Tag: White Supremacist

  • পশ্চিমের শেষ ভরসা কী সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ?

    পশ্চিমাশক্তির শেষ ভরসা কী সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ??

    গৌতম দাস

    ০৬ জুন ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-48q

      US Treasury Secretary Janet Yellen

    Antony Blinken

    সামনের দিনগুলোতে গ্লোবাল পরিসরে যুদ্ধ-লড়াই ক্রমেই ‘জাত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই হিসেবে’ খাড়া করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। মানে, কারা নৃতাত্ত্বিক-জাতি হিসেবে শ্রেষ্ঠ যেন এ নিয়ে হতে যাচ্ছে লড়াইটা – এ ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হবে। কথাটা আরো সরাসরি করেও বলা যায়। যেমন পশ্চিমা শক্তি আসলে সোজা বলতে চাইছে, আগামী যেকোনো যুদ্ধ-লড়াই তারা ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ব’-এর লড়াই হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে। অর্থাৎ বাস্তবে তারা আগেই জানত ও জানে যে, দুনিয়াতে কোন নৃতাত্ত্বিক-জাতি শ্রেষ্ঠ – এই অনুমান বা তুলনা করাটাই অর্থহীন। প্রতিটি জনগোষ্ঠীরই একেক দিকে বিশেষত্ব থাকে, থাকতে পারে। কিন্তু মূল কথা, কোন অজুহাত বা জুতসই সাফাই-যুক্তি কেউ দিলেও আমরা কেউ কারো অধীনে অধীনস্থ নই বা করতে দিতে পারি না। অতএব ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ব’ প্রতিষ্ঠার লড়াই বলে কিছুই নেই।

    তবু দুনিয়াতে আমরা দেখেছি টানা সাড়ে তিন শ’ বছরের কলোনি দখল ও লুটেরা শাসন চলেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত যার ভুয়া সাফাই ছিল এই যে, পশ্চিমা সাদা ককেশীয়রা ছিল নাকি ‘বেশি সভ্য’। কাজেই তারা আমাদের মত দেশের  উপর শাসন কায়েম করবে লুট করবে, এ উছিলায় যে, তারা আমাদের সভ্য বানাবে ইত্যাদি।

    সবচেয়ে বড় কথা, মনে করা হয়েছিল বিশ্বযুদ্ধে মুখ্যত জার্মান হিটলার ও তার দোসর-বন্ধুদের উত্থান ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের পতনের মধ্য দিয়ে হয়তো দুনিয়া যথেষ্ট শিক্ষা পেয়েছে। ফলে বর্ণবাদ বা রেসিজম [RACISM] এই জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ সেবার পরাজিত হওয়ার পর ক্রমেই এই চিন্তা হয়তো চাপা পড়ে যাবে। এছাড়া তখন ধরে নেয়া হয়্বেছিল যে মানুষ শ্রেষ্ঠত্ববাদের বিপদ ও চরম খারাপ দিক সম্পর্কে  নিশ্চয় ইতোমধ্যে অনেক জেনেছে। ফলে কোন রেসিজমের চিন্তা আবার জেগে উঠার সুযোগ নেই। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে এই পশ্চিমা শক্তিই খোদ এবার রেসিজম, এই পুরনো ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ হয়ে ফিরতে চাচ্ছে।

    এমনিতে নয়া চলতি শতক হল অর্থনৈতিক দিক থেকে আমেরিকার পতন ও চীনের উত্থানের সময়কাল। তাই বারবার মনে করিয়ে দিয়েছি এটা অবজেকটিভ মানে মানুষের ইচ্ছা নিরপেক্ষ এক ফেনোমেনা। যেমন আমেরিকান কোনো প্রেসিডেন্ট কোনো যুদ্ধ লাগিয়ে চীনা উত্থান ঠেকানোর চেষ্টা করবেন হয়ত কিন্তু তাতেও এটা ঠেকবে না। অন্তত সেই ২০১৪ সাল থেকে তাই নিয়মিত বলে আসছি যে, এককালে পুরনো ব্রিটিশ কলোনি সাম্রাজ্যও পেছনে পড়ে যেমন উত্থিত আমেরিকার কাছে হেরে গিয়েছিল আর নানা ঘটনাপ্রবাহ শেষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা এক গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠেছিল, আজ প্রায় ৭৫ বছর পরে এটাও আবার পরিবর্তিত হতে যাচ্ছে। এবার চীনা উত্থান মানে চীনের অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত সম্পদ সঞ্চয়, এই পুঞ্জিভবন [accumulation] ব্যাপক ও সবাইকে ছাড়িয়ে হাজির হওয়া শুরু হয়েছে। এটা চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতাতে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে; ঠিক যেমন এককালে আমেরিকা ব্রিটিশ অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

    আমেরিকার এই ক্রমেই পতন ও চীনের ক্রমেই উত্থান প্রমাণিত সত্য হিসেবে আমেরিকার ন্যাশনাল সার্ভেতেও ২০০৮ সাল থেকে স্পষ্ট হয়ে চলেছে। গত ২০০৮ সাল ছিল এ নিয়ে প্রথম পরিসংখ্যানগত প্রকাশিত সার্ভে রিপোর্ট ও প্রমাণ, যা এরপর থেকে প্রতি চার বছর পরপর এর বিকাশ আরো স্পষ্ট করে একই রিপোর্ট তুলে ধরছে। এ নিয়ে বুশ বা ওবামা আমলে তারা উভয়েই দুই টার্ম করে ক্ষমতায় থাকলেও তাদের মিলের দিকটি হল – এদুই প্রেসিডেন্টই সার্ভে রিপোর্ট হাতে পেয়েছেন ঠিকই কিন্তু নিজ সার্ভে রিপোর্টও মানতে চাননি। অস্বীকার করে গেছেন, ‘এতে তেমন কিছু হবে না’ ধরনের কথা দাবি করে। তবে তলায় তলায় উভয়েই এশিয়ায় চীন ঠেকানো বা China Containment পলিসি নিয়েছেন। সেটা হল, ভারতের পিঠে হাত রেখে চীনকে ঠেকানোর নীতি।

    সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটা হল তারা উভয় তাদের প্রেসিডেন্টশিপের মোট ১৬ বছর ধরে দেখেছেন এতে আমেরিকার ফেভারে কোনো অগ্রগতি নেই। তবে কেবল কয়েক বছর পরে পরে চীনের উপরে চাপ সৃষ্টি করে আমেরিকার জন্য নয়া কিছু বাণিজ্য সুবিধা আদায় করেছেন, চীনের কাজ থেকে। চীনও কখনোই তাদের নিরাশ করেনি। এভাবেই চলে আসছিল এমনকি এত পাগলাটে ও জাতিবাদী ভাব দেখানো ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর আমলেও। তিনিও একইভাবে চীনের কাছে দাবি করেছেন আর এতে নয়া কিছু বাণিজ্য সুবিধা তিনিও পেয়েছেন। এমনকি সর্বশেষ তা ২০১৭ সালেও যে বছর প্রথম ‘কোয়াড’ বা QUAD (আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত এই চার দেশের) জোটকে চাঙ্গা করা হয়েছিল তখনো ট্রাম্প সুবিধা পেয়েছিলেন।

    কিন্তু এরপরই আমেরিকাকে ট্রাম্প এক মহাপরিবর্তনের দিকে মোচড় দিয়েছিলেন। সেটা হল “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ” [White Supremacist]। মানে আমরা সাদারাই দুনিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতি – এই ধারণা। এখানে সাদা বলতে ফর্সা হলেই হবে না। ককেশীয় ]Caucasian] নৃগোষ্ঠির  গায়ের সাদাচামড়ার অর্থে ‘সাদা’ হতে হবে।  ট্রাম্প দল হিসাবে নিজে রিপাবলিকান দলের লোক।  এর উপর নিজেকে  “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ” [White Supremacist] এর দিক ঝোঁক দেখানো! এটা স্বভাবতই এক ভয়ঙ্কর রেসিজম। কিন্তু ২০১৬ সালে নির্বাচন করতে আসার শুরু থেকেই এই ঝোঁক-অভিমুখ ট্রাম্পের সাথেই ছিল। তবে প্রথম দিকে খাপ ছাড়া বা অস্পষ্টতার কারণে সাধারণ্যে তা হয়ত স্পষ্ট হয়নি। যেমন ধরা যাক স্টিভ ব্যাননের [Steve Bannon] কথা। তিনি ছিলেন আগে ট্রাম্পের  ২০১৬ সালের নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। আর পরে ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণের পরে হন, প্রেসিডেন্ট অফিস হোয়াইট হাউজের প্রধান উপদেষ্টা হন ব্যনন। যদিও তিনি মাত্র সাত মাস এই পদে ছিলেন। আর এরপর ওই সৃষ্টপদটাই আবার অবলুপ্ত করে দেয়া হয়। রাজনৈতিক চিন্তার দিক থেকে এই ব্যানন ছিলেন ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী বড় নেতা, তাত্বিক। তবে প্রেসিডেন্টশীপের  শুরুর থেকেই তাঁর এত উগ্র অবস্থান ট্রাম্প নিতে পারেননি; তাই ব্যননকেই সরে যেতে হয়েছিল। যদিও ট্রাম্প যতই ক্ষমতামলের শেষের দিকে গেছেন ততই তিনি আরো বেশি ও প্রকাশ্যে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী (হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট) গ্রুপের ওপর তাঁর নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে গেছেন।

    পরেরবার গত ২০২০ সালের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প পরাজিত হলে এরপরের বাকি তিন মাস তিনি লাগাম ছাড়া, তিনি আর রিপাবলিকান না, যেন সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের মূল নেতা হয়ে উঠেন। আর এরই সবচেয়ে বড় প্রকাশ তিনি ঘটান ৬ জানুয়ারি ২০২১ সালে। ঐদিন সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা আমেরিকান সংসদ বা কংগ্রেস [Congress] ভবন দখল করে নিয়েছিল ও এর শিখরে উঠে কংগ্রেস বিল্ডিংয়ে তাদের রাজত্ব কায়েম করে ছাদে দেয়ালে নাচানাচি-বিজয় প্রকাশ করেছিল। সরকারি হিসেবে ওদিন সাতজনের মৃত্যু ও কয়েকজনের আহত হওয়ার মধ্যে দিয়ে ঘটনা শেষ হয়েছিল।

    সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী বা জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদী বলতে এরা কারাঃ
    বাংলাদেশের মত পাঠকদের মধ্যে সাধারণ্যে ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ব’ কথাটা অনেকের কাছে আবছা ধারণায় থাকতে পারে বা তা খুব একটা পরিষ্কার না এমন হতে পারে। তাই এনিয়ে আগে একটু কথা বলে নেই। শব্দটার মূল বিষয় ‘শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা’ বা নিজেকে সব ব্যাপারে, অন্য এথনিক জনগোষ্ঠীর চেয়ে ধর্ম-জাতি ইত্যাদি যেকোনো দিকে শ্রেষ্ঠ-বোধ করার দাবি তুলে ধরে। ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে সুপ্রিমেসিস্ট [Supremacist]। আর, ইংরেজি ‘সুপার’ বা সবার চেয়ে ভাল – এ ধারণা থেকে ‘সুপ্রিমেসিস্ট’ শব্দ তৈরি করা হয়েছে। এই সুপ্রিমেসিস্ট শব্দেরই খাস বাংলা হল শ্রেষ্ঠত্ববাদী। বলাবাহুল্য, সুপ্রিমেসিস্ট বা শ্রেষ্ঠত্ববাদী এগুলো নেতিবাচক শব্দ। এগুলো শুধু নেতিবাচক শব্দই নয়, এটাকে ইংরেজিতে বলে ‘ডেরোগেটরি’ [derogatory] শব্দ মানে, কাউকে – নিচা দেখানোর-  শব্দ। বাংলায় বললে কাউকে ইচ্ছা করে ‘নিচা দেখানোর’ জন্য এসব শব্দ ব্যবহার করা হয়।

    কিন্তু কোন জনগোষ্ঠীর মানুষের নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ – এই বোধ তাদের কেউ কেউ আনে কেন? এটার দরকার কী?  আসলে যখন থেকে মানুষ টের পেয়েছে নিজের গায়-গতরের শ্রমে সম্পদ জোগাড়ের চেয়ে সহজ ভিন্ন পথ আছে; তখন থেকে শুরু হয়েছে এই সমস্যা। সেটা হল, অন্যের শ্রম-সম্পদ লুটে খাওয়া ও নেয়া, অন্যের কাঁধে চড়ে খাওয়া ইত্যাদির জন্য অন্য পুরো জনগোষ্ঠীকেই নিজ অধীনস্থ করা বা বাধ্য করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে যারা।

    কিন্তু তাতেও পেছনে আরো বড় কাহিনী আছে। দুনিয়াতে মানুষের থিতু হয়ে কৃষিকাজভিত্তিক জীবনযাপন শুরু করা বলা হয় মোটামুটি প্রায় ছয় হাজার বছর বয়সী। সে কারণে এখান থেকেই আমাদের তৎপরতাকে আমরা সভ্যতা বলি বা ‘সিভিলাইজেশন’-এর শুরু বলা হয়। আর দুনিয়াতে এমন সভ্যতার জীবন বা কৃষিকাজে মানে থিতু হয়ে কোনো ভূগোলে বসবাস শুরু করা, যাযাবর জীবন ত্যাগ করা- এসবই শুরু হয়েছিল আর এটাই সভ্যতার শুরু। আসলে অন্তত দশের অধিক বিভিন্ন সভ্যতা যারা প্রায় কাছাকাছি সময়ে (কিন্তু পরস্পর সম্পর্কে একেবারেই না জেনে, যোগাযোগ ছাড়াই) শুরু হয়েছিল। যেমন এসব সভ্যতার বিচারে আমরা ‘সিন্ধু সভ্যতার’ অংশ (যার মূল ভূখণ্ড এখন পাকিস্তানের অংশ)। আর এর ভেতরেও আবার অনেক নৃতাত্ত্বিক-জাতির জন্ম ও বিকাশ ঘটেছিল, যার মধ্যে আমরা বৃহত্তরভাবে সিন্ধু সভ্যতার অংশ হলেও এর ভেতরের “বাঙালি” – এই নৃতাত্ত্বিক-জাতির অন্তর্ভুক্ত বা অংশ। যেমন এশিয়ায় আমাদের কাছাকাছি সবচেয়ে প্রভাবশালী আরেক সভ্যতার নাম হল মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক-কুয়েত), টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরের এই সভ্যতা।

    আগের দিনে এথনিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বা সভ্যতাগতভাবে তাদের মধ্যে কোন সঙ্ঘাত হয়নি এমন নয়। তবে ধরনটা ছিল যেমন, দেখা গেছে দেশ যুদ্ধ-মারামারিতে অন্যের দখলে চলে গেছে পেয়েছে অথচ এরপর থেকে  দখলদারও সেই ভূমিতেই (যেভুমি থেকে সে এসেছে তা ফেলে) এর পর থেকে নিজেও বসবাস শুরু করেছে। এটাই প্রধান ধরণ ছিল। মোগল শাসকেরা এমন ধারার ছিল। তাই এতে সম্পদ পাচার বা নিজ পুরানা দেশে লুটে ফেরত নিয়ে যাওয়া এমন ফেনোমেনো তা ছিল না।   পরবর্তীতে টেকনোলজি বিকাশের সুযোগ নিয়ে এক কলোনি দখল যুগ (১৬০৭-১৯৪৫) শুরু হয়েছিল। আর এ্রতে একমাত্র দখলদার হাজির হয়ে যায় ইউরোপ যারা,  এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা সব মহাদেশকেই কলোনি, নিজের শিকার বানিয়ে নিয়েছিল। প্রায় সাড়ে তিন শ’ বছরের এই লুটেরা শাসন চলেছিল। কিন্তু এটি বিশেষ লক্ষণীয় যে, এই প্রথম ইউরোপীয় কলোনিবাজ দখলদাররা দখলের পরে সাথে এ কাজের পক্ষে সাফাই বক্তব্যও দেয়া শুরু করেছিল। আর সেই প্রথম আমরা কে সভ্য আর কে নয় এ নিয়ে  শঠতাপুর্ণ তুলনা হতে দেখেছিলাম। আর এ থেকে দেয়া সাফাইটা হয় যেমন, এশিয়ায় আমাদের চেয়ে ইউরোপীয় দখলদাররা “ভালো সভ্য” বা “বেশি সভ্য” বলেই সবার আগে তাড়া দাবি করেছিল। পরে এই মিথ্যা  সাফাই দিতে শুরু করেছিল যে  “যেন তারা আমাদের সভ্যতা শিখাতেই আমাদের দেশ দখল করেছে। এ থেকেই শুরু হয় সভ্যতা শব্দটার শঠতা বা ছলনার নেতি ব্যবহার। যেন ইংল্যান্ড বৃটিশ-ইন্ডিয়া দখল করেছিল আমাদের সভ্যতা শিখাতে এসে আর এতে  আমাদের স্থায়ী মজুদ বা উদ্বৃত্ত সম্পদ সবই নিরন্তর লুট করে নিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের কাজ।
    আসলে সরাসরি বললে আমরা শ্রেষ্ঠ কিংবা আমরা অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ – এ ধারণা, এ অনুভবটা থেকেই সব অপরাধের উতস বা শুরু হতে পারে। কারণ আপনি হয়ত সতর্ক থাকলেন কিন্তু অন্যে হয়ত আপনার না করে দেয়া ধারণা-কথাটাই অন্য জনগোষ্ঠীকে পদানত বা অধীনস্থ করার সাফাই হিসেবে কেউ ব্যবহার করবেন।

    যেমন আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশের ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট’ ধরণের চিন্তাচর্চার ঘাঁটিঁ বা ফেবারেবল অঞ্চল। এদের মূল কথা হল, তাদের গায়ের চামড়ার সাদা (বলতে চায় সাদা ককেশীয় নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী) অতএব তাঁরা অন্য সব নৃ-গোষ্ঠির মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যেখানে কেউ শ্রেষ্ঠ কিনা এটা অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রমাণিত ধারণা, এর চেয়েও বড় কথা এর কারণে কাউকে লুটে নেয়া, নিজ অধীনস্ত করে নেয়া অথবা  একই দেশের ভিতরে সহ-নাগরিকের সাথে কাউকে বৈষম্য করা  ইত্যাদি সব এগুলো ক্রিমিনাল অপরাধ। অথচ কেউ যখন জাত শ্রেষ্ঠত্বের মুইথ্যা বড়াই করে সে আসলে ইঙ্গিতে বলতে চায় তাদের ন্রৃ-গোষ্ঠি চার-পাঁচ শ’ বছর ধরে অনেক জনগোষ্ঠীকেই অধীনস্থ করে রাখতে পেরেছিল তাই তারা এখনও শ্রেষ্ঠ। তবে একালে ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট’ চিন্তা ফিরে জেগে ওঠার কারণ আরেকটু ভিন্ন।

    গ্লোবাল ইকোনমি যেখানে পরিবর্তিত হচ্ছে এর অভিমুখ হল, চীনের উত্থানে আমেরিকান ইকোনমির পতন বা তাদের অন্ততপক্ষে রি-অ্যাডজাস্টমেন্ট (ভিন্ন কাজ ভিন্ন দেশ ইত্যাদি) একটি খুবই স্বাভাবিক বা প্রায়ই ঘটা ঘটনা হিসেবে উঠে আসছে। বড়লোক অবস্থাপন্ন অনেকেই তো বটেই, মিডল ক্লাসের ব্যবসা বা চাকরি প্রায়ই টলায়মান হয়ে উঠছে। আগের বাজার, আগের নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার হাতে টিকে থাকছে না। আর এ’বস্থায় তাদের ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট’ বয়ানটা  মুখরোচক হয়ে উঠে আসছে এমন যে, “আগে তারা সুন্দর দিন ‘কাটাইত”! কিন্তু অ-সাদা মানুষেরা সব নষ্ট করে দিয়েছে। মানে এখন কালো বা বাদামি চামড়ার লোকেরা তাদের পশ্চিমাদেশে এসে ছেয়ে ফেলাতেই নাকি তাদের চাকরি-ব্যবসার সব সুবিধা এরা নিয়ে গেছে।

    আসলে, স্বভাবতই এখানে অর্থনৈতিক গ্লোবালাইজেশনের কারণ, পশ্চিমা দেশ থেকে সাদা চামড়ার মানুষ অন্য দেশে ব্যবসা-কাজের লোভে বেরিয়েছে বা অন্য চামড়ার কিন্তু সস্তা শ্রমিক বলে তাঁরা পশ্চিমা দেশে কাজ ও থাকার অনুমতি পেয়েছে। কিন্তু যেকোনো উগ্র জাতিবাদের মত এই হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্টরা সত্য-মিথ্যা মিলিয়েই কথা বলবে। মূলকথাটা সোজা  – যখন পশ্চিমা কোনো দেশের অর্থনীতি ভাল চলে তখন বাইরের আমাদের মত দেশের সস্তা শ্রমিক পেতেই তো মাইগ্রেটেড শ্রমিক সে আমদানি করবে। কাজেই অ-সাদা চামড়াদের তখন ভালো লাগবে যখন পশ্চিমা দেশে অর্থনীতি ভালো চলবে। অতএব এর সাথে কোনো রঙের গায়ের চামড়ার মানুষ ভাল অথবা শ্রেষ্ঠ – এটা ডাহা মিথ্যা ও ভুয়া কথাবার্তা। কিন্তু তবু পশ্চিমের ঘৃণায়, নরওয়ে-তে হত্যা বা সর্বশেষ নেদারল্যান্ডসে মুসলমান বলে হত্যাকাণ্ডগুলো প্রায়ই উঠে আসছে।

