Category: GOUTAM DAS

  • গ্লোবাল এম্পায়ারঃ কোয়াড বা টিকার ভালো-মন্দ বিচার

    গ্লোবাল এম্পায়ারঃ কোয়াড বা টিকার ভালো-মন্দ বিচার

    গৌতম দাস

    ১৭ মে ২০২১, ২২:১৯, ০০:০৬ মঙ্গলবার

    https://wp.me/p1sCvy-3xu

     

    চীন না আমেরিকা, আমাদের জন্য কে ভাল বা আমাদের কার পক্ষে থাকা উচিত বা আমার কাকে পছন্দ – এনিয়ে আমাদের ব্যক্তিগত আগ্রহ, লাভালাভ অথবা ভালো-মন্দ বিচারবোধ থাকতে পারে। কিন্তু এটা ব্যক্তিগত বা সাবজেকটিভ [subjective] বোধবিচার। কিন্তু এই ব্যাপারটাকে অবজেকটিভ [objective] ভাবে  বিচার ও বুঝতে হবে, মানে সাবজেক্ট বা কর্তাসত্বা ভাবে নয়।  কর্তা-মানুষের কাকে পছন্দ সে ভিত্তিতে ও দিক থেকে বিচার করে নয়।  একটা ঘুর্ণিঝড় যেমন বাংলাদেশে কখন  ও কোথায় আঘাত হানবে তা মানুষ জানে না। মানুষের হাতে তা নির্ধারিতও না।  এমন ঘটনাগুলোকে অবজেকটিভ ঘটনা বলে। মানে সাবজেক্ট এর ইচ্ছার ভিত্তিতে না। আমাদের ইচ্ছার বাইরে প্রাকৃতিক ঘটনা দিয়ে বুঝতে হবে।

    গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীন বা আমেরিকার নেতৃত্ব অবস্থান কী হবে তা কোথায় দাড়াবে সেটা তাদের নিজেদের নেয়া স্ব স্ব নীতি-পলিসি অবশ্যই দায়ী। তবুও ব্যাপারটা এমন না যে আমেরিকা নিজের নেতৃত্ব অবস্থান ফাইনালি কী হবে কতটা স্থান কী ধরে রাখতে পারবে সেটা আমেরিকা চাইলেই রক্ষা করে ধরে রাখতে পারে। আবার চীন চাইলেই আমেরিকাকে নেতার অবস্থান থেকে ফেলে দিতে পারে তাও না। কারণ সবদেশেরই নীতি-পলিসি যাই নেয়া হোক না কেন এসবের বাইরে কিছু অবজেকটিভ ঘটনা উপাদান থেকেই যাবে যার প্রভাবে ফাইনালি সবকিছু নির্ধারিত হয় ও হবে যে কোন দেশের নেতাগিরি কতদিন ধরে সে ধরে রাখতে পারব আর কে নতুন উঠে আসবে। এই কারণে আমরা চীন বা আমেরিকা কাকে আমরা পছন্দ করব সেটা না। বরং  চীন বা আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব অবস্থান কতটা ধরে রাখবে বা পারবে তা নির্ধারণ হয় সেসব অবজেকটিভ ফ্যাক্টর দিয়ে সেগুলোকে আমলে নিতে ও খেয়াল করতে হতে হবে।  তাই আমরা চীন পছন্দ করি নাকি আমেরিকা এই ভিত্তিতে কোন একটার পক্ষে ঝাপিয়ে পড়ার মানে হবে না। তবে স্বভাবতই কেউ যদি নিজেকে ভাড়াটে বা দালাল হিসাবে কারও পক্ষে নামতে চায় সেটা অন্য আলাপ আর তা তো ঠেকানো যাবে না।
    তবে এ’প্রসঙ্গে বাংলায় “ভগ্নদুত” বলে একটা শব্দের সাথে পরিচিত  করে দেয়া যাক।  রাজার আমলে কোন যুদ্ধে  পরাজয়ের খবর তো কাউকে না কাউকে বয়ে রাজধানীতে রাজার কাছে আনতেই হয়, হত। যে বয়ে আনে তাকে বাংলায় “ভগ্নদুত” বলে। পরাজয়ের খবরের বাহক বলে। কিন্তু রাজাসহ  প্রায়ই মানুষ যা ভুল করে বসে তা হল  যেন ভগ্নদুতই যুদ্ধে রাজার পরাজয়ের জন্য দায়ী!  অথচ তা একেবারেই নয়। অনেকটা টিভি রেডিও তে যখন কোন আবহাওয়াবিদ এসে বিশাল দুর্যোগের পুর্বাভাস দেয় আর আমাদের শ্রোতাদের কেউ কেউ যখন ভেবে বসে ঐ দুর্যোগটাই নিশ্চয় ঐ আবহাওয়াবিদের তৈরি বা বানানো! কাজেই আবহাওয়াবিদকে গালমন্দ শুরু করে, এটা সেরকম! তবু ইতিহাসে ভগ্নদুতেরা অনেকেই খুন হয়েছেন রাজার ক্ষোভে!

    কাজেই দেশে প্রো-আমেরিকান বা প্রো-ইন্ডিয়ানদের চোখে আমি ভগ্নদুত অবশ্যই। তাদের চোখে আমি যেহেতু গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের কথা প্রায়শই তুলি ও বলি পুর্বাভাস দেই; আবার বলি যে অ্যামেরিকার পতন আর চীনের উত্থানের কথার নানান দিক…। যদিও আমি পুর্বাভাস দাতা, নেহাতই  এক পলিটিক্যাল এনালিস্ট মাত্র।

    আবার যেমন দেখেন আমি আমেরিকাকে হয়ত পছন্দ করি না তাই অ্যামেরিকার নেতৃত্ব হারাচ্ছে তা বলি এমন তো নয়। বরং নেতৃত্ব বা সক্ষমতা  হারানো এগুলোই তো অবজেকটিভ ফ্যাক্টস।  আর এর চেয়েও বড় কথা এই ফ্যাক্টস বা রিপোর্টগুলোর ৯০ ভাগ হল আমেরিকারই সরকারি স্টাডি গবেষণায় পাওয়া  ও তাদেরই প্রকাশিত রিপোর্ট। কারণ আমেরিকান খোলা সমাজের কিছু সুবিধা তো আছেই, সেগুলো সহজেই পাওয়া যায়। আর চীনের সরকারি তথ্য খুব কমই পাওয়া যায়।  যেটুকু পাওয়া যায় তা হংকং-কেন্দ্রিক বিভিন্ন ওপেন মিডিয়া। যা পশ্চিমা মিডিয়ার বিরুদ্ধে নিজেরা আগেই নতুন গ্লোবাল জগতে নাম কামিয়ে বসে পরতে চাইছে এরা।

    কাজেই বাংলাদেশে বসে চীন বা আমেরিকানদের নীতির বিচার করতে হবে আমাদের আর তা অবশ্যই অবজেকটিভ চোখে, আমরা কাকে পছন্দ করি সে ভিত্তিতে একেবারেই নয়। একমাত্র তবেই আমরা চীন-আমেরিকা নিয়ে বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সহজ সমাধান পাওয়া যেতে পারি।  আর যারা নিজেকে ভাড়াটে বা দালাল হিসাবে কারও পক্ষে নামতে চায়, তাদের নিয়ে এখানে বলার কী আছে!

     গরিব-বড়লোকের  টিকা বলে ভাগঃ
    করোনার টিকা জিনিসটা শেষ পর্যন্ত গরিব-বড়লোকের টিকা হয়েই হাজির হয়ে গেল। আবার একই সাথে তা গ্লোবালি এক ভুয়া এম্পায়ার আর উপযুক্ত এম্পায়ারের দাবি হিসাবে হাজির হয়ে গেল।

    গরিব-বড়লোকের টিকা বলতে সবমিলিয়ে দুনিয়ায় ব্যবহৃত টিকাগুলো হল, একদিকে ফাইজার [Pfizer], মর্ডানা [Moderna] আর জনসন [J&J]। অন্যদিকে – এস্টোজেনিকা [Oxford-AstraZeneca] , সিনোভ্যাক, Sinovac, সিনোফার্মা [Sinopharm], স্পুটনিক [Sputnik V] , কোভ্যাক্সিন [Covaxin] ইত্যাদি।

    এর মধ্যে প্রথম তিনটা – মানে ফাইজার, মর্ডানা, জনসন হল বড়লোকের টিকা। কারণ এর দাম অনেক বেশি আর এর চেয়েও বড় কথা হল এর সংরক্ষণের তাপমাত্রা আমাদের মত দেশে বজায় রাখা খুবই কঠিন। এদের দাম ২০ থেকে ৩৩ ডলারের মধ্যে। আর সংরক্ষণ তাপমাত্রা (-১৫) থেকে (-৮০) ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে। যেখানে গরিব গোত্রের টিকাগুলোর প্রায় সবই ৪ ডলারের নিচে আর সংরক্ষণ তাপমাত্রা ২-৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড।
    সাধারণের বুঝার ভাষায় বললে, বাসায় আমরা যে ধরণের কমন ফ্রিজ ব্যবহার করি (ডিপফ্রিজ না) সেটাই গরীবের ভ্যাকসিনগুলো সংরক্ষণের জন্য যথেষ্ট। আর বড়লোকের ভ্যাকসিন আমাদের মত দেশে যেখানে গরমের সময় তাপমাত্রা +৪০ ডিগ্রি[] পর্যন্ত উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা সেখানে সংরক্ষণ কঠিন। তাই বড়লোকের কোন ভ্যাকসিন আমরা বিনা-পয়সায় পেলেও তা ঢাকাতেই ব্যবহার প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। [এখানে ভ্যাকসিন বিষয়ে তথ্যগুলো বিবিসি বাংলার ১০ এপ্রিলের আর ১৪ জানুয়ারির দুটি রিপোর্ট থেকে নেয়া ]।
    তাহলে এটা পরিস্কার যে, আমাদের মত দেশকে এস্টোজেনিকা, সিনোভ্যাক, সিনোফার্মা, স্পুটনিক, কোভ্যাক্সিন – এসব গরীবদের টিকার মধ্যেই থাকতে হবে। এর মধ্যে এস্টোজেনিকা যুক্তরাজ্যে আবিস্কার হলেও এর ফর্মুলা ভারতে এনে তৈরির ফলে এর সস্তা ভার্সান কোভিশিল্ড পাওয়া যায়, যা বাংলাদেশকে বিক্রি করেছিল ভারত এবং এজন্য তারা আগাম বিনিয়োগ হিসাবে টাকা নিয়েও এখন আর টিকা দিচ্ছে না। আগামিতেও দেয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
    এখানে স্বভাবতই ভারতে উতপাদিত এস্টোজেনিকা [Oxford-AstraZeneca] অথবা কোভ্যাক্সিন [Covaxin] কে প্রাপ্যতার তালিকা থেকে বাইরে রাখতে হল কারণ ভারতের পক্ষে বিদেশে কাউকে  টিকা সাপ্লাই অসম্ভব। এখন তারা উলটা বাইরে থেকে টিকা আনার প্রচেষ্টা শুরু করেছে।

    এরপরে,  সিনোভ্যাক, সিনোফার্মা এ’দুই টিকা চীনের তৈরি। দুটোই  হু-এর [WHO] নোটিশ বোর্ডে ৭৮-৯০% পর্যন্ত কার্যকর দেখা যায়। যার মধ্যে সিনোভ্যাক এর কার্যকারিতা পরে ব্রাজিলে কমে গিয়ে ৫০.৪% হয়েছিল দেখা গেছে, তবে ব্লুমবার্গ ইন্দোনেশিয়ায় দেখা গেছে ফলাফল ৯৪-৯৮%, চিলিতে ৬৭% কার্যকারিতার কথা জানায়। আর সিনোফার্মা [WHO] হু-এর তালিকায় ৭৯% কার্যকর হিসাবে উল্লেখ আছে এখনো। আবার, ল্যানসেটে রাশিয়ান স্পুটনিক এখনো ৯১% কার্যকর বলে উল্লেখ রয়েছে।
    খারাপ খবর হল ভারতের অপর টিকা কোভ্যাক্সিন ৭৮% পর্যন্ত কার্যকর দেখালেও এটা তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল শেষ হবার আগেই বাজারজাত শুরু করেছে বলে অভিযোগ আছে বিবিসির রিপোর্টে। দেখেন [What was the controversy around Covaxin?] এই শিরোনামের অংশটা পড়তে পারেন।

    তার মানে দাঁড়ালো দুনিয়াতে অন্য যত ভ্যাকসিন আবিস্কৃত হয়ে থাকুক না কেন, বাংলাদেশের জন্য “পাওয়া সম্ভব” এবং “উপযুক্ত” ভ্যাকসিন বলতে বাকি থাকল চীনা সিনোভ্যাক, সিনোফার্মা (এটা বেশি উপযুক্ত) আর রাশিয়ান স্পুটনিক।

    এদিকে আবার ‘পাওয়া সম্ভব’ আর ‘উপযুক্ত’ হলেও আরো কথা আছে। তা হল, কিনতে আমাদের অর্থনৈতিক সামর্থ আছে কিনা? কতটুকু? এছাড়া যদি নিজে দেশে উৎপাদন করে নিতে হয় সে মুরোদ (বিনিয়োগ ও টেকনিক্যালিটি) কতটা? এসব ক্ষেত্রে তাহলে কী হবে? সে প্রসঙ্গের আগে একটা কথা।

    এম্পায়ার (empire):
    এম্পায়ার (empire) ধারণাটা এ প্রসঙ্গে বুঝা জরুরি। ইংরাজিতে এম্পায়ার (empire) বলে একটা শব্দ আছে যার মূল বা রুট অর্থ হল  – এক বিরাট ভুখণ্ড বা কয়েকটা দেশজুড়ে ভুখণ্ড তবে যা কোন একক শাসকের অধীনে পরিচালিত। বাংলায় এটাকেই আমরা ‘সাম্রাজ্য’ শব্দ দিয়ে চিনি। তবে এই শব্দ দিয়ে যেমন অটোমান সাম্রাজ্য (১২৯৯-১৯১৮) থেকে শুরু করে রাশিয়ান জার সাম্রাজ্য (১৭২১-১৯১৭), ব্রিটিশ সাম্রাজ্য (১৬০০-১৯৪৫) ইত্যাদি চিহ্নিত করার পাশাপাশি অনেকে বিশেষত কমিউনিস্টরা আজকের আমেরিকাকে (১৯৪২-চলমান) ‘সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা’ বলে থাকে। যেখানে সাম্রাজ্য শব্দের সবখানেই মুল কমন বৈশিষ্ট্য বা মানে হল, কয়েকটা দেশজুড়ে বা বিরাট ভুখণ্ড যাতে পরিচালিত হয় একক শাসন কর্তৃত্বে। যদিও কমিউনিস্টদের সাম্রাজ্যবাদ মানে এসবের উপরে আরো অনেক কিছু। আমাদের মত দেশে ক্যাপিটালিজম আর স্বাধীন মত হবে না; যারা আগে যেসব দেশ ক্যাপিটালিজম স্বাধীনভাবে বিস্তার করে নিবার সুযোগ নিয়েছে তাদের বাধার কারণে  – ইত্যাদি আরো অনেক কিছু। তবে ১৯৪২ সালের পর থেকে দুনিয়ায় সাম্রাজ্য বলতে কমন ধারণাটায় বদল আসতে থাকে। জাতিসংঘ জন্ম নিবার পরের জমানায় পুরান সাম্রাজ্যগুলোর কেউ নিজেকেই আর সাম্রাজ্য বলে দাবি করে না বা ডাকে না। কেবল কমিউনিস্ট নথিপত্রে আভ্যন্তরীণভাবে আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদী ডাকার দলিল থাকতে পারে।   বর্তমানে কেউ অন্তত আর সরাসরি অন্য দেশ গিয়ে বসে সাম্রাজ্য (বা সাম্রাজ্যবাদী) শাসক বলে দাবি করে উপস্থিত হয়ে শাসন করা বন্ধ হতে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এমন রাজনৈতিক ভিত্তির উপরেই লড়া হয়েছিল তাই।
    যেমন ১৯৪২ সালের (জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা ১জানুয়ারি ১৯৪২) আগের শাসনগুলো ছিল মূলত কলোনি-দখলি শাসন আর ওদেশের অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ব সম্পদ ওদেশ থেকে লুট করে শাসকের দেশে পাচার করা বুঝাত। ১৯৪২ এর পর থেকে বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষের পর সেই সুযোগই আর বাস্তবে থাকেনি। কারণ কলোনি- দখলি শাসন আইনত নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
    তবে ১৯৪৫ সালের পরে মূলত প্রত্যেকটা দেশ কলোনিমুক্ত ইন্ডেপেন্ডেন্ট  স্বাধীন রাষ্ট্র ধরে নিয়ে তাদের পরস্পরের মধ্যে দুনিয়াজুড়ে এক বাণিজ্য বিনিময় সম্পর্ক শুরুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, যেটা একেবারেই নতুন এক দুনিয়া তৈরি করে আর এরই এক “গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডার” বা নিয়ম শৃঙ্খলা চালু হয়েছিল। এটা আমেরিকার নেতৃত্বেই চালু হয়েছিল এবং এখনও আছে প্রায় ৭৫ বছরের বেশি সময় ধরে আমেরিকার নেতৃত্বে আধিপত্য কিন্তু এখন যা আবার ঢলে পড়ার শেষের দিকে। কারণ আমেরিকার হারানো প্রভাবের জায়গা দখল করার উপযুক্ত হয়ে উঠে আসছে চীন।
    সে যাক, কিন্তু ১৯৪৫ সালের পরের আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারের মধ্যে গরিব দেশগুলো কলোনিমুক্ত অর্থে স্বাধীন হয়ে যায় বটে কিন্তু নিজ নিজ অর্থনীতি কার্যকরভাবে চালানোর উপযুক্ত অর্থে স্বাধীনভাবে তারা টিকে থাকতে পারছিল না। যোগ্য ছিল না। এর মূল কারণ, আগের দু’শ’ বছর ধরে যেমন বাংলাদেশের মত দেশ থেকে এমন সম্পদ লুট আর পাচার হয়েছে যে তার কিছু অংশ অন্তত কোনো শর্তে আবার ফিরিয়ে না আনতে পারলে এসব স্বাধীন দেশ  অর্থনীতি জাগবে না; বরং না খেয়ে মরার অর্থনৈতিক দশায় পড়েছিল।  সেসব শর্তেরই সাধারণ দিক হল কিছু সুদে আগের পাচার হওয়া অর্থই যেন ফেরত এনেছিলাম আমরা। আমরা একা নই এটাই নতুন গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডার। এছাড়া আমরা যতটুকু তাদের / আমাদের জন্য অর্থনৈতিক ভাবে সচল হব যতটা তাদের পণ্য ও বিনিয়োগ কিনতে চাহিদা তৈরি হবে ততটাই তাদেরও বিরাট লাভ।  ফলে আমাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ তাদেরও বা তাদেরই কম ছিল না। আর এ কাজেই ওসব অনুদান বা প্রায় না সুদের ঋণের আয়োজন। আর এতে প্রধান ও প্রায় একক বিরাট ভূমিকা রেখে এসেছে আমেরিকা।

    গ্লোবাল এম্পায়ার আমেরিকাঃ
    আমেরিকার এই ভূমিকাটা্র একটা মন্দের ভাল দিক আছে। ফলে আমরা একে মন্দের ভাল বলতে পারি। তবে কথাটাকে এভাবে বলতে হবে যে, এটা গরিব দেশকে সাহায্য করতে, তাদের একটা ভায়াবল অর্থনীতির গড়ে দিবার জন্য করা আমেরিকান বিনিয়োগ – না ঠিক এতটুকু তা নয়। এটা উলটা, মূলত আমেরিকার হাতে জমে যাওয়া বিনিয়োগহীন বিপুল উদ্বৃত্ব সম্পদের হিল্লা করার জন্য, গরিব দেশে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজে বের করা হয়েছিল। আর সেটা করতে গিয়ে আগে গরীব দেকে মুক্তি আর এরপর প্রায় না সুদে বা অনুদানে (আসলও ফেরত দিতে হয় না যেখানে) অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছিল। যাতে আমাদের অর্থনীতি যত সচল হবে ততই আমরা তাদের পণ্যের ক্রেতা হব। আমরা চাহিদাহীন বন্ধ্যা এক অর্থনীতি হয়ে থাকলে এতে আমেরিকা বা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিরাট ক্ষতি। এছাড়া, অর্থনীতি যত বড় হতে হতে আরও সমৃদ্ধ হবে যাতে ন্যুনতম চার পার্সেন্টের উপরে সুদে বিনিয়োগ পাওয়ার যতই যোগ্য হব আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ততই সব বন্ধ করে দিবে। সুতরাং অ্যামেরিকার লক্ষ্য যেন আমরা আরও বড় বড় বিনিয়োগ নেবার যোগ্য হই। তাদেরকে সরাসরি ব্যবসা বিনিয়োগ করতে দিতে পারি এমন যোগ্য অর্থনীতির দেশ হই। এভাবে সারা দুনিয়া জুড়ে গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময়, দুনিয়ার আরো কোণে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই অর্থে আমেরিকার এই ভূমিকাটা মন্দের ভাল। কারণ আমাদের অর্থনীতি ক্রমশ তুলনামূলকভাবে ভাল হবার কিছু সম্ভাবনা এর ভিতর আছে। ফকির হয়ে থেকে ধুকে মরার চেয়ে। কমিউনিস্টদের শোষণতত্ব অনুসারে আমেরিকা যে শোষক এটা অবশ্যই এজন্য ভুলে যাবার দরকার নেই। কিন্তু আমরা কী সেজন্য আমেরিকাকে গালমন্দ করে, পেটে খিদা নিয়ে না খেয়ে বসে থাকব? ধুকে মরব? এটাও কোন কাজের কথা না। এতটুকু প্রাকটিক্যাল হওয়ার কথা বলছি। যাতে আমরা এই গ্লোবাল অর্থনীতির ভিতরে প্রবেশ করে অংশ হয়ে এর ভিতরেই আমাদের জন্য যেসব তুলনামূলক সুবিধা জেগে উঠতে দেখা যাবে সেগুলোর সুযোগ নিয়ে স্ট্রাগল করে উঠে এক ভায়াবল অর্থনীতিতে  আসার চেষ্টা করব? এই হল সেই লড়াই। আর অবশ্যই আমেরিকান সম্পর্কে কমিউনিস্টদের শোষণতত্ব অস্বীকার বা না ভুলেই তা করা সম্ভব।  দুর্ভিক্ষে না খেয়ে আটকে থাকা কোন কাজের কথা না!  এককালের গরীব চীন আজকে দেবারেবল কিন্তু অবজেকটিভ সুযোগ পেয়ে কী অ্যামেরিকার উপর উঠে যেতে রুল করতে চাইছে না!
    এখন এই যে আমাদের মত দেশের অর্থনীতিতে আমেরিকার (তার নিজের স্বার্থে) সাহায্য আমরা পাচ্ছি বা আমেরিকা সাহায্য করছে – এটাই আমেরিকার ‘ইতিবাচক এম্পায়ার ভূমিকা’। এই যে ১৯৭১ সালের পরে আমরা বিশ্বখাদ্য কর্মসুচি (WFP) খাদ্য সাহায্য নিয়ে টিকে বেচে ছিলাম এটা নিশ্চয় খারাপ হয় নাই। এখন WFP কে ফান্ড দিয়েছিল কে?  এসব লিল্লাহ ফান্ডের প্রায় ৭০ ভাগ এখনও আমেরিকা যুগিয়ে থাকে। কেন? কারণ আপনি আমেরিকা গ্লোবাল নেতা মানে, আপনি অ্যামেরিকার উপর এক এম্পায়ারের দায়িত্ব আপনাতেই বর্তায়, বর্তাবেই। আপনি আমেরিকা তো নিজের জন্য প্রবল প্রভাবের সুবিধা তো নিবেনই। আমরা ঠেকাতে পারব না। কাজেই গ্লোবাল এম্পায়ারের দায় ভুমিকা – রোল প্লে করাই আপনার কাজ। আর আমাদের দিক থেকে এটাই মন্দের ভাল, গ্লোবাল নেতা ইতি ভুমিকা।
    আবার দেখেন যেমন, আমাদের ১৯৮৮ সালের বন্যা। আমেরিকা প্রায় না সুদে বা কোনটা কম সুদে বা অনুদানে অবকাঠামো খাতে আরো ঋণ-বিনিয়োগ না করলে আমরা হয়ত সেই সময় বন্যার ক্ষতি থেকে উঠে আসতেই পারতাম না বা বিরাট কষ্ট হত, অথবা ঘুরে দাঁড়াতে দেরি হত। আবার আমেরিকার দিক থেকে ঐ নতুন অবকাঠামো খাতে ঋণ-বিনিয়োগটা সেসময় আরো না যোগালে তাদেরই আগের দেয়া কোন ঋণ-বিনিয়োগ আমরা ফেরত দেবার যোগ্য থাকতাম না হয়ত। তাই এটা ছিল আমাদের আগে তাদেরই বিরাট মৌলিক স্বার্থ।

    এই হলো সেই “এম্পায়ারঃ কথাটার বিশেষ মানে। এম্পায়ার এর ভুমিকা কথাটা বুঝতে হবে ভাল করে। মানে অ্যামেরিকার সাথে সামগ্রিক নেতিবাচক সত্ত্বেও কিছু ইতিবাচক ভূমিকা, তবে সেটাও এম্পায়ারের স্বার্থেই। এটাই গত প্রায় ৭৫ বছরের আমেরিকার কিছু ইতিবাচক ভূমিকাও রেখে গেছে। এবং পরের গ্লোবাল নেতাকেই এই দায় নিতেই হবে। মানে এটাই আবার গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতৃত্বে যখন পালাবদল ঘটে আর তাতে নতুন যে নেতা আসে তাকেই এই দান-অনুদানে খরচের দায় নিতে হয়। অর্থাৎ ইতিবাচক এম্পায়ার রোল নিতে হয়। চীন এখন সে রোল নিচ্ছে ক্রমশ।

    ঠিক যেমন শুরুতে রাজাও খাজনা, ট্যাক্স, সেলামি বা পুণার্হ ইত্যাদি নানান নামে চাঁদা তোলে। কিন্তু প্রজাদের জন্য এর কোন অংশই রাজা ফিরে খরচ করে না। কিন্তু কোন সাম্রাজ্যের সম্রাট তিনিও আরও বেশি চাঁদা তুলেন হয়ত। কিন্তু ওর বিরাট অংশ তিনি সিভিল ইউটিলিটি মানে পাবলিকের জন্য রাস্তাঘাট, নিরাপত্তা বা পানির ব্যবস্থা নির্মাণ ইত্যাদিতে ব্যয় করেন। এজন্য এম্পায়ার রাজার চেয়ে অনেক বেশি কাম্য – তারা দু’জনেই জোর করে বসা শাসন ক্ষমতা হলেও এর মধ্যে মাত্রার পার্থক্য রয়েছে।

    সার কথা হলো, পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা বলে একটা ব্যাপার আছে। গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা আমেরিকা এতদিন সে দায় ও ভূমিকা পালন করেছে, অকাতরে অর্থ ব্যয় করেছে আরও সুবিধা পাবার জন্য। এখন তার গ্লোবাল নেতাগিরি ঢলে পড়লে নেতার সবার আগে যে সামর্থে টান পড়ে তা হল – এই ‘পজিটিভ এম্পায়ারের খরচ করার ভূমিকা’। আর ঠিক ততটাই যেন নতুন বা আসন্ন গ্লোবাল নেতাও ঐ ভূমিকাটা পালনের জায়গা নিতে যোগ্য হয়ে উঠে। অর্থাৎ চীন সেই ‘পজিটিভ এম্পায়ারের দায় ও ভূমিকা’ নেবার অনেক যোগ্য এখন!

    কেন এম্পায়ারের কথা তুললামঃ
    সারকথায় আমরা কেউ সাবজেকটিভ বা ব্যক্তি অর্থে আমেরিকাকে না চীনকে পছন্দ করি তাতে কিছুই যায় আসে না। আমেরিকাকে না চীন কাকে কার উপরে বেশি ভালোবাসি সেই সাবজেকটিভ বিচার এখন প্রসঙ্গের বাইরে তুলে রাখতে হবে, অপ্রাসঙ্গিক বলে। বরং এদের মধ্যে কে এখন ‘পজিটিভ এম্পায়ারের দায় ও ভূমিকা’ নেবার যোগ্য – এই ব্যাপারটা অবজেকটিভভাবে নির্ধারিত হচ্ছে। সেদিকটায় তাকাতে হবে। কে বেশি যোগ্য বা উপযুক্ত সেই অবজেকটিভ বাস্তবতাকে মানতে হবে, একমাত্র সেদিকে দিয়েই বাস্তবতা নির্ধারিত হবে। আমরা তা না করতে পারলে সেটা ভাঁড়ামো মানে আমাদের আমেরিকান (বগলে ভারতীয়) ভাঁড়ের দালালের ভূমিকায় নামা হবে।

    তাহলে?  বাংলাদেশে  আমরা ব্যাপারটাকে কিভাবে বিচার করব?
    দুনিয়া এখন কোভিড-১৯ ভাইরাসের কবলে পড়ে হাসপাস করছে। কে কতদিন আর কীভাবে বাঁচে তা অজানা। গ্লোবাল অর্থনীতি ক্রমশ দেবে গিয়ে ঢলে পড়ছে। গ্লোবাল অবকাঠামো ব্যাংকগুলো তা ঠেকাতে চেষ্টায় নানান উদ্যোগ নিয়েই যাচ্ছে। সবারই একই লক্ষ্য রিকভারি- মানে ক্ষতি সামলে আবার জেগে উঠার চেষ্টা। অর্থাৎ উল্টা ভাইরাসের উপরে আধিপত্য বিস্তার করা, অন্তত কিছু প্রতিরোধ ব্যবস্থা খাড়া করা।

    এই কাজে প্রধান পদক্ষেপ, হা সেই পদক্ষেপ হতে পারে সোজা কথায় ব্যাপক হারে উপযুক্ত টিকা বিতরণ হতে পারে একটা প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য প্রধান কাজ। কিন্তু গাফিলতি, অযোগ্যতা, পরিকল্পনায় মারাত্মক ত্রুটির কারণে বাংলাদেশে টিকাকরণে যতই দেরি হচ্ছে ভাইরাস ততই নিজেকে আরেক রূপ বা ভেরিয়েন্টে হাজির করার সুযোগে দুর্দমনীয় হয়ে উঠছে। অর্থাৎ দ্রুত ও একসাথে সবাইকে (অন্তত ৭০ ভাগ) টিকা দিয়ে শেষ করাই একমাত্র জিতবার পথ।
    আর এখানেই গ্লোবাল নতুন বা পুরানা নেতার একটা ‘পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা’ নেয়ার আছে, যা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। আবার তা আসলে একটা মাপক, কে দুনিয়ার যোগ্য নেতা। আর কার দিন ফুরিয়েছে। কারণ, প্রচুর পরিকল্পনার ব্যাপার এখানে আছে। আগে বিনিয়োগের প্রয়োজন। যেমন গবেষণায় বিনিয়োগের ব্যাপার তো আছেই। সেই সাথে এরপর ঐ লাইসেন্স নিয়ে উৎপাদন এবং সুষ্ঠুভাবে টিকা বিতরণে বিনিয়োগ ও টেকনিক্যালিটির একটা ব্যাপার আছে। এখন একটা ওপেন কোশ্চেন করা যাক! একাজে গ্লোবাল নতুন বা পুরানা নেতার একটা ‘পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা’ নেয়াতে কে বেশি যোগ্য?
    প্রথমত, আগের ডোনান্ড ট্রাম্প তো নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে স্বীকারই করেননি যে এটা করোনা একটা মহামারি ও সমস্যা। মাত্র এবছরের শুরুতে বাইডেন ক্ষমতায় আসার পরে এটা আমেরিকানদের জন্যই প্রথম ও উপযুক্ত মনোযোগ পায়। মানে গ্লোবাল রোল দূরে থাক আমেরিকা আগে নিজ জনগণের প্রতিই ঠিকমতো মনোযোগ দেয়নি। বরং ভাইরাসকে দুনিয়ায় বিস্তার লাভ করতে যেন পরোক্ষে সাহায্য করেছে যেন!
    এরপর বাইডেন, তিনি কথিত কোয়াডের মিটিং ডাকলেন। সদস্যরা সবাই বিশেষ করে ভারত লাফিয়ে উঠে এখানে কর্তা বা প্রধান নায়কের ভাব ধরল। চীনের বিপরীতে ভারত যেন গ্লোবাল নতুন নেতার একটা ‘পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা’ নেওয়ার বেশি যোগ্য – খামোখা এই ভন্ড হামবড়া ভাব নিয়েছিল ভারত।  যে কখনও ক্যালকুলেটরই টিপে দেখে নাই  ভারতের মোট জনসংখ্যাকে টীকাকরণ করতে  সে নিজে কতটা মুরোদে সামর্থবান, যোগ্য।  সে সভার শুরুর দিকে বাইডেন যতই পরিষ্কার করে বলার চেষ্টা করছিলেন তিনি মূলত দ্রুত কেবল আমেরিকান নাগরিকদেরকে টিকাকরণের জন্যই এসেছিলেন যাতে এখাতে জাপানি বাড়তি বিনিয়োগ নিয়ে ভারতের টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা তিনি আমেরিকানদের জন্য কাজে লাগাতে পারেন। কিন্তু ততই চীনকে পরাজিত দেখানোর লোভে আর বাস্তব হোক না হোক চীনের চেয়ে ভারত যোগ্য দেখানোতেই দিল্লি চাপাচাপি শুরু করে। আর ভারত এর এক মুখরোচক নাম দেয় – ‘টিকা কূটনীতি’। যা অবাস্তব তো বটেই প্রয়োজনীয়ও ছিল না। শেষে বাইডেন মিথ্যা হলেও কোয়াডের হয়ে “এশিয়াকে টিকাদাতা” হিসাবে হাজির হবার মিথ্যা কথা দিয়ে রাজি বলার পরই কেবল ঐ সভা শেষ করতে পারেন।
    অথচ আজকের বাস্তবতা হল, আমেরিকা ভারতের টিকা পায়নি বা নেয়নি। তবে বাইডেন নিজেই অন্যান্য উৎস থেকে টিকা সংগ্রহ বাড়াতে সক্ষম হন। আর এদিকে ভারত আমাদের দেশের বেক্সিমকোর মাধ্যমে ভারতীয় টিকা পেয়ে যাচ্ছে সাথে নগদ লাভও হচ্ছে এই মিথ্যা বাস্তবতা খাড়া করে। এতে আমাদের চীনা টিকা ও লাইসেন্স পাওয়া ভন্ডুল করে দিতে তারা সমর্থ হয়। কারণ আমরা লোভি হয়ে পড়েছিলাম। সময়মতো চীনকে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছিলাম।  ভারত আমাদের টিকার সব সমাধান দিয়ে দিয়েছে আবার পকেটও ভরবে এই অবাস্তব চিন্তায় আমরা বাস্তব দুনিয়াটা উপেক্ষা করেছিলাম।
    আর ওদিকে এখন ভারতের জন্য কঠিন বাস্তবতা হল, বিদেশের কাউকেই তার টিকা দেয়ার সামর্থ নেই। সেটা দূরে থাক। তারপরেও ভারতের নিজ জনগোষ্ঠির সবাইকে টিকা দিতে আগামি  দু’বছরে পারবে কিনা সন্দেহ। যার মানে নিজ জনগোষ্ঠীকেই টিকাকরণ করতে ভারতের সামর্থ নেই। তাই ভারত ইতোমধ্যেই বাইরে থেকে টিকা আমদানির অনুমতি দিয়েছে। তাহলে এই ভারত আমেরিকা এবং বাংলাদেশসহ সারা এশিয়াকে টিকা কূটনীতিতে ছেয়ে ফেলার যে হুঙ্কার- এটা কেন দিয়েছিল? এতেই প্রমাণ হয়, গ্লোবাল নতুন বা পুরানা নেতার একটা ‘পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা’ নেওয়ার কাজটা ভারত কোনদিন  বুঝেছে বলে আমাদের মনে করার কোন কারণ নেই। কেবল দুচোখ ভরে জ্বলজ্বল করা লোভ ছাড়া তাদের কোন মুরোদই নাই যেন!

    তাহলে ওরকম  পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কী করতে পারত? মানে টিকা বা টাকা ফেরত কোনোটাই না পেয়ে বাংলাদেশের তখন কোথায় যাওয়ার বাকি ছিল? আমেরিকার কাছে?

    আগেই বলেছি, টিকা উৎপাদন গরিব-বড়লোক বলে ভাগ হয়ে আছে। আমেরিকায় উৎপাদিত টিকা বিনা পয়সায় দিলেও আমাদের কাজে লাগানো কঠিন। তবু, আমাদের প্রায় ১৩ লাখ একডোজ নেয়া গ্রহিতা বিপজ্জনক অবস্থায় আছে। কারণ ভারত তাদের জন্য দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেয়নি, আবার কখনও দিবে সে সম্ভাবনাও নেই। আবার অন্য উৎস থেকে আমেরিকার হাতে প্রায় ৫ কোটি এস্টোজনিকা মানে আমাদের মত একই টিকা থাকার কথা জানা গেছে। তাই সেখান থেকে মাত্র ঐ ১৩ লাখ ডোজ আমরা চেয়ে আমরা অনুরোধ করেছিলাম কিন্তু আমেরিকাও এখনও কোনো সাড়া শব্দ করেনি।

    তাহলে এখন চীন ভরসা ছাড়া আমাদের টিকা পাবার উপায় কী? এটাই সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা। আর এই দুরাবস্থায় আমাদেরকে ফেলে গেছে ভারত ও তার হামবড়া ভাব! অতএব টিকা পেতে হলে আমাদের আগের লোভ ও ভুল সিদ্ধান্তের জন্য চীনের কাছে গিয়ে সরি বলে আবার তাকে রাজি করানো ছাড়া উপায় কী ছিল? এছাড়া বিনিয়োগ ও টেকনিক্যালিটি ইত্যাদি সবকিছুতেই আমাদের ঘাটতি আছে। অর্থাৎ আমাদের এক  মুরোদ ওয়ালা এম্পায়ার দরকার! আর ঠিক বিপরীতে চীনের সেই এম্পায়ারের দায় ও ভূমিকা নেয়ার সামর্থ আছে। এটাই বাস্তবতা।
    আমাদের অনেকের মনে হতে পারে, আমরা স্পুটনিক টিকা পাবার চেষ্টা করতে পারি। এটাও বাস্তবতার খবর না নিয়ে কথা বলা। রাশিয়ার আর কাউকে টিকা উৎপাদন করে সাপ্লাই দিবার সক্ষমতা নেই। তাদের কারখানা ওভার অকুপায়েড মানে সক্ষমতা সব পূরণ হয়ে গেছে। এছাড়া  ঐ টিকা দিতে পারলেও সে টিকার দাম পড়বে ১৫ ডলারেরও বেশি কারণ তাদের উৎপাদন খরচ বেশি। ভারতে দিতে চেয়েছে হাজার রুপিতে। এছাড়া কৌশলগত দিক থেকে চীন কোন দেশকে না করে দেয় তবে তাকে টিকা দিবার সিদ্ধান্ত রাশিয়া আর নিবে না। তাদের কৌশলগত পারস্পরিক  সম্পর্ক এরকমই। আর রিয়েলিটি হল, আমাদের স্পুটনিক টিকা উতপাদনের লাইসেন্স পাবার নিশ্চয়তার প্রসঙ্গে, চীনের হাতে (চীনা সরকারি নিয়ন্ত্রণে চীনা প্রাইভেট কোম্পানি) বাংলাদেশে উৎপাদনের জন্য রাশিয়া সহজেই লাইসেন্স দিতে রাজি হবে। নইলে নয়। কাজেই আগামী চার মাস নিয়মিত চীনে তৈরি টিকার সাপ্লাই পাওয়া আর ঐ চার মাসের মধ্যে বাংলাদেশে নিজেদের অন্তত দু/তিনটা প্রাইভেট কোম্পানিকে টিকা উৎপাদনে যোগ্য করে সাজিয়ে দিয়ে তাদের দিয়ে বাংলাদেশের নিজ উৎপাদন যোগাড় ইত্যাদিতে চীনকে রাজি করতে পারলেই একমাত্র টিকা দ্রুত পাওয়া সম্ভব।

    তাহলে সোজা কথা চীনের এই গ্লোবাল এম্পায়ার ভূমিকাটাই আমাদের জন্য কাম্য ও মুখ্য। এখন চীন যদি আমাদের কাছে বিনিময়ে নিশ্চয়তা চায় যে আগের মত আমাদের আবার পা পিছলাবে না? ভারত বা আমেরিকার কাছে লোভে ফাঁসবো না আমরা – চীন সেই গ্যারান্টি যদি চায় তাহলে কী হবে? এমনিতেই সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে চীন সে নিশ্চয়তা আমাদের কাছে চাইতেই পারে। এটা তার অধিকার।

    এখন প্রথমত, বিচার করেন আমাদেরকে চীনের কাছে ফিরে হাত জোড় করে অনুরোধ করার ভূমিকায় দাঁড় করালো কে? ভারতে মিথ্যা আশ্বাস ও প্রফিটের শেয়ারের লোভ। আর সেই সাথে কোয়াড, টিকা কূটনীতি এসব মিথ্যা বোলচাল। অথচ গ্লোবাল নেতার একটা ‘পজিটিভ এম্পায়ারের ভূমিকা’ নেয়া- এই মুরোদ তো আমেরিকাসহ কোয়াডের কিছু করার নাই,  আমরা দেখলাম না!

    জাস্ট কল্পনা করেন। ঈদের পরের ঢাকায় আক্রান্ত লোকের সংখ্যা যদি বেড়ে যায়, সেইসাথে ভারতীয় ধরণের ভাইরাস যদি ছড়িয়ে যায়? এদিকে দেশে ইতোমধ্যে আমাদের টিকা পাওয়া লোকের সংখ্যা এখন যেখানে মাত্র দু-তিন পার্সেন্টের মত তখন ঐ পরিস্থিতিতে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?

