Category: INDIA

  • একজন শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; সহযোগী সম্পাদক, সমকাল

    একজন শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; সহযোগী সম্পাদক, সমকাল
    গৌতম দাস
    ২৬ আগষ্ট ২০২৪
    https://wp.me/p1sCvy-5HS

     

    শেখ রোকন, সমকাল


    সরি সরাসরি নাম ধরেই বলতে হল।  তিনি কবে সমকালে ঢুকে গেছেন আমি খেয়াল করি নাই।  কিন্তু এখন মানে হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির আশপাশের কালে সর্বক্ষণ তিনি; ওদিকে চোখ ফেলতে না চাইলেও চোখে পড়ে যাচ্ছেন। কারণ, তিনি যে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা এখন তলানিতে ঠেকেছে সেখানেই মুক্তি খুঁজছেন। তাদের এখনও ত্রাতা ভাবছেন!
    তিনি হয়ত কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতায় গভীর আস্থা রাখেন। তা রাখেন তাতে নতুন অসুবিধা নাই। সেটা ব্যক্তিগত পছন্দ! কিন্তু সাথে সময়কাল সংক্রান্ত জ্ঞান না থাকলে তা আত্মঘাতি। এই সময়কালটা হল, হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির আশপাশের কাল। হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি উত্তরকালে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলরা এবার আর নিজেদের নয়া পরিচয়ের কোন নৌকা ভাসাতে ব্যর্থ হয়েছে অথচ এটাও আপনি খেয়াল করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই তবু সেই তাদেরকেই [কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল] যারা নিজেরাই নিজেদের অতলে হারিয়ে ফেলেছেন সেখানেই আপনি এখনও মনিমুক্তা খুঁজছেন!   ঠিক যেমন ২০০৯ সালে হাসিনা উত্থানের যুগের শুরুতে এই গোষ্ঠি তারা কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতায় হাসিনার গুম-খুনের রাষ্ট্র বানানোটাকে মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর  চেতনা পক্ষে কাজ গণ্য করে এর পক্ষেই মানে হাসিনার ক্ষমতার পক্ষেই সাফাই যোগাড় কর্তা হয়ে হাজির হয়েছিলেন; শাহবাগে জড়ো হয়েছিলেন! ঠিক সেভাবেই আবার হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির কালেও আবার নৌকা বদলাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মানুষ এদেরকে ২০১৩ সালে তাদের শাহবাগী প্রকল্পের কালেই তাদের চেহারা দেখে ফেলেছিল। তাই হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির কালেও তারা এবার আর কোন নৌকাতেই উঠতে পারেন নাই।
    অথচ আপনি নিয়মিত এদেরকে নয়া (যদিও তা সেই পঁচা) উপস্থাপনাই হাজির করার জায়গা করে দিয়ে চলেছেন! কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতায় আপনার ভক্তি যাচ্ছেই না; অথচ এই অতিভক্তির খেসারত শুধু আপনি না দেশের মানুষ তো বটেই সাথে আপনার পত্রিকার স্টাফ ও মালিক সকলকেই বইতে হবে। কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা গত শতকেই (মানে ২০০০ সালের আগেই) মৃত হয়ে গেছে। তবে এটা মোটা দাগে বলা কথা! একচুয়ালি এটা আনুষ্ঠানিকভাবে মরে গেছে ১৯৯১ ডিসেম্বরে; প্রতীকীভাবে বললে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবার পরে।
    একথাটা বাংলাদেশিদের বুঝবার জন্য সহজ করে বলি।

    মনিসিংহ-খোকা রায় এসব জমিদার-সন্তানদের হাত ধরে ১৯৪৮ সালে শুরু হওয়া পুর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির (যেটা এখন মূলত সিপিবি নামে) কথা কমবেশী সকলেই জানেন। যেটা একালে মানে ১৯৯১ সালের পরে ভেঙ্গে যাওয়া একাংশ মুজাহিদুল সেলিম বা প্রিন্সদের অংশকে কেবল আপনারা দেখতে পান। অপর অংশ মানে যারা অন্তত এখনও পার্টির সম্পত্তিতে তৈরি হওয়া বহুতল ভবনের অপর অংশের মালিক; এরা এখন কোথায়? এর উত্তরে এটুকু বলা যায় এই অংশ আর সেলিম- মঞ্জুরুলদের মত আরেক সিপিবি’র  কোন ‘কমিউনিস্ট পার্টি’ খুলে নাই। কেন?
    পঙ্কজ ভট্টাচার্য, অজয় রায়েরা কোথায় হারিয়ে গেলেন? আগে যে রীতি চালু ছিল যে বাংলাদেশে হিন্দুরা জন্মানো মাত্রই পরিবারসহ নিজেকে ‘কমিউনিস্ট’ গণ্য করত; এই রীতিতে ছেদ পরেছিল তাতে! কিন্তু কেন?
    এখানেই উত্তর পাবেন কেন জমিদার-সন্তানদের হাত ধরে ১৯৪৮ সাল থেকে নতুন করে “পুর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি” শুরু হয়েছিল। মূল ঘটনা হল, পাকিস্তানের জন্ম মানেই কার্যত জমিদার উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া – জমিদার-হিন্দু আধিপত্য ও  দুশ বছরের জমিদারি রুস্তমি খতম তাদের শাসন উচ্ছেদ – এটাই ঘটেছিল। এরই লিগাল বা আনুষ্ঠানিক উচ্ছেদ হল পুর্ব-পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে ১৯৫০ সালের জমিদার উচ্ছেদ আইন আনা। যেটা ১৯৫১ সালের আগষ্ঠে অনুমোদিত বা আইনে পরিণত হয়েছিল। আর এতে ক্ষুব্ধ জমিদার-হিন্দুরা এটাকে দেখেছিল এতদিন যাদেরকে তাঁরা পায়ের নিচে দলে  রেখেছিল সেই মুসলমানদের মাথা তুলে দাঁড়ানো। অন্যভাষায়, সেই থেকে – ইসলামই তাদের এনিমি বা স্থায়ী শত্রু। আর একারণে ইসলাম কোপানো (ধর্ম কোপানোর সুবিধা একমাত্র কমিউনিস্ট হলেই পাওয়া যেতে পারে বিবেচনা থেকেই) এই সুবিধা পাবার লোভ থেকেই জমিদার সন্তানেরা কমুউনিস্ট হয়ে গেছিল। না হলে মানে এরা নুন্যতম সাচ্চা কমিউনিস্ট হলে তো সবার আগে জমিদারী উচ্ছেদের পক্ষে তাদের কমিউনিস্ট পার্টির (চীনপন্থি অংশসহ সকলের) অন্তত একটা রেজুলেশন থাকত! তা নাই কেন? সিপিবি’র জবাব দেয়া উচিত!

    ভুমি মালিকানা ব্যবস্থা নিয়ে খোদ কার্ল মার্কসের মৌলিক অবস্থান কী? তা কী এসব হিন্দু-কমিউনিস্ট এরা কখনও পড়ে দেখেছেন? কোন প্রমাণ নাই তাই মনে হয় না। অথচ মার্কস মনে করেন, জমিতে যেকোন (মানে জমিদারিসহ) মালিকানা ব্যবস্থা থাকা মানে ক্যাপিটালিজম বিকাশের পথ রুদ্ধ করা; মানে মার্কসের মূলকথা তাদের ভাষায় “পুরানা ফিউডাল সম্পর্ক”  বা সামন্তবাদ থেকে যাবে; যেমন, জমিদারতন্ত্র বিলুপ্ত হবে না এতে।
    অথচ এই জমিদার নন্দন কমিউনিস্টেরা  আমাদের ইলা মিত্রের (কমিউনিস্ট হবার পরেও) তেভাগার গল্প শুনায় যার স্বামী (পুরানা) রাজশাহীর এক জমিদার ছিলেন। আসলে, কে জমিদার ছিলেন না?
    প্রমথ চৌধুরী, কিশোরগঞ্জের জমিদার নীরোদচন্দ্র চৌধুরী (আত্মঘাতি বাঙালির লেখক)?

    আবার এদের কান্ড দেখেন,  জমিদার-হিঁন্দুর ১৯০৫ সালের “বঙ্গভঙ্গ বিরোধী” আন্দোলন নাকি পুর্ববঙ্গের স্বার্থে! অথচ প্রকৃত ঘটনা এর উলটা। সুর্য সেন ছিলেন, জমিদার-হিঁদুর স্বার্থের লেঠেল বা লাঠিয়াল! প্রীতিলতা বা কল্পনারাও তাই! অথচ তাদের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল!!!  এর বিরুদ্ধেই পরের বছর ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল। সত্যি কথাটা হল,  পুর্ববঙ্গে জমিদার উচ্ছেদ এর কাজ শুরুর ক্ষেত্রে এক নম্বর প্রথম বীর হলেন হাজী শরীয়তুল্লাহ! এনিয়ে আমার লেখা পড়ে নিতে পারেন! অরিজিনালি লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল ২০১১ সালে।

    হাজী শরীয়তুল্লাহ ও গণ-প্রতিরোধ
    গৌতম দাস
    আগস্ট ১২, ২০১৬
    http://wp.me/p1sCvy-1EO

     

    তাই এককথায়, ইসলাম কোপাতেই আর পুরানা জমিদার-হিন্দুর হারানো আধিপত্য যতটা পারা যায় ফিরিয়ে আনা ঘটাতেই ১৯৪৮ সাল থেকে আমাদের এদিকে  “পুর্ব-পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির” গঠন হয়েছিল। আর তা থেকেই ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের জন্ম!

    আর সেকারণেই ১৯৯১ সালে সোভিয়েত পতনের পরে তারা একেবারেই হতাশ হয়ে পরেছিল যে কমিউনিজমের আড়ালে ইসলাম কোপানো ব্যাপারটা আর কাজ করবে না,  এটাই ভেবেছিল।

    যদিও মোট মাত্র ৯ বছরের মধ্যে তারা নতুন রাস্তা খুঁজে নিয়েছিল। ২০০১ সালে প্রায় সকল কমিউনিস্টেরাই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বুশের কোলে উঠে গিয়েছিল – সে তখন থেকেই এক নতুন বাপ তাদের! যে আর “মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ” নয় তখন থেকে!  কারণ সে আবার ইসলাম কোপানোর ফয়দা- এই লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ট দিবে পুরান কমিউনিস্টদেরকে। এই হল, পুরান কমিউনিস্টদের কাছে নাইন-ইলেভেন – টুইন টাওয়ার হামলা – ওয়ার অন টেরর এর মূল তাতপর্য ।  যা এক নয়া রাস্তা হয়ে এসেছিল জমিদার-হিন্দুর হারানো আধিপত্য ফেরত পারার আশা হিসাবে!

    আর এসব কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল  এদের ততপরতায় বাংলাদেশের নীট ক্ষতিটা হল, বাংলাদেশের জনমত – ইসলামিজম আর প্রগতিশীল বলে শার্প আর বিপদজনকভাবে দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেছিল। সমাজে মতভেদ থাকা একজিনিষ আর ইসলাম কোপানো বা নির্মুলের চিন্তা আরেকটা! আর এর ফাঁক দিয়েই হিন্দুত্ববাদ ও র-এর ততপরতা বাংলাদেশে জেঁকে বসেছিল।
    অথচ হাসিনা উতখাত বা মন্দির রক্ষা আর এখনও জীবন্ত বন্যা মোকাবোলা প্রশ্নে এই প্রথম ২০০১ সাল থেকে চলে আসা নয়া শতকে এখন ২০২৪ সালে এসে, এই প্রথম আমরা একতাবদ্ধ এক জনগোষ্ঠি!

    একারণের বলেছি ২০০০ সালের পরের নয়া শতক থেকে পুরান  কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা মৃত হয়ে আছে!  আর তখন থেকে যেকোন পুরান (বেশির ভাগ) কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল এর মুখ দিয়ে বেরোনো প্রথম শব্দ হল (যেমন ইনুকে স্মরণ করতে পারেন) জঙ্গীবাদ; মানে আর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ না।  এসবের হাত ধরেই গত ষোল বছরের হাসিনার ফ্যাসিজম এর পক্ষে সাফাইদাতা হল কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা। শাহবাগ কী ছিল? কারা তাত্বিক সমর্থন দিয়েছে সাফাই দিয়ে পত্রিকা বের করেছিল? এরা আর এটাই জমিদার-হিন্দুর কমিউনিজম-প্রগতিশীলতার আড়ালে জমিদারি চিন্তা আধিপত্য রাজনীতি ফিরিয়ে আনার ততপরতা! যে জমিদারি চিন্তা আধিপত্য রাজনীতি এর পিঠে পা দিয়েই ইন্ডিয়া বা র-এর ততপরতা বাংলাদেশে ছেয়ে গেছিল!

    অথচ গত শতকের পুরান কমিউনিজম এর কোন পুণর্মুল্যায়ন মানে আবার একে ভেবে দেখা, ঢেলে সাজানো (খোদ মার্কসের ভাষায় যেটা পর্যালোচনা -Critique) এটা ছাড়া এই মুরোদ ছাড়া কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা এরা সকলেই কঠিনতম রাজনৈতিক অপরাধী! যেহেতু নয়া শতকে এসে পুরান কমিউনিজম একেবারেই মৃত!

    আপনি শেখ রোকন এসব দিকে বেখবর! সেকারণে আপনি এসব পঁচা কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল নতুন করে কথা বলতে দিবার দাওয়াত দাতা – জায়গা করে দিতে এগিয়ে এসেছেন। আমি “গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি” এর কথা বলছি বুঝতে পারছেন আশা করি।
    গত ৫ আগষ্ট  আপনি এদের প্রধান নেতা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর একটা সাক্ষাতকার ছাপিয়েছিলেন। শিরোনাম ছিল “উভয় পক্ষকে সাময়িক হলেও সমঝোতায় আসতেই হবে”। অথচ আপনাদের উভয়ের কপাল খারাপ । পরের দিনই হাসিনা পদত্যাগ করে গোপনে ভারতে পালিয়ে যায়। মানে হল না আপনার মিডিয়ার কেউ না, এমনকি  সাক্ষাতকারদাতা চিন্তাও করতে পারেন নাই যে বাস্তব পরিস্থিতি কী? কোন দিকে এর অভিমুখ! এর মূল কারণ  কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা তো আসলে মৃত, মুরোদহীন হয়ে আছে এটাই আপনারা জানেনই না; অথচ এই মৃত লাশের উপর মুখ লাগিয়ে আপনারা এর চর্চার গুনগান গাইতেছেন!

    বুয়েটের কনসালটেন্ট শিক্ষক যারা আপনার কাছে পরিবেশবাদ বুঝা বন্ধু-সুহৃদঃ
    যতদুর মনে পড়ে বুয়েটের এক ছাত্র আবরারকে হাসিনা সরকার ও তাদের কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল ক্যাডারেরা খুন করার পরে আপনি আমাকে ম্যাসেজ করেছিলেন। আপনার সাথে জেআরসি [জামিলুর রেজা চৌধুরী বুয়েটের প্রবীন শিক্ষক যিনি বাংলাদেশের যে কোন বড় ব্রীজ বা সিভিল প্রজেক্ট এর কনসালটেন্ট] কথা হয় যেখানে স্যার আমার নাম তুলেছিলেন প্রাক্তন ছাত্রনেতা হিসাবে আর সেদিন সেকথা আপনি আমাকে জানিয়েছিলেন। পাঠকেরা অনেকে জানেন হয়ত তবু জানিয়ে রাখি আমি ১৯৭৯ সালে প্রথম বুয়েটে ভর্তি হয়েছি্লাম কিন্তু গ্রাজুয়েট হয়ে বের হয়েছিলাম ১৯৯৩ সা্লে, মানে এরশাদ পতনের পরে বুয়েটে ফিরেছিলাম রেগুলার হয়ে তাই। মাঝের প্রায় দশবছর সক্রিয় রাজনীতি করে বেড়ানোর কারণে বুয়েটের বাইরে ছিলাম, বা ছাত্রত্ব ছিল না।  তবে মূল কথাটা হল আমার কঠিন রাজনৈতিক সক্রিয়তার জন্য (১৯৮০-৮৩) এই সময়কালের খুব কম ছাত্র-শিক্ষককেই পাওয়া যাবে যাদের কাছে আমি পরিচিত এবং ইতি-নেতি চরিত্র ছিলাম না। ভিসি থেকে সিনিয়র শিক্ষকেরা মূলত তাদের এপলিটিক্যাল [রাজনীতি খারাপ জিনিষ] এটিচ্যুডের কারনে আমার রাজনৈতিক সক্রিয়তাকে নেতি চোখে দেখতেন। যদিও এই রিটায়ের্ড বয়সে এসে এদের অনেকেই এখন উলটা আমাকে প্রশংসা করেন । (যদিও আমাকে এখনও ভালবাসেন এমন প্রবীন বুয়েট শিক্ষকের সংখ্যাও কম না।) আপনি শেখ রোকন আমাকে সেকথাই জানায়ছিলেন আমার যতদুর মনে পড়ে বলেছিলেন আমাদের আমল হলে এমন আববার হত্যা আমরা ঘটতেই দিতাম না।

    কিন্তু আমার শিক্ষকদের সম্পর্কে সাধারণভাবে আমার ব্যক্তিগত মুল্যায়ন তখনও যা এখনও তাই আছে!
    এরা মূলত এ-পলিটিক্যাল [রাজনীতি খারাপ জিনিষ মনে করা এটিচ্যুডের]। অথচ এরা প্রায় ব্যতিক্রম খুব কম এভাবে যত বয়স্ক হন ততই সরকারী কনসালটেন্সি পাবার বা ভিসি হবার দৌড়ে সরকারের কোলে উঠে পড়তেও দ্বিধা করেন না। এমনকি এখনও তারা রাজনীতিই বুঝেন না অথচ ভাব করেন তারা রাজনীতির তত্ব বুঝেন এমনকি পরিবেশবাদও বুঝেন! কী এক তামাশা!

    এদের তামাশার একটা নমুনা দেখেনঃ
    যেখন দেখেন এবারের সিলেট-কুমিল্লা-ফেনী-লক্ষীপুর-চট্টগ্রাম ডুবে যাবার পরে – “রাজনীতির অংশ নয় এই বন্যা আইনুন নিশাত – এই লেখাটা ছাপা হয়েছে সমকালে।
    আইনুন নিশাত উনি অরিজিনালি বুয়েটের সিভিলের শিক্ষক; উনি  রাজনীতি বলতে কী বুঝেন? এছাড়া উনি তাহলে কী রাজনীতি বুঝেন? মনে হচ্ছে আসলে উনি রাজনীতি বলতে “দলবাজী” বুঝছেন। বুয়েটের ছাত্র হিসাবে আমার অভিজ্ঞতা হল বুয়েটের কোন শিক্ষকের রাজনৈতিক-বোধ নাই। পলিটি (polity) ধারণা সে তো অনেক দুরের বাত! তা না থাক! কিন্তু তাদের ভান আর কোন দলবাজিকে রাজনীতি বলে বুঝা এটা অসহ্য, অগ্রহণযোগ্য।  এর চেয়ে অসহ্য হল এরাই আবার নিজ পেশার শেষের দিকে সরকারী প্রজেক্টের প্রধান কনসালটেন্ট হওয়া কিংবা ভিসি হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন; ফ্যাসিজমের কোলে উঠে গলা জড়িয়ে ধরে ঝুলে পড়তে দ্বিধা করেন না।

    এই যে  আইনুন নিশাত সাহেব “রাজনীতির অংশ নয় এই বন্যা” বলে ফতোয়া দিলেন – তাহলে উনি রাজনীতি বুঝেন বলে দাবি করে বসলেন! নাকি? অথচ এটাই হল তাঁর নিরেট ভারত-প্রীতি। সোজাসাপ্টা করে বললে ভারতের পক্ষে, লীগের পক্ষে দালালি। এছাড়া নিজ ইঞ্জিয়ারিং টেকনোলজি ও এনভায়রণমেন্ট বুঝবার অযোগ্যতাই উনি নিজে ধরেছেন!

    কমন নদী বা প্রবাহিত অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশের এমন নদীতে সমান হিস্যা ও অধিকার থাকে। তাই অভিন্ন নদীতে বাধ-ড্যাম বা এর প্রবাহে যে কোন বাধা সৃষ্ঠি করা এমনকি পানি টেনে অন্যদিকে নেওয়া ইত্যাদি সব কাজই অবৈধ; ভাটির দেশের অধিকারকে ক্ষুন্ন করা – এসব কথা উনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, কথিত পরিবেশবাদী বা দাবিকৃত রাজনৈতিক-বোদ্ধা হয়েও জানেন না। আসলে না জেনে এসব কথা বলার মজাই আলাদা তাই না!

    কী আর বলব? উনি আমাদের শিক্ষক হয়ে বসে আছেন! সারাজীবন এরাই [জেআরসি সহ সেকালের সিনিয়র শিক্ষকেরা] আমার-বিরুদ্ধে গালাগালি করে গেছেন যে আমি নাকি বুয়েটে ছাত্রদের মধ্যে রাজনীতি ঢুকিয়েছি! অথচ তারা প্রায় সকলেই কনসালটেন্ট কিংবা ভিসি হওয়ার জন্য ফ্যাসিজমের কোলে উঠে বসতে দ্বিধা করেন নাই, এখনও করছেন ভারতের দালালি!

    এবার শেখ রোকনের কথায় আসিঃ
    আর শেখ রোকন তিনি নাকি কোন নদী বিষয়ক, পরিবেশ বিষয়ক এনজিও সাথে যুক্ত বিধায় তিনিও  আইনুন নিশাত সাহেব এর সমর্থন পেয়ে দাবি করছেন এবারের বন্যায় সবই বৃষ্টির পানি, ভারতের দোষ নাই। আর সাথে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও তাঁর সাথে আরও কিছু শাহবাগী কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের [যারা সেসময় সর্বজন কথা বের করতেন] পাল্লায় পড়ে তাদের লেখা এখন প্রমোট করছেন শেখ রোকন, হয়ত ভাবছেন আমরা বন্যায় ভারতকে দায়ী করে সাম্প্রদায়িকতা করছি! অথচ শেখ রোকন আপনিও অপরাধী! অজ্ঞ থেকে মিথ্যা প্রপাগান্ডা করার অপরাধে।

    আগে পরিবেশ কী তা বুঝেনঃ
    আগে পরিবেশ কী তা বুঝেন। এটা অন্তত বস্তুবাদ না যে সাইন্স বা বিজ্ঞানের জ্ঞানে আপনি তা বুঝে যাবেন; ইঞ্জিনিয়ারদের লগে ঘুরে ঘষাঘষি করলেই শিখে যাবেন! অন্তত কিছু ফিলসফির মৌলিক জ্ঞান-ধারণা ছাড়া কেউই   পরিবেশ বুঝতে পারবে না। যেমন পরিবেশ শব্দটাই ভুল! প্রাণ-পরিবেশ বলা উচিত তাহলে আপনার যে কিছু হুশ আছে তা বুঝা যাবে।

    আবার আরও কিছু সহজ পথও আছে।
    পারিবারিকভাবে মুসলমান নাম করে আছেন যারা সেই ভরসায় বলছি। নূহ-নবীর নাম না চাইলেও তো জেনেছেন শুনেছেন। এই নাম ও সাথে তার বয়ান ও এর তাতপর্য বুঝতে মনোযোগ দেন। অনেক ফয়দা হবে।  হুমায়ুন আজাদ বা জাফর ইকবালসহ কথিত যত বিজ্ঞানবাদী আছেন তাদেরকে  মাথা থেকে ফেলেন আগে আর এসবের চেয়ে নূহ-নবীর তাতপর্য অতুলনীয় শ্রেষ্ঠ! শুনতে অবাক লাগতে পারে কিন্তু এটাই কঠিন সত্য!
    আচ্ছা আপনা্রা তো কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলতা শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করে ইসলাম কোপানো কে ফরজ জ্ঞান করেন। তাই আসেন নূহ-নবী বাদ রাখেন। ক্রিশ্চানিটিতে নোহা [NOAH]  এর কনসেপ্ট আছে। অথবা আসেন হিন্দুত্ববাদই তো শ্রেষ্ঠ প্রগতিবাদ; আসেন সেখানে আসেন। সেখানে মনু-অবতার (অবতার মানে সনাতনি ব্যাখ্যা হল আরেক দুনিয়া থেকে যে এই দুনিয়াতে মানুষকে উদ্ধারে সময় সময়ে ‘অবতরণ’ করে আসেন) খুঁজে দেখেন। সব জায়গায় মানে সব থিওলজিতেই (ধর্মতত্বে) কমন একটা জিনিষ পাবেন একটা নৌকার প্রতীক আর দেখবেন জোড়ায় জোড়ায় প্রাণ-প্রজাতি নূহ-নবীর মতন করে ঐ নৌকায় তুলছেন!
    যেকোন ধর্মতত্ব মেটাফরিক্যাল [metaphor] ভাষায় দুনিয়ায় হাজির হয়;  এর সোজা মানে, এর ভিতর একটা গভীর মানের দিক আরেকটা  সাদা-সাপ্টা মানে থাকে। চিন্তার মুরোদ থাকলে, ওর গুঢ় অর্থের দিকটা তালাশ করেন। রব এর গুণ, প্রতিপালক এর গুণ বৈশিষ্ঠ যদি বুঝেন আপনার উপর হেদায়েত হয়ে থাকে তবে বুঝবেন নূহ-নবী সংক্রান্ত প্রতীক মেটাফোর!

    আবার ভুল বুঝেন না যে আমি আপনাকে ধর্মে মনোযোগী হতে বলছি। সেটা আপনার ব্যক্তিগত! বলছি পারিবারিকভাবেই যেটা আপনার ভিতর যতটুকু আছে যা আপনি কখনও এক্সপ্লোর করেন নাই; মেরে ফেলেছেন কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলদের পাল্লায় পরে; ইসলামবিদ্বেষে আর বিজ্ঞানবাদীতাই – সেটা ফিরে এখনও মনে করে হাতড়ে দেখলে এখনও অনেক কিছু পেতে পারেন। ধর্ম পালন না করেন সেটা আমার এখানে বিবেচ্য নয়; কিন্তু সবার আগে ধর্মতত্বকে তুচ্ছ জ্ঞান করারটা অন্তত ত্যাগ করেন।

    আর যদি মুরোদ হয় তবে ফিলসফির মৌলিক কিছু দিকে পথ ধরে আগাতে হবে। স্পিরিট [Spirit) বুঝতে হবে মানে, মানুষ স্পিরিচুয়ালও। অর্থাৎ মানুষ কেবল বস্তু না – কেবল এক ফিজিক্যাল ফেনোমেনা নয়। তাই কেবল বিজ্ঞান এর বুদ্ধি দিয়ে মানে যেটা ইম্মানুয়েল কান্ট [1724-1804] এর বিজ্ঞানবোধ বা লজিক (চিন্তার লজিক্যাল বা র‍্যাশনাল পদ্ধতি)  – এসব দিয়ে মানুষ বুঝা সম্পন্ন হবে না।  মানুষ স্পিরিচুয়ালও এদিকটা বুঝা যাবে না।। তাই সেদিক্টাও মানে কান্ট এর এই চিন্তার পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা বুঝতে হবে যেটা কান্ট [মানে kantian logic / rationality] এর সীমাবদ্ধতা! অন্যভাষায় এটাইকেই বলছি,  ফিলসফির মৌলিক কিছু দিকে পথ ধরে আগাতে হবে। স্পিরিট বুঝতে হবে মানে মানুষ স্পিরিচুয়ালও। তাতে স্পিরিটের অর্থ ধর্মতত্ব দিয়ে বুঝেন কিংবা হেগেলের (absolute Spirit) স্পিরিট অর্থেই বুঝেন তাতে অসুবিধা নাই – হেগেলের স্পিরিট যেটার বাংলা অনেকে করেছেন প্রজ্ঞা। আবার  আধাবুঝের ধর্মতত্ব দিয়ে অনেকে এটাকে আধ্যাত্ববাদ বলে এক স্টুপিড বা পচা বাংলাও করে থাকেন অনেকে!
    আর এরপরেও যদি চিন্তার মুরোদে কুলায় তবে হেগেলকে মার্কস কিভাবে ও কোথায় কোথায় বদলে নিয়েছেন ততদুরও যেতে পারেন। এটাই খোদ মার্কসের গুরুত্বপুর্ণ অবদান যেটাকে বলে, আইডিয়াল [ideal] আর রিয়েল [real] এর ফারাক কী – সেই প্রসঙ্গ! তবে মনে রেখেন এই অংশের খবর ব্যক্তি স্টালিন ও স্তালিনের অনুসারী (কার্যত এটাই আবার মার্কসবাদ বলে সারা দুনিয়ায় পরিচিত; যেকারণে আমার অনুবাদ বইয়ে বলেছি মার্কস আর মার্কসবাদ দুইট আলাদা) এমন এদের কারো কাছেই নাই; জানা নাই। এদিকটা বুঝতে জর্মান ইডিওলজি পড়তে হবে। বিশেষ করে ফয়েরবাখ সম্পর্কে মার্কসের গুরুত্বপুর্ণ মূল্যায়ন কী আছে সেখানে, সেটা!
    কেবল একটা নোট দিয়ে রাখতে পারি। আমার নিজের ওয়েব সাইট [goutamdas.com] যেখানে আমার নানান লেখা গত ১০ বছর ৫০০ এর বেশী হয়ে গেছে বলে আমাকে জানিয়েছে। ওখানে গান্ধীর সত্য মানে ‘ট্রুথ’ নয়, ফ্যাক্টস নামে আমার একটা লেখা আছে। ওখান আসলে আমি  আইডিয়াল [ideal] আর রিয়েল [real] নিয়ে মার্কসের ধারণাটা প্রয়োগ করেছি – গান্ধীর চিন্তা ভাবনার বৈপরীত্য-কে দেখিয়ে দেবার জন্য। কাজেই শিরোনাম দেখে ওটা গান্ধীর উপরে লেখা মনে হলেও আসলে ওটাই হেগেল প্রসঙ্গে মার্কসের অবস্থান নিয়ে লেখা! বুদ্ধিমানেরা সেভাবে পড়তে পারেন!

    তবে আমাদের এখানে এই লেখার প্রসঙ্গে মৌলিক রাজনৈতিক বুঝাবুঝির মুল জায়গাটা হল, কমন বা অভিন্ন নদীর পানির উপরে ভাটির দেশের অধিকার বা সম-অধিকার।
    এই জায়গায় আইনুন নিশাত সহ সকল ইঞ্জিনিয়ার বা বিজ্ঞানবাদীতার নামে ভারতীয় দালালদেরকে আমাদের উপরে ফেলে দিতেই হবে!

    এই কথাটা শেখ রোকন যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন ততই সেটা উনার ব্যক্তিগত, উনার পত্রিকার স্টাফ ও মালিকের জন্য ভাল ও সঠিক হবে! নইলে এরা সবাই জনগণের হাতে উপড়ে ফেলে দেওয়া দশাতে পড়বেন!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ   ০২ঃ৫৩ দুপুর  ২৬ আগষ্ট ২০২৪
    শেষ আপডেটঃ  ৩ঃ৩০ দুপুর  ২৬ আগষ্ট ২০২৪

     

  • ভারতের নির্বাচনঃ কংগ্রেসও সরকার গড়ে ফেলতে পারে

    মোদি হেরেছেন আগামিতে কী?
    এর অর্থ, তাতপর্য ও মূল্যায়ন” –

     

    ভারতের নির্বাচনঃ কংগ্রেসও সরকার গড়ে ফেলতে পারে
    গৌতম দাস
    ০৫ জুন ২০২৪ সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৭
    https://wp.me/p1sCvy-5Fv

    নরেন্দ্র মোদি ও রাহুল গান্ধী

     

    প্রথম আলোসহ অনেক মিডিয়ায় আজ ভোরবেলায় দেয়া রিপোর্টের শিরোনাম –   ৫৪২ আসনের চূড়ান্ত ফল: বিজেপি ২৪০, কংগ্রেস ৯৯ আসন। এটা অবশ্য একা প্রথম আলো না, এমনকি সারা ভারতের ইংলিশ পত্রিকাগুলোরও প্রায় কমন শিরোনাম এটাই!
    কিন্তু এই ফলাফলের এমন উপস্থাপন আমাদের দেশে এতে অর্থ খোলসা হবে না। বলা যায় কিছুই বুঝা যাবে না। কিন্তু যদি একই তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে করা বা দেয়া অন্য শিরোনামটা হয় এমন যে – “বিজেপি একা সরকার গড়তে পারছে না – আবার কংগ্রেসও গড়ে ফেলতে পারার দাবিদারও” – তাতেও এই নয়া শিরোনামও সঠিকই থাকে মানে, একই তথ্য-সম্মত রিপোর্টের শিরোনামই  থাকে।  আর সেক্ষেত্রে আমাদের লাভালাভ হত এই যে আমরা ভারতের এবারের নির্বাচনী ফলাফলের অর্থ-তাতপর্য সহজেই ধরতে পারতাম!  কারণ এমন নয়া শিরোনাম শুনলে বাংলাদেশীরা সবাই নড়েচড়ে বসবেন।  হ্যা, কথা একেবারে সত্য! এতটুকু বাড়িয়ে বলা হয় নাই;  আর এতে কোন যদি-কিন্তুও নাই।

    এবার একটু খুলে বলা যাক, তবে স্বল্প কথায় বললে, ভারতে সরকার গড়তে কোন দলকে ২৭৩+ আসনে বিজয়ী হতেই হয়। আর বিজেপি এবার পেয়েছে ২৪০ আসন। অর্থাৎ মোদির বিজেপি তাই এবার  ৩২-৩৫ আসনের ঘাটতিতে আছে। একথার অর্থ হল বিজেপি কোনভাবেই একা সরকার গড়তে পারছে না। এই অর্থে বিজেপি এবারের ফলাফল হল, বিজেপি হেরে গিয়েছে।  সেজন্যই  গতকাল সকাল দশটার পর থেকেই বিজেপির সুর বদলে ফেলেছে। মোদি আর নিজ দলের সকলেই বিজেপির নাম মুখে নেয়া বন্ধ করেছে; এর বদলে তারা তাদের রাজনৈতিক জোট এনডিএ [NDA, National Democratic Alliance] এই নাম বলা শুরু করেছে। যেমন দাবি করছে, এনডিএ (বিজেপি নয়) আবার ক্ষমতায় আসতেছে। আসলে বিজেপি যে একা আর সরকার গড়তে পারছে না সেটা মোদির অজানা ছিল না। কিন্তু আগের মতই হামবড়া “ভাব” বজায় রাখতে না পারলেও কর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে এই “সুক্ষ্ম কারচুপি” বা কথার ফাঁকি তৈরি করেছে যে বিজেপি নয়, এনডিএ আবার ক্ষমতা আসতেছে!

    বিজেপি এখন নিজের নাম ভুলে কেবল এনডিএ এনডিএ করছে, কেনঃ
    আসলে এতদিন মানে পিছনের দুবারই সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজেপিই সরকার গঠন করে থেকেছে। তাই বিজেপি যা চায় তাই জোটের বাকি সকলকে মেনে চলতে হয়েছে। এতে আবার, এতদিন এনডিএ আছে ঠিকই কিন্তু তেমন উচ্চারিতই নয়, এমন দশা হয়েছিল !  এছাড়া সবচেয়ে বড়কথাটা হল বিজেপির সবসময় যে  প্রধান নীতি মেনে চলেছে তা হল অন্যের দল ভাঙ্গিয়ে প্রার্থীকে নিজদলের প্রার্থী করা; আর তা করে গেছে অর্থ বা যেকোন “অবৈধ সুবিধার” লোভ দেখিয়ে। তাতে সেটা এনডিএ জোটের ভিতরের কেউ হতে পারে আবার বাইরেরও! কোন পরোয়া করে নাই। আর মোদির এসব কাজের অর্থের যোগান? সেটাও কোন অসুবিধাই নয়; কারণ, দলের ফান্ডের ভান্ডার আদানি বা আম্বানিরা তো আছেই! এরই পরিণতি হচ্ছে এনডিএ জোটের প্রায় সকল দলই (যাদের এবার মোট আসন হল ৫২) বিজেপি বা তাদের নিজ এনডিএ জোটের প্রতি আনুগত্যহীন! এতে সারকথাটা দাড়িয়েছে এই যে – না মোদি না তাঁর এনডিএ জোটের কেউ – কারোরই কোন স্থির কমিটমেন্টে আর কেউ নাই। সব পক্ষই যখন তখন অন্য জায়গায় সুবিধা দেখলেই এনডিএ জোট ভেঙ্গে ত্যাগ করে চলে যায় অথবা সময়ে জোটে ফিরে আসে  – এটাই এতদিনের কমন প্রাকটিস!  গতকাল সন্ধ্যা থেকেই তাই মোদির প্রধান দুর্দশাটা হল – বিজেপি এই নাম ভুলে গিয়ে এই জায়গায় এনডিএ জোটের নাম বসিয়ে উচ্চারণ।  এছাড়াও আরও সিরিয়াস দিক মানে, মোদির গত দশবছরের ইজ্জত ধুলায় মিটানোর মত দুর্দশা হল যে মোদিকে এখন থেকে দুই এন বা N  দিয়ে যাদের নাম নাইডু আর নীতিশ – এদের মন যুগিয়ে চলতে হবে, পা-ধরতে হবে।

    আজ ভোর থেকেই নিশ্চিত হওয়া এই কঠিন বাস্তবতা হল, মোদিকে এখন নিশ্চিতভাবেই এই ৫২ জনের হাত-পা চাটতে হবেই। আর তিনি তা ইতোমধ্যেই শুরু করে দিয়েছেন! যেমন এই ৫২ জনের মধ্যে বড় আসন ওয়ালা দুই এনডিএ জোট সঙ্গী দল হল – টিডিএ [তেলেগু দেশম পার্টি TDP] যেটা অন্ধ্রপ্রদেশ (হায়দ্রাবাদ) রাজ্যের দল; আর এরই মূল নেতা চন্দ্রবাবু নাইডু [Nara Chandrababu Naidu ]। আর আরেকজন হলেন বিহারের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার; দেখুন “এবার খেলা দেখাবেন নীতীশ কুমার, কার্ড তো তাঁর হাতেই, তাকিয়ে গোটা দেশ”। সবচেয়ে মজার কথা হল, কংগ্রেসসহ অন্যান্য মোদিবিরোধী দলের বর্তমান জোট ইন্ডিয়া [I.N.D.I.A] এর জন্ম বলা হচ্ছে মাত্র ১১ মাস আগে (July 2023)। আর এই জোট গঠনের উদ্গাতা ও প্রথম উদ্যোগীদের একজন হলেন কিন্তু এই নীতিশ কুমার; যিনি পরে আর এই জোটে আর থাকেন নাই কারণ, তিনি এসেছিলেন মোদির এনডিএ জোট ভেঙ্গে আর মোদি আবার তাকে বড় কোন “সুবিধার” বিনিময়ে আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন।  এককথায় গত দশবছরের মোদি জমানায় তিনি সমসময় মোদির পক্ষে, আর না-হয় মোদিবিরোধী  এদুই জোটের কোন একটার সাথে বারবার বদলাবদলিতে থেকেছেন।

    যদিও নীতিশের তুলনায় নাইডু – তিনি অনেক স্থির। বেশির ভাগ সময় তিনি কংগ্রেস ও তার বন্ধুদলের সাথে জোটের সঙ্গি থেকেছেন; কেবল এবারই সম্ভবত তিনি মোদির কোলে। তিনিই ইন্ডিয়ার আইটি খাতে যা সুনাম এর জনক! এককথায় গ্লোবাল আইটি খাতে একদিকে আমেরিকান গবেষণায় বুদ্ধি-পরিকল্পনা-ডিজাইন ইত্যাদি সবই তাদের আর অন্যদিকে তাতে ভারতের সস্তা কিছুটা এডুকেটেড শ্রমের অংশটা মাথা হল চন্দ্রবাবুর অন্ধ্রপ্রদেশ-হায়দ্রাবাদ রাজ্য। তাই ভারতের গৌরবজনক টেক সিটি [Tech city] বলতে এই হায়দ্রাবাদ।
    ওদিকে অন্ধ্রে কেন্দ্রের নির্বাচনের দিনই রাজ্য সরকারেরও নির্বাচন হয়ে যায় একই সাথে প্যারালাল, এমন চারটা রাজ্যের একটা সে। গতকাল পাঁচ বছর পরে নাইডু আবার রাজ্য নির্বাচনে (বিজেপির সাথে করা জোটে) বিপুল ভোটে ফিরেছেন। আর এদিকের হিসাবে, এবার নীতিশ-নাইডু মিলিয়ে তাদের মোট আসন প্রায় ২৮; নীতিশ ১২ আসন আর নাইডু ১৬ আসন। ফলে বুঝতেই পারছেন বর্তমানে এনডিএ জোটে থাকা  নীতিশ-নাইডু মোদির কাছে কত গুরুত্বপুর্ণ। যেমন নাইডুর বিজয়ে ইতোমধ্যেই নাইডুকে মোদি তোয়াজ করতে চলেছেন; বিজয়ে ফোন করেছেন। আগামি নয় জুন নাইডু নয়া মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিবেন আর তাতে উপস্থিত থাকবেন সম্ভবত মোদি স্বয়ং! দেখেন,  অন্ধ্র প্রদেশের বিধানসভায় শপথ নেবে, তখন সেখানে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং!  এর পরিকল্পনা চলছে।

    কিন্তু মোদির দিক থেকে দেখলে ভয়ঙ্কর কথাটা হল, বিজেপি জোটের নীতীশ-নাইডুর সঙ্গে যোগাযোগ করছে কংগ্রেস। খবরটা হিন্দুস্তান টাইমসের আমি নিজেই গতকাল রানিং এনডিটিভিসহ স্থানীয় হিন্দি চ্যানেলে দেখেছিলাম; তখন নির্বাচন নিয়ে কংগ্রেসের প্রেস ব্রিফিংয়ের পরে এই সংবাদ জেনেছিলাম। আর আজকে সব মিডিয়া লিখছে সব ছোট বড় দল এখন দিল্লিমুখি – মানে ধরাধরি পায়ে পরার কেনা বেচা এখন তুঙ্গে চলবে। আমাদের টিডিএস পত্রিকা সেগুলারই একটা সাম-আপ ছেপেছে – “মোদির ‘প্লেন’ ছেড়ে বিরোধী ‘প্লেনে’ নিতিশ? মাঝ-আকাশে জল্পনা তুঙ্গে!” । মানে হল নীতিশ কুমারকে নিয়ে টানা হেচড়া দরাদরি সম্ভবত চরমে উঠেছে।

    এসবের অর্থ কী?
    অর্থ খুব সোজা। মোদি একা (মানে কেবল বিজেপি) সরকার গড়ার দাবিদার নন; কারণ তাদের মোট আসন ২৪০ মাত্র, এটাই সব কিছু স্বাক্ষ্য! আর দ্বিতীয় কথা, আরো যে ৩২-৩৫ আসন মোদিকে যোগাড় করতেই হবে (যার মধ্যে নাইডু-নীতিশ মিলে ২৮ আসন থাকবে তা ধরে নেয়া আছে); আর এছাড়াও ৭-১০ জন আরো এমপি লাগবে; সাথে স্টান্ড-বাই আরো কিছু এমপি লাগবে। মজার কথা হল, এতে সব খুচরা আসন পাওয়া দলই এখন অনেক দাম হাকাবে। সবচেয়ে বড় কথা অলক্ষ্যে কংগ্রেসের ইন্ডিয়া জোটও যদি এতে মোদির চেয়ে বেশী সংখ্যায় এমপি যোগাড় করতে পারে তবে মোদিও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বাদ যাবেন। তাঁর তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার শখ খতম! যদিও ভারতের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রী হবার প্রথম সুযোগ ও আহবান মোদিই পাবেন; কারণ তার দলের অবস্থান ২৪০ এমপি।
    এমনকি আগামি দশদিনের মধ্যে যদি মোদি আপাতত এমপি যোগাড়ে সফলও হয়ে যান তবুও পরের দুমাসের মধ্যে আবার ক্রাইসিস দেখা দেওয়া – সেটাও অসম্ভব নয়। মোদির যোগাড় করা এমপিগুলো আগামি দিনগুলোতে নিজেই ভেগে যাবে বা কংগ্রেস ভাগায়ে নিয়ে যাবে – এমন শঙ্কার মধ্যেই কাটবে! এককথায় নিয়মিত এক ভাঙ্গাগড়ার ভিতর দিয়ে দুর্বলভাবে খাড়া করা কোন সরকারই বারবার গঠন হতে থাকবে!  এজন্য শিরোনামে বলেছি কংগ্রেসও দাবিদার হয়েই থাকবে। এনিয়ে আরো একটু বিস্তারে যাব পরবর্তিতে এলেখার শেষের দিকে।

    তাহলে আগামিতে ভারতে কী হতে যাচ্ছেঃ এক.
    আপাতত পয়েন্ট দুইটা।
    ১। ভারতের মোদির হিন্দুত্ববাদ এখানেই আটকে গেল; আরও আগানোর সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। ভারত হিন্দুত্ববাদ মুক্ত হতে থাকবে এখন থেকে; অন্তত উচ্চারিত হবে না আর! এটাকে বলা যায় হিন্দুত্ববাদের দিন শেষ; এর শুরু হল এখন থেকে!
    ২।  প্রমাণিত হল, হিন্দুত্বের সুরসুরি দিয়ে মানুষের পেটের ক্ষুধা বা কাজ না পাওয়া বেকারত্ব-কে ঢাকা দিয়ে সাময়িক চলতে পারলেও শেষে মোদি ফেল করতই; সেটা এবারই ঘটে গেল!

