০০৭ সাল থেকে বার্মার জেনারেলদেরকে পশ্চিমের স্যাংশন উঠিয়ে এনে পশ্চিমের সাথে বার্মার  সম্পর্ক করে দিল! সেই ভারতের এখন খবর নাই। কারণ বার্মা এখন মূলত আমেরিকা ও চীনের দ্বন্দ্বের ইস্যু!  ভারত সেখানে কেউ না।  তবে এখন এই পরিস্থিতিতে অনেকে মনে করতে চান যে  একমাত্র একটু পথ ভারতের জন্য  যা খুলা আছে তা হল আমেরিকা অথবা চীন “সাগরেদ” হয়ে যাওয়া!  এদুই দেশের কোন একটার অধীনস্ত  “ছুট-ভাই’ হতে হবে – আর তাতে যতটুকু উচ্ছিষ্ট ভাগ ভারতের পক্ষে আসে! এটুকুই!
    তাহলে এই উচ্ছিষ্ট খাওয়ার জন্যই কী ভারত এতদিন খেদমত করে গেছিল?  এই প্রশ্নের জবাব  সেকালের ভারতের কংগ্রেস বা একালের  মোদির বিজেপি – এদের কারো কাছে নাই। আগে-পিছে চিন্তা না করে কাজ করা কথিত নীতি-নির্ধারক এরা কখনই পুরানা কাজ-ততপরতার আত্ম-মুল্যায়ন করে না, করবে না।  মোদি সরকার ভারতের যে বাকি ছয়-আট মাস ক্ষমতায় আছে এইসময়ে সে না আমেরিকার পক্ষে না চীনের পক্ষে কোনদিকেই যেতে পারবে না। আর যদি আগামিতে মোদিবিরোধিরা ক্ষমতায় আসে তবে তারা আমেরিকার অধীনস্ত এক ভারত খাড়া করবে আবার যেটা ততটা চীনবিরোধীও হবে না। যদি আদৌও ঘটনা সেসব দিকে গড়ায়!

    তাহলে সুবীর ভৌমিক ঢাকার উপর ড্রাগন মানে চীনের নিঃশ্বাস ফেলা দেখছে কেনঃ
    এটার একটাই জবাব ভারতীয়  ঈর্যাকাতরতা! এছাড়া আর কোন অর্থ নাই।  অথচ এটা আসলে তাদের কর্মফল!
    যেমন প্রথম কথা, চীনের কূটনীতি হল যে লোকদেখানো হলেও রোহিঙ্গা ফেরত নেয়া শুরু হয়েছে – এটা প্রতিষ্ঠা করা যাতে অ্যামেরিকান কোন ভবিষ্যত আক্রমণ বার্মার উপর ঘটলেও রোহিঙ্গা ফেরত না নেয়াকে যেন আমেরিকা তাদের  বার্মা আক্রমণের সাফাই হিশাবে হাজির না করতে পারে। এছাড়া চীন চাচ্ছে আমেরিকার বিরুদ্ধে এখানেই হাসিনা সরকারের স্বার্থ আছে এটা প্রতিষ্ঠা করা, দেখানো!   কিন্তু আসলেই কী তাই?

    লোকদেখানো ভাবে রোহিঙ্গা ফেরত এর  চীনা কূটনীতি তো নিস্ফল; কোন নুন্যতম সাফল্য বা এর কার্যকারিতা এতে আসে নাই!  ফলে হাসিনা সরকারের চীনের (কোন নীতি-পলিসির) কোলে উঠার সুযোগটা কোথায়?   আর তাহলে সোজা প্রশ্ন, সুবীর ভৌমিকের এখানে ঢার উপর চীন বা ড্রাগনের নিঃশ্বাস ফেলা দেখছে কোথায়?