    গত ১০ মে বিবিসি রিপোর্ট করেছে ‘কোয়াড’ এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ চীন ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে যথেষ্ট খারাপ করবে বলে চীন মন্তব্য করেছে। আমাদের অতিউৎসাহী প্রো-ইন্ডিয়ান-আমেরিকান লোকজন এনিয়ে আমেরিকার কাছে নালিশ নিয়ে গিয়েছিল।  আর এতে আমেরিকান প্রতিক্রিয়া হলো ‘চীনের রাষ্ট্রদূত যে মন্তব্য করেছেন, তার ওপর নজর আছে যুক্তরাষ্ট্রের’। বাস এখানেই শেষ। মনে হচ্ছে না   অ্যামেরিকার এম্পায়ার ভুমিকা দেখানোর কোন মুরোদ বা ইচ্ছা আছে।  এতো দেখি নালিশ করে বালিশ পাবার মত ঘটনা!  কাজের কাজ কিছু নাই।  আমরা দেখতে চাই অ্যামেরিকার ইতি এম্পায়ার ভুমিকা? কোথায় সেটা?  তাহলে আমরা টিকা পাব কী করে? সেটাব জবাব কী আমেরিকা বা ভারত অথবা দেশের এই অতিউৎসাহী প্রো-ইন্ডিয়ান-আমেরিকানদের আছে? এনিয়ে তাদের বক্তব্য কি? আমরা শুনি না।

    ব্যাপারটা খেয়াল করেন!  বাংলাদেশ চীনের কাছে ফিরে টিকা চাইতে যেতে হচ্ছে এমনই খারাপ অবস্থায় যখন চীনের কাছে আমাদের কোনো পজিটিভ ইমেজ নেই। কারণ আমরা চীনের আগের অফার কোন সদুত্তর ছাড়াই এর অবজ্ঞা, অপব্যবহার করেছি। কাজেই চীন আমাদের আগের আচরণের বিরুদ্ধে এবার নিশ্চয়তা তো চাইতেই পারে! একই ভুল কাজ করব না এর গ্যারান্টি তো চাইবেই!
    আর এ ঘটনাকে চীনের রাষ্ট্রদুতের মন্তব্য  বিবিসি রিপোর্ট করেছে এভাবে,
    “এ ধরনের ছোট গোষ্ঠী বা ক্লাবে যুক্ত হওয়াটা ভালো না।
    বাংলাদেশ এতে যুক্ত হলে তা আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যথেষ্ট খারাপ করবে”।

    আর প্রো-ইন্ডিয়ান-আমেরিকান লবিস্টরা এটাকে ব্যাখ্যা করছে ‘চীনা হুমকি’ হিসেবে। অথচ বিবিসির পুরা রিপোর্টে ‘হুমকি’ বলে কোনো শব্দই নেই। এর মানে এটা লবিস্টদের উস্কানি দেবার জন্য কিছু মিডিয়ার  ব্যবহৃত নিজস্ব শব্দ ও ব্যাখ্যা। এবং কিছু বিশেষ মিডিয়া কোন রেফারেন্স ছাড়াই ইচ্ছামত ব্যাখ্যা দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কথা বলে তা রিপোর্ট করে চলেছে।

    আবার দেখি কেউ কেউ লিখছেন তারা নাকি বিস্মিত হয়েছেন। আর  আসলে আমরা তাদের আচরণ দেখে বিস্মিত হচ্ছি। তারা টিকা পাবার কোনো পাল্টা উৎস বা প্রপোজাল কি দিয়েছে?

    একমাত্র অবজেক্টিভ চোখেই কোয়াড, টিকা পাওয়া বিষয়ের ভালো-মন্দ বিচার করার মত যদি আমাদের অবশিষ্ট কিছু যোগ্যতা থেকে থাকে তবেই হয়ত আমরা এ যাত্রায় পার পেয়ে যেতেও পারি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৫ মে  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে   “কোয়াড-টিকার ভালো-মন্দ বিচার” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে আর  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। সেভাবেইপরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মোমেন শতভাগ ঠিক বলছেন

    মোমেন শতভাগ ঠিক বলছেন

    গৌতম দাস

    ১১ মে ২০২১

    https://wp.me/p1sCvy-3xc

     

    পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন-সহ আমাদের হাসিনা সরকারের নিশীথ ভোট বিষয়ক সমস্যা আছে সবাই জানি। এছাড়া এমনই আরো অনেক সমস্যা ছাড়াও এর উপর এসে পড়েছে লাভে টিকা কিনতে গিয়ে ঠগের পাল্লায় পড়ে  পাবলিকের সামনে সরকারের ইজ্জত খোয়ানো! ভারতের টিকা নিলে নাকি রথ দেখা কলা বেচা দুটাই হবে, ঠগের দেখানো নগদ এমন লাভের লোভে পড়ে এখানে সরকারের চরম বেইজ্জতি অবস্থায় পড়েছিল।

    মূল বেইজ্জতিটা অবশ্য ছিল এই যে, এরপর সরকারের হাতে কোন ব্রান্ডেরই কোন টিকা নাই, কোন উতপাদনকারি-দাতা নাই।   যদিও ক্ষুন্ধ চীন আছে কিন্তু ‘সরি’ বলে তার গালমন্দ শুনে হলেও রাগ ভাঙাতে পারতে হবে! এককথায় কোন ভায়াবল সোর্সই নাই, ছিল না দুনিয়াতে যে নতুন করে সরকারের টিকা সরবরাহকারি হতে পারে। তাও যখন আবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসে গেছে। বিরাট গল্পে গগন ফাটিয়ে দেয়া ভারত গ্লোবালি সবাইকে টিকা দিবে, টিকা কূটনীতি করবে – কিন্তু শেষে গোমুত্র এর উপর ভরসাকারি ভারত হয়ে গেল সে।

    এই ভন্ড ভারত, দেখা গেল আমাদেরকে দূরে থাক, শুধু ভারতের সব পাবলিক সবার জন্য টিকা উতপাদনেরই অযোগ্য। কারণ তার কারখানার সেই উতপাদন ক্যাপাসিটিই শুরু থেকেই নাই ছিল না। অথচ সবাই মোদীর চাপাবাজিতে বিশ্বাস করেছিল। সেরাম কোম্পানির মূল ও মোট উতপাদন ক্যাপাসিটি কত তা কেউ চেক করে নাই। ফলে তারা আগাম বাংলাদেশের টাকা নিয়ে নিজ কারখানার উতপাদন ক্যাপাসিটি বাড়িয়েছে ঠিকই কিন্তু আমাদেরকে টিকাও দেয় নাই,  আমাদের টিকা নিজেরা ব্যবহার করেছে।  আবার টাকাও ফেরত দেয় নি। আমাদের সরকার কমপ্লিট প্রতারিত অবস্থায়!

    বলা যায়, হাসিনাকে গত ১৪ বছরে বহুবার চীনের সাথে নানান ইস্যুতে ডিল করতে হয়েছে, করতে পেরেছেন কিন্তু কখনও এত নিচা নামতে হয় নাই। নিচে ঝুকে কথা বলতে হয় নাই। এবার হয়েছে। কারণ বাস্তবত দুনিয়াতে বাংলাদেশের জন্য চীনই একমাত্র সমাধানদাতা অবশিষ্ট ছিল । চীন নিশ্চিত করেছে আমাদের টিকার প্রাপ্যতা ও সাথে বিনিয়োগ, টেকনিক্যালিটি ইত্যাদি যা যা লাগে সব যোগাড় করে দিবে। মনে হচ্ছে হাসিনার ইজ্জত চীন রক্ষা করে দিতে যাচ্ছে। হাসিনার কাছে এর চেয়ে বড় পাওনা আর কী!

    তবু সর্বশেষ, ঘটনার শেষের দিক থেকে বলা শুরু করলে বলতে হয়, কয়েক ঘন্টা আগে সাংবাদিক সম্মেলনে মোমেন বাংলাদেশের মিডিয়া্র কূটনীতিক জগতকে একটা ভাল শিক্ষা দিয়েছে। একেবারে তুলে আছাড় মেরে দিয়েছেন। কারণ কেউ কোন দেশ কোনদিনই বাংলাদেশকে কোয়াডে যোগ দিতে অফার করে নাই। কোয়াড নিজেই যে ম্যাচুরিটিতেই এখনও যায় নাই, তাই।  এই কঠিন সত্যির খবর না নিয়েই আমরা ……।

    অতএব এসব কথিত সাংবাদিক-কূল তার সামনে  কতটা নাদান তাই তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন।  হয়ত এই শিক্ষা তাদের জন্য পাওনা ছিল। এটা ইতিবাচক হবে। এখন তিনি যদি দয়া করে একটা ইস্কুল খুলেন আর মিডিয়ার সম্পাদকেরা যদি তাদের কথিত কূটনীতিক কর্মিদের সেখানে পড়তে পাঠান তাহলে মনে হয় আমরা সবাই একটা রাস্তা খুজে পাব! পেতেও পারি!

    খুব অল্প কথায় বললে, প্রথম আলো ও তার রিপোর্টার প্রথম থেকেই দাবি করেছিল, “যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ভারতসহ চারটি দেশের কৌশলগত অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তা সংলাপ বা কোয়াড নিয়ে চীন তার উদ্বেগের কথা” – এটাই নাকি বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে চীন জানাতে এসেছিল। চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ২৭ এপ্রিলে বাংলাদেশে কয়েক ঘন্টার সফরে নাকি তাই ঘটেছিল।
    যদিও প্রথম আলোর ঐ রিপোর্ট পড়ে মনে হয় নাই যে “কোয়াড কী” সে সম্পর্কে রিপোর্টার  জানেন বা খবর রাখেন।
    যেমন ধরেন, ১। কোয়াড নিজেই কী এতটুকু সংগঠিত যার অন্তত একটা নিজস্ব ফাংশনাল সেক্রেটারিয়েট আছে?.জবাব হল – এটা অতদুরে সংগঠিত পারে নাই এখনও। কেবল বাইডেন আসার পর এই প্রথমবার কোয়াড এক যৌথ বিবৃতি দিতে সক্ষম হয়েছিল। অথচ কোয়াডের জন্ম নাকি ২০০৭ সালে, কেউ বলে এরও আগে।
    ২। কোয়াড কী সামরিক জোট না বাণিজ্যিক না স্টাটেজিক – না কি সবকিছু? এই ব্যাপারটা কী চাররাষ্ট্রের মধ্যে সেটেল্ড? তারা নিজেরা কথা শেষ করতে পেরেছেন নিজেদের মধ্যে?  না, বরং এটা একেবারেই অনালোচিত। ফলে একটা সিদ্ধান্তে আসা দূর কা বাত। আর এটা সামরিক জোট হতে চাইলে ভারত সম্ভবত সবার আগে বের হয়ে যাবে, সেই সম্ভাবনা আছে।
    ৩। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কোয়াড রাষ্ট্রগুলো কী নিশ্চিত তারা এই জোটকে বাড়াবে, মানে পঞ্চম কোন রাষ্ট্রকে ভিতরে নিবে? জবাব হল, তারা নিজেরা চারজনই যেখানে নড়বড়ে কে কতটুর থাকে ঠিক নাই, আবার কোয়াড নিজেই অস্পষ্ট যে সে কতদুর যেতে চায় সেখানে পঞ্চম রাষ্ট্রের যোগদান নিয়ে আলাপ কোথা থেকে হবে? এমন কথা বলার মানে এরা তো মফস্বলি সাংবাদিক হওয়ারও যোগ্য না।
    তাহলে একেবারেই কী বাংলাদেশকে কেউ কোয়াড নিয়ে অফারই করে নাই? হা ঠিক তাই। মোমেন শতভাগ ঠিক বলছেন। “যে প্রতিষ্ঠানের (কোয়াড) কথা বলেছেন, সেই প্রতিষ্ঠানের লোকজন আমাদের কাছে এখনও অ্যাপ্রোচই করে নাই”। তাহলে?

    কোয়াড নাকি ইন্দো-প্যসেফিকঃ
    এমনিতেই ইন্দো-প্যসেফিক নিয়ে জোট বা আরেক উদ্যোগ যেটা আছে ওর সাথে আবার এই কোয়াডের সম্পর্ক কী তা স্পষ্ট নয়। এখনও পরিস্কার করে নাই তারা কেউ। আর গত বছর ট্রাম্পের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্তিফান বিগান অক্টোবরে যে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন তখন ইন্দো-প্যসেফিক উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার জন্য অফার করতে পারে বলে কথা শোনা গিয়েছিল। কিন্তু বিগান ঢাকার পৌছানোর আগের দুদিন ধরে মন্ত্রী মোমেন মিডিয়ায় যে কামান দেগেছিলেন সেটা থেকে সবকিছু আমাদের বুঝতে পেরে যাওয়া উচিত। তিনি আমেরিকাকে উদ্দেশ্য করে মিডিয়ায় বলেছিলেন – (অ্যামেরিকার স্তিফান এসে অফার দিলেও) আমরা কোন সামরিক জোটে যেতে পারব না, অস্ত্র কিনতে পারব না। কেবল অবকাঠামো খাতে যদি ঋণ দিবার মুরোদ থাকে (যা অ্যামেরিকার নাই) তাহলে কিছু আলাপ হতে পারে। এই ছিল তার সার কথা। আমার পুরান লেখায় দেখতে পারেন।  এভাবে সরাসরি আর ফ্লাট এক অবস্থান আর প্রকাশ্যে তা মুখের উপর টাঙিয়ে রেখেছিলেন তিনি।

    তাহলে কী অ্যামেরিকার সাথে “ব্যাপারস্যাপার” বলে বাংলাদেশের কী কিছুই ছিল না, নাই? হা, অবশ্যই আছে। মূল কথায় তা হল,  বাস্তবতা হল গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হিসাবে আমেরিকা হেরে যাচ্ছে চীন উঠে আসছে। এই পটভুমিতে আমেরিকা-চীনের দ্বন্দ্বে কোন কোন রাষ্ট্র চীনকে ফেলে আমেরিকার পক্ষে যাবে এরই একটা ভাসা ভাসা জোটের ধারণা অবশ্যই আছে। ভাসা ভাসা বলছি এজন্য যে জাপান, অষ্ট্রেলিয়া ও ভারত এই তিন রাষ্ট্রই এখনও চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্কের ইস্যুতে চীনকে একেবারেই ত্যাগ করে ফেলে আসতে রাজী তা একেবারেই না। তারা কেউ সিদ্ধান্ত নেয় নাই, নেওয়াটা বাস্তবেও খুবই কঠিন। বরং বলা যায় “অ্যামেরিকার দিকে চললাম” এমন সম্ভাবনার কথা ঝুলিয়ে রেখে এটাকে প্রচ্চন্ন হুমকির মত ব্যবহার করে তারা চীনের বিরুদ্ধে অ্যামেরিকার দিকে বা ভাইসভারসা উলটা আমেরিকার থেকে আরো বাণিজ্য বা অন্য-সুবিধা আদায়ের পক্ষপাতি। এবং তা পেলে একেবারেই অ্যামেরিকাকে হাত ছেড়ে চীনের সাথেও জুড়তে পারে। সে সম্ভাবনাও বাদ দেয়া যায় না।

    আবার কোয়াড সামরিক জোটে রূপ নিতে গেলে সবার আগে ভারত বের হয়ে যাবে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে এখন আমেরিকা, চীন আর ভারত তিনপক্ষ যার যার নিজের অবস্থানের পক্ষে একা দাড়ানোর দিকে পরিস্থিতি যাচ্ছে। মূল কারণ আমেরিকান   সেভেন্থ ফ্লিট বঙ্গোপসাগরে মোতায়েনের ইচ্ছা। তাহলে ইন্দো-প্যসেফিক বা কোয়াড – কিসের কী? তা আর থাকে বা টিকে থাকে কোথায়?

    এছাড়া আরো কিছু মুখ্য তথ্য হল, শেখ হাসিনার অবস্থান তো লুকানো নয়। ২০১২ সালের পর থেকে হাসিনা আর কখনও অ্যামেরিকার প্রশাসনের সাথে কোন ডিল বা বিশেষ সম্পর্কে যান নাই এবং সম্ভবত কখনও যাবেন না। কারণ তিনি তাদের উপর আস্থা রাখেন না, বিশ্বাসভঙ্গকারি মনে করেন। তবে অবশ্যই হাসিনা এসব কথা লিখে  উচ্চারণ করে বলেন নাই, কাজে বুঝিয়েছেন। যেমন স্তিফান বিগানের সফরে!

    এখন উপরে ধারাবাহিকভাবে যেসব খবরের কিছু লিখলাম সেসব খবরগুলো যিনি রাখেন নাই, যা লুকানোও নয়, – এখন আপনারাই বলেন তার কী কূটনীতিক পাড়ায় থাকা উচিত। এককথায় বাংলাদেশকে কোয়াডে যোগ দিবার প্রসঙ্গই যেখানে নাই, আতাপাতাও নাই সেখানে প্রথম আলোর চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বরাতে এতসব দাবি করার অর্থ কী? যদিও আপনারা বাংলাদেশ,  আমেরিকা-ভারতের দিকে চলে যায়েন না – টাইপের  আবছা কথাবার্তা তো হতেই পারে। যদিও মনে হয় না, তা আনুষ্ঠানিক কিছু হবে না। কারণ মূলকথা এর কিছুই  এখনও ম্যাচুইরিটি পায় নাই।

    তাহলে চীনা রাষ্ট্রদুত কোয়াড নিয়ে এত কড়া কথা বললেন কেন?
    বলেছেন এজন্য যে পড়ে পাওয়া সুযোগ দেখেছেন, তাই। আর তার তা এবার তুলে নিলে চীনের  লাভ দেখেছেন, তাই।
    যেমন আমাদের সাংবাদিকেরাই নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ নাকি কোয়াডে ঢুকার অফার-দাওয়াত পেয়েছে। এটা ধরে নিয়ে তারা সব কথা বলে গেছেন। যদিও বাস্তবত আসলে এটা যদি টাইপের কথা।  কথাটা বায়োবীয় হয়, মানে যদির কথা নদির পাড়ের হয় তাহলে এই সুযোগে দুটা কথা বলার সুযোগ চিনা রাষ্ট্রদুত দেখবেন তো  নিবেনই না কেন! যেমন চীনা রাষ্ট্রদুত বলল ধরেন, দেখেন টিকা নিয়ে ভারত আপনাদের প্রতারিত করেছে। কাজেই  আপনারা বাংলাদেশ  কিন্তু, আমেরিকা-ভারতের দিকে যায়েন না – এটাইপের আবছা কথাটা যদি তিনি এই সুযোগে স্পষ্ট করে বেটার বলতে পারেন যে – কোয়াডে যোগ দিলে বাংলাদেশের সাথে চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কটা ক্ষতিগ্রস্থ হবে (কথাটা সত্যিও বটে); তো রাষ্ট্রদুত সেসুযোগ নিবেন না কেন?  কারণ, মনে রাখবেন চীনা রাষ্টদুত নিশ্চিত করছেন না যে আমরা কোয়াদে ঢুবার অফার পেয়েছি কী না। এটা নিশ্চভিত করছি আমাদের সাংবাদিকেরা……; রাইট! কাজেই এতে রাষ্ট্রদুতের দায় কী?
    এককথায় বোকা সাংবাদিকেরা অজান্তে চীনা রাষ্টদুতকে সুবিধা করে দিয়েছেন আর তিনি তা নিয়েছেন!

    আবার সাংবাদিকেরা যদি মনে করেন চীনা রাষ্ট্রদুতের মুখ থেকে এইকথা বের করে দিয়ে অ্যামেরিকার কোন বিশাল লাভ করে দিয়েছেন তারা তাহলে সেটাও ভিত্তিহীন ধারণা। কারণ আমেরিকানদের এসব কথা অজানা থাকার কোন কারণ নাই!

    তাহলে?

    তাহলে ইস্কুলে যান!

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

  • গ্লোবাল বাণিজ্য, আইএমএফ ও ট্রাম্পের ডি-কাপলিং

    গ্লোবাল বাণিজ্য, আইএমএফ ও ট্রাম্পের ডি-কাপলিং

    গৌতম দাস

    ১৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3id

     

     

    Washington is pressing for a post-pandemic decoupling from China

    আমেরিকার এবার নভেম্বর ২০২০ নির্বাচন সমাপ্ত এবং ফলাফল অনানুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়েছে। তাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হারিয়ে জো বাইডেন বিজয়ী হতে যাচ্ছেন জানা গেছে। তবে ফলাফল নিয়ে নানা রাজ্যের যেসব আপত্তি এর নিষ্পত্তি এখনো শেষ হয়নি। তবে সবাই প্রায় মেনে নিয়েছেন, বাইডেনই আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী ঘোষিত হবেন। গ্লোবাল মিডিয়াতে বাইডেনকে নামের আগে রীতি অনুযায়ী “প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট” [President-Elect] শব্দ যোগ করেই পরিচিত করানো হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বড় কথা, বাইডেন তাঁর হবু নতুন সরকারে মানে আমেরিকান ভাষায়, বাইডেন প্রশাসনে কাদেরকে মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা প্রধান কর্মকর্তা করবেন এই বাছাইও শুরু হয়ে গিয়েছে। বেছে নেয়া ব্যক্তিদের নাম ক্রমেই সামনে আসছে।

    হবু বাইডেন প্রশাসনে তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ পদ “সেক্রেটারি অব স্টেট” বা আমাদের ভাষায় “পররাষ্ট্রমন্ত্রী”। এক হিসাবে এটা প্রশাসনের দ্বিতীয় প্রধান গুরুত্বপূর্ণ পদ। এই পদে বাইডেন যে নাম বেছে নিয়ে ঘোষণা করে দিয়েছেন তিনি  এন্টনি ব্লিঙ্কেন [Antony John Blinken]। হার্ভার্ডের গ্রাজুয়েট ব্লিঙ্কেন এর আগে ওবামা আমলে একসময় উপ-নিরাপত্তা মন্ত্রী (২০১৩-৫) আর উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী (২০১৫-৭) হিসেবে কাজ করেছেন। অর্থাৎ বাইডেন তখন উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন বলে তার সাথে কাজ করেছেন। অনুমান করা হচ্ছে, সেসব সূত্রে ব্লিঙ্কেন এবার হবু বাইডেন প্রশাসনে বাছাইয়ে টিকেছেন।

    এদিকে ট্রাম্পের আমলেই একটা নতুন শব্দ চালু হয়েছিল ‘ডি-কাপলিং’ [decoupling]। ইংরেজি ‘ডি-কাপলিং’ শব্দের অর্থ কঠিন কিছু নয়, আমাদের প্রায় পরিচিত। এটা আসলে কাপলের [couple] উল্টা শব্দ। কাপল শব্দের একটা অর্থ, দম্পতি (স্বামী-স্ত্রী)। মানে, কারো সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হয়ে যাওয়া। আর এরই উল্টা শব্দ হল, ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করা বুঝাতে ডি-কাপলিং। ট্রাম্পের আমলে শেষের দিকে এই শব্দটা ব্যবহার করে বলা হত যেমন,  ট্রাম্প চীনকে ডি-কাপলিং করার নীতি নিয়েছে। মানে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যবসাবাণিজ্যের সম্পর্ক থেকে চীনকে আলাদা করে দূরে বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাচ্ছেন ট্রাম্প, চীনের সাথে তাঁর বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে। যেমন, যেসব আমেরিকান কোম্পানি চীনে গিয়ে ফ্যাক্টরি গড়ে তুলেছে তা স্থানান্তর করে আমেরিকায় ফিরিয়ে না আনলেও চীনের বাইরে অন্য দেশে নেয়ার পরিকল্পনা করেছেন। আর তাতে ওই স্থানান্তরের খরচও ট্রাম্পের সরকার বহন করবে। এই ছিল,  ট্রাম্পের ডি-কাপলিং। এমনকি এই প্ররোচনায় জাপান এগিয়ে এসেছিল। অবশ্য যুক্তি দিয়েছিল যে, চীনের ‘ভাইরাস’ থেকে বাঁচতে এটা সে করছে। যদিও কোনো এন্টারপ্রাইজ বা বড়  কোম্পানির ক্ষেত্রে এমন স্থানান্তর খুবই রুটিন। আর তা মূলত যে কারণে সাধারণত হয়ে থাকে তা হল, ফেলে আসা দেশে ন্যূনতম মজুরি তুলনায় অনেক বেড়ে যাওয়া। অথবা উল্টা করে বললে, নতুন কোন দেশ পাওয়া গেছে যেখানে ন্যূনতম মজুরি অনেক কম এবং অবকাঠামোগত সুবিধা অনেক ভাল, প্রশাসন দক্ষ চটপটে ইত্যাদি। আর এমন পাওয়া যায় বলেই ফ্যাক্টরি স্থানান্তর করা হরহামেশাই হয়ে থাকে। যেমন জাপান বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে বাংলাদেশের এক সিগারেট কোম্পানি কিনে বাংলাদেশের সিগারেট ব্যবসায় ঢুকে গেছে অনেকটা এমনভাবেই। যদিও এখানে ব্যাপারটা ঠিক মেশিনপত্র নয়, পুঁজি স্থানান্তর করে। আর বিপরীতে, ট্রাম্পের ‘ডি-কাপলিং  ব্যবস্থাটার কথা বলা হয়েছিল এর উদেশ্য ছিল, চীনকে একঘরে করা, চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধের অংশ হিসেবে।
    কিন্তু হবু পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন ইতোমধ্যেই ডি-কাপলিং প্রসঙ্গে তার শক্ত বিরোধী অবস্থান জানিয়ে বলেছেন, “ডি-কাপলিং করা এক অবাস্তবচিত ও উল্টা ফল দেবে এমনটা কাউন্টার-প্রডাকটিভ ধারণা” […।decoupling is ‘unrealistic’ and ‘counterproductive’; it also wouldn’t work]।’ এ নিয়ে তিনি আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স-এ  বক্তৃতাও করেছেন।

    গ্লোবাল বাণিজ্যঃ
    ‘গ্লোবাল বাণিজ্য’ [Global Trade] শব্দটা শুনলে বিরাট দুনিয়াব্যাপী কোনো ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটা একেবারেই দূরের কিছু না। এখানে বাণিজ্য মানে লেনদেন; অর্থাৎ আপনি আপনার পণ্য দিবেন আর অন্যের পণ্য নিবেন। কিন্তু না, অনেকের মনে হতে পারে এর আরেকটা মানে আছে। সেটা হল, বাণিজ্য মানে পণ্য দিয়ে মুদ্রা নেবেন। হ্যাঁ, এই কথাও ঠিক; তবে এটা পুরো ঘটনার অর্ধেকটা। আপনি পণ্য দিয়ে যে মুদ্রা নিয়ে ফিরলেন এরপরে সেই মুদ্রা দিয়ে আবার অন্য পণ্য বা কাঁচামাল কিনবেন। মানে, কিনতে হবে আপনাকে; খুব স্বাভাবিক। যেটা শেষ বিচারে পণ্য বেচে আরেক পণ্য কেনার ঘটনায় গিয়ে দাঁড়াবে। একারণে বাণিজ্য মানে, পণ্য লেনদেন। এটাই পণ্য কেনাবেচা মানে বিনিময়, ইংরেজিতে এক্সচেঞ্জ [exchange]। তাই গ্লোবাল বাণিজ্য মানে একটা গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ, দুনিয়াব্যাপী পণ্য বিনিময়।
    কথাগুলো ধারণা হিসেবে অবশ্যই ঠিক আছে, তবুও একটা বিষয় এতে আড়ালে থেকে গেছে, সেটাকে সামনে আনতে হবে। সে বিষয়টা হল মুদ্রা। পণ্য কেনাবেচা করতে গেলে মুদ্রা লাগবে। এর সাথে কথা আরো আছে। পকেটে পর্যাপ্ত টাকা থাকলে আপনি বাংলাদেশের যেখানেই যান যেকোনো পণ্য কিনতে পারবেন। টাকার বিনিময়ে বিক্রেতা আপনাকে পণ্য দিবে। তবে আবার সেই কিছু ‘কিন্তু’ও এখানে আছে সাথে! বাংলাদেশের সীমান্ত পার হলে কী হবে? না, এইবার আর কেউ আপনাকে কোন পণ্য বেচবে না। কারণ আপনার হাতে বাংলাদেশের মুদ্রা, তাই বাংলাদেশের ভেতরে থাকলে যেকোনো বিনিময় সম্ভব হলেও সীমান্ত পার হলে কিন্তু আর ওই মুদ্রা চলবে না। প্রত্যেকটা স্থানীয় মুদ্রার সীমাবদ্ধতা হল এটাই; দেশের সীমানা পার হলে ওই মুদ্রায় কোন বাণিজ্য, পণ্য কেনাবেচা বা বিনিময় আর চলে না। তাহলে?
    দেশের বাইরেও বাণিজ্য বা বিনিময় করতে চাইলে এবার প্রয়োজন “আন্তর্জাতিক মুদ্রা”। এমন এক মুদ্রা, যা দেশের সীমানা পার হয়ে গেলেও যেকোনো দেশেই ওই মুদ্রায় পণ্য বাণিজ্য বা বিনিময় বিক্রেতারা তখনও করবেন। তাই এবার সোজা বলা যায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রায় যে বাণিজ্য সম্পন্ন করা যায় তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। এটাকেই গ্লোবাল বাণিজ্যও বলে। বাংলাদেশের বাইরের সাথে কোনো কিছু বেচাকেনা, বাণিজ্য করে আসা – এটাই গ্লোবাল বাণিজ্য। আমাদের সীমান্তের বাইরের ভারত থেকে কোনো কিছু বাণিজ্য করে আসাও তাই গ্লোবাল বাণিজ্যের অংশ। কাজেই “গ্লোবাল বাণিজ্য” বলতে সুদূরের কোন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের সীমান্ত পার হলেই এর শুরু।
    এখন “আন্তর্জাতিক মুদ্রা” আবার কী? গ্লোবাল বাণিজ্য মানে বুঝেছিলাম তা আদতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য বেচাকেনার বাণিজ্য। আর এটাই সম্পন্ন করার একটা সিস্টেম বা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে যে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেটাই আইএমএফ। ফলে যেসব দেশের মুদ্রাকে আইএমএফ আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে স্বীকৃতি দিয়েছে (আইএমএফ এর টেকনিক্যাল শর্ত পূরণের কারণে), যে মুদ্রার বিনিময় হার (conversion rate) আইএমএফ নির্ধারণ করে দিয়েছে, এমন মুদ্রাগুলোই কেবল আন্তর্জাতিক মুদ্রা। যেমন এখন পর্যন্ত – ডলার, পাউন্ড, ইউরো, ইয়েন ও ইউয়ান আন্তর্জাতিক মুদ্রা। তবে মনে রাখতে হবে এগুলো কিন্তু একই সাথে প্রধানত দেশীয় মুদ্রা বা নিজ নিজ দেশের স্থানীয় মুদ্রা যাকে আবার ‘ডাবল রোল’ হিসেবে কাজ করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রারও স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
    এখন এতে দুনিয়াতে যে বিরাট পরিবর্তন এসেছে তা হল – একটা ‘গ্লোবাল অর্ডার’ বা নিয়ম-শৃঙ্খলার ব্যবস্থাপনা চালু হয়ে গেছে যার কারণে আমরা নিজ দেশের ভেতরের মতই দেশের বাইরেও বাণিজ্য-বিনিময় বা গ্লোবাল বাণিজ্য সহজেই করতে পারি। এবং তা কবে থেকে? গত ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্মের পর থেকে।

    কিন্তু এ তো গেল ইতিবাচক দিক। এবার নেতিবাচক দিক থেকে দেখা যাক। যেমন ইরান কোন কোন দেশের সাথে বাণিজ্য করতে পারবে বা আদৌ কারো সাথে পারবে কি না এটা ডিকটেট করার ক্ষমতা এসে গেছে আমেরিকার হাতে। এই ক্ষমতাটা যদিও পড়ে পাওয়া। মানে আইএমএফ এটা জেনেশুনে দিতে চেয়েই দিয়েছিল ব্যাপারটা এমন নয়। এটাকেই আমরা ইরানের ওপর আমেরিকার “অবরোধ” [Sanction] বলে জানি। অবরোধ – মানে ইরান নিজদেশের বাইরের কারো সাথে বাণিজ্য করতে পারবে না। কিন্তু এটা আমেরিকা কার্যকর করে কী করে? ের জবাবের আগে একটা কনসেপ্ট পরিস্কার করে নেই। আমেরিকার যে অবরোধ দেয় তা আইএমএফ-এর অনুমোদনে প্রাপ্ত কোন ক্ষমতা নয়, বরং আমেরিকা নিজ ক্ষমতাতেই এটা আরোপ করে থাকে। কিন্তু ইরান সেটা মানতে বাধ্য হয় কেন? সোজা। আমেরিকার ‘অবরোধ’ কথার প্রাকটিক্যাল মানে হল, যেন আমেরিকা বলছে, ইরান তুমি কোন কেনাবেচা ডলারে করতে পারবে না; মানে, ইনভয়েসে মূল্যটা “আমেরিকান ডলারে” তা লিখতে পারবা না। করলে কী হবে, আমেরিকা বাধা দেবে কিভাবে? ইনভয়েসে বা বিলে ডলারে দাম লেখার মানে হল, ঐ কেনাবেচা সম্পন্ন করতে গেলে ক্রেতার ব্যাংক আর বিক্রেতরা ব্যাংকের লেনদেনের মাঝখানে একটা আমেরিকান ব্যাংকের সাহায্য-সহায়তা লাগবেই। না হলে কেনাবেচায় মূল্যের অর্থ-স্থানান্তর ঘটানো যাবে না। আর ট্রাম্প তাঁর দেশের ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন যে, “যেসব দেশ বা ব্যক্তিকে অবরোধ তালিকায় ফেলেছি এদের দেশের কোনো কোম্পানির  অর্থ ছাড়ে তোমরা জড়িত হবে না, হলে ঐ আমেরিকান ব্যাংককেই আমেরিকা-রাষ্ট্র বিলিয়ন ডলারের জরিমানা করবে”। এভাবেই অবরোধ কার্যকর করেছে আমেরিকা। এই এক পড়ে পাওয়া বিশাল ক্ষমতা আমেরিকান হাতে আছে বা এসে গিয়েছে, সেই থেকে।

    ডি-কাপলিংঃ
    তাহলে ট্রাম্পের চীনের সাথে বাণিজ্যযুদ্ধে “চায়না ডি-কাপলিং” এই প্রোগ্রামের আসল মানে কী? মানে হল, চীনকে একঘরে করা। যেটা আরও পরিস্কার করে বললে, চীনকে বাদ দিয়ে বাকি দুনিয়ার যত বেশি দেশ পাওয়া যায় এমন সকলকে নিয়ে আগে যেমন আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়ে ছিল  যেন সে অবস্থাটাই ফিরে এসেছে বলে ট্রাম্পের সুখবোধ ফিরে পাবার এ’এক বাসনা!  তবে এটা বাসনাই! মূল কারণ এই শতকের শুরু থেকেই চীন হল সেই রাষ্ট্র যার হাতে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সারপ্লাস সঞ্চিত হওয়া শুরু হয়েছে। যার অর্থ চীনই এখন আমাদের মত বা এর চেয়েও ভাল অর্থনীতির রাষ্ট্র এমন যাদেরই আবার বিদেশি বিনিয়োগ-পুঁজি খুবই দরকার তাঁদের চীনকে খুবই দরকার। এছাড়া চীনের উঠতি বিশাল বাজার সেটাও আকর্ষণীয়। অতএব ট্রাম্প তো ফেল করবেন; করছেনও। কারণ এই জায়গায় এসে আমেরিকা আর চীনের বিকল্প বা প্রতিদ্বন্দ্বি কোনটাই একেবারেই নয়। একারণে অষ্ট্রেলিয়া বা এমনকি জাপান যারা ট্রাম্পের হামবড়া বাতের কোয়াড [QUAD] জোটের দুই মাতবর; এই তারাই আবার চীনের নেতৃত্বের RCEP বাণিজ্য জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটলে সেখানে সবার আগে নাম লিখায়। সাথে দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড ভিয়েতনাম কেউ বাইরে বাকি থাকে নাই।

    যদিও বাস্তবত ট্রাম্প ব্যর্থ হয়েছেন তবু এমন ঘোষিত নীতিটা এখনও বর্তমান। তাই এই ‘একঘরে’ করতে চাইলে মানে আসলে ঠিক কী হত? আমাদের গ্রাম-সমাজের প্রেক্ষিতে একঘরে মানে ওর নুন, পানি বন্ধ করে দেয়া; আর ওর সাথে কেউ কোনো পণ্য বিনিময় করবে না যার ব্যবহারিক মানে ‘নো এক্সচেঞ্জ’! ওকে সমাজ থেকে বের করে দেয়া; সেক্ষেত্রে যদিও সে আগের বাড়িতেই বসবাস করবে, তারপরেও। কেমন করে এটা ঘটানো সম্ভব হবে? কারণ, ওর সাথে পণ্য বিনিময় না করা মানে, ও যে লবণটা খাবে সেটাও তাকে নিজেই সমুদ্রের পানি জোগাড় করে শুকাতে হবে, না হয় লবণের খনি জোগাড় করতে হবে এবং তা নিজেই। তাতে সমুদ্র হাজার মাইল দূরে বা লবণের খনি খুঁজতে পাকিস্তানের সিন্ধুতে যেতে হতে পারে। মূল কথায়, যা কিছু সে ভোগ করবে তার সবটার ‘উৎপাদক’ তাকে নিজেই হতে হবে। নইলে তা ভোগ করা যাবে না, ভোগ নাই! ‘নো এক্সচেঞ্জ’ কথার মানে তাই। এখান থেকেই ‘সমাজ’ কথাটার মানে কত বিশাল সে হুঁশ আসতে পারে আমাদের। আমরা যারা যারা পণ্য বিনিময় করি-জড়াই তারা এই কাজের মাধ্যমে আসলে একটা সমাজ গড়ে তুলি, অজান্তেই। সমাজ মানে তাই এক অর্থে পণ্য বিনিময়কারীদের সমাজ, পরস্পরকে স্বীকৃতি দেয়ার সমাজ। এমনকি এভাবে ‘আন্তর্জাতিক সমাজ’ও। অর্থাৎ চীন যেখানে আমেরিকার বদলে নয়া গ্লোবাল নেতা হবার সবগুণ সম্পন্ন হয়ে উঠছে সেখানে ঐ চীনকেই একঘরে করার চিন্তা? এটা ট্রাম্পের একটা ফাজলামো ছাড়া আর কিইবা বলা যায়!

    জাতিবাদী সমাজঃ
    আর গ্লোবাল পণ্য বিনিময়কারীদের সমাজ ঠিক এর উল্টা অর্থ সেটাই হল “জাতিবাদী সমাজ”। সে জন্য জাতি-রাষ্ট্র বা বিদেশবিরোধীতা কথাটার অর্থ এখানেই। তত্ত্ব অনুযায়ী (তত্ব বলেছি কারণ বাস্তবে এমনটা দেখা যাবে না; অলীক) এসব জাতিবাদী দেশে সবকিছুই নিজেরাই দেশের ভিতরে উৎপন্ন করার কথা। জানি একথা শুনে অনেকেই খুশিতে পুলকিত হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু না ঘটনাটা হবে উলটা! তত্ত্বীয়ভাবে বললে এরা আমদানি-রফতানি কোনটাকেই না বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তারা তা অপছন্দ করে। কিন্তু বাস্তবতা এর উলটা।
    নরেন্দ্র মোদী সাহেব কট্টর হিন্দুত্ব জাতিবাদী। তিনি জাতিবাদী সমাজের প্রবক্তা। বক্তৃতায় সবসময় আত্মনির্ভর, স্বদেশী দেশপ্রেমিক টাইপের কথা তুলে বক্তৃতা করবেন এরা। কিন্ত সেই মোদী সীমান্তে চীনের হাতে মার খেয়ে চীনা-পণ্য বয়কটের হুঙ্কার দিয়েছিল। অর্থাৎ আগেই যেমন চীনা-পণ্য আমদানি করতেন, কোন কোন পণ্য ৯০% পর্যন্ত চীনা আমদানির, তেমনই তিনি আর করবেন না বলে হুঙ্কার দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টাটা, ভারতে চীনা পণ্যের আমদানি বেড়েছে। দেখুন, As Chinese imports boom, what happened to Modi’s ‘self-reliant’ India?
    এটাই মোদীর ‘আত্মনির্ভরশীল’ তবে ‘অলীক অর্থনীতি’। গত সপ্তাহে ভারতের নতুন পার্লামেন্ট বিল্ডিং নির্মাণ উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই আত্মনির্ভরশীল (তবে অলীক) অর্থনীতির গড়বেন [New Parliament building testament to Aatmanirbhar Bharat: PM Modi] বলে ‘চাপা মেরেছেন’।
    এখানে আরেকটা কথা পরিস্কার করে রাখা ভাল। এই জাতিবাদিরাই আবার নিজ দেশের বিদেশি পণ্য আমদানিকে খুবই অপরাধ বা নিচা চোখে দেখে থাকেন। এটাও অর্থহীন এবং এক মিথ্যা ধারনা-বুঝ। প্রথমত আমি আমদানি করতে পারি মানে আমার বৈদেশি্ক মুদ্রা যথেষ্ট আছে। অর্থাৎ অন্যকিছু পণ্য আমি উতপাদন ও রপ্তানি আমিই করি তবেই না ঐ মুদ্রা পাই। তাহলে এটা খারাপ কেন? যেমন আমরা গার্মেন্ট রপ্তানি করতে পারি মানে হল অন্তত একটা ধরণের পণ্য আছে যা উতপাদনে আমরা দক্ষ বলে সবার চেয়ে কম শ্রমে মানে দামি তা রপ্তানি করতে পারি। আর এরপরে ঐ প্রাপ্ত অর্থ দিয়েই আমরা অবশ্যই আমদানি করব,।কাজেই আমদানি মানেই নিচা বা খারাপ এমন ধারনা ভিত্তিহীন!

