Tag: Global Economic Order

  • বিদেশিবিরোধিতা সস্তা মিথ, ‘গ্লোবাল অর্ডার’ বুঝেন

    বিদেশিবিরোধিতা সস্তা মিথ, ‘গ্লোবাল অর্ডার’ বুঝেন

    গৌতম দাস

    ২৭ জুলাই ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-37d

    Sharad Pawar: The God of Broken Mandates, YOUTUBE Rare Interviews, Crux Files

    আপনি যে ভুখন্ডে দাঁড়িয়ে আছেন চাইলে কেবল তার কথা মনে রেখে নিজের সম্পর্কে কথা বলতে পারেন। নিজের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারেন এভাবে। অথবা অন্যটা হল,  এই গ্লোব বা বিশ্বের যে অংশ আপনার ঐ ভুখন্ড, গ্লোবাল পটভুমির কথা খেয়ালে রেখে এবার আপনি আপনার ভুখন্ড সম্পর্কে অনুভবের কথা বলতে পারেন। এখানে খেয়াল করেন, দ্বিতীয়টাও কিন্তু আপনার সম্পর্কেই অনুভব। কিন্তু ফারাক হল, এখানে এক গ্লোবাল পটভুমিতে আপনি, এভাবে।  তাতে এই দুই ভাষ্য হবে দুরকম।  সেক্ষেত্রে প্রথমটাকে বলা হবে এক লোকাল ভাষ্য আর দ্বিতীয়টাকে গ্লোবাল ভাষ্য।  অর্থাৎ আপনারই  সম্পর্কে প্রথমটা হল এক সংকীর্ণ ভাষ্য আর পরেরটা পুর্ণ ভাষ্য। এই হল লোকাল বনাম গ্লোবাল ভাষ্যের ফারাক।
    [লেখাটা অনেক বড় হয়ে গেছে, এড়াতে পারিনি। তবে একটা উপায় আছে, যারা ছোট ভার্সানে পড়তে চান তারা কিছু প্যারা বাদ দিয়ে পড়তে পারেন। যে সব প্যারা এক ইঞ্চি জায়গা ছেড়ে শুরু এগুলোই সেই প্যারা। বাদ দিয়ে পড়া যায় এখানে এমন দুটা প্যারা আছে। এতে লেখাটা অনেক ছোট হবে। চেষ্টা করে দেখতে পারেন। ]

    গ্লোবাল প্রেক্ষিত বা দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়াই ভারতের প্রবীন রাজনীতিক শারদ পাওয়ার [Sharad Power] কথা বলেন। তবে তিনি একা নন বরং ভারতের প্রায় সব রাজনীতিকই এমন, তাই তাঁকে সব রাজনীতিকেরই প্রতীকী প্রতিনিধি হিসাবে ধরে নিয়ে কথা হবে। এঁদের দেশ বলতে একটা ‘লোকাল’ বুঝের ধারণায়,  আর এক কল্পনার জগতে বাস করা রাজনীতিবিদ। মানে গ্লোবাল প্রেক্ষিতে থেকে এবার লোকাল অনুভবটা করতে পারেন না এরা, মিসিং। এঁরা মনে করেন তারা ‘স্বনির্ভর’, ‘আত্মনির্ভরশীল’, ‘স্বদেশ’ ইত্যাদি শব্দের লোক। কিন্তু আসলে তাঁরা এসব শব্দের মিথ্যা ফুলজুড়ি বিলানো ধরনের রাজনৈতিক জগতের জন্য লড়ছেন। যদিও  এঁদের অনেকেই জানেন এটা বাস্তব নয়, বাস্তবে এসব নেই, পরাবাস্তবতা অস্তিত্বহীন। তবু এটা কেবল তাদের কল্পনায় আছে। রেখে দিয়েছেন। কারণ তারা মনে করেন হোক অবাস্তব তবু এর একটা ‘উপযোগিতা’ আছে।  বাস্তবায়ন অযোগ্য হলেও এটা তাদের লাগে পাবলিকের কাছে কিছু স্বপ্ন বিলিয়ে কল্পনায় জগতে পাবলিককে প্রবেশ করিয়ে যাতে আবেগী কিছু মিথ্যা কথা বলে তাদের সংযত রাখতে পারেন। আবার সময়ে উস্কে তুলতে পারেন – এমন কিছু শব্দ দিয়ে যেমন দেশপ্রেম, দেশভক্তি, হিন্দু জাতি মহান অথবা ভারতীয় জাতি মহান ধরনের অলীক এবং অর্থহীন। একদিকে এরা গ্লোবাল প্রেক্ষিত বা গ্লোবাল অর্ডার বলে দুনিয়াতে কিছু আছে কি না তারা খোঁজ করে দেখেননি। আবার অন্যদিকে তবু কেবল ভুয়া স্বদেশিপনায় অলীক স্বপ্নগুলোই তারা বিক্রি করেন, এটাই তাদের রাজনীতি। অন্তত ভোট যোগাড়ের কৌশল। এটাই ভারতের নেশন-স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র বাদীদের অনড় রাজনীতি। তাতে এরা হিন্দুত্বের জাতিবাদী বিজেপিই হোক কীংবা  সফট হিন্দুত্বের জাতিবাদী কংগ্রেস যেই হোক। জাতিবাদী সকল রাজনীতির বৈশিষ্ট এটা।

    কেন শারদ পাওয়ার প্রসঙ্গঃ
    শারদ পাওয়ার, ৮০ বছর বয়সী ভারতের প্রবীণ রাজনীতিবিদদের একজন, যিনি এখনো রাজনীতিতে সক্রিয়। মূলত মারাঠা জনবসতির রাজ্য মহারাষ্ট্র, যার রাজধানী মুম্বাই; আর এর এখনকার ক্ষমতাসীন রাজ্য-সরকার এক কোয়ালিশন সরকার। এতে শারদ পাওয়ার কেবল এক অংশীদার শুধু নন, অ্যাংকর বলা যায়, যিনি জোট ধরে রাখার ক্ষেত্রে এক বড় মুরব্বির ভূমিকা পালন করে থাকেন। এই রাজনীতিবিদ ১৯৬০ সালের দিকে ২০ বছর বয়সে প্রথম কংগ্রেস দলে নাম লিখিয়েছিলেন।  আর অনেক পরে, তিনি আসলে ভারতের এক সাবেক প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাওয়ের সমসাময়িক; এই অর্থে যে, ১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধী মারা যাওয়ার পর তাঁরা একসাথে দলের প্রধান পদের দাবিদার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের শিকা শেষে নরসীমার পক্ষে যায়। নরসীমা প্রধানমন্ত্রীও হন, আর শারদ পাওয়ার পান পরের ভারী পদ প্রতিরক্ষা মন্ত্রিত্ব। অবশ্য তিনি একবার কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রীও ছিলেন। এ ছাড়া রাজনৈতিক জীবনে তিনি অন্তত পাঁচবার মুখ্যমন্ত্রী আর অনেকবার অনেক মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছেন।
    কিন্তু ১৯৯৯ সালে এসে পুরনো প্রতিযোগিতার লেজ ধরে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাঁকে আরো চাপের মুখে ফেলে হারাতে চেয়ে পাল্টা গান্ধী পরিবারের হাতে দলের সবক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার কৌশল নিয়েছিল। পরিণতিতে একপর্যায়ে তিনি কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে নিজেই নিজ আঞ্চলিক মারাঠাকেন্দ্রিক এক দল খুলে বসেন যার নাম- ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি বা এনসিপি। কিন্তু কংগ্রেসের প্রতি নিজের জন্ম-মোহটা থেকেই গিয়েছিল বলা যায়। তাই আমরা পরবর্তিতে দেখি প্রায় সব সময়ই তিনি কংগ্রেস দলের সাথে ঐক্যে নানান কোয়ালিশন করে ক্ষমতায় অথবা কখনো বিরোধী দলে থেকেছেন।

    শারদ পাওয়ার ভারতের রাজনীতিবিদদের এক সিম্বল বা প্রতীক ধরে নিয়েই আজকের কথা আগাবো আমরা। আমাদের আজকের লেখায় তাকে বেছে আনার গুরুত্ব হল – তার সমবয়সী ভারতীয় কোন রাজনীতিবিদ আর রাজনীতিতে প্রায় নেই বললেই চলে। তাঁরা অবসরে নয়ত মৃত। গান্ধী পরিবারে ক্ষমতা এক বংশ পরম্পরার মধ্যে কুক্ষিগত হওয়ায় একদিকে কংগ্রেসে আর অন্যদিকে মোদীর উত্থানের পর মোদীর দলেরও সিনিয়র প্রায় সব নেতাকে (ঘোষণা দিয়ে ৭০ বছর বয়স যাদের হয়ে গিয়েছে তারা সবাইকে) অবসরে পাঠিয়ে দেয়াতে, বলতে গেলে ভারতের সিনিয়র রাজনীতিকদের এক আকাল শুরু হয়েছে যার মধ্যে শারদ পাওয়ার সম্ভবত একমাত্র ব্যতিক্রম যিনি ৬০ বছর একটানা রাজনীতি করেও এখনো সক্রিয় রাজনীতিক। আমাদের দরকার ছিল একজন ভারতীয় রাজনীতিকের যিনি অন্তত টানা ৬০ বছর সক্রিয় রাজনীতি করেছেন এবং এখনো ভারতের রাজনৈতিক ঘটনাবলি বিশেষ করে বর্তমান চীন সম্পর্কে কী ভাবেন তা সেই নিজ বুঝটাই সরাসরি অবলীলায় তুলে ধরেন বা ধরতে রাজি আছেন। কারণ ভারতের রাজনীতিকদের চিন্তার ঝোঁক বা ট্রেন্ডের একটা উদাহরণ হিসেবে কাউকে পাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল যাতে তাকে দেখিয়ে প্রতীক হিসেবে বাকিদেরই এক নমুনা হিসাবে তাঁকে তুলে ধরে কথা বলা যায়। আমাদের মনে হয়েছে শারদ পাওয়ার তেমনই একজন, ভারতীয় রাজনীতিকদের কমন ট্রেন্ডের প্রতীক।

    এক মুখপাত্র ‘সামনা’ ম্যাগাজিনঃ
    মুম্বাইয়ে এখন মূলত শিবসেনা দল ক্ষমতায়। কিন্তু তারা তাদের সাবেক জোটসঙ্গী বিজেপিকে বাদ দিয়ে এবার সাথে কংগ্রেস আর এনসিপিকে নিয়ে মিলে রাজ্যক্ষমতায় সরকার গঠন করে আছে। আর মুরব্বি হিসেবে পরামর্শ দিয়ে শারদ পাওয়ার এই জোটকে  ইতোমধ্যেই কয়েকবার সরকার-পড়ে-যাওয়া  সামলিয়েছেন। অনুমান করা হয়, শারদ পাওয়ারের এসব দিক ও গুরুত্ব বিবেচনা করে – শিবসেনা দলের মারাঠি ভাষায় প্রকাশিত এক দলীয় মুখপত্র পত্রিকা আছে নাম ‘সামনা’- (এর একটা ভাল বাংলায় অর্থ হবে সম্ভবত মুখোমুখি বা ফেস করা) এই পত্রিকায় শারদ পাওয়ারের এক লম্বা সাক্ষাৎকার নিয়ে ছাপা হয়েছিল। মারাঠি ভাষার সেই সাক্ষাৎকার পরে গত ১২ জুলাই আরেক (মূলত টিভি) মিডিয়া ‘নিউজ ১৮’ [NEWS18.COM]-এর ওয়েবে ইংরাজিতে অনুবাদ করে ছাপা হয়েছিল। যা আমাদের হাতে মানে নজরে আসে।
    সময়কাল হিসেবে এই সাক্ষাৎকার হল চীন-ভারত সীমান্তে সংঘর্ষ, উত্তেজনা ও অন্তত ২০ ভারতীয় সেনা মারা যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে। ফলে সেসব ঘটনাকে পটভূমিতে রেখে পাওয়ার কথা বলে গেছেন।
    ভারতে কী রাজনীতি চলে আসছে? তা অন্তত গত ৬০ বছর ধরে যে চিন্তায় যে রাজনীতি তারা সব দলের সবাই যা করে এসেছেন এমন কোনো রাজনীতিকের নিজের মুখে এর স্বীকার করেছেন – এমনটা সহজে পাওয়া যায় না। আমরা এই সাক্ষাৎকারটাকেই নিব ভারতের দল নির্বিশেষে বিভিন্ন রাজনীতিবিদদের চিন্তার সাধারণ বৈশিষ্ট্য ও ঝোঁক বা ট্রেন্ড কেমন, কী – সেটা বুঝতে ও রেফার করতে একটা উদাহরণ হিসেবে।

    লোকাল বনাম গ্লোবালঃ
    আমরা প্রায়ই বলতে শুনি, ভারতীয় রাজনীতিকদের গ্লোবাল প্রেক্ষিত বোধ একদমই নেই। এই কথাটা বলতে ঠিক কী বুঝব? শুরুতে যেটা বলছিলাম, তারা যে রাজনীতির বোধে অভ্যস্ত ও যাকে আদর্শ মনে করে বড় হয়েছে, সারা দেশে যেটা ব্যাপকভাবে আচ্ছন্ন প্রধান ধারার চিন্তা সেটা হল – এক পবিত্র দেশপ্রেম আর নেশন বোধ। মানে প্রবল জাতিরাষ্ট্র-বাদী বা সংক্ষেপে প্রবল জাতিবাদী এবং মূলত এক কাল্পনিক স্বদেশিপনা। আর সর্বোপরি এপ্রসঙ্গে উপরে যেভাবে বলছি, তাতে এ’এক “লোকাল” চিন্তা।  সম্ভবত এত প্রবল এর স্বদেশিপনা বলেই এরা এর মধ্যে আর গ্লোবাল প্রেক্ষিত বোধকে জন্ম নিতে দেয় নাই। বিজেপির মোদী অথবা শাওরদ পাওয়ার ইত্যাদি সবাই এই জায়গায় এক – কম অথবা বেশি স্বদেশিপনা আর আর লোকাল চিন্তাতেই সব সীমিত। আর এক কমন দিক এরা সকলে জাতি-রাষ্ট্র বাদী।
    সব রাষ্ট্র ব্যবস্থাই মূলত এক লোকাল ফেনোমেনা – এক স্থানীয় সিস্টেম। অর্থাৎ রাষ্ট্র একটা সিস্টেম – এক বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা, কিন্তু তা স্থানীয়। আর একে লোকাল বা স্থানীয় বলছি বলে এর সাপেক্ষে একটা গ্লোবাল বা বাইরের বলতে কিছু আছে। হা আছে। ঠিক যে অর্থে রাষ্ট্র মূলত আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা। তাহলে ওর বাইরের দিকের কী হবে? কোন বাইরের? কেবল নিজেরই বাইরের? না। সব রাষ্ট্রেরই কমন বাইরের দিক যেটা তা নিয়ে কথা বলছি। মানে কেবল একটা রাষ্ট্রের কথা আর বলছি না। একটা রাষ্টের মধ্যে প্রসঙ্গ আর নাই, বের হয়ে গেছি। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্তঃসম্পর্ক এখন প্রসঙ্গ। এই আন্তঃসম্পর্কঅকে একটা ব্যবস্থাধীন করার জন্য একটা সিস্টেম লাগবে মানে আরেক বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা লাগবে, এটার কী হবে? আসলে এটাকেই বলছি গ্লোবাল – এক গ্লোবাল সিস্টেম দরকার। গ্লোবাল অর্ডার, গ্লোবালি ছেয়ে থাকা এক বিধিবদ্ধ ব্যবস্থার কথা বলছি।
    তাহলে এখন সার করে বললে, রাষ্ট্র বলতে যদি স্থানীয় বা লোকাল পর্যায়ের এক আভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা বুঝি তবে রাষ্ট্রগুলোর বাইরের দিকের জন্য আরেকটা ব্যবস্থা, এক গ্লোবাল সিস্টেম বা গ্লোবাল অর্ডার লাগবে। এটাই গ্লোবাল অর্ডার, এর কথা বলছি।
    দুনিয়ায় প্রথম এক গ্লোবাল অর্ডার স্থাপিত হয়েছিল আমেরিকার হাতে বা নেতৃত্বে। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে, এতে বিজয়ীদের হাতে ও নেতার নেতৃত্বে। এই প্রথম অর্ডার চালু করতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তা করা হয়েছিল। এমন সব গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর হয়েছিল ১৯৪৫ সালে। যদিও প্রস্তুতির কাজ ১৯৪২ সাল থেকে শুরু বলা চলে।
    তার মানে কী এর আগে কোন গ্লোবাল ব্যবস্থা বলতে দুনিয়াতে কিছু ছিল না?  হ্যাঁ ঠিক তাই। আসলে এর আগের দুনিয়া বলতে ১৬০৭-১৯৪৫ এই সময়কালটা কলোনি যুগ। মানে তা দখল শাসন ও লূটের যুগ। তখন কলোনি মালিকদের মধ্যে শত্রুতাই ছিল মুখ্য, তেমন কোন আন্তঃবাণিজ্য বা সম্পর্ক বলতে খুব তেমন কিছু ছিল না।
    আসলে গ্লোবাল অর্ডার বলতে এ্কটা একই সাথে এটা মূলত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বা অর্ডার বুঝায়।  আর এই তিনটাই প্রথম চালু হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে ১৯৪৫ সালের ঐ সময়ে। তাহলে এর আগের কালটাকে কি বলতে পারি? বলতে পারি সেটা ছিল একটা কলোনি যুগ যার মাধ্যমে একধরণের “কলোনি ক্যাপিটালিজম” বলতে পারি একে কিন্তু সাথে খুবই সীমিত বা তেমন কোন বাণিজ্যিক ব্যবস্থা ছিল না বলা যায়। এখন ৭৫ বছর পরে আমেরিকার নেতৃত্বের ঐ গ্লোবাল ব্যবস্থার যুগ ধীরে ধীরে শেষ হচ্ছে। আর সে জায়গা নিতে উঠে আসতে চাইছে চীনের নেতৃত্বের এক ভিন্ন গ্লোবাল ব্যবস্থা বা অর্ডার।

    গ্লোবাল অর্ডার বলতে মুখ্য ফোকাস আন্তর্জাতিক বাণিজ্যঃ
    গ্লোবাল ব্যবস্থার মুখ্য বা কেন্দ্রীয় ফোকাস বলতে সবসময়ই সেটা হল বাণিজ্য – আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। এই বাণিজ্যের এক সিস্টেম গড়ে তোলা ও নিয়ন্ত্রিত হয় মূল দুই নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে, আর সাথে বাণিজ্যিক বিষয়ে রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের পারস্পরিক বুঝাবুঝির প্রতিষ্ঠান হল ডাবলুটিও। আগেই বলেছি গ্লোবাল অর্ডার বলে যাই বুঝি না কেন এর মুখ্য জিনিষ হল এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা। গ্লোবাল পণ্য ও পুঁজির লেনদেন বিনিময় বাণিজ্য। যা আবার আসলে একটা মুদ্রা ব্যবস্থা – আন্তর্জাতিক  বেচাকেনা বিনিময়ের মুদ্রা ব্যবস্থা। কারণ প্রত্যেক রাষ্ট্রের সীমানা যেখানে শেষ সেই রাষ্ট্রের স্থানীয় মুদ্রা দিয়ে কেনাবেচা সেখানেই শেষ। তাই যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য হতে পারে যেকোন দু রাষ্ট্রের মানে সব রাষ্ট্রের কাছেই গ্রহণযোগ্য এক মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করতে পারা দিয়ে; মানেই এক আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করতে হবে আগে। নইলে পণ্য বিনিময় অচল। এই কাজটারই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আইএমএফ। আমরা বলি দুনিয়াটা বড়লোক দেশের দিকে ফেবার করে সাজানো। কথা সত্য। এরই আরেক অর্থ হল, আইএমএফ বড়লোক রাষ্ট্রগুলোর দিকে কান্নি মেরে কাজ করে ও সাজানো। কিন্তু সাবধান। এর মানে আইএমএফ “নিপাত গেলে” এটা কোন সমাধান নয়, হবে না। আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্ভব করতে চাইলে আইএমএফ ধরণের কোঅর্ডিনেশন ও নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠান আমাদের লাগবেই। তবে যাতে সে কান্নি না মারে – তা বন্ধ করার ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে। যদিও কান্নি মারা বন্ধ করতে সক্ষম হওয়া সেটা কিন্তু এক ক্ষতিগ্রস্থ-পক্ষদের গ্লোবাল ক্ষমতার অর্জন ও নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার প্রশ্ন। মানে এটা আইএমএফ “নিপাত” যাওয়ার প্রশ্ন নয়। আমরা যাই নতুন কিছু করি না কেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা চালু রাখা ও নিয়ন্ত্রণ – দুনিয়াকে চালু রাখার জন্য অনিবার্য প্রয়োজনীয়।
    অনেকে শ্লোগান দেন, বিদেশি পুঁজি, বিদেশি পণ্য ইত্যাদি সব হারাম – দেশি – স্বদেশিপনাই একমাত্র পথ। এরাই অবশ্য জাতি-রাষ্ট্র বাদী। আর এটাই কলোনি যুগের ধারণা। যখন আন্তর্জাতিক পণ্য বিনিময় বাণিজ্য ধারণাটাও ছিল না। ফলে স্বদেশি বা আত্নম্বভরিতা ধরণের ধারণা জন্মানোর জন্য উর্বর মাটি-পরিস্থিতি। আর রাজনীতি বা রাজনৈতিক ক্ষমতা মানেই অন্যদেশ ভুমি কলোনি-দখলের ক্ষমতা। এরচেয়েও বড় কথা “স্বাধীন রাষ্ট্র” বলে কিছু নাই। আছে কলোনি হয়ে থাকা রাষ্ট্রের ধারণা – মাই লর্ড বলে হাত জোর করে দাঁড়িয়ে থাকা। ফলে এই দশা-পরিস্থিতি জন্ম নেয়া রাষ্ট্র ধারণাটাই জাতি-রাষ্ট্র ধারণা। আর এদেরই অলীক কল্পনাটা হল অর্থনৈতিক স্বদেশিপনা, বিদেশি মানে হারাম ধারণা। পণ্য বিনিময় বানিজ্য ধারণাকে নিচে চাপা দিয়ে ফেলে রাখা। বলাই বাহুল্য এটাই এবসার্ড, অবাস্তব কথা বলা। বাস্তবে তাদের কথা মিলিয়ে দেখে এরপর তারা বলে না। আপনি নিজেই একটা কারখানা দিলেন কিন্তু সেটা চালাতে যদি অন্য দেশের একটা টেকনোলজি, একটা ধাতব অংশ যা খুবকম দেশে পাওয়া যায় ইত্যাদি এমন হয় (আর সব কিছুই – সেটা ধাতু বা কাঁচামাল সব দেশে পাওয়া যায় না, যাবে না বলে) সেক্ষেত্রে ঐ কারখানা চলবে না। কারণ,ধাতু বা কাঁচামাল বা টেক (বাজার না হয় না বললাম) ইত্যাদি পেতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময়ই ওর একমাত্র সমাধান। কিন্তু স্বদেশিপনা জাতিবাদী আপনি তো কিছুই বিদেশের কিনতেও চান না, বেচতেও চান না। অথচ এটাই আইএমএফ “নিপাত যাক” কথার ব্যবহারিক সত্যিকারের মানে।
    সারকথায়, এই জাতিবাদীদের জন্ম কলোনি যুগে যখন দুনিয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা বলতে কিছুই ছিল না। কিন্তু সেখান থেকে আজকের দুনিয়ায় একটা গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থার দুনিয়ায় রূপান্তরিত হয়ে গেল কেমন করে? কে করল তা এরা ‘কেউ’ জানে না।  এই কেউ বলতে জাতি-রাষ্ট্র বাদী আর কমিউনিস্ট দুই পক্ষকেই বুঝতে হবে। এই রূপান্তরটা সম্পর্কে এদুই পক্ষই অন্ধকারে। গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থা, খারাপ-ভাল ত্রুটিপুর্ণ যাহোক একটা গ্লোবাল অর্ডার কার্যকর হয়ে আছে এটা তারা জানে না। যদিও এটা থাকার সুবিধা গ্রহণ করতে তারা দ্বিধা করে না। ডলার কামানোকে কাঙ্খিত ভগবান পাওয়ার মতনই মনে করে। যদিও আবার যারা একটু সিনিয়র মোটামুটি বুঝতে পারে গ্লোবাল ব্যবস্থা একটা কিছু আছে তারা আবার সে ধারণায় পানি ঢেলে একে নেতি চোখে দেখে আর বলে ওটা “সাম্রাজ্যবাদী”। একারণে তারাও অন্ধকারে।
    কেউ বুঝুক অথবা সারাজীবন অন্ধকারেই থেকে যাক গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থাকে কেন্দ্রে রেখে একটা গ্লোবাল অর্ডার দুনিয়ার কার্যকর আছে। আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে গড়ে উঠা যে ব্যবস্থাটা বয়স এখন প্রায় ৭৫ বছর। এদিকে আবার এই গ্লোবাল ব্যবস্থার নেতা আমেরিকাকে অন্তত অর্থনৈতিক দিক থেকে চ্যালেঞ্জ করে নেতৃত্ব নিতে চীনের উত্থান এখন আসন্ন। ধীরে ধিরে তা কার্যকর হওয়া শুরু করেছে। এটা যে আসন্ন তা চীন নিজে বলেছে বলে জেনেছি তা নয়। এটা আমেরিকান সার্ভে-স্টাডিতে পাওয়া রিপোর্টর ফাইন্ডিংস বলেছে।
    এখন সমস্যা কত গভীর হয়েছে দেখেন! যে জাতিবাদীরা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল সিস্টেম বা অর্ডার সম্পর্কে পুরাই অন্ধকারে থেকে গেছিল গত ৭৫ বছর ধরে তারা এখন কিভাবে বুঝবে যে এখন যে আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বটাই বদল হয়ে চীনের উত্থানের সময় হয়েছে?

    অতএব চীন বা আমেরিকেকেও ভারত বিবেচনা করছে গ্লোবাল অর্ডারের হবু অথবা পুরান নেতা হিসাবে নয়। বড় জোর আর পাঁচটা পড়শি রাষ্ট্রের মতই যেখানে এরা দুজন হয়ত কিছু বাড়তি ক্ষমতাধর রাষ্ট্র, এরকম। গ্লোবাল সিস্টেম বলতে মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আর তাকে কেন্দ্র করে পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক সিস্টেম এক গ্লোবাল ব্যবস্থা বলে যে কিছু আছে এসব তাদের নলেজ-অনুমানের বাইরে মনে হচ্ছে। একটা জাতিসংঘ বলে কিছু আছে তা জানে। কিন্তু কে বানালো এটা, কেন বানাতে পারল, সেসব জানা এসব গ্লোবাল প্রেক্ষিতের ভিতর দিয়ে ভারতের দুনিয়াকে জানা – না, জাতি-রাষ্ট্রের রাজনীতির জন্য এসব জানা জরুরি নয়। এসব বিষয় সবচেয়ে ভাল্ভাবে ধরা পড়ে জাতিসংঘের ভেটো-মেম্বার হওয়ার জন্য তাদের বোকার আকুতি দেখলে। বুশ আমলের শেষে ওবামার শুরুতে ওবামা ভারতকে চীন ঠেকানো বা চায়না কনটেইমেন্ট কাজের ঠিকা দেওয়ার কথা পাকা করেছিল। আর তখন টোপ দিয়েছিল যে বিনিময়ে আরেকটা মুলা দিবে। সেটা হল ভেটো-মেম্বার পদ। আর প্রণব মুখার্জি তা বিশ্বাস করেছিল এতই দৃঢ়ভাবে যে ২০১০ সালে হাসিনার ভারত সফরে হাসিনাকে দিয়ে দাবি তুলিয়েছিল যে ভারতকে ভেটোক্ষমতা দিতে হবে! জাতিসংঘের জন্ম কেন হয়েছিল কী করতে হয়েছিল আর কেনই বা এই ভেটোক্ষমতার ব্যবস্থা্র জন্ম তা প্রণব বুঝেন এরপর আর তা মনে হয় না। যদি হত তাহলে ওবামা আশ্বাস যে ফাঁকা ধুর্তমি তা ধরতে পারতেন। ভেটো কথাটার ব্যবহারিক মানে কী তাই তো তিনি বুঝেন নাই, দেখা যাচ্ছে। কথা হল পাঁচ ভেটো মেম্বারের কেবল একজন যদি ভেটো দেন মানে না করে দেন তবে সেই সিদ্ধান্ত হবে না। কাজেই ওবামা চাইলেই ভারতকে নতুন সদস্যপদ দিতেই পারবেন না। অন্তত চীনকেও পক্ষে নিতে হবে। তা যদি বুঝতেন তাহলে তো চীনকেই আগে সন্তুষ্ট করতে যেতেন। আসলে সেটাও কম বোকামি হত না। কারণ, আমেরিকা নেতা ছিল বলেই ডিকটেট করে ঐ পাঁচজনকে ভেটো ক্ষমতা দিয়ে হলেও একটা জাতিসংঘ গড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। দুনিয়ার নেতা বদলালে পরে তার ডিকটেটের ক্ষমতা কী মাত্রায় হবে সেটার উপর নির্ভর করে তিনি জাতিসংঘ-২ বলে কিছু শুরু করতে পারবেন কিনা! এতা গ্লোবাল সিস্টেম সম্পর্কে বুঝাবুঝির মামলা। তবে সাবধান তা আবার ইউরোপের কোন দেশের বই-পুস্তক পড়ে জানা যাবে না। অর্থাৎ সারা ভারত এই অতি জাতি-রাষ্ট্রবাদ এটাই তাদের গ্লোবাল প্রেক্ষিত থেকে ভারতকে অস্তিত্বের তাতপর্য ও সম্ভাবনা কখনও বুঝতে পারেন নাই। গ্লোবাল প্রেক্ষিত সম্পর্কে দুর্বল বুঝাবুঝির উতস এখানেই। মজার কথা কলোনি আমলের ও ঐ আমলের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ ধারণা বলে কলোনি শাসনের সমাপ্তিতে সারা ইউরোপের সকল রাষ্ট্র এটা ১৯৫৩ সালের মধ্যে ত্যাগ করে, বাতিল করে দেয়। সেটা রাজনীতিকরা তো নয়ই, ভারতের একাদেমিকরাও টেরও পেয়েছে জানা যায় না।
    সাধারণভাবে ভারতের রাজনীতিক্বেওর পর্ব এখানেই শেষ করে এবার শারদ পাওয়ারের পর্ব।

    সুনির্দিষ্ট শারদ পাওয়ারের লেখা থেকেঃ
    বয়ান একঃ ঐ সাক্ষাৎকারে শারদ পাওয়ারের বক্তব্য, ‘চীন সামরিক সক্ষমতা ভারতের চেয়ে দশ গুণ বড়। কাজেই পাকিস্তানের চেয়ে চীন আমাদের বড় শত্রু ও হুমকি”। কিন্তু এর মানে কী যারাই ভারতের চেয়ে সামরিক দিক দিয়ে বড় তারা সবাই ভারতের শত্রু? তাই নয় কী?
    অর্থাৎ তাহলে তো আমেরিকা ভারতের জন্য চীনের চেয়েও আরো বড় শত্রু; মানতে হবে। কারণ আমেরিকা সামরিক দিক দিয়ে এখনো চীনের চেয়ে বড়। কিন্তু পাওয়ার-সহ ভারতীয় নেতা ও পাবলিক কি তাই মনে করবে? ট্রাম্প পুজা করা বিজেপি তো অবশ্যই না। তার মানে ভারতের চেয়ে সামরিক সক্ষমতায় বড় হওয়াটাই ভারতের কেউ শত্রু হবেই। এটা ভিত্তিহীন তাই কারো মানার কোন কারণ নাই!
    আবার তিনি বলছেন, ‘শত্রুর কথা উঠলেই আমাদের পাকিস্তানের কথা মনে আসে। কিন্তু না, পাকিস্তান নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। বরং সামনে চীন আমাদের প্রধান শত্রু, কারণ ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করার চীনের ক্ষমতা আছে, আর আছে দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মসূচি”।

    পাওয়ারের এই বোঝাবুঝিও ভুল। কারণ একই যুক্তিতে তো তাহলে আমেরিকাও ভারতের শত্রু হয়ে উঠতে পারে। মানে উঠবেই। এই যে ‘ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ’ কথাটা- এখানে কে শত্রু হবে আর কে মিত্র হবে এটা বুঝবার ভিত্তি কী?
    আসলে শারদ পাওয়ার বা তার মত করে ভাবা (জাতি ভাবনার) মোদীর মধ্যে কোনো ফারাক নেই। তারা সবাই একই চিন্তা ফ্রেমের লোক যেটা পুরনো ফ্রেমের কলোনি আমলের ফ্রেম ও সে আমলে সারা ইউরোপ এভাবেই চিন্তা করত। যার সার কথাটা হল – বিদেশী মাত্রই আমার শত্রু। আমার দেশে আমরা এক জাতি আর এর বাইরে সবাই ‘বিদেশী’ যার মানেই ওরা সবাই আমার শত্রু। এটাই জাতি-রাষ্ট্রের ধারণার চিন্তা ফ্রেম। য়াগে বলেছি এটা অবশ্য সারা ইউরোপ ১৯৫৩ সাল থেকে বাদ দিয়েছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, বিদেশী মাত্রই শত্রু এ কথা সবসময় ঠিক নয়। বরং বিদেশীর সাথে ‘বাণিজ্যও’ করা সম্ভব আর তা দুদেশের জন্য বিরাট লাভজনক হতে পারে। বাণিজ্য মানে পণ্য বিনিময়, লেনদেন- এক পণ্যের বিনিময়ে অন্য পণ্য দেয়া। যেটা নিজ নিজ দেশের হাটবাজার-গঞ্জে করে থাকি, সেটাই তবে কিছু ভিন্ন রূপে বা ভিন্ন শর্ত-পরিস্থিতিতে।

    যদিও আন্তঃরাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক পরিস্তিতিতে সেখানে আরেক বাস্তব টেকনিক্যাল সমস্যা আছে। সেটা হলো মুদ্রা। একটা দেশের সীমানার মধ্যে ওই দেশের মুদ্রা- এটাই পণ্য বিনিময় বাণিজ্যে বিরাট ও মূল ভূমিকা রাখে। কিন্তু সমস্যা অন্যখানে, আপনি পকেটে টাকা নিয়ে সারা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত চষে বেড়াতে পারবেন, যা মনে চান আর যা সেখানে পাওয়া যায় সব কিনতে পারবেন। কিন্তু দেশের সীমান্ত পার হলেই বাংলাদেশী মুদ্রা আর কাজ করবে না। আপনি বাধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বেন। অর্থাৎ সীমান্ত ছেড়ে যাওয়া মানে তখন পড়শি দেশের মধ্যে একটা বিনিময় বাণিজ্যের অবস্থা। সেক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশে বেচাকেনা মানে কেবল সে দেশের মুদ্রাই চলবে। তাই আপনার সে ক্ষেত্রে বাড়তি দরকার পড়বে একে তো মুদ্রার বিনিময় হার জানা আর মুদ্রা বিনিময় করে দিতে রাজি থাকা একটা দোকান বা ব্যাংক। আরো কথা আছে- আলোচ্য দুই দেশকে আইএমএফের সদস্য হতে হবে। নইলে বিনিময় হার জানাসহ আরো বহুবিধ জটিলতার মুখে পড়বেন। কেনাবেচা লাটে উঠবে। কিন্তু একটা বিশাল ঘটনা এখানে ঘটে গেছে। তা হল, এই দুই দেশের বাণিজ্য মানে জাতিরাষ্ট্রবাদী রাজনীতিবিদরা জন্মের পর থেকে দেখে আসছেন একটা গ্লোবাল বাণিজ্যের ব্যবস্থা চালু হয়েই আছে। তাই তারা ধরে নেন, এই ব্যবস্থাটা দুনিয়ার জন্ম থেকে নিশ্চয়ই ছিল।
    এটাই শতভাগ মিথ্যে অনুমান। আইএমএফেরই জন্ম এইমাত্র ১৯৪৪ সালে। এর মানে এর আগে বিনিময় বাণিজ্য খুবই কঠিন না প্রায় ছিলই না, দরকারও কম ছিল, সে অন্য কারণে। এক কথায় আজ আইএমএফ যা করে এই পুরোটাই সেকালে করত মাত্র এক ব্যক্তির মালিকানার এক ব্যাংক আর ইউরোপের আর তিন-চার শহরে বসে থাকা তার তিন-চার ছেলে মিলে। সেদিকে এখন আর যাবো না। আরো যাবো না কমিউনিস্ট রহস্য-গল্প দূরে রাখার জন্য।
    যে কথা বলছিলাম, তার মানে যেকোনো দুই দেশের মধ্যে পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য মানে হল – আইএমএফের জন্ম এর আগেই হয়ে গিয়েছে আর এই বাণিজ্য আর কেবল দুই দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বা ‘লোকাল’ ঘটনা একেবারেই নয়। একটা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা দুনিয়ায় চালু থাকা। তাতে জাতিবাদী মন যতই মনে করুক পড়শি দেশের সাথে বাণিজ্য একটা লোকাল ঘটনা, এটা কিন্তু একেবারেই সত্য নয়।
    গত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই গ্লোবাল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থাবলির পুরো কাঠামোই যে তৈরি হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে সেটা আমরা টের না পেয়ে বিদেশী পুঁজি, বিদেশী ঋণ ঘৃণাকারী যেই হই না কেন। একটা গ্লোবাল সিস্টেম আছে বা ১৯৪৫ সালে চালু হয়েছিল বলেই মোদী বা শারদ পাওয়ারের ‘দেশী অর্থনীতি’ নামক কল্পনা চালু আছে। নইলে তো বাণিজ্যের অভাবে না খেয়ে রাজনীতিবিদিদের মুখ দিয়ে কথাই বের হত না!

