Tag: GOUTAM DAS

  • মোদী-হাসিনার ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’, কে কী পেল

    মোদী-হাসিনার ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’, কে কী পেল

    গৌতম দাস

    ২১ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০৫  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3iQ

    নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বৈঠক

    [আগের কথা সবার আগে। যারা এই ভার্চুয়াল বৈঠককে হাসিনা আবার ভারতের কোলেই উঠতে যাচ্ছে কিনা অথবা, উঠল কিনা সেটা বুঝতে চোখ-কান খাড়া করেছেন, তাঁদের বলে রাখি পরিস্থিতি আবার সেদিক কোন পক্ষ থেকেই নিবার জন্য এই বৈঠক ছিল না। সে অর্থে এটা বলা যায় রুটিন। এখন বাস্তবতাটাই আর তেমন নাই, ফেবারেবলও নয় তা দুপক্ষই মনে মনে স্বীকার করে নিয়েছে। এটাই সবচেয়ে বড় ঘটে যাওয়া  পরিবর্তন। বাইডেনের জিতে আসাটাই এসব পরিবর্তনের মূল কারণ। বাইডেন উত্থান ফেস করতে হাসিনার জন্য কাজে লাগবে – ভারত এখন তেমন কোন শক্তিই নয়। বরং, চীনই কিছু কাজে আসতে পারে, তুলনামূলক অর্থে এক বেটার সম্ভাবনা। এই হল সেই নির্ধারক রিডিং। যা সবকিছুকে বদলে দিয়েছে এমন, এক ড্রাইভিং ফোর্স!  দুই, এটা খুব সহসাই আর পুনরায় ভারতমুখি সেদিকে যাচ্ছেই না। তিন, ঘটনা-পরিস্থিতি সম্ভবত আর কোনদিনই ২০১৮ সালের আগের মত হবে না, যাবে না। “ও দিন গুজর গয়া! ফুলষ্টপ! ]

    গত ১৭ ডিসেম্বর মোদি-হাসিনা দুই প্রধানমন্ত্রীর এক ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’ অনুষ্ঠিত হয়েছে; মানে কার্যত যার যার দেশের অফিস রুমে বসেই ঐ বৈঠকটা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তারা পরস্পর কথা বলেছেন। যদিও দু’দেশের পাবলিক টিভিতে এই অনুষ্ঠান যেভাবে ও যতটুকু আমাদের সামনে আনা হয়েছে তাতে পুরাটাই কাঠপুতলির শো-এর মত খুবই আড়ষ্ট আর যান্ত্রিক মনে হয়েছে। এদিকে ভার্চুয়াল হলেও তা ‘শীর্ষ বৈঠক’ বা সামিট যখন বলা হচ্ছে তখন দু’পক্ষেরই চাওয়া-পাওয়াও অবশ্যই ছিল অন্তত ‘কিছু’।

    বাংলাদেশের দিক থেকে বললে, ভারতের প্রতি আমাদের সরকারি অবস্থান ও সময়টা যাচ্ছে এখন ভারতের জন্য খুব ‘করুণ’ এবং ‘দুঃসময়ের’ বলা যায়। এমন অভিমুখের শুরু ২০১৮ সালের শুরুর দিক থেকেই; আমাদের সরকারেরও ‘মন-বাঁধা’ সে সময় থেকেই। আর এর স্পষ্টতা অ্যাকশনে প্রকাশ পেতে থাকে ২০১৮ ডিসেম্বরের “নৈশ-ভোটের” সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই। কথাটা এভাবে বলা যায়, শেখ হাসিনা চীনের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে চলতি সরকারের আমলের শুরু থেকেই কখনো পিছপা হননি। সেই ২০১০ সাল থেকেই তিনি লেগে আছেন, চীন সফর করে যাচ্ছেন। সফর বিনিময়ও হচ্ছে। তবে সম্পর্কের মাত্রার দিক বিচারে প্রধানমন্ত্রী এগিয়েছেন ততটুকু যতটুকু ভারত এলাও করেছে অথবা ভারতের কড়া আপত্তি পেরিয়ে তিনি ‘ছাড়’ আনতে পার পেয়েছেন। সেটাই তিনি এবার গত ২০১৯ জানুয়ারির শুরু থেকেই অবাধে করা শুরু করে গেছেন যেন; যতটুকু বাস্তব কাজকর্ম দেখে অনুমান করা যায়- এই অর্থে বলা যায়, বর্তমান সরকার যা কিছু ভারতকে দেয়ার ব্যাপারে সরকারি কমিটমেন্ট দিয়ে রেখেছিলেন কেবল তাই শেষ করা হচ্ছে, কিন্তু নতুন কমিটমেন্টে তেমন আগ্রহ নেই। অবস্থাদৃষ্টে ব্যাপারটা এমনই মনে হচ্ছে। এ ছাড়া ঘটনার ফোকাস আসলে এদিকটায় নয়, বরং উল্টা দিকে। ব্যাপারটা বাজারে আসছে বরং এভাবে যে, সরকার কতটা গভীরভাবে চীন-ঘনিষ্ঠ এর খোলাখুলি বহি:প্রকাশ থেকে। এথেকেই এবার অর্থ তৈরি হচ্ছে যে তাহলে সরকার প্রধান আর আগের মত ততটা ভারত ঘনিষ্ঠ থাকতে চাইছেন না। তবে এ ছাড়াও আরেকটা বিবেচনা সম্ভবত তিনি আমলে নিচ্ছেন। আমরা জানি, মুজিব খুন হয়ে যাওয়ার পরে একসময় শেখ হাসিনা নিরাপত্তার তাগিদে প্রায় পাঁচ বছর ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলে কৃতজ্ঞতা বা আগামীর দিক বিবেচনা যেমন মানুষের মধ্যে কাজ করে তেমন কিছু একটা হয়তো আছে বলে মনে হয়েছে। ফলে একধরনের সফটনেস এখনো থাকলেও সেটা অবশ্য কোনোভাবেই ২০০৯ সালের মত আর নয়। সেই পাতার পাঠ পার হয়ে গেছে, আর ফিরে পাবার সুযোগও নাই। তবু সর্বোপরি আমাদের পরিষ্কার থাকা ভাল যে, প্রতিবেশী ভারতের সাথে একটা স্বাভাবিক বা রুটিন সম্পর্ক তো থাকবেই যেটা নিয়ে আলোচনার তেমন কিছু নাই। ভারতের সাথে বাড়তি বা “বিশেষ সম্পর্কটা” আর থাকবে কি না- এটাই কেবল আলোচনার।

    সম্পর্ক ঢলে পরছে, নতুন এক বাস্তবতার অনুভবঃ
    তবে আমাদের সবাইকেই মানতে হবে এবারের  ‘ভার্চুয়াল বৈঠকে’ একটা নতুন ব্যাপার উঠে এসেছে। তা হল, এবারের কয়েক ঘন্টার আনুষ্ঠানিকতায় একটা নতুন অনুভব সব সময় বজায় থেকেছে যে, ভারত বাংলাদেশের মন পাওয়ার চেষ্টা করছে (দ্য প্রিন্টের জ্যোতি মালহোত্রা নিজেই এটা স্বীকার করে বলেছেন, ভারত তার “দেমাগ” বা ওভারউয়েনিং ইনফ্লুয়েন্স খুইয়েছে’ [replaced India’s overweening influence in the region] )- যেটা এবার সব ঘটনার সারফেসে হাজির হচ্ছিল। যদিও এই অঞ্চলে ভারতের নাকি প্রভাব ছিল বলে যে গল্প দেয়া হচ্ছে তা শত্ভাগ ভিত্তিহীন। চীন ঠেকানোর মজুরি হিসাবে আমেরিকার দেয়া উপহার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া – এই এটা ছাড়া এশিয়ায় ভারতের প্রভাব বলতে কোনদিনই কিছু ছিল না।  তবে নেহেরুর কিছু স্বপ্ন-কল্পনায় পোলাও-কোরমা খাওয়ার গল্প ছিল আমরা শুনেছিলাম যে, বৃটিশেরা ভারত ছেড়ে চলে গেলেও যেনবা নেহেরু সাব’কে কল্পিত ভাইস-রয় বা রাণীর প্রতিনিধিত্ব দিয়ে গেছিলেন। কল্পনায় নেহেরু এমন ভাব ধরে চলতেন অবশ্যই। আর তা থেকে নেহেরুর মধ্যে কলোনি-দখলদার এটিটুড এর যাত্রা! কাজেই এশিয়ার ভারতের প্রভাব বলতে এক মিছা স্বপ্ন-প্রভাব কথাটাই আমরা অনেকবার শুনেছি। নিজ বা অন্যদেশে প্রচুর বিনিয়োগের ক্ষমতা এটাই কোন রাষ্ট্রকে অন্যদেশের উপর প্রভাব-ধারী রাষ্ট্র হিসাবে হাজির করে। আর ঠিক এই  বিনিয়োগ সক্ষমতা জিনিষটাই ভারতের কোনদিন ছিল না, হয় নাই।

    ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’ থেকে আশা করার আমাদের তেমন কিছু ছিল নাঃ
    এসব দিক বিচারে ভার্চুয়াল বৈঠক থেকে বাংলাদেশের বিরাট কিছু পাওয়ার আশা হাসিনার ছিল তা মনে হয় না। কেবল স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পুর্তিতে ও তা পালনে ভারতের সাথে একটা অনুষ্ঠান করে আনুগত্য-প্রতিদান জানানো। আর আনুষ্ঠানিকভাবে যেটাকে সাত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা বলা হয়েছে এরই একটা হল, “নয়া দিল্লি জাদুঘরের সাথে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের সহযোগিতা”- এ নিয়ে একটা সমঝোতা স্মারকে হাসিনার আগ্রহ থাকতে পারে। এমন এক ব্যবহারিক কাজের প্রতি সম্ভবত সরকারের যা আগ্রহ ছিল। সেটার আর বিস্তারিত দিক হল, মহাত্মা গান্ধীর সমান্তরালে শেখ মুজিবকে নিয়ে এসে একটা ‘জাদুঘর শো’-এর আয়োজনের ব্যাপার আছে এখানে তাই। এ ধরনের কিছু ছাড়া ছাড়া বিষয় ছাড়া ঢাকা বা হাসিনার পক্ষ থেকে খুব কিছু আশা ছিল তা মনে হয়নি। বাকিগুলো সবই সংখ্যা বাড়িয়ে দেখানোর ডেকোরেশন পিস।
    তবে স্পষ্ট করেই আমরা সবাই নিশ্চিত থাকতে পারি, তিস্তার পানিতে আমাদের দেশের ভাগ বুঝিয়ে দেয়ার কোনো ইচ্ছা-পরিকল্পনা ভারতের কোনো দিন ছিল না, আজও নাই, আগামীতেও হয়তো হবে না যদিনা আমরা তাদের বাধ্য করার মেকানিজম বের করতে পারি।

    বিপরীতে দিশা-হারানো ভারতঃ
    এর বিপরীতে ভারতের অবস্থা ছিল বেদিশা, অপ্রস্তুত। তারা হয়ত বুঝছেন, না-বুঝার কারণ নাই বলে যে, এ’আমলে এসে বাংলাদেশ ক্রমশ তাদের ‘হাতের বাইরে’ চলে যাওয়া শুরু করে দিয়েছে এবং যাবেই। যেমন মিডিয়ার কথা যদি ধরি, ভারতের নিজের মিডিয়াগুলো একমত হতে পারেনি – কেন এই ভার্চুয়াল বৈঠক হচ্ছে। বরং অনেককেই মন্তব্য করতে দেখা গেছে যে, তারা লিখেছেন, গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের শীর্ষপর্যায়ের সাথে বাংলাদেশের তেমন যোগাযোগ বা সাক্ষাৎ নেই। অন্ততপক্ষে সেটা তো ভেঙেছে, এটাই নাকি ‘অনেক অর্জন’। এমন প্রায় একই অবস্থা বাংলাদেশেরই এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের। বুঝা যাচ্ছে তিনি ঢাকার এমবেসির ভালই প্রভাবাধীনে উটে বসেছেন। তাই যেন তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন কথা যে তাঁর কথার তালমিল  না থাকলেও জোর করে হলেও ভারতের স্বার্থের পক্ষে তাঁকে কথা বলতেই হবে। ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক ভাল হতেই হবে; এমনকি ভাল না হলেও ভাল বলতেই হবে। এমনই করুণার দশা তাঁর। বিবিসিকে তিনি বলছেন, “,……পানি বণ্টন, সীমান্ত প্রাণহানি, রোহিঙ্গা সংকট এবং করোনাভাইরাস মোকাবিলার মতো বিষয় আলোচনায় উঠতে পারে……তবে সেটা হোক বা না হোক, নানা ইস্যুতে দুই দেশের সমঝোতা স্বাক্ষর, বৈঠক ইতিবাচকভাবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন। তিনি আরও বলছেন,

    “যে সমঝোতাগুলো স্বাক্ষরের কথা বলা হচ্ছে, আপাত: দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বা স্পর্শকাতর যে বিষয়গুলো রয়েছে, তার তুলনায় এগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে আমরা যে ট্রেন্ড দেখেছি,সেটা হলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা। সেটা কিন্তু অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ”।

    অথচ ঘটনা হল উলটা। ভারতের সাথে আমাদের অধীনস্ততার সম্পর্ক সেটা তো “দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ” না হলেই তো বরং ভাল! তাই নয় কি? বাস্তবতা হল, ভারত-বাংলাদেশের কথিত “ভাল সম্পর্কের” তাল কেটে গেছে অনেক আগেই। বড় কথা হাসিনা আর সেটা নিয়ে আমলও করছেন না। এখন সবকিছু চলছে “দেখন শোভা” আকারে। এই হল বাস্তবতা।
    ওদিকে দ্য হিন্দু লিখেছে, “অবকাঠামো ও কানেক্টিভিটি প্রজেক্ট এই ভার্চুয়াল বৈঠকের ফোকাস” [Modi-Hasina summit to highlight infrastructure, connectivity projects]। এরাও আসলে দিবাস্বপ্নে আছেন। কারণ বাস্তবে এনিয়ে তেমন কোন উচ্চবাচ্যই হয়নি। আর আসলে এটা ছিল আসামকে রেলওয়ে করিডোর আরো পোক্তভাবে দেয়ারই একটা প্রকাশ, যেটা প্রকৃতপক্ষে শেখ হাসিনারই আগের কমিটমেন্ট এখন বাস্তবে পূরণ করে দেয়া। ভারতের বাকিরা, মানে সরকার ও মিডিয়া- এরা যেমন বাড়িয়ে বলা ছাড়া কোন ছাড়া কোনকথাই বলতেই পারেন না, তেমনি কিছু একটা যার যার মন-মত বলেছেন।
    যেমন আরেকদল অন্ধের হাতি দেখার মত বলছেন, মোদীর ভারতের ‘পড়শির গুরুত্ব’  নাকি সর্বাগ্রে বা (Neighbor First) – এই বলে নাকি মোদীর এক নীতি আছে, আর এর উপরেই নাকি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দাঁড়িয়ে আছে। এসব শিরোনাম করেছেন অনেকে যেমন, দ্য প্রিন্ট [The Print], ওয়াইর [WIRE], ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস [Indian Express] বা থিংকট্যাংক ওআরএফ [ORF] এর মতন যারা তারা শিরোনাম করেছে, “নেইবার ফাস্ট” কথার মিথ্যা বাকচাতুরী থেকে। অথচ মোদীর এই নীতির ব্যবহারিক কার্যকারিতা কোথায় আছে আর সেটা  কী তা তারা কেউ বলতে পারবেন না। এমনকি এটাও তারা দেখতে পান না যে, তাদের “মহান ভারত” সামান্য কয়েক মাসের জন্য কয়েক টন পেঁয়াজের বাড়তি শুল্কের লোভও ছাড়তে পারে না; আগে থেকে বলতেও পারে না ঠিক কী করতে চায় পেঁয়াজ নিয়ে; বাংলাদেশের সাথে এনিয়ে একটা নিয়ম বা কমিটমেন্টেও আসতে পারে না। অথচ বাংলাদেশের দিকে দেখেন, যে আসামের জন্য বিনা পয়সায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের আসামে তেল পাইপলাইন, গ্যাস পৌঁছে দেয়া, বিদ্যুতের করিডোর, সড়ক, নৌ-করিডোর, বিনা পয়সায় বাংলাদেশের তিন বন্দর আসামে ব্যবহার করা হবে এবং প্রায়োরিটিসহ ইত্যাদি। অথচ সেই আসামই আবার ‘মুসলমান খেদাও’ এর আন্দোলন করবে, এনআরসি করবে! কিন্তু এরা সকলে মুখে বলবে সবই নাকি ‘পড়শি আগে’ বলে মোদীর নাকি এক নীতি আছে সে অনুযায়ী চলছে। আসলে তামাশার আর শেষ নেই! তারা কি কেবল তামাশাই ভালোবাসেন?
    আর এ ব্যাপারে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে দ্যা প্রিন্ট বলে এক ওয়েব মিডিয়া। এখন করোনাকালে ভারতে মিডিয়ায় কর্মীদের বেতন দেয়াই কঠিন হয়ে গেছে। তাই যেন এই মিডিয়া এবার সরকারি মুখপাত্র সেজেছে। এছাড়া, সাথে পেজ বিক্রি বা সরকারি (গোয়েন্দা) প্রপাগান্ডার খেপ মারার কাজে লেগে পড়েছেন। ‘ভার্চুয়াল বৈঠক’ প্রসঙ্গে এরা কমপক্ষে তিনটা রিপোর্ট করেছেন। এর মধ্যে একটা মারাত্মক ভুল এবং না বুঝা তথ্য দিয়ে লিখেছেন জ্যোতি মালহোত্রা [Jyoti Malhotra]।
    সাধারণভাবে বললে, ভারতীয় মিডিয়া-কর্মীদের আত্ম-জিজ্ঞাসাও নাই। কোনো যাচাই বা জিজ্ঞাসাই নেই যে ভারত কী কোন গ্লোবাল অর্থনৈতিক শক্তি? তা কিভাবে বা কবে থেকে? আসলেই কী ব্যাপারটা সত্যি – এই যাচাইয়ের সাহস নাই। বরং উলটা তাদের ধারণা এটা যেন দাবি করার ব্যাপার। তারা জোরসে দাবি করলে বা ভাব ধরলে যেন তারা তা হয়েই যাবে! অথচ স্বাধীনভাবে যাচাই করলে বা সামান্য একটু চোখ-কান খুলে রাখলেই তাদের না বোঝার কোনো কারণ নাই যে, ভারত নিজেই অবকাঠামো ঋণ-গ্রহণকারী দেশ, এখনো। এই গণ্ডিই পার হয় নাই ভারত। আর সবচেয়ে বড় পরিমাণ এমন ঋণ তারা এখনো পেয়ে চলেছে চীন থেকে। অথচ ভারতের সরকার ও মিডিয়া ভাব করতে চায় উলটা – যেন ভারত বাংলাদেশের বিরাট ঋণদাতা। ব্যাপারটা যে কারও বুঝতে পারার সহজ উপায়টা হল, বাংলাদেশে ভারতের কোন প্রকল্প – এর মূল্যের দিকে নজর ফেলা। কারণ, দশটাকার হলেও সেটা প্রকল্প আর দশ বিলিয়ন ডলারের হলেও সেটা প্রকল্প। এমনিতেই গত ১০ বছরে ভারতের এমন প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে এর (কমিটমেন্ট দেয়া) দশভাগ অর্থও এখনো ছাড় করা হয়নি। ভারত-প্রিয় প্রথম আলো লিখছে, “তিন দফায় ৭৩৬ কোটি ডলার ঋণচুক্তির মধ্যে এখন পর্যন্ত অর্থছাড় হয়েছে মাত্র ৭০ কোটি ডলার”।  এছাড়াও এসব ভারতীয় ঋণের মুখ্য শর্ত হল, প্রায় সমস্ত পণ্য ও সেবা (মানে শ্রমিকও) ৮৫% ভারত থেকেই কিনতে হবে। মানে দাদা “…খেয়ে এসেছেন না গিয়ে খাবেন” তত্বের একদম খাঁসা প্রয়োগ।  মূলত একারণের ঋণের অর্থছাড়েও অগ্রগতি নাই। ফলে ভারতের সবদিকেই লাভ আর লাভ! এছাড়াও ভারতের এমন প্রকল্পে দেখা যাবে, প্রকল্পের মোট মূল্য ভারত হিসাব করে থাকে হাজার ডলারে। অথচ চীনের কথা বাদই দিলাম পশ্চিমাদেশের সবচেয়ে কম সামর্থের রাষ্ট্রটাও মিলিয়ন ডলারে ছাড়া দাতা বা ঋণ-প্রকল্পের কোন মূল্য হিসাব করে না। মানে হল, ইত্তেফাকের আনোয়ার হোসেন মঞ্জু যদি নিজ ভান্ডারিয়া উপজেলায় পানির ট্যাপকল বসানোতে ভারতের ৫ কোটি টাকা ব্যয়কে “বাংলাদেশে ভারতীয় প্রকল্প” বলেন,  সেটা তো যার আত্ম-লজ্জাবোধ নাই তাকে ঠেকানো যাবে না। শুধু তাই না এজন্য মঞ্জু সাহেব তিনি নিজে যদি হাইকমিশনারকে সাথে নিয়ে ভান্ডারিয়া ভ্রমণ করেন, তাতে এনিয়ে কিছু বলতে আমাদেরই লজ্জা লাগবে।

    এক জ্যোতি মালহোত্রাঃ
    দ্যা প্রিন্টের জ্যোতি মালহোত্রা তাঁর লেখায় বাংলাদেশের পদ্মা ব্রিজ তৈরি সম্পন্ন করার প্রসঙ্গ তুলেছেন। কথা সত্য, পদ্মা ব্রিজ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাথে প্রথম দিকে দুর্নীতির অভিযোগ (অনেক পরে বিশ্ববাংক নিজেই ঢাকা সরকারের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ কানাডার আদালত থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল।) তারা তুলেছিল। আর সেই তোলার পর থেকে শেষে পদ্মা প্রকল্পই বাতিল হয়ে গেলে সে সময় ভারত নিজেই আগ বাড়িয়ে বাংলাদেশকে এক বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অথচ এখন পর্যন্ত এনিয়ে ভারত আর পরে কখনো কথা এগোয়নি। কিন্তু জ্যোতি মালহোত্রা নিজে থেকেই তাদের রাজনীতিবিদ ও সরকারের প্রতি এমন গাধামির কমিটমেন্ট করা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু তা করেছেন সাথে কিছু ভুয়া তথ্যসহ। জ্যোতি তাঁর লেখায় শিরোনাম করেছেন, ‘ভারত না, চীন বাংলাদেশে ব্রিজ বানিয়েছে; কিন্তু মোদী সরকার মনে করছে সবকিছু এখনো হাতছাড়া হয় নাই” [China, not India, builds a bridge in Bangladesh, but Modi govt believes all is not lost yet”]। মালহোত্রার ধারণা ও ভাবটা হল তিনি এমন শিরোনাম করে বিরাট এক “বুদ্ধিদীপ্ত জ্ঞানের কথা” বলেছেন।
    এখানে ‘ব্রিজ’ বলতে তিনি পদ্মা ব্রিজ বুঝিয়েছেন। কিন্তু সত্যটা হল, চীনা অর্থে বাংলাদেশ পদ্মায় মূল ব্রিজটা বানায়নি। বরং এই মূল অংশের পুরোটাই বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থ। অবশ্য এর নির্মাণ ঠিকাদার চীনা এক কোম্পানি China Railway Major Bridge Engineering Group Co, Ltd (MBEC)। কিন্তু সাবধান। তারা এই মূল ব্রিজের কেবল ঠিকাদার, কোনো অর্থদাতা নয়। আমরা আশা করব ও ধরে নিচ্ছি যে ভারতের বাকি মিডিয়াকর্মীরা ঠিকাদার আর ঋণদাতার ফারাক নিজে বুঝতে পারেন, এমন যোগ্যতা তাঁদের আছে। এছাড়া মূল ব্রিজের উপর দিয়ে গাড়ি চলার ব্যবস্থা থাকলেও  এর নিচ তলায় আলাদা করে কেবল রেল প্রকল্পের (রেললাইন পাতা) কাজ সম্প্রতি শুরু হয়েছে। কিন্তু এই অংশের কাজটার জন্য বাড়তি প্রায় ২.৬৭ বিলিয়ন ডলার চীনা ঋণ নেয়া হয়েছে [$2.67b loan deal signed with China]। কিন্তু রেলওয়ের ঠিকাদারও আবার ওই মূল ব্রিজ বানানোর ঠিকাদারই। কাজেই জ্যোতির বক্তব্য সঠিক নয়।
    আবার লক্ষণীয় এই যে, ভারতকে চীনের সাথে তুলনা করা আরেক আহাম্মকি। যদিও সবসময় ভারতের সাংবাদিকেরা সব সময় এটাই করে থাকে। যেমন এনিয়ে শিরোনামে “সবকিছু এখনো হাতছাড়া হয় নাই” জ্যোতির  এমন কথার অর্থ কী? তিনি কী মোদীকে অভিযোগ করে বলছেন, ভারত আমাদেরকে চীনের মত ব্রিজ বানায়ে দেয় না কেন? বা এখনও দিতে পারে? এর মানে ব্যাপারটা কী এতই সহজ যে, মোদী সরকার চাইলে এখনো বাংলাদেশের উপর চীনের মতোই প্রভাব বিস্তার ঘটাতে পারে। অথচ জ্যোতি কথাটা বলছেন কোনো রকম স্টাডি বা পড়ালেখা না করে। প্রভাব-বিস্তারের সক্ষমতা ভারতের কেন নাই তা নিয়ে কোন বুঝাবুঝি না জড়ো করেই। এটাই ভারতীয় সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
    আবার, এই ‘প্রভাব বিস্তার’ কথার মানে কী? পড়শি রাষ্ট্রকে চাপ দিয়ে যেনতেন একটা চুক্তি করিয়ে নেয়া? ভারত-নেপাল অথবা ভারত-ভুটান চুক্তির মত? অথচ কথাটা হল, বড় অর্থনীতির যে রাষ্ট্র চলতি সময়ে সারপ্লাস একুমুলেশন বা উদ্বৃত্ত সঞ্চয়  সবাইকে ছাড়িয়ে বেশি করে চলেছে, সেই আসল প্রভাবশালী রাষ্ট্র। এখনকার ভারত এমন কোন রাষ্ট্র নয়। এটা না হলে সে কখনো দুনিয়ায় প্রধান প্রভাব-বিস্তারি এবং গ্লোবাল অর্থনীতির নেতারাষ্ট্র হতে পারবে না; হবে না। টানা গত ৭৫ বছর ধরে আমেরিকা এসব শর্ত পূরণ করে তবেই নেতা হয়ে টিকে ছিল। এটা জোর খাটিয়ে নেপাল বা ভুটানের উপর নেহরুর নয়া কলোনিশাসক হওয়ার চেষ্টা নয়। সে জন্য পড়াশুনা না করলে ‘প্রভাব বিস্তার’ কথাটার অর্থ বোঝা যাবে না। এরই পরিণতি হল, ভারতে একেকটা নেহরুর জন্ম ও তার ‘কলোনি শাসক’ হওয়ার চিন্তা। যে নেহরুরা মনে করেন দুইটা রাষ্ট্রের মধ্যে একমাত্র সম্পর্ক হল, একটা আরেকটার ওপর প্রভাব বিস্তার করে সেটাকে অধীনস্থ করা বা কলোনি বানানো। তুরস্কের নিউজ-এজেন্সি টিআরটি ভারতকে এই ‘কলোনি বুঝ’ ত্যাগ করতে পরামর্শ দিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ভারত কী এখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় সারপ্লাস একুমুলেশনের রাষ্ট্র? একেবারেই না, মোটেও নয়। এটা জানা ভারতের মিডিয়া বা নেতাদের জন্য কোনো কঠিন কাজ নয়। আর ভারতের সাংবাদিকেরা এর ভাব ধরলে বা ভান করলে এই অর্জনটা হয়ে যাবে না, হওয়া যাওয়ার অইথ এ যায় নয়। তাহলে?

    এ ছাড়া আরো এক বড় অসঙ্গতি হলো, এ যুগে (হিন্দু) জাতিবাদী রাষ্ট্র হয়ে এটা অর্জন করা যাবে না। কারণ (হিন্দু) জাতিবাদ মানেই হলো, ব্রাহ্মণ্যবাদ ও এর জাতপ্রথায় সক্রিয় থাকা এক সমাজ। কারণ এটা দুনিয়ার চরম বৈষম্যের প্রকাশ। তাই এই সামাজিক রীতি বৈষম্যহীন নাগরিক-সাম্য রাষ্ট্রের সাথে স্ববিরোধী সংঘাতপূর্ণ ধারণা। এ ছাড়া জাতিবাদী চিন্তার বড় অনুষঙ্গ হলো, জাতিরাষ্ট্র বা কথিত ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের’ ধারণা। জাতীয় স্বার্থ যে অনুসরণ করে তার পক্ষে সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। কারণ সাংবাদিকতায় ফ্যাক্টসের ওপর দাঁড়াতে হবেই। কথিত জাতির (রাষ্ট্রের) স্বার্থকে প্রধান বিবেচ্য বলে গণ্য করে ফ্যাক্টসের ওপর দাঁড়ানো না-ও হতে পারে। সাংবাদিকতা ক্যাডার সার্ভিসের চাকরি নয়। অথচ ভারতে সবচেয়ে বড় করে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েই ‘ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের সাংবাদিকতা’ করেন দ্য প্রিন্টের সম্পাদকসহ ওই মিডিয়ার সবাই। খবরের সত্য-মিথ্যা নয়, দেশপ্রেমের নামে মালহোত্রাসহ সবাই সাংবাদিকতা করছেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী হিন্দুত্ববাদ যেটাকে জাতির স্বার্থ মনে করবে সেটি প্রকৃত রাষ্ট্রস্বার্থ নাও হতে পারে। কারণ এটা তো আসলে একটা কূপমণ্ডূক দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি। সেটিকে ‘জাতীয় স্বার্থ’ বলে সাংবাদিকরা মানতে বাধ্য হতেই পারেন না।

    জ্যোতি মালহোত্রা আরেক কী কারণে আমাদের ডেইলি স্টারের সম্পাদককে খুব পছন্দ করেছেন মনে হচ্ছে। তিনি এই সম্পাদকের সাক্ষাৎকার (যেটা আসলে সাক্ষাতকার না বলে অনধিকার ও অত্যাচার বলা ভাল) নিয়েছেন। আমরা এর একটাই কারণ অনুমান করতে পারি, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মাহফুজ আনাম বাংলাদেশে আমেরিকার হস্তক্ষেপের পক্ষের সক্রিয় প্রবক্তা ছিলেন। হয়ত সেই সূত্রে। এছাড়া আনাম সাহেব পদ্মা সেতুর মূল কাঠামোর কাজ সমাপ্তির দিনে এবার তিনি প্রধানমন্ত্রীকে এক দেবীর আসনে বসিয়ে গত ১১ ডিসেম্বর এক মন্তব্য-কলাম লিখেছিলেন। সেসব কথাগুলোই আবার জ্যোতি মালহোত্রা তাঁর লেখায় ‘কোট’ করেছেন। যাই হোক, মাহফুজ আনামকে জ্যোতির প্রশ্নে বা সেই উছিলায় দাবি হল – ভারত বাংলাদেশকে ১৯৭১ সালে স্বাধীন হতে সাহায্য করেছে। কাজেই আমরা ভারতকে ফেলে চীনের প্রভাবে যাচ্ছি কেন বা চীনা ঋণে ঢুকতে যাচ্ছি কেন? জ্যোতি সাক্ষাতকার এমন আগ্রাসী ও অসৌজন্যতাপুর্ণ আদব-হীন প্রশ্নে ভরপুর ছিল। যেন তিনি ভারতের হয়ে আমাদেরকে জবাবদিহিতা চাইতে এসেছেন! সোজা করে বললে, এটা আসলে জ্যোতি মালহোত্রার এক দিকে গাধামি প্রশ্নের উছিলায় করা এক বেয়াদবি। অপর দিকে এটা মারাত্মক অনধিকার চর্চা।

    “১৯৭১ সালে সাহায্য” বলে যে ইঙ্গিত জ্যোতি দিচ্ছেন এর মানে কী? আমরা একাত্তর সালে ঐ কথিত সাহায্য নিয়ে ভারতের কলোনি হয়ে গেছিলাম? জ্যোতি কি তাই দাবি করছেন? তাহলে তো আমাদের অভিযোগ-মুল্যায়ন সঠিক যে, নেহরু আমল থেকেই ভারত আদতে একটা কলোনি দখলদার হতে চাওয়া মনোভাবের ও নীতির রাষ্ট্র। অথচ ভারতকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ নিজে একটা সার্বভৌম রাষ্ট্র তাই সে কেন কী করবে, এর জবাবদিহিতা কাউকেই দিবে না। সে প্রশ্নই উঠে না। কাজেই জ্যোতির তার অনধিকার আর গাধামি প্রশ্ন করা বন্ধ রাখা উচিত। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকা যত ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ বিষ ভিয়েতনামে বিমান থেকে ছিটিয়েছে, এর কোনো তুলনা নেই। যার কারণে এখনো ভিয়েতনামি মা-বাবাদের  বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হয়। অথচ এখনকার ভিয়েতনাম-আমেরিকা সম্পর্ক সে সময়ের চীন-ভিয়েতনামের ঘনিষ্ঠতম সম্পর্কের চেয়েও ভালো। কাজেই কলোনি মানসিকতা অবিলম্বে ত্যাগ করে ভারতের সাংবাদিকদের বরং আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্ক নিয়ে তাদের উচিত চোখ কান খুলে পড়াশোনা করা।

    তাহলে মোদী কেন ভার্চুয়াল বৈঠকে এসেছিলেন?
    বাস্তবত এটা আর তার অজানা নয় যে বাংলাদেশ ক্রমেই ভারতের মুঠো থেকে বের হয়ে যাচ্ছে এবং যাবেই। কিন্তু মোদীর সবচেয়ে বড় সমস্যা হল তিনি সেকথা তাঁর ভোটার কনস্টিটিউয়েন্সির কাছে স্বীকার করতে পারবেন না। কারণ তিনিই তার সরকারের সব বৈদেশিক সম্পর্ককে আভ্যন্তরীণ নির্বাচনি ইস্যু করে হাজির করেছেন। বলা ভাল মাখায় ফেলেছেন। তিনি এপর্যন্ত  নিয়মিত দাবি করে গেছেন যে তাঁর হিন্দুত্ববাদের চরম দেশপ্রেমের কারণে তার সরকারের বৈদেশিক সম্পর্কগুলোতে তিনি চ্যাম্পিয়ান। অতেওব এখন তার ধরা খাওয়ার সময়। তাই বাংলাদেশের সাথে তার সম্পর্ক ঢিলা হয়ে গেছে এটা স্বীকার করার সোজা ফল হবে রাহুল গান্ধীসহ বিরোধীদেরকে সাহায্য করা, ফলাফলে তিনি নিজে ভোট হারাবেন। তাই এই ভার্চুয়াল বৈঠক করে তিনি আবার তার ভোটারদের কাছে এটা তুলে ধরে দাবি করবেন যে, না বাংলাদেশ আগের মতোই “ভারতের প্রভাবাধীনে” আছে। তার লাভ এতটুকুই। তবে ভোটে এর প্রভাব মোদীর জন্য অনেক মূল্যবান! সার কথায়, এটা তাই পরস্পরের ‘পিঠ চুলকে দেয়া’র ভার্চুয়াল বৈঠকও বটে!

    তবে “ফুটানির ভাণ্ডটা ফুটা” করে দিয়েছেন তৌহিদ হোসেন। বিবিসিকে তিনি বলেছেন, “…… পানি বণ্টন, সীমান্ত সঙ্ঘাতের মত ইস্যুতে আলোচনা বা সমঝোতা না হলে অন্য এসব ইস্যু ততটা গুরুত্ব বহন করে না” – এমনটাই  মনে করছেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো: তৌহিদ হোসেন।’

    ধুর্ত মিথ্যাবাদী জ্যোতি মালহোত্রাঃ
    জ্যোতি লেখা আর্টিকেল দেখে মনে হবে মোদী যেন তাকে বাংলাদেশে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডার করার জন্য ভাড়া করেছেন। জ্যোতিকে যেন দেখাতেই হবে বাংলাদেশের ভারতের তথা মোদী সরকারের প্রভাব কমে নাই মোদী এখনও ফাইট করে যাচ্ছেন। তাতে কূট, ধুর্তামি বা মিথ্যা বলে হলেও জ্যোতি তা করতে হবে। জ্যোতি লেখার শিরোনামের একাংশে লেখা ছিল এখনও সব শেষ হয়ে যায় নাই [Still, all is not lost]।  এটা বলে তিনি কী বুঝাতে চাচ্ছেন?
    সেটা জ্যোতি তার লেখার ভিতরে বলেছেন এভাবেঃ
    Bangladesh has recently told China to get lost or pay up for the trials of the Chinese Covid vaccine in Bangladesh, while signing an agreement with India’s Serum Institute to buy three crore doses. অর্থা্ৎ তিনি দাবি করছেন – যে চীনা ভেকসিন [SINOVAC বা সাইনোভ্যাক] বাংলাদেশেরও পরীক্ষায় অংশ নেয়া ও শেষে তা পাবার কথা ছিল সেই প্রসঙ্গে – জ্যোতি মালহোত্রার দাবি বাংলাদেশ নাকি চীনকে (বা সাইনোভ্যাক) বলেছে  “হয় দূর হও নাহলে টাকা দেও”। অথচ ফ্যাক্টস হল জ্যোতি তাঁর এই দাবির পক্ষে কোন প্রমাণ দিতে পারেন নাই। এমনকি কোথায় এমন কথা বলেছে তাও তিনি দেখাতে পারেন নাই।  অর্থাৎ তিনি সরাসরি  মিথা প্রপাগান্ডা করেছেন। তাহলে ব্যাপারটা আসলে কী?

    কথাটা হল, সাইনোভ্যাক একটা চীনা প্রাইভেট কোম্পানি হলেও চীনা সরকারের কো-অরডিনেশনে বাংলাদেশের ওর ট্রায়ালের শেষ বা তৃতীয় পর্যায়ে সামিল হবার প্রস্তাব পেয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এই প্রস্তাবের পক্ষে  সময়ে সাড়া দিতে না পারায় সাইনোভ্যাক অন্য দেশকে ঐ জায়গায় সামিল করে নিয়েছে। ফলে বাংলাদেশে অনেক দেরি করে সাড়া দেওয়াতে এবার ফান্ড যোগাড়ের সমস্যা দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশ সাইনোভ্যাকের ভ্যাকসিন পাওয়া থেকে বাদ পরে যায়।

    এরপরে শুরু হয়ে যায় কার ভুল বা ব্যর্থতায় বাংলাদেশ বাদ পড়ল এনিয়ে দোষ ঠেলাঠেলি। আর ওদিকে ভারত ও আমেরিকান মিডিয়াও আগ্রহী হয়ে উঠে চীনকে দায়ী বা ব্যর্থ প্রমাণ করার জন্য। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীও প্রকারন্তরে বাংলাদেশের দায় ঠেলার জন্য  ভারতের মিডিয়াকে নিজের স্বার্থে ফেবারেবল ভাবতে থাকে।

    রয়টার্স সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য গ্লোবাল নিউজ এজেন্সির একটা, কিন্তু ইন্ডিয়ান রয়টার্স এটা বাদে। কারণ, যেকোন ইস্যুতে ভারত সরকারের ভাষ্যের সাথে সাংঘর্ষিক হয় এমন নিউজ তারা তারা যতই সত্য হোক প্রচার করতে পারে না।  তাই এই সাইনোভ্যাক ইস্যুতে ভারত সরকার প্রভাবিত যে নিউজটা বাজারে এসেছে সেখানেও ইন্ডিয়ান রয়টার্স লিখেছেঃ

    Sinovac informed the health ministry in a letter, seen by Reuters, that a delay in approvals in Bangladesh had resulted in funding getting reallocated to trials in other countries.

    ঠিক এই কথাটাই উপরে আমার ব্যাখ্যায়ও আছে। মূল কথা delay in approvals, আমরা সাইনোভ্যাককে অনুমোদন দিতে দেরি করেছি। আর সেই সাথে এতে funding getting reallocated  অর্থাৎ ফান্ড অন্যদেশের নামে স্থানান্তর হয়ে যায়। এদুই কথার সোজা মানে আমাদের সময়ে সিদ্ধান্ত না পারাই সব ব্যররথতার উৎস।

    কিন্তু ইন্ডিয়ান রয়টার্স-সহ ইন্ডিয়ান ও আমেরিকান বেনার নিউজ এই সুযোগে শিরোনাম বা নিউজ করেছে – Bangladesh will not co-fund Sinovac’s vaccine trial। কেন? 

    অনুমান করা যায় বাংলাদেশ বাদ পরার পর বিকল্প কী আছে জানতে কৌতুহল হবে। এর জবাবে ফান্ড যেহেতু নয়া পরিস্থিতিতে মুল সমস্যা তাই ফান্ড যোগাড়ের কথাই তো সবদিক থেকে আসবে। তাই এবার নিজের মান বাঁচাতে ও দোষ ঠেলতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অজুহাত খাড়া করে ভারত ও আমেরিকান মিডিয়াকে অনেক কথার সাথে বলছেন, “বাংলাদেশ সাইনোভ্যাককে কো-ফান্ড করব না” । এতে ভাবটা এমন যেন  সব প্রস্তাব ভেস্তে গেছে হঠাত করে সাইনোভ্যাকের অর্থ চাওয়াতে। এভাবে খবরটা উপস্থাপন করলে ঐ দুই মিডিয়াই চীনবিরোধী মিথ্যা প্রপাগান্ডার সুযোগ তারা নিতে পারে ও তারা নিয়েছে। আর এমন ব্যাখ্যা না হোক এমন কথা টুইস্ট করার কারণে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজের দায় এড়ানোর কিছু সুযোগ পেয়ে যান। কিন্তু তবু ইন্ডিয়ান রয়টার্সকে স্বীকার করতেই হয়েছে মূল সমস্যা – “বাংলাদেশের সময়ে সিদ্ধান্ত না পারা”।
    আর এথেকেই ধুর্ত মিথ্যাবাদী জ্যোতি মালহোত্রা সিদ্ধান্তে গিয়েছেন ভারতের জন্য এখনও সময় আছে [Still, all is not lost]।  আর একেবারেই  বানানো কথা যে বাংলাদেশ নাকি চীনকে বলেছে ,হয় দূর হও নাহলে টাকা দেও। জ্যোতি তবু রেফারেন্স দিয়েছে  ভারতের এক ছোট ওয়েব মিডিয়া লাইভ-মিন্ট থেকে। সেখানে সরাসরি “told China to get lost or pay“–  এমন কোন শব্দ বা বাক্য নাই।

    তো এখন তাহলে বাংলাদেশে ভারতের জন্য সবকিছু হারায় না – কথাটার জ্যোতি মালহোত্রার বিশেষ অর্থ কী হতে পারে? যে ভারত এখন তাহলে ভারত বাংলাদেশকে ভ্যাকসিন সরবরাহ করবে? তাই কী? এটাই কী জ্যোতি মালহোত্রা মোদীকে ম্যাসেজ দিচ্ছেন?

    আগেই বলেছি ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী দেশপ্রেমের মিথ্যা নাটক তাদেরকে বাস্তব থেকে দূরে রাখে। কোন কিছু শিখতেও দেয় না, আগ্রহীও করে নাই। তথ্যের ব্যাপারে তারা গাধা-গরুই থেকে যায়। তথ্য সামনে তাকলেই নিজেই শিখে নেয় না। জ্যোতি মালহোত্রা কী জানেন না ভারতের হয়ে আসা বাংলাদেশকে দুলাখ শিশি কিন্তু কেবল একলাখ মানুষকে দেয়া যাবে এমন ভ্যাকসিনে কী হয়েছে? তিনি নিশ্চয় জানবেন ঐ ভ্যাকসিন ভারতের না, ইউরোপ থেকে প্রতিটা তিন ডলারে কিনে তা তারা বাংলাদেশকে পাঁচ ডলার করে বেচবেন। এই হল ভারতের বাংলাদেশকে কথিত ভ্যাকসিন দানে ভারতের কৃতিত্ব!