    হিন্দুত্ববাদের দিন শেষঃ
    গতকালই কলকাতা থেকে প্রথম আলোতে লিখেছে, নীতিশ-নাইডুর হাতে এখন বিজেপির বাঁচা-মরা। এটা আসলে খুবই কম করে বলা। কেন?
    গতকাল থেকেই কলকাতার আনন্দবাজার একেবারে মমতার পক্ষ আঁকড়ে ধরা অবস্থান নিয়ে ফেলেছে। আর কোন এদিক-ওদিক তাকানোর অবস্থায় নাই এই পত্রিকা! আজকেও এরা এক মুল্যায়ন রিপোর্ট লিখেছে। নিচে দেখেন।

    “ভোটের ফলপ্রকাশের পর মঙ্গলের সন্ধ্যায় ‘জয় জগন্নাথ’ দিয়ে মঙ্গলবার বক্তৃতা শুরু করলেন নরেন্দ্র মোদী (ঘটনাচক্রে, এ বার ওড়িশায় বিপুল জয়
    পেয়েছে বিজেপি)। দেশে তৃতীয় বার এনডিএ কেন্দ্রে সরকার গড়ার জাদুসংখ্যা পেরিয়ে যাওয়ার পর মোদীর ৩৪ মিনিটের বক্তৃতায় এক বারও
    ‘জয় শ্রীরাম’ শোনা গেল না। রামমন্দিরের কথা বললেন যদিও। বিজেপি নয়, জোর দিলেন এনডিএ নামক জোটের উপর। তাঁর ভাষণে বার বার
    শোনা গেল এনডিএ-র কথা”।

    আনন্দবাজারের অবজারভেশন তাতপর্যপুর্ণ! মোদির মুখে আর ‘জয় শ্রীরাম’ শোনা গেল না, নাই।  জোর দিলেন বিজেপি নয়, জোর দিলেন এনডিএ নামক জোটের উপর। আর এই কথাগুলোই আমিও উপরে বলেছি। কেন এমন হচ্ছে? এককথায় কারণটা হল, মোদির এখনও আবার প্রধানমন্ত্রী হবার সুযোগ থাকলেও সেটা অবশ্যই হতে হবে এক কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী!! আর কোয়ালিশন সরকার মানেই হল, বিজেপির শ্লোগান ও কর্মসুচী বা দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে চলবে না। এরই এককথায় বলা অর্থ হল, মোদির হবু কোন কোয়ালিশন সরকারে হিন্দুত্ববাদের বয়ান, বক্তব্য শ্লোগান চলবে না। এটা বলাই বাহুল্য।  হিন্দুত্ব বা হিন্দুত্ববাদের দাগ বা গন্ধ মোদির কোয়ালিশন শরীক কোন দলই নিতে চাইবে না। কারণ, বিশেষত মোদির চেয়েও কংগ্রেসের থেকে কখনও বেশী দাম পেতে কখন কোন শরীক দলকে কংগ্রেসের জোটের দরজায় টোকা দিতে হয় তা কে জানে? তাই ছোট দলগুলোর কেউই আগাম নিজ দলের সম্ভাবনা নষ্ট করতে চাইবে না! তাি মোদি এসব নিজেই বুঝে, আগাম নিজেই ঠান্ডা পায়ে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছেন!!! এটা বেশ মজার না?
    কে ভেবেছিল যে খোদ মোদিকেই হিন্দুত্ববাদ বা জয় শ্রীরাম ত্যাগ করে একদিন এসবকেই এড়িয়ে চলতেই হবে!! এর চেয়ে বড় তামাসা আর কী হতে পারে??? যদিও এরপরেও কোন কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কোন নিশ্চয়তা মোদির হাতে নাই!

    দুই. পেটের ক্ষুধা বনাম হিন্দুত্বের সুরসুরিঃ
    এটা ঠিক যে উগ্র জাতিবাদ মানে যেটা খোলাখুলি নিজ জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদ এর কথা সগর্বে বলে। তাও আবার সেই উগ্র জাতিবাদ  (ভাষা, ভুগোল বা অন্যকিছু ভিত্তিক জাতিবাদ না হয়ে যেটা ধর্মীয় জাতিবাদ) যদি ধর্মভিত্তিক উগ্র জাতিবাদ হয় সেক্ষেত্রে এমন উগ্র জাতিবাদী অনুসারী মাত্রই এক কমন সমস্যার মুখে তাদের পড়তে দেখা যায়। সেটা হল ধর্মবোধ এমনই উচ্চে উঠে যায় যে তিনি নিজ শরীরের কথা ভুলে যান বা অস্বীকার করতে বসে যান। অথচ কোন রক্তমাংসের মানুষের পক্ষে কী নিজ শরীরের কথা চাহিদা ভুলে যাওয়া সম্ভব? মানে হল, মানুষ মাত্রই সে বৈষয়িক; মানে সে রক্ত-মাংসের শরীর, তার ক্ষুদা লাগে। আর এই নানা ধরণের শারীরিক ক্ষুধা এটা সারাদিন ধর্মবোধে ডুবে বুঁদ হয়ে থাকলেও কমবে না, ক্ষুদা পুরণ হবে না। এটাকেই বলে নিজ শরীরের চাহিদা বা ক্ষুধা অস্বীকার করে কারও স্পিরিচুয়াল  বা ধর্ম-ভক্ত হয়ে উঠার সুযোগ নাই!  মানুষ আগে শরীর টিকায়ে বেঁচে থাকতে পারলে এরপরই কেবল সে স্পিরিচুয়াল  বা ধর্ম-ভক্ত হয়ে উঠতে পারে! অর্থাৎ আগে শরীর (মানে চাকরি বা কাজ) পরে হিন্দুত্ববাদ!

    এখন এখানে এককথায় বললে, শাসক হিসাবে মোদি অযোগ্য কারণ তিনি গত দশ বছরে দেশে নুন্যতম সংখ্যায় কাজ সৃষ্টি করতে পারেন নাই; এমন কোন অর্থনীতি খাড়া করতে পারেন নাই।  [একই সমস্যা ছিল মোদির আগের কংগ্রেস কোয়ালিশনের (২০০৪-১৪) দশ বছরেও]। ফলে এবার নির্বাচনের আগে এমন বহু সাধারণ মানুষ বা পাশ করা বেকারদেরকে নিয়ে ছোট ইন্টারভিউ দেখেছি তারা বলছেন, মোদির হিন্দুত্ববাদ তাঁদের ভাল লাগে [হিন্দুত্বের  জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদের সুরসুরি যেহেতু]; কিন্তু একই নিশ্বাসে তিনি বলছেন তিনি বেকার; এটা তাঁর খারাপ বা অসহ্য লাগে।
    মোদির হিন্দুত্ববাদ যাদের ভাল লাগে, মোদির এমন সাপোর্টার সবাই এবার মোদিকে ছেড়ে যান নাই; যদিও গেছেন কেবল একটা অংশ। ফলা ফল তাই বলছে! কিন্তু তাতেই মোদির এমন ভরাডুবি! শারীরিক ক্ষুধা সবসময়ই এমনই ধর্মবোধেরও  উপরে আগে বা প্রায়োরিটিতে অবস্থান করে থাকে! এর আরেকটা প্রমাণ হল, এত ঢাকঢোল পিটিয়ে সুপ্রীম কোর্টকেই হাত করে রায় নিয়ে মোদি বাবরি মসজিদের উপর রামমন্দির নির্মাণ শেষ করলেন। ভেবেছিলেন এটা তাকে এবার ভোটে ব্যপক মাইলেজ দিবে; তিনি ভোটে অনেক আগিয়ে থাকবেন। অথচ ঘটেছে উলটা।
    এবার উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টি (কংগ্রেসের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে) যে মূল শ্লোগান দিয়েছে তা আসলে এটাই যে হিন্দু-মুসলমানের অমীমাংসেয় ক্যাচাল উস্কে ঝগড়া বিতর্ক কিংবা রামমন্দির নির্মাণ ইস্যু এসব পাশে রাখেন, আগে কাজ সৃষ্টি করেন – মানুষ ক্ষুধার্ত সেদিকের তাকান!  সেদিকটা নিয়ে সরকারী কর্মসুচী, প্রকল্প তৈরি করেন আগে। আর এটাই এই দলকে পপুলারিটি দিয়েছে। মোদি-যোগীকে ভেঙ্গে তছনছ করে দিয়েছে। উত্তরপ্রদেশের মোট আশি আসনের ৪৪ টাই নিজেরা পেয়েছে সমাজবাদী দলের জোট!
    ঠিক একই জিনিষ ঘটেছে মমতার পশ্চিমবঙ্গে। মুসলমান প্রধান আসনগুলোতে বিজেপির বিরুদ্ধে মমতার শ্লোগানও ছিল একই। বুঝা গেল ধর্মবোধ গুরুত্বপুর্ণ অবশ্যই, কিন্তু শারীরিক ক্ষুধা চাহিদা ভুলে সম্ভবত দশ বছরের বেশী সমাজের একটা বড় অংশ এভাবে চলতে পারে না! মোদির বা হিন্দুত্ববাদের হার হয়েছে এখানেই!

    তাহলে কী দাড়ালো?
    মূলকথাটা হল ভারতের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে – রাইজিং ইন্ডিয়া হতে – ইন্ডিয়া এখনও অনেক দূরে। এবারের নির্বাচন যেন এমনই এক ম্যাসেজ বা রায় চোখ আঙুল দিয়ে দেখাল।  গালগল্প তুলে আর এক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের চাপাবাজির দক্ষতা দিয়ে রাইজিং ইন্ডিয়া হওয়া যায় না। দেশে কাজ সৃষ্টি করতে হয়! টানা দশবছর হিন্দুত্ববাদের উত্থান দেখে যারা এতদিন এটাকেই ভারত শ্রেষ্ঠ, উগ্র হিটলারি হিন্দুত্ববাদী জাতিবাদই ভরসা আর এগুলোই ভারতের অর্থনীতি রাইজিং ইন্ডিয়াতে পৌছে যাবার লক্ষণ মনে করেছিল – তারাই সেই আম জনতাই আবার ফিরে গেল তাদের মনে পড়ল তারা ভুল আর মোহ এর মধ্যে আটকে গেছে। তাদের পেটে ক্ষুধা চিনচিন করছে!  কারণ তাদের কাজ নাই, অর্থনীতি নাই মানে কাজ নাই! এবার প্রায় ১৮০০ কোটি রুপী খরচ করে বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। এটা ‘ফৈজাবাদ’ কনষ্টিটুয়েন্সী যার নাম বদলে অযোধ্যা করা হয়েছে। এই কথিত অযোধ্যেতেই বিজেপি হেরে গেছে, ৪৮ হাজারেরও বেশী ভোটে সমাজবাদি পার্টির কাছে।

    এতে ভারতের আগামি পরিণতি কী হতেপারেঃ
    আমি আগে অনেকবারই বলেছি নেহেরুর হাতে ভারত এই রাষ্ট্রগঠন – এটাই মারাত্মক ত্রুটিপুর্ণ। কারণ, “কেন্দ্র নামে” এই ভুতুড়ে ক্ষমতা-প্রতিষ্ঠানের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখে ভারতরাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল। আসলে বৃটিশ আমলেও ভারত বলে একই প্রশাসনের শাসনের অধীনে চলা কোন ভুখন্ড বলতে কিছুই ছিল না। ছিল কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক হেড কোয়ার্টার। আর এই কোম্পানি হেড কোয়ার্টার এর অধীনে আলাদা আলাদা কিছু রাজ্য এবং এরই পাশাপাশি ৫৫০ এরও বেশী আলাদা আলাদা করদ রাজ্য। এমন রাজ্য-প্রদেশ বা করদ রাজ্য এরাও আবার কেউ কারো অধীনে শাসিত নয়। সবাই আলাদা আলাদা ভাবে  এক কোম্পানি হেড কোয়ার্টার এর অধীনে শাসিত! তাই এক ভারত বলে কিছুইর অস্তিত্ব ছিল না। তাই নেহেরু একেবারে গায়ের জোরে সবকিছুকে এক ভুতুড়ে কেন্দ্রের অধীনে করে একটা ভারতরাষ্ট্র গড়তে গেছিলেন। আর এটাই আজ কাল হয়েছে।  এতে সবচেয়ে খারাপ ও বিপদের কথা হল, এই কেন্দ্র জিনিষটা আসলে কী? এটা কেমন ধরণের রাষ্ট্রচিন্তা? তা কখনই আমল করা হয় নাই। একাদেমিকেরাও না, রাজনীতিবিদেরাও না। এমন না হবার পিছনের মূল কারণ হল কমিউনিজম বা সবরোগ-হর সমাজতন্ত্রী ধারণা;  আর সমাজতন্ত্রী মানে সমাজের এক অংশ অপর অংশের উপর দাবড় দিয়ে রেখে চলে থাকে; ফলে চলতেই হবে – এমন ঘোষিত এক একনায়কতান্ত্রিক ধারণা। বিপরীতে এখানে রিপাবলিক বা পাবলিক ধারণাটাই অনুপস্থিত। পাবলিকের ক্ষমতা, গণ বা নাগরিক অধিকার ধারণাটাই অনুপস্থিত। এমনকি আমেরিকা কেন ফেডারল রাষ্ট্র -এর অর্থ বৈশিষ্ট কী তাও ভারতের কেউ, নুন্যতম কোন একাদেমিশিয়ান বুঝতে গেছেন জানা যায় না।   সবাই বড় জোর বাচ্চাদের মত করে আধো আধো বোলে (কেন্দ্রিয় সরকার না বলে) উচ্চারণ করে ইউনিয়ন গভর্মেন্ট। অথচ রাষ্ট্রই বুঝে না!

    এক কথায় বললে ভারতের কোথাও কোনও কোণায় না রাজনীতিক পাড়ায় না একাদেমিক পাড়ায় – রাষ্ট্রচিন্তা ও এর অলিগলি নিয়ে কোন ধারণাই নাই। তাই আপনা থেকে ভারতরাষ্ট্রের এই আদি ও মৌলিক ত্রুটি কখনও কাটবে না। আসলে সেই ১৯৮৯ সালে রাজীব গান্ধীর শেষ আমল থেকেই এটা পরিস্কার হয়ে উঠেছিল, নেহেরুর তৈরি কেন্দ্রের নামে জবাব্দীহিতা হীন একটা কথিত কেন্দ্রের হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রিভুত করে রাখা ভারতরাষ্ট্র এর দিন শেষ হয়েছে। এতে হয়েছে যেটা সারা ভারত শাসন করতে গেলে প্রথম শর্ত হল সারা ভারতে স্থানীয় কমিটি সংগঠন আছে (এটাকে ভারতে সর্বভারতীয় দল বলা হয়) এমন একটা কেন্দ্রীয় দল থাকা। নেহেরু মারা যান ১৯৬৪ সালে, আর ১৯৮৯ সালে এসে রাজীবের হাতের কংগ্রেস বুঝে যায় যে তারা আর সর্বভারতীয় দল নয়। সম্ভবত রাজীব মারা (১৯৯১) যাবার আগেই বুঝে গেছিলেন এই সংকটের কথা। সেজন্যই কী তিনি বিজেপিকে একটা সুযোগ দিতে গেছিলেন? যেটা প্রথমে ১৯৮৯ সালের কাশ্মীরের নির্বাচনে কারচুপি করে কাশ্মীরের ইসলামি রাজনীতিকে ভোটের রাজনীতি থেকে সশস্ত্র পথে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন; পরে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গাকে কেন্দ্র করে বিজেপির উত্থানের রাস্তা খুলে গেছিল সেদিকে ঠেলে দিছিলেন? কিন্তু তাতেই মোদির দশবছরের শাসন শেষেও বলা যায় বিজেপিও সর্বভারতীয় দল হতেই পারে নাই। এরই সোজা সাপ্টা মানে হল, এখন এর এক মাত্র  বিকল্প হল কোয়ালিশন সরকার!

    মোদির এবারের হারের তাতপর্য- এক. কোয়ালিশন সরকারঃ
    রাজীব গান্ধীই ছিলেন শেষ স সরকারের শাসন। যেন সেটা টের পেয়েই বিজেপির জন্য রাস্তা খুলে দিছিলেন তিনি। আর আজ এর পরিণতি হল, মোদির এবারের হারের ভিতর দিয়ে শুধু মোদির এবারেরই নয় আগামিতেও ভার শাসিত হতে থাকবে এক কোয়ালিশন সরকারের মাধ্যমে। মানে বিজেপি বা কংগ্রেসকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের কোয়ালিশন।  এটাই আবার আস্ত আস্তে বিজেপি বা কংগ্রেস দল দুটো আরো ছোট হতে হতে সেগুলো প্রভাব হারিয়ে ভারতের রাজনীতি হয়ে যাবে আঞ্চলিক দলগুলোর দলগুলোর কয়েকটা স্থায়ী জোটের সরকার। এমন কয়েকটা আঞ্চলিক দলের আঞ্চলিক জোটের কথা ভেবেই বলেছিলাম এমন প্রধান তিনটা আঞ্চলিক দলের জোট হবে সম্ভবত। যেমন দক্ষিণ ভারতীয় জোট, উত্তর ভারতীয় জোট আর পুর্ব ভারতীয় জোট ইত্যাদি।

    মোদির এবারের হারের তাতপর্য- দুই. দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকারঃ
    দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার – এটাই হয়ে উঠবে বাকি সবকিছুকে ছাপিয়ে প্রধান বৈশিষ্ঠ। এটা এবার থেকেই শুরু হয়ে যাবে। যে৪মন উপরে দেখিয়েছিম কেন খোদ মোদিকে ইতোমধ্যেই হিন্দুত্ববাদ বা রামমন্দির এসব ইস্যু নিয়ে কথা নিজের পেটেই দাফন করে দিতে হবে। কারণ কোয়ালিশন সরকারে শরীকের মন যুগিয়ে চলতেই হবে।
    এছাড়া আরো কথা আছে। যেমন ইতোমধ্যেই গতকাল বিকালে ভারতের হিন্দি নিউজ চ্যানেলে উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ সৃষ্টির কথা শোনা গেছে। এতদিন এই ব্যাপারটা ছিল বড় জোর রাজ্য সরকারের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে। মানে শরীক দলকে মন যুগাতে উপ-মুখ্যমন্ত্রী পদ সৃষ্টি করে তাদের আসন দেয়া হয়েছে। কখনও সেটা আবার আরো দু-তিনটা উপ-মুখ্যমন্ত্রী দেখা গেছে। এবার সেই একই ভাবনা থেকেই সবচের‍্যে বেশী পিছলা শরীক বিহারের নীতিশকে উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ অফার করা হতে পারে। আর সেক্ষেত্রে হায়দ্রাবাদের নাইডু সাহেব কেন বাদ পড়বেন? সেক্ষেত্রে তিনিওও আরেক উপ-প্রধানমন্ত্রীর হকদার হয়ে যেতে পারেন।
    অনেকের কাছে ব্যাপারটায় ব্যাপক তামাসার দিক নজরে পড়লেও একটু সিরিয়াস দিকে যাওয়া যাক। এই উপ-প্রধানমন্ত্রী বানানোর যে অভিমুখ এর সোজা মানে হবে সেই কোয়ালিশন সরকার যেকোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এটা মতভেদে ডুবে থাকবে। এককথায়, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয় সেসব ইস্যুতে সে ব্যাপারে একেবারেই অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়ে যাবে।  তাই দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার এর খাঁড়া অর্থ হল সিদ্ধান্তহীনতার অকেজো সরকার!

    মোদির এবারের হারের তাতপর্য- তিন. ‘র’-এর মত প্রতিষ্ঠান দুর্বল ও অকেজো হতে থাকবেঃ
    অনেকে ব্যাপারটা খেয়াল করেছেন অথবা না। সামরিক বা ইল্টেলিজেন্স ধরণের প্রতিষ্ঠান; এগুলোর জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম এমন সরকার হতে হয়।  যেকোন সরকারী প্রতিষ্ঠানকেই কোন না কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে হতে হয়। আবার মন্ত্রণা লয়ের অধীনে চলে যাওয়া মানে দীর্ঘসুত্রিতা; কারণ মন্ত্রণালয় থেকে পরে আবার প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌছানি আর সিদ্ধান্ত ফাইনাল করা এটাই দীর্ঘসুত্রিতা। এজন্য ‘র’-এর মত প্রতিষ্ঠান এটা সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অধীনে সেটা একই সাথে হ্যা আবার না। আসলে দীর্ঘসুত্রিতা এড়াতে মাঝখানে কোন মন্ত্রী নাই ঠিকই কিন্তু অজিত দোভাল-কে উপদেষ্টা করে রাখা হয়েছে। তাঁর মাধ্যমেই এটা দ্রুত প্রধানমন্ত্রীকে জানানো বা অনুমোদনের ব্যাপারগুলো দ্রুত সেরে নেবার ব্যবস্থা সম্পন্ন। এটাই হল আদর্শ রূপ!

    কিন্তু সমস্যা হল যখন কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় থাকে বিশেষত যখন শরীক দলও অনেক প্রভাবশালী বা ওজনদার – মানে কথা না শুনলে সরকার ভেঙ্গে যেতে পারে এমন। সেক্ষেত্রে একই প্রধানমন্ত্রী কিন্তু কোয়ালিশন সরকারের বলে তিনি আগেই প্রতিজ্ঞা করেছেন পার্টনারের কাছে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও পার্টনার বা  উপ-প্রধানমন্ত্রীকে না জানিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিবেন না।

    এখন ধরা যাক, একটা আন্তরাষ্ট্রীয় অপহরণ ও গুমের কেস। অন্যদেশ থেকে এনে ভারতের কোন রাজ্যের সড়কে তাকে ফেলে রেখে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পরে ঐ শহরের এসপি গিয়ে সেটা উদ্ধার দেখানো হবে। এখন এতে র-কে জড়িত হতে হলে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন স্বাক্ষর লাগবে – অফিস বা বিজনেস অর্ডারে মনে করেন এভাবেই নির্দেশিকায় লেখা আছে। এখন সেই ফাইল প্রধানমন্ত্রীর অফিসে পড়ে আছে কিন্তু কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন নাই। কেন?
    কারণ, গতবার এমনই এক সিদ্ধান্তগ্রহণের বেলায় এক উপ-প্রধানমন্ত্রীকে রাজী করানো হয়েছিল এভাবে যে তিনিও একটা বিজনেস ডিলে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন চান। প্রধানমন্ত্রী সেটা দিতে রাজি হলেই তবেই তিনিও আগের সিদ্ধান্ত অনুমোদন দিতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে নানান প্যাচে আর ঝামেলায় পড়ে প্রধানমন্ত্রী নিজ প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেন নাই। কাজেই এখন র-এক্ষেত্রে এক-দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করলেও প্রধানমন্ত্রী তাদেরকে অনুমোদন দিবার অবস্থায় নাই!

    এতে ফলাফল কী হবে?
    ‘র’-এর মত প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল ও অকেজো হতে থাকবে। একদিক দিয়ে এটা ভাল হয়ত। যে র যেভাবে বেপরোয়া কানাডা-আমেরিকার মত দেশে গিয়ে গুম-খুন করে আসছে বীরদর্পে – সেগুলো ভারতে কোয়ালিশন ধরণের সরকারের কারনে সিদ্ধান্তহীনতায় দুর্বল ও অকেজো হতে থাকবে; এমন ততপরতা কমে আসবে।  অবশ্য অনেকে বলেন, এনিয়ে এক লেখা বইয়ে ভারতের অশোক রায়না এমনই ধারণা পোষণ করেছেন। 
    কিন্তু সাধারণভাবে যে কোন রাষ্ট্রস্বার্থ এমন হয় যেটা এমন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করতেই হয় যেমন অন্যদেশের জাশুশি-গোয়েন্দাগিরি ঠেকানো। সেক্ষেত্রে ঐ রাষ্ট্রের কোয়ালিশন সরকার রাষ্ট্র-কাঠামো ও এর ততপরতাকেই স্থবির করে দিতে পারে।

    এককথায় বললে, সিদ্ধান্তহীনতা যে কোন রাষ্ট্রের অস্তিত্বরক্ষার বা নরমাল ফাংশনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা। আর নিয়মিত কোয়ালিশন সরকার মানেই সিদ্ধান্তহীনতা।
    এজন্যই বলেছিলেম এভাবে চললে ভারত রাষ্ট্র এভাবে ক্রমশ স্থবির হতে থাকবে সম্ভবত তিনটা আঞ্চলিক রাজ্য জোটে বিভক্ত হয়েও টিকতে না পেরে।

    মোদির এবারের হারের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বড় তাতপর্য এটাই!

    আর সবশেষে বলাই বাহুল্য, ভারতে যতই দুর্বল আর কোয়ালিশন সরকার গঠিত হবে ততই সেই সরকার দুর্বল হয়ে পড়বে বাংলাদেশের উপর তার অযাচিত সব হস্তক্ষেপ, সব প্রভাব ও আধিপত্য ঘটানোর ক্ষেত্রে !! নিজ মাথার ঘাঁয়ে পাগল এমন সরকার বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সময় দিতে চাইবে না। এমনকি ভারতের কোটারি সমর্থন স্বার্থের ও সহায়তার উপরে দাঁড়ানো বাংলাদেশের যেকোন সরকারো দুর্বল হয়ে পড়বে!

     

     

     

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ      ২০২৪  রাত
    শেষ আপডেটঃ   জুন মে ২০২৪, সকাল 

  • জেনারেল আজিজের উপর আমেরিকান নয়া ‘পদক্ষেপ’ কেন?

    জেনারেল আজিজের উপর আমেরিকান নয়া ‘পদক্ষেপ’ কেন?

    গৌতম দাস
    ২১ মে ২০২৪
    https://wp.me/p1sCvy-5DG

     

    ছবি ডেইলি স্টার থেকে নেয়া 

     

     

    গতকাল দুপুর থেকেই খবরটা  ঢাকায় ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়ছিল যে সাবেক এক ‘বাংলাদেশ আর্মি চীফ’ জেনারেল আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে আমেরিকান অসন্তোষ বা এনিয়ে তাদের “নয়া পদক্ষেপ” এর খবর। আজ ডেইলিস্টার লিখেছে, “আমেরিকা আজিজ আহমেদ ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের উপর [“United States has imposed sanctions on former chief of Bangladesh Army Aziz Ahmed and his immediate family…”] স্যাংশন  দিয়েছে। এলেখায় বেশির ভাগ সময় জেনারেল আজিজকে নিয়ে আমেরিকান বিবৃতিকে  আমি “আমেরিকান পদক্ষেপ” বা শুধু “পদক্ষেপ” বলে চিহ্নিত করব। যদিও ডেইলি স্টার সহ অনেক মিডিয়াই এটাকে স্যাংশন আরোপ করা বলেছে। আর এর বিপরীতে আমেরিকান বিবৃতিতে স্যাংশন শব্দটা দেখিনি। তাই, এই বতর্ক থেকে দূরে থাকতে  একে “আমেরিকান পদক্ষেপ” বলব এখানে।

    “আমেরিকান পদক্ষেপ” বলতে শব্দে যাই থাক, বাংলাদেশে সামাজিকভাবে এক বড় খুশির প্রতিক্রিয়া হয়েছে দেখার মত। এতে লক্ষ্যণীয় যে,  বিগত দুবছরের সরকারবিরোধী আন্দোলনকালে যারা আমেরিকান সাপোর্ট ও সহায়তার ব্যাপারে গভীরভাবে বাইডেন-লু এর আমেরিকার উপর “রাজনৈতিক আস্থা” রেখেছিল; গভীর নির্ভরশীলতায় আপন বোধ করত প্রবল খুশির প্রতিক্রিয়া এসেছে মূলত তাদের থেকে।  কিন্তু এসব সত্বেও , সেসময়ে এরাই আবার বাধ্য হয়েছিল নির্বাচনের আগে যখন আমেরিকা  নিজেই নিজ কমিটমেন্টের উলটা ঘুরে গিয়ে বাংলাদেশকে ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল শুধু না, একেবারে “বিজয়ী” হাসিনার কোলে গিয়ে উঠেছিল; আর তা দেখে লজ্জায় মারা গিয়েছিল যারা মূলত তারাই এবার জেনারেল আজিজের বিরুদ্ধে আমেরিকান পদক্ষেপ দেখে আর নিজেদের চাপা কষ্ট বা প্রতারিতবোধের কষ্ট আর লুকিয়ে রাখতে পারে নাই। বাংলাদেশের এই “আমেরিকা সমর্থক গোষ্ঠি” লজ্জায় মরমে মরে গিয়েছিল, নির্বাচন ঘটে যাবার পর থেকে এতদিন পর্যন্ত। বিশেষ করে এখন বাইডেন-হাসিনা নাকি “কেমন জানি বন্ধু” যা নিয়ে আবার মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উচ্ছ্বাস জানিয়ে বিএনপিকে টিটকিরি দিয়ে কথা বলে চলেছে। এদিকে আমেরিকার ধারণা তারা একসাথে বাইডেন-হাসিনা ‘কী জানি’ [ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি] উতযাপনও শুরু করে দিয়েছিল ইত্যাদি!  তাই গত চার-পাঁচ মাস “আমেরিকা সমর্থক গোষ্ঠি”দের কেটেছে এসব নখড়া দেখতে দেখতে!  অতএব পালটা এবার এদের উচ্ছ্বাসের প্রতিক্রিয়াই ছিল আজ দেখার মত। যেন তারা বলতে চাচ্ছে – তাদের প্রিয় আমেরিকা অনেক সুইট – এরা বিট্রে করে না, ফেলে পালায় না ইত্যাদি। মানে যেন সিনেমার ডায়লগের ভাষায়,   উদ্ধার করতে ‘মেরা অর্জুন [এখানে আমেরিকা] জরুর আয়েগা”। কিন্তু আসলেই কী তাই? এটার মানে কী আমেরিকার ফিরে এসেছে?   আমেরিকা কী ফিরে এসে গেছে? বা আসবে?

    বলা বাহুল্য উচ্ছ্বসিত এই আমেরিকা সমর্থকেরা কঠোর সরকারবিরোধী; তারা সরকারের পতন দেখার জন্য উন্মুখ বহুদিন থেকেই জেনুইনলি। কিন্তু তারা সকলে কী তা এবার দেখতে পাবে?
    এনিয়ে আমার মন্তব্য ও পরামর্শ হবে – এখনও উচ্ছ্বসিত না হয়ে “ধীরে চলেন”। প্রচুর [if, not, but’] এসবের যদি, কিন্তু আছে সামনে; সেসব ব্যাপারে – আমেরিকা কী অবস্থান নেয় সুযোগ থাকে; পরিস্থিতি কতটা আমেরিকার ফেবারে থাকে বা আমেরিকা চায় তা এখনও অনিশ্চিত। আর সবচেয়ে বড় কথা আমেরিকা যাদের ভরসায় বা যাদের সমর্থন পেতে বা খুশি করতে চেয়ে বা লক্ষ্য করে এই “পদক্ষেপ ঘোষণা” নিয়ে থাকুক না কেন বাংলাদেশের সেই রাজনৈতিক অংশ কী আমেরিকাকে আগের মতই গ্রহণ করবে? এটাই এখন একেবারেই অনিশ্চিত। যেমন, মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়া দেখা যাক!

    আজ বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়াঃ
    আজকে বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মির্জা আলমগীর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, “আজিজ আহমেদের নিষেধাজ্ঞা আরেকটা বিভ্রান্ত করাঃ মির্জা ফখরুল”। এর সোজা মানে হল, আমেরিকা আগেও বিভ্রান্ত করেছে তাই আবার আরেকটা বিভ্রান্তি আনা বলেই দেখতে চাচ্ছে বিএনপি – আমেরিকান এই পদক্ষেপকে!  কেন তিনি এমনটা বললেন সেটা বুঝার চেষ্টা করতে পারেন আমেরিকা সমর্থকেরা। উচ্ছ্বসিত আমেরিকা সমর্থকদের মত করে, আলমগীর সাহেবেরও তো অন্তত ইতিবাচক মন্তব্য করার কথা! কিন্তু এই মন্তব্য অন্তত নেতিবাচক! কিন্তু সেটাই বা কেন?  এছাড়া আরেকটা কথাও তিনি ওখানে বলেছেন।  আলমগীর সাহেব বলছেন – “নিজের ঘরকে যদি নিজে সামলাতে না পারি, অন্য কেউ সামাল দেবে না। নিজের শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে হবে, নিজের শক্তি দিয়ে তাদের (আওয়ামী লীগ) পরাজিত করতে হবে”। এই বাক্যের মূল শব্দ নিজের শক্তিতে দাঁড়ানো, আমেরিকার না। এদিকটা মনোযোগ দিয়ে বুঝতে হবে।
    কাজেই আমার মন্তব্য ও পরামর্শ হবে – বাংলাদেশের “উচ্ছ্বসিত আমেরিকা সমর্থক”, আপনারা একেবারেই ধীরে চলেন; স্থির হয়ে নেন আগে! আর সমস্ত স্ব-সক্ষমতা  দিয়ে পরিস্থিতি বুঝতে ও ব্যাখ্যা পেতে চেষ্টা করেন সবার আগে। এর আগে কোন মুভ করলে ভুল হবে।

    এখন কেন এই আমেরিকান পদক্ষেপঃ  
    জবাবটা এবার এখানে খাড়া বলে ফেলি। ভারতের নির্বাচনে মোদি নাকি এবার হেরে যাবেন। আমেরিকান এই পদক্ষেপ এমন এই অনুমানের উপর নির্ভর করে নেয়া হয়েছে; যেটা এখনও ঘটে নাই। আগামি ৪ জুনে প্রকাশিতব্য ভারতের নির্বাচনী ফলাফলে মোদি হেরে গেছে – এটা আমেরিকাসহ আমরা সকলেই শুনতে পাব হয়ত। এই হল সেই অনুমান। সোজা কথা এটা এখনও ঘটে নাই; ঘটতেও পারে!

    তাই বলাই বাহুল্য যদি উলটা হয়। মানে মোদি যদি নিজেকে বিজয়ী বলে ঘোষণা দেখাতে পারেন তবে সেক্ষেত্রে বলাই বাহুল্য – “আমেরিকার পদক্ষেপের” এখানেই আপাতত ইতি হয়ে যাবে।
    তবে মির্জা ফকরুলের নেতি-প্রতিক্রিয়ার কারণ ভিন্ন। এর সাথে আমরা যেন আবার আমেরিকার ভাবনা বা অনুমানের সাথে সম্পর্কিত করে না দেখি; এটা সম্পর্কিত নয় তাই। সেটা বিএনপির নিজস্ব আলাদা কারণ।

    এখন আমার অনুমান হাসিনা বা মোদি সরকারও খুব নিশ্চিত নন যে আমেরিকা বা বাইডেন-লু ঠিক কী বুঝে এমন বেমাক্কা এক পদক্ষেপ হাঁকালেন?  বিবৃতির কাগজে আমেরিকা  “ডেজিগনেশন” [designation] এই শব্দটা ব্যবহার করেছে। মানে নামকরণে সাবেক জেনারেল আজিজকে অপরাধী বলে চিহ্নিত করে ফেললো।
    তবে আমি মন্ত্রী হাসান মাহমুদ যে কথা বলেছেন যে আমাদের সরকার জানত দুদিন আগে বাংলাদেশের আমেরিকার এমবেসিকে বাইডেন প্রশাসন জানিয়েছিল, এনিয়ে কিছু বলছি না।

    আরেকটা কথা, হাসান মাহমুদ যে কথা বলেছেন যে – এটা “ভিসা স্যাংশন নয়” – একথা কিন্তু সত্য [US sanction on Aziz not under visa policy: foreign minister]। বরং অরিজিনাল স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতিতেও স্যাংশন বলে কোন শব্দই নাই। এছাড়া আমেরিকার ঐ বিবৃতিতে আজিজ ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের  – আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধ বা সম্পত্তি বায়োজাপ্ত ইত্যাদি কোন শব্দাবলীও নাই।

    কেবল একটাই শব্দ আছে “ডেজিগনেশন”। মানে, বাংলায় বললে “চিহ্নিত করা” ধরণের বা নামকরণ করা যেন। তাই বলছে, আমেরিকান প্রশাসন সাবেক জেনারেল আজিজকে দুর্নীতিবাজ যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধবংস বা বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করেছে। এই হলো অভিযোগ ও নামকরণ। একথা অবশ্যই বেশ ওজনদার!  কিন্তু সেজন্য আমেরিকার দিক থেকে শাস্তি কী বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ কী আরোপ করা হবে – এধরণের কোন বাক্য আর সেখানে নাই। তবে কোন আইনে এই ডেজিগনেশন এর একটা ধারা নম্বরউল্লেখ করা আছে; তা হল  [7031(c)] ।  হতে পারে ঐ ধারার বিস্তারে কোন শাস্তির কথা লেখা আছে। তবে আপাতত আমরা তা জানি না।

    তাই,  উপরে আমি লিখেছে, জেনারেল আজিজের উপর স্যাংশন আরোপ করা হয়েছে। হা বলেছি তবে নিজ বরাতে না। বলেছি ডেইলিস্টারের বরাতে। বিবৃতিতে স্যাংশন শব্দটাই নাই আগেই বলেছি; আমি গত রাতে পড়েছি। তাই ঢাকার মিডিয়ায় কীভাবে আসছে এমনকি হাসান মাহমুদ তিনিওও স্যাংশন আরোপ হয়েছে বলেছেন।

    তাহলে মূলকথাটা হল, আগামী ৪ জুন ভারতের নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের দিন। এদিন যদি মোদিই হেরে গেছেন বলে প্রকাশিত হয় তবেই আমেরিকান বিবৃতি আরো পাতা খুলে ফুলে-ফলে বিকশিত হয়ে উঠতে চাইবে। এবং সেক্ষেত্রে খুব দ্রুতই বহু বহু সব ঘটনা ঘটবে।   ইতোমধ্যেই অবশ্য ভারতে রাষ্ট্রক্ষমতার করিডোরে প্রবল আলোড়ন বয়ে যাচ্ছে যে মোদি এবার হারছেন। ভারতের যত জুয়ার আড্ডা আছে বড় বড় সব বিখ্যাত ডেরা সেখানে মোদি হেরে যাওয়ার পক্ষে বাজি ধরা জুয়ারি লোকের সংখ্যাই বেশী, রেটও হাই। এটা একটা খুবই তাতপর্যময় তথ্য! ইতোমধ্যে ভারতীয় শেয়ার বাজারও সব বিক্রি করে দাম ফেলে মানে আগে নিজ বিনিয়োগ বাচাও – এমন জোয়ার তুলেছিল আমরা দেখেছি।  আার অন্যদিকে, ভারতে ভোটপ্রদানের % যদি ৬০ এর নিচে যায় তবে মনে করা হয় এটা মোদির হারার লক্ষণ! সেটাও চারপর্বের পর থেকে দেখা যাচ্ছে!
    তবুও আমার শেষ কথা, এমন যত আলামতই দেখা যাক না কেন –  মোদির হাতে থাকা “ভোট বাক্সকে সফটওয়ার ম্যানিপুলেশনের সক্ষমতা” যদি অকার্যকর হয়ে থাকে তবেই একমাত্র তবেই, উপরে যা বলেছি তা সত্য হতেও পারে, নইলে মোদি নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করবেনই আগেরবারের মতই!!
    এবার এক বাক্যে বলি,  যদি মোদি হেরে যায় তবে সবচেয়ে কঠিন সঙ্কটে পড়বে হাসিনা সরকার! আর হবু সেটাই আমেরিকার পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য!
    নিচে আমেরিকান বিবৃতিটা সেঁটে দেয়া হলঃ

    Designation of Former Bangladesh Official for SIGNIFICANT Corruption:

    The U.S. Department of State announced today the public designation of former General Aziz Ahmed, previously Chief of the Bangladesh Army Staff, due to his involvement in significant corruption.  His actions have contributed to the undermining of Bangladesh’s democratic institutions and the public’s faith in public institutions and processes.

    Aziz Ahmed engaged in significant corruption by interfering in public processes while helping his brother evade accountability for criminal activity in Bangladesh.  Aziz also worked closely with his brother to ensure the improper awarding of military contracts and accepted bribes in exchange for government appointments for his personal benefit.

    This designation reaffirms the U.S. commitment to strengthening democratic institutions and rule of law in Bangladesh.  The United States supports anticorruption efforts in Bangladesh through assistance to make government services more transparent and affordable, improve the business and regulatory environment, and build capacity in investigating and prosecuting money laundering and other financial crimes.

    These public designations are made under Section 7031(c) of the annual Department of State, Foreign Operations, and Related Programs Appropriations Act.  This action renders Aziz and his immediate family members generally ineligible for entry into the United States.

     

     

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ    ২১ মে ২০২৪  রাত ১১ঃ ২৬
    শেষ আপডেটঃ   ২৩ মে ২০২৪, ভোর  ০৫ঃ ৪৬

  • ভারতের নির্বাচনী তামাসা ও আগামি দক্ষিণ এশিয়ার হবু চিত্র!

    ভারতের নির্বাচনী তামাসা ও আগামি দক্ষিণ এশিয়ার হবু চিত্র!
    গৌতম দাস
    ১৭ মে ২০২৪  সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫৪
    https://wp.me/p1sCvy-5Cc

     

       “ভারতের নির্বাচন কমিশনের ‘হাঁটু কি এখন দুর্বল’?”  – এটা গত ২০১৯ সালের ভারতের নির্বাচনের সময়ের বিবিসির রিপোর্ট। যা ভারতের নির্বাচনি তামাসা বুঝবার জন্য এখনও গুরুত্বপুর্ণ।

     

    ভারতের নির্বাচনী তামাসা!
    ভারতে এখন নির্বাচন চলছে। মানে সাতপর্বে ১৯ এপ্রিল থেকে ০১ জুন পর্যন্ত সাতটা আলাদা আলাদা দিনে বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মূলত মোট একই সিকিউরিটি ফোর্স বারবার কিন্তু নানান আসনে ব্যবহারের সুবিধা পাবার জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। নইলে, যেটা একই দিনে সব আসনে নির্বাচন হলে আসন প্রতি ফোর্সের সংখ্যা কমাতে হত, তা এখানে এড়ানো সম্ভব। আজ ১৭ মে ২০২৪;  মানে ইতোমধ্যে ভারতের চার পর্বেই নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেছে। এখন বাকি আছে ২০ মে, ২৫ মে আর ০১ জুনের নির্বাচন। মানে ০১ জুনেই সাত পর্বের নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে যাবে। এরপর দুদিন গ্যাপ দিয়ে ফলাফলের জন্য ৪ জুন সকাল থেকে সব ভোটের বাক্স নানা রাজ্যে একই দিনে একসাথে গণনা শুরু হবে। আর ঐদিনই দুপুর ১২ টার মধ্যে মিডিয়ায় বিশেষত টিভিগুলোতে কে কোথায় আগিয়ে আছে এই ট্রেন্ড [trend] বা অভিমুখ অনুমানের সুযোগ দর্শক-পাবলিকের কাছে এসে যাবে। যদিও সব ভোট গণনায় আরো সময় লাগবে। এরপর ঐদিনেই সন্ধ্যা সাতটার পর থেকে ক্রমশ আরো স্পষ্ট হতে থাকবে; ভোটের ফলাফলের আরো স্পষ্ট  অভিমুখ কোনদিকে। আর ঐদিনই রাত বারোটার মধ্যে অভিমুখ তো বটেই ফলাফলেও একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে কোন দলের জোট বিজয়ী হতে যাচ্ছে।  এই হলো এবারের ভারতের নির্বাচনি দিন-তারিখ!

