Tag: CHINA

  • চীন-ভারত যুদ্ধ কী না চাইতেও লেগে যাচ্ছে

    চীন-ভারত যুদ্ধ কী  না চাইতেও  লেগে যাচ্ছে

    গৌতম দাস

    ০৬ জুলাই ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-35o

     

                               Global times Editor – Hu Xijin, @HuXijin_GT   আর বাংলা অনুবাদ নেয়া হয়েছে এখান থেকে

    চীন-ভারত যুদ্ধ কী লেগে যাবে? মোদী মনের মধ্যে যুদ্ধ চাই না এই বাসনা রাখা সত্বেও? যদিও ইতোমধ্যে সাধারণ তবে শিক্ষিত মানুষ যারা এতদিন দূর থেকে দেখে একটু মজা পাচ্ছিল তারা এখন যুদ্ধের টেনশনটা দীর্ঘ হচ্ছে দেখে এবার নিজের জন্য একটু উদ্বিগ্ন হয়ে যাচ্ছেন যে, নিজের জন্য আমল করার মত এখানে কোন লুকিয়ে থাকা হুমকি বা বিপদ হঠাৎ হাজির হতে পারে কি না(!), তাই এনিয়ে ভাবা শুরু করেছেন। গত ১৫ জুন চীনা হামলায় কমপক্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা মারা যাওয়ার পর থেকে এই টেনশনটা এভাবে ক্রমেই সত্যি বলে হাজির হচ্ছে।

    অপমানিত ‘ভারত-নেশন’ থেকে নিজেকে আলাদা করার দৌড়াদৌড়িঃ
    পুরা ব্যাপারটা শুধু ভারতীয় সেনা মারা যাওয়ার মধ্যেই শেষ বা  আটকে থাকলে তাও হয়ত চলত। কিন্তু সর্বদলীয় বৈঠকের ব্রিফিংয়ে ভারতের কেউ যা কল্পনাও করেনি তাই ঘটে গেছে। গত ছয় বছরে সবসময় ছাপান্ন ইঞ্চি বুকের ছাতি দেখিয়ে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওই সভায় বলে বসেন, “সীমানা পেরিয়ে কেউ ভারতে ঢুকেনি। ভারতের কোনো সেনা চৌকিও অন্য কারো দখলে নেই”। এর সোজা মানে দাঁড়ায়, ওই ২০ ভারতীয় সেনা চীনের ভূখণ্ডে গিয়ে মার খেয়ে মরেছে। আর সহযোদ্ধা-সেনারা তাদের লাশ বয়ে ভারতে এনেছে। এতে ব্যাপারটা এতই শকিং আর বেইজ্জতির প্রশ্ন হয়েছে যে, বিরোধীরা বুঝে যান এ নিয়ে কথা বাড়ালে সারা ভারত আরও অপমানিত হবে। তাই ভারতের এক সাবেক রাষ্ট্রদূত নিজের কলামে লিখছেন, কোনো বিরোধী নেতা সভার ওই অবস্থায় আর যুদ্ধে যাওয়ার পক্ষে মুখ খোলেনইনি। কিন্তু কিছু “সাহসী” সাংবাদিক বা সাবেক কূটনীতিক যারা নিজেদের খুবই ‘সাচ্চা ন্যায়পরায়ণ’ মনে করেন তারা তাদের “ভারত-নেশন” আরো অপমানিত হবে, সে সম্ভাবনার দিকটা ভুলে বা পেছনে ফেলে বরং প্রধানমন্ত্রী মোদীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার কর্তব্য পালনে খুবই ব্যস্ত। আসলে তারা “নেশনের” অপমানের দায় থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে বরং এর দায় মোদীর ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন সফলভাবে। সুতরাং অন্তত নিজেরা আর অপমানিত বোধ করছেন না। ভারতের সাংবাদিক করণ থাপার আর সাবেক পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাওয়ের সাক্ষাৎকার দেখে তাই মনে হয়েছে। যেন তারা জানেন না যে, মোদীর রাজনীতি উগ্র হিন্দু-জাতিবাদী এবং তার বিজেপি দল মিথ্যা বলতে বলতে পুরা দেশকেই প্রায়ই অপমান করে ফেলে থাকেন। তারা ভারতের মুসলমান নাগরিকদের সীমাহীন নিপীড়ন নির্যাতন হত্যা করে থাকে। আর এজন্য নিয়মিত দুনিয়ার হিউম্যান রাইটস সংগঠনগুলো এসব কাজ তুলে ধরে মোদী সরকারের নিন্দা করে। তাতেও এরা কেউ বিজেপির মতোই কোন অপমান বোধ করেন না।
    আসলে তারা “নেশন-স্টেট” বা জাতি এই বোধছাড়া কোন রাজনীতি হতেই পারে না বলে মনে করে নিশ্চিন্তে এতেই ডুবে থাকেন। অথচ এরাই আবার বাস্তবে অন্যের হাতে অপমানিত হলে বা মার খেলে তখন ওই কথিত নিজ জাতি-দেশ থেকে নিজেকে মুক্ত বলে কল্পনা করতে থাকেন। এরাও জানেন এতে অপমান বা সমস্যা যাবে না; তবু নিজেকে একটা সান্ত্বনা দিতে তারা এসব হাসির কাণ্ড করে থাকেন। কিন্তু তবু এরা ‘নেশনের’ রাজনীতিই যে ‘উগ্র জাতিবাদ’ তা বুঝেও এর প্রতি তাদের ভালোবাসা থেকে একটু হিলবেন না। তাদের বিশ্বাস এমনই শক্ত।

    নতুন মরীচিকা দেখতে পাওয়াঃ
    এরই মধ্যে গত সপ্তাহে এই ব্যক্তিবর্গরা আরেকটা আশার আলো দেখে ফেলেছিলেন। এরা আলোর মরীচিকায় বিশ্বাস করেন, আর ওর পেছনে ছুটতে রাজি থাকেন। এরা জানেন এটা মরীচিকা এবং নিছক আলো নয়, এরপরেও নিজের প্রবল হতাশা ঠেকাতে মনকে বুঝ দেন যদি ওটা সত্যিই আলো হয়েই যায়! এমন ব্যক্তিরা বিশেষ করে মিডিয়াকর্মীরা আশার আলো জাগাতে বলতে শুরু করলেন, আমেরিকা নাকি ভারতের সমর্থনে সৈন্য সরিয়ে আনছে জার্মানি-ইউরোপ থেকে এশিয়ায়। বাংলাদেশেও আমেরিকান বা ভারতীয় স্বার্থ দেখা থাকতে চাওয়া মিডিয়ার কেউ কেউ এই খবরটাকে টুইস্ট করে প্রচার করেছে।
    ঘটনা হল, যুদ্ধ করে নগদ বা বাকি কোনো রিটার্নই নাই – আমেরিকা নিজের জন্য তা আনতে পারেনি। অথচ এক বিপুল বেহুদা সামরিক খরচ করে ফেলেছে। সেটা কোথায় আর কবে? আপনারা অনুমান করলেই তা মিলে যাবে। জবাব হল, ইরাক ও আফগানিস্তানে। এই বেহুদা খরচের কারণে দুর্বল আমেরিকার অর্থনীতি আরো ডুবেছে, ২০০৭-৮ সালে গ্লোবাল মহামন্দা হয়েছে।  এসব বাস্তবতায় সেই ২০১০ সাল থেকে লিয়ন পেনেত্রা, চাক হেগেল বা এশ কার্টার এভাবে পরপর যারা ডিফেন্স সেক্রেটারি ছিলেন তারা সবাই খরচের সেই দায়্ভার ভুলতে হাতের কাছে ইউরোপকে দেখে, ন্যাটোর মিটিংয়ে “ইউরোপ কোনো খরচ দেয় না” বলে প্রবল সরব থেকেছেন। আর প্রকাশ্যে মিডিয়ায় অভিযোগ তুলেছেন এই অনুমানে যে, অপমান করলে বোধহয় ইউরোপ যুদ্ধের এই ভাটির দিনে এসে কিছু খরচের দায় নেবে। কিন্তু না, প্রশ্নই আসে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমেরিকান সেনারা (যখন সেটা আমেরিকার এম্পায়ার উত্থানের যুগ, ফলে বহু খরচের দায় নিজেই এককভাবে নিয়ে নিয়েছিল) আর কখনও ইউরোপ থেকে ব্যারাক গুটিয়ে নিজ দেশে ফেরেনি বরং জার্মানিতেই ঘাঁটি গেড়ে থেকে গিয়েছিল। আর ন্যাটো গঠিত হলেও এর ৯৫ শতাংশ পরিচালন খরচের দায়ভার আমেরিকা একা বহন করে গেছে। যদিও ইরাক ও আফগানিস্তানেও আমেরিকা এক ব্যর্থ যুদ্ধে খরচ করে গেছে, তবু মনকে সান্ত্বনা দিতে – ইউরোপ ন্যাটোর খরচ দেয় না – বলে ইউরোপকে ঝাড়ি দিয়ে গেছে সেই থেকে।

    যুদ্ধের বেহুদা খরচ সামলাতে না পেরে গ্লোবাল মহামন্দাঃ
    আসলে আঁচ লাগা শুরু হয় ইরাক আফগানিস্তানে ওয়ার অন টেররের পরাজয় থেকে। একটা কমিটি বসেছিল ২০০৬ সালে যার পরিষ্কার রিপোর্ট ছিল যে, আমেরিকা যুদ্ধে হেরে গেছে এই অর্থে যে, আমেরিকা এমন এক অনন্ত যুদ্ধে আটকে গেছে যা থেকে বিজয় লাভ অসম্ভব; আবার ছেড়ে পালিয়ে যাওয়াও খুব সহজ না। অথচ এ থেকে নিয়মিত যে খরচ বেড়েই চলেছিল, তাতেই মূলত আমেরিকান অর্থনীতির ভেঙে পড়া আর বেসামাল অবস্থার শেষে ২০০৭-০৮ সালের দুনিয়া মহামন্দা হাজির হয়েছিল। আর তখন থেকেই চীনের সাথে তুলনায় অর্থনীতিতে ক্রমশ আমেরিকার পিছিয়ে পড়ার শুরু। ওবামা আমলে তার প্রশাসন তাই এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, ইরাক-আফগান যুদ্ধে বিজয়ের চিন্তা তো আর নয়ই বরং,  ২০১০-১৪ ধরে সময়কালের মধ্যে সব সৈন্য ফিরিয়ে আনতে হবে। এই ছিল সবচেয়ে নির্ধারক সিদ্ধান্ত। এটা বাইপার্টিজান সিদ্ধান্ত। আর সেটার তলানি অংশটাও গুটিয়ে ফেলা হলো এবার ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে, এটাও বাইপার্টিজান মানে দু-দল মিলে নেয়া সিদ্ধান্ত। তাই আফগানিস্তান ছেড়ে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার জন্য তালেবানদের সাথে ট্রাম্পের মরিয়া চুক্তি হল। ওদিকে ৭৫ বছরের আগের সিদ্ধান্ত বদলানো যে (ন্যাটোর অধীনে), ইউরোপে থাকা সেনা প্রত্যাহার, যা নিয়ে আবার ইউরোপের এখন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া।
    লক্ষণীয় যে, এই ফেরত আনা সেনা এশিয়ার কোথার মোতায়েন হবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। কিন্তু সেনা প্রত্যাহারের যতগুলো কারণ ছিল তার মধ্যে মোদীর মতোই চাপাবাজি করে “চীন-ভারতের সামরিক টেনশনও একটা বাড়তি কারণ” বলে এই শব্দ কয়টা সেখানে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে।

    ওবামার এশিয়ান পিভোট (২০১০) এটা আগেই ব্যর্থ হয়েছিল তবু সেটাই আবার আনা হচ্ছেঃ
    তবু আমাদের মনে রাখতে হবে, এটা একটা পুরানা ব্যর্থ উদ্যোগ। কেন? ওবামা আমলে খুবই জোর দিয়ে বলা হয়েছিল যে এটা হল ওবামার এশিয়া ‘পিভোট’ [Pivot] পলিসি। ওবামা আমলে অনুমান-পরিকল্পনাটা ছিল এমন যে, আমেরিকার অনুমিত ও কথিত চীনের “আগ্রাসী নীতির” কারণে ভয়ে আশ্রয় লাভের জন্য ইস্ট এশিয়া বা সাউথ চায়না সি- এর সংশ্লিষ্ট দেশগুলো (ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম…) নিরাপত্তা খুঁজতে আমেরিকার কোলে এসে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আর আমেরিকা ভারসাম্য রক্ষাকারী (পিভোটাল) ভূমিকায় নেমে কথিত আগ্রাসী চীনের হাত থেকে এদের সবাইকে রক্ষা করবে। এই ছিল মোটামুটি মূল অনুমিত ধারণা-পরিকল্পনা। আর এরই অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় একটা স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি বানানো ও উদ্বোধন করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের মধ্যেই জানা হয়ে যায় যে এই পরিকল্পনাটাও ব্যর্থ ও পরাজিত হচ্ছে। কারণ এশিয়ার সাউথ চায়না সি- এর সংশ্লিষ্ট কেউই আমেরিকার কাছে নিরাপত্তা খুঁজতে যায়নি। জাপানের প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংক পত্রিকা ‘ডিপ্লোম্যাটের’ মতে সেকালে তারা লিখেছিল এটা ওবামার চরমতম ভুল [The Pivot to Asia Was Obama’s Biggest Mistake]।
    কারণ সাউথ চায়না সি নিয়ে এশিয়ার এদিকে টেনশন আছে, অসন্তোষ আছে কথা সত্য। কিন্তু সেজন্য কোনো যুদ্ধজোটে যোগ দেয়া সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর কাছে তপ্ত কড়াই থেকে চুলার ভিতরে ঝাঁপ দেয়ার শামিল বলে তাদের মনে হয়েছিল। তাই তারা সামরিক প্রশ্নে চীন বা আমেরিকা কোন দিকে যায়নি, দূরে ছিল। বরং অর্থনীতির প্রশ্নে চীনের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করে গেছে। এক কথায় এটা আমেরিকার জন্য এক “বিগ মিস-ক্যালকুলেশন”। তবে নতুন করে যুদ্ধে কোন রিটার্ন আনা ছাড়াই আবার অর্থ নষ্ট হয়েছিল। মাঝখান থেকে অস্ট্রেলিয়াও ঘাঁটি বানাতে উৎসাহ ভরে যতটুকু নিজের অর্থ ঢেলেছিল সেটাও লস। যেটার জন্য বুক চাপরানি এখনও সে করে মাঝে মাঝে।
    তাহলে এখন জার্মানি থেকে সেনা প্রত্যাহারের নামে সেই পতিত প্রকল্পে আবার হাওয়া, নাড়াচাড়া দেয়া কেন? প্রথমত আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, এর সাথে এসময়ের  চীন-ভারতের উত্তেজনার কোনই সম্পর্ক নাই। কারণ চীন-ভারত উত্তেজনা শুরুর বহু আগে থেকেই এই সেনা প্রত্যাহারের নড়াচড়ার শুরু। আসলে এর কারণ মূলত হংকং। আর সাথে কিছু আলাদা টেনশনে থাকা তাইওয়ান। এক-চীনের দাবিতে চীন কবে তাইওয়ানে হামলা করে, আর তা থেকে নিজের নিরাপত্তার জন্য তাইওয়ান একেবারেই আমেরিকার হাতে বাঁধা। তাইওয়ানের কেসটা না হয় বুঝা গেল কিন্তু হংকংয়ে নতুন টেনশনটা কী?

    হংকং নতুন ফোকাসঃ
    মূল টেনশনটা হল, হংকংয়ের তরুণেরা তারা চীনের থেকে আপোষে যা পেতে পারে সেই অর্থে সর্বোচ্চ স্বাধীনতা হল আরও এক  স্বায়ত্তশাসনের চেষ্টা করা; কিন্তু ঘটনা সেদিকে মুভ করেনি। বরং ‘চীনের থেকে স্বাধীনতা’ মানে হংকংকে চীন থেকে আলাদা করার পরিকল্পনা – এদিকে তারা আগিয়েছে। এটা অবশ্যই তাদের স্বার্থ-বুঝ ও ইচ্ছা কী নিয়ে তারা আগাবে। তবে এটা ব্রিটিশ-আমেরিকান স্বার্থ-পরিকল্পনার দিকেও ঝুঁকে পড়া। মানে, এর ভিতরে নিজেদের স্বাধীনতার স্বার্থকে প্রোথিত করা। এখন হংকংয়ের বাসিন্দাদের জন্য এদুই পথের কোনটা ভালোমন্দ, ব্যাপারটা সেভাবে দেখার চেয়ে যেমন পথ তেমন ওটা মিস্টি না তিতা, এভাবে বলাই সঠিক হবে। তারা যেপথ বেছে নেবে তার সমান মূল্য তো দিতে হবেই। যদিও চরম আত্মাহুতি দিলেই হংকংয়ের স্বাধীনতা মিলবে এমন নিশ্চয়তা নাই, বেইজিংয়ের তিয়েনআনমিন স্কয়ারের অভিজ্ঞতা তাই বলে। সবচেয়ে বড় কথা, হংকং ইস্যুকে কোন সাধারণ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলে মনে করা হবে অতি সরলীকরণ হবে। ফলে তা হবে মারাত্মক ভুল বিবেচনা।
    এছাড়া যেমন, হংকংয়ের ব্যবসায়ীরা যাদের স্বার্থ এক বিরাট ফ্যাক্টর যে তারা কী ছাত্র-তরুণতরুণীদের সাথে স্বাধীন হবার আন্দোলন পর্যন্ত যেতে চাইবে কী? সেটা এখনো পুরাই অনিশ্চিত। কারণ হংকং হচ্ছে চীনা পণ্য বাইরে বিক্রির দিক থেকে এক বড় আড়ত বা ‘হাব’ [hub], দুনিয়াজুড়ে চীনা পণ্য পৌঁছে দেয়ার পাইকারি বাজার। কাজেই এই ব্যবসায়ীদের স্বার্থ কতটা চীনবিরোধী হবে, তারা কতটা সাড়া দিতে আগ্রহী হবেন এখনও বলা মুশকিল। আবার এটা ১৯৮৯ সালও নয়। ফলে  তিয়েনআনমিনের মতই ব্যাপক ম্যাসাকার এবারও চীন করে ফেললে তা সামলানো চীনের জন্যও খুবই কঠিন এক ঘটনা হবে, অন্তত দ্রুত এক  ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হবে, তা বলাই বাহুল্য। এসব মিলিয়ে চিন্তা করে এতে চীনা তাতক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হল, আইনি প্রস্তুতি নেয়া। চীন ইতোমধ্যে ৩০ জুন একটা নতুন নিরাপত্তা আইন পাস করেছে (Hong Kong  national security law)। যার কারণে, কেউ রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রাম যত যাই করুক, কিন্তু তা ছাড়িয়ে “হংকংয়ের স্বাধীনতা চাই” ধরনের স্লোগান দিলে, এটর্নি অফিস এর ভাল প্রমাণ পেলে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের শাস্তি’ মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে। এই আইনে ইতোমধ্যে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের স্বাক্ষর হয়ে গেছে। যদিও এখন পর্যন্ত চীনের জন্য এর একটা দুর্বল পয়েন্ট হল, আইনটা পাস হয়েছে মেইনল্যান্ড চীনে, যা পরে হংকংয়ের আইনসভাতেও তা এনডোর্স করে নেয়া হয়নি। নিলে ভালো হত। যদিও এর পক্ষে চীনের জন্য কোন আইনগত বাধ্যবাধকতা আছে কি না আমরা পরিস্কার নই।
    ঘটনা হল এ নিয়ে আমেরিকার প্রতিক্রিয়া কী হবে? ঘটনা সেখানে। একটা দুরবর্তি সম্ভাবনা কারও মনে হতে পারে যে চীন আমেরিকার সহায়তা নিয়ে এই বিক্ষোভকারীদের সাথে নিগোশিয়েট করে ফেলল। এর সম্ভাবনা খুবই কম কারণ চীন চাইবে না এভাবে আমেরিকাকে দেবতা বা গুরুত্বপুর্ণ বানানো। বরং নিউইয়র্ক টাইমসের ভাষায় এই আইন ইতোমধ্যেই আমেরিকা ও তার বন্ধুদের জন্য এক হুশিয়ারি সঙ্কেত (The law sends a warning to the U.S. and other countries.)।

    অল-আউট অবরোধ, মানে কীঃ
    তাই আমরা বরং অন্য দিকগুলো দেখি।  যেমন, প্রত্যক্ষ সূত্র নেই; কিন্তু “হতে পারে” ধরনের আধাগুজব, মিডিয়ায় নিউজ ছিল যে, চীন এই আইন চালু করলে আমেরিকা নাকি চীনের ওপর ‘অল-আউট’ অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করার পরিকল্পনা নিয়ে রেখেছে। এর তাৎপর্য হল, চীন আমেরিকান ডলারে কোনো কিছু কেনাবেচা করতে পারবে না। বেচাকেনার কোন দলিল-ইনভয়েজ ডলারে হতে পারবে না। হলে তা ভাঙিয়ে  এর অর্থ নিজের কারেন্সি ও একাউন্টে আনতে কোন না কোন আমেরিকান ব্যাঙ্কের কাছে যেতেই হবে। আর কোন আমেরিকান ব্যাঙ্কের জন্য এদেরকে সাহায্য করা হবে নিষিদ্ধ কাজ করা, ফলে দুই বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত জরিমানা দিতে হতে হয়েছে অতীতে হংকং ব্যাঙ্ককে, আমরা দেখেছি। এদিকে চীনের ‘হংকং নিরাপত্তা আইন’ পাস হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিক্রিয়ায় ইতোমধ্যে আমেরিকার অল-আউট কোন অবরোধ আরোপ করা হয়নি। যদিও ছোটখাটো (যেমন ভিসা রেস্ট্রিক্টকশন ধরনের) অবরোধ, আপত্তিগুলো কার্যকর হতে যাচ্ছে।
    অল-আউট অবরোধ আরোপ কথাটা শুনতে ভালো লাগে, আমেরিকা তা হয়ত ঘোষণা করে দিতেও পারে যদি, তাতে সে এখনো অনেক পাওয়ারফুল বল মনে হবে হয়ত। কিন্তু তাতে বাস্তবতা পুরো উলটো হয়ে যাওয়ারও প্রবল সম্ভাবনা। কারণ চীন এই সুযোগে তার কারেন্সি ইউয়ানকেই (ডলারের জায়গায়) চীনের আমদানি-রফতানিতে লেনদেনের মুদ্রা হিসাবে বসানোর চেষ্টা করতে পারে। যেমন শুধু যদি  সে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল কিনে এর দাম যদি ইউয়ানে পরিশোধ করতে পারে, তবে ডলার ফেলে ইউয়ানই দুনিয়ায় লেনদেন প্রধান কারেন্সি বলে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যেতে পারে। এই সম্ভাবনা আছে – তখন কী হবে?
    আর এথেকেই বাজারে অল-আউট অবরোধের গুজব আর সামরিক প্রস্তুতির সম্পর্কটা বোঝা যেতে পারে। কিন্তু সাবধান। আমেরিকা যদি যুদ্ধ-বেচার ক্ষেত্রে হেরে যাওয়া পার্টি হয়ে থাকে আর সেজন্য গত ১০ বছরে সে যদি প্রধানত খরচ কমানোর পার্টি হিসেবে নাম লিখিয়ে থাকে, তাহলে এখন আবার হংকং ইস্যুকে কেন্দ্র করে অল-আউট যুদ্ধের প্রস্তুতি নিবে এ কথাতো ঠিক মিলছে না, মানে কথা হয় না। সম্ভবত সেজন্যই এখনো পরিস্থিতি “ছোটখাটো অবরোধের” মধ্যে আটকে আছে। এই হল, জর্মানি থেকে সেনা প্রতাহারে ঘটনার পিছনের সত্যি কথাটা। চীনও আমেরিকার দিক থেকে এমনকি সাউথ চায়না সি তে কোন প্রতিরোধ দেখছে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু তা বলে হম্বিতম্বি করা, ট্রাম্প মোদীর মতো চাপাবাজি করতে যাবে না, তা তো নয়। দেখা যাক! অর্থাৎ ব্যাপারটা নিয়ে এখন পর্যন্ত নিট লাভালাভ হল মিডিয়া হাইপ বা উত্তেজনা তোলা, এর মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে।
    মিডিয়ায় উত্তেজনা তোলা সেটাই সম্ভবত আপাতত করা হচ্ছে বা চলবে। কিন্তু মোদীর আমেরিকার পকেটে হাত ঢুকিয়ে থাকার কাজ-সার্ভিসটা করে দেয় কে?  সম্প্রতি এনিয়ে নেপাল ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক এক আর্টিকেল লিখে বলেছেন, এই কাজের হোতা মূলত সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর, তিনি ভারতের এখনকার বিদেশমন্ত্রী। মোদীর সাথে তাঁর সম্পর্ক আমেরিকায় রাষ্ট্রদূত থাকার শেষজমানায়, তাঁর অবসরে চলে যাওয়ার আগে আগে, সেই ২০১৪ সালে। কিন্তু সেটা ছিল মোদীর ক্ষমতায় আসারও বছর। মোদী যখন আমেরিকার সাথে সম্পর্ক কীভাবে শুরু করবেন, কোন দিক দিয়ে আগাবেন, এসব দুশ্চিন্তায় বে-দিশা হয়েছিলেন, তখন রাষ্ট্রদূত জয়শঙ্করের আগেই করা কিছু হোমওয়ার্ক [আমেরিকান কিছু ডিপ্লোম্যাটদের সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক বা র‍্যাপো(rapport) ও তাদের থেকে আমেরিকান মনোভাবের খোঁজখবর রাখা] মোদীর কাছে খুবই কাজের মনে হয়েছিল ও কাজে লেগেছিল। সেই থেকে জয়শঙ্কর মোদীর ‘আমেরিকান পকেটে হাত ঢুকানো’র বিশেষ দূতের ভূমিকায় আছেন। কারণ, আমেরিকান ডিপ্লোমেটদের কারো কারো সাথে তার বিশেষ সম্পর্ক দু’পক্ষই খুবই কাজের জিনিস বলে মানতে শুরু করেছিল। আর একারণে সেই রাষ্ট্রদূত থেকে জয়শঙ্কর এখন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

    জয়শঙ্কর মোদীর কে লাগেঃ
    বলা হয়ে থাকে, চাপাবাজি বিষয়ক মোদীর সু অথবা কু পরামর্শ জয়শঙ্করই বয়ে নিয়ে যেয়ে থাকেন আমেরিকান সেক্রেটারি অব স্টেট পম্পেও-এর কাছে। আর সেখান থেকেই ট্রাম্প আরো নানা চাপাবাজির উদ্যোগ নিয়ে থাকেন। মাইক পম্পেও জার্মানি থেকে আমেরিকার সৈন্য স্থানান্তরের কারণগুলোর মধ্যে একটা কারণ হিসেবে “চীন-ভারত টেনশন” কথা কয়টা ঢুকিয়ে দেন। আর তাতেই কিছু ‘পেইড মিডিয়া’ এ নিয়ে হইচই ছড়ানো শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু সবচেয়ে তামাশার দিকটা হল, মোদী সরকারের কেউ এ নিয়ে কোথাও কোন ইতি বা নেতি মন্তব্য করেননি। কারণ তাঁরা এই চাপাবাজিটা থেকে কিছু লাভালাভ তুলে নেয়ার চেয়েও বড় টেনশনে আছেন যে, চীন আবার এই চাপাবাজির খবরে ক্ষেপে গিয়ে কিছু না করে বসে।

    কিন্তু এতে চীনা প্রতিক্রিয়াটা ধরা পড়ে যখন চীনা গ্লোবাল টাইমসে এক প্রফেসর আর্টিকেল লিখে বলেন, ভারতের প্রধান সমস্যা হল ‘উগ্র জাতিবাদ’। মানে তিনি বলতে চাইছেন মোদী সরকার চীনের বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে  – এই করে ফেলবে, সেই করে ফেলবে, বোমা মেরে উড়িয়ে দেবে, মুখ তোড়া জবাব দিব অথবা একমাত্র ৫৬ ইঞ্চি ছাতির মোদী এমন জবাব দিতে পারেন – ইত্যাদি এ ধরনের ‘উগ্র জাতিবাদ’ উস্কানি দিয়ে ভোটের ইস্যু বানানোতে মোদী এক ওস্তাদ লোক অথচ পুরো ব্যাপারটাই বানোয়াট। এতে সমস্যা হল, যদি কখনো সত্যিকার পরিস্থিতি আসে আর মোদী কিছুই করতে পারেন না অবস্থা হয়, তা হলে মোদী ইজ্জত-সম্মান হারানো এক ভয়ঙ্কর লোক হিসেবে হাজির হয়ে যান ও যাবেন। তাই ব্যাপারটা নিয়ে চীন এতই বিরক্ত যে, এবারের বিশ ভারতীয় সেনার বিপরীতে চীনা আহত-নিহতের ফিগারটা কী তা সে এখনও একেবারেই প্রকাশ করেনি। যেন মোদী ও তাঁর দল এনিয়ে কোন নির্বাচনী বীরত্বগাথা গল্প তৈরি না করতে পারে সেজন্য। যেমন লাদাখে যারা মার খেয়েছে তারা ভারতের বিহার রেজিমেন্টের। তাই ভারতের অন্তত একজন পত্রিকা সম্পাদক ইতোমধ্যে টুইটে বলে বসেছেন আগামি বছর বিহারে রাজ্য নির্বাচন – তাই সেখানে যেন ঐ বিহার রেজিমেন্টের ‘উগ্র জাতিবাদী মিছা বীরত্বের গল্প” নির্বাচনে ভোট পাবার ইস্যু না করা হয়।

    ঘটনা হল, মোদীও জানেন চীনের বিরক্ত হওয়ার বিষয়টা। সম্ভবত এজন্যই মোদী স্বীকার করে নিয়ে বলেছিলেন যে, “ভারতীয় ভূখণ্ডে কেউ ঢুকেনি”। এর উদ্দেশ্য ছিল চীনকে ঠাণ্ডা ও খুশি করা। বরং এতে সম্ভবত চীনের মনে এখন ধারণা এই যে মোদী উগ্র জাতিবাদী রাজনীতির লোক হিসেবে ভোটের লোভে যেকোনো গল্প বানাতে মিছা মিছা যুদ্ধ লাগিয়ে এই সেই জয় নিয়ে আসছেন বলে কোনো মকারি-যুদ্ধ খাড়া করে ফেলতে পারেন। অতএব এবার তাই সত্যিকার ভয় দেখাতে চীন সেনা সমাবেশ করেছে। এর পালটা ভারতও করেছে। তাই সত্যিকার যুদ্ধের মুডে কেউ নেই বলেই মনে হয়। যদিও একটা ভয় থেকেই যায় মোদী কখন না আবার  “নেশনকে দেখানোর মুডে” বা মোডে চলে যান। বিশেষত এই কোভিড ভাইরাসে কাবু হয়ে থাকার কালে।

    মোদী লাদাখ সফরেঃ
    সম্প্রতি মোদী লাদাখ সফরে গিয়েছিলেন; সেখানে গিয়ে আবারও হম্বিতম্বি। কড়া কথার মধ্যে তিনি চীনকে পরোক্ষে “আগ্রাসনবাদী” বলেছেন। অর্থাৎ নাম না নিয়ে বলেছেন।  যেটা নিয়ে ভারতেরই কিছু বুদ্ধিমান সম্পাদক তা নাকচ করে দিয়েছেন।  বিশেষ করে আবার চীনও এর পালটা প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, চীনের ১৪ প্রতিবেশি রাষ্ট্রের মধ্যে  ১২টার ক্ষেত্রেই আপোষে সীমানা চিহ্নিতকরণ সুষ্টভাবে সমাপ্ত হয়ে গেছে। তাই মোদীর দাবি মিছা কথা, প্রপাগান্ডা। কিন্তু তাতে বাকী ঐ দুই রাষ্ট্র কারা? ভারতেরই আরেক সম্পাদক [এখানে তার কথার[এখানে ভিডিও ক্লিপ আছে ইউটিউবের] তিনিও মোদীর “চীন আগ্রাসনবাদী” – এই মন্তব্য পছন্দ করেন নাই। তিনি বলেছেন ঐ দুই রাষ্ট্র হল এক ভারত। আর দুই হল, ভারতেরই প্রভাবের কারণে ভুটান। এখন পাঠক বুঝে নেন আগ্রাসনবাদী তাহলে কে দাঁড়ালো!
    আবার সেনাদের সামনে মোদীর  গরম জাতিবাদী বক্তৃতা  – “ভারত কখনো মাথা নত করেনি। এখানেও করবে না”। ধরনের গা গরম করা কথা বলেছেন। সেনাদের উত্তপ্ত করতে আর মনোবল ধরে রাখতে এমন কথা রাজনৈতিক নেতারা বলেই থাকেন বা বলতেই হয়।  তবে সাবধান! মোদী এরপর কিভাবে পদক্ষেপ-আচরণ করেন তা দিয়ে তার এই কথার অর্থ তৈরি হবে।
    কিন্তু চীন ইতোমধ্যেই একটা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ভারত যেন কোনো স্ট্র্যাটেজিক মিস-ক্যালকুলেশন [Avoid miscalculation, says China ] বা ভুল হিসাব না করে বসে। এই কথাকে কলকাতার এক বাংলা নিউজ এর বাংলা করেছে।  সেটা এই রচনা শুরুতে যেটা টাঙানো হয়েছে। অর্থাৎ মোদীর কথা নেহায়েত কথার কথা হিসাবে থাকাটা ভাল হবে, চীনা সম্পাদক এটাই বুঝিয়েছেন।
    মোদীর আরেক জাতিবাদী তত্ত্ব কথায় বলেছেন, “দুর্বলরা নাকি শান্তি স্থাপন করতে পারে না”। তাই তিনি “সাহসী” হতে বলছেন। কিন্তু কথা হল, দুর্বল শব্দের উল্টা হল সবল হওয়া; কিন্তু মোদী খামোখা উল্টাপাল্টা সাহস দেখাতে গিয়ে না ডুবে যান, সে শঙ্কাও হাজির হচ্ছে দেখা যাচ্ছে।
    আগামী দিনে মোদী আবার “আমাকে কেউ মারে নাই” ধরনের মেসেজ দিয়ে নিজেকে কারেক্ট করেন কিনা কিংবা কী বলে বসেন তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। “উগ্র জাতিবাদ” এই হিন্দুত্ব আসলেই এক গভীর সমস্যা!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৪ জুলাই ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “চীন-ভারত কি যুদ্ধ বাধার দিকে হাঁটছে”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারতের জয়িতা ভট্টাচার্য কী চায়, জানে?

    ভারতের জয়িতা ভট্টাচার্য কী চা্‌য়, জানে?

    গৌতম দাস

     ২২ জুন ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-34w

     

    ভারত ও বাংলাদেশের সরকার এরা নাকি পরস্পরের খুবই ঘনিষ্ঠ। এমন একটা অনুমান-পারসেপশন অনেকের মধ্যে আছে। একথার হয়ত কিছুটা সত্যতাও কেউ কেউ দেখাতে পারবেন। এরপরেও  সেটা যত ঘনিষ্ঠই কল্পনা করা যাক না কেন, শেষ বিচারে আমরা ভুলে যেতে পারি না যে এরা দুটো একেবারেই আলাদা রাষ্ট্র।  আমের মওসুম এটা, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে যেন এখন – সবার কুড়ানো আম ফেলে দেওয়ার একটা গল্প আছে, তাই যেন কেউ আনতে চাইছে।

    সবার কুড়ানো আম ফেলে দেওয়ার গল্পঃ
    ছোটবেলায় বৈশাখ মাসের ঝড়ে আম কুড়াতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা একালের ঢাকা শহরে যারা বড় হচ্ছেন তাদের জীবন-অভিজ্ঞতার সাথে মিলবে না হয়ত। তবে যারা পুরনো দিনের বা জেলা শহরে বা গ্রামে বড় হয়েছেন তাদের এমন অভিজ্ঞতা আছে। তেমনি এক কালবোশেখি ঝড়ে আম কুড়ানোর বিকেলের ঘটনা। আট-দশ বছর বয়সের বন্ধুবান্ধবরা সবাই মিলে বিকেলে ঝড় উঠতেই আম কুড়াতে ছুটছে। বাগানে গিয়ে আম কুড়ানোর ধুম লেগেছে। কিন্তু বন্ধুদের একজনের যেন কোনো ঘুম নেই। দেখতে-শুনতেও সে অন্যদের চেয়ে একটু যেন আলাদা, সবার চেয়ে লম্বাতেও হয়ত একটু বেশিই হবে। সে আম কুড়াচ্ছে না।
    কিন্তু আবার প্রচণ্ড ব্যস্ত। কারণ সে বরং সবাইকে আম কুড়াতে বাধা দিয়ে বেড়াচ্ছে – “এই আম নিবি না, রাখ” – বলে হাত থেকে আম কেড়ে ফেলে দিয়ে পরের জনেরটা কাড়তে যাচ্ছে। এভাবে সবার হাত থেকে আম ফেলে দিচ্ছে। আর মুখে বলে চলছে, “আমার খালাত দুলাভাইয়ের চাচার বাগানের আম, তোরা কেউ আম নিবি না”। কিন্তু এখানে সমস্যাটা হল, বাধাদানকারী একজন আর কুড়ানেওয়ালা বাকি সবাই। ফলে সবাই বিকল্প উপায় খুঁজতে গিয়ে কিছু সুযোগ পাচ্ছে। অন্যকে বাধা দেয়ার সময় কিছু না কিছু ফাঁকফোকর পেয়েই যাচ্ছে। সেই ফাঁকে দু’চারটা করে আম কুড়িয়ে নিচ্ছে। এদিকে একসময় ঝড় থেমে গেছে। সবাই যার যার বাড়ির পথে। কিন্তু অবাক ব্যাপার। দেখা গেল সবারই হাতে-কোচড়ে দু-চারটা করে আম আছে। বাধাদানকারী মেয়েটার ভাগে একটাও আম নেই! কারণ সে যখন পুরো সময়টা সবাইকে বাধা দিতে গিয়ে নষ্ট করেছে, অন্যরা প্রত্যেকে সেই ফাঁকে দু-চারটা করে আম সংগ্রহ করে নিতে পারলেও সে নিজে কিছুই পায়নি।
    গল্পটার মরাল হলঃ হিংসা বা ঈর্ষা না, এর ইতিবাচক ফল নাই; তাই বরং কিছু অর্জন করার লক্ষ্যে নিজ শ্রম-উদ্যোগ কাজে লাগালে ভাগ্য কিছুটা ফিরতেও পারে।

    থিংকট্যাংকের মাহাত্ম্যঃ
    কথাগুলো মনে হল ভারতের এক জয়িতা ভট্টাচার্যের একটা রচনা দেখে। যেন তিনি সেই ঝড়ের সময় সবার কুড়ানো আম ফেলে দিয়ে বেড়ানো ছোট মেয়েটা। জয়িতা ভারতের ‘ওআরএফ [ORF]’ মানে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন নামে এক থিংকট্যাংকের ফেলো। সম্ভবত আসামের শিলচরের মেয়ে তিনি, আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে পিএইচডি করেছেন।

    আমেরিকান সমাজের পলিটিক্যাল কালচারে রাষ্ট্র-সরকারের নীতিনির্ধারণে বা পলিসি সাব্যস্ত করতে পক্ষ-বিপক্ষের পয়েন্টগুলোকে নিয়ে গুছিয়ে জোরালো করে তুলে ধরতে অনেক স্টাডি ও গবেষণা করতে হয় অথবা কখনও কনসেন্সাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কাজটা – আমেরিকান সমাজ সেগুলো থিংকট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই করে থাকে। এমন প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত দাতব্য প্রতিষ্ঠান বা নন-প্রফিট ফাউন্ডেশন টাইপের কাঠামোর হয়ে থাকে। যদিও একটা দুর্ভাগ্য যে, একালে এসে লক্ষ করা যাচ্ছে অনেক সময় থিংকট্যাংক গড়ার নামে এক প্রপাগান্ডা প্রতিষ্ঠান গড়া ফ্যাশন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আমেরিকা চলতি শতকে এসে যখন এখাতে ভারতের দিকে তাকিয়ে বিপুল অর্থ ঢালতে শুরু করেছে। এমনিতেই আরেক দেশের অর্থে থিংকট্যাংক গড়া- এটা থিংকট্যাংক ধারণার মৌলিক ভিত্তিরই বিরুদ্ধে। কারণ থিংকট্যাংক তো গড়া হবে নিজ দেশেরই নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি গবেষণার জন্য। কাজেই এ’খাতে অন্য-রাষ্ট্রের যেচে অর্থ দিতে আসা মানে এতে দাতাদেশের সরাসরি স্বার্থ ও চিন্তায় প্রভাব ছড়ানো শুধু নয়, এটা প্রায় ঐ দাতা দেশের ফরেন পলিসির বাস্তবায়ন করা। কিন্তু তামশার দিকটা হল প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে সবখানে এক “আত্মম্ভরিতা” মানে স্বনির্ভরতার গল্প বলে বেড়ানো ভারত সে-ই, প্রথম রাষ্ট্র যে আমেরিকার টাকায় ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখা খুলে ভরিয়ে ফেলেছে। কিন্তু কেন?