    বাস্তবতা হল, দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতা হয়ে থাকার প্যারা বা হেপাও প্রচুর।  চীন হবু নেতা, এছাড়া ফান্ডও যোগাড় করা তার জন্য তুলনামূলক সহজ। তাই একটা আশা থাকবে তবে বাংলাদেশকে পারসু করতে হবে মানে চীনকে হেদায়েত করতে জানতে হবে যেন সে বাংলাদেশের ভ্যাকসিন ফান্ড যোগাড় বা পাবার ব্যাপারটাতে নজর দেয়। আমাদেরকে সাহায্য করে।  আরেকটা হতে পারে পশ্চিমা দাতব্য ফান্ড – বিল গেটস সহ আর যারা এব্যাপারে দাতব্য ফান্ড যোগাড়ের চেষ্টা করছেন, তাঁদের টা।

    আর জ্যোতি মালহোত্রাকে বুঝতে হবে এই হল বাস্তব দুনিয়া যারা বা যেটা ফান্ডের সম্ভাব্য উৎস। বাংলাদেশের ফান্ড লাগবে মানেই বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব বাড়ানোর জন্য দুয়ার খুলেছে তা সত্যি না, বাস্তব নয়। প্লিজ হুশে আসেন! এছাড়া শকুনের বদ-দোয়া বা অভিশাপে সমাজে বেশি বেশি করে গরু মারা যায় না!  যাবে না! কোনদিন তা হবে না!  আপনি বা আমি পছন্দ-অপছন্দ যাই করি কিংবা নাই করি না কেন, তবু চীন গ্লোবান নেতা হবে; চীন সামর্থবান হয়েছে আরও পোক্তভাবে হবে। কারণ এটাই নৈব্যক্তিক (objective reality) বাস্তবতা! কাজেই ঈর্ষা বা হিংসা শেষ করেন, ইতি টানেন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৯ ডিসেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “মোদি কী পেতে ‘ভার্চুয়াল বৈঠক” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

     

  • গান্ধীর সত্য মানে ‘ট্রুথ’ নয়, ফ্যাক্টস

    গান্ধীর সত্য মানে ‘ট্রুথ’ নয়, ফ্যাক্টস

    গৌতম দাস

    ১২ নভেম্বর ২০২০, ২১:৩৬

    https://wp.me/p1sCvy-3i5

    অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে অনেকের মূল্যায়ন আমরা দেখে থাকি; কিন্তু কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গেলে, সেখানে অন্তত কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে তা করা হচ্ছে – তা নিয়ে আমাদের পরিষ্কার থাকা উচিত। না হলে তা যথার্থ মূল্যায়ন বলে বিবেচিত না হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার কোন মানদণ্ডটা সঠিক? সেটা কী এমন যে চোখে আঙুল দিয়ে পাঠককে দেখাতে হবে? না, ব্যাপারটা ঠিক তাও না। কারণ কোন মানদণ্ড অনুসরণ করে মুল্যায়ন করা হলে বুদ্ধিমান পাঠক তা অবশ্যই ধরে ফেলতে পারবেন। কাজেই কী মানদন্ড ব্যবহার করা হয়েছে তা চোখে আঙুল দিয়ে পাঠককে দেখানোটা জরুরি নয়। কিন্তু পরিস্কার মানদন্ড বজায় থাকতে হবে।

    আমাদের পড়া অনেক মূল্যায়নই, সেটা গান্ধীকে (মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী) নিয়েও হতে পারে – তা এমন মানদণ্ডের সমস্যার জালে আটকে থাকতে পারে। তবে গান্ধীর  একাডেমিক লাইফের দুর্বল দিক নিয়ে অনেক নেতি কথা প্রচলিত আছে- যা অনেকের লেখায় আমরা দেখতে পাই। তবে গান্ধী নিজেও বলে গেছেন, তিনি ছাত্র হিসেবে খুবই মধ্যমমানের [mediocre] ছিলেন, মেধাবি ছিলেন না। তবে সেক্ষেত্রেও কারও শিক্ষাগত যোগ্যতা কত দূর, তা জানা দিয়ে তাকে মূল্যায়ন করা সঠিক পদ্ধতি না।

    গান্ধী ব্যারিস্টার ছিলেন। সে জন্য কী তাকে বড় বিদ্যাধারী মানতে হবে? না এমন কোনো মানে নেই। এর চেয়ে বরং ব্যারিস্টার কথাটা আমাদের আর কী ধারণা বা চিন্তার আবহাওয়া তৈরি করে দেয় সে দিকে যাওয়া যেতে পারে। মনার্কি বা রাজতন্ত্রের যুগে কেউই ব্যারিস্টারি পড়েনি, আমরা ধরে নিতে পারি।  কারণ, রিপাবলিক না  অধিকারের ধারণার তখন চল ছিল না; শুরু হয়নি বলে চাইলেও পড়া যেত না। এটা বুঝলে ও মানলে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারি। কারণ ব্যারিস্টার মানে হল সেটা আর রাজতন্ত্র না, তা ছিল আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের যুগের কথা। যেখানে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও উৎস জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার হাতে। মানে সব রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস ওই পাবলিক- এটা শুরুতেই স্বীকার না করে উপায় নেই। এখন গান্ধী মর্ডান রাষ্ট্র, রিপাবলিক ও রিপ্রেজেন্টেশন ধারণাগুলো কতটা বুঝতেন ও মানতেন এগুলো হতে পারে গান্ধীকে মূল্যায়নের একটা পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া।

    দ্বিতীয়ত, গান্ধী সবসময় পকেটে এক খণ্ড গীতার কপি নিয়ে ঘুরতেন বলে জানা যায়। মূলত গীতার ‘সত্য’ তার আকর্ষণের বিষয় ছিল; কিন্তু এই ‘সত্য’ নিয়ে তার বাড়াবাড়ি থেকে বোঝা যায়, তিনি দর্শন পর্যন্ত বা চিন্তার পদ্ধতি কী – ইত্যাদি বিষয়গুলো পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি বা এসব বিষয়ে তার আগ্রহ ছিল এমন ধারণা দেয় না।

    যদিও ‘গীতা’ যাকে আমরা সাধারণভাবে এক থিওলজিক্যাল এক্সপ্রেশন বলে দেখতে ও বুঝতে পারি, সেখানকার কোনো বক্তব্যের ‘সত্য’ মানে এটা আবার  থিওলজির ‘সত্য”। মানে সেটা আইডিয়েল অর্থে ‘সত্য’- ‘কী হওয়া উচিত’ এই অর্থে। কারণ ধর্মতত্ব আইডিয়েল (ideal বা আদর্শ) বিষয় নিয়ে নাড়াচাড়া করে থাকে।

    ইংরাজি ভাষায় ট্রুথ[Truth] আর ফ্যাক্টস[Facts] এই দুটা শব্দেরই আমরা বাংলা করি “সত্য”। যদিও ফ্যাক্টস মানে সত্য – এখানে সত্য বর্ণনা অর্থে সত্য। মানে ঠিক বলছি কীনা এই অর্থ ‘সত্য’ ধারণা।  আর ট্রুথ শব্দটা ধর্মতত্বের সত্য ধারণা।   এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে আমাদের জন্য লক্ষ্যণীয় যে, গান্ধীর ‘সত্য’ আর গীতার ‘সত্য’ ধারণা ও প্রসঙ্গ এক না। বরং গান্ধীর সত্য হল “ফ্যাক্টস”। কাজেই এ নিয়ে এত হৈ চৈ ফেলানোর কিছু নেই। অর্থাৎ কোনো মানুষের চিন্তা যখন খুবই প্রাথমিক স্তরে থাকে, তখনকার আলাপ এগুলো বলা যায়। অথচ এটা নিয়ে গান্ধীর ‘সত্যাগ্রহ’ আন্দোলন বলে বুঝে-না বুঝে কত আড়ম্বর করা হয়েছে। আর তাতে গান্ধীর ‘সত্যের’ সীমাবদ্ধতাই প্রকাশ পেয়েছে আরও ভালোভাবে। কারণ গান্ধীর ‘সত্য’ থিওলজির ধারণার মতো নয়। তাতে পকেটে গীতা রাখা, না রাখায় কোনো ফারাক নেই। তাই বলা যায় গীতার সত্য মানে কোনো থিওলজি বা ধর্মতত্ত্বীয় সত্য ধারণা নিয়ে গান্ধী নাড়াচাড়াই করেননি।

    প্রসঙ্গ আরও আছে। গান্ধী সারাজীবন হিন্দুধর্ম গ্রন্থগুলো থেকে এর নানা তাফসির বা ব্যাখ্যাকর্তা হিসেবে সমাজে হাজির থাকতে চেয়েছেন; কিন্তু এতে ঘোরতর সমস্যাটা হলো যে, আপনি কোন ধর্মের তাফসিরকারী আর রাজনীতিবিদ একই সঙ্গে এটা হতে পারে না। দ্বিধা তৈরি হবে। রাজনীতিবিদ মানেই আপনি সব নাগরিকের জন্য নেতা হয়েছেন, ধর্ম নির্বিশেষে সবাই আপনার ‘কনস্টিটুয়েন্সি’ এটা মেনে নিয়েই রাজনীতিতে যেতে হয়। ‘কনস্টিটুয়েন্সি’ মানে হলো আপনি তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি বা নেতা হতে চান। এই ‘কনস্টিটুয়েন্সি’কে এক সঙ্গে বাঁধা ও গড়াই তো রাজনীতি; কিন্তু গান্ধী ‘কনস্টিটুয়েন্সি’ ভঙ্গ করেছেন। হিন্দুধর্ম গ্রন্থগুলোর তাফসিরকারী হয়ে বক্তৃতা দিয়ে বুঝিয়েছেন যে, তিনি কেবল হিন্দুদের জন্যই রাজনীতিবিদ। তাও আবার হিন্দুদের সবাই নয়। কেন? সেখানেও বিভক্তি টেনেছেন। কেবল সেসব হিন্দু যারা তার করা তাফসিরের অনুসারি ভক্ত বা সঠিক মনে করেন, কেবল তাদের। কাজেই তিনি ভারত স্বাধীনকারী রাজনীতিবিদ হতেই পারেন না। এ ক্ষেত্রে তিনি ন্যূনতম ধরনও মানেননি। ফলে তিনি এ সেক্টরে অযোগ্য।

    তাহলে কী আমি ধর্ম আর রাজনীতি আলাদা করতে পরামর্শ দিচ্ছি? একেবারে তা না কিন্তু। সোজা জবাবটা হল, যে কোনো থিওলজি মানেই হলো তা আর রাজনৈতিক পরিভাষায় হাজির থাকে না। এছাড়া কোন একটা থিওলজি মানেই হল তা আর সার্বজনীন অর্থাৎ ধর্মনির্বিশেষে সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। তা কেবল নির্দিষ্ট কোন ধর্মের অনুসারীদের জন্য প্রযোজ্য। তবে থিওলজির গভীর জ্ঞানের কথাগুলোকে ঠিক রেখে শুধু পরিভাষা বদলে নতুন করে রাজনৈতিক পরিভাষায় স্থাপন করে সার্বজনীন রূপে সব নাগরিকের জন্য অবশ্যই হাজির করা যাবে। বা তা করা উচিত; কিন্তু এমন কোন যোগ্যতা গান্ধীর ছিল বলে আমার জানা নেই।

    সবশেষে বলবো গান্ধীর যুগের সবাই ডুবেছিল জাতি বা নেশন ধারণার কারণে- যা তাদের অযোগ্য করে দিয়েছিল। এ নিয়ে সংক্ষেপে বলব। তারা সবাই আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র বলতে এই জাতিরাষ্ট্রই বুঝতেন। তাও আবার নেশন বলতে কোনো না কোনো ধর্মীয় অর্থে জাতি, যেমন ব্রিটিশ জাতি মানে তারা বুঝতেন ‘এঙলো ক্যাথলিক খ্রিস্টান’ ধর্মীয় নেশন। তাই এরই অনুকরণে তারা ভারতেও হিন্দু ধর্মীয় জাতির এক জাতিরাষ্ট্র- এমন এক রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্ন মনের ভেতরে পুষে নিয়েছিলেন।

    তবে ব্যাপারটা আরও একশ’ বছরের পুরনো। গান্ধী ভারতের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ১৯১৪-৫ সালের দিকে। এর একশ’ বছর আগে ১৮১৫ সালে রামমোহন রায় প্রথম ভারতে জাতিরাষ্ট্রের ধারণা নির্মাণ করেছিলেন। তিনিই প্রথম ব্রিটিশদের বুঝেছিলেন ‘এংলো ক্যাথলিক খ্রিস্টান’ ধর্মীয় নেশন হিসেবে। তবে এর অনুকরণে আগে তিনি ভারতের সবাইকে একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম ধর্মে দ্বীক্ষিত করতে ১৮১৫ সালে ব্রাহ্ম-ধর্ম প্রকল্প নিয়ে ব্রাহ্ম সমাজ গড়ে তুলেন। এর মাত্র আঠারো বছরের মধ্যে ১৮৩৩ সালে রামমোহন মারা যান। পরে অনেক চেষ্টা করেও ব্রাহ্ম সমাজ আর এগোতে পারেনি, উল্টা তা দুই/তিন ধারায় বিভক্তও হয়ে যায়। আর তাতে হিন্দু নেতারা সবাই এবার ব্রাহ্মধর্ম ফেলে হিন্দুধর্মীয় এক জাতিরাষ্ট্র গড়া ছাড়া উপায় নেই যুক্তিতে গোপনে বা প্রকাশ্যে তৎপরতা শুরু করেন।  অর্থাৎ অখন্ড ভারতের জন্য এক হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্র কায়েম করাকে জায়েজ মানা শুরু হয়েগেছিল। আর এতেই বলা বাহুল্য  এজন্য এটাই এখনো ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের আদি পাপ হয়ে আছে। বিশেষত নেহেরু-গান্ধীও হিন্দুধর্মীয় এক জাতিরাষ্ট্র রাজনীতির অনুসারী হয়ে উঠেন। স্বাধীন ভারতের চূড়ান্ত রূপ দেয়া হয়েছে- এ দুই নেতার হাতে। আর এ কারণে এখন কম-বেশি ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সবাই অস্থিরতা ও সংঘাতে রয়েছে।

    জাতিরাষ্ট্র চিন্তার বিকল্প দুনিয়া এখন হাজির; কিন্তু কেউ সেদিকে আগ্রহ দেখায় না। অন্তত ভারতের কেউ করে না। বরং আরও জোরেসোরে জাতির স্বার্থ বলে এক শব্দে হিন্দুধর্মীয় জাতিরাষ্ট্র ধারণাটাকেই আবার হাজির করে। আরএসএস-বিজেপির রাষ্ট্রচিন্তা হল এই হিন্দু জাতি রাষ্ট্র ভারতেরই আরও দানব ভার্সন।

    লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

     

    [এই লেখাটা  গত ২৮ অক্টোবর ২০২০, সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “গান্ধীকে নিয়ে মূল্যায়ন” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আরসিইপিঃ দুনিয়ায় নতুন সম্পর্ক আনার সম্ভাবনা

    আরসিইপিঃ দুনিয়ায় নতুন সম্পর্ক আনার সম্ভাবনা

    গৌতম দাস

    ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3hi

    RCEP, China-led biggest TRADE BLOCK

    RCEP, 3rd Summit 2019 Bangkok

    রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ [Regional Comprehensive Economic Partnership (RCEP)]- এরই সংক্ষিপ্ত রূপ ‘আরসিইপি’। দুনিয়াতে এপর্যন্ত অর্থনীতিভিত্তিক রাষ্ট্র-জোট অনেকই গড়া হয়েছে, বেশির ভাগ সময় তাতে আঞ্চলিক একটা ছোঁয়াও খুঁজে দেখলে পাওয়া যাবে অথবা অঞ্চলের একটা আবছা ভাবধারণাও তাতে থাকতে দেখা গেছে। তাই বিভিন্ন রাষ্ট্র-জোটের একেকটা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা নতুন কিছু নয়। কিন্তু আরসিইপি এক বিরাট বড় ব্যতিক্রম। কাঠামোগতভাবে দেখতে একে আগের মতই কিছু একটা মনে হলেও এটা অবশ্যই  এক “বিশেষ” ধরণের অর্থনীতিভিত্তিক রাষ্ট্র-জোট। অঞ্চল হিসেবে এটি এশিয়াকেন্দ্রিক, নিঃসন্দেহে। কিন্তু মূলত চীনকেন্দ্রিক। গত আট বছর ধরে চলা এক প্রচেষ্টা এবার বাস্তব হতে যাচ্ছে। এর সদস্যদের ফাইনাল অংশগ্রহণ ও চূড়ান্ত স্বাক্ষরদানের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার এক অনুষ্ঠান উদ্বোধন ঘটানো হয় গত ১৫ নভেম্বর ২০২০, এক ভার্চুয়াল মিটিংয়ের মাধ্যমে।

    কারা এর সদস্য?
    অনেক আগের এক অর্থনৈতিক জোট আসিয়ান (সাউথ-ইস্ট এশিয়ার রাষ্ট্র সমিতি বা Association of Southeast Asian Nations, ASEAN), যার সদস্যরা হল – ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম – এই ১০ দেশ। এরা সবাই আরসিইপির সদস্য হয়েছে। এছাড়া আর রাষ্ট্র হল – জাপান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, এছাড়া সাথে চীন তো আছেই। এভাবে মোট ১৫ রাষ্ট্রসহযোগে গঠিত হয়েছে আরসিইপি জোট।
    যদিও এটা আনুষ্ঠানিক চালু হয়ে কাজ শুরু করতে আরও বছর দেড়েক সময় লাগতে পারে। সাধারণত ৬০-৭০ শতাংশ হবু সদস্যের স্বাক্ষর পেলে সেই জোট উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক চলাচল শুরু হয়ে থাকে। একারণে এখানে আসিয়ান থেকে ন্যূনতম ছয় রাষ্ট্র আর বাকিদের থেকে ন্যূনতম তিন রাষ্ট্র সদস্য এতে সম্মতি স্বাক্ষর করলেই আরসিইপি কার্যকর হতে পারবে। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে এটা অবশ্যই এশিয়ার নতুন এক অর্থনৈতিক রাষ্ট্র-জোট। কিন্তু তারপরও সবাই বলছে এটা ‘চীনকেন্দ্রিক’ এক জোট। তবে ভারত গত বছর থেকে এই হবু জোট থেকে বের হয়ে যায়।

    নিউইয়র্ক-ভিত্তিক গ্লোবাল মিডিয়া ব্লুমবার্গ বা আমেরিকান থিঙ্কট্যাংক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটও এটাকে চায়না-লেড না বলে চীন পরিচালিত [Driven by China, the RCEP ] মানে চীনা-নেতৃত্বের আরসিইপি এভাবে উল্লেখ করেছে। ভারতের ইকোনমিক টাইমস চায়না লেড বলেছে, তাঁদের রিপোর্টের শিরোনাম, China-led RCEP trade pact is signed, in challenge to US]। তবে চায়নাকেন্দ্রিক বলা না বলা নিয়েও বিতর্ক আছে আমেরিকাতেই অনেক কোণে। তবে এটা এখনকার মধ্যে সবচেয়ে বড় ট্রেড ব্লক বলে স্বীকার করেছে প্রায় সকলেই।  বলা হচ্ছে, দুনিয়ার মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৪০ শতাংশ এই জোট সদস্যদের মাঝে হয়ে থাকে। আর দুনিয়ার মোট জিডিপি আয়ের ৩৫ শতাংশ এবং মোট ২৬ ট্রিলিয়ন ডলারের মোট জিডিপি ভ্যালুর উৎস আরসিইপির সদস্য রাষ্ট্রগুলো।

    ভ্যালু এডিশন শেয়ার করার জোটঃ
    কিন্তু আরসিইপির আসল গুরুত্ব উপরে যা যা বলা হয়েছে সেখানে নয়। এর তাৎপর্য অন্যখানে; আরসিইপি ‘বিশেষ’ অন্য কারণে। এটা দুনিয়ায় এক নতুন ধরনের “আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের” সূচনা করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এর পেছনের মুখ্য ধারণাটা হল – ‘ভ্যালু এডিশন’ শেয়ার করা। এত দিনের প্রচলিত পণ্য রফতানি বলতে মূলত যা বুঝা হত তা হল, যতদূর সম্ভব নিজের কাঁচামালে আর পুরো ম্যানুফেকচারিংয়ের পর্যায়টা নিজ একই রাষ্ট্রে – এভাবে সম্পন্ন করা এক ফিনিশড পণ্য উৎপাদন, আর শেষে তা রফতানি করা। তাই এর মধ্যে ভ্যালু এডিশন কী জিনিস তা আমাদের সবার নজরে না এনেও তা চলতে পেরেছিল। কিন্তু ভ্যালু এডিশন [value addition] সেটা আবার কী?
    ‘ভ্যালু এডিশন’ শব্দটা শুনে তা নতুন আবার কোনো কথার কচকচানি বা অপরিচিত কোনো কঠিন ধারণা কিনা তা মনে হলেও এটা এমন নয়। বাংলাদেশের মানুষ কিন্তু ইতোমধ্যেই এর সঙ্গে পরিচিত। সেটা কিভাবে? দোকানে কোন জিনিস কিনে আমাদের সবাইকে সেটার দাম দেওয়ার সময় দামের উপর আলগা একটা ট্যাক্স গুনতে হয়। সেটা হল ‘ভ্যাট’ [VAT]। এই ট্যাক্স আমাদের সবার পরিচিত; আর ইংরেজিতে ভিএটি শব্দটা ভাঙলে হয় ‘ভ্যালু এডেড ট্যাক্স’ [Value Added Tax] বা সংক্ষেপে ভ্যাট।
    বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ১৯৯১ সাল থেকেই এটা চালু হয় এবং সারা দুনিয়াতেই এই ট্যাক্সটা আড়াই পার্সেন্ট হিসেবেই চালু হয়। কিভাবে? কারণ এটা বিশ্বব্যাংক নির্ধা্রিত, এটা তাঁদের এক স্টাডির রেজাল্ট। ফলে সবার জন্য কমন। আমাদেরও সেটা আগে দিতে হত আড়াই পার্সেন্ট, এখন চলতি অর্থবছর থেকে সরকার জবরদস্তিতে সেটা পাঁচ পার্সেন্ট করেছে।
    কিন্তু তা না হয় বুঝা গেল। তবু, এই ভ্যালু [value] এটা আবার কী? ভ্যালু একটা ইংরেজি শব্দ যার আক্ষরিক বাংলা অর্থ হল ‘মূল্য’। তবে অর্থনীতি সম্পর্কিত বিষয় হিসাবে ব্যবহার হলে এই শব্দটার অর্থ হয় মূল্য। যেকোন উৎপাদিত পণ্যের যেমন মূল্য থাকে- পণ্যমূল্য, সেই মূল্য এটা। আপাতত এই আলোচনায় শুধু অর্থনীতি সম্পর্কিত অর্থে ‘মূল্য’ বুঝব আমরা। কিন্তু সেই মূল্য বলতেই বা ঠিক কী বুঝব?
    কোনো উৎপাদিত পণ্য (প্রডাক্ট) বলতে এর দুটি অংশ থাকে – প্রাকৃতিক অংশ যা আল্লাহ দিয়েছেন এমন অর্থে পড়ে পাওয়া অংশ আর অপর অংশ যা মানুষ যোগ করেছে। এই যোগ করা মানে হল মানুষের যোগ করা শ্রম। তাই মূল্য বলতে আসলে বুঝতে হবে যোগ করা শ্রমের মূল্য [তবে সাবধান এটা মজুরি নয়]। কারণ বাকিটা তো প্রাকৃতিক, পড়ে পাওয়া, ফলে সেটাতে মানুষের কৃতিত্বের কিছু নেই। তাই অর্থনীতিতে ভ্যালু ধারণাটা হল, প্রাকৃতিক জিনিসের ওপর শ্রম ঢেলে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে তোলা। তাই এবার ভ্যাট মানে হল – কোন প্রডাক্টে যতটুকু নতুন শ্রম যোগ হয়েছে (এ জন্য ইংরেজি অ্যাডেড শব্দটা), সরকার সেই মূল্যের উপর আড়াই পার্সেন্ট  টাক্স হিসাবে তা সরকার নিজে কেটে রেখে দিচ্ছে। পণ্যে অ্যাডেড ভ্যালুর উপর এই আড়াই পার্সেন্ট- এটাই ভ্যাট। মূল তত্ত্বকথা এখানে শেষ।
    এখন আমদানি-রফতানির স্তরে এই মূল্য নিয়ে কী ঘটে সে কথা তুলব। বাংলাদেশে কোনো পণ্য আমদানি করতে গেলে যেমন একই ধরনের নাটবল্টু দু’দেশ থেকে আনতে দু’রকম হারে আমদানি ট্যাক্স দিতে হতে পারে। কেন? কারণ একটা দেশের বেলায় কাঁচামাল লোহা তার নিজের দেশেরই খনন-উত্তোলন করা আর পরে কারখানায় ওর ম্যানুফেকচারিং- প্রক্রিয়ার পুরোটাই আবার ওই দেশেই সম্পন্ন করা; এভাবে তৈরি হওয়া প্রডাক্ট হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এর অর্থ হল, এখানে শতভাগ ‘ভ্যালু এডিশন’ ঐ একদেশেই সম্পন্ন হয়েছে। তাই এবার এই প্রডাক্ট আমার দেশে আমদানিতে এর ওপর আমদানি ট্যাক্স অনেক কম হবে। তুলনায় অন্য যে নাটবল্টু ধরা যাক, অস্ট্রেলিয়া থেকে (আধা প্রক্রিয়াজাত) বা ইনগট অবস্থায় লোহা এনে আরেক দেশে যে বোল্ট বানানো হয়েছে- এমন যদি হয়ে থাকে তবে ঐ প্রডাক্ট আমার দেশে আমদানিতে এর ওপর ট্যাক্স বেশি ধরা হবে; চাইকি অনেক দেশ তা নিজ দেশে আমদানি নিষিদ্ধ বলে বসতে পারে।
    যেমন, আমাদের দেশ থেকে চীনে এখন  কোন কিছু রফতানি করার বেলায়, ভিন্ন দেশ থেকে আমাদের আমদানি করা কোনো কাঁচামালের উপর আমাদেরকে ৪০ শতাংশের বেশি ভ্যালু যোগ করতেই হবে। যদি তা না হয় পারিনি, এমন উৎপাদিত যেসব প্রডাক্ট তা এখন চীনে রফতানি অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। আমাদের প্রতি চীনের আমদানি নীতির বাধ্যকতার সীমা এটা, যা আমরা এখন ২৫ শতাংশ হলেও যেন রফতানির সুযোগ পাই সেই দেনদরবার করছি চীনের কাছে।
    আবার ভ্যালু এডিশন কথাটা আমদানির সময় আরেক শব্দ দিয়ে ভিন্নভাবে প্রকাশ হতে পারে। যেমন- আমরা বললাম, আমদানি করতে চাওয়া পণ্যের কান্ট্রি অব অরিজিন কী বা কোথায়? মানে আমার রফতানির জন্য তৈরি প্রডাক্টে আমদানি কাঁচামালের উৎস দেশ কে আর সেটা মোট পণ্যমূল্যের কত অংশ? নাকি উৎপাদিত আমাদের ফিনিশড প্রডাক্টের মধ্যে আমাদের আমদানি কাঁচামালের  উপর আমাদের ভ্যালু এডিশন অংশ অনেক বেশি হয়েছে বলে (কাঁচামাল আমার দেশের না বাইরের তা আর গুরুত্বপূর্ণ নয়)। অতএব আমার রফতানি পণ্যের ভ্যালু যোগ করা অংশে আমার অবদান প্রবল হলে আর কাঁচামালে আমার কান্ট্রি অব অরিজিন অংশ কত এটা উপেক্ষা করতে হবে, চাপা পড়ে যাবে। কোনো দেশের আমদানি নীতিতে ‘কান্ট্রি অব অরিজিন’ কথাগুলো এভাবে পাঠ করা হয়।
    এবার আসি নতুন রাষ্ট্র-জোট আরসিইপিতে। কেন এটাকে ‘বিশেষ’ বলছি? গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের সময়কাল চলছে এই সময়ে্র মধ্যে আছি আমরা। আর এখানেই পুরনো গ্লোবাল নেতা আমেরিকার চেয়ে হবু নতুন চীনা নেতৃত্ব কিছু জায়গায় একেবারেই আলাদা ও বেটার কিছু হবার সম্ভাবনা জাগবেই। তাই এই ‘বিশেষ’ শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। আমেরিকান নেতৃত্বের ৭৫ বছরের আমলটার মূল বৈশিষ্ট্য হল – সেটা এক গভীরভাবে অসম পণ্যবিনিময় সম্পর্ক; ওরাই শুধু আমাকে বেচবে আর আমি খালি কিনে যাবো, প্রচলিত এই নিয়মটাই বজায় ছিল যা এবার বদলাবে, তুলনামূলক ভাল হবে।

    শেয়ার্ড সাপ্লাই চেন প্রডাক্টঃ
    কারণ এবার সবাই সবার কাছে প্রডাক্ট বেচবে নিজের ভ্যালু অ্যাড করার পর, তাতে সেটি ফিনিশড প্রডাক্ট নাও হতে পারে। আবার সবাই অন্যের ভ্যালু অ্যাড করাটা তার কাছ থেকে কিনবে কিন্তু পরে ওর উপর নিজের ভ্যালু এড করার জন্য। এতে শেষে শুধু যা দাঁড়াবে তা হল – সবাই নিজ সামর্থ্য-যোগ্যতা মত নিজের ভ্যালু অ্যাড করা অংশটা যোগ করতে থাকবে। এতে শেষে একটাই শর্ত কাজ করবে, যে বা যারা আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় দক্ষভাবে কোনো প্রডাক্ট বানাবে (দক্ষ মানে সবচেয়ে কম শ্রমে সবচেয়ে ভালো গুণের প্রডাক্ট) বলে; এবার আর বাকিরা ঐ একই প্রডাক্ট বানানো থেকে সরে গিয়ে যেটা যে অন্যের চেয়ে ভালো পারে সে দিকে সরে যাবে) আর ঐ পণ্যের বেলায় সবাই তাদের থেকেই কিনবে। এতে সবাই কম দামে ভালো পণ্য কেনার সুযোগ পাবো।

    কিন্তু, এতে আরসিইপি বিশেষ কী হয়ে গেছে বলা হবে কেন? কারণ, বলা হয়েছে, এই ১৫ রাষ্ট্রের আরসিইপি-ভুক্ত কেউ কারো দেশে রফতানি করতে গেলে কান্ট্রি অব অরিজিনের প্রশ্ন তোলাই হবে না যদি ঐ ১৫ দেশেরই কারে থেকে কাচামাল (বা আধাপ্রক্রিয়াজাত ভ্যালু এডেড কাঁচামাল ) আনা হয়। আর তা হল এবার যে কেউ  তাতে নতুন করে নিজের ভ্যালু এড করে তৃতীয় আরসিইপি দেশে  রফতানিতে আর কোনো বাধা দেয়া হবে না।

    অর্থাৎ একটা প্রডাক্ট কিন্তু তা এই ১৫ দেশের জোটেরই হয়ত (ধরা যাক) পাঁচ দেশে পাঁচ অংশ তৈরি মানে ভ্যালু অ্যাড করা হল। এতে এই শেয়ার করা মোট ভ্যালু অ্যাডেড হয়ে সেই ফিনিশড প্রডাক্ট এবার অবাধে যেকোনো আরসিইপিভুক্ত দেশে রফতানি হতে পারবে, কোনো কান্ট্রি অব অরিজিনের প্রশ্ন তোলা হবে না। কারণ, আরসিইপি দেশের কেউ না কেউ এর অরিজিন। তত্ত্বগত ভাষায় এটাই ‘শেয়ারড ভ্যালু এডিশন প্রডাক্ট’ বা শেয়ার্ড সাপ্লাই চেন প্রডাক্ট বলা হয়।

    এই ‘শেয়ার্ড সাপ্লাই চেন প্রডাক্ট’ এভাবে আমদানি-রফতানির এক নতুন যুগ বা গ্লোবাল প্রডাকশনের এই নতুন যুগ নিঃসন্দেহে আসন্ন দুনিয়াকে বদলে দেবে। চীন প্রায়ই একে ‘উইন-উইন’ [win-win] অবস্থার যুগ বলে থাকে। অর্থাৎ গত ৭৫ বছরের আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল সিস্টেম এখন চীন বদলে দিতে ইচ্ছা রাখছে। এসব জায়গায় হবু চীনা নেতৃত্বের গ্লোবাল সিস্টেমে তা আমূলে বদলে যেতে পারে। আগের দাতা-গ্রহীতা বা ‘অসম পণ্য বিনিময়ের সম্পর্ক’ যুগের সবটা না হলেও অনেকটাই এতে বদলে যাবে। চীন এটাই চেষ্টা করবে, কতটা সফল হবে তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে। এটাই হবু চীনা নেতৃত্বের ‘বিশেষ’ তাৎপর্য।

    ঠিক যেমন আমেরিকা  ১৯৪৫ সালের আগের ব্রিটিশ কলোনির সূর্যটা  ডুবিয়ে দিয়েছিল। এরপর আমেরিকার নেতৃত্বের এক নয়া গ্লোবাল সিস্টেম দুনিয়ায় এনেছিল। যার সবচেয়ে ইতিবাচক সার কথাটা ছিল – দুনিয়াতে এবার আর কেউ কারো কলোনি থাকবে না। কলোনি ব্যবস্থা উঠে যাবে। আর এর বদলে আমেরিকান নেতৃত্বের নয়া গ্লোবাল ব্যবস্থায় প্রত্যেকেই কলোনিমুক্ত স্বাধীন দেশ হিসেবেই উঠে দাঁড়াবে। আর আমেরিকার সাথে এক গ্লোবাল বাণিজ্য সম্পর্কে জড়িত হবে, বিনিয়োগ লোন নেবে, খাতক হবে। এতদূর পর্যন্ত এটা আগের কলোনি ব্যবস্থার চেয়ে তুলনামূলক অবশ্যই অনেক ভালো।  তবু এর কালো দিকটা ছিল, আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ব্যবস্থাটা মারাত্মক উঁচু-নিচু এবং এক দাতা-গ্রহীতা বা ‘অসম পণ্য-বিনিময়ের সম্পর্কের’। এক কথায় যেটা হল, ওরা (পশ্চিম) শুধু ওদের প্রডাক্ট সিঙ্গাপুরে (পশ্চিমা দেশের পাইকারি পণ্যবিক্রির চকবাজার হলো সিঙ্গাপুর) এনে সেখান থেকে আমাদের মত দেশে শুধু রফতানি করবে, তারা একলাই শুধু বেচবে। আর আমাদের ভুমিকা আমরা কেবল তা কিনব বা ভোক্তা হব। এক আধিপত্যের সম্পরকের মধ্যে। এটা আমূলে বদল এখন শুরু হবে। এটাই নিঃসন্দেহে এক চীনা স্বপ্ন। নতুন দুনিয়ার চীন। চীন সেটাকে ‘জিনপিংয়ের স্বপ্ন’- এই ব্র্যান্ড নেম দিয়ে বাজারে আনতে চাচ্ছে।

    কিন্তু একটা সাবধানতা। কোনো রাষ্ট্রই আদর্শ রাষ্ট্র নয়, হতেই পারে না। বরং বাস্তবে যা পাওয়া যায় সেগুলোই বাস্তবের রাষ্ট্র অর্থাৎ দোষে-গুণে আর সীমাবদ্ধতায় ভরা এসব রাষ্ট্র। অতএব বাস্তব রাষ্ট্র হিসেবে চীন যা আরসিইপি জোটকে করে দেখাতে চায় বলে জানাচ্ছে এটা তার কামনা মাত্র। এর কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, এ ছাড়া চীন কতটা তা বাস্তব করে তুলতে পারবে আর কতটা সে যোগ্য সেটার প্রমাণ দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

    শেষে আরসিইপি নিয়ে গ্লোবাল মিডিয়া ব্লুমবার্গের ভাষায় কিছু কথা। লন্ডন-বেসড অক্সফোর্ড ইকোনমিক্স নামে [head of economics for South Asia and South-East Asia at Oxford Economics] এক কনসাল্টিং কোম্পানির কথা এনেছে তারা। গ্লোবাল ইকোনমিক ইস্যুতে ঐ কোম্পানি তার এন্টারপ্রাইজ ক্লায়েন্ট কোম্পানিদের নানান ফোরকাস্ট বা পরামর্শ দিয়ে থাকে। এদেরই এক ডিপার্টমেন্টাল হেড প্রিয়াংকা কিশোর ব্লুমবার্গকে ইমেল মন্তব্যে জানিয়েছে – “আরসিইপিভুক্ত দেশের মধ্যে কমন রুলস অব অরিজিনের কারণে মূলত এই ট্রেড-ব্লক খুবই আকর্ষণীয় হবে, পরস্পরের অর্ধপ্রক্রিয়াজাত কাঁচামাল সাপ্লাইয়ের উৎস হবে এবং আমদানিকারক হিসেবেও হাজির হবে” [The common rules of origin make the bloc an attractive destination for supply chains by making it easier for RCEP members to source inputs from within the bloc, said Priyanka Kishore, head of economics for South Asia and South-East Asia at Oxford Economics, said in an emailed response.]।

    এভাবে আরেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, “এতে আরসিইপিভুক্ত দেশগুলো পরস্পরের মধ্যে রফতানিতে বাধাগুলো কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে, রাস্তা দেখাবে বিশেষত এই করোনা অর্থনীতির গতিহীনতার আমলে গ্লোবাল বাণিজ্য অর্থনীতিতে গতি ফেরাবে” [The RCEP is now seen paving the way for lowering trade barriers for member nations at a time when the pandemic poses a challenge to global commerce.]। এছাড়া, সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনির রিসার্চ ফেলো অমিতেন্দু পালিতের মন্তব্য – তিনি মনে করেন, “এতে বাণিজ্য করার যে ব্যয় তা কমে আসবে যা হবে এক বিরাট সুবিধা, আর তা সবাই পাবে। আর এটা চালু হলেই এদের নিজেদের মধ্যে ৯২ শতাংশ ক্ষেত্রে বাণিজ্য পণ্যের শুল্ক উঠে যাবে। এটা ভারত যেমন জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে ফ্রি ট্রেড চুক্তি করে অর্জন করেছে এর চেয়ে অনেক বেশি লাভজনক হবে”  [“Under RCEP, cost of trade will come down which is a big advantage.” ……”As the trade pact kicks in, tariff will be eliminated on at least 92% of traded goods among participating countries. This is much more broad-based than what India has committed under its existing FTAs with Japan, South Korea or Asean”.]।

    ‘বাজার সংরক্ষণবাদী’ জাতি-রাষ্ট্রের দিন কী শেষ হবেঃ
    আধুনিক রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল জাতি-রাষ্ট্র (Nation state) রূপে আর কলোনি দখলের যুগে সমান্তরালে ওর সাথে সম্পর্ক রেখে। এছাড়া তখন ওর অনুষঙ্গ অর্থনৈতিক ধারণা ছিল, জাতিবাদী-অর্থনীতি। মানে নিজ বাজার সংরক্ষণবাদী [Protectionist] – কাউকেই নিজ বাজারে ঢুকতে না দেওয়া। কিন্তু অন্যের বাজারের বেলায় সেখানে ভিন্ন বা উল্টা নিয়ম। যেভাবে পারো অন্য যে কারো বাজারে ঢুকে পড়। তাকে বাজার সংরক্ষণ করতে দিও না- ওর বাজারে ঢুকে পড়ো, যেকোনো জবরদস্তি করো। আরএসএস- মোদী এই নীতি যার সম্ভবত সবচেয়ে আদর্শ উদাহরণ। আর ৭৫ বছরের গ্লোবাল নেতৃত্ব দেয়া আমেরিকার শেষ চার বছরে ট্রাম্প আমলে এসে – তিনিও গ্লোবাল নেতাগিরি ত্যাগ করে জাতিবাদী হতে চেয়েছিলেন, যেন হয়েছিলেন মোদির অনুসারী। যে সারা জীবন অন্যের বাজার ভেঙে ঢুকে পড়া আমেরিকা এবার হয়ে যেতে চায় ‘নিজ বাজার সংরক্ষণবাদী’।
    সার কথাটা হল, শুধু নিজের জন্য বাজার সংরক্ষণ মূলত সেকালের কলোনি ক্যাপিটালিজমেরই অনুষঙ্গ। যেটা একালে এসে রিভিউএ দেখা যাচ্ছে তা কারো জন্য সুবিধার হয়নি। তবু এখনও অনেকে তা হতে চায়। তারা নিজরাষ্ট্রের অর্থনীতি চালাতে চায়  আমদানিতে একপক্ষীয় বাধা দিয়ে, ব্যাপক ট্যাক্স বসিয়ে আর এভাবে শুল্ক সংগ্রহ করে ঐ শুল্কের অর্থে। কিন্তু এর বিপরীতে উৎপাদন বাড়ানো, নতুন কাজ সৃষ্টি, কম শ্রমঘণ্টা লাগিয়ে দক্ষভাবে পণ্য উৎপাদন করে পণ্য সবার নাগালে আনা বাজার বাড়ানো – ইত্যাদি করে  এরপর সেসব  মানুষের আয়ের উপর ট্যাক্স বসিয়েও বিকল্পভাবে রাষ্ট্রের অর্থনীতি চালানো সম্ভব। এতে যে কাজের সংস্থান করা সহজ তা তারা বুঝতে চায় না। বাংলাদেশের শাসকরা মূলত আমদানি শুল্ক সংগ্রহ করে দেশ চালানো সহজ গণ্য করেছে বলেই আরসিইপি গঠন হয়ে গেলেও এতে নিজে ঢুকতে আগ্রহ করেনি, পারেনি বা কেউ তাকে ডাকেনি।

    সব শেষে জানাই, আরসিইপি প্রসঙ্গে এটি শুধু একটি দিক নিয়ে লেখা। এর আরো বহু দিক নিয়েই লেখার আছে। আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আছে। আমার সীমিত সক্ষমতায় তা নিয়ে আগামীতে আবার ফিরে দেখা হবে হয়ত!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২৯ নভেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “আরসিইপিঃ দুনিয়ায় নতুন কী সম্পর্ক আনবে” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নষ্টা-সেকুলারিজমের বীণা সিক্রি

    নষ্টা-সেকুলারিজমের বীণা সিক্রি

    গৌতম দাস

    ২৩ নভেম্বর ২০২০, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3gD

    ব্যাপারটা একটু পুরনো। কিন্তু বারবার ফিরে আসে এমন পুরনো রোগ। বীনা সিক্রি [Veena Sikri ] বাংলাদেশে ভারতের সাবেক এক রাষ্ট্রদূত। গত ২০০৩-০৬ সময়কালে তিনি রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ভারতের প্রায় সকলের সব কিছুতে শো-আপ বা বাড়িয়ে বলা বা দেখানো – এটা এমনকি বেসরকারি পর্যায়ে তো বটেই সরকারি পর্যায়েও অভ্যাসের মত হয়ে গেছে। বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে সম্ভবত শো-আপ করাদের শীর্ষ আছেন বীণা। আর বাংলাদেশে তিনি এটা করার আরো সুযোগ নিয়ে থাকেন কারণ তিনি সরকারি আমলা হিসেবে চাকরি শেষ করলেও এখন সাউথ এশিয়ান উইমেন্স নেটওয়ার্কের (South Asia Women’s Network, SWAN)) আহ্বায়ক বলে জানা যায়, এর সুযোগে।

    সিক্রির সেকুলারিজম-বোধঃ
    দেখা যায়, তিনি সবসময় আমাদের যেচে ‘হেদায়েত’ করতে ভালোবাসেন আর ইদানীং তা সবচেয়ে বেশি যা নিয়ে, সেই সাবজেক্ট হচ্ছে  সেকুলারিজম। আবার তাঁর সেকুলারিজম ভাবনাটা ‘বিশেষ’। সেটা যেন উল্টো মনে করিয়ে দিতে চায় যে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কিন্তু মুসলমান। তাই যেন বলতে চান, এরা তো একটু খাটো (!), সেটা এখন এঁরা সেকুলার হলে  সমান পক্ষ হতেও পারে!। যদিও এই সাবজেক্ট নিয়ে তাঁর জানা-বুঝা ঠিক বা যথেষ্ট কি না তা নিয়ে সন্দেহ করার কারণ আছে। এ ছাড়াও অন্য যেসব প্রসঙ্গ তিনি সাধারণত আনেন ও কথা বলেন সেগুলো যেমন – ভারত নাকি পড়শিদের জন্য ‘বড়ভাই’, সে কথাটা আবার উনি নিজমুখেই বলছেন। এমনই ডেস্পারেট এবং যেন  মুল্যবোধের ঘাটতিতে থাকা ও অপ্রয়োজনীয় সংঘাত শো করা মানুষ তিনি। গত ২০১৫ সালে ভারতের এক ওয়েব মিডিয়ায় [livemint] তিনি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন যেটা ঢাকার দৈনিক ইত্তেফাকও পরদিন অনুবাদ করে ছেপেছিল। ওর বাংলা শিরোনাম ছিল- “ভারত এখন দক্ষিণ এশিয়ায় ‘এলডার ব্রাদার’ : বীনা সিক্রি”। আবার ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ভারতের এশিয়ান এজ পত্রিকায় তিনি বলেন, “বাংলাদেশ মুসলমান ও বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে আটকে গেছে” [Bangladesh is caught between Bengali and Muslim identities: Veena Sikri]। এ ছাড়াও শাহবাগ আন্দোলনের আমলে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে বলছেন, সেটা নাকি “৭১-এর প্রজন্মের জেগে উঠা ছিল” – ইত্যাদি ধরনের ভারতীয় ব্যাখ্যা যার সার কথা হতে দেখা যায় যেটাকে আমরা প্রচলিত ভাষায় বলি, ইসলাম ‘কোপানো’র সুযোগ নেয়া আর উচ্ছ্বাস দেখানো। তখন প্রশ্নকর্তা অবশ্য শাহবাগের মধ্যে যা দেখেছিলেন সেটা হল এক না- বুঝা অবুঝ চোখে এক “আরব স্প্রিং” বলে একে ভ্রম। অথচ আরব স্প্রিং (নামেও বোঝা যাচ্ছে) সেকালে ঘটেছিল সাধারণত মুসলমান প্রধান রাষ্ট্রে। আর আমেরিকান এই প্রোগ্রামের লক্ষ্যও ছিল সেটা।  কিন্তু বাংলাদেশের শাহবাগ তো ইসলামবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত কথিত “সেকুলারদের” আন্দোলন!

