Tag: Terrorism

  • ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে ইসলামবিদ্বেষ

    ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে আলী রিয়াজের ইসলামবিদ্বেষ
    গৌতম দাস
    ২৮ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার

    ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে ইসলামবিদ্বেষ

    গুলশান হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর পশ্চিমের “সন্ত্রাসবাদ” প্রসঙ্গে পুরান অকেজো আর ইসলামবিদ্বেষী কথাবার্তাগুলো আবার সচল হতে শুরু করতে দেখা যাচ্ছে। ফরেন অ্যাফেয়ার্স আমেরিকার “সম্ভ্রান্তজনদের” পত্রিকা। আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করে এমন পত্রিকা। সেখানে গত ৬ জুলাই এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। যার শিরোনাম ‘বাংলাদেশ’স হোমগ্রোন প্রবলেম, ঢাকা অ্যান্ড টেররিস্ট থ্রেট’। আর এর যুগ্ম লেখক, আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি। লেখার দুটো বড় সমস্যা। এ ধরনের লেখা আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের সুপরামর্শ দেয়ার বদলে মিথ্যা ভিত্তিহীন ধারণা দিয়ে বিভ্রান্তই করবে। এছাড়া কিছু জনস্বার্থবিরোধী বেকুবি কাজ খোদ আমেরিকানরাই অনেক সময় করে থাকে। [ফরেন এফেয়ার্সের মূল আর্টিকেলটা এখানে কপি করে রাখা আছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন। ]
    প্রথমত, যে চিন্তা-ফ্রেমের আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে লেখকদ্বয় কথা বলছেন তা হলো “সেকুলারিজম”। সেটা যেন আমাদের নজর না এড়ায় সে জন্য লেখায় দু’বার  শক্তভাবে সেকুলারিজমকে রেফারেন্স হিসাবে উল্লেখও করেছেন। লেখকেরা আওয়ামী লীগকে মিষ্টি ধমক দিয়েছেন এই বলে যেন বলছেন, “তোমরা না সবচেয়ে বড় সেকুলার দল। তোমাদের কী এমন করা সাজে?”- এ রকম। অথচ বাস্তবতা হল, আওয়ামি লীগই সবচেয়ে ভাল বুঝে – কী করে, কখন সেকুলারিজম নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়। আবার কেন লেখকদ্বয়ের ‘সেকুলার-বোধের’ ভেতরেই আমাদেরকে সমাধান খুঁজতে হবে এটাকে প্রশ্ন করা যায়। এমন প্রশ্ন কখনো তারা নিজেদের করেছেন কি না তাও জানা যায় না। ঐ বোধের ভিতরে, সেখানেই কোনো সমস্যা আছে কি না আগে সেটা তাদের যাচাই করা উচিত। সেকুলারিজমের অনেক ব্যাখ্যা আছে। আমরা তাদেরটার কথাই বলছি। এমনিতেই ভারতীয় উপমহাদেশে যে সেকুলারিজম ধারণা দেখতে পাওয়া যায় সেটা আসলে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
    ইসলামের বিরুদ্ধের তাদের ঘৃণা-বিদ্বেষকে আড়াল করতেই সেকুলার শব্দটা ব্যবহার করা হয়। কেউ যদি মনে ঘৃণা পুষে রাখে আর দাবি করতে থাকে যে তার বুঝের সেকুলারিজমের ভেতরই সমাধান হতে হবে- সে ক্ষেত্রে এখান থেকে আর কী বের হতে পারে তা বলাই বাহুল্য। ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা ঘটনাগুলোর জন্য সরকার আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করছে না, বিএনপি-জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে- এমন এক গিভেন বা আগাম অনুমিত কাঠামোর ওপর লেখাটা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এটা স্টার্টিং পয়েন্ট। উল্টো করে বললে লেখাটার ভাষ্যটা এমন নয় যেমন সরকারি ভাষ্যে বলা হয় যে, আইএস বা ইসলামি চরমপন্থীরা এগুলো করছে বটে তবে বিএনপি-জামায়াতই আইএস বা আলকায়েদা। অথবা ইসলামি চরমপন্থীরা আসলে ছদ্মবেশী বিএনপি-জামায়াত অথবা সহযোগী – তা-ও নয়। লেখায় একেবারে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ‘হাসিনা বরং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং এর এক রাজনৈতিক সহযোগী দল জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।’ (Instead, Hasina has passed the blame onto the principal opposition party, the Bangladesh Nationalist Party (BNP) and one of its allies, the Islamist Jamaat-i-Islami.)। এই পরিষ্কার চিরকুট সার্টিফিকেট বাক্যটা ইন্টারেস্টিং। অর্থাৎ সরকারের বয়ানের কিছুই লেখকেরা শেয়ার করছে না, মানছেন না। আর বলতে চাচ্ছেন সন্ত্রাসী ঘটনাগুলোর জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ বা দায়ী করা ঠিক নয়। এগুলো


    Islamophobia বা ইসলাবিদ্বেষ  বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছিঃ
    কারও বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী  বলা হয়। এখানে ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা ঘৃণা বা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। এর ধরণের রেসিজম।


    জেনুইন এবং এর আলাদা কর্তা আছে। তাহলে বাকি থাকল সরকারের আইএস বা আলকায়েদার উপস্থিতি স্বীকার করছে না কেন তা নিয়ে আলী রীয়াজের অভিযোগ। তবে অবশ্যই বলা যায়, সরকার এটা কেন করছে না তা অন্তত আলি রিয়াজের জানা থাকার কথা। কথাটা বলছি এ জন্য যে, এক কথায় বলা যায়, সরকারের স্বীকার না করার জন্য আমেরিকার পুরানো কিছু কৃতকর্ম দায়ী। বুশের আমলের বিশেষ করে বিগত ২০০৪-০৬ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়া যায়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের ওপর মুসলমান। শুধু এই ফিগারটাই তখন থেকে হয়ে গিয়েছিল দোষের। কারণ বুশের ওয়ার অন টেরর – এর লাইনের বোঝাবুঝি অনুসারে,  মুসলমান=টেররিস্ট। এখানে মুসলমান বলতে লিবারেলসহ যে কোন মুসলমান বুঝতে হবে, কারণ সেসময় তাই বুঝানো হয়েছিল ও হত। অতএব ৯০ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ মানেই এক ভয়ঙ্কর যায়গা। মুসলমানের বাংলাদেশ নিশ্চয় সব টেররিস্টে ভর্তি, গিজগিজ করছে। যদিও এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের কমবেশি সবসময় ছিল। আর ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বুশের আমলে এর সাথে যোগ দেয় বুশ প্রশাসন। আসলে এটাই হল গোড়ার ইসলামবিদ্বেষ। আর তাদের নিজেদেরই ধারণ করা ইসলামবিদ্বেষ সমস্যার সমাধান হল টোটকা বিশেষ সেকুলারিজম। টোটকা বিশেষ বলা হল এজন্য যে, যা নিজ বিশেষ ‘হিন্দু’ ধারণার ‘অপর’ – সেই অপর মুসলমানকে বুঝার বদলে একটি বিদ্বেষ, একটা বিদ্বেষের এপ্রোচ থেকে এর জন্ম। আর সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম সম্পর্কে আমরা জানি এটা সেই সেকুলারিজম নয়। যেমন মডার্ন স্টেট মানেই একধরনের সেকুলার বৈশিষ্ট্যের স্টেট এই ধারণা থেকে এর জন্ম নয়।
    যা-ই হোক, সেকালে বাংলাদেশের মত যে কোনো মুসলমান জন-আধিক্যের রাষ্ট্র-সমাজ মাত্রই – যারাই বুশের মুখোমুখি হয়েছিল তারা দেখেছিল – বুশের অজানা ভয় ও ইসলামবিদ্বেষমূলক ভাবনা থেকে উৎসারিত হয় ওয়ার অন টেরর। ফলে সে সময় বুশ প্রশাসন বারবার বিএনপি সরকারকে চাপ দিয়েছিল দেশে আলকায়েদা বা সন্ত্রাসী উপস্থিতি আছে স্বীকার করে নিতে। মুল কথা ছিল দেশে “সন্ত্রাসী” থাক আর না থাক, বুশের প্রেসক্রিপশন বা করণীয় তালিকা অনুসরণ করে যে কোন মুসলমান প্রধান রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজাতে হবে।  গ্লোবাল ইসলামবিদ্বেষের পোয়াবারো অবাধ চর্চা শুরু হয় তখন থেকে।
    কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তা হল, আলকায়েদার উপস্থিতি আছে কি না আছে সেটা নয়, বরং আছে এই অজুহাত তুলে হস্তক্ষেপ করে শেষে বিষয়টাকে ভিন্নদিকে নিয়ে আমেরিকা দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করেছিল আর ‘মাইনাস টু’ করার চেষ্টা নিয়েছিল। এটা সত্যি যে, ওই পরিস্থিতিতে হাসিনা নিজের নগদ লাভের বিবেচনায় ঐ সময় আমেরিকান সেই অবস্থানের পক্ষে প্রকাশ্যে সায় দিয়েছিল এবং আমেরিকানদের তালে তালে একই প্রচারে গিয়েছিল। অর্থাৎ সেকালের আলকায়েদা (বা একালের আইএস) আছে স্বীকার করিয়ে নেয়া ব্যাপারটা ঠিক স্বীকার অস্বীকারের ইস্যুতে বা এর মধ্যে আটকে থাকেনি – বরং হয়ে দাঁড়িয়েছিল ক্ষমতা দখল করে কোনো দীর্ঘস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম আর মাইনাস টুর ইস্যু হাজির করা। হাসিনার কাছে একালে তাই ব্যাপারটা একই আলোকে দেখবার, এমনই আমেরিকার ইচ্ছা কী না, আগের মতই করবে এমন ভাবা – এ্টাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই হাসিনার সরকারের আমলে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করতে তাঁর এত অনীহা। কারণ করলে কী হয় সেটা সে আগে দেখে ফেলেছে। সে ফল খেয়েই সে আজ ক্ষমতায়। অতএব একালে আমেরিকানদের পক্ষে আগের আলকায়েদার জায়গায় এবার আইএস স্বীকার করাতে গেলে প্রত্যক্ষ সাক্ষী হাসিনার অনীহা ও বাধার মুখোমুখি তো তাদের হতেই হবে।
    আবার আরো কতগুলো নতুন দিক আছে এবারের পরিস্থিতিতে। হাসিনার পক্ষে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করার অর্থ কী হবে? কী দাঁড়াবে? এর সোজা অর্থ হবে ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা রোধে সংশ্লিষ্ট বিদেশী-দেশী রাষ্ট্র প্রতিনিধির সমন্বয়ে প্রতিরোধে কমিটি না হলেও মনিটরিং ধরণের কিছু কমিটি তৈরি হয়ে যাবে বা করতে হবে। অন্ততপক্ষে দেশী-বিদেশীদের নিয়ে একটি মনিটরিং ও সমন্বয় কমিটি ধরনের কিছু একটা হবে। এর মানে হবে এখন যেমন কাউকে সন্ত্রাসী বলে ধরে তাকে ক্রসফায়ার করে দেওয়া অথবা কী করা হবে বা হল এর ব্যাখ্যাদাতা একক কর্তা সরকার। এখানে সে যা মনে চায় ব্যাখ্যা দিতে পারে, আর সেটা নিজের একক এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে থাকে ও আছে। কিন্তু মনিটরিং কমিটি একটি হয়ে গেলে সেক্ষেত্রে বিষয়টা তখন মনিটরিং ও সমন্বয় ধরণের কমিটির সাথে শেয়ার করতে হবে। এবং অন্তত সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ওই কমিটিতে ‘সন্ত্রাস’ দমন করেছি বলে সরকারের দাবি করা যে কোন কাজ- ততপরতার ব্যাখ্যা ঐ কমিটির কাছে হাজির করতে হবে। যেটা এখনকার সিস্টেম অনুসারে, জনগণের কাছে দেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা সরকার বোধ করে না, নাই। যেমন ক্রসফায়ার করলে ওই ধরনের কমিটির কাছে সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা হাজির করতে হবে। ফলে পরিণতিতে এক কথায় বললে এখন যেভাবে সরকারের বিরোধী বিএনপি-জামাত ধরণেরসহ সব রাজনৈতিক দলের যে-কাউকে যা খুশি করার বা ভয় দেখিয়ে দাবড়ে রাখার সুযোগ আছে, তা পুরোটা না হারালেও অনেকখানি  সীমিত হয়ে যাবে। এই অর্গল খুলে দিলে বা ঢিলা হয়ে গেলে আবার রাস্তার আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে যেতে পারে। এ সবকিছু মিলিয়েই সরকার আইএসের উপস্থিত আছে এটা স্বীকার করার বিরোধিতা করে যাচ্ছে। উলটা দেশের মানুষ অথবা সরকার নিজে বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, তাকে  বলে যেতে হচ্ছে যে “বিএনপি-জামাত সব জঙ্গী কার্যক্রম করছে”।
    বিএনপি আমলে যে পথে আমেরিকা একবার আকাম করেছে সেটা এখন উদোম হয়ে গেছে। তাই সেই একই পথে হাসিনা সরকারকে এবার পরিচালিত করা বা ঠেলে দেওয়া আমেরিকার জন্য কঠিন হচ্ছে। তবে সবচেয়ে তামাশার দিক হলো আলি রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি এখন বলছেন, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল মানে যুদ্ধাপরাধের বিচার নাকি বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। শব্দটা ব্যবহার করেছেন ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’, মানে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। (Meanwhile, a widely criticized International Criminal Tribunal has sentenced as many as nine key Jamaat-i-Islami members to the death penalty. Four have already died.) মানে সমালোচিত হওয়ার বিষয়টাকে আমলে নিচ্ছেন লেখকদ্বয়। অর্থাৎ ঐ ট্রাইবুনালের বিচার প্রক্রিয়ার কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। আর এ কথা তুলেছেন, ডেইলিস্টার ও প্রথম আলোর সম্পাদকদের বিরুদ্ধে কী কী আইনি অপব্যবহার ও হয়রানি করা হয়েছে অথবা পলিটিসাইজড জুডিশিয়ারি ব্যবহার করা হয়েছে এর উদাহরণের সাথে। কারা এই “ব্যাপকভাবে সমালোচিতকারী” সমালোচক?  এই সমালোচকদের দলে তো আমরা এই লেখকদ্বয়কে দেখিনি।অথবা  তাঁরা আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টকে এমন কোনো কী পরামর্শ রেখেছিলেন অথবা কোনো প্রকাশ্য আর্টিকেল? আমরা দেখিনি, জানা যায় না। বরং আমরা লক্ষ করেছিলাম ‘জামায়াত নেতাদের ফাঁসি হলে ইসলামি রাজনীতি নাকি বাংলাদেশে নির্মুল হয়ে যাবে’ এরই উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা। অতএব এখন সেসব কথা বলে লাভ কী? কারণ এই প্রশ্নবিদ্ধ বা ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’ বিচারের মধ্য দিয়ে পুরা বিচার বিভাগকেও পলিটিসাইজ করে ফেলার কাজটা হয়ে গিয়েছে। ইন্টারনাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সর্বশেষ রিপোর্টে (এশিয়া রিপোর্ট নং ২৭৭। ১১ এপ্রিল ২০১৬) বাংলাদেশের সংকট মিটানোর প্রথম কাজ হিসাবে এই পলিটিসাইজ বিচার বিভাগকে ডিপলিটিসাইজ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে কথাটা আমার না। কিন্তু এর দায় কার?  আজ আমেরিকা যদি মনে করে থাকে ওই বিচার বিতর্কিত ছিল তবে এর এমন কোনো প্রকাশ আমরা ‘যুদ্ধাপরাধবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টেফান জে র‌্যাপের তৎপরতায় দেখিনি কেন? সে প্রশ্ন তো লেখকদ্বয় তুলছেন না। ওই বিচারের পদ্ধতিগত দিকে কোনো মেজর ত্রুটির ব্যাপারে তিনি কখনো কথা তুলেছিলেন, আমরা দেখিনি। কেবল ফাঁসির বিরুদ্ধে তারা, মানে ফাঁসি ছাড়া অন্য যে কোন শাস্তির কথা বলেছেন। কিন্তু সেটা তো বিচারের ত্রুটির ইস্যু নয়। তাহলে আজ আমেরিকা যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ‘ব্যাপকভাবে সমালোচিত’ বিচার মনে করলে এর দায় থেকে আমেরিকাও বাইরে নয়। অন্তত আলী রীয়াজও এসব দায়ের কতটুকু বাইরে সে বিচারও তাকে নিজেই করতে হবে।

    এখনকার আইএসের উপস্থিতির স্বীকারোক্তি করা না করা নিয়ে আলী রীয়াজ এত কথা তুলছেন। এটা সবাই জানে আইএস সশস্ত্র ও রক্তাক্ত ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতাই তার প্রধান কাজ। আমরা যদি প্রকাশ্য গণতৎপরতা আর গোপন সশস্ত্রতা এদুইয়ের মাঝে মোটা দাগে একটা ফারাক বুঝতে পারি তাহলে ২০১৩ সালেই হেফাজতের প্রকাশ্য গণতৎপরতা দেখে অস্থির হওয়ার কী ছিল। ওটা নিশ্চয় আরযাই হোক  অন্তত ‘সন্ত্রাসবাদ’ ছিল না। ওটা ছিল একটা গণক্ষোভ। প্রধান কথা, ওটা মাস অ্যাকটিভিটি, কোনো ‘সন্ত্রাসবাদী’ ঘটনা নয়। যদি ওটাকে সন্ত্রাসবাদ বলেন, তাহলে আইএসকে কিছু বলার থাকে না। অথচ হেফাজতের তৎপরতাকে ভয়ঙ্করই মনে করা হয়েছিল। ভেবেছিলেন তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ দেখছেন। এই গণক্ষোভকে মিস হ্যান্ডলিং করার দোষেই কী আসল “সন্ত্রাসবাদ” আইএস এখন হাজির হয়নি? মিস ান্ডিলিংয়ের একটা প্রধান কারণ কী ইসলামবিদ্বেষ নয়? তাই মিস হ্যান্ডলিংয়ের কারণেই সরকার ইসলামবিদ্বেষী পরিচয় য়ার স্পষ্ট হয়েছে, সরকারের গণবিচ্ছিন্নতা বেড়ে চরম হয়েছে।
    আর কে না জানে যেকোনো সরকারের ‘ইসলামবিদ্বেষী’ পরিচয় আর ‘গণবিচ্ছিন্নতা’ এগুলোই আইএস ধরনের সংগঠনকে ডেকে আনে। তাদের হাজির হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফেবারেবল, লোভনীয় পরিস্থিতি মনে করে তাঁরা। এগুলোই পাঁচজন আঠারো বছরের ছেলে ১০ ঘণ্টা ধরে সরকার  কাপিয়ে দিয়ে গেল এমন হিরোইজম দেখতে সাধারণ মানুষকে একবার উদ্বুদ্ধ করে ফেলতে পারলেই
    সব শেষ।

    আলী রীয়াজের সেকুলার বুঝের ব্লাসফেমি ভুত দেখা
    আলি রিয়াজ বিগত ২০১৩ সাল থেকে হেফাজতের আন্দোলনে “ব্লাসফেমি আইনের নাকি দাবি” করা হয়েছে একথা মুখস্থের মত বলে যাচ্ছেন, অথচ এটা আর একটা মিথ্যা ও ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য। আর সবচেয়ে বড় কথা ব্লাসফেমি আইনের দাবি কখনোই হেফাজত করেনি। অথচ এটা যাচাই না করেই কেউ আগাম হেফাজতকে খারাপ দেখতে চাইলে যা হয় তাই হয়েছে। মজার ব্যাপার হল, সেই ব্রিটিশ আমল ১৮৬০ সাল থেকেই পেনাল কোডে এই আইনটা আছে। পেনাল কোডের ধারা ২৯৫ থেকে ২৯৮ সম্পর্কে তিনি জানেন, পাতা উল্টিয়েছেন মনে হয় না। অতএব হেফাজত দাবি করে থাকুক কী না থাকুক ব্লাসফেমি বা ধর্মের অবমাননা সংক্রান্ত আইন বৃটিশ আমলেই পেনাল কোডে রাখা আছে। আর তাই ব্লাসফেমি আইন করার জন্য বৃটিশরা নিশ্চয় বড় মৌলবাদী গোষ্ঠী? না কী?

    দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, ব্লাসফেমি ইংরেজি শব্দ। ফলে কওমি আলেমরা এমন ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করবেন কেন? আসলে, তাদের দাবি ছিল তাদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, তাকে অপমান করা হয়েছে, বেইজ্জতি করা হয়েছে। ফলে এর প্রতিকার চান তারা; আইন ও শাস্তি চান। যেকোনো গণক্ষোভের (বা সিভিল ডিস-অবিডিয়েন্সের) বেলায়  ব্যাপারটা এমনই হয়, এভাবেই গড়ায়। বরং তারা কোনো সশস্ত্র তৎপরতায় নয়, আইনসঙ্গতভাবে মাস তৎপরতায় সমাবেশ ডেকে সরকারের কাছে আইন দাবি করেছিলেন, শাস্তি চেয়েছিলেন। নিজেই কোনো ধর্মীয় আইন বা ফতোয়া জারি করেননি। সে আইন প্রয়োগ করেননি, কাউকে দায়ী করে কোতল করেন নাই। এ ছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল – হেফাজত কোন কল্পিত কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্রের কাঠামোতে নয়, একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতেই একটি আইন চাইছিলেন। অতএব দুইটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্ট হল – এক.  হেফাজত আইএস এর মত কোন গোপন ও সশস্ত্র কায়দার সংগঠন নয়, ফলে অমন কোন সংগঠন হয়ে  সে  ঢাকায় হাজির হয় নাই, আসে নাই। গণবিক্ষোভ জানাতে পাবলিক সমাবেশ করেছে। সবাইকে জানিয়ে, সবাইকে নিয়ে এবং প্রকাশ্যে। অথচ আমরা তাকে ট্রিট করেছি ওকে ‘সন্ত্রাসী’ দাবি করে। আমাদের সরকার ও জনগণের একাংশের গভীর ইসলামবিদ্বেষ থেকে তাঁরা প্ররোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় পয়েন্টঃ হেফাজত দাবি করেছে একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতে একটা আইন করে সমাধান। কিন্তু সেকুলারিজমের নামে আমাদের ইসলামি বিদ্বেষী মন সেটা দেখতেই পায় নাই। কারণ কী দেখে কী চিনতে হয় আমরা জানি না, আমরা এমনই দিগগজ! কিন্তু আমাদের মন ভর্তি হয়ে আছে ঘৃণা আর বিদ্বেষে। তাই জবরদস্তিতে দাবী করছি হেফাজত না কী ব্লাসফেমি আইন চাইছে!    এখন নিশ্চয় আমাদের সেকুলাররা পরিস্কার ভাবে মানবেন যে হেফাজতকে মিসহান্ডলিং করা হয়েছে। ইসলাম বিদ্বেষের কারণে তারা তা করেছেন। সেখান থেকে আস্তে আস্তে সরকার গণবিচ্ছিন্নতার শুরু। এর তলানীতে ঠেকা অবস্থায় আজ এভাবেই কী বাংলাদেশকে  আইএস ধরণের রাজনীতি বিকাশের জন্য সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র বানায়ে হাজির করা হয় নাই? যেটা আসলে আইএস ততপরতাকে দাওয়াত দেয়ার সামিল। অথচ আমরা কিছুই লক্ষই করিনি, বুঝতেই পারিনি। কারণ, কী লক্ষ্য করতে হবে আমরা তাই জানি না। আমরা খালি নাকি সেকুলারিজম বুঝি।

    আসলেই কী বুঝি? বিগত ২০১৩ সাল থেকে দেখছি আমাদের যাদের মন ইসলামিবিদ্বেষী তারা হেফাজত ঘটনার মিডিয়া রিপোর্ট করার সময় হুবহু কওমি আলেমদের দাবিটা উল্লেখ না করে নিজের বিদ্বেষের জ্ঞান জাহির করতে আলেমদের ভাবনাকে খ্রিষ্টীয় অনুবাদ করে লিখে দিলেন- “আলেমরা ব্লাসফেমি আইন চেয়েছে”। আলী রীয়াজ যাদের একজন। ওই রিপোর্টাররা কী জানেন ব্লাসফেমি খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় অবমাননাবিষয়ক শব্দ। এই শব্দ ইসলামের আলেমদের নয়, হতেই পারে না। অতএব এটা তাদের শব্দই নয়। এটা অবুঝ ও বেকুবদের শব্দ। আমরা সেটা আলেমদের মুখে জবরদস্তি সেঁটে দিতে দেখেছি। বিশেষ করে যারা ইংরেজি মিডিয়া রিপোর্ট করলেন তাদের কেউ কেউ গোলামি মনের সমস্যায় ভাবলেন নিশ্চয় ব্লাসফেমি শব্দ ব্যবহার করলে ইংরেজিতে ব্যাপারটা সঠিকভাবে ইংরেজিভাষী বা বিদেশীদের বুঝানো যাবে। আর কেউ কেউ ভাবলেন এটাকে সরকারের পক্ষে ক্রেডিট আনার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। দেশে বিদেশে সবাইকে জানালেন যে, ব্লাসফেমি আইনের জন্য নাকি বাংলাদেশে ইসলামি ‘পশ্চাৎপদ’ হুজুরদের সমাবেশ হয়েছিল। আর এতে সরকারকে হিরো হিসেবেও তুলে ধরা গেল যে ‘ইসলামি সন্ত্রাসবিরোধী’ কাজ হিসেবে সরকার কওমি আলেমদের ঠেঙিয়েছে। অথচ কোথায় আলেমদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে খারাপ কথার শাস্তি দেয়ার আইনের দাবি আর কোথায় একে ব্লাসফেমি আইন বলে হাজির করে তুচ্ছ পশ্চাৎপদ অচল পুরানা মাল বলে তাদের হাজির করা হল। এছাড়াও আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই ব্যাপারটাকে ‘ডিফেমেশন অব রিলিজিয়নের” বিষয় হিসেবে দেখা ও সে অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রতিকারের প্রতিশ্রুতির বিষয় হিসেবে দেখে এর সমাধান দেয়া সম্ভব ছিল। আমার ধারণা ছিল না অন্তত আলী রীয়াজ ২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলনের সময় থেকে আলেমররা ‘ব্লাসফেমি আইনের’ দাবি করেছে বলার ভুলটা এত দিনেও তিনি লালন করছেন। এই ভুলটা কাটানোর জন্য সেসময় থেকেই নানা আর্টিকেল বাজারে এসেছে।  তাহলে এমন ভুল ধারণা লালন যারা করেন তাদের কী ‘অবস্কিউরানিস্ট’ বা স্থবির অচল, যারা নতুন গ্রহণ করে না- বলা চলে! আলী রীয়াজ এই ‘অবস্কিউরানিস্ট’ শব্দটাই ব্যবহার করেছেন হেফাজতের আলেমদের বিরুদ্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘অবস্কিউরানিস্ট’ রিলিজিয়াস গ্রুপ দ্যাট ডিম্যান্ডেড দা ইন্ট্রোডাকশন অফ এন অ্যান্টি-ব্লাসফেমি ল ইন ২০১৩।’ (Hefazat-e-Islam, an obscurantist religious group that demanded the introduction of an anti-blasphemy law in 2013)
    সোজা কথায় বললে আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলির মতো আমেরিকান বন্ধুদের ও খোদ আমেরিকাকে আগে ঠিক করতে হবে তারা আসলে কী চান। সফল ইসলামবিদ্বেষ চাইলে অথবা আলেমদের অচল মাল বা পশ্চাৎপদ হিসেবে দেখানো, এগুলো খুবই সহজ কাজ। আমরা কেউ কাউকে আমার পছন্দের ধর্ম অথবা নিধর্মের সমাজ নাস্তিকতায় নিয়ে যেতে পারব না। কারো ধর্ম খারাপ প্রমাণ করে কিছুই আগাতে পারব না। এর প্রয়োজনও নেই। বরং আমাদের কমন সুন্দর দিকগুলার গৌরব তুলে ধরে এক রাজনৈতিক কমিউনিটি গড়ে অনেক দূর যেতে পারি। নাইলে আমাদের জন্যই হয়ত অপেক্ষা করছে আইএস অর্থাৎ আলকায়েদার পথ। আমরা যদি ওইটারই যোগ্য হই তবে তাই হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সান হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অন লাইনে ১৮ জুলাই ২০১৬ সংখ্যায় (প্রিন্টে ১৯ জুলাই) ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার তা নানা সংযোজন ও এডিটের পর ফাইলান ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

  • যখন ভয়ে মানুষ যেচে সত্য কথা বলে

    যখন ভয়ে মানুষ যেচে সত্য কথা বলে

    গৌতম দাস
    ১৪ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার
    http://wp.me/p1sCvy-1uG

    গত ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান কাফের ঘটনা দেশি-বিদেশি সকলকে ব্যাপক নাড়া দিয়েছে। সিএনএন, বিবিসি আর আল-জাজিরা এই তিন আন্তর্জাতিক নিউজ চ্যানেল পুরা দশ ঘন্টা জুড়ে সমানে কভার করাতে, এছাড়া সময়ে লাইভ ব্রডকাস্ট করাতে সারা দুনিয়ায় খবরটা এত ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা যায়। এতদিন যে যা নিয়ম-নীতি মেনে অথবা কোন কিছুই না মেনে বেপরোয়াভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এই ঘটনা এবার এমন সবাইকে অভিমুখ বদলাতে, বিষয়টা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। এর মূল কারণ সম্ভবত এটা আলকায়েদা বা আইএস ধরণের ততপরতায় ভারতীয় উপমহাদেশের কোন দেশের উপর প্রথম হামলার ঘটনা। যা এর আগে দেখা যায় নাই। ভারতীয় মিডিয়া এই হামলার ঘটনাকে গত ২০০৮ সালের তাদের বোম্বাই হামলার সাথে বার বার মিলিয়ে দেখাতে চেয়েছে। প্যারালাল টানার চেষ্টাও করছিল। ভারতের মিডিয়ার এই অক্ষম প্রচেষ্টা ২০০১ সালের ৯/১১ এ টুইন টাওয়ারে হামলার সময় থেকে করে আসছে। অথচ বোম্বাই হামলা – হামলার ঘটনা হিসাবে অনেক ঘটনার সাথে মিললেও আমাদের মনে রাখতে হবে ভারতের ক্ষেত্রে এই ধরণের ঘটনাগুলোর উৎস কাশ্মীর কেন্দ্রিক যা কোন আন্তর্জাতিক ঘটনা না, বড় জোর হয়ত তা আঞ্চলিক ঘটনা বলে দাবি করা যায়। আর তার চেয়েও বড় কথা কাশ্মীর ইস্যু বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ধরণের ক্যাটাগরির ঘটনা। নিশ্চয় আমাদেরকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আর গ্লোবাল ইসলামি ফেনোমেনা যা পশ্চিমের চোখে “আন্তর্জাতিক টেরর মুভমেন্ট” – এর তো ফারাক টানতেই হবে। আসলে দুই ধরণের ঘটনাকে মিলিয়ে গুলিয়ে মিডিয়ায় দেখানোর চেষ্টা ভারতের পররাষ্ট্র নীতির কৌশল মাত্র। এটা দোষের নয় হয়ত, নিজের বয়ান খাড়া করার জন্য অনেক রাষ্ট্রই এমন করে থাকে। তবে স্বভাবতই এমন বয়ানের খাতক সবাই হবে এমন আশা ভারতের মিডিয়ার না থাকাই ভাল। সবাইকে এটা মেনে নিতেই হবে তাও নয়। অন্যদিকে যারা আইএসের উপস্থিতির বিষয়টা যে কোন উদ্দেশ্যে অস্বীকার করে যাচ্ছিল, বলা যায় এরা সবাই এর পরিণতির দিকটা উপেক্ষা করে এক ধরণের বেপরোয়া চলছিলেন একথা সত্যি হলেও তাদের কাছে সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারটা অজানা ছিল তা নয়। অথচ সকলেই একটা ভান কর গেছে যেন তারা এমন একটা কিছু ঘটবে বা ঘটতে যাচ্ছে জানতেনই না। অথবা অবস্থান হল যে দেখি না আগে বাস্তবে ঘটুক, ততদিনে আর একটু বেশিক্ষণ সুবিধাদি খেয়ে নেই। এজন্য এরাই হামলার ঘটনা ঘটবার পরেপরেই একেবারে উলটা গান ধরেছে, সব ছেড়ে ভদ্র সভ্য হবার চেষ্টা করছে,সেই সুবিধা খাওয়া শক্তি। হামলার ঘটনার শুরু পয়লা জুলাই রাত প্রায় পোনে নয়টা। তবে বাংলাদেশে এই প্রথম জিম্মি করার ঘটনা বলে ঘটনার ব্যাপকতা ও গভীরতার দিকটা বুঝতে সকলের সময় লেগেছিল। প্রায় রাত দশটার আগে কেউই ঘটনার মাত্রা ঠাহর করে বুঝতে সক্ষম হন নাই। এরপর সারারাত ধরে উতকন্ঠা শেষে জিম্মি উদ্ধার একশন অভিযান শুরু হয় সকালে অর্থাৎ ২ জুলাই সকাল সাতটা চল্লিশ মিনিটে। তাতে কী ঘটল সকালে, ফলাফল কী দাড়াল – সকাল দশটার আগে এর নিউজ মিডিয়ায় আসে নাই। তবে এরপর থেকে দিনভর ক্রমশ পরিস্কার হতে থাকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ।
    পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা ইদানিং মানে, গত কয়েকমাস ধরে বাংলাদেশের ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগী হয়ে উঠেছে। আগেকার দিনে দৈনিক পত্রিকা বলতে আমরা প্রিন্ট পত্রিকাই বুঝতাম। কিন্তু সেগুলো সবই এখন একই সাথে অনলাইনও হয়ে উঠেছে। অনলাইন মানে আগে যেমন ছিল, প্রতিদিনের খবর পরেরদিন সকালে একসাথে প্রিন্ট হয়ে বের হওয়া সে নিয়ম-ছন্দ এখানে ভেঙ্গে ফেলা। দিনের ঘটনা দিনেই যখন ঘটছে প্রায় তখনই প্রকাশিত করে ফেলা হল অনলাইনের বিশেষ বৈশিষ্ঠ। এমনকি ঘটনা উদ্ভাসিত হয়ে ঘটা শেষ পর্যন্ত ডেভেলপিং স্টোরি হিসাবে ক্ষণে ক্ষণে একাধিক রিপোর্ট বের করে ফেলা যায় ও হয় এখানে। এটাও অনলাইন পত্রিকার আর এক বিশেষ বৈশিষ্ঠ। আনন্দবাজার অনলাইন শুধু হয় নাই, নিয়মিত সম্পাদকের বাইরে অনলাইন সম্পাদক বলে আলাদা লোক নিয়োগ দিয়েছে। বাংলাদেশের পাঠক টানার জন্য আনন্দবাজার দিনের শুরুতে সরাসরি পাঠকের মেলবক্সে অনলাইন পত্রিকার লিঙ্ক পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। আরও আছে। পত্রিকায় আগে যে সাব-ক্যাটাগরি হেডিং করা খবর পরিবেশন করত যেমন – কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গের জেলা, রাজ্য, কেন্দ্র এরপর বিদেশ এভাবে মোটা দাগের ক্যাটাগরিতে ভাগ করে। এবার এর পাশাপাশি –কেন্দ্র আর বিদেশের মাঝখানে ‘বাংলাদেশ’ বলে নতুন ক্যাটাগরি যোগ করা হয়েছে। প্রতিদিন অন্তত এক বা একাধিক বাংলাদেশ সংক্রান্ত খবর সেখানে তোলা হয়ে থাকে। আর থাকে নতুন নিয়োগ পাওয়া– সম্ভবত বাংলাদেশ পাতার ভার যার উপর সেই “অমিত বসুর” একটা রিপোর্ট। যদিও এটা রিপোর্ট না কলাম, তা নিশ্চিত কর বলা মুশকিল। তবে যেটা নিশ্চিত তা হল অমিত বসুর রিপোর্ট মানেই – প্রধানমন্ত্রী হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে, উন্নতি হচ্ছে, পাকিস্তানের চেয়ে আগে যাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় মধ্যে ভাল বিনিয়োগ হচ্ছে, ইত্যাদির ঢেডা পিটানো প্রশংসাসুচক রিপোর্ট। আর বলা বাহুল্য এসবের বিপরীতে ‘বিএনপি-জামাত’ এর নানান নেতিবাচক ফেনোমেনায় তাদেরকে ভিলেন বানানো থাকে। সবমিলিয়ে এই হল অনলাইন সম্পাদক অঞ্জন বন্দোপাধ্যায়ের লেখা তাঁর আলাদা সম্পাদকীয়সহ সাজানো অনলাইন আনন্দবাজার, বাংলাদেশ যার বিশেষ ফোকাস।
    শুরুতে যেকথা বলছিলাম, ০২ জুলাই সকাল দশটার পর থেকে জিম্মি উদ্ধার কাহিনী নিউজ হয়ে প্রচারিত হওয়া শুরু করেছিল। দুপুর তিনটা চল্লিশ মিনিটে আনন্দবাজার অনলাইনের বাংলাদেশ নিউজ সেকশনে একটা রিপোর্ট আপলোড করা হয়। শিরোনাম “মধ্য এশিয়ার অর্থই অনর্থ ঘটাচ্ছে বাংলাদেশে!” – যার লেখক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী। লেখাটা মন্তব্য প্রতিবেদন ধরণের বলা যেতে পারে। লেখার প্রসঙ্গ বিচার করলে বুঝা যায়, বাংলাদেশের জিম্মি ঘটনার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা কী হতে পারে সে সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা দেয়া এর উদ্দেশ্য। অথবা হয়ত লেখককে সম্পাদকের অনুরোধটা হয়ত এমনই ছিল।
    হোলি আর্টিজানের ঘটনায় ভারতের সংশ্লিষ্ট ইন্টারেষ্ট বা কনসার্ণ গ্রুপের কিছু সাধারণ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এর মধ্যে প্রধান কমন প্রতিক্রিয়া হল, স্বভাবতই ভয়ভীতি। এছাড়া এথেকে উতসারিত পরের প্রতিক্রিয়া হল – যতটা সম্ভব দুরত্ত্ব তৈরি করে দাঁড়ানো যাতে তা ভারত ‘অ-সংশ্লিষ্ট’ এই ভাব তৈরি করে। ভারত এসব ছুয়ে নাই তা দেখান। এর মূল উদ্দেশ্য ভারত এসবে সংশ্লিষ্ট না ফলে ভারত যেন বাংলাদেশের সাথে টার্গেট না হয়। হামলা যেন না ছড়িয়ে ভারতে প্রবেশ না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখা পদক্ষেপ। যেমন এব্যাপারটা সবচেয়ে প্রতীকী প্রতিক্রিয়ার রূপ হল, কোন স্পষ্ট ঘোষণা না দিয়ে অনির্দিষ্ট ও হঠাত করে ঢাকা-কলকাতা ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ ট্রেন বন্ধ করে দেয়া। সাদা চোখে এসব পদক্ষেপ হয়ত অস্বাভাবিক না। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে জায়গায় আজ এসে পৌছছে তা সে জায়গায় আনতে ভারতের বাংলাদেশ নীতির দায় আছে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে ভারতের নীতি অবস্থানকে সাথে নিয়ে দেখলে তা বুঝা যাবে। সেক্ষেত্রে বলা যায় এটা বাংলাদেশকে বিপদে ফেলে এখন পালিয়ে যাওয়া, সম্পর্ক ও দায়–হীন বলে হাত ধুয়ে ফেলা – এভাবে ভারতের নিজেকে হাজির করার চেষ্টা।
    উপরে ভারতের সাধারণ প্রতিক্রিয়া বুঝাতে প্রথম শব্দটা লিখেছে ‘ভয়ভীতি’। মানুষ ভয় পেলে বয়ান ১৮০ ডিগ্রী বদলে ফেলতে পারে তাই যেন বুঝা গেল সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরীর এই লেখায়। মোট ৬৭৬ শব্দের এই লেখার প্রথম ৫৩৮ শব্দ তিনি ব্যয় করেছেন ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদ ব্যাখ্যা করতে বা বলা যায় দায়ী করতে। বলা বাহুল্য সেটা এক অর্থনীতিবাদী ঝোকের ব্যাখ্যা। দুনিয়ার সব অঘটনের জন্য ‘পুঁজিবাদ দায়ী’ করা ধরণের। এছাড়া এই ব্যাখ্যা-ধারা বলতে চায় – দুনিয়ার ঘটনাবলী ঘটে নৈব্যক্তিকভাবে, বা ঘটবেই ধরণের। ফলে যেন মানুষ দায়ী না, ঘটনার কর্তাও সে নয়। অথবা কর্তা কেউ নয় ও নাই। এই ব্যাখ্যার ঝোক, ঘটনার কর্তা দেখতে পায় না বা চায় না। তবে লেখক সব্যসাচীর লেখায় ‘পুঁজিবাদ’ মূল প্রসঙ্গ নয়, বরং যা তিনি বলবেন এর পটভুমি রচনার উপাদান বলা যায়। কী তিনি বলবেন?
    এককথায় বললে তাঁর বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী। ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের এর হামলাকারিরা কোন কিসিমের মাদ্রাসা ছাত্র নয়। বরং একেবারে দেশ-বিদেশের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং তাঁরা উচু সমাজের সন্তান। এসব প্রকাশ হয়ে পড়ার পর অনেকেই ব্যাপক অস্বস্তিতে ভুগছেন। কারণ এতে ‘সন্ত্রাস’ বিষয়ে তাঁদের সব গালগল্প আর গরীব-ঘৃণা উদোম হয়ে গেছে। লেখক সব্যসাচীও তাদের একজন তবে একটু ভিন্নভাবে। সারকথায় বললে, তিনি বলতে চাইছেন, পুঁজিবাদের কারণে, মধ্যপ্রাচ্যে মাইগ্রেটেড লেবার গিয়েছে। সেই লেবাররাই বাংলাদেশের “জঙ্গীবাদ” সমস্যার জন্য দায়ী। সব্যসাচীর নিজের ভাষায় পড়েন, “……পাঠানো অর্থে তাঁদের পরিবারদের সমৃদ্ধ করে তুলছেন, তাঁরা কিন্তু নিজেরা দ্রুত আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন ওই দেশগুলোর স্বাভাবিক ‘আফিমের নেশা’ ধর্মীয় উন্মাদনায়, বাড়াবাড়িতে। দারিদ্র্য,অশিক্ষা বা অল্প শিক্ষার জন্যই এটা হচ্ছে। তাঁরা মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর কড়া ‘ডোজ’-এর মৌলবাদে আকৃষ্ট হচ্ছেন। আর যে বাংলাদেশিরা রুটি-রুজির টানে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে যাচ্ছেন, শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য তাঁদের তেমন নেই বলে (যাকে ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ বলা হয়) তাঁরা চট করে ওই ‘সোনার হরিণ’-এর টানে মজে গিয়ে ওই ধর্মীয় ‘আফিম’-এর নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ছেন। তাঁদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে ওই ‘আফিমের নেশা’ (মৌলবাদ) আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে”।
    প্রথমত, সব্যসাচীর ভুগোল-বোধে সমস্যা আছে। তিনি আসলে বলতে চাইছেন মিডল-ইষ্ট বা মধ্যপ্রাচ্যের কথা। কিন্তু শব্দে সেটাকে বলছেন, “মধ্য এশিয়া”। কিন্তু ইষ্ট মানে তো এশিয়া নয়, প্রাচ্য। যে অর্থে ওয়েষ্ট বলতে যেভাবে পাশ্চাত্য বুঝি। আবার সেন্ট্রাল এশিয়া বলে আলাদা রিজিয়ন আছে। বৃটিশ-ইন্ডিয়া কলোনি সাম্রাজ্যের যুগে যা আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্তের রুশ জার সাম্রাজ্য অঞ্চল। ফলে তিনি মধ্য এশিয়া বলতে সেন্ট্রাল এশিয়া বুঝাচ্ছেন কিনা পাঠক বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত সব্যসাচীর আর বাকী দিকটা হল, ইসলাম-বিদ্বেষ। আবার শুধু তাই না, বরং সাথে আছে শ্রেণী ঘৃণা। একেবারে “শিক্ষা,বংশ পরিচয়,সামাজিক কৌলিন্য” কথা তুলে তিনি ঘৃণা ছড়িয়েছেন। কিন্তু এতকিছু করেও সব্যসাচীর কোন লাভ হয় নাই। সব পানিতে পড়ছে। কেন? এই লেখা তিনি লিখছেন ২ জুলাই দুপুরে। আর্টজানের হামলাকারিদের “শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য” তখনও প্রকাশ হয় নাই। পরে পরিচয় প্রকাশিত হলে দেখা গেছে “হামলাকারি জঙ্গীদের” “শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য” অর্থাৎ হামলাকারিদের পারিবারিক পরিচয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগত পরিচয় সব্যসাচীরা নিজের জন্য যেমন কাম্য মনে করেন সেই একই শ্রেণীর অথবা সম্ভবত আরও উচু শ্রেণীর। অতএব বলার অপেক্ষা রাখে না সব্যসাচীর ঘৃণাতত্ত্ব বুমেরাং হয়ে ‘ধরা খেয়েছে’। ইংরাজিতে কথা বলা, স্বচ্ছল ঢাকার এলিটদের সন্তান, দামি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া যারা সম্ভবত সব্যসাচীর চেয়ে আপাদমস্তক আধুনিক তারাই আর্টিজান হামলাকারি। ফলে স্পষ্টত সব্যসাচীর গরীব ও মুসলমান-বিদ্বেষী অবস্থান এখানে সবার সামনে উন্মোচিত হয়ে গেছে।

    ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানো প্রথম ৫৩৮ শব্দের পরে সব্যসাচীর লেখার শেষ ১৩৮ শব্দ। এটাও ভীষণ কৌতুক কর। ঠাকুর ঘরে কে রে আমি কলা খাইনি – ধরণের। মানুষ অনেক সময় প্রচন্ড ভয় পেলে আগাম ও যেচে অনেক সত্য কথা বলা শুরু করে। এটা যেন তেমনই এক ঘটনা। সরাসরি সব্যসাচীর বক্তব্য উঠিয়ে আনছি, বলেছেন, “৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে যে ভাবে আদালতের নির্দেশের মাধ্যমে একের পর এক যুদ্ধাপরাধীকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হচ্ছে আর সে সব দ্রুত কার্যকর করা হচ্ছে, তাতে আমার মনে হয়, বাংলাদেশি যুব সমাজের কাছে এই বার্তা যাচ্ছে যে, হাসিনা সরকার প্রতিশোধস্পৃহায় ভুগছেন। তাঁরা এটা থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন যদি কোনও আন্তর্জাতিক আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হত বা বাংলাদেশি আদালতে ওই মামলাগুলোয় যদি অন্তত এক জন বিদেশি বিচারপতি রাখা যেত”।

    তার মানে সব্যসাচী একটা হামলা খেয়েই সাথে সাথে স্বীকার করছেন যে সরকার প্রতিশোধস্পৃহায় ভুগছে। এটা সত্যিই এক দেখার মত তামাশা। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ হয়েছে কথা সত্য, যা আইনী ভাষায় বললে, এটা আদালতে প্রমাণ করলে তা শাস্তিযোগ্য বিষয়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে অবিচার আর বেইনসাফি করা হয়েছে। তবে সেটাও তুলনায় খুবই ক্ষুদ্র বিষয়। এর তুলনায় এঘটনার ভিতর দিয়ে খোদ রাষ্ট্রের ভিত নাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, রাষ্ট্র আজ অন্যের দাস হয়েছে। রাষ্ট্র আজ ভেঙ্গে পড়ার দশায়। এটা আমার কথা নয়, প্রকারন্তরে এটাই আসলে সব্যসাচীই স্বীকার করছেন। তিনি এটাকে “সরকারের প্রতিশোধস্পৃহায়” করা কাজ বলছেন। তার মানে এখানে কোন বিচার হয় নাই, ‘প্রতিশোধস্পৃহায়’ করা কাজ হয়েছে। কিন্তু এঘটনাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ আউলিয়ে সব ধবংস হয়ে যাবার পর এখন সব্যসাচী এর কারেকশন খুজছেন। আদালতের স্টান্ডার্ড নিয়ে কথা তুলছেন। অর্থাৎ সাব-স্টান্ডার্ড আদালত ব্যবহার করা হয়েছে প্রকারন্তরে তা বুঝিয়েছেন। বলছেন, যদি “আন্তর্জাতিক আদালতে” বিচার করা হত এবং “বিদেশি বিচারপতি রাখা যেত” – এসব কথা বলছেন। তাহলে স্বভাবতই এখানে যে প্রশ্নটা নিরুত্তর থেকে যায় যে, এটা এতদিন তিনি আমাদের বলেন নাই কেন? এখন বলে তিনি কী হামলাকারিদের এক্টকে ন্যায্যতা দিলেন না? তবে এখানে একটা ফ্যাক্টস বলে রাখা ভাল। আর্টজানে হামলাকারিরা জামাত রাজনীতির খাতক না, এটা বলা যায়। কারণ আইএস খোদ তাদের মাসিক প্রকাশনাতে জামাতকে “মুরতাদ” মনে করে বলে জানিয়েছে।

    কিন্তু অবাক কান্ড যে আনন্দবাজার সব্যসাচীকে দিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করা ধরণের আর্টিকেলে কারেকশনের কথা বলে সেই আনন্দবাজারই আবার গত ৮ জুলাই এই অবস্থানের ঠিক উলটা কয়েকটা “পেজ ফর সেল” রিপোর্ট ছেপেছে। গত ৮ জুলাইয়ের বাংলাদেশ নিয়ে ছয়টার বেশি রিপোট ছেপেছে যার সবগুলাই “পেজ ফর সেল” ধরণের রিপোর্ট। অর্থাৎ আনন্দবাজার তার পত্রিকার পাতা বা জায়গা কোন বিশেষ গ্রাহককে বিক্রি করেছে। আর ঐ গ্রাহক ঐ পাতায় যা মনে চায় তাই লিখে ভরিয়েছে। এরপর আনন্দবাজার আবার তা ছাপলেও কিন্তু নিজে মনে করে গ্রাহক ঐ পেজে যা লিখেছে তার দায়দায়িত্ত্ব আনন্দবাজারের নাই। এই হল ‘পেজ ফর সেল’।

    গত ৮ জুলাই প্রকাশিত সেসব রিপোর্টের মধ্যে দুই দুখানা হল জমিদারি-রুস্তমি আমলের কিশোরগঞ্জের জমিদারদের জমিদারি চলে যাবার হাহুতাশ ও হাহাকার বিষয়ক। প্রথমত কিশোরগঞ্জ কেন? কারণ এবার ঈদের দিন শোলাকিয়া ঈদের জামাতকে টার্গেট করে সেই মাঠে পৌছানোর রাস্তায় পুলিশ চেকপোস্টে সশস্ত্র হামলা করা হয়েছিল। ফলে সেই সুত্রে কিশোরগঞ্জ এখানে বিষয়। কিন্তু কাদের দিয়ে আনন্দবাজার কিশোরগঞ্জ নিয়ে আর্টকেল লিখে ছাপাচ্ছে? কিশোরগঞ্জের জমিদারের দুই উত্তরাধিকারী। এটাই হল ইন্টারেস্টিং রগড়ের দিক। আমাদের অনেকের পরিচিত The Autobiography of an Unknown Indian বইয়ের লেখক নীরদ চন্দ্র চৌধুরীর পিতা ছিলেন কিশোরগঞ্জের নবগ্রামের জমিদার পরিবারের সন্তান। সেই নীরদ চন্দ্র চৌধুরী আবার এই শতকে বসেও পুর্ববঙ্গের মানে একালের বাংলাদেশের মুসলমানদেরকে বাঙালী বলে স্বীকার করেন না। এটা অবশ্য উনি একা নন, বৃটিশ কলকাতা হল জমিদারির আয় পয়সায় বেড়ে ঊঠা শহর। ভেঙ্গে বললে, বাংলার জমিদার-প্রজা সম্পর্কের কৃষি থেকে পাওয়া উদ্বৃত্ত লুটেরা সম্পদ পুঞ্জিভুত হয়ে যে শহর গড়ে উঠেছিল তার নাম কলকাতা। আর কলকাতায় এতে যে ধরণের চিন্তা, রাজনীতি, সাহিত্য সংস্কৃতি বা লাইফ ষ্টাইল যা গড়ে উঠেছিল এককথায় এটার প্রতীকী শব্দই “বাঙালী”। সেজন্য শব্দ হিসাবে কলকাতা ও বাঙালী প্রায় সমার্থক শব্দ। তবে এই বাঙালী ধারণাতে অবশ্যই আমরা পুর্ববঙ্গের কেউ অন্তর্ভুক্ত নই, গণ্য নই। আর ঐ কলকাতা বা বাঙালী – এটা জমিদার ঔরসের বাঙালি, বা সংক্ষেপে “জমিদার বাঙালি”। পুর্ববঙ্গের আমরা, আমাদের দুটা কথা এখানে মনে রাখা দরকার, এক. বাংলার জমিদার প্রজা সম্পর্কের কৃষির সেসময়ের শোষিত প্রজাদের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ট অংশ ছিল মুসলমান। আর দুই, ‘কলকাতা’ বা ‘বাঙালী’ প্রকল্প প্রজা মুসলমানদের বাঙালি মনে করতে না, স্বীকৃতি ছিল না। ফলে বলা যায় ‘জমিদার বাঙালি’ প্রকল্প খুবই ‘ক্লাস কনশাস’ প্রকল্প ছিল।

    সেই সুত্রে এজন্য নীরদ চন্দ্র চৌধুরি (১৮৯৭-১৯৯৯) নিজ জীবদ্দশায় গত আশির দশকেও আনন্দবাজার পত্রিকায় পুর্ব্বঙ্গের মুসলমানদের সম্পর্কে লিখেছিলেন “তথাকথিত বাঙালী”। সেই নীরদ চৌধুরির সন্তান হলেন ধ্রুবনারায়ণ চৌধুরী। আর নীরদ চৌধুরিরই আপন বড় ভাইয়ের মেয়ে হলেন কৃষ্ণা বসু। (কৃষ্ণা বসু নিজেই তার আর এক পরিচয় জানিয়ে বলেছেন তিনি, ভারতের প্রাক্তন লোকসভা সাংসদ এবং সুভাষচন্দ্র বসুর পরিবারের সদস্যা।) ধ্রুবনারায়ণ চৌধুরী এবং কৃষ্ণা বসু এরা দুজন আনন্দবাজার পত্রিকায় দুটো আর্টিকেল ছাপিয়েছেন গত ৮ জুলাই। তাদের বাপ-দাদাদের জমিদারি আমলে কিশোরগঞ্জে কত দুধ-ননীর নহর বয়ে যেত এরই বর্ণনা দিয়ে। এবারের ঈদের শোলাকিয়ায় হামলার বিরুদ্ধে তাদের মনে পড়ছে বাপ-দাদার কিশোরগঞ্জের কথা। তারা তুলনা করছেন বাপ-দাদাদের জমিদারির কিশোরগঞ্জ কত ভাল ও আদর্শ ছিল। যদিও দুজন মানছেন কিশোরগঞ্জ তারা দুজনই প্রায় কখনও যান নাই। আনন্দবাজারের এই প্রজেক্টটাই আসলে ইন্টারেস্টিং। যেন “জঙ্গীবাদ” খেদিয়ে আনন্দবাজার বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে আবার জমিদারি ফেরত আনার স্বপ্ন দেখছে! আমরা আজ জঙ্গীবাদের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি এর মানে কী পরিত্যক্ত পরাজিত জমিদারি ব্যবস্থা আমরা এখন ভাল মনে করব? আনন্দবাজারের ধারণা এটাই জমিদার নীরদ চৌধুরির উত্তরাধিকারদের দিয়ে হাহুতাশ ছড়ানোর ভাল সময়। তাই জঙ্গীবাদের চেয়ে জমিদারি শোষণ নিষ্পেষণ ব্যবস্থা ভাল ছিল এমন তুলনা ইঙ্গিত টানছে। অথচ আনন্দবাজারের কী খেয়াল রাখা উচিত ছিল না যে “জমিদারি” শব্দটা কলকাতায় না-বুঝা গৌরবের ভাবতে পারে। ওর বনেদিয়ানাকে কুর্নিস জানাতে পারে এমনকি তা কারো পেয়ারের হলেও বাংলাদেশ “জমিদারি” খুবই ঘৃণিত একটা শব্দ। আর কোন প্রজারই জমিদারের দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণের কথা না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আনন্দবাজারের চেষ্টা হচ্ছে পরাজিত জমিদারের দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখা কিশোরগঞ্জের বর্ণনা একালে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দেয়া। বাংলাদেশ মূলত মুসলমান প্রজাদের আবাসভুমি। বৃটিশ উপনিবেশ মাস্টারের কোলে বসে কিশোরগঞ্জের জমিদার নীরদচন্দ্র চৌধুরীরা কী মৌতাতে হুকায় টান দিতেন,ইংলিশ নাটক মঞ্চস্থ করতেন কী না এসব গল্পগুলো এপার বাংলাদেশ খাবে না। খাবার কোন কারণ নাই। বরং ক্রোধ হবার সম্ভাবনা।

    সবশেষে মুরোদ তত্ত্ব দিয়ে শেষ করব। দানব সরকারের বিরুদ্ধে যখন নিজের গুম খুন হয়ে যাওয়া অথবা সরকারের দাবরানির চোটে নিজের জান বাঁচাতে যখন নুন্যতম সরকার বিরোধীরা সবাই ব্যস্ত ঠিক সেই সময়টাই হল সবচেয়ে বিপদজনক। কেন? কারণ সেই সময় জনগণ মুরোদ ওয়ালাদের খুঁজে,তাদের মর্দানি দেখতে পছন্দ করে ফেলতে পারে। মানে দানব সরকারের বিরুদ্ধে যে কেউ সশস্ত্র সবল প্রতিরোধ করতে মুরোদ রাখে তাদের দেখতে পছন্দ করে ফেলতে পারে। অর্থাৎ ফাঁকা রাজনীতির কথা না “মুরোদ”। তাই এটা আমাদের সবার জন্য ভীষণ বিপদজনক সময়। অন্যভাষায় এটা তাই “জঙ্গীবাদ” জন্মাবার জাগবার সবচেয়ে ফেবারেবল সময়। এভাবে জঙ্গীবাদ জনগণের মৌন সমর্থন পেয়ে যায় ‘যদি’ সেটাই সবার জন্য সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক হবে। অনেকে এধরণের সময়কে নকশাল যুগ বলে। এটাই মুরোদ তত্ত্ব। আশা করি আমরা মুরোদ তত্ত্ব মনে রাখব।

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১০ জুলাই দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (১১ জুলাই প্রিন্টে)ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও পরিবর্ধিত ও এডিট করে ফাইনাম ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

  • ভুয়া বয়ান খাড়া করতে যাওয়ার বিপদ

    ভুয়া বয়ান খাড়া করতে যাওয়ার বিপদ
    গৌতম দাস
    ১৩ মে, ২০১৬
    http://wp.me/p1sCvy-17R

     

     

    পশ্চিমা দেশগুলো “সন্ত্রাসবাদ বা টেররিজম” বলে তাদের “ওয়ার অন টেররের” শত্রুদের  ডেকে থাকে। এই শব্দগুলোকে তাদের শত্রুর সাধারণ ডাকনাম বানিয়ে ফেলেছে। আর এটাকে সুযোগ হিসাবে নিয়ে আমাদের সরকার তার বিরোধীদের বিশেষ করে যারা সরকারের ক্ষমতা ও প্রধান ধারার রাজনৈতিক বিরোধী  তাদেরকেও ওই একই দড়িতে ফাঁসি দেওয়ার চেষ্টা করছে। সময়ে তা বিরাট তামাশা হয়ে হাজির হচ্ছে।

    যেমন  আমাদের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু চেষ্টা করেছেন, পশ্চিমের টেরিরজমের বয়ানের ভিতর একই আগুনে সেকে আমাদের রাজনীতিতে পরিচিত “সামরিক স্বৈরাচার” শব্দটাকেও ‘সন্ত্রাসবাদ’ বলে চালিয়ে দিতে। বলা বাহুল্য এটা তথ্যমন্ত্রীর খুবই অপরিপক্ক ও ব্যর্থ এক প্রচেষ্টা। কিলিয়ে কাঁঠাল পাঠানোর ধারণাও এখানে খাটো।

    “সামরিক স্বৈরাচারেরা টেররিষ্টের সাথে যুক্ত ছিল”
    দক্ষিণ ভারতীয় এক প্রাচীন ইংরাজি দৈনিক ‘দি হিন্দু’, সেখানে বাংলাদেশ বিষয়ক এক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। আসলে ‘দি হিন্দু’ পত্রিকার সংবাদদাতা কল্লোল বন্দোপাধ্যায়ের ঢাকা সফরে থাকার সময় বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর এক সাক্ষ্যাৎকার নিয়ে এর ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছিল ঐ রিপোর্ট। রিপোর্টটা প্রকাশিত হবার পর তা পড়ে মনে করার কারণ আছে যে মন্ত্রীই “একটা নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে, গাড়তে” ঐ পত্রিকার সাথে কথা বলেছিলেন।  দি হিন্দু পত্রিকায় ঐ রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, (Terrorist in tie up with military autocrat) ‘টেররিষ্ট ইন টাই-আপ উইথ মিলিটারি অটক্রাট, সেইজ বাংলাদেশ মিনিস্টার”। যার বাংলা করলে হবে, “সামরিক স্বৈরাচার টেররিষ্টের সাথে যুক্ত ছিল– বলেছেন  বাংলাদেশের মন্ত্রী”।

    “There are thousands of AL-Qaeda-trained extremists in Bangladesh who have links to military autocratic forces as well as international terrorist groups, says Hasanul Haq Inu, Minister of Information in Prime Minister Sheikh Hasina’s government”.এই ছিল ঐ রিপোর্টের শুরুর একটা বাক্য। বাংলাদেশে হাজার হাজার আলকায়েদার ট্রেনিং প্রাপ্ত জঙ্গী আছে যারা সামরিক স্বৈরাচারি শক্তির এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গ্রুপের সাথে যুক্ত আছে – বলেছেন বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।

    স্বাধীনতা পরবর্তি হিসাবে ধরলে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘মিলিটারি অটোক্রেটিক’ বা ‘সামরিক স্বৈরাচার’  বলতে জিয়ার ১৯৭৫-৮১ সময়কালের শাসন আর এরশাদের ১৯৮২-১৯৯০ সময়কালের শাসন সাধারণত অনেকে এই সময়টাকে বুঝিয়ে থাকেন। অর্থাৎ সারকথায় বললে ১৯৯০ সালের পরের অন্তত ১৫ বছর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক স্বৈরাচার বলে কেউ ছিল না।  ওদিকে আল-কায়েদা নামটা আমরা প্রথম জানি, নজর করি ৯/১১ বা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার টুইন টাওয়ার হামলায় হামলাকারিদের নাম হিসাবে। যদিও আল-কায়েদার অপ্রকাশিত জন্ম বলা হয় ১৯৮৮ সালে। তাহলে জিয়া তো বটেই এমনকি এরশাদ এই দুই সামরিক স্বৈরাচার আল-কায়েদার সাথে সম্পর্ক যুক্ত থাকবে কী করে? এমনকি যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই ১৯৮৮ সালে আল-কায়েদা কেবল জন্ম নিয়েছে ততপর হয় নাই, ততপরতাও শুরু হয় নাই এসময়টাতে সেক্ষেত্রেও একমাত্র এরশাদের জমানার কেবল শেষ  দুবছর তারা আল-কায়েদা নামটা শুনে থাকলেও থাকতে পারে। ট্রেনিং দেয়া অসম্ভব।

    বুঝা যাচ্ছে ইতিহাসের সময়কাল জ্ঞান সম্পর্কে ও হোমওয়ার্কে কাচা দুর্বল থেকেই এই বয়ান তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়া এটাও বুঝা যাচ্ছে যেভাবেই হোক ‘সামরিক স্বৈরাচার’ শব্দটাকে তিনি আল-কায়েদা নামের সাথে বেধে পচাতে চাইছেন। কিন্তু ইতিহাসের সময়কাল জ্ঞানের অভাবে গল্পটা অপুষ্ট থেকে গেছে। আর ঐ সময়কালের ফ্যাক্টসগুলো মোটা দাগে বললে তা হল, এক. ১৯৭৯ সালের প্রথম অর্ধে ইরানে বিপ্লবী খোমেনী ক্ষমতা দখল করে। দুই. ইরানের পড়শি মুসলিক অধ্যুসিত সেন্ট্রাল এশিয়া যা ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এর সীমান্ত, সেই সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভ নিজ ঘর সামলাতে ভীত হয়ে পড়েছিল। তিনি এই ভেবে ভয় পেয়েছিলেন যদি ইরান বিপ্লবের জোয়ার আছর প্রতিবেশী সেন্টাল এশিয়াতে পড়ে। যদি তারা ইরান বিপ্লবের প্ররোচনায় বিচ্ছিন্ন আলাদা রাষ্ট্র হবার আওয়াজ তোলে। তাই এর প্রতিক্রিয়ায় আগাম ব্যবস্থা হিসাবে ১৯৭৯ সালে ঐ একই বছর শেষে ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে যাতে মাঝের বাফার রাষ্ট্র হিসাবে আফগানিস্তানকে ব্যবহার করা যায়।  সেন্ট্রাল এশিয়ার যেকোন সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্থানের উপর বল প্রয়োগ করা যায়। তিন. সোভিয়েত এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আমেরিকা পালটা ব্যবস্থা নিতে চায়। আর নিকট পড়শি পাকিস্তানও হুমকি অনুভব করতে থাকে।তাই আমেরিকান প্ররোচনায় ও তার সামরিক ও অর্থ সাহায্যে পাকিস্তান স্থানীয় ইসলামি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের (নানান গ্রুপের মুজাহেদিন)  সংগঠিত করে ফেলে। এভাবে দীর্ঘ দশ বছর মুজাহেদিনদের সাথে লড়ার পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকতে না পেরে ১৯৮৯ সালের শুরুতেই আফগানিস্থান ছেড়ে চলে যায়, সব সৈন্য প্রত্যাহার করে। চার. সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহারের পরে আল কায়েদা গ্রুপের ভ্রুণ এর জন্ম হয়। আর ইতোমধ্যে ১৯৯৬ সালের দিকে মুজাহেদিন গ্রুপগুলোর মধ্যে তালেবান গ্রুপ আমেরিকান পরোক্ষ সমর্থনে এবং তারা সরার চেয়ে সংগঠিত ও কার্যকর ছিল বলে পুরা আফগানিস্তানের শাসন হাতে পায়, সরকার গঠন করেছিল। এতে আল-কায়েদা ও তালেবান পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করেছিল ও চিন্তায় প্রভাবিত করতে পেরেছিল, সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।   পাঁচ. তাহলে আমাদের আলোচ্য প্রসঙ্গের দিক থেকে ফ্যাক্টস হল, আমাদের দুই ‘সামরিক স্বৈরাচারের’ আমলে আল-কায়েদা ফেনোমেনা দৃশ্যমান ছিল না বা বা দৃশ্যমান হয়ে উঠার পর্যায়ে যায় নাই।  ছয়. তবে এটা সত্য যে মুলত পুরা নব্বুই এর দশক জুড়েই বা তার আগেও বাংলাদেশ থেকে অনেকেই জোশ আগ্রহে ইসলামি বিপ্লবের অভিজ্ঞতা নিতে আফগানিস্তানে গিয়েছিল, নানান মুজাহিদ গ্রুপের হয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। আর এরাই ১৯৯৬ সালের পর থেকে দেশে ফিরে এসেছিল। এখানে পাশাপাশি মনে রাখা যেতে পারে, আশির দশকে কমিউনিস্টরাও একইভাবে প্যালেস্টাইনে বিপ্লব বা যুদ্ধের স্বাদ নিয়ে গিয়েছিল। যাই হোক,মন্ত্রী ইনু হয়ত আফগান ফেরত সেসব যোদ্ধাদের কথা বুঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু এই ঘটনাবলী এবং এর সময়কাল বাংলাদেশের কোন সামরিক স্বৈরাচারের আমলের ঘটনাই নয়। এটা হতেই পারে,মন্ত্রী ইনুর জিয়াউর রহমানের উপর বা বিএনপির উপর ক্ষোভ আছে। বিশেষত ৭ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে হয়ত। তবু বলতেই হয় এটা তাঁর খুবই দুর্বল ও কাঁচা প্রচেষ্টা। কারণ তিনি সময়কাল মিলাতে পারেন নাই।

    তবু দি হিন্দুর রিপোর্টটা অন্য দিক থেকে দেখা যেতে পারে। রিপোর্টটা সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এর সুনির্দিস্ট ফোকাস এর অভাব আছে, ফলে  খাপ ছাড়া।  খুব সম্ভবত এটা হতে পারে যে, মন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতকার নেয়া শেষ করা হয়েছে কিন্তু কোথায় ফোকাস করে পত্রিকা বা ঐ রিপোর্টার রিপোর্টটা প্রকাশ করবেন তা ঠিক হয় নাই। কারণ সে বিষয়ে সম্ভবত মন্ত্রীর নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে রিপোর্টারকে তিনি নিজের মতের পক্ষে আনতে চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু রাজি করাতে বা মানাতে পারেন নাই। অথবা এমন হতে পারে যেভাবে মন্ত্রী ব্রিফ করেছিলেন রিপোর্টার সেভাবে বুঝে নাই বা বুঝতে রাজি হয় নাই। ফলে রিপোর্টের একটা বিপর্যয় সেখানে ঘটেছে। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোন ফোকাসের ছাড়া একটা রিপোর্ট হয়ে গেছে। সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য যে বাংলাদেশের আম পাঠকের চোখে – “জিয়া, এরশাদ সামরিক স্বৈরাচারেরা ইসলামি সন্ত্রাসের সাথে যুক্ত ছিলেন” – এই নতুন বয়ান তাদের পাতে পড়া অথবা নজরে পড়া দূরে থাক এই বক্তব্য কারও আমলেই আনা যায় নাই। বিশেষত আমাদের স্থানীয় মিডিয়ার কারণে। সেখানে নতুন বয়ানটা প্রতিষ্ঠা করা সে তো অনেক দুরের ব্যাপার।

    মন্ত্রীর বয়ান বাজারে আসে নাই, বাধা স্থানীয় মিডিয়া
    মন্ত্রীর বয়ান বাজারে আসতে পারে নাই, আমাদের স্থানীয় মিডিয়ার বাধার কথা বলছিলাম। কারণ একটা মজার ব্যাপার হল দি হিন্দুর ঐ রিপোর্টকে উদ্ধৃৎ করে বাংলাদেশের স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে রিপোর্ট হয়েছিল। কিন্তু কেউই ‘দি হিন্দুর’ শিরোনামকে নিজ রিপোর্টের শিরোনাম করে নাই। এমনকি মন্ত্যরীর পছন্দের সংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গটাকে আমলেই নেয় নাই। প্রিন্ট পত্রিকার প্রত্যেকেই নিজস্ব ও ভিন্ন শিরোনাম করেছে।  আমাদের দৈনিক মানবজমিন গতকাল ১৫ এপ্রিল দিনের কোন এক সময়ে অনলাইনে এক রিপোর্ট ছাপতে দেখা গেছে,  যার বডির লেখা এত অল্প যে তার চেয়ে লেখার ব্যানার হেডলাইনটা বড় অথবা  তা না হলেও প্রায় সমান। আর শিরোনাম করেছিল,  “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে” এটা হল সেই হেডলাইন। হেডলাইন দিয়ে চমকে দেবার খবর অর্থে এটা চমকপ্রদ খবর সন্দেহ নাই। অর্থাৎ নিজের দেয়া শিরোনামের ঐ পাঁচটা শব্দই কেবল সব বক্তব্য।  বাক্যগুলো ‘দি হিন্দুর’ লেখার রিপোর্টের বডি থেকে তুলে নেয়া কয়েকটি শব্দ। আবার প্রায় একই হেডলাইন – “লাদেনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৮ হাজার জঙ্গি রয়েছে বাংলাদেশে ” – এটা হল দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার ঐ দিনের শিরোনাম। কিন্তু এদুটো পত্রিকার কেউই ‘দি হিন্দু’র পত্রিকার বাংলাদেশ বিষয়ক ঐ রিপোর্টের সুত্রে ও বরাতে ছাপিয়েছে বলে জানিয়েছে ঠিকই কিন্তু কেউই মন্ত্রী ইনু যে বক্তব্যটা ফোকাস চাইছিলেন যে “সামরিক স্বৈরাচার টেররিষ্টের সাথে যুক্ত ছিল” এদিকটা নিয়ে কোন উতসাহই তাদের ছিল না।  বরং ভারতের দি হিন্দুতে তা ছাপা হওবার পর পরই বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকাগুলো ঐ রিপোর্টকে উদ্ধৃত করেছে ঠিকই কিন্তু  নিজেরা ভিন্ন ট্রিটমেন্টে  ও ভিন্ন শিরোনাম দিয়ে।  কিন্তু কী তাদের প্ররোচিত করেছিল?

    স্থানীয় শিরোনাম হয়ে গেল, “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে” 
    ‘দি হিন্দুতে’ শিরোনামটা পড়ার পরই যেকপোন দেশী পাঠকের মনে যে বিরাট খটকা লাগে তা হল বাংলাদেশের ‘সামরিক স্বৈরাচার’ আর ‘সন্ত্রাসবাদ’ এই শব্দদুটো মিলিয়ে কেমনে কোন বাক্য রচনা করা গেল। কিন্তু স্থানীয় পত্রিকা সেজন্য রিপোর্টার শিরোনাম বদলে তাদের স্থানীয় শিরোনাম, “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে” করে নাই।

    একথা ঠিক যে যেকোন ভারতীয় সাংবাদিকও টেররিজম শব্দটার প্রতি অতিরিক্ত সেনসেটিভ থাকে। কিন্তু এর মানে এই না যে কোন গারবেজ বা যে কোন কিছুকে টেররিজম বলে দাবি করলেই তাদেরকে তা খাওয়ানো যাবে, তারা মেনে নিবে। বাংলাদেশের সামরিক স্বৈরশাসক জিয়া বা এরশাদ এরা আজকের মতই “ইসলামি জঙ্গী” ছিল অথবা “ইসলামি জঙ্গীবাদের” সাথে যুক্ত ছিল ইনুর এমন বক্তব্য  ইতিহাস-সম্পর্কহীন। একেবারেই ইতিহাসবোধহীনের ম্যানুফ্যাকচারড। দি হিন্দুর সাংবাদিক মন্ত্রীত ইনুর দাবি প্রমাণের দায়িত্ব না নিয়েই তাঁর কথাই ছেপেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের সাংবদিকেরা সেদিকে যায়ই নাই। তারা তুলে নিয়েছে, “লাদেনের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত  ৮ হাজার জঙ্গি” এই কয়টা শব্দ কেবল। তাও আবার হিন্দুর রিপোর্টের বডি থেকে  কয়েকটা শব্দ। এতে দেশের মিডিয়ায় তথ্যমন্ত্রীর  দাবি আসে নাই, এই অর্থে বেকার হয়ে পড়ে আছে। কিন্তু এতে একটা সুবিধা তথ্যমন্ত্রী পেয়েছেন যে এই রিপোর্টে যে কোন প্রমাণ সম্পর্কহীন উদ্ভট দাবি এখানে আছে তা বাংলাদেশের মিডিয়া আমলই করে নাই। কিন্তু কেন?