    কাজেই আমাদের একটা বড় অবজারভেশন ও দাবি যে, ভারতের রাজনীতির সাধারণ ধারা হল তাদের এক প্রবল মিথ্যা অনুমান যে সব কিছুই ‘লোকাল’। তারা ‘বিদেশী’ বিরোধী। বিদেশী মাত্রই ভারতের স্বার্থবিরোধী ইত্যাদি যত সব মনগড়া কল্পনা আছে। মানে ভারতের অভ্যন্তরীণ চোখে দুনিয়াটাকে দেখা। কিন্তু এর বিপরীতে আমাদের মত রাষ্ট্রগুলোর উপরে একটা প্রবল প্রভাবশালী গ্লোবাল ব্যবস্থা বা গ্লোবাল অর্ডার কার্যকর থাকে ও সক্রিয় কাজ করে থাকে। সেই গ্লোবাল অর্ডারের অধীনে আমাদের অভ্যন্তরীণ বা লোকাল ঘটনাবলিগুলো তৈরি ও কার্যকর হয় ও ক্রিয়াশীল থাকে। কিন্তু আমরা তা টের পাওয়ার যোগ্য না হলে মনে হবে গ্লোবাল সিস্টেম বলে কিছু নেই। ভার্তে যা ঘটে তার সবই যেন তার অভ্যন্তরীণ স্বার্থ বা ইচ্ছা দিয়েই ঘটায়। সার কথায়- গ্লোবাল প্রেক্ষিতই বড় প্রভাব বিছিয়ে ঠিক করে দেয় লোকাল ঘটনাবলি কেমন ঘটবে। কাজেই স্থানীয় স্বাধীন কোন প্রেক্ষিতে লোকাল ঘটনাবলি ঘটে না, ঘটবে না। চীন পালটা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ার উদ্যোগ ও এক নয়া গ্লোবাল ব্যবস্থা খাড়া করতে চায় বলে, চাইতে পারে বলেই ভারতের কাছে অফার আসতে পারে আসবে। আবার ভারত যদি ঠিক করতে বসে আমেরিকার চীন ঠেকানোর ঠিকা নিয়ে আমেরিকার সাথে ভাগ্যকে বেধে ডুবতে বসা সিস্টেমের নায়কের সঙ্গি হবে নাকি নতুন গ্লোবাল অর্ডার যে ঠিক করবে যে দুনিয়ার ভবিষ্যত ঠিক করবে তার সাথে যাবে – এটা কে বেশি সুবিধা দিবে সেই মামলা একেবারেই নয়। ভারতের ভবিষ্যত নতুন গ্লোবাল অর্ডারের ভিতরে – যদি গ্লোবাল অর্ডার জিনিষটা বুঝতে সক্ষম হন।
    বয়ান দুইঃ শারদ পাওয়ার বলছেন, “ভারতের জন্য সত্যিকারের হুমকি হলো চীন, যে চীন ভারতের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে গেছে। অতএব, ঐ চীনের সাথে, কমরেডদের সাথে আমাদের খুব গলাগলি আছে, (যেমন একই দোলনায় বসে মোদি-শিং দোল খাচ্ছে আর কথা বলছে) এমনটা এই ছবি দেখিয়ে য়ামাদের মাঝে যে শত্রুতা এর মোকাবিলা হবে না। মোদি হাত মিলাচ্ছে বা কুলাকুলিতে জড়িয়ে ধরছে প্রেসিডেন্টকে শি কে এটা হতে পারে না”।
    এর চেয়ে জাতিবাদী বক্তব্য আর কী হতে পারে?
    শারদ পাওয়ারের এসব কথা তাকে আরো নাদান কম চিন্তা ও সঙ্কীর্ণ বুঝের লোক বলে পরিচিত করবে। তার প্রথম সমস্যা শত্রু আর প্রতিদ্বন্দ্বী শব্দ দুটোকে মাখিয়ে ফেলা। যেমন ক্লাসের দুই ফার্স্ট-সেকেন্ড স্টুডেন্টের মধ্যে যেটা হয় সেটাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলে, শত্রুতা নয়। স্পোর্টসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় কিন্তু কেউ কারো শত্রু নয়।
    সোভিয়েত ইউনিয়ন-আমেরিকার মধ্যে শত্রুতা ছিল তা সত্ত্বেও কোনো কোনো ফোরামে একসাথে বসে কথা বলা ও কাজ করার মতো বন্ধুত্ব থাকতেই হত। কিন্তু কোন বাণিজ্য সম্পর্ক, পণ্য লেনদেন ছিল না, গ্লোবাল বাণিজ্য সিস্টেমের সুবিধাও কার্যকর ছিল না। কিন্তু এটা ১৯৪৫-৯২ সাল পর্যন্ত। আর এর পর থেকে রাশিয়ার পুতিনসহ নিজেকে কমিউনিস্ট মনে করা (আজ অথবা আগের) সব রাষ্ট্রই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য হয়ে গেছে। মানে দুনিয়াটা এখন একই গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে এসে গেছে। যেটা এখনো আমেরিকার একার পকেটে সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণে। আর এটাই ভেঙে পড়ছে ধীরে ধীরে আর চীনের নেতৃত্ব নতুন একটা ব্যবস্থা গড়তে, বদল ঘটাতে এগিয়ে আসছে। মোদী বা শারদের মত কথিত দেশী জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকরা আগেই আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্ডারের মধ্য থেকেও এর সম্পর্কে বেখবর থেকেছে। নিজের স্বনির্ভর-অর্থনীতি নামে সোনার-পাথর বাটি ধরণের কাল্পনিক ধারণার মধ্যে বসবাস করে গেছে বলে গ্লোবাল অর্ডারের পালাবদল ব্যাপারটা কখনও বোধগম্য হয় নাই। বাস্তবতা হল – ভারত চাইলেও পুরনো আমেরিকার নেতৃত্বের পুরনো অর্ডারের মধ্যে বসবাস করতে পারবে না। খোদ আমেরিকাকেও চীনের নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারের মধ্যে ঢুকতে হবে। কারণ একসাথে দুনিয়াতে দু’টি অর্ডার চালু থাকতে পারবে না। দুইটা আইএমএফ চালু থাকতে পারবে না।

    একাধিক বিশ্বব্যাংক  যদিও থাকতে পারবে। তাহলে কেন চীন ভারতের শত্রু? আবার খেয়াল করতে হবে যে, চীন শত্রু না হলেও খুবই খারাপ প্রতিদ্বন্দ্বী সেই চীনই আবার বাণিজ্যের পার্টনার হতে পারে, পুঁজি বিনিয়োগদাতা ইত্যাদি এসবই একালে সম্ভব। কারণ কোল্ড-ওয়্যারের আমলে সোভিয়েত-আমেরিকা কোন একই বাণিজ্য ব্যবস্থার সদস্য ছিল না। সোভিয়েতরা বৈদেশিক বাণিজ্যে বিশ্বাস করত মনে হয় না। অন্তত এনিয়ে তাদের তাত্বিক অবস্থানও নাই। এটাই সেকালে শত্রুতা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হওয়া সম্ভব ছিল। সেটা একালে আর সম্ভব নয়। কারণ এখন চাল-ডাল মিলে গেছে, এখন আলাদা করা তত্বে সম্ভব বলে যদিও দেখাতেও পারে বাস্তবে এটা প্রায় অসম্ভব।
    আবার ঘটনা হল, চীনের সাথে ভারতের নতুন ও পাল্টা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক নির্মাণ প্রকল্প ব্রিকস, সেটা এতদিন ঠিকই চলছিল। এর মানে কী তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শত্রুতা মিলিয়ে গেছিল, তা ছিল না? বিস্মিত হতে হয় শারদ পাওয়ারের চিন্তা না করে কথা বলে বসা দেখে। অথচ প্রতিদ্বন্দ্বিতা শত্রুতা যাই বলেন তা অবশ্যই ছিল। কিন্তু সবাই নখ লুকিয়ে ফেলা শত্রুতা সামনে না নিয়ে আসা অর্থে একটা কার্যকর লেনদেনের সম্পর্কের মধ্যে ছিল। এটা সম্ভব। আর এটাই একালের গ্লোবাল সিস্টেমের বৈশিষ্ট। যেটা জাতি ধারণা নিয়ে ধরাছোয়া যাবে না। সবই উলটাপালটা মনে হবে। কাজেই ভারতের সব দুর্দশার রুট কারণ এসব জাতিবাদী, বিদেশবিরোধী আজিব চিন্তা যা এদেরকে গ্লোবাল সিস্টেম বুঝতে সবসময় বিরাট বাধা হয়ে থেকেছে!

    মোদী বা শারদের বিদেশ-নির্ভরতা বিরুদ্ধে কথা বলাটা ভুল। বিদেশের সাথে পণ্য-বিনিময় বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়া মানেই তা  বিদেশনির্ভরতা নাও হতে পারে। যদি ব্যাপারটাকে ইন্টারডিপেন্ডেন্সি –পরস্পরের উপর পরস্পর নির্ভরশীল হওয়া, একপক্ষীয় না এভাবে সাজানো যায়। আর ব্যাপক বৈদেশিক বাণিজ্যে জড়িয়ে যাওয়া মানে কিছু কিছু রপ্তানি পণ্যে মাস্টার উতপাদক হয়ে যাওয়া। মানে সবচেয়ে দক্ষ উতপাদক মানে সবচেয়ে কম শ্রমে তা উতপাদন করতে পারা নায়ক হওয়া। এসব নয়া ধারণা, বিদেশ-নির্ভরতা বিরুদ্ধবাদীদের মাথায় ঢুকবে না!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা  গত ২৫ জুলাই ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “শারদ পাওয়ার সবার প্রতিনিধি” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • চীন-ইরান প্যাক্ট থেকে গ্লোবাল পালাবদল শুরু হবে

    চীন-ইরান প্যাক্ট থেকে গ্লোবাল পালাবদল শুরু হবে

    গৌতম দাস

    ২০ জুলাই ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-36q

     

    https://www.dailymail.co.uk/news/article-3413556/

    চীন-ইরান এলায়েন্স থেকে গ্লোবাল পালাবদলের শুরু হবে,
    আর ইউরোপের চীনের দিকে ঝুঁকবার সম্ভাবনা বেড়ে গেলঃ

    বিশ্ব-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যাকে আমরা অনেকে “গ্লোবাল অর্ডার” বলে বুঝে থাকি, এর আসন্ন পালাবদলে [Global Economic Order] নির্ধারক এক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। চীন ও ইরান এক দীর্ঘমেয়াদি এবং ইরানের অর্থনীতি ও সামরিক উন্নতিকে ফোকাস করে এক স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ চুক্তি করতে যাচ্ছে। এটা হবে দীর্ঘস্থায়ী  ও স্ট্র্যাটেজিক সাথে বাণিজ্যিকভাবেও এদুই দেশের গভীর সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া। অবস্থা এমন হয়ে যাবে যাতে ইরানের গায়ে কেউ ফুলের টোকা দিলেও সেটা চীনের গায়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, চীনের স্বার্থের উপর এর প্রভাব থাকবে, এমন অবস্থা হয়ে যাবে। অর্থাৎ এদুই দেশ স্বার্থের প্রশ্নে তারা বহুদূর কমন স্বার্থ হয়ে হাঁটবে। তাতে এ নিয়ে তাদের মধ্যে আলাদা করে কোনো ‘প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত থাকুক আর নাই থাকুক।

    এনিয়ে মিডিয়ায় দুনিয়াজুড়ে  মন্তব্যের ঢল বইছে। মন্তব্যগুলো মূলত আমেরিকা ও ভারতের ব্যর্থতা বা অকর্মন্নতার  দিকে আঙুল তুলছে আর বলছে এরা দুই হল হারু পার্টি – They are the losers। যদিও লুজার শব্দটা কারোরই শুনতে ভাল লাগে না। তবু তেমনটাই কয়েকটা পত্রিকা লিখছে – ১।  ট্রাম্পের মহাকাব্যিক পরাজয় । ২। এই পার্টনারশিপ আমেরিকার জন্য ভয় পাইয়ে দিবার মত ওয়ার্নিং দিচ্ছে। ৩। এই প্যাক্ট এশিয়া্র সাথে আমেরিকার ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করে। আবার বোকা গাড়োলের মত এক মন্তব্যও আছে আর এটা সম্ভবত এই প্যাক্ট নিয়ে আমেরিকার প্রথম সরকারি মন্তব্য। বর্তমানে ইরানের উপর অস্ত্র-ক্রয় বিষয়ে জাতিসংঘের এক নিষেধাজ্ঞা দেয়া আছে যেটা আগামি তিন মাস পরে অক্টোবরে শেষ হয়ে যাবে। সেদিকে তাকিয়ে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের (বিদেশমন্ত্রী) মাইক পম্পেও বোকার মন্তব্য করেছেন – “এই প্যাক্টই বলে দিচ্ছে আমাদেরকে আবার একটা শক্ত নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবে“। ঘটনা হল, জাতিসংঘের কাঠামোতে ভেটো ক্ষমতাওয়ালা যেকোন একরাষ্ট্র  না-ভোট দিয়ে দিলে এরপরে ঐবিষয়ে আর কোন সিদ্ধান্ত হবার সুযোগই নাই। চীন ইতোমধ্যেই সে ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে। এখন এখানে ভেটো ক্ষমতাধর চীন থাকার পরেও এতে পম্পেও-এর এমন আওয়াজ ছাড়ার কোন অর্থ আছে?
    আচ্ছা, আপাতত আর এদিকে আগে না গিয়ে, প্যাক্ট বা চুক্তিপত্রের ভিতরে প্রেবেশ করি।

    চুক্তির খসড়া দলিল তৈরির কাজ শেষ। তবে এখানে খসড়া কথার মানে হল, এর  অনুমোদনের অংশ বাকি বা প্রক্রিয়াধীন যা দুদেশের পার্লামেন্টে আলোচনা ও পাস হওয়া এরপর রাষ্ট্রপ্রধানদের  অনুমোদনের ধাপ আছে তা সমাপ্ত করার প্রক্রিয়া অচিরেই শুরু হবে বা কিছু শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু এরই ফাঁকে প্যাক্টটাকে আমেরিকার দিক থেকে দেখলে, তাদের এক সফল গোয়েন্দাগিরি সম্পন্ন হয়েছে, বলতে হয়। আর চীন-ইরানের দিক থেকে দেখলে কোনো বিশ্বাসঘাতক, হলুদ কাগজের ১৮ পৃষ্ঠার এই খসড়া দলিলটা্র কপি চুরি করেছে আর পরে নিউ ইয়র্ক টাইমস সেটা হাতে পেয়ে ছেপে দিয়েছে। পত্রিকাটার দিক থেকে দেখলে, হাতে পেলে তো তারা ছাপবেই। যদিও চুরি করে পাওয়া একটা দলিল ছাপানোতে, এতে  গোপন রহস্য ধরনের ভাব তৈরি হয়েছে যেনবা চীন-ইরান কোনো অপরাধ করছিল যা (নিউ ইয়র্ক) টাইমস প্রকাশ করে দিয়েছে, এই ভাবের। না, কোনোভাবেই এটা তেমন কিছুই নয়। কোনো ধরনের অপরাধ তো নয়ই। ট্রাম্পের আমেরিকা এপর্যন্ত  ইরানের উপর দীর্ঘদিন ধরে  যেসব সীমাহীন অবরোধ চাপিয়ে রেখেছে তাতে ইরান একেবারেই কোণঠাসা, অর্থনীতি ধুঁকছে, এই করোনাকালে ইরানিদের জীবন থমকে গেছে যেখানে। তবে ট্রাম্পের এসব অবরোধ আরোপের নেতি উদ্দেশ্য আর এতে কৃত আসল অপরাধ হল ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলের হয়ে ভাড়া খাটা আর শত্রুতামূলক কাজ করা। যদিও এই অবরোধ জাতিসঙ্ঘের নয়, কেবল আমেরিকার আরোপিত বলে তা মানতে কোনো দেশের উপর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু টেকনিক্যালি আমেরিকা আমাদেরকে বাধ্য করতে পারে এসুযোগ আমেরিকার হাতে আছে।

    তবে অবশ্যই, আমেরিকার অবরোধ আরোপ মানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ডলারের অপব্যবহার করা হচ্ছে এখানে। মূলত “আমেরিকান অবরোধ আরোপ” কথার প্রাকটিক্যাল মানে হল, আমেরিকার ইরানকে নিষেধ করে দেয়া যে তুমি আমেরিকান ডলারে কোন আন্তর্জাতিক কেনাবেচা করতে পারবে না। কারণ দুই দেশ ডলারে কোন বেচাকেনা করলে “আমেরিকান কোন ব্যাংকের” কাছে যাওয়া ছাড়া এই লেনদেনের একাউন্ট ট্রান্সফার সম্পন্ন হবে না।   অতএব এর প্রতিকারের ব্যাপারটা এখন গায়ের জোর। এই অবস্থায় গায়ের জোরের মুরোদে কুলালে সবার আগে ঐ আমেরিকান অবরোধ উপড়ে ফেলে দেয়াটাই হবে খুবই জায়েজ কাজ।  সেটা কেমন, সেদিকে যাব।

    চুক্তিটা ঠিক কী নিয়েঃ
    সামগ্রিকভাবে উপর থেকে দেখলে, ইরানের এটা চীন থেকে পুঁজি আর টেকনোলজি ধার নিয়ে নিজের অবকাঠামো, শিল্প আর সাথে সামরিক ব্যবস্থাদিতেও সহযোগিতা নিয়ে সেসব গড়ে নেয়া। (নিউইয়র্ক)  টাইমসের ভাষায়, ইরান ব্যাংকিং, টেলিকম, বন্দর, রেলওয়েসহ আরো ডজনখানেক প্রকল্প হাতে নিবে; এছাড়া সামরিক সহযোগিতা, গবেষণা, ট্রেনিংসহ এসব বিষয় দেয়ানেয়া করবে। এভাবে ইরান নিজেকে সবল বাণিজ্যিক পার্টনার হিসাবে গড়ে তুলবে। আর নেয়া ঐ ঋণ শোধ দিতে চীনকে ইরানের তেল-গ্যাস সরবরাহ করবে। ফলে মোট ২৫ বছর এনার্জি দিয়ে বিনিময়ে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও টেক পাওয়ার চুক্তি এটা।  টাইমসের ভাষায়, এজন্য এটা এক ‘বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার’ প্যাক্ট [Economic and Security Partnership]। একটা তুলনা দিয়ে বলা যাক এটা কত বড় অঙ্কের অর্থ। বিশ্বব্যাংক  সবখাতক রাষ্ট্রের জন্য অবকাঠামো খাতে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার মোট বাজেট হল বছরে ৫০-৬০ বিলিয়ন। আর তুলনায় ইরানের এই ঋণ হল গড়ে একাই কেবল নিজ-রাষ্ট্রের জন্য প্রতি বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার করে, এবং তা ধারাবাহিক ২৫ বছর।

    ইরানের কাছে এই ঋণের গুরুত্ব কীঃ
    কম করে বললে সেই ১৯৫৩ সাল থেকে ইরান ধুঁকে মরছে, লড়ছেও। আমেরিকা যখন ফিজিক্যালি সিআইএ এজেন্ট পাঠিয়ে (যেটা একালে (2013) আমেরিকান সরকারের স্বীকার করার কারণে প্রতিষ্ঠিত সত্য) ইরানের নির্বাচিত মোসাদ্দেক সরকারকে ফেলে দিয়ে শাহকে ক্ষমতায় বসিয়ে চার দেশ মিলে ইরানের তেল লুট করে নেয়ার চুক্তিটা করে নিয়েছিল, সেই থেকে। এর চেয়ে প্রকাশ্যে সম্পদ লুণ্ঠনের ঘটনা আর কী হতে পারে! এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৯ সালের খোমেনির বিপ্লব সফল হয়েছিল। এক সবল পালটা থাপ্পর।  আর তাতে লুটেরাদের হাত থেকে ইরান নিজের সার্বভৌমত্ব সামলে ছিল কিন্তু সেটাকে সংহত সুরক্ষিত করতে গিয়ে ইরানিদের অর্থনৈতিক জীবনটা আর কখনো স্থায়িত্ব দেয়া, একটু থিতু হওয়া আর কখনই সম্ভব করতে পারে নাই। প্রধান সঙ্কট থেকে গেছে, প্রয়োজনীয় পুঁজি-বিনিয়োগে ঘাটতি ও টেকনোলজি পাওয়া আর ওদিকে নিজের এনার্জি পণ্য, অবরোধের কারণে বিক্রি করতে না-পারা, সবসময় এগুলোই তাদের বেঁধে রেখেছে। এই যে চার দিকে নেই নেই অথচ দেশের প্রয়োজনীয় সম্পদ আছে গরিব দেশ নয় – এঅবস্থা থেকে ইরান সম্ভবত এবার মুক্তি পেতে যাচ্ছে। এই প্রথম ইরানের বিনিয়োগে খরা কাটতে যাচ্ছে। ইরানের শিক্ষিত বা সক্ষম মানুষেরা কাজ পায় না বেকার, সে দুঃখ সম্ভবত  ঘুচবে এবার।

    উপচে ওঠা প্রভাবঃ
    হবু এই চুক্তি নিঃসন্দেহে ইরানের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নতি আনবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবু সাধারণভাবে দেখলে মনে হবে এটা আর পাঁচটা দেশের বড় অবকাঠামো বিনিয়োগের মতই কিছু ঘটনা হয়ত। কিন্ত তাই কী? আর এতটুকুতেই কি সীমাবদ্ধ থাকবে? অবশ্যই না। কারণ, এতে বেশ কিছু প্রভাব তৈরি হবে তা অন্যান্য প্রভাবের উপর পড়বে আর তাতে প্রভাবগুলোর মোট যোগফল বা কিউমিউলেটিভ ফলাফল পরিণতি হবে গভীর। আর এটাই “গ্লোবাল অর্ডারে” বড় ধরনের পালাবদল ঘটিয়ে ফেলবে। সব গ্লোবাল উত্তেজনা তাই এখানেই। খুব সম্ভবত আগামী ইতিহাসে, কোন কোন ঘটনা থেকে পালাবদলে গ্লোবাল অর্ডারের নেতৃত্ব পুরানা স্থিতি ছেড়ে চীনের হাতে চলে এসেছিল – এর অন্যতম হিসেবে চীন-ইরানের এই হবু চুক্তির কথা লেখা হবে। এই চুক্তি এমনই বড় প্রভাবশালী হয়ে উঠতে যাচ্ছে এবং হওয়ার মতই প্রবল পটেনশিয়াল।

    যেমন একটা পটেনশিয়ালিটি বা সম্ভাব্য আড়ালে থাকা ক্ষমতার কথা বলি। এক কথায় বললে, আমেরিকার ইচ্ছামতো যাকে খুশি যেকোনো দেশের উপর “অবরোধ আরোপ করে” তাকে ডলারে কেনাবেচার সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে পারে। এর টেকনিক্যাল সুযোগ সে পড়ে পাওয়া চার আনার মত পেয়েছে ও নিয়েছে। ১৯৪৪ সালে আইএমএফের জন্মের সময় এর সদস্যরা একমত হওয়াতে একমাত্র আমেরিকান ডলারকেই (এবং এটাই তখন সব শর্তপুরণ করতে পারে এমন একমাত্র যোগ্য মুদ্রা ছিল) আন্তর্জাতিক বিনিময় মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। কারণ মুদ্রার বাস্তব অসুবিধা হল, কোন না কো রাষ্ট্রীয় মুদ্রাকেই একই সাথে তাকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলেও গ্রহণ করতেই হয়। কোন রাষ্ট্রীয় মুদ্রার বড় ইতিগুণ হল, এটাই একমাত্র বাস্তব কার্যকর ও ব্যবহারিক মুদ্রা। ফলে যা লোকাল একটা দেশের মুদ্রা যে মুদ্রার নিয়ন্ত্রণ ওই দেশের হাতে তাকেই উপায়হীন হয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলেও গ্রহণ করতেই হয়েছিল। এটাই মুদ্রার গুণ-বৈশিষ্ট্যের ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা। মুদ্রার এই সীমাবদ্ধতা কাটানোর কোনো সমাধান এখনো দুনিয়াতে নাই।
    তাই  আইএমএফ-স্বীকৃত আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে যদিও ডলারে কেনাবেচা করতে ইরানকে কেউ বাধা দিতে পারে না। কারণ ইরানও আইএমএফের সক্রিয় সদস্য। কিন্তু আমেরিকা এর বিপরীতে বলবে সে নিজের রাষ্ট্রীয় মুদ্রা হিসেবে যে ডলার সেই ডলারে বেচাকেনা করতে ইরানকে বাধা দিতেই পারে। এই এক্তিয়ার তার আছে। সোজা কথা, মুদ্রার গুণগত সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে আমেরিকা বাড়তি এই ক্ষমতাটা অপব্যবহার করে থাকে। আমেরিকার এই অপব্যবহার এতই মারাত্মক যে গত ২০০৮ সাল থেকে বারো বছর ধরে রাশিয়াকে সে আজও ডলার-অবরোধ দিয়ে রেখেছে। পরিণতিতে রাশিয়ান মুদ্রা রুবলের মূল্য অর্ধেক হয়ে আছে।
    শেষে প্রায় ইরানের মতনই রাশিয়াও সেকালে চীনের সাথে এক এনার্জি চুক্তি করে এর বিনিময়ে নিজ অর্থনীতি সামলিয়েছে। অবশ্য এছাড়াও ওদিকে ব্রিটেন রাশিয়ান গ্যাস ব্যবহার করে আর সেই গ্যাসের মূল্য থেকে পাওয়া আয় রাশিয়া আবার ব্রিটিশ বাজারে বিনিয়োগ করে রেখেছে বলে ব্রিটেনের বিশেষ অনুরোধে আমেরিকা কেবল এই অর্থটা অবরোধ আরোপের বাইরে ছাড় দিয়ে রেখেছে। তবে মূলত চীনের সাথে লেনদেনের ভরসায় রাশিয়া বাজারে টিকে আছে। মনে রাখতে হবে, অবরোধের আরেক ব্যবহারিক মানে হল গ্রামে কাউকে যদি একঘরে করে রাখা হয় – এর প্রভাব একটা রাষ্ট্রের উপর তেমনই। সেটা যাই হোক, এটাই আবার চীন-রাশিয়ার বর্তমান বিশেষ সম্পর্ক ও  এলায়েন্সের আসল ভিত্তি। তাদের আমেরিকাবিরোধী অবস্থানের গোড়ার কথা এটা। যদিও কেউ কেউ এখনো ভুল করে ‘কমিউনিস্ট ইডিওলজি’ এদের সম্পর্কের ভিত্তি মনে করে; যা একেবারেই ভিত্তিহীন। আর ইডিওলজির সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে আজকে নয় সেই ১৯৫৮ সাল থেকেই তা ভেঙে চুকেবুকে গেছে। বরং আমেরিকার ডলার-অবরোধের ক্ষমতা ভাঙতে চীনের মিত্র হিসাবে সবচেয়ে আগ্রহী শক্তি রাশিয়ার পুতিন। অতিরিক্ত ছটফটে পুতিন পারলে এখনই কিছু করে এমন যেকোনো কিছু করতে রাজি। তবে এ নিয়ে চীনের সাথে রাশিয়ার লম্বা যৌথ পরিকল্পনা আছে।

    ডলারের অবরোধ আরোপের ক্ষমতা ভেঙে দেয়া মানে কীঃ
    আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাপারটা কী তা কমিউনিস্টদের আজো ঠিকমতো বোঝা হয়নি। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থাটা ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের চালু ও দাঁড়িয়ে আছে এটাই তারা রিয়েলাইজ করে না। এই ব্যবস্থাটা চালু হয়ে গেলেও কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো তখন এতে অংশ নেয় নাই (আবার আমেরিকাও নেতিবাচক মনোভাব রাখাতে যেমন, সুনির্দিষ্ট করে পোল্যান্ডের সদস্য-পদলাভের আবেদন না করে দিয়েছিল আমেরিকা)।  কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো সেই থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক ছাড়াই বিকশিত হয়েছিল। তবে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমিতভাবে বার্টারে কিছু পণ্য বিনিময় হত। কিন্তু এভাবে কতদিন?  এভাবে ১৯৯২ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙে যাওয়ার আগে পর্যন্ত। এরপরে এরা সবাই আইএমএফের সদস্যপদ পায় ও নেয়। তত দিনে দুনিয়ার বাণিজ্যে কেনাবেচা প্রধানত ডলারেই সম্পন্ন হওয়া প্রবলে  শুরু হয়ে গেছে। প্রধানত মানে? মানে হল, অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে  আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের  সত্তর ভাগের বেশি লেনদেন যদি কোন একক মুদ্রায় সম্পন্ন হয় তাহলে সেটাই প্রধান আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে ধরতে পারি। এটা অনেকটা খুব চালু দোকানের খাবারের মত। খুব চালু বলেই ওর খাবার সবসময় টাটকা ও ভেরাইটি থাকে। ফলে ওর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অন্য দোকান কেউ দাড়াতেই পারে না। কিন্তু একবার যদি তার বিক্রি পড়ে যায় তবে ঐ দোকান শেষ। একইভাবে, ডলারের ক্ষেত্রে, ওর প্রতিদ্বন্দ্বী মুদ্রা গ্লোবাল লেনদেনের মুদ্রা হিসাবে একবার সত্তর ভাগের কাছাকাছি চলে গেলে ডলারের দফারফা হয়ে যাবে। এটাই ডলারের অবরোধ আরোপের ক্ষমতা ভেঙে দেয়া। এদিকে ইতোমধ্যে  চীনা ইউয়ান শর্ত পূরণ করাতে পারায় গত ২০১৫ সাল থেকে ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে আইএমএফের স্বীকৃতি পায়। আর সেই থেকে রাশিয়ার সাথে চীন পরিকল্পনা করে করে আগাচ্ছে।

    চীনের জ্বালানি কেনাকেন্দ্রিক পরিকল্পনা নিয়ে আগানোঃ

    China's annual average crude oil imports

    Source: China General Administration of Customs, based on Bloomberg, L.P.

    এখনকার মুল পরিকল্পনাটা হল, চীনের জ্বালানি কেনাকেন্দ্রিক। বড় অর্থনীতি বলে চীনকে প্রচুর জ্বালানি কিনতে হয় [World’s largest Importer]  …..more than 10 million barrels a day last year। মানেই তার পরিশোধ করা এক বড় পেমেন্ট হল জ্বালানির মূল্য শোধ করা। অতএব হিসাবটা হল, এই পেমেন্ট যদি সে ডলারে না করে নিজ মুদ্রা ইউয়ানে করে তাহলে ঐ ৭০% গ্লোবাল লেনদেন থেকে ডলারকে হটানোর পথে অনেক দূর আগিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু এত দিন এই পরিকল্পনা ছিল মধ্যপ্রাচ্যের বাদশা বা গালফকেন্দ্রিক, বাদশাহরা যদি আমেরিকার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে একবার রাজি হয় ভরসা করে – এভাবে। কিন্তু এর ভিতরে  ইরানকে নিয়ে গোনায় ভাবা হয়নি। কারণ ইরান আজকের হবু সম্পর্কের মধ্যে আসতে চায় এমন আগ্রহ আগে কখনও  দেখায়নি। আর ইরানের কাছে চীনের দেয়া প্রস্তাব ছিল সামগ্রিক ও দীর্ঘস্থায়ী, এখনকার হবু চুক্তির মত হতে হবে এই শর্তের।  ইরানের আগে অনাগ্রহটা কেন ছিল তা বুঝতে ইরানের বিরোধী নেতা আহমদিনেজাদের প্রতিক্রিয়া অনুসরণ করা যেতে পারে। তিনি বলছেন, এই চুক্তি হলে আমরা অনেক বেশি চীনা নির্ভরশীল হয়ে যাব। বাইরে থেকে দেখলে তিনি সম্ভবত আগামী নির্বাচনে লড়ার কথা ভাবছেন। তবে প্রশ্নাতীতভাবেই ইরান চীনা নির্ভরশীল তো হবেই, কথা সত্য। কিন্তু প্রশ্ন সেখানে নয়। প্রশ্ন হল ইরানের হাতে এর বিকল্প আর কী আছে? ব্যাপারটা হল, পোলাও পাতে আসার অপশন যদি নাই থাকে তবে পোলাও খাবো কি না সেই বাছাবাছির অর্থ কী! এই হল ইরানের বাস্তবতা। যদিও ইলেকশনি ইস্যু হিসেবে দেখলে আহমদিনেজাদের বক্তব্যের গুরুত্ব বুঝা যেতে পারে।

    সেটা যাই হোক, এবারের সর্বশেষ ২০১৯ সালের মে মাসের শুরু থেকেই ট্রাম্প আরো  কড়া অবরোধ আরোপ করেছিলেন। এতে এক চীন আর ভেনিজুয়েলা (একে তেল পাঠানো রি-সেল করার জন্য) ছাড়া কোথাও ইরানি তেল বেচা যায়নি। ভারত এই প্রথম কোন তেল কিনে নাই। তাও সেটা আবার সকলকেই  কনসেশন রেটে আর ইরানি নৌবাহিনীর পাহারায় নিজ ট্যাংকার-ক্যারিয়ারে করে তা পাঠাতে এবার ইরানি-অফার ছিল তা সত্ত্বেও। ফলে ইরানের পাবলিক তাদের জীবনযাত্রায় আর কত গভীর চাপ, আর কত দিন সহ্য করতে পারা সম্ভব- এটাও মুখ্য বিবেচনার দিক হয়ে উঠেছিল এখানে। সম্ভবত সে কারণে এর আগে সহসা ইরান রাজি হতে পারেনি এমন হলেও এবার বাধ্যবাধকতা বেশি অনুভব করায় রাজি হয়েছে। এতে গালফ বাদশাহদের ইউয়ানের চীনা তেলের পেমেন্ট নেয়াতে রাজি করানো যতটা কঠিন ছিল এখানে সে কাজ অনেক সহজেই সম্পন্ন হয়েছে, দেখা যাচ্ছে। কারণ খসড়া চুক্তিতে দেখা যাচ্ছে সব লেনদেন হবে চীনা ইউয়ানে, একথা ইতোমধ্যেই লেখা আছে। সুতরাং এটা একটা বিরাট অগ্রগতি। অর্থাৎ পালাবদলের ধাক্কা দেয়ার ক্ষেত্রে এক বিরাট পদক্ষেপ হয়েছে এটা। অর্থাৎ এই চুক্তির ইমপ্যাক্ট কেবল ইরানের কী লাভ-সুবিধা হল ততটুকুতেই নয় বরং নতুন এক চীনা গ্লোবাল ক্ষমতায় প্রভাব প্রতিপত্তিতে হাজির হতেও বড় ভূমিকা রাখবে। যেখানে ইরান সেই নতুন ক্ষমতার পাশে বুক ফুলিয়ে হাটবে তা বলাই বাহুল্য!  এজন্যই বলা হচ্ছে এই চুক্তি পালাবদলের শুরুর ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে।

    সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্তদের অন্যতম হবে ভারতঃ
    ভারতে চিন্তাবিদরা এখন বিরাট প্রশ্নের সম্মুখীন ও প্রকাশিত যে, তাদের চিন্তার ক্ষমতা-সামর্থ্য কত সীমিত! এই চিন্তাবিদ বলতে নানান রঙের কথিত থিংকট্যাংক বা একাডেমিক বা কনসাল্টিং ফার্মের কথা বলছি। এক কথায় বললে, এই চুক্তি ভারতকে ভারতের স্বার্থ একেবারে ধসিয়ে দিবে, দিশেহারা করে দিবে। অথচ, এর আগাম কোনো হদিস এই কথিত চিন্তাবিদরা ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের দিয়েছে প্রমাণ জানা যায় না।  বরং আমরা বিস্মিত হই দেখে যে, হবু-চুক্তি প্রকাশ হবার পরে সবচেয়ে বেশি অহেতুক বাজে কথা বলা হামবড়া লোকটাই এখন সবার আগে মাথা নিচা করেছে। বিসিসিকে এরা যা বলেছে এর সারকথাটা হল, তারা হেরে সব মেনে নিয়েছে। বিবিসি লিখছেঃ

     “ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক সাবেক সচিব পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীও কার্যত মেনে নিচ্ছেন, চাবাহারে ভারত বিপুল পরিমাণ লগ্নি করার পরও এই বন্দরের নিয়ন্ত্রণ হয়তো শেষ পর্যন্ত চীনের কাছেই হাতছাড়া হয়ে যাবে। মি. চক্রবর্তীর কথায়,”ইরান বলছে ওই রেল প্রকল্পে ভারত ঠিক সময়ে টাকাপয়সা দেয়নি। আমরা যেটা দেখছি,চাবাহার নিয়ে ভারতের মধ্যেও এখন একটা দ্বিধা কাজ করছে – কারণ ওই প্রকল্পে চীনের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।” “আমার ধারণা চাবাহার বন্দর প্রকল্পে শেষ পর্যন্ত ভারতেরও শেয়ার থাকবে – কিন্তু চীনই শেষ পর্যন্ত ওখানে সবচেয়ে বড় প্লেয়ার হিসেবে উঠে আসবে।”
    —এরপর আর আমাদের কিছুই কী বলার আছে!

    এর মানে, এই চুক্তির কারণে ভারত মূলত ইরান, আফগান বা সেন্ট্রাল এশিয়া জোনে ব্যবসা বাণিজ্য সহায় সমর্থনহীন অবস্থায় পড়ে সব গুটিয়ে নিয়ে বাসায় ফিরতে মানসিকভাবে তৈরি। কিন্তু ভারতের দুর্দশা তো এতেও শেষ হবে না। এই হবু চুক্তির আয়োজনের ফলে ভারতকে চীন এমন কঠিন এক  দুর্দশা পরিস্থিতিতে ফেলে দেবার মুখে নিয়ে যাবে যেখানে – ভারতকে এখন খোলাখুলি চীন অথবা আমেরিকা কোনো একটা পক্ষকে বেছে নিতে হবে। অর্থাৎ সেই সময় এসে গেছে যখন ‘এ-ও হয় ও-ও হয়’ বলে দু’দিকেই নৌকায় পা দিয়ে থাকার সুবিধা এনজয় করার দিন শেষ। এতে ভারত যদি আমেরিকা ক্যাম্পে যায় তা গেলে হয়ত সামরিক দিকে কিছু সুবিধা হতে পারে। কিন্তু সাথে খামোখা অনেক দায় আসবে যেগুলো  আসলে হুদাই পশ্চিমের ব্যাগেজ টানা হবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে  সবচেয়ে বড় ক্ষতি যেটা হবে বাইরে থেকে সব অর্থনৈতিক সাহায্য সমর্থন পাওয়ার দিন শেষ হবে। আর যদি চীনের ক্যাম্পে মাথা নিচু করে ফিরে তবে চীনের টার্মেই ফিরতে হবে। কম দরে বিক্রি হতে হবে।

    আবার উপরে এই যে অবলীলায় বলছেন,  “ভারতেরও শেয়ার থাকবে” – এই কথা কয়টা তো মারাত্মক ভীতিকর। মানে ব্রিকস ব্যাংক বা এআইআইবি ব্যাংক ইত্যাদি এমন সবখান থেকে ভারত গুটিয়ে যাবে কেবল নিস্ক্রিয় পার্টনারের মত  শেয়ার মালিকানা নিয়ে থাকবে – তাই কী? তার মানে গত এক সপ্তাহের মধ্যে কথার চাপা আর তুবরি ছুটানো লোকগুলো সব হার মেনে নিয়ে গুটিয়ে যাচ্ছে  -সেলফ, নিজ উদ্যোগে??