    এমনিতেই যারা বাংলাদেশে ভারতের রাষ্ট্রদূত হয়ে আসেন এঁদের মধ্যে একটা ‘কলোনি দখলদার মাস্টার’ ভাব কমবেশি থাকতে দেখা যায়; যেন তারা ভারত সরকারের ভাইস-রয় বা ‘কলোনি রাজপ্রতিনিধি, আমাদের দেখভাল বা দেখেশুনে রাখতে ও হেদায়েত করতে এসেছেন। ঠিক যে জিনিসটা ১৯৪৭ সালে আগস্টে কলোনিমুক্ত ও স্বাধীন ভারত হয়ে গেলে নেহরুর মধ্যে দেখা গিয়েছিল বা যেত। বডি ল্যাঙ্গুয়েজে তিনি নিজেকে ‘ব্রিটিশ ভাইসরয়’ ভাবতেন যার সবচেয়ে ভাল ও বিস্তারিত প্রমাণ আমরা দেখতে পাই নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তির ভাষায়। কলোনিদখলি চোখ মনে করে দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে সার্বভৌম সমমর্যাদার সম্পর্ক হতে পারে না। কোন সম্পর্ক হলে তা হতেই হয় দখলদার ও অধস্তনের, এই বিশ্বাস তাঁর প্রখর ছিল। ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করে চলে গেলেও নেহরু যেন ব্রিটিশের উত্তরসূরি; তাই তিনি কলোনি মাস্টারের সেই ভূমিকায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। এমন চিন্তার সমস্যার গোড়া হল – নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র চিন্তার মধ্যে; যেখানে দুই রাষ্ট্রের সমমর্যাদার নাগরিক সম্পর্ক বলে কোনো ধারণা বা ইমাজিনেশন থাকে না, কাজ করে না। সব কিছুকেই এরা মাস্টার-স্লেভ বা প্রভু আর গোলামঅধস্তন বানিয়ে ফেলেন এবং সেভাবে দেখে থাকেন। এর বাইরে ভাবতে পারেন না। অথচ মজার কথা এরাই আসেন আমাদেরকে সেকুলারিজম শিখাতে; আর এতে যদিও আমরা তাঁদের ক্লাস-সেন্স দেখি আর প্রীত হই!।

    বীণা সিক্রির সেকুলারিজম আসলে একজন হিন্দু জাতিরাষ্ট্রবাদীর ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানো বৈ আর কিছু নয়। এটি সবচেয়ে সহজে ধরা পড়ে যখন আমরা দেখি আরএসএস-বিজেপির মতো পাঁড় হিন্দুত্ববাদী দলের মোদী সরকার প্রায় সাত বছর ধরে ভারতে ক্ষমতায়; অথচ বীণা সিক্রির মোদীর বিরুদ্ধে কোনো আপত্তি বা সমালোচনাই নাই; বরং ভাবটা হল একেবারে সব ঠিকঠাক সুন্দরভাবে চলছে। অথচ “জয় শ্রীরাম” বলানোর জবরদস্তি অত্যাচার নিপীড়নে টেকা দায়, মুসলমান নাগরিকের বুকের খাঁচার ওপর লাফিয়ে উঠছে তাঁরা। কিন্তু বীণা সিক্রির তাতে কোন বিকার আছে আমরা দেখি নাই! তার মানে, সিক্রির সেকুলারিজম ভাবনার ফিল্টারেও আরএসএস বা মোদী পার হতে যেতে পারেন। এর চেয়ে তামাশা আর কী হতে পারে! আবার দেখি – বীনা সিক্রি মোদী-অমিতের ভারতের পড়শি দেশের থেকে কেবল ‘না-মুসলমানদেরই নাগরিকত্ব দেয়া’ হবে এই চরম বৈষম্যমূলক আইন গ্রহণ করেছেন বলে প্রকাশ্যে জানাচ্ছেন। এমনকি বীণা সিক্রি মোদীর এই আইনের পক্ষে তিনি নিজে সাফাই গেয়ে বলেছেন, এটা ‘ন্যায্য’। এখানে তাকে “বাহ রে সেকুলারিস্ট” ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ দেখি না।

    সিক্রির ভারত ‘এলডার ব্রাদার’ তত্ত্বঃ
    ভারতের বাইরের মানুষ ভারতের বড় ভাই সুলভ আচরণের বিরুদ্ধে আপত্তি ও নিন্দা জানিয়ে থাকে। অথচ বীণা ভারতের এই অশিষ্ট ও আন-ওয়েলকাম আচরণ এটাকেই ভারতের জন্য গৌরবের বলে মনে করেন বা তুলে ধরে থাকেন।   বীনা সিক্রির এমন বুঝাবুঝির দৌড় দেখে জানা যায়, তার চিন্তা কত স্থুল। আর তিনি মনে করেন, বাকচাতুরি দিয়ে তিনি কথা বলবেন আর এটাকে কূটনৈতিক কথা বলে সবাই তা গ্রহণ করবে বা মেনে নিবে।

    বাংলাদেশে ২০০৭ সালের জবরদস্তির তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করে আমেরিকা বাংলাদেশকে ক্রমেই ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল; যাতে ভারত যেমন ইচ্ছা আসামসহ নর্থ-ইস্টের জন্য বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিটের নামে পুরো একটা করিডোর এবং তা বিনাপয়সায় এবং প্রায়রিটিতে আমাদের দুই বন্দরও প্রায় বিনাপয়সায় ব্যবহার করতে পারে। অবশ্য আসাম নিয়ে ভারতের জন্মের সময় (১৯৪৭) থেকেই নেহরুসহ ভারতের শাসকদের দ্বিধা ছিল যে, আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্টের জন্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে করিডোর মাগনা পেলেও সেটা দরকার কি না, নেয়া ঠিক হবে কি না! এ কথাটা শুনতেই আজব ও অবিশ্বাস্য লাগতে পারে। কিন্তু কথা সত্য।

    আসামের অসুস্থ দ্বৈততাঃ বাংলাদেশের করিডোর ভোগ করে কিন্তু মুসলমান খেদাও চায়
    ভৌগলিকভাবে, আসামসহ ভারতের পুরা নর্থ-ইস্ট কিন্তু বাকি ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বা ল্যান্ডলকড নয় একেবারেই। অন্তত ১৮ কিলোমিটার সংযোগ-ভূমির (চিকেন নেক) দ্বারা এটি সরাসরি ভুমিসংযুক্ত। আবার দেশভাগের সময়ের আগে বা পরে কখনোই নর্থ-ইস্টের জন্য করিডোর বা ট্রানজিট দরকার বলে ভারত কখনো এমন কিছু পাওয়ার ইচ্ছা বা আগ্রহই প্রকাশ করেনি। এটাই প্রমাণ করে, ভারত আসামের জন্য করিডোর বা ট্রানজিট চায় না, অন্তত এই প্রশ্নে তাদের বিরাট দ্বিধা আছে। কেন?

    কথাটা বুঝা খুবই সহজ। আসাম যে যুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে করিডোর বা ট্রানজিট চাইবে, বাংলাদেশের অগভীর ফিডার বন্দর বা কোন গভীর সমুদ্র বন্দর ব্যবহার করে পণ্য আনা-নেয়ার সুবিধা চাইবে, এরই সাথে সাথে ঠিক একই যুক্তিতে আসামসহ নর্থ-ইস্টের ওপারে আরো উত্তরে আছে চীন। চীনের ঐ ভূখন্ডের বাসিন্দারা তাঁরা পুরোপুরিই ল্যান্ডলকড বলে, তারাও আসামের ওপর দিয়ে করিডোর বা ট্রানজিট চাইবে আর একইভাবে অসমীয়দের মত বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া সব করিডোর ফ্যাসিলিটিই পেতে চাইবে। এর সোজা মানে হবে, ভারতকেও আসামের ওপর দিয়ে চীনকে করিডোর সুবিধা পেতে দিতে বাধ্য হতে হবে। কিন্তু এটাই ভারত কখনো চায় না। এতে নাকি ভারতের আসামের ‘পবিত্রতা ও শান্তি নষ্ট হয়ে যাবে’- এই হল ভারতের প্রকাশ্য যুক্তি।  এটা আসলে নিজ সন্তানকে হাত-পা নুলা করে দিয়ে এবার তাকে দেখিয়ে রাস্তায় বসে ভিক্ষা করানো – এভাবে আয়-ইনকাম করার মত। আসাম ডেভেলপড হয়ে গেলে তা দেখে চীনের সাথে আসামের সীমান্তে লাগোয়া অংশ আসামের উপর দিয়ে করিডোর চেয়ে বসতে পারে তাই, আসামকে নুলা করে রাখতে হবে, এই মনোভাব!
    এ জন্যই আমরা দেখি স্থানীয় (অসমীয়, বোড়ো বা অন্যান্যরা) আসামের বাসিন্দারা কথিত ‘বাঙালিদের বহিষ্কার’ চাইত সেই ১৯৫১ সাল থেকে। কিন্তু কখনো বাংলাদেশের ওপর দিয়ে করিডোর বা ট্রানজিট চায়নি। অথচ আবার ভারতের শাসকরা পিছিয়ে পড়া আসামে (১৯৭২ সালের আগে পুরো নর্থ-ইস্টকে আসাম রাজ্যের অংশ গণ্য করা হত) কখনো অবকাঠামো বিনিয়োগই ঠিকমতো দিতে রাজি হয়নি; সম্পদ নাই বা ঘাটতি বলে এড়িয়ে গেছে। আর তাতে আসামই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রবল সব বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন জেগে উঠেছে (এখনও উঠে আছে), তবু ভারত কিছুই করতে রাজি হয়নি, নির্বিকার।
    আমরা নাকি “মাগনা পেলে আলকাতরাও খেতে চাই”- এখন সেই অবস্থা হয়েছে ভারতের। মাগনায় করিডোর পাচ্ছে বলে যেন এখন ভারতের আগ্রহ হয়েছে। কিন্তু ইন্টারেস্টিং হল – বাংলাদেশ বিনাপয়সার পোর্টসহ করিডোর দিচ্ছে; এটা বিজেপির পক্ষ থেকে আসামের বাসিন্দাদের জন্য কোনো উপহার মোদী সরকার এনে দিয়েছে – এটা প্রকাশ্য সত্য হলেও এটা আসামে কোন দলের নির্বাচনী ইস্যু নয়। এখনও এমন মানে বা মনে করা হয়নি। মূল কথা, আসামের এ পাওয়াটা লোপ্রোফাইলে রেখে দিতে চায় ভারত সরকার। কারণ সম্ভবত বাংলাদেশ যে এত বিশাল সুবিধা দিয়েছে এটা বেশি প্রচার করা হলে না বাংলাদেশ থেকে বাংলাদেশ বা মুসলমানবিরোধী ও বিদ্বেষী আন্দোলন বন্ধ (আসামের বাঙালি খেদাও বা এখনকার নাগরিকত্ব যাচাইয়ের নামে অসমীয় মুসলমানদের খেদানো) করার দাবি বের হতে পারে। এ ছাড়া এর প্রচার বেশি হলে কখন আবার চীন না একই সুবিধা দাবি করে ভারতের কাছে চেয়ে বসে আর বাংলাদেশ তাতে সমর্থন দেয়। এটা অবশ্যই বিরাট এক তামাশা যে, পোর্টসহ করিডোর সুবিধা পাওয়া আসামের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের কোনো দলের নির্বাচনে এটা কোনো ইস্যুই কেউ করতে রাজি না…।

    করিডোর নেয়ার পালটা কী, বাংলাদেশকে কী দিয়ে বুঝ দিবেঃ
    কিন্তু সমস্যা আরেক জায়গায়। আমেরিকা আমাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দিলেও ভারতের জন্য এটা কিছু চক্ষুলজ্জার যে, কোন কিছু পাল্টা সুবিধা বাংলাদেশকে না দিয়ে করিডোর নেয়াটা কেমন দেখাবে! তাই এই অস্বস্তিটা কাটাতেই ঠিক করা হয়, বাংলাদেশকে “দুধ-ভাত খেলোয়াড়” বানিয়ে খেলায় নিবে। সেটা কী?
    মরহুম শেখ মুজিব সেই ১৯৭৪ সালে ভারতকে বেরুবাড়ি দিয়ে দিয়েছিলেন, বিনিময়ে আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন কিন্তু আমাদের ছিটমহলে যাওয়ার করিডোর ভারত দিয়ে দেবে – এই ভূমিবিনিময় চুক্তি হয়েছিল ওই সময়। তাই আমাদের কনস্টিটিউশন সংশোধন করে শেখ মুজিব আমাদের কর্তব্য করেছিলেন তখনই। কিন্তু ভারত তার দায় কখনো গত ৪১ বছরে পূরণ করেনি। অর্থাৎ এটা আমাদের পাওনা অধিকার হলেও ভারত আটকে রেখেছিল। এ ছাড়া তিস্তার পানি পাওয়াও ছিল আমাদের ভাটির দেশের পাওনা ও অধিকার। আর যা কোনো রাষ্ট্রের পাওনা অধিকার সেটি পেতে আবার নতুন করে ভারতকে কোন কিছু দিয়ে ভারতের সাথে বিনিময় করার প্রশ্নই ওঠে না। সেটা হবে অনেকটা যেন সেই ঠগের কারবার যে, আমার থেকে ধার নেয়া টাকা ফেরত দেয় না। কিন্তু একবার যে ফেরত দিবার আগ্রহের নামে এবার আমার থেকেই আবার নতুন করে ধার নিয়ে সেই টাকা দিয়েই আমার আগের ধার শোধ করল বলে দাবি করছে; ঠগের বাটপাড়ি যেমন হয়। ভারত সেই ছিটমহল ভূমিবিনিময়ের আইন এবার ৪১ বছর পরে ২০১৫ সালের মে মাসে পার্লামেন্টে পাস করা হয়েছে। আর তিস্তার পানি? সেটাও আমাদের পাওনা হলেও তা আর কখনোই পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না।

    কিন্তু এই ২০১৫ সালের মে মাসে ভারতীয় পার্লামেন্টে আইন পাস হওয়াটাকে নিয়ে বীণা সিক্রির মন্তব্য সাক্ষাৎকারে দেখেন।  “এই চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারত তার বড় ভাই (বিগ ব্রাদার) পরিচিতি মুছে দক্ষিণ এশিয়ায় জ্যেষ্ঠ ভাই (এলডার ব্রাদার) হিসেবে সম্মান অর্জন করেছে বলে মনে করেন বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীনা সিক্রি” [……By approving implementation of LBA, India has shed its “big brother” tag and acquired an “elder brother” status in South Asia, says Veena Sikri ]। দেখেন কারবার! আসলে টাউটারিতেও তো কিছু সীমা থাকে। সিক্রি সেটাও ছড়িয়ে গেছেন।

    শুধু তা-ই নয়, সিক্রির আরো চাপাবাজি হল, তিনি বলছেন – সংসদে এই আইন পাস করে দিয়ে নাকি মোদী তাঁর “প্রতিবেশী প্রথম” [neighbourhood first] মতবাদ কাজে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন”। এ ছাড়া আরো আছে। সিক্রি বলেছেন, এই আইন পাস হওয়াতে নাকি, “ভারতের জন্য ভূখণ্ডগত জাতীয় ক্ষতি হয়েছে” [for India, it’s a notional loss of territory]।  এটা কলোনিদখলবাজ ইংরেজদের চেয়েও শঠতাপূর্ণ কথা। কারণ এটা ছিল ভূমির বিনিময়ে ভূমি নেয়ার চুক্তি। তাই তথাকথিত কোন আত্মত্যাগের বালাই নাই এবং নয় এটা। এটা কারো জন্যই একপক্ষীয় কোন ভূমি হারানোই নয়। আমরাও সমতুল্য ভূমি হারিয়েছি। অথচ সিক্রি এটা এখানে তুলে ধরছেন ‘ভারতের দয়া’ বলে, “একপক্ষীয় ভূমি হারানো” বলে। ফলে সত্যিই আমরা ঠগের পাল্লায় পড়েছি দেখা যাচ্ছে। এটাই হলো, টিপিকাল ছেচরামো! আমরা নির্বাক!

    এভাবে সর্বশেষ যে মিথ্যা বলা আর চাপাবাজিটা বীনা সিক্রি করেছেন আর আবার এদেশে লেখা ছাপিয়েছেন, সেটা গত  ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, বাংলা-ইংরেজি দুভাবেই ছাপিয়েছিল [তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি দ্রুত স্বাক্ষরিত হওয়া উচিত]।

    এ ছাড়াও ভারত-বাংলাদেশ মিলিয়ে গত ২৯ আগস্ট এক ভার্চুয়াল ওয়েবনিয়ার আলোচনায় তিনি আবার আরো মিথ্যা ও চাপাবাজি করতে গেছেন। এটাই তাঁর তথাকথিত নষ্টা-সেকুলারিজম নিয়ে। এর আয়োজক ছিল Indian Council for International Cooperation নামে কেউ। সেখানে তিনি দাবি করে বলেছেন, “বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশন বঙ্গবন্ধুর লিগ্যাসি এবং ওর মধ্যে সেকুলারিজম, ডেমোক্র্যাসি, সোস্যালিজম ও জাতীয়তাবাদ বলে কিছু বৈশিষ্ট্য আছে – যেগুলো ইন্ডিয়ান কনস্টিটিউশনের সাথে কমন”।   ……….. “ঢাকার ১৯৭২ সালের কনস্টিটিউশন আমাদের দুই দেশের মধ্যে নতুন ধরনের সম্পর্ক শুরু করতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে”।

    ইসলাম-কুপানি নষ্টা-সেকুলারিজমঃ
    লক্ষ্য করা যাচ্ছে বীনা সিক্রি ইদানীং সুযোগ পেলেই ‘জ্ঞানী’ লোক হওয়ার আর বাংলাদেশকে সেকুলার হতে জ্ঞান দেয়ার উৎস হিসেবে নিজেকে হাজির করতে চাইছেন। কিন্তু আমরা সত্যিই খুব দুঃখিত! আমরা মনে করি, তার কনস্টিটিউশন বা সেকুলারিজম বিষয়গুলো নিয়ে নুন্যতম কোন জ্ঞান বা ধারণাই নেই। সাথে কিছু ফ্যাক্টস প্রসঙ্গেও একেবারেই জানা নাই। কিন্তু এজ ইউজুয়াল আন্দাজে বলা ঠিকই আছে। বীণা সিক্রি চাইলে  একেবারেই কান খুলে শুনে রাখতে পারেন, নিচের বাক্যটাঃ

    কোনো কনস্টিটিউশনে যদি “আমাদের নীতি সেকুলারিজম” জাতীয় কিছু বলে উল্লেখ থাকতে দেখি আমরা তবুও ঐ রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হবে না। আসলে রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হওয়ার কোন পথ বা পদ্ধতিই এটা নয়। একেবারেই নয়। এমনকি কনস্টিটিউশনের কোথাও সেকুলারিজম শব্দটা উল্লেখ করা না থাকলেও সেই রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার বলে গণ্য হতে পারে।

    মানুষ মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত শিখে এবং চাইলে শিখতেও পারে। সিক্রি, আপনার উচিত হবে এ বিষয়ে পড়তে বসা, স্টাডি করা। দুঃখজনক হল – নেহরু, গান্ধীসহ যারা আগের ভারতের নেতা ছিলেন এমনকি ইন্দিরা গান্ধী এরা কেউই উপরে যে প্যারাটা লিখেছি, সে কথাগুলো জানতেন তা মনে হয় না। সে কারণে ভারতের কনস্টিটিউশনেও সেকুলারিজম শব্দটা আগে ছিল না। এরা সবাই সেকুলারিজম কী করলে একমাত্র হয় সে বিষয়ে জানাজানি শেষ না করেই মারা গেছেন। সেটা তাঁদের এজেন্ডাও ছিল না মনে করার কারণ আছে। কারণ কংগ্রেস ১৮৮৫ সালে জন্মের পর থেকে যে রাষ্ট্রের ধারণা রপ্ত ও বাস্তব করেছে সেটার মূল বৈশিষ্ট হল –  এক হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র।

    তাই একটা সত্য আগে জেনে রাখুন। সেকুলারিজম লিখে রাখা নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের দুই কনস্টিটিউশনে এটি কমন কথা এবং কমন ভিত্তি এবং এই কমন ভিত্তির বলে যে নতুন ধরনের সম্পর্ক ইত্যাদি অনেক কথা বীনা বলেছেন তাও অর্থহীন এবং ভিত্তিহীন – অসত্য ও ভুল।

    ফ্যাক্টসটা হল – বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার সময় রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এই তিন নীতি লেখা হয়েছিল, ১৯৭১ সালের এপ্রিলে ১১ বা পরে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১।  এরপরে ১৯৭১ সালের অক্টোবরেও – ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেক এই অনুরোধ প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার থেকে তত দিনে তিনবার চাওয়া হলেও ভারত তা দেয়নি। কারণ ইন্দিরা গান্ধীর রাষ্ট্র বিষয়ক ধারনায় অস্পষ্টতা ছিল। কিন্তু যেটা তাকে তাড়া করছিল তা হল,  ভারত মানে মূলত একটা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র ভারত যার জন্মের শত্রু পাকিস্তান যে পাকিস্তানের পুর্ব অংশ যা বাংলাদেশ নামে সাধীন হতে চাইছে কিন্তু সব ছাপিয়ে ইন্দিরাকে যা খোঁচা দিচ্ছে এরা তো নব্বই ভাগই মুসলমান – এই মুসলমানদের স্বাধীন হতে তিনি কেন গাটছাড়া বাধবেন? তাই তিনি একটা নিশ্চয়তা চাচ্ছিলেন, একটা রক্ষাকবচ চাইছিলেন। যদিও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সবগুলো পক্ষই এলাইয়েন হয়ে যাবার কারণে বাংলাদেশ স্বাধীন করতে সবাই সক্রিয় হবেনই এটা নির্ধারিত হয়ে গেছিল একাত্তরের আগষ্টেই। যেমন বাস্তবত সুযোগ ছি না নাহলে ইন্দিরাই মন শান্তির জন্য তিনি হয়ত অনুরোধ রাখতেন তোরাও ভারতের মত একটা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র হয়ে যা। তাই এরই বিকল্প শব্দ যা সম্ভবত তার পরামর্শকেরা তাকে দেয় সেটা হল “সেকুলারিজম”।  কিন্তু একটা রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন কী করে সেকুলার গণ্য হয়, কী করে তা নিশ্চিত করতে হয় তা তারা কেউ জানতেন না।  জানতেন না এত কঠিন শব্দ উচ্চারণ করে বলছি এজন্য যে  – এই কাজটা অন্তত “আমরা সেকুলার” অথবা “আমাদের রাষ্ট্রনীতি হল সেকুলার” এভাবে  তা কনষ্টিটিশনের প্রতিটা পাতায় লিখে রাখলেও তা হবে না। ফলে ইন্দিরার “আমাদের রাষ্ট্রনীতি হল সেকুলার” – লিখে রাখা দেখেই নিশ্চিত বলা যায় যে তাঁরা এটা কেউই জানতেন না। ইন্দিরার ভয় যে বাংলাদেশ না কথিত ইসলামি রাষ্ট্র হয়ে যায় – এটাই ছিল তাঁর আসল ভয়। কিন্তু তিনি জানেনই না এই ভয় তাড়ানোর পথ কী। তাই পুরা আনাড়ী হয়ে সেকুলারিজম শব্দটা তিনি আকড়ে ধরেন।  এতে তখনকার মত বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকারকে ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর যে  ড্রাফট বা পরামর্শটা পাঠান যাতে তিনি সররত আছেন জানান  সেখানে – সেকুলারিজম, ডেমোক্র্যাসি, সোস্যালিজম ও জাতীয়তাবাদ বলে নতুন করে এই চার নীতির কথা উল্লেখ করে- এটাই ভিত্তিতে বাংলাদেশ যেন নতুন করে অনুরোধ পাঠায় ইনফরমালি তাই বলা হয়েছিল।

    আরেকটু বলে রাখা ভাল, হিন্দু-ভারত ও প্রগতিধারীরা ইসলামি রাষ্ট্র বা মুসলমান রাষ্ট্র হয়ে গেল কিনা এনিয়ে প্রবল শঙ্কায় থাকে যদিও ভারত নিজেই যে হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র হয়ে জন্ম হয়ে আছে সে খবর তাঁদের নাই। তারা প্রায়ই আপত্তি তুলে পাকিস্তান একটা ইসলামি রাষ্ট্র বা মুসলমান রাষ্ট্র হয়েছিল। কিন্তু কেউই বলতে পারবে না কি দেখে তারা তা বুঝেছিল তাও বলতে পারবে না। কেবল আপাত জ্ঞানীরা দাবি করবে পাকিস্তানের ফরমাল নাম দেখে – সেটা হল ইসলামি রিপাবলিক অফ পাকিস্তান। এই নামের মধ্যে ‘ইসলাম” লেখা থাকার কারণে। কিন্তু শব্দটা আসলে ডেকোরেটিভ বা নেহায়তই সাজানোর জন্য।  পাকিস্তান রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্টমূলক শব্দ হল রিপাবলিক, একমাত্র যা দিয়ে ওর ক্যারেকটর প্রকাশ পায়। এর অর্থ হল, এটা নাগরিকের ভোটে প্রতিনিধিত্বে নির্বাচিত ক্ষমতার রাষ্ট্র এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কথা হল, এই নাগরিক হিন্দু এবং মুসলমান দুধরণের যেকেউই হতে পারে। মানে হিন্দু নাগরিকের ভোটটা অর্ধেক বলে গণনা হবে তা নয়। একজন মুসলমান নাগরিকের ভোটের মত সমান হিন্দুর ভোটটাও ঐ এক ভোট বলেই গণনা হবে। যদিও পাকিস্তান রাষ্ট্রে নাগরিক বৈষম্যমূলক কিছুই ছিল না এমন দাবি এখানে করা হচ্ছে না।

    জাতিরাষ্ট্রের ভুল নয়, দরকার বৈষম্যহীন সম-অধিকারের নাগরিক রাষ্ট্রঃ
    যাহোক কথা শেষ করতে এখন সংক্ষেপ করব। আসলে বাই ডেফিনেশন রিপাবলিক শব্দের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত যে আরেক অর্থ আছে তা হল এখানে নাগরিক বলতে সবাই বৈষম্যহীন সমান অধিকারের নাগরিক হতেই হবে ধরে নেয়া হয়েছে। তাতে নাগরিকদের মধ্যে  ধর্মীয় বা গায়ের রঙ, বা পাহাড়ি-সমতলি ধরনের ইত্যাদি যত ভিন্নতাই থাকুক না কেন। আইডিয়েলি এটাই হল রিপাবলিক ধারণা। সেটাকে আরও স্পষ্ট রাখার জন্য “সাম্য নীতির” কথা অনেকে আলাদা করে উল্লেখ করে রাখে অনেক কনষ্টিটিশন। আর যে কনষ্টটিউশন সাম্যনীতি মানবে বলে পাবলিককে প্রতিশ্রুতি দেয় সেটাই (কোন ধর্মবিদ্বেষী নয়) সত্যিকার সেকুলার রাষ্ট্র বলে বিবেচিত হবার জন্য যথেষ্ট। তাই মূলকথা ” নাগরিক সাম্যনীতি মানবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়াই – যথেষ্ট। এরপরে ঐ রাষ্ট্র আর সেকুলার কিনা এটা বোকার প্রশ্ন। ধর্ম কুপানোর বদ-চিন্তার সাথে নষ্টা-সেকুলারিজম এতে বিদায় হতে পারে। ধর্ম থেকে রাষ্ট্র আলাদা করা এটাও আরেক বদ-চিন্তা, মূলত অপ্রয়োজনীয় চিন্তা।

    কিন্তু সাবধান লেখাই যথেষ্ট না। সামাজিক রাজনৈতিক প্রাকটিস বা চর্চায় সেকথাকে বাস্তব করে দেখানো এটা আলাদা কাজ। সেটা আলাদা করে অর্জনের বিষয়। কনষ্টিটিউশনে লিখে রাখার প্রায় দুশ বছর পরেও আমেরিকায় – “ব্লাক লাইফ ম্যাটারস” বলে আন্দোলন করে মানুষে হুশ ফিরাতে হয়।

    যারা সেকুলারিজম জিনিষটাই খায় না মাথায় দেয় বুঝে না তারাই কনষ্টিটিউশনে সেকুলারিজম লিখে এবার প্রবল্ভাবে ইসলামবিদ্বেষী চর্চায় মেতে উঠে।

    বীণা সিক্রির কথায় ফিরি আবার। এখন সার করলে, এর মানে- ১. সেকুলারিজম, ডেমোক্র্যাসি, সোস্যালিজম ও জাতীয়তাবাদ বলে নতুন করে এই চার নীতি করার শর্তেই নিরুপায় বাংলাদেশকে ভারতের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতে হয়েছে। ২. তখনও ভারতের কনস্টিটিউশনে এই চার নীতির কোনো শব্দই ছিল না। তা অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া হয়েছে আমাদেরও ১৯৭২ সালের সংবিধানের অনেক পরে, ১৯৭৬ সালে, নতুন করে ভারতের কনস্টিটিউশন সংশোধন করে নিবার সময় [THE CONSTITUTION (FORTY-SECOND AMENDMENT) ACT, 1976]। এবং বলা বাহুল্য ভারতের সমাজ রাজনীতিতে যার কোন ইম্প্যাক্ট বা ভুমিকা নাই। কারণ, থাকলে আরএসএস বা মোদী সরকারের জন্ম হবার কথা না। তাই মূলত কাজটা ইন্দিরা গান্ধীসহ ভারতের যারাই এই কথিত ও নষ্টা-সেকুলারিজমের ভক্ত অথবা যারা রাষ্ট্র বা কনস্টিটিউশন সেকুলার হয় কিভাবে বুঝেন না তাদের সবার চরম অজ্ঞতাই প্রকাশ করে এবং এ অজ্ঞতা চিহ্ন হয়ে থেকে গেছে – সেকুলারিজম লিখে রাখা না রাখা পর্যন্তই এদের জ্ঞান।

    এক দিকে নতুন রাষ্ট্র গড়ার সময়ে কী কী বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হয়, সেসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় যথেষ্ট ধারণা না রাখা, অন্য দিকে মূলত ইসলামবিদ্বেষ ও ঘৃণার পরিণতিই হলো আমাদের তিন দেশে (ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান) অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও সব অসাম্যের সবচেয়ে বড় কারণ।  কারও মনের দগদগে ধর্মবিদ্বেষ ও ঘৃণা যেন সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে এজন্য সেকুলারিজম ধারণাটাকেই এর সাফাই-হাতিয়ার করে হয়েছে। নষ্টা-সেকুলারিজমকে – সেভাবে ব্যবহার করা হয়ে এসেছে এত দিন।

    আবার তাজউদ্দিন যা লিখতেই বাধ্য হয়ে থাকেন, বাংলাদেশের মানুষরা সচেতন, তাই তাদের প্রতি এই বিদ্বেষ ও ঘৃণা তারা টের পেয়েছে। তাই তারাও কনস্টিটিউশনে ‘সেকুলারিজম’ বলে এক শব্দ লিখে রেখে সকল নষ্টামি চিন্তাকে প্রতিরোধ ও শায়েস্তা করতে, কিছুটা রাগে ক্ষোভে পাল্টা – আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস বা রাষ্ট্রধর্ম ধরনের শব্দ বা ধারণা ঢুকিয়ে রেখেছে। যদিও তারা ভালোই জানে, এগুলো লিখে রাখা বা না রাখার সাথে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস নড়াচড়া হবে না, হওয়ার কোনোই সম্পর্ক নেই।

    যারা নষ্টা-সেকুলারিজমের শয়তানি থেকে বেরিয়ে শুদ্ধ হতে চান, তারা আরেকটু একটু খোঁজখবর করতে পারেন। রাজা রামমোহন রায় যাকে ভারতের কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলরা ভারতে, বিশেষ করে বাংলায় ‘রেনেসাঁর আদিগুরু’ বলে সবাই জানেন ও মানেন, তিনিই তো ব্রাহ্মসমাজ ও ব্রাহ্মধর্ম চালু করেছিলেন, ১৮১৫ সালে। তা হলে এখানে রেনেসাঁর আদিগুরু ধর্ম চালু করেন কেমনে? আর সেই ধর্ম এখানে ইতিবাচক হয় কেমনে?

    প্রগতিশীলদের এক প্রিয় ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তিনি ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী ছিলেন। কারণ তার দাদা দ্বারকানাথ শুধু রামমোহনের অনুসারী ছিলেন না, ১৮৩৩ সালে রামমোহন মারা গেলে তিনিই ব্রাহ্মসমাজের দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথ ১৯১১-১৫ সময়কালে ব্রাহ্মসমাজের মুখপাত্র ‘তত্ত্ববোধিণী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।

    কিন্তু তবু সেকুলারিজম বলি আর নাই বলি, বৈষম্যহীন সার্বজনীন সম-নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র কেন কায়েম হয় নাই আমাদের তিন রাষ্ট্রে – আমাদের সেই আদি-পাপ অন্যখানে – সেকথা এখনও বলা হয় নাই। রামমোহন ভাবতেন ১. রাষ্ট্র মানেই তা নেশন-স্টেট, ২. আর নেশন বা জাতি মানেই ধর্মের ভিত্তিতে জাতি।

    এই বোধটাই বৈষম্যহীন সমান অধিকারের নাগরিক ধারণা বা রিপাবলিক ধারণা বুঝতে না পারা বা পৌছাতে না পারার প্রধান বাধা, মুল কারণ – যেটা রামমোহন রায়ের আদি-পাপ। আমরা তিন রাষ্ট্র যার ভুক্তভোগী সাফারার!

    আর এসব ধারণা মূলত কলোনিবৃটিশ রাজের আমলের জাতি বা জাতিরাষ্ট্র এর ধারণাজাত। কিন্তু হিটলারের উত্থান ভয়াবহতা দেখার পরে ১৯৫৩ সাল থেকে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্র এক কনভেনশন ডেকে নিজেদের ভূল সংশোধন অরে নিয়েছিল। আমরা যার খবর জানি না।

    তবু রামমোহন উদ্দেশ্যমূলকভাবে এমন করেছিলেন সেটা মনে করা ভুল হবে।  আসলে ভারতের সবাইকে ব্রাহ্মধর্মে নিয়ে গিয়ে এরপর সবাইকে নিয়ে এক ব্রাহ্মধর্মীয়-জাতিরাষ্ট্র গড়তে পরিকল্পনা নিয়েছিলেন বলেই এই ধর্ম চালু করেছিলেন। তবে তা সফল হয়নি। যদি সফল হত তবুও এটা রাষ্ট্র বিষয়ে ভুল ধারণা ।  আর প্রথম ধর্মের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র গড়ার পরিকল্পনাকারী এই রামমোহন রায়। তা হলে ১৯০৬ সালে মুসলিম লিগ গঠন এবং জিন্নাহকে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ার দায়ে অভিযোগ আনা কিভাবে সঠিক হয়? সর্বোপরি ১৮৮৫ সালে জন্ম নেয়া কংগ্রেস দল সেটা তো এই রামমোহন রায়ের উদ্যোগেরই শেষ পরিণতি।

    তবু একজনের কথা এখানে উল্লেখ করে রাখি যার “ধর্মের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র গড়ার” ইচ্ছাটা উদ্দেশ্যমূলক। বাকিটা পাঠকেরা আরও খোঁজ করেন। তিনি হলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধায়। ১৮৭৯ সালে তাঁর লিখিত এক প্রবন্ধপুস্তক – নাম ছিল ‘সাম্য’। কিন্তু বইটার দ্বিতীয় মুদ্রণের সময় তিনি তা প্রত্যাহার করে নেন, আর ছাপান নাই। রামমোহন বলা যায় অকালেই অসুস্থ হয়ে মারা যান। কিন্তু এরপরেও যারা ব্রাহ্ম প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন বটে কিন্তু কার্যকর হচ্ছে না এটা সকলেই বুঝতে পারছিলেন। শেষে ১৮৭২-৭৮ সালের মধ্যে এটা তিন টুকরা ভেঙ্গে যায়। এরপর যারা ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করেছে বলে এটাকে সাফাই হিসাবে ব্যবহার করে হিন্দু প্রকল্প মানে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র প্রকল্প করে আগিয়ে যান তাঁদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র অন্যতম। এসবেরই পরিণতি ১৮৮৫ সালের কংগ্রেস। কিন্তু মুসলমানেরা কেউ একটা হিন্দু জাতিরাষ্ট্র প্রকল্পকে নিজের মনে করে নিবে সেকথার কোন জবাব দেয় নাই। বরং এদের স্বাধীন ভারত রাষ্ট্র চিন্তা যে হিন্দু জাতিরাষ্ট্র প্রকল্প চিন্তা তা ক্রমশ লুকিয়ে চলার কৌশল নিয়েছে। সামনের হিন্দু শব্দটা উচ্চারণ এড়িয়ে চলেছে। তবু প্রধান চিন্তার ভুল বা আদি-পাপ হল রাষ্ট্র মানেই ব্রাহ্মধর্মীয় জাতিরাষ্ট্র এই রাষ্ট্র-বুঝ।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২১ নভেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “বীনা সিক্রির নষ্ট সেকুলারিজম” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • গ্লোবাল ও লোকাল প্রেক্ষিতে বাইডেন পাঠ

    গ্লোবাল ও লোকাল প্রেক্ষিতে বাইডেন পাঠ

    গৌতম দাস

    ১৬ নভেম্বর ২০২০, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3gc

    US  President-elect Joe Biden

    গত কমপক্ষে সত্তর বছর ধরে রাজত্ব করা গ্লোবাল নেতা আমেরিকা শেষকালে এসে ট্রাম্পের হাতে পড়ে এক ঝটকায় সেটা  লোকাল-আমেরিকায় পরিণত হয়ে গেছিল। লোকাল মানে গ্লোবাল নেতার মফস্বলি হয়ে যাওয়া। যে মফস্বলি বলতে এখানে জাতিবাদি আমেরিকা বা ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ যেটা, সেটাই বুঝানো হয়েছে। অথচ যে আমেরিকা দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশনের দিকে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে গেল, সেই নেতা – সেই আমেরিকা কি করে “সংকীর্ণ ও আমি আগে” এই মফস্বলি অবস্থান নেয়? আবারীখন বাইডেন জিতেছে বলে, আমেরিকার আগের গ্লোবাল নেতা হয়ে থাকা অবস্থানে ফিরে যাওয়া সেটা কী আদৌ সম্ভব? সম্ভবত একেবারেই না। এছাড়া আমেরিকা যখন নেতা ছিল সে তো তখন আত্মভোলা  নিজের স্বার্থ-অবস্থান ভুলে থাকা কোন আমেরিকা ছীল না। বা কোন খেপা মাজারের পাগল ধরণের কেউ তো ছিল না। তাহলে জাতিবাদী, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ – এটাও কী ট্রাম্প আসলে আমেরিকাকে নিতে পেরেছিল?  আসলে আমেরিকার নেতৃত্বে যেখানে আশির দশক থেকে শুরু হয়ে যাওয়া গ্লোবালাইজেশন – বিশেষত গ্লোবাল পণ্য বিনিময় বাণিজ্য সেটা দুনিয়ায় চালু হয়ে গেলে তা থেকে ফিরে গিয়ে খোদ আমেরিকাই আবার জাতিবাদী হবে এটাই তো সম্ভবই না। তাহলে আমেরিকার জন্য গত চারবছরের ট্রাম্প কে ছিল?

    ডোনাল্ড ট্রাম্প ছিল একটা মশকরার নাম, একটা তামাসা। অনেক সময় কিছু কঠিন সত্যিকথা থাকে যা সরাসরি তা প্রকাশ করা যায় না, উচ্চারণও করতে চায় না অনেকে। যদিও সেটা ঘটে গিয়েছে। সেকথাটা হল, আমেরিকা  – গ্লোবাল নেতৃত্ব হারিয়েছে।  এই তিন শব্দের ছোট বাক্যটা আমেরিকার জন্য উচ্চারণ কঠিন বলে যেন একথাটাই আরেকভাবে ঘুরিয়ে বলা হয়েছিল যে জাতিবাদী  ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এর একজন ট্রাম্পের উত্থান ঘটেছে। একারণে ট্রাম্পের আরেক নাম “পাবলিক ন্যুইসেন্স” (Public nuisance)! ন্যুইসেন্স মানে কী?  মানে হল, আপনি যদি একবার নিজের পোষাক খুলে ফেলতে পারেন, শহরের প্রধান রাস্তায় ন্যাংটা হয়ে হাটতে পারেন তবে এরপর এর কোন দায় আর আপনার না। বরং তাঁদের সব দায় যারা আপনাকে ন্যাংটা দেখছে। আপনার পোষাক খুলে ফেলার মানে অন্য সব মানুষকে এবার  চোখেমুখে পোষাক এঁটে, ঢেকে চলাচল শুরু করতে বাধ্য করা। এটাই নিজের একার দায়দায়িত্ব অন্য সবার ঘাড়ে চড়িয়ে দেয়া! এটাই বেস্ট ন্যুইসেন্স! আমেরিকায় এই ন্যুইসেন্সের নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প;  তাঁর উত্থান ও চার বছরের শাসন। আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব হারিয়ে যাওয়া সরাসরি সে স্বীকার করতে পারেনি বা চায়নি বলে, আমেরিকা যেন ট্রাম্পের ন্যুইসেন্স দেখিয়ে সেটাই প্রকাশ করেছিল। সারা ইউরোপ  ট্রাম্পের আমেরিকার এই জাতিবাদ একেবারেই পছন্দ করে নাই। আর এখন বাইডেনের চ্যালেঞ্জ হল, সেই আস্থাহারানো ইউরোপকে আবার আস্থায় ফিরিয়ে আনা, যেটা প্রায় অসম্ভব। যেমন একজন বলছে, বাইডেন পুর্বাবস্থায় ফিরে যাবার প্রতিশ্রুতি দিলেও “US could swing back to Trump-ism, so they’re wary” – আমেরিকা যে আবার কোনদিন ট্রাম্পএর জাতিবাদে ফিরে যাবে না এর নিশ্চয়তা কী?

    এছাড়াও ইউরোপে ১৯৪৫ সালের পর থেকে আমেরিকান সেনা গ্যারিসন রেখে এসেছে এপর্যন্ত নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য। কিন্তু ট্রাম্পের আমেরিকা ২০১৮ সালে এসে হঠাত করে এজন্য ৪০০% হায়ার চার্জ চেয়েছিল ইউরোপের কাছে। সেটা কী আমেরিকা আবার চাইবে না? নিশ্চয়তা কী?

    “German Chancellor Angela Merkel also warned in 2018 that the European Union could no longer depend on the US, while core Asian allies, such as South Korea and Japan, suddenly found themselves faced with demands for up to 400% higher payments for the presence of US troops.”