    ট্রাম্পের অবুঝ খায়েস ডি-কাপলিংঃ
    তামাশার কথা হল, ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছিলেন এমনই এক কল্পিত আমেরিকান জাতিবাদী অর্থনীতি গড়বেন বলে- ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নামে।
    ট্রাম্প সেই গত চার বছরে আবদার ধরে বসেছিলেন যে, চীন চাক বা না চাক তিনি চীনকে একঘরে রাষ্ট্র বানাবেনই। তবে এটা তো আসলে অলীক, এক খায়েশের কথা। আর বাস্তবে সেটা আসলে উল্টা। তিনি চীনবিরোধী হতে চান এমন বুঝা না বুঝা উসকানি-চুলকানি যাদের আছে এ ধরনের দেশগুলোর একটা আমেরিকান প্রভাবাধীন জোট বানিয়ে চীনকে তা থেকে আলাদা করে দিতে চান। এমনই কল্পরূপের কিছু নমুনা হল, ‘কোয়াড’ রাষ্ট্র গ্রুপ (ভারত, আমেরিকা, জাপান ও অষ্ট্রেলিয়া) বা হবু ইন্দো-প্যাসিফিক উদ্যোগ ইত্যাদি।
    আপাতত ট্রাম্পের হাত থেকে দুনিয়া বেঁচে নাজাত পাইছে, চায়না অথবা কোন দেশকে ডি-কাপলিং করা দুনিয়াকে আর দেখতে হচ্ছে না। কারণ ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে গেছেন। আর ব্লিঙ্কেনও দাবি করছেন, তিনি বুঝেছেন ডি-কাপলিং অবাস্তব। কিন্তু ধরা যাক, ট্রাম্প নির্বাচনে জিতলে কী হত?

    সত্যিকার অর্থে ‘কোল্ড-ওয়ার ২’ কী?
    এক কথায় বললে, ট্রাম্পের হবু পদক্ষেপে সেটাই হওয়ানোর চেষ্টা হত। ফলে যেন তা সম্ভাব্য সত্যিকার অর্থে ‘কোল্ড-ওয়ার ২’। যদিও এটা নিয়ে অনেকে এর আগে আন্দাজে ঢিল মেরেছেন। চীন ও আমেরিকার ঝগড়া-সঙ্ঘাত কখনও মারাত্মক হলেই লিখে দিয়েছেন ‘কোল্ড-ওয়্যার ২’ আসছে। কিন্তু না। ঠিক কোন শর্ত পূরণ হলেি কেবল ‘কোল্ড-ওয়্যার ২’ হতে পারে, সেটাই আমরা জানব এখন। তার আগে,  কোল্ড ওয়ার বলতে ঠিক কী বুঝব? গত ১৯৫৩-৯১ সাল, এই সময়কালে দুনিয়াটাকে সোভিয়েত-আমেরিকা এদের উভয়ের নেতৃত্বে দুইটা ব্লকে ভাগ করে নেয়া হয়েছি্‌ বা গিয়েছিল। কিন্তু শুধু দুই ব্লক-জোটরাষ্ট্রে দুনিয়া ভাগ করলেই সেটা কোল্ড-ওয়্যার বলে চালানোটা আনাড়িপনা হবে। তাহলে আর কী শর্ত লাগবে? সেটি হল, প্রথমত যদি একটা ব্লক-জোট ‘গ্লোবাল বাণিজ্যে’ অংশ না নেয়। নেয়ার যোগ্য না হয়। কিন্তু অংশ নেয় নাই তা বুঝব কেমন করে? এটা বোঝা খুবই সহজ। একেবারেই সহজ বুদ্ধিটা হল কোন রাষ্ট্র যদি আইওএমএফের সদস্যপদ না নিয়ে থাকে এর মানে তখন সে চাইলেও আর গ্লোবাল বাণিজ্যে যোগ দিতে পারবে না। তাই আমরা জেনেছিলাম সোভিয়েত ইউনিয়নের কখনই সদস্যপদ আবেদনই করে নাই। আর সাথে তার ব্লকের বেশির ভাগ রাষ্ট্রই এমন সদস্যপদ নেয় নাই। অথবা বাংলাদেশ  মত; যে নিয়েছে ১৯৭৩ সালে। কিন্তু ১৯৭৬ সালের শুরুরদিকের আগে তেমন কোন সক্রিয়তায় কোন কাজে লাগায় নাই। এভাবেই আমরা শেখ মুজিব জীবিত থাকতে ১৯৭৪ জুলাইয়ে দুর্ভিক্ষটা পর্যন্ত আমরা যেন সোভিয়েত ব্লকেই ছিলাম। আবার শেখ মুজিব নিজেই ১৯৭৪ সেপ্টেম্বর থেকে আইওএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সক্রিয়তা চাইতে গেছিলেন। তো, এদেরকেই  যারা কোল্ড-ওয়ারে জড়িয়ে গেছিল এমন দেশের ব্লক বুঝাতে চাচ্ছি।  এদের যারা যারাই আইএমএফের সদস্যই না হয় অথবা আগে হয়ে থাকলে এখন সদস্যপদ ত্যাগ করে – এটাই সবচেয়ে ভাল প্রমাণ যে এরা ‘গ্লোবাল বাণিজ্যে’ অংশ নেয় না। আইএমএফের সদস্যপদ ত্যাগ করা মানে, ওসব রাষ্ট্র আর ‘গ্লোবাল বাণিজ্যে’ অংশ নিতে পারবে না। ঠিক এমনটা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সোভিয়েত ব্লকের অনেক রাষ্ট্রের।
    কিছু বেজ ফ্যাক্টস বলে রাখি। আইএমএফের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৪ সালে আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটনউড শহরের এক হোটেলের ২২ দিনের সম্মেলনে, ৪৪ রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিয়ে। তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের মানে, জোসেফ স্টালিনের প্রতিনিধিও তাতে অংশ নিয়েছিলেন; কিন্তু এর জন্ম দলিল তৈরি করা সম্পন্ন হওয়ার পরে ফাইনাল সদস্যপদ নিয়ে যখন চাঁদা দিয়ে স্বাক্ষর করতে একটা দিন ধার্য হয়েছিল তখন থেকে কোনো সোভিয়েত প্রতিনিধি আর উপস্থিত হননি। তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন কখনই আইএমএফের সদস্য ছিল না। তবে  আইএমএফ ফাংশনাল হলে পঞ্চাশের দশকে সোভিয়েত ব্লকের অনেক সদস্যই যেমন- পোল্যান্ড এর সদস্যপদ পেতে আবেদন করেছিল। তাতে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক উভয়েই অনুমোদন করলেও আমেরিকান প্রশাসনের আপত্তিতে তা বাতিল হয়ে যায়। অতএব মূল কথাটা হল সোভিয়েত ব্লক-জোটের সাথে আমেরিকার নেতৃত্বে বাকিদের ব্লক-রাষ্ট্রের কোনো গ্লোবাল বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল না। তাই পণ্য বিনিময় বাণিজ্য সম্ভব ছিল না। এটাই যেকোন ‘কোল্ড-ওয়ার’ পরিস্থিতি আবার দেখা দিতে গেলে প্রধান শর্ত, যা আগে পুরণ হতেই হবে।

    কাজেই ট্রাম্পের স্বপ্ন একালে অধরা হয়ে থাকার সম্ভাবনাই ছিল প্রচুর। মূল কারণ এখন দুনিয়ার খুব কম রাষ্ট্রই আছে যে আর আইএমএফের সদস্য নয়। বিশেষ করে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও ভেঙ্গে আরো ১৫ রাষ্ট্রে পরিণত হবার পর থেকে এরা সকলেই আইএমএফের সদস্যপদ নিয়ে নিয়েছিল সেজন্য। আর ১৯৮০ সালে কমিউনিস্ট চীন আইএমএফের সাথে সম্পর্ক সক্রিয় করে ফেলার পর থেকে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য দেশের মধ্যে ১৯০ টা দেশই আইএমএফের সদস্যপদ নিয়ে নিয়েছে। এই অবস্থায় চীনকে আর একঘরে করা আরো অসম্ভব হয়ে গেছে। যে চীন দুনিয়ার হবু নেতা এবং পালটা নতুন করে পুরান আইএমএফের সংস্কার করে নিবার ক্ষমতা সম্পন্ন।  কাজেই ট্রাম্প আবার জয় লাভ করলেও আইএমএফ একটা বড় ঝাকুনি খেত হয়ত। কিন্তু তবু আইএমএফের সদস্যপদ সবারই থেকে যেত। ওদিকে সারা ইউরোপ ট্রাম্পের আমেরিকার উপর ১৯৪৫ সালের পরে এই প্রথম আস্থা হারিয়েছিল যেটা আর ফিরে আসত না। যেমন এর উল্টাটা, সেই আস্থা আবার কতটা ফিরে পাওয়া যাবে সেলক্ষ্যে বাইডেন ঝাপিয়ে পড়ে কাজ করার পরিকল্পনা নিচ্ছে্ন এখনই।

    তাই  একালে বাইডেনের হবু প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, ডি-কাপলিং ‘অবাস্তব’ ও ‘কাউন্টার-প্রডাকটিভ’। কথাটা অনেক তাৎপর্যপূর্ণ; যদিও এর মানে বাইডেনের আমলে চীন ও আমেরিকার মধ্যে আর কোনো সঙ্ঘাত থাকবে না  – না সেটারও কোন সত্যতা নাই, এর একেবারেই সত্যি নয়। মূল বিষয়, একই গ্লোবাল বাণিজ্য সমাজে সবাই থাকছে কি না। আর একই বাণিজ্য সমাজে আর যদি কখনও না থাকে একমাত্র সেক্ষেত্রেই যেটা হতে পারে ‘কোল্ড-ওয়ার ২’ পরিস্থিতি। কাজেই না-বুঝ ‘কোল্ড-ওয়ার ২ বলে এ নিয়ে আলাপ তোলা বন্ধ করাই ভাল। আর উল্টাটা যদি চীন-আমেরিকা একই বাণিজ্য সমাজে যদি থাকে, তবেই দুনিয়া ফান্ডামেন্টালি ঠাণ্ডা থাকবে!‘ বলাই বাহুল্য!

    সবশেষেঃ
    ১। কয়েক মণ চাল-ডাল যদি একবার মিশিয়ে ফেলা হয়, এরপর তা আবার আলাদা করে আগের জায়গায় আলাদা চাল ও আলাদা ডাল করা প্রায় অসম্ভব এক ঘটনা। এই যুগে ডি-কাপলিং প্রয় সেরকমই এক অলীক ধারণা!
    ২। একটা মজার কথা হল, কমিউনিস্টদের কাছে তবু সেই থেকে জোসেফ স্টালিনের মতই “গ্লোবাল বাণিজ্য” এক অ-বুঝ ধারণা শুধু না, একটা নো-গো [no-go] ধারণা; যা তারা বুঝার চেষ্টাও করে না, আলোচনায় অংশগ্রহণও করে না! বরং অনেকটা যেন হারাম খাদ্যের প্রতি যেমন মানুষের আগ্রহ থাকে না সেরকম! এমনকি কেন এমন ‘হারাম মনোভাব সেটা উলটে দেখা বা রিভিউও করে না এরা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১২ ডিসেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “গ্লোবাল বাণিজ্য ও ট্রাম্পের ডি-কাপলিং” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বেহায়া রাজামোহন ও ইসরাইলকে স্বীকৃতি

    বেহায়া রাজামোহন ও ইসরাইলকে স্বীকৃতি

    গৌতম দাস

    ০৭ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3hD

     

     

    রাজামোহন বলছেন, ইসরায়েল শক্তিশালী; তাই আমাদের একে স্বীকৃতি দেয়া উচিত! কে এই রাজামোহন?
    সি রাজামোহন (সিলামকুরি রাজামোহন, Chilamkuri Raja Mohan) একজন ভারতীয় একাডেমিক, জার্নালিস্ট ও ফরেন পলিসি এন্যালিস্ট – এভাবেই তার পরিচিতি দেয়া আছে উইকিপিডিয়াতে। রাজামোহন  তেলেগুভাষী, ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের বাসিন্দা। সেখানকারই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে মাস্টার্স। কিন্তু পরে দিল্লি জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) থেকে “আন্তর্জাতিক সম্পর্ক” বিষয়ে মাস্টার্স ও পিএইচডি করেন। সেখানে তাঁর পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল,  ‘স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ ও আর্মস কনট্রোল’ [Strategic Studies and Arms Control)]। পরে জেএনইউ বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষকতা শুরু করে প্রফেসর হন তিনি। কিন্তু ক্রমেই তিনি নজরে পড়েন এবং হয়ে পড়েন ভারতে “আমেরিকার বন্ধু”। এতে পরবর্তী সময়ে অবস্থা এমন হয় যে ভারতে এমন কোনো আমেরিকান ফান্ডেড এনজিও বা থিংক ট্যাংক আর বাকি নেই যার পরিচালনার সাথে তিনি সংশ্লিষ্ট নন। এসবই চলতি শতকের প্রথম দশকের ঘটনা। যখন গ্লোবাল ইকোনমিতে চীনা উত্থান ক্রমশ বড় জায়গা নেওয়াতে সবার চোখে পড়তে শুরু করেছিল। ফলে চায়না কনটেইনমেন্ট [China Containment] বা ‘চীন ঠেকানো’ এর জন্য কাজ করা যখন থেকে আমেরিকান ফরেন পলিসির জন্য গুরুত্বপূর্ণ শুধু নয়, প্রায় প্রধান প্রোগ্রাম হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আমেরিকা নিজেরই নানান গবেষণা ও স্টাডি এবং সেসবের রিপোর্টে পরিষ্কার করেই নির্দেশ করছিল যে, চীনের উত্থান ও অর্থনীতিতে এর আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাওয়া ও চীনের নেতার আসনে বসাটা অনিবার্য। এটা রোধ করা যাবে না এমন অনিবার্য।
    তবু এশিয়াতে আমেরিকার প্রধান কাজ হিসাবে দাঁড়ায় চীন ঠেকানোর কাজে নেমে পড়া। আমেরিকার সমস্ত এশিয়ান নীতি-পলিসিকে “চীন ঠেকানো” এই অভিমুখ করে সাজানো হয়। আর তাতেই একাজে ভারতের একাডেমিক জগতে স্থানীয় ভাবাদর্শ ও চিন্তাকে চীনবিরোধী করে প্রভাবিত করার কিছু কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল। দিল্লি হয়ে ওঠে যার কেন্দ্র। তখন ভারতের ট্রাডিশনাল (সোশ্যাল বা সামরিক-স্ট্রাটেজিক) গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময়ই স্থানীয় ও সরকারি সীমিত ফান্ডের মধ্যে কোনো মতে খুঁড়িয়ে চলছিল। তারা নিজেদেরকে থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানও বলত না, তখনো চালু হয়নি এ পরিভাষা। আমেরিকা এসব প্রতিষ্ঠানকে পাশে ফেলে এসবেরই প্যারালাল ধারা হিসেবে আমেরিকান থিংক ট্যাংকের ভারতীয় শাখা খুলে অথবা সরাসরি এনজিও ফান্ড ঢেলে ভারতে চিন্তা ও ভাবাদর্শে দখল তৎপরতা শুরু করেছিল। তেমনি সবচেয়ে প্রভাবশালী এক থিংক ট্যাংক হল, ‘কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’, যা ওয়াশিংটনভিত্তিক [Carnegie Endowment for International Peace, Washington DC.]। সংক্ষেপে এটাকে কার্নেগি এন্ডোমেন্ট অথবা শুধু কার্নেগি বলে অনেকে। যেমন ভারতে এরই শাখা খোলা হয়েছে “কার্নেগি ইন্ডিয়া” নামে। আর এরই প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর হন সি রাজামোহন। শুধু তাই নয়, ভারতের আগেকার ট্রাডিশনাল ও পরের আমেরিকা ফান্ডেড থিংক ট্যাংকগুলো এবং ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় মিলে একটা নীতি-পলিসির সমন্বয় করার দায়িত্বও নেয় এই ‘কার্নেগি ইন্ডিয়া’। এছাড়া কোনো থিংক ট্যাংকের প্রোগ্রামে ফান্ডের সংস্থান অথবা চীন ঠেকানো সংশ্লিষ্ট নানান ইস্যুতে মাস্টার্স ও পিএইচডি করতে বিদেশে পড়তে যাওয়ার বৃত্তি যোগানোর কাজটা ভারতে করে থাকে মূলত এই কার্নেগি ইন্ডিয়া। অবশ্য ভারতে এখন দেশী-বিদেশী সব ধরনের থিংক ট্যাংকের নেয়া যেকোনো প্রোগ্রামের লিখিত অনুমোদনদাতা প্রতিষ্ঠান ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়। তবু এক কথায় বলা যায়, গত প্রায় ২০ বছরের বেশির ভাগ সময় ধরে ওয়ার অ্যান্ড টেরর প্রোগ্রামসহ ভারত-আমেরিকার কৌশলগত সব তৎপরতার প্রধান বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ের কাজ হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে।
    কিন্তু ব্যতিক্রম ছিল গত চার বছরে ট্রাম্পের আমল। কারণ ট্রাম্পের ধারণা এসব গ্লোবাল প্রভাব তৈরি করে তা দিয়ে আমেরিকার আর কোনো কাজ নেই, মানে এসব আর কাজে আসবে না। বরং আমেরিকান জাতিবাদী-অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে চীনবিরোধিতা বা চীনের সাথে বাণিজ্যযুদ্ধ করা ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” ধরণের চিন্তা ও তৎপরতার জন্য বেশি লাভজনক ও উপকারী। ফলে এসব কাজের যত প্রস্তাব পেন্টাগন বা স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে অনুমোদনের জন্য হোয়াইট হাউজে গেছে তার সবই ট্রাম্প ডাটবিনে ফেলে রেখেছিলেন। ফলে সেই থেকে ভারতে রাজামোহন বা তার থিংক ট্যাংকের কাজ একেবারেই সীমিত হয়ে পড়েছিল, যদিও একেবারে বন্ধ হয়নি। রাজামোহন এখন কার্নেগি ত্যাগ করে সাময়িকভাবে যুক্ত আছেন সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাথে।

    রাজামোহনের নতুন এসাইনমেন্ট ইসরাইলের স্বীকৃতি জোগাড়ঃ
    রাজামোহনের নতুন অ্যাসাইনমেন্ট হল ইসরাইলের পক্ষে এজেন্সি নিয়ে মাঠে নামা। উপরের যে রাজামোহনকে বর্ণনা করা হল তিনি এবার দেখা যাচ্ছে, আবার তৎপর হয়েছেন। তার এবারের এসাইনমেন্ট হল এশিয়ায় ইসরাইলের জন্য স্বীকৃতি আদায় করে দেওয়ার দালালিতে নেমে পড়া। সরাসরি বললে, পাকিস্তান এবং সেই সূত্রে বাংলাদেশও যেন ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়, এর পক্ষে ওকালতি করা। রাজামোহন এই স্বীকৃতি দেয়ার ‘ফায়দা’ বেচতে এসেছেন, তবে সাথে হুমকি-ভয়ও দেখাচ্ছেন।
    রাজামোহন নিয়মিত ভারতের “ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস” ইংরেজি দৈনিকে কলাম লিখেন। এর সর্বশেষ ভাষ্যে তিনি যে রচনাটা পাঠিয়েছেন এর শিরোনাম হল, “পশ্চিম এশিয়ায় বদলে যাওয়া ভূরাজনীতি বাস্তবতাকে ইন্ডিয়া, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অবশ্যই মোকাবেলা করতে হবে” [India, Pakistan and Bangladesh must deal with changed geopolitical realities in West Asia]।

    তাঁর লেখার এই শিরোনাম ঘোরতর চাতুরীতে পূর্ণ। এখানে “পশ্চিম এশিয়া” মানে কী? তিনি আসলে ইরানের নাম না নিয়ে বলছেন, পশ্চিম এশিয়া। ইরান যেন তার ও ইসরাইলের ‘ভাসুর’! তাছাড়া এমন কোনো কাজের এরিয়া কী আমরা দেখাতে পারব  যেখানে ইন্ডিয়া, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ এই তিন দেশেরই একই নীতি-পলিসি গ্রহণ সম্ভব বা এর কোন সুযোগ আছে? ইন্ডিয়া এমন কোনো কমন স্বার্থ-অবস্থানের ইস্যু বলে কিছু অবশিষ্ট রাখেনি; সবকিছুতে উগ্র হিন্দুত্ব বা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের ধারণা মাখিয়ে সব তিতা করে ফেলেছে। কারণ ভারতের আচরণ হল – মনে মনে দাবিও বলা যায়- যেন ভারত বলতে চায়, ‘আমেরিকা এখন আমি ভারতের পিঠে হাত রেখেছে, কাজেই পাকিস্তান ও বাংলাদেশের চেয়ে আমি অনেক উঁচুতে”। ফলে সে তো বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের উপরে নিজেকে কোন প্রভাব বিস্তারযোগ্য শাসক মনে করে । ভারত নিজেকে যখন থেকে এমনই এক ‘মুই কী হনু রে’ জায়গায় নিজেকে অনুভব করে সেদিন থেকে সম্পর্কটাই তো অসম, কাজেই কমন স্বার্থ বলে এখানে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। ফলে এমন বাস্তবতায় রাজামোহনের তিন দেশকে এক নিঃশ্বাসে হাজির করাটাই সন্দেহজনক।

    আসলে রাজামোহন এখন ‘ইসরাইলের এজেন্সি’ নিয়ে এসেছেন। তাই আকার ইঙ্গিত নয় একেবারে সরাসরি বলছেন, আমরা এই তিন দেশ যেন ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিই। কিন্তু তিনি ভান করছেন ভারত যেন এখনও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় নাই। এই ভান করার বদ উদ্দেশ্যটা হল, এটা একটা যেন আঞ্চলিক স্বার্থ এই ভাব ধরা। অথচ যেটা ভারত ইতোমধ্যে সেই পঞ্চাশের দশকেই [September 17, 1950] করে ফেলেছে, স্বীকৃতি দিয়ে ইসরাইলের কোলে উঠে বসেছে। কাজেই রাজামোহনের ভান ও নখড়া খুবই চাতুর্যপুর্ণ।

    কিন্তু এই কথাটা রাজমোহন আবার তুলেছেন অত্যন্ত আরেক ধূর্ততায় ও অনৈতিকভাবে। তার লেখা রচনার প্রথম প্যারার অনুবাদ হল এরকমঃ – “তেহরান থেকে বাইরে গত সপ্তাহে ইরানি এক পরমাণু বিজ্ঞানীকে (মোহসেন ফাখরিজাদাহ) নির্লজ্জ ও বেপরোয়া খুনের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিচিত রাজনৈতিক বয়ানকেই গুরুত্ব আরোপ করে যে, আপনি ভুল না সঠিক অবস্থানে তাতে কিছু যায় আসে না। বরং আপনি দুর্বল না শক্তিশালী, এটাতেই আসলে সবকিছু যায় আসে। ফাখরিজাদেহর গুপ্তহত্যাটা প্রমাণ করে ইরানের বেড়ে চলা মারাত্মক ‘স্ট্রাটেজিক দুস্থ’ অবস্থা। এ অঞ্চলে ইরানকে উপেক্ষা করে কিছু আরব দেশ ও ইসরাইলের মধ্যে সম্পর্ক ধারাবাহিকভাবে স্বাভাবিকীকরণে পুনঃসজ্জিত করা চলছে- এ দিকটাই উল্লেখযোগ্য”।

    এখন লক্ষণীয়, শুরুতে তিনি ফখরিজাদাহের গুপ্তহত্যাকে বর্ণনা করতে ইংরেজিতে ‘ব্রাজেন’ [brazen] বলে একটা শব্দ ব্যবহার করেছেন; যার অর্থ নির্লজ্জ ও বেপরোয়াভাবে যে কাজ করা হয় – অর্থাৎ এই গুপ্তহত্যাটা এক নিন্দাসূচক কাজ এটা; তিনি তাই বলছেন। অথচ পরের বাক্যেই আবার গুপ্তহত্যার পক্ষে সাফাই দিয়ে বলছেন, এসব কাজকে ঠিক-বেঠিক দিয়ে বুঝা যাবে না; (মানে দুনিয়াতে ন্যায়-অন্যায় বলে যেন কিছু নাই) বুঝতে হবে আপনি দুর্বল না শক্তিশালী সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। মানে পরের এই বাক্যে এবার তিনি খোলাখুলি বলছেন, “ফাখরিজাদেহর গুপ্তহত্যাটা প্রমাণ করে, ইরানের বেড়ে চলা মারাত্মক ‘স্ট্রাটেজিক দুস্থ’ অবস্থা।”

    ফখরিজাদেহ খুন হয়েছেন আর তাতেই নাকি ইরানের স্ট্রাটেজিক দুরবস্থা প্রমাণিত হয়েছে, কাজেই এখন দল বেঁধে আমাদের ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে হবে  – এমন কথা যিনি বলেন তিনি তো নিম্ন শ্রেণীর কোনো দালালের চেয়েও ইতরোচিত অধম!

    এক কথায় রাজামোহন বলতে চাচ্ছেন, ইসরাইল যেহেতু ‘শক্তিশালী’ এবং ‘এটাই ম্যাটার করে’ অতএব ভয়ে এখন আমাদের ইসরাইলের ‘পা’ চাটতে হবে’। আসলে আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, রাজামোহন ধরনের লোকের মধ্যে সমস্ত মনুষ্যগুণাগুণ লোপ পেয়েছে। তাদের মধ্যে ন্যূনতম কোনো নৈতিকতা আর অবশিষ্ট নেই।

    আচ্ছা, কালকে যদি ইরান প্রতিশোধমূলক কোনো একশন নেয় যেটা সে ইতোমধ্যেই প্রতিজ্ঞা করেছে এবং যেটা সে ট্রাম্পের ক্ষমতা ত্যাগের পরে নেবে বলে অনুমান করা হচ্ছে – তাহলে কী হবে?

    আসলে এখন রাজামোহন চিন্তার সক্ষমতার দিক থেকে একেবারে দেউলিয়াত্বের কিনারে চলে গেছেন, দেখা যাচ্ছে। তাই এ’অবস্থায় তাঁর প্রথম কাজ হতে হবে পড়াশোনায় ফেরত যাওয়া। আর সেখানে  ‘ক্ষমতা’- এই ইস্যুটা নিয়ে তিনি যেন আবার পড়াশোনা শুরু করেন। তাতে তিনি দেখবেন, ক্ষমতা নেয়াই যায়, এটা বড় ঘটনা নয়। বড় দিকটা হল, ক্ষমতার সপক্ষে একটা নৈতিকতা, একটা সাফাই হাজির করে দেখাতে পারা। এটা না পারলে ঐ ক্ষমতা তাকে সবসময় পীড়া দিতেই থাকবে। আর সাফাই হাজির করতে না পারলে ঐ ক্ষমতা তাঁর হাত থেকে চলে যাবে এবং তাঁরই বিরুদ্ধে হাজির হতে থাকবে। চাই কী, যাওয়ার আগে তাকেই মেরে ফেলে দিয়ে যেতে পারে!

    আর ইসরাইল রাষ্ট্র-টা সম্পর্কে কেবল একটা কথা বলা যায়। যেদিন আমেরিকা গ্লোবাল নেতৃত্ব হারিয়ে ফেলবে (মানে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতার আসনে আসীন হয়ে যাবে), সেদিন ইসরাইল রাষ্ট্র একই কারণে নৈতিকতাহীন বা সাফাইহীন এক ইসরাইল রাষ্ট্র এমনই একটা ক্ষমতা খাড়া করার কারণে নিজ অস্তিত্বটা আরও টেকানোর সঙ্কটে পড়বে। তবে এসবের আগেই আমাদের কাজ হবে অর্থপুর্ণভাবে এখন আমরা যে দিকে চোখ রাখতে পারি তা হল, চীন-ইরানের ২৫ বছরের হবু চুক্তি।

    এদিকে সৌদি আরবের বাদশাহ-রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভাব ও টিকে থাকা আমেরিকার সাথে সৌদিদের সম্পর্কের সমান বয়সী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নায়ক-নির্ধারক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট আর সৌদি বাদশাহর চুক্তি (১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৫) হয়েছিল। সৌদি আরবের এখনো মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্র হয়ে থাকার ভিত্তিও সেইটাই; যদিও তা এখন শেষ বয়সের দিকে পৌঁছাচ্ছে বলে অনুমান করা হয়। চীনের গ্লোবাল নেতৃত্ব নেয়া আর চীন-ইরানের ২৫ বছরের চুক্তি কার্যকর হওয়া – হবু এসব ঘটনারই সোজা পরিণতি হবে, আজকের সৌদি অবস্থানটা তখন নেবে ইরান। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অনেক কিছুরই নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে। মধ্যপ্রাচ্য বা জিসিসির প্রতিটি আমিরাতের  (আমীর রাষ্ট্রের) অস্তিত্ব সঙ্কটাপন্ন হবে। যার আলামত এখনই ফুটে উঠতে শুরু করেছে আমেরিকার গত নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয়ের পর থেকেই। আর মূলত ঠিক একারণের সিলামকুরি রাজামোহন ইসরায়েলের হয়ে দালালি করতে ছুটে এসেছেন – পাকিস্তান বাংলাদেশ যেন স্বীকৃতি দেয়।

    চীন-ইরানের হবু চুক্তির খবর চাউর হয়ে গেলে গত  সেপ্টেম্বরে ২০২০ -এ বিবিসি বাংলা এক রিপোর্ট করেছিল। সেখানেই এসব নতুন পরিস্থতি নিয়ে বিস্তারিত আছে। সেখান থেকে এখানে চারটা বাক্য তুলে এনে এখানে পরপর লিখব। এগুলো মূলত দিল্লির এক অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদোয়াজের মন্তব্যঃ

    “পর্যবেক্ষকদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই যে চিরশত্রু চীন এবং হালে পাকিস্তানের সাথে ইরান যেভাবে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে ভারত তাতে গভীর উদ্বিগ্ন।”
    “দিল্লির জওহারলাল নেহেরু ইউনিভারসিটির (জেএনইউ) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সঞ্জয় ভরদোয়াজ বিবিসি বাংলাকে বলেন, চীনের সাথে ইরানের অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত যে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে ভারতের মাথাব্যথা বাড়ছে।”
    “গত ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা যত বেড়েছে, ইরানের সাথে ততই দূরত্ব বেড়েছে। সেই শূন্যতা পূরণে ঝড়ের মত ঢুকে পড়েছে চীন”।
    “মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে রাশিয়া এবং চীনের দৃষ্টিভঙ্গি এখন একইরকম। তাদের সাথে যুক্ত হয়েছে পাকিস্তান, ইরান এবং তুরস্ক। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যে সব দেশের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হচ্ছে – ইউএই এবং সৌদি আরব- তারা ইরানের বড় শত্রু।“

    অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে সব হারানো ভারতের পক্ষে এখন আছে কেবল সৌদি আরব আর ইউএই [UAE] (দুবাই, আবুধাবিসহ সাত আমিরাতের জোট)।  তাই এই ডুবন্ত ভারতকে বাঁচাতে রাজামোহন  ছুটে এসেছেন পাকিস্তান ও ভারতের কাছে – ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়ার দালালি নিয়ে । তিনি ভেবেছেন আমরা ঘাসে মুখ দিয়ে চলি, তাই মধ্যপ্রাচ্যের আসন্ন ব্যাপক উল্টপালট আমরা খবর রাখি না, বুঝব না। সেকারণে রাজামোহনকে বিশ্বা করব। অথচ  সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সৌদি আরব আর ইউএই (দুবাই, আবুধাবি ইত্যাদি)। তবে আরেক আমিরাত হওয়া সত্ত্বেও সবচেয়ে ভালো অবস্থানে যাবে কাতার। আর এর কারণ সে আগে থেকেই সৌদিবিরোধী এবং নিজের নিরাপত্তা তুরস্কের সেনা নিয়ে এসে নিশ্চিত করেছে কেবল সেজন্যই না।  ঐ এলাকায় সবার আগেই তেলেবেচা আয়ের বদলে  ভারী-শিল্পে নিজের অর্থনীতির ভিত গেড়েছে কাতার।  একারণে একধরনের ব্যাপক ওলটপালট যা ঘটবে যার আছর সবচেয়ে দ্রুত সামলে নিতে পারবে কাতার। যদিও সবচেয়ে বড় কথা, মধ্যপ্রাচ্যে রাজতন্ত্র টেকানোই মুশকিল হয়ে যেতে পারে, তবে কাতারকে ছাড়া। এ ছাড়া আরো বড় সঙ্কট সবার জন্য (আমাদেরসহ) অপেক্ষা করছে। সেটি হল – ২০৩০ সালের পরে মাটির নিচের তেলভিত্তিক শিল্পসভ্যতা দুনিয়া আর থাকছে না, বিদায় নিতে যাচ্ছে।  আসলে বাইডেন ক্ষমতাগ্রহণের পর থেকেই পরিবেশসম্মত জ্বালানিতে জ্বালানির উৎস বদলে যাওয়া ব্যাপক ত্বরান্বিত হবে। যেটা এতদিন গোয়াড় ও দেউলিয়া ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরিপুর্ণ দায়ীত্ব-জ্ঞানহীনভাবে  তছনছ করে রেখেছিল।  মধ্যপ্রাচ্যের এই তেল অর্থনীতি শুকিয়ে আসলে এর প্রভাবে আয়-ইনকামের সঙ্কট যেটা দেখা দেবে, এর বিকল্প যা এত দিনে বাদশাহদের তৈরি করে ফেলা দরকার ছিল, বলতে গেলে এর কিছুই করতে তারা সক্ষম হয়নি। তাই সঙ্কট ধেয়ে আসবে।
    আগামি ২০২৫ সাল থেকেই এই সঙ্কট দৃশ্যমান হওয়া একটু একটু করে শুরু হতে থাকবে। ওদিকে বাংলাদেশের যারা মধ্যপ্রাচ্যে কষ্টকর শরীর-ঘাম বেঁচে আয় করা বৈদেশিক মুদ্রার যে আরামে আমরা এখন আছি, ৪২ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভের গরম অনুভব করছি, এসব বদলে যাবে। বসে বসে মাটির নিচের তেল বেঁচে আয়েশ করার দিন শেষ হয়ে যাবে। বরং এবার শিল্পভিত্তির উপরে অর্থনীতিকে দাঁড় করানোর প্রতিযোগিতায় ইরান প্রতিটি রাজতন্ত্রকে হয়ত বুঝিয়ে দেবে কে কতটা যোগ্য, কতটা মুরোদ রাখে!

    আর বলাই বাহুল্য  চীন মধ্যপ্রাচ্যের এসব ওলটপালটে ইরানকে পুর্ণ ও সক্রিয় সমর্থন দিয়ে যাবে। আর এতেই মধ্যপ্রাচ্যে ভারত নিজ গুরুত্ব হারাবে। ভারত যেন ইরানের দুর্দিনে ইরানের তেল কেনা বন্ধ না করে মুখ না ঘুরিয়ে নেয় – এমন শত আবেদন ভারত পায়ে মাড়িয়ে বুক ফুলিয়ে হেটে গেছিল, ট্রাম্পের আমেরিকার কোলে গিয়ে উঠেছিল। ভারতের এসব দিনের প্রতিদান/প্রতিশোধ তখন ইরানের কাছ থেকে পাওয়ার সময় হবে। ভারত ব্যবসা, একসেস সব হারাবে। এমনকি ইরানে চাবাহার বন্দরের ভারতের শেয়ার মালিকানা – এই বিনিয়োগও বেকার হয়ে যাবে। কারণ, চাবাহার পোর্ট পাকিস্তানের গোয়াদর ডিপ সি পোর্টের সাথে সমন্বয় করে ব্যভারকারি ভাগাভাগি করে চলতে শুরু করবে।  ওদিকে চাবাহার বন্দর ব্যভার করে ভারতকে আর আফগানিস্তানে যাবার দরকার কমে আসবে। হয়ত উতখাতি হয়ে যেতে পারে, সেখানে চীন-পাকিস্তানের প্রভাব অর্থাৎ তালেবানদের সাথে চীন-পাকিস্তানের সম্পর্ক সবার চেয়ে উন্নত হবার কারণে।  কিন্তু চীন এই পুরা উল্টপালটে ইরানের পাশে শক্ত হয়েই দাঁড়াবে। কেন?

