Tag: Josep Borrell

  • আফগানিস্তান সবাইকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে

    আফগানিস্তান সবাইকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে

    গৌতম দাস

    ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

    The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.” –Josep Borrell, ইইউর ফরেন পলিসি চিফ, the European Union’s top diplomat;

     

    গত ৩১ আগষ্টের দুদিন আগেই শেষ পর্যন্ত আমেরিকা আফগানিস্তান ছেড়ে গুটিয়ে চলেই গেল; আর তা পক্ষ-বিপক্ষের সবাইকে অবাক করে। বিশেষ করে পক্ষের লোকেরা নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, আমেরিকারও দিন শেষ হয় তাহলে! এবার এতে সবাই বুঝে গিয়েছিল এটা শুধু আফগানিস্তান ছেড়ে আমেরিকার গুটিয়ে চলে যাওয়া বা পালিয়ে যাওয়া নয়। এটা শুরু। এটা শুধু আমেরিকার আগফানিস্তান ছেড়ে যাওয়া নয়, এটা গত কমপক্ষে ৫০০ বছরে ধরে অন্যের দেশে গিয়ে সে দেশ দখল, লুটপাট, ক্ষমতার রুস্তমি দেখানো আর সভ্যতা শেখানোর যে ভণ্ডামি চলেছিল, এখন থেকে এই পুরো প্রক্রিয়াটারই গোটানো, বন্ধ বা সমাপ্তির ইঙ্গিত করছে এটা। আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের দিন শেষ – মানে পশ্চিমের নেতৃত্বের দিনও শেষ! এটাই হল সেই অবিশ্বাসের ঘটনা যা এখানে বাস্তবায়িত হয়ে গেছে!

    “রাষ্ট্র আর রাজনীতি” সাধারণত আমার লেখার মূল প্রসঙ্গ হয়ে থাকে। তবে রাষ্ট্র আর রাজনীতির দেশীয় দিকের চেয়ে বৈদেশিক বা গ্লোবাল দিকটা এ লেখায় অনেকসময় ভারী থাকে বলে অনেকে আমাকে আন্তর্জাতিক ইস্যুর লেখক বলে মনে করে; যদিও আমার লেখার মূল প্রসঙ্গ রাষ্ট্র আর রাজনীতিই।

    গত ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরাশক্তির প্রভাব’ নিয়ে একটা সিরিজ লিখেছিলাম। ফলে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন আমি আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে লিখছি। আসলে তখন থেকেই মূলত যে কথা বলতে চেষ্টা করেছি তা হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দুনিয়ায় প্রথম একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম তৈরি হতে সুযোগ পেয়েছিল, আমেরিকা যার প্রথম নেতা। যদিও এই সিস্টেমে কে নেতৃত্ব দেবে তা নির্ভর করে অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্নে সেসময়ের যে দেশ শীর্ষে থাকে তার ওপর। আবার যতই এই শীর্ষ অবস্থান ঢলে পড়ার দিকে যেতে থাকবে ততই তার নেতাগিরির দিনও শেষ হবে। আবার ওই ঢলে পড়া শীর্ষ অবস্থান বিপরীতে ক্রমেই অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে, যার দখলে যাবে, সেই-ই নতুন গ্লোবাল নেতার আসন নেবে। তবে সাবধান, অর্থনৈতিক সক্ষমতার বৃদ্ধির ব্যাপারটা সামরিক ক্ষমতার বলে অর্জনের বিষয়ই নয়। আমার লেখার প্রসঙ্গ ঠিক এই গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলও নয়। বরং জানা যে, এই পালাবদলের কালে তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী কী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে অথবা নতুন কী কী ফ্যাক্টরের আবির্ভাব হয়ে থাকবে, এসব।

    ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে এ কথাগুলোই আমি বলে আসছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, মানুষের পুরনো চিন্তার ফ্রেম তাকে আমার কথাগুলো বুঝতে বাধা দিয়ে গেছে। বিশেষত যেমন এক প্রধান বাধা হল কমিউনিস্ট চিন্তার ফ্রেমে ফেলে আমার কথা বুঝতে চাওয়া। দুই. যারা আবার নিজেদের কমিউনিস্ট ফ্রেমের বাইরের চিন্তার লোক মনে করেন তারাও আমার কথা মানতে চাননি। কারণ আমি বারবার দেখিয়েছি, এখনকার পালাবদলে আমেরিকার অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর ওদিকে তাদের আমেরিকা-প্রীতি বা শক্ত আস্থা ততই দুর্বল হলেও তারা আমার কথা অস্বীকার করে থেকেছে। যদিও সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হয়েছে এক প্রপাগান্ডা যে, আমি ‘চীনের পক্ষের লোক’; অতএব এ কারণে নাকি আমি আমেরিকাবিরোধী। আমি যতই বলি, আমি অবজেকটিভ দর্শক-পূর্বাভাসদাতা মাত্র। তারা মানেনি। বিশেষ করে ভারতের প্রপাগান্ডা যে, আমারটা নাকি চীনা ভাষ্য।

    অথচ একমাত্র আমিই গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম তৈরি হওয়ার ইতিহাসটা প্রসঙ্গ করে সবার সামনে এনেছি। এভাবে গ্লোবাল নেতৃত্ব ব্যবস্থা, আবার এই নেতৃত্বের পালাবদলের প্রসঙ্গটাও এনেছি। ইতিহাসে এ ঘটনাটা প্রথমে ঘটেছে আমেরিকার নেতৃত্বেই। ফলে অকৃপণভাবে বাস্তবের সেই আমেরিকান গৌরবের কথাই আমাকে সতভাবে তুলে ধরতে হয়েছে। বাংলাদেশে আমার চেয়ে বেশি সেই ইতিহাসের আমেরিকান গৌরবের কথা আর কেউ তুলে আনেনি, তাদের এটা অজানা থাকার কারণে। কলোনিয়াল কারণে আমরা ইউরোপিয়ান-ব্রিটিশ ইতিহাস পড়ে ও ফলো করে অভ্যস্ত, আমাদের একাডেমিগুলোতে পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসুচিও তাতেই ভারাক্রান্ত। যেমন অনেক কমিউনিস্টকে দেখেছি, যারা এখনও মনে করেন গ্লোবাল নেতা বা  এক নম্বর পরাশক্তি হল নাকি ব্রিটিশ রাষ্ট্র, আমেরিকা নয়।

    যাই হোক, আমার দিক থেকে সেটা ছিল গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেমটা (ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতাসহ) তৈরির পেছনে আমেরিকান অবদানটাকে তুলে এনে ওর জন্ম ইতিহাসের দিকটা দেখানো। কিন্তু সেটা আমেরিকান-প্রীতি দেখানো জন্য অবশ্যই নয়। ইতিহাসের ফ্যাক্টস বলার জন্য বলতেই হয়েছিল। আবার উল্টো দিকে পালাবদলে চীনের নেতা হওয়ার ক্ষেত্রে তার যোগ্যতা-সহ বড় অযোগ্যতাগুলো কী – এর তালিকা আমিই সবার আগে ও বিস্তারে লিখেছি। কারণ মূল বিষয়টা আমেরিকা বা চীন এর কোনটাই একেবারেই না। ব্যাপারটা হল – আমাদের সময়কালকে আমরা ঠিকভাবে বুঝতে ও ব্যাখ্যা করতে পারছি কি না! এটাই মূল বিষয়। কিন্তু সেসব প্রসঙ্গ এখানে আবার কথা তুলেছি কেন?

    ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস এর সাক্ষাৎকারঃ
    বাইডেনের আমেরিকার আফগানিস্তান ছেড়ে পালানো দেখে বর্তমান ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস [Ben Wallace ]  দ্বিতীয় বিশযুদ্ধের পরে এই প্রথম  সবদায় আমেরিকা ঘাড়ে ফেলে হাত ধুয়ে ফেলেছেন।  অথচ ওয়ার অন টেররের শয়তানির প্রথম যুগে, প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে এক নিশ্বাসে যার নাম উচ্চারণ হত তিনি হলেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার! মিঃ ওয়ালেস কী এখন এই মিথ্যাবাদী [সাদ্দামের ইরাকের কাছে weapon of mass destruction (WMD) আছে এই মিথ্যা কথা ] প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ার এর দায় নিতে চাচ্ছেন না।  ঐ  সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী ওয়ালেস  বলেছেন, তিনি “আমেরিকাকে আর কোনো পরাশক্তি মনে করেন না” [It is certainly not a global force, it’s just a big power,]। কেন? আসলে সাক্ষাৎকারটা নিয়েছিল ব্রিটিশ ‘স্পেকটেটর’ নামে ম্যাগাজিন। সেটি নিয়ে লন্ডন ‘গার্ডিয়ান’ পরে এক রিপোর্ট করেছে। মূল সাক্ষাৎকারে ব্রিটিশ মন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘গ্লোবাল রঙ্গমঞ্চে আফগানিস্তান থেকে প্রস্থানটা ব্রিটিশ শক্তিরও সীমাবদ্ধতা প্রদর্শন করে কি”? [whether the exit from Afghanistan demonstrated the limits of British power on the world stage] মন্ত্রী এই জিজ্ঞাসার জবাবে প্রথমে স্বীকার করে নেন যে, ‘ব্রিটেন স্পষ্টতই একটি পরাশক্তি নয়”। এরপর তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে মনোযোগ দিয়ে চেপে ধরেন। ওয়ালেস বলেন, ‘যে দেশ বা শক্তি যেকোনো একটা কিছু করব বলার পরে আর সেটি করবেই বলে আঁকড়ে থাকার মুরোদ রাখে না সে আসলে পরাশক্তিই নয়।’
    কিন্তু এত কঠিন করে আমেরিকাকে নিচু দেখানো কথা মন্ত্রী বললেন কেন?