    তাহলে এখন প্রশ্ন উঠবে, এখন আবার জোসেফ বা জো বাইডেন – তিনি কে? আগে ট্রাম্প-জোকার জাতিবাদী আমেরিকা  হয়ে তা  প্রকাশ করেছিল এবার বাইডেন এবার প্রকাশ্যে সরাসরি স্বীকার করে নিবেন যে আমেরিকা আর গ্লোবাল নেতা নাই। বড় জোর এটাই হবে।

    বাইডেনের আমেরিকাই যতটুকু যা শেষ নেতাগিরিঃ
    প্রভাবশালী সিএনএন একটা আর্টিকেল ছেপেছে যার শিরোনামঃ “সমমনা জোটবন্ধুদের আস্থা ফিরে অর্জন করা হবে বাইডেনের বিদেশনীতির কঠিনতম চ্যালেঞ্জ“(Biden’s toughest foreign policy challenge may be regaining allies’ trust)। তিন স্টাফ লেখকের এক যৌথ রিপোর্ট এটা। লেখায় বলতে চাওয়া হয়েছে, ট্রাম্প গত চার বছরে ইউরোপকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে আমেরিকা আর গ্লোবাল নেতা নয়। ইউরোপের দায় এবং ওর ভালমন্দ চিন্তা আর ট্রাম্পের নয়। ট্রাম্প হল – আপনি বাঁচলে বাপের নাম – এমন এক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট। কাজেই সেই আমেরিকাকে এবার বাইডেন আবার তুলে এনে আগের জায়গায় কতটুকু বসাতে পারবে, নেতৃত্ব ফিরে আসবে কী করে? এছাড়া বাইডেনও আবার ট্রাম্পের মত ফেলে পালাবে না তো? এই আস্থা অর্জন বাইডেনের প্রধান চ্যলেঞ্জ। কিন্তু লেখাটা আসল যে কথাটা দেখতেই পারে নাই তা হল, এখন এটা একেবারেই এক ফ্যাক্টস হল, আমেরিকা আর আর নেতৃত্বে ফিরে আসবে না। পারবেই না।

    সারকথায়, আসলে ট্রাম্প আর বাইডেন একই ঘটনার দুইটা প্রকাশ। দুজনই বলছে,  আমেরিকা আর নেতা নয়। তবে ট্রাম্প কথাটা বলছে আমেরিকার সেসব লোকের হয়ে যেন যেমন, এক পরিবারের পিতা জীবনের শেষ বয়সে এসে বলছে আমি কেবল আমার জন্য ভাত রাধব, সবার ভাত যোগাড় করতে পারব না বলে, এভাবে। অন্যদিকে বাইডেন হচ্ছে সেই আশ্বাসবাদী যে ভাবধরতে চায় আমরা এখনও নেতা আছি; অথচ এটা সত্যি না। তবু এমন বলে সবাইকে আশ্বাস সে দিচ্ছে বটে কিন্তু কেউ তারকথায় আস্থা রাখছে না, রাখবে না।

    ট্রাম্পের ন্যুইসেন্স তৈরির ক্ষমতা আরো দুমাস আছেঃ
    এমাসের গত ৭ নভেম্বরের দিকে প্রথম জানা গেছিল যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল হিসাবে জো বাইডেন অন্তত ২৭৯ [এখন সর্বশেষ গণনা অনুসারে এটা ৩০৬] ইলেক্টোরাল কলেজের আসন পেয়ে বিজয়ী হতে যাচ্ছেন । কিন্তু তা সত্ত্বেও নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে বিতর্ক, আপত্তি বা মামলার নিষ্পত্তি এখনো খতম হয়নি। তবে ধীরে ধীরে প্রতিটি মামলা বা ঘটনায় ট্রাম্প-ক্যাম্পের তোলা আপত্তি বা অভিযোগের কোনো “প্রমাণ পাওয়া যায়নি” বলেই তা খারিজ হয়ে ক্রমে অনেক কিছুর নিষ্পত্তি হয়ে চলেছে [US election security officials reject Trump’s fraud claims]। তবু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল প্রসঙ্গে আমেরিকার আকাশের কালো মেঘ ও অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। এর পেছনের প্রধান কারণ সম্ভবত, খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু ঘোষণা ও পাল্টা পদক্ষেপ। যেমন- তিনি নিজেই হুমকি দিয়েছেন যে- ‘তিনিই এই নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন অথচ তাদেরকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তারা হেরেছেন বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে”। এটা তিনি মানেন না।  এতে এবার সংশ্লিষ্ট কিছু পদক্ষেপ বিপদজনক হয়ে উঠছে বলে মনে করা হচ্ছে। যেমন, জেনারেল সার্ভিস এডমিনিস্টেশন (জিএসএ) বলে হোয়াইট হাউজের একটা সেকশন আছে। এই অফিস নতুন প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর শপথ ইত্যাদির প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো করে থাকে। ট্রাম্পের বিশেষ নির্দেশে এই অফিস নড়াচড়াহীন বসে আছে। বিবিসি লিখছে এই অকার্যকারিতা আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকির ইস্যু হয়ে উঠতে পারে [could access “pressing national security issues”.]।
    কিন্তু ট্রাম্প-ক্যাম্প অনড়। তারা মূলত নানান ইস্যুতে  প্রমাণসহ অভিযোগ তুলে ধরতে আগ্রহী হওয়ার চেয়ে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা ছড়ানোর চেষ্টা করছে অনেক বেশি। ট্রাম্প স্টেট ডিপার্টমেন্টের পম্পেইকে দিয়ে ঘোষণা করিয়েছেন যে, আগামী ২০ জানুয়ারির (দেশের নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ নেয়ার দিন) পরে ট্রাম্পের সরকার কার্যক্রম অব্যহতভাবে চালু রাখবে। তাই নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অজানা আশঙ্কা যা আগে কখনো আমেরিকা দেখেনি তা এখন থেকেই তাদের সমাজে ছেয়ে বসে আছে। যদিও সেটা বাড়ছে, ঠিক এমনটাও বলা যাবে না।
    বরং ছোট ছোট পদক্ষেপে ক্রমে অভিযোগগুলো আদালতে বা নির্বাচনী কর্তাদের হাতে প্রত্যাখ্যান বা নাকচ হয়ে যাচ্ছে। ১৪ নভেম্বরের শুরুতে, ভোর রাতের হিসাবে কয়েক ঘণ্টা আগে প্রকাশিত কয়েকটা খবরের শিরোনাম এ রকম- ১. পেনসিলভানিয়ার নির্বাচনী কর্তারা নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে আদালতে ট্রাম্পের মামলার ফেডারেল বিচারককে জানিয়েছেন, তিনি মামলা বাতিল ঘোষণা করে দিতে পারেন এখন – রয়টার্সের প্রকাশিত রিপোর্ট। ২.আমেরিকার নিবার্চনী কর্তারা ট্রাম্পের কারচুপির অভিযোগ বা দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন- বিবিসি ইংরেজির রিপোর্ট। তারা আরো বলেছেন, ‘এবারের ভোট ব্যবস্থায় কোনো ভোট বাতিল হয়েছে বা হারিয়ে গেছে, পরিবর্তন করা হয়েছে অথবা কোনো ধরনের কালোদাগ লেগেছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’ বরং আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ‘ভালো নির্বাচনগুলোর অন্যতম এবারের ভোট”। ৩. বাইডেন এরিজোনার আসনগুলোও পেয়ে নিজের ইলেক্টোরাল কলেজ আসন ২৯০ তে নিয়ে আরো পোক্ত হতে যাচ্ছেন- রয়টার্সের প্রকাশিত রিপোর্ট। ৪. এটা বিবিসি বাংলার ফ্যাক্ট চেক টিমের গবেষণা; মানে, তাদের ভাষায় ‘বিবিসির রিয়েলিটি চেক টিম’-এর ১০ নভেম্বরের রিপোর্ট। তারা বলছেন, “কোনো তথ্যপ্রমাণ না দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বক্তৃতা-বিবৃতিতে বেশ কয়েকটি পোস্টের কথা উল্লেখ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রচারণা শিবির”।
    এভাবেই ট্রাম্পের অভিযোগের পাটাতন ক্রমে নিজ পায়ের নিচের মাটি হারিয়ে চলেছে। তবু সব অভিযোগ শেষ হয়েছে এমন নয়। এর প্রধান কারণ, আমেরিকার নির্বাচনী ব্যবস্থায় আমাদের মতো কোন কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল নির্বাচনী অফিস বলে কিছু নেই। ভোট নেয়া, তদারকি ও ফলাফল ঘোষণা প্রত্যেকটা রাজ্যের দায়িত্ব এবং তা তাদেরই নিজ নিজ আইনে পরিচালিত হতে হয়; যাতে আবার রাজ্যে রাজ্যে কিছু আইনগত ভিন্নতাও আছে। তাই এখন ট্রাম্পের অভিযোগগুলো নিষ্পন্ন হচ্ছে, প্রতিটি রাজ্যে এবং মূলত নির্বাচন অফিস ও আদালতে। তবু একটা ধারণা হিসেবে বলা যায়, এগুলো নিষ্পত্তি করতে আগামী ২৩ নভেম্বরের মধ্যে রাজ্যের নির্বাচনী কর্মকর্তারা ফলাফল ঘোষণার কাগজে স্বাক্ষর করা শেষ করতে পারেন। তখন এই ফলাফল ‘অফিসিয়ালি ঘোষিত ফলাফল’ বলে বিবেচিত হবে।
    আর তখন ট্রাম্পের অফিস ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করতে বাধ্য হয়ে যাবে। তা না করলে আদালত ট্রাম্পের অফিসকে অকার্যকারিতার জন্য অভিযুক্ত করতে পারবেন এবং পাল্টা করণীয় নির্দেশ জারি করতে পারেন। অর্থাৎ ক্রমে ট্রাম্পের জন্য, ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করার বাধ্যবাধকতা কঠিন ও শক্ত হয়ে আসছে।
    এভাবে অনুমান করা যায়, ট্রাম্প যতই হুমকি দেন তবু, ২০ জানুয়ারির আগেই ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু ও সম্পন্ন করতে ট্রাম্প বাধ্য হবেন। আর সবার উপরে আমেরিকার মানুষ স্থিতিশীলতা চায়, দেশে একটা ফাংশনাল সিস্টেম দেখতে চায়; মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো হতাশাগ্রস্ত জীবনের কোনো দেউলিয়া ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট হয়ে বলবেন, ‘আমি ক্ষমতা হস্তান্তর করব না’-এই দায়দায়িত্বহীন বাক্য কিংবা বিশৃঙ্খলা মানুষ দেখতে চায় না। জীবন ইতিবাচক এবং জীবন এমন আশা-ভরসা নিয়েই চলে। তাই আমরা বরং এখন জো বাইডেনের বিজয়ে ও হবু বাইডেন প্রশাসনের চলার পথের নীতি-পলিসি কী হতে যাচ্ছে আলোচনা সেদিকে নিচ্ছি।

    বাইডেন প্রশাসন সম্ভাব্য অবস্থান-বৈশিষ্ট কেমনঃ
    প্রথমত এ্তদিন ট্রাম্প গত চার বছরে যত ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন, এর উল্টা যাত্রায় বাইডেন এখন যতটা সম্ভব আগের ওবামা আমলের অভিমুখী হবেন। সাধারণভাবে যা “ডেমোক্র্যাট আইডিয়াল অবস্থান” মনে করা হয় তেমন অভিমুখে যাবে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটা আরো প্রো-পাবলিক হতে চেষ্টা করবে, সাধারণ জনমত ঠিক যা আশা করে। যেমন- পরিবেশ ইস্যুতে ‘প্যারিস চুক্তিতে’ ফেরত যাওয়া আর হিউম্যান রাইটস ইস্যুতে অনেক কড়া অবস্থান নিয়ে আসছেন বাইডেন।
    তবে সব কিছুর উপরে যা প্রধান দ্বন্দ্ব, যার নিরসন হবে বাইডেনের মুখ্য ইস্যু – যা অনেকটা পরস্পর সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো চাকার মধ্যে প্রথম যে চাকাটা ঘুরে বাকি সব চাকাকে ঘুরতে বাধ্য করে, এমন সেই ‘প্রাইম মুভার’ ইস্যু হবে চীনের সাথে ‘বাণিজ্য ইস্যু’ নিয়ে আলোচনা (যাকে গত চার বছর বাণিজ্যযুদ্ধ বলে ডাকা হয়েছে) তা শুরু করা। সেকারণে, আগামি ২০ জানুয়ারি বাইডেনের শপথ নেয়ার পরেই এক নম্বর প্রায়রিটি হবে এই ইস্যু।

    যদিও ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের আমলেই তা তিন পর্বে মিটিয়ে ফেলার একটা পরিকল্পনা ছিল যার প্রথম পর্ব ট্রাম্পই আলোচনা ও ঐকমত্য শেষে স্বাক্ষরও সমাপ্ত করেছিলেন। কিন্তু আর অগ্রগতিতে না গিয়ে সব স্তব্ধ করে রেখে দিয়েছিলেন। সেসবই এবার ফাংশনাল হতে শুরু করবে। এটাই হবে বাইডেনের ‘প্রাইম মুভার’ ঘটনা। এ জন্য যে, ট্রাম্প বাণিজ্য আলোচনাকে বাণিজ্যযুদ্ধের জায়গায় নেয়াতেই আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব যা গত ৭৫ বছর ধরে রাজত্ব করার শেষে এর পালাবদলটা মসৃণ হওয়ার বদলে তা যুদ্ধপরিস্থিতির দিকে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ঠেলে দেয়ার দিকে নিচ্ছিলেন ট্রাম্প। আর এটাই এখন অভিমুখ বদলাবে, যেটা দুনিয়াজুড়ে সবার আশা। এই অর্থে, বাইডেনের বিজয়ের প্রাথমিক খবর মানুষকে এক সম্ভাব্য গ্লোবাল যুদ্ধপরিস্থিতি এড়াতে এক মুক্তির সূচনা করল মনে করেছে। এক সম্ভাব্য গ্লোবালযুদ্ধ এড়াতে পারা অর্থে এটা এক নাজাত।

    তাহলে এখন কী হতে পারে?
    খুব সম্ভবত বাণিজ্য আলোচনায় আসলে যা হবে চীনের দিক থেকে দেখলে তাকে বলা যায়- এটা হবে, যত বেশি সম্ভব আমেরিকাকে বাজার ছাড় দিয়ে এর বিনিময়ে চীন নিজের গ্লোবাল নেতৃত্ব নেয়া- এই হস্তান্তর মসৃণ ও বাধাহীন করার নিশ্চয়তা ‘কিনে নেয়া’। বাণিজ্য আলোচনায় এই দেয়া-নেয়াই সম্পন্ন হতে পারে। যদিও  এটা আবার দুইভাবে ঘটতে পারে। এক, মুখে স্বীকার করে নিয়ে শুরু করা যে, আমরা পরস্পর এটাই বিনিময় করছি। অথবা তা হতে পারে মুখে স্বীকার না করে দুইপক্ষই মনে মনে এটা ধরে নিয়ে। তবে মুখে স্বীকার না করে নেয়ার কৌশলগত সুবিধা বেশি।
    এভাবে বাণিজ্য আলোচনা-নেগোসিয়েশনের আগের পথেই দ্বিতীয় পর্ব একটা চুক্তিতে পৌঁছালেই এরপর জো বাইডেন-শি জিনপিংয়ের যৌথ সামিট অনুষ্ঠিত হতে পারবে ও হবে। আর দুইপক্ষের উপরই দ্রুত এমনটা করার জন্য গ্লোবাল অর্থনীতি ও বাজারের চাপ থাকবে প্রচন্ড। কারণ করোনাকালে দ্বিতীয়বারের আক্রমণের ধাক্কাও আসন্ন। ফলে নিরন্তর মন্দা বাজারে মধ্যে ইতিবাচক মেসেজ পেতে সবাই আগ্রহী যাতে বাজার চাবুক খেয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

    এতে গ্লোবাল বাজার ও ক্ষমতার করিডোরে কী মেসেজ যাবে?
    সামগ্রিকভাবে মূল মেসেজটা হবে ইন্দো-প্যাসিফিক এবং কোয়াড [QUAD] উদ্যোগ ও স্ট্র্যাটেজিকে কেন্দ্র করে। ট্রাম্প মূলত মরিয়া হয়ে এদুটাকে একই সাথে সামরিক জোট ও বাণিজ্য জোট হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়ে চলেছিলেন। ট্রাম্প জানতেন এটা ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের পরে অকেজো দিশেহারা স্থবির হয়ে যাবে, কারণ নির্বাচনে পরাজিত হয়ে গেলে তো এমনই দশা হওয়ার কথা।
    চীনের সাথে বাণিজ্য আলোচনায় একবার প্রথমপর্বের আলোচনার শেষে  ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে এবং প্রকাশ্যে প্রেসের সামনে বলেছিলেন, চীন বাকি নেগোসিয়েশন আর করল না, আগালোও না – বাইডেনের ভরসায়। মানে নিজ ক্ষমতাসীন থাকার দু’বছরের মধ্যেই সে সময় ট্রাম্প বুঝাতে চেয়েছিলেন আগামীতে রিপাবলিকান প্রার্থী বাইডেন জিতে আসবে, এই ভরসায় আছে চীন। আর তারা তখন বেটার সুবিধা পাবে ও নিবে (ট্রাম্পের কাছে পাচ্ছে না) চিন্তা করে এখন ট্রাম্পের সাথে কম্প্রোমাইজ ডিলে যাচ্ছে না। তাই তিনি ওখানে ঘোষণা করেন, আগামীতে বাইডেনের ক্ষমতাসীন হওয়া বন্ধ করতে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন। তাই ধীরে ধীরে চীনবিরোধী জোট গড়া – আর সেটা খাঁড়া করা খুবই কঠিন হলেও তিনি ইন্দো-প্যাসিফিক ও কোয়াড গড়ে এটাতে সামরিক জোট ও বাণিজ্য জোট এ দুই লক্ষ্য জুড়ে দিয়েছিলেন।
    আর এখন ঠিক এ জায়গাটাতেই বাইডেন বদল ঘটাবেন। কৌশলগতভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক ও কোয়াড উদ্যোগ ভেঙে না দিয়ে বরং এখন এটা কেবল বাণিজ্যের জোট এমন ধারণা সেট করে দেবেন। অর্থাৎ চীনের সাথে বাইডেন কী দেয়া-নেয়া করতে যাচ্ছেন বা করে ফেলবেন এর ছাপ-ইঙ্গিত তিনি এভাবে প্রকাশ করবেন।
    স্বভাবতই, আড়াই লাখ আমেরিকানের কোভিড-১৯-এ মৃত্যু আর প্রায় ৯ কোটি বেকারের আমেরিকায় বাইডেনের চীনা ডিল বা সম্ভাব্য এই ‘দেয়া-নেয়া’ – এটা একটা ইতিবাচক আবহাওয়া তৈরি করবে। যেকোনো অর্থনীতিই বেকারত্ব ও মহামারী থেকে বের হয়ে আসতে চায়। কারণ ‘উহান ভাইরাস’ বলে ট্রাম্পের নিজের সব শোচনীয় ম্যানেজমেন্ট ব্যর্থতা চীনের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া নির্বাচন পার হওয়ার জন্য হয়তো চলে। কিন্তু বাস্তবতা খুব কঠিন। তাই, না আমেরিকান অর্থনীতি না বেকার মানুষ এসব কথাকে এতদিন ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে। অতএব, যদি এভাবেই আগানো হয় তবে বাইডেন-শি জিনপিংয়ের সামিট তখন আমেরিকায় এক শীতল-পরশের মতো ভূমিকা নিয়ে হাজির হবে বলে অনুমান করা যায়।

    তাহলে ভারত তখন কোথায় যাবে?
    সীমান্তে চীন ভারতের সব দখল করে ১৯৫৯ সালের পুরনো সীমান্তকে ভিত্তি করে বসে পড়াতে ভারতের ইন্টেলিজেন্সিয়া বিশেষত মিডিয়া ফোরফ্রন্টে যারা আছেন তারা বুঝে গেছেন, মোদি তাদের সবাইকে বেইজ্জতি করে ফেলেছেন। কিন্তু তবু তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত ইজ্জত ও নিরাপত্তা হারানোর অসহায়ত্ব একালে ফুটে উঠেছে। তারা পরিষ্কার জানেন, কেন চীন ১৯৫৯ সালের পুরনো সীমান্তকে ভিত্তি মেনে ভারতের সব কেড়ে নিয়েছে। কেন ‘এলএসি’ [LAC] বলে এখন কিছুই নেই। মোদীর হামবড়া ভাব আর পুরা কাশ্মির ভারতের বলে দখলের দাবি – এসব অবিবেচক অবস্থাই ভারতে তাদেরকে ইজ্জত ও নিরাপত্তা হারানোর অসহায়ত্ব অনুভবে ফেলে দিয়েছে, তা তারা কমবেশি সকলেই জানেন। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত হল – তবু কথিত ‘জাতীয় স্বার্থের’ নামে মিথ্যা কথার জার্নালিজমই তাদের করতে হবে। অথচ যা মিথ্যা তা কখনই জার্নাজিলম-ই নয়। তাই তাদের দেখে  বাইরে থেকে মনে হবে তারা মোদীর পক্ষেই দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু আসলে এটা তাদের ইজ্জত ও নিরাপত্তা হারানোর অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি পাবেন, তাদের রিলিফ দিবে মনে করেই এই মিথ্যার চর্চার মহড়া যাতে তারা এখন যুক্ত ও মত্ত হয়েছেন।

    এ কারণে আগামীতে বাইডেন-জিনপিংয়ের সামিট যতই আসন্ন হয়ে উঠবে ভারত ততোধিক অস্থির হয়ে ভারত-চীন সম্পর্ক আবার আগের মত অবস্থায় ফিরে পেতে মরিয়া ও ন্যাংটা হয়ে উঠবে। চীনের সাথে ৫ আগস্ট ২০১৯ সালের কাশ্মিরের স্ট্যাটাস বদলে দিবার আগের সময়ের চীন-ভারত সম্পর্ক যে জায়গায় ছিল সেখানে ফিরে যাওয়ার জন্য অস্থির ও মরিয়া হয়ে উঠবে। অবশ্য একালের মোদীর ভারত জানবে যে, বাইডেনের আমেরিকা ভারতকে আর ‘চীন ঠেকানোর’ কাজের কোনো ঠিকা দেবে না। ফলে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া- সেই ঠিকা ফেরত পাওয়া – না, এরও কোনো বালাই থাকবে না। তবু চীন-আমেরিকার সম্পর্কের টেনশনের আড়ালে ভারত নিজেকে লুকায় রাখার কৌশল নিবে যাতে বাইডেনের “ঝারি” একটু কম ভারতের গায়ে লাগে।

    আর এটাই মোদীর সবচেয়ে বড় “বাইডেন-অস্বস্তি” ইতোমধ্যেই মোদীকে কঠিনভাবে অস্থির করে তুলেছে। সে কারণে বাইডেন আসছে এই খবর পাওয়ার পর থেকে ভারতীয় মিডিয়ার সুর বদলে গেছে।  ট্রাম্পকে বাপ ডাকা আক্ষরিক অর্থেই পুজা করা মোদীর ভারতের জন্য বাইডেন জিতাতে এখন আঙুর ফলে একেবারেই টক হয়ে গেছে! যেমন আনন্দবাজার লিখছে, “অ্যামেরিকায় গদি বদলালে ভারতের কী”! যেন সমাজ-সংসারে নিরাসক্ত এক যোগী কথা বলছে। মানে তারা এখন ভেক ধরে বলছে, “আমেরিকার নির্বাচনে কে জিতল তাতে ভারতের কিছুই যায় আসে না”। অর্থাৎ তারা আসলে যেন বলতে চাইছে,  “হে মহান বাইডেন সাব, আমরা ভুল করেছি; আমাদের মাফ করে দাও। আমাদের মোদি ‘হাউ ডি মোদী’ করেছিল, হিউস্টনে আর গুজরাটে। যেখানে মোদী নিজে মুখে সমস্ত প্রটোকল ইজ্জত সম্মান ভেঙ্গে “আব কি বার ট্রাম্প সরকার” (পরের নির্বাচনে ট্রাম্পই জিতবেন) বলে স্লোগান ধরেছিল। এটা গর্হিত কাজ, অসৌজন্যমূলক। কারণ একজন সিটিং প্রধানমন্ত্রী এভাবে পক্ষপাতিত্বপূর্ণ অবস্থান প্রকাশ্যে নিয়েছে। ফলে এখন বাইডেন-মোদী কখনো সাক্ষাৎ হলে (বা একারণেই হয়ত সাক্ষাত হতে অনেক দেরি হবে) মোদী মুখ দেখাবেন কী করে, সেই অস্বস্তি এড়াবেন কী করে? এমন ন্যূনতম হুঁশজ্ঞান নেই এমন লোকই এখন ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার প্রধান। আর সেসব ঢাকতেই মোদী এখন মিডিয়াকে কিনে-বশ করে এমন রিপোর্ট ছাপানোর তোড়জোড়। বিবিসি বাংলার ট্রাম্পের নামে আগেভাগে ‘আব কি বার ট্রাম্প সরকার’ জয়ধ্বনি দিয়ে মোদি কি এখন বিড়ম্বনায়?’ এই শিরোনামের রিপোর্টটা বলে দেয়, মোদী কোন বেইজ্জতিতে আছেন। ভারতের কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মী দুই সপ্তাহ আগে যারা ট্রাম্পকেই তাদের নিরাপত্তাদাতা মনে করতেন এরাই এখন বলছেন, বাইডেনের সাথে ভারতের সম্পর্ক যেন কতকাল আগের। আসলে তামাশার বোধ হয় কোনো সীমা থাকে না!

    এদিকে চীন-ভারত লাদাখ সীমান্তে সেনা প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা ইতোমধ্যেই হঠাৎ গতি পেয়েছে, মনে হচ্ছে।

    কিন্তু বাংলাদেশে?
    কিন্তু বাইডেন জিতবার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশে সম্ভবত হবে সবার চেয়ে ভিন্ন। এর মূল কারণ, হিউম্যান রাইট মেনে চলার প্রশ্নে বাইডেনের কড়া অবস্থান নিবেন অনুমান করা হচ্ছে তাই। এটাই মোদীর জন্যও সবচেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ার কারণ হয়েছে ইতোমধ্যেই। বাইডেন আগেই তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে কাশ্মিরে রাইট ভায়োলেশন নিয়ে সোচ্চার হবেন জানিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও হিউম্যান রাইট ইস্যুতে কড়া অবস্থানের কারণ হল,  সাধারণভবে এটা ছিল সবাইকে দেয়া, মূলত হেনরি কিসিঞ্জারের পরামর্শ যে, একালে চীনকে বেকায়দায় রাখতে চাইলে হিউম্যান রাইট মেনে চলার প্রশ্নে আমেরিকার নিজ প্রশাসনের কড়া অবস্থান জরুরি। তাই ব্যবসা পাওয়ার লোভে আমেরিকার মানবাধিকারে ছাড় দেয়া যাবে না। এই নীতি অবশ্য ডেমোক্র্যাটরা তুলনামূলক বেশি অনুসরণ করেছেন। বাইডেনের কড়া অবস্থানের পেছনে এটাই কারণ।

    আর এটাই হাসিনা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। অনেকে বলতে পারেন, এটাই একই সাথে চীনের উপরেও চাপ, যাতে হাসিনা-চীন ঘনিষ্ঠতা কমে। এক থিঙ্কট্যাঙ্ক কনসালট্যান্ট কুগেলমানের [Michael Kugelman] বরাতে বাংলাদেশের একটি পত্রিকা লিখেছে, এই “ঘনিষ্ঠতা কমানো হবে” বাইডেনের বাংলাদেশ অবস্থানের মূল নির্ণায়ক।

    “I do imagine that he will view Bangladesh through the lens of US-China rivalry, and he will aim to engage with Dhaka in order to encourage it to distance itself from Beijing.

    কিন্তু কুগেলমানের একথা আসলে ‘ওভার এস্টিমেশন’। কারণ ‘বেসিক ফ্যাক্টস’ হল – অবকাঠামোর- ঋণদাতা বিনিয়োগকারী  হিসাবে আমেরিকা বাংলাদেশে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী একেবারেই নয়, এমনকি চাইলেও তা হতে পারবে না। আমেরিকার এমন বিনিয়োগ সক্ষমতা নাই বলেই তো গ্লোবাল নেতা হবার পদ হারাচ্ছে, চীন সে জায়গায় বসতে যোগ্য হয়ে গেছে। তাই আমেরিকার বাংলাদেশের ‘চীনা ঘনিষ্ঠতা’ ছুটানোর কোনো মুরোদই নেই। মনে রাখাই ভাল ধমকিয়ে কারো মন পাওয়া যায় না, এর সম্ভাবনা নেই। সে জন্য মন পাওয়ার ‘তরিকা’ ধরতে হয়। তবে অবশ্য বাংলাদেশে ইন্টারভেন করার মুরোদ আমেরিকার এখনো শেষ প্রান্তে হলেও আছে এবং খুব সম্ভবত এই বাইডেন প্রশাসনই হবে বাংলাদেশে ইন্টারভেন করার ব্যাপারে আমেরিকার শেষ প্রশাসন। আরেক বটম লাইন হল – চীন বাংলাদেশের কাছে অবকাঠামো-ঋণদাতা বিনিয়োগকারী থাকবেই, তাতে বাংলাদেশে যেই ক্ষমতায় থাক অথবা একটা নির্বাচিত সরকার থাকুক কি না থাকুক কিংবা ওই ঋণ থেকে অর্থ সরানোর সুযোগ কারো থাকুক আর নাই থাকুক। কাজেই কুগেলমান যেভাবে কথাটা চীনকে জড়িয়ে হাজির হয়েছেন তাতে ব্যাপারটা এক “সস্তা ভয় দেখানো’  হয়েছে। ভদ্র ভাষায় বলতে হয়, এটা কুগেলমানের “অতিসরলীকৃত এক বুঝ” বলা যায়।

    কিন্তু বাংলাদেশে হিউম্যান রাইট মেনে চলার রেকর্ড সঠিক করার চাপ আসন্ন, একথা বাস্তব ও সত্য। ট্রাম্প নয়, এটা বাইডেন জিতেছে বলে, ভারত আর বাইডেনের পিঠে চেপে চলা বা আসা কোনো ‘ব্যাগেজ’ নয়। তাই সরাসরি আমেরিকান চাপই আমাদের সরকারের এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছে। কিন্তু তাই বলে ভারতের কোন চাপ নয়। হবার সম্ভাবনাও নাই। আবার ওদিকে রাতারাতি বাংলাদেশের সরকার ভাল হয়ে যাবে, হিউম্যান রাইটের সব রেকর্ড ভালো করে ফেলবে – তা সম্ভবই নয়। করা যায় না। তবে বাইডেন হিউম্যান রাইট মেনে চলার জন্য সরকারকে চাপ দিলে এর ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষের একটা সমর্থন আমেরিকার পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়াবে অবশ্যই। ঠিক যে অর্থে হাসিনা সরকারের জনসমর্থন বা পাবলিক রেটিং প্রায় নেই বলে, বাইডেনের চাপের বিরুদ্ধে, ইন্টারভেনশনের বিরুদ্ধে জনমতকে সরকার কাজে লাগাতে ব্যর্থ হবে।

    তবু ‘কী হতে যাচ্ছে’ তা নিয়ে এসব আসলে অনুমানের কথা। বাস্তবে কিভাবে ব্যাপারটা ঘটবে, তা দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। যদিও চ্যালেঞ্জগুলো বাস্তব!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৪ নভেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “গ্লোবাল ও লোকালি ‘বাইডেন পাঠ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নেপাল রাজনৈতিক অস্থিরতায়, অভিমুখ কোনদিকে

    নেপাল রাজনৈতিক অস্থিরতায়, অভিমুখ কোনদিকে

    গৌতম দাস

    ০৯ নভেম্বর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3fv

    ‘র’ এর প্রধান সীমান্ত কুমার গোয়েল, নেপালের প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রসাদ অলি ও মাওবাদী নেতা পুষ্পকমল দাহাল প্রচন্ড

    Democrat Joe Biden won the U.S. presidential election on Saturday after a bitter campaign…… REUTERS

    বিশ্বের চলতি প্রধান ঘটনায় এখন, সবশেষের কথাটা সবার আগে বলবার সময়।  জো বাইডেন বিজয়ী নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। যদিও ট্রাম্প এখনও ভুয়া আপত্তিতে ঘোঁত ঘোঁত শব্দ তুলছেন! যা এক সপ্তাহের মধ্যে মিলিয়ে যাবে। তবে এর আগের ঘটনাবলীতে গত ৩ নভেম্বরের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল যেখানে ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনকে জিতে যাবার পক্ষে আগাচ্ছিল। কিন্তু বিজয়ী হতে প্রয়োজনীয় ২৭০ ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের শেষ ৬টা পূরণ হওয়ার আগেই মনে হচ্ছিল তা থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সেটা পুনঃগণনার ফ্যারে পরে পিছিয়ে ২৫৩ হয়ে যায়। এদিকে তাতে অন্তত একটা রাজ্যে (জর্জিয়া) ভোট পুনঃগণনা শুরু হয়েছিল। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ফলাফলের পার্থক্য ১% এর নিচে হলে সেখানে ঐ পরিস্থিতিতে কেউ অনুরোধ না করলেও আপনাতেই পুনঃগণনা শুরু হয়ে যায়। তাতে আগে যদিও ফলাফলের সামগ্রিক ঝোঁকটা বাইডেনকে বিজয়ী করার দিকে ছিল তা থমকে দাঁড়িয়ে যায়। আর যতক্ষণ ফলাফল নিশ্চিত নয় ততক্ষণ এ নিয়ে এর চেয়ে বেশি কথা তখনই  আর না বলা ভাল মনে হয়েছিল। যদিও আভাস বলে সে শব্দটা আছে সেটা বিচারে এসব বুঝাবুঝির ক্ষেত্রে আমার চোখে এক অদ্ভুত ও সঠিক ইঙ্গিত দিবার উৎস হাজির হয়েছিল – ওয়াল স্ট্রিট বা আমেরিকান শেয়ার মার্কেটকে, যা স্বার্থসংশ্লিষ্টরা ছাড়া খুব কম মানুষই জানে বা আমল করে থাকে। ঘটনা হল, নির্বাচনি ফলাফল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তাতে রাজনীতিবিদের চেয়েও মারাত্মকভাবে যায়-আসে যাদের তারা হল ওয়াল স্টিটে যারা সারাদিন কাটান তাদের স্বার্থ। তাই মার্কেটের প্রতিক্রিয়া্ হল, নির্বাচনি ফলাফলের অভিমুখ বুঝবার বেস্ট উপায়। হয়েছেও তাই। আমেরিকান বাজার বাইডেন জিততেছে ধরে নিয়ে গত তিনদিন ধরে বাজার চাঙ্গা!

    সর্বশেষ পেলসিলভানিয়ার ইলেক্টোরাল কলেজ আসন সাথে গোনায় ধরে বাইডেন এখন ২৭৩ অর্থাৎ তিনিই প্রথম ২৭০ মার্ক ছাড়িয়ে গেলেন ফলে বিজয়ী তিনি। এছাড়া এখনও যে কয়টা গণনার সমাপ্তি টানতে বাকি তা সাথে ধরলে অনুমান করা হচ্ছে বাইডেন ৩০৬ পর্যন্ত যেতে পারে।

    ওদিকে ফলাফল পুরা প্রকাশিত হওয়ার আগেই এখনও ক্ষমতাসীন ট্রাম্প নিজের বিজয় ঘোষণা করে বক্তৃতা প্রচার করে দিয়েছেন। আর সাথে তিনি এমন একটি ধারণা প্রচার করে চলেছেন যেন, তিনি বা তাঁর দল এখন আমেরিকান সুপ্রিম কোর্টে অসংখ্য (ভিত্তিহীন হলেও) অভিযোগ নিয়ে একবার হাজির হতে পারলেই আদালত ট্রাম্পের বিজয়ের পক্ষে রায় দিয়ে দেবেন। কিন্তু কেন এমন হবে? এর জবাবটাও তিনি প্রচার-প্রপাগান্ডা করছেন আরেক কানকথা ছড়িয়ে যে, এখনকার সুপ্রিম কোর্টের ৯ জন বিচারকের মধ্যে ৬ জনের নিয়োগ হয়েছে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টদের হাতে; মানে তারা কনজারভেটিভ চিন্তার মানুষ এ’হল অনুমান। অতএব এ’কারণে ট্রাম্পই নিজের জিতে যাবার পক্ষে আদালতের রায় পাবেন। কিন্তু এটা খুবই আবেগি এবং সরল দলবাজি চিন্তা। আমেরিকার সাধারণ সমাজ ও বিচার সমাজ কি এতই নিচা ও হাল্কা-চিন্তা করা লোক – গর্ধব বোকা আর অবিবেচক? এখানে সবচেয়ে বড় ভুল-অনুমানটা হল সাধারণ  আমেরিকানদেরকে আবেগি মনে করা।  কাজেই এই অনুমান ভিত্তিহীন। যদিও বিচারকদের কেউ রক্ষণশীল চিন্তার হতেই পারেন; তাই বলে কোনো যুক্তি-প্রমাণ বা শক্ত কারণ ছাড়াই কি তাঁরা রায় দিতে পারেন? এটা বেশি কথা বলা। এছাড়া আরেকটা কথা মনে রাখতে হবে, প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী ধরনের নির্বাহী ক্ষমতাধারীরা যা করতে পারেন একজন বিচারক তা পারেন না। সেটা হল, কোন নির্বাহী কোন সিদ্ধান্ত নিলে সে সিদ্ধান্তের পক্ষে কারণ তিনি প্রকাশ্যে নাও বলতে পারেন; ‘রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা’ ইত্যাদির কথা তুলে। কিন্তু একজন বিচারক রায় লেখার সময় কারণ উল্লেখ করে সেটা যে ন্যায়সঙ্গত এর সপক্ষে সাফাই দিয়েই তাকে রায় লিখতে হয়। অতএব ট্রাম্পের চাপাবাজি বা বুলি বন্ধ হবে!
    আর ঠিক সে কারণে এখন আমেরিকান বিশ্লেষকরাই মিডিয়াতে মন্তব্য করছেন, বিচারককে কেবল প্রমাণ হাতে পাওয়ার পরেই আর ন্যায়সঙ্গত কারণ দেখিয়েই রায় লিখতে হবে। আর এর চেয়েও বড় কথা, বাস্তবে যেসব নির্বাচনী অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে মামলা করা হয় বা এবার হয়েছে সেখানে কথা একটাই বলা হচ্ছে, ‘অভিযোগ দেয়া হয়েছে’ কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রমাণসহ অভিযোগ তোলা হয়নি। ফলে বিচারক তা আমলে না নেয়ার সম্ভাবনাই প্রবল হচ্ছে। তাই এক কথায় বললে, ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দলের ভূমিকা এখন এতই নোংরা ও ধ্বংসাত্মক যে, যেকোন সময় জনমত উল্টে তাদের এসব তৎপরতার বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে। আমেরিকার সাধারণ নাগরিক সারা দিন এত কঠিন বাস্তবতার মধ্যে কষ্টকর জীবনযাপন ও বসবাস করতে হয় যে, কোনো আবেগে প্রভাবিত হওয়ার চেয়ে এরও আগে কঠিন বাস্তব দিকটা তাদের আগে চোখে পড়ে। তাদের কাছে আবেগ যেন বিলাসিতা, তাই দূরে থাকে আগে থেকেই। ফলে তারা যখন দেখতে পেয়ে যাবে যে, ট্রাম্প প্রমাণ দেয়ার চেয়ে অভিযোগ তোলার দিকেই বেশি আগ্রহী তখন তারা খোদ ট্রাম্পেরই হাত ছেড়ে হতাশ হয়ে সরে যেতে দেরি করবেন না। এভাবে একবার জন-মনোযোগ হারিয়ে ফেললে এটাই ট্রাম্পের হেরে যাওয়ার বাস্তব অবস্থা পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলতে পারে। মানুষকে কষ্ট দিতে আর হতাশ করে ফেলতে ট্রাম্প ও তার দল বা সরকারের এসব কাজও আরেক দিকে প্রচণ্ড নষ্টা ভূমিকা পালন করেছে।

    গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদলের কালের নির্বাচনঃ
    আমেরিকার এবারের নির্বাচনটা হচ্ছে এমন এক সময়ে যখন একই সাথে গ্লোবাল নেতৃত্ব পালাবদলের কাল এটা। যেখানে বাস্তবে গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলে যাবার আগে, খুব সম্ভবত, এটাই শেষ আমেরিকান নির্বাচন অথবা যুদ্ধবাজ রিপাবলিকানদের জন্য শেষ সুযোগ। অর্থাৎ এবার ট্রাম্প যদি জিতেন, তবে গ্লোবাল নেতৃত্ব বদল তাতে থামবে না যদিও। কিন্তু একটা যুদ্ধের ভেতর দিয়ে ফলাফল হিসাবে গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলটা আসবে হয়ত। অর্থাৎ একটি যুদ্ধপরিস্থিতির পরেই কেবল গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল ঘটবে। ট্রাম্পের এই মনোভাবের প্রতিক্রিয়াতেই যেমন সারা এশিয়া বিশেষত সাউথ-এশিয়ায় ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোর উপর প্রচণ্ড আগ্রাসী ও চাপ সৃষ্টিকারী হয়ে আমেরিকা গত কয়েক মাস থেকে গত সপ্তাহ পর্যন্ত তৎপর হয়েছিল। পম্পেই বা স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্তারা বাংলাদেশসহ নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ইত্যাদি দেশে সফরে গিয়ে এমন মরণ-চাপ তৈরি করে চলেছিলেন।
    এটি সত্য যে, এবারের আমেরিকান নির্বাচন এত চাপের মধ্যে হওয়ার মূল কারণ গ্লোবাল অর্থনীতির অর্ডারের নেতৃত্বের পালাবদল একেবারেই আসন্ন, তাই। তবে বাইডেন জিতলে সেটা তুলনামূলকভাবে কম উত্তেজনা ছড়িয়ে শান্তিপূর্ণ ডায়লগের মধ্য দিয়ে ঘটার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। কিন্তু এসব কিছুকে যা ছাড়িয়ে গেছে তা হল, বাংলাদেশ ছাড়াও নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, পাকিস্তানেও- এসব দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে নোংরামি আর খোয়াখেয়িতে ভরপুর করে তুলেছে ভারত-আমেরিকা। এরা বাধ্য করছেন এসব দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে আমেরিকা, ভারত না চীন এভাবে কোনো একটার ‘পা-চাটা দালাল’ হয়ে তারা নিজ দেশটাকেই যেন বিভক্ত করে ফেলে এমন বেপরোয়া হোক। আর এতে আস্তে আস্তে সব হারানো ভারতের ভূমিকাও আরো মরিয়া আমেরিকান বরকন্দাজ যেন, যার কাজ হলো নিজের সঙ্কীর্ণ স্বার্থে এসব নোংরামিকে আরো তুঙ্গে তোলা।

    বড় উদাহরণ বা শিকার এখন নেপালঃ
    গত দু’সপ্তাহ ধরে এমনই হুমকির মুখে পড়া দেশ হল নেপাল। ইংরেজিতে ‘র’ [RAW] হল ভারত-রাষ্ট্রের বহিস্থ গোয়েন্দা সংস্থা, যার ঘোষিত প্রধান কাজই হল, প্রতিবেশী দেশে অন্তর্ঘাতমূলক ক্ষতিকর কাজ করে বেড়ানো। এসব অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করে হাত পাকানো ‘র’ এর অপারেশন ডিরেকটর ছিলেন বি রমন। যখন একটা বড় সময় ‘র’ এর প্রধান ছিলেন আর এন কাও। তাই রমনের লেখা এক বইয়ের নাম “দ্যা কাও-বয় এন্ড ‘র’ ” – আগ্রহীরা পড়তে পারেন। আবার মূলত পড়শি দেশে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করে বেরায় একারণে ভারতের পক্ষে ‘র’ নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনার সুযোগ নাই। তাই তা ভারত সরকার নিজেই করে না বা প্রায় হয় না বললেই চলে। আর এটাই স্বাভাবিক। ঠিক যেমন ওয়াশরুমে গিয়ে আমরা কী করি তা নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো আলোচনা করি না, এমন ‘নোংরা কিছু’ যেন এই প্রতিষ্ঠান। তবু নেপালে ঘটনার শুরু এই ‘র’ এর কারবার থেকেই। বর্তমান ‘র’-এর প্রধান, সীমান্ত কুমার গোয়েল তিনি, নেপাল সফরে গিয়েছিলেন গত ২১ অক্টোবর প্রকাশ্যে এবং প্রটোকল ভেঙে ‘ওয়ান-টু-ওয়ান’ নেপালের প্রধানমন্ত্রীর সাথে ২ ঘণ্টা ধরে বৈঠক করে ওই দিনই ফিরে এসেছেন। এতদিন ‘র’-এর প্রসঙ্গ উঠলে তা লিখেছি – ‘ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা’ এভাবে সৌজন্যে। আজ প্রকাশ্যে লিখতে হবে। কারণ ‘র’-এর প্রধান ৯ সদস্যের টিম নিয়ে ভারতীয় বিমানবাহিনীর এক বায়ুযানে চড়ে ভিন দেশে গিয়ে প্রকাশ্যে একনাগাড়ে ১৬ ঘণ্টা (যেখানে শিডিউল ছিল ৯ ঘণ্টার) তৎপরতা চালিয়ে মধ্যরাতে নিজ দেশে ফিরেছেন। অথচ ভারতীয়দের দিক থেকে দেখলেও এমন কাজ, এটা লক্ষণ বা ইঙ্গিত হিসেবে খুবই খারাপ উদাহরণ হয়েছে। একজন প্রধানমন্ত্রীর সাথে কেন ‘র’-এর প্রধানকে মিটিং করতে হবে, বা তিনি তা করবেন? যেমন, মানুষ নিজ শরীরের মধ্যেই নিজের বর্জ্য নিয়ে ঘোরে। এর মানে এই নয় যে, আমরা তা প্রদর্শন করে বেড়াবো। এটা তো প্রটোকলেও পড়ে না। এই সফর এটা ভারতের কোনো হামবড়া ভাব বাড়বে না বা ক্রেডিট নয়। কারণ এর উল্টা মানেটা হল, ভারত যেন নিজের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কাজ ‘র’-এর হাতে তুলে দিয়েছে। যার মানে তাহলে এটা কি ইঙ্গিত যে, ভারতের বিদেশ বিভাগ ফেল করেছে, তারা অযোগ্য? কাজেই ভারতের নিজ প্রশাসনের কিছু নিয়ম প্রটোকল তো অন্তত ভারতের নিজের জন্যই মানা উচিত ছিল! এখন একটা উদাহরণ থেকে গেল যে, চাইলে ভারত সরকার এমন ‘ন্যুইসেন্স আচরণ’ করতে নেমে যেতে পারে! এছাড়া গোয়েলের এই সফরকে আড়ালে রাখতে বা ঝাপসা করে ফেলতে অনেক ভারতীয় মিডিয়া পুস্পদাহালের সাথে গোয়েলের সাক্ষাত হয়েছে বলে মিথ্যা দাবি করেছে। অনেক মিডিয়া মাধব চন্দ্র নেপাল সহ আরো নেতাদের কথা বলএছে। কিন্তু দাহালসহ সকলেই পরে মিডিয়ার সামনে জানিয়েছে এসব কথা মিথ্যা অনুমান। বরং পুস্পদাহাল ও মাধব এই খবরকে উড়িয়ে দিয়েছেন Former prime ministers Dahal and Madhav Kumar Nepal on Thursday morning refuted reports suggesting their meetings with Goel.. তাঁরা এই সভাকে ভুল কাজ ও অপরিপক্ক কূটনীতিবোধ [wrong and termed it diplomatic immaturity.] বলে চিহ্নিত করেছেন।