    আবার যে কথাটা বলছিলাম ভারতীয় চিন্তার সামর্থ্য – এখন এটা ভারতের রাজনীতিক ও চিন্তাবিদদের জন্য প্রমাণ করা খুবই কঠিন যে, চীন-ইরান যে এমন একটা দীর্ঘস্থায়ী এলায়েন্স করে বসতে পারে তা তারা বিন্দুমাত্র আগে জানত। অর্থাৎ ইরানি তেল না কিনলে মুখ ঘুরিয়ে নিলে যে ভারতেরই বহুমুখী স্বার্থ  যে মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হবে সেটা তারা আগে দেখতেই পায়নি, টেরই পায় নাই! তাদের চোখে “মেরা ভারত মহান” হয়েই ছিল বা “অনেক ক্ষমতাবান” হয়েই ছিল! তার মানে দাঁড়াল ভারতে শুধু উদ্বৃত্ত বা বিনিয়োগের বিপুল ঘাটতি আছে তাই নয়, চিন্তার সামর্থের দিক থেকেও  বহু পিছনে আছে। আমেরিকান থিংকট্যাংকের পাল্লায় পড়ে তাদের স্ব-ক্ষমতাটাও শেষ।

    ভারত ইরানের জাভেদ জারিফকে প্রবল হতাশায় ফে্লে এর পরিণতি খাটো করে দেখেছিলঃ  
    আবার ঘটনা দেখেন সেদিন কীভাবে ঘটেছিল। তেলকেনা বিষয়ে ভারতের পিছলানির আলাপ সেই ২০১৮ জুনে নিকি হেলির ভারত সফরের সময় থেকে শুরু আর মোচরানি দিতে শুরু করেছিল। ভেবেছিল কী জানি বিরাট ক্ষমতাবান এক ভারতীয় পাঞ্জাব অরিজিনের মানুষ হাতে লেগে গেছে, ভারতকে আর পায় কে!  তাই সেসব মোচরানি! এছাড়া  সর্বশেষ যেদিন ১৩ মে ২০১৯ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ [Mohammad Javad Zarif] এক দিনের ঝড়ো সফরে ভারত এসেছিলেন এবং খুবই মনোক্ষুন্ন হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। কারণ এর আগেই ২ মে ২০১৯ থেকে ইরানের অনুরোধ ফেলে মাড়িয়ে ভারত ইরানি তেল কেনা বন্ধ করে দিয়েছিল; আমেরিকান অবরোধের অজুহাত দেখিয়ে। অথচ  চীন তখনও তেল কিনা জারি রেখেছিল। বিশেষত সেবার যেখানে তেল ইরানি পাহারায় ইরানি ট্যাঙ্কারে ভারতের তীরে পৌছে দেওয়ার সস্তা অফার ছিল। তবু ভারত এই প্রথম মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। তাই অন্তত শেষবারের মত “ফাইনাল ওয়ার্ডস” শুনতে এসেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ। এমনকি পরিষ্কার করে বলেছিলেন, ঐ আমেরিকান থিংকট্যাংক- সিএসআইএস [CSIS] -তোমাদের ডুবিয়ে ছাড়বে, এদের পাল্লায় পড়ো না। কিন্তু কেউ তার কথা শোনেনি। এমনকি পরের ২ অক্টোবর ২০১৯ এ আমেরিকায় মিডিয়াকে জয়শঙ্কর দাবি করে বুঝাচ্ছিলেন [Iran not disappointed with India for not buying oil from Tehran: Jaishankar] তেল কেনা বন্ধ করে দেয়ায় ইরান ভারতের ব্যাপারে হতাশ হয়নি। আরো ভয়ঙ্কর সাফাই দিয়ে বলেছিলেন, [we frankly understand each other’s compulsions and possibilities,] – “যার যার দেশের বাধ্যবাধকতা আছে আর (আরেক দিকের) সুবিধাও আছে”। এর মানে তাহলে এখন চীন-ইরান নতুন চুক্তির পথে চলে যাওয়ায় নিশ্চয় ভারতের কোনো ক্ষতি বা অসুবিধা হয়নি, তাই নয় কি? বুঝে শুনেই তো যার যার লাভালাভের সন্ধানে ভারত ইরানকে ছেড়ে আমেরিকাকে বেছে নিয়েছিল! তাহলে চার দিকে আজ চীন-ইরান চুক্তির খবরে মিডিয়ায় ভারতের নাকিকান্না কেন? জয়শঙ্করের সম্ভবত অনুমান এই যে আমেরিকার CSIS থিঙ্কট্যাঙ্কে দাওয়াত পেলে জাতে উঠা যাবে।  কিন্তু গ্লোবাল সিস্টেমটাকে বুঝবার  যে দুনিয়াদারি সেখানে আমেরিকার নেতৃত্বের পুরানা গ্লোবাল অর্ডার যে ভেঙ্গে পড়েছে  এটা তো নিজের যোগ্যতায় জেনে নিতে হয়, আর ঠিক করতে হয় কী কী করব না!
    যদিও বেশির ভাগ মিডিয়া ভারতের ক্ষতিটা ঠিক কী হয়েছে সেটাও বুঝেনি মনে করার কারণ আছে। যেমন দ্য হিন্দু। এটাকে অনেক বুদ্ধিমান অগ্রসর মিডিয়া বলে মানুষ মানে। কিন্তু ওর শিরোনাম দেখুন, “ইরানে চাবাহার রেল প্রজেক্ট থেকে ভারতকে বের করে দিয়েছে ফান্ড দিতে ভারতের দেরি দেখে”। এর মানে ঘটনাকে কত ক্ষুদ্র সংকীর্ণ জায়গা থেকে দেখছে। ভাবছে ব্যাপারটা হল ভারতকে কেবল একটা রেল প্রজেক্ট থেকে বের করে দেওয়া।  ঠিক একই নাদান বুঝ  বিবিসিকে দিয়েছে ভারতের এক সাবেক ভাইস অ্যাডমিরাল শেখর সিনহা। বলেছেন তাদের ঠিকাদার কোম্পানিটা আসলে নাকি ঢিলা!  কিন্তু ঘটনাটা কী এতই সহজ আর এতটুকুই! অথচ হিন্দুর ঐ রিপোর্টেই ভেতরে ঐ চীন-ইরান চুক্তির সবকিছুর উল্লেখ আছে। ভারতকে যে  মূলত ইরান, আফগান বা সেন্ট্রাল এশিয়া জোনে ব্যবসা-বাণিজ্যে সহায়শুণ্য বের করে দিবে সেদিকটা দেখতেই পায় নাই। এছাড়া নিজে  অন্তত অবকাঠামো বিনিয়োগে ঘাটতি  সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে সেসব তো আছেই।
    এর সোজা মানে হল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদকে হতাশায় ফিরিয়ে দেয়াকে তারা দেখেছিল – আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক এত বিশাল কিছু আর এতে ভারতের জন্য অর্জন এতই বড় যে, ভারতের এর বিপরীতে ক্ষুদ্র ইরানের কথাগুলো নিয়ে ভাবা অপ্রয়োজনীয়, খুবই স্মল। কাজেই তখনকার এসব অনুমানের উপর খুশিতে ডগমগ আত্মতুষ্টিতে থাকা ভারত এখন কিভাবে অনুসিদ্ধান্ত টানে যে এখন ভারতের যা ক্ষতি তাতে সব দোষ চীনে্র? বড়ই বিচিত্র ভারতের ভিকটিমহুড মন!
    যেমন দেখেন এনিয়ে আরো কিছু মিডিয়ায় শিরোনামঃ ‘”চাবাহার প্রকল্পে ধাক্কা ভারতের, নেপথ্যে চিন”, “ইরানের একটি বড় প্রকল্প থেকে ভারতকে বাদ” – এটা নাকি আবার আমাদের প্রথম আলোর সারা দুনিয়ার মিডিয়া ঘেটে করা এক ডেস্ক রিপোর্ট।  বুঝেন অবস্থা তাদের চোখ কত সংকীর্ণ। আবার “চীন-ইরান দোস্তি, যুক্তরাষ্ট্রে অস্বস্তি”। কিন্তু ট্রাম্প বাবাজি অস্বস্তিতে পড়বে কেন? তিনি কী ইরানের সাথে পারমানবিক চুক্তি কেন ভেঙ্গে দিয়েছিলেন?  অর্থাৎ এর মানে হল,  এই চুক্তির বড় পিকচার বা গ্লোবাল প্রভাবের দিকটা তিনি আমল করতে পারেনি।  আসলে এখনও অনেকেই ব্যাপারটাকে নেহাতই একটা ইরানি প্রকল্প থেকে ‘চীনের প্রভাবে’ ভারতকে বের করে দেয়া হিসেবেই বুঝেছে। এভাবে চীনকে দোষারোপ করে নিজেদের চিন্তা করারও অযোগ্যতা তারা ঢাকতে চাচ্ছে। আবার ভারত আমেরিকান সখ্যকে অতিগুরুত্ব দিয়ে তারা বলতে চাচ্ছে  – ভারত চাইলে  ইরানি তেল কেনা বন্ধ করতে পারবে কিন্তু ইরান ভারতকে কোন প্রজেক্ট থেকেই বাদ দিতে পারে না! আহা কী সুবিধা!

    এর চেয়ে বরং কংগ্রেসে আমরা কিছুটা বুদ্ধিমান লোকজন আছে মনে হচ্ছে। তারা বলেছে,‘চীন বেটার ডিল দিয়ে ইরানকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে অথচ মোদী সরকার সেটা আগে বুঝতেই পারেনি।’ অর্থাৎ  কংগ্রেস অন্তত বিনা প্রসঙ্গে চীনকে দোষী করার দিকে যেতে চায়নি; বরং প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখেছে।

    মাথা নিচা ভারতের বুদ্ধিমানেরাঃ
    তবে এই প্রথম আমরা এক নতুন ধরণের ভারতকে দেখতে পাচ্ছি যারা চীন-ইরান হবু চুক্তির কথা প্রকাশিত হবার পর একেবারেই চুপসে গেছে, যেন তাদের দম্ভ কমেছে অন্তত কিছুটা। বিশেষ করে থিঙ্কট্যাকের সাথে সংশ্লিষ্ট আছেন যারা এমন ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে। বিশেষত বাংলাদেশের ১/১১ এর সময়ের ভারতীয় রাষ্ট্রদুত  পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর পরিবর্তন অবাক করার মত। ওআরএফ – এই থিঙ্কট্যাঙ্কের সাথে  সর্বশেষ জড়িত এই সাবেক কূটনীতিক, যেখানে সেখানে কটু কথা বলার ক্ষেত্রে খুবই খ্যাত, তিনি বিবিসির সাথে যেভাবে কথা বলেছেন তার ইঙ্গিতটা হল যেন বলা যে, আমরা চীন-ইরান চুক্তির কাছে হেরে গিয়েছি আর তা মেনে নিচ্ছি বলেই আমাদের স্বর এমন নরম হয়ে বদলে গেছে। তবে  স্বর বদলে  নরম করে নেয়া প্রসঙ্গে পিনাক রঞ্জনকেও ছাড়িয়ে গেছেন আরেক নারী ব্যক্তিত্ব, তিনি  দিল্লিতে ইনস্টিটিউট অব চায়না স্টাডিজ নামে আরেক থিঙ্কট্যাঙ্কের ফেলো অধ্যাপক শ্রীমতি চক্রবর্তী। বিবিসির কাছে তিনি প্রায় সব প্রশ্নেই ভারতের দোষ দেখেছেন বা হার স্বীকার করে নিয়েছেন। যেমন তিনি  “ভারতকে সরানোয় চীনের ভূমিকা আছে কি না তা বলা মুশকিল”  বলেছেন। এছাড়া বলেছেন, “ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা জারির পর তেহরান দিল্লির কাছ থেকে যে ধরনের সমর্থন আশা করেছিল, সেটা তারা পায়নি তাতেও কোনও ভুল নেই!”।  মানে একদম গুলে গিয়ে সবাই যেন মোম হবার দশায়।  যদিও তিনি বলছেন, “ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর আমেরিকার সঙ্গে ইরানের যে সংঘাত চরমে উঠেছে, চীন খুব ভালভাবেই তার অ্যাডভান্টেজ নিচ্ছে”। মনে হতে পারে তিনি এখানে পরোক্ষে হলেও চীনকে দায়ী করছেন সুবিধা তুলে নেওয়ার জন্য। যেখানে ব্যাপারটা হল আপনি আপনার প্রতিদ্বন্দ্বিকে যদি বোকা হয়ে সুবিধা করে দেন সেক্ষেত্রে সে সুবিধা তো নিবেই। গ্লোবাল নেতৃত্ব দখলের দিনগুলোতে সামলে না চললে প্রতিদ্বন্দ্বি সুবিধা ত নিবেই। সেখানে প্রেসিডেন্টের নানান ক্ষমতার মর্ম ও ওজন বুঝে না এমন কোন দেউলিয়া ব্যবসায়ী যদি হঠাত করে আমেরিকান প্রেসিডেন্টের আসনে বসে পড়ে তবে তার ‘কেলাসনেস’ বা অযোগ্যতা আমেরিকার ক্ষতি তো করবেই। গ্লোবাল ক্ষমতার পালাবদলের সময়ে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বি এভাবেই সুযোগ নিয়ে নিয়ে সামনে ধেয়ে আসছে এবং আসবেই – এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। আর এদিকে ভারতের ক্ষেত্রে তার চিন্তা করার প্রকৃত সামর্থ ও যোগ্যতা তার যে লেবেল বা মানের তাতে শেষে আজ সে ঠিক সেই মাপের বামন হয়ে গেছে।  ইরানকে গুরুত্ব দিয়ে না দেখা খাটো করে দেখা বা ইরানের তেল না কিনলে ভারতের কিছুই হবে না এই হামবড়া ভাব – এভাবে ট্রাম্প আর মোদী মিলে ধারাবাহিক ভাবে ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করে যেন ইরানকে ঠেলতে ঠেলতে চীনের কোলে ফেলে দিয়েছে। এখন এর কাফফারা দিতে দিতে এরা কোথায় গিয়ে ঠেকে তাই দেখার বিষয়!

    চিন্তায় অযোগ্য আর বেপরোয়া মানুষেরা এমন কাফফারা দিতে দিতেই শেষ হয়ে যায়! দিন সবারই একদিন আসে, আগে আর পরে!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত ১৯ জুলাই ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  ঐদিনই প্রিন্টেও  “চীন-ইরান এলায়েন্স,পালাবদলের শুরু” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভুখন্ড ফেরত ব্যাপার না, আওকাত বুঝে চল

    ভুখন্ড ফেরত ব্যাপার না, আওকাত বুঝে চল

    গৌতম দাস

    ২৯ জুন ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-350

     

    সবার শেষে বলতে আসলেন নরেন্দ্র মোদী, তিনি বলে উঠলেন – “না, সীমান্ত পেরিয়ে কেউ ঢুকতে আসেনি। ভারতের কোনো সেনা চৌকিও অন্য কারো দখলে নেই। লাদাখের কোনো বর্ডার পোস্ট অন্যের দখলে যায়নি”। এভাবেই মার খেয়ে মার হজম অথবা কান্না হজম করতে হয়েছে মোদীকে! চীনের হাতে কমপক্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনার মৃত্যু নিশ্চিত করার পরে ডাকা ভারতের সর্বদলীয় সভাতে তিনি এভাবেই তার কথা শুরু করেছিলেন। এ যেন দুই বারো-চৌদ্দ বছরের বাচ্চার মারামারি আর তাতে দুই বাচ্চার বাবারা যখন সালিশ মিটিংয়ে বসেছে সেখানে হঠাৎ মার খাওয়া বাচ্চার বাবা বলে বসলেন, ‘আমার ছেলেকে কেউ মারেইনি”। স্বভাবতই এরপর আর অন্য কারো কিছু বলার থাকে না, মিটিংও ডিসমিস হয়ে যায়। অর্থাৎ কঠিন মার হবে কিন্তু আওয়াজ বের হবে না সিচুয়েশন। কিন্তু মোদী এমন বললেন কেন? যেখানে ঐ মিটিংয়েরই প্রথম দিকের বক্তৃতায় এমনকি মোদীর মন্ত্রীরা বলেছেন, চীনা সৈন্যরা ভারতের ভূমি দখল করেই তাদের সেনাদের হত্যা করেছে!

    রাষ্ট্র বলতে একটা নেশন-স্টেট বা জাতি-রাষ্ট্র বুঝ, এক ফান্ডামেন্টাল সমস্যা
    মোদী কেন এমন বললেন, এই প্রশ্নের জবাবের আগে আমাদের অন্য কিছু সিরিয়াস আলাপ সেরে নিতে হবে। আমাদের মত দেশগুলোতে রাষ্ট্র বলতে জাতিরাষ্ট্র বুঝা হয়ে থাকে যেটা আসলে একটা ধর্মীয়-জাতি ধারণাই; যদিও এখানে সেটা ‘ধর্মীয়’ কিনা এর চেয়ে কথিত ‘জাতি” এই ভুতুড়ে ধারণাটাই মুল সমস্যা। আর এই ‘নেশন’ কথাটাকে সবাই কথার কথা হিসাবে রাষ্ট্র বলেও ডাকে। দুনিয়াতে প্রথম কলোনি দখল শুরু হয়েছিল সতেরো শতকে।  এমন দখল করা প্রথম ভূমি হল ভার্জিনিয়া, আমেরিকায় এই উপনিবেশ, যা ১৬০৭ সালে ব্রিটিশদের হাতে দখল হয়েছিল। আর সেই থেকে শুরু হয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত (প্রায় টানা ৩০০ বছর) সারা দুনিয়ায়ে কলোনি দখল টিকে ও চালু ছিল। আর, এরপর থেকে কলোনিমুক্ত স্বাধীন করে দেয়া শুরু হয়েছিল। এই লম্বা কলোনি যুগের দখলদার রাষ্ট্রের কাজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নিজদেশের রাষ্ট্র-কাঠামোই হল নেশন-স্টেট [nation-state] ও এর ধারণা। সেযুগে দখলে বের হওয়া কোম্পানির (যেমন ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি) সামরিকভাবে সজ্জিত জাহাজ নিয়ে বের হয়ে পড়া ছিল ঐ সময়ে ওসব সমাজের সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় ও প্রধান ব্যবসা।

    জনপ্রতিনিধিত্বের রিপাবলিক রাষ্ট্র কেমন হওয়ার কথা ছিলঃ
    ইংল্যান্ডের কথাই যদি ধরি, রাজতন্ত্র [monarchy] [মানে একটা রাজবংশ বা ডায়নেস্টির শাসন যে, রাজার ছেলে রাজা হবে] ভেঙে প্রথম রিপাবলিক বা জনপ্রতিনিধিত্বের রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা হিসাবে দেখা হয় ইংলিশ রেভোলিউশনকে (১৬৪২-৬০) [English Revolution]। যারা রেভেলিউশন বলতে চায় না এদের অনেকে এটাকে “ইংলিশ সিভিল ওয়ারও” বলে থাকে। এ্মন জনপ্রতিনিধিত্বের রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গঠন কাঠামো হওয়ার কথা এমন যে এটা  একটা রাজনৈতিকতা বা পলিটি [Polity] প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হব্ব। যেখানে সমাজের সব অংশকে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সমাজের সকল অংশকে জায়গা দিতে হবে, কথা বলতে দিতে হবে, সবাইকে শুনতে হবে ইত্যাদি। এভাবে সবার জন্য যা ভাল হবে এমন এক “কমন গুড” এর পক্ষে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে এর লক্ষ্য। এভাবে এক “পলিটিক্যাল কমিউনিটি” অর্থে রাষ্ট্রগঠন, এই ছিল এর উদ্দেশ্য।

    কিন্তু সেসময়ের বৃটিশ সমাজের সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী ব্যবসা ছিল কলোনি দখল কোম্পানির মালিক হওয়া। তাই ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির মত ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলোর স্বার্থে “পলিটিক্যাল কমিউনিটি” গঠনের সব চিন্তা সবকিছু উলটে দিয়ে বাস্তবে যে প্রথম রিপাবলিক গড়েছিল তাই ছিল নেশন-স্টেট।
    অর্থাৎ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গঠন কাঠামোটাই পলিটিক্যাল কমিউনিটি হিসেবে গঠিত আর হলো না। এর বদলে রাষ্ট্রের বাইরের দিকে তাকিয়ে এক রাষ্ট্র গড়া হল। যেমন ঐ কলোনি দখল ব্যবসা কোম্পানিগুলোর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ইউরোপের পড়শি রাষ্ট্রের (যেমন ফরাসি বা ডাচ রাষ্ট্রের) সমতুল্য কোম্পানি – যেমন ব্রিটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিদ্বন্দ্বী হল ডাচ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি, এরকম। তাই ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো নিজের স্বার্থে চাইল এই নেশন-স্টেট। যাতে সকল ব্রিটিশ মানুষ কথিত ‘এক জাতির’ আওয়াজ তুলে অপরাপর ডাচ বা ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির বিরুদ্ধে নিজ দেশের ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে বিনা-বিভক্তিতে সকলে খাড়া হয়ে যায়। এতে কলোনি দখলের কোম্পানিগুলোর স্বার্থই যেন সব ব্রিটিশ নাগরিক-মানুষের স্বার্থ বলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এতে সকল বৃটিশ নাগরিক বিশেষত যারা প্রান্তজন, গরীব বা কম আয়ের মানুষ – তারা কী চায়, তাদের সমস্যা কী সেটা আর তাদেরকে বলতে সুযোগ দেয়া হল না, শুনাও হল না। এককথায় “কমন গুড” আর হল না।  কলোনি দখল আর দাস ব্যবসায়ীদের স্বার্থটাই কথিত “নেশনের স্বার্থ” বলে চালিয়ে দিতে তা সবার উপরে চেপে বসল, চাপিয়ে দেওয়া হল। নেশন স্টেটের কাজই হল এই চাপিয়ে দেয়াটা নিশ্চিত করা।

    রেনেসাঁর ধারণার মূলকথা হয়ে যায় জাতিরাষ্ট্রঃ
    রিপাবলিক বলতে নেশন-স্টেট ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাওয়ায় মূলত যে দুই নিট ক্ষতি হয়ে যায় তা হল – এক. রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ গঠন কাঠামোটা পলিটিক্যাল কমিউনিটি হলে সব পক্ষকেই শুনার যে বাধ্যবাধকতা থাকার কথা তা হারিয়ে যায়। দুই. অন্যের দেশ কলোনি-দখল করা ও সম্পদ লুট করে আনা বৈধ হয়ে যায়। রাষ্ট্র সব জায়েজ করে দেয়।  আর সবচেয়ে ভয়াবহ তৃতীয় ক্ষতিটা হল, রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিকল্প হিসাবে রিপাবলিক বা গণপ্রতিনিধিত্বের রাষ্ট্র বলতে আসলে নষ্টা নেশন-স্টেট রূপটাই রেনেসাঁ চিন্তার সর্বোত্তম উপহার দাবিতে হাজির হয়ে যায়।

    রেনেসাঁর আদিগুরু রামমোহন রায়ের হাতে ব্রাহ্মধর্মীয়-জাতিরাষ্ট্রের মশালঃ
    কমিউনিস্টদের দাবি রামমোহন রায় ভারতে রেনেসাঁ এনেছেন মানে, প্রগতিশীলতা এনেছেন। বাস্তবত কথা মিছা নয়। কিন্তু প্রগতির ঐ রেনেসাঁতে রিপাবলিক রাষ্ট্র বলতে  ‘নেশন-স্টেট’ (জাতি-রাষ্ট্র) ধারণাই। অর্থাত জাতি-রাষ্ট্র ধারণা রেনেসাঁর ভিতর দিয়ে  রামমোহন রায় ভারতে এনেছেন। কিন্তু এর উপর আবার তাঁর দেখা ও বুঝের ব্রিটিশ জাতি-রাষ্ট্র বলতে একে তিনি বুঝেছিলেন, ধর্মভিত্তিক একটা জাতি-রাষ্ট্র হিসাবে। মানে তাঁর বুঝাবুঝিতে  কথিত বৃটিশ জাতিরাষ্ট্রকে তিনি এভাবেই বুঝেছিলেন; এক  “এংলো ক্যাথলিক ক্রিশ্চান ব্রিটিশ” জাতি, এভাবে। এখানে ‘এংলো ক্যাথলিক’ বলতে সেটা ক্যাথলিক ক্রিশ্চান ধর্মটাই কিন্তু ইংলিশ রাজপরিবার এর যে ভাষ্যটা মানে কেবল সেই রূপ ও ভাষ্যটা।   কিন্তু এদিকে রামমোহনের  নিজ ভারতের বেলায় এখানে দুটা বড় ধর্ম হিন্দু-মুসলমান ছাড়াও ছোট সংখ্যায় পালিত আরও অনেক ধর্ম আছে, টের পেলেন। তাই তিনি স্বাধীন ভারত একটা “জাতি-রাষ্ট্র” গড়ার প্রধান সমস্যা সমাধানের জন্য সবার আগে সবাইকে একই একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত করতে মনস্থ করলেন। তাই তিনি ১৮১৫ সালে ব্রাহ্ম ধর্ম চালু করেন। কিন্তু এরপর তিনি মাত্র আর ১৮ বছর বেঁচে ছিলেন। তিনি বেঁচে থাকতেই যেসব বাধা ও সমস্যার তিনি মুখোমুখি হচ্ছিলেন তা তিনি মারা যাবার পরে আরও বিরাট আকার ধারণ করে। শেষে তাঁর ব্রাহ্মসমাজ দুটো ধারাতে ভাগ হয়ে যাবার পর ক্রমশ তারা সকলেই অকেজো, স্থবির হয়ে যায়।  এই প্রকল্প ব্যর্থ হলে আর তিনি মারাও গেছেন বলে এরপরে বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখের হাত ঘুরে এই প্রকল্প যেন “ব্রাহ্ম জাতি-রাষ্ট্র” হতে পারল না বলে নেহায়তই ‘না-পারতে’,  এটা এক ‘হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র’ প্রকল্প হিসাবে মানিয়ে নেয়ানোর চেষ্টা হিসেবে হাজির করেন, এরা সকলে। ততদিনে কংগ্রেস দলের জন্মানোর সময় হয়ে গেছিল। তাই  ১৮৮৫ সালের কংগ্রেস দলের জন্মের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হিসাবে  ‘হিন্দু জাতি-রাষ্ট্র ধারণাই হাজির হয়েছিল। বলাই বাহুল্য এটা মুসলমানদের জন্য অস্বস্তিকর। কংগ্রেসের মুসলিম সদস্যরা তো বটেই সমাজেও মুসলিমদের থেকে আপত্তি প্রবল হয়ে থাকে। এটা না হবার কোন কারণ ছিল না। কারণ, একটা রাষ্ট্র গড়তে চায় বলে  জনগণকে একটা ধর্মে আসতে হবে – এটা কী কোন পুর্বশর্ত হতে পারে?  কাউকে আরেক ধর্মে যেতে ফোর্স করা যায়? না সম্ভব?  এটাই তো বড় জুলুম, চরম অন্যায্য!
    মুসলমানদেরকে হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্র মেনে নিতে বলা হচ্ছিল – কেন? গান্ধী ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে  মরবার আগে পর্যন্ত  এমন আবেদন একাজ করতে গিয়ে  “হিন্দু-মুসলমান এক” হতে বলে চলেছেন, অসহায় পাগলের মতন। কারণ ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হতেই ব্যাপক দাঙ্গা ছড়িয়ে পরেছিল। কিন্তু তাতে কী? বাস্তবে গান্ধী টের পেয়েছেন তার এই আবেদন কতটা অবসার্ড, উদ্ভট। কোন মানুষের কাছেই স্ব স্ব ধর্মত্যাগের আহবান খুবই অস্বস্তিকর। মানুষ একটা রাষ্ট্র গড়তে চায় বলে তাদের সবাইকে এক ধর্মে যেতে হবে, এক হতে হবে – এর কী সম্পর্ক?  অথচ সব জটিলতার, সব এবসার্ডিটির উতস হল একই ধর্মের এক জাতিরাষ্ট্র গড়ার কল্পনা – রাষ্ট্র সম্পর্কে এমন উদ্ভট ইমাজিনেশন থেকে। অথচ সহজ সমাধানটা হল, কে কোন ধর্মের তাতে কিছু এসে যায় না, সবাই নাগরিক। কিন্তু সমান নাগরিক। সমান অধিকার-সম্পন্ন নাগরিক। অধিকারের বৈষম্যহীন নাগরিক। কাজেই এরপর কে কোন এক না ভিন্ন ধর্মের নাগরিক তাতে কিছু এসে যায় না। কাউকে ধর্ম বদলাবার আহবান অথবা তথাকথিত হিন্দু-মুসলমান’  “এক হবার আবেদন” করতে মারা যাবারও কোন দরকারই পরে না। কারণ সেক্ষেত্রে সবাই সমান অধিকারের নাগরিক।  কিন্তু গান্ধী-নেহেরুর কংগ্রেস নিজেদের এই উদ্ভট চিন্তার পরাজয় ঢাকতে হিন্দু শব্দটা লুকিয়ে ফেললেন কিন্তু সেই  হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্র – এটাকেই কায়েম করতে সচেষ্ট থেকে গেলেন।
    কংগ্রেসের জন্মের পর মুসলমানেরা দীর্ঘ ২০ বছর অপেক্ষার দেন-দরবার চালিয়েছিলেন। এরপর ১৯০৬ সালে বাধ্য হয়ে মুসলমান জাতি-রাষ্ট্র প্রকল্প হিসাবে মুসলিম লীগের জন্ম হয়ে যায়।
    কিন্তু এখানে মজার ব্যাপার হল, মুসলিম লীগ “মুসলমান” জাতি-রাষ্ট্র কথাটা প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেই বলতে হয়েছিল যাতে সে মুসলমানদের এতে, এদলে ডেকে আনতে পারে। কারণ, তাদেরকে “মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট অঞ্চলগুলোকে নিয়েই” আলাদা রাষ্ট্র চাই একথা বলা ছাড়া উপায় ছিল না।  আর এই সুযোগে কংগ্রেসিরা নিজেদের হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্রের লোক – তাদের এই পরিচয় লুকিয়ে ফেলে দাবি করতে থাকে তারা কেবল জাতি-রাষ্ট্রের লোক এবং তারা প্রগতিশীল। কারণ তারা রেনেসাঁ মানা-বুঝা লোক। আর এখান থেকেই এক পর্যায়ে আর জাতি-রাষ্ট্র কথাটাও না বলে তারা  বলতে থাকে তারা জাতীয়তাবাদী।  যেন নেশন-স্টেট ধারণা থেকে জাতীয়তাবাদী ধারণাটা আলাদা।  তাই এই “জাতীয়তাবাদ” এক প্রগতিশীল ধারণা হয়ে যায়।
    আর এর বিপরীতে মুসলমানেরা ধর্মের রাষ্ট্র চায়, রেনেসাঁ মানে না- তাই তারা হয়ে যায় পশ্চাৎপদ – এই হয়ে যায় তাদের যুক্তি। বিশেষ করে পাকিস্তান রাষ্ট্র আলাদা হয়ে যাওয়ার পর জমিদার-হিন্দুরা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে  নিজেদের ক্ষমতা জমিদারি হারানোর বদলা নিতে গিয়ে এই “পশ্চাৎপদ-প্রগতিশীলতার” ভুয়া তর্ক ও যুক্তিটা তুলে ধরেছিল। আর সেই সাথে জাতি-রাষ্ট্র কথাতে যে তার হিন্দুজাতি্রাষ্ট্র আকাঙ্খা পরিচয় যাতে ধরা না পড়ে যায় তাই “জাতি” শব্দটা ভেঙে এবার ‘জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র’ বলা শুরু করল; যেন এটা জাতি-রাষ্ট্র থেকে এটা  ভিন্ন কোন ধারণা। এই রেনেসাঁ আর প্রগতিশীলতা এটাই ড; সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বুঝের ‘রেনেসাঁ’ আর ‘প্রগতিশীলতা’ ধারণার উতস। জিন্নাহ’র উপরে কুপিয়ে গেছেন অথচ নেহেরু-গান্ধীর হিন্দু-জাতি-রাষ্ট্রের কংগ্রেস এটা চোখে দেখেন নাই। ভাবেন – এটা ভারতীয় রেনেসাঁ ফলে প্রগতিশীলতা , এই বলে কাভার দেন – এসব হল “জাতীয়তাবাদ”।

    ইউরোপের জাতিরাষ্ট্র চিন্তার পরিণতিঃ
    ভারত-পাকিস্তানের পরিণতি জানলাম এখন ইউরোপের পরিণতি দেখা যাক। মূলত দু’কারণে সারা ইউরোপ. (৪৭ টা রাষ্ট্রের এক জোট হয়ে) ১৯৫৩ সালে জাতি-রাষ্ট্র ধারণাটা ত্যাগ করেছিল।  তারা ঐ ৪৭ রাষ্ট্র একটা সম্মেলন ডেকে “পুর্ণ-স্নান সেরে” নিয়ে নিজেদের শুদ্ধ করে  নিয়েছিলেন। স্ব স্ব রাষ্ট্র পুণর্গঠন করে নিয়েছিলেন যে জাতি-রাষ্ট্র আর না, সবারই এটা এখন  নাগরিক অধিকার ভিত্তিক রাষ্ট্র।  কারণ এক. দ্বিতীয় বিশযুদ্ধে ইউরোপে জাতি-রাষ্ট্র চিন্তার সবচেয়ে খারাপ পরিণতি ও প্রোডাক্ট হল জার্মানির হিটলার ও তাঁর শাসন।  হিটলারের উত্থান ও তাঁর নীলচোখের শ্রেষ্ঠ “জার্মান নেশন” – এই জাতগর্বের চরম বর্ণবাদী ভয়াবহতা দেখতে হয়েছিল সারা দুনিয়াকে।  এটা ছিল নিজেদের জাতি-রাষ্ট্র ধারণার সবচেয়ে কদর্য ও চরম রূপ। সারা ইউরোপ কোনমতে এটা থামাতে পেরেছিল তবে নিজের মুরোদে না। মূলত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের দেয়া অর্থ ও সামরিক সহায়তায় তাঁরা সক্ষমতা দেখিয়ে  জিতেছিল । অতএব এরপর জাতি-রাষ্ট্র ধারণাটা ফেলে দেয়া এটা ফরজ হয়ে যায়।  আর দ্বিতীয় কারণ, ঐ মার্কিন সহায়তা যেটা না পেলে সারা ইউরোপই  হিটলারের পদানত হয়ে যেত, ঐ সহায়তাটা পেতে শর্ত হিসাবে সারা ইউরোপকে দাসখত দিতে হয়েছিল যে, তারা দুনিয়া থেকে কলোনি দখল ব্যবসা বন্ধ করে দেবে এবং কলোনিকৃত রাষ্ট্রগুলোকে মুক্ত স্বাধীন করে দেবে। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট দ্বিতীয় বিশযুদ্ধ বিজয় পরবর্তী দুনিয়ায় রাষ্ট্রের যে ধারণা আঁকছেন, তবে তা তিনি করছেন মূলত একটা জাতিসঙ্ঘের রূপ কাঠামো বর্ণনা করে। সে কাঠামোটা হল অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের এসোসিয়েশন হিসেবে জাতিসঙ্ঘ। অতএব রাষ্ট্র হতে হবে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র  এই বাধ্যবাধকতাও ছিল।

    এই বাধ্যবাধকতায় জাতিসঙ্ঘের রূপ কাঠামোটা কী ছিলঃ
    রূপ্টা কী ছিল তা বুঝার সবচেয়ে সহজ প্রমাণ হল আমাদের সবার পরিচিত কাশ্মির। কাশ্মিরের রাজা হরি সিং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নেহরুর সাথে অন্তর্ভুক্তি চুক্তিতে [Accession Treaty বা ইন্সট্রুমেন্ট অব একসেশন] (যদিও অস্থায়ী) স্বাক্ষর করেছেন তাই কাশ্মির ভারতের অংশ হয়ে গেছে – এই দাবি নিয়ে নেহরু ব্যাপারটায় ভারতের পক্ষে রায় আনতে  জাতিসঙ্ঘে দরবার করতে যান। খুশি তিনি, কারণ তার চোখে এত সহজ এই মামলা, অতএব রায় তার পক্ষে আসবেই। এই যে আস্থা আর নেহরুর রাষ্ট্র বোঝাবুঝি এটাই প্রমাণ করে যে, তিনি প্রবল জাতিরাষ্ট্র-বাদী। আর সেই সাথে জাতিসঙ্ঘের গঠনভিত্তি কী তিনি এর কিছুই জানেন না, অজ্ঞ। কখনো খেয়াল করেন নাই, বুঝতেও যান নাই। তাই তিনি বোকা হয়ে দেখলেন, জাতিসঙ্ঘ কাশ্মিরে গণভোটে আয়োজন করতে বললেন। আর সে ভোটের রায় নিয়ে সে ভিত্তিতে কাশ্মির কার থাকবে – ভারত বা পাকিস্তানের না স্বাধীন কাশ্মির হবে, কোনটা – তা ফয়সালা করতে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল। ভুখন্ডের বাসিন্দাদের সিদ্ধান্ত যে শাসক কে হবে তা বেছে নিবার নাগরিক অধিকার, পাবলিক ভোট  – এই হল ভিত্তি।

    কেন জাতিসঙ্গ এমন রায় দিয়েছিলঃ
    কেন এমন রায়? কারণ সেকথাটাই জাতিসঙ্ঘেরও জন্মভিত্তি। এর মানে হল নেহরু জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি জানতেন না। নেহেরু তো রাজা নিয়ে এসেছিলেন, ভেবেছিলেন রাজার সইয়ের হুকুমে কাশ্মির ভারতের।  কাশ্মির ভুখন্ডের বাসিন্দাদের সিদ্ধান্ত – এরাই যে ক্ষমতার উতস তা নেহেরু জানতেন না। জানলে তো রাজার কাছে ছুটতেন না।  জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি কলোনি দখল ‘হারাম’। তাই যেকোন ভুখন্ডের বাসিন্দারাই সিদ্ধান্ত নিবার হক রাখেন যে তারা কার দ্বারা শাসিত হবেন – এটাই, জাতিসংঘেরও জন্মভিত্তি। কোন ভূখণ্ড কোথায় কার সাথে যুক্ত হবে, কাদের দ্বারা শাসিত হবে, এর সিদ্ধান্ত নেবার একমাত্র এখতিয়ার কোনো রাজা নয়, কোনো সম্রাট বা সুলতানও নয়। সেই সিদ্ধান্ত নেবে ওই ভূখণ্ডের বাসিন্দা জনগণ। এটা তাদের নাগরিক অধিকার।
    খেয়াল করুন কোনো, “জাতি”গোষ্ঠী নয়, কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের গোষ্ঠীও নয়। কোনো ‘নেশন’ নয়। আর এই যুক্তির ভিত্তিতেই জাতিসঙ্ঘ কলোনি দখল করা অবৈধ জ্ঞান করে। কাজেই রাজা-সম্রাটেরা কেউ কিছুই নয়। বাসিন্দা নাগরিকেরাই সব, তারাই ক্ষমতার উৎস। এ কারণে রাজা হরি সিংয়ের চুক্তিতে স্বাক্ষরের কোনো মূল্য নেই। তাই কাশ্মির সেকালের নেহরুর ভারতের নয়, একালে ৩৭০ ধারা বাতিল করে দিলেও তা মোদীর ভারতের নয়। মোদীর কাশ্মিরকে ভারতে অন্তর্ভুক্তি করে নেওয়াও একই কারণে জাতিসঙ্ঘের চোখে অবৈধ। অর্থাৎ কাশ্মির ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের ‘নাগরিক অধিকারই’ মূল কথা; যেটা জাতিরাষ্ট্র বুঝের নেহরু বুঝেন নাই বলেই ধরা খাইছিলেন। তিনি অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র সম্পর্কে নির্বোধ ও উদাসীন। তাই এর বাস্তবায়কও নন। তিনি আসলে এক জাতি-রাষ্ট্রের শাসক ও তেমনই রাজনীতিক। তিনি জাতিসঙ্ঘের জন্মভিত্তি জানতেন না বলেই কাশ্মির ইস্যুতে ‘বোকার সাহস” করে জাতিসঙ্ঘের রায় আনতে গেছিলেন। ধরাও খেয়েছিলেন।

    তাহলে এখন চীন-ভারত বিবাদের মধ্যে এসব কথার গুরুত্ব কী?
    আমরা আসলে এতক্ষণ ছিলাম রাষ্ট্রের ‘লোকাল’ দিকের আলোচনায় যে রাষ্ট্র জাতিভিত্তিক না নাগরিক ও নাগরিক অধিকারভিত্তিক হতে হবে এই প্রসঙ্গে। এখন আমরা যাব এর ‘গ্লোবাল’ দিকে।
    রুজভেল্ট শুধু রাষ্ট্রের ভিত্তি কী হবে সেকথাই সবাইকে নিয়ে সে সময় ঠিক করে দিয়েছিলেন তাই নয়। তিনি রাষ্ট্রের গ্লোবাল দিক কী হবে সেটাও ঠিক করেছিলেন।