    গত প্রায় এক বছর ধরে যত সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে তা তে আইএস জড়িত নয়, তারা হাজির নাই, হয় নাই, এটা বলা সরকারি অবস্থান বা ভাষ্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারি এই অবস্থানটাই ধারাবাহিকভাবে বলে আসছেন।  কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ ব্যাপার হল, তথ্যমন্ত্রী ইনু দি হিব্দু পত্রিকার সাক্ষাতকারে দাবি করে ফেলেছেন “লাদেনের প্রশিক্ষিত ৮০০০ জঙ্গি বাংলাদেশে”। যদিও এটা বলার উদ্দেশ্য তাঁর ভিন্ন ছিল।  কিন্তু একথা বলার আগে তথ্যমন্ত্রী খেয়ালই করেন নাই যে এভাবে বললে “আইএস নাই” প্রসঙ্গে সরকারি অবস্থানের বিরুদ্ধে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরুদ্ধে তিনি ইনু আর এক মন্ত্রী, খোদ বিরোধীতা করে ফেলছেন। আর স্ববিরোধিতার সেদিকটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবার সুযোগ ঐ দুই দেশি পত্রিকা ছাড়তে চায় নাই।

    এখন ফলাফলঃ ফলাফল হল, দি হিন্দুর রিপোর্ট মন্ত্রীর  ঈস্পিত লক্ষ্য তো পূরণ করতে পারেই নাই উলটা বরং ক্ষতি করে ফেলেছে। “বাংলাদেশে আইএস বলে কিছু নাই, সাংগঠনিক কাঠামো নাই” – একথাগুলো বলা এখন সরকারের বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অফিসিয়াল অবস্থান। সরকার মনে করে এগুলো স্বীকার করে নিলে আমেরিকাসহ পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলোর জন্য হস্তক্ষেপের রাস্তা খুলে দেয়া হবে। আই এস দমাতে তাদের এখন আমাদের দেশে আরও সরাসরি ভুমিকা দরকার বলে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো যুক্তি সাজিয়ে বসতে পারে। অনেকটা খালেদা সরকারকে উতখাতে বা ১/১১ এর সরকার কায়েমের পক্ষে যেভাবে যুক্তি সাজানো হয়েছিল। সরকারের এই অনুমানগুলো পটেনশিয়াল। ফলে বিপদজনক হতেও পারে। কিন্তু তথ্যমন্ত্রীর বয়ান অবশ্যই সরকারি ভাষ্যকে দুর্বল করেছে।

  • আমেরিকার চোখে ‘ফরাসি রাজনৈতিক কালচার’ দায়ী

    আমেরিকার চোখে ‘ফরাসি রাজনৈতিক কালচার’ দায়ী
    গৌতম দাস
    ২৯ এপ্রিল ২০১৬, শুক্রবার, ১২:০০ রাত

    http://wp.me/p1sCvy-14w

    এক তামাশার স্টাডি রিপোর্ট ছাপা হয়েছে সম্প্রতি ফরেন এফেয়ার্স পত্রিকায়। দ্বিমাসিক এই পত্রিকা ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ আমেরিকান সমাজে খুবই মান্যগণ্য পত্রিকা মনে করা হয়। সেখানে  এক গবেষণা রিপোর্টের ফলাফল নিয়ে একটা লেখা ছাপা হয়েছে গত ২৪ মার্চ, ২০১৬।  পশ্চিমা সমাজের নেতা বা যারা পশ্চিমা রাষ্ট্র চালান অথবা নীতিনির্ধারক, এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চিন্তার অলিগলি মতিগতি পাঠের জন্য জরুরি হচ্ছে এই ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ জার্নাল, এমনটা মনে করা হয়।

     ফরেন অ্যাফেয়ার্সে চলতি এই লেখার শিরোনাম, ‘দুনিয়াজুড়ে সুন্নি জঙ্গিতত্ত্বকে ব্যাখ্যা করে এমন ফরাসি সংযোগ-সূত্র’। ইংরেজিতে ‘The French Connection Explaining Sunni Militancy Around the World”। এই লেখার সারকথা হল, অন্য সব কিছুর চেয়ে ‘ফরাসি কালচার’- এর মধ্যে বিচুটি-মার্কা জলুনির এমন আলাদা কিছু আছে যে জন্য অন্য দেশের চেয়ে ‘ফরাসি ভাষাভাষী’ দেশে ‘সুন্নি মিলিট্যান্সি’ বেশি। কথাগুলো সাম্প্রতিককালে ইউরোপের দুই রাজধানী প্যারিস (ফ্রান্স) ও ব্রাসেলসে (বেলজিয়াম) কয়েক মাসের ব্যবধানে পরপর আইএস হামলার কথা স্মরণ করেই বলা হয়েছে। আর এর মধ্য দিয়ে দুনিয়ায় ২০০১ সালের পর থেকে আলকায়েদা ফেনোমেনার আবির্ভাব ঘটা, ৯/১১ টুইন টাওয়ারে হামলা, সেই থেকে আমেরিকান “ওয়ার অন টেরর” নীতি অনুসরণ করা ও তার ভয়াবহ ফলাফলে এলোমেলো হয়ে যাওয়া দুনিয়া ইত্যাদি এই ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে আমেরিকার যেন কোনই হাত নাই এমন একটা ভাব, সাজেশন হাজির করা হয়েছে। তামশা করে বলা হয়েছে, আমেরিকার এসব “মহান অবদান” নয়, মনোভাব দৃষ্টিভঙ্গী নীতি নয় দুনিয়াজুড়ে আজ যাকে সন্ত্রাসবাদ বলছে, ‘সুন্নি মিলিট্যান্সি’ বলছে এর জন্য ফরাসী ভাষাভাষী রাষ্ট্রগুলো দায়ী। একেবারে গবেষণা করে নাকি তারা এই প্রমাণ পেয়েছে। নায়ক হয়ে ঘটনা ঘটিয়ে এরপর সামলাতে না পেরে এখন হাত ধুয়ে ফেলার জন্য সত্যিই এটা আমেরিকার দেখানো এ’এক চতুর রাস্তা!
    বলা বাহুল্য, এটা সুই আর চালুনির কুতর্কের মতো যারা পরস্পর পরস্পরকে পেছনে ফুটা থাকার কারণে খোঁটা দেয়- সে জাতীয়।  আমেরিকা ফরাসি ভাষাভাষীদের পেছনে ফুটা থাকার জন্য অভিযোগ করছে। যাহোক, এই অর্থে এই পত্রিকার রিপোর্ট বেশ তামাশার তা বলতেই হবে।

    এখানে আগেই বলে নেয়া হয়েছে একটা ‘এম্পেরিক্যাল স্টাডি’ মানে অভিজ্ঞতালব্ধ ধারণা উপর ভিত্তি করে তারা এসব কথা বলছেন। অর্থাৎ সংখ্যাবাচক প্রাপ্ত তথ্য থেকে খোজাখুজিতে পাওয়া ধারণাকে ব্যাখ্যা করে তারা কথাগুলো বলছে।  গত ২০০১ সাল থেকে  আলকায়েদা ফেনোমেনার দুনিয়ায় হাজির হওয়া পর থেকে এর সর্বশেষ প্রভাবশালী রূপ হলো আইএস  (আইএসআইএল)- এর খলিফা রাষ্ট্র ও তৎপরতা। আলকায়েদার সাথে আইএসের মধ্যে অনেক ফারাক আছে সেগুলোর মধ্যে অন্তত একটা ভিন্নতা হল, পশ্চিমা দেশ বিশেষত ইউরোপ থেকে তরুণদের আইএস এ যোগদানের হিড়িক। আর সেই সাথে ‘কেন তরুণেরা কিসে আকৃষ্ট হয়ে এই যুদ্ধে যাচ্ছে’ এ নিয়ে গবেষণা স্টাডিরও পাল্লা দিয়ে কমতি দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু সেই স্টাডির তথ্য থেকে সব দোষ ফরাসি ভাষাভাষীদের বা যারা ফরাসী ভাষায় কথা বলে তাদের – এ কথা বলে আমেরিকার দায় এড়িয়ে এখন কেটে পড়ার তাল করছে। তবে আর যাই হোক  এ দেখে অন্তত আমাদের মেতে ওঠার কোনো কারণ নেই।

    এখানে এই স্টাডির মূল বিষয়টি কী ছিল তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রিপোর্টটা বলছে, “ইউরোপের কোন দেশ থেকে কতজন বিদেশী যোদ্ধা হিসেবে আইএসে যোগ দিতে গেছে আর সে দেশ কয়টি আইএস হামলা খেয়েছে এই দুই তথ্য থেকে ওই দেশে সুন্নি রেডিক্যাল ও সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার মাত্রাকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে এমন তত্ত্বটা কী’হতে পারে তা খোঁজ করা। এভাবে, খুঁজতে গিয়ে আমরা যা পেলাম তাতে আমরাই আশ্চর্যান্বিত। বিশেষত যখন আমরা বিদেশী যোদ্ধাদের রেডিক্যাল হয়ে ওঠার প্রসঙ্গে গেলাম। দেখা গেল, বিদেশী যোদ্ধাদের রেডিক্যাল হয়ে ওঠার কারণ একটা দেশের সম্পদ কেমন তা নয়। এমনকি এর নাগরিকেরা কেমন কী মাত্রায় শিক্ষিত অথবা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তাও নয়। বরং আমরা দেখলাম বিদেশী যোদ্ধাদের রেডিক্যাল হয়ে ওঠা কিসের ওপর নির্ভর করে এ বিষয়টিকে যা সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে তা হল যে, ওই দেশটা ফরাসি ভাষাভাষী কি না”। এখানে ফরাসী ভাষাভাষী বলতে যেমন ওই রাষ্ট্রের ঘোষিত জাতীয় ভাষা (ন্যাশনাল ল্যাংগুয়েজ) আগে অথবা এখন ফরাসি কি না – সেটাকে ভিত্তি হিসাবে ধরা হয়েছে। কিন্তু “অদ্ভুত ব্যাপারটা দেখা গেল, সবচেয়ে বেশি সুন্নি রেডিক্যাল হয়ে উঠেছে এমন পাঁচটা দেশের মধ্যে চারটাই ফ্রাঙ্কোফোন, মানে ফরাসি ভাষাভাষী, যার মধ্যে আবার ইউরোপের প্রধান এমন দুই দেশ হল – ফ্রান্স ও বেলজিয়াম”।
    ইংরেজি ভাষাভাষী যুক্তরাজ্য যেমন ফরাসি ভাষাভাষী বেলজিয়ামের চেয়ে অনেক বেশি বিদেশী যোদ্ধার জন্ম দিয়েছে। এবং এটা সৌদি যোদ্ধাদের চেয়েও সংখ্যায় কয়েক হাজার বেশি। কিন্তু এভাবে সংখ্যাগুলোর দিকে তাকালে তা বিভ্রান্তিতে ফেলবে। বরং আমরা যদি কোনো দেশের জন্ম দেয়া বিদেশী যোদ্ধাদের সংখ্যা ওই দেশের মোট মুসলিম জনসংখ্যার শতকরা কত ভাগÑ এ দিক থেকে দেখি তাহলে আসল ছবিটা আমরা পাবো। প্রত্যেক মুসলিম বাসিন্দাপিছু কতজন বিদেশী যোদ্ধা জন্মেছে এই হিসাবের বিচারে বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য বা সৌদি আরবের চেয়েও অনেক বেশি বিদেশী যোদ্ধার জন্ম দিয়েছে।

    এখন ফরাসি ভাষাভাষী বলতে এখানে ঠিক কী বুঝব বা কী বোঝানো হয়েছে? ফরেন অ্যাফেয়ার্সের লেখা এর জবাব দিচ্ছে। বলছে, ফরাসি ভাষাভাষী বলতে বোঝানো হচ্ছে, “ফরাসি রাজনৈতিক কালচার”। এরপর ফরাসি রাজনৈতিক কালচার কথাটাকেই আরও ব্যাখ্যা করে দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, “ফরাসি কায়দার সেকুলারিজম ব্রিটিশ কায়দার সেকুলারিজমের চেয়েও বড় আগ্রাসী। যেমন- ইউরোপের মাত্র দু’টি দেশ (ফ্রান্স ও বেলজিয়াম) পাবলিক স্কুলে বোরখা নিষিদ্ধ করেছে। এ ছাড়া ইউরোপের বিচারে এরাই সেই দুই রাষ্ট্র যেখানে গণতন্ত্রের মান বা মাত্রা সবার নীচে”।
    এককথায় বললে, ফরেন অ্যাফেয়ার্সের বক্তব্যের মূল পয়েন্টটা হল ফ্রান্সের সেকুলারিজম ব্রিটিশদের সেকুলারিজমের চেয়েও খারাপ। এটা ছাড়া বাকি সব কথাই চর্বিত চর্বণ। আবার খুব কৌশলে আমেরিকার এই জার্নাল ফরাসিদের তুলনা করেছে আর অন্য ইউরোপীয় দেশের সাথে। সচেতনে নিজেদের, মানে আমেরিকার সাথে তুলনা করেনি।

    কিন্তু আসল কথা হল,বিষয়টা কোনভাবেই স্রেফ ব্রিটিশ আর ফরাসিদের মধ্যকার ভালো বা খারাপ সেকুলারিজমের তর্ক নয়। এ প্রসঙ্গটা এর আগে আমার এই সাইটে এক লেখায় এনেছিলাম এই লিঙ্কে যার শিরোনাম ছিল, ‘মাল্টিকালচারালিজম বনাম অ্যাসিমিলিয়েশন’ । বলেছিলাম, ‘মাল্টিকালচারালিজম বলতে ব্রিটিশ বুঝটা হল ব্রিটিশ সমাজটাকে সে নানা কমিউনিটির সহযোগে এক বড় কমিউনিটি হিসেবে রাখতে চায়। কলোনি মাস্টারের দেশ ও সমাজে সবাই যে যার ফেলে আসা নৃতাত্ত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগোলিক ইত্যাদি পরিচয় বজায় রেখেই আবার এক বৃহত্তর ব্রিটিশ সমাজে এক ব্রিটিশ পরিচয়ে তবে ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে বড় হোক। বিপরীতে ফরাসি পছন্দের অ্যাসিমিলেশন। শুনতে ভালো কিন্তু আসলে এখানে অনেক বেশি বলপ্রয়োগে জবরদস্তির ব্যবহার দেখাক যায়। এভাবে বল ব্যবহার করে সব ধরণের নাগরিক বিশেষ করে “অ-সাদা” সবাইকে বাধ্য করে এক রকম করার প্রচেষ্টা এটা। অর্থাৎ ফরাসি কলোনি মাস্টারের দেশ সমাজে যারা নিজের পুরানা সব কিছু ফেলে এসেছে এমনদের বেলায় তাদের সেসব নৃতাত্ত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগোলিক ইত্যাদি পরিচয়ের স্বীকৃতি নেই। সব ভুলে যেতে হবে, বাদ দিতে হবে। এ জন্য বাধ্য করা হবে। কিন্তু এই বাধ্যবাধকতার দিকটা আড়াল করে ‘সুন্দর’ ইউনিফর্মভাবে এক রকম করার নামে (ইংরেজি সিমিলার বা এককরণ থেকে অ্যাসিমিলিয়েশন) আসলে জবরদস্তিতে সবাইকে ফরাসি হতে, ফরাসি কালচারই একমাত্র চর্চার কালচার হতে, করতে বাধ্য করা হয়েছে।
    কিন্তু এরপরও ওই লেখায় এই প্রশ্ন সেখানে সেখানে তুলেছিলাম যে, ফরাসিরা ব্রিটিশদের মতো মাল্টিকালচারালিজমের বদলে অ্যাসিমিলিয়েশনের পথ ধরল কেন? এর ব্যাখ্যায় বলেছিলাম,  ঘটনাচক্রে ফরাসিদের ভাগে যেসব কলোনি পেয়েছিল সেই সব জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগই মুসলমান জনসংখ্যার। কলোনি-পূর্ব থেকেই এরা তাই, বিশেষত আলজেরিয়া থেকে পশ্চিম আফ্রিকা পুরোটাই, মুসলমান। আর এ অঞ্চল থেকেই মাস্টার দেশ ফ্রান্স নিজ দেশের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিক সে এনেছিল। েই বাস্তবতার কারণে, এরপর ফ্রান্স মাল্টিকালচারের লাইনে থাকলে আফ্রিকার মুসলমানদের ধর্মসহ কালচারাল বৈশিষ্ট্য জিইয়ে এবং ডমিনেটিং থেকে যেতে দিতে হত। এটাকে তারা রিস্কি কাজ মনে করেছিল। বিশেষত নিজ দেশেযেখানে  সাদা চামড়ার জনসংখ্যা কমতির দিকে, আর কালো এবং মুসলমান আফ্রিকান জনসংখ্যা বাড়তির। তাই নিজ কালচারাল ডমিনেন্সির বজায় অটুট রাখার তাগিদে অ্যাসিমিলিয়েশনের লাইন বা জবরদস্তি ফরাসি কালচার চাপিয়ে রাখাটাই ফরাসিরা উত্তম মনে করেছিল। আর সেটাকেই ফরেন এফেয়ার্স এই রচনায় ব্রিটিশ সেকুলারিজমের থেকে ফরাসিদেরটা ভিন্ন বলে চেনাতে চেয়েছে।

    এখানে আর একটা মৌলিক তথ্য মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে। বুশের ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নির্বিচার হত্যা ও সন্ত্রাস শুরু হয়েছিল ২০০১ সালে আফগানিস্তানে হামলা দিয়ে এবং এই হামলার পক্ষে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত ও সম্মতি পকেটে রেখে এবং সেই সুত্রে একাট্টা সারা ইউরোপকে পাশে নিয়ে। কিন্তু পরে ইরাক হামলার সময় ২০০৩ সালে ঘটনা আর একই রকম থাকেনি। ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের হাতে মানব বিধ্বংসী মারণাস্ত্র (ডব্লিউএমডি) আছে এই মিথ্যা ও অপ্রমাণিত অভিযোগ তুলে এই হামলা চালানো হয়েছিল। কিন্তু সেই জাতিসঙ্ঘের চোখেই এবার বুশ-ব্লেয়ারের জোট ইরাকে দখলদার বাহিনী বলে পরিচিত হয়েছিল। কারণ এই হামলার পক্ষে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত ও সম্মতি বুশ-ব্লেয়ার জোগাড় করতে পারেনি। বরং বুশ-ব্লেয়ারের বিপক্ষে সোচ্চার থেকে নির্ধারক ভোট দিয়েছিল ফরাসি ও জার্মানি। সেকারণে, পরে  ইরাক হামলায় ফরাসিরা অংশগ্রহণ করেনি। তবে অংশগ্রহণ করেনি সম্ভবত দুটা জিনিস চিন্তা করে। এক, ব্রিটিশদের সাথে ফরাসিদের বহু প্রচলিত পুরনো এক প্রতিযোগিতা হল  কে কত বেশি আমেরিকার সাথে ঘনিষ্ঠ তা হওয়া ও দেখানো। আর এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশরা বেশির ভাগ সময়ে জিতেছে। ফলে এটাকে ফ্রান্সের টনি ব্লেয়ারের উল্টো অবস্থান নিয়ে আমেরিকান তোয়াজ পাওয়ার চেষ্টা হিসাবে অনেকে মনে করে। আর দ্বিতীয় কারণ হলো, এভাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে গেলে এই যাওয়ার মানে হবে মধ্যপ্রাচ্যের স্থানীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা আর তা থেকে নিজ দেশের অ-সাদা চামড়া ও মুসলমান জনগোষ্ঠীর সম্ভাব্য রোষের মধ্যে পড়া। এটা ফ্রান্স এড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু পরের পাঁচ বছরের মধ্যে ফ্রান্স বুঝে যায় যে, ইরাকের তেলের খনি বা অবকাঠামো প্রজেক্ট আর ফরাসিদের ভাগে কখনও কিছুই আসবে না। তাই অবস্থান বদল করে ২০০৮ সালের পর থেকে আবার ফরাসি সৈন্য ন্যাটো নামের আড়ালে অংশগ্রহণ করেছিল। আর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওঁলাদের আমলে ফ্রান্স আমেরিকান সক্ষমতার ঘাটতি মেটাতে একাই মালিতে ‘ইসলামি জঙ্গি’দের বিরুদ্ধে  যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। সুবিধা করতে না পেরে তা এখন আছে জাতিসঙ্ঘ বাহিনী নামের আড়ালে। যেন ইরাক হামলায় ফ্রান্সর অংশগ্রহণ না করাটা পুষিয়ে দিতে এার সে একাই মালিতে লড়তে গিয়েছিল। গাদ্দাফির পতন ঘটিয়ে এই ইসলামি গ্রুপটাই পরে মালিতে গিয়ে নিজেদের আইএস বলে পরিচিতি দেয়। আর মূল কথা হল, পরবর্তিতে মালিতে ও সিরিয়ায় আইএস বেধরকভাবে ফরাসি বোমা হামলা শিকার হয়েছিল। তাই ঐ আক্রমণের প্রতিক্রিয়াতেই ফরাসিরা প্যারিসে আইএসের হামলার শিকার হয়েছিল। তাহলে সার কথায় এটা সত্য যে, ইউরোপের মাত্র দু’টি দেশ ফ্রান্স ও বেলজিয়াম পাবলিক স্কুলে বোরকা নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু সেটা ফরাসি সেকুলারিজম ব্রিটিশের সেকুলারিজম থেকে বেশি আগ্রাসী, কারণটা এমন নয়। বরং তা অ্যাসিমিলিয়েশনের লাইনের জন্য, বা জবরদস্তি ফরাসি কালচার চাপিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে।

    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় গত ১০ এপ্রিল ২০১৬ ছাপা হয়েছিল। সেই লেখা আরও এডিট সংযোজন করে আবার ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।  ]

     

  • মোদীর পাকিস্তান সফর আচমকা না পরিকল্পিত

    মোদীর পাকিস্তান সফর আচমকা না পরিকল্পিত
    মোদির পাকিস্তান সফরের অর্থ কী
    গৌতম দাস 

    http://wp.me/p1sCvy-tV
    ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫

     

    ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চমক দিতে ভালোবাসেন। বিশেষ করে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ ধরনের ফালতু ও অবাস্তব শব্দ ও বাজে ধারণাগুলো বাদ দিয়ে সরিয়ে রাখলে যে কোনো দুইটি রাষ্ট্র মানেই দুইটি আলাদা আলাদা স্বার্থ এবং যে সম্পর্ক আসলে আবার মৌলিকভাবে স্বার্থ-সংঘাতমূলক। কিন্তু তবু এরই ভেতর সাময়িক কোনো কোনো ইস্যুতে এক কমন অবস্থান হাজির করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। তার সুযোগ নিতে হয়, দরকার হয়ে পড়ে। তাই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক মাত্র এক জটিল বিষয়। হয়তো দেখা যাবে, ৯০ ভাগ বিষয়ে দুই রাষ্ট্রের অবস্থান ফাটাফাটি সংঘাতের, কিন্তু বাকি ১০ ভাগের কমননীতি-অবস্থানের (তবে তা সাময়িক) কারণে কোনো উদ্যোগ নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার অবস্থায় তাকে আনতে হতে পারে, আনা হয়। তো সারকথা হলো, তাই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কমাত্রই এক জটিল জিনিস। কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোদির এ চমক সৃষ্টি করার ঝোঁক সবসময়; মোদির এই ঝোঁক একদিক থেকে যেন পরোক্ষে তাঁর স্বীকার করে নেয়া যে, কূটনৈতিক সম্পর্ক জিনিসটা জটিল বলেই চমক সৃষ্টি করে মোদি একে সহজ করার কিছু সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করে থাকে। আবার আরেক দিক থেকে এ জটিল জিনিসটিকে সামলাতেই শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারস্পরিক এক গুড ইম্প্রেশন তৈরির চেষ্টা থাকে। যেটাকে আমরা ব্যক্তিগত ইমোশন শেয়ার বা ভাবের সম্পর্ক তৈরি ইত্যাদি বলি, মোদি বলতে চান এগুলো জটিল কূটনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখে। কথা সত্যি, জটিল স্বার্থ-সংঘাতের ইস্যুকে নরম করতে, অন্তত ডায়ালগ শুরু করার দিক থেকে পারস্পরিক বোঝাবুঝি ভালো থাকলে তা একটা ইতিবাচক ভূমিকা অবশ্যই রাখে। অতএব এ কথাটাকেই আমরা ভিন্নভাবে বলি যে, মোদি চমক তৈরি করতে ভালোবাসেন।

    মোদি আসলে গিয়েছিলেন পুতিনের রাশিয়া সফরে। সেখান থেকে ফেরার পথে তিনি হঠাৎ পাকিস্তানে থেমেছিলেন। দুই দিনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ সফরে গত বুধবার ২৩ ডিসেম্বর তিনি রাশিয়া পৌঁছেছিলেন। কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, সেই ’৫০-এর দশক থেকেই রাশিয়া বা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতে ভারী অস্ত্র, যুদ্ধ টেকনোলজির সরবরাহকারী। তবে মাঝে ২০০৫ সাল থেকে প্রথম আমেরিকান অস্ত্র; বিশেষত পারমাণবিক টেকনোলজি পাওয়াসহ ভারী অস্ত্র কেনা, একসাথে যৌথ উদ্যোগে নানানভাবে ভারতে এর স্থানীয় উৎপাদন ইত্যাদি অনেক বিষয়ে সম্পর্কের দুয়ার খুলেছে। কিন্তু তা খুললেও এখনো অস্ত্রবিষয়ক সম্পর্ক ও যৌথ উদ্যোগে উৎপাদন ও সরবরাহের বিষয়ে অর্থসহ সব ধরনের অঙ্ক বা ফিগারের দিক থেকে এখনো রাশিয়া সবার চেয়ে আগে এবং একমাত্র।
    ফলে গুরুত্বপূর্ণ এবার যৌথভাবে লাইট কার্গো হেলিকপ্টার উৎপাদন, যৌথভাবে ট্যাংক তৈরি, যৌথভাবে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান উৎপাদন, পারমাণবিক ক্ষমতায় চলা অ্যাটাক সাবমেরিন লিজ বা ভাড়া নেয়া এবং শত্রুর ছোড়া মিসাইল আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রাশিয়ান মিসাইল শিল্ড কেনা ইত্যাদি বিষয়ে চুক্তি শেষ করে দিল্লি ফেরার পথে শুক্রবার কয়েক ঘণ্টার জন্য মোদির আফগানিস্তানের কাবুল যাওয়ার কথা ছিল। আবার আফগানিস্তান কেন? অনেকেই জানেন, আফগানিস্তান সরকারের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পাশাপাশি ভারতের সাথেও প্রায় একই ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক আফগানিস্তানের আছে। এ দিকটা জানতে আগ্রহীরা ছাড়া এর বাইরের লোকেরা খুব কমই জানেন। আফগানিস্তানে আমেরিকান স্বার্থ ও প্রভাবের কারণে এর ফায়দা যেন শুধু পাকিস্তান না তোলে, ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের বাড়তি সুবিধা হিসাবে না হাজির হয়ে যায়, ভারতের ভাষায় তা যেন ভারসাম্যহীন না হয়, তা ঠেকাতে এর বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে ভারতের এমন সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করেছে আমেরিকা। আফগানিস্তানের সঙ্গে এসব রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক সূত্রে মান রাখার জন্য ভারত ৯০ মিলিয়ন ডলার অনুদান হিসেবে খরচ করে আফগানিস্তানের জন্য এক নতুন পার্লামেন্ট ভবন তৈরি করে দিয়েছে। ওই ভবন উদ্বোধন করতেই মোদির সংক্ষিপ্ত কাবুল সফর। এই সফরের খবর নিরাপত্তার কারণে খুব সীমিত বা লো-প্রোফাইল রাখাতে অনেকেই জানতেন না মোদি আসবেন। আর কাবুলে কর্মসূচির শেষে ওই দিনই বিকেলে তার দিল্লি ফিরে যাওয়ার কথা।
    কিন্তু চমক ঘটল কাবুল কর্মসূচি সমাপ্তিতে। মোদি এ ধরনের চমকের খবর সবার আগে নিজেই টুইট করে ঘোষণা বা প্রকাশ করতে ভালোবাসেন। ফেরার পথে তিনি টুইট করলেন যে, ভারতে ফিরে যাওয়ার আগে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সাথে দেখা করতে লাহোর যাচ্ছেন। শুক্রবার নওয়াজ শরিফের জন্মদিন, তাই তিনি শুভেচ্ছা জানাতে যাচ্ছেন আর একই সাথে শরিফের নাতির বিয়ে, ফলে শরিফের লাহোরের বাসায় তিনি যাবেন।
    ব্যাপারটাকে মানুষের শরীরের সাথে তুলনা করা যায় যে, এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন মানুষ তৎক্ষণাৎ সেই কাজ করার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে, যেন সেই ব্যাথা যা তাকে তাড়িত করছে তা রিলিজ বা উপশমের জন্য। ভারত-পাকিস্তান এ দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ককে নিয়ে কেচ্ছা-কাহিনীর শেষ নেই। বেশির ভাগ সময় সেটা ঝগড়া-বিবাদের, চরম ও গরমের। তবুও ভারত-পাকিস্তান এখন এমনই এক পরিস্থিতিতে পড়েছে; কোনো এক ব্যথা তাদের এমন তাড়িত করছে যে, তারা পরস্পরের কাছাকাছি আসতে, পুরনো কিছু বিবাদ প্রসঙ্গে মারমুখী হওয়ার বদলে তা লঘু করতে দিল্লি তৎপর হওয়া খুবই জরুরি মনে করছে। অতএব ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কাবুল সফর থেকে দিল্লি ফেরার পথে আচমকা পাকিস্তানে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। অন্তত তার মুখে বলা উদ্দেশ্য হলো, ২৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের জন্মদিন ছিল। ফলে মোদি জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য পথে শরিফের লাহোরের বাসায় এক ঘণ্টা কাটিয়ে (পাকিস্তানে মোট ব্যয়িত সময় আড়াই ঘণ্টা) দিল্লি ফিরে গেলেন। কিন্তু এমন কী সেখানে ঘটেছে, যা এ দুই শীর্ষ নেতাকে এমন বেচাইন করছে? ভারতের মোদীকে বেচাইন করেছে আইএস। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার এক রিপোর্টের শিরোনাম থেকে ধার করা ভাষায়, “ঘাড়ে নিশ্বাস এবার, আইএস এখানে অপারেশনে নামছে”।

    সেটা আজকের প্রসঙ্গ!
    এতক্ষণ চমকের দিক থেকে ধারাবর্ণনা করলেও আসলে মোদির পাকিস্তান ইস্যু নিয়ে তাগিদবোধ অনেক আগে থেকেই। সুনির্দিষ্ট করে বললে, আইএসের প্যারিস হামলা বা আক্রমণের পর প্যারিসের জলবায়ু সম্মেলনে শরিফের সাথে দেখা হওয়াকে পরিকল্পিতভাবে মোদি নতুন করে মিলিত হয়ে কথা বলার কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন ও লাগিয়েছিলেন।

    আসল টেররিজম এর পানি কানে ঢুকছে
    ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের মধ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে পরস্পরের আপত্তি ও মতবিরোধের শেষ নেই। এবং এর প্রায় প্রতিটি ইস্যু আজন্ম। ফলে পুরানা সেসব দিকে না গিয়ে একালের বিরোধের মূল ইস্যু নিয়ে কথা তুললে বলতে হয়, ভারত মনে করে, ভারতে আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতা ইতোমধ্যেই ঘটেছে, অ্যাকশন প্রস্তুতি চলছে ধরনের অবস্থায় আছে। এ বিষয়টা মোদীর কাছে পাকিস্তানের সাথে দ্রুত ডায়লগ শুরু করতে নগদ তাগিদ হিসেবে হাজির হয়। অর্থাৎ ২০০১ সাল আলকায়েদা ফেনোমেনা উত্থানের পর থেকে ভারতে এরা সরাসরি হাজির ও তৎপর না হলেও কাশ্মির-কেন্দ্রিক সশস্ত্র ইসলামি বিচ্ছিন্নতা রাজনৈতিক তৎপরতাগুলোকেই ভারত আলকায়েদার ‘টেররিজম’ বলে চালিয়ে এসেছে। কিন্তু এখন এই প্রথম ভারতকে আলকায়েদা বা একালের আইএস বিষয়ে মানে প্রকৃত “টেররিজম” মোকাবিলার জন্য তৈরি হতে হচ্ছে। ভার্তের দাবি করা এতদিন যাকে সে ছলনা করে টেরিজম বলে এসেছে তা অন্ততপক্ষে সেটা “গ্লোবাল টেররিজম” ছিল না,অথবা আমেরিকার ভাষায় যা “টেররিজম” তা এটা ছিল না। এবার আইএসের টেররিজম, “গ্লোবাল টেররিজম” – একে মোকাবেলার জন্য মোদী ভারতকে উপযুক্ত করে সাজাতে তৎপর হয়েছেন। সম্ভবত মোদি সরকারের ইচ্ছা ও অনুভব হলো, এত দিন ধরে টেররিজম বলে চালিয়ে দেয়া বিচ্ছিন্নতা আন্দোলন আর আইএসের ‘টেররিজম’এ দুইয়ের সাথে একসাথে লড়তে গেলে ভারতের সক্ষমতা ও রিসোর্সে টান পড়তে পারে, তাতে উপযুক্তভাবে মোকাবিলার কাজে নাও করা যেতে পারে। এর বদলে প্রথমটার বিষয়ে পাকিস্তানের সাথে বা পাকিস্তানের মাধ্যমে কোনো রফা করতে পারলে অথবা কমপক্ষে একে তুলনামূলক কম ভয়ঙ্কর হিসেবে হাজির রাখতে পারলেও তা ভারত সরকার ও রাষ্ট্রের সুবিধা হয়। হয়ত এটাই মোদির জন্য স্বাভাবিক ও সঠিক অনুমান। কিন্তু গোল বেধেছে তাহলে কাশ্মির ইস্যুকে সুরাহা করতে ভারতকে কোনো একটা ফর্মুলা প্রস্তাব করতেই হবে এমনকি তা কেবল নিজ পছন্দমত কান্নি মারা করে হলেও। সেটা ভারত চায় না বলে মনে করার কারণ আছে। ফলে ভারতের ইচ্ছা কাশ্মির ইস্যু পাশ কাটিয়ে আইএসের টেররিজম মোকাবেলার ইস্যুতে পাকিস্তানকে যতটা সম্ভব পাশে পাওয়া চেষ্টা করে যাওয়া। পাকিস্তানের সাথে মোদীর প্রবল তাগিদের উৎস এখানে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান পাল্টা বলতে চায়, ডায়লগ সেও অবশ্যই করতে চায় কিন্তু কাশ্মির ইস্যু পাশ কাটিয়ে শুধু টেররিজম নিয়ে ডায়লগ সে চায় না। এটাই ছিল এতদিন ভারত-পাকিস্তানের একালের মতবিরোধের মূল বিষয়। তাহলে সার বিতর্ক হলো, “টেররিজম বিষয়ে আলাপ হবে” না “কাশ্মীর ইস্যুসহ টেররিজম নিয়ে আলাপ হবে”।
    এই বিরোধে দীর্ঘ দিন এভাবে নন-ডায়লগ হয়ে পড়ে থাকার পর মোদি এবার পাকিস্তানের সাথে মতবিরোধের স্থবিরতা কাটাতে উদগ্রীব হয়েছেন। এ বিষয়ে, গত ২৫ ডিসেম্বরের নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখছে, মোদি বুঝেছেন, “তিনি যে পাকিস্তানের সাথে ডায়লগে যুক্ত হচ্ছেন, এটা দেখানো তার দরকার, কারণ তিনি আমেরিকা ও সৌদিদের চাপে আছেন”। টাইমস এ কথাগুলো লিখছে এক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক অশোক মালিকের বরাতে। মালিক অবশ্য আরেক কথা বলেছেন যে, “পাকিস্তানের আগের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সম্প্রতি বদল করে সেখানে সেনাপ্রধানের পছন্দের লোক আনা হয়েছে। কিন্তু মোদি এটাকে তার জন্য সুবিধা হিসেবে দেখেছেন, কারণ তিনি সরাসরি পাকিস্তান সেনাদের সাথে কাজ করতে চান”। অনেকে খোঁচা দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের প্রকৃত ক্ষমতা সেনাদের হাতে। নওয়াজের ভুল পদক্ষেপের কারণে নিজের আগের সরকারের আমলে তাঁর সেনাদের সাথে সম্পর্কের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না; যেটা জেনারেল মোশাররফের বিমান আকাশে আটকে রাখা আর পাল্টা তাদের ক্যু-এর ক্ষমতা দখল পর্যন্ত গিয়েছিল। তাই এবারো এমন কোনো জটিলতা যেন না সৃষ্টি হয়, সেজন্য নওয়াজের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নেয়ার আগের সময়ের ইনফরমাল ডিল হলো, কেবল সামরিক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সেনাদের অবস্থান বেশি গুরুত্ব পাবে, বাকি অন্য সব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের। এ বিষয়টাকে অনেকে খোঁচা দেয়ার কাজে ব্যবহার করে। তবে মোদী জানেন, পাকিস্তান থেকে তিনি যা চান তা পেতে গেলে তার জন্য সরাসরি সেনাদের সাথে ডিল করা ভাল, কারণ শেষ বিচারে তারাই তা দিতে পারে।
    এসব পটভূমি মাথায় রেখে মোদি প্যারিস জলবায়ু মিটিংয়ে নওয়াজ শরিফের সাথে সমঝোতা করে ডায়লগ ওপেন করেন যে, দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা টেররিজম ইস্যুতে সহযোগিতা নিয়ে ডায়লগ করবে। আর পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে একই সাথে কাশ্মির ইস্যুতে ডায়লগ চলবে। যদিও এটা মনে করার কোন কারণ নাই যে সব আলাপ প্যারিসের ঐ সাইড-টকে শুরু হয়েছিল। পাকিস্তানে ভারতের রাষ্ট্রদুতের মাধ্যমে পুর্বপ্রস্তুতিমূলক আলাপ অনেক আগে থেকেই চলছিল। নওয়াজের সাথে মুখোমুখি আলাপের মাধ্যমে দুই প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতে তা একধরণের ফরমাল বা চুড়ান্ত আকার পেয়েছিল। সেই রফা অনুযায়ী ৬ ডিসেম্বর ব্যাংককে দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ে টেররিজম ইস্যুতে ডায়লগ হয়। আর এর দুই দিন পর ৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানে সুষমা স্বরাজের সফরে কাশ্মির ইস্যুতে ডায়লগ হয়।
    বলা যায়, মোদি ভারতে আইএস তৎপরতা ছড়ানোর সম্ভাবনা ও তা মোকাবেলাকে মাথায় রেখে, এটাকে সব বিবেচনার মূল কেন্দ্রে রাখার কারণে তিনি পাকিস্তানের সাথে আলোচনা করতে সিরিয়াস হয়েছিলেন। যদিও ভারতে কাশ্মির ইস্যুতে কিন্তু পাকিস্তান-কেন্দ্রিক যেসব সশস্ত্র ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা আছে, এগুলো ২০০১ সালে আলকায়েদা ফেনোমেনা হাজির হওয়ার আগে থেকেই আছে বা ছিল।
    ফলে  আভ্যন্তরীণ মুল্যায়নে ভারতের কখনই ধরে নিবার কারণ নাই যে, এরা আর আলকায়েদা ফেনোমেনা এক। কিন্তু তবুও ভারত কাশ্মীর-কেন্দ্রিক ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতাকেই কল্পিত জঙ্গিবাদ ও টেররিজম বলে, নিজের ভূমিতে অনুপ্রবেশ ইত্যাদি কথার প্রচার চালিয়ে গেছে। উদ্দেশ্য, কল্পিত টেররিজমের সরবরাহকারীর অজুহাতে বাংলাদেশকে কব্জার মধ্যে রাখা, ভারতের জন্য বাংলাদেশের ওপরে বাণিজ্য সুবিধা আদায় করা আর ট্রানজিট করিডোর আদায় করে নেয়ার কাজে ব্যবহার করে নেওয়া। সম্প্রতি আইএস ভারত ও বাংলাদেশে উপস্থিত হয়ে থাকতে পারে, এটা তারা স্বীকার করছে। ফলে বাংলাদেশ সরকারের ভাষ্যের সাথে ভারতের রাষ্ট্রের ভাষ্যের এ প্রথম অমিল দেখা গেছে। এমনকি আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ অমিল-গরমিলকে স্বীকার করে নিয়ে গত সপ্তাহে বলেছেন, তারা ভারতের পাওয়া তথ্যের সাথে নিজের বোঝাবুঝি ও অমিলের কারণ খুঁজছে। তাহলে এ কথা মনে করার কারণ আছে যে, মোদির পাকিস্তান সফর কোনো চমক বা কারিশমা দেখানো নয়। নিউইয়র্ক টাইমসের ২৫ ডিসেম্বরের রিপোর্টে ভারতের ইংরেজি একটি দৈনিকের ডব্লিউআইআরই (WIRE)-এর সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভারাদ্বারজনের এক মন্তব্য তুলে এনেছে। “In a way, he is sending a signal to everyone that there will be no more U-turns,” said Siddharth Varadarajan, a founding editor at The Wire, an Indian news site. “He is putting his personal political brand on this process. He can’t walk away that easily now.”
    মোদী সম্পর্কে ভারাদ্বারজন বলছেন, “একভাবে দেখলে চমকের পাকিস্তান গমন করে মোদি আসলে সবার কাছে এক বার্তা দিয়ে ফেলেছেন, যা থেকে তিনি আর সরে আসতে পারবেন না। তিনি আসলে নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ইমেজ এই প্রক্রিয়ার মধ্যে জড়িয়ে ফেলেছেন। ফলে তিনি এখন আর সহজে এখান থেকে সরে যেতে পারবেন না”।