    এবারের ভারতের নির্বাচন নিয়ে আমি  এপর্যন্ত এবারের হবু বা ইতোমধ্যেই ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী যা আসছে ও ঘটবে এসবের অর্থ তাতপর্য অথবা বিশ্লেষণ নিয়েও কিছুই লিখি নাই। তুলনায় গতবার মানে গত ২০১৯ সালের নির্বাচনের বেলায় সম্ভবত মোট আট / দশটা লেখা দিয়েছিলাম। তাহলে এবার দূরে আছি কেন?
    মূল কারণ, ২০১৯ সালে পুরা নির্বাচনের সময়ের ঘটনাবলীর খুবই কমই মনিটর করতে বাদ রেখেছিলাম। যেমন ভোটের আগের অন্তত তিনটা সার্ভে গ্রুপের সার্ভে সম্পর্কে স্টাডি ও ফলো করেছিলাম। যারা আবার একই সাথে  “বুথ ফেরত ভোটারদের” সাক্ষাতকার নিয়ে সার্ভে রিপোর্ট নিয়েও আমার স্টাডিতে অনেক সময় দিয়েছিলাম। শেষের দিকে ভারতের অনেক মিডিয়ার সাথে আমিও ধারণা দিচ্ছিলাম যে মোদির দল বিজেপি ও তাদের জোট[এনডিএ] সম্ভবত নির্বাচনের হেরে যাবে। কিন্তু না। মোদি-অমিত শাহের হাতে ভোটের বাক্স ম্যানিপুলেশনের [অবৈধ হাত ঢুকিয়ে ফলাফল উলটানো] ব্যবস্থা আছে। এবং তা খুবই সুনির্দিষ্ট করে ফল আনতে পারে এমন বা  যেখানে যতটুকু ফলাফল পালটানো দরকার তা করার ক্ষমতা সম্পন্ন। এদিকটা তখন আমল করা হয় নাই। তাই বিপত্তি। আর এবারও অনেক কিছুই পরিবর্তন হলেও মোদি-অমিত শাহের হাতে ভোটের বাক্স ম্যানিপুলেশনের ব্যবস্থা বহাল ও অটুট আছে বলেই জানি। তাই এবার দূরে থেকেছি লিখা থেকে যদিও, এবারেরও খবরাখবর রাখছি কিন্তু কিছু লিখি নাই।

    গতবারও এমন সব পর্বের নির্বাচনের পরে গণনার দিন শুরুর আগে এমন চারদিনের গ্যাপ ছিল। মনে করা হয় ঐ গ্যাপের দিনগুলোই মোদি-অমিতের চোখে এসব ম্যানিপুলেশনের উপযুক্ত সময় আর তা তখনই করা হয়ে থাকে বলে এপর্যন্ত যতটুকু জানা যায়। যেমন দেখেন, উপরে যে ছবিটা ব্যবহার করেছি সেটা ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিবিসির একটা রিপোর্ট থেকে নিয়েছি। যেখানে তখনকার শিরোনাম ছিল কত এগ্রেসিভ বা উদগ্র আক্রমানাত্মক! শিরোনাম লিখেছিল – “ভারতের নির্বাচন কমিশনের ‘হাঁটু কি এখন দুর্বল’!!!
    সেসময়ের অমিত শাহ যিনি এখন কেন্দ্র-সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (তখন তিনি কোন মন্ত্রীই ছিলেন না, কেবল ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক) তিনি তখন এক টিভি লাইভ শোতে এসে বলেছিলেন বিজেপি ৩০০ পার করবে। ভারতে সরকার গড়তে ২৭২+ আসনে বিজয়ী হতে হয়। তো ৩০০ পার মানে হল ৩০০ এর বেশী আসন পাবে। সত্যিই তাই ঘটেছিল। ২০১৯ সালে, একা বিজেপির মোট আসন পেয়ে হয়েছিল ৩০৩।  মোদি সেসময় মানে ঐ টিভি শো এর দিন কাশী (উত্তরপ্রদেশের খুবই গুরুত্বপুর্ণ হিন্দুদের এক তীর্থস্থান মনে করা হয়) থেকে ফিরেছেন। সেখানে নাকি তিনি কয়েকদিনের ধ্যানে বসেছিলেন!!! সেবারের নির্বাচনের শেষদিনের আগেই  মোদি কাশীতে গিয়ে ধ্যানে বসেছিলেন তাঁর হরেক রকমের রংঢঙ আর প্রপাগান্ডার অংশ হিসাবে। তাই সেই শো তে তিনি অমিত শাহের পাশে বসে থাকলেও বেশী কথা বলছিলেন না। তবে অমিত শাহের সেদিনের ঘোষণা ছিল যে তারা ৩০০ আসন পার করবেনই, এটা শোনার পর থেকে আমার মনে গভীরতম সন্দেহ শুরু হয়েছিল যে অমিত শাহের কথাই সম্ভবত সত্য হতে যাচ্ছে! আমি বোকা হয়ে যাচ্ছি!

    আগেই বলেছি অমিত শাহের কথা সত্য হয়েছিল; নিজ দলের আসন ছিল ৩০৩ আর সাথে বিজেপির নিজ জোট [NDA] এর আসন সহ মোট আসন হয়েছিল ৩৫৩। সেবারের মূলত এমন ম্যানুপুলেটেড বা হস্তক্ষেপ করা ফলাফলের কারণেই এবার ভারতের নির্বাচন নিয়ে কোন ধরণের লেখা লিখিই নাই। এড়িয়ে গিয়েছি। আর তাই এবার এটাই প্রথম লেখা। তাহলে আবার কেন ভোট পর্বের মাঝামাঝি সময়ে এখন লিখতে আসলাম?
    সেসব আরেক কাহিনী যা বাংলাদেশেও ছড়িয়েছে। ছড়িয়েছে কারণ এবার এক প্রবল অনুমান হল, মোদি এবার নির্বাচনে নাকি হেরে যাবেন। আর তাতে কংগ্রেসের রাহুল এন্ড গং মানে তাদের জোট ক্ষমতায় আসলে আমেরিকার সাথে তাদের বিশেষ সম্পর্কের সরকার হবে সেটা।  তাই বলাই বাহুল্য এর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের আয়ুসহ আনাচে কানাচে। সেকারণে এখন বাংলাদেশে যাই ঘটছে বা ঘটবে সেসকল ঘটনার সাথেও এইসব (মোদি হারবেন ধরণের) কল্পিত-অনুমিত ঘটানাবলীর মিল আছে কিনা সেই জল্পনা-কল্পনাও প্রবলে উঠেছে।

    যদিও এমন বহু ঘটনা – গুজব, আধা গুজব, আধা সত্যি  ইত্যাদি সবই কানে আসছে। তবুও ভারতের এবারের নির্বাচন নিয়ে আমার নিজ অবস্থান হল, মোদি-অমিত শাহের হাতে বাক্স ম্যানিপুলেশনের মেকানিজম নাই তা খর্ব বা অকেজো হয়ে গেছে একথা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত  শেষ বিচারে মোদির হারের কোন সম্ভাবনা (অন্তত আমার কাছে) নাই আর তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। যদিও এবার ইতোমধ্যেই এমনকি এখন ভারতের ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান -র- বলতে সেটা,  ‘মোদির র’ আর ‘কংগ্রেসি র’ বলেও ভাগের কথা উঠে গেছে, এমনটা সত্বেও!

    এমনিতে রাহুলের কংগ্রেস বা তাদের জোটের [I N D I A] পক্ষে বাইডেন প্রশাসন এবার দাঁড়িয়েছিল বেশ আগেই।  আর তাতেই  মোদিকে বিপুল অর্থদাতা ও তাঁর অবাধে খরচে উৎস যে আদানি গ্রুপ; আর এর বিরুদ্ধে বাইডেন প্রশাসনের লেগে পড়াতেই তাতে এই গ্রুপের শেয়ারে ধ্বস নামিয়ে দিয়েছিল, বলে মনে করা হয়। ওপেন সোসাইটি খ্যাত বা হেজ ফান্ড ব্যবসায়ী জর্জ সোরেস নিজেই [একালে বিভিন্ন দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমেরিকান হস্তক্ষেপের ধারা বজায় রাখতে যে অর্থের প্রয়োজন হয় তা যোগাতে আমেরিকা প্রশাসন আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে গেছে; তাই সেই অভাব পূরণে অর্থের চালান যোগাতে এখন সবচেয়ে বড় যোগান দাতা হয়েছে এই ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন নামের থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান। পুরানা সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙ্গে গেলে তা যে ১৫ রাষ্ট্র হয়েছিল এমন সব রাষ্ট্রেই আমেরিকান (এনজিও) হস্তক্ষেপ এর উসিলায় অর্থ ঢেলেছে এই প্রতিষ্ঠান। এটাকে তারা অরেঞ্জ রেভেলিউশন বলে ডেকে থাকে। ]
    বাইডেনের হয়ে ভারতে  আদানির বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিলেন জর্জ সোরেস; এক পাবলিক বক্তৃতা দিয়ে তিনি নিজে আদানির বিরুদ্ধে মার্কেট তাতিয়ে  ছিলেন। কিন্তু এতকিছু করে বাইডেন প্রশাসন আগিয়েও মাঝে হঠাত কংগ্রেসী রাহুলদের সব ততপরতায় ভাটা দেখতে পাই আমরা। রাহুলের জোটও অসংলগ্ন বা আভ্যন্তরীণ দ্বিধায় শ্লথ হতেই দেখেছিলাম। কিন্তু এবার ডোনাল্ড লু এর সফর [তিনি এমাসে বাংলাদেশে আসার আগে ভারত পরে শ্রীলঙ্কা সফর করে এসেছিলেন।] যেটা  বাইডেন প্রশাসনেরও ভাটা বা শেষ সময়ে সফর এটা; এবার তাঁর রুট ছিল ইন্ডিয়া-শ্রীলংকা হয়ে বাংলাদেশ।  আর লু এর এবারের ভারত সফরের পরে আমরা দেখি যে ‘ইন্ডিয়া’ জোটে সরব বা চাঞ্চল্য শুরু হয়েছে। ওদিকে ভোট প্রদান চতুর্থ পর্বে এসে অবজারভেশন বলছে, ভোটপ্রদানের হার নিম্নমুখি। আর ভারতের ভোট বিশ্লেষকেরা একমত যে  মোট ভোটপ্রদানের নিম্নহার (%) মানে তা মোদির ভোট  কম  হবার লক্ষণ।  আবার ওদিকে ইরানের সাথে মিলে চাবাহার [Chābahār ] সমুদ্র বন্দর চালু ও ব্যবহারের ততপরতা শুরু করেছে ভারত বহুদিন এই প্রকল্প পরিত্যক্ত থাকার পরে। যদিও আবার ততপর হওয়াতে বাইডেন প্রশাসন ভারতকে থ্রেট করেছে, নিষেধাজ্ঞা বা ব্যবস্থা নিবার হুমকি দিয়েছে।
    ইত্যাদি এসব কিছু নতুন সব ঘটনাবলীতে মুল ঘটনা হয়ে উঠে আসছে বাইডেন প্রশাসন ও কংগ্রেসের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা অনেকদূর আগিয়ে গিয়েছে। আর তা থেকেই নিট ফলাফল হল, মোদির এবার হেরে যাওয়ার আলাপ, সম্ভাবনা বা গুজব উঠে আসছে তা বলা যায়। এককথায় বললে, বাইডেন প্রশাসনের কাছে, চলতি নির্বাচনে এক প্রো -আমেরিকান নয়া সরকার দেখতে চাওয়া হল তাদের প্রায়োরিটি। এই আকাঙ্খাটা খুব একটা কোথাও লুকানো ঠিক তা নয়। বরং কোথাও কোথাও এনিয়ে গভীর সব পরবর্তি পরিকল্পনা করতে বসে গেছে সংশ্লিষ্ট অনেকেই।  এমনকি তাতে কথিতভাবে মোদি আর অমিত শাহের মধ্যে গভীর দ্বন্দ্বের কথাও আবিস্কার করে রেখেছে অনেকে। অথচ এরা জানেনা মোদি-অমিত এরা দুজন ‘হরি আর হর এর মত’ হরিহরাত্মা!
    আর এই মিলিত-আত্মার জন্ম হয়েছিল ২০০২ সালে গুজরাত কিলিং  বা মুসলমান নিধনের কালে যখন গুজরাটি মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মোদি আর তাঁর ডানহাত ছিল এই অমিত শাহ, যিনি ছিলেন আবার ঐ মোদির রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী! এই যুগল একসাথে আরএসএস-কে হাত করে, প্রভাবিত করে বিজেপি থেকে – লাল কৃষ্ণ আদভানি এবং অন্য দু’জন নেতা মুরলী মনোহর যোশি ও উমা ভারতী (এরা তিনজন হলেন আদালতের খাতায় বাবরি মসজিদ ভাঙার মূল আসামি) সহ অন্যান্য সব বুড়াদেরকে বয়সের অজুহাত তুলে দলের সব কমিটি থেকে বিদায় করে দিয়েছিল!  এরপর গত দশবছর ভারতের ক্ষমতায় থেকে তারা যা যা করেছে তা কেবলমাত্র এদুই জনের আজীবনের প্লান ও খায়েস বলে মনে করা হয়। এদের মাঝে আর কেউ নাই। তবে লিডার কেবল মোদিই। কাজেই যারা মোদি- অমিতের বিচ্ছেদ বা দ্বন্দ্বের কথার গল্প ছড়াচ্ছেন এই বিচারে তারা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এখনও শিশু!
    এছাড়াও, সবকথার শেখ কথা হল, মোদি-অমিতের হাতে যতক্ষণ ভোটবাক্স ম্যানিপুলেশনের সক্ষমতা আছে ততক্ষণ সব জল্পনা-কল্পনা অনুমান লু-তত্ব সবই ভুয়া আর অকেজো বলে হাজির হবেই বলে আমার ধারণা। মোদি আবার বিজয়ী হবেনই, সম্ভবত এভাবেই। এপ্রসঙ্গ আরেকটু কথায় শের দিকে আবার আসব। এর আগে উপরের কথা শেষ করে নেই।

     

    সফটওয়ার ভিত্তিক বাক্স ম্যানিপুলেশনঃ
    ততদিনে কানে আসছিল অন্য আরেক দিকের তথ্য, (দেশি-বিদেশি) ইন্টেলিজেন্স ইনফরমেশন যে মোদি ভোটের বাক্স বা ইভিএম বাক্স ম্যানিপুলেট (বাইরে থেকে প্রোগ্রামিং ব্যবহার করে ফল গণনা শুরুর আগেই হবু ফলাফল উলটে রাখা) করার সফটওয়ার সংগ্রহ করেছেন। অনুমান করা হয়ে থাকে এটা জুয়ারি শহর ম্যাকাও [Macao] আর- উত্তরকোরিয়া ভিত্তিক সফটওয়ার গ্রুপ যারা সাহায্য করছে বা করে চলেছে। অনেকে এমনকি এটাও মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ হ্যাকিংয়েও এই গ্রুপের কেউ কেউ টেকনিক্যাল কাজ ও দিকে এসব অর্থে ও সুত্রে জড়িত ছিল। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর দিকটা হল, এদিকটা নিয়ে মানে ভারতের নির্বাচনে ভোটের বাক্সের স্বচ্ছতা রাখা নিয়ে যত আবেদন  বা দাবি এপর্যন্ত তোলা হয়েছে এর সবই হয় ভারতের নির্বাচন কমিশন নিজে বা সুপ্রীম কোর্ট – এরা সেসব নাকচ করে ফেলে রেখেছে। কখনও সুপ্রীম কোর্ট বলেছে এটা কমিশনের কাজের উপর হস্তক্ষেপ হবে তাই তারা কিছু করবে না; আবার কখনও  (নির্বাচন) কমিশনের  কাছে মামলা ফেরত পাঠিয়ে হাত ধুয়ে ফেলেছে। আর নির্বাচন কমিশন বেশির ভাগ সময় যেকোন পাবলিকের আবেদনের ক্ষেত্রে জবাবই দেয় নাই বা নাকচ করে ফেলে রেখেছে। এনিয়ে আমার অন্তত তিনটা পুরানা লেখায় এসব নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছি। বেশিরভাগ সময় ফেরত পাঠানোর যুক্তিতে বলা হয়েছে যে এতে নির্বাচন ব্যবস্থা ফলাফল দিতে দেরি করবে বা ম্যানুয়াল ভোটের মত হয়ে যাবে তাই এতে হাত দেয়া যাবে না। অর্থাৎ যেন স্বচ্ছ নির্বাচন করা এটা প্রধান বিবেচনা নয়; এর বদলে অস্বচ্ছ ও কারচুপির সুযোগ রেখে দেওয়া আর এভাবেই তাড়াতাড়ি ফল আসার নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তোলাটাই আদালত ও কমিশনের কাছে লক্ষ্য!
    মজার কথা হল, এই অবস্থা সত্বেও কয়েকমাস আগে ভারতের প্রধান বিচারপতি বাংলাদেশে এসেছিলেন আমাদেরকে সবক শিখাতে যে ভারতের বা কোন দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায়  সুপ্রীম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের ভুমিকা কতই না মহান ও পবিত্র! আগ্রহিরা দেখতে পারেন এনিয়ে আমার পুরানা লেখা।

    যেটা অনুমান করা যায় সারকথায়,  মোদির তৈরি এটা একটা বিরাট র‍্যাকেট; অর্থ ও নানান ব্যক্তিগত সুবিধার আয়োজন ঘটিয়ে এই সিস্টেমটা দাঁড় করানো হয়েছে মোদি আর অমিত শাহের জুটিতে।  এবং ততই খোলাখুলি তাদের কাজের ধরণ। যেমন ২০১৯ সালের নির্বাচনে আইনভঙ্গের জন্য অনেক প্রার্থীকে সতর্ক করে ফাইন বা শাস্তি দিয়েছিল কমিশন। কিন্তু মোদির নামে বহু অভিযোগ জমা পড়লেও বা স্থানীয় নির্বাচনী কমিশন কর্তারা একশনের অনুমতি চাইলেও কমিশনারেরা তাতে অনুমতি দেয় নাই। অর্থাৎ প্রার্থী মোদি বিরুদ্ধে নির্বাচনি আইন ভঙ্গের সব অভিযোগই ব্যবস্থাহীন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থেকেছিল সেবার।  ভারতের নির্বাচন কমিশন প্রধান-সহ তিন সদস্য বিশিষ্ট। এটা সব সময় তাদের দুই-এক ভোটে এমন সিদ্ধান্ত দিয়েছিল সেসময়। আর তৃতীয় সদস্য অশোক লাভাসা, তাঁর আপত্তি ভোট সবসময় সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখিয়ে উপেক্ষা করা হয়েছে। সেই নির্বাচন শেষে কয়েক বছরের মধ্যে শেষে অশোক লাভাসাকে কমিশন ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। আপোষ করে তিনি এখন ম্যানিলায় বিশ্বব্যাংক সমতুল্য এডিবি-তে ভারত সরকারের প্রতিনিধি হয়ে লটকে আছেন। মানে নির্বাচন কমিশন থেকে তাঁকে বের করে দেয়া হয়েছে কায়দা করে।
    এমনকি এখনকার যে নির্বাচন কমিশন তা এবারের নির্বাচনী তারিখ ঘোষণার আগের সপ্তাহেও হয়ে পড়েছিল, এক সদস্য বিশিষ্ট; মানে কেবল প্রধান কমিশনার বিশিষ্ট। কারণ, আভ্যন্তরীণ আয়োজনে মোদি বাকি দুজনের পদত্যাগ করায়ছেন যাতে মোদি নয়া দুজন নতুন পছন্দের কমিশনার নিতে পারেন। তাই-ই হয়েছিল। আর এরপর তিন-সদস্য বিশিষ্ট হয়েই দুদিন পরে ঐ কমিশন এবারের নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করেছিল। আমাদের দুদকের মত তথাকথিত এমন নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান মোদির হাতে অনেকগুলো। যেমন সিবিআই [Central Bureau of Investigation], ইডি[Enforcement Directorate] ,  এনআইএ [National Investigation Agency], আইবি [Intelligence Bureau (India]; এছাড়া আয়কর বিভাগ আছে। আর এর বাইরে যে আর কত এমন প্রতিষ্ঠান আছে অগুনতি। কিন্তু সারকথা হল, বিভিন্ন রাজ্যের বিরোধীদলের বিরুদ্ধে মোদি্র এদের লাগিয়ে দেয়া, হয়রানি করা, বিজেপির সাথে আপোষে আসতে বাধ্য করাই এদের মুল লক্ষ্য হয়ে আছে মোদির ইচ্ছায়। এসবই মূলত পলিটিক্যাল স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহার।
    আর এর বাইরে গত পাঁচ বছরে ধরে চলেছে মোদির আরেক মারাত্মক ব্যবস্থা। এর আনুষ্ঠানিক নাম ইলেকটোরাল বন্ড [electoral bonds] স্কিম। সরকারী ব্যাংক স্টেট ব্যাংক [SBI] থেকে এটা কেবল যেন বিজেপি-কে চাঁদা আদায়ের এ’এক আজিব ব্যবস্থা। এই ব্যাংক আসলে বড় ব্যবসায়ীদেরকে এই বন্ড বিক্রি করে থাকে; কিন্তু কে কিনল সে পরিচয় পাবলিকলি দেখায় না। আর বিজেপি সরকার উপরে যে দুদক সমতুল্য প্রতিষ্ঠানের কিছু নাম দেখালাম, এদেরকে দিয়ে হয়রানির ভয় দেখিয়ে ঐ ব্যাংকে চাঁদা জমা করে আসতে মানে বন্ড কিনতে বাধ্য করে থাকে। এখাতে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুসারে প্রায় একমাত্র সুবিধাভোগী হল বিজেপি। আর মোট এমন বন্ডের পরিমাণ ১২ হাজার কোটি রুপীরও বেশী। গত ২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে থেকে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। এটা পাঁচ বছর লুটপাট করতে দিবার পরে এবার নির্বাচনের আগে সুপ্রীম কোর্ট বীর হয়ে উঠেছিল। তারা ওসব চাঁদাদাতা সবার নামের তালিকা চলতি নির্বাচনের কয়েকদিন আগেই একদিনের মধ্যে  প্রকাশ করতে “স্টেট ব্যাংক-কে পালনীয় বাধ্যতামূলক” বলে নোটিফাই করেছিল। আর তাতেই সব নাম বের হয়ে আসে। অথচ পাঁচ বছর আগেই একাজ তারা করতে পারত।
    সবচেয়ে বড় কথা উপরে যেসব ইনভেস্টিগেশন প্রতিষ্ঠানের অল্পকিছু তালিকা দিয়েছি সেগুলো অপব্যবহার করেই বিজেপি সব বিরোধীদল আর ব্যবসায়ীদেরকে সাইজ করে গেছে যাচ্ছে। অথচ না সুপ্রীম কোর্ট বা নির্বাচন কমিশন এদিকে তাকায়-ই নাই। এটাই মূলত মোদির নামে এখন ফ্যাসিজমের অভিযোগ তুলেঅনেককে আগিয়ে আসতে দেখছি। কিন্তু এমন অভিযোগ তোলার ক্ষমতা এখনও যেন তাদের দেশের বাইরে – বাইডেন প্রশাসনের হাতে! এমনই দুর্দশা!

    আর এমন মোদি-ব্যবস্থার মধ্যেই আবার এবারের নির্বাচন হচ্ছে! আর কোর্ট বা কমিশন এব্যাপারে নির্বিকার! দেখেন এটা কমবেশি এখন সবাই জানে যে সরাসরি মুসলমানবিদ্বেষ করে ঘৃণা জাগিয়ে মোদি ভোটের প্রপাগান্ডা পরিচালনা চালিয়ে যাচ্ছে! অথচ এটা ঠেকানোই ছিল কোর্ট এবং কমিশন   এর মুখ্য দায়ীত্ব! কিন্তু এরা নির্বিকার! এটাই প্রমান করে ভারত কোন চুলায় মাথা লুকায়েছে! অথচ সমাজ অসহায়! এমনকি মোদিকে ফ্যাসিবাদ বলতেও যেন সাহস করছে না!

    এখন দুইটা শেষ কথাঃ
    অনেকাংশেই কথাগুলো বলব ভারত-ইরানের চাবাহার পোর্ট কে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি ইরান-ভারত চুক্তি হয়েছে। আর তাতে পোর্ট পরিচালনা ভারতকে দেয়া হয়েছে। আর তাতেই আমেরিকা ভারতকে কড়া স্যাংশনের হুশিয়ারি দিয়েছে।

    ১। এই নির্বাচনে মোদি ফিরে জিতুক কিংবা বিরোধি কোয়ালিশন জিতুক – একটা মূল কথা হল, ভারত ক্রমশ আমেরিকা থেকে দূরে যেতে থাকবে।  মানে ততই ভারত একেবারে চীনের কোলে উঠে না গেলেও অন্তত নিউট্রাল বা একধরণের গভীর ব্যবসায়িক সম্পর্ক করতে অনেক ধাপ আগিয়ে যাবে। এককথায় বললে, চীন-ভারত উভয়ের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ বিষয়ক দুরত্বটা ফিকে হতে থাকবে। আর ব্যবসায়িক স্বার্থ ততই ওর জায়গা নিবে।
    বাংলাদেশের গত কথিত নির্বাচনের কয়েকদিন আগে আমি লিখেছিলাম আমেরিকা আমাদেরকে রাস্তায় ফেলে চলে গেলে তা এশিয়া থেকেই আমেরিকার বিদায়ের সুত্রপাত ঘটবে। এখানে সেই কথাটাই বলছি তবে আরেক ভাবে আরেক দিক থেকে। এবার মোদি ক্ষমতায় নিজেকে বিজয়ী দাবি করে টিকে গেলে ইন্ডিয়া-আমেরিকার সম্পর্কের পতন ও পারস্পরিক দুরত্ব ঘটবে খুবই দ্রুত। আর যদি কংগ্রেস এন্ড গং জিততে পারে তবে সাময়িক এই নয়া সরকার আমেরিকা-ঘনিষ্ট বলে নিজেদের দেখানো শুরু করবে। কিন্তু সেটা হবে সাময়িক ক্ষীণ আয়ুর এক ঘটনা। মানে জমবে না। অচিরেই একেবারে সাধারণ ব্যাবসায়িক স্বার্থের বিরোধ বাধা হবে।
    যেমন ধরা যাক, ভারত-ইরানের চাবাহার পোট [Chabahar Port ]। এটা এদুই দেশের জন্যই গুরুত্বপুর্ণ , তবু ভারতের জন্য বেশী।  পাকিস্তানের গোয়াদর গভীর সমুদ্র বন্দর ভারত পুরানা ক্যাচালের কারণে ব্যবহার করতে পারবে না। এর মানে হল, সেন্ট্রাল এশিয়া বা আফগানিস্তানে (ল্যান্ডলক দেশ) পণ্য পাঠাতে অসুবিধায় পড়তে হবে। অথচ ঐ রুটে শুধু গোয়াদরের সুবিধা না। আর গোয়াদর ব্যবহার করতে পারলে এরপর ওদিকে চীনের বেল্ট-রোধ ধরে একদিকে একেবারে ইউরোপ পর্যন্ত ট্রেন বা সড়ক পথে পরিবহনের যে সুবিধা; অন্যদিকে ইরান থেকে পুবে সেন্ট্রাল এশিয়া আফগানিস্থান যে সড়ক ও রেল সুবিধা তৈরি হয়েছে তা থেকে ভারত বঞ্চিত হয়ে আছে।  এসব কিছুরই অন্তত এক ছোট বিকল্প হলেও চাবাহার ভারতের জন্য এক ভাল বিকল্প ও বাস্তবতা।
    কিন্তু আমেরিকা ইরানের সাথে কোন সম্পর্কই রাখা যাবে না কেউ রাখলে তার উপর স্যাংশন দেয়া হবে – এই হুশিয়ারিই আমেরিকার এশিয়া থেকে বিদায় হয়ে যাবার পথেই তাকে কয়েক ধাপ ঠেলে দিবে। কারণ, ভারতে মোদি অথবা রাহুল যাদের সরকারই আসুক কারোই চাবাহারের পক্ষে না থাকার বিকল্প নাই। কারণ, এটা ভারতের জন্য বিরাট এক বাণিজ্যিক সুযোগ। কাজেই আমেরিকা বিরোধিতার পথেই ভারতকে যেতে হবে।

    আবার সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ  আরেকদিকের কথা বলিঃ
    ইরানের ভারতকে দেয়া এই অফার – এবিষয়ে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি এতে চীনের সম্মতি আছে। আর আছে বলেই ইরান সহজেই এতদুর আগিয়ে পোর্ট পরিচালনার ভার ভারতকে দিয়ে দিয়েছে। যেখানে আমেরিকান সুবিধা খেতে ট্রাম্পের আমলে ভারত ইরানের হাত ছেড়ে পালিয়েছিল। সেসময় ইরান তেল ভারতে পৌছে দিতে চেয়েছিল তাও ভারত ইরানের তেল কিনতে রাজি হয় নাই। বরং রাজি না হয়ে এই সিদ্ধান্তকে বিক্রি করে আমেরিকার থেকে সুবিধা নিয়েছিল। সেই থেকে চাবাহার প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে গেছিল। কিন্তু প্রতিশোধ ভুলে এখন ইরানের আবার আগানো এটা চীনের আগ্রহ ও প্ররোচনাতেই বলে অনুমেয়। চীনের ক্যালকুলেশন পাকা যে ইরান এই সুবিধা দিলেই ভারতের আমেরিকার বিরোধিতা বাস্তবতা হয়ে উঠবে।  আর সেটা দেখতেই ইরানকে দিয়ে এই অফার। বাণিজ্যিক দিক থেকে এতে ইরানেরও তো ক্ষতি নাই।
    আবার এ’ঘটানার মাধ্যমে চীন ভারতের কাছে ম্যাসেজ দিয়েছে যে ভারতেরও বাণিজ্য সুবিধা কার্টেল / ছেটে ছোট করা চীনের নীতি নয়, তাতে চীন-ভারত যতই বিরোধ থাকুক। আসলে চীন ভারতকে বলতে চায় ভারতও গোয়াদর ডিপ পোর্ট হয়ে বেল্ট-রোড ধরে সেন্ট্রাল এশিয়া বা আফগানিস্থানে বা অন্যদিকে, ইউরোপ পর্যন্ত চীনা বেল্ট-রোডের রেল ও সড়ক ফেসিলিটিজও ব্যবহার করতে পারে। চীন এনিয়ে বাধা তৈরির বদলে পজিটিভলি আহবান জানাচ্ছে। ভারতের অর্থনীতি বিকাশে চীনের ক্ষতি নাই, লাভ আছে। এছাড়া সবচেয়ে বড় লাভ দক্ষিণ এশিয়া থেকে আমেরিকাকে আউট করা হবে তাতে। কারণ, আমেরিকা ভারতে পা রাখতে সুযোগ পায় বলেই বার্মা, বাংলাদেশের মত দেশে যা খুশি করার চেষ্টা করে থাকে।
    এখন মোদি ক্ষমতায় ফিরলে আমেরিকা-ভারতের সম্পর্কের ইতি দ্রুত ঘটবে। আর আমেরিকা ভারতের উপর স্যাংশন দিলে তাতে ভারতও দ্বন্দ্ব ভুলে বাধ্য হয়ে ডলার ফেলে ইউয়ানে বাণিজ্য শুরু করে দিবে।  আবার যদি কংগ্রেস কোয়ালিশন ক্ষমতায় আসে তাহলেও এটাই ঘটবে। হয়ত শুরুর এক বড় জোর দুই বছর একটু আমেরিকান-ভারত (কংগ্রেস) ঘষাঘষি জারি থাকবে। আর ক্রমশ সেটা ভারতের বাণিজ্য স্বার্থেই হবু কংগ্রেস সরকারও একই পথ ধরবে। খুব সম্ভবত সেক্ষেত্রে মোদির চেয়ে দ্রুতই কংগ্রেস চীনের কোলে গিয়ে উঠার সুযোগ নিতে চাইবে।

    ২। মোদি যদি ক্ষমতায় ফিরতে পারেনঃ
    সেক্ষেত্রে এটা চরম দানব এক মোদি হবে। বিরোধী বলে কারো অস্তিত্ব নিয়ে টিকাই মুশকিল হয়ে যাবে। ইতোমধ্যেই কানাঘুষা তিনি ভারতের কনষ্টিটিউশনেও হাত দিবেন।  এই ধারা যতই তীব্র হবে হিন্দুত্ববাদী – এই উগ্র জাতিবাদি মোদির ভারত ততই পরিণতিতে বিচ্ছিন্নতা বাদের মুখোমুখি হবে। আর তা ঘটে গেলে ভারত মেজর তিন টুকরা হবে। মোদি এখন ক্ষমতায় টিকে আছে ভারতরাষ্ট্র গঠনগত দিক থেকে এক সেন্ট্রালাইজড কুক্ষিগত ক্ষমতার আর এর উপর আবার উগ্র হিন্দু-জাতিবাদি রাষ্ট্র বলে। আবার এটাই আবার মোদির আগামিতে ক্ষমতায় উত্থান ঘটলে এই গঠন বৈশিষ্টই মোদির ভারতকে ভাঙ্গনের দিকে নিয়ে যাবে দ্রুত!

    সব মিলিয়ে ভারতের প্রতিটা পরিবর্তনের ধাক্কা চাপ (এমনকি শরণার্থীর) বাংলাদেশে এসে আছড়ে পড়তে পারে সেক্ষেত্রে! বাকি যা কিছু পাঠক আন্দাজ করে নিয়েন। এই হল, আগামি দিনের দক্ষিণ এশিয়ার কিছু বিচ্ছিন্ন চিত্র!

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ    ১৭ মে ২০২৪  সন্ধ্যা ০৭ঃ ১৮
    শেষ আপডেটঃ   ২৪ মে ২০২৪  বিকাল ০৩ঃ ৫৫

  • গত পরশু পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর মিথ্যা প্রপাগান্ডা

    গত পরশু পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর মিথ্যা প্রপাগান্ডা
    গৌতম দাস
    ৩১ মার্চ ২০২৪ সন্ধ্যা ০৭ঃ ৫৩
    https://wp.me/p1sCvy-5tZ

    ‘ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই পিটার হাস গা ঢাকা দিয়েছেন’

     

    রাতে বাসায় ফেরার পথে বাঁশ বাগানের নিচ দিয়ে যেতে যেতে পথিক ভুতের ভয়ে উচ্চস্বরে গান গেয়ে থাকে। সে অবস্থা হয়েছে ভারতের পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর! পিনাক বাংলাদেশে ২০০৭ সালে, ১/১১ এর শুরুর কালে ভারতীয় রাষ্ট্রদুত ছিলেন। আর, বর্তমানে রিটায়ার্ড সরকারী কূটনৈতিক চাকরি থেকে; তবে এখন নয়াদিল্লি-কেন্দ্রিক এক স্থানীয় থিঙ্কট্যাংক [ORF] এর ফেলো। ভারত সরকারের হয়ে বা র-এর হয়ে বয়ান দিতে তিনি সময় সময়ে ক্ষেপ মারা বক্তব্য দিয়ে থাকেন। এবারও তাই!  সম্প্রতি বাংলাদেশকে নিয়ে তিনি শতভাগ মিথ্যা – যেটাকে ডাহা মিথ্যা বলা হয় – এমন এক বয়ান ছেড়েছেন। পত্রিকার শিরোনামে তা হল, ‘ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই পিটার হাস গা ঢাকা দিয়েছেন’। আমাদের বাংলা ট্রিবিউন পত্রিকা যেটাকে বলা যায় প্রো-ভারত এজেন্সির দ্বিতীয় প্রজন্ম – এদের পত্রিকা; এরা হাসিনার এই কালে নিয়মিত নয়াদিল্লির এক রঞ্জন বসুর কলাম ছেপে থাকেন।  বসুন্ধরার সময় খারাপ যাচ্ছে; পত্রিকায় অর্থ ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। তাই এবার এমন ফোকাস কাজের কনট্যাক্ট পেয়েছে যেন এই বাংলা ট্রিবিউন। এখানে ছাপা হওয়া প্রোপান্ডা নিউজের শিরোনাম হল  ‘ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই পিটার হাস গা ঢাকা দিয়েছেন’। এটা লিড প্রোপাগান্ডিস্ট এর খবর। আর বাকি আরো তিনটা পত্রিকাও (যুগান্তর, ভোরের কাগজ,  প্রথম আলো ইত্যাদি) একই খবরটা নিজেরা করছে সুত্রবিহীন গায়েবি খবর হিসাবে তারা ছেপেছে। প্রথম আলোর কায়দাটা মোক্ষম, তারা একই বয়ান কিন্তু দাবি করেছে এটা তাদের দিল্লির প্রতিবেদক সৌম্য ব্যানার্জি এর পাঠানো খবর।

    ঘটনাস্থল দিল্লি কিন্তু আওয়াজ বাংলাদেশেঃ
    ঘটনাস্থল দিল্লি যেখানে পিনাক রঞ্জনের এক বই-প্রকাশ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল। তার তাতে সেই বইয়ের খবর পাশে ফেলে রেখে দিয়ে, – এই ডাহা মিথ্যা প্রপাগান্ডাটা ছড়ানো হয়েছে মূলত পিনাক রঞ্জনের মুখ দিয়ে।  আর এই প্রপান্ডা খবরের ব্যাকগ্রাউন্ড বা পটভুমিটা হল বাংলাদেশে ক্রমশ তুঙ্গে উঠা ভারত-বিরোধিতার ক্ষোভ যা ভারতের পণ্য বর্জন নামে শুরু হলেও এখন ভারত খেদাও বলে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করতে চাইছে। রাজনীতিতে যা কিছুই হাসিনাবিরোধী বা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বা গণ-মানুষের স্বার্থবিরোধী বা অপছন্দের – তাই, একই সাথে ভারতের ইন্ধনে ঘটছে বলে তা ভারতবিরোধীও – এই হল এর প্রধান বক্তব্য – প্রাইম ন্যারেটিভ লাইন অব পলিটিক্স!  আর সর্বশেষ এতে বিএনপি কার্যত পুরাদমে নেমে পড়াতে এর মোমেন্টাম এখন তুঙ্গে উঠেছে!  তা এখনই খোদ হাসিনা সরকার ও মোদির ভারতও দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। অথচ এই পরিস্থিতি তো খোদ সরকারই ডেকে এনেছে।  যেমন  – “ভারত পাশে ছিল বলেই” – নাকি সরকার এখন ক্ষমতায় বলে ভারতকে হাসিনা সরকার নিজের ভগবান বানিয়ে ফেলেছে। এমন বক্তব্যটাই যে সরকারের বিরুদ্ধে যেতে পারে তা সরকার ভাবেই নাই।  এই বাড়াবাড়িটাই কী শেষে নিজেদেরই বিরুদ্ধে  চলে যাচ্ছে – বলে হাসিনা-ভারতের মনে “কু-ডাকা” শুরু করেছে বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে!
    আর এই দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা থেকে বের হতেই সম্ভবত হাজির করানো হয়েছে পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীকে। আর এবার তাঁর সাথে আছে ইসলাম  বা এনিয়ে এথনিক উন্নাসিকতার প্রতিবিম্ব বীনা সিক্রি। সাথে আমাদের “এক সাবেক” শহিদুল হকও ডাক পেয়ে বর্তে গেছেন; কিছু কাজ পেয়েছেন বেকার জীবনে!

    সবচেয়ে বড় তামাসাটা হল  একটা শিয়ালেরও যে বুদ্ধি আছে – মানে একটা শিয়ালও জানে বাঘ মামাকে কেন মামা বলে তোয়াজ করতে হবে! আবার তাই বলে মামার আসনে বসে নিজেকেই “বনের রাজা” দাবি করা বা ভাব ধরা যে চরম গর্হিত কাজ সেটা শিয়াল পরিস্কার বুঝে! তাই একাজ সে কখনও করে না!  কিন্তু পিনাক রঞ্জন তাও বুঝে নাই। তিনি দাবি করেছেন যেন মোদির ভারতই পরাশক্তি আর পিটার হাসের আমেরিকা হল ভারতের অনুসারি এক স্যাটেলাইট রাষ্ট্র! তাই ভারতের এক হুঙ্কারে –  ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই– নাকি পিটার হাস হাসিনাকে বিরক্ত করা ছেড়ে একেবারেই পালিয়েছে!!!! যুগান্তর এনিয়ে লিখেছে পিটার হাস নাকি এই হুঙ্কারেই আত্মগোপনে চলে গেছেন।  এই হল আমেরিকার জায়গায় যেন ভারতই হল যে পরাশক্তি – এমন ভাবনায় মোদির দালালটা হলেন পিনাক রঞ্জন!

    ভারতের কঠোর অবস্থান জিনিষটা কীঃ
     এখনও আমেরিকাই এক পরাশক্তি  – তাতে আমরা যতই আমেরিকান অযোগ্যতা তুলে ধরি না কেন; অথবা আমরা যতই প্রমাণ দেই যে আমেরিকার পুরান সক্ষমতা ঢিলা হয়ে যাচ্ছে। আমাদের এসব অবজারভেশন সত্য হলেও আমেরিকা এখনও পরাশক্তি!  এটা মাথায় রেখে আমাদের কথা বলতে হবে। বাইডেনের গত দুই বছরের প্রচেষ্টা ছিল মূলত চীনের বাইরেটাতে এশিয়াকে কতটা চীন-মুক্ত করা যায় এরই প্রচেষ্টা ও পরীক্ষা করতে বসা। তাই এশিয়াকে চীন-মুক্ত অর্থে বাংলাদেশকেও কতটা চীন-মুক্ত করা যায়; এই লক্ষ্যে বাইডেন তিনটা জিনিষ প্রয়োগ করেছিল – গণতন্ত্র, মানবাধিকার আর স্যাংশন।  কিন্তু ডিসেম্বর ২০২৩ ছিল টাইম লিমিট।  আর এই সময়কালের মধ্যে তারা নিজেদের টার্গেট কিছুই তেমন অর্জন করতে পারছেনা  – এটা টের পাবার পরেই তারা ২০০৭ সালের মতই দ্বিতীয়বার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে কেটে পড়ার পথে রওয়ানা দিয়েছে – আমার আগের লেখায় আমি এটাই বলছি। যেটাকে আমরা আমেরিকার ফেলে পালানো বা প্রতারণা বলছি। আর এই বিষয়টাকে আমরা তুলে ধরাতে এই সুযোগে মোদির চামচা  পিনাক রঞ্জন র-এর খেপ মারতে এসে হাজির!  ভারতের ফাঁকা বাহাদুরি যে যেন ভারত হুঙ্কার দিয়েছে বলেই  বা ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই– নাকি পিটার হাসের আমেরিকা ভাগছে!  ভারতের এসব হামবড়া বা মুই কি হনু রে ভাব এসব মফস্বলি ভাব-স্বভাব সেই নেহেরু আমলের!  যে সবসময় ভাব করতে চায় বৃটিশেরা চলে গেলেও নেহেরুই এখন ভাইসরয় বা রাণীর রেখে যাওয়া প্রতিনিধি!!! অথচ রাণীর শাসন মানে এক ঘৃণিত কলোনি দখলদারের শাসন সেটাই ভারত এখনও বুঝতে পারল না! এসব কথা বার্তা এতই পেটি-সংকীর্ণ যে কথা বলতে অস্বস্তি লাগে। যেমন পিনাক লিখছেন শুনিয়ে দেয়া – বলছেন “কড়া বার্তাটা (আমেরিকাকে) শুনিয়ে দেয়া হয়েছিল”। মানে ব্যাপারটা যেন নিম্ন আয়ের ঘরের বউ-শাশুড়ি বা বউ-ননদের কথা শুনিয়ে দেওয়ার তৃপ্তি…!  কথা শুনানোর তৃপ্তি তিনি কলকাতায় থাকার সময়ে শিখেছিলেন; এখন অভ্যাস হয়ে গেছে! অথচ সেই স্বভাব না গেলেও বনে গেছেন তো কূটনীতিক!!!

    যাহোক আমরা যদি গত ২০২৩ সাল জুড়ে র-এর তিন হাতা-চামচা; মানে সুবীর ভৌমিক, এএমএন আবদি  আর চন্দন নন্দী – এই তিনের কথা মানে তারা এসময়ে যত কিছু লিখেছেন তা পিনাক রঞ্জনকে দেখতে বলি, পরামর্শ দেই –  কারণ, তাদের সেসব লেখাই পিনাক রঞ্জন-কে মিথ্যাবাদি বলে দেখাবে! সেসময়ের এই তিন জন সমানে প্রতিটা লেখায় আকুলিবিকুলি করে গেছে আমেরিকার সমীপে আবেদন করে। যার সার কথা, আমেরিকা তুমি হাসিনা সরকারকে স্যাংশন দিয়ে দিলে বা তাতে এসরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে ভারতের আর বাংলাদেশকে চুষে লুটে খাবার গত ১৫ বছরের সুখ সব শেষ হয়ে যাবে। তাহলে এখন পিনাক রঞ্জন কী বলতে চাচ্ছেন এটাই ভারতের কঠোর অবস্থান এর নমুনা???? নিজেকেই এসব আত্ম-প্রতারণা কেন করছেন তিনি?
    এমনকি শেষ লেখায় ফেডারল পত্রিকায় সুবীর মন্তব্য করেছেন – হাসিনা সম্ভাব্য ক্ষমতাচ্যুতির পরে আমেরিকা বার্মার দখল নিলে সেটা নাকি এক []Will US do a Bosnia on Myanmar?….]https://thefederal.com/opinion/will-us-do-a-bosnia-on-myanmar-no-fly-zone-move-may-involve-india/ মানে বসনিয়া কসোভো ম্যাসাকারে এথনিক ক্লিনজিং বা নির্মুল এর মত ঘটনা হবে।  র-এর এই তিন এজেন্ট এর লেখাগুলোই বড় সাক্ষী যে গত ২০২৩ সাল জুড়ে ভারতের অবস্থান আর মুরোদ কী ছিল! পিনাক রঞ্জনের উচিত ছিল আগে কিছু পড়াশুনা করা; না আমাদের লেখা পড়ার কথা বলছি না। এবারের বই প্রকাশের নামে প্রপাগান্ডায় এসাইমেন্ট নিয়ে নামার আগে পিনাক রঞ্জনের উচিত ছিল এটুক হোম-ওয়ার্ক করে আসা!