    গ্লোবাল দিক মানে হল মূলত “আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের” দিক – যেটা মূলত গ্লোবাল রাজনৈতিক অর্ডার এবং গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার এসব দিক। আমরা এখন ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলতে আরেকটা শব্দ ব্যবহার করব। ইংরাজি ‘অর্ডার’ শব্দটা নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষা বা চালু করা  অর্থে ব্যবহৃত হয়। সময়ে এটা আইন প্রণয়ন অর্থেও।  মানে রাষ্ট্রের গ্লোবাল দিক বলতে আমরা বুঝাতে ও বুঝতে বলছি গ্লোবাল অর্ডার এর দিক।  অর্থাত এবার আর রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ নয়  মূলত বাইরের এই অর্থে যে এতক্ষণ যদি রাষ্ট্রের ভেতরের অর্ডার নিয়ে কথা বলে থাকি তবে এখন রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার, বাইরের বা পারস্পরিক সম্পর্কের নিয়মশৃঙ্খলা ও আইন অর্থে এক অর্ডার নিয়ে কথা বলব। তাই কথাটা এখানে গ্লোবাল অর্ডার বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকের মত বিষয়গুলোতে পারস্পরিক সম্পর্কের নিয়ম-শৃঙ্খলার  বা সুশৃঙ্খলা বিন্যাস ঘটাতে একটা অর্ডার।।

    আগেই বলে নিয়া যাক েই গ্লোবাল অর্ডার স্থাপন আপনাতেই বা কর্তা ছাড়া হয় নাই। এই কর্তা হলেন চারবারের (১৯৩২-৪৫) লাগাতর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডেলোনো রুজভেল্ট [Franklin Delano Roosevelt  বা FDR]। দুনিয়াকে একটা গ্লোবাল অর্ডারে সাজানোটা আমেরিকান প্রেসিডেন্টের হাতে হওয়াটা জায়েজ হয়েছে কী না – তা নিয়ে কথা বলা এখানকার প্রসঙ্গ নয়। সেটা খোলা রেখেই আমরা ইতিহাসে যা ঘটেছিল তা নিয়েই আগাচ্ছি।  তবে কোন সাবজেকটিভ কর্তা ছাড়া একাজ সম্ভবত হতই না।  রুজভেল্টের আমেরিকা বিশ্বযুদ্ধ শেষে গ্লোবাল অর্ডার কী হবে এর এক নির্ধারক হয়ে উঠেছিলেন। গ্লোবাল অর্ডার  বলতে যেমন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কী হবে, কিভাবে হবে এর নির্ধারক হয়ে উঠেছিল আমেরিকা। অথবা আরো সরাসরি বললে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নীতি নিয়ম, মুদ্রা কী হবে তা প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ঠিক হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারে। এই গ্লোবাল অর্ডারটা খাড়া হয়ে ছিল বা আছে মূলত তিনটা প্রতিষ্ঠান জাতিসঙ্ঘ, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকে। অবশ্য সাথে আরো কিছু অনুষঙ্গ প্রতিষ্ঠান থাকলেও এরাই মুখ্য। গত সত্তর বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্ডারটা চালু থেকেছে। আর তা ভালো ও খারাপ দু অর্থেই। কিন্তু এখন এই প্রথম ক্রমশ অন্তত অর্থনৈতিকভাবে চীন আরো প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে উঠে আসছে। ফলে এবার চীনের নেতৃত্বের নতুন এক গ্লোবাল অর্ডার একে বদলে ফেলতে উঠে আসছে।

    তৈরি হন, গ্লোবাল অর্ডারে পরিবর্তন আসছেঃ
    কিন্তু এর প্রমাণ কী? এই বক্তব্যের ভিত্তিই বা কী? কারো খেয়ালে বা নেহায়তই অনুমানে এমন কথা নিশ্চয় লেখা যায় না।  আসলে প্রথমে কথাটা কিছু লক্ষণ দেখে বলাবলি শুরু হয়েছিল ২০০২ সালের দিকে, কিছু পশ্চিমা মিডিয়ায়। পরে আমেরিকা নিজেই সরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে স্টাডি করে গ্লোবাল অর্ডারে পরিবর্তন আসছে তা নিশ্চিত হয় ও আমাদেরকেও নিশ্চিত করে। এর রিপোর্ট ওয়েবে পাবলিক করে দেয়া ডকুমেন্ট আর যা প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ সালে। শিরোনাম ছিল “২০২৫ সালের দুনিয়া দেখতে কেমন হবে” [“NIC Global Trends 2025 | (Published in- 2008)| ]। শুধু তাই নয়, পরেও এই স্টাডি চালিয়ে যাওয়া হয়। আরো দুটা রিপোর্টে – ২০৩০ সালে কেমন “NIC Global Trends 2030″| (Published in- 2012)| আর শেষেরটা ২০৩৫ সালে কেমন হবে [“NIC Global Trends 2035″| (Published in- 2017) ] এভাবে। সবগুলোরই একই রেজাল্ট আসে, আমেরিকা ডুবে যাচ্ছে চীন ভেসে উঠছে – নতুন নেতা চীন। বাস্তবে চীনের নেতৃত্বের এই স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে লিড নেয়া শুরু হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে।

    ঐ স্টাডিতে চীনের পিছনে পিছনে আর কার অর্থনীতি উঠে আসার সম্ভাবনা আছে, এরও স্টাডি-ডাটা সেখানে ছিল। এ থেকেই বুশের আমল থেকে আমেরিকা নিজের করণীয় ঠিক করে যে, ভারতের পিঠে হাত রেখে কাছে টেনে একে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা – এটা তার কৌশল হবে। আর তা থেকেই বাজারে ভারতের গুরুত্ব বাড়ে। এমনিতে ভারতের অর্থনীতি খুব গরিবই; বিশেষ করে অবকাঠামোগত সক্ষমতার দিক থেকে। তবুও চীনের কাছাকাছি জনসংখ্যার বলে এর পটেনশিয়াল বা সম্ভাবনা আছে এমন “রাইজিং অর্থনীতি” মনে করা হয়। ইতোমধ্যে ২০০৯ সাল থেকে  চীনের নেতৃত্বে পালটা আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক ধরনের কিন্তু নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রিকস [BRICS] ব্যাংক জন্ম নেয়। ভারত সেখানে যুক্ত হতে অফার পেলে যোগ দেয়। চীনও তার বিনিয়োগ সক্ষমতা থেকে ভারতের চাহিদামত ঋণ বিশেষত অবকাঠামোগত ঋণ প্রদান করতে থাকে। কিন্তু ততই আমেরিকার কাছে ফিরে ফিরে যাওয়ার ঝোঁক ও আমেরিকার অফার করা সুবিধা নেওয়ার ঝোঁক তার বাড়তেই থাকে। যদিও ট্রাম্প আমলে এসে আমেরিকা মনে করে, ভারতকে চীনের পেছনে লাগানো বৃথা। কারণ এটা তেমন কোনো ফলদায়ক নয়, তেমন রেজাল্ট নাই।

    কিন্তু ভারতের আচরণ এমন হয়ে যায় যে, সে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে থাকে যে, সে যেন চীন ও আমেরিকার মাঝে দুটার সাথেই স্মার্ট প্লে করে দু’জনের থেকেই নিজের সুবিধা আদায় করে ফুলে উঠতে পারবে। বর্তমান ভারত-চীন দ্বন্দ্ব-সংঘাত হল,  সেই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী মোদীর ভারতকে নিজ প্রকৃত সক্ষমতার দিকে হুঁশ-নজর করিয়ে দেয়ারই চীনা-উদ্যোগ, বলা যায়।

    ব্যাপারটা অনেকটা কাউকে মারধর দেয়ার পরে আবার যেমন বুঝিয়ে দেয়া যে কাঁদলে আবার আরো মার খাবি। কথিত বিশ ভারতীয় সেনা মারা যাওয়ার পর চীন সাবধান করে দেয় যেন ভারত নতুন টেনশন আবার সৃষ্টির চেষ্টা না করে। তাই অবশেষে মোদীর সবল অবস্থান ঘোষণা যে “কেউ ভারতের মাটিতে আসেনি”। খুব সম্ভবত ভারতকে সামরিকভাবে আরো হেস্তনেস্ত করবে আর বুঝিয়ে দিবে যে চীন-ভারত বাণিজ্যিক সম্পর্ক ত্যাগ করলে ভারতেরই বেশি ক্ষতি শুধু নয়, তার অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকা মুশকিল হয়ে যাবে, সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া থেকেই মোদির এমন হঠাত বক্তব্য – ‘কেউ ভারতের মাটিতে আসে নাই।’

    কিন্তু ভারতের কেন এমন হল কেনঃ
    ভারতের কোনো রাজনীতিক বা একাডেমিক বা নীতিনির্ধারক চলতি পুরা ইস্যুটাকে “গ্লোবাল অর্ডারের” দিক থেকে দেখেছেন এমন কোন মিডিয়া রিপোর্ট নজরে আসেনি। এর ওপর আছে ভারত মানেই আসলে এক নেশন-স্টেট ভাবনায় ডুবে থাকা ভারত। এর প্রধান স্বাক্ষ্য হল হিন্দুত্বভিত্তিক রাজনীতি একমাত্র নেশন-স্টেট ভাবনার উপরেই নিজে দাড়াতে পারে।  মোদীর তথাকথিত বয়কট বা স্বদেশি অর্থনীতির ধারণাও বোকা বোকা কথার নেশন-স্টেট ভাবনার উপরেই জন্মাতে পারে।

    তাই এবার আরো সরাসরি বলে, যদি প্রশ্ন করা যায়, গ্লোবাল অর্ডার নিয়ন্ত্রণের লিডার প্রশ্নে ভারত কার সাথে থাকতে চায় নিজের ভবিষ্যত ভাল হবে বলে মনে করে – আমেরিকা না চীনের সাথে? এখন পর্যন্ত ভারতের আচরণ থেকে এর জবাব হল ভারত জানে না। এবং না জেনেই এমন ফেলে রেখে থেকে যেতে চায়।

    অথচ এর সহজ জবাব হবে আমেরিকার বিরুদ্ধে এবং সেটা এজন্য যে, যে নেতার যুগ শেষ হয়ে যাচ্ছে সে আমেরিকা, সে ক্ষয়িষ্ণু শেষ হয়ে যাচ্ছে – তাই সে দুনিয়ার অতীত নেতা; বিপরীতে ভারত নিঃসন্দেহে নিজেই প্রধান নেতা হতে চায় অথবা অন্ততপক্ষে আগামী নেতা চীনের প্রধান সহযোগীর ভূমিকায় দেখতে চায়। তাই এটাই হতে হবে। এসবের বাইরে অন্য কিছু তো হতে পারে না। তাহলে সে বারবার অতীতের মধ্যে মানে আমেরিকার ভেতর আশ্রয় খুঁজছে কেন, তাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইছে কেন?

    এর জবাব ভারতের কাছে নেই। কেন নেই?
    মূল কারণ, গ্লোবাল দিকটা সে বুঝতেই পারে না। মূল কারণ, হিন্দুত্ববাদী জাতি-রাষ্ট্র বুঝের লোক। এর বাইরে তার দৃষ্টি যায় না, প্রয়োজনও দেখে না। গ্লোবাল বলে কিছু দেখতেই পায় না। তাদের দুনিয়া স্বদেশিপনাতেই!

    যেমন আমাকে একজন বলছিল, পাকিস্তান যদি চীন ও আমেরিকার সাথে একই সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে তাহলে ভারতও চীন ও আমেরিকার সাথে একই সাথে সম্পর্ক রাখলে সেটা দোষের হবে কেন? বা পারবে না কেন?

    প্রথম কথা, আমরা গ্লোবাল অর্ডার নিয়ন্ত্রণকদের সহযোগী (মূল নেতার সাথে প্রভাবশালী ভূমিকায়) কেউ একজন হওয়ার প্রসঙ্গে কথা বলছি। স্রেফ দুটা রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখা না রাখার বিষয় নয় এটা। পাকিস্তান গ্লোবাল অর্ডার নিয়ন্ত্রণকারীদের কেউ নয়, সহযোগী হয়ে ওঠার তালিকাতেও কেউ নয়। পাকিস্তান অর্থনীতিগতভাবেও তেমন কোনো শক্তিশালী দেশ নয়। তাই বলছি গ্লোবাল অর্ডার বা এর নিয়ন্ত্রক বলতে কী বুঝিয়েছি সেটা আমল করাই হয় নাই, এই প্রশ্নের মধ্যে। অর্থাৎ এই প্রশ্নকর্তা যেন ভারত নিজেই!

    হিন্দি বা উর্দুতে একটা কমন ফিল্মি ডায়লগ আছে- “আওকাত দেখা দিয়া” না! মানে কারও বাস্তব মুরোদ বা স্টাটাস কি ও কেমন সেটা কোনো হামবড়া লোককে মনে করিয়ে বা দেখিয়ে দেয়া। চীন ভারতকে তার আওকাত মনে করিয়ে দিয়েছে; যদিও তার মিডিয়া ও বিরোধী দল, এমনকি তার নিজ দল পুরানা স্টাইলে এখনো ভাব দেখিয়ে যাচ্ছে! অর্থাৎ তারা ধারণাও করতে পারছে না চীন মোদীকে ঠিক কী দেখিয়ে দিয়েছে!

    কারো কোনো সামরিক বা অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা নিশ্চয় দোষের নয়। তবে না থাকলে কেমন আচরণ করতে হয় সেটাই আলোচ্য। যতদিন সেটা অর্জিত না হয় ততদিন ভারত চীনের সাথে সংঘাতবিহীন সম্পর্ক রেখে বা সংঘাত এড়ানোর বুদ্ধিতে চলাই তার জন্য “সোজা রাস্তা” । আসলে চীন বুঝিয়ে দিচ্ছে মোদী তোমার হিন্দুত্ব, তোমার জাতি-রাষ্ট্র ধারণার বাইরের সবকিছুতে অবুঝ থাকা আর তোমার হামবড়া ভাব- এগুলো অচল! এভাবে চললে তুমি মরে যাবা – তাই এসব ছাড়তে হবে।

    চীন কী আগ্রাসনবাদী হয়ে উঠছেঃ
    নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, “চীন যা করছে তা পড়শিকে দেয়া উস্কানি মনে হলেও এতে ম্যাসেজ দিয়েছে আমেরিকাকেই”।  আমেরিকান ডিপ্লোম্যাটরা গালওয়ানের হত্যার ঘটনাকে “চীনের আগ্রাসন” বলছে।  কিন্তু ভারতের এক রিটায়ার্ড লে জেনারেল বলছে, “কে ক্ষমতায় বস – এটা ভারতকে চীনের দেখানো শেষ হয়েছে মনে হয়ে গেলে সে সব ভুমি ফেরত দিয়ে চলে যাবে”।

    একথার সাথে সম্ভবত আরেকটা কথা যোগ দিতে হবে – ততদিনে সম্ভবত চীন  সাথে – এক ডিসিপ্লিন্ড  অনুশাসন মেনে চলা – সুবোধ বালক, এমন ভারতকেও দেখব আমরা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২৭ জুন ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “ভূখণ্ড ফেরত আনা ব্যাপার নয়”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ব’ ফিরানোর খোয়াব

    ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ব’ ফিরানোর খোয়াব

    গৌতম দাস

    ১৮ মার্চ ২০১৯, সোমবার ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-2yu

    The judge ruled images of the suspect in court must blur his face. Photo: Mark Mitchell-Pool/Getty Images,  from this link.

    প্রায় লাগোয়া দুইটা দ্বীপ নিয়ে গঠিত দেশ নিউজিল্যান্ড। এর উত্তরের দ্বীপে নিউজিল্যান্ডের রাজধানী শহর ওয়েলিংটন আর দক্ষিণের দ্বীপের সবচেয়ে বড় শহর ক্রাইস্টচার্চ [Christchurch]। এবার ১৫ মার্চ ২০১৯, সেই ক্রাইস্টচার্চ উঠে আসে বিশ্বজুড়ে মিডিয়া শিরোনামে – “মসজিদে বন্দুকধারীর হামলা”। শহরের মধ্যে গাড়ী চালিয়ে আসতে ১০ মিনিট লাগে এমন দুরত্বে দুটো মসজিদ আছে – আল নুর [Al Noor Mosque] আর লিনউড [Linwood mosque] মসজিদ। সেখানে শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময় একের পরে অন্যটায় পরপর, হামলাকারী মারাত্মক ও বড় ধরণের সন্ত্রাসী হামলা চালায়।  মিডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীর নাম ‘ব্রেনটন ট্যারান্ট’ [Brenton Tarrant]। সে মূলত অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। তবে প্রায়ই পাশের নিউজিল্যান্ডে আসেন। চিন্তার দিক থেকে “খ্রিষ্টান এবং ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা চামড়ার লোকদের কথিত শ্রেষ্ঠত্বে” বিশ্বাসী। অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে ব্রেনটনের পরিচয় হল – ২৮ বছর বয়সী এই সাদাচামড়ার পুরুষ স্বল্প আয়ের খেটে খাওয়া পরিবারের [28-year-old white male from a low-income, working-class family]। আর সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলায় বেপরোয়া গুলিবর্ষণে ৪৯ জন ইতোমধ্যেই মৃত, আরো প্রায় ২০ জন হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন।

    নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরার সামনে মিডিয়ায় বলছেন, ‘এটা খুবই পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা’ [“well-planned terrorist attack”]।

    Jacinda Ardern, prime minister of New Zealand, described the shootings as a “well-planned terrorist attack”, and said this is one of the country’s “darkest days”..

    অর্থাৎ আমরা দেখলাম তিনি এখানে “মুসলমানেরাই ভিকটিম” বলে এটাকে ‘টেররিজম’ বলবেন কি না এমন দ্বিধা দেখাননি। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীও এটাকে “সন্ত্রাসী হামলা’ [extremist terrorist attack] বলে নিন্দা জানিয়েছেন। বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিবৃতিতে এটাকে “টেররিজম” বলা হয়েছে। এমনকি ভারতের বিদেশমন্ত্রী বা কানাডার সরকারও। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এটাকে “খুবই পরিকল্পিত” [well-planned] বলছেন কেন? আর একটা বিশেষ দিক হল, এই হামলার পুরো সময় ১৭ থেকে ২০ মিনিটের; যার ১৭ মিনিটেরই লাইভ শো ফেসবুকে অন-লাইনে দেখানো হয়েছে। আর তা এমন ভয়ডর-পরোয়াহীন তাণ্ডব যে, রাইফেলের মাথায় বসানো ক্যামেরা থেকে নেয়া অনলাইন লাইভ ছবি নামাজ পড়তে আসা অসহায় মুসল্লিদের প্রতি গুলি ছোড়ার লাইভ ছবি – সাথে সাথেই ফেসবুকে প্রচারিত হচ্ছিল। এ ছবিগুলো যে লাইভ সম্প্রচার হচ্ছিল তা এএফপি নিজেরা পরীক্ষা করে আমাদের নিশ্চিত করে [AFP determined the video was genuine] এই রিপোর্ট ছেপেছে।

    হামলাকারী কে বা কারা? তাদের রাজনৈতিক বা চিন্তাগত পরিচয় কী? পুলিশ বলছে, হামলাকারীরা মোট চারজন, যার তিনজনই সম্ভাব্য সহযোগী। আর চতুর্থজন যে দৃশ্যমান হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্ট তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে হামলার পরই এবং মানুষ হত্যার মামলায় অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। অন্যদের নিয়ে তদন্ত চলছে। গত ২০১১ সালে প্রায় একই ধরনের ঘটনায় নরওয়েতে ৭৭ জন মানুষ হত্যা করেছিল এন্ডার্স ব্রেইভিক [Anders Breivik]। হামলাকারী ব্রেনটনের পছন্দের ব্যক্তিত্ব যারা তাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন বলে জানিয়েছে, এমন দুই ব্যক্তির একজন হলেন এই ব্রেইভিক আর অন্যজন হলেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ব্রেনটন এই দুই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের চিন্তা ও কাজের প্রশংসা করেছেন। অনুমান করা যায়, এর মূল কারণ এরা দু’জনই হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট [white supremacist] চিন্তা ধারণ করেন।

    White Supremacist কারা?
    “দুনিয়ায় সাদাচামড়ার লোকেদের শাসন-কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে কারণ সেটা ছিল তাদের শ্রেষ্ঠ যুগ” – এই বক্তব্য বিশ্বাসে চলা পাশ্চাত্বের রাজনৈতিক-সামাজিক গ্রুপ এরা।  মূলত এরা ইনসাফ বা ন্যায়-অন্যায় মুল্যবোধ থেকে বিচার করে পথ চলে না, এমনই মানুষ। “আমি আর এক মানুষের সহায়-সম্পত্তি বা ওর পুরা দেশটাই দখল করে নিব – কারণ আমি সুপার – আমি ক্ষমতাবান, বলশালী” – এই সাফাই বয়ানের উপর দাঁড়ানো এসব হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট। তারা বলতে চায় পশ্চিমের সাদা চামড়ার লোকেরা আমরা এটাই করে এসেছি, কলোনি দখল করেছি, দুনিয়া লুটে শাসন করেছি, দাবড়ায় রেখেছি – কাজেই আমরা শ্রেষ্ট। তাই আবার “সেদিন” ফেরত আনতে হবে। তাদের মুল বক্তব্য এটাই।  এক ধরণের ‘সাদাদের ক্ষমতা’ বা হোয়াইট পাওয়ারের [White Power] পুজারি তাঁরা।
    এছাড়া এরা দাবি করে তারা মাইগ্রেন্টবিরোধী। মানে গরিব দেশ থেকে মানুষের (যুদ্ধের শরণার্থী হওয়াসহ) নানা কারণে পশ্চিমের দেশে বসবাস করতে আসাকে (ইকোনমিক মাইগ্রেন্ট) অনুমোদন দেয়ার এরা তীব্র বিরোধী।
    কোন তথ্য-উপাত্তে প্রমাণ না থাকলেও এরা প্রচার প্রপাগান্ডা করতে ভালবাসেন যে মাইগ্রেন্টরা “নোংরা”, এরা তাদের শহর নোংরা করে থাকে আর শহরে সব অপরাধের জন্য দায়ী হল এই মাইগ্রেন্টরা। এককথায় যারা তাদের মত নয় এমন “অপর” [other] যেকোন মানুষই নিকৃষ্ট, খারাপ। তাদের আচার আচরণ কালচার সব খারাপ। শুধু তাই না।  এখানে  হোয়াইট-সুপ্রিমিস্টদের পরিচয়ের আর এক অর্থ আছে। তারা বিশ্বাস করে সাদা চামড়ার জনগোষ্ঠিরা ছাড়া বাকি অন্যেরা বেশি বেশি বাচ্চা পয়দা করে। আর তাতে কোন সাদা চামড়ার দেশে এরা সহজেই তাদের ছাড়িয়ে জনসংখ্যায় বেশি হয়ে যায়। (মুসলমানদের সম্পর্কে ভারতের মোদীর বিজেপি-আরএসএস সংগঠন ও তাদের কর্মীদের বিশ্বাস ও ভাষ্যও প্রায় একই রকম মিল দেখতে পাওয়া যায়।) তাই, সাদা চামড়ার জনগোষ্ঠি ছাড়া এমন “অপর” লোকেদেরকে বুঝাতে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা একটা শব্দ ব্যবহার করে থাকে – “ইনভেডর” [invader] – মানে অনুপ্রবেশকারি-দখলদার। হামলাকারি ব্রেনটন ও তাঁর বন্ধুরা কথিত অনুপ্রবেশকারিদেরকে হত্যা করা তাদের টার্গেট ও একাজ জায়েজ মনে করে থাকে। যদিও এরা সাধারণভাবে “ইনভেডর” বলে ডাকে কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় তারা ইনভেডর বলতে মূলত কেবল মুসলমান জনগোষ্ঠিকেই বুঝিয়েছে। অনেকটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর  মত। আমরা মনে রাখতে পারি, তিনি ও তাঁর দল বাংলাদেশ থেকে ভারতে কথিত মাইগ্রেন্টদের “মুসলমান” এবং কখনো ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা “তেলাপোকা” ইত্যাদি মানুষের জন্য অমর্যাদাকর শব্দ ব্যবহার করে থাকেন।

    হামলাকারি ব্রেনটন সম্পর্কে উপরের এতকিছু তথ্য জানার উপায় বা উতস কী? হামলা ঘটে যাবার পরে ব্রেনটন সম্পর্কে খোঁজ করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং এএফপি [AFP] আমাদের জানাচ্ছে যে, এক মাস ধরে ফেসবুক ও টুইটারে ব্রেন্টন একটা গ্রুপ হিসেবে প্রকাশ্যেই সক্রিয় ছিল। [The Twitter profile had 63 tweets, 218 followers and was created last month.] ‘যে কেউ’ বা এনোনিমাস হিসেবে তারা একটা গ্রুপ চালিয়ে গেছে, যে গ্রুপের নাম ‘8chan’ ফোরাম [Politically Incorrect” forum on 8chan, a online discussion site ]। এই গ্রুপ যে খুলেছে, তার নাম হিসেবে দেখা যাচ্ছে, হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্টের নাম। একই ‘মালিক’ হিসেবে একই নামে এক টুইটার অ্যাকাউন্টও [@brentontarrant] আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই হামলার পুরো বর্ণনা এখান থেকেই প্রচারে দেয়া হয়েছে। কেন এই হামলা তা বিস্তারে বর্ণনা করতে তাদের ‘ম্যানিফেস্টো’ বলে ৭৪ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট এই সাইট থেকে নামিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ঐ ডকুমেন্টের শিরোনাম হল- ‘The Great Replacement’। বলা হয়েছে, এই ম্যানিফেস্টো লিখতে প্রণোদনাদাতাদের নাম হল ‘হোয়াইট জেনোসাইড’। মানে এরা নিজেদের ‘সাদা গণহত্যাকারী’ বলে ডাকছে। সাধারণত ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা’ নিজেদের ‘সাদা গণহত্যাকারী’ বলে থাকে। এ ছাড়া, নিজেদের বিদেশী বা মাইগ্রেশনবিরোধী এবং সংশ্লিষ্ট আরও কিছু শব্দ ও ধারণা যেমন, ডাইভারসিটি (Diversity বা বহুমুখিতা) বা মাল্টিকালচারিজমের [Multi-culturalism বা সাংস্কৃতিক বহুমুখিতা] এসবের ঘোরতর বিরোধী বলে দাবি করে থাকে।

    ডাইভারসিটি বা মাল্টিকালচারিজম ধারণার এখানে সারকথা হলটা – অনেক ধরণের দেশের ভুগোল ও সংস্কৃতির মানুষের একসাথে এক শহরে এই রাষ্ট্রে এসে বসবাস করা – একই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এর ‘বৈষম্যহীন’ এক “নাগরিক সাম্য” বৈশিষ্ঠের কনষ্টিটিউশনের অধীনে।

    এনিয়ে ইউরোপের তর্কবিতর্কের উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্রিটেন রাষ্ট্রনীতি হিসেবে ‘মাল্টিকালচারিজম’ মেনে চলা তাদের জন্য সঠিক নীতি বলে মনে করে থাকে। কিন্তু ফ্রান্স ঘোষিতভাবেই মাল্টিকালচারিজম অপছন্দ করে থাকে। এর বদলে তাদের পছন্দ হল ‘এসিমিলিয়েশন’[assimilation] নীতি। যার বাংলা ও খুলে বলা অর্থ হল – ইংরেজি assimilate (বাংলায় সব-একই-ধরণ বা এককরণ করা) থেকে এসিমিলিয়েশন। এই এসিমিলিয়েশন শব্দের মূল বিষয়টা হল, ইউরোপের ব্রিটিশ-ফরাসিসহ সব কলোনি-দখলদারেরা আমাদের মত দেশকে এককালে কলোনি বানিয়ে, দখল করে লুটতে গিয়েছিল। পরবর্তিতে সেই সূত্রে আবার সস্তা শ্রম পাওয়ার লোভে তারা আমাদেরকে (কালো চামড়ার নেটিভদেরকে) কালক্রমে নিজ নিজ ইউরোপীয় দেশেও নিয়ে গিয়েছিল। “নেটিভরা” একসময়ে কলোনি মালিকের দেশেই তারা স্থায়ীভাবে পরিবারসহ  নাগরিক হিসাবে বসবাসও শুরু করেছিল। কারণ যেমন কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়াকে কার্যত মূল বৃটিশ ভুমিরই এক্সটেনশন মনে করা হত। কিন্তু একালে এসে ইউরোপের অর্থনীতি ঢলে পড়াতে ব্যবসা বানিজ্যের ভাটায় স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখে এই নেটিভরাই তখন চক্ষুশুল হয়ে গেলে যা হয়, তাই। কলোনি মালিকের দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্তরা তাদের দেশে যাওয়া নেটিভদেরকেই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বি গণ্য করছে। এই ব্যাপারটা বৃটিশেরা যেমন সহনীয়ভাবে দেখে ফরাসীরা তেমন নয়। তাই ফরাসি নীতি হল, নেটিভদের সবাইকেই ফরাসি কালচারই অনুসরণ করতে হবে। নেটিভরা নিজ দেশ থেকে আনা সংস্কৃতিই ফেলে দিতে হবে বা ফরাসি কালচারের অধস্তন হতে হবে। তদুপরি, নিজ (বিশেষত ইসলাম) ধর্ম পালনও যেনবা ফরাসি কালচারের অধস্তন হয়ে পালন করতে হবে; এমন করতে বাধ্য করাই । ফরাসি দেশে বোরকা আইনত নিষিদ্ধ এ ‘যুক্তি’তেই। জবরদস্তিতে সবাইকে ফরাসি হতে,নেটিভেরা নিজ দেশ থেকে আনা শুধু সংস্কৃতিই ফেলে দিতে হবে বা ফরাসি কালচারের অধস্থন হতে হবে তাই না। নিজ (বিশেষত ইসলাম) ধর্মপালনটাও যেনবা ফরাসি কালচারের অধস্থন হয়ে করতে হবে; এমন করতে বাধ্য করাই assimilation নীতি। যেমন ফরাসি দেশে বোরখা পড়া আইনত নিষিদ্ধ, এই যুক্তিতেই। এটাকেই ফরাসি রাষ্ট্র তার “এসিমিলিয়েশন” এর নীতি বলে সাফাই দিয়ে চলে থাকে। এই দুই নীতির তুলনা নিয়ে গত ২০১৫ সালে আমার এক পুরানা লেখা এখানে সময় করে আবার পড়তে পারেন।

    হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা হিটলারেরও ভক্ত। যেমন এরা হিটলার বা তার সংগঠন নাৎসি পার্টির নানান চিহ্ন বা প্রতীক ব্যবহার করে থাকে। হিটলারের বাণী নিজেরা পুনর্ব্যবহার করে। হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্টের রাইফেলের গায়ে এর ওপরে কমপক্ষে ছয়টা নাম ও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আঁকা আছে। এর একটি হল, ‘ফরটিন ওয়ার্ডস’ (Fourteen Words) চৌদ্দ শব্দের এক বাণী। আর তা হল – আমাদেরকে অবশ্যই “আমাদের মানুষের” অস্তিত্ব ও আমাদের “সাদা সন্তানদের” ভবিষ্যত সুরক্ষিত করতে হবে। [“We must secure the existence of our people and a future for white children.”]।  এটাকে অনেকে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের একটা মূল ‘মন্ত্র’ বলে থাকে। এখানে ‘our people’ বা ‘white children’ বলে এরা বর্ণবিদ্বেষ জাগানোর চেষ্টা করে থাকে।

    ব্রেন্টনের মত হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা বলতে চায় তারা মাইগ্রেশনবিরোধী। কিন্তু আসলেই কি তাই?
    আমেরিকা, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ড এসব রাষ্ট্রের আদি বাসিন্দা কারা? আর কারা এর অবৈধ দখলদার? অথবা তাঁদের ভাষায় অনুপ্রবেশকারি-দখলদার? নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী [aborigine] হল ‘মাউরি’-রা [Māori]। ইউরোপ থেকে বিশেষত ডাচ বণিক ‘আবেল তাসমান’ [Abel Janszoon Tasman] প্রথম ইউরোপীয়, যিনি মাউরি সভ্যতা ও এর ভূমির সন্ধান পাওয়ায় (১৬৪২) পরবর্তী সময়ে ‘নিউজিল্যান্ড’ নাম দিয়ে দখল করে, কালক্রমে নিউজিল্যান্ড ইংল্যান্ডের কলোনি হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। এখানে ইউরোপীয় সাদা চামড়ার লোকজনই কি অনুপ্রবেশকারী-দখলদার নয়? হামলাকারী ব্রেনটন নিজেই (বা তাঁর পূর্বপ্রজন্ম) অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের আসল অনুপ্রবেশকারী-দখলদার। অতএব, হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের নিজেকে না বলে (মুসলমানসহ) অন্য কাউকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলা প্রহসন মাত্র। ক্রাইস্টচার্চের মুসলমানদেরকে “হোয়াইট জেনোসাইডার” ব্রেনটন এর বিদেশি বা তথাকত্থিত “মাইগ্রেশনবিরোধীতার” তামাশা হল এটাই যে খোদ মাইগ্রেন্ট মাইগ্রেশনবিরোধীতার ভান করতে নেমে নির্বিচারে মানুষ খুন করছে।

    তবে এখানে আমাদের পরিস্কার থাকতে হবে যে বুশ-ব্লেয়ারের “ওয়ার অন টেরর” আর হোয়াইট বা “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব হাঙ্গামার” উত্থান  – এদুটো একই ফেনোমেনা নয়। বরং একেবারেই আলাদা। তবে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব হাঙ্গামাকারিরা” ইচ্ছা করে ইনভেডর বা অনুপ্রবেশকারী-দখলদার বলতে কথাটা সংকীর্ণ করে কেবল “মুসলমান” বুঝাচ্ছে – যাতে তারা খ্রীশ্চান-পশ্চিমাবাসীদের দৃষ্টি-আকর্ষণ করা সহজ হয়।

    সারকথা : আমাদের যথেষ্ট মাথা তুলে যেটা দেখতে হবে যে, হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের উত্থান কেন এখন দেখা যাচ্ছে? তারা অটোমানদের সাম্রাজ্যের প্রতি ঘৃণা অথবা ইউরোপিয়ান খ্রিশ্চানিটির জেরুসালেম দখল চেষ্টার অতীত লড়াইগুলোকে এখন কেন রেফারেন্সে আনছে?

    আমরা গ্লোবাল অর্থনীতির ইতিহাসকে মোটা দাগে তিনটা পর্বে ভাগ করে বুঝতে পারি। প্রথম পর্ব হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। যেটাকে “কলোনি অর্থনীতির যুগ” বলা যেতে পারে। দ্বিতীয় পর্ব হল – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ থেকে গত শতাব্দী (বিশ শতক) পর্যন্ত, যেটা  আমেরিকার নেতৃত্বে “গ্লোবাল অর্থনীতির যুগ”। আর তৃতীয় পর্বকে বলা যায়, চলতি শতকে আমেরিকান নেতাগিরির পতন আর ক্রমেই সেই জায়গা নিতে “চীনের উত্থিত গ্লোবাল নেতৃত্ব”।

    পশ্চিমের, বিশেষত ইউরোপের অর্থনীতি ভালো চলছে কি না তা বুঝবার সহজ তরিকা বা নির্ণায়ক হল – মাইগ্রান্ট ইস্যু। অর্থনীতি ভাল চললে দেখা যাবে, তারা সবাই ভুলে যায় যে মাইগ্রান্ট তাদের একটি সমস্যা। কারণ, তখন পশ্চিমের বাড়তি শ্রম দরকার; ফলে মাইগ্রান্ট শ্রমিক খুব দরকারি। আবার অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলেই মাইগ্রান্ট বিষয়টিকে মানে, ওই বাড়তি শ্রমের বিষয়টিকে পাশ্চাত্য এক বিরাট সমস্যা মনে করে থাকে। তারা তাদের মধ্যবিত্তদেরকে মাইগ্রান্টদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে উঠায়। অথবা যেমন আমরা এখন ফ্রান্সে দেখছি। ফরাসি নেতা মেরিন লি পেনের National Front পার্টির উগ্র ন্যাশনালিস্টরা (হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট) তাদের মধ্যবিত্তকে ক্ষেপিয়ে তুলছেন। কিন্তু এরপরেও তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরেছেন। তবে তারা আসলে “কী রাজনীতি” করছেন তা বুঝবার কিছু ইঙ্গিত দেয়া যাক। তার দলের দুই ভাইস-প্রেসিডেন্টের একজন ফিলিপো [Florian Philippot] সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন। যা তিনি বলছেন বাধ্য করা হয়েছে। ফিলিপোর দাবি তাদের দলের আভ্যন্তরীণ বিতর্ক আসলে এখন এক সরে যাওয়া ইস্যু। “আমরা আগে আসলে দাবি করতাম এক অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ। যেটা এখন “মাইগ্রান্ট আর ফরাসি আইডেন্টিটি” – তার এই পুরানা ট্রাডিশনাল অবস্থানকেই মুল রানোইতিক ফোকাস বলে হাজির করেছে। এটা আসলে এক ভয়ঙ্কর পিছনের দিকে পিছলে পড়া”। [Philippot said the debate within the FN about a shift away from his focus on economic nationalism back to its traditional priorities of immigration and French identity were “a terrible backward slide”].
    এই বক্তব্য থেকে আমরা “অর্থনৈতিক জাতীবাদ” থেকে মোদীর হিন্দুত্ববাদ কোথায় আলাদা তা বুঝে নিতে পারি।

    গ্লোবাল অর্থনীতির ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্বে এসে আমেরিকার নেতৃত্বের হাতে ইউরোপ এর আগে নিজেদের কলোনি শাসনের অর্থনীতির সমাপ্তি ও সমর্পণের ঘোষণা দিতে হয়েছিল।
    এখন চীনা উত্থানের পর্বে এসে ইউরোপ বিশেষ করে ফ্রান্স আরেক দফা (তবে এবার আমেরিকাসহ) চীনেরও পেছনে থাকতে শুরু করতে যাচ্ছে। এরই প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপে এই  সাদা চামড়ার আইডেনটিটি- ধরনের রাজনীতি দেখা যাচ্ছে। দাবি উঠছে তাদের আগের “কলোনি যুগ” সবচেয়ে ভালো ছিল। কারণ, সেটা ছিল শান-শওকতের যুগ। তাই কলোনি লুণ্ঠনের সেকালে ফিরে যেতে হবে”। ইউরোপের প্রবীণ প্রজন্ম এখন তরুণদের কাছে সাদা চামড়ার সুপ্রিমেসির গল্প শুনিয়ে উসকানি দিচ্ছে।

    সময় কখনো পেছনে ফেরে না। যেমন আমরা চাইলেই এখন “দাস-প্রথা” আবার ফিরে দুনিয়াতে চালু করতে পারব না। একইভাবে কলোনি লুণ্ঠন একালে আবার বৈধ বলে দাবি করা, সাদা চামড়ার বর্ণবাদের শ্রেষ্ঠত্ব একালে আবার ন্যায্য বলে সাফাই গাওয়া- এসব অসম্ভব। দুনিয়ার অভিমুখ আর সেটা নয়। এগারো-বারো শতকের জেরুসালেম দখলের জোশ- ক্রুসেডের সেই উসকানি একালে আবার তৈরি করা, সেটাও অসম্ভব। মডার্ন রাষ্ট্র ও শাসন দুনিয়ায় এসে যাওয়ার পরে পুরনো ‘ক্রুসেড’ আর হবে না। যদি তাই হত তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরে ব্রিটেন জেরুসালেম দখলের চেষ্টায় বারবার হেরে যাওয়ার শোধ তুলতে আবার ক্রুসেড লড়ে জেরুসালেমের দখল করতে চেষ্টা করত। “কামাল তুনে কামাল কিয়ার” তুরস্ক গড়ার পথে হাঁটত না। বরং আমরা দেখেছি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন সত্ত্বেও ‘মডার্ন রিপাবলিক’ ব্রিটিশ সরকার ‘ক্রুসেড’ শব্দটি মুখেও আনেনি।

    আমরা এখন যেমন চাকরি, পড়াশোনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সুবিধা পেতে পশ্চিমমুখী হই। সামনের দিনে ইউরোপীয়দের অন্তত চাকরি বা অধিকতর সুযোগ-সুবিধার জন্য এশিয়ামুখী হয়ে ধাবমান হতে দেখা অসম্ভব নয়। এটাকেই তারা হার মনে করছে। পাশ্চ্যাতের সমাজে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব ফিরিয়ে আনার” নামে অস্থিরতার কারণ এখানেই।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ব’ কি ফিরবে“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • ভারতের “ইতি-জনসংখ্যা নেতি হয়ে যেতে পারে”

    ভারতের “ইতি-জনসংখ্যা নেতি হয়ে যেতে পারে”

    গৌতম দাস

    ২০ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০২

    https://wp.me/p1sCvy-2vW

     

     

    এশিয়ায় চীন-ভারত দ্বন্দ্ব প্রতিযোগিতা সর্বত্র, এমনকি একাডেমিক পর্যায়েও। চীনের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে ভারত অথবা ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে চীনের একাডেমিক মূল্যায়ন বা পর্যালোচনা দেখা যায় না বললেই চলে। একাডেমিক মূল্যায়নের না থাকার কথা বলছি, যদিও প্রপাগান্ডার উদ্দেশ্য ছদ্ম-মূল্যায়ন প্রচুর আছে দেখা যায়। সম্প্রতি চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের (FUDAN) গবেষক লিন মিনওয়াং ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অভিমুখ সম্পর্কে চীনেরই গ্লোবাল টাইমস পত্রিকায় পর্যালোচনামূলক লিখেছেন। (এখানে দেখুন) সে লেখার শিরোনাম হল – [Demographic dividend cannot guarantee India’s rise], বাংলায় “বিপুল জনসংখ্যার সুবিধা থাকলেই কোনো দেশের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হয়ে যায় না”। [বাংলায় অনুবাদ এখানে পাবেন]।

    হ্যাঁ  চীনা গবেষক এর কথাটা সঠিক। ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল অর্থনীতিতে দেখা গেছে, যেসব দেশ নিজেকে গ্লোবালি শীর্ষ অবস্থানে বা প্রথম দিকের এক-দুই নম্বরের অর্থনীতিতে সহজেই নিয়ে যেতে পেরেছে তার পেছনে, একটি কমন ফ্যাক্টর কাজ করেছে। তা হল, দেখা গেছে সাধারণত সেসব দেশ বিপুল জনসংখ্যার দেশ হয়ে থাকে। জনসংখ্যার পড়ে পাওয়া সুবিধা বা Demographic Dividend বলে। এ ছাড়া ঐ বিপুল জনসংখ্যার বড় অংশ যদি ৩০ বছরের নিচের বয়সের হয় তবে এর সুবিধা আরো বেশি পাওয়া যায়। ফলে এখান থেকে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এক সর্বগ্রহণযোগ্য ধারণা দেখা যায় যে, বিপুল জনসংখ্যা দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই ইতিবাচক উপাদান। চীনের এই গবেষক এই ইতিবাচক ধারণাটাকে ভারতের বেলায় প্রয়োগ করে, এর উপর ভিত্তি করে আরও মন্তব্য করেছেন। তিনি বলছেন, ভারতের বিপুল জনসংখ্যার সুবিধা আছে কথা ঠিক। কিন্তু তা থাকলেই ভারতের অর্থনীতির উত্থান নিশ্চিতভাবে হবেই এটা ধরে নেয়া ভুল হবে। কেন?