    কারণ চীনকে আগামি সেসময়ের মধ্যপ্রাচ্যের লেনদেন-বিনিময় বাণিজ্যের শীর্ষ মুদ্রার ভূমিকায় ডলারের বদলে ইউয়ানকে বসাতে হবে। একারণে মধ্যপ্রাচ্যের সব ওলটপালট ঢেলে সাজানোতে চীনের প্রবল সক্রিয় সমর্থন থাকবে।

    চীন-ইসরায়েল সম্পর্কঃ
    বর্তমান বাদশা-আমিরাতদের যে আগামি দুরস্থার কথা টানলাম, এরা সকলে বিশেষ করে দুবাই-সৌদি এরা কী আপোষেই সব হার স্বীকার করে নিবে? এটাই হল সেন্ট্রাল প্রশ্ন! আসলে, এই বাদশাতন্ত্র বাঁচাতেই রাজামোহন আমাদের কাছে ইসরায়েলে বেঁচতে এসেছেন।  আইডিয়াটা হল, এটা তো কেবল দুবাই-সৌদি রাজাগিরি  টিকানোর সঙ্কটই নয়, এটা ইসরায়েলেরও অস্তিত্বের সংকট। তাই চক্ষুলজ্জা ভুলে দুবাই-সৌদিদের বাদশারা ইসরায়েলের সাথে গাটছাড়া বেঁধেছে আর সেটা এই অনুমানে যে  ইরানের উত্থানে একই সঙ্কটে থাকা ইসরায়েলের সাথে গাটছাড়া বাঁধলে  সামরিক শক্তি দিয়ে ইসরায়েল তাঁদের রক্ষা করবে। কিন্তু এই অনুমান ভিত্তিহীন। কারণ দুবাই-সৌদি রাজাগিরির সমস্যাটা মূলত সামরিক নিরাপত্তার নয়, মূল সমস্যা অর্থনীতির। তেল-বেচা আয়ের বাইরে নতুন অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি বা তাতে শিফট করে নিবার। শোনা যাচ্ছে দুবাইয়ের তেলের রিজার্ভ শেষের দিকে। তবে দুবাই সিঙ্গাপুর না হলেও ওর চেয়ে ছোট হলেও একধরণের পাইকারি গোডাউন বটে। জেবল আলী ধরণের ইপিজেড আছে, কিন্তু কোনটারই পণ্য বা কাঁচামাল চীনের সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ লিঙ্কেজে যুক্ত নাই। দুবাই আফ্রিকার (৫০-৬৫) দেশের জন্য একটা হাব বটে। কিন্তু তা এশিয়ান পণ্যের জন্য নয়। বরং চীনের কারণ এশিয়ার সাথে আফ্রিকার যোগাযোগ প্রবলে বাড়ছে আর তা দুবাইকে ছাড়াই সরাসরি। তাই দুবাইয়ে ইতোমধ্যেই হাহাকার শুরু হয়েছে। কাজেই ইসরায়েল দুবাই-সৌদি রাজাগিরি  টিকানোর সঙ্কটে কেউ নয়। তবে হয়ত কিছু নুইসেন্স বা উপদ্রব তৈরি করতে পারবে। যেমন ইরানের পরমাণুবিজ্ঞানিকে গুপ্তহত্যার যে অভিযোগ আসছে এরকম কিছু। কিন্তু মূলকথা অর্থনীতিগত সঙ্কট মিটানো ইসরায়েলকে দিয়ে হবে না, ইসরায়েলের অস্ত্র দিয়েও হবে না।
    ওদিকে আজো চীনের সাথে ইসরাইল এদুই রাষ্ট্রের মধ্যে কোন প্রত্যক্ষ বা বড় কোন স্বার্থবিরোধ নেই। কিন্তু তা না থাকলেও, এখন থেকে নতুন বা হবু মধ্যপ্রাচদচ্য যেটা আকার নিতে যাচ্ছে তাতে ইসরাইল চীনের স্বার্থের বিরোধী হয়ে উঠবে। কারণ ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে ওলটপালটের ঢেলে সাজানোতে, রাজতন্ত্রগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা নেবে যা চীনের জন্য বাধা। এ কারণেই প্রকাশ্যে বা গোপনে আমিরাতগুলো ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে রাখতে চায় যাতে ইসরাইল তাদের প্রটেক্ট করে, নিরাপত্তা দেয়। অর্থাৎ চীন-ইসরায়েল মুখোমুখি হতে চলেছে ক্রমশ।  অতএব চীন কিছুই চিন্তা না করে মধ্যপ্রাচ্য কাভার করতে কেবল ইরানের সাথেই গাঁটছড়া বাঁধেনি বা ২৫ বছরের স্ট্রাটেজিক অ্যালায়েন্স গড়েনি, এটা বুঝতে হবে।

    অতএব, রাজামোহন সাহেব, আপনি হারু পার্টি ইসরায়েলের এজেন্সি নিয়ে এসেছেন। অন্তত বাংলাদেশ আপনার সাথে যাবে না। এছাড়া, আপনার কোনো অনুমানই নেই যে, আমাদের সমাজে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে হবে- এ কথায় প্রতিক্রিয়া কী হবে? এ ছাড়া এ কথাটা টেবিলে তুলবে কে? যে তুলবে সে সব নৈতিকতা হারানো এক লোক বলে সমাজে চিহ্নিত হয়ে যাবে, এর দায়ে তার সামাজিক অস্তিত্ব সঙ্কটগ্রস্ত হবে। ফলে ব্যতিক্রম হিসেবে দু-চারজন কেউ কেউ নিশ্চয়ই থাকবেন, কিন্তু তারাও অপ্রকাশ্য থাকবেন। এমনকি প্রগতিশীলরাও তাদের এত দিনের অবস্থান ছেড়ে ইসরাইলের পক্ষ নিচ্ছেন, এমন দেখা পাওয়া খুবই কঠিন হবে। বাংলাদেশে কমন অবস্থান যেটা দেখা যায় তা হল, ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল ও তাদের জীবনের ওপর সব ধরনের অত্যাচার নির্যাতনের প্রতীক হল ইসরাইলিরা। এটাই আমাদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক তা নির্বিশেষে আমাদের সাধারণ পারসেপশন। আর নৈতিকতা জিনিষটা আমাদের সমাজের সব কর্ণারে এখনও যথেষ্ট শক্ত; এর দায়বোধ দল নির্বিশেষে সকল পক্ষই গুরুত্ব দিয়ে দেখে।

    অথচ রাজামোহন পরামর্শ দিচ্ছেন বাংলাদেশ যেন ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়। বুঝা যাচ্ছে, তিনি নিজ পেশাতেও কোনো দক্ষতা রাখেন না, বোঝাবুঝির পড়াশোনাতেও দুর্বল। তাকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশ ধান্ধাবাজ দেশ নয়। বাংলাদেশে এখনো একটা কাজের পক্ষে ন্যূনতম নৈতিক অবস্থান, সামাজিক অবস্থান থাকা ম্যাটার করে অনেক। পুওর রাজামোহন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “রাজামোহন ইসরাইল বেচতে এসেছেন!” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • মোদী-অমিতের নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল

    মোদী-অমিতের নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল

    গৌতম দাস

    ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2OV

     

     

    _https://indianexpress.com/article/north-east-india/tripura/tripura-citizenship-bill-protest-northeast-india-tribal-parties-6150368/

    এবার নাগরিকত্ব বিল। মানে ভারতের নাগরিকত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে আনা এক সংশোধনী বিল [Citizenship Amendment Bill, 2019 (CAB)]। এর সোজা অর্থ হল আসামে এখন এবং ভবিষ্যতে অন্য রাজ্যে এনআরসি তালিকা করার পর মুসলমান যারা বাদ পড়বেন, তাঁরা একেবারেই বাদ। আর তাঁরা বাদে বাদ পড়া অন্য সব ধর্মের সবাইকে যেন আবার ভারতের নাগরিকত্ব সহজেই দেয়া যায়; এরই এক খোলাখুলি নাগরিক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা হবে এটা। এই লক্ষ্যে মোদী সরকার আগামী সপ্তাহে ভারতের নাগরিকত্ব আইনের ওপর একটা সংশোধনী বিল আনতে যাচ্ছে, যা ইতোমধ্যে মোদীর মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিয়েছে। আগামি সোমবার (৯ ডিসেম্বর) লোকসভায় পেশ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল।

    বিজেপি-আরএসএসের একেবারে ওপরের নেতারা জানেন, মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো এটাই তাদের রাজনীতি। কেন? মুসলমানরা খারাপ আর হিন্দুরা ভাল – না, ঠিক এটা প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠা করা তাদের কাজ বা রাজনীতি নয়। তাদের মূল কাজ হল পোলারাইজেশন, মানে ভোটার মেরুকরণ। অন্য ভাষায় কাজটা হল হিন্দুদের আলাদা করা, হিন্দুরা আলাদা, ভালো আর সব কিছু তাদেরই- এটা সব সময় প্রমাণ করে চলা ও এই দাবি তাতিয়ে রাখা। কেন? কারণ এমনটা শুধু প্রমাণ করে রাখা তাদের কাজ নয়। বরং কাজের লক্ষ্য হল, হিন্দু হিসেবে তারা যেন এরপর দলবেঁধে কেবল বিজেপির প্রার্থীকেই ভোট দেয়। মানে বিজেপির বাক্সে সব হিন্দু-ভোট যেন এসে ঢুকে।

    এই শেষ বাক্যটাই হলো আসল লক্ষ্য। অর্থাৎ মুসলমানরা খারাপ আর হিন্দুমাত্রই ভাল, এটা প্রমাণ প্রতিষ্ঠার সময় আধা সত্য বা মিথ্যা যা খুশি কিছু প্রচার করা হল। এতে ধর্মীয় পোলারাইজেশন বা হিন্দু মেরুকরণ ঠিকঠাক করা হলো। কিন্তু কোনো কারণে বিজেপির প্রার্থীর বাক্সে সব হিন্দুর ভোট ঢুকল না। তাহলে কিন্তু এটা আর বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি হবে না। বিজেপির প্রার্থীর বাক্সে সব হিন্দুর ভোট এই হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে ফেলা- এটাই বিজেপির উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনীতির চর্চা করার মূল লক্ষ্য।

    স্বাধীনতা, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদ
    এদের রাজনীতির বুঝও আজীব; মূলত তিনটি শব্দের- স্বাধীনতা ও দেশপ্রেম বলে এ দুই শব্দের অর্থহীন কিছু আবেগী সুড়সুড়ি তুলে ফেলা আর তৃতীয়টা হল জাতীয়তাবাদ : মানে উগ্র-হিন্দু জাতীয়তাবাদ। অর্থাৎ রাষ্ট্র, অধিকার, নাগরিক, রিপাবলিক, কনস্টিটিউশন ইত্যাদি এসবই এদের কাছে একেবারে অপ্রয়োজনীয় সব শব্দ ও ধারণা। রাষ্ট্র বলে কোন ধারণা এদের কাছে অপ্রয়োজনীয় থাকে, তাই এর কোনো নীতিগত দিক যেমন নাগরিকের কিছু মৌলিক অধিকার থাকবে; যা রক্ষা করতে, সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে- এটা বিজেপির রাজনীতিতে কোনো বিষয় নয়। অথবা ধরা যাক, রাষ্ট্র নাগরিকদের মধ্যে কোনো অধিকারবৈষম্য করতে পারবে না, আইনের চোখে সবাইকে সমান দেখবে ও আচরণ করবে ইত্যাদি বিষয়গুলো? রাষ্ট্রের এমন পালনীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রাখার ব্যাপারটাও বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতিতে কোন আমলযোগ্য ব্যাপারই নয়। কেবল কেউ বিজেপি কি না, সে হিন্দুত্ব চিন্তার লোক কি না – সেটার দিকে চোখ রেখে চলে বিজেপির বাক্স ভরানোই এই রাজনীতিতে যথেষ্ট।

    কিন্তু তাই বলে বিজেপি-আরএসএস বা তাদের কর্মীরা কি কেবল এক হিন্দুত্বের আবেগের মধ্যেই তীব্রভাবে ডুবে থাকে- যেন কেবল এক হিন্দুত্বের ভাবাবেগের সুড়সুড়িই তাদের জন্য সব কিছু, ডুবে বুঁদ হয়ে থাকা? তাই কী? না, সম্ভবত তা একেবারেই নয়। যেমন আমরা পরীক্ষা করতে পারি এবার ভারতে পেঁয়াজ-উৎপাদক অঞ্চল বা রাজ্যে বন্যায় তা নষ্ট হওয়াকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজসঙ্কট খাড়া করেছে। বাংলাদেশের মত ভারতেও নিজের বাজারেও পেঁয়াজের সঙ্কট চলছে। চড়া মূল্যের বাড়াবাড়ি হয়ত বাংলাদেশের মত না। কিন্তু মজার ঘটনাটা হল, তুরস্ক ভাল সহনশীল দামে ভারতকে পেঁয়াজ দিতে রাজি হওয়ায় সেই তুরস্ক ভারতের কাশ্মির নীতির কঠোর সমালোচনা করে ধুয়ে দিলেও এ ব্যাপারে মোদীর ভারত সরকার চুপচাপ। যেমন ভারতের অনলাইন ‘দ্য প্রিন্ট’ পত্রিকায় একটা খবরের শিরোনাম হলো, ‘মোদি সরকার তুরস্কের কাশ্মির সমালোচনা শুনেও চোখ বুজেছে; কারণ ভারতের এখন তুরস্কের পেঁয়াজ দরকার” [Modi govt ignores Turkey’s Kashmir criticism — because India needs its onions]।

    আবার প্রায় একই রকমভাবে মালয়েশিয়ার মাহাথির গত সেপ্টেম্বরে জাতিসঙ্ঘ অধিবেশনে ভারতকে কাশ্মিরে ভারত ‘দখলদার বাহিনী’ বলে অভিযুক্ত করেছেন। তাতে ভারত প্রথমে ছদ্মরাগ দেখিয়েছিল যে, তারা আর মালয়েশিয়ার পামঅয়েল কিনবে না। কিন্তু দামে সস্তা পাওয়ায় ভারত এখন আগের মতোই মালয়েশিয়ার পামঅয়েল আমদানি করতে শুরু করেছে। তাহলে অর্থ দাঁড়াল, উগ্র হিন্দুত্বের তথাকথিত আবেগ নয়, এমনকি মুসলমানবিদ্বেষ বা ঘৃণা ছড়িয়েও নয়; সুখ বলতে তা এখনো তাদের কাছে বিষয়-আশয়ের বস্তুসুখের মধ্যেই, সেখানে হুঁশ জাগ্রত রেখে খাড়া বৈষয়িক লাভালাভেই তাদের সুখ।

    কাজেই ভুয়া হলেও বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতি হল বাছবিচার হুঁশহীন এক উগ্র হিন্দুত্বই। যদিও সম্প্রতি তাদের পরপর দুইটা বড় বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। একটা হল মোদী সরকারের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির মাপ জিডিপিতে ধস নেমেছে। আসলে বলতে হবে, এবারের ধস আর লুকিয়ে রাখা যায়নি। দুই বছর আগে যেটা  ৮ শতাংশ বলে মোদী দাবি করেছিল, কিন্তু সেটা আসলে আড়াই পার্সেন্ট বাড়িয়ে বলা হচ্ছিল।  সেই বাড়ানো ফিগারটাও এখন কমতে কমতে এবার ৪.৫ শতাংশ হয়ে গেছে। এটা সমাজের সব কোনায় হাহাকার তুলে ফেলেছে। কাজেই এটা ঢাকা দিতে এখন আবার কোনো এক জবরদস্ত মুসলমানবিদ্বেষ-ঘৃণার ইস্যু দরকার।

    এ ছাড়া তাদের আরেক বিপর্যয় ঘটেছে আসামের এনআরসি ইস্যুতে। তারা হিন্দুমনকে খুব তাতিয়েছিল যে, নিশ্চয় লাখ লাখ নাগরিকত্ব অপ্রমাণিত মুসলমান থেকে যাবে এমন-তারা তালিকায় দেখতে পাবে আশা করেছিল। কিন্তু হিন্দুদেরই হাহাকার উঠেছে কারণ নাগরিক-প্রমাণে ব্যর্থ হওয়া মোট ১৯ লাখের ৭৫ শতাংশ হলো হিন্দু। এখন উঠতে-বসতে বিজেপিকে বদ দোয়া দেয়া আসামের এই হিন্দুদেরকে সামলানোই কঠিন হয়ে গেছে বিজেপির। অন্যের জন্য খুড়ে রাখা গর্তে পড়ে এখন উলটা বিজেপিরই জান যায় অবস্থা।
    তাই বিজেপি এখন অছিলা খুঁজছে দু’টি- ১. তৈরি হওয়া আসামের এনআরসি তালিকাই বাতিল বলে ঘোষণা করে দিতে আর ২. ভারতের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন।

    বিজেপির মূল লক্ষ্য আসলে ‘বিদেশী’ বলে বা ‘মুসলমান’ বলে একটা কল্পিত স্থায়ী শত্রু খাড়া করে ফেলা; যারা সব সময় নাকি ভারতের ‘হিন্দুস্বার্থের বিরোধিতা’ যাচ্ছে এভাবে এমন একটা গল্প ও ইমেজ বিজেপি খুজছে যা দিয়ে সে একটা স্থায়ী শত্রুরূপ দান সম্পন্ন করতে চাচ্ছে। বিজেপির ইচ্ছা কল্পিত এমন শত্রুর বিরুদ্ধেই সারাজীবন সে লড়াই করে যাচ্ছে তা দেখাতে পারে। যেন সে এই চেক ভেঙে ভেঙে সব সময় খেয়ে চলতে পারে, পোলারাইজেশন ও ভোটের বাক্স ভরার রাজনীতি করে যেতে পারে। সে কাজে এমন স্থায়ী এক ইস্যু হতে পারে যেমন সেটা হতে পারে এমন যে ‘ভারত জুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো- এই শ্লোগান।

    তবে আসলে এটা আর অনুমান হিসেবে নেই, গৃহীত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। ‘ভারতজুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো এই বয়ানেই একমাত্র বিজেপি রাজনীতি করবে ও করতে হবে, এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে মোদি-অমিতের দানবগোষ্ঠী।

    অর্থনীতিতে ডুবে গিয়ে এরা এখন এমন অবস্থায় যে ‘ভারতজুড়ে এনআরসি’ আর, বিদেশী খুঁজতে হবে- এটাই তাদের একমাত্র বাঁচার সম্ভাবনার রাজনীতি হয়ে গেছে। ব্যাপারটা আঁচ করে দক্ষিণী প্রাচীন পত্রিকা দা হিন্দু এডিটোরিয়াল লিখে বলেছে The Centre should focus on the economy and address issues of real concern] কেন্দ্র সরকারের উচিত অর্থনীতির দিকে যেটা প্রকৃত উদ্বেগের ইস্যু সেদিকে মনোযোগ দেয়া উচিত।
    যেমন এখন ঝাড়খণ্ড রাজ্যের নির্বাচন চলছে, সেখানে অমিত শাহ নির্বাচনী জনসভা বক্তৃতা করেছে- “ভারতজুড়ে এনআরসি করতে হবে”, এই লাইন নিয়ে। আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং- “আপনার পাশের লোকটা বিদেশী নয়তো, চেক করেছেন কী”- এমন বিদেশীভীতি বা জেনোফোবিয়া ছড়ানোর উদ্যোগ-রাস্তা ধরেছে। এটাকে এক মানসিক অসুস্থতা বললেও খুব কমই বলা হবে।

    কিন্তু এর আগে ইতোমধ্যে আসামে যে ড্যামেজ ঘটে গেছে, তা হলো এনআরসি মোট ১৯ লাখ বাদ পড়াদের মধ্যে ১৪ লাখই হিন্দু। তাই এখন উলটা আসামের সমাজ থেকে এদের বাদ হয়ে যাওয়া ঠেকাতে হবে বিজেপিকে। তাই, এদেরকে বাঁচানোর ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে আগামী সপ্তাহে আনা হচ্ছে, ১৯৫৫ সালের পুরনো নাগরিকত্ব বিলের এক সংশোধনী। এটাই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল ২০১৯। যাতে তাদেরকে আবার নতুন করে নাগরিকত্ব দেয়া যায়। সেই উদ্দেশ্যে এই বিলে বলা হবে, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ বা পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিষ্টানরা (কিন্তু মুসলমানরা বাদ) অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে থাকলেও তারা ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে বিবেচিত হবে না; বরং উল্টো যেমন বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ হিন্দু অভিবাসী এবং বৈধভাবে আসা অভিবাসী (কিন্তু যাদের ভিসার মেয়াদ পেরিয়ে গেছে), তারা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

    আসলে আগের ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুসারে কোনো অবৈধ অভিবাসী (ভিসা ছাড়াই ঢুকে পড়া বা ভিসার মেয়াদ শেষেও থাকা) বিদেশী ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারে না। সোজা কথায় মোদী নতুন আইনে এই বাধা তুলে দিতে চাইছে; কিন্তু মূলত মুসলমান ছাড়া বাকি সব ধর্মের মানুষের জন্য সুযোগ রেখে দিয়ে- এভাবে আনা হবে এই সংশোধনী। এটাই এর প্রত্যক্ষ মুসলমানবিদ্বেষ এবং মুসলমানবৈষম্য।

    এমন এই বিদ্বেষ ও বৈষম্য তৈরি করা – এটাই হবে বিজেপি-আরএসএসের রাজনৈতিক পুঁজি। স্থায়ী ঘৃণাবিদ্বেষ তৈরি ও ছড়ানোর উৎস; যাতে এটা কেনাবেচা থেকেই স্থায়ীভাবেই পোলারাইজেশনে বিজেপি প্রার্থীর বাক্স ভরার রাজনীতি করে যাওয়া যায়। এক দিকে ‘ভারত জুড়ে এনআরসি করতে হবে’, বিদেশী খোঁজো- এর রাজনীতি চালিয়ে অস্থির ঘৃণাবিদ্বেষ উত্তেজনা তাতিয়ে রাজনীতিতে টিকে থাকা, মুসলমান তাড়িয়ে খাঁটি হিন্দুদের ভারত কায়েম করা- এ এক বিরাট মাইলেজের স্থায়ী ইস্যুর রাজনীতি বিজেপি-আরএসএস নিজের জন্য তৈরি করতে চাইছে। আর এ কাজ করতে গিয়ে কোনো হিন্দু এতে ফেঁসে নাগরিকত্ব খোয়ালে তাকে আবার নাগরিকত্ব দিয়ে আগের মতোই ভারতে রেখে দেয়া যাবে। এই সুবিধা তৈরি করতে চাইছে বিজেপি। অর্থাৎ বিজেপি-আরএসএস-কে তাদের ঘৃণ্য-রাজনীতির ইস্যু সরবরাহের নিয়মিত খোরাক হয়ে থাকতে হবে, আর স্থায়ীভাবে নাগরিকবৈষম্যের শিকার হতে থাকতে হবে ভারতের মুসলমান নাগরিকদের।

    কিন্তু বিজেপি-আরএসএসের এই মুসলমান ‘বলি’ দিয়ে দেয়ার রাজনীতি- তা আবার ‘ভারত জুড়ে এনআরসি’ বা বিদেশী খোঁজো যে নামেই আসুক তা কি টিকেই যাবে? বিজেপি-আরএসএস এরাই কি একমাত্র সত্য হয়ে যাবে? আগাম কোনো কিছু শতভাগ নিশ্চিত করে বলা যাবে না। কিন্তু ইতোমধ্যে যেসব অভিযোগ দেখা যাচ্ছে তা নিয়ে কিছু কথা এখানে বলা যায়।

    এনআরসি নামে মোদি-অমিতের দানব শয়তানি শুরু ও শেষ হলে পরিণতি কী হয় তা মুসলমান-অমুসলমান নির্বিশেষে আসামের সবার তা দেখার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যে নেয়া হয়ে গেছে। অহমিয়া বা বিজেপি যতই এটা ‘বিদেশী’ বা মুসলমানরাই কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে খুশিতে থেকেছিল বটে, কিন্তু সবশেষে এটা তাদের নিজের জন্যই খানাখন্দ খুঁড়ে রাখার মতো কাজ হয়েছে। এখন হাহাকার উঠেছে। শুধু তাই নয়, পড়শি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গেও এ বিষয়ে পক্ষ-বিপক্ষের তর্কে ওই বাংলাও এখন বুঝে গেছে যে, নাগরিকত্বের ডকুমেন্ট সার্টিফিকেট আর কার্ড জোগাড়ের জন্য দৌড়াদৌড়ি কী জিনিস। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের যারা ইতোমধ্যে বিজেপিতে যোগ দিয়ে হিন্দুত্বে সুবিধা খাওয়া আর মুসলমানের রাস্তায় গড়াগড়ি যাওয়া ব্যালকনিতে বসে আরামে দেখা যাবে বলে ভেবেছিল, এরা নিজেই ইতোমধ্যে বুঝে গেছে এনআরসি কী জিনিস। এটা যে হিন্দু-মুসলমান বাছবিচার ছাড়াই নির্বিশেষে যে কাউকে চরমতম হয়রানির শিকার বানিয়ে ফেলতে পারে, সেটা এখন আসামের পরিণতি দেখে সবাই বুঝতে পেরেছে।

    এনআরসিতে নাগরিক প্রমাণের দায় নাগরিকের, রাষ্ট্রের না। অথচ একটা ডকুমেন্ট ব্যক্তিপর্যায়ে রক্ষা সংরক্ষণ যতটা কঠিন রাষ্ট্রের হেফাজতখানা, সেটা রক্ষা উল্টো ততই সহজ। ব্যক্তি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হতে পারে সবচেয়ে সহজে। তাই স্বাভাবিক ছিল, কেউ নাগরিক নয় তা প্রমাণের দায় থাকা রাষ্ট্রের কাঁধে। ইন্দিরার আমলে একসময় এটা তাই ছিল।

    এ ছাড়া এমনিতেই দুনিয়া এখন গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের- এর প্রধান স্বভাব বৈশিষ্ট্য তাই এমন যে পুঁজি আর শ্রমের (মানুষের) মাইগ্রেশন এখানে হবেই, তারা নিরন্তর ঘুরে বেড়াবে। শুধু মানুষ নয়, পুঁজিও এখানে দেশী-বিদেশী পরিচয় নেবে, ঘটবে। তাই ব্যাপক ইকোনমিক মাইগ্রেশন মানে বৈধ-অবৈধ লেবার মাইগ্রেশন সবচেয়ে কমন ঘটনা হবে এখানে। এর ওপর ভারতবর্ষের দেশভাগ- এটা নিজেই সবচেয়ে স্থায়ী এক রাজনৈতিক মাইগ্রেশনের ফেনোমেনা। যা কখনই একেবারে শেষ হয়নি, হবে না। ফলে এখানে একটা নিচু মাত্রার বা কিছু মাত্রার মাইগ্রেশন সব সময় আছে এবং আশা করি আরো অনেক দিন থাকবেই। একমাত্র বদ মতলব থাকলেই কেবল এটাকে কেউ ইস্যু হিসেবে হাজির করতে চাইবে, আর কেবল মুসলমানবিদ্বেষ হিসেবে এটাকে ব্যবহার করতে চাইতে পারে।

    ‘মাত্র ছয় মাস। তার মধ্যেই ভগ্নমনোরথ দশা কাটিয়ে নিমেষে চাঙ্গা হয়ে উঠল তৃণমূল। তিনটি বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চমকে দেয়া পুনরুত্থান ঘটালেন নিজের দলের। তৃণমূলের ২১ বছরের ইতিহাসে কোনো দিন জয় মেলেনি যে দুই আসনে, সেই কালিয়াগঞ্জ এবং খড়গপুর সদর আসনও ছিনিয়ে নিল ঘাসফুল। আর লোকসভা নির্বাচনে করিমপুরে যে ব্যবধানে এগিয়ে ছিল তৃণমূল, এবার জিতল তার চেয়ে অনেকটা বেশিতে।’ এটা এ মাসের শুরুর দিনে আনন্দবাজারের এক রিপোর্ট টুকে এনেছি।

    গত মে মাসে মোদির আরো বেশি আসন নিয়ে দ্বিতীয়বার বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার পর ছয় মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে তিনটি প্রাদেশিক আসনে উপনির্বাচনের ফলাফল এসেছে। তাতে এর তিন আসনই পেয়েছে মমতার দল। অথচ এ তিনটির দু’টিতে মমতার দল গত ২১ বছরে কখনো জিততে পারেনি। এই তিনটি আসনই হয় মুসলমান প্রধান অথবা বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া নয়তো বা আসাম লাগোয়া আসন। আর এসব সত্ত্বেও এগুলোর দু’টি ছিল সিপিএম বা কংগ্রেসের দখলে। আর একটি এমন রাজ্য বা বিধানসভা আসনের উপনির্বাচন, যা গত কেন্দ্র নির্বাচনে প্রথম বিজেপি দখলে যাওয়া আসনের অন্তর্গত। তাই এবারের নির্বাচনের শেষে ফলাফল দেখে সব পক্ষই একবাক্যে স্বীকার করেছে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা সবাই এনআরসি আতঙ্কে দৌড়াচ্ছে, ভুগছে। এনআরসি তাদের আক্রমণ করে ফেলেছে। কলকাতার বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষও স্বীকার করে নিয়েছেন বলে রিপোর্ট বলছে, Dilip Ghosh on Saturday identified “fear and confusion over NRC” ।

    তাই সেই আতঙ্কের একমাত্র ত্রাতা হিসেবে মমতা তাদের আশ্রয় হয়ে ধরা দিয়েছে। তাই মমতার বিজয়। আগে তারা ভেবেছিল বিজেপির উত্থানে মুসলমানের কোণঠাসা হওয়া দেখতে তাদের খারাপ লাগবে না হয়তো। কারণ, ‘মমতা নাকি চাপে থাকা মুসলমানদের রশি আলগা করে মাথায় তুলেছিল।’ আর এখন বেলকনিতে বসে “মুসলমানদের কষ্ট পাওয়া দেখার মজা” দেখতে চাওয়ারা বুঝে গেছে, ব্যাপারটা এমন মজা-তামাশার নয়। এনআরসি মানে নিজেই নিজের জন্য হয়রানি ডেকে আনা, পকেটের পয়সা খরচ করে দুঃখ কেনা। তারা প্রত্যেকে ছোট চাকরি বা ব্যবসায় স্বল্প আয়-ইনকামে অস্থির থাকতে হয় এমন জীবন যাপন করেন। সেখানে উটকো নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের টেনশন? এই হয়রানি ডেকে আনা তাদের জীবনের অর্থ কী! কলকাতায় ইতোমধ্যে রেশন কার্ড বা ডকুমেন্ট ইত্যাদি জোগাড়ের নীরব দৌড়াদৌড়ি কেউ কেউ শুরু করে দিয়েছেন। কাজেই কেউ পারলে তাদের সেই ত্রাতা হতে পারেন মমতা- এই মেসেজই তারা হাজির করে ফেলেছেন!

    ইতোমধ্যে আর একটা বড় ডেভেলপমেন্ট আছে। গত মে মাসে শেষ হওয়া নির্বাচনে এক ব্যাপক কারচুপি হয়েছে আর তা মূলত ডিজিটাল ব্যালট-কেন্দ্রিক ব্যবস্থার সুযোগে। এটা বিজেপি ছাড়া মূলত সব আঞ্চলিক দল বিশ্বাস করে। যদিও হাতেনাতে দেয়ার প্রমাণ হাজির করা মুশকিল। এ ধারণা আরো জোরদার এ জন্য যে, নির্বাচন কমিশন বা সুপ্রিম কোর্ট গত নির্বাচনে খোদ মোদি বা বিজেপির বিরুদ্ধে নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। যায়নি। পাশ কাটিয়ে চলেছে। সেটিও আবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল যে, যদি তা করতে হয়, তবে আগ্রাসী মোদির নির্বাহী ক্ষমতার সাথে সঙ্ঘাতে যাওয়ার রিস্ক তাদের নিতেই হতো। যদিও কনস্টিটিউশনালি সে ক্ষমতা তাদের দেয়াই আছে। কিন্তু কেউই আসলে সঙ্ঘাতে যেতে চায়নি। এমনকি একজন সক্রিয় আপত্তিকারী কমিশনার এখনো মোদির নির্বাহী ক্ষমতার হয়রানির শাস্তি ভোগ ও মোকাবেলা করে চলেছেন।

    তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, ইতোমধ্যে তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে সংসদে ১৯টা বিজেপি-বিরোধী পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয়েছে। ‘নির্বাচনী সংস্কার, ব্যালট ফেরানোর প্রস্তাবকে সামনে রেখে’ রাজ্যসভায় স্বল্পমেয়াদি আলোচনার জন্য যৌথভাবে নোটিশ দিয়েছেন এ দলগুলোর নেতারা। এমন ইস্যুগুলো আস্তে ধীরে বড় ও সফল হয়ে উঠতে পারে, যা বিজেপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে হাজির হতে পারে। আপাতত আগামী সপ্তাহের উত্তেজনা নাগরিকত্ব আইন সংশোধনী বিল নিয়ে।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা গত  ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “নতুন ইস্যু নাগরিকত্ব বিল” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • গান্ধীর ‘হিন্দুইজম’

     

    গান্ধীর ‘হিন্দুইজম’

    গৌতম দাস

    ০৭ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2JS

    https://www.kolkata24x7.com থেকে নেওয়া

    [সার সংক্ষেপেঃ ছুপা হিন্দু জাতীয়তাবাদী গান্ধী-নেহেরুসহ ভারতের ইমেজ হল গান্ধীরা খুবই ভাল মানুষ। আর জিন্নাহ বেটা খুব খারাপ তাই তারা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করে পাকিস্তান বানিয়েছে, এতই খারাপ এরা। কিন্তু কঠিন সত্যি হল কংগ্রেস গান্ধী-নেহেরুসহ এরাই নিজেদের হিন্দুইজমের বাইরে কখনই যায় নাই। একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারতই কায়েম করতে কাজ করে গেছে তারা। আর এর সবচেয়ে বড় তাত্বিক নেতা হল গান্ধী। ফলে এদের হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত হতে চাওয়াটাই নিরুপায় মুসলমানদেরকে ঠেলে দিয়েছে মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তান কায়েম করতে। কাজেই নিরুপায় হয়ে জিন্নাহ সঠিকভাবেই মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ভারত ভাগ করে পাকিস্তান কায়েম করেছিলেন। বলা যায় মুসলিম লীগ মুসলিম জাতীয়তাবাদের দিকে কেন গিয়েছিল তা গান্ধী-নেহেরুসহ কংগ্রেসের হাতে নির্ধারিত হয়েছিল।
    মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদের পক্ষে কাজ করা বাংলাদেশের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ কথিত কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা যারা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করার দায় জিন্নাহ’র উপর এককভাবে চাপিয়ে নিজেরা হাত ধুয়ে ফেলতে চায় তাদেরকে চ্যালেঞ্জ। এরা মনগড়া কথা বলে এই গল্প তৈরি করেছে। নিজেদের দায় আকাম জিন্নাহর উপর চাপিয়েছে।
    এই লেখার একটা সারকথা এটা। তবে গান্ধী বনাম আরএসএসের তর্ক লড়াটাই কী ছিল তা জানার মাধ্যমে মূলত আপনাদেরকে চিনতে হবে গান্ধীর হিন্দুইজম-কে।]

     

    আসেন ছুপা হিন্দুবাদীগণকে চিনে নেইঃ
    মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, যাকে আমরা গান্ধী নামে চিনি। অনেকে তাকে আদর করে বা তেল দিয়ে তোয়াজ করতে বাপু বা মহাত্মা নামেও ডাকে। গান্ধী, জিন্নাহ, প্যাটেল- এরা সবাই মোদীর মতই গুজরাতি। যদিও সেকালের গুজরাট বলতে এটা বোম্বাই মানে বোম্বাই প্রেসিডেন্সির অংশ ছিল। মাত্র গত ১৯৬০ সালে গুজরাত প্রথম বোম্বাই (মহারাষ্ট্র) থেকে রাজ্য হিসেবে আলাদা হয়ে যায়। গত দুই অক্টোবর ছিল সেই গুজরা্তি গান্ধীর জন্মবার্ষিকী; তাও আবার ১৫০তম। সম্ভবত সে কারণে তাকে নিয়ে স্তুতিমূলক-মূল্যায়নের ছড়াছড়ি একটু বেশি দেখা গিয়েছিল এবার, এটা বলতে পারলে সহজ হত হয়ত। কিন্তু সমস্যা জটিল করে তুলতে সক্ষম হয়েছে, বিজেপি এবং আরএসএস এ দুই প্রতিষ্ঠানই। তাই নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল ‘১৫০তম’ জন্মবার্ষিকীই এবারের হইচইয়ের আসল কারণ কি না।

    এক কথায় বললে, ভারতের জন্মের সময় থেকে কংগ্রেসের তৈরি সব না হলেও অনেক আইকন অথবা বয়ান এত দিন ধরে আরএসএস-বিজেপি এই গোষ্ঠী, এরা ভাগ বসিয়ে হয় নিজেদের আইকন করে নিয়েছে অথবা একে ম্লান বা পুরো নষ্ট করে দিয়েছে। বিজেপির তেমনই আর এক এবারের উদ্যোগ হল গান্ধীকে নিজেদের আইকন করে নেয়ার চেষ্টা। খোদ আরএসএস প্রধান মোহন ভগত এ দিন দাবি করেছেন, “গাঁধীর আদর্শেই এগোচ্ছি”।
    তবে বলাই বাহুল্য, আইকন দখলের সময় বিজেপি-আরএসএস এর আগের বয়ান-মূল্যায়নকে নিজেদের মত করে আকার দিয়ে সাজিয়ে নিয়ে থাকে। যেমন নেহরুর প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং গান্ধীঘনিষ্ঠ কংগ্রেস নেতা সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল- এই প্যাটেলকে ইদানীং বিজেপি-আরএসএস একেবারে নিজেদের নেতা আইকন করে নিয়েছে। গুজরাতে পৃথিবীর দীর্ঘতম স্ট্যাচু এখন প্যাটেলের, মোদীর উদ্যোগে এটা বানিয়ে নেয়া হয়েছে। মোদীর গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রিত্বের আমলে ২০১৩ সালে, পরিচালনা কমিটি তৈরি, অর্থ সংগ্রহসহ এর কাজ তিনি উদ্বোধন করেছিলেন। প্যাটেলকে তুলে ধরারও কারণ-সূত্র একটাই। ভারত স্বাধীনের বছরের আগস্টের পরবর্তীকালে ৫৫০-এরও বেশি ছোট-বড় করদরাজ্যের রাজাগুলোকে বলপ্রয়োগে পিটিয়ে নতুন ভারতের অঙ্গীভূত হওয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল। আর এই বলপ্রয়োগের প্রশ্নে নেহরুর সাথে প্যাটেল একমতে থাকলেও, প্যাটেল নিজে ও তার মন্ত্রণালয় ও এর কাজকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন অপ্রয়োজনীয়ভাবে এক আগ্রাসী ও চরমপন্থা অবস্থানে। আর শুধু সে কারণেই এক আগ্রাসী হিন্দুজাতিবাদী হিসেবে প্যাটেলকে পরিচিতির আইকন লাগিয়ে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে মোদি-আরএসএস গোষ্ঠী। তাই এবার খোদ গান্ধীকে দখল নিতে এবারে বিজেপি এক কর্মসুচি শুরু করেছে যার নাম, “গাঁধী সঙ্কল্প যাত্রা”। ভেঙে বললে এটা হল, থেমে থেমে আগামী ৩০ জানুয়ারির মধ্যে গান্ধীর জন্মের ১৫০ বছর পালনে বিজেপির নেয়া ১৫০ কিলোমিটার পদযাত্রার এক কর্মসূচি।

    স্বভাবতই কংগ্রেসের গান্ধী, তাদের এত বড় “জাতির পিতা’ আইকন বিজেপি-আরএসএসের ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া- এটা কংগ্রেস এখন দুর্বল ক্ষয়িষ্ণু হয়ে গেলেও আপত্তি তো তাদের তুলতেই হয়। তারা তুলেছেও, আর সাথে কমিউনিস্টরাও বিজেপি-আরএসএসের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়ে সঙ্গ দিয়েছে। বিজেপি-আরএসএসের গান্ধী দখলে এবারের বার্ষিকীতে ঝাপিয়ে পড়া নিয়ে খোঁচা মারাও কম হয় নি। যেমন কংগ্রেস নেতা  মল্লিকার্জুন খড়্গে; তিনি বলেন,  ‘‘এত দিন যাঁরা শুধু গডসের নাম নিতেন, ভোট পেতে তাঁরা গাঁধীর নাম নেওয়া শুরু করেছেন”।  গডসে [Nathuram Vinayak Godse] হল গান্ধীকে গুলি করে [৩০ জানুয়ারী ১৯৪৮] হত্যাকারী সেই আততায়ীর নাম। দলের দায় এড়াতে যে হত্যা করার আগে দিয়ে আরএসএস থেকে নিজে পদত্যাগ করে নিয়েছিল। আর একালে এই সেদিনও প্রকাশ্যেই বিজেপি গডসে কে দলের হিরো মেনেছিল।

    ঘটনার এ দিকটা নিয়ে আমাদের আর এতে খুব বেশি মনোযোগ দেয়ার কিছু নেই। কিন্তু এই ১৫০তম উপলক্ষে আমরা অন্তত তিনজন একাদেমিকের লেখা বা মন্তব্য জানতে পেরেছি। এদের একজন প্রফেসর ও লেখক রামচন্দ্র গুহ [Ramachandra Guha], যাকে গবেষক বা ইতিহাস নিয়ে নাড়াচাড়া করা সিরিয়াস লেখক বলা যায়। কিন্তু তাঁর মূল পরিচয় হবে সম্ভবত তিনি বর্ষ-পুরানা চিবিয়ে রাখা জিনিষটাই আবার চিবাতে থাকেন, এমন ভারতীয় একাদেমিক না। তার চিন্তার ফ্রেম পুরানাদের চেয়ে আলাদা। কাজেই খুব বড় করে পরিচয় না বললেও আপাতত অন্তত এতটুকু বলতেই হবে। তিনি কলকাতার ইংরেজি দৈনিক “হিন্দুস্তান টাইমস” এবং “টেলিগ্রাফে” কলাম লিখে থাকেন। সেখানে যেমন লেখা এক কলামের তিনি শিরোনাম দিয়ে দিয়েছেন – “সোনিয়া গান্ধীর কেন ইবনে খালদুন পড়া উচিত”। অবলীলায় ইবনে খালেদুনের নাম নিয়ে কথা বলা একাদেমিক ভারতে খুব কমই আছেন!

    তিনি “গান্ধী ও আরএসএস” [Gandhi and the RSS] – এই শিরোনামে এক কলাম লিখেছেন গান্ধীর ‘১৫০তম জন্মবার্ষিকী’র তিন দিন আগে। এটা ছিল গবেষণাধর্মী দেড় হাজারের বেশি অক্ষরের এক সিরিয়াস লেখা, সাথে সুনির্দিষ্ট বইপুস্তকের রেফারেন্স। যার মূল প্রসঙ্গ হল, ঘটনাকাল ১৯৪৭ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর, এই সময়কালে গান্ধীর সাথে আরএসএসের সম্পর্ক কেমন গিয়েছিল, তা রেফারেন্সসহ তুলে আনা। তাঁর লেখায় ঘটনার মূল পাত্রপাত্রী হল একদিকে গান্ধী আর অন্য দিকে আরএসএস প্রধান গোলওয়ালকার [Golwalker] ও তার দল।  সে সময়ে নানান শহরে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা ঘটছিল আর গান্ধী সেসব শহরে গিয়ে দাঙ্গা থামানোর উপায় হিসেবে অহিংস প্রতিবাদে দাঙ্গা না থামা পর্যন্ত অনশনে বসছিলেন। এছাড়া এর পাশাপাশি আরএসএসও সেসব শহরে গিয়ে মুসলমান ও গান্ধীর বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা, হুমকি দিয়ে কিভাবে লিপ্ত হত অথবা তাদের মুখপাত্র “অর্গানাইজার” পত্রিকায় উসকানি দিয়ে কী লিখত, এমনকি গান্ধীর সাথে চিঠি চালাচালি বা একবারের মুখোমুখি সাক্ষাতে কিভাবে আরএসএস নেতা গোলওয়ালকার অভিযোগ অস্বীকারের লুকোচুরি খেলে গান্ধীর প্রচেষ্টাগুলো ভণ্ডুল করে গেছিল – গান্ধী রচনাবলী ও আর্কাইভ ঘেঁটে তা তুলে আনা- সেসবের বিস্তারিত বিবরণ আমরা এই লেখায় পাব। তিনি বলেছেন, আর দুদিন পরে (জন্মবার্ষিকীতে) মোদী ও আরএসএস গান্ধী সম্পর্কে নানান ভাল ভাল কথার ফুলঝুড়ি [nice things will be said] তুলবে। তাই এর আগেই তিনি সেকালে গান্ধী ও আরএসএসের সম্পর্ক কেমন ছিল তা নিয়ে এই রেকর্ড হাজির করে রাখতে চান।
    এই লেখকের লেখা অনুসারে, পলিটিক্যাল লাইনের দিক থেকে গান্ধীর অবস্থান হল, তিনি বহুধর্মীয় জাতীয়তাবাদের (religiously plural nationalism) ধরণের এক ভারত চাইছেন, সেজন্য লড়েছেন। গান্ধীর এই হিন্দুবাদে হিন্দুধর্ম বলতে এটা ‘এক্সক্লুসিভ রিলিজিয়ান’ নয়। মানে একা হিন্দুধর্ম না, অন্য (মুসলমান) ধর্মও সাথে আছে। [Hinduism was not an exclusive religion]। কিন্তু মূলকথা এই বিশেষ হিন্দুবাদের, একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভারত চাইছেন গান্ধী। বিপরীতে আরএসএস নেতা গোলওয়ালকার চাইছেন মুসলমানদের মেরে কেটে হলেও বাধ্য করে পাকিস্তানে পাঠানো। হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, ‘দুনিয়ার কোনো শক্তি নেই মুসলমানদের হিন্দুস্তানে রাখে” [“no power on Earth could keep them in Hindustan”]। তো এসব লেখা বা কথার সারাংশ হল, একজন মুসলমানদের কচুকাটা করে ভাগাতে চাইছেন তো অন্যজন হিন্দু-মুসলমানের কথিত ঐক্যের পুর্বশর্ত ও এর জোয়ার তুলতে চাইছেন। না হলে অনশনে, না খেয়ে রইছেন। আর একারণে কাজের কাজ কিছু হোক আর না হোক অন্তত সহানুভুতি তার পক্ষে যাচ্ছে। এতে গান্ধীর আপাত জিত ও জাতির পিতা হওয়া তো কার পক্ষে ঠেকানো যায় নাই।

    কিন্তু আসল কথা হল, তাতে লাভ কী হয়েছে? ভারত কি হিন্দু-মুসলমানের ভারত হয়েছে? পাকিস্তান আলাদা হয়ে গেলেও ভারতে নিয়মিত দাঙ্গা হয়ে চলেছে। এমনকি চলতি শতকের শুরুতেও গুজরাটে বড় দাঙ্গা হয়েছে। রাষ্ট্র হিসেবে ভারত নাগরিকের রাষ্ট্র হতে পারেনি। হিন্দুর রাষ্ট্র হয়ে থেকেছে। পারস্পরিক ধর্মীয় বিদ্বেষ কিছুই মেটেনি, দীর্ঘ সময় যাওয়াতে যা যতটুকু চাপা পড়েছিল তা প্রবল হচ্ছে আবার। সারকথা গান্ধীর নিজের আমল থেকেই দাঙ্গা বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। কিন্তু কেন? এর জবাব গান্ধী কখনো দেননি। অর্থাৎ গান্ধীর হিন্দুইজমের ভারতরাষ্ট্র এটা কখনই সমাধান হতে পারে নাই। আসলে তা হওয়ার কথাও না।

    তবে রামচন্দ্র গুহের এই পরিশ্রমী কাজটির পরও এই লেখা থেকে একালে, মোদি-আরএসএস খারাপ আর গান্ধী মহান- এর বেশি কিছুই প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। গান্ধীর হিন্দুইজমের বিপরীতে মোদী-আরএসএসের হিন্দুত্ববাদ- এর ভারত আরও শক্ত হয়ে হাজির হয়েছে। এককথায় রামচন্দ্র গুহের পরিশ্রমটার মধ্যে কোন প্রতিকার নাই, ইঙ্গিত নাই। আছে খালি গান্ধী মহান! সে তো আমরা সকলেই জানতামই!

