Tag: GOUTAM DAS

  • ইউক্রেনঃ আমরা একা, কেউ জবাব দেয় না ভয় পায়

     

    ইউক্রেনঃ আমরা একা, কেউ জবাব দেয় না ভয় পায়

    গৌতম দাস

    ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3WL

    –

        guide to the Ukraine-Russia crisis

     

    শেষ পর্যন্ত রাশিয়ান সৈন্য ইউক্রেন অভিযান শুরু করে দিয়েছে। রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে এক ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ চালানোর জন্য নির্দেশ দেয়ার পরেই এই অভিযান শুরু হয়ে যায়। তিন দিক থেকে ইউক্রেনের উপর আক্রমণ শুরু হয়। গত কয়েক মাস ধরেই ইউক্রেন নিয়ে সামরিক উত্তেজনা চলছিল। একদিকে পশ্চিমা দেশ ও তাদের ন্যাটো জোট আর বিপক্ষে রাশিয়া – এভাবে হুমকি পাল্টা হুমকি চলার মধ্যেই এই সামরিক অভিযান এখন সত্যি হয়ে গেল। এই লেখায় পশ্চিমা দেশ বা শুধু পশ্চিমা বললে তা আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের মিলিত স্বার্থ বুঝাতে লেখা হয়েছে; যার আরেক প্রকাশ হল ন্যাটো জোট।

    বৃহত্তর দিকটা দেখে বললে, পুরান সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্র ভেঙে গিয়েছিল ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে। ভেঙে গেলে পরে তা  রাশিয়াসহ মোট পনেরোটা রাষ্ট্রে আপসে বিভক্ত হয়েছিল। ইউক্রেন ওই পনেরো ভেঙে-গড়া রাষ্ট্রের একটা। আর সেই থেকেই মূলত রাশিয়া বাদে ১৪ রাষ্ট্রকে নিয়ে আরেক ধরনের ভাঙা-গড়া শুরু হয়েছিল। আর সম্ভবত তার শেষ-কাণ্ডই এখন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। আলাদা আলাদা ১৫ রাষ্ট্র স্বাধীন হয়ে বাধাহীন  জন্ম নেয়ার পরেও তারা থিতু না হয়ে উল্টো অস্থিরতার মধ্যে ঢুকে পড়েছিল মূলত কিছু বাইরের উপাদান এতে হাজির হওয়ার কারণে। সেই বাইরের উপাদান ছিল ‘পশ্চিমা দেশ’। অথবা অন্যভাবেই বলা যায় ন্যাটোকেন্দ্রিক পশ্চিমা দেশ এরা, তাদের ব্যাপক খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেসব মারাত্মক ভুলগুলো করেছিল তার মাশুল দেওয়ার শেষ পেরেক ঠুকে দেয়া ধরনের ঘটনাটাই বোধহয় এবার ঘটল।

    রাশিয়ার ইউক্রেনকে তিন দিক থেকে ঘিরে ধরে আক্রমণ শুরুর মূল লক্ষ্য রাজধানী কিয়েভের পতন ঘটানো তাই সেই অভিমুখে; আর তা সাময়িক হলেও লক্ষ্য কিয়েভ দখল। পুতিন ঘোষণা করেই বলছেন, ‘ইউক্রেনকে ডি-মিলিটারাইজ [to demilitarise] করা’ মানে তার সব সামরিক সক্ষমতা বিনাশ করে দেয়া আর ইউক্রেনের মনে হিটলার-গিরির ভাবনা [“denazify”], মানে ইউক্রেনের উগ্র চরম জাতিবাদী অবস্থান ছেয়ে গেছে সেটা ছেঁটে দেয়া এই অভিযানের লক্ষ্য [ Putin said he had orderd the operation to demilitarise and “denazify” the country.]। ২৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় রুশ আর্মি রাজধানী কিয়েভের প্রবেশ মুখ পার হয়ে গেছে। এখন কার্যত সবাই কমবেশি নিশ্চিত যে, পুতিনের রাশিয়া কবে ইউক্রেন থেকে সেনা প্রত্যাহার করে ফিরে যাবে সেটা একমাত্র তারা নিজেরাই নির্ধারণ করবে [Putin’s ‘prerogative to decide end of Ukraine operation’]। তবে ইউক্রেনকে রাশিয়া নিজ দখলে নিয়ে নেবে এমন কোনো পরিকল্পনা এখানে নেই বলে জানা যাচ্ছে।

    তাই এটা অনেকটা, ১৯৬২ সালে চীনের ভারতে আক্রমণ করে পুরো নর্থ-ইস্ট (আসাম) দখল করে নেয়া, এরপর কয়েক দিন এটা দখলে রেখে নিজের সক্ষমতা কতদূর এর একটা ইমেজ প্রতিষ্ঠার পরে নিজ ইচ্ছাতেই আবার সেনা প্রত্যাহার করে চলে যাওয়া – সেরকম। আর পরে এরই প্রভাব-প্রতিক্রিয়ায় সে যাত্রায় ভারত হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল, আর নতুন করে চীনকে ভাব-ভালোবাসার মেসেজ পাঠানো এমনকি তার এক গালভরা নামও ছিল ‘পঞ্চশীলা নীতি’ [শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচটি নীতি] বলে। তাতে চীন-ভারত ‘ভাই ভাই’ হয়ে গিয়েছিল। এটা তেমনি একটা কিছুর দিকে যাবে হয়ত। অথচ মূল ঘটনা হল – মাওয়ের চীন সরকার আর দালাইলামার মধ্যে তিব্বতের স্বায়ত্বশাসন নিয়ে  মতভেদ দেখা দিলে আমেরিকা তাতে দালাইলামার পক্ষে সিআইএ পাঠিয়েছিল; আর তারা ভারতের ভুমিতে নর্থইস্ট-আসামে স্টেশন করে ততপরতা শুরু করেছিল। তার তা থেকেই  নেহেরুর ভারতকে চীনের শিক্ষা দেওয়ার জিদ বা ঘটনা। কারণ, ১৯৫৩ সাল থেকে কোথাও কিছু হলেই আমেরিকা সেখানে সিআইএ পাঠানো – এভাবে হস্তক্ষেপের কূটনীতি চালু করেছিল। তাই কোনটাকে ন্যায় আর অন্যায় বলবেন?
    আবার মনে রাখতে হবে, আইনের মারপ্যাচে আপনি একটা দেশের বন্দর ব্লক করে ওদেশে প্রবেশ বা পণ্য আনা-নেয়ার পথ বন্ধ বা বাধাদেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এখন এসব ক্ষেত্রে ঐদেশের মুরোদ থাকলে সে অবশ্যই সামরিক-সহ সব পথেই বাধাদাতাদের উতখাত করবেই। রাষ্ট্রের কোর [core] ইন্টারেস্ট বা মৌলিক স্বার্থ ইস্যুতে প্রতিক্রিয়া এমনই হবে; তাতে এই স্বার্থরক্ষার পক্ষে কোন দেশি বা আন্তর্জাতিক আইন থাকুক আর নাই থাকুক অথবা এমনকি তা বেআইনি হোক! প্রতিক্রিয়া এমনই হবে। তাতে আপনি “আমেরিকা সেজে” সেটাকে “বেআইনি” আগ্রাসন বলার মজাও নিতে পারেন।

    বাংলাদেশের প্রধান মিডিয়া ও সোস্যাল মিডিয়াতে স্বাভাবিকভাবে ইউক্রেন ইস্যু আছড়ে পড়েছে যদিও সেসব আলোচনার বেশির ভাগই “ন্যায়-অন্যায়” কার কতটা এদিকটাই ভারী করে। শুধু ন্যায়-অন্যায় বিচার করতে অনেকেই যাবে অবশ্যই। কিন্তু কেন ঘটল এমন ঘটনা বা ঘটনাটা এ দিকে গেল কেন তা বুঝতে হলে আরো গভীর অন্য দিকে তাকাতে হবে। আবার এমন ঘটনা দুনিয়ায় নতুন নয়। সাথে আরেকটা সতর্কতা জানিয়ে রাখি; এটা কমিউনিস্ট-অকমিউনিস্ট ইস্যুও নয়। ফলে পুতিন বা কমিউনিস্টরা ভাল কিনা এই চোখে কোনো তর্ক তুলে আনাও অর্থহীন। এতে বুঝবুঝিতে অযোগ্যতাই প্রদর্শন করা হবে ও অকেজো তর্ক তুলে আনা হবে। আবার শুধু হামলার প্রসঙ্গের মধ্যে থেকে এজন্য যারা “ন্যায়-অন্যায়” খুজছেন তারা ধরে নিয়েছেন যেন এই হামলার আগে বা পরে কিছু নাই, কোন ঘটনা নাই  – জানবেন কেবল এর উপরে দাঁড়িয়ে তারা কথা বলছেন।

     অপর রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবোধের অভাব অনুভব কী খুবই তুচ্ছ বিষয়ঃ
    তাহলে অপর রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবোধের অভাব অনুভব কী খুবই তুচ্ছ বিষয় – “যা আমার কী আমি কেন”  আমল করব ধরণের???  একটু পরীক্ষা করা যাক!  আমেরিকান ফ্লোরিডা উপকূলের ৯০ মাইলের মধ্যে কিউবার নেতা ক্যাস্ত্রো এক কমিউনিস্ট বিপ্লব ঘটিয়ে বসলে, ১৯৬২ সালের এঘটনায় আমেরিকার তাতে অস্বস্তি শুরু হয়েছিল। এখান থেকে কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস বলে ১৩ দিনের এক সেনা মোতায়েন ধরে টেনশনের কাহিনী শুরু হয়েছিল। কারণ, তাতে হুমকি পাল্টা হুমকিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় মিসাইল স্থাপন ও আমেরিকার দিকে তাক করে বসিয়ে দিলে তা এক চরম উত্তেজনাকর অবস্থা তৈরি করেছিল। মূল ইস্যু আমেরিকার ‘নিজ নিরাপত্তাবোধ’। আর অন্যদিকে, কিউবান বিপ্লবকে বাধা দান না করা।  আমেরিকা ‘নিজ নিরাপত্তাবোধ’ এর অভাব থেকে আপত্তি করাতে এর সব শুরু। আর তাতে এর শেষ হয়েছিল ‘কোনো যুদ্ধ নয়’ ভাবে। মানে আমেরিকা কিউবা থেকে আক্রান্ত হবে না আর বিপরীতে আমেরিকাও কিউবান বিপ্লব ভেঙে দিতে যাবে না আক্রমণ করবে না – উভয় পক্ষ এমন প্রতিশ্রুতি  বিনিময়ে তখন ঐ বিরোধের সমাপ্তি ঘটেছিল। এ বাইরে কোনো ন্যায়-অন্যায় অথবা এরা সঠিক-বেঠিকতা নিয়ে আলোচনা করতে বসে নেই। তাহলে এখানে রাশিয়ার “নিজ নিরাপত্তাবোধ” কোন বিবেচনার বিষয় হবে না, ১৯৯৭ সাল থেকে আমেরিকা রাশিয়াকে অপমান ও কোনঠাসা করে চলবে – আর এনিয়ে কোন প্রতিক্রিয়া পরিণতি হবে না – এই আশা অবাস্তব ও আকাঙ্খা দিশাহীনই হবে।

    ইউক্রেনে কী নিয়ে বিরোধঃ
    অল্প কথায় বললে এর একদিকে ‘রাশিয়ার নিজ নিরাপত্তাবোধ’। কারণ প্রো-আমেরিকান ইউক্রেন সরকার ন্যাটোতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর এথেকেই রাশিয়ার নিরাপত্তা চিন্তা শুরু। এটাকে যদি একালের ঘটনা হিসাবে দেখি, তবু এর শুরু খুবই কম করে ২০১৪ সাল থেকে। কিন্তু এ নিয়ে আপস আলোচনার ডায়লগের পথে কখনো দু’পক্ষ যায়নি, যেতে পারেনি; যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ান সেনারা পৌঁছানোর মুহূর্তে চীন-রাশিয়ার মধ্যে এক তথ্য বিনিময় ঘটেছিল, আর তাতে চীনের দিক থেকে রাশিয়াকে এক প্রকাশ্য পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির এক নিউজে বলা হয়েছে, চীন ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়াকে এখন ‘নেগোসিয়েশন’ করে নিতে আহ্বান জানিয়েছে [China’s Xi speaks to Putin, calls for ‘negotiation’ with Ukraine]। যদিও আপাতত ঘটনা এদিকে যাবার পক্ষে কোনো আভাস নাই।
    নিজ নিরাপত্তাবোধের অভাব- সব সমস্যার শুরু এখান থেকেই। তবে এই বিবাদের রুট অনেক অনেক পুরোনা। আর সেখানেই এই “নিরাপত্তাবোধে অভাব” ব্যাপারটা ঢুকে আছে। অটোমান সাম্রাজ্যের সময়কাল (১২৯৯-১৯২২) যার তুলনায় রাশিয়ান জার সাম্রাজ্যের বয়স (১৮৯২-১৯১৭) অনেক কম। কিন্তু দুটা সাম্রাজ্যের আয়ু শেষ হয়েছিল কাছাকাছি সময়েই। সাম্রাজ্য মানেই তার কিছু কলোনি বা উপনিবেশ থাকতে দেখা যায়। আর জার সাম্রাজ্যের আমলেই নানা পথ ঘুরে ইউক্রেন জারের রাশিয়ার উপনিবেশ হয়েছিল আর তা থিতু হয়েই ছিল। তবে অস্থির হয়ে যায় ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় লেনিনের কমিউনিস্ট বিপ্লব থেকে।

    অনেকেই হয়তো খেয়াল রেখেছেন জারের রাশিয়ায় লেনিনের বিপ্লব হয়েছিল কেবল রাশিয়ায়, মানে  জার সাম্রাজ্যের অংশ সংশ্লিষ্ট উপনিবেশগুলোতেও না। ব্যাপারটা অনেকটা, আমরা যখন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া পরিচয়ে ছিলাম তখন যদি মূল ইংল্যান্ডে কোনো কমিউনিস্ট বিপ্লব ঘটত তবে তখন কলোনি ব্রিটিশ-ইন্ডিয়াতে কি কমিউনিস্ট বিপ্লব হয়েছে মনে করা যেত? অবশ্যই ঠিক তা না। তবে কী তা কল্পিত কমিউনিস্ট ইংল্যান্ড এই নয়া-রাষ্ট্রের অংশ হয়ে যেত? নাকি তাতে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়াকে তারা কলোনিমুক্ত স্বাধীন বলে ছেড়ে দিত? আলোচ্য ক্ষেত্রে যেন কমিউনিস্ট ইংল্যান্ড কলোনি ব্রিটিশ-ইন্ডিয়াকে নিজের অঙ্গ করে নিয়ে নয়া এক কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের ঘোষণা দিয়েছিল এটা হলে যেমন হত তেমনই রাশিয়ান বিপ্লবের নয়া নাম হয়ে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন – এক বিপ্লবী নয়া কমিউনিস্ট দেশ।

    ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পরে, ইউক্রেনের ক্ষেত্রে  ঠিক এটাই ঘটেছিল। ইউক্রেন জারের উপনিবেশ ছিল বলে লেনিনের বিপ্লবের পরে কমিউনিস্ট রাশিয়ার সাথে একে যুক্ত করে নিলে তা সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে হাজির হয়, ১৯২২ সাল থেকে। অর্থাৎ একা ইউক্রেন নয়, জারের সব উপনিবেশকে অন্তর্ভুক্ত করে নয়া সোভিয়েত রিপাবলিক বলে রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়। এতে ইউক্রেনও রাশিয়ান কর্তৃত্বের সোভিয়েত রিপাবলিক হয়ে যায়। বিপ্লব রাশিয়াতে হলেও রাষ্ট্র হিসেবে এর নাম হয়ে যায় ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’ (১৯২২ সাল থেকে) আর বলাই বাহুল্য এতে রাশিয়ান ভূখণ্ডের তুলনায় সোভিয়েত ইউনিয়ন কয়েক গুণ বড় হয়ে যায়।

    অনেকে এটাকে নয়া নামে লেনিনের উপনিবেশ এক্সটেনশন বলতে পারেন বা বলেন হয়ত। কিন্তু  এর পেছনের মূল কারণ ছিল রাশিয়ান কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দুনিয়ায় প্রথম কমিউনিস্ট বিপ্লব বলে আর খোদ ইউরোপের ঘটনা আর ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে যখন সবাই ব্যস্ত এই সুযোগে ফাঁক গলে লেনিনের ক্ষমতা দখল করে নেয়ার ঘটনা ছিল সেটা। ফলে পরে তারা প্রচণ্ড ভীত ছিল যে ইউরোপের কলোনিমালিকেরা (তখনকার ব্রিটেন ফ্রান্স এরা; যাদের প্রধান ব্যবসা তখনও ছিল কলোনি দখলদারি ) কখন জানি হামলা করে। ম্যাপের দিকে তাকালে দেখব, মূল রাশিয়ার মোটামুটি চার পাশে বেষ্টন করে আছে সাবেক সোভিয়েতের ইউক্রেনসহ বাকি উপনিবেশগুলো। অর্থাৎ তাদের পেরিয়ে গেলে তবেই বাইরে থেকে রাশিয়া আক্রমণ করা সম্ভব হতে পারে। আবার ইউক্রেন হলো সবচেয়ে বড় ভূখণ্ড যার অপর পাড়ের দিকটাই হল পশ্চিম ইউরোপ। রাশিয়াকে যাদের ভয়ে সারাজীবন কাটাতে হয়েছে, এখনো হচ্ছে। এরাই ইউরোপের মূল কলোনি দখলদার যারা এককালে আজকের আমেরিকাসহ সারা দুনিয়াকেই কলোনি করে রেখেছিল ১৯৪৫ সালের আগে পর্যন্ত।

    রাশিয়ার নিরাপত্তাবোধের প্রশ্ন কবে থেকেঃ
    তাহলে কমিউনিস্ট রাশিয়ার আমল থেকেই নিরাপত্তাবোধের অভাব প্রসঙ্গটা তুঙ্গে উঠেছিল যে, তারা নতুন ধরনের (কমিউনিস্ট) রাষ্ট্র বলেই পড়শিদের থেকে বা তাদের মাধ্যমে অন্যের হাতে হামলার শিকার হতে পারে এই সম্ভাবনা থেকে সব শুরু। এমনকি এই নিরাপত্তাবোধের অভাব প্রশ্নটা এতই সিরিয়াস ছিল যে, এ’থেকে ট্রটস্কি-র (Leon Trotsky)   নতুন রাজনৈতিক তত্ত্ব পর্যন্ত হাজির হয়ে ছিল যে, ‘এক দেশে সমাজতন্ত্র’ করে তা টিকানো সম্ভব কিনা; সম্ভব করতে গেলে কী করতে হয় ইত্যাদি। এ নিয়ে তাদের নেতৃত্বে বিভক্তিও দেখা দিয়েছিল সেসময়। সারকথায় ওই ১৯২২ সালে রাশিয়া রাষ্ট্রের বদলে সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্র (সংক্ষেপে এরপরে শুধু সোভিয়েত লিখব) গড়ার মূল কারণ ছিল নিরাপত্তাবোধের অভাব মিটানো। আর ইউক্রেন-রাশিয়ার বিশেষ নিরাপত্তা সম্পর্ক সেই থেকে। কারণ ইউক্রেন পশ্চিম ইউরোপ থেকে রাশিয়াকে প্রটেক্ট করা সবচেয়ে বড় ও মূল ভূখণ্ড।

    পরবর্তীকালে ১৯৫৩ সাল থেকে আইসেনহাওয়ার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই ‘হকিশ’ [hawkish] বা বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে সব কেড়ে নিয়ে যাওয়া আচরণের খারাপ দেশ হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছিল এমন আমেরিকার জন্ম হয়। এটাকেই কমিউনিস্টদের ভাষায় আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ হয়ে ওঠা বলা্র শুরু। এমনকি তা কোল্ড-ওয়ার [Cold War] বা স্নায়ুযুদ্ধের কালের শুরু ধরা হয় যার অন্য একটা বড় কারণ হল ‘পারমাণবিক অস্ত্রের’ জমানার শুরুও সেটা। সোভিয়েত ও আমেরিকা দু’পক্ষই পারমানবিক অস্ত্রের  ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়েছিল ঐ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকজুড়েই। পারমাণবিক অস্ত্রের কথা ইউক্রেন নিয়ে আলাপে কেন তুললাম?

    পারমাণবিক অস্ত্রের কথায় ইউক্রেন নিয়ে আলাপে কেনঃ
    কারণ ওসব পারমাণবিক অস্ত্রের একটা বড় অংশই রাশিয়া মোতায়েন করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্মুখ ভূমি [frontal state-land], ফ্রন্টাল স্টেট হিসেবে ইউক্রেনে। কারণ পশ্চিম ইউরোপ থেকেই রাশিয়া আক্রান্ত হতে পারে বলেই রাশিয়াকে  রক্ষা করতে বাফার ইউক্রেনেই সেসব পারমানবিক অস্ত্রগুলোর বেশিরভাগ মোতায়েন করা হয়েছিল। পরে সোভিয়েত ভেঙে  গেলেও সেই থেকে ১৯৯২ সালে ইউক্রেন আলাদা রাষ্ট্র হবার পরেও অনেকদিন তা আগের মতই মোতায়েন ছিল।   পরে আস্তে আস্তে সেসব পারমাণবিক অস্ত্র তুলে বা খুলে ফেলা হয়।

    এখন অনেকে যুক্তি তুলছেন, সেসময় ওসব অস্ত্র রেখে দিলে আজ ইউক্রেনকে রাশিয়ার হাতে মার খেতে হতো না। এমন কথা কিছু ফ্যাক্টস নজরে না থাকার কারণে বলা হচ্ছে। প্রথমত পারমাণবিক অস্ত্র নিজেই এক বিরাট রাজনৈতিক তো বটেই এমনকি অর্থনৈতিক বোঝা। এর প্রধান কারণ অহেতুক (তুল্য রিটার্ণ নাই) বিরাট খরচ; যে খরচের পক্ষে সাফাই জোগাড় করা কঠিন। এছাড়া টেকনিক্যালি সাউন্ড স্টাফ লাগে প্রচুর আর এমন মোতায়েন থাকা অস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ করা আরেক বাড়তি খরচ।  যেমন উত্তর কোরিয়া নিয়ে নিরন্তর আমেরিকার সাথে খোচাখুচি টেনশনের মুখে এখন চীনের পজিশন হল – ঐ পুরা অঞ্চলকেই পরমানু-মুক্ত রাখা। সবপক্ষই  অপরের সামরিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সকলে মিলে একটা কোন চুক্তি করুক, এটাই চীনের অবস্থান।  এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কথাগুলো এভাবে বলা হছে এজন্য যে, অস্ত্রগুলো ইউক্রেনের ভূখণ্ডে মোতায়েন হলেও এর মালিক-কর্তা ও খরচ বহনকারী ছিল খোদ রাশিয়া। ফলে সোভিয়েত ভেঙে গেলে এটা ইউক্রেনের জন্য দায় হয়ে উঠেছিল। মোতায়েন অস্ত্রে জং ধরিয়ে তো কারো কোনো স্বার্থ নেই। তবে উল্টা স্বার্থ ছিল ন্যাটোর। অস্ত্রগুলো পশ্চিম ইউরোপের দিকে, বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানি – এসব দেশের দিকে তাক করা। কাজেই তাদেরই বড় স্বার্থ ছিল কেবল ইউক্রেনকে যেন  পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করে দেয়া হয়। এখানে নেপথ্যে বলে রাখি, এখন পাঠকেরা বুঝবেন ইউক্রেনে হামলা স্রেফ ন্যায়-অন্যায়ের ইস্যু না। শুধু রাশিয়ান হামলার ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা দিয়ে এর সমস্যা বা সমাধান কিছু বুঝা যাবে না।

    সোভিয়েত ভেঙে যাবার পরেঃ
    বেশির ভাগ মানুষই কোল্ড-ওয়ার [cold war] বলতে সেকালে সোভিয়েত-আমেরিকার রেষারেষি-টেনশন যেটা যেকোনো দুটো দেশের মধ্যে হয়েই থাকে  তেমনই কিছু একটা বলে বুঝে থাকে। এটা ভাল অনুমান না। গভীর তলদেশ কত গভীরে তার আন্দাজ না নিবার মত ভুল। কোল্ড-ওয়ার বা এই এনিয়ে টেনশনের এক মূল বৈশিষ্ট্য হল দুই ধরনের অর্থনীতি। না, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বা যেটাকে ম্যাক্রো [macro] অর্থনীতি বলে সেটার কথা বলছি না। বলছি আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বা গ্লোবাল বাণিজ্যের দিক থেকে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অর্থে। তাই কোল্ড-ওয়ার বলতে তাদের মূল এক বিভক্তি হল – আমেরিকার নেতৃত্বে একদল দেশ, গ্লোবাল বাণিজ্যের প্রয়োজনে এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম চালু করে সবাই তাতে যুক্ত হয়ে পড়েছে। আরেক দল (এরাই কমিউনিস্ট বা সোভিয়েত ব্লকের) বলছে, গ্লোবাল বাণিজ্য দূরে থাক, আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যও দরকার নেই। তাই আমরা ওদের সাথে নাই।  প্রথম দল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে এই বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ’ব্যবস্থাটা একটা শৃঙ্খলার সিস্টেম  চালু করেছে। যদিও এটা বৈষম্যমূলক, এর মাখন যায় মাতবর রাষ্ট্রের ঘরে। অন্যদের জন্য তবু তা মন্দের ভাল; বিনিয়োগ বা কাজ-চাকরিহীন হয়ে না খেয়ে মরার চেয়ে। তাই সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রগুলো কেউ আইএমএফের সদস্য হয় নাই, (আমেরিকাও আগ্রহ দেখাতে চায় নাই এটাও একটা কারণ) একারণে কোনো আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যে যোগ দিতে চাইলেও তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
    আমাদের মনে রাখতে হবে পুরান কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের দুটা পরিণতির উদাহরণ হয়ে (তবে আদর্শ হিসাবে দেখতে বলছি না) তা আমাদের সামনে হাজির আছে। চীন আজ গ্লোবাল নেতৃত্ব দখলের পথে উঁচুতে অথচ উল্টাদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেছে, রাশিয়া হয়ে ধুঁকছে। আজ পাশে চীন না থাকলে আমেরিকার বিরুদ্ধে “কেঁদে উঠতেও” পারত না। কিন্তু সাবধান চীন-রাশিয়ার  তারা পুরান কমিউনিস্ট বলে হয়েছে তাদের সম্পর্কটা হয়েছে – এমন ধরে নেয়া একেবারেই না। মনে এই ভুল লালন করা যাবে না। বরং তাদের প্রধান এনিমি বা বাধা আমেরিকান আধিপত্য – এই কমন প্রধান এনিমির জন্যই তারা কাছাকাছি ও এটাই তাদের সখ্যতার ভিত্তি।

    তাহলে কোল্ড-ওয়ার থাকলেও সোভিয়েত ভেঙে গেলে  -সবার আগে দুটা অর্থনীতি বা অর্থনীতিগত ফারাক – এখানেই প্রধান পরিবর্তনটা ঘটেছিল। সোভিয়েত ব্লক – ১৯৯২ সালের মধ্যেই এরা সবাই আইএমএফের সদস্য হয়ে যায়, এমনকি রাশিয়াও। অর্থাৎ তখন থেকে দুনিয়ার প্রায় সব রাষ্ট্র একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেমের অংশ হয়ে যায়।সবার সাথে সবার  আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যও সম্ভব হয়ে  উঠে তাতে। কিন্তু তাহলে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমাদেশগুলোরও উচিত ছিল বিষয়টাকে গঠনমূলকভাবে দেখার, পরিকল্পিত ও সহযোগিতামূলক ভাবে দেখার।

    এই অংশটা আমার বক্তব্যের সার কথাঃ
    গ্লোবাল নেতৃত্ব কথাটার তাতপর্য বুঝতে হবে।  গ্লোবাল নেতা হিসাবে ১৯৯১ সালের পরে আমেরিকার এখানে এক বিরাট করণীয় ভুমিকা ছিল। যেটা সে করে নাই বলে আজকের এই সংকট ও তার ব্যর্থতা। এবং এটা আজকে গ্লোবালি আমাদের সকলকেই এক সংকটেরর মুখোমুখি করেছে। কী সেটা?
    এককথায় ইন্ট্রিগেশন বা সমন্বয়। এবং ইতিবাচক দৃষ্টিতে সমন্বয়।  দুটা ধারার অর্থনীতিতে  থাকা ভিন্নতা ভেঙ্গে তাদের এক হবার এক ধারা হবার সুযোগ এসেছে এটাকে পরিকল্পিতভাবে ভিন্নতা মিশে যাবার ব্যবস্থা নেয়া। কারণ দুটা পক্ষ অসংখ্য সামরিক টেনশন ও সংঘাতে থেকে বের হয়ে আসার একটা সুযোগ পাওয়া গেছে সেটাকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো। কাজটাও যথেষ্ট কঠিন ছিল। কী করে পুরোনা ১৫ রাষ্ট্রকে একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেমের অংশ করবে – যার প্রধান দিকটা ছিল উভয় পক্ষের মধ্যে এক বাণিজ্যিক লেনদেন, বিনিময় ব্যবস্থা কার্যকর ভাবে খাড়া করা।  এসব দেশ থেকে যেসব পণ্য প্রতিযোগিতায় বাইরের সবার জন্য সবচেয়ে সস্তায় দেয়া সম্ভব সেগুলোকে উতসাহিত করা। আর এটা সম্ভব হলেই বিনিময়ে তাদের যেসব পণ্য পশ্চিমা জগত থেকে লাগবে চাহিদা আছে সেসব আমদানির অর্থনৈতিক সক্ষমতাও হাতে পাবে বলে আমদানি করবে; আর বলা বাহুল্য সেটা পণ্য, বিনিয়োগ সেবা সবকিছুতেই।  এই লক্ষ্যে একটা ব্যাপক স্টাডিভিত্তিক পরিকল্পনা দিয়ে শুরু করতে পারত। আর একাজ করতে গিয়ে ঐ ১৫ দেশের নিজ নিজ কোর স্বার্থগুলো কী, ওদের জনগণের মানে পাবলিক এক্সপেক্টেশন গুলো কী তা জেনে নিতে হত। আর সেবগুলো অর্থনৈতিক সমন্বয়ের পরিকল্পনায় প্রতিফলিত করতে হত। আর এতেই পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক্টা আগেই তৈরি হয়ে যেত।
    তবে একাজ আগে অর্থনীতি দিয়ে শুরু করতেই হত। কারণ বস্তুগত সম্পর্কটা আগে তৈরি হয়ে গেলে পরে রাজনৈতিক ভিন্নতাগুলো তৈরি হয়ে যাওয়া  অর্থনৈতিক স্বার্থে আপোষে মিটিয়ে নেয়া সহজ হয়ে যেত।

    কিন্তু না। গ্লোবাল নেতা হিসাবে আমেরিকা এখানে কোন স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা করে নাই।  অথবা না করলেই বা চাপ ফেললেই তাদের বেশি লাভ এমন অনুমান কাজ করেছিল।

    কিন্তু আমেরিকা বুঝেছিল উলটা।  প্রথমত সোভিয়েত পতনটাকে সে নিয়েছিল উতযাপনের বিষয় হিসাবে। কী উতযাপন? না, দুনিয়াতে আমেরিকা তাহল তখন থেকে একক পরাশক্তি। এবং এর চেয়েও বড় কথা এই পরাশক্তি-বোধ এক চরম দায়-দায়ীত্বহীন কথিত পরাশক্তির। যেন যে পরাশক্তি হয়ে যায় তার আর দুনিয়া নিয়ে  কোন দায়দায়িত্ব থাকে না। যা ইচ্ছা তাই যেন সে করতে পারে এমন এক চরম বা এবসলিউট স্বাধীনতা-বোধের ফ্যান্টাসি ছাড়া এটা আর কিছুই নয়। কথাটা একটুও বাড়িয়ে বলা হচ্ছে না। মিলিয়ে দেখা যাক।
    সেটা ছিল ক্লিনটনের যুগ (১৯৯৩-২০০১) মানে ২০০১ সালে জুনিয়র বুশের ক্ষমতায় আসার আগের আট বছর। এতে আমাদের মত দেশে বেধরক সামরিক ক্যু ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল – এই নীতি অন্তত তিনি বদলানোর পক্ষে চলে যান মূলত কিছু থিঙ্কট্যাংকের চাপাচাপিতে।  যার ফলস্রুতিতে একটা বড় উদাহরণ হল পাকিস্তান। তবে ভারতের বেকুবি প্ররোচনা আর নওয়াজ শরীফের তাতে পা-দেয়ার পরিণতিতে মোশাররফের ক্যু ছাড়া পাকিস্তানে আর সামরিক ক্যু হয় নাই। যদিও এই নীতি পরের আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা চালু রাখতে পারে নাই। সিভিলিয়ান মুখোস পরে করেছেন। বাংলাদেশের ওয়ান-ইলেভেন এর প্রমাণ।   ্তাতে যতটুকু যা নয়া কাজ!

    আর ২০০১ সালে থেকে নির্মম ও বেপরোয়াভাবে বুশের ওয়ার অন টেররে যেকোন (বিশেষত মুসলমান) দেশে রেজিম বদল হয়ে উঠেছিল তার প্রধান নেশা। আর এর পিছনের চিন্তাটাই ছিল “আমেরিকা এখন একক পরাশক্তি” ফলে যা ইচ্ছা তাই।  অথচ বুঝতেও পারে নাই দায়দায়িত্ব কী জিনিষ গ্লোবাল নেতৃত্ব কী জিনিষ! তাই পাঁচ বছরের মধ্যে (২০০৬) মূল স্ট্রাটেজিক প্লানারেরা বুঝে যায় তারা ডুবে যাচ্ছে, হাত-পা আটকে গেছে।

    ওদিকে পুরান সোভিয়েতেও তারা একাজটাই করেছে আরো ভয়ানকভাবে। রাশিয়াকে গুনেছে বুড়া বাঘ হিসাবে আর বাকি ১৪ রাষ্টকে ব্যবহার করেছে একেকটা পুতুল সরকার বসিয়ে, ওসব দেশে এনজিও খুলে আর এর মাধ্যমে কাকে পুতুল করা হবে সেই বাছাই কার্যক্রম পরিচালনা করে। অথচ আমেরিকা দেখতে পায় নাই এর অর্থ হল ওসব দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা সোভিয়েতের কারণে এমনিতেই ছিল দুর্বল অবিকশিত আমেরিকা সেটাকে আরও দুর্নীতিবাজ ও প্রো-আমেরিকান করে গড়ে তুলতে।  অথচ বুঝতেই চায় নাই এমন প্রো-লাগালোর অর্থ হল ঐ ভঙ্গুর রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে এইবার প্রো-রাশিয়ান আরেক প্রতিরুপ গড়ার দিকে আমেরিকা নিজের ঠেলে দেওয়ার কর্মসুচি নেয়া হচ্ছে সেটা। প্রো-আমেরিকান বা প্রো-রাশিয়ান পুতুল – এটা কোন রাজনৈতিক ব্যবস্থা হতে পারে না। অথচ আমেরিকা এর ভিতরে ঐ ১৪ রাষ্টড়কে নিয়ে গেছে। আর তাতেও সামলাতে না পেরে এবার “ন্যাটোর মেম্বার বানিয়ে নেয়া” – এই নতুন কায়দা শুরু করেছিল। কেউ প্রশ্ন তুললেই বিরোধী মানে তারা গণতন্ত্রবিরোধী। যেন কাউকে কৌশলে ন্যাটোর মেম্বার করে সবার মুখ বন্ধ করা খুবই “গণতন্ত্রী কাজ” ও সমাধান। মাঝে ১৯৯৮  সালে খোদ রাশিয়াকে  লোভ দেখিয়ে জি৭ এর সদস্য বানিয়ে নিয়ে সেটা নিজে জি৮ করে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ার মুখবন্ধ করে রাখার এই পরিকল্পনা কাজ করে নাই। এককথায় কোন দায়ীত্ববান গ্লোবাল নেতার ভুমিকা নিয়ে নয় খাবলা দিয়ে খাবার মত ছল-বলে কৌশলে ঐ ১৪ দেশের উপর রাজনৈতিক-সামরিক প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে গেছে আমেরিকা। আর একালে কিছু হলেই সবার উপরে অবরোধ আরোপ – হয়ে গেছে আমেরিকানদের ঢলে পড়া গ্লোবাল নেতৃত্ব টিকবে না জেনেও তা টিকানোর আপ্রাণ চেষ্টা শুরু করেছে। এরই এক পর্যায়ে অসহ্য হয়ে পড়া রাশিয়া এবার পালটা আঘাত করেছে। যদিও আঘাত বা পালটা আঘাত এদের কোনটাই সমাধান নয়। দরকার রাজনৈতিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গটে তোলা, সেটা গ্লোবালি এবং ওসব ১১৪ বা ১৫ দেশেও।

    আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিম এখানেই ব্যর্থ আর তা থেকেই এরই এক প্রকাশ হল,  বর্তমান সঙ্ঘাত।
    অনেক সময় আপনি যাকে শত্রু মনে করেন, তা সত্ত্বেও এটাও সত্যি যে তাকে কিছু ট্রেনিংয়ের ভেতর দিয়ে যদি নিতে পারেন তবে সেটা আপনাদের উভয়েরই ভাল হতে পারে। অহেতুক স্বার্থ সঙ্ঘাত তাতে লোপ পেতে পারে।

    সাধারণভাবে বললে, পশ্চিমের উচিত ছিল প্রথমে অর্থনৈতিকভাবে যতদূর সম্ভব ঘনিষ্ঠ ও পরস্পর নির্ভরশীল ও সহযোগিতায় এক বাণিজ্য সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া বা গড়ে তোলা। পরে রাজনৈতিক স্বার্থ অবস্থান ভিন্নতাগুলো কমানোর বিষয়ে কাজ করা। এতে পূর্ব-ইউরোপের সাথে ইন্ট্রিগেশন সহজ ও কম, বাধাহীন হত। মূলত এটাকেই বলছি পরিকল্পিতভাবে কাজ করা। কিন্তু আমেরিকার নেতৃত্ব পশ্চিম ইউরোপ এ কাজটা করেছে অপরিকল্পিত হেলাফেলায়। তার চেয়েও চাপে ফেলে বাধ্য করায়, আর অপর পক্ষের উদ্বেগগুলোকে উপেক্ষা করে। সর্বোপরি এনজিও বা অন্য কোনো উপায়ে পাপেট সরকার বসিয়ে প্রভাবিত করা আর সাথে, যেকোনো উপায়ে ওসব দেশকে ন্যাটোতে ঢুকিয়ে নেয়া।
    এর মধ্যে সবচেয়ে অবিবেচক ও অন্যায় কাজটা  হল ন্যাটো টিকিয়ে রাখা। আর এটাকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ঐ ১৪ দেশকে ধরার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা।  ন্যাটোর জন্ম হয়েছিল  পশ্চিমাদের ঘোষিত রাশিয়াবিরোধী সামরিক জোট হিসাবে ১৯৪৯ সালেই। আর যার এক মারাত্মক নীতি হল, এর কোনো এক সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে বাকি সদস্যের সবাইকে ওর পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনে যুদ্ধে যেতে হবে। তা থেকেই এখনকার ইউক্রেন দ্বন্দ্বের জন্ম; যেটাতে পশ্চিমারা ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য করে নিয়ে রাশিয়ার ওপর পাল্টা আধিপত্য কায়েম করে নিতে চাচ্ছে। আর রাশিয়ার আপত্তি হলো আমার নিরাপত্তা স্বার্থ উপেক্ষা করলে আর আমার ওপর রুস্তমি করতে চাইলে আমি সর্বাত্মক বাধা দেব। পশ্চিমের হুমকির মুখে তাই ইউক্রেনকে রাশিয়া কিছুতেই ন্যাটোর সদস্য করে নিতে দেবে না।

    এই হলো আমেরিকার অপরিকল্পিত ও হামবড়া দেখানোর সুবিধার ওপর চালিয়ে দেয়া কাজ। আমেরিকার ধারণা, সে ন্যাটোতে যোগদান করা ইউক্রেনের ‘অধিকার’ বলে চালিয়ে দিতে পারবে। এই সাফাই দিয়ে নিজের সব আকাম চাপা দিতে পারবে।  এটা ন্যায়-অন্যায়ের ব্যাপার বলে চালিয়ে দিতে পারবে।

    প্রথমত আমেরিকা নিজের বেলায় এভাবে বিষয়টাকে দেখে নাই। অর্থাৎ ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস যেটাকে বলে তখন, আমেরিকা কিউবার মিসাইল মোতায়েনকে কিউবার ‘অধিকার’ হিসেবে দেখতে পারেনি কেন? ন্যায় হিসেবে দেখতে পারেনি কেন? কেন নিজের নিরাপত্তাবোধকে আপত্তির ইস্যু করেছিল?