    সোজা কথাটা হল, চীন-ভারত দুরাষ্ট্র যেন পরস্পর থেকে দূরে থাকে, পরস্পরকে চরম ও একমাত্র ‘শত্রুজ্ঞান’ করে দূরে থাকে এটাই আমেরিকা নিশ্চিত করতে চায়। এদের পারস্পরিক প্রবল রেষারেষি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যেন এরা লিপ্ত ও ডুবে থাকে, ঈর্ষায় থাকে এটাই আমেরিকান স্ট্র্যাটেজি। আমেরিকা এখনও বর্তমান গ্লোবাল লিডার যদিও দ্রুত এটা শুকিয়ে আসছে, ক্ষীয়মান। আর বিপরীতে চীন উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি, নেতৃত্বের জায়গাটা সে দখল করবে এটাই এর অভিমুখ। এখন ভারত যদি চীনের পাশে দাড়ায় তবে এই  অনিবার্য রদবদলটা ঘটবেই তবে এবার দ্রুত হতে থাকবে।  আমেরিকা যদি ডুবতে বসা এক বর্তমান হয় তবে চীন পাশে ইন্ডিয়া এক সম্ভাব্য আগামি। এখন  আমেরিকার গ্লোবাল অর্থনৈতিক সামর্থ্য বা সক্ষমতায় পতন আর চীনের উত্থানের একালে তাই আমেরিকার চাওয়া ও তার ভয় হল যে চীন-ভারত যেন আমেরিকান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আগামীর নেতৃত্ব হয়ে একজোটে দাঁড়িয়ে না যায়। ফলে এর সোজা হিসাব হল, চীন-ভারত যেন রেষারেষির সম্পর্কে খাড়া হয়ে থাকে সবসময়। আর এখানে সবচেয়ে বড় ইনপুট যেটা দিয়ে রাখা হয়েছে যে, ২০৫০ সাল নাগাদ ভারতের অর্থনীতি নাকি সবার চেয়ে (চীনের চেয়েও) উপরে যাবে এমন কথা ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। আর তাই ভারত, বাস্তবতার সাথে মিল না পেলেও ‘যদি লাইগা যায়’ এই লোভে, ভারত চীনের সাথে সহযোগিতামূলক পদক্ষেপ নিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে বরং অস্থিরতায় একধাপ আগালে তিনধাপ পিছিয়ে যায়। এ কাজগুলোই নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে করিরে নিচ্ছে আমেরিকার কিছু থিংকট্যাংক যারা ভারতে এর শাখা খুলেছে।

    আবার এটাও খুবই সম্ভব যে ভারত বিরাট কিছু হওয়ার লোভ করতে গিয়ে আমেরিকান পরামর্শের ফাঁদে পড়ে , ভারত আর হয়ত চীনের সহযোগী আগামির স্থানটাও নিতে পারল না। বরং আমেরিকান লোভ-উস্কানি বা পরামর্শে ডানে-বায়ে চীনের বিরোধিতা করতে গিয়ে যেটুকু সফল হওয়ার ভারতের সম্ভাবনা ছিল সেটুকুও ভেসে গেল। এমনও ঘটে যেতে পারে। এটা অসম্ভব নয়। কারণ, ভারত যদি দুনিয়ার আগামি বা আগামির মূল সহযোগী বলে নিজেকে মনে করে তবে ভারতকে অবশ্যই মানতেই হবে আমেরিকা তার পথে বাধা অর্থে এনিমি। কারণ আমেরিকার বর্তমান অবস্থান থেকে সে যদি চ্যুত না হয় তবে ভারতের ভাগ্য খুলতে পারে না। অথচ তামশাটা হল, ভারত আমেরিকার হাত জড়িয়ে ধরে বসে থাকতে চাচ্ছে, আর মিথ্যা স্বপ্ন দেখছে কিছু একটা হওয়ার। যেটা আমেরিকার হাত ধরে অর্জন তো হবারই নয়।

    আমেরিকা যেমন চীনকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে তেমন ভারতের কাছেও আমেরিকা নিশ্চয় হারতে চাইবে না। অথচ এ কথাটা ভারতের কানে নিচ্ছে না, কোনো আমলই করে না। বরং ধরে নিয়েছে আমেরিকা তার বন্ধু থাকবে। এসব কারণেই ভারতের কোন ধরণের কোন অর্থনৈতিক শক্তির কিছুই না হয়ে ফলাফলে, কোনো উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে না ওঠার সম্ভাবনাও প্রবল। এছাড়াও ভারতের আভ্যন্তরীণ রাষ্ট্র-কাঠামোগত  দুর্বলতার দিক  আছে যেমন অভ্যন্তরীণ গঠন দুর্বলতা হল কেন্দ্র বনাম রাজ্যের দ্বন্দ্ব। মানে এক রাজ্য আরেক রাজ্যের ঘাড়ে উঠে থাকতে চায় – ভুতুড়ে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার নামে।

    তবে ভারতের বিপুল এক ভোক্তা জনগোষ্ঠী আছে, যা তার নিজের জন্যই এটা চীনের মতোই বিশাল তবে তুলনায় একটু ছোট) এক বিরাট সম্ভাব্য রেডি বাজার। এই ফ্যাক্টরটা ছাড়া ভারতের সব কিছুই প্রায় নেগেটিভ জোনে। কাজেই কনস্ট্রাকটিভ (গঠনমূলক) আর পজিটিভ এটিটিউড লাগবে, খুবই জরুরি এটা। অন্যের ক্ষতি করে বেড়ানো কারও অন্তত ভারতের বেলায়, তার জনজীবনের লক্ষ্য হতেই পারে না। এটি কী সবার আগে ভারত বুঝবে? দেখা যাক!

    আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখাগুলো যা ভারতে খোলা হয়েছে এরা আবার কাঠামোর দিক থেকে বিদেশী এনজিও গোত্রের। আর ভারতে ওদের বড় অফার হল, ভারতীয় স্টুডেন্ট-একাডেমিকদের পিএইচডি বা মাস্টার্স বিদেশে পড়তে স্কলারশিপ দেয়া। এটা ভারতের বুদ্ধিবৃত্তির উপর একে প্রলুব্ধ করে বিপথগামি বা বিভ্রান্ত করে ফেলার বিরাট পদক্ষেপ। আমেরিকা বিগতা অর্থনৈতিক শক্তি। অথচ এর স্বপক্ষে ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক মনকে কব্জা করে সাজিয়ে নেয়া, মূল লক্ষ্য ভারতীয় মনকে কনফিউজ করে রাখা। । এর কাজ হল  ক্যারিয়ারের লোভে এরা ভারতে বা জাপানে বসে চীনা তৎপরতার এটা বা সেটা খারাপ, চীনা লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য খারাপ এসব কথা প্রচার প্রপাগান্ডামূলক কাজ অথবা  ক্যাম্পেইন-মূলক গবেষণা স্টাডিতে এসব ভারতীয়দেরকে এনগেজ করে রাখা। গত ২০০৬ সালে বুশের ভারত সফর থেকে এসব কাজের ধারা শুরু হয়েছিল। পরে ওবামার আমলে তুঙ্গে উঠেছিল ডালপালা বিছিয়ে। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে এসে ২০১৭ সাল থেকে ট্রাম্পের আধাখেচড়া জাতিবাদী  ধারণার ধাক্কায়  আমেরিকান থিংকট্যাংকগুলোর  আগের প্রায় সব অর্থ বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যায়। আর সেই সাথে, ভারতকে দেয়া আমেরিকায় বিশেষ রফতানি সুবিধা (যেন চীনবিরোধী হওয়ার বুকিং মানি) যা কিছু আগে ওবামা আমলে দেয়া হয়েছিল সব গুটিয়ে ফেরত নেয়া হয়। সারকথা ট্রাম্পের আমেরিকা এ ব্যাপারে আমেরিকানদের কোন লাভ হচ্ছে কিনা এনিয়ে হতাশ ও হয়রান, সন্ধিহান হয়ে উঠেছিল। থিংকট্যাংক এনজিওগুলো তাই ট্রাম্প আমলে এসে ফান্ড অনেক গুটিয়ে ফেলেছে। তবে “চীনা ঋণের ফাঁদ”, “চীনা ঋণের শোষণ” ইত্যাদি এসব ক্যাম্পেইনগুলো এখনও এরা চালিয়ে যায়।

    তবে ওআরএফ এর গঠন ঠিক একইরকম নয়, ব্যতিক্রম। ওআরএফ এটাও দাতব্য অবশ্যই, তবে মুখ্যত স্থানীয় ব্যবসায়ী – রিলায়েন্স গ্রুপেরই প্রায় একক দানের অর্থে পরিচালিত। কিন্তু আমেরিকান  থিংকট্যাংকগুলোর সাথে ওআরএফ এর সবচেয়ে কমন মিল ও সম্পর্কের দিকটা হল, ওআরএফসহ সব থিংকট্যাংক পরিচালিত হয় ওই একই আমেরিকান চীনবিরোধী বয়ানভাষ্য ও নীতির অধীনে। আমেরিকার তৈরি যে অভিমুখ। আমেরিকান মাদার থিংকট্যাংকগুলোতে বসে যেসব চীনবিরোধী যুক্তি বয়ান তৈরি হয় সেগুলো সারা ভারতের সব থিংকট্যাংকই আউড়িয়ে যেতে থাকে। তবে লক্ষণীয় যে ভারত সরকার বেশির ভাগ সময়ই নিজের সরকারি ভাষ্য বা অবস্থানে ওইসব বয়ানকে য়ানে না, মূলত এড়িয়ে চলে। এর সম্ভাব্য কারণ, এই চীনের সাথেই তো ভারত সরকারের যৌথভাবে ব্রিকস [BRICS] ব্যাংক, এআইআইবি ব্যাংক [AIIB]  অথবা সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন [SCO] ধরনের জোট তৎপরতায় অংশ নিয়ে থাকতে হয়।

     ওআরএফ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এখন কেনঃ
    সারা দুনিয়ার মত করোনাভাইরাসে বাংলাদেশেও খারাপভাবেই আক্রান্ত। এখন পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে। করোনাভাইরাসের টেস্ট করার সুযোগহীনতা বা চিকিৎসাহীনতার চরম দিনগুলো পেরিয়ে বাংলাদেশ যখন প্রায় ৬০টির মতো টেস্ট-সেন্টার খুলতে সক্ষম হয়েছে তত দিনে আবার এখন দিনকে দিন আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ডেড সংখ্যাটাই বিপজ্জনকভাবে বাড়তে শুরু করে দিয়েছে। হাসপাতালগুলো রোগীতে উপচে উঠছে। হাসপাতালে একটা সিটের খোঁজে পাঁচ-ছয় হাসপাতাল ছোটাছুটি করতে করতেই রোগী মরে শেষ এমনই অবস্থা। এমনিতেই আমাদের সরকারের ম্যানেজমেন্ট সামর্থ্য সামলিয়ে যতটুকু যা রিসোর্স বা স্বাস্থ্য বাজেট আমরা জড়ো করতে সক্ষম সেটাও দুর্নীতির কারণে লোপাট হচ্ছে। যার সারকথাটা হল, এক চরম ম্যানেজমেন্ট ফেল করা অবস্থার মধ্যে আমরা আছি। বের হওয়ার উপায় নেই। হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনা সমস্যার কারণে ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ, ট্রেনিং বা দক্ষতা বাড়ানো পর্যন্ত আমাদের রিসোর্স পৌঁছাতে পারে না। করোনার আবির্ভাব আমাদের সবাইকে উদাম করে ছেড়েছে, নিজেদের অযোগ্যতায় নিজেরাই এখন চরম বিপদে পড়েছি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীই হুমকি দিচ্ছেন ‘এভাবে চলতে থাকলে হাসপাতালে জায়গা দিতে পারব না।’ এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের হাসপাতাল ব্যবস্থা যদি চূড়ান্ত ফেল করে তবে এরপর পুরা আইনশৃঙ্খলাই ফেল করতে আর সময় লাগবে না।

    দেরিতে হলেও করোনা মোকাবেলায় একশন গত মার্চের শেষে আমরা যখন শুরু করি তখনই অনেকে জানতেন যে আমাদের জন্য সামনে অনেক রিস্ক অপেক্ষা করছে, আমরা ঢুকছি। যারা দূরেরটা আগে দেখতে পেয়ে যান; তাদের বলাবলি করতে শুনেছি যে, আমরা কঠিন বিপদে পড়ে গেলে শেষ পর্যায়ে আমাদের এ যাত্রায় টিকে যাওয়ার একটাই সম্ভাবনা আছে যে চীনের সাহায্য সহায়তা যদি পেয়ে যাই, দুয়ার খোলে যদি । কারণ করোনা যা দাবি করে আর আমাদের যা সামর্থ্য এ দুইয়ের গ্যাপ মিটাতে সক্ষমতা নিয়ে পাশে দাঁড়াতে পারে সম্ভাব্য একমাত্র চীনা সহায়তা।
    ঘটনাচক্রে সেটাই এখন বাস্তব, আমরা তারই মুখোমুখি। আমাদের সরকারপ্রধান চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনে কথা বলেছেন, ইতোমধ্যেই চীনা সাহায্যকারী টিমও এখন ঢাকায়।

    আমরা উদ্যোগ নিতে পেরেছি এটা ভালো খবর অবশ্যই। সব সরকারই কোনো খারাপ অবস্থায় হাতের কাছে যা আছে ও সম্ভব তার সবই কাজে লাগাতে চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক। নিশ্চয় আমরা এমন কোনো সরকার দেখার আশা করি না যারা বুঝছেন তাদের কোনো ভুল বা ব্যর্থতায় বা কোনো গ্যাপে শেষে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে পারে, অথচ তারা সেটা দাঁড়িয়ে কেবল দেখছেন! এটা তো হতে পারে না!

    তবে এরপর আরেকটু আছে, চীনেরই আরেকটা প্রোগ্রাম আছে ‘সিস্টার সিটি অ্যালায়েন্স’ [China wants ‘sister cities’ in Bangladesh]। পত্রিকার ঐ রিপোর্ট বলছে, চীনা টিম আমাদের ঐ এলায়েন্স প্রোগ্রামে আমরা যুক্ত হতে পারি বা চাই কিনা এর দাওয়াত দিয়ে রেখেছে। তা নিয়ে সরকারি নানা পর্যায়ে কথাবার্তা এখনো চলছে।

    কিন্তু জয়িতা ভট্টাচার্যের লেখা দেখে বুঝা যাচ্ছে, এনিয়ে তাঁরা খুবই ক্ষেপে উঠেছেন।, ওই চীন-বাংলাদেশ সরকারপ্রধান পর্যায়ে টেলিফোন আলাপ ঘটার পর থেকেই। যেন তিনি বলতে চাইছেন আমার “দখলি প্রিয়া” কেন অন্যের সাথে কথা বলল। কিন্তু
    সমস্যা হচ্ছে, বাংলাদেশটা ইন্ডিয়া নয়। কাজেই তাদের চোখ দিয়ে চীনের টিম বা উহান সিটির কর্তাদের আমরা কেন দেখব?  আমরা দেখতে পারব না। আমাদের প্রয়োজনের চোখ দিয়েই আমরা দেখব?

    বলা বাহুল্য, করোনা প্রসঙ্গে আমাদের সক্ষমতা সামর্থ্যরে সীমা কী তা জানতে আমাদের আর বাকি নেই। তাই চীনা বন্ধুদের আমরা দেখব আমাদের খারাপ সময়ের  সহায়তা-দাতা হিসেবেই। এই দাতা যাদের নিজ শহর সামলানোর অভিজ্ঞতা আছে, দক্ষতা আছে, দক্ষ জনবল আছে, সব রিসোর্স আছে যারা আমাদের শিখিয়ে নিতে দিতে সহায়তা করতে পারবে। আর সর্বোপরি যাদের আগ্রহ আছে। এখন খাদের কিনারায় ঠেকে যাওয়া আমরা কোন ‘সিটি অ্যালায়েন্স চুক্তি’ তে যুক্ত হই আর নাই হই – করোনা সঙ্কট মোকাবেলায় আমাদের চীনা সহযোগিতা খুবই দরকার। এ হলো বাস্তবতা। তাহলে আমরা কেন তা নেবো না?

    ভারত পছন্দ করছে না তাই?
    কোনদিক দিয়েই  ভারতের অবস্থান ও সক্ষমতা কোনোভাবেই চীনের কাছাকাছি নয়। না রিসোর্সের সক্ষমতায়, না অভিজ্ঞতায়। এর উপর ভারতেরই এখন অথবা আগামী মাসে করোনা সংক্রমণের পিক সময়কাল আসে কিনা এ নিয়ে তারা চরম এক হিমশিম অবস্থায়। এছাড়া আরো বিরাট এক সমস্যা আছে। ভারত থেকে সহায়তাকারী কোনো টিম এসেছে এমন যদি হয় তবে ওই টিমকে সাধারণ মানুষই গ্রহণ করবে না, এটা আমাদের আগে খোদ জয়িতাই জানেন! তিনিই লিখেছেন আমরা ভারতীয়দের পছন্দ করি না। তাহলে?

    পাবলিকের উপর গোসসা করা  – যারা পাবলিক নিয়ে ডিল করেন যেমন কোন গবেষক তিনি কখনই তা করতে পারেন না। কারণ তিনি জানেন পাবলিকের উপর রাগ করা গোসসা দেখানো তার কাজ এক্তিয়ার একেবারেই নয়। কাজেই সাবধান! জীবনে ভাল সফল গবেষক হতে চাইলে তার উচিত হবে বরং পাবলিক কেন ওরকম বা সেরকম হয়েছে বা আচরণ করছে সেটা খুজে বের করা, এটা বের করতে জীবন লাগিয়ে দেয়া। সস্তা দেশপ্রেমিক হবেন না।

    ইন্ডিয়ার সমস্যা এটা যে, নিজের আকার আকৃতি বা অবস্থানের ব্যাপারেও তার সঠিক ধারণা নেই। তাই ভান করে যেন সে এক পরাশক্তি। যেমন দেখেন, বাংলাদেশের এক পত্রিকা মালিক সম্পাদকের উপজেলার পৌরসভায় পানীয় জলের ব্যবস্থার জন্য প্রজেক্টে ভারত তাতে মাত্র কয়েক কোটি টাকার অনুদান দিয়েছে। অথবা ধরেন মফস্বলের একটা কলেজের কয়েকটা ঘর দোতলা করতে হবে তাকে এক কোটি টাকা অনুদান দিয়ে দিল। আর ভারতের হাইকমিশনার সেটা আবার ঘটা করে উদ্বোধনও করতে গেছেন। ভারতের ধারণা এতে এবার ভারতকে দাতা দেশের আসনে বসতে জায়গা দেয়া হবে। অথচ বুঝতে চেষ্টা করল না যে, সব রাষ্ট্রেরই অনুদান দেবার সক্ষমতা থাকতেই হবে এর তো কোনো মানে নেই। কিন্তু কোন ঘটনাটা নিজেকে অপমানের মধ্যে ফেলবে এটা তো সকলেরই অবশ্যই বুঝার ক্ষমতা থাকা উচিত! তাই না!
    আবার দেখেন, এবার করোনা শুরু হলে সার্কের নামে একটা ফান্ড তৈরি করতে হবে বলে হইচই করা হল। কেন? সত্যিই অর্থপূর্ণ সাঙ্ঘাতিক কিছু কী তারা করতে চেয়েছিল?
    ভারতের হাইকমিশনার বাংলাদেশকে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন (যেটা ম্যালেরিয়ার ট্যাবলেট) এটা করোনার ওষুধ বলে যা এখনও প্রমাণিত নয় – অথচ এটাকেই মোদীর পক্ষ থেকে করোনা নিরাময়ের ওষুধ বলে দান করে গেলেন। শুধু তাই নয়, জানিয়ে গেলেন ওই ওষুধের দাম মোদীর দেয়া চাঁদার ভাগ থেকে কাটা যাবে। বুঝেন মোদী-ফান্ডের কী মহিমা! এতে দুটো ঘটনা ঘটল। এর একটা অপরাধ। কারণ আমাদের ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদনহীন একটা ওষুধ আমাদের দেশে আমদানি করা হল। আবার এটা তো ডাক্তারেরা ব্যবহার করতে বলতে পারবেন না। অন্তত আইনি ঝামেলায় পড়বেন। আর এটা করোনার বিরুদ্ধে কাজ করবে এর কোন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালই এখনো শেষ হয়নি,  ফলে প্রমাণিত কোনো ওষুধ নয় এটা। ফলে আমাদের ওষুধ প্রশাসনেরও কোন অনুমোদন দেয়ার সুযোগই নেই। মানে যেন দাওয়াত দিয়ে কাউকে গরম ভাতের বদলে পান্তা খেতে দেয়া যায়? আপনি তাই করলেন।

    এদিকে, জয়িতা বলতে চাইছেন এই ‘সিটি অ্যালায়েন্সের’ অফারের মধ্যে চীনা “বেল্ট-রোড প্রকল্পের” সম্পর্ক আছে। আর এটাতে “চিনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য আছে”।  আসলে দুনিয়ার অনেক সমস্যারই জন্ম হত না। হয়েছে এস্টিমেশন থেকে মানে নিজেকে মাপতেই শিখে নাই। শিক্ষা নেয় নাই কখন। বিশেষ করে দুচারজন  বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার এরকম। এরা পোস্টিং পেয়েই মনে করা শুরু করে তারা বাংলাদেশের রাজা না হলেও কিছু অংশের মালিক হয়ে গেছেন!  আচ্ছা ধরা যাক, বাংলাদেশে “চিনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য আছে””  [The Chinese motivation exceeds the promotion of cultural ties and it has a larger Geo-strategic objective…]।  আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে বেল্ট-রোড প্রকল্প – এই ট্রিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের চীনা “চিনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য নাই।  কিন্তু সাবধান প্রশ্নটা “আছে কিনা” এর নয়, এটা একেবারে মুরোদের প্রশ্ন। এজন্য বাইরের কারও দিকে তাকানোর আগে নিজের মুরোদ চেক করা উচিত! তাই না! তাই প্রথম প্রশ্ন হল,  তাতে ভারতের কী সমস্যা? যার মুরোদ নাই আসলে তার কোন সমস্যা কী আমলযোগ্য? ভারতই বলুক! আচ্ছা এছাড়া আরও কাহিনী আছে! দেখেন  অফার তো বাংলাদেশকেই করেছে তাই না? ভারতকে তো করে নাই? নাকি? কাজেই প্রতিক্রিয়া যা দেখানোর তা বাংলাদেশই দেখাক। অন্তত বাংলাদেশকে দেখাতে দেয়া উচিত। এজন্যই বলে ওভার-এস্টিমেশন একটা গভীর অসুখ!

    আসলে, বুঝা গেছে সমস্যার গোড়াটা মেন্টরের। জয়িতার মেন্টর-মুরুব্বি সম্ভবত বলে দিতে ভুলে গেছেন যে বাংলাদেশ কোন স্বাধীন রাষ্ট্র নয় এমন ধারণা জয়িতার মুখ দিয়ে প্রকাশ পেলে  লোকে জয়িতাকেই বেকুব বলবে!

    আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি। ভারতে কী চীনা ঋণে নেয়া কোনো অবকাঠামো প্রকল্প চালু নেই? খোদ মোদীই মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় থেকেই একাজে দক্ষ্মহস্ত নয়?  ভারতে কোনো নতুন শহরের অবকাঠামো নির্মাণ অথবা রেলের অবকাঠামো বা রেলকর্মী ট্রেনিং ইত্যাদি? এগুলো কাদের বিদেশি অবকাঠামো প্রকল্প? এখানে ভারতে চীনা রাষ্ট্রদুতের একটা সাক্ষাতকার আছে ২০১৫ সালের এপ্রিলের সেকালের চীনা প্রজেক্টের হদিশ মিলবে এখানে।  এটাই  মোদীর ক্ষমতায় আসার পরে চীনা বিনিয়োগ প্রকল্পে ঝাপিয়ে পড়া ছিল।  আমরা এই একটা নমুনা থেকে অ-নে-ক নিশ্চয় জানবে পেরে স্বর নিচা করব! এখন কথা হল,  তাহলে সেগুলোতে কী “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য আছে” তা ভারতের মনে হয়নি? নাকি সব জিও-স্ট্র্যাটেজিক ব্যাপার কেবল বাংলাদেশের চীনা প্রকল্পের বেলায়? যত্তসব বিরক্তিকর কাণ্ড!

    আর জয়িতা “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য” খুজতে বাংলাদেশে এসেছেন? ভারতের মিডিয়া খবর লিখছে ভারতের ওষুধের বাজারের ৪০% কাচামাল বা তৈরি ওষুধ আমদানির দিক থেকে নির্ভরশীল।  সেই চীনের কাছে গালয়ানে মার খেয়ে এসে এখন চীনাপণ্য বয়কট আউড়াইতেছেন, “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য বুঝতে আইছেন?  তো চীনা ওষুধ বা কাঁচামাল কী এখন আমদানি বন্ধ করতে পারবেন? এই আপনাদের স্ট্রাটেজিক বুঝ?  যে চীন ভারতের প্রথম সম্ভাব্য এনিমি তার কছেই আপনি ওষুধের মত জীবনরক্ষাকারি পণ্যে নির্ভরশীল। আর মুখে সেই গান্ধীর আমল থেকে আউড়াইতেছেন আত্মনির্ভরতা? অথচ এই আত্মনির্ভরতা শ্লোগানটাই বহু আগে থেকেই ভুয়া ও অপ্রয়োজনীয় বলে প্রমাণিত। অথচ ভারতের রাজনীতিকদের সে হুশই নাই।  আপনারা আসলে কাকে ফাঁকি দেন? চীনা ওষুধ বা কাচামাল সবচেয়ে সস্তা আর এই সস্তা থুয়ে অন্য জায়গায় যাবার মুরোদ কী ভারতের আছে, কেমনে সে মুরোদ অর্জন ক্রতে হয় তাও তো জানেন না। সস্তা দেখলে যেখানে কাপড় ঠিক রাখা মুশকিল – এমনই অর্থনীতি আপনারা বানাইছেন? আবার এই অবস্থায় আইছেন আমাদেরকে “চীনের জিও-স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য” বুঝাইতে? হা হা হা কী তামশা……

    আবার কিছু কথা তো একেবারেই পরিষ্কার। যেমন বেল্ট-রোড প্রকল্পে বাংলাদেশ তো প্রকাশ্যেই ঘোষণা দিয়ে যুক্ত আছে সেই ২০১৬ সাল থেকে। এটা তো লুকানো নয়। এ নিয়ে একবার আমাদের অবস্থান ইন্ডিয়াকে জানান দিতে গিয়ে য়ামাদের পররাষ্ট্র সচিবের সাথে ছোটখাটো একটা বিতর্কও হয়ে গিয়েছিল সে সময়। অর্থাৎ এই ফ্যাক্টসটা প্রতিষ্ঠিত। তবে ভারতের নিজের জন্য এই বেল্ট-রোড প্রকল্প হারাম বলে মনে করতেই পারে ভারত। এটা তাদের সিদ্ধান্ত। ভালো, তা করুক। কিন্তু তাহলে ভারতের জন্য যা হারাম তা আমাদের ওপরও হারাম বলে চাপানোর চেষ্টা কেন?

    এখন চীনের ‘সিটি অ্যালায়েন্স প্রকল্পের’ সাথে যদি বেল্ট-রোড প্রকল্প যুক্তও থাকে আর তাহলে তা ভারতের জন্য “সন্দেহের উদ্রেক” [raised suspicions ] করলেও বাংলাদেশের তাতে কী? কারণ আমরা তো বেল্ট-রোড প্রকল্পের অংশ হয়েই ঢুকে আছি। কাজেই ভারতের ‘সন্দেহের উদ্রেক’ আমাদের ঘাড়ে চড়াবার তো সুযোগ নেই। ভারতের নিজের ঘাড়েই এটা রাখতে হবে জয়িতাকে। তিনি নিশ্চয় আশা করবেন না যে আমাদেরও চীনকে নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক করতে হবে! আশা করি জয়িতা পরিষ্কার থাকবেন, নাকী!

    জয়িতার চীনা শোষণ তত্বঃ
    আবার আরেক বিপদ। জয়িতার দাবি বেল্ট-রোড প্রকল্প বিভিন্ন রাষ্ট্রকে এতে ঢুকিয়ে নেয়ার এটা নাকি বিভিন্ন রাষ্ট্রকে চীনা ঋণগ্রস্ত করে ‘ঋণের বোঝা’ চাপানোর আর ‘শোষণের’ প্রকল্প [debt burden and the exploitation by China]। কিন্তু জয়িতা ভট্টাচার্য তাহলে বলেন, ভারতও কেন নানা ধরনের চীনা অবকাঠামো ঋণ নিয়ে চলে সেটা আবার কোন চীনা শোষণের পাল্লায় পড়ার জন্য? আমি অবশ্য ভুটানে ইন্ডিয়ান লোন কত তানিয়ে কিছু বলছি না। জয়িতা নিজের ক্রাইটেরিয়াতে নিজেই চেক করে দেখতে পারেন।

    আবার এখানেই শেষ নয়। চীনা-বিশ্বব্যাংক এআইআইবি-তে সেখানে চীনা (শোষকের) সাথে ভারতই তো প্রধান পার্টনার-মালিক হয়ে আছে। আবার ভারত একই শোষক চীনের সাথে ব্রিকস ব্যাংক খুলেছে? এর মানে কী, তাহলে কি ভারতও শোষক? বলেন কী? না না – জয়িতা আপনাকে অনেক পড়াশোনা নিয়ে বসতে হবে!

    এ জন্যই বলছিলাম, কেউ আজকাল ন্যূনতম হোমওয়ার্ক না করে লিখতে বসে না। থিংকট্যাংক বলতে আমেরিকানরা গবেষণা কাজ বোঝাত। অথচ আজকাল থিংকট্যাংক আর প্রপাগান্ডা কাজ সব একাকার করে ফেলা হয়েছে। যারা প্রপাগান্ডিস্ট তারাই গবেষক বলে নিজের পরিচয় দিচ্ছে। এমন দুর্দশার কথা কারে বলি!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ২১ জুন ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  সেদিনই প্রিন্টেও  “ভারতের জয়িতা ভট্টাচার্য”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নেপালে ভারতের জমিদারি আর ফিরবে না, পাশে মর্যাদা দেন

    নেপালে ভারতের জমিদারি আর ফিরবে না, পাশে মর্যাদা দেন

    গৌতম দাস

    ১৫ জুন ২০২০, ০০:০৭ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-33n

    _Nepal’s new territorial map, released earlier this week, has shown the area in the light red shade to be part of its territory, evoking strong reactions from India. This came after India, in its new maps released in November last year, showed the Kalapani area (marked in deep red) to be part of its territory. SCMP

    এশিয়ায় বিশেষ করে ভারতের পড়শি অঞ্চলের সকলেই অবাক হয়ে আগ্রহ নিয়ে লক্ষ্য রাখছে নেপাল কী করছে, কী করে ভারত মোকাবিলা করছে। প্রশ্নটা মোকাবিলার। নেপাল-ভারত সীমান্তে অসন্তোষ ও পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে প্রবল টেনশন উত্তেজনা গত কয়েক মাস ধরে বেড়েই চলছিল। এরই মধ্যে নতুন ঘটনা হল, গত ১২ জুন সকাল নয়টায় ভারতের বিহার রাজ্যের সীতামারহি [Sitamarhi] জেলার সীমান্তের ওপারে নেপালের অংশে তাদের সরলাহি [Sarlahi] জেলার সীমান্ত এলাকায় নেপালি সীমান্তরক্ষীর গুলিতে একজন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। সেই সাথে ঐ গোলাগুলিতে দুজন ভারতীয় গুরুতর জখম হয়ে ভারতের হাসপাতালে জীবন নিয়ে লড়ছে আর একজন ভারতীয় নেপালি হেফাজতে আটকা আছে, যাকে ঘটনাস্থল থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
    নেপাল-ভারতের সম্পর্কের মধ্যে এবারের উত্তেজনা ও অসন্তোষের  মূল ঘটনাটা মূলত ৮ মে থেকে; যখন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং (অনলাইনে ভার্চুয়ালি) একটি সড়কের নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন। বিবিসির ভাষায়, “ভারতের উত্তরাখণ্ড, চীনের তিব্বত আর নেপালের সীমানা যেখানে মিশেছে সেখানে হিমালয়ের একটি গিরিপথের নাম লিপুলেখ। ঐ গিরিপথের দক্ষিণের ভূখণ্ডটা ‘কালাপানি’ নামে পরিচিত- যে এলাকাটি ভারতের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও নেপাল তাদের অংশ বলে দাবি করে থাকে”। নেপালের দাবির পক্ষে যুক্তি এটাIndia and Nepal Treaty of 1950তে [Sugauli Treaty 1816]  এর রেফারেন্স আছে। সুগৌলি চুক্তি হল ১৮১৪-১৬ সালের এংলো-নেপাল যুদ্ধের শেষে উভয়পক্ষের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যেটা থেকে নেপালের সীমানার রেফারেন্স টানা হয়ে থাকে। এই চুক্তির পরবর্তিতে ব্রিটিশরা আরও তাদের দখল নেয়া এলাকা ছেড়ে দিয়ে তা লিপিবদ্ধ করতে ১৯২৩ সালে আরেক আপডেটেড নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি [Nepal–Britain Treaty 1923] করেছিল। আর এই চুক্তিতে উল্লেখিত মেয়াদ শেষেই ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তি [India and Nepal Treaty of 1950] স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যা নিয়ে এখনকার নেপালের প্রবল আপত্তি উঠে আছে। চুক্তি নিয়ে একটা রিভিউ প্রক্রিয়া চালু আছে। যদিও চুক্তি এখনো বহাল আছে।

    সাবধান, প্রতিহিংসা এক নেতি এনার্জি, এটা উলটা আপনারই ক্ষতি ডেকে আনতে পারেঃ
    গত ১৯৯৬ সালে নেপাল মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলন শুরুর প্রাক্কালে এই ১৯৫০ সালের চুক্তি রিভিউ বা বাতিল অন্যতম দাবি হিসাবে তাতে যুক্ত করা ছিল। বিগত প্রায় দুশ বছর ধরে নেপাল-ভারত সব সময়ই কোন না কোন এক চুক্তি  গুরুত্বপুর্ণ হয়ে থেকেছে। অন্তত তা এজন্য যে নেপাল ভুমিবেষ্টিত বা ল্যান্ডলকড। নেপালের দক্ষিণে ভারত আর উত্তরে চীন এভাবে এইদুদেশ দিয়েই নেপাল ঘেরা। যদিও আবার দক্ষিণের ভারতের দিক দিয়ে নেপালে প্রবেশপথগুলো তুলনামূলক সহজ, অন্তত দক্ষিণদিকের পাহাড়ি এলাকা বা পথ কম উচ্চতার বলে আর এদিক দিয়ে কোন সমুদ্রবন্দরে পৌছানোর দুরত্ব তুলনায় কম বলে। আর প্রাচীনকাল থেকে এপথটাই আগে থেকে চালু হয়েছিল বলে। ফলে ১৯৫০ সালের চুক্তির মুখ্য প্রসঙ্গ সমুদ্রে যেতে ভারতের অনুমতি ও শর্ত এসব (অসম) চুক্তির মাধ্যমেই বলবত থেকেছে। তবে ভারতের ইচ্ছা-আকাঙ্খা প্রতিফলিত করে ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নেপালের নতুন কনষ্টিটিউশন রচনা ও ঘোষণা হয় নাই বলে, এরপর ভারত হয়ে পণ্য আমদানীর ঐ একমাত্র পথও ভারত অবরোধে বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু ভারতের এই সিদ্ধান্তই নেপালের গরীব সাধারণ মানুষের জীবন বিশেষত জ্বালানির অভাবে ভীষণ রকম কষ্টে ফেলে দেওয়ার কথা, আর তা ফেলেছিলও তাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু সবশেষে এর ফলাফল হয়েছিল একেবারে উলটা।  সেটাই নেপালের জন্য নতুন দুয়ার, নতুন পথ খোলার শর্ত হয়ে বাস্তবতা হাজির হয়েছিল। ঐ অবরোধে নেপালে রান্নার জ্বালানিসহ সব ধরণের পণ্য আমদানি বন্ধ থাকায় মাস ছয়েক পরে  নেপাল চীনকে অনুরোধ করলে চীন সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে। চীন মানে চীনা-তিব্বতের সীমানা নেপালের আরও উত্তর দিকে যেটা আরও খাড়া পাহাড়ের দিক।  চীনা-তিব্বতের এদিকে  দুটো সীমান্ত চৌকি দিয়ে বের হওয়া যেত আগে। কিন্তু এপ্রিল ২০১৫ এর নেপালের ভুমিকম্পে সেগুলো ভারী পাথর চাপা পড়ে বন্ধ হয়ে যায় বা ভেঙ্গে যায় বলে ব্যবহার অযোগ্য হয়েছিল। তবুও বিকল্প সুবিধা একটাই ছিল যে ২০১৫ সালের আগে থেকেই চীন-তিব্বত অংশ থেকে সবচেয়ে কাছাকাছি (২০০০ কিমির বেশি) চীনের কোন সমুদ্রে পৌছানোর হেভিডিউটি রেললাইনের এক প্রকল্পে নতুন করে রেললাইন পাতা ইতোমধ্যেই হয়ে গেছিল। কিন্তু নেপাল এর ব্যবহারকারি হওয়ার কোনই আলাপ ছিল না বলে ঐ রেলপথ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে কমপক্ষে ১০০কিমি দূর দিয়ে চলে গেছিল। চীন তাই ঐ রেললাইন যেন নেপাল ব্যবহার করতে পারে এর ব্যবস্থা করতে ঐ প্রায় ১০০কিমির এক নতুন কানেকটিং রেল প্রকল্প নিয়ে নেপালকে সহায়তা করতে আসে। সেই কানেকটিং রেলপথ এখন চালু হয়ে গেছে। চীনের সাতটা বন্দর এখন নেপালও ব্যবহার করতে অনুমতিপ্রাপ্ত উন্মুক্ত। তাই নেপালের ভারত-নির্ভরতার দিন এভাবেই সমাপ্ত হয়ে যায় আর, এমন শাপে বর নিয়ে নেপাল তাদের ভাগ্য গড়ার দিকে রওনা দিয়েছে। কারও অসুবিধা বা খারাপ করতে চাইলে আপনার অজান্তেই এর পরিণতি তার জন্যই ভাল হয়ে যেতে পারে। এজন্য বলা হয়, খারাপ উদ্দেশ্য বা নেতি মন বা প্রতিহিংসা – এগুলো এর কর্তার বিরুদ্ধেই প্রযোজ্য হবাব সম্ভাবনা নিয়ে আসে! কাজেই সাবধান!

    ওদিকে লিপুলেখ নিয়ে নেপালের বিপরীতে ভারতের যুক্তি হল – এলাকাটা প্রায় ‘ষাট বছর’ আগে [মানে এরও আগে বা এর চেয়ে পুরানা কালে নয়] থেকেই তাদের দখলে আছে। তাই এটা তাদের। সাথে আরেকটা যুক্তি দেয় ভারত যে, ২০১৫ সালে এটা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময়ই দুই দেশ মিলে লিপুলেখে একটি বাণিজ্যিক পোস্ট খুলতে সম্মত হয়েছিল, যা তাদের যৌথ ঘোষণায় আছে। এ কথার বিপরীতে নেপালের বক্তব্য তাতেও নেপাল  ঐ ঘোষণা কখনোই মেনে নেয়নি বলে তখন থেকেই রেজিষ্টার্ড আপত্তি জানিয়ে আসছে। তাই এখন গত মাসে ৮ মে লিপুলেখে ভারতের রাজনাথ সিং সড়ক তৈরির কাজ উদ্বোধন করা থেকেই নেপালের পুনঃআপত্তিতে প্রবল উত্তেজনা শুরু হয়ে যায়। নেপালে প্রতিবাদের বিষয়টাকে পার্লামেন্টে আইন পাস বা কনস্টিটিউশন সংশোধনের পর্যায়ে পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

    সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত দেব মুখার্জিও মোদীর বিরুদ্ধে নেপালের পক্ষে এক স্বাক্ষীঃ
    নেপালে একের পর এক ভারতের পরাজয়ের শুরু বলা যায় নেপালের রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে নতুন রিপাবলিক কনষ্টিটিউশন রচনার প্রথম উদ্যোগের (First failed Constituent Asembly was dissolved on May 28, 2012 ) ব্যর্থ হয়ে পড়া থেকে। নেপালের কোন রাজনৈতিক শক্তির উপরে ভারত কোন নিয়ন্ত্রণ আনতে না পেরে ঐ রচনা প্রক্রিয়া যেন ফেল করে সেদিকে ঠেলে দিয়েছিল। এতে হতাশায় ডুবে যাওয়া সারা নেপাল এরপর আবার বহু কষ্ট সহ্য করে (কারণ সবদলের একমত হওয়া খুবই কঠিন একটা কাজ) সর্বদলীয় আবেদন নিয়ে তাদের সুপ্রীম কোর্টে গেলে  কোর্ট কিছু শর্তসাপেক্ষে তাদেরকে  নতুন করে রিপাবলিকের কনষ্টিটিউশন রচনার “কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলি গঠনের নির্বাচন” অনুষ্ঠানের অনুমতি দিয়েছিল। দুনিয়ার ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির খুব কমই আছে। কিন্তু দ্বিতীয় সুযোগে নেপালের প্রধান তিনটা দলই  আয়োজনের পুর্ণ সদব্যবহার করতে নিজেদের মধ্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে ভারত থেকে (দুই কমিউনিস্ট আর নেপালি কংগ্রেসও) প্রধান তিনদল নিজেদের দূরে নিয়ে যায়। এই তিনশক্তি মিলে নেপালের নতুন রিপাবলিক কনষ্টিটিউশন রচনা সমাপ্ত ও তাতে ভারতের প্রবল আপত্তি ও বাধা উপেক্ষা করেই ঐ নতুন কনষ্টিটিউশনের ঘোষণা দিয়েছিল ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫। তাদের তিন দলীয় প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও পূরণ করেছিল। কিন্তু এতে ভারত প্রতিক্রিয়া ছিল ভয়াবহ জলুনির। তারা ভারতের উপর দিয়ে নেপালে সব ধরণের পণ্য আমদানিতে অবরোধ আরোপ করেছিল। কিন্তু এটাও ব্যর্থ হয়ে পড়া থেকেই চীন-নেপাল সম্পর্কের নতুন দিনের শুরু।  অথচ অন্তত দুশত বছরের ভারত-নেপাল সম্পর্কের মধ্যে চীন কখনও কোথাও হাজির ছিল না। ২০১৬ সাল থেকেই মাত্র নেপালের মঞ্চে চীনের প্রবেশ ঘটেছে।

    এককথায় বললে, তাই কাউকে দোষারোপের আগে ভারতের সংশ্লিষ্ট সব সরকারি কর্তা, রাজনীতিক বা একাদেমিকের নিজেদের লজ্জা ঢাকতে হলে  নিজেকেই দোষারোপ করা উচিত ছিল। হয়ত আত্মসমালোচনা করে এজন্য তারা কিছু অনুশোচনামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন এমন আমাদের দেখতে পাওয়া উচিত ছিল। সে যাই হোক, তবু কিছু প্রতিক্রিয়া হয়েছে। মোদী ২০১৪ সাল থেকে ভারতের ক্ষমতায়। তাই এদের মধ্যে একটা ঝোঁক উঠে এসেছে যে ভারতের আগের সব ব্যর্থতা মোদীর মাথায় ঢেলে দেওয়া। যদিও মোদীও, তার আমলে পুরান ঘটনা থেকে কোন শিক্ষা নিয়েছেন নীতি বদলিয়েছেন তা জানা যায় না।
    ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূতরা অবসরে যাওয়ার পরে সাধারণত কোন চলতি সরকারের অবস্থানের বিরোধিতা করে প্রকাশ্যে কোনো কথা বলেন না, এড়িয়ে যান। কিন্তু সাবেক ভারতীয় এক রাষ্ট্রদূত দেব মুখার্জি মনে হচ্ছে ব্যতিক্রম। তিনি রাজনাথের সড়ক নির্মাণ উদ্বোধন ঠিক পছন্দ করেননি। আর বিবিসিকে বলছেন, ‘রাস্তা উদ্বোধনের বিষয়টা অন্যভাবে করা যেতে পারত বলেও তার অভিমত”। দেবের অভিমত নেপালের আপত্তির মুখে মোদী সরকার নাকি বলেছিল, এ নিয়ে আলোচনা হবে। তাই বিবিসি লিখেছে দেব মুখার্জি বলেছেন, “… ভারত যখন নেপালকে কথা দিয়েছে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে, তখন বলা যায় না এটা আমাদেরই এলাকা – তোমাদের এ নিয়ে কিছু বলার হক নেই”। অর্থাৎ মোদী সরকারকে তিনি খুবই শক্ত হাতে আঘাত ও সমালোচনা করেছেন বলতেই হয়। এই ঘটনাকে আমরা বোধহয় দলবদ্ধভাবে না পারলেও ব্যক্তিগতভাবে করা দেব মুখার্জির প্রায়শ্চিত্ত বলতে পারি।
    আরেক দেশের নতুন কনস্টিটিউশন গৃহীত হওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি তোলার আমি কে? এনিয়ে আপত্তি তুলে নিজেকে হাস্যকর করার কোনো মানে হয় বলে এমন কাজ  আমরা কোন রাষ্ট্রকে করতে দেখি না। কিন্তু নেপালে সব হারিয়ে ভারত তাই করেছিল। যদিও সবকিছু উপেক্ষা করে নেপালে নতুন কনস্টিটিউশন গৃহীত ও ডিক্লারেশন বা ঘোষণা হয়েছিল। কিন্তু এর পরের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে এক ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠের সরকার ক্ষমতায় আসে সেটা ছিল নেপালের বড় দুই কমিউনিস্ট পার্টি মিলে এক দলের সরকার। আর একমাত্র নেপালি কংগ্রেস কোন মতে বিরোধী দলে জায়গা হয় আর সেই সাথে তার ভারতের সাথে সম্পর্ক রক্ষার কিছু সুযোগও সামনে আসে। কিন্তু এবার, নেপালের পার্লামেন্টে লিপুলেখ নিয়ে প্রতিবাদ ইস্যুতে আলোচনায় সেই নেপালি কংগ্রেসের এক এমপি পুষ্পা ভূষল গৌতম বলেন, “১৮১৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও নেপালের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাগাউলি চুক্তি অনুসারে ওই এলাকা সম্পূর্ণভাবে নেপালের”। অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে নেপাল কংগ্রেস দলও এখন কম ভারতবিমুখ নয়। এ থেকে নেপালের অভ্যন্তরীণ অবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা বেশ খানিকটা আন্দাজ পেতে পারি।
    নেপালের মাওবাদীরা তাদের সশস্ত্র বিপ্লব নিয়ে প্রথম যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৯৬ সালে। সেখানে নেপালে তাদের রাজার মূল সহযোগী বলে ভারতকে উল্লেখ করা হয়েছিল। ফলে ওই বিপ্লবের মূল শত্রু বলে তারা চিহ্নিত করেছিল ভারতের শাসকদের। বিশেষ করে ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তি বাতিলের প্রধান দাবি তারা সেই থেকে শুরু করেছিল। মাঝে ২০০৭ সালের দিকে নিজেরা কৌশল বদলে সশস্ত্র থেকে গণআন্দোলনে নেমে আসারকালে চুক্তি বাতিলের কথা কিছুটা ঢিলেঢালা ছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকে চুক্তি রিভিউয়ের পক্ষে আনুষ্ঠানিক দাবি তোলার একপর্যায়ে ২০১৬ সালে এটা কাজ শুরু করলেও নেপালের মূল ফোকাস সরে যায় ভারতের বিকল্প হিসেবে চীনের ভেতর দিয়ে বাইরের দুনিয়াতে বের হওয়ার ব্যবস্থা ও কোনো নতুন চুক্তির পথ খুঁজে বের করা। তা এখন চীনের মাধ্যমে কার্যকর হয়ে গেছে। এরও প্রভাব এখন নগদ দেখা যাচ্ছে। সারা নেপালের চরম ভারতবিমুখ হয়ে পড়া চলছে ধরা যায় গত সাত বছর ধরে। কিন্তু এই লিপুলেখ সীমান্তের রাস্তা নির্মাণ কেন্দ্রে করে এবারের ভারতবিমুখতা বা বিরোধিতা অনেক বাস্তব হয়ে উঠেছে। চীন-নেপালের সাতটা সীমান্ত দিয়ে বাইরের সাথে যোগাযোগ, সম্পর্ক করার কথা নেপাল প্র্যাকটিক্যালি ভাবতে পারে এখন। এক কথায় মূল কারণ এটাই যে, ভারত ছাড়াও নেপালের অর্থনৈতিক জীবন এখন সার্ভাইভ করা বাস্তবে সম্ভব। এটাই হলো এবারের ভারতবিমুখতার বিশেষ দিক।