    সেক্রেটারি ওবায়দুল কাদের কবে থেকে বলা শুরু করেন – “ভারত পাশে ছিল বলেইঃ”
    এটা নিয়েও পিনাক রঞ্জনের সবার আগে স্টাডি করে আসা দরকার ছিল – বিশেষত এবারের এসাইনমেন্ট নিবার আগে!  কারণ, সেটাই পিনাক রঞ্জনের এবারের দাবি যে পুরাটাই মিথ্যা – এরই আরেক অকাট্য প্রমাণ!
    কাদের দাবি করে বলে যাচ্ছেন যে “ভারত পাশে ছিল বলেই” – বিএনপি আমেরিকান সহায়তা নিয়ে নির্বাচন বানচাল করতে পারে নাই! আর একথারই পিনাক রঞ্জনি ভাষ্য হল, ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই পিটার হাস বাবাজি ভেগে গেছিল।

    কিন্তু প্রশ্ন হল তাহলে কাদের কবে থেকে মানে কবে প্রথম বলা শুরু করলেন যে “ভারত পাশে ছিল বলেই” – …?
    আর সাথে দুইটা প্রশ্ন। কাদের কী নির্বাচনের আগে থেকে বলা শুরু করেছিলেন, না পরে? প্রশ্ন দুইঃ পরে হলে ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের কতদিন পরে?
    জবাদটা আগেই জানায় দেই। কাদের একথা বলা শুরু করেছেন ২৮ জানুয়ারি ২০২৪ থেকে।  মানে ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পরে। এবং নির্বাচনের  প্রায় তিন সপ্তাহ পরে।

    তাই, এর জবাব হাতে গুনে বলে দেয়া সম্ভব।  ওবায়দুল কাদের “ভারত পাশে ছিল বলেই” – এটা বলাটা নির্বাচনের আগে বলেন নাই। এমনকি নির্বাচনের পরে বা ৭ জানুয়ারির পরে পরেও না। এককথায় বলা যায়, ২৮ জানুয়ারি ২০২৪ এর আগে কখনই কাদের বলেন নাই।

    কেন?
    এবার ধারাক্রমে বলে দেয়া যাক!
    ১। ৮ জানুয়ারি ২০২৪ প্রথম ভারতীয় রাষ্ট্রদুত প্রণয় ভার্মা, হাসিনাকে ফোন করে কেবল নির্বাচনী বিজয়ে অভিনন্দন জানাতে পেরেছিলেন। যদিও এই খবরটুকুও দাবি করেছে কেবল আনন্দবাজার তাদের ইংলিশ ABPlive এর দাবি করা সেটা  – Indian Envoy Calls On Bangladesh PM Hasina After Her Election Victory For 5th Term। তাও আবার কিছুটা মিথ্যা দাবি আর চাতুরিতে এটা করা হয়েছে। যেমন শিরোনামে দেখেন Calls On আছে যার অর্থ কারও সাথে গিয়ে দেখা করা। এমনকি এই নিউজে একটা ছবি ব্যবহার করা হয়েছে যে হাসিনার সাথে প্রণয় ভার্মা কথা বলছেন। কিন্তু এটা কোনভাবেই কোন কল অন Calls On নয়, এটা ছিল ফোনে কথা বলা আর ঐকথার বিষয়বস্তু হল সংক্ষিপ্তভাবে নির্বাচনী বিজয়ে অভিনন্দন জানানো।  অর্থাৎ কাদেরের “ভারত পাশে ছিল বলেই” .অথবা পিনাকের ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই ইত্যাদি বলার সময় সেটা ছিল না। অথবা কোন মিডিয়াও এটা দাবি করে নাই।

    ২। পরের সাক্ষাত সেটা ঠিক সাক্ষাত না, ১৪ জানুয়ারি ২০২৪ সম্প্রীতির বাংলাদেশ নামে ভারতীয় কিছু পরিচিত বাংলাদেশি এজেন্টদের খুশি প্রকাশ। সারকথায় প্রণয় ভার্মা সেখানে সরকারের কারও সাথে কথা বলেও যান নাই। ‘মিট দ্যা সোসাইটি’ শীর্ষক আলোচনা  – এনিয়ে একমাত্র ইত্তেফাক এখানে বিরাট সার্ভিস দেয়া এক রিপোর্ট করেছে।

    ৩। পরের সাক্ষাত একেবারে ১৫ জানুয়ারি ২০২৪। বাংলাদেশ-ভারত দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাত; কারণ ওটা ছিল এর আগেই ১১ জানুয়ারিতে শপথ নেয়া নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদের সাথে প্রণয় ভার্মার প্রথম সাক্ষাত। কিন্তু সেখানেও কথাবার্তায় মুখ্য বিষয় কী ছিল? সেটাও – কাদেরের “ভারত পাশে ছিল বলেই” .অথবা পিনাকের ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই ইত্যাদি কোন প্রসঙ্গ ছিল না। এনিয়ে সরকারি বাসসের নিউজের শিরোনাম, দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্যে টাকা-রুপি ব্যবহারের উদ্যোগ প্রশংসনীয় : সৌজন্য সাক্ষাতে এলে প্রণয় ভার্মা’কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী – অর্থাৎ এখানেও এটা কাদের বা পিনাক রঞ্জনের দাবি করা ইস্যু নাই।  এই ইস্যুতে বনিক বার্তার রিপোর্ট এর শিরোনাম দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো গতিশীল হবে -ভারতীয় হাইকমিশনার যার মানে হল ভারত এখানে “উন্নয়ন অংশীদারত্ব” হতে চলে গেছে। কোনই রাজনৈতিক ইস্যু এটা ছিল না। অর্থাৎ প্রণয় ভার্মা খুজে পাচ্ছিলেন না ৭ জানুয়ারির পরে কী নিয়ে বাংলাদেশের সাথে কথা শুরু করলে তা সঠিক হবে।

    ৪।  এরপরেই একেবারে ২৮ জানুয়ারী ২০২৪।
    এদিন থেকেই কাদের ও প্রণয় ভার্মা  উভয়েই কথা মানে কথা বলার ইস্যু – খুঁজে পাওয়া শুরু করতেন।  দেশ রুপান্তর এর শিরোনাম, নির্বাচনের সময় ভারতে আমাদের পাশে জোরালোভাবে দাঁড়িয়েছিল। এরপর কালবেলা এর শিরীনাম –  অবিশ্বাসের দেয়াল ভেঙেছেন দুদেশের প্রধানমন্ত্রী : ওবায়দুল কাদের। এরপর  টিবিএস এর রিপোর্ট-  India stood beside Bangladesh when BNP tried to foil polls with another country’s help: Quader । কেন ডেইলি স্টার এর শিরোনাম – India played its part as ‘honest neighbour’: Quader । এর সোজা মানে হল, কাদের এর আগে জানতেনই না যে  আমাদের কথিত ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে-পরে “ভারত পাশে ছিল বলেই” – কিনা?
    একইভাবে পিনাক রঞ্জনও জানতেন না যে   ভারতের কোন কঠোর অবস্থানের কারণেই ইত্যাদিতে আমেরিকার পিটার হাস পালিয়ে গেছিলেন কিনা!!

    চীন আর চীন-ময়ঃ
    ৭ জানুয়ারি নির্বাচন হয়েছিল। সেই থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন আমাদের মিডিয়া শিরোনামে চীন থেকেছিল।

    ধারাক্রমে সেসব খবরঃ
    ১। ২২ জানুয়ারি বিডিনিউজ চীনা রাষ্ট্রদুত আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালের সাথে দেখা করেছেন সেই রিপোর্ট
    ২। ২২ জানুয়ারি   নয়াদিগন্ত আরেকটা রিপোর্ট নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়াতে চীনের প্রতি অনুরোধ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

    ৩। ২৫ জানুয়ারি আরেক রিপোর্ট ‘শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রী পুনর্নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন শি’ – হাসিনার সাথে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধির সাক্ষাতে। এটা বাসসের রিপোর্ট ছাপিয়েছে যুগান্তর।

    ৪। ২৫ জানুয়ারি আরেক রিপোর্ট বাংলা ট্রিবিউন, চীনের কাছে আরও সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

    ৫। ২৮ জানুয়ারির বনিক বার্তার রিপোর্ট বাংলাদেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে পাশে থাকবে চীন— রাষ্ট্রদূত
    ৬। ২৮ জানুয়ারি আরেক মারাত্মক নিউজ হাসিনার চীন সফরের দাওয়াত নিয়ে, China invites PM Hasina on official visit to Beijing। মজার কথা হল এটা সরকারি রিপোর্ট। মানে বাসসের করা রিপোর্ট যা ছেপেছে ইংলিশ ট্রিবিউন।

    ৬। ৩০ জানুয়ারি বিবিসি বাংলা (এরা বাংলাদেশের ভিতরের রিপোর্ট ছাপতে ছাপতে দেরি করে ফেলে তাই) বাংলাদেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন ‘পাশে থাকবে’ কীভাবে?

    তাহলে সারকথাটা কী দাড়ালোঃ
    মূলকথাটা হল, পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী ডাহা মিথ্যা বলছেন। এর সোজা মানে হল, ৭ জানুয়ারি কথিত নির্বাচনের আগে-পরে ভারতের হুঙ্কারে পিটার হাসের আমেরিকা ভেগে গেছিল – এটা পুরাটাই মিথ্যা দাবি।  বরং ৭ জানুয়ারির আগে ভারত অসহায়ত্ব প্রকাশ করে গেছে, আক্ষেপ করেছে।  আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল, নির্বাচনের পরের বিশদিন। প্রতিদিনের সংবাদের শিরোনাম হয়ে থেকেছিল চীন। গত ১১১ জানুয়ারি নয়া মন্ত্রীরা আর সংসদ সদস্যরা সকলেই নিজ নিজ শপথ গ্রহণ এবং নয়া মন্ত্রীসভা গঠন সব সম্পন্ন করে ফেলেছিলেন। সেই থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত চীন ছিল সব খবরের উপরে আর তা প্রতিদিন!

    কিন্তু হায় ২৮ জানুয়ারি ২০২৪ ছিল জংশন পয়েন্ট।    ঐদিনের পরে আর চীনের সাথে সরকারের কোন সম্পর্ক আলাপ দেখা সাক্ষাতের খবর মিডিয়ায় আর দেখা যায় নাই। মানে এসব ঘটেছে এমন কোন সংবাদ নাই। সোজা কথায় এসব আর ঘটে নাই। বরং একই ২৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি ওবায়দুল কাদের সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে ঢাকায় প্রণয় ভার্মার সাথে সাক্ষাত করেন। আর এরপর থেকে সব কিছু ঘুরে যায়। মজার কথা হল, ২৮ জানুয়ারি নিয়ে মিডিয়া রিপোর্টগুলো ছোট দুলাইনের। কিন্তু দিনশেষে সরকারি ভাষ্যটা আসে। যেটা সরকার UNB কে দিয়ে প্রকাশ করে। আর এতে মিডিয়ায় প্রাণ আসে। কারণ নাহলে অনুমিত কানাঘুষা শোনা দিয়ে রিপোর্ট হয় না। যেমন এজন্য ডেইলি স্টারের বড় রিপোর্টটা ২৯ জানুয়ারির।
    আর এই সরকারি ভাষ্য থেকেই শুরু হয়েছিল ভারত পাশে ছিল বলেই নির্বাচন নিয়ে কোনো দেশ অশুভ খেলার সাহস পায়নি :। যদিও ২৮ জানুয়ারির পরেই বক্তব্যটা এমন ছিল না। এমন বক্তব্য এসেছে আরো পরে ১৬ মার্চ ২০২৪। আর এর আগের বক্তব্যটা ছিল “India stood beside Bangladesh when BNP tried to foil polls with another country’s help: Quader – এরকম। এটাই ছিল খাটী সরকারি ভাষ্য। কারণ এটা টিবিএস UNB কে সরকারের প্রকাশিত বক্তব্যটাই হুবহু ছেপেছিল।  আর একই UNB এর সরকারী ভাষ্যই তবে অন্য অংশ থেকে তুলে এনে শিরোনাম করেছিল কালবেলা  অবিশ্বাসের দেয়াল ভেঙেছেন দুদেশের প্রধানমন্ত্রী : ওবায়দুল কাদের।
    প্রশ্ন হল, এখানে ২৮ জানুয়ারি কাদের কারকথা বলেছেন যার সাথে হাসিনার অবিশ্বাসের দেওয়াল ছিল??

    উত্তর সহজ। পিনাক রঞ্জন যদি দাবি করতে চান নির্বাচনের আগেই –  “ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই পিটার হাস বাবাজি ভেগে গেছিল”।  তাহলে এখন ব্যাখ্যা দেক উনি যে কাদের কেন ভারতের সাথে অবিশ্বাসের দেওয়ালের কথা বলছেন? অর্থাৎ অবিশ্বাস যে ছিল এটা তো পরিস্কার। এখানে অবিশ্বাস মানে হল আস্থাহীনতা যে ভারত কিছুই করতে পারলো না! এছাড়া আমরা উপরে দেখলাম ২৮ জানুয়ারির আগে ভারত কোন বোলচাল দাড় করাতেই পারে নাই।
    বরং এরপর ভারতের অজিত দোভাল এসেছেন ৫ ফেব্রুয়ারির আশেপাশের সময়ে। কারনে তার সফর নিয়ে আমাদের সরকার কোন পাবলিক বক্তব্য দেয় নাই। তবে কিছু কিছু পত্রিকায় অনুমিত নিউজ দেখা গেছে যেমন নিউ এজ এরটা – Ajit Doval completes brief visit to Bangladesh – ।
    আর এরপর থেকেই হাসিনা সরকার চীনের হাত ছেড়ে গাট্টিবোচকা নিয়ে ভারতের কোলে উঠা সম্পন্ন করেছিল।

    কিন্তু সাবধান! অনেকেই মনে করবেন হয়ত যে,  বুঝাই যাচ্ছে এরপর থেকেই পিনাক রঞ্জনের কাহিনী শুরু হয়েছে!! তাই কী????

    না সেটাও একেবারেই মিথ্যা।  কারণ এটা কোন পিটার হাসের আমেরিকাকে কোন “ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই – ছিল না। বরং উলটা হাসিনা সরকারের ভারতের কোলের পক্ষে ভারতের সমর্থন প্রকাশিত হয়েছিল ঐ একই ৫ ফেব্রুয়ারিতে। বাইডেন চিঠি লিখেছিলেন হাসিনাকে যেতা পিটার হাস সরকারকে পৌছে দিয়েছিলেন। অজিত দোভালের সফর আর পরে বাইডেনের আপোষের চিঠি সবটা মিলিয়েই হাসিনা চীন ত্যাগ করেছিলেন।
    আর এখন চান্স মত পিনাক রঞ্জন চাপাবাজির ঝুলি নিয়ে হাজির হয়েছেন – আমেরিকাকে কথিত ধমকদাতা হয়ে!

    আর সেই সাথে , কমপক্ষে গত ১৭ বছর ধরে “ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক” এক মহান অথবা চিরায়ত অথবা আমরা আমরাই তো ইত্যাদি ধরণের অসংখ্যা মিথ্যা আবেগ তুলে বারবার, ভাষ্য খাড়া করে গেছে ভারত; যার সার কথা হল বাংলাদেশ ভারতের সম্পত্তি বা ভারতের কলোনি। ভারতের এই  মনোভাবকে আমাদের কবর দিতে বন্দোবস্ত করতে হবে।
    এককথায়, ভারত আমেরিকার যৌথ উদ্যোগেই  হাসিনা সরকার চীনের হাত ছেড়ে গাট্টিবোচকা নিয়ে ভারতের কোলে উঠা সম্পন্ন করেছিল।  আর এটাকেই পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর মত মফস্বলী ভেবেছেন তিনি এখানে ডাহা মিথ্যা এক চাপাবাজি করলেও কেউ বুঝতে পারবে না। তাই ভারতের আমেরিকাকে ধমক দেয়া বা ভারতের কঠোর অবস্থানের কারণেই – বলে ডাহা মিথ্যা গল্প সাজিয়েছেন।

    তবে এসব যাই হোক হাসিনা-মোদি দুই সরকারেরি অনিশ্চয়তা টেনশন ক্রমশ বাড়ছে ভারত খেদাও পরিস্থিতিতে জনমত কী তারা নিজেরাই ডেকে আনলেন? এই ডেকে এনে কী তারা ভুল করলেন?
    বাকিটা আগামিতে……।

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ     মার্চ ২০২৪ ০৭ঃ ১৯   সন্ধ্যা
    আপডেটঃ     মার্চ ২০২৪ ০৮ঃ ১০   রাত

     

  • মোদি-চন্দ্রচূড়ের আদালত কী বাংলাদেশের জন্য ‘মডেল’ প্রশিক্ষক হতে চায়?

    মোদি-চন্দ্রচূড়ের আদালত কী বাংলাদেশের জন্য ‘মডেল’ প্রশিক্ষক হতে চায়?
    গৌতম দাস
    ০৩ মার্চ ২০২৪  সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫৭
    https://wp.me/p1sCvy-5sa

     

     

     

    একটা অন্যায়-অপরাধের প্রতিকার বলতে আরেকটা অন্যায় করা নয়! কিন্তু মানুষের জিঘাংসা এতই তীব্র, সে প্রতিহিংসার আগুনে এতই সাইকো যে মানুষ সে পথেই যায়!
    আর নিজের করা বর্তমানের অন্যায়-অপরাধের সাফাই হিসাবে সে আগে তার উপরে ঘটা অন্যায়-অপরাধকে হাজির করে!  তাতে কিছুই মুছে না, দুটাই অন্যায়-ই হয়ে জ্বল জ্বলে থেকে যায়!

    গত সপ্তাহে ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট আয়োজিত ঢাকার এক অনুষ্ঠানে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় যশোবন্ত চন্দ্রচূড়-কে [CJI  D. Y. CHANDRACHUD]  দাওয়াত দিয়ে আনা হয়েছিল। অফিসিয়াল দাওয়াত কার্ডের লেখা অনুসারে ব্যাপারটা ছিল – “The supreme Court of Bangladesh is going to organize an international conference on “South Asian Constitutional Court in The Twenty-First Century: Lessons from Bangladesh and India” on 23 & 24 February 2024. The valedictory scession of the conference will be held on 24 February 2024, at 10:00AM at the Bangabandhu International Conference center (BICC). – এরকম।
    মানে হল এই আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন করা হয়েছে; যদিও এতে অংশগ্রহণকারী কেবল ভারত ও বাংলাদেশ। আবার বলা হয়েছে, এটা দক্ষিণ এশিয়ার কনষ্টিটিউশনাল কোর্টের অভিজ্ঞতা নিয়ে আলাপ; যেখানে আবার কেবল ভারত আর বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা-পাঠ [lessions] নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু ঘটনা হল, দক্ষিণ-এশিয়া বলতে কেবল ভারত-বাংলাদেশই বুঝায় না। এভাবে ভারত কখনই তার দক্ষিণ-এশিয়ার ধারণা বাস্তবের সাথে মিলাতে না পারলেও একই কান্ড করে থাকে! আসলে ঘটেছে যেটা ভারতের মিথ্যা আধিপত্যের খপ্পরে পড়েছে বাংলাদেশ! আর সেটা ঢাকতেই এটা “দক্ষিণ-এশিয়ার ব্যাপার” বলে নোংরামি ঢেকে রাখার ভারতের এই অক্ষম প্রচেষ্টা!

     

    অনুষ্ঠানের আরো দৃষ্টিকটু দিকঃ
    ঘটনার আরো সব মারাত্মক দিক আছে। সবচেয়ে দৃষ্টিকটু হল, একটা জুডিশিয়ারি ক্ষমতা তা যেন এক্সিকিউটিভ (বা প্রধানমন্ত্রীর) ক্ষমতার অধীনে আছে ও থাকতে হবে এই অনুমানে দাঁড়িয়ে সবকিছু আয়োজন করা হয়েছে। কোন রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী বিভাগের অধীনে থাকে না। রাখা যায় না। বিচার বিভাগ জনপ্রশাসন বিভাগের মত নির্বাহি-প্রধানমন্ত্রীর অধীনের কোন প্রতিষ্ঠান নয়, পুলিশ বা সামরিক বিভাগের মতও নয় যে এসব অফিস বা বিভাগের মত বিচার বিভাগও প্রধানমন্ত্রীর অধীনের কোন সরকারি অফিস-প্রতিষ্ঠান নয়। তাহলে এটা আর রিপাবলিক রাষ্ট্র থাকে না! জনগণই ঐ প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতার উতস  তা আর কার্যত থাকে না!
    সেপারেশন অব পাওয়ার” বা বিচার বিভাগকে প্রধানমন্ত্রী (বা রাজার) নির্বাহী ক্ষমতা থেকে বিচ্ছিন্ন বা আলাদা করার কনসেপ্ট এটা ইউরোপে রাজতন্ত্রের আমল থেকেই চালু এক পজিটিভ ধারণা। অর্থাৎ পরবর্তিতে জনগণই সব শাসন ক্ষমতার উতস – যেটাকে ঐ শাসন ক্ষমতার উতস কোন রাজা-বাদশা নয়; তাদের ডায়নেস্টির বংশ-পরম্পরা বা রাজার ছেলে রাজাও আর নয় এমন নয়া এই রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণার মুলকথা চালু হয়েছিল। বলা হয় যা রাজতন্ত্র ব্যবস্থাকে নির্মুল করে ক্ষমতা নিয়েছিল – সেই রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা আসার আগেই এটা চালু হয়েছিল যে বিচার বিভাগকে রাজার (বা পরে সমতুল্য নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর) ক্ষমতা থেকে  আলাদা বা সেপারেট করতেই হবে। নইলে বিচার করা অর্থহীন। নির্বাহী ক্ষমতার শাসকের মুখ চেয়ে যে রায় দেয়া হয় ওটা বিচার নয়!

    তাই একালে রিপাবলিক নামে এক বাংলাদেশ রাষ্ট্র বা জনগণের শাসনের নামে কিছু একটা চালু আছে আমরা দেখছি  অথচ কিছু লোক মনে করছে যেন বিচার বিভাগও সর্বময় ক্ষমতার প্রধানমন্ত্রীর বাইরে থাকে কী করে?? অধীনেই তো থাকা উচিত! বিএনপি-জামাত জঙ্গীবাদ ঠেকাতে নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই বিচার বিভাগ গড়তে হবে যারা সহি মনে করছেন এটা তাঁরা গড়ে তুললে সেটা প্রধানমন্ত্রীর মুখ চেয়ে বিচার ও রায় দিবার এক বিচার বিভাগই হবে! এর বাইরে কিছু হবার সুযোগ নাই! এমনিতেই যেটা নিয়ে সরকার-বিরোধী যেকোন নাগরিকের ইতোমধ্যেও অভিযোগ করে আসছে। আমাদের বিচার বিভাগকেই ঢেলে সাজাতে হবে বলে মনে করে এমন অভিযোগকারিরা! সেখানে সুপ্রীম কোর্ট আয়োজিত এই কনফারেন্স আসলে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগকেই পুষ্ট করল!

    এই আয়োজনে দৃষ্টিকটু ঘটনার শেষ নাই। যেমন প্রধানমন্ত্রীকে প্রধান অতিথি করে আনা হয়েছে। অথচ ব্যাপারটা মূলত দুদেশের সুপ্রীম কোর্টের এক অনুষ্ঠান মাত্র।  কোর্ট যেকোন নির্বাহী (প্রধানমন্ত্রীর) ক্ষমতা থেকে দুরে বা আলাদা থাকবে সেটাই স্বাভাবিক হত। অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে তারা এনেছে হয়ত সেটা বড় সমস্যা হত না যদি নিজ পরিমিতবোধে প্রেসিডেন্ট – তিনিও কোন রাজনৈতিক বক্তব্য আনছেন না বা এড়িয়ে গেছেন। এরপর থেমে যাওয়া উচিত ছিল।  কারণ, কোন চীফ জাস্টিস প্রধানমন্ত্রীর সাথে এক আসরে হাজির থাকেন না – খুবই সীমিত ও নির্দিষ্ট কিছু আনুষ্ঠানিকতার আসর ছাড়া!  প্রধানমন্ত্রী আর বিচার বিভাগের ক্ষমতা আলাদা – এটা সব জায়গাতেই প্রতিষ্ঠিত রাখতেই হয়!

    পুর্ব-সংস্কার বা প্রিযুডিস [prejudes]
    সেপারেশনের ইস্যুটা ছাড়াও আরেকটা বিরাট বিবেচনা নিয়ে বিচারকদের চলতেই হয়, মানতেই হয়। সেটা হল – পুর্ব-সংস্কার বা প্রিযুডিস [pre-judes]। বিচারক সকালে উঠে বাসায় নাস্তার টেবিলে এক ঘনিষ্ট আত্মীয়,বন্ধু বা হয়ত নিজ স্ত্রীর মুখে মন্তব্য শুনলেন যে আজ এজলাসে যে কেসের শুনানী তিনি শুনবেন সেই আসামীই আসল বা মূল খুনী অপরাধী – এধরণের একটা মন্তব্য!  কিন্তু বিচারকের কাজ হচ্ছে কোন কারও কানকথা না শুনা, কানেই না আসে সে ব্যবস্থা করা! আর এজলাসে বসে কেস ডকুমেন্ট আর শুনানীতে বাদী-বিবাদির উকিল কী তথ্য আর যুক্তি তুলছেন কেবল সেসবের ভিত্তিতে আসামী সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা। যেটা একমাত্র এজলাসেই তৈরি হয়, শুনতে শুনতে জন্মায়। কাজের সকালে বাসায় যদি কিছু শুনেছেন আর এতে তার মন যেভাবে প্রভাবিত হয়েছে – এটাই প্রিযুডিস বা পুর্ব-সংস্কার বলা হবে। এককথায় সেটা আসলে এজলাসে-বিচারে বসার আগেই প্রভাবিত হয়ে বিচার করে ফেলার অবস্থায় নিতে পারে বিচারককে!  একজন বিচারকের জন্য প্রিযুডিস তাই সবচেয়ে বড় অপরাধের কাজ মনে করা হয়!
    বিচারকেরা তাই নিজ জীবন সাজান যেন প্রিযুডিস এড়ানো জীবনাচার হয় নিজের! এজন্য সামাজিক-পারিবারিক নিজ জীবন তিনি নিয়ন্ত্রিত করেন। সবার দাওয়াতে তিনি যান না, সব সামাজিক অনুষ্ঠানে তিনি অংশ নেন না; খুবই ঘনিষ্টজনেরটা ছাড়া! যাতে আবার কোন ব্যক্তিগত আলাপে তিনি জেনে বা না-জেনে যেন কারো দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে যান! এভাবে সতর্কতা নিতে হয় তাঁকে! কাজেই প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা-সাক্ষাত সেটা তো অনেক দুরের যেখানে নিজ সব আত্মীয়স্বজন বন্ধুর সাথেও কোন বিচারকের ততটা মেলামিশার কথাই না!

    অথচ এখানে হয়েছে উলটা প্রধানমন্ত্রীকেই এখানে চীফ গেষ্ট করা হয়েছিল। আর প্রধানমন্ত্রী প্রায় ত্রিশ মিনিটের বক্তৃতার পুরাটাই ছিল রাজনৈতিক বক্তব্য! আমাদের বিটিভির রেকর্ডেড এই বক্তৃতা ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে। এটা পুরা অনুষ্ঠানেরই ভিডিও প্রায় দুই ঘন্টার বেশি; এর মধ্যে ১ঃ৪৪ মানে একঘন্টা ৪৪ মি এর পর থেকে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা শুরু হয়েছে।
    ওদিকে আরেক বড় অস্বস্তিকর ব্যাপার হল, এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে বলা হয়েছে সমাপনী বক্তা অতিথি [valedictory scession]। এটা সকাল দশটায় শুরু হলেও এটাই সমাপনি অনুষ্ঠান নয়। কারন, ঐদিনই বিকালে তিনটা থেকে ২৪ তারিখেওর আলোচনা অনুষ্ঠান হয়েছে।

    এই অনুষ্ঠানের আয়োজন কেন? মূল উদ্দেশ্য কী?
    এর জবাবটা হাসিনার দিক থেকে দেখে বললে মানে, হাসিনার আধাঘন্টার বক্তৃতার দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলে যা পাওয়া যায় তা হল, এদিনটা আসলে ছিল হাসিনার ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসার পর থেকে এপর্যন্ত তিনি কী কী অর্জন করেছে এর একটা তালিকা হাজির করা আর এসবের জন্য ভারতের সরকার সেনাবাহিনী সহ ভারতের ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান প্রায় সবাইকেই ধন্যবাদ জানানো। এর ভিতরে আবার ভারতের হাসিনাকে ছয় বছর আশ্রয় দেয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে। এর সাথে হাসিনার ভাষায় বিচার বিভাগ যেভাবে   নিয়ন্ত্রিত ভাবে আচরণ করে ১৯৭৫ সালের আগষ্টের পর থেকে বখে গেছিল একে তিনি এবার শুদ্ধ করে নিজের মত করে সাজিয়েছেন – এই অর্জনকে ভারতের সামনে তুলে ধরতে চেয়েই যেন এই কনফারেন্স আয়োজন করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে!
    এই হল, হাসিনার আধাঘন্টার বক্তৃতার সারকথা!
    কিন্তু প্রধান বিচারপতি  চন্দ্রচূড় এর কিছু মন্তব্য সব আউলায়ে দিয়েছে।  কিন্তু এরও আগে, চন্দ্রচুড়  আবার এই কনফারেন্স সম্পর্কে হাসিনার নিজ ভাষ্যকে পাশ কাটিয়ে নিজ ভাষ্য খাড়া করেছেন।

    কনফারেন্সের দাওয়াতপত্রের ভাষ্য ভারতেরঃ
    কেন ভারতের পুরা বিচার বিভাগ না হলেও এর মাথা সুপ্রীম কোর্ট এমন কনফারেন্সে যোগ দিল – এনিয়ে তাদের মনেও অস্বস্তি ছিল তা বুঝা যাচ্ছিল। যেমন, হাসিনার সাথে ভারতের বিচার বিভাগের লেনা-দেনা কী? আমাদের বিচার বিভাগের যেকারণে আমাদের নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ট হওয়া অস্বস্তিকর কারণ তাদেরকে নির্বাহী ক্ষমতা থেকে সেপারেশনে দূরে থাকাটাই একমাত্র স্বাভাবিক! বাকিটা অস্বাভাবিক!! তাহলে ঠিক একই যুক্তিতে ভারতের সুপ্রীম কোর্টও তাই অস্বাভাবিক কিছু করেছে???  তাদেরও কোন লেনা-দেখা থাকতেই পারে না। এছাড়া ভারত ও বাংলাদেশ এদুই সুপ্রীম কোর্ট কী একাদেমিক-টেকনিক্যাল বৈশিষ্ঠের কোন কনফারেন্সে মত্ত হয়েছিল? জবাব হল যে একেবারেই না। কারণ তাহলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাদের কোন কাজ থাকার কথা না ??

    তাই এই অস্বাভাবিক দিক, এদিকটা সাফাই দিতেই চন্দ্রচুড় এন্ড গং বিচারপতিরা তার সঙ্গি হয়ে এসেছেন – অনুমান করা যায় তারা অনুষ্ঠান সুচির পাতার শুরুতেই ১০-১২ লাইনের কিছু বক্তব্য ঢুকানো দেখে। নিচে তেমনই পাতাটা দেখেন।

    এককথায় বললে এটা ভারতের জুড়িশিয়াল পেশাদারদের কিছু অপ্রয়োজনীয় আতলামী ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের ভারত যেন এশিয়ায় না হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় বিচারীয় বিষয়ের বিরাট কুতুব এক অথরিটি!  এমন আগাম অনুমান ধরে নিয়ে তারা কথা বলেছে! যেমন বাক্যের প্রথমেই একটা শব্দ ব্যবহার করেছে পোস্ট-কলোনিয়াল। অনেকে আবার  পোস্ট-কলোনিয়াল শব্দটা কাউকে ব্যবহার করতে দেখলে এটা যেন বক্তার বিরাট এক জ্ঞানের বহরের প্রকাশ ভেবে মাথা নিচা করে সালাম-আনুগত্য জানাতে-বুঝাতে চায়।  অথচ এই ভাষ্যের সারকথা হল, ১৯৪৫ সালের আগের পশ্চিমাবিশ্বের অভিজ্ঞতা পরের কলোনিমুক্ত দেশে যেন আর অত কাজের না। তাই লিখেছে  – where constitutional borrowing has occured in the region rather than from europe & America. -মানে হল  পোস্ট কলোনিয়াল সময়ে ইউরোপ ও আমেরিকার চেয়ে আমাদের এই রিজিয়নে [মানে যার একছত্র নেতা হল ভারত বলে বক্তার ভুয়া অনুমান] আমাদের নিজেদের মধ্যকার অভিজ্ঞতা ধার নেয়া বেশী ঘটেছে। ফলে ভারত হল বাংলাদেশের জুডিশিয়াল বা বিচারীয় জ্ঞানের জগতে এক একছত্র নেতা ওস্তাদ। অতএব মোদি-চন্দ্রচূড় এন্ড গং-দের কথা শুনে বাংলাদেশ তুমি অনুগত হয়ে চল!!!!  আর আমাদের সুপ্রীম কোর্ট ভারতের সুপ্রীম কোর্টকে বড়ভাই মেনে আনুগত্য করুক!  কিন্তু আসলেই কী ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এর অর্জন এতই গৌরবেই? আসেন একটু চেক করে দেখি!

    প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা তাঁর বিরুদ্ধে ইলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় মানতে রাজি হন নাইঃ 
    ভারত রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রথম ধাক্কা খেয়েছিল ১৯৭৫ সালে। আর এতে ভারত এরপর থেকে নিজে আর কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র বলে নিজেকে দাবি করতে পারে কিনা সেই প্রশ্ন উঠেছিল। কেন?
    গত ১৯৭২ সালের কেন্দ্র-নির্বাচনে ইন্দিরার আসনে তিনি কারচুপি করেছেন আর এভাবেই তিনি এমপি আর শেষে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এমন মামলা করে তার প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী! এই মামলার হাইকোর্টের রায় বের হয় ১৯৭৫ সালে। বিচারক তাকে প্রধানমন্ত্রী পদ ত্যাগ করার সময় দিয়ে সাজা ভোগ করতে রায় দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এই রায় অমান্য করতে পালটা দেশে জরুরি আইন জারি করে পরিস্থিতি নিজের হাতে এনে নিয়ন্ত্রণে নেন; যাতে সাজা ভোগের প্রসঙ্গ চাপা পড়ে। সারকথা একটা রিপাবলিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগ আর নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী – এরা যদি কেউ কাউকে কনষ্টিটিউশনাল বাধ্যবাধ্যকতা মান্য করতে  বা কাজ করতে দিতে না চায় – এটা ছিল সেই কেস। যার সার-অর্থ হল, রাষ্ট্রটা নাই হয়ে গেছে!! ঠিক তাই হয়েছিল ভারতে।  যদিও পরে ইন্দিরা সরকারের পতন ঘটে – নির্বাচনে বিরোধী মোরারজি দেশাই এরা ক্ষমতায় আসে। আমি আর সে  সব ফারদার বিস্তারে যাচ্ছি না এখন।

    [অনেকে ভাবতে পারেন কেবল ভারত রাষ্ট্রই ইন্দিরার হাতে এমন সংকটে পরেছিল। না, একেবারেই সত্য না। শেখ মুজিবের বাংলাদেশ রাষ্ট্রও ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি শেখ মুজিবের হাতেই এমন নাই হয়ে গেছিল। আমার পুরানা  ২০১০ সালের লেখা পড়েন এখানে।]

    কিন্তু এরপর থেকে ভারতের আইন পেশার একাদেমিক, উকিল বা বিচারক কমিউনিটি দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যাদের মধ্যে ডমিনেটিং ভাষ্য হল, বিচার বিভাগের প্রধানমন্ত্রীকে সমীহ করে কম্প্রমাইজে চলা উচিত ছিল! বিচারকদেরও প্রধানমন্ত্রী জিন্দাবাদ বলতে হত!  শহরের এলিটদের বিরুদ্ধে যেভাবে গরীবেরা দাড়াতেই পারে না আগের মানসিকভাবে হেরে গিয়ে থাকে বলে – এটা ছিল অনেকটা সেরকম!
    আর সেই থেকে ভারতে এই “দেশের স্বার্থে” বলে আপোষি জাতিবাদিদের আপোষ ধারাটাই চলে আসছে এখনও। নানান বাঁক পেরিয়ে। এমনকি এখনও এই চন্দ্রচূড়েরা একই কাজ করে চলছেন! মুসলমান নিধন অত্যাচার নিগৃহ বৈষম্য চন্দ্রচুড়েরা দেখতেই পান না!  এমনকি চন্দ্রচূড় ঢাকায় এসেছেন মোদি-হাসিনার রাজনৈতিক আলোচনার ফলশ্রুতিতে। কিন্তু চন্দ্রচুড় কেন এই আলোচনায় অংশ নিবেন? মোদি বা হাসিনার সাথে এই প্যাচ-আপে তিনি কেন অংশ নিবেন? তিনি কী মোদির অধীনে কোন মন্ত্রণালয়ের সচিব?? এর উপর আবার মোদি  যে বাংলাদেশে নিজ কলোনি শাসন – আধিপত্য কায়েম করতে চলেছেন। আর চন্দ্রচূড় “পোষ্ট-কলোনিয়াল” বলে হুঙ্কার তুলে মোদির কলোনিদখলের নৌকায় উঠে বাংলাদেশে এসেছেন!  প্রধানমন্ত্রীকে সমীহ করে কম্প্রমাইজে চলা প্রধান বিচারপতির চন্দ্রচূড়ের তো পরিণতি এমনই হবার কথা; নয় কী!!!

    চন্দ্রচূড় ভাব ধরতে চান কলোনিয়াল পশ্চিমারা খুব খারাপ। একমাত্র তিনিই বীর! তো রিপাবলিক ধারণাটা কোথায় পাইছেন, মহাশয়?  ব্যক্তি-বোধ, নাগরিক, রাষ্ট্র রাজনীতি ইত্যাদি সহ ভারতে রিপাবলিক ধারণা কিভাবে এলো? মোগল আমলে ছিল?? কাজেই বকোয়াজ বন্ধ করেন। ইউরোপের আমাদের মত দেশকে কলোনি করা অন্যায় নিঃসন্দেহে! কিন্তু কলোনিদখলদারদের দেশে শাসন ব্যবস্থা চালু ছিল বলে এই হিসাবে রিপাবলিক – জনগণ ক্ষমতার উতস – রাজনীতি নাগরিক ইত্যাদি সব ধারণাওগুলো আমরা বৃটিশদের থেকেই পেয়েছি। এটা পজিটিভ পাওনা! আর বৃটিশেরাও আবার সে ধারণার গোড়াটা পেয়েছে রোমান-দের কাছে থেকে। এটা শুরুতে প্রাচীন রোম থেকে পরে হোলি রোমান এম্পায়ার সমাজ থেকে!
    এখনও আমাদের হাইকোর্টের বিচারকেরা রায় লেখার সময় দুচারটা এক্সিওম [AXIOM] বা স্বতসিদ্ধ সত্য বলে কিছু বাণীর উল্লেখ করতে খুবই ভালবাসেন। এর মাহাত্ম হল, তিনি যে রোমান এক্সিওমগুলো মুখস্ত করেছেন সেটাই যাহির করে দেখানো! এখন চন্দ্রচূড়েরা কী বৃটিশ-রোমানদেরকে কলোনি শাসক বলে তুচ্ছ বা অস্বীকার করবেন? পশ্চিমা কলোনি শাসকদের গালি দিয়ে আবার, এখন ভারতকেই  কলোনিদখলদার (বাংলাদেশকে দখল) করে গড়তে চাইবেন? মোদির হাতধরে বাংলাদেশে আসবেন???

    বৃটিশদের কাছ থেকে রাজা রামমোহন রায় বৃটিশ রিপাবলিক ধারণাটা প্রথম বুঝেছিলেন। তিনিই প্রথম এটা বুঝে তা কাজে লাগাতে গেছিলেন। কিন্তু বুঝেছিলেন উলটা। ভেবেছিলেন, রিপাবলিক জাতি-রাষ্ট্র মানে একটা ধর্মীয়-জাতি ধারণা। সেটা অর্জন করতেই তিনি অসংখ্য জাতে বিভক্ত হিন্দুদেরকে সহ সকলেই আগে এক নয়া এক ব্রাহ্ম ধর্মে নিতেচেয়েছিলেন। আর এরই শেষ আজ পরিণতি বিজেপি-আরএসএসের হিন্দুত্ববাদ! 
    একটু পড়ালেখা করেন বুঝা কঠিন না। কিন্তু হুদাই পশ্চিমাবিরোধী সাইজেন না! এর পরিণতিতেই তো বাংলাদেশকেই একালে ভারতের কোলোনি সম্পর্কে বেধে ফেলার কাজে মোদির সঙ্গি হয়ে এসেছেন!

    চন্দ্রচুড়ের হাত ধুয়ে ফেলার কোশেশঃ
    কিন্তু এসব সত্বেও চন্দ্রচুড় নিজের হাত ধুয়ে রাখতে চেয়েছেন। হাসিনার উপস্থিতিতে ঐ অনুষ্ঠানের সবটা বিটিভি সংগ্রহ ও রেকর্ডিং করেছে। কিন্তু ভারতের ইন্ডিয়া টুডে আবার সেখান থেকে নিয়ে নিজেই ইউটিউব ভিডিও করে ছেড়েছে, বিশেষ করে চন্দ্রচূড়ের আধাঘন্টা কথা। কিন্তু তাতেই এরা সনুষ্ট হয় নাই। এ’বাদেও ঐ আধাঘন্টা থেকে আবার বিশেষ আড়াই মিনিটের একটা বক্যব্যের ভিডিও-ও তারা ছেড়েছে। মনে রাখতে হবে ইন্ডিয়া টুডে মোদি সরকারেরই বা র-এর আরেক হাতিয়ার। যখন বাংলাদেশে বিরোধী বা বাংলাদেশকে টার্গেট করে কিছু তাদের প্রপাগান্ডা করার থাকে তখন তারা এই মিডিয়া ব্যবহার করে থাকে। সেই আড়াই মিনিটের লিঙ্ক এখানে। চন্দ্রচূড়ের এই অংশের বয়ানটুকুকে  তাই এন্ডিয়া টুডে নিচে লিখিত টেলপ দিয়ে এক মলিয়া পড়ে শুনিয়ে দিয়েছেন  যাতে কেউ মোদির দোষে অসৎ কাজের সঙ্গী বলে চন্দ্রচুড়কে অভিযুক্ত না করেন। চন্দ্রচুড় খারাপ ও অনিশ্চিত সময়ের কথা বলছেন যে এসব সময়ে সুপ্রীম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের মত প্রতিষ্ঠানগুলো কনষ্টিটিউশনের উপর মানুষের আস্থা-বিশ্বাস ধরে রাখার পক্ষে এগিয়ে আসে। এসব প্রতিষ্ঠানের ঠিকমত সচল থাকাটা সেজন্য গুরুত্বপুর্ন।

    In a time of uncertainty and ambiguity, the pillar of democracy are put to the test. CJ DYC speaking at the south asian constitutional court conference in Bangladesh emphasis the crucial role of institution like supreme court and election commission in upholding the trust of the people in the constitution.
    Speaking at the conference, CJ DYC said, the constitution is not like the income tax act. The legitimacy of our Governance institutions hinges on their functionality.
    He stressed that the confidence of the people in the constitution solidify when these institutions rise to the occasion.

    সারকথায় তিনি বলছেন  সুপ্রীম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের সচল ও কর্মক্ষম থাকাটা গুরুত্বপুর্ণ। মানে তিনি রেকর্ড রাখতে চান যে এদুটা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব তিনি আমাদের বুঝাইছিলেন! কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় গত পনেরো বছরে এটা হাসিনা সরকারের অধীনে একটা প্রতিষ্ঠানেরও এমন যোগ্য হয় নাই এটা কে না জানে! আর নির্বাচন কমিশন??? নিশ্চয় এবার ৭ জানুয়ারী ভোট দিয়ে জনগণ খুবই খুশি!!!! কারণ, হাসিনা বলেছেন স্বাধীন বাংলাদেশে এটাই নাকি বেস্ট নির্বাচন!  অর্থাৎ চন্দ্রচুড় হুদাই কীছু বকোয়াজ করে গেলেন আরকি!
    অবশ্য ভারতের অনেকের মনে হতে পারে সব হল আমরা মুসলমানদের স্মস্যা। আমরা পশ্চাদপদ আমরা তাই কিছু পারি না!।    তাহলে আচ্ছা ভারতের সুপ্রীম কোর্ট কী খুব একটিভ আর নির্বাচন কমিশন খুবই সুনামের?
    একই কথা বার বার লেখার চেয়ে আমার নিজেরই এক পুরানা লিখার লিঙ্ক এখানে, কী ভয়াবহ অবস্থা দেখেন এখানে। লেখাটার শিরোনাম ছিল ভারত-রাষ্ট্রের ভেঙ্গে পড়া ও রবি কান্তের হতাশা । চন্দ্রচুড়ের নিজের সুপ্রীম কোর্টের অবস্থা বুঝবার জন্য। এবং এই আবেদনে নির্বাচন কমিশন ভাল হয়ে যায় নাই।
     আর ভারতের খোদ নির্বাচন কমিশন??? সে আরেক ভয়াবহ অবস্থা!!!  ভারতের নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যের; প্রধান ছাড়া আরো দুজন কমিশনার। কম কথায় বললে মামলা টা ২০১৯ সালে ভাএরতের নির্বাচনের। মোদিসহ আরো অনেক প্রার্থীই নির্বাচনি আইন ভেঙ্গে সাজা পেয়েছেন বা  ফাইন দিয়েছেন। কিন্তু একমাত্র নরেন্দ্র মোদি ছাড়া। তার নামে যৎগুলো অভিযোগ দায়ের হয়েছিল কমিশন তার একটাতেও কোনই পদক্ষেপ নিতেই যান নাই। এনিয়ে কমিশন প্রধান এক সদস্যকে পাশে পেয়ে দু-এক ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখিয়ে কোন একশনে যান নাই। আর তৃতীয়জন অশোক লাভাসা তার নাম – তিনি এরপর সরকারি নিগ্রহের শিকার হতে থাকেন – আর তা উনার স্ত্রীসহ যিনি উচ্চপদস্ত ব্যাংকার। তিনি নির্বাচন কমিশনের প্রতিটা সিদ্ধান্তে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রাখা ব্যক্তি ছিলেন। কয়েকবছর পরে আর চাপ সহ্য করতে না পেরে অশোক লাভাসা আপোষ করতে বাধ্য হন। রফাটা হল এখন তিনি নির্বাচন কমিশন ছেড়ে দিয়েছেন; [ADB] এডিবিতে ভারত সরকার পক্ষের আমলা প্রতিনিধি হিসাবে আছেন!