    মানুষ কখনও কখনও যখন টের পায় যে ভুল করেছে, ভুল পথে চলছে কিংবা আরো বড় ঘটনা যখন যে বুঝে যায় সে চরম বোকার মত সমুলে হেরে যাচ্ছে – পতন আসন্ন; এমন পরিস্থতিতে, এটাই সেই খড়কুটো আকড়ে ধরার দশা-বাস্তবতা!  সুবীর ভৌমিকের আচরণ অবস্থান তেমনই। উলটাপালটা কথা বলছেন যেটা তার নিজেরই অজানা নয় যে “তার কথা হচ্ছে” না।  কাউকে যদি বলি আপনার কথা হয় না এটা কিন্তু আসলে সবচেয়ে অসম্মাঞ্জনক । এর মানে হল, তার নিজের কথা যে অর্থপুর্ণ হচ্ছে না (মানে অর্থহীন) সেটা উনি নিজেই নিজের বুঝবার  মত দশা-অবস্থাও হারিয়েছেন!  এককথায় চিন্তা করতে অযোগ্য অক্ষম এমন এক মানুষ তিনি, তাই বলা হচ্ছে। সুবীরের অবস্থা এলেখায় হয়েছে তাই।

    সুবীরের শেষ ভরসা সুখরঞ্জন দাসগুপ্তঃ
    সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত হলেন চল্লিশ বছরের আনন্দবাজারের সংবাদদাতা। বাংলাদেশ স্বাধীনের পরে টানা প্রায় সাড়ে তিনবছর বাংলাদেশে থেকে আনন্দবাজারের জন্য কাজ করেছেন। কিন্তু শেখ মুজিব হত্যার সময় ছিলেন না। আবার ২০০৩ সালে আনন্দবাজার-ই ছেড়ে দেন। হয়ে যান কলামিস্ট কিন্তু বাংলাদেশের পত্রিকায়!  ঘটনা কী? ঘপ্টনা খুবই সিম্পল। মিডিয়া কর্মীর পরিচয় দেখিয়ে গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করা নতুন কিছু নয়। দাসগুপ্ত সেটাই করে গেছেন। আর ২০০৩ সাল থেকে তিনি গোয়েন্দা কাজে ফুলটাইমার হয়ে যান।  তিনি সময়ে বিডিনিউজ২৪-এ কলাম লিখে থাকেন।
    তাঁর সবচেয়ে বড় ডি-মেরিট বা অযোগ্যতা হল তার বয়স! বয়স মানে ঠিক বয়েস নয়। হিন্দুত্ববাদী মন ও চোখ আর গোয়েন্দা-গিরি সার্পনেস এদুটো একেবারেই এককথা নয়। বরং এক মনে করাটাই বিরাট অযোগ্যতা।  তার বয়েসী মানুষের হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বকে দেখার স্টাইল সেটা কংগ্রেস-নেহেরু আমলের তা একালে কার্যকর গোয়েন্দা ইনটেলিজেন্সের জন্য একেবারেই অচল। এর উপর তিনি নাকি বরিশাল ঝালকাঠির লোক, পঞ্চাশের দশকে দেশ ছেড়েছিলেন। এতে তার মনে যে ক্ষত এটাই তো ডি-মেরিট। এই আবেগ বা ঘৃণা যা কিছু আছে তা তার এসাইনমেন্টের জন্য নেগেটিভ।   এটা ভারতের ‘র’-সহ যেকোন ইন্টেলিজেন্সে কাজের জন্য একেবারেই অচল মাল। এটা হিন্দুত্ববাদ চর্চা-প্রচারের জন্য কাজের হতেও পারে! কিন্তু সেটা তো  ইন্টেলিজেন্স কাজ নয়। অন্তত ঘটনাবলী ঠিকমত ব্যাখ্যা করতে  সক্ষমতার দিক থেকে অক্ষম ও অযোগ্য। এছাড়া এই ব্যর্থতা ঢাকতে ষড়যন্ত্র তত্ব আমদানি করে গল্প ছড়ানো – সেটা আরও অযোগ্যতার প্রকাশ।
    সুখরঞ্জন এক কলাম লিখেছিলেন গত বছর (২৪ জুলাই ২০২২) যার শিরোনাম বাংলা করে লিখলে বিএনপির নির্বাচনে অনিচ্ছার অন্তরালে [Behind the BNP’s poll reluctance]। এককথায় এটা সুখরঞ্জনের এক গারবেজ লেখা। পাঁড় হিন্দুত্ববাদি চোখে আওয়ামী লীগকেই  ব্যাখ্যা করার  বেকুবি চেষ্টা; যা লীগের পক্ষেও গ্রহণ করা সম্ভব হয় নাই।  যদিও আওয়ামি লীগ পরম যত্নে এলেখাকে তাদের দলীয় ওয়েব সাইটের মুখে টাঙিয়ে রেখেছে। লীগের এই অতি আগ্রহের কারণ খুব সম্ভবত এটাই যে, ঐ লেখাতেই দাসগুপ্ত উল্লেখ করেছেন, বিএনপিকে নাকি কানাডার কোন আদালত জঙ্গী বলেছে তিনি লিখেছিলেন  “Even a Canadian court verdict in 2017 put a “terrorist tag” on the BNP for its violent activities.” – এই লেখার পরিণতি বা বাস্তবতা কী তা এখন আমরা আমরা সবাই জানি।  এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  জার্নালিজমের এক সিনিয়র শিক্ষক মন্তব্যে বলেছেন, “এরা তো কোর্টের রায়ের ইংরাজিও বুঝে না”।