    এখানে আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম ইউরোপের প্রধান স্ববিরোধিতা হল, পুরনো সোভিয়েত ব্লককে ঘরে ডেকে নেয়া বা স্বাগত জানাতে না পারা। তারা সেটা তো করেইনি, উল্টা ন্যাটোকে শক্তিশালী করছে; তাও আবার সাবেক সোভিয়েত দেশগুলোকেই ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে। সোভিয়েত ভেঙ্গে গেছে; এরপরে আর ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তা থাকা যেখান প্রশ্নের মুখে সেখানে  আমেরিকা যদি রাশিয়ার সাথে যদি নুন্যতম কার্যকর সম্পর্ক চায় তবে ঐ ১৪ দেশকেই ন্যাটোতে ঢুকাতে হবে কেন? ফলে পশ্চিমের উদ্দেশ্যটাই অসৎ হয়ে গেছে, সে রাশিয়ার জন্য উপযুক্ত পার্টনার নয়। এটা তো কাজ করবে না সংঘাতই ফিরে আসবে।

    এ ছাড়া পুরোনা সোভিয়েত রাষ্ট্রগুলোতে এনজিওর তৎপরতাকে পাপেট সরকার বসানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করা আর পরিস্থিতিকে এমন দিকে ঠেলে দেয়া যেন এখন ইউক্রেনের মতো দেশগুলো হয়েছে রাশিয়া আর পশ্চিম দু’পক্ষেরই নিজ নিজ পাপেট সরকার বসানোর প্রতিযোগিতা। এটা পশ্চিমের জন্য কোনো যুক্তিতেই তাদের পলিসি হতে পারে না- তাদের দাবি অনুসারে তারা তো ডেমোক্র্যাসির বরপুত্র! নাকি? কোনো দায়িত্ববান ব্যবসায়ীও এমন অবস্থান নিতে পারে না।

    রাশিয়ান হামলার মুখে আমাকে একা ফেলে পালিয়েছে পশ্চিমঃ
    এই কথাগুলো হলো হামলার দ্বিতীয় দিন, মানে ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির বোধোদয়! “Who is ready to fight alongside us? I don’t see anyone,” এই হলো পাপেটের করুণ দশা। এ কথার সোজা মানে হল, সারা পশ্চিম তাকে ছেঁকা দিয়েছে; এতিম করে ফেলে পালিয়েছে এবং এজন্য পশ্চিম দায়ী অবশ্যই। কিন্তু প্রধান দায়ী প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি নিজেই। কেন তিনি আগে চিনতে পারেননি? কাদের হাত ধরে ও উসকানিতে জেলেনস্কি পুতিনের সাথে শত্রুতা করতে গিয়েছিলেন? লাগতে গিয়েছিলেন কেন?
    এখানে সবচেয়ে লক্ষণীয় যে এই খবরটা কোন পশ্চিমা মিডিয়া কাভারই করে নাই। এসেছে evening standard স্থানীয় পত্রিকায় আর নয়ত আল জাজিরায়। কেন? দেশের দোষ ঢেকে রাখার দেশপ্রেমিকতা? নাকি এটাই এমবেডেড জার্ণালিজম???

    তাহলে এক মাস আগে পোল্যান্ডে ও রোমানিয়ায় পর্যন্ত বাইডেনের আমেরিকা নিজ সেনা মোতায়েন করেছিল কেন? আবার মোতায়েন করার পর যখনই নিশ্চিত হয়েছে যে  রাশিয়া আক্রমণ করবেই স্রেিরিয়াস আগেই সেনা প্রত্যাহার করে আমেরিকা ভেগে যায়। আর এখন বলছে আমেরিকা রাশিয়ার সাথে বা ইউক্রেনের ভূমিতে রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ করবে না। কী তামাসা! এ কথা আগে বলেনি কেন? এটা কি প্রতারণা না?

    কেন এমন পরিণতিঃ
    কারা কারা রাশিয়ার ওপর স্যাংশন দিয়েছে এই তালিকাটাও বেশ মজার। এক কথায় এটা হল বাইডেনের সাজানো অ্যান্টি-চায়না ব্লক; একেবারে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত। মানে হল বাইডেনেকে যদি তারা শেষ পর্যন্ত আঁকড়ে থাকে তবে এটা হবে সবাইকে না খাইয়ে মারার বুদ্ধিতে গড়া এক ব্লক যাদের মূল বৈশিষ্ট্য তাদের আর ‘গ্লোবাল’ হওয়ার ব্যাপারটাই কখনই বুঝে নাই। এছাড়া বুঝার মুরোদ নেই সেতা তো বহু পুরানা। মানে হল, তাদের যুদ্ধের খরচ বইবার অর্থেও কারো সাথে যথেষ্ট সারপ্লাস সম্পদ নেই অথচ গ্লোবাল নেতা হওয়া বা থাকার ক্ষেত্রে যা এক নম্বর শর্ত। আর মূলত একারণেই তাদের কেউ একটা দেশও ইউক্রেনের পক্ষে সামরিকভাবে দাঁড়ায় নাই। যদি না দাড়াতে পারে, দাড়ালে বিশযুদ্ধ লেগে যাবার ভয় আছে মনে করে তাহলে ইউক্রেনকে ন্যাটোতে সদস্য করে নিতে চাওয়াটাই তো অর্থহীন।

    কিন্তু বাইডেনের পরামর্শক বা থিংকট্যাংকের ফেলোরা তবু বুদ্ধি দিয়ে যাচ্ছেন, আমেরিকা এখনো সামরিক দিক থেকে চীনের ছয় গুণ শক্তিশালী। কাজেই তারাই গ্লোবাল নেতা।’ এদের কে বুঝাতে পারবে গ্লোবাল সক্ষমতা বলতে প্রধানত অর্থনৈতিক সক্ষমতা বুঝায়। এরপরে সামরিক আসতে পারে, আগে নয়।

    তাতে ফলাফল? এখন নিম্নচাপ! মানে?
    মানে হল, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ন্যাটোর খরচ কে দেবে? এর উত্তর নেই বলে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির রাস্তায় পড়ে থেকে কাতরাচ্ছে! আর পশ্চিম ইউরোপের কথা, আমেরিকা ন্যাটোতে খরচ না দিলে তারা নড়াচড়া করবে না। তাই সাত মণ ঘি ঢালা হয়নি, আর তাতে রাধাও নাচেনি। আবার এটা এমনই লজ্জার কথা, তারা সেটা প্রধান কারণ মিডিয়ায় আনে নাই। প্রায় ৪৮ ঘন্টা পরে লজ্জার মাথা কাটা গেলে ৬০০ মিলিয়ন ডলারে হয়াত খউলেছে। যার অর্ধেকেরও বেশি ফ্রান্স অস্ত্রের ব্যবসা করে নিতে নিয়েছেন, ইউক্রেনকে দূর থেকে কিছু অস্ত্র পাঠাবেন বলে  অথচ প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির অভিযোগ তাকে ভালুকের মুখে ফেলে পালিয়েছে- এই বক্তব্যের ফলে পশ্চিমের কার মুখ-সম্মান এখনো বেঁচে আছে? আমেরিকান সংসদে অর্থের মঞ্জুরি হবে, এরপর বাইডেন অর্থ পাঠাবে আর এরপর ফ্রান্সের মত কেন অর্থের ভাগ পেলে অস্ত্র পাঠাবে ? এর ভাবেই যুদ্ধ করতে এমেছিলেন  প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি??? এটা কী যুদ্ধ!
    আবার রাশিয়ার দিক থেকে এটা প্রতিশোধের খায়েশ কিছু মিটানো ছাড়া কিছুই নয়। দিন শেষে সবাইকেই কথা বলতে বসতে হবে। দেশের ভিতরে বা বহুরাষ্ট্রীয়ভাবে স্থায়ী রাজনৈতিক ব্যবহা গড়ে তোলার মধ্যেই  সমাধান আছে। সবাইকে সেখানে যেতে হবে।

    আর এর মধ্য দিয়ে আমেরিকার অসহায়ত্ব আরো স্পষ্ট হয়েছে। আর নিশ্চিত হওয়া গেছে ট্রাম্প আর বাইডেন দুজনেই আসলে  পরাজিত আমেরিকার সৈনিক – তবে একই মুদ্রার দুই দিক। ফলে এই ট্রাম্প বলছেন, তিনি আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতাগিরিই ছাড়াতে চান! আর জাতিবাদী “সাদারাই শ্রেষ্ট” রাজনীতিতে আমেরিকাকে সাজাতে চান!  আর বিপরীতে বাইডেন মনে করেন – আরে আমেরিকা এখনও গ্লোবাল নেতা; তাদের কত কী ক্ষমতা আছে ট্রাম্প সেগুলার ব্যবহারই জানে না। তাই তিনি এবার সেগুলো ব্যবহার করে সবাইকে দেখিয়ে দিবেন। শেষে আমরা এখন দেখছি সে ফাটা ঢোল স্যাংশন! কিন্তু সেটাও হয়ত তাকে অন্তত বেইজ্জতিতে ফেলত না! কিন্তু  প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে গাছে তুলে নিয়ে দেখেন, তার পকেটে মানিব্যাগই নাই। এটা ওনেকটা বাসে উঠে টের পেলেন পকেটে কোন টাকা নাই। শেষে কন্টাকটরকে হাত ঘড়ি খলে দিয়ে কোন মতে বাসায় ফেরা, এই আর কী!

    আমেরিকার দিন ফুরানোর ইঙ্গিত এগুলো তাতে ট্রাম্প না বাইডেন এর প্রেসিডেন্ট, কিছু এসে যায় না। এরা একই মুদ্রার দুই দিক মাত্র!
    আর ওদিকে পুতিন যদি টার্গেট পুর্ণ করে ইউক্রেন থেকে ফিরে আসতে চান তবে ১৪ দিন অনেক বেশি, ৭-১০ এর মধ্যে শেষ করতে হবে। নইলে পা দেবে গেলে বের হওয়া কঠিন হয়ে যাবে। আর ন্যাটোর কেউ যদি সেনা নিয়ে ইউক্রেনের পক্ষে দাড়ানোর চিন্তা করে তবে এক নয়া বিশ্বযুদ্ধ সকলকে তাতে টেনে নিয়ে যাবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২৬ ফেব্রুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “ভালুকের মুখে আমাকে একা ফেলে পালিয়েছে” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাইডেনকে স্যাংশন আরোপের ক্ষমতা কোন মহাপ্রভু দিয়েছে!

    বাইডেনকে স্যাংশন আরোপের ক্ষমতা কোন মহাপ্রভু দিয়েছে!

    গৌতম দাস

    ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২

    https://wp.me/p1sCvy-3Wm

     

    শিরোনামটা আমার না বাইডেনের থেকে ধার করা। এক তামাসার নিউজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

    Who in the Lord’s name gives him the right to declare new so-called countries on territory that belongs to his neighbors?” – Joe Biden tackles Putin

    ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন আর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বাইডেন এর বাকযুদ্ধ এখন প্রতিদিনের ঘটনা। যেন প্রতিদিনের সন্ধ্যায় মিডিয়ায় হানিফ সংকেত মার্কা এক নম্বর সোপ অপেরা [soap opera] চালু হয়েছে এটা।  ম্যাপের দিকে তাকালে দেখব ইউরোপ (মানে যা আসলে পশ্চিম ইউরোপের মাতবর দেশগুলোর ভুমি। এদেরকে আমরা বুঝাই) সেই পশ্চিম ইউরোপ আর রাশিয়ার মাঝের রাষ্ট্র মানে বাফার রাষ্ট্রটাই হল ইউক্রেন।  সম্প্রতি বাইডেন একটা বাণী দিয়েছেনঃ  পুতিনকে তার প্রতিবেশীদের অন্তর্ভুক্ত ভূখণ্ডে নতুন তথাকথিত দেশ ঘোষণার অধিকার কে দিয়েছে?

    প্রসঙ্গটা অরিজিনালি হোয়াইট হাউজে এক সাংবাদিক সম্মেলনের। আবার সেখানের প্রসঙ্গটাকে সময় দিয়ে সিএনএন-ই একমাত্র তুলে এনেছে। আর বাংলাদেশে  এর একটা অনুবাদ  রিপোর্ট করেছে টিভি ‘চ্যানেল ২৪’। ওটা একমাত্র বাংলায় বলে আমি ওটাই রেফারেন্স হিসাবে এনেছি। বাইডেন প্রশ্ন তুলেছেন, “পুতিনকে তার প্রতিবেশীদের অন্তর্ভুক্ত ভূখণ্ডে নতুন তথাকথিত দেশ ঘোষণার অধিকার কে দিয়েছে? এটি ‘আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’।” অর্থাৎ তিনি পুতিনের অথরিটি বা কর্তৃত্বকে লিগাল চ্যালেঞ্জ করতে চাইছেন।

    এক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ হবে উলটা বাইডেনকেই সাবধান হতে বলা। এটা তার জন্যই ভাল হবে। নইলে এনিয়ে বেশি আগালে হৈচৈ করলে নিজেরই কাপড় খুলে যেতে পারে। কেন?

    সরাসরি ও শর্টকাটে বললে,  আমেরিকা বিভিন্ন দেশের উপর ইচ্ছামত যখন ইচ্ছা স্যাংশন [sanction] আরোপ করে থাকে।  এই ক্ষমতা আমেরিকাকে কোন মহাপ্রভু দান করেছে??? কোন আন্তর্জাতিক আইনই আমেরিকাকে এই ক্ষমতা দেয় নাই। তাহলে  ২০১৪ সাল থেকে লাগাতর নানা অজুহাতে রাশিয়ার উপর আমেরিকাকে  স্যাংশন আরোপের ক্ষমতা-কর্তৃত্ব আমেরিকাকে দিয়েছে?? একইভাবে প্রায় ইরানের বিপ্লব (১৯৭৯), এই জন্মের পর থেকে  আমেরিকাকে  স্যাংশন আরোপ করে চলছে। আমেরিকাকে এই ক্ষমতা-কর্তৃত্ব কে দিয়েছে?

    আপাতত আর আরও  প্রমাণ-উদাহরণ না দিয়ে  এখানেই থামলাম!  কাজেই বাইডেনের উচিত হবে না ক্ষমতা-কর্তৃত্ব বিষয়ক কথা আর বাড়ানো। একেবারে কাপড় খুলে যাবে…।

    আমেরিকাকে অর্থনৈতিক  স্যাংশন এর মানে কী?
    আমেরিকাকে অর্থনৈতিক  স্যাংশন দেয়ার সোজা মানে হল, যেকোন দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যে পণ্য কেনাবেচায় যে ইনভয়েস (বা রশিদ) মানে পণ্যের দামাদাম লিখা হবে তা কোন দেশের মুদ্রায় লেখা হবে – এই হল প্রশ্ন! সবাই বেশি প্রফার করে আমেরিকান ডলারে তা লিখতে। এর সুবিধা হল বিক্রেতা এরপরে পণ্য বেচা অর্থ দিয়ে ডলারে অন্য যেকোন দেশের পণ্য সহজেই সে আবার কিনতে পারে। কারণ ডলার গ্রহণ করতে সব বিক্রেতাই প্রেফার করে। আবার দুপক্ষের জন্যই অসুবিধা হল, ঐ ইনভয়েসে লেখা ডলারের অর্থ ছাড় করতে একটা না একটা আমেরিকান ব্যাংকের মাধ্যমেই তা করতেই হবে। এখন কোন আমেরিকান ব্যাংক একাজে আপনাকে সাহায্য করলে ঐ ব্যাংক-কে  আমেরিকান রাজস্ব-বিভাগ বিলিয়ন ডলার ফাইন করে থাকে – এটাই হল অবরোধ আরোপ সোজা পরিণতি।  তাই অবরোধ আরোপ মানে হল, আপনাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা থেকে বের করে দেওয়া।

    তাহলে ইউক্রেন ইস্যু এটা কিসের লক্ষণ?
    চীন-রাশিয়া মিলে এখন আমেরিকার এই যত্রতত্র কোন আন্তর্জাতিক আইনী নিয়ন্ত্রণ ছাড়া স্যাংশন  আরোপ করা্র যুগের সমাপ্তি চিরদিনের মত শেষ করে দিতে উঠেপড়ে লেগেছে। ডলার বাদে বাকি সব কারেন্সিতে লেনদেনের এক নয়া গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়তে চাচ্ছে। অন্তত “ডলার রেজিম” সমাপ্ত করতে হবে এই তাদের মূল লক্ষ্য। [সেটা কতদুর কী পারবে সে অন্য আলাপ।] তবে এর  সাথে তাদের বন্ধুরাও যোগ দিয়েছে যেমন ইরান ও চীন-রাশিয়ার প্রভাবাধীন রাষ্ট্রগুলো। আর এতে বেদিশা হয়ে ততই আমেরিকা অবরোধ-আরোপে অপব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে। যেটা অনেকটা “জন্মের খাওয়ার” মত!  যেখানে খাদক খাইতে খাইতেই শেষে মারা যায়!

    তাই সম্ভবত বাইডেনই হবেন শেষ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট যার আমল পর্যন্ত তৃতীয় দেশে হস্তক্ষেপ, সরকার বদলানো এমনকি সিআইএ পাঠিয়ে ক্ষমতা দখলদারি করার চর্চা জারি ছিল, এটাই আগামি ইতিহাসে লিখা থাকবে।  মানে এরপরেও আমেরিকা থাকবে অবশ্যই তবে অন্যের সরকার বদলানোর ক্ষমতা বদলানোতে ঠুঠো হয়ে থেকে।

    অন্য দেশে খোদ সরকারই উপরে ফেলার ক্ষমতা সিআইএ বা আমেরিকার কোন মহাপ্রভু দিয়েছে???
    আমরা অনেক সময় চুপ থাকি নিরুপায় হয়ে বা আমাদের সাময়িক স্বার্থের জন্য বা কৌশলগত কারণে। কিন্তু কখনই আমরা মন থেকে আমেরিকার এই অবাধ ও নিয়ন্ত্রণহীন [unruly] ক্ষমতা পছন্দ করি না। করতে পারি না!

    কাজেই বাইডেনের আমেরিকার প্রতি আমাদের পরামর্শ হবেঃ “ডলার-রেজিম এই ক্ষমতার” অপব্যবহারকারি হয়েন না। ছাড়ান দেন। আর পুতিন বা বাইডেন আপনারা কারোই আরেক দেশে সেনা পাঠানোর আগে এই ইস্যু বিষয়ক গ্লোবাল কনভেনশন-আইন করেন; পরস্পর দোষারোপ করে কতদুর যাবেন! নইলে এসব চাতুরিপুর্ণ বয়ান আপনার পক্ষে কাজ করবে না…। বৃটিশ সাম্রাজ্যের সুর্য এভাবেই একদিন অস্তে ডুবে গেছিল!

     

  • মোমেন এটা কী করলেন?

    মোমেন এটা কী করলেন?

    গৌতম দাস

    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২২

    গত দু-একদিন ধরে একটা ভিডিও ক্লিপ ফেসবুক মাতিয়ে বেড়াচ্ছে, সেখানে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন কিছু বক্তব্য রাখছেন। এই ধরণের ছবি বা ক্লিপে মোমেনকে দেখে আমাদের কারই ভাল লাগে নাই। আভ্যন্তরীণ ভাবে সরকার বিতর্কিত হতে পারে কিন্তু মোমেন বিদেশে বাংলাদেশের ইমেজের -প্রতিরূপই থাকেন! ফলে আমাদের সবার জন্যই এটা ম্যাটার করে! এঘটনায় সরকারের মানে বাংলাদেশের ইমেজ আরও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
    বাংলাদেশের মানুষের কাছে এটা মোটেই সুখকর চিত্র নয় যে তাদেরকে প্রতিনিধিত্বের নামে কেউ বিদেশিদের একাংশের কাছে কাকুতি-মিনতি করছে…!! তাও আবার সেটা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে – যেখানে বডি ল্যাঙুয়েজ আর ঘটনা ল্যাঙ্গুয়েজ আর পুরা সেটের সেটিংটা হল যে জয়শঙ্কর স্টেজে ডায়াসে আর মোমেন আমজনতা স্তরে নিচে……। আর জয়সঙ্কর আমাদেরকে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছে …… বাহ বাহ কি দৃশ্য!
    আসলে ওটা ছিল মোমেনের মুরোদ দেখানোর বেস্ট সুযোগ। জয়শঙ্করের আপত্তি হল চীনা বিনিয়োগ আমরা কেন নিয়েছি। আর চীনা বিনিয়োগ নেয়া মানেই –  তার চোখে, এমন এয়ারপোর্ট বানানো যেখানে কোন বিমান ল্যান্ড করে নাই ইত্যাদি।
    আর এখানেই মোমেনের জিজ্ঞাসা করা দরকার ছিল ভারত আমাদের বিআরটিসি-কে লোন (কথিত লাইন অব ক্রেডিট)  দিয়ে ডুবিয়ে দিয়েছে কেন? গত তের বছর ধরে বিআরটিসি এক অলাভজনক গলার কাটা, সরকারি রাজস্ব থেকে উলটা ভর্তুকি দিয়ে এটা টিকিয়ে রাখত্বে হয়েছে। কারণ সর্বশেষ ভারতের লিল্যান্ড-সহ নিজ  অচল গাড়ি কোম্পানিগুলোকে টিকিয়ে রাখতে ভারত সরকার প্রায় দুশ কোটি টাকা ওসব কোম্পানিগুলোকে পরিশোধ করে দেয়। আর এখন ঐ কোম্পানিগুলোর অবিক্রিত গাড়িগুলো কোন দাম যাচাই ছাড়া ইচ্ছামত দামে আমাদেরকে কিনতে বাধ্য করা হয়েছে। আর ঐ দুশকোটির টাকার (এর আগেও দফায় দফায় এই) ঋণ ও এর সুদ বইতে দায় চাপিয়েছে আমাদের উপর, এটাই লাইন অন ক্রেডিট কথার মানে।
    তাহলে অলাভজনক এয়ারপোর্ট প্রকল্প ঋণের মত আমাদের অলাভজনক বিআরটিসি কোম্পানিকে ডুবিয়ে দেওয়ার কাজটা কী জয়শঙ্কর সাহেব করেন নাই???
    মোমেনের উচিত ছিল এই জবাবদিহিতা জয়শঙ্করের কাছে চাওয়া…। এটা হতে পারত স্মার্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মত কাজ।এছাড়া একই রকম যেসব চীনা বিনিয়োগ ভারত নিয়েছে মোদির প্রথম পাঁচ বছরে সেসব প্রকল্পের তথ্য ভারত ওয়েব সাইট থেকে সরিয়ে রেখেছে কেন? ভারতে চীনা বিনিয়োগের তথ্য আগে জয়শঙ্করের উচিত পাবলিক করে দেয়া। এরপর অলাভজনক এয়ারপোর্ট প্রকল্প ঋণের গল্প আমরা শুনতে রাজি হব। এটাই সমান সমান হতে পারে তাই না!!!!
    মোমেন কোন অনুষ্ঠানে গিয়ে আপনাকে সাধারণ্যে বসতে হতেই পারে, এড়ানো যায়না এমন স্তরে বা পরিস্থিতিতে। কিন্তু সেক্ষেত্রে তাই বলে সেটাকে আরও কোন রাজ-সভাসদের অর্থ তৈরি করতে পারেন না – যেখানে আপনাকে অনুগ্রহপ্রার্থি প্রজা মনে হয় এমন পরিস্থিতি নিজেকে নিচা দেখানোর বা নিচে ফেলার তো দরকার নাই! নাকি???
    ওখানে ভুলে যাওয়া হয়েছে যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন আপনি ওখানে ব্যক্তি মোমেন নন। আপনি সেখানে অবশ্যই সব রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সাথে সমান মর্যাদার আরেক ও নিজ রাষ্ট্রের প্রতিনিধি। কিন্তু মোমেনের বক্তব্য দেয়া আর প্রশ্ন করার মধ্যে সেটাই অনুপস্থিত ছিল। যেন ব্যক্তি মোমেন কিছু বাকা প্রশ্ন করতে চাইছেন, মান-অপমানের কথা ভুলে।
    ঘটনা হল বাংলাদেশ চীনের সাথে গভীর সম্পর্ক গিয়ে নিজেকে জড়িয়েছে। সুনির্দিষ্ট এখনকার বাংলাদেশ সরকার সঠিক বা বেঠিক যেভাবেই হোক তা করেছে। কিন্তু সেজন্য আমরা কারও কাছে জবাবদিহিতা করতে যাব কেন?? আমরা তা করতে যেতে পারি না! সেজন্য মোমেন ইন্ডিয়ার মাধ্যমে প্রায় সত্তরটা দেশের কোন সভায় গিয়ে জবাবদিহিতা করতে যাবেে কেন? তাও কার্যত ভারতের জয়শঙ্করের মাধ্যমে???
    মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্স বা এমএসসি [MSC], ১৯৬৩ সালে জন্ম নেয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পরিস্থিতিতে গ্লোবাল সিকিউরিটি প্রসঙ্গে ডায়লগের একটা জোট। ওর নিজ ভাষ্য অনুসারে তা ট্রান্স-আটলান্টিক মানে আটল্যান্টিকের দুইপাড়ে মানে আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপ-কে নিয়ে করা এক জোট।
    এখন কোন যুক্তিতেই আমরা ট্রান্স-আটলান্টিক ভূগোলের কেউ নই। অথবা কোন বড় অর্থনৈতিক স্বার্থ বা অর্থনীতির কেউ হই নাই। তাহলে আমরা এমএসসি তে গেছি কেন?? কোন সুখে?? আমাদের কোন স্বার্থই এখনও নাই, হয় নাই যে ওমন সভায় যাওয়া যখন প্রয়োজনীয় হয়েছে!! একমাত্র যদি আমাদের অপমানিত হবার সাধ না হয়ে থাকে! অথচ কার সামনে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে ক্ষমতা রক্ষার বন্দোবস্ত কখনও দুনিয়াতে কেউ অর্জন করতে পারে নাই।
    এই হল সরকারের প্রথম মারাত্মক অসংগত আচরণ!
    ফলে যেন নিচা হবার জন্য ওখানে মোমেন গিয়েছেন!
    ঘটনা হল, ঐ এমএসসি সংগঠন জন্ম থেকেই কোল্ড ওয়ার যুগে এন্টি-সোভিয়েত এক ডায়লগের জোট। কিন্তু একালে সেসব হারিয়ে তা এখন কার্যত এক চীন-বিরোধী টান্স-আটল্যান্টিক জোট হয়েছে। তাও আবার এখন এমন এক সময়ে যখন ইইউ বাইডেনের সাথে আর এক সুরে নাচবে না, স্টেপ মিলাবে না – সেটাই এখন সবখানে একেবারেই স্পষ্ট। যেমন ইউক্রেন ইস্যুতে ইউরোপ বাইডেনের সাথে হাত ধরে হাটছে না, পা ফেলছে না…।
    তাহলে সেরকম একটা জোটের সভায় গিয়েই হাসিনাকে তার চীনের সাথে সম্পর্কের গভীরে যাওয়াটা উচিত-অনুচিত যাই হোক, কেন তাকে তার সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গাইতে ঐ সভায় যেতে হবে?? আর জয়শঙ্করের কাছে কেন? সে কে??
    কোয়াড জোট – তা অবকাঠামোর জন্য স্বল্পসুদের ঋণ দিবার সংগঠন নয় – এর সে মুরোদও নাই এটা তেমন জোটও নয়। সারা দুনিয়া এটা জানে। তাহলে কোয়াড এমন ঋণ দিতে পারলে তবেই আমরা কোয়াডে যাব অথবা চীন এমন ঋণ দিতে পারে কেবল এজন্যই আমরা চীনের কাছে গিয়েছি – এসব বয়ান তুলে ধরতে মিউনিখ যাওয়া কেন? আর অপমানিত হওয়া কেন? দুনিয়া সম্পর্কে আমরা কী এতই বেখবর??
    প্রথমত ভুল অথবা সঠিক দিদ্ধান্ত আমরা যেটাই নেই না কেন কারও কাছে জবাবদিহিতার সম্পর্ক আমাদের হতেই পারে না। এর মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করার মত কোন কাজ কোন ঘটনাই থাকতে পারে না। অপমানিত হওয়া ছাড়া। আর সেটাই মোমেন করেছেন, যেকোন সম্ভবত কোন উপদেষ্টা, কারও বোকামি নির্দেশে।
    কোয়াডের কথাই যদি এসময় মাথায় থাকে তাহলে এর বাস্তবতাটা হল এখন ইউরোপ-আমেরিকা একই চোখে ঘটনা দেখছে না। এমনকি কোয়াডের চার দেশই একই তালে নাই। অকাস সামরিক জোট গঠনই এর প্রমাণ। আবার পরিণতিতে অকাস (AUKUS) বা কোয়াড (QUAD) দুটাই স্থবির। বরং আমেরিকার বাংলাদেশে অবরোধ দেওয়ার গ্লোবাল পলিটিক্যাল সোজা মানেটা হল বাইডেনের কাছে অকাস বা কোয়াড কোনটাই আর ফোকাসে নাই। তার ফোকাস এখন বঙ্গোপসাগর- সেভেন ফ্লিট ইত্যাদি এসব। আর বঙ্গোপসাগর- সেভেন ফ্লিট মানেই ভারতের সাথে আমেরিকার জন্মের সর্ববৃহত স্বার্থ-সংঘাত হবে সেটা।
    আবার খোদ ভারত-ই কী এখন কোন জোটে কারও সাথে আছে?? আজ বাইডেন তো কাল পুতিন – এই অবস্থায় চলে গেছে ভারত; পা কাঁপছে। ওদিকে পুতিনও ভারতের উপর ভরসা করে বসে নাই। তাহলে পুতিনের পাকিস্তানের ইমরানের সাথে ঘনিষ্ঠতার নয়া যুগ শুরু করত না। ইমরানের সাম্প্রতিক রাশিয়া সফর ইঙ্গিত করে যে পাকিস্তানের জন্মের পরে এই প্রথম সে মেরু বদল করছে। যার মানে পুতিনের কাছে ভারতের চেয়ে পাকিস্তান বেশি গুরুত্বপুর্ণ এখন। তাহলে এই পরিস্থিতিতে ভারতকেই পুতিনের কাছে যেতে হবে নিজ তাগিদেই, সব অপমান বা তুচ্ছ হবার কথা জেনেই।
    তাহলে মোমেন কোন ভারতের কাছে যাচ্ছে, নিজ চীনের সাথে সম্পর্ক এর সাফাই দিতে যাচ্ছে কেন? হাসিনার সরকারের ভারতের কাছে ঠেকা টা কোথায়? কে ভারত? কোন ভারতের কাছে সে যাচ্ছে??
    এক হতে পারে যদি সরকার পরে যায় তো কর্মিদের আশ্রয়স্থল হতে পারে এমন কাজে লাগা ছাড়া এই “একাকী” হয়ে পড়া ভারত হাসিনার কেউ না। কোন কাজে লাগবে না। এটা হতেই পারে ভারতের মাধ্যমে আমেরিকা চলতি সরকারকে এককালে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। কি সেই কৃত্যজ্ঞতা তো ২০১৪ সাল থেকে মিটে গেছে।
    কেউ কার কাছে সাফাই দিয়ে ক্ষমতায় থাকা যায়নি, যাবে না।
    আর মোমেন সাহেব কোন মিটিংয়ে যাবার আগে ঐ হবু মিটিংয়ের ফরমাট আগে জেনে নিয়ে তবেই তার যাওয়া উচিত। আপনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আপনাকে মাটিতে রেখে ডায়াসেে বসবে ভারতের জয়শঙ্কর – এই ফরমাট কখনও গ্রহণযোগ্য নয়। যেকোন ধরণের বাংলাদেশের সরকারের জন্যই এটা ইজ্জতের প্রশ্ন।
    প্রটোকল প্রটোকল বলে চেচিয়ে লাভ নাই, প্রটোকল আগে বুঝতে হবে। কোন প্রটোকল চিন্তায় মোমেন সাহেব মিউনেখ গেছিলেন?? এখানে হাসিনার লাভালাভের চিন্তায় তিনি কিছুই হাসিল করতে পারেন নাই, উলটা তিনি বাংলাদেশের মান-সম্মান ডুবিয়ে দিয়ে এসেচেন।

    সবশেষ হাসিনা সরকারের কী হবে এটা এখন অবজেক্টিভ বাস্তবতায় নির্ধারিত হবে। সাবজেক্টিভ কর্তা হিসাবে হাসিনা তাতে হাত ঢুকায়ে কিছুই আগাবে না – এমন শত মিউনিখ মিটিং সরকারকে রক্ষা করতে পারবে না! লাভের লাভ হবে অপমানিত হয়ে ফিরে আসা…! আর সেটাও সরকারের বিরুদ্ধেই যাবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com[লেখাটার প্রথম ভার্সান আজ (২২ফেব্রু ২০২২) সকালের সরাসরি আমার ফেসবুকে দেয়া হয়েছিল।
    পরে তা আরও আপডেট করে, আমার এই ওয়েব সাইটে দেয়া হয়েছে। আর সেই ভার্সান টাই ফিরে লোড করা হল  আজই আমার ফেসবুকে এখনই সকাল ১১ঃ৩৪ এ।
    এই আপডেটে অনেক নতুন তথ্য সংযোজন করা হয়েছে।]
  • জমিদারি-হিন্দুত্ব জাগিয়ে বলা ওআইসি ‘সাম্প্রদায়িক’!

    জমিদারি-হিন্দুত্ব জাগিয়ে বলা ওআইসি ‘সাম্প্রদায়িক’!

    গৌতম দাস

    ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Vn

     

     

          MEA spokesperson Arindam Bagchi. | Photo Credit: twitter/@abagchimea

    ইংরেজি কমিউনাইজ [communize] শব্দটি খুবই ইতিবাচক এক শব্দ। যার রুট শব্দ কমিউন [commune]। ল্যাটিন অরিজিন কমিউনিস [communis] সেখান থেকে ইংরাজিতে যার অর্থ কমন [common] বা সাধারণ। সেখান থেকে সম্ভবত ফ্রেঞ্চ comuner (মানে ভাগাভাগি শেয়ার করা), হয়েও অরিজিনাল কমিউনাল [communal] (জোর করে দেয়া হিন্দু-ভারতীয় নেতি অর্থটা না) খুবই ইতিবাচক শব্দ যার অর্থ যে কমিউনিটিতে স্বেচ্ছাশ্রম দেয়, কমিউনিটির জন্য কাজ করে, আর কমিউনিটির কষ্ট-আরামসহ সবই যে শেয়ার করে; এবং এক সম্প্রদায় হিসেবে মিলেমিশে থাকে। এছাড়া, অনেক সময় প্রকৃতির সাথে স্পিরিচুয়ালি সম্পর্কিত করে দেখা অর্থে ‘কমিউনাইজ’ শব্দটা ব্যবহার করা হয়। দেখা যাচ্ছে রুট কমিউন এর যতগুলা অর্থ হয় সবই ইতিবাচক। কোন নিচা মানে যেটাকে ইংরাজিতে নেতিবাচক বা derogatory অর্থে ব্যবহার হয় এমন কোন ডেরিভেটিভ শব্দ বা অর্থই নাই।

    অথচ বৃটিশ-ইন্ডিয়ান সমাজের জমিদার-হিন্দুরা রাজনৈতিক, সামাজিক বা কালচারাল আধিপত্য খাটাতে গিয়ে  সেই দরকারে অরিজিনাল  কমিউনাল শব্দের অর্থ-বিকৃতি ঘটিয়েছিল। তাই ডিকসনারিতে না থাকলেও হিন্দুত্ববাদী ধারণা ও ঘৃণায় হিন্দুত্ব-জাতির জোশে তারা সব ঢেকে ফেলতে চেয়েছিল। আর তাতে সবচেয়ে ইতিবাচক কমিউন শব্দটাকেও জবরদস্তিতে নেতিবাচক অর্থ দিয়ে ছেড়েছে। কিন্তু শব্দটা ইংরাজি, ফলে ইংলিস ডিকসনারি তাদের এই নেতি অর্থ গ্রহণ করে নাই। একারণে বলা যায় জমিদার-হিন্দুরা  কমিউন শব্দের বাংলা – ‘সম্প্রদায়’ শব্দটাকে করেছে ‘সাম্প্রদায়িক’ যা খুবই নেতিবাচক অর্থ। তাই ভারতে ছেপে নেওয়া ছাড়া অন্য কো্ন ইংরেজি ডিকশনারিতে নেতি ‘কমিউনাল’ শব্দটাই পাওয়া যাবে না। কমিউন বা কমিউনিটি অথবা ইতিবাচক-কমিউনাল শব্দ পাওয়া যাবে। যার সবগুলোও অবশ্যই ইতিবাচক শব্দ।

    এখন জমিদার-হিন্দুর দেয়া এই কমিউনাল শব্দের অর্থ কী? তারা কী বোঝাতে চান?
    প্রথমত তারা বলতে চান, অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানেরা বাঙালি না। আর জমিদার-হিন্দুর রাজনৈতিক সামাজিক কালচারাল আধিপত্য অবিভক্ত বাংলার সবাইকে মানতেই হবে। আর সেই জবরদস্তি ক্ষমতার জমিদার-হিন্দুর দাবি  – বাঙালি মানেই কেবল হিন্দু; মুসলমানেরা এথনিক পরিচয়ে বাঙালিই নয়। মানে যেন কারও এথনিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় অন্য কারও রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারণ করে দেয়া যায়।
    সারা মোগল আমলের নিয়ম  খাজনা দেয়া সাপেক্ষে জমিতে যেই চাষাবাদ করে জমি ভোগ-দখলের অধিকার তাঁর। বৃটিশ কলোনি-দখলদার শাসকেরা প্রথম এই জমি মালিকানা ভিত্তি ভেঙ্গে দেন। তারা জোর করে জমির আগের টাইটেল এবার অর্থের বিনিময়ে ‘জমিদার নামে নয়া গোষ্ঠির কাছে সেই জমির টাইটেল হস্তান্তর বা লিখে দিয়েছিল। অথচ তখনও জমি ভোগ-দখলের অধিকার পুরানা জমির চাষাবাদ-কারিদেরই ছিল।

    তাই এই জমিদার-হিন্দু শ্রেণী নিজ ক্ষমতা আধিপত্য দেখাতে  মুসলমানদের এথনিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় নিজ রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারণ চালু করেন। দাবি করেন মুসলমানেরা বাঙালি না। এরই বিপরীতে দুবার জবাব দিয়েছে বাঙালি মুসলমানেরা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের প্রধান সংখ্যা-শক্তি হয়ে দেখিয়েছে তারা অবশ্যই মুসলমান। আর পরে ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে সশস্ত্রযুদ্ধ করে দেখিয়েছে – তারা বাঙালিও।  জমিদার কলকাতা তাদের বাঙালিত্ব কেড়ে নিতে পারে নাই, পারবে না। ব্রাহ্মণ্য বর্ণপ্রথায় নিষ্পেসিত অন্তজ কিন্তু লড়াকু বাঙালির যে অংশটা ভালভাবে বাঁচতে ও লড়াবার সুবিধার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছিল এরা বাঙালি মুসলমান অবশ্যই। কিন্তু একারণে তার এথনিক-জাতি পরিচয়, যে ভাষায় সে মায়ের সাথে কথা বলে সম্পর্ক করে তা বদলে যাবে কেন? মুসলমানদের বাঙালি পরিচয় কোন জমিদার-হিন্দু মাতবর কেড়ে নিতে পারে না। মুসলমানদের বাঙালি পরিচয় কেড়ে নিবার ক্ষমতা জমিদার-হিন্দুর নাই,  জমির মালিকানা টাইটেলের মত এই বাঙালি পরিচয় কেড়ে নেয়া যায় না সম্ভব নয়। মানুষের এথনিক পরিচয় প্রায় অর্গানিক; ফলে তা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আমরা যে ঘরে জন্ম নেই সে ভিত্তিতে এই পরিচয় সেখানেই নির্ধারিত হয়ে যায়। এজন্য  এথনিক-সাংস্কৃতিক অর্থে জাতি বা জাতিবোধ কথাটা আগে বুঝতে হবে। এটা জবরদস্তির বিষয় না। মুসলমান বাঙালি তাই বাংলা ভাষা ছাড়ে নাই ছাড়তে পারে না, বাঙালি খাদ্যাভাস ইত্যাদিও ছাড়বে না আর সর্বোপরি মুসলমানিত্বও ছাড়ে নাই। তাতে শরতচন্দ্র হয়ে যতই আপনি “বাঙালি বনাম মুসলমানের খেলা” দেখানোর উপন্যাস লেখেন না কেন!