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) মাঝামাঝি ১৯৪২ সাল থেকে ওই যুদ্ধসহ গ্লোবাল নেতৃত্বই আমেরিকার হাতে চলে গিয়েছিল। আমেরিকা-পরাশক্তি হওয়ার দিকে যাত্রা তখন থেকে। অর্থাৎ ১৯৪২ সালের আগের টানা ৩০০ বছর সারা দুনিয়া ছিল ইউরোপের কলোনি; ইউরোপের পাঁচ রাষ্ট্রের অধীনে কলোনি দখলে চলে যাওয়া দেশ। আর এই পাঁচের মধ্যে ব্রিটিশ-ফরাসি ছিল সেরা – যে দুয়ের মধ্যে আবার ব্রিটিশরা সবার সেরা। আর বিশ্বযুদ্ধ শেষে সারা ইউরোপকে স্বেচ্ছায় কলোনি শাসন ত্যাগ করতে হয়েছিল। কারণ আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

    তবু বিশ্বযুদ্ধের পরে পরাশক্তি  আমেরিকার আড়ালে থেকে তারই ছোট পার্টনার হিসেবে অন্তত ব্রিটিশ-ফরাসি ভাব ধরে চলেছে। কিংবা ন্যাটো-জোটের সদস্য হিসেবে থাকার কারণে তারাও পরাশক্তি ভান করার সুযোগ পেয়ে এসেছে। করে গেছে। অথচ এসব কমন বাহিনী (যেমন- ন্যাটো) অথবা জার্মানি, জাপানে বা দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যারাক গড়ে সেখানে আমেরিকান সেনাবাহিনী পেলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেই ১৯৪৫ সাল থেকে এসবের খরচের বেশির ভাগ এখনো একা আমেরিকা বহন করে আসছে। খুব সম্ভবত আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের পরে এখন আমেরিকা এসব খরচ বইতে অপারগতা দেখাবে, ফলে ইউরোপের যে ক্ষমতার জৌলুস সেসব কিছুতে এখন টান পড়বে।

    ইইউর ফরেন পলিসি চিফঃ
    তাই ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফরেন পলিসি ও নিরাপত্তা পলিসি ইস্যুতে প্রধান প্রতিনিধি জোসেপ বোরেলের [Josep Borrell] মন্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলছেন, বাইডেনের দুর্বল পরিকল্পনায় আফগানিস্তান ত্যাগ করার পর সারা মহাদেশজুড়ে এ নিয়ে সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। ‘এটা পশ্চিমা দুনিয়ার জন্য বিরাট পরাজয় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে সবকিছু ওলটপালট করে খেলা বদলে দেয়ার মতো এক ঘটনা। “ইইউ’র এখন ‘আপন স্বার্থ বুঝে নিতে সক্ষম হতে নিজেই এগিয়ে আসা ও সক্ষম হওয়া উচিত, বিশেষত যখন আমেরিকা আর সংশ্লিষ্ট থাকতেই চাচ্ছে না” [The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.]”।

    But after Biden’s ill-planned exit from Afghanistan, criticism exploded across the continent. “It’s a failure of the Western world and it’s a game-changer for international relations,” said Josep Borrell, the European Union’s top diplomat. “The EU must be able to intervene to protect our interests when the Americans don’t want to be involved.”

    আর ওদিকে বাইডেন সম্ভবত ভাবছেন, ‘গত ৭৫ বছর ধরে তোমরা কেউ খরচের দেও নাই। কাজেই যেখানে আমেরিকার একার পক্ষেই আর খরচ বইবার ক্ষমতা নেই সেখানে তোমাদের সাথে কথা বলে আমার কী লাভ?’
    কথাগুলো সত্য বটে! কিন্তু ট্রাম্প যখন আগে একইভাবে ও ভঙ্গিতে ইইউ এবং ন্যাটো পর্যায়ে কথা বলেছিলেন; আর ট্রাম্পের আমল থেকেই ইতালি-জার্মানি ও পরে ফরাসিদের উদ্যোগে সারা ইইউ-ই চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে ফেলেছিল। আর তাতে ইইউ-চীনের কম্প্রিহেনসিভ ইনভেস্টমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট [EU – China Comprehensive Agreement on Investment (CAI)] স্বাক্ষর শেষ হয়ে গিয়েছিল। অথচ বাইডেন শপথ নেয়ার পরই ইইউ’র সাথে ট্রাম্প সম্পর্ক খারাপ করে ফেলেছেন – একথা বলে অভিযোগ তুলে এরপর দাবি করেছিলেন, তিনি ২০০১ সালের আগের আমেরিকা-ইইউ পারস্পরিক সম্পর্কের সবকিছুই তিনি আবার গড়বেন – এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কেন? আর ইইউ এই প্রতিশ্রুতিতে এতই আস্থা-বিশ্বাস রেখেছিল যে, চীনের সাথে তাবত চুক্তি ও কথাবার্তা সবকিছু [(CAI) চুক্তিসহ] সেই মুহুর্ত থেকে স্থগিত রাখা হয়েছিল ; তারা এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল চীনকে! এখন সেসবের তাহলে কী হবে?

    অর্থাৎ বুঝাই যাচ্ছে, ইইউ-আমেরিকা  সম্পর্কের পারস্পরিক আস্থা কত নিচে নেমে গেছে। আসলে মূল ঘটনা হল  – বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন একাই। ব্রিটেন বা ন্যাটোকেও সাথে নেননি, একবার জিজ্ঞাসাও করে নাই। কেবল প্রত্যাহারের শেষদিন, ৩১ আগস্টের কদিন আগে জি-৭ পর্যায়ে একটা নামকাওয়াস্তে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছিল। যেখানে ইউরোপের কোন সদস্যের কারো কোনো অনুরোধ-পরামর্শ বাইডেন একেবারেই আমল করেননি।

    এক কথায় বললে, কার্যত দু’দিন আগেই আমেরিকা সব ব্যাগ গুছিয়ে চলে যাওয়ার পর সারা পশ্চিমা দুনিয়ায় প্রচণ্ড হতাশা আর ক্ষোভ নেমে আসে এবং সর্বগ্রাসী এক ‘লস্ট’ [LOST] মানে সব হারানো অনুভব তাদের সবাইকে একেবারে ‘খেয়ে ফেলেছিল’। ফলে এসব চরম হতাশামূলক বক্তব্য-মন্তব্য সেসবেরই বহিঃপ্রকাশ। এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস কত চেষ্টা করেছিলেন,এসময়ে তার সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম সফরকে বিরাট হাইলাইট করবেন। কিন্তু আফগানিস্তানের পরাজয়সম প্রত্যাহার সব কিছুকেই ছাপিয়ে গিয়েছিল, আর তাতে গ্লোবাল মিডিয়া থেকেই এই সফর আউট হয়ে গেছে। গ্লোবালি বাহাদুরি করে বেড়ানো আমেরিকা এমন হতাশায় হারিয়ে যেতে পারে এটা এর আগে কেউ কল্পনাও করেনি।

    সবার নিচে খারাপ অবস্থায় ইন্ডিয়াঃ
    “অবশেষে সব দোলাচল, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও দোটানার অবসান। ঢাকঢাক গুড়গুড়ের ঘোমটা সরিয়ে গত মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় ভারতীয় দূতাবাসে তালেবানের মুখোমুখি হলেন রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তাল এবং ভারতের ‘উইশ লিস্ট’ বা ইচ্ছা তালিকা তিনি পেশ করলেন। গোপনীয়তার ঘেরাটোপ সরিয়ে নয়াদিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে তা প্রচারও করল। সন্ত্রাস বন্ধে সন্ত্রাসীদের সাথে সরাসরি দর-কষাকষির এক নতুন অধ্যায়ও শুরু হলো। ‘আগামী দিনে এই গতিপথের চরিত্র কী হবে, এখনই অনুমান করা কঠিন”।

    উপরের প্যারাটা – না এটা কোন অ-ভারতীয়ের লেখা নয়। বরং, বাংলাদেশী প্রথম আলো পত্রিকায় দিল্লির প্রতিনিধি সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় এর পাঠানো রিপোর্ট এটা। যিনি সব সময় ভারতীয় উগ্র দেশপ্রেমের রঙে লেখা লেখা পাঠিয়ে থাকেন। অথচ এই লেখায় তিনি মোদির ভারতের দেউলিয়া হয়ে পড়া “আফগান নীতি” থেকে নিজের দূরত্ব রচনা করে, এরপর লিখেছেন। তার সব চেয়ে কড়া সমালোচনার বাক্য ওই “সন্ত্রাস বন্ধে সন্ত্রাসীদের সাথে সরাসরি দর-কষাকষির এক নতুন অধ্যায়ও শুরু হল” [ভারতকে নীতি বদলাতে বাধ্য করল তালেবান]।

    সৌম্য এমন করে কেন লিখেছেন? কারণ আট বছরে পা দেয়া মোদি সরকারের পাকিস্তান-আফগানিস্তান নীতি হল – মুসলমানবিদ্বেষ; একে ততই চরমে নাও আর মুসলমান ঘৃণা ছড়াও যত বেশি সম্ভব। কারণ এতে ততই হিন্দুত্ববাদ ফলবতী হয়ে ভোটবাক্স ভরাবে। কিন্তু এটা করতে গিয়ে ভারত-রাষ্ট্রের ক্ষতি হলেও সে্টা সেকেন্ডারি ও তুচ্ছ। কারণ সহজে ক্ষমতায় থাকতে পারাটাই মোক্ষ!