    “সমালোচকদের পাকিস্তা্ন পাঠিয়ে দিবার রাজনীতি” – ভারত আর বাংলাদেশে একই
    বিজেপি তার সমালোচককে বাংলাদেশের মতই কিছু হলেই পাকিস্তান পাঠিয়ে দেয়। বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়েই যে যখন যেভাবে সুবিধা মনে করেছে পাকিস্তান ইস্যুকে অ্যান্টি-পাকিস্তানি হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ – এক উগ্র বর্ণবাদ প্রচার করে থাকে ভোটের বাক্স ভরার দিকের নজর থেকে। কিন্তু রাষ্ট্র সরকার চালাতে গেলে তার তো একটা পাকিস্তান নীতি, পাকিস্তানের সাথে সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো কিভাবে ডিল করবে তা থাকতেই হবে। আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নির্বাচনী বক্তৃতায় ভোট পাবার জন্য পাকিস্তান-বিরোধী উস্কানি, সুড়সুড়ি জাগিয়ে ভোটের বাক্স ভড়তে যা বলা হয় তার সাথে বৈদেশিক পাকিস্তান নীতির কোন সম্পর্ক নাই। ফলে সবসময় তাদের যার যার সরকারের পাকিস্তান নীতিতে আর তাদের স্ব স্ব কালে যেকোনো নির্বাচনে পাকিস্তানবিরোধী ঝড় তুলে ভোটের বাক্স ভরার রাজনীতির মধ্যে কখনো মিল-সামঞ্জস্য রাখতে পারেনি। বরং সময়ে স্থানীয় নির্বাচনে জেতার বিষয়টিকে মুখ্য বিবেচ্য রাখতে গিয়ে বেশির ভাগ সময়ে সরকারের পাকিস্তান নীতিতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি। এসব সমস্যার কথা খেয়াল করে ভারাদ্বারজন ওই মন্তব্য করেছেন।
    কম-বেশি প্রায় এই একই সমস্যা আমাদের দেশেও হয়ে আছে। সরকারের সক্ষমতা ও মনোযোগ এরই মধ্যে (নকলভাবে) জঙ্গি বলে সাংবিধানিক রাজনীতির জামায়াত-বিএনপি দমনের কাজে সরকার ব্যবহার করে চলেছে। আবার সাম্প্রতিককালে আসল ‘টেররিজম’ আইএস বা জেএমবি দমনের কাজেও এটা ব্যবহার করছে। অর্থাৎ সরকারের মোট সক্ষমতাটা তাদেরকে দুইভাবে ভাগ করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এভাবে কত দিন চলতে পারবে, সক্ষম থাকবে কি না জানি না। তবে কেবল জেএমবি দমনের কাজে মনোযোগী থাকার জন্য সক্ষমতা কেবল সেদিকে নিবদ্ধ রাখতে আপাতত সাংবিধানিক রাজনীতিতে বিরোধীদের সাথে কোনো ডায়লগ, আঁতাত, বোঝাবুঝি কোনো কিছুর আলামত দেখা যাচ্ছে না, যাতে সরকার সব রিসোর্স সক্ষমতা একমুখী করতে পারে।

    মোদির পাকিস্তান সফরে ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়া
    মোদির সফরে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রতিক্রিয়া হয়েছে অদ্ভুত ও মারাত্মক; তবে এককথায় এবং দূরে সেভ জায়গায় দাঁড়িয়ে বললে বলতে হবে, মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তো এমন প্রতিক্রিয়াগুলোকে কয়েকটা খোপে ভাগ করে বললে, প্রথম খোপ  হল তারা যারা সরাসরি শুধু ভোটের রাজনীতির বিবেচনায় লাভালাভের দিক চেয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। এরা হলো খোদ কংগ্রেস, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ও তার জনতা দল ইউনাইটেড। খোপ দুই, যারা জম্মু ও কাশ্মীর অথবা পাকিস্তান-ভারতের জন্মের সময় থেকেই লম্বা বিবাদে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। যেমন এককথায় বললে, ভারতীয় কাশ্মীরকেন্দ্রিক সব ধরনের দল মোদির পাকিস্তান সফরকে ইতিবাচক বলেছেন। এছাড়া এদের সবার একই কথা “ডায়ালগ”; নিরবচ্ছিন্ন ডায়ালগই প্রধান কার্যকর করণীয় মনে করেন সবাই। এমনকি যারা কাশ্মীড় ইস্যুতে বিচ্ছিন্নতাবাদী লাইন অনুসরণ করে তারাও মোদিকে স্বাগত জানিয়েছেন। শ্রীনগরের মডারেট দল হুরিয়াত এটাকে সরকারের নেয়া “ইতিবাচক সঠিক পদক্ষেপ” বলেছে। আর হার্ডলাইনের আলী শাহ জিলানি বলছেন, “ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টার বিরুদ্ধে তাদের কোনো আপত্তির কিছু নেই”। বর্তমানে ভারতীয় কাশ্মীর রাজ্যে বিজেপির সঙ্গে চলতি জোট সরকার গঠনের পার্টনার স্থানীয় মডারেট দল পিডিপির নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী মুফতি মোহাম্মদ সাঈদও খুবই উচ্ছ্বসিত হয়ে এটাকে ‘সঠিক দিকে পদক্ষেপ’ বলেছেন। ওদিকে হায়দ্রাবাদকেন্দ্রিক এমআইএম দলের নেতা ও কেন্দ্রীয় লোকসভার সদস্য ব্যারিস্টার আসাদুদ্দিন ওয়ার্সীও মোদির সফরের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ডায়ালগ চালিয়ে যাওয়ার কথা তুলেছেন। কাশ্মীরের স্থানীয় দল ন্যাশনাল কংগ্রেসের শেখ আবদুল্লাহর নাতি ওমর আবদুল্লাহও স্বাগত জানিয়েছেন; তবে এমন পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয় না, ছুটে যায় বলেও আক্ষেপ করেছেন। ওদিকে বাম কমিউনিস্টদেরও (সিপিএম, আরএসপি) এই খোপে ফেলা যায়, একই ধরনের স্বাগত জানানোর কারণে। তবে এদের বাড়তি কিছু শব্দ আছে। যেমন তারা ‘টেররিজমও নিপাত যাক’ সঙ্গে যোগ করে তাদের কথা বলেছেন।

    এই সফরের খবর ভারতীয় মিডিয়ায় আসার পর কংগ্রেস প্রতিক্রিয়ায় বলেছিল, “এই সফরের কোন তালমিল প্রটোকল রাখা হয়নাই। ফলে এটা একটা ফালতু তামশা ব্যাপার হয়েছে। এর খারাপ পরিণতি হবে। এর আগে বাজপেয়ির এমন সফরের পরে কারগিল যুদ্ধ এসেছিল”। যেমন, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এনডিটিভি, দি হিন্দু,। কংগ্রেস এমন মন্তব্য করার সময় ধরেই নিয়েছে যেন আগে কোন ইনফরমাল আলাপ ছাড়াই মোদী পাকিস্থান সফরে গিয়েছেন। এর আর এক অর্থ আইএস ইস্যুতে মোদীর সরকার কী করে তাতে তাদের কোন মাথাব্যাথা নাই। আভ্যন্তরীণ ইস্যুতে নিজ দলের সুবিধাই আসল কথা।  সোনিয়ার কংগ্রেসকে কেবল ভোটের রাজনীতির বিবেচনায় বক্তব্য অবস্থান নেয়া ও প্রকাশের দলে বা খোপে ফেলাতে অনেকে বিস্মিত হতে পারেন। কিন্তু ব্যাপারটা ইদানীং এমন অবস্থাতেই ঠেকেছে। বিশেষ করে লোকসভা ২০১৪-এর নির্বাচনে কংগ্রেস শোচনীয়ভাবে হেরে মোট আসনের মাত্র ১০ ভাগেরও নিচে আসন সংখ্যা হয়ে যাওয়ার পর। যেমন মোদি সরকারের ‘ল্যান্ড বিল’ বা জমি অধিগ্রহণ আইন নামে একটি আইনের প্রস্তাব করেও বিরোধীদের বিরোধীতায় তা শেষ পর্যন্ত পাস করাতে পারেনি, পক্ষে-বিপক্ষে ভাগ হয়ে গেছে। শেষে মোদী বিলটা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বা বলা যায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাস হয়নি বলে এমনিতেই এটা প্রত্যাহার হয়ে গেছে ধরতে হবে। ওই বিলের সারকথা ছিল একদিকে চাষাবাদের জন্য জমি, অন্যদিকে অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য বা শিল্প-কারখানার জন্য জমি এ দুই ধরনের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্যের লাইনটা কোথায় টানা হলে সঠিক হবে, সব কুল রক্ষা পাবে। এ বিলের ইস্যুতে কংগ্রেসের অবস্থান খুবই সঙ্কীর্ণ বিরোধিতার। সিদ্ধান্তের পেছনে তাদের মূল বিবেচনা ছিল, কোনো চটকদার পপুলার কথা বললে তাতে দল চাঙা হবে। অথচ বিষয়টা একালের সব রাষ্ট্রের জন্যই খুব নির্ধারক এক নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। পার্লামেন্টে আলোচনার সময় রাহুল গান্ধী দলের মূল অবস্থান-বক্তব্য রেখেছিলেন। রাহুলের বক্তৃতার পর মিডিয়াসহ কংগ্রেসের নিজের দলের আলোচনার বিষয় ছিল, ‘রাহুলের পারফরম্যান্স’। রাহুল ‘কী বলেছেন’ সেটা নয়, ‘কোন অভিনয়ে’ বলেছেন সেটাই বিবেচ্য ও চর্চার বিষয় হয়েছিল। দল কি অবস্থান নিয়েছে, সেদিক নিয়ে কারও কোনো আগ্রহ ছিল না। কথাগুলো তুলে আনলাম, ভারতের এখনকার বিরোধী দল কংগ্রেসের রাজনীতির কোয়ালিটি বোঝানোর জন্য। তবে একথাও ঠিক, বিজেপি যখন বিরোধী অবস্থানে ছিল, তখনও কমবেশি এসব সমস্যা একই ছিল। সরকার ও বিরোধী দল এভাবে ভাগ করে দেখা ছাড়াও যদি একই ক্ষমতাসীন বিজেপির নির্বাচনীর রাজনীতির অবস্থান আর সরকারের নীতি বা সংসদে আনা বিলের বেলায় অবস্থান এভাবে ভাগ করে দেখি তো সেখানেও বিশাল ফারাক আর ছলচাতুরিতে ভরা অবস্থান দেখতে পাব। নভেম্বরের বিহার নির্বাচনে বিজেপির মধ্যে পাকিস্তান-বিরোধী ঘৃণা ছড়ানো কাড়াকাড়ি ছড়াছড়ি গেছে। এছাড়া ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘বিজয় দিবসে’ প্রচারণায় নামতে ভারতীয় বাহিনীকে খোদ মোদির টুইট বার্তার আহ্বান জানিয়েছিল। বিজেপির এগুলো সবই ভোটের রাজনীতি। সস্তা ইসলামবিদ্বেষ ছড়ালে ভোটের বাক্স ভরে উঠবে এ বিশ্বাসে কাজে নেমেছিল। আবার সেই মোদিই এখন পাকিস্তান সফরের মাধ্যমে চমক সৃষ্টি করার চেষ্টা থাকলেও এক সিরিয়াস বিজনেসে পাকিস্তানের সঙ্গে জড়াতে চান, একথা শতভাগ সত্যি।

    সারকথায় দেখা যাচ্ছে, ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশেই আইএস ইস্যুটা এখনও মুখ্য ইস্যু হতে এবং যথাযথ গুরুত্ব পাবার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের বিরোধী কোনঠাসার আভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে  বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

    [এই একই প্রসঙ্গে আমার দুটো লেখা কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে এবং ভিন্ন ভিন্ন পয়েন্ট তুলে  দুটি দৈনিকে ছাপা হয়েছিল। প্রথমটা ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫ দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় আর দ্বিতীয়টা ২৭ ডিসেম্বর ২০১৫ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে ঐ লেখা দুটোর পয়েন্টগুলোকে একসাথে করে এরপর নতুন করে পরিবর্ধন ও এডিট করে এখানে আবার ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

    goutamdas1958@hotmail.com

  • কানে পানি গেছে, এবার কী সত্যিই বাঘ এসেছে!

    কানে পানি গেছে,
    এবার কি সত্যিই বাঘ এসেছে!

    গৌতম দাস
    ০১ ডিসেম্বর ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-hR

    বাংলাদেশে “আইএস এসেছে, আইএস আসে নাই” মনে হচ্ছে এই ছুপাছুপি খেলার অবসান ঘটতে শুরু করেছে। ২৮ নভেম্বর শুরুর প্রথম প্রহরে চ্যানেল আইয়ের টকশোতে এসেছিলেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত। আলোচনার এক ফাঁকে তিনি সরাসরি উপস্থাপক মতিউর রহমান চৌধুরীকে বলেই ফেললেন,”দাবিক” ম্যাগাজিনটা দেখেছেন নিশ্চয়! বলা বাহুল্য, দৈনিক মানবজমিনের মালিক সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীই সম্ভবত সবার আগে তাঁর পত্রিকায় দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্টের রিপোর্ট ছাপিয়েছিলেন। বলা যায়, “আইএস আছে” দাবির পক্ষে প্রথম স্থানীয় মিডিয়ার স্বীকারোক্তি সেটা।

    আইএসের মুখপত্র বলা হয়ে থাকে বা স্বীকৃত মাসিক ম্যাগাজিন হলো দাবিক। বিদেশী গোয়েন্দা ইনটেলিজেন্স জগতে দাবিককে আইএসের মাসিক মুখপত্র মনে করা হয়। আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো থেকেও স্বীকারোক্তি মিলা শুরু হয়েছে। ওদিকে ভারতের অবস্থান বেশ তামাশার। অথবা বলা যায়, ‘দাবিক আইএসের মুখপত্র নয়’এমন উল্টা দাবি কোনো মহল থেকেই এখনো কাউকে করতে দেখা যায়নি। বিশেষত দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্ট ছাপা হবার পর। তবে মাস খানেক আগে “আইএস বলে কিছু নাই। সব জামাত এর কাজ।” এই ভাষ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা এজেন্সীর বরাতে বহু রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়া ০৬ অক্টোবর সংখ্যা। বাংলাদেশের ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো এই রিপোর্টের বরাতে নিজ নিজ পত্রিকায় পরের দিন লেখা ছাপিয়েছে। টাইম অব ইন্ডিয়া ভারতের ইন্টেলিজেন্স সুত্রের বরাতে আমাদেরকে ‘নিশ্চিত করছে’ বলে পত্রিকাটা দাবি করেছিল যে দুই বিদেশী হত্যায় আইএসের সংশ্লিষ্টতা নেই। সেই সাথে আমাদের জানিয়েছিল বাংলাদেশ সরকারের মতোই বরং একাজের জন্য তারা জামায়াতে ইসলামিকে দায়ী মনে করে।  ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল (অব.) সৈয়দ আতা হাসনাইন দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে একটি উপস্থাপনা দেন। তারপর প্রশ্নোত্তর পর্বে উপস্থিত একজন জানতে চান, বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি আছে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, আমার মনে হয়, বাংলাদেশে বিস্তৃতভাবে আইএস নেই। ভারত ও পাকিস্তানেও একইভাবে আইএসের বিস্তৃত উপস্থিতি নেই। হাসনাইন সাহেব ন্যদের চেয়ে একটু বুদ্ধিমান দেখা যাচ্ছে। তিনি যেন অস্বীকার করলেন না তবে বিস্তৃত উপস্থিতি নাই।  অথচ এক মাসও যায়নি, মনে হচ্ছে এবার কানে পানি ঢুকেছে। হিন্দুস্থান টাইমস ২৮ নভেম্বর লিখছে, বগুড়ায় হামলার ঘটনায় আইএস-সংশ্লিষ্টতা নেই, সরকারি এই দাবিকে সন্দেহের মুখোমুখি করেছে। এছাড়া ভারতের দি হিন্দু পত্রিকা দাবিক পত্রিকায় আইএসের বক্তব্য সিরিয়াসলি নিয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে “বেঙ্গল” নামে ঢাক দেয়াটাকে। এককথায় বললে ভারতে বড় সব প্রিন্টেড মিডিয়া আইএসের উপস্থিতি প্রসঙ্গে আগের অস্বীকার অবস্থান ছেড়ে স্বীকার করে রিপোর্ট করা শুরু করেছে।
    ভারতের মিডিয়ার অবস্থান তামশার বলছি আর এক কারণে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ভারতী জৈন নামের সাংবাদিক  ০৬ অক্টোবর (যে নিউজটা প্রথম আলো অনুবাদ করে ছেপেছে পরের দিন ০৭ অক্টোবর) ভারতের জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা লিখছেন, “জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের কার্যক্রম সারা বিশ্বেই আছে। দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চরমপন্থীদের সম্পৃক্ততা আছে—এমনভাবে প্রচার চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী; যেন কাজটি করেছে আইএস। এটি করা হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। জামায়াতে ইসলামীর এর পরের পরিকল্পনা হতে পারে, এটা দেখানো যে ‘হাসিনা সরকার বাংলাদেশে বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।” অথচ ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়া গত ১৫ সেপ্টেম্বর ভারতীয় জামাতে ইসলামির আর এক রিপোর্ট ছেপেছে। এম পি প্রশান্ত নামের সাংবাদিক লিখছেন, ভারতের জামাতে ইসলাম আইএসের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামতে যাচ্ছে। “Jamaat-e-Islami to launch campaign against ISIS” – এই হল ঐ রিপোর্টের শিরোনাম। কারণ ভারতীয় জামাত মনে করে আইএস ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে।  কারণ তারা অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছে। আর আইএসের খলিফাগিরিও এক নকল কারবার”। তাহলে এই রিপোর্ট থেকে বুঝা যাচ্ছে আইএস কে জামাত কিভাবে মুল্যায়ন জানা যাচ্ছে। তাহলে ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্টের বরাতে ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়ার – “বাংলাদেশে জামাতই আইএস” এই প্রপাগান্ডার মানে কী?

    সিরিয়ার উত্তরে আলেপ্পো প্রদেশের এক শহরের নাম দাবিক। এই নামের গুরুত্ব হল, বলা হয়ে থাকে কোনো এক হাদিসে এই শহরের নামের উল্লেখ আছে যে, এই শহরে রোমান অর্থাৎ খ্রিষ্টানদের সাথে মদিনা থেকে আসা সৈন্যদের শেষ লড়াই হবে। এবং ক্রুসেডাররা পরাজিত হবে। হাদিসের মত ওল্ড স্ক্রিপ্টে এই শহরের নামের রেফারেন্স থেকে সম্ভবত সে কথা স্মরণ করে আইএসের পত্রিকার নাম দাবিক রাখা হয়েছে। এর আগে দাবিকের প্রথম সংখ্যায় তাঁরা নিজেদেরকে পরিচিত করার প্রতীকী স্লোগান হিসেবে লেখা হয়েছিল, ‘আনটিল ইট বার্নস দি ক্রুসেডর আর্মিস ইন দাবিক অর্থাৎ “প্রত্যাদেশ মোতাবেক দাবিক শহরে খ্রিষ্টান ক্রুসেডর সেনাদের পুড়িয়ে শেষ করার আগে পর্যন্ত”।
    দাবিক যে কারণেই নাম রাখা হোক না কেন আমাদের প্রসঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল এই ১২তম সংখ্যাতেই প্রথম ‘বেঙ্গল’ নাম উল্লিখিত হয়েছে। মোট ৬৫ পৃষ্ঠার এই সংখ্যায় ৩৭ নম্বর পৃষ্ঠায় কোনো এক আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির রচিত একটা লেখা ছাপা হয়েছে। আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির ওই লেখার শিরোনাম “দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল”। ঐ রিপোর্টের লক্ষণীয় ব্যাপার হল, নামের মধ্যে বাঙালি ও বেঙ্গল শব্দের বহুল ব্যবহার। বাংলাদেশকে কেন “বেঙ্গল” নামে তারা ডাকছে এর একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা বা নোট দিয়েছে। বলছে ১৯৭১ এর আগের (সম্ভবত বুঝাতে চেয়েছে বৃটিশ আমলের বাংলা) ন্যাশনালিষ্ট বাংলাকে বুঝাতে তারা “বেঙ্গল” নামটা নিয়েছে। এথেকে আমরা আবার “তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি” বলে মিলিয়ে যেন ভুল না বুঝি। তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি ধরণের মোটেও নয়। বরং যেকোন ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদে তাদের আপত্তি সেজন্য।

    যাহোক সেটা, শুধু তা-ই নয় বাংলাদেশে আইএসের এফিলিয়েশন বা স্বীকৃতি দেয়া সংগঠন হিসেবে জেএমবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। আর বিএনপি (ন্যাশনালিস্ট মুরতাদ্দিন) এবং জামায়াতকে (পার্লামেন্টারি মুরতাদ্দিন) সংগঠন আর আওয়ামী লীগকে ‘তাগুতি সরকার’ হিসেবে চিহ্নিত ও ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া জেএমবির মূল নেতা আদালতের রায়ে ফাঁসিতে মৃত্যু হওয়া শায়েখ আব্দুর রহমানকে বীর শহীদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
    এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি ভাষ্যে দাবিক ম্যাগাজিনের বক্তব্যের সত্যতা বা এর অস্তিত্ব স্বীকার করে এমন বক্তব্য দেখা যায়নি। অর্থাৎ সরকারি ভাষ্য “বাংলাদেশে কোনো আইএস জঙ্গি নেই” এই বয়ান এখনো অটুট আছে। বাংলাদেশে নিরাপত্তাবিষয়ক এক গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামান অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি থাকার পক্ষে সম্ভাবনার কথা বলে গেছেন। এমনকি কাজের ধরন হিসেবে আইএস স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের এফিলিয়েটেড হিসেবে ঘোষণা করে ওই সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ভেতর দিয়ে নিজেরা হাজির থাকে সে কথাও বলেছিলেন। দাবিকের ১২তম সংখ্যা সম্পর্কে বাংলা দৈনিক মানবজমিনের রিপোর্টের পর আমেরিকার এনবিসি টিভি নেটওয়ার্কের বরাতে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকাও এক রিপোর্ট করেছে। মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামানের বরাতে প্রথম আলো ওখানেও লিখছে যে তিনি বলেছেন,‘যেহেতু আইএসের নিজস্ব প্রকাশনায় (দাবিক) বাংলাদেশ সম্পর্কে এত বিস্তারিতভাবে লেখা হয়েছে। তাই বিষয়টি আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। যদি এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে এদের প্রতিহত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’

    বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মিথ্যাগুলো অদ্ভুত। সরকার নিজেও জানে এটা মিথ্যা, আমরাও যে জানি সরকার এটা মিথ্যা বলছে, সেটাও সরকার জানে। কিন্তু এর পরেও সরকার নিজের মিথ্যা বয়ানটাকে আঁকড়ে থাকবে। আর আমাদেরকে বলতে থাকবে‘বুঝোই তো আমার বয়ান মিথ্যা, তবু আমাকে মিথ্যা বলতে সুযোগ দাও।’ তেমনই এক বয়ান হলো, ‘এই দেশে আইএস বলে কিছু নোই।’ দাবিকের ১২তম সংখ্যা প্রকাশের পর সরকারের এই মূল বয়ানে কোনো বদল আসেনি। তবে এখন কেবল বাড়তি যে কথাগুলো সরকারি বয়ানে যোগ হয়েছে তা হলো, কখনো বলে জামায়াত বা কখনো বিএনপি এগুলো করছে। কখনো বলে জামায়াত জেএমবির নামে করছে। কখনো বলে জামায়াত আইএস নাম দিয়ে করছে। প্রথম আলোর ওই রিপোর্টেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “এ দেশে আইএস বলে কিছু নেই। ইতালীয় নাগরিক তাবেলাকে বিএনপি নেতা কাইয়ুম তার ভাইকে দিয়ে শুটার ভাড়া করে হত্যা করেছে। তাদের কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এসব ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে তারাই আইএসের নামে এসব প্রচার করছে। এসব প্রচারণাকে আমরা গুরুত্ব দিই না”। অর্থাৎ আইএস নেই এখনো সে কথা আঁকড়ে ধরে আছে। তবে বাড়তি স্বীকারোক্তি হল, এক. আইএসের নাম দিয়ে অন্যেরা কেউ করছে। দুই. জামায়াত-বিএনপি এগুলো করেছে। এ কথা ঠিক যে জামায়াত-বিএনপিকে জড়িয়ে মিথ্যা বয়ান দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের আর একধরনের উদ্দেশ্য আছে। তা হলো, সরকারবিরোধী সাংবিধানিক ধারার বিরোধী দল জামায়াত-বিএনপির ওপর দমনপীড়ন বা চলতি গণগ্রেফতারের পক্ষে এক ন্যায্যতার বয়ান খাড়া করা। ফলে “আইএস আছে” স্বীকার করে নিলে জামায়াত-বিএনপির ওপর নিপীড়নের পক্ষে বয়ানের ভিত্তি থাকে না। এমনিতেই এ বয়ান জনগণ বা খোদ সরকার কেউ বিশ্বাস করে না। সবাই বোঝে এটা সরকারের মুখরক্ষার বয়ান মাত্র।
    তবে এ কথাও সত্যি যে, কিছু টেকনিক্যাল সমস্যাও আছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতা বিষয়ে সরকার কোনো স্বীকারোক্তি বয়ান দিয়ে দিলে কতকগুলো অসুবিধা ও জটিলতা সৃষ্টি হবে যেগুলো সরকার এড়াতে চায়। যেমন, কোনো দেশে ‘সন্ত্রাসবাদী’ তৎপরতা ও উপস্থিতি আছে, এমন অফিসিয়াল স্বীকৃতি থাকলে হয়ত বিদেশী দূতাবাস বা প্রতিষ্ঠানকে কিছু রুটিন নিরাপত্তা বিষয়ক করণীয় এমন পদক্ষেপ নিতেই হবে। যেমন, অতি জরুরি স্টাফ ছাড়া বাকিদের দেশে পাঠিয়ে দেয়া, ইমারজেন্সি উন্নয়ন কর্মসূচি ছাড়া বাকি সব তৎপরতা বন্ধ করে দেয়া, স্ব স্ব দেশের যেসব নাগরিক বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারি প্রকল্পে নিয়োজিত আছে নিরাপত্তার জন্য তাদেরকে দেশে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ ও চাপ দিতে হবে ইত্যাদি। আর এরই সার প্রভাবটা পড়বে বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্যে অর্থনীতিতে। তাই সরকার এসব বিপর্যয় হয়ত এড়াতে চায়। তবে অবশ্যই এমন স্বীকারোক্তি না দেয়ার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলকে দমনের কাজে এই বয়ানকে খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার মারাত্মক বিপজ্জনক এবং অগ্রহণযোগ্য।

    দুই.
    ইসলামি রাজনীতির পক্ষে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই কি তাকে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন বলা ঠিক হবে? এমনিতেই পশ্চিমের “টেররিজম” – এর সংজ্ঞাও কোন স্পষ্ট ভিত্তি নাই। এককথায় তা সাবজেকটিভ; আমি চাই তাই ধরনের। অনেকটা যেন আমি অমুক সংগঠনকে টেররিস্ট বলতে চাই তাই – এরকম। কিন্তু কেন বলতে চাই – এর কোন জবাব নাই,  বলব না, নিরুত্তর।  বিভিন্ন দলিলে বলা হয়েছে টেররিস্ট দল কারা এক তালিকা আছে। ঐ তালিকায় যাদের নাম আছে ওরাই টেররিষ্ট। এভাবে আসলে কোন সংজ্ঞা না দিয়েই টেররিজম কোনটা বা টেররিষ্ট কারা এর ছদ্ম ভিত্তি দাঁড় করানো হয়েছে। এটা আমেরিকান কায়দা। আবার ঠিক এই কায়দা অনুসরণ করে জাতিসংঘেরও এক নিজস্ব টেররিস্ট তালিকা ও কায়কারবার।
    তো যে কথা বলছিলাম, পশ্চিমা সংজ্ঞার দিক থেকে বিচারেও ব্যাপারটা সম্ভবত ঠিক তা নয় যে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই সে পশ্চিমের চোখে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন। বরং সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কার ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার কোথায় এই প্রশ্ন বিচারে আমরা ভিন্ন এক ভাগ-বিচার দাঁড় করতে পারি। যেমন, যেগুলো পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর যেগুলো তা নয় এমন দুইয়ের ভাগ-বিচারের মধ্যে বড় ফারাক হল, পাকিস্তানের ভূমিতে ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার আছে, এমন সংগঠন সম্পর্কে একটা অনুমান আমরা করতে পারি যে এসব সংগঠন নিজেদের এজেন্ডা যা-ই থাক, মাঝে মধ্যে পাকিস্তান সরকার বা এর গোয়েন্দা বাহিনীর দেয়া অ্যাসাইনমেন্টও সম্পন্ন না করে দিলে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ওসব সংগঠনের তৎপরতা পাকিস্তানের চলতে দেয়ার কথা নয়। যেটাকে আমরা বলতে পারি ট্যাক্স দিয়ে চলা। কারণ, সশস্ত্র সংগঠন মানেই যেকোনো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক আইনের চোখে তা বেআইনি তৎপরতাই হবে। ফলে সেই বেআইনি দিক উপেক্ষা করে কাজ করতে দিতে পারে একমাত্র সরকার বা এর কোনো এজেন্সি। কথাটা আরেকভাবে বলা যায়, সশস্ত্র ওসব সংগঠনের কোনো তৎপরতা যদি সরাসরি পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইচ্ছার সাথে সংঘাতের বিষয় হয়, তাহলে পাকিস্তান সরকার এসব সশস্ত্র সংগঠনকে নিজ ভূমিতে থেকে তৎপরতা চালাতে দিবে না। দিতে পারে না। এই বিচারে আলকায়েদা ও আইএস ছাড়া বাকি প্রায় সব সংগঠন পাকিস্তানভিত্তিক। ফলে পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর পাকিস্তানভিত্তিক নয়, এভাবে দুটো ভাগ আমরা করতে পারি।
    আবার পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোর আর এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল, এরা দুনিয়াব্যাপী তৎপরতার সংগঠন নয়। এমনকি এরা ঠিক আঞ্চলিক সংগঠনও নয়। মানে আমাদের অঞ্চলের সব রাষ্ট্রেই সংগঠনের শাখা ও তৎপরতা আছে তা নয় এবং সব সরকারের বিরুদ্ধে তৎপর এ কথাও সঠিক নয়। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রে তৎপর এবং এই অর্থে বলা যায়, বেশির ভাগই কাশ্মির ইস্যু কেন্দ্রিক সংগঠন। এটাই তাদের মূল কাজের এলাকা। তবে উপচে পড়া এফেক্ট হিসেবে বাংলাদেশেও এদের তৎপরতা থাকতে পারে। কিন্তু মূল কথা আলকায়েদা বা আইএসের সাথে সম্পর্ক বা এফিলিয়েটেড সংগঠন এরা কেউ নয়।
    তাহলে পাকিস্তানভিত্তিক আর আন্তর্জাতিক- এভাবে ভাগ দেখানোর আর এক কারণ হল, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো ৯/১১-এর আগেও হাজির ও তৎপর ছিল। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিজ নিজ স্বার্থে পরস্পরের বিরুদ্ধে এবং অপর রাষ্ট্রের ভেতর কাউন্টার ইনটেলিজেন্স বা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালানোর বহু পুরনো রেওয়াজের ধারাবাহিকতা সংগঠন। পশ্চিমা বা আমেরিকানরা যে অর্থে সন্ত্রাসবাদী বা টেরর সংগঠন বলতে বোঝে, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো এর পুরো অর্থ বহন করে না। অটল বিহারি বাজপেয়ির বিজেপি সরকার ২০০৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত  ভারতে ক্ষমতাসীন ছিল। পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোকে এরা সে সময় এক নতুন নামে ডাকত, বলত  “সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদ”। অর্থাৎ সীমান্তের অপর পাড় থেকে মানে পাকিস্তান থেকে যারা আতঙ্ক বা সন্ত্রাস ছড়াতে এসেছে। এই নাম খুবই অর্থপূর্ণ। পশ্চিম তাঁর সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদী বলতে যাদেরকে বোঝাতে চায় ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদীরা’ ঠিক সে সংগঠন এরা নয়।
    এসব বিচারে এবার স্পষ্ট করে বলা যায়, আলকায়েদা বা আইএসের সন্ত্রাসবাদ ভারত অথবা বাংলাদেশ এপর্যন্ত কখনও দেখে নাই। এর আগে কখনোই অভিজ্ঞতা নেয়া বা মোকাবেলা করতে হয়নি। মনে হচ্ছে, এবারই প্রথম করতে হবে। তাহলে এত দিন ভারতের ভোকাবুলারিতে সর্বক্ষণ যে জঙ্গিবাদের কথা শুনে এসেছি সেগুলো কী ছিল? দু’টি পয়েন্টের দিক থেকে তা ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রেওয়াজি অন্তর্ঘাতী তৎপরতা যেগুলো ছিল, আফগান যুদ্ধফেরত যোদ্ধাদের ফেরার কারণে যেটা আরো বড় মাত্রা পেয়েছিল; সেকালে নাইন ইলেভেন আমেরিকায় হামলার পর আমেরিকা ভারতের সমর্থন চাওয়াতে ভারত তার নিজ অভিজ্ঞতার ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদকে’ আমেরিকান বুঝের ‘সন্ত্রাসবাদ’ বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বলে চালানোর সুযোগ পেয়েছিল এবং নিয়েছিল। কিন্তু তবু ভারত অভ্যন্তরীণভাবে নিজস্ব মূল্যায়নে পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র তৎপরতা আর আন্তর্জাতিকভাবে আলকায়েদা ও আইএসের তৎপরতাকে পরিষ্কার আলাদা ভাগ করেই বুঝে থাকে। তবে এত দিন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সে তৎপরতায় ভারতের নিষ্ঠা আছে, অথবা বাংলাদেশে তার সিকিউরিটি স্বার্থ আছে এসব কথা ছড়িয়ে সে বাংলাদেশে নিজের পছন্দের সরকার রাখাকে জায়েজ করেছে। বিনিময়ে ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থ আদায় করা আর সবচেয়ে বড় স্বার্থ বাংলাদেশ থেকে মাগনা ট্রানজিট আদায় করা এগুলো চালু রেখেছে। আজ সম্ভবত সময় ঘনিয়েছে। কানে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতার বিপক্ষে ভারতের নড়াচড়া প্রস্তুতি নিতেই বা  করতেই হচ্ছে তাকে। আইএস তৎপরতার উপস্থিতি, হোক না তা স্থানীয় সংগঠনকে এফিলিয়েশন দেয়া তৎপরতা, এটা ভারতের পক্ষে আর কোনোভাবেই খাটো করে দেখা সম্ভব হচ্ছে না। এই জায়গায় এসে বাংলাদেশ সরকারের স্বার্থের পক্ষে ‘আইএস নেই’ সে কথা বলবার অবস্থায়  ভারত আর নেই। যদিও সর্বশেষ গত অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে দুই বিদেশী হত্যার পরেও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে তাল মিলিয়ে ও নিজের গোয়েন্দা তথ্যের সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিল আইএস নেই। একই সাথে এবার ভারতীয় মিডিয়াগুলোর ভোল বদলও লক্ষণীয়। অন্তত নিরাপত্তার প্রশ্নে এই ইস্যুতে হাসিনার বয়ান ও স্বার্থকে ভারত আর নিজের স্বার্থের সাথে মিলিয়ে দেখতে ও চলতে পারছে না।
    বলা বাহুল্য, ভারতের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ, নিরাপত্তাবিষয়ক জেনুইন কোনো হুমকি ইত্যাদি – এসবকে অন্য সব কিছুর ওপর তাকে স্থান দিতেই হয়। সবার আগে চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা।

    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে গতকাল ৩০ নভেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এরই ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আরও সংযোজন এডিট করে এখানে আজ আবার ছাপা হল।]

    সর্বশেষ এডিটঃ ০১ ডিসেম্বর, ভোর ০২ঃ৫২

  • “মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামাত-মুক্ত বিএনপির” রাজনীতি

    “মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামাত-মুক্ত বিএনপির” রাজনীতি
    গৌতম দাস
    ২৬ আগষ্ট ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-bf

    গত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। সে সফরের পর দেশের সরকার বা বিরোধী দল অথবা কোন বিদেশী কূটনীতিক কেউ দায়িত্ব নিয়ে বলেনি নরেন্দ্র মোদি কী মেসেজ রেখে গেলেন। কিন্তু কানাঘুষা,আর অনুষঙ্গী ঘটনাবলিতে ক্ষমতাসীনদের আচরণ বক্তব্য থেকে দিনে দিনে এটা স্পষ্ট হচ্ছে যে, মোদি-হাসিনা এবং মোদি-খালেদা আলোচনায় একটা নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার বিষয় ইস্যু হিসাবে উঠেছিল। অনুমানে ধরে নেয়া এই আলোচনার পক্ষে সাক্ষ্য দেয় এমন দু’টি শব্দ এরপর থেকে রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত হয়ে উঠতে দেখা যায় – “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি”। এই ব্যাপারটাকে উল্টো করে বলা যায় যে, “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” এই দু’টি বাক্য চালু হওয়া থেকে বোঝা যায় মোদির সফরে নির্বাচন বিষয়ে একটা ইস্যু সেখানে উঠেছিল। আর একটু স্পষ্ট করে বলা যায়, নির্বাচন বিষয়ে অনুমান করা ঐ আলাপের সারকথা সম্ভবত এরকম যে, “সকলকে নিয়ে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা দরকার কারণ রাজনৈতিক সঙ্কট এভাবে ফেলে রাখাটা আমাদের সবার জন্যই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে”। মোদির সফর- উত্তরকালে মোদির এই মেসেজের অর্থ কী অথবা কেমনে কী অর্থ দাঁড়িয়ে যায় সেসব সম্ভাবনার আগেই সম্ভবত শেখ হাসিনার সরকার এবং ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা নিজেই এর অর্থ নিজের মত করে সাজানো শুরু করে দেয়। সে অর্থটাই সম্ভবত “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” এই দু’টি বাক্য চালু করেছে। তবে এথেকে “মধ্যবর্তী নির্বাচন” কথাটার অর্থ কমবেশি সহজে বোঝা যায় কিন্তু “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” কথাগুলোর অর্থ তাৎপর্য কী?