    কিন্তু বৃটিশ-ভারতের কলকাতার জমিদার হিন্দু সেই জবরদস্তিটাই করেছিল। বিশেষত মুসলমানেরা তাদের মানতে না চাইলে অথবা পাল্টা তাদেরকে ভিন্ন কোন নিজ ধর্মীয় সামাজিক চিহ্ন দেখানোর চেষ্টা করলে তাদেরকে “সাম্প্রদায়িক ডাকা হবে” – এটা ছিল জমিদারশ-হিন্দুর সিদ্ধান্ত। তাদের আধিপত্যের সমাজে থাকতে গেলে তাদের সংজ্ঞায়িত করা ধারণা মানতে বাধ্য করার কায়দা হল এটা। মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দেয়া তাদের কথিত সব শিষ্টাচার ও কোড ফলো করলেই কেবল তারা স্কুল-কলেজ বা চাকরিতে তাদের সমাজে প্রবেশাধিকার দেবে, পাশে বসতেও দিতে পারে। আর যে তাদের কোড মানে না, ডমিনেন্স মানে না তাকে জমিদারেরা ‘সাম্প্রদায়িক’ বলত।  একারণেই আজও সাম্প্রদায়িক শব্দটাই জমিদার-হিন্দুর সেই অত্যাচারেরই স্মারক চিহ্ন। কাজেই  এই সাম্প্রদায়িক শব্দটা ব্যবহারে আমাদের সতর্কতা প্রয়োজন! প্রয়োজন ব্যবহার বাদ দেয়া।
    মনে রাখতে হবে  মুসলমানের বিরুদ্ধে জমিদার-হিন্দুর  বুকভরা বিদ্বেষ আর ঘৃণার ঝড় তোলা শব্দটাই হল ‘সাম্প্রদায়িক’।

    ভারতের বিদেশ বিভাগ বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি একজন বাঙালি হিন্দু; উনার ‘বাগচি’ টাইটেল তাই নির্দেশ করে। এদিকে হিজাব ইস্যুতে স্বভাবতই ওআইসি বা ইসলামি ঐক্য সংস্থা [Organisation of Islamic Cooperation (OIC)]  ভারতের মুসলমান বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানোর নীতির নিন্দা করে অন্যান্যদের মতই বিবৃতি দিয়েছিল। এটা সহ্য হয় নাই ভারতের বিদেশ বিভাগের। ব্যাপারটাকে তারা দেখেছে যেন পুরানা জমিদার-হিন্দুর চোখে, তাদের আধিপত্য অস্বীকারের চেষ্টা হচ্ছে যেন। তাই পুরা জমিদার-হিন্দুর ঘৃণার হুঙ্কার দিয়েছেন অরিন্দম বাগচি। বলেছেন এটা নাকি ওআইসির সাম্প্রদায়িক মাইন্ডসেট। এছাড়া অরিন্দম দাবি করছেন ভারতে নাকি একটা “কনষ্টিটিউশনাল ফ্রেমওয়ার্ক ও মেকানিজম” কার্যকর আছে আর ওর সাথে নাকি  আছে – “ডেমোক্রাটিক ইথোস (মুল্যবোধ) ও পলিটি (রাজনৈতিকতা)” ।

    ……constitutional framework and mechanisms, as well as democratic ethos and polity. The communal mindset of the OIC Secretariat does not allow for a proper appreciation of these realities

    কিন্তু সরি,  অরিন্দম! ভারতে এগুলোর কোনটাই নাই, ভারতের জন্ম থেকেই নাই। আছে কেবল দগদগে ঘা, এক হিন্দুত্ব। পলিটি, ইথোস কিছুই থাকতে দেয়া হয় নাই।  এমনকি কান পেতে শুনেন আরএসএস প্রধানের ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা দিবার পরিকল্পনা শুনতে পাবেন। উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখন্ড রাজ্যকে মুসলমান-শুণ্য করতে হবে, শেখানে তারা থাকতে পারবে না – এই ডাক ও পরিকল্পনাও শুনতে পাবেন।  আর চলতি নির্বাচন উপলক্ষ্যে সব হারিয়ে মোদির ভোট যোগাড়ের এতে একমাত্র উপায় মুসলমান গণহত্যার হুমকি, মুসলমান বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানো আর বিজেপি প্রার্থী না জিতলে মুসলমান মারবেন, বুলডোজার চালাবেন এই হুমকি দিচ্ছে। এগুলো কী কনষ্টিটিউশনাল আচরণ ?? ভারতে কী সুপ্রীম কোর্ট অথবা কোন নির্বাচন কমিশন বলে কিছু আর আদৌ আছে??? যাদের প্রত্যক্ষ কনষ্টিটিউশনাল দায়িত্ব ছিল মুসলমান ভোটারদের উপর এত চরম হুমকির বিরুদ্ধে তাতক্ষণিক সকল ব্যবস্থা নেয়া। অথচ এমন কোন কিছুই করা হয় নাই। মানে  ভারতের দুর্বল যে কনষ্টিটিউশন যে কনষ্টিটিউশনালিজম তাই তো  আজ একেবারেই নিস্ক্রিয় ও অকেজো হয়ে গেছে। এবং এটা প্রমাণিত। সে কারণে এসবের বিরুদ্ধে ওআইসি তো কোন ইসলামি আলেম ডেকে আনার কথা বলে নাই, পরামর্শ দিতে যায় নাই।  বরং আহবান রেখেছে [……OIC called upon the U.N. and the Human Rights Council to take “necessary measures”] জাতিসংঘ ও এর হিউম্যান রাইট কাউন্সিলের কাছে তাদেরকে “প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” নিতে বলেছে। অথচ দেখা যাচ্ছে এটাও মুখপাত্র অরিন্দমের সহ্য হয় নাই।   তাহলে?

    … ভারতে আছে কেবল দগদগে ঘা – যার নাম হিন্দুত্ব। যেখানে পলিটি, ইথোস কিছুই থাকতে দেয়া হয় নাই, পারে না।

    অর্থাৎ  মুখপাত্র অরিন্দম এখনও জানেনই নাই যে ও আইসি-কে সাম্প্রদায়িক বলা – এটা একটা এথনিক ঘৃণা ছড়ানোর কাজ। কারণ এই “সাম্প্রদায়িক” শব্দ ও ধারণাটাই জমিদার-হিন্দুর মুসলমান-বিদ্বেষী ধারণা ও সেকালে তাদের হাতেই যার আবির্ভাব ঘটানো হয়েছিল।  অন্যের এথনিক পরিচয় অরিন্দম আপনি পছন্দ না করতে পারেন। কিন্তু আপনি অন্য এক জনগোষ্ঠিকে তার এথনিক পরিচয় ও ইতিহাস তুলে কথা বলতে পারেন না; জমিদার-হিন্দুর মুসলমান-বিদ্বেষের ইতিহাসের পক্ষে সাফাই দিতে পারেন না। বিশেষ করে আপনি যখন একটা দেশের বিদেশবিভাগের মুখপাত্র!! খেয়াল করেন, হিজাব নিয়ে বিবৃতি, আপত্তি তো আমেরিকাও তুলেছে। ওখানে অরিন্দম বাগচির মুরোদ হয় নাই  “সাম্প্রদায়িক মাইন্ডসেট” শব্দ ব্যবহার করে আমেরিকার বিরুদ্ধে  কথা বলার!
    এদিকে বর্তমান চালু নির্বাচনে মরিয়া মোদিকে জিতাতে,  খুঁচিয়ে ঘা করা এক পদক্ষেপ হল ভারতের স্কুল-কলেজে হিজাব ইস্যু খাড়া করা। এতে চরম এক মুসলমানবিদ্বেষ-ঘৃণায় বৈষম্যমূলক আচরণে সমাজ তোলপাড় করা ফেলা, এটাই চলছে এখন। এতে আমেরিকা, ইউরোপ আর এদিকে পাকিস্তান বা ওআইসির নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছে;  আর আসলে এতে ভারত কূটনৈতিক সঙ্কটে পড়ে যায়। কারণ, কূটনৈতিক রেওয়াজে এ’বিষয়টা হল,  আপনি আপনার দেশের সব চিহ্ন-পরিচয় নির্বিশেষে আপনার নাগরিকের প্রতি অ-বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক সাম্যের চোখে দেখতে বাধ্য থাকবেন ও দেখবেন – এটাই “আন্তর্জাতিক পলিটিক্যাল অর্ডার” আশা করে। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই এবার  ভারতের নিন্দা করা হয়েছে।  আর তাতেই কূটনৈতিক ভাষা ও ভাষ্য হারিয়ে বেহাল দেউলিয়া অবস্থায় পড়ে যায় ভারত।  এমন বে-দিশায় পড়ে, ওআইসি-কেই ঐ পুরানা জমিদার-হিন্দুর বয়ানের সাহায্যে “সাম্প্রদায়িক” বলে গালি দেয়া হয়েছে। আর এতে যেন সারা দুনিয়াটা জমিদার-হিন্দুর রাজত্ব – এটাই ধরে নেয়া হয়ে গেছে!  আবার তাদের হিসাব টনটনে, একইভাবে তারা আমেরিকাকে তাদের নিন্দার জবাব দিতে যায় নাই! অর্থাৎ দুনিয়ার মুসলমান মাত্রই তারা যেনবা জমিদার-হিন্দুর প্রজা এই অনুমান শেখানে খাটাতে যায় নাই!
    তাই, এরপরে আমাদের আশা থাকবে যে “সাম্প্রদায়িক” শব্দটার অর্থ-ইতিহাস-তাতপর্য বুঝে এটাকে কিভাবে আমল ও সুলুক করতে হবে তা আমরা নিজেরাই বুঝে নিতে পারব। কারণ জমিদার-হিন্দুর এমন মুসলমান-বিদ্বেষে ভরপুর শব্দের ইতিহাসের পক্ষে আমরা দাড়াতে বা প্রমোট করতে পারি না।

    মুসলমান কোপাতে হবে ও ইসলামবিদ্বেষ একমাত্র ভরসা মোদিরঃ
    প্রায় তিন সপ্তাহ আগের এক লেখায় পরিষ্কার করে লিখেছিলাম যে, একালের ভারতে বিজেপি-আরএসএস বা মোদি একেবারে চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া বা হিন্দুত্ববাদ প্রথমবারের মতো উৎখাত হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পড়েছিল গত ২০২১ সালে। সেবারের মধ্য মার্চে ভারতে নেমে এসেছিল করোনাভাইরাস আক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় আক্রমণের ঝড়! সারা ভারত তাতে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। অক্সিজেন, বেড আর সৎকার, এসব পাওয়ার পুরোপুরি অনিশ্চয়তা – এটাই হয়ে উঠেছিল ভারতের মুখ্য পরিচয় আর মোদি যার প্রতীকী এবং এক অসহায় প্রধানমন্ত্রীর রূপ। সৌদি আরব অক্সিজেন ভরা ট্যাংকার পাঠিয়েছে কার্গো প্লেনে করে কিন্তু তা তিনি দেশে  না দেখিয়েও পারছেন না আবার দেখালে মোদির ইজ্জত যায় অবস্থা! যেন মুসলমান সৌদি আরব তো ‘নিচা’; তার সাহায্য মোদি নিয়েছে এটা কেমন দেখায়? তাই তিনি ঐ ট্যাংকারের উপর রঙ লাগিয়ে সৌদি সব চিহ্ন ঢেকে ঐ অক্সিজেনই ব্যবহার করেছেন, ক্রেডিট নিয়েছেন!  আর তা দেখেই দ্যা-হিন্দু দৈনিকের কূটনীতিক এডিটর সুহাসিনী হায়দার প্রথম নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, তাদের ভারত আসলে, মোদি তাকে যা বুঝায়ছিলেন, এমন কোনো পরাশক্তি নয়! যা নিয়ে মৌদির বয়ানে এতদিন তিনি বিশ্বাস করেছিলেন।  কেবল তখন সেটা তাস্র কাছে পরিস্কার হয়েছে যে ভারত কোন পরাশক্তি নয়। বলেছেন, ভারত নইলে সৌদি সাহায্য নিবে কেন? এ’এক অদ্ভুত ভারতের মিথ্যাবলা প্রধানমন্ত্রী মোদি আর তার সাংবাদিক যার নিজস্ব বুঝাবুঝির মেকানিজমই বিকশিত হয় নাই!

    সেখানে আরো বলেছিলাম, চলতি এই নির্বাচনে “মুসলমান কোপাতে হবে, ইসলামবিদ্বেষ – এটাই হবে মোদির একমাত্র ভরসা। হিন্দুত্ববাদের দিকে ভোটার ফেরানোর একমাত্র উপায়। আর তাই ঘটছে। এ’কারণেই ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, বাইডেন যতই মোদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অবরোধের ভয় দেখান না কেন, মোদিকে আরো বেশি করে এখন মুসলমান কোপাতেই হবে – তা কাশ্মিরে বা সারা ভারতে। এটাই মোদির রাজনৈতিক আয়ু লুপ্ত হওয়া ঠেকানোর একমাত্র উপায় ঠাউরানো যার সোজা মানে, আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাইডেনের সাথে মোদি ভারতের সম্পর্ক আর ভালো হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, বরং আরো সঙ্ঘাতেরই সম্পর্ক হবে। অন্তত ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত!”

    নির্বাচন শুরু হয়েছে, খবর ভালো নাঃ
    শিডিউল মোতাবেক গত ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারতের কিছু রাজ্য বা বিধানসভা নির্বাচন শুরু হয়েছে। আর এর সাথে  মোদির পক্ষে পরিকল্পিতভাবে দুটো চরম ঘৃণা ছড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি করে নেয়া হয়েছে। প্রথমটি ঘটানো হয়েছে, গত ২০২১ সালের ডিসেম্বরের ১৭-১৯ লাগাতার এই তিন দিন। দুই কথিত ‘সাধু’ নরসিংহআনন্দ ও প্রবোধানন্দ গিরি, তারা এর আয়োজক ও বক্তা। এরা আবার বিজেপি-আরএসএসের বিভিন্ন নামের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের প্রধান নেতা। তারা শেখানে বলেছেন, “প্রত্যেক হিন্দুকে ‘সাফাই অভিযান’ পরিচালনার জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হবে। এ ছাড়া আর কোনো সমাধান নেই”। [every Hindu must pick up weapons and we will have to conduct this cleanliness drive (safai abhiyan). There is no solution apart from this.”] আর প্রথমজন বলেছেন, ‘সারা দুনিয়ায় যদি মানুষকে টিকে থাকতে হয় তবে আমাদেরকে জিহাদিদের উপর সাফাই অভিযান চালাতে হবে” [“In the entire world, if we want humanity to last, we will need to clean it of jihadis. ]। এর পরও কারো বুঝতে অস্পষ্টতা যাতে না থাকে তাই বলে দেই, এখানে এই সাফাই অভিযান মানে হল জাতিগতভাবে (মুসলমানদের) সবাইকে নির্মূল করা বোঝাতে ইংরেজিতে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বলে বোঝায়। দুনিয়াতে প্রথম হিটলার ও তার সহযোগীদের এই এথনিক ক্লিনজিং’ এর অভিযোগে বিচার হয়েছিল। সেই থেকে আন্তর্জাতিক আদালতের চোখে এটা সবচেয়ে ঘৃণিত অপরাধ। যার বেলায় শাস্তি হল সর্বোচ্চ দন্ড। সেই থেকে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ – এটাই একাডেমিক বইপত্রে ও আইন-আদালতের ভাষাও সবচেয়ে বড় গোত্রের এক অপরাধ মানা হয় বটে।  এটাই এখন মোদি ও তাঁর গোষ্ঠির প্রধান রাজনৈতিক পরিচয়। অথচ মোদি সরকারের বিদেশ বিভাগের মুখপাত্র সমালোচকদেরই উলটা “সাম্প্রদায়িক” বলছেন!

    গত ডিসেম্বরে কথিত সাধুদের ঘৃণা-সভার পরে প্রায় এক মাস ধরে চলে এদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না দেয়ার-নেয়ার পুলিশি প্রচেষ্টা; এছাড়া কোনো বাদি-অভিযোগকারী পাওয়া যাচ্ছে না, এ অজুহাতও খাড়া করা হয়েছিল। এরপরে ১৫ জানুয়ারি কেবল নরসিংহ-আনন্দকে গ্রেফতার করা হয়। তবুও এমন সব আইনে গ্রেফতার দেখানো যাতেসে সহজেই জামিন পেতে পারে। অথচ ‘জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ’ বা ‘জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি’ – শুধু এ’অভিযোগে কাশ্মির বা নর্থ-ইস্টে অনবরত এমন আইন প্রয়োগ ও গ্রেফতার করে কয়েক বছরের জন্য ফেলে রাখা হচ্ছে; এমন অন্তত চারটি আইন আছে। এসব আইন প্রয়োগ করে তারা, জঙ্গি বা সশস্ত্র সন্ত্রাসী বলে থাকে। অথচ নরসিংহআনন্দের উপর একটা পুরা কমিউনিটিরর উপর এথনিক ক্লিনজিং,  গণহত্যা বা হত্যার হুমকি এসবের কোনটাই অভিযোগ আনা হয় নাই। কেবল ৫০৯ দারার একটা অভিযোগ দেয়া হয়েছিল যে নারী ও সাংবাদিকদের উপর আপত্তির ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে [under section 509 of the Indian Penal Code (IPC) for making objectionable remarks against women and abusing a journalist.]। ফলে স্বভাবতই   ইতোমধ্যে তাঁর জামিনে মুক্তিও  হয়ে গেছে।

    এখন এমন গণহত্যার হুমকির ঘটনার পর এক মাস কেন বিভিন্ন অজুহাতে কোনো গ্রেফতার বা মামলা না করে অপেক্ষা করা হল? মূল কারণ এবছরের পাঁচ রাজ্য নির্বাচন শুরু হয়েছে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় এক মাস ধরে কয়েক পর্বে। তাই ১৭-১৯ ডিসেম্বর ২০২১ সালে ঐ এথনিক ক্লিনজিং আর চরম মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোর বক্তব্য দেয়ার পরও কোনো পুলিশ অ্যাকশন না ঘটানোতে – হিন্দু ভোটারদের মনে উসকানির ঝড় তুলে মানসিকভাবে তাদের প্রভাবিত করার সুযোগ নেয়া হয়। এভাবে এক মাস কাটিয়ে দেয়ার পরে নরসিংহআনন্দ এরপরে গ্রেফতার হয়েছে কি না বা জামিন হয়েছে কি না তা এসব আমজনতা হয়ত ব্যাপারটা আর খেয়াল রাখবে না; বেশির ভাগই মনে রাখবে না – এই ভরসায়। কিন্তু এদিকে হিন্দু ভোটারদের উসকানি দিয়ে এর নগদ ফলাফলে মোদির ভোটের বাক্স পর্যন্ত আনার লক্ষ্যে তাদের মনের ওপর ছাপ ফেলার ঘটনাটা ঘটিয়ে দেয়া তো হয়েই গেছে। এই ছিল পরিকল্পনাটা।

    এবার দ্বিতীয় ঘটনা – স্কুল-কলেজে হিজাবঃ
    নির্বাচন শুরু হয়ে গেলে সেসব রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বিষয়টা নির্বাচন কমিশনের অধীনে চলে যায়। কমিশনের যেকোনো নির্দেশনা মান্য করা সব-বাহিনীর জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। সে কারণে হিজাবের ইস্যুটা উঠানো হয়েছে এমন এক বিজেপিশাসিত রাজ্যে যেখানে এবছর নির্বাচন নাই। ফলে নির্বাচন কমিশনেরও কিছু বলার নাই। কিন্তু আবার ইস্যুটা হাজির করা হয়েছে এমনভাবে যার এফেক্ট ভারতব্যাপী বিস্তৃত হয়। স্কুল-কলেজে হিজাব নিষিদ্ধকরণ ইস্যু যে কারণে এটা কেবল কর্নাটক রাজ্যের ঘটনা। এর ওপর আবার এটা এক-দু’টা স্কুল-কলেজের স্থানীয় পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত। সারা  রাজ্যে বা কর্নাটক শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও নয়। একটা জেলার দু-একটা স্কুল-কলেজে। কিন্তু পাশের আরো দুটো জেলায় জবরদস্তিতে হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাই শুরু করে দেয়া, আন্দোলন, এসব শুরু হয়েছে মোদির ছাত্র সংগঠনকে দিয়ে; অথচ  সংশ্লিষ্ট স্কুল-কলেজ পরিচালনা কমিটি নিশ্চুপ।

    এতে কার্যত হিজাদ নিষিদ্ধ ইস্যুটা সারা কর্নাটক তো বটেই, সারা ভারতের সব রাজ্য ছাপিয়ে ভারতের বাইরে আমেরিকার নিন্দা প্রস্তাব, ওআইসি নিন্দা প্রস্তাব ঘটিয়ে এটা এখন ভারতের জন্য এক গ্লোবাল কূটনীতিক ইস্যু হয়ে গেছে। এতে বলাবাহুল্য এর এফেক্ট নির্বাচন চলছে এমন পাঁচ রাজ্যের উপরই পরিপূর্ণভাবে কার্যকর প্রভাব ফেলেছে। আর এবার তা সেখানকার প্রতিটি ব্যালট বাক্সে গিয়ে আছড়ে পড়বে, বিজেপির ভোটের বাক্সগুলো এখন নিশ্চয় উপচে পড়বে আর মোদি-বিজেপি এরই অপেক্ষায়! এ হল পরিকল্পনা!

    কথিত নিরপেক্ষ হিন্দুত্বের আদালতঃ
    এছাড়া এবার ঘটনাকে আরো পোক্ত করতে কোনো উপায়ই ছাড়া হয়নি; তাই আদালতও।  এদিকে আদালত মানেই ভীষণ বিজ্ঞ, জ্ঞানী মানুষে তা ভরপুর থাকে। তাদের সামাজিক সম্মানও অনেক উঁচুতে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট থেকেও এ’ইস্যুতে বলা হল, তারা এখন হস্তক্ষেপ করবে না; কখন করবে তা তারাই ঠিক করবে বলে রায় দেয়া হয়েছে। আর এ সুযোগে স্থানীয় রাজ্য হাইকোর্ট বিরাট নিরপেক্ষতার ভান নিয়ে হাজির। তারা এক সাময়িক রায় দিয়ে দিয়েছে। সেটা হল, “স্টাটাস কো”;  যার আইনি মানে হল বিবদমান পক্ষগুলো বিবাদ শুরুর আগে যে যেখানে ছিল, সেখানে ফিরে গিয়ে স্থিতাবস্থায় থাকবে, যত দিন আদালত ইস্যুটা নিয়ে বিচার বিবেচনা করে কোনো ফাইনাল রায় না দেয়। এটাই ইউজুয়াল প্র্যাকটিস হয়ে থাকে।

    কিন্তু এখানে বাড়তি একটি টুইস্ট দেয়া হয়েছে। বলছে ‘স্ট্যাটাস কো’; কিন্তু সাথে ব্যাখ্যাও দিচ্ছে যে, এর মানে হল, এই অন্তর্বর্তী বা সাময়িক সময়ে কেউ কোনো ধর্মীয় পোশাকে স্কুল-কলেজে যেতে পারবে না। অথচ এ বলাটাই বেআইনি। এটা নিজেই এক বিরাট বৈষম্য – একেবারে এক সূক্ষ্ম কারচুপি করা যাকে বলে।

    কারণ হিজাব ইস্যু হওয়ার আগে যে যেমন খুশি হিজাব, পাগড়ি, ঘোমটা প্রভৃতি পরে স্কুল-কলেজে যেতে পারত ও আসতও। কাজেই ‘পূর্বাবস্থা’ বলতে এটাকেই বুঝায়। কিন্তু ব্যাখ্যায় তা না বলে উল্টো ধর্মীয় পোশাক পড়া যাবে না [we restrain all the students regardless of their religion or faith from wearing]  এ কথা বলে আসলে কথিত এই সাময়িক সময়ের রায়ের কথা বলে যারা হিজাববিরোধী মোদি-বিজেপির লোক এদের দাবিকেই মেনে নেয়া ও এদের পক্ষেই রায় দিয়ে দেয়া হয়ে গেছে। অর্থাৎ দুপক্ষের কথা শুনে বিচার বিবেচনা করে ফাইনালি রায় হবার আগেই we restrain বলে হিজাবকেই বাদ দেওয়ার কর্তৃত্ব কোন বিচারকেরই নাই। কিসের ভিত্তিতে আপনারা we restrain বললেন???  কারণ, এই সাময়িক রায়টাও তো কোন শুনানির শেষে দেয়া নয়,  করা হয়নি। অথচ, আদালত যেন খুবই একটি নিরপেক্ষ সাময়িক সিদ্ধান্ত দিয়েছে এই ভাব করে তাদের হিন্দুত্বের খেয়াল এটাই চাপিয়ে দিয়েছে।

    “Pending consideration of all these petitions, we restrain all the students regardless of their religion or faith from wearing saffron shawls (Bhagwa), scarfs, hijab, religious flags or the like within the classroom, until further orders.”

    এখন পরে কী ফাইনাল রায় হবে তা আগেই বলে দেয়া যায়। এ’বছরের নির্বাচন কেবল এই পাঁচ রাজ্যে আর তা কেবল ১০ মার্চ পর্যন্ত। এর মানে হল ১০ মার্চের পরে আদালত ফাইনাল রায় দিলে আর সেখানে আবার হিজাব পরে স্কুল-কলেজে আসার পক্ষেও যদি আদালত রায় দেয় তো বিজেপির আপত্তি হবে না; কারণ পরের বছরের আগে আর নির্বাচন নাই। অর্থাৎ এখনকার এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞাটা যেঁ বিজেপির পক্ষে কাজ করে দিয়ে আদালত বিজেপির হিন্দুত্ব ও ভোট জোগাড়কে সাহায্য করল। আবার ফাইনাল রায় হিজাব পড়ার পক্ষে  দিবার পথ খুলে রেখে বিচারক বিরাট উদার সাজবার পথ পরিষ্কার রেখে দিলেন, এবং তেমন রায়ও দিতে পারবেন।

    ভারতের উচ্চ আদালতগুলোর ভেঙে পড়ার ইতিহাসঃ
    এমনিতে ভারতের উচ্চ আদালতগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশের চোখে আমাদের দেশের অনেকে ভূয়সী প্রশংসা করতে দেখা যায়। কিন্তু বটম অব দ্য ফ্যাক্টস হল, ভারতের আদালতগুলো রাজনীতি বা সরকারের কাছে স্বেচ্ছায় নিজেদের সব ক্ষমতা সমর্পণ করার পেশাগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ১৯৭৫ সালে। কেন ও কখন? প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী কারচুপির জাজমেন্টে তাকে দোষীকরে রায় দেয়া হয়ে যায়। এরপর বাকি ছিল তিনি কিভাবে শাস্তি হিসাবে জেলে যাবেন তার ব্যবহারিক সিদ্ধান্ত নেয়া কেননা তিনি সিটিং প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর এরপর ইন্দিরার উপর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ত্যাগ করে নিয়ে এরপর শাস্তিভোগের জন্য তৈরি হয়ে আসতে আদালতের সিদ্ধান্ত-রায় দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ইন্দিরা আদালতের সেই নির্দেশ পালন না করে, রায় উপেক্ষা করে –  ক্ষমতায় থেকেই উল্টো দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে বসেন। এভাবে তিনি এই শাস্তি গ্রহণ  জীবনেও আর করেন নাই।

    আর সেই থেকে আইন পেশার সব লোক, রাজনীতিবিদ মিলে মূল্যায়নে গিয়েছিলেন যে, জাজদের অমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সাথে সংঘাতে যাওয়াতে তাতে কোন লাভই হয়নাই  উলটা ভারত-রাষ্ট্রই নাকি  দুর্বল হয়ে গেছে। তাই তাদের আপস করা উচিত ছিল।’ এমন সঙ্ঘাতের এই নাকি মহিমা। অর্থাৎ আদর করে যেন বলা যে “রাজনীতিবিদেরা খুব দুষ্ট”।  অতএব মন্দের ভাল হিসেবে ক্ষমতার সাথে আপস করাই নাকি ভাল – এই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত। কেন?

    কারণ না হলে জরুরি অবস্থা দিলে তো তা রাষ্ট্রই না থাকার সমান, এই ক্ষতি হয়। ফলাফলে জরুরি অবস্থা পাওয়ার চেয়ে তাই নির্বাহী ক্ষমতার সাথে আপস করা অথবা এড়িয়ে চলা হলো -এটাই সর্বোত্তম পন্থা। এটাই নাকি আদালতের পথ। যদিও এর কোনো লিখিত প্রস্তাব পাওয়া যাবে না, তবে এটাই সেই থেকে তাদের অলিখিত চর্চা ও বুদ্ধিজীবিতা!  আর এ সুযোগে দেখা যাচ্ছে এখন যেটা হয়েছে, একদল বিচারক হয়েছেন যারা এ সুযোগে প্রধান নির্বাহীর কাছ থেকে নানা পার্সোনাল সুবিধা আদায় করে নেয়ার সূক্ষ্ম তৎপরতা চালিয়ে, কে কত বুদ্ধিমানের মত মোদির সাথে সঙ্ঘাত এড়িয়েছেন সেই ক্রেডিটের গর্ব ও এর প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছেন। তাতে  ভারতের পরপর গত দুই প্রধান বিচারপতি যে এই দোষ দুষ্ট আছে তা আমাদের দেখার সুযোগ হয়েছে। একজন বিশেষ মটর সাইকেল চড়ার খায়েস মিটালেন। অপরজন আসাম জাতিবাদের পক্ষে জাতির-সৈনিক হয়ে গেলেন!
    এতে প্রায়ই ভারত-রাষ্ট্রের বড় বড় দুর্বলতা বা ‘ফুটাফাটা’ এসবের কারণে, এটি ভেঙে পড়ার দিকে এগোচ্ছে বলা হয় – সে পথের সবচেয়ে বড় এক গর্ত হল, এই নির্বাহী ক্ষমতার সাথে আপস, এড়িয়ে যাওয়া তথা হবু জরুরি অবস্থা এড়ানোর বিরাট বুদ্ধি প্রয়োগ-কথা!

    মুসলমান কোপানো, ঘৃণা ছড়ানোর সাথে ভোটের সম্পর্কঃ
    অনেকের মনে হতে পারে মোদির মুসলমান কোপানো, ঘৃণা ছড়ানোর নীতি-পদক্ষেপের সাথে ভোটের সম্পর্ক কী? আমরা বোধহয় বাড়িয়ে দেখছি ব্যাপারটাকে। তা অবশ্যই না। ভারতে এখন রাজ্য নির্বাচন চলছে পাঁচ রাজ্যে যেখানে সবচেয়ে বড় উত্তরপ্রদেশ রাজ্যও আছে। কত বড়? ভারতে কেন্দ্র সরকার গড়তে মোট ন্যূনতম ২৭২ আসনে জিততে হয়। এই ২৭২টার ৮০ আসন সংগ্রহ করা সম্ভব একা এই উত্তরপ্রদেশ থেকেই, যার মানে ২৭২ এর প্রায় তিনের এক ভাগ আসন পেয়ে যাওয়া। একারণে বলা হয়, কেউ কেন্দ্রে সরকার গড়তে চাইলে উত্তরপ্রদেশে জেতা গুরুত্বপূর্ণ’ যদিও এখন যা চলছে তা কেন্দ্রের নির্বাচন না; রাজ্য নির্বাচন। কিন্তু এখন উত্তরপ্রদেশ রাজ্য নির্বাচনে জিতলে তবেই না ২০২৪ সালে কেন্দ্র নির্বাচনেও  উত্জেতরপ্তারদেশের আশি আসনের বেশির ভাগ পাওয়া সম্ভব! একারণে এবারের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে মোদি মুসলমান কোপায়ে যেকোনোভাবে জিততে মরিয়া!

    ঘটনার কেন্দ্র কৃষি আইনবিরোধী আন্দোলনঃ
    এই প্রথম এটা রেকর্ড যে, একটা কৃষক আন্দোলন ১৫ মাস ধরে লাগাতার ভারতের হাইওয়ে রাস্তায় বসে থেকে প্রতিবাদ করে শেষে জয়ী হয়েছে। দিল্লি-উত্তরপ্রদেশের সংযোগ হাইওয়ে সড়কের মুখ্য শহর গাজিপুর। এটাই ছিল সেই আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি। হিন্দু জাতিবাদী আনন্দবাজার পত্রিকাও একে ‘ধাত্রীভূমি’ [ইতিহাসের ধাত্রীভূমিতে কি ক্ষতির আশঙ্কায় বিজেপি? ] বলে উচ্ছ্বাস দেখিয়েছে। এঅঞ্চলটাকে ‘পশ্চিম উত্তরপ্রদেশও’ বলা হয়। এটাই মোদির জন্য কাঁটা বিছানো ভূমি। এখানে মোদি হাঁটলে পায়ে কাঁটা বিঁধবে খালি। অথচ বিরোধী অন্যদের বেলায় হবে উল্টোটা। দিল্লিসহ এ অঞ্চলের আবহাওয়া হল – গ্রীষ্মে যত তপ্ত গরম, শীতকালে ততই শীত। অথচ এখানেই ১৫ মাস ধরে অনেকেই বউ-সংসার সাথে নিয়ে রাস্তায় বসে-শুয়ে কষ্ট করে গেছেন। শেষে মোদি তাদের সবার কাছে হার স্বীকার করে মাফ চেয়েছেন, চালু করা তার তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার বা বাতিল করেছেন। কেন?
    এ অঞ্চলটা আশপাশের হরিয়ানা, পাঞ্জাব বা উত্তরপ্রদেশের বাকি যারা বাণিজিক কৃষিকাজ করে থাকেন, তাদের সবার চেয়েও সমৃদ্ধ এবং আসলে অগ্রগামী স্বার্থের বড় কৃষক লোকেদের বসবাসের স্থল। এদের জাট বা জাঠ, ইংরেজিতে জাঠল্যান্ডার বলা হয়; এমন এদের বৈশিষ্ট্য হল – মিনিমাম পাঁচ একর বা বেশি ও উর্বর জমিকে ঘিরে এদের কারবার এবং পাইকারি কৃষিপণ্যের বাজারের  (মান্ডির) বড় সাপ্লায়ার এমন কৃষক এরা। পাকিস্তানের করাচিতে বা কাশ্মিরেও এমন ‘জাঠদের’ দেখা মিলবে। আর তত্ত্বটা হল, যত আরবাইনাইজেশন বা শহুরেকরণ ঘটবে, ততই জাঠ কালচার বড় হবে, তাদের প্রভাব বাড়বে। এরাই ছিল ঐ কৃষক আন্দোলনের মূল আপসহীন অংশ। কিন্তু এমন জাঠ অঞ্চলে হিন্দু-মুসলমান জাঠের টেনশন প্রায়ই ঘটে থাকে, হয়েছেও স্থানীয় ভাষায় এটাকে তারা আবার জাঠ ও মুসলমান দ্বন্দ্ব বলে বুঝে।

    মোদির ২০১৪ সালের প্রথম কেন্দ্রে সরকার গঠনে নির্বাচনের আগের প্রায় এক বছর অমিত শাহ, ‘দা মাস্টারমাইন্ড অব দাঙ্গা’ – তিনি এসে এই উত্তরপ্রদেশে কাটিয়েছেন। তারই পদক্ষেপে মুজাফফরনগরে তিনি পরিকল্পিত দাঙ্গা ঘটিয়েছিলেন, যার নগদ পরিণতি হল জাঠ-মুসলমান শত্রুতাকে চরমে তোলা, ভোট ভাগ হয়ে যাওয়া। আর সেটারই ব্যালট ফলাফল ছিলল, ২০১৪ নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের মোট কেন্দ্রিয় ৮০ আসনের ৭২ আসন মোদির ব্যাগে। এমনকি অমিত শাহের এই ‘শত্রুতা’ বিক্রি করেই বিজেপি পরে ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশ বা ইউপি রাজ্য নির্বাচনে বিজয় লাভ করেছিলেন।  এবং পরে ২০১৯ সালে মোদির দ্বিতীয়বার সরকারের আসার জয়ও সম্পন্ন করেছিলেন, একই জাঠ-মুসলমান বিভক্তির কাধে চড়ে। কিন্তু এবার আর নয়। কেন?