    আবার গ্লোবাল ইকোনমিতে  চীনা উথান ও চীন নেতা হলেই সেটা সাদা চামড়া জনগোষ্ঠীর মানুষেরা না খেয়ে মরবে, বা তাদের জন্য খারাপ ঠিক তা নয়। তবে সুযোগ সুবিধা কমে বা ভিন্ন হয়ে যেতে পারে। আবার তারাও এশিয়ায় মাইগ্রেটেড (লেবার, টেকনিশিয়ান বা যেকোনো স্পেশালাইজড) হলে তারাও ভালো করবে যেভাবে গত অন্তত শ’বছর আমরা এশিয়ানরা এভাবেই নিজেদের ভাগ্য খুলবার চেষ্টা করে এসেছি। তবে একটা জিনিষ, দুনিয়াতে গত প্রায় ছয়শ বছর ধরে একনাগাড়ে সাদা ককেশীয়দের একচেটিয়া শাসন চলে আসছে।  এখন গ্লোবাল ইকোনমিতে  পরিবর্তনের মোচড়ে যদি সাদা ককেশীয়দের একচেটিয়া শাসন দূর হয়ে যায় তাতে চীনের কী করার আছে??  আবার পশ্চিমাদেশের আধিপত্য চলে যাওয়া মানে সব হারানো তা তো নয়! আমেরিকা বৃ্টিশদের থেকে গ্লোবাল নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছে বলে লন্ডন তো পরিত্যক্ত শহর হয়ে যায় নাই। একালেও এখন অনেকেই নন্ডনে সেটেল হতে চাচ্ছেন। সৎ মনোভাব নিয়ে তাকালে অনেক কিছুই খারাপ লাগার কথা নয়!

    একই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের দুই রূপ ট্রাম্প ও বাইডেনঃ
    ট্রাম্প সম্পর্কেই উপরে বেশি কথা লিখেছি তবে তাতে ট্রাম্পই কেবল খারাপ আর বাইডেন ভাল, তিনি জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদী বা হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট নন অথবা কম? তাই কি? না, তা একেবারেই নয়।
    তবে নতুন যেটা তা হল, বাইডেন তাঁর যুগে সবচেয়ে বড় হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট হিসেবে হাজির হতে চাইছেন। এটাই একালের সবচেয়ে বড় শিফট! এখন এটা একেবারেই পরিষ্কার যে, বাইডেন আরো বড় হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়েই ২০২১ সালে্র জানিয়ারিতে শপথ নিয়েছিলেন। তা হলে ট্রাম্প ও বাইডেন দু’জনই কি সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী? সাধারণ উত্তর হ্যাঁ-সূচক। কিন্তু তবু দু’জনের কাজের ফিল্ড বা ফোকাস ভিন্ন। যেমন, ট্রাম্প অভ্যন্তরীণভাবে মূলত আমেরিকার ভিতরে অর্থে হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট। আর বাইডেন সারা পশ্চিমাশক্তি মিলে, যার মধ্যে ইউরোপীয় নেতারা শামিল আর ব্যতিক্রমী জাপানিজরা। তারা মনে করে, গত পঁচাত্তর বছরে  আমেরিকার পুরনো গ্লোবাল নেতৃত্ব তারা আরো কিছু দিন যেভাবেই হোক ধরে রাখবেন।

    এতে বাইডেন এন্ড গংয়ের সবচেয়ে যেটা বড় বিভ্রম ও জিদ তা হল ইকোনমিক নেতৃত্বটা যেন সাবজেক্টটিভ বা ব্যক্তি ইচ্ছায় নির্ধারিত হয়। যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধটা প্রধানমন্ত্রী চার্চিল প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের দাসখতে রাজি বা বাধ্য না হয়েও বৃটিশ সাম্রাজ্য তার পুরনো গ্লোবাল অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব হিটলারের হাত থেকে চাইলেই বাঁচতে ও বাঁচাতে পারত। বাইডেন আসলে এর থেকেও এককাঠি উপর দিয়ে চলেছেন। বাইডেন মনে করছেন, পাঁচ-ছয় শ’ বছর ধরে সাদা চামড়ার শাসন দুনিয়ায় চলছে। এ শাসন চীনের (অ-সাদা) নেতৃত্বের তলে পড়তে পারে না, যেভাবেই হোক টিকিয়ে রাখতেই হবে – এই জবরদস্তির উসকানি দিয়ে বাইডেন নিজ গ্লোবাল নেতার সুপ্রিমিজম যেন তিনি ধরে বা টিকিয়ে রাখতে সফল হবেন – এই হল তার বাজনার মূল সুর!

    কিন্তু বাইডেনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের খাস প্রমাণ কী?
    বাইডেন প্রশাসন এতদিন ঠিক কী বলে ইউরোপকে ইউক্রেন যুদ্ধে শামিল করেছেন, তা পাবলিকলি খোলাসা করেননি। যারা বারবার রাশিয়ান তেন-গ্যাস ছাড়া চলতে পারবে না বলে অনবরত বেঁকে বসছিল! কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল বাইডেন নিজেদের সাদা শাসন হারিয়ে যাবে এমন ভয়-উস্কানি দেখিয়ে থাকতে পারেন। সম্প্রতি তা নিয়ে একটু ডিটেইল ব্যাখ্যা করেছেন বর্তমানে বাইডেন প্রশাসনের দুই মন্ত্রী কর্তা- পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন [Antony Blinken ] ও ট্রেজারি বা অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেন [Janet L. Yellen], তবে দুই আলাদা আসরে। দুটোই লম্বা পলিসি বক্তব্য।  আটলান্টিক কাউন্সিল [Atlantic Council] নামে আমেরিকার এক থিংকট্যাংক আছে, এর এক বক্তৃতায় জ্যানেটের বক্তব্য গত ১৩ এপ্রিলে। জ্যানেটের দেয়া বক্তব্যের ট্রান্সক্রিপ্ট ওরেই তাদের সাইটে দিয়ে দিয়েছে এখানে।  আর ওদিকে ব্লিঙ্কেন জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বক্তৃতা দিয়েছেন গত ২৬ মার্চ ২০২২। সেখানেই তিনি ‘চীনা সরকারের প্রতি বাইডেন প্রশাসনের পলিসির রূপরেখা’ দিচ্ছেন বলে এ বক্তৃতা দিয়েছেন। ইইউ এর পলিটিকো মিডিয়া তার রিপোর্টের শিরোনাম দিয়েছে, “Blinken calls China ‘most serious long-term’ threat to world order”। এককথায় চীনকে ওয়ার্ল্ড অর্ডার মানে বিশ্বব্যবস্থার শৃঙ্খলার জন্য হুমকি বলে বর্ণনা করছেন ব্লিঙ্কেন। সোজা করে বললে, চীনা অর্থনৈতিক উত্থানে আমেরিকার কষ্ট হচ্ছে অথচ সেকথাটা ব্লিঙ্কেন লুকিয়ে হাজির করছেন এভাবে যে চীন ওয়ার্ল্ড ব্যবস্থার জন্য ফিট নয়!!!  আসলে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা বা গড়ে যাবার প্রায় পচাত্তর বছর পরে এসে এসব কথা অর্থহীন!  আগ্রহিরা লেখা দুইটা সরাসরি পড়ে নিতে পারেন। আমি কিছু ক্যাচি অংশ তুলে আনব। 

    এখনকার সার কথাগুলো বোঝা খুব কঠিন না। আমি ব্লিঙ্কেনে কিছু মুখ্য ভাব-শব্দ তুলে আনছি। মুখ্য শব্দগুলোর দিকে খেয়াল রাখলেই মূল বক্তব্য বুঝা যাবে। যেমন –

    এক. ইউনিভার্সাল ভ্যালু [ …… Beijing’s vision would move us away from the universal values]; ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার, ইন্টারন্যাশনাল রুল বেজড অর্ডার [we will defend and strengthen the international law, agreements, principles, and institutions that maintain peace and security] ;

    দুই. ইকোনমিক অর্ডার, ইন্টারন্যশনাল ল, প্রিন্সিপাল ও প্রতিষ্ঠান;

    তিন. রাশিয়ার সাথে চীনের অ্যালায়েন্স [……potential security risks to the U.S. and its allies posed by China’s alliance with Russia. ] ইত্যাদি।

    এসব কিছুর সার কথা একটাই – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত যেন আমেরিকার নেতৃত্বে জাতিসঙ্ঘ ও আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রভৃতি যেসব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল চীন এগুলোর কেউ নয়। এ-সংক্রান্ত সব মূল্যবোধ ও ইউনিভার্সাল মূল্যবোধের বাইরে চীন।

    তা হলে ব্লিঙ্কেন এখন কী করবেন?
    তিনি স্বীকার করে বলছেন, ‘চীন হল একমাত্র দেশ যার আন্তর্জাতিক অর্ডার বদলে ফেলার ইচ্ছা ও সামর্থ্য আছে- যে সামর্থ্য বলতে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, কূটনীতিক, সামরিক ও টেকনোলজিক্যাল সব বোঝায়। কিন্তু চীনের আর আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ এক নয়।’ [……“China is the only country with both the intent to reshape the international order and, increasingly, the economic, diplomatic, military and technological power to do it,” ]

    তা হলে ব্লিঙ্কেনের প্রতি এখন প্রথম প্রশ্ন হল, যদি চীন আর আমেরিকার মধ্যে ন্যূনতম রাজনৈতিক অর্থনৈতিক মূল্যবোধ বা কাম্য ও প্রতিষ্ঠিত দুনিয়ার নিয়ম-শৃঙ্খলা বা গ্লোবাল অর্ডারে মিল না থেকে থাকে তা হলে চীনের সাথে আমেরিকার এত দিন চলল কী করে? জাতিসঙ্ঘ গঠন হতে পেরেছিল কী করে? যদি ধরে নেই চীন (মাওয়ের চীন) পরে এসেছে, তবু জাতিসঙ্ঘের জন্মের থেকে সবচেয়ে প্রবল্ভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন সক্রিয় সদস্য ছিল। কিন্তু তাই বলে কী লুটেরা কলোনি মাস্টার (বৃটিশ-ফরাসির) ইউরোপ নিশ্চয় সেকালের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মূল্যবোধ ও অর্ডার-শৃঙ্খলা (ব্লিঙ্কেন কথিত) কায়েমের পক্ষে বা দোস্ত ছিল না। তা হলে এর পরেও সেকালের রুজভেল্ট একমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নকেই গোনায় ধরে গ্লোবাল অর্ডার সাজাতে হয়েছিল? তা হলে আজ অন্য যে কারও প্রতি বাইডেনের এত বিতৃষ্ণা কেন? এর সাফাই কই??  রুজভেল্ট কী জানতেন না যে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্তালিন পাক্কা কমিউনিস্ট ছিলেন? তবু ব্লিঙ্কেন সাহেব আজ যে মুল্যবোধের বড়াই অমিল দেখছেন তা রুজভেল্ট আমলই করেন নাই। তা করলে তো জাতিসংঘের জন্মই হওয়ার কোন কারণ নাই। আর তা হয় নাই। কাজেই ব্লিঙ্কেন অবশ্যই অর্থহীন কথা বলছেন! মূলকথা রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্বেও তাঁরা একসাথে জাতিসংঘ গঠন করেছিলেন। আর আজ ব্লিঙ্কেন নয়া বৈরাগী হতে চাইছেন, মুল্যবোধ বুঝাবুঝির তর্ক উঠিয়েছেন!!!