    সে কথাই তিনি তার লেখায় তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে দুনিয়াতে চীন ও ভারতের উভয়েরই জনসংখ্যা শীর্ষে, ১০০ কোটির উপরে – একারণে তিনি চীনের অর্থনৈতিক উত্থান সম্পন্ন হওয়ার বেলায় কী ঘটেছে সে অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে তিনি ভারতের অর্থনীতিকে তুলনা করে নিজের মন্তব্য পেশ করেছেন।

    প্রথমত গ্লোবাল অর্থনীতির আলাপে, কোনো বড় দেশ বলতে অর্থনীতির ভলিউম বা আকারের দিকে তাকিয়ে সেটাকে মূলত বড় দেশ বলা হয়ে থাকে। যদিও সাধারণত বড় দেশ বলতে আবার বড় জনসংখ্যার দেশ অর্থেও তা বলা হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে বড় দেশ মানে তাই সাধারণত বড় জনসংখ্যা এবং বড় অর্থনীতি দুটোই হাজির থাকতে দেখা যায়। আবার ব্যতিক্রমও আছে। যেমন বাংলাদেশ বড় জনসংখ্যা দেশ এবং তা বড় অর্থনীতির দেশ না হলেও এর জিডিপি বাড়ার হার বেশি এবং চড়া। তবু কোনো দেশের অর্থনীতি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিপুল জনসংখ্যাকে ইতিবাচক এবং তা পড়ে পাওয়া এক সুবিধা মনে করার পেছনের মূল কারণ আরো গভীরে। বিপুল জনসংখ্যার দেশ বড় রফতানিকারক দেশ হতে গেলে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে একটা বাড়তি সুবিধা তার থাকে। তা হল, রফতানিতে উত্থান-পতন আছে কারণ, রফতানি মানেই নিজ দেশের বাইরের, যেখানে সবটা নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এ ছাড়া কোনো প্রাকৃতিক বা রাজনৈতিক দুর্যোগে সব এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। যখন রফতানিতে ধস নামতে পারে।

    এসব সম্ভাব্য খারাপ সময়ে কেবল বিপুল জনসংখ্যার দেশ হওয়ার কারণে এর টিকে যাওয়ার সক্ষমতা অন্যদের চেয়ে বেশি হবে। মূল কারণ, ওর নিজের একটা বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারও আছে যেটা প্রায় স্থির। তাই রফতানি বন্ধ হয়ে গেলে বা কমে গেলেও এই চাপ সে সামলে নিতে পারে অভ্যন্তরীণ বাজারের যে আয় তা ভাগাভাগি করে নিয়ে অথবা রফতানি না হওয়া পণ্য অভ্যন্তরীণ বাজারে এর  বিক্রি বাড়িয়ে। আর এতে এই যে শ্বাস নেয়ার কিছু বাড়তি সুযোগ সে পেয়ে যায় এই সময়টাকে সে কাজে লাগায় দ্রুত বিকল্প বাজার খুঁজে বের করতে, নতুন চিন্তা-পরিকল্পনা করতে। সারকথায় বড় আভ্যন্তরীণ বাজার সবসময় ঐ দেশেরই কোন কারণে রপ্তানিতে মার খেয়ে গেলে তখন একটা কুশন হিশাবে কাজ করে। এ কারণে, শেষ বিচারে রফতানি-অর্থনীতিতে টিকে যাওয়ার লড়াইয়ে এই দেশ তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় হায়াত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে হাজির থাকে। ত এই হলো বিপুল জনসংখ্যার রহস্য বা বাড়তি পড়ে পাওয়া সুবিধা।

    কিন্তু চীনের এই গবেষক এসব কথা সব মেনে নিচ্ছেন। কিন্তু এরপরেও প্রশ্ন তুলছেন যে বড় জনসংখ্যার দেশ হলেই তাতে নিজ অর্থনীতি বিকশিত হবেই, বড় হয়ে উঠবেই তাকী নিশ্চিত করে? তার জবাব হল না। বলছেন, বিপুল জনসংখ্যা থাকাটাই যথেষ্ট নয়, কারণ আরো বহু কিছু করণীয় বা ফ্যাক্টর বিবেচনায় নিবার আছে।

    মোদির একটা অর্থনৈতিক কর্মসূচি আছে। যার নাম ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’। যার মূল কথা হল, ভারতে যে যা বেচতে চাও তা ভারতে এসে বানিয়ে এরপর বেচ। চীনা গবেষক বলছেন, “মেক ইন ইন্ডিয়া” এই পদক্ষেপ ইতিবাচক। এর উদ্দেশ্যে ছিল শ্রমমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানো যাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়। যদিও বেশ কয়েক বছরের চেষ্টার পরও এই উদ্যোগ খুব একটা উন্নতি হয়নি বা সাফল্য পায়নি।

    এর কারণ হিসেবে তার দু’টি পয়েন্ট আছে।
    বলছেন প্রথমত, “ভারত বিশ্বায়নকে ধারণ করার সবচেয়ে ভালো সময়টা নিজের কাজে লাগাতে পারেনি”। তিনি বলছেন, “আশির দশকে চীন অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে হাত দেয় এবং শ্রমমুখী উৎপাদন খাত গড়ে তোলে। তাদের শ্রমশক্তির পুরোটা ব্যবহার করার চেষ্টা করে তারা। তুলনায় সে সময় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ভারতের অর্থনীতি সার্ভিস সেক্টর মুখ্য করে গড়ে তোলেন এবং দেশটি যেন “বিশ্বের অফিস” সে হিসেবে গড়ে ওঠে। চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের আসল পথ এখান থেকেই পরবর্তীতে আলাদা হয়ে যায়। মোদি সরকারের জন্য এখন আর এর কোন সংশোধনী আনাটা অতটা সহজ নয়”।

    চীনা গবেষকের কথা সবটা না হলেও বহুলাংশে সত্য। তবে চীনের বেলায়, গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নকে কাজে লাগানোর যে সফলতা ও সময়ের কথা বলা হচ্ছে ওর মধ্যে একটা কাকতলীয় দিক আছে। কারণ, আমেরিকা বা বিশ্বব্যাংক দুনিয়াব্যাপী বিশ্বায়নের লক্ষ্যে অর্থনীতির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মোটামুটি আশির দশকের শুরু থেকেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেটার অর্থ এরশাদের আগমন বা এর প্রকাশ হিসেবে আমরা এরশাদের ক্ষমতা দখলকে দিয়ে বুঝতে পারি।

    তবে চীনের আজকের পর্যায়ে উত্থানের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটেছিল তিন পর্বে। এর প্রথমটা বলা যায় অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির পর্যায়ঃ তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবে ১৯৫৮ সালের পর থেকে এবার প্রায় পুরো ষাটের দশকজুড়ে, (১৯৫৮-৬৮) এই সময়কাল। এর পরের দ্বিতীয় পর্ব হল, ভিত্তি ঠিকঠাক করাঃ গ্লোবাল নেতা আমেরিকার সাথে রফা ও দেনা পাওনার ভিত্তি ঠিক করা এবং বোঝাবুঝির ভিত্তি তৈরির কাল। কী ভিত্তিতে আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম নিয়ম-শৃঙ্খলে চীন প্রবেশ করবে এবং চীনে বিদেশী পুঁজির আগমনে তা নিয়ে নতুন সম্পর্ক ও লেনদেন বাণিজ্য বিনিময়ের পথে যাত্রা করবে এর ভিত্তি স্থাপন করা। যেটা মোটামুটি (১৯৬৮- ১৯৭৭) সাল পর্যন্ত সময়কালে সম্পন্ন করা হয়েছে। এরপর তৃতীয় পর্যায় মানে মাঠে বাস্তবায়ন পর্ব শুরু হয়। সেটা ১৯৭৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকা পরস্পরকে কূটনৈতিক স্বীকৃতিদান করে পরস্পরের দেশে কূটনৈতিক অফিস খোলার মাধ্যমে শুরু হয়। বাইরের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডারে চীনের প্রবেশ শুরু হয় বা পুঁজি চীনে প্রবেশ শুরু করে। ঘটনাচক্রে দুনিয়াজুড়ে গ্লোবালাইজেশনও যাত্রা শুরু করে ওই আশির দশক থেকে।

    ফলে এ থেকে পড়ে পাওয়া সুবিধাও চীন উপযুক্ত সময়ে কাজে লাগিয়ে ফেলতে পেরেছিল। মূল কথা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবালাইজেশন যে একই সময়ে শুরু হয়েছে আর সেই একই সময়ে চীন নিজেকে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডার শৃঙ্খলে প্রবেশের জন্য প্রস্তুতি শেষ করতে পেরেছিল – এই দুই ঘটনার সমপাতিত হওয়া এক কাকতলীয় ঘটনা মাত্র। চীনের প্রস্তুতি সম্পন্ন একই সময়ে হওয়াটা পরিকল্পিত মনে করা  – এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই, এমন ধারণা ভুল হবে। অথবা চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করে দেয়াটাই আবার গ্লোবালাইজেশনও নয়।

    গ্লোবাল কর্মসূচি গ্লোবালাইজেশন, এর শুরু আর চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করার কাজ শেষ করা একই সময়ে ঘটেছে, এতটুকুই। ফলে এটা কাকতলীয়। এমনকি গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা নিতে হবে এমন টার্গেট করেই চীন নিজেকে উন্মুক্ত করেছে এ কথাও সত্য নয়। কারণ মনে রাখতে হবে, চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করার মূল সিদ্ধান্ত মূলত ১৯৫৮ সালের; যখন দুনিয়াতে গ্লোবালাইজেশন এই গ্লোবাল কর্মসূচি বলে কোনো কিছু বাস্তবে ছিল না। এমনকি বাংলাদেশের বেলায়ও যেমন, ১৯৮২ সালে এরশাদের আগমন কেবল গ্লোবালাইজেশনের কারণে শুরু হচ্ছে বলে ঘটেছিল তা নয়। বিশ্বব্যাংকের দিক থেকে এরশাদের আগমন ঘটানোর উদ্দেশ্য ছিল দুটা কাজ করে ফেলা। সে সময়ের বাংলাদেশে তাদের দু’টি কর্মসূচি ছিল যা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের দিক থেকে কোনো সম্ভাব্য বাধা না আসতে দিয়ে বাস্তবায়ন করে ফেলা। সে কর্মসূচির একটা হল – রফতানিমুখী অর্থনীতি (এটাই গ্লোবালাইজেশন কর্মসূচি) করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানো। আর অন্যটা রাষ্ট্র-প্রশাসনিক সংস্কার (স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট বা Structural Adjustment)। এ দুটোকে আমরা যেন মিশিয়ে না ফেলি। কেবল  প্রশাসনিক সংস্কারের কর্মসুচির দিক থেকে জরুরি মনে করেছিল বিশ্বব্যাংক বলে জিয়ার বদলে এরশাদকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল।

    তবে চীনা গবেষকের কথা সঠিক যে, ভারতের বেলায় বলা যায় গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা সে নিতে অনেক দেরি করেছে। গ্লোবালাইজেশনের মূল কথাই হল – ভিন দেশে রফতানি করব। এতে আপনা থেকেই এর আরেক যে সোজা মানে হয়ে গেল তা হল, অন্যকেও নিজের বাজারে প্রবেশ করতে দিবো। আমাদের মতো দেশের বেলায়, অন্যকে প্রবেশ করতে দিলে তবেই আমার অন্যের বাজারে প্রবেশ পাওয়া যেতে পারে। ভারতে রাজীব গান্ধির আমলে (১৯৮৪-৮৯) গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা নিতে সংস্কারের কাজ নীতি-পলিসি বদলানো শুরু হলেও এটা তেমন কোন গতি পায়নি। সেটা কিছুটা পেয়েছিল পরের নরসীমা রাওয়ের আমলে (১৯৯১-০৬) মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী হলে। কিন্তু সেটাও বড় প্রভাবের ফলাফল আনতে পারেনি। কারণ শুরু থেকেই কোথায় কোথায় নিজেকে উন্মুক্ত করবে এর বাছবিচার সঠিকভাবে না করে বরং সব খাতেই বাইরের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করেছিল। চীনা গবেষকের ভাষায় যেটাকে তিনি আদতে নিজেকে “সার্ভিস সেক্টর করে হাজির করা” বলছেন। এই ব্যাপারটাকেই সার কথায় চীনের সাথে তুলনায় ভারত গ্লোবালাইজেশনের সুবিধার কিছুই নিতে পারেনি বলছেন। অবশ্য গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশের দিক থেকে, এমনিতেই ভারত চীনের চেয়ে কমপক্ষে দশ বছরের লেট কামার।

    তবে ভারত একবারই কিছু সুবিধা নিতে পেরেছিল ২০০৪-০৯ এই সময়কালে, মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম সরকারের আমলে। বিদেশী বিনিয়োগ এসেছিল ঠিকই। কিন্তু আগে বলে না দিয়ে পরে, পেছনের তারিখ থেকে ট্যাক্স দিতে হবে, বলে আইন বানিয়ে এবার ট্যাক্স দাবি করাতে বিদেশী বিনিয়োগ ভেগে যায়। আর আদালতে কেউ কেউ ট্যাক্স ইস্যুতে মামলা করলে সব মামলাতেই সরকার হেরে যায়। এভাবেই মোদির আগের সরকারগুলোর বাজে সব অভিজ্ঞতা। বরং পরবর্তীতে গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা যতটুকু যা ভারত পেয়েছে তা নিজ সক্ষমতার জোরে নয়, আমেরিকার “চীন ঠেকানোর কর্মসূচিতে” ভারতের সাগরেদ-খেদমতগার হতে রাজি হওয়ার বিনিময়ে পাওয়া সব রফতানি সুবিধা সেগুলো। যেগুলো আবার ট্রাম্পের আমলে আমেরিকার দিক থেকে সব কেড়ে নেয়া হয়েছে। এ কারণে আসলে গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা পাওয়া বা নেয়ার দিক থেকে চীনের সাথে ভারতের অবস্থা তুলনীয়ই নয়। মানে সমতুল্য নয়।

    তবে চীনা গবেষকও ‘শ্রমমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানো যাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান’ ঘটানোর যে ধারণাটা রেখেছেন সেটাও ভুয়া। অর্থাৎ শ্রমঘন মানে ইচ্ছা করে অনেক শ্রম লাগে এমন শিল্প গড়তে হবে বেশি বেশি করে – এই ধারণাটা অবাস্তব। কারণ, পরিকল্পনা করে চাইলেই বেশি শ্রম লাগানো যায় না। আসলে আপনি কেমন শ্রমঘন শিল্প করবেন সেটার মূল নির্ধারক শ্রমের ন্যূনতম মূল্য কেমন এর ওপর।

    যেমন ধরেন হাউজিং ব্যবসায় একটা বাড়ি বানাতে বেশি শ্রম লাগিয়ে বাড়ি বানাবেন নাকি তুলনায় কম-শ্রম (কিন্তু বেশি টেকনোলজি দিয়ে সেটা পূরণ) এভাবে বাড়িটা বানাবেন? এটা পুরোটাই নির্ভর করে ঐ দেশে সে সময় শ্রমের ন্যূনতম মূল্য কত- এর ওপর। যেমন, একটা হবু বাড়ির চারতালায় ইট ও কাঁচামাল ইত্যাদি বয়ে নিয়ে যেতে হবে। এখন এটা কী কপিকল যন্ত্র লাগিয়ে করবেন নাকি শ্রমিক মাথায় করে ইট বয়ে নিয়ে যাবে এভাবে করবেন – সেটা নির্ভর করে হাউজিং ব্যবসায়ী এখানে হিসাব করবেন কোনোটা সস্তা পড়বে সেই ভিত্তিতে। এই কাজে মেশিনের চেয়ে ম্যানুয়েল বা মানুষের শ্রম যদি সস্তা হয়, মানুষের শ্রম যতক্ষণ মেশিনের চেয়ে তুলনায় সস্তা প্রডাক্ট দেবে ততক্ষণ কপিকলের বদলে শ্রমিক মাথায় করে ইট বইবে। শ্রমঘন হবে! মানে হল, তথাকথিত ‘শ্রমঘন শিল্পের’ রাজত্ব ততক্ষণ চলবে। এমনকি এই ব্যাপারটা ঈঊ সময়ে টেকনোলজি পাওয়া না পাওয়ারও নয়। যেমন শ্রমের বিকল্প কোনো টেকনোলজি বাজারে পাওয়া গেলেও তা ব্যবহার হবে না, ব্যবহারকারী তা কিনবে না যদি ওর বিকল্প হিসেবে মানুষের শ্রমের প্রডাক্ট বা ফলাফল তখনও ওর চেয়ে সস্তা হয়।

    ফলে শুরুর দিকে কোনো অর্থনীতি শ্রমঘন শিল্প করে গড়ার পরিকল্পনা করে করতে হয় – বেশি বেশি কাজ সৃষ্টির জন্য, বেকার কমানোর জন্য – এটাও একটা ভুয়া কথা। এগুলা পেটি-কমিউনিস্টদের অবাস্তব ও আবেগী কথা। তবে শুরুর দিকে শ্রম সস্তা যত দিন থাকে তত দিন ওই সস্তা শ্রমের লোভে, মেশিনের চেয়ে ওই শ্রম সস্তা যত দিন থাকে তত দিন বেশি ‘শ্রমঘন শিল্প’ হতে দেখা যায়। ফলে চাইলেও শ্রমঘন শিল্পই আবার ধরে রাখা যায় না। যেমন- চীন এখন নিজের অভ্যন্তরীণ চাহিদার গার্মেন্ট আর নিজে না করে ফ্যাক্টরি উঠিয়ে দিচ্ছে, আমদানির দিকে ঝুঁকছে। কারণ, ন্যূনতম মজুরি অনেক উপরে উঠে গেছে। বাংলাদেশ থেকে আনলে এখন ওটা সস্তা।

    শেষ কথাঃ বিপুল জনসংখ্যা অর্থনীতির জন্য একটা সম্পদ অবশ্যই। কিন্তু এটাই আবার বিরাট লায়াবিলিটি হয়ে যেতে পারে যদি অবকাঠামো বিনিয়োগ ও সরাসরি বিনিয়োগ আনা, কাজ সৃষ্টি, দক্ষ প্রশাসন, দক্ষ নীতি সুবিধা, সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সার্ভিস ব্যবস্থা ইত্যাদি দিকগুলোতে – এককথায় কাজ সৃষ্টিতে সরকারের বড় বড় গাফিলতি থাকে।  বিপুল জনসংখ্যা তখন অর্থনীতির জন্য একটা বিরাট দায়, একটা লায়াবিলিটি হয়ে উঠতে পারে।

    তাহলে চীনা গবেষক আসলে মনে করিয়ে দিয়েছেন ভারতের আসন্ন দুর্বল জায়গা কোনটা বাড়ছে। এটা বিরাট স্ট্র্যাটেজিক দুর্বলতা হয়ে উঠবে।  কারণ মোদির দলবাজি আর হিন্দুত্বের হাতে ভারতের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো ইদানিং ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। কারণ মোদী সেগুলো আমাদের রাষ্ট্রের মত সবখানের নির্বাহী হস্তক্ষেপ শুরু করছে – কেন্দ্রীয় ব্যাংক, তদন্ত প্রতিষ্ঠানসহ সবখানে। ভারত কী হিন্দুত্বের রাজনীতি দিয়ে অথবা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করে দিয়ে – বিপুল সম্ভাবনার জনসংখ্যাকে সফলতায় রুপান্তরিত করতে পারবে; নাকি উলটা সব লেজে গোবরে করে বিপুল জনসংখ্যাই এক দায় হয়ে উঠবে? এসব বিষয়গুলোরই ফয়সালার হবে ভারতের আসন্ন নির্বাচনে। খুব সম্ভবত বিরাট সব হতাশা অপেক্ষা করছে ভারতের জন্য।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৮ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ইতি জনসংখ্যার নেতি হওয়া“  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস কী তৃতীয়পক্ষের নাগালে

     

    চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস কী তৃতীয়পক্ষের নাগালে

    গৌতম দাস

    ১৫ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০৩

    https://wp.me/p1sCvy-2uW

    ইমরান খান ও শি জিনপিং – ছবি : সংগ্রহ

    পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কেমন? মানে সম্পর্ক বলতে ভেঙ্গে বললে, স্ট্রাটেজিক, ইকোনমিক বা পলিটিক্যাল সম্পর্ক কেমন, এই হল প্রশ্নটা। কোন দুই রাষ্ট্র তা ঘোষণা দিয়ে বললে  স্বভাবতই তা বুঝতে সহজ হয়। তবে না বললেও আন্দাজ অনুমান করে অনেক কিছুই প্রায় সঠিক জানা যায়। আসলে আমেরিকা এবং বিশেষ করে ভারতের সবচেয়ে গভীর আগ্রহ হল, স্ট্রাটেজিক দিক থেকে পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কী – তা জেনে ফেলার। ভারতের এই আগ্রহের তীব্রতা টের পাওয়া যায়, তাদের সব মিডিয়ায় ব্যবহৃত একটা শব্দ থেকে। সেটা হল, “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” (all weather friend); যেমন তারা খোঁচা দেওয়া মন্তব্য হিসাবে প্রায়ই লিখে থাকে যে – চীনের “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” পাকিস্তান ওমুকটা করতে যাচ্ছে……। তবে “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” লেখাটা যতটা না খোঁচা দিয়ে বলা এর চেয়ে বেশি এটা আসলে এক ঈর্ষামূলক আক্ষেপ। “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” মানে যারা খারাপ বা ভাল যে কোন পরিস্থিতিতেই বন্ধুই থেকে যায়। এছাড়াও আর একটা বিষয় হল, সাধারণভাবে স্ট্রাটেজিক দিক থেকে পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কী তা জানাবুঝা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট করে “চীন-পাকিস্তান করিডোর প্রকল্পের” [CPEC projects] পিছনে স্ট্রাটেজিক বিষয়াদি কী লুকানো আছেও তা জানতে ভারত ও আমেরিকা বিশেষভাবে আগ্রহী।

    পাকিস্তানে ইমরান খানের সরকার এ’এক নতুন ধরনের ক্ষমতা। আমাদের আগের দেখা বা পুরনো অভিজ্ঞতায় যেসব ধারণা আছে তা থেকে এটা একেবারেই ভিন্ন। আমাদের মত রাষ্ট্র মাত্রই, আমরা সাধারণত দেখি এক বিশেষ কোটারি অথবা ব্যক্তিস্বার্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট ও দুর্নীতি সেখানে ঘটবেই। এটা গেল এক দিক আর অন্য দিকে থাকবে ঐ গোষ্ঠী নিজেদের কোটারি কোনো লাভালাভের লোভে বিদেশী কোনো স্বার্থের পক্ষে কাজ করবে। এগুলোই আমাদের মত প্রায় সব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই মুখস্তের মত আমরা দেখতে অভ্যস্ত। এই অবস্থায় পাকিস্তানের ইমরানের আগমন অন্তত এই অর্থে নতুন যে, এই ক্ষমতা আমাদের দেখা বা জানা থেকে একেবারেই ভিন্ন। এখানে অনেক কিছুই আমরা ভিন্ন দেখব, তা অনেকেই আশা করে।

    কিন্তু কতটুকু নতুন বা ভিন্ন? সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে পাকিস্তানের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে চোখ ফিরানো দরকার। সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, পাকিস্তান পাকিস্তানের জন্য কাজ বা পদক্ষেপ নিতে পারে না। অন্তত পারেনি। পাকিস্তান আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করে এসেছে সেই ১৯৭৯ সাল থেকে, যে ধরনের যুদ্ধকে আমরা ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ বলি। মানে অন্যের স্বার্থে তার যুদ্ধের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে সেই যুদ্ধ করে দেওয়া বা নিজে ব্যবহৃত হয়ে যাওয়া। যেখানে সাধারণভাবে  প্রক্সি মানে হল, স্কুলের ক্লাসরুমে নাম ডাকার সময় অনুপস্থিত বন্ধুর হয়ে “উপস্থিত” বলার মত। আমেরিকার হয়ে পাকিস্তানের প্রক্সি যুদ্ধ খেটে দেওয়া – এবিষয়ে আদি গ্লোবাল ঐতিহাসিক ঘটনা বা শুরুর ঘটনাটা হল, ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব হওয়া, আর তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনস্ত মধ্য এশিয়ায় এই বিপ্লবের প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে এই ভয় পেয়ে  সোভিয়েত ইউনিয়নের (বাফার গড়তে) আফগানিস্তান দখল করা; আর এবার তা ঠেকাতে বা উল্টে দিতে আমেরিকা, পাকিস্তানকে দিয়ে এর বিরুদ্ধে নিজের প্রক্সি যুদ্ধ শুরু করা – মানে মোজাহিদিন লড়াই শুরু করা – এটা ছিল প্রথম পর্ব। আর এরই লেজ ধরে দ্বিতীয় পর্বে, আলকায়েদা-তালেবান বনাম আমেরিকার ওয়ার-অন টেরর যুদ্ধে এরই ময়দান হিসেবে পাকিস্তানের ব্যবহৃত হওয়া, যুদ্ধে ঝাপায় পড়ার পাটাতন হিসাবে আমেরিকাকে পাকিস্তানের ভুমি ব্যবহার করতে দিয়ে নিজে আমেরিকার যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া।

    ফলে এই দুই ইস্যুতে গত ৩৮ বছর ধরে পাকিস্তান অন্যের হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। না এটা অবশ্যই পাকিস্তানের স্বেচ্ছায় করা কাজ নয়। এছাড়া এর মধ্যে তা যতটা না নিজ স্বার্থে এর চেয়ে অনেক গুণ বেশি আমেরিকান স্বার্থে আর আমেরিকার চাপের বাধ্যবাধকতায় পাকিস্তান করেছে। এই অবস্থা বিবেচনায় নিলে বলতেই হবে যে পাকিস্তান আর আমাদের মত এক আম- রাষ্ট্রের মতো থাকেনি। এ এক বিরাট ব্যতিক্রমী, বিশেষ রাষ্ট্র হয়ে গেছে। যে নিজের স্বার্থ না থাকলেও আমেরকান স্বার্থে নিজেকে ব্যবহৃত হতে দিয়েই শেষ হয় নাই। এরপর আবার আমেরিকাই অভিযোগ তুলেছে পাকিস্তান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। এই বিচারে পাকিস্তান আমাদের মত একই পাল্লায় তুলনাযোগ্য রাষ্ট্র কি না সেই প্রশ্ন অনেকে তুলতে পারেন। তবে এই আলোকেই সার কথাটা হল, গত ৩৮ বছরে পাকিস্তান পাকিস্তানের জন্য, নিজের জন্য রাষ্ট্র থাকেনি, কাজ করেনি।

    কিন্তু ওদিকে আরেক সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটা হল, পাকিস্তান নিয়ে যেকোনো আলোচনার সময় বেশির ভাগ মানুষ পাকিস্তান রাষ্ট্রের যেকোন সিদ্ধান্ত যে পাকিস্তানের নয় – এই প্রক্সি-খেটে বেড়ানো, বিশেষ করে আমেরিকান স্বার্থের দায়ের বাধ্যবাধকতায় চলে বেড়ানো, সে কথা মনে রাখে না। মনে রেখে কথা বলে না। পাকিস্তান যেন স্বাধীন – এই অনুমান ধরে নিয়ে এরপর পাকিস্তানের সমালোচনা ও মূল্যায়ন শুরু করেন। সবচেয়ে তামাশার কথা হল, বুশের আমল থেকে পরের সব আমেরিকান প্রশাসন পাকিস্তানের যেকোনো সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ যে আমেরিকারই স্বার্থে প্রক্সি পদক্ষেপ সে কথা স্বীকার না করে, দায় না নিয়ে উল্টো পাকিস্তানের সমালোচনা করে থাকেন।

    তবু এগুলোও মূল বিষয় নয়, আরো দিক আছে। তা হল, প্রক্সি যুদ্ধের এই কালের  পাকিস্তানের অপর দুটা রাজনৈতিক দল,  নওয়াজ শরীফের পিএমএল (PML-N) আর ভুট্টো পরিবারের পিপিপির (PPP) ভূমিকা। তারা এই প্রক্সি যুদ্ধের পাকিস্তান পরিস্থিতিতে নিজেরা যে ন্যক্কারজনক ভূমিকা নিয়েছে তা হল – যেহেতু আমেরিকান ইচ্ছা, চাহিদা বা সিদ্ধা্নতের পক্ষে থাকা তাদের আমলের সরকারের পক্ষে এড়ানো বা ভিন্ন কিছু করা সম্ভব নয়, তাই ক্ষমতায় থেকে চুরি আর লুটপাটের বন্যা বইয়ে দেয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ – কারণ আমেরিকানদের খেদমতে খেটে যাবার করার কারণে ক্ষমতা তো নিশ্চিত! আর তাতে দায় দোষারোপ সব আমেরিকার ওপর দেয়া যাবে। এই দুই দল এখান থেকে পাকিস্তানকে দেখেছে – আর এটাই পাকিস্তানের দুরবস্থায় সবকিছুর উপরে দুর্ভাগ্যের দিক। এ কারণে আজ পাকিস্তানের ক্ষমতার করিডোরের আলাপে এক চালু হিসাব হল, নওয়াজ অর্থ লোপাট করে বিদেশে রেখেছে দুই বিলিয়ন ডলার, আর ভুট্টো পরিবার রেখেছে এক বিলিয়ন ডলার।

    এভাবে পাকিস্তানের অর্থনীতি ফোকলা অবস্থায়। পাকিস্তানের নির্বাচনে ইমরান এবার ক্ষমতায় এসেছেন। লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট স্বাক্ষ্য দিয়ে, ডাটা ও গ্রাফ এঁকে দিয়ে বুঝিয়ে, বলছে পাকিস্তানের চরম খারাপ অর্থনৈতিক দুরাবস্থার জন্য ইমরান দায়ী নয়। আগের সরকার নওয়াজ শরীফ দায়ী। [The economy’s troubles are not Mr Khan’s fault.]   তবে বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের দেউলিয়া এই অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে এখন ১৩ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। পাকিস্তান রুপির ডলার বিনিময় মূল্যমান গত এক বছরে ৯১ থেকে নেমে এখন ১৩৪ রুপিতে ঠেকেছে। কথাগুলো বলা হচ্ছে এ জন্য যে, ইমরানের ক্ষমতার শপথের পরের প্রথম মাস তার কেটেছে সৌদি, চীন নাকি আইএমএফ  – কার কাছ থেকে নুন্যতম ঋণ-মুক্তির অর্থ বা “বেল আউট”-এর অর্থ পেতে পারে সেই খোঁজাখুঁজিতে। সৌদিদের উপর প্রবল ভরসা করে ইমরান নিজেই প্রথম সফর হিসাবে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। কিন্তু তারা ঋণ দেওয়ার বদলে, CPEC projects এ বিনিয়োগের শেয়ার নিতে স্বেচ্ছায় এক পালটা প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ইমরানের বিবেচনায় সঠিকভাবেই এই প্রস্তাব কার্যকর করতে গেলে চীনের সাথে পাকিস্তানের  সম্পর্কে খামোখা নতুন জটিলতা দেখা দিতে পারে। কারণ সৌদি প্রস্তাবে একমত হতে চীনকেও বুঝাতে হবে, রাজি করাতে হবে ইত্যাদি অনেক ব্যাপার আছে। তাই সৌদি প্রস্তাব ফেলে রাখা ছাড়া ইমরান উপায় দেখেন নাই।  

    ইতোমধ্যে সর্বশেষ খবর হল, শেষমেশে, ইমরানের সিদ্ধান্ত – পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে আইএমএফের কাছে সাত বিলিয়ন ডলারের বেল আউট ঋণ চেয়ে আবেদন পেশ করেছে। আনুষ্ঠানিক ভাষায়, এটা পাকিস্তানের “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতি” মিটানোর ঋণ। 

    গ্লোবাল অর্থনীতির (Global Economic Order) দিক বিচারে এশিয়ায় এখন এটা মূলত চীন-আমেরিকার লড়াইয়ের যুগ চলছে; অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে পালাবদলে এটা আমেরিকার জায়গায় চীনের আগমন ও সেই স্থান দখলের কাল। এই লড়াইটা, আমেরিকার দিক থেকে এটা তার প্রভাব ও ক্ষমতার পতন যতদুর সম্ভব ঠেকানোর লড়াই। আর চীনের দিক থেকে নিজের প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়িয়ে নিজে উত্থান নিশ্চিত করার লড়াই। এ দিকে এই মূল লড়াইয়ে ক্রমশ হারু পার্টি আমেরিকা, একাজে বাড়তি সুবিধা পেতে  ভারতকে নিজের পক্ষে রাখার চেষ্টা করছে দেখা যায়। যদিও সবসময় আবার তা নিজ অন্য স্বার্থের দিকে তাকিয়ে সম্ভব করে তুলতে পারে না, সেকথাও সত্য।

    চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্প (China–Pakistan Economic Corridor বা CPEC projects) – মোট ৬২ বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প যা উত্তর দক্ষিণ বরাবর পাকিস্তানের বুক চিড়ে করাচির গোয়াদরের গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তানের সীমানা পেরিয়ে একেবারে চীনের জিনঝিয়াং (Xinjiang Uyghur Autonomous Region) উইঘুর প্রদেশের কাশগড় পর্যন্ত এক হাইওয়ে তৈরি হচ্ছে। তাই এই প্রকল্পটা আসলে চীনকেই পাকিস্তানের করিডোর দেয়া। অর্থাৎ পুরোটাই কেবল পাকিস্তানের স্বার্থে নেয়া কোনো অবকাঠামো প্রকল্প নয়। চীনের উইঘুর প্রদেশ ল্যান্ডলকড অঞ্চল; ফলে এর বধ্যদশা ঘুচাতে, অঞ্চলটাকে সমুদ্রপথেও যোগাযোগ করিয়ে দিতে, রাজনৈতিকভাবে উইঘুর মুসলমানদের মন-জয় করতে, তাদের পিছিয়ে থাকা দশা থেকে মুক্ত করতে  – চীন এটা নিজের জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প মনে করে।

    কিন্তু আমেরিকা (সাথে ভারতও) নিজেদের সন্দেহ ও স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থে চীন-পাকিস্তানের এই বাস্তব বৈষয়িক ঘনিষ্ঠতার চরমতম বিরোধিতা করে থাকে। পাকিস্তান আমেরিকার প্রভাবের হাত থেকে ছুটকারা পেয়ে যাচ্ছে এই প্রকল্পের মত তৎপরতার কারণে। ফলে এই প্রকল্প পুরোটাই আমেরিকান স্বার্থের বিরোধী বলে এরা দেখে। কিন্তু ওদিকে আমেরিকা ও ভারতের জন্য আর এক চরম অস্বস্তিকর একটা ফ্যাক্টস হল, করিডোর প্রকল্প পাকিস্তানের মূল চার প্রদেশকে এক সাথে এক জায়গায় এনেছে। এই প্রকল্প পাকিস্তানের সব প্রদেশের ওপর দিয়ে গেছে, তাই এটা কেবল কেন্দ্রের নয় পাকিস্তানের সব প্রাদেশিক সরকারও স্বাধীনভাবে নিজের স্বার্থের দিক থেকে এই প্রকল্পকে  অনুমোদন করে স্ব স্ব প্রাদেশিক পার্লামেন্টেও সিদ্ধান্ত পাশ করেছে। এমনকি বেলুচিস্তান যেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আছে তাদেরও কোনো পক্ষই এই প্রকল্পের ঠিক বিরোধী নয়।