    এরই মধ্যে এবার এই জাঠ ও মুসলমান একযোগে মোদির বিরুদ্ধে রাস্তায় কৃষি আন্দোলন করে ফেলেছেন এবং জয়ী হয়েছেন। আর এতেই মোদি মাফ চেয়েও যে এই বিরোধী ঐক্যের পাথর সরাতে পারবেন না, তা জেনেও যতটা যা করা যায় মনে করে লজ্জ্বার মাথা খেয়ে মাফ চেয়েছেন। আর তার একমাত্র করণীয় করেছেন যে মুসলমান কোপানো আর বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানো তুঙ্গে তোলা প্রবলতরভাবে তা সম্পন্ন করতে গেছেন, আর এখান থেকেই বাড়তি হিজাব বিতর্ক। স্কুলের ছোট বা টিন-এজ মেয়েগুলোকে মানুষের মর্যাদা হারিয়ে অপমানের অভিজ্ঞতায় অবলীলায় ডুবিয়ে দেয়ার এই নিষ্ঠুরতা।

    ইউপি নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ৫৮ ও ৫৫ আসনের এলাকায় নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেছে ইতোমধ্যে; বিশেষ করে প্রথম ৫৮ আসন – এই-ই সেই জাঠ অঞ্চলের। মোদির ভাগ্য এখানেই নির্ধারিত হবে। তবে এর ফলাফল পেতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী ১০ মার্চ। যদিও এরই মধ্যে আগাম মিডিয়া পূর্বাভাস মোদির বিরুদ্ধেই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৯ ফেব্রুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব, ওআইসিকে বলে সাম্প্রদায়িক!” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • আমাদের স্মৃতি  ও অসংবেদনশীল লতা

    আমাদের স্মৃতি  ও অসংবেদনশীল লতা

    গৌতম দাস

    ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3UR

     

                                            Lata Mangeskar (1929-2022)

    _

    সমাজ কোনো ব্যক্তির গুণাবলিকে তুলে ধরতে সহায়তা করে থাকে, তার ভাল গুণ থাকলে তা ফুটিয়ে তোলার কাজটা করে থাকে। উল্টা করে বললে, সমাজের ওপর ভর করেই ব্যক্তি ফুটে ওঠে, ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠে। এমনকি তার গুণের উচ্চতা যদি অনেক উপরের হয় তাতে অনেক সময় তার বড় কিছু ত্রুটি যদিও ওই গুণের উচ্চতার নিচে-আড়ালে চলে যায়, তবু এসব অর্থে আমরা বলি, ব্যক্তিত্ব সমাজের সৃষ্টি।

    আবার কোন কোন ব্যক্তিত্ব তার ভাল-মন্দ যাবতীয় গুণ ও ত্রুটিসহই কখনও সমাজের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। তেমনি এক ব্যক্তিত্ব সম্ভবত গত আট যুগের বিখ্যাত গায়িকা লতা মঙ্গেশকর। গত ৬ ফেব্রুয়ারি ৯২ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার কেরিয়ার বা পেশাদার গায়িকা জীবনই অনেক লম্বা, প্রায় ৭২ বছর। এক মারাঠি পরিবারে জন্ম নেয়া লতার পেশাদার গানের জগতে প্রবেশ বা প্রথম তাঁর গলায় সিনেমার গান  রেকর্ডিং বলা হয় ১৯৪৮ সালের আশপাশের সময়ে। ব্রিটিশ-ভারত মানে অখণ্ড ভারত থাকার সময় থেকেই ভারতে সিনেমা – এই নয়া মিডিয়ার জন্ম হয়েছিল। তাতে নির্বাক-সবাক হয়ে চলচিত্রের উত্থানের শুরুর কালেই লতার আগমন। তবে এই সিনেমা নির্মাণ যখন নিজের জন্যই একদিকে নিজের বোদ্ধা দর্শক ও প্রশংসাকারী জড়ো করছে আর অন্য দিকে টেকনিশিয়ানগোষ্ঠী তৈরি করে সাজিয়ে বসতে শুরু করেছিল ততদিনে দেশ ভাগ হয়ে যায়। তবু ভাগ হওয়া আজকের তিন দেশে ভারতীয় সিনেমার প্রতি আগ্রহ ভাগ হয়ে যায়নি বা কমে যায়নি।

    সম্ভবত এর মূল কারণ  কমন অরিজিনের এক সাংস্কৃতিক বন্ধন; এ’তিন দেশের সংস্কৃতির মৌল উৎসগুলো একই জায়গার। এথনিক অর্থে মানুষ মাত্রই তার জাতিগত পরিচয় থাকে। আবার আমরা কোনো না কোনো সিভিলাইজেশনের অন্তর্গত থেকে বড় হই। এই বিচারে আমরা সবাই সিন্ধু সভ্যতার অংশ। তাই সিভিলাইজেশন অর্থে এর একই এথনিক জাতি পরিচয় আমরা তিন দেশেরই কমন বৈশিষ্ট্য। সংস্কৃতির অংশ হিসেবে প্রাচীন ভারতের যত প্রকাশ দেখা যায় বা এ সম্পর্কে জানা যায় এর এক বড় চিহ্ন হল সংস্কৃতিতে গানের ধারা এবং ধরনগুলোর স্টাইল ও বৈশিষ্ট্য। যেমন আমাদের এই গানের ধারা পশ্চিমের সভ্যতার কোন ধারা অথবা আরব বা মেসোপটেমিয়ার ধারাও হওয়ার কথা নয়। প্রাচীন ভারত বলতে গেলে এর দাবিদার আমরাও কারণ এর বহু চিহ্নবৈশিষ্ট্য আমরা এখনো বহন করি। যেমন একটা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এর কেন্দ্রে আছে; এমন এক চিহ্ন সম্ভবত রাগসঙ্গীত ও এর ঘরানা মানে স্কুলগুলোতে যার প্রকাশ। তাই সভ্যতার চিহ্ন হিসেবে ক্লাসিক মিউজিক একটা খুবই শক্ত চিহ্ন হয়ে আছে। তবে এখন পলিটিক্যালি ডিভাইডেড দেশ তিনটাতে সভ্যতার রূপ-পরিণতিতে কী কী রূপ নিয়ে প্রকাশিত আছে, সেখানে অর্জনগুলো কেমন কী, আর তা কে কত অবিকশিত অর্থে ছোট বা বড় এসবের বিচারের ক্ষেত্রে তুলনায় ফারাক যতই যা নজরে আসুক, ভারত-পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সংস্কৃতিতে গানের ভিত্তি বা ফাউন্ডেশন একই।

    কোক স্টুডিও-এর যুগেঃ
    গত ১৯৪৭ সাল থেকে ভাগ হয়ে যাওয়ার পরও আমাদের গানের ভিত্তি এক হওয়া সত্ত্বেও আমরা কে কেমন কতদূর বিকশিত হয়েছি, অর্জন করেছি তা এক সহজ তুলনা করে বুঝার উপায় হতে পারে এমন কিছু সম্ভবত এখন এসে গেছে। সেটা হল কোক স্টুডিও।
    এখানে স্টুডিও বলতে মূলত গানের রেকর্ডিং স্টুডিও। অর্থাৎ রসুইখানা যেখানে ফাইনাল প্রডাকশনটা তৈরি হয়েছে। আর কোক বলতে বহুজাতিক পানীয় প্রস্তুত কোম্পানি ‘কোক’ এর কথাই বলা হচ্ছে, অবশ্যই। তবে এখানে এর ভূমিকা কেবল অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা করা সূত্রে যতটুকু; যাতে জোগানো তাদের অর্থের বিনিময়ে এই গানের তৎপরতা ও প্রচারের সাথে জুড়ে থাকার সুবিধায় কোক কোম্পানিও প্রচার ও প্রসার পায়। এ’থেকেই নামের ব্রান্ডিং  আর সেই ব্রান্ড নাম ও শব্দটা হয়ে দাঁড়ায় কোক স্টুডিও।

    এর শুরু ২০০৮ সালে পাকিস্তান থেকে। সাধারণত এমন গানের আয়োজন মানে, সংস্কৃতিতে গান এই শিল্পকলা সৃষ্টির আয়োজনে এক কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব লাগে। আর তাঁকে  অর্গানাইজার বা সংগঠক হতে হয়; আর তাঁকে গানের ও সমাজের এমন দুই অর্থেই সংগঠক হতে হয়। অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, কোক স্টুডিওতে এমন সংগঠক যারা হচ্ছেন  তাদের টেকনিক্যাল গুণ হল তারা সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ব্যাকগ্রাউন্ড বা মিস্কিং ইত্যাদি এসব অন্তত বুঝেন ভাল; আর সাথে সেন্স অব মিউজিক। স্বভাবতই তা নিশ্চয় পশ্চিমা-কালচারাল গানের বোধ বুঝাচ্ছি না। সেটা থাকলে তা বাড়তি ভাল, তুলনা করে তাঁরা নিজের বোধগম্যতা বাড়াতে পারবেন। কিন্তু মূল জিনিস হল, নিজের এথনিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ও ইতিহাস সম্পর্কে একটা ভালো রকমের বোধ থাকতে হবে।

    পাকিস্তানে গত ২০০৮ সালে পাকিস্তান-কোক-স্টুডিও শুরু হয়েছিল এমন যে কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বের হাত ধরে তার নাম রোহেইল হায়াত [Rohail Hyatt]। গত ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানে গানের কম্পোজার হিসাবে  তাঁর আগমন; এসে পাঁচবছরের মধ্যে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন শুরু করেছিলেন, বলা হয়। এরপর নানা এলবামে কাজ করার পর তার উল্লেখযোগ্য  সব ছাপিয়ে গুরুত্বের কাজটা হল কোক স্টুডিও, এই প্রডাকশন।  এখানে পাকিস্তান সমাজের কাদের কাদেরকে বেছে তুলে এনে রোহেইল তাঁর গানের ধরন ও বৈচিত্র্য বা কম্বিনেশনের ডালি সাজাচ্ছেন তা লক্ষণীয়। সে দিকটা খেয়াল করলে তার ওজন বুঝা যাবে। পাকিস্তান কোক স্টুডিও-এর সফলতার তিন বছর পরে ভারতে একই আইডিয়াতে ইন্ডিয়ান কোক স্টুডিও শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে; দক্ষিণী কম্পোজার বা সুরকার লেসলি লুইসের [Leslee Lewis] হাত ধরে। আরেক দক্ষিণী গায়ক হরিহরণকে সাথে নিয়ে ১৯৯৬ সালে তার বহুল আদর পাওয়া অ্যালবামের নাম “কলোনিয়াল কাজিন”। তরুণদের টিভি এমটিভি এর কল্যাণে,  এ’নামেই লুইসকে বেশি মানুষ চেনে।

    দুই কোক স্টুডিও-এর তুলনা আমাদেরকে আমাদের একই প্রাচীন উৎস এবং একই সাথে আমাদের ভিন্নতা সম্পর্কে অনেক কথা বলতে পারে, পরিচয়  করাতে পারে। আগেই বলেছি অবিভক্ত ইন্ডিয়ান ধারার সংস্কৃতিতে এক বড় কমন চিহ্ন হল ক্লাসিক মিউজিক যা দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় আমাদের কালচারাল উৎস একখানে। ক্লাসিক গান বা রাগ-প্রধান গান শুনে সচেতনরা ছাড়া অন্যদের বোঝা মুশকিল হতে পারে যে, সেটা ভারত না পাকিস্তানের উপস্থাপন।

    কিন্তু এরপর যদি ভারত-পাকিস্তান কোক স্টুডিওর মধ্যে ফারাক – মানে কে কোন দিকে গেছে বিকশিত হচ্ছে অভিমুখ কী তা তুলনা করে বুঝতে চাই তা হলে, ভারতের কোক স্টুডিও দেখে বোঝা যাবে ভারতের গানের জগত বাণিজ্যিক ভিত্তি খুঁজে নিতে পেরেছে। বাণিজ্যিক ভিত্তি বলতে “মডার্ন ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি” জগতের ভারত যার সবচেয়ে বড় প্রকাশ হল ভারতীয় বাণিজ্যিক সিনেমা। অর্থাৎ ভারতের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ইন্ডিপেনডেন্ট অর্থে স্বাধীন নয় বরং তা  এক সিনেমা জগতকেন্দ্রিক। ফলে ভারতীয় কোক স্টুডিওতে এর গান, অর্জন ও পারফরমেন্সে এটা মডার্ন এবং সিনেমাকেন্দ্রিকতার ছাপে ভরপুর।

    তুলনায় পাকিস্তান কোক স্টুডিওর বৈশিষ্ট্য হল, সে দেখিয়েছে সে পাকিস্তান এলিট ঘরের কিন্তু গভীর মিউজিক সেন্সের তরুণ যারা পপ বা রক ধরনের মিউজিক থেকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লাসিকে এসে গেছে; তাদেরকে রোহেইল তুলে এনেছেন। কিন্তু সেই সাথে রোহেইল শেষে একেবারে ক্লাসিক কাওয়ালি বা বুল্লেহ শাহকে পর্যন্ত একাকার করে  পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন আমাদের।  এমনকি বিস্ময়কর এক ব্যক্তিত্ব হলেন সাইন জহুর  যিনি আমাদের মত অক্ষরের-শিক্ষায় জীবন যাপন করেন না। তাঁর ফোনেটিক্যাল মানে শব্দ উচ্চারণের দুনিয়ায় এই মাধ্যমে তাঁর চলাচল। অক্ষর না চিনে নিজের গলার স্বর বা শব্দের উচ্চারণ দিয়ে নিজের জগত গড়েছেন; গানের লিরিক যিনি অক্ষরে দিয়ে না আঁকিবুঁকিতে নোট নেন; তাঁকেও রোহেইল আবিস্কার করে আমাদেরকে পরিচয় করে দিয়েছেন।  পাকিস্তান কোক স্টুডিও আমাদের দেখাচ্ছে পাকিস্তানেরও গানের শক্তিমত্তা কত সমৃদ্ধ কত বিস্তৃত। বুল্লেহ শাহদের আখড়া এখনও কত সক্রিয়, নুসরত ফলে আলীদের ঘরানা এখনও কেমন দাপটের সাথে টিকে আছে। তাঁরা এখনও পাকিস্তানে হারিয়ে যান নাই, নিজের মত সারভাইবালের স্ট্রাগল করে হাজির থাকার চেষ্টা অরে যাচ্ছেন।
    তবে একই ক্লাসিক কালচারাল অরিজিনের ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে গানের শক্তিমত্তার দিক থেকে পাকিস্তান সম্ভবত এগিয়ে কিন্তু আবার এই শিল্পকলাকে পেশা হিসেবে নেয়ার ক্ষেত্রে, বাণিজ্যিক ভিত্তি দেয়ার ক্ষেত্রে ভারত অতুলনীয় উঁচুতে উঠে গিয়েছে। যে ভারতে শিল্পকলার মুখ্য বা ফোকাস ইন্সটিটিউশন যদিও ঠিক গান অথবা নাটক থিয়েটার নয়, সিনেমা। ফলে কাউকে বা কারও অর্জন ফেলে দিবার নয়! স্বভাবতই এ কারণে দেশগুলো যার যার বাড়তি সুবিধার বা অর্জনের দিক অথবা অসুবিধা বা অবিকশিত নেতিদিকও অবশ্যই আছে ও তৈরি হয়েছে।

    কেন লতার আলাপের মধ্যে এদিকে এত দূরে এলামঃ
    মানুষের আবেগ-অনুভূতির ওপর দাঁড়ানো মানুষের শিল্পকলা বা ক্রিয়েটিভিটি [creativity] চর্চার দিক – সাধারণভাবে দেখলে মানুষের জীবনে একটা পেশা খুঁজে পাওয়া বা নেয়া যতটা কঠিন, ক্রিয়েটিভিটির জগতে এটা তার চেয়েও কঠিন।  মানুষের শিল্পকলা-বোধের জন্ম থেকেই এটা এমনই কঠিনতর।  তাই, জন্ম থেকেই শিল্পকলা-বোধের আদি লড়াই হল খোদ নিজ নিজ বিষয়-আশয়ের জীবনের সাথে। সোজা বাংলায়, পেটের সাথে। কেউ যে শিল্পকলা চর্চায় লিপ্ত হবে তো খাবে কী অথবা কে তাকে খাওয়াবে এই হল সেই মুখ্য প্রশ্ন। এটাকেই আরেক শব্দে প্রকাশ করতে বলা হয়”পৃষ্ঠপোষকতা” কে দিবে? মানে কার অর্থে ‘পেটের চিন্তা’ না করেও নিশ্চিন্তে শিল্পকলা চর্চায় ব্যস্ত হওয়া যায়? কোন যুগ-কালেই এই প্রশ্নের কোন জবাব কেউ দিতে পারে নাই। কারণ এর সমাধান নাই। তাই পায় নাই সেকালেরও শিল্পকলা-বোধের মানুষেরা……।

    অতএব, এই প্রশ্নে শিল্পকলা সব সময় একটা আপস করেই এপর্যন্ত চলে এসেছে বা টিকে গেছে, আছে। যেমন সেটা হল, যদি সেটা রাজ-রাজড়ার আমল হয় তো রাজাদের স্তুতিমূলক গানের  তৎপরতা কেটেছে। যেমন রাজ-বন্দনামূলক গান।  আর এটাকে বলেছি রাজ- পৃষ্ঠপোষকতা। অথবা অন্যদিকে ফিরলে আমরা পাই মন্দিরে মাজারে আখড়ায় স্পিরিচুয়াল ক্ষুধা মিটানোর গান, ভক্তিসঙ্গীত, ভজন, কাওয়ালির ধরনে চলে যাওয়া। আর এখান থেকে গণমানুষের দান, ভালোবেসে দান, এমন সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতায় বেঁচে থাকা। কিন্তু এখানের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল – এই ধারা আরো খুবই সিরিয়াস ক্লাসিক্যাল ধারা।  যেন শ্রেফ ভাল পৃষ্ঠপোষকতা নয়। সে সবকে ছাড়িয়ে মোক্ষলাভের জন্য সে মন্দিরে মাজারে আখড়ায় স্পিরিচুয়াল ক্ষুধা মিটাতে হাজির হয়েছে। নিজ আত্ম-ক্ষুধায় গানের ভিতর দিয়ে সে কোন একক স্পিরিটে পৌছানোর কসরত করছে!! এমনকি জমিদারির কালে, বাঈজি জীবনের মধ্য দিয়ে ক্লাসিক গানকে টিকে থাকতে হয়েছে। সেকালে এমন আরেক রূপ করাচিতে দেখা যেত ‘মুজরা’ বসানো…।  শিল্পকলায় স্ট্রাগল-এর কোন শেষ নাই…।

    বলা হয়, আসলে যা “মনের থেকে” ভাল লাগে তার “দাম” [beyound value] হয় না। আবার উল্টা দিকটা হল যে ব্যক্তি এটা শিল্পকলা-বোধে  ‘সৃষ্টি’ করে আপনার সামনে হাজির করেছে তাকে বাঁচিয়ে রাখবেন কী করে, সে খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকবে কী করে? তাই একটা বিনিময় মূল্য তাঁর অবশ্যই লাগবে। এই প্রশ্নও কম জরুরী নয় বরং  আরেক ভাইটাল প্রশ্ন! যার জবাব দিতে হবে বা পেতে হবে!

    আর বাণিজ্যিক সম্পর্কের যুগে এরই এক ধরণের আপাত সমাধান হল, পেশা হিসেবে শিল্পকলার যেকোনো এক শাখায় এতে পেশাদার পারফরমার হিসেবে একদিকে শিল্পকলার চর্চা, অন্যদিকে পেটের চিন্তার সমাধান পেতে হবে বা ব্যবস্থা করতে হবে ও হয়েছে। তবে বলাই বাহুল্য, এই বাণিজ্যিক সমাধান – এটাও এক বড় কম্প্রোমাইজ। জন্ম থেকেই কোন আপোষ করা ছাড়া কোনো শিল্পকলা চর্চা নাই, ঘটে নাই। মানে, মানুষের শিল্প-চিন্তার প্রকাশ সেটাকে “বেচাবিক্রির বস্তু” করতেই হয়েছে। আর বেচাবিক্রির বস্তু  না করে কেমনে নিজের ভরণ-পোষণ হবে – সেই প্রশ্ন  এড়িয়েই শিল্পকলাকে এই আপস করেই  নিজেকে বাস্তব করে চলতে হয়েছে। তাই একেই শিল্পকলা আছে – বলা যাচ্ছে!

    এ ব্যাপারে ভারতে যে বিকাশিত রূপটা হাজির হয়েছে সে দিকে তাকিয়ে বললে ভারতে শুধু বা মূলত গানকে পেশা হিসেবে নেয়ার ব্যবস্থা দাঁড় করানোতে যায়নি। বরং আরেকটা আরো বড় মাধ্যম তৈরি করে নিয়েছে; আর এটাই হল সিনেমা জগত। আর সিনেমারই এক গুরুত্বপুর্ণ অঙ্গ হতে পেরেছে বলেই গান এই শিল্পচর্চাটা টিকে গেছে ও আছে, সিনেমার আরেক শিল্পকলা রূপ হিসেবে  গান সাথে জুড়ে গিয়েছে। তাই এখন এভাবে বলা যায়, বাণিজ্যিক সিনেমার ভেতর দিয়ে টিকে আছে ক্লাসিক মিউজিক। তবে ঠিক ক্লাসিক রূপে না, মডার্ন মিউজিক হিসেবে।
    এখন অলক্ষ্যে এ দুইয়ের সম্পর্কটা বলে রাখা যাক। সেটা হল ক্লাসিক মানে ব্যাকরণসম্মত দিক এবং যা ভিত্তিমূলক দিক – শুধু তাই না। যেকোন ক্লাসিক দিকের মর্ম উপলব্ধি করতে গেলে “বোদ্ধা ট্রেনিং” থাকা লাগবে। এপ্রিশিয়েশন [appriciation] বোধ হুশ-জ্ঞান লাগবে। সেটা না জানলে প্রশংসা বা মূল্যায়ন করা যায় না – এই হল সুত্র।  কিন্তু আবার আরেক সমস্যা হল কাজটা ক্লাসিক হলেও তা হাজির করতে হবে সাধারণ্যে এবং তা জন-সাধারণের বোধের সীমায় পৌছে দিয়ে। অন্যভাবে বললে তত্ব নয় ব্যবহারিক রূপ লাগবে। আর সেটাই ব্যবহার দক্ষতায় ব্যবহৃত ও সৃষ্ট নতুন রূপটা আম আদমির সামনে পেশ-প্রদর্শন করে তাদের কোনো না কোনো বোধগম্যতায় তা আনা; আর সবচেয়ে বড় কথা, তাদেরকে আনন্দ-মজা দেয়া; সাধারণের জীবন অসংখ্য টেনশনের জীবন – সেটাকে রিল্যাক্স করার বা স্ফুর্তি জাগানো যার লক্ষ্য  – এই রূপটাই আধুনিক গান। সেকারণের যার গানের ক্লাসিক দিক নিয়ে নুন্যতম বোধ অভিজ্ঞতা আছে সেই  ফিরে আধুনিক গানে ভালকিছু করতে পারবে ও দীর্ঘযাত্রায় টিকে যাবে।

    তাহলে লতা মঙ্গেশকর আমাদের কে?
    সাধারণভাবে বললে, এথনিক-সাংস্কৃতিক সভ্যতায় অরিজিনে মিল অর্থে এখনকার ভারত আসলে আমাদের এক কাজিন যেন; চাচাত-মামাত ভাই-বোন যেমন। যদিও একই ব্লাড, ডিএনএ ইত্যাদি আমাদের। তবুও আপনার কাজিন আপনার চেয়ে বহু ও বেশি গুণে গুণান্বিত হতেই পারে। আবার আপনার থেকে খারাপ এবং কদর্যও হতে পারে। কিন্তু ‘কাজিন’ বলছি কেন? মূল কারণ এথনিক-সাংস্কৃতিক সভ্যতাগত মিল ও একই হবার কারণে।

    এখন ভারতেই কেবল শিল্পকলা প্রভাবশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পেরেছে – মুম্বাইভিত্তিক সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বা বাণিজ্যিক সিনেমা রূপে। আরই এরই বগলে লেগে ঝুলে হাটছে গানের চর্চা। আর লতা মঙ্গেশকর হলেন ওই গানের জগতে টানা এক ৭২ বছরের পেশাদার। ব্রিটিশ-পিরিয়ড থেকে একাল পর্যন্ত কালদর্শী একজন পেশাদার।

    কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও লতার সাথে আমাদের কী সম্পর্ক? এনিয়ে আগেই বলেছি শিল্পকলার প্রধান শত্রু হল শিল্পীর ব্যক্তি-বৈষয়িক জীবনের চাহিদা। জীবনে বৈষয়িক চাহিদার মিটানোর উপায় কী হবে তা না খাড়া করে শিল্পকলা চলতে পারে না। ফলে একদিক থেকে বললে এটা  এটাকে পেশা হিসাবে নেয়া মানে তা শিল্পকলার আপোষ, আবার অন্যদিক থেকে বললে এটাই শিল্পকলাকে পেশা হিসেবে নেয়ার ব্যবস্থা ও সুযোগ এবং সম্ভবত একমাত্র সম্ভাবনা। আমাদের এই তিন দেশের মধ্যে ভারতই বাণিজ্যিক সিনেমা এই মিডিয়াকে সফলভাবে শিল্পকলা-সংশ্লিষ্ট মানুষদের পেশা হিসেবে নেয়ার এক স্থিতিশীল ব্যবস্থা হিসেবে হাজির করতে পেরেছে। আর এই এক্সপেরিমেন্ট যখন শুরু হয় সেটাকে বলা যায় ১৯১৩ সালের প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র যা পরে আরো বিকশিত হয়ে হয় ১৯৩১ সালের সবাক চলচ্চিত্র হয়েছে।

    আর এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হল, এক সময়ে আমরা সবাই অবিভক্ত ভারতের অংশীদার ছিলাম বলে ওর সব অর্জন ও ব্যর্থতারও ভাগিদার ছিলাম। ফলে সিনেমার এই শিল্পকলার বিকাশে মুখ্য ভূমিকা নেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের অবিভক্ত সবার সাথে সে সময়ের পূর্ববঙ্গের বুঝমানেরাও প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে তাকিয়েছিল। নিজের শিল্পকলার ভবিষ্যত খুঁজে ফিরেছিল।

    সে আগ্রহ দেশভাগ হয়ে যাওয়ার কারণে পরেও থেমে যায়নি। কারণ আগ্রহটা আমাদের কালচারাল ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমরা পাকিস্তান-বাংলাদেশ (পূর্ববঙ্গ) হয়ে গেলেও রাজনৈতিক বিবাদ পাশে সরিয়ে রেখে যতটা সম্ভব পরস্পর কালচারালি কানেকটেড থাকার চেষ্টা করেছিলাম আমরা, যা স্বাভাবিক। ফলে সেই ঐতিহ্যের স্মরণ থেকেই একালে লতা মঙ্গেশকরের মৃত্যুতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইমরান খান পর্যন্ত; তাঁর  শোকবার্তা প্রেরণ খুবই ভ্যালিড ও স্বাভাবিক এক তৎপরতা। অবশ্য এর আরো একটা বড় কারণ ‘স্মৃতি’।

    স্মৃতি মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়ঃ
    বড় কারণ ‘স্মৃতি’, যা আমাদের তাড়া করে অনেকেই লক্ষ্য করেছেন হয়ত, ছোটবেলায় শোনা অনেক গান দু-একটা যা তখনই খুব অপছন্দ লাগত ফলে কম বা না শুনতাম আমরা হয়ত ব্যক্তিগতভাবে। অথচ আজ বড় হয়ে ধরা যাক সাবিনা ইয়াসমিনের সেই গান যা আমার অপছন্দের গান সেটাই খুব ভালো লাগছে! কেন, এর কারণ কী? এর কারণটা অদ্ভুত!! মানুষ পরিণত বয়স হলে তখন আমরা আর শুধু গান শুনি না। কোন ভেসে আসা গানশুনার সাথে সাথে আমরা তরুণ বা ছোটবেলার সেসব সময়ের টুকরো টুকরো অসংখ্য স্মৃতি মনে ভেসে উঠতে থাকে। আর এতে গান ছাড়িয়ে ওই স্মৃতিতে ডুবে যাই আমরা। অসংখ্য খারাপ বা ভালোর সুখবোধ আর ওদিকে হয়ত লজ্জা কিংবা অপরাধবোধ, মিলবার আকুতি ইত্যাদি জেগে ওঠে। নস্টালজিক ক্ষোভ হতাশা ফ্যান্টাসি ইত্যাদি সব এসে মাথায় ভিড় করে। আর ভালো লাগাটা মূলত ওখান থেকে। ফলে সাবিনার সেটা ধীর-লয়ের গান ছিল বলেই হয়ত টগবগে তরুণ বয়সে যেটা ভাল লাগেনি, সরিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু পরিণত বয়সে স্মৃতির গুণে  সেটাই এখন মহার্ঘ্য হয়ে উঠতে পারে। অতএব গানের আরেক নাম এখানে গভীর স্মৃতি! লতা আমাদের স্মৃতির আরেক নাম!

    তাহলে একালে লতার গান কথার আসল মানে হল আমাদের পুরনো সেসব দিনের ভালো-মন্দ, দুঃখ-সুখের খুটিনাটি স্মৃতি। আমরা ভাগ হয়ে ছিটকে তিন দেশে পড়েছি কিন্তু লতার গান হল আমাদের পুরান সেসব স্মৃতির গ্রন্থি-কার। বুনে বুনে যে আবার তা জোড়া দেয়!!! মোটামুটিভাবে বললে, পঞ্চাশ তো বটেই ষাটের দশক পর্যন্ত আমরা ভারতের  সিনেমাকেন্দ্রিক পেশাদার শিল্পকলার যে উত্থান তার খবর নিতে পেরেছিলাম। এরপর থেকে রাজনৈতিক বিবাদ অনেক ভারী হয়ে যায়, প্রজন্মও বদলে যায়। স্মৃতি ফিকে হয়ে আসতে থাকে। তবু যাদের বয়স এখন ষাট বা এর বেশি তাদের স্মৃতিতে এখনও ভারতীয় সিনেমা বা লতা বাস করে, এটা কম কথা নয়!

    তবু ঠিক কেন লতা মঙ্গেশকর আজ এখানে প্রসঙ্গঃ
    লতা আজ এখানে লেখার প্রসঙ্গ হলেও এনিয়ে আরো কিছু কথা আছে। তবে সেসব অন্যদিকের কথায় এখন যাব…।
    এটা এখন সবাই স্বীকার করে নিয়েছে যে, গ্লোবাল অর্থনৈতিক তৎপরতায় বাকি মহাদেশকে ছাড়িয়ে এশিয়াই প্রধান গ্লোবাল কেন্দ্র হয়ে উঠছে। এই কথাটা মাথায় খেয়াল রেখে  আরো অনেক কিছু দিয়ে আমাদের প্রভাবিত করতে আমেরিকার এক থিংকট্যাংক ফেলো মাইকেল কুগেলমানকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে; যিনি আমেরিকান ফরেন পলিসি নামের ম্যাগাজিনে এশিয়ার ঘটনাবলি প্রসঙ্গে সাপ্তাহিক নিজের এক কলাম লিখে থাকেন। কুগেলমানের এবারের প্রসঙ্গে দেখি, লতা মঙ্গেশকর উঠে এসেছে  [Lata Mangeshkar Was a South Asian Icon]। তবু গুরুত্ব দেইনি। কিন্তু তাঁর একটা শুরুর বাক্য ছিল এমন যে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবার কাছে কমন কিছু ব্যক্তিত্ব হয়ে হাজির হওয়া সহজ নয়। কিন্তু লতা হয়েছেন, এধরণের সেই বাক্যটা। তবু তার ব্যাখ্যাটা পূর্ণ মনে হয়নি। কুগেলম্যান লিখেছিলেন…  “Her music united a region that has few shared heroes and often struggles to come together around common causes.”  অর্থাৎ লতা নাকি এই অঞ্চলকে (তিনি আসলে বলতে চেয়েছেন আমাদের তিন দেশ) ঐক্যবদ্ধ করেছেন যেখানে আমাদের কমন হিরোর সংখ্যা খুবই কম আর একই কারণে একমতে ও একসাথে হবার উদাহরণ অনেক কম।

    কুগেলম্যান  কথাগুলো আনাড়ির মত বলেছেন, আর জোর করে মিলিয়ে বলেছেন। ফ্যাক্টস হল, ঠিক লতা মঙ্গেসকর আমাদের তিন দেশকে ঐক্যবদ্ধ করেন নাই। উপরে এতক্ষণ সেকথাগুলোকেই খুঁড়ে বিভিন্ন দিক থেকে তুলে এনে বলার চেষ্টা করেছি। যার সারকথা হল, আমরা তিনদেশ লতার পেশাজীবন শুরুর পরে একটা বড় সময় পর্যন্ত একদেশ হিসাবেই ছিলাম। এবং এখনও সাংস্কৃতিক অরিজিন হিসাবে আমরা একই রূট শেয়ার করি। শত রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্বেও লতা  অবশ্যই আমাদের শেয়ারড লাইফের এক প্রতীক। কিন্তু কোথায় আমরা ঐক্যবদ্ধ? এটা তো না থাকলেও জোর করে কাউকে খুশি করার জন্য বলার বিষয় নয়। বাস্তবতার কথাটা বললে অসুবিধা কী? এদিকটা তিনি না জেনে উলটা ব্যাখ্যা করতে গেছেন। তাই এখন নিচে আমরা দেখব আমাদের রাজনৈতিক ভিন্নতার শুরু কোথা থেকে, যেটা কুগেলম্যানের বুঝাবুঝিরই বাইরে…।

    কুগেলম্যান আমাদের তিন দেশে ভাগ হয়ে যাওয়া এবং এখনো তা নিয়েই আমাদের মধ্যে বড় রাজনৈতিক মতবিরোধে জড়িয়ে থাকাকে ইঙ্গিত করছেন?  অথচ তিনি লতার হিন্দু মহাসভা, আরএসএস বা বিজেপির মোদির প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্য অনুভব করার দিক নিয়ে বেখবর।  আর স্বভাবতই এ নিয়ে লতা মঙ্গেশকরের ব্যক্তি রাজনৈতিক মতামত বা পছন্দের প্রশ্নে তাঁর হিন্দু-মহাসভা থেকে উঠে আসা আরএসএস-বিজেপি মোদির প্রতি ভালোবাসা আবেগ দেখানো; ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে  মোদি যেন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন সেই দোয়া-কামনা পাবলিকলি প্রকাশ করা থেকে শুরু করে, অবলীলায় বাবরি মসজিদ ভাঙার পক্ষে গান গেয়ে দিয়ে অংশ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি আমার মনে পড়া থেকেই তো এটা সবদিক থেকে লিখতে তাগিদ অনুভব করেছি।

    আমি আগেও অনেকবার বলেছি, রাজনৈতিক চিন্তায় একটা খামতি কত যুগ ধরে আমাদের তিন দেশকে গর্তে ফেলেছে এর আদর্শ উদাহরণ, এমন ব্যক্তিত্ব হলেন রাম মোহন রায়। গত ১৮১৫ সালে তার ‘আত্মীয় সভা’ নামে পাঠচক্র(?) থেকে (ব্রাহ্মণ নয়)  ব্রাহ্মধর্ম প্রচলনের প্রস্তাব করেন তিনি। সেখান থেকে ব্রাহ্মসমাজ গড়া শুরু করা এটাই এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ। তিনি ভুল অনুমানে বুঝেছিলেন, ব্রিটিশরা একাট্টা অ্যাঙ্গলিকান বা ইংলিশ-ক্যাথলিকভিত্তিক এক ‘জাতি’ বলেই নাকি তারা মডার্ন ব্রিটিশ জাতি-রাষ্ট্র হতে পেরেছে। কাজেই ভারতকেও জাতি-রাষ্ট্র হতে হলে আগে একেও এক জাতি হতে হবে। তাই এক ‘ব্রাহ্ম-জাতি’ হয়ে নিতে হবে আগে। কারণ তাঁর অনুমান আমাদের অবিভক্ত ভারতে সনাতন ছাড়াও মুসলমানসহ অন্যান্য ধর্মও আছে। এর চেয়েও বড় বিষয়, হিন্দুধর্মেই অগুনতি জাতিভেদ বর্ণপ্রথা আছে। কাজেই আগে সবাইকে এক ধর্মে এনে নিতে হবে। নাহলে জাতি-রাষ্ট্র গঠন করা যাবে না। এই হলো তাঁর বোঝাবুঝিতে প্রধান ও পরিপুর্ণ ভুল অনুমান। আর এই ভুলের উপর দাঁড়িয়ে তিনি ব্রাহ্মধর্ম প্রচলন করে নিতে হবে বলে এক পূর্বশর্ত আরোপের কারণ। তবে গুরুত্বপূর্ণ যে দিকটা আমাদের মনে রাখতেই হবে, ভারতীয় কমিউনিস্ট ইতিহাসের চোখে, তাদের লিখিত ইতিহাস অনুসরণের ব্যাখ্যায় রামমোহনই নাকি কমিউনিস্টদের কথিত “বেঙ্গল রেনেসাঁ’র আদিগুরু”।

    পরবর্তিতে এর আঠারো বছরের মধ্যে রামমোহনের মৃত্যু হয়, আর ১৮৭২ সালের মধ্যে ব্রাহ্মসমাজ তিন টুকরা হয়ে ওই ব্রাহ্ম প্রকল্প অকেজো হয়ে যায় যদিও তা পরে উনিশ শতকেও কেবল টিকেই ছিল। কিন্তু অকেজো হয়ে যাওয়ার পর থেকে বা বলা যায় এ সুযোগে নতুন তত্বকার বা অভিমুখ দাতা হয়ে আসেন কপালকুন্ডলার বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনিই যুক্তি সাজান যেহেতু ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করেছে, তাই বিকল্প হিসেবে হিন্দু-জাতির ভিত্তিতে ভারত জাতি-রাষ্ট্রের সংশোধিত প্রকল্প নেয়া হোক। আর এর ভিত্তিতেই পরে কংগ্রেস দলের জন্ম দেয়া হয় ১৮৮৫ সালে। পরিণতিতে ২০ বছরের মধ্যে মুসলিম লীগের জন্ম। আর ওদিকে কংগ্রেসের চেয়েও আরো কট্টর উগ্র হিন্দুত্ব জাতিবাদী দল হিসাবে তৈরি হয় হিন্দু মহাসভা যেটা আরএসএস-বিজেপির আদি বা পুর্ব সাংগঠনিক রূপ।

    এখন লতার পছন্দ এই আরএসএস-বিজেপির মোদির রাজনীতি। কিন্তু সাবধান, এটা সাধারণভাবে যেমন বলা হয়, যার যা রাজনৈতিক দল পছন্দ সে তা করবে – এটা এমন ব্যাপার নয়। আপনি দেশের আরেক জনগোষ্ঠী-অংশকে কোপাবেন কাটবেন হত্যা করবেন, নির্মুল করে দিবেন – এটা কোনো রাজনীতি?? এই চিন্তা দিয়ে এক ভারতে সবাইকে ধরে রাখবেন কী করে?? এটা তো কারো পছন্দের রাজনীতি হতে পারে না, ফলে এটা সবার পছন্দের গায়িকা হতে চাওয়া কারও পছন্দের রাজনৈতিক মতামত হতেই পারে না। আবার যিনি সমাজের জন্য গান গাইবেন তিনি এমন রাজনীতি ভালোবেসে একই সাথে সুকুমারবৃত্তির চর্চাও করবেন কিভাবে? এটা দায়ীত্বজ্ঞানহীন, বোধশক্তিহীন চিন্তা ও কাজ।

    ফলে এক দিক থেকে আমরা লতাকে  রাজনৈতিক দিক বাদ বা পাশে সরিয়ে রেখে কেবল আমাদের স্মৃতিগুলোকে রক্ষা করতে তাঁর গান মানে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই; আমাদের দায়িত্ব পরিপালন করেছি। আমরা আমাদের স্মৃতির হত্যাকারী তো হতে পারি না, তাই। কিন্তু একই সাথে একই নিঃশ্বাসে লতার চিন্তার অন্ধত্ব, রাজনৈতিক হিন্দুত্বের প্রতি বেহুঁশ ভালোবাসা থাকা এটা আমাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য; সেটাও জানিয়ে রাখতে চাই!

    তবে এটাও সত্য, গানের জগতের বহু বিখ্যাত লোক কিন্তু যারা বুদ্ধিমান তারা তাদের রাজনৈতিক পছন্দ  বাইরে আনেন না। ব্যক্তিগত জগতেই রেখে দেন। মূল কারণ তাদের গান পছন্দকারিরা নানান রাজনৈতিক মতের হতেই পারে্ন। এখন তিনি নিজের রাজনৈতিক মত প্রকাশ্যে দেখিয়ে ওসব পছন্দকারিদের মধ্যে বিভক্তি আনতে পারেন না।   বুদ্ধিমানদের এতটুকু সচেতনতার আছে বলে এজন্য আমরা তাদের নিয়ে ঘাটাতে চাই না।

    কিন্তু লতা মঙ্গেশকর এতই বোধশক্তিহীন যে, তিনি প্রকাশ্যেই তার ব্যক্তিগত দিক পাবলিক করে দেন। এবং বেপরোয়াভাবে হিন্দুত্ববাদে লিপ্ত হয়ে যান। ফলে মানুষের সুবৃত্তি আমল করার অযোগ্য ব্যক্তিত্ব তিনি যা শিল্পকলার সাথে আনফিট! অবশ্য অনেক সময় পেটের দায়ে মানুষ শিল্পকলার জগতে এসে পড়ে, সেটাও ঠিক!