    আবার চীনের কথায় আসিঃ  সত্তরের দশকে কিসিঞ্জারের আমেরিকা ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের স্বার্থসহ দুনিয়ার সব মূল্যবোধকেই পায়ে দলে চীনের মন পেতে কি গোপনে বেইজিং ছুটে যাননি? তখন সেটা কি আমেরিকার বৈষয়িক স্বার্থের ভিত্তিতে বাকি সবভুলে পা ফেলা ছিল না? তা হলে তখন আজকের তোলা মূল্যবোধের কথা কোথায় ছিল? ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক মিটিংয়ে মাওয়ের চীনকে ভেটোক্ষমতাসহ সদস্যপদ ফিরে দেয়া হয়।  আবার টানা সাত বছর (১৯৭১-৭৭) চীন-আমেরিকার নেগোসিয়েশন চলেছিল – উভয় উভয়কে যা কিছু সব বুঝে নেবার যথেষ্টের চেয়েও অতিরিক্ত সময়  দিয়েছিল। এই হিসাব শেষে ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তাদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক চালু হয়েছিল। তা হলে তখনকার আরো কড়া কমিউনিস্ট চীনকে সহ্য হলে এখন লিবারেল চীনকে অসহ্য লাগা শুরু হবে কেন? আমেরিকান পুঁজি ওয়াল স্ট্রিটের সেকালে অবাধে চীনের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ায়, চীন অনুমতি দেয়ায় যদি তখন চীনকে ভালো মনে হয়ে থাকে – মূল্যবোধে কোনো সমস্যা না দেখা দিয়ে থাকে, তা হলে এখন এমন কী ঘটেছে সেটা অবশ্যই বাইডেন-ব্লিঙ্কেনকে আগে স্পষ্ট বলতে হবে। সুপ্রিমিজম করতে দেয়া হবে না।
    আবার আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের ইস্যুতে যদিও চিয়াংকাইশেকের জাতিবাদী চীন ১৯৪৫ সাল থেকেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য।  কিন্তু ১৯৪৯ সালে মাওয়ের বিপ্লব হয়ে যায় মূল চীন ভূখণ্ডে। চীন জাতিসঙ্ঘেরও সাধারণ সদস্য ছিল না তখন। পরে ১৯৭১ সালে তাইওয়ানকে বাদ দিয়ে মূল চীন (জাতিসঙ্ঘ জন্মের সময়ের )ভেটো-ওয়ালা সদস্যপদ ফিরে পেয়েছিল। আর একইভাবে চীন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সক্রিয় মেম্বার হয়েছে ১৯৮০ থেকে। এমনকি মাওয়ের চীন, মূলচীন ডব্লিউটিওয়ের সদস্যপদ নেয় আরো পরে, ২০০১ সালে। তা হলে জাতিসঙ্ঘ বা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠানের ইন্টারন্যাশনাল মূল্যবোধ না বুঝে থাকাটার আর কি চীনের বুঝতে বাকি ছিল? আর মুল্যবোধ বুঝা নিয়ে কোন সময় কোন আপত্তি আমেরিকা তুলে নাই কেন? মুখ খোলার আগে ব্লিঙ্কেন কী এতটুকু বুঝেন নাই কথা বুঝে বলতে হয়!!! গুছিয়ে মিলিয়ে কথা বলতে হয়!!

    আসলে এসব প্রশ্নের উত্তরে ব্লিঙ্কেনের খবর নেই। যেন তাদের কথা একটাই, তাদের সাদা চামড়ার নেতৃত্ব দুনিয়াতে তাদের স্থায়ী করে দিতেই হবে। না হলে চীনা মূল্যবোধ নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলতেই থাকবেন???

    সবশেষে, ব্লিঙ্কেন  সম্ভবত বুঝেছিলেন তারা কথার মেরুদণ্ড নেই – খামোখা কথা বলছেন। তাই এবার তিনি বলে বসেন, “চায়নার বন্ধু রাশিয়ার’ হুমকিতে তারা ভীত [security risks to the U.S. and its allies posed by China’s alliance with Russia]। অতএব, এটা চীনের দায়। ইউক্রেনের যুদ্ধও চীনের দায়!
    এক কথায় বললে, সাদা চামড়া সুপ্রিমিজম, জাত শ্রেষ্ঠত্ব এর আওয়াজ তুলে এভাবেই ডুবে যাবে বাইডেনের আমেরিকা!! এ’ভিন্ন কোন পরিণতি নাই!

    বাইডেন আসলে কোথায় যেতে চাইছেন? কোন বাস্তবোচিত কোন চিন্তা তিনি করতে পারতেছেন তা মনে হয় না। তবে খুব সম্ভবত বাইডেন-ব্লিঙ্কেন-জ্যানেট এদের যে এক অলীক কল্পনাটা আছে সেটা খুব সম্ভবত এই যে, কোল্ডওয়ার যুগের মত মুখ্যত, একটা মূল আইওএমএফ-বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রিক বাণিজ্যের দুনিয়া আরেকটা বাকিদের ব্লক এর বাইরে; এমন দুটা ব্লকে দুনিয়া ভাগ করা। এমন শখ বা কল্পনা অনেকের মধ্যেই প্রায় দেখা যায়। কিন্তু হার্ড ফ্যাক্টস হল, দুনিয়াতে আর কখনও দুই অর্থনৈতিক ব্লক ফিরে আসবে না। চাইলেও ফেরা যাবে না।  দুনিয়ায় ফিরে আসবে না। মূল কারণ, আমরা এখন (১৯৯১ সালের পর থেকে) সব দেশই একই  আইওএমএফ কেন্দ্রিক বাণিজ্যের দুনিয়া চালু করে ফেলেছি। আমরা  আইওএমএফ বদল করে আরেকটা আইএমএফ বানাতে পারি, নামে বদল হিসাবে। কিন্তু আইএমএফ টাইপের কিছুই বানাবো না এটা হবে না। আর যেমন এক ঘরে দুটা পীর থাকতে পারে নাই, তাই দুনিয়াতে একসাথে দুটা ‘আইএমএফ’ থাকবে না।  মূলকথা, সকলকেই একই আইএমএফ (ধরণের প্রতিষ্ঠান) এর এবং এমন একটাই প্রতিষ্ঠানের সবাই সদস্য এভাবে – হয়েই থাকব!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০৪ জুন  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ট্রাম্প ও বাইডেন, সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের দুই রূপ“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদঃ বয়ানের গরমিলে হেরে যাবে

    সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদঃ বয়ানের গরমিলে হেরে যাবে

    গৌতম দাস

    ২৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-2yD

     

    গত ২২ মার্চ ছিল শুক্রবার; অর্থাৎ নিউজিল্যান্ডে গত ১৫ মার্চ শুক্রবার জুমার নামাজের সময় এক জোড়া মসজিদে হামলায় ৫০ জনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার ঠিক এক সপ্তাহ পরের শুক্রবার সেটা। এ দিন নিউজিল্যান্ডের প্রতিটি শহর দুপুরে, বিশেষ করে ঘটনাস্থল ক্রাইস্টচার্চ সিটিতে ‘হেডস্কার্ফ’ (Headscarf, ওড়না জড়িয়ে মাথা ঢাকা) লাগানো নারীদের পদচারণায় সরব হয়ে উঠেছিল। কারণ, ২২ মার্চ শুক্রবার ছিল নিউজিল্যান্ড জুড়ে আগের শুক্রবারে হামলায় নিহতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তাদের পরিবার এবং সাধারণভাবে মুসলমানদের সাথে নাগরিক সবাইকে নিয়ে নিউজিল্যান্ডের সরকার ও প্রশাসনের সংহতি প্রকাশের দিন। এটা ছিল আসলে ধর্মীয় এবং সামাজিক ধরণের জমায়েতের এক মিশাল। ফলে তা মুসলমান ধর্মীয় আবার অন্যধর্মের লোকেদেরও সংশ্লিষ্ট হবার সুযোগ রাখা হয়েছে বা সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। যাতে সকলে মিলে সংহতি প্রকাশ করা যায়। আর “সংহতি” মানেই তো ধর্মসহ সব নির্বিশেষে সকলে মিলে যা পালন করা হয়। কিন্তু কিসের বিরুদ্ধে এই “সংহতি” সেকথাও মনে রাখা দরকার। “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী” [White Supremist] – এমন চিন্তা ও বয়ান আর এর চর্চার বিরুদ্ধে এই সংহতি। অর্থাৎ নিউজিল্যান্ডের এক ব্যাপক জনসমাগমে প্রধান ধারা হিসাব এই বক্তব্য উঠে এসেছিল  যে তারা “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী-দের” বিরুদ্ধে এবং ধর্ম-নির্বিশেষে তাঁরা সংহত – এককাট্টা।  তাই এই আয়োজন করা হয়েছিল ঐদিনের জুমার নামাজের জমায়েতের সাথে একসাথে। আর সেই উপলক্ষে আয়োজনস্থল ছিল দুই মসজিদে হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি বা নিহত হওয়া আল নূর মসজিদের সামনের স্থানীয় ‘হাগলে পার্ক’ [Hagley Park ]। সেখানেই বয়স-নির্বিশেষে নারীরা সবাই মাথায় হেডস্কার্ফ পরে যোগ দেন, যাতে তা তাদের প্রকাশিত সংহতির প্রতীকে পরিণত হয়।