    ‘বিশেষ সম্পর্কের’ সমাপ্তি কি এখানেই ঘটবে?
    এছাড়া এরই আরেক ছাপ দেখা যাচ্ছে আবার এখন। যেমন গত ১১ জুন কাঠমান্ডু পোস্ট পত্রিকায় একটা কলাম ছাপা হয়েছে যার শিরোনাম- ‘বিশেষ সম্পর্কের’ সমাপ্তি কি এখানেই ঘটবে”? [Is this the end of the ‘special relationship’?] এখানে বিশেষ সম্পর্ক বলতে ভারত-নেপাল বিশেষ সম্পর্কের কথা বুঝানো হয়েছে। আর ঐ লেখায় কলকাতার হিন্দুস্থান টাইমসের এক সম্পাদকীয় আর এক প্রকাশিত রিপোর্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হিন্দুস্থান টাইমসের ঐ সম্পাদকীয় [The costs of anti-Indian nationalism in Nepal | HT Editorial] একেবারেই সাব স্ট্যান্ডার্ড; ওর নিম্নমান তাদের নিজের জন্যই লজ্জার। এত খারাপ তারা সাধারণত লিখে না। কিন্তু এখানে তারা নিজের দগদগে কিন্তু খামোখা “নেশনস্টেট বোধের” আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। আর কাউকে “কাজের ছেলে” গণ্য করে কোনো লেখা দাঁড় করালে যেমন হয় তারই ছাপ রেখে একটা লেখা হয়েছে এটা। ঐ সম্পাদকীয়-এরই আবার সাব-হেডলাইন হল, “কাঠমান্ডু (ভারতের সাথে) সম্পর্ক রিসেট করে ঢেলে সাজাতে চায়, এতে তারই স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে“। পত্রিকাটা অভিযোগ করেছে, নেপালে নাকি “গভীর এন্টি-ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম” ছড়িয়ে পড়েছে।
    আরো লিখছে, “নেপাল-ভারতের মধ্যে এক ‘বিশেষ সম্পর্ক’ আছে, অসন্তোষের গোড়াটা সেখানে”। লিখেছে, “বাস্তবে এর মানে ভারত-নেপালের সাথে খোলা সীমান্ত শেয়ার করে। ভারত নেপালিদের বিনা বাধায় ভারতে কাজ করতে এলাউ করে আর নেপালিরা (গুর্খা) ভারতের সেনাবাহিনীকে সেবা (কাজ) করে। এর বিপরীতে, নেপালিরা এ দুটোতেই রাজি আছে, পরোক্ষে ওরা নিজের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতকে একটা ভূমিকা দিয়েছে (এটা আর কোন সম্পাদকের আলাপ নয় রাস্তার চা দোকানের রকবাজের আলাপ হয়ে গেছে) আর নেপালিরা ভারতের নিরাপত্তার স্বার্থের ব্যাপারে সেন্সেটিভ হয়ে থাকছে। … ভারতও বিশেষ সম্পর্ক থেকে লাভবান হয়েছে। তবে এই বিশেষ সম্পর্ক রিসেট(reset) করলে নেপালকে এর মূল্য দিতে হবে”।
    “নেপালকে এর মুল্য চুকাতে হবে। এর মানে হবে কড়া সীমান্ত, এর মানে হবে নেপালিদের ভারতে অবাধে কাজ করা বন্ধ, এর মানে হবে নেপালের উন্নয়নের জন্য (ভারত থেকে) দ্বিপক্ষীয় জরুরি সহযোগিতার দ্রব্যাদি কমে যাওয়া, এর মানে হতে পারে, ত্বরাই মানে নেপালের দক্ষিণাঞ্চল থেকে যে রাজনৈতিক প্রতিরোধের ঝড় উঠবে (মানে ভারত উসকিয়ে তুলবে) তা সামলানো। কাঠমান্ডু কি এসবের জন্য তার একক সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও মূল্য চুকানোর জন্য তৈরি? এটা তো একটা পরিষ্কার প্রো-চায়না ঝোঁক ও এক আগ্রাসী ন্যাশনালিজম? এভাবে ‘বিশেষ সম্পর্ক’ সব নিঃশেষ করে দেয়া দুই দেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে, তবে নেপালের বেশি ক্ষতি হবে”।

    এখন এক কথায় বললে, হিন্দুস্থান টাইমসের এই ভাষ্য থেকে বুঝা যাচ্ছে অন্তত গত দশবছরে নেপাল-ভারতের সম্পর্কের ইতিহাস নিয়ে এদের কোন খবর নাই, মুল্যায়ন বা কমপক্ষে কোন রিডিং  নাই। তবে সেটা যাই হোক, হিন্দুস্থান টাইমস মুলত একটা মিডিয়া একটা দৈনিক, কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বের প্রতিষ্ঠান নয়। কাজেই মিডিয়া হিসাবে এই বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য। আর তাদের এই লেখার প্রেক্ষিতে মন্ব্যে বলতে হয়, কাউকে কাজের ছেলের মত ট্রিটমেন্ট আচরণ করে যদি বলা হয় “আমার পা-দাবানো ছেড়ে চলে গেলে তুই তো না খেয়ে মরবি”- এটা সেরকমের বক্তব্য।  এটা নেপালের জন্য অপমানজনক হবারই কথা। আসলে ভয় দেখিয়ে কাউকে জোয়ালে নিয়োজিত রাখার অনেক উপায় আমরা জানি, দেখেছিও। তবে এখানে দেখছি; এখানে বলা যে ‘আমারও একটু কষ্ট হবে তোর হাতে আমার পা-দাবানো পাব না, তবে তোরই না খেয়ে থাকতে বেশি কষ্ট হবে”। এটা এ ধরনের। এমনই নিম্নমানের।

    বলাই বাহুল্য, এটা কোনো পত্রিকার সম্পাদকীয় হতে পারে না। বাহ্যত উভয়ের সম্পর্ক যাই থাক, নেপাল-ভারত সম্পর্ক দুটো সমমর্যাদার রাষ্ট্রের, যেখানে কেউ কারো অধস্তন এমন মনে করাটাই অগ্রহণযোগ্য তো বটেই, বরং এভাবে বলা বা মনে এমন ধারণা পুষে  নিয়ে কথা বলাটাও অপরাধ। দুটো সমমর্যাদার রাষ্ট্রের এই সম্পর্ক-নীতির কথা মনে রেখে এই সম্পাদকীয় লেখা হয়নি। এজন্য এটা গর্হিত কাজ।

    জাতিসঙ্ঘ যেখানে ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্রের পড়শি দেশের উপর দিয়ে গিয়ে সমুদ্র ব্যবহারের একসেস পাওয়াকে অধিকার গণ্য করে রেজুলেশন তৈরির প্রক্রিয়ায় আছে, এরা তখন বেখবর হয়ে নেপালকে “এন্টি-ইন্ডিয়ান ন্যাশনালিজম” করার মূল্য চুকাতে হবে বলে ভয় দেখাচ্ছে, হুমকি দিচ্ছে।

    এছাড়া, এটা আসলেই একটা হাসির কাণ্ড যে হিন্দুত্বের ভারত ও হিন্দুত্বের ন্যাশনালিজমের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে আমরা আরেকটা মানে নেপালের  ন্যাশনালিজম দেখে টিটকারি দিয়ে বিতৃষ্ণা প্রকাশ করতে দেখছি। আর সবচেয়ে ভয়াবহ হল নেপালের ত্বরাইবাসীরা ভারতের উসকানিতে নেপালের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে – ভারত-রাষ্ট্র তা করাবে বলে হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু হুমকি দিচ্ছেন এক পত্রিকার সম্পাদক! কোনো সরকারপ্রধান বা রাজনীতিক নয়। এখানে আবার পত্রিকার সম্পাদক এমনই জাতিবাদী হয়েছে যে, রাষ্ট্র বা সরকারের কেউ না হয়েই তিনি হুমকি দিচ্ছেন! এটা এমনই জাতিবাদিতা!   জমিদারের ছেলে যদি রেষ্টুরেন্টে গিয়ে পাশের টেবিলে বাসার এককালের কাজের ছেলেকে খেতে দেখে তাহলে যেমন জমিদার রোয়াব-ভ্যানিটি রক্ষার্তে তেলেবেগুনে ঝাপিয়ে পড়ে, হিন্দুস্থান টাইমসের সম্পাদকের অবস্থ হয়েছে তেমনই।  এই অবস্থায় সম্পাদককে একটাই কথা বলা যায় – মহাশয়, কুল ডাউন! আপনি শান্ত হোন! সাম্য, সম-মর্যাদা ব্যাপারটা বুঝেন?  আপনি বুঝে নেন জলদি, অবস্থা আরো খারাপ হবার আগেই! দেখছেন না ৪০০ বছরের আগের কালো-দাস-ব্যবসায়ী সেলিব্রেটি হয়ে এতদিন নিজের মুর্তি টাঙিয়ে খারায় ছিলেন! কিন্তু এখন? না আর না! এবার সময় হয়েছে আপনি মাটিতে, নদীতে লুটায় পড়তেছেন না? আর লুকায়ে স্বাভাবিক থাকতে পারছে না! আপনিও, কেউ বাদ যাবেন না!

    ওই সম্পাদকীয় লেখা হয়েছিল গত ৮ জুন। আর নেপালে এর পালটা সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে ১১ জুন। এ থেকে নেপাল-ভারত সম্পর্ক কোন উত্তেজনায় আর কেমন পর্যায়ে আছে এরই কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে।

    নেপাল সীমান্তে ভারতীয়দের উপর গুলিঃ
    তাহলে গত ১২ জুন নেপালি পুলিশের হাতে ভারতের এক নাগরিককে হত্যা, দুইজন ভারতীয় নাগরিকের মারাত্মক আহত ও একজনকে নেপালি পুলিশের গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে; এ ঘটনার কি নেপাল-ভারত সীমান্ত লিপুলেখ নিয়ে উত্তেজনার কোনো সম্পর্ক আছে? এর জবাব হল, পরোক্ষে সম্পর্ক অবশ্যই ভাল মতনই আছে, প্রত্যক্ষে সম্ভবত নেই। সাধারণ অবস্থায় নেপাল-ভারত  তো খোলা সীমান্ত, অবাধে দুদেশের নাগরিক যেতে পারে। বিশেষ করে বিহার জেলা সংলগ্ন এলাকায় সীমান্তের দুই পারের বাসিন্দাদের মধ্যে বৈবাহিক আত্মীয় সম্পর্কই প্রচুর। কিন্তু এখন নেপালে ১৪ জুন পর্যন্ত লকডাউন চলছে। নেপ[আলী সীমান্ত্রক্ষীর যুক্তি,  এসময় নেপালের মেয়ে বলে এক ভারতের বউমা অবাধে এখনই শ্বশুরবাড়ি অবাধে আসাযাওয়া করতে পারে না। লকডাউনের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে সেটা করতে যাওয়া থেকেই তর্কবিতর্কের শুরু। এরপর এই বাধা ভাঙতে ভারত থেকে লোকজন এনে (কমপক্ষে ৩০ জন) চাপ প্রয়োগ করতে চাইলে সীমান্তরক্ষীরা (মাত্র ৭ জন) ভয় পেয়ে ভারতীয়দের সামলাতে না পেরে গুলি ছুড়েছে। প্রথমে দশ রাউন্ড ফাঁকা ফায়ার। কিন্তু এতে কোন কাজ না হওয়ায় এবার নিচে ফায়ার করেছে। ভারতের প্রায় সব পত্রিকার বর্ণনার সারকথা এটাই। তবে নেপালের সীমান্ত সৈন্য বাড়ানোর প্রচেষ্টা আছে তা ভারতের ইকোনমিক টাইমস লিখেছে বলে কেউ কেউ লিখেছে। কাজেই পরোক্ষ লিপুলেখের টেনশন এখানেও আছে, বলা যায়। এখানে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি ভারত-নেপাল সম্পর্কের আগামি অভিমুখ সেদিকেই যাচ্ছে – মুক্ত অবাধ সীমান্ত আর থাকছেই না। চুক্তি বদল হচ্ছেই। তবে কতটা আপোষে সেটা এক বিরাট প্রশ্ন!

    তবে আমরা উপরে দেখলাম ভারতীয় সম্পাদকের মনোভাব। তিনি নেপালের এমন বেড়া দিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়া কী সহজে সহ্য করে নিবেন? সন্দেহ রাখার অবকাশ আছে অবশ্যই!   জমিদার-মন এসব সহজে নিতে পারে না। ‘বান্দি’ করে যাকে এতদিন দাবায় পায়ের নিচে রাখছিলেন তিনি, সে এখন আমারই পাশের চেয়ারে বসে কেমনে!   আর বিপরীতে ওদিকে নেপালির পত্রিকার কলামিস্ট চাইছেন নেপাল-ভারত সম্পর্ক রিসেট করা ঢেলে সাজিয়ে নিতে, যাতে অসাম্য, অমর্যাদার সম্পর্ক দূর হয়ে যায়। মানুষ না খেয়ে হলেও সম-মর্যাদার জন্য জীবন দিতেও উঠে দাড়াতে চায়। এটা কোন জমিদার মন বুঝে না। যার একটাই ওষুধ – রিপাবলিক মন – রাষ্ট্র, নাগরিক বৈষম্যহীনতা, মর্যাদা ইত্যাদি ঝাপ্টা দেওয়া।  অর্থাৎ কলামিস্ট তিনি বুঝাতে চাইছেন ১৯৫০ সালের চুক্তির বাতিল অথবা ন্যূনতম একটা রিভিউ করতে। আর বর্তমান সীমান্ত সমস্যার সমাধান চাইছেন। রিভিউ রিপোর্ট এসে গেছে। কিন্তু মোদী সময় পাচ্ছেন না বলে এড়িয়ে রেখেছেন।

    বোঝা যাচ্ছে, নেপালের সাথে ভারত তাদের সম্পর্কটা খামোখাই তিতা করে ফেলেছে, খুব সম্ভবত তাদের পুরাণা কলোনি আচরণ পছন্দ করে তা আকড়ে থাকার কারণে। আর এর তাবত দায় এখন চীনের ওপর চাপাতে চাইছে। যদিও রেকর্ড ও ফ্যাক্টস একেবারেই পরিষ্কার যে ২০১৫ সালের অক্টোবরের আগে নেপালে চীনের নামই কেউ জানত না। কোথাও উচ্চারিত হত না এমনই অপ্রয়োজনীয় মনে হত। তবে নিশ্চয় চীনও নিস্পাপ নয়। তবে সেটা এখানে প্রসঙ্গও নয়। বাস্তবতা হল, নেপালের প্রতিটা মানুষকে ভারতের চরম কষ্টকর জীবনের মুখে ফেলে দেয়া থেকেই এর ভিতরেই ত্রাতা হিসেবে হাজির হতে সুযোগ পেয়ে গেছিল চিং । যে সুযোগ সে না চাইতে পেয়েছিল এবং নিয়েছিল।  এরপর থেকে নেপালে চীনের আবির্ভাব ঘটা আর কেউ ঠেকাতে পারে নাই।  প্রতিহিংসা দিয়ে এর বিরুদ্ধে কিছুই করা যাবে না। নেপালের কিছুই করতে পারবে না, উলটা নিজের আরো ক্ষতি ছাড়া।

    ভারত কেবল নিজের আচরণ আর স্বভাবকেই দায়ী করতে পারে; আর যারা আগে সেসময় ২০১৫ সালে এটা দেখতে মিস করেছেন তাদের জন্যই সম্ভবত সেই প্রমাণ এখনো হিন্দুস্থান টাইমসের সম্পাদক আবার হাজির করেছেন!

    লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ১৩ জুন ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টেও  “নেপাল-ভারত সীমান্তে অসন্তোষ”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ব্যক্তি-লাভালাভের ফসল ট্রাম্প আর মোদীর ঘরে কী উঠবে

    ব্যক্তি-লাভালাভের ফসল ট্রাম্প আর মোদীর ঘরে কী উঠবে

    গৌতম দাস

    ০৮ জুন ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-32U

     

    মোদি ও ট্রাম্প – সংগৃহীত

    চীন-ভারত সীমান্তের পূর্ব-লাদাখ অংশে উভয়পক্ষের সামরিক প্রস্তুতি ও তৎপরতার কথা আমরা গত ২২ মে থেকে শুনে আসছি, যা গত সপ্তাহে একধরনের শঙ্কার চরমে উঠেছিল। এরপর গত ২৮ মে থেকে কানাঘুষা ব্যক্তিগত টুইট থেকে জানা যাচ্ছিল যে, মোদী সরকার দেশীয় মিডিয়াকে সীমান্তে সৈন্য সমাবেশের খবর কম গুরুত্ব দিয়ে বা কম কম ছাপতে গোপন প্রচার চালিয়েছে যাতে পাবলিক এই ইস্যুটাকে আর বিশেষ গুরুত্ব না দেয়। এরপর গত ২ জুন ভারতের নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা জানায়, সামরিক নেতৃত্ব পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সবশেষে গত ৬ জুন আলজাজিরা বলেছে যে ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শান্তিপুর্ণ সমাধানে তারা উভয়ে বিতর্ক নিরসনে কথা বলতে চায় [“……India and China have agreed to resolve a dispute over their shared border in the Ladakh region through “peaceful” diplomatic channels, according to the Indian foreign affairs ministry.”…]  আমাদের আজকের লেখার ইস্যু এ ঘটনায় সর্বশেষ অবস্থান প্রসঙ্গে যে, এটা এখন কোথায় কোন দিকে গেছে বা যাচ্ছে।

    এর আগের সপ্তাহে এই প্রসঙ্গে বলেছিলাম সীমান্তে চীন-ভারত সৈন্য মুখোমুখি অবস্থায় পৌছাবার পিছনের যতগুলো কারণ আছে এর মধ্যে অন্যতম হল মোদী-ট্রাম্পের আরেক শস্তা সমীকরণঃ। মানে এটা ট্রাম্প-মোদীর ব্যক্তিগত লাভালাভের স্বার্থ , ফলে এখানে ভাদের দুই সরকার বা প্রশাসনের অফিসিয়াল কোনো স্বার্থ বা ইস্যুই নয় এটা। যেমন ট্রাম্পের প্রয়োজন আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে নিজেকে আবার জিতিয়ে আনা। তাই ট্রাম্প তাঁর সম্ভাব্য ভোটারদের দেখাতে চান যে তিনি চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার সব ধরনের স্বার্থ নিয়ে লড়াকু এক বেস্ট ক্যান্ডিডেট। যেহেতু চীনের উত্থানেই আমেরিকার গৌরব সব ধূসর ও ম্লান হয়ে গেছে। কাজেই সেই চীন-ব্যাসিংয়ের কাজটা করতে সক্ষম একমাত্র ট্রাম্পই আমেরিকার জন্য বেস্ট ক্যান্ডিডেট। এভাবে তৈরি ইমেজটা দিয়েই ট্রাম্প তাঁর প্রপাগান্ডা মেসেজ চালাতে চাইছে। আর এই ইমেজ তৈরি করার ক্ষেত্রে মোদী ট্রাম্পের প্রধান সহযোগী হতে গেছেন। কারণ এতে বিনিময়ে তারও ব্যক্তি লাভ-স্বার্থ আছে। অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে করোনার আগে থেকেই ভারতের মোদী সরকার খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল। এর উপর এখন করোনার কারণে অবস্থা আরো খারাপ। কাজেই তাঁর সরকারের অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স এখন পাবলিকের কাছে বিরাট প্রশ্নবোধক ইস্যু। অতএব সরকারের পারফরম্যান্স ও যোগ্যতা নিয়ে পাবলিকের অভিযোগ-অসন্তোষের মন ও চোখ সরাতে, হয় পাকিস্তান অথবা চীনের সাথে কোনো সীমান্ত টেনশন তৈরি করা আর সেখান থেকে অবাস্তব হলেও, মোদী কোনোভাবে নিজেকে অন্তত একবার বিজয় অর্জনকারী বীরের ভূমিকায় হাজির করতে পারলে মোদী মনে করেন সেটা এক ‘বিরাট অর্জন’ ও সব অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ঢেকে ফেলার চাদর-কাভার হতে পারে। মোদীর তাই লক্ষ্য হচ্ছে, ট্রাম্পের হয়ে “খেপ মেরে” দেয়ার বিনিময়ে নিজের জন্য এই অর্জন নিশ্চিত করা।  চীন-ভারত সীমান্ত টেনশনে তাই তিনি ইতোমধ্যেই “ট্রাম্প মধ্যস্থতা করতে চান”- এই প্রস্তাব  ট্রাম্পকে দিয়েই বাজারে হাজির করিয়েছেন। যেন নিজ দেশে দেখাতে পারেন ট্রাম্প কতই না ভারতের পাশে আছে। যদিও সারা ভারতের লোক এর আগে ডোকলাম ইস্যুতে দেখেছে আমেরিকা সেবার আসে নাই, বরং না জড়িয়ে দূরে থেকেছে। এছাড়া এখনও ট্রাম্প যা কিছু করছে দেখাচ্ছে তা খোদ তাঁর অফিস হোয়াইট হাউজেরই কোন নীতি-পলিসির অংশ নয়। সবই তার ব্যক্তি-নির্বাচনি জয় লাভালাভের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অফিসিয়াল নয়, “ব্যক্তিগত টুইট” দিয়েই ট্রাম্প বাজিমাত করে চলছেন!

    তাই এসব মিলিয়ে পরিকল্পনা মতে, গত ২ জুন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ভারতের ‘নিউজ১৮’ টিভি কেই এক একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়ে বসেন। কিন্তু কেন নিউজ১৮ টিভি? ব্যাপারটাকে আমরা এভাবে পাঠ করতে পারি যে, রাজনাথের ঐ সাক্ষাৎকারটার মানে হল এই ম্যাসেজ যে, ইতোমধ্যে চীন-ভারত সীমান্ত টেনশন ইস্যুতে ভারত-আমেরিকান  আলোচনা সমাপ্ত হয়ে গেছে। সেখানে পরস্পরের অসুবিধা আর প্রয়োজনগুলো নিয়ে জানা-জানানো ও পরস্পরের পছন্দ হয় এমন কমন অবস্থানও সাব্যস্ত হয়ে গেছে। এখন ঐ আলোচনায় কী সাব্যস্ত হয়েছে মোদী সরকার কী মেনেছেন এর পরোক্ষ অফিসিয়াল স্বীকৃতি বা রেকর্ড তৈরি করে রাখতেই ঐ সাক্ষাৎকার দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাহলে সেটা কেবল নিউজ১৮ টিভিকেই দেয়া কেন? কারণ নিউজ১৮ আর সিএনএন কোনো কোনো ইস্যুতে প্রোগ্রামে, জয়েন্ট ভেঞ্চারে সম্পর্কে চলে। অর্থাৎ সিএনএনের ভারতে কোনো স্বার্থ থাকলে সেটা নিউজ১৮-ই কাভার বা দেখাশুনা করে থাকে। এই অর্থে রাজনাথের ওই সাক্ষাৎকারটা দেয়া হয়েছে পরোক্ষে আমেরিকান সিএনএনকে। যেন সেখান থেকে  ট্রাম্প প্রশাসন অফিসিয়াল ভার্সন সংগ্রহ করে নিতে পারে। অর্থাৎ এটা একটা সাক্ষাৎকারের পাবলিক ভার্সনই কিন্তু মুখ্যত সেই ভার্সনটাই আবার ট্রাম্প প্রশাসনের সংগৃহীত অফিসিয়াল ভার্সন।

    আরও একটা বড় দিক আছেঃ
    ধরা যাক, সীমান্ত সৈন্য সমাবেশ ইস্যুতে শেষে ভারতের সাধারণ জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে গেল যে মোদীর ব্যক্তি-লাভালাভ দেখতে যাবার কারণে ভারতের ৪০-৬০ বর্গকিমি  এলাকা চীনের কাছে সে হারিয়েছে। আর এতে দিনকেদিন মোদীর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়ে গেল আর তা এক পর্যায়ে আমেরিকাকেও দায়ী করা শুরু হয়েগেল যে ট্রাম্পও নিজের ব্যক্তি লাভালাভের জন্য মোদীর পিছনে আছে। তেমন পরিস্থিতি যদি উঠে আসে তাহলে কী হবে? বিশেষ করে বিরোধীদল সকলেই যদি মোদী ও আমেরিকার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তুলতে থাকে?
    তেমন পরিস্থিতির কথা ভেবেই এই সাক্ষাতকার নিয়ে রাখা হইয়েছে। যাতে আমেরিকা তখন অফিসিয়ালি বলতে পারে যে ট্রাম্প যা করেছে সেগুলো তার ব্যক্তি-নির্বাচনি লাভালাভের জন্য করেছে। আর ভারতের সীমান্ত ইস্যুতে এর সাথে আমেরিকার সরকারি নীতি অবস্থানের কোনই সম্পর্কে নাই ও ছিল না। এমনকি ট্রাম্পের “মধ্যস্থতার প্রস্তাব” (যা চীনও না বাস্তবের ভারতও না – উভয়ে এরা কেউই চাইবে না) হোয়াইট হাউজের নীতি-পলিসির সাথে এর কোন সম্পর্ক নাই। একথা চীনের গ্লোবাল টাইমস পত্রিকাও আগেই লিখে বলেছে ‘To what extent Trump’s personal Twitter account reflects the will of the White House remains to be seen’। এখানে পার্সোনাল টুইট একাউন্ট শব্দগুলো লক্ষণীয়।

    এসব কারণের মোদী-ট্রাম্পের ব্যক্তি লাভালাভের প্রয়োজনে  সীমান্তে টেনশন জাগানোর কাজটা যতদুর ঘটাবার ঘটানো হয়ে গেছে।  আর তা শেষ হয়ে গেছে বলেই এই  কারণে ঐ সাক্ষাৎকারে রাজনাথ মূল যে কথাটা বলেন তা হল, দু’পক্ষের সিনিয়র মিলিটারি অফিসারেরা বৈঠকে বসে এখন  ‘মতপার্থক্য’ দূর করে ফেলবে। ভারতের বেশির ভাগ পত্রিকার শিরোনাম কথিত এই মতপার্থক্য শব্দ দিয়েই লেখা। কিন্তু “কী নিয়ে” এই মতপার্থক্য যার জন্য তিন ডিভিশন করে সেনাসামন্তের সমাবেশ ঘটাতে হলো? মিডিয়া এটার নাম দিয়ে বলছে “সীমান্ত বিতর্ক’ বা “বর্ডার ডিস্পুট নিয়ে মতপার্থক্য”। আবার যেসব পত্রিকা  রাজনাথকে সরাসরি উদ্ধৃত করেছে তাদের লেখায় রাজনাথ কিভাবে সীমান্ত উত্তেজনাকে মোলায়েম করা ভাষায় তুলে ধরছেন তা লক্ষণীয়। প্রথমত, রাজনাথ এটাকে সীমানা বিষয়ে দু’দেশের দু’রকম ধারণাজাত [The difference arose regarding the perception of LAC..…. ] একেবারেই এক তুচ্ছ সমস্যা বলে দাবি ও চিহ্নিত করে সব উত্তেজনায় ক্রমাগত পানি ঢেলে গেছেন। বলেছেন, এলএসি (LAC) বা “দু’দেশের দখলে থাকা” ভূমির সীমানা নিয়ে আমাদের দু’দেশের যে পারসেপশন; এই পারসেপশনে ভিন্নতার কারণে আমাদের মতপার্থক্য। এরচেয়েও মোলায়েম ভাষ্য এরপরেও আছে। রাজনাথ বলছেন, “এতে চীনারা বেশ ভালো সংখ্যায় […Chinese have come in good number…]. অর্থাৎ তিনি চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন না, ঘটনার বর্ননা দিচ্ছেন কেবল – এতই উদার আর নিরপেক্ষ তিনি।  কারণ সীমান্তে টেনশন জাগাবার বিজেপির মূল উদ্দেশ্য পুরণ হয়ে গিয়েছে। তাই এর সাথে জুড়ে বলছেন ভারতও তাতে ‘প্রয়োজনীয় সংখ্যক’ (…India has also done whatever is required…… ) সৈন্য জমায়েত করেছিল”। কেন তিনি এত মোলায়েম ভাষায় কথা বলছেন সাথে এরও এক সাফাই যোগান দিতে গিয়ে বলছেন, “এমনকি আগেও যখনই সীমানা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে যেমন ওই ডোকলামে (ভুটানে চীনা সীমান্ত নিয়ে) তখনও আমরা সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে কথা বলেই মতপার্থক্য মিটিয়ে ফেলেছিলাম”। সারকথায় এখানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং কেবল বলতে বাকি রেখেছেন কিন্তু না বলে বুঝিয়ে দিয়েছেন যেন – ‘আমরা দুই রাষ্ট্র আসলে খুবই ভালো। আমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। ট্রাম্প-মোদীর যে ব্যক্তি-লাভালাভ এ’থেকে তুলে আনার কথা ছিল তা এখন পুর্ণ হয়ে গেছে। তাই আপনারা আর খামোখা চিন্তা করবেন না”।
    কিন্তু বাস্তবের ভারতের একেবারেই ভিন্ন। ভারতের মিডিয়াগুলো ক্রমশ অসন্তোষে ভরে উঠতে শুরু করেছে। আর তা ভরে তুলতে শুরু করেছে মূলত অবসরে যাওয়া সিনিয়র জেনারেল বা লেফটেন্যান্ট-জেনারেলদের মিডিয়ায় সরবে তাদের লিখে বলা সব অসন্তোষ। তাদের মধ্যে অন্তত দু’জন প্রকাশ্যেই তাদের অসন্তোষ, আপত্তি ও সরকারি ব্যাখ্যায় গরমিল নিয়ে প্রশ্ন আর সর্বোপরি চীন আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি ভূখণ্ড দখল করে ফেলেছে- এসব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এ’দু’জন ব্যক্তিত্ব হলেন- এক. সাবেক উত্তরের আর্মি কমান্ডার লে. জে ডিএস হুডা (রিটায়ার্ড) [Lt Gen. Hooda]। আর অপরজন হলেন লে. জে এইচএস পানাগ (রিটায়ার্ড) [LT Gen. H S PANAG]। মিঃ পানাগ আবার নানান রাষ্ট্রীয় চক্র-পদকধারী যেটা “পদ্মভুষণের” একধাপ নিচে।
    লে. জে পানাগ ক্ষুব্ধভাবে লিখছেন, “অফিসিয়ালি দু’পক্ষই বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা ও কূটনীতিক আলোচনায় বিবাদ মিটানোর উপর আস্থা প্রকাশ করেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, কূটনীতিক ও মিলিটারি পর্যায়ে আলাপ আগাচ্ছে। কেবল এলএসি’র ‘পারসেপশনে মতপার্থক্য’ শব্দটাকে কুপিয়েছেন তিনি [……While harping on “differing perceptions” about the Line of Actual Control (LAC), Singh said the Chinese presence along the LAC was in “achhi khasi sankhya (sizeable numbers)”. ]। আবার ‘আচ্ছা সংখ্যক’ চীনা সৈন্যের উপস্থিতির কথাও বলেছেন”।
    ইতোমধ্যেই মেজর জেনারেল পর্যায়ে ২ জুনই আলোচনা হয়ে গেছে। এখন ৬ জুন অসমাপ্ত আলোচনা আবার হবে। তবে এবার তা হবে লে. জে. অফিসার পর্যায়ে। আর এতেই তিনি অসন্তুষ্ট।

    লেফটেনেন্ট জেনারেলদের ক্ষোভ অসন্তোষঃ 
    লে. জে পানাগের আরও ক্ষুব্ধ আপত্তি হল, এবারের সৈন্য সমাবেশের পরিণতি নিয়ে। তিনি বলছেন, “ইতোমধ্যেই গত জুনের শুরুতে চীনারা বিভিন্ন জায়গায় ৪০-৬০ বর্গকিমির মতো এলাকা যা আগে ভারতের দখলে ছিল তা দখল করে নিয়ে গেছে। ফলে এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে এখন আলোচনার টেবিলে চীনারা কথা বলবে আপারহ্যান্ডে থেকে, গলা চড়িয়ে। ফলে হারানো ভূমি ফেরত পাওয়া ভারতের জন্য মুশকিল হবে। এটাই এই লে. জে-এর বিরাট আপত্তির জায়গা [Having seized the initiative by securing approximately 40-60 square km of Indian territory in three different areas, China will be negotiating from a position of strength and will try to impose unacceptable conditions–no further development of border infrastructure on the Indian side–to restore status quo on its own terms.]

    কারণ তিনি আরও ভয়ের কথা তুলে বলছেন, এখন আলোচনা যদি একেবারে ফেল করে যায় তবে চীন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েই এসেছে বলে একটা গ্যাঞ্জাম বা “সীমিত যুদ্ধ” লাগিয়ে এখন যা দখল করেছে সেসব দখল স্থায়ী করে ফেলতে পারে [If diplomacy fails, China has come prepared for a border skirmish or a limited war.]। এ কারণে এবার মোদীর বিরুদ্ধে তিনি নামধরে সরাসরি অভিযোগ এনে বলছেন, এই পরিস্থিতিতে “পরিস্কার কোন স্ট্রাটেজি নিয়ে না আগানোতে মোদী সরকার ও তাঁর সামরিক বাহিনী এসব অভিযোগ (ভূমি হারানোর অভিযোগ) ‘অস্বীকার’ (ডিনায়েল) করে আর ‘সীমান্ত পারসেপশনের ভিন্নতা’ আছে বলে পার পেতে চাইছে” [… rather than evolving a clear strategy and broadly sharing it with the nation, the Narendra Modi government and the military have gone into ‘denial’ about any loss of territory, attributing the present situation to differing perceptions about the LAC.]।
    তিনি আরো অভিযোগ এনেছেন যে, কিছু সাংবাদিককে সরকার নামিয়েছে ‘সীমান্ত পারসেপশনের ভিন্নতা’ বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য [Some journalists and activists are also busy peddling their interpretation ……]। তাই লে.জে পানাগের  সারকথা, এতে চীনাদের আর কী লাগে! ভারত এখন চীনাদের হাতে নাচা পুতুল হয়ে যাবে [. What else does China want? We are playing into its hands.]।
    এমনকি ঐ লেখাটা তিনি নিজের নামে দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় লিখেছেন, যার শিরোনামে আরো ভরপুর ক্ষোভ ও উসকানিমূলক শব্দ আছে। ভারত যে ভূমি হারিয়েছে বলে তিনি দাবি করছেন, তার স্যাটেলাইট ম্যাপের ছবি জোগাড় করে তা ঐ পত্রিকা-রিপোর্টে ছাপিয়ে দাবি করে লিখেছেন যে, ঐ হারানো ভূমির ছবি দেখতে হাতের আঙুলের মতোন। তাই নিজের লেখার শিরোনাম দিয়েছেন, “ভারতের আঙুল চীনের বুটের নিচে চাপা পড়েছে, ‘অস্বীকার’ করে লাভ হবে না [India’s Fingers have come under Chinese boots. Denial won’t help us]।”

    ঐ একই দ্য প্রিন্ট পত্রিকায় স্নেহেশ এলেক্স ফিলিপ নামে আরেকজন রিপোর্টার বিভিন্ন সেনা কমান্ডারের মতামত সংগ্রহ করে আরেকটা রিপোর্ট লিখেছেন লে.জে পানাগের মতনই প্রায় একই ধরনের সব অভিযোগে। তিনি  “নজিরবহীন” [Unprecedented] শব্দটা ব্যবহার করে বলছেন, এই শব্দটা ভারতের জেনারেলদের বেশির ভাগই ব্যবহার করে তার সাথে কথা বলেছেন। তাদের দাবি চীন-ভারত সীমান্তবিরোধ মীমাংসার লক্ষ্যে ২০১৩ সালের চুক্তিতে দু’দেশের সেনাদের মধ্যে ডায়লগের যেসব প্রটোকল সাব্যস্ত হয়ে আছে সে অনুযায়ী লে. জে পর্যায়ের অফিসারেরা বৈঠকে যদি বসে তাতে প্রতিষ্ঠিত প্রটোকল ভঙ্গ করা হবে। কারণ প্রটোকলে লোকাল ট্যাকটিক্যাল কমান্ডার (পদবি মেজর জে. মর্যাদার) লেভেলে ডায়লগের করার কথা বলা হয়েছে […according to the established protocol, talks are held at the local tactical commander level. In the past, the highest level of talks have involved divisional commanders, who are major general-rank officers.]।

    “ফলে এখন ভারতের ১৪ কোর কমান্ডারকে চীনের মেলিটারি ডিস্ট্রিক কমান্ডারের সাথে বসতে হবে” [India’s 14 Corps Commander will meet the chief of China’s Southern Xinjiang Military District on 6 June in eastern Ladakh after the protocol in place ]। এ জন্য তাঁরা সকলে এটাকে “নজিরবিহীন” বলছেন। এই প্রসঙ্গে আরেকজন লে. জে ডিএস হুডা (রিটায়ার্ড) গত দিন এক অনলাইন সেমিনারে মন্তব্য করেছেন, তিনিও এমনটা জীবনে কখনো দেখেননি [“I have not seen Corps Commander level officers carrying out military talks,” ]। স্নেনেশ লিখেছে, এই প্রটোকল মানা না মানা নিয়ে গত দিনের অনলাইন সেমিনারে অন্য রিটায়ার্ড অফিসারদের মধ্যে অনেক তর্কবিতর্ক হয়েছে।

    এর মানে হল, তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের ব্যাখ্যা ও অনুমান সঠিক যে মোদী-ট্রাম্প তাদের ব্যক্তিগত লাভালাভের স্বার্থ মিটাতে চীন-ভারত লাদাখ সীমান্তে সেনা সমাবেশ ঘটানোর পক্ষে উসকানি তৈরি করেছে। কিন্তু এখন ঘটনাচক্রে লাভের পাল্লা চীনের দিকে চলে যাওয়া এই হাতছুট ঘটনা ঘটে যাওয়ায় সিনিয়র সামরিক অফিসাররা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন আর সাংবাদিকদের পর্যায়ে প্রবল হারু-পার্টি হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে হাহাকার উঠে আসছে। আর মোদীর পক্ষের লোকেরা ততই [denial] বা অস্বীকার করে ব্যক্তিপর্যায়ে লাভের ফসল ঘরে তুলতে চাইছেন – আর বিরোধ বেধেছে এখানেই।
    লক্ষণীয় যে, কোনো সিভিল কূটনীতিক লোক মোদি-রাজনাথের এখনকার পরিকল্পিত ডায়লগের কোনো পর্যায়ে আর যুক্ত নাই। এর মানে হারানো ভূমি উদ্ধারের দায় এখন পুরাটাই সামরিক অফিসারদের উপর। আর ভূমি উদ্ধার না হলে বা সীমিত যুদ্ধে তা স্থায়ীভাবে চীনের কাছে ভারত হারিয়ে ফেললে সে দায়ও হবে সামরিক অফিসারদের। এখন মোদী ব্যক্তিগত লাভালাভ তার ঘরে তুলে নেয়ার বিনিময়ে ভারত রাষ্ট্রকে এর কাফফারা দিতে হতে যাচ্ছে, খুব সম্ভবত। এটাই ব্যাপক উদ্বিগ্নতা সৃষ্টি করছে। এদিকে গত ৬ জুনের লে.জে অফিসার লেভেলের চীন-ভারত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েও কোন ফলাফল হাজির করতে পারে নাই। ফলে উত্তেজনা বেড়েই চলছে।
    শেষ পর্যন্ত কী ঘটে সেটি দেখতে সম্ভবত আর দু’দিন অপেক্ষা করতে হবে!