    জুনিয়রদের উঠতে না দেয়াঃ
    আবার ভারতেই লতার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের আরেক বড় ও গভীর অভিযোগ হল তিনি নবাগতেরা যেন তাদের কোন প্রতিভায় যেন তারা তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠতে না হতে পারেন, এজন্য নিম্নশ্রেণীর আচরণ পদক্ষেপ বারবার তিনি নিয়েছেন।  এপ্রসঙ্গে ভারতের কিছু গায়িকা যেমন সুমন কল্যাণপুর বা অনুরাধা পরোয়াল [Suman Kalyanpur, Anuradha Paudwal] এদের কথা জানা যায়। এসব গায়িকারা যেন গানের গায়িকা বাজারে কাজ না পায় এমন এক একচেটিয়া অবস্থা সৃষ্টি অভিযোগ লতার বিরুদ্ধে বহু পুরানা। এমন শর্ত তিনি প্রযোজক-পরিচালকদের দিয়ে থাকে। অন্যভাবে বললে একটা একচেটিয়ার ব্যবস্থা কায়েম করে সবস্ময় টিকতে চেয়েছেন তিনি। অথচ তার নিজ প্রতিভা তো কম ছিল না! তাহলে তিনি কী নিজের উপর আস্থা রাখতে পারেন নাই? ইন-সিকিউরিটিতে ভুগতেন কেন??
    যেমন  খুব সম্ভবত সত্তর দশের শেষের দিকে্র ঘটনা যতটুকু মনে পড়ে, আমাদের রুনা লায়লাও এর শিকার হয়েছিলেন। একটা সিনেমায় গড়ে পাচটার মত গান থাকতে দেখা যায়। ঐ প্রযোজক পরিচালক রুনাকে দিয়ে তার সিনেমার দুটা গান রেকর্ডিং করিয়েছিলেন। এমনকি সেই গান সিনেমায় ছাড়ার আগেই বাজারেও ছাড়া হয়ে গেছিল। কিন্তু এবার লতা বললেন তিনি বাকি গানগুলো আর গেয়ে দিবেন না। যদি গাওয়াতে হয় তবে সবগানগুলোই (মানে যেদুটা রুনা গেয়ে ফেলেছে  সে দুটা সহ) আবার তাঁকে দিয়েই গাওয়াতে ও রেকর্ডিং করাতে হবে।  প্রযোজক বাধ্য হয়ে সেই শর্ত মেনে নিয়েছিলেন। অর্থাৎ ফলাফল হল এই যে লতার একচেটিয়ার হাতে গান জিনিষটাই জিম্মি হয়ে থেকে গেছিল।

    এমনকি পশ্চিমবঙ্গের রানাঘাট রেল স্টেশনে বসে গায়ে গেয়ে  পয়সা তুলে পেটের ভাত যোগাড় করা রানু মন্ডল কিভাবে যেন ঐ গান গেয়েই আধুনিক জগতের টিভি-রেকর্ডিং স্টুডিও পর্যন্ত পৌছে গিয়েছিলেন। তাকেও সহ্য করতে পারেন নাই লতা। বলেছেন রানুরা যেন আগে তাঁর গাওয়া বা রেকর্ডেড হওয়া গান কোন না করেন। কেন? তাঁর গাওয়া সব গানের সব ক্রেডিট কী তাঁর একার? সুরকার, লিরিসিস্ট, এরেঞ্জার, বাদকেরা ইত্যাদি আর কারও কোন অবদান নাই?? শেষ বয়সে এসেও এত উদ্ধত কেন? আচ্ছা তিনি যেটা “শ্রদ্ধাঞ্জলি” নামের প্রায় ৪৫ মিনিটের যে এলবামটা বের করেছেন স্টেজে গেয়েছেন সেটা তো চল্লিশের দশকয়ের গান থেকে শুরু করা হয়েছে যেগুলোর বেশির ভাগই তো অন্যের গাওয়া। তাহলে সেগুলো তিনি ফিরে গেয়েছেন কেন? আবার তারই গাওয়া গান অন্যেরা একালে গাইতে গিয়ে কোন নতুন নোট লাগানো এবং উপযুক্ত কারিশমায় গায়কিতে তা উপস্থাপন কী করা যায় না – এমনকি নয়া কোন এক্সপেরিমেন্ট নি্রীক্ষা করতেও কী তিনি দিবেন না!!!  শুনেছি রানু এখন সবছেড়ে  ফিরে গেছে তার পুরান রেল স্টেশনে…।
    এই একচেটিয়াত্ব ও ঈর্ষার শিকার হওয়া থেকে লতারই ছোট বোন আশা ভোঁশলেও বাদ যায় নাই। এসব দিক নিয়ে আরও জানতে আগ্রহিরা ভারতেরই দুটা আর্টিকেল এখানে ও এখানে পাবেন।

    [ফুট নোটঃ আসলে ইন্ডিয়ান ক্যাপিটালিজমের বিকাশ এই  ইতিহাস পাঠের এক বড় অংশ হতে পারে। আর তা ভালভাবে পাঠ করতে চাইলে এর এক ভাল  উপায় হতে পারে  – ভারতীয় সিনেমার বিকাশ  ও এটা একচেটিয়া পথ কেন সে অনুসরণ করল – সেটা স্টাডি  করা।  আর এখান থেকেই নেহেরুর তথাকথিত কমিউনিস্ট ইকোনমির মুখ থুবড়ে পরা পরিণতি এসবকিছুর স্টাডি  করতে হবে সেক্ষেত্রে। এসবই পরিণতিতে ইন্ডিয়ার প্রথম “ব্যালেন্স অব পেমেন্ট এর ক্রাইসিস ১৯৯১” তৈরি করেছিল। যেটাকে  বলা যায় আধা-বুঝের  নেহেরুর কথিত কমিউনিস্ট ইকোনমি কিভাবে আইএমএফের কাছে মুখ থুবড়ে সারেন্ডার করেছিল আর পরে  ব্যাপক সংস্কার করে নিজের ইজ্জত রক্ষা করেছিল এরই ইতিহাস!  ভারতীয় সিনেমা একচেটিয়া ভাবেই বিকশিত হয়েছে, মূলত এমন নেহেরুয়ান অর্থনীতির কারণে। এটাই লতার একচেটিয়া বা নিজে ‘শ্রেষ্ট’ হয়ে থাকার খায়েস – এসবকে কতটা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে তা নিয়ে কোন এক আগামিতে দেখা হতে পারে… ]

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১২ ফেব্রুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “আমাদের স্মৃতি ও অসংবেদী লতা” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নেতাজীকে নিয়ে মোদি-মমতার বিবাদে

    নেতাজীকে নিয়ে মোদি-মমতার বিবাদে

    গৌতম দাস  ৩১ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-3TZ

     

    [সার-সংক্ষেপঃ রাজনৈতিক আন্দোলনে সশস্ত্র ধারায় অথবা নিরস্ত্র গণ-আন্দোলনের ধারা হতে পারে।  কিন্তু সশস্ত্র ধারা হলেই সেটাকে উচ্চমার্গের আন্দোলন মনে করা অর্থহীন ও ভুল মাপকাঠির জ্ঞান। এর উপর যদি সে সশস্ত্রতা আবার হিটলারের ধারার যুদ্ধের ক্যাম্পের সাথে যুক্ত হয়ে করার চেষ্টা হয় অর্থাৎ যার অর্থ হল স্বাধীনতা বা ‘ফ্রিডম’ নিয়ে কথা বলা অথচ রাজনীতির ঠিক নাই। কী রাষ্ট্র তারা গড়বে সেটাও শেখানে বেখবর-ই থাকে! ভারতের নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ঠিক এরই প্রতীক।  তিনি জাপানের সামরিক সহায়তায় বৃটিশ শাসন উচ্ছেদ করতে মন-কামনা করেছিলেন যা ব্যর্থ হয়।  ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি এদেরও হিটলারের আদর্শী ও অনুসারী। আরএসএস লেবেলে হিটলারের কাজ-ততপরতা নিয়ে তাদের উচ্ছাসমূলক অবস্থান দেখা যায়। কারণ তারা চরম জাতিবাদি – এথনিক ক্লিনজিং বা এথনিক জাতিকে নির্মুল করা জায়েজ মনে করার রাজনীতি করে। যদিও এখানে আমরা দেখব, ভারতের মোদি ও মমতা দুই রাজনীতি করলেও একই ‘নেতাজীকে’ দখল নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে তারা লড়ছে।]

              Taiwan offers to open national archive to ‘rediscover legacy’ of Netaji Subhas Chandra Bose

    সুভাষচন্দ্র বসু (১৮৯৭-১৯৪৫) [Subhas Chandra Bose], বৃটিশ আমলে কলকাতার বাঙালি রাজনীতিবিদ এবং একসময়ে কংগ্রেসের সভাপতি;  যাকে কথিত পাবলিকের দেয়া খেতাব-নাম হল ‘নেতাজী’।  এখনকার কলকাতায় তাকে মূলত নেতাজী নামেই সবাই ডাকে ও পরিচিত।
    এই নেতাজী কিভাবে তিনি মারা গেছেন তা অবিশ্বাস করে এনিয়ে তাঁর কথিত “অন্তর্ধান রহস্য” বলে আলোচনা সেই পঞ্চাশের দশক থেকে প্রায়ই উঠেছে। কিন্তু একালে তৃণমূল কংগ্রেস দলের নেতা মমতা ব্যানার্জি এই নেতাজী ইস্যুকে মোদির বিরুদ্ধে মানে আরএসএস-বিজেপির হিন্দি-বলয়ের আক্রমণের বিরুদ্ধে একটা বড় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করেছেন। আর  কলকাতা বিজেপিকে কোণঠাসা করতে এটাকে হাতিয়ার করেছেন। কলকাতা বলতে এখানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রতীক হিসাবে দেখে বলা হচ্ছে এবং এই কলকাতা যা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানীও বটে।
    যদিও মমতার মূল তর্ক এখানে আসলে  – কলকাতা কী আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্ববাদের হিন্দু-বাঙালি অংশ? নাকি কলকাতার নেতা নেতাজীর বাঙালি, এই বাঙালি-হিন্দু এরা আলাদা এথনিক জাতি এবং এরা রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদের কোন অংশই নয়? এই তর্ক সামনে এনেই হিন্দুত্ব পরিচয়ের বাইরে হিন্দিবিরোধী বাঙালি-হিন্দু জাতিবাদের জোয়ার পশ্চিমবঙ্গে সফলভাবে তুলতে পেরেছিলেন তৃণমুল দলের সভাপতি মমতা বন্দোপাধ্যায়। আর তা পেরেছিলেন বলেই গত ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে বিজেপি-মোদিকে ঠেকিয়ে দিয়ে বিপুল বিজয়ী হয় তৃণমুল এবং তা থেকে তৃণমূলের মমতা এখন ক্রমেই মোদির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ফিগার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সম্প্রতি এক জনমত জরিপ সমীক্ষাতে মমতা কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর চেয়েও পপুলার রেটিংয়ে এগিয়ে থাকা নেতা এবং মোদির প্রতিদ্বন্দ্বি কেন্দ্রীয় রাজনীতিবিদ। ওই রিপোর্ট লিখেছে– “১৭ শতাংশ মানুষ বিরোধী দলের প্রধান মুখ হিসেবে দেখছেন মমতাকে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে দেখছেন ১১ শতাংশ”। কাজেই নেতাজী হলেন কলকাতার বাঙালি-হিন্দুর নেতা, আর হিন্দি-বলয়ের যারা এই নেতাজীকে নেতা মানে না তারাই বিজেপি – এই হল মমতার ডিফারেন্সিয়াল পয়েন্ট। আর মমতার এই “ভাগ দেখানো” বয়ানের সামনে কলকাতা বিজেপি পুরাপুরি অপ্রস্তুত ও বোকা! মূলত নেতাজী সুভাষকে নিয়ে তারা দ্বিধাগ্রস্ত; ছুড়ে ফেলবেন নাকি কোলে তুলে নিবেন তা জানেন না! কারণ এনিয়ে তাদের কেন্দ্রীয় বিজেপির থেকে কোনো দিকনির্দেশনা তারা কখনো পায়নি, সে রকম কোন ইঙ্গিত অবস্থানই নাই।

    ইন্ডিয়া টুডের জানুয়ারি সংখ্যার ‘মুড অফ দ্য নেশন’ সমীক্ষায় এই চিত্র ফুটে উঠেছে। সমীক্ষায় যোগ দেওয়া ১৭ শতাংশ মানুষ বিরোধী দলের প্রধান মুখ হিসেবে দেখছেন মমতাকে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধিকে দেখছেন ১১ শতাংশ মানুষ।

    এখন বিজেপি তার হিন্দুত্বের চোখে দেখা ভারতের নেতাজীকে কোনো নেতা মানবে কী? এর উত্তর দেয়া ছাড়া কলকাতা বিজেপিকে কলকাতার-বাংলায় “বাইরের লোক” হিসেবেই থাকতে হবে। মমতার এই ইঙ্গিতপূর্ণ বয়ান এজন্য মোদির জন্যও কণ্টকময়!

    গত তিন বছরে এনিয়ে বহু ধাক্কা খাবার পরে মোদি তাই এবার ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছেন। তিনি মমতার চ্যালেঞ্জের মুখে নিজে বাঁচতে নেতাজীকে ‘আপন” করে নেয়ার সিদ্ধান্ত-পরিকল্পনা এঁটে নিয়েছেন। গত ২৩ জানুয়ারি ছিল নেতাজী সুভাষের জন্মদিন। মোদি  ঐদিন দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে নেতাজীর হলোগ্রাম মূর্তির উদ্বোধন করেছেন। অর্থাৎ মোদিও এবার প্রতিযোগিতায় নেমে  মমতার কাছে নেতাজীর শেয়ার নিতে চাইছেন! কিন্তু এই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কে; কী তাঁর রাজনীতি?

    নেতাজী সুভাষের রাজনৈতিক জীবনঃ
    জওয়াহেরলাল নেহরু নেতাজীর চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় হলেও নেহরুর আগেই নেতাজী কংগ্রেস দলের সভাপতি হয়েছিলেন ১৯৩৮-৩৯ সালের সময়কালে। নেতাজী পড়াশোনা শেষে লন্ডন থেকে ফিরে ১৯২১ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে গান্ধীর কংগ্রেস দলে যোগ দিয়েছিলেন। যখন মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধীর বয়স ৫১ বছর। আর তখন নেতাজীর রাজনৈতিক গুরু বা মেন্টর [mentor] ছিলেন চিত্তরঞ্জন দাস। এই চিত্তরঞ্জন দাস ছিলেন কলকাতার মেয়র, নামকরা ব্যারিস্টার আর এছাড়া কিছুটা আগ্রাসী জাতিবাদী। কিন্তু পরবর্তীতে গান্ধী আর নেতাজীর মধ্যে প্রায় প্রতিনিয়ত বড় রাজনৈতিক মতপার্থক্য দেখা দিতে শুরু করেছিল। তাদের মূল মতপার্থক্যকে ব্যাখ্যা করা যায় সম্ভবত এভাবে যে, গান্ধী রাজনৈতিক গণ-আন্দোলন করবেন, কিন্তু অহিংসভাবে। আর এর বিপরীতে সুভাষও রাজনৈতিক গণ-আন্দোলন করবেন কিন্তু রাজনৈতিক বলপ্রয়োগে, যতটা পরিস্থিতি অনুমোদন করে এবং সময় সুযোগ হলে সশস্ত্রভাবেও। গান্ধীর রাজনৈতিক চিন্তার চেয়ে সুভাষের রাজনীতি অনেক রেডিক্যাল এভাবেও সম্ভবত বলা যায়।
    এথেকে দীর্ঘ সময় দলের অভ্যন্তরীণ লড়াই সঙ্ঘাতে গান্ধী নেতাজীকে কোণায় বা আড়ালে ফেলে রাখার চেষ্টা করে গেছেন। আর এসবের পরিণতিতে নেতাজী দ্বিতীয়বার কংগ্রেস দলের কেন্দ্রীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৩৯ সালে ঠিকই কিন্তু গান্ধীর প্রবল বিরোধিতায় গ্রুপিংয়ের চাপে বেশি দিন টিকতে পারেননি; একপর্যায়ে সভাপতির পদ তিনি ত্যাগ করেন। এরই  আরেক পর্যায়ে ইনি কংগ্রেস দলও ত্যাগ করেন। পরে ঐ ১৯৩৯ সালেই তিনি ‘ফরওয়ার্ড ব্লক” নামে নতুন দল গড়েন। কিন্তু ওই বছরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বৃটিশদের বিরোধী জোটপক্ষ হিটলারের জার্মানি-জাপান জোটের সাথে বিশেষ করে জাপানের সহযোগিতায় ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র যুদ্ধের লড়াইয়ে নামেন। যদিও খুব বড় কোনো সফলতার ঘটনা সেটা ছিল না। এদিকে বিশ্বযুদ্ধ প্রায় শেষের কালে ১৯৪৫ সালে এক বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে বিধ্বস্থ বিমান থেকে তার শরীর আগুনে ঝলসে যায়। পরে এখনকার তাইওয়ান যার এক অংশ সেকালে জাপান কলোনি ছিল, সেখানকার এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার সমর্থকরা তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে “রহস্যজনক” বিমান হামলায় নিখোঁজ হয়ে যান ধরনের এক ফ্যান্টাসির বর্ণনায় বিশ্বাস করেন। এটাই তাদের চোখে নেতাজীর কথিত “অন্তর্ধান রহস্য”!  এই হল একেবারে সারাংশে সুভাষের জীবনী।

    কলকাতার বীর নেতাজীঃ
    কিন্তু সেই থেকে কলকাতায় ১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসন প্রত্যাহার ও কলোনি প্রশাসন গুটিয়ে চলে যাবার পরে বিশেষত কংগ্রেসবিরোধী মহলে নেতাজীকে এক বীর বানানোর তৎপরতা দেখা যায়। তারা নতুন করে গান্ধীর কংগ্রেসবিরোধী হয়ে নয়া বয়ান খাড়া করতে তৎপর হন। মূলত তরুণ ও পেটি মধ্যবিত্ত মহলে যা কথিত ‘অন্তর্ধান রহস্য’ এমন ‘রহস্যময়’; তাই নিশ্চয় আরো অনেক কিছু অজানা এ’ধরনের প্রপাগান্ডা যেটা সারবত্তায় এক গভীর কিন্তু ফাঁপা আবেগ তৈরি হয়েছিল। যদিও গান্ধী-নেহেরুরা বাংলার নেতাজীকে জায়গা দেয় নাই, মুল্যায়ন করে নাই ধরণের বঞ্চিতবোধ থেকে অভিমান গোসসা কলকাতায় সেই থেকে সবকালেই বেশ  সরব। বিশেষত তরুণদের আক্ষেপ হল, তাদের ভারত ‘স্বাধীন’ হয়েছে তারা জানছে; ‘স্বরাজ’ বা কথিত ব্রিটিশবিরোধী “স্বাধীনতার আন্দোলন” হয়েছে তাদের জানানো হচ্ছে কিন্তু বাস্তবে এটা তো টেবিলে বসে আপস আলোচনায় স্বাধীনতা পাওয়া বলেই তারা দেখছে। তাই এতে জোশ নাই!!!

    আর তাই  উত্তেজনাহীন স্বাধীনতা আন্দোলনের ঘটনা-বর্ণনার বিপরীতে এর বিরুদ্ধে তাদের সুভাষ বা নেতাজী (কলকাতায় তার সমর্থকদের দেয়া নাম) হলেন তাদের আসল সশস্ত্র যোদ্ধা – এই হল সেই বয়ান। আর যেহেতু হিন্দু-বলয়ে ভারতের প্রথম প্রতিভূ হল কংগ্রেস আর এর নেতা নেহেরু-গান্ধী যারা কলকাতার নেতাজীকে কোণঠাসা করেছিলেন, কাজেই কলকাতা বাঙালি-জাতিবাদের নেতা হিসেবে মমতা মোদিকেও দায়ী ও বিজেপিও  বাংলায়  বহিরাগত – এই ইঙ্গিত খাড়া করে চলছিলেন। আর সেটাই এবার মোদি সংশোধিত করে নিলেন।

    নেতাজীকে আমরা কী চোখে দেখবঃ
    প্রথমত কলকাতা শুরু (১৭৮৯) থেকেই আমাদেরকে গোনায় না ধরা আলাদা ভেবে এসেছে। বিশেষত পুর্ববঙ্গের সংখ্যাগরিষ্ট জনগোষ্ঠি মুসলমান এরা আদৌ বাঙালি কিনা  বা বাঙালির অংশ কিনা এসব প্রশ্ন তুলেছে। তবে আমরা অবশ্যই সেকালের হিসেবে পূর্ববঙ্গ বা একালের বাংলাদেশের লোক। আমরা আমাদের মতই অবশ্যই বাঙালি, রক্ত দিয়ে স্বাধীন করে বাংলাদেশ পেয়েছি। তাহলে এখন আমরা কলকাতার ‘নেতাজী’কে কিভাবে দেখব? তৃণমূলের মমতার চোখে? নাকি কোনো প্রগতিবাদী চোখে?  এর জবাব হল – বস্তুতঃ  দুটোর কোনোটাই না। আসলে আমাদের চোখ মানে দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থ আলাদা হয়ে গেছে বহু আগে থেকেই।

    সে স্বার্থ দিয়ে চিনতে চাইলে – বাংলাদেশের মূল স্বার্থ হল, জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ, তাই বরাবর সেকালের জমিদারি ব্যবস্থা ও শাসনের বিরোধিতা ছিলাম এবং তা করে গেছি আমরা। ফলে এই সূত্রে জমিদার হিন্দুরা যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উপর মুসলমানবিরোধী ও বিদ্বেষী আধিপত্য কায়েম করে নিয়েছিল; আর মুসলমানরা বাঙালি নয় বা বাঙালি স্বীকার করত না, আজও সেসবের কালচারাল প্রভাব ও জের অনেক ক্ষেত্রেই বর্তমান দেখা যায়। সেই থেকে মুসলমানবিদ্বেষের প্রচলন শুরু হয়েছিল; যে কারণে আজও প্রগতিবাদ ও মুসলমানবিদ্বেষ প্রায় সমার্থক!
    তাই আমরা দেখেছিলাম, আমাদের পূর্ববঙ্গ বা একালের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৯৪৭ সালে একমাত্র বাংলার ভাগ হওয়াই ছিল আমাদের স্বার্থ। কারণ বাংলা ভাগ ছাড়া জমিদারি মালিকানা ব্যবস্থার উচ্ছেদ সম্ভব ছিল না। তাই বাংলা ভাগ মানেই হয়ে যায়, সেকালের পূর্ববঙ্গ বা একালের বাংলাদেশের স্বার্থ।

    এর বাইরে আমাদের জন্য অন্য কোন অপশন খোলা ছিল না। তাই ১৯০৫ অথবা ১৯৪৭ সালে দু’বারই যারাই বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেছে দেখা গেছে তারা জমিদার হিন্দুস্বার্থের লোক; প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ তাদের স্বার্থের লোক। এজন্য আমাদের স্বার্থ কী তা বুঝবার সোজা ফর্মুলা হল, যারাই ১৯০৫ অথবা ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেছে এরাই আমাদের বিরোধী জমিদার-হিন্দু স্বার্থের লোক, আর এরাই প্রগতিশীল। আর প্রগতিশীলতাই তো শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির পদত্যাগ নিয়ে আন্দোলন পর্যন্ত আমাদের বিরক্ত করে চলেছে, পিছু ছাড়েনি। যেমন দেখেন, ভিসির বিরুদ্ধে আন্দোলন; অতএব বাস্তব ভিসির মুখে দাড়ি থাক আর না থাক ভিসি-ব্যঙ্গ করা ছবিতে ভিসির মুখে মুসলমানি দাড়ি লাগিয়ে তারা দিবেই! আর ভিসি অবশ্যই এবার ‘তালেবান’ হয়ে যাবেন! কারণ তাদের ভিসি তো কথিত ‘প্রগতিশীলতা’র বিরোধিতা করেছেন!
    তা হলে এত কথার সাথে এখানকার প্রসঙ্গ নেতাজী সুভাষের সম্পর্ক কী? প্রথমত, একটা রেফারেন্স জানিয়ে রাখি। গত ২০১৯ সালের আমার একটা লেখার শিরোনাম ছিল- “কলকাতার ‘নেতাজী’ কেন বাংলাদেশের কেউ না“। অর্থাৎ আমাদের অবস্থানটা কী, এর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এখন দরকার এর একটা আপডেট জানা।

    পুর্ববঙ্গের স্বার্থে নেতাজী কখনও অবস্থান দেখান নাইঃ
    এটা ঠিক নেতাজীকে পুর্ববঙ্গের স্বার্থের পক্ষে কখনও অবস্থান দেখাতে হয় নাই। একটা সুবিধা তিনি পেয়েছিলেন।  আসলে নেতাজী রাজনীতিতে এসেছিলেন ১৯২১ সালে, অর্থাৎ ১৯০৫ সালে তিনি রাজনীতিতে কেউ নন, মাত্র আট বছর বয়সী তিনি। আবার কার্যত ১৯৩৯ থেকেই তিনি মূলধারা রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন বা দূরে। আর ১৯৪৭ সালের দেশ বা বাংলাভাগের আগেই মানে ১৯৪৫ সালেই তিনি মৃত। এ ছাড়া পূর্ববঙ্গের কোনো সময়ে কোনো ইস্যুতে পক্ষ-বিপক্ষে  কোনো অবস্থান তার ছিল কী, জানা যায় না। তা হলে কী দিয়ে তাকে সুনির্দিষ্টভাবে বিচার মূল্যায়ন করতে পারি?
    তার জাপানের সহায়তা নিয়ে সশস্ত্র লড়াইয়ের তাৎপর্য কী? প্রথমত ব্রিটিশবিরোধী তার সশস্ত্র তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনা ছিল না, হয়ে উঠতে পারে নাই। প্রশ্নটা আর একটু এগিয়ে স্বচ্ছ করে করতে পারি এভাবে যে, ব্রিটিশ শাসকরা কলোনি ভারত ত্যাগ করে চলে যাওয়ার পেছনে নেতাজীর গঠিত সেনাবাহিনী ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এর তেমন কোনো অবদানই নেই, ছিল না।

    মূলত ঘটনা হিসেবে জাপানের সহায়তায় নেতাজীর ব্রিটিশ-ভারতের সশস্ত্র বিরোধিতা ছিল খুবই সীমিত। সেই আক্রমণ ছিল ভারতের নর্থ-ইস্টের এখনকার রাজ্য নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমায়; ব্রিটিশ-ভারতের কোহিমা সীমান্তে এক-দুইটা বর্ডার-পোস্টে আক্রমণ মাত্র। যা ঘটনা হিসেবে খুবই নগণ্য, যেখানে কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমি দখলের কথাও জানা যায় না। তাহলে?

    বৃটিশ কলোনি-শাসকেরা কখনও কলোনির নিয়ন্ত্রণ হারান নাইঃ
    এবার সাধারণভাবে বলা যাক। ভারতে ব্রিটিশ শাসন ছিল মোট প্রায় ২০০ বছর (১৭৫৭-১৯৪৭)। এসময়ের মধ্যে কখনই কলোনি শাসকরা নিয়ন্ত্রণ হারায়নি। তাদের ক্ষমতা চ্যালেঞ্জড হয়ে যায়নি। তবু তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় হামলা আক্রমণের ঘটনা হল ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ, সেটাও নিয়ন্ত্রণ হারানোর মত কোন ঘটনা হয়ে উঠতে পারে নাই। এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল আমরা এই ঘটনাকে ডাকি সিপাই বিদ্রোহ বলে – সিপাই বিপ্লব বলি না।
    বিদ্রোহ মানে হল উপস্থিত শাসন অসহ্য হয়ে গেছে তাই মানছি না বলে উত্থান। কিন্তু এর পরে কোথায় যাব সেই পরিনতি পরিকল্পনা নিয়ে কোন ভাবনা নাই, এখনও দানা বাধে নাই। অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক হুশ-জ্জান বোধ তখনও নাই। একারণে ওটা বিদ্রোহ অবশ্যই  কিন্তু পরে ক করব এই রাজনীতিক প্রস্তুতি নাই বলে তা আর কোন বিপ্লব নয়। 

    আর তাই শেষে বৃটিশ শাসক ঐ বিদ্রোহকে “ওভার-পাওয়ার” করে বিদ্রোহ দমন করে ফেলতে সক্ষম হয়। পরে বিদ্রোহীদের ওপর ভয়ার্ত নৃশংসতা ঘটিয়ে এর শেষ হয়েছিল। ফলে তাদের শাসন ফিরে নিজেকে সংহত করে নেয় যদিও সেই থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কলোনি দখল শাসনের বদলে সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের শাসনাধীন হই আমরা।
    অন্যদিকে, এছাড়া ব্রিটিশ ভারতে রাজনৈতিক আন্দোলন হয়েছে ১৯০০ সালের পর থেকে কলোনি ত্যাগের আগে পর্যন্ত সময়ে।  যেখানে ১৯০০ সালের আগে অনেক বিদ্রোহই হয়েছে – ইতিহাস এর সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই ব্রিটিশ শাসকের জন্য নিয়ন্ত্রণ হারানো তো নয়ই; বেগ পেতে হয় এমন কোনো উচ্চতার আন্দোলন সেগুলোর কোনোটাই ছিল না। কাজেই নেটিভ বা ভারতীয়দের কোনো আন্দোলনের কারণে কলোনি শাসকরা অখণ্ড ভারত ছেড়ে যায়নি।  আর অখন্ড ভারতে প্রথম রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের জন্মই যেখানে ১৮৮৫ সালে। তাই কথাটাকে আরো বড় প্রেক্ষিত থেকে বললে, এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকা মহাদেশের কোনো কলোনি হয়ে থাকা দেশের স্থানীয়দের আন্দোলনের ঠেলায় কলোনি শাসকরা তাদের মুক্ত করে দিয়ে পলায়ে যায় নাই। এমন উদাহরণ জানা নাই।
    বরং আমরা চোখ আরো বড় করে তাকাতে পারি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পরে কেবল ব্রিটিশ কলোনি দখলদার নয়; এর সাথে ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন ও নেদারল্যান্ডসসহ সব কলোনি দখলদারেরাই দখলদারি ছেড়ে সব দেশকেই কলোনিমুক্ত করে দিয়ে গিয়েছিল স্বেচ্ছায়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা হলো, কোনো দখলী দেশের স্থানীয় আন্দোলন-সংগ্রামের কারণেই তারা সেই কলোনি ত্যাগ করে যায়নি। কলোনি মুক্তি ঘটেছিল কার্যত স্বেচ্ছায়। অর্থাৎ মামলাটা কেবল বৃটিশদের বেলায় নয়, সকল কলোনিদখলদারেরাই স্বেচ্ছায় ছেড়ে চলে গেছিল। কিন্তু কেন?

    হ্যাঁ, একটা ‘তবে’ অবশ্যই ছিল। সেটা হলো আটলান্টিক চার্টার চুক্তি যা স্বাক্ষরিত হয়েছিল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মধ্যে ১৯৪১ সালের ১৪ আগস্টে। ওই চুক্তিকে একটা দাসখত বলা যায় যেখানে চার্চিল রুজভেল্টকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, হিটলারের পরাজয়ের ওই বিশ্বযুদ্ধে বিজয় ঘটলে দুনিয়া থেকে সব কলোনি শাসনের সমাপ্তি টানা হবে। যুদ্ধ-পরবর্তী দুনিয়াতে আর কোন কলোনি শাসন থাকবে না। আর এই শর্তেই আমেরিকা বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, নেতৃত্বে বড় ভূমিকা নেয়া যুদ্ধের খরচের বেশির ভাগ একা বয়েছিল ইত্যাদি। আর এখান থেকে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব শুরু হয়েছিল।

    কাজেই নেতাজী সুভাষও অখণ্ড ভারত বা কলকাতার বিরাট ভূমিকা রাখা কোন রাজনীতিক হতেই পারেননি, ছিলেন না।

    তবে দ্বিতীয় আরেক প্রসঙ্গঃ
    নেতাজী সুভাষ আরেক বিরাট অবিবেচক কাজ করেছিলেন। তাঁর রাজনীতির বোধ-বুদ্ধির খামতি এখানে ধরা পড়ে। তিনি আসলে প্রথমে গিয়েছিলেন জার্মানিতে, সরাসরি হিটলারের সাথে দেখা করতে। কিন্তু হিটলার এশিয়ায় তাঁর সামর্থ্য নিয়ে আসতে ছড়িয়ে পরতে চাননি। ফলে অপারগতা প্রকাশ করে তিনিই  এশিয়ায় হিটলারের র্জামানির বন্ধু ও পক্ষশক্তি  জাপানের কাছে যেতে বলেন। আর সেখান থেকেই নেতাজীর জাপানের সাথে সম্পর্কের শুরু। ‘শত্রুর শত্রু আমার মিত্র’ এই ফর্মুলা অনুসারে এটা হয়ত জায়েজ বা  অন্যায় মনে হচ্ছে না। কিন্তু আসলে এটা অন্যায় এবং বিরাট ভুল-ও। কেন?

    প্রথমত ১৯৪২ সালের পয়সা জানুয়ারি থেকেই বিশ্বযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ একদম স্বচ্ছ হয়ে যায়। এমনকি মনে রাখতে হবে ঐ পয়লা জানুয়ারি জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা করার দিন।  যারা ঘোষণা করে দিয়েছিল যুদ্ধে জিতলে সেই নতুন দুনিয়াতে সব কলোনি শাসন নিষিদ্ধ থাকবে। অথচ নেতাজী নামে কথিত নেতা সেটার খবর রাখেন নাই। তার রিডিং বা ইতিহাস-পাঠই ভুল, ডাহা মিথ্যার উপর দাঁড়ানো। তাই তিনি অবলীলায় যাচ্ছেন হিটলারের কাছে??????? যারা এর বিপরীত পক্ষ!!!

    আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান বিজয়ী হলে, নেতাজীও হয়ত বিজয়ী হতেন! কিন্তু সেই ভারত অথবা বেঙ্গলের এই বিজয়ী নেতাজী আমাদের জন্য নিজেই এক হিটলার হতেন! রোহিঙ্গাদের শাসক বার্মিজ শাসক জেনারেলরা যেমন, ঠিক সেরকম!। কেন এমন কথা বলছি? জাপানিরা ১৯৪২ সালেই বার্মাকে ব্রিটিশ কলোনি শাসন থেকে বের করে নিজের অধীনে নিয়েছিল। এই অর্থে স্বাধীন করে দিয়েছিল। অং সান সু চির বাবাসহ ত্রিশজন বার্মিজকে জাপানিজ আর্মি বিশেষ ট্রেনিং দিয়েছিল। পরে তাদের নেতৃত্বেই এক সেনাবাহিনী গড়ে দিয়েছিল জাপানিরা যারা ব্রিটিশদের হাত থেকে বার্মাকে ‘মুক্ত’ করেছিল।
    আবার লক্ষ্য করা যাক,  ভারতের এত জায়গা থাকতে নেতাজী কোহিমায় গেছিলেন কেন? সেটা এজন্য যে, কোহিমা সীমান্তের ওপারেই ছিল জাপান সমর্থিত ঐ বার্মিজ বাহিনী। তাদের সাহায্যেই নেতাজী দুই একটা বর্ডারপোস্ট সাময়িক দখল নিতে পেরেছিলেন, যা টেকেনি।

    এখন আসেন কেন এখনকার বার্মার কথা তুললাম?
    আমার একটা লেখার শিরোনাম হল, মিয়ানমার কোন রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব। সেখানে দেখিয়েছি বার্মা কোনো রাজনৈতিক রাষ্ট্রই নয়। এর মূল তাতপর্য হল যেহেতু বার্মাকে ব্রিটিশমুক্ত করে দিচ্ছে জাপানিজ আর্মি। খুবই ভালো কথা হয়ত! মনে হতে পারে। কিন্তু ঐ জাপানের নিজের রাজনীতিক ব্যবস্থা কী ধরনের? জাপান তখন সরাসরি একটা রাজতন্ত্র। তাও আবার কিছু নৃশংস জেনারেলের এক সেনাবাহিনী সহায়তায় ওটা একটা সেনা-রাজতন্ত্রী দেশ; এবং এক এশিয়ান কলোনি শাসক। পুরা কোরিয়া (তখন দুই কোরিয়া এক অখন্ড) এবং চীনের প্রায় ২৫% তখন জাপান কলোনিদখল করে রেখেছে। অর্থাৎ সোজাসাপ্টা বললে, জাপান তখন বৃটিশের মতই কলোনিদখলদার কিন্তু রাজতান্ত্রিক সাম্রাজ্য। মানে  কোনো রাজনৈতিক রাষ্ট্রই নয়; কোনো জন-রাষ্ট্র বা রিপাবলিক নয়। আর যা রিপাবলিক নয়, তা কোন রাষ্ট্রই নয় এবং রাজনৈতিকও নয়। জনগণ বা পাবলিক বলে কোন শব্দ বা ধারণা প্রচলিত নাই। আছে রাজা-আমির আর এর বিপরীতে সবাই প্রজা।

    রাজনৈতিক রাষ্ট্র হওয়ার পূর্বশর্ত হল, দেশ-রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস সেখানে থাকে জনগণ। জনস্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে বলে স্বীকার করার প্রশ্ন তখন আসে। রাজা-শাসক বলে শেখানে কেউ থাকে না। আগে জনপ্রতিনিধি হতে হয়, তবেই সে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি।

    এমনকি এখনো জাপান কোনো রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। জাপানের ফর্মাল নাম ইউনিয়ন অব জাপান। নামের সাথে কোথাও ‘রিপাবলিক’ শব্দটা নেই যদিও সেখানে নির্বাচন হয়, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকে।অর্থাৎ তারা “গণতন্ত্রী” হয়ত কিন্তু কোন জনরাষ্ট্র, জনপ্রতিনিধিশীল রিপাবলিক রাষ্ট্র সেটা এখনও নয়।  আর এ কারণে সেকালে জাপানিজদের দেয়া সব ট্রেনিংয়ে বলাই বাহুল্য কোন রাজনীতি, পাবলিক, জনস্বার্থ, পিপলস রাইট ধারণাগুলো থাকে নাই; কাজ করে নাই। এ কারণে বলেছি, সেকালের বার্মা বা কলকাতার নেতাজী এরা রাজনীতি কী তাই জানতেন না, গুরুত্ব দেন নাই। অথচ স্বাধীনতা ফ্রিডম বলে চিল্লাইতেন! একারণে  বর্তমানেও বার্মা বা মিয়ানমার কোনো রাষ্ট্র নয়, একটা সামরিক ক্লাব যারা ওর ক্ষমতায় আছে, শাসন করছে মাত্র।

    সারকথাঃ যে নিজেই এক সেনা-রাজতন্ত্রী দেশ, সেই শাসক আমাকে স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার ট্রেনিং দিতে পারেই না।

    আর  একারণেই নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু কোন রিপাবলিক জনরাষ্ট্র গড়ার সৈনিক ছিলেন না। “রাজনীতি” বা পাবলিক শব্দের অর্থ না বুঝা নেতাজী কেবল সশস্ত্রতা আর সাথে স্বাধীনতা ফ্রিডম বলে চিল্লাইতেন। দেশের জন্য প্রাণ দেওয়ার কথা বলে আবেগী করে তুলতেন। অতএব তার জাপানের বিজয়ের পরিণতিতে এশিয়ার দেশগুলো হত একেকটা বার্মা – নেতাজীর  সেই পরিণতি হত একটা ‘গর্ভস্রাব’।  কাজেই এই নেতাজী আমাদের কেউ নন। যার মাথায় কোনো রাষ্ট্র চিন্তা, রিপাবলিক ধারণা নেই। আছে বরং হিটলারের দাগ লাগা কিছু দায় ও চিহ্ন!

    কাজেই এই নেতাজী আমাদের কেউ নন। যার মাথায় কোনো রাষ্ট্র চিন্তা, রিপাবলিক ধারণাই নেই। আছে বরং হিটলারের দাগ লাগা কিছু দায় ও চিহ্ন!

    কিন্তু তবু সাবধান! তৃণমূলের মমতাকে মোদির সাথে তার নেতাজী নিয়ে লড়াই করতে দিতে হবে; এটা আমরা নাকচ করব না। কারণ এটা ঠিক ‘নেতাজীকে’ নিয়ে কোনো লড়াই নয়। নেতাজীর আড়ালে এটা মোদির হিন্দুত্বে ভারতের অধীনের কলকাতা নাকি বাঙালি হিন্দুর কলকাতা থাকবে, এর লড়াই এটা।  এটাই কলকাতা বা মমতার নিজস্ব লড়াই – নিজি মামলা – যেখানে আমরা কেবল কামনা করতে পারি হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মমতা বিজয়ী হোক! টিকে থাকুক!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২৯ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “মোদি-মমতার ‘নেতাজী’ বিবাদ” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক নিম্নমুখী ভাটাতে 

    ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক নিম্নমুখী ভাটাতে 

    গৌতম দাস

    ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Tp

    Capitol Hill’s Advocacy on US-India Ties: Devolution of Three Decades Of Progress

     

    ঘটনা এখানে দু’টা কিন্তু কারণ একই। বাংলাদেশ মার্কিন অবরোধের পাল্লায় পড়েছে। আর ওদিকে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক দূর থেকে দূর-অস্তে চলে যাচ্ছে। সেই সুত্রে, কোন ভারত-ঘনিষ্ট ও নির্ভরশীল কোন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্র্ককের সুযোগ ও সম্ভাবনাঢ় বাস্তবতা ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে। এখন বাংলাদেশে মার্কিন অবরোধ না হয় দেখা-বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু তা বলে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ভাটায় চলে যাবে কেন?