    এসব কিছুর মূল কারণ সব প্রদেশের জনগণও এই প্রকল্পকে দেখে থাকে এক হাইওয়ে ধরে রপ্তানিতে গভীর সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানোর সুযোগ, এতে রপ্তানি বাণিজ্যে সক্রিয় হতে নিজ নিজ প্রাদেশিক স্বার্থেও বিকশিত হওয়ার জন্য এই প্রকল্পকে বিরাট নিয়ামতের মত মনে করে। ফলে চার প্রদেশ অন্তত একটা ইস্যুতে পুরো পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। আবার চীনেরও স্বার্থে এই অবকাঠামো প্রকল্প ব্যবহৃত হবে বলে এর অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি নিশ্চিত করার দায়ভার এবং এর ঋণ পরিশোধের দায়ভার পাকিস্তানের সাথে চীনেরও। কিন্তু এসব বিষয়গুলো কিভাবে পারস্পরিক চুক্তিতে লেখা আছে – সেটা বিলিয়ন ডলারের এক কৌতূহল আমেরিকার (সাথে ভারতেরও) কাছে। তাদের গভীর অনুমান যে চীন-পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক সামরিক বোঝাবুঝি এই চুক্তির মধ্যে প্রতিফলিত থাকবে।

    আসলে অর্থনৈতিক স্বার্থ মানেই সাথে জড়ানো থাকে সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থঃ
    এই প্রকল্পের শিরোনামেই বলা আছে এটা “অর্থনৈতিক” প্রকল্প। অর্থাৎ এটা কোন সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থে নেয়া যুদ্ধ করার প্রকল্প নয়। তবুও তাতে কিছু এসে যায় না। কারণ শতভাগ যেকোন অর্থনৈতিক প্রকল্পেও ওর নিরাপত্তার দিক থাকবেই; ফলে সেই সুত্রে ওর সামরিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থের দিকও থাকেই, তা আলাদা করা যায় না। এই ব্যাপারটা আমেরিকা বা ভারতের বেলায়ও সমান সত্য। যখন চীন অর্থনৈতিক ভাবে কেবল জাগতে শুরু করছে কেবল, সেই ২০০৮ সালের একটা ঘটনা হল – মার্কিন কংগ্রেসের ফরেন এফেয়ার হাউজ কমিটির সামনে এক মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হায়ার করে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের আলোচনায় চীন উত্থানের প্রভাব কী এনিয়ে মুল্যায়ন রিপোর্ট করিয়ে নেয়া হয়েছিল। এরপর সেই প্রফেসরকে কংগ্রেস কমিটিতে শপথ করিয়ে যেমন জেরার শুনানি চলে তা চলেছিল। যেখানে প্রফেসর স্বাক্ষ্য দিয়ে বলেছিল চীনের অর্থনীতিতে বাধা সৃষ্টি করে একে ডুবিয়ে দিবার উপায় কী। চীনে জ্বালানি তেল আনা আর রপ্তানি পণ্য পাঠানোর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথে, চোকিং পয়েন্ট মানে ঠুটিই চিপে শ্বাস রুদ্ধ করে ধরা সম্ভব এমন এক চিকন হয়ে পড়া নৌচলাচল পথের অংশ আছে, (Strait of Malacca বা বাংলায় মালাক্কা প্রণালী নামে) মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার মাঝে। যা চিপে ধরলে মানে এই ৯০০ কিমি চিকন হয়ে থাকা নৌপথে – ইচ্ছা করে কোন জাহাজ ডুবিয়ে নৌচলাচল ব্লক করে দিলেই চীনের অর্থনীতি ডুবিয়ে দিতে আমেরিকাকে আর যুদ্ধ করতে লাগবে না। এই ছিল ঐ প্রফেসরের যুক্তি ও পরামর্শ। এখন আমেরিকান সিনেট যদি চীনের ক্ষতি  করতে এই আলাপ করতে পারে তাহলে চীন পালটা তার দুর্বল জায়গা – ঐ মালাক্কা প্রণালীর অনেক অনেক বিকল্প তৈরি করে রাখবে না কেন?  আর চীন তা করলেই, “চীন অর্থনীতির সাথে সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থ” মিলিয়ে ফেলছে –  আমেরিকা ও ভারতের এই ভুয়া চিৎকার অর্থহীন।  ফলে পাকিস্তানের গোয়াদর অথবা শ্রীলঙ্কার হাম্বানতোতায় [এমন কি হবু বাংলাদেশের সোনাদিয়ায়ও আর একটা ] গভীর সমুদ্র বন্দর বানিয়ে তা ব্যবহার করে – চীন মালাক্কা প্রনালীর বিকল্প ব্যবস্থায় বাণিজ্যিক পণ্য চলাচলের উপায় করে নিবে – এটাই কী সবচেয়ে স্বাভাবিক নয়? এই অবস্থায় চীন গভীর সমুদ্র বন্দর বানিয়ে কেবল “ভারতকে মুক্তা মালার মত ঘিরে ফেলতেছে”, তাই ভারতের হাসিনাকে চাপ দিয়ে  বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় আর একটা বন্দর করা ঠেকিয়ে রাখতে হবে – এসব বক্তব্য কোন এক পেত্নির নাকি-কান্না ছাড়া আর কী? তাহলে সারকথা, কোন অর্থনৈতিক প্রকল্প যত বড় হবে তাতে উল্লেখ করা থাক আর না থাক, ওর সাথে সাথে এক সামরিক -স্ট্রাটেজিক স্বার্থ জড়িয়ে থাকা ততই বেশি সম্ভাবনা তৈরি হবে। সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোন (৫ থেকে ৬২ বিলিয়ন ডলারের) বড় বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রকল্প কোন রাষ্ট্র কেন নিবে? বরং নিতেই পারে না।

    কিন্তু প্রশ্ন এত দূরে কেন উঠছে? কারণ, পাকিস্তান ঋণের জন্য আইএমএফের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদনের পরে এখন আইএমএফ টিমের চলতি সপ্তাহেই পাকিস্তান সফর এবং মূল্যায়নে বসা নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে খবর হল, পাকিস্তান সফর করছে এমন আইএমএফের টিম বলেছে, তাদেরকে CPEC করিডোর প্রকল্পও ক্ষতিয়ে দেখতে হবে যাতে তারা বুঝতে পারে, পরিষ্কার ধারণা পেতে পারে যে পাকিস্তানকে ঋণ দেয়া আইএমএফের জন্য কতটা রিস্ক বা দায় নেয়া হয়ে উঠতে পারে। যদিও পাকিস্তান এই আবেদন প্রত্যাখান করেছে। কিন্তু ভারতের মিডিয়া প্রবল আগ্রহ তৈরি করেছে যে এইবার “আঙ্কেল স্যাম” তাদেরকে CPEC করিডোর চুক্তির হদিশ পাইয়ে দিবেই।

    এখানেই হল আসল ইস্যু। আগেই বলেছি, আমেরিকার (সাথে ভারতও) কাছে তাদের অনুমান হল, চীন-পাকিস্তানের ওই প্রকল্পের চুক্তিতে চীন-পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক সামরিক বোঝাবুঝি কী আছে তা এই চুক্তির মধ্যে প্রতিফলিত থাকবে। তাই তাদের প্রবল কৌতূহল ওই চুক্তিতে কী আছে তা জানার।

    এখন আইএমএফকে দিয়ে চুক্তির “স্টাটেজিক তথ্যের দিক হাতিয়ে”  আমেরিকা কি তার সেই প্রবল আগ্রহ আর কৌতূহল মিটিয়ে নিতে পারবে?
    আমরা স্মরণ করতে পারি, ইমরান খান সরকারের শপথ নেয়ার মুহূর্তে পাকিস্তানের লোন প্রসঙ্গ উঠতেই আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেই হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠেছিলেন, “আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়ে চীনের ঋণের দায় শোধ করা যাবে না”। [Pompeo warns against IMF bailout that pays off Chinese lenders]। এটা অবশ্যই আমেরিকার কোন বুদ্ধিমান মন্তব্য ছিল না। ছিল, ডুবে যাচ্ছে এমন মরিয়া এক আমেরিকান আস্ফালন।

    তাই মনে করার কারণ আছে যে, আইএমএফের প্রেসিডেন্ট লাগার্দের (Christine Lagarde) কথিত এখনকার মন্তব্য যে আমাদেরকে “CPEC করিডোর প্রকল্পও ক্ষতিয়ে দেখতে হবে” [যদিও কোন মিডিয়াই লাগার্ডে বা আইএমএফের কোন কর্ককর্তার সরাসরি বরাতে একথা বলতে পারে নাই। সবাই “সোর্স বলেছে” বলে লিখেছে। ] এটা আগের পম্পেই হুঙ্কারেরই নরম ও কারেক্ট ভার্সন। এখন দেখার বিষয় চীন-পাকিস্তান করিডোর চুক্তি পুরোটাই বা অংশ ওপেন না করেও পাকিস্তান আইএমএফের ঋণ হাসিল করতে পারে কি না!

    তবে ভারত ও আমেরিকার দুটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা এখানে আলাদা করা দরকার। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণ কী, চীনা CPEC করিডোর প্রকল্পের ঋণ? এপর্যন্ত কোন দেশি বা বিদেশি মিডিয়া রিপোর্ট এই দাবি করেছে এমন দেখা যায় নাই। কিন্তু সকলেই এমন একটা অস্পষ্ট ইঙ্গিত করার চেষ্টা করে থাকে। ইমরানের পাকিস্তান সরকার এবিষয়ে নিজেই কিছু ফ্যাক্টস প্রকাশ করে এমন ইঙ্গিত ও প্রপাগান্ডাকে নস্যাতে উড়িয়ে দিয়েছে।  ইমরানের সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় – তারা বলেছে, “The CPEC deals are open and transparent,” said Noor Ahmad, a spokesman for the Ministry of Finance.

    এছাড়া জানিয়েছে, পাকিস্তানের এপর্যন্ত প্রাপ্ত মোট বিদেশি ঋণ ৯৫ বিলিয়ন ডলারের, যার মধ্যে মাত্র ৬ বিলিয়ন বা ৬.৩% হল CPEC করিডোর প্রকল্পের ঋণ। [Pakistan has already brushed aside criticism on growing indebtedness of the country due to CPEC, saying the share of the CPEC loans was only $6 billion or 6.3% in total outstanding external debt of $95 billion as of end June this year.]  আর দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা হল, আইএমএফ এবারই প্নরথম নয় আগেও (২০১৪) করিডর প্রকল্পের এক মুল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি করেছিল। করিডোর প্রকল্পের কোঅর্ডিনেটর এটা জানিয়েছেন। সেই রিপোর্ট অনুসা্রে, আইএমএফ লিখেছিল,  [The IMF report has then stated that the CPEC infrastructure and transport projects are financed by long-term concessional government borrowing from China.]  অর্থাৎ  এই প্রকল্প চীনের স্বল্প সুদে (concessional) দেয়া ঋণ” বলে মনে করেছে আইএমএফ। বিশ্বব্যাংকের ভাষায় “কনসেশনাল” ঋণ মানে হল  –  (১% এর কম,) ০.৭৫% বাৎসরিক সুদ, চল্লিশ বছরে শোধ করতে হবে তবে প্রথম দশ বছর কোন কিস্তি দিতে হবে না, মাফ পাবে। এখানে “কনসেশনাল” ঋণ মানে সুনির্দিষ্ট করে কী বুঝানো হয়েছে তা জানা যাচ্ছে না। এছাড়া ঐ রিপোর্টে আর একটা মন্তব্য আছে, CPEC-related outflows would peak at about $3.5 billion to $4.5 billion per annum by fiscal year 2024-25. – মানে ঋণ শোধের দায় সবচেয়ে চড়া হয়ে উঠবে ২০২৪-২৫ সালে, যখন বছরে প্রায় চার বিলিয়ন করে কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ তখন এটা পাকিস্তানের জন্য কঠিন হতে পারে। এই বিষয়গুলো পাকিস্তানের ট্রিবিউন পত্রিকার রিপোর্ট। কাজেই আমেরিকা ও ভারতের ভুয়া ক্যাম্পেইনের পাল্লায় পড়া থেকে এবার সকলে সাবধান। 

    দুনিয়ার জন্য বর্তমানে এক ইউনিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যখন চীনের উত্থান ঘটেইনি সেই পরিস্থিতি মানে, যখন দুনিয়াতে আমাদের মতো রাষ্ট্রের কোনো ঋণ পাওয়ার একমাত্র উৎস ছিল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। সেসব দিন পেরিয়ে, এখন চীন উত্থিত ও বিকল্প হিসেবে আবির্ভাবের একালে দুনিয়াকে নতুনভাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককেও  আমল করতে হচ্ছে। কারণ এখন আর সে একক ঋণদাতা নয়। শুধু তাই নয়, আইএমএফ যদি প্রফেশনাল প্রতিষ্ঠানের মত না হয়ে আমেরিকান বিদেশনীতির ভাঁড় হয়ে থাকতে চায়, ঐ বিদেশনীতি সরাসরি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হয়ে থাকতে চায় তবে এই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানও একদিন আমেরিকার সাথে শুকিয়ে ছোট হয়ে যাবে – সেটাও আশা করি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের আমল করে চলে, আমরা দেখতে পাব!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ অক্টোবর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস জানা“  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

  • ট্রাম্প-কিম বৈঠক, দুনিয়ায় আসন্ন বদলের ইঙ্গিত!

    ট্রাম্প-কিম বৈঠক, দুনিয়ায় আসন্ন বদলের ইঙ্গিত!

    গৌতম দাস

    ১৪ জুন ২০১৮, ০০:০১

    https://wp.me/p1sCvy-2sc

     

     

    আগামি দুনিয়ার বহু কিছুর নির্ধারক হবে এমন, সিঙ্গাপুরের এক বিশেষ ঘটনার দিকে গত ১২ জুন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। ঘটনাটা হল, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন – এদের মধ্যে সিঙ্গাপুরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইকোনমিস্ট (৭ জুন ২০১৮) পত্রিকার ভাষায়, [WHEN a great power promises a smaller country a “win-win” deal, diplomats mordantly joke, that means the great power plans to win twice.]  কোনো ক্ষমতাধর পরাশক্তি যখন কোনো তুলনামূলক ছোট রাষ্ট্রের সাথে বৈঠক থেকে ‘উইন-উইন’ (win-win) ফল আসবে বলে জানায়, মানে তাতে ‘উভয় পক্ষের জন্য জিত’ হবে বলে ঢোল পেটায়; তখন এটা নিয়ে কূটনীতিকেরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করেন। কারণ, তাদের জানেন এসব ক্ষেত্রে ওই উইন-উইন কথার আসল অর্থ কী! আদতে সেখানে বিষয়টা দু’জনেরই লাভালাভ ধরণের কিছু নয়, বরং কেবল একজন, পরাশক্তি অংশটার একারই দুইবার বিজয়। এটাই উইন-উইন কথার আসল অর্থ। কিন্তু ইকোনমিস্ট সাবধান করে বলছে, এবারের ঘটনাটা হবে ব্যতিক্রম। কেন?

    প্রথম কথা হল, ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র এখান থেকে কী পাওয়ার আশা করে? অথবা আরো গোড়ার প্রশ্ন, ট্রাম্প এমন বৈঠকে বসতে রাজি হলেন কেন? তার তাগিদ কি অনেক? কী সেই তাগিদ বা দুর্বলতা?

    এখানে ঘটনার পটভূমি খুবই পুরনো, সেই ১৯৫০-এর দশকের। অন্যভাবে বললে, সময়টা হল যখন থেকে সোভিয়েত কমিউনিস্টরা লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ ধারণা বা শব্দকে নিয়ে এবার আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে ডাকা বা গালি দেয়া শুরু করেছিল। কারণ এর আগে আমেরিকার হাতে দুনিয়ার নেতৃত্ব ও ক্ষমতা কোনোটাই ছিল না, তাই। ছিল ইউরোপের ব্রিটিশ বা ফ্রান্সের মতো কলোনি মাস্টারদের হাতে। অথবা এই বিচারে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মঞ্চে যখন দুনিয়ার নেতৃত্ব ও ক্ষমতার প্রথম এক পালাবদল মঞ্চস্থ হচ্ছিল, ইউরোপের কলোনি মাস্টারদের থেকে আমেরিকার হাতে। এরই ঠিক অপর পিঠের না হলেও অনুষঙ্গ ঘটনা হল, অবিভক্ত কোরিয়া আগে জাপানের কলোনি হয়ে ছিল আর সেবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জাপানের হাত থেকে কোরিয়া মুক্ত হয়েও এক স্বাধীন রাষ্ট্র হবে, নাকি আবার ইউরোপের কারও অধীনে নতুন করে চলে যাবে; তার ফয়সালা আসতে দেরি হচ্ছিল।

    আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্বপ্ন বা ইচ্ছা কোনোটাই ছিল না দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুনিয়ায় কাউকে নিজের কলোনি করে রাখায় অথবা অন্য কাউকে কলোনি করতে দিতে। বরং “নিজস্বার্থে কলোনি ব্যবস্থা উতখাত” এই মূল নীতিতে তিনি বিশ্বযুদ্ধের আমেরিকাকে পরিচালিত করেছিলেন। তাই ১৯৪৫ সালে সিটিং প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তাঁর হঠাৎ মৃত্যুতে পরের রুজভেল্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট, রুজভেল্টের ভাবশিষ্য এবং পরবর্তি (প্রায় আট বছরের) প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের নীতিও ছিল রুজভেল্টের নীতি ও এরই ধারাবাহিকতা। কিন্তু তাঁরও পরের নির্বাচনে বিজয়ী হিসাবে ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে পরের প্রেসিডেন্টের শপথ নেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেনাপতি আইসেনহাওয়ার। আর এতেই ঝুলে থাকা ট্রুম্যানের আমেরিকান নীতি বাস্তবে এতদিন যে দ্বিধা ও লিম্ব হয়ে ছিল যে, কলোনি-উত্তর পরিস্থিতিতে কোরিয়া কি আমেরিকার কলোনি হবে নাকি কমিউনিস্ট কোরিয়া হবে, এবার সেটা নির্ধারিত হয়ে যায়। নতুন পথে যাত্রা শুরু করে।
    রাষ্ট্রসংঘ জন্মের পরেপরে এর উদ্যোক্তা নেতা ছিল আমেরিকা। তার তা ছিল দুনিয়ার যে কোন বিবাদে মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা নেয়া ট্রুম্যানের আমেরিকা। এবার তা আইসেনহাওয়ার আমেরিকা হয়েই আর মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা নয়, এবার নিজেই একটা পক্ষ হয়ে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে সামরিক একশনে চলে যায়। আমেরিকা ১৯৫৩ সালে ‘কোরিয়া যুদ্ধ’ শুরু করেছিল। তবে এই যুদ্ধ লম্বা সময়ব্যাপী অমীমাংসিত হয়ে যেতে থাকায় শেষে এ থেকে বের হতে – কমিউনিস্ট কোরিয়া আর আমেরিকা প্রভাবিত কোরিয়া – এভাবে দুই রাষ্ট্রে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া হিসেবে এক আপসরফায় কোরিয়া ভাগ হয়ে যায়। সামনে উদাহরণও ছিল ১৯৪৯ সালে বিপ্লব করা মাওয়ের চীন।  চীনা বিপ্লবের শেষের দিকে সেখানেও মূল চীন থেকে দ্বীপাঞ্চল তাইওয়ানকে আলাদা রাষ্ট্র বলে ভাগ করে বিপ্লব বা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি করা হয়েছিল।

    আসলে পুরনো জাপানিজ কলোনি অবিভক্ত কোরিয়া মুক্ত হয়ে নতুন তর্কের মধ্যে পড়ে যে, এবার তা আমেরিকান প্রভাবমুক্ত কোরিয়া হবে, না কমিউনিস্ট কোরিয়া হবে – এ বিষয়টিরই আপাত মীমাংসা মনে করা হয়েছিল কোরিয়া ভাগ করে দিয়ে। ফলে এটাকে বলা যায় সোভিয়েত-মার্কিন ‘কোল্ড ওয়ারের’ যুগ শুরুর অন্যতম উদাহরণ। [আর এক উদাহরণ ইরান, নিজ তেল সম্পদের মালিকানা রক্ষার বিবাদ] আর সেই সময় থেকে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আমেরিকা নিজের স্থায়ীভাবে সেনা ব্যারাক বানিয়ে অবস্থান নিয়েছিল, যা এখনো বর্তমান। সেই থেকে আমেরিকাই এই দেশ দুটোর প্রতিরক্ষা দেখার কাজ স্বতপ্রবৃত্তভাবে নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছিল। আর তা থেকে এর পরে আরেক সমস্যার সৃষ্টি হয়।

    দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান থেকে ঘাঁটি এসে আমেরিকা যেকোনো সময় উত্তর কোরিয়ায় হামলা করতে পারে, উত্তর কোরিয়ায় এই আশঙ্কা বাড়তে থাকে। আর এই চাপ থেকে মুক্ত হতে একমাত্র উপায় বা সমাধান হিসেবে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দিকে ঝুঁকে যায় ও সফলতাও লাভ করেছিল। এতে চাপ এবার উল্টো আমেরিকার ওপর পড়ে। আমেরিকা বুঝে যে, উত্তরকে কোন রকম চিন্তাভাবনা না করে, যথেষ্ট না করে বা ভুলভাবে নাড়াচাড়া করলে দুনিয়ার সকলকেসহ ঐ এলাকার সবাইকে পারমাণবিক বোমার বিপর্যয় দেখতে ও ভুগতে হতে পারে।

    তবে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়া প্রমাণ করেছিল, পারমাণবিক বোমা লাভ নিঃসন্দেহে দুনিয়ায় প্রাণ প্রকৃতি ও জীবন টিকে থাকার দিক থেকে খুবই বিপজ্জনক ও চরম আত্মধ্বংসী ও ক্ষতিকারক এক কাজ। তা হওয়া সত্ত্বেও অন্য আরেক দিক বিচারে পারমাণবিক বোমা অর্জন আর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবজ যেন প্রায় সমার্থক। বোমা নিজ নাগালে থাকলে আমেরিকার মত পরাশক্তির হাত থেকেও নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব। আবার এটাও ঠিক, এই বোমা অর্জন মানে গরিব দেশের জনগোষ্ঠীর সীমিত সম্পদের উপর নতুন এক বিপুল পরিমাণ খরচ জোগানোর দায় চাপানো। জনগণের জীবনমান কমিয়ে ফেলা, কম্প্রোমাইজে ঠেলে দেওয়া। উত্তর কোরিয়া তবুও সব বিবেচনা শেষে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকেই প্রাধান্যে রেখে অবস্থান ও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

    অপর দিকে এতে আমেরিকার দিক থেকেও কিছু সান্ত্বনা ছিল যে, উত্তর কোরিয়ার বোমা সরাসরি আমেরিকা পর্যন্ত পৌঁছানোর যোগ্য নয়। কারণ, কোরিয়া থেকে আমেরিকা হাজার পাঁচেক মাইল দূরে আরেক মহাদেশে। যদিও দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আমেরিকান স্থাপনা বা বিনিয়োগ সহজেই উত্তর কোরিয়ান বোমা খাওয়ার নাগালে ছিল, এটাও কম ঝুঁকি বা বিপদের নয়। তবে সামগ্রিক ফলাফলে সেই থেকে কোরিয়া-জাপান-চীন এশিয়ার এই কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলের প্রায় সবার (আমেরিকাসহ) পকেটে পারমাণবিক বোমা আছে বলে কেউই আর যুদ্ধের ঝুঁকিতে যায়নি, এড়িয়ে চলতে পেরেছে। কিন্তু ভুলচুকে বা উত্তেজনায় কখনো সবাই বোমা খেয়ে মরতে হতে পারে, পারমাণবিক বোমার ভয়ে ভীতিকর সেই সম্ভাবনা ওই অঞ্চলে টিকটিক করে আছে।

    ইতোমধ্যে ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা বিশ্বব্যবস্থায় এই বিষয় সম্পর্কিত দুটা বড় ধরণের পরিবর্তনের বিষয় সামনে এসেছে।

    প্রথমটা হল, চীনের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে নিশ্চিত উত্থান। আর সাথে  ঘটেছে সম্ভাব্য গ্লোবাল লিডার হিসেবে আমেরিকার জায়গা দখল করে নিতে যাচ্ছে চীন। এ ছাড়া, বিশ্বের উদ্বৃত্ত সম্পদ একুমুলেশন বা সঞ্চিত হওয়ার একমাত্র এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী গন্তব্য হয়েছে এখন চীন। ফলে ভিন্ন শব্দে বললে চীন এখন একমাত্র ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সক্ষমতার উদীয়মান সুর্য। ফলে এক নির্ধারক রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী এখন চীন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এক দিকে যত সম্পদ বাড়ে ততই সেটি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাও বেশি হতে থাকে। সম্পদ যত কম তা সুরক্ষার বালাই তত কম। তাই চীনের এই স্বার্থ,  বা ফলাফলে তার যেকোন কথার ওজনও অন্য সবার চেয়ে বেশি ভারী হয়ে ওঠে।

    যদিও চীন খোদ নিজেই পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়েছিল সেই ১৯৬৪ সালে; তবুও চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের সাথে সাথে পারমাণবিক বোমা ঝুঁকিতে থাকা তার নিজের অঞ্চলকে মুক্ত দেখার এক তাগিদ চীনের ভেতর দেখা দেয়াই স্বাভাবিক। ফলে এ সম্পর্কে একটা নীতির কথা চীন বলা শুরু করে তখন থেকে। তা হল, কোরিয়া-জাপান-চীনের ওই পুরো অঞ্চলকেই পারমাণবিক বোমামুক্ত করা। এতেই সবার স্বার্থ সুরক্ষিত হতে পারে। আর একধাপ ভেঙে বললে, ওই অঞ্চলে আমেরিকান কোনো সেনাঘাঁটিতে অথবা তাকে আশ্রয় দেয়া কোরিয়া ও জাপানের হাতে অথবা চীনের হাতেও কিংবা সম্ভাব্য অন্য কারো হাতে বোমা মজুদ না রাখার এই নীতিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে ঐকমত্যে আসা। যদিও সবচেয়ে বড় প্লেয়ার আমেরিকা কখনো চীনের এই প্রস্তাবের প্রতি গরজ দেখায়নি। অর্থাৎ এই প্রস্তাবের ভেতরে আমেরিকা নিজের তাৎক্ষণিক স্বার্থ দেখেনি; বরং পাল্টা উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের ডালি খুলে বসে থেকেছে সব সময়। যদিও সেসব অভিযোগ আবার মিথ্যাও নয়। উত্তর কোরিয়াও আবার আমেরিকার বিরুদ্ধে নিজের নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে রাখার জন্য হাজারটা অভিযোগ তুলতে পারবে, সেগুলোও মিথ্যা নয়। তাতে প্রেসিডেন্ট বুশ উত্তর কোরিয়াকে ‘এক্সিস অব এভিল’ বলে ক্ষোভ ঝাড়লেও কিছু এসে-যায় না। উত্তর কোরিয়া পাকিস্তান বা ইরানকে বোমা সংগ্রহ ও অর্জনে সাহায্য করেছে, এ কথা মিথ্যা নয়। এক কথায় বললে ১৯৪৫ সালে জাপানে আমেরিকার পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ, অর্থাৎ ব্যবহার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর থেকে সোভিয়েত-মার্কিন এক সমঝোতা হয় যে, দুনিয়ায় আর সব রাষ্ট্রকে বোমা অর্জন থেকে দূরে রাখা তাদের উভয়েরই কমন স্বার্থ। এটাকে দুনিয়ায় পরমাণু অস্ত্রের আরও বিস্তার ঠেকানোর জন্য সমঝোতা বলে হাজির করারও সুযোগ ছিল। ফলে বলা যায়, এও সমঝোতার প্রতিক্রিয়া দুনিয়াতে এক উল্টো অপবস্থা তৈরি করে। তা হল, এখান থেকেই  সোভিয়েত-মার্কিন এ দুই রাষ্ট্রের বাইরের দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে টেকনোলজি শেয়ার ও বেচা-বিক্রির এক নতুন দুনিয়া শুরু হয়েছিল। তবে ওয়ার অন টেররের আমলে ব্যাপারটা আরও কিছু নতুন মাত্রা পেয়েছিল। তা আমেরিকার এই ভয় থেকে যে, র‍্যাডিক্যাল সশস্ত্র ইসলামি রাজনীতির ধারাগুলো যেন এই টেকনোলজি বা বোমা  হাতে না পেয়ে যায়। আর উত্তর কোরিয়া যেন এর সরবরাহকারী হিসেবে না হাজির হয়ে যায়। সেই সম্ভাবনা ঠেকানোর অভিপ্রায় থেকেই বুশ ‘এক্সিস অব এভিল’-এর তত্ত্ব হাজির করেছিলেন।

    ইতোমধ্যে একালের উল্লেখযোগ্য দ্বিতীয় নতুন ঘটনা হলো উত্তর কোরিয়ার ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল অর্জন। মানে মহাদেশ টপকিয়ে মিসাইল ছুড়ে মারার যে সীমাবদ্ধতা উত্তর কোরিয়ার ছিল, তা সে কাটিয়ে তুলতে পেরেছে। এসবের ঘোষণাও প্রকাশ হয়ে পড়া থেকেই নতুন তোলপাড় শুরু হয় কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলে। চীনের পুরনো প্রস্তাব আবার আলো-বাতাস পায়।

    কিন্তু এবার আমেরিকা এখন তার যৌবন হারিয়ে উত্থান রহিত শরীর ও ক্ষমতায়। বিশেষ করে যখন তার মুরব্বিয়ানা ঢলে পড়ার আমল এসে গেছে তখন এসব ঘটছে। ট্রাম্প ইতোমধ্যেই চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের ডালি খুলে লড়াই শুরু করেছিল তখন উত্তর কোরিয়ার নতুন সক্ষমতার কথা চাউর হয়েছে। ট্রাম্প যেন তাই লজ্জার মাথা খেয়ে হলেও চীনকে নিজের প্রভাব বিস্তার করে উত্তর কোরিয়াকে মানাতে কাজ করতে অনুরোধ করে। অর্থাৎ আমেরিকান প্রভাব এখানে ভোঁতা ও অকার্যকর, সেটাই যেন মেনে নিয়েছিল আমেরিকা। সবচেয়ে বড় কথা, অতি দ্রুততায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প চীনকে তাগিদ দিয়ে জানান, উত্তর কোরিয়াকে ডি-নিউক্লিয়ারাইজড অবস্থায় তিনি দেখতে চান। এর জন্য আমেরিকাকে কী কী করতে হবে সেসব শর্ত নিয়ে কথা শুরু করতে তিনি রাজি। এ অংশটির সিদ্ধান্ত ট্রাম্প নিয়েছিলেন কল্পনার চেয়েও দ্রুততায়। ফলে চীন মাঠে নেমে তৎপরতায় নিজের প্রভাব ব্যবহার করে কাজে নেমে যায়।

    আগামী দিনে ইতিহাস লিখতে বসে ঐতিহাসিকেরা নিশ্চয়ই মৃদু তর্ক করতে পারেন যে, কবে থেকে অথবা কোন ঘটনা থেকে চীন আমেরিকাকে হটিয়ে সেই জায়গায় বসে দুনিয়াকে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিল, সেই প্রারম্ভিক ঘটনা কোনটি? সেই প্রারম্ভিক ঘটনাটি কী হবে, তাই যেন নির্ধারিত হতে যাচ্ছিল প্রায়। সেটি হত, সম্ভবত চীনা উদ্যোগে আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে সমঝোতা ঘটিয়ে দেয়া।
    হত বলছি এ জন্য যে, এটা যত দ্রুত ঘটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তাতে হঠাৎ ‘জন বোল্টন’ সিম্পটম দেখা দেয়ায় ঘটনায় ছেদ ঘটে যায়। ফলে তা থমকে দাঁড়িয়েছিল। মাস খানেকেরও বেশি আগে ঠিক হয়েছিল ১২ জুন চীনা উদ্যোগ কাজ শুরু করবে সিঙ্গাপুরে ট্রাম-কিম সরাসরি এক আলোচনা থেকে।

    জন বোল্টন এখন ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, একজন হকিস (hawkish) বা যুদ্ধবাজ। বুশের আমলে তিনি রাষ্ট্রসঙ্ঘে আমেরিকান প্রতিনিধি ছিলেন, আজকের নিকি হ্যালি যে পদে আছেন। বোল্টনের বৈশিষ্ট্য হল, বল প্রয়োগ আর জবরদস্তিই সব কিছুর উপযুক্ত সমাধান বলে বিশ্বাসী তিনি। ট্রাম্পের গ্রিন সিগনালে চীনা উদ্যোগ পারমাণবিক সমঝোতার তৎপরতা যখন মাঠে কাজে নেমেছিল, সে সময় হঠাৎ করে সম্ভবত সেকেন্ড থট হিসেবে ট্রাম্প পিছটান দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর এরই বাস্তবায়নে তিনি বোল্টনকে ভিলেন হিসাবে মাঠে ছেড়ে দেন বলে অনেকের অনুমান। আর তা থেকে অনেক লিখেন, TRUMP-KIM TALKS: THE ART OF NO DEAL অর্থাৎ ট্রাম্পের কৌশল ছিল, কী করে একটা হবু ডিল ভেঙ্গে দিতে হয়।

    লিবিয়ার গাদ্দাফির কথা আমাদের মনে আছে। তিনিও তার পারমাণবিক কর্মসূচি যা ছিল তা গুটিয়ে রেখে আমেরিকার সাথে ডিল করতে গিয়েছিলেন সেই ২০০৪ সালে, আমেরিকা কখনও লিবিয়ায় আক্রমণে যাবে না- এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে। কিন্তু মাঝখানে ওবামার আমলে আরব স্প্রিংয়ের উত্থানের কালে আমেরিকা বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে। পারমাণবিক কর্মসূচি-হারা গাদ্দাফি – তার ওই দুর্বলতার সুযোগে ওবামার আমেরিকা তাকে ক্ষমতাচ্যুত ও নৃশংসভাবে পাবলিক লিঞ্চিংয়ে হত্যা করেছিল। জন বোল্টন এক টিভি কথোপকথনে উত্তর কোরিয়ায় ‘লিবিয়া মডেল’ প্রয়োগ করবেন বললে সেখান থেকেই এই সন্দেহের ঝড় উঠে আসে। যে তিনি সম্ভবত হুমকি দিচ্ছেন। আমেরিকা বিশ্বাঘাতক সেটাই তিনি যেন মনে করায় দিয়ে, এর মাধ্যমে বলপ্রয়োগের হুমকি বা চাপ তৈরি করে কাজ আদায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

    গত ১৯৯২ সাল থেকেই আমেরিকা-উত্তর কোরিয়া বা দুই কোরিয়ার “শান্তি” আলোচনার উদ্যোগ চলে আসছে। ফলে এবারের দুই কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রথম সাক্ষাত (যেখান থেকে পরিণতিতে আমেরিকা-উত্তর কোরিয়ার ১২ জুন বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছিল) যেটা ২৫ এপ্রিল শুরু হয়েছিল সেটা নতুন না হলেও, এবারেরটা একেবারে নতুন ছিল। কী অর্থে?

    সবচেয়ে বড় কারণ দৃশ্যমানভাবে এবারের সমঝোতা আলোচনার উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী হল রাইজিং চীন। এর তাতপর্য সুদুর প্রসারি। খুব সম্ভবত এটাই গ্লোবাল বিরোধ মীমাংসায় উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী হিসাবে চীনের ভুমিকার প্রথম প্রয়াস হিসাবে চিহ্নিত হবে। এটাকেই এক এম্পায়ার রোল – দুনিয়ার এম্পায়ারের ভুমিকা  ও নেতৃত্ব নেয়া বলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই ভুমিকা পালন করে আসছিল আমেরিকা। একারণের আলোকেই বলেছিলাম আগামি ইতিহাসবিদেরা সম্ভবত চীনের এম্পায়ার বা নেতা হওয়ার সুত্রপাতের ঘটনা বলে চিহ্নিত করবে। আবার মনে করিয়ে দেই এই ভুমিকাটা – উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী গ্লোবাল নেতার। ডিপ্লোমেসিরর ভাষায় “main powerbroker behind” বলা হয়। এদিকটা বুঝে এই অঞ্চলের মিডিয়া পলিটিক্যাল কমেন্টেটর BERTIL LINTNER এর ভুল হয় নাই। এই প্রসঙ্গে তার লেখা এখানে দেখা যেতে পারে।

    উত্তরের প্রেসিডেন্ট কিম এর চীন সফর দিয়ে এবারের চীনের উদ্যোগে পারমাণবিক সমঝোতার বল গড়ানো প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করা যেতে পারে। এটাকে বলা যায় কী কৌশলে আগানো হবে এর কমন আন্ডারস্টাডিং ও ব্রিফিংয়ের সফর। এরপরে ২৫ এপ্রিল উত্তরের প্রেসিডেন্ট কিম এবার দক্ষিণ কোরিয়া গিয়ে ওখানের প্রেসিডেন্ট মুনের সাথে বৈঠক করেন। কিন্তু এর আগে কিমের চীন সফর ছিল লিডিং ঘটনা। কেন?

    এক. এবারের নেতা ও উদ্যোক্তা আর আগের প্রত্যেকটার মত (দুনিয়ার নেতা) আমেরিকা নয়, চীন। দুনিয়ার হবু নেতা এখন চীন।

    দুই. কিম এবারও দক্ষিণ কোরিয়া যাবেন। কিন্তু আগের দক্ষিণ আর এবারেরটা এক নয়। আগের দক্ষিণ আমেরিকার এক স্যাটেলাইট রাষ্ট্র। আমেরিকার উপর নিজ নিরাপত্তার ব্যাপারে শতভাগ নির্ভরশীল রাষ্ট্র। আর এবার? এটা ট্রাম্পের আমেরিকা। একলা চল ‘আমেরিকা ফাস্ট’ এর আমেরিকা অর্থাৎ আমেরিকার আর এম্পায়ার নয়। গ্লোবাল বিরোধে কোন উদ্যোক্তা মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা ত্যাগী আমেরিকা। এন্টি গ্লোবালাইজেশনের আমেরিকা। ট্রাম্প নিজেই আগে থেকে বলে আসছে, এবারের কিমের সাথে আলোচনায় সেটা দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপানের স্বার্থকেও সাথে মনে রেখে কথা বলা সেটা প্রাধান্য নাও পেতে পারে। কারণ এটা ‘আমেরিকা ফাস্ট’।

    তিন. ফলে এটা দক্ষিণ কোরিয়ার এক বাপ-মা হারা দশা। আর ঠিক এটাকেই ক্যাশ করতে এবারের কিম – দক্ষিণের প্রেসিডেন্ট মুনের (Moon Jae-In) সঙ্গে সাক্ষাতে অতিরিক্ত উদার, আলিঙ্গনের বডি ল্যাঙুয়েজে। ব্যাপারটা অনেক মিডিয়াও নজর করেছে।  কিম ইঙ্গিত দিয়ে বুঝাতে চাইছেন কাল দিন, এম্পায়ার আমেরিকার দিন শেষ। এখন আমরা আমরা আমাদের নিজেদের বিরোধ নিজেরাই সমাধান করতে আগায় আসতে পারি। এবং আমি কিম রাজি। যারা সাক্ষাতের ভিডিও ক্লিপটা দেখেছেন, তাদের আমার কথা বুঝতে সহজ হবে।

    এককথায় বললে, চীনের নেতৃত্বে আসন্ন নতুন দুনিয়ায় এক নতুন উষালগ্নে কিম-মুন আলোচনা হচ্ছে – একথাটা যেন দক্ষিণের মুন এর পক্ষ বুঝে এটাই কিমের মুল বার্তা।

    তবে ১২ জুনের বৈঠকের উপর মাঝে অনিশ্চিতর কালো ছায়া পড়েছিল প্রকাশ্য মূল যে বিবাদকে কেন্দ্র করে তা হল, যখন উত্তর ও দক্ষিণের প্রেসিডেন্টদ্বয় পারস্পরিক সাক্ষাৎ ও কথাবার্তার কারণে ইতিবাচক আবহ তৈরি হয়েছিল; কিন্তু এর মধ্যে হঠাৎ করে দক্ষিণ কোরিয়া আর আমেরিকা যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করে। আর তা থেকে উত্তর কোরিয়ার কিম সব যোগাযোগ-আলোচনা ভেঙে দেন।

    প্রশ্ন হল, ট্রাম্প কেন সাময়িক পিছু হটে গিয়েছিলেন? বোল্টনের টিভি সাক্ষাতকার আর দক্ষিণের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া করে নেতি কালো ছায়া কেন ছুড়েছিলেন? খুব সম্ভবত খোদ আমেরিকা উত্তরের কিমের পারমানবিক বোমার নাগালে – এর যে নিরাপত্তা হুমকি তা ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছে এক বিরাট বিষয়। অন্যদিকে চীনের উদ্যোগ ও মধ্যস্থতায় যদি প্রমানুমুক্ত উত্তর কোরিয়া পাওয়া যায় তবে তা বুড়া সিংহ আমেরিকার জন্য অমুল্য। কারণ কোন যুদ্ধ ক্ষয়ক্ষতি, অর্থ প্রাণ কিছুই না হারিয়ে উলটা নিজ পারমানবিক বোমা থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত পাওয়া। কিন্তু এর মূল্য বা খেসারতও কী কম?