    এখান থেকেই সাজানো মোদি-নীতি নাকি হল, “সন্ত্রাসবাদী সংগঠন বা ব্যক্তি বলে ভারত সরকার যাদেরকে ঘোষণা করেছে তাদের সাথে কোনো কথা বা যোগাযোগ করা যাবে না”।  কিন্তু এই নীতিই মোদির গলায় এখন ফাঁস হয়েছে। মোদী সরকার এতদিন এই নীতির কারণে, তালেবানের সাথে কোনো ফরমাল ডায়ালগ করতে পারছিল না। কারণ তারা আগেই তালেবানকে “সন্ত্রাসবাদী” বলে নিষিদ্ধ করে রেখেছে। সেই ২০১৪ সালে সুষমা স্বরাজ যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী!

    কিন্তু গত আগস্টের শুরুতে বা তারও আগের দু-একবার তাই ভারত কাতারে তালেবানের সাথে কথা বলার সুযোগ নিয়েছে। কিন্তু প্রকাশ্যে তা কখনো স্বীকার করেনি। ফলে ডায়ালগের বড় কোনো কার্যকর ফল ভারত পায়নি। আবার গত ১৫ আগস্ট তালেবানদের কাবুল দখলের পর এয়ারপোর্ট পার হতে গিয়ে আটকেপড়া ভারতীয়রা বুঝে যায়, ভারতে‘মোদিকে ফোন করে কান্নাকাটি করেও কোনই লাভ হচ্ছে না। এর চেয়ে কাছের তালেবান কমান্ডারই নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য আসল ভরসা।’ তা ইতোমধ্যে  আমরা কলকাতার বাঙালি তমালের ভাইরাল হওয়া বয়ানে দেখেছি। কাজেই এখানেও প্রমাণিত যে, ইসলামবিদ্বেষ বা তালেবান-ঘৃণা ভারতেরই নিজস্বার্থের বিরোধী। কাজেই চরম নিরুপায় হয়ে আর নিজের পায়ে দেয়া নিজের বেড়ি ভেঙে এবার কাতারে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তাল তালেবান নেতা শের মোহাম্মদ আব্বাস স্ট্যানিকজাইয়ের সাথে বৈঠক করেছেন, প্রকাশ্যেই। তবে যে উসিলায় বৈঠক করেছেন তা ঝুটা। কারণ ঐ রিপোর্টার লিখেছেন, “জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ৩-২ বিভাজনে যে প্রস্তাব পাস করে…’, এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা। কারণ, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ সাজানো হয়ে আছে এভাবে যে  এর পাঁচ ভেটো সদস্যের যেকোনো এক সদস্য যদি ভেটো দেয় তো ওই যেকোন প্রস্তাব বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ একটা না-ভেটো ভোটই সভার সবকিছু উলটে দিবার জন্য যথেষ্ট। সোজা কথা, চার ভেটো সদস্য একদিকে ভোট দিয়েও  বিপক্ষে এক না-ভোট কে উল্টাতে পারবে না। এমনকি তাতে মোট ১৫ সদস্যের ১৪ সদস্য কোন প্রস্তাবের পক্ষে আর এক ভেটো-সদস্য বিপক্ষে থাকলেও ওই প্রস্তাব গৃহীত হবে না। এটাই তো ‘ভেটো’র অর্থ। অথচ লেখা হয়েছে ‘জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ ৩-২ বিভাজনে যে প্রস্তাব পাস করে’, অর্থাৎ যেন পাঁচ ভেটো সদস্যের তিন সদস্য পক্ষে আর দুই সদস্য বিপক্ষে থাকলেই প্রস্তাব পাস করা যায়; যেন নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটো-সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই প্রস্তাব পাস হয়। আসলে এ কথাটাই ভিত্তিহীন। কাজেই দীপক মিত্তাল নিরাপত্তা পরিষদে পাস হওয়া কোনো প্রস্তাবের ভিত্তিতে তৈরি করা ভারতের কোনো দাবিনামা নিয়ে তালেবান নেতার সাথে দেখা করতে যাননি। দেখা করেছেন, ভারতের নিজের এক কামনা-নামা নিয়ে।

    তবে জেনে না জেনে ওই রিপোর্টার পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, আফগানিস্তানে আমেরিকার স্বার্থ আর ভারতের স্বার্থ একেবারেই আলাদা। তাই আমেরিকা তালেবানের সাথে ডিল করেছে এবং চুক্তি করে তা বাস্তবায়ন করেও ফেলেছে। অথচ ভারতের সামনে কোনো দিশা নেই। আসলে ভারতই এখনো তালেবানদের সাথে সম্পর্ক করবে কি না, সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

    আর ভারতের সিদ্ধান্ত না নিতে পারার প্রধান কারণ ইসলামবিদ্বেষ ও গভীর মুসলমান- ঘৃণা। কারণ এ দু’টাকে মোদি ও তার দল, হিন্দুত্ববাদের পক্ষে ভোট জোগাড়ের চাবি বলে ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছে এবং সহসাই এখান থেকে সরে আসতে পারবে না, তা চায় না।

    যদিও মুখে বলছে তালেবানদের হাক্কানি গ্রুপে তার আপত্তি, কারণ এরা পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত। বাস্তবতা হল – তালেবান মূল লিডারের তিন ডেপুটি আছেন যার একজন হাক্কানি গ্রুপের প্রধান সিরাজুদ্দিন হাক্কানি। আর ভারত দাবি করছে যে, তাকে মানে ওই গ্রুপকেই বাদ দিতে হবে! অর্থাৎ ভারত নিজেকে তালেবানদের কাছে নিজেকে এতই ওজনদার মনে করে?
    আসলে ঘটনাটা উল্টো। ভারত তালেবানদের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। ফলে কোনো গ্রুপ-কে বাদ দেয়ার কথা তালেবানদেরও ভাবতেই হবে না।

    তালেবানের নিজের সমস্যাঃ
    ‘তালেবানের নিজের সমস্যা অন্যখানে এবং সেটা হল, আফগানিস্তানে রাষ্ট্রপ্রধান কেউ থাকল নাকি ১০ জনের কোন কমিটি ক্ষমতায় থাকল তা একেবারে নয়। মূল কারণ, এগুলো তো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাদের নিয়ে, কেমন হবে সেনিয়ে প্রশ্ন। এমন সরকার গঠিত হলে সেটা  সাময়িক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলে তা তো এক-দু’বছর ক্ষমতায় থাকতেই পারে – তাতে কোনটা একা প্রেসিডেন্ট  কেউ অথবা একটা কমিটি যাই হোক। মূল সমস্যাটা হল – এরপর স্থায়ী সরকার যেটা হবে সেটা কেমন হবে ব- এটা আগে বলতে পারতে হবে!

    এ পর্যন্ত দুনিয়ায় দেখা গেছে, শাসনক্ষমতা হয় মূলত দু-ধরণের, হয় রাজতন্ত্রের না হয় রিপাবলিক (প্রজাতন্ত্র)। সাধারণত রাজতন্ত্রগুলো তাকে শাসনক্ষমতা কে দিয়েছে তা বলতে পারবে না, এমন ধরনের হয়। যেমন কোন আমিরের আমিরাত তেমনই এক শাসনক্ষমতা যা আসলে এক ‘রাজতন্ত্র’, যদিও শব্দটা ব্যবহার করেনি। তবু এটা রাজতন্ত্র বা মনার্কিই। এমনকি সমাজের কিছু এলিট যেমন ধরুন গুলশান-বারিধারার বাসিন্দাদের নিজেদের মধ্যে ঠিক করা এক শাসনক্ষমতা বা সরকার – এরাও কে তাদের ক্ষমতা দিয়েছে তা বলতে পারবে না বা ফলে চায় না।

    আসলে কে তাদের ক্ষমতা দিয়েছে বা দিবে- এই প্রশ্নের জবাব তাদের কাছে থাকতে হবে। নিজেকেই নিজে দিতে পারতে হবে। এর জবাব যার কাছে নেই, দিতে চায় না; এর মানে হবে এটা রাজতন্ত্র অথবা একটা এলিট গ্রুপ এদের রাজতন্ত্র।

    তবে এই প্রশ্নটারই আরেকভাবে জবাব দেয়া যেতে পারে। তা হল, শাসন ক্ষমতায় ঐ দেশে পাবলিক বা জনগণের ভূমিকা কী হবে? সরকারের সাথে পাবলিকের সম্পর্ক কী হবে কিভাবে হবে? পাবলিক কি ভোট দিতে পারবে? ভোটের ব্যবস্থা কি আদৌ  ঐদেশে থাকবে? (কারণ, রাজার দেশে ভোট দেয়া থাকে না।) এসব প্রশ্নের জবাব থাকতেই হবে।

    নিজেকেও প্রশ্ন করা যেতে পারে, আমাদের দেশে রাতের ভোটের সরকার হলে আমরা এতে আপত্তি দেখাই কেন? সরকারের জবাবদিহিতা না থাকলে, ইচ্ছামতো গুম-খুন করা হলে আপত্তি করি কেন?