    স্বভাবতই মসজিদে হামলায় একসাথে পঞ্চাশজন মেরে ফেলার পর এর একটা মানসিক যাতনার প্রভাব তৈরি হয়েছিল নিউজিল্যান্ড জুড়ে।  মুসলমান জনগোষ্ঠি বিশেষ করে নারীরা যাদের সাধারণত মুসলমান পরিচয় মানে ওড়নায় মাথা জড়ানো হয়েই বের হতে দেখা যায়, ফলে তারা চিহ্নিত – ফলে তারা আবার হামলা আক্রমণের শিকার হন কিনা এই ভয়বোধ জেকে-বসা খুবই স্বাভাবিক। মুসলমান সহকর্মি বা পড়শিদের কাছে তাদের এই ভয়ভীতিবোধের কথা জানতে পেরে নিউজিল্যান্ডের একই সাধারণ মানুষ যাদেরও গায়ের রঙ সাদা তারা এতে অস্বস্তি আর কিছুটা অপরাধবোধেও ভুগতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ মসজিদে হামলার ঘটনা কেবল নিউজিল্যান্ডের মাত্র ১% মুসলমান জনগোষ্ঠিকেই নয় প্রধান ধারার সাধারণ মানুষকেও আলোড়িত করে এক নেতি প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। আর সেখান থেকে সাদা-বাদীদের প্রত্যাখান করে মুসলমা্নদের ভয়বোধ আর সাধারণ মানুষের অস্বস্তি ও অপরাধবোধ – সবকিছু ঝেড়ে ফেলে একসাথে উঠে দাড়ানোর, রুখে উঠার প্রয়োজনীয়তা হাজির হয়েছিল। আর সেটাই ছিল হেডস্কার্ফে প্রকাশিত প্রতীকে “সংহতি” প্রদর্শনের কড়া বার্তা। এককথায় বললে, এই সংহতি প্রকাশের ফলে মসজিদে হামলার সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের যে উদ্দেশ্য ছিল যে নিউজিল্যান্ডের সাদাচামড়ার সাধারণ মানুষকে উস্কানি দেয়া, মুসলমান বা মাইগ্রেন্টদের বিরুদ্ধে তাদের শুড়শুড়ি দিয়ে ক্ষেপিয়ে তোলা ইত্যাদি সবকিছুই মাঠে মারা যায়। উলটা সাদাচামড়ার খ্রীশ্চান সাধারণ মানুষই মুসলমানদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বসে।

    মাথায় স্কার্ফ লাগিয়ে মসজিদের ঘটনায় নিহত বা ভিকটিম পরিবারের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, সান্ত্বনা-সহানুভূতি জানানোর রেওয়াজ শুরু করেছিলেন নিউজিল্যান্ডের নারী প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডেন [Jacinda Arden], হামলার ঘটনার পরের দিন থেকেই। এক আদর্শ প্রধানমন্ত্রীর মতই তিনি কাজটা করেছেন। এসব সময়ে ধর্ম-নির্বিশেষে ভিকটিমের পাশে দাঁড়ানো আর জনগোষ্ঠীকে বিভক্ত হতে না দেয়া, ঐক্য ধরে রাখা – এটাই তো তার আসল কাজ। তাই স্বভাবতই সেটা দেশ-বিদেশে খুবই প্রশংসিত হয়েছে। আর সেখান থেকেই নিউজিল্যান্ড জুড়ে প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা ধর্মনির্বিশেষে এক নাগরিক ঐক্য ও সহমর্মিতা বোধ তৈরিতে লেগে পড়েছিলেন এবং তিনি তাতে সফল তা বলা যায়। তিনি বারবার বক্তৃতায় বার্তা দিয়ে গেছেন যে, ‘হামলাকারী ব্রেনটন ও তার সাদারাই শ্রেষ্ঠ এই তত্ত্ব “অগ্রহণযোগ্য এবং স্বভাবতই তা আমাদের মধ্যে অনৈক্য, বিভেদ তৈরি করতে ব্যর্থ হবে, কারণ আমরা এক”। বলা যায় ব্রেনটন ও তার সাদাবাদিতাকে উপড়ে তুলে সমাজ-কমিউনিটি থেকে বাইরে ফেলে দিতে এখানেই তিনি এবার সক্ষম ও সফল হয়ে যান। তার এই শক্ত অবস্থান ও প্রচেষ্টা জনমনে ইতিবাচক আবেদন সৃষ্টি করতে সফল হয়েছে। তাই সে্টাকেই আরো বড় করে ছড়িয়ে দিতে সোস্যাল মিডিয়ায় ‘হেডস্কার্ফ ফর হারমনি’ [Headscarf-for-Harmony] নামে হ্যাশট্যাগ গ্রুপ গঠন হয়ে যায়। বলা হচ্ছে অকল্যান্ড শহরের এক ডাক্তার তাঁর এক মুসলমান সহকর্মির কাছ থেকে তাঁর ভয়ভীতিবোধের ব্যাপারটা জেনে কিছু করার তাগিদ থেকে এই হ্যাশটাগ আন্দোলন আহবান জানানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই গ্রুপের উদ্যোগেই জুমাবারে প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথে সমন্বয়ে ঐ ‘হেগল পার্কের’ সমাবেশে দুই মিনিটের নিস্তব্ধতা পালন করে সংহতি প্রকাশের প্রোগ্রাম সবাই মিলে বাস্তবায়ন করেছিল।

    রাজনৈতিক-সামাজিক বড় ঘটনায় সবসময়ই কিছু অতি-বাদী এরাও হাজির থাকে। সবকিছুতেই অতিরিক্ত মানে, পরিস্থিতি যতটুকু দাবি করে তার চেয়ে বেশি করে ফেলা, এমন হয় এরা। এরা হতে পারে – অতি-বাম, নয়ত অতি-ইসলামি বা অতি-নারীবাদী ইত্যাদি ধারার কাউকে কাউকে পাওয়া যায়ই। এখানেও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। যেমন সামাজিক মিডিয়ায় অনেককে দেখা গেছে এক “ষড়যন্ত্র তত্ব” নিয়ে হাজির হতে। এরা বলতে চাচ্ছেন যে প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডার স্কার্ফে নিজেকে প্রকাশ ও সহমর্মিতা প্রদর্শন – এটা “মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র”। এটা আসলে কেবল দেখানো জন্য। কেন? কারণ সাদা শ্রেষ্ঠ্ত্ববাদী খ্রীশ্চান ব্রেনটন= নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী খ্রীশ্চান জেসিন্ডা। অর্থাৎ খ্রীশ্চান সুত্রে ব্রেনটন=জেসিন্ডা। এতে মানে দাড়ালো যে জেসিন্ডাই ব্রেনটন। সেকারণে হামলা করে এসে এখন জেসিন্ডা কালো স্কার্ফ পড়ে হাজির হলেও তিনি আসলে মুসলমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী। এদের এমন এই চিন্তার কাঠামোটা দাঁড়িয়ে আছে ১. খ্রীশ্চান সুত্রে ব্রেনটন=জেসিন্ডা। ২. খ্রিশ্চান মানেই সে এন্টি-মুসলমান। মুসলমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী। ৩। খ্রীশ্চান কখন মুসলমানের জন্য ভাল কিছু করতে পারে না; ইত্যাদি এসব বক্তব্যের ভিত্তির উপর।

    কিন্তু এমন চিন্তা যেকোন মুসলমানের জন্যই ভীষণ বিপদজনক। কেন? কারণ এই বক্তব্যের যুক্তির প্যাটার্ণ অনুসারে তাহলে সারা দুনিয়াতে ঘটা যত খুন খারাবি, রাজনৈতিক হত্যাকান্ড এমনকি সন্ত্রাস সৃষ্টির জন্য করা কাজসহ যাবতীয় কাজ আছে যা কোন না কোন মুসলমান জড়িয়ে আছে সেসবের জন্য দায়ী দুনিয়ার সব মুসলমানেরা – একথা মেনে নিতে হবে! আসলে এমন চিন্তা অতি-সরলিকরণ দোষে দুষ্ট। মুসলমান মানেই সে ভাল অথবা খ্রীশ্চান মানেই খারাপ – এটা অতি-সরলিকরণ এক ভিত্তিহীন চিন্তা। একইভাবে এক মুসলমানের কাজের দায় সব মুসলমানের – এমন চিন্তাও অতি-সরলিকরণ দোষে দুষ্ট। আসলে এগুলো খুবই কম চিন্তা করে বলে ফেলা কথা। যেমন, বলা হল এক মানুষের নাম রহিম। অতএব মানুষ মাত্রই তাঁর নাম রহিম – এমন মনে করা। এগুলো হল ‘সাধারণ’ আর ‘বিশেষ’ – এই দুই এর সম্পর্কে গুলিয়ে ফেলে একাকার করে দেখা। যেখানে মানুষ আমাদের সাধারণ নাম। আর রহিম বিশেষ নাম। তাই রহিম একই সাথে মানুষ হলেও মানুষ মাত্রই সে রহিম হবে তা কখনও নয়।  তবু চিন্তায় সতর্ক না থাকলে চিন্তার এমন এই পা-পিছলানি ঘটে।

    মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করতে বিভিন্ন প্রতীক বা আচার-রিচুয়াল [ritual] ইত্যাদির আশ্রয় নিয়ে থাকে। ফলে সেখানে কোন জিনিসটি প্রতীক হয়ে উঠছে, এর চেয়েও কী উদ্দেশ্য মানুষের সবার সেই ঐক্য সংহতি প্রকাশ তারই ভাব-প্রভাব নিয়ে হাজির হয়ে যায় সেই প্রতীক। এখানে তা-ই হয়েছে। এখানেও যে স্কার্ফ যা মূলত ইসলামী নারীদের কারণে ইসলামের প্রতীক মনে করা যায় সেই স্কার্ফকেই এখানে নিউজিল্যান্ডবাসী ধর্ম-নির্বিশেষে সকলের প্রতীক হিসাবে – সেই সংহতির প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। হামলাকারি ব্রেনটন যদি নিউজিল্যান্ডের খ্রীশ্চানদের বার্তা দিয়ে থাকে যে স্কার্ফ বা মুসলমান দেখলেই তাদের “নির্মুল কর” তাহলে সেক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের খ্রীশ্চানেরা পালটা বার্তা তৈরি করেছে যে না তাঁরা বরং ব্রেনটন ও সাদা শ্রেষ্ঠত্বের চিন্তাকে প্রত্যাখান করছে। শুধু তাই না। শোকে দুঃখে থাকা মুসলমানদের সাথে মিলে সহমর্মিতায় ঐ স্কার্ফকেই সংহতির প্রতীক হিসাবে তুলে ধরছে।