    আবার নেপাল মানেই কেবল ওর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী খাড়্গা প্রসাদ অলি (কেপি অলি), তা তো না। নেপালের অন্যান্য ডেজিগনেটেড নেতা বা জনপ্রতিনিধিরাও আছেন। আছে অলির নিজ রাজনৈতিক দল অন্যান্য নেতৃত্ব। কিন্তু ব্যক্তি অলির কোনো দুর্বলতায় তাঁকে বেকায়দায় ফেলে এই সফরের অনুমতি ‘র’-এর প্রধান আদায় করে নিয়েছেন বলে মনে করার কারণ আছে। যেমন এই সফরের ফরমাল উদ্দেশ্য কী? তা প্রধানমন্ত্রী অলি না নিজের দলে, না মন্ত্রিসভায়, না মিডিয়ায় কখনো আলোচনা করেছেন বা জানিয়েছেন। এমনকি নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও কিছু জানাননি।  করোনাকালে ভারত-নেপাল ফ্লাইট বন্ধ। তাই কেবল গোয়েলকে সামরিক বিমানে করে নেপালে আসতে গেলে আগাম অনুমতি যেটা দরকার, এর অনুরোধের ফাইলটাই কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চালু করে দেয়া হয়েছিল। এছাড়া আর কোথায়ও কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না যদিও নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষমতাসীনদের দলে অলিরই উপদলের লোক। আবার এটা কি ফরমাল না ইনফরমাল সফর, তা নিয়ে নেপালের মিডিয়ায় আলোচনা হচ্ছে; যার জবাবে এটা ফরমাল তা কেউ বলতে পারছে না। বিশেষত যখন এই সফরে আলোচনার এজেন্ডা বলেও কিছু ছিল না। আবার প্রধান প্রটোকল ভঙ্গের ঘটনাটা হল, বিদেশী সফর হয়ে থাকে সবসময় কাউন্টারপার্টের (মন্ত্রী হলে মন্ত্রী, সচিব হলে সচিব, জেনারেল হলে জেনারেল এভাবে) আমন্ত্রণে ও মূলত তাঁর সাথেই এবং আগাম ঠিক হয়ে থাকা এজেন্ডা ধরে। তবে সেটা কখন সাথে যেমন, প্রধানমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ পর্যন্তও হতে পারে। কিন্তু কোথাও কোন আলোচনা-সাক্ষাৎ পুরাটা ওয়ান-টু-ওয়ান হবে না, প্রতিনিধিদল থাকবে সাথে। কিন্তু অলি প্রথম যে প্রটোকল ভেঙে নিজেকে অপমান বা নিচা করেছেন  (‘র’ তা হতে দিয়েছে) তা হল, তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়ে আরেক দেশের গোয়েন্দা প্রধানের (সচিব বা সচিবের নিচে প্রটোকলে যার অবস্থান) সাথে এবং ওয়ান-টু-ওয়ান বৈঠক করেছেন এবং তাও কোন এজেন্ডা ছাড়া বৈঠক; কিভাবে তিনি করেন এটা? ন্যূনতম আত্মসম্মানবোধ থাকলেও এটা তাঁর করার কথা নয়।

    তবে পরের দিন দেশে প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে তিনি নিজের প্রেস উপদেষ্টাকে দিয়ে এক ছোট্ট প্রেস নোটে বলালেন যে, “ভারতের ‘গুপ্তচর সংস্থা’ ‘র’-এর প্রধান সামন্ত গোয়েল প্রধানমন্ত্রী অলির বাসভবনে এসে সাক্ষাৎ করেছেন। বৈঠকের সময় নেপাল-ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে বিপর্যস্ত হতে না দেয়া, আলোচনার মধ্যমে সমস্যার সমাধান, পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে তিনি নিজ ধারণা ব্যক্ত করেন।…… সূর্য থাপা, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উপদেষ্টা”।

    নেপাল-ভারতের তিতা হয়ে থাকা সম্পর্কঃ
    নেপাল-ভারত সম্পর্ক আগেও তিতা কম ছিল না, কিন্তু গত এক বছর ধরে তা ‘ভীষণ তিতা’ হয়ে আছে। মূলত কালাপানি, লিপুলেখ আর লিম্পিয়াধুরা- এই জায়গাগুলো বর্তমানে ভারতের দখল নিয়ন্ত্রণে রয়েছে; যা নেপাল মনে করে এগুলো তার ভূখণ্ড। তাই পাল্টা এগুলো অন্তর্ভুক্ত করে নেপাল এক নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে যা আগে নেপালের সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ করে নিয়েছিল।
    প্রধানমন্ত্রী অলি, তার দলের নাম এখন, নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি। আমাদের সিপিবি ধরনের; তবে অনেক গণভিত্তি এর হয়ে গেছে নির্বাচনী রাজনীতি করতে করতে। নেপালের এক মাওবাদী দলটা ছাড়া নেপালের আর সব রাজনৈতিক দলই আগের রাজতন্ত্রের আমলে রাজার অনুগত হয়ে চামচামি করে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগ করে ক্ষমতার কিছু স্বাদ পেত। কিন্তু মাওবাদীদের উত্থানের কারণে আগের সেই ভারসাম্য উৎখাত হয়ে যায়। তাতে সেই রাজতন্ত্রও উৎখাত হয়ে নেপাল এক রিপাবলিক গণক্ষমতার রাষ্ট্র এখন। গত সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে এক নয়া কনস্টিটিউশন চালুর পরে, যেটা ভারত মেনে না নেওয়া থেকেই চরমবিরোধের শুরু হয়। ভারতে নেপালে সমস্ত পণ্য আমদানির পথ অবরোধ করে রাখে প্রায় টানা ছয় মাস। আর তা থেকে সাধারণ নেপালবাসীরা প্রায় সকলেই চরমতম ভারতবিরোধী হয়ে যায়। এরপর থেকেই এই ভারতবিরোধী অল-আউট সেন্টিমেন্ট – এই পপুলিজমের নেতা হয়ে বসেন অলি। অথচ এর আগে তিনিই ছিলেন নেপালি কংগ্রেসের পরের গুরুত্বের চরম ভারতপ্রেমী রাজনৈতিক দল।  এখনকার গোয়েল-সফর সংকটে নেপালের মিডিয়া লিখছে, সে সময় নাকি অলির খাতির ভারতের রাজনীতিবিদ বা নেতাদের চেয়েও বেশি ছিল ‘র’-এর সাথে।
    তাই নেপালের এক সিনিয়র সাংবাদিক লিখছেন, “ওলি সেই ব্যক্তি ২০১৫ সালের অবরোধের আগে যাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করত ভারত। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চেয়েও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হতো ওলির। মনে হচ্ছে, ভারতের সাথে সম্পর্কের অচলাবস্থা নিরসনের জন্য তার প্রচেষ্টাতেই গোয়েল নেপাল সফর করলেন”। এমন একটা সম্ভাবনা হিসাবে  ব্যাখ্যা করেছেন নেপালের সিনিয়র সাংবাদিক Yubaraj Ghimire। তার সাবধানি ব্যাখ্যাটা হল, অলির উপদেষ্টা সুর্য থাপার কথা বিশ্বাস করলে ভারত গত একবছরের তিতা সম্পর্কের সময় থেকে উঠে আসার জন্য আবার ‘র’-কেই ব্যবহারের জন্যই সামনে এগিয়ে দিয়েছে। এমন একটি মুখ-আড়ালের ব্যাখ্যা ভারত থেকেই দেয়া হচ্ছে। কিন্তু অবিশ্বাস্য দিকটা হল, নেপালের সব মিডিয়া গত দু’সপ্তাহ ধরে হন্যে হয়ে খুঁজছে কেন ‘র’-এর প্রধান গোয়েল এসেছিলেন। কেউ হদিস করতে পারেনি কিন্তু সবাই আশঙ্কা করছে, এগুলো সামনে নেপালে আকস্মিক সরকার বদল বা খারাপ সময়ের ইঙ্গিত!

    নেপালের দুই কমিউনিস্ট পার্টির এক হওয়াঃ
    এদিকে গত সাধারণ নির্বাচনের (২০১৭ নভেম্বর) আগে থেকে আরেক বড় পরিবর্তন নেপালে ঘটেছিল । নেপালে ২০১৫ সালের কনস্টিটিউশন চালুর পর থেকেই কেবল নেপালের রাজনীতিতে  চীনের উপস্থিতি ঘটেছিল। তাও সেটা ঘটেছিল ভারতের পণ্য অবরোধের বিপরীতে বিকল্প হিসাবে চীনের ভিতর দিয়ে নেপাল বাইরের দুনিয়ার সাথে পণ্য আমদানি-রপ্তানির বাণিজ্য সম্পর্ক করতে পারে কিনা, এরই খোজ করতে গিয়ে। তাই  নেপালের রাজনীতিতে সেই প্রথম চীনের উত্থান ঘটেছিল। এতে ক্রমশ চীনের সাথে সারা নেপালের ব্যাপক সম্পর্ক হয়েছিল। বিশেষত সেটা আবার অলির কমিউনিস্ট পার্টি আর মাওবাদী পার্টির সাথেও। তাই চীনের পরামর্শ ও অনুরোধে এই দুই পার্টি এক পার্টি হওয়ার প্রক্রিয়া চালু করে। আর একসাথে ঐ নির্বাচনে লড়ে তারা ক্ষমতায় এসেছিল, দু-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে যেটা এখনও আছে। কিন্তু এক হওয়ার প্রক্রিয়া খুব সুখকর হয়নি। বেশির ভাগ সময় যে মূল অভিযোগটা সবার উপরে ভেসে থেকেছে তা হল, অলি দলের কাউকেই না বলেকয়ে বা আলোচনা না করে চলেন। দলীয় ফোরামে কোনো সিদ্ধান্ত নেন না, সব সিদ্ধান্ত নেন একাই। আর তা সবাইকে মানতে বাধ্য করেন। আর দ্বিতীয় বড় অভিযোগ হল, তাদের নতুন দলের নীতি ও সিদ্ধান্ত হল কেন নেতা একসাথে একের অধিক পদ ধারণ করে রাখবেন না। কেউ প্রধানমন্ত্রী হলে, তাহলে একইসাথে দলীয় প্রধানের পদ দখল করে থাকলে যেকোন একটা ছেড়ে দিতে হবে, এরকম। অথচ অলি সেটা আজও মেনে চলেন নাই, প্রয়োগ করেন না।
    অবস্থা এমনই চরমে যে, অনেকেই মনে করছে এই দ্বন্দ্বের এখন একটাই সমাধান – কমিউনিস্ট পার্টি আবার ভাগ হয়ে যাওয়া। যেটা এখন কেবল চীনের অনুরোধে খুবই হাল্কাভাবে এক হয়ে আছে। কিন্তু বাস্তবতা অসহনীয় পর্যায়ে। তবে এবার দল ভাগ হলে, তা আবার আগের মতোই আগে যে যার গ্রুপ বা উপদলে ছিল, সেভাবে ফিরবে না। বড় অংশটা বরং মাওবাদী পুষ্প কমল দাহালের পক্ষে চলে যাবে। যেমন যারা ওলির আগের কমিউনিস্ট দলের সিনিয়র নেতা হিসাবে অলির সাথে ছিলেন, মাধব কুমার নেপাল বা ঝালানাথ খানাল; দল ভাগ হলে এরা এখন পুস্পকমলের সাথেই যাবেন। এরা অলির আচরণ দেখতে দেখতে এতই বিরক্ত।  কিন্তু দল ভাগ হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান ফ্যাক্টর হল, যেকোন ভাগ হওয়া মানেই ভারত সেই ফ্রাকশনকে মদত দিবে। আর সর্বোপরি, প্রো-ইন্ডিয়ান নেপালি কংগ্রেসে দলের সাথে কোয়ালিশনে সরকার করা যায় কি না সে দিকে পরিস্থিতি টার্ন নিবে। মূল কথায়, নেপালে আবার ঘরোয়া অস্থিতিশীলতা প্রবেশ করবে।

    সংবাদ না থাকলে যা হয়, নেপালজুড়ে গুজবঃ
    কিন্তু আজব ঘটনাটি হল নেপালজুড়ে একটি পক্ষ যে গুজব ছড়াচ্ছে তা হল, পুষ্প দাহালের মাওবাদী ফ্রাকশন ভারতের সহযোগিতায় অলিকে পদচ্যুত করতে চাইছে। এই গল্পটা অলি ছড়িয়েছিলেন সেই গত জুলাই থেকে। এখানেও দেখুন, “ভারতকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য, নেপালের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি’। অথচ এই গল্পটার সবচেয়ে স্ববিরোধী বা বে-মিলের অংশটা হল, ভারত যদি অলিকেই ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাহলে সেই অলির সাথে একান্তে  ‘র’ এর প্রধান গোয়েল এই সাহসী মোলাকাত করছেন কেন? কী করে করবে? তাই এই অ্যাবসার্ড প্রপাগান্ডাটা পাবলিক খাবে এমন মনে হয় না! এর মানে আবার এও নয় যে এমন ঘটনা ঘটাবার চেষ্টা অলি করতে পারে না। মরিয়া অবস্থায় পৌছালে নিরুপায় হয়ে তিনি তা করতেও পারেন। কিন্তু আগেই বলে দেয়া যায় তা এক ব্যর্থ প্রচেষ্টায় পরিণত হবার সম্ভাবনাই বেশি হবে।

    আরেকটা গুজব হল, পুষ্প দাহাল অংশ থেকে বেরিয়ে অলি ভারতের প্ররোচনা ও সহযোগিতায় নেপালি কংগ্রেসের সাথে মিলে প্রো-ইন্ডিয়ান সরকার গড়তে চাইছে। হয়ত ভারত এটা চায় তা নিয়ে কিঞ্চিত সত্যতা আছে। কিন্তু এই গুজব-গল্পটারও বিরাট দুর্বল দিকটা হল, গত পাঁচ বছরে অলি ভারতবিরোধী অবস্থান ও বক্তব্যের জন্য ‘চ্যাম্পিয়ন’ – সবার উপরে – এভাবেই তিনি নিজেই নিজের ইমেজ তৈরি করে এসেছেন। এমনকি এই তো গত বছর এসময়ে লিপুলেখ ভারত দখল করেছে বলে ভারতবিরোধী যে ইমেজ তিনি নিজের জন্য দাঁড় করিয়েছেন, সেই তিনি এখন আবার এক প্রো-ইন্ডিয়ান সরকার গড়বেন, কেমন করে? তাও আবার নেপালি কংগ্রেসের সাথে মিলে যার ইমেজ হল গত নির্বাচনের পর থেকে যতদূর সম্ভব ভারতের কোলের ভেতরে ঢুকে যেয়ে বসা দল। তবে সেটা যাই হোক দ্বিতীয় এই গল্পটার সত্যতাো হয়ত কম নয়। কারণ?

    ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট দলের অলি-দাহাল সংঘাতঃ
    অনুমান করা হচ্ছে, পুরান দুই ধারার দুই কমিউনিস্ট নেতার সংঘাত আবার মারাত্মক জায়গায় যাচ্ছে বা চলে গেছে। সর্বশেষ গত জুন-জুলাইয়ে এই সংঘাত তুঙ্গে উঠলে সেসময় চীনা পরামর্শে সে যাত্রায় সেবারের সংঘাত সেসময়ের মত মিটিয়ে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে তা আর মিটবে না। এই অনুমানকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে গত পরশু ৬ নভেম্বরের নেপালের সেতপতি [Setopati] নামের এক ওয়েব মিডিয়া রিপোর্ট থেকে।  সেখানে দলের বিরোধের বহু কিছুরই উল্লেখ আছে।  সারকথায়, এই দলীয় ভিতরের সংঘাতই ভারতের জন্য সুযোগ বয়ে আনবে মনে করছে ভারত। তাই হয়ত গোয়েলের এই সফর!

    কিন্তু গোয়েল-অলির কোন পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্র একেবারেই ফেল করার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।  বিরাট বিপদে পরে এটা বরং অলির খড়কুটো আকড়ে ধরার মত প্রচেষ্টা। তাঁর প্রধান সমস্যা হল, তিনি ভারতবিরোধী চ্যাম্পিয়ান ইমেজ ব্যবহার করে পরিত্রাণ পেতে চান, কিন্তু বাস্তবতা হল তাকে আবার ভারতের কোলেই আশ্রয় নিতে হচ্ছে। ফলে তার চ্যাম্পিয়ান ইমেজ বিশ্বাস অযোগ্য ও বিক্রি অযোগ্য হয়ে হাজির হবেই। এটাই অলির প্রধান সংকট।

    দ্বিতীয়ত ভারতের আরেক বড় সংকট হল, নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯৫০। এটা দাসখত চুক্তি বলে দাবি ও প্রচার করেই মাওবাদী রাজনীতি ১৯৯৬ সাল থেকে আন্দোলন সুচনা করে আজ ক্ষমতায়। তাই নেপালে সাধারণ্যে একথাটা প্রতিষ্ঠিত যে এই টা দাসত্ব-চুক্তি। পরবর্তিতে তাই দুদেশের কিছু সিনিয়র সিটিজেনকে প্রতিনিধিত্ব দিয়ে তারা মিলে একটা কমিটি এই চুক্তির রিভিউ ও প্রস্তাব করার জন্য দুদেশ থেকে গঠিত হয়েছিল। তারা পর্যালোচনা শেষ করে, চুক্তি বাতিল করে নতুন কিছু করার প্রস্তাব করেছে। কিন্তু মোদী গত ২০১৮ সাল থেকে সময়াভাবের অজুহাতে কমিটির সাথে দেখা করছে না; যার ব্যবহারিক মানে হল, ঐ যৌথ রিপোর্টকে স্বীকার বা আমলে নিতে চাচ্ছেন না মোদী। ফলে ভারত চাইছে একবার কোন প্রো-ইন্ডিয়ান দল বা জোট ক্ষমতায় গেলে ঐ প্রস্তাবকে স্থায়ী ধামাচাপা দেওয়ার ব্যবস্থা করে।

    নেপালি রাজনীতিতে নুন্যতম করণীয়ঃ
    তবে গ্লোবাল নেতার পালাবদলের কালে, সাবধানে থাকতে নেপালের করণীয় কাজের গাইড লাইন কী হতে পারে সে হিসাবে দুটা  সার কথা বলা যায়। এটা বাইডেনের জিতা বা না-জিতা নিরপেক্ষ। এক, নেপালের দলগুলো কেউ ভারতের, কেউবা চীনের, কেউবা আমেরিকার দালালির এজেন্সি নিয়ে বসে পড়লেই সব শেষ! তাই কোনমতেই এটা হওয়া যাবে না। আর দুই, এসব এড়িয়ে নেপাল যেন এই তিন দেশের যেকোন প্রস্তাবে ‘না’ বলার ক্ষমতাটা কখনো নিজে্দের হাতছাড়া করে, এদুইটা জিনিষ ঠিক থাকলে নেপালের অনেক কিছুই করা সম্ভব! ওদিকে বাইডেনের বিজয় নিশ্চিত হয়েছে। তাতে কী নেপাল কোন সুবিধা পাবে?

    বাইডেনের বিজয়ের প্রভাব কতটুকু পড়বেঃ
    খুব বেশি না। নেপালের একটা সুবিধা হবে এতটুকুই যে বাইডেন আসাতে নেপালের উপর আমেরিকার সরাসরি চাপ কিছুটা কমবে। যেটা ট্রাম্পের শেষ আমলে অনেক আগ্রাসী হতে চাচ্ছিল। আর দুই, মূলত বাইডেনের বিজয়ে ভারতের পিছনে আমেরিকান সমর্থন বেশ কিছুটা ঢিলা হয়ে যাবে। ফলে নেপালের উপর চাপ দিবার ক্ষেত্রে ভারতের কিছু সক্ষমতাও। মুল কারণ ইন্দো-প্যাসেফিক সহ যেকোন চীনবিরোধী জোটের উদ্যোগ গত ছয়মাসে যেভাবে দানব হয়ে উঠেছিল সেটা এখন ঝিমিয়ে পড়ার সম্ভাবনা বড়বে। এই বড় পরিবর্তন সম্ভবত আসন্ন। বাইডেনের আমলেও আমেরিকার চীনবিরোধী কোন জোটের উদ্যোগ হয়ত এখনও থেকেই যাবে কিন্তু তা আগে যেমন সামরিক ও অর্থনৈতিক দুটারই জোট হতে চেয়ে আগে বাড়ছিল সেটা প্রথমত এখন কেবল “অর্থনৈতিক” হওয়ার দিকে নেমে, ছোট হয়ে যাবে। সামরিক দিকটা বাদ যাবে।  ফলে বাইডেনের বিজয় ভারতের মোদীর জন্য এক বিরাট ক্ষত এবং ক্ষতি নিতে আসতে পারে।

    তাই চীনের চাপে ভারত এতদিন আমেরিকার যত আগ্রহ ও যাকিছুকে নিজের জন্য সম্ভাবনা এতদিন দেখছিল তা অনেককিছুই এখন গুটিয়ে যাবার সম্ভাবনা। ফলে ততটাই নেপালের উপর ভারতের প্রভাব ফেলার ক্ষমতা। আর যদিও বাংলাদেশ এখানে প্রসঙ্গ না তবু একটা বাক্য বলে দেয়া উচিত। এই একই আলোকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ বিচার করতে যাওয়া ভুল হবে। কারণ বাইডেন সাথে করে আনবেন হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান। এই অবস্থান, যেটা বাংলাদেশের উপর প্রচন্ড চাপ তৈরি করতে এগিয়ে আসবে। বাংলাদেশ সরকারের জন্য যা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হবার সম্ভাবনা।  ওদিকে ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার ইতোমধ্যেই পদত্যাগপত্র রেডি করেছেন; কিন্তু যাকে কাজ চালিয়ে যেতে অনুরোধ করা হয়েছে। আর ট্রাম্পের দ্বিতীয় লোক, ট্রাম্পের ‘পার্টনারস ইন ক্রাইম’ – পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেই, তিনি এখন কোথায় তা জানা যায় না। তবে যদি তিনি আগামি সপ্তাহে আবার কোন ভিনদেশ ভ্রমণে না বের হন তবে এটাকে আমরা কোয়াড আর ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে হৈচৈ তোলা, চাপ তৈরি সমাপ্তির প্রথম লক্ষণ বলে গণ্য করতে পারি!

    তবুওও নেপালের উপর চাপ-প্রভাব তৈরির ভারতের রুটিন চেষ্টা সেটা অব্যাহতই থাকবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৭ নভেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “নেপাল থেকে শিক্ষা ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • করাচি নাকি গৃহযুদ্ধে, ভারতের পরিকল্পিত ফেক নিউজ

    করাচি নাকি গৃহযুদ্ধে, ভারতের পরিকল্পিত ফেক নিউজ

    গৌতম দাস

     ২৬ অক্টোবর ২০২০, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3eu

    প্রথম ছবিটা ভারতের scroll.in মিডিয়া ওয়েব সাইট থেকে নেয়া। ভারতের CNN-News18  টিভির অফিসিয়াল টুইটার পেজ থেকে নেয়া স্ক্রিন শর্ট। যেখানে লেখা আছেঃ
    #ImranUnderSeige – Civil War breaks out in Pakistan.
    Clashes between Sindh Police and Pakistan Army.
    Chorus for Imran Khan’s ouster grows.
    Massive explosion in Karachi kills 5
    @Arunima24 reports from New Delhi.

    আর দ্বিতীয় ছবিটাও নেওয়া হয়েছে একই উৎস থেকেঃ তবে এটা পাকিস্তান থেকে পালটা ঠাট্টা করে দেয়া এক টুইট বার্তা। বলা হয়েছেঃ ব্রেকিং নিঊজ। করাচির গুলশান-ই-বাগের এই সাহসী নওজওয়ান পাকিস্তান এয়ার ফোর্সের এই বিমানটা থামিয়ে দিয়েছে। নাগরিকেরা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেমেছে।
    ছবির ক্যাপশন শেষ এখানে।


    জন্ম থেকেই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে একটা পারস্পরিক টেনশন অস্বস্তি সবচেয়ে ঠান্ডা সময়েও বর্তমান থাকে। কিন্তু এরও কিছু নিয়ম ও সীমার মধ্যে তা থাকে। কিন্তু এবার সেসব সীমাও ছাড়িয়ে গেছে। গত ২০ অক্টোবরের ঘটনা।  ভারতের লিডিং মিডিয়াগুলো আর সোশাল মিডিয়ায় ভুয়া একাউন্ট থেকে যে ফেক নিউজ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তা হল, করাচীর গুলশান-ই-বাগ এলাকায় পাক আর্মি ও সিন্ধ পুলিশের মধ্যে বন্ধুক যুদ্ধ (ফায়ার ফাইটিং) থেকে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে, পুলিশের আইজিপিকে অপহরণ করা হয়েছে ইত্যাদি। আমাদের মত যেকোন দেশের মত পাকিস্তানেও আভ্যন্তরীণ রাজনীতিক সংঘাত হয় অথবা তা থেকে সময়ে অনেক ধরণের উত্তেজনা তৈরি হয়। আর অনেক সময়ই সেসব বিষয় নিয়ে পড়শি ভারত বা পাকিস্তানে চুইয়ে পড়া ধরণের যেটুক কিছু কিছু খবর তারা স্থানীয় মিডিয়া থেকে সংগ্রহ করতে পারে তাই ছাপা হয়। কিন্তু কখনই উৎস দেশের মিডিয়ার চেয়েও পড়শি দেশে ছাপানো তথ্য বেশি বা বানানো ফেক নিউজ হয়না কখনও। কিন্তু এবার করাচীতে – আর্মি-পুলিশ, পরস্পরের ফায়ার ফাইটিং, গৃহযুদ্ধ, আইজিপি অপহরণ ইত্যাদি – ধরণের শব্দ ব্যবহার করে ভারতে এই ফেক নিউজ ছেয়ে ফেলা  হয়েছে। এটা মারাত্মক এবং সীমা ছাড়ানো ঘটনা নজিরবিহীন। সবচেয়ে মারাত্মক হল এই ফেক এমনই যে করাচীতে “গুলশান-ই-বাগ” বলে কোন পারা বা এলাকাই নাই। এটা এমনই অর্গানাইজড মিথ্যা। ঘটনা অনুসন্ধানে এটা ভারতের গোয়েন্দা, মিডিয়া ও সরকারের যোগসাজশে ঘটানো ঘটনা বলে অনুমান করার কারণ আছে যা নওয়াজ শরীফসহ বিরোধীদলীয় জোটের সাথে ভারতের আঁতাতের ইঙ্গিত বহন করে। বিবিসির চোখে এটা সংগঠিত ও “সমন্বিতভাবে” মিথ্যা বলার ঘটনা। কিন্তু কেন?

    পাকিস্তানে কথিত সেনা-পুলিশ সঙ্ঘাতের ফেক নিউজ করে ভারতের বিভিন্ন মিডিয়া ভারত ছেয়ে ফেলেছে; অনেক সেলিব্রেটি যাদের অ্যাকাউন্ট ভেরিফাইড চিহ্ন লাগানো তারাও সোশ্যাল মিডিয়ায় সেসব ফেক নিউজ কপি করে ছেয়ে ফেলেছেন। এ অবস্থায় ওই ফেক নিউজ প্রসঙ্গে এর বিরুদ্ধে ‘বিবিসি বাংলা’ ও তুরস্কের ‘টিআরটি ওয়ার্ল্ড’ এজেন্সি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আলাদা রিপোর্ট ছেপেছে।

    টিআরটির রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘ভারতীয় মিডিয়া নির্দয়ভাবে গণউন্মাদনা জাগিয়ে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে কাল্পনিক গৃহযুদ্ধের খবর প্রচার করছে’ [Mass hysteria as Indian media relentlessly covers imaginary war in Pakistan]। আর বিবিসি বাংলার শিরোনামটা হল – “করাচিতে গৃহযুদ্ধের ভুয়া খবর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে মাতামাতি।
    তবে পরবর্তিতে ভারতের এই ফেক নিউজ করা নিয়ে পাকিস্তানের সোশ্যাল মিডিয়ায় যেমন ঠাট্টা তামাশা বা টিটকারি করা হচ্ছে বলে পাকিস্তানেই পত্রিকায় রিপোর্ট হয়েছে তেমনি বিবিসিও কোথায় কিভাবে কারা এই নানান ফেক নিউজ তৈরি করেছে
    , আর কিভাবে কারা কারা তা প্রচার করেছে এরই এক লম্বা অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছে। এটি মূলত বিবিসিরই নিজের যেটা ফেক নিউজ ধরা বা চেক করার বিভাগ আছে, ‘বিবিসির রিয়েলিটি চেক’ ও ‘বিবিসি মনিটরিং’ নামে, এদেরই মুখ্য তৎপরতা ও সহায়তায় তৈরি করা এক রিপোর্ট। যেমন বিবিসি ঠাট্টা টিটকারি প্রসঙ্গে বলেছে, ‘সিভিলওয়ারকরাচি’, ‘ফেইক নিউজ’ এবং ‘ইন্ডিয়ানমিডিয়া‘ হ্যাশট্যাগে তারা অনেক রঙ্গ রসিকতামূলক পোস্ট এবং মিম শেয়ার করেছে টুইটারে’।

    করাচীতে “গুলশান-ই-বাগ” নামে কোন এলাকার অস্থিত্বই নাই; অথচঃ
    করাচিতে যে নামে কোন পাড়াও নাই, সেখানে “সেনাবাহিনী এবং সিন্ধু পুলিশের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি চলছে” বলে টুইট করা হয়েছে।  বিবিসি লিখেছে, “প্রথম এই টুইট কে করেছিলেন তা স্পষ্ট নয়। বিবিসি অনেক খোঁজখবর নিয়েও @drapr007 নামের এই টুইটার অ্যাকাউন্টটি কে চালায় সে সম্পর্কে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি। (তবে) এই টুইটের এক ঘন্টা পর একই অ্যাকাউন্ট থেকে আরেকটি টুইট করা হয়। এবারের টুইটে ব্রেকিং নিউজ হ্যাশট্যাগ দিয়ে বলা হয়, করাচীর গুলশান-ই-বাগ এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং সিন্ধু পুলিশের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি চলছে। যারা করাচী শহর চেনেন, তারা জানেন যে সেখানে গুলশান-ই-বাগ নামে কোন এলাকার অস্থিত্বই নেই। কিন্তু বেশিরভাগ পাঠক তো আর সেটি জানেননা”।

    “…টুইটে ব্রেকিং নিউজ হ্যাশট্যাগ দিয়ে বলা হয়, করাচীর গুলশান-ই-বাগ এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং সিন্ধু পুলিশের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি চলছে। যারা করাচী শহর চেনেন,তারা জানেন যে সেখানে গুলশান-ই-বাগ নামে কোন এলাকার অস্থিত্বই নেই”।

    অথচ এই ফেক তৎপরতায় ভারতীয় মিডিয়ায় এমন ব্যক্তিত্বও আছেন যাদের অবস্থান এমন কোন হালকা কিছু নয়, বরং সিরিয়াস ও রাষ্ট্রীয় পদকজয়ী সম্পাদকও আছেন। অথচ এদেরও ফেক নিউজের প্রতি আগ্রহ এখন খুবই তীব্র মনে হচ্ছে, যার কারণ সম্ভবত তারা চীনা সীমান্ত সঙ্ঘাত দেখে নিজেদের মানে ভারতের ভবিষ্যত নিয়েই হতাশ ও যেন অনিরাপদ বোধ করছে! তাই তারা কোন ধরণের চেক না করে নেয়া ফেক নিউজ প্রচারে অংশ নিয়েছেন, আর নিজেদের পত্রিকার এমন শিরোনাম করেছেন ও ধরা খেয়েছেন। যেমন- বিবিসির এমন তালিকায় আছে “সিএনএন-নিউজএইটিন (CNN-NEWS18), জি নিউজ (ZEE NEWS) ও ইন্ডিয়া টুডে (IndiaTODAY) পর্যন্ত’ – এমন মিডিয়া। অর্থাৎ এরা বিজেপি দলীয় প্রপাগান্ডা করা কোন পেড মিডিয়া বা পারসন নয়, এর বাইরের। এর আগেও ভারতের এই ফেকপ্রীতির দশা দেখে আগে যেটা মনে হত এটা বোধহয় কেবল বিজেপি-আরএসএস এর সমস্যা। (দেখুন বিবিসির রিপোর্টে ভারতের ফেক নিউজ ফ্যাক্টরির ততপরতা নিয়ে )। কিন্তু এখন এটা প্রমাণ করে যে ভারত রাষ্ট্র ও সমাজে কতটা নিচে নেমেছে। আর এই ফেক নিউজ ছড়ানো আসলে ভারতীয় গোয়েন্দা, মিডিয়া ও সরকারের এক যোগসাজশ ততপরতা।
    যেমন – এরা অর্ণব গোস্বামী বা রিপাবলিক টিভিসহ হিন্দি বা মারাঠি ভাষায় প্রচারিত বিজেপি দলীয় মিডিয়া প্রপাগান্ডিস্ট যারা আছেন
    , এদের মত কেউ নয়। যেমন ইন্ডিয়া টুডের সম্পাদক রাজদ্বীপ সরদেশাই; তিনি এটা ছাড়াও আরো অনেক মিডিয়া গ্রুপের সাথে জড়িত সম্পাদক-সমতুল্য নানান পর্যায়ে। তিনি এত খারাপ রেপুটেড কোন লোক নন, বরং ভারতের বিচারে নতুন ধরনের মিডিয়াব্যক্তিত্ব (সে সময় নতুন উদ্যোগ এনডিটিভির সাথেই শুরু থেকেই রাজদ্বীপের উত্থান হয়েছিল ) হিসেবে রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত। অথচ তার নিজের পত্রিকার হেডলাইনেও একই রকম ফেক নিউজ। শিরোনামে লিখেছেন, “করাচিতে সিন্ধু-পুলিশ প্রধানকে অপহরণ করা হয়েছে” – এধরণের ফেক রিপোর্ট। বিবিসি সেটারও এক স্ন্যাপ শট তুলে এনে ছাপিয়েছে  প্রকাশিত ঐ রিপোর্টে।তবু আমাদের আজকের লেখার প্রসঙ্গ ঠিক পাকিস্তান নয়; বরং কেন ভারত সরকার ও তার প্রভাবে তার মিডিয়া এমন প্রচারণা চালাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে? এটা কিসের ইঙ্গিত? আর মূলত কেন এই ইঙ্গিত আমাদের জন্যও ভয়ঙ্কর? আমাদের বেলাতেও এটা ঘটতে পারে কেন? এনিয়ে কথা বলব।

    বিরোধী জোট পিডিএম (পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট)
    পাকিস্তানে এক বিরোধী জোট তৈরি হয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরানকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে। এই জোটের আলাদা নামও দেয়া হয়েছে – পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট (পিডিএম)। এর চেয়েও মজার দিকটা হল এই জোটের প্রধান বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে মওলানা ফজলুর রহমানকে। আর খুব দ্রুত চলতি মাসজুড়ে চলছে তাদের সিরিজ জনসভা। তাদের এবারকার জনসভার স্টেজে দেখা যাচ্ছে বয়স্ক মওলানা ফজলুর দুই পাশে জোটের প্রধান দুই দলের দুই তরুণ প্রতিনিধি – মরিয়ম নওয়াজ শরিফ আর বিলওয়াল ভুট্টো।  দুই জেনারেশনের মিলন বা জংশন-মূলক এই চিত্রটা ইতিবাচক মনে করা যেত কিন্তু সমস্যা হল, এসব নিউ জেনারেশনের নেতাদের পিতারা দুর্নীতির দায়ে বিচারে অভিযুক্ত বলে সর্বোচ্চ আদালতের রা কাঁধে নিয়ে এখন জেলের বাসিন্দা; সে কারণেই তারা এখানে। আর এই দুর্নীতির অভিযোগ দু-এক কোটি রুপির নয়, মিলিয়ন ডলার তো বটেই, বিলিয়নেও মাপতে হতে পারে। অনুমান করা হয় তা দুই বিলিয়নের বেশি ডলারের। নওয়াজ শরিফ আরো ‘শ্রেষ্ঠ’। তিনি নাম তুলেছেন মানে তা প্রকাশিত হয়েছে ‘পানামা পেপারস’ নামে পরিচিত এক অর্থপাচার কেলেঙ্কারির ডকুমেন্টে। যেটা ‘অফশোর অ্যাকাউন্টে’ যারা টাকা পাচার করে রেখে দিয়েছেন দুনিয়ার এমন প্রায় দুই লাখ লোকের ডকুমেন্টের তালিকা যা এক ভুলের কারণে ফাঁস হয়ে যায়। আগ্রহীরা লন্ডন গার্ডিয়ানের এর রিপোর্টটা দেখতে পারেন – What are the Panama Papers? A guide to history’s biggest data leak.।  আর এই পানামা পেপারস এর কেলেঙ্কারিতেই পাকিস্তানের দুর্নীতিবিরোধী কোর্ট তাকে দশ বছরে সাজা  ও সাথে ফাইন হিসাবে আরও $10.6 million শোধ করতে নির্দেশ দিয়েছে। এর সাথে “রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ” করে রায় দেয়।

    “The Panama Papers (Spanish: Papeles de Panamá) are 11.5 million leaked documents that detail financial and attorney–client information for more than 214,488 offshore entities. … The documents contain personal financial information about wealthy individuals and public officials that had previously been kept private.”