    ওদিকে মোদীর মতই ট্রাম্পও সম্ভবত আরো বড় বিপদেই পড়ে গেছেনঃ
    ওদিকে ট্রাম্পও প্রায় একই অবস্থায় ইতোমধ্যে পড়ে গেছেন। আগে থেকেই মোদি-ট্রাম্পের সখ্যতার ভিত্তি হল দু’জনই নিজ-রাষ্ট্রের অমীমাংসিত নানান রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে নাড়াচাড়া করবেন কোন সমাধান করার জন্য নয় বরং নিজেদের ব্যক্তি ইমেজ গড়তে এসব ঘটনাকে কাজে লাগাতে চান বলে। যেমন হংকংয়ের স্বাধীনতা নিয়ে চীন সমস্যায় আছে আর তা বেশ পুরানা। কিন্তু তা নিয়ে এই সময়ে চীনের বড় কোনো গোলযোগে পড়ার কথা নয়। কেবল,  ১৯৮৯ সালে চীনের তিয়েনানমেন স্কয়ার ম্যাসাকারের বার্ষিকীগত ছিল ৪ জুন ২০২০। হংকং আন্দোলনকারীরা সেটা পালন করতে চাইলে কিছু উত্তেজনা তৈরি হবে এই আশঙ্কায় স্বভাবতই হংকং সরকার ওই বার্ষিকী পালনে অনুমতি দিবে না। দেয়ও নাই। কিন্তু ট্রাম্প এটাকে নিয়েই নাড়াঘাটা করতে তার ব্যক্তিলাভের পরিকল্পনা সাজিয়েছিল। তিনি তাইওয়ানকে দিয়ে হংকংয়ের স্বাধীনতার দাবি সমর্থন করিয়ে উস্কানি বাড়িয়ে তুলেছেন। আর তাতেই উত্তেজনা আরো বড় করে দেখাতে মার্কিন নৌবহরের তাইওয়ানের দিকে টহলের আয়োজন শুরু করান ট্রাম্প। ব্যাপারটা হল, আজ হয়ত এই সন্দেহজনক ভাষায় এই বিষয়গুলো নিয়ে লিখতে বসতে হত না যদি ট্রাম্প এই কাজগুলো সিরিয়াস হয়ে করতেন, নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি হিসেবে করতেন। কিন্তু না, ট্রাম্পের উদ্দেশ্য এসব উত্তেজনাকে আমেরিকান নির্বাচনের আগে তিনি ‘চীন-ব্যাসিং লড়াকু প্রার্থী’ নিজের এই নির্বাচনী ইমেজ গড়তে কাজে লাগানো- এসবই দেখানোর একেকটা শো মাত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চান!

    কিন্তু অলক্ষ্যে ন্যায়ের ঘণ্টা সম্ভবত হেসে বেজে উঠেছিল। কে জানত ঠিক এ সময়েই কালো আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েড কালো বলে এক পুলিশের নৃশংসতায় খুন হয়ে যাবেন! আর আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমা দেশ ক্ষোভে রাস্তায় ফেটে পড়বে! এই লেখার কয়েক ঘণ্টা আগে প্রকাশিত আলজাজিরার একটা খবরের শিরোনাম পাঠ করে আগাবো, তাহলে কম কথায় ব্যাপারটা বলা যাবে। পেছনের মুলঘটনাটা হল, ফ্লয়েড মারা যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার রাস্তায় রাস্তায় কালো-সাদা নির্বিশেষ অংশগ্রহণে বিক্ষোভ শুরু হলে এতে ট্রাম্প খুবই খারাপভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান। এতেই তিনি ধরা পড়ে গেলেন যে তিনি ব্যক্তি মানুষ হিসেবে কেমন!

    একজন নির্বাচিত নির্বাহী প্রেসিডেন্ট আর পাবলিকের মধ্যে সম্পর্কটাই বা কী তা ট্রাম্প আজীবন বুঝতেই পারলেন না। বুঝতেও চাননি, খেয়াল করে দু’দণ্ড বুঝবার চেষ্টাও করেননি দেখা যাচ্ছে। অথচ পাবলিক তাকে  সমর্থন বা ভোট দিয়েছে বলেই তো তিনি প্রেসিডেন্ট এবং তিনি পাবলিকের সাক্ষাৎ রিপ্রেজেন্টেটিভ, প্রতিনিধি। ফলে পাবলিকলি তিনি আর যা খুশি করার ব্যক্তি এমন নিজ খেয়ালখুশির ইচ্ছাধীন নন যে, যা মনে চায় তা তিনি আর বলে ফেলতে পারেন না, করতে পারেন না! কারণ তিনি পাবলিকের সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিনিধি। অর্থাৎ যিনি রিপ্রেজেন্টেশন শব্দটার মর্মই সারা জীবনে বুঝতে পারলেন না তিনিই হয়ে গেছেন আমেরিকান এক প্রেসিডেন্ট। আমেরিকান জনগণের এতটাই দুর্ভাগ্য বলতে হবে! আবার সেই ট্রাম্প তিনিই হলেন ব্যক্তি ব্যবসায়ে অর্থকড়ি খোয়ানো হতাশ এক দেউলিয়া ব্যবসায়ী; মধ্যপ্রাচ্যের শেখেরা কোন এককালে যাকে দয়া করে তাদের পকেটমানির কিছু অংশ দিয়ে দানখয়রাত করে ট্রাম্পকে দেউলিয়ামুক্ত করে রেখেছিল। এমন চরম অরাজনৈতিক ও দুস্থ ব্যবসায়ী ট্রাম্প তাই অতএব ফ্লয়েডের খুন হওয়ার প্রতিবাদ মিছিলকে তিনি খামোখাই যেচে নিজের কান্ধে তুলে নিয়ে ব্যাপারটাকে দেখলেন এরা যেন তাঁর বিরোধী সব মানুষের তৎপরতা ও কাণ্ডকারখানা হিসেবে। কখনও খেয়ালই করেন নাই, নাগরিক ক্ষুব্ধ হলেই তারা রাষ্ট্রের প্রতিরূপ প্রেসিডেন্টের কাছেই আপত্তি অভিযোগ তুলে।

    অথচ তাই এখানে দরকার ছিল সিম্পল একটু সহানুভূতি আর জনমনের ক্ষোভে পাশে দাঁড়ানো! আপন করে নিয়ে দুটো কথা বলা। তিনিও ন্যায়-ইনসাফের পক্ষে, এই কথাটাই নতুন করে আবার বললে সেটা অবশ্যই নাগরিকের মনে সাহস জোগাবে। তাই এমন কিছু শব্দে আবার সেসব কথাগুলোই ঘোষণা করতে হয়, প্রতিশ্রুতি পুণর্ব্যক্ত করতে হয়, শপথ নিতে হয়। কিন্তু উল্টো তিনি হম্বিতম্বি করা শুরু করলেন হাভাতে লোকের মত। ইনি ঘোষণা করলেন তিনি নাকি এবার সামরিক বাহিনী পাঠিয়ে এই প্রতিবাদবিক্ষোভ ভেঙে দেবেন, ব্যবস্থা নেবেন ইত্যাদি। হাভাতে বললাম এজন্য যে প্রায় সময়ই তিনি এমন সব উদ্ভট প্রতিক্রিয়া দেখান, যেনবা তিনি এক প্রবল প্রতাপের রাজা! আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর ব্যাপক নির্বাহী ক্ষমতা আছে অবশ্যই। কিন্তু এসবই যেন তাঁর ব্যক্তিগত, তাঁর ব্যক্তি সম্পদের মত – এই হল ট্রাম্পের নিকৃষ্টতম অরাজনৈতিক অনুভব ও অনুভুতির প্রকাশ। কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই যেনবা এসব ক্ষমতা তিনি যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করতে পারেন!

    এখন আলজাজিরার প্রকাশিত রিপোর্টের  শিরোনামটা ছিল এমন– ‘জেনারেলেরা বিদ্রোহে: মার্কিন মিলিটারি নেতাদের ঝাঁজালো তাপ কেমন ট্রাম্প তা বুঝছেন”।

    [Revolt of the generals: Trump faces heat from US military leaders]

    বলাই বাহুল্য এটা ট্রাম্পের মুখে সরাসরি পাবলিকলি মারা একটা থাপ্পরের মত। সেই সাথে ঐ আলজাজিরা রিপোর্ট আরো বলছে যে, প্রেসিডেন্টের ডিফেন্স সেক্রেটারি (মন্ত্রী) মার্ক এসপার পেন্টাগণে উপস্থিত হয়ে বলেন , কনস্টিটিউশন মোতাবেক প্রেসিডেন্টকে পাবলিকলি মনে করিয়ে দিতে তিনি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন যে “একটিভ-ডিউটিতে আছে যেসব মিলিটারি সদস্য ফোর্স তাদের কাউকেই প্রেসিডেন্ট কোন “শান্তিপুর্ণ গণবিক্ষোভ-প্রতিবাদের” বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারেন না” [active-duty military troops should not be used to quell the protests]। সোজা কথায় এমন মিলিটারি ডাকার হুমকি প্রেসিডেন্ট দিতেই পারেন না। আর তাঁর এই কথা শুনে এবার পেন্টাগনের উপস্থিত জেনারেলরা ডিফেন্স সেক্রেটারির স্বপক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে্ন। মার্ক এসপার পরিস্কার করে দিয়ে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট করতে পারেন একেবারেই অন্য উপায়হীন হয়ে পড়লে, খুবই শোচনীয় পরিস্থিতিতেই একমাত্র, এসপার যোগ করেন।
    আর তাতেই এখনকার ট্রাম্প প্রশাসনের টপ জেনারেল মার্ক মিলি তিনিও এরপরে একই দিনে একটা পাবলিক ঘোষণা দেন। তাতে তিনি লেখেন যে, তিনি আমেরিকান মিলিটারি লিডারদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে কনস্টিটিউশনাল শপথ নেয়া বাক্য অনুসারে তাঁরা “জনগণের কথা বলার স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ জমায়েতের অধিকার রক্ষা” করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

    General Mark Milley, the top US commander, later the same day issued a memo to military leaders reminding them of their oaths to protect the US Constitution and the “right to freedom of speech and peaceful assembly”.

    এর সোজা মানে তারা সকলে মিলে  প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাপড় খুলে নিয়েছেন। আলজাজিরার ভাষায়, এটা বিরলদৃষ্ট এক দুর্ঘটনা! [A rare public rift has opened… ]

    এর মানে ট্রাম্পও কী মোদীর মতই নির্বাচনী বা ব্যক্তিগত লাভালাভ ঘরে তুলতে পারলেন না, ব্যর্থ হয়ে গেলেন? আসন্ন নভেম্বর নির্বাচনে ট্রাম্প ব্যাপকভাবে হারতে যাচ্ছেন?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত ০৭ জুন ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  প্রিন্টেও  “ট্রাম্প-মোদি দু’জনই কি সব হারাবে”– এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

    এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাব কী ফিরতে পারে

    গৌতম দাস

    ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Qz

    _

    চারদিকে বলাবলি শুরু হয়েছে, আমেরিকা নাকি ফিরে আসছে। অন্তত চেষ্টা করছে। ফিরে আসার অর্থ হল, দুনিয়াজুড়ে পরাশক্তিগত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রভাববলয় ছিল আমেরিকার। চলতি শতকের শুরু থেকে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান চোখে পড়ার পর্যায়ে গেলে এর প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার প্রভাববলয় ভেঙ্গে পড়া শুরু করেছিল। সেই পুরানো প্রভাবে আবার ফিরে আসার চেষ্টার কথা বলা হচ্ছে এখানে। তাও সেটা আবার বিশেষ করে এশিয়ায়; মানে এশিয়ান প্রভাববলয় ফিরে গড়ে নিতে চায় আমেরিকা। কিন্তু সমস্যা হল, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয়ের নিজ আয়ু শেষ হওয়ার আগেই আমেরিকা যদি নিজেই নিজের আয়ু ধরে টানাটানি করে, তাহলে সেটা ঠেকাবে কে? আসলে সেই টানাটানিতেই আমেরিকান প্রভাব বলয়ের আয়ুর অকালমৃত্যু ঘটেছিল।

    বাস্তবতা হল, অন্য মহাদেশের অবস্থা যাই হোক, এশিয়ায় আমেরিকান প্রভাববলয় বজায় থাকার শর্ত এখনো আছে, নিঃশেষিত হয়নি সম্ভবত। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রভাব নেই বা চোখে পড়ে এমন লেবেল থেকে নিচে নেমে গেছে। আর তা মূলত আমেরিকার নিজ ভুল নীতি-পলিসির কারণে। এককথায় সেই নীতিটা হল – দক্ষিণ এশিয়ায় নিজ কথিত “নিরাপত্তা স্বার্থ” ভারতের চোখ দিয়ে দেখার আমেরিকান সিদ্ধান্ত। বিশেষত এশিয়ায় তথাকথিত আমেরিকান নিরাপত্তা্র স্বার্থও নাকি আমেরিকা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে। চলতি শতকের প্রথম দশক থেকেই এটা শুরু হয়েছিল। ভারত নিজের সিকিউরিটি স্বার্থ দেখলে তাতে নাকি আমেরিকান সিকিউরিটি বা নিরাপত্তা স্বার্থও, মানে ওয়্যার অন টেররের জন্য প্রয়োজনীয় ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ দেখা হয়ে যাবে। ভারত-আমেরিকার বুঝাপড়া নাকি এত গভীর মাত্রার!

    কিন্তু এটা আমেরিকার ‘নিরাপত্তা স্বার্থ’ বলে চালিয়ে দিলেও এটা কোনো “নিরাপত্তা” স্বার্থই ছিল না। তাহলে কী স্বার্থ এটা? এটা আসলে ছিল আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর’ [china containment] স্বার্থ। এই এসাইনমেন্ট সে ভারতকে দিয়ে করাতে গিয়ে বিনিময়ে সে ভারতকে এশিয়ায় ভারতের পড়শি কিছু রাষ্ট্রে একটা মাতবরি করতে দিয়েছিল বা প্রশ্রয় দিয়েছিল। যেটা ব্যবহার করে ভারত আজ আসামের জন্য বিনা পয়সার করিডোর ইত্যাদি লুটছে, এটা এর একটা উদাহরণ। কিন্তু আজ সেটাও কমপক্ষে ১২ বছর হয়ে গেল। এর পরিণতি ও ফলাফল কী হয়েছে? সেই স্টক টেকিং বা তাতে আমেরিকার লাভ-ক্ষতি কী হয়েছে, সেই হিসাব বুঝাবুঝি করে নেয়ার সময় হয়ে গেছে।

    আমেরিকার বারাক ওবামার দুই মেয়াদ, অর্থাৎ আট বছরের (২০০৯-১৬) সময়কালে উল্লেখযোগ্য দু’টি গুরুত্বপূর্ণ নীতি-পলিসি নেয়া হয়েছিল। এর এক. আরব স্প্রিং আর দুই. চীন ঠেকানো (কন্টেইনমেন্ট)। এর মধ্যে আরব স্প্রিং যা ছিল আল কায়েদা ফেনোমেনার বিস্তার কালে মূলত মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রগুলোতে নির্বাচিত সরকার কায়েম ও এক লিবারেল শাসন কায়েম করার প্রোগ্রাম। সাধারণভাবে এর পরিণতি কী হয়েছে তা এককথায় বললে, আমেরিকার আরব স্প্রিংয়ের প্রোগ্রাম ফেল করেছে। যেটা সামগ্রিকভাবে অন্তত মিসরে ফেল করেছে, একমাত্র তিউনিসিয়া তা এখনো টেকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর বাকি সব মুসলিমপ্রধান দেশেই মূলত আমেরিকার মারাত্মক কিছু “অসততা” প্রয়োগের জন্য তা ফেল করেছে।

    এমনিতেই আমেরিকান পলিসি মাত্রই যেন সেটা ঘোষিত পলিসির সাথে সাথে আড়ালে দুই-একটা লুকানো এজেন্ডাও থাকবেই, এটাই হয়ে গেছে আমেরিকান প্রাকটিস। এই লুকানো এজেন্ডা মাত্রই এগুলো মূলত আমেরিকা ন্যূনতম স্বচ্ছতা ও সততা বজায় রাখে না বা পারে না এমন কিছু বাড়তি তৎপরতা। যেমন- লিবিয়ায়, আরব স্প্রিংয়ের নামে গাদ্দাফিকে প্রত্যক্ষভাবে খুন করাই ছিল এর লুকানো লক্ষ্য। অথচ বাইরে বলেছে, আরব স্প্রিংয়ের সংস্কার এর লক্ষ্য। ফলাফল কী হয়েছে? গাদ্দাফিকে নৃশংসভাবে পাবলিকলি খুন করা হয়েছে। কিন্তু তাতে আমেরিকার তেমন কিছুই সফলতা কি এসেছে, তা কেউ বলতে পারবে না।

    বরং লিবিয়া এখন হয়েছে রাষ্ট্রহীন এক ভুখন্ড। কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বিভক্ত হয়ে গেছে আর ওয়ার লর্ডদের শহর হয়ে আছে লিবিয়া এখন। আর শুধু তাই না, সেকালের ওবামা-হিলারি ভেবেছিলেন তারাই একমাত্র ও খুবই বুদ্ধিমান আর দক্ষ। কিন্তু না, তা একেবারেই নয়। গাদ্দাফি লিবিয়া থেকে ক্ষমতাচ্যুত ও খুন হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ওবামা-হিলারির কাফফারা দেয়া শুরু হয়েছিল সেই থেকে। পাল্টা চার আমেরিকান – রাষ্ট্রদূত ও তাঁর সহকারী আর সাথে দুই সিআইএ অপারেটর সবাই বেনগাজি এম্বাসির ভিতরেই খুন হয়ে গেছিলেন। আর তা হয়েছিল যারা ওই খুনের পরে আইএস নামে আত্মপ্রকাশ করছিল সেই হবু আইএস, তাদেরই হাতে। ওদিকে প্রায় একইভাবে সিরিয়াও ছারখার হয়ে গেছে। যদিও পুতিনের কারণে প্রেসিডেন্ট আসাদ টিকে গেছে, কিন্তু তার দেশ-রাষ্ট্র সব শেষ, নরক হয়ে গেছে।

    এরপরেও এখন কী সব থিতু হওয়া আর পুনর্গঠন কী শুরু হয়েছে? না, তা আসার কোনো আশু সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এমন সিরিয়া থেকেও কোনো লাভালাভ কিছুই আমেরিকা নিজের ভোগে লাগাতে পারেনি। তাহলে এই আরব স্প্রিংয়ের আমেরিকার লাভ হল কী? এদিকে শেষবেলায় এসে ন্যাটো সদস্য তুরস্ক এখন খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধেই সদর্পে দাঁড়িয়ে গেছে। তাহলে স্টক টেকিং এর ফলাফল হল এই যে, আমেরিকান এই প্রকল্পের সবটাই পানিতে গেছে। আর তা গেছে মূলত লুকানো এজেন্ডার কারণে।
    তবে অন্য কথা হল, আরব স্প্রিংয়ের তৎপরতার সব বলতে এতটুকুই নয়। আরো যেসব স্টান্ডিং প্রোগ্রাম ছিল ও আছে, সেগুলো রুটিনমাফিক এখনো চলছে বিশেষত, যেসব এম্বাসি-ভিত্তিক প্রোগ্রাম আছে যেগুলো ‘লিডারশিপ’ বা ‘ইয়ুথ’ [Leadership, Youth]- এই শব্দ দুটো সেখানে আছে বা থাকবেই এমন ইউএসএইড ফাইন্যান্সড, এনজিও প্রোগ্রাম সেগুলো।  এগুলো আসলে আরব স্প্রিং প্রোগ্রামের আরও কিছু দিক।  তবে মোটা দাগে বলা যায়, আমেরিকান কোনো পলিসি লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না, মূলত তার ভেতরে প্রায়ই কিছু লুকানো এজেন্ডাও সাথে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে যাওয়া হয়, মূলত এর দায় নিতে যায় বলে।

    দ্বিতীয় আমেরিকান পলিসির নাম বলেছিলাম-  চীন ঠেকানো বা কন্টেনমেন্ট। বুশের হাতে শুরু হয়ে দুই বছর চলার পর এটা ওবামার আট বছর ধরে চলে শেষে এই পলিসিও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে যায়। কিসের ভিত্তিতে এই পলিসিকে ব্যর্থ বলছি? প্রথমত, ‘চীন ঠেকানোর’ পলিসি মানে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা চীনের উত্থান ঠেকানো। বুশ-ওবামা এমন উত্থিত চীনের গায়ে ফুলের টোকাও লাগাতে পারেননি। ঠিক যেমন আমেরিকা উত্থিত হয়েছিল উনিশ শতকের শেষ ভাগে (১৮৮৩ সালের দিকে) এবং তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৮) আগেই;  আজকের চীনের মতই ছিল সেই আমেরিকার উত্থান  – সেকালের কলোনি মালিক ব্রিটেন বা ফরাসিরা এদেরকে ছাড়িয়ে আমেরিকান উত্থান ঘটে গিয়েছিল। অর্থাৎ তারাও আমেরিকার উত্থান কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। সেকালের বুদ্ধিমান আমেরিকানরা বলত এটা এক আমেরিকান সেঞ্চুরির দিন আসতেছে! তাসত্বেও এথেকে কোন শিক্ষা না নিয়ে একালে চলতি শতকে বুশের আমলে আমেরিকার কিছু ‘আবেগি ইমোশনাল ফুল” – নীতিনির্ধারক ভেবেছিলেন তাদের প্রাণপ্রিয় আমেরিকা বুঝি চীনের উত্থান ঠেকিয়ে রাখতে পারবে; অন্তত বেশ কিছুদিন, তাতেই অনেক ফায়দা হবে, আমেরিকার। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় গাধা বা বোকাটা ছিল বারাক ওবামা। আয়ারল্যান্ড সফরে (মে ২০১১) গিয়ে এক পাবলিক বক্তৃতায় তিনি দাবি করেছিলেন “দুনিয়াকে আমরাই এখনও শাসন করে যাব”।  সে যাই হোক, এশিয়ার দুটা রাইজিং ইকোনমি চীন ও ভারত, এদের একটাকে দিয়ে অন্যটাকে ঠেকিয়ে দিতে হবে – আমেরিকা এই কুটনীতির কথা তখনকার তাদের প্রধান শান্ত্বনা ছিল।  মনে করা হয়েছিল, এতে চীনের বদলে এশিয়ায় সবখানে না হোক, অন্তত ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে  চীনের বদলে ও তুলনায় ভারতের প্রভাব বাড়বে, প্রভাব বেশি করা সম্ভব হবে। এতেই চীন ঠেকবে, দমে যাবে ইত্যাদি।

    না, বাস্তবে সেসব কিছুই করা সম্ভব হয়নি তা আমরা এখন দেখতেই পাচ্ছি। না আমেরিকা, না ভারত এনিয়ে কিছু করতে পেরেছিল। এর কিছুই হয়নি। ফলে চীনা উত্থান ঠেকানোর দিক থেকেও এই পলিসিও ব্যর্থ অবশ্যই। আবার আমেরিকান পলিসির দিক থেকে এটা শুধু ব্যর্থ হয়ে শেষ হলেও তাও হত। না তা নয়। ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোতে এখন বাংলাদেশ সহ অন্য যেকোন পড়শি দেশে ভারতের প্রভাব যেমনই থাক এসব রাষ্ট্রের উপর অন্তত আগে আমেরিকার যে ট্র্যাডিশনাল প্রভাব ছিল, সেসবেরও কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। কারণ আমেরিকা তার যাঁতা-কাঠি (আমাদেরকে চাপ দিয়ে করিয়ে নিবার জন্য আমেরিকার যা সক্ষমতা ছিল এরই হাতিয়ার) নিজের কথা ভুলে ভারতকে দিয়ে দিয়েছিল। আর ভারত সেই আমেরিকান ক্ষমতা পেয়েও তা নিজের প্রভাব তৈরিতে কাজে লাগাতে বা নিজের বলয় তৈরিতে তা কাজে লাগানো বা ধরে রাখতে পারেনি। মূলত প্রভাব ফেলতেই পারেনি। চীনের কাছে বারবার প্রায় সবক্ষেত্রেই ভারত হেরে গেছে মূলত দু’টি কারণে। এক বিনিয়োগ সক্ষমতার দিক থেকে চীনের মত ভারত চীনের ক্ষমতার সমান কেউ নয়, এর ধারেকাছের কেউ নয়। আর দ্বিতীয়ত, ভারতের জন্ম থেকেই নেহরু অনুসৃত ‘কলোনিয়াল চিন্তার’ অনুসৃত নীতি ও ব্যুরোক্রাটদের নেহেরু-মানসিকতা। এর সবচেয়ে পারফেক্ট উদাহরণ হল নেপাল।

    নেপালে মাওবাদী সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সাল থেকে, যা ২০০৭ সালে নেপালি রাজতন্ত্র উৎখাত করে শেষে নতুন নেপাল রিপাবলিকের কনস্টিটিউশন রচনার সমাপ্তির ঘোষণা দিতে  পেরেছিল ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। [আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইয়ের প্রসঙ্গ এটাই ]। এই পুরো সময়ের মধ্যে চীন নেপালের কোন কিছুতেই কেউ ছিল না; রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কোনভাবেই সম্পর্কিত কেউ ছিল না। অথচ হঠাত করে ২০১৬ সালের শুরু থেকে চীন নেপালের এক বিরাট ত্রাতা হিসেবে হাজির হয়ে যায়। কারণ, ভারত নেপাল অবরোধ করে বসেছিল। মানে ল্যান্ডলক নেপালকে এতদিন ভারতের উপর দিয়ে সমস্ত আমদানি করা অনুমতি ছিল তা ভারত নিষিদ্ধ করে দেয় এক সীমান্ত অবরোধ আরোপ করে।  মূলত এটাই ভারতের চরমতম ভুল নাড়াচাড়া আর তা থেকে নেপালি প্রতিটা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ভারতকে প্রচণ্ডভাবে সবচেয়ে ক্ষিপ্ত ও ঘৃণা  অপছন্দ করতে শুরু করেছিল। কারণ নেপাল জ্বালানিতে বিশেষ করে রান্নার গ্যাসে শতভাগ ভারতের উপর নির্ভরশীল। তাই পণ্য অবরোধে জ্বালানির অভাবে গরীব মানুষ ও নারীদের জীবন সবচেয়ে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। অথচ মাওবাদীদের কাজ ও রাজনীতি – “নতুন নেপাল” গড়া  – এই কাজটা সহজ করে দিয়েছিল কিন্তু আমেরিকান সরকারই।

    নেপালের শেষ রাজা ও তাঁর অকেজো প্রশাসনের সাথে  পুরনো সব রাজনৈতিক দলের সবার সাথেই রাজার ওয়ার্কিং রিলেশন ভেঙে পড়ায় ত্যক্ত-বিরক্ত অবস্থায় আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিশ্চান রাকা নেপাল সফরে এসেছিলেন। আর সেখানেই তিনি পাল্টা মাওবাদীদেরকেই পছন্দ করে বসেন। কেন? কারণ এরা বাস্তববাদী ও কাজবুঝা লোক, বোকা কমিউনিস্ট নয়। এমনকি সেখান থেকেই, আমেরিকানদের কারণে ও তাদের মধ্যস্থতায়  ভারতকে দিয়েও মাওবাদীদের  গ্রহণ করানো কাজটা সহজ করে দিয়েছিল। আমেরিকান সেই উদ্যোগের কারণের ২০০৬ সালে মাওবাদীরা সশস্ত্রতা থেকে গণ-আন্দোলনের ধারায় শিফট করে ফিরে এসেছিল এবং নেপালের সব দল মিলে গণ-আন্দোলনে রাজাকে পরাস্ত করে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। তবে আমেরিকা মাওবাদীদের সাথে কাজ করা সম্ভব মনে করেছিল মূলত যে কারণে তা হল, এরাও মাওবাদী বটে কিন্তু অন্তত কম্বোডিয়ার খেমাররুজ নয়। কেউ কিছুর মালিক মাত্রই তাঁর গলা কাটতে হবে এটা তাদের নীতি ছিল না। এছাড়া কথিত “সমাজতন্ত্র” ধারণার কোন ফ্যান্টাসিও এদের নেই। বাস্তবে এরা  রাজতন্ত্র উতখাত করে নাগরিক অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়। এই শেষের লক্ষ্যটাই আমেরিকানদের আকৃষ্ট করে ধারণা বদলে যায়। আর সম্ভবত তা কিছুটা ভারতকেও। যদিও এখনও ভারতের মাওবাদীরা নেপালি মাওবাদীদের থেকে এলাবারেই আলাদা থেকে যায়।

    এসব কারণেই  আমেরিকান মধ্যস্থতা মেনে এমনকি ভারতও পুরানো রাজার হাত ছেড়ে মাওবাদীসহ নেপালি অন্যান্য দলের পক্ষে বিরাট ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল। যেমন মাওবাদীরাসহ রাজাবিরোধী সব দলের নিজেদের মধ্যে রাজা উতখাতের কর্মসুচী ফাইনালের রফা-চুক্তির গোপন বৈঠকগুলো সব ভারতের আয়োজনে ও নিরাপত্তায় এবং ভারতে সম্পন্ন হয়েছিল। সেটা ছিল ভারতের দিক থেকে দেওয়া এক ব্যাপক ও খুবই ক্রুশিয়াল সহযোগিতা। কিন্তু রাজা উৎখাতের পরে নেপালে রাষ্ট্রগঠনের কালে ভারত কাকে নিজের প্রভাবাধীন করে নেয়া যায়, এমন দল বা গোষ্ঠী খুঁজতে লেগে গিয়েছিল। এ ছাড়া রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পারস্পরিক লাভালাভের উইন-উইন সিচুয়েশনের পথে না গিয়ে ভারত কলোনিয়াল মাস্টারের ভূমিকা ও সম্পর্ক চেয়ে বসেছিল। অথচ ভারতের জন্য এগুলোর কোন প্রয়োজনই ছিল না। কিন্তু তাতে কী? ভারতের মাথায় মডেল হিসেবে ঘুরছিল ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল চুক্তিটা।

    কারণ, সেটা ছিল আসলে এক কলোনি-চুক্তি। সেভাবেই এটা লেখা হয়ে আছে। ভারত বুঝতেই পারল না ১৯৫০ সাল আর ২০১৫ সাল এক নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়া থেকে কলোনি উঠে গিয়েছিল কেন? অথবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকা কেন ব্রিটিশদের কলোনি মাস্টারের ভূমিকাতেই নিয়ে মাঠে নেমে যায় নাই কেন? আমেরিকা কী বোকা ছিল? আর নেহেরু খুব চালাক! আসলে জাতিসঙ্ঘ কেন ও কিসের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, এটাও নেহরুর কখনোই বোঝা হলো না, বুঝতেই পারেননি তিনি। ফলে পরবর্তীকালের সারা ইন্ডিয়ারও পলিটিক্যাল জগৎটাও নেহেরু-বুঝের দুনিয়া হয়ে থেকে গেছে। আর এখন তো সবকিছুই বুঝাবুঝির বাইরে চলে গেছে। বরং উল্টো ভারতের নেহরু ডিপ্লোমেসির চোখে  – তারা নেপাল বা ভুটানের সাথে ব্রিটিশ কলোনিয়াল শক্তিদের মতোই ভারত চুক্তি করতে সফল হয়েছিল – এটাকেই সাকসেস মনে করা হয় এখনও।

    নেপাল ২০১৫ সালে নতুন কনস্টিটিউশন চালু ঘোষণা করলে কলোনি-মডেল মনের ভারত ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। তারা ভারতের উপর দিয়ে নেপালের পণ্য আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল। আর সেকালে ভারতের ওপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া নেপালের মানুষের বাইরে বের হওয়ার আর কোন বিকল্প পথ ছিল না। আর সেই থেকে প্রথম দৃশ্যপটে চীনের আগমন। ভারতের উলটা দিকে নেপালের অপর সারা উত্তর সীমান্তে চীন ছিল-আছে বটে, কিন্তু সেদিকে রাস্তাঘাট বলতে তেমন কিছু ছিল না। যেটুকু টিমটিমা ছিল তাও ঐ জমানায় ঘটা ভুমিকম্পের পরে পাথর চাপায় বন্ধ হয়ে গেছিল। বরং সেকালে চীনের অভ্যন্তরে যেসব নতুন হাইওয়ে রেল নেটওয়ার্ক সুবিধা তৈরি হচ্ছিল, তাতে যুক্ত হতে গেলে রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে প্রায় শত কিলোমিটার নতুন কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ তৈরি করে নিতে হবে – এই ছিল অবস্থা । ২০১৫ সালের পরে ভারতের বেকুবিতে সেসব কানেকটিং রেল বা সড়ক যোগাযোগ একালে এখন তৈরি করে নেয়া হয়েছে। ভারত থেকে একটা দিয়াশলাইও আমদানি না করে নেপাল এখন সহজেই চীনের বন্দর ও চীনের ভেতর দিয়ে বা চীন থেকে জ্বালানিসহ সব পণ্য আনতে পারে। আবার নেপালের নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে ভারত ছাড়া অন্য কাউকে।

    ভারতের হাতে সব দিয়ে দিয়ে, সব প্রভাব হারানো আমেরিকা গত মাস থেকে এখন নতুন করে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও নেপালের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক তৈরি করার চেষ্টা শুরু করেছে। যদিও সম্প্রতি নেপাল আমেরিকার ৫০০ মিলিয়ন ডলারের অনুদান প্রস্তাব অনুমোদন করে নাই। অর্থাৎ সেই আমেরিকা এখন সব হারিয়ে আবার নেপালে প্রবেশ করতে স্ট্রাগাল করছে। যেটা মূলত চীনের প্রভাব টপকাবার জন্য আমেরিকার এক স্ট্রাগল। তবে অবশ্যই এবার আর ভারতের হাত দিয়ে খাওয়া নয় অথবা ভারতের চোখ দিয়ে দেখা নয়- সবই আমেরিকার নিজের ও সরাসরি উদ্যোগ। বরং চীনের সাথে একটা প্রতিযোগী মুডে আমেরিকা লড়তে চাইছে। এই ঘটনার প্রমাণ থেকে মনে হচ্ছে, আমেরিকা ফেরত আসার চেষ্টা করছে অবশ্যই। আর ভারতের হাত দিয়ে খেতে চাওয়া পুরনো আমেরিকার একটা ভাল শিক্ষা হয়েছে এতে, তা দেখাই যাচ্ছে। একই রকম আবার ওদিকে শ্রীলঙ্কা?

    শ্রীলঙ্কায় নির্বাচনে সরকার বদলের সাথে সাথে সেখানে খুবই নোংরাভাবে ওদেশের দলগুলো চীন অথবা ভারতমুখী হয়ে যাচ্ছিল। যেটা স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মেরুদণ্ডহীন দুর্দশাকেই প্রকাশ করে আসলে। এরপর গত সরকারের শেষ দিকে তারা সেবার ভারত-চীন ছেড়ে আবার আমেরিকামুখী হয়ে যায়, মানে আমেরিকাকেও উন্নয়ন প্রজেক্ট দিয়েছিল। আগের চীনা-পছন্দ রাজা পাকসে – তাঁর ভাই এবারের নির্বাচনে জয়ী হন ও সরকার গড়েন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আসার পর, এখন আমরা রিপোর্ট দেখছি নতুন সরকার আমেরিকান প্রজেক্ট স্থগিত করে দিয়েছে [চীনমুখি শ্রীলঙ্কা এখন, আমেরিকার মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প স্থগিত] করেছে। প্রায় একই দশা দেখা গেছে মালদ্বীপেও। আসলে এগুলো মূলত দুর্বল সরকার ও সরকার ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির লক্ষণ।

    মূল কথাটা হল – রাষ্ট্রস্বার্থকে দল বা ব্যক্তিস্বার্থের অধীন করে ফেলা অথবা সেকেন্ডারি করে ফেলা থেকে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়। কোনো বিদেশী সরকারকেই নিজের সরকার ও ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ এই স্তরে ঢুকে পড়তে এলাও করা একেবারেই অনুচিত। নিজের ক্ষমতায় থাকা বা ফিরে আসার সুবিধার কথা ভেবে কোন সরকার একবার এ কাজ করে বসলে- চীন, ভারত বা আমেরিকা এ তিন রাষ্ট্রকে দূরে রাখা ঐ রাষ্ট্রের জন্য খুবই কঠিন হয়ে যায়। তবে আমাদের জন্য এখন প্রাসঙ্গিক বিষয় হল, আমেরিকা নিজের কর্তৃত্ব-আধিপত্যের দণ্ড একবার ভারতের কাছে দিয়ে দেয়া অথবা খোয়ানোর পর এখন এসব দেশেই নতুন করে নিজের ক্ষমতার বলয় বানাতে চেষ্টা করতে নেমেছে আমেরিকা। এগুলোও আমেরিকার ফিরে উঠে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টার নমুনা বলা যায়।

    তবে ২০১৬ সালে ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আগের ওবামা সরকারের আমেরিকার ভারতকে দেয়া বিশেষ সুবিধা (যেমন চীন ঠেকানোর জন্য খোদ বাংলাদেশকেই ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল)। এছাড়া যেমন- আমেরিকায় শুল্কমুক্ত রফতানির সুযোগ পেত ভারত। সেগুলো সুবিধা সব সমূলে প্রত্যাহার করে নেন ট্রাম্প। উল্টা শাস্তিমূলকভাবে ভারতের রপ্তানির উপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করেন যা কার্যত আমেরিকায় ভারতের রফতানির সুযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প।

    আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার পর থেকে বাংলাদেশের সবকিছুই এখন ভারতের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু কোন কর্তৃত্বই আর আমেরিকার হাতে বা ভাগে নেই বললেই চলে। তবে গত অক্টোবরে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমান্ত বরাবর ভারতকে রাডার বসানোর চুক্তি করার পর থেকে আমেরিকা কিছুটা তোলপাড় দেখানো শুরু করেছিল। কিন্তু সেটাও হঠাৎ করে এ বিষয়ে আবার সবকিছু নিশ্চুপ দেখা যাচ্ছে। তবে সারকথায় – নিজের ক্ষমতা ও প্রভাব ফিরে পেতে আমেরিকা আবার সব দেশেই তৎপর হতে চেষ্টা করছে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি।

    ওদিকে আমেরিকাকে পালটা শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল সম্ভবত পাকিস্তান। আর মূলত সেই পাকিস্তানেই এখন আমেরিকা আবার ফিরে যাচ্ছে। আগের মতই সামরিক সহযোগিতা ও ট্রেনিং দেয়ার এক লম্বা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।

    গত ২০১৬ জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথ নেয়ার পর থেকে পাকিস্তানের ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা নিয়ে প্রায় তেড়ে এসেছিলেন ট্রাম্প। অবস্থা এমন যেন আমেরিকা নিজেই না বরং পাকিস্তানই আমেরিকাকে আফগানিস্তানে হামলা করতে ডেকে নিয়েছিল। তাই পাকিস্তান আমেরিকার সব দুঃখের জন্য দায়ী এমন ভাব ধরেছিল ট্রাম্প। অর্থাৎ আমেরিকা না, পাকিস্তানই সব কথিত “টেররিজমের” জন্য দায়ী। যেন আফগান তালেবানের তৎপরতা বহাল আছে; পাকিস্তানের কারণেই। এমনই ছদ্ম অভিযোগে আমেরিকান প্রতিশ্রুতির ৬০০ মিলিয়ন ডলার হঠাৎ বন্ধ করে দিয়েছিল ট্রাম্প। আমেরিকা-পাকিস্তান সম্পর্ক সবচেয়ে নেতি ও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছিল। এসব ঘটনা সবই পাকিস্তানের গত নির্বাচনের (জুলাই ২০১৮) আগের ঘটনা। কিন্তু পাকিস্তানও শক্ত অবস্থান নিয়ে আমেরিকা থেকে দূরে সরেছিল আর তা পাকিস্তানের সেনা-সিভিল ক্ষমতা্র এক সাথে নেয়া সিদ্ধান্তে। আর ততই আমেরিকা পাকিস্তানকে দোষারোপ করে চলেছিল চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতার জন্য, গোয়াদর বন্দর প্রকল্পের জন্য।

    আসলে গত সরকারের (২০১৮ সালের আগের) আমল থেকে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা খুবই খারাপ জায়গায় ঠেকেছিল। তাই নতুন নির্বাচিত ইমরান খানের  উপর আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রধান মাইক পম্পেও যেন গোলা ছুড়ছিলেন, যখন তিনি বললেন, আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের থেকে লোন নিয়ে ইমরান খান চীনের লোন পরিশোধ করতে পারবে না। ক্যাম্পেইন তখন এমনই চরমে উঠেছিল। অথচ চীনা লোনের কিস্তি পরিশোধের সময়কাল শুরুই হয়নি এখনো, হবে ২০২৩ সাল থেকে। যা হোক, শেষে সবই থিতু হয়েছে এখন। পাকিস্তানের প্রয়োজনীয় সব ঋণ সে একাই চীনের থেকে পেতে পারত, কিন্তু ইমরান খান এর পুরাটা নিতে চাননি। কারণ, পশ্চিমা বাজার এই খবরটা ভালোভাবে নিবে না। বাজারকে আস্থায় আনা সমস্যা হবে, এছাড়া আমেরিকান প্রপাগান্ডার ত উপস্থিত থাকবেই। তাই বাজারের আস্থা পেতে লোনের একটা অংশ প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার  পাকিস্তান সেটা আইএমএফের থেকেই সংগ্রহ করেছিল। কারণ আইএমএফ জড়িত ও তার রেকমেন্ডেশন হলে বাজার আস্থা পাবে। হয়ে ছিলও তাই। তাই আজ? গত পরশুর রিপোর্ট – আইএমএফ, পাকিস্তানি সরকারের উদ্যোগের উচ্ছসিত প্রশংসা করে বলছে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সঠিক রাস্তায় উঠে পড়েছে [Pakistan’s economic reform program is on track. ]। কিন্তু মনে রাখতে হবে  ইমরান খান এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আমেরিকার চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই।

    তবে আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের সব উত্তেজনা ঠাণ্ডা হয়ে যায় মূলত আমেরিকার আফগানিস্তান থেকে শেষ সৈন্যকে নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থেকে। ওবামা ২০১৪ সালে মূল অংশটা নিয়ে গেলেও দশ হাজারেরও বেশি একটা সামরিক ব্যাচকে রেখে গেছিল ট্রেনিং এর নামে। এবার ট্রাম্প এদেরকেও আরামে দেশে ফিরিয়ে নিতে  আমেরিকার তালেবানদের সাথে চুক্তি করতে গিয়ে দেখেছিল যে পাকিস্তানের সহযোগিতা ছাড়া এটা অসম্ভব। আর এই চুক্তি আমেরিকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করাতে তাদের আমেরিকা-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সমপর্ক আবার উষ্ণ করে নিতে চায় ট্রাম্প। পাকিস্তানের উপর আস্থা রাখা যায় ও তা খুব গুরুত্বপুর্ণ, এই হুঁশ থেকে আমেরিকা পাকিস্তান সম্পর্ক নরমাল হতে শুরু করেছে। আর সেখান থেকে সম্পর্ক এখন আগের চেয়ে গভীর হতে চলেছে। এটাকেই ‘দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন নীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন’ বলছেন অনেকে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টও তা সরাসরি নিজেও বলছে [U.S. to resume military training program for Pakistan: State Department]।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়ানো, আবার পুরো কর্তৃত্ব নেয়া, সবাইকে সাহায্য করা ছাড়াও আর যেসব নীতিগত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আমেরিকা যুদ্ধের নেতৃত্ব নিতে রাজি হয়েছিল সেটা হল – নাগরিক অধিকারভিত্তিক স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ভুখন্ড শাসক কে হবে এর নির্ধারণের হকদার একমাত্র ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দা কোন রাজা বা কলোনি দখলদার নয় – এই নীতির ভিত্তিতে জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া। পাঁচ ভেটো সদস্যের জাতিসঙ্ঘের সবাই (ফ্রান্স বাদে সে তখন হিটলারের দখলে ছিল তাই, পরে স্বাক্ষর দিয়েছিল) এসব কথা লেখা এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে সম্মতি দিয়েছিল ১৯৪২ সালে্র ১ জানুয়ারি। এটাকেই পরবর্তিকালে “জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা” বা Declaration বলে মানা হয়। কিন্তু নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকার মেনে চলার বাধ্যবাধকতা কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মাওয়ের চীন (যারা ঐ পাঁচের মধ্যে দুই ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন সদস্য) পরবর্তীকালে মানেনি বা নিজ রাষ্ট্রে কখনো চর্চা  করেনি।  একালে এখন চীনা অর্থনৈতিক উত্থান একটা বাস্তবতা, দুনিয়ার অর্থনৈতিক নেতা সে। কিন্তু চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রসঙ্গ? এর ভবিষ্যত অন্ধকার!