    কিন্তু ঐদিনই স্কার্ফের বিরুদ্ধে আবার আপত্তি তুলে ধরেছেন কিছু অতি-নারীবাদী। এটা “সস্তা প্রতীকী প্রদর্শনী” বলেছেন। [In an unsigned opinion piece on Stuff.co.nz, a Muslim woman called the movement “cheap tokenism”.] তাদের দাবি স্কার্ফ হল নারীদেরকে ঘেরটোপের মধ্যে আটকে রাখার মুসলমানের ধর্মীয় ব্যবস্থা ও চিহ্ন। অতএব স্কার্ফ ধর্মনির্বিশেষে সংহতির প্রতীক হতে পারে না। আগেই বলেছি এটা অতি-নারীবাদী অবস্থান। প্রথমত, স্কার্ফকে সুনির্দিষ্টভাবে এই ঘটনায় ধর্মনির্বিশেষে সংহতির প্রতীক বলে গ্রহণ করতে কেউ কাউকে বাধ্য করে নাই। এমনকি মুসলমানেরাও নয়। সোশাল মিডিয়ায় কেউ একজন প্রস্তাব করেছিল আর তাতে ধর্মনির্বিশেষে সকলের তা মনে ধরেছিল – এত টুকুই। স্কার্ফের আর অন্য মানে যাই থাক সুনির্দিষ্ট এখানে এই সবচেয়ে ‘ওপেন চয়েজ’ এর মাধ্যমে যার যার বেছে নেয়া ও সাড়া দেওয়া – এটা বিরাট তাতপর্যময় এবং গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা। অতি-নারীবাদী অবস্থান এটা দেখতে মিস করেছে। এটা পরিস্কার যে এখানে স্কার্ফের অন্য কোন মানে/প্রতীক আছে কিনা অথবা যাই থাক তা এদের বিবেচনার বিষয়ই ছিল না। মুল বিষয় ছিল “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী চিন্তা ও ব্রেনটনের বার্তাকে” নাকচ করা। এবং নিজেদের সংহতি জানানো। কিন্তু স্কার্ফ মাত্রই “গা-চুলকানি বোধ” এটা তো যাদের এমন অনুভব তাদের চিন্তায় অসর্তকতার সমস্যা। এখানে বরং সবচেয়ে কড়া মেসেজ ছিল – ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ চিন্তা ও নারকীয় খুনি ব্রেনটনের বার্তাকে নাকচ করা। অর্থাৎ স্কার্ফ ইসলামের প্রতীক কি না, ইসলাম ভাল অথবা মন্দ কিনা সেসব বিষয় উহ্য রেখে এবং একে ছাপিয়ে গিয়ে  ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ চিন্তা ও নৃশংস খুনের কাজকে কোন জায়গা না দেয়া, প্রত্যাখ্যান।
    কিন্তু তবু স্কার্ফ কেন? এটা বুঝতে অনেকেই মারাত্মকভাবে মিস করেছেন। অনেক সময় বিরাট চিন্তাবিদ তাত্বিক হতে গিয়ে আমরা বাস্তবতা বা ব্যবহারিক দিক ভুলে যাই। সুনির্দিষ্ট বাস্তব দিকটা নজর দিতে গাফিলতি করে বসি। নিউজিল্যান্ডের মুসলমান মোট জনসংখ্যার ১% বলছেন অনেকে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক লাখ হয়ত। আমাদেরকে কল্পনা করতে হবে ্সেখানকার ঐ সংখ্যালঘু মুসলমান নারী-পুরুষের জায়গায় বসে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে হামলার পর থেকে এদের মনে কী তীব্র ভয়ভীতি নিরাপত্তাহীনতা  দানা বেধেছিল। অথচ বেচে থাকার স্বাভাবিক কাজ কর্মের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাজ নিজেই করতে হয় বলে সেজন্য মুসলমান নারী-পুরুষ সকলকেই ঐ শহরে বাইরে বের হতেই হবে। অথচ বাইরের বেশির ভাগ মানুষের গায়ের চামড়ার রঙ তো সাদা! তাহলে এরা সবাই কী মুসলমানদের জন্য ঘাতক, একেক জন মুসলমানদেরকে হামলার জন্য ওঁত পেতে বসে আছে? এমন যেন এই হামলে পড়ল বলে?  এটাই সেই ভয়ঙ্কর দুঃসহ ভীতি! এটা আমরা যারা দূরে বসি আছি আমাদের অনুভব করতে হবে। তাহলে বুঝব। না হলে সবই কারও ষড়যন্ত্র বলে মনে হবে।

    সহকর্মি বা পড়শি যারা মুসলমানদের পাশে বসবাস করে দেখা হয় এদের মধ্যে যাদের কে তবু কাছের মনে হয় তাদের সাথে মুসলমানেরা স্বভাবতই তাদের অনুভব শেয়ার করবে। তাই ঘটেছিল। কিন্তু সেকথা শুনে ঐ খ্রীশ্চান পড়শির কী মনে হয়েছিল? ঐ খ্রীশ্চান পড়শিরা এই প্রথম টের পেয়েছিল যে মসজিদে হামলাকারি ব্রেনটন তাদের কী ক্ষতি করে দিয়ে গেছে! অথচ মসজিদে হামলার ব্যাপারটা আগে হয়ত ঐ খ্রীশ্চান পড়শির কাছে অনেক দুরের ঘটনা মনে হচ্ছিল। কিন্তু খ্রীশ্চান পড়শি এবার টের পেল ব্রেনটন তাদের সবাইকেই পড়শি মুসলমানদের কাছে  একেকজন খ্রীশ্চান সন্দেহভাজন খুনি  বানিয়ে ছেড়েছে  – যে সম্ভাব্য খুনিরা এখনই বুঝিবা রাইফেল বের করে মুসলমানের উপর  ঝাপিয়ে পড়বে এমনই দানব!

    স্বভাবতই যা সে নয় এমন পরিচয়ের দাগ তার গায়ে লাগাতে চিত্রিত হতে বেশির ভাগ মানুষই রাজি হবে না। এর সোজা মানেটা হল মুসলমানের মনে হামলা ভয়ভীতির দুঃস্বপ্ন আর সাধারণ খ্রীশ্চান পড়শিরা এদের সবার গায়ে একেকটা দানব এই পরিচয় লেপ্টে দেয়া একই কথা। অতএব একপক্ষের মনে ভীতি আর অপরপক্ষকে দানব পরিচয় লেপ্টে দেয়া – দুপক্ষই সবই এসব কিছু ঝেড়ে ফেলে একসাথে  উঠে দাড়াতে মনস্থ করা থেকেই স্কার্ফ প্রতীকের উদ্ভব। আর মুসলমান মেয়েরা স্কার্ফ ব্যবহার করে বলে না চাইতেই তারা মুসলমান বলে জনসমক্ষে চিহ্নিত। সম্ভবত সে থেকেই  ধর্মনির্বিশেষে সকলেই যদি প্রতিবাদের প্রতীক হিসাবে স্কার্ফ পড়ে তাহলে অন্তত মুসলমান নারীরা সেফ ফিল করবে – এমন ভাবনার উদ্ভব। অতএব এই স্কার্ফ প্রতিবাদের সারকথা ছিল সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের প্রত্যাখ্যান। মুসলমান পড়শির মনে সাহস ফেরানো – এক কমিউনিটি ঐক্য। অতএব মুলত একেবারে ব্যবহারিক প্রয়োজন বোধ ছিল কমিউনিটিতে মুসলমান নারীদের ভয়ভীতি তাড়ানো আর নিরাপত্তাবোধ আনা।  আর সেই অভিযোগের দাগ থেকে সাদা চামড়ার সাধারণ মানুষকে মুক্ত করা। নিউজিল্যান্ডের মুসলমানেরা ভয়ভীতি দূর করে বাসা থেকে বের হবার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এটা এক অগ্রপক্ষেপ।
    সুতরাং একেবারেই মুল তাগিদ ছিল নিউজিল্যান্ডের কমিউনিটি-সমাজে এক ব্যবহারিক সমস্যা দূর করা। তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের মধ্যে  নানান কিসিমের অতি-বোধ তৈরি হচ্ছে ইস্যু বা সমস্যার ব্যবহারিক দিক থেকে তা দেখতে না পারা থেকে। অতি-ইসলামবাদীরা ভাবছেন সকলেই স্কার্ফ চাপালে তো বিপ্লবের জোশ কমে যাচ্ছে ফলে নিশ্চয় এটা ব্রেনটনের খ্রীশ্চান বোন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডার ষড়যন্ত্র। অথচ তারা দেখতে পাচ্ছেন না ভয়ভীতিতে নিরাপত্তার অভাববোধে ঘরবন্দী মুসলমান নারী-পুরুষ বাইরে বের হবার পক্ষে নির্বিশেষ কমিউনিটি-সাহসের জন্ম হোক, উঠে দারাক – সেটা খুঁজে ফেরা থেকেই এই স্কার্ফ সংহতির জন্ম। এমনকি মুসলমানদের মনে সাহস আনার জন্য জেসিন্ডা নিউজিল্যান্ডের মত হামলা ঘটবার দেশ-শহরে পালটা অত্যন্ত দৃঢতা দেখিয়ে ঐ শুক্রবারে টিভিতে জুমার আজান প্রচারের ব্যবস্থা করেন। 

    প্রায় একই ধরণের এক ব্যাখ্যা ও এর প্রয়োগ করতে গিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান নিজের বিপদ ডেকে আনতে গিয়েছিলেন। তবে তাঁর সৌভাগ্য যে তিনি তা সামলে নিতে, নিজেকে কারেক্ট করে নিতে সুযোগ পেয়েছিলেন এবং তিনি সাহসের সাথে তা নিয়েছেন। তুরস্কের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আসন্ন। কোন নির্বাচনে আভ্যন্তরীণ বহু হিসাবকিতাব থাকে, বুদ্ধিমানেরা সে হিসাবের সব বক্তৃতা বিবৃতিকে সেগুলা যেন দেশের বাইরে না যায় সেদিকে খেয়াল রেখে কথা বলেন, ব্যবস্থা করে রাখেন। এরদোগান ব্রেনটনের হামলায় নিজেকে এর প্রতিরোধের বীর হিসাবে দেখাতে বক্তৃতা করেছিলেন, হামলার ভিডিওও দেখিয়েছেন। বাইরের দুনিয়া এসব  জানলেও প্রথমদিকে  উপেক্ষার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এরদোগান একবার সীমা ছাড়িয়ে অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ডকে খামোখা হুমকি দিয়ে বসেন। তিনি বলেন ব্রেনটনের বিচার যদি অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ড না করতে সক্ষম হয় তবে যেভাবেই হোক তিনি এর বিচার করবেন [“If New Zealand fails to hold the attacker accountable, one way or another we will hold him to account.”]। এটা তো বিনা মেঘে বজ্রপাত। কারণ অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ড ব্রেনটনের বিচার করতে চাইছে না বা পারছে না – এমন কোনকিছুর অন্তত ইঙ্গিতও তো আগে থাকতে হবে! এরপরে না বিচার করার “অন্য কারও” সুযোগ আসবে? তাই এটা গায়ে পড়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য হিসাবে হাজির হয়েছিল। স্বভাবতই এই বেহিসাবি বক্তব্য অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে খারাপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। তবে এরদোগানের সৌভাগ্য যে অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ড গঠনমূলক ভাবে আগায়, এরদোগানকে পিছনে ফিরে যাবার সুযোগ তৈরি করে দেয়  – এমনভাবে কথা বলেন। এরদোগান সেই সুযোগটা নিয়ে পরেরদিন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডার কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে বক্তৃতা দিয়ে সে উত্তেজনার সমাপ্তি টানেন [Turkey’s President Erdoğan praises Jacinda Ardern in an op-ed for the Washington Post]। ভিতরে কূটনৈতিক দৌড়ঝাপও ব্যবপ ছিল স্বভাবতই যেমন এরদোগানের এক অফিস কর্তা পরিস্থতি নরম করতে বলছেন, [“President #Erdogan’s words were unfortunately taken out of context,” ]। এরদোগান বিশাল পা-পিছলানি ঘটনার প্রধান দিকটা হল, তিনিও – ব্রেনটন= সাদাবাদী খ্রীশ্চান= জেসিন্ড, এই ভুল ও ভিত্তিহীন সাজানো অনুমানের সমীকরণ টেনে এর উপর দাঁড়িয়ে কল্পিত শত্রু খাড়া করে কথা বলে গেছেন। অথচ হামলার ঘটনার পর প্রথম সুযোগ থেকেই শেষ পর্যন্ত জেসিন্ডা বলে আসছেন [‘We are one’] ও অষ্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী, ব্রেনটন ও তাঁর রাজনীতিকে কোন প্রশ্রয় নয় বরং নিন্দা করছেন; সমাজচ্যুত করতে কথা বলে গেছেন।