    আর আরেক বড় সমস্যা হল, নিজেকে  রিপাবলিক রাষ্ট্র ও সরকার বলে নিজেকে ঘোষণা না করলে জাতিসঙ্ঘের অনুমোদন পাওয়া অসম্ভব। তাতে ‘ইসলামী রিপাবলিক’ ঘোষণা দিলেও ওসুবিধা হবার কথা না।  ইরান বহাল তবিয়তে এক ইসলামি রিপাবলিক যে জাতিসঙ্ঘের সদস্যও।  এটা না হলে, ক্রমশ উঠে যাওয়া অজস্র প্রশ্নের ঠেলায় বিভেদ শুরু হবে। যারা আমেরিকা বা পশ্চিমের বিরুদ্ধে তালেবানদেরকে চীন-রাশিয়াসহ  যারা স্ট্রং সমর্থন জানিয়ে আসছে, তারাও দুর্বল হয়ে যাবে একপর্যায়ে।

    আসলে ব্যাপারটা হল,  আ্মরা যেমন ইচ্ছা তেমন শাসনক্ষমতার রাষ্ট্র ও সরকার গড়তে পারি না। এর আরেক মূল কারণ, একালের গ্লোবাল বাণিজ্য। আপনার দেশকে গ্লোবাল বাণিজ্যে অংশ নেয়া সদস্য হতে হবে। না হয়ে দেশ চালানো একালে খুবই কঠিন। অনেকটা অবরোধে পড়ে থাকা ইরানের তেল আছে; কিন্তু তা অন্যদেশে বেচে আরেক অন্য দেশ থেকে অন্য পণ্য কিনতে পারবে না – এ ধরনের সমস্যা হবে; যেটা মারাত্মক। এটা অনেকটা গ্রামে আপনাকে একঘরে করে ফেলে রেখে দেয়ার মতো হবে। আপনার দেশের মাটির নিচে বহু কিন্তু হবু  মুল্যবান সম্পদ থাকতে পারে। কিন্তু যখন আপনি তা কাউকে বেচতে পারেন না, তখন আর সেটা সম্পদ নয়। ওটা আর মুল্যবান নয়।

    তবে এরপরেও যদি এতে আপনার কোনো সমস্যা না হয়, সহ্য হয়, তবে ঠিক আছে। আপনার যা ইচ্ছা শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে অন্য দেশ থেকে কিছুই কিনতে বেচতে পারবেন না যার সোজা মানে, গ্লোবাল পণ্যবিনিময় মানে মুদ্রাব্যবস্থায় আপনি সদস্য না হয়েই থাকতে চাওয়ার পথ বেছে নিলেন। একবার করে দেখতে পারেন, জীবন যাপনের কষ্টটা জানা থাকা খারাপ না, খারাপ কেন হবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৪ সেপ্টেম্বর আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “আফগানিস্তান নিয়ে সবাই প্রশ্নের মুখোমুখি “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ইইউ-চীন চুক্তি, শপথের আগেই বাইডেনের পরাজয়

    ইইউ-চীন চুক্তি, শপথের আগেই বাইডেনের পরাজয়

    গৌতম দাস

     ০৪ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3kf

    CN-EU in a videoconference on CAI DEAL, 30 DEC 2020

    দুনিয়া নতুন বছর ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে এসে পড়েছে। তার মানে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের শপথ নেয়ার দিন ২০ জানুয়ারি আরো ঘনিয়ে এল। প্রায় সব কিছু ঠিক মতই আগাচ্ছে, তেমন কোন বাধা দেখা যাচ্ছে না। বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্রমে খাঁচার ভেতরে প্রবেশ করে ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছেন যেন। কিন্তু তবু একটা ভাগাভাগির লাইন আমেরিকান সমাজ ও মিডিয়ায় টানা হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই; যা সম্ভবত আর মুছবে না কোনো দিন। তা হল তথাকথিত আমেরিকান জাতিবাদিতা। অলীক জাতিবাদিতার পক্ষে-বিপক্ষের একটা ভাগাভাগির দাগ থেকেই যাবে।

    [শেষের কথাটা আগে বলাঃ গেল সব গেল! বাইডেন শপথ নিবার আগেই বাইডেনের আমেরিকার বিরাট কিছু হারিয়ে গেল। বিষয়টা হল আগামি দিনে চীনের সাথে ইইউ, (২৭ রাষ্ট্রের এই ইউরোপীয় ব্লক), এর মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্য বিনিয়োগ কীভাবে হবে-চলবে (বিশেষত চীনের আভ্যন্তরীণ বাজার ইইউ-এর জন্য কীভাবে খুলে দেয়া হবে) এর মৌলিক নীতিমালা বিষয়ক চুক্তি্র – CAI  ‘কম্প্রিহেনসিভ এগ্রিমেন্ট অন ইনভেস্টমেন্ট’ (সিএই), আলোচনায় সমাপ্তিটানা হল, একটা ভার্চুয়াল মিটিংয়ে করে। আমার এই এক বাক্যও পুরা ব্যাপারটার গুরুত্ব পাঠককে বুঝাতে খাটো হতে পারে। তাই এই বিবেচনায় পরের আরেক বাক্য লিখছি। গ্লোবাল ব্যবসা বিনিয়োগের  নিউইয়র্কভিত্তিক অন্যতম গ্লোবাল মিডিয়া  ব্লুমবার্গ (Bloomberg) গত মাসে ২২ ডিসেম্বর জানিয়েছিল যে প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট বাইডেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করেছে যাতে ইইউ চীনের সাথে এই চুক্তি এখনি না করে, ধীরে চলে [European Union came under mounting pressure to slow down its push for a major investment deal with China,……]। কারণ, বাইডেন চেয়েছিলেন, তিনি শপথ নিবার পরে তখন ইইউ আর আমেরিকা যৌথভাবে একটা পক্ষ হয়ে, অপর পক্ষ চীনের সাথে দরকষাকষিতে বসলে চীনকে আরও ছাড় দিতে বাধ্য করা যেত; এমন একটা লোভ বাইডেন দেখিয়েছিলেন। এব্যাপারে বাইডেনের হবু নিরাপত্তা উপদেষ্টা Jake Sullivan, এর টুইট দেখতে পারেন [He urged “early consultation with our European partners on our common concerns about China’s economic practices.”]। কিন্তু ইতোমধ্যেই বড় ধরণে ইইউ এর আমেরিকা-বিতৃষ্ণা ঘটে যাবার জন্য একা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই যথেষ্ট হয়েছিল। এতে আমেরিকা-বিতৃষ্ণা এমন পর্যায়ে পৌছিয়েছে যে বাইডেনের কোন বাধা-অনুরোধ এখানে কাজ করে নাই।  ফলে এখন আমেরিকান পাবলিক বুঝবে হয়ত আমেরিকা ফার্স্ট” এর  জাতিবাদ নীতির ট্রাম্প আমেরিকার কী কী ক্ষতি করে দিয়ে গেছে। চীন-ইইউ এই বিশেষ  ব্যবসা বাণিজ্য বিনিয়োগ চুক্তি যার আনুষ্ঠানিক নাম CAI বা ‘কম্প্রিহেনসিভ এগ্রিমেন্ট অন ইনভেস্টমেন্ট’ (সিএই), তা গত ৩০ ডিসেম্বর সম্পন্ন করে ফেলেছে। উপরের ছবিটা সেই চুক্তি সম্পন্ন করার ব্যক্তিত্বদের ছবিই। এনিয়ে বিস্তারিত এই লেখার শেষ অংশে করা হয়েছে।
    তবু এই চুক্তি স্বাক্ষরের ঘটনার মূল তাতপর্যটা কী তা এখানেই বলে রাখি। কলোনিযুগ শেষ হলে ১৯৪০ এর দশক থেকে ইউরোপীয় মাতবর কলোনিদখলের মাস্টারেরা সব হারিয়ে শেষে আমেরিকার ক্ষমতার দাপটের অধীনে এর আঁচল ধরে হেটে  এপর্যন্ত কোনমতে টিকে আসছিল। অবশ্য ইতোমধ্যে তাদের মধ্যে অনেক নতুন কিছু করার-হবার খায়েস জমাও হয়েছে। তাই এখন যা হল সেটা এই যে চীন এসে সহজেই প্রথমত ইউরোপকে আমেরিকার অধীনতার আঁচল ধরে চলা থেকে মুক্ত করে দিল। আর এর কৃতজ্ঞতায় ইইউ অবশ্যই নিজেকে ধন্যবোধ করছে ও করবে। কিন্তু তা কখনই এবার চীনের সাথেও সম্পর্কটাও আগের আমেরিকা-ইইউ এর মত  অধীনতার আঁচল ধরে চলা হবে না। কেন? চীন কী কোন মহান শক্তি? “মেরা ভারত মহান” এর মতই,  চীনও মহান, সেজন্য? না একেবারেই না। প্রশ্নটাই মহান হওয়া না হওয়ার না।  প্রশ্নটা সময়ের, অগ্রবর্তি এক সময়ের। গত ৭৫ বছরের আমেরিকান নেতৃত্বের দুনিয়াতে অনেক কিছুই ঘটেছে কিন্তু কোথায় কলোনি দখল, কলোনি শাসন বা সম্পর্ক আর ফিরে আসে নাই। আসবে না। নতুন সময়ে পুরানা সম্পর্ক ফিরে আসে না, আসতে পারে না – আগের সুযোগগুলো সব নষ্ট হয়ে যায়, তাই।  কিন্তু চিন্তা করলে দেখব, টের পাব এটা “আমেরিকান মহান” কিনা বা মহান ছিল বলেই কলোনি আর ফিরে আসে নাই তা একেবারেই নয়।  তবু কারণ একটাই, “নতুন সময়”।  নতুন সময়ে ‘পুরান ঘটনা’ ঘটতে পারে না। ঘটবার পরিস্থিতিই একই থাকে না বলে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন সময়ে পুরান ঘটনাগুলো আবার সংঘটিত হতেই পারে না, তাই।  অতএব চীন-ইইউ এর সম্পর্ক আগের ‘আমেরিকা-ইইউ এর মত  অধীনতার আঁচল ধরে চলা’ হয়েই গড়ে উঠবেই না। ]