    অর্থাৎ সুপ্রীম কোর্ট আর নির্বাচন কমিশনের সচল ও কর্মক্ষম থাকাটা গুরুত্বপুর্ণ বলে বিরাট জ্ঞানের কথা ছাড়লেও প্রধান বিচারপতি হিসাবে তিনি সরাসরি এর জন্য দায়ী!  অথচ বাংলাদেশে এসে জ্ঞানের কথা ছাড়ছেন???

    আমি এখনও পরিস্কার না বুঝি নাই, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ঠিক কী চান? কেন চন্দ্রচুড় ঢাকায় এসেছিলেন?  আমাদের কাছে এক প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সিনহা তার ঘটনাবলী এখনও জলজ্যান্ত আছে। তিনি গুজরাটে গেছিলেন এক বেসরকারি ল কলেজের অডিটরিয়াম উদ্বোধন – এই আমন্ত্রণে। গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বাংলাদেশের হিন্দুদের জন্য কত কী ভাল করেছেন এর ফিরিস্তি দিয়ে বক্তৃতা করে গেছিলেন। ভুলে গেছিলেন তিনি বিচার বিভাগের লোক যা প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নয়। আর তিনি কোন সচিবও নন। প্রধানমন্ত্রীর জন্য এসব জয়গাথা ছড়ানো তার কাজ দায়ীত্বের সাথে অসামন্বস্যপুর্ণ!  কিন্তু তিনি ফাঁদে পড়লেন যে তিনি কার কথা কে বেশী গুরুত্ব দিবেন! হিন্দু মনে ভাবলেন কাকা-বাবু এখানে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে প্রেফারেন্সিয়াল! ফলাফল আমরা সবাই জানি! এর মানে  আমাদের সব অভিজ্ঞতাই বলছে এসবের একটাও কাজ করে নাই! এরপরেও ঠিক কী জানতে বাকী আছে???? আমার বুঝাবুঝি-নাগালের বাইরে!

    একটা গুরুত্বপুর্ণ বিষয় “আরবিট্রেশন” – এটা ভুলে গেছিলাম, এখন যোগ করে দিচ্ছিঃ
    ধনঞ্জয় চন্দ্রচুড় তাঁর বক্তৃতায় বিচার ব্যবস্থার ভিতরেই সালিশ ব্যবস্থাও [arbitration] যোগ করার প্রস্তাব করেছিলেন।  সালিশি মানে বুঝতে হবে – যেখানে কেউ অপরাধী বলে রায় দেয়া হয় না, কাউকে সাজা দেয়া হয় না। এটা এক আপোষ-মীমাংসার পথ। ফলে স্বভাবতই কোন ক্রিমিনাল কেসে এর ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু চন্দ্রচুড় এই সালিশ-ব্যবস্থার কথাও আসলে বলেনই নাই। তাহলে?
     
    তিনি আসলে  মিন করেছেন – মানে আরবিট্রেশনের কথা বলে এই আড়ালে (হিন্দুত্ববাদী) সরকারের চাওয়ার পক্ষে রায় দেয়া। এর ইঙ্গিত দিয়েছেন। সেটাই আমরা এখন নিচে দেখব।
    বাবরি মসজিদ ধবংস করা হয়েছিল ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। যদিও মানুষে নানানভাবে এঘটনাকে ব্যাখ্যা করে কেবল নিজের পক্ষে সাফাই টেনে থাকে। আর আমার ধারণা হল এটা ছিল মুসলমানবিরোধী ঘৃণা সাজিয়ে  সেই উস্কানিতে আরএসএস-বিজেপি যে ভোটের রাজনীতি ক্ষমতাদখল ব্যবস্থা আনতে যাচ্ছে এরই আগমনী সিগনাল- বার্তা ছিল।  তাদের হিসাবে এটা ছিল এভাবে হিন্দুত্ববাদী ক্ষমতা আনবার জন্য পারফেক্ট টাইমিং; হয়েছিলোও তাই। এরই পরিণতি-প্রমাণ হল গত দশবছরের নরেন্দ্র মোদীর শাসন! ও বিচারকদের আছে তাঁর নানান চাওয়া – এর জন্য চাপ সৃষ্টি! আর এর পুর্ণতা দিবার পিছনের অন্যতম এক বিচারক হলেন ভারতের বর্তমান প্রধান বিচারপতি ধনঞ্জয় যশোবন্ত চন্দ্রচূড়! তারঁ বাবা যশোবন্ত বিষ্ণু চন্দ্রচূড় [YBC]ও এর আগে প্রধান বিচারপতি ছিলেন। ধনঞ্জয় [DYC] হার্ভার্ড ল স্কুল গ্রাজুয়েট ও পিএইচডি হোল্ডার।  কিন্তু হায়!
    ১৯৯২ সালের মসজিদ ধবংস মামলায়  সুপ্রীম কোর্টের ফাইনাল রায় ঘোষণা হয় ২০১৯ সালে।  ধনঞ্জয় সেখানে রায় দাতা পাঁচ  বিচারকের একজন বিচারক! যেখানে বিচারকদের রায়ের সারকথা হল, মসজিদের স্থানে মন্দির করতে দেয়া হোক আর মসজিদের জন্য সরকার আলাদা জায়গা দেক! এই হল, ধনঞ্জয় চন্দ্রচূড়দের বিচারের রায়ের নামে সরকারের দালালি আর ইঙ্গিত দেয়া এটাই তাদের সালিশি ব্যবস্থা????
    তার মানে ধনঞ্জয় চন্দ্রচূড় কী আমাদের বিচার বিভাগকে সালিশের চর্চার কথা বলে  বিভিন্ন মামলায় সরকারের পক্ষে রায় দিবার কথা বলে গেলেন? মনে রাখতে হবে, প্রধানমন্ত্রীর চাওয়ার পক্ষেই বিচার বিভাগকে থাকতে হবে রায় দিতে হবে – এই অভ্যাস সেই যে ১৯৭৫ সাল থেকে ইন্দিরার হাতে শুরু হয়েছিল ভারতের বিচার বিভাগ এথেকে বের হতে পারে নাই। বরং এই চামচামির ধারা বজায় রেখে নিজের আখের গুছানো বিচারক প্রধান বিচারক হওয়াটাই ভারতের বিচার বিভাগের অনুসৃত নীতি হয়ে গেছে!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ ০৩ মার্চ ২০২৪ ০৭ঃ ১৯   সন্ধ্যা
    আপডেটঃ ০৪ মার্চ ২০২৪ ০৮ঃ ১০   রাত

     

     

     

     

     

  • আলী রীয়াজদের সংকট এবং আইলিন এর এবারের ঢলে পরা সফরে! 

    আলী রীয়াজদের সংকট এবং
    আইলিন এর এবারের ঢলে পরা সফরে! 

    গৌতম দাস
    ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা সাতটা নয়
    https://wp.me/p1sCvy-5qQ

     

       র‌্যাবের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ৫ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

     

     

    প্রতীকীভাবে “আলী রীয়াজদের” বললেও এরা আসলে কারা? বলতে চেয়েছি যারা দ্বৈত নাগরিক মানে, বিশেষ দ্বৈততার দিক আছে। তাও এটা ঠিক দ্বৈত নাগরিক মাত্রই এমন সবার কথা বলছি না। একজন ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী বা সাধারণ মানুষ যারা আপন ভাগ্য-অন্বেষণে  আমেরিকায় (বা বিদেশে) নাগরিকত্ব যোগাড় করেছেন বা যোগাড় করতে না পারলেও রেসিডেন্ট পারমিট – মানে সে দেশে থেকেই বসবাস ও কাজ-চাকুরি করার অনুমতি পেয়ে নিয়েছেন – এমন সকল মাইগ্রেন্ট বা প্রবাসী – এদের সকলকে বাইরে রেখে বাকিদের কথা বলছি। অর্থাৎ সাধারণদের প্রায় সকলকেই একেবারেই বাইরে রাখছি।  এমন এরা সকলকেই এই আলোচনার বাইরে রেখে কথা বলছি।  তাতে যাদের কথা বলছি, এরাও দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা না নিয়েছেন, তাতেও কোন ফারাক নাই।  কারণ, আমার এই কথাগুলো সাধারণদের নিয়ে নয়। তাহলে?

    আমি কথা বলছি যারাও মাইগ্রেন্ট অবশ্যই, কিন্তু যারা সেদেশের সরকারের নীতি-পলিসি সংশ্লিষ্ট পেশা নিয়েছেন যেমন কোন আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাংক ফেলো। এছাড়াও যারা আমেরিকা সরকারের নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। অথবা আরেকটা চিহ্ন যাদিয়ে এদের আলাদা করা যায় যে যারা তাদের পেশাগত কাজটাই এমন যে তাঁকে আমেরিকান প্রশাসনের পক্ষে সাফাই দেয়া বা যুক্তি-অবস্থান যোগানোই যাদের একমাত্র কাজ; এভাবেই তাদের লিখা বা কথা বলতে হয়। ফলে বলাই বাহুল্য যারা দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা রেসিডেন্ট পারমিট হোল্ডার শুধু নন; বরং বাড়তি আরো যারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে আমেরিকান প্রশাসনের সাথে জড়িয়ে আছেন বা গেছেন – আমি কেবল এদের কথা বলছি। এখানে “আলী রীয়াজদের” বলতে তাদের কথা বুঝিয়েছি। এই অর্থে এদের বিশেষ দ্বৈততার দিকেই আমার নজর তাতে এরা নাগরিক অথবা যাদের মধ্যে অনেকে শুধু-ই রেসিডেন্ট পারমিট হোল্ডার হলেও! 

    বাংলাদেশে আমেরিকান ফরেন পলিসির প্রয়োগ আছে স্বাভাবিকভাবেই আর, আপনি এই বিশেষ দ্বৈততায় নাগরিক বা হয়ত না; কিন্তু আপনি  আমেরিকান পলিসি-প্রশাসনের কর্ম প্রয়োগ-ততপরতার সাথে জড়িত; যেমন ধরা যাক আলী রিয়াজ এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক এর ফেলো। এখন আলী রিয়াজ বাংলাদেশের সিরিয়াস রাষ্ট্রস্বার্থ জড়িত এমন কোন ইস্যুতে আমেরিকান পলিসি সম্পর্কিত কোন আলোচনায় অংশ নিয়েছেন; আর সেখানে আলী রিয়াজের কথা বক্তব্য-অবস্থান – যা কিছু তিনি সেখানে বলবেন বা লিখবেন, এটাতে তিনি কাকে প্রতিনিধিত্ব করছে বলে ধরে নিব? আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ? কথাটা বলা হচ্ছে এটা মনে রেখে যে আলী রিয়াজ বাংলাদেশ-অরিজিন আমেরিকান!  তাই এককথায়, ছোট করে প্রশ্ন হচ্ছে আলী রিয়াজের ভাষ্য কী আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ এর ভাষ্য? কোনটা বলে ধরে নিব?

    এখন আমরা স্বীকার করি বা স্বীকৃতি দেই আর না দেই – বাস্তবতা হল এখানে এক গভীর “কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট” মানে, দুই রাষ্ট্রস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংঘাত-বিরোধ আছে। আর এর একেবারে প্রাথমিক কিছু অবলিগেশন [obligation] বা দায় আছে আলী রীয়াজদের! নুন্যতম সততা স্বচ্ছতার খাতিরে তাদের এবিষয়ে একটা ঘোষিত অবস্থান থাকা উচিত।  কথাটা এমন হতে পারে যে, “আমি (আলী রিয়াজেরাদের কেউ) যাকিছু পলিটিক্যাল-ইকোনমিক বক্তব্য রাখি  সেখানে আমি সুনির্দিষ্ট করে ভিন্ন কিছু উল্লেখ না করলে ধরে নিতে হবে সেখানে আমি কেবল আমেরিকাকে প্রতিনিধিত্ব করেই বক্তব্য দিয়েছি ও দেই বলেই মনে করা সঠিক হবে”।
    যদিও থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলোদের কাজ হল আমেরিকার ক্ষমতাসীন প্রশাসনের পক্ষে ঢোল বাজানো। এমনকি সেটা প্রকাশ্যে ক্রিটিক্যাল বা নেগেটিভ অবজারভেশন দেয়াও না।

    মনে রাখতে হবে থিঙ্কট্যাঙ্ক এর চাকরি বা সার্ভিস দেওয়ার চুক্তিপত্র করা, এটা কিন্তু আমেরিকায় গিয়ে কোন ইঞ্জিয়ারিং-টেকনোলজি ফার্মের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তাদেরকে সার্ভিস দেয়া ও আয় করার মত ঘটনা একেবারেই নয়; সমতুলনীয় ঘটনা নয়। কারণ, থিঙ্কট্যাংক ফেলো বা আমেরিকাকে বাংলাদেশী-কনসালটেন্ট সার্ভিস দেওয়ার পেশাটা শতভাগ রাজনীতিক ও রাষ্ট্রস্বার্থ-মুলক কাজ!  কেউ এথনিক বাঙালি জনগোষ্ঠির লোক বলে সেই ইমেজকে ব্যবহার করে নিজেকে আড়ালে রাখার সুবিধা নেয়া ভুল ও অসততা হবে। মানে, এর উপর দাঁড়িয়ে সে সুবিধা নিয়ে আমেরিকান স্বার্থ বাস্তবায়নের কথা খেয়াল করে বক্তব্য দিয়ে যাওয়া  – এটা খুবই অস্বচ্ছ কাজ এই অর্থে তা অপ-ততপরতা হতে পারে! আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে সার্ভিস দিয়ে আয় করা হয়ত সাধারণভাবে অপরাধ নয় তবে,  আগে নিজ পরিচয়-অবস্থান পরিস্কার করে রাখলে সেটাই সততা হবে যে আমি আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে চাকরি-কাজে বা সার্ভিস দেওয়াতে আছি! 

    সম্প্রতি এবিষয়টা খুবই সিরিয়াস পর্যায়ে গেছে বলে আমার মনে হয়। ওয়েবিনার [webinar] মানে অনলাইন টকশোতে কথা বলা যাকে বলি, তার মধ্যে।  ওয়েবিনার মানে, কয়েক ব্যক্তি যারা নানান দেশে বসে আছেন কিন্তু তা সত্বেও যেন তারা একসাথে এক দেশের এক রুমে বসে আলোচনা করছেন – এমন এক গোলটেবিল বৈঠকের মত সেটা। এটা সম্ভব কারণ, তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রত্যেকে অডিও-ভিডিও সব অর্থেই কানেকটেড থাকেন সেখানে। অনেকে এটাকে তাই ভার্চুয়াল [virtual] বৈঠকও বলেন। [ভার্চুয়াল মানে হল, যা বাস্তব নয় কিন্তু যেন বাস্তব মনে করে নেয়া হয়েছে ও সে  অনুযায়ী আচরণ করা হচ্ছে; যার বাংলা অনেকে করে বলেন – “জ্ঞানত” বা অনুমিত]  তেমনই সম্প্রতি এক বৈঠকের খবর প্রসঙ্গে রিপোর্ট করেছে প্রথম আলো। শিরোনাম “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” । আর এই ওয়েবিনার বৈঠকের নিজস্ব শিরোনাম ছিলঃ ওয়েবিনারের শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ ও তার প্রতিবেশী: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব’।
    সেখানেই এই প্রশ্ন যে অংশগ্রহণকারী প্রবাসীরা তাঁরা কাদের প্রতিনিধিত্ব করে কথা বলছিলেন –  আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ? –

    এমন অস্পষ্টতা ছিল পীড়াদায়ক ও বিভ্রান্তকর! 
    কারণ, শিরোনাম দেখেই জানা যাচ্ছে – তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ নিয়ে এবার কথা বলছেন অথচ আমেরিকাকে বাইরে রেখে এর সব দায় কেবল ভারতের উপর চাপাচ্ছিলেন। অথচ তাঁরা কারা? মানে তারা কাকে প্রতিনিধিত্ব করছেন? মানে প্রবাসী ব্যক্তিদের কোন রাষ্ট্রীয় পরিচয়? তারা অনেকেই বাংলাদেশি-অরিজিন আমেরিকান। তাই ঐ ওয়েবিনারে তারা কী বাংলাদেশি রাষ্ট্রস্বার্থের নাকি আমেরিকান বা বিদেশি রাষ্ট্রস্বার্থের নাগরিক-প্রতিনিধি হিসাবে কথা বলছিলেন?


    কারণ, বিষয়টাতে এই প্রশ্ন ওখানে খুবই সিরিয়াস দিক ছিল? বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের জন্য দায়ী করা হচ্ছিল কেবল ভারতকে!  কিন্তু এটা ছিল
    বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একেবারে ভারত-আমেরিকার যৌথ প্রযোজনায় ঘটা হস্তক্ষেপ!
    আমরা তো ভুলতে পারি না যে ২০০৭ সালের ১/১১ এর সেনা ক্ষমতাদখল ছিল এক আমেরিকান প্রযোজনা। যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে
    তুলে দেওয়া।  আমেরিকার পক্ষ থেকে ভারতকে ঠিকা দেয়া কাজ – এশিয়ায় ভারত চীন ঠেকানোর চেষ্টা করবে – আর বিনিময়ে এরই উপহার ছিল বাংলাদেশকে
    ভারতের হাতে তুলে দেয়া! কিন্তু আমেরিকা বাংলাদেশকে তুলে দিবার কে??? এটা তো চরম অপরাধ??
    আর এখন ওয়েবিনারের যে শিরোনাম “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত”
    এই একই কাজ যার শুরু তো সেই ১/১১ এর পর থেকেই, গত সতের বছর ধরে। তাহলে???
    আর এখন সব দায় একা ভারতের উপর চাপাচ্ছে কেন আলী রীয়াজেরা???? আমেরিকার হাত ধুয়ে ফেলানো???? এটা ঘোরতর অসততা!

    ওয়েবিনারের এই শিরোনাম আমাদেরকে নিজেই জানিয়ে দিয়েছে যে সেখানে আলোচনার প্রসঙ্গ হল – বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ। যদিও তামাসা করে বললে, এটা কিন্তু তাদের একটা ভাল অগ্রগতিও বটে!
    ভারতের বাংলাদেশে হাত ঢুকানো তো নতুন না। কারণ গত ১/১১ এর সময়ে বাংলাদেশে আমেরিকার সামরিক ক্ষমতা দখলের এক প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া যাতে ভারত পক্ষে অসংখ্য সব ধরণের করিডোর এবং সবই বিনা-পয়সায় বাংলাদেশ থেকে আদায়; এমনকি ভারতের সুবিধা করে দিতে এজন্য যা অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় বইবার দায়ীত্ব এটাও বাংলাদেশের অর্থ ও দায়! অন্যদিকে পুরা বাংলাদেশকে ভারতের নিজ পণ্যের একচেটিয়া বাজার বানানো; এনফোর্সড ও অবৈধভাবে রেমিটেন্স আদায়ের জন্য বাংলাদেশকে উতস দেশ হিসাবে ব্যবহার ইত্যাদি সহ হেন ভারতীয় স্বার্থ নাই যা তখন থেকে লুট করা শুরু করা হয় নাই। যেটা ২০১৭ সালের পর থেকে একটু ঝিমিয়ে গেলেও চলতি ফেব্রুয়ারি থেকে তা আবার আমেরিকান প্রটেকশনে বিপুল বেগে চালু করার ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে। আর এটা এতই তীব্র ও প্রকাশ্য যে আলী রীয়াজেরা এই ইস্যুতেই কেবল ভারতকেই দায়ী করে হলেও এবার বৈঠক ডেকে বসতে বাধ্যই হয়েছে। বাধ্য বলছি কারণ, গত ১৫ বছর তো আলী রিয়াজদের এনিয়ে কোন ততপরতা দেখি নাই। আলী রীয়াজদের এই চিকণ বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হয়!! এতে ভারতবিরোধী সাজা গেছে আবার আমেরিকান নীতি-পলিসি অবস্থানের পক্ষে সার্ভিসও দেয়া গেছে!
    আলী রিয়াজ আমেরিকান এক থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো হিসাবে জয়েন বা চুক্তিবদ্ধ হবার পরপরই সেসময় (২০০৭) মূলত আমেরিকান পলিসি যে – এশিয়ায় চীনের বিস্তার ঠেকাও – যা তাদের ভাষায় চায়না ঠেকাও বা China Containment নামে ডাকত তারা – একাজের সারকথা ছিল –  বাংলাদেশকে উপহার হিসাবে ভারতের হাতে তুলে দেয়া – আর তাই করা হয়েছিল। কাজেই আলী রীয়াজের এই অপরাধ এটা অজানা থাকার কোন কারণ নাই। যখন তিনি তো সেখানে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে বাংলাদেশ এক্সপার্ট হিসাবেই রিক্রুটেড!   আমি জানি এনিয়ে আলী রিয়াজকে কোন পাবলিক সভায় বা বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় সভাতে এনিয়ে প্রশ্ন করলেও তিনি এনিয়ে তিনি কিছু জানেন না – এমন ধারণাই দিয়ে গিয়েছিলেন।  কথাটা অন্যভাবেও বলা যায় গত ১৫-১৭ বছরে আলী রীয়াজেরা যেন আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া  এই গর্হিত অপরাধ কাজ কখনও হতে দেখেনই নাই!! তাই যেন এবারই প্রথম বলতে চাইছেন যে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” । এক কথায় বললে আলী রীয়াজেরা ভান করছেন যেন আগে আমেরিকার এমন অপরাধের ঘটনা দেখা যায় নাই। আর সে কারণেই নিশ্চয় আলী রীয়াজেরা এমন ইস্যুতে কখনও কিছু লিখেছেন, বলেছেন এমনটার দরকার হয় নাই! তাই তা আমরা জানি না!  আবার আলী রিয়াজদের পক্ষে আমেরিকান ততপরতা দায় নিয়ে কথা বলা এটা আমাদের আশা করা কী ঠিক হবে?  কারো এনিয়ে জানা থাকলে এখনও শেয়ার করতে পারেন, বাধিত হব। তবে যারাই আগে কখনও কিছু বলেন নাই এটাকে তাদের অপরাধ – আমরা এটাই বলব! যদি বাংলাদেশী পরিচয়কে প্রতিনিধিত্ব করেন তবে ঘোরতর অপরাধকারী এরা। আর আমেরিকাকে প্রতিনিধিত্ব বা চাকুরির খাতিরে করলে এমন কাজ করা – এরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রস্বার্থের চোখে প্রকাশ্য শত্রু! যারা আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ছুপা এজেন্ট!!

    কিন্তু আসলেই কী এটা তাঁদের অগ্রগতিঃ
    আলী রীয়াজেরা এবার এনিয়ে ওয়েবিনার বৈঠক করেছে। মানে “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” এটা বুঝতে এদের ১৫-১৭ বছর লেগেছে।  এই অগ্রগতিটুকু হতে – মানে আসলেই কী এটা তাঁদের জন্য অগ্রগতি? সন্দেহ আছে! কেন?
    কারণ তারা এসেছে এবার আমেরিকাকে বাঁচাতে! যেন ভারত-আমেরিকাকে একই দড়িতে ফাঁসি না চড়ে!

    বাইডেনের আমে্রিকা এবার স্পষ্ট করেছিল অন্তত গত শেষ দুবছরে [১০ ডিসেম্বর ২০২১ থেকে] যে বাইডেন প্রশাসন শুধু হাসিনার বাংলাদেশ না, মোদির ভারতের উপরেও গণতন্ত্র-মানবাধিকার বা স্যাংশন আরোপে পিছপা হবে না। মূলকথাটা ছিল এবারের বাইডেন প্রশাসন ভারতের হাত ধরে এশিয়াতে আসে নাই বা নিজের “এশিয়া নীতি” সাজায় নাই। ফলে ভারতের চোখ দিয়ে এশিয়া দেখতে বাইডেন যেন আসেন নাই আমাদেরকে তিনি সেই ধারণাই দিয়ে গেছিলেন। কিন্তু হায় হায়! শেষ অন্তত চার মাসে (সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে) বাইডেন এন্ড গং আর কাপড় ঠিক রাখতে পারেন নাই! ন্যাংটা হয়ে গেছেন। আর শেষে ইন্ডিয়ার কোলেই মুখ লুকিয়েছেন, এশিয়ার সব ভরসা আর নিজ আশ্রয়স্থল করেছেন ভারত। আমেরিকান এই পল্টি-মারা সত্যি অতুলনীয়!

    এককথায় বললে, বাইডেন পল্টি মেরেছেন কারণ, তিনি দেখেছেন, হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখেই নাকি বাংলাদেশে চীন ঠেকানো বা চীন প্রভাব রোধ করা সম্ভব। তাই আমরা এখন সরাসরি বলতে পারি বাইডেনের নীতি-পলিসি গণতন্ত্র-মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোন  স্যাংশন-ট্যাংশন আরোপ ছিল না। সোজা লক্ষ্য ছিল,  বাংলাদেশে চীন ঠেকানো বা চীন প্রভাব রোধ করা। তাই আমেরিকা গত সেপ্টেম্বর ২০২৩  থেকেই আমাদের বিরোধীদল ছেড়ে পল্টি মেরেছিল। যা এখন ক্রমশ আমাদের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে। আর স্পষ্টতই এটা ভারতের বিজয়! বুড়া বাইডেন এখন সব ফেলে দিয়ে ভারতের কোলে কেলায় পড়েছে! আর এতে দ্বিতীয়বার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে স্পষ্ট করে তুলে দেয়া ঘটলো!

    আর এব্যাপারে আলী রীয়াজদের মত সবার চেয়ে মুশফিকুল ফজল আনসারী অন্তত সৎ! টেক্কাকে টেক্কা বলার পদক্ষেপ তিনি নিয়েছেন। যদিও তার পারস্পেকটিভ মানে, যে ওয়েব পত্রিকার তিনি নির্বাহী সেখানে প্রকাশিত কিছু আর্টিকেল থেকেই এটা পরিস্কার বুঝা যাচ্ছিল যে আমেরিকা পল্টি মারার সিদ্ধান্ত নিয়েছে! তবু আনসারী নিজের পারস্পেকটিভ-এ লিখতে না পারলেও অন্তত ভারতের WIRE পত্রিকায় নিজের বক্তব্য ছেপে দিয়েছেন। যার বাংলা করে ছেপেছে মানবজমিন!

     

    আইলিন লা-বাকার [Eileen Laubacher] আবার বাংলাদেশ সফরেঃ
    লা-বাকারের এটা দ্বিতীয় বাংলাদেশ সফর; মানে ২০২৩ সালের ৮-১০ জানুয়ারি। সেবার তাঁর পরিচয় দেখেছিলাম যা আমাদেরকে তখন UNB দিয়েছিল যে লাবাকার আমেরিকার একজন National Security Council’s Senior Director for South Asia । আর এবার তাঁর আরো একটা বাড়তি পরিচয় যোগ হয়েছে দেখা যাচ্ছে। সেটা হল, তিনি একইসাথে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের বিশেষ সহকারী-ও [Special Assistant]। অবশ্য এমনিতেই তিনি আমেরিকান নেভির এক সিনিয়র অফিসার – রিয়ার এডমিরাল আইলিন লা-বাকার!
    লা-বাকারকে নিয়ে  মানে তার এবারের সফর  নিয়ে এখনই সবটা লিখা যাবে না। এর টেকনিক্যাল প্রবলেমটা হল, তিনি কেবল গতকালকেই ঢাকায় তাঁর প্রকাশ্য ততপরতা শুরু করেছেন যা অন্তত আজ ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। এটাই তাঁর অফিশিয়াল সিডিউল! ফলে ২৭ ফেব্রুয়ারির পরে তা আবার আমাদের করতে হতে পারে। তাই এখন একটা কেবল তুলনা করব যে, লা-বাকারের আগের বছরের সফর আর এবারের সফর নিয়ে।
    গতবারের লাবাকার এর সফরের পরে আমার এক পুরানা লেখা আছে; লিঙ্ক এখানে।

    একটা আসল কথাই বলতে ভুলে গেছি। গতবার মানে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইলিন লাবাকার এর প্রথম সফরের সময় ভারতের হয়ে আমাদের
    কাছে কুখ্যাত সুবীর ভৌমিক কী লিখেছিলেন?
    তার সেই লেখার শিরোনাম ছিল – “আমেরিকা কী বার্মা-কে বসনিয়া বানাবে? নো ফ্লাই জোনের পরিকল্পনায় ভারতকেও নিষেধাজ্ঞায় সামিল করবে”
    – অয়ার আজ সেই ডোনাল্ড লু হয়েছে ভারতের কোলে বসা এক গুডি গুডি আদরের দুধ-বালক! ল্যু এখন সুবীরদের বাপ হয়ে গেছে!
    সুবীরের পুরানা সেই লেখার লিঙ্কঃ

    সেকালে লিখেছিলাম, “বাইডেনের এক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকারকে [Director for South Asia Rear Admiral Eileen Laubacher] পাঠানো; যার  উদ্দেশ্য খোদ হাসিনাকেই বার্মা দখল প্রোগ্রামে সামিল করা বিনিময়ে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে রাখা হবে – এই প্রস্তাব কতটা কার্যকর করা যায় তা দেখতে”।
    এছাড়াও সেখানে তখন এর কয়েকলাইন আগে বা উপরে লিখেছিলাম, “আমেরিকার বার্মা দখলের বাসনা বলতে এমনকি আবার সেটাও ঠিক যে এটা শুধু- সু চিকে মুক্ত করা বা বার্মিজ জেনারেলদের উতখাত ও শায়েস্তা করা নয়। এগুলো পরোক্ষ উদ্দেশ্য। আর মুখ্য বা প্রধান উদ্দেশ্য হল এশিয়াতেই চীনবিরোধীতা [কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির খাড়া করার মতই তবে আরেকটা পদক্ষেপ] ও চীনকে চ্যলেঞ্জ করে নয়া কল্পিত হবু বার্মায়  আমেরিকান উপস্থিতি ঘটিয়ে দেখানো”।

    আর এবারের পরিস্থিতি হল, হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি এখন আর ইস্যু বা বাস্তবতা নয়। দ্বিতীয়ত, খোদ শাসক বার্মার জেনারেলেরাই এখন বিদ্রোহীদের হাতে নাস্তানাবুদ। তাই, বার্মার ক্ষমতা এখন – জেনারেল বা বিদ্রোহী – এভাবে কার কাছে কতটুকু সেটা এক গবেষণার ব্যাপার এমনই এক অস্থির পরিস্থিতি এটা। কাজেই এর ভিতরে আবার আমেরিকা বার্মাকে দখল পেতে চাইলে কাকে উতখাত করবে – জেনারেল না বিদ্রোহীদের – সেই মূল বিষয়টাই অস্পষ্ট!  কাজেই আমেরিকার বার্মাদখল ইচ্ছা – সেটা এখন আমেরিকার মনের ভিতরে আরো অস্পষ্ট হয়ে থাকাই স্বাভাবিক। ফলে এখনই হাসিনাকে বার্মা ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার পক্ষে আসতে বলা অর্থহীন!
    ওদিকে হাসিনা সরকার বা সেনাবাহিনী উভয়েই যুদ্ধের বিপক্ষে। আর তা প্রায় প্রকাশ্য! আবার হাসিনারও এনিয়ে না-বুঝা-নাই যে  নিজ অর্থনৈতিক সংকটের ভিতরে আবার যুদ্ধ লাগানো বা অন্যের লাগানো যুদ্ধের মধ্যে পরা – এর মানে কী দাঁড়াবে? কাজেই আমেরিকার বার্মাদখল ইস্যু হাসিনার কাছে এক নন-স্টার্টার ফুড এর মত মানে, যা খাওয়া শুরুর জন্য কোন সুস্বাদ এর খাদ্য না; বরং করলা ভাজার মতই তিতা!

    তাহলে আইলিন লাবাকারের এবারের কাজটা কী? ফোকাস?
    বাংলাদেশের সরকার-বিরোধীদেরকে রাস্তায় নামিয়ে পরে বিনাবাক্যে পলায়ন বা পল্টি মারা – এটা আগামিতে আমাদের মত দেশে আমেরিকাকে আর কোন সরকার বা বিরোধী দল সহজে বিশ্বাস করতে চাইবে না! আমেরিকার এই পরিচয়ের সিল পরে গেছে!  সম্ভবত এর খেসারত-কাফফারা দিতে দিতেই আমেরিকাকে গ্লোবাল শক্তি হিসাবে ক্রমশই উত্থানরহিত হয়েই শেষ হয়ে যেতে হবে বা যোগ্যতায় দুনম্বর অবস্থানে চলে যেতে হবে!  বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে নেতার জায়গা ছেড়ে দিয়ে যেভাবে বৃটিশ সাম্রাজ্যের সুর্যও যে ঢুবে যায় সেটা বৃটিশেরা নিজেই তা প্রমাণ করেছিল – আমেরিকা সম্ভবত সেদিকে হাঁটতে থাকবে!  সম্প্রতি স্থানীয় পার্টনারদের সাথে আলোচনায় যখন এক পশ্চিমা এমবেসি জানতে পারে যে বর্তমানে বাংলাদেশের এনজিও-গুলো আর পাবলিকও আমেরিকার উপর আর আস্থা রাখছে না, হারিয়েছে। হাসিনার টিকে যাওয়া তাদের কাছে বিরাট বাজে ও অবিশ্বাস্য উদাহরণ হয়ে কপালে লটকে গেছে! ওদিকে বিপরীতে এনজিও – এই কালচার বা ততপরতা এখনও পশ্চিমেরই একচেটিয়া; চীন এখনও এনজিও ততপরতা বলে কোনকিছুতে আগ্রহী নয় তাই শুরুই করে নাই। কখনও করবে কিনা এরই কোন পাত্তা নাই। তা সত্বেও নাকি স্থানীয় পার্টনারেরা জানিয়েছে যে বিকল্প হিসাবে  এনজিও-রা সরকারি দলে ভিরে যেতে চাইছে আর নয়ত চীন-বিকল্প হবে কবে কখন তা নিয়ে আলাপ শুরু করে দিয়েছে। মজার কথা হল, উপস্থিত পশ্চিমা প্রতিনিধিদের জন্য এই আলোচনা শোনা ছিল পাপের মত; আর তথ্য ছিল অবিশ্বাস্য আর মারাত্মক তিতা অভিজ্ঞতা!  তারা আশা করেছিল বাংলাদেশের মানুষ বড় জোর আরো কঠিন করে  আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের সমালোচনা করবে!! কিন্তু উলটা বিকল্প হিসাবে চীনের নাম সামনে নিয়ে আসা – এটা তারা স্বপ্নেও ভাবে নাই!!!

    তবু আমেরিকান চোখ বা তাঁদের বিবেচনায় বসে দেখলে, তারা মনে করে শুধু আমেরিকার পলায়ন এটা তো কোন পলায়নই না নিজ স্বার্থে সময়ে সঠিক কাজটা করা। আর সেই সাথে এথেকে ভারত-আমেরিকা মিলে গিয়ে যৌথভাবে এবং খোলাখুলি চীন ঠেকানোর কাজে নেমে পড়া নিশ্চয় বাইডেনের এক এশিয়ান অর্জন!  কাজেই লাবাকারের আপাত প্রধান ফোকাস হাসিনা সরকারকে কতটা আমেরিকার কাছের বলে অনুভব করানো যায়! কিন্তু কাজটা খুবই কঠিন! গত দুবছর ধরে হাসিনাকে আমেরিকা যে নাকানি-চুবানি খাইয়েছে সেই ক্ষত-ই এখনও শুকায় নাই; কাজের এর বিপরীত মেরুতে গিয়ে গভীর সদ্ভাবের এক সম্পর্কে  রূপান্তর খুবই কঠিন!  ব্যাপারটা যেখানে প্রধানমন্ত্রীর নিজ পরিবারের উপর অত্যাচার হিসাবে গড়িয়ে আছে – নিয়েছিলেন !  সেই আমেরিকার সাথেই আবার কী নির্ভরশীলতার সম্পর্ক আবার হাসিনা সরকার করতে চাইবেন বা সফল হবেন – মনে জমে থাকা ক্ষোভ-অবিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে বাইরে বাইরে কতটা আর বাইডেনের আমেরিকার ঘনিষ্ট হতে পারবেন হাসিনা?

    মানুষ একমাত্র মুরোদ-ধর ক্ষমতার কাছেই যায়; আর তাতে সেখানে কিছুটা নিজেকে নত দেখায়ে হলেও রাজি হয়ে। কিন্তু  একবার যদি কারো মুরোদ নিয়ে আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, মুরোদ নিয়ে সন্দেহ জাগে তাহলে সব শেষে!  আমেরিকার অবস্থা এখন সে জায়গায়, সে নিজেই নিজেকে সে জায়গায় নিয়েছে!
    আর হাসিনাও জেনে গেছেন যে বাইডেনকেই অত পাত্তা না দিয়েও টিকে যাওয়া যায়!
    কাজেই এখন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির সাফল্য আমেরিকার সাথে একসাথে বাংলাদেশের উতযাপন এর কথা বলে লাবাকার কতদুর যেতে পারবেন? বরং হাসিনার প্রেফার করার সম্রভাবনা বেশী যে আমেরিকাকে যতটুকু তাঁর দরকার তা ভারতের মাধ্যমে পেয়ে নিতে; ডিমান্ড নোট পাঠিয়ে। আর এতে মোদি-জয়শঙ্কর ততই নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করতে থাকবে হয়ত!

    কিন্তু নগদ ডলার মানে, হাসিনা সরকারের অর্থনীতিতে এর  গভীর চাহিদা হয়ে আছে এর সুরাহা কী হবে এ নিয়ে তো কিছুই হয় নাই!   কিভাবে হবে সেটাও সব অস্পষ্ট! সবাই ঘুরায়-ফিরায় চীনের বিকল্প হিসাবে জাপানকে ধরতে হবে – বলতে চায়! কিন্তু জাপানকে ধরতে চাইলে তা হাসিনা নিজেই পারে, লাবাকার-বাইডেনদেরকে হাসিনার এখানে দরকার নাই। আসলে সমস্যা তো অন্য জায়গায় –  জাপান এখন আর সেই ইয়াং  বা উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি নয়। যখন সেই সময় বলতে, ১৯৬৬ সালের আশেপাশে মানে যখন নয়া এশিয়ান ডেভলবমেন্ট ব্যাংক [ADB] খুলেছিল, সেই ১৯৬৬ সালের শেষের পর থেকে। যখন সে বড় ভাইয়া আমেরিকার অনুমতি নিয়ে এই দুদেশ মিলে এডিবি’র  সবচেয়ে বড় দুই শেয়ার-হোল্ডার মালিক হয়ে নিয়েছিল। সেই উদীয়মান জাপানের জোশ আর এখন খুজলে তো হবে না, নাই! এছাড়া, জাপানেরর সুদের হারও বেশী; ঋণ দান ক্ষমতা সামর্থও চীনের মত লেবেলের না! এই অবস্থায় আমেরিকা আর ইইউ এদুই গোষ্ঠিও যদি তাদের ঋণদানের অক্ষমতায় সেইও জাপান-ভরসা, মামে স্কলেই জাপান ভরসার গান গেয়ে উসুল করতে চায় তা আর কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব? অথচ গ্লোবাল নেতা হবার এই পালা বদলের কালে চীনের তুলনায় আমেরিকার ক্রাইসিস ও অযোগ্যতা তো এটাই!!   সিংহও একদিন বুড়া হয়! শিকার করতে অযোগ্য হয়ে না খেয়ে শুকিয়ে একদিন মরে যায়!

    কাজেই আইলিন লাবাকার এরা যতই বাংলাদেশকে রাস্তায় ফেলে রেখে পল্টি মেরে নিজেদের বুদ্ধিমান বিজয়ী ও ইন্দো-প্যাসেফিকে নিজেদের বিজয় হয়েছে বলে জোশ তুলতে চান না কেন সেটা কার্যত – বাংলাদেশকে আরেকবার ভারতের কাছে বিক্রি করে দেওয়াই হবে! হয়েছেও তাই! এবং বাইডেনের বকোয়াজ পরিণতিতে তাই হয়েছে! আবার এদিকটাও যে হাসিনা বুঝেন না তাও তো না!  কাজেই বাইডেনের টিম যা এসেছে বাংলাদেশে বা আগামিতে আসবে সবই এমন অর্থহীন-ই হবে!

    তবে এটা জানতেও কারও বাকি নাই যে বাইডেনের প্রশাসনের জন্য এটা হল ক্ষমতার শেষ বছর অতএব বাকি কিছু মাস তাইরে-নাইরে করে পার করে দেয়া যাকে, আমরা টাইম পাস বলি!! এটাই বাকারদের লক্ষ্য!
    সক্রিয়ভাবে বাইডেন প্রশাসন তো আর তো মাত্র ছয়-আট মাস ! আগামি নভেম্বর ২০২৪ এর প্রথম সপ্তাহেই পরবর্তি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলাফল কমবেশি স্পষ্ট যে সম্ভাব্য প্রার্থী ট্রাম্পই সম্ভবত বিজয়ী হচ্ছেন!  অর্থাৎ অন্তত বাইডেন আর নয়! যেটা এর মূলকথা!! ফলে যারা এবছর বাইডেন প্রশাসনের হয়ে বাংলাদেশে আসছেন তাদের কেরিয়ারও শেষ! ফুল স্টপ!!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৭ঃ৫৬ সন্ধ্যা

     

     

     

     

     

     

     

     

     

    নিচে উপরের লেখাটারই একটা সাদামাটা রচনা বা Plain Text ভার্সান দেয়া হল পরীক্ষামূলকভাবে,  অনেকে বলছেন এতে লেখা মোবাইলে পড়তে সুবিধা হবে। পাঠকেরা মন্তব্য জানাবেন আশা করিঃ

    আলী রীয়াজদের সংকট এবং
    আইলিন এর এবারের ঢলে পরা সফরে!
    গৌতম দাস

    ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা সাতটা নয়
    https://wp.me/p1sCvy-5qQ

    প্রতীকীভাবে “আলী রীয়াজদের” বললেও এরা আসলে কারা? বলতে চেয়েছি যারা দ্বৈত নাগরিক মানে, বিশেষ দ্বৈততার দিক আছে। তাও এটা ঠিক দ্বৈত নাগরিক মাত্রই এমন সবার কথা বলছি না। একজন ব্যবসায়ী, চাকুরিজীবী বা সাধারণ মানুষ যারা আপন ভাগ্য-অন্বেষণে  আমেরিকায় (বা বিদেশে) নাগরিকত্ব যোগাড় করেছেন বা যোগাড় করতে না পারলেও রেসিডেন্ট পারমিট – মানে সে দেশে থেকেই বসবাস ও কাজ-চাকুরি করার অনুমতি পেয়ে নিয়েছেন – এমন সকল মাইগ্রেন্ট বা প্রবাসী – এদের সকলকে বাইরে রেখে বাকিদের কথা বলছি। অর্থাৎ সাধারণদের প্রায় সকলকেই একেবারেই বাইরে রাখছি।  এমন এরা সকলকেই এই আলোচনার বাইরে রেখে কথা বলছি।  তাতে যাদের কথা বলছি, এরাও দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা না নিয়েছেন, তাতেও কোন ফারাক নাই।  কারণ, আমার এই কথাগুলো সাধারণদের নিয়ে নয়। তাহলে?

    আমি কথা বলছি যারাও মাইগ্রেন্ট অবশ্যই, কিন্তু যারা সেদেশের সরকারের নীতি-পলিসি সংশ্লিষ্ট পেশা নিয়েছেন যেমন কোন আমেরিকান থিঙ্ক ট্যাংক ফেলো। এছাড়াও যারা আমেরিকা সরকারের নীতি-নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পর্কিত। অথবা আরেকটা চিহ্ন যাদিয়ে এদের আলাদা করা যায় যে যারা তাদের পেশাগত কাজটাই এমন যে তাঁকে আমেরিকান প্রশাসনের পক্ষে সাফাই দেয়া বা যুক্তি-অবস্থান যোগানোই যাদের একমাত্র কাজ; এভাবেই তাদের লিখা বা কথা বলতে হয়। ফলে বলাই বাহুল্য যারা দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা রেসিডেন্ট পারমিট হোল্ডার শুধু নন; বরং বাড়তি আরো যারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে আমেরিকান প্রশাসনের সাথে জড়িয়ে আছেন বা গেছেন – আমি কেবল এদের কথা বলছি। এখানে “আলী রীয়াজদের” বলতে তাদের কথা বুঝিয়েছি। এই অর্থে এদের বিশেষ দ্বৈততার দিকেই আমার নজর তাতে এরা নাগরিক অথবা যাদের মধ্যে অনেকে শুধু-ই রেসিডেন্ট পারমিট হোল্ডার হলেও!

    বাংলাদেশে আমেরিকান ফরেন পলিসির প্রয়োগ আছে স্বাভাবিকভাবেই আর, আপনি এই বিশেষ দ্বৈততায় নাগরিক বা হয়ত না; কিন্তু আপনি  আমেরিকান পলিসি-প্রশাসনের কর্ম প্রয়োগ-ততপরতার সাথে জড়িত; যেমন ধরা যাক আলী রিয়াজ এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক এর ফেলো। এখন আলী রিয়াজ বাংলাদেশের সিরিয়াস রাষ্ট্রস্বার্থ জড়িত এমন কোন ইস্যুতে আমেরিকান পলিসি সম্পর্কিত কোন আলোচনায় অংশ নিয়েছেন; আর সেখানে আলী রিয়াজের কথা বক্তব্য-অবস্থান – যা কিছু তিনি সেখানে বলবেন বা লিখবেন, এটাতে তিনি কাকে প্রতিনিধিত্ব করছে বলে ধরে নিব? আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ? কথাটা বলা হচ্ছে এটা মনে রেখে যে আলী রিয়াজ বাংলাদেশ-অরিজিন আমেরিকান!  তাই এককথায়, ছোট করে প্রশ্ন হচ্ছে আলী রিয়াজের ভাষ্য কী আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ এর ভাষ্য? কোনটা বলে ধরে নিব?