    এঘটনার ভিতর দিয়ে চীন দুনিয়ার এম্পায়ার, গ্লোবাল বিরোধে  উদ্যোগ ও মধ্যস্থতাকারি হিসাবে স্বীকৃত হয়ে যাবে। শুধু তাই না এটা আমেরিকার নিজের হাতে দেয়া স্বীকৃতি হবে।

    কিন্তু ইতোমধ্যে কিমও বোল্টনের টিভি সাক্ষাতকার আর দক্ষিণের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া দেখে প্রচন্ড হতাশ ও ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন।  তিনি দক্ষিণের প্রেসিডেন্টকে দায়ী করেন। এই বিরাট ঐতিহাসিক সুযোগ হেলায় হারানোর জন্য। তাই ঘটনার গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে মুনকে তিনি  ‘অজ্ঞ’ ও ‘অযোগ্য’ বলে অভিযুক্ত করেন। এছাড়া, দক্ষিণ কোরিয়ার ভিতরের নেপথ্যের সংবাদ হল, জেনারেলরা নিজ স্বার্থে ও আমেরিকান প্ররোচনায় এই কাজ করেছিল। ফলে উত্তর কোরিয়ার কিমের এই ঘোষণার ফলে ১২ জুনের বৈঠক অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পরে এবার ট্রাম্পের দিক থেকে ২৫ মে ওই বৈঠক বাতিল উল্লেখ করে কিমকে চিঠি দেয়া হয়। ফলে সব আশা-ভরসা শেষ হয়ে যায়।

    দোদুল্যমান ট্রাম্প প্রশাসন আসলে উভয় সঙ্কটে আছে। কিন্তু পারমানবিক বোমা খাওয়া থেকে নিজের নিরাপত্তা রক্ষার ইস্যু আবার প্রাধান্য পায়।  খুব সম্ভবত একারণেই  দোদুল্যমান ট্রাম্পেরআবার পিছু হটেন। নিজ নিরাপত্তার কথা ভেবে সেটাকেই প্রাধান্য দিতে এগিয়ে আসা। আবার সিদ্ধান্ত বদলান।

    সুযোগ নেন এই বলে যে, আলোচনা ভঙ্গ হয়ে গেলে এতে চীন নিজে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানিয়েছে। এবং আমেরিকাকে নিজের উদ্বিগ্নতার কথা জানিয়েছে।  কোরিয়া উপদ্বীপকে অনিশ্চয়তায় ফেলে রাখলে তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় চীন। অতএব চীনের আবেদনে সাড়া দিতেই ট্রাম্প এটাকে আবার উদ্যোগ নেয়ার অছিলা হিসেবে নেন। আর এতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট হঠাৎ করে আবার উত্তরে সফরে যান। আর তাতেই আবার ১২ জুনের বৈঠক প্রাণ ফিরে পায়।
    এতে ফলাফল কী আসবে, সেটি জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এ ঘটনার শুরু থেকেই কোনো পশ্চিমা মিডিয়া বা একাডেমিক বা থিংকট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠান- কেউ ট্রাম্পের কথা বা কাজের ওপর আস্থা রেখেছেন, এমন দেখা যায়নি। যেমন বোল্টনের মন্তব্যের সময় থেকেই মিডিয়ায় সব ধরনের ভাষ্যের সারকথা ছিল কোন ডিল কেমন করে না করতে হয়, ভেঙে দিতে হয়, এড়িয়ে যেতে হয়; ট্রাম্প তার ওস্তাদি আমাদের দেখাচ্ছেন এই ছিল তাদের মূল্যায়ন। অর্থাৎ সব কিছুর দায় এককভাবে পশ্চিমা সমাজ ট্রাম্পের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের একা চলার নীতি যেমন এই বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের স্বার্থের দিক থেকে কথা তুলবে না, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও আছে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১২ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ট্রাম্প-কিম বৈঠক”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

    এই রচনার উতসর্গঃ সাইফুল ইসলাম কে। আমার সব লেখার একনিষ্ঠ পাঠক। তাঁর নিরন্তর তাগিদ থেকে এলেখার জন্ম।

  • চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

    Talks over dinner: Prime Minister Narendra Modi with U.S. President Donald Trump, Japanese Prime Minister Shinzo Abe and other leaders at a dinner in Manila on Sunday. | Photo Credit: PTI

    চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

    গৌতম দাস
    ২৮ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার ০০:০৪

    https://wp.me/p1sCvy-2lK

     

     

    চলতি নভেম্বর মাসে প্রথম দুই সপ্তাহ জুড়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এশিয়াতে নানান রাষ্ট্রে এক সিরিজ সফরে এসেছিলেন। তিনি ৩ নভেম্বর হাওয়াই দিয়ে সফর শুরু করেছিলেন। এরপর পাঁচটি রাষ্ট্রের (জাপান, দ: কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন) প্রত্যেক রাষ্ট্রে তিনি কমপক্ষে এক দিন করে কাটিয়েছেন। এ ছাড়া এই সফরকালে দুটি ‘রাষ্ট্রজোটের সম্মেলন’ হওয়ার সিডিউল ছিল – ভিয়েতনামে ২১টি রাষ্ট্রের এপেক সম্মেলন আর ফিলিপাইনে ১০ রাষ্ট্রীয় আসিয়ান সম্মেলন। ফলে ওই দুই সম্মেলনসহ মিলিয়ে ট্রাম্পের অংশগ্রহণ হিসাব করলে আরও প্রায় দুই ডজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ট্রাম্প এই স্বল্পকালে মোলাকাত করেছেন। এদের মধ্যে বার্মার সু চিও ছিলেন। এর বাইরে, এই সফরে ট্রাম্পের যাওয়া হয়নি এমন আরো কিছু এশিয়ান রাষ্ট্রে (আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার) কাছাকাছি সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) রেক্স টিলারসন সফর করেছেন। সব মিলিয়ে গত এক মাস এশিয়া ছিল আমেরিকান কূটনীতির টগবগে মুখ্য ফোকাস।

    ট্রাম্পের এই এশিয়া সফরকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখা যায়। তাতে এর একটা অংশে ছিল বলা যায় ট্রাম্পের চীন সফর; মানে চীনের কাছ থেকে সঙ্ঘাতহীন পথে, তবে স্বার্থে অটল থেকে, আমেরিকান বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থ বুঝে নেয়া বা আদায় করার আলাপ। আর এর সাথেই এই অংশে ছিল, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে চীনের ভূমিকা আমেরিকার জন্য ইতিবাচক – এই অনুভব নিয়ে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ কোরিয়া, তাকে আশ্বস্ত করার সফর। ট্রাম্পের বাকি এশিয়ান রাষ্ট্র সফর ছিল অন্য ভাগে। সেটার নাম দেয়া যায়, এশিয়ায় চীনের পাল্টা প্রভাব সৃষ্টি ও বিস্তারের লক্ষ্যে সফর। আগের ওবামার প্রশাসন বলেছিল, তাঁর ভাষায়, ‘এশিয়ায় এখনো আমরাই নেতা আছি’। এই ভাব ধরে তিনি এশিয়া সফর করেছিলেন; তবে এটা কূটনীতিক ভাষার আড়াল। এখান থেকে লুকিয়ে থাকা কথার তাৎপর্য খুব বোঝা যাবে না। তাই সরাসরিভাবে বললে, এশিয়ায় আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment’) নীতি জারি আছে সেই ২০০৭-০৮ সাল থেকে। সে সময় সেটা প্রথম প্রেসিডেন্ট বুশ তাঁর কর্মসূচি হিসাবে চালু করেছিলেন। সেটা ওবামার হাতে আরও গোছানো আকার পেয়ে নাম হয়েছিল ‘এশিয়া পিভট’ বা ভরকেন্দ্র নীতি (Asia pivot)। সেই নীতিটাকেই আরেকবার অন্তত নামের কিছু পরিবর্তন করে তা নিয়ে এবার ট্রাম্প এশিয়ায় গিয়েছিলেন। বদলে নেয়া সে নাম হল, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ পলিসি (indo-pacific)। এটাকেই আগে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ নীতি বলা হত। এখন ট্রাম্পসহ তার প্রশাসনের লোকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে একে ডাকছেন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতি বলে। বলছেন, ‘একটা মুক্ত অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিকের অঞ্চল’ (“free and open Indo-Pacific” ) বজায় রাখার পক্ষে আমেরিকা সবার অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নামে ডাকার পরে এ নিয়ে মিডিয়া-প্রতিক্রিয়া হল, এটা কোনো নতুন নীতি নয়। অর্থাৎ চীন ঠেকাও নীতি আমেরিকার যেটা ছিল – সেটাই নতুন মোড়কে এখনও মূল লক্ষ্য হয়ে আছে। তবে একালে এর ভেতর কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও তার বন্ধুজগতে।

    তবে ‘চীন ঠেকানো’ – এই ধারণার অরিজিনাল উৎস অন্যখানে, অন্য কারণে। সেটা হল, আমেরিকা একক পরাশক্তির এক গ্লোবাল পাওয়ার হলেও তা আর থাকছে না – নিজ সার্ভে-স্টাডি  থেকে পাওয়া ফ্যাক্টস আমেরিকা যেদিন নিজ সরকারি গবেষণা অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন থেকেই প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার করণীয় পদক্ষেপ হিসাবে  ‘চীন ঠেকানোর’ চিন্তাভাবনার শুরু ঘটেছিল। দুনিয়ার আমেরিকান নেতৃত্বের (অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব) অবস্থান চীনের হাতে চলে যাওয়া এবং স্টাডি বলছে তা আর ঠেকানো অসম্ভব বলে আমেরিকান অবস্থান হল, তাহলে  অন্তত বিলম্বিত করিয়ে দেয়া যায় কি না, এর লক্ষ্যেই ঐ  ‘চীন ঠেকানোর’  পদক্ষেপ নিয়েছিল আমেরিকা। সেই পদক্ষেপ হিসেবে যেমন, এশিয়ায় আরেক রাইজিং অর্থনীতি হল ভারত, আমেরিকা সিদ্ধান্ত নেয় যে তাহলে ভারতের পিঠে হাত রাখা, আর কাছে টেনে ফেভার করে অন্তত ভান করে একে চীনের বিরুদ্ধে লাগানো –  আমেরিকার এই ভারত নীতিও চীন ঠেকানোর মতলবে। তবে আমেরিকা সেকাজ  ‘একটি মুক্ত অবাধ এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’- এর গুরুত্ব বুঝানোর আড়ালে এটাকেই তার ‘এশিয়া নীতি’ বলে হাজির করেছে।

    সাইড লাইন
    যেকোনো রাষ্ট্রজোটের আহূত সম্মেলনে মূল অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশগ্রহণ করেও এর ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও সেরে নিয়ে থাকেন। আসিয়ান সম্মেলনে তেমনি এক “বিশেষ বৈঠক” হয়েছে। এই বৈঠকের ব্যাপারটা, মানুষের অনেক গোপন সম্পর্ক থাকে এবং মরার বয়সে পৌঁছলে সে পাবলিকলি তা স্বীকার করে ফেলে, অনেকটা যেন সেরকম। তবে এর গুরুত্ব ভিন্ন অর্থে আসিয়ান সম্মেলনের চেয়ে বেশি বলে অনেক মিডিয়া গুরুত্ব দিয়েছে। সেই “বিশেষ বৈঠকের” নাম হল, এক ‘কোয়াড’ ব্লকের মিটিং।

    আসিয়ান সম্মেলনের সাইড লাইনে এশিয়ায় চীনবিরোধী এক  নিরাপত্তা জোটের আদলে তবে প্রকাশ্যে – আমেরিকা, জাপান, ইন্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়া – এই চার রাষ্ট্রপ্রধানেরা এক সাথে বসেছিলেন। কিন্তু সেটা আবার কোনোভাবেই যেন শোরগোল না তুলে ফেলে, চীন যেন ক্ষেপে না যায়, সে দিকে খেয়াল রেখে তা তারা করতে চেয়েছে। যেমন এভাবে চার রাষ্ট্রের একসাথে বসার নাম কী, সে দিকে তারা নিজেরা এর কোন নাম দেননি। কিন্তু  মিডিয়া এটাকে নিজ উদ্যোগে বা নিজের রিপোর্টিংয়ের স্টাইলে  “কোয়াড ব্লক”  [QUAD BLOC] (ইংরেজি কোয়াড মানে চার – ফলে যেন চার মুরব্বির জোট) বলা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোনো যৌথ ঘোষণাও ঐ বৈঠক থেকে দেয়া হয়নি। নেহায়েতই চার নেতার এক ডিনার যেন এভাবে লো-প্রফাইলে রেখে, তবে যারা ট্রাম্পের এশিয়া নীতি- ‘একটি খোলা এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’-এর গুরুত্ব বোঝানোর কাজে একমত, তারাই যেন জড়ো হয়েছেন। তবে এই ‘কোয়াড’ করার আইডিয়াটা অনেক পুরনো। ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এই চার রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রস্তাবটা পেশ করেছিলেন। কিন্তু এত দিন সেটা আলোর মুখ দেখেনি। আর এখন যৌথ ঘোষণা না দিতে পারা ‘কোয়াড’, ওই ডিনার অনুষ্ঠানের পরবর্তীকালে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সচিবপর্যায়ে একসাথে বসলেও শেষে যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় – (ভারতের প্রাচীন দক্ষিণী দৈনিক ‘দি হিন্দু’ অনুসারে), ‘চার দেশের বিবৃতি চার রকমের।’ সার কথায় বললে, এখন আমরা দেখছি, আসলে তাদের পরস্পরের অবস্থানে বড় ধরণের ভিন্নতা আছে। সেসব নিরসন করে নিবার আগেই কিংবা তা নিরসণযোগ্য কিনা সেসব যাচাইয়ের আগেই তারা তাড়াহুড়াতে একসাথে বসে গিয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ভারত, এটা চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সরাসরি বিরোধিতাকারী জোট হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু বাকিরা মনে হচ্ছে সেখান থেকে সরে গেছেন। বিশেষ করে ট্রাম্পের এ মাসের চীন সফরে তিনি, চীন-আমেরিকার যৌথ ৪০ বিলিয়ন ডলারের এক ‘সিল্ক রোড ফান্ড’ গঠনের চুক্তি করে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?

    গ্লোবাল বা রিজিওনাল রাজনীতি বোঝাবুঝির দিক থেকে, বিশেষ করে ‘জাতীয়তাবাদী’ অবস্থান বলতে  কী বুঝায় আর তা একালে বুঝাবুঝির দিক থেকে তা কী আগের কোল্ড ওয়ার কালের মতই নয়? জবাব হল যে না, চলতি শতক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই বুঝাবুঝির দিক থেকে ভিন্ন হয়ে গেছে। বোঝাবুঝি এখন বদলে গেছে। আমরা যে জাতীয়তাবাদী ধারণা নিয়ে গত শতকে যেসব অভিজ্ঞতায় বড় হয়েছি তার অনেক কিছুই এই শতকে আর মিলছে বা মিলবে না, অচল। সংক্ষেপে বললে এর মূল কারণ হল, সেগুলোর পটভূমি ছিল কোল্ড ওয়ারের ‘গ্লোব’, অর্থাৎ যেকালে দুনিয়া একই তা সত্বেও সেটা দুটা বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির ব্লক, দুটা রাষ্ট্রজোট হয়ে দুনিয়ায় বিরাজ করত। অর্থাৎ যোগাযোগ সম্পর্কের দিক থেকে দুটোই আলাদা, বিচ্ছিন্ন। পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির বিনিময়ের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি অর্থনীতিতে বড় হয়ে ঐ শতক কাটিয়েছি আমরা। ক্যাপিটালিজম সম্পর্কে বা এর বিস্তারিত বিনিময় সম্পর্ক সম্পর্ককে আমরা যা জেনেছি বুঝেছি, তা কোল্ড ওয়ারের বিচ্ছিন্ন দুই ব্লকের অর্থনীতির পটভূমিতে। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে (চীনের বেলায় আরো আগেই, ১৯৭৮ সালের পর থেকে) ভেঙে যাওয়ার পর ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা আগের দুনিয়া তখন থেকে আর বিভক্ত থাকল না, এবার এক্‌ একটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে সকলে এসে গেছিল। এতে আমরা সবাই এবার ভাগহীন, দুনিয়াজুড়ে এক ব্যাপক বিনিময় সম্পর্কের – পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির ব্যাপক বিনিময়ের যুগে প্রবেশ করে গেছি। যেটা আবার আর কখনও উলটা পিছনে ফিরে যাবে না  (irreversible)।  আর এর ভেতরে আগের রক্ষণশীল ব্লক যুগের জাতীয়তাবাদের ধারণা যেটা ছিল, তা একালে অচল হয়ে যায়। কারণ আগেকার কালের পারস্পরিক বিনিময় সম্পর্কহীন যে দশা দুনিয়া ছিল তার আর  কোনো অবশেষও নেই এখন, এমন সেইকালের জাতীয়তাবাদ ধারণা এখন পালটিয়ে গেছে। আমরা এখন দুনিয়াজুড়ে সবাই  ওতপ্রোতভাবে পরস্পরের সাথে গভীর পণ্য লেনদেনে ও বিনিময় সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। চলতি পটভূমিতে তখনকার জাতীয়তাবাদবোধ তো অচল হবেই। তাই এই নতুন গ্লোবাল বিনিময়ের দুনিয়ায় কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্রজোট খাড়া করা এবং তা টেকানো খুবই কঠিন ও জটিল। যেমন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার অন্যদের নিয়ে কোনো রাষ্ট্রজোট করে টিকানো খুবই কঠিন ও জটিল হবে। তাই আমরা দেখছি। কারণ খোদ আমেরিকাসহ হবু জোটের সব রাষ্ট্রই প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে আবার চীনের সাথে নানা পণ্য বিনিময়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। তবে সেই সাথে যার যার মত স্বার্থবিরোধও আছে। কিন্তু তা থাকলেও চীনের বিরুদ্ধে সবার স্বার্থ-ঝগড়া  কমন নয়, একরকম নয়। অর্থাৎ চীনের সাথে বিরোধ আছে; কিন্তু একেক রাষ্ট্রের ইস্যু একেকটা। সেখান থেকে একটা কমন স্বার্থ বের করা খুবই মুশকিল। এ ছাড়া ‘কোয়াডের’ চার রাষ্ট্র তাদের নিজেদের মধ্যেও তো পরস্পরবিরোধী গুরুতর স্বার্থবিরোধ আছে। যেমন-  বিদেশি ব্যাংক, বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্সিং খাতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া নানা ইস্যুতে তৎপরতায় খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের স্বার্থ-অবস্থান আছে। আবার এবিষয়ে চীনের সাথে তাদের গভীর স্বার্থ সম্পর্ক। ফলে তারা চীনের সাথে এখানে হাত মিলিয়ে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। ওদিকে আমেরিকার বিরোধী রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে গঠিত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোট ‘সাংহাই কো-অপারেশন’ গড়ে উঠে জমে উঠছে। আর তাতে সদ্য যোগ দেয়া সদস্য হল ভারত। ফলে  চীন যেমন গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার স্থান নেয়ার জন্য ধাবমান, প্রায় তেমনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দেয়ার আকাঙ্খা তো ভারতেরও আছে। কারণ আগের নেতা মাতবরের মাতবরি ঢিলা না হলে চীন বা ভারত উঠবে কেমন করে। ফলে সেই আকাঙ্খা পূরণের দিক থেকে দেখলে, অন্তত এই ব্যাপারে ভারতের কাছে চীন বাস্তব সঙ্গী ও বন্ধু; এক পথের পথিক। এই অবস্থায় আগেরকালের জাতীয়তাবাদ দিয়ে একালের রাষ্ট্রস্বার্থবোধ বুঝতে চাইলে মারাত্মক ভুল হবে; আগের জাতীয়তাবাদী বোধের ধারণা একালে এজায়গায়  অচল। জটিলতা হল একালে যার সাথে বড় স্বার্থবিরোধ আছে, তার সাথেই আবার গভীর বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়েও থাকে।

    আরো কথা আছে। রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষক, বিরাট অভিজ্ঞতা-দাতা। মানুষের কী হবে, মানুষ কে, কী – এসবের জবাব উত্তর একালে জানতেই লাগবে। মানুষের মর্যাদা কী হবে, এটা কি অর্থনীতির বাইরের প্রশ্ন? মানুষের মর্যাদা, মৌলিক মানবিক-রাজনৈতিক অধিকার এগুলো পাশ কাটিয়ে কি আমরা একটি গ্লোবাল অর্থনীতি চালাতে টিকাতে পারব, এর এক অর্ডার, নিয়মশৃঙ্খলা কায়েম করতে পারব?

    জবাবে সারকথাটা হচ্ছে, আসলে মানুষের মর্যাদা, মানুষের মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে দুনিয়ায় সবার জন্য পালনীয় এবং তা সবাইকে রক্ষা করতে বাধ্য ও কমিটেড হতে হবে – এমন এক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবশ্যই লাগবে, এটা পূর্বশর্ত। এটা ছাড়া কোন গ্লোবাল অর্থনীতি হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে এ’বিষয়ে নুন্যতম কিছু কমিটমেন্টে যেতে হতেছিল।
    কেবল অর্থনীতিই সব, জীবনের সব লক্ষ্য অর্জন মানেই বৈষয়িক অর্জন- এটা সবচেয়ে ভুল কথা, এক অর্থহীন ধারণা এর প্রমাণ?

    এই যে ‘কোয়াড ব্লক’, আমেরিকা জাপান ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মিলে চারটি রাষ্ট্র – চীনের বিরুদ্ধে, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের বিরুদ্ধে জোট হয়ে উঠতে চেয়েছিল। চীনের বিরুদ্ধে এটাই তাদের কমন লক্ষ্য হওয়ার কথা। তাহলে রোহিঙ্গারা, সামান্য এগারো লাখের এক জনগোষ্ঠী – এক রোহিঙ্গা ইস্যু তাদের কোথায় নিয়ে গেল? আমরা দেখলাম মোটা দাগে বললে যে প্রক্রিয়াতে যাক, চীন আর ভারত এক দিকে  বা পক্ষে, আর আমেরিকা আরেক দিকে, কেন? ‘কোয়াড’ গড়ার খায়েশ যাদের আছে তাদের তো এই আলাদা আলাদা পরিণতি হওয়ার কথা নয়। কোয়াড ব্লকের সাথে মিলের দিকে তাকিয়ে বললে চীন একা আর বাকি চার বিপরীত পক্ষে এমন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয় নাই। কেন?

    এটা প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো জোট বা কোনো কমন স্বার্থ খাড়া করা যায় না, যাবে না। টিকবে না। মানুষকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ বলেও কিছু নেই।

    ভারতের এক আঁতেল, থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব হলেন সাবেক নৌ-কমডোর সি উদয়ভাস্কর।  ‘কোয়াড’ গঠনে তিনি মহা খুশি, উদ্বেলিত আবেগি। তিনি বলছেন, চার রাষ্ট্রজোট গঠনে উচ্ছসিত তিনি শিরোনামেই লিখছেন, এটা নাকি “ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স” বলে। বলছেন, ‘কোয়াড’ যাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে তারা হলেন সব ‘গণতন্ত্রের লোক’। ‘গণতন্ত্র তাদের লক্ষ্য, তাদের ধ্রুবতারা-চোখের মণি। [Democracy as a lodestar for partnership is enticing.] সে দিকে তাকিয়ে নাকি হাঁটছে ওই ‘কোয়াড’। ‘এটা হলো গণতন্ত্রীদের ঐক্যতান কনসার্ট’(concert of democracies ) । হতে পারে হয়তো; তবে সেটা স্ব স্ব রাষ্ট্রসীমার ভেতরে। আর চীনকে নিচু দেখানোর উদ্দেশ্যে বললে, তা বটে, ঐ চার তারা নির্বাচনের দেশ। কিন্তু তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো ‘কোয়াডের’ সদস্যরা (like-minded democracies) একমত নন কেন? একপক্ষে নন কেন? ‘গণতন্ত্রীদের ঐক্যতানের’ পক্ষরা এক দিকে; আর বিপক্ষরা চীনের সাথে অন্য দিকে – এই ভিত্তিতে অবস্থান নিতে পারলেন না কেন? আর তারা যদি গণতন্ত্রকে “ধ্রুবতারা মেনে হেঁটেই” থাকেন, সে ক্ষেত্রে তাদের এই গণতন্ত্রবোধ নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমায় থেমে যায়? বাইরে অকেজো কেন? বার্মার জেনারেল বা সু চির উপর প্রযোজ্য নয় কেন? উদয়শঙ্করের ভারতের “গণতন্ত্রবোধ”  রাষ্ট্রসীমার ভেতরেই কেবল কাজ করে, কেন? আর বাইরে কাজ করে না বলেই রোহিঙ্গারা মরবে, ১৯৯২ সালের নাগরিকত্ব আইন ওদের ওপর প্রয়োগ করা হবে কেন? গ্লোবাল ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইট বলে কিছু থাকবে না বা নেই কেন? অথচ উদয় শঙ্করেরা এ ব্যাপারে উদাসীন হবেন। হায়রে গণতন্ত্রী!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • কম্বোডিয়াঃ গ্লোবাল রাজনীতিতে চীন কেন হেরে যাবে

    কম্বোডিয়াঃ গ্লোবাল রাজনীতিতে চীন কেন হেরে যাবে

    গৌতম দাস
    ২১ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার
    https://wp.me/p1sCvy-2lz

    বার্মার রোহিঙ্গার পর এবার কম্বোডিয়া। তবে এবার গ্লোবাল রাজনীতির প্রসঙ্গে সেদিক থেকে কথা বলা হচ্ছে, গ্লোবাল অর্থনীতি নয়। সচরাচর চীন মানেই গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের  অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও শীর্ষ উঠার কথা তুলে বলে থাকি। কিন্তু এবার নয়, সেটা যেন পাঠকের মনোযোগ ফস্কে না যায়, নজরে থাকে সেটা আশা করব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই আমেরিকা দুনিয়ায় গ্লোবাল রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ক্রমশ নিজ সক্ষমতা দেখিয়ে দুনিয়াকে নিজের একক নেতৃত্বে নিয়েছিল। সেটা এখনও আছে, যদিও সময়ে এখন একটা ভাটার টান অনুভুত হওয়া শুরু হয়েছে। গ্লোবাল অর্থনীতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমানভাবে ঢিলা হতে শুরু হয়েছে অনেক আগেই, তুলনায় যদিও গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন একেবারেই নয়। এই পরিস্থিতিতে পাঠকের নজর টানব সত্তরের দশকের  কমিউনিস্ট বিপ্লবের ছোট দেশ কম্বোডিয়ার দিকে।

    রাষ্ট্রের নাম কম্বোডিয়া, রাজধানী যার নম পেন। থাইল্যান্ড, লাওস ও ভিয়েতনামের পড়শি এই রাষ্ট্রের দেড় কোটি জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ শতাংশ সবাই খেমার (Khmer) নামে এক এথনিক জনগোষ্ঠীর, তাদের ভাষার নামও খেমার। দেশের সাইজ বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বড়, এর জনগোষ্ঠি মূলত বৌদ্ধ-ধর্মীয়। প্রায় ৭০০ বছরের পুরনো এক রাজতন্ত্রে শাসিত ছিল খেমাররা। কিন্তু এরপর নানা হাত ঘুরে কলোনি দখলের যুগে এসে শেষে, ফরাসি কলোনি রাজ্যে পরিণত হয় ১৮৬৩ সালে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে তা থেকে স্বাধীন হয় ১৯৫৩ সালে, কিন্তু থিতু হতে পারেনি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের (১৯৪৫-৭৫) সাথে ভাগ্য ক্রমশ বাধা পড়ে যায়। ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হলে, কম্বোডিয়ান চীনাপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি খেমাররুজ (ফরাসি ভাষায় রুজ মানে লাল। অর্থাৎ কমিউনিস্ট লাল খেমার বা Khmer Rouge) নেতা পলপট কম্বোডিয়ায় ক্ষমতা দখল করেছিলেন। কিন্তু তার কুখ্যাত শাসনের তিন বছরে (১৯৭৫-৭৮) এই দল শ্রেণী-শত্রু হত্যা নৃশংসতার উদাহরণ হয়ে যায়; বলা হয় ঐ সময়কালে গ্রামে মালিকানা উচ্ছেদের নামে এরা ২০ লাখ লোককে গণহত্যা করেছিল।

    প্রতিক্রিয়ায় এরপর অনেক ক্যু, পালটা ক্যু শেষ করে সেসব পেরিয়ে ১৯৯১ সালে সব বিবদমান পক্ষগুলোকে নিয়ে ‘প্যারিস শান্তিচুক্তিতে’ এক রাজনৈতিক আপোষনামা তৈরি হয়েছিল; এরও আরো পরে, কম্বোডিয়া থিতু হতে হতে ১৯৯৭ সাল লেগে যায়। আর সেসব প্রক্রিয়ারই আর এক অংশ, জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে ‘খেমাররুজের গণহত্যার’ বিচার এখনও চলছে। সেই থেকে সাজিয়ে রাখা মৃত মানুষের সাদা সাদা মাথায় খুলি হয়ে যায় কম্বোডিয়ার ব্যঙ্গপ্রতীক। তবে এই কম্বোডিয়া এখন এক কনষ্টিটিউশনাল রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র; অর্থাৎ এর নামকাওয়াস্তে রাজতন্ত্র বা এক রাজা আছে ঠিকই, তবে সব কিছুই জনগণ নির্বাচিত, এক কনস্টিটিউশনাল রিপাবলিক এটা। আর ১৯৮৫ সাল থেকে নানা কায়দা করে এর প্রধানমন্ত্রী হয়ে আছেন হুন সেন। একালে আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের এক অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী কম্বোডিয়া ও এর শ্রম। চীনের বিপুল বিনিয়োগের এক গন্তব্য এখন কম্বোডিয়া। চলতি বছরেও টার্গেট দুই বিলিয়ন ডলার। থাইল্যান্ড এর পড়শি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-গঠনের দিক থেকে প্রায় একইরকম বলে ব্যাংককের মত ট্যুরিজমের আয় কম্বোডিয়ার এক বড় আয়ের খাত হয়ে উঠছে ক্রমেই। আর সমুদ্র সীমান্তে (অফসোরে) তেল গ্যাস পাওয়ায় তা অর্থনীতিতে এক বিশাল খাত হয়ে উঠছে। এই হল পুরনো দিক থেকে কম্বোডিয়ার বর্ণনা-পরিচিতি, এবার চলতি লেটেস্ট দিক থেকে আর এক পর্ব শুরু করা যাক।

    আগামী বছর ২০১৮ সালে কম্বোডিয়ায় আবার সাধারণ নির্বাচন হবার কথা। আবার বলছি কারণ গত ২০১৩ সালের নির্বাচন ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে রাজনৈতিক অসন্তোষ দিয়ে তা শেষ হয়েছিল। স্বল্প ভোটে বিরোধী দল (কম্বোডিয়া ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টি, CNRP) হেরেছিল এভাবে দেখিয়ে ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। আর চলতি প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের দলকে (কম্বোডিয়ান পিপলস পার্টি, CPP) বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। ফলে ‘বিরোধীদের সংসদ বয়কট’ – আমাদের পরিচিত এই ফেনোমেনায় কম্বোডিয়ার বিরোধী দল বেশির ভাগ সময়টা সংসদের বাইরে কাটায়। ওদিকে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন, গুম, খুন করা, ইংরাজী দৈনিক পত্রিকা বন্ধ, রেডিও সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ এগুলো খুবই কমন। কিন্তু ওদিকে সরকারের সংসদে পাশ করা বড় অদ্ভুত কিছু আইন চালু আছে। যেমন একটা হল কুখ্যাত ‘কটূক্তি আইন’ (ডিফেমেশন ল), যা দিয়ে কোনো সরকারি কর্মচারী বা পদ ধারক কারও সমালোচনা করলে তাকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া সম্ভব। এরকম অদ্ভুত আরো কিছু আইন প্রচলিত আছে সেখানে। যেমন – সরকারের আইনি অধিকার আছে কোনো রাজনৈতিক দলকে সামান্য অজুহাতে নিষিদ্ধ করে দেয়ার। এই আইনে বর্তমান বিরোধীদলীয় প্রধান তিনি ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে স্টাটাস দিয়েছেন – এই অজুহাতে তাঁকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। তিনি বিদেশে পালিয়ে গিয়েছেন। এর পরে ফেব্রুয়ারি থেকে যিনি দলের নেতা হয়ে আসেন তিনিও গত কয়েক মাস থেকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায়’ জেলে আছেন। আর উচ্চ আদালত এর পুরো বিচার শেষ নাই বটে, কিন্তু তা না করেই গত ৩১ অক্টোবর আদালত তাঁর জামিনের আবেদনে সাড়া না দিয়ে উলটা ডিটেনশন দিয়ে রেখেছে।

    ঐ রায়ের বিচারক খিম পন তাঁর রায়ে লিখেছেন, ‘বিরোধীদলীয় এই নেতা কেম সোখাকে ডিটেনশন দেয়া হল, নতুন ক্রাইম ঠেকাতে আর যাতে জনশৃঙ্খলা রক্ষা আদালত গ্যারান্টি দিয়ে নিশ্চিত করতে পারে’ সেজন্য।  [The detention of Kem Sokha is to prevent new crimes and that the court can  guarantee public order, JUDGE KHIM PONN]  কম্বোডিয়ায় আরেকটা মজার আইন আছে। তা হল, রাজনৈতিক দলের প্রধানের নামে যদি আদালতে কোন ক্রিমিনাল অপরাধের অভিযোগ দায়ের করা হয় ও তা বিচারের শেষে আদালতের রায়ে যদি সাজা হয়, তবে এরপর পুরা ঐ দলকেই সরকার ‘বিলুপ্ত’ বলে ঘোষণা করে দিতে পারে। কম্বোডিয়ার প্রধান বিরোধী দলের বেলায় ঠিক তাই ঘটেছে।  প্রধান বিরোধী দল CNRP এর সর্বশেষ অবস্থা হল, এই দলের আগের প্রধান যে ছিলেন তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে সাজা হয়ে গেছে, তিনি বিদেশে পালিয়ে আছেন। আর দলের চলতি প্রধান ডিটেনশনে আছেন। অভিযোগ হল সেই ২০১৩ সালে তিনি আমেরিকান সরকারি লোকের সাথে  তিনি কথা বলছেন এমন এক ভিডিও দেখিয়ে, তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাই ডিটেনশন দেয়া হয়েছে। আর গত ৬ অক্টোবর, তাই এইবার খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আদালতে  বিরোধী দলকেই বিলুপ্ত ঘোষণা করার আবেদন করেছিলেন। আর তাতে সুপ্রিম কোর্ট গত ১৬ নভেম্বর প্রধান বিরোধী দল কম্বোডিয়া ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে রায় দেন। ঐ রায়ের ফলে সেই সাথে ওই দলের ১১৮ জন সিনিয়র সদস্য ও রাজনীতিক নিষিদ্ধ হবেন এবং গত চার বছরে  যে ৪৮৯টি কমিউন (স্থানীয়) নির্বাচনে CNRP দলের সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছিলেন তারাও সবাই পদ হারাবেন। ওদিকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংসদের ৫৫টি আসনই হারাবেন।

    এই অবস্থায় তাহলে আগামী বছরের সংসদ নির্বাচনে কী হতে যাচ্ছে? যেখানে প্রধান বিরোধী দলকে ছলেবলে কৌশলে অযোগ্য ঘোষণা করে দেয়া হল, এর অর্থ তাৎপর্য না বোঝার কিছু নেই। আমাদের দেশের বিনা নির্বাচনে বিজয়ের মতো কিছু একটা সেখানে এখন হবে তা বলাই বাহুল্য। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ নাই। বিগত ২০১৩ সালের নির্বাচনে এই বিরোধীরা হুন সেনকে বহু পেরেসান করেছিল। এবার তাই তিনি কোনো রিস্ক রাখলেন না। আর ওই ৫৫টি আসন এখন (আমাদের এরশাদের মত) খুচরা বিরোধী দলগুলো যারা সবাই মিলে গত নির্বাচনে মোট ভোটের মাত্র ৭ শতাংশ পেয়েছিল এদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়া হবে। এসব ছোট দলের সদস্যদের মধ্যে তাই হুটোপুটি শুরু হয়েছে পদ-পদবি ও সুবিধাদি নেবার জন্য। আরো আছে। একই অভিযোগ এনে এখন আরো সম্ভাব্য ১০০ জন্য বিরোধী প্রার্থীকে নিষিদ্ধ করে রাখার তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

    সাবেক খেমাররুজ নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হুন সেন ক্ষমতায় আছেন ১৯৮৫ সাল থেকে, একনাগাড়ে প্রায় ৩৩ বছর। সম্প্রতি তার দেশে এক বয়ান,  ‘দেশের স্থিতিশীলতার জন্য’ এ কথা কয়টাক এক বিরাট ইস্যু বা অজুহাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী হুন সেন এক পাবলিক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘দেশের স্থিতিশীলতার জন্য’ আরো এক যুগ তাকে ক্ষমতায় থাকতে হবে।