    যদিও এটা ঠিক, প্রথমটার জন্য দ্বিতীয়টা ঘটছে  ব্যাপারটা ঠিক এমন নয়। তবে, সম্পর্কিত। কিভাবে? যেমন গত ১০ ডিসেম্বরের মার্কিন অবরোধ আরোপের যে ঘোষণা সেটা কেবল বাংলাদেশের উপর না আরো অনেক দেশসহ সবার বেলাতেই সাধারণভাবে বলা হয়েছিল  এই মার্কিন অবরোধের মূল কারণ – “মানবাধিকার লঙ্ঘন”। আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেনের ভাষায়, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি আর মানবাধিকার জড়াজড়ি করে থাকা শুরু হয়েছে… [to infuse human rights into its foreign policy,] । আর তা থেকেই, হ্যাঁ সেখান থেকেই বাংলাদেশে অবরোধ আরোপ আর ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ঝুলে পড়া – এ’দুই ঘটনার পেছনের কারণ একটাই আর তা হল – (আমেরিকার ভাষ্যমতে) মানবাধিকার লঙ্ঘন। যেটা বাংলাদেশের বেলায় র‌্যাব এই প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা বিষয়টা মুখ্য, আমেরিকা সেটাই বলছে। আর ভারতের বেলায় মুখ্যত কাশ্মিরের স্বাধীনতা-স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়া, ৩৭০ ধারা বাতিলসহ জবরদস্তি কাশ্মির ভারতের মূল ভূখণ্ড বলে জুড়ে নেয়া, এই মানবাধিকার লঙ্ঘন। ঘটনা দু’টার ‘মিলের জায়গা’ এখানেই।

    ভারতে নিজস্ব ব্যবসায়ীদের অর্থে পরিচালিত একমাত্র থিংকট্যাংক ওআরএফ [ORF] বা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন। এই ওআরএফ-এর এক নিজস্ব রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল গত বছর বাইডেনের শপথ গ্রহণের পরে ২৩ এপ্রিল ২০২১। ওই রিপোর্টের শিরোনাম : হিউমান রাইটস ও মার্কিন ফরেন পলিসি : ভারত ও চীনের ওপর এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া [Human Rights and US Foreign Policy: Implications for India and China]। যার প্রথম অংশে চীনের বিরুদ্ধে উইঘুরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যতকিছু অবরোধ দেয়া হয়েছে এর তালিকা দিয়ে ভারতের জন্য তা উপভোগের, এমন ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। কিন্তু রিপোর্টের দ্বিতীয় অংশ ছিল ভারত প্রসঙ্গেঃ বলাই বাহুল্য তা ভারতের জন্য ছিল খুবই হতাশার। এমনকি সেটা প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল উপ-শিরোনামেই। সেটা এমন : ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের (বিরুদ্ধে) ক্যাপিটাল হিল-এর অ্যাডভোকেসিঃ পরিণতিতে গত তিন দশকের সম্পর্ক অগ্রগতির উল্টা-ভ্রমণ [Capitol Hill’s Advocacy on US-India Ties: Devolution of Three Decades Of Progress]।

    ‘ক্যাপিটল হিল’ বলতে আমেরিকান কংগ্রেস বা সংসদ বিল্ডিং কমপ্লেক্স বুঝানো হয় যেখানে কংগ্রেস সদস্যরা আইন প্রণয়নের জন্য বসেন বা মিলিত হয়ে থাকেন। যেখানে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বার্ষিক “স্টেট অব দা ইউনিয়নের” ভাষণও দিয়ে থাকেন। আর সেখানেই ট্রাম্প আমলের শেষের সময় থেকেই ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রসঙ্গে একের পর এক প্রস্তাব পাস হয়েছে। তা কখনো ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দু’দলই (বাই-পার্টিজান) মিলে, আবার কখনো একা ডেমোক্র্যাট সদস্যদের উদ্যোগে। ওআরএফ-এর ওই রিপোর্ট, পাস হওয়া ওমন সব প্রস্তাবের তালিকা দিয়েছে। এনিয়ে বিস্তারে যেতে আগ্রহিরা দেখতে পারেন – Table 2: Comparison of tabled resolutions on India’s abrogation of Article 370 in Kashmir]।  আর সেখান থেকেই এই রিপোর্টটা অনুসিদ্ধান্ত টেনেছে যে, বিগত ৩০ বছর ধরে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের যে ধারাবাহিক অগ্রগতি, তা এখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব প্রস্তাবের ভেতর দিয়ে উল্টা নিম্নগতি বা ভাটার পথে হাঁটা দিয়েছে। যদিও রিপোর্টটা শুরুতে আমেরিকা এতদিন ভারতকে কত কী খাতির করেছে ও গুরুত্ব দিয়েছে এ নিয়ে অজস্র প্রশংসা ও ভারতের সুখ স্মৃতির বর্ণনা দিয়েছে। এমনকি এটাও লিখেছে যে, আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও তৎপরতা বলে যা কিছু আমেরিকা করেছে তা ভারতের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে ও ফোকাসে রেখেই করা হয়েছিল। আর তা থেকেই তা আসলে এখন কত তীব্রভাবে ভেঙে গেছে, তিন দশের ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক অগ্রগতি এখন কতটা উল্টা-ভ্রমণ করছে বলে তা হতাশার, কত গভীর বেদনা-বিধুর তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ওই রিপোর্টে।

    কিন্তু পাক্কা তিন দশক বা ৩০ বছর কেন?
    দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানের কোনো ঘটনার অনেক স্মৃতি বা পুরানা গুরুত্বপূর্ণ দিক-পটভূমি হারিয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়; কাশ্মির ইস্যু যেখানে প্রায় পঁচাত্তর বছরের পুরানা ঘটনা। এদিকে ভারতের মিথ্যা প্রপাগান্ডায় অনেকের আজ মনে হতে পারে শুরু থেকেই (১৯৪৭-৪৮) কাশ্মিরিরা বোধহয় ‘সশস্ত্র’ প্রতিবাদ করা “জঙ্গি-টেরর” , ফলে তারা খারাপ লোক! অথচ এই প্রপাগান্ডা ভিত্তিহীন, একেবারে ফ্যাক্টস লুকানো বা উল্টেদেয়া কথা। অথচ মূল ঘটনা গত ১৯৮৭ সালের কাশ্মির রাজ্য নির্বাচনে পরিকল্পিত ব্যাপক কারচুপি। ঐ নির্বাচনে রাজীব গান্ধী-ফারুক আব্দুল্লাহ (মানে তখনকার কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ও কাশ্মির ন্যাশনাল কংগ্রেসের ফারুক আবদুল্লাহর দলকে জিতানোর) এদের যৌথ ও ব্যাপক কারচুপি করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকেই কেবল সাধারণ কাশ্মিরিদের সশস্ত্র আন্দোলনের শুরু হয়েছিল। কিন্তু তাদের এই কারচুপির পক্ষে গোপন ভাষ্যে সাফাই কী ছিল?
    তাদের খোড়াযুক্তি আর কানে-কানে প্রচার করা সাফাইটা ছিল যেহেতু ঐবছর মুফতি মোহম্মদ সাঈদের নেতৃত্বে কিছু ইসলামি দলের একটা জোট নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং তারা পপুলার ও জিতে যাবার প্রবল সম্ভাবনা; অতএব এদেরকে যেকোন উপায়ে ঠেকানো জায়েজ।  এককথায় বললে রাজীব-আব্দুল্লাহর অন্যায় জোট কাশ্মিরে আইনি রাজনীতি, প্রকাশ্য ও কনষ্টিটিউশনাল রাজনীতি আর থাকবে কিনা সে পরোয়া করলেন না। এনিয়ে আরেকটু বিস্তারিত লেখা এখানে আগ্রহিরা পড়তে পারেন।  তারা আইনি রাজনীতিক ব্যবস্থায় কবর দিয়ে হলেও কারচুপি করে মুফতি সাঈদের জোটকে পরাজিত দেখানোর জিদে ডুবে গেলেন।  আর তা থেকেই আর নির্বাচন নয়, সশস্ত্রভাবে আন্দোলন ও প্রতিবাদ জড়ো করতে হবে – এই রাজনৈতিক ধারা কাশ্মিরে মূল ফোকাস হয়ে উঠেছিল। আর তাতে এর বিপরীতে আস্তে আস্তে বিজেপি নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ির উত্থান ঘটেছিল। কাশ্মিরের রাজনীতির এই সশস্ত্র প্রকাশের কারণ হিসেবে তিনিই প্রথম মিথ্যা বয়ান চালু করলেন। তিনি দাবি করতে থাকলেন, ভারতের নিকৃষ্ট কারচুপির তৎপরতা নয় বরং উল্টা ‘সীমা পার কি আতঙ্কবাদ’ এই ভাষ্য নিয়ে আসেন। অর্থাৎ পাকিস্তানই এর জন্য ‘দায়ী’। তারা সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র ও জঙ্গি-টেরর ভারতের কাশ্মিরে পাঠানোর মাধ্যমেই ভাররের কাশ্মিরকে অশান্ত করা হয়েছে। এই মিথ্যা বয়ান তিনি শুরু করেছিলেন। আর আমেরিকা প্রথমে প্রচ্ছন্নভাবে পরে ২০০১ সালের পর থেকে খোলাখুলি ওয়ার অন টেররের নামে এর ভিত্তিতে ভারতের সাথে তথাকথিত জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বয়ানে গ্লোবাল জোট বেঁধে ছিল।

    সেই ১৯৮৭ সালের পর থেকে হিসাব করলে, গত তিন দশকের ভারত-আমেরিকা সেই সম্পর্কেরই এখনকার ভাটা বা নিম্নগতির শোক আর হতাশা নিয়েই ওআরএফ-এর এই রিপোর্ট। মজার কথা হল – এই বাজপেয়িকেই তিনি  নাকি এক ‘বিরাট নরম মনের মানুষ যিনি কাব্য এবং সাহিত্যচর্চাও করেন’ বলে ভারতের অনেকে প্রচার করে থাকেন। তার কবিতা নিয়ে গান রচনাও করা হয়েছে, এভাবে তার ইমেজ নির্মাণের চেষ্টাও আমরা দেখেছি। অথচ তিনি হলেন প্রথম হিন্দুত্ববাদী যিনি সেই থেকে কাশ্মিরকে অশান্ত করা ও হত্যাকাণ্ডকে সাফাই যোগানদার প্রধান নায়ক! ভারত যখন কাশ্মিরে ব্যাপক কারচুপি, এই বিরাট অনৈতিক কাজ করে আত্ম-অপরাধবোধে হতাশায় ভুগছিল তখন এই বাজপেয়িই অসৎভাবে উল্টা পাকিস্তানকে দায়ী করে ভারতীয়-মনকে আত্ম-অপরাধবোধ থেকে বের করে নিয়েছিলেন।

    বাজপেয়ি ২০০৪ সাল মে পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর ওদিকে আমেরিকাও ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক-বন্ধনের যাত্রা শুরু করেছিল এই বাজপেয়ির হাত ধরে এবং ওই একই মারাত্মক অসৎতার ওপর দাঁড়িয়ে; ব্যাপারটাকে আতঙ্কবাদ বা টেররিজমের বিরুদ্ধে তাদের ঐক্য হিসাবে দেখিয়ে। তাই ত্রিশ বছরের রেফারেন্সটা খুব হালকা কোনো দিন গণনা নয়। তবে ভারত-আমেরিকার ত্রিশ বছরের সম্পর্ক যে এবার ঢলে পড়ছে এর গুরুত্ব বাংলাদেশে ততটা টের পাওয়া না গেলেও গত বছর বাইডেনের আগমন বা শপথের সময় থেকেই তাই ভারত এ সম্পর্কে পরিষ্কার ছিল। বাইডেনের লক্ষ্য ছিল, তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা তুলে এর আড়ালে মূলত চীনকে বেকায়দায় ফেলবেন আর এভাবেই চীনের সাথে লড়বেন, এই ছিল পরিকল্পনা। আর এই সূত্রে ভারতকেও বধ করার ইচ্ছা জেগে ওঠে। কারণ এটা আমেরিকার সব দল ও প্রশাসনের কাছেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল যে, ভারতকে খাতির করে যা লুটবার তা শেষ হয়েছে। এবার এশিয়ায় আগে বাড়তে গেলে আমেরিকাকে আর মেঘের আড়ালে থাকা নয়, সরাসরি নিজে মঞ্চে হাজির হতে হবে। আর মূলত এ কারণেই ভারত-আমেরিকা সম্পর্ককে এবার আসলে ঢেলে সাজানো, নতুন রূপ দেয়ার ইচ্ছা বাইডেনের বা ভারতের ভাষায় ‘অধোগতিতে বা ভাটায়’ প্রবেশ করা। আর এখান থেকে আমেরিকার দীর্ঘদিনের সুপ্ত ইচ্ছা বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর মোতায়েন – ভারত যেটার ঘোরতর বিরোধী; যেটাকে সে তার কুঁড়েঘরের পাশে আমেরিকার সাততলা বানিয়ে সেখান থেকে ভারতের বেডরুমের দিকে নজরদারি হিসাবে দেখে থাকে – সেই সুপ্ত ইচ্ছা এবার ভারতকে উপেক্ষা করে তা বাস্তবায়নের ফেভারেবল বা  উপযুক্ত সময় হিসাবে দেখছে।

    অর্থাৎ বাইডেনের শপথের পর থেকেই ভারত জানত, ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ভাটায় প্রবেশ করে গেছে। তাই তাদের সুখের দিন, ভারতের নিজেকে ভুয়া হলেও ‘পরাশক্তি’ ভাব ধরার দিন, সেটাও এবার শেষ। এমনকি গত ৯-১০ ডিসেম্বর ২০২১ বাইডেন মানবাধিকার সম্মেলন বা ডেমোক্র্যাসি সামিট আয়োজনের দু’মাস আগে থেকেই ভারতও তৈরি হচ্ছিল। কারণ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর বা এক মাসেরও আগে থেকে ঐ সামিটের দাওয়াতি কার্ড বিলানো শুরু হয়েছিল এবং মোদিও ওই সামিটে আমন্ত্রিত হন। তবু ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের যে তাল কেটে গেছে এর সবচেয়ে ভাল প্রকাশ হল প্রথমতঃ, আমরা এখন খুজলে দেখব মোদি ওই আমেরিকান সামিটে অংশ নিয়েছিলেন কিনা আমরা বেশির ভাগ মানুষ তখন তা খেয়াল করিনি। যার মূল কারণ হল,  মোদির যোগদান তার নিজে দেশেই হাইলাইট পায়নি বা দেয়া হয়নি। ফলে বিদেশ মিডিয়াতেও তাই ঘটেছিল। অথচ ফ্যাক্টস হল মোদি ওই ডেমোক্র্যাসি সামিটে যোগ দিয়ে অনলাইনে বক্তব্য রেখেছিলেন। তবে ওটা মানবাধিকার সামিট হয়ে দাঁড়িয়েছিল মোদি যেখানে এক অনুচ্চারিত আসামি হয়ে ছিলেন!

    এসব অস্বস্তিকর সময় ও সভা মোদিকে মুখোমুখি হতে হবে; এ তো জানা কথাই ছিল। তাই এসব কিছুটা হাল্কা করতে ওর চার দিন আগে ৬ ডিসেম্বর ২০২১ মোদি রাশিয়ার পুতিনের (মাত্র পাঁচ ঘণ্টার) এক ভারত সফর আয়োজন করেছিলেন। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় তাদের কোনো তৎপরতাকে যা মানে দিতে চায় সেই ফরমায়েশ মাফিক  রিপোর্টটা পাওয়া যায় দ্য-প্রিন্টের জ্যোতি মালহোত্রার লেখায়। কিন্তু যেখানে আবার রেগুলার বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং, এটা পাওয়া যাবে ওই একই দ্যা প্রিন্টের নয়নিমা বসুর লেখায়। নয়নিমারা হল ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বিটের সেসব সাংবাদিক যাদেরকে মন্ত্রণালয় বিশ্বাস করিয়েছে যে “ভারত একটা পরাশক্তি” হয়ে গেছে। আর তারা কোন সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকুক বা না তারা এটা বিশ্বাস করা সাংবাদিক। তেমনই আরেকজন হল, দ্যা-হিন্দুর সুহাসিনী হায়দার। সে যাই হোক, গত ৬ ডিসেম্বর মালহোত্রা লিখলেন, পুতিনের সফর নাকি এক ‘ডিফাইনিং মোমেন্ট’। কিন্তু ঠিক কী কী ডিফাইন করে বা নয়া মানে দাঁড় করানোর মুহূর্ত ছিল সেটা – তা আজো কেউ বলল না বা জানে না। এর মূল কারণ, ভারতের সব মিডিয়া এমনকি ইন্ডিয়ান বিবিসিও এর মানে দেয়ার চেষ্টা করেছে যে, তারা চীনের নাম উল্লেখ করে “চীনকে মেসেজ দিচ্ছে_ বলে জানিয়েছে। অথচ ঘটনা তো এখানে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ভাটায় পড়েছে, খতম হয়ে যাচ্ছে – সেটা! তাহলে চীন এলো কোথা থেকে ও কেন?

    আসলে বাইডেনের আমেরিকার সাথে ভারতের বিশেষ খায়-খাতির আর ভারতই হল ‘ইন্দো-প্যাসিফিকের ফোকাস” বা সব কিছু ইত্যাদি বলে  বা কোয়াডের সদস্য বলে যে হামবড়া ভ্যানিটি আগে দেখাত সেটার একেবারে  সমাপ্তি ঘোষণা না হইয়ে গেলেও সব ঢিলেঢালা হয়ে যাচ্ছে; এটা আর লুকানো থাকছে না। আর সেই কথা টের পেয়ে যেন এখনভারতের পাশে আমেরিকা আর নাই – ফলে  এই ভারত আবার কোনো চীনা হামলার শিকার না হয়ে যায় – মূলত এই ভুয়া অনুমানের ওপর দাঁড়িয়েই পুতিনের সফর এটাকে ভারতের ‘চীনকে দেয়া মেসেজ’ হিসেবে দেখতে বলছে ভারতের মিডিয়া। মালহোত্রার লেখার শিরোনাম খেয়াল করেন, [Putin’s visit is a defining moment for India-Russia ties. It’s a telling message to China]।

    এরপরেও এখন অনেকের মাথায় প্রশ্ন আসতে পারে, বুঝা যাচ্ছে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এখন ভাটায় চলে গেছে। তার মানে কি এটা আবার আগামীতে কখনো জোয়ারে উঠতে পারে?
    অথবা একই প্রশ্নকে অন্য দিক থেকে হাজির করলে – যেমনঃ ভারতের কাশ্মিরের মানবাধিকার লঙ্ঘন অথবা একালের প্রায় সারা ভারতের মুসলমানদের নির্মূল করো অথবা এথনিক ক্লিনজিং করো ইত্যাদিতে আরো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে পড়ে ভারত আমেরিকার হাতে অভিযুক্ত হয়ে যাবার ভয়েই কি ভারতের দিক থেকে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া? এটাই কি একমাত্র কারণ?

    এর জবাব হলো – না, এর অন্য আরেক বিশাল কারণ আছে। সেটা হল, আগামী ২০২৪ সালের নির্বাচন!

    আগামী ২০২৪ সালে নির্বাচনে বিজেপি বা ওর হিন্দুত্ববাদই নির্মূল হয়ে যেতে পারে :
    একালের ভারতে বিজেপি-আরএসএস বা মোদি একেবারে চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া মানে হিন্দুত্ববাদ প্রথমবারের মত উৎখাত হয়ে যাবার মত অবস্থায় পড়েছিল গত বছর। গত মধ্য মার্চে ভারতে নেমে এসেছিল করোনাভাইরাস আক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় আক্রমণের ঝড়! সারা ভারত তাতে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। অক্সিজেন, বেড আর সৎকার, এসব পাওয়ার পুরাপুরি অনিশ্চয়তা – এটাই হয়ে উঠেছিল ভারতের মুখ্য পরিচয়। আর মোদি যার প্রতীকী এবং এক অসহায় প্রধানমন্ত্রী রূপ। সৌদি আরব অক্সিজেন ভরা ট্যাংকার পাঠিয়েছে কার্গো প্লেনে করে কিন্তু তা দেখাতে গিয়েও মোদির ইজ্জত যায় অবস্থা! যেন মুসলমান সৌদি আরব তো নিচা; তার সাহায্য মোদি নিয়েছে এটা কেমন দেখায়? আর তা দেখেই দ্যা-হিন্দুর সুহাসিনী হায়দার  প্রথম নিশ্চিত হয়েছিলেন যে ভারত আসলে  নিশ্চয় কোন পরাশক্তি নয়!!! নইলে সৌদি সাহায্য নিবে কেন???

    জীবিত মানুষ আর মৃত-লাশের গভীর সম্পর্কঃ
    মানুষ মারা যাবার পরে একটু সম্মানজনক সৎকারও যদি নাই জোটে তাহলে আর বেঁচে থাকতে আমি হিন্দু কি না, আমার হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠ কি না এসব গল্পে কাম কি? এসব কোনো কাজে লাগবে? এর কি কোনো জবাব আছে? আসলে এসব প্রশ্ন ছেয়ে ফেলেছিল সে সময়ের মোদির হিন্দুত্বের ভারতে!   মূল কারণ, মানুষ মূলত যেকোন মৃতব্যক্তির লাশের মধ্যে নিজেকে দেখে, দেখতে পায়, সে মরলেও তাকে কোনো অশ্রদ্ধা অসম্মান করা হবে কিনা – ব্রিজের উপর থেকে তাঁর লাশও নদীতে ফেলে দেয়া হবে কি না! বা নদীর ধারের বালিতে লাশ ফেলে পালিয়ে আসবে কি না কিংবা, নদীর পাড়ে কোনোমতে বালিচাপা দিয়ে পালাবে কি না; অথবা যা পরে ভাসেতে ভাসতে গঙ্গা নদী ধরে আরেক রাজ্যে পঁচা-গলা লাশ হিসাবে উঠবে কীনা …… ইত্যাদি। সারা ভারতের মানুষ এসব দেখে মানে নিজের সম্ভাব্য পরিণতি দেখে আঁতকে উঠেছিল!!! ভারতের মানুষেরা নিজের এই পরিণতি এই অপমান অশ্রদ্ধা দেখে ফেলেছিল। এসব কাণ্ড যেকোনো মানুষের জন্য নিজের বেলায়ও ঘটতে পারে, এই অনুমান- আর এই অনুমান নিয়েও এর পরে বেঁচে থাকা অর্থহীন! আর এসব ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন মোদি! এটা একা কোনো ভারতীয় মানুষ নয়। সারা ভারতের মানুষের কাছে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল এই জীবন, তাদের এই বেঁচে থাকা কী দরকার; এটা অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন? হিন্দুত্বের মোদি ভারতের প্রতিটা মানুষকে এমন অভিজ্ঞতা ও অনুভব এনে দিয়েছিলেন!
    মোদি এসব জানতেন যে তার সম্পর্কে মানুষের গভীর মনে অন্তঃস্থলে তিনি কী পরিচয়ে আছেন?? তিনি প্রচন্ড ভীত হয়ে পড়েন!

    সেই ঘটনাকাল ছিল মোদির দ্বিতীয় টার্মের মাত্র দ্বিতীয় বছর শেষে (২০১৯ সালের মে মাস থেকে তিনি সেকেন্ড টার্মের প্রধানমন্ত্রী)। তবু মোদি বুঝে যান, আশঙ্কিত হন যে, তার হিন্দুত্ববাদের আয়ু এবার এসব হতাশ মানুষের হাতে শেষ হয়ে যেতে পারে। তাই তখন থেকে মোদি বিজেপি-আরএসএস এদের সবার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায় – ২০২৪ সালের নির্বাচনে হবু বিপর্যয় অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদের সম্ভাব্য নির্মূল হয়ে যাওয়া- এটা যেকোনো উপায়ে ঠেকানোই তাদের বাকি তিন বছরের একমাত্র কাজ!

    কিন্তু তাতে কী? ঘুরেফিরে সব কথার শেষে যেখানে এসে ঠেকে সেই একই কথা। মুসলমান কোপাতে হবে, ইসলামবিদ্বেষ – এটাই একমাত্র ভরসা। হিন্দুত্ববাদের দিকে ভোটার ফিরানোর একমাত্র উপায়। এ কারণেই ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, বাইডেন যতই মোদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অবরোধের ভয় দেখান না কেন মোদিকে আরো বেশি করে এখন মুসলমান কোপাতেই হবে – তা কাশ্মিরে বা সারা ভারতে। এটাই তার রাজনৈতিক আয়ু লুপ্ত হওয়া ঠেকানোর একমাত্র উপায় যার সোজা মানে আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাইডেনের সাথে মোদি ভারতের সম্পর্ক আর ভাল হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই বরং আরো সঙ্ঘাতেরই সম্পর্ক হবে। অন্তত ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত!
    অবস্থা এখন এমন যে ইমরান খানের পাকিস্তান এই প্রথম এক নিজ ‘জাতীয় নিরাপত্তা পলিসি” [NSP] প্রণয়ন করেছে। যেটা আগের মত গতানুগতিক কেবল ভারতবিরোধিতার উপর দাঁড়ানো নয়। আর কেবল সরাসরি সরাসরি সামরিক নয় বরং সামগ্রিক। এটা নিয়ে ভারতের মিডিয়াও পাকিস্তানের সহবস্থানের মনোভাবে লেখা এই নীতির প্রশংসা করেছে। এছাড়া প্রফেসর আয়েশা সিদ্দিকা যিনি পাকিস্তান অরিজিন লন্ডন  SOAS এর শিক্ষক কিন্তু  যিনি তার সেনা-ঘৃণা ম্যানিয়াকের জন্য কুখ্যাত, তিনিও অংশত এই পলিসিকে খারাপ বলতে পারেন নাই। পরোক্ষে প্রসংসা করেছেন বলা যায়। কিন্তু এত কিছুর পরেও মোদি বা তার সরকার এর সুযোগে ইমরানের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল করার দিকে আগাবেন সেই সুযোগ মোদির নাই। কারণ ইমরান কেন যেকোন পাকিস্তানই তার কাছে এখন একমাত্র একটাই প্রয়োজনীয় – পাকিস্তান কোপানো মানে মুসলমান কোপানো আর তাতে ততই হিন্দুভোট নিজ বাক্সে — এই চিন্তার বাইরে যাবার অবস্থায় নাই মোদি। বরং ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আরেকবার ফেক একটা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হচ্ছে এই রচনা আর মোদি তাতে বিজয়ী এটা দেখানো যায় কী করে এটাই মোদির লক্ষ্য আর তিনি তা খুজছেন!!

    এই একই সুত্রে, কাজেই বাংলাদেশেও সরকারের সাথে ভারতপ্রীতির সম্পর্ক ঠিক যেমন আমরা আগে ২০১২ সালের পরে দেখেছিলাম, তেমন আর হওয়ার সম্ভাবনাময় নয়। অর্থাৎ মার্কিন অবরোধ হয়েছে বলে, হাসিনার ভারতপ্রীতির সম্পর্ক আগের মতই পুনরায় উত্থিত হচ্ছে না। মূল কারণ, এখনকার ভারত নিজেই বাইডেন প্রশাসনের চোখে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আসামি বলে দূরে দূরে থাকছে।  অর্থাৎ আগে ভারত-আমেরিকার স্ট্রাটেজিক বন্ধুত্ব জোরদার ছিল বলেই হাসিনা সরাসরি আমেরিকাকে এড়িয়ে ভারতের মাধ্যমে আমেরিকান চাহিদা পূরণের চেষ্টা করতে পারত। আর এতে ভারত সরকার এবং এমনকি ‘র’-এর বহু অন্যায় আবদার হাসিনাকে সহ্য করতে হত। সেসব পরিস্থিতি গত ১৬ ডিসেম্বরের পরে একেবারেই লক-আপ হয়ে গেছে। যা আর ফিরবে না। মূল কারণ, ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক দূর অস্তে চলে গেছে। এটা কোনভাবেই আর আগের সময়কালে একেবারেই নাই। আর এটা যে নাই তা সবগুলো পক্ষের কাছেই উদাম।  উপায়ন্ত না পেয়ে  ওআরএফ-এর আরেক ফেলো, সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর লেখায় তার ছাপ পড়েছে। গত ১৬ ডিসেম্বর তিনি ওআরএফ-এর সাইটে যে লেখা দিয়েছেন তাতে চীনার পাকিস্তানকেই কোপানোর চেষ্টা করে গেছেন। সাথে যেমন বলেছেন, বাংলাদেশের সাথে ভারতের “অনন্য সম্পর্কটা” চীনের কারণে “উদ্বেগজনক প্রতিবন্ধকতা” হয়ে দাড়িয়েছে। ঐ লেখার লম্বা শিরোনামটা  হলঃ “এক অনন্য সম্পর্কের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন: উদ্বেগজনক প্রতিবন্ধকতার মাঝেও ভারত এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে অংশীদারিত্ব” – এর মূল  অর্থ এটাই। আরো সোজা করে বললে পিনাক সবকিছুকে নামিয়ে এনেছেন ভারতের অস্ত্র কেনায় বাংলাদেশের আপত্তিতে।
    ঠিক যেমন ও যে কারণে ভারত কোন চীনা অস্ত্র কিনে না, কিনবেও না; সস্তা ও মাঙনা হলেও নিবে না – ঠিক একই কারণে বাংলাদেশ ভারতের অস্ত্রের গুনাগুণ নুন্যতম ভাল কোয়ালিটির হলেও অথবা তা বাংলাদেশকে মাঙনা দিলেও বাংলাদেশ নিবে না।  এটা পানির মত সরল সত্য! এটা না বুঝার কিছু নাই। কিন্তু না বুঝার ভান ধরে পিনাক রঞ্জন এখন চীনের বিরুদ্ধে কামান দেগেছেন ঐ লেখায়। আবার এনিয়ে একটা মিথ্যা বা শব্দ বদল করে নেয়া ক্যাম্পেইনও করছে অনেকে। শিরোনাম লিখেছে,   “চীনের ওপরে বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে: পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী! – এভাবে। যেটা করেছে ক্যাম্পেইন পত্রিকা আমাদের সময়। অথচ পিনাক রঞ্জনের মূল বক্তব্যে ছিল,  “চিন থেকে আমদানি করা সামরিক সরঞ্জামের উপরে বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে”। মূল লেখা ওআরএফ-এর বাংলায় সাইট থেকে দেখতে পারেন এখানে।  অর্থাৎ সাধারণভাবে সব ব্যাপারে বাংলাদেশে চীন-নির্ভরতা নাকি কেবল অস্ত্র কিনাতে এই নির্ভরতা – এই দুটাকে এক করে প্রপাগান্ডা করা হচ্ছে। পিনাক রঞ্জন এখানে কেবল “অস্ত্র কেনার” ক্ষেত্রের কথা তুলেছেন।

    তবে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ঢলে পড়া ভা ভাটায় চলে যাওয়া নিয়ে  ইতোমধ্যেই এর ছাপ পড়া শুরু হয়েছে ভারতের থিংকট্যাংকের লেখা বা রিপোর্টে। আমেরিকা ভারত থেকে অনেক দূরের কেউ – এই অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে তারা লিখছে আর সাথে আমেরিকার এশিয়ায় উপস্থিতিতে কী কী খামতি সেখানে আছে এমন মৃদু সমালোচনাও সেখানে এখন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। যেমনঃ “আমেরিকা কি অবশেষে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সঠিক ভাবে পা ফেলছে?” – এটা ওআরএফ-এর আরেক ফেলোর লেখা, এখান এমন সুর দেখা যাবে। যা অনেকটা ডিভোর্স হয়ে যাওয়া বউ/স্বামী এর সাথে সামাজিকভাবে দেখা হয়ে গেলে যেমন হয়, সেরকম! আমেরিকান থিংকট্যাংক কলামিস্ট রাইটার কুগেলমানও ব্যাপারগুলো আমল করছেন, দেখা যাচ্ছে।
    সব মিলিয়ে  নতুন করে এক ‘গ্লোবাল পোলারাইজেশন’ সাজিয়ে উঠা আসন্ন হয়ে উঠছে মনে হচ্ছে!
    আর ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে ভাটা – এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ও আরও হবে ভারতের। বাংলাদেশ তী ভারতেরই – যেন তার গ্রামের বাগানবাড়ি – এই অতি আহ্লাদ এখন শুকিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে। অনেকের অনুমান এটা শেষ হবে  ২০০৬ সালের আগের ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের যায়গায় –  “ব্যাক টু দ্যা প্যাভেলিয়ানে”!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২২ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে ভাটা, কার কাজে লাগবে”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • আমেরিকায় সম্পত্তি-কেনা অর্থপাচারকারীর কী হবে?

     

    আমেরিকায় সম্পত্তি-কেনা অর্থপাচারকারীর কী হবে?

    গৌতম দাস

    ১০ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Sm

     

     

    US Department of State’s Coordinator on Global Anti-Corruption Richard Nephew. 

    US vows to crack down on money laundering in homebuyers

     

    খবরটা একটু পুরনা, গত মাসের। ইস্যুটাকে গ্লোবাল অর্থপাচার- এই “দুর্নীতিরোধক” এক পদক্ষেপ বলা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে খবরটার গুরুত্ব মার্কিন অবরোধের চেয়ে কম নয়। হয়তো এর দৃঢ় প্রভাব অনেক বেশিই হবে। কিন্তু টাইমিং আর সম্ভবত আমাদের মিডিয়া এর তাৎপর্য যথাযথ টের না পাওয়ার কারণে এটা সামনে মানে উপর তলায় আসেনি। বিষয়টা আবার অবরোধ আরোপের মতোই আমেরিকান এক তৎপরতা। তফাত এই যে, অবরোধ দিয়ে বাইডেন দাবি করেছেন, এটা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে। আর এটাও বাইডেনের নেয়া পদক্ষেপ যা করাপশন বা দুর্নীতিকেন্দ্রিক। তবে তা গ্লোবাল নেচারের এবং প্রস্তুতি পর্যায়ে আছে মানে মাঠে এখনো অ্যাকটিভ হয়নি। তবে এটা বাংলাদেশের দুর্নীতি আমেরিকাকেও ছুঁয়েছে ধরনের। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই প্রসঙ্গকে আমেরিকান দলিল বা রিপোর্টে ব্যাখ্যা করা হয়েছে criminals, kleptocrats শব্দ দিয়ে। তাদের বিরুদ্ধে নেয়া পদক্ষেপ হিসেবে। কাদের বিরুদ্ধে? ‘kleptocrat’। ইংরাজি ক্লেপটোক্র্যাট শব্দটার অর্থ হল, সরকারি ক্ষমতা অপব্যবহার করে যে শাসক পাবলিক অর্থ-সম্পত্তি আত্মসাৎ করে। জন-সম্পত্তি চোর শাসক।

    এ নিয়ে রয়টার্সের করা গত মাসে একটা রিপোর্ট আছে।  এই রিপোর্টে (বাংলাদেশের মত অনেক দেশকে মাথায় রেখে) অনেক পরিকল্পনার কথা বলা আছে। কিন্তু এর দুদিন পরেই ৯-১০ ডিসেম্বরের গণতন্ত্র সামিট [Democracy Summit] – এই গুরুত্বপুর্ণ কর্মসুচির কারণে kleptocrat ধরে আনার পরিকল্পনা থেকে মিডিয়া মনোযোগ কমে যায়। তবে ঐ রিপোর্টের  প্রথম বাক্যটা হল এ’রকমঃ “বাইডেন প্রশাসন গত ৬ ডিসেম্বর শপথ নিয়েছেন যে, (বিভিন্ন) দেশের সরকারি সম্পদ চুরি-লুটকারী অপরাধী শাসক ও এমন অন্যদের তারা কড়া পদক্ষেপ নিয়ে তাদের তছনছ করে দেবেন; যারা মানিলন্ডারিং করে আনা নগদ অর্থে ঘরবাড়ি (রিয়েল স্টেট) কেনাবেচায় জড়িত এবং একাজটা আসলে (তখনকার) আগামী সপ্তাহে আহূত আমেরিকার ‘গণতন্ত্র সামিট’-এর সাথে বৃহত্তর অর্থে দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ হিসেবে সম্পর্কিত” [“The Biden administration on Monday vowed to crack down on “criminals, kleptocrats and others” paying cash for houses to launder money as part of a broader anti-corruption drive linked to this week’s U.S. Summit for Democracy.”]।

    এখন একটা উদাহরণ দিয়ে বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে ব্যাপারটা আরেকটু স্পষ্ট করা যাক। ধরা যাক, বাংলাদেশের এক মন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের জন্য সরকারি বার্ষিক বাজেটের প্রায় অর্ধেক অর্থ আত্মসাৎ করেছেন, সেই অর্থ  এবার মন্ত্রী নিজের ছেলেকে দিয়ে আমেরিকায় ট্রান্সফার করে নিয়ে গেছেন। এরপর ছেলে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছে ও ওই অর্থ দিয়ে হাউজিং প্রকল্প কিনেছে বা গড়েছে। বাইডেন সরকার বলতে চাইছে্ন “এটা মানিলন্ডারিং করে আমেরিকায় আনা অর্থ”। তাই  অর্থের কোনো বৈধ উৎস বলতে না পারা এই চক্রকে তিনি আইনের আওতায় আনবেন”। কথা সত্য। বাইডেন যা বলছেন তা যদি উনি সিরিয়াসলি বাস্তবে করে দেখান তবে এটা বাংলাদেশের সরকারের জন্য বিরাট আঘাত করা ঘটনা হবে।

    এবারের (৯-১০ ডিসেম্বরের) ‘ডেমোক্র্যাসি সামিটের’ সাথে এই দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সম্পর্কটাকে আরেকটু পিছনের পটভূমিতে বলা যাক। ঐ একই রয়টার্স রিপোর্ট আমাদের জানাচ্ছে, “বাইডেন ক্ষমতার শপথের (২০ জানুয়ারি ২০২১) পরে জুন মাসেই তাঁর সহকারীদের তিনি এ’ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন [President Joe Biden ordered officials in June to step up the fight against corruption.]। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই কাজকে তারা আমেরিকান ‘জাতীয় নিরাপত্তার কৌশলপত্রের’ অংশ করে নিয়েছিলেন। আর তাই একাজে ‘৩৮ পৃষ্ঠার এক প্রাথমিক প্রস্তাব’ তৈরি করা হয়েছিল। [সেটার পিডিএফ কপি ঐ লিঙ্কে]  যার শিরোনাম ‘দুর্নীতি রুখতে আমেরিকান জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্র’ [ Pursuant To The National Security Study Memorandum On Establishing The Fight Against Corruption As A Core United States National Security Interest]। অনলাইনে এই দলিল উন্মুক্ত করা হয় ওই ৬ ডিসেম্বরেই।

    যা চীনা ব্যাবস্থায় নাই বা দিতে পারবে না; সেটাই বাইডেনের ইস্যুঃ
    যা চীনের নাই বা দিতে পারবে না বাইডেন তাই করবেন ও এমনই নীতি-পলিসি নেবেন – এবারে বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর তিনি এই বিশেষত্বকে যেন নিজের সাইনবোর্ড করেছেন। তাই, মানবাধিকার রক্ষার নীতি ও দুর্নীতিবিরোধী নীতি এভাবে গ্লোবাল অভিযানে হাতে নেয়া আর তাতে যত বেশিসংখ্যক দেশ ও ওসব দেশের জনগণের সমর্থন তাতে শামিল না হলেও আকৃষ্ট করা- এভাবেই তিনি আগাচ্ছেন। এটাই তার চীন ঠেকানোর কায়দা!