    এখানে তামাশার দিকটা হল, বিএনপির রাজনীতি কেমন হবে জামায়াত ছাড়া না জামায়াত সহ এই শর্ত আওয়ামী লীগের মুখ থেকে আসছে। এক্ষেত্রে এমন একটা ভাব তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে যেন এখানে আওয়ামী লীগ দাতা আর বিএনপি গ্রহীতা। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিএনপির ক্ষমতাদাতা নয়। আওয়ামি লীগ নিজে বড়জোর নিজের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে আবার নিজের মত করে একটা নির্বাচন দিতে পারে, তাই নয় কি? কারণ এটা কারো না বুঝতে পারার কারণ নেই যে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে অনেক কিছু হয়ত দিতে পারে কিন্তু এর পরেও যা কখনই দিতে পারে না তা হল ক্ষমতা। আর যাই হোক, আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ক্ষমতাদাতা হতে পারে না। হওয়ার কথাও নয়।
    তবু এই সরল কথাটা আড়াল করে একটা ভাব ছড়ানো হয়েছে যেন এক শর্ত সাপেক্ষে ক্ষমতাসীন সরকার বিএনপির ক্ষমতাদাতা হতেও পারে। কি শর্তে? যে, বিএনপি যদি জামাতমুক্ত হয় তবে যেন সে লীগের কাছে থেকে ক্ষমতাও পেয়ে যেতে পারে! তাই আওয়ামি লীগ এখান থেকেই বিএনপিকে নির্দেশদাতা হবার ভান ধরেছে, বলছে যে জামাতমুক্ত হয়ে যাও তুমি!

    এ’এক সত্যি বিরাট তামশা। শুধু তাই না। এছারা এখানে এভাবে আর একটা ইঙ্গিত তৈরি করা হয়েছে যেন ৫ জানুয়ারিতে কোনো নির্বাচন না করা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ এর পক্ষে সাফাই দিচ্ছে এমন যেন নেহায়ত বাধ্য হয়ে ৫ জানুয়ারিতে কোনো নির্বাচন না করা সত্ত্বেও আওয়ামি লীগ নিজেকে বৈধ সরকার বলে দাবি করেছে। যেমন, লীগের হস্তক্ষেপ ছাড়া একটা ফেয়ার নির্বাচন হলে তাতে বিএনপি নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসে পড়লেও যেন আওয়ামী লীগের আপত্তি ছিল না,থাকত না। কিন্তু লীগের হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে এজন্য যে, ওই নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতযুক্ত থেকে যাবার কারণে সহযোগী জামায়াত ক্ষমতায় চলে আসবে আর কেবল ঠিক এখানেই আওয়ামী লীগের আপত্তি। জামাত ঠেকানোর মহান কর্তব্য সম্পন্ন করার জন্যই যেনবা জবরদস্তিতে আওয়ামি লীগ নির্বাচন না হতে দিয়েও নিজেকে নির্বাচিত দাবি করছে! তাই কী? আওয়ামী লীগের এমন সাফাই, এমন ইঙ্গিত অবশ্য কেউই বিশ্বাস করে না, এমনকি তারা নিজেরাও না। এটা যে ছলনামূলক মিথ্যা কথা, কেউ বিশ্বাস করবে না জেনেও মুখরক্ষার জন্য বলা কথা তা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সবাই জানে, মানে। তবু তাদের এই কথা বলা ছাড়া মুখরক্ষার সাফাই হিসেবে আর কিছু বলার নেই। এই হল, “জামাতমুক্ত বিএনপি দেখতে চাওয়া” আওয়ামি লীগের আবদারের সারকথা।
    তবে এ বিষয়ে আরও করুণ অবস্থা ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের। গত ৫ জানুয়ারি ২০১৪ নির্বাচনের আগের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেখানেও হবু নির্বাচনের পক্ষে শক্ত হয়ে দাঁড়ানো এবং এরশাদকেও হবু নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য যে যুক্তি তিনি এরশাদকে দিয়েছিলেন এরশাদের সাথে সুজাতার মিটিং শেষে তা গরম থাকতে থাকতেই এরশাদ নিজেই মিডিয়াকে স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন। সুজাতা সিং বলেছিলেন জামায়াত ক্ষমতায় এসে যাবে তা ঠেকানোটা এরশাদের আসল কাজ। মহান দায়িত্ত্ব। আর জামায়াত ঠেকাতে হবে সে জন্য এরশাদকে হাসিনার সাথে নির্বাচনে যেতে হবে। আর এই মহৎ কাজের জন্যই বিএনপি-জামায়াতকে বাইরে রাখার যে সুযোগ পাওয়া গেছে তা ব্যবহার করতে এরশাদের নির্বাচনে যেতে যেন দ্বিধা না করেন। সুজাতার যুক্তির সারকথা ছিল বাংলাদেশের ক্ষমতাকে “জামাতমুক্ত” দেখতে যাওয়ার খায়েশ। বুঝা যাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামি লীগকে ভোট না দিলেও জবরদস্তিতে লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চাওয়ার ভারতের ব্যকুলতা কত তীব্র ছিল যে একটা ভাল সাফাই যুক্তি যোগাড় করতে না পারলেও বাংলাদেশে এমন ন্যাংটা হস্তক্ষেপের পক্ষে কথা বলতে সুজাতা কত ডেসপারেট ছিলেন।
    সুজাতা সিং সেসময়ের ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের মধ্যে শীর্ষ কূটনীতিক। এই শীর্ষ কূটনীতিকের এটা নিঃসন্দেহে তার করুণ দুর্দশার চিত্র। তিনি তার হস্তক্ষেপের কাজকে,এরশাদের সাথে মিটিংয়ের বক্তব্যের স্বপক্ষে পাবলিকলি কোন সাফাই হাজির করতে পারেন নাই। এর ফলে তাঁর কথা হয়ে গেছে এমন যে, বাংলাদেশের মানুষ যদি চায়ও বিএনপি-জামায়াতকে ভোট দেবে, নিজেদের প্রতিনিধি বলে নির্বাচন করবে তবু সুজাতার ভারত তা হতে দিতে পারে না। আচ্ছা, এটা কি কোনো অতিথি পররাষ্ট্র সচিব বলতে পারেন? সেটা কি বাংলাদেশের জনগণ কাকে নির্বাচন করবে, নেতা প্রতিনিধি মানবে এর বিরুদ্ধে সুজাতার সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং বাধা দেয়ার সফর ছিলো না? সম্ভবত সে জন্য এর পর থেকে তিনি আর কখনো বাংলাদেশে মিডিয়ার মুখোমুখি হননি।
    সেই থেকে এবারও ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের একই দুর্দশা দেখা যাচ্ছে। তারা তাদের বক্তব্যের পক্ষে এবারও র‍্যাশানালিটি বা যুক্তি-বুদ্ধি হাজির করতে পারছে না। তাদের সব যুক্তির প্রধান কথা সবসময় যা থাকে তা হচ্ছে, বাংলাদেশের “ইসলামি সন্ত্রাসবাদ বা তাদের উত্থান” – এই বিষয়ে তারা উদ্বিগ্ন। খুবই ভালো কথা। ফ্যাকটস হিসেবে ভারতের এমন উদ্বিগ্নতার পক্ষে সত্যতা আছে কি না সে তর্ক না তুলেই ভারতের উদ্বিগ্নতা স্বীকার করে নেয়া যাক।
    কিন্তু সে জন্য তারা বাংলাদেশের জনগণ কাকে ভোট দেবে তা কি ঠিক করে দিতে পারে? একটা হস্তক্ষেপের নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়াতে পারে? জনগণ কোন দলকে কোন নেতাকে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা তাতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে? ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের পছন্দের দল ও নেতার পক্ষে যদি জনমত না থাকে,তাদের পছন্দের নেত্রীর পাবলিক রেটিং যদি না থাকে তারপরও কি তাদের জিতিয়ে আনার পক্ষে কিছু করার সুযোগ থাকে?
    আমরা এখানে খুবই সাধারণ একটা প্রশ্ন তুলেছি। প্রশ্নটা হলো, ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের পছন্দের দল ও নেতার পক্ষে যদি জনমত না থাকে, নেত্রীর নিজ গুণেই যদি নিজেদের পাবলিক রেটিং ধরে রাখতে না পারেন, না থাকে তাহলে কি তারা বাংলাদেশে একটা হস্তক্ষেপবিহীন নির্বাচন হতে দেবে না? এসব বিষয় মোটেও কোনো বিশাল কিছু নয়। এসব প্রশ্ন তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ১৯৪১ সালে রুজভেল্ট-চার্চিলের বিখ্যাত আটলান্টা চার্টারে সমাধা হয়ে গেছে, সেকালেই। এটা এখনও যারা মানতে পারে না তারা নিশ্চয় এখনো কলোনি শাসনের পক্ষের লোক। অথচ সে সময়ই এটা দুনিয়াতে সমাধা হয়ে গেছিল যে, জনগণকে পছন্দের নেতা প্রতিনিধি নির্বাচন করতে না দেয়া, নেতা বেছে নিতে না দেয়া মারাত্মক অপরাধ। অন্য রাষ্ট্রের এমন কাজের কোনো অধিকারই নেই। ভিন রাষ্ট্র বা পড়শি রাষ্ট্র প্রতিবেশী দেশের নির্বাচিত কোনো নেতাকে বড় জোর প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু কোন নেতাকে নির্বাচিত হতে,বেছে নিতে জনগণকে কোনোক্রমেই বাধা দিতে পারে না। ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের একালে এমন অধপতিত দশায় পড়তে হয়েছে যে তারা প্রত্যক্ষ বাধা দিচ্ছেন। আবার তাদের কাজের পক্ষে যুক্তিবুদ্ধি সাজিয়েও দাঁড়াতে পারছেন না। খোলাখুলি হাসিনার গায়ের জোরের পক্ষে গিয়ে দাঁড়াতে হচ্ছে।
    তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গোড়ার সঙ্কট হলো, হাসিনার আওয়ামী লীগ পাবলিক রেটিং নেই। অথচ ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা সেই হাসিনার ওপর সব বাজি ধরে বসতে চান। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন একটা করিয়ে নিয়েছেন,কিন্তু শান্তি নেই। নতুন নির্বাচনের প্রয়োজন এটা এখন স্বীকার না করে পারছেন না। রা নির্বাচন না দিলে আরো বড় বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। ঘটনা পরিস্থিতি সেক্ষেত্রে হাতছুট হয়ে যেতে পারে সে সম্ভাবনার রিস্ক নিতে হবে।
    তাই লজ্জার মাথা খেয়ে আওয়ামী লীগ নিজেকেই মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামায়াতমুক্ত বিএনপির কথা পাড়তে হচ্ছে। অথচ বুঝতে চাইছেন না যে আওয়ামী লীগের মুখ দিয়ে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপির’ শর্ত আওড়ানোর কোনো মানে হয় না। কারণ এর মানে কী বিএনপি জামায়াতমুক্ত হলে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ক্ষমতা দেবে? ক্ষমতায় এনে দিবে? আর বিএনপি যদি জামাতমুক্ত না হয় তাহলে লীগ কোন ফেয়ার বা হস্তক্ষেপহীন নির্বাচন হতে দিবে না? এটাই কী ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের অবস্থান বক্তব্যের স্বপক্ষে যুক্তি? ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ কথাটার পক্ষে সাফাই?

    অন্য আর একদিক থেকে বললে, জামায়াতমুক্ত বিএনপির বাসনা অবশ্য আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের থাকতেই পারে – যদি সেটা তাদের বাসনা মাত্র হয়। কারণ আইনগতভাবে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’র শর্ত আরোপ করতে পারে জনগণ অনুসমর্থিত কনস্টিটিউশনাল একটা রেফারেন্ডাম। দেশের ভিতর কে কেমন পার্টি হবে এটা বিএনপির আওয়ামী লীগের উপর কিংবা আওয়ামী লীগের বিএনপির উপর আরোপ করার বিষয় নয়। ঠিক যেমন বিএনপি আওয়ামী লীগকে বা ভাইসভারসা কেউ কাউকে ক্ষমতায় আনতে পারে না,এমনটা অবাস্তব ঠিক তেমনই শর্ত দিতে কিংবা শর্ত পূরণ করলে তবেই অন্যকে ক্ষমতায় আনব এটাও অবাস্তব। অর্থহীন কথাবার্তা। এ ছাড়াও মনে রাখতে হবে এ বিষয়ে কথা বলার দিক থেকে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা কেউ না, কোনো পার্টিই নয়।
    এ কারণে বিএনপির কোনো নেতা অথবা কোনো সুশীল বুদ্ধিজীবী অথবা প্রথম আলোর উপসম্পাদকের মতো কোনো মিডিয়া কর্মী যখন এমন কথা ছড়ায় যে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ হতে হবে এটা হাস্যকর। অবাস্তব। এক্ষেত্রে তারা অবশ্যই আদতে আওয়ামী কর্মী না হলে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দার স্বার্থ পালনকারী।

    এখানে বলে রাখা ভাল, আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা “জামায়াতমুক্ত” অথবা “জামায়াত বিরোধিতা” এমন কথা বলে বা লিখে কেবল জামায়াত রাজনৈতিক দলকে বুঝায় না। তারা আসলে বুঝাতে চায় যেকোনো ইসলামি রাজনীতি বা রাজনীতির সমর্থক; এক কথায় বললে ইসলামি ফেনোমেনা বা পুরা ইসলামি কনস্টিটুয়েন্সি। এখন আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা তারা সবাই আসলে বুঝাতে চায় তারা বাংলাদেশে কোনো ইসলামিক রাজনৈতিক অভিপ্রকাশ, রাজনীতিতে কোনো ইসলামি ফেনোমেনা তারা দেখতে চায় না। যদি তাদের চাওয়াটা ন্যায্য বলে ধরেও নেই তবু এটা বাস্তবায়ন করার উপায় লীগ-বিএনপির এক দল অপর দলকে শর্ত দেয়া নয় বরং জনসমর্থিত (রেফারেন্ডাম বা তুল্য কোনো কিছুর মাধ্যমে) এমন একটা কনস্টিটিউশন হাজির করে তা নিশ্চিত করা। কারণ এক দল অন্য দলকে ক্ষমতায় আনার কেউ নয়। কোন রাজনীতি কে করতে পারবে তা একে অপরকে ডিকটেক্ট করার তারা পরস্পরকে বলার কেউ নয়।
    আবার বাংলাদেশে কোনো “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতি থাকতে পারবে না” আর বাংলাদেশে কোনো “ইসলামিক রাজনৈতিক অভিপ্রকাশ,রাজনীতিতে কোনো ইসলামি ফেনোমেনা থাকতে পারবে না” বলা এক কথা নয়। প্রথম বক্তব্যটা কনস্টিটিউশনে বলার পরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকতে পারে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু দ্বিতীয় বক্তব্যটার বেলায় ইসলামি নাম নিয়ে আইনত কিছুই থাকতে পারবে না। তবে অবশ্যই নাম না নিয়েও তা থেকে যাবে। কারণ আইন করে একটা রাজনৈতিক চিন্তাকে স্তব্ধ করা যায় না। আবার প্রথম কথাটা পড়শি ভারতসহ যেকোনো বিদেশী আশা করতে পারবে। মানে “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির” বিরুদ্ধে বলতে পারবে, আশা করতে পারবে। কিন্তু এরপরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকলে তা নিয়ে বলার ক্ষেত্রে বিদেশীরা কিছু বলার কেউ নয়।
    আমাদের এখানকার প্রসঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওপরের শেষ বাক্যটা। অর্থাৎ ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ বলে কিছু হবে কি না এ নিয়ে ভারতের কিছু বলার নেই। ভারত বলার কেউ নয়। ‘সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতি থাকতে পারবে না’ এমন ধরনের কথা বাংলাদেশের কনস্টিটিউশনে বলার পরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকতে পারে কোনো অসুবিধা নেই। আর এ নিয়ে ভারতের কথা বলার কোনো সুযোগ নেই।
    কিন্তু এসব আইনি সাংবিধানিক কাজের দিক দিয়ে না এগিয়ে আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের মুখ দিয়ে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপির’ কথা বলানো খুবই বিপজ্জনক। কারণ একটা কথা মনে রাখতে হবে, বাস্তবতা হলো, “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির” বিরুদ্ধে মেজরিটি মানুষের একটা কনসেনসাস জনমত আছে। জনমত জরিপেও সেটা প্রতিফলিত হবে। কিন্তু যদি বলা যায় “কোনো ইসলামি রাজনৈতিক দলই বা ফেনোমেনাই বাংলাদেশে থাকতে পারবে না” সে ক্ষেত্রে দেখা যাবে এই একই জনগোষ্ঠী বা জনমতের মেজরিটি উল্টো রায় দেবে। শুধু তাই নয়,চাপাচাপি করতে যাওয়ার জন্য নিজের দেশ ভূমি জমিতে ‘সন্ত্রাসবাদ’ দেখতে চায় না এর সপক্ষের মেজরিটির ঐকমত্যের জনমতটাও এরপর আর থাকবে না। হত্যা করা হবে।
    এ ছাড়া একটা কথা সুনির্দিষ্ট করে বলার সময় হয়েছে যে বাংলাদেশে ‘সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির’ হতে পারে বা থাকতে পারে এটা ভারতের স্বার্থের বা উদ্বিগ্নতার বিষয় নয়। ভারত বরং এসব বিষয়ে তত সিরিয়াস নয়। বিষয়টাও তত সিরিয়াস নয়। রাষ্ট্রের রুটিন তৎপরতাতে সেসব দিক নিয়ন্ত্রণ করে রাখা সম্ভব এবং তাই হচ্ছেই। বরং ভারতের সিরিয়াস প্রসঙ্গ হলো, ক. বিনা শুল্কে, বিনা বিনিয়োগে, বিনিয়োগের দায় না নিয়ে ট্রানজিট হাসিল করা খ. বাংলাদেশ চীনের সাথে অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সম্পর্কে কতটা পক্ষে বা দূরে থাকবে তা বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থে নির্ধারণ করার বদলে ভারতের স্বার্থে নির্ধারণ করতে বাধ্য করা। ভারত তার নিরাপত্তার উদ্বিগ্নতার কথা বলে এর আড়ালে এসব অর্থনৈতিক রাজনৈতিক স্বার্থ বাংলাদেশ থেকে হাসিল করতে জবরদস্তি করে চলছে। এ কাজে কোনো পাবলিক রেটিংয়ে দুর্বল রাজনৈতিক দলই তার জন্য বেশি উপযুক্ত। কারণ যত জনসমর্থন বেশি ভারতের কথা তত সে শুনবে না।

    দুই.
    গত এক সপ্তাহে খালেদা জিয়ার কথিত এক মন্তব্যকে নিয়ে দু’টি প্রপাগান্ডা রিপোর্ট বের হয়েছে। প্রথমটি ভারতের ‘দি হিন্দু’ (THE HINDU) পত্রিকার খোদ সম্পাদকীয়। দ্বিতীয়টি স্টাটফোর (STRATFOR) নামে আমেরিকান গোয়েন্দা ইনটেলিজেন্স পত্রিকার এনালাইসিস রিপোর্ট। দু’টি রিপোর্টের প্রসঙ্গ একই এবং এটা পরিষ্কার যে, ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের প্রভাবে এই রিপোর্ট দু’টি তৈরি। বাংলাদেশে তারা যে অবস্থান বা নীতিতে পরিচালিত সেই নীতির পক্ষে এ দুটোই প্রপাগান্ডা রিপোর্ট। হিন্দু সম্পাদকীয় বের হয়েছে ২৮ জুলাই আর স্টাটফোরেরটা বের হয়েছে ৩০ জুলাই। দু’টি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ‘খালেদা জিয়া নাকি নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসেছেন। ফলে তাতে নাকি বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।’

    হিন্দু দাবি করছে, ‘BNP’s decision to drop its demand for the formation of a caretaker government। আর স্টাটফোর দাবি করছে, Khaleda Zia has indicated that parts of the opposition might be willing to drop some of their demands — such as imposing a neutral caretaker government to oversee elections.
    প্রথমত তথ্য হিসেবে এটা মিথ্যা যে, খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ছেড়ে দিয়েছেন, বা সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত ২৫ জুলাই খালেদা জিয়া তার গুলশানের অফিসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইনজীবীদের সাথে সাক্ষাতের সময় নাকি এ কথা বলেছেন। বিডিনিউজ২৪ পত্রিকার রাজনৈতিক লাইন বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক লাইনের সবচেয়ে কাছাকাছি। ফলে এখানে পর্যবেক্ষণ হল, সরকার আর ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের কমন অবস্থানটাই সবচেয়ে ভালো প্রতিফলিত হয় এই পত্রিকার রিপোর্টে। সেই বিডিনিউজ ঐদিনের প্রসঙ্গে খালেদার কথা কী বুঝেছে তা দেখা যাক। বিডিনিউজ২৪ ইংরাজী শিরোনাম করেছে, Khaleda says fairness is the key, caretaker or no caretaker’। আর ভেতরে কোট আনকোট লিখছে, ‘It is not necessary that elections should be under a caretaker government. Whatever it is called, we want a neutral government to ensure free and fair elections’। এতটুকু পড়ে যে কারো নিশ্চিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট যে, খালেদা কেয়ারটেকারের দাবি ত্যাগ করেছেন এমন বুঝ এখান থেকে বের করার সুযোগ নেই। কারণ সারকথা হলো, খালেদা জিয়া ‘কেয়ারটেকার’ শব্দ নিয়ে আঁকড়ে বসে থেকে ঝোলাঝুলি না করে ‘হস্তক্ষেপবিহীন নির্বাচন’ দাবি তার মূল কথা এটাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। অর্থাৎ বিডিনিউজ অন্তত ভুল বা উল্টো বোঝেনি। তবু হিন্দু আর স্টাটফোর বুঝেছে।
    তবু কি আর করা যাবে এবার তাদের বোঝার যুক্তিবুদ্ধি বা লজিকটা কী তা পরখ করা যাক।

    খালেদা জিয়া কেয়ারটেকার দাবিটা যদি ত্যাগ করেই থাকেন তো সেটা ইতিবাচক বা তার মধ্যে আশার আলো দেখার কি আছে?
    গত দু-তিন বছরে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনগুলোর ন্যূনতম ফেয়ারনেস বা গ্রহণযোগ্যতা প্রসঙ্গে যদি এই দুই মিডিয়া রিপোর্টারের ধারণা না থাকে তবে বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের এমন সম্পাদকীয় বা বিশেষণ লেখার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সুতরাং ধরে নিতে হবে শেখ হাসিনার অধীনে যেকোনো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার গুরুতর সঙ্কট যে আছে এটা তারা জানেন। আর কে না জানে হাসিনার অধীনে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নেই এ জন্য নয় যে বিরোধীরা তাতে অংশগ্রহণ করেনি। অংশগ্রহণ করলেও সেখানে আরো মারাত্মক সঙ্কট আছে। সর্বশেষ ঢাকা সিটি নির্বাচন এর সাক্ষী যেখানে খোদ খালেদার গাড়িতে নিয়মিত আক্রমণ করতেও শেখ হাসিনা দ্বিধা করেনি। ভোট কারচুপির ডেস্পারেটনেস দেখার মতো। তাহলে এ অবস্থায় খালেদা কেয়ারটেকারের দাবি ছেড়ে দিয়েছে সুতরাং এটা ভালো খবর হিসেবে উদযাপন করা উচিত, তাই কী? তার মানে এই পত্রিকা দু’টি একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হওয়াটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না, গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন খালেদার কথিত কেয়ারটেকারের দাবি ছেড়ে দেয়া, এটাকে আবার তাদের ভালো এক ‘আপসরফাও’ মনে হয়।

    পত্রিকায় রিপোর্ট লিখতে গেলে ন্যূনতম কিছু এথিকসের ওপর দাঁড়াতেই হয়। একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে সব পত্রিকা দাঁড়াবে এটাও তো স্বাভাবিক। আমরা এখানে দেখছি পত্রিকা দুটো বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়ানো দরকার মনে করছে না। এর চেয়ে বরং না করে কথিত আপসরফা করে ফেললে আমাদেরকে খুশি হতে তাগিদ দিচ্ছে। পত্রিকা দুটো নিজেরাও দেখা যাচ্ছে এ খবরে খুশি হয়েছে। নির্বাচনটা এখন বিশ্বাসযোগ্য না হলেই বরং এই দুই পত্রিকা খুশি দেখা যাচ্ছে। এ কেমন খুশি? কেমন এথিকসবোধ?

    স্টাটফোরের নামে সম্প্রতিকালে দাগ লেগেছে। সম্প্রতি উইকিলিকস সিআইএর সাথে তাদের অনৈতিক যোগাযোগের ফাইল ফাঁস করে দিয়েছে। নইলে এর আগে এটা যথেষ্ট সম্মানজনক পত্রিকা ছিল। কিন্তু ‘হি্ন্দু’ (১৮৭৮ থেকে প্রকাশিত) মাদ্রাজ থেকে বের হওয়া প্রায় দেড় শ’ বছরের পুরানো ইংরেজি পত্রিকা। যেকোনো পত্রিকা তার দেশে-বিদেশের রিপোর্ট করতে গিয়ে তার সরকারের অবস্থান তাকে কাঁধে করে ঘুরতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, যদি না মনিকাঞ্চন বা অনুগ্রহ লাভের কোনো ব্যাপার না থাকে। এ ছাড়া এটা সম্ভবও নয়। কারণ সরকার অনেক সময় অনেক অবস্থান নেয় অনেক কারণে, অনেক স্বার্থে। এর সবগুলো সবসময় ওই পত্রিকারও স্বার্থ হবে এমন কোনো কারণ নেই। বরং না হওয়াই স্বাভাবিক। যেমন নিজের দেড় শ’ বছরের ইমেজ রাখার স্বার্থ আর আমলা-গোয়েন্দা বাহিনীর প্রপাগান্ডা রিপোর্ট এই দুই স্বার্থ স্ববিরোধী হতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে তা আত্মঘাতী হয়েছে।

    এক বিচারে ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা সফল যে তারা দুটো পত্রিকাকে তাদের প্রপাগান্ডায় শামিল করতে পেরেছে। এতে পত্রিকা দুটো যে এথিক্যাল সঙ্কটে জড়িয়ে গেছে এর দায় ক্ষতি তাদের নিজেদেরই বহন করতে হবে। তবে স্টাটফোর আবার হিন্দুর থেকে এককাঠি সরেস। স্টাটফোর দাবি করছে শেখ হাসিনা নাকি গত দু-তিন বছরে যা করেছেন এটা নাকি বিরোধী দল দমন নয়, সন্ত্রাসবাদ দমন। তাই যদি হয় তাহলে আবার খালেদার সাথে আলোচনা, কম্প্রোমাইজ এসবের মানে কি? যে সন্ত্রাসী তার সাথে আবার আলোচনা নিগোশিয়েশন কম্প্রোমাইজ কি হতে পারে? তাকে তো দমন ও নির্মূল করারই কথা। এই প্রশ্ন দেখা যাচ্ছে স্টাটফোরের মাথায় আসেনি। এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে একটা স্পেস ভাড়া দেয়ার রিপোর্ট তারা করছে এটা তাদের কাছেও পরিষ্কার।

    তাহলে, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামায়াতমুক্ত বিএনপি’র রাজনীতির অর্থ হলো এক আকাক্সক্ষা যে আশা করছে বিএনপি যেমন-তেমন এক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে আওয়ামী লীগকে পুনর্বার যেভাবে হোক বিজয়ী ঘোষণা করে দেয়ার জন্য। মানুষের আকাঙ্খার রকমফেরের আসলে কোনো শেষ নেই।

    [লেখাটার প্রথম ভার্সান সংক্ষিপ্ত আকারে আগে ছাপা হয়েছিল গত ০৯ আগষ্ট ২০১৫, মাসিক অন্যদিগন্ত পত্রিকায়। এখানে আবার নতুন করে লিখে, এডিট করে ছাপা হল।]

  • লিসা কার্টিজ অথবা পশ্চিমা মনের ইসলাম-ভীতি ও দ্বিধা

    লিসা কার্টিজ অথবা পশ্চিমা মনের ইসলাম-ভীতি ও দ্বিধা

    গৌতম দাস

    হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়ার গবেষণা ফেলো হলেন লিসা কার্টিস (Lisa Curtis)। বাংলাদেশের দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার আমেরিকান সংবাদদাতা লিসা কার্টিসকে কিছু লিখিত প্রশ্ন পাঠিয়েছিলেন, যার লিখিত জবাব তিনি দিয়েছেন আর মানবজমিন পত্রিকায় তা গত ৬ এপ্রিল ২০১৪ ছাপা হয়েছে।

    থিঙ্কট্যাংক হেরিটেজ ফাউন্ডেশন ও আমেরিকান বিদেশনীতি
    হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, আমেরিকার থিঙ্কট্যাংকগুলোর মধ্যে প্রথমসারির। থিঙ্কট্যাংক মানে রাষ্ট্রের স্বার্থ ও নীতি কি হওয়া উচিত তা নিয়ে আগাম চিন্তাভাবনা ও নিজস্ব গবেষণা করে এতে পাওয়া ফলাফল জনসমক্ষে হাজির করা হয়, তা পরে বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নীতি হবার ক্ষেত্রে নির্ধারক ভুমিকা রাখে। তবে থিঙ্কট্যাংক বেসরকারি দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে চলে, সরকারী কোন প্রতিষ্ঠান সে নয়। হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের বিশেষত্ত্ব হল, ১৯৭৩ সালে প্রেসিডেন্ট রিগানের প্রভাবে এই প্রো-ইহুদি থিঙ্কট্যাংক জন্ম নেয়। ঘোষিত লক্ষ্য হল, ঘোষণা দিয়ে বলে কয়েই রক্ষণশীলভাবে চিন্তা করা। রক্ষণশীলভাবে ভেবে দেখা আমেরিকার রাষ্ট্রনীতি কি হতে পারে, হওয়া উচিত। আর হেরিটেজ মনে করে আমেরিকান রাষ্ট্র যেন অবশ্যই বেসরকারি উদ্যোগ ও খাতের মাধ্যমে প্রায় সব কিছু করতে ও পরিচালিত হতে দেয়, রাষ্ট্র দায় কম নেয় এবং সব বিষয়ে রাষ্ট্র যেন সীমিত সংশ্লিষ্টতার ভুমিকায় থাকে এবং ব্যক্তি স্বাধীনতায়, প্রচলিত আমেরিকান মুল্যবোধ আর শক্ত আমেরিকান জাতীয় প্রতিরক্ষাবোধের কথা খেয়াল রাখে।

    কিন্তু ছাপা হওয়া লিসা কার্টিজের এই প্রশ্নোত্তরকে আমাদের এত গুরুত্ব দেবার কি আছে? আমেরিকান সরকারগুলোর নীতিতে কোন থিঙ্কট্যাংকের ভুমিকা ও গুরুত্ব কি তা বুঝতে হলে মনে রাখতে হবে, আমেরিকান সমাজের কোন গ্রুপের কোন নীতি বা অবস্থান সরকারের নীতি হয়ে উঠার আগের ধাপটা হল থিঙ্কট্যাংকের উদ্যোগে করা চিন্তা, গবেষণা ও পরামর্শ। তবে আবার এটা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের জন্য ঠিক কোন বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একেবারেই তা সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা। আর থিঙ্কট্যাংকের কাজের ধরণ হল, সিরিয়াস গবেষণা শেষে ফলাফল স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাডেমিক, ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক দল নেতা, দেশের ও প্রয়োজনে বিদেশের রাজনৈতিক নেতাসহ সকলের সাথে তা শেয়ার করা, আর গোলটেবিল, সেমিনার আলোচনা সভার মাধ্যমে সে নীতি অবস্থানকে যতদুর সম্ভব একটা প্রতিনিধিত্বমুলক করে আকার দিয়ে তোলা। আর সবশেষে সরকারি অফিসের লোকজন চাইকি গুরুত্ত্বপুর্ণ বিষয় হলে সর্বোচ্চপদ মন্ত্রণালয়ের সচিব (আমেরিকান হিসাবে আন্ডার সেক্রেটারিকে) সেসব সভায় দাওয়াতে হাজির করে থিঙ্কট্যাংকের অবস্থান চুড়ান্ত করা। কিন্তু মনে রাখতে হবে এরপরেও থিঙ্কট্যাংকের নীতি-অবস্থান কোন আমেরিকান সরকার তার নীতি হিসাবে গ্রহণ করতে বাধ্য না হলেও সাধারণত দেখা যায় থিঙ্কট্যাংকের ঐ অবস্থান আংশিক অথবা পুরাটাই সরকারের নীতি হয়। আর অনেক সময় কোন সরকারের কেউ নিজেই “অনানুষ্ঠানিকভাবে” বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে কোন থিঙ্কট্যাংককে কোন একটা বিষয়ে এমন উদ্যোগ নিতে পরামর্শ দিয়ে থাকে।