    আগেই একে ‘তথাকথিত’ বলে দিলাম, আর সেই সাথে ট্রাম্পের চালু করা এই জাতিবাদিতা অলীক বা কাল্পনিক- তা আগেই বললাম এ জন্য যে, আমেরিকা রাষ্ট্র  ৭৫ বছর আগে একবার গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিল, অর্থাৎ এক গ্লোবাল পণ্য বিনিময়বাণিজ্য ব্যবস্থায় প্রবেশে সবাইকে সুযোগ এনে দিয়েছিল, সব রাষ্ট্রকে জড়তা ভেঙে তাতে শামিল করেছিল, সে রাস্তায় সবাইকে নামিয়ে গ্লোবাল আইন নিয়মকানুন তৈরি করে ফেলেছিল, দুনিয়ার বাণিজ্য বিনিময়ের অভিমুখ নির্ধারণ করে গ্লোবাল পণ্য-পুঁজির বিনিময় বা বাণিজ্য এনে দিয়েছিল। কিন্তু  সেই আমেরিকা এখন বুড়া বয়সে উলটা জাতিবাদি সংরক্ষণবাদিতা দিয়ে, নিজ বাজারে অন্যের ঢোকা বন্ধ করে, চীন ও ইইউর সাথে ট্যারিফ আরোপের যুদ্ধ লাগিয়ে গ্লোবাল বাণিজ্য অসম্ভব করে তুলবে, এটা কি কেউ ভেবেছিল? এটা কীভাবে ঘটল?
    তামাসার দিকটা হল, জাতিবাদী অর্থনীতি, আত্মনির্ভর অর্থনীতি, সংরক্ষণবাদিতা অথবা নিজে আমদানিও করব না রফতানিও করব না এমন চিন্তা – এটা দুনিয়ায় একসময় একমাত্র টিকে ছিল সেসব দেশে ও সে সবকালে (১৬০৭-১৯৪৫) যখন ইউরোপের ওসব চিন্তার নেতা ও রাষ্ট্রের প্রধান অর্থনৈতিক তৎপরতা বলতে ছিল অন্য দেশকে কলোনি দখল করা আর সেখান থেকে লুট ও শোষণে সম্পদ উঠিয়ে আনা; এমন রূপের কলোনি-দখলদার রাষ্ট্র। কিন্তু আমেরিকা তো কখনো এমন দখলদার রাষ্ট্র বা তেমন অর্থনৈতিক দেশ ছিল না। এছাড়া ১৯৪৪ সালে ব্রেটনউড বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান (আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক) দুনিয়ায় চালু হয়ে যাওয়ার পর সেটা হওয়া শুধু আমেরিকার জন্য নয়, ইউরোপসহ যে কারো জন্যই আরো অসম্ভব হয়ে গেছিল।
    সে কারণে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ধরনের জাতিবাদিতা মানে, পণ্য-পুঁজি আমদানিও করব না, রফতানিও করব না। এ ধরনের বাণিজ্যবিরোধী ধরনের স্বপ্ন আকাক্ষা তো আসলে কলোনি আমলের চিন্তা। যা বর্তমান বাস্তবতার দুনিয়াটাতে আর নাই।
    তাই ট্রাম্পের জাতিবাদিতা হল, চীনকে একঘরে করে বা চীনকে বাদ দিয়ে সর্বোচ্চসংখ্যক বাকি রাষ্ট্রকে নিয়ে আগের মতোই আমেরিকান নেতৃত্বের (চীন বাদে) গ্লোবাল বাণিজ্যের সমাজ কায়েমের এক অলীক প্রচেষ্টা যেটা শতভাগই বাস্তবায়ন-অযোগ্য। তবে মানতে হবে জাতিবাদে প্রপাগান্ডা মূল্য অনেক ও সুড়সুড়ি তোলার ক্ষমতাও অপরিসীম। এ ছাড়া, এথেকে নিজ দেশে জাতবাদী এক মিথ্যা ঐক্য ধারণা- অথবা ‘আমরাই শ্রেষ্ঠ’ ধারণার জন্ম দেয়া যায় খুব সহজেই। কেবল এখানে এসে মোদী ও ট্রাম্প নীতিতে এক ছিলেন।
    তবে মোদীরটা প্রায় খোলাখুলি নিজের সাথেই অসততা বা প্রতারণা। যেমন, লাদাখ সীমান্তে চীনের সাথে সঙ্ঘাত শুরুর পর থেকে চীনা পণ্য বর্জনের ডাক এখনো দেয়া আছে, প্রপাগান্ডা ও পণ্য আমদানিবিরোধিতার পক্ষে ক্যাম্পেইনও চলছে। কিন্তু বাস্তবে যেটা হচ্ছে তা হল, আগের চেয়ে চীনা পণ্য ভারতে আমদানি কমা দূরে থাক, এখন তা (গত অক্টোবর থেকে) ৩০% বেশি আমদানি হচ্ছে। এছাড়া মোদীর মনবাসনা ও মনের গোপন নীতি হল,  আপনার নিজদেশ কাউকে দেশের বাজারে ঢুকতে দেবে না। এর মানে, অন্যেরা রফতানি করতে পারবে না কিন্তু আপনিই কেবল ওসব দেশে পাল্টা রফতানি করতে চান – এই নীতি। বিদেশি মুদ্রা খুবই লোভনীয় জিনিষ গণ্য করা। এটাই অলীক জাতিবাদিতা, যার কায়েম-বাস্তবায়ন অসম্ভব।
    আর এ দিকে মোদীর বিপরীতে ট্রাম্পের আমেরিকার বাস্তবতা হল, এখানে আমেরিকান বাণিজ্যস্বার্থ দুই ভাগে বিভক্ত; দুটা ক্যাম্প তৈরি হয়ে গেছে। স্মল বা মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজগুলো মনে করে, তাঁরা স্বপ্ন-কল্পনায় দ্যাখে যে চীনের আসন্ন গ্লোবাল প্রভাবক-আধিপত্যের কারণে নিজ এন্টারপ্রাইজগুলো নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখতে পারবে না। তাই ট্রাম্পের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিই তাদের আত্মরক্ষার উপায়। কিন্তু এটা ‘মনে মনে পোলাও খাওয়া’র মত। কারণ তাঁদের ভয়ের অনুমানটা ঠিকঠিক যাচাই করে দেখা হয়নি, তাই পরীক্ষিত নয়। বাস্তবে ওসব স্বপ্ন-কল্পনা সত্য না হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। আর এসবের বিপরীতে, চীনের আসন্ন গ্লোবাল প্রভাবে এক ধাক্কা আমেরিকার স্মল বা মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজগুলোর উপর আসবে অবশ্যই, শুরুওও হয়েছে অবশ্যই। কিন্তু তাতে এগুলো সব বিনাশ বা বন্ধ হয়ে যাবে এটি সত্য নয়। বরং এই ধাক্কায় ঢেলে সাজানো আসন্ন হবে অবশ্যই। তাতে কোনো ধরনের স্মল বা মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ বন্ধ হয়ে যাবে আবার নতুন ধরনের কিছু স্মল বা মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ জন্মানোর সম্ভাবনাও তৈরি হবে। আর গ্লোবাল নেতৃত্বের বদলকালে কিছু  কোলেটারাল ড্যামেজও হবে অবশ্যই। তাই ব্যাপারটাকে বিদেশীর বিরুদ্ধে দেশীর সংরক্ষণবাদী বিষয়ের চোখে দেখবার বিষয় নয়। বরং নতুন অর্থনৈতিক নেতা আসন্ন হবে বলে তার সাথে নিজেকে খাপ-খাইয়ে নিয়ে টিকানোর জন্য ঢেলে সাজানো, খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য কিছু পরিবর্তন – এসব তো করতেই হবে। এড়ানো যাবে না। তবু জাতিবাদী প্রপাগান্ডায় সফল সুড়সুড়িতে অলীক শত্রুর বিরুদ্ধে জাতিঐক্যের গানই  অনেক সফলতা পাবে, অন্তত প্রথম কয়েক বছরে।
    এর বিপরীতে আমেরিকায় যারা বড় এন্টারপ্রাইজ, যারা গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান মানে গ্লোবাল রফতানি বাণিজ্যভিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান; এরা বাইডেনের আমলকে স্বাগত জানাবেন। কারণ এতোমধ্যেই যা ঘোষিত বাইডেনের নির্ধারিত নীতি তা হল, ট্রাম্পের জাতিবাদিতায় আমেরিকার অনেক ক্ষতি হয়েছে; তাই আমাদের যত দ্রুততায় আগের সময়ের গ্লোবাল বাণিজ্য সম্পর্ক এবং পারলে যতটা সম্ভব গ্লোবাল নেতা থাকার নীতি ফিরিয়ে আনতে হবে। এটাকে বাইডেনের পরামর্শকরা বলছেন, ডেমোক্র্যাট দলের পুরনো বা ক্লাসিক নীতি অথবা ওবামার নীতিতে ফিরে যাওয়া ও কন্টিনিউ করাই বাইডেনের সাধারণ নীতি হবে এবং এই বার্তাটাই সে চীনকে দিতে চায় বলে যতটা সম্ভব ওবামার আমলের যত পুরনো লোক (উপদেষ্টা, সচিব) আছেন তাদের দিয়েই বাইডেনের স্টাফ মূলত সাজানো হচ্ছে। আর তারা যেহেতু আগে চীনের সাথে কাজ করেছেন, পূর্ব-পরিচয় অভিজ্ঞতা আছে ফলে তা আমেরিকার ওপর চীনা আস্থা (ট্রাম্পের কারণে যেটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে) ফিরানোর একটা আলাদা মাইলেজ হতে পারে। অর্থাৎ বাইডেনের আমেরিকা সেই পুরানা গ্লোবাল বাণিজ্যের ট্রাকেই ফিরে যাবে; কথিত জাতিবাদিতায় নয়। তাই সবখানেই সেটা পুনরুদ্ধার করাই বাইডেনের মৌলিক নীতি হবে।