    এখন আমরা স্বীকার করি বা স্বীকৃতি দেই আর না দেই – বাস্তবতা হল এখানে এক গভীর “কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট” মানে, দুই রাষ্ট্রস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংঘাত-বিরোধ আছে। আর এর একেবারে প্রাথমিক কিছু অবলিগেশন [obligation] বা দায় আছে আলী রীয়াজদের! নুন্যতম সততা স্বচ্ছতার খাতিরে তাদের এবিষয়ে একটা ঘোষিত অবস্থান থাকা উচিত।  কথাটা এমন হতে পারে যে, “আমি (আলী রিয়াজেরাদের কেউ) যাকিছু পলিটিক্যাল-ইকোনমিক বক্তব্য রাখি  সেখানে আমি সুনির্দিষ্ট করে ভিন্ন কিছু উল্লেখ না করলে ধরে নিতে হবে সেখানে আমি কেবল আমেরিকাকে প্রতিনিধিত্ব করেই বক্তব্য দিয়েছি ও দেই বলেই মনে করা সঠিক হবে”।

    যদিও থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলোদের কাজ হল আমেরিকার ক্ষমতাসীন প্রশাসনের পক্ষে ঢোল বাজানো। এমনকি সেটা প্রকাশ্যে ক্রিটিক্যাল বা নেগেটিভ অবজারভেশন দেয়াও না।

    মনে রাখতে হবে থিঙ্কট্যাঙ্ক এর চাকরি বা সার্ভিস দেওয়ার চুক্তিপত্র করা, এটা কিন্তু আমেরিকায় গিয়ে কোন ইঞ্জিয়ারিং-টেকনোলজি ফার্মের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তাদেরকে সার্ভিস দেয়া ও আয় করার মত ঘটনা একেবারেই নয়; সমতুলনীয় ঘটনা নয়। কারণ, থিঙ্কট্যাংক ফেলো বা আমেরিকাকে বাংলাদেশী-কনসালটেন্ট সার্ভিস দেওয়ার পেশাটা শতভাগ রাজনীতিক ও রাষ্ট্রস্বার্থ-মুলক কাজ!  কেউ এথনিক বাঙালি জনগোষ্ঠির লোক বলে সেই ইমেজকে ব্যবহার করে নিজেকে আড়ালে রাখার সুবিধা নেয়া ভুল ও অসততা হবে। মানে, এর উপর দাঁড়িয়ে সে সুবিধা নিয়ে আমেরিকান স্বার্থ বাস্তবায়নের কথা খেয়াল করে বক্তব্য দিয়ে যাওয়া  – এটা খুবই অস্বচ্ছ কাজ এই অর্থে তা অপ-ততপরতা হতে পারে! আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে সার্ভিস দিয়ে আয় করা হয়ত সাধারণভাবে অপরাধ নয় তবে,  আগে নিজ পরিচয়-অবস্থান পরিস্কার করে রাখলে সেটাই সততা হবে যে আমি আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে চাকরি-কাজে বা সার্ভিস দেওয়াতে আছি!

    সম্প্রতি এবিষয়টা খুবই সিরিয়াস পর্যায়ে গেছে বলে আমার মনে হয়। ওয়েবিনার [webinar] মানে অনলাইন টকশোতে কথা বলা যাকে বলি, তার মধ্যে।  ওয়েবিনার মানে, কয়েক ব্যক্তি যারা নানান দেশে বসে আছেন কিন্তু তা সত্বেও যেন তারা একসাথে এক দেশের এক রুমে বসে আলোচনা করছেন – এমন এক গোলটেবিল বৈঠকের মত সেটা। এটা সম্ভব কারণ, তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রত্যেকে অডিও-ভিডিও সব অর্থেই কানেকটেড থাকেন সেখানে। অনেকে এটাকে তাই ভার্চুয়াল [virtual] বৈঠকও বলেন। [ভার্চুয়াল মানে হল, যা বাস্তব নয় কিন্তু যেন বাস্তব মনে করে নেয়া হয়েছে ও সে  অনুযায়ী আচরণ করা হচ্ছে; যার বাংলা অনেকে করে বলেন – “জ্ঞানত” বা অনুমিত]  তেমনই সম্প্রতি এক বৈঠকের খবর প্রসঙ্গে রিপোর্ট করেছে প্রথম আলো। শিরোনাম “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” । আর এই ওয়েবিনার বৈঠকের নিজস্ব শিরোনাম ছিলঃ ওয়েবিনারের শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ ও তার প্রতিবেশী: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব’।

    সেখানেই এই প্রশ্ন যে অংশগ্রহণকারী প্রবাসীরা তাঁরা কাদের প্রতিনিধিত্ব করে কথা বলছিলেন –  আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ নাকি বাংলাদেশের  রাষ্ট্রস্বার্থ? –

    এমন অস্পষ্টতা ছিল পীড়াদায়ক ও বিভ্রান্তকর!
    কারণ, শিরোনাম দেখেই জানা যাচ্ছে – তারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ নিয়ে এবার কথা বলছেন অথচ আমেরিকাকে বাইরে রেখে এর সব দায় কেবল ভারতের উপর চাপাচ্ছিলেন। অথচ তাঁরা কারা? মানে তারা কাকে প্রতিনিধিত্ব করছেন? মানে প্রবাসী ব্যক্তিদের কোন রাষ্ট্রীয় পরিচয়? তারা অনেকেই বাংলাদেশি-অরিজিন আমেরিকান। তাই ঐ ওয়েবিনারে তারা কী বাংলাদেশি রাষ্ট্রস্বার্থের নাকি আমেরিকান বা বিদেশি রাষ্ট্রস্বার্থের নাগরিক-প্রতিনিধি হিসাবে কথা বলছিলেন?

    কারণ, বিষয়টাতে এই প্রশ্ন ওখানে খুবই সিরিয়াস দিক ছিল? বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের জন্য দায়ী করা হচ্ছিল কেবল ভারতকে!  কিন্তু এটা ছিল
    বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একেবারে ভারত-আমেরিকার যৌথ প্রযোজনায় ঘটা হস্তক্ষেপ!
    আমরা তো ভুলতে পারি না যে ২০০৭ সালের ১/১১ এর সেনা ক্ষমতাদখল ছিল এক আমেরিকান প্রযোজনা। যার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে
    তুলে দেওয়া।  আমেরিকার পক্ষ থেকে ভারতকে ঠিকা দেয়া কাজ – এশিয়ায় ভারত চীন ঠেকানোর চেষ্টা করবে – আর বিনিময়ে এরই উপহার ছিল বাংলাদেশকে
    ভারতের হাতে তুলে দেয়া! কিন্তু আমেরিকা বাংলাদেশকে তুলে দিবার কে??? এটা তো চরম অপরাধ??
    আর এখন ওয়েবিনারের যে শিরোনাম “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” এই একই কাজ যার শুরু তো সেই ১/১১ এর পর থেকেই, গত সতের বছর ধরে। তাহলে???
    আর এখন সব দায় একা ভারতের উপর চাপাচ্ছে কেন আলী রীয়াজেরা???? আমেরিকার হাত ধুয়ে ফেলানো???? এটা ঘোরতর অসততা!

    ওয়েবিনারের এই শিরোনাম আমাদেরকে নিজেই জানিয়ে দিয়েছে যে সেখানে আলোচনার প্রসঙ্গ হল – বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ। যদিও তামাসা করে বললে, এটা কিন্তু তাদের একটা ভাল অগ্রগতিও বটে!

    ভারতের বাংলাদেশে হাত ঢুকানো তো নতুন না। কারণ গত ১/১১ এর সময়ে বাংলাদেশে আমেরিকার সামরিক ক্ষমতা দখলের এক প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে নিয়ে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া যাতে ভারত পক্ষে অসংখ্য সব ধরণের করিডোর এবং সবই বিনা-পয়সায় বাংলাদেশ থেকে আদায়; এমনকি ভারতের সুবিধা করে দিতে এজন্য যা অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় বইবার দায়ীত্ব এটাও বাংলাদেশের অর্থ ও দায়! অন্যদিকে পুরা বাংলাদেশকে ভারতের নিজ পণ্যের একচেটিয়া বাজার বানানো; এনফোর্সড ও অবৈধভাবে রেমিটেন্স আদায়ের জন্য বাংলাদেশকে উতস দেশ হিসাবে ব্যবহার ইত্যাদি সহ হেন ভারতীয় স্বার্থ নাই যা তখন থেকে লুট করা শুরু করা হয় নাই। যেটা ২০১৭ সালের পর থেকে একটু ঝিমিয়ে গেলেও চলতি ফেব্রুয়ারি থেকে তা আবার আমেরিকান প্রটেকশনে বিপুল বেগে চালু করার ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে। আর এটা এতই তীব্র ও প্রকাশ্য যে আলী রীয়াজেরা এই ইস্যুতেই কেবল ভারতকেই দায়ী করে হলেও এবার বৈঠক ডেকে বসতে বাধ্যই হয়েছে। বাধ্য বলছি কারণ, গত ১৫ বছর তো আলী রিয়াজদের এনিয়ে কোন ততপরতা দেখি নাই। আলী রীয়াজদের এই চিকণ বুদ্ধির প্রশংসা করতেই হয়!! এতে ভারতবিরোধী সাজা গেছে আবার আমেরিকান নীতি-পলিসি অবস্থানের পক্ষে সার্ভিসও দেয়া গেছে!

    আলী রিয়াজ আমেরিকান এক থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো হিসাবে জয়েন বা চুক্তিবদ্ধ হবার পরপরই সেসময় (২০০৭) মূলত আমেরিকান পলিসি যে – এশিয়ায় চীনের বিস্তার ঠেকাও – যা তাদের ভাষায় চায়না ঠেকাও বা China Containment নামে ডাকত তারা – একাজের সারকথা ছিল –  বাংলাদেশকে উপহার হিসাবে ভারতের হাতে তুলে দেয়া – আর তাই করা হয়েছিল। কাজেই আলী রীয়াজের এই অপরাধ এটা অজানা থাকার কোন কারণ নাই। যখন তিনি তো সেখানে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে বাংলাদেশ এক্সপার্ট হিসাবেই রিক্রুটেড!   আমি জানি এনিয়ে আলী রিয়াজকে কোন পাবলিক সভায় বা বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় সভাতে এনিয়ে প্রশ্ন করলেও তিনি এনিয়ে তিনি কিছু জানেন না – এমন ধারণাই দিয়ে গিয়েছিলেন।  কথাটা অন্যভাবেও বলা যায় গত ১৫-১৭ বছরে আলী রীয়াজেরা যেন আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া  এই গর্হিত অপরাধ কাজ কখনও হতে দেখেনই নাই!! তাই যেন এবারই প্রথম বলতে চাইছেন যে প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” । এক কথায় বললে আলী রীয়াজেরা ভান করছেন যেন আগে আমেরিকার এমন অপরাধের ঘটনা দেখা যায় নাই। আর সে কারণেই নিশ্চয় আলী রীয়াজেরা এমন ইস্যুতে কখনও কিছু লিখেছেন, বলেছেন এমনটার দরকার হয় নাই! তাই তা আমরা জানি না!  আবার আলী রিয়াজদের পক্ষে আমেরিকান ততপরতা দায় নিয়ে কথা বলা এটা আমাদের আশা করা কী ঠিক হবে?  কারো এনিয়ে জানা থাকলে এখনও শেয়ার করতে পারেন, বাধিত হব। তবে যারাই আগে কখনও কিছু বলেন নাই এটাকে তাদের অপরাধ – আমরা এটাই বলব! যদি বাংলাদেশী পরিচয়কে প্রতিনিধিত্ব করেন তবে ঘোরতর অপরাধকারী এরা। আর আমেরিকাকে প্রতিনিধিত্ব বা চাকুরির খাতিরে করলে এমন কাজ করা – এরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রস্বার্থের চোখে প্রকাশ্য শত্রু! যারা আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ছুপা এজেন্ট!!

     

    কিন্তু আসলেই কী এটা তাঁদের অগ্রগতিঃ
    আলী রীয়াজেরা এবার এনিয়ে ওয়েবিনার বৈঠক করেছে। মানে “প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করছে ভারত” এটা বুঝতে এদের ১৫-১৭ বছর লেগেছে।  এই অগ্রগতিটুকু হতে – মানে আসলেই কী এটা তাঁদের জন্য অগ্রগতি? সন্দেহ আছে! কেন?
    কারণ তারা এসেছে এবার আমেরিকাকে বাঁচাতে! যেন ভারত-আমেরিকাকে একই দড়িতে ফাঁসি না চড়ে!

    বাইডেনের আমে্রিকা এবার স্পষ্ট করেছিল অন্তত গত শেষ দুবছরে [১০ ডিসেম্বর ২০২১ থেকে] যে বাইডেন প্রশাসন শুধু হাসিনার বাংলাদেশ না, মোদির ভারতের উপরেও গণতন্ত্র-মানবাধিকার বা স্যাংশন আরোপে পিছপা হবে না। মূলকথাটা ছিল এবারের বাইডেন প্রশাসন ভারতের হাত ধরে এশিয়াতে আসে নাই বা নিজের “এশিয়া নীতি” সাজায় নাই। ফলে ভারতের চোখ দিয়ে এশিয়া দেখতে বাইডেন যেন আসেন নাই আমাদেরকে তিনি সেই ধারণাই দিয়ে গেছিলেন। কিন্তু হায় হায়! শেষ অন্তত চার মাসে (সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে) বাইডেন এন্ড গং আর কাপড় ঠিক রাখতে পারেন নাই! ন্যাংটা হয়ে গেছেন। আর শেষে ইন্ডিয়ার কোলেই মুখ লুকিয়েছেন, এশিয়ার সব ভরসা আর নিজ আশ্রয়স্থল করেছেন ভারত। আমেরিকান এই পল্টি-মারা সত্যি অতুলনীয়!

    এককথায় বললে, বাইডেন পল্টি মেরেছেন কারণ, তিনি দেখেছেন, হাসিনাকে ক্ষমতায় রেখেই নাকি বাংলাদেশে চীন ঠেকানো বা চীন প্রভাব রোধ করা সম্ভব। তাই আমরা এখন সরাসরি বলতে পারি বাইডেনের নীতি-পলিসি গণতন্ত্র-মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কোন  স্যাংশন-ট্যাংশন আরোপ ছিল না। সোজা লক্ষ্য ছিল,  বাংলাদেশে চীন ঠেকানো বা চীন প্রভাব রোধ করা। তাই আমেরিকা গত সেপ্টেম্বর ২০২৩  থেকেই আমাদের বিরোধীদল ছেড়ে পল্টি মেরেছিল। যা এখন ক্রমশ আমাদের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে। আর স্পষ্টতই এটা ভারতের বিজয়! বুড়া বাইডেন এখন সব ফেলে দিয়ে ভারতের কোলে কেলায় পড়েছে! আর এতে দ্বিতীয়বার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে স্পষ্ট করে তুলে দেয়া ঘটলো!

    আর এব্যাপারে আলী রীয়াজদের মত সবার চেয়ে মুশফিকুল ফজল আনসারী অন্তত সৎ! টেক্কাকে টেক্কা বলার পদক্ষেপ তিনি নিয়েছেন। যদিও তার পারস্পেকটিভ মানে, যে ওয়েব পত্রিকার তিনি নির্বাহী সেখানে প্রকাশিত কিছু আর্টিকেল থেকেই এটা পরিস্কার বুঝা যাচ্ছিল যে আমেরিকা পল্টি মারার সিদ্ধান্ত নিয়েছে! তবু আনসারী নিজের পারস্পেকটিভ-এ লিখতে না পারলেও অন্তত ভারতের WIRE পত্রিকায় নিজের বক্তব্য ছেপে দিয়েছেন। যার বাংলা করে ছেপেছে মানবজমিন!

    আইলিন লা-বাকার [Eileen Laubacher] আবার বাংলাদেশ সফরেঃ
    লা-বাকারের এটা দ্বিতীয় বাংলাদেশ সফর; মানে ২০২৩ সালের ৮-১০ জানুয়ারি। সেবার তাঁর পরিচয় দেখেছিলাম যা আমাদেরকে তখন UNB দিয়েছিল যে লাবাকার আমেরিকার একজন National Security Council’s Senior Director for South Asia । আর এবার তাঁর আরো একটা বাড়তি পরিচয় যোগ হয়েছে দেখা যাচ্ছে। সেটা হল, তিনি একইসাথে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের বিশেষ সহকারী-ও [Special Assistant]। অবশ্য এমনিতেই তিনি আমেরিকান নেভির এক সিনিয়র অফিসার – রিয়ার এডমিরাল আইলিন লা-বাকার!

    লা-বাকারকে নিয়ে  মানে তার এবারের সফর  নিয়ে এখনই সবটা লিখা যাবে না। এর টেকনিক্যাল প্রবলেমটা হল, তিনি কেবল গতকালকেই ঢাকায় তাঁর প্রকাশ্য ততপরতা শুরু করেছেন যা অন্তত আজ ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। এটাই তাঁর অফিশিয়াল সিডিউল! ফলে ২৭ ফেব্রুয়ারির পরে তা আবার আমাদের করতে হতে পারে। তাই এখন একটা কেবল তুলনা করব যে, লা-বাকারের আগের বছরের সফর আর এবারের সফর নিয়ে।

    গতবারের লাবাকার এর সফরের পরে আমার এক পুরানা লেখা আছে; লিঙ্ক এখানে।

    একটা আসল কথাই বলতে ভুলে গেছি। গতবার মানে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইলিন লাবাকার এর প্রথম সফরের সময় ভারতের হয়ে আমাদের
    কাছে কুখ্যাত সুবীর ভৌমিক কী লিখেছিলেন?
    তার সেই লেখার শিরোনাম ছিল – “আমেরিকা কী বার্মা-কে বসনিয়া বানাবে? নো ফ্লাই জোনের পরিকল্পনায় ভারতকেও নিষেধাজ্ঞায় সামিল করবে”
    – অয়ার আজ সেই ডোনাল্ড লু হয়েছে ভারতের কোলে বসা এক গুডি গুডি আদরের দুধ-বালক! ল্যু এখন সুবীরদের বাপ হয়ে গেছে!
    সুবীরের পুরানা সেই লেখার লিঙ্কঃ  https://thefederal.com/…/will-us-do-a-bosnia-on…/

    সেকালে লিখেছিলাম, “বাইডেনের এক প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা আইলিন লা বাকারকে [Director for South Asia Rear Admiral Eileen Laubacher] পাঠানো; যার  উদ্দেশ্য খোদ হাসিনাকেই বার্মা দখল প্রোগ্রামে সামিল করা বিনিময়ে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির প্রসঙ্গ চাপা দিয়ে রাখা হবে – এই প্রস্তাব কতটা কার্যকর করা যায় তা দেখতে”।

    এছাড়াও সেখানে তখন এর কয়েকলাইন আগে বা উপরে লিখেছিলাম, “আমেরিকার বার্মা দখলের বাসনা বলতে এমনকি আবার সেটাও ঠিক যে এটা শুধু- সু চিকে মুক্ত করা বা বার্মিজ জেনারেলদের উতখাত ও শায়েস্তা করা নয়। এগুলো পরোক্ষ উদ্দেশ্য। আর মুখ্য বা প্রধান উদ্দেশ্য হল এশিয়াতেই চীনবিরোধীতা [কোয়াড বা ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির খাড়া করার মতই তবে আরেকটা পদক্ষেপ] ও চীনকে চ্যলেঞ্জ করে নয়া কল্পিত হবু বার্মায়  আমেরিকান উপস্থিতি ঘটিয়ে দেখানো”।

    আর এবারের পরিস্থিতি হল, হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি এখন আর ইস্যু বা বাস্তবতা নয়। দ্বিতীয়ত, খোদ শাসক বার্মার জেনারেলেরাই এখন বিদ্রোহীদের হাতে নাস্তানাবুদ। তাই, বার্মার ক্ষমতা এখন – জেনারেল বা বিদ্রোহী – এভাবে কার কাছে কতটুকু সেটা এক গবেষণার ব্যাপার এমনই এক অস্থির পরিস্থিতি এটা। কাজেই এর ভিতরে আবার আমেরিকা বার্মাকে দখল পেতে চাইলে কাকে উতখাত করবে – জেনারেল না বিদ্রোহীদের – সেই মূল বিষয়টাই অস্পষ্ট!  কাজেই আমেরিকার বার্মাদখল ইচ্ছা – সেটা এখন আমেরিকার মনের ভিতরে আরো অস্পষ্ট হয়ে থাকাই স্বাভাবিক। ফলে এখনই হাসিনাকে বার্মা ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার পক্ষে আসতে বলা অর্থহীন!

    ওদিকে হাসিনা সরকার বা সেনাবাহিনী উভয়েই যুদ্ধের বিপক্ষে। আর তা প্রায় প্রকাশ্য! আবার হাসিনারও এনিয়ে না-বুঝা-নাই যে  নিজ অর্থনৈতিক সংকটের ভিতরে আবার যুদ্ধ লাগানো বা অন্যের লাগানো যুদ্ধের মধ্যে পরা – এর মানে কী দাঁড়াবে? কাজেই আমেরিকার বার্মাদখল ইস্যু হাসিনার কাছে এক নন-স্টার্টার ফুড এর মত মানে, যা খাওয়া শুরুর জন্য কোন সুস্বাদ এর খাদ্য না; বরং করলা ভাজার মতই তিতা!

    তাহলে আইলিন লাবাকারের এবারের কাজটা কী? ফোকাস?
    বাংলাদেশের সরকার-বিরোধীদেরকে রাস্তায় নামিয়ে পরে বিনাবাক্যে পলায়ন বা পল্টি মারা – এটা আগামিতে আমাদের মত দেশে আমেরিকাকে আর কোন সরকার বা বিরোধী দল সহজে বিশ্বাস করতে চাইবে না! আমেরিকার এই পরিচয়ের সিল পরে গেছে!  সম্ভবত এর খেসারত-কাফফারা দিতে দিতেই আমেরিকাকে গ্লোবাল শক্তি হিসাবে ক্রমশই উত্থানরহিত হয়েই শেষ হয়ে যেতে হবে বা যোগ্যতায় দুনম্বর অবস্থানে চলে যেতে হবে!  বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে নেতার জায়গা ছেড়ে দিয়ে যেভাবে বৃটিশ সাম্রাজ্যের সুর্যও যে ঢুবে যায় সেটা বৃটিশেরা নিজেই তা প্রমাণ করেছিল – আমেরিকা সম্ভবত সেদিকে হাঁটতে থাকবে!  সম্প্রতি স্থানীয় পার্টনারদের সাথে আলোচনায় যখন এক পশ্চিমা এমবেসি জানতে পারে যে বর্তমানে বাংলাদেশের এনজিও-গুলো আর পাবলিকও আমেরিকার উপর আর আস্থা রাখছে না, হারিয়েছে। হাসিনার টিকে যাওয়া তাদের কাছে বিরাট বাজে ও অবিশ্বাস্য উদাহরণ হয়ে কপালে লটকে গেছে! ওদিকে বিপরীতে এনজিও – এই কালচার বা ততপরতা এখনও পশ্চিমেরই একচেটিয়া; চীন এখনও এনজিও ততপরতা বলে কোনকিছুতে আগ্রহী নয় তাই শুরুই করে নাই। কখনও করবে কিনা এরই কোন পাত্তা নাই। তা সত্বেও নাকি স্থানীয় পার্টনারেরা জানিয়েছে যে বিকল্প হিসাবে  এনজিও-রা সরকারি দলে ভিরে যেতে চাইছে আর নয়ত চীন-বিকল্প হবে কবে কখন তা নিয়ে আলাপ শুরু করে দিয়েছে। মজার কথা হল, উপস্থিত পশ্চিমা প্রতিনিধিদের জন্য এই আলোচনা শোনা ছিল পাপের মত; আর তথ্য ছিল অবিশ্বাস্য আর মারাত্মক তিতা অভিজ্ঞতা!  তারা আশা করেছিল বাংলাদেশের মানুষ বড় জোর আরো কঠিন করে  আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের সমালোচনা করবে!! কিন্তু উলটা বিকল্প হিসাবে চীনের নাম সামনে নিয়ে আসা – এটা তারা স্বপ্নেও ভাবে নাই!!!

    তবু আমেরিকান চোখ বা তাঁদের বিবেচনায় বসে দেখলে, তারা মনে করে শুধু আমেরিকার পলায়ন এটা তো কোন পলায়নই না নিজ স্বার্থে সময়ে সঠিক কাজটা করা। আর সেই সাথে এথেকে ভারত-আমেরিকা মিলে গিয়ে যৌথভাবে এবং খোলাখুলি চীন ঠেকানোর কাজে নেমে পড়া নিশ্চয় বাইডেনের এক এশিয়ান অর্জন!  কাজেই লাবাকারের আপাত প্রধান ফোকাস হাসিনা সরকারকে কতটা আমেরিকার কাছের বলে অনুভব করানো যায়! কিন্তু কাজটা খুবই কঠিন! গত দুবছর ধরে হাসিনাকে আমেরিকা যে নাকানি-চুবানি খাইয়েছে সেই ক্ষত-ই এখনও শুকায় নাই; কাজের এর বিপরীত মেরুতে গিয়ে গভীর সদ্ভাবের এক সম্পর্কে  রূপান্তর খুবই কঠিন!  ব্যাপারটা যেখানে প্রধানমন্ত্রীর নিজ পরিবারের উপর অত্যাচার হিসাবে গড়িয়ে আছে – নিয়েছিলেন !  সেই আমেরিকার সাথেই আবার কী নির্ভরশীলতার সম্পর্ক আবার হাসিনা সরকার করতে চাইবেন বা সফল হবেন – মনে জমে থাকা ক্ষোভ-অবিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে বাইরে বাইরে কতটা আর বাইডেনের আমেরিকার ঘনিষ্ট হতে পারবেন হাসিনা?

    মানুষ একমাত্র মুরোদ-ধর ক্ষমতার কাছেই যায়; আর তাতে সেখানে কিছুটা নিজেকে নত দেখায়ে হলেও রাজি হয়ে। কিন্তু  একবার যদি কারো মুরোদ নিয়ে আস্থা নষ্ট হয়ে যায়, মুরোদ নিয়ে সন্দেহ জাগে তাহলে সব শেষে!  আমেরিকার অবস্থা এখন সে জায়গায়, সে নিজেই নিজেকে সে জায়গায় নিয়েছে!

    আর হাসিনাও জেনে গেছেন যে বাইডেনকেই অত পাত্তা না দিয়েও টিকে যাওয়া যায়!
    কাজেই এখন ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির সাফল্য আমেরিকার সাথে একসাথে বাংলাদেশের উতযাপন এর কথা বলে লাবাকার কতদুর যেতে পারবেন? বরং হাসিনার প্রেফার করার সম্রভাবনা বেশী যে আমেরিকাকে যতটুকু তাঁর দরকার তা ভারতের মাধ্যমে পেয়ে নিতে; ডিমান্ড নোট পাঠিয়ে। আর এতে মোদি-জয়শঙ্কর ততই নিজেদের ক্ষমতাবান মনে করতে থাকবে হয়ত!

    কিন্তু নগদ ডলার মানে, হাসিনা সরকারের অর্থনীতিতে এর  গভীর চাহিদা হয়ে আছে এর সুরাহা কী হবে এ নিয়ে তো কিছুই হয় নাই!   কিভাবে হবে সেটাও সব অস্পষ্ট! সবাই ঘুরায়-ফিরায় চীনের বিকল্প হিসাবে জাপানকে ধরতে হবে – বলতে চায়! কিন্তু জাপানকে ধরতে চাইলে তা হাসিনা নিজেই পারে, লাবাকার-বাইডেনদেরকে হাসিনার এখানে দরকার নাই। আসলে সমস্যা তো অন্য জায়গায় –  জাপান এখন আর সেই ইয়াং  বা উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি নয়। যখন সেই সময় বলতে, ১৯৬৬ সালের আশেপাশে মানে যখন নয়া এশিয়ান ডেভলবমেন্ট ব্যাংক [ADB] খুলেছিল, সেই ১৯৬৬ সালের শেষের পর থেকে। যখন সে বড় ভাইয়া আমেরিকার অনুমতি নিয়ে এই দুদেশ মিলে এডিবি’র  সবচেয়ে বড় দুই শেয়ার-হোল্ডার মালিক হয়ে নিয়েছিল। সেই উদীয়মান জাপানের জোশ আর এখন খুজলে তো হবে না, নাই! এছাড়া, জাপানেরর সুদের হারও বেশী; ঋণ দান ক্ষমতা সামর্থও চীনের মত লেবেলের না! এই অবস্থায় আমেরিকা আর ইইউ এদুই গোষ্ঠিও যদি তাদের ঋণদানের অক্ষমতায় সেইও জাপান-ভরসা, মামে স্কলেই জাপান ভরসার গান গেয়ে উসুল করতে চায় তা আর কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব? অথচ গ্লোবাল নেতা হবার এই পালা বদলের কালে চীনের তুলনায় আমেরিকার ক্রাইসিস ও অযোগ্যতা তো এটাই!!   সিংহও একদিন বুড়া হয়! শিকার করতে অযোগ্য হয়ে না খেয়ে শুকিয়ে একদিন মরে যায়!

    কাজেই আইলিন লাবাকার এরা যতই বাংলাদেশকে রাস্তায় ফেলে রেখে পল্টি মেরে নিজেদের বুদ্ধিমান বিজয়ী ও ইন্দো-প্যাসেফিকে নিজেদের বিজয় হয়েছে বলে জোশ তুলতে চান না কেন সেটা কার্যত – বাংলাদেশকে আরেকবার ভারতের কাছে বিক্রি করে দেওয়াই হবে! হয়েছেও তাই! এবং বাইডেনের বকোয়াজ পরিণতিতে তাই হয়েছে! আবার এদিকটাও যে হাসিনা বুঝেন না তাও তো না!  কাজেই বাইডেনের টিম যা এসেছে বাংলাদেশে বা আগামিতে আসবে সবই এমন অর্থহীন-ই হবে!

    তবে এটা জানতেও কারও বাকি নাই যে বাইডেনের প্রশাসনের জন্য এটা হল ক্ষমতার শেষ বছর অতএব বাকি কিছু মাস তাইরে-নাইরে করে পার করে দেয়া যাকে, আমরা টাইম পাস বলি!! এটাই বাকারদের লক্ষ্য!

    সক্রিয়ভাবে বাইডেন প্রশাসন তো আর তো মাত্র ছয়-আট মাস ! আগামি নভেম্বর ২০২৪ এর প্রথম সপ্তাহেই পরবর্তি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলাফল কমবেশি স্পষ্ট যে সম্ভাব্য প্রার্থী ট্রাম্পই সম্ভবত বিজয়ী হচ্ছেন!  অর্থাৎ অন্তত বাইডেন আর নয়! যেটা এর মূলকথা!! ফলে যারা এবছর বাইডেন প্রশাসনের হয়ে বাংলাদেশে আসছেন তাদের কেরিয়ারও শেষ! ফুল স্টপ!!

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    আপডেটঃ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ০৭ঃ৫৬ সন্ধ্যা

     

  • “ডোনাল্ড ল্যু ফের…” কোথাও আসেন নাই; আমাদেরকে ভারতের কোলে তুলে দিতে চাইছেন

    “ডোনাল্ড ল্যু ফের…” কোথাও আসেন নাই;
    আমাদেরকে ভারতের কোলে তুলে দিতে চাইছেন

    গৌতম দাস
    ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা ১৯ঃ ৫৮
    https://wp.me/p1sCvy-5pM

    The Indo-Pacific Strategy in Action: Commemorating the Second Anniversary

     

    আপনি যদি হন কোন পাগলা-প্রেমিক যে প্রেমিকা মেয়েটার  মন পাবার জন্য নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে বসে আছেন আর তাতে আবার আপনিই নিজ চোখে যদি দেখতে পান সেই মেয়েটাই আসলে আপনাকে না আরেক পুরুষের মন পাবার জন্য তাঁকে চিঠি মানে আকুল হয়ে প্রেমপত্র লিখছে – তাহলে এর মানে কী বুঝবেন??? এর অর্থ হল আপনি শুধু বেকুব পাগলা না, গাধাও বটে!!! সে “আকুল প্রেমপত্র” খানা আপনার হাতে আসার পরেও যদি আপনি নিজের সাথে প্রতারণা করেন, নিজেকে মিথ্যা প্রবোধ দিতে থাকেন যে আমেরিকার বাইডেন-ল্যু আবার আসবে, এই এলো বলে ইত্যাদি তবে আর আপনাকে আপনারই গড়া মিথ্যা মায়ার জগত ভেঙ্গে বাস্তবের জগতে আপনাকে কেউ আনতে পারবে?
    একারণেই “ডোনাল্ড ল্যু আবার…… ” – এটুকু সংবাদের শিরোনাম শুনলেই বাংলাদেশের বিরোধী-মন ফেসবুকার-সহ সকলে হুটোপটি শুরু করে দিচ্ছে! খুবই বিপদজনক লক্ষণ এটা সন্দেহ নাই!!

    মানুষ জন্মানো শিশু অবস্থায় মায়ের পেট থেকে বাইরের দুনিয়ায় একবার চলে আসা মানে, যেটাকে আমরা জন্ম নেওয়া বলি তা, একবারেরই ঘটনা। একবার জন্ম নেয়া শিশু পরে আবার সে মায়ের গর্ভে ফিরে যেতে পারে না। কোন সুযোগ নাই। আর ফিরা যায় না এমন একমুখিতা বা irreversible ঘটনা এটা! এছাড়া  মায়ের গর্ভেরও সেই পুর্ব-পরিবেশ দশা পরিস্থিতিও আর থাকে না যে সেখানে ফিরে গিয়ে শিশু চাইলেই আবার আশ্রয়-বসবাস করতে পারে! কিন্তু তবু মানুষের মধ্যে কল্পনা থাকে। ফ্যান্টাসি করে মানুষ, মানে কল্পনায় এমন বসবাস করতে চায় মানুষ! আর সেভাবে  চলে যেতে চায়; বুঝতে চায় সে অনুভুতি কেমন, ইত্যাদি। যদিও মানুষ একেবারে পরিস্কারই জানে – মানুষ জানে যে এটা একেবারেই অবাস্তবতা; তবু ফ্যান্টাসিতে করতে চায়! তাই সেখান থেকেই একটা কথ্য-ভাষ্য দেখা যায় “মায়ের গর্ভে ফিরে যাবার মতই অসম্ভব”! কোন একটা ব্যাপার একেবারেই অসম্ভব বুঝাতে তাই অনেকে বলে জন্ম নেওয়া বাচ্চার মায়ের গর্ভে ফিরে যাবার মতই অসম্ভব!

    আবার ইংরাজিতে এমনই আরেকটা বাগধারা শব্দ আছে – ব্যাক টু দা প্যাভেলিয়ন! কথাটা ক্রিকেট খেলায় বেশী ব্যবহৃত হয়।  মানে ব্যাটসম্যান খেলতে নেমে আউট হয়ে যাবার পর ক্রিকেট ফিল্ডের বাইরে চলে আসতে ও নিজ শিবিরে আশ্রয় নিতেই হয়।  আর সারকথায় এর অর্থ হল – “আপনি আউট, আপনি ব্যর্থ তাই আপনার স্থান এখন বাইরে”!!! অথবা এভাবটা বুঝাতে চায় যে – আপনি ব্যর্থ এখন তাই আপনি যেখান থেকে এসেছিলেন সেই প্যাভিলিয়া্নে বা মাঠের বাইরে ফিরে চলে যান। এই অর্থে ব্যাক টু প্যাভেলিয়ান মানে আপনি হেরে গেছেন কথাটাই আসলে একটু সুন্দর করে বলা!

    বাইডেন ব্যাক টু দা প্যাভেলিয়ন!
    হা ঠিকই ধরেছেন কথাগুলো হচ্ছে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে নিয়ে!  বাইডেন ব্যাক টু দা প্যাভেলিয়ন!! মানে বাইডেন, “তুমি হেরে গেছো তাই তুমি এখন মাঠের বাইরে যাও”!!!
    তবে কথাটা আমি বলি নাই! যারা বাইডেনের পরাজয় হয়ে গেছে বুঝে তা এখন আবার তা ঢাকতেও শুরু করেছে অথচ পরাজয় পরবর্তি বাইডেনের সকল ততপরতাই বলে দিচ্ছে যে তিনি হেরে গেছেন!  এমনিতেই বাংলাদেশিদের জন্য বাইডেন যে পরাজিত হয়েছেন তা বুঝে ফেলার ক্ষেত্রে আমরা  সবার চেয়ে একটু আগিয়ে আছি বলতেই হয়। যেমন, বাইডেনের আমেরিকাই দাবি করে জানিয়েছে যে বাংলাদেশে কোন “ফেয়ার ইলেকশন” ঘটে নাই। আর আমরা দেখতেছি  কথিত এই নির্বাচনের পরে হাসিনা-ই আবারও সরকারে আছেন, নতুন করে বসেছেন। তাই ফেয়ার ইলেকশন না হওয়ার কথা তো আর অন্তত ঢাকার কাউকেই বুঝায় বলার কিছু নাই। যার আরেক অর্থ হল, বাইডেনের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার (যেটা নাকি বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতির মুখ্য বৈশিষ্ট ও নীতি-পলিসি বলে দাবি করা হয়েছিল তা) এছাড়া এর সাথে বাইডেনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও ভিসা নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক যেসব পলিসি ছিল সেসব এখন ভাগাড়ে গেছে,  গোল্লায় গেছে, অকেজো হয়ে কোথায় হারিয়ে গেছে। এটা বাংলাদেশিরা নিজ শরীরি অনুভবেই টের পেয়েছে!

    কিন্তু এঘটনাটা বাইডেন নিজে বা তাঁর অন্তত মন্ত্রী সভাসদ এরা কীভাবে দেখছে? তারা কী এটা খোলাখুলি স্বীকার করেছে?  না করে নাই, করছে না।  কারণ তা করলে এরপর সম্ভবত বাইডেনকেই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ছেড়ে ভাইস প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা দিয়ে চলে যেতে হত; এছাড়া সেক্ষেত্রে, শাসনের নৈতিক শক্তি হারানো কোন ক্ষমতা মানে সে তো পরাজিত ক্ষমতাই! তার আর কিছুই অবশিষ্ট  থাকে না বলে স্বীকারের প্রসঙ্গ উঠতে পারছে না! তাহলে?

    যদি মনে রাখি তবে এসবেরই ঘটনা-আলামত শুরু হয়েছিল বলতে পারি –  গত বড়দিন (২৫ ডিসেম্বর ২০২৩) থেকে যখন, পিটার হাস এই বড়দিন এবার পালন করেছিলেন নয়াদিল্লিতে বসে। সেই থেকে আমাদের কাছে আমেরিকার পলায়নের সন্দেহ গভীরে বাড়ছিল কিন্তু একেবারে সুনির্দিষ্ট করে কিছু জানা বা বলা যাচ্ছিল না!  এরপর ৭ জানুয়ারির নির্বাচন হতে দেওয়ার “স্বাভাবিকতা” দেখে এরপর থেকে পরে ঘোষিত ফলাফল আর একেবারে ৪ ফেব্রুয়ারি, বাইডেনের লেখা শেখ হাসিনাকে চিঠি পর্যন্ত আরো সব আলামত ক্রমশ সব প্রকাশিত হচ্ছিল। এরপরেই শুরু হয়েছিল বাইডেনের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি – একে এক সফল কার্যক্রম বলে প্রচার যা শুরু হয়েছিল ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে যেটা শেষে ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ডোনাল্ড ল্যু এর ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির দুবছর কথিত সফল সমাপ্তি উতযাপন দেখলাম আমরা।  আসলে এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক হল ” ইউএস ইন্সটিটিউট অফ পিস” মানে, USIP [U.S. Institute of Peace], গত ১৫ ফেব্রুয়ারি এদিন আইপিএস এর দুবছর পুর্তিতে সফলতা উতযাপনে ডোনাল্ড ল্যু কে তারা  আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আর ঐ সভাতেই ল্যু এর দেয়া বক্তৃতার এক-দুইটা বাক্য মাত্র ছিল বাংলাদেশকে নিয়ে। আর তাতেই বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো ঝড় বইয়ে ফেলেছিল। আবার যদিও সেখানে ল্যু বার্মা বলতে ঠিক সেখানে যে বর্তমান সশস্ত্র সংঘাত চলছে এর কথা তুলেন নাই বা বলেন নাই। সাধারণভাবে কথা বলেছিলেন। তিনি ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা সমস্যর দায় বাংলাদেশ বইছে তা নিয়ে তিনি কথা বলেছিলেন।   মজার কথা হল সে অনুষ্ঠান ১৫ ফেব্রুয়ারি হলেও বাংলাদেশে এর প্রতিক্রিয়া হয় ১৮ ফেব্রুয়ারিতে। আর বাংলাদেশ এই শব্দ যোগ করে দিয়ে বলা পুরা কথা থেকে কেবল  ০১ঃ৪৬ মিনিটের বক্তব্যটুকুর ভিডিও এনেছে চ্যানেল ২৪ যা দেখা যাবে এখানে।

    আর যারা ঐ অনুষ্ঠানের পুরা ১ ঘন্টা ৪৬ মিনিটের রেকর্ডিং-টাই পেতে চান তা পাবেন এখানে।  তবে মনে রাখবেন, এর রেকর্ডিং চালুর আবার প্রথম ১৬ মিনিট পরে অনুষ্ঠানটা শুরু হয়েছিল তাই প্রথম ঐ ১৬ মিনিট পেরিয়ে বা বাদ দিয়ে শুরু করতে পারেন। আর শুরুর আবার ২৭ঃ৩৫ মিনিটে গিয়ে ল্যু এর প্রথম বক্তব্য শুরু হয়েছে। কিন্তু দুঃখের কথা এই বক্তৃতায় ল্যু বাংলাদেশ নিয়ে কিছুই বলেন নাই – শব্দটাও উচ্চারণ করেন নাই। এই অংশে তাঁর পুরা বক্তব্যটার প্রসঙ্গ হল কেবল শ্রীলঙ্কা। পরে সেকেন্ড রাউন্ডে সবার বক্তব্য শুরু হলে ল্যু আবার বলার সুযোগ নেন ৫৩ঃ ৫৪ মিনিটে।  আর তখনই তিনি কেবল দেড় মিনিটের বক্তব্যে বাংলাদেশ শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন আর সেটাই চ্যানেল২৪ রেকর্ড ক্লিপ এনেছে।

    একটা সোজা কথায় সে প্রশ্নটা করা যাকঃ
    ডোনাল্ড ল্যু নিজের আইপিএস উতযাপন বক্তৃতায় ছোট্ট করে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এনেছেন। তিনি বলেছেন বার্মা বা রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু ফেরার প্রসঙ্গটা দীর্ঘায়িক হতে পারে; জটিলতা বাড়তেও পারে। তাই বাংলাদেশ আর ভারতকে নাকি সতর্ক থাকতে হবে! কিন্তু কী আশ্চর্য বাইডেন-ল্যু এর বার্মা এক্ট বলে কী জানি একটা ছিল না? যেটা নাকি আমাদের রক্ষকবচ? ল্যু-রা এই বার্মা এক্ট দিয়েই নাকি আমাদেরকে রক্ষা করবেন??? এটাই তো দয়াময়ী বাইডেন-ল্যু এর আশ্বাস বাক্য ছিল না??? তো সেটা এখন কোথায় গেল?? এর তো কোনই হদিসও নাই!!!! আর উলটা ল্যু আমাদেরকে নিজ নিজেই নিজের আত্মরক্ষার কানপড়া দিচ্ছেন কেন??? আমাদের রক্ষাকর্তা হবার সাধ-আল্লাদ ছিল যার সেই আমেরিকা – আহা রে আমেরিকা – আমাদের ত্রাতা আমেরিকা তুমি কোথায় গেলে তাহলে?  

    তাই এবারের আবার ল্যু এর প্রসঙ্গ –  এটা অবশ্যই আমাদের মিডিয়ার সৃষ্টি হৈ চৈ! মানে একটা উচ্ছ্বাস বা হাইপ তোলা যেন পাঠক হৈ চৈ শুরু হয়ে এসব মিডিয়ার হিট বা TRP বাড়ে বা দর্শক আছড়ে পরে তাদের নিউজে – এটা সেধরণের এক নিউজ রিপোর্ট ছিল।
    যেমন মানবজমিনেরটা দেখা যাক – ওর শিরোনাম হল  ডনাল্ড লু ফের দৃশ্যপটে। এই শিরোনামটাই উস্কানিমূলক!  কারণ, বিগত দুবছর বাইডেনের আমেরিকা যেভাবে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতির পক্ষে, ওর পিছনে দাঁড়িয়ে নিজ নানান পদক্ষেপ বা ঘোষণায় আন্দোলনকে সাহস দিয়ে গেলেও গত সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে এরাই আবার মাঠ ছেড়ে চলে গেছিল। তবু বিরোধীদলগুলো এখনও আমেরিকান সমর্থন আবার আসবে, আমেরিকা আবার এই এলো বলে ইত্যাদি অনুমান ছড়িয়ে রেখে চলছেই – কিছুই গুটায়ে ফেলে নাই – তাতে করে আম-জনতার মনে একটা গভীর কিন্তু ভুল আশা এখনো জিইয়ে আছেই যে আমেরিকা আবার আসবেই……! !