    হাসিনা সরকার টিকে যাবার জন্য কি ভারত, চীন ও রাশিয়ার সমর্থন দায়ী
    লিসা কার্টিজ এই প্রশ্নোত্তরে ৫ জানুয়ারির পরও হাসিনার টিকে যাওয়ার জন্য ভারত, চীন ও রাশিয়ার স্ব স্ব বাংলাদেশ নীতিকে সরাসরি দায়ী করেছেন। লিসা কোন আমেরিকান সরকারী পদবীধারী কেউ নন। ফলে তার মুখ দিয়ে এমন সরাসরি অভিযোগ করা মন্তব্য নিয়ে ভারত, চীন বা রাশিয়া সরকারের কারও হেরিটেজের লিসা কার্টিজের অথবা আমেরিকার ষ্টেট ডিপার্টমেন্টের (আমাদের হিসাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) কাছে ব্যাখ্যা চাইবার কিছু নাই। আবার লিসার বক্তব্য “আনুষ্ঠানিক” সরকারি না হয়েও আবার আসলে পরোক্ষে সরকারিই। লিসার বক্তব্যকে আমরা আমেরিকান সরকারি নীতি নির্ধারকদের প্রটোকল, কূটনীতির ভাষা, ফরমালিটির নিয়মকানুন থেকে মুক্ত হয়ে তাঁরা মন খুলে কথা বলতে পারলে কি বলতেন তেমন বক্তব্যের এক মহড়া মনে করতে পারি; এবং তা নীতি নির্ধারকদের সবার চিন্তার প্রতিনিধিত্বমূলক না হলেও অন্তত প্রভাবশালী একটা ধারার বক্তব্য হিসাবে দেখতে পারি। ফলে লিসা কার্টিজের বক্তব্যকে আমরা সেখান থেকে দেখে পাঠ করে এটাকে উসিলা করে তা নিয়ে আলোচনার সুত্রে মুল্যায়নে কিছু বলার সুযোগ হিসাবে নিব।
    প্রথমত প্রকৃত তথ্য হিসাবে এক ভারত ছাড়া চীন অথবা রাশিয়া কি আসলেই হাসিনার সরকার টিকে যাবার কারণ, তাদের সমর্থনের উপর কি হাসিনা টিকে গেছে? তা মনে করার কোন কারণ আমরা দেখি না। এমন কোন ফ্যাক্টসের খবর কারও কাছে আছে অথবা বাস্তবে এটা তাই -এর কোন সত্যতা নাই। আমার আগের লেখায় বলেছি, ফ্যাক্টস হল ভারত আমেরিকা চীন রাশিয়া সবাই বাংলাদেশে রাজনৈতিক সঙ্কট (যে যেমনটা দেখতে চায় তেমন) একটা আকার নিয়ে থিতু হয়ে বসুক তা নিজের স্ব স্ব স্বার্থে চায়। আবার এর সমস্যা ও এর জটিলতাগুলোও বুঝে ও মানে। ফলে এথেকে বেরোনোর পথ হিসাবে ভারতের নির্বাচনের দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। কারণ সেটা বর্তমান ভারসাম্যের প্রায় স্থবির অবস্থাটা ভেঙ্গে নতুন ভারসাম্য তৈরির নিয়ামক হতে পারে। আমার ঐ লেখাতেও আমি চীনের অবস্থান কোনভাবেই হাসিনার সরকারে টিকে থাকুক এমন তথ্য বা ব্যাখ্যা দেখাই নাই। কারণ ব্যাপারটা অলীক। বরং চীনের এ পর্যন্ত দেয়া রাষ্ট্রদুতের বিবৃতিগুলো, তাদের ফরেন অফিসের মন্তব্য এমন কোন সাক্ষ্য বহণ করে না। আর চীন বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশ আসার অপেক্ষায় আছে কথা সত্য তবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে হাসিনা আবার গেড়ে বসার পরেও সে এটাকে সঠিক ও উপযুক্ত সময় মনে করতে পারে নাই; অপেক্ষা করছে এক স্থিতিশীল রাজনীতি ও সরকার দেখার জন্য। এর সর্বশেষ প্রমাণ বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যানের বক্তব্য। (বিনিয়োগ বোর্ডের অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে) তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন চীনের দিক থেকে এব্যাপারে কোন নড়াচড়া নাই। ফলে লিসা কার্টিজের অভিযোগ আমরা দেখছি ভিত্তিহীন, কোন সারবত্তা নাই।
    তবে লিসা আর এক অভিযোগ তুলেছেন সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি প্রসঙ্গে। ঐ প্রশ্নোত্তরে বলেছেন, “বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের চেয়ে এই দেশটিতে কিভাবে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি করা যাবে সেদিকেই মস্কো ও পেইচিংয়ের মনোযোগ বেশি”। লিসা কার্টিজের এই অভিযোগকে পেটি ঈর্ষাজাত ক্ষোভ হিসাবে আমরা বড়জোর দেখতে পারি। প্রথম কথা চীনা সাবমেরিন বা অন্যান্য অস্ত্র বিক্রির বিষয়টা ৫ জানুয়ারির বহু আগের ঘটনা; অন্ততপক্ষে ২০১১ সালের ডিল, একালেরই নয়। আর যদিও একথা সত্য যে পরিসংখ্যান বলে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অস্ত্র সরবরাহের তালিকায় বিলের অঙ্কে এবং পরিমাণে চীনা অস্ত্র আমেরিকার চেয়ে বহুগুণে বেশি। কিন্তু এর কারণ চীনের আমাদের উপর বিশেষ আগ্রহ একথাটা ভিত্তিহীন। অথবা চীন আমাদেরকে মুখ্যত তার অস্ত্রের বাজার হিসাবে দেখে এটা কোন গবেষকের মুখ থেকে শোনা হাস্যকর বললে কম বলা হয়। এই বিদ্যা অথবা মুল্যায়ন এসেসমেন্ট দিয়ে কারও পক্ষে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক কোন গবেষণাকর্ম করা অসম্ভব। এতে ঘোড়ায়ও হাসবে। একথা বলে লিসা কার্টিজ নিজেকেই তুচ্ছ করেছেন। এর বেশি এনিয়ে আর কি বলব! পরিসংখ্যানের যে কথা বলছিলাম, খুব সম্ভবত অস্ত্রের মুল্য এবং অস্ত্রের উপর আস্থা মানে আমাদের বাজেট ও বাজেট অনুপাতে পাওয়া মান এগুলোই এখানে মুল ফ্যাক্টর। ফলে চীনা অস্ত্র কিনতে আমাদের মানে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বের চেয়ে বাহিনীর আগ্রহই বেশি ও মুখ্য। আর েব্যাপারে যারা খোঁজ রাখে তাঁরা কে না জানে আমেরিকার যেকোন অস্ত্র বা সরঞ্জামের মুল্য সর্বাধিক, তাতে কোয়ালিটি ও হাইটেক সুবিধা যত উচ্চমানেরই হোক। ফলে আমাদের বাহিনীর সিদ্ধান্ত – এটা প্রাকটিক্যাল, স্বাভাবিক এবং সর্বপরি আমাদের বাজেট বাস্তবতা যে তাঁরা সঠিকভাবেই মুল্যায়ন করতে জানেন এর প্রমাণ। ওদিকে, ভারতের উপর পুরা নির্ভরশীল ও মুখাপেক্ষি হাসিনার সরকারের নীতিতে দোষের শেষ নাই, একথা সত্য। কিন্তু এবিষয়ে আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রয়োজন, বাহিনীর নিজস্ব যুক্তি অবস্থান ও আগ্রহের প্রসঙ্গে গত পাঁচ বছরে হাসিনা যথোপযুক্ত উতসাহ ও সাড়া দেন নাই, প্রাধান্য দেন নাই এমন কথা বলা ও ভাবা ভুল হবে। একথা লুকানো নয় যে হাসিনা সর্বক্ষেত্রে ভারতের উপর নির্ভরশীল, বহু আন্ডারহ্যান্ড ডিল আন্ডারষ্টান্ডিং ভারতের সাথে তাঁর আছে, বাইরে থেকে দেখে আমরা অনুমান করতে পারি। আবার সামরিক বাহিনীর নিজস্ব স্বার্থজাত সিদ্ধান্তকে হাসিনা রাজনৈতিক অনুসমর্থন জানায় নি এমন উদাহরণ একেবারে নাই যে তা নয় (যেমন বিডিআর হত্যাযজ্ঞ ইস্যু)। তাসত্ত্বেও মোটের উপর হাসিনার রেকর্ড ভাল। যেমন ভারতের আপত্তি আর বিরূপ প্রচারণা সত্ত্বেও আমাদের জন্য গুরুত্বপুর্ণ চীনা সাবমেরিন কেনার সামরিক বাহিনীর প্রস্তাবে উদ্যোগে সাড়া দিতে তিনি পিছপা হন নাই। আমেরিকা এবং ভারতের অখুশি, আপত্তি, চোখ বড় বড় করে তাকানো সত্ত্বেও গত ২০১১ সাল থেকে চীনের সাথে ভাল ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পর্কও বজায় রেখেছেন, সফর বিনিময় অব্যাহত আছে এবং তা গুরুত্বের সাথেই, এবং বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আগ্রহে সাড়া দিয়ে রেখেছেন। এককথায় বললে চীনের সাথে সম্পর্ককে হাসিনা ভারতের সাথে সম্পর্কের একই ঝুড়িতে রেখে ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেন নাই, আলাদা আলাদা বক্সে রেখেছেন যাতে কোন ঠোকাঠুকি না লাগে এমন করে বুদ্ধিবিবেচনার সুযোগ করে নিয়েছেন, গুরুত্ব দিতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এথেকে এমন সিদ্ধান্তে আসা বা বোকামিরও সুযোগ নাই যে হাসিনার সরকার ভারতের সাথে সাথে চীনেরও সমর্থনের উপর টিকে থাকা এক সরকার।
    এমন সিদ্ধান্ত টানার সুযোগ না থাকার মুল কারণ (গত মাসের লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করেছি, এখানে সংক্ষেপে বলি) চীনের বিদেশনীতি এখন পর্যন্ত আমাদের মত দেশে কেমন সরকার বা কে সরকারে থাকবে এধরণের কোন পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগিদারী কর্তৃত্ত্ব না হলে চীনের বিদেশনীতি আগাবে না অথবা আমেরিকার মত চাপ দিয়ে আদায় করার নীতিতে চলে এমন করে তা সাজানো নয়। কিন্তু বাংলাদেশকে ঘিরে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ অবশ্যই আছে কিন্তু সেটা রাজনৈতিক বা পরাশক্তিগত কর্তৃত্ত্বের মাধ্যমে আদায় করে চলে এমন নয়। আবার লিসা কার্টিস যেমন এক জবরদস্তিতে আরোপিত ধারনা দেবার চেষ্টা করেছেন, চীনের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব যেনবা বাংলাদেশ চীনের কাছে অস্ত্রের লোভনীয় বাজার ফলে খাতক মাত্র। আর চীনও যেনবা অস্ত্র বিক্রি ব্যবসার উপর দাড়িয়েই রাইজিং চীনের অর্থনীতি হয়েছে, দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো ডাহা ভিত্তিহীন কথা এবং প্রপাগান্ডা। কেউ গবেষক হতে চাইলে তাঁর প্রথম পাঠ হল, অন্তত প্রপাগান্ডা আর তথ্যের ফারাক করে চলতে শেখা। এম্পায়ার আমেরিকার খাসলত দেখতে দেখতে লিসা কার্টিসের হয়ত একপেশে ধারণা হয়ে গেছে যেন আমেরিকা বা পশ্চিমের খাসিলতই চীনের খাসলত হতেই হবে। আগামিতে চীনের খাসলত কি দাঁড়াবে সেটা আগামিই বলতে পারে। কিন্তু এখনই পশ্চিমের খাসলত দিয়ে আগাম চীনের ঘাড়ে তা খামোখা চড়িয়ে আরোপ করে এখনকার চীনকে ব্যাখ্যা করার কোন অর্থ হয় না; তবে হয়ত পেটি ঈর্ষাজাত মনের সুখ পাওয়া যেতে পারে। তাহলে হাসিনা তাঁর সমস্ত বেকুবি নীতির দোষ থাকা সত্ত্বেও তিনি আমাদের সামরিক বাহিনীর চীনা অস্ত্র কেনার ব্যাপারে সম্মতি জানাতে সক্ষম হয়েছে। এটাই বাস্তব। এটা কতটা সামরিক বাহিনীর সাথে দুরত্ব তৈরি করার রিস্ক বা চটানো তিনি সহ্য করতে পারবেন বা পারবেন না সে কথা ক্যালকুলেশন করে রেখে করেছেন অথবা করেন নাই এনিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু বটম অব দা ফ্যাক্ট হল বাস্তবে তিনি এগুলো করে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন, এর কারণ যাই হোক। আবার লিসা কার্টিজের “চীনের অস্ত্রবিক্রির ধান্দা” এমন কথার প্রেক্ষিতে যদি বলি, আমাদের সামরিক অফিসারদের উপর প্রভাবের দিক থেকে যদি দেখি তবে তাদের ট্রেনিং সেমিনার ভিজিট ব্যক্তিগত সম্পর্ক ইত্যাদিতে আমেরিকার প্রভাবের সমতুল্য এর ধারে কাছে আর কোন রাষ্ট্র নাই। এমনকি ঘোর অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমেরিকার হাত মুচড়ানিতে পড়ে আমাদের সেনাবাহিনী এই তো সেদিন ১/১১ এর ক্ষমতা দখল করে দিয়েছে। এরচেয়ে বড় উদাহরণ আর কি হতে পারে! কিন্তু এজন্য আমি কেন কেউই বলবে না যে সেনা অফিসারদের উপর আমেরিকার প্রবল প্রভাব আছে অতএব আমেরিকার সমর্থনে হাসিনা টিকে আছে এগুলো তার প্রমাণ! অথবা লিসা যেভাবে বলেছেন যে বাংলাদেশে চীন “কিভাবে আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানি” করতে পারে সেই তালে আছে – তেমন করে কেউ বলবে না যে, আমেরিকা কেবল আমাদের অফিসারদেরকেই হাত করার তালে আছে। কারণ এতে বক্তার নিজের কান্ডজ্ঞানশুণ্য আর গাভর্তি রাগ ক্ষোভকে প্রমাণ করবে।

    এবার হাসিনার টিকে থাকার ব্যাপারে রাশিয়ার ভুমিকা প্রসঙ্গে আসি। হ্যা, একথা সত্যি যে রাশিয়ার মধ্যে প্রবল অস্থিরতা আছে। যেখানেই কোন সরকারের সাথে আমেরিকার নুন্যতম বিরোধ সংঘাত আছে, রাশিয়া দেখে, সেখানেই ঐ সরকারের পক্ষে সমর্থন দিয়ে দাঁড়ায়ে পড়তে হবে -এমন সরল করে পরিস্থিতি মুল্যায়নের ও অস্থির মতির সিদ্ধান্ত নেবার একটা ঝোঁক রাশিয়ার আছে। এটা শত্রুর শত্রু মানেই আমার বন্ধু –এমন এক সরল তত্ত্ব। অথচ বন্ধুত্বের সম্ভাবনার এই যুক্তির ভিত্তি যথেষ্ট দুর্বল এবং আমাদের অভিজ্ঞতাও এর পক্ষে সায় দেয় না। মুল কারণ প্রতিটা বন্ধুত্ত্বের সম্পর্কের নিজস্ব পজিটিভ ভিত্তি লাগে। আর তাছাড়া একটা শেষ কথা আছে। রাশিয়ার এই ঝোঁক থাকা সত্ত্বেও এটাই তার নীতি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বা শেষ কথা নয়, শেষ বিচার্য ব্যাপারটা এমনও নয়। আরও বিবেচনাও আছে। আমেরিকা বা পশ্চিম বিরোধী ও পশ্চিমা বলয়ের বাইরে কোন স্বার্থজোট গড়ার আগ্রহ রাশিয়ার প্রবলভাবেই আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু একা সেকাজ করার মত সক্ষমতা রাশিয়ার নাই, বাস্তবতা নাই এটাও রাশিয়া ভালভাবেই জানে। কারণ রাশিয়ার যতই রাগ ক্ষোভ থাক এটা রাশিয়া-আমেরিকার দুই ব্লকে ভাগ হয়ে থাকার যুগ নয়, দুনিয়াও নয়, সেদিন গত হয়েছে বহু আগেই এটা সে ভালই হুশ রাখে। বরং রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর জোট (BRICS Bank এর মত প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে) এর পক্ষে তেমনি একটা সম্ভাবনা, তাই সে মানে। উতসাহী রাশিয়ার এমন মান্যি করাটা টের পাওয়া যায় যদি আমরা মনে রাখি প্রথম ব্রিকস সম্মেলন ডাকার আয়োজক হয়েছিল রাশিয়াই, ২০০৯ সালে। ওদিকে এব্যাপারে চীন ততোই ধীর স্থির ঠান্ডা মাথার। কোন হুড়োহুড়ি অস্থিরতা, এখনই সব জবরদস্তিতে করে ফেলার চেষ্টা করতে হবে এমন অবিবেচক সে নয়, তা দেখায়নি। চলতি গ্লোবাল অর্থনীতির অর্ডারটা ভেঙ্গে এরই প্রতিদ্বন্দ্বী নতুন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো দাঁড় করানো এবং আমেরিকার বদলে নতুন নেতৃত্বে নতুন অর্ডার চালু করার কাজটা সফল করতে যেখানে পরিস্থিতিকে পরিপক্ক করে তুলার কাজটা কিলিয়ে কাঠাল পাকিয়ে করা মত কাজ নয়। বরং পরিপক্ক হতে যেখানে যতটুকু সময় ও মনোযোগ লাগবে সেখানে ঠিক ততখানিই দিতে হবে এব্যাপারে সে পরিস্কার। আমরা তাই দেখেছি। এছাড়া ব্যাপারটা পরিপক্ক বা ম্যাচিয়র হওয়াটা আবার ভলিন্টারিলি ও আপন ইচ্ছায় হতে হবে এমন দিকটাও তার নজর এড়ায়নি। যেমন একথা আজ পরিস্কার কেবল ব্রিক ব্যাংকই এখনও ফাংশনাল হতে পারল না ভারতের দ্বিমুখি দ্বিধাগ্রস্থতার কারণে। একদিকে পুরানো বা চলতি অর্ডারটা থেকে আমেরিকার তরফে বেশি সুবিধা পাবার লোভে পড়েছে ভারত আর অন্যদিকে ততটাই নতুন অর্থনৈতিক অর্ডারটা খাড়া করার ক্ষেত্রে ভারতের তাই পিছুটান ফলে ব্রিক ব্যাংক বিষয়ে ধীরে চলা – এই হল ভারতের দ্বিমুখি দ্বিধাগ্রস্থতা। ভারত এখনও তাই মনস্থির করে ব্রিক ফেনোমেনার পক্ষে দৃঢ় ও শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। কিন্তু সেজন্য চীনের ভারত নীতিতে আমরা কোন চাপাচাপি দেখিনি।

    ভারতের দ্বিধামুখে বা দুমুখে খেলার আর এক প্রতীকী উদাহরণ
    ভারতের দ্বিমুখি ঝোঁকের প্রতীকী ও আদর্শ উদাহরণ সম্ভবত ‘সাংহাই কর্পোরেশন’ উদ্যোগ। “সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন” (Shanghai Cooperation Organization (SCO) – ১৯৯৬ সালে শুরু হবার সময় মনে হয়েছিল এটা সম্ভবত এক সামরিক বা ষ্ট্রাটেজিক জোট হতে যাচ্ছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ক্রমশ এটা মূলত এক অর্থনৈতিক জোট হওয়ার চেষ্টা করছে। সম্ভবত সে কারণে এখনও আমেরিকান মিডিয়া থিঙ্কট্যাংক (কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন) এটাকে আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর সামরিক জোট – ন্যাটোর মত এর পাল্টা সমান্তরাল এক সামরিক জোট, “চীনের ন্যাটো” বলে চিত্রিত করেছে। এর মূল উদ্যোক্তা চীন ও রাশিয়া, সাথে নেয়া হয়েছে সেন্ট্রাল এশিয়ার চারটি দেশ, Kazakhstan, Kyrgyzstan, Tajikistan, and Uzbekistan। জন্মের শুরুর দিকে ১৯৯৬ সালে SCO এক বিবৃতি দিয়েছিল এই বলে যে কবে “আমেরিকান সামরিক বাহিনী সেন্ট্রাল এশিয়া অঞ্চল থেকে গুটিয়ে চলে যাবে এর তারিখ তারা জানতে চায়”। তবে ঐ বিবৃতিতে আমেরিকাকে চলে যেতে হবে ঠিক এমন দাবী তারা করেনি কেবল তারিখ জানতে চেয়েছে আর আমেরিকার যে যাওয়া দরকার এতে এই তাদের আকাঙ্খার প্রকাশ ঘটেছে। কিন্তু ক্রমশ এই জোট একালে তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে আফগানিস্তান ২০১৪ পরবর্তি পরিস্থিতিতে। ২০১৪ পরবর্তি মানে আমেরিকার নিজস্ব পরিকল্পনা অনুসারে এবছর ২০১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে তাদের সব সৈন্য (ন্যাটোও) প্রত্যাহার করবেই। এটা তিন বছর আগেই নির্ধারিত ও সিধান্ত হিসাবে ঘোষিত। মূলত খরচ যোগাতে অসমর্থ অর্থনৈতিক অপারগতা -আমেরিকান নিজস্ব এই সীমাবদ্ধতার কারণে এই ঘোষণা। যদিও ২০১৫ সাল থেকে কি হবে, কেবল ট্রেনিং এর নামে (১০ হাজার রাখার ইচ্ছা আমেরিকার) কতজন সৈন্য থাকবে এবিষয়ে কোন নতুন চুক্তি কারজাই করেন নি। আফগানিস্থানে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শেষ হয়েছে চলতি মাসে কিন্তু ফলাফল এখনও প্রকাশ হয়নি, প্রক্রিয়াধীন। নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ঠিক করবেন নতুন আয়োজনে কিছু আমেরিকান সৈন্য রাখার চুক্তি কেমন হবে বা আদৌও হবে কি না। বাস্তব এই প্রদত্ত পরিস্থিতিতে SCO ভাবনা-চিন্তা করছে এবছরের শেষে ন্যাটো ও আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলে তারা সামরিক নয় বরং এক ব্যাপক বিনিয়োগ সম্পর্কে প্রবেশ করতে চায় আফগানিস্তানে। SCO তে অবজারভার ষ্টেটাসের সদস্য রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এর উপস্থিতিতে গত কয়েক বছর তা নিয়ে আলোচনা চলছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান ইরান, মঙ্গোলিয়া এবং ভারত এই পাঁচ রাষ্ট্র এখনও পর্যন্ত SCO এর অবজারভার সদস্য, পুর্ণ সদস্য নয়। তবে প্রতি বছরের SCO সম্মেলনে তারা গুরুত্ব দিয়ে অন্তত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাঠিয়ে থাকে। গত বছর ২০১৩ সেপ্টেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমন খুরশিদ কিরগিজস্তানে অনুষ্ঠিত SCO সম্মেলনে গিয়েছিলেন এবং ভারত পুর্ণ সদস্য হতে চায় সে ইচ্ছা ব্যক্ত করে এসেছেন। (দেখুন, India aspires to become full SCO member) কিন্তু একই সাথে তার স্ববিরোধীতা বা পিছুটানও ব্যক্ত করেছেন ঐ রিপোর্টে। বলেছেন, We are not sure of a timeline অর্থাৎ সময়সীমা বা কবের মধ্যে হব জানি না। এককথায় ব্যাপারটা হল, পুরানা গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার ভেঙ্গে পড়ার লক্ষণ হিসাবে আমরা দেখছি পালটা উদ্যোগগুলো একটা যেমন “ব্রিকস ফেনোমেনা” ঠিক তেমনই আর এক উদ্যোগ হল এই SCO গঠন। কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে, “ব্রিকস ফেনোমেনা” এই উদ্যোগের মতই SCO গঠন উদ্যোগেও ভারতের ভুমিকা দোলাচালে, আছি আবার নাই এমন দোদুল্যমান নন-কমিটেড। কিন্তু ধীরস্থির চীন বরাবরের মতই; ভারতের চিন্তা ও ভুমিকা সে জানে কিন্তু সেজন্য চীন ভারতকে তাড়া লাগায় নি, কোন ধরনের চাপ সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়নি, নিজে কায়দা কৌশল করে চাপ বা শর্ত তৈরি করেনি ভারতের উপর। বরং ছেড়ে দিয়ে রেখেছে ভারতের ভলিন্টারি ও আপন ইচ্ছার উপর। পরিস্থিতি পরিপক্ক হতে যতটা সময় লাগছে, দিচ্ছে। আবার আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিকঃ চীন বা রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর নেতৃত্বে নতুন গ্লোবাল অর্ডারের নৌকা ভাসানো মানে ব্যাপারটা যে পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা অথবা তাদেরকে একঘরে করা তা যে নয় এটা চীন সযত্নে খেয়াল রাখতে চায়। সকলকে মনে করায় রাখতে চাই। রাশিয়ার মত তাই চীন ব্যাপারটাকে প্রতিহিংসায় রি রি করে উঠার বিষয় মনে করে না, কারণ আসলে তো ব্যাপারটা পশ্চিমের উপরে প্রতিশোধ নেয়ারও নয়। ঠিক যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে, ইউরোপের কলোনী মালিক (বৃটিশ, ফরাসী, স্প্যানিস, ডাচ, পর্তুগীজ ইত্যাদি) যাদের সাম্রাজ্যের সুর্য নাকি কখনই অস্ত যাবে না বলে বড়াই শোনা যেত একদিকে তা ভেঙ্গে চুড়মার হয়ে গেল আর অন্যদিকে এর বদলে আমেরিকার নেতৃত্ত্বে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারের সুচনা হয়েছিল কিন্তু আমেরিকা ব্যাপারটাকে ইউরোপের উপর আমেরিকার প্রতিশোধ হিসাবে ঘুর্ণাক্ষরেও দেখেনি, ইউরোপকে একঘরে করা হিসাবেই দেখেনি। কারণ আমেরিকা মানে তার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট (১৯৩৩-৪৫ পরপর চারবারের প্রেসিডেন্ট) এটা পরিস্কার ছিলেন যে এই পালাবদলের অর্থ প্রতিশোধ বা একঘরে করার মত তা একেবারেই নয়। বরং তাঁর নেতৃত্ত্বে এটা আরও সকলের সাথে ইউরোপকেও সাথে নিয়েই নতুন এক গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডার সুচনা করার কাজ। ব্যাপারটা রুজভেল্টের দয়া বা উদারতার চোখে দেখার বিষয় নয়, বরং বাস্তবতা ও ঘটনাবলির বাস্তব অর্থও এটাই। এমনকি নীতিগতভাবে ষ্টালিনের রাশিয়াকেও কোন নীতিগত কারণে (যেমন কমিউনিষ্ট রাষ্ট্র বলে) বা কোন প্রিযুডিস বা আগাম অনুমানে ধরে তার নেতৃত্বে আসন্ন নতুন গ্লোবাল পুঁজিতান্ত্রিক অর্ডারের বাইরে রাশিয়াকে রাখার কথা তিনি ভাবেননি। এজন্য উদ্যোক্তাদের প্রথম সভায় টানা ২২ দিনের ব্রেটনহুড সম্মেলনে রাশিয়া উপ্সথিত ছিল। এনিয়ে বিস্তার করে অন্য কোথাও লিখতে হবে। এবারের পালাবদলেও ব্যাপারটাও তাই, এখানে সাদৃশ্য আছে। এখনকার প্রসঙ্গের জন্য সারকথা এতটুকুই যে রাশিয়ার ইতিউতি উঁকি মারা বা অস্থিরতায় থাকলেও অন্তত চীনকে বাদ দিয়ে এককভাবে হাসিনাকে চোখবন্ধ সমর্থন দিয়ে রাশিয়া এগিয়ে যাবে এই অনুমান ভিত্তিহীন। হাসিনার সাথে ৫ জানুয়ারির পরের পরিস্থিতিতে একসাথে কাজ করার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত রাশিয়ান বিবৃতিতেও এমন কিছু নাই যেটা একই প্রসঙ্গে আমেরিকা বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিবৃতিতে নাই। ফলে রাশিয়াকেও জড়িয়ে লিসা কার্টিসের অভিযোগ ভিত্তিহীন ও মনগড়া অনুমানের।

    হাসিনাকে দানব বানানোর তিন দেশীয় সমর্থনের এই অভিযোগ তাহলে উঠল কোন সূত্র থেকে
    একটা কথা বলে রাখা ভাল, লিসা কার্টিসের এই অভিযোগ তাহলে উঠল কোথা থেকে? একেবারেই কি তা সুত্রহীন? না, সুত্র সম্ভবত একটা আছে। সেই সুত্র ভারত নিজে। একটা হুইস্পারিং ক্যাম্পেইন বা কানকথা ভারত ছড়িয়েছে। ধীরস্থির চীনের বিপরীতে অস্থির প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে যেমন রাশিয়া ঠিক তেমনই আর এক প্রান্ত হল ভারত, হাত নিশপিশ করা ভারত। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আমেরিকার সাথে তার সুখের হানিমুন ভেঙ্গে যাওয়াতে এই হাত নিশপিশ, পারলে আমেরিকাকে এখনই একটা শিক্ষা দিয়ে দেয় এমন ভাব। উপরে বলেছি, এতদিন ভারত আমেরিকার লোভের ফাঁদে পড়ে কেবল নিজের জন্য পুরানো বা চলতি অর্ডা্রটা ও এর সংশ্লিষ্ট পরাশক্তিগত ভারসাম্যটাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে থাকলে আমেরিকার কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা পাবে এই বেকুবি লোভে ও আশায় ব্রিক ব্যাংকের উদ্যোগকে ধীরে চল নীতিতে আটকে রেখেছিল। আজ আমেরিকার সাথে বিরোধে হঠাত স্বপ্নভঙ্গ হওয়াতে সে প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠেছে। মিথ্যা ভয় ছড়িয়েছে, প্রপাগান্ডায় মেতেছে যে ভারত, চীন ও রাশিয়া একজোট হয়ে উঠতেছে ফলে এবার আমেরিকাকে শিক্ষা দেয়া হবে। যদিও এই বাস্তবতা পরিপক্ক হতে এখনও ঢেড় সময় লাগবে এবং ব্যাপারটা মোটেও ঠিক শিক্ষা দেবার বা প্রতিশোধ নেবার মত নয়। কিন্তু সার কথা সেটা অন্তত একদুই কয়েক বছরের মধ্যে ঘটবার মত তো নয়ই। আর সেকাজটাও তো খোদ ভারতই ধীরে চল নীতিতে ফেলে রেখেছে, দোদুল্যমান ও লোভী হয়ে মনোযোগ দেয়নি। এটা সে ভাল করেই জানে। এবং এখনও মনস্থির কিনা আমাদের জানা নাই। ফলে কানকথা ছড়িয়ে শত্রু আমেরিকার যদি কিছু ক্ষতি করা যায়, ভয় দেখিয়ে কিছু বাগে আনা যায় – তো তাতেই মনের সুখ ভারতের। আর এই কান কথা ছড়ানোর প্রপাগান্ডা মেশিনের দায়িত্ত্ব দিয়েছে বা নিয়েছে হাসিনা সরকার। মন্ত্রী হবার পর, ভারত সফর করা (১৮-২২ জানুয়ারী, ২০১৪) বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রী হলেন তোফায়েল আহমেদ। ভারত সফর থেকে ফিরে ঢাকায় তিনি সাংবাদিক সম্মেলন ডেকেই এই কানকথাগুলো ছড়িয়েছেন। খুব সম্ভবত সেখান থেকেই লিসা কার্টিজের – ভারত, চীন রাশিয়া – এই তিন “অক্ষশক্তিকে” হাসিনা সরকার টিকিয়ে রাখার খলনায়ক হিসাবে প্রপাগান্ডা। এটাকে ভারতের প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে লিসা কার্টিসের প্রপাগান্ডার কৌশল বলা যেতে পারে। কিন্তু গুরুত্ত্বপুর্ণ দিকটা হল, প্রপাগান্ডার লড়াই করা – এই কাজ কোন গবেষকের হতে পারে না। লিসা এখানে গবেষক মর্যাদা থেকে পতিত স্খলিত হয়েছেন।

    সত্য লুকানো
    লিসা বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্র তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না। মার্কিন কর্মকর্তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের বর্তমান বাংলাদেশ নীতি খুবই ক্ষুদ্রদৃষ্টিসম্পন্ন”। একথা বলে লিসা সত্য লুকালেন। বেশিদিন আগে নয় ২০০৭ সালে এই হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের গোলটেবিল বৈঠকে “দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকা ভারতের চোখে নিজের নিরাপত্তা ইস্যুটাকে দেখবে” বিষয়টা সাব্যস্ত হয়েছিল সেসময়ের আন্ডার সেক্রেটারী অব ষ্টেট (২০০৫ – ৮) নিকোলাস বার্ণসের উপস্থিতিতে। নিকোলাস বার্নসকে বলা হয় ইন্ডিয়ার সাথে আমেরিকান নতুন ও বিশেষ সম্পর্কের (বিশেষ করে পারমানবিক টেকনোলজি, অন্য অস্ত্র ভারতকে সরবরাহ এবং নিরাপত্তা চুক্তির প্রধান নিগোশিয়েটর) কারিগর। আমেরিকা নিজের তথাকথিত নিরাপত্তার অজুহাতে কি বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক রাখেনি, সারাজীবন আমাদের মত দেশে কে ক্ষমতায় থাকবে বা থাকবে না তা ঠিক করার যাতাকাঠিটা কি ভারতে হাতে ব্যবহার করতে ধার দেয়নি? এসবই ২০০৭-৮ সালের ঘটনা, আমাদের তা ভুলে যাবার কোন কারণ নাই, লিসারও নয়।
    অর্থাৎ চীনের রাইজিং ইকোনমি তথা অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে দাড়াবার বিরুদ্ধে ভারতকে পক্ষে টেনে তার মন পাবার জন্য আমেরিকা কেবল “ভারতের প্রেসক্রিপসনের” নয়, বাচ্চা যা চায় তা সব পূরণ করার চেষ্টা করেছে। আর তাতে বাংলাদেশের জন্য এমন দানব ভারতের আবির্ভাব ঘটিয়েছে যে তার একক স্বার্থে গড়া যেন এক কলোনি বাংলাদেশ সরকার হাজির করেছে ২০০৯ সাল থেকেই। আজ খোদ ভারত ও হাসিনা সরকার লিসার আমেরিকাকে কলা দেখিয়েছে, তুচ্ছ করছে – এতে এখন বেয়ারা বাচ্চা কথা শুনে না বলে লিসার গোস্যা করার কি আছে? এমনটাই কি হবার সম্ভাবনা সবসময় ছিল না অথবা কথা নয়।
    তবে এটা ঠিক সর্বশেষ গত তিন বছর ২০১১ সাল থেকে আমেরিকা ও ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে মুখোমুখি সংঘাত দেখা দিয়েছে। ফলে লিসার কথা কেবল এখন অর্থে সঠিক যে “যুক্তরাষ্ট্র এখন আর তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না”। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বাচন-মরণ এমন নির্ধারক ভারত ফ্যাক্টর হয়ে উঠল কবে থেকে? তা কি আমেরিকার প্ররোচনাতেই হয় নাই?
    যদি মানবজমিনের অনুবাদের কিছু বাদ পরে না যেয়ে থাকে তবে দেখা যাচ্ছে লিসা বলছেন “যুক্তরাষ্ট্র তার বাংলাদেশ নীতিতে ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর নির্ভর করছে না”। অর্থাৎ বাক্যটা আমেরিকা “ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর কখনও নির্ভর করে নি অথবা করে না” – এমন নয়। লিসা সুযোগ রেখে দিয়েছেন, যেন প্রছন্নে ধরে নিয়ে বলতে চাইছেন – “আগে করত এখন করছে না”। তো সেক্ষেত্রে “ভারতের প্রেসক্রিপশনের ওপর” আগে নির্ভর করা আর এখন না করা সবকিছুর দায়ভার কাফফারা সবই তো আমেরিকারই।
    এছাড়া এখন লিসা আবিস্কার করে বলছেন, “মার্কিন কর্মকর্তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের বর্তমান বাংলাদেশ নীতি খুবই ক্ষুদ্রদৃষ্টিসম্পন্ন”। খুবই ভাল কথা, সত্যি কথা। কিন্তু সত্যি কথাটা অনুভব করতে আমেরিকা বড্ড দেরি করে ফেলেছে। এর দায় এবং দুর্ভোগ দুটার জন্য আমেরিকার তৈরি হওয়াটাই লিসার কপাল! নয় কি? আমেরিকান নীতির দায় খেসারত তো আমেরিকারই। এতে বাংলাদেশে আমাদের দুর্দশার কথা তাকে আর নতুন করে কিইবা বলার আছে এখানে!
    তবে লিসা এখন হাত ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন। মানবজমিন জানাচ্ছে, “লিসা বলেন, “যে কোন পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসন শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধেই যাবে”। “যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বর্তমান বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে একই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না,এটা সত্য”। অর্থাৎ লিসা হাসিনা সরকারকে এখন চিহ্নিত করছেন, “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” সরকার বলে। বিগত ৫ বছর অর্থাৎ গত ৫ জানুয়ারির ইলেকশনের আগে পর্যন্ত কি এটা ভিন্ন কিছু ছিল? লিসা বাক্যের মধ্যে অর্থের একটা ফাঁক রেখে দিতে চেয়েছেন, পরিস্কার করেননি। বাংলাদেশের আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, এটা ২০০৯ সাল থেকে এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়াই,আমাদের কাছে কোন কিছুই নতুন ঠেকে নাই। তাহলে কি লিসা এতদিন খবর নেন নাই, রাখেন নাই? না, আসলে ব্যাপারটা তা না। পুরা প্রশ্নোত্তরে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে লিসার বক্তব্যে ছত্রে ছত্রে আমেরিকার বাংলাদেশ নীতির উপর হতাশা ফুটে বের হয়ে আছে। এটা আসলে নিজ কর্মফলের উপর নিজেরই হতাশা। সেই হতাশা থেকে এখন “দায়ী কে” বলে নিজের দিকে না তাকিয়ে বাইরের শত্রু খোজার চেষ্টা আছে। যেমন যেকথা দিয়ে শুরু করেছি, “লিসা কার্টিস বলেন,শেখ হাসিনা সরকারকে চীন,রাশিয়া ও ভারতের এই নিঃশর্ত সমর্থন বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে পশ্চিমা দেশগুলোর বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলেছে”। অর্থাৎ তিনি দোষী খুজে পেয়েছেন, ভারত চীন ও রাশিয়াকে। এই তিন রাষ্ট্রের তাদের স্ব স্ব বাংলাদেশ নীতিকে। কেন তিনি এভাবে বাইরের শত্রু খুজছেন?