    স্পষ্ট করেই বলা যায়, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র বা মানবাধিকারের বাইরে থাকা বা থেকে চীনের পক্ষে দুনিয়াকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেয়া অসম্ভব। বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে শুরু হওয়া আমেরিকার নেতৃত্ব  – এর সেই ভূমিকা ঠিক একারণেই সহসা দুনিয়া থেকে চলে যেতে গিয়েও যাবে না, যাচ্ছে না। এটাই বারবার আমেরিকার নেতৃত্বে ফিরে আসার শর্ত জাগিয়ে রাখছে, রাখবে।

    তাহলে আমেরিকা কি আগের মতোই বাংলাদেশেও কোন প্রভাব কর্তৃত্ব নেবে, এমন ভূমিকায় ফিরে আসবে? অন্তত নিজেও চীনের পাশে একটা শেয়ার নিবে?  আর বলাই বাহুল্য- জুতা খুলে ঘরে ঢোকার মত এবার ভারতকে বাইরে রেখে আসবে; এবার আর ভারতকে ভুলেও সাথে আনবে না? বিষয়গুলো এখনো আনসেটেল্ড, অবশ্যই! তবে বড় অক্ষরে এর একটা শর্ত লিখে দেওয়া যেতে পারে – এশিয়ায় আমেরিকা ফিরতে চাইলে ভারতের হাত ছেড়ে দিয়ে আসতে হবে। যাতে সবাই বুঝে যে আমেরিকা আগের সিদ্ধান্তের ভুল কারেক্ট করছে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা গত ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “এশিয়ায় আমেরিকার ফিরে আসা “ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ঝুঁকে কান্নি মারার না, এটা ভারসাম্যের যুগ

    ঝুঁকে কান্নি মারার না, এটা ভারসাম্যের যুগ

    গৌতম দাস

    ১৫ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার,

    আপডেটেড ১৭ জুলাই, ২০১৯ ১৭:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-2CP

    –

    একালে আপনি কার দিকে? চীন, আমেরিকা নাকি ভারতের? সাথে রাশিয়ার নামটা নিলাম না, সেটা একটু পেছনে পড়েছে বলে। তো চীন, আমেরিকা নাকি ভারত – এই প্রশ্নের জবাব হল – একটাও না। আর সরাসরি বললে, জবাবে এখানে বিকল্প শব্দটা হল “ভারসাম্য”। কারও দিকে ঝুঁকে পড়া না, কান্নি মারাও না – বরং একটা ভারসাম্য। নিজের স্বার্থের পক্ষে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একটা ভারসাম্য। এই অর্থে এটা ভারসাম্যের যুগ।  চীন, আমেরিকা নাকি ভারত কারো সাথে নয়, এক ভারসাম্য অবস্থান বা ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট- এমন পজিশন নেয়া।

    এককালে আপনি কোন দিকে? অথবা আপনার রাষ্ট্র কোন দিকে – আমেরিকা না সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) কোন দিকে অবস্থান নিয়েছে? এটা খুবই ভ্যালিড প্রশ্ন ছিল। এভাবে ‘আপনি কোন দিকে’ বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে বা কলোনি-উত্তরকালে ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়ায় চলতে শুরু করেছিলেন। বলা বাহুল্য, সেটা আমেরিকার নেতৃত্বে সেকালের নতুন দুনিয়া। তখনো পরাশক্তি বা দুই মেরুতে বিভাজন শুরু হয়নি। সেটা হয়েছিল ১৯৫৩ সাল থেকে। শুরু হয়েছিল গ্লোব-জুড়েই এক ব্লক রাজনীতিঃ সোভিয়েত ব্লক না আমেরিকান ব্লক। এভাবে সেই থেকে ৭০ বছর আমরা পার করে দিয়েছি। ফলে আমাদের মতো দেশের ভাগ্য সেকালে লুকিয়ে ছিল ‘কোন দিকে’ বলে যার যার মতে, এক ভাল ব্লক খুঁজে নেয়ার ভিতরে। আর এই ছিল আমাদের “কোন দিকের” ধারণার জন্ম কাহিনী। এভাবেই চলছিল একনাগাড়ে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। আর লোকে বলতে শুরু করেছিল যে, দুনিয়া এবার এক মেরু, আমেরিকান মেরুর দুনিয়া হয়ে গেল। কথা হয়তো আপতিকভাবে সত্য, অন্তত সাদা চোখে সবার তো তাই মনে হচ্ছিল। কিন্তু আসলেই তাই কী?

    ওদিকে চীনের উত্থানঃ  শুরু হিসাবে ধরলে চীনের উত্থানে আজকের চীন হয়ে উঠার শুরুটা বলা যায় সেই ১৯৬৮ সাল থেকে, যদি না ১৯৫৮ সালের তথাকথিত “সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে” এর শুরু বলে কেউ কেউ না-ই ধরতে চান। না, তথাকথিত লিখেছি, “সাংস্কৃতিক বিপ্লবটা” ভুয়া ছিল বা মনে করি কিনা সেজন্য না। লিখেছি কারণ, আসলে সেটা ছিল দলের চিন্তার মূল খোলনলচা বদলে দেয়া এক বদল।  কিন্তু সেটা করা হয়েছিল “সাংস্কৃতিক বিপ্লবের” নামের আড়ালে। ফলে এটা দলের পলিটবুরোর নেতাদের সাথে তৃণমুল কর্মীদের সাংস্কৃতিক ফারাক দূর করার আন্দোলন একেবারেই নয়। বরং সেটা ছিল, পলিটবুরোর নেতাদের সাথে নেতাদের লড়াই। দলের পুরানা অবস্থানের সাথে নতুন রাজনৈতিক অবস্থানের লড়াই। আজকের চীন বলে যেটা দেখছি আমরা এটাই ছিল সেই নতুন রাজনৈতিক অবস্থান। এমনকি মাওও ছিলেন এটারই পক্ষে।
    যাহোক, “সাংস্কৃতিক বিপ্লবটা” ভাল না মন্দ সে তর্ক এখানের নয় বলে সেটা এখন এড়াতেই মূলত ১৯৬৮ বলেছি। যেখানে ১৯৬৮ সাল হল যখন আসলে “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” শেষে তা বিজয়ী ও মোটামুটি থিতু হবার কাল। তবুও দুনিয়া জুড়ে চীন আজকের এজায়গায় যেতে রওয়ানার এটা কোন ইঙ্গিত কিনা এমন আলোচনা কোথাও ছিল না। এর চেয়েও তখন মুল আলোচ্য ছিল কথিত “চীনা সমাজতন্ত্র” কোথায় যাচ্ছে।
    এমনকি ১৯৬৮ সালই বা কেন, ১৯৭১ বা ১৯৭৮ সালেও খুবই কম একেবারেই হাতেগোনা কিছু লোক ছাড়া কেউ বুঝেনি যে, সেটাই আজকের চীন হওয়ার শুরু। অথচ চীনের কাছে ১৯৭১ সাল মানে আমেরিকার সাথে গোপন চুক্তি অনুসারে, ওর সাহায্যে চীন মানে মাও সে তুংয়ের চীন, সেই প্রথম জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ লাভ করেছিল। আর এটা ছিল ভেটো দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন একটা সদস্যপদ। অনেকের কাছে তথ্যটা আজব লাগতে পারে কিন্তু এই তথ্য শতভাগ সত্য। কারণ, জাতিসংঘে এই সদস্যপদ এত দিন (চীন বলতে) তাইওয়ানকে দিয়ে রাখা ছিল। আর সেটাই ১৯৭১ সালে সেবার তাইওয়ানকে বাদ দিয়ে মাওয়ের চীনের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল, আমেরিকার সাথে চীনের গোপন আলাপের ফলাফল অনুসারে। গোপন বলছি এজন্য যে ১৯৭১ সালেই কিসিঞ্জার [Henry Kissinger] গোপনে প্রথম “মাওয়ের  চীন” সফর করেছিলেন, আর সেখানেই ভেটোওয়ালা সদস্যপদ ফেরত পাবার বুঝাবুঝিটা তৈরি হয়েছিল।

    আরও ওদিকে ১৯৭৮ সালঃ এটা উল্লেখযোগ্য এ জন্য যে, মোটাদাগের সব দেনা-পাওনা [চীন আমেরিকান পুঁজি, বিনিয়োগ ও পণ্য ইত্যাদি নিজ বাজারে প্রবেশ করতে দিবে। এতে বিনিময়ে কী কী নিবে এরই দেনা-পাওনা] ডিল সম্পন্ন করে চীন-আমেরিকা উভয় রাষ্ট্র পরস্পর পরস্পরকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে উভয়ে একে অন্যের দেশে অফিস খুলে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ১ জানুয়ারি ১৯৭৮ সাল থেকে। এভাবে পরবর্তিতে ১৯৯০ পর্যন্ত চীন ছিল আসলে আমেরিকান পুঁজি ও টেকনোলজি কিভাবে ব্যবহার করবে এর, আর গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থনীতি ও গ্লোবাল বাজারে প্রবেশ করে চীনের নিজেকে অভ্যস্ত, সাজানো ও খাপ খাইয়ে নেয়ার প্রস্তুতিকাল। আর এরও পরের প্রায় ২০ বছর ধরে চলে চীনের অর্থনৈতিক ডাবল ডিজিট (বা সময়ে এর চেয়েও বেশি) উত্থানের পর্ব। তবে ২০০৭ সালে গ্লোবাল রিসেশন শুরু হলে তা কমতে থাকে। তত দিনে আমেরিকা বুঝে গেছিল যে, চীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠার দিকে, তাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
    তাই ব্যাপারটা এমন নয় যে, আমেরিকা আগে তা জানত না বা অনুমান করেনি। আসলে বিষয়টা ছিল জেনেও কিছুই করার নেই ধরণের পরিস্থিতি। গ্লোবাল পুঁজির এক আপন স্ববিরোধী স্বভাব এটা। চীনের জনসংখ্যার শত কোটির ওপরে (২০১৮ সালের হিসাবে ১৪২ কোটি)। এমন দেশে সত্তরের দশকেও সে ভার্জিন এই অর্থে যে তখনও সেখানে কোন বিদেশি বিনিয়োগ যায় নাই। তাই এর বাজার খুলে দিলে এর বিদেশি পুঁজি পাবার আকাশচুম্বি চাহিদা পুরণ করতে বাইরের সকলে ঝাপিয়ে পড়বে। মানে উলটা করে বললে ওয়ালস্ট্রিটের চোখে এত বড় ক্রেতা সে জীবনেও কল্পনা করে নাই। তাই চীনে বিদেশি বিনিয়োগে বাজার চাহিদা ধরতে আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট একে উপেক্ষা করা কথা চিন্তাও করতে পারে না।  তাই আমেরিকান পুঁজিতে চীন ফুলে-ফেঁপে উঠতে থেকেছিল ১৯৯০ সালের আগেও,  তবে ১৯৯০ সালের পরে আরও প্রবলভাবে। এটা জানা সত্বেও যে এই পুঁজি চীনে ব্যবহৃত হবার পরে যে নতুন উদ্বৃত সঞ্চয় ও সম্পদ তৈরি করবে তা বলাই বাহুল্য আমেরিকাকে পিছনে ফেলে দিবে এবং চ্যালেঞ্জ করবে, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু এই ভবিষ্যতের কথা ভেবে চীনে প্রবেশের সুযোগ আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট উপেক্ষাও করতে পারে নাই কারণ উপেক্ষা করলে তাতে তার নিজের মরণ। মূল কথা, সব সময় নতুন নতুন বিনিয়োগের সুযোগের ভিতরই কেবল আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট এর জীবন। তাই নতুন শতকের শুরু থেকেই আমেরিকা জেনে যায় চীন উঠে আসতেছে। এটা দেখেই বুশের আমলে, ২০০৪ সাল থেকে শুরু হয়েছিল এবার চীন ঠেকানোর [China Containment] কৌশলের তোড়জোড়। প্রেসিডেন্ট বুশের ভারত সফর (২০০৬ মার্চ) থেকে ভারত আমেরিকার হয়ে চীন ঠেকানোর কাজ হাতে নেওয়ার ব্যাপারটা আর একধাপ আগিয়েছিল। আর তখন থেকেই ধীরে ধীরে আপনি কোন দিকে অথবা আপনার রাষ্ট্র কোন দিকে, সেটা বুঝতে পারা ও জবাব দেয়া আর আগের মত সহজ থাকেনি। কেন?

    আপনি কোন দিকে, এর জবাব দেয়া শুরুর সেকালে সহজ ছিল। কারণ, আমেরিকা নাহলে সোভিয়েত – এদুটোর কোন একটা মেরু বা পরাশক্তি আপনি বেছে নিলেই হত। কিন্তু একালে ব্যাপারটা আর মেরু বা পরাশক্তি-কেন্দ্রিক বিষয় নয়। যেমন – আপনি কোন দিকে চীন, আমেরিকা নাকি ভারত? এই প্রশ্নের মধ্যে চীন, আমেরিকা বা ভারত এদের কাউকে পরাশক্তি গণ্য করা নাই বা হয়নি। একালে কেউ পরাশক্তি কি না তা এখানে মুখ্য বিষয়ই নয়। মুখ্য বিষয় গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা বা নেতৃত্ব কার, সেখানে। ফলে তা আসলে এখন মূলত পুরনো নেতা আমেরিকার জায়গায় নতুন হবু নেতা চীনের যোগ্য হয়ে দখল নেয়ার ইস্যু।

    এই হিসাবে এখানে নেতা বা কেন্দ্র দুইটা – চীন ও আমেরিকা। তাহলে, সাথে ভারতের নামও আসছে কেন? কারণ, ভারত আমেরিকার হয়ে সে “চীন ঠেকানোর” কাজে ভাড়া খাটত। প্রতিদান হিসেবে পেয়ে গেছিল বাংলাদেশের ওপর আমেরিকান ছড়ি ঘুরিয়ে মাতবরি। এছাড়াও আর একটা দিক হল, চীনের প্রায় কাছাকাছি জনসংখ্যার দেশ হল ভারত। ফলে এখনই না হলেও ভারত পটেনশিয়াল বা আগামীর সম্ভাবনা ভাল, এমন অর্থনৈতিক হবু শক্তি; এতটুকুই। তাতে সব মিলিয়ে ভারত ভেবেছিল এভাবেই দিন যাবে “চীন ঠেকানোর” বোলচালের মধ্যে থাকবে আবার চীনের নেতৃত্বে নতুন বিশ্বব্যাংক ‘এআইআইবি’ খুললে তাতে চীনের পরই বড় মালিকানা শেয়ারটা চীন ভারতকেই দিবে। ব্যাপারটা সেই কবিতার মতো যেন বলছে – “এভাবে কি দিন যাবে তোমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে অথচ তোমার কথা না ভেবে!’ ভারত আগামি গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা চীনের কোলে শুয়ে অথচ আমেরিকার কথা ভেবেই দিন কাটিয়ে দিতে পারবে – তাই ভেবেছিল।
    কিন্তু না একালে দিন তেমনভাবে যায়নি। যাওয়ার কথাও ছিল না। এখন ফলাফল হল বাংলাদেশ আমেরিকার হাতছাড়া, উল্টা বাংলাদেশ এখন ভারতের কোলে, সেটা সত্য। কিন্তু ওদিকে আবার ট্রাম্পের আমলে এসে ভারতকে “চীন ঠেকানোর” কাজে ভাড়া খাটাতে ট্রাম্পের আমেরিকাই আর আগ্রহী নয়। উল্টো চীনের মত ভারতের বিরুদ্ধেও ট্রাম্প বাড়তি শুল্ক আরোপের বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। যেখান থেকে ভারত আবার মোচড় দিয়ে নিজের আত্মগরিমা আর ট্রমা-ভীতি পেছনে ফেলে চীনের কোলে য়ুহান সামিটে হাজির। বলা হচ্ছে, ওই য়ুহান সম্মেলন সেখানে এমন কিছু মৌলিক বোঝাবুঝির ভিত্তি নাকি তৈরি হয়ে গেছে, যা আরো বিকশিত বা বাড়তে না পারলেও নাকি পিছাবে না। আমেরিকার সাথে ভারতের পরস্পরের পণ্য অন্যের যার যার বাজারে ঢুকার বিরুদ্ধে উভয়েরই বাড়তি বাণিজ্য শুল্ক আরোপের ফলে – এটা দুদেশেরই রপ্তানি প্রায় স্থবির করে ফেলেছে। গতমাসে জাপানে জি২০ এর বৈঠকের ফাঁকে সাইডলাইনে ট্রাম্পের চাপ বা হুমকি – মার্কিন পণ্যের ওপর ভারতের উচ্চ শুল্কারোপ গ্রহণযোগ্য নয় – এসবই একালের পরিণতি।

    কিন্তু ট্রমা- ভারতের ট্রমা [Trauma] সে ব্যাপারটা কী? বিষয়টা হল, ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে ভারতের হার, এটাই তাকে বারবার বেচাইন অস্থির করে যে যদি একালে আবার সেটা হয়, এটি ভীতিই ভারতকে বারবার আমেরিকার দিকে টেনে নিয়ে যায়। চীন আগামির ফ্রেশ গ্লোবাল নেতা, তুলনায় আমেরিকা ক্রমশ ডুবে যাওয়া নেতা – এটা ভারতের অজানা নয়। তাই আমেরিকার চেয়ে আগামি নেতা চীনের সাথে আগেই গাটছাড়া বাধলে গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রভাব প্রতিপত্যি আগেই বাড়বে শুধু তাই না, আগামি দুনিয়ার যা কিছু নতুন রুল তৈরি হবে তা তৈরিতে নিজের ভুমিকা মতামত আগেই চীনের পাশাপাশি জোরদার করে রাখতে সুবিধা পাবে।  কিন্তু ট্রমার জন্য ভারত আমেরিকার দিকেই বারবার ফিরে আসে, কান্নি মেরে পরে থাকে। অর্থাৎ বলা যায়, ভারত আমেরিকার সাথে তার সম্পর্ককে ভারসাম্যের জায়গা থেকে দেখে না, দেখতে পারে না। বরং আমেরিকাকে পুরনো পরাশক্তির আলোকে দেখতে চায়। কিন্তু চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব তো পরাশক্তিগত নয়। তবু ভারত আমেরিকার দিকেই কেবল ছুটে যায়। এছাড়া সবখানেই ভারতের গাছের খাওয়া আবার তলারও খেতে চাওয়ার নীতি তো আছেই। আবার তাতে সময়ে ধরাও খায়। যেমন ২০১৮ সালের মাঝামাঝি ট্রাম্প নিজের আফগান পলিসি প্রকাশ করেছিলেন। এতে পাকিস্তানকে সন্ত্রাস প্রশ্রয় দেবার অভিযোগ দিয়ে সাজানোতে ভারত আবার তাতে ছুটে গিয়েছিল মোহে। কিন্তু না! ছয় মাস যেতেই জানা গেল ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে শেষ হাজার দশেক আমেরিকান সৈন্য, তাও এবার ফেরত আনতে চান। অথচ আফগান নীতিতে এর কোনো ইঙ্গিতও ছিল না। যা হোক, সৈন্য ফেরতের চিন্তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন দেখল, পাকিস্তানের সহায়তা ছাড়া তা অসম্ভব। ফলে যে পাকিস্তানকে আমেরিকা চীনের কোলে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল, তাকেই আবার কুড়িয়ে নেয়া শুরু করেছিল।

    আমেরিকার আফগানিস্তান-বিষয়ক বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদ [U.S. envoy Zalmay Khalilzad ] এই সেই বিশেষে দুত যিনি ট্রাম্পের আফগান নীতি প্রকাশের সময় পাকিস্তানের কঠোর সমালোচক, উঠতে বসতে সন্ত্রাস লালনকারী বলেছিল। সেই তিনি এবার সৈন্য ফেরানোর উপায় হিসেবে তালেবানদের সাথে কথা বলা আর রফাচুক্তি করার চেষ্টায় পাকিস্তানের সহায়তা কামনায়  এসে এবার পাকিস্তানকেই প্রায় বাপ ডাকা বাকি রেখেছে।  এরই সর্বশেষ হল আজ ১৫ জুলাই টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে “আফগান শান্তি আলোচনা থেকে ভারতকে কুনুই মেরে বের করে দেয়া হয়েছে” [India elbowed out of Afghanistan peace talks]।

    আবার, সাম্প্রতিককালে আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান “ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স” [Financial Action Task Force (FATF)] প্রবল সক্রিয় হতে দেখা গেছে। এই সংগঠন মূলত মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচার যার একটা বড় অংশ জঙ্গিসংগঠনের অর্থ যোগানদাতা বলে অনুমানে এরই কাউন্টার করতে নানান পদক্ষেপ নিয়ে থাকে ও তা মনিটর করে। এতে আমেরিকার উদ্যোগে পাকিস্তানকে চেপে ধরাতে [পাকিস্তানের অনেকগুলো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু প্রতিশ্রুতিমত তা নেয় নাই। তারিখ মিস করেছে।] ভারত খুবই খুশি ছিল। নিজ মনকে আশ্বস্ত করেছিল ভারত যে, হ্যাঁ অন্তত এই টেররিজম ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার এই অ্যালায়েন্স, এটাই তো ভারত চায়। এটা খুব দরকারি আর কাজেরও। এবং তারা দুই-রাষ্ট্র কত ভাল এবং তার টেররিজম ইস্যুতে একটা ন্যায্য লড়াইয়ে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। তাই তারা পাকিস্তানের মত নয়। অনেক ভাল। কিন্তু ঘটনার বাস্তবতা হল, এমন টেররিজম ইস্যু বলে আসলে বাস্তব দুনিয়াতে সত্যিকারের কিছুই নেই। টেররিজম কী, কোনটাকে বলবে, কী হলে বলবে এর এমন সংজ্ঞাই নাই – না আমেরিকার নিজের কাছে, না জাতিসংঘের। কেবল এক তালিকা আছে, কাদেরকে বা কোন সংগঠনকে তারা টেররিস্ট মনে করে। আর সেই থেকে বরং টেররিজম বলতে ভারত-আমেরিকা নিজেরা কী বুঝবে ও বুঝাবে, এ নিয়ে তাদের মধ্যে “গভীর বোঝাবুঝি” আছে অবশ্যই। কাকে টেররিজম বলে চালিয়ে দিবে – সেটাই আসল সেখানে। যেমন- ২০০৭ সালে যা বলা হয়েছিল ওর সারকথা ছিল যে, বাংলাদেশকে টেররিজম মোকাবেলার যোগ্য করে সাজাতে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছে। অথচ এই “টেররিজম” কথাটি ছিল এক সাইনবোর্ড মাত্র। ভারতের মূল স্বার্থ ছিল আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদ ঠেকাতে, তা ভেঙ্গে দিতে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা আর কলকাতা থেকে নর্থ-ইস্ট সরাসরি যোগাযোগের নানান করিডোর হাসিল করা।  সেকাজে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বিনা পয়সায় সব ধরণের করিডোর এককভাবে হাসিল করেছে ভারত। এখানে এককভাবে কথাটার মানে হল, করিডোর কেবল ভারতই ব্যবহার করবে, চীন পারবে না। এছাড়া সেই সাথে ভারত পুরা বাংলাদেশের বাজার দখল পেয়ে নিবে।  সার কথা ভারত কেবল “কানেকটিভিটি” “কানেকটিভিটি” বলে চিৎকার করবে, মুখে ফেনা তুলে ফেলবে। কিন্তু এর মানে হবে বাংলাদেশের উপর দিয়ে কেবল ভারতই যাবে। কিন্তু ভারতের উপর দিয়ে কেউ যদি বাংলাদেশে আসতে চায়, আমরা যেতে চাই – না সেটা সে পারবে না। সেটা নেপাল, ভুটান কিংবা চীন এমন পড়শি কেউ যেই হোক তারা বাংলাদেশে আসতে পারবে না বা আমরাও যেতে পারব না। আর ভারত সব পাবার বিনিময়ে  আমেরিকার স্বার্থে ভারত এবার  “চীন ঠেকানোর” কাজে অবস্থান নিয়ে ভাড়া খাটবে। তাহলে দাঁড়াল যে এই হল ভারত-আমেরিকার টেররিজমের সংজ্ঞা ও বিশেষ বুঝাবুঝি। আর সেই সাথে সীমান্তে বাংলাদেশি মেরে শেষ করে চলবে। কিন্তু? হা আরও বিরাট “কিন্তু” তৈরি হয়েছে এখন।

    ভারত-আমেরিকার এই “বিশেষ টেররিজম-বুঝের” সাইনবোর্ড তাদেরকে অনেক কিছু এনে দিয়েছিল, বিশেষ করে তাতে ভারতের  আস্থা ছিল দৃঢ় ও গভীর। কিন্তু টেররিজম-বুঝের সাইনবোর্ড এখন তা করলার চেয়েও তিতা। কেন? বালুচিস্তান!

    বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বা পাকিস্তান থেকে আলাদা স্বাধীন হতে চাওয়ার আন্দোলন অনেক পুরনো। কিন্তু এতে পাকিস্তান সরকারের সাথে কোনো নেগোসিয়েশন বা রফা-পরিণতিতে না যেতে পারার পেছনে একটা বড় কারণ হল – ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের এই আন্দোলনের দলকে [(বিএলএ), Baluchistan Liberation Army (BLA)) প্রায় খোলাখুলি সহায়তা ও সমর্থন। কিন্তু এবার এক বিরাট কিন্তু হল,  গত ২ জুলাই আমেরিকা পররাষ্ট্র দফতর বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মিকে (বিএলএ) স্পেশালি ডেজিগনেটেড গ্লোবাল টেররিস্ট [Specially Designated Global Terrorists (SDGTs)] বলে ঘোষণা দিয়েছে। ট্রাম্পের এক নির্বাহী নির্দেশে এটা জারি করা হয়েছে গত সপ্তাহে, ০২ জুলাই।

    পাকিস্তানে সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তারক্ষীদের বিরুদ্ধে (বিএলএ) বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা চালানোর পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান সরকার ২০০৬ সালে এই সশস্ত্র গ্রুপটিকে নিষিদ্ধ করেছিল। বলাই বাহুল্য, এবারের ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে চীন ও পাকিস্তান উভয়ে স্বাগত জানিয়েছে। অথচ চিপায় আটকা পড়ে ‘কোথাও নেই’ হয়ে গেছে ভারত। বিএলএ-কে টেররিস্ট বলায় এতে চীনেরও স্বার্থ ছিল সরাসরি। কারণ, পাকিস্তানের পেট চিরে পাকিস্তানের সব প্রদেশ ছুয়ে তাদের উপর দিয়ে টানা “চীন-পাকিস্তান করিডোর” [CPEC] স্থাপনার কাজে চীনা ঠিকাদারের কর্মীরা বারবার বিএলএ’র হাতে অপহরণের বা চাঁদা দানের শিকার হয়েছে বহুবার, চলতি শতকের শুরু থেকেই। সেসময় মনে করা হত, চীন-পাকিস্তানের এমন সহায়তার সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে ভারত  (বিএলএ)কে সহায়তা দিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের এই নির্বাহী নির্দেশের পরে? আরও আছে!

    ট্রাম্পের বিএলএ-কে শুধু টেরর ঘোষণা করা নয়, আগামী ২২ জুলাই ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-ইমরানের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার এক ঘোষণাও দিয়েছে হোয়াইট হাউজ, গত ১১ জুলাই। মানে ব্যাপারটা এক কথায় বললে আমেরিকার নিজের কৌশলগত অন্য কোনো স্বার্থে – এককালে আচারের আঁটির মতো চুষে রস খেয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়া পাকিস্তানকে আবার এবার সমাদরে কোলে তুলতে চাইছে আমেরিকা। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, এখানেও (বিএলএ)কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেয়া আসলে কোন টেররিজম ইস্যু নয়, সাইনবোর্ড মাত্র; আমেরিকার কৌশল্গত স্বার্থ মাত্র, যা আগে বাংলাদেশের মতোই। তাহলে ভারতের এখন এতে বাকশূন্য বোকা হয়ে যাওয়া কেন? যাকে কেউ কেউ বলছে তিতা ওষুধ খাওয়া। কারণ হল, ভারতের কাশ্মিরে সরকারি টেররিজমের নিপীড়ন ও হত্যার পক্ষে এতদিন ভারতের পক্ষে একটা ন্যায্যতা বা সাফাই জোগাড় করে দেয়া হয়ে যেত এই বলে যে, টেররিজমের একক হোতা হল পাকিস্তান বা মুসলমানরা। কিন্তু আমেরিকার বিএলএ-কে টেররিস্ট ঘোষণা করাতে এবং  ঘোষিত সেই দলকে খোদ ভারতই সমর্থন করত বলে ভারত হয়ে গেল এখন টেররিস্ট-সমর্থক রাষ্ট্র ; আমেরিকা পরোক্ষে এবার তাই বলে বসল।

    তাহলে এখান থেকে কী শিক্ষা? শিক্ষাটা হল, চলতি এযুগ গ্লোবাল নেতৃত্বের বিশেষত, অর্থনৈতিক নেতৃত্বের নেতা বদলের যুগ এটা। আবার খেয়াল রাখতে হবে, এটা সোভিয়েত-আমেরিকার দুই ব্লকে ভাগ হয়ে থাকার যুগ নয়। ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা কথাটা বুঝতে হবে। সেকালে এর মানে ছিল এক ব্লকের কোনো রাষ্ট্রেরই অপর ব্লকের কারো সাথে পণ্য, পুঁজি বিনিয়োগ বাজার ইত্যাদিতে কোনো লেনদেন-বাণিজ্য সম্পর্ক রাখত না, হারাম মনে করত, তাই সম্পর্ক বলতে কিছুই ছিল না।

    অথচ এ কালে দুই রাষ্ট্রের মধ্যে যতই ঝগড়া বা রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধই থাক না কেন- সেখানে একই সাথে উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে পণ্য, পুঁজি বিনিয়োগ বাজার ইত্যাদিতে সব বিনিময় লেনদেন-বাণিজ্যও সমানে চলে থাকে। অতএব, এ কালের ফর্মুলা হল সবার সাথেই নিজস্বার্থ মুখ্য করে এক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে লেপটে থাকা। তাই চীন, না আমেরিকা, নাকি ভারত এভাবে কারও দিকেই এককভাবে কান্নি মেরে থাকা যাবে না। এটা আবার শর্টকাট কোনো ন্যাশনালিজমের মত তা ভেবে বসাও ভুল হবে।

    কাজেই আপনি ভারতের দালাল – নিজভূমিতে অন্যকে করিডোর দিয়েছেন, বাজারসহ সব খুলে দিয়েছেন এমন ভারতের দালাল, নাকি আপনি চীনের বিনিয়োগ এনে সয়লাব করেছেন সেই চীনা দালাল- এ দুটোই ভুল পথ। এমনকি এ দুইয়ের ভয়ে আমেরিকার কোলে গিয়ে উঠেছেন, এটাও ভুল। বরং তিনের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে হবে কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণভাবে। এককভাবে কারো সাথে সম্পর্ক [এক্সক্লুসিভ বা বিশেষ সম্পর্ক, বন্ধুরাষ্ট্র ইত্যাদি সব] একালে হারাম, বরং কার সাথে কতটুকু যাবেন তা আগেই নিজ বোঝাবুঝি ঠিক করে রাখতে হবে। প্রয়োজনে তা বলা যেতে পারে, কখনো বলা যাবে না, কাজে দেখাতে হবে। কিন্তু নিজে কী করবেন সেই নিজ হোমওয়ার্ক অবশ্যই আগে করে রাখতে হবে।

    সোনাদিয়ায় বন্দরসহ বিসিআইএম করিডোর নির্মাণ আমাদের কৌশলগত মৌলিক স্বার্থ। অথচ ভারতের স্বার্থকে প্রাধান্যে রাখতে এটা কমপক্ষে ১০ বছর ধরে উপেক্ষায় ফেলে রাখা হয়েছিল। আমাদের ‘নিশীথ ভোটের’ পরবর্তীকালে এ থেকে পরে পাওয়া দিকটা হল, এটা উন্মোচিত হয়ে গেছে যে, ক্ষমতায় আসার জন্য কারোই আর ভারতের সমর্থন জরুরি বা এসেনশিয়াল নয়। আবার আমেরিকাও এখন বিষহীন ঢোঁড়া সাপে পরিণত। আর বিরোধী দলসহ সারা দেশের মানুষ আজ ভারতকে আমাদের ঘাড়ে চেপে বসা দানব মনে করছে। ফলে তারা ভারতবিরোধী। লক্ষ্যনীয় যে এবারই প্রথম এই ভারতবিরোধিতা পুরাপুরি রাজনৈতিক, এ টু জেড রেখা টানতে পারবেন। তাই এটাই তো হাসিনার জন্য ছিল সব উপেক্ষা করে নিজস্বার্থে চীন সফরের সবচেয়ে ভালো সময়। শেখ হাসিনা যা বুঝেই নিয়ে থাকেন না কেন, এক সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। ওদিকে এতে চীনা প্রতিক্রিয়া বা সাড়া ব্যাপক। তারা আশাতীত খুশি যে, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। চীনা গ্লোবাল টাইমস তিনটারও বেশি আর্টিকেল ছেপে উচ্ছসিত। হাসিনাকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, বাংলাদেশ বেল্ট-রোড আর বিসিআইএম [BCIM-EC] করিডোরে অংশ নিতে খুবই আগ্রহী। এই রিপোর্টের শিরোনাম হল, Hasina in balancing act between China, India। [এই রিপোর্টের শেষেই সবগুলো খবরের লিঙ্ক পেতে পারেন]।

    তারা আসলে আরও খুশি এ জন্য যে, বিসিআইএম প্রকল্প জেগে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন এতে বা বেল্ট রোডে ভারত যোগ দেবে হয়তো কোনো এক কালে, আমেরিকার হাতে কোনো পরিস্থিতিতে চরম নাকানি-চুবানি খাওয়ায় বিধ্বস্ত হওয়ার পরে। কিন্তু কথাটা তারা ইতিবাচকভাবে লিখেছে।  সেকথা আমাদের ইউএনবি বার্তা সংস্থার বরাতে ভারতের দ্যা হিন্দু পত্রিকা বিরাট করে লিখেছে [“the initiative would have to be revived working together with India,” the United News of Bangladesh (UNB) reported on its website.]।

    প্রথম আলোতে চীন সফরঃ
    তবে হাসিনার চীন সফর প্রসঙ্গে প্রথম আলোর ভুমিকা খুবই নেতিবাচক। প্রায় সময় সে আমেরিকান অবস্থান নিয়ে খবর হাজির করে থাকে। এবার আমেরিকার হাসান ফেরদৌস যে লেখাটা লিখেছে সেটা অর্ধ সত্য বা পুরাই অসত্য। আর তা আমেরিকার তো বটেই, ভারতেরও কৌশলগত অবস্থানে দাঁড়িয়ে লেখা। মূলত তিনি কোন যুক্তি বলা ছাড়াই, চীনবিরোধী। এই খামতি তিনি পুরণ করতে, আশির দশকের চিন্তায় ও তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলে গেছেন। আবার ভারতীয় প্রপাগান্ডা খেয়ে লিখছেন, ভারত নাকি আমাদের চীনের মতই ঋণ দিয়ে অবকাঠামো গড়ে দেওয়ার সঙ্গী। যেমন লিখছেন, “চীন ও ভারত দুই দেশই আমাদের অবকাঠামো খাতে বড় রকমের ভূমিকা রাখছে”। কিন্তু ভারত কোন অবকাঠামো আমাদের গড়ে দিয়েছে? নিজস্বার্থে করিডোরের কিছু অবকাঠামো গড়ে নেয়া ছাড়া? তা আমাদের জানা নাই। যেমন ভারতের বহরমপুর জেলা থেকে বাংলাদেশ হয়ে আসাম – এই তেল পাইপ লাইন স্থাপন কী বাংলাদেশের স্বার্থে্র অবকাঠামো? ভারতের টাটা আর লিলেন্ড গাড়ি, আমাদের বিআরটিসি- এর ঘাড়ে ডাম্প করতে কোন প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই এটা করা হচ্ছে। আর এতে দেখানো হয় যে ভারত আমাদের ঋণ দিয়েছে এই গাড়ি কিনতে। অথচ ব্যাপারটা উলটা, ভারতের রুগ্ন ইস্পাত শিল্পকে বাঁচাতে ভারত সরকার ওসব গাড়ির দাম আগেই শোধ করে কোম্পানিগুলোকে বাঁচায়। এরপর কেনা সেই গাড়ি ভারত সরকার আমাদেরকে ঋণে বিক্রি করেছে বলে কাগজপত্রে দেখায়। এই হল “অবকাঠামো ঋণ”!
    এছাড়া ভারত কী কাউকে অবকাঠামো ঋণ দিতে সক্ষম এমন অর্থনীতির রাষ্ট্র? নাকি ভারত এখনো মূলত ঋণ নেওয়ার রাষ্ট্র? কাজেই ভারত আমাদের অবকাঠামো গড়ে দেয়, এসব আজগুবি তথ্য তিনি কোথায় পেলেন? এগুলো তো ভারতের প্রপাগান্ডা দালালি! আজীব! এছাড়া লেখার শিরোনামসহ তিনি হাসিনা সম্পর্কে আনন্দবাজারি স্টাইলে লিখছেন, হাসিনা নাকি “চীনা তাস” খেলতে গেছেন। যেন এক বিনোদন রিপোর্ট লিখতে বসেছেন।
    সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে সম্পর্কে লিখছেন, “বাংলাদেশ যে চীন থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে চায়” সেজন্যই নাকি এই বন্দর নির্মাণ হয় নাই। আবার নিজেই বলছেন, “ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তিতে সে (সোনাদিয়া) উদ্যোগ ভেস্তে যায়”। এই তথ্যও ভিত্তিহীন কারণ, যুক্তরাষ্ট্রকে হাসিনার “বিকল্প কিছু” দেওয়াতে সোনাদিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এতে কোন আপত্তি নাই। আপত্তি একমাত্র ভারতের।  আবার “বাংলাদেশ যে চীন থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে চায়” – এই কথা সত্যি হলে তাহলে আর হাসিনা চীন সফরে গেলেন কেন? কী বিনোদন কাটাতে গেছিলেন? তাহলে চীনে গিয়ে আবার [BCIM-EC] প্রকল্প শুরু করতে আলাপ তুললেন কেন? সে ব্যাখ্যা কই?
    আর [BCIM-EC] প্রকল্পতে যদি বন্দরসহ প্রকল্প এটা নাই হয় তবে এটাকে বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পে যুক্ত হবার এক “করিডোর” ভাববার তো কোন সুযোগই নাই। কাজেই বন্দর-ছাড়াই BCIM-EC প্রকল্প, এমন ভাবনা তো আসলে ভারতের অবস্থান। তাও পুরানা অবস্থান। সম্প্রতিকালে সেঅবস্থান থেকে ভারতের নড়াচড়ার আলামত দেখাচ্ছে। আসলে হাসিনার চীন সফর নিয়ে কিছু বলার জন্য নুন্যতম তথ্য নিয়ে পড়াশুনা বা নাড়াচাড়ার দরকার তা ফেরদৌসের কাছে নাই, ফাঁকিবাজ ছাত্রের মত যার হোমওয়ার্ক নাই।

    আরও আজিব কান্ড তিনি পায়রা বন্দরকে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দরের বিকল্প বলে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পায়রা চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে একটু বড় মাত্র। এছাড়া ড্রাফট বা গভীরতার লিমিটেশন, মানে বড় জাহাজ ঢুকানোর লিমিটেশন আছে, তাই একে গভীর সমুদ্র বন্দর বলতে অনেকের দ্বিধা আছে। আরও পরিকল্পনাগত বিরাট ত্রুটি হল,  সারা বছর এই বন্দরের প্রবেশ অংশকে নাব্য রাখতে হলে সারা বছরই একে ড্রেজিং করে যেতে হবে। সোনাদিয়া লোকেশনে ড্রাফট যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই ১৮ মিটার। তাই আমেরিকার চোখেই বাংলাদেশের দুটা বিস্ময়কর অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প হল, পায়রা আর রূপপুর। এককথায় বললে, চীন ঠেকানী মুডের ভারতের মান-মন রাখতে ‘পায়রা’ আসলে এক অর্থহীন, টাকা পানিতে ফেলা প্রকল্প।

    হাসান ফেরদৌসের আজগুবি তথ্য আরও আছে। তিনি বলেছেন, এবার এপ্রিলে চীনে “বেল্ট-রোড সামিটে নাকি প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম নেতৃত্ব দিতে” গিয়েছিলেন। এটা ভুল তথ্য। বরং প্রতিনিধি দলের নেতা হিসাবে গেছিলেন কোন প্রতিমন্ত্রী না বরং ফুল মন্ত্রী। আর সেই মন্ত্রী হলেন, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন । যেটা গওহর রিজভিও নিশ্চিত করেছেন পাবলিকলি। আর হংকংয়ের পত্রিকায় সাক্ষাতকার শাহরিয়ার আলম দিয়েছিলেন কথা সত্য কিন্তু, কোথায় বসে তা অস্পষ্ট। ঢাকায় বসেই খুব সম্ভবত, এবং তা ভারতের আয়োজনে। খুব সম্ভবত ঠিক সেসময়ের দ্বিধাগ্রস্থ হাসিনাকে চাপ দিয়ে কাজে লাগিয়ে। যেটার পুরা পরিস্থিতি বদলে যায় চীনা রাষ্ট্রদুতের উদ্যোগে ফলে, বিশেষ করে বিএনপিকে -সহ  স্থানীয়ভাবে সরকার, রাজনীতিক, সাংবাদিক ইত্যাদি নানান ব্যক্তিত্বদের নিয়ে “বাংলাদেশ-চীন সিল্ক রোড ফোরাম” গঠন করে ফেলার পরে; হাসিনা তখন থেকেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যান।
    এখন কথা হল, প্রথম আলো এমন আধা-সিদ্ধ লেখা ছাপাচ্ছে কেন? লেখকের পরিচয় হিসাবে তাঁর লেখার নিচে লেখা থাকে, ” হাসান ফেরদৌস, যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি”। অর্থাৎ এটা অপিনিয়ন বা কোন গেস্ট লেখকের কলামও নয়, প্রথম আলোর নিজের স্টাফ রিপোর্ট। তাহলে প্রথম আলো, সে কার পক্ষে থাকতে চায়? ভারত বা আমেরিকার সমর্থনে ভারতের পক্ষে? প্রথম আলোর ম্যানেজমেন্ট কী এগুলো দেখে নাই, জানে না? অদ্ভুত ব্যাপার! তবে একটা জিনিষ আমরা পরিস্কার থাকতে পারি। এমনটা চলতে থাকলে আগামিতে বড় কাফফারা দিতে হবে।