    সুখরঞ্জনের লেখা – “বিএনপির নির্বাচনে অনিচ্ছার অন্তরালে” কী আছে?   সেই লেখায় তিনি বলতে চেয়েছেন যে বিএনপি-জামাত আন্দোলন করে হাসিনা সরকারের অপসারণ চায়। আর তাই – মানে বিএনপি এক জঙ্গী দল বলেই বিএনপি নাকি  নির্বাচনে অংশ নিতে চায় না [……the BNP, reluctant to fight the parliament elections? Why is it that the BNP leaders are threatening to launch an agitation to oust the Hasina government?]। এখানে,  agitation to oust- এই ইংরাজি কথাটার আক্ষরিক অর্থ হল আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে উতখাত – করতে চাওয়া। এরপরেও এটা আইনি ভাষার মধ্যেই এক গ্রহণযোগ্য বক্তব্য। যেমন বললাম আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করব – এটা বললে যে অর্থ হয়। আর কারচুপি বা রাতের ভোটের প্রেক্ষিতে  হাসিনার পরিচালিত নির্বাচনে অংশ নিতে না চাওয়া – এটাও খুবই ন্যায্য ও আইনি ফ্রেমের মধ্যে থাকা বক্তব্য। এটা কোন আদালতও অন্যায় বলতে পারে না। কিন্তু আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি বড় লীগার হয়ে এটাতেই সুখরঞ্জন বিএনপিকে (জামাতের সাথে ট্যাগ করে যেখানে ২০২২ সালের আগেই বিএনপি আগের ২০ দল ভেঙ্গে দিয়েছে) জঙ্গীত্ববাদ অভিযুক্ত করতে চেয়েছে।
    দ্বিতীয়ত আরো বড় পয়েন্ট হল, আমেরিকা এই নির্বাচনে হাসিনা সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। আর একারণে স্বভাবতই বিএনপি তার আন্দোলনে কোন সহিংসতা করলেই আমেরিকা বা স্থানিয় এমবেসি,  বিএনপির বিরুদ্ধেই অবস্থান নিবে। অন্তত সমালোচনা ও অভিযুক্তও করতে পারে; আর সেটা বিএনপি জানে। কাজেই কোন যুক্তিতেই বিএনপিকে সহিংসতার পথে যাবে না। তাই এমন অভিযোগ তোলা – এটা তো আওয়ামি লীগও করছে না। অথচ সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত নিজেকে খুবই বুদ্ধিমান জ্ঞান করে আওয়ামি লীগকে রাস্তা দেখানোর নামে এলেখা লিখেছে। অথচ এটা দাসগুপ্তের  সবচেয়ে স্টুপিড লেখা ও আর্গুমেন্ট। এটা এতই স্টুপিড যে আওয়ামি লীগও দাসগুপ্তের স্টাইলে বিএনপিকে অভিযোগ করছে না। বরং এই প্রথম (লীগ নিজেই দিয়েছে বলে অভিযোগ) গাড়িতে আগুন দেয়া ফলে জঙ্গীবাদের অভিযোগ বিএনপির বিরুদ্ধে খাড়া করা যায় কিনা সেটা বাজায় দেখতে চাইছে। যদিও তা জমে নাই।  মানে লীগ বুঝায়ে দিয়েছে লীগকে রতাজনীতি শিখানো ; এটা সুখরঞ্জনের কাজ না। আসলে এজন্যই বলেছি, সুখরঞ্জন এর কথা হয় না।!
    তাহলে, এখন সুবীর কোথায় এসে ঠেকেছে? এই সুখরঞ্জন দাসগুপ্ত যিনি নাকি “কোর্টের রায় বুঝেন না” তিনিই এখন সুবীরের শেষ ভরসা।  সুবীর এই সর্বশেষ লেখাটা তিনি  এই দাসগুপ্ত এর কাঁধে সওয়ার হয়েই লিখে দিয়েছেন। মানে ইন্টেলিজেন্ট এজেন্সির এই  এজেন্টের রেফারেন্সে লিখে দিয়েছেন। এটাই সুবীরের খড়কুটো আকড়ে ধরার দশা বটে!