    কিন্তু বাইডেনের আমেরিকা ওবামা আমলের নীতিতে কতটা ফিরতে পারবে?
    সেটা এক বিরাট প্রশ্ন, অবশ্যই। পুরনো জায়গায় ওবামার লেভেলে আবার ফিরতে না পারার শঙ্কাও ক্রমে বাড়ছে। ব্যাপারটা বুঝতে সবার আগে প্রশ্ন করা যাক, আসলে ‘ফিরতে পারা’ মানে কী?
    সংক্ষেপে বললে আমেরিকা গ্লোবাল নেতৃত্ব নিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে ১৯৪২ সাল থেকে। সুনির্দিষ্ট সে যা করেছিল তা হল, ঐ বিশ্বযুদ্ধের মূল নির্ধারক নেতৃত্ব নেয়া, হিটলারবিরোধী অক্ষশক্তি জোট গড়া; তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নকেও শামিল করা, ওই বিশ্বযুদ্ধে নিজেদের বিজয় ঘটানো, যুদ্ধের মেজর খরচ হিসেবে পক্ষের সব রাষ্ট্রকে আমেরিকা কোনো চুক্তি ছাড়াই অর্থ জুগিয়ে চলেছিল, যুদ্ধে বিজয় নিশ্চিত করার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন বাদে সবাইকেই আবার যুদ্ধ-পুনর্বাসন ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য, নতুন করে এবং এবার জাপান-জার্মানি-ইটালিসহ সারা ইউরোপকে নতুন বিনিয়োগ দেয়া। আর সেই সাথে ইউরোপ যেন এবার কমিউনিস্টদের দ্বারা দখল না হয়ে যায় তাই জার্মানি ও জাপানে স্থায়ীভাবে সামরিক ব্যারাকে আমেরিকান সৈন্য রেখে দেয়া। আর এসব কিছুর খরচ আমেরিকা একা বহন করা। আর আমেরিকা কখনোই এই নিরাপত্তাদানের খরচ ইউরোপের কাছে চায়নি। এরই বিনিময়ে আমেরিকা ইউরোপের মন পেয়েছিল। আর সেই থেকে আমেরিকা পায় নিজে গ্লোবাল (অর্থনীতি তো বটেই) পলিটিক্যাল একচ্ছত্র লিডারের স্বীকৃতি। তা দিয়েছিল অ-কমিউনিস্ট সারা ইউরোপ। এছাড়া বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা পক্ষজোটের অন্যান্য রাষ্ট্রে যা কিছু খরচ বা বিনিয়োগ  করেছিল কিস্তিতে হলেও তারা সেসব খরচের অর্থ ফিরিয়ে দিয়েছিল। আর অবকাঠামো ঋণও তারা স্বল্প সুদসহ ফেরত দিয়েছিল কিস্তিতে। তবে সামরিক ব্যয় যেমন ইউরোপে সব আমেরিকান-ব্যারাক রাখার খরচ বা সামরিক জোট ন্যাটো পরিচালনার খরচের কমপক্ষে নব্বই ভাগ একা আমেরিকা বহন করে এসেছে, এ পর্যন্ত। কিন্তু এবার ট্রাম্প এসে কেবল ট্রাম্পই এইবার ইউরোপের কাছে সামরিক ব্যারাক রাখার খরচ চেয়েছিলেন। এর চেয়েও ‘শকিং’ ব্যাপারটা হল, ট্রাম্প নিজেই আমেরিকার গ্লোবাল বাণিজ্যের নেতা অবস্থান ছেড়ে সরে গিয়েছিলেন। ট্রাম্পের শপথ নেওয়ার শুরুর ঐ বছর (২০১৭) গ্লোবাল ইকোনমিক ফোরামে ব্যক্তি তিনি অংশ নেয়নি। আর পরে যেখানেই অংশ নিয়েছেন (যেমন জি৭ বা জি২০) সেখানে জাতিবাদী ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিতে চলতে চেয়ে কথা বলে গেছে্ন। ফলে সবখানে তাল কেটে যাওয়া কথা। এসব মিলিয়ে গত ৭৫ বছরের যে আমেরিকা গ্লোবাল নেতার পরিচয় পেয়েছিল তা ট্রাম্প তার শেষ চার বছরে সদম্ভেই সব মুছে ফেলেছিলেন।
    আর ঠিক সে কারণেই, আসন্ন বাইডেন প্রশাসনের সাধারণ নীতি হবে আমেরিকাকে যতটা সম্ভব আগের গ্লোবাল নেতার আসনে ফিরিয়ে নেয়া। এ কাজে এবার মূলত তার আগানোর পথ হবে নীতিগত জায়গায় শক্ত করে দাঁড়িয়ে সব কিছুকে ফিরিয়ে আনা। আর এ কাজে সবার উপরে থাকবে হিউম্যান রাইট ইস্যুতে এক শক্ত আপসহীন অবস্থান। মোদির ভারত এতে ‘সাফার’ করবে অবশ্যই, কিন্তু ভারতকে কষ্ট দিতে হবে, এটা বাইডেনের কোন পলিসি নয়। বরং হিউম্যান রাইট ইস্যুতে শক্ত আপসহীন অবস্থান নিলে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্নে আমেরিকা চীনের কাছে পরাজিত হয়ে গেলেও গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতৃত্ব সহসাই আমেরিকার হাত থেকে চলে যাবে না এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে আমেরিকার গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেকটা আর অনেকদিনই হয়ত ঠেকিয়ে রাখতে পারবে এবং তা সম্ভবত অনেক দীর্ঘ দিন আমেরিকার হাতে থাকবে।  এই হল পিছনের অনুমান। তবে এবার প্রকাশিত এক গবেষণা-স্টাডি রিপোর্ট বলছে, করোনাভাইরাসকে কঠোরভাবে মোকাবেলা করতে এবং এই ম্যানেজমেন্ট সাকসেসের কারণে ২০৩৫ সালে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে অর্থনৈতিক নেতৃত্ব চীনের পাওয়ার কথা ছিল। [এ দশকের মধ্যেই চীন হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি: রিপোর্ট] সেটা এখন ২০২৮ সালের মধ্যেই চীন অর্জন করে ফেলবে বলে অনুমিত হচ্ছে। তাই অন্তত গ্লোবাল রাজনৈতিক নেতার আসন ধরে রাখতে বাইডেন নিজ দেশের হিউম্যান রাইট ইস্যুতে শক্ত আপসহীন অবস্থানের কথা বলছেন। তিনি শুধু ভারতের কাশ্মীর নীতিই নয়, ভারতের নাগরিকত্ব আইন এবং মুসলমানদের প্রতি নিপীড়ন ও বৈষম্য নিয়েও উচ্চকিত হবেন বলে জানিয়ে আসছেন। একই অবস্থান নেবেন বাংলাদেশের হিউম্যান রাইট ইস্যুতেও। এ কারণে এসব দেশের নেতৃত্ব চিন্তিত হয়ে পড়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হচ্ছে।