    যদিও এনিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা অনেকটাই ভিন্ন। আমরা আগে দেখেছি দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এর আগেও অন্য আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিয়েছিলেন। আর তাতে যা তারা করবেন বলে মাঠে নামেন, তাই তারা করেন বা সফল হয়েছিলেন ব্যাপারটা এমন সত্য নয়। আমরা মনে করতে পারি আমাদের দেশের বেলায় ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের কথা বলে এই একইভাবে বাংলাদেশে আমেরিকার প্ররোচিত-সমর্থিত এক ক্ষমতা দখল হয়েছিল। ফলাফল কী হয়েছিল আপনারা সবাই কমবেশি জানেন। আর তাতে ফলাফল হল, তখনকার দুর্নীতি শত-কোটিতে গণনা করা হত বা চল ছিল। আর এখন বাংলাদেশে দুর্নীতির সেই গণনা হয় হাজার-কোটিতে; এই হল আমেরিকার দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের পরিণতি। অর্থাৎ যা আমেরিকা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিল তা করে নাই। সেদিকে ঘটনা নেয় নাই। আবার যেমন বলা হয়েছিল, আমাদের রাষ্ট্রকে ‘ওয়্যার অন টেরর’ মোকাবেলার উপযোগী ও যোগ্য করে সাজাতে নাকি ঐ ক্ষমতা দখল। কিন্তু আমরা দেখেছিলাম আমাদের রাষ্ট্রকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ আমেরিকা যা করব বলে গল্প শোনায় তা শুনতে ভালো লাগে হয়তও অনেকের। কিন্তু তা সে পূরণ না করে উল্টা নিজের বদ-উদ্দেশ্য কায়েম করে ভেগে যায়। এবং কোনো দায়দায়িত্ব নেয় না এবং কখনো নিজের আকামকে ফিরে দেখে না, ভুল বা অপরাধের মূল্যায়ন বা স্বীকার করে না। এক কথায়, এরা দায়দায়িত্ব-জ্ঞানহীন। ফলে স্বভাবতই, এখন বাইডেন প্রশাসন কী করছে ও কী বলতে চাইছে তা নিয়ে পাবলিক মনে কোনো আশাবাদ তৈরি করতে চাই না। আবার আগাম নিরুৎসাহিত বা হতাশা ছড়ানোও আমার কাজ নয়। বরং বাস্তবে যা হচ্ছে ও হবে তা যেন পাবলিক নিজেই সতর্ক থেকে চোখ-কান খুলে দেখে বুঝে নেয় এর সব রাস্তা খোলা থাকুক- এটাই ভালো!

    ৩৮ পৃষ্ঠার এক প্রাথমিক প্রস্তাবঃ
    উপরে উল্লিখিত ৩৮ পৃষ্ঠার এক প্রাথমিক প্রস্তাবে, মানে ঐ রিপোর্টের কিছু বাক্য যা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। যেমন চতুর্থ পাতায় বলা হয়েছে, “গত ৩ জুন বাইডেন বলেছেন, ‘দুর্নীতিবিরোধী লড়াইকে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ বলে বিবেচনা করতে হবে” [On June 3, 2021, President Biden established the fight against corruption as a core national security interest of the United States.”]।’ এখন মনে হতে পারে, দুর্নীতিবিরোধী কাজে তিনি ভিন রাষ্ট্রের জন্য ত্রাতা হতে চাচ্ছেন, তবে তাতে এটা খোদ আমেরিকার ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ হচ্ছে কিভাবে? তিনি বলছেন, ‘গ্লোবাল দরিদ্র-মানুষ কমিয়ে আনার কাজে লড়াই এবং উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের বিকাশ এগুলোই পরোক্ষে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করে” [“corruption threatens United States national security, economic equity, global anti poverty  and development efforts, and democracy itself….[B]y effectively preventing and countering corruption and demonstrating the advantages of transparent and accountable governance, we can secure a critical advantage for the United States and other democracies.” ]।’ [ লেখকের নোট হল, এখানে সবই ভাবানুবাদ করা হয়েছে, তাই ছোট হয়েছে অনেক সময়। যাদের আগ্রহ তারা মুল ইংরাজিটা দেখে নিতে পারেন। ]

    খুবই আদর্শবাদী কথা হয়তো এগুলো। তবু এখন এসব কথা শুনে আমরা এতটুকু বলতে পারি যে, এতে আমেরিকান নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করে বা হয় কি না তা আমরা না, আমেরিকাই সবচেয়ে ভালো বলতে পারে। তবে এটুকু আমরা বুঝি, কখনো দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নেয়া অথবা কখনো চুপ থাকার অবস্থান নেয়া – যেটাই আমেরিকা করুক তাতে ঐ সময় অবশ্যই তা আমেরিকার স্বার্থের পক্ষে যাবে অনুমান করেই আমেরিকা এমন একেকটা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। ফলে এককাট্টা কোন নীতি না রাষ্ট্রস্বার্থের ভিত্তিতেই আমেরিকা চলে – এদিকটা খেয়াল রেখেই আমেরিকার বাতচিত বুঝতে হবে বা নেয়া উচিত। নইলে হুদাই ভরসা করার কিছু নাই। যেমন  ২০০৭ সালে আমরা দেখেছিলাম আমাদের রাষ্ট্রকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল কারণ আমেরিকান বিবেচনায় ওটাই আসলে তার একান্ত স্বার্থ ছিল। যেটা এখন সম্ভবত আর তার স্বার্থ নয় যদিও ওর স্বাদ মানে আমাদের জিব পোড়ার অভিজ্ঞতা এখনো বর্তমান! যেমন সে সময়ে  ভারতকে চীন-ঠেকানো বা কনটেইনমেন্ট [containment] এর কাজে ব্যবহার করা বা এমন কাজ করিয়ে নেয়া আমেরিকার স্বার্থ ছিল। আর এই কাজের বিনিময়ের বমাল ভাগাভাগির হিসাবটা ছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া, ভারতের বাংলাদেশ থেকে করিডোর ও বাজার-সুবিধা নেয়া ইত্যাদি। অতএব এখনো এবার আমেরিকা বিনিময়ে কী উসুল করবে বা কিছু একটা চাইবার স্বার্থ নিশ্চয় আছে সেটা আগাম অনুমান করে নেয়াই সঠিক হবে। যদিও সেটা কী তা এখনো অস্পষ্ট।

    তবে আমাদের জন্য যা বুঝবার আছে তা হল, এবারের “দুর্নীতিবিরোধী লড়াইকে আমেরিকার নিজের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ বলে বিবেচনা করা’ মানে হল আমরা বুঝতে পারি যে এটা আমেরিকার দিক থেকে বেশ বড়সড় এক আমেরিকান স্বার্থ। কোনো মামুলি স্বার্থ নয়।
    দ্বিতীয়ত, ওই ৩৮ পৃষ্ঠার প্রস্তাবনায় আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। বলা হয়েছে, আমেরিকায় এই হাউজিং সেক্টরের (ওদের ভাষায় রিয়েল এস্টেট[real estate]) মোট কেনাবেচায় এক-তৃতীয়াংশ লেনদেনই হয় নাকি নগদ অর্থে [ “All-cash real estate deals, which currently account for about one-third of all U.S. home sales, according to the National Association of Realtors.”]।

    All-cash real estate deals, which currently account for about one-third of all U.S. home sales, according to the National Association of Realtors.

    এটা আমেরিকান রিয়েল এস্টেট এসোসিয়েশন থেকে পাওয়া ডাটা। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ডাটা সন্দেহ নেই। কেন?
    আসলে ‘অল-ক্যাশ রিয়েল এস্টেট ডিল’ [All-cash real estate deals] এই শব্দ কয়টার মধ্যে অনেক কথা বলা আছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে সরকারি বা জনগণের অর্থ চুরি করতে দেয়া আর সেই অর্থ-পাচারকারীরা কেন আমেরিকায় গিয়ে রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় ঢুকে বা কেনাবেচায় সামিল হয় এমন আগ্রহের কারণটা এখন সবার কাছে পরিষ্কার হবে। বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া এবং স্বভাবতই তা অর্থের উৎস বলতে না-পারা অর্থ, ফলে এগুলো নগদ অর্থ থাকা অবস্থায় থেকেই রিয়েল এস্টেট প্রপাটি কিনবার জন্য সুযোগ বেশি তাই এটা আদর্শ জায়গা। এখন প্রশ্ন হল, বাইডেন কী সেই মুরোদ দেখাতে পারবেন? মুরোদ রাখেন বা কতটা পারবেন? তিনি কি আমাদের মত দেশ থেকে পাচারকারীদেরকে তাদের অর্থের উৎস দেখাতে বাধ্য করতে পারবেন এবং পাচারকারীরা তা না দেখাতে পারলে সেই প্রপার্টি যেন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট বাজেয়াপ্ত করে নিতে পারে এমন ‘প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাহী আদেশ’ কি জারি করতে পারবেন?
    স্পষ্টতই আমি সন্দেহ করছি। কেন?

    কারণ, ২০১৬ সালে ওবামা আমলে এমনই প্রায় একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এনিয়ে আরেক রয়টার্স রিপোর্ট পাবেন এখানে [U.S. targets money laundering in all-cash home sales in Miami, Manhattan]। তখন এধরণের সংশ্লিষ্ট ইন্সুরেন্স কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে এমন ‘অল-ক্যাশ বাড়িক্রেতাদের’ পরিচয় ট্রেজারি বিভাগে রিপোর্ট করতে [Treasury Department ordering title insurance companies to report the identities of people paying cash for high-end properties ]। কিন্তু তাতে তো এতদিনে অন্তত বাংলাদেশ বিরাট কিছু হৈচৈ পরে যাবার কথা ছিল। আমাদের মানুষ না চাইলেও তা জেনে যেত! কিন্তু এমন কিছু হয় নাই তা আমরা জানি। তাই,  এরপরও এই “নির্দেশ থেকে” এতে খুব বড় কোনো অগ্রগতি হয়েছে বলা যাবে না। তবে কখনও কখনও প্রায়ই আমরা একটা প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট দেখে থাকব যে, ‘গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি’ [Global Financial Integrity ] নামের এক নন-প্রফিট প্রতিষ্ঠান পাচার হওয়া বিভিন্ন দেশের অর্থের কিছু হদিস ও হিসাব প্রকাশ করেছে। যেমন, সাড়া ফেলা ‘প্যান্ডোরা পেপারস’ [Pandora Papers] (যেখানে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নওয়াজ শরীফের অর্থপাচারের তথ্য ছিল। আর এটাই তাঁর পাকিস্তানের আদালতের রায়ে শাস্তি হবার কারণ) ধরনের লিকেজ তথ্য বাইরে এসেছিল। এসব তথ্য ওই উদ্যোগের কিছু ইতিবাচক ফল মাত্র। যদিও সাধারণত ওখানে যে অর্থপাচারের তথ্য থাকে তা কোন দেশ থেকে মোট কত অর্থপাচার হয়েছে – ফোকাস সেদিকেই থাকে। তাতে সুনির্দিষ্ট ব্যক্তির তথ্য কমই থাকে। কিন্তু আরেকটা দিক হল যে, আবার বলা যায়, যেমন ঐ উদ্যোগ থেকে বাংলাদেশের কোনো কিছু প্রকাশ পায়নি। আমরা জানতে পারিনি। আর সবচেয়ে বড় কথা, এগুলো সুস্পষ্ট নাম ও প্রমাণও নয়। বরং অর্থপাচারের ট্রেন্ড বা অভিমুখ হল,  ২০১৬ সালের পরে বাংলাদেশ থেকে আরো বেশি করে আমেরিকাসহ বিদেশে অর্থপাচার হয়েছে বাধাহীনভাবে; আমাদের ব্যক্তিগত জানাশোনা থেকেই যা দেখা যায়। ফলে বাইডেন-ওবামাদের  আইন করা আর তা মাঠে প্রয়োগ করে অপরাধীদের ‘ন্যাংটা’ করা আসলে অনেক দূরের ঘটনা। এছাড়া যদি না এর মাঝে আবার কোনো “আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ” নামে কিছু ঢুকে বসে! আমরা তাই দেখতে চাইব সুনির্দিষ্ট কিছু।  এবং সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল,  সেসব ব্যক্তি ও তাদের পাচারকরা অর্থ দুটোই ফেরত আনা দেখতে চাইব। কারণ, আমেরিকাকে মনে রাখতে হবে তারা “আইনগতভাবে” শব্দটা ব্যবহার করেছে – ‘kleptocrat’ বলে। যার বাংলা মানে যারা ব্যক্তিগত পাচারকারী তারা নয় বরং সুনির্দিষ্ট করে ক্ষমতাসীন শাসক যারা ‘পাবলিক মানি’  আত্মসাৎ ও পাচারকারি। বাংলাদেশের পাবলিক মানি এর হকদার বাংলাদেশের মানুষ – তাঁর ‘জনস্বার্থ’ এটা। অতএব আমেরিকান ট্রেজারি এই আইনগত কারণে উদ্ধারকরা অর্থ বাংলাদেশের ট্রেজারি হস্তান্তর করবে এটাই কাম্য! তবেই বাংলাদেশের মানুষের কাছে বাইডেনের এই-সেই ততপরতা মিনিংফুল হতে পারে! নইলে আরেকটা ১/১১ দেখার সাধ আমাদের নাই, তা সরাসরিই বলা দেয়া যায়!

    এবারের আরো কিছু বৈশিষ্টঃ
    তবে এবারের মানে ৬ ডিসেম্বরের মিডিয়া যতটুকু যা হইচই করা; এর অন্যতম কারণ হল, বর্তমানে বাইডেন প্রশাসনের ট্রেজারি বা রাজস্ব বিভাগের ডেপুটি মন্ত্রী ওয়ালী আদেইমো [Wally Adeyemo]; তিনি সম্প্রতি এক আমেরিকান থিংকট্যাংক ‘ব্রুকিং ইনস্টিটিশনের’ অতিথি বক্তৃতায় কথা দেন যে, তিনি এ বিষয়ে খুব আগ্রাসীভাবে চাপ দিবেন যাতে বৈধ উৎস দেখাতে না পারা যারা আমেরিকায় নগদে বাড়ি কিনেছেন তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার কাজ ত্বরান্বিত করা হয়। তিনি অবশ্য সেখানে স্বীকার করেন যে, “উপস্থিত আইনে নগদ অর্থেই রিয়েল এস্টেট প্রপার্টি কিনতে কোনো বাধানিষেধ নেই”। সাথে এও স্বীকার করে বলেছেন, “আমাদের রিয়েল স্টেট ব্যবসা এ ধরনের চোর শাসকদের বিদেশে সম্পত্তি কিনতে সাহায্য করে নিজেরই বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে”।

    [Another of these dark corners is the real estate market. Today, certain all-cash real estate transactions are not subject to permanent anti-money laundering rules or requirements for beneficial ownership disclosure. As a result, our real estate markets are at risk of becoming a safe haven for criminals, kleptocrats, and others seeking to park corrupt profits.]
    _ Remarks by Deputy Secretary of the Treasury Wally Adeyemo on Anti-Corruption at the Brookings Institution

    তবে আমাদের জন্য বটম লাইন হল, “খাওয়ার পরে হাত না ধোয়া পর্যন্ত বিশ্বাস নাই যে, আসলেই খেতে দিবে”। অর্থাৎ আশ্বাস না, কাজে বাস্তবায়ন দেখতে চাই। ফল দেখতে চাই। যেমন তিনি ঐ বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন আইএমএফের এক হিসাব মতে, সারা দুনিয়ার সরকারগুলো অর্থপাচার-দুর্নীতির কারণে প্রতিবছর প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার (একহাজার বিলিয়ন) ট্যাক্স-রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। তাই আবার স্বপ্নও অবশ্যই দেখতে চাই। যেমন, আমেরিকায় এমন প্রেসিডেন্সিয়াল এক্সিকিউটিভ অর্ডার আর এর বাস্তবায়ন শুরু হলে তা কানাডার ওপর ছড়াবে, চাপ তৈরি করবে। অর্থাৎ আমেরিকায় কেনা সম্পত্তি কানাডায় সরিয়ে নেয়ার সুযোগ হবে না। এমনিতেই আমেরিকার সাথে কানাডার একটা আইনের ইউনিফর্মিটি রাখার চেষ্টা হয়। কানাডায় পালিয়ে থাকা আমেরিকার আসামিকে কানাডাই গ্রেফতার ও পরে প্রত্যাবর্তন করাতে পারে। এ ছাড়া খেয়াল করলে দেখা যাবে, আমেরিকার ঘোষিত (বাংলাদেশসহ অনেক দেশের ওপর) অবরোধ আরোপ, এটা ব্রিটেন ও কানাডাও সমর্থন করে [“Our actions today, particularly those in partnership with the United Kingdom and Canada, send a message that democracies around the world will act against those who abuse the power of the state to inflict suffering and repression.”]।

    এজন্য বিপরীতে যেমন দেখা যায়, মালয়েশিয়া কেন লুট ও অর্থপাচারকারীদের ‘সেকেন্ড হোম’ হতে পেরেছে? কারণ, মালয়েশিয়ার আইনে আগেই বলে দেয়া হয়েছে যে মালয়েশিয়ায় অর্থ নিয়ে প্রবেশ করলে বাড়ি-প্রপার্টি কেনাসহ নাগরিকত্ব পাবে, সহজেই। কারণ মালয়েশিয়ায় আনা অর্থের উৎস জানতে চাওয়া হবে না। আর এ ধরনের রাষ্ট্রগুলো নিজের এমন আইনের সাফাই হিসেবে বলে, তারা নিজ দেশের জন্য বিদেশী পুঁজি সংগ্রহের উপায় হিসেবে এটা করেছে। যদিও আমার দেশের সম্পদ চোরকে কেন এমন উৎসাহ ও সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে; যা প্রকারান্তরে আমাদের দেশের শাসককে লুটপাট ও অর্থপাচারে উৎসাহিত করা – এই ব্যাপারে তারা নিশ্চুপ থাকে।

    কাজেই বাংলাদেশী ‘All-cash real estate deals’ ক্রেতা, এদের নিয়ে অগ্রগতি কই?  ০৬ ডিসেম্বরের পরে এক মাসের বেশি হয়ে গেছে, স্বভাবতই আমরা অগ্রগতি জানতে চাইব। কেবল তখনই একমাত্র এসবের ওপর পাবলিকের আস্থা-বিশ্বাস অল্প করে হলেও জাগতে পারে। শুধু গল্পে কিছু হবে না। আমরা তো চোদ্দবছর আগে একবার ধোকা-খাওয়া ঘরপোড়া জনগোষ্ঠির মানুষ!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ০৮ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “অর্থপাচারকারীর কী হবে?”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ‘অবরোধের’ অভিমুখ, এছাড়া কোথাও অন্য আলাপ নেই

    ‘অবরোধের’ অভিমুখ, এছাড়া কোথাও অন্য আলাপ নেই

    গৌতম দাস

    ২৭ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3RC

     

         The Impact of the U.S. President on Economic Sanctions

      An exterior view of the building of US Department of the Treasury is seen on March 27, 2020 in Washington, DC. – US Treasury Secretary Steven Mnuchin on Friday pledged to quickly send cash to Americans as part of the a massive $2.2 trillion relief package aimed at rescuing the coronavirus-battered economy. (Photo by Olivier DOULIERY / AFP) (Photo by OLIVIER DOULIERY/AFP via Getty Images)

     

    চার দিকে মার্কিন  অবরোধ ছাড়া বাংলাদেশে এখন যেন কোনো আলোচনার বিষয় নাই। গত ১০ ডিসেম্বর বাইডেন প্রশাসন এক স্যাংশন বা অবরোধের তালিকা প্রকাশ করেছিল। ওই তালিকাটা প্রকাশ করার পরে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়ে আছে বাংলাদেশে। তালিকায় ভুক্ত অন্য দেশগুলো হল – উগান্ডা, উত্তর কোরিয়া, চীন, বেলারুশ, শ্রীলঙ্কা ও মেক্সিকো। এখানে আমেরিকার দিক থেকে এই অবরোধ আরোপের কারণ কী? সে কারণ বলা হয়েছে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অবরোধ আরোপ’ …“gross violations of human rights,”…। তবে বাংলাদেশসহ এই সাত দেশের যেসব সরকারি কর্মকর্তার ওপর অবরোধ আরোপ হয়েছে তারা মোট ১২ জন [designated 12 government officials ]। অথচ এই ১২ জনের মধ্যে একা বাংলাদেশেরই ছয়জন। যারা একই প্রতিষ্ঠানের র‍্যাব [RAB] থেকে। মানে আগের মহাপরিচালক বেনজির ও এখনকার বর্তমান মহাপরিচালক এবং সাথে এখনকার চলতি অতিরিক্ত মহাপরিচালক সাথে আরো সাবেক তিন অতিরিক্ত মহাপরিচালক – এভাবে মোট ছয়জন। [ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের মূল নিষেধাজ্ঞার প্রেস রিলিজে এই ছয়জনের নাম দেয়া আছে।] তাই  সম্ভবত বলা যায়  বড় চাপ অথবা ‘বড় থাবা’তে যে আমেরিকা  বাংলাদেশকে ধরেছে তা অনুমান করা যায়। এখান থেকেই বাংলাদেশের সর্বত্র চা দোকান থেকে আলিশান ড্রয়িংরুম বা ক্ষমতার করিডোরগুলোতে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়েছে  এই মার্কিন অবরোধ।

    কিন্তু এই অবস্থার কারণেই আবার বাংলাদেশের বাইরে অবরোধের প্রতিক্রিয়া কী হচ্ছে, কিভাবে পড়ছে সেদিকটা প্রায় নজর শূন্য হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের। অথচ সেটাও বাংলাদেশের দিক থেকে দুনিয়ার পরিবর্তন বুঝার জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয় মোটেও। তবু প্রথমেই বলে নেই, এখানে ‘বাংলাদেশের বাইরে’ বলতে শুধু অবরোধ তালিকায় থাকা উগান্ডা, উত্তর কোরিয়া, চীনসহ ছয় দেশের কথা বুঝাচ্ছি না। এর বাইরেরও দেশ যারা আছে, যাদের নাম তালিকায় থাকার কথা কিন্তু শেষবেলায় এসে আমেরিকা যার নাম তালিকায় রাখেনি। যেমন, এমন অন্যতম দেশ হল, ভারত।

    এই ২০০১ সাল শুরু হয়েছিল, এটা ধরে নিয়ে যে ভারত  তখন থেকে আমেরিকার ঘোরতর স্ট্র্যাটেজিক বন্ধু হয়ে গেছে। আসলে এক ভয়ঙ্কর ইসলামবিদ্বেষ [islamophobia] এক ফোবিয়া যা কোনভাবেই গ্রহনযোগ্য নয় কারণ তা ধর্মের বিরুদ্ধে অন্য এক ধর্মের এথনিক ঘৃণা ছড়ানোর হিটলারি তৎপরতা। অথচ  এটাই আবার ভারত ও আমেরিকার কমন চরম অনৈতিক ও নির্মুলের [ক্লিনজিং-এর] স্বার্থ। এমন দগদগে স্বার্থই তাদের গত শতকের বেশিরভাগ সময় জুড়ে যে সব পুরনো বিবাদ ছিল তার সব ভুলে কাছাকাছি ও নতুন বন্ধু হতে উৎসাহিত করেছিল।

    অন্যভাবে বললে আমেরিকার “ওয়ার অন টেরর”পলিসিতে বড় সমর্থক হিসেবে এশিয়ায় ভারতকে পেতে ভারত-আমেরিকা কমন ইসলামোফোবিয়ার ভিত্তিতে পরস্পর তারা নতুন বন্ধুত্ব শুরু করেছিল। আর এটা এমনই পরস্পরের পিঠ চুলকে দেয়া বন্ধুত্ব যে, মনে করা হত তাদের পরস্পরের এই ‘পার্টনারস ইন ক্রাইম’-এর বন্ধুত্ব – এটা সহসাই নষ্ট হচ্ছে না; হবে না বা ভাঙবে না।

    অনেকের মনে হতে পারে কেন আমি এটাকে ভারত-আমেরিকার  – “ইসলামোফোবিয়ার ভিত্তিতে পরস্পর তাদের নতুন বন্ধুত্ব শুরু” বলছি? একটা ছোট ঘরোয়া উদাহরণ দিব। বিভিন্ন দেশের মাইগ্রেন্ট হতে চাওয়াদের নিয়ে নিজ দেশে নাগরিকত্ব দিচ্ছে এমন দেশগুলোর মধ্যে  কানাডা অন্যতম।  আর বাংলাদেশের অনেক বাসিন্দা এমন সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রেও অন্যতম। তাতে বাংলাদেশ থেকে  হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে অনেকে এমন নাগরিকত্ব নেয়া শেষ করেও ফিরে দেশেই থেকে গেছে অথবা কানাডায় বসবাস শুরু করেছে। সম্প্রতি গত সপ্তাহে কানাডা আবার আরো চার লাখের মত নতুন মাইগ্রেন্ট নিবে বলে ঘোষণা করেছে। এমন প্রেক্ষিতেই আমাদের এই স্টোরি।
    এনিয়ে দুই উচ্চ-শিক্ষিত হিন্দু নারীর কথোপকথন যারা  বহু পুরানা কানাডায় নাগরিকত্ব নেয়া বাংলাদেশি মাইগ্রেন্ট। তারা আক্ষেপ করে বলছেন, নয়া এই আরো মাইগ্রেন্ট নেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে, তাদের দৃষ্টিতে কানাডা আর তাদের বসবাসের জন্য উপযুক্ত স্থান থাকবে না। কেন, এমন অনুমান? কারণ এতে কানাডিয়ান বাংলাদেশিদের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা ব্যাপক বেড়ে যাবে। আর তাদের অনুমানে ধরে রাখা আছেই যে  মুসলমান মাত্রই তারা “পশ্চাতপদ, আনকুথ, আনকালচার্ড” ইত্যাদি। ওরা সেই কথা চিন্তা করে এই কথা বলছেন। মানে বৃটিশ আমল থেকেই  “প্রগতিশীলতা নামে” যা তাদের মনের গভীরে প্রোথিত তা আসলে এক এথনিক ঘৃণা, এক ক্লিনজিংয়ের আকাঙ্খা, এক “হিটলারি মনোরোগ”। সেসবই এখানে নব-পরিসরে প্রকাশিত হয়েছে।
    এই কথোপকথনের পরে আরো কিছু শেষ অংশটা এখন কী ও কেমন হতে পারে সেই ছবিটা এঁকে দেয়া যাক। সেটাও কম ভয়ঙ্কর নয়। ইসলামোফোবিয়া-সহ যেকোন ফোবিয়া [phobia] বা এথনিক ঘৃণা-বিদ্বেষ আসলে কিন্তু খুবই ছোঁয়াচে। মানে কী? মানে হল তা শ্রোতার মনেও পালটা এথনিক ঘৃণা-বিদ্বেষ জাগিয়ে তুলতে পারে।  যেমন ইসলামোফোবিয়ার কমন অনুষঙ্গ বা সাথে বড় হওয়া ভাবনা হল মুসলমান নির্মুল বা ক্লিনজিংয়ের প্রবল আকাঙ্খা। কিন্তু তাতে কী সমস্যা? সমস্যাটা হল, এতে ইসলামোফোবিক দিকটা টের পেলে মুসলমানদের মনেও প্রথম প্রতিক্রিয়াটা হয় আত্মরক্ষা।  মানে, মনে আত্মরক্ষার চিন্তা আসা। যা সবচেয়ে কমন ও স্বাভাবিক!  কিন্তু এই আত্মরক্ষার উপায় বা পথ হিসাবে সে এরপর যা বেছে নেয় সেটাও আরেকটা তবে অন্যভাবে বলা আমরা-তোমরা। যেটা হল আমার ধর্মটাই শ্রেষ্ঠ।  যেটা পরিণতিতে এমন এক দুনিয়ার কল্পনা হিসাবে হাজির হয় যে দুনিয়াটাতে মুসলমান ছাড়া আর কেউ নাই। অর্থাৎ আত্মরক্ষার  বেস্ট মানে যেন এমন এক দুনিয়ার কল্পনা করা যেখানে মুসলমান ছাড়া আর কেউ না থাকে।  তাহলে এখানে সারকথাটা হল, যেকোন ফোবিয়া মাত্রই অন্যান্য অসংখ্য ফোবিয়ার জন্ম দেয়া। যেগুলো সমান মাত্রায় বিপদজনক।
    ইংরাজি এথনিক [ethnic] মানে বাংলায় আমরা একেও ‘জাতি’ বলি।  এছাড়াও ইংরাজিতে আরেক জাতি [race] আছে। বাংলায় একেও আমরা জাতি বলি। দুটার ফারাক হল, রেস মানে রক্ত বা জিন [gene] -গত বায়োলজিক্যাল ফারাক। এই অর্থে জাতিগত  মানুষে-মানুষে ফারাক বুঝায়। যুগ যুগ ধরে  নানান ধর্ম, কালচার, ভাষা, খাদ্যাভাস ইত্যাদির ভিত্তিতে  জনগোষ্ঠিগত সামাজিক ফারাক হতে দেখা যায় এটাই এথনিক-জাতিগত ফারাক।

    এখন কোন একটা রেস অথবা এথনিক জাতি যদি “অপর” জাতির উপর ঘৃণা-বিদ্বেষে চরমে উঠায় বা ‘ফোবিক’ হয়ে যায় এটাই “হিটলারি ফেনোমেনা”।   সবচেয়ে বড় কথা এক ফোবিয়া বাকি সকলের মধ্যে একই নতুন নতুন ফোবিয়ার জন্ম দেয়, ডেকে আনে।  এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল, হিটলারের “ইহুদি-ফোবিক” হয়ে যাওয়া।  আবার পরিণতিতে এথেকে ছোঁয়াচে ঘটনায় এবার ইহুদিদের মধ্যে জায়োনিস্ট আইডিয়ার ব্যাপক উদ্ভব ও জনপ্রিয়তা। জায়োনিজম তাই দুনিয়ার বাকি সব-জাতি [race and ethnic উভয় অর্থে] জনগোষ্ঠিকে প্রবলতম ঘৃণা-বিদ্বেষ করে থাকে, এমন চরম ফোবিক এক ফেনোমেনা হয়ে গেছে। সে নিজেকে বাদে বাকি সব-জাতি [race and ethnic উভয় অর্থে] জনগোষ্ঠি্র উপর আক্রমণ ও নির্মুলের আকাঙ্খাকে স্বাভাবিক মনে করে;  অর্থাৎ যেকোন “অপর” এর উপর তাদের নুন্যতম আস্থা-বিশ্বাস নাই, সব উঠে গেছে।

    কিন্তু এমন সব গাঢ় অনুমানকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে বাইডেনের অবরোধের তালিকা প্রকাশ। ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অবরোধ আরোপ’- এই ভিত্তিতে সেই তালিকা; তবে বেছে বেছে ‘কিছু দেশের’ ওপর বাইডেন প্রশাসনের অবরোধের পদক্ষেপ নিতে তাদের দেশের নাম তালিকায় রেখেছেন। বেছে বেছে কিছু দেশ বললাম এজন্য যেমন দেখেন, বাইডেন নিজের ঘোষিত নীতি ভারতের বেলায় প্রয়োগ করার মুরোদ দেখাতে পারেননি। কিভাবে সেটা?

    ঘটনার শুরু গত ২০২০ সালে বাইডেন যখন প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা নিশ্চিত করেন। তবে এরও আগেই কিছু আমেরিকান (মুসলমান ও নন-মুসলমান) কংগ্রেস সদস্য কাশ্মিরে ভারতের মুসলমানদের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন আর সর্বোপরি কাশ্মিরের (ভারতের জন্ম থেকেই দেওয়া) স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা ক্ষুণ করে জবরদস্তিতে সারা কাশ্মিরই ভারতের মূল ভুখন্ডের অংশ বলে (২০১৯ আগস্টের ৫ তারিখে) মোদি সরকারের সংসদে ঘোষণা – এরপর থেকে ক্রমাগত কাশ্মিরের বাসিন্দাদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘন চরমে উঠেছিল বলে এসব ঘটনাকে আমলে নিয়ে এর বিরুদ্ধে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব এনেছিল। আর প্রার্থী বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হলে এই প্রস্তাবের পক্ষে পদক্ষেপ নিবেন বলে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন। আর এটাই বাইডেন-মোদির সংঘাতের সম্পর্কের ঘটনার উৎস। আর এমন ঘোষণা মোদি সরকার ভালোভাবে নেয়নি, বিপদ দেখেছিল। এই ঘোষণা থেকেই মোদির পিছটান ও আমেরিকান সম্পর্ক ছেড়ে পালানোর উপায় বের করা শুরু হয়েছিল। তাই বাইডেন বিজয়ী হওয়ার পর থেকে মোদি সরকারের অঘোষিত টেনশন শুরু হয়ে যায়।

    তবে সেই টেনশন আরো বাস্তব হয়ে উঠতে বাইডেন প্রশাসন শপথ নেয়ার পরেও ১০ মাস সময় লেগে যায়। এবার ১০ ডিসেম্বরে বাইডেন অবরোধের তালিকা প্রকাশ করেছেন। এদিকে ইতোমধ্যে মোদি সরকারের মুসলমানদের ওপর একের পর এক নির্যাতন, নিপীড়নের পাপ আর কেবল কাশ্মিরেই আটকে থাকেনি। ভারতজুড়ে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল। এছাড়া বাইডেনের সাথে বিবাদ বাড়ার আরও ঘটনা ছিল যা যোগ হয়েছে। কোন্ কোন্ দেশের নাগরিককে তার দেশের সরকার নিজ নিজ ধর্মপালনে বাধা দিচ্ছে বা ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে তা লক্ষ্যরাখা ও নোট নেয়ার জন্য আমেরিকায় এক রাষ্ট্রীয় স্বাধীন কমিশন [USCIRF] আছে যার কাজ হল সেসব লঙ্ঘনকারি সরকারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য যে প্রশাসনই আমেরিকায় ক্ষমতায় থাকে তার কাছে বার্ষিক সুপারিশ রিপোর্ট পাঠিয়ে দেয়া। এবারের ২০২১ সালের এমন রিপোর্টে ভারতকে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী ক্যাটাগরির দেশ [CPC (“country of particular concern,”] হিসেবে ভারতের বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়ার সুপারিশ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।

    তাই মোদি সরকারের আশঙ্কা ছিল বাইডেন ট্রাম্প প্রশাসনের মত তার ফেভারেবল সরকার নয়। যে ট্রাম্প প্রশাসন এসব রিপোর্ট উপেক্ষা করে ফেলে রেখে চলেছিল। এছাড়া চলতি ডিসেম্বরের ৯-১০ তারিখ বাইডেন ‘ডেমোক্র্যাসি সামিট’ আহবান করেছিল আর এখান থেকে যে এই অবরোধের তালিকা প্রকাশ করা হবে তা আমেরিকার দিক থেকে আগেই ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। ফলে সেসব কথা ভারত জানা ছিল গত অক্টোবর মাস থেকে, বিশেষ করে নভেম্বরের শুরুতে প্রকাশ্যে  সামিটের দাওয়াতপত্র বিতরণ শুরু হওয়া থেকে।

    আর এখান থেকেই মোদি সরকার আমেরিকার ওপর পাল্টা চাপ সৃষ্টির কৌশল ও পদক্ষেপ নিতে জরুরী বোধ করা শুরু করেছিল। সেই পদক্ষেপ হিসাবে ভারত প্রকাশ্যেই রাশিয়ার সাথে তার ঘনিষ্ঠতা প্রকাশ করতে শুরু করে। অনেকে ধারণা করত চীন ও রাশিয়া যেহেতু আমেরিকার বিরুদ্ধে তারা এক-জোট; এই অবস্থা গত ১০ বছরের বেশি ধরে বহাল রেখেছে কাজেই এর বিপরীতে চীন-ভারত প্রকাশ্য বড় শত্রুতায় আছে বলে একে পাশ কাটিয়ে ভারত-রাশিয়া ঘনিষ্ঠতা খুব একটা কার্যকর হবে না।

    আসলে ২০০১ সালে ওয়্যার অন টেরর নীতির কারণে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা শুরু হয়েছিল তাতে বলা যায় আমেরিকা ওই প্রথম রাশিয়া থেকে ভারতকে বিচ্ছিন্ন ও আলাদা করে  অনেক দূরে নিয়ে চলে যায়; যার মূল টোপ বা কারণ হল, বুশের আমেরিকা ভারতকে পরমাণু-অস্ত্রবিষয়ক টেকনোলজি ও কাঁচামাল-উপাদান সরবরাহের যেসব আইনি বা কনভেনশনের বাধা (এনপিটি NPT) ছিল তা উপেক্ষা করে সহায়তার হাত বাড়িয়েছিল। স্বভাবতই এর লোভেই ভারত তার এতদিনের জিগার- যে ভারতকে রাশিয়ান অস্ত্রে সজ্জিতকারী এত পুরনো বন্ধু, সেই রাশিয়াকে উপেক্ষা করে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক বন্ধু হওয়ার জন্য ছুটে গিয়েছিল।

    ভারতের ‘সরকারি কালচারে’ কোনটাকে তারা ‘সুখ’ বা অর্জন বলে বুঝে এর কিছু বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি বা এটিচ্যুড-ভঙ্গিমা আছে। যেমন আমেরিকা ভারতকে গুরুত্ব দিয়ে গত প্রায় ২০ বছর চলেছে কাজেই ভারত পরাশক্তি হয়ে গেছে। এমন অর্থহীন মিথ্যা হামবড়া কংগ্রেসের প্রণব মুখার্জি করে গেছে আর এখন মোদি করে যাচ্ছেন। তবে কৌওলটা হল এটা সরকার নিজে পাবলিকলি প্রচার না করে, প্রপাগান্ডা সাংবাদিকদের দিয়ে করানো! সে উদ্দশ্যে তারা সরকারের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের সাথে কাজ করে এমন  সাংবাদিকদেরকে তা বিশ্বাস করিয়েই ছেড়েছিল। এ ছাড়াও আমেরিকা যেসব ঢংয়ে ভারতকে গুরুত্ব দেয়া প্রকাশ করেছিল সেটা নিশ্চয় ভারতের জন্য খুবই সম্মানের- এই অনুমানটাই সরকারি কালচারে বর্তমান।

    যেমন প্রায়ই আমরা একটা কথা শুনব যে “২+২ ডায়ালগ”। এটা তাদের অনুমান বিচারে খুব উচ্চমার্গের ব্যাপার। এমনকি রিপোর্টের শিরোনামেও এই শব্দগুলো তারা এনেছে। কেন? কারণ এটা আমেরিকা ভারতকে অফার করেছিল। তাহলে নিশ্চয় এটা দামি কিছু না হয়ে যায়ই না……!! এবং এই কালচার চালু করেছিল। অথচ ব্যপারটা স্রেফ আর কিছুই না, আমেরিকার ভারতকে অস্ত্রবিক্রি গছানোর মাত্র কায়দা একটা। সেখানে ‘২+২’ বলতে খাঁড়া মানে, দুদেশেরই পররাষ্ট্র আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী এভাবে এখানে চারমন্ত্রীর একসাথে বসে অস্ত্র কেনাবেচার লক্ষ্যে কোন মিটিং করা। এটা এতদিন আমেরিকান স্টাইল ছিল, ভারতকে জাতে তোলার। তাই এবার পুতিনের সফরে ভারতও রাশিয়ার সাথে এক ‘২+২ ডায়ালগ’ করেছে। এর এক পরোক্ষে ‘প্রদর্শনী অর্থ’ আছে যে, আমরা আমেরিকা ছাড়াই রাশিয়ার সাথেও এমন গুরুত্বের ডায়ালগ করেছি। আর ভারত সব সময় (ভুয়া এক সুখ) অনুভব করতে চায় যে দুনিয়ার পরাশক্তিদের সাথে ভারতের ‘২+২ ডায়ালগ’ – এসব করা মানে ভারতও এতে পরাশক্তি হয়ে গেছে। এর লক্ষণ এসব!!!