    মওলানা ফজলুর নেতৃত্বে পিডিএম, এটা নওয়াজ ও ভুট্টোর দলসহ ছোট-বড় ১১ দলের জোট, যা জন্ম নিয়েছে গত সেপ্টেম্বর ২০২০ মাসে আর এ’মাসের ৩ অক্টোবর  মওলানা ফজলুকে এর প্রধান বানিয়েছে। এর প্রথম সমাবেশ ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে পাঞ্জাবের গুজরানওয়ালায় আর দ্বিতীয়টা ছিল করাচিতে ১৮ অক্টোবর। এখান থেকেই ভারতীয় সংশ্লিষ্টতার ঘটনা সামনে আসতে থাকে।

    তবে এর আগেও, মানে গত বছর নভেম্বরে একই রকম সমাবেশ করেছিলেন মওলানা ফজলু। নওয়াজ ও ভুট্টোর দল বাইরে দাঁড়িয়ে সেসময় তাঁকে সমর্থন দিচ্ছে জানালেও কেউই তাতে অংশগ্রহণ করেনি। রাজধানীতে তখন সেখানে মওলানা ফজলু জমায়েত নিয়ে ১৩ দিনের অবস্থান করে  বসেছিলেন। কিন্তু কোনো দাবি কিছু আদায় করা ছাড়াই তা প্রত্যাহার করতে হয়েছিল সে সময়ে। ইমরান খান ২০১৮ সালের আগস্টের নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন। আর তাতে খাইবার-পাখতুন প্রদেশের এক কেন্দ্র থেকে দাঁড়িয়ে ফজলু হেরে যান, ইমরানেরই দলের প্রার্থীর কাছে।
    বলা হয়ে থাকে সেই জেনারেল জিয়াউল হকের আমলে (পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ১৯৭৮-৮৮) তাঁর উত্থানের সময় তাঁর সাথে মওলানা ফজলুর প্রভাবশালী উত্থান ঘটেছিল
    ; বিশেষত বিতর্কিত ব্লাসফেমি আইন ও দুর্নীতিবিরোধী ইসলামী আইন ইত্যাদি প্রসঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ও প্রভাব খুবই মুখ্য ছিল বলে। সেই থেকে তিনি ‘প্রভাবশালী ইসলামী নেতা’ হিসেবে রাজনীতি করে এসেছেন। ভোটে দাঁড়িয়েছেন পাখতুন প্রদেশ থেকে। সেই জিয়াউল হকের আমল মানে সেটা মূলত গ্লোবাল ইতিহাসের এক গুরুত্বপুর্ণ টার্নিং পয়েন্ট “সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগান দখল” এরই কালপর্ব পাকিস্তানের সমকালীন শাসন পর্বকাল; যাকে আমেরিকা পেলেপুষে পাকিস্তানের ক্ষমতায় বড় করেছিল, সোভিয়েত মোকাবিলা করতে। সেই জিয়াউল হক, মওলানা ফজলুর মাধ্যমে অসংখ্য মাদরাসা খুলে তারই মাধ্যমেই পরিচালনা করেছেন।  তাই মাদ্রাসা ফান্ড মওলানা ফজলুর রহমানের প্রভাব ও উত্থানের পিছনে এক বিরাট ফ্যাক্টর হয়ে থেকেছিল মনে করা হয়। এছাড়াও আরও বাড়তি দিকটা হল, তিনি পাকিস্তানের রাজনীতিতে সৌদি রাজ-প্রভাব রাখা বা ফেলার এক বড় উপায় হয়ে ওঠেন। অথচ সেই তিনিই ২০১৮ নির্বাচনে নিজ রেগুলার কনস্টিটুয়েন্সি থেকেই পরাজিত হয়ে যান। এই ফলাফল দেখে তিনি অপমানিত। তাই তিনি মেনে নিতে পারেননি। সে কারণে এক বছর না যেতেই তিনি ইমরানের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিলেন, এমনটা মনে করা হয়। তবুও মওলানা ফজলুর ২০১৯ এর ঐ একক আন্দোলন আর এবার ২০২০ সালের  নওয়াজ মুসলিম লীগ ও পিপলস পার্টিকে সাথে নিয়ে আন্দোলনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু ফারাক আছে।

    এবারে বিরোধীদের আন্দোলনের মূল দাবি কী?
    কম কথায় বললে, তাদের মূল দাবি ২০১৮ নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে অথবা তাদের অভিযোগ আর্মি সেখানে নির্বাচনের পরিবর্তে ‘সিলেকশন’ করেছে; তাই এটা বাতিল করতে হবে।
    ব্রুকিংস ইনস্টিটিউট [Brookings Institution]
    , বহু পুরানা (১৯১৬) এক আমেরিকান থিংকট্যাংক ও গবেষণা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এরই এক গবেষক ফেলো হলেন ড. মাদিহা আফজাল [Madiha Afzal]। মাদিহা পাকিস্তানি অরিজিনের; লাহোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও ল-এর গ্র্যাজুয়েট। পরে আমেরিকান ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি; আর পরে আমেরিকার কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু দিন অধ্যাপনার পর তিনি এখন ব্রুকিংসের ফেলো। তিনি নিয়মিত পাকিস্তানের রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় বা ব্রুকিংসের নিজ সাইটেই লিখে থাকেন। সেখানের এক আর্টিকেলে তার বক্তব্য হল, ‘এখনকার আর্মির অনেকেই নওয়াজকে অপছন্দ করে সত্য কিন্তু আশির দশকের মাঝামাঝির নির্বাচনে নওয়াজ শরিফের ক্ষমতাসীন হওয়াতেও এই আর্মিই তাকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল বলে অভিযোগ আছে।’ এ ছাড়া একালে নওয়াজের মধ্যে প্রায় খোলাখুলিই প্রো-ইন্ডিয়ান হয়ে ওঠার ঝোঁক প্রবল হয়ে উঠেছে – আমরা দেখছি।

    খুবই কম কথায় বললে  ঘটনাটা হল, ১৯৯১ এর পরে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকা দুনিয়ার একক নেতা হয়ে যায়। এতে আমেরিকান থিংকট্যাংকগুলো তাদের রাজনৈতিক দল ও নেতাদের চেপে ধরে যে, দুনিয়ার একলাই নেতা এখন আমেরিকা বলে এবার তৃতীয় বিশ্বে আমেরিকাকে সামরিক শাসন জারি বা সমর্থন করা আর চলবে না, তখন থেকে বন্ধ করে দিতে হবে। ক্লিনটন (প্রেসিডেন্ট ১৯৯৩-২০০১) সে সময়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেন। আর এখান থেকেই নতুন চক্রে পড়ে নওয়াজ মূলত প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে ব্যবসায়ী হিসেবে বেশি সক্রিয় হওয়াতে ভারতের ফাঁদে আটকা পড়েন। ক্লিনটন যেখানে স্বীকার করে নিয়েই শুরু করছেন যে, আমেরিকার ইচ্ছা ও কারণে এত দিন ‘সামরিক শাসন’ এশিয়া চলেছে সেখানে ভারত, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীই পাকিস্তানের সামরিক শাসনের মূল কারণ ও সমস্যা বলে এক ধারণা প্রচার করতে থাকে। এতে ক্লিনটন ব্যাপারটা পাশ কাটিয়ে গেলেও নওয়াজ শরিফ ভারতের এউ লাইনে পাকিস্তানে সামরিক বাহিনীর ওপর রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণের সুযোগ এসেছে বলে প্রচার করতে থাকেন। একই সময় ভারত-পাকিস্তান কারগিল যুদ্ধ সীমিত হয়ে শেষ হয়েছিল। কিন্তু এবার নওয়াজ এই যুদ্ধের জন্য ভারতের সহযোগী অবস্থান নিয়ে প্রচার ও প্ররোচনা করতে থাকেন যে, ততকালীন আর্মি চীফ জেনারেল মোশাররফের কারণে কারগিল যুদ্ধ ঘটেছে বলে সব দায় আর্মির উপর চাপায় দেন। আর এই দাবি করে তাকে সরাতে এক পরিকল্পনা করেন নওয়াজ। শ্রীলঙ্কা থেকে জেনারেল মোশাররফ দেশে ফিরিতে রওনা করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাকে বহনকারী সেই বাণিজ্যিক প্যাসেঞ্জার বিমান পাকিস্তানের কোথাও নামতে দেওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এই ফাঁকে নওয়াজ আর্মি চিফ পরিবর্তন করে দেন। এই ঘটনাটা জেনারেল মোশাররফের নিজের দেয়া বর্ণনায় তারই  “লাইন অফ ফায়ার” বইতে বিস্তারিতভাবে পাওয়া যায়।  কিন্তু মোশাররফকে আকাশে ঝুলিয়ে রেখে চিফ পরিবর্তন এই ব্যাপারটার প্রতিক্রিয়া আর্মির ভিতরে ভাল হয় নাই। বিশেষত কারগিল যুদ্ধের জন্য পুরা সেনাদের দায়ী করা আবার আকাশে একটা প্যাসেঞ্জার ফ্লাইটকে এক-দেড়শ নিরীহ নাগরিককে মৃত্যুর মুখে নিরাপত্তাহীন করে ফেলে রাখা যেটা ফৌজদারি খুনের অপরাধ এর দায়  সেনারা শেয়ার নিতে চায় নাই । তাই এতে উলটা আর্মির মধ্যে নওয়াজবিরোধী ক্ষোভ জেগে উঠাতে আধা ঘণ্টার মধ্যে পালটা ক্ষমতা দখল ও বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রো-মোশাররফ মেজরিটির সেনা গ্রুপ। তারা ঐ প্যাসেঞ্জার ফ্লাইটের তেল ফুরানোর প্রায় পাঁচ মিনিট আগেই নিরাপদে মোশাররফের ঐ ফ্লাইটকে আবার পাকিস্তানের রাজধানীতেই অবতরণে সক্ষম হয়। মোশাররফ ক্ষমতাসীন হন আর নওয়াজ বন্দী হন। এটাই ১৯৯৯ সালের প্রথম অমেরিকার অনিচ্ছায় পাকিস্তানের সামরিক ক্ষমতা দখল। তাই প্রতিক্রিয়ায়  আমেরিকা মোশাররফের সরকারকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। এভাবেই চলতে থাকে। পরে ২০০১ সালের ‘নাইন-ইলেভেন’ হামলার পর সেদিনই নিরুপায় আমেরিকার পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল বিবিসি-সিএনএনকে জানায় যে আমেরিকা সেদিন প্রথমেই পাকিস্তানকে স্বীকৃতি দিয়েছে বলে জানায়। কিন্তু ভারতের পক্ষে সেনাদের বিরুদ্ধে যাবার ঐ ঘটনায় নওয়াজের আসলে স্বার্থ ছিল, ভারতীয়দের সাথে ব্যবসা করা। নওয়াজ  নিজে তিনি তার মূল ইত্তেফাক গ্রুপের মালিক ও ব্যবসায়ী। তিনি ও তাঁর মত ব্যবসায়ীদের স্বার্থ ছিল ভারতের সাথে আরও নতুন ব্যবসায় যুক্ত হতে। সেকাজে তারা চেয়েছিলেন – ভারতীয় পণ্য পাকিস্তানে এনে বিক্রি করে কমিশন খাওয়া্র ব্যবসা করবে। যেমন একটা দিক উল্লেখ করা যায় বাংলাদেশের মত পাকিস্তানেও একই আইনে একই সময় থেকে, ভারতীয় সিনেমা অবিভক্ত পাকিস্তানেই আমদানি নিষিদ্ধ ছিল। নওয়াজ এটা প্রথম খুলে দিয়েছিলেন। আর ভারতীয় সিনেমা প্রডিউসার-মালিকরা নগদ খদ্দের পেয়েছিলেন। আসলে এমন ব্যবসাপাতির বিরুদ্ধে আর্মিই নওয়াজের ক্ষমতার জন্য প্রধান বাধা বলে অনুভব করাতেই পুরো ব্যাপারটা আর রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে থাকেনি। নওয়াজ গংয়ের পেটি ব্যবসায়িক স্বার্থ মুখ্য হয়ে হাজির হওয়াতেই ভারতের তাঁবেদারিটাই মুখ্য হয়ে উঠেছিল; অথচ এই স্বার্থটাই যা পাকিস্তানে সে সময় রাজনীতিবিদ (ব্যবসায়ী) বনাম আর্মি এই ভুয়া নামে হাজির হয়েছিল। তবু পাকিস্তান আর্মি আমেরিকার ইচ্ছা মেনে সেই থেকে আর কখনো ক্ষমতা দখল করতে যায়নি। তবে তা আর না করেও রাজনীতিতে যতটুকু প্রভাব রাখা যায় সে চেষ্টা করে অবশ্যই। বলাবাহুল্য, নওয়াজদের মত রাজনীতিবিদ থাকলে পাকিস্তানে এ সমস্যার কোনো দিন কোনো সমাধান নাই।

    তবে পরিস্থিতিকে ভারতের আধিপত্যে নেয়ার জন্য উপযুক্ত করে সেদিকে ঠেলে দেয়ার জন্য আমেরিকানদের লোভের স্বার্থ মূলত দায়ী। কারণ মূলত আমেরিকার আগ্রহ ভারতের বাণিজ্য, বাজার, অস্ত্র বিক্রি ইত্যাদির ওপর। যেটা ভারত পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলার পর (১৯৭৪) থেকে ভারত-আমেরিকা প্রায় বাণিজ্য সম্পর্কহীন হয়ে পড়েছিল। তাই ১৯৯৯ সালে ভারত নিজ বাজার বাণিজ্য সুবিধা আমেরিকাকে দেয়ার এক পূর্বশর্ত হিসেবে উল্টো পাকিস্তানের বাজার ভারতকে পাইয়ে দিতে যেন আমেরিকা সাহায্য করে এই শর্ত দিয়েছিল। আর এই ভারত-আমেরিকান স্বার্থের মধ্যে পড়ে পাকিস্তানের নিজভাগ্য হারিয়ে গিয়েছিল। কারণ ভারতের প্ররোচনায় ব্যবসায়ী নওয়াজেরা পাকিস্তান আর্মিকেই নিজ স্বার্থ হাসিলের পথের বাধা হিসাবে উপলব্দি করতে থাকে। আজ সেসব পুরনো পাকিস্তানবিরোধী পরিকল্পনা আবার সামনে আসছে, একটু একটু করে। তার আগে মাদিহার বাকি কথা শেষ করে নেই।

    মাদিহা এবার তার কথা শেষ করতে সরাসরি ২০১৮ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে চলে যান। তার ঐ আর্টিকেলের শিরোনাম হল, পাকিস্তানের ইমরান খান কী নোংরা নির্বাচনে বা না প্রকৃত ম্যান্ডেটে জিতেছেন [Did Pakistan’s Imran Khan win a “dirty” election or a real mandate?] ২০১৮ জুলাই ২৭ তারিখে সেটা ছাপা হয়েছিল, যেখানে ঐ নির্বাচন হয়েছিল ২৫ জুলাই।  মাদিহা ঐ লেখায় বলেন, এখানে ‘অস্বীকার করা কঠিন’ এমন দুটো ফ্যাক্টস আছে। প্রথমত, নির্বাচন কমিশনের ম্যানেজমেন্ট ফেইলিওর বা অযোগ্যতাটা ছিল মারাত্মক। সারা দিন ভোট প্রদানের সময় কোথাও কোনো বড় অভিযোগ ছিল না, উঠেনি। কিন্তু ভোট গণনার শুরুতে তাতে আরো দেরি হওয়ায় মানুষের সন্দেহ বাড়তে থাকে। অথচ এর কারণ হল কমিশনের সফটওয়ার ফেল করেছিল। এবং এই ফেল করা কমিশনের অযোগ্যতা অবশ্যই। মাদিহার দ্বিতীয় পয়েন্টটা অনেক শক্ত। তিনি বলছেন, বিদেশী পর্যবেক্ষক হিসেবে সেখানে ছিল ইইউর অবজারভা্রের, এক বড় টিম। কিন্তু তাদের রিপোর্ট হল, নির্বাচন মোটা দাগে ‘ইতিবাচক’ হয়েছে।

    এ ছাড়া কিছু প্রসঙ্গ যা মাদিহা আনেননি তা হল, আসলে যেখানে আর্মির প্রভাব কার্যকর ছিল, সেখানে নওয়াজের দলের পুরনো এমপিকে দুর্নীতির দায়ে আদালতের মাধ্যমে অযোগ্য ঘোষণা করে দেয়া হয়েছিল। এই কাজে পরোক্ষে আর্মির হাত ছিল মনে করা হয়। এ কথা অবজারভাররাও বলেছিল। তবে তারা এটা সরাসরি নির্বাচনের দিনের ঘটনা নয় পুর্ব প্রভাব বলে কম গুরুত্ব দিয়েছিল তারা। এর মূল কারণ, ঐ  জেনারেল জিয়ার আমলের ইসলামী দুর্নীতির আইন। বিচারকদের এটা প্রয়োগ ও ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আদালতকে যথেচ্ছ অধিকার দেয়া আছে এতে। সেকারণে এক রায়ের শেষে বিচারকের এমন মন্তব্য আছে যে, তিনি মন্তব্যে বলেছেন, আমাদের এমন ক্ষমতা দিলে তো এটা অপব্যবহার হবেই। আর সেটা ব্যবহার করাতেই নওয়াজের দলের বহু প্রার্থী অযোগ্য হয়ে যায়। তবে মূলত কমিশন তাদের সফটওয়ার ফেল করার কারণে ফলাফল দিতে দেরি হয়েছে। আর এ থেকেই প্রচারণার শুরু।

     এবার এপ্রসঙ্গে শেষের মূল যে কথাটা তা হল, বিরোধী দলের এখনকার এই আন্দোলন শুরু হলে পরে কেন ইমরান সরাসরি আলজাজিরাকে বলছেন যে, এই আন্দোলনে নওয়াজ শরিফ “ভারতের খেলা খেলতে নেমেছেন”! [Pakistan’s Khan accuses rival Sharif of “playing India’s game”] প্রথমত এটা কথার কথা কোন অভিযোগ নয় বা কমন রাজনৈতিক দল একে অপরকে যেভাবে ও অর্থে যেমন বলে থাকে সেই সাধারণ অর্থ বলা কোনো কথা নয়। এর সুদূরপ্রসারী অর্থ আছে। কী সেটা?

    দুনিয়ার এই সময়টা এখন পালাবদলের। এটা গ্লোবাল নেতা বা নেতৃত্বের পালাবদল – আমেরিকার বদলে চীনের নেতৃত্ব নেয়ার পালাবদল। আমেরিকা জানে, এই পরিবর্তন অনিবার্য। তা জেনেও যত তাতে দেরি করিয়ে দেয়া যায় এই লক্ষ্যে আমেরিকা খড়কুটোও আঁকড়ে ধরতে চাইছে। আর তা থেকেই এখন চারদিকে যাবতীয় নতুন সমস্যা।

    আর এ কাজে আমেরিকার চেয়েও অনুসারী সাগরেদ ভারত আরো কূটাশ্রয়ী হতে চাইছে। তাই ভারত চাইছে, একটা গ্লোবাল পোলারাইজেশনের মধ্যে পাকিস্তানকে ফেলে দিতে। মওলানা ফজলু মানে সৌদি লবি বা প্রভাব। ভারত এটার উপরে আমেরিকা, মাঝে সৌদি আর নিচে ভারত এভাবে চায়না বিরোধী এক পোলারাইজেশন টানতে চাইছে। যেন পাকিস্তানে আমেরিকা-চায়না পোলারাইজেশনটা পাকিস্তানের দলভিত্তিক হয়ে যাক। যেমন ইমরান এক দিকে আর তিনটি দল অন্য দিকে;  ভারত-চীন পোলারাইজেশনের দুই ভাগ এমন হোক। এতে ভারত যেন নওয়াজকে নিজের নৌকায় সামিল করে নিতে পারে। আর নওয়াজকে পুরনো ১৯৯৯ সালের কথা ও অ্যালায়েন্সের কথা, ব্যবসায়িক সুবিধার কথা মনে করিয়ে ভারত সেই সুড়সুড়ি দিচ্ছে। আর নওয়াজের অবস্থা হল – যিনি দুর্নীতির দায়ে বাকি জীবন জেলে থাকার জন্য শাস্তির রায়প্রাপ্ত; কারণ তাঁর তো দুর্নীতিতে সাজার রায় হয়ে গেছে তাই, তার কাছে পুরা পাকিস্তান ভারতের অধীনে চলে গেলেইবা কী? যদি তাতে নওয়াজ খালাস পেয়ে যাওয়ার উপায় পাওয়া যায়? এ কারণেই ভারতের গৃহযুদ্ধের প্রপাগান্ডা নওয়াজের সাথে ভারতের আঁতাত কত গভীরে চলে গেছে এরই প্রকাশ। ভারত প্রকাশ্যে পাকিস্তান নিয়ে, পাকিস্তানের একটা দলের পক্ষ নিয়ে ফেক নিউজ প্রপাগান্ডা শুরু করেছে – এই ফেনোমেনা এটা গত পচাত্তর বছরের ইতিহাসে কেউ দেখেনি!

    কিন্তু মূল কথা- একটা দেশের জন্য এটাই সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের হবে যদি ক্ষমতাসীন ও বিরোধীরা এরা এভাবে চীন বা আমেরিকান এই ভিত্তিতে দেশের দলগুলো একেকটার এজেন্ট হয়ে ভাগ হয়ে যায়। পাকিস্তানের ভাগ্যে সেই বিপদ ঘটতে যাচ্ছে।

    আর এটাই আমাদের জন্যও কী কোনো ইঙ্গিত যে, আমাদের ভাগ্যেও না এমন পরিণতি কোনো ফাঁক-ফুটা দিয়ে এসে যায়!

    সর্বশেষ, ভারতের এক খুবই সিনিয়র সম্পাদক হলেন শেখর গুপ্তা। যিনি ভারতের প্রধান সব পত্রিকার সম্পাদক হওয়া শেষে এখন বয়স্ক হয়ে এখন নিজের দ্যাপ্রিন্ট নামে মিডিয়ার সম্পাদকমন্ডলীর প্রধান। তিনি প্রায়ই ভিডিও ক্লিপ রিপোর্ট করেন। তিনি স্বীকার করেছেন, করাচী নিয়ে ভারতের মিডিয়ার রিপোর্টিং ভিত্তিহীন মিথ্যা। বিশেষত গৃহযুদ্ধ বা পাকিস্তানি সেনাদের আইজিপির অপহরণ এর খবর প্রসঙ্গে বলছেন ইনি নিজের সোর্সের মাধ্যমে খবর নিয়েছেন ও জেনেছেন এগুলা ফেক। যদিও তিনি কারা তাহলে ফেক একাউন্ট থেকে ফেক এমন টুইট তথ্য ও রিপোর্ট  ছড়ালো, ফেক গৃহযুদ্ধের ছবি  ছড়ালো – এসব নিয়ে কোন টুশব্দ তিনি  করেন নাই। কিন্তু এরপরের রাজদ্বীপ তার ইন্ডিয়া টুডে প্রিন্ট পত্রিকা থেকে অপহরণের শিরোনাম দেয়া ফেক রিপোর্ট এখন সরায় নেন নাই বা দুঃখ প্রকাশ করেন নাই। ইতোমধ্যে ইমরান খান এই ইন্টারভিউয়ে প্রতিজ্ঞা করে জানান, তিনি নওয়াজ শরীফকে যিনি সুপ্রীমকোর্টের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত তাকে বৃটেন থেকে ফেরত আনবেনই। এছাড়াও বলেন যে তিনি ক্ষমতায় থাকেন আর না, এই দুর্নীতিবাজেরা যেন ক্ষমতায় না ফিরতে পারেন এটা নিশ্চিত করবেন। [He said whether he remained in power or not, he would make sure that leaders of the protesting opposition parties never came back to power.]।

    ।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত  ২৪  অক্টোবর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “ভারতের ফেক নিউজ, করাচি নাকি গৃহযুদ্ধে?” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • আমেরিকা কী জেনেই ভারতের স্বার্থের জালে আটকাচ্ছে!

    আমেরিকা কী জেনেই ভারতের স্বার্থের জালে আটকাচ্ছে!

    গৌতম দাস

    ১৯ অক্টোবর ২০২০, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3dR

    Biegun-Momen joint Press meeting

    আমেরিকান ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট বা উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগানের দু’দিনের বাংলাদেশ সফর শেষ হয়েছে। এ নিয়ে প্রথম যে মন্তব্য করার আছে সেটা হল, এতে তাৎক্ষণিক কোনো ফল আসেনি বা আসছে না তা বুঝা গেছে। কিন্তু এর মানে কী আগামীতে আসবে? না। সেটাও একেবারেই অনিশ্চিত এবং সম্ভবত, না। বরং এশিয়ায় আমেরিকা এক চির-অথর্ব শক্তি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।

    যদিও আপাতত, আমেরিকার দিক থেকে বললে তারা যে ফলাফলের আশায় আর যে বুঝাবুঝিতে বাংলাদেশকে রাজি করানোর পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিল তা তাৎক্ষণিক ফল দেয়নি, মানে কাজ করছে না, এটা তারা বুঝেছে। এ যাত্রায় তাতে দেরি হবে, সময় লাগবে এমনকি কখনো না-ও হতে পারে। এখন আমেরিকা যদি একটা ইতিবাচক ফল চায় তবে এই রাস্তায় হবে না। ভিন্ন রাস্তা ও কৌশল ধরতেই হবে। তাহলে কী হবে এখন?

    ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আলাপ হয়েছে নাকি-আলাপ হয়নিঃ
    ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ জিনিসটা কী? স্ট্রাটেজি নাকি নেশনস বা ভিশন অথবা জোট বা সমিতি? আজও তা আমেরিকাও জানে না। তবু ভারতের মিডিয়াকে অনুসরণ করে এবার ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি (বা সংক্ষেপে আইপিএস [Indo-Pacefic Strategy, IPS]) বলতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের কিছু প্রো-ইন্ডিয়ান মিডিয়াকে। যেখানে খোদ আমেরিকাই এখনো একেক সময় একেকটা শব্দ ব্যবহার করে অস্থিরতা প্রকাশ করে যাচ্ছে। আমেরিকান কূটনীতিকরা আর গ্লোবাল নেতা থাকছেনা বলে আমেরিকার ওজনের ভারে কিছু কাটতে পারছেন না। তারা বললেই হয়ে যাচ্ছে না। বহু কাঠখড় পুড়িয়েও সময়ে তা থেকে কিছুই মিলছে না। সবকিছু দ্রুতই যেন দিন ফুরিয়ে আসছে, এমন দশা। এ দিকে বিগানের বাংলাদেশে আসার পর দেখা যাচ্ছে ইন্দো-প্যাসিফিক “বিজনেস ফোরাম” বলে আরেক নতুন শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন। শব্দটা আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। মানে রাষ্ট্র যারা ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্ত হবেন তাদের একটা ইকোনমিক বা বিজনেস জোটও থাকবে, তাই মনে হচ্ছে। আবার প্রধানমন্ত্রী হাসিনার দিক থেকে দেখলে এটা যেন বিগানকে দেয়া তার এক সান্ত্বনা পুরস্কার যে, ‘বিজনেস ফোরাম নিয়ে খুশি থাকো’! এদিকে আবার ‘কোয়াড’ বলে চার-রাষ্ট্রীয় (QUAD) এক জোট  তো আছেই। সেই সাথে আবার এদের সবাইকেই কি ‘এশিয়ান ন্যাটো’ বলে আরেক নামে নামাবে এরও কানাঘুষা উঠছে। তার মানে ইন্দো-প্যাসিফিক বলতে সামরিক-নিরাপত্তা জোট নাকি বিজনেস জোট মুখ্য হবে এ নিয়ে টানাটানির এখনো শেষ হয়নি।

    অভ্যন্তরীণভাবে ইন্দো-প্যাসিফিকে এসব অমীমাংসিত বিষয় থাকা অবস্থায়, বাংলাদেশে আমরা দেখছি এবার প্রথম বাধা উদয় হল যে, ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে বাংলাদেশের সাথে আলাপ হয়েছে, না হয়নি – এ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের সরকারি অবস্থান হল, ধারাবাহিকভাবে তারা বলছেন- ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আলাপ হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন ও ডেপুটি-মন্ত্রী শাহরিয়ার আলম দু’জনই আলাদা করে ক্যাটাগরিক্যালি বলেছেন “আইপিএসের প্রসঙ্গটা আলোচনায় আসেনি”। অথচ ‘প্রথম আলো’ নিশ্চিত করে লিখেছে তাদের প্রশ্নের উত্তরে বিগান বলেছেন, “আজ (বৃহস্পতিবার) আমি বাংলাদেশ সরকারের সাথে আইপিএস নিয়ে আলোচনা করেছি। ব্যাপকতর অর্থে আইপিএসে যেসব সুযোগ রয়েছে তা নিয়ে কথা বলেছি। অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার এগিয়ে নিতে আমরা একে অন্যকে কিভাবে যাতে সহায়তা করতে পারি তা নিয়ে আমাদের কথা হয়েছে। এটা বাংলাদেশের জন্য তো বটেই, এর প্রতিবেশী দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেক সুফল বয়ে আনবে”।

    এখন ভাষ্যগুলোকে আমরা কী এভাবে নিতে পারি? বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে কথা বলতে চায় না এই অবস্থানটা বুঝিয়ে দিতে গিয়ে যতটুকু যা কথা বলতে হয়েছে, এটা তাই। এ ছাড়া সরকারের অবস্থানটাও  বিগানের ঢাকায় পা-রাখার আগে থেকেই অনেক শক্ত ছিল। অন্তত যতটুকু আর যে শক্ত ভাষায় তারা মিডিয়ায় কথা বলছেন। যেমন, দেশের ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকায় উঠেছে, বিগানের ঢাকায় পা-রাখার আগের দিন মন্ত্রী মোমেনকে এক সাংবাদিক যতবার আমেরিকান প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন করেছেন তাতে অন্তত বেশ কয়েকবার তিনি বলেছেন ‘উই আর নট ইন্টারেস্টেড’। এর মধ্যে সবচেয়ে কোটেড দু’বাক্য হল এ রকম। মোমেন বলছেন,

    “We have no objection to the Indo Pacific Strategy. But they should come forward to the infrastructure development if they want to make the Indo Pacific Strategy more effective”.

    “ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে আমাদের আপত্তির তো কিছু নেই। যদি তারা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিকে কার্যকর দেখতে চান, তবে তাদের অবকাঠামোগত উন্নয়নের উপায়গুলো নিয়ে সামনে আসতে হবে। তাদের অর্থব্যয় করতে পারতে হবে; শুধু কথায় কাজ হবে না”। এরপরে ঐ সাংবাদিক নিজে যোগ করেছেন, ‘মন্ত্রী আসলে বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন খাতে আমেরিকার কোনো বিনিয়োগ বা অবদান নেই এ কথার দিকে ইঙ্গিত করছেন”।
    এর আগেরদিনও আমেরিকার কেবল অস্ত্র-বিক্রির দিকে আগ্রহকে খোঁচা দিয়ে মোমেন বলেছিলেন, “তারা আমাদের অস্ত্র-বিক্রি (অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ইত্যাদি) করতে চায়। কিন্তু আমরা কোনো সঙ্ঘাতের ব্যাপারে জড়িত হতে আগ্রহী নই। তারা চাইলে অবকাঠামো গড়ার ক্ষেত্রে আমেরিকার বিনিয়োগ নিয়ে আসতে পারে”।

    “They want to sell arms, but we are not interested in issues related to conflict,”

    আমেরিকান ইন্দো-প্যাসিফিক নৌকায় ওঠার প্রস্তাব উপড়ে ফেলে দেয়ার দিক থেকে দেখলে এটা হাসিনা সরকারের ভাল কৌশল যে, এমনভাবে শান্তিবাদী এবং উন্নয়নবাদী সেজে জবাবটা দিয়েছে। আর উল্টা আমেরিকাকে খোঁটা দেয়া যে, – “এখন অবকাঠামো খাতে আর তোমার বিনিয়োগ সক্ষমতা নেই, তুমি অযোগ্য আর এটা তোমার দুর্বল জায়গা”। সাথে যেন বুঝিয়ে দেয়া বাংলাদেশের চীনের প্রতি আগ্রহ বা চীনকে আমার দরকার তোমার চেয়ে বেশি। অতএব “উই আর নট ইন্টারেস্টেড”। কিন্তু বাংলাদেশের এই অবস্থান কত দূর টিকবে? সেটা বলা মুশকিল হলেও এটা আপাতত আমেরিকান স্ট্রাটেজিস্টদের বিরাট বিপদে ফেলে দিয়েছে, সন্দেহ নেই।

    বাংলাদেশের অনেকে এখানে একটা ভুল তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে তর্ক করেন যে, “আমেরিকার বাংলাদেশে বিনিয়োগ নাকি এখন সর্বোচ্চ”। অনেকে আরো অ্যাগ্রেসিভ হয়ে ঢাকার আমেরিকান দূতাবাসের ওয়েবসাইটের রেফারেন্স দেন। তাদের বিনয়ের সাথে বলব, বিনিয়োগ বলতে অবকাঠামো বিনিয়োগ বলে যা বুঝায় সেটা সাধারণত কেবল সরকারি ভাবেই হয়। আরেক ধরণের বিনিয়োগ হয় সেটা বেসরকারি। অর্থাৎ ডাইরেক্ট মানে ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) [FDI, Foreign Direct Investment]। যেটা সরকারের নয়; আমেরিকান প্রাইভেট কোম্পানির। আমেরিকান সরকার সেটার মালিকও নয়; ফলে এসব কোম্পানি উঠে চলে যেতে বা জেঁকে বসতে চাইলেও তা তাদের মালিক-শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থই মুখ্য করেই সব সিদ্ধান্ত নিবে যেটা ওর শেষ কথা। সেক্ষেত্রে আমেরিকান সরকারের বলার সুযোগ এখানে তাই প্রায় নাই। অতএব, ‘আমেরিকান সরকারি বিনিয়োগ’ বলতে কেবল অবকাঠামোকেই বুঝতে হবে। কিন্তু দূতাবাসের সাইটে ব্যাপারটাকে Bilateral Economic Relations ‘বাংলাদেশে আমেরিকান বিনিয়োগ’  বলে শিরোনামে রাখা হয়েছে। অথচ ভিতরে কেবল এফডিআই এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সব বিভ্রান্তি সম্ভবত এখান থেকে। যেখানে আবার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে ঐ বিনিয়োগে সাঙ্গু গ্যাসের জন্য বিনিয়োগটাই ওর বড় অংশ। এটা আসলে শেভরন কোম্পানির বিনিয়োগ। তাই মোট পরিমাণ হিসাবে সেটা ৩.৪ বিলিয়নের। তবু সেখানেও একটা অঙ্কের ফাঁকি আছে। ঐ ফিগারটা বলা হয়েছে ২০১৮ সালের। এ কথার মানে হল তারা ২০২০ সালের পর্যন্ত আপডেটেড তথ্য দিচ্ছে না।, সম্ভবত এর পরের দু’বছরে ফিগারটা কমে গেছে। অর্থাৎ ২০১৮ সালে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ কথাটা মিথ্যাও নয় আবার এটাই সব সত্যি তাও নয়। তবে মন্ত্রী মোমেনের পরিস্কার দাবি – অবকাঠামোতে আমেরিকান বিনিয়োগ নেই। আর একথাটাও ভুল বলে কেউ দাবি করেছেন, দেখা যায়নি।

    তাহলে কি এখন আমেরিকা ইন্দো-প্যাসিফিকে বাংলাদেশকে তুলতে না পেরে হতাশ মুখে বসে থাকবে?
    না, ঠিক তা নয়। তবে ইতোমধ্যে বিগান ও তার দল তাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াটা দেখিয়ে ফেলেছেন মনে করা যেতে পারে। যেমন প্রথম আলোর বিস্তারিত কথোপকথনের রিপোর্টে (১৬ অক্টোবর) দেখা যাবে, যতগুলো ইস্যু বিগান তুলেছেন তাতে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন আমেরিকা তা সমাধানে আগ্রহ দেখাবে যদি তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে বাংলাদেশ আগে উঠে, তাহলে। তবেই আমেরিকা প্রধান উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসবে।
    যেমন, স্টিফেন বিগানের এই সফরের পাশাপাশি আরেক প্রচেষ্টা চলছে ইউরোপে রোহিঙ্গা ইস্যুতে। তাতে বাংলাদেশ অনাগ্রহ দেখিয়েছে ইতোমধ্যেই। ক্রিটিক্যাল বিচারে ব্যাপারটায় বাংলাদেশের অনাগ্রহ দেখানো খুবই সঠিক। কারণ, ব্যাপারটা হল  এরা ইউরোপিয়ানদের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান এভাবে জোট বেধে আগামি ২২ অক্টোবর রোহিঙ্গাদের সাহায্যের জন্য একটা ফান্ড তৈরির চেষ্টায় বসতে যাচ্ছে। এমন বিষয়ে এক রিপোর্টের শিরোনাম – “রোহিঙ্গাদের ১০ বছর মেয়াদি মানবিক সহায়তা প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের, আগ্রহী নয় বাংলাদেশ”।  এখান থেকেই আসলে পুরা ব্যাপারটায় ভারতের পক্ষে যাতে সুবিধা হয় এমন আমেরিকান পরিকল্পনা থাকা অসম্ভব নয় মনে হচ্ছে। যেমন এনিয়ে বণিকবার্তায় মোমেনের বক্তব্য বা মিডিয়ায় প্রশ্ন রেখেছেন,  এতে মূল হচ্ছি আমরা, রোহিঙ্গা সংকটের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রথমে তো আমাদের জিজ্ঞাসা করতে হবে, তারপর এগুলো হবে। যুক্তরাষ্ট্র শুধু মুখে বলে দিয়েছে বৈঠকের বিষয়ে। কী নিয়ে আলাপ করা হবে এ নিয়ে আমাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হবে। সেটি জানার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। এটিতে আমরা সবার প্রথমে অংশগ্রহণ করতে চাই। তবে পুরো বিষয়টি বুঝে তারপর”।

    চারটি গ্রুপ এ বৈঠকটি মূল হচ্ছি আমরা, রোহিঙ্গা সংকটের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রথমে তো আমাদের জিজ্ঞাসা করতে হবে, তারপর এগুলো হবে। যুক্তরাষ্ট্র শুধু মুখে বলে দিয়েছে বৈঠকের বিষয়ে। কী নিয়ে আলাপ করা হবে এ নিয়ে আমাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হবে। সেটি জানার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করা হয়েছে। এটিতে আমরা সবার প্রথমে অংশগ্রহণ করতে চাই। তবে পুরো বিষয়টি বুঝে তারপর। – পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন

    অর্থাৎ সোজা মানে হল, রোহিঙ্গা[Rohingya] ইস্যুতে আমরা আশ্রয়দাতা অথচ কোথাকার চার গ্রুপের মিটিং আর আমরা তা জানি না কেন? দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাদের পালার জন্য অর্থ সাহায্যের চেয়েও বড় প্রয়োজন মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি যাতে তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে বাধ্য হয়। কিন্তু সেদিকে কোনো উদ্যোগ নেই কেন? আর তৃতীয়ত, তিন বছর হয়ে গেল; এখন কেবল ফান্ডের উদ্যোগ। তাহলে প্রত্যাবাসন নিয়ে আগ্রহ হবে কবে, সে খবর নেই কেন? এই কঠোর সমালোচনা বিগান প্রকারান্তরে মেনে নিয়ে বলছেন- কেবল “এ দেশের জনগণকে যাতে তার বোঝা টানতে না হয়” তাই ফান্ডের অর্থ তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে দরকার আছে। এছাড়া বিগানের দাবি, “এ সমস্যার শুরু থেকেই মিয়ানমারের ওপর যতটা সম্ভব রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সোচ্চার রয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকারের বিষয়ে। তবে এতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন। সব দেশকেই এ সমস্যা সমাধানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে”।
    দেখা যাচ্ছে “আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন”  বা ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’- সবই তিনি বলছেন কিন্তু উদ্যোগ কে নিবে – ঘন্টাটা বাধবে কে – সেটাই বলছেন না। বরং এক “অনন্তকালের দিকে” তা ঠেলে দিয়েছেন, এটাই সম্ভবত ষড়যন্ত্রপুর্ণ দিক হয়ে উঠার সম্ভাবনা। এছাড়াও, বিগান যে ভাষায় বলছেন, “শুরু থেকেই মিয়ানমারের ওপর যতটা সম্ভব রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে” যুক্তরাষ্ট্র করেছে বলে যা বলছেন এটা পুরাপুরি ভুয়া। বরং ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের সীমান্তে ধেয়ে আসার এর প্রথম বছরটা ছিল – আমেরিকা, ভারত ও চীন এই তিন শক্তিরই বার্মিজ জেনারেলদের কে কত তোয়াজ করতে পারে এরই যেন প্রতিযোগিতার বছর। কারণ মূল প্রতিযোগিতাটা আসলে ছিল মায়ানমার থেকে কে কত ব্যবসা বাগাতে পারে সেদেশে, এরই প্রতিযোগিতা।  বার্মীজ জেনারেলরাও এই ব্যবসা বিতরণের টোপ দিয়ে ঐতিনটা দেশকেও নাচিয়ে চলেছিল। ব্যবসা পাবার লোভে আমেরিকা, ভারত ও চীন কারোরই আন্তর্জাতিক দায়দায়ীত্ব বা মানবাধিকার প্রসঙ্গে কোন খেয়াল ছিল না। আর এটার সুযোগ নিয়েই  বার্মীজ জেনারেলেরা রোহিঙ্গাদের ইচ্ছামত হত্যা ও রেপ ও নির্মমতার আয়োজন  করে বাংলাদেশে তাদের ঠেলে দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, এভাবে ঠেলে দেওয়ার সাফাই হিসেবে বার্মিজ পুলিশ-আর্মির ওপর কথিত “আরসা (ARSA) বাহিনীর” মিথ্যা আক্রমণের গল্প হাজির করেছিল। অথচ আরসা হল বার্মীজ সেনাবাহিনীরই তৈরি এই বাহিনী – যা একই পুতুল শিয়ালের ছানার মত বার্মীজ সেনাবাহিনী সব জায়গায় হাজির করে বিপদে পড়লেই; বিচ্ছিন্নতাবাদী ফোর্স হিসাবে দেখায়। যেমন সেসময় দাবি করেছিল কথিত আরসা আক্রমনের প্রতিক্রিয়ায় নাকি বার্মীজ সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের মেরে রেপ করে সীমান্তে পাঠিয়েছিল। আর এসবের সবচেয়ে ত্যাদরামো ব্যাপার হল, এ নিয়ে এই তিন শক্তি কে কত ভালোভাবে বার্মীজ সেনাবাহিনীর ঐ সাফাই এর পক্ষে দাড়াতে ও সমর্থন যোগাতে পারে, গল্প  গাইতে পারে এরই প্রতিযোগিতা চলেছিল। সে কারণেই রোহিঙ্গাদের আগমনের ঢল সে সময়ে সহসা বন্ধ করা যায়নি। অতএব প্রথম বছরজুড়ে সেসব দিন ছিল ভয়াবহ, এখন সেসব সত্যতা পাল্টাতে চাইলেই কেউ পারবে না। বরং বিপদ ও শঙ্কার কথা হল, ঐ তিন শক্তির বার্মীজ সেনাবাহিনী তোয়াজের প্রতিযোগিতা আবার না শুরু হইয়ে যায়। যদিও এখন একমাত্র চীনই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়া  নিয়ে সোচ্চার। আর ভারত, আমেরিকার কোনই খবর নাই। এখনও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এদুইয়ের কাছে কোন ইস্যুই নয়।
    আসলে বার্মীজ সেনাবাহিনীর সাথে এই তিন শক্তির খাতিরদারি সবকালে একই রকম থাকে নাই। যেমন এখন মুখ্যত ভারত সবচেয়ে কাছে বার্মীজ সেনাবাহিনীর নৌকায়। আর এই ভারতই হল সেই ২০০৭ সাল থেকেই আমেরিকাসহ সারা ইউরোপ এমন সকলকে  বার্মীজ জেনারেলদের সা্থে যোগাযোগের অগ্রদুত বা এডভান্স পার্টি – এই ভুমিকা পালন করে এসেছে। আর চীন এখন একেবারেই বাইরে ছিটকে পড়েছে, মনে হচ্ছে। আর আমেরিকার অপ্রত্যক্ষ যোগাযোগে, যার প্রত্যক্ষ যোগাযোগটা মেইনটেন করে দিচ্ছে ভারত এবং অবশ্যই তা ভারতের বিরাট এক স্বার্থে। সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসব।

    তাই এখনকার মত স্টিফেন বিগানের সফর শেষ হল এই বলে এবং এই মুলা ঝুলিয়ে যে, তাদের নৌকায় উঠলে তবেই তারা রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বহু কিছুরই সমাধানে এগিয়ে আসতে পারে।

    তাই এখনকার মত স্টিফেন বিগানের সফর শেষ হল এই বলে এবং এই মুলা ঝুলিয়ে যে, তাদের নৌকায় উঠলে তবেই তারা রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বহু কিছুই সমাধানে এগিয়ে আসতে পারে। এর মানে কি তারা এখন একেবারেই চলে যাচ্ছে?
    অবশ্যই না। তারা অবশ্যই আবার আসার কথা ভাববে। তবে সেটা খুব সম্ভবত আমেরিকার নির্বাচন সমাপ্তির আগে না; পরেই নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের হাত ধরে, হয়ত। যদি তা ঘটে তবে সেটা হবে বাংলাদেশের উপর আরো চাপ নিয়ে, আরো প্রলোভন নিয়ে এবং আমাদের সরকারকে যতভাবে বাধ্য করার সুযোগ তাদের হাতে আছে সব নিয়ে। এছাড়া আরো অনেক ‘কিন্তু’ আছে।

    স্টিফান বিগানের এই সফরের মুল সাফাইঃ
    মনে রাখতে হবে, ইন্দো-প্যাসিফিক জোট গড়তে চাওয়া এটা আসলে ইতোমধ্যেই একটা ফেইল্ড প্রজেক্ট ছিল; ২০১৬ সালেই ওবামার হাতে ‘এশিয়া পিভোট’ নামের এই প্রকল্পটা ব্যর্থ হয়ে যায়। ইন্দো-প্যাসেফিক সমুদ্র-অঞ্চলের পাশের একটা দেশও সেকালে ওবামা নিজ নৌকায় তুলতে পারে নাই। তারপরেও স্টিফেন বিগান কিন্তু এখন প্রথম আলোকে যে নতুন গল্পটা দিয়েছে তা এরকমঃ স্টিফেন বিগান বলেন, “দুঃখজনক হলেও সত্যি, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরে আমাদের নিরাপত্তার অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। আর এটা আমি অস্বীকারও করতে চাই না। আমাদের নিরাপত্তাজনিত কিছু উদ্বেগ রয়েছে। এ বিষয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক দেশেরও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ কারো কথা উল্লেখ করব না। যেমন হিমালয়ে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গালওয়ান উপত্যকায় চ্যালেঞ্জ আছে। সেনকাকু দ্বীপ নিয়ে জাপান সাগরে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। তাইওয়ানে উত্তেজনা রয়েছে। হংকংয়ে ক্রমবর্ধমান দমন পীড়ন চলছে। তিব্বতের শিনজয়ানে উত্তেজনা বিরাজ করছে। অস্ট্রেলিয়ার জনগণের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়ছে। এসব উত্তেজনা আর চ্যালেঞ্জ যুক্তরাষ্ট্রসহ এ অঞ্চলের অনেক দেশকে সতর্ক করে তুলেছে”।
    এখানে প্রথম বাক্যে ‘আমাদের’ লেখা, এই আমাদের বলতে কারা? কারণ, ওবামার সেই কালেও এশিয়া-প্যাসিফিকের (এশিয়া-পিভোট নাম ছিল তখন ) কোনো দেশই আমেরিকার নৌকায় উঠেনি। এমনকি এই ভারতও না। যদিও তাতে অনেক দেশই আছে যারা সেসময় হয়ত জেনুইনভাবেই চীনের ওপর অসন্তুষ্ট, ক্ষুব্ধও এবং অনেক কিছুই ছিল। কিন্তু তাই বলে আমেরিকার যুদ্ধ-নিরাপত্তা ফেরি করার জোটে তারা কেউ উঠেইনি। তাহলে এটা এখনও আমেরিকার “আমাদের” নিরাপত্তা’ চ্যালেঞ্জ হল কেমনে? আমাদের মানে, তাহলে এই চ্যালেঞ্জ তো আসলে আমেরিকাকে একাই! অর্থাৎ আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জড হয়ে গেছে আর তা হয়েছে চীনের হাতে। এবং বড় কথা তা ন্যাচারাল!  আর মানতে হবে কেউই দুনিয়ায় স্থায়ী নেতা নয়। তাই, এমন ধরে নেয়ার কোনই ভিত্তি নাই। কাজেই “আমাদের” বলে এই মিথ্যাটা বলার দরকার কী? আর এতে কী আমেরিকার দুঃখ ঘুচবে? এছাড়া একালেও তো কোয়াডের তিন দেশ ছাড়া আর কেউ এখনও আমেরিকার সাথে জোট করেনি? আবার এই তিন রাষ্ট্রও আবার আধামন দিয়ে ও দ্বিধাগ্রস্থ অবস্থায়। অতএব আগের এশিয়া পিভোটের মত এবারো ইন্দো-প্যাসেফিক উদ্যোগও যে ফেল করবে না, তেমন নতুন কিছু তো ঘটেনি। আমেরিকা তা দাবিও করতে পারছে না।  আর ভারত? সেও আধামনে ও দ্বিধায় যতটুকু ভিড়েছে আর যা করছে এর কারণ ভিন্ন। ভারত তা কেবল নিজদেশের লোক আর মিডিয়ার মনোবল যেন চাঙ্গা থাকে সে জন্য করেছে – যেন বলতে চাইছে “ভয় নাই, বড় মুরুব্বি দেশ ভারতের পাশে আছে”। কিন্তু আসলে আছে কী?