    কিন্তু কথা হল, তাতে চীন ভারতকে যতই সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ডালি চীন বা বাংলাদেশ যতই সাজিয়ে রাখুক না কেন অথবা বিসিআইএম প্রকল্পে ভারতের যোগদানের দরজা খুলে রাখুক না কেন – এতে ভারতের অন্তর্ভুক্তি খুব সহজ নয়। আবার তা অসম্ভবও নয় নিশ্চয়। আবার এটা হতেও পারে যে, দেখা গেল ট্রাম্পের বাকি আমলের (জানুয়ারি ২০২১) মধ্যেও মোদী সিদ্ধান্ত নিতেই পারলেন না। [একটু আগের খবর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ভারত সফরের (এটা গত বছর চীনে মোদীর “য়ুহান সামিটের” পাল্টা সমতুল্য সফর)] তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও তা সেই অক্টোবর ১২ তারিখে। অর্থাৎ বুঝা গেল মোদীর তেমন তাড়া নাই।  যদিও অনেকে অবশ্য বলছেন, গত জুন মাসে কাজাখস্তানে সাংহাই করপোরেশনের [SCO] শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সেখানে ঐ সম্মেলনের এক যৌথ ঘোষণা থেকে বেল্ট রোড প্রকল্পের ব্যাপক প্রশংসা করা হয়। আগে এমন হলে, তাতে ভারতের আপত্তি আছে বা অংশগ্রহণে ভিন্নমত আছে বলে তা সাথে উল্লেখ থাকত। এবার তেমন কিছুই দেখা যায়নি। অনেকে এর অর্থ করছে যে, ভারত সম্ভবত এখন থেকে এতটুকু সরেছে যে সে বেল্ট-রোডের প্রসঙ্গটা গ্রহণও করেনি আবার বিরোধিতাও করেনি, এমন অবস্থায় এসেছে – আগের আপত্তির জায়গা থেকে সরে এসে।

    তবুও এতে তেমন আশাবাদী না হওয়ার অন্য কারণ হল, যে হিন্দুত্বের ঝাণ্ডা তুলে মোদি আবার ক্ষমতায় এসেছেন তা হলো চরম মুসলমান বিরোধিতা, যেটা পারলে ভারত থেকে প্রায় মুসলমান জনগোষ্ঠিকে মুছে নির্মুল করে ফেলার এক আকাঙ্খা যেন, যার মানে মুসলমানের কারণে পাকিস্তান বিরোধিতাও। কিন্তু এই ডিভিডেন্ড বা বাড়তি লাভ মোদী সহসাই লঘু করতে চাইছেন না। আগামী পাঁচ বছরজুড়েই ভারতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় পাঁচ রাজ্য করে নির্বাচন হবে। তাই এই একই মুসলমানবিদ্বেষী হিন্দুত্ব মোদীকে ব্যবহার করে যেতে হবে। এ ছাড়া বাবরি মসজিদ মন্দির বানানো, আসামসহ সারা দেশে নাগরিকত্ব পরীক্ষার নামে মুসলমান খেদানো, পশ্চিমবঙ্গসহ যেসব রাজ্যে বিরোধীরা ক্ষমতায় আছে সেসব রাজ্যসরকার দখল, কাশ্মিরে চরম বলপ্রয়োগে একে  কনষ্টিটিউশনালি ভারতের অঙ্গ করে নেয়া; এমন অনেক কিছু মোদির কর্মপরিকল্পনার তালিকায় আছে।

    এদিকে যদিও ঐ সাংহাই করপোরেশন মানে হল, যেখানে চীন, রাশিয়া, সেন্ট্রাল এশিয়া আর, ভারত-পাকিস্তানও এর সদস্য। কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ‘টোন-ডাউন’ করা মোদীর পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ পাকিস্তানে বোমা মেরে আসা বীর হলেন মোদী – এই বোলচাল মিথ্যা হলেও নিজের এই নির্বাচনী ইমেজে তিনি জিতেছেন তাই এটা তিনি আবছা হতে দেবেন না। যদিও ওদিকে আবার মোদীর হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে এবার আমেরিকা ভারতের ধর্মপালনের স্বাধীনতা নাই এটা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ নিয়ে মুখোমুখি।

    অতএব, ভারতকে বাদ রেখে বন্দরসহ বিসিআইএম প্রকল্পকে এগিয়ে নেয়ার কথাও ভাবা যেতে পারে। ভারতের জন্য অপশন খোলা থাকবে, যার ফাইন্যান্সিয়াল দায়ভারসহ যুক্ত হতে চাইলে ভারত সে সুযোগ নিতে পারবে। কারণ, ভারত সহসাই প্রকল্পে যোগ দিচ্ছে, এমন আশাবাদী হওয়া বেশ কঠিন।

    শ্রীলঙ্কা ড্রামাঃ
    অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা এক নতুন ড্রামার মঞ্চস্থল হয়ে উঠেছে। এম ভদ্রকুমার হলেন ভারতের একজন সাবেক কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত। তিনি তার কলামে হাসিনার চীন সফর সফল ও বিরাট অর্জন বলে প্রভুত প্রশংসা করেছেন। কিন্তু আবার  লিখেছেন, ” শ্রীলঙ্কায় ২০১৫ সালেই, অ্যাঙলো-আমেরিকান ‘রেজিম বদল’ প্রকল্পে সঙ্গ দিয়ে ভারতের কূটনীতি ইতোমধ্যেই হাতে রক্ত লাগিয়ে ফেলেছে [“In Sri Lanka (2015), Indian diplomacy tasted blood by collaborating with the Anglo-American project at ‘regime change.”] …… আর এখন যা হচ্ছে তাতে ভারতকে পাপোষের মতো ব্যবহার করে আমেরিকা শ্রীলঙ্কায় ঢুকে পড়েছে। শ্রীলঙ্কাকে সামরিক চুক্তিতে জড়িয়ে নিচ্ছে, অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ধন্য আমেরিকান হস্তক্ষেপ নীতি। [Meanwhile, the US used India as a door mat to make inroads into Sri Lanka. And the result is Sri Lanka has been seriously destabilized, thanks to intrusive US policies]। আসলে ওখানে রাষ্ট্রপতি সিরিসেনা আমেরিকাকে ডেকে আনার নায়ক। তিনি প্রেসিডেন্টের ক্ষমা প্রয়োগ করে এক উগ্র বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা [নাম Galagoda Aththe Gnanasara], নানাসারা বলে পরিচিত এই নেতাকে অপহরণের অভিযোগে ছয় বছরের ও আদালত অবমাননার সাজার জেল থেকে ছুটিয়ে এনেছেন। রাজনৈতিক দলের মত তাঁর এক ধর্মীয় সংগঠন আছে – নাম Bodu Bala Sena (BBS) or “Buddhist Power Force”। মানে কথিত অহিংস বৌদ্ধ ধর্মের এই নেতা নিজ সংগঠনের নাম রেখেছে “পাওয়ার ফোর্স”। বুঝা যাচ্ছে তিনি শিকারির “খুবই অহিংস”। এরপর তাঁর সম্পর্কে আর কিইবা বলার বাকি আছে। তিনি সম্প্রতি স্থানীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উগড়ানো এক পাবলিক মিটিং করেছেন। শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধদের এই ধারাই মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন রোহিঙ্গাবিদ্বেষী একই বৌদ্ধ ধারা। অর্থাৎ তাহলে ফলাফল হল, শ্রীলঙ্কায় চীনের প্রভাব দমাতে গিয়ে ভারত ব্যাপক রক্তপাত ঘটানোর পর এখন এর মাখন উঠিয়ে দিচ্ছে বা তা নিয়ে যেতে এসেছে আমেরিকা।

    তা হলে এশিয়ায় মূল বিষয়টি হচ্ছে, না চীনের কোলে না ভারতের – এটাই বাঁচার উপায়। ভারসাম্যের নীতিতে, কারো দিকে কান্নি না মেরে থাকা। আর কেবল নিজের স্বার্থের দিকে ফোকাসের নীতি – এভাবে হোমওয়ার্ক করে আগানো, এই নীতিই একমাত্র বাঁচোয়া। কিন্তু ভারত ভারসাম্যের নীতি না মেনে চলার দেশ। বরং উলটা, আমেরিকার দিকে কান্নি মেরে থাকার নীতি ভারতের। যে আমেরিকা আবার চলে নিজের একক স্বার্থে। আমেরিকার বেলায়, বালুচদের টেররিস্ট ঘোষণা করে দেয়া অথবা শ্রীলঙ্কায় (SOFA সহ) সামরিক চুক্তি করে ঢুকে পড়া, এগুলো এর উদাহরণ হলেও এসব বিষয় ভারতকে হুঁশে আনবে, এমন ভরসা করা কঠিন।

    তবে যারাই চীনের বদলে ভারত অথবা চীনের বিরুদ্ধে ভারতের প্রভাব বলয় বাড়ানোর জন্য খুনখারাবি পর্যন্ত যাবে, সম্পর্কের ব্যাপারটা যারা এভাবে দেখবে বা এই ভুল করে বসবে – এরাই সবশেষে সব খুইয়ে নিজের সব অর্জন আমেরিকার হাতে তুলে দিয়ে থাকে। হাসিনার জন্য এটাও এক বিরাট শিক্ষা হতে পারে যে, যদি না তিনিও আবার শেষে সব হারিয়ে, আমেরিকাকে ডেকে নিয়ে না আসেন।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “এটা ভারসাম্যের যুগ“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • চীনা হুয়াওয়ের ৫জিঃ আমেরিকার কঠিন পরিণতির ইঙ্গিত!

    চীনা হুয়াওয়ের ৫জিঃ আমেরিকার কঠিন পরিণতির ইঙ্গিত!

    গৌতম দাস

    প্রথম প্রিন্টেড প্রকাশঃ নয়া দিগন্ত, ঈদুল ফিতর ঈদ সংখ্যা, মে ২০১৯

    প্রথম অনলাইন প্রকাশঃ ০৪ জুলাই, ২০১৯

    https://wp.me/p1sCvy-2C8

     

    [এই লেখাটা গত ঈদে মানে, গত মে মাসে ঈদুল ফিতরের ঈদ সংখ্যা নয়া দিগন্ত পত্রিকায় প্রিন্টেড ভার্সান হিসাবে ছাপা হয়েছিল। সে হিসাবে এর প্রথম প্রিন্টেড প্রকাশঃ নয়া দিগন্ত, ঈদ সংখ্যা, মে ২০১৯। কিন্তু এর কোন অন লাইন ভার্সান তারা করে নাই। সেকারণে  ঐ ছাপা ভার্সানেরই হুবহু সফট কপি, (নতুন কোন এডিট করা ছাড়াই) এখানে নতুন করে আনা হল। সাথে ছাপা ভার্সানের প্রথম পৃষ্ঠার একটা স্কান কপি ছবি আকারে উপরে সাটানো হল। লেখাটা যখন শেষ করে জমা দিয়েছিলাম, সেটা ছিল ১ মে ২০১৯।
    ফলে মে মাসের পর থেকে ফোনের ৫জি টেকনোলজি ইস্যুতে চীন ও আমেরিকার গভীর স্বার্থ সংঘাত আর বিপরীতে চীন ও ইউরোপের পারস্পরিক স্বার্থ খাপ খাইয়ে নেয়ার সম্পর্ক সংক্রান্ত যা কিছু ডেভেলবমেন্ট ঘটেছে তা এখানে আপডেট করা নাই। সেসব নিয়ে আলাদা আবার লিখতে হবে। তবে ৫জি নিয়ে চীন-আমেরিকার সংঘাত এখনও চলছে।হুয়াওয়ে কোম্পানির প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকর্তা সাবরিনা মেঙ’ কে আমেরিকার অনুরোধে কানাডা গ্রেফতার করেছিল, সাত মাস আগে। কানাডা-আমেরিকার মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি আছে। তাই আমেরিকায় দায়ের করা এক মামলার অভিযোগ সাবরিনার কানাডা সফরের সময় যেন তাঁকে গ্রেফতার করে আমেরিকার হাতে তুলে দেয়া হয় – সেই আবেদন আগেই কানাডাকে জানিয়ে রেখেছিল আমেরিকা। তাই  ঐ কর্মকর্তা সাবরিনার কানাডা ট্রানজিট সফরে থাকার সময়ে তাঁকে গ্রেফতার করেছিল কানাডা; যাতে কানাডারই আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে  কানাডা সরকার তাঁকে আমেরিকার হাতে তুলে দিতে পারে। বর্তমানে সাবরিনা জামিনে তবে কানাডা ত্যাগ করতে পারবে না, এই শর্তে যে মামলা না মিটে যাওয়া অব্দি। আর স্থানীয় থানায় রিপোর্ট, সাথে আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিয়ে ও মামলা মোকাবিলা করে যেতে হবে। ইতোমধ্যে চীনা ৫জি টেকনোলজি দুনিয়া কাঁপিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।]

    চীনা ইন্ডাস্টিইয়াল টেকনোলজি কোন পর্যায়ে আছেঃ
    চীনা শিল্প-পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত টেকনোলজি কেমন পর্যায়ের, কেমন মানসম্পন্ন অথবা কোন স্তরে আছে চীনা টেক-শিল্প? এই প্রসঙ্গে চীনা টেকের মান যেন খুবই নিচে এই অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে চীনকে ব্যঙ্গ করা, নিচা দেখানো বা খোঁটা দিয়ে কথা বলা এমন লোকের কোনো অভাব নেই। গ্লোবাল অর্থনীতিতে মানে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের নেতৃত্ব এখন বাঁক পরিবর্তনের পর্যায়ে আছে, চলছে। এমনই আমাদের চলতি দুনিয়ায় চীনা উত্থানকে, সঠিক অথবা বেঠিকভাবে, যারা নিজ নিজ রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের পরাজয় হিসেবে দেখে থাকে ( ফলে অনেক সময় এতে তাদের অপ্রয়োজনীয় ঈর্ষা চেপে রাখতে পারে না, প্রকাশ হয়ে পড়ে) এমন রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষে আছে ভারত। কিন্তু মজার কথা হচ্ছে, তবু চীন-ভারতের সম্পর্কের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেন যথেষ্ট গভীর।

    ভারতীয় অর্থনীতিতে বিদেশী বিনিয়োগ তা, অবকাঠামোগত বিনিয়োগ অথবা বাণিজ্যিক বিনিয়োগ (মানে ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট, FDI)  এই দুই অর্থেই ভারতের অর্থনীতিতে চীনা বিনিয়োগ এখন এক বিরাট ভূমিকা ও অবদান নিয়ে হাজির আছে। যেমন ব্রিকস (BRICS) উদ্যোগ হল,  বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের এক বিকল্প গড়তে চীনের সাথে মোট পাঁচ রাষ্ট্রের এক উদ্যোগের নাম, চীন যেখানে মূল উদ্যোক্তা। ভারতও অবশ্যই এই উদ্যোগের সাথে আছে, শুধু তাই না। এই ব্রিকস উদ্যোগের ভেতরে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB) নামে আর এক বিকল্প-বিশ্বব্যাংকও চালু আছে। কাজ ও তৎপরতার ধরনের দিক থেকে এটাও এআইআইবি (AIIB) নামে চীনের নেতৃত্বে যে মূল বিকল্প-বিশ্বব্যাংক আছে (যেখানে চীনের ৩০% মালিকানার পরই ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মালিকানা ১০%) এরও বাইরের প্রতিষ্ঠান NDB, আর তা আর এক চীনা বিকল্প-বিশ্বব্যাংক অবশ্যই। যদিও মনে রাখতে হবে, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB) -এটা এআইআইবি (AIIB) নামে চীনের মূল বিকল্প-বিশ্বব্যাংক থেকে একেবারেই আলাদা এক প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া বিনিয়োগ সক্ষমতার দিক থেকে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক তুলনায় খুবই ছোট। তবে এই দুই বিকল্প-ব্যাংকের মধ্যে মূল ফারাক বুঝতে গেলে এটা মনে রাখলেই চলে যে, আসলে ব্রিকস উদ্যোগের নামে চলা যেকোনো তৎপরতা তা কেবল চীন, রাশিয়া, ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা এই পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ; তাতে সে তৎপরতা এই (NDB) ব্যাংকের সুবিধাদির গ্রহীতা বা দাতার যে ভূমিকারই হোক না কেন। মানে পাঁচের বাইরের আর কেউ এর সদস্য না, ফলে ব্যাংকের সুবিধাদি তাদের বাইরের কেউ পাবেও না। আবার নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদ দেয়া হয়েছে ভারতকে আর সব মিলিয়ে বর্তমান বাস্তবতা এই ব্যাংকের একমাত্র বিনিয়োগ ‘খাতক’ হল ভারত।  নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের কেবল পাঁচ সদস্য রাষ্ট্রের বিপরীতে তাহলে এআইআইবি ব্যাংকের সাথে এর মূল ফারাকটা হল, সর্বশেষ লেবাননকে সাথে ধরলে এআইআইবি ব্যাংকের মোট সদস্য ৮৭ রাষ্ট্র, যারা সবাই এআইআইবি-এর সুবিধাদি পাওয়ার যোগ্য। সার কথায় বোঝা গেল চীনের সাথে ভারতের গাঁটছড়া ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা অনেক গভীরের, উপরে উপরে তা যতই রেষারেষির বলে দেখাক না কেন।

    কিন্তু তবু ভারতের কূটনীতিতে বাস্তব কৌশলগত তৎপরতাগুলোর সবটাই চীনবিরোধী করে সাজানো। এমনকি সম্প্রতি অভ্যন্তরীণভাবে বিজেপির উদ্যোগের চীনা-পণ্যবিরোধী এক প্রপাগান্ডাও চালু হতে দেখা গেছে। এ ছাড়া আরো আছে। যেমন ভারতের বাংলার বাইরে, উত্তরে হিন্দি-বলয়ে বা দক্ষিণে দাক্ষিণাত্য রাজ্যগুলোতে মূল ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব হিসেবে দেওয়ালি পালিত হতে দেখা যায়। বাংলায় যেটাকে আমরা কালীপূজা নামকরণ হয়ে পালিত হতে দেখি, এটাই সেই দেওয়ালি। যদিও বাংলার মূল ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব হয়ে আছে আবার দুর্গাপূজা। আর কালীপূজা বাংলাতেও আছে, তবে সেটা সেকেন্ডারি উৎসব। এখন এই দেওয়ালিকে বাণিজ্য ও বাজারের দিক থেকে দেখলে, ভারতে এই প্রধান উৎসবে বাজি বা পটকার বাজারটা বিশাল, প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলারের মত। এ ছাড়া এই উৎসবের সাজসজ্জার আলোকবাতি, খেলনা বা আনুষঙ্গিক আইটেমসহ ধরলে এমন মোট আমদানি বাজার বছরে ৮৫০ মিলিয়ন ডলারের। ওদিকে চীন থেকে ভারতের বাজারে বছরে আমদানির মোট পরিমাণ ৭০ বিলিয়নের ওপরে। আর এই আমদানি পণ্যগুলোর মধ্যে বিশেষত বাজি-পটকা এতদিন যা ভারতে স্থানীয়ভাবে তৈরি হত, বিশেষ করে তামিলনাড়ু–র শিবাকাসি শহরে (ভারতের ৯৫ ভাগ পটকা এখানে তৈরি হয়, আর ১০ লাখের মতো লোক কাজ করে) তৈরি পটকার দখলে ছিল এই বাজার। কিন্তু এক্ষেত্রে চীনা পণ্য হল এখন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিশেষ করে দামের কারণে। সস্তা চীনা পণ্যের ঠেলায় স্বভাবতই ভারতীয় উৎপাদকরা অস্থির ও নাখোশ। তাই গত ২০১৬ সাল থেকে অভ্যন্তরীণভাবে এই চীনা-পণ্যবিরোধী একটা ন্যাশনালিজমের বয়ান তৈরি হতে দেখা গেছিল, যাতে প্রধান তাল দেয়া অবস্থানটা বিজেপির।

    মূল বিষয়টা হল, আমাদের মতো দেশে ছোটখাটো সমস্ত পণ্য, যা আগে নিজ নিজ দেশে তৈরি করতে সক্ষমতা ছিল ফলে বাজারও নিজ দখলে ছিল সেই সব বাজারে এখন চীনা সস্তা পণ্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে হাজির হয়ে গিয়েছে। এর পেছনের প্রধান কারণ “বাল্ক (bulk) প্রডাকশন লাইন”। কোনো পণ্য উৎপাদনের সময় একেকটা ব্যাচে তা তৈরি হয়। আমাদের মতো দেশের কারখানায় ট্রাডিশনাল উৎপাদনের চেয়ে চীনা উৎপাদনের আলাদা বৈশিষ্ট্য হল সেখানে একেকটা উৎপাদন ব্যাচ আমাদের চেয়ে কয়েকগুণ লম্বা শুধু তাই না, এক সাথে বসা ব্যাচের সংখ্যাও কয়েকগুণ বেশি। এতে উৎপাদকের সুবিধা হল কাঁচামাল কেনার সময় বিপুল ক্রয়ের সুবিধায় দামে কম পাওয়াসহ পণ্য তৈরির ব্যাচ সাইজের কারণে বহু পর্যায়েই উৎপাদনের ওভারহেড খরচ কমিয়ে ফেলতে পারে। আর এটা এক বাল্ক বা বিপুল সাইজের উৎপাদনের কারণে তাতে চীনা পণ্যমূল্য আমাদের মত দেশের চেয়ে অনেক সস্তা, বিশেষ করে যেমন প্লাস্টিক পণ্যে যা কখনো একেবারে অর্ধেক হয়ে যায়। প্লাস্টিকের সামান্য টুথব্রাশ উৎপাদনের বেলায় চীনা সস্তা দামের ঠেলায় আমাদের উতপাদন সক্ষমতা সঙ্কুচিত হয়ে গেছে।

    এরই প্রতিক্রিয়ায় ভারত বা আমাদের মতো দেশের ছোট উৎপাদকেরা চীনবিরোধী ‘ন্যাশনালিস্ট’ হওয়ার চেষ্টা করে, ন্যাশনালিজমের ‘বয়ান’ এর গাঁথুনি খাড়া করার চেষ্টা করে থাকে। যদিও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। তাদের আবার মোকাবিলার ভিন্ন অভিজ্ঞতা হল, এসব নাকে-কাঁদুনি “ন্যাশনালিস্ট” হয়ে থাকা বেকার; এরচেয়ে বরং কাজের কিছু পদক্ষেপ তারা নিতে পারে। যেমন প্রাণ গ্রুপ; যেসব প্লাস্টিক পণ্যে, অন্তত মূল্যের দিক থেকে চীনাদের সাথে পারা যাবে না অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সেসব পণ্য ‘প্রাণ’ নিজেই চীন থেকে আমদানিকারক হয়ে এনে বিক্রি করতে শুরু করেছে। আর নিজ প্রডাকশন লাইন বদলে অন্য প্রডাকশনে নিয়ে গিয়েছে, অনুমান করা যায়।

    যদিও ন্যাশনালিজমের বুঝ থেকে  “দেশে ব্যবহার্য সব জিনিস নিজেদেরই বানাতে পারতে হবে” এটা কতটা সঠিক বুঝ, কাজ হয় কি না ও বাস্তবোচিত কি না অথবা তা আদৌ বাস্তবায়ন সম্ভব কিনা এমন  “অর্থনৈতিক ন্যাশনালিজম” এর পালটা-চিন্তা হাজির আছে। অথচ পরীক্ষা করা হয়নি যে এটা আদৌ অর্থপূর্ণ পথ কি না? ভায়াবাল কি না? নাকি এটা জনগোষ্ঠীর সম্পদ ও শ্রমঘণ্টার অপচয় বা টেকনোলজি ইত্যাদিতে পিছিয়ে পড়ে থাকা হবে? যদিও আবেগের ন্যাশনালিজম বহু আগেই প্রশ্নবিদ্ধ। এখন এই কঠিন বাস্তব প্রশ্নগুলো একালে আরো সামনে এসে গেছে, স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। তবুও বারবার সহজেই সস্তা সুড়সুড়ি তৈরি করা যায় বলে দেখা যাচ্ছে ‘অর্থনৈতিক ন্যাশনালিজম’ থেকেই যাচ্ছে, জাগিয়ে উঠানো হচ্ছে।

    ভারতের রাষ্ট্র ও রাজনীতি উগ্র ন্যাশনালিস্ট, এটাই তার মূল ধারা। ওদিকে আবার চীন-ভারতের অমীমাংসিত সীমান্ত আর তা থেকে সামরিক সঙ্ঘাতের পুরানা (১৯৬২) স্মৃতি বা নতুন করে কিছু ঘটার একটা বাস্তবতা আছে বলে মূলত এসবকে পুঁজি করে ভারতে ‘অর্থনৈতিক ন্যাশনালিজম’ এর উসকানি ধারা খুবই প্রবল। বিশেষ করে ছোট উৎপাদকেরা চীনবিরোধী বয়ান সহজেই খাড়া করতে পারে। এবং করে লড়তে থাকে। সেখান থেকেই বয়ানের ডালপালা গজায় যে চীনা পণ্যের মান, এর টেকের মান খুবই খারাপ, ঠুনকো ইত্যাদি ইত্যাদি!

    তবে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে, লো-টেকনোলজি লাগে এমন পণ্যে – চীনারা পণ্য মান খারাপ করে সস্তা দামে বাজার দখল করে এগোতে হবে – এটাই তাদের সবকালের এগোনোর পথ ও পরিকল্পনা – এমন বুঝের কোনো অনুমান করা ভুল হবে। তাহলে কিভাবে দেখতে হবে? আসলে তাদের মূল বিষয় ছিল আশির দশকে চীনা ক্যাপিটালিজম উত্থানের শুরুর দিকের নিজ সস্তা শ্রমের সুবিধাকে কাজে লাগানো আর “বাল্ক প্রডাকশন লাইনে” উৎপাদন করে বাজারে নেতা হওয়া। যেমন আরেক উদাহরণ, আমাদের মত দেশে কম্পিউটার পণ্য সস্তায় পাওয়ার পেছনে চীনের দুই উতপাদন সূত্র – সস্তা শ্রম ও বাল্ক প্রডাকশন – হল মূল কারণ। আবার যেসব পণ্যের ক্ষেত্রে মান একটু গুরুত্বপূর্ণ সেই বাজারটা চীনারা তাইওয়ান, ব্যাংকক বা সিঙ্গাপুরের (একালে ইন্দোনেশিয়া বা ফিলিপাইনের) হাতে ছেড়ে দিয়েছে বা বাধ্য হয়েছেও বলতে পারি।

    ইদানীং চীনা উৎপাদকদের মধ্যে আর এক আওয়াজ জোরদার হচ্ছে যে, চীনা শ্রম আর সস্তা নয়, মানে ন্যূনতম মজুরি চোখে পড়ার মত অনেক বেড়ে গেছে। ফলে আগের সেই বাল্ক প্রডাকশন কোম্পানি এখন চীন ছেড়ে সস্তা শ্রমের কোন ভিন দেশে কারখানা স্থানান্তর করতে চায়, এটা বড় ইস্যু এখন চীনে।

    আবার এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে চীন নিজের এমন পরিচয় চায় না যে দেশ-বিদেশে মানুষ চীনকে ‘লো-টেকনোলজি’ পণ্যের দেশ হিসেবে চিনুক অথবা এটাই তার ভবিষ্যৎ পরিচিতি হয়ে দাঁড়াক। ফলে যেসব হাই-টেকনোলজি চীনের করায়ত্বে নাই তা আনতে পশ্চিম থেকে কোম্পানিগুলোকে জয়েন্ট ভেঞ্চারের কোম্পানি হিসেবে চীনে আনার তৎপরতাও প্রবল হয়েছে। বিশেষ করে যেমন গাড়ি তৈরির শিল্পে। পশ্চিমের কোম্পানিগুলোও আসতে খুবই আগ্রহী কারণ পশ্চিমের দিনকে দিন বাজার সঙ্কোচনের বিপরীতে চীনে বাজার উদ্যমী ও সচল (vibrent) বলে।

    এভাবে লো আর হাইটেকের ছাড়াও আর এক দিকের চীনা কৌশল হল কোন একটা উতপাদন খাতে লেটেস্ট টেকের শীর্ষ নেতা হওয়া। তেমন সেই খাত হল মোবাইল টেলিফোন। তারবিহীন স্মার্ট টেকনোলজি। চীনা এমন দুই পাইওনিয়ার কোম্পানি হল, বেসরকারি হুয়াওয়ে (HUAWEI) ও সরকারি জেডটিই (ZTE)।

    মোবাইল টেকনোলজির ব্যবসা ফলে এর উৎপাদনের পুরাটা বলতে গেলে তা মূল তিন ধরণের উতপাদক কোম্পানিতে বিভক্ত। এক হল, আমরা ব্যবহারকারী পর্যায়ের উতপাদক মানে, ফোন সেটের (mobile phone set) উৎপাদন ও বাজারজাত করা। দুই হল, আমাদের গ্রামীণ বা বাংলালিঙ্কের মত কোম্পানিগুলো; যাদের ভূমিকা হল ব্যবহারকারিদের ফোনের সেটে – নেটওয়ার্ক কানেকশনসহ ফোনের সার্ভিস জোগান দেয়া। এদেরকে ক্যারিয়ার (carrier) কোম্পানিও বলে থাকে অনেকে। আর তৃতীয় ধরণটা হল, আর এক টেক উৎপাদক যারা গ্রামীণদের মত কোম্পানির জন্য বেজ যন্ত্রপাতি উৎপাদন করে তা সরবরাহ করে থাকে। স্বভাবতই এসব বিপুল যন্ত্রপাতি সাধারণ মানুষ পর্যায়ে সরাসরি ব্যবহার করার জন্য না। তবে এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেই ক্যারিয়ার কোম্পানিগুলো পাবলিককে সার্ভিস জুুগিয়ে থাকে, তাই পাবলিক এই টেকনোলজির পরোক্ষ ব্যবহারকারী। এ কারণে এমন যন্ত্রপাতিকে ‘ব্যাকঅ্যান্ড’ (back-end) টেক বা পেছন-ঘরে লাগে এমন যন্ত্রপাতি বলে। অর্থাৎ গ্রামীণের মত কোম্পানিগুলোই ব্যাকঅ্যান্ড যন্ত্রপাতির মূল ক্রেতা বা গ্রাহক। আর এটা ব্যবহার করেই সাধারণ মানুষকে তারা নানান ফোন সার্ভিস যুগিয়ে থাকে।

    এই মোবাইল টেকনোলজিতে চীন শীর্ষপর্যায়ের টেক-উৎপাদন ও সরবরাহকারী পরিচয় হাসিল করে ফেলেছে। টেকনোলজিতে উঁচুমান – এই পরিচয় চীনা পণ্যে লাগানোর ক্ষেত্রে – ফোন কোম্পানির নাম এখন হুয়াওয়ে (HUAWEI)। তবে এই কোম্পানি ফোনসেট এবং ব্যাকঅ্যান্ডের যন্ত্রপাতি  – দুটোই উৎপাদন করে থাকে। তাই সাধারণ মানুষের কাছেও ‘হুয়াওয়ে’ নামটা পৌঁছে গেছে ও পরিচিত। হুয়াওয়ে ব্যক্তি-মালিকানাধীন কোম্পানি, তা সত্ত্বেও কমিউনিস্ট কায়দায় এর কর্মচারীরাও প্রত্যেকে স্বল্প হলেও সবাই শেয়ারহোল্ডার মালিক। এ ছাড়া মালিকেরা বা পরিচালক বোর্ডের মেম্বারেরা রোটেশনালি মানে ঘুরে ঘুরে সবাই নির্দিষ্ট কিছু দিনের জন্য চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকেন। এমন অনেক কিছুই এর নতুন বা ভিন্ন। এ ছাড়া এই কোম্পানি চীনা সরকাররেও আদরের চোখের মনির মত। কারণ এটা  সামগ্রিকভাবে চীনা টেকনোলজিক্যাল উচ্চতা কত, তা কতটা ওপরে উঠেছে এর চিহ্ন সেট করেছে।

    আর ঠিক ততটাই যেন এটা আমেরিকার চক্ষুশূল। অনেকগুলো কারণে। প্রথমত কী দিয়ে বুঝা যাবে হুয়াওয়ে উঁচুমানের টেকনোলজির? মোবাইলে টেকনোলজিতে ওয়ান-জি, টু-জি করে লেটেস্ট হলো ফাইভ-জি। মোবাইলে টেক্সট (লেখা), ভয়েজ (শব্দ) আর ভিডিও (ছবি) পাঠানো – এই তিনটাই আদান-প্রদান করা যায় কি না; আর তা কত দ্রুত যায় এরই প্রকাশ হল – এই ওয়ান থেকে ফাইভ জি (ইংরেজি জি মানে এখানে জেনারেশন বা প্রজন্ম) পাঁচ প্রজন্মের টেকনোলজি।

    ৫জি এর স্পিড

    যার মূল জিনিসটা হল, ফোন নেটওয়ার্কে চলাচলকারী ডাটার গতি। যেমন একটা ধারণা দেয়া যাক, ১৯৯১ সালে চালু ২জি টেকনোলজি দিয়ে একটা পাঁচ গেগাবাইটের পূর্ণ সিনেমার ডাটা নামিয়ে আনতে সময় লাগত এক মাসেরও বেশি। তাই তা করতে যায়নি কেউ। কিন্তু গত ২০১০ সাল থেকে চালু হয়ে থাকা চলতি ৪জি টেকনোলজিতে (যা আমরা বাংলাদেশে দেখি নাই, গল্প আর “কে দিয়েছের” চাপাবাজি শুনেছি। অভিজ্ঞতা পাইনি বলাই ভাল) লাগে ৭ মিনিট। সেই পাঁচ গেগার সিনেমা আসন্ন নতুন ৫জি টেকনোলজিতে লাগবে মাত্র ৪০ সেকেন্ড। [৫জি সাপোর্ট করে এমন ফোনসেট এখনো বাজারে আসনি, তবে এ বছরই আসবে।]

    এই ৫জি টেকনোলজি এখন একটা রাষ্ট্রের টেক-উচ্চতা কতটা তা মাপার বিষয় (স্টান্ডার্ড) হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন আমেরিকার কোন কোম্পানি এই টেকনোলজি নিয়ে কখনও কাজই করেনি। বিপরীতে এই টেকনোলজি নিয়ে নিজের ল্যাবে গবেষণা ও উন্নয়ন শেষ করে, এরপর বাণিজ্যিক উৎপাদনে এবং বিক্রিতে চলে গেছে চীনা হুয়াওয়ে। শুধু তাই না, ২০১৮ সালের মোট বিক্রিতে ইতোমধ্যে কিছু ৫জি টেকসহ বিক্রি করেছে ১০৮ বিলিয়ন ডলারের। এই বিক্রি, তাও আবার সরাসরি ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের মিথ্যা প্রপাগান্ডা হুমকির মধ্যে যে চীনা ৫জি টেকনোলজি [বেসরকারি হুয়াওয়ে ও সরকারি জেডটিই ] বাজারে আনা হয়েছে অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চীনের গোয়েন্দাগিরির জন্য। অন্যের রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য সংগ্রহ ও তা নিজ দেশে পাচারের জন্য – এই হল সেই ভীতিকর মিথ্যা প্রপাগান্ডা। শুধু তাই না, ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ নির্দেশ জারি করেছে যে কোনো আমেরিকান সরকারি অফিস এ দুই কোম্পানির কোনো কিছু কিনতে ও ব্যবহার করতে পারবে না [President Donald Trump in August, which bars federal agencies and their contractors from procuring its equipment and services]। এই আইনের বিরুদ্ধে খোদ হুয়াওয়ে নিজে আমেরিকার টেক্সাসের আদালতে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেছে।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নতুন দুনিয়ায় মাতব্বরিতে নেতা আমেরিকার সাথে সবসময় ছোট-তরফ বা প্রধান সাগরেদ হয়ে থেকেছে ইউরোপ। সম্ভবত এবারই প্রথম আমেরিকান নেতাগিরির শেয়ার-ভাগ সাগরেদ নিতে চাইছে না। ইউরোপ আমেরিকার হাত ছেড়ে ভেগে আগে বাড়তে যাচ্ছে।

    এ বছর ‘মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস” [Mobile World Congress] যেটা সাধারণভাবে বললে ‘মোবাইল টেকনোলজির গ্লোবাল বাণিজ্যমেলা, তা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৯ সালের ২৫-২৮ ফেব্রুয়ারি, স্পেনের বার্সিলোনায়। কিন্তু ট্রাম্পের প্রপাগান্ডাীখানে এসে ফেল করে যায়। মানে চীনা হুয়াওয়ে সম্পর্কে আমেরিকার প্রপাগান্ডা ও ভীতি ছড়ানো আর তা ইউরোপে কাজ করাতে ব্যর্থ হয় আমেরিকা এই সম্মেলন থেকেই। এটা ফোন ব্যবহারকারি সাধারণ মানুষের মেলা নয়, ফলে সাধারণ ক্রেতাদের বাদে বা তাদের বাইরে, মোবাইল নিয়ে গবেষণা, উৎপাদন থেকে বাণিজ্য বিতরণ পর্যন্ত জড়িয়ে থাকা টেলিকম এক্সিকিউটিভদের মেলা ছিল এটা। ইউরোপের পলিটিকো ম্যাগাজিনের হিসাব মতে প্রায় এক লাখ [where some 100,000 telecoms executives had gathered] এমন টেলিকম নির্বাহীর সমাগম হয়েছিল এখানে। এমনিতেই এই মেলার বড় খরচের  দায়ভার নিয়েছিল হুয়াওয়ে। সে সাথে নিজের ৫জি টেকনোলজিসহ সব পণ্যের ব্যাপক প্রদর্শনীও করেছিল। এই মেলা থেকেই মোবাইল উতপাদন ব্যবসার দুনিয়ার বড় বড় কুতুবেরা বিশেষ করে যারা ইউরোপীয় যেমন, নরওয়ের নোকিয়া, ব্রিটিশ ভোডাফোন, সুইডিশ এরিকশন ইত্যাদির, আমেরিকান প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে এদের আপত্তিগুলো সামনে প্রবলে আসতে থাকে।

    তাদের বক্তব্যের সারকথা হল, তারা আমেরিকার কাছে খাস প্রমাণ চাচ্ছে, নইলে তারা হুয়াওয়ের টেকনোলজি কিনতে ও ব্যবহার- সম্পর্ক করতে থামবে না। অর্থাৎ চীন বা হুয়াওয়েকে রাজনৈতিক কারণে কোণঠাসা করার কাজে যুক্ত হতে তারা অস্বীকার করে বসলেন। রয়টার্স বলছে, ওই মোবাইল মেলাতে ভোডাফোনের প্রধান নির্বাহী মিডিয়াকে জানিয়েছেন যে, আমরা “ফ্যাক্টস ভিত্তিক মূল্যায়ন দেখতে চাই” [“We need to have a fact-based risk-assessed review,” – Nick Read, chief executive of Vodafone]। আর হুয়াওয়ের টেক ব্যবহার করব না বলার খারাপ পরিণতিও আছে। আমরা যদি অস্পষ্ট তর্কে সিদ্ধান্তহীন থাকি তবে ইউরোপ আপডেট টেকনোলজিতে দুই বছর পিছিয়ে যাবে। আর ইতোমধ্যে আমরা যারা হুয়াওয়ের ৪জি টেক ব্যবহার করছি সেগুলোর কী হবে?” [ Read said it was not a simple case of barring Huawei from future 5G networks as the company’s equipment was already in use in 4G networks in Europe that would be the foundation of the new technology……“It will delay 5G in Europe by probably two years,” he said.] ।

    ওদিকে ওই মেলা থেকে এক টেকনিক্যাল আলোচনায় হুয়াওয়ের চেয়ারম্যান সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বললেন আমেরিকার হাতে কোন প্রমাণ নাই [The U.S. security accusation on our 5G has no evidence, nothing,”] অথচ প্রপাগান্ডা করছে।  তিনি খোঁচা দিয়ে বলেন, “হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করার মিথ্যা অভিযোগ আনার আগে আমেরিকা স্নোডেনকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারে [those concerned about government spying “can go ask Edward Snowden” ]। (আমেরিকান টেক কন্ট্রাকটারের এক স্টাফ অ্যাডওয়ার্ড স্নোডেন প্রমাণসহ দেখিয়ে দেন যে আমেরিকান সরকার কিভাবে গ্লোবালি মোবাইল ডাটা হ্যাক করে থাকে। এই তথ্য ফাঁস করা, সেই থেকে তিনি আমেরিকা থেকে পালিয়ে রাশিয়াতে আশ্রয়প্রার্থী হয়ে বাস করছেন।)

    তবে অনেক তর্ক-বিতর্কে উঠার পরে ঐ বার্সেলোনা মেলা থেকেই হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে আমেরিকার অভিযোগ হাল্কা হয়ে যেতে থাকে। ইউরোপীয় পলিটিকো বা আমেরিকান ব্লুমবার্গ মিডিয়া বলছে, মূলত ট্রাম্পের একটা মন্তব্য থেকে এই অবস্থার সৃষ্টি। ব্যাপারটা হল, বর্তমানে চীন ও আমেরিকা এক বাণিজ্য যুদ্ধে পরস্পরের ওপর বাড়তি আমদানি শুল্ক আরোপের ঝগড়ায় আটকে আছে। যার সর্বশেষ অবস্থা হল তারা এখন আলাপ আলোচনার মধ্যে আছে যাতে মনে হচ্ছে তারা একটা আপসের পথ খুঁজে পেতে যাচ্ছে, কিন্তু কিছুই এখনও ফাইনাল নয়। সেই আলোচনার সময়ে এক পর্যায়ে ট্রাম্প বলে বসেন যে হুয়াওয়ে কেসটা আমাদের আলোচনায় দরকষাকষিতে হাতিয়ার হতে পারে [“President Trump has made a big mistake by allowing the Chinese to draw the conclusion that the two are related”]। এ কথা জেনে যাওয়ার পর থেকে ইউরোপের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ফলে তা থেকে টেক কোম্পানিগুলোও হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে আমেরিকার অভিযোগগুলো আর গুরুত্ব দিয়ে আমল করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। এরপর থেকে আমেরিকা ইউরোপকে আর নিজের নৌকায় তুলে নিতে পারেনি।

    এদিকে বিতর্কেরও কোনো শেষ হয়নি। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল এ নিয়ে খুবই ভোকাল। তিনি এক পাবলিক আলোচনাতে বলছেন, তিনি দুটো বিষয়ে নীতিগতভাবে বিশ্বাস করেন না। এক, আমেরিকার এমন সেনসেটিভ নিরাপত্তা-বিষয়ক অভিযোগ পাবলিকলি তুলল কেন? আর দুই-একটা কোম্পানিকে একঘরে করতে হবে কারণ সে একটা বিশেষ দেশের [“First, to discuss these very sensitive security questions publicly, and second, to exclude a company simply because it’s from a certain country.’] – একটা বিশেষ দেশ বলতে বলা বাহুল্য তিনি বুঝিয়েছেন চীনের হুয়াওয়ে] কোম্পানি। ’ এরপর তিনি আরো এক ধাপ এগিয়ে শক্ত এথিক্যাল প্রশ্ন তুলে বলছেন, “চীন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী বলে তার সাথে এভাবে লড়ব। বরং আমাদেরকে অবশ্যই ন্যায্য আইনকানুন ও পারস্পরিক স্ট্যান্ডার্ডের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। আর আমরা ‘বহুরাষ্ট্রীয় দুনিয়া ব্যবস্থা’ মাল্টিলেটারিজম ত্যাগ করতে পারব না, [“Of course we’re in a systemic competition with China,’’ Merkel said in a separate speech at the same event. “But the answer can’t be that we fight those who are economically strong, we must stand up for fair, reciprocal rules and not give up on multilateralism.’’]।

    এ কথাগুলো তিনি বলেছেন কারণ ইতোমধ্যে এ নিয়ে ন্যাটোর মিটিংয়ে চরম তর্কাতর্কি ও আর আমেরিকান হুমকি প্রদর্শন ঘটে গেছে। আমেরিকা হুমকি দেয় যে চীনা ফোন টেকনোলজি ৫জি ব্যবহার জার্মান বন্ধ না করলে তারা আর আগের মত জার্মানির সাথে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করবে না। ন্যাটোর জেনারেল স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, “ন্যাটো ফোর্স জার্মানির সাথে ‘বার্তা যোগাযোগ ছিন্ন” করবে যদি তারা হুয়াওয়ের সাথে সম্পর্ক রেখে কাজ করে’ [The threat escalated when Nato’s Supreme Allied Commander in Europe, US General Curtis Scaparrotti, warned Germany that Nato forces would cut communications if Berlin were to work with Huawei.]। কিন্তু মার্কেলের অবস্থান আসলে খুবই পরিষ্কার। তিনি বলতে চাইছেন, আমরা নিরাপত্তা স্টান্ডার্ড উন্নত করতে পারি, আলোচনায় চীনকে তা মানতে বাধ্য করতে পারি। কিন্তু চীনা কোম্পানি টেন্ডারে অংশ নিতে পারবে না এ কথা বলতে পারি না।

    ওদিকে ইটালিকে নিয়েও প্রায় একই রকম বিতর্কে [Italian daily La Stampa ] এক ভুয়া নিউজ ছাপা হয়েছিল। ওর পেছনে আর এক কারণ হল, সেই একই সময়ে ইতালি চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিয়েছে, এমন এক মেমোরেন্ডাম বা সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু ইতালির মন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, তারা যেহেতু এখনও ৫জি ইস্যুতে  নিরাপত্তার জন্য হুমকিমূলক কোনও কিছুই পায়নি। তাই কোনও কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে আগ্রহী নয়। ইতালির “টেলিকম ইতালিয়া” কোম্পানি হুয়াওয়ের গ্রাহক। তারাও বলছে সরকারি কোনো নিষেধাজ্ঞা না পেলে তারা কিছুই বন্ধ করবে না [Italian phone incumbent Telecom Italia has previously said it will keep working with Huawei until told otherwise by the government.]।

    মোটা দাগে বললে, হুয়াওয়ে বা চীনা টেকনোলজি ঠেকিয়ে দেয়ার ইস্যুতে আমেরিকা ইউরোপকে নিজের নেয়া ‘নিষেধাজ্ঞার পথে’ আকৃষ্ট বা রাজি করাতে পারেনি। এর মূল কারণ চীন বা হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে আমেরিকার আনা গোয়েন্দাগিরি অভিযোগের কোনও প্রমাণ দিতে না পারা। অর্থাৎ আমেরিকান অভিযোগ এখনো ভিত্তিহীন বলে এমন অসৎ পথে আমেরিকার সঙ্গী হতে চায়নি ইউরোপ। ইতোমধ্যে প্রায়ই ট্রাম্পের মুখে শোনা যায় যে চীন আমাদের টেকনোলজি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। ঠিক তেমনি হুয়াওয়ের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে আমেরিকান টি-মোবাইল কোম্পানির পক্ষে [T-Mobile, an American wireless carrier] টেকনোলজি চুরির মামলা করা হয়েছিল। লন্ডন ইকোনমিস্ট জানাচ্ছে, সে মামলাতে আদালতের মূল্যায়ন হল, এখানে টি-মোবাইলের কোনো ‘ক্ষতি করা, কারও অন্যায় লাভবান হওয়া এমন কিছু ঘটেনি। এমনকি এটা হুয়াওয়ের দিক থেকে ইচ্ছা করে কিছু ঘটানো এমন কাজ নয়, খারাপ উদ্দেশ্যে করা কোনো কাজও নয়” [The court found, however, “neither damage, unjust enrichment nor wilful and malicious conduct by Huawei”.।

    তবু আমেরিকার দিক থেকে ইউরোপকে নিয়মিতভাবে চীনা ৫জি টেকনোলজি ব্যবহার না করার আবেদন করে চলছিল। সম্প্রতি ইউরোপীয় কমিশন আমেরিকার চীনাবিরোধি যা অভিযোগ তা আনুষ্ঠানিক আমল করেনি বলে জানা যাচ্ছে। কিভাবে? কারণ সে তার নিজস্ব কিছু পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। সেগুলো আসলে উপরে অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের বয়ানে যেটা আমরা দেখেছি সেই অবস্থানই। তা হল, কমিশনের সিদ্ধান্ত হল যে আরো ‘শক্ত নিরাপত্তা স্টান্ডার্ড’ তৈরি করতে হবে, কিন্তু কোনো দেশকে ঠেকাতে হবে এটা তাদের কোনো পথ নয় [commission officials signalled they prefer to secure Europe’s critical digital infrastructure with a more nuanced approach, rather than bowing to US pressure for blanket bans.]। । আসলে মূলত এ কারণেই ইউরোপের মোবাইল জয়েন্টগুলো হুয়াওয়ের টেকনোলজি কেনার ও সাথে সম্পর্কে এগিয়ে যেতে শুরু করেছিল।

    হুয়াওয়ের ‘প্রধান ফাইন্যান্স কর্মকর্তা’ সাবরিনা গ্রেফতারঃ
    তবু আমেরিকা চীন ও হুয়াওয়েকে বিনা যুক্তিতে স্রেফ নিজের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মাতব্বরির স্বার্থে কোন যুক্তি ছাড়া “তাদের ঠেকাতে” একের পর এক বাধা তৈরি করে যাচ্ছে। এমনই আর এক বাধার দেওয়াল হল, হুয়াওয়ের ‘প্রধান ফাইনান্স কর্মকর্তা’ সাবরিনা মেঙ ওয়ানঝুয়ের [Huawei CFO Subrina Meng Wanzhou ] কানাডায় গ্রেফতার। যিনি আসলে হুয়াওয়ের প্রতিষ্ঠাতা মালিক রন ঝেংফাই এর নিজের মেয়ে। সেই সাবরিনা মেঙ কোম্পানির কাজে হংকং থেকে মেক্সিকো যাচ্ছিলেন, পথে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার ছিল তার বিমান বদলের জন্য যাত্রা বিরতি। আর এই ভ্যাঙ্কুভার বিমানবন্দর থেকে কানাডিয়ান পুলিশ তাকে গত ১ ডিসেম্বর ২০১৮, গ্রেফতার করেছে। কিন্তু এর সাথে আমেরিকার কী সম্পর্ক?