    ভারতের দিবাস্বপ্নঃ
    এ দিকে গত ২৪ ডিসেম্বর নিউইয়র্ক টাইমসে এমন এক প্রো-ভারতীয় রিপোর্ট ছাপা হয়েছে যাকে বলা চলে, বাইডেনের নীতির চাপের কথা ভেবে ভারতীয় মিডিয়া ও রাজনীতিতে যে দম বন্ধ অবস্থা তৈরি হয়েছে তা থেকে ভান করে হলেও যেন তাদের সাময়িক নিঃশ্বাস নিতে দিতেই এই রিপোর্ট লেখা হয়েছে। তাই যেন এটা এক দিবাস্বপ্নের আকাঙ্খায় লেখা রিপোর্ট।
    ঐ রিপোর্টের শিরোনাম, ‘বাইডেন হিউম্যান রাইট ইস্যুতে জোর দিলেও আমেরিকা-ভারত সম্পর্ককেও বিস্তারে নেবেন’ [Biden Is Expected to Expand U.S.-India Relations While Stressing Human Rights]। এই শিরোনামটা নিজেই এক হার-স্বীকার করা সান্ত্বনামূলক শিরোনাম। কারণ হিউম্যান রাইট ইস্যুর ব্যাপক ‘খামতিতে থাকা’ মোদী বাইডেনের সাথে আলাপে গেলে বলাই বাহুল্য, প্রতিটা পদেই সমালোচিত হবেন আর এই সমালোচনার ভয় ও মনমরা অনৈতিক অবস্থানের ছাপ সবার ওপর সব ইস্যুতেও থাকবে। তাই বাইডেনের পক্ষেও সম্পর্ক কোনো দিকে এগিয়ে নেয়া কঠিন হয়ে যাবে। এ ছাড়া এমন দুই নেতার বৈঠকে যদি একজনের চোখে অপরজন খাটো হয়ে থাকেন ওবে ঐ পরিস্থিতিতে আলোচনাই আগাবে না। শুধু তা নয়, সেটি একটি বেইজ্জতির কাণ্ড হয়ে যেকোনো সময় হাজির হয়ে যেতে পারে এই ভয় ঢুকবে ভারতের সবার মনে। আর এই ভয়েই সম্ভবত মোদী বাইডেনের সামনে মুলাকাতে আসতেই চাইবেন না। তাই, মোদী সাক্ষাতের কোন মিটিং এড়িয়ে চলতে চাইবেন, এটাই হওয়ার কথা।
    তবে ওই রিপোর্ট এসব প্রশ্নের মীমাংসা না করতে পেরে শেষে অস্বাভাবিকভাবে (বাইডেন ডেমোক্রাট  অথচ) এবার রিপাবলিক থিংকট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের কিছু মন্তব্য নিয়ে এসেছে, নিজেদের মনোবল বাড়াতে। যেমন কার্নেগি ইন্ডিয়ার অ্যাশলে [Ashley J. Tellis], ট্রাম্পের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টেফান বিগান [Stephen Biegun] বা থিংকট্যাঙ্ক ব্যক্তিত্ব রিচার্ড ফনটেইন [Richard Fontaine,]- এদের কথা উদ্ধৃতিতে আনা হয়েছে। কিন্তু মজার কথা হল, কোথাও পরিষ্কার বলা নেই তারা এসব কথা কবে বলেছেন? নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে, না পরে? তা স্পষ্ট নয়। আবার কোথাও যদি বলা থাকে তবে সেটা অবশ্যই গত নভেম্বরের   নির্বাচিনের আগের যখন নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষের প্রপাগান্ডা হিসাবে অনেক কথা বলা হয়েছিল, সেসব কথা। আর সবচেয়ে বড় কথা, তারা কি বাইডেন জিতার পরে তার সম্ভাব্য নীতি সম্পর্কে কথা বলছেন? অবশ্যই তা নয় অথবা তারা সেটাও নিশ্চিত করেননি। এমনকি ঐ রিপোর্টের এক জায়গায় দাবি করা হয়েছে, বাইডেন নাকি এশিয়ায় চীনের ক্ষমতার ভারসাম্য হিসেবে কোয়াড জোট নিয়েও আগাবেনই [As relations between New Delhi and Beijing soured, India strengthened its commitment to a multilateral partnership with the United States, India, Japan and Australia — known as the Quadrilateral Security Dialogue, or Quad.] অথচ এসব কথা তো নভেম্বর নির্বাচনের আগে বলা কথা।

    কাজেই বলা বাহুল্য এমন জবরদস্তি অনুমানের ভিত্তি নেই। কারণ বাইডেন চীনের বিরুদ্ধে অনেক রাষ্ট্রের সাথে নীতি বা পলিসিগত জোট বা ঐকমত্য করবেন হয়ত। কিন্তু কোয়াড তো সামরিক জোট আর তা এক আলাদা প্রতিষ্ঠান। কোনো দেশের অন্য দেশের সাথে পলিসিগত মিলের ভিত্তি খুঁজে পেয়ে ঘনিষ্ঠ হওয়া আর সামরিক জোটে তৎপর ও যুক্ত হওয়া – এ দুটো কোনোভাবেই আমরা এক বলে চালিয়ে দিতে পারি না। অথচ এমন উদ্ভট দাবি এখানে করা হয়েছে চাতুরির সাথে। শেষে রেফারেন্স টানা হয়েছে ভারতের ট্রাম্প অনুসারী এক আমেরিকান থিংকট্যাঙ্কের প্রধান, ব্রহ্ম চেলানির। চেলানির দাবি একেবারে হুমকির মতন। নিউইয়র্ক টাওইমসে দাবি করা হয়েছে  চেলানি নাকি বলেছেন, বাইডেন যদি চীনের প্রতি নরম অবস্থানে কথা বলেন তবে তা ভারতকে ‘দ্বিতীয় চিন্তা’ করতে ঠেলে দিবে [“If he’s seen as pursuing a softer approach with China, it will make New Delhi have second thoughts about a soft alliance,” said Brahma Chellaney, a professor of strategic studies at the Center for Policy ]। তবে এটা বিরাট হুমকি দেয়ার মতো কথা। কিন্তু ভারত ‘দ্বিতীয় চিন্তা’ করে কোথায় যাবে? ভারতের কাছে আমেরিকার কাছে যাওয়া ছাড়া আর কে বিকল্প আছে? আসলে ভারতের জন্য একটাই আমেরিকান বিকল্প আছে; সেটা হল, এবার উল্টা আরো বেশি করে চীনের ঘনিষ্ঠ হয়ে কোলে উঠে যাওয়া! এ ছাড়া ভারতের জন্য আমেরিকার বিকল্প আর কই?
    তবে আবার সবশেষ ঐ রিপোর্টে স্বীকার করে নিয়ে বলা হয়েছে, ‘আমেরিকার কিছু অ্যাক্টিভিস্ট বরং দাবি করেছেন বাইডেন যেন ভারতের সরকারকে হুঁশিয়ার করে দেয় ভারতের হিউম্যান রাইটের ব্যাপারে সতর্ক না হলে সেই ভারত হবে আমেরিকার জন্য ভীষণ বিপদের” [Some activists in the United States want the Biden administration to go even further and warn Indian officials that discontent over some of its current policies could imperil how strong a partner India might be for the United States. …… “Human rights first is equally important,” said Simran Noor, the chairwoman of South Asian Americans Leading Together, an advocacy group in the United States. ]। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে এই রিপোর্ট শেষবিচারে ভারতের জন্য সান্ত্বনামূলক কিছু বাক্যও তুলে ধরতে পারেনি।