    ভারতের আধা-মনে, দ্বিধায় দিন গুজরানঃ
    ভারতের আধা-মনে মানে হাফ-হার্টেড হয়ে দ্বিধায় দিন কাটছে। চলতি অক্টোবর মাসের ছয় তারিখে জাপানে যে কোয়াড (QUAD) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক হয়ে গেল এটা তো আসলে ভারতেই হওয়ার কথা ছিল। [“But he (Biegun) added that the Quad grouping is expected to meet in New Delhi this autumn..…. ] কিন্তু ভারত আগেভাগেই গত মাসে মাফ চেয়ে হোস্ট হতে অপারগতা জানায়। কারণ ভারতের আসল অবস্থান হল – একপা আগে দুইপা পিছে, এমন টলমলে। কেন?

    মোদী গত ২০১৮ সালে ১ জুন সিঙ্গাপুরে আটল্যান্টিক জোট ‘সাংগ্রিলা” এর বার্ষিক সম্মেলনে প্রধানবক্তার বক্তব্যে হিন্দু বেদের বরাত দিয়ে; ভারত ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে কারো বিরোধী হয়ে কোন জোট গড়ার বিরুদ্ধে- বক্তব্য দিয়েছিলেন। বলেছিলেন ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে ভারতের নিজের সংশ্লিষ্টতা এমন হতে হবে যে ভারত কারো বিরুদ্ধে না [মানে এখন যেভাবে আমেরিকা বলছে চীনের বিরুদ্ধে জোট তা নয়] বরং ইনক্লুসিভ বা সবাইকে নিয়ে হতে হবে। এবার ধর্মগ্রন্থ বেদের বরাত দিয়েছিলেন – एकम सत्यम, विप्राः बहुदावदंति বাংলায়, সত্য একটাই, জ্ঞানীরা তা বিভিন্ন উপায়ে প্রকাশ করে থাকে। তাই ভারত বহুত্ববাদে, একসাথে পাশাপাশি বসবাসে, খোলামনে আর ডায়লগে বিশ্বাস করে। যারা এর রেফারেন্স চান তারা ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটের এই রেফারেন্স লিঙ্কে পুরা বক্তৃতাটা দেখতে পারেন।

    In conclusion, let me say this again: India’s own engagement in the Indo-Pacific Region – from the shores of Africa to that of the Americas – will be inclusive. We are in-heritors of Vedanta philosophy that believes in essential oneness of all, and celebrates unity in diversity एकम सत्यम, विप्राः बहुदावदंति (Truth is one, the learned speak of it in many ways). That is the foundation of our civilizational ethos – of pluralism, co-existence, open-ness and dialogue. The ideals of democracy that define us as a nation also shape the way we engage the world.

    এছারা এই আলোকেই একবার এই গত জুলাই ২০২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর প্রকাশ্যেই বলে ফেলেন যে, ভারত কোন সামরিক বা নিরাপত্তা জোটে যাবে না [India will never be a part of an alliance system, says External Affairs Minister Jaishankar]। কারণ ভারত জোট-নিরপক্ষে সেই সোভিয়েত কোল্ড ওয়ারের আমল থেকে। এই নীতিতেই ভারত এখনো থাকবে। তার মানে হল, যতটুকু অন্য দেশে গিয়ে কোয়াডের মিটিং-এ ভারত যোগ দিয়েছে সেটা লোক দেখানোর জন্য। আর খুব সম্ভবত তা প্রধানত বর্তমান চীনের চাপে মারখাওয়ার মুখে নিজ পাবলিক ও মিডিয়ার মনোবল ঠিক রাখতে। তাই এবার একবার যদি ভারত কোয়াডের হোস্ট হয়ে যেত তবে সেখান থেকে যে ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া ফোকাস ভারতের জন্য তৈরি হয়ে যেত তাতে ভারত আর কোয়াডের সিরিয়াস ও সক্রিয় কেউ নয় বা সে তখনও জোট-নিরপেক্ষ  – এসবকথা এরপর দাবি করা খুবই কঠিন হয়ে যেত। সেটা হলে হয়ত পাবলিকলি অনেক কিছুই ভারতকে মুখে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেলতে হত যা করতে ভারত একেবারেই প্রস্তুত নয়। এই বিড়ম্বনা ও সম্ভাব্য ‘বেইজ্জতি’ থেকে বাঁচতে বা এড়াতে সে কোয়াড মিটিংয়ের আয়োজক না হয়ে এড়িয়ে যায়।

    নতুন আরো বিশাল বড় কারণঃ
    যদিও এর পেছনে আরো বড় কারণ আছে। আসলে এখন ক্রমশ পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে শুধু কোয়াডের চার দেশ – ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া – আর এদেরকে নিয়ে আমেরিকা, এদের নিয়েও কোনো ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিক জোট গড়া একেবারেই সম্ভবই নয়। কেন? এত বড় কথা কেন?
    মূল কারণ মিয়ানমার ইস্যু। অথবা বলা যায় ভারতের আসল ইচ্ছা বা ঘটনায় মোঁচড়।
    মূল প্রশ্নটা হলঃ মিয়ানমার ইস্যুতে আমেরিকা্র রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য করাসহ মিয়ানমার জেনারেলদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর যেকোনো ভূমিকা – এটা নেয়া কি আদৌ সম্ভব? উত্তরটা কন্ডিশনাল বা শর্ত সাপেক্ষ। মানে আমেরিকাকে যদি তা সম্ভব করতে তুলতে চায় তাহলে কোয়াড অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক কোনো জোট খাড়া করার চিন্তা আমেরিকাকে এখন থেকে একেবারেই বাদ দিতেই হবে। কারণ কী?

    কারণ, নিশ্চয় আমেরিকা জানে যে মিয়ানমারকে সাবমেরিন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ভারত। আর এতে ভারত মুখে সাফাই দিয়েছে, চীনের ভয়ে তাকে নাকি এটা করতে হয়েছে। অর্থাৎ ভারত-মিয়ানমার এখন এক ঘোষিত সামরিক-অ্যালাই বা পক্ষজোট হয়ে গেছে। তাহলে আমেরিকার এই ভারতকে নিয়েই কোয়াড অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিক জোট গড়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কী করে সম্ভব?
    এর সোজা মানে হল, যত দিন মিয়ানমার-ভারতের সম্পর্ক ভারতের কাছে সবার উপরে বা আগে অগ্রাধিকার-সম্পর্ক হয়ে আছে বা থাকবে তত দিন আমেরিকা ভারতকে নিয়ে  ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলে কোন ব্যাপারে কিছুই করতে পারবে না। এশিয়ায় কাউকেই কোনো সাহায্যে হাজির হতে বা কিছু করতে পারবে না যা ভারতের স্বার্থবিরোধী। এর মানে আমেরিকার আসলে হাত-পা বাঁধা পড়তে যাচ্ছে। এক অথর্ব শক্তি হচ্ছে। এসব আমাদের আগেই বুঝতে পারা কি খুব কঠিন? বার্মীজ জেনারেলেরা বহু চিন্তা করে  ঠিক এটাই করতে চেয়ে আমেরিকা-চীন-ভারতের মধ্যে ভারতকেই বেছে আলাদা করে কাছে টেনে আপন করে নিয়েছে। আর তা থেকেই এতকিছু ঘটা শুরু হয়েছে।
    এখন এসবের সোজা মানে স্টিফেন বিগানের এই সফর এখন তাহলে দাড়াচ্ছে যে এটা পুরাটাই লোক দেখানো বলে হাজির হতে পারে। যদিও এমনিতেই আগামী ৩ নভেম্বর আমেরিকার নির্বাচনের পরে পরিষ্কার হয়ে যাবে কোয়াড অথবা ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজিক জোট এরা আসলে সিরিয়াস না নির্বাচনী দেখন-শোভা ছিল; নির্বাচনের পরেও কি এরা বেঁচে থাকবে, তৎপর থাকতে পারবে, কিভাবে?
    এরপরে নতুন প্রেসিডেন্ট তিনি যদি চান – এইবার আমেরিকা যে অথর্ব নয় তা প্রমাণ করতে গেলে আমেরিকার জন্য সেক্ষেত্রে একমাত্র অপশন হল, ভারতের বিরুদ্ধে সামরিকসহ সবভাবে খাড়া হতে আমেরিকাকে রাজি থাকতে হবে – এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারা। অর্থাৎ বাংলাদেশের কাছে দেখাতে হবে যে আমেরিকা ভারতবিরোধী সামরিক কোন জোটনেতা বা শক্তি – এভাবেই একমাত্র হাজির হতে হবে। সেক্ষেত্রে তাহলে এর মানে হবে এশিয়ায় আমেরিকার ভারত বলে কেউ নাই, দাঁড়াবার জায়গাই নাই। এমন হয়ে যাবে যা চিন্তা করা আমেরিকার জন্যই খুব কঠিন। আর আমাদের জন্য আমেরিকা তেমন দুর্দশায় পড়েছে সেটি চোখে না দেখলে আমরা কেউ বিশ্বাস করব না।

    আমেরিকার কুমিরের কান্না নাকি অথর্ব হয়ে যাওয়াঃ
    অতএব রোহিঙ্গাদের জন্য আমেরিকান চোখের পানি কুমিরের কান্না হয়েই থাকার সম্ভাবনা প্রবল।  তাহলে  গত দুবছর ধরে স্টিফেন বিগানের ততপরতা ফল কী এবার উল্টা ফলতে যাচ্ছে? এশিয়াতে আমেরিকাই ভারতের স্বার্থের অধীনে কেবল ততপর থাকবে? আর এটাই কী এবার স্টিফেন বিগানের ভারত সফরের ফলাফল হবে!
    তাই এখন এই অথর্ব আমেরিকা যে ভারতের কারণে উত্থান-রহিত হতে যাচ্ছে (আগামি ৩ নভেম্বর আমেরিকার নির্বাচনের পরেই পরিষ্কার হয়ে যাবে), এই আমেরিকাকে লইয়া কেবল হাসিনা নয়, পুরা বাংলাদেশই বা ‘কী করিবে’?  এই অথর্ব আমেরিকা আমাদের কোন কাজে আসবে? ভারত তার নিজের সঙ্কীর্ণ স্বার্থের ফাঁদে, অগ্রাধিকারের ফাঁদে খোদ আমেরিকাকেই আটকে ফেলতে যাচ্ছে, সম্ভবত!
    তার মানে আমেরিকা কী জেনেই ভারতের স্বার্থের জালে আটকা পড়তে চাইছে! নাকি এটাই যৌথ উদ্যোগ?

    সবশেষে একটা বাড়তি প্রসঙ্গ কথিত ভুরাজনীতিঃ
    বিগানের সফর উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের মিডিয়ার দুর্দশা দুর্গতি কী মাত্রায় তা সব উদাম হয়ে গেছে। এক কারো দালালি বা এজেন্ট হওয়া ছাড়া কোনকিছুই এদের করার দূরে থাক ইস্যুটা বুঝবারও সামর্থের সংকট প্রবল হয়ে ধরা দিয়েছে।  আর যখন কোন কিছু বুঝার ব্যর্থতা হাজির হয় তখন তা ঢাকতে এদের অনেকে একটা শব্দ ব্যবহার করে – ‘ভুরাজনীতি’। এ’এক কঠিন সমস্যা হয়ে হাজির হয়েছে। অথচ শব্দ না বুঝলে তা ব্যবহারের দরকার কী? এছাড়া ভুরাজনীতি শব্দটাই ভাল শব্দ নয়, আসলে তা  এমন আবছা। যেমন গ্লোবাল অর্থনীতি বা কোন গ্লোবাল অর্ডার নিয়ম বলে যে দুনিয়ায় কিছু আছে তা ভুরাজনীতি শব্দটা কাভারই করে না, তাই এই প্রসঙ্গটা কিছুই বুঝবার উপায় নাই। এই কথিত ভুরাজনীতি মানে কী, তা তাদের লেখা পড়েও কিছু বুঝার সুযোগ নাই। আরেক দল আছে যারা নিজের অসহায়ত্ব টের পেয়ে বুদ্ধিমান হতে চেয়ে ভারতের মিডিয়াকে কপি করে রিপোর্ট লিখেছে। অথচ এই ইস্যুতে বাংলাদেশের সরকারি অবস্থানই ভারতের বিরুদ্ধে সে খবর তাদের নাই। তারা খেয়ালই করে নাই। ওদিকে স্টার গ্রুপ বা প্রো-আমেরিকান মিডিয়া যারা, তারা ভাব ধরতে গেছে তারা সরাসরি আমেরিকান অবস্থান হাইলাইট করছে। কিন্তু হায়! তারাও বুঝে নাই যে এই ইস্যুতে স্টিফেন বিগানও মায়ানমারের বিরুদ্ধে কিছু বলতে চাইছেন না। যদিও তিনি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন ‘আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক’ উদ্যোগ নিলে আমেরিকা আছে। মানে তিনি আসলে ইস্যুটাকে অনন্তকালের দিকে অমীমাংসিত ঠেলে দিয়েছেন। মানে কোন উদ্যোগ না নেওয়া, মানেই ত ভারতের অবস্থান। আবার বিগানের  “আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক” উদ্যোগ মানে কী? চীন উদ্যোগ নিলে তারা যাবে না সে তো বলাই বাহুল্য। ফলে এটাও এক কথার কথা।  সারকথায় রোহিঙ্গা বা মায়ানমার ইস্যুটাকে স্বাধীনভাবে বুঝবার তাগিদ বা সম্ভবত মুরোদ আছে মিডিয়ার তা বেশিরভাগ মিডিয়া রিপোর্ট পড়ে টের পাওয়া যায় না। আবার প্রথম আলোর বাংলা অনুবাদের এক উদাহরণ হল, চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগের বাংলা করেছে  – “অঞ্চল ও পথের উদ্যোগে (বিআরআই)”। ফলে এক কঠিন দশা। আর এসবের সার ফলাফল হল বাংলাদেশের পাবলিককে মুল ইস্যুটা কী তা বুঝাতেও মিডিয়ার ব্যর্থতা। এতে সবমিলিয়ে ক্ষতিটা হয়েছে বাংলাদেশের স্বার্থের। আর এটা বলার সময় হয়েছে যে সরকার সরকারের অনুগামি মিডিয়া (ফার্মের মুরগীর মত) তৈরি করে রাখলে এর কী পরিণতি হয় তাও আমরা দেখলাম!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৭ অক্টোবর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “ভারতের স্বার্থে আটকা পড়ছে আমেরিকা!” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসছেন, কোন জোটে উঠা এড়াতে হবে

    উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসছেন, কোন জোটে উঠা এড়াতে হবে

    গৌতম দাস

    ১২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3dt

    যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট (উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী) স্টিফেন ই. বিগান

    বাংলাদেশের একটা ক্রিটিক্যাল সময় পার করছে, সামনে আরও খারাপ সময়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি। সাথে আবার এটা এমন একটা সময় যখন বাংলাদেশের সরকারের রেটিং ভালো নয়, হওয়ার কোন কারণও নাই। অথবা সরকারও এ সময়ে অন্তত ২৫% মানুষ তার পক্ষে আছে মনে করে বোকার সাহস দেখাতে একটা খোলা সার্ভে হতে দিতে চাইবে না বা মনেও করবে না। সাধারণভাবে এশিয়ার জন্য বিশেষ করে ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর জন্যই খুব খারাপ সময় এটা। মূল কারণ, গ্লোবাল অর্থনীতির পুরান নেতা আমেরিকার বদলে পালাবদলে চীনের ক্রমশ নেতা হয়ে হাজির হওয়ার সময় হয়েছে। মূলত গ্লোবাল নেতা হওয়ার পালাবদলের এই সময়, বিশেষ করে এশিয়ান স্টেজ বা রঙ্গমঞ্চে ছোট দেশগুলোকে নিজের নিজের নৌকায় বা জোটে তুলতে টানাহেঁচড়ার খুব ভয়ঙ্কর সময় সামনে। তার প্রকৃত মাত্রা ও চিত্রটা পাবো আমরা আগামী ৩ নভেম্বর আমেরিকার নির্বাচনের পরের সপ্তাহ থেকে। কারণ এই টানাহেঁচড়ার পেছনের আবার একটা বড় কারণ নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে ‘দেখন শোভা’ বা রোডশো। এই নির্বাচনে ট্রাম্পকে দেখাতে হবে, তিনি চীন বিরোধিতায় প্রবল লড়ছেন ও এমন সক্রিয়ভাবে তৎপর যে, নিজের অসুস্থতা ভুলে করোনার বেড থেকে উঠে এসেছেন।

    চীনবিরোধী ‘কোয়াড’ [QUAD – India, Australia, japan, USA] জোট গড়তে ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট (বা আমাদের সমতুল্য অর্থে পররাষ্ট্রমন্ত্রী) পম্পেও গত এই ৬ অক্টোবরও জাপানে কোয়াড পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মিটিং করেছেন, ট্রাম্প লড়ে চলেছেন এটা দেখাতে। অথচ ভিতরের কাহিনী হল, এবারেও তারা একসাথে চার রাষ্ট্র মিলে একটা যৌথ-বিবৃতি দিতে পারেনি। আলাদা আলাদা করে দিয়েছেন আর তাতে নিজ নিজ ইস্যু ঢুকিয়েছেন। এ’থেকেই সন্দেহ ৩ নভেম্বরের পরে কোয়াডের কোন অর্থপুর্ণ মিটিং আদৌ আর হয় কিনা অথবা কী হয়? আর হলে সেটা কেমন হয়, ভাষ্য কী থাকে তা দেখতে হবে আগে। নইলে আমেরিকান ইলেকশনের আগের মাসেও আমেরিকান কোন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, এর আগে কখনও এমন তৎপর ছিলেন জানা যায় না।

    পালাবদলঃ
    আমেরিকার বদলে চীন নতুন নেতা হতে যাচ্ছে, এটা কোন মানুষ বা সাবজেক্ট দ্বারা নির্ধারিত ঘটনা নয়; অবজেকটিভ ঘটনা। বস্তুগতভাবে নির্ধারিত এই ঘটনা। আর এটা আমেরিকার পরপর তিনটা সরকারি সার্ভেরই একই মূল ফাইন্ডিং বা প্রাপ্ত ফলাফল। অবজেকটিভ বা বস্তুগত শর্ত বলতে এখানে প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে হাজির হয়েছে চীনের হাতে বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা বা চীনের হাতের বিপুল সারপ্লাস বা পুনঃবিনিয়োগযোগ্য সঞ্চিত সম্পদ। যা সম্ভবত সবাই মানবেন তা হল এই চীনা সক্ষমতা, এটা আনপ্যারালাল; মানে একালে এই বস্তগত সক্ষমতার তুলনা একমাত্র চীন নিজেই। কিন্তু সমস্যা হল, কোন দেশ নিজে পরাজিত হয়েছে জানলেও একেবারেই চলতে না পারা দশা না আসা অবধি কে যেচে পরাজয় স্বীকার করতে চায়! জটিলতা সেখানেই। তবে বোকার স্বর্গে বাস করা কেউ কেউ তো থাকেনই। অথবা আমেরিকান ছোট ছোট এন্টারপ্রাইজের পরিচালকেরা কেউ, যাদের পক্ষে আমেরিকার হারু-বাস্তবতা মেনে নেয়া তো আসলেই কঠিন। তাই এদের কেউ কেউ এর পরেও সামরিক দিক থেকে আমেরিকা এখনো অনেক গুণ শক্তিশালী – এ দিয়ে আমেরিকার শক্তি মেপে চলতে চাইবে হয়ত। তাদেরকে বুঝানোও সম্ভব নয় যে, সামরিক শক্তি দিয়ে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্ব কায়েম করা যায় না, সক্ষমতাও মাপা যায় না।

    এখনও এক অমীমাংসিত অংশঃ
    কিন্তু তবু আমেরিককন ঐ সার্ভেতে নির্ধারিত ফাইন্ডিংসে যে মুখ্য অংশটা এখনও অমীমাংসিত তা হল, এই পালাবদল কী একটা যুদ্ধের পরিণতি হয়ে আসবে, না আপসে টেবিলে বসে কথা বলে আসবে? আমরা এখনও কেঊ তা জানি না। তবে বড়জোড় গত পালাবদলের কথা মনে করে দেখতে পারি আমরা। গত পালাবদল মানে? এর আগেও গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল হয়েছে নাকি? অবশ্যই; এর আগেও যে পালাবদল হয়েছে তা অনেকে আমলই করেন নাই হয়ত। তাদের মন করিয়ে দেই, ৭৫ বছর আগে আমেরিকা গ্লোবাল পলিটিক্যাল (অর্থনৈতিকসহ) নেতা হয়েছিল বিপরীতে সব কলোনি-দখলদারদের (ইউরোপের বৃটিশ, ফরাসি, ডাচ ইত্যাদি সকলকে) পরাজিত করে অথবা তাদের উপরের নেতা হয়ে বসে আর সেটাই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৫ সাল। অর্থাৎ যুদ্ধের ফলাফল হিসাবেই আমেরিকা নেতা হয়েছিল বৃটিশসহ সবার উপরে। যে ইউরোপের ওরা গর্ব করত যে, কলোনি সাম্রাজ্যের সূর্য নাকি কখনোই অস্ত যাবে না। সেই গর্ব ভেঙে চুরমার করে দেয় আমেরিকা। তা সত্বেও এটা আজ কোন নিশ্চয়তা নয় যে এবারও তাহলে একটা যুদ্ধের পরেই কেবল চীন নেতা হবে।

    সীমিত যুদ্ধ না বড় পারমাণবিকঃ
    এছাড়াও যুদ্ধ হলে সেটা ছোটখাটো যুদ্ধের সীমায় থাকবে তো? না বড় আত্মহত্যার কোনো কাণ্ড ঘটবে? ‘আত্মহত্যা’ বলছি এজন্য যে, বেশির ভাগ মন্তব্যকারী “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ” বলে একটা কথা প্রায়ই বলে ফেলে। কিন্তু তাতে এটা বুঝাই যায়, তারা কী নিয়ে কথা বলছে, এর কোনো ইমাজিনেশন বা কল্পিত ছবিও তাদের মাথায় কিছু নেই। তারা প্রায় সবাই গত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কল্পনাটাই মাথায় রেখে এবার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা অবলীলায় বলে যায়। অথচ তারা আমলই করেনি যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেটা কোন পারমাণবিক বোমার যুদ্ধ ছিল না। কারণ সেকালে রাষ্ট্রনেতারা পকেটে পারমাণবিক বোমার কোড নিয়ে ঘুরতেন না। কিন্তু একালে ঘুরেন! তবু সেবার কেবল আমেরিকা ঐ যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে এরপরেও ঐ যুদ্ধের পটভূমিকে উসিলা করে পারমাণবিক বোমা কেমন নৃশংসভাবে মানুষ মারতে পারে এরই পরীক্ষা করে নিয়েছিল। যুদ্ধে এক “হারু পার্টি” ছিল হিটলারের বন্ধু জাপানের সামরিক সরকার, কলোনি এম্পায়ার; অথচ বেচারা জাপানের জনগণের উপর পারমাণবিক বোমা প্রয়োগ করে সেই পরীক্ষা করে নেয়া হয়েছিল। এর ফলাফল ছিল চরম ভয়াবহ, তা বললেও কম বলা হবে! কিন্তু তবু একালে যারা অবলীলায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা বলছেন মনে হয় না তারা আমল করেছেন যে, এবার হবু যুদ্ধে প্রধান তিন থেকে ছয়টা দেশ – পারমাণবিক বোমাসমৃদ্ধ দেশই হবে। সুতরাং এবার যদি (সীমিত নয় এমন) বড় যুদ্ধ হয় তাহলে আমাদের পরিচিত দুনিয়াটাকেই আর খুজে পাওয়া না যাওয়ার সম্ভাবনা। তাই নিজে বাঁচার তাগিদে হুঁশজ্ঞানটুকু অন্তত যদি থাকে তবে বড় যুদ্ধের কথা কেউ বলবে না বা সেদিকে যাবে না। কিন্তু যুদ্ধ লেগে গেলে কে নিশ্চয়তা দিতে পারে এটা কোথায় গিয়ে শেষ হবে! নাকি দুনিয়াই শেষ হবে?
    তাই এসব সম্ভাবনার দিক মাথায় রেখে এশিয়ান স্টেজে চীন ও আমেরিকার মহড়া আর লেজে ফাঁকফোকরে আমেরিকান প্রক্সি হিসাবে ভাবধরা ভারত  – এভাবে সব মিলিয়ে পরিস্থিতিটা আমাদের মত দেশের জন্য এক অস্বস্তিকর ও খারাপ সময়।
    তাই গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদল ঘটবে অনিবার্য এটা জেনেও আমেরিকা যেন নিজ মনকে শান্ত্বনা দিতে চীনবিরোধী একটা যুদ্ধজোট গড়তে চাইছে, কখনও যেটাকে ‘কোয়াড’ অথবা “ইন্দো-প্যাসেফিক জোট” বলছে কখনও “এশিয়ান ন্যাটো”। আর ভাবছে  একবার এই জোট গড়তে পারলে আমেরিকা আরও কিছুদিন গ্লোবাল নেতা থাকতে পারবে। অথচ খাঁড়া মিথ্যাটা হল, সামরিক শক্তি দেখিয়ে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হওয়া যায় না। কারণ মুরোদের প্রশ্নটা এখানে বিপুল সারপ্লাস বা বিনিয়োগ সক্ষমতার, বিপুল সমরাস্ত্রের যোগ্যতার নয়; বিনিয়োগ সক্ষমতার তারুণ্য একালের চীনের মত আমেরিকারও এককালে ছিল, যা সবশেষে এখন আর নাই।

    স্টিফেন ই বিগান এর বাংলাদেশ সফরঃ
    এমন অবস্থায় আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি সেক্রেটারি (উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী) স্টিফেন ই বিগান বাংলাদেশ সফরে আসছেন আগামী ১৪-১৬ অক্টোবর। মি. বিগান আমাদেরকে বলে কয়েই তাদের ইন্দো-প্যাসিফিক জোটে তুলে নিতে চেয়েই আসছেন। ঢাকার আমেরিকান এমবেসি ও বণিকবার্তা  আমাদের তাই জানাচ্ছে। আমেরিকা তার স্বার্থের কথা ও পথে তাদের মতে আমাদের ‘হেদায়েত’ করতে চাইবে। তাতে বলার কিছু নেই। কিন্তু আমরা আমাদের কোনো কোটারি গোষ্ঠীর স্বার্থে তাতে সাড়া দিতে পারি না। আমাদেরকে পাবলিক ইন্টারেস্ট বা জনস্বার্থ তো দেখতে হবে! আর ঠিক এই বিষয়ে আমাদের জন্য আইডিয়েল ও সঠিক অবস্থান হবে নিউট্রালিটি; মানে কারও নৌকায় বা জোটে না উঠে, এড়িয়ে যাওয়া। কোন যুদ্ধে বা কারো যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া মানে হবে আমাদের যাকিছু অর্জন এর শেষ সম্বলটাও হারানো। অথচ আমাদের জন্য সময়টা কঠিন এজন্য যে, আমাদের এখনকার সরকার দুর্বল, পিছনে জনসমর্থন নাই; তাই স্বর নরম করে ফেলতে পারে। আর সে কারণে সেসব ঘাটতি পূরণ করতে ওদিকে আবার ক্ষমতায়ও থাকতে চাইবে বলে কোন না কোন আপস যাতে না গিলে ফেলে, এই ভয় আমাদের থাকবে। সরকারের পাবলিক রেটিং থাকা না থাকাটা এখানে এভাবে সম্পর্কিত। অথচ এসময় দরকার ছিল অভ্যন্তরীণভাবে অন্তত এই ইস্যুতে পাবলিকের সবপক্ষের একটা ঐকমত্য, একক অবস্থান নিয়ে এক ভয়েজে কথা বলা। তাহলেই আমাদের এসব কোটারি স্বার্থগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারা সহজ হয়ে যেত।

    ভুল ম্যাসেজ(!) দিয়ে শুরুঃ
    ওদিকে ইতোমধ্যেই  মি বিগান আমাদের সাইলেন্ট মেজরিটিকে একটা প্রাথমিক ভুল মেসেজ দিলেন মনে হচ্ছে। তিনি বাংলাদেশে কাজ শেষে ভারতে যাচ্ছেন। এর মানে কী? চৌদ্দ বছর পরে আবার একালেও ভারতকে বগলে করে আমেরিকা কী বাংলাদেশে এসেছে? এর অর্থ-ইঙ্গিত খুবই সুদূর প্রসারীভাবে হবে নেতিবাচক। যদি মানে তাই হয় তবে আমাদের দেশের মানুষের জন্য খুবই খারাপ মেসেজ তিনি এনেছেন। এর মানে বাংলাদেশের সাইলেন্ট মেজরিটির মনোভাব আমল করতে ও ক্ষোভ বুঝতে আমেরিকা আবার ব্যর্থতার পথই বেছে নিতে যাচ্ছে। যেখানে হাত পরিষ্কার রাখতে ও দেখাতে আমেরিকার উচিত আলাদা ডেস্ক মানে আলাদা স্টাফ-ডেস্ক থেকে ভারতকে ডিল করা। তাই বলা বাহুল্য যে এরকম চললে আমেরিকার এখনও বাংলাদেশে কাজ করা বা ভূমিকা রাখার যতটুকু শেষ সুযোগ আছে তা অকার্যকর করা হবে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। এতে বাংলাদেশে আমেরিকার কোনো পরিকল্পনাই পাবলিকের দিক থেকে কোনদিনই আর সমর্থন বা আমল পাবেই না।

     

    এশিয়ার ছোট দেশের সমস্যা, উদাহরণ হিসাবে মালদ্বীপঃ
    তাই একটা উদাহরণ হিসাবে এবার মালদ্বীপকে সামনে রেখে কিছু কথা বলব। তবে মালদ্বীপ এশিয়ার ছোট দেশ হিসাবে পালাবদলের কালের সমস্যা ভাল মোকাবেলা করেছে কীনা সেজন্য নয়; বরং কিভাবে আরো জটিল জালে মালদ্বীপ আটকে গেছে এর উদাহরণ হিসেবে মালদ্বীপকে নিয়ে কথা বলব। মালদ্বীপের মূলসমস্যা আসলে – তাদের দুই প্রধান দল  গ্লোবাল পালাবদলের দুই ক্যাম্পের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে একটু ফারাক হল এটা চীন-আমেরিকা দুই ক্যাম্প না হয়ে চীন-ভারত হয়ে আছে; মানে আমেরিকার প্রক্সি এক্ষেত্রে ভারত। যেকোন দেশের জন্য এটা চরম দুর্ভাগ্যজনক যে, দেশের প্রধান দুই রাজনীতির দল যদি চীন ও ভারতের এজেন্ট হয়ে কায়েমি দোকান খুলে বসে যায়। এরই আরেক উদাহরণ যেমন শ্রীলঙ্কা। অভ্যন্তরীণভাবে বলা হয় মালদ্বীপ মূলত নাকি দুই সৎভাই মামুন আবদুল গাইয়ুম আর ইয়ামিন আবদুল গাইয়ুম মূলত তাদের আর তাদের অনুসারী বা অনুগামী রাজনীতিকদের নিজেদের দুই দল হিসেবে ভেতরের লড়াই হয়ে বিভিন্ন সময়ে হাজির হয়ে চলেছে।

    Mohamme্‌d, Nasheed, Ibrahim Mohamed, Solih & Abdulla Yameen

    দুই ভারতীয় রিপোর্টারঃ
    মালদ্বীপ নিয়ে এ’বছরের আগস্ট থেকে এপর্যন্ত দুই ভারতীয় রিপোর্টারের দুইটা রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। সুধা রামচন্দ্রন ব্যাঙ্গালোর থেকে লিখেছেন আগস্টে জাপানি ‘ডিপ্লোমেট’ পত্রিকায় – [Has India Won the Match Over the Maldives?]- এই শিরোনামে। আর সীমা দাসগুপ্তা কলকাতা থেকে লিখেছেন গত সপ্তাহে হংকং থেকে প্রকাশিত এশিয়ান টাইমসে -India risks losing its military hold on Maldives – এই শিরোনামে। সুধার লেখাটা একেবারেই প্রো-ইন্ডিয়ান ভাষ্য বা ভারতের তথাকথিত ‘জাতীয়’ স্বার্থ মেনে লেখা বলা যেতে পারে। সীমার লেখাটা সে তুলনায় অনেক বেশি নিউট্রাল।
    গত ২০১৮ সালের শেষে সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে  (প্রো-চাইনিজ) ইয়ামিন হেরে যান প্রো-ইন্ডিয়ান নাশিদ গ্রুপ ও দলের কাছে। মালদ্বীপ প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ জনসংখ্যার ও প্রায় ১২শ’ দ্বীপমালার দেশ, যার মাত্র  প্রায় ১৮৫টা ছোটবড় দ্বীপ বসবাসযোগ্য। বাকিগুলোতে চাষাবাদ হয় মূলত। ইয়ামিনের গত আমলে রাজধানী মালে ও এর সংলগ্ন এমন বড় চারটা দ্বীপকে একটা ব্রিজ দিয়ে যুক্ত করা হয়েছে, যার একটাতে এয়ারপোর্ট আর শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য জোন আছে। আর বাকি দুটোতে বসবাসের জন্য ১৬-২৫ তলা করে আবাসিক ফ্লাট তৈরি করেছে,  ইয়ামিনের সরকার চীনা ঋণে। মোট প্রায় ২২৪০০০ ফ্লাট। এরকম প্রতি ফ্লাটে যদি দু’জন করে বাসিন্দার এক পরিবার ধরি তবে মালদ্বীপের ৮৬% জনসংখ্যাকেই সরকার আবাসন দিতে পারবে, এতই বিপুল সংখ্যায় ফ্লাট নির্মাণযজ্ঞের দ্বিতীয় পর্যায় চলছে এখনও।
    এখন সুধার লেখায় তাঁর অভিযোগ হল, ইয়ামিন মোট ১.৪ বিলিয়ন ডলার চীন ঋণ নিয়ে এসব নির্মাণকাজ করেছে। আরো বড় অভিযোগের স্বরে লিখছেন, এখন এই ঋণ কি মালদ্বীপ পরিশোধ করতে পারবে? নাকি শ্রীলঙ্কার মত হবে? মানে, বলতে চাইছেন, ভারত শ্রীলঙ্কায় যেমন প্রপাগান্ডা করতে পেরেছিল তেমন প্রপাগান্ডা করার সুযোগ কি মালদ্বীপেও পাবে?
    সুধা লিখছেন, “This was of concern to India. Would the Maldives, like Sri Lanka, end up handing over strategic assets in lieu of unpaid debt to China? Would the Chinese set up a naval base in the archipelago?”। কিন্তু তামাশাটা হল, ঋণ নিয়েছে মালদ্বীপ, কিন্তু তাতে উদ্বিগ্ন হয়েছে ভারত, যে কী করে মালদ্বীপ সেই ঋণ শোধ দিবে! আবার সেই ভারতই ইয়ামিনের পরের বর্তমান প্রো-ইন্ডিয়ান সলিহ-নাশিদ সরকারকে ৮০০ মিলিয়ন ডলার নতুন ঋণ দিয়েছে। অথচ এখন এই নতুন ঋণের বোঝা এটা শোধ দিবে কী করে সেটা ভারতের উদ্বিগ্নতার বিষয়ই নয়? দুনিয়াতে এরচেয়ে বড় জোকারি আর কী হতে পারে!

    প্রপাগান্ডা ও গুজবের শুরু এখান থেকেইঃ
    ধরা যাক, সুধার আশঙ্কামত মালদ্বীপ চীনা ঋণ পরিশোধে বিরাট সমস্যায় পড়বে। কিস্তির অর্থ দিতে গিয়ে বাজেটে টান পড়বে!  ইব্রাহিম সলিহ এখন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট। তাহলে সলিহ-নাশিদ গ্রুপ যারা এখন ক্ষমতায়, এরা তো ক্ষমতায় এসেই নতুন করে ইন্ডিয়ান ঋণ নিয়েছে। অর্থাৎ মালদ্বীপ সরকার নতুন আরও প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার ভারতীয় ঋণ নিয়ে এবার একইভাবে অন্য আর তিনটা দ্বীপ যুক্ত করতে রাস্তা বানাচ্ছে। এখন চীন ঋণ শোধে যদি মালদ্বীপের মুরোদই না থাকে তবে এর উপর আবার ভারতীয় ঋণ নিচ্ছে কেন? কোন সুখে আর বিবেচনায়? আর এই ভারতীয় ঋণের বেলায়ও এর কিস্তি পরিশোধের অর্থ কোথা থেকে আসবে, শোধ দিবে কী করে? এনিয়ে ভারত নিরুদ্বেগ কেন?  অর্থাৎ সুধার অনুমিত, কথিত ঋণের ফাঁদের গল্প আসলে ছিল প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেইন মাত্র। আর মালদ্বীপের অর্থনীতির কোন ঋণের দায় বইবার আসল সহ্যক্ষমতা কী এবং কতটুকুর উপর দাঁড়িয়ে এনিয়ে কোন পেশাদারের বিশ্লেষণ-প্রাপ্ত ফলাফল জেনে নিয়ে তিনি কথা বলেননি। বরং ভারতীয় সাংবাদিক বলে চোখ বুঝে মিথ্যাবলার  ভারত সরকারের স্বার্থের পক্ষে দাড়ায় অপেশাদার প্রপাগান্ডা রিপোর্ট করে বসেছেন! অথচ প্রপাগান্ডা করা তার কাজ বা পেশা নয়। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে সুধা আসলে প্রবল জাতিবাদী হয়ে কথিত ভারতীয় “জাতীয় স্বার্থে” এই মিথ্যা প্রপাগান্ডা শুরু করেছেন। আর আমাদের জন্য এখান থেকে শিক্ষণীয় হচ্ছে, এমনিভাবে দুই প্রধান দলের, এমন চীন বা ভারতের পক্ষ নিয়ে প্রপাগান্ডা শুরু করবেই – একটা দেশের জন্য এই ইতরোচিত প্রপাগান্ডাই সবচেয়ে চরম ক্ষতিকর ও আপত্তিকর ও বিপদজনক। আর মালদ্বীপের প্রধান দুর্ভাগ্য আর পতনের কারণ হতে পারে এটা! এ জন্যই বলছি একেকটা দল চীন বা ভারতের দালালি নিবে, আর দেশটা ভাগ হয়ে যাবে পাবলিক এটা চলতেই দিতে পারি না। এমন হলে সে দেশ শেষ হয়ে যাবেই।
    আবার এই নাশিদ (২০১৩ সালের তিনিই শুরুতে প্রো-ইন্ডিয়ান প্রেসিডেন্ট ছিলেন যদিও, কিন্তু শেষে প্রো-চাইনিজ হয়ে ভারতীয়দেরকে দেয়া এক এয়ারপোর্ট প্রকল্প তিনিই বাতিল করে দিয়েছিলেন ) পরে তিনি ইয়ামিনের আমলে দুর্নীতির দায়ে জেলে ছিলেন। কিন্তু কোনো এক (সম্ভবত অসুস্থতার) অজুহাতে জামিন পেয়ে সেসময় পালিয়ে শ্রীলঙ্কা চলে যান আর সেখান থেকে ২০১৮ সালে মিডিয়ায় ইন্ডিয়ান আর্মিকে মালদ্বীপ দখলের প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু এদের দল আবারও ২০১৮ নির্বাচনে জয়ী হয়ে এলে সেবার ঘোষণা দিয়ে প্রো-ইন্ডিয়ান সরকার কায়েম করেছিলেন যেখানে সোলিহ হন প্রেসিডেন্ট আর নাশিদ স্পিকার। আর পুরাতন চেয়ারছোঁয়া-খেলায় রোটেশনের মত ইয়ামিন এখন জেলে। এই হল ভারত বা চীনা দালালির রাজনীতির পরিণতি!

    এখন সলিহদের অভিযোগ হল চীন ঋণ থেকে ইয়ামিন সরকারের আমলে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। আরও অভিযোগ, চীনা প্রাইভেট কোম্পানির কাছে ঋণ নিয়ে ইয়ামিনের সরকার মালদ্বীপের কিছু প্রাইভেট ব্যবসায়ীকে কয়েকটা রিসোর্টগুচ্ছও বানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ইয়ামিনের সরকার ঋণের খাতক না হয়েও নিজে ঐ বেসরকারি বাণিজ্যে লোনের গ্যারান্টার হয়ে আছে। অতএব সলিহ-নাশিদের গ্রুপ এর দাবি এখানে এই গ্যারান্টার হওয়া মানে, তারা এর ব্যাখ্যা দিচ্ছেন যে এি সমুদয় অর্থও সরকারই ঋণ নিয়েছে ধরতে হবে। অর্থাৎ গ্যারান্টার হওয়া মানেই সরকার নিজেই ঋণ বুঝতে হবে। এবং এই অর্থও আত্মসাৎ হয়ে গেছে। সলিহ-নাশিদের অর্থমন্ত্রী অভিযোগ তুলে বলছেন, গ্যারান্টার হওয়া মোট ৯৫৩ মিলিয়ন ডলার হল এটাও ইয়ামিন সরকার চীনা ঋণ নিয়েছে ধরতে হবে। আর এছাড়া সরকার নিজের জন্য ঋণ নিয়েছে বাদ বাকিটা। এভাবে মোট ১.৪ বিলিয়ন ডলার চীনা ঋণ নিয়েছে। সে ঋণ পরিশোধে নাকি শ্রীলঙ্কার মতো অবস্থা হবে মালদ্বীপের। আসলে এই প্রো-ইন্ডিয়ান গোষ্ঠী বুক ফুলিয়ে সবাইকে ‘হাইকোর্ট’ দেখাচ্ছে। ভেবেছে, সারা দুনিয়া তাদের এই বাক-চাতুরী বুঝবে না। অথচ এতে যে প্রশ্ন উঠে গেছে, তাহলে বাড়তি ৮০০ মিলিয়ন ডলারের ভারতীয় ঋণ নিল কেন আর এই ঋণের কিস্তি দেবে কিভাবে?