    আবার আর দুই শিক্ষাবিদ- গৌতম ভদ্র ও দীপেশ চক্রবর্তী, এদের মন্তব্য সংগ্রহ করে রিপোর্ট করেছে আনন্দবাজার, এখানে “গাঁধীর স্বরাজ আর সঙ্ঘের রাষ্ট্র এক নয়” – এই শিরোনামে। এদুইজনের মিলের দিকটা হল তারা নিজেদের সাবঅল্ট্রান [subaltern] ধারার প্রবক্তা ভাবেন বা ভাবতেন, যদিও তারাই এখন বলে থাকেন, এই ধারা এখন সাংগঠনিকভাবে মৃত। এদের একটা বৈশিষ্ট্য বলা যায় যে, তারা হিন্দু বা মুসলমান ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের কোলে বসে সেই চোখে দেখার যে অভ্যস্ত যুগ ও ধারা ছিল এর বাইরের এরা। বরং সমাজের যাদের কথা বা স্বর শোনা হয় না, উপেক্ষিত, নিচু আয়ের, নিচু জাতের মনে করে চাপানো হয় ইত্যাদি তাদের উদ্বেগগুলো উঠিয়ে আনা বা তাদের জায়গায় বসে দেখার পক্ষের লোক। কিন্তু মডার্ন রিপাবলিক গড়তে একটা ‘জাতি’ ধারণা বা একটা না একটা “জাতীয়তাবাদ” অনিবার্য প্রয়োজনীয় বলে এরা মনে করেন কি না- এই প্রশ্নে, প্রশ্নটাই তাদের মাথায় এসেছে এমন প্রমাণ দেখা যায় না।
    তবে দীপেশের এখনকার অবস্থানটা হল, ঠিক মোদী মানে উদ্র জাতীয়তাবাদীরা নয় তবে সাধারণভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদ যেহেতু ভারত মেনেই নিয়েছে তাহলে একইভাবে মুসলিম জাতীয়তাবাদকে মেনে নিতে জায়গা করে দিতে অসুবিধা কী। প্রথম আলো বা তাদেরই প্রতিচিন্তায় তাঁর কিছু লেখা দেখে এমন মনে হয়েছে। কিন্তু মূল কথা যেটা, কেন ধর্মীয়সহ যেকোন জাতীয়তাবাদ একটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের জন্য অনিবার্য প্রয়োজনীয় পুর্বশর্ত মনে করা হয়েছে? এটা ভিত্তিহীন নয় কেন, সে প্রশ্ন এদের অবস্থান দেখা যায় নাই।

    এদিকে আনন্দবাজার দীপেশের একটা বড় উদ্ধৃতি এনেছে সেটা হল এরকম, “হেডগেওয়ার ১৯৩৪ সালেই বলে দিয়েছিলেন, রাজনীতি বিষয়ে সঙ্ঘ উদাসীন। অন্য দলের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, সে খাদির সমর্থক এবং অস্পৃশ্যতা বর্জনের বিরোধী নয়। তখনকার কংগ্রেস আর সোনিয়া-রাহুলের কংগ্রেস যেমন এক নয়, হেডগেওয়ারের সঙ্ঘ আর আজকের সঙ্ঘও এক নয়”। এই কথাটাকে স্পষ্ট বুঝবার জন্য এখানে ফুটনোট দিয়ে রাখছি। তা হল, আরএসএস –এর পুরা নাম রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। সংক্ষেপে একে সঙ্ঘ বলে ডাকে অনেকে। এই সঙ্ঘ ১৯২৫ সালে এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন হেডগেওয়ার (কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার)। আর পরবর্তিতে ৪৭ সালের দিকে আরএসএস-এর প্রধান ছিলেন,  গোলওয়ালকার (মাধব সদাশিব গোলওয়ালকার); যার নাম এই লেখার প্রথম দিকে নেয়া হয়েছে।

    বিপরীতে গৌতম ভদ্র – তার বিজেপি-আরএসএস সমালোচনা অনেক সরাসরি। তার দুটি উদ্ধৃত বক্তব্য ঐ রিপোর্টে এসেছে। যেমন- ভদ্র আরএসএস প্রধানের সমালোচনা করে বলছেন – ‘ভারত আধ্যাত্মিক দেশ। আধ্যাত্মিক পথেই এর উত্থান হবে বলে চেয়েছিলেন গাঁধী” – মোহনের এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা সঠিক নয়। বরং আসল বক্তব্য ও ব্যাখ্যা হল, “গাঁধী কখনই আধ্যাত্মিক দেশ বলেননি। তিনি ধর্মের কথা বলেছেন, রামরাজ্যের কথা বলেছেন। কিন্তু সেই রাম অযোধ্যায় থাকেন না, অস্তিত্বের ভেতরে তার স্বর অনুভব করা যায়। ইনার ভয়েস!”।
    আর ভদ্রের দ্বিতীয় উদ্ধৃতি, গান্ধীর ‘হিন্দ স্বরাজ’ নামে প্রবন্ধের অর্থ, এখনকার আরএসএস প্রধান মোহন ভগত যেভাবে করেছেন, এর সমালোচনা সংক্রান্ত। মোহন বলেছেন, “পরাধীনতার ফলে তৈরি গোলামি মানসিকতা যে কী ক্ষতি করতে পারে, গাঁধী বুঝতেন। স্বদেশী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা ‘হিন্দ স্বরাজ’-এ তাই এক ছাত্রের চরিত্র এসেছিল। তৎকালীন রাজনীতিবিদেরা দেশের পূর্ব গৌরব ভুলে পশ্চিমের অন্ধ অনুকরণ চালিয়ে যেতেন। তার প্রভাব আজও দেখা যাচ্ছে”। শেষে তিনি আশা ব্যক্ত করেছেন, ‘গাঁধীর পথ ধরেই ভারত আবার বিশ্বগুরু হয়ে উঠবে”।
    আনন্দবাজার বলছে এই ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে, দুই ইতিহাসবিদই আপত্তি করে তাদের মতে বলছেন, “হিন্দ স্বরাজ নিছক স্বদেশীর কথা বলে না। সে আধুনিকতার বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গভীর নৈরাজ্যবাদের কথা বলে। সঙ্ঘের রাষ্ট্রবাদের সাথে তার সম্পর্ক নেই”। ‘আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা আমাদের অসভ্য করে’- ঐ বইয়ে লিখেছিলেন গাঁধী। ‘হিন্দ স্বরাজ’ আর ‘হাউডি মোদি’ মেলে না কিছুতেই! তবে দীপেশ চক্রবর্তীর মতে, গান্ধীর কাজকে তিনি বলছেন, একে “জেহাদি অহিংসা বলতে পারেন”। গৌতম ভদ্রও এতে একমত। মোটা দাগে তাঁদের সারকথা হল, মোদি ও আরএসএস গান্ধীর ধারার উত্তরসূরি নয়। যদিও সেটা তো বলাই বাহুল্য।

    আসলে এখান থেকে দু’টি প্রশ্ন উঠে, যা নিয়ে উপরের রামচন্দ্রসহ তিন শিক্ষাবিদের কেউই তোলেননি। তার প্রথমটি হল, যদি মোদী ও আরএসএস গান্ধীর ধারার উত্তরসূরি না-ই হয়, তবু মোদী ও আরএসএস গান্ধীকে নিজেদের করে নেয়ার সুযোগ নিতে বা দাবি করতে পারছেন কেন? এই যে দুইটা পক্ষ এদের উভয়ের চিন্তার মিল বা মৌলিক দিকটি কী ছিল?
    কংগ্রেস ও আরএসএস ভিন্ন রাজনৈতিক দল অবশ্যই। তবুও তাদের রাজনীতিতে মিলের দিকটি হল – হিন্দু জাতীয়তাবাদ। উভয়েই হিন্দু জাতীয়তাবাদী। আর ফারাক হল, এই হিন্দু জাতীয়তাবাদকে দুই দল দু’ভাবে ব্যাখ্যা করে থাকে। আরএসএস বলছে হিন্দু জাতীয়তাবাদ- এটাই হিন্দুত্ব। হিন্দু জাতি খাঁটি, পিওর; খাঁটি আর্য রক্তের ধারা হিন্দুরা। এটাই আবার হিটলারের ভাষায় জর্মানিরা পিওর আরিয়ান রেস (খাঁটি আর্য রক্তের)। অর্থাৎ এরা তাদের জাত-শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে এই একই জায়গাকে কেন্দ্র করে। এ কারণে হিটলার ও আরএসএসের রেসিজম বা বর্ণবাদিতা, জাত-শ্রেষ্ঠত্ব একই ধরনের।
    বিপরীতে গান্ধীর হিন্দু জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যায় তাঁর দাবি হিন্দু বা হিন্দুইজম শব্দ – এটা কেবল একটা হিন্দুধর্ম নয়, অন্য (মুসলমান) ধর্মও। এ নিয়ে তার ব্যাখ্যার পক্ষে বিস্তর কোশেশ আছে। যেমন দাঙ্গার মুখে প্রতিকার হিসেবে তিনি হিন্দুকে আল্লাহু আকবর বলাতে চান আবার, মুসলমানকে জয় শ্রীরাম ধরনের কিছু। এ কারণে গান্ধীর হিন্দুইজমের পূর্বশর্ত হচ্ছে, কথিত এক ফ্যান্টাসির “হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য”। এ প্রসঙ্গে গান্ধী নিজ দলীয় কংগ্রেস কর্মীদের উদ্দেশ করে বলা ১৯৪৭ সালের ১৫ নভেম্বরের এক ভাষণ থেকে রামচন্দ্র গুহের গবেষণায় উদ্ধৃতিটা দেয়া হল এখানেঃ “be true to the basic character of the Congress and make Hindus and Muslims one, for which ideal the Congress has worked for more than sixty years”.

    কিন্তু বাস্তবতা হল, গান্ধীর নির্দেশ নিজের দল কতটা মেনেছিল তা প্রশ্নসাপেক্ষ তো বটেই। এ ছাড়া, এমনকি তা পুরোপুরি মেনে চললেও ফলাফল শূন্যই হয়েছিল। তখন ও এখনকার বাস্তবতাই এর প্রমাণ। তাহলে মূল সমস্যা কোথায়? গান্ধীর “হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য” কথার আসল মানেই বা কী? এর সোজা অর্থ পরস্পরের ধর্মের পক্ষে জয়গানের স্লোগান দিতে হবে, এটাই বলা হচ্ছে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য।

    কিন্তু তাতে এ থেকেই আবার, হিন্দুদেরকে কেন আল্লাহু আকবর বলতে বলছেন গান্ধী- এই অভিযোগ তুলে আরএসএস তাদের মুখপাত্র অর্গানাইজার পত্রিকায় গান্ধী ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করে তাদের ধুয়ে দিয়েছিল। আসলে এতে উল্টো আরএসএসের পক্ষে দাঙ্গা বাধানোই সহজ হয়ে গেছিল।

    এখানে মূল কথা হল, গান্ধীর এই ঐক্যের প্রস্তাবই ছিল অলীক ও অবাস্তব, বাস্তবায়ন অযোগ্য। ধর্ম মানুষের যার যার কোর বিশ্বাসের প্রশ্ন। এখানে চাইলেই এক ধর্মের লোক আর এক ধর্মের পক্ষে জিন্দাবাদ বলে ধ্বনি দিতে পারে না। এমনকি কোনো মুসলমানের অন্য ধর্মের পক্ষে জিন্দাবাদ বা মূল শ্লোক বা কালাম উচ্চারণ করার পরে সে আর মুসলমান থাকে কি না সে প্রশ্ন তো উঠবেই! আবার এটা হিন্দুর দিক থেকেও একই ভাইসভারসা। অথচ গান্ধীর প্রস্তাব ও ব্যাখ্যা দাবি করছে একটা ভারত রাষ্ট্র গড়তে চাইলে এসব অস্বস্তিকর নিজ নিজ ধর্মবিরোধী অবস্থানে নাকি যেতেই হবে। হিন্দু-মুসলমানের তথাকথিত ঐক্য- এর মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব নাকি এতই।

    এক কথায় বললে গান্ধীর কথিত ‘হিন্দুইজমের’ জাতীয়তাবাদ প্রকল্প- এর ধারণাই বাস্তবায়ন অযোগ্য। ফলে তা অবাস্তব হয়ে থেকে গেছে। আর গান্ধী খুন হয়ে মরে যেন বেঁচে গেছেন।

    কিন্তু কেন একটা ‘হিন্দুইজমের’ জাতীয়তাবাদ, বিশেষ করে তা কেন ‘হিন্দুইজমের’ হতেই হবে ? এ ছাড়া একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদই কেন দরকার? একটা ভারতরাষ্ট্র গড়তে চাইলে কেন এটা অনিবার্য?

    লক্ষণীয় যে, ওপরের তিন ভারতীয়  একাডেমিকের কেউ এসব প্রশ্নগুলোর দিকে যাননি বা যেতে চাননি। কোনো রাষ্ট্র গড়তে চাইলে একটা জাতীয়তাবাদ, তাও আবার একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ- এটাকে কেন এসেনশিয়াল বা অনিবার্য প্রয়োজনীয় মনে করা হচ্ছে, এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা হয়নি। জাতীয়তাবাদ যার গোড়াটা আছে কথিত এক ‘জাতি’ ধারণায়। বাংলায় জাতি বললেও এটা দু’টি আলাদা ধারণা ইংরেজিতে রেস ও এথনিক- এ দুই শব্দের অর্থ বাংলায় একটাই- ‘জাতি’ করা হয়ে থাকে।

    লক্ষণীয় যে, ইংরেজিতে এই দু’টি শব্দই অরাজনৈতিক পরিচয়-প্রকাশমূলক শব্দ। যেমন বাঙালি রেসের লোক আর আমার খাদ্যাভ্যাস বা ধর্ম-সংস্কৃতি কী হবে এই এথনিক পরিচয় আমার জন্মের আগে থেকেই নির্ধারিত। এই পরিচয়গুলো আমরা যে কেউ বেছে নিয়ে দুনিয়ায় আসি না বলেই, এগুলো অরাজনৈতিক। এর দায় আমার নয়। এর সাথে আমি কেমন রাষ্ট্র গড়বে এর সম্পর্ক কী? এমন কোনো সম্পর্ক নেই। কাজেই রাষ্ট্র গড়তে চাইলে নিজ নিজ ধর্ম নিয়ে সংশয় তৈরি করার প্রয়োজন কী?

    নিশ্চয় নেহরু-গান্ধীরা কোনো বোকা অবুঝ মানুষ নন! কিন্তু তবু সেই রামমোহনের আমল থেকেই আমরা যেন একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ অনিবার্য প্রয়োজনীয়, এমন একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের তালাশে থাকতে দেখতে পাই আমরা। কেন?

    মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্র সম্পর্কে আমাদের তাবৎ কামনা, বোঝাবুঝি আগ্রহ ইত্যাদি সব কিছুর উৎস হল ব্রিটিশ কলোনি মাস্টারের রাষ্ট্র। রামমোহন থেকে নেহরু-গান্ধী পর্যন্ত সবাই বিশ্বাস করতেন [তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় থাকা একমাত্র রাষ্ট্র] যে ব্রিটিশ রাষ্ট্র তারা দেখছে এর নাগরিকদের এক থাকার পেছনে তাদের একই ধর্মীয় পরিচয় ( এংলিকান ক্যাথলিক, Anglican Catholic)- এটাই তাদের কথিত ঐক্য বা এক হয়ে থাকার ভিত্তি হয়ে আছে। কাজেই ভারতেরও একটা রাষ্ট্র হতে গেলে তাদেরও একটা ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে একটা একক ধর্ম থাকতেই হবে। এই ছিল তাদের প্রবল অনুমান। কিন্তু এই অনুমান একেবারেই ভুল ও ভিত্তিহীন। বৃটিশ রাষ্ট্রের ভিত্তি মানে তা এক হয়ে আছে কোন Anglican Catholicism এর কারণে নয়।   যদিও আবার এরা সবাই দেখেছিল ভারতে সেটা বাস্তবতা নয়। কারণ অবিভক্ত ভারতে সবার ধর্ম এক হিন্দুত্ব মানে এক হিন্দুধর্ম তা ছিল না। তাই সেখান থেকে রামমোহন বলে গেছিলেন অবিভক্ত ভারতের সবার জন্য একটা ব্রাহ্ম ধর্ম তৈরি করতে, যদিও সেটাও  অলীক ও অপ্রয়োজনীয় বলে ব্যর্থ হয়েছিল। সম্ভবত সেকারণে গান্ধীর পথটা রামমোহন থেকে আলাদা হয়েছিল। যেটা আবার পরবর্তি উদ্যোগ হিসাবে বঙ্কিম চন্দ্র (১৮৩৮-১৮৯৪) -এর হিন্দুত্বের কাছাকাছিই, ইসলামবিদ্বেষী ছুপা অথবা উদাম।

    এককথায়, মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে ঐ সমাজে পিছনে একটা একক ধর্মের মিল বা ঐক্য থাকতেই হয়, এই অনুমান মিথ্যা, ভিত্তিহীন। সম্পুর্ণত এক ভুল ধারণা। বরং রাষ্ট্রে নাগরিক এক হয়ে থাকে – নাগরিক ঐক্য থাকে – মূলত বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকার বা নাগরিক নির্বিশেষে “সাম্য” কায়েম রাখতে পারলে। এটাকেই অনেকে ক্লাসিক অর্থে সেকুলারিজম (ইসলামবিদ্বেষী সেকুলারিজম নয়) বলেও বুঝে থাকে।

    পরবর্তীকালে সেই একই কারণে গান্ধী নতুন ব্যাখ্যা দিলেন যে ভারতের হিন্দুইজম মানে এটা একটা ধর্ম না, বহু। এক রিলিজিয়াস প্লুরালিটি। একে হিন্দু এবং মুসলমানের ধর্ম বলে, বহু বলে বুঝতে হবে দাবি করতেন। গান্ধীর হিন্দুইজম বলতে তাই ‘হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য’ কথাটা এভাবে বুঝতে হবে। গান্ধীর এই অবাস্তব সোনার পাথরের বাটি ধারণার উৎস এখানে। অথচ হিন্দু ও মুসলমান শুধু নয়, বরং যেকোনো দুই মানুষ এক বোধ, একটা ঐক্যবোধ করতে পারে খুবই সহজে এভাবে যে,  পরিচয় নির্বিশেষে রাষ্ট্রে সব নাগরিক সমান, তাদের নাগরিক অধিকার সমান- এই ভিত্তিতে যদি একটা রাষ্ট্র গড়া যায়। মানুষের এথনিক, রেসিয়াল, নারী-পুরুষ, ভাষা বা ধর্মীয়সহ যেকোনো পরিচয় নির্বিশেষে এক অধিকার বৈষম্যহীন রাষ্ট্র কায়েম ছিল এর আসল সমাধান। অথচ খুব সম্ভবত হিন্দু বা হিন্দু সভ্যতা এসব কোনো ধারণার আড়ালে গান্ধীসহ সবার মনেই একটা হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ব একটা হেজিমনি কায়েমের, এর ধারণা কাজ করত। তাই কোন হিন্দুইজম ছাড়া রাষ্ট্র কল্পনা তারা করতে চান নাই, বা পারেন নাই। অথচ এক রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে চাইলে হিন্দু-মুসলমানকে এক হয়ে যেতে হবে কেন? এছাড়া এই – হিন্দু-মুসলমান এক করে ফেলা – এই প্রকল্পটাই তো অলীক অবাস্তব; এক সোনার পাথরের বাটি!

    ফলে বাস্তবত এক দিকে গান্ধীর দেয়া অলীক অবাস্তব প্রস্তাবের কারণে হিন্দু-মুসলমান এরা এক পরস্পর বিরোধাত্মক পরিচয় হিসেবে উঠে এসেছিল এবং যেটা এখনো আছে। আবার তিনি হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য থাকতে হবে বলে পরস্পর একে অপরের ধর্মের পক্ষে চিল্লা দিতে হবে বলে দাবি করছেন, নইলে তিনি অনশনে যাবেন। আর অন্যদিকে আরএসএস গান্ধীর এই অবস্থানকেই যে [হিন্দুকে আল্লাহু আকবর বলতে হবে], গান্ধী ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুদেরকে ক্ষেপিয়ে আরএসএসের পক্ষে আনার মোক্ষম সুযোগ হিসেবে ব্যবহার ও দাঙ্গায় প্ররোচিত করে গেছে।

    সারকথায়, গান্ধী নিজেই দাঙ্গার কারণ, আবার দাঙ্গা উঠে এলে তিনি অনশনে বসে গেছেন! আর এই গান্ধীকেও মোদী ও আরএসএস এখন নিজেদের করে নিতে চাচ্ছে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা এর আগে গত  ০৫ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “গান্ধীর স্ববিরোধী ‘হিন্দুইজম“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • ভারতের অনুমোদনের অধীন রাজনীতিতে আটকে যাচ্ছি

    ভারতের অনুমোদনের অধীন রাজনীতিতে আটকে যাচ্ছি

    গৌতম দাস

    ২৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2DQ

     

    -একই প্রসঙ্গে প্রথম-পর্বের লেখাটা এখানে পাবেন।

    বাংলাদেশে সব দলের রাজনীতি কী ভারতের অনুমোদনের অধীনে চলে যাচ্ছে?
    রাজনীতির অনেক সংজ্ঞা হয়। এর একটা হল, রাজনীতি মানে ফ্রেন্ড অ্যান্ড এনিমির ভাগ [Friend-Enemy distinction] সম্পর্কে পরিষ্কার হুশ বা সেন্স থাকা। মানে বন্ধু ও শত্রু চিনবার, সে ভাগাভাগি বুঝবার সক্ষমতা দেখানো। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা কি তার বাবাকে ঠিক ঠিক পাঠকারী ন্যূনতম যোগ্য একজন বলে নিজেকে হাজির করতে পেরেছেন ও পারবেন? কারণ, বলা যায় সম্ভবত আমরা ক্রমশ এক ঘেরার মধ্যে পড়তে যাচ্ছি। গত ২০০৮ সালে ক্ষমতা নেয়ার সময় এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা কিছু ভুল করেছিলেন। তিনি হয়ত নিজের পক্ষে সাফাই দিয়ে বলতে পারেন এভাবে যে, র‍্যাটসের কারবারে তারা তো আমাকে প্রায় কোনঠাসা করে বাইরে ছিটকে ফেলেই দিয়েছিল। আর ওদিকে বিএনপি-জামাত আগেই নির্বাচন ব্যবস্থাকে এমনভাবে  প্রভাবিত করে সাজিয়ে ফেলেছিল যে তারা ছাড়া আর কারও জিতে আসবার সব সুযোগ শেষ করে এনেছিল। কাজেই আমার হাতে তো কোন অপশনই ছিল না। কোন মতে শেষ ট্রেন ধরতে পেরেছিলাম বলে উঠে এসেছি। কাজেই কাদের “অনুমোদন” সাপেক্ষে ক্ষমতা পাবার রাস্তা হচ্ছে সে বিবেচনা তা ছিল আমার কাছে সেকেন্ডারি । প্রাইমারি বিবেচনা ছিল আমি ক্ষমতা পাচ্ছি কীনা। এসব তিনি হয়ত বলতেই পারেন।

    কিন্তু মুল প্রশ্ন যেটা, তিনি কী বন্ধু-শত্রুর সীমারেখা ঠিকঠাক টেনে এগিয়ে গেছিলেন? এটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ নির্ণায়ক। আমেরিকা-ভারত বাংলাদেশের সরকারে কে আসবে থাকবে – এর নির্ধারক হয়ে উঠে গিয়েছিল। আমরা দেখেছিলাম হাসিনার ক্ষমতারোহন যত না সত্য এর চেয়েও বড় সত্য হয়ে গেছিল এটা। হাসিনাসহ তার সমর্থকদের হয়ত মনে হয়েছিল, আমেরিকা-ভারত এর নির্ধারক হয়ে হাজির হওয়া – এটা সাময়িক সব ঠিক হয়ে যাবে। অথবা এটা হাসিনার পক্ষেই থাকবে।  তাই কী?

    আসলে এই অনুমানটাই ছিল ভিত্তিহীন, অলীক। তাই এটা শুধু আত্মঘাতি না, সেসময় এটা আত্মবিলীন করে ফেলার পক্ষে এক পদক্ষেপ হয়েছিল। নিজের অস্বিত্ব কেউ নিজে বিলীন করার দিকে আগালে যেমন হয় – এরকম এক অবস্থা।  কারণ, আপোষ করারও তো একটা শেষ সীমা বলে কিছু থাকে। এদিকটা থেকে কেউ চিন্তা করে নাই, সম্ভবত।

    রাষ্ট্রগুলোর সব আন্তঃসম্পর্কেই যত কিছুই বলে কয়ে নেয়া হোক, এমনি তা চরম ভদ্রলোকি চুক্তি করে নেয়া হলেও পরবর্তিতে নতুন বাস্তবতায়  এসব বুঝাবুঝির বুঝ আউলায়ে যেতেই পারে। যায়, আর তা সবচেয়ে স্বাভাবিক। মূল কারণ কেউ সরকারে স্থায়ীভাবে আসীন হয় না। ওবামার পরে, এপর্যন্ত সব প্রেসিডেন্টের, পুরা উলটা ধরণের এক প্রেসিন্ডেন্টের আগমন ঘটেছিল যার নাম ট্রাম্প। আর এদিকে ভারতে কংগ্রেসের কাকাবাবুর পরে বিজেপি-আরএসএস-মোদী এসে গেছে। কাজেই বাংলাদেশকে নিয়ে পুরানা আমেরিকা-ইন্ডিয়ার  যত শক্ত বুঝাবুঝির বুঝই থাকুক না কেন – যার আউটকাম হিসাবে আমাদের সরকার যেমনই হোক না কেন, আমেরিকা-ইন্ডিয়ার পুরান বুঝাবুঝি তা এখন ভেঙ্গেচুরে শেষ; এমনকি তা পুরা নন-ফাংশনাল হবার যোগাড়। তাই আত্মবিলীন করে হাসিনার ক্ষমতা পাওয়ার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছিল।

    এতদিন হাসিনা ক্যাম্পে মনে করা হয়েছিল,  বাংলাদেশের হিন্দু ব্যক্তিত্ব বা রাজনীতিকদের দিয়ে তোলা নিপীড়নের অভিযোগ কাজে লাগালে এটা বিএনপি-জামাতসহ হাসিনাবিরোধী যে কাউকে কোনঠাসা বা জঙ্গীত্বের শক্ত অভিযোগ তুলে আটকে ফেলা একেবারেই সহজ। কিন্তু এখন আসল সত্য কথাটা ভেসে উঠছে! এখন এটা নিশ্চয় পরিস্কার ভারতের হাতে কত “প্রিয়া সাহা” হাতিয়ার আছে! যা হাসিনাকেও সাইজে আনার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে!

    গত বছর নির্বাচনের আগে, ২০১৮ সালের প্রথম অর্ধের শুরু থেকেই  ভুলের পরবর্তি ধাপ শুরু হয়েছিল। হাসিনা সম্ভবত খেয়ালই করেন নাই যে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের আগের হিন্দু রাজনীতি ততদিনে বদলে গিয়েছে। এটা হিন্দুত্বের রাজনীতিতে মোড় নিয়ে ফেলেছে। নতুন হিন্দুত্বের রাজনীতি নতুন আর এক রাজনীতির দল হিসাবে হাজির হয়েছিল – বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট নামে।

    [বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট গত ২০১৩ সাল থেকেই চোখে পরার মত এরা ততপর, তবে দলের ভিতরে কামড়াকামড়িও আছে। তাই ব্রাকেটবন্দী দুই পক্ষের সংগঠন আলাদা। দলের কথিত মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামানিক বনাম বাকিরা, মিডিয়া ভাষ্য অনুযায়ী ব্যাপারটা এমনভাবেই উপস্থাপিত। এই প্রামানিক আসলে সরাসরি আরএসএসের সদস্য। নিজেকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি বলেও পরিচয় করিয়েছেন। সম্ভবত প্রতিদ্বন্দ্বি মূল নেতা এমন বাকিরা সব স্থানীয়, যাদের ভারতে আরএসএসের অতদুরে লম্বাহাত ছুতে পাবার বা নাগাল পাবার সুযোগ  হয় নাই। তাই বিতর্কের গোড়াটা এখানে।]

    কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, হাসিনা বা তার দলের এই হিন্দু মহাজোট দলের উত্থান-আগমনের প্রতি মনোভাব খুবই আজিব। হাসিনা ব্যাপারটাকে দেখেছিলেন খুবই হাল্কা ভাবে। ভেবেছিলেন এটা আওয়ামি লীগের হিন্দু ভোট, কন্সটিটুয়েন্সি হাতছাড়া বা ক্ষতি করতে পারে, এতটুকুই।  কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি ও স্বার্থের দিক থেকে দেখলে এটা যে এক মহামারি ডেকে আনতে যাচ্ছে সেদিকটা সম্ভবত তিনি বা দলের কেউ আমল করে নাই। মূলত চিন্তার সীমাবদ্ধতা কারণে তা বুঝা যায় নাই। এটা একা হাসিনা না, খোদ কথিত প্রগতিশীলতার বড় সবনেতাও এমনই অবস্থায়। যেমন ধরেন  বাংলাদেশের জন্ম থেকেই ধর্মকে রাষ্ট্রের সাথে মিলানোকে সবার চেয়ে উচ্চস্বরে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল এরা মহাপাপ মনে করে বলে আমাদের জানিয়ে আসছে। তাহলে এই হিন্দু মহাজোটের আগমনে এরা কেউ উদ্বিগ্ন হয় নাই কেন? অথচ নিজেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদী ভেবে যারা গর্বিত  এরা কেউই এনিয়ে কোথাও রা করে নাই। দরকার অনুভব করে নাই। উলটা যেন সবাই একেকজন হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হয়ে গেছেন। ওদিকে আমরা শুনেছিলাম মহাজোটের  কিছু হিন্দু নেতা গুম হয়ে গেছেন। আবার বছর খানেকের আগেই জানা গিয়েছিল যে না সবাই নিজ পারিবারিক জীবনে ফিরে এসেছেন।

    কিন্তু কেউ বুঝতে চান নাই, বা চিন্তার মুরোদে কুলায় নাই যে হিন্দু মহাজোট যে ষাট আসনের দাবিতে আগিয়ে আসতেছে এই দাবি আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাবে, কী হবে।  অথচ এটা রাষ্ট্রতত্ব বা রাষ্ট্রগঠন বিষয়ক সিরিয়াস এক ফান্ডামেন্টাল বিষয়। যেমন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র নিজ দেশে বিজেপি-আরএসএসের একটা শাখা কাউকে খুলতে দিতে পারে? এর জবাব হল, অবশ্যই না। প্রশ্নই আসে না। নির্বাচন কমিশনের আইনেও এমনটাই আছে।

    ভারতের বেলায় তো আরও না। না, ওরা হিন্দু বলে না। এখানে “কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট” একেবারে সরাসরি। আর যদি সাফাই দিতে বলা হয় যে ভারতের রাজনীতির দলের শাখা বাংলাদেশে কেন, এখানে কী কামে? এর কোন সাফাই জবাব হয় না। বাংলাদেশের হিন্দু-জনগোষ্ঠিকে ভারতের বিদেশনীতির স্বার্থে সংগঠিত করবে? তাই যদি হয়, এটা তো স্বাক্ষাত বিদেশি এজেন্টগিরির কাজ!  কিন্তু কেউ  বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট এর বেলায় এটা প্রয়োগের কথা ভেবেছে মনে হয় না।

    আবার কেউ হিন্দু মহাসভার [RSS এর আগের ভার্সান] শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী হয়ে বাংলাদেশে হিন্দু রাজনৈতিক দল খুললেই যে তিনি তথাকথিত “হিন্দুস্বার্থ” উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ান হবেন – এধারণাও ভিত্তিহীন। আবার হিন্দুস্বার্থ মানে কী, ভারতরাষ্ট্রের স্বার্থ?  এটা হতেই পারে না।  আবার এর অন্য বিপদও আছে।  আপনি হিন্দুস্বার্থ উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ান দল হলে এতে পাশে একজন মুসলমানস্বার্থ উদ্ধারের চ্যাম্পিয়ানকেই হাজির পাইবেন। নিশ্চিত থাকতে পারেন। কারণ আপনিই ডেকে আনছেন। অথবা ভাইস-ভারসা। তখন কী করবেন?  আবার সব হিন্দুর (বা সব মুসলমানের) একই স্বার্থ এই অনুমানের ভিত্তি নাই। আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন মোদীর চলতি পাঁচবছর ভারতরাষ্ট্রকে ভেঙ্গে পড়তে বা ফেলতে কয়েক ধাপ দ্রুত আগিয়ে দিবে।

    রাষ্ট্র এজন্য কোন পরিচয় বিভক্তি ঘটতে দিতে যায় না, দিতে পারে না। রাষ্ট্র তার পুরা জনগোষ্ঠির মধ্যে কোন ধরণের পরিচয় বিভক্তি যাতে ঘটতে না পারে অথবা রাষ্ট্র যাতে এতে জড়িয়ে না যায় এথেকে শতহাত দূরে থাকতে হয়। রাষ্ট্রকে তাই সার্বজনীন হতে হয়। নাগরিক মাত্রই সবার জন্য সে সার্বজনীন বৈষম্যহীন আচরণের, সম-অধিকার নিশ্চিত করার কর্তা, এক রাষ্ট্র হতে হয়। আর এই ধারণার অধীনে থেকে এবার সবাই যার যার ধর্ম খোলা মনে পালন করতে পারে। সমাজে যার যা ধর্মের সে অনুযায়ী যা তার পালনের ইচ্ছা বা অনিচ্ছা এমন নানান ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়া যায় সব করতে পারা যায়। রাষ্ট্রকে এমন হতেই হয়। এমনকি ধর্মনির্বিশেষে সবার ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়ীত্ব। অথচ আমাদের এখানে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে দূরে রাখতে হবে এই বকোয়াজ চালু আছে। আর  এই কথার আড়ালে এক ইসলামবিদ্বেষই চালু করা হয়েছে।

    কিন্তু গত বছরের প্রথম ছয়মাসে পরিস্থিতি আরও উলটা হয়ে যায়। এতদিন হিন্দু মহাজোট করতে সহযোগিতা দেয়া বা না দেয়ার বৃহত্তর ইমপ্লিকেশন – মানে এর পরিণতি ও মারাত্মক আত্মঘাতি দিকটা আওয়ামি লীগ আমল করতে পারে নাই সত্য। তবে হিন্দু মহাজোট আওয়ামি লীগের কেবল ভোট কাটবে কিনা এই তুচ্ছ পয়ন্টের দিকে দেখে ব্যাপারটাকে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। হিন্দু মহাজোটের বিস্তার এতে অনেকটাই বাধা পেয়েছিল, তাও সত্য। কিন্তু বিজেপির পরবর্তি পদক্ষেপে ফলে মহাজোটের বিস্তারের বাধা কেটে যায়।

    সেই পদক্ষেপটা হল লীগ-বিএনপির মধ্যে প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দেয়া। এই দুই পার্টিকেই আলাদা করে বিজেপি বলেছিল, হিন্দুদেরকে পঞ্চাশটা আসন দিতে। আর দুই দলই তাতে রাজি হয়ে যায়, পরস্পরের ভয়ে। না জানি  এতে ভারতের সমর্থন প্রতিদ্বন্দ্বি অপরপক্ষের দিকে ঝুঁকে যায় কী না, এই শঙ্কায়। কারণ বিজেপি দুজনকেই বলেছিল এই শর্ত মানলে, মোদী সরকারের সমর্থন মিলবে। এরই এক আউটকাম হিসাবে হাসিনার দিক থেকে নিয়ন্ত্রণ-সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান হয়ে হাজির হয়েছিল পীযুষের “সম্প্রীতির বাংলাদেশ” প্রতিষ্ঠান। এই প্রসঙ্গে সরকারের ভুমিকা কেমন ছিল, কেমন বোকা বোকা আত্মঘাতি ছিল তা বুঝতে সবচেয়ে বিস্তারিত রিপোর্টটা এখানে পাবেন।  সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ বেকুব প্রগতিবাদী্রাও এতেই ঝাপিয়ে পড়ে সমর্থন দিয়ে এসেছিল সম্প্রীতির বাংলাদেশকে। প্রগতিবাদীদের চিন্তার দৌড় আমরা চিনেছিলাম।

    আর ওদিকে বিএনপিতেও মাথামোটা লোকের সংখ্যা কম নয়, এমন হিন্দু-মুসলমান নেতা নির্বিশেষে মিন্টুরাও ততপর হয়ে উঠেছিল। যেন বিএনপি এই ক্ষমতা পেয়ে যাচ্ছে, রব কানাঘুষা উঠেছিল। যদিও কোন দলই শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি রাখতে পারে নাই। বাংলাদেশে কনষ্টিটুয়েন্সির বাস্তবতা ভিন্ন। একা হিন্দুভোটেই কেউ নির্বাচিত হবে এমনভাবে কোন কন্সটিটুয়েন্সি নাই। তাই, আমরা তখনকার মত বেঁচে গিয়েছিলাম। এককথায় বললে, পঞ্চাশ আসনের ধারণা চাইলেও বাস্তবায়নের বাস্তবতাই নাই। এছাড়া নিশীথ ভোটের কারণে পুরা বাস্তবতা ছিল অন্য আর একটা।

    কিন্তু পঞ্চাশ আসন এক মারাত্মক ধারণা। এক কথায় কোন রাষ্ট্রকে ওর আভ্যন্তরীণ কোন পরিচয়ের (ধর্মীয়, পাহাড়ি, নারী, সাদাকালো ইত্যাদি ) ভিত্তিতে কন্সটিটুয়েন্সি ভাগ করে দেওয়া আত্মবিলীনতা ও স্ববিরোধী। রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়া বা ফেলার পক্ষে এককাঠি আগিয়ে যাবার এক পদক্ষেপ। একারণেই রাষ্ট্রকে নাগরিক নির্বিশেষে সার্বজনীনভাবে সবাই নাগরিক, সমান অধিকারের, বৈষম্যহীন নাগরিক – এমন হতে হয়। তবে এই সার্বজনীন ও সমান ধারণার অধীনে থেকে মেনে নিয়ে এরপর রাষ্ট্র আমাদের সব বিভক্তি পরিচয়ের চর্চা, তা সাংস্কৃতিক বা ধর্ম চর্চা বিষয়ক যাই হোক সবকিছুই আমরা করতে পারব। কিন্তু সাবধান। কনষ্টিটুয়েন্সিকে কোন উপ-পরিচয়ের যেমন ধর্মীয় ভিত্তিতে কোন ভাগ করা যাবে না। এটা করা মানেই রাষ্ট্র ভেঙ্গে আর একটা রাষ্ট্র করার দিকে থবা অন্য রাষ্ট্র গিয়ে বিলীন হবার দিকে চলে যাওয়া হবে। কনষ্টিটুয়েন্সিকে কোন উপ-পরিচয়ে ভাগ বলতে, কথিত যে পঞ্চাশ (বা সত্তর) আসনের কথা বলা হচ্ছে এর বিস্তারিত আসল কথা হচ্ছে তাতে হিন্দুরা কেবল হিন্দুদের ভোট দিবে – এভাবে একটা ভাগ বুঝতে চায় – হিন্দু মহাজোট। অর্থাৎ সারা বাংলাদেশের হিন্দুরাই ঐ সত্তরটা (কেবল হিন্দুরা প্রার্থী হতে পারবে এমন) আসনের নানান হিন্দু প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে – এমন ব্যবস্থা করার সোজা অর্থ এরপর বাংলাদেশ রাষ্ট্র ভাগ হয়ে আর একটা রাষ্ট্র হয়ে যাবে। এজন্যই একই রাষ্ট্রে কোন উপ-পরিচয়ের ভিত্তিতে কনষ্টিটুয়েন্সি ভাগ করা যায় না। এজন্য এটা রাষ্ট্রের আত্মবিলীনতা ও স্ববিরোধীর পদক্ষেপ। একারণের রাষ্ট্র ধারণা মাত্রই তা আসলে এক সার্বজনীন নারিকত্বের ধারণা হতেই হয়। নাগরিক নির্বিশেষে সার্বজনীনভাবে সবাই নাগরিক, সমান অধিকারের, বৈষম্যহীন নাগরিক।

    “বৃটিশ পার্লামেন্টের যে আইনের অধীনে তারা ভারত শাসন করত তাই – .“ভারত শাসন আইন” (Government of India Acts) নামে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে করা এর অনেকগুলো সংশোধিত ভার্সান আছে। যার মধ্যে যেটার নাম “ভারত শাসন আইন ১৯৩৫” (Government of India Acts 1935) ” ১৯৩৫ সালে করা এই সংশোধিত রূপ, এর আওতাতেই “বেঙ্গল প্রাদেশিক নির্বাচন” শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ বেঙ্গল প্রদেশ স্তরে প্রাদেশিক নির্বাচিত সরকার থাকতে পারে – এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে ভোটদানের পদ্ধতি ছিল এরকম যে, মুসলমানেরা কেবল মুসলমানকে ভোট দিবে। তাই এটাকে অনেকে “রোয়েদাদ” বা “সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ” নামে চিনে। এই পদ্ধতিতেই ১৯৩৭ ও ১৯৪৬ সালে প্রাদেশিক নির্বাচন হয়। অর্থাৎ আমাদের এখন যে কনষ্টিটিউয়েন্সি (চলতি বাংলায় যাকে আমরা আসন বলি যেমন, উনি কোন আসন থেকে দাড়িয়েছেন…এরকম।) এটাকে বলা যায় ভৌগলিক ভিত্তিতে বা এলাকা ভিত্তিতে ভাগ করা কনষ্টিটিউয়েন্সি।