    এখানে আমরা মনে রাখতে পারি, খ্রীশ্চান ইউরোপের অনেক দোষত্রুটি বা স্বার্থ আছে অবশ্যই। কিন্তু নতুন করে আবার কোন ক্রুসেডে খ্রীশ্চান-মুসলমানের লড়াই – এমন ভাষ্য তুলে এনে কোন বিতর্ক তাদের রাজনৈতিক দল বা ক্ষমতাসীনরা (সাদা শ্রেষ্টত্ববাদী পকেট গ্রুপেরা না) আর কখনও তুলবে না, তাদের সামাজিক অভিমুখ সেদিকে নয়। কারণ এতে বড় ক্ষতিটা তাদেরই। কারণ তাদের আভ্যন্তরীণ সমাজে কোন ধর্মতাত্বিক বিতর্কে বা এর আবহ খোদ তাদের রাজনৈতিকতাকেই [Polity] আড়াল করুক বা পেছনে ফেলে দিক, এটা তাদের স্বার্থ নয়। খ্রীশ্চান বিভিন্ন ধারা বা ফেকড়াতে পড়ে এতে দগদগে ঘৃণা লড়াই মারামারির বহু কষ্টকর পথ পেরিয়ে, তারা সেসব বিভক্তিতে তা থেকে গৃহযুদ্ধ শেষে  আজ তারা এক থিতু সমাজের অবস্থায় পৌচেছে। রাজনীতিকরা নিজের স্বার্থে সহজেই এটা ভাঙতে দিবে না।

    যদিও আজ আমরা দেখছি, মসজিদে নামাজিদের ওপর হামলাকারী ব্রেন্টন- ‘সাদারাই শ্রেষ্ঠ ও ক্ষমতাবান’ এই বক্তব্যের পূজারী। যাদের নিজের ইতিহাস-পাঠ খুবই দুর্বল, আর গোঁজামিলের। একথাও সত্য যে, গ্লোবাল ইতিহাসের পুরো দুই-আড়াই শ’ বছরের কলোনি শাসনামলও দাঁড়িয়ে ছিল  সাদাদের এমনই এই সাফাই-বয়ানের ওপর। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল, সব রেসিজমই কোনো-না-কোনো কিছু নিয়ে তথাকথিত এক “শ্রেষ্ঠত্বের” একটা বয়ান খাড়া করে তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আলোচ্য ক্ষেত্রেও সেই তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান হল- ‘আমরা সাদা, তাই আমরা শ্রেষ্ঠ।’ হামলাকারী ব্রেন্টন ট্যারান্টের দাবি – পুরনো কলোনি আমলের জবরদস্তি বা সাদা শ্রেষ্ঠত্বের সেই রাজত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে।

    ঘটনা হল, যেকোনো রেসিস্ট বা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা কখনো নিজের দাবির পক্ষে (মানুষ মানে এমন) ঠিকঠাক সাফাই হাজির করে কথা বলতে পারে না। কারণ, তারা বয়ানের জোরে অথবা সততা, ন্যায় বা ইনসাফের জোরে কথা বলতে পারে না; তারা গায়ের জোরে কথা বলে। অথচ কেউ সাদা চামড়ার লোক হলেই তাকে আমাদের শ্রেষ্ঠ মানতে হবে কেন? এ কথার ভিত্তি কই? অথবা ধরা যাক সাদারাই মূলত দুনিয়াজুড়ে অন্যের দেশ-সম্পদ দখল করে কলোনি শাসন করে গেছে। কিন্তু এই কারণে এই জবরদস্তি এখনও মেনে নিতে হবে, ফিরিয়ে আনতে হবে কেন? এসব সহজ, ছোটখাটো সাদা প্রশ্নের জবাবই তাদের কাছে নেই। বিশেষত যখন একালে রিপাবলিক রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট হল “নাগরিক বৈষম্যহীনতা”, যেটাকে ইতিবাচক দিক থেকে নাগরিক সাম্য [equality] বলা হয়। কিন্তু নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে সাদা শ্রেষ্ঠত্বের জায়গা বা সুযোগ কই?  এছাড়া এর সাথে আছে ইনসাফ আর মানুষের মর্যাদার ভিত্তির কথা।  এর মানে হল, যারা তাদের তাত্বিক [mentor] মানে যারা ব্রেন্টনদেরকে সাদা-শ্রেষ্ঠবাদী হতে উসকানি দিয়ে উদ্বুদ্ধ করেছে তারা খুবই নাবালক-চিন্তার লোক।

    দ্বিতীয়ত, আরো বড় প্রশ্ন হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আর পরের দুনিয়া তো আর এক ছিল না; আকাশ-পাতাল ফারাক হয়ে গেছিল। এটা সাদা চোখেই জানা-বুঝা যায়। যেমন প্রথম ফারাক হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপের চার-পাঁচটা কলোনি মালিক দেশের দখলদারিত্বে দুনিয়ার বাকি সব (এশিয়ার, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা) দেশই দখল ও কলোনি হয়ে গেছিল। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে উল্টো চিত্রঃ কলোনি দখলদার ইউরোপের ব্রিটিশ বা ফরাসিরাসহ সকলেই একের পর এক কলোনি ছেড়ে চলে গেছিল। এতে উপনিবেশগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে গেছিল। কেন?

    কারণ, ব্রিটেন-ফ্রান্সের মতো ইউরোপ কলোনি মালিক-দখলদারেরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে জিততে হলে এর একমাত্র নির্ধারক বাস্তবতা ছিল আমেরিকাকে নিজেদের পক্ষে পাওয়া – এর উপরে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আমেরিকান শর্ত ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে ইউরোপের জিতে যাওয়ার পরে ইউরোপের সবাইকে কলোনি দখলগিরি ছেড়ে দিতে হবে। ইউরোপ এই শর্ত মেনেছিল উপায়হীন হয়ে। এই শর্তের কারণেই দুনিয়া থেকে কলোনি উঠে যায়। শুধু তাই নয়, গায়ের জোর থাকলেই অন্যের দেশ ও সম্পদ দখল করা যাবে না, সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব মেনে চলতে হবে, – এসব আমেরিকান শর্তও মেনে নিতে হয়েছিল। যা তদারকের প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসঙ্ঘের জন্ম (১৯৪৪) হয়ে যায়। এ ছাড়া ইচ্ছামত মারধর নৃশংতা হত্যার যুদ্ধ করা যাবে না, বরং যুদ্ধের আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন তৈরি হয়ে যায়, যেগুলো মেনে চলতে হবে। জেনেভা কনভেনশন ১৯৪৯ সালে এর জন্ম, আর এর আগে ১৯৪৮ সালের হিউম্যান রাইট চার্টার রচিত হয়ে যায়। এ ছাড়া, আরো পরে ১৯৬৬ সালের জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক সিভিল ও পলিটিক্যাল রাইট (ICCPR) রচিত হয়ে যায়। সংক্ষেপে বললে, এ সবগুলো আইন, কনভেনশন বা চুক্তির সারকথা হল, গায়ের জোর থাকলেই আর সবকিছু করা যাবে না।
    কাজেই অন্যের স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্ব অমান্য, দেশ দখল, নাগরিক মানুষের অধিকার না মানা- এসব ইত্যাদি পেরিয়ে এসে গ্লোবাল ইতিহাস আজকের দুনিয়াতে দাঁড়িয়ে – ফলে কেবল ‘আমি সাদা তাই আমার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নাও”- বলে একালে শুধু এই সাদাবাদীরা কতদুর যাবে; এ কথা বলে কতটুকু তারা আগাতে পারবে? তবে হ্যাঁ পরোক্ষ শাসন সম্ভব, যদিও তা দূর থেকে প্রভাব রাখা প্রভাবিত করা অর্থে হতে হবে। একালে আমেরিকা ইরাক দখল করেছে, ছেড়েও দিয়েছে। পুতুল শাসক রেখে শাসন করেছে- এসব পরোক্ষ কাজ সম্ভব। যদিও কফি আনানের মুখ থেকে – ইরাকে আমেরিকা ‘দখলদার বাহিনী’- এই রায় শুনেও ক্ষমতাধর আমেরিকাকেও চুপচাপ সেকথা হজম করে থাকতে হয়েছে।

    এসবের সারকথা হল, যে কলোনি শাসন আমলের সাদা শ্রেষ্ঠত্বের স্বপ্ন এরা এখন আঁকছে; অথচ সেই শাসন বহাল ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে, পরে নয়। দুনিয়া এখন সে জায়গায় নেই। খোদ ইউরোপের সব রাষ্ট্রকেই কলোনি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। পরবর্তিতে সাদা চামড়ার গরম বা শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে সেই পঞ্চাশ-ষাটের দশকেই তারা কিছু রক্ষা করতে পারেনি। তাই প্রধান প্রশ্ন – ইউরোপের এখন যেসব রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আছে বা থাকবে, তাদের সকলকেই এসব হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট রাজনৈতিক ধারাগুলোকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে। করতে বাধ্য নইলে, জাতিসঙ্ঘে জবাবদিহি করতে হবে। সভ্যতার গরম ফুটা হয়ে যাবে। হয়ত এর আগে বিরাট একদল লোক এই আত্মগ্লানিতেই মারা যাবে।