    সরকার গ্যারান্টার হওয়ার কালচার কোথা থেকেঃ
    প্রপাগান্ডা ফেলে এখন প্রকৃত ঘটনাটা ব্যাখা করা যাক। রাষ্ট্র কেন এখানে গ্যারান্টার হতে গেল এর পক্ষে ইয়ামিন সরকারের উপযুক্ত সাফাই থাকা দরকার ছিল, অবশ্যই। কিন্তু অন্যদিকের আরেক কথাও জেনে রাখা ভাল। তাহলে, ফেয়ার বিচার করা হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে সরকারের গ্যারান্টার হয়ে থাকা স্বাভাবিক হতে পারে। যেমন  তা হল, বিশ্বব্যাংকের নিয়ম ও কালচার অনুযায়ী যারা নিজেদের “মধ্য আয়ের দেশ” হয়ে যায় বা দাবি করে আর বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল সুদের (যেখানে ঋণের সুদহার নামমাত্র ০.৭৫% যা ১% এরও কম) ঋণ আর পাবে না। তখন থেকে তাদের ২% সুদহারের ঋণ শ্লটে যেতে হবে। বাংলাদেশ এখন এই শ্লটে। এছাড়া আরও একটা শ্লট আছে যেটাকে আইএফসি (ইন্টারনাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন, IFC) লোন বলে, যার সুদহার ৪%। আইএফসি বিশ্বব্যাংক গ্রুপেরই আরেক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। বিশ্বব্যাংকের সুপারিশে ওর লোনও পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ওর শর্ত হল এই লোন সরকারি খাতের জন্য নয়, কেবলমাত্র বেসরকারি কোম্পানিকে দেয়া হয়। এছাড়াও আরেক শর্ত হল তবু সরকারকেই আবার ঐ লোনের গ্যারান্টার থাকতেই হবে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে দুইটা বেসরকারি কোম্পানি যারা ১২০০ মেগা বিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণকারি তারা আইএফসির লোন পেয়েছে বা পাইয়ে দিয়েছে। কারণ এই লোন সরকারকেই পাইয়েই দিতে হয়, সুপারিশ করে। স্বাধীনভাবে পাওয়া যায় না। এই ঋণের অন্তত একটা মেঘনা গ্রুপের মালিকানাধীন প্রকল্প অর্থাৎ বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যেই এমন গ্যারান্টার হয়ে আছে। সম্ভবত বিশ্বব্যাংককে অনুকরণ করে চীনা বেসরকারি লোন নেয়া হয়েছে ওখানে, মালদ্বীপে সরকার গ্যারান্টার হয়ে। আরো কথা আছে, এই লোন চুক্তি কিন্তু হয় ঐ বেসরকারি লোন গ্রহীতা কোম্পানির সাথেই দাতা IFC এর। কারণ, যদি পরিশোধে কোনো সমস্যা দেখা দেয় সে ক্ষেত্রে সরকার যাতে লোন আদায়ে দাতার পক্ষ নেয়, সে জন্যই এই ব্যবস্থা। আর এমন প্রকল্প যেহেতু তা সাধারণত সরকারের কোন ঠিকাদার কোম্পানির জন্যই করা হয়; যেমন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে সরকারি ঠিকাদার অথবা উতপাদিত বিদ্যুৎ  সরকারকে বিক্রি করে এমন হয়ে থাকে ফলে ঐ বেসরকারি কোম্পানিকে আল্টিমেট পেমেন্ট দেয় সরকার। তাই সরকারের হস্তক্ষেপের কোন না কোন সুযোগ থেকেই যায় তাই এমন গ্যারান্টার ব্যবস্থা কোন সরকারের জন্য  বড় কোন রিস্কের সম্ভাবনা কম থাকে।
    এই যদি হয় আমেরিকার বিশ্বব্যাংকের কালচার বা নিয়ম তাহলে আমেরিকার বন্ধু ভারত মানে প্রো-ইন্ডিয়ান মালদ্বীপ সরকার কেন এই প্রপাগান্ডা শুরু করেছে? ৯৫৩ মিলিয়ন ডলার ঋণে সরকার গ্যারান্টার বলে এই অর্থও ‘সরকার চীনা ঋণ নিয়েছে’ বলে পাড়া মাতাচ্ছে কেন? এগুলাই চরম অসততা ও মিথ্যা প্রপাগান্ডা ফলে বিপদজনক। চীন বা ভারতের স্বার্থে তাদের এজেন্টরা এসব মিথ্যা প্রপাগান্ডার লড়াই দেশের উপর চড়িয়ে দেয়। এই হল মালদ্বীপে দেশ ভাগ হয়ে থাকা দুই দালালদের কায়কারবার থেকে পাওয়া শিক্ষা; যদি তা আমরা শিখতে চাই!
    এখন তামাসা হল, মালদ্বীপ নিয়ে ভারতের দুই লেখকের আশঙ্কা কিন্তু একই। তাই শিরোনামও প্রায় এক। দু’জনই আশঙ্কা করছেন, ভারত মালদ্বীপে টিকবে কিনা; মালদ্বীপে ভারতের প্রভাব টিকাতে আর কতদিন পারবে? প্রথম লেখক সুধা রামচন্দ্রনের আশঙ্কা, চীনের মত ভারতের বেশি ঋণ দেবার মুরোদ নাই, তাই সমস্যা। তাই সুধার শিরোনামে শঙ্কা – “মালদ্বীপে ভারত কী চীনের উপরে জিততে পেরেছে?”। আর দ্বিতীয় লেখক সীমা দাসগুপ্তের আশঙ্কা ভারত হেরে যাচ্ছে সেজন্য শিরোনাম দিয়েছেন, “মালদ্বীপে সামরিক অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে ভারত”। কারণ সলিহ-নাশিদ গ্রুপ প্রো-ইন্ডিয়ান হলেও সম্ভবত ইতোমধ্যে তারাই আবার চীনের সাথে যোগাযোগ শুরু করে বসেছে। কোভিডের পরে তাদের সম্ভবত অর্থ বা ঋণ দরকার। আর অনুমান করি এক্ষেত্রে তারা সঠিকভাবেই ভারতের চেয়ে চীনকে উপযুক্ত মনে করেছে।

    এছাড়াও মালদ্বীপে নন-পার্টিজান এক সংগঠন ‘প্যাট্রিওটিক ইয়ুথ মুভমেন্ট অফ মালদ্বীপ’  মালদ্বীপে ভারতের উপস্থিতি, হেলিকপ্টার ও আকাশ থেকে সমুদ্রসীমা মনিটরিংয়ের কিছু বায়ুযান দেশের সঠিক প্রয়োজনের দিকে তাকিয়ে সরবরাহ করা হয়নি বলে দাবি করেছে। এ ছাড়া এসব যানগুলো পরিচালনার জন্য পাইলটদের ট্রেনিং শেষ করতে অসীমভাবে দেরি করে মালদ্বীপ ছাড়তে ভারতীয় সেনাদের গড়িমসি নিয়ে  – সবমিলিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে তারা নানা ধরণের পাবলিক সমাবেশে প্রতিবাদ করা শুরু করে দিয়েছে। তাই সীমা দাসগুপ্তার আশঙ্কা, ভারতকে মালদ্বীপ ছাড়তে হতে পারে। তাই তার লেখার শিরোনামই হলো সরাসরি, “মালদ্বীপে সামরিক অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে ভারত”। অর্থাৎ ভারতের ফকিরি বা ছ্যাঁচরামি করতে এখানেও দেখা যাচ্ছে।  ছেচরামো করে হলেও ভারতের সামরিক সদস্যদের মালদ্বীপে রাখতে হবে। এতে ভারতের কোন ইজ্জত বাড়ে তা কে জানে!  এটা যেন ভারতের ফরাক্কা বাঁধ তৈরির কথা মনে করিয়ে দেয়। এই বাঁধটা  পরীক্ষামূলকভাবে চালানোর অনুমতি নেয়া হয়েছিল বাংলাদেশের থেকে, শেখের আমলে। অথচ সে পরীক্ষামূলকটাই এখন  বিনা অনুমতিতে স্থায়ী হয়ে গেছে, ভারতের খবর নাই!

    এদিকে সীমা দাসগুপ্তা দুটা আরো ভয়ঙ্কর তথ্য দিয়েছেন। সীমা লিখেছেন, ‘বর্তমান প্রেসিডেন্ট সলিহ ভারতের সাথে করা একটা চুক্তি বাস্তবায়ন করেছেন, যেটা অনুসারে মালদ্বীপে “ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের সাথে জড়িত বিষয়ে ভারতীয় আদালতের রায় প্রযোজ্য হবে”। এটা এক ভয়ঙ্কর নতজানু চুক্তি। আমাদেরও এটা নিয়ে সতর্ক হওয়ার ব্যাপার আছে। সারা দুনিয়ার রেওয়াজ হল – আইনি বিষয়ের জন্য এক্তিয়ার হবে প্রকল্প ভোক্তার স্থানীয় দেশের আদালতের। তবে আরও কিছু স্বার্থবিরোধ-বিতর্ক দেখা দিলে আন্তর্জাতিক কোনো সালিশি আদালত যেমন বিশ্বব্যাংকের সালিশ-বিরোধ নিরসনের আদালত, না হয় ইউরোপীয় সমতুল্য সালিশি আদালতের কথা সাধারণত বাণিজ্য চুক্তিতে উল্লেখ করা থাকে।
    এছাড়া অপর তথ্য হল, সীমা লিখছেন, “ভারতের নজরদারি বিমান ও হেলিকপ্টার মোতায়েন এবং এগুলো পরিচালনার জন্য (মালদ্বীপে) মোতায়েন করা ভারতীয় সেনা ও সরঞ্জামাদির বিষয়কে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু“ করেছে মালদ্বীপের পাবলিক। এমন ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ও ছড়িয়েছে যা দাবি করছে যে, “মালদ্বীপের কিছু অংশকে ভারত নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছে”। সীমা লিখেছে, “মালদ্বীপের সাবেক এক সরকারি কর্মকর্তা বলছেন, ভারতের সামরিক উপস্থিতির ব্যাপারে মালদ্বীপের পাবলিকের মধ্যে গভীর হতাশা দেখা দিয়েছে যার গভীর ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে”। দেখা যাচ্ছে, অপরের জন্য গর্ত-খানাখন্দ খুঁড়লে তার শিকার হয়ে ঐ গর্তে নিজেকেই পরতে হতে পারে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ১০ অক্টোবর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসছেন, কোনো জোটে ওঠা নয়” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নেহেরু থেকে প্রণব বা মোদীর জাতিসঙ্ঘ পাঠ

    নেহেরু থেকে প্রণব বা মোদীর জাতিসঙ্ঘ পাঠ

    গৌতম দাস

    ০৫ অক্টোবর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3cY

    প্রতি বছর ২৫ সেপ্টেম্বরের আগে-পরের দিনগুলোতে সাধারণত দেখা যায় সরকার প্রধানেরা নিউইয়র্কমুখী হচ্ছেন। তখন তারা জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের [UNGA, UN General assembly] সভায় যোগ দিতে ব্যস্ত দিন কাটান। সাধারণ পরিষদের সভা মানে, বছরে এই একটাই গুরুত্বপুর্ণ অনুষ্ঠান যা সব সদস্যরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। জাতিসঙ্ঘের সদস্য রাষ্ট্র এখন প্রায় ১৯৩ টি। এখানে সবার হাজিরা বাধ্যতামূলক না হলেও জাতিসঙ্ঘের এই জমায়েতেকে যেন এক ‘বিশ্বসভা’। মানে যা দুনিয়ার সব জনগোষ্ঠীর হাজির থাকার এক প্রতিনিধিত্বমূলক বিশ্বফোরাম বা বিশ্বদরবার ধরনের ধারণা – সেটা কোথাও ঘোষণা করা না থাকলেও, ক্রিয়াশীল থাকে বলে মনে করা যায়, এখানেই এর গুরুত্ব। এ’বছরও সেপ্টেম্বরে এর ব্যতিক্রম হয়নি। যদিও ফারাক এতটুকুই ছিল যে এবার কোন সরকারপ্রধানই কোভিডের কারণে জাতিসংঘে নিজ সশরীরে হাজির হননি, আগাম রেকর্ড করা বক্তব্য পাঠিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর মোদীও বক্তব্য পাঠিয়েছিলেন।

    জাতিসঙ্ঘ কেমন ধরনের প্রতিষ্ঠান আর কী তার ক্ষমতার এখতিয়ার ও সীমা? এটা কী পারে বা পারে না? এ নিয়ে সাধারণ্যে প্রচুর বিভ্রান্তি আছে, এমনকি সরকারপ্রধান বা অনেক দেশের একাডেমিক পর্যায়েও।

    সাধারণত কোনো পাবলিক প্রতিষ্ঠান আর সাম্য ধারণাটা প্রায় হাত ধরাধরি করে চলে। এজন্য সংগঠন বা সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান মানেই তা মাস (ইংরেজি mass বা বাংলায় গণ) অর্গানেইজেশন বলে ধরে নেয়া হয়। আর কোন গণসংগঠন মানেই সেখানে সদস্যরা সবাই সমান; এমন সাম্যতাই সেখানে ভিত্তি বলে সবাই মেনে নিয়ে থাকে। তবে গণপ্রতিষ্ঠান মানেই সবাই সেখানে সমান – এটা আধুনিক কালের ধারণা। কিন্তু এটারইবা আসল মানে কী?

    তা হল, যখন রাজা বা সম্রাটের শাসন বা রাজবংশের দিন ফুরিয়েছে আর এর বিপরীতে পাবলিক বা জনগণের শাসন বলে ধারণার উদ্ভব ঘটেছে। কোনো ব্যক্তি বা রাজা নয়, সব রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস পাবলিক বা জনগণ।  প্রতিটা নাগরিক তবে সম্মিলিতভাব ক্ষমতার উৎস, একথা থেকে যেখানে সবকিছুর শুরু। আর ঐ সমাজে ও সংগঠনে ‘রাজকীয় মর্যাদার’ কোন বিশেষ বলে কেউ থাকে না। বরং পাবলিকের রাষ্ট্রটাই হল সমাজের সবচেয়ে বড় বা প্রধান গণপ্রতিষ্ঠান। তাই কোন ব্যক্তি বা রাজার খামখেয়ালি না, পাবলিক আর পাবলিকের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্ব মাধ্যমে এখানে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। অন্তত হওয়ার কথা।
    এই সূত্রে পাবলিকের রাষ্ট্র বা ‘রিপাবলিক’ [republic] কথাটা এসে গেছে সেখানে রাষ্ট্রসহ যেকোনো গণপ্রতিষ্ঠান মানেই ধর্ম নির্বিশেষে নাগরিক সবাই সমান, এমন বৈষম্যহীনতার এক সাম্য ধারণা ও নীতি বজায় থাকতে হবে।

    এখন এই বিচারে তাহলে ১৯৪৫ সালে জাতিসঙ্ঘের ম্যান্ডেট লিখে যখন জন্ম হয়েছিল সেকালে এর সব সদস্য রাষ্ট্রই সমান এমন ধারণার ভিত্তিতেই একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটা যাত্রা শুরু করেছিল। যদিও ব্যতিক্রম আছে। যেমন- সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সদস্যরা সবাই সমান আর সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। কিন্তু জাতিসঙ্ঘেরই আরেকটা ফোরাম আছে নিরাপত্তা পরিষদ [UNSC, UN Security Council] যা এক অর্থে সাম্যনীতির ফোরাম নয়। তাহলে কী এটা পাবলিক প্রতিষ্ঠানের নীতি ভঙ্গ করে গড়া হয়েছে? জবাব হবে, না। ঠিক তা নয়; আর সেটা জরুরিও নয়। তাহলে? ব্যাপারটা কী, কিভাবে এটা ব্যাখ্যা করব?

    আমরা এ বিষয়ে অনেক ফতোয়া পাবো, এমনকি অনেক একাডেমিক প্রতিষ্ঠানেও; যেখানে হয়ত স্টুডেন্টরা শিখছে – জাতিসঙ্ঘ ‘অগণতান্ত্রিক’ প্রতিষ্ঠান। গণতান্ত্রিক শব্দটা এখানে আনলাম অনেকে ব্যবহার করে বলে।  প্রথমত ‘গণতন্ত্র’ খুব ভালো শব্দ নয়, বরং চাতুরীর শব্দ।
    পাবলিকের ক্ষমতার রাষ্ট্র বা রিপাবলিক ধারণার বিকল্প বা সমতুল্য ধারণা ‘গণতন্ত্র’ নয়। যেমন এতে অনেকে কোন একটা দেশের বেলায় হয়ত বলবে,  “সেদেশে নির্বাচন হয়, চাইকি সেটা নিশীথভোট হয়ত, অতএব গণতন্ত্র আছে” – টাইপের কথা বলে রিপাবলিক ধারণাকে অর্থ তাৎপর্যহীন করে ফেলতে পারে। তাই এখানে দুটি পয়েন্টে কথা বলব।

    প্রথম পয়েন্টঃ আমরা জাতিসংঘের প্রসঙ্গে কথা বলছি মানে প্রসঙ্গটা এখানে ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্রবিষয়ক; আর আমরা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে একাকার করে দেখছি। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই এক করে দেখলেও কোনো ভুল হয় না, এ কথাও সত্যি। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক ভুল হয় ও হবেই। লক্ষ্যণীয়, এছাড়াও আমরা নিরাপত্তা পরিষদ নিয়ে কথা বলছি মানে এটা একটা রাষ্ট্রের ভিতরের বা অভ্যন্তরীণ দিক নিয়ে কথা বলছি না, বলছি রাষ্ট্রের বাইরে বা ঊর্ধ্বের বিষয় নিয়ে। রাষ্ট্রের বাইরে বা ঊর্ধ্বের বিষয় মানে এখন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের কথা খেয়াল রেখে তা লঙ্ঘন যাতে না হয় এভাবে কথা বলতে হবে। সোজা কথাটা হল, জাতিসঙ্ঘ বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর কোনো সমিতি বা এসোসিয়েশন এমনটা বুঝে নিয়ে,এরপর প্রশ্ন হল,  জাতিসঙ্গে বসে নেয়া সবার সিদ্ধান্ত কী কোনও একটা সদস্য রাষ্ট্রের উপর প্রয়োগ করা যাবে? কারণ তা করতে গেলে তো ঐ রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হবে? এজন্য, যেকোনো রাষ্ট্রের ওপর আরেক রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রগুলোর কোনো সিদ্ধান্ত যেমন কার্যকর মনে করা যায় না, তেমন জাতিসঙ্ঘেরও। অর্থাৎ সার্বভৌম বাংলাদেশের উপর জাতিসংঘ কোন সুপার-স্টেট হতে পারে না; কিংবা আরেক বড়ভাই রাষ্ট্র বলে কিছু থাকতেই পারে না। (তবে কিছু শর্ত সাপেক্ষে করা যায়।) কাজেই ব্যক্তিদের নিয়ে একটা সমিতি বা ক্লাব ব্যক্তির উপর ক্লাব বা দলের সিদ্ধান্ত দিতে পারলেও এই ব্যাপারটা রাষ্ট্রের বেলায় খাটতে পারে না। রাষ্ট্রগুলোর কোনো সমিতি বা কোন জাতিসংঘ তার কোন সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করতে পারে না। রাষ্ট্রই শেষ কথা এর উপর আর কেউ কর্তা থাকতে পারে না। তাই, এখানে এসে যা ব্যক্তির বেলায় সত্য ও প্রযোজ্য মনে করা যায় তা রাষ্ট্রের বেলাতেও সত্য ও প্রযোজ্য বলে একাকার করে দেখা যাবে না, ভুল হবে।

    তাহলে কী জাতিসঙ্ঘের কোন সিদ্ধান্ত সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সদস্য রাষ্ট্রের  উপর প্রযোজ্য নয় বা করা যাবে না? তাহলে হয়ে আছে কী করে? সেটা বুঝার জন্য সার্বভৌমত্ব কথাটা খেয়াল রেখে – একটা কায়দা করা হয়েছে – সেদিকে তাকাতে হবে। যেমন ধরা যাক, সব রাষ্ট্র বসে কোন নতুন আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন তৈরি করতে লাগলো। বাংলাদেশের প্রতিনিধি ধরা যাক তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দলিল প্রস্তুত শেষে ওই দলিলে স্বাক্ষর দিয়ে এলেন। এখন ঐ আইন মানতে বাংলাদেশকে বাধ্য করানো কী যাবে? কারণ সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হবে। আমাদের সংসদের বাইরের কোন আইন আমাদের কেন মানতে হবে? তাই এই জটিলতা এড়িয়ে যেতে বা এথেকে বিরত থাকতে যা করা হয় তা হল, জাতিসংঘের ঐ মিটিংয়ে পাশ হওয়া ওই আইন বা কনভেনশনটাই এবার দেশে নিয়ে এসে সরাসরি আমাদের সংসদে পেশ করা হয়। যেন আমরা আমাদের সংসদে কোনো প্রস্তাব পেশ করছি এভাবে। এইবার সেই প্রস্তাব আমাদের সংসদে পাস হওয়ার পর সেটা আর জাতিসঙ্ঘের আইন বা কনভেনশন বলে বাংলাদেশ মেনে চলছে এমন নয়। সেটা আমাদের সংসদে পাস হয়ে যায় যদি তবে তা আমাদের সংসদে গৃহীত আইন বলে মানতে কোন আর অসুবিধা নাই। এই প্রক্রিয়াটাকেই র‌্যাটিফিকেশন [ratification] বা অনুসমর্থন করে নেয়া বলে।  আর এই হল সার্বভৌমত্ব বাঁচিয়ে আর জাতিসঙ্ঘের সাথে দেশের সম্পর্ক রক্ষার সমাধান।

    দ্বিতীয় পয়েন্টঃ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ১৯৩৩-১৯৪৫ সালের এ সময়ে একনাগাড়ে চারবারের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। জাতিসঙ্ঘের আইডিয়া বা ইমাজিনেশনের উদ্গাতা মূলত তিনি। এর পেছনের কারণ, তিনি হলেন সেকালের কলোনি শাসন উচ্ছেদ করে দেয়ার পক্ষের লোক। যাতে এরপর স্বাধীন হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রগুলো নিজ অর্থনীতি পরিচালনা করতে গিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে আমেরিকান পুঁজিবাজারের ঋণখাতক হতে চাইলে হতে পারে। মানে নিজ প্রয়োজনীয় ঋণের গ্রহীতা অর্থে পুঁজিবাজারের ক্রেতা হয়ে উঠে। যাতে দুনিয়ায় কলোনি দখল শাসনের চেয়ে তুলনামূলক অনেক ভাল স্বাধীন রাষ্ট্রের ব্যবসা-বাণিজ্যের এক আন্তঃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। একাজে তিনি আবার যুদ্ধের বিপক্ষের লোক। এজন্য সবাইকে নিয়ে আগে আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন তৈরি করে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্বার্থ বিরোধ মীমাংসার ব্যবস্থা হিসেবে জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ার পক্ষের লোক। কারণ তাঁর অনুমান যুদ্ধে পুঁজি-সম্পদ বিনষ্ট হয় মারাত্মক, তাই এমন বাস্তবতা থেকে তিনি সরতে চাচ্ছিলেন। [যদিও তার স্বপ্ন বা আইডিয়া আর পরবর্তিতে বাস্তবের আমেরিকা ১৯৫৩ সাল থেকেই আর এক থাকে নাই। তবে তা নিয়ে কথা আজকের প্রসঙ্গ নয়।] যদিও সেকালে তার প্রস্তাব ইউরোপের নেতারা সহজেই মেনে নিয়েছিল কারণ হিটলারের আক্রমণের মুখে  তাদের তখন  আমেরিকার অধস্তন হয়ে পড়া এবং পুরা মুখাপেক্ষি হয়ে থাকার দশা তাই। কিন্তু তখনকার  সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্তালিন তা মানতে চাননি। স্তালিনের সোজা আপত্তির দিকটা ছিল, যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য রাষ্ট্রের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয় ও  চলে এমন এক জাতিসঙ্ঘ গড়ার পর ঐ প্রতিষ্ঠান আমেরিকান কলকাঠির প্রভাবে কোন সময় সেই জাতিসঙ্ঘ তার কোন সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত যদি সংখ্যালঘু বলে সোভিয়েত ইয়নিয়নের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে তখন কী হবে?
    আবার স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সোভিয়েত রাষ্ট্র ওর ঊর্ধ্বে বা বাইরের জাতিসঙ্ঘ বলে কারো সিদ্ধান্ত কেন বাধ্য হয়ে মানবে? অতএব স্তালিন তা একেবারেই মানতে নারাজ।

    ভেটো ধারণার আবির্ভাবঃ
    এই জটিলতা সমাধান করতেই আসে ‘ভেটো’ সিস্টেমের আইডিয়া। এর সোজা ব্যবহারিক মানে হল, সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই ভেটোওয়ালা সদস্য রাষ্ট্রের একটাও যদি আপত্তি করে, না ভোট দেয় (না-ভোটটাই ভেটো) তবে সেটা আর সিদ্ধান্ত হতে পারবে না। সেজন্য এটা আলাদা করে নিরাপত্তা পরিষদ এই ফোরাম, এখানে পাঁচ রাষ্ট্রের একটাও যদি কোন ইস্যুতে আপত্তি করে তাতে আলোচনার প্রস্তাব ভোটাভুটির আগেই বাতিল হয়ে যাবে। তবে এটা গেল ভেটো ব্যবস্থার নেগেটিভ দিক থেকে ব্যাখ্যা। এটাকে উল্টা ইতিবাচক করে বলা যায়, উপস্থিত দুনিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতাগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পাঁচটা পরাশক্তি বা বিশেষ রাষ্ট্র একমত না হলে সেটা নিয়ে এরপর আর সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত হতে পারবে না। দুনিয়ার ক্ষমতা-ভারসাম্যের জন্য সবার আগে পাঁচটা বিশেষ রাষ্ট্রের একমত হয়ে থাকা জরুরি একথাটা সবার মেনে নেওয়ার ভিত্তিতেই আসলে জাতিসংঘের জন্ম। এই আইডিয়া হাজির করেই রুজভেল্ট স্তালিনকে নিজের নৌকায় তুলতে পেরেছিলেন, জাতিসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়িত হয়েছিল।

    মফস্বলি মোদীর এবারের জাতিসংঘঃ
    এবারের সেপ্টেম্বরে মোদি নাকি খুবই সফল এক প্রধানমন্ত্রীর মত জাতিসঙ্ঘে বক্তৃতা রেখেছেন। অন্তত কলকাতার আনন্দবাজারের চোখে তাই। উগ্র হিন্দুজাতিবাদী অবস্থানের আনন্দবাজার এবার প্রকাশ্যেই হিন্দুত্ব জাতিবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।  ভারতের “সীমান্ত সঙ্ঘাতের” এই “মোক্ষম সময়ে” প্রধানমন্ত্রী মোদী নাকি ভারতের “নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা আরো জোরালো ভাবে তুললেন”- এভাবে লিখেছে আনন্দবাজার। মানে আনন্দবাজারের কথা শুনে মনে হচ্ছে রুজভেল্টসহ সবাই নিজের নিজের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা আরো জোরালো তুলেছিল” বলেই যেন জাতিসঙ্ঘ গড়ে উঠেছিল! মফস্বলি আর কাকে বলে! আনন্দবাজার আর, নেহেরু থেকে প্রণব মোদী এভাবে সকলেই যদি মফস্বলি হয়ে যায় তো ভারতের ভবিষ্যত কী? একটু পড়াশুনা ও তথ্য সংগ্রহ আর বুঝাবুঝি ভারতকে কে করাবে? কঠিন এক পরিস্থিতি! আনন্দবাজারসহ এসব উগ্র হিন্দুজাতিবাদের ধারণা হল যে ঐ নিজের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার দাবিটা এক উদগ্র হিন্দুজাতি হয়ে মোদীর মত যুদ্ধবাজ-দেশপ্রেমিক [jingoist] নেতার নেতৃত্বে জোরালো করে তোলা – এটাই হল চাবিকাঠি! যেটা একেবারেই হিটলারের জর্মানির নীলচোখের জর্মান জাতশ্রেষ্ঠত্ব চিন্তা। সে ভিত্তিতেই এবারের মোদীর বক্তৃতার স্ক্রিপ্ট [Full text of PM Modi] লিখেছেন সম্ভবত হিটলারকে গুরু মানা কোন আরএসএস নেতা!

    কিন্তু জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি কী? কোন বক্তব্য? আর সেটা ভারতের কোনো রাজনীতিবিদ, কী মিডিয়া ঠিক কী বুঝেছে এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে কেবল আনন্দবাজারও বুঝেনি তাও নয়। আসলে এযুগে এখনো যারা “জাতিরাষ্ট্র চিন্তার” রাজনীতিতে আছেন কোন জাতিসংঘ বা এর চেয়েও কোন উন্নত প্রতিষ্ঠান বা দুনিয়া গড়া তাদের বুঝের বাইরেই থেকে যাবে, আমরা ধরে নিতে পারি। এছাড়াও উলটা এরা যদি হিটলারের মত আরো উগ্র-জাতি চিন্তার কেঊ হন তাহলে তো কথাই নেই। যেমন ছিল জাতিসঙ্ঘে মোদীর এই বক্তব্য। বাস্তবত জন্ম থেকেই ভারত জাতিসঙ্ঘ কী তা বুঝে উঠতে পারে নাই। অন্তত নিচের কয়েকটা পয়েন্ট থেকে তা বুঝে নেয়া যায়।

    এক. জাতিসঙ্ঘের জন্ম হল সেই পথচিহ্ন-মার্ক যখন “জাতিরাষ্ট্র” [nation state] ধারণার নিকৃষ্ট পরিণতি হিসেবে হিটলারের জার্মানির উত্থান ও যুদ্ধের ধ্বংসলীলা যা সারা ইউরোপ দেখেছিল। দেখার পরে জাতিসঙ্ঘের জন্ম ততপরতার সমান্তরালে ইউরোপের ৪৭ রাষ্ট্র এক কনভেনশন ডেকে (১৯৫০ সালে স্বাক্ষর নেয়া শুরু আর ১৯৫৩ সালে কার্যকর) জাতিরাষ্ট্রভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র ত্যাগ করে অধিকারভিত্তিক ও নাগরিক বৈষম্যহীনতার প্রতিশ্রুতিতে নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছিল। আর ভারতের কোনো রাজনীতির ধারাই বা রাজনীতিবিদ তা টেরও পায়নি। একাডেমিকরাও এর খবর এখনো পেয়েছেন এমন জানা যায় না। বরং উলটা ভারতে ‘জাতীয় স্বার্থ’ কথাটা রীতিমত দানব হয়ে উঠেছে। এই শব্দ দিয়ে আপনি প্রধানমন্ত্রী বা সম্পাদক যেকোনো ডাহা মিথ্যা বলে যেতে পারেন। কেবল জাতীয় স্বার্থের খাতিরে এটা বলছেন এই সাফাই দিলেই সব জায়েজ থাকবে। এমনকি মুসলমান বা দলিতের ওপর সব জুলুম অত্যাচার হত্যা সব করতে পারবেন। এই হলো বর্ণহিন্দুর চরম রেসিজমের একালের ভারত। হতে পারে এই ‘জাতীয়স্বার্থ’ ভঙ্গের ভয়ে একাডেমিকেরাও ভারত জাতিরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু বলতে চান না।

    দুই. জাতিসঙ্ঘ জাতিরাষ্ট্র ধারণার ওপর কখনোই দাঁড়ানো নয়। এজন্য জাতিসঙ্ঘ কাশ্মিরের সমাধান করতে বলেছিল রাজার ইচ্ছা নয়, কোন কথিত জাতির ভিত্তিতেও নয়। কাশ্মির ভূখন্ডের বাসিন্দা নির্বিশেষে তাদের ভোটের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য, রায় দিয়েছিল। নেহেরু তা করেন নাই, মোদি পর্যন্তও তা কেউ করেন নাই। সারা ভারতের রাজনীতি মনে করে হিন্দুত্ব ও জাতিরাষ্ট্র ধারণার উপর ভিত্তি করেই তাদের রাজনীতি ও মহান ভারত রাষ্ট্র খাড়ায় আছ। রাম মোহন রায় থেকে শুরু করে (হিন্দুত্বের) জাতিরাষ্ট্র এখনও তাদের রাজনীতির মূলভিত্তি। তাতে কেউ হিন্দুত্বের ভিত্তি কথাটা গলা নামিয়ে বলে বা মুখে উচ্চারণ না করেও ধরে নিয়ে কথা শুরু করে। আর মোদীর মত যারা এরা সবাই গলা চড়ায় প্রকাশ্যে বলে, এই যা ফারাক। নেহেরুও তাই কাশ্মীরের রাজা খুজে বের করেছে। অথচ কাজটা সহজ ছিল কাশ্মীরের ধর্ম নির্বিশেষে সব ধরণের জনগণের কাছে এপ্রোচ করতে পারতেন, তাদের সমর্থন চাইতেন যেই রাজনীতিতে নেহেরু যেতেই পারেন নাই, বা করতেন না।
    আর এছাড়া সুযোগ পেলেই অন্য বা পড়শি রাষ্ট্রকে অধস্থন কলোনিকৃতের মত রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। কলোনি করে নেয়া ছাড়াও যে দ্বিপাক্ষিক ব্যবসা বাণিজ্য করে লাভবান হওয়া যায় এটা ভারতের বুঝে দেখা হয় নাই। কলোনিচিন্তাই তার কাছে পথ থেকে গেছে। ভারতের ধারণা এটাই নিজরাষ্ট্র পরিচালনার খাসনীতি (নেপাল-ভারত চুক্তি এর খাস উদাহরণ)। অথচ এর উলটা কলোনিদখল হারাম – এই ধারণার উপর জাতিসংঘ দাঁড়ানো।

    তিন. একালের জাতিসঙ্ঘে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো সদস্যপদ পাওয়ার লোভ জেগেছে ভারতের। আর মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে তা জাগিয়েছে আমেরিকা। চীন ঠেকানোর খেপ মারতে ভারতকে নিয়োগ করার জন্য এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আমেরিকা। তামাসা হলো ভারত সেটা বিশ্বাস করেছে। কারণ ভারত খবরই রাখে নাই যে আমেরিকার সেই মুরোদ এখন আর রাখে না। যা ছিল জাতিসঙ্ঘের জন্মের আগে। যা এখন আর কিছুই নাই। এখন কেউ কাউকে সদস্যপদ পাইয়ে দিতেই পারে না।
    তাই আমেরিকান ঝুলানী মুলা খেয়ে বিশ্বাস করেছিল প্রণব মুখার্জি। গত ২০১০ সালে হাসিনার প্রথম ভারত সফরের যৌথ ঘোষণায় প্রণব তাই লেখিয়ে নিয়েছিল যে বাংলাদেশ ভারতে ভেটো সদস্যপদ পায় যেন তা সমর্থন করে। প্রণবের জাতিসঙ্ঘ পাঠ এমনই যে তিনি বুঝেছিলেন হাসিনার মত অনেক দেশের সমর্থন বাগানো যেন জাতিসংঘে ভারতের ভেটোসদস্যপদ হাসিলের উপায়।
    ব্যাপার হল, ভেটো সদস্যপদ দেয় কে? ব্যাপারটা ভারতের আর জানাই হলো না। একালে মোদীও তাই বিশ্বাস করে বলছেন, “আর কত দিন রাষ্ট্রপুঞ্জের সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়ার বাইরে থাকবে ভারত?”। মোদী পুরাই বেকুবি আরো ধারণাটা হল, এই কথাটা জোর দিয়ে উদগ্রভাবে বললে বোধহয় কেউ শুনবে বা কাজ হবে। মোদী বক্তৃতায় এবার সেটাই করেছেন। আর আনন্দবাজার আরেক বেকুব হয়ে এটারই প্রশংসা করে ছেয়ে ফেলেছে। কিন্তু কথা হল, মোদী এটা কার কাছে চাচ্ছেন? জাতিসঙ্ঘ না আমেরিকা নাকি চীন? নাকি কারও কাছে এটা চাওয়ার জিনিষ কিনা সেটা মোদী বা তার পরামর্শকেরা নিশ্চিত হয়েছেন? উগ্র জাতিবাদীর কাছে আসলে সব কিছুই জোর দাবি করে নেওয়ার জিনিষ! এর বাইরে কোন ভাবনা তাদের কাজ করে না!

    প্রথম কথা, এটা এককালের মানে জাতিসঙ্ঘের জন্মের আগের সময়ের কোন রাষ্ট্রের মুরোদের প্রশ্ন  ছিল যে কে কাকে সদস্যপদ দিতে পারে। যা সেকালে একমাত্র আমেরিকারই ছিল। এমনকি সেকালের স্টালিনেরও ছিল না। ইউরোপেরও কারোই না; তারা হিটলারের মার খেয়ে ১৯৪১ সালের আগষ্টের পর থেকে একেবারেই আমেরিকার মুখাপেক্ষি। ফলে এরা নিজের ভেটো সদস্যপদটা ঠিকঠাক মত হাসিল হয়েছে কিনা কেবল এতেই সন্তুষ্ট ছিল। যেমন পঞ্চম দেশ চীন এর মধ্যে ঢুকে নিজ ভেটো সদস্যপদ পেয়েছিল কী করে?

    [যারা পড়তে কম সময় দিতে চান তারা নিচের প্যারাটাই বাদ দিয়ে পড়তে পারেন।]

    চীন কিভাবে ভেটো সদস্যপদ পেয়েছিলঃ
    এর জবাবটা একালে যে জানে সে-ই সেকালের পুরা ব্যাপারটা বলতে পারবে। চীন আসলে ছিল সেকালের পুরা সময়জুড়েই  জাপানের কলোনি, পুরাটা না হলেও চীনের অন্তত ২৫% এর মত ভুমি সমসময়ই জাপানের দখলে ছিল।  বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের জর্মান ইতালি ও জাপানের বিরোধী যে মিত্রশক্তিজোট গড়ে উঠেছিল আমেরিকার রুজভেল্ট তার মূলনেতা হিসাবে নিজ স্বপ্নের আগামি দুনিয়া যার হবু গ্লোবাল নেতা হবে আমেরিকা, সেই দুনিয়ায় এশিয়ান কলোনিশক্তি হিসাবে জাপানকে ধবংস করে চীনকে এশিয়ার হবু নেতা ও আমেরিকার পক্ষের দেশ হিসাবে দেখতেন তিনি। মূলত রুজভেল্টের সে স্বপ্ন-কল্পনার কারণে চীন ভেটো সদস্যপদ পেয়ে গেছিল। এমনকি এটা চীনও তা চেয়েছিল বা কল্পনা করেছিল কখনও তা জানা যায় না।
    কিন্তু একটা আসল কথা এখনও এখানে বলা হয় নাই। আমাদের জেনে নিতে হবে। আমরা এতক্ষণ  যে চীনের কথা বলছি সেটা মাওয়ের চীন নয়। মাওয়ের চীন তখন উদয় হয় নাই, হয়েছিল আরও চারবছর পরে ১৯৪৯ সালে। তাই এতক্ষণ চীন বলতে বুঝিয়েছি – চীনা ন্যাশনালিষ্ট রাজনীতির নেতা চিয়াং কাইসেকের চীনের কথা। কিন্তু রুজভেল্ট ও কাইসেকের কপাল পোড়া দুঃখটা হল, ১৯৪৫ সালে কলোনিশক্তি জাপানের পতন হলে এর মাত্র চারবছর পরেই ১৯৪৯ সালে মাওয়ের বিপ্লব চীনে ক্ষমতা দখল করেছিল। আর চিয়াং কাইসেক পালিয়ে সেকালেও চীনেরই ভুখন্ড কিন্তু আলাদা দ্বীপ তাইওয়ানে, আশ্রয় নিয়েছিল। এরপর একদিকে মাওয়ের বিল্পবীদের লংমার্চের ক্লান্তি অন্যদিকে সেকালের হবু বিশ্বশক্তির দুই নেতা স্তালিন ও প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান (১৯৪৫ সালে রুজভেল্টের স্বাভাবিক মৃত্যু হলে ভাইস প্রেসিডেন্ট এই ট্রুম্যান প্রেসিডেন্ট হন) এদের চাপাচাপিতে “যুদ্ধের বদলে শান্তির” কথায় মাও আর ফিরে তাইওয়ান দখলে যান নাই, পরে দেখবেন বলে ছেড়ে দেন। এতে পরবর্তিতে চিয়াং কাইসেক তাইওয়ানেই ঘাটি গেড়ে বসে যায়। যেটা এখনও আছে। এটা পরে আরও পোক্ত হয়ে যায় আমেরিকার কারণে। কারণ মাওয়ের চীনই আগের জাতিসংঘে রেজিষ্টার করা ভেটো সদস্যপদের চীন হিসাবে নিজের প্রতিনিধিত্ব চাইলে আমেরিকা এতে সমর্থন দিতে এবার গড়িমসি শুরু করেছিল। স্তালিনও কিছুই করতে পারে নাই। মাওয়ের চীন নিচু স্বরে মনে করে স্তালিন চায় নাই তাই হয় নাই। তবে সেসময় মাও চাইলে হয়ত আলাদা নতুন চীন হিসাবে সদস্যপদ পেতে পারত কিন্তু সেক্ষেত্রে আগের ভেটো সদস্যপদ চিরদিনের মত হাতছাড়া হয়ে তাইওয়ানে হাতে থেকে যেত। তাই মাওয়ের  চীন এরপর জাতিসংঘের সদস্যপদ নাই এভাবে এমন চীন হয়েও রয়ে গেছিল। কিন্তু কতদিন?
    একনাগাড়ে (১৯৪৯-১৯৭১) এই সময়টা। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর অর্থাৎ যখন আমরা উদ্বাস্তু হয়ে ভারতে আশ্রিত, খাওয়া না খাওয়া হয়ে আছি আর নির্যাতন, হত্যায় নিত্যসঙ্গি হয়ে দিন যাচ্ছে; ১৯৭১ মার্চের পরের সেই ঐবছরেরই সেপ্টেম্বরের  জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ঘটেছিল প্রকাশ্যে অনেক কিছু। সেখানে এক প্রস্তাবে উপর ভোটের সময় সংখ্যাগরিষ্টতার ভোটে “এতদিনের তাইওয়ানের ভোগ করা ভেটো সদস্যপদ” এর আসল হকদার মাওয়ের চীন বলে ঐ সিদ্ধান্ত প্রস্তাব পাশ হয়ে যায়। আর এর চেয়েও বড় কথা এটা সম্ভব হয়েছিল কারণ ঐ ভোটাভুটির সময়ে আমেরিকা ছিল আধারাজি কিন্তু আবার বাধাও দেয় নাই, এমন অবস্থান নিয়েছিল সেকারণে। কেন? এর পিছনের লম্বা কারণ হল, এটাই ছিল বিগত ১৯৬৮ সাল থেকে চলে আসা গোপনে চীন-আমেরিকান আলোচনা-বুঝাবুঝি-আলাপের প্রথম প্রকাশ। যেটা সেসময়ে ঘটেছিল পুর্ব পাকিস্তানের স্বার্থের বিনিময়ে, আয়ুব-ইয়াহিয়ার শাসন কাল জুড়ে তাদের মধ্যস্ততায়। আর সাথে আরও সবচেয়ে নির্ধারক ঘটনাটা ছিল – ১৯৭১ সালের এপ্রিলে কিসিঞ্জার পাকিস্তান সফরে যাচ্ছেন একথা বলে মাঝের দুদিন গোপনে কিসিঞ্জার সেই প্রথম মাওয়ের চীন সফর করেছিলেন। সেসময়েরই একমত হওয়া ডিলের প্রথম সাক্ষাত আলাপ ও আতাঁত ছিল সেটা। মূলত মাওয়ের চীন আমেরিকান পুঁজি ও ব্যবসা বাণিজ্য চীনে প্রবেশ করতে দিবে যদি নিক্সনের আমেরিকা বিনিময়ে  চীন নামের ভেটো সদস্যপদ তাইওয়ানের বদলে এটা তখন মাওয়ের চীনের হাতে এনে দিবে তাতে রাজি হয়। এই ছিল ডিল। এভাবেই মাওয়ের চীন জাতিসংঘের ভেটো সদস্যপদ লাভ করেছিল। আর মাঝের সময়ে লম্বা আলোচনা ও বুঝাবুঝি করে নেওয়ার পর ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকা পরস্পরকে স্বীকৃতি দিয়ে উভয় দেশে এমবেসি খুলে গভীর বাণিজ্য সম্পর্ক শুরু করেছিল।

    গ্লোবাল নেতা হিসাবে আমেরিকা আর কাউকে এখন ভেটো সদস্যপদ পাইয়ে দিবার বা এমন কোন নেতাগিরি মাতব্বরি করারই মুরোদ রাখে না; সব এখন প্রায় শুকিয়ে আসছে। এটা বুঝা কী খুব কঠিন? দ্বিতীয়ত আগামিতেও  জাতিসংঘের কোন সংস্কার হওয়া অথবা এমনকি ভেটো সদস্যের পাঁচ দেশের তালিকাও বদলাবে না,  যতক্ষণ না নতুন গ্লোবাল নেতা কেউ এসে বসছে। সেটা এখনই বলে দেয়া যায়। কারণ, এটা হবে সেই হবু নেতার নতুন করে জেগে উঠা প্রভাব ইচ্ছা বা এখতিয়ার। অন্যভাবে বলা যায়, তার সাথে অন্যরাষ্ট্রের সম্পর্কের মাত্রার ওপর নির্ভর করবে আর কোন রাষ্ট্র নতুন করে জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা পাবে, নাকি কেউই পাবে না অথবা বাদ যাবে। এখন যদি হবু সে নেতা চীন হয়, তবে তাই! সমস্যা হচ্ছে জাতিসংঘের উত্থানের সময়ের ঘটনাবলী নিয়ে আপনার স্টাডি বা পরিস্কার বুঝাবুঝি না থাকলে আপনি মফস্বলি চিন্তাই তো করবেন, আমেরিকার টাউটারি মিথ্যা আশ্বাসই আপনার  কাছে সত্যি মনে হবে। আর এই বেপুথে যেতে আপনাকে আরও টানবে আপনার জাতিরাষ্ট্র চিন্তা। অথচ ১৯৪৫ সালের পর থেকে এই কলোনিচিন্তাটাই, এই জাতিরাষ্ট্র চিন্তা যে  মৃত সে খগবর আপনি রাখেন নাই।

    আজকের ভারত মানে এই হিটলার-অনুসারি হিন্দুত্ববাদী ভারত, একে  চীন আগামিতে নতুন নেতা হলে  কেন একে ভেটো সদস্যপদ দিতে যাবে, না অন্য কেউ দিবে? আর এমন সদস্যপদ পাওয়ার প্রাথমিক যোগ্য হবার জন্য তবু অন্তত কিছু রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও কমিটমেন্ট তো ভারতের লাগবে! কেবল হিন্দুত্বের জন্য যে ভারত নিজ দেশের অন্যান্য অ-হিন্দু সকল নাগরিকের প্রতি চরম বৈষম্য করে, কোন সাম্য আচরণের কথা চিন্তাও করতে পারে না সেই ভারতকে কে এবং কেন ভেটো সদস্যপদে টেনে তুলবে?

    আবার মোদীর ধারণা দেখেন, তিনি বক্তৃতায় বলেছেন, ‘জাতিসঙ্ঘ এবং ভারতের মূল আদর্শ নাকি এক।’ ‘বসুধৈব কুটুম্বকম (গোটা বিশ্বই আত্মীয়) এই মন্ত্র রাষ্ট্রপুঞ্জের সভায় বার বার’ নাকি জাতিসঙ্ঘে উচ্চারিত হয়ে থাকে। অথচ মোদীর ভারত হল এমন, যে হিন্দু নয় বা যার হিন্দুত্ব নাই এমন কাউকে সে সহ্য করতে পারে না। সেই মোদী এমন ফাঁপা আওয়াজ দিচ্ছে!
    দেখা যাচ্ছে এটাই এখনও ভারতের জাতিসঙ্ঘ রিডিং!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৩ অক্টোবর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “মোদি-প্রণবের জাতিসঙ্ঘ পাঠ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]