    চীন-ইইউ CAI  চুক্তি করে ফেলাঃ বাইডেন শপথ নিবার আগেই যা হারালেন
    এদিকে গত ৩০ডিসেম্বর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীন মিলে বিশাল তাতপর্যপুর্ণ এক ভার্চুয়াল ভিডিও শীর্ষ বৈঠক সম্পন্ন করেছে। এটা হল, চীনের সাথে ইইউর মূলত বিনিয়োগ ও বাণিজ্যবিষয়ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক চুক্তি। এর আনুষ্ঠানিক নাম ‘কম্প্রিহেনসিভ এগ্রিমেন্ট অন ইনভেস্টমেন্ট’ (সিএই) বা CAI  ।
    এতে সার কথাটা হলো, ট্রাম্প প্রশাসন তার চার বছরে যেভাবে ইইউকে দূরে ঠেলে দিয়েছে, তা বাইডেন এসে মেরামত করে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনবেন বলে যে নীতি ঘোষণা করেছিলেন, তা আর এখন কার্যকর হওয়ার সুযোগ থাকল না। এর আগেই চীন-ইইউর এই চুক্তি আমেরিকাকে চিরদিনের জন্য পাশে ও বহু পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল।
    এই ফাইনাল আলোচনায় ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন (উপরের ছবিতে ঘড়ির কাটার অর্ডারে) চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং, ইইউ কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট মিশেল [Charles Michel],  ইইউর দুই প্রধান নেতা রাষ্ট্র জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেল আর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রো; আর এদের সাথে ছিলেন ইইউ কমিশন প্রেসিডেন্ট উর্সুলা [Ursula von der Leyen]। অর্থাৎ পক্ষ হিসাবে চীন ও ইইউ এই দুই পক্ষ।  কিন্তু কেন বাইডেনের অনুরোধ ফেলে ইইউ নেতারা এই চুক্তিতে গেলেন এনিয়ে অপ্রকাশ্যে বিস্তর মনকষাকষি নেপথ্য আলাপ হয়েছে। যার প্রায় সবটাই আমরা পেতে পারি হংকং থেকে প্রকাশিত এশিয়ান টাইমস ওয়েব পত্রিকায়। সেখানে গত ৩১ ডিসেম্বর সংখ্যায় রিপোর্টার ডিভিড হাট [DAVID HUTT] এর লেখা এক বিস্তারিত প্রায় দশ পৃষ্ঠার রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। যার শিরোনাম হল, ইইউ-চীনের ডিল বাইডেনের টিমকে হয়ত আরও অনেক অপশন দিতে পারত [EU-China deal may give Biden’s team more options]। অর্থাৎ আমেরিকার পক্ষ থেকে দেখা ও করা এই শিরোনাম। আমেরিকান চোখে তাঁরা আমেরিকা-ইইউ এর সম্পর্ককে ট্রান্স-আটলান্টিক [transatlantic relationship] সম্পর্ক বলতে ভালবাসে। ভৌগলিকভাবে তারা আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ের ভুমি বলে। সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্ট পত্রিকা সেখানে প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট বাইডেনকে  ট্রান্স-আটলান্টিসিস্ট বলে খোচা দিয়ে লিখেছে- President-elect Joe Biden is considered to be an Atlanticist। কিন্তু এশিয়ান টাইমসের  ডেভিড হাট অত দূর থেকে কথা বলেন নাই। তিনি সরাসরি ইইউ কে প্রতারনাকারিই [gazumped, যার বাংলা হল,  বাড়িবিক্রির বিক্রেতার সাথে দরদাম সব ঠিক হবার পর ফাইনাল পেমেন্টের আগে তিনি এবার বাড়ির বর্ধিত দাম হেঁকে গোঁ-ধরে বসা – একে যে  প্রতারণার ঘটনা বলে মনে করা হয়]  বলেছেন। কারণ , তিনি বলছেন নভেম্বর নির্বাচনের আগের মাসে অক্টোবর ২০২০ তে ট্রাম্পের উদ্যোগে ইইউ-আমেরিকা এই বৈঠক বসেছিল চীনের বিরুদ্ধে তারা কী কমন অবস্থান নিতে পারে সেই বিষয়ে।  ডেভিড হাট ইইউ এর ফরেন পলিসি প্রধান যোসেপ বোরেলের [Josep Borrell] এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলছেন তিনি চীনবিরোধী ইইউ-আমেরিকা বৈঠকের প্রশংসাও করেছিলেন। কিন্তু তি এখন এমন উলটে গেলেন কেন? এটাকেই তিনি প্রতারণা বলছেন।  ডেভিড হাট আরও খবর দিচ্ছেন ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাথিউ [Matthew Pottinger] এর উদ্ধৃতি টেনে বলছেন “ইইউ এর এই আচরণে আমরা আমেরিকার উভয় দল এই ঘটনায় আমরা স্তম্ভিত ও হতবাক”[Leaders in both US political parties and across the US government are perplexed and stunned that the EU is moving towards a new investment treaty right on the eve of a new US administration.”]।
    এইবার পালটা ইইউ এর দিক থেকে জবাব বক্তব্যও তুলে ধরেছেন ইইউ এর ট্রেড কমিশনারকে উদ্ধৃত করে ডেভিড হাট লিখছেন, কমিশনার বলেছেন CAI  চুক্তিতে স্বাক্ষর করে আমরা এখন আমেরিকার সমান হলাম” [CAI deal as a “leveling up” with the US on trade terms relating to China]। কেন একথা? কারণ ইউরোপ অনেক আগে থেকেই ট্রাম্পের উপর ক্ষুব্ধ ছিল। কারণ তিনি চীনের সাথে বাণিজ্যযুদ্ধ করে গেছেন। কিন্তু তা থেকে বের হতে ট্রাম্প যে সমঝোতা আলোচনা করেছিলেন সেখানে তিনি ইইউ-কে জানিয়ে তা করেন নাই। যদিও ঐ আলোচনা প্রথমপর্বই কেবল শেষ হয়েছিল এমনকি ঐ অংশ পর্যন্ত  চুক্তিও সম্পন্ন করা হয়েছিল, তবে এর পরে আলোচনা আর আগায় নাই। সব ভেঙ্গে পড়েছিল। ইইউ এর ট্রেড কমিশনার সেই উপেক্ষারই রেফারেন্স তুলে বলছেন এইবার আমরা আমেরিকার সমান হলাম।  এরকম ইইউ-আমেরিকার অনেক অভিযোগ-পাল্ট অভিযোগের কথা আছে ডেভিডের এই রিপোর্টে।
    কিন্তু এসব কিছুকে পিছনে ফেলে সত্য এখন একটাই, ইইউ-চীন চুক্তি স্বাক্ষর করে ফেলেছে এবং দুপক্ষই এতে ভীষণ সন্তুষ্ট। এরই এক প্রকাশ হল, স্বাক্ষর শেষে ইইউ এর পক্ষ থেকে চীনের প্রশংসাসূচক একটা শব্দই বহু কথাই বলে দিয়েছে। তা হল, ইইউ এই চুক্তিকে চীনের দিক থেকে করা ‘অতুলনীয় এক প্রতিশ্রুতি’  [unprecedented commitment] বলে মনে করছে যা চীনে ইইউর বাণিজ্যকে নিশ্চয়তা ও আগাম বোঝা সম্ভব – এমন সব আস্থা দিবে [provide commercial certainty and predictability, with wide access for an array of European companies to the hitherto heavily restricted Chinese market.]। আসলে এই চুক্তি চীনের সম্পর্কে পশ্চিমাদেশে যেসব বদ্ধমুল ধারণা ছিল যেমন চীনে সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো পণ্যে মূল্য বাণিজ্যিকভাবে নির্ধারিত হয় না, সরকারি হস্তক্ষেপে নির্ধারিত হয়। অথবা শিল্প অথবা কৃষি পণ্যে সখানেই কত ভর্তুকি দেয়া হয় তা গোপন রাখা হয় [regulate China’s state-owned enterprises and transparency on subsidies.] কিন্তু এই চুক্তির পরে ইইউ নেতারা খুশি যে এখন এসব তথ্য সবই তারা সহজেই জানতে পারবেন।

    সবশেষে দাড়ালো কী?
    এতদিন চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হবে এটা জানা ছিল কিন্তু এর পথে বাধাগুলো কো করে সামলাবে বা অপসারণ করবে তা স্পষ্ট ছিল না। এই চুক্তি বলে দিচ্ছে চীন কী করে তা করতে যাচ্ছে। আর এটা সম্পন্ন করতে চীনের একটা সাধারণ ফর্মুলাও অনুসরণ করতে দেখা যাচ্ছে। সেটা হল, সবাইকে আলাদা আলাদা ডিল কর বা সামলাও। ইইউ-চীন চুক্তিটা দেখিয়ে দিল ট্রাম্প এবং এমনকি বাইডেনও  কতটা নাদান। ভুয়া জাতিবাদ আর ভুয়া আমেরিকা ফাস্ট সমুলে ত্যাগ করে আমেরিকার উচিত ছিল ইইউ-কে সাথে রেখে একটা পক্ষ হয়ে এরপর চীনের সাথে ডিল করতে বসা। অথচ ট্রাম্প চার বছর চলল ঠিক এর উলটা অবস্থান নিয়ে, ‘একলা চল’। আবার বাইডেন ক্ষমতায় আসবার আগে থেকেই এই দুর্বল জায়গাটা নিয়ে কাজ করা পরিকল্পনা নেয়া উচিত ছিল যে কী করে এই খামতি মোকাবিলা করবে। এমনকি ডেমোক্রাট দল হিসাবেও ইইউ এর সাথে কথা আগিয়ে রাখা দরকার ছিল। এখন যা হল তাতে এটা প্রমাণিত যে বাইডেনের টিমের বাস্তবতা সম্পর্কে কোন ধারণাই নাই; দুর্বলতা বা সবলতার কোন দিক সম্পর্কেই নাই। ওদিকে এর আগে চীন  RCEP এর বাণিজ্য চুক্তি করেছে। তাতে পুরা এশিয়ার যত মাতবর আছে – জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া অষ্ট্রলিয়া, নিউজিল্যান্ড আর সাউথ চায়না সি-এর আশাপকাশের কেউ বাকি নাই। অর্থাৎ এদেরকে ডিল করেছে আমেরিকা বা ইইউ এর বাইরে রেখে আলাদা করে।  এখন বাইডেন ক্ষমতার শপথ নিলে তাকেও চীন বঞ্চিত করবে না। কিন্তুঞ্জোট পাকাতে দিবে না। দরকষাকষির ক্ষমতাও ছেটে দেওয়া হয়ে গেছে। আমেরিকা যে গ্লোবাল নেতার মত ইইউ ও RCEP এর সদস্য দেশগুলোকেও নিজের সাথে রেখে এইবার চীনের সাথে বসবে বা ডিল করবে – সেই বাস্তবতাটাই চীন ভেঙ্গে দিয়ে আসছে ও ফাইনালি দিলও। অর্থাৎ চীনের গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে বাধা দিবার কোন জোট বা কোন রাষ্ট্রের অবস্থানের আর সুযোগ থাকল না। এখন সবার স্বার্থই চীনের সমৃদ্ধির মধ্যে, চীন দুর্বল হলে নয়।  অতএব আমরা বলতে পারি এটাই পারফেক্ট পরিস্থিতি চীনের গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হবার পথের।

    ভারত কোথায়?
    কিছু একটা কথা বাদ পড়ে গেল। কী সেটা? ভারত কোথায়? সে কী পেল, তার অবস্থান কই? ভারতই আসলে সমুলে বাদ পড়ে গেল, একেবারে ওয়াইপ আউট, মুছে গেল। একমাত্র পথ খোলা থাকল, লজ্জার মাথা খেয়ে কম্প্রোমাইজ; মাফ চেয়ে চীনের অনুগ্রহ লাভের পথ পাওয়ার অপেক্ষা করতে হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০২ জানুয়ারি ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “ভারতের দিবাস্বপ্ন আর ইইউ-চীন চুক্তি” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]