    তাহলে এখন থেকে যা বোঝার বুঝে নেন। কিন্তু কোথাকার এক কম্বোডিয়ার চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা ইতিহাস নিয়ে আমি কেন আপনাদের শুনাতে এলাম? বাংলাদেশের সরকার আর বিরোধী দল আর ওদিকে আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আকার ইঙ্গিতে কিছু বলার জন্য কী? না একেবারেই নয়। এই অনুমান ভুল। বরং আসল উদ্দেশ্য এতক্ষণ উপরে কোথাও লেখাই হয়নি। কী সেটা?
    কম্বোডিয়ার সর্বশেষ রাজনৈতিক দশা পরিস্থিতি নিয়ে ইষ্ট এশিয়ার মিডিয়াগুলোর অনেকেই নানা আর্টিকেল ছেপেছে। এমনি একটা হল, হংকংভিত্তিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। ‘মর্নিং পোস্টে’ একটি কলাম ছাপা হয়েছে, লেখক এডোয়ার্ড মরটন।

    তিনি বলছেন, “হুন সেন চীনের সাথে গাঁটছাড়া বেঁধে আমেরিকাকে বুড়ো আঙুল দেখাতে নেমেছেন। কিন্তু হুন সেনের এই হিসাব ‘যা নয় তাই বাড়িয়ে ধরা’ অনুমান বলে প্রমাণিত হবে।” কিছু বিশ্লেষক, কিছু রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও জার্নালিস্টদের বক্তব্যের রেফারেন্সে তিনি এসব কথা বলেছেন। তার এসব মন্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় হুন সেনের আরেক মন্তব্য থেকে। তিনি বলছেন, ‘আগামী বছরের নির্বাচনের ফলাফলে পশ্চিমাদের স্বীকৃতি জোগাড়ের প্রয়োজন হবে না।’ কিন্তু তবু এটাও আমার এই লেখার ফোকাস নয়। তবে এবার লিখছি ফোকাসটা কোথায় এবং তা কী? যা খুবই বিপজ্জনক ইঙ্গিত।

    আলজাজিরা টিভি গত ১৭ নভেম্বর কম্বোডিয়া পরিস্থিতি নিয়ে ২৫ মিনিটের টকশোর মতো অনুষ্ঠান ‘ইনসাইড স্টোরি’ প্রচার করেছে। সেখানে তিন অতিথি ছিলেন ০১. মু সোচুয়া – তিনি সদ্য নিষিদ্ধ হওয়া বিরোধী দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট, পলাতক হয়ে প্যারিসে আশ্রয় নিয়ে আছেন। ০২, ভিকটর গাও – চায়না ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পরিচালক। তিনি আসলে আবার ‘চায়না এনার্জি সিকিউরিটি ইন্সটিটিউটের’ চেয়ারম্যান। তার আরেক পরিচয় হল, তিনি বিখ্যাত চীনা নেতা দেং জিয়াও পিংয়ের অনুবাদক হিসাবে কাজ করেছেন। আর ০৩. হোসেক লি ম্যাকিয়ামা – তিনি ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির পরিচালক। এই তিন প্যানেল বক্তার মধ্যে চীনা একাডেমিক মি: গাও – এর বক্তব্য আমার প্রসঙ্গ।

    গাও তার পালা এলে তিনি স্পষ্ট করে হুন সেনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন। হুন সেনের সরকার, তার গৃহীত পদক্ষেপ সব সমর্থন করলেন। এটা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। এমনকি রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের জেনারেলদের পক্ষেও এত স্পষ্ট করে পাবলিক মিডিয়ায় চীন কথা বলেনি। ১৯৭০-এর দশকে চীন-আমেরিকার সম্পর্ক পাকা হয়, আর সে সময়ে নিজেরা যার যার স্বার্থ বুঝাবুঝি, পারস্পরিক স্বীকৃতি বা দেনাপাওনাগুলো ঠিকঠাক হয়েছিল ১৯৭১-৭৮ সালের মধ্যে। আমেরিকান বিনিয়োগে চীনে এক ক্যাপিটালিজম জগত প্রবেশ করবে আর, এক নতুন অর্থনৈতিক পথে চীন যাবে সে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তখন থেকেই চীন নিজের জন্য আর একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে এর ফলে ক্রমশ চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব সক্ষমতা ক্রমশ বেড়ে চললেও এর প্রভাবে কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিষয়াদিতে নাক গলানোর বা গ্লোবাল প্রভাবের ভাগিদারি ভাগ পাওয়ার সুযোগ হাতে পেলেও চীন তাতে জড়িত হবে না। না এটা চীনের কোনো ভালো মানুষি নয়। বরং দুনিয়াজুড়ে আমেরিকান যে রাজনৈতিক প্রভাব বলয় তৈরি হয়ে আছে এর মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবের ভাগিদারি এই খাতে চীন নিজেকে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অথবা প্রভাবের শেয়ার নিতেও সে যাবে না। বরং চীন যদি এতে পুরো ছাড় আমেরিকাকে দিয়ে দিলে, দুনিয়ার সব কোনা থেকে গ্লোবাল অর্থনৈতিক বিষয়াদির ভাগিদারি কর্তৃত্ব ও প্রভাব বিনা বাধায় পেতে সহজ হবে। ফলে আমেরিকার সাথে চীনের সম্পর্ক অ-সাংঘর্ষিকভাবে বিকশিত হতে পারবে। চীন চেয়েছিল গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের কোনো ভাগ আমেরিকার কাছে সে চাচ্ছে না। অথবা চীন সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী নয় এই বার্তা আমেরিকাকে  জানানো। আর সে কারণে সবার আগে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজের উত্থান পর্বকে প্রায় বাধাহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে। যেটা  আসলে সহজে চীন বাস্তবে অর্জন করেছিল।

    যেমন – ২০১৪ সালে আমাদের নির্বাচন ইস্যুতে দেখা গিয়েছিল কোন রাজনৈতিক স্টেক বা কেমনভাবে নির্বাচন হতে হবে তা নিয়ে কোনো বক্তব্য চীনের ছিল না। কিন্তু সরকারে যেই থাক বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসায় চীনের যা স্বার্থ যা সে চায় তা নিয়ে যেন কেউ বাধা হয়ে না দাঁড়ায় এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে সে পশ্চিমা অবস্থানের পক্ষে নীরব সমর্থন দিয়ে তা নিশ্চিত করেছিল। রাজনৈতিক প্রভাবে ভাগিদার সাজতে না চাওয়া চীনের এই নীতি অবশ্যই বেশ লম্বা সময়ের জন্য, তবুও তা আবার এক অর্থে সাময়িক। যেমন, যত দিন চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে পূর্ণতা নিয়ে হাজির হচ্ছে  ততদিন একই সাথে গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের দিকে হাত বাড়াতে চীন যাবে না। তবে এর পরে অবশ্যই যাবে। এরই সোজা অর্থ সম্ভবত এবার রাজনৈতিক ইস্যুতেও আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীন দুনিয়ায় হাজির হতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

    কম্বোডিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চীন সরাসরি হুন সেনের পক্ষ দাঁড়িয়েছে শুধু তাই নয়, হুন সেন একটি ন্যূনতম ভাবে ফেয়ার নির্বাচিত সরকার হয়ে থাক সেটার দরকার নেই – এ কথায় এতদূর গিয়ে প্রবক্তা হয়েছে। মি. গাও বলেছেন. কম্বোডিয়ায় একটা ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গেলে যদি পুরনো অস্থিতিশীলতা আবার ফিরে এসে পড়ে’ তাই এর দরকার নেই। আর এতে অর্থ সম্পদও নষ্ট হতে পারে। তা ছাড়া ‘তথাকথিত গণতন্ত্র’ (তিনি তথাকথিত বা সোকল্ড শব্দটা ব্যবহার করেছেন) বাস্তবায়নকে দেখার অনেক ধরন আছে। অর্থাৎ হুন সেন বিরোধীদের মেরে ধরে গুম নির্যাতন করে, জবরদস্তি যদি নিজেকে ভুয়া নির্বাচিত হিসেবে দেখায় তবুও সেটা চীনের স্টাইলের নির্বাচন (গণতন্ত্রকে দেখার নানা পথ আছে) মনে করে এবং ‘স্থিতিশীলতার স্বার্থে’, ‘সম্পদ নষ্ট না করার স্বার্থে’ হুন সেনকেই নির্বাচিত মানতে হবে। চীনের নিজের রাজনৈতিক ব্যবস্থার রাষ্ট্রে নাগরিকের কোনো রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক অধিকার, মানবিক মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন- এগুলোকে সে নিজ করণীয় বলে মনে করে না। নিজে করেওনি। বরং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্য অর্জন এগুলোই করণীয়। অর্থাৎ মানুষ বৈষয়িক বিষয়াদির ভোগকারি মাত্র। তার কোন স্পিরিচুয়াল ও রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা, করণীয়, দায়দায়িত্ব এসব কিছু নাই- এই হলো চীনা কল্পনায় দেখা মানুষ। মানুষ সম্পর্কে এই অনুমানের উপরে দাঁড়ানো আছে চীনের নেতৃত্ব।

    তাহলে কী দাঁড়াল? চীন কী এখন থেকে আমেরিকার সাথে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক প্রভাব এর ভাগিদার বা পুরা কতৃত্ব নেয়ার জন্য এখন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া শুরু করবে? যার বাইরের দিকটা দেখে লাগবে কম্বোডিয়ায় মতই, কোনো বিরোধী দল সেখানে নেই অথবা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা থাকার দরকার আছে কিনা এই নিয়ে আমেরিকা ও চীনের লড়াই? নাকি কম্বোডিয়ার মত কিছু দেশের বেলায় (সব দেশের বেলায় নয়) চীন একক রাজনৈতিক প্রভাব হাসিলের জন্য এখন থেকে আমেরিকার সাথে লড়বে? এই দুইয়ের মধ্যে সেটা যেটাই হোক, চীন গোহারা হারবে সেটা আগেই বলে দেয়া যায়। কারণ মডার্নিটি পরবর্তী দুনিয়া ১৯৪৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইট চার্টার পর্যন্ত গিয়েছে। ওর অনেক খামতি আছে। কিন্তু তাই বলে সেটা ওর পেছনের সময়ে ফিরে যেতে পারে না। দুনিয়া এমনকি সত্তরের দশকে কমিউনিস্ট বুঝে আবার ফিরে যেতে পারে না।

    অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে চীন যতই এগিয়ে যাক, চীনের রাজনৈতিক বুঝাবুঝিতে ব্যাপক ঘাটতি আছে। তবুও, আচ্ছা এটাই কী চীনের সদ্য সমাপ্ত দলীয় কংগ্রেসে উল্লেখিত ‘মডার্ন সমাজতন্ত্রের’ ব্যাখ্যা; আর এজন্য শি জিনপিংকে মাওয়ের সমতুল্য নেতা বলে দাঁড় করানো শুরু? সেটা যাই হোক, চীনের এই পদক্ষেপ খুবই বিপজ্জনক ও আত্মঘাতী পথে যাওয়ার ইঙ্গিত!

    সর্বশেষঃ
     রয়টার্স এজেন্সির খবর,  ১৭ নভেম্বর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেগুলার বিফ্রিংয়ে প্রশ্নের উত্তরে জানায়, কম্বোডিয়ার চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরোধী দল ও নেতাদের নির্মুল ও শুন্য করা প্রসঙ্গে চীন বলছে, এটা “কম্বোডিয়ার নিজস্ব কায়দার উন্নয়নের রাস্তা অনুসরণ” করা বলে চীন মনে করে। [Cambodia in pursuing its own development path……)
    আর এর পাল্টা আমেরিকা বলছিল, আমেরিকা নির্বাচন সম্পর্কিত সব ফান্ড প্রত্যাহার করে নিচ্ছে এবং আরও কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ [“concrete steps”] নিতে যাচ্ছে।  এর প্রতিক্রিয়ার হুন সেন গতকাল ১৯ নভেম্বর বলেছেন, তিনি  সমস্ত আমেরিকান এইড প্রত্যাহার করে নিতে স্বাগত জানায়। [“Hun Sen … welcomes and encourages the U.S. to cut all aid.”]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com   

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • মিস করা রোহিঙ্গা-ট্রেন কী আমেরিকা ধরতে পারবে

    মিস করা রোহিঙ্গা-ট্রেন কী আমেরিকা ধরতে পারবে

    মিস করা রোহিঙ্গা-ট্রেন কী আমেরিকা ফিরে ধরতে পারবে
    গৌতম দাস
    ০৭ নভেম্বর ২০১৭, রাত ০০ঃ৪৩
    https://wp.me/p1sCvy-2kC

    আমেরিকা কি ফেল করা ট্রেন আবার ধরতে পারবে? কোন ট্রেন? বার্মা ট্রেন, নাকি মিয়ানমার ট্রেন? আসলে এসব ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলে লাভ নেই; কথা হলো এটা রোহিঙ্গা-ট্রেন! অর্থাৎ আমেরিকা কি ফেল করা রোহিঙ্গা-ট্রেন আবার ফিরে ধরতে পারবে? আবার ধরার জন্য কতদুর সিরিয়াস যাবে? রোহিঙ্গা-ট্রেন  – একথারই বা মানে কী? কী বলতে চাওয়া হচ্ছে? রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যার একটা খুবই ক্ষুদ্র অংশ, মাত্র চার পারসেন্ট। কিন্তু মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গা-মানুষের মর্যাদা এতই পর্যুদস্ত, এতই নিচে অমানুষের বা ঊন-মানুষের স্তরে উগ্র বর্মি জাতীয়তাবাদ নিয়ে গেছে যে, দুনিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে গেছে রোহিঙ্গা পারসিকিউশন বা অত্যাচার নিষ্পেষণ। সেই সাথে বার্মিজ জেনারেলদের নাম নৃশংসতার ওস্তাদ হিসেবেও ছড়িয়ে পড়েছে। এরা নির্মূল ক্লিনজিংয়ে কত দক্ষ এর স্বাক্ষর-চিহ্ন ব্যাপক ছড়াছড়ির মুখে জাতিসঙ্ঘকে বলতেই হয়েছে যে, ‘দুনিয়ার সবচেয়ে পারসিকিউটেড বা নিষ্পেষিত জনগোষ্ঠী হলো রোহিঙ্গারা’। অতেব আমাদের সামনে এখন প্রশ্ন হল, আমেরিকা কি বর্মি জেনারেলদের একটা শিক্ষা দিতে পারবে? কতদুর পর্যন্ত সিরিয়াসলি যাবে?

    আগে আমরা দেখছি, আমেরিকা ভুলে গিয়েছিল মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে, জেনোসাইড বা ক্লিনজিংয়ের বিষয়ে দুনিয়ার কাছে তার কমিটমেন্ট কী? দুনিয়ার কাছে কী প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে গ্লোবাল লিডার হয়েছিল? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গ্লোবাল ইকনোমিক ব্যবস্থায় একটা অর্ডার বা নিয়ম শৃঙ্খলা কায়েম করেই আমেরিকা আজকের ওয়ার্ল্ড লিডার হয়েছিল। তবে  শুধু এতটুকু করেই হতে পারেনি। এটা সে হতে পেরেছিল কারণ সাথে কিছু পলিটিক্যাল কমিটমেন্টও তাকে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। মানুষের মর্যাদা রক্ষা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির প্রতিশ্রুতি। যদিও তাতে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। বিভিন্ন সময়ে আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার  বিষয়টাকে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করেছে, নিজ সঙ্কীর্ণ স্বার্থে ‘রেজিম চেঞ্জের’ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের নজির স্থাপন করেছে। এখনো এই সমস্যা দুনিয়াতে আছে যে, সুদানের বশির একটা গণহত্যা চালালেও চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ যদি উদ্ধার হয় তবে বলা হবে গণহত্যা হয়নি, বরং ‘গণহত্যার কাছাকাছি’ কিছু একটা হয়েছে। কারণ চীনের এ কথা না মানলে চীন ভেটো দিয়ে দিবে; একই উদাহরণ আমেরিকারও আছে। ফলে ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিচার বিবেচনা মুল্যায়নে একটা গণহত্যা ঘটেছে কি না তা সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে দুনিয়ায় এখনো বহু সীমাবদ্ধতা আছে। আসলে তাই দরকার আবার এক রুজভেল্টের, আবার এক নতুন প্রতিশ্রুতিতে নতুন করে জাতিসঙ্ঘ গড়া। অথচ আমেরিকা নিজেরই সেসব ইতিহাস ভুলে বসে আছে। আর বাস্তবে হারার আগেই মনে মনে হেরে গেছে।

    এ কথা ঠিক যে, ২০০৭-০৮ সাল থেকেই এটা জানা গিয়েছিল যে, দুনিয়ার অন্তত অর্থনৈতিক পরাশক্তি ও লিডার অর্থে চীনের কাছে আমেরিকার কাঁধবদলের সময় হয়ে গেছে। আমেরিকার জায়গায় সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উত্থিত হচ্ছে চীন। এ কথাও সত্যি যে, কারো অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে উত্থিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে এটা তখন থেকে কেবল সময়ের ব্যাপার যে, সেই রাষ্ট্র এখন ক্রমে ক্রমে সব অর্থেই গ্লোবাল পরাশক্তি হিসেবে হাজির হবে। কিন্তু তাই বলে একথাও ভুলে যাওয়া যাবে না যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের আমেরিকা কেবল অর্থনৈতিক আর সামরিক শক্তির জোরে গ্লোবাল পরাশক্তি বা গ্লোবাল লিডার হয়নি। সাথে রাজনৈতিক শক্তি হতে হয়েছে আগে, কিছু গ্লোবাল রাজনৈতিক মুল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে আগে;  তবেই আমেরিকার গ্লোবাল লিডার হওয়া গেছে। এমনি এমনি আমেরিকা দুনিয়াকে নিজের এম্পায়ার বানাতে সক্ষম হয়নি। পলিটিক্যাল আইডিয়া, এর উপযোগী গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান আর সর্বোপরি কমিটমেন্ট – এসব প্রতিটি জিনিস গুরুত্বপূর্ণভাবে হাজির করাতে হয়েছিল আমেরিকাকে। আর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি? সেটা বাইরে কাউকে না খোদ নিজের কাছে নিজেকে দিতে হয়েছিল যে – মানুষের মর্যাদা রক্ষা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা কেবল আমেরিকাতে করলেই হবে না, সারা দুনিয়ার ব্যাপারেও অন্তত নীতি-অবস্থানগত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। এতকিছু বলার পরেও এ কথাও সত্য যে, ১৯৪৮ সালে জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস চার্টার যেটা রচিত হয়েছিল বটে কিন্তু ওখানের ‘ইনডিভিজুয়ালিজম’ ধারণায় ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা আছে, তাই তা নিয়ে দুনিয়াকে আরো অনেক কাজ করতে হবে। সারকথা কোনো ‘রাজনৈতিক’ নীতি-অবস্থান এবং এসবের প্রতি প্রতিশ্রুতি ছাড়া আমেরিকা গ্লোবাল লিডার হয়নি, হতে পারেনি। আজকের জায়গায় আমেরিকা এমনি এমনি উঠে আসেনি। তাই আগেই বলে দেয়া যায় এই নুন্যতম শর্তপুরণ ছাড়া  আগামিতে অন্য কেউও হতে পারবে না।

    অথচ এই শতকে এসে  আমেরিকা সত্যি সত্যি হেরে যাওয়ার আগেই ২০০৮ সালে সব ছেড়েছুড়ে আগেই হার স্বীকার করে নিয়েছিল। এর আগে নানা সিরিয়াস হিউম্যান রাইটস ভঙ্গের কারণে ২০০৮ সালের আগের বার্মা ছিল আমেরিকান অবরোধে ডুবে থাকা, বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় একঘরে হয়ে থাকা এক বার্মা। অথচ চীনের দেখানো রাস্তায় সেই মতনই বার্মায় বিনিয়োগ ও ট্রেড আর ব্যবসার ভাগ পেতে মরিয়া লোভী হয়ে আমেরিকা চীনের পথ অনুসরণ করে বসেছিল। বর্মি জেনারেলদের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের রেসিজমে নির্মূল ক্লিনজিং দেখেও না দেখার ভান করার দিন দুনিয়াতে যেন আবার ফিরে এসেছিল – চীনের দেখানো সর্টকাট রাস্তার লোভে পরে আমেরিকাও এই শর্টকাট পথ নেয়ার লোভে পড়েছিল। আমেরিকা মনে করে নিয়েছিল যেন দুনিয়ায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক নীতি অবস্থান এবং এসবের প্রতি প্রতিশ্রুতি ছাড়া দুনিয়া এ পর্যন্ত আসতে পেরেছিল। আর আমেরিকা কোনো কমিটমেন্ট ছাড়াই বোধহয় সে এই দুনিয়ার নেতা হয়েছিল। ২০০৮ সালের বার্মার কনস্টিটিউশন চালুর পরেও সেই একই দানব ও কোটারি এক সামরিক রাষ্ট্রই ছিল বার্মা। অথচ বলা হচ্ছিল বার্মা নাকি ‘গণতন্ত্রের পথে’ যাত্রা শুরু করেছে, গণতন্ত্রের পথে নাকি ট্রানজিশনে বা অন্তর্বর্তি রাস্তায় আছে বার্মা। আর সু চি নাকি শান্তির নোবেল মানুষ ইত্যাদি। এসব ভুয়া সার্টিফিকেট বিতরণ করেছিল আমেরিকার নেতৃত্ব পশ্চিম।  চলতি আগষ্টে বার্মায় ফিরে গণহত্যা শুরুর পরে সু চি তাঁর সাফাই ভাষণে গণহত্যার অভিযোগের জবাবে মিয়ানমারের ‘শিশু গণতন্ত্রের’ যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তা শুনে প্রখ্যাত মার্কিন জেনোসাইড বিশেষজ্ঞ ড. গ্রেগরি এইচ স্ট্যানটন যথার্থই বলেছেন, “এটা গতানুগতিক অজুহাত। অভিযোগ প্রত্যাখ্যানকারীদের দিক থেকে এটা বহুল ব্যবহৃত একটি কৌশল। তারা বলে থাকেন, গণহত্যা বন্ধের দিকে নজর দেয়ার চেয়ে শান্তিপ্রক্রিয়া বজায় রাখাটাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। অং সান সু চি তাই করেছেন”।

    অথচ আমেরিকা ট্রেন মিস করেছিল। রাজনৈতিক কর্তব্য ভুলে সস্তা ব্যবসাব ও বৈষয়িকতার লোভের ফাঁদে বর্মি জেনারেলদের কাছে নিজেকে ধরা দিয়েছিল। নিজেকে সস্তা করে তুলে, সস্তায় বিক্রি করে দিয়েছিল। নিজের দাম নিজে বোঝেনি। যার দায় ওবামা প্রশাসনেরও কম নয়। চীনের কাছে দুনিয়ার নেতৃত্ব হারানোর আগেই আমেরিকা উলটো নিজেকে চীনের পর্যায়ে নামিয়ে ফেলেছিল।

    আচ্ছা আমেরিকা কী কখনও খেয়ালই করেনি দুনিয়াতে কোথাও রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কমিউনিস্টদের কোনো রাজনৈতিক সিরিয়াস প্রতিশ্রুতিই নেই। এরা নিজ নিজ বিপ্লবের পরে রাষ্ট্রের নামের সাথে ‘রিপাবলিক’ বলে একটা শব্দ রেখেছে, ইংরেজির একটা ‘আর’ অক্ষর সেখানে আছে বা ছিল। লুপ্ত হয়ে যাওয়া সোভিয়েত মানে ওর ‘ইউএসএসআর’ (USSR) নামে ‘আর’ অক্ষরটা ছিল। এখনও বর্তমান মাও এর চীনের নাম ‘পিআরসি’ (PRC) তেও ‘আর’ অক্ষরটা আছে। এই ‘আর’  এর অর্থ হল ‘রিপাবলিক’। রাজতন্ত্র উতখাত করে পিপলস রিপারলিক প্রতিষ্ঠা ছাড়াও মর্ডান রিপাবলিকের আরও অর্থ হল রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। কমিউনিস্টদের কাছে  এসব কথার সাথে কোনো ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ অ্যাক্ট’ তৎপরতা তাদের কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের করণীয় নাই। সেখানে কনস্টিটিউশনের কোনো গুরুত্ব নেই, কী লেখা আছে সেখানে তাও তত গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলে রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা সেটা তো কোনো সিরিয়াস কিছু নয়। কারণ এসব কথার কথার নাকি নেহাতই ভোটের হিসাব; যেমন কোনো করপোরেট চেয়ারম্যানেরও এক ভোট, এক ফকিরেরও এক ভোট। তাই মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির কথাবার্তার কোন মুল্য কমিউনিস্টদের কাছে নাই। মৌলিক মানবাধিকার ইস্যুটা নাকি কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে আমেরিকার ষড়যন্ত্র। যদিও একথা সত্য রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা সমাজে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা নয়। ফলে এটা যথেষ্ট নয়। কিন্তু তাই বলে এটা কোন অর্জনই নয়, এটা মারাত্মক ভুল ধারণা। ফলে মর্ডান রিপাবলিকে মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য  ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা কমিউনিস্টদের কাজই নয়, এর কোন গুরুত্ব নাই, এটা কারও কাজে লাগে না, এগুলো মানুষের কোন অর্জন নয় – এটা মিথ্যা ভিত্তিহীন কথা শুধু না। খুবই নিম্ন বোধের – মানুষ কেবল জীব, এই অনুমানে বলা বক্তব্য। মানুষকে রিডিউসড নীচা গণ্য করা বক্তব্য।

    তাই চীনের বুঝ হল, তারা যে দানব বর্মি জেনারেলদের পা-চুমে বিনিয়োগ ব্যবসা খাচ্ছে – এর পাশেই লাখ লাখ রোহিঙ্গা ঐ জেনারেলদের হাতেই কচুকাটা ক্লিন হয়ে গেলে তাতে চীনের কী দায়! তার কোনো দায় নেই। সেই, ১৯৭০-এর দশক থেকেই চীন নিজের কাছে পরিষ্কার যে, গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের দুনিয়ায় সে যাচ্ছে বটে কিন্তু কোনো গ্লোবাল ইউনিভার্সাল রাজনৈতিক মুল্যবোধ প্রতিষ্ঠা হওয়া বা থাকা না থাকার দায়দায়িত্ব সে নেবে না। কেবল কোন ব্যবসাটা সে পাবে সেই ভাগ সে ঠিকই গ্লোবাল প্লেয়ারদের ভাগ থেকে নিজেরটা বুঝে নেবে। এই নীতিতেই চীনের বিদেশনীতির ডিপলোম্যাসি এত দিন চলে এসেছিল। আর প্রমাণ হয়েছে এটা অচল। রোহিঙ্গারা প্রমাণ করে দিয়েছে   এই চীন ব্যর্থ। এই চীন গড়ে তোলা অর্থহীন, খামোখা। মানুষ কেবল জীব নয়, সে কেবল একটা বৈষয়িক জীব-জীবন নয়। মানুষের জীবনের আরও অর্থ উদ্দেশ্য লক্ষ্য আছে; দায় কর্তব্য আছে। স্পিরিচুয়ালিটির দিক আছে। জীব জীবন ছাড়িয়ে মানুষের তাই আরও উন্মেষ দরকার হয়। সেকথাটাই আর ভাবে বললে হয়, মানুষের রাষ্ট্রের তাই রাজনৈতিক কমিটমেন্ট দরকার থাকে। মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক ইনসাফ, মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়ার স্তরে তাই মানুষের নুন্যতম দায়। এসব পুরণের পথে নুন্যতম দায় কর্তব্যবোধ নাই চীনের। ফলে আগেই বলা যায় কোন গ্লোবাল নেতা হওয়ার খায়েশ চীনের পূরণ হবার সুযোগই নাই। আসলে সে ধরা খেয়েছে। কিভাবে?

    আগেই বলেছি আমেরিকা লোভে পড়ে হুঁশ হারিয়েছিল। নিজের গৌরব নিজের অবদান ভুলতে বসেছিল। এমনকি এবারের আগষ্টের পর থেকে নবউদ্যোগে নির্মূল অভিযান শুরুর পরে, ৮ সেপ্টেম্বর প্রেসের সাথে বক্তব্যে বিষয়ে আমেরিকার উপমন্ত্রী মার্ফি সাহেবের কথাবার্তা লক্ষ্য করা যাক। তিনি তখনও কেবল সতর্ক কী বলতে কী বলে ফেললে আবার বর্মি জেনারেলদের মন উঠে যায়, অখুশি হয়ে যায় – সেদিকে খুবই সতর্ক থেকে ৮ সেপ্টেম্বর প্রেসের সাথে কথা বলছেন। জেনারেলদের মন জোগাতে মার্ফি বলার চেষ্টা করছিলেন যে এটা নাকি রোহিঙ্গা বা মুসলমান নির্মূল ক্লিনজিংয়ের ইস্যু নয়, এটা নাকি রাখাইন স্টেটের দুই জাতিগোষ্ঠীর ঝগড়া, অর্থাৎ বার্মা রাষ্ট্র বা মিলিটারির কোন ভূমিকা নেই। তার এই অবস্থা দেখে সিবিএস নিউজের সাংবাদিক সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করায় জবাবে মার্ফি সাহেব আবার সে কথা কনফার্ম করেছিলেন। কিন্তু এরপরেও সব চিতপট হয়ে যায়, সব কিছু ঘুরে যায়। গত ২ অক্টোবর মিয়ানমারে অবস্থিত ২০টি দেশের রাষ্ট্রদূত একসাথে রাখাইন প্রদেশ সরেজমিন সফর করে এসে এরপরে তা নিয়ে মিয়ানমারে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত যে বিবৃতি দেন তাতে পরিস্থিতি উলটে যায়। যার মূল কথা হল, বার্মার জেনারেলদেরকে অধিকার সংরক্ষণে রাষ্ট্রের দায়দায়িত্বে স্মরণ করিয়ে দেয়া, আর বারে বারে চাপ দিয়ে বলা যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে, জাতিসঙ্ঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন আসতে দেয়া ইত্যাদি। এসব নিয়ে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।

    অর্থাৎ তখন থেকে আমেরিকা সুর পালটিয়ে ফেলেছিল। নিজ শক্তি, তুচ্ছ করে ফেলে রাখা হারানো গৌরবের কথা মনে পড়ে গেছিল। ফলে এরপর থেকে আর এটাকে ‘রাখাইন প্রদেশের জাতিগোষ্ঠীর নিজেদের ঝগড়া’ বলে আড়াল করতে চাইছে না। এটাকে বলা যায় আমেরিকান বার্মা নীতিতে মেজর শিফট পটপরিবর্রতন।  এরপরে ২৩ অক্টোবর এসে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতি – এটা একেবারে কঠোর অ্যাকশনের দলিল নির্দেশনামা যেন। সাথে আগের মতো যে দায়ী ইনভেস্টিগেট করো, তাকে ধরে নিয়ে আসো সেসব কথা তো আছেই। তবে মূল কথা হল, ২০০৮ সালের আগে আরোপিত আমেরিকার দেয়া যেসব অবরোধ উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল সেগুলো আবার কার্যকর করা হয়েছে বলে ঘোষণা করে দেওয়া। বিশেষত বর্তমান ও সাবেক সামরিক অফিসারদের ওপর ট্রাভেল ব্যান আবার বলবৎ করা, বার্মা থেকে রুবিসহ দামি পাথর আমেরিকায় পাঠানো ব্যবসার ওপর নিষেধাজ্ঞা ফিরে আরোপ, আর সামরিক বাহিনীর জন্য নেয়া আমেরিকার স্পন্সরড যেকোনো কর্মসূচি স্থগিত করে দেয়া। এক কথায় আমেরিকান রাষ্ট্রের সাথে বর্মি আর্মি সদস্যদের সব ধরনের যেকোনো সংশ্লিষ্টতা ও যৌথ তৎপরতা স্থগিত।
    তবে এবারের সারকথায় গুরুত্বপুর্ণ দিক হল, মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতে দেখতে চায় আমেরিকা এই দাবিটা ছিল মুখ্য। আর, একথা শুনে জেনারেলদের কাপড় নষ্ট করে ফেলার জন্য যথেষ্ট। ভারতের মিডিয়া ভাষ্যকারদের মতে, ‘ভারত নাকি প্লট হারিয়ে চীনের কাছে হেরে হাত গুটিয়ে’ নিয়েছে। তাই বাংলাদেশ-মিয়ানমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার প্রক্রিয়া’ নিয়ে আলাপে বসতে আয়োজন করে দিয়েছে নাকি চীন। কিন্তু তাতে আমাদের মন্ত্রী দেশে ফিরতে-না-ফিরতেই যাকে বলে দু’জনে দুই মন্ত্রী দু’দিকে দুই ধরনের কথাতে হয়ে পড়েছেন একেবারে ‘ফল এপার্ট’। তাতে বোঝা গেল যে বর্মি জেনারেলদের শায়েস্তা করা চায়নিজ কূটনীতির কাজ নয়। এ ব্যাপারে চায়নিজরা চাইলে আমেরিকানদের কাছে মধ্যস্থতাকারীর কাজে কূটনৈতিক কিছু শিক্ষা নিতে পারে। আচ্ছা এটা কি জানা কথা না যে, পিছলা বার্মিজ জেনারেল ভাষ্য বদলে দেবে। অতএব আগে থেকেই চীনাদের ‘দুটা মানে হয়’ এমন সুযোগ যাতে না থাকে এমন শব্দ বা কথা না রাখা – সেই ফুটা বন্ধ করার ব্যাপারে চীনাদের সাবধান হওয়া দরকার ছিল!

    কিন্তু এরও আগে যে কথা বলতে হবে, তা হলো- ১৯৭০-এর দশক থেকে নেয়া চীনাদের পলিটিক্যাল দায় বা সংশ্লিষ্টতা না নিয়ে গ্লোবাল পলিটিক্যাল-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে কেবল অর্থনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্টতায় থেকে মাখন খেয়ে যাবো খালি, চীনাদের এই বুদ্ধি অচল-অকেজো এটাই প্রমাণ হয়েছে। কারণ আমরা দেখছি, আমেরিকানদের সামান্য একটু নাড়াচাড়াতেই ভয় পেয়ে বর্মি জেনারেলদের কী করে চীন রক্ষা করবে তা নিয়ে চীনকে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। চীনাদের হাতে ভেটো ক্ষমতা থাক আর না থাক কিছু যায় আসে না তাতে। এথেকে চীন কী শিক্ষা নিয়েছে যে,  দুনিয়া চলে রাজনৈতিক শক্তির মুরোদে। অর্থনৈতিক শক্তি বা মুরোদ আপনার অঢেল থাকতে পারে কিন্তু সেটা রাজনৈতিক শক্তির বিকল্প নয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক কমিটমেন্ট, নীতি-অবস্থান থাকতেই হবে, এসব দিক- তো আছেই। বাংলাদেশ-মিয়ানমারকে একসাথে বসানোর কাজে চীনাদের নামা প্রমাণ করেছে রাজনৈতিক সমাধানের পথ কী জিনিস। এটা রোহিঙ্গারা মরুক যা হোক, আর্মি জেনারেলদের কাছ থেকে বিনিয়োগ আর ব্যবসা বাগানোর কাজটা ভালো জানলেই চলবে – চীনের অনুমান যে মিথ্যা ছিল তা চীনকে বুঝিয়ে দিয়েছে। এই ধারণার যে ভিত্তি নেই, এটা মিথ্যা ও অচল তা বুঝিয়ে দিলেও কী চীন সে শিক্ষা নিয়েছে আমরা নিশ্চিত না। কারণ চীনকে ‘রাজনৈতিক কমিটমেন্ট নেগোসিয়েশন’ এর গুরুত্বের কথা মেনে নিতে হয়েছে। আর আসলে রোহিঙ্গারা সব অত্যাচার নিষ্পেশন সহ্য করতে হয়েছে কথা ঠিক কিন্তু তা করে  সারা দুনিয়াকে রোহিঙ্গা ইস্যু দেখিয়ে দিয়েছে যে দুনিয়া চলে দুনিয়া চলে রাজনৈতিক শক্তির মুরোদে। রাজনৈতিক কমিটমেন্ট তাতে লাগবেই। আর তা নাই বলে, চীনাদের দুনিয়ার গ্লোবাল নেতা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

    উপরের এসব কথার উপর দাঁড়িয়ে আর একটা কথা বলে দেয়া যায়।  কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র দুনিয়াকে অ্যাম্পায়ার হিসেবে নিজের নেতৃত্বে চালাতে কখনই পারবে না, কখনোই সম্ভব হবে না। এর মূল কারণ রাজনৈতিক কমিটমেন্ট না দেখিয়ে, হিউম্যান রাইটসকে নিজের ইস্যু গণ্য না করে দুনিয়া চালানো অসম্ভব। রিপাবলিক রাষ্ট্র আর তাতে মানুষের  মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য ইনসাফ কায়েম ইত্যাদিতে মানবাধিকার সুরক্ষার ইস্যু আগামীতে আরো সিরিয়াস ইস্যু হয়ে উঠবে দুনিয়াতে। কমিউনিস্ট জগতে যার কোনো ন্যূনতম ধারণা বা আমলই নেই। কমিউনিস্টদের এখনো ধারণা, ‘তাদের বেইজ্জতি করতেই’ নাকি আমেরিকা এই ইস্যুটা হাজির রাখে। এর চেয়ে অজ্ঞতার আর কী হতে পারে! এর মানে কি কমিউনিস্ট বলতে চাইছে দুনিয়াতে গণহত্যা ক্লিনজিং রেসিজম – এগুলো চলবেই? তাই কি? তবে আমি শিউর মাফিয়া রাষ্ট্র রাশিয়ার পুতিন অথবা চীনে নতুন জেঁকে বসা শি জিনপিংয়ের ‘মডার্ন সমাজতন্ত্র’ নামে সোনার পাথরের বাটি ধারণার ভেতর এর কোনো জবাব পাওয়া যাবে না।

    কিন্তু আমেরিকানরা কত দূর যাবে? রোহিঙ্গারা কি ঘরে ফিরবে? আমেরিকানরা কতটা সিরিয়াস? অর্থাৎ উপরে আমেরিকার সৎ পথে রওনা হবার অনেক ইঙ্গিত দিবার পরেও আমি সন্দেহ রাখছি যে  আমেরিকা শেষ মাথা পর্যন্ত যাবে কীনা? কতদুর যাবে?  বাংলাদেশের মানুষদের জন্য এসব মাপার দ্রুত একটা মাপকাঠি দেই।

    ‘এশিয়ায় আমেরিকান (নিরাপত্তা) স্বার্থ আমেরিকা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে’ এই নীতিতে ২০০৭ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বুশ প্রশাসন চালু করে দিয়ে গেছে। এই কথার একটা ইম্পিকেশন অর্থে সারার্থ হল, সেই থেকে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক দিয়ে রেখে গেছিল। সেটা এখনও ওরকমই আছে। ট্রাম্প হয়ত ব্যাপারটা নিয়ে ভোকাল ততপর নয়। কিন্তু রুটিন প্রসাশনের গাইডিং প্রিন্সিপাল এখনও সেটাই। এখন এই সপ্তাহ ট্রাম্পসহ স্টেট ডিপার্টমেন্টের মন্ত্রী মুরুব্বিরা মানে রেক্স টিলারসন এবং আন্ডার সেক্রেটারিসহ এভাবে সবাই আমাদের দেশ বা পড়শি দেশে থাকবে। এগুলো যত যা-ই ঘটুক যতক্ষণ না আমেরিকা আমাদেরকে ভারতের কাছে দিয়ে রাখা  বন্ধকদশা থেকে ছুটিয়ে আমাদের সাথে সরাসরি ডিল না করবে, এই ব্যাপারে স্পষ্ট অবস্থান নিবে তত দিন অন্য যাই কিছু আমরা দেখি না কেন আমেরিকার ওপর আমাদের আস্থা রাখার কোনো কারণ সৃষ্টি হয়নি এটাই বুঝতে হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ০৫ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]