    অথচ এই বাংলাদেশের বেলাতেই বাইডেন ব্যাক টু দা প্যাভেলিয়ন! কথার আসল অর্থ হল এবার বাইডেন-ল্যু আবার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিতে এসেছে! গত ২০০৮ সাল মানে গত ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ১/১১ এর ক্ষমতাদখলের পরের বছর যেভাবে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল যেই দগদগে ক্ষত আমাদের ভুলবার নয় – আর যা পরে ২০১৭ সাল নাগাদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে তিনি আমেরিকাকে এখন থেকে প্রত্যাহার করে নিলেও কার্যত হাসিনা সরকারের ভারত-নির্ভরতা ও ভারতকে কোলে ধরে রাখার চেষ্টা থেকেই গিয়েছিল। কারণ, বাংলাদেশ বা ভারতে দুদেশেই পুরানা ক্ষমতাসীন সরকারেরাই থেকে গেছিল বলে আমেরিকান প্রত্যাহারের কোনকিছুই প্রকাশ করতে হয় নাই বা প্রকাশ্যে দেখাতে বাধ্য হয় নাই। এছাড়া নানান উসিলায় প্রায়ই নয়া আমেরিকান চাপ আসছিলই! তাই হাসিনা ততই ভারতকে চেপে ধরে রেখে চলছিলেন যা রুটিন ওয়ার্ক  এর মত ডাল-ভাত হয়ে গেছিল!

    আবার এখন বাইডেন-ল্যু এখন ব্যাক টু দা প্যাভেলিয়ন! হয়ে গেলেও তাদের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি [আইপিএস] একেবারেই অর্থহীন অকেজো আর নুন্যতম ফল দেখাতে পারছে না অথচ সামনে্র নভেম্বর ২০২৪ বাইডেনকে আমেরিকান  নির্বাচনে নিজ জনগণের মুখোমুখি হতে হবে, তাঁর চলতি সরকারের সাফল্য কী এনিয়ে কথা বলতে হবে!  তাই মিথ্যা হলেও এবারের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে আইপিএস এর দুবছর পালনের দিন বাইডেন-ল্যু দাবি করছেন যে তারা এক সফল আইপিএস পলিসি যেন দেখিয়েছেন। চিঠি লিখে বাইডেন হাসিনাকে খায়েশ ব্যক্ত করে বলছেন যে বাংলাদেশ-আমেরিকা একসাথে  সফল আইপিএস পলিসি উতযাপন করতে চান!! আর বাস্তবতা হল, হাসিনার লিখিত আইপিএস বাইডেনের থেকে আলাদা!  হাসিনার আইপিএস-এ চীন কোন এনিমি  বা শত্রু নয় বা এভাবে দেখানো হয় নাই। বরং চীনের নামই নেন নাই হাসিনা!

    তাহলে বাইডেন-হাসিনা একসাথে সফল(?) আইপিএস পলিসি উতযাপন করবেন কীভাবে?  আর অন্তত হাসিনা তো বাস্তবে তা করেনও নাই!

    কিন্তু পরাজিত বাইডেন আবার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছেন। এটা করে হলেও বাইডেন নিজেকে সফল বলে দেখাতে চাইছেন!!!! তিনি এতই মরিয়া!! কিন্তু হাসিনা সরকার কী তা মেনে নিয়েছে!!! বা কিভাবে নিয়েছে?
    গত ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের দিনের পরের ১১ জানুয়ারির মধ্যেই হাসিনার নয়া এমপিদের শপথ থেকে শুরু করে নয়া সরকারের মন্ত্রীদেরো শপথ অনুষ্ঠানও শেষ করে ফেলেছিলেন। এরপর ১১-২৭ জানুয়ারি মোটামুটি টানা প্রায় প্রতিদিন আমরা দেখেছি চীনের প্রসঙ্গ আর ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদুতের সাথে নানা দেখা সাক্ষ্যাত, আলোচনা পরিকল্পনা। এমনকি হাসিনার সম্ভাব্য চীন সফরের লক্ষ্যে চীনা দাওয়াত জানানোও ঘটে গিয়েছিল!!
    কিন্তু হায় সব ওলট-পালট! ২৮ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভিন্ন চিত্র। ৪ ফেব্রুয়ারি বাইডেনের লেখা  হাসিনাকে চিঠি আর এর আগে ভারতের অজিত দোভালের সফর থেকে সব উলটা চিত্র হয়ে যায়। আজও কেউ বা মিডিয়ার কেউ জানে না অজিত দোভাল ঠিক কবে এসেছিলেন, কয়দিন ছিলেন- এছাড়া ঠিক কী নিয়ে আলাপ করতে এসেছিলেন।  সরকারের দিক থেকেও এই সফর সম্পর্কে আজও মিডিয়াকে কিছুই জানানো হয় নাই। তাই বাংলাদেশের মিডিয়ায় যে যতটুকু জানিয়েছে তা মূলত অনুমান-নির্ভর আর নয়ত ভারতের মিডিয়ায় ছাপানো গারবেজ-প্রপাগান্ডার বরাতে যা খুশি লেখা!  অর্থাৎ সবমিলিয়ে  – বাইডেনের হাসিনাকে লেখা চিঠি ছাড়া সব কিছুই অস্পষ্ট। আর প্রবল ইঙ্গিত ছড়ানো হয়েছে যেন বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব (আগের ২০২১ সাল বাইডেন ক্রষমতার শপথ নিবার আগের মত”  বাইডেনের গণতন্ত্র-মানবাধিকার পলিসি নিয়ে হাজির হবার আগের মতই যেন আছে!

    আগেই বলেছি গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ছিল বাইডেন-ল্যু এর পেয়ারের কিন্তু অকেজো ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি [আইপিএস] শুরুর দুবছর পুর্তি-সমাপ্তির দিন। যে দিনকে আইপিএসের কথিত সাফল্য এর দিন; আর যা বাইডেন-হাসিনা যৌথভাবে উতযাপনের জন্য প্রস্তাব রেখেছেন বাইডেন। কিন্তু হাসিনা এনিয়ে কোন সাড়া দিয়েছে আমাদের জানা নাই। তিনি নিজের কাজ নিয়ে নিজের মত ব্যস্ত থাকলেও  আমরা ডোনাল্ড ল্যু-কে পাই USIP এই থিঙ্কট্যাঙ্কের সাথে উতযাপন করতে।
    শুধু তাই না, ঐ উতযাপন অনুষ্ঠানে ডোনাল্ড ল্যু – কিছুদিন আগে শ্রীলঙ্কায় অর্থনীতিতে দুর্যোগ বা ভেঙ্গে পড়া ঘটেছিল তা থেকে উঠে জাগার ঘটনাকে আইপিএসের সাফল্য বলে দেখাচ্ছেন। এখানেই শেষ না তিনি একাজে ভারতেরও অংশগ্রহণকে আমেরিকা-ভারতের সাফল্য হিসাবে এই প্রথম তুলে ধরেছেন। যেটা এর আগে কখনই আমরা দেখি নাই শুধু না বরং ভারতেরই অসন্তোষ দেখেছি যে শ্রীলঙ্কায় ভারতের সব প্রভাব সাফল্য একা আমেরিকা নিয়ে গেল বলে। শ্রীলঙ্কায় নগদ অর্থ বা ঋণদান নয়, ভারত বস্তুগতভাবে খাদ্যপণ্য আর জ্বালানি গ্যাসের সিলিন্ডারের সরবরাহ জুগিয়েছিল। তাদের দাবি মত যা নাকি তিন বিলিয়ন ডলার মুল্যমানের মত । কিন্তু ফলাফলে দেখা যায় চীন-ভারত সবাইকে ফেলে শেষে আমেরিকার প্রভাবের সেখান জয়জয়কার হয়। অথচ এখন ল্যু শ্রীলঙ্কার এই অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে আমেরিকা-ভারতের সাফল্য হিসাবে হাজির করেছেন।

    USIP এর ঐ অনুষ্ঠানের ভিডিওতে দেখা যায় কেবল ল্যু-ই নন অন্যান্য আলোচকেরা আবার কোয়াড [QUAD] এর প্রসঙ্গ আনছেন কেন? কোয়াড কী কার্যত মৃত নয়ঃ
    USIP এর ঐ অনুষ্ঠানের ভিডিওতে দেখা যায় কেবল ল্যু-ই নন অন্যান্য আলোচকেরাও এমনভাবে ভারতের প্রসঙ্গ এনেছেন বাইডেনের গত তিন বছরের শাসনামলে যেন বাইডেন খুবই ভারত-ঘনিষ্ট ছিলেন!!!  যেটা বাস্তবে একেবারেই উলটা ছিল!  আর সেটা বাইডেনের চয়েস ছিল না। মূল কারণ, বাইডেন ভারতের উপরও নিজের  গণতন্ত্র-মানবাধিকার পলিসি প্রয়োগ করতে গেছিলেন। প্রতিবছর ভারতের মুসলমানেরা ধর্ম-পালনে ও জীবনযাপনে নিগৃহিত হচ্ছে এই ছিল তাঁর মূল বক্তব্য এবং আমেরিকান প্রশাসনিক সিস্টেমে এক স্বাধীন (ধর্মীয়) কমিশনার আছেন যার কাজই হল এনিয়ে প্রেসিডেন্টকে রিপোর্ট দেয়া যে কোন দেশের মানুষের ধর্ম পালনের অধিকার ক্ষুন্ন হল! তাই বাইডেন এনিয়ে বহুবার মোদির বিরুদ্ধে  সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন। শুধু তাই না বিপরীতে, বাইডেন কংগ্রেসের রাহুলের সাথেও যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। রাহুলদের যেন সুবিধা হয় তাই মোদির জিগরি দোস্ত গৌতম আদানির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছেন। বেচারার শেয়ার মালিকানায় ধ্বস নামিয়ে দিয়েছেন।  হেজ [Hedge] ফান্ড ব্যবসায়ী বা “ওপেন সোসাইটি” এই দাতব্য বা থিঙ্কট্যাঙ্কের মূল ফাইন্যান্সার জর্জ সোরেস-কে দিয়ে বাইডেন মোদির প্রিয় ব্যবসায়ী গৌতম আদানির ব্যবসায়িক সব গুমো্র আর কথিত অপততপরতার ফিরিস্তি দিয়ে শেষ বিচারে শুধু আদানিকেই নয় খোদ, মোদিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন!  বাইডেন নিয়মিত ভারতীয় মুসলমানদেরকে নিপীড়নের জন্য মোদিরকে দায়ী করেছেন। যে কারণে এক পর্যায়ে পুরানা প্রেসিডেন্ট ওবামাও মোদিকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন মোদির এই মুসলমানবিদ্বেষী নীতির কারণে একদিন ভারত বিভক্ত হয়ে যেতে পারে!  অর্থাৎ গত তিনবছর ধরে বাইডেন তার গণতন্ত্র-মানবাধিকার পলিসির লাইনে মোদিকে আক্রমণ করে গেছিলেন।
    অথচ এখন এবারের ঐ আইপিএস সাফল্য উতযাপন সভায় ভারতের প্রশংসায় সব ভরে উঠেছিল! আবার কোয়াড [QUAD] নিয়েও ভারতের সাথে কাজের স্মৃতি আউড়ানো হয়েছে সেখানে। অথচ কোয়াড কার্যত মৃত! কারণ, অষ্ট্রেলিয়ার আমেরিকান পারমানবিক সাবমেরিন কেনাকে কেন্দ্র করে AUKUS  নিয়ে একপর্যায়ে ভারত জানিয়ে দিয়েছিল যে ভারত কোয়াড বা অন্যকিছুর নামে অন্য দেশ বা জোটে সেটাকে সামরিক জোট বুঝায় বা  এমন ততপরতাও বুঝায় –  এমন কিছুতে ভারত থাকতে চায় না; জড়াবে না। এথেকেই QUAD অকার্যকর হয়েছিল আর AUKUS নিয়ে কিছুদিন চর্চা হয়ে সব শেষ ঠান্ডা হয়েগেছিল। যার মূল কারণ বলা যায়, মোদি সরকারের উপর বাইডেনের গণতন্ত্র-মানবাধিকার পলিসির চাপাচাপি।
    অথচ এখন তাহলে ল্যু এন্ড গংয়ের  আইপিএস সাফল্য উতযাপন সভায় ভারতের প্রশংসা কিভাবে? পুরা পরিস্থতিকে তারা এমন ভাবে তুলে ধরেছেন যেন বাইডেনের তিনবছর ভারতের সাথে সম্পর্ক তার আগের ওবামা আমলে [২০০৮ সালে বুশের সময়েই বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল যাতে ভারত বাংলাদেশ নিয়ে যা খুশিকরতে পারে যা পুরা ওবামা আমলেও বজায় ছিল ] যেমন ছিল – (ভারতের হাতে তুলে দেওয়া এক বাংলাদেশ) ঠিক তেমনই যেন আছে।  যা খুবই খারাপ ইঙ্গিতপুর্ণ! যার থেকে আমাদের শঙ্কা যে বাইডেন-ল্যু পিটার হাসেরা আমাদেরকে আবার ভারতের কোলে উঠিয়ে দিতে চাইছে!!!

    এসব কারণেই এই অনুমান জল্পনা-কল্পনা বেড়েছে যে বাইডেন ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবার আগে কী নিজ ব্যর্থতা ঢাকতে আবার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে সওদা করে দিয়ে যেতে চাচ্ছেন?
    এটা আমাদেরকে আরো স্পষ্ট পরিস্কার করে খুটিনাটি-সহ সব বুঝতে হবে। তবে ইতোমধ্যেই যেটা দৃশ্যমান তা হল হাসিনার মুখ থেকে উঠা চীন এখন আর প্রসঙ্গই নয়। আবার এর মানে বাইডেনের আমেরিকা-ভারত কোন নয়া উদ্যোগ বা অফার পেয়ে কী হাসিনা খুশি? উতফুল্ল? না তাওও নয়! মানে প্রধান দ্বন্দ্ব – গত দুবছরের বাইডেন-ল্যু এর সাথে হাসিনার দুরত্ব আর গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে হাসিনা তা ভুলে এখন বাইডেনের দিকে আগিয়ে আসছেন বলে মনে হচ্ছে না!  আর এসবের পরিণতি হল যেন সবকিছু স্থবির হয়ে গেছে! আর তামাশা হিসাবে বারবার উঠে আসছে বাইডেন-ল্যু এর বোকা বোকা পানিপ্রার্থীর মত সব আচরণ – হাসিনার মান ভাঙ্গানোর নানান কসরত ইংরাজিতে যেটাকে উউ [WOO] বলে! আর ভদ্র তবে সংস্কৃত-ঘেঁষা বাংলায় বলে “প্রণয় ভিক্ষা” চাওয়া! যেগুলোর দিকে তাকানো যায় না এমনই অসহ্য!!! এই হল এখনকার বাইডেনের পরিণতি!!!

    যদিও আগামি একমাসের মধ্যে হাসিনার মধ্যে আবারও যদি চীন সফরে যাবার জন্য ব্যাকুল-উদগ্রীব হতে দেখি তো আমাদের অবাক না হওয়াই সম্ভবত সঠিক হবে! 

    সবশেষে একটা কথাই বলব! বাইডেন-ল্যু এর দশা যদি হয় হাসিনা সরকারের প্রণয় ভিক্ষুক হওয়া; তবে আমাদের বিরোধীদলেরা সেই – বাইডেন-ল্যু এরাই আবার আমাদেরকেও নাকি উদ্ধারে আসবে; এই আসতেছে –  আসতেছে বলে তারাই বা তাহলে কার কাছে কী ভিক্ষা করছে!!! এর কোন জবাব খুঁজে পাই নাই!!! কেবলই বিস্মিত হয়ে আছি, থাকছি! আর বিরোধীদের এ এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব দেখে যাচ্ছি!!!

     আপডেটঃ  ১৯ ফেব্রুয়ারি  ২০২৪, সন্ধ্যা সাতটা ১৮
    সর্বশেষ আপডেটঃ  ২০ ফেব্রুয়ারি  ২০২৪, দুপুর দুইটা ৪৫

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • বার্মা নিয়ে আমেরিকান বোকা পরিকল্পনায় উলটা, সব নিয়ন্ত্রণ এখন চীনের হাতে উঠার পথে

    বার্মা নিয়ে আমেরিকান বোকা পরিকল্পনায় উলটা,
    এখন সব নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে উঠার পথে
    গৌতম দাস
    ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা ১৭ঃ ৪৮
    https://wp.me/p1sCvy-5mC

     

    China success, Western failure in revolutionary Myanmar

     

     

    বর্তমানের বার্মা নিয়ে বিশেষ করে তার “সীমান্ত যুদ্ধ” নিয়ে অজানা আশঙ্কা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে।  যদিও এটা দুই দেশ বার্রমা ও বাংলাদেশের মধ্যে – “সীমান্তে ঘটা কোন যুদ্ধ”- নয়। বরং একই বার্মার সেনা সরকার আর বিদ্রোহী এথনিক (ethnic) গোষ্ঠির যুদ্ধ। কিন্তু ঘটনাস্থল যেহেতু বাংলাদেশ-বার্মা সীমান্ত আর সেনা সরকারের বাহিনী বলতে তারা কার্যত বার্মার সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিজিপি বা Border Guard Police) ফলে, “বিজিপি বনাম বিদ্রোহী গোষ্টির” যুদ্ধের গোলা কখনও কখনও বাংলাদেশে এসে পড়ছে। আর এটাই সীমান্ত সংলগ্ন বাংলাদেশিদের জনজীবনকে মারাত্মক আতঙ্কিত করছে। এতে এলাকার বাংলাদেশি প্রশাসন বাসিন্দাদের সরিয়ে নিরাপদ দুরত্বে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেটা সঠিক সিদ্ধান্ত।

    বার্মা কী আর, কোথা থেকে এখানে, এর পিছনের পটভুমি নিয়ে কিছু কথাঃ
    বার্মার পিছনের পটভুমির দিক নিয়ে অল্প কথায় বললে, প্রথমত, বার্মা কখনও জনগণের ক্ষমতার উপর দাঁড়ানো অন্তত মুখে বা কনষ্টিটিউশনে লিখে স্বীকার করা অর্থেও কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র করা হয় নাই, ছিল না আর এখনও নয়। রিপাবলিক বলতে বুঝায় যে, ঐদেশের শাসনক্ষমতা (ruler) যখন স্বীকার করে নেয় যে তার ক্ষমতার উতস একমাত্র জনগণ; মানে ঐ দেশের বাসিন্দা-পাবলিকেরা নিজ দেশের শাসকদেরকে একটা শাসন ব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্যে (গণভোটে বা জনপ্রতিনিধিত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে)  রায়-ম্যান্ডেট দিয়েছে। আবার এই শাসকেরা রাজা-বাদশা নয় অথবা রাজা-বাদশার উত্তরাধিকার সুত্র তারা নিজেদের রাজা বলে দাবী করছে না।  এই অর্থে বার্মা কখনই কোন রিপাবলিক নয়। এমনকি দেশের নামেও রিপাবলিক শব্দটা নাই; তাহলে বার্মা কী এর সবই অস্পষ্ট। তাই বার্মার শাসক বলতে আসলে, এখানে মূল ক্ষমতাটা এক ধরণের মিলিটারীদের একটা ক্লাবের হাতে যাদের উপরে কেউ নাই; আর তারাই দেশটাই মালিক ও ক্ষমতাধারী। এভাবেই এটা চলে আসছে অং সান সুচি এর বাবাদের [আমরা যে নামে চিনি এই “সু চি” এর বাবার নাম অং সান (Aung San)] আমল থেকে।
    কেন এরকম? এর মৌলিক কারণ হল বার্মা দেশের বাসিন্দাদের মেন্টর (Mentor) [মানে যাদের চিন্তা অনুসরণে বা প্রভাবিত হয়ে] – বার্মার এই মেন্টর কারা ছিল সেটা বুঝতে হবে আগে। যেমন, আমাদের উপর মেন্টর – প্রভাবক ভুমিকা যদি বৃটিশ কলোনিদখলদার বা ভারতের উপর বৃটিশদের রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা-কে বলি তবে বার্মার মেন্টর হল সেকালের রাজতন্ত্রী জাপান। যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) এশিয়ায় হিটলারের সহযোগী একমাত্র শাসক ছিল জাপান আর সে জাপান তখনও সম্রাট শাসিত ছিল। অর্থাৎ বিশ্বযুদ্ধে দুপক্ষের প্রধান রাষ্ট্রগুলো সকলেই রিপাবলিক হলেও জাপান ছিল এক ব্যতিক্রম – ছিল সম্রাটের সাম্রাজ্য। একারণে, এখনও জাপান রাষ্ট্রের নাম কি – তা খুঁজে দেখলে সেই আনুষ্ঠানিক নামে কোন রিপাবলিক শব্দ নাই। এর বদলে সব জায়গায় ‘ইউনিয়ন’ বলে একটা শব্দ আছে যার আবার সুনির্দিষ্ট অর্থ নাই। অর্থাত পাবলিক বা জনগণের ক্ষমতা বলে বা বুঝায় – এমন কোন ধারণা ইঙ্গিতও নাই।

    বৃটিশেরা ভারতের মতই বার্মা দখল ও কলোনি করেছিল ১৮২৪ সালে। কিন্তু এই দখলি বার্মা-কে তারা ভারতের সাথে মাখিয়েই শাসন করে গেছিল। যেমন দখলি-বার্মা ভুখন্ড যেন ভারতেরই আরেকটা প্রদেশ এভাবেই তারা শাওন শুরু করেছিল। তবে এনিয়ে তরুণ বার্মীজদের মনে চরম অসন্তুষ্টি টের পেয়ে গত ১৯৩৭ সালের এপ্রিলে প্রথম  বৃটিশ-ভারত বর্মাকে ভারত থেকে আলাদা করে বৃটিশদের কলোনি শাসন কায়েম করেছিল। অর্থাৎ এর আগে পর্যন্ত বৃটিশ-ভারতেরই আরেকটা প্রদেশ যেন বার্মা – এভাবেই বৃটিশেরা বার্মা শাসন করে গিয়েছিল।  আর চলমান ব্যাপক এই ক্ষোভে বিক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালয় তরুণদের মধ্যে থেকে নানা ঘটনাবলী শেষে একপর্যায়ে প্রথমে এদের ত্রিশজনকে (যারা বার্মার শাসকদের ভয়ে তখন থাইল্যান্ডে পালিয়ে ছিল) –  এদের জাপানে নিয়ে ট্রেনিং দিয়েছিল জাপানের রাজতন্ত্রী সরকার। এই ত্রিশজনের একজন হলেন সু চির বাবা। কিন্তু তাদের ঐ ট্রেনিংয়ের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা বা খারাপ দিকটা হল, বৃটিশ শাসকের বিরুদ্ধে যারা এই ট্রেনিং দিয়েছিল তারা রাজতন্ত্রী। তাই এই ট্রেনিং কোন রাজনৈতিক ট্রেনিং ছিল না। কোন মনার্কি [monarchy] বা রাজা-বাদশার দেশে রাজনীতি ধারণা বা রাজনৈতিক দল ভোট ইত্যাদি কিছুই থাকে না। রাজার দেশে প্রজারা স্বাধীন ব্যক্তি নয়। প্রজা মানেই তো অধীনস্ত [sub-ordinate] মানেই সে স্বাধীন সত্বা নয়। তাই সমাজে স্বাধীন ব্যক্তি ধারণা ও ব্যক্তি ধারণা উত্থান এর ধারণা আসা খুবই গুরুত্বপুর্ণ! একেবারে পুর্বশর্তের মত জরুরি।   রাজনীতিটাই বাদ দিয়ে সামরিক ট্রেনিং মাত্র; যা মারধর, গোলাগুলি আর টর্চার কিভাবে করতে হয় এসব শিখা সর্বস্ব! অথচ ঐ ত্রিশজন ট্রেইন্ড তরুণই একাল পর্যন্ত বার্মার শাসন ক্ষমতা ও কাঠামো যা হয়েছে সবকিছুর উদগাতা, কিন্তু যারা “রাজনীতি” বলতে কি তা জানে নাই একারণেই পরবর্তিতে এটা আর্মির একটা ক্লাব ছাড়া আর কিছুতে গিয়ে পৌছাতে পারে নাই। এই ত্রিশজনই তাই হয়ে উঠেছিল বার্মার সকল ক্ষমতার উৎস এবং শাসক। এটাই ১৯৪২ সালে বৃটিশ ইন্ডিয়ার সাথে লড়াই করে শাসক বৃটিশদেরকে পরাজিত করে (তবে জাপানের কোলে বসে) নিজেরা বার্মাকে স্বাধীন করেছে বলে ক্রেডিট নিত। ১৯৪৮ সালে ভারতের মত বার্মাও বৃটিশ কলোনি-শাসকেরা ত্যাগ করে চলে যায়। আর শুরু হয় “স্বাধীন বার্মায়” ঐ ত্রিশ জনের শাসন। যারা এরপর মূল দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায় কেউ সামরিক বাহিনীতে কেউ রাজনীতিতে রাজনৈতিক শাসক – এভাবে। এতে শাসন ব্যররথতার জন্য একে অপরকে দায়ী করতে থাকে। যা সমাপ্ত হয়  যখন ১৯৬২ সালের শেষ নির্বাচনের পরে ঐ মিলিটারি অংশটাই জেনারেল নে উইনের নেতৃত্বে সব ক্ষমতা দখল করে বসেছিল। এসবের উত্তরসুরি আজকের ক্ষমতাসীন সামরিক ক্লাব। তবে নে উইন সেকালে নিজেকে সোভিয়েত কমিউনিস্ট ধারার কমিউনিস্ট বলে পরিচয় দিতেন।

    অন্যদিকে, এথনিক (ethnic)-জাত বিভক্তি বার্মাতে মারাত্মক। মূল এথনিক গোষ্টি বর্মীরা [Bamar (68%)] আর বাকিদের মধ্যে আবার তুলনায় সংখ্যায় বড় এমন আরও সাতটা [The eight ‘official’ groups are the Bamar (68%), Chin (2.5%), Kachin (1.5%), Karen (7%), Kayah (1.83%), Mon (2%), Rakhine (4%) and Shan (9%).] – এভাবে এথনিক জাত গোষ্ঠির কথা আলোচিত হয়, এরা এই সাত জনগোষ্ঠি সকলেই বর্মীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহী যোদ্ধা।   মনে রাখতে হবে এতসব জাত-বিভক্তি সত্বেও এর একমাত্র সমাধান হল – কেবল রাজনীতিই পারে সকল এথনিক পক্ষকেই সাথে নিয়ে একটা রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা (রিপাবলিক) কায়েম করে সকলে সমান অধিকার বসবাস করা। কিন্তু  এটাই স্বাধীন বার্মার জন্মের আগে থেকেই অনুপস্থিত। শাসক বর্মী বা বামার-রা বার্মা নাম বদলে মায়ানমার রেখেছিল সাধু সাজতে; কিন্তু তা লোক দেখানি ছিল বলে অন্য এথনিক কেউ আমল করে নাই।
    গত ১৯৮৯ সালে নে উইনের শাসনও ক্ষমতাচ্যুত হয়, ক্ষমতা নেয় সাত-আট বর্মী জেনারেলদের একটা গোষ্ঠি; কিন্তু জাতিসংঘের অবরোধ আরোপে সেই সরকারও দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু সীমান্ত আছে বলে একমাত্র চীনই হয়ে যায় বার্মার সাথে বাকি দুনিয়ার যোগাযোগের মাধ্যম; ইনফরমাল চোরাচালানি টাইপের ‘বাণিজ্য সম্পর্ক’ শুরু হয়েছিল সেই থেকে। পরে ২০০৭ সালে ভারতের কূটবুদ্ধি-পরামর্শে দুতয়ালিতে আমেরিকা-ইউরোপ-পশ্চিমারা চীনের পাশাপাশি তারাও বার্মার মাখন খেতে এগিয়ে আসে। যার দলিল হল ২০০৮ সালের কথিত কনষ্টিটিউশন মানে সামরিক ক্ষমতাকে স্বীকৃতি (উদ্ভট ভাবে, আর্মি প্রতিনিধিরাও সংসদে ২৫% হয়ে বসবে) দিয়ে এক কনষ্টিটিউশন। এছাড়া বাইরে দেখাবে সুচি কে  যেন  তিনি সিভিল-শাসন বলে তারা সাইনবোর্ড হিসাবে রাখবে। ভারতের কূটবুদ্ধি-পরামর্শ এত তীব্র হয়ে উঠেছিল যে জেনারেলেরা এই প্ররোচনায় ইসলামবিদ্বেষী হয়ে রোহিঙ্গাদের ২০১৭ সালে মেরেধরে দেশত্যাগ করতে, বাংলাদেশে যেতে বাধ্য করেছিল। মজার কথা হল, তখন আমেরিকা, চীন, ভারত, ইউ ইত্যাদি কেউই শাসক জেনারেলদেরকে দায়ী বা দোষারোপ করে নাই। সকলেই কথিত এক আরসা (ARSA) বাহিনীকে এদের উপর দোষ চাপিয়েছিল। কারণ, বর্মি জেনারেলেরা ওসব (আমেরিকা, চীন, ভারত, ইউ ইত্যাদি) সকল-বিদেশিকেই নানান ব্যবসা বিতরণ করে দিচ্ছিল। যেটা কেউই হারাতে চায় নাই। ফলে কোন বার্মা এক্ট বা গণতন্ত্র-মানবাধিকারের কথা কারই মনে ছিল না।  কিন্তু সেটাও অচল হয়ে পড়ে ২০২০ সালের নির্বাচনের পরে, আর্মি আবার সব ভেঙ্গে দিয়ে নিজের হাতে সব ক্ষমতা নেয়।

    এবার চলতি ঘটনার দিকেঃ   
    বার্মা নানান কারণে এক অদ্ভুত জায়গা ও পরিস্থিতি। চীন বার্মায় একই সাথে সেনা সরকার এবং বিদ্রোহী এথনিক গোষ্ঠিগুলার সাথে ‘ঘনিষ্ট’ সম্পর্ক রেখে চলতে পারে। সেনা সরকার আপত্তি করে না। এমন খুব কম দেশই পাওয়া যাবে বা নাই। মানে জেনারেলদের এতই চীনকে দরকার যে বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলার অস্ত্রের উৎসও চীন অবলীলায় হতে পারে। তবে এতদিন চীন কোনপক্ষকেই একে-অন্যের উপর চড়াও হয়ে উঠতে দেয় নাই, ভারসাম্য বজায় চলতে বাধ্য করে রাখতে পেরেছিল। এটাই চীনের বর্মীজ সেনা ও বিদ্রোহীদের মধ্যে যেন একটা লাইন টেনে, বিবদমান প্রত্যেকের সীমারেখা বাতলে দিয়ে আর তাতে চীন নিজেই এক ভারসাম্য শাসক হয়ে দুপক্ষের উপর দাঁড়িয়ে থাকা শুরু হয়েছিল।  তবে মোটামুটি গত (২০২৩) ডিসেম্বরকে টার্গেট করে চীন এই ভারসাম্যটা ভেঙ্গে জেনারেলকে নিচে বা কোনঠসা করে বিদ্রোহীদেরকে চড়াও হয়ে উঠতে এলাও করেছে। কিন্তু সেটা কেন?

    আমেরিকার বার্মা এক্টঃ
    চীনের এমন আগের ভারসাম্য কিছুটা ভেঙ্গে আবার নয়াভিত্তিতে আরেক ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে ততপর হবার পিছনের কারণ আমেরিকার কথিত বার্মা এক্ট।  বাইডেনের আমেরিকার সমস্যা হল, মুরোদ থাক আর নাই থাক সবকিছু আগেই লেড়েচেড়ে আউলা করে দিতে হবে – এই নীতিরই এক ফসল হল বার্মা এক্ট। যতদুর আন্দাজ করা যায় মোটা দাগে এতে আমেরিকান পরিকল্পনাটা হল, বার্মায় দখল দেয়া মানে জেনারেলদের পতন ঘটিয়ে যেন সামরিক ক্যু হয়েছে এমনভাবে পছন্দের জেনারেল বসিয়ে তা করা। আর এর সাফাই হিসাবে বার্মায় গণতন্ত্র-ও-মানবাধিকার আনবেন বাইডেন, এর নামই বার্মা এক্ট!  ব্যাপারটা সামরিক আবার আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে আমেরিকা নিজ মেরিন বার্মার মাটিতে নামাবে না, কেবল এরিয়াল (arial) কভার মানে আকাশপথে কাউকে উড়তেই দিবে না – যাতে বার্মার কোন উড়োজাহাজই মাটি ছেড়ে ডানা না মেলতে পারে। আর বাংলাদেশের পদাতিক ব্যবহার করবে আমেরিকান মেরিনের জায়গায়।  আবার বাংলাদেশের পদাতিক মুভ করাতে চাইলে আগে আমাদের  সরকারের উপর দখল লাগবে। তাইবাংলাদেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নামে বিরোধিরা বিজয়ী হতে পারলে এর সুবিধার উপর ভর করে তাতে “বাইরের” সুবিধাটা (মানে যেমন বার্মা দখল) আমেরিকা পেত। কিন্তু আগেই বলেছি আমেরিকান মুরোদের খবর নাই! তাই সবকিছু লেড়েচেড়ে আউলিয়ে সবাইকে পথে নামিয়ে ভন্ডুল করে – পুরানা সব ভারসাম্য নষ্ট করে এখন বাইডেন পলাইছে শুধু না। হাসিনাকে ‘ব্যক্তিগত’ চিঠি লিখতেছে।

    যদিও বিষয়গুলো এত সহজ নয়। পুরানা ভারসাম্য ভাঙ্গার একটা খেসারত তো থাকবেই। মোটামুটি গত ডিসেম্বর ছিল বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা – অন্তত চীনের ক্যালকুলেশন এটাই ছিল। এভাবে মার্ক করে চীনও আমেরিকান বার্মা এক্টকে মোকাবিলার নিজ পরিকল্পনা সাজাইয়েছিল। অর্থাৎ চীনের দিক থেকেও ডিসেম্বর ছিল টার্গেট; তবে তা ঠিক বাংলাদেশ নিয়ে নয় ভিন্ন অর্থে মানে, বার্মাকে নিয়ে। এইযা ভিন্নতা!

    বার্মায় কী ঘটছে এর একটা সোর্স এশিয়া টাইমসঃ
    এশিয়ান টাইমস এটা হংকং থেকে প্রকাশিত একটা সমৃদ্ধ ওয়েব ম্যাগাজিন। এটাকে এটাকে সম্ভবত এশিয়ার “ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল” বললে অত্যক্তু হবে না। অর্থাৎ নিউইয়র্কের আদি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল যেমন বাবা গ্লোবাল পুঁজি বাজার যদি ধরি তবে চীন -কেন্দ্রিক নয়া এশিয়ান পুঁজি বাজার তৈরি হয়েছে হংকং-সিঙ্গাপুর কেন্দ্রিক; আর এসবকে কেন্দ্র করে জর্নাল-টা হল এশিয়ান টাইমস। যার আবার ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস বলে আলাদা পত্রিকা হয়েছে, সাথে আরো একটা। প্রায় আটজনের একটা গ্রুপ যাদের ওয়াল স্ট্রিটে মিডিয়ায় কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তারাই মূলক এই পত্রিকাটা চালায়। এদের উপর ভর করে আবার একদল পলিটিক্যাল এনালিস্ট গড়ে উঠেছে বার্মাসহ আশিয়ান জোট এলাকার রাজনৈতিক ঘটনাবলীতে কাজ করা যাদের এলাকা। এদের একজন হল ডেভিড স্কট ম্যাথুসন [DAVID SCOTT MATHIESON]; যিনি নিজের পরিচয় লেখেন – an independent analyst working on conflict, humanitarian and human rights issues – এভাবে। এসব ততপরতা গুলোকে বলা যায় গ্লোবাল নেতা আমেরিকা-পরবর্তিতে এশিয়ায় কী হতে যাচ্ছে এরই রিপোর্টার এনাস্লিস্ট হচ্ছেন এরা।
    সেই ডেভিড স্কট বর্তমান বার্মার পরিস্থিতি নিয়ে নিএই দুখানা এনালাইটিক্যাল রিপোর্ট ছেপেছেন। আর একই সাথে নিউইয়র্ক টাইমসে ছাপা হওয়া একটা রিপোর্টের রেফারেন্স দিয়েছেন যেটা আসলে আমেরিকান প্ররোচনায় বিদেশে গঠন করা জান্তাবিরোধী সু চির সরকার এর করুন হাল নিয়ে লেখা রিপোর্ট। আনুষ্ঠানিকভাবে সু চুদের সরকারকে আমেরিকার নিজের মত করে সাজিয়ে নেয়া National Unity Government of Myanmar বা সংক্ষেপে NUG বলে ডাকা হয়।  যাদের অবস্থা হল বাংলাদেশে এখনকার বাংলাদেশি বিরোধীদলের মত যারা হাসিনা পতন বা নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েও পুরানা গান-ই গাইছে। এই অবস্থাকে বুঝাতে ইংরাজিতে শব্দটা হল এবানডান (abandon) বা পরিত্যক্ত বলতে যা বুঝায়! তো বাইডেনের আমেরিকান পরিত্যক্ত আমাদের বিরোধীদলের মতই, সু চিদের NUG সরকারের অবস্থা। নিউইয়র্ক টাইমসে ছাপা হওয়া সেই করুণ রিপোর্টও দেখতে পারেন এখানে।  এদেরকেই বাইডেন তার বার্মা এক্টের খোরাক বা কথিত হবু সরকার বানাতে চেয়েছিল, আর তাদের অবস্থা আমাদের বিরোধীদলের মত!!!

    বার্মা এক্টকে মোকাবিলার চীনা নিজ পরিকল্পনাঃ
    চীনের দিক থেকে নিজ পাল্টা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আমেরিকার নিজেরটার চেয়ে তুলনামূলক অনেক সহজ ছিল। এর মূল কারণ, আগে দীর্ঘদিন থেকেই  বর্মার সেনা সরকার আর বিদ্রোহী – এভাবে দুপক্ষের উপরই চীনা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই ছিল। মানে যদি বার্মার ভিতরের তিনটা পক্ষ আছে ধরলে, এর একটা হল জেনারেলদের জান্তা সেনা সরকার; দুই হল, সাত-আটটা এথনিক-জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্টি যারা আবার এখন চীনের প্ররোচনায় ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স নামে একত্রিত হয়েছে। নয়া পরিস্থিতিতেও জেনারেলেরা আর ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স দুইটাই এখনো চীনের নিয়ন্ত্রণে। আর তৃতীয় পক্ষটা হচ্ছে কেবল আমেরিকার নিয়ন্ত্রণের সু চিদের NUG। যেটারই এখন পরিত্যক্ত অবস্থা!
    আর  এবারের চীনা পরিকল্পনা ছিল জেনারেলদের হাতটা ধরেই রাখা কিন্তু এবার একটু ঢিলা করে ধরা যাতে বিদ্রোহীরা একটু আপার হ্যান্ড পায়। এতে যদিও আগের ভারসাম্য মানে জেনারেল আর বিদ্রোহীরা আগে প্রত্যেকে যে সীমারেখার মেনে চলার মধ্যে দিয়ে ভারসাম্য তৈরি করে বসবাস করছিল  – সেটাই এখন চীন ভেঙ্গে দিতে চাচ্ছে। আর তা দিলে চীনের স্বার্থের এতে কোন ক্ষতি হবে না কেন? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজব। মানে জেনারেলেরা এতে বিগড়ে গিয়ে চীনবিরোধী হয়ে যায় যদি? চাইকি আমেরিকার হাত ধরে ফেলে যদি?

    জবাব হল, চীন জানতে এমন দুটাই অসম্ভব। কারণ জেনারেলদের চীনবিরোধী হওয়া মানে কি ভারত? নাকি রাশিয়া বা খোদ আমেরিকার হাতধরা? না, এমন প্রত্যেকটাই বাস্তবে অসম্ভব।  চীনবিরোধী হয়ে রাশিয়া একচুলও অন্যদিকে যাবে না। আর আমেরিকা? আগেই বলেছি বাইডেনের যতই “বার্মা এক্ট” থাকুক বা সু চিদের NUG  থাকুক এই আমেরিকা তো এখন বাংলাদেশ ছেড়েই ভেগে গেছে কাজেই – মানে বাংলাদেশ থেকে সামরিক সহায়তা পাবার বাস্তবতাই আউলায়ে গেছে – আর এতে আমেরিকা তার বার্মা এক্টও এখন কিছু ছেড়া কাগজ মাত্র- মুরোদহীন। আর এতদিন আমেরিকা তো এই জেনারেলদের বিরুদ্ধেই হম্বিতম্বি করে গেছিল। ফলে সেই জেনারেলেরা এখন চীনের উপর ক্ষেপে গিয়ে বাইডেনের হাত ধরার কোন বাস্তবতাই নাই। আবার আমেরিকা বার্মার ঠিক কার হাত ধরার কথা ভেবেছিল জেনারেলেরা নাকি সু চিদের NUG দের??? অবশ্যই সেটা সু চিদের NUG। মানে জেনারেলদের ভাগ্যে আমেরিকান দীয়া-আশীর্বাদের কোন সুযোগই ছিল নাই, ছিলই না।  আর এখন তো বাইডেন নিজেই পরিত্যক্ত।  আর ওদিকে ভারতও এসবের ভিতর উল্লেখ-অযোগ্য। কারণ এর না আছে অর্থনৈতিক বা সামরিক সক্ষমতা। পারে কেবল কূটকাচালি বা প্যাচ-লাগানি। যেটাও এখানে সম্ভব না; যদিও ভারতের হম্বিতম্বি আছে সেকথায় শেষে যাবো! তবে সেটাও কারও ঘাড়ে চড়ে করতে চাইবে ভারত আর এটাই সম্হভবত হাসিনা সরকার!! আর মনে রাখতে হবে আমেরিকান বার্মা এক্ট পরিকল্পনা তো ভারতেরও স্বার্থবিরোধী করে সাজানো ছিল।
    কাজেই চীনের দিক থেকে জেনারেলদের হাত হাল্কা করে ধরার এটাই ছিল পারফেক্ট টাইম। কারণ তারা তবু চীনকে ছেড়ে কোথাও যাবার জায়গা নাই। সেজন্যই শুরুতেই যেটা বলেছি, বার্মীজ সেনা সরকারের উপর বিদ্রোহীদের চড়াও হতে দেওয়াটা আসলে চীনা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। যার দুচারটা গোলা বাংলাদেশে এসে পড়ছে। চীনা পরিকল্পনায় বাংলাদেশে সম্ভাব্য সরকার বদলের সময়কাল ছিল ডিসেম্বর-কেন্দ্রিক। তাই জেনারেলদের উপর বিদ্রোহীদের সওয়ার হওয়ার টাইমিং-টা ছিল সে-মোতাবেক !
    তাই বার্মা এক্ট সফল করতে হাসিনাকে সরাতে আমেরিকার এগিয়ে আসার আগেই সেক্ষেত্রে বাইডেন দেখত বার্মা বিদ্রোহীদের ক্ষমতায় কিন্তু জেনারেলরাই নাই, উধাও! কিন্তু এখন বাইডেনের পলায়ন ঘটে যাওয়াতে এতে নিট কিছু লাভ হতে পারে জেনারেলদের। তারা আয়ু পাবে। কিন্তু আরও অনেক পরে।

    এবার আবার ডেভিড স্কটের রিপোর্ট থেকে এনিয়ে তার বক্তব্য তুলে আনব।
    তিনি বলছেন, একটা ভুল আশা ছড়িয়ে পড়েছিল যে থাইল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনের মতো মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র। পুরা বক্তব্যটাই নিচে কোট করে দিয়েছে। ডেভিড স্কটের রিপোর্ট এর মূল লেখাটার শিরোনাম হল, China success, Western failure in revolutionary Myanmar এখানে। যার বাংলা অনুবাদ ছেপেছিল প্রথম আলো। আমি সেই অনুবাদের লিঙ্ক হল এখানে।

    মিয়ানমারের ক্ষেত্রে চীন আন্তর্জাতিক পরিসরের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়। মিয়ানমারের ওপর চীনের প্রভাবকে স্পষ্টভাবে আলাদা করা
    যায়। তিন বছর ধরে একটি চিৎকারই প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে যে মিয়ানমারের প্রতিরোধ আন্দোলনে বাইরে থেকে অস্ত্র দরকার। একটা ভুল আশা ছড়িয়ে
     পড়েছিল যে থাইল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনের মতো মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মিয়ানমারের প্রতিরোধযোদ্ধাদের
    নীরবে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে চীন। থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের ওপর চীনের কৌশলগত সমর্থন না থাকলে অপারেশন ১০২৭ সম্ভবপর হতো না।

    আর ডেভিড স্কটের শিরোনামেই প্রায় সবকথা বলা আছে। লিখছেন চায়না সাকসেস আর ওয়েস্টার্ণ ফেইলিওর। মনে রাখতে হবে ডেভিডেরা সুইডেন, সুইজারল্যান্ড বা নরওয়ের শান্তি নিয়ে কাজ করা গ্রুপের সাথে সম্পর্কিত। তবে ডেভিডের সবচেয়ে মারাত্মক কথা যে –  “একটা ভুল আশা ছড়িয়ে পড়েছিল যে থাইল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনের মতো মিয়ানমারকে অস্ত্র সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্র”। আর এটাই বাংলাদেশের এখনকার বিরোধী দলেরও সেই একই অবস্থা! ডেভিড আরো লিখছেন, “কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মিয়ানমারের প্রতিরোধযোদ্ধাদের  নীরবে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে চীন। থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের ওপর চীনের কৌশলগত সমর্থন না থাকলে অপারেশন ১০২৭ সম্ভবপর হতো না”।
    এই হচ্ছে ডেভিট স্কটের তথ্য ও ব্যাখ্যা। আর ঐ অপারেশন ১০২৭ হচ্ছে সেনা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সম্মিলিত অপারেশনের কোন নাম – যেটা চীন সমর্থিত।

    আমেরিকার বোকা পরিকল্পনায় এখন উলটা, সব নিয়ন্ত্রণ এখন একা চীনের হাতেঃ
    কথা ঠিক, পরিশেষে পুরা পরিস্থিতির সবটাই চীনা নিয়ন্ত্রণে।  বার্মার তিনপক্ষের সু চিরা বাইডেন হাতছেড়ে দেওয়ায় পত্রিত্যক্ত! আর বাকি দুপক্ষ মানে জেনারেলেরা আর বিদ্রোহিদের মধ্যে থে বর্তমানে চীন বিদ্রোহীদেরকে আপার হ্যান্ডে বসিয়ে রেখেছে।   কিন্তু আমি মনে করি না চীন বার্মা বিদ্রোহীদেরকে জেনারেলদের উপরে বসায় দিবে – জিতিয়ে বা জিততে দিবে। এর চেয়ে চীন বরং আবার জেনারেল আর বিদ্রোহীদের মধ্যে মানে উভয়ের ক্ষমতা ও এক্তিয়ার প্রসঙ্গে আবার নয়া এক ভারসাম্য ব্যবস্থা তৈরি করে দিবে। চীন যদি বুদ্ধিমান হয় তো এটাই করবে। তবে এটা অবশ্যই নয়া আরেক ভারসাম্যে – মানে পুরান হিসাবে নয়। এতে অনেক কিছুতেই বিদ্রোহিরা এবার আপার হ্যান্ড পাবে। আর এসবের মূল নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে আরও সবল হবে। রোহিঙ্গারা ফিরবে কিনা সে ইস্যুতে চীন এখন এককভাবে নির্ধারক হবে। অর্থাৎ মুল কথা – বার্মার যে এথনিক জাতিহগত সংঘাত এটা মিটানোর মত রাজনীতির হদিস বা রাজনৈতিক জ্ঞান বা বুঝাবুঝি এখনও বার্মার কোন কোণাতেই নাই।  চীনেরও জানা নাই। কারণ সমাধানটা হল ফেডারেলিজম (Federalism)। অনেকে আমেরিকান ফেডারেলিজম বললে বুঝে। আর এটা আমেরিকার বাইরে – মানে ইউরোপেরই কোথাও নাই। আর সবচেয়ে বড় কথা এটা হল – জাতিবাদ বা কমিউনিস্টদের জাতীয়তাবাদের বিপরীত ধারণা। অর্থাৎ জাতিবাদি লড়াই (এথনিক বিবাদ) অনেক দেশের মত বার্মারও এখন প্রধান শত্রু! 