    আমেরিকা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ান
    লিসার দরকার থাপ্পড় খাবার পরও আমেরিকার বাংলাদেশ নীতিকে একটা ইতিবাচক ভাবাদর্শগত টোপড় পড়িয়ে আড়াল টানা। যেটাকে বলে আমেরিকান নীতির পক্ষে ইডিওলজিক্যাল ন্যায্যতা জোগাড় করা। লিসার দিক থেকে তিনি জানেন, আমেরিকান নীতির সততা প্রমাণ করতে চাইলে আসলে আগে দরকার বিপরীতে ভিলেন ক্যারেকটার চিহ্নিত ও চিত্রিত করা। ভিলেনকে যত নোংরাভাবে আঁকা তিনি আঁকতে পারবেন আপনাআপনি নায়ক আমেরিকা বা ওর নীতির সততা ততোই উজ্জ্বল হবে। সিনেমার মত এই হল তাঁর ফর্মুলা।
    লিসার সম্ভাব্য বা হবু প্রমাণিতব্য বিষয় হল এতদিনের আমেরিকার বাংলাদেশ নীতি যেন বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলার ততপরতাই এবং সর্বশেষ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ভিতর দিয়ে এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” খপ্পরে পড়েছে তা থেকে উদ্ধার করার ততপরতা। এখানে তাঁর ফোকাস শব্দ গণতন্ত্র। আমেরিকাকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ান হিসাবে হাজির করা।
    এই প্রসঙ্গে তিনি চিন ও রাশিয়ার বাংলাদেশ নীতির ‘নোংরা’ বা ভিলেন ভুমিকার পিছনের কারণ সম্পর্কে বলছেন। মানবজমিন লিখছে, “বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার দৃশ্যত ভিন্নমাত্রার সম্পর্ক বিষয়ে লিসা বলেন, ‘৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন সত্ত্বেও রাশিয়া ও চীন শেখ হাসিনা সরকারের পাশে দাঁড়াবে- এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কেননা, এই দেশ দু’টির নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই। তাই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অধিকার কিংবা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা খুব কমই উদ্বিগ্ন”। এটা লিসার দেয়া খুবই ইন্টারেষ্টিং একটা তথ্য সন্দেহ নাই । চিন ও রাশিয়ার “নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নেই”। তাই তারা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মর্ম বুঝল না, দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসন তারা কায়েম করল। এবং তা আবিস্কার করে লিসা আশ্চর্য হন নাই। লিসার এই যুক্তির পাটাতনটা আমেরিকা-রাশিয়ার ঠান্ডা-যুদ্ধের সময়কালের। যখন আমেরিকা রাশিয়ার ‘গণতন্ত্রের ঐতিহ্য ভিত্তি নাই, ফলে বুঝল না’ বলে প্রপাগান্ডা করত আর বিপরীতে নিজে গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন প্রমাণ করতে আমাদের মত সবদেশেই মার্শাল ল’ এর দানব শাসনের সরকার কায়েম করত। পুরা ঠান্ডা যুদ্ধের কালেই লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আমাদের মত সব দেশগুলো চলেছে আমেরিকান সমর্থিত সামরিক শাসনে। এটা বেশ মজার যে লিসা কার্টিজ সেই ক্লিশে বিগতযৌবনা যুক্তি একালে সবাই যেখানে একই গ্লোবাল পুঁজিতন্ত্রে সম্পর্কিত সেকালে আবার হাজির করছেন। সেসব বাজে ফালতু কথা থাকুক। আমরা বরং প্রশ্ন করি, যে কোন রাষ্ট্রের বিদেশনীতিতে মুল পরিচালক নির্ধারক ফোকাস কোনটা? আরেক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা নাকি নিজের পরাশক্তিগত অর্থনৈতিক, সামরিক, রাজনৈতিক অথবা ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ হাসিল করা? এটা লুকিয়ে লাভ নাই যে প্রশ্নাতীতভাবে এর জবাব দ্বিতীয়টা। এবং এটা ঠান্ডাযুদ্ধের সেকাল এবং একাল যেটাই হোক সবকালেই অর্থাৎ সবসময় এটা সত্য। তবে হ্যা এটা কাঁচা সত্য অর্থাৎ কূটনৈতিক ভাষায় এই সত্য এই লক্ষ্য বা ফোকাসের কথা সরাসরি বলা হয় না, বলা যাবে না। বলা হবে মোড়ক, রেঠরিক বা বাকচাতুরি দিয়ে। যেমন ‘গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য’, কিংবা ‘গণতন্ত্র মহান’ এসব বাকচাতুরির ভাষায়। বেশিদিন আগের নয়, ‘সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ তো আমরা সেদিনও বাংলাদেশে দেখেছি।
    তাহলে দাড়ালো এই যে বাংলাদেশের জন্য লিসার আমেরিকা গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন আর চীন বা রাশিয়ার নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নাই বলে গণতন্ত্রের মর্ম বুঝল না – এই তত্ত্বের বেইল নাই। এটা ক্লিশে বিগতযৌবনা যুক্তি। কিন্তু তবু লিসার তত্ত্বে আর একটা জিনিষ কিছুতেই বেড় পায় নাই মানে চওড়ায় আটাইতে পারে নাই। লিসার এই তত্ত্ব ভারতের বেলায় খাটাতে গিয়ে তিনি বিপদ টের পেয়েছেন। গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়নরা ভারতকে “বৃহৎ গণতন্ত্রের” পরাকাষ্ঠা বলতে বলতে মুখের ফেনা তুলে ফেলে থাকে। ফলে চীন বা রাশিয়ার মত ‘নিজেদেরই গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য কিংবা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি নাই’ বলে সব সমস্যাকে এসেন্সিয়াল করার লিসার বিগতযৌবনা যুক্তি বা তত্ত্বটা এখানে খাটছে না। তাই এবার নতুন পাঞ্চ, নতুন টুইষ্ট বা প্যাঁচ। মানবজমিন লিখছে, “লিসা কার্টিস বলেন, ভারতে যদিও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ গতিশীল এবং দেশটি তার গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করে থাকে, কিন্তু নিজ দেশের গণ্ডির বাইরে গণতন্ত্র উত্তরণে নয়া দিল্লিকে কখনও বড় রকমের ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি”।
    আগে বলেছি, বাংলাদেশে গণতন্ত্র দেখতে চাওয়া না চাওয়াটা এমনকি কোনটাকে গনতন্ত্র করা হচ্ছে বলে চালিয়ে দেয়া হবে এর সবটাই নির্ভর করে ভারতসহ যেকোন বিদেশীদের বিদেশনীতিতে কোনটা তাদের নিজেদের আপন স্বার্থে যায় এর উপর। অর্থাৎ সুপ্রিম হল, ভিন্ন রাষ্ট্রের আপন স্বার্থ। কেউই বাংলাদেশে গণতন্ত্র কায়েম করার জন্য নিজের রাষ্ট্রে দোকান খুলে নাই। বাংলাদেশের জনগণও তা করতে কাউকে দিতেও পারে না। প্রশ্নও উঠে না। য়ার ২০০৯ সালে কি আমেরিকা ভারতের হাত দিয়ে আমাদেরকে হাসিনার মহান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও শাসন উপহার দেয়নি? আসলে লিসা এই প্রশ্নোত্তর লিখার সময় তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, লিসা কার্টিজ একজন কূটনৈতিক নন বরং গবেষক, হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো। গবেষক হিসাবে তাঁর কাজ কোন বিদেশনীতিকে ক্রিটিক্যাল ও এনালাইটিক্যাল চোখে অর্থাৎ বিশ্লেষক হিসাবে ঘটনাবলিকে দেখার বিরাট সুযোগ তার ছিল এবং আছে। বিদেশী রাষ্ট্রের বাংলাদেশ নীতি বাস্তবের মুখোমুখিতে পড়লে ওর সমস্যাগুলো কি, কি চেহারা নিয়ে তা দাড়ায় তা নিয়ে বিশ্লেষক অন্তর্দৃষ্টি হাজির করা হত পারত তার আসল ভুমিকা। সম্ভবত একাজে তাঁর ঘাটতি খামতি ঢাকতেই তিনি গবেষকের বদলে স্বচ্ছন্দে তিনি যেন কূটনৈতিক – এই ভুমিকায় নেমে পড়েছেন।

    আমেরিকার নীতিটাই স্ববিরোধী ও আত্মপ্রবঞ্চনামূলক
    মানবজমিনের প্রশ্নোত্তরের রিপোর্টিংয়ের শুরুতে বলেছে, “গণতন্ত্রের পক্ষে দুর্বার গণআন্দোলনই বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে পারে। গণতন্ত্রের দাবিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব বেশি অস্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ বিষয়ে ভারত তার অবস্থান পরিবর্তন করবে বলে মনে হয় না”। একথাগুলো লিসা কার্টিজের প্রশ্নোত্তরে বলা তার নিজেরই কথা কি না আমরা পরিস্কার হতে পারিনি। হতে পারে তা লিসা কার্টিজের লেখা জবাবের কোন অংশ পড়ে মানবজমিন রিপোর্টারের মনে যে ছাপ তৈরি হয়েছে সেই সুত্রে লেখা। যাই হোক সেটা, এই প্রসঙ্গে একটা কথাই বলা যেতে পারে। সর্বশেষ গত একবছরের বাংলাদেশের মানুষের প্রতিবাদ বিক্ষোভের কথাই যদি বলি যখন গণবিক্ষোভ আন্দোলনের তোড়ে এক পর্যায়ে ঢাকা ঢাকার বাইরে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ হাসিনার বিরুদ্ধে তাদের সাধ্যমত সর্বোচ্চ প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছিল। কিন্তু লক্ষ্যণীয় হল সেসময় এর প্রতি আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গি। চলমান ঐ গণআন্দোলন যতই মাত্রা লাভ করছিল আমেরিকাসহ বাংলাদেশের পশ্চিমা কূটনীতিকরা ততোই একে ‘সহিংসতা’ বলে ব্যাখ্যা করছিল বললে কম বলা হবে। বলতে হবে অভিযুক্ত করেছে একতরফা ভাবে। আর তথাকথিত ‘অহিংস’ প্রতিবাদের কথা নসিহত করছিল আমাদের। কিন্তু এই প্রতিবাদ বিক্ষোভকে হাসিনা সরকারের রাস্তায় প্রতিবাদ “বিক্ষোভ দেখা মাত্রই আর্মড গাড়িতে চড়ে সরাসরি গুলি” এই মারাত্মক মোকাবিলার ধরণ সম্পর্কে কোন কার্যকর নোটিশ তারা করেছে এমন প্রমাণ তারা রাখে নাই। অর্থাৎ সরকারের সরাসরি গুলি এটা সহিংসতা নয়, নৃশংসতা নয়। যারা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে সেটা সহিংসতা করা। পশ্চিমা কূটনীতিকদের ভাষ্যের পিছনে এমন নীতিটাই আমরা দেখেছি।
    অর্থাৎ দেখা গেছে আমেরিকার নীতিটাই স্ববিরোধী ও আত্মপ্রবঞ্চনামূলক। যদি তারা সত্যিই বিশ্বাস করে হাসিনা এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” বিপদ ডেকে আনছে তবে সততার সাথে তা বলতে হত, করতে হত। উলটা জনগণের প্রতিবাদ বিক্ষোভকে ‘সহিংসতা’ বলে লেবেল লাগিয়ে পালটা প্রচারণায় তাদের নামার কথা নয়। কিন্তু তারা সেটাই করেছে। নিজেদের স্ববিরোধী নীতিটারই বাইরে সরব প্রকাশ ঘটিয়েছে। কূটনীতিকদের কথা সে জগতে থাক। লিসা কার্টিজ বা হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের প্রসঙ্গে সেদিকে আর না যাই। কূটনীতিকদের কথা বাদ রেখে এনিয়ে খোদ লিসার আর এক লেখা (৫ জানুয়ারি নির্বাচনের দুসপ্তাহ আগে লেখা) থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে কিছু সারকথা বলা যাক। লেখার শিরোনাম, দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামিজমের বিরুদ্ধে লড়াঃ বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক পথে রাখা। এখানে দেখুন। [Combating Islamism in South Asia: Keeping Bangladesh on the Democratic Path] এই লেখা হেরিটেজ ফাউন্ডেশন থেকে স্পনসর করা লিসা কার্টিজের কাজ। ওর সারাংশ দেয়া আছে রিপোর্টের শুরুতে সেখান থেকে একটা বাক্য, “While the threat from terrorism had diminished to some extent under the government of Prime Minister Sheikh Hasina, the recent execution of an Islamist politician and the sentencing to death of other opposition leaders accused of war crimes during Bangladesh’s war of independence in 1971 have unleashed furor among Islamists.”। অর্থাৎ লিসা দাবি করছেন হাসিনা সরকারের অধীনকালে নাকি সন্ত্রাসবাদের বিপদ কিছুটা কমেছে। কিন্তু লিসা কিভাবে বুঝলেন যে বিপদ কমেছে। তাঁর বুঝাবুঝির নির্ণায়ক, মানে কি দেখে তিনি বুঝলেন? আমরা জানি না। কিন্তু এক নিশ্বাসে একই বাক্যের পরের অংশে বলছেন, “একজন ইসলামিষ্ট রাজনীতিকের ফাঁসি দেয়া হয়েছে”। অর্থাৎ লিসা সরাসরি বলছেন না তবে তার নির্ণায়ক কি সেটা তিনি ইঙ্গিতে বলছেন।
    কিন্তু কোন ‘ইসলামি রাজনীতিকের’ ফাঁসির সাথে সন্ত্রাসবাদের সম্পর্ক কি? হাসিনা কি তাঁকে ফাঁসি দিয়েছেন “সন্ত্রাসবাদের” জন্য? আমেরিকা “সন্ত্রাসবাদ” মনে করে তেমন কোন ততপরতার জন্য এই ফাঁসি দেয়া? লিসা সেটা খোলসা করে না বরং ইঙ্গিতে ধরে নিতে বলেছেন। চিন্তার এই ফাঁকি ও অসততাটা লক্ষণীয়। আবার তিনি বলছেন ফাঁসিটা “‘৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের অভিযুক্ত হিসাবে তবে এটা ইসলামিষ্টদের বিক্ষুব্ধ করেছে”।
    তিনি যদি বুঝাতে চেয়ে থাকতেন, ৭১ সালের একটা কৃত যুদ্ধাপরাধের ফাঁসি এটা তাহলে এটা কোনই সমস্যার হত না। যদিও সেক্ষেত্রে সেই অপরাধী ইসলামিষ্ট কিংবা ইসলামিষ্ট নয় তাতে কিছুই এসে যাবার কথা নয় কারণ এটা গৌণ দিক। মুখ্য দিক হবার কথা তিনি যুদ্ধাপরাধী। কিন্তু তিনি এই ফাঁসির ঘটনাকে সম্পর্কিত করছেন ১) হাসিনাকে “সন্ত্রাসবাদের হুমকি” কমানোর নায়িকা হিসাবে। (২) ফাঁসির কারণে যারা বিক্ষুব্ধ হয়েছেন তাদেরকে বিক্ষোভকে “ইসলামিষ্টদের বিক্ষোভ” হিসাবে চিহ্নিত করে।
    একটা কথা লিসাসহ এমনভাবে যারা ভাবেন তাদের সবাইকে পরিস্কার করে বলতে হবে। ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ কি একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ? যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচার? আমাদের মনে রাখতে হবে, আলকয়েদা বা তা সংশ্লিষ্ট দল বা গ্রুপের ততপরতা অথবা আলকায়েদার মত ততপরতাকে আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ মনে করে।

    যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচার
    কোন প্রশ্ন না রেখে ধরে নিচ্ছি আমেরিকায় সংজ্ঞায় যেটাকে সন্ত্রাসবাদ বলা হয় সেটাই সন্ত্রাসবাদ। আদালতে কোন অপরাধের বিচার এবং শাস্তি হয়ে গেলে তা থেকে বুঝার উপায় কি যে ঐ অপরাধ সন্ত্রাসবাদের অপরাধ ছিল কি না? তার আগে একটা কথা পরিস্কার করে নেই। অপরাধটা যদি কোন “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” করেন (লিসা কার্টিস Islamist politician বলে এক শব্দ ব্যবহার করেছেন) তাহলেই কি সেটাকে সন্ত্রাসবাদের অপরাধ বলে বুঝব? না তা অবশ্যই বুঝা যাবে না, বুঝা ঠিকও হবে না। কারণ মূল বিষয় হল, দেশের কোন আইনে অভিযোগটা দায়ের করা হয়েছে এটাই সবকিছুর নির্ধারক। এটাই এবিষয়ে সব তর্কের অবসানের মুখ্য উপায়। ফলে অভিযোগ যদি দায়ের ও গ্রহণ করা হয়ে থাকে “যুদ্ধাপরাধ আইনে” (আমাদের মূল ইণ্টারনাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল এক্ট ১৯৭৩ যা সংশোধিত হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে কয়েকবার তার সর্বশেষ সংশোধনীসহ) তাহলে কেউ “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” হন আর নাই হন তিনি একমাত্র যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন বা ফাঁসি হয়েছে বলা যাবে, বলে বুঝতে হবে। আর অভিযোগ যদি দায়ের ও গ্রহণ করা হয়ে থাকে আমাদের “সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনে (আমাদের মূল সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০০৯ যা ২০১৩ সাল পর্যন্ত সংশোধিত হয়েছে তা সহ) তাহলে কেউ “ইসলামিষ্ট রাজনীতিবিদ” হন আর নাই হন তিনি একমাত্র সন্ত্রাসবাদের অপরাধ করেছেন, অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন বা ফাঁসি হয়েছে বলা যাবে, বলে বুঝতে হবে। এই কথা থেকে পরিস্কার যে, ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ কোনভাবেই নয়। এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার মানে কি “সন্ত্রাসবাদের” বিচা্র তাও কোনমতেই নয়। যেসব জামাতের নেতাদের বিচার চলছে বা ফাঁসি হয়ে গেছে এরা কেউই “সন্ত্রাসবাদের অপরাধে” এখনও বিচারের কাঠগড়ায় অথবা বিচার শেষে রায়ে শাস্তিপ্রাপ্ত বা ফাঁসিপ্রাপ্ত তা একেবারেই নয়। মুল কারণ তাদের সবার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে ইণ্টারনাশনাল ক্রাইম ট্রাইবুনাল এক্ট ১৯৭৩ – এই আইনে। এরপর আশা করি জামাতের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধাপরাধের (আসলে সঠিক আইনী ভাষায় ‘মানবতা বিরোধী অপরাধ’) বিচার বা শাস্তিকে কেউ “সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে” বিচার হচ্ছে বলে বুঝবেন না, ভুল করবেন না, মিথ্যা ছড়াবেন না। এমনকি জামাতের কোন নেতাকে (লিসা কার্টিসের মত করে) কেউ Islamist politician বলে মনে করেন কিংবা না করেন তাতে কোন ফারাক পড়বে না।
    এখান লিসা কার্টিসের চিন্তার ফাঁকিটা গ্রেফতার করা যায়। এরপরেও জবরদস্তিতে লিসা কার্টিজ যদি মনে করেন, ৭১ সালের যুদ্ধাপরাধটাও একালে আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদ। তাতেও আমাদের অসুবিধা নাই। কিন্তু লিসা কার্টিজসহ যারা এভাবে মনে করবেন তাদেরকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে তাহলে আমেরিকা নিজেই ঐ “সন্ত্রাসবাদের” অংশ। আজ ৭১ সালের ঘটনাগুলো যুদ্ধাপরাধ বলেন অথবা “সন্ত্রাসবাদ” বলেন যে নামেই লিসা কার্টিজ ডাকেন এর দায়ভার আমেরিকারও। কারণ তখন আমেরিকান অবস্থান মুসলিম লীগ বা জামাতে ইসলামসহ পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকের পক্ষে ছিল, সমর্থন ছিল।
    ধরে নিচ্ছি আমেরিকান সন্ত্রাসবাদ সংজ্ঞায়নের এসব বিপদ টের পেয়ে এবার হয়ত লিসা কার্টিজ জোর দিবেন তাঁর ব্যবহৃত “ইসলামিষ্ট” শব্দটার উপর। অর্থাৎ ইসলামিষ্ট রাজনীতি মানেই “সন্ত্রাসবাদ”, ফলে সন্ত্রাসবাদের বিপদ দেখতে পাওয়া। লিসাদের জেনে অথবা না জেনে অথবা চিন্তায় ফাঁকি দিয়ে সন্ত্রাসবাদের ভুত দেখে বেড়ানোটাও আরও মারাত্মক বিপদের। কারণ জামাত ইসলামি ইসলামি রাজনীতি করে তাতে সন্দেহ নাই। এই অর্থে লিসা যদি “ইসলামিষ্ট” শব্দটা ব্যবহার করে থাকেন তবে তাঁকে মনে করিয়ে দিতে চাই বিচারটা হয়েছে যুদ্ধাপরাধের আইনে কোন এন্টি-টেরর ল জাতীয় কোন “সন্ত্রাসবিরোধী আইনে” নয়। ফলে আমেরিকার “সন্ত্রাসবাদ” খুজে ফেরা চোখে লিসা কার্টিজ বড়জোর একজন আমেরিকান নাশনালিষ্ট নাগরিক, কোন মতেই কোন গবেষক নন। এছাড়া আমরা আরও বুঝব লিসাও হাসিনার বাকচাতুরির ফাঁদে পড়েছেন। এই ফাঁসি কোন এন্টি-টেরর এক্টে হচ্ছে কি না – এই সহজ দিকটা খেয়াল করার মত বুদ্ধি তিনি দেখাতে পারেন নাই। যদি লিসা দেখতেন, জানতেন তবেই সেটা খুব সহজেই আমেরিকান সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদী ঘটনা তিনি বলতে পারতেন ও সে ঘটনাকে তাঁর ‘ইসলামিষ্টের বিচার’ কথার কোন অর্থ হত।
    হুশ হারানো বুদ্ধি বিবেচনার এই স্ববিরোধ লিসা কার্টিজের একার নয়। আমেরিকাসহ প্রায় সব পশ্চিমা কূটনীতিকদেরও একই অবস্থা। ইসলামিষ্ট কথাটাকে তারা জবরদস্তি তাদের সংজ্ঞার সন্ত্রাসবাদ বলে ইঙ্গিত মেরে প্রচ্ছন্নে বুঝাতে চান। এভাবে তাদের নিজেদের সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা বা ক্রাইটেরিয়া তারা নিজেরাই গুলিয়ে ফেলেন। অথবা ইচ্ছা করে করে রাখেন। কিন্তু বটম লাইন হল, জামাত আওয়ামি লীগের মতই একটা আধুনিক রাষ্ট্রের কনষ্টিটুশনাল আইনী রাজনৈতিক দল, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া যাদের উভয় দলের লক্ষ্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বা পাড়ায় আওয়ামি লীগের মতই জামাতও চাপাতি ধরণের সন্ত্রাস করে। কিন্তু চাপাতির সন্ত্রাস করলেও যেমন আওয়ামি লীগ সশস্ত্র বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যের কোন রাজনৈতিক দল নয় ঠিক তেমনি জামাতও আওয়ামি লীগের মতই কোন সশস্ত্র বলপ্রয়োগে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যের রাজনৈতিক দল নয়। এমনকি একথা ১৯৪২ সাল থেকে শুরু হওয়া মওলানা মওদুদির রাজনৈতিক চিন্তার ও দলের ক্ষেত্রেও সমান সত্য ও প্রযোজ্য।

    যদিও সমস্যাটা কেবল লিসা কার্টিজের নয়, কেবল পশ্চিমা কূটনৈতিকদেরও নয়। এমনকি আমাদের অনেকেই ইসলামি রাজনীতি অপছন্দ করি বলে এই জবরদস্তি জেনে অথবা না জেনে করি। সে যাক, পশ্চিমা কূটনৈতিকরা মনে করতেই পারেন তারা তাদের সন্ত্রাসবাদের লড়াই করবেন আর সেকাজে বাংলাদেশে একটা “গণতান্ত্রিক” মেকানিজম ও প্রক্রিয়া চালু রেখে বা দেখতে চেয়ে তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ মোকাবিলা করবেন। এটা হতেই পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সবার আগে তাদের মনে খোলা হতে হবে। “ইসলামিষ্ট” শব্দটা শুনে কোন আগাম ধারণার বশবর্তি হয়ে দ্বিধাগ্রস্থতার কিছু নাই। অন্তত আইডিয়ালি বললে একাজে তারা কোন ব্রান্ডের “ইসলামিষ্টদেরকেও” না পাবার কোন কারণ নাই। কারণ শুনে ইসলামিষ্ট লাগলেও মর্ডান রাষ্ট্রের মত এক লিবারেল রাষ্ট্রই তাদের কল্পনা – এটুকু আছে কিনা সেটাই তো মূল বিবেচ্য হওয়ার কথা।
    তাহলে, মুল সমস্যাটা পশ্চিমা মনের। এই স্ববিরোধের কারণে তাই একদিকে লিসা কার্টিজ হাসিনা সরকারকে সন্ত্রাসবাদ লড়াইয়ে খামোখা সার্টিফিকেট দেন আবার অভিযোগ করেন হাসিনার বাংলাদেশ এক “দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতান্ত্রিক শাসনের” বিপদ ডেকে আনছে।

    একটা সতর্কবাণী দিয়ে শেষ করি। এতক্ষণ কথাগুলো বলেছি, বাইরের মানুষ আমাদেরকে কি করে দেখে সেদিক থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে নতুন রাষ্ট্র গঠনের কাজটা আমাদের। এবং একান্তই আমাদের। একমাত্র আমাদেরকেই তা বাস্তব করে তুলতে হবে। সেকাজে আন্দোলন সংগ্রামই আমাদের পথ। লিসা কার্টিস সহ বাইরের কেউ আমরা কি করি জানতে আগ্রহ থাকতে পারে। তাতে তাদের দেখার স্ববিরোধীতাটা কোথায় তা তারা ঠিক জানুক আর নাই জানুক, আমাদের কাজ আমাদেরকেই করতে হবে। আশা করি সেদিকটা আমলে রেখে আমরা লেখাটা পাঠ করব।

    SHORT LINK:

  • আরব স্প্রিং

    আরব স্প্রিং
    ২০১৩ জুলাই

    http://wp.me/p1sCvy-1p

    আরব স্প্রিং শব্দটা আমরা অনেকেই শুনেছি – আর এর অর্থ হতে দেখেছি একটা গণ-বিক্ষোভ বা গণ-আন্দোলন হিসাবে,কেবল এই দিকটাই নজরে রেখে। সেজন্য ২০১১ সালের শুরুর দিকে সেকুলারিস্ট আর ইসলামিষ্ট উভয়কেই আরব স্প্রিং এর সমর্থক হতে দেখা গিয়েছিল। আরব স্প্রিং শুরু হওয়া তিউনিশিয়া পরে মিশরের পরিস্থিতিও কেবল গণ-আন্দোলন দিক থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। আসলে বিশ্ব-অর্থনীতি ও ক্ষমতা কাঠামো কিম্বা মতাদর্শিক লড়াই-সংগ্রামের ক্ষেত্রে আদৌ কোন নতুন পরিবর্তন ঘটেছে কিনা সেটা গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা হয়ে ওঠে নি। কিন্তু আরও বিস্তারে লিবিয়া পেরিয়ে বিশেষ করে সিরিয়ান পরিস্থিতিতে এসে আরব স্প্রিং কথাটাকে যে আর কেবল গণ-আন্দোলন দিক থেকে ব্যাখ্যা বুঝাবুঝিতে কুলাচ্ছিল না তা সকলে টের পেতে শুরু করে। ইতোমধ্যে সকলে অন্তত বুঝতে পেরেছে এটা নেহায়েতই গণ-আন্দোলনের ঘটনা নয়। ফলে সেকুলারিস্ট আর ইসলামিষ্ট উভয়ের ক্ষেত্রেই আমরা দেখি সিরিয়ান প্রশ্নে এসে আরব স্প্রিং এর প্রতি ভালবাসা ও সমর্থন এবার ফিকে হয়ে গেছে; একটা জটিল গোলমেলে অবস্থায় সকলে। সেকুলারিষ্টদের কেউ কেউ অবশ্য এবার ৮০ দশকে ফেলে আসা রাশিয়া –আমেরিকার ঠান্ডাযুদ্ধের ব্লক ধারণা দিয়ে ঘটনা ব্যাখ্যার এক অক্ষম চেষ্টা করেছিল। ব্যাখ্যায় থই না পাওয়ার মুল কারণ আরব স্প্রিং কেবল গণ আন্দোলন নয়। তাহলে গণ-আন্দোলনের দিক ছাড়া আর কি কি দিক আছে যা জানতে হবে যা দিয়ে আরব স্প্রিংকে বুঝা যাবে সেদিকে যেতে হবে।

    গত দুবছর ধরে চেষ্টা করেছি মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকা – দুনিয়ার এই ভুগোলের নানান দেশের আরব স্প্রিং এর ঘটনাবলী অনুসরণ করার। আমার অভিজ্ঞতা লেখার চেষ্টা করেছি,এর আগেও। কিন্তু পুরা ঘটনা — মানে সব দেশের ঘটনা একসাথে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা কখনও শেষ করতে পারি নাই। আগের লেখা দুটো কেন্দ্রিভুত হয়ে গেছে কেবল মিশরের ঘটনায় ভিতর দিয়ে আরব স্প্রিংকে যতটা স্পষ্ট করা যায়, সেদিকে। আমার লেখার ক্ষমতার (গাফিলতি কুঁড়েমিসহ)চেয়ে ঘটনা ঘটেছে দ্রুত, সেটাও এর মুল কারণ। গত কয়েক সপ্তাহে সিরিয়ান ফেনোমেনা নতুন মাত্রা লাভ করেছে, অভিমুখেও বদল ঘটছে। ঘটনা যদি তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণের চেয়ে দ্রূত ঘটতে থাকে তখনেই সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

    প্রথম কথা হলো, বাইরে থেকে যেটা আরব স্প্রিং সেটা এর গণআন্দোলনমূলক প্রকাশ্য দিক। আর এর অন্তরে মোটা দাগে দুটা স্বার্থ বা দুটো রাজনীতি আছে। এক. আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি। দুই. নতুন ধরণের এক ইসলামী রাজনৈতিক ধারা। কিন্তু আরব স্প্রিং এর ইনিশিয়েটর বা প্রথম উদ্যোগটা এসেছে আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি –মার্কিন পরাষ্ট্র নীতির এই অন্তর্গত তাগিদ থেকে। আর দ্বিতীয় দিকটা হলো, নতুন ধরণের ইসলামী রাজনৈতিক ধারা। এখানে আমি এই ধারাকে কারযাভী (Sheikh Yusuf al-Qaradawi) ইসলাম বলে নামকরণ করব বা চেনাবো। তবে এই ইসলামী ধারা কেন হাজির হলো? এর জবাব হলো, আসলে আমেরিকান নতুন নীতির লক্ষ্য হলো, এক “মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার” কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া। ফলে দ্বিতীয়টার জন্ম হচ্ছে আমেরিকার এই কৌশলগত প্রয়োজন থেকে ফলে মোটা দাগে কথা শুরু করব, মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকায় আমেরিকান নতুন পররাষ্ট্রনীতি থেকে।
    মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকা বলে একটা আঞ্চলিক ভৌগলিক এলাকা চিনানোর চেষ্টা করলাম বটে। কিন্তু সেটাও মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকা এই অঞ্চলের গড়পরতা সব রাষ্ট্রের বেলায় ব্যাপারটা আবার তাও নয়। বরং এভাবে বললে ঠিক হবে যে, মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকার বেছে নেয়া কিছু দেশে। যেমন, মধ্যপ্রাচ্যের গালফ ষ্টেট অর্থাৎ দুবাই-সৌদি-বাহরাইন-কাতার-ওমান-কুয়েত এর মত আমির-বাদশার রাষ্ট্রগুলোর জোট (গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি) – এই বাদশাজোট ভুক্ত রাষ্ট্র হলে মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির অনুমোদিত আরব স্প্রিং সেখানে নো-গো এরিয়া। কোন জিসিসি রাষ্ট্রে আরব স্প্রিং করবার চেষ্টা করা হলে তা কঠোরভাবে দমন করা হবে। কারা দমন করবে? ওসব দেশের স্ব স্ব বাদশা-শাসক একা অথবা সৌদি নেতৃত্বে যৌথভাবে জিসিসি। আর সেখানে আরব স্প্রিং ঘটলেও ওবামা সেখানকার বাদশা-শাসকদের পদত্যাগ করতে দাবী জানাবে না। ঠিক যেমন মিসরে মোবারকের বেলায় আমরা দেখেছি। অথচ মিসর, লিবিয়া বা সিরিয়ায় আরব স্প্রিং ঘটাবার জন্য সৌদি নেতৃত্বে অর্থ, লজিষ্টিক, ডিপলোমেটিক ইত্যাদির প্রধান পৃষ্টপোষক এরাই। আর নতুন উদিয়মান কাতার, এর বাদশা। তাহলে দেখা যাচ্ছে আরব স্প্রিং এর একটা গড়পরতা আঞ্চলিক ভুগোল পাওয়া মুস্কিল। বরং আমরা দেখছি আরব স্প্রিং ঘটছে বা ঘটানো হচ্ছে বেছে বেছে নেয়া কিছু মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকার রাষ্ট্রে। কেন? এর জবাব আমাদের জানতে হবে। সেখানে যাব। তবে ইনিশিয়েটর বা প্রথম উদ্যোগটা – আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি এখান থেকে কিছু কথা বলে নিব আগে।

    আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি বলেছি; “নতুন” শব্দটা ঢুকিয়েছি এর মানে আগে একটা নীতি ছিল। হা, আগে ছিল “ওয়ার অন টেরর” – অর্থাৎআমেরিকায় ৯/১১ এর আলকায়েদা হামলার পর নেয়া ২০০১ সালের শেষে নেয়া যে নীতি। সেটা থেকে আলাদা মানে আগেরটা ঠিক বাদ দিয়ে নয়, বলা যেতে পারে বোলচাল (rhetoric) ব্যাপারটাকে আর -ওয়ার অন টেরর – না, তবে ওর সাথে নতুন কিছু কৌশলগত বৈশিষ্ট যুক্ত করা। তবে আগের সাথে পরের নীতির মুল তফাত একটা তো করা যায় অবশ্যই। সেটা হলো, ইসলাম প্রসঙ্গে। পুরানোটা অর্থাৎ বুশের নীতিকে বলা যায়, ইসলামের যেকোন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ। ক্রুসেড। এসব প্রকাশকে দমন ও নির্মুল করেই আমেরিকাকে নিজ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মুল ফোকাস আলকায়েদা। বিপরীতে নতুন নীতির বৈশিষ্ট হলো, ১। আমেরিকান রাষ্ট্র ও গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য ইসলামকে মুখ্য হুমকি বলে মেনে নেওয়া, (It profoundly affects the security of the West)। ২। তাই করণীয় হিসাবে সব ধরণের ইসলামের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের বদলে মার্কিন বিরোধী কিম্বা রেডিক্যাল আলকায়েদার বাইরে এক “মডারেট ইসলাম” এর ধারা খুজে বের করা। আলকায়েদার বিপরীতে এক ‘মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” খাঁড়া করা যেটা আমেরিকাকে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
    দুই নীতির তুলনা করে বৈশিষ্টগুলো আলাদা করে বুঝার কাজটা আর একভাবে করা যেতে পারে। যেমন, বুশের বোলচাল ছিল, আরব “স্বৈরাচারী রাষ্ট্র ও শাসকগুলো” থেকে তাদের জনগণকে তিনি “লিবার্টি”তে আনবেন, “ফ্রিডম” শিখাবেন। তাই তিনি ইরাক হামলা ও দখল করলেন। আর বিপরীতে এবার নতুন নীতির বৈশিষ্ট হলো – আগেরটা ছিল দেশ দখল করে “লিবার্টি”, “ফ্রিডম” রপ্তানী করার। আর এখন হলো, ওসব দেশের জনগণকে এক এনজিও কার্যক্রমের মাধ্যমে “লিবার্টি”, “ফ্রিডম” শিখাবেন আর উস্কানী দিয়ে তবে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রিত রেখে শাসকের পতন ঘটাবেন। আর সাধারণভাবে মুসলমান প্রধান দেশ আর বিশেষ করে বেছে বেছে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে এই কর্মসুচী নেবার কারণ – এসব দেশের শাসকেরা “prevalence of authoritarian political structures” অর্থাৎ “স্বৈরাচারী” কাঠামোতে থাকে বলে ঐ রাষ্ট্রগুলো আলকায়েদা আন্দোলনের গড়ে উঠার পটেনশিয়াল বা সম্ভাব্য রাষ্ট্র হয়ে থাকে। আর তা সহজেই জনগণের জনপ্রিয় সমর্থন জোগাড় করে ফেলে। ফলে “লিবার্টি”, “ফ্রিডম” এর কথা বলে নিয়ন্ত্রিতভাবে শাসকের পতন ঘটানোর এক পুরা প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে শেষে এক ”মডারেট ইসলাম” এর ধারা খুজে বের করার কাজটা ঘটাতে হবে। ফলে আলকায়েদার বিরোধী এক ‘মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড়ে তোলা যাবে। এভাবে ”মডারেট ইসলাম” এর ধারা খুজে হাজির করা আর আলকায়েদার বিপরীতে এক ‘মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড় তোলা এই কাজটারই বাইরের ডাক নাম “আরব স্প্রিং”।
    আমরা আরব স্প্রিং নামে কোন আমেরিকান ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বয়ান করছি না। এককথায় বললে এটা একদিকে আলকায়েদা ধরণের ইসলামী ফেনোমেনাকে দমন করা আর পছন্দসই এক ইসলামী ফেনোমেনার জন্ম দেয়ার নতুন মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি। এছাড়া মনে রাখতে হবে, আমেরিকান রাষ্ট্রনীতি কোন সিরিয়াস গবেষণা ছাড়া কারও এক মাথাগরম অথবা খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত থেকে জন্ম হয় না। বরং আমেরিকান নতুন এই রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আমরা দেখছি – এর ব্যাকগ্রাউন্ড গবেষণার কাজটা করেছে RAND Corporation, যা পরে বিস্তর সেমিনার আলাপ আলোচনা আভ্যন্তরীণ তর্ক-বিতর্ক ইত্যাদির পর ওবামা প্রশাসনের নীতি হিসাবে গৃহিত হয়েছে। এখানে ইংরাজিতে যেসব ব্রাকেটবদ্ধ কথা আছে তা RAND Corporation এর এক গবেষণা রিপোর্ট (RAND_MG574) থেকে নেয়া।

    RAND Corporation সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
    RAND Corporation সংগঠন হিসাবে নিজেকে এক নন-প্রফিট দাতব্য প্রতিষ্ঠান বলে পরিচয় দেয়। এটা অবশ্যই এক ধরণের বেসরকারী তবে আমেরিকার নীতিনির্ধারণী থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ধরণের প্রতিষ্ঠান। জন্ম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে যখন এর মুল প্রতিষ্ঠান ছিল আমেরিকান বিমান বাহিনীর জন্য যুদ্ধবিমান তৈরির এক প্রাইভেট কোম্পানী, নাম Douglas Aircraft Company,। ডগলাস কোম্পানী পরবর্তিতে বিভিন্ন সময়ে অন্যান্য বিভিন্ন বিমান কোম্পানীর সাথে মার্জ বা যুক্ত হতে হতে এটাই এখনকার আমেরিকান এয়ারবাস কোম্পানী, এক বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমান কোম্পানী। মুল ডগলাস কোম্পানী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিমান বাহিনীর জন্য যুদ্ধবিমান তৈরি ও সরবরাহের সাথে সাথে আমেরিকার জন্য যুদ্ধনীতি বিষয়ে গবেষণার কাজও করত। তবে সেটা Douglas Aircraft Company এর অধীনেই ‘RAND প্রজেক্ট’ নামে শুরু করা হয়েছিল। আর যুদ্ধ শেষে, ১৯৪৮ সালে ‘RAND প্রজেক্ট’ নিজেই মুল বিমান কোম্পানী থেকে আলাদা প্রতিষ্ঠান RAND Corporation নামে ক্যালিফোর্নিয়ায় রেজিষ্টার্ড করা হয়। আগের মত আর কেবল যুদ্ধনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বদলে আমেরিকার জন্য সোশাল, পলিটিক্যাল, ষ্টাটেজিক ও ইকোনমিক নীতিনির্ধারণী গবেষণা কাজ করা নিজের লক্ষ্য বলে ঘোষণা করেছিল। এটা এখন নিজেই একটা বিশ্ববিদ্যালয়ও চালায়। আমি RAND এর যে রিপোর্টের রেফারেন্সে এখানে কথা বলছি সেটার শিরোনাম হলো, RAND_MG574 Building Modern Muslim Networks । ২১৭ পৃষ্টার এই ডকুমেন্ট অনেক বড় মনে হলে শুরুতে ১৩ পৃষ্টার সামারি পড়ে নেয়া যেতে পারে। আমার এই লেখায় আমি এটাকে “RAND ইসলাম প্রজেক্ট” বলে রেফার করব। এছাড়াও এই ওয়েব সাইটে সংশ্লিষ্ট আরও অন্তত ৫-৭টা রিপোর্ট পাওয়া যাবে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন।
    তাহলে আমরা উপরে দেখলাম, আরব স্প্রিং এর পুরা কনসেপ্টই হলো, “RAND এর ইসলাম প্রজেক্ট” ওর গবেষণার সময়ের নাম। যা পরে আমেরিকান রাষ্ট্রের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতিতে আরও অনেক কম্পোনেন্ট বা উপাদানের মধ্যে এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্টপূর্ণ দিক। আর আরব স্প্রিং ওর ডাকনাম বা বাইরের নাম। “RAND ইসলাম প্রজেক্ট” আর পরে এটাই ওবামার হাতে আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি। বলা বাহুল্য, আমেরিকান সরকার কবে কোন দলিল্‌ কোন মিটিংয়ে “RAND এর ইসলাম প্রজেক্ট”কে নিজের পররাষ্ট্রনীতি বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিল এবং কিছু বাদ রাখলো না পুরাটাই নিল এর খুটিনাটি ও সুনির্দিষ্ট হদিস পাওয়া মুশকিল। কিন্তু আমরা যদি উল্লেখ্য রিপোর্টের কেবল সামারিটাই দেখি তবে সেখানে যেসব ধারনা ও শব্দ পাই যেমন, Democracy Promotion, Civil-Society Development, Public Diplomacy বা স্মার্ট ডিপ্লোম্যাসি – এই একই শব্দ ও ধারণাগুলো আমরা হিলারী ক্লিনটনের হাতে আকার নেয়া এখনকার আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্টসুচক নীতিতে পাই। এছাড়া যেসব আমেরিকান এনজিও এর মাধ্যমে “লিবার্টি”, “ফ্রিডম” শিখাবেন, নিয়ন্ত্রণ রাখবেন সেগুলো নাম হলো National Endowment for Democracy NED), the International Republican Institute (IRI), the National Democratic Institute (NDI), the Asia Foundation, and the Center for the Study of Islam and Democracy (CSID)। বাস্তবে মিশরের আরব স্প্রিং এর ক্ষেত্রে আমরা এই আমেরিকান এনজিও সংগঠনগুলোকেই পাই। তবে সাথে আরও কিছু আমেরিকান এনজিওকে পাই যেমন, ফ্রিডম হাউস, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর জার্নালিস্ট, আর জর্মনদের মধ্যে আছে রক্ষণশীল ক্রিশ্চিয়ান ডেমক্রাটিক ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান – কনরাড এডেনেওয়ার, ইত্যাদি। এসব আমেরিকান এনজিওগুলোর ফান্ডের উৎস আমেরিকান রাষ্ট্র, সরাসরি; এবং ফান্ড বিতরণ করা হয়েছে আমেরিকার বিদেশকে এইড বিতরণের সরকারি প্রতিষ্ঠান USAID এর মাধ্যমে।এই রিপোর্টে এই আমেরিকান এনজিওগুলোকে USAID এর implementation contractors বলা হয়েছে। এছাড়া রিপোর্টে American Federation of Labor (AFL) ধরণের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এটা ওবামার ডেমোক্রাট পার্টির প্রভাবান্বিত আমেরিকান স্থানীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলোর রাজ্য ফেডারেশনগুলো আছে, এদেরই মুল ফেডারল বা কেন্দ্রিয় ফেডারেশন। American Federation of Labor বাংলাদেশে গার্মেন্টসে ট্রেড ইউনিয়নে নেত্রী কল্পনা আকতারের সংগঠনের মাদার সংগঠন। “RAND এর ইসলাম প্রজেক্টে” এধরণের সংগঠনগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের মত ইসলাম জনগোষ্ঠির দেশে আরব স্প্রিং ধরণের প্রভাব বিস্তারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বাস্তবে আমরা তাই দেখছি।
    বাংলাদেশের মত দেশে শ্রমিকেরা ভাল আছে, তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষিত আছে আর আমেরিকানরা কেবল সুস্থির এদেরকে অস্থির করে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে এমন মানে করাটাও ঠিক হবে না। বলা ভাল যে, বাংলাদেশে ট্রেড ইউনিয়নকে কাজ করতে দেয়া হয় না, শ্রমিকদের সমস্ত অধিকার, স্বাভাবিক প্রতিবাদী তৎপরতা দাবিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে এই পরিস্থিতির সুযোগ আছে বলেই সেটার উপর ভরসা করেই AFL এর মাধ্যমে আমেরিকান পরিকল্পনা তৎপরতা আছে।