    তবে খেয়াল রাখতে হবে, সেটা ছিল প্রাদেশিক নির্বাচন, পুরা ভারতরাষ্ট্রের নির্বাচন নয়। তাছাড়া সেটা ছিল এক কলোনি শাসকের অধীনের বৃটিশ-ইন্ডিয়া যা অবিভক্ত ভারত বটে কিন্তু এই ভারত কোন স্বাধীন রিপাবলিক নয়, এক কলোনি-রাষ্ট্র মাত্র। তবু তাতেই, মাত্র ১২ বছরের মধ্যে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান (পুর্ব) আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যায়। কাজেই আলাদা কনষ্টিটিটুয়েন্সি কথার প্রকৃত মানে কী, পরিণতি কী এটা না বুঝে কথা বলা উচিত নয়। অনেককে এমনও দেখেছি উদার ভাব ধরে বলে ফেলেন, “ওরা চাচ্ছে কাজেই এটা দিতে অসুবিধা কী”? অতএব সাধু সাবধান, “রাষ্ট্র বিষয়ে” – না বুঝে কোথাও মুখ খোলা উচিত হবে না।

    বাংলাদেশের হিন্দুদের রাজনৈতিক দাবি বলতে অন্য অনেক কিছুই হতে পারে। কিন্তু তাদের অধিকার না পাওয়া অথবা তা ঠিকঠিক না পাওয়ার প্রতিকার  মানে তাদের কনষ্টিটিটিয়েন্সি ভাগ করতে চাওয়া, এটা নয়। হতে পারে না। এটাই ভারতের প্ররোচনা। তারা আরএসএসের প্ররোচনায় দাবি তুলছে কথিত সত্তর আসনের। এর সোজা মানে হবে, বাংলাদেশকে ভাগ করে সেটা হিন্দুদের বলে ভারতের মধ্যে সেই টুকরাটাকে বিলীন করে দেওয়ার দাবি।  মনে রাখতে হবে ষাট বা সত্তর আসনের আরেক বড় নেতা প্রবক্তা হলেন রানা দাসগুপ্ত। তিনি প্রকাশ্যে হিন্দু মহাজোটে আছেন কিনা তাতে কিছু আসে যায় না। তবে যাট আসন মানে শেষে অন্তত একটা টুকরা ভারতে নিয়ে যাওয়া এটাই এখন বাংলাদেশে হিন্দুত্বের রাজনীতি হয়ে যাওয়া, হিন্দু রাজনীতির সব ধারার কমন ফিচার। এই বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতি কঠোর ভাবে দমন করা – বাংলাদেশ যদি রাষ্ট্র থাকতে চায় তার জন্য ফরজ কাজ। আত্মরক্ষার বেসিক পাঠমূলক কাজ।

    আর এদের মধ্যে ‘সাহসী’ গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক মনে করেন কোন টুকরা কেন পুরা বাংলাদেশটাকেই নিতে যেতে ভারতের অধীনে। এক অখন্ড ভারতের ভিতরে।  এটা কোন ধরণের রাজনীতি? এটা কী রাজনীতি না দেখায় দেখায় বিদেশীএজেন্ট এর ততপরতা।  আসলে তিনি ১৯৪৭ সালের আগে যে জমিদার রাজত্ব ছিল, – অবিভক্ত বাংলায় বর্ণহিন্দু জমিদারের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বের অধীনে এক একচেটিয়া হেজিমনি ছিল জমিদারিসহ সেই রাজত্বই ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখছেন।

    তাঁর বক্তৃতার ভিডিও তে দেখেন প্রামাণিক ভাব করছেন তিনি রাষ্ট্র বুঝে ফেলেছেন। তিনি বলছেন, “একদিন এই রাষ্ট্র ছিল আমাদের হাতে”। একথার মানে কী? তিনি জমিদারি শাসন ফেরত আনতে চাইছেন, আবার কায়েম করবেন?  তিনি উপস্থিত হিন্দুজনগোষ্ঠির শ্রোতাদের রাষ্ট্রকাঠামো বুঝাইতেছেন। আলাদিনের চেরাগের গল্প বলছেন। চেরাগ ঘষে, চেরাগকে হকুম দিয়ে আগের মালিকের হাতে ক্ষমতা নিতে চাচ্ছেন। আবার “জাতির” কথা বলছেন। এ’ কোন জাতি? পুরা ভিডিওটা [এখানে পাবেন] মনযোগে দেখলে প্রামাণিকের  মনের খায়েস, ইমেজ, ইমানিজেশন সম্পর্কে মোটা দাগে বহু কিছু ধারণা পাওয়া যাবে।

    হাসিনার দ্বিতীয় মারাত্মক ভুল, এই আত্মঘাতি সিদ্ধান্তটা ছিল আসলে আরএসএসের খায়েস – এই রাজনীতিটাকেই চিনতে না পারা এবং  উলটা একে সহযোগিতা ও সমর্থন করে বসা। এই জায়গায় তিনি বাবার মেয়ে থাকতে পারেন নাই। শেখ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা এটা তিনি নিজে কখনই ভুলেন নাই। পাকিস্তান আন্দোলনের বয়ানের উপরে একটা পর্দা আছে, মুসলিম জাতীয়তাবাদের। আমাদেরকে গোনায় না ধরা জমিদার আমলে, হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান ও এর অত্যাচার থেকে বাঁচতে গিয়ে ওদেরই আঁকা পথে নিরুপায় আমাদের মুসলিম জাতীয়তাবাদ এটা। কিন্তু এটা বাইরের দিক, একটা পর্দা। সেটা সরিয়ে পর্দার নিচের পাকিস্তান আন্দোলনকে বুঝাবার হিম্মত ছিল শেখ মুজিবের।  পাকিস্তান আন্দোনলের মূল উপাদান, কনটেন্টটা কী? কীজন্য কী নিয়ে আমাদের মুরুব্বিরা লড়তেছিল ইত্যাদি – এটা যে না বুঝবে সে কমিউনিস্ট, প্রগতিশীল কী ইসলামি যত যাই রাজনীতি বলেন সে করুক, সব বৃথা। কারণ সে বাংলাদেশ মানে পুর্ববঙ্গ থেকে বাংলাদেশ, এর ফর্মেশন সম্পর্কে কিছুই জানে না। এদেশের মানুষের গঠন-তন্তু (ফাইবার) বা নার্ভের খবর সে পাবে না। আমরা মুসলমান হবার কারণে জমিদারের জমিদারি ক্ষমতার হেজিমনি আমাদেরকে বাঙালি বলে গোনায় ধরে নাই। অস্বীকারে ফেলে রেখেছিল। অনেকের ভাষায়, তাই আমরা রক্ত দিয়ে নিজেই নিজের বাঙালি পরিচয়ও লিখেছি, প্রতিষ্ঠা করেছি। রাষ্ট্র গড়ে নিয়েছি। এটাই শেখ মুজিবের নেতৃত্বের বাংলাদেশ। [এই বাংলাদেশের জন্য শেখ মুজিবকে ক্রেডিট দেয়া মানে এই না যে আমাদেরকে তাহলে “বাঙালি জাতিয়তাবাদীর সমর্থক হয়ে যাওয়া হল, অথবা আমরা হয়ে গেছি।]
    যেটা মুল কথা, ১৯৭১ সালে আমরা যে বাঙালি হলাম তাতপর্যের দিক থেকে এটা – জমিদারির “বাঙালি” নয়, কলকাতার বাঙালিও নয়, বরং এটাই প্রজা-বাঙালি, “প্রজাদের উত্তরসুরি বাঙালি”। এই প্রজা-বাঙালির বিজয়ের ইতিহাস যেখান থেকে শুরু। তবুও এসবের ইতিহাস ও গৌরবের দিক – অন্যের প্ররোচনায়, প্রগতির ভুল ব্যাখ্যার হাতছানিতে, না বুঝে বিভ্রান্তিতে ইসলামবিদ্বেষও আমাদের কারও কারও ভিতর আছে। আমরা বুঝি নাই, এর ভিতরে আসলে জমিদারি হারানোর দুঃখ থেকে জন্মানো কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদও লুকিয়ে আছে।

    গত বছরের হাসিনা এই দ্বিতীয় ভুল থেকেই, এবারের আর এক প্রতিক্রিয়া-পরিণতিই হল “প্রিয়া সাহা ইস্যু”। আর সেই সাথে ওদিকে গোবিন্দ প্রামাণিকদের ষাট আসনের [এটা পঞ্চাশ না ষাট না সত্তর এমন তিন ভাষ্যই পাওয়া যায়] রাজনীতিক ততপরতা। পরিস্থিতি এজায়গায় এসে ঠেকেছে।

    সেসব ভুলের কি পুনরাবৃত্তি ঘটবে? আমরা কী ভারতের অনুমোদনের অধীন এক ক্ষমতা হয়ে থাকব?  এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠে এসেছে। তবে শেখ হাসিনা যদি তার বাবাকে ঠিকঠিক পাঠ করেন তাহলে তিনি ভুল করবেন না, এই এক সরল ক্লু এখানে আছে।
    আগামী দিনের ইতিহাসে কি বাংলাদেশে হিন্দুত্বের রাজনীতি আনার ও একে তৎপর হতে দেয়ার দায় শেখ হাসিনার ওপর বর্তাবে? নাকি এর আগেই তিনি কঠোর পদক্ষেপ নিতে মাঠে নেমে যাবেন?

    আড়ালে এত দিন তৎপর থাকা এসব নানান প্রশ্ন এখন প্রিয়া সাহা ও তার বন্ধুদের হাতে পড়াতে পুরা সমাজকে এমন অস্থির চঞ্চল করেছে যে, সবাইকে কান খাড়া অ্যাটেনশন দিতে বাধ্য করে ফেলেছে। এতে আপাতত প্রিয়া সাহার সার্কেলের প্রায় সবাই সব ‘দায় প্রিয়ার’ বলে পিছে হটেছে, সব অস্বীকার করে আপাতত খামোশ হয়ে গেছে। আর বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা আসলে অদৃশ্যপূর্ব ঘটনা যে, এই প্রথম কোনো হিন্দু ব্যক্তিত্বের আচরণের দায় অন্য হিন্দু ব্যক্তিত্ব বা সংগঠন ঘোষণা দিয়ে তার দায় নিতে অস্বীকার করছেন। কিন্তু হিন্দু মহাজোটের গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকের ধারা আপাতত প্রধান প্রবক্তা, বীর হয়ে থাকতে চাইছেন।

    ফ্যাক্টস হচ্ছে, বাংলাদেশে ট্র্যাডিশনাল হিন্দু রাজনীতি আর কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল রাজনীতি হল, পুরনো জমিদার হিন্দুর জমিদারি আর সামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক হেজিমনি বা কর্তৃত্ব হারানোর দুঃখ থেকে জাত। এমন দুঃখ কমবে বা মিটবে কী করে, পুরান ক্ষমতার দাপট আবার ফিরায় আনা যায় কি করে -এসব চিন্তার ওপর দাঁড়ানো। কিন্তু আজিব ব্যাপারটা হচ্ছে, বাংলা সাধারণ আম-হিন্দুরা পুরনো জমিদারের জমিদারি হারানোর দুঃখকে নিজে বেখবরে থাকার কারণে এটা নিজেদেরই ‘দুঃখ’ মনে করে বসে আছে। এটাই আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার একটা দিক। যার অন্য দিকটা হল, আমাদের উপমহাদেশের ভারত-বাংলাদেশ ও পাকিস্তান- এ তিন দেশে কোথাও নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে কেউ সক্ষমতা দেখাতে পারেনি। বৈষম্যহীন নাগরিক-সাম্য, মানুষের মর্যাদা আর ন্যায়বিচারে নিশ্চিত হয়নি। সব ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে আইডিয়াটাই রাজনীতিক বা অ্যাকাডেমিক সমাজেও স্পষ্ট হয়ে পৌঁছেনি। এ ছাড়া কী দেখলে একটা রিপাবলিক রাষ্ট্রকে চেনা যায়, এর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী ইত্যাদি এসব ধারণা স্বচ্ছ না তো বটেই।

    যেমন ওদিকে সেকুলারিজম বলে এক ধারণা এসে জায়গা নিয়েছিল। যদিও এই ইসলামবিদ্বেষী-সেকুলারিজমকে বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠী নিজেদের জন্য এক রক্ষাকবচ ধারণা মনে করত, অনেকে করে এখনো। কিন্তু সাবধান। এর সাথে অবশ্যই ১৬৪৮ সালের   Treaty of Westphalia থেকে [ওয়েষ্টফিলিয়া অনেক বড় বিষয়, এর ইস্যুগুলোও বিভিন্ন মাত্রা বা ডাইমেনশনের।  তাই এটাকে ত্রিশ বছরের গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি মনে করা হয় কেন? আর কী নিয়ে সেই সারা ইউরোপ জুড়ে যুদ্ধ সেখানে ফোকাস করেন। আমাদের তর্কের জন্য প্রাসঙ্গিক এটাই।] পাওয়া প্রথম “ক্লাসিক সেকুলারিজম” ধারণার কোনই সম্পর্কই নেই। এটা, সেটা একেবারেই নয়। তবুও ভারতে এই ইসলামবিদ্বেষী-সেকুলারিজম ধারণার পপুলারিটি আরো বেশি (ছিল)। ভারতের এই বিদ্বেষী-সেকুলারিজম ভারতের কনস্টিটিউশনে ঢুকানো হয়েছে ইন্দিরার হাতে ১৯৭৬ সালে, মানে ১৯৪৯ সালে ভারতে কনস্টিটিউশন গৃহীত হওয়ারও ২৭ বছর পরে। এখন আমরা প্রশ্ন করতে পারি, এর মানে কি প্রথম ২৭ বছর ভারত তাহলে, সেকুলার রাষ্ট্র ছিল না! তাই কী? এছাড়া সেকুলারিজম কী আলাদা করে লিখে রাখার জিনিষ? অথচ এসব আজিব বুঝ নিয়ে চলছে একাদেমিশিয়ানরাও!

    নেহেরু-গান্ধী থেকে ইন্দিরা গান্ধীসহ কারো কাছেই এর জবাব কী, কখনো শোনা যায়নি। আবার মোদীর আমলে এসে ভারতের কনস্টিটিউশনে সেকুলারিজম লটকানো থাকলেও মোদীর রাজত্বে কেউ ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে রাজি না হলে তার মাথায় কোপ দিতে মোদীর কোনই আইনি অসুবিধা হচ্ছে না।
    আগে প্রগতিবাদিতা করা খুবই সহজ কাল ছিল। যেমন ধরেন অমর্ত্য সেন ফতোয়া দিয়েছেন, ঠিক করে দিতে চান কোন ধারার ইসলাম ভারতের (হিন্দুত্বের) সাথে কমপ্যাটেবল। তাঁর পছন্দের ইসলাম ছিল, সুফি ইসলাম। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ – সে নিজেও লোক দিয়ে সেটা জানিয়ে হুঙ্কারও দিয়ে পত্রিকায় একসময় কলাম লিখেছিল। কিন্তু কেবল আমাদের জানা হয় নাই, তাহলে মুসলমানেরাও কী বলতে পারবে কোন ধারার হিন্দু ধর্ম তার পছন্দের, সে এলাও করবে?

    হায়রে বিদ্যাপতি বিদ্যান সব! রাষ্ট্র বা রিপাবলিক ধারণার বেসিক না বুঝা তো পাপ না। কিন্তু না বুঝে মুখ খোলা কেন? এমন হাসির পাত্র হওয়া দরকার কী? এতে মনের ভিতরের ইসলামবিদ্বেষ চিন্তাটাই ভেসে  উঠেছে এটা অবশ্য মন্দ পাওয়া নয়। – বুঝা যাচ্ছে কেউ তাদের একথা বলে সাবধান করারও নাই।

    সে যাক। কিন্তু এটা মোদীর আমল, এখানে ধর্মকে গালি দেওয়ার বিষয় বলে বুঝা ও মুরোদ দেখানোর প্রগতিবাদিতা করা আর সহজ নয়। এখন সিনেমা-কেন্দ্রিক সেলিব্রেটিরা মোদীর বিরোধিতায় যে বিবৃতি দিয়েছিল [এখানে দেখেন] এর বিপরীতে সেলিব্রেটিরা শুধু বিজেপির কাছ থেকে  হুমকিই পায় নাই। অতি-আধুনিক সিনেমার আধুনিকতায় ভরপুর নায়িকা-নায়িকা কর্তারাও এবার হিন্দুত্বের  বয়ান হাতে নিয়ে মোদীর রাজনীতির পক্ষে পাশে দাড়িয়ে গেছে। [পালটা বিবৃতি এখানে] । অপর্ণা সেন-কৌশিক সেনদের জন্য এটা এখন চ্যালেঞ্জ যে তাদের ইসলামবিদ্বেষী প্রগতিবাদের কত দম আছে,  কী আছে কতদুর যে, তারা নায়িকা কঙ্গনাদের আধুনিক-হিন্দুত্ব কে পরাজিত করতে পারে! বুঝা যাচ্ছে প্রগতিবাদী চিন্তার ওভারহলিংয়ের সময় এসে গিয়েছে। আবার ঢেলে সাজাতে হবে।

    আবার ভারতের এসব কাণ্ড দেখে অবশ্য বুঝার উপায় নেই যে, ভারতে কোনো সুপ্রিম কোর্ট অথবা কোনো নির্বাচন কমিশনার বলে কিছু আছে নাকি নেই। কারণ, এরা পুরোপুরি অ্যাকশনবিহীন। এর কারণ এরা সম্ভবত সমাজে থাকে না। অথবা না হয় তারা আরএসএসে যোগ দিয়েছে তাই, ‘জয় শ্রীরাম’ বলানোর ধ্বনি তাদের কানে পৌঁছাচ্ছে না। অথবা এ-ও হতে পারে তারা এটা অনুমোদন করেছে। এই হল, এখনকার ভারতের সেকুলারিজমের নমুনা।

    ওদিকে ভারতে এটা যাই হোক, বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠী নিজেদের এখন খুবই চালাক লোক বলে ভাবে। তারা আর এখন তত সেকুলারিজম জপছে না। তাদের এখনকার নেতা আর মণি সিংহ কমিউনিস্ট বা পঙ্কজ ভট্টাচার্যের ন্যাপ পার্টি, অথবা প্রগতিবাদ না। তাদের নেতা এখন আরএসএস নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক। যে নেতা বলছেন, হিন্দুরা এখন ‘ভারত-বাংলাদেশ দুই দেশেরই নাগরিক’ থাকবে, আর এক ‘অখণ্ড ভারতের’ পক্ষে কাজ করে যাবে।
    প্রামানিক বা রানা দাশগুপ্তদেরও বিশ্বাস দৃঢ় হচ্ছে যে ৬০ আসন পেয়ে গেলে তারা আবার ’৪৭ সালের আগের জমিদারি রাজত্ব প্রভাব ফিরে কায়েম করে ফেলবে, এমন ধারণা প্রবল হচ্ছে। অবস্থা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেন লীগ-বিএনপি কোনো দলের বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসতে গেলে ভারতের অনুমোদন [approval] লাগবে, এটা তারা মেনেই নিয়েছে। তাই সেই লোভে লীগ-বিএনপি কার আগে কে কত বেশি তাড়াতাড়ি হিন্দু মহাজোটকে খাতির করবে, ৬০ আসন দেবে ইত্যাদি নিয়ে প্রতিযোগিতা লেগে গেছে। আমরা এমন দেউলিয়া জায়গায় পৌঁছে গেয়েছি।

    ২.
    এর আগের লেখায় দেখিয়েছিলাম জমিদারি উচ্ছেদ কেন পূর্ববঙ্গের জন্য ফান্ডামেন্টাল পদক্ষেপ ছিল। জমিদারি উচ্ছেদ মানে ছিল আসলে আমাদের কৃষির উদ্বৃত্ত কলকাতার (জমিদারদের হাতের) বদলে ঢাকায় পুঞ্জীভবন ও সঞ্চয়ে জমা করা। এছাড়া উচ্ছেদে ভূমি মালিকানার ধরনে পরিবর্তনের কারণে এবার কৃষিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন দুটোই বাড়াতে পারবে, এই অবস্থা তৈরি হয়েছিল। এ ব্যাপারটাকেই সংক্ষেপে তখন ‘ক্যাপিটাল ফর্মেশন’ বলে ছেড়ে দিয়েছিলাম। বিস্তারে যায় নাই।

    বগত ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান লাভের পরে, জমিদারি উচ্ছেদ কেন অপরিহার্য ছিল; এর সপক্ষে আজ আরও দু’টি কারণ হাজির করব, যার একটা আইনি অন্যটা অর্থনৈতিক দিকসংক্রান্ত।

    আইনি কারণঃ
    চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনটা ১৭৯৩ সালে পাস করা হলেও এটা বাস্তবে জমে উঠে কার্যকর হতে প্রায় প্রথম সাত বছর লেগে যায়। কথাটার মুল কারণ ছিল শুরুতে সেকালে, অর্থ থাকলেও জমিদারি কেনার লোকের অনাগ্রহ। আর ব্রিটিশদের দিক থেকে বললে, ক্রেতা না পাওয়া। তাই পরের প্রায় সাত বছর ধরে চলেছিল ক্রেতা-বিক্রেতার লাভ-সুবিধা নিয়ে নানা কথার চালাচালি ও শেষে হবু জমিদারের দিকে কান্নি মেরে আইনের সংশোধন করার এক উতসব। তাই বারবার নতুন করে একেকটা সংশোধনী এসেছিল। এদিকে সবার উপরের ফ্যাক্টর ছিল, জমিদারি কেনা-বেচার ব্যাপারটাই ছিল একেবারে নতুন। বৃটিশকলোনি মালিকের হাতে সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ইউনিট প্রেসিডেন্সি। অর্থাৎ বাংলা প্রেসিডেন্সির মত আর দুটা – মুম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি ছিল। কিন্তু জমিদারি ব্যবস্থা কেবল বাংলাতেই চালু করা হয়েছিল। আবার আমাদের এই ভুভাগের দিকে কৃষি প্রায় পুরোটাই প্রকৃতিনির্ভর।
    বৃষ্টি না হওয়া, আবার বান-বন্যা অথবা প্রচন্ড খরা সব কিছুরই প্রভাব এখানে হতে পারে মারাত্মক। তাই জমিদারি কেনার পর ফসল মার গেলে এর দায় কে নেবে – এটা ছিল এক বড় প্রশ্ন। এর জবাব দিতেই ব্রিটিশরা জমিদারি কেনার দাম ফিক্সড (চিরস্থায়ী) করে দিয়েছিল। মানে, বৃটিশরা জমিদারি বেচতে এর দাম বছর বছর তারা কমাবে বাড়াবে না। আইনে সংশোধনীতে এমন করা হয়। যাতে এক বছর মার গেলে পরের বার পোষানো যায়। ‘চিরস্থায়ী’ শব্দটির গুরুত্ব এখান থেকেই। এ ছাড়াও হবু জমিদারি ক্রেতার আরো আপত্তি ছিল যে, কোনো প্রজা খাজনা না দিলে জমিদারের তো কিছুই করার থাকছে না, তাহলে জমিদারি নেয়ার লসের কী হবে? তাই এর সমাধান করে জমিদারি কিনতে আগ্রহী করতে, তখন থেকে জমিদারদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দিয়েছিল ব্রিটিশেরা। মানে জমিদার তার পাইক-পেয়াদা দিয়ে কোমরে দড়ি লাগিয়ে খাজনা না দেয়া প্রজাকে ধরে আনা ও আটকে রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল। এনে কাচারি বাড়ির কোনো রুমকে জেল ঘোষণা করে সেখানে আটকে রাখতে পারত। এখান থেকেই জমিদাররাও ব্রিটিশদের মত না হলেও এক ‘ছোট বাহাদুর’ বলে গণ্য হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এতে এক বিরাট আইনি ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছিল।
    মোগল আমলের ভূমি মালিকানা ব্যবস্থায় জমির ধার্য খাজনা পরিশোধ করলেই রায়তের শুধু ওই জমিতে চাষাবাদের অধিকারই নয়, ভূমির মালিকানা স্বত্বও (টাইটেল, Land-Title) হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে রায়ত নিজের নামে পেয়ে যেত। এমনকি তা যার যার ধর্মীয় আইন-নিয়ম মোতাবেক তা উত্তরাধিকারিকেও হস্তান্তর করা যেত। এ কারণে হবু জমিদারি ক্রেতারা অনাগ্রহী ছিল যে, যে জমি ইতোমধ্যে রায়তের নামে টাইটেল হয়ে আছে – কাজেই সেটা জমিদার যদি কিনে, তাতে “আমি জমিদার” এই কথার কী অর্থ থাকে? তাই একথার কোন মানেই নাই। আর তাতে আমি ওই জমির খাজনা প্রজার কাছে দাবি করব কোন আইনি ভিত্তিতে? এটা ছিল হবু জমিদারের জমিদারি কিনতে তাদের দ্বিধার পক্ষে সবচেয়ে বড় আইনি প্রশ্ন। এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর ব্রিটিশদের কাছেও ছিল না, এক গায়ের জোর দেখানো ছাড়া। তাই ব্রিটিশরা জবরদস্তিতে ঘোষণা করেছিল, জমিদারি কিনলে পুরা জমিদারির অন্তর্গত জমির টাইটেল সব জমিদারের নামে করে ঘোষণা দেয়া হবে। অথচ এ কাজটি করা হয়েছিল পুরোই আইনের দিক থেকে ভিত্তি ছাড়াই, অবৈধভাবে। কারণ, ব্রিটিশদের পুরনো টাইটেল কেড়ে নেয়াই ছিল অথরিটিহীন, অবৈধ। তাই ১৯৫১ সালের জমিদারি উচ্ছেদের আইনে জমিদারি উচ্ছেদের ঘোষণায় মালিকানা স্বত্বও নির্ধারণের পদ্ধতি আবার আগের জায়গায় ফিরে এসেছিল। প্রজা-কৃষকের জন্য এটা ছিল একটা বিরাট অর্জন ও রিলিফ।

    অর্থনৈতিক কারণঃ
    জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদ করার পেছনে অর্থনৈতিক কারণটা খুবই শক্ত। মূল কারণটা এককথায় বললে, প্রাচীন কৃষিকে সচল করে উৎপাদন বাড়াতে চাইলে জমিদার-প্রজা সম্পর্কের পুরনো খোদ জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থাটাই ছিল প্রধান বাধা। কেন?

    কৃষি উৎপাদন বাড়ানো কথাটির মানে অনেক গভীর। কলোনি উপনিবেশ-উত্তর পরিস্থিতিতে দেশ স্বাধীন বা দেশ পাওয়া কথাটা অর্থহীন হবে, যদি স্বাধীন কলোনিমুক্ত সরকার নাগরিক মানুষকে কাজের সংস্থান না দিতে পারে। এখান থেকেই আসে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা। আপনি সেন্সিবল হবু প্রধানমন্ত্রী হতে চাইলে আপনার প্রধান মাথা হবে এই ইস্যুটা। অবশ্য আপনি যদি নেহেরু হন তাহলে চিন্তার কিছু নাই। আসলে কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানো কথাটির আর মানে হল, কম শ্রম বা শ্রমিক ব্যয় করে বেশি ফসল পাওয়া। “শহর” শব্দের একটা অর্থ হল, কৃষি থেকে আসা উদ্বৃত্ত বা সারপ্লাস [surplus] যেখানে গিয়ে জমা বা পুঞ্জীভূত হতে থাকে, সেই জায়গাটার নাম হয়ে যায় “শহর”, বা রাজধানি শহর। পুঞ্জীভূত হয় বলেই এটাকে ‘পুঁজি’ বলি আমরা। তাই এ সারপ্লাসটা যেখানে পুনর্বিনিয়োগ হয় সেটাও ঐ শহরেই। শহর মানে তাই আবার মূলত অ-কৃষি ধরণের নতুন এক উৎপাদন ব্যবস্থা। শহর মানে আবার গ্রাম বা কৃষি থেকে বাড়তি শ্রমিক মাইগ্রেট করে আনা হয় বা আসে যেখানে, তা কৃষি না হলেও অসুবিধা নাই, নতুন ধরনের কাজ তো পাওয়া যাবে এই আশায় শ্রমিকেরা আসে। শহরের মানে এর পরেও শেষ নয়। সুযোগ পেলে সে কথা আর একদিন লম্বা করে বলা যাবে।
    কাহিনী হল, এখন শহরের হাতে সারপ্লাস আছে, কিন্তু শ্রমিক পেতে গেলে আগের কৃষিতে এখন কম শ্রমিক লাগাতে হবে। এর সোজা হিসাবটা হল, আগে যদি কৃষিতে ১০০ জন লোক লাগিয়ে সবার খাদ্য উৎপাদন হয়ে থাকে তাহলে এখন কম শ্রমিক লাগিয়ে (ধরা যাক ৭৫ জন) ওই একই পরিমাণ মোট ১০০ জন মানুষের খাদ্য চাহিদা মিটাতে হবে। তবেই ২৫ জন বাড়তি শ্রমিক পাওয়া যাবে। যারা গ্রাম ছেড়ে শহরে যেতে রাজি এমন শ্রমিক পাওয়া যাবে। যারা নতুন উৎপাদন ব্যবস্থা শুরুর উপায় হবে। আবার তাতে আগে ১০০ জন লেবার দিয়ে ১০০ জনের খাদ্য তৈরি হত, এখন ৭৫ জন লেবার দিয়ে ওই একই পরিমাণ খাদ্য তৈরি করতে হবে। কারণ, শহরে এখন যা তৈরি করা হবে, এগুলো খাদ্য নয়, অন্য কিছু, অন্য প্রয়োজনীয় মানুষের ভোগ্যপণ্য উৎপাদন করবে। তাই শ্রমিকসহ শহরের সকলের জন্য খাদ্য গ্রাম থেকেই আসবে। কিন্তু ৭৫ জনে ১০০ জনের খাদ্য তৈরি করতে গেলে এইবার ভূমি মালিকানায় পরিবর্তন আনতে হবে। কেন?
    কারণ, এবার কৃষিতে বিনিয়োগ লাগবে, টেকনোলজিও লাগতে পারে, যা কিনতে বিনিয়োগ লাগবে। কিন্তু জমিদার বলবে আমি বিনিয়োগ করব কেন? না করলেও তো একই খাজনা পাবো। তাই বিনিয়োগ করা তাঁর স্বার্থ নয়। আবার প্রজা বলবে আমি নিজেই জমিদারের বারো মাসে তেরো খাজনার দাবি মেটাতে গিয়ে দেনাগ্রস্ত; কাজেই আমি কোথা থেকে বিনিয়োগের অর্থ দিব।
    অর্থাৎ জমিদার-প্রজা এই মালিকানা সম্পর্ক ব্যবস্থাই কৃষি আর তা থেকে সামগ্রিক উৎপাদন বাড়ানো ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। অথচ স্বাধীনতার অর্থ বাস্তব করতে গেলে, মানুষকে কাজের সংস্থান দিতে গেলে তাই জমিদার উচ্ছেদ করাই মূল পদক্ষেপ। এ জন্যই জমিদারি উচ্ছেদ ছিল প্রথম ভিত্তিমূলক সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ। একেবারে ফান্ডামেন্টাল। মনে রাখতে হবে কলকাতার বদলে ঢাকাকেন্দ্রিক পুঁজি সঞ্চয় শুরু করা না গেলে কিছুই করা যেত না। জমিদারের পায়ের নিচের থাকা চাষা, আর গোলাম থাকতে হত আজও আমাদের।

    নেহরুকে স্বদেশীবাদী প্রগতিবাদী ভারতের প্রায় সবাই তাকে ‘সমাজতন্ত্রী’ বলে খুব প্রশংসা করে থাকে; কিন্তু আসলেই কি তিনি তা। মনে হয় না। তিনি যদি ব্রিটিশরা চলে গেলে হবু স্বাধীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলে নিজেকে কল্পনা করেন, তাহলে এর আসল অর্থ হল একটা অর্থনীতি গড়ার স্বপ্ন যেখানে নাগরিকদের কাজের সংস্থান করে দেয়ার পরিকল্পনা হত তার প্রধান কাজ। কিন্তু বাংলার কৃষিকে জমিদারি সম্পর্কের মধ্যে ফেলে রেখে দিলে তো এটা অসম্ভব। তাহলে তিনি কিসের, কার প্রধানমন্ত্রী? এটা যেকোন সমাজতন্ত্রীর না জানা থাকার কথা নয়। কিন্তু নেহরু জমিদারি উচ্ছেদে পক্ষের লোক ছিলেন না। তিনি বরং মুসলিম লীগের হাত থেকে জমিদারদের বাঁচানোর জন্য জমিদার সভার [জমিদার মালিক সমিতি] পক্ষ নেয়া কর্তব্যজ্ঞান করেছিলেন। এর প্রথম সভাপতিকে চিনেন এখানে। অথচ তিনিই যদি সোচ্চার হতেন, আগে যেচে জমিদারি উচ্ছেদের স্লোগান দিতেন তাহলে অন্তত পূর্ববঙ্গের মুসলমান প্রজারা নেহরু জিন্দাবাদ বলে স্লোগান দিত। পুর্ববঙ্গের আলাদা হওয়া আর হয়ত, সম্ভবত দরকার হত না।

    সোজা কথাটা ভারত ভাগ বা বাংলার ভাগ হওয়াটা মানে তা হিন্দু-মুসলমানের লড়াই না। সেটা বাইরের দিক। এটা মুসলমান না হিন্দু কে বেশি খারাপ, সে তর্কই না? অথবা ইসলাম ধর্মটাই খারাপ, তাই সব সমস্যা এখানে। কারও প্ররোচনায় এমন মনে করতেও পারেন। অভিজিতসহ অনেকেই এমনটা ভাবেন বা বই লিখেছেন।
    এর চেয়ে  ভিতরে ঝুঁকেন, মুরোদ দেখিয়ে ভিতরে ঝাঁক মারেন! উথালপাতাল করে খুজেন। পর্দাগুলো উন্মুক্ত করেন…।

    আর তবে আপনি জেনে না জেনে জমিদারের পক্ষের লোক হলে বলবেন বাংলা ভাগ ভুল। নাকি কান্না শুরু করতে পারেন।  আপনি লন্ডন থেকে ইংরাজি সাহিত্যের ডক্টরেট করে আসা লোক হলে ভাববেন – এটা রেনেসাঁ না হবার সমস্যা। মুসলমানেরা পশ্চাদপদ, তারা কেবল ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বানায়। এর মধ্যেই আসল সমস্যা দেখবেন। হিন্দুরা কত আধুনিক বলে আপনি আবিস্কার করবেন। মর্ডানিটি নিয়ে দুটা কবিতা লিখে তারিফ করবেন, ইত্যাদি।

    আপনি কী হবেন? সেটা তো আপনার হাতেই!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “আমরা কি অ্যাপ্রুভালের অধীন হয়ে যাবো“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • ভেনিজুয়েলা সঙ্কট কিসের ইঙ্গিত

    ভেনিজুয়েলা সঙ্কট কিসের ইঙ্গিত

    গৌতম দাস

    ০১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-2yM

    প্রেসিডেন্ট দাবিদার হুয়ান গুয়াইদো ও প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো – ফাইল ছবি

    ল্যাটিন আমেরিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলা। এই ভেনিজুয়েলারই নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ [Hugo Chávez] কমিউনিস্টদের নয়নমণি, তাদের সাফল্যের প্রতীক ছিলেন। ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় অসুস্থতায় তিনি মারা যান। যদিও সেনাবাহিনীর এই সাবেক লে. কর্নেল ক্ষমতায় তার উত্থান এই সেদিন, মানে ১৯৯৮-৯৯ সালের এবং তা স্বল্পকালীনও – মাত্র ১৪ বছরের শাসন। ভেনিজুয়েলায় যা তার উল্লেখযোগ্য অবদান বলে কমিউনিস্টেরা মনে করে তা হল একধরনের “সমাজতন্ত্র কায়েম” করেন তিনি, বিশেষত ২০০৭ সালের পর থেকে। শ্যাভেজের মৃত্যুর পর তার ভাইস প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। খুবই মার্জিনাল (৫০.৬২%) ভোটে তিনি সেবার জিতেছিলেন।

    আর এর পরের টার্মের নির্বাচন হয় ২০১৮ সালের মে মাসে। কিন্তু এখানে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ করে বিরোধীরা নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবুও মাদুরো নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে গত ১১ জানুয়ারি ২০১৯ শপথ নেন। ওদিকে গত ২০১৫ সালে ভেনিজুয়েলার পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়েছিল, যার ফলাফল ছিল বিরোধী দলের বিজয়-প্রাধান্যে। তাই মাদুরোর শপথের প্রতিক্রিয়ায় পার্লামেন্ট হয়ে উঠে বিরোধীদের বিকল্প ক্ষমতা প্রদর্শনের কেন্দ্র। মাদুরোর এই দ্বিতীয় শপথের পর থেকে পার্লামেন্টে থেকে তারা মাদুরোকে প্রেসিডেন্ট না মানার তৎপরতাও শুরু করেছিল। তারা পাল্টা প্রস্তাব পাস করে, মাদুরো সঠিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নন, তাই পার্লামেন্ট অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে সংসদের বিরোধী দলের নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে [Juan Guaidó] মনোনীত করছে [declared himself interim president on 23 January ]। এতে ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমেরিকার উপস্থিতি ও স্বার্থ খুবই খোলাখুলি হয়ে যায়। আর বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়, এক রাষ্ট্রে দুই প্রেসিডেন্টের দাবিদার – বলাই বাহুল্য, এটা ঐ রাষ্ট্রের ইমেজের জন্য খুবই খারাপ।

    দেশে-বিদেশে এর বিভক্ত প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছিল। তবুও এক সোজা লাইন টেনে বলা যায়, দেশের ভেতরে তবে পার্লামেন্টের বাইরে আর কেউই এটা মানেনি বা প্রভাব নেই। অর্থাৎ নির্বাহী প্রেসিডেন্ট মাদুরোর নিয়ন্ত্রণে স্বভাবতই সব সরকারি অফিস প্রশাসন তো আছেই; সেই সাথে বিচার বিভাগও তার পক্ষে। ফলে দাঁড়ায়, পার্লামেন্ট ছাড়া রাষ্ট্রের অবশিষ্ট দুই মূল প্রতিষ্ঠান মাদুরোর পক্ষে। তবে সেই সাথে নির্ধারক সেনাবাহিনীর জেনারেলরাও মাদুরোর পক্ষে। মাদুরো জেনারেলদের সাথে ক্ষমতা ও বৈষয়িক সুবিধা শেয়ার করেন বলে প্রচলিত আছে। কিন্তু দেশের বাইরে?