    The “Dorbesh coterie”  বা সুখরঞ্জনের দরবেশ কোটারিঃ
    সুখরঞ্জন এর যেকোন বয়ানই অচল হচ্ছে এবং হবেই – এর মূলকারণ তিনি সবকিছুকে হিন্দু বনাম মুসলমান বা হিন্দুরা ভাল মুসলমানে মানে খারাপ –  এই স্টাইলে যেটা ষাটের দশকের নেহেরুয়ান বয়ান বা জমিদার-হিন্দুর বয়ান – আর এর উপর দাঁড়িয়ে বলা কথা। এই স্টাইল ক্লিশে [Cliché] মানে অতিব্যবহারে জীর্ণ। তাই এই বয়ান আওয়ামি লীগের জন্যও বিপদজনক এবং বুমেরাং হবার সম্ভাবনা। তিনি বেক্সিমকোর সালমান রহমানের (যাকে সাধারণ্যে দরবেশ বলার রেওয়াজ আছে। কিন্তু সেটা কোন খারাপ অর্থে না। সম্ভবত তার কোন সন্তানের মৃত্যুর পরে তিনি এমন দাড়ি রাখা শুরু করেন তাই পাবলিক যেন বলতে চায় তিনি এত সৎ লোক নন)  উপর চড়াও হয়ে কথা বলার চেষ্টা করছেন। প্রথমত এটা লীগ বা সরকারের কাছে অগ্রহণযোগ্য। বিপরীতে সুখ্রঞ্জন দরবেশ বলতে তিনি পাকিস্তানি এই হুজুগ তুলতে চান। এটাই তো জমিদার হিন্দুর হিন্দুত্ববাদী ভাষ্য। এটা এমনই অগ্রহণযোগ্য যে লীগও এতা খায় নাই। আর কেন না জানে সালমানের পরিবারের অনেকের বিয়ে হয়েছে পাকিস্তানি ফেমেলির সাথে সেই পাকিস্তান আমল থেকেই। আর এটা কী অপরাধ??? এটা হিন্দুত্ববাদের চোখে অপরাধ হতে পারে যা একটা বড়সড় গাধামি!!!
    তামসাটা হল সুবীরও এতই দেউলিয়া হয়েছে যে সেও হিন্দুত্ববাদি চোখে ও মনে  সুখরঞ্জনের দরবেশ কোটারি বক্তব্যকে আপন করেছে। গল্প-প্রপাগান্ডা করেছে হাসিনা নাকি এমন দরবেশ কোটারি মানে পাকিস্তানিদের পাল্লায় পড়েছে  আর এছাড়া এমন নাকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনসহ নয়জন মন্ত্রী আছে।  এটা টু মাচ!!!
    বটম লাইনটা হল ভারতের র এই সংস্থা হিন্দুত্ববাদি হতে পারে না। অর্থাৎ আমি বলতে চাই, বজরং দল বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এর কাজ আর র-এর কাজ এক হতে পারে না। একই ধরণের সংগঠন তারা নয়।  র এই সংস্থা হিন্দুত্ববাদ সময়ে কাজে লাগাতে পারে পরিমিত ভাবে কিন্তু এর জন্য সংগঠনের পেশাদারিত্ব ক্ষুন্ন হতে পারবে না। তা যদি বজায় না রাখতে পারে তবে এটা পরের রাষ্ট্রে অন্তর্ঘাত কাজ করার মত ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান হতে অযোগ্য হবে। অকেজো ও ধবংস হয়ে যাবেই! অথচ সুখরঞ্জন ও সুবীর মিলে  র এই সংস্থাকে যেন বজরং দল ঠাউরিয়েছে!!!
    ওদিকে এক বিরাট তামাসার কথা হল সালমান রহমান কত কোটি ডলার মানি লন্ডারিং করেছে এর ফিরিস্তি নিয়ে হাজির হয়েছে। মানে ধরে নিয়েছে হাসিনা যেন ঘাসে মুখ দিয়ে চলে!! বুদ্ধিসুদ্ধি কিছু নাই!!!  অথচ এতে এরা দুজনই যে চরম বেকুব দুই মহাজন সেটা তারা নিজেরাই বুঝতে পারছে না।
    তাই, শুধু এই সুবীর ভৌমিক বা সুখ্রঞ্জন দাসগুপ্ত এরাই কোঙ্কিছু চিন্তা করতে বেকুব আর অযোগ্য হিশাবে নিজেকে তুলে ধরেছে তাই নয়,  সারা ভারতীয় প্রাতিষ্ঠানিকতা-ই  বা এস্টটাবলিশমেন্টই এমন মফস্বলি এটাই উন্মোচিত হয়ে পড়েছে।  – ভারত পরাশক্তি হওয়া দূরে থাক কোন শক্তিই নয় সেটাই ভৌমিক ও দাসগুপ্ত নিজেরাই হাজির করে দিয়েছেন।