    আসলে “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” পরিকল্পনা ও সুপারিশগুলো সাজানো হয়েছে ৬০-৮০ দশকে কোল্ড ওয়ার ডিপ্লোম্যাসির যুগে আমেরিকা-রাশিয়ার লড়াইয়ে রাশিয়া যেমন করে নিজের পররাষ্ট্র নীতি সাজিয়ে ছিল ও আমেরিকার বিরুদ্ধে ও উপর সুবিধা পেত, নিত সেকথা মনে রেখে। তৃতীয় বিশ্বের যে কোন উপনিবেশ বিরোধী স্থানীয় জাতীয় সংগ্রাম আন্দোলন আমেরিকা বিরোধী হয়ে যেত, আর ব্যতিক্রমহীনভাবে তা রাশিয়ামুখী হত। এখনকার RAND গবেষকেরা কেন এমন হত, রাশিয়া কেন সুবিধা নিতে পারত এর মুল্যায়ন করেছেন। বলছেন, আমাদের মত দেশগুলোতে কমিউনিষ্টরা রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ট্রেড ইউনিয়ন ইত্যাদি নানান সংগঠন গড়ত (তুলনা করুন, কচিকাচার আসর থেকে শুরু করে, ছাত্র ইউনিয়ন ও যুব ইউনিয়ন সংগঠন, টিইউসি ট্রেড ইউনিয়ন, উদিচী সাংস্কৃতিক সংগঠন ইত্যাদি) আর একাজে সহায়তা হিসাবে রাশিয়ানরা টাকা দিত। ফলে তৃনমূল থেকে সামাজিক সবজায়গায় আমেরিকা বিরোধী কিন্তু স্থানীয় সংগঠন ভিত্তি হিসাবে কাজ করত। আর এগুলো গড়ে তোলাই রাশিয়ান বিদেশনীতি ছিল। অর্থাৎ আইডিয়া হিসাবে সেকালের রাশিয়ান বিদেশনীতিটাই তারা আদর্শ ধরে অনুসরণ করতে চায়। কিন্তু এবার সেই মডেলের আলোকে আমেরিকানদেরকে টাকা ও সংগঠন দিয়ে মুসলমান প্রধান দেশে আলকায়েদার প্রভাব খর্ব করতে আলকায়েদার বাইরে এক ইসলাম – “মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড়ার কাজে নেমে পড়তে হবে। একালে এই সংগঠন গড়ার কাজটাই “সিভিল সোসাইটি” গড়ার কাজ। আবার তুলনা করে আলকায়েদার দুটো সুবিধার কথা উল্লেখ করে বলছে, ওদের আছে অর্থ আর বিস্তার হয়ে থাকা সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক…(The first is money……..The radicals’ second advantage is organization. Radical groups have developed extensive networks over the years, which are themselves embedded in a dense net of international relationships)। [ফর্মাল রিপোর্টে আলকায়েদা না লিখে এর বদলে তারা radicals লিখে]। আরও বলছে যাদের নিয়ে তারা সম্ভাব্য “মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড়বে এদের নির্বাচনের ব্যাপারে প্রাথমিক ফোকাস হবে,( initially focus on a core group of reliable partners whose ideological orientation is known) নির্ভরযোগ্য পার্টনার যাদের আদর্শগত মনোভাব জানা। আর যাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে এরা হলো, সেকুলার ও লিবারেল মুসলমান একাডেমিক ও বুদ্ধিজীবি, মুসলিম স্কলার, কমিউনিটি এক্টিভিষ্ট নেতা, নারী সংগঠন, মিডিয়ার জার্নালিষ্ট, লেখক। ( Liberal and secular Muslim academics and intellectuals; Young moderate religious scholars; Community activists; Women’s groups engaged in gender equality campaigns; Moderate journalists and writers)। আর মডারেট নেটওয়ার্ক গড়তে আমেরিকান ভুমিকা কি হবে কারা কিভাবে তা গড়বে বলা হচ্ছে, Moderates, however, do not have the resources to create these networks themselves; they may require an external catalyst। অর্থাৎ একদল মডারেট মুসলিমরা এই নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে কিন্তু যেহেতু তাদের রিসোর্স নাই (টাকাপয়সা ও সংগঠন), তাই বাইরের ক্যাটালিষ্ট অনুঘটক বা উস্কানিদাতা হিসাবে আমেরিকানদেরকে লাগবে।

    শেখ ইউসুফ আল-কারযাভী
    আরব স্প্রিং বা “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য তালিকায় মুসলিম একাডেমিক বুদ্ধিজীবি বা স্কলার এর কথা বলা হয়েছে। “মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড়ার কাজে উপযুক্ত লোক হিসাবে যে স্কলারকে পাওয়া গেছে তার নাম শেখ ইউসুফ আল-কারযাভী (Sheikh Yusuf al-Qaradawi)। যার হাত দিয়ে নতুন ধরণের ইসলামী রাজনৈতিক ধারা গড়ে তোলা হবে। এখানে আমি এই ধারাকে কারযাভী (Sheikh Yusuf al-Qaradawi) ইসলাম বলে নামকরণ করব বা চেনাবো।
    এটা কারযাভী কেন হলেন তা আমাদের ব্যাখ্যা পেতে হবে। তাই আগে তাঁর একটু সংক্ষিপ্ত ব্যাকগ্রাউন্ড ও পরিচয় পেতে হবে।

    কারযাভী মুলত একজন মিশরীয় এবং এই সময়ের মুসলিম ব্রাদারহুডের সবচেয়ে প্রভাবশালী তাত্ত্বিক নেতা। জন্ম ১৯২৬ সালে। ছাত্র অবস্থা থেকে তিনি ব্রাদারহুডের সদস্য। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশুনা বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে গ্রাজুয়েট হন। এরপর ১৯৫৮ সালে আরবী ভাষা ও সাহিত্যে ডিপ্লোমা ডিগ্রী নেন। এরপর ১৯৬০ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মীয় মৌল দিক (Usul al-Din)ফ্যাকাল্টি থেকে কোরানিক ষ্টাডি বিষয়ে মাষ্টার ডিগ্রী নেন। এরপর ১৯৬২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে কাতারের Secondary Institute of Religious Studies এর প্রধান করে পাঠানো হয়। কারযাভীর কাতার নিবাস শুরু হয় এখান থেকে। এরপর ১৯৭৩ সালে তিনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে পিএইচডি শেষ করেন, তাঁর বিষয় ছিল Zakah and its effect on solving social problems। এরপর ১৯৭৭ সালে তাঁর হাত দিয়েই কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীয়া ও ইসলামী ষ্টাডিজ ফ্যাকাল্টি খুলা হয়। তিনি এর প্রথম ডিন হন। এরপর ১৯৯০ সাল থেকে তিনি কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে Director of the Seerah and Sunnah Center at Qatar University হয়ে আছেন এখনও পর্যন্ত।

    রাজনৈতিক জীবনে তিনি তিনবার জেল বন্দী থাকেন, ১৯৭০ সালে রাজনৈতিক কারণে তাঁর মিসরীয় নাগরিকত্ত্ব বাতিল করা হয়। সে কারণে এরপর থেকে তাঁর কাতারে বসবাস। মিশরীয় ব্রাদারহুড তাকে দুবার (১৯৭৬ ও ২০০৪ সালে) সংগঠনের প্রধান হয়ে আহবান জানায়। কিন্তু তিনি স্বাধীন একাডেমিক স্কলার জীবন যাপনে স্বস্তি পান বলে তা ফিরিয়ে দেন। তাঁর লেখা রচনা, কখনও ফতোয়া অথবা বক্তৃতা ব্রাদারহুডসহ দুনিয়া জুড়ে ইসলামী রাজনীতিতে বিশাল প্রভাব রাখে। ২০১১ সালে মোবারকের পতনের পর তিনি প্রথম আবার মিশরে বেড়াতে আসেন। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে খুতবা দেন। তাহরীর স্কয়ারে গণ সমাবেশে বক্তৃতা দেন।

    নিজ দেশে থেকে বহিস্কারের পর কাতারই হয়ে উঠে কারযাভীর সেকেন্ড হোম। উলটো করে বলা যায়, কাতারের বাদশা থানি হয়ে উঠেন তাঁর প্রধান পৃষ্টপোষক। আরব স্প্রিং বা “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” নিয়ে আমেরিকান রাজনীতির নতুন পথ শুরুর পর কারযাভী এর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। কেন হলেন? তাঁর চিন্তার সাথে এর মিলের দিকটা কি? এদিক থেকে বললে আরব স্প্রিং এক রাষ্ট্র বদলের কর্মসুচি; রাষ্ট্রের রেডিক্যাল বদল না হলেও এটা আমেরিকার নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র বদল তো বটেই। কারযাভীর রাষ্ট্র-বোধ বিষয়ে জানা যায় তাঁর State-in-Islam বইতে পাওয়া যায়।
    এই বইয়ে কারযাভী নিজের অবস্থানকে বুঝাতে বলছেন, The Moderate Islarnic trend comes in the middle between the deviated secularists and the narrow-minded ones. আর narrow-minded ones বলতে তিনি নাম করেছেন হিজরি অষ্ট শতকের মানে ১৪০০ খ্রী. এর ইমাম ইবনে আল কাইউম ও তার মত অনুসারিদের কথা যারা হিজরি পনেরো শতক অর্থাৎ এখনকার খ্রী. শতক পর্যন্ত অনুসরণ করছেন। বলছেন, Imam Ibn ul-Qayyim spo ke sadly of the narrow -minded j urists of his time (the 8″1 ce ntury AH) ……. Ironically. those narrow-minded jurists still have disciples in our time. who live in the 15th century AH] অর্থাৎ একদিকে তিন এদের সংকীর্ণমনা বলছেন আর বিপরীতে সেকুলারিষ্ট – এর মাঝে তাঁর মডারেট ইসলামী ট্রেন্ড। ফলে তাঁর এই অবস্থান থেকে আরব স্প্রিং বা “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” প্রতি আগ্রহ ও নিজ অবস্থান থেকে সমর্থন বলে বুঝার চেষ্টা করতে পারি।

    কারযাভীর এই অবস্থানের কারণে, আরব স্প্রিংয়ের বাস্তবায়নের মুল কেন্দ্র এখন কাতার। RAND এর RAND Gulf States Policy Institute এখন আমেরিকার পরে নেমে এসেছে কাতারের রাজধানী দোহায়, নাম RAND – Qatar Policy Institute। কিন্তু কাতার কেন কারযাভীকে ঘিরে এই নতুন ইসলামের কেন্দ্র হিসাবে নিজেকে জাহির করা ঠিক মনে করল এর জবাব পাওয়া যাবে এখনকার কাতারি উদীয়মান অর্থনীতি, নতুন বিশাল বিনিয়োগের ভিতরে খুজতে হবে। আমরা আপাতত সেদিকে যাব না। কিন্তু তাতপর্যপুর্ণ মুল ব্যাপার হলো, সৌদি ওহাবি বা সালাফি ইসলামের কেন্দ্রের বাইরে মধ্যপ্রাচ্যে কারযাভী ইসলামের কেন্দ্র হিসাবে কাতারকে আমরা পাচ্ছি। তবে দুই ইসলামি ট্রেন্ডের সম্পর্ক বন্ধুত্ত্বপুর্ণ, যদিও ইদানিং সংঘাত দেখা দিচ্ছে। সার করে বললে, আরব স্প্রিং আমেরিকার নীতি কিন্তু বসবার কুশন দিয়েছে কাতার। আর যেসব দেশে আরব স্প্রিং ঘটছে বা ঘটানো হচ্ছে এর জন্য ফান্ড ও লজিষ্টিক সেন্টার কাতার। আর ওদিকে সৌদি বাদশা ওহাবি বা সালাফি হওয়া সত্ত্বেও গ্লোবাল পাওয়ার এলায়েন্সের কারণে কারযাভী ইসলামকে সমর্থন দিচ্ছে। মনে রাখতে হবে আরব স্প্রিং শুরু থেকেই অর্থাৎ ডিজাইন পরিকল্পনা রচনার সময় থেকেই শিয়া বা ইরান-সিরিয়া বিরোধী। অন্যভাবে বললে আরব স্প্রিং কর্মসুচি চালু করার আগেও আমেরিকান নেতৃত্ত্বে গ্লোবাল পাওয়ার এলায়েন্সের বৈশিষ্ট হলো তা শিয়া বিরোধী, যেটা সৌদি বাদশার বিশেষ আগ্রহের কারণ।

    আরব-ইসরায়েল তৃতীয় যুদ্ধের (১৯৭৩) সংক্ষেপে একটু সালতামামি করব। এই যুদ্ধে পরাজয়ের পর থেকে প্যান আরব জাতীয়তাবাদ শুকিয়ে মরতে থাকে এবং নিজ নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থ মানে নিজ রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদ যেমন, মিশরীয় জাতীয়তাবাদ, সিরীয় জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি মুখ্য বিবেচনার বিষয় হয়ে যায়। কমন প্যালেষ্টাইন স্বার্থকে পিছনে ফেলে আগে নিজের রাষ্ট্রস্বার্থ বাঁচাও, দরকার হলে অন্যকে বিক্রি করার বিনিময়ে; যেমন আমেরিকান মধ্যস্থতায় মিসর-ইসরায়েলের ক্যাম্প ডেভিড প্রতিরক্ষা চুক্তি। এই নতুন ফেনোমেনা দেখা দিতে শুরু করে। আর এর প্রতিক্রিয়ায় নতুন ফেনোমেনা, নতুন ধরণের আন্দোলন – প্যালেষ্টাইনে হামাস আর লেবাননে হিজবুল্লাহ – এদের জন্ম। পলিটিক্যাল ওরিয়েন্টেশন হিসাবে এই দুই আন্দোলন মিসরের ব্রাদারহুডের মত হলেও আবার অর্থ ও লজিষ্টিকের দিক থেকে এরা ইরান-সিরিয়ার উপর নির্ভরশীল ও সম্পর্কিত। আইডোলজির দিক থেকে এটা সম্ভব হয়েছিল কারণ প্রতিষ্ঠাতা বান্নার আমল থেকেই ব্রাদারহুড শিয়া-সুন্নি বলে ভাগের রাজনীতি করেনি। বান্না নিজেও বলতেন, ব্রাদারহুড আন্দোলনের বৈশিষ্ট হলো একদিকে এটা সালাফি অন্যদিকে এটা সুফিজম। পরবর্তিতে কারযাভীর খুতবাগুলোতেও সুফিজমের প্রতি তাঁরও সহানুভুতি দেখতে পাওয়া যায়।

    এই লেখা গত দুসপ্তাহ ধরে লেখার চেষ্টা করছি। ব্যকগ্রাউন্ড ম্যাটেরিয়াল পড়ে ঝালাই করে আপটুডেট হতে সময় নিয়ে ফেলেছি বেশি। ইতোমধ্যে গত রাত্রে মিশরীয় আর্মি সেকুলারদের আপাত সমর্থনে প্রেসিডেন্ট মরসিকে পদচ্যুত করে ক্ষমতা নিয়েছে। ওদিকে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সিরিয়ায় যুদ্ধকে আমেরিকান প্রশাসন সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ করে নেমে পড়ে যুদ্ধকে এক নির্ধারক দিকে নেবার চেষ্টা করছে; লেবাননের হিজবুল্লাহ সরাসরি প্রেসিডেন্ট আসাদ এর পক্ষে যুদ্ধে নামার প্রেক্ষিতে এতে নড়াচাড়া পড়েছে। কারযাভী এই প্রথম প্রকাশ্যে হিজবুল্লাহকে শয়তানের দল বলে ভিডিও বক্তৃতা করেছেন। এখানে দেখুন,
    এসবের প্রেক্ষিতে “আরব স্প্রিং” এখন মারাত্মক ব্যর্থ ও ব্যাকফায়ার শুরুর আলামত বলে মনে করার কারণ আছে। তাই লেখাটা আপাত শেষ করব কেন আরব স্প্রিং ব্যর্থ হবে তার উল্লেখযোগ্য কিছু কারণ আলোচনা করে।

    আরব স্প্রিং কেন ব্যর্থ হবে, এর মৌলিক দুর্বলতাগুলো কি কি
    ১। কথিত স্বৈরাচারঃ মুসলমান প্রধান দেশগুলোতে কথিত “স্বৈরাচারী” শাসক চলতে দেয়ার অর্থ এটা আলকায়েদার ঘাটি হবার জন্য পটেনশিয়াল হবে। কারণ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনগণের ন্যায্য ক্ষোভ বিক্ষোভকে পুজি করে আলকায়েদা নিজের রাজনীতির ন্যায্যতা যোগাড় করে ফেলবে। ফলে স্বৈরাচার রাখার আমেরিকান রাষ্ট্রের জন্য পটেনশিয়াল থ্রেট। তাই এনজিওর মাধ্যমে লিবার্টি, ফ্রিডমের আওয়াজ শিখিয়ে এক পপুলার আপরাইজিং তবে নিয়ন্ত্রিত রেখে স্বৈরাচারকে সরিয়ে দিতে হবে, একটা লিবারেল ইসলামী সরকার কায়েম করতে হবে। আর এর ভিতর দিয়ে আমেরিকার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন মডারেট ইসলামি নেটওয়ার্ক গড়ে নিতে হবে। এটাই আরব স্প্রিং। কিন্তু এই পরিকল্পনা চিন্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো – আর্মি। স্বৈরাচার মানে কী? যদি সুনির্দিষ্টভাবে মিসরের দিকে তাকাই – কাম্প ডেভিড চুক্তির কারণ মিসরের আর্মি মানে হলো, যে অসমাপ্ত আরব-ইস-রায়েল যুদ্ধ এবং ক্রমআগ্রাসী ভূমি লোভী ইসরায়েলি দস্যুতার বিরুদ্ধে আরবদের ক্ষোভ থেকে ইসরায়েলকে প্রতিরক্ষা করবে। আভ্যন্তরীণভাবে দেশে দমন করবে এবং সীমান্ত পার হতে দিবে না। এটাই ঐ চুক্তির শর্ত, এর বিনিময়েই মিসরের সিনাই উপত্যকা ইসরায়েল ছেড়ে যায়। আর এই প্রতিরক্ষার সার্ভিসের খরচ হিসাবে বছর বছর আমেরিকান তিন বিলিয়ন এইড পাবে মিসর। ইসরায়েলও পাবে ১০ বিলিয়ন করে। আমেরিকার দিক থেকে এটাই মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও তেলের দামের উপর কর্তৃত্ত্ব রাখার কাফফারা। অন্য ভাষায় আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য নীতি, ১৯৭৯ সালের চুক্তি এই বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই হয়েছিল। এখন মিসরীয় আর্মিকে যে মহান দায়িত্ত্ব দেয়া হলো এটা স্রেফ আর্মি প্রতিষ্ঠানের ভিতরে সীমাবদ্ধের বিষয় নয়। বরং এটা হলো সামগ্রিকভাবে মিসরীয় রাষ্ট্রকে সাজিয়ে নেয়া, ইসরায়েলকে প্রতিরক্ষা দেয়ার মত যোগ্য দুর্দমনীয় মিলিটারী রাষ্ট্র করে গড়ে তোলা। আভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারলে ইসরায়েলের পক্ষে ভাড়া খাটা অসম্ভব। গত ৩২ বছর ধরে এরই প্রতিকী দিক হলো, আর্মি চীফ (একা ব্যক্তি না, এক কমান্ড কাউন্সিলের প্রধান তিনি) সবসময় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হয়েছেন। আবার বাহিনীর সবাইকে খুশি রাখতে হবে। ফলে আর্মি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স যার প্রধান আবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। আলাদা আয়ের ব্যবস্থা। আমেরিকাতেও বাহিনী পোষার খরচ কমাতে বাহিনীর যুদ্ধ বিমান বা অস্ত্র, কমিউনিকেশন ইত্যাদির টেকনোলজি কমার্সিয়াল কোম্পানীকে ভাড়া দেয়া থাকে। এটা তা নয়। এটা হলো, ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স এর আয় আর্মি প্রতিষ্ঠান চালাবার ইকুইপমেন্ট কেনার কাজে নয়, বরং বাহিনীর সদস্যদের জন্য বাড়তি নগদ আয় হিসাবে সরবরাহ বিতরণ করা হয়।
    বলেছিলাম আরব স্প্রিং পরিকল্পনা চিন্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো – আর্মি। মানে নতুন আরব স্প্রিং ঘটবার পরের পরিস্থিতিতে আর্মির ভুমিকা তো বদলাতে হবে। কিনতি বদলে গিয়ে কি হবে সেটা সাধারণভাবে সব মুসলমান প্রধান দেশের বেলায় এক বিরাট প্রশ্ন। আর বিশেষ করে মিসরের বেলায় যেখানে আর্মি মানে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সার্ভিস দেয়া সেখানে আর্মির ভুমিকা বদল মানে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা এক্ষেত্রে কে দিবে? সে এক ট্রিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। “RAND ইসলাম প্রজেক্টে” এক্ষেত্রে নিরুত্তর।
    আরব স্প্রিং এ লিবার্টি, ফ্রিডমের আওয়াজ তুলে পপুলার আপরাইজিংকে নিয়ন্ত্রিত রেখে স্বৈরাচার হঠানোর নাটক করা কাগুজে পরিকল্পনায় যত সহজ মনে হোক বাস্তবে তা ভীষণ রিস্কি। কোন গ্যারান্টি নাই যে তা আমেরিকার হাতে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। হাতছুট ঘটনা হিসাবে আলকায়েদা ধরণের রেডিক্যাল নয়, অন্য অর্থে এটা সাম্রাজ্যবাদ বা পশ্চিম স্বার্থ বিরোধী রেডিক্যাল দিকে দৌড়াবে না কোন নিশ্চয়তা নাই। সেই অযাচিত পরিস্থিতি সামলানোর জন্য আমেরিকার জন্য শেষ ভরসা হবে আর্মি প্রতিষ্ঠান। একথাগুলো “RAND ইসলাম প্রজেক্টে” লেখা নাই। কিন্তু এটা অনুমান করা কঠিন কিছু নয়। এজন্যই আর্মি প্রতিষ্ঠান শব্দটা স্পর্শ করে কোন বাক্য নাই এই দলিলে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট মিসরীয় পরিস্থিতিতে আর্মি (SCAF) এক নির্ধারক প্রসঙ্গ। এটা আরব স্প্রিং এর দলিলে উহ্য করে রাখা হয়েছে বলেই মিসরে আরব স্প্রিং অকেজো ও ব্যর্থ হবেই, হচ্ছে। এজন্য আর্মি কখনই সুপ্রীম জুডিশয়াল কাউন্সিল, সুপ্রীম নির্বাচন কাউন্সিল, সুপ্রীম কাউন্সিল অব আর্মড ফোর্স ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান যেগুলো ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির ছানাপোনা – এগুলো কখনই ভাঙ্গতে দেয়নি। ফলে গত দুবছর ধরে বারবার এই প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করে আগের রাষ্ট্র নিজেকে পুনর্গঠিত করে নিতে পারছে। মিসরীয় আর্মির দিক থেকে আরব স্প্রিং এর প্রতি সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, প্রজেক্টের দলিলে আর্মির ভুমিকা কি হবে তা লেখা নাই, ভাবাই হয়নি। এজন্যই সে ৪২ দেশি, আমেরিকান এনজিও কর্মিকে আরব স্প্রিং করার দায়ে ৫ বছরের সাজা ও জরিমানা শুনিয়ে দিয়েছে। মোবারক, আগের আর্মি চীফ তানতাওই পদত্যাগ করেছেন, ইন্টিলিজেন্স চীফ আর্মি জেনারেল মারা গেছেন যাকে মোবারক উত্তর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিল – সবাই চলে গেছেন কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও অটুট ও শক্তিশালী আছে। একটা সাবধানতার কথা বলব। উপরের কথাগুলো যেন আমাদের দেশের সস্তা সামরিক শাসন-বেসামরিক শাসনের কুতর্কের মত ভেবে বুঝবার চেষ্টা না করি। পিছনে আমেরিকান পরিকল্পনা না থাকলে, কোন জেনারেলের ব্যক্তিগত খায়েসে ক্ষমতা দখল ঘটায় না।

    ২। মুল বিরোধ সেকুলারিষ্ট বনাম ইসলামিষ্টঃ
    “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” দলিলে সম্ভাব্য যাদের নিয়ে আরব স্প্রিং বা নতুন রাষ্ট্রের আকার দেবার কথা বলা হয়েছে তার মুল দুই এলিমেন্ট সেকুলারিষ্ট এবং ইসলামিষ্ট। আবার ইসলামিষ্টদের প্রতি আগ্রহটা বেশি। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে এই দুই আদর্শের ঐক্য হবে বা এক পাত্রে দুটোকে ধারণ করা যাবে? এই বিষয়ে RAND প্রজেক্টের গবেষণা দলিল নিরুত্তর। বরং ওখানে সেকুলারিষ্ট এবং ইসলামিষ্ট উভয়কেই ধারনা দেয়া হয়েছে তারা “গণ আন্দোলনের ভিতর দিয়ে স্বৈরাচার উৎখাত করতে হবে। কিন্তু স্বৈরাচার উৎখাত এর মানে কি? উৎখাতের পরেই বা কি হবে? একটা লিবারেল রাষ্ট্র? তাহলেও তো আসলে তা একটা নতুন রাষ্ট্র। অর্থাৎ রাষ্ট্রগঠন, রাষ্ট্র কনষ্টিটিউট করা মামলা। যাতে একমাত্র একটা নতুন কনষ্টিটিউশনেই এর পরিণতি টানা যায়। এই প্রসঙ্গে সেকুলারিষ্টরা বিহবল। কোন চিন্তাগত প্রস্তুতি তাদের নাই। ফলে রাষ্ট্রগঠনের কাজটা আড়ালে ফেলে ইসলামিষ্টদের সাথে তাদের আদর্শগত দ্বন্দ্বের বাইরে কোন কিছুই তাদের মাথায় আসে না। একমাত্র সমাধান দেখে ইসলামিষ্টদের সেকুলার হয়ে যাওয়া। অথচ এর বাইরে রাষ্ট্রগঠনের কাজে এমন কি তার কাছে আছে যা সে ইসলামিষ্টদেরকে অফার করতে পারে যাতে আদর্শগত বিরোধ বা শ্রেণী বিরোধ থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রগঠনে কোন মৌলিক সুত্রে তারা ঐক্যমত তৈরি করতে পারে – এটা তার জানা নাই। বিপরীতে ইসলামিষ্টরা, এদের একালের রাষ্ট্র সম্পর্কে এমপেরিক্যাল তথ্য সংগ্রহও নাই। যেমন, কারযাভী তাঁর “ষ্ট্রেট ইন ইসলাম” (State in Islam) বইতে (১৯৯৭) এক নিঃশ্বাসে তিনি নবীর আমলেও সেটাকে রাষ্ট্র বলছে, চার খলিফা আমলকেও, অটোম্যান সুলতানের আমলকেও। ফলে রাষ্ট্র বলতে আসলে তিনি ঠিক বুঝাচ্ছেন তা বুঝা মুশকিল। আবার সাধারণভাবে বললে, “ইসলামে রাষ্ট্র” নিয়ে তাঁর ধারণা বয়ান করতে গিয়ে একটা চেষ্টা দেখা যায় তিনি অবলীলায় মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণায় বিশেষ বিশেষ শব্দ ব্যবহার করছেন। যেমন, রাইট বা অধিকার, তিনি প্রায়ই ব্যবহার করছেন। রাইট বা অধিকার তো ইসলামের ধারণা নয়। আর রিপাবলিক রাষ্ট্রের ‘অধিকার’ ধারণা তো ইউরোপের সবকালের একই ধারণাও নয়। এছাড়া পশ্চিমে ব্যক্তি ও নাগরিক বলে ধারণাটার পিছনে একটা আগাম অনুমান আছে; যার উপর দাঁড়িয়ে আছে অধিকার ধারণা। ইসলাম কিভাবে ব্যক্তি ও নাগরিক ধারণাকে গ্রহণ করে, আদৌ গ্রহণ করে কি না, না করলে ইসলামে যে রাষ্ট্র তিনি দেখছেন সব জায়গায় কালোর্ধ হিসাবে সেখানে ধারণাগুলো কি ছিল এর একটা হিস্টোরিক্যাল অনুসন্ধান তো নিতেই হবে আগে। ফলে জবরদস্তি মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণাগুলোকে ইন্টারচেঞ্জিংলি ব্যবহারের একটা ঝোক তার মধ্যে দেখা যায়। এতে তিনি কি বুঝছেন, কি বুঝাচ্ছেন এর হদিস এক অসম্ভব কাজ। যেমন, শাসককে মেনে চলার (obey) প্রশ্ন তিনি তুলেছেন। বলছেন,
    To obey the rulers stipulated that they are from among themselves. Allah put this obedience after obedience to Him and the Messenger (peace be upon him) and it ordained that in time of dispute the whole matter must be brought before Him and His Messenger, (i.e. the Glorious Quran and the Sunnah). This is based on the assumption that Muslims have a state that dominates and a ruler that is to be obeyed. Otherwise all this would be in vain.

    কিন্তু রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণায়, শাসক সরকারের সাথে নাগরিকের সম্পর্কটা অন্তত obey করার না। আর এই সম্পর্ক কারযাভীর বর্ণনা তালাল আসাদের থেকে অনেক পিছনের। তালাল আসাদ এব্যাপারে obey ধারণার ভিতরে যান নি। তাছাড়া সম্পর্কটা রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের – এটা ঠিক পারশনিফায়েড শাসক ব্যক্তির সাথে নাগরিকের একেবারেই নয়। এছাড়া নাগরিক নিজে মুল ক্ষমতার উৎস। এটা তিনি কনষ্টিটিউশনে বলে রাখা নির্দিষ্ট বিষয়ে শর্ত সাপেক্ষে রাষ্ট্রকে সেই ক্ষমতা আমানত হিসাবে দেন।
    এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রগঠন কনষ্টিটিউট ধারণায় (সে অনেক দুরের ব্যাপার যদিও) সেকুলারিষ্টের সাথে তিনি কি করে একসাথে রাষ্ট্র গড়বেন। সার কথায় সেকুলারিষ্ট ও ইসলামিষ্ট উভয়েই আসলে ওবামার আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি -মার্কিন পরাষ্ট্র নীতির এই অন্তর্গত ষ্ট্রটেজিক তাগিদের দিক থেকে আরব স্প্রিংকে বুঝবার চেষ্টা করেন নি। ফলে উভয়েই প্রতারিত।

    ৩। আরব স্প্রিং এর প্রথম সাফল্যের জমানায় ২০১১ সাল বছর জুড়ে আমেরিকান প্রশাসন আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল। তিউনিশিয়া, মিসর, ইয়েমেন, জর্দান, আলজেরিয়ার ঘটনায় সব দেশেই স্ব স্ব দেশের ব্রাদারহুডকে নিরুপদ্রব সঙ্গী হিসাবে তারা পেয়েছিল। পরিস্থিতি আমেরিকান হিসাব মত নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা পাওয়া গিয়েছিল। এতে আরও উতসাহিত হয়ে এবার আর মাস-মুভমেন্ট বা গণ আন্দোলনের তরিকা না। তা ছেড়ে লিবিয়ায় আরব স্প্রিং আন্দোলন সশস্ত্র দিকে নিতেও আমেরিকানদের বুক কাঁপেনি। রাশিয়া চীন নিজের ভাগের কথা বুঝে উঠার আগেই জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল থেকে লিবিয়ার আকাশে নো ফ্লাই জোন আরোপের সম্মতি পাশ করে আনা হয়েছিল। একই বা আরও প্রবল উতসাহে সিরিয়াতে আরব স্প্রিংকে আর লোক দেখানে গণ আন্দোলন না, দ্রুত একেবারে আন্দোলন সশস্ত্র দিকে নিতেও তাদের মধ্যে কোন দ্বিধা কাজ করতে দেখিনি।

    আরব স্প্রিং আলকায়েদা বিরোধী আলাদা ইসলামী রাজনৈতিক ধারা জন্ম দেবার আমেরিকান প্রচেষ্টা হলেও এর প্রতি আলকায়েদা প্রতিক্রিয়া কি ছিল তা হয়ত আমরা অনেকেই খেয়াল করিনি। এপর্যন্ত আলকায়েদা কখনই আরব স্প্রিংয়ের বিরোধাতা করে বিবৃতি দিয়েছে নজরে আসেনি। বরং মোবারকের পতনের পর আলকায়েদা একে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু দুবছর ধরে সিরিয়ান যুদ্ধ চলার পর এখন পরিস্থিতি কি? আমেরিকান সিনেট কমিটি সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ করে সিরিয়ার মাঠে নামার সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেবার পরও এক মাস সেটা স্থগিত করে রেখেছিল। গত এক বছর ধরে আমেরিকান ইন্টিলেজিন্স সাবধান করে আসছে সিরিয়ার সশস্ত্রতা আলকায়েদার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আলকায়েদা সমর্থিত স্থানীয় Al-Nusra Front এখন সবার ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে। ওদিকে লিবিয়ার বেলায় মিডিয়া রিপোর্টে মনে করা হয়েছিল সশস্ত্র আরব স্প্রিং এর পরও লিবিয়া বুঝি আমেরিকান নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু বেনাগাজিতে আমেরিকান এমবাসেডরসহ সাতজন ষ্টাফ খুন হয়েছেন। রাজধানী ত্রিপোলীর বাইরে সশস্ত্রগ্রুপগুলো কেউ অস্ত্র ফেরত দেয়নি বরং তথাকথিত কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনী এমন এক একটা বাহিনীকে অটুট রেখে স্বীকৃতি দিয়ে বাহিনীগুলোর স্বাধীন কাম কাজ স্বীকার করে নিয়েছে। আর সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো, লিবিয়ার ডামাডোলে সেখান থেকে ভারী অস্ত্রসহ আলকায়েদা নিয়ন্ত্রিত এক আফ্রিকান গ্রুপ মালিতে জড়ো হয়েছে। মালি দেশকে ভাগ করে ফেলেছে, যেটা পরবর্তিতে ফরাসী আর্মি পাঠিয়ে আফগানিস্তানের মত আফ্রিকার এক নতুন ফ্রন্ট খুলতে হয়েছে। এসব ফেনোমেনার সার লক্ষণ হলো, জোশের ঠেলায় যেখানে যেখানে আরব স্প্রিংকে সশস্ত্র করা হয়েছিল সেখানেই তা ক্রমশ আলকায়েদার নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। শেষ হাসি তারাই হাসছে, লাভের গুড় তাদের পকেটে। “RAND ইসলাম প্রজেক্টে” দলিলে কোথাও আরব স্প্রিংকে সশস্ত্র করার পরিকল্পনা এমনকি ইঙ্গিত নাই। ফলে লিবিয়ার ক্ষেত্রে এমপায়ারের চকচকে লোলুপ দৃষ্টি ছাপিয়ে উঠেছিল সেটাই পরিস্থিতিকে সশস্ত্রতার দিকে সহজেই টেনে নিয়ে গেছিল বলা যায়। আর সিরিয়ান পরিস্থিতি এখন যা তাতে আমেরিকান অবস্থান এখন যেদিকেই যাক না কেন ঐ পুরা জোন আলকায়েদার দখলে চলে যাচ্ছে। তাহলে যে উদ্দেশ্যে কারযাভী ইসলামকে সঙ্গি করে নেয়া হয়েছিল যে একটা – নন-রেডিক্যাল ইসলাম, কারযাভী ইসলাম সেভাবে হাজির হতে পুরাপুরি ব্যর্থ। শুধু তাই নয়, আরব স্প্রিংকে শিয়া বিরোধী হিসাবে হাজির করার যে সুপ্ত অভিমুখগুলো ছিল সেগুলো প্রকাশ হয়ে এখন খোদ কারযাভিকেই শিয়া বিরোধী বয়ান দিতে হচ্ছে। হিজবুল্লাহ (আল্লাহ দল) কে শয়তানের দল বলে বয়ান দিতে হচ্ছে। হামাসের সাথে হিজবুল্লাহর বিরোধ সংঘাত প্রকাশ্য হতে শুরু করেছে। কাতারি বাদশা প্যালেষ্টাইনে গিয়ে হামাসকে বলেছেন সিরিয়া –ইরানের উপর নির্ভরশীলতা ত্যাগ করতে। এখন থেকে অর্থ সরবরাহ তিনিই করবেন। কিন্তু অস্ত্র দিবে কে? তাদের প্রতিরোধ যুদ্ধ কি বন্ধ হয়ে যাবে? সিরিয়ায় আসাদকে সরানোর ঘটনার শুরু থেকেই তো কারযাভীর এটা বুঝার কথা যে সিরিয়ায় “সশস্ত্র আরব স্প্রিং” জয়লাভ করলে তাতে হামাস ও হিজবুল্লাহ আন্দোলন বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
    [অসমাপ্ত]
    এখানে অনেক ধারণা স্পর্শ করেছি, তুলে এনেছি, সময়াভাবে বিস্তার করতে পারিনি। আগামিতে সেগুলো করার ইচ্ছা রাখি। ফলে আপাতত একটা প্রাথমিক রচনা হিসাবে এটাকে পাঠ করার আবেদন রাখছি।