    ট্রাম্পের আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আঞ্চলিক দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্র জোট  ওএএস [ Organization of American States, OAS] , এসব মিলিয়ে মোট প্রায় ষাটেরও বেশি বিভিন্ন রাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেতা গুয়াইদোকে ইতোমধ্যে স্বীকৃতি দিয়েছে। আর পাল্টা রাশিয়া এবং চীন থেকে ইরান, সিরিয়া, তুরস্ক, এরা মাদুরোর পক্ষে। এক কথায় যেন নতুন করে এক ‘কোল্ড ওয়ার’-এর দুই পক্ষ দল। এ ঘটনায় সবচেয়ে বাজে দিক হল এটাই। যার কারণেই হোক, পরিস্থিতিকে ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম আমেরিকা’ এমন দুই পক্ষে বিভক্ত হয়ে কোল্ড ওয়ার বা ঠাণ্ডা যুদ্ধেরীক লড়াই যেন ফিরে এসেছে – এমন ভাব তৈরি করা, এভাবে ফেলে দেয়া একেবারেই ঠিক হয়নি। কারণ, দুনিয়াকে আমরা চাইলেই আবার ‘দুই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়’ ফেলে দিতে পারব না। কারণ, দুনিয়ায় এমন কিছুই আর বাস্তবে নেই। এ জন্য এমন ভান ভনিতা ছায়ার সাথে লড়াই – এটা কারো পক্ষেই কোনো কাজের কাজ হয়নি। এটা দুই পক্ষের জন্যই এক অচলাবস্থা।

    আরও কঠিন বাস্তবতার দিকটা হল, এখন কথিত সেই ‘সমাজতন্ত্র’ কোথাও আর টিকে থাকতে পারেনি, টিকে নেই কোথাও। কাজেই ভান করে যেন মাদুরোর পক্ষে এক “সমাজতান্ত্রিক জোট” উঠে দাড়িয়েছে, এই ভাব ধরার সুযোগ নেই। কারণ, রাষ্ট্রের সব কিছুই একমাত্র সরকারি মালিকানায় – এমন চিত্রের সেই সমাজতন্ত্রের রাষ্ট্র বলতে একালে আর কেউ অবশিষ্ট নাই। ফলে যে চিত্রের রাষ্ট্রগুলো এখন আর নাই তাই এদেরই কোন “সোভিয়েত” ব্লক বা আলাদা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কোন রাষ্ট্র-জোট আর নাই। গত ১৯৯১ সালের পর থেকে বলা যায়, সারা দুনিয়ার সব রাষ্ট্র এখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার অন্তর্গত। এমনকি মিয়ানমার অথবা আরো নির্দিষ্ট করে বলতে হয় উত্তর কোরিয়াও এখন মূলত চীনের মাধ্যমে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থায় যুক্ত। কাজেই এ কালে প্রতারণা করা ছাড়া, “কথিত সমাজতন্ত্রী” ভাব ধরার আর কিছুই নেই। ‘সমাজতন্ত্র’ কারও কাছে খুব ভালো জিনিস হয়ত। ছিল অথবা আছে এখনও। তবুও দুনিয়ায় এমন কিছু একটা এককালে চালু থাকলেও এখন সেটা “এক মৃত অভিজ্ঞতা” ছাড়া আর কিছু নয়। কাজেই এ কালের রাশিয়া অথবা প্রেসিডেন্ট পুতিন মানেই “সমাজতন্ত্রী” নয়। এমন আকার ইঙ্গিত করা,  ভং-চং ধরারও কিছু নাই। এমনকি তার সাগরেদ হিসেবে ইঙ্গিতে চীনকে সাথে দেখতে পেলেও কথা একই থাকে।

    বরং, একালে বলা যায় চীন-রাশিয়া মিলে তারা হয়ত আমেরিকার বিরোধীও। তবুও তা যেকোনো দুই বিরোধী স্বার্থের রাষ্ট্রের মতই। এর বেশি গুরুত্ব বা  তাতপর্য এর নাই।  এটা “সাম্রাজ্যবাদ” হিসেবে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন-রাশিয়া কোন অবস্থান এমন মানের ইঙ্গিত দিয়ে নৈতিকতার সুড়সুড়ি তুলতে হবে – এমন চেষ্টা ফাঁপা কাজ তো বটেই, তা অগ্রহণযোগ্য ও খারাপ কাজ। কাজেই ‘সমাজতন্ত্রের’ পক্ষ নেয়া হচ্ছে মনে করে এখনকার রাশিয়া বা চীনকে সমর্থন করা কিংবা সাম্রাজ্যবাদের বিপক্ষে থাকা বুঝা; কিংবা আমেরিকার ও ইইউর বিরোধিতা করা কিংবা ভেনিজুয়েলার মাদুরোকে কোলে তুলে নেয়া – এসব প্রতিটি কাজই এখন নিজের সাথে প্রতারণা, মিথ্যা প্রবোধ দেয়া হয়ে দাঁড়াবে। এর চেয়ে বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া কাজের হতে পারে। ভেনিজুয়েলা সঙ্কটের গোড়া কোথায় তা নতুন করে বুঝতে চেষ্টা করতে পারি।

    কমিউনিস্টরা বলতে পছন্দ করবেন হয়ত যে শ্যাভেজ ভেনিজুয়েলার তেলসম্পদ জাতীয়করণ করেছেন, গরিবের জন্য তেল বিক্রির অর্থ পাকা বহুতল বাড়ি, শিক্ষা-চিকিৎসায় ব্যয় ইত্যাদির ‘সমাজতন্ত্র কায়েম’ করেছিলেন; সে জন্য “সাম্রাজ্যবাদীরা” ভেনিজুয়েলার জন্য বাধা ও নানান সমস্যা সৃষ্টি করেছে। ভেনিজুয়েলার বর্তমান সঙ্কটে রাশিয়া ঠিক এ ব্যাখ্যাই দিচ্ছে।

    আসলে তেল জাতীয়করণ আর গরিবের জন্য খরচ ব্যাপারটাকে সমাজতন্ত্র বলি আর না বলি, ভেনেজুয়েলার সঙ্কট সেজন্য হয়নি। আবার যদিও বেজ ফ্যাক্টস হল, ভেনিজুয়েলায় তেল জাতীয়করণ শ্যাভেজ করেননি, এটা ১৯৭৬ সাল থেকে আগেই করা ছিল। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি (PDVSA) -এর জন্ম তখন থেকেই। শ্যাভেজ ২০০৭ সালে যেটা করেছেন, সেটা কী তাহলে? দুনিয়ায় যা তেল প্রতিদিন ভোগ-ব্যবহার হয়ে যায়, ভেনিজুয়েলা এর ১৩ শতাংশ একা উৎপাদন করে থাকে বা সক্ষম। কিন্তু তার এই সক্ষমতার প্রধান তেলক্ষেত্র এমন এলাকাকে বলে ‘অরিনোকো বেল্ট’। [ ভেনেজুয়েলায় একুশশত কিলোমিটার লম্বা বিস্তৃত অরিনোকো নদীর দক্ষিণ অঞ্চল জুড়ে দুনিয়ার বৃহত্তম এই তেল ক্ষেত্রে ]।  কিন্তু যেখানকার তেল তুলতে বড় বাধা ছিল যে, প্রথম দিকে এই তেল ক্ষেত্রে প্রস্তুত করতে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন ছিল।

    সে কারণে সরকারি মালিকানাধীন তেলক্ষেত্রের উপরই তা তেল তোলার অবস্থায় আনতে “তেল উত্তোলন বিনিয়োগ প্রকল্প” নেয়া হয়েছিল। আর বিদেশী কোম্পানিকেই বিনিয়োগ এনে এই প্রকল্প চালাতে দেয়া হয়েছিল।  আসলে মুল কারণ ছিল, দুনিয়াতে তেলের চাহিদা ক্রমে বাড়তে থাকায়  ১৯৯৭ সালের দিকে ভেনেজুয়েলার ‘অরিনোকো বেল্ট’ এর তেল উত্তোলনে বিদেশি কোম্পানি বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। এভাবে কূপ তৈরি বহু আগেই শেষ করে কোম্পানিগুলো, যখন বহু আগেই উৎপাদনেও চলে গেছিল, এরই কয়েক বছর পর ২০০৭ সালে ওই কোম্পানিগুলোকেই হুগো শ্যাভেজের সরকার চাপের মুখে দেশ থেকে বের করে দেয়। এ কাজকে ‘সমাজতন্ত্র’ বলে দাবি কমিউনিস্টরা করুক আর যা-ই করুক, আইনি দিক থেকে ব্যাপারটা হল একটা প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে যে পার্টনার, তাকেই কোম্পানি থেকে গায়ের জোরে বের করে দেয়ার মত। তাই এসব ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশে যেমনটা হয়, তেমনই এখানেও ক্ষতিপূরণ মামলা হবেই, হয়েছিলও। আর তাতে কোন কোনটার মালিকানা বিতর্ক মামলায় ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়ে গেছে, আবার কোনটার মামলা এখনো পেন্ডিং। এখন একে ‘সমাজতন্ত্র’ নামে ডেকে কেউ সুখ পেতে চাইলে পেতে পারে, প্রপাগান্ডা করতে চাইলে করতে পারে।

    তবে হুগো শ্যাভেজ এর চেয়েও আরো গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কট তৈরি করেছিলেন অন্যখানে। আমরা সে দিকটা বুঝতে যাবো। মাটির নিচের তিন ডলারের তেল ১৭০ ডলারে বেচার চেয়ে আরামের কাজ আর কী হতে পারে! এর চেয়ে আরামের ‘সমাজতন্ত্র’ আর কী হতে পারে! শ্যাভেজ এ মজাই খেয়েছেন। দুনিয়ায় তেলের দাম কিন্তু সব সময়ই সাব্যস্ত হয়েছে কোন ‘সমাজতন্ত্র’ ব্যবস্থা নয় বরং, ‘বাজার’ মানে, একেবারে গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক বাজারব্যবস্থা দিয়ে। ২০০৭ সালের দিকে তেলের বাজার তখনও তুঙ্গে ছিল, কারণ চীনের জিডিপি তখনো ডাবল ডিজিটে। তাই চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিতে তার জ্বালানি চাহিদা মানে চীনের সম্ভাব্য ব্যাপক তেলের চাহিদাও ছিল তুঙ্গে ফোরকাস্ট। এ দিকটায় নজর করে তেলের বাজারের ফোরকাস্ট খুবই তেজী ছিল।  যদিও ২০০৭ সালের শেষে (২০০৭-০৮) এসে, আমেরিকা টের পায় যে আফগান-ইরাক ওয়ার অন টেররের অন্তহীন যুদ্ধে জড়িয়ে আমেরিকান রাষ্ট্র নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা ছাড়িয়ে খরচ করে ফেলেছে। কিন্তু ওদিকে যুদ্ধ শেষেরও কোন নামগন্ধ নাই। সামগ্রিক পরিণতিতে আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতিতে (দ্বিতীয়) মহামন্দা হাজির হয়েছিল।

    এতে আমেরিকা-ইউরোপের অর্থনীতি ঢলে পড়লেও কিন্তু চীনের অর্থনীতির গতি কিছু কমে  সিঙ্গেল ডিজিটের জিডিপিতে এসে আটকে বহাল ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের শেষে (এনার্জি স্টাটিস্টিক্সের প্রতিষ্ঠান, US Energy Information Administration (EIA); এটা আমেরিকান সরকারের হলেও তেলের বাজারে সবার কাছে বিশ্বস্ত) EIA -এর দেয়া চাহিদার ফোরকাস্ট (নিম্নহার) প্রকাশ পায়। এর ফলে তেলে বিনিয়োগকারীরা সদলে আগেই পুঁজি তুলে নেয়া শুরু করেছিল। এতে এরপর থেকে তেলের দাম প্রবলভাবে ক্রমেই কমতে কমতে একপর্যায়ে ৩০ ডলারেও গেছিল, যা এখন ৫৫-৬০ ডলার/ব্যারেলের মধ্যে। সেই থেকে এর ধাক্কা ভেনিজুয়েলার মতো রাষ্ট্র ও ‘সমাজতন্ত্রী’ সরকার আর সহ্য করতে পারেনি। তত দিনে অবশ্য শ্যাভেজ মারা (২০১৩) গেছেন, মাদুরো এসেছেন ক্ষমতায়।

    তাহলে ভুলটা কোথায়? মফস্বলের এক দোকানদার বাবা তার দুই ছেলেকে নিয়ে ব্যবসা করেন। সারা দিন তার দোকান খোলা থাকে আর প্রতিদিন তার ক্যাশবাক্স ভর্তি হতে থাকে নগদ ও গোনা হয়নি এমন পরিমাণ টাকায়, তার ব্যবসা এমনই চালু। কিন্তু প্রতিদিন সেই বাবা সন্তানদের সাবধান করে একটা কথাই কেবল বলেন, বাবারা মনে রাখবা, বাক্সের সব টাকা আমার নয়। ব্যবসায় লভ্যাংশ যেটা, কেবল সেটা আমার, সেই টাকা থেকে সংসারে খরচ করতে পার। কেন? কারণ তিনি আসলে বলছিলেন ব্যবসার পুঁজিতে হাত না দিতে, পুঁজি না খেয়ে ফেলতে। ক্যাশবাক্সের কাঁড়ি কাঁড়ি মোট টাকা মানে তা হল ব্যবসায় বিনিয়োগ আর মুনাফার যোগফল। কাজেই, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা দেখে ছেলেদের যেন মাথা খারাপ না হয়ে যায়।

    সমাজতন্ত্রী শ্যাভেজ-মাদুরোরা বাজার খুবই অপছন্দ করেন, কিন্তু ফুলে-ফেঁপে ওঠা ১৭০ ডলারের তেলের বাজার কামনা করেন, ব্যাপারটা তাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৭০ ডলার এক ব্যারেল তেলের মধ্যে ১৭০ ডলার পরিমাণ ভ্যালু (value addition) ভেনিজুয়েলা যোগ করেনি। তবুও ওই দামেই তা বিক্রি হয়েছে, কারণ বাজারের প্রবল চাহিদা। আর সেটা আবার কোনো স্থানীয় বাজার না গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক বাজারে সেটি নির্ধারিত। ফলে এই বিপুল আয়ের ওপর চোখবুজে ভরসা করে খরচের ফর্দ আর দায় নিয়ে ফেলা অনুচিত হলেও শ্যাভেজরা তাই করেছিল। সরকার সমাজতন্ত্রের নামে ‘গরিবের জন্য অর্থ ব্যয়ের পপুলার কর্মসূচি’ খুলে বসেছিল। ফলে এটা স্থায়ী সরকারি ব্যয়ের খাত হয়ে উঠেছিল। বিপরীতে আয়ের সংস্থানের ব্যবস্থাটার কোন স্থায়ীত্ব না থাকলেও। তাই তেলের দাম পড়ে গেলে তখন এই ব্যয় নির্বাহে সরকার হিমশিম। ফলাফলে অতিরিক্ত টাকা ছাপানো, ফাইন্যান্সিয়াল মিসম্যানেজমেন্ট, মুদ্রাস্ফীতি ইত্যাদি।

    তবে দ্বিতীয় আরো বড় ভুলটা হল, তেল বেচে পাওয়া অর্থ থেকে সরাসরি পপুলার সামাজিক কর্মসুচিতে খরচ না করে বরং একে আগে কোনো উৎপাদনে, কোনো কৃষি বা শিল্প কাজে বিনিয়োগ হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা উচিত ছিল। এরপর সেই উৎপাদনের লাভালাভ থেকে একটা অংশই কেবল ‘গরিবের জন্য অর্থব্যয়ের পপুলার কর্মসূচিতে ব্যয়’ বা ব্যবহার করা উচিত ছিল। এতে শুরুতে গরিবের জন্য কর্মসূচি চালু করতে কয়েক বছর একটু দেরি হত অবশ্যই। কিন্তু ক্রমেই একবার চালু করতে পারলে তা স্থির ও দৃঢ়ভাবে চলত। মাঝপথে তেলের দাম পড়ে গেলেও তা রাষ্ট্রের জন্য দায় হয়ে উঠত না। তেলের আয়ের সাথে গরিবের জন্য ব্যয়ের সরাসরি কোনো সম্পর্ক না করা ছিল এর সূত্র বা চাবিকাঠি।

    ক্যাপিটালিজমের স্বভাব না বুঝে ক্যাপিটালিজমের বিরোধিতা, খামখা সব পদক্ষেপ আর উদ্ভট দাবি অনেক অর্থনীতি ডুবিয়ে দিতে পারে। সমাজতন্ত্রীরা আজীবন এগুলোই করে এসেছে। সমাজতন্ত্রী চিন্তার আরেক আজিব বৈশিষ্ট্য হল – নাগরিকের সব মৌলিক খরচের (অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান) দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে – তা সবার আগেই দাবি করে অথবা ধরে নেয়। কিন্তু রাষ্ট্র কোথা থেকে তা জোগাড় করবে, সামর্থ্য আছে কি না, হয়েছে কি না বা কতটা সেসব কোনো কিছু দেখা ছাড়াই এমন দাবি তারা করে থাকে। তারা ধরে নেয় রাষ্ট্রের এই সামর্থ্য আছে বা থাকবেই বা থাকে। অথচ প্রথম কাজ ছিল রাষ্ট্রের আয় ও খরচের সামর্থ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয়া।  আর পরে বাড়া সামর্থের অনুপাতে খরচের পরিকল্পনা করা।

    আফ্রিকার দেশগুলো কলোনিমুক্ত স্বাধীন হয়েছিল মোটামুটি ষাটের দশকের শুরু থেকে। তাদের কাছেও সমাজতন্ত্র-ভাবনা এমন এক কাঙ্খিত বটিকাও ছিল। আফ্রিকার  জাম্বিয়া ১৯৬২ সালে স্বাধীন হয়েছিল। এর এমন স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতা ও স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্টের নাম কেনেথ কাউন্ডা। এ কালে চাকরি সুত্রে জাম্বিয়ায় বসবাস কালে শুনেছি, তিনি নাকি সেকালে বাসায় তৈরি মদ খেয়ে জনগণের পেট খারাপের কষ্ট পাওয়া পছন্দ করতেন না। তাই কারখানায় তৈরি মদ ট্যাঙ্ক লরিতে নিয়ে বিতরণের ব্যবস্থা করতে গেছিলেন। সম্ভবত মদও যেহেতু এক প্রকার খাওয়া্‌ মানে অন্নের সংস্থান। ফলে সেটাও রাষ্ট্রের খাওয়ানোর দায় নিতে গেছিলেন তিনি। ১৯৯১ সালের পর এসে জাম্বিয়া রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে গেছিল, যা এখন একালে আবার অনেক কষ্টে ধীরেসুস্থে বিদেশী (চীনা ও বিশ্বব্যাংকের) বিনিয়োগ, দান-অনুদানে আবার জাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

    ভেনিজুয়েলার সঙ্কট অবশ্য ওপরে যেগুলো বললাম, এগুলোই সব নয়। এর উপরে আরো নানান ডালপালাও আছে। যেমন ওই ২০০৭ সালের আরো ঘটনা হল, যখন সমগ্র দুনিয়ায় সমাজতন্ত্র এক মৃত অভিজ্ঞতা মাত্র, (১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্র ভেঙে গেছে) যা নিজ উদ্যোগে ভেঙে পড়েছে তা সবাই জানে। কিন্তু তবু শ্যাভেজ সেখান থেকে কোন শিক্ষা , সাবধানতা সতর্কতা ছারাই ভেনিজুয়েলার টেলিকম, বিদ্যুৎ, পানি, সিমেন্ট, স্টিল, ব্যাংক ইত্যাদি সব কিছু জাতীয়করণ করেন। পরবর্তীকালে এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনের বিস্তারিত সব দিক প্রসঙ্গ যদি সরিয়েও রাখি, তবুও ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে এর প্রধান প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছিল এবং এখনও হয়ে আছে – এগুলোর অদক্ষভাবে প্রচুর খরচে পরিচালনা।

    আর সব কিছুকে ছাড়িয়ে যাওয়া দিক দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়া, সেটা তো আছেই। সরকারের হাতে মালিকানা রাখলে সে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট বা পরিচালনা যে এক অসহনীয় সমস্যা, এ কথা তো ২০০৭ সাল নাগাদ সমগ্র দুনিয়ার সমাজতন্ত্রীদের কানে ঢুকে যাওয়ার কথা। ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সেটা ঘটেনি। ভেনেজুয়েলার দুর্নীতি জনমনে কত মারাত্মক উদ্বেগের তা একটা চিহ্ন হল – এ বছর জানুয়ারিতে মাদুরো প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে তিনি তা উল্লেখ করে বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি ‘বিশেষ ব্যবস্থা’ নেবেন। [He concluded by highlighting that the recovery of Venezuela’s economy and the fight against corruption and indolence are the government’s priorities for the near future,]। এমন সব কিছু অব্যবস্থার প্রভাব কত প্রবল তা বোঝার আরেক সহজ জায়গা হল মুদ্রাস্ফীতি। আপনার যদি ১০ হাজার টাকা থেকে থাকে, তবে এক বছর পর ওর মূল্য ভেনিজুয়েলায় এখন ৫৯ পয়সা। বলা হচ্ছে, ভেনিজুয়েলায় মুদ্রাস্ফীতি এখন ১০৮৭.৫২ শতাংশ। [which means that bolívar savings worth $10,000 at the start of the year dwindle to 59 cents by the end. ]

    অনেকে ইঙ্গিতে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, ভেনিজুয়েলা সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্র, সে জন্য নাকি পুতিনের রাশিয়ার সাথে খুব দহরম-মহরম। এমন ভিত্তিহীন অনুমান অনেকের মনে কাজ করে থাকে। কিন্তু পুতিনের সাথে সমাজতন্ত্রের সম্পর্ক কী? পুতিন বা রাশিয়া কী এমন দাবি করেছে  যে রাশিয়া সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্র, আছে? তবু এমন “সমাজতন্ত্র- বিক্রেতা” এখনও আছে। এরা আসলে রাশিয়ার রাষ্ট্রস্বার্থের তাঁবেদার ও ভাঁড়। বাস্তবে, ভেনিজুয়েলা এখন রাশিয়ার বিরাট বিনিয়োগের ক্ষেত্র, ২০০৬ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত রাশিয়ার মোট বিনিয়োগ প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার [Since 2006 Russia has lent Venezuela at least $17bn. ]। ইকোনমিস্ট এক রিপোর্টের শিরোনাম বলছে, [Vladimir Putin fights for his own future ] অর্থাৎ অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়ার কারণে মাদুরোকে যদি শেষে বিদায়ই নিতে হয়, তবে নিজের বিনিয়োগ নিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাশিয়া।

    অর্থনীতি ভেঙে পড়া, দুর্নীতিতে ডুবে যাওয়া ও অব্যবস্থায় অচল ইত্যাদির সরকারের ক্ষেত্রে যা হয়, এখানে তা ঘটেছে। এর একপর্যায়ে সরকার গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিজের পক্ষে সরাসরি ক্যাডার গুণ্ডা বা মিলিশিয়া নামাতে হয়, বিরোধী জমায়েতে হামলা করতে হয় যারা আবার পুলিশবাহিনীর প্রটেকশন পেয়ে থাকে – এসবই ঘটে গেছে ভেনিজুয়েলায়। জবরদস্তিতে ক্ষমতায় থাকার সব কর্মাদি এখানে সম্পন্ন করা হয়েছে। সবার ওপরে মাদুরোকে  আবার কেউ উলটে ফেলে দেয় তা থেকে রক্ষা করতে পুতিনের দেয়া প্রটেকশন, সেটা তো আছেই।

    ইকোনমিস্টের আরেক অবজারভেশন হল – […hollowing out of institutions and the privatisation of state power is precisely what Russia and Venezuela have in common]। অর্থাৎ এখানে মাদুরো আর পুতিনের মধ্যে এক বড় মিল আছে। সেটা হল, উভয় ব্যক্তিরই দখলে থাকা বা পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর যার যা ভূমিকা তা হল, প্রশাসন পাবলিকের পক্ষ থেকে গণস্বার্থ দেখা ও মনিটরিং বা নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদি সব দায়িত্ব বাদ দিয়ে এখন উলটা্ “প্রতিষ্ঠানগুলোকেই ফোকলা” আর অকেজো করে ফেলা হয়েছে। প্রশাসনিক বিজনেস রুলের রুল বই দিয়ে এগুলো আর পরিচালিত নয়। এগুলো পরিচালিত হয় ব্যক্তি-মুখের নির্দেশে। এটা যেন ‘রাষ্ট্রক্ষমতারই এক প্রাইভেটাইজেশন’ এমন ঘটে গেছে। আর কে না জানে, যখন রাষ্ট্রের নির্বাহীদের কেউ কব্জা করে নেয়, তখন তার রাষ্ট্রীয় সম্পদও তাদের দখলে চলে যায়, রাষ্ট্র এক পরিত্যক্ত এলাকা হয়ে যায়।

    এসবের মিলিত এখন আর এক রূপ হল, ‘প্রাইভেট আর্মির’ সমাধান। ইকোনমিস্ট-সহ অনেকে জানাচ্ছে, ইতোমধ্যে মাদুরোর কোনো সম্ভাব্য ক্ষমতাচ্যুতি ঠেকাতে রাশিয়া ইতোমধ্যে কয়েক শ’ রাশিয়ান ‘প্রাইভেট আর্মি’ বা ওয়াগনার (Wagner mercenaries) পাঠিয়েছে।

    ‘প্রাইভেট আর্মি’- এটা ইদানীংকালের আরেক নতুন ফেনোমেনা। তবে সাবধান, এটা পুতিনের রাশিয়াই প্রথম দেখিয়েছে তা মোটেও নয়। ইরাকে বা আফগানিস্তানে ব্লাক-ওয়াটার[Blackwater] বাহিনীর কথা আমরা শুনেছিলাম। এরাই ছিল সেখানে আমেরিকান ‘প্রাইভেট আর্মি’ সরবরাহের কোম্পানি। পরে অবশ্য এক স্থানিয় বাজারে সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে গুলি ছুড়ে মারার অভিযোগে কেলেঙ্কারিতে পড়ে এই বাহিনী আমেরিকায় ফিরে যায়। মজার ব্যাপার হল, মিয়ানমারের এক ইংরেজি দৈনিক খবরে দাবি করা হয়েছে যে, চীন সেই ব্লাক-ওয়াটার কোম্পানিকেই নতুন নামে মিয়ানমারে নিয়োগ করতে যাচ্ছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের নাগরিকদের অধিকার চুলায় যাক, আমেরিকা, রাশিয়া অথবা চীন প্রত্যেকেই নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে প্রাইভেট গুন্ডাবাহিনী পাঠিয়ে হলেও তা করতে চায়। এব্যাপারে তাদের মধ্যে কোন নীতিগত ফারাক নাই।

    ভেনিজুয়েলাবাসীর জীবন দুর্বিষহ করে তোলার ক্ষেত্রে আরেক বিরাট অবদান ট্রাম্পের আমেরিকার। এ কালে আমেরিকা যার ওপরে ইচ্ছা “অবরোধ আরোপ” করে রাখছে। এই অবরোধের সোজা মানে, সেই রাষ্ট্রের পক্ষে ডলারে কোনো কিছু বেচা/কেনা করা বন্ধ করে দেয়া। ফলে ভেনিজুয়েলার এখন ডলারে তেল বিক্রি বন্ধ। এ ছাড়া ওষুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয়গুলো পণ্যের আমদানিতেও এর বাধা তোইরি করে রাখা  তো আছেই। অথচ ১৯৪৪ সালে ডলারকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে গ্রহণ করার সময় আমেরিকা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল নিজে অন্য রাষ্ট্রকে ডলারে পণ্য কেনাবেচা করতে বাধা দিবার সুযোগ নিজের হাতে রাখবে এমন কোনো শর্ত ছিল না।

    সামগ্রিক দিক থেকে দেখলে ভেনিজুয়েলার বিরাট আরেক ভুলটা হল বিপ্লবীপনার মোহে শেষে রাশিয়া ও আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতার ফাঁদে পড়া। অথচ সরাসরি কারো কব্জায় পড়া এড়িয়ে যাওয়া – এই নীতি অনুসরণ করে পথ চলা সঠিক ছিল। এ ছাড়া নিজ দেশের রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ যতই বিরোধ থাক, নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অবিতর্কিত রাখা খুবই জরুরি। অন্যথায় আভ্যন্তরীণ বিরোধকে ছোট বা সীমিত  ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা কঠিন হয়ে যায়। কারণ, সমাজে নানা রকম স্বার্থদ্বন্দ্ব থাকবেই, যা এক চলমান ঘটনা। কিন্তু তা এক ‘পারমিশিবেল রেঞ্জের’ মধ্যে রাখতে পারতে হয়। আমরাই একমাত্র ভাল অথবা সমাজতন্ত্রী এসব প্রচার করে সমাজকে অন্তত গভীর দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেললে নিজের দেশ বাইরের দেশ ও লোকের স্বার্থের ঘুঁটি হয়েই ওঠে। ভেনিজুয়েলার অবস্থা হয়েছে এটাই।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ৩০ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভেনিজুয়েলা কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে “ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

     

     

  • মোদীর পাশে মমতার মুখ ভেসে উঠছে

    মোদীর পাশে মমতার মুখ ভেসে উঠছে

    গৌতম দাস

    ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-2xI

    ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট বা লোকসভা নির্বাচন হওয়ার সময় আরও কাছে ঘনিয়ে এসেছে। গত ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের অভিজ্ঞতার কথা মনে রাখলে বলা যায়, পুরো এপ্রিল-মে মাসজুড়ে এবারও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং তা হবে কয়েকটা পর্বে, যেমন গতবার হয়েছিল নিরাপত্তার স্বার্থে পাঁচ পর্বে দুই মাস ধরে বিভিন্ন দিনে। আর সবশেষে মে মাসের মাঝামাঝি একসাথে ভোট গণনা ও ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি নতুন সরকারও গঠিত হয়ে শপথ নিয়েছিল মে মাসের মধ্যেই। অর্থাৎ সেই হিসাবে কথা বললে আর এক মাস পর থেকেই ভারতে নির্বাচনী আমেজ শুরু হয়ে যাবে। নির্বাচন কমিশনের আওতায় চলে যাবে প্রশাসনিক কাঠামো।

    আর সেই সাথে সরকার চালানো আর রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর কমিশনের বিভিন্ন বাধানিষেধ বা গাইডিং নানা নিয়ম আরোপিত হতে শুরু করবে – মানে এবিষয়গুলোও নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। মোদির সরকারের ‘ফ্রি হ্যান্ড’ মাতবরিতে  বিরোধীদলের উপর রাষ্ট্র-প্রশাসনকে অপব্যবহারে প্রয়োগের সুযোগ ইদানীং প্রবল হয়েছে; যেমন- অপছন্দের বিরোধী দলকে বেকায়দায় ফেলতে বা বিজেপির কাছে নত হতে বা কোণঠাসা করতে বাধ্য করছে। সেসবের সুযোগ আর থাকবে না। দুর্নীতি বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণের নামে ভারতের কথিত সিবিআই (Central Bureau of Investigation – CBI) বা ইডি (Enforcement Directorate, ED) -কে ব্যবহার করে মমতার মত মোদীবিরোধীদের হয়রানি করার অভিযোগ যা ইদানিং প্রবল, মোদীর সেসব কাজ করার সুযোগ শেষ হয়ে পরিস্থিতি নির্বাচন কমিশনের অধীনে ও নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।

    ফলে ওদিকে ইতোমধ্যেই আসন্ন নির্বাচনে কী কী ইস্যু প্রধান হয়ে উঠবে, তাও পরিষ্কার হয়ে গেছে। যে কথা বলছিলাম, সিবিআই-ইডির কথা। ‘মোটা দাগে’ বললে, এর গঠন আমাদের দুদকের মত না হলেও এটা বরং ভারতের কেন্দ্রীয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে তবে পুলিশ প্রশাসনের ( Delhi Special Police Establishment Act, 1946.) এক আইনী ক্ষমতায় পরিচালিত বিশেষত দুর্নীতিবিরোধী এক বিশেষ তদন্ত-অনুসন্ধানের সংস্থা। আর ইডি হল, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে অর্থনীতিবিষয়ক আইন প্রয়োগ ও সম্পর্কিত অপরাধের বিরুদ্ধে লড়বার সংগঠন।  এসবের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাইরের যেকোনো হস্তক্ষেপ বা প্রভাবমুক্ত থেকে আদালতের নির্দেশ-সিদ্ধান্তে এর হাতে দেয়া কোনো ঘটনা-মামলার নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত-অনুসন্ধান রিপোর্ট পাওয়া এবং তা আইনের আওতায় আনা। বাংলাদেশের দুদকের মত প্রতিষ্ঠান কাজের নামের মিল ছাড়া আর কোনদিক থেকেই সিবিআই তুলনীয় নয়। আর সিবিআই অনেক বেশি সফল, শক্তিশালী ও পেশাদার ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের দুদক দেখে মনে হয় কেবল সরকার বিরোধীদের সাইজ করার ওর কাজ। আর ওদিকে ভারতের ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, তবুও সিবিআইয়ের মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার ঘটে চলছে; তাই অপব্যবহারমুক্ত প্রতিষ্ঠান বলা যাচ্ছে না।

    এর সবচেয়ে বড় প্রকাশ ছিল গত ০৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী মমতার রাজ্য পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে মোদীর সিবিআই লেলিয়ে দেয়া – যা আসলে আক্ষরিক অর্থেই রাজ্য পুলিশ বনাম কেন্দ্রের সিবিআই অফিসের লড়াইয়ের ঘটনা। এতে মাঠের চেহারা দাঁড়ায় এমন যে, কলকাতায় এসে রাজ্য পুলিশ কমিশনারকে গ্রেফতার বা জিজ্জাসাবাদ করতে তার বাসায় কেন্দ্রের সিবিআই দল পৌছালে তাদেরকেই রাজ্য পুলিশের বাধা দেয়া শুধু নয়, উল্টো সিবিআই অফিসারদের গ্রেফতার করে গাড়িতে তুলে কাছের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

    মোটামুটি ঘটনা-সংক্ষেপটা হল, আমাদের ডেসটিনির মত মানুষের টাকা নিয়ে সুদসহ ডাবল ফেরত দেয়া বা এমএলএম করবে বলে শেষে পুরা টাকাই মেরে দেয়ার ঘটনা। ঘটনাকাল মমতার জমানার আগে এবং ধরা পড়া মমতা-কালীন। তবে এখানে মমতার দলের কিছু নেতা সহ অনেক কয়টা রাজনৈতিক দলের (কংগ্রেস, সিপিএম অথবা আগে তৃণমুলের নেতা এখন বিজেপি করা এমন সকলে অভিযুক্ত) নেতাকেই মাসোহারা বা নিয়মিত চাঁদা দিয়ে সম্পর্কিত করে নেয়া ছিল। মমতার আমলে এই কেলেঙ্কারি প্রকাশ হয়ে পড়লে তিনি রাজ্য-পর্যায়ে যে তদন্ত কমিটি করেছিলেন ও রিপোর্ট দিয়েছিলেন তা হয়েছিল এই আলোচ্য পুলিশ কমিশনার রাজীবের নেতৃত্বে। এদিকে কেন্দ্র সরকারও সিবিআইকে দিয়ে ঘটনা তদন্ত, মামলা ও চার্জশীট দেওয়ায়। তাহলে এখন ইস্যু কী? সেটা হল সিবিআইয়ের দাবি তারা পরে জেনেছে রাজীব তদন্তের সময় কথিত এই ডাইরি পেয়েছিলেন যা তিনি সিবিআইকে দেন নাই বা জানান নাই। যদিও আসামিরা বলছে এমন ডাইরির কথাটাই ভুয়া। কিন্তু এখানেই নির্বাচনের আগে মোদীর ইচ্ছা তিনি এই কথিত (দুর্নীতি) অনিয়মের কথা তুলে মমতাকে একটু বেকায়দা ফেলে ভোটারের স্মৃতিতে বছর দশের আগের ঘটনাটা মনে করিয়ে দেয়া এই অনুমানে যে তাহলে আসন্ন নির্বাচনে্র ভোটে কিছু মাইলেজ বা বাড়তি সুবিধা তিনি পেয়েও যেতে পারেন। মামলা ইতোমধ্যেই রাজ্য হাইকোর্ট ছেড়ে ভারতের সুপ্রীম কোর্টে বিচারাধীন। বাকি বিষয়টা কী হল তা সংক্ষেপ করার জন্য এনিয়ে দুপক্ষই এবার আদালতে গেলে প্রধান বিচারপতি কী নির্দেশ দিলেন তা দেখব। বিচারকের সারকথাটা ছিল, রাজীবকে সিবিআইয়ের গ্রেফতার করতে পারবে না, এটা অপ্রয়োজনীয়। তবে   সিবিআইয়ের রাজীবকে কোন জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইলে সে অবশ্যই সহযোগিতা করে মুখোমুখি বসবে, তবে তৃতীয় নিরপেক্ষ জায়গায়। ইতোমধ্যে শিলং শহরে সিবিআই আর রাজীব মুখোমুখি সাক্ষাতও ঘটে গেছে, শান্তিপুর্ণভাবে। রাজীব এখন নিজের কাজে। এর মানে, প্রধান বিচারপতির এই রায় বা নির্দেশই প্রমাণ করে যে মোদী সিবিআই লেলিয়ে রাজীবকে গ্রেফতারে উঠায় নিয়ে যেতে আর তাতে নির্বাচনের আগে মমতাকে এনিয়ে অস্বস্তিতে ফেলতে চেয়েছিল। যেমন এক প্রাক্তন সিবিআই প্রধান মন্তব্য করছেন, রাজীব সিবিআইয়ের সাথে সহযোগিতা না করলে তাকে তো সহজেই আদালতের মাধ্যমে বাধ্য করা যেত। সিবিআই সে পথে না গিয়ে হাঙ্গামা বা মিডিয়া ইস্যু তৈরির পথে গেল কেন? খুব জেনুইন প্রশ্ন। যার সহজ জবাব মোদী তো আসলে এক হাঙ্গামা বা মিডিয়া ইস্যুই চেয়েছে। আর এটাই তো অপব্যবহার। তবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘটনা হল, মমতাও কম যান না। রাজীবের বাসায় যে সন্ধায় সিবিআই যায় সেই তখন থেকে এর প্রতিবাদে রাস্তায় অবস্থান ধর্মঘট করতে বসে যান, আর তা চলে লাগাতর তিনদিন যতক্ষণ না আদালতে প্রধান বিচারপতি নির্দেশ জারি করেন। আর এই তিন দিনে সব বিরোধীদলের নেতাই  বিবৃতি দিয়ে ও ব্যক্তি প্রতিনিধি পাঠিয়ে মমতার ঐ অবস্থান ধর্মঘটে স্ব স্ব দলের সমর্থন ও সহ-অবস্থান জানান দিলেন। তাতে সবার কমন এক স্বরে অভিযোগ ছিল যে মোদী নিজ দলের সংকীর্ণ স্বার্থে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানগুলোকে লেলিয়ে অপব্যবহার করছেন। সারকথায় সব মিলিয়ে এতে হাঙ্গামা বা মিডিয়া ইস্যু অবশ্যই একটা হয়েছে। কিন্তু সেটা মমতার পক্ষে গিয়েছে।

    কিন্তু ঘটনার অন্য এক মাত্রার দিক আছে। সাদা চোখে দেখলে ব্যাপারটাকে  মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে মোদীর সিবিআই-ঘটিত নেহায়েতই এক অপব্যবহার মনে হলেও এর ভেতরে জন্মের সময় থেকে ভারত রাষ্ট্র-এর এক গাঠনিক দুর্বলতা [ফেডারল রাষ্ট্রক্ষমতা না হয়ে ভুতুড়ে কেন্দ্রের কুক্ষিগত ক্ষমতা] আর তাতে ভুতুড়ে ক্ষমতার শিকার হওয়া ইস্যু আরো উদোম হয়ে সামনে আসাও নজরে আসবে। এটাই মূলত ভারত রাষ্ট্রক্ষমতার ‘কেন্দ্র বনাম রাজ্যের লড়াই’ – মমতা যে লড়াইয়ের সোচ্চার অগ্রসেনানি। ভারত রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার সময়ের মৌলিক ও গভীর দুর্বলতা এটাই।

    ভারত এখন মোট ২৯টি রাজ্যের দেশ। কিন্তু ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা মূলত কোন রাজ্যের হাতে? সে রকম কোনো একটা রাজ্য অন্যান্য রাজ্যের ওপর ছড়ি ঘুরাচ্ছে কি না। এসব প্রশ্নকে ভারতের জন্মের সময় থেকেই পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ এভাবেই বাস্তবতা হল। কথিত এই “কেন্দ্রীয় ক্ষমতাটাই” এক ভুতুড়ে [না বলা কওয়া, অ-সংজ্ঞায়িত (un-defined power) লুকানো ক্ষমতা ] ক্ষমতা হিসেবে থেকে গেছে। এই ক্ষমতা কার হাতে এবং কেন এর জবাব খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ‘হিন্দি-বলয়’ বা ‘হিন্দিতে কথা বলা’ রাজ্য নামে একটি পরিভাষা দিয়ে বলা হয়েছে, এদের হাতেই ভারতের কথিত কেন্দ্রীয় ক্ষমতা এ পর্যন্ত বিরাজ করে এসেছে। আর অন্য সব রাজ্যের ঘাড়ের ওপর কর্তৃত্ব চালিয়ে গেছে। রাষ্ট্রের আদায়কৃত রাজস্ব কাকে কতটা দেবে কেন্দ্রীয় এই ক্ষমতা তা নিয়ন্ত্রণ করে, বরাদ্দ দেয়। আর এই বরাদ্দ নিয়ে বিরোধী দলের রাজ্য সরকার (যেমন মমতা) নিয়মিত হৈ চৈ করে তুলছেন। এভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের নামে এই ভুতুড়ে ক্ষমতা রাজ্যগুলোর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতার ভাষায়- ক্ষমতার কেন্দ্র বনাম রাজ্যের বৈষম্যের বিরুদ্ধেই তার মূল লড়াই, এটাই তার রাজনীতি। এরই একটা প্রকাশ হল সিবিআই প্রতিষ্ঠানকে রাজ্যের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের অপব্যবহার করা।

    আর সব রাজ্যই অনুভব করে ‘কেন্দ্র’ নামে এক ভুতুড়ে ক্ষমতা তার ঘাড়ে চেপে আছে। কিন্তু কী করে এর বিরুদ্ধে লড়বে, তাদের কাছে তা এখনো অস্পষ্ট। মমতাই একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী যিনি কেন্দ্র-রাজ্যের ক্ষমতার বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তবে, কী করলে এর সমাধান আসবে তা তিনিও সুনির্দিষ্ট করে বলার ক্ষেত্রে তিনিসহ পুরা ভারতের রাজনীতিবিদ, একাডেমিকসহ সমাজের সবাই অস্পষ্ট। বলা যায়, একাডেমিক স্তরেও ইস্যুটি নিয়ে আলোচনাই শুরু হয়নি। সকলেই ভীত যে এতে না ভারত বিভিন্ন রাজ্যে টুকরা হয়ে যায় শেষে। যদিও মমতা বৈষম্যের কথা তুলে ধরার ক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু আসল কথা, সমাধান কী? এর এক কথার জবাব হলো কথিত, ভারত রাষ্ট্রের কথিত কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ভেঙে দিয়ে এক ফেডারেল কাঠামোর রাষ্ট্রব্যবস্থায় চলে যাওয়া। এমন রাষ্ট্র হিসাবে যার আদর্শ উদাহরণ আমেরিকা, তার ফেডারেল স্টেট কাঠামো। এ কারণে ৫০ রাজ্যের আমেরিকার কখনও এমন অভিযোগ নাই যে কোন এক-দুইটা রাজ্য বাকি সব রাজ্যের ঘাড়ে চড়ে মাখন তুলে নিয়ে খাচ্ছে, বা মাতবরি করছে। এমন অভিযোগ আজ আমেরিকার জন্মের আড়াই শ’ বছর পরও উঠেনি। একারণেই বলা যায় আমেরিকা রাজ্যগুলোর সত্যিও এক স্বাধীন ইউনিয়ন। কেউ বা অন্য রাজ্য তাদের বাধ্য করে নাই। নিজের স্বার্থে বুঝে বুঝে নিয়ে তেমন নিয়ম আইন করেই একই ফেডারল রাষ্ট্রে সকলে সামিল হয়েছে।  কথিত ইউনিয়ন-ভারত আসলে নেহেরুর বলপ্রয়োগে বাধ্য করা এক ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ভারত; যেখানে বহু ক্ষমতার উৎসের হদিস নাই, কেন এই ক্ষমতা তার – এর কোন ব্যাখ্যা নাই,  এমন ক্ষমতা। বরং ইতোমধ্যেই সমালোচক ও বিরোধীদের দাবি, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও প্রতিরক্ষা খাতেও “রাজনৈতিক দলাদলি ঢোকাচ্ছে মোদির সরকার“।

    তবে এখনকার সারকথা হল, কেন্দ্র ও রাজ্যের ক্ষমতার বৈষম্য, এ বিষয়টিকে মমতা নির্বাচনে ইস্যু হিসেবে হাজির করতে সফল হয়েছেন। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা অপব্যবহারের দায়ে মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তিনি বাকি সব বিরোধী দলকেও একাট্টা করতে সক্ষম হয়েছেন। এটাই আসন্ন নির্বাচনে একটা মুখ্য ইস্যু হিসেবে রূপ পেয়েছে।