    এছাড়া সাথে আরেকটা মিডিয়া কাভারেজে আমরা দেখতে পাই ওই একই দ্য-প্রিন্ট [the-print] ওয়েবপত্রিকায় যেটা লিখবেন জ্যোতি মালহোত্রা। তার লেখা পড়ে পেইড লেখা মনে হবে। ‘যেমন তেমনই’ লেখাটার শিরোনাম হল Putin’s visit is a defining moment for India-Russia ties. It’s a telling message to China। আজিব ঘটনাটা হল, এটাই নাকি “চীনকে (চোখ টাটিয়ে) বলা এক মেসেজ’। মানে অন্য লেখায় নয়নীমা বসুর লেখাটা যদি বিদেশ মন্ত্রণালয় তাকে প্রভাবিত করে লেখানো লেখা বলি তাহলে মালহোত্রার লেখাটা হল একেবারে অর্ডার দিয়ে লেখানো! কিন্তু কেন এটা ‘ডিফাইনিং মোমেন্ট’ বলা হচ্ছে এর ব্যাখ্যা নেই। আর এমন তো নয় যে, রাশিয়া ভারতের সাথে কোনো ডিফাইনিং মোমেন্ট তৈরিতে যেতে চাইছিল!  না; তা তো নয়। বরং ভারতই আমেরিকার সাথে তাকাতে রঙিন চশমা দিয়ে দুনিয়া দেখার সুযোগ নিচ্ছিল আর এটা ভারতকেই আটকে রেখেছিল রাশিয়ার কাছে ছুটে যাওয়া থেকে। তাহলে ডিফাইনিং মোমেন্টের নাগাল ভারত এতদিন পায়নি নিজের বোকামিতেই…।

    তবে এতে যেটা হয়েছে তা হল, ভারত আমেরিকা থেকে আরো অনেক দূরে চলে গেছে যেখান থেকে ফিরে আবার আমেরিকার কাছে যাওয়াটা অনেক কঠিন হয়ে গেল। অনিশ্চিতও হয়ে গেল।

    কিন্তু মোদি আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ছেড়ে রাশিয়ার সাথে ভারতের পুরান সম্পর্কটা ফিরে জাগাতে এত সিরিয়াস কেন? প্রথমত মোদি তা করতে গেছেন নিজ সরকারের স্বার্থে নয়। বরং মোদির আসন্ন সব নির্বাচনে বিজয়ের স্বার্থে। ভারতের বিরুদ্ধে বাইডেনের মানবাধিকার লঙ্ঘন বা মুসলমান দমনের অভিযোগ  বরং মোদিকে আগামি ২০২৪ সাল পর্যন্ত নির্বাচনে বেকায়দা অবস্থায় ফেলবে; এই হলো মোদির অনুমান। করোনার সেকেন্ড ওয়েভ থেকেই মোদির পাবলিক রেটিং এরপর থেকে যারপরনাই খারাপ। আর সেটাকে চাঙ্গা করতে মোদি এখন আরো বেপরোয়াভাবে মুসলমান নির্যাতন শুরু করেছেন, অন্তত ২০২৪ পর্যন্ত করে যাবেন। যেমন, ‘পাবলিক প্লেসে নামাজ পড়া যাবে না। ভোটের আগে ত্রিপুরায় মসজিদে হামলা বা কমিউনিটিতে হামলা করলে অন্য বিরোধীরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে আগিয়ে আসে নাই। এই ভয়ে যে এতে সেই বিরোধী দল হিন্দু-ভোট হারাবে”। আবার চার দিন আগে উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারে তথাকথিত কিছু সাধুদের দিয়ে (নাম তার খুব বাহারি – যতি নরসিংহানন্দ স্বরস্বতী) প্রকাশ্যে জনসভায় ঘোষণায় আহ্বান জানালেন মুসলমানদের হত্যা করার জন্য। অথচ কেউ মামলা করেনি, এই অজুহাতে পুলিশ চুপ করে বসে আছে। তাই কলকাতার মমতার দল তৃণমূলের এক উপস্থিত সদস্য বাদি হয়েছে। তিনি নির্বাচন কমিশনেও নালিশ দিয়েছেন। মোদির দলের মুখ কুলুপ! অর্থাৎ এগুলো হল, আগামী মাসে উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে আবার জিতে আসার জন্য মোদির একমাত্র  ও শেষ উপায়।
    তাই এই অবস্থায় মুসলমানের ওপর নির্যাতন বা হত্যার অভিযোগ আবার আমেরিকান মানবাধিকার লঙ্ঘনে বড় হয়ে উঠুক এটা মোদি নিতে পারবেন না। তাই আমেরিকার কাছ থেকেই ভারতের এই পলায়ন। তাতে ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থ যাই হোক সেটা সেকেন্ডারি, পরে দেখা যাবে। মোদির মূল স্বার্থ এখন নির্বাচনে বিজয়। নির্বাচনে নিজের দলকে বাঁচানো।

    তাই এই ডিসেম্বর মাসেই বাইডেনের ওপর পাল্টা চাপ তৈরি করতে মোদির ভারত এবার মরিয়া অবস্থায় রাশিয়ার পুতিনের ভারত সফর আয়োজন করেছিল। পুতিনের ভারত সফর ছিল ৬ ডিসেম্বর এবং তা কেবল পাঁচ ঘণ্টার জন্য। কিন্তু আয়োজন, আলোচনার বিষয়বস্তু প্রসঙ্গে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের প্রপাগান্ডা ছিল শিখরে।

    ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় তাদের দেশীয় মিডিয়ায় কিভাবে হাজির থাকতে চায়, এর কিছু তরিকা দেখতে পাওয়া যায়। দা-প্রিন্টের নয়নীমা বসু বলতে চান যে, ভারত আর শুধু রাশিয়ান অস্ত্রের ক্রেতা নয়। ভারত এখন অস্ত্রবিষয়ে জয়েন্টভেঞ্চারে উৎপাদক। এমনকি অস্ত্রবিষয়ক গবেষণাতেও অংশীদার হতে যাচ্ছে।

    তাহলে সারকথাটা কী?
    সারকথাটা হল, অবরোধের অভিমুখটা এখন থেকে যতই দিন যাবে ভারত ততই আমেরিকা থেকে দূরে চলে যেতে থাকবে। যার একটা পর্যায়ে ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক আর আগের জায়গায় ফেরার সব সম্ভাবনা নিঃশেষ ও লুপ্ত হয়ে যাবে। অবস্থা দ্রুতই সেদিকে যাচ্ছে। আর সেটার এখনই যে অবস্থা তাতে বাংলাদেশের উপর আমেরিকান চাপ প্রয়োগ যে হারে বাড়ছে তাতে এথেকে বাংলাদেশকে নুন্যতম রিলিফ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের কোন ভুমিকা রাখার সুযোগ এখনই প্রায় নাই। ফলে আমাদের সরকারকে সহায়তা দিবার ক্ষেত্রে বাকি থাকল কিছু পুরান কমিউনিস্ট রাষ্ট্র যারা মনে করে শ্রেণী স্বার্থের নামে রাষ্ট্রের হাতে নাগরিককে হত্যা কিংবা, গুম-খুন করার সুযোগ তো থাকতেই হবে। সেই সুত্রে,  রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্ক সেটা আবার কী? অথবা ধরেন, নাগরিক বলে কাউকে সুরক্ষার দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে? কেন? এসব তারা মানে না। তাদের রাষ্ট্র ধারণায় এসবের বালাই নাই। আছে কেবল তথাকথিত শ্রেণীস্বার্থের শ্রেণীবোধ – শ্রেণীর রাষ্ট্র ধারণা ইত্যাদি। আসলে এগুলো এমন সব শত বছরেরও বেশি পুরান অর্থহীন সব কমিউনিস্ট প্রলাপ!! যা রিভিউয়ের সাহস, নিজেকে সংশোধন ও পুনর্গঠনের সক্ষমতা একালে কারও মধ্যেই নাই!
    তবুও ব্যক্তিগত স্বার্থ বা আত্মরক্ষার্থে  হাসিনা সরকারের অভিমুখ দিনকে দিন সেরকম ক্যাম্পের দিকেই হবে। আবার এর উল্টাটা যে, আমেরিকান বিরাট কোন স্বার্থ আছে যেমন বঙ্গোপ্সাগরে সপ্তম নৌবহর নোঙর করানোর সুযোগ মিলবে –  এই লোভে সে কোন স্বৈর শাসকের বিরুদ্ধে খাড়া হয়ে যেতেও পারে। সেটা হয়ত পারে, হয়ত তা সে করবে হয়ত না। কিন্তু এসব স্বার্থে আমেরিকান কোন পদক্ষেপ নিবার ক্ষেত্রেও আমেরিকান সক্ষমতার মুরোদ নিঃশেষ হবার দিক যাচ্ছে আর সম্ভবত বাইডেনই হতে যাচ্ছেন তাতে শেষ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট। তাও আবার যা করার তা  আগামি বছরের মাঝামাঝির পরে তাও লোপ পেয়ে যাওয়ার অভিমুখে হাটছে!!! বিশেষত আমেরিকান – সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতিক উত্থানের ধাক্কায় –
    রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ গঠন তা সামলাতে অক্ষম হয়ে যেতে পারে, এমন স্বার্থ সংঘাত বিপুল বেগে বাড়ছে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ২৫ ডিসেম্বর ২০২১ ওয়েবে  আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “অবরোধ’ ছাড়া কোথাও আলাপ নেই”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • গিভ এন্ড টেকের ‘বস্তুই’ নাই

    অবরোধ আলোচনায়ঃ

    গিভ এন্ড টেকের ‘বস্তুই’ নাই

    গৌতম দাস

    ২০ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Re

     

    Recent US sanctions On China, Bangladesh

    Bangladesh protests US sanctions against RAB

     

     

    গত ১০ ডিসেম্বর বাইডেনের আমেরিকার ট্রেজারি বিভাগ বাংলাদেশের বিশেষ প্যারামিলিটারি বাহিনী ‘র‌্যাব [RAB] এর চলতি এবং সাবেক সাত অফিসার ও খোদ প্রতিষ্ঠানটার ওপর অবরোধ বা স্যাংশন [sanction] আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এতে সাবেক র‌্যাব প্রধান ও বর্তমান আইজি পুলিশ বেনজীর আহমেদও আছেন। এদিকে সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদেরও আমেরিকান ভিসা বাতিল করে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে বলে দেশের মিডিয়ায় রিপোর্ট এসেছে।

    বাংলাদেশে আমেরিকার এই অবরোধ আরোপের রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাব এখন কোথায় কতটুকু পড়বে অথবা এর প্রতিক্রিয়া কী কী, কতদূর হতে পারে অথবা সরকার টিকে থাকতে কোনো সমস্যায় পড়বে কি না – এসব নিয়ে জল্পনা-কল্পনা এখনকার সময়ের প্রধান আলোচনার বিষয়। তবে এটা বলাই বাহুল্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার যেকোনো বাহিনীর সদস্যরা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার বিষয়ে এখন অন্তত এসংক্রান্ত পুরো পরিস্থিতি ও এর অভিমুখ নিশ্চিত ঠাহর করার আগ পর্যন্ত সতর্ক হয়ে থাকতে চাইবেন।
    সবচেয়ে বড় কথা, গত ১৩ বছরে নানা অনিয়ম রেজিমে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় সেই ব্যবহারিক রেওয়াজ আবার একটু থমকে দাঁড়াতে চাইবে। “আবার” বললাম এ জন্য, যেমন গত ২০১৯ সালে ক্রসফায়ারে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ছিল  চার শতাধিক [……২০১৮-২০১৯ সালে ৪২৪ জন ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন……। ]। কিন্তু পরের বছর তা কমে এর মাত্র ১০ ভাগে নেমে এসেছিল। কারণ, কক্সবাজারে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড। অনেকের অনুমিত ব্যাখ্যাটা এরকম যে, বাহিনীতে দলাদলি বা সহমত ভেঙে যাওয়ায় রেকর্ড উল্টো হয়েছে। কাজেই এবার অবরোধের ঘটনাতেও এই শক থেকে এবার ডাটা কী আসে তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে কর্মি-জনবলের  মনোবলের ওপর প্রভাব পড়া যে খুবই সম্ভব তা সম্ভবত সরকার আমল করছে। যেমন ১০ তারিখের পর থেকে এখন পর্যন্ত সরকারের প্রধান প্রতিক্রিয়া হল একেবারে ‘ডিনাইয়াল’[denial] বা পুরোপুরি অস্বীকার করা। সম্ভত তাদের অনুমান, গুরুত্বপূর্ণ আমলা ও দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে হলে এটাই পথ।

    এই অবরোধের সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট বাইডেনের এক নির্বাহী আদেশে ইও নং ১৩৮১৮ [Executive Order (E.O.) 13818] হয়েছে এবং বাইডেন প্রশাসনের স্টেট ডিপার্টমেন্ট বা পররাষ্ট্র বিভাগসহ আরো অনেক বিভাগের মিলিত তৎপরতার সার ফলাফলে এই অবরোধ আরোপ ঘটেছে। কিন্তু সবশেষে এর পাবলিক ঘোষণাটা দেয়া হয় ট্রেজারি বিভাগ থেকে। কেন?
    কারণ বিষয়টা মূলত ফাইন্যান্সিয়াল এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বিষয়ক। আরেকটু খুলে বললে দুনিয়ায় যত বৈদেশিক মুদ্রায় লেনদেন হয় তার ৮৫ ভাগ বা তারও বেশি হয় আমেরিকান ডলারে; যার সোজা মানে সব লেনদেনের একটা না একটা পর্যায়ে তা হতে হয় ডলারে আর এর পরেই তা কনভার্ট হয়ে নিজ নিজ দেশীয় মুদ্রায়। আর ডলারে হওয়া মানে, কোনো না কোনো স্থানীয় (যেমন ঢাকার) কোন ব্যাংকের আবার কোন এক আমেরিকান ব্যাংকে (ডলারে) যে অ্যাকাউন্ট থাকে এর মাধ্যমে তা হয়েছে। তাই ডলারে লেনদেন মানেই আমেরিকান ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমের অংশ হওয়া ও তা ব্যবহার করা। মানে ধরা যাক, বাংলাদেশে স্থানীয় ‘ন্যাশনাল ব্যাংকে’ আমার অ্যাকাউন্ট আছে। এই ব্যাংকের আবার কোনো আমেরিকান ব্যাংকে ডলার-অ্যাকাউন্ট আছে। এতে এখন মূলত আমার হয়ে সেই ডলার-অ্যাকাউন্ট কোনো লেনদেন সম্পন্ন করে দিয়ে থাকে। এখানে যদিও আমার হয়ে আমার দেশী মুদ্রার ব্যাংক অনেক লেনদেন করে দেয় বলে আমরা ডলারে লেনদেন ব্যাপারটা টের পাই না। কিন্তু যখন আমার নামে ‘অবরোধ আরোপ’ করা হবে এর অর্থ, আমার জন্য এই ‘আমেরিকান ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমকে’ ব্যবহার ও প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয় তখন থেকে।

    তাহলে কোন আমেরিকান ব্যাংক যদি আমাকে নিষিদ্ধ বা অবরোধ করার তথ্য, জেনে অথবা না জেনে আমার লেনদেনটাও সম্পন্ন করে দেয় তাহলে কী হবে? বলাই বাহুল্য, এতে এই ট্রেজারি বিভাগ সেই আমেরিকান ব্যাংককে কড়া ফাইন করবে। যেমন- ইরানের ওপর আরোপিত অবরোধে হংকং ব্যাংকের আমেরিকান শাখা এমনই এক নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে এক লেনদেন ঘটিয়ে দিয়েছিল বলে ওই ব্যাংককে ট্রেজারি বিভাগ থেকে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার ফাইন করা হয়েছিল।

    আরেকটা কথা, কেন আমেরিকার হাতেই এমন অবরোধ আরোপের ক্ষমতা দেখা যায়? দুনিয়ার অন্য কোনো দেশ বা সে দেশের মুদ্রাও কী এমন অবরোধ আরোপ  করতে পারে না? অবশ্যই করতে পারে। যেমন- চীনও পাল্টা কিছু কিছু আমেরিকান প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ওপর অবরোধ আরোপ করে দেখা যায়। কিন্তু দুইটার ফারাক হল যেহেতু চীনা মুদ্রা ইউয়ানে দুনিয়ায় লেনদেন ডলারের তুলনায় অনেক কম সেকারণ চীনা-অবরোধের প্রভাবও অনেক কম। এ ছাড়াও যাদের লেনদেন চীনের সাথেই কেবল সেখানে কেবল এর কিছু প্রভাব পড়বে।

    ওদিকে, আমেরিকা কী কারণ দেখিয়ে এই অবরোধ আরোপ করেছে? তারা দেখিয়েছে যে, বাংলাদেশের র‌্যাব ও এই প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট ওসব ব্যক্তিরা বাংলাদেশে গুরুতরভাবে ‘আইনের শাসন’ ও ‘মানবাধিকার আইন’ ভঙ্গ করেছেন। এখন আমেরিকান প্রশাসনও যদি এমন কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করে থাকে তাহলে কি আমরা অথবা অন্য কোনো দেশ একই ধরনের মানে আমেরিকার ওপর অবরোধ আরোপের পদক্ষেপ নিতে পারব? আর পারলে তা করি না কেন?

    প্রথমে বলে রাখি, এটা তো এখন আশা করি সবার কাছে পরিষ্কার যে, এই অবরোধের শাস্তি দেয়ার সাথে জাতিসংঘ বা অন্য কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা নাই। কেবল আমেরিকান প্রশাসনই এটা করেছে। তাই বলা যায়, আইনত বাংলাদেশ বা আমেরিকাবিরোধী অন্য কোনো দেশও এমনইভাবে কোন আমেরিকান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চাইলে এমন পদক্ষেপ নিতে পারবে। কিন্তু সবার আগে ব্যাপারটায় আমেরিকা আমাদের সাথে খুব তুলনীয়ই নয়, সেদিকটায় নজর দিতে হবে। কারণ আমেরিকার বিচারব্যবস্থা এখনো তাদের সমাজে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা রাখে, এছাড়া তারা নিজেকেই নিজে সংশোধন করে নেয়ার  এখনো অযোগ্য হয়ে যায় নাই, বরং ক্ষমতাসম্পন্ন; যদিও এর সবই ভাল এমন আদর্শব্যবস্থা নিশ্চয় আমেরিকা নয়। তবে আমাদের দেশের বেলায় এ’ধরনের অভিযোগগুলোর গত ১৩ বছরে কোনো সুরাহা বা প্রতিকার নেই। ফলে এ জায়গায় আমরা আমেরিকার সাথে তুলনীয় নই।

    দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা আরো গুরুত্বপূর্ণ। এখনো পর্যন্ত ডলারের দেশ আমেরিকা বাদে অন্য কোনো দেশ অবরোধ অন্যকোন দেশের উপর আওরোপ করলেও এর কোন শক্ত প্রভাব নাই, এর মূল কারণ কী? মানে অন্য কোনো দেশের অবরোধের তেমন মূল্য নেই। কারণ কিছুটা উপরে বলেছি। বাকিটা হল, অবরোধ মানে, আসলে প্রতিষ্ঠিত কোন দেশের ইকোনমিক ও ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম থেকে কাউকে বের করে দেয়া। অনেকটা একঘরে করে দেয়ার মত। যদিও সেটা আমেরিকান ডলারের অবরোধ হলে তবেই সেই চাপ কার্যকর। কারণ দুনিয়ার ৮৫ ভাগেরও বেশি লেনদেন হয় এই ডলারে। আবার সবকিছুই এত বেশি পরিমাণে ডলার-মুদ্রায় কেন? এমন হওয়ার কারণ, গ্লোবাল বাণিজ্য ও লেনদেন ব্যবস্থাটার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ [IMF] হলেও এটা জন্ম (১৯৪৪) থেকেই একমাত্র আমেরিকান ডলারকেই ভিত্তি করে এটা শুরু বা কার্যকর হয়েছিল। ফলে তাতে ডলার আন্তর্জাতিক লেনদেনের একমাত্র মুদ্রা হয়ে যায়। কিন্তু তা হলেও তখনো মূলত ডলার আসলে একটা দেশের, আমেরিকার স্থানীয় মুদ্রা। অর্থাৎ আমেরিকার নিজের মুদ্রার ব্যাপারে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আমরা অন্য দেশের কেউ বাধা দিতে পারি না। আমেরিকার পড়ে-পাওয়া এই বাড়তি  সুবিধা প্রাপ্তির শুরু এখন থেকেই। এটা জানা সত্বেও এমনটাই করতে হয়েছিল।

    তাহলে আমরা ডলারকে সেকালে আন্তর্জাতিক লেনদেনের একমাত্র মুদ্রা হিসেবেও নিয়েছিলাম কেন?
    কারণ সে সময় এক আমেরিকান ডলার ছাড়া আর কোনো দেশের মুদ্রা – তার অ্যাকাউন্টে সারপ্লাস বা উদ্বৃত্ত ছিল না। এর মানে আবার কী? মানে হল, দুনিয়ার যত লোককে ডলারে পেমেন্ট দিতে হবে বা আমেরিকার কাছে পাওনা, এর চেয়ে আমেরিকা যাদের কাছে পাবে মানে তারা ডলারে আমেরিকাকে পেমেন্ট দেবে, এর পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। এই পরিস্থিতিটাকে বলা হয় (ডলার) সারপ্লাসে আছে। আবার একটা টেকনিক্যাল পয়েন্ট হলো গ্লোবাল বাণিজ্য লেনদেন ব্যবস্থা কোনো মুদ্রায় চালু করতে গেলে ওর জন্য গ্লোবাল বাণিজ্যের সেই মুদ্রাকে সারপ্লাস মুদ্রা হতে হয়। ১৯৪৪-৪৫ সালে একমাত্র মার্কিন ডলার ছিল সারপ্লাস। এ’ছাড়া বাকি ইউরোপের সব মুদ্রা ছিল মুদ্রাস্ফীতির মুদ্রা। মানে, ভল্টে রাখা সোনার চেয়ে নোট ছাপানো মুদ্রা মান-পরিমাণে বেশি। তাই সেকালে ডলার হয়ে যায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একমাত্র মুদ্রা।

    “তারা ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর তালিকাতে রেখেও ভারতের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের কোনো ঘোষণার মুরোদ দেখাতে পারেননি। উল্টো ভারতকে ‘গণতন্ত্রী রাষ্ট্র’ বলে দাওয়াত দিয়েছেন আর মোদি সেখানে বক্তৃতা দিয়েছেন। বাংলাদেশ নিয়ে আলজাজিরার রিপোর্টে অনেকে ব্লিঙ্কেনের ‘এই চাপাবাজি’র ফাঁদে পড়েছেন। দেখা গেছে, তারা ব্লিঙ্কেনের কথা বিশ্বাস করে নিয়েছেন; আগে যাচাই করেননি”

    কাজেই একা আমেরিকা সেকালে পাওয়া সুবিধার জন্য একালেও যে অবরোধ আরোপের সুবিধা নিচ্ছে তা সেকালের সবল অর্থনীতির কারণে। এই বাড়তি সুবিধা যা পেয়েছিল সেটা ওর পড়ে পাওয়া সুবিধা, যা কেবল কুড়িয়ে পাওয়া নেয়া সুবিধা যেন।

    এজন্য বেনজীর বা ওই সাতজন শুধু আমেরিকাতেই নয় বিদেশে যেকোনো সম্পত্তি কিনতে চাইলে বাধা পাবেন। আবার, তাদের আগে থেকে কোনো সম্পত্তি থেকে থাকলে টেজারি বিভাগ তা এখন বাজেয়াপ্ত করে নেবে। এ ছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, এই সাতজনের সংখ্যাটা যেকোনো সময় আমেরিকা আরো বাড়াতে পারে। এনিয়ে আমাদের সরকারি আমলা বা দলীয় নেতারা সবসময় একটা ভয়ের মধ্যে কাটাবেন, কী জানি কী হয়! যেটা সরকারি কার্যক্রম ততপরতাকে ধীর বা শিথিল করেও দিতে পারে। দায়িত্ব নিয়ে কাজ করার লোক পাওয়ার অভাব দেখা দিতে পারে। সম্ভবত তাই সরকার মনোবল বাড়ানোর দিকে বড় নজর বাড়িয়েছে।

    কোনো এক প্রফেসরের পরামর্শ হল (যাকে মনে হচ্ছে পরামর্শক প্যানেলে নিযুক্তি পেয়েছেন), আমেরিকা যেহেতু লবিতে পরিচালিত এক দেশ; ফলে বাংলাদেশ সরকারের উচিত নিজের পক্ষে লবি ফার্ম নিয়োগ করা। পরে আমরা এর পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেনকে দেখতে পাই। ‘মানবজমিন’ লিখেছে – তিনি বলছেন, “যুক্তরাষ্ট্র সরকারে অনেক জ্ঞানী-গুণী লোক আছেন তাদের সাথে আমাদের আলোচনা চলছে, সেটি অব্যাহত থাকবে”। অর্থাৎ সরকার যে আমেরিকান কোনো লবি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়ে সে ভিত্তিতে তৎপর হয়েছে সেটাই তিনি যেন এভাবে আমাদের জানালেন। এর ১২ ঘণ্টার মধ্যে আমরা জানলাম আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন ফোন করেছেন আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে। কিন্তু কী কথা হয়েছে সুনির্দিষ্ট করে কেউ এর তেমন ব্যাখ্যা করতে পারলেন না; যদিও একটা শীতল প্রভাব অনেকের মধ্যে দেখা গেল যেনবা সরকারের ভাগ্য কী হয় সে উৎকণ্ঠা যেন এখন থেকে কেটে যাচ্ছে যাবে। কিন্তু একই সাথে সবার এটাও অনুমান এটা এত সহজে যায় না। তাহলে?

    যখন কিছুই অফার করার থাকে না, তখন আপোষ চাইলেও কী দিয়ে দেয়া নেয়া হবে?
    এবার এ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। বাস্তব বড় কঠিন। বাস্তবতাকে ঢেকে রেখে লাভ নেই বরং দুদণ্ড আবেগকে বাইরে রেখে বাস্তব চিন্তা করলেই যা জানা যায়। সেই কঠিন বাস্তবতাটা হল, আমেরিকার এই অবরোধ আরোপের পরে, “না সরকারের খুব কিছু আমেরিকাকে অফার করার আছে, না আমেরিকার খুব কিছু পাওয়ার সুযোগ আছে”। এমন কাঠামোর মধ্যে আছি আমরা দুইপক্ষ। অনেকে খুঁজে পেয়েছে কিংবা মহাসত্য কোনো কিছু দেখিয়ে দিতে পেরেছে মনে করে বলার চেষ্টা করছেন যেমন আমাদের মন্ত্রী মোমেন বলছেন, “বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অধীনে একাধিক বৈঠক হয়ে থাকে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ফোরাম হচ্ছে পররাষ্ট্র সচিবপর্যায়ে পার্টনারশিপ ডায়ালগ। এ ছাড়াও বিভিন্ন বৈঠকে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়ে থাকে। তারা যেসব বিষয়ে জানতে চায় সেটির উত্তর দেয়া হয়” ইত্যাদি।

    কূটনীতি মানে আসল কথা সরিয়ে কথার প্যাঁচাল, এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।  এখানে মোমেনের আসল স্বার্থের কথাটা ছিল, “নিষেধাজ্ঞা শিথিলে বাইডেন প্রশাসনের সাথে আলোচনা চায় ঢাকা”। এটা আসলে মুখ্য গিভ অ্যান্ড টেক। আমরা সরাসরি সে জায়গায় যাবো; এতে সময় ও জায়গা বাঁচবে।

    কথা হল, বাংলাদেশ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার দেখতে চায়। কিন্তু বাইডেন কী পেলে তা প্রত্যাহার করবেন? টু দ্য পয়েন্ট বললে এক কথায়, শেখ হাসিনা চীন থেকে সরে এলে। এখন এটা কী সরকারের পক্ষ থেকে করা সম্ভব? না, একেবারে অসম্ভব। তাহলে হাসিনা সরকার এর বদলে কী কামনা করছে? সে চাইছে বৈষয়িক অন্য একটা কিছু যেমন ‘কোনো প্রজেক্ট’ নিয়ে যেন মিটিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু সে কথায় আবার সারবস্তুটা হল, সরকারের দেয়ার মত তো এমন কিছু নেই যা পেলে বাইডেন খুশি হবেন; সব মিটিয়ে নিবেন।

    কথা হল, বাংলাদেশ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার দেখতে চায়। কিন্তু বাইডেন কী পেলে তা প্রত্যাহার করবেন? টু দ্য পয়েন্ট বললে এক কথায়, শেখ হাসিনা চীন থেকে সরে এলে। এখন এটা কী সরকারের পক্ষ থেকে করা সম্ভব? একেবারে অসম্ভব। তাহলে সরকার এর বদলে কী কামনা করছে? সে চাইছে বৈষয়িক অন্য একটা কিছু ‘কোনো প্রজেক্ট’ নিয়ে যেন মিটিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু সে কথায় আবার সারবস্তুটা হলো, সরকারের দেয়ার মতো এমন কিছু নেই যা পেলে বাইডেন খুশি হবেন; সব মিটিয়ে নেবেন।

    তবে সেই কথা বলার বাহানাতে সরকারের একটা লাভ হয়েছে যে, বাইডেন সরকারের সাথে তারা ‘গুড টার্মে’ আছে, মিথ্যা হলেও এমন একটা ছবি, এটা বাংলাদেশের পাবলিককে দেখানো গেছে।

    কথা হওয়া আর একমত হওয়া এক নয়ঃ
    আর বলা হচ্ছে, মানবাধিকার নিয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা হয়েছে। কিন্তু একমত হওয়ার সুযোগ কী আছে? অবশ্যই না। কারণ মূল সমস্যা তো মানবাধিকার মানা না মানাতে নয়। মানবাধিকারের প্রশ্ন তো লংটার্মের পালনীয় শর্ত দিয়ে সবসময় মিটিয়ে নেয়া হয়েছে। গত ২০১৩ সাল থেকে ইউপিআরের [UPR] নামে জাতিসংঘের কর্মসুচি বসলে সেখান থেকে সময় বাড়িয়েই সমস্য দূরে ঠেলা কী চলছে না? আর যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান- বয়ান হল, “বাংলাদেশের গুম-নিয়ে কোনো আইন বা করণীয় নেই। তাই বাংলাদেশে কোনো গুম নাই”।  মহা অদ্ভুত এই যুক্তি!!! আসলে এই সরকার পাবলিক রেটিংয়ের ভিত্তিতেতা নিয়ে মাথা না ঘামানো সরকার বলে আর এভাবে সুদীর্ঘ  ১৩ বছর কাটিয়ে দেওয়ার পরে এর যা ভিত্তি দাড়িয়েছে তাতে এর পক্ষে কোন ধরণের মানবাধিকার রক্ষার কমিটমেন্ট দেয়া অর্থহীন, সেই কমিটন্টে আস্থা রাখাও অর্থহীন!

    যদিও প্রকৃত সমস্যা আরো অনেক গভীরে। আমেরিকা আসলে যা চাচ্ছে হাসিনার বাংলাদেশ তা দিলে তা ধারণ-যোগ্যতা বা পাত্র তো আমেরিকার কাছে নেই। যেমন- আস্থা পাওয়া যায় বাংলাদেশের টিকা পাওয়ার সুরাহা প্রশ্নে চীনা-বিকল্প বলে কী আমেরিকার কোন মুরোদে আছে? যেখানে দুনিয়ার কোথাও আমেরিকা কোনদেশের টিকাপ্রাপ্তির সমাধান করে দিয়েছে – আমেরিকার কাছে এমন কোনো দেশের নাম আছে? বরং উল্টো, সে তো জি৭-এর সদস্য হিসাবে তাদের জাতিসঙ্ঘের ‘হু’ [WHO]কে দেয়া কমিটমেন্টের সব টিকাই দেয়নি। অথচ বাংলাদেশের সমাজে এখন যতটুকু দোকান হাটবাজার গঞ্জ যা যতটুকু যে খোলা আছে কারখানা চলছে তা তো এই চীনা টিকার প্রাপ্যতার জোরেই। ফলে এখনো বাংলাদেশের টিকাদাতা-ওস্তাদ বদলানো – আবার টিকা নেই মানেই হবে, সোজা লকআউট। টিকা নাই মানে হবে, অর্থনীতিও নাই; ডুবে যাওয়া।
    যদিও টিকা নেয়া মানে করোনা থেকে একেবারে মুক্তি এমন অবস্থায় দুনিয়া এখনও পৌঁছায়নি, তবু যতটুকু যা ব্যবসা-বাণিজ্য খোলা এবং কার্যকর, তা ঘটতে-চলতে পারছে টিকা দেয়ার জন্যই। আমেরিকার হাতে এনিয়ে চীনের বিকল্প আমাদেরকে কী দেয়ার আছে? বিশেষ করে নয়া ওমিক্রন [Omicron] ভ্যারিয়েন্টের হামলার মুখে? ওদিকে ম্যান্ডেটবিহীন নিশিথ ভোটের সরকার, এটা এখন বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প ছাড়া চলতে পারবে না। কারণ এরা পাবলিক রেটিং-এর উপর ভরসা করে চলে না, দাঁড়িয়ে নাই। ফলে উলটা এদের  কর্মীদেরকে “প্রকল্প” মানে অর্থের সংস্থান করে না দিতে পারলে তারা থাকবে কেন?  এখন বলেন,  আমেরিকা কি চীনের মত এই অবকাঠামো ফান্ড জোগাতে সক্ষম? তাহলে কিসের ভরসায় হাসিনার সরকার চীনকে ফেলে ছেড়ে আসবে? কাজেই কোনো ডিলের জায়গাটা কোথায়? ভিত্তিটা কী? বলপ্রয়োগে সরানো ছাড়া সরকারের সরে যাওয়ার জায়গা নেই!

    আবার দেখেন হাসিনার বাংলাদেশ চীন ছেড়ে আসবে কোথায়? কোয়াডে? “অসামরিক” কোয়াড কি সক্রিয়?  মানে ভারত কি এখন আমেরিকান ক্যাম্পে আছে ? সেটা এখন  না ভারত নিশ্চিত বলতে পারবে, না আমেরিকা! এই নড়বড়ে কোয়াডের কোথায় ঢুকবে হাসিনার বাংলাদেশ?

    মূল ইস্যু তো একখানেও সেই একই – মানবাধিকার! ভারতের মানবাধিকার প্রশ্নে আমেরিকার যেসব অবরোধ আরোপ করার কথা তা বাইডেনের উচ্চারণের আগেই তো ভারত ভেগে গেছে! মোদির ভারত আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দিয়েছে। বাইডেন কী হতভম্ভ নয়?  এতে এখন বিশৃঙ্খল ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক বাইডেন সোজা করবেন কী করে? ইমিডিয়েট কোনো পরিকল্পনা কী বাইডেনের কাছে?? মনে হয় না!!

    কূটনীতিতে একটা বড় অংশ থাকে বাকচাতুরি, এজন্য কূটনীতির ভাষাই আলাদা; কিন্তু তাই বলে সাবধান এতে সবটাই চাতুরি তা অবশ্যই নয়।  কিন্তু ব্লিঙ্কেন ভেবেছেন এটা শতভাগ চাপাবাজির খেলা। ডেমোক্র্যাসি সামিটসহ গত ৯ ডিসেম্বর থেকে বাইডেন কোথাও বলেননি যে, এখন থেকে মানবাধিকার – তার সরকার-প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হবে। একথা বলতে চাইলে যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে তা প্রকাশ করতে হয় তা করেছেন? কেউ জানে না!

    অথচ বাইডেনের পররষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন এখন এশিয়ায় আসিয়ান দেশ সফরে, ইন্দোনেশিয়ার পরে মালয়েশিয়ায় সফর শেষ প্রায়। [যদিও বাকি প্রোগ্রাম গুটিয়ে তিনি ফেরত চলে যাবেন কারণ দলে একজনের করোনা-পজিটিভ ধরা পড়েছে।]  কিন্তু তিনি প্রতিদিন চাপা মারছেন, মানবাধিকার নাকি তাদের সরকার-প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে!!! ভয়েস অব আমেরিকার এক রিপোর্টে বলা হয়েছে তারা বিদেশনীতিতে মানবাধিকারকে ঢুকিয়ে (ইনফিউজ) নিচ্ছে [……to infuse human rights into its foreign policy…]। কিন্তু এটা ব্লিঙ্কেনের নিজের ভাষ্য নয়, রিপোর্টার নিজে যা বুঝেছে বলে তার কাছে মনে হয়েছে সেই ভাষ্য।  মানে  এই বাক্য ব্লিঙ্কেনের নয়, নিজের বক্তব্য বলছেন রিপোর্টার। তবে আরেক জায়গায় বলেছে, আমরা মানবাধিকারকে বিদেশনীতির কেন্দ্রে নিচ্ছি [……We are determined to put human rights at the center of our foreign policy……]। এই বাক্য ব্লিঙ্কেনের বলা হয়েছে, উপরে কোটেশন চিহ্ন দেয়া আছে!!  এরপরেও এটা মেনে নেওয়ার বিরাট সমস্যা আছে। কারণ এই প্যারাগ্রাফেরই শেষ শব্দগুলো হল,  ……promote accountability for human rights violations and abuses, no matter where they occur । কিন্তু এই ‘নো ম্যাটার হয়ার দে অকার’ কথাগুলো  বিশ্বাস-অযোগ্য। কারণ, ব্লিঙ্কেনের দাবির মানে হল যে ……মানবাধিকার লঙ্ঘন “যেখানেই হোক না কেন” তারা সক্রিয় হবেন – এই কথাটাই তো মিছা! কেন?
    এসব শুনে বা পড়ে মনে হতে পারে যে, বাইডেন-ব্লিঙ্কেন খুবই সিরিয়াস এবং একটা নীতিগত অবস্থান নিয়ে তারা মানবাধিকার বাস্তবায়নে এগিয়ে এসেছেন। ফলে এবার আর তারা  কে কোন দেশ বা কোন ‘কৌশলগত বন্ধু’ তা দেখবেন না। দেখবেন মানবাধিকারের নীতি কে মানেননি; আর তার ওপর তারা কঠোর হবেন।

    তাই কী?
    না, এটাই সর্ব্বৃহৎ চাপাবাজি। কারণ তারা ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর  আমেরিকার অবরোপ আরো  সম্ভাব্য  তালিকাতে রেখেও সেই  ভারতের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপের কোনো ঘোষণার মুরোদ দেখাতে পারেননি। উল্টো ভারতকে ‘গণতন্ত্রী রাষ্ট্র’ বলে সার্টিফিকেট-সহ দাওয়াত দিয়েছেন আর মোদি সেখানে ‘বক্তৃতা’ দিয়েছেন। বাংলাদেশ নিয়ে আলজাজিরার রিপোর্টে অনেকে ব্লিঙ্কেনের ‘এই চাপাবাজি’র ফাঁদে পড়েছেন। যেমন সেখানে  এক রিসার্চ ফেলোর বরাতে বলা হয়েছে…told Al Jazeera the US sanctions show that the Biden administration has made a “significant policy shift” not only over Bangladesh, but in the US foreign policy in general,……। অর্থাৎ এটা নাকি বাইডেনের আমেরিকার পলিসি শিফট ঘটে গেছে।
    তাহলে ভারত তো আমেরিকার অবরোধ আরোপের  সম্ভাব্য  তালিকার দেশ – তবু কেন অবরোধ নাই? কাশ্মীর ইস্যুতে, সারা ভারতে মুসলমান নিপীড়ন ধর্মীয় স্বাধীতায় হস্তক্ষেপ মসজিদ ভেঙ্গে বা আগুন দেয়া পাবলিক নামাজে বাধা দেওয়া ইত্যাদিতে সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান  থেকে বাইডেনকে অবরোধ দেয়ার সুপারিশ দেয়া ছিল ; এছাড়া সর্বশেষ ভারতের খৃশ্চানদের উপরেও তাদের চার্চে হামলায় এবার ক্রিসমাস পালন না করার সিদ্ধান্তের কথা শোনা যাচ্ছে – হিন্দু ছাড়া অন্য কোন ভারতীয় ধর্মপালন করতে পারবে না যেন, এমন অবস্থা দাড়িয়েছে। এই জলন্ত তথ্যগুলো পাশে রেখে যেখানে ভারতের উপর আমেরিকার কোন অবরোধ নাই এটা সত্বেও আমেরিকা  “significant policy shift” করেছে এমন দাবি কিভাবে করা যায়?  অর্থাৎ  এখানে কার্যত
    দেখা গেছে, এরা ব্লিঙ্কেনের কথা বিশ্বাস করে নিয়েছেন; চোখ খুলে আগে বাস্তবে যাচাই করেননি।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার  ১৮ ডিসেম্বর ২০২১ ওয়েবে  আর পরেরদিন  প্রিন্টে  “লেনদেনের ‘বস্তুই’ নাই”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]