    কানাডা-আমেরিকার মধ্যে পরস্পরের “বন্দী হস্তান্তর চুক্তির” সম্পর্ক আছে। তাই আমেরিকার অনুরোধে কানাডা সরকার এই গ্রেফতার করেছে। কিন্তু আমেরিকার অভিযোগ কী?
    আমেরিকার দিন ফুরিয়ে আসছে এর অনেকগুলো চিহ্ন ফুটে উঠতে শুরু করেছে। এর একটা হল, যাকে খুশি তাকে যেকোন অপছন্দের রাষ্ট্রকে নিজের একক সিদ্ধান্তে সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ ঘোষণা করে দেয়া। নেতানিয়াহুর জিগরি দোস্ত ট্রাম্প ইরানের ওপর খুবই বেজার। ট্রাম্প ইরানের ওপর অবরোধ ঘোষণা করেছেন। যার সোজা অর্থ হল ইরান কোন ভিন্ন-রাষ্ট্রের সাথে পণ্য কেনা বা বেচাবিক্রির ক্ষেত্রে আমেরিকান ডলারে সেই লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবেন না। করলে কী হবে? করলে এর মানে হবে ওই পণ্যের চালানে ডলারে পেমেন্টের কথা উল্লেখ থাকবে আর সেই ডলার দেয়া-নেয়া করতে গেলে তা একমাত্র একটা পর্যায়ে কোন না কোন এক আমেরিকান ব্যাংকের মাধ্যমে করতে হবেই। আর ইরান যেহেতু অবরোধ ঘোষিত তালিকায় আছে তাই আমেরিকান কোনো ব্যাংকের জন্য ওই অবরোধের অর্থ হল, এই লেনদেন ঘটিয়ে দেয়া নিষিদ্ধ। কোন আমেরিকান ব্যাংক যদি এমন নিষিদ্ধ লেনদেনে সহায়তা করে আর আমেরিকান সরকার যদি এ জন্য তাকে অভিযুক্ত করে তবে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ফাইন দিয়ে তাকে রেহাই পেতে হয়। তাহলে ইরান অবরোধের সাথে হুয়াওয়েকে কিভাবে সম্পর্কিত করছে আমেরিকা?

    অভিযোগ হল, হুয়াওয়ে তার মোবাইল টেক বিক্রি করেছে ইরানকে। আমেরিকার অভিযোগ এই বিক্রি ঘটেছে হুয়াওয়ে মূল কোম্পানির নাম বা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে নয়, বেনামে। ‘স্কাইকম’ নামে এক কোম্পানির মাধ্যমে হুয়াওয়ে ইরানের সাথে কেনাবেচা ব্যবসা করেছে। কিন্তু আইনত স্কাইকম হুয়াওয়ের কোনো অধীনস্ত বা সাবসিডিয়ারি কোম্পানি নয় বলে বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে সাবরিনা সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাই মামলাটা হয়েছে এই লেনদেনে মিথ্যা তথ্য দেয়ার অভিযোগে। ভয় পাওয়ার মতো তথ্য হল, প্রমাণিত হলে আমেরিকায় এর সাজা কমপক্ষে ৩০ বছর। তবে কানাডার আদালতে এখনকার মামলা হল সাবরিনা মেঙকে আমেরিকার কাছে হস্তান্তরের অনুমতি পাওয়ার। কানাডার আদালত অনুমতি না দিলে কানাডা সরকার সাবরিনাকে আমেরিকার কাছে হস্তান্তর করতে পারবে না। তাই সাবরিনা এখন বিশেষ অনেক শর্তের জামিনে আছে, যার একটা হলো তাকে কানাডায় থাকতে হবে, রায় না হওয়া পর্যন্ত।

    ঘটনার এখানে শেষ নয়, উপরে বলেছিলাম যে চীন-আমেরিকা যে বাণিজ্য যুদ্ধের সমাপ্তির আলোচনা চলছে ট্রাম্প সেখানে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি সাবরিনাকে ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারটাকে তিনি ঐ আলোচনায় বিশেষ সুবিধা আদায়ের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চান।
    কিন্তু ব্যাপারটাতে আমেরিকা একাই চালাক তা তো নয়। চীনও অন্তত দুজন কানাডার নাগরিককে পাল্টা ডিটেনশন দিয়ে আটকে রেখেছে [After Meng’s Vancouver arrest, Chinese police also detained two Canadian citizens]। যাদের একজন আমেরিকার প্রাক্তন কূটনৈতিক, এখন “ক্রাইসিস গ্রুপ” নামের থিঙ্কট্যাঙ্কের সাথে কাজ করছেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ‘উঠায়ে নেওয়া’, ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা এসবই চালু করার জায়গায় পৌঁছেছে আমেরিকা।

    কিন্তু আমেরিকা এক হুয়াওয়েকে নিয়ে এত মরিয়া কেন?
    এখানে দুটা প্রসঙ্গ, তবে কমকথায় বলতে হবে। একালে মোবাইল টেকনোলজিতে আমেরিকা আর কুতুব কেউ নয়। বরং সব  টেক কোম্পানিই বেচে-কিনে সারা। আমেরিকান ভ্যানিটি ছিল প্রখ্যাত গ্রাহাম বেলের এটিঅ্যান্ডটি [AT&T]। কিন্তু এত বিখ্যাত এটাই তার নেতি দিক। কোম্পানিটা একচেটিয়া করছে – এই অভিযোগে আমেরিকান এন্টি-ট্রাস্ট আইনের মামলা খেয়েছিল এই কোম্পানি। ফলাফলে দুটা ঘটনা ঘটে। এটিওঅ্যান্ডটি নিজেই নিজের কোম্পানিকে ভেঙ্গে দুইটা করে। মানে লুসেন্ট (Lucent) নামে যন্ত্রপাতি উৎপাদন ইউনিটকে আলাদা কোম্পানি [Lucent Technologies, Inc.] হিসেবে সাজিয়ে নেয়। এতে সেকালে (১৯৯৬) বাজারে প্রবল সাড়া জাগানোতে ইনিশিয়াল ইস্যু করা শেয়ার বেচে তারা তিন বিলিয়ন ডলার জোগাড় করেছিল।

    আমাদের অধুনা বিলুপ্ত মোবাইল কোম্পানি সিটিসেলের কল্যাণে “সিডিএমএ” [CDMA] নামে টেকনোলজির কথা কেউ কেউ জানি। বাংলাদেশের মোবাইলে ওই একটাই সিডিএমএ নামে টেকনোলজি ছিল। এ ছাড়া বাকি সবগুলো এখন জিএসএম [GSM]। এই দুটা ছাড়া কাছাকাছি সুবিধা-অসুবিধার অন্যান্য অনেক টেকনোলজি ছিল। আমেরিকান সরকার ১৯৯৬ সালে সিদ্ধান্ত নেয় যে সে দেশে টেকনোলজির স্টান্ডার্ড বলে কিছু সবাইকে আর মানতে হবে না। “সিডিএমএ” বা “জিএসএম” বা যেকোন স্টান্ডার্ডের মোবাইল সার্ভিস চালু করা যাবে।  সরকার তখন মনে করেছিল এতে একচেটিয়াত্ব বন্ধ হবে। কিন্তু হিতে বিপরীত হয়ে যায়। কারণ, মোবাইল টেকনোলজি ব্যবসার রিস্কি দিকটা হল, এখানে ব্যাকঅ্যান্ডের যন্ত্রপাতি উৎপাদনের কোম্পানিগুলোকে নিরন্তর গবেষণা ও নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করে যেতে হয়। তাই আমেরিকায় একটা স্ট্যান্ডার্ড না থাকার কারণে সব টেকনোলজির ফোন সার্ভিস বেচে তুলে আনা রাজস্ব সবগুলো টেকনোলজিতেই গবেষণা করতে গিয়ে ভাগ হয়ে যায়। ফলে প্রত্যেকটা টেকনোলজির গবেষণা খরচ জোগানো কঠিন হয়ে যায়। ফলে ২০০১ সালের মধ্যে লিসেন্টের পতন শুরু হতে থাকে। এর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল মটোরোলা [Motorola] তারও অবস্থা খারাপ। মোটের ওপর আজকের শেষ পরিণতি অবস্থাটা হল – নরওয়ের নোকিয়ার কাছে আমেরিকার লুসেন্ট বা মটোরোলা দুটাই বিক্রি হয়ে গেছে। ওদিকে ফ্রান্সের আর এক কোম্পানি “এলকাটেল” [Alcatel] – সেও এখন নোকিয়ার পেটে, চলে গেছে। ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে আমেরিকার নিজের এখন মূল ব্যাকঅ্যান্ড যন্ত্রপাতি বানানোর কোন কোম্পানি নেই। সব ইউরোপের হাতে। বলা হয়ে থাকে, সম্ভবত এর মূল কারণ ইউরোপ শুরু থেকেই কেবল ‘জিএসএম’ [GSM] একেই একমাত্র মোবাইল টেক স্ট্যান্ডার্ড বলে নির্দিষ্ট করে দেয়। ফলে এখানে কোম্পানিগুলোর গবেষণার খরচ জোগান তুলনামূলক সহজ ছিল।
    তাহলে সার কথা দাঁড়াল আমেরিকার হাতে কোনো ৫জি টেকনোলজিই নেই। কিন্তু না থাকলে কী? ইউরোপ থেকে কিনে নেবে!
    ব্যাপারটা অত সহজ নয়। কেন?

    ৫জি এক বিরাট সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উল্লম্ফন
    মূল কারণ ৫জি কোনো সাধারণ টেকনোলজি নয়। যেমন ২জি থেকে ৩জি অথবা ৩জি থেকে ৪জি এসেছিল – তেমন সাধারণ নয়। কথাটা ভেঙে বলতে হবে।

    প্রথমতঃ আগের যেকোনো টেকনোলজি থেকে ৫জি তে আসা – এটা এক বিরাট সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক উল্লম্ফন। মানে কী? এত সাংঘাতিক করে ব্যাপারটা হাজির করছি কেন?
    আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (Artificial intelligence, AI) এর কথা একালে আমরা অনেকে শুনেছি। যন্ত্র বা রোবটকে মানুষের বুদ্ধিতে চলার মত করে তৈরি করা। মানুষের শ্রম কম লাগবে। আর এর বিকল্প হিসেবে রোবট সে কাজ করবে। যেমন “রোবট রেস্টুরেন্ট” – মানে এখানে কাস্টমারকে রোবট ঘুরে ঘুরে খাওয়া সার্ভ করছে, অর্ডার নিচ্ছে – এটা আমরা অনেকেই দেখেছি।

    এ ছাড়া ড্রাইভার ছাড়া গাড়ির কথা শুনেছেন অনেকে। এসব আগামীতে আমরা কেমন থাকব, চলব, কেমম কাজ পাবো, করব অথবা আমাদের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হবে ইত্যাদি প্রায় সব কিছুকে বদলে দেবে, প্রভাবিত করবে।

    এসবের প্রধান আর কমন বিষয়টা হল, এগুলো গায়েবি নিশ্চয় নয়, বরং মানুষই অনেক দূরে বসে এসব কিছুকে পরিচালিত করবে। যেহেতু অনেক দূর থেকে, একটা বৃত্তের মধ্যে নানান জায়গায় বসে বসবাস করে তাই খুবই দ্রুত আর বাল্ক নির্দেশ পৌঁছানোর উপযুক্ত তারবিহীন টেকনোলজি বা নির্দেশ বহনকারী ওয়ারলেস টেকনোলজি লাগবে। এসব কিছু ঠিকঠাক চলার ব্যাকবোন বা শিরদাড়ার মত কাজ করতে হবে ৫জি ওয়ারলেস টেকনোলজিকে। এর মাধ্যমেই সবাই সব নির্দেশ পাঠাবে, নেবে।

    আরো দিক আছে কারখানা পর্যায়েও প্রডাকশন লাইনে নির্দেশ পাঠাতে ব্যবহৃত হবে ৫জি টেকনোলজি। এ জন্য বলা হচ্ছে এই ৫জি মোবাইল বা ওয়ারলেস টেকনোলজিকে আসলে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পর্যায়ে কাজ করতে হবে।

    এই বিপুল পরিবর্তন যা মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনে ব্যাপক উল্লম্ফন ঘটাবে এর ব্যাকবোন  হতে যাচ্ছে ৫জি টেকনোলজি। অথচ আমেরিকার হাতে এটাই নাই, থাকবে না। এখনও যদি শুরু করে তবুও তিন থেকে পাঁচ বছরের পেছনে থাকবে আমেরিকা। এছাড়া অর্থনৈতিক লাভজনকভাবে একে প্রতিস্থাপন সে ত আমেরিকার জন্য আর এক অলীক স্বপ্ন! আর ওদিকে চীন! এখনই সে শীর্ষে। অতএব, বলাই বাহুল্য আমেরিকা কেন এমন হাত-পা ছোড়া ছোট ছেলের মতো অস্থির আচরণ করছে। আমেরিকার জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি ও পরিণতি অপেক্ষা করছে বলাই বাহুল্য!

    [এই ব্যাপক পরিবর্তনের টেকনিক্যাল দিকটা  থেকে আগ্রহী পাঠকেরা এই আর্টিকেল ও সংশ্লিষ্ট অন্যগুলো পড়ে দেখতে পারেন।]

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আমেরিকার বন্ধুদের নড়াচড়া, কী বুঝে

    পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আমেরিকার বন্ধুদের নড়াচড়া, কী বুঝে

    গৌতম দাস

    ০৩ জুন ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2AL

     

    বাংলাদেশের “পররাষ্ট্রনীতি” বলতে যা কিছু আছে তা হঠাৎ করে আমেরিকানদের নজরে পড়েছে মনে হচ্ছে। যদিও এরা কোন আমেরিকান, কারা এরা, তা নিয়েও কথা আছে অবশ্য। সে কথায় পরে আসা যাবে। এই নড়াচড়া বা নজর ফেলা এককথায়, পন্ডশ্রম। বিষয়টা ‘প্রথম আলো’র ভাষাতেই বললে, গত ১৭ মে তাদের একজন লিখেছে, “বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোন পথে- এই জিজ্ঞেস নিয়ে সম্প্রতি এক গোলটেবিল বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন রাজনীতিক, কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। আলোচনায় উঠে আসে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভেতর-বাহির, জাতীয় নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সমস্যা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা দিক। আয়োজক ছিল বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই, BEI) এবং ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই, IRI )“।

    আয়োজক প্রতিষ্ঠান দু’টি আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ধরনের দুই প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত। তারা ঐ থিঙ্কট্যাঙ্কেরই বাংলাদেশ শাখা নাকি কেবল ফান্ডদাতা-এনজিও সম্পর্ক, কোনটা- সেটা তাদের মুখ থেকেই আমাদের জানার বাকি আছে। যা হোক, এমন প্রতিষ্ঠানগুলো যা কিছু নিজের কাজের ইস্যু হিসেবে তুলে আনে, অনুমান করা অবাস্তব হবে না যে, তা আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ বলে তারা মনে করে।

    কথা হল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন আছে, এর ঘাটতি, খামতি কী – সে প্রশ্ন এখন কেন? বিশেষ করে আজকের খোদ বাংলাদেশই যে দশায় আছে, একে এই অবস্থায় আনা ও ফেলার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকায় আমেরিকান বন্ধুদেরও অবদান আছে। গত ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকায় ক্ষমতায় থাকা বুশ এবং ওবামা- এই দুই প্রশাসনের তো বটেই অন্তত আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটেরও [AEI] বিশেষ ভূমিকা এ ক্ষেত্রে আছে। বাংলাদেশকে নিয়ে কী করা হবে এনিয়ে অন্তত  ভারত-আমেরিকার আলোচনাগুলোতে, গোলটেবিল বা ইনফরমাল বৈঠকে ইনপুট দিয়ে।

    বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এক ধরনের পরিণতি, এই অর্থে ‘উত্তরসূরি’ বলা যায়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশে যে এক ধরনের সামরিক ক্ষমতা দখল হয়েছিল তাকে আমরা অনেকে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বলি, যা দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। কেন এই ঘটনা ঘটেছিল, এর ‘আনুষ্ঠানিক’ কারণ কখনও জানা যাবে না। কিন্তু আসল কারণ যা দখলকারীদের সাফাই-বক্তব্য থেকে জানা যায়, মোটাদাগে সে ভাষ্যটা হল – আগের সরকার  “ওয়ার অন টেরর” -কে ঢিলেঢালাভাবে নেয়াতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে “জঙ্গি মোকাবেলার উপযোগী” করে ঢেলে সাজানো ও সংস্কার করা হয়নি। সে কাজগুলো সম্পন্ন করতেই ঐ ক্ষমতা দখল। কিন্তু এই বক্তব্যটা ক্ষমতা দখলের ছয় মাস পরে বদলে যায়।

    মূল কারণ, আমেরিকান অগ্রাধিকার মানে কোনটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ ও আগে দরকার সেই বোধ বদলে গিয়ে এক নতুন আকার নিয়েছিল। আমেরিকা ওয়ার অন টেরর বা জঙ্গি ঠেকানোর চেয়ে তখন থেকেই “চীন ঠেকানো’-কে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য অগ্রাধিকার সাব্যস্ত করেছিল।  না সাব্যস্ত করা ছিল আগেই তবে বাস্তবায়ক রেডি ছিল না তখন। আমেরিকার ‘চায়না কনটেইনমেন্ট’[China containment], মানে ‘চীন ঠেকানো’ নামের কর্মসূচি আছে। এর অর্থ হল, ২০০৫ সালের পর থেকে গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা হিসেবে চীনা উত্থান আর আমেরিকার পতন যখন আমেরিকার নিজের করা সার্ভে ও পরে তা নিয়ে প্রকাশিত (২০০৮) রিপোর্টও স্বীকার করে, তখন এশিয়ার দুই ‘রাইজিং অর্থনীতি’ চীন ও ভারত – এদের একটাকে (ভারতকে) কাছে টেনে একে অপরটির (চীনের) বিরুদ্ধে লাগানোর নীতিই আমেরিকার “চায়না কনটেইনমেন্ট”। আমেরিকার এই “চায়না ঠেকানোর” নীতিতে ভারত নিজেকে পরিচালিত হতে দিতে রাজি হয়ে যায় এসময়েই। বাংলাদেশে আমেরিকান প্রায়োরিটি বদলের রহস্য এখানেই।  সেজন্যই হঠাত করে এই রদবদল ঘটেছিল।

    আর এর বিনিময়ে ভারত পায় – এক. একদিকে আমেরিকায় পণ্যের রফতানি বাজারে বিনা বা কম শুল্কে আমেরিকায় প্রবেশ সুবিধা, ভারতের আমেরিকান হাইটেক অস্ত্র আমদানি ইত্যাদি। আর দুই. এছাড়াও অন্য দিকে আমেরিকা ভারতের হাতে বাংলাদেশকে “দেখভালের দায়িত্ব” তুলে দেয় যাতে জঙ্গী ঠেকানো কথার আড়ালে ভারত বিনা পয়সার করিডোর, আসামের বিদ্রোহ দমনে বাংলাদেশকে ব্যবহারসহ এ দেশকে সরাসরি অন্যান্য নানান ব্যবহার করে সব সুবিধাই নিতে পারে ভারত।  প্রায় নিয়ন্ত্রক বনে ভারতের হাতে চলে যায় বহু কিছু। যেমন, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে ও প্রয়োজনে একটা গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে চীনের সাহায্য নিবে কিনা তা নির্ভর করবে ভারতের স্বার্থ এই অগ্রাধিকার যদি তা এলাও করে একমাত্র তবেই। এর সোজা অর্থ, ভারত বন্দর চায় না তাই বাংলাদেশ এটা করতে পারবে না।

    ফলে এভাবেই এরপর থেকে চলে আসছে আজ পর্যন্ত, আমাদের এই দুর্দশার শুরু এখান থেকে। কিন্তু সেই আমেরিকা এখন আবার আরও কী চায়? একই লোকদের আমরা আবার তৎপর হতে দেখছি কেন?

    গত ২০১৪ সালের নির্বাচন উপলক্ষ্যে আমরা দেখেছিলাম যে, সেবার বাংলাদেশের বিনা ভোটের নির্বাচনকে ভারত প্রকাশ্যে সদর্পে সমর্থন দিয়েছিল আর তাতে ভারত ও বাংলাদেশের সরকার এত ঘনিষ্ঠতায় মিলে গেছিল যে, তারা কেউই আর যেন আমেরিকাকে চেনেই না। বাংলাদেশে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ডন মোজিনা, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নিজের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে ব্রিফিং না পেয়ে বা না নিয়ে ভারতে গেছিলেন – এই ব্যাপারটা খুবই প্রতীকী নিঃসন্দেহে!

    বাস্তবতা হল, আমেরিকা এখন নিজের সব মুরোদই হারিয়েছে। চীন ঠেকানোর যে কাজ ভারতকে দিয়ে করানোর বিনিময় হিসেবে আমেরিকা ভারতের হাতে বাংলাদেশকে দেখার দায় তুলে দিয়েছিল, তাতে কি চীনের উত্থান ঠেকানো গেছে? প্রশ্নই উঠে না কারণ এভাবে তা হয় না।  তাই আমেরিকা তা ঠেকাতে পারেনি। কোন দাগও ফেলতে পারেনি, আমাদেরকে কষ্ট-দুর্দশায় ফেলা ছাড়া। বরং নিজেরই বেগতিক অবস্থায় আর দুর্দিনে আমেরিকা এক “পাগলা প্রেসিডেন্ট” পেয়েছে, যিনি নিজেই আমেরিকার গ্লোবাল নেতাগিরি ছেড়ে দিতে চান। তিনি নাকি ন্যাশনালিস্ট আমেরিকান! কী তামাশা! গ্লোবালাইজেশনের নেতা আমেরিকা, যে দুনিয়াটাকে অন্তত ৩০ বছর ধরে একটা গ্লোবালাইজড শ্রমবিভাজিত এক গ্লোবাল অর্থনীতিতে নিয়ে গিয়েছে, সেই আমেরিকার পাগলা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলছেন, উনি এখন নাকি ‘ন্যাশনালিস্ট’, সবকিছু “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিতে ফরে সাজিয়ে ফেলবেন বা হয়ে যাবেন। যেন বুড়া বয়সে বিড়াল বলছে সে আর মাছ খাবে না।

    কিন্তু ঘটনার কঠিন সত্য দিকটা হল, আমরা কেউই মায়ের গর্ভে ফিরে যেতে পারি না, পারব না।  এটা সম্ভব নয়। তাই এর চিন্তাই করি না। কিন্তু এই গোয়াড় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন এটাও নাকি করা সম্ভব। ব্যাপারটা এমনই নাকি সহজ। আসলে পাগলামি আর দেশ চালানো তো এক জিনিস নয়। তাতে আমাদের অসুবিধা নেই; কিন্তু যারা বাংলাদেশে আমেরিকান স্বার্থের দেখভাল করে সেই “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা” তাদেরকে আবার তৎপর হতে আর বড়ই পেরেশান দেখাচ্ছে। সমস্যাটা মূলত তাদের। মনে হচ্ছে তাঁরা এটা বুঝতে বা এই বাস্তবতা মানতে চাচ্ছেন না।

    অন্য রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করা ন্যায় কিনা কথা সেটা না। সে প্রশ্ন পাশে ফেলে রেখে আগালে এসব ব্যাপারে প্রথম দেখা প্রয়োজন হয় মুরোদ আছে কী না। কিন্তু ট্রাম্পের আমেরিকা মুরোদহীন। অর্থাৎ তিনি আমেরিকাকে মুরোদহীন করে ফেলেছেন অথবা আমেরিকা যে মুরোদহীন এটা মেনে নিয়েছেন। এখন ‘মুরোদহীন’ হলে আর সে তো মরদ থাকে না। তাই আমেরিকার মরদগিরি শেষ। ভারতকে বাংলাদেশ দিয়ে দেয়ার পর থেকে ঘটনাচক্রে আমেরিকাও এই মুরোদহীন হয়ে যায়, ট্রাম্পের উত্থানের মধ্য দিয়ে। তাই, ইতিহাসে ২০০৭ সালই সম্ভবত বাংলাদেশে ‘সর্বশেষ আমেরিকান হস্তক্ষেপ’ বলে উল্লেখ থাকবে। অন্তত ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত, মানে ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত আমেরিকা এমন থাকবে – অভিমুখ, ঝোঁক তাই বলছে। ২০২১ সালে (মানে ২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে) কে প্রেসিডেন্ট হিসাবে জিতে বসবে – ডেমোক্রাট না রিপাবলিকান, এছাড়া আবার সে কেমন প্রেসিডেন্ট হবে – এগুলো হাজারটা শর্তের “যদি-না-কিন্তু” এর প্রশ্ন। এককথায় বিষয়টা এখন পুরাটাই অনিশ্চিত। আর ততদিনে আমেরিকার আগের মতন বাস্তব হস্তক্ষেপের মুরোদই থাকবে না, তা না হলেও তা আরও কমে যাবে। বাস্তবতাই থাকবে না হয়ত। অতএব, বাংলাদেশের “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকান” – আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কিছুই হচ্ছে না। পারছেন না। আমরা জানি নভেম্বর ২০১৮ জেমস মাতিসের [Mattis] পদত্যাগ আপনাদের সব আশার বাতি নিভিয়ে দিয়েছে, আপনারা অনেক দুঃখ পেয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হল আসলে সেটাই শেষ।  মনে রাখতে পারেন – ট্রাম্প যতদিন অফিসে আছে তিনি সবকিছু ফ্রিজ করে দিবেন। এই সময়ের মধ্যে স্টেট ডিপার্টমেন্ট, পেন্টাগন ইত্যাদি যেখানেই যা কিছু নড়াচড়া শুরু হোক না কেন, সেসব হোয়াইট হাউজে যাওয়া মাত্রই ‘আমেরিকান স্বার্থের’ সবচেয়ে ‘ভালো ভালো উদ্যোগ ও প্রস্তাব’ তা যত ভালই হোক না কেন – এসবই ডিপ ফ্রিজে চলে যাবে। কারণ, পুরনো অভ্যাসে “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকার”  এসব তৎপরতার প্রতি ট্রাম্প ন্যূনতম আগ্রহী নন। এখান থেকেই এটাকে ‘মুরোদহীনতা’র শুরুও বলতে পারেন। কাজেই দিন শেষ!

    আসলে ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ যারা তাঁরা সম্ভবত আসলে খেয়ালই করেননি যে ২০০৭ সালেই তাদেরকে অসত্য বলা হয়েছিল। ‘ওয়ার অন টেরর’-এর ভয়াবহতার কথা তুলে তা সামনে রেখে এর আড়ালে আমেরিকা ‘চীন ঠেকানোর প্রায়রিটি’তে মেতে উঠেছিল। ভারতের হাতে সব তুলে দিয়েছে অথচ বাংলাদেশের বন্ধুদেরই তা বলেনি। আর বাংলাদেশের বন্ধুরা যদি জানতেনই তাহলে তারা বিশ্বাসঘাতক ও আত্মঘাতি। তবে তাদের শান্ত্বনা এই যে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে এসে আমেরিকার পক্ষে আর সত্য লুকায়ে রাখা সম্ভব হয় নাই।  ‘ওয়ার অন টেরর’ যে আর আমেরিকার প্রায়রিটি নয়, সে তা আর লুকিয়ে রাখতে পারেনি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস মাতিস এই সময়ে এসে আর না লুকিয়ে পরিষ্কার করে দিয়েছেন [Mattis: US national security focus no longer terrorism]। এটা ২০১৮ সালের শুরুতে ১৯ জানুয়ারি বিবিসির সংবাদ শিরোনাম। মাতিস বলছেন, “টেররিজম নয়, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা আমেরিকার জন্য প্রধান হুমকি”। অথচ এই কথাটাই ২০০৭ সাল থেকেই তাদের মনের কথা। কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে সিদ্ধান্তের সময় থেকেই সব স্তরে তা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। মুল কারণ দুনিয়াতে চীনা উত্থান অনিবার্যভাবে আসন্ন – সেকথা তারা তখনই গবেষণা সার্ভে ও স্টাডির রিপোর্ট প্রকাশের প্রাক-কাল অবস্থা থেকেই তা নিশ্চিত হয়ে গেছিল। আনুষ্ঠানিক এমন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ সালে।

    এই বিকল্প ডেভেলবমেন্টগুলো ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ এরা আমল করেছিলেন বা করতে সক্ষম ছিলেন তা তাদের কারবার ততপরতা দেখে কখনও মনে হয় নাই। কিন্তু এতে আসলে যা মূল জিনিষটা বদলে গেছে, বিশেষ করে খোদ ‘ফ্রেন্ডস’ শব্দটিরই সংজ্ঞা বদল হয়ে গেছে ট্রাম্পের হাতে, সেটাই কেউ আমল করেছে মনে হয় নাই। ট্রাম্পের আগমন ও উত্থান – তাঁর পরিচলন নীতিটাই আসলে বলে দিয়েছে, প্রশ্ন তুলে দিয়েছে যে – আদৌ আমেরিকার কোনো ফ্রেন্ড দরকার আছে কি না? ট্রাম্প নিজেই জবাব দিয়েছেন, যে দরকার নাই। আর যদি থাকেও, তারা ভিন্ন কেউ; অথবা বাংলাদেশে তার এমন ফ্রেন্ড আর লাগবে না। ট্রাম্প নিশ্চয় সরাসরি এ কথা বলেননি, তবে তাঁর অনুসৃত নীতি (ন্যাশনালিস্ট ট্রাম্প বা ট্রাম্পের নাশনালিজম) এই মেসেজটিই স্পষ্ট করে দিয়েছে।

    বাংলাদেশে আমেরিকান বন্ধুদের (Friends of America, in Bangladesh) বাংলাদেশকেই সবকিছুর জন্য দোষী ঠাউরানো – অস্বাভাবিক বা নতুন না। এটাই তারা সবসময় করে এসেছেন। যেমন এভাবে অনেকে এখনও বলছেন যে, ভাল ভাল “গণতান্ত্রিক দেশে”  তাদের পররাষ্ট্রনীতি নাকি “জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে” সমর্থিত ও সমৃদ্ধ থাকে বলে, পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জ তারা সহজেই মোকাবেলা করতে পারে। কিন্তু আমরা দুর্ভাগা; সেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারিনি। আবার প্রথম আলো পত্রিকা যে রিপোর্ট করছে তাতেও দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় প্যারায় তারাও লিখেছে এভাবে – “আলোচনায় প্রায় সব বক্তা অভিমত প্রকাশ করেন, যেকোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হল সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য সুদৃঢ় না হলে সেটি অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিরোধী দলে থাকতে একে অপরের বিরুদ্ধে ‘সার্বভৌমত্ব’ বিকিয়ে দেয়ার অভিযোগ করে থাকে, যা জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পরিপন্থী। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে ক্ষমতার পালাবদল হলেও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে পররাষ্ট্রনীতিও অনেকটা বদলে যায় বলে জনমনে ধারণা আছে। এ ছাড়া পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টি অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও সুশাসনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বলে মন্তব্য করেছেন একাধিক আলোচক”। অর্থাৎ সার কথা আমেরিকার কোন দোষ নাই। সব আমাদের দুই দলের রেষারেষির কারণে, তাই সবদোষ আমাদেরই।

    বিইআই ও আইআরআই-এর আলোচনা সভায় আমাদের রাজনৈতিক দলের ওপর সব দায় চাপিয়ে এমন মন্তব্য খুবই অনুচিত ও অবিচার তা বলাই বাহুল্য। কারণ, ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও অবস্থানের ব্যাপার কমবেশি সবই আপনারা তো জানেন। আমাদের রাজনৈতিক দলের বিবাদ আছে কথা সত্য, ফলে তা অনেক কারণের একটা । কিন্তু তা থাকলেও সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী কারণ তো – আমেরিকার হস্তক্ষেপ।

    ঠিক আছে তাহলে আসেন, আপনাদের বক্তব্যকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করে দেয়া ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ, আপনাদের বক্তব্যের দুদিন পরেই। ভেঙ্গে বললে, একটা বড় ঘটনাই ঘটেছে। সম্ভবত বলা যায় যে চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্প প্রসঙ্গে আমাদের সম্মিলিত বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে এটাই এই প্রথম আমরা প্রধান দলগুলো একটা সফল এককাট্টা অবস্থান প্রকাশ করেছে।

    তাহলে ঠিক এখনই আপনাদের নড়াচড়া কেন?
    সম্প্রতি চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্প প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে এই প্রথম প্রধান দলগুলো একটা সফল অভিন্ন অবস্থান প্রকাশ করেছে। আর এটা তারা করেছে ভারতের এব্যাপারে অবস্থান যাই হোক না কেন – এই প্রথম এটা ধরে নিয়ে। “গত ১৯ মে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘বাংলাদেশ চীন সিল্ক রোড ফোরাম’ গঠন করেছেন”। বেশির ভাগ পত্রিকার হেডিং এটাই। এর বেশির ভাগ কৃতিত্ব হয়ত বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদুতের – তা যারই হোক, এ ঘটনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভি, ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ঝাং জুয়ো -এদের উপস্থিতিতে সহায়ক সে কমিটি করা হয়েছে সেখানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানসহ অনেকে এর সদস্য হয়েছেন। মঈন খান বক্তৃতায় করেছেন। ওদিকে ড. গওহর রিজভী [Gowher Rizvi] ঐ সভায় দাবি করেছেন যে, “ভারত নিজেই এখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করছে”।

    এই কথাটার বাস্তবতা অবশ্যই আছে। তবু বাস্তবতা যতটুকুই থাক একেবারে মাঠের ফ্যাক্টস হল, এই গতকাল ১ জুন ২০১৯ ব্লুমবার্গ রিপোর্ট লিখেছে যে ট্রাম্প চীন ঠেকানোর ঠিকাদারিসহ  ভারতের সাথে কোন খাতিরের সম্পর্কই করতে চান না। সবকিছুর মাথা মুড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। কাগজ কলমে ভারত সুবিধাদিগুলো উপভোগ করত কারণ, ভারত আমেরিকার বিবেচনায় একটা উন্নয়নশীল দেশ [Developing Nation] ঘোষণা করা ছিল বলে। এখন ট্রাম্প সেটার মাথা মুড়িয়ে দিয়েছে, বলছে Trump Ends India’s Trade Designation as a Developing Nation.। এমনিতেই আগের ভারতকে দেয়া সবসুবিধা ( যা চীন ঠেকানোর বুটি হিসাবে ওবামা দিয়েছিল) ট্রাম্পের আমেরিকা বন্ধ করে দিয়েছিল গত বছর ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। শুধু তাই না উলটা ভারতীয় রপ্তানি পণ্যের উপর বাড়তি শুল্ক ট্যারিফ বসিয়ে দিয়েছিল যাতে রপ্তানিই অকার্যকর হয়ে যায়।

    কাজেই ভারত এখনও আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর খেপ মারতে” পুরানো শর্ত রাজি থাকলেও খোদ ট্রাম্প বাবাজিরই “মন” নাই। নট ইন্টারেস্টেড। এই ফ্যাক্টসটা আমল করলে বাংলাদেশের ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ এদের সব ততপরতাই পন্ডশ্রম। ওদিকে খেয়াল করলেই আমরা নিজেরাও বুঝব যে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলতে চীন গত বছর থেকেই পুরাপুরি তৈরি – এবং তা বাস্তবায়িতই হয়ে গেছে। এর প্রমাণ সফল  য়ুহান সম্মেলন (Wuhan Summit)। এমনকি এবছরও সম্ভবত পরের মাসে দ্বিতীয় য়ুহান সম্মেলন হতে চলেছে। এসব ততপরতার সার কথাটা হল এবার হয় ভারত চীনা শুধু বেল্ট ও রোড প্রকল্পেই না খোদ চীনা নৌকাতেই উঠবে। যদি কোন কারণে না উঠতে পারে, বনাবনি না হয় তবে পরস্পর কঠিন শত্রুতার দিন শুরু হবে। সুতরাং  নিঃসন্দেহে ভারত অনেক দাম চাইবে। যা তার দাম নয় এর চেয়েও বেশি হবে হয়ত সেই প্রাথমিক “asking price” । কিন্তু চীনা স্বার্থের চেয়েও বেশি এমন অসম্ভব অবাস্তব কিছু না চাইলে এই ডিল হবার সমূহ সম্ভাবনা। বিশেষ করে দুটা ফ্যাক্টস এর পটভুমিতে একথা বিবেচনা করা যায়। এক. চীন-আমেরিকার বাণিজ্য যুদ্ধ মিটিয়ে নিবার ডিল ব্যর্থ হয়ে গেছে যা, এখন পরবর্তি ঝড়ের অপেক্ষায় যা এখন আসন্ন। আর দুই. ভারত শত চাইলেও আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের কোন ডিল, কোন “খেপ” পাবার কিছুই নাই, কোন অফারও নাই। বরং পুরা উপেক্ষা আছে। ভারত চীনের কোলে গিয়ে উঠে বসলেও যেন ট্রাম্পের তা নিয়ে কোন পরোয়া নাই। ভারতকে এমনই তাচ্ছিল্যের মুডে আছেন ট্রাম্প। যার মূল কারণ হল, ট্রাম্প তার এখন প্রধান লক্ষ্য হল দ্বিতীয় বার নির্বাচনে দাঁড়ানো – এই মুডেই তিনি আছেন। আর তাই যা কিছু সিদ্ধান্ত তিনি এখন নিচ্ছেন তা সে উদ্দেশ্যেই প্রভাবিত। চীনের সাথে বিরোধ মিটিয়ে কোন বাণিজ্য ডিল না করা অথবা ভারতকে কোন বিশেষ সুবিধা না দেওয়া ইত্যাদি এমন সবই একারণে তুচ্ছ ট্রাম্পের কাছে। বরং তিনি বীর, তিনি আমেরিকান ন্যাশনালিস্ট – এই পরিচয় গড়তে তিনি একমাত্র ব্যস্ত যা দিয়ে তিনি নির্বাচন লড়বেন। যদি না আবার ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি হন!