    আসন্ন নির্বাচনের দ্বিতীয় ইস্যু,
    এই নির্বাচনের দ্বিতীয় ইস্যু হল, চাকরি বা কাজ সৃষ্টি। গত ২০০৪ সাল থেকে পরের ১৫ বছরে ভারতের তিন সরকারের আমলে প্রথম প্রধান ইস্যু ছিল এটা। অন্য ভাষায়, ইস্যুটার নাম সরকার “অর্থনীতিতে ভাল” করেছে বা সাফল্যের সাথে তা চালাতে পেরেছে কি না। এর জবাব বা আসন্ন নির্বাচনের আগের মূল্যায়নে বলা যায়, এই ইস্যুতে মোদী ইতোমধ্যেই প্রকাশিত যে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। আর এর সর্বশেষ প্রমাণ হল, এক পরিসংখ্যান রিপোর্ট। মোদির সরকার নির্বাচনের আগে এর স্বাভাবিক প্রকাশ ঘটতে দিতে বাধা দিয়েছে – এই অভিযোগে জাতীয় পরিসংখ্যান কমিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধানসহ দুই সদস্য পদত্যাগ করেছেন। [কেন্দ্রের বিরুদ্ধে এই রিপোর্ট চেপে রাখার অভিযোগ তুলে ইতিমধ্যেই ইস্তফা দিয়েছেন ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল কমিশন-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান পি সি মোহনন। ]  সে রিপোর্ট বলেছে, কাজ সৃষ্টি বা চাকরির সংস্থান এই সরকারের আমলে গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

    এই পরিসংখ্যানের মধ্য দিয়ে যে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে তা ভারত রাষ্ট্রের জন্য আরেক কারণে খুব খারাপ ইঙ্গিত। ১৯৮৫ সালের পর থেকে ভারতের ‘কেন্দ্রীয় সরকার’ (যেটা ভুতুড়ে বা অস্পষ্ট সাফাইয়ের ক্ষমতা বা হিন্দি বলয়ের কোটারি ক্ষমতা) ধারণাটাই দুর্বল হতে শুরু করেছিল। কেন? কারণ, কংগ্রেস বা বিজেপির মত কোনো সর্বভারতীয় দলের আর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজয় লাভ করে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা  আসীন হতে আর সক্ষমতা পারে নাই। মানে এ’দুই দল ভুতুড়ে ক্ষমতাতেও আসতে সক্ষমতা ছিল না- এ দৃশ্যই প্রধান ফেনোমেনা হিসেবে সামনে আসতে শুরু হয়েছিল। এর বদলে আমরা দেখছিলাম, সর্বভারতীয় দল দু’টি আর এককভাবে নয়, বরং আঞ্চলিক দলের সাথে জোট করে কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করা – এই নতুন ফেনোমেনা শুরু হয়ে গিয়েছিল।

    কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএ বা বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ জোট  – এভাবে কোয়ালিশন গড়া – এভাবে সরকার গঠনঅই প্রধান ধারা বলে হাজির হয়েছিল। তবে আবার গত ৩০ বছরের এই ফেনোমেনার বিরুদ্ধে ব্যতিক্রম হল, ২০১৪ সালের বিজয়ী চলতি মোদী সরকার। যদিও এটাও একটা এনডিএ কোয়ালিশন সরকার, সে কথা সত্য। কিন্তু এই এনডিএ জোট গঠন ছাড়াই মোদীর বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতাও আছে। মোদীর বিজেপি সেবার এই ব্যতিক্রম ঘটাতে পেরেছিলেন কেন? কারণ, মূলত কাজ সৃষ্টির ইস্যু। ২০১৪ সালের মোদি প্রবল প্রচারণা চালিয়ে হতাশ [এর আগে কংগ্রেসের দ্বিতীয় ইউপিএ জোটের সরকারের অর্থনীতিক ব্যর্থতায় ] ভোটারদেরকে ফিরে আস্থায় নিতে পেরেছিলেন যে, গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী মোদি সেবার কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করতে পারলে (অর্থনীতিতে ভালো করে) ব্যাপক কাজ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন। কিন্তু পাঁচ বছর শেষে এবার ২০১৯ সালে হতাশ ভোটাররা দেখছেন, সেই আস্থা এখন আবার ধুলায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। অর্থাৎ মোদীর চাকরি সৃষ্টিতে ব্যর্থতা-হতাশার মানে হল, এবারে ভারতের নির্বাচনে আবার সর্বভারতীয় দল দু’টির ওপর প্রবল অনাস্থা (কেন্দ্রীয় ভুতুড়ে ক্ষমতার ওপর অনাস্থা) – এটাই স্থায়ী হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। অর্থাৎ বিজেপি বা কংগ্রেস বাদে কেবল আঞ্চলিক দলগুলোর কোন এক কোয়ালিশন সরকার – এটাই মুখ্য ফেনোমেনো বলে এখন থেকে হাজির হয়ে যেতে পারে।

    এর সোজা অর্থ আরো ব্যাপকভাবে, এবার বিজেপি অথবা কংগ্রেসের নেতৃত্বের আঞ্চলিক দলগুলোকে সাথে নিয়ে কোনো কোয়ালিশন সরকার আর নয়, বরং (১৯৯৬ সালের দেবগৌড়া সরকারের মত) কেবল আঞ্চলিক দলগুলোরই কোয়ালিশন সরকার গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। মোদির ‘কাজ সৃষ্টিতে’ চরম ব্যর্থতার প্রভাবে এমন ঘটার সম্ভাবনা প্রবল হয়েছে।

    আসন্ন নির্বাচনের তৃতীয় ইস্যু,
    গরু, গো-মাতা বা গো-রক্ষক মোদি ইস্যু! হিন্দুত্বের হুজুগ বা জোয়ার তুলে সমাজে মেরুকরণ ঘটিয়ে ভোটের বাক্স ভরতে হবে- এটাই বিজেপি-আরএসএসের রাজনীতির সারকথা। এই উদ্দেশ্যে গরুকে হিন্দুত্বের রাজনৈতিক প্রতীক বানিয়ে গত পাঁচ বছর ধরে  কথিত মুসলমানেরা মাংস বহন করেছে বা ফ্রিজে রেখেছে অথবা গরু কেটেছে ইত্যাদি হুজুগ তুলে পাবলিক লিঞ্চিংয়ের ব্যাপকতা দেখা গেছে। এমন সামাজিক তাণ্ডবে মোদী নিজেকে গরু-পূজারী, গো-মাতা বা গো-রক্ষক হয়ে হাজির করে গেছেন। কিন্তু মোদী এই ‘গরুর রাজনীতি’তেও পরাজিত। মোদী ভেবেছিলাম গরুর রাজনীতির জজবা দিয়ে বাক্স ভরবেন। কিন্তু সেটা আগেই ব্যাকফায়ার করে গেছে। কীভাবে?

    যেকোনো দলীয় কর্মসূচি তা অর্থনৈতিক দিক থেকেও টেকসই বা বাস্তবায়িত (viability) করা সম্ভব কি না তা আগাম যাচাই করে নিতে হয়। মানে, সেদিক থেকেও টিকে থাকার সক্ষমতা থাকতে হয়। মোদির গরুর রাজনীতির অর্থনৈতিক দিকও টেকসই কি না তা আগেই পরীক্ষা করে নেয়া হয় নাই এবং তা টেকসই নয়। তা না করাতে, এর ব্যর্থতা থেকেই মোদী এখানে হেরে গিয়েছেন। যে সমাজে গরু কৃষির উপকরণ সে সমাজে মাংস হিসেবেও গরুর ব্যবহার থাকতে হবে বা থাকবেই। এর বিরুদ্ধে যাওয়ার চিন্তা অবাস্তব। এমনকি ধর্মীয় বা কোনো কারণে, মাংস নিজেরা না খেলেও, অন্তত মাংস রফতানি করতেই হবে। এই সত্য মোদি মানতে চাননি, বোঝেননি- তাই তিনি ব্যর্থ।

    মূল ব্যাপারটি হল, একটা বয়সের পরে গৃহপালিত গরুকে আর কৃষিতে বা মাল টানার কাজে ব্যবহার করা যায় না। তখন থেকে গরুকে আর বসিয়ে খাওয়ানো মালিকের পক্ষে অসহনীয় দায় হয়ে যাবেই। এটাই হিন্দুত্বের রাজনীতি বুঝতে অক্ষম। অথচ এর সামাজিক সমাধান ছিল, গরুকে বিক্রি করতে দেয়া। যার সোজা অর্থ হল, গরু নিজে না কাটলেও, অন্যকে মাংসের উৎস হিসেবে  গরুকে ব্যবহার করতে দিয়ে দেয়া, যার মাধ্যমে গরুর জীবনচক্রের একটা পরিসমাপ্তি টানা। কিন্তু মোদীর রাজনীতি হিন্দুত্বের জোশে –  মাংসের জন্য গরুকে বিক্রি করতে দেয়া যাবে না বলে অবিবেচক বাধা তৈরি করেছিল। কিন্তু গরুকে সেই পর্বে খাওয়াবে কে, এর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করলেন না। নামকাওয়াস্তে কিছু গো-শালা বানালেও তা রক্ষণাবেক্ষণ আর গরু্কে খাওয়ানোর অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করলেন না।

    আসলে বাস্তবে কতগুলোই বা গো-শালা বানাবেন? বাড়ি থেকে গো-শালা বেশি দূরত্বের হলে গাড়ি ভাড়া করে কেউ গরু গোশালায় দিতে যেতে চাইবে না। এতে যেহেতু গরুকে খাওয়ানোর দায়িত্ব নিতে  কৃষক/ গরুমালিক অপারগ, তাই সে – এবার গরুর দড়ি খুলে ছেড়ে দেয়াকেই একমাত্র ও সহজ উপায় মনে করল। কিন্তু তাতেও ‘গরু খাবে কী’ ব্যাপারটা শেষ হলো না। গরু তাই এবার ব্যাপক হারে কৃষকের ফসলি জমিতে গিয়ে হামলে পড়ল। ফলে রাত-দিন জমি পাহারা দিয়ে ফসল বাঁচানো এক বিরাট মাথাব্যথা আর খরচের নতুন খাত হিসেবে হাজির হল। ব্যাপারটা এতই মারাত্মক হয়ে গেছে যে, গত ডিসেম্বরে রাজস্থানের রাজ্য নির্বাচনে ‘ছাড়া গরু’ মোকাবেলা করা নির্বাচনী ইস্যু হয়ে হাজির হয়েছিল। অর্থাৎ ছাড়া গরু ইস্যু উল্টো মোদির ভোটকেটে দিয়ে রাজস্থানে বিজেপি পরাজিত করেছিল। তাই এখন চাকরি সৃষ্টি না করতে পারার ব্যর্থতা, না ছাড়া গরুর সমস্যা- কোনটা মোদির প্রধান ব্যর্থতা বলে হাজির হবে, তা নিয়ে এখন জল্পনা-কল্পনা। এমনই এক আর্টিকেল আছে এখানে – লোকসভা নির্বাচনে মোদির বিজেপি’র জন্য বিপর্যয়ের কারণ হবে কোনটি – গরু না বেকারত্ব?।

    আসন্ন নির্বাচনের চতুর্থ ইস্যুঃ
    চতুর্থত, হিন্দুত্বের নাগরিকত্ব বিল। নতুন এই আইন লোকসভায় বা কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টে বিজেপির আনা বিল হলেও এটা মোদী এনেছিলেন মূলত সারা ভারতে এটা প্রযোজ্য হবে- তেমন ভেবে নয়। বরং বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ নর্থইস্ট – এদুই পকেটের রাজ্যগুলোর জন্য। তারা আবার মোট আট রাজ্যের (নর্থইস্ট সাত রাজ্য আর পশ্চিমবঙ্গ) হলেও এখানে লোকসভার মোট আসন হলো ৬৬টা। ভারতের লোকসভার মোট ৫৪০ আসনের মধ্যে সরকার গড়ার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় আসন পেতে হয় ২৭২টা। আর, এই পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামসহ নর্থইস্টের মোট ৬৬ আসনের কথা মাথায় রেখেই মোদী নাগরিকত্বের বিলটা এনেছিলেন। কিন্তু তার কপাল এখন একেবারেই ফাটা, যেখানে হাত দেন সব ব্যর্থ।

    তার অনুমান ছিল এই বিল তাকে নির্বাচনের ৬৬ আসনে বিজেপির পক্ষ জিততে বাড়তি সুবিধা বা মাইলেজ দেবে। অথচ এটা ছিল তার সবচেয়ে ভুল অনুমান। ফলাফলে ইতোমধ্যেই তিনি ব্যর্থ। কারণ, নর্থইস্ট সাত রাজ্যের বেলায় তা ‘ব্যাকফায়ার’ করেছে। এই বিল আনার কারণে মোদীর ভোট পাওয়া দূরে থাক, ওই সাত রাজ্যে তারা এখন ইউনিয়ন ভারতের সাথে থাকবে কী না সেই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। প্রতিদিন এখন এনিয়ে ভারত ছেড়ে, ‘ভেগে যাওয়া’র আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে। আর এদিকে আসামে? সেখানে এখন রাজ্য সরকারে আছে বিজেপি। কিন্তু আসামের মূল নাগরিকদের সব দল ও পক্ষই এখন সেই বিজেপির প্রবল বিরুদ্ধে। জনসম্মতির রেটিংয়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় বিজেপি। এই বিল আনার কারণে বিজেপিকে ১৯৮৫ সালের চুক্তির সাথে প্রতারণার কৃতিদার হিসাবে বিট্রেয়ার মনে করছে। বাকি থাকল পশ্চিম বাংলা। সেখানেও মোদীর বিরুদ্ধে মমতার সংগ্রাম ও বিরোধিতা প্রবল আর সফলই বলা যায়। বরং উলটা, মমতা তার নেতৃত্বে আঞ্চলিক দলগুলোকে বিজেপির এবং মোদীর বিরুদ্ধে একাট্টা করতে সক্ষম হয়েছেন, আর স্বভাবতই এতে মোদীর বিরুদ্ধে “বাংলার স্বার্থের আসল ধারক” হলেন মমতা – এ কথা বলে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ ভোটারের সহানুভূতি মমতা নিজের ব্যাগে তুলে ফেলেছেন।

    তাহলে কী দাঁড়াল? কারা এই বিলের পক্ষে? বাংলাদেশের মতো পড়শি দেশের যেসব হিন্দু আছেন, এদের অনেকে মোদীর চরম ভক্ত। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতির প্রধান ধারা এখন আরএসএস-মুখি অথবা ডমিনেটেড। কিন্তু তাতে মোদীর কোনো লাভ নেই এ জন্য যে, তারা খুব কম জনই মোদীর ভোটার। কাজেই পড়শি দেশের হিন্দুদের স্বার্থে পশ্চিম বাংলার হিন্দুরা কতটা মোদীর ভোটের বাক্সে ভোট দিতে য়াগিয়ে আসবেন তা এখন প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ, মমতার কারণে কেন্দ্র ও রাজ্য ক্ষমতার লড়াই ব্যাপারটাকে মুখ্য করে তোলাতে এখন পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ভোটারেরা স্থানীয় স্বার্থে তারা এখন হিন্দিবলয় বিরোধী; মমতা সেখানে মোদীকে “ভিলেন” হিসেবে দেখাতে পেরেছেন।

    মোদীর আরও বিপদ আছে। কারণ  মোদী সরকারের দায় খোদ আরএসএস আর নিতে চাচ্ছে না। বরং তাঁরা এখন মোদী সরকারের বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষের পক্ষে সহানুভূতি দেখিয়ে নিজের ইমেজ বাঁচাতে ব্যস্ত। আনন্দবাজারের শিরোনাম- “বেকারত্ব বাড়ছে, বিরোধীদের সুরে সঙ্ঘ প্রধান, অস্বস্তিতে মোদি’। ওদিকে বিজেপি দলের ভেতরেই মোদী-অমিত গ্রুপের বিরোধিতাকারীরা- যেমন- মন্ত্রী নিতিন গডকড়ী মোদীর থেকে নিজের দুরত্ব তৈরি করতে চাইছেন। এদিকে শত্রুঘ্ন সিনহা বা যশবন্ত সিনহা ও অরুণ সুরি- এরা প্রকাশ্যেই বিরোধিতায় নেমেছেন।  এমনকি মোদীবিরোধী মমতার সমাবেশ র‌্যালিতেও অংশ নিচ্ছেন।

    তাই সব মিলিয়ে আমরা লক্ষ করছি- আসন্ন নির্বাচনী ফলাফলের সম্ভাব্য ঝোঁকটা হল, মোদির বিজেপির ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে কমছেই আর কমছেই। কিন্তু এর মানে কী? তা সত্ত্বেও আবার বিকল্প হিসেবে কংগ্রেসের নেতৃত্বে কোনো কোয়ালিশন ক্ষমতার দাবিদার তারাও নয়। বরং কেবল আঞ্চলিক দলগুলো – এদেরই কোনো কোয়ালিশন সরকারের সম্ভাবনা ক্রমেই জেঁকে বসা, এটাই প্রবল হচ্ছে।
    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মোদির ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা কতটুকু?” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • নির্বাচনকে সাফাই দিতে ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্কের বিপদ

    নির্বাচনকে সাফাই দিতে ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্কের বিপদ

    গৌতম দাস

    ৩১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-2×5

    –

    [সার সংক্ষেপঃ বাংলাদেশের সদ্যসমাপ্ত সংসদ নির্বাচন ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক-গুলোকে বেশ বিপদেই ফেলেছে, মনে হচ্ছে। তারা সাধারণ ও সোজা যুক্তিবুদ্ধি সাজিয়ে অর্থপূর্ণ একটি লেখা দাঁড় করাতেও হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে এর আগে একটা লেখা ছাপিয়েছিলাম যেগুলো মূলত ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্কের বাইরের লেখকদের লেখা নিয়ে। সেসব লেখায় দেখেছিলাম – সেখানে এ জাতীয় সমস্যা দেখা যায়নি। থিঙ্কট্যাঙ্কের বাইরের লেখকেরা স্বাধীনভাবেই তাদের মনের কথা পরিষ্কার বলেছিলেন।  কিন্তু থিঙ্কট্যাঙ্কের ভিতরের লেখকেরা? বুঝা যাচ্ছে থিঙ্কট্যাঙ্কের লেখকেরা ভারত সরকারের অবস্থানের সাথে মিল রেখে কথা বলার দায় রেখে লিখছেন। তাতেই অর্থপুর্ণ বাক্যগঠন ঠিক রাখতে পারছেন না। অথচ যেভাবেই হোক নির্বাচনের ফলাফলের পক্ষে সাফাই খাঁড়া করতে চাইছেন। এতেই এলোমেলো সব বিপদ ভেসে উঠছে। ]

    এমনিতেই ভারতে বিদেশের (মূলত আমেরিকা) সাথে সম্পর্কিত থিঙ্কট্যাঙ্ক (Pro-US Think Tank) আর অপর দিকে ভারত থেকে প্রকাশিত বিদেশি মিডিয়া  (পাবলিশিং অথবা এজেন্সি, যেমন রয়টার্স)- এদেরকে নিয়ে এক বিরাট সমস্যা। বোঝা যায়, ভারত থেকে এগুলো প্রকাশিত হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের বিদেশনীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখা অথবা এদের অবস্থান যেন সরকারি অবস্থানের বিপরীত হয়ে না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে, সম্ভবত অলিখিত কোনো শর্তে, তা প্রকাশিত হতে গিয়ে এসব সমস্যা হাজির হয়। যেমন- কিছু থিঙ্কট্যাঙ্কের দৌরাত্ম্যের প্রাবল্য এত দিন যা নিয়ে ভরপুর ছিল তা হলো চায়নাব্যাশিং বা চীন ঠেকানোর জন্য আমেরিকার থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা থেকে প্রকাশিত নানান প্রপাগান্ডা। অর্থাৎ তারা আর মূলত থিংকট্যাংক থাকতে চাইছিলেন না বা ছিল না। আমেরিকার স্বার্থে চীনের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডার ‘ঘেঁটু’ হয়ে উঠতে চাইছিল এরা। বাক্যে মিল থাকুক আর না-ই থাকুক, অর্থপূর্ণ যুক্তি সাজানো হোক আর না-ই থাক, চীনবিরোধী প্রপাগান্ডায় সরব থাকতে হবে – এই ছিল তাদের কান্ডকাখানা।

    তবে এই সমস্যা থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের স্বস্তি দিয়ে বাঁচিয়েছেন। ভারতে বসে আমেরিকান থিংকট্যাংকের চীন ঠেকানোর প্রপাগান্ডায় অর্থ ঢালা অথবা ভারতকে এর বিনিময়ে কোনো বাণিজ্য সুবিধা দেয়া – এসবের মধ্যে তিনি আগের প্রেসিডেন্টদের মত তিনি নাই, থাকতে চান না – এটা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। সম্ভবত সে কারণে ভারতের কিছু থিংকটাংকের খামাখা চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা ইদানীং আর দেখা যায় না। বিশেষ করে, এপ্রিল ২০১৮ সালে চীনে অনুষ্ঠিত মোদি-শি জিনপিং এর মধ্যে  য়ুহান সামিটের [Wuhan Summit] পরে। বলা যায় এই সামিট থেকেই আমেরিকার হয়ে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা করা থেকে ভারত সরে আসতে শুরু করে।  তবে এ ছাড়াও এর আরেক কারণ, বুদ্ধিমান মোদী সরকার চীনের সাথে ঐ সামিট-সুখালাপের সময় যাতে কোন বিরূপভাব তৈরি না হয় তা নিশ্চিত করতে চীনবিরোধী এধরনের থিংকট্যাংকগুলোর তৎপরতা বন্ধ করতে তাদেরকে সভা-সেমিনার করার অনুমতি না দেয়াকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এতে এগুলোর অনেকেই তৎপরতা গুটিয়ে গিয়েছিল বা সরাসরি গুটিয়ে ফেলতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তবুও ভারতের সরকারি নীতির পক্ষে প্রচারে থাকা কিছু থিংকট্যাংক এখনো আছে। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে লিখতে গিয়ে এরাই সমস্যায় পড়েছে।

    সাধারণভাবে  মানুষের পক্ষে লেখা ও চিন্তা করা সমান্তরাল কাজ, যা প্রায় সমার্থক। এ জন্য দরকার মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারা; এ কারণে, এক দিকে ফরমায়েশি সরকারি অবস্থানের পক্ষে থাকতে হবে আবার নিজ মনে (ফ্রি আরগুমেন্টে) লিখতে হবে – এ দুই কাজ এক সাথে করা কঠিন। প্রায় অসম্ভব। তবুও চাকরি বাচাতে অনেককে এমনটা করতেই হয়। সেক্ষেত্রে ফরমায়েশি সে লেখা শেষ করলেও এটা যে ফরমায়েশি, এর ছাপ লেখাতেই থেকে যায়। এ জন্য বলা হয়, চিন্তাকে বন্ধক রেখে গবেষক বা  একাডেমিক হওয়া যায় না। থিংকট্যাংক “অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন” বা ওআরএফের [ORF] ফেলো ডঃ জয়িতা ভট্টাচার্য আর বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন বা ভিআইএফের [Vivekananda International Foundation (VIF) ] ফেলো ডঃ শ্রীরাধা দত্তের বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে দুটা আলাদা আর্টিকেল রচনায় তাদের সেই হাল হয়েছে। ভারতের মিডিয়ায় ভিআইএফ -কে বিজেপির মোদী সরকারের থিঙ্কট্যাঙ্ক বলা হয়েছে।

    এমনিতেই কোন একাডেমিক পরিচয়ধারী যদি আবার আনক্রিটিক্যাল হন – এটা খুবই অযাচিত কম্বিনেশন। আন-ক্রিটিক্যাল মানে যে ক্রিটিক্যাল নয় অর্থাৎ আগে থেকেই সব জানার অজুহাতে, যেকোনো জিনিসকে পুনরায় উল্টেপাল্টে নানান দিক থেকে দেখে না, যাচাই-বাছাই বা সন্দেহ করার দৃষ্টি যার তৈরি হয়নি, এদের পক্ষে নিজের একাডেমিক পরিচয়ের প্রতি সুবিচার করা কঠিন। কিছু একাডেমিকের “ভারতীয় সেকুলারিজম” বিষয়ক ধারণা ও এর ব্যাখ্যার প্রতি আস্থা-বিশ্বাস এতই আনক্রিটিক্যাল যে, এটা পোপের বাইবেলের উপর আস্থা-বিশ্বাসকেও হার মানায়। অনেকের ধারণা – থিওলজিতে কারও ক্রিটিক্যালনেস বলে কিছু নেই; কিন্তু সেটিও আসলে ভিত্তিহীন। আধুনিকতাতেই শুধু ক্রিটিক্যালনেস বা উল্টেপাল্টে নানান দিক থেকে দেখা ও যাচাই করা আছে, এ কথা সত্য নয়। থিওলজিতেও ক্রিটিক্যালনেস দেখা যায়। এর ভালো প্রমাণ হল, থিওলজির ইন্টারপ্রিটেশনে বা তাফসিরে ভিন্নতা। আর সেখান থেকেই একই ধর্মের নানান ইস্যুতে বিভিন্ন ব্যাখ্যার উৎপত্তি। আর তা অনুসরনের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধারা বা Sect দেখতে পাওয়া যায়, যা খুবই স্বাভাবিক। তবুও ভারতীয় সেকুলারিজম ও এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কোন ক্রিটিক্যাল অবস্থান দেখা যায় না।

    জয়িতা ভট্টাচার্য, বাংলাদেশের এবারকার নির্বাচনের আগেই ২৬ ডিসেম্বর এক নিবন্ধ লিখেছিলেন। ঐ লেখার প্রথম তিন অনুচ্ছেদ ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন নিয়ে। এর মধ্যে এক উপশিরোনাম আছে, তা হল- “নির্বাচন কমিশনে ৭০টা রেজিস্টার্ড দলের মধ্যে ১০টাই ধর্মীয় রাজনৈতিক দল” [10 Out of 70 Religious Political Parties Registered With EC]। কিন্তু তাতে জয়িতা সমস্যা দেখছেন কোথায়? মানে তিনি এটাকে বাংলাদেশের জন্য ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখছেন কেন? ওরা ধর্মীয় রাজনৈতিক দল বলে? আর এখানে ধর্মটার নাম ‘ইসলাম’ বলে? তাই কী?

    কিন্তু ব্যাপার হল, ইসলামি দল হলেই এমন খড়্গহস্ত হওয়া অপ্রয়োজনীয়। বরং এমন চিন্তার মানে, দেখা যাবে হয়ত কথিত এই ‘সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গি” আসলে নিজেই ইসলামোফোবিক। আবার ভাবনা-চিন্তা করা দরকার যে এই ১০টি ইসলামী রাজনৈতিক দলের সাথে ভারতে হিন্দুত্বের দল বিজেপির ফারাক কিসে? জয়িতা বিজেপিকে সহ্য করতে পারলে বাংলাদেশের এই ১০টি ইসলামী দলকে করতে পারছেন না কেন? আরও সিরিয়াস কথায় আসা যাক। জয়িতার সম্ভাব্য আপত্তি বা বিচার করার ক্রাইটেরিয়া কী? স্বভাবতই আগে ক্রাইটেরিয়া বা মাপকাঠি ঠিক না করে কথা বলতে গেলে ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব বা ফোবিক [-phobic] অথবা বিদ্বেষী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

    আসল কথায় আসি। জয়িতা জানাচ্ছেন – এই ১০টি দল নির্বাচন কমিশনে রেজিস্টার্ড। আমরা নিশ্চয়ই বুঝি ‘রেজিস্টার্ড’ শব্দের মানে। এর সোজা অর্থ হল – বাংলাদেশের রিপাবলিক কনস্টিটিউশনকে মেনে সে অনুসারে রাজনৈতিক দলের যা যা বৈশিষ্ট্য থাকতে বাধ্য বলে (দলটা নয়) নির্বাচন কমিশন মনে করে, সেসব শর্ত এই দলগুলো পূরণ করেছে। সে কারণে এরা রেজিস্টার্ড দল, সার্টিফায়েড। এখন এসব রেজিস্টার্ড দলের গায়ে গন্ধ, চিহ্ন, শব্দ ও রঙের মধ্যে যতই স্পষ্ট করে ইসলাম প্রকাশ পাক না কেন, যেহেতু বাংলাদেশের কনস্টিটিউশন মেনেই এরা রেজিস্টার্ড হয়েছে, রাজনীতি করতে চাইছে, তাতে আর সমস্যা কী? একে এরপরও সমস্যা ভাবার কারণ কী? বরং এরপরও কারো কাছে ‘সমস্যা’ মনে হলে সেটি তারই ইসলামবিদ্বেষ মানে, মনের ফোবিয়ার সমস্যা হতে পারে। যেখানে এমনকি আগামীতেও নির্বাচন কমিশন যদি বাড়তি কিন্তু কনস্টিটিউশন কাভার করে, এমন কোনো নতুন শর্ত আরোপ করে, সেটাও তো এসব রাজনৈতিক দল মানতে বাধ্য থাকবে। তাহলে এরপরে আর আপত্তির কী আছে? আপনি আর কী চাইতে পারেন? আসলে সবার আগে আমাদেরকেই “চাইতে” জানতে হবে। একটা ইসলামী দল রিপাবলিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই থাকতে চাইছে, আর কী চান আপনারা? আসলে এর পরের স্তর হল, রজনীকান্তের সেই গানের কলি- “ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়”। আসলে রিপাবলিক বৈশিষ্ট্য অথবা রাষ্ট্র কী, তা জানা বোঝা সম্পন্ন না হয়ে মানে, বাকি রেখে কোনো আপত্তি প্রকাশ করতে গেলে তা শেষে ‘ফোবিয়া’ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকবে।

    জয়িতা ভট্টাচার্যের ওই রচনায় আর একটা উপশিরোনাম হল – তিনি বলছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনে “ধর্মভিত্তিক দলের ভোট-শেয়ার গুরুত্বপূর্ণ নয়” [Vote-Share of Religion-Based Parties Not Too Significant]। বাস্তবে জয়িতার এই দাবি ভিত্তিহীন। কারণ, যেমন বলা যায় গত ২০১৩ সালের ৫ মের পরে প্রথম নির্বাচন ছিল ঢাকার বাইরের গাজীপুরসহ কিছু শহরের “মেয়র নির্বাচন”। ঐ নির্বাচনে সরকার সবখানেই গো-হারা হেরে যায়। কেন? কারণ, জামায়াত নয় এমন কিছু ধর্মীয় দল নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাদের প্রার্থীকে ভোট না দিতে ক্যাম্পেইনে নেমেছিল; মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরেছিল। আর তাতেই ঐ ফলাফল হয়েছিল। তাই কেউ নিজে ভোটে দাঁড়ালে কয়টা ভোট পাবে সেটাই নয়, বরং অন্যের ভোট কত কাটতে পারবে, সেটাও এক বিরাট সক্ষমতা ও নির্ধারক ফ্যাক্টর। আর এরপর থেকে, “নির্বাচনের মা মারা যাওয়াতে” সেই শোকে ঐ নির্বাচনের পর থেকে (আগের মানের) “অবাধ নিরপেক্ষ” নির্বাচন বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যায়; তা আর কখনো হয়নি। বুদ্ধিমান জয়িতা নিশ্চয়ই এসব কথা বুঝবেন। এছাড়া আরও বিস্তারে জানা ও যাচাই করতে তিনি গোয়েন্দা লাগাতে বা খোঁজ নিতে পারেন। আসলে বাংলাদেশে ধর্ম আর রাজনীতির সম্পর্ক বুঝা, তা বিশেষ করে ভারতীয় সেকুলারিজমের বুঝ দিয়ে বুঝতে যাওয়া, আরও অসম্ভব।

    জয়িতা নির্বাচনের পরেও গত ৩ জানুয়ারি আমাদের নির্বাচন প্রসঙ্গে আর একটা নিবন্ধ লিখেছেন । তা প্রকাশিত হয়েছিল ওআরএফের ওয়েবসাইটে।

    জয়িতা ভট্টাচার্য এবং রাধা দত্তের রচনায় এক অভিন্ন ত্রুটি হল, তাঁরা আগে বলে নিচ্ছেন না যে, তারা কেবল নির্বাচন কমিশনের হাতে প্রকাশিত ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে লিখছেন। কারণ, এই নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ আদৌ ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে কি না, তা অবাধ ছিল কি না, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এখন কেমন ইত্যাদি আনুষঙ্গিক দিক সম্পর্কে চারদিক থেকে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে এরা সেসবের কোন খোঁজ নিয়েছেন, তাদের জানাশোনা আছে, তা মনে হয় নাই। তাঁরা দাবিওও করেন নাই। কেবল সব জায়গায় “নিষ্ঠাবান যুধিষ্ঠির” (পুরাণে যে কখনও মিথ্যা বলেন নাই বলে মনে করা হয়) ভেবেছেন আমাদের নির্বাচন কমিশনের বচনকে।  বলা যেতে পারে, কমিশনের বয়ানের বাইরে্র কোন উৎস ও তথ্যকে তাদের বিবেচনায় তারা কোন কারণে আনতে পারেননি বা আনেননি। এ অবস্থাতেই তাদের ওই রচনা লিখিত হয়েছে।

    জয়িতার দ্বিতীয় এই লেখায়, তৃতীয় প্যারা থেকে পরের চার প্যারা মিলিয়ে তিনি একটা বয়ান সাজিয়েছেন। এর প্রথম প্যারায় বলেছেন, “বিএনপি ভোটে কারচুপির অভিযোগ করেছে”। এর পরের প্যারায় বলছেন, “কিন্তু নির্বাচন অবজারভারেরা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করেনি”। [অর্থাৎ পাঠককে ইঙ্গিত ও সাজেশন হল, বিএনপির অভিযোগ বাতিল হয়র গেল।] এবার পরের প্যারায় জয়িতা বলছেন, “১৯ জন লোক মারা গেছে। সুতরাং নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়নি”। এর শেষে বলছেন, “নির্বাচনের আগে বিরোধীরা আওয়ামি লীগের ক্যাডারদের সন্ত্রাস ও হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেছে। আর একইভাবে লীগও বিরোধীদের বিরুদ্ধে পালটা অভিযোগ এনেছে”। [পাঠককে ইঙ্গিত ও সাজেশন হচ্ছে, তাহলে মামলা ডিসমিস]। অথচ এরপরেই আবার লিখছেন, “নির্বাচনপূর্ব ভায়োলেন্সের মাত্রা দেখে মানুষ ভোট দিতে আসে কিনা এনিয়ে আশঙ্কা ছিল”। কিন্তু ভোটের শেষে কমিশন বলেছেঃ আশি ভাগ ভোট পড়েছে; তাই ওই ভয়-আশঙ্কা ছিল ভুয়া”। [মানে এখানেও সাজেশন হচ্ছে, তাহলে মামলা ডিসমিস]

    আসলে এসব বাক্যের মাধ্যমে জয়িতা নিজের পরিচয়  “থিংকট্যাংক গবেষক” থেকে “প্রপাগান্ডিস্টের” স্তরে নিজেই নামিয়েছেন। কারণ এটা কোনো গবেষকের কাজ নয়, কাজের পদ্ধতিও নয়। সাধারণ বিবেচনা হল, দু’টি বিবদমান পক্ষের বেলায় কার কথা গ্রহণ করা হবে, তা ঠিক করতে হয় স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় ওয়াকিবহাল পক্ষের কাছ থেকে। কিন্তু তিনি আগেই একটা পক্ষ বেছে নিয়েছেন। এটা গবেষকের উচিত নয়, কাজও হতে পারে না। কথিত কিছু নির্বাচন “অবজারভারদের” বরাতে জয়িতা বলছেন, “ভোটে কারচুপি হয়নি, কারণ অবজারভারেরা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি”। কিন্তু খোদ “অবজারভারদেরই” গ্রহণযোগ্যতা কী ছিল? তা কি তিনি জেনে নিয়েছিলেন? সম্প্রতিকালে ঐ “অবজারভারদের” অনেকেই এখন “তওবা” পড়ছেন, বড় ভুল হয়ে গেছে বলছেন। তাহলে জয়িতা এখন কী বলবেন?

    শেষের প্যারায় তিনি একবার ভায়োলেন্সের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ তুলে এটা ‘ডিসমিস’ করছেন। অথচ পরের বাক্যেই বলছেন, ভায়োলেন্সের মাত্রা দেখে [Considering the level of pre-poll violence] ভোটার আসে কি না সে শঙ্কা ছিল। এর মানে জয়িতাই আবার মেনে নিচ্ছেন যে, আসলে উল্লেখযোগ্য মাত্রারই ভায়োলেন্স সেখানে হয়েছিল। তাহলে? মোট কথা, তার গল্পটা এখানে এসে আর মিল রাখতে পারল না।

    আবার লক্ষণীয়, ১৯ জন মারা গেছে দাবি করে তিনি সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, এর মানে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়নি। আসলে এ কথার মানে হয় না। কারণ, ঠিক কতজন মারা গেলে কোনো নির্বাচন ‘শান্তিপূর্ণ’ হবে? কোথাও এমন কোন মাপকাঠি কী আছে? আর এই মাপকাঠি কে দিয়েছে? ওদিকে আবার এই ১৯ জন কারা? কিভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে? এটা কেবল লীগের দেয়া ফিগার। এদের মধ্যে আওয়ামিলীগেরই অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মৃত্যু কয়জনের? সে খোঁজ কি নেয়া হয়েছে? অথচ ‘১৯ জন মরেছে – মানে শান্তিপূর্ণ ভোট হয়নি” – এসব মুখস্থ বলছেন তিনি। কোনো সিরিয়াস মানুষ বা গবেষক এভাবে মুখস্থ কথা বলার কথা না।

    আবার তার লেখায় (শেষের দিক থেকে গণনায়) চতুর্থ প্যারায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে “মানবাধিকার লঙ্ঘনের এবং ‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনে বাধা’ তৈরির অভিযোগ তুলেছেন জয়িতা। অথচ এর আগে আমরা দেখেছি বিরোধীদের তোলা অভিযোগ নাকচ করেছিলেন জয়িতা। কেন? সে ব্যাখ্যা অনুপস্থিত। তাহলে শেষে দাঁড়ালো কী? জয়িতার লেখা পড়ে মনে হয়েছে সরকারি “ব্রিফিং ঠিক রাখতে আর, ভাষ্য ব্যালেন্স করতে গিয়েই তিনি তাল হারিয়ে ফেলেছেন। অথচ কারও ভাষ্যের ব্রিফিং ঠিক রাখা, সেই তালে কথা বলা কোনো গবেষকের কাজ হতে পারে না। এভাবে তিনি নিজেই নিজের কাজের মান প্রকাশ করলেন।

    শ্রীরাধা দত্তের লেখা :
    আমাদের নির্বাচনের পরে তাঁর লেখা দেখেছি একটাই। আর সে লেখার চার ভাগের তিন ভাগই হল, আমাদের প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ভারতের নর্থইস্টকে করিডোর দিয়ে ভারতের কত কী উন্নতি করে দিয়েছেন, এরই ফিরিস্তি। অথচ এই লেখার মূল প্রসঙ্গ আমাদের নির্বাচন কাভারেজ। অর্থাৎ এই লেখার সাথে বাংলাদেশের নির্বাচন বা শেখ হাসিনার বিজয়ের সম্পর্ক কী? অথবা এটা কি বাংলাদেশের কোনো উন্নয়নের গল্প? হাসিনা ভারতের নর্থইস্টকে করিডোর উন্নয়ন করে দিয়েছেন, তাই কী? সেটা যাই হোক ব্যাপারটা অপ্রাসঙ্গিক।

    শ্রীরাধার লেখায় শেষের একটা প্যারায় এক অদ্ভুত কথা আছে। তিনি লিখেছেন- “বিএনপি নিজেই দায়ী”। কোথায় কী বিষয়ে আমরা তা দেখব। তবে রাধা সবচেয়ে কড়া এক বাক্য লিখেছেন। সে কথাটি হল – আওয়ামী লীগের জোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি পেল আর বিএনপি জোট মাত্র সাতটি পেল; এটা ”মনে হচ্ছে আমি মানতে পারলাম না”[looks unconvincing]।

    কিন্তু তিনিই শেষের দিকে বলছেন, “২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি ওয়াকওভার দিয়েছে”। কিন্তু এবারের ফলাফলের জন্য অন্য কেউ নয় তাঁরা নিজেরাই দায়ী। এমনকি যদি কেউ মেনেও নেয় যে নির্বাচনে নির্বাহি ক্ষমতার বিরুদ্ধে সর্বত্র হাত ঢুকানোর অভিযোগ, হাসিনার অসহিষ্ণুতা, আর যেকোন ভিন্নমতের প্রতি তাঁর দমনের নীতি তবুও সরকার বিরোধীরা নিজেই আসলে নিজেদেরকে কোণায় চিপার মধ্যে ফেলার জন্য দায়ী। […this time around they have none to blame for their dismal performance. Even if one accepts the allegations of executive overreach, Hasina’s intolerance, and her increasing repressive ways towards any contrarian views, the opposition had really bound themselves into a corner]।

    অর্থাৎ বলছেন- “এবারো খারাপ ফলাফলের জন্য বিরোধীরা অন্যকে দায়ী করতে পারে না। যদি নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ, হাসিনার অসহিষ্ণুতা, ক্রমবর্ধমান বিরোধী মত দমন এসব অভিযোগ যা-ই ঘটুক তা সত্ত্বেও বিরোধীরা নিজেই নিজেদের এক কোনায় বন্দী করেছে”।
    এটি কি নুন্যতম অর্থপূর্ণ কোন কথা? না পুরাটাই স্ববিরোধী? দুঃখিত, আসলেই বুঝতে অপারগতা জানাচ্ছি। পাঠক নিজেকে সাহায্য করেন……।
    এ কারণেই, শুরুতে বলেছি বাংলাদেশের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন ভারতের থিংকট্যাংকগুলোকে অর্থপূর্ণ অন্তত কয়েকটা বাক্যও লিখতেও বিশাল বিপদেই ফেলে দিয়েছে, দেখা যাচ্ছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২১ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “নির্বাচনঃ ভারতের থিংকট্যাংকের বিপদ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]