    তার মানে সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দুনিয়া আবার কায়েমের যে উসকানি দেয়া হচ্ছে, এর মেনটর যারা, তারা হয় নাদান আর নাহলে নরেন্দ্র মোদির মতো চিন্তা্ আর দলের লোক এরা। অর্থাৎ তাদের উদ্দেশ্য হল, সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দুনিয়া আবার কায়েমের উসকানি – এই ন্যাশনালিজমের আওয়াজ তুলে আসলে ভোটের বাক্স ভর্তি আর ক্ষমতা পাওয়া। সাদা শ্রেষ্ঠত্বের কোন দুনিয়া কায়েম এদের আসল লক্ষ্য নয়, কম্মো না। সে মুরোদ নাই তা তারা জানে। ঠিক যেমন মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির মূল লক্ষ্য হল ভোটের বাক্স ভর্তি ও সরকারে আসা – আর এক হিন্দুত্বের ফ্যাসিজম কায়েম করে বিরোধী নির্মূল করা। তবে ইউরোপ নিশ্চয়ই ভারত নয়। স্বাধীন মর্ডান রিপাবলিক ইউরোপের নাগরিক্দেরকে তাদের চিন্তার উপর সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দুনিয়া কায়েমের স্বপ্ন ও লোভ দেখিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে এক ফ্যাসিজম কায়েম- সেটা বেশ কষ্ট কল্পিত অবশ্যই।

    এ ছাড়া আর একটা দিক আছে। একালের ক্যাপিটালিজম মানে কোনো একটা রাষ্ট্রের মধ্যেই কেবল সীমাবদ্ধ এমন কোনো ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটালিজম’ বলে কিছুই আর নেই। এক এবসার্ড কল্পনা মাত্র। ক্যাপিটালিজম মাত্রই গ্লোবাল। অন্য রাষ্ট্রের সাথে লেনদেন- পণ্য, পুঁজি, বাজার, বিনিয়োগ ইত্যাদি সব কিছুই এখন গভীরভাবে সম্পর্কিত থেকে বিনিময় এক্সচেঞ্জ করতে আমরা সবাই বাধ্য। এ অবস্থায় কোনো ‘সাদাদের ক্যাপিটালিজম’- এটা কোনভাবেই সম্ভব নয়। বরং উল্টো, সাদা লোকদের উৎপাদিত পণ্য প্রডাক্টের ক্রেতা কেবল সাদা চামড়ার লোকেরাই হোক, সেটা সাদা মানুষের চাওয়া হতেই পারে না।

    তার মানে সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদারদের বয়ানের সাফাইয়ের ঠিক-ঠিকানা নেই। অসঙ্গতিতে পরিপূর্ণ। যদিও উসকানি আছে চরমে। তবে এমন যেকোনো দাবিদারদের বয়ানে একটা কমন জিনিস আমরা দেখতে পেয়ে থাকি। তা হলো যে আইডেনটিটি বা পরিচয় (যেমন- এখানে আমরা সাদা চামড়ার খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠী পরিচয়) তারা দাঁড় করাক না কেন, তা তারা করবে এর কোনো অতীত অর্জনকে টেনে এনে। আর সেকালের এমন অর্জন বলে কোন কিছু থাক বা না থাক ঐ জনগোষ্ঠীর অতীতে অনেক শান-শওকত ছিল, প্রভাবশালী ছিল এমন গল্পগাথা তৈরি করে প্রচার করবেই তারা। এটাই সাদা-বাদী সুড়সুড়ি।

    দেখা যাচ্ছে, ব্রেন্টনের মেন্টর-পীরেরা গল্পগাথা তৈরির এ কাজে ক্রুসেডকেও তুলে এনেছে। কিন্তু ঘটনা হল, খ্রিষ্টান ইউরোপ তো ক্রুসেড জিতেনি। এ ছাড়া ক্রুসেড মূলত বারো-তেরো শতাব্দীর পরে ইউরোপেই আর কখনও জাগেনি। বরং পনেরো শতাব্দীর পর থেকে প্রধান শাসকগোষ্ঠী বা শ্রেণী বলতে ইউরোপ তা আর ধর্মতাত্ত্বিক-ভিত্তির কোনো শাসকগোষ্ঠীর হাতে থাকেনি; বরং ম্যানুফাকচারার, জাহাজ ব্যবসায়ী, কলোনি দখলকারি মাস্টার – এসব, আর ওদিকে আরেক চিত্র, মোটের ওপর যারা ছিল রাজতন্ত্রবিরোধী। এসব বৈশিষ্ট্যের মডার্ন রিপাবলিক রাজনৈতিক ধারার শাসন কায়েম হয়ে যায়। ক্রুসেডের সাথে যারা স্বার্থ আর বয়ানের দিক থেকে যোজন যোজন দূরে। তাহলে একালে এসে আবার ফিরে ত্রুুসেডের গর্ব তুলে অথবা হেরে যাওয়ার সহানুভূতি সে কার কাছে বেচবে? কার থেকে পাবে বলে আশা করে? মডার্নিস্ট ইউরোপের জনগণ কি ক্রুসেডের গর্ব অথবা মুসলমানদের হাতে হেরে যাওয়ার সহানুভূতির ভেতর আশ্রয় নিতে রাজি হবে? আসলে এটাকে এক কষ্ট-কল্পিত ফ্যান্টাসি বললেও কম বলা হয়।

    আর এক চরম স্ববিরোধিতাঃ সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদারদের বয়ানের আর এক বৈশিষ্ট্য হল, মাইগ্রেন্টবিরোধিতা [অভিবাসী=migrant]। যেটা আসলে ‘অপর’ বা বিদেশী ভীতি ও বিরোধিতা; যাকে বলা যায় জেনোফোবিয়া [Xenophobia]। এটা অবশ্য সব ধরনের জাতিবাদেরই কমন ফিচার যে, তারা বিদেশী-বিরোধী হয়। তবুও ইউরোপের কোনো ধারার বয়ানধারীদের একালে মাইগ্রেন্টবিরোধী হওয়ার ক্ষেত্রে তা অবশ্যই শক্ত সাফাই তৈরিতে ব্যর্থ হবে। কারণ, যে ইউরোপের উত্থান বা ওর তরুণ বয়স কেটেছে অন্যের দেশ দখল করে, কলোনি শাসন করে সেই পুরান কলোনি-দেশ থেকে কয়েকজন নেটিভ মাস্টারের দেশে এসে বসবাস শুরু করলে তা না জায়েজ, এমন কথা সে কিসের ভিত্তিতে বলবে? সে কারণে এদের এই তথাকথিত মাইগ্রেন্টবিরোধিতার বয়ান বর্ণনা তৈরির ভিত্তি দেয়া মুশকিল হবেই। তা ছাড়া, মাইগ্রেন্টরা তো নিজে জোর করে ইউরোপে ঢুকে যায়নি। ইউরোপের অর্থনীতি ভালো চললে বাড়তি লেবার দরকার, তাই মাইগ্রেন্টদের স্বাগত জানানোর নীতি নিয়েছিল তারা, বলেই মাইগ্রেন্টরা এসেছে। অর্থনীতি খারাপ গেলে এখন এদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে খেদিয়ে দিতে চাইলেই ব্যাপারটা তত সরল হবে না, এতাই স্বাভাবিক।

    তবুও আচ্ছা ধরা যাক। সাদা শ্রেষ্ঠত্বের বয়ানদাতাদের অভিবাসীবিরোধিতা জায়েজ। সে ক্ষেত্রে তারা আসলে  ত সাধারণভাবে বিদেশীবিরোধী হওয়ার কথা। আর সেই বিদেশী কোন ধর্মের তাতে কিছু এসে যায় না, এমনই হওয়ার কথা। কিন্তু তাহলে ব্রেনটনেরা মুসলমানদের ওপর হামলা করছে কেন? মুসলমানবিদ্বেষী কেন? এটা তো সাদাবাদীদের বয়ানের সাথে মিলল না! যেমন- হিন্দু ভারতীয় এমন নাগরিকেরা ইউরোপে ঢুকেছে এমন ক্ষেত্রে তারাও কি সাদা শ্রেষ্ঠত্বের বয়ানের চোখে মাইগ্রেন্ট বলে গণ্য হবে? আমরা নিশ্চিত, মনে হয় না। আসলে সাদাবাদীরা কি অভিবাসীবিরোধী নাকি মুসলমানবিরোধী – সে ফয়সালা তাদের আগে করতে হবে। কারণ – দু’টার সাফাই তো দুই রকম হতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মুখে তারা অভিবাসীবিরোধী কিন্তু কাজে ইসলামোফোবিক। তাদের বয়ান এমনই সব গরমিলে ভর্তি। তবে খুব সম্ভবত ওয়ার অন টেররের কারণে পাশ্চাত্য একালে সঙ্গোপনে অথবা প্রকাশ্যে মূলত ইসলামোফোবিক। এই ফোবিয়ার তেলে নিজেদের মাছ ভাজতে সাদাবাদীরা বাস্তবে ইসলামোফোবিক হয়ে উঠছে।

    তবে এই প্রথম আমরা দেখছি সাদা চামড়ার প্রধান ধারা (সাদাবাদী নয় যারা) এমন আমপাবলিকেরা অপরাধবোধে ভুগছে। কারণ, সাদাবাদীদের নৃশংসতার দায় তাদের উপরও এসে পড়ছে। সেটাই নিউজিল্যান্ডে আমরা ঘটতে দেখছি। তাই সাদাবাদীদের থেকে নিজেদের আলাদা করে দেখাতে তাদের এই হেডস্কার্ফ প্রতীক নিয়ে সংহতি প্রকাশ। আপাতত এতটুকু বিচার করেই বলা যায়, সাদাবাদীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। বিশেষত নিউজিল্যান্ডের মত প্রধানমন্ত্রীর  নুন্যতম অবস্থান যদি সে দেশে থাকে। বাকিটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
    প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা এ ভাবটাই পৌঁছে দিতে শতভাগ সফল হয়েছেন বলে প্রশংসিত। আমাদের স্বার্থেই জেসিন্ডার পাশে, প্লুরালিজমের [Pluralism] পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে।

    যে কোন শ্রেষ্ঠত্ববাদই বিপদজনক, যা আপনাকে কোন না কোন একটা রেসিজমে পৌছে দিবে। ফলে সাবধান!

    তবে তামাসা উপভোগের জন্য বলিতেছি – উগ্র জাতিবাদী আনন্দবাজারও জেসিন্ডার পক্ষে দাঁড়িয়ে মূল এক সম্পাদকীয় লিখিয়াছে – আগ্রহিরা ইহার সাধু-ভাষার মজা উপভোগ করিতে পারেন; যার শিরোনাম অ-স্বীকার।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৩ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা বয়ানের গরমিলে হারবে“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]