    আর সব হারানি ভারত এসবের ফয়দা খেতে এখন হাসিনার মাধ্যমে – অন্তত বর্মা ইস্যুতে তাকে চীনবিরোধী অবস্থানে জায়গা করতেই হবে মনে করছে। এককথায়, বর্মা সীমান্তে বিশৃঙ্খলা সাময়িক হলেও ভারতেরও স্বপ্নে পোলাও খাবার মত  এক আশা তৈরি হয়েছে  যে, হাসিনা সরকারের কাঁধে চড়ে ভারতের বার্মা দখলের মুরোদ না থাকলেও একটা শেয়ার নিতে চায়। ভারত আবার প্রবল একটা আশাও খাড়া করেছে যে একাজে আমেরিকার তাদের পিছনে দাঁড়াবে। ভারতের এই অবাস্তব আশা – উচ্চাশা এটাই এখন হাসিনা সরকারকে বেচাইন করে তুলছে!  এসবের কারণে, সরকার এতে ততটাই চীন থেকে দূরে না চাইলেও হয়ে পড়ছে। সরকার সতর্ক না হলে ভুল পদক্ষেপ দিয়ে ফেললে তাতে শুধু সরকার না পুরা বাংলাদেশই – সরকারের ভারতপ্রীতিতে বা চাপে পড়ে – বিরাট বিপর্যয় ডেকে আনবে! যদিও সবকিছুই এখনও – প্রাইমারি অভিমুখ কোনটা নিবে  – সেই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে – কিন্তু লক্ষণগুলো খুবই খারাপ ঝোঁকের! এক ব্যাপক  দেশি-বিদেশি নয়া পোলারাইজেশনও ঘটাবার চেষ্টা শুরু হয়েছে। তা কতদুত সফল হবে এখনই জানি না। যদিও একারণে, ব্যাপক উঁকিঝুঁকি মারা শুরু হয়েছে!

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ১১ ফেব্রুয়ারি  ২০২৪, ভোর চারটা দশ মিনিট

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • হাসিনা কি ভারতের চাপে ভুল পথ ধরতে আগাচ্ছেন

    হাসিনা কি ভারতের চাপে ভুল পথ ধরতে আগাচ্ছেন
    গৌতম দাস
    ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪  সন্ধ্যা ১৮ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-5la

     

     

    হাসিনা সম্ভবত  ভুল করতেছেন। ভুল পথে ধরতে যাচ্ছেন।  আর এতে চীনের থেকে “বাজেট সহায়তা” বলে নগদ ডলারে, প্রায় দুই ডিজিটের ঋণ আনা বোধহয় তাঁর হাত ছুটে যাবে! আর তাতে সব মিলিয়ে মানে কি দাঁড়াবে? বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে ভাঙ্গা অর্থনীতি! যা ক্রমশ আমাদেরকে দুর্ভিক্ষদের দিকে নিবে? আর আমরা তা দাঁড়ায় দাঁড়ায় দেখব?

    কেন বলছি একথা?
    এটা আর লুকানোর কিছু না যে সরকারের অর্থনৈতিক সংকট কাঁধে নিয়ে হাসিনার একটা খেলনা নির্বাচন শেষে নিজেকে তাতে বিজয়ী-প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা কললেন বটে কিন্তু তাতে করে তার ক্ষমতায় খাড়ায় যাবার চেয়েও আরো বড় ও মারাত্মক সঙ্কট হল ‘অর্থনৈতিক’  – সেটাই এখন সরকারকে জাপটে চেপে ধরেছে! গত মাসে নয়া সরকার গঠনের পর থেকেই ঢাকার চীনা রাষ্ট্রদুত প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন মন্ত্রীর অফিসে গিয়ে সাক্ষাতের রিপোর্ট  হচ্ছে মিডিয়ায়। আর এসব রিপোর্টে কেন চীনের এসব সাক্ষাত হচ্ছে বা ইস্যু কি; তা নিয়ে আমাদের জল্পনা কল্পনাও করতে হচ্ছে না। যেমন চীনা রাষ্ট্রদুত ইয়াও ওয়েন এর সাথে নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ এর যে প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাত হয়েছে এনিয়ে হাতের কাছে দুটা রিপোর্ট দেখছি। বিবিসি বাংলার বেলায় শিরোনাম, “বাংলাদেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন ‘পাশে থাকবে’ কীভাবে?” –  আর বণিকবার্তায় শিরোনাম, বাংলাদেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে পাশে থাকবে চীন— রাষ্ট্রদূত” – মানে দুটাই প্রায় একই ভাষার শিরোনাম।

    “ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন গত বেশ কয়েকমাস যাবত বলে আসছেন যে বাংলাদেশ
    রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন পাশে দাঁড়াবে। কয়েকদিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সাথে বৈঠকের
    পর চীনের রাষ্ট্রদূত আবারো একই কথা বলছেন,
    যেটি সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট হয়েছে।” – বিবিসি

    অর্থাৎ আমাদের জল্পনা-কল্পনার কিছু নাই, কারণ ব্যাপারটা খোলাখুলি-ই যে বাংলাদেশের কঠিন রিজার্ভ সংকট বর্তমান। আর এতে সহায়তা দিতে চীন আগ্রহী বা রাজিও আছে। এরই ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে।  এছাড়া বিবিসি দুজন মন্তব্যকারীকেও নিয়ে এসেছে সংকট নিয়ে তাদের মতামত দিবার জন্য। একজন হলেন সিপিডির কর্তা দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। আর অন্যজন ডঃ জাহিদ হোসেন যিনি নিজ কেরিয়ার গড়তে সেই আশির দশকের শেষ থেকেই বিশ্বব্যাংক ওয়াশিংটনের এর সাথে কাটিয়ে শেষটা বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের চীফ ইকোনোমিস্ট হিসাবে শেষ করেছেন। এরপর আনুষ্ঠানিক অবসর নিলেও কনসালটেন্ট হিসাবে বিশ্বব্যাংক ঢাকার এক্সটারনাল বা ছুটাকাজ-সম্পর্কে জড়িত ও অভিজ্ঞ মতামত দিয়ে থাকেন।

    দেবপ্রিয় সম্পর্কেও আরেকটু বিস্তারে পরিচয় বলা দরকার। এককথায়, দেবপ্রিয় এখন শুধু সিপিডির কর্তাব্যক্তি শুধু তাই নয়, তিনি প্রায় যেন ভারতের মুখপাত্র হয়েছেন। যদিও বলা হয় সিপিডির জন্ম ১৯৯৩ সালে কিন্তু এটা প্রথম লাইম-লাইটে  এসেছিল ২০০৪ সালে। তাও আবার পরের ১/১১ এর ক্ষমতাদখলের পক্ষে প্রস্তুতিমূলক কাজ ২০০৪ সাল থেকেই শুরু হয়েছিল বলে। কিন্তু সার অর্থে সেটা ছিল আসলে ভারতের স্বার্থের পক্ষে ‘কনসালটেন্সি’ এবং তা খোলাখুলি। বিশেষত বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের নর্থ-ইস্টকে বিনা পয়সায় সব ধরণের করিডোর দেয়ার ওকালতি। এমনকি যারা সিপিডির এই দালালি ব্যবসার সাথে একমত নয় তারা সবই নাকি “অশিক্ষিত” এমন মন্তব্যও করেছিলেন রেহমান সোবহান।

    এটুকুই নয়, একেবারে সাম্প্রতিককালে দেবপ্রিয় একেবারে রানা দাসগুপ্তের সাথে পাল্লা দিয়ে তবে একসঙ্গে বাংলাদেশের প্রো-ইন্ডিয়ান প্রধান হিন্দু লিডার হতেও আপত্তি করছেন না। দেবপ্রিয়ের মুল পেশা “উন্নয়ন কনসালটেন্সি” কিন্তু একালে তিনি (সাথে সিপিডির বস রেহমান সোবহানও)  এই পরিচয় ছাপিয়ে ভারত-সমর্থিত হিন্দু নেতা হতে দ্বিধা করছেন না। কোন প্রফেশনাল মানুষের এমন কাজ ও নিচা মানের কমবিনেশন  (কনসাল্টেন্সি আর প্রো-ইন্ডিয়ান প্রধান হিন্দু লিডার একত্রে) আমরা আগে দেখি নাই। কিন্তু এমন কেন? কারণ, দেখতে দেবপ্রিয়র এটা দুটা পেশা-ততপরতা হলেও এদের মিলটা হল দুইটাই ভারতের স্বার্থ আর তিনি বাংলাদেশে থেকেও সেই স্বার্থের প্রতিনিধি।

    মুল ও গুরুতর প্রসঙ্গ হল বাংলাদেশ রিজার্ভঃ
    উপরে দেখলাম আমরা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা বা রিজার্ভের মারাত্মক সংকট আছে, তা এখন সরকারিভাবেও স্বীকৃত। তা চীনা রাষ্ট্রদুত আর নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে প্রথম আলাপেই আলোচিত ও রিপোর্টেড। আর এই সংকট মিটাতে চীন সবচেয়ে সম্ভাব্য এক মুশকিল আহসান বটে! কিন্তু এক বড় কিন্তু আছে।  সেটা হল, চীন কেন বাংলাদেশকে বৈদেশিক মুদ্রা দিবে?

    এছাড়া এখানেও আবার সব পরিসরেই আরেকটা ভুল বুঝাবুঝি আছে সেটা হল – রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন ‘পাশে থাকবে’ ; এই রিজার্ভ সংকট মানে ঠিক আসলে কি? বাংলাদেশের হাতে বা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঞ্চয় বা মজুদে ‘যথেষ্ট’ নগদ ডলার নাই। আর এটা কমপক্ষে গত দুবছরের ফেনোমেনা।  বলা যায় ২০২২ সালের আগষ্টে তেলের দাম ৫১% বাড়ানোর সময়কাল থেকেই রিজার্ভ সংকট মারাত্মক হয়ে উঠেছিল যা এখন সম্ভবত চরমকাল পার করছে।
    কিন্তু যে “রিজার্ভ সংকট” শব্দে এটা বলা হচ্ছে সেটা কি চীন যে ২০১৬ সাল থেকে ঢেলে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প দিয়েছে সেসব প্রকল্পের বৈদেশিক মুদ্রা ছাড় দেয়া ত্বরান্বিত করা অথবা নতুন করে চীন বাংলাদেশকে আরো বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে কি??
    এর সরাসরি জবাব হল  -‘না’ সেটা না। আসলে বলা হচ্ছে ১. চীনের বাংলাদেশকে নগদ ডলার এবং ২. তা বড় পরিমাণ (ধরা যাক দশ বিলিয়নের মত) নগদ ডলার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সাথে চালু চীনা উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থছাড়ের কথা অবশ্যই আছে। কিন্তু সেটা এখানে গৌণ ও ভিন্ন বিষয়! চীনের আমাদেরকে নতুন করে নগদ ডলার ঋণ দেয়া আর  চীনা উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থছাড় – এদুইটা একই জিনিষ একেবারেই না। আর এখানেই এদুটাকে মাখামাখি করে অনেকের মধ্যেই বুঝাবুঝিতে জট পাকানো ধারণা আছে।
    বাংলাদেশের রিজার্ভের দিক থেকে দেখলে একটা ২০ বিলিয়ন ডলারের চীনাসহ যে কারো কোন উন্নয়ন প্রকল্প শুনতে অনেক বড় মনে হলেও প্রতিবছর এর  অর্থছাড় বড় জোর মাত্র এক বিলিয়ন ডলার হবে। কারণ প্রকল্প যত বড়ই হোক পুরা প্রকল্পের অর্থ (বৈদেশিক মুদ্রা) তো শুরুতে বা একবারেই বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়া হয় না। বরং প্রকল্প যতটুকু বাস্তবায়ন হয় ততটুকুই অর্থছাড় ঘটে। এছাড়া প্রতিবছরের অর্থছাড়ের সব অর্থ দিয়েই তো যা কেনা হয় এর সবকিছুই বাংলাদেশি পণ্য বা শ্রম নয়। অর্থাৎ বিদেশি পণ্য কেনা মানেই সেই অর্থ (বৈদেশিক মুদ্রা) আবার বিদেশেই চলে যাবেই। তাই সারকথায়, উন্নয়ন প্রকল্পের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে্র মধ্যে ধরে রাখা খুবই কঠিন। কারণ, অর্থছাড় ব্যাপারটা আসলে ধীরগতির কাজ-বাস্তবায়ের হারের উপর নির্ভরশীল বা সম্পর্কিত; এছাড়া অর্থছাড় হলেও তা দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য বা শ্রম কেনা হবে যতটুকু কেবল ততটুকু বৈদেশিক মুদ্রাই বাংলাদেশের রিজার্ভে থেকে যাবে। একারণে আমাদের রিজার্ভ সংকট – এটা যত বড়ই বিদেশি উন্নয়ন প্রকল্প নেই না কেন – এটা মিটবে না।

     আমাদের দরকার নগদ ডলারঃ
    অর্থাৎ আমাদের রিজার্ভ সংকট মিটাতে গেলে আরো বড় বড় নতুন বা পুরানো প্রকল্পের দ্রুত অর্থছাড় দিয়েও মিটবে না। তাই আমাদের রিজার্ভ সংকট মিটানোর চাহিদাকে পরিস্কার করতে বুঝাতে বলা হবে নগদ ডলার (বৈদেশিক মুদ্রা) লাগবে। আর এটা অবশ্যই উন্নয়ন প্রকল্প ঋণ একেবারেই নয় – এভাবেই বুঝতে হবে।

    কিন্তু কি নামে দেশে সাধারণত এসে থাকে নগদ ডলার?
    এককথায় জবাব – বাজেট সহায়তা নামে এসে থাকে। এটাই এর টেকনিক্যাল বা খাতওয়ারি নাম! মানে সরকারের বাৎসরিক বাজেটের বৈদেশিক মুদ্রা অংশের দায় মিটাতেই কেবল সরকার এই নগদ ডলার ব্যবহার করতে পারবে।  এজন্য অনেকে এটাকে “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের দায়” মিটানোও জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রাও বলে থাকে। তবে মূল কথাটা হল, এটা প্রকল্প ঋণ সহায়তা নয়। আমরা যেন দুটা ধারণাকে মাখায় না ফেলি।
    ব্যাপারটা আমরা দেখছি একমাত্র স্পষ্ট করে ধরতে পেরেছেন ও ব্যাখ্যা করেছেন ডঃ জাহিদ হোসেন,  ঢাকা বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ।

    “চীন তো বলেনি যে বিনিয়োগে সমস্যা হলে, তারা বাংলাদেশের পাশে থাকবে। তারা বলেছে, রিজার্ভের সমস্যা হলে পাশে থাকবে।
    তার মানে তোমার ক্যাশ নাই, আমরা তোমাকে ক্যাশ দেব। এটাই তো মিন (বোঝানোর) করার কথা।”
    জাহিদ হোসেন মনে করেন, তিনভাবে এই সহায়তা বা পাশে থাকার বিষয়টি হতে পারে। … বাজেট সহায়তা কিংবা ব্যালেন্স
    অব পেমেন্ট সহায়তা হতে পারে।” – বিবিসি

    কিন্তু কোন দাতাদেশই নগদ ডলার বা বাজেট সহায়তা দিতে চায় নাঃ
    কেন? কারণ, ২০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন প্রকল্প দেয়া তুলনায় সহজ; অথচ ৫-৭ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা দেয়া কঠিন। দাতা দিতে চায় না।  তুলনা করে বললে, ৫-৭ বিলিয়ন ডলারের কোন উন্নয়ন প্রকল্পের সব অর্থ যদি দাতা একবারেই একাউন্ট ট্রান্সফার করে দেয় তবে সেটাই তখন কার্যত বাজেট সহায়তা হয়ে যায়। এতে তাহলে সরকার কাজ বাস্তবায়ন অনুযায়ী বছরে মাত্র কয়েক মিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে পারে আর বাকি ডলার আমদানি ব্যয়-সহ এমন সব কাজেই ব্যবহার করতে পারবে। একারণে, বাজেট সহায়তা ঋণ কোন সীমার বাইরে খরচ-ব্যবহার করা যাবে না তা কড়াভাবে বলা বা শর্তে বলা থাকে। এই অর্থে বাজেট সহায়তা হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্প ঋণের চেয়েও অনেক বাড়তি সুবিধা ঋণ গ্রহিতা পাবে বা তাকে দেয়া হয় এমন এক ঋণ। এক স্পেশাল ঋণ, যার মোবিলিটি বা ব্যাবহারযোগ্যতা ঋণ গ্রহিদার জন্য বহুগুণ!

    তাহলে কোন দাতা দেশ এমন বহুল সুবিধা সম্পন্ন ‘বাজেট সহায়তা’ ঋণ কখন ও কেন দিতে রাজি হবেঃ
    এককথায় জবার, দাতাও যখন বিনিময়ে অন্য অনেক সুবিধা পাবে! যেমন বাংলাদেশে চীন ‘বাজেট সহায়তা’ ঋণ দিবে তখন যখন সে বিনিময়ে বিশেষ স্ট্রাটেজিক সুবিধা পাবে; এমন হতে পারে !  এককথায় বিশেষ সুবিধার ঋণ তাই দাতাও এথেকে বিনিময়ে তার বিশেষ সুবিধা আদায় করতে বা পেতে চাইবেই।  সম্প্রতি শেয়ার বিজ পত্রিকা ভারতের ঋণ প্রসঙ্গে একটা রিপোর্টের শিরোনাম হল, “পাইপলাইনে আটকে আছে ৮০ শতাংশ ঋণ” । তাও আবার সেটা ১৩ বছর ধরে। এছাড়া এসব ঋণের ৭৫% পণ্য বা শ্রম ক্রয় ভারত থেকে হতে হবে এমন শর্ত দেয়া। এমনিতেই ভারতের এসব প্রকল্প মানেই হল যা বাস্তবায়ন হলে সুবিধা কেবল ভারত পাবে – এমন! মানে বাংলাদেশ থেকে কড়িডোরের সুবিধা নিবে ভারত তাও বিনা পয়সায় আর সেজন্য যে রাস্তাঘাট ব্যবহার ভারত করবে – বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঐ রাস্তাঘাট নির্মাণের খরচ মানে ঋণ গ্রহণ ও সুদ পরিশোধ করবে বাংলাদেশ। এই হল ভারতীয় স্টাইল! যেমন ভারত কলকাতা-ত্রিপুরা রোড বা ট্রেন চলাচলের সুবিধা নিবে; ভারত পদ্মা সেতু ব্যবহার করবে আর সেতুর চীনা-ঋণ নেয়া ও পরিশোধের দায় বাংলাদেশ নিবে। আর ভারত কেবল আখাউড়া থেকে  ত্রিপুরা লাইনে পাঁচ-ছয় কিমি ট্রেন লাইন প্রকল্পে অর্থ খরচ করে (যেন পুরা প্রকল্পেই) সেটাতে ভারত বাংলাদেশকে ঋণ দিয়েছে বলে দেখাবে।  এককথায় বললে এভাবেই ভারত সমস্ত স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা একপক্ষীয় ভাবে ব্যবহার করবে। আর দাবি করবে ভারত নাকি বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী ঋণদাতা! এমনকি আজকাল অনেক তরুণ ফেসবুকার কেও পাওয়া যাবে যে প্রমান করে দিবে যে বাংলাদেশকে ভারতের দেয়া ঋণ চীনের চেয়েও পরিমাণে বেশী!

    কেন এভাবে এই তুলনা করে দেখালাম?
    দেখালাম এজন্য যে জাহিদ হোসেনের সাথে একই প্রশ্ন দেবপ্রিয়কে করেছিল বিবিসি। দেবপ্রিয়-ই ভারতের সাথে তুলনা ডেকে এনেছিলেন। বিবিসি লিখেছে “…ভারতের দেয়া ক্রেডিট লাইনের কথা উল্লেখ করে মি. ভট্টাচার্য…”। এটা কি তুলনীয় ঘটনা? ভারত কি অবকাঠামো ঋণ দেয়ার মত নিজে যোগ্য অর্থনীতি হয়েছে? দেবপ্রিয় এর সেখবর নাই, তবুও তিনি কোশেশ চালিয়ে গেছেন। এমনই খেদমতগার তিনি! যে ভারত বিনা পয়সায় স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা একপক্ষীয়ভাবে নিচ্ছে তার সাথে চীনের অবকাঠামো উন্নয়নের ঋণদাতা ভুমিকার তুলনা করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, কেন বাংলাদেশ চীনের নগদ ডলার দেওয়ার বাজেট সহায়তা শিরোনামের ঋণ নিতে পারবে না – এম মিথ্যা ও ভুয়া ধারণায় ভয় দেখিয়েছে।

    “তবে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নেবার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা হতে পারে বলে
    উল্লেখ করেন মি. ভট্টাচার্য। কারণ, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ঋণ নিয়েছে এবং সামনে ঋণের আরো কিস্তি আসবে।
    এমন অবস্থায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নিতে গেলে আইএমফ বিষয়টা মানবে কি না সেটাও একটা দেখার বিষয়, বলছিলেন মি. ভট্টাচার্য।” – বিবিসি

     

    দেবপ্রিয় মস্কোর প্লেখানভ রাশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা ও পিএইচডি। ফলে সারাজীবন তিনি “পশ্চিমা পচা-গলা পুঁজিবাদের”  বিরোধীতা ও নিন্দা করে এসেছেন। যা বুঝি না তার নিন্দা করা তো খুব আরামেরই।  আর এখন মোদির “হিন্দুত্ববাদের পুঁজিবাদ” তাঁর কাছে খুব মিস্টি ও উপাদেয়। অথচ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক তার কাছেও নিপাত যাক সংগঠন। সুযোগ পেলেই তিনি এ’সংগঠনের বিরুদ্ধে বিষ উগলে দেন। অথচ উনার নিজ অযোগ্যতা হল, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এটা কি ও কেমন প্রতিষ্ঠান অথবা ১৯৪৫ সালের পরে গ্লোবাল পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক ব্যাবস্থা হিসাবে এটা কিভাবে কাজ করে? আবার এটা কোথায় কোথায় গরীব দেশের বিরোধী আবার কোথায় ঐ গরীব দেশের কাছেই “অন্ধের  কাছে তাঁর লাঠির” মতই সহায়ক – ইত্যাদি এসব দিকে তিনি বেখবর! এই গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেমটা চালু আছে বলেই কিন্তু তিনি আয়-ইনকাম করার সুযোগ পেয়েছেন সেতাই তিনি মনে হয় খেয়াল করেন নাই!

    প্রথম কথা হল, কোন দেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে ওর একটা দিক হল (সবটা নয়) নগদ ডলারের অভাব বা প্রয়োজন হয়ে পরে। এর সবটা আইএমএফ দেয় না বা যোগান দিতে পারে না। এছাড়া এমন সংকটে আইএমএফের কাজ ও প্রধান ভুমিকাটা ঠিক ঋণ দেয়া বা নগদ ডলার যোগান দেয়া না। বরং ১৯৪৫ সাল থেকে আইএমএফের কাজের মধ্যে দিয়ে তৈরি হওয়া যে পেশাদার অভিজ্ঞতা তা দিয়ে সে কোন দেশের পড়ে যাওয়া অর্থনীতিকে টেনে তোলার পথ বাতলানো (যেটাকে কমিউনিস্টেরা আধো বোলে শর্ত দেয়া বলে না-বুঝা হৈ চৈ করে থাকে)। মানে পড়ে যাওয়া ট্রেনকে আবার লাইনে তোলার মত! সেকারণে গ্লোবাল পুঁজি বাজার সংশ্লিষ্ট যেকেউ এসব ক্ষেত্রে ঐ পতিত দেশের অর্থনীতি কারকশন পদক্ষেপগুলো নিয়ে উঠে এসেছে কিনা এব্যাপারে কেবল আইএমএফ এর বক্তব্য-কেই বিশ্বাস করে। এখন অসুবিধা হল মাঙনা পরামর্শ দিলে পতিত দেশ তা আমল করতে চায়না; যেন এতে সিরিয়াসনেস আনতেই বা সেটা ঠেকাতেই কিছু ঋণ ঐ সংকটে পতিত দেশকে আইএমএফও দিয়ে থাকে। যেমন, বাংলাদেশের এখন ৫-১০ বিলিয়ন ক্যাশ ডলার লাগবে বলে কথা উঠেছে সেখানে আইএমএফের দেয়া এখনকার (বছর দেড় আগে শুরু হওয়া) ঋণ হল ৪.৭ বিলিয়ন। কিন্তু তা দেয়া হবে প্রতি ছয় মাসে মাত্র ৬৮২ মিলিয়ন (৬৮.২ কোটি) ডলার করে; মানে সাড়ে তিন বছর ধরে। এভাবে সাত কিস্তিতে অর্থ পাবে। তাও আবার প্রতিবার উন্নতির (রিকভারির) যে টার্গেট  আইএমএফ দিবে তা পূরণ সাপেক্ষে পরের কিস্তির অর্থ ছাড় হবে – এভাবে।
    কিন্তু ছয় মাসে ৬৮২ মিলিয়ন মানে মাসে ১০০ মিলিয়ন ডলারের মত; এটা কোন অর্থই না।  যেখানে শুধু জ্বালানি আমদানিতে আমাদের প্রতি মাসে ব্যয় এক বিলিয়ন ডলার। মানে শুধু জ্বালানি আমদানির মোট অর্থের দশভাগের একভাগ মাত্র আইএমএফের দেয়া ঋণ প্রতি মাসে। অর্থাৎ আইএমএফের ঋণটা “টোকেন” (token) ; বা নাম কা ওয়াস্তে!
    আগের অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন এই কিস্তির ডলার উনি একলা নিজেই বাংলাদেশকে দিতে পারেন। যেটা এতই অল্প!

    অথচ জ্ঞানী দেবপ্রিয় আন্দাজে বলতেছেন যেহেতু “বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ঋণ নিয়েছে এবং সামনে ঋণের আরো কিস্তি আসবে।”– তাই আমরা আর এখাতে চীনের থেকে নগদ ডলার বা বাজেট সহায়তা খাতে নাকি ঋণ নিতে পারব না। যেন বাচ্চা বয়সে আমাদেরব শোনা সেই ডায়লগ যে বলতে চাচ্ছেন-  “না না অমন করেনা মা বকবে”।  তাই সেই ভাষায় দেবপ্রিয় বলছেন, “এমন অবস্থায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নিতে গেলে আইএমফ বিষয়টা মানবে কি না সেটাও একটা দেখার বিষয়”।

    আসলে দেবপ্রিয় বলতে চাচ্ছেন বাংলাদেশ বা হাসিনা যেন চীনের কাছে না যায়। এ্যটাই তাদের মন-কামনা!!!  আর এখানে এই তাদের মানে ভারতীয় স্বার্থের বুঝতে হবে!  হাসিনা যেন চীনের থেকে বাজেট সহায়তার নগদ ডলার ঋণ করতে না যায়।  কেন? এতে দেবপ্রিয় এর কি অসুবিধা?
    দেবপ্রিয় বলতে চাইছেন এতে ভারত রাগ করবে। কারণ, হাসিনার চীনের কাছে যাওয়া মানে তিস্তা প্রকল্প জাতীয় আরো অনেক (ভারতের মাতব্বরি অস্বীকার করে সম্মতি দেয়া) প্রকল্পে হাসিনার সম্মতি দেওয়া বা হাসিনাকে নগদ ডলার সহায়তা ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে চীনকে স্ট্রাটেজিক সুবিধা দেয়া। এখন বাংলাদেশ তার নিজ স্বার্থে চীনকে কি দিবে নিবে সেটা একান্তই বাংলাদেশের স্বার্থ! এখানে ভারতের বলার কি আছে? কিন্তু দেবপ্রিয় মনে করেন এটা তার ও ভারতের স্বার্থবিরোধী!

    এবার এর উলটা দিক থেকে দেখি। হাসিনা নগদ ডলার সহায়তা যদি না আনতে পারে তাহলে কি হবে? আগামি মাস থেকেই আমদানি ব্যয় মিটাবার সামর্থ ভেঙ্গে সব এলোমেলো হয়ে পড়বে বলা হচ্ছে। অর্থনীতি চরম বিশৃঙ্খলায় পড়বে। মুদ্রাস্ফীতি আকাশ ছুবে করবে – ধরাম করে ছাদে ঠেকবে। মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বি হওয়া কথাটার-ই আরেক ভাষ্য হল, গরীব মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শেষ। নুন্যতম খাদ্য কেনার সামর্থটাও নাই হয়ে যাবে। এটাই দুর্ভিক্ষের আরেক নামে। এজ্জন্য কোন দেশের ফরেন রিজার্ভ শুণ্যের দিকে কিনা এটাও দুর্ভিক্ষ আসবার একটা বড় সিগনাল!  অর্থাৎ ভারত বা তার এজেন্ট দেবপ্রিয় আমাদের হুমকি-ভয় দেখাচ্ছেন যেন হাসিনা চীন না ভ্রমণে না যায়। কারণ, এতে নাকি ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ চীনের কাছে ক্ষুন্ন হবে! কি আবদার!! অথচ এতে বাংলাদেশের অর্থনীতি ফেল করলে যে দুর্ভিক্ষের দিকে যাবে তবু হাসিনা তা ঠেকাতে ব্যবস্থা না নেক এটাই ভারতের আবদার!
    অথচ এনিয়ে ক্রমান্বয়ে ভারত হাসিনার উপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। সর্বশেষ বিনা পাবলিক ঘোষণায় অজিত দোভালের সফরও বাংলাদেশ সফরও সেকারণে বলে কানাঘুষা চলছে!

    একটা সমতুল্য অভিজ্ঞতাঃ
    করোনার টিকা আমরা কোথা থেকে কিনবো?  এই টিকা প্রথম অনুমোদন পেলে দেখা দিয়েছিল কাড়াকাড়ি। কারণ, বড়লোক পশ্চিমা দেশগুলো তাদের মোট চাহিদার ছয়-সাত গুণ বেশী টিকা নিজেদের জন্য সংগ্রহ-মজুত শুরু করেছিল। খামোখা নিজ সাদা শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্খায়। আর এটাই আমাদের মত গরীর দেশের অবস্থা আরো শোচণীয় করেছিল। চীন অফার দিয়েছিল তাদের টিকার গবেষণার শেষ বা তৃতীয় ফেজে যুক্ত হবার বিনিময়ে টিকা পাওয়ার। কিন্তু এতে ভারতের চেয়েও চীনের বাংলাদেশের উপর প্রভাব বেড়ে যাবে তাই এক শয়তানি চাল দিয়েছিল ভারত। বাংলাদেশ প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৪০০ মিলিয়ন ডলার ভারতের টিকা কারখানায় বিনিয়োগ করলে তারা  আমাদের প্রয়োজনীয় টিকা সরবরাহ করবে। তাহলে টিকা ক্রয় নিয়ে বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যবসায়ী- মন্ত্রী উপদেষ্টারা এই সুযোগে বিরাট আয় করে নিতে পারবে। অর্থ্বের লোভে সরকারও সেদিকেই রওনা দিয়েছিল; সরকারি সহায়তায় বেসবকারি বিনিয়োগও দিয়ে যুক্ত হয়েছিল ভারতের সাথে।  তবু চীন এনিয়ে একটাও কথা পাবলিকলি বলে নাই। রয়টার্স মুখে মাইক ধরলেও বলেছিল – নো কমেন্ট!
    আর সরকার-বেসরকারি দালালেরা ভেবেছিল তারা সহজেই জিতে গিয়েছে। ভেবেছিল চীন কি বোকা যে সহজেই ওয়াক ওভার দিয়ে দিছিল। আর তারা স্বপ্নে ৪০০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে কত হচ্ছে তা গুণা-গুনতি শুরু করেছিল!
    কিন্তু না, সব হিসাব ভুল!
    কয়েকমাসের মধ্যে মোদি ঘোষণা করে বলেছিলেন বাংলাদেশে টিকা পাবে না। আগে ভারতের জনগণ সকলে টিকা পাবে এরপর দেখা যাবে! কিন্তু তখন হাসিনা টিকা পাবেন এমন বিকল্প কোথায়? পশ্চিম উতপাদকেরা সবাই নিজেকে বা অন্য পশ্চিমাদের নিয়েই ব্যস্ত!  ফলে হাসিনার আবার সেই চীনের কাজে গিয়েই হাতেপায়ে ধরা! স্বভাবতই চীন এবার হেসেছিল কিনা আমরা জানি না! কিন্তু বাংলাদেশ থেকে চীন তাদের স্টাটেজিক সুবিধা যা তারা আগের বেছে রেখেছিল তা এবার উসুল করে নেওয়ার বিনিময় আমাদেরকে টিকা দিয়েছিল। সেজন্য টিকা চুক্তি করতে চীনা স্বাস্থ্যমন্ত্রী না এর বদলে  তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এসেছিল। বড় শিরোনামে বললে, এটাই কক্সবাজারে ছয় কিলোমিটারের (রিফুয়েলিং) রানওয়ে নির্মাণ ও এর সাথে আরো অনেক চীনা স্ট্রাটেজিক স্বার্থ বিষয়ক বিষয়ে তা পাইয়ে দিতে চুক্তিতে উপণীত হতে হয়েছিল আমাদেরকে। তার মানে দাঁড়ালো সেকালে হাসিনাকে এই কাজে ভারত-ই ঠেলে দিয়েছিল!  এবারও বাজেট সহায়তা আনতে হাসিনার সম্ভাব্য চীন সফরকে কেন্দ্র করে কি একই ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে?

    এখন ভারতের মোদিসহ বিরাট বিরাট সব স্ট্রাটেজিক এনালিস্ট, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা সব যারা যারা আছেন তারা হিসাব দেন! বলেন, বাংলাদেশকে শুরুতে চীনা টিকা গবেষণায় যুক্ত হয়ে টিকা যোগাড়ে বাগড়া দিয়ে ভারতের কি লাভ হয়েছে? অবশ্যই কোন লাভ হয় নাই। উলটা ক্ষতি হয়েছে। স্ট্রাটেজিক দিক থেকে চীনারা ভারতের ও আমেরিকার উপরেও আগিয়ে গেছে।  আর ভারতের এসব তথাকথিত স্ট্রাটেজিক পরিকল্পকেরা আপনারা তো নিজের স্বার্থই রক্ষা করতে জানেন না। এটাই প্রমাণিত হয়েছে।  মনে করেন অর্থের লোভ আর মনি-পরী হানিট্রাপের মাধ্যেমেই সব অর্জন করে ফেলবেন। আপনারা এতই বুদ্ধিমান! আর ‘র’-এর কাজ আগানোর ভিত্তিও এই অর্থ আর মেয়েমানুষ দিয়ে ট্রাপ করা! অথচ আপনারা ভাবছেন চীনের বুদ্ধি-পরিকল্পনার উপরে আপনি এই অর্থ আর মেয়েমানুষ দিয়ে ট্রাপ দিয়ে জিতে যাবেন; রাজত্ব করবেন!    এর সোজা মানে দাঁড়ালো এখন জবাব নাই আপনাদের কাছে? বাংলাদেশের করোনার টিকা চীন থেকে সংগ্রহের প্রথম পরিকল্পনাকে ফেল করিয়ে দিয়ে ভারতের কি লাভ হয়েছে? নাকি আলটিমেটলি ভারতই বাংলাদেশকে আরো বেশী করে চীনে কোলে উঠিয়ে দিয়েছে?
    ভারতের স্ট্রাটেজিক জ্ঞানীরা এখন আমাদের দিকে না তাকিয়ে ভারতের নিজের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে মুল্যায়ন করেন আগে; সাহস থাকলে!

    এরপরে এর ভিত্তিতে ঠিক করেন হাসিনাকে আবার এখন চীন সফরে (বাজেট সহায়তা আনতে) যেতে বাধা দিবেন কোন সাহসে? কোন লক্ষ্যে ও যোগ্যতায়? আপনাদের মূল সমস্যা তো অর্থনৈতিক সামর্থ নয়, হিংসা-ভিত্তিক চিন্তা! তাই চিন্তা, বুদ্ধি পরিকল্পনা সবই এখানে এসে সব শুকিয়ে যাবে আপনাদের!  অথচ সেই পুরানা পথ; অজিত দোভালকে পাঠিয়ে চাপ দিবেন??? পেটি (petite বা উচ্চারণে পেতিত মানে ক্ষুদ্র বা সংকীর্ণ) চিন্তা, পেটি দোকানদারি মানসিকতা বা হাভাতে এরা অবশ্য এগুলাই করে থাকে! যারা বিরাট চকচকে লোভের চিন্তায় শেষে সবসময় আত্মঘাতি হয়ে থাকে! মোদি কেন এর ব্যতিক্রম হবেন!

    ভারত-চীনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের শিকার না হইঃ
    এই বক্তব্যটা মন্ত্রী ওয়ায়দুল কাদেরের। গত ৪ ফেব্রুয়ারি পুরা বক্তব্যটা নিয়ে মিডিয়া শিরোনাম ছিল – আমরা যেন চীন-ভারতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত না হই: ওবায়দুল কাদের ।  দেখে পড়ে মনে হতে পারে যে হাসিনা খুবই সতর্ক বোধহয় তাই চীন-ভারত দুটা দেশ থেকেই দূরে থাকতেই হাসিনা সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। না, এই অনুমান ভাবনাটা ভুল! কারণ, এটা হল আসলে সম্ভবত হাসিনা এখন আর চীন সফরের কথা ভাববেন না! আর তাতে সবকিছু সিদ্ধান্তহীনতায় ফেলে বসে থাকতে চাইছেন। কারণ, হাসিনার চেয়ে কে সবচেয়ে বেশী জানে যে চীনের কাছ থেকে নগদ ডলার না আনা মানে অর্থনৈতিক রিকভারি হবে না; মানে দেশকে ক্রমশ এক দুর্ভিক্ষ এ’দিকে ঠেলে দেয়া হবে?

    হাসিনার কাছে পরিস্থিতিটা এখন কোন দুরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের শিকার জড়িয়ে যাওয়া বা না যাওয়ার  হিসাবে দেখতে যাওয়াটাই ভুল! হাসিনার জন্য বাংলাদেশের জন্য লক্ষ্যটা হল  অর্থনৈতিক রিকভারি আর তা করে, দুর্ভিক্ষ এড়ানো। সবচেয়ে বড় কথা এতে কোন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যাওয়া বা না যাওয়া যাই ঘটুক – তবুও দুর্ভিক্ষ যদি এড়াতে পারে তবে সবের দায় জনগণ এর কাছে সারেন্ডার করলে তারা তা শেয়ার করবে। কিন্তু কেবল মনে রাখেন একটা চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ – এটা বাংলাদেশের অভিমুখ, গতিপথ অপরের প্রত এটিচ্যুড ইত্যাদি সব বদলে দিয়েছিল। পুরা পঁচাত্তর সালটা আমাদের খুনাখুনিতে কেটেছে। ১৯৮১ সালের আগে কিছুই নুন্যতম থিতু হয় নাই! আর সেই থেকে খুড়িয়ে চলা, পড়ছি আর উঠছি, খুড়িয়ে চলছি – জনমত বিভক্ত! কোন রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকেই এরপরে আমরা নুন্যতম বের হতে পারছি না! প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা ইত্যাদি নেগেটিভ এটিচ্যুড বার বার ছাপিয়ে উঠছে!

    হাসিনা কি করতেছেন তা তিনি নিজেই স্থির মনে এখানে খুঁজে দেখতে পারেন। যেমন, তিনি মনে করেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর হয়ে ক্ষমতা নিয়েছেন। ধরে নিলাম তিনি ঠিক ও সৎ ও ন্যায্য কথাই বলছেন। কিন্তু তাহলে স্কুলের পাঠ্যবই তা ভারতে পাঠিয়ে ছাপানোর নামে তাদের অনুমোদন নিতে পাঠান কেন? এটা কি কোন মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর কাজ হতে পারে? সালমন রহমান কখনও বইয়ের ব্যবসা করেন নাই, ছিলেন না। অথচ তাকেই কেন বই ছাপিয়ে আনার দায়ীত্ব দেয়া হয়েছে কেন? পাঠ্যবই ছোটখাট জিনিষ না।  ভারতীয়দের সম্পাদিত বই পড়ালে কি বাংলাদেশ থেকে মুসলমানদের কথিত জঙ্গীবাদী মানসিকতা দূর হয়ে যাবে? কথিত ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ হয়ে গেলে জঙ্গীবাদ চলে যাবে – এটাই কি মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর এসব চিন্তার ভিত্তি নয়? অথচ এটাই তো ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের নিচে বাংলাদেশকে রেখে দেওয়া; নয় কি? আচ্ছা ভারতের পাঞ্জাবের খালিস্তান মুভমেন্ট কি জঙ্গীবাদ নয়, এটাও কি ভারতের সরকারি পাঠবই পড়েই আর তা পড়ার পরেও জন্মাইছে। তাই নয় কি? হায় মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী!!! তাহলে আমরা কোথায় দাড়াবো? আমাদের কোথায় নিয়ে চলেছেন আপনারা?

    তাহলে মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর শত্রু হল  ইসলামি জঙ্গীবাদ মানসিকতা আর এটাকে ধুয়ে পরিস্কার করতেই গঙ্গায় ডুব দেওয়ানো্র জন্যই এমন পাঠ্যবই ব্যবস্থাপনা?  এভাবে আমরা কি আমাদের মুসলমান পরিচয়কে এভাবে শুদ্ধ ও হিন্দুত্ববাদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে নিতে পারবো? নাকি এরপরও মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী বলে কিছু অবশিষ্ট থাকবে? আসলে, হিন্দুত্ববাদের অধীনস্ত হয়ে একটা “মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী” বা হাসিনার বাংলাদেশ বলেও কিছুই থাকবে না! মানে হবে না!! কারণ, নিজের অস্তিত্বের অর্থ তাতপর্য নিজেকেই তৈরি করতে হয়!

    ভারত তার পেটি স্বার্থে যতই বাধা সৃষ্ট করুক সিদ্ধান্ত নিতে হবে একান্তই নিজ দেশ-মানুষের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে তাতে চীনের খুশি-অখুশি নাকি ভারতের  খুশি-অখুশি এসব অনেক নিচের প্রায়োরিটি! বাংলাদেশের কাছে নিজ স্বার্থের উপরে কেউ নাই, থাকতে পারে না!
    অর্থনৈতিক রিকভারি আর তা করে , দুর্ভিক্ষ এড়ানো এটাই আমাদের মুখ্য স্বার্থ। আমরা আরেকবার দুর্ভিক্ষ দেখতে পারি না!  এতে ফেল করা বা পরাজিত হওয়া যাবে না!!!
    কাজেই “আমরা যেন চীন-ভারতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত না হই”-এটা হতাশা আর সংকটে পালিয়ে যায় যারা তাদের কথা!

    আমাদের শাসকদের নিজ স্বার্থ বুঝতে অন্তত সুমতি হোক!

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০৬ ফেব্রুয়ারি   ২০২৪, সন্ধ্যা  সাতটা

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com