    কেন চীনের প্রতি ঈর্ষাকাতর বলেছিঃ
    সুবীর অভিযোগ আকারে বলছেন, চীনা বিশেষ দুত নাকি হাসিনা সরকারকে আমেরিকা মোকাবিলার কিছু টিপস দিয়েছে। আর এটাতেও ভারত উদ্বিগ্ন!!  এটা আসলে একতা গাধা-গরুর আলাপ হয়েছে।
    হাসিনা যেখানে আমেরিকার প্রবল চাপ আছে সেখানে চীন যদি এমন কিছু টিপস দিতে চায় বলাই বাহুল্য সরকার বা মোমেন তা শুনতে আগ্রহিওই তো হবেই। এটাই তো সেলফ-ইন্টারেস্ট বা নিজস্বার্থ। অথচ সুবীর আশা করছেন হাসিনা এখানেও ভারতের স্বার্থের চোখে তাকাবেন…। এটা এক গাধা-গরুর আলাপ ছাড়া কী?
    দেখেন Tips to handle US? উপশিরোনামে সুবীর বা দাসগুপ্তকে রেফার করে লিখছেন, “we have good reasons to believe China was providing Bangladesh with a brief to handle the US,” । মানে চীনের এমন পরামর্শ কেন হাসিনা নিল? যেন এটা নেয়া হাসিনার অপরাধ হয়েছে???? 

    দিন কে দিন দেখা যাচ্ছে সুবীর ভৌমিক বা দাসগুপ্ত – রা এমন গারবেজ লেখা প্রসব করা শুরু করেছেন…!

     

    আপডেটেডঃ    ০৬ আগষ্ট ২০২৩; দুপুর ১১ঃ০২
    আপডেটেডঃ     ২০২৩;

    >>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com