    কাজেই ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ, আপনাদের উচিত হবে বাস্তববাদী হওয়ার, সময় পার হয়ে যাচ্ছে। পন্ডশ্রম অর্থহীন। বরং ফ্রেন্ডশীপ রিনিউ বা চেক করে দেখতে পারেন – তা এখনও বহাল আছে কী না।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    Goutam.das@gmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত  ০১ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “পররাষ্ট্রনীতি আমেরিকার বন্ধুদের নজরে“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

  • রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

    রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

    গৌতম দাস

    ১৩ মে ২০১৯, ০০:০৬

    https://wp.me/p1sCvy-2Ae

     

    চীনের মেগা অবকাঠামো প্রকল্প – বেল্ট ও রোডের দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত মাসের ২৫-২৭ এপ্রিল। আর সেই সম্মেলনের পাঁচ দিন আগে, ২০ এপ্রিল সম্মেলন সম্পর্কে মানুষকে জানান দিতে ঢাকার চীনা দূতাবাস প্রচ্ছন্ন থেকে এক স্বাগত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। এটাকে বলা যায় চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্পের পক্ষে এক প্রচারণার অনুষ্ঠান। “দ্য বেল্ট অ্যান্ড রোড” – এই নামে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই এক ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হবে এক থিঙ্কট্যাঙ্কের আয়োজনে – এই বার্তা পৌঁছে দেয়া ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। আর সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। সাথে সেখানে আরও অনেকের মধ্যে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রেখেছিলেন ঢাকায় চীনা চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স চেন উয়ি (Chen Wei )।

    সেখানে প্রধান অতিথি গওহর রিজভীর যে বক্তব্যে বেশির ভাগ মিডিয়ায় শিরোনাম করা হয়েছে সেটা হল, তিনি বলেছেন – চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ ‘ফিটস ইনটু আওয়ার ন্যাশনাল প্রায়োরিটি’ [as it ‘fits into our national priorities’…]। সেন্টার ফর ইস্ট এশিয়া ফাউন্ডেশন (Center for East Asia Foundation (CEAF) ) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। বেশির ভাগ বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা বিডিনিউজ২৪ পত্রিকা অনুসরণে রিপোর্টটি করেছিল, তাকে রেফার করে অথবা না করে। সম্ভবত সে কারণে অনেকেরই খবরের কমন শিরোনাম হল, গওহর রিজভী বলেছেন, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের সাথে একদম ফিট করে [China’s Belt and Road fits into Bangladesh’s priority: Gowher Rizvi]। আর বিডিনিউজের রিপোর্টের ছবিটাই একমাত্র ছবি দেখা যাচ্ছে যা কিছু ইংরেজি দৈনিকেও ব্যবহার করা হয়েছে। সম্ভবত বিডিনিউজের ছবিটাই সেটা। তাই, এক মানবজমিন ছাড়া অন্য সব বাংলা পত্রিকা কোনো ছবি ছাড়াই রিপোর্টটা করেছে। সবচেয়ে ভাল ট্রিটমেন্ট দেয়া নিউজ করেছে মানবজমিনে। আর এরপরের ভাল ট্রিটমেন্ট হল, বণিকবার্তারটা এখানে।  এমনকি চীনের পপুলার সরকারি পত্রিকাও শিনহুয়াও (Xinhua) গওহর রিজভিকে হাইলাইট করেই রিপোর্টটা কাভার করেছে।

    গওহর রিজভী সেখানে আরও বলেছেন, “আমাদের নিজেদের বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর, ) আছে, যেটা আসলে চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগেরই সংক্ষিপ্ত ভার্সন [ “We had our own BCIM (Bangladesh, China, India and Myanmar Economic Corridor) which is essentially a reduced version of the Belt and Road Initiative,”]। বণিকবার্তা আরও জানাচ্ছে – গওহর রিজভী বলেন, “বাংলাদেশ এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে গর্বিত। বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও উদ্যোগের মডেল”।

    এ ছাড়া সেখানে, গওহর রিজভি আর এক বিশাল দাবি করেছেন। তিনি চীন ও ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে সাংবাদিকদের কিছু প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তার বৈদেশিক সম্পর্কগুলো সামলানোর দিক থেকে খুবই সফল” [“Bangladesh is extremely successful in managing its foreign relations,” added Gowher.] কিন্তু কিভাবে সেটা? তিনি বলছেন, আমরা “কোনো দিকে কোনো পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলি” বলেই আমাদের এই সফলতা ; [“It has always avoided taking sides,”]।
    খুবই ভাল আর গর্বের কথা বটে। কিন্তু আসলেই কী তাই!

    গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলপ্রকাশ ও নতুন সরকার গঠনের পরপরই আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০ জানুয়ারি ভারতীয় ‘সিএনএন-নিউজ১৮’ টিভিকে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে এবং সুনির্দিষ্ট করে বিসিআইএম প্রকল্পে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার কথা ভারতকে জানানো তো বটেই, উল্টো ভারতকেও আহ্বান করেছিলেন, যাতে দ্বিধা-আপত্তি ফেলে তারাও এতে যোগ দেন। বলেছিলেন “বিসিআইএম প্রকল্প স্বাক্ষরের পর আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই” [“After signing that agreement, I think there is no reason to worry about the corridor for India,” ]। আর ‘ভয় পাওয়ার কোনো ইস্যু থাকলে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয়ভাবে’ (বাংলাদেশকেও সাথে নিয়ে) কথা বলে তা মিটিয়ে নিতে পারে ভারত। হাসিনার এই সাক্ষাৎকারের আলোকে দেখলে গওহর রিজভীর গতমাসের এই বক্তব্য এরই ধারাবাহিকতা মনে হবে।

    রিজভীর এই বক্তৃতা ২০ এপ্রিলের। বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলন ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়ার কথা। তাই এমনকি রিজভী ওই সভায় জানিয়েছিলেন, আমাদের শিল্পমন্ত্রী দ্বিতীয় সম্মেলনে বাংলাদেশ দলকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। সব ঠিকঠাক, কিন্তু একটা ‘কিন্তু’। কোথায় গেল গওহর রিজভির “কারও কোন পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলির” – কূটনীতিক সাফল্য?

    এর ঠিক তিন দিন পর, ২৩ এপ্রিল মানে চীনে মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলনের দুই দিন আগে  – আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের হঠাত এক সাক্ষাৎকার ছাপা হয় হংকংয়ের দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে। এর শিরোনাম হল, ‘বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে” [Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans as it seeks to fund future development]।’
    তাহলে কী দাঁড়াল ব্যাপারটা? যে মেগা প্রকল্পকে বাংলাদেশ ‘স্বাগত জানায়’, আমাদের “প্রায়োরিটির সাথে যা খাপে খাপে মিলে গেছে” বলে দাবি করি, আমরা যার “অংশ হতে পেরে গর্বিত”, আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ‘সাকসেস স্টোরি’, ইত্যাদি কথা বললেন গওহর রিজভী দুই দিন আগে, সেসব বয়ান এবার উল্টো রথে গেল কেমন করে? আর  পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তিনিইবা কেন এবং কিভাবে বলছেন, বাংলাদেশ ‘চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে?’ এমনকি যেখানে ওই ২৩ এপ্রিলই আমাদের শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ হুমায়ন বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের সম্মেলনে যোগ দিতে চীন রওনা হয়েছেন! আসলেই এটা সত্যিই এক বিরাট তামাশা যে, মানুষ যা নিয়ে “গর্ব করে” তারই আবার “বিকল্প খোঁজে” কিভাবে এবং কেন?

    এরপর থেকে সব সুনসান, শিল্পমন্ত্রীও চীন থেকে ফিরে এসেছেন। মনে হচ্ছে চুপচাপ থাকছেন। কারণ, মিডিয়ায় এ নিয়ে কোনো রিপোর্ট প্রচারিত হয়নি। ভারত আগের মতোই, তারা এবারের বেল্ট ও রোড মেগাপ্রকল্পের এবারের সম্মেলনেও নাই। যদিও ভারতের মিডিয়ার পাল্টা প্রপাগান্ডা আছে। যেমন ভারতের বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা রিপোর্ট করেছিল, তারা খুব খুশি যে, “বিসিআইএম প্রকল্প নাকি এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনে বাদ” [China drops BCIM from BRI projects’ list] দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সে সময়ের ‘আবহাওয়া’ ভারতের দখলে, অন্তত ৮ মের আগ পর্যন্ত। ওই আবহাওয়ার ভারতীয় মেসেজ ছিল এমন যেন বলতে চাচ্ছিল – বাংলাদেশ বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে “অগ্রাধিকার খুঁজে পেয়ে” বা এতে “গর্বিত” হয়ে বা ভারতকে এ প্রকল্পে যোগ দিতে “ভয় নেই” বলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ‘আহ্বান রেখে’ যেন বিরাট অন্যায় করে ফেলেছেন। তাহলে আসলেই কি আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে আমরা কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলতে পেরেছি, নাকি ভারতের আপত্তির ভয়ে সিটকে গেছিলাম? কিন্তু কেন?

    ক্ষমতা কেন নিজেকে বিশ্বাস করতে পারবে না যে সেই ক্ষমতাঃ
    কথা এটা নয় যে, বর্তমান সরকার বৈধ কি অবৈধ, নির্বাচিত প্রতিনিধি কিংবা নয়, সুষ্ঠু ভোট হয়েছে কি হয়নি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছেন, এটাই বাস্তব। তার হাতেই ক্ষমতা আছে। তিনিই ডি-ফ্যাক্টোভাবে ক্ষমতায় আছেন। মানে, পদ-অধিকারী হিসেবেই তিনি ক্ষমতায় আছেন। তিনিই ক্ষমতাসীন এবং প্রধানমন্ত্রী। ফলে নিজ ক্ষমতায় অবিশ্বাস করার কী আছে? কিন্তু খোদ ক্ষমতা যখন বিশ্বাস করতে পারে না যে সেই ক্ষমতা বা তার কাছেই ক্ষমতা তখন – এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে!

    গত ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে আর একটা বিষয় প্রমাণিত হয়েছে, ভারতের সমর্থন ছাড়াই এই সরকার একটা নির্বাচন পেরিয়ে নিজেকে পুনর্নির্বাচিত করাতে পারে। তখন থেকে এটা দাঁড়িয়েছে যে, ভারতের সমর্থন পাওয়া কথাটা আসলে ফেটিশ, ভুতুড়ে! কোন মানে নাই, অর্থহীন। তাতে বাংলাদেশে ওই নির্বাচনের কোয়ালিটি যেমন হোক না কেন, তাহলে ক্ষমতা কেন বুঝতে পারে না যে, সে-ই বাস্তবে ক্ষমতায়?

    ধন্যবাদ দিতে হয় বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদূতকে। তিনি আমাদের ‘উদ্ধার’ করেছেন। আমাদের মিডিয়ার মুখে কিছু শব্দ দিয়েছেন। তিনি বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের গত ২৫-২৭ এপ্রিলের দ্বিতীয় সম্মেলনের সফল সমাপ্তিতে গত ৮ মে ঢাকায় মিডিয়া ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেছিলেন। তিনিই সদর্পে আমাদের জানালেন, বিসিআইএম প্রকল্প বহাল তবিয়তে আছে। শুধু তাই নয়, তিনি আশা করেন ভারতও এতে যোগ দেবে (‘হোপ ইন্ডিয়া উড বি পার্ট’)। আর এতে যেন বুঝিয়ে দিলেন, আমাদের সরকারের নিজের থেকে নিজের ‘মুখ লুকিয়ে রাখা’র কিছু নেই।

    আচ্ছা, আগামীতে ভারত চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে যে যোগ দিবে না, এর নিশ্চয়তা কী? কোথায়, কে দিতে পারে? কেউ কী পারে? তাহলে? আমরা কার কেন, ধমকানি শুনছি কী?

    আমরা কি জেনে অথবা না জেনে ভারতের পক্ষে ভাঁড় ও ভার হয়ে দাঁড়াতে চাইছি, যাতে মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার বিনিময়ে ভারত চীনের থেকে বিশাল বার্গেনিং সুবিধা লাভ করতে পারে? কিন্তু এতে আমাদের কী লাভ? আর ভারত নিজের লাভের পোটলা বাধ হয়ে গেলে আমাদের জন্য কী কোন অপেক্ষা করবে, চিন্তিত হবে? আমরা কী পেলাম তা জানার কী ভারতের কোন আগ্রহ থাকবে? নাকি থাকতে পারার কথা! নাকি নিজের পথে হাটা দিবে? এগুলো আমাদের না বুঝতে পারার তো কিছু নাই।

    তাহলে ক্ষমতা কেন বিশ্বাস করতে পারে না যে সে-ই ক্ষমতা!

    গত ৮ চীনা রাষ্ট্রদূতের সংবাদ সম্মেলনের ইস্যু মিডিয়ায় কিছুটা তোলপাড় তুলেছে। ৯ মের আগে বাংলাদেশে কোনো মিডিয়া এই সম্মেলনের কাভার রিপোর্ট ছাপেনি। আর পরের দিন ১০ মে দুপুরেই কলকাতার আনন্দবাজারে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়ামূলক রিপোর্ট তোলপাড় এনেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে- আনন্দবাজারের রিডিং হল, চীনা রাষ্ট্রদূত বিসিআইএম প্রকল্পকে এবার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে পেঁচিয়ে তুলে ধরছেন। ব্যাপারটা নাকি এখন চীনের ‘অর্থনৈতিক করিডোরকে সামনে এনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে তাকে যুক্ত’ করে পদক্ষেপ নেয়া হলো। এর ফলে ‘যা ভারতের পক্ষে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হবে না’।

    হ্যাঁ কথা সত্য, রোহিঙ্গা ইস্যু আর বিসিআইএম ইস্যুকে তিনি জড়িয়েছেন। কিন্তু এমন কথা তো নতুন নয়। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিনিয়োগসহ ব্যাপক অর্থনৈতিক তৎপরতা শুরু করা গেলে সেটাই হবে রোহিঙ্গা সমস্যার ভালো সমাধান – চীনা রাষ্ট্রদূত এ কথাই বলেছেন। ঠিক যেমন অনেক প্রগতিবাদী বলেন ও ব্যাখ্যা দেন যে, আলকায়েদা বা আইএস তৎপরতা বৃদ্ধির কারণ অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা। ফলে তরুণেরা কাজকাম পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তরুণেরা আর আলকায়েদা বা আইএস করবে না”।’ এমন যুক্তি দেওয়ার অনেক লোকই আছে। তা থাক। চীনের রাষ্ট্রদূতও দিয়েছেন, তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। বরং এ বক্তব্যকে স্বাগত। কারণ, ভারত যদি একমাত্র এমন বয়ানে ভয় পেয়ে থাকে কিংবা তার কানে পানি ঢোকে কিংবা এই বয়ানে ভয় পেয়েছে বলে ভারত এটাকে অছিলা হিসেবে ব্যবহার করে, মোটা দাঁও মেরে চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে আমাদের আপত্তি করার কী আছে? কিছু নেই।

    এ ছাড়া আর একটা অর্থে আমরা রাষ্ট্রদূতের কথা বুঝতে ও গ্রহণ করতেই পারি। বিসিআইএম প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করা হয়েছে দেখতে চাইলে এর আগেই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে, মানে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে কোনো টেনশন নেই, এটা অবশ্যই দেখতে পেতে হবে। মিয়ানমারের সাথে টেনশন ও অবিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়ে থাকবে; অথচ পাশাপাশি বিসিআইএম প্রকল্প বাস্তব দেখতে চাইছি, এমন তো হতেই পারে না। ফলে রোহিঙ্গা ও বিসিআইএম একসাথে যুক্ত হয়ে থাকারই ইস্যু। তা ভারত বা আনন্দবাজার যেভাবেই বুঝুক।

    তবে প্রথমত আনন্দবাজারের ওই রিপোর্টকে পড়তে হবে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ইনফরমাল প্রতিক্রিয়া হিসেবে। কারণ পেছনের কাহিনী সাধারণত এমন হয় যে, আনন্দবাজার ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য জানার পর তা নিয়ে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কারো কাছে গেলে তাঁরা আনন্দবাজারকে “এমন রিপোর্ট করতে পারে” বলে সায় জানিয়েছে – এরকমই কিছু একটা হয়েছে বলে মনে করা যায়। কারণ “কারো” সাথে কথা না বলে এমন রিপোর্ট সাধারণত করা হয় না, এটা নিশ্চিত থাকতে পারি। কিন্তু বিদেশ মন্ত্রণালয় এমন গুড মুডে কেন যে, এমন চীনাপ্রীতি বা সহানুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে আনন্দবাজারের রিপোর্টে? এটাই আসল বিষয়। কারণ আসলে, ‘মুড কুছ এইসাই চলতা হ্যায়’ আজকাল।

    সংক্ষেপে মূলকথাগুলো হল – ইইউকে চীন নিজের বেল্ট-রোড মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে গিয়ে পশ্চিমের নেয়া বা গ্লোবাল প্রকল্পে সেসব “স্ট্যান্ডার্ড প্রাকটিস” অনুসরণ করা হয় সেগুলোকেই চীনও অনুসরণ করতে রাজি হয়ে যায়, যেটা চীন-ইইউর গত মাসের সামিট থেকে প্রকাশিত তাদের “যৌথ ঘোষণায়” ঠাঁই পেয়েছে। ঠিক একই ইস্যুগুলো একমত হয়ে চীন ও সম্মেলনের রাষ্ট্র-সরকার প্রধানদের এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাতেও তুলে এনে প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে চীনের বিরুদ্ধে ‘ঋণফাঁদ’ প্রপাগান্ডার সুযোগ অচিরেই বাস্তবে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কারণ, নীতিগত দিকটি ইতোমধ্যে চীনের কাছে এগুলো গৃহীত। এরই লেজ ধরে এবার চীন এগিয়েছে। ভারতকেও নিজের মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে পরিকল্পনা করেছে। তা করতে গিয়ে চীন ভারতের জন্যও এক পুরা প্যাকেজ নিয়ে তৈরি হয়েছে। এর প্রাথমিক দিক ইতোমধ্যেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব গোখলের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের আগেই ২১-২২ এপ্রিল গোখলের সেই চীন সফর ঘটে গেছে। কিন্তু যতই গুরুত্বের ছিল এই সফর, গোখলেরা ততই এটাকে একেবারে অগুরুত্বপূর্ণ, ‘রুটিন’ সফর বলে প্রচার করে রেখেছেন। ভারতীয় থিঙ্কট্যাংক ওআরএফ এর মনোজ যোশীও তার লেখায় ব্যাপারটাকে “খুবই রুটিন” বলে ঢেকে দিতে চেয়েছেন। তবুও ঐ প্যাকেজের দু’টি বিষয় প্রকাশিত হয়ে গেছে বা করা হয়েছে। কাশ্মীর বিচ্ছিন্নতাবাদী মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের তালিকায় তুলতে চীনের আপত্তি প্রত্যাহার আর ভারতের সাথে বিতর্কিত বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা যা এতদিন চীনের অংশ বলে চীনের ম্যাপে দেখানো হইয়েছে সেসবের অনেক কিছু, তা এখন থেকে প্রত্যাহার। দু’টিই মূলত চীন-ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এক আন্ডারস্টান্ডিংয়ের অংশ। যে কারণে এ দুই ইস্যুতে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক। তবে মোদী আজহারসহ দু’টি ইস্যুকে চলতি নির্বাচনে নিজের সাফল্য বলে ব্যবহার করতে চায় – একারণেই  এ দুটা ইস্যু কেবল আগে প্রকাশিত হয়ে গেছে।

    আসলে পুরো প্যাকেজ নিয়ে চীন অপেক্ষা করছে – ভারতের নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হলেই নতুন সরকারের সাথে চীন আলোচনা ও নেগোশিয়েশন শুরু করতে সে অপেক্ষা করছে। গত বছরের মত সম্ভবত আর এক ভারত-চীন শীর্ষ সামিট – ‘য়ুহান সম্মেলন টু’ থেকে সব কিছু চূড়ান্ত করা হবে বলে গোখলের সাথে প্রাথমিক বোঝাবুঝি হয়েছে। মিডিয়ার অনুমিত রিপোর্টগুলো এরকমই। এরমধ্যে দ্যা হিন্দুর এই রিপোর্টটা ভাল ইনফরমেটিভ। রিপোর্টার অতুল আনিজা চীনে অবস্থিত দ্যা হিন্দুর একমাত্র স্থায়ী প্রতিনিধি। চীনের লক্ষ্য ভারতকে যত দূর অফার করা যায়, এর সর্বোচ্চটা দিয়ে হলেও নিজের মেগা প্রকল্পে ভারতকে শামিল করে নেয়া। এটা এমন অফার হবে যে, ভারত রাজি না হওয়া মানে হবে, বেশি চিপা লেবুর দশা।

    এখন খুব সম্ভবত আমরা বুঝে না বুঝে ভারতের ভাঁড় অথবা ভারতপক্ষে বার্গেনিং ভার হতে চাচ্ছি। শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ খোলা এই অপ্রয়োজনীয়  নিজের পিঠে নিজেই ছুরি মারা প্রতিক্রিয়াই ঘটিয়েছি আমরা। ওইদিকে গওহর রিজভীর বক্তব্য- বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে – ‘ভারতের কোলে’ বসে এসব কথা তিনি কেন বলেন? এতে কোন বাহাদুরি হয়? এর সদুত্তর পাওয়া মুশকিল। আমরা যদি শক্তিহীনই হই তো চুপ থাকতে পারতাম, অন্তত! শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ না খুলে কী পারত না? কী ক্ষতি হত? নাকি আমরা কী এতই ঠেকছি যে নিজের ফেলা থুতু চাটতে হয় আমাদেরকে !

    চীন-ভারত সম্ভাব্য বার্গেনিং রফায় আমরা ভারতের পক্ষে চীনের বিপরীতে ‘ওজন’ হব কেন? আমরা কেন চীন-ভারত সম্পর্কের উচ্ছিষ্টভোগী অবস্থান বেছে নিবো? চীন ও ভারতের মধ্যে কোনো রফা যদি নাই হয় তবে সেক্ষেত্রে চীনের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক কেন হতে পারবে না? এটাই কি গওহর রিজভীর ‘বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে?’ এর আসল চিত্র? এ বুঝগুলো তারা কাকে দিলেন? দিলেন কেন?

    দুঃখের কথা পদ-অধিকারী হয়ে থেকেও ক্ষমতা নিজেকে বিশ্বাস করছে না যে, সে-ই ক্ষমতা। সাংবাদিক ব্রিফিংয়ে চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য কি আমাদের সেই ক্ষমতাবোধ ফিরে জাগাতে ভূমিকা রাখতে পারবে!

    ———–মূল লেখা এখানেই সমাপ্তি। ————-


    বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে – বিস্তারিত, যাদের পড়বার মত বেশি সময় আছে তাদের জন্যঃ
    এখানে “বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে” পাঠককে আবার মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে। এটা মূলত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কেন্দ্রিক চারদেশীয় সড়ক ও রেল সংযোগ প্রকল্প। এটা সিঙ্গাপুরের গভীর সমুদ্র বন্দরে মালসামান নামিয়ে এরপর আবার ছোট লাইটার জাহাজে করে তা চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর এনে – এভাবে বাংলাদেশকে মহাসমুদ্র হয়ে বিদেশের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া নয়। তাই, প্রথমত এটা লাইটার জাহাজ আর না বরং মহাসমুদ্রগামী (Ocean Shiping Line) জাহাজ এখানে সরাসরি সোনাদিয়া বন্দরে কনটেইনার নামাবে। এরপর চার দেশ [বাংলাদেশ, চীন (মানে পুর্বচীন কুনমিং-এ), ইন্ডিয়া (পূর্বে কলকাতা) ও মায়ানমার] যার যার কনটেইনার সরাসরি নামিয়ে সহজেই তা নিজ দেশে নিতে পারবে; চাইলে আগের মতই আবার লাইটার জাহাজে অথবা সরাসরি সড়ক বা রেল পথে। এই সড়ক বা রেলপথের রুটটা হল – সোনাদিয়া [কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার অন্তর্গত] থেকে মায়ানমার হয়ে চীনের পুবদিকে কুনমিং-এ পৌছানো। আর ওদিকে ভারত সোনাদিয়া হবু বন্দরে যুক্ত হতে পারে লাইটার জাহাজে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার থেকে। অথবা কলকাতা থেকে যশোর হয়ে সড়ক বা রেল পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কর্ণফুলি টানেল হয়ে সোনাদিয়া বন্দর এভাবে। আসলে এই চারদেশের পুর্বদিকে যার যা জেলা অথবা প্রদেশ তা সবই ল্যান্ডলকড পাহাড়ি ভুমিঅঞ্চলে আবদ্ধ। চীনের পশ্চিম দিক যেমন হিমালয়সহ অন্যান্য পাহাড়ে আবদ্ধ; তেমন ওর দক্ষিণ দিক পুরাটাই আর বিশেষ করে দক্ষিণপুর্ব কোনা এটাই কুনমিং অঞ্চল – এটাও ল্যান্ডলকড। চীনের একমাত্র সেন্টার পুর্বদিকটাই সরাসরি সমুদ্রে উন্মুক্ত। কোন রাষ্ট্রের সমুদ্রে-উন্মুক্ত দিক নাই – তা একটা অঞ্চল নাই অথবা কোন দিকেই নাই এটা সেই রাষ্ট্রকে যোগাযোগ ব্যবসা বাণিজ্যে পিছনে ফেলে রাখবে – এই হল ব্যাপারটা বুঝার সরল ফর্মুলা। তাই এই চার রাষ্ট্রের জন্যই সোনাদিয়া বন্দর হল নিজ নিজ ল্যান্ড লকড অঞ্চলকে সমুদ্রে-উন্মুক্ত করার সুযোগ নেয়া। বিশেষ করে চীন যেমন তার পশ্চিম অঞ্চলকে চীন-পাকিস্তান করিডর প্রকল্পের বড় সুবিধাভোগী হয়ে নিজেকে “সমুদ্রে-উন্মুক্ত” করার সুযোগ নিয়েছে। ঠিক তেমনি পুবদিকে সে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পের সুবিধাভোগী হয়ে সমুদ্রে-উন্মুক্ত হতে চাইছে। সোনাদিয়া বন্দরসহ এই বিসিআইএম প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারি ফলে অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী হবে চীন; ফলে এর অবকাঠামো ঋণ পরিশোধে বড় রাজস্ব আয় আসবে ব্যবহারকারি চীনের কাছ থেকে।
    বাংলাদেশ হবে আর এক বড় সুবিধাভোগী যে সিঙ্গাপুর নির্ভরতা ত্যাগ করতে পারবে। এছাড়া পুরা প্রকল্পের মূল ততপরতা কেন্দ্র নিজভুমিতেই নির্মিত হবে বলে এর সুযোগে নিজ অর্থনীতিকে এক আঞ্চলিক হাব – বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠার সুযোগ পেয়ে যাবে।

    ভারতের আসল ল্যান্ডলকড অঞ্চল হল তার নর্থ-ইস্ট; মানে বাংলাদেশের উপরে বা, পুরা উত্তর-জুড়ে আমাদের সুনামগঞ্জ টু পঞ্চগড় এই পুরা পুব-পশ্চিম কোণার উপরে, সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল। [পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল – এরই পুব দিকটা হল মায়ানমারের পশ্চিমে, তার ল্যান্ডলকড অঞ্চল।] ভারতের নর্থ ইস্ট মানে মূলত প্রধান বড় অংশ আসামসহ বাকি ছোট ছোট পাহাড়ি মোট সাত রাজ্য। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে তাদের বাংলাদেশের উপর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে সুক্ত হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কেবল আমাদের উত্তর পশ্চিম কোণে মানে তাদের শিলিগুড়ি চিকন-গলা হয়ে আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্ট পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে এখন যুক্ত।

    আসামের মুল সমস্যা মুসলমান বা বাংলাদেশি মুসলমান এগুলা কিছু না। মূল সমস্যা ল্যান্ডলকড। সমুদ্রে-উন্মুক্ত কোন অঞ্চল বা পথ নাই, এক কলকাতা যাওয়া ছাড়া।
    কিন্তু নেহেরু থেকে এপর্যন্ত ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আসলেই পুরাপুরি দ্বিধাগ্রস্থ যে তাঁরা নর্থ-ইস্টকে ল্যান্ডলকড মুক্ত করতে চায় কী না! তারা একেবারেই নিশ্চিত না যে তারা আসলে কী চায়। এই কথা কিসের ভিত্তিতে বলছি? বলছি কারণ বিসিআইএম প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান। প্রথমত ভারত “বিসিআইএম প্রকল্প” বলতে যা বুঝে সেটা সোনাদিয়ায় কোন বন্দর ছাড়াই, কেবল চারদেশের সড়ক বা রেল যোগাযোগ প্রকল্প। অর্থাৎ ভারতের নেতৃত্ব কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্টকেই – এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকার সুবিধার আওতায় আনতে দেখতে চায় না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ভারত যতদিন বিসিআইএম প্রকল্পে সক্রিয় ছিল, টেকনিক্যাল বা রাজনৈতিক সভায় অংশ নিয়েছে সেখানে কোথাও ‘বন্দর’ বা ‘সোনাদিয়া’ শব্দ উচ্চারিত হতে দেয় নাই। সেটা ছিল চীনের বেল্ড ও রোড মেগাপ্রকল্প আইডিয়া হিসাবেই হাজির ছিল না। তাতেই বিসিআইএম প্রকল্প বলতে ভারত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর ছাড়াই কেবল চারদেশের সড়ক ও রেলের বাইরে অন্যকিছু আমল করতে চাইত না। পরে বেল্ট ও রোড প্রকল্প গেড়ে বসার পরে এর সাথে বিসিআইএম প্রকল্প যুক্ত করার প্রস্তাব আসাতে এই সুযোগে সবকিছু থেকেই ভারত দূরে থাকার সুবিধা নেয়।অর্থাৎ সোজা কথায় কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকা ভারতের নেতৃত্বের ভারতের স্বার্থের জন্য কোনই দরকারি মনে করে না। বরং বিনা পয়সায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর নিয়ে লাইটার জাহাজের উপযুক্ত বাংলাদেশের দুই বন্দর ব্যবহার করতে পেলে ভারত আর কিছু দরকার মনে করে না। আসাম বরং ‘বাংলাদেশি কথিত অনুপ্রবেশকারি’, ‘তেলাপোকা’ বা ‘মুসলমান খেদাও’ আন্দোলন করবে – এতেই ভারতের স্বার্থ, ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যত বলে বিশ্বাস করে ভারতের দলগুলো প্রায় সবাই। ভারতের অবস্থান যে ঠিক বুঝিছি আমরা এর আর এক সর্বশেষ প্রমাণের দিতে তাকানো যাক।

    আট মে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদুতের সংবাদ সম্মেলনকে নিয়ে কেন ভারত এসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে আনন্দবাজার সেসব সাফাই জানিয়ে এক পালটা রিপোর্ট করেছে। লিখেছে,

    “কূটনীতিকদের মতে, ঘোরতর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বিসিআইএম নিয়ে প্রকাশ্যে নিজেদের অসন্তোষ জানাতে পারে না ভারত। কারণ বাংলাদেশ এবং মায়নমারের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এই প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত। অথচ ভারতের আপত্তির প্রধান কারণটি নিরাপত্তাজনিত। বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে”।

    যাক, গত পরশুদিনের আনন্দবাজার ভারতের অবস্থান সম্পর্কে আমাদের বুঝ ও অনুমান পুরাপুরি সঠিক- তাই নিশ্চিত করল। এর মানে দাড়াল কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই অঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ল্যান্ডলকড করেই রাখতে চায়, দমবন্ধ করেই রাখতে চায়। কারণ এরা গভীর সমুদ্রে উন্মুক্ত হয়ে গেলে, অর্থনৈতিক ততপরতা ভাইব্রেন্ট হয়ে গেলে তারা আর ভারতের নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে। কথাগুলো শুনে মনে হল খামোখা রক্ষণশীল বাবা কথা বলছে যে মেয়েকে স্কুলে দিলে সে ছেলেদের সাথে পালিয়ে যেতে পারে। বলাই বাহুল্য কথিত সেই দুস্ট ছেলে হল চীন!

    সেকথাটাও চীন হাট করে খুলেই বলছে। পরিস্কার করেই লিখেছে, বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে”। এজন্যই নাকি চীনা বিনিয়োগ না। কেবল জাপান বা সিঙ্গাপুরের নাকবোচা ছেলের সান্নিধ্য অনুমোদিত ছিল গত পাঁচ বছর। বাহ বাহ, ভারত বাপের কী বুদ্ধি!
    কিন্তু সরি দুটা ভুল তথ্য আছে এখানে। ভুগোল-বোধের সমস্যা আছে। কলকাতা থেকে ঢাকা পরে সোনাদিয়া বন্দর হয়ে মায়ানমারের উপর দিয়ে চীন যেতে গেলে পথে ভারতের নর্থ-ইস্টের কোন রাজ্য পড়বে না। সোনাদিয়া হবু বন্দর থেকে চীনের উলটা পথে একমাত্র আমাদের ফেনী বা আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরায় প্রবেশ করলে এরপর আসামের নাগাল পাওয়া গেলেও যেতে পারে।অর্থাৎ আনন্দবাজারের কথার তালমাথা নাই। এর সোজা সমাধান হল ভারত বিসিআইএম প্রকল্প থেকেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলেই তো পারে। মানে সেক্ষেত্র্বে প্রকল্পের নাম হবে বিসিএম প্রকল্প সোনাদিয়া বন্দর করিডোর প্রকল্প। কিন্তু এটাও ভারত হতে দিতে চায় না। কেন? সেটা কী কোন ঈর্যা জনিত? কেন?
    দ্বিতীয় ফ্যাক্টসের গড়মিল হল বিজেপির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি রামমাধব তাহলে গতবছর চীনে গিয়ে নর্থ-ইস্টের জন্য বিনিয়োগ আনতে দেন-দরবারে করেছিলেন কেন? According to a PTI report, the latest Indian plan was conceived after a ministerial delegation from the northeastern states of Assam, Tripura and Nagaland led by Ram Madhav, a senior leader from the ruling Bharatiya Janata Party (BJP), visited the southern Chinese city of Guangzhou and held talks with both Chinese and Indian businessmen. ভারত মুখে এককথা আর পেটে বা মনে অন্য কথা রেখে দিয়ে আগাতে চায়; ভারতের মিডিয়াও এর থেকে বাইরে নয়।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা এর আগে গত  ১১ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

    বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

    গৌতম দাস

    ০৬ মে ২০১৯, 0১:৩৬

    https://wp.me/p1sCvy-2zV

     

    The Second Belt and Road Forum for International Cooperation

    চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প, গত ২৫-২৭ এপ্রিল ছিল এবিষয়ে তাদের দ্বিতীয় সম্মেলন বা সামিট। যার পুরা আনুষ্ঠানিক নাম হল “The Second Belt and Road Forum for International Cooperation”, সংক্ষেপে বিআরএফ [BRF]। গত ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সামিটের মত এবারও এটা বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বলা হয়, বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আইডিয়া চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালের অক্টোবরে কাজাখাস্তানের এক সম্মেলন থেকেই প্রথম হাজির করেছিলেন। সেই থেকে ধরলে গত ছয় বছরে এই মহা প্রকল্পের মুখ্যনাম এক-দু’টা থাকেনি, কয়েকটা হাজির হয়েছে। ঠিক যেমন চলতি এই দ্বিতীয় সম্মেলনে এর নাম দেয়া হয়েছে “বেল্ট ও রোড ফোরাম” বা বিআরএফ। প্রথম সামিটে যেখানে নাম ছিল “বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ” বা বিআরআই।

    ২০১৭ সালে এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলনকে ডাকা হয়েছিল “বেল্ট রোড সামিট” বলে। সম্ভবত বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে প্রথম সম্মেলন ছিল সেটি, সেদিকটা মুখ্য করতে। ওদিকে জন্মের শুরুতে এর নাম ছিল সিল্ক রোড প্রকল্প, সিল্ক রুট প্রকল্প, ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইত্যাদি অনেক কিছু।
    আসলে প্রকল্পের আইডিয়া ও এর বাস্তবায়নের বিষয়টা ছিল খুবই ব্যাপক, যে কারণে এটাকে শুধু প্রকল্প না বলে মহাপ্রকল্প লিখছি। আর এর চেয়ে বড় ব্যাপার হল, বিষয়টার বহু কিছুই ইভলভিং [evolving] বা ফুলের পাপড়ি খোলার মত বীজ আইডিয়াটা ক্রমান্বয়ে বাস্তব ও স্পষ্ট হয়েছে। কাজেই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পে নতুন নতুন মুখ্যনাম বলাতে বিষয়টা একেক সময় একেকটা, এমন অবশ্যই নয়। বরং বলা যায় একই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আনফোল্ডিং [unfolding] মানে ক্রমেই ভাঁজ খুলে নিজেকে পূর্ণ আর স্পষ্ট অবয়বে হাজির করা হয়েছে। আর সেই সাথে অবশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে ক্রমেই নেগোসিয়েশনে বা পরস্পরের সুবিধা-অসুবিধাগুলো আমলে নিয়ে নতুন বোঝাপড়ায় যাওয়া – আর সেই ভিত্তিতে এসবের চুক্তি সম্পন্ন করা। “ক্রমেই ভাঁজ খোলা” বলতে আমরা এটাও বুঝতে পারি।

    দুনিয়ায় খুব সম্ভবত এটাই এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ এক অবকাঠামো প্রকল্প, যা কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের। জাতিসঙ্ঘের ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৭০-এর বেশি রাষ্ট্র এই প্রকল্পের অংশ হয়ে গেছে বা আনুষ্ঠানিক যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে। আর প্রাথমিক আগ্রহ জানিয়ে সম্মেলনে যোগ দিয়েছে মোট ১২৯ রাষ্ট্র। অপর দিকে ওই ৭০ রাষ্ট্র, যারা যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে, এদের বড় অংশই হল এশিয়ান বড় বা উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো, এছাড়া ইদানীং ইউরোপীয় রাষ্ট্রের যোগদান বাড়ছে। তবে এখানে এশিয়া বলতে তা মধ্য-এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ – এভাবে বুঝতে হবে, যেখানে এশিয়া ও ইউরোপ সড়ক ও রেল পথে সংযুক্ত হচ্ছে এই মধ্য এশিয়াকে মাঝখানে রেখে।
    এই মহাপ্রকল্পের সাথে আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় এমন ২৯ টা সংগঠনও জড়িয়ে আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ হল জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তোনিও গুতারেস [António Guterres] আর আইএমএফ-এর প্রধান ক্রিশ্চিয়ানা ল্যাগার্দে [Christine Lagarde] যারা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

    এই পর্যন্ত এই মহাপ্রকল্পে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হিসাবে ৯০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়ে গেছে, যা বছরে ৫.২% করে বেড়ে এমন হয়েছে। এছাড়া BRI এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোও একই সময়ে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এদিকে চীনের সাথে BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এখনই বাণিজ্য বাজার কেমন তা নিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, এটা ইতোমধ্যেই ৬ ট্রিলিয়ন ডলার পার হয়ে গেছে আর তা বছরে ৪% হারে বাড়ছে। এমন BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলো সব মিলিয়ে এদের সাথে চীনের বাণিজ্য, এখনই চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ২৭.৪% । অর্থাৎ এটা হেলাফেলা ফিগার হবার কথা নয়। আর বলাই বাহুল্য এই মহাপ্রকল্প যত সম্পন্ন হতে থাকবে এটাই চীনের প্রধান বৈদেশিক বাণিজ্যের রুটখাত হতে থাকবে।

    সম্মেলনে যোগ দেয়া রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কতজন? ২০১৭ সালের প্রথম সম্মেলনে সে সংখ্যাটি ছিল ২৯, আর এবার ২০১৯ সালে দ্বিতীয় সম্মেলনে তা আট বেড়ে হয়েছে ৩৭ জন। মানে এই ৩৭ রাষ্ট্র বাদে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো রাষ্ট্রপ্রধান নয় তবে, মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। আবার ইইউর সদস্য এমন রাষ্ট্রপ্রধান যারা এখানে উপস্থিত হয়েছে, এমন রাষ্ট্র ছিল অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল। ওদিকে কেবল পুর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া থেকেই যোগ দেয়া রাষ্ট্রপ্রধান ছিল প্রায় ১১ জন। এদের মধ্যে ছিলেন, যেমন পাকিস্তানের ইমরান খান, মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ, নেপালের রাষ্ট্রপতি ভান্ডারি অন্যতম। এছাড়া পুর্ব এশিয়ার এবারই প্রথম রাষ্ট্র বা সরকারের যেসব প্রধান যোগ দিয়েছে, এমন দুই রাষ্ট্র হল সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড। এতে ১০ সদস্যের আসিয়ান রাষ্ট্র জোটের প্রায় সবাই এবার যোগ দেন। বিশেষ করে থাইল্যান্ড খুবই উল্লেখযোগ্য।

    বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পকে বুঝবার সময় এখানে একটা কথা খেয়াল রাখতে হবেঃ সোভিয়েত যুগের মানে, কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫৩-৯১) চিন্তার অভ্যাসে আমাদের মনে গেঁথে থাকা কিছু ধারণা দিয়ে চিন্তা করলে আমাদের মনে হতে পারে যে, যেখানে নতুন গ্লোবাল নেতা চীনা সেখানে আমেরিকা বা তার জোটের কেউ যোগ দিবেই না। ঠিক যেমন সেকালে সোভিয়েত ব্লকের কোর রাষ্ট্রগুলা আমেরিকা ব্লকের রাষ্ট্রের সাথে কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লেনদেন-বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, ঠিক তেমনই একালেও বোধহয় ঘটনাগুলো সে রকম। এমন ধারণা মাথা থেকে ফেলে দিতে হবে। কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তি ও ব্লক ব্যবস্থা ১৯৯১ সালে ভেঙ্গে যাবার পর থেকে একালের দুনিয়া সেকালের সাথে পুরাটাই অমিল, তাই বরং মিল খুঁজতে যাওয়াটাই ভুল হবে।  যেমন একালের চীন-ভারত – এদের স্বার্থবিরোধের শেষ নেই, অথচ তাদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিশাল; এখনই তা ৮০ বিলিয়ন ডলারের, যা ১০০ বিলিয়নের পথে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। আবার খোদ চীন-আমেরিকা গত আশির দশকে তাদের সম্পর্কের শুরু থেকেই ব্যাপক ঘনিষ্টভাবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পণ্য ও বাজারে ব্যাপক লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক করে গেছে। কেবল একালেই তারা বাণিজ্যঝগড়ায় হাজির হয়েছে, যা আবার নিরসন মীমাংসারও চেষ্টা চলছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও চীনে আমেরিকান বিনিয়োগ আগের মতোই চলছে, বাণিজ্যও চলছে এবং তা আকারে এখনও বিপুল যদিও তা চলছে বাধা পেয়ে পেয়ে। এমনকি গত ২০১৭ সালের BRI সম্মেলনে আমেরিকার এক আমলা প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিল। আর যদিও এবারো এমনভাবেই যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল কিন্তু শেষে কোন কারণে আমেরিকার প্রতিনিধি আসে নাই।
    তাহলে এক কথায়, একালের মূল বৈশিষ্ট খেয়াল করতে হবে; তা হল, বাণিজ্যিক লেনদেনের সবসম্পর্ক রেখেই একই সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রস্বার্থ ইস্যু নিয়েও ঝগড়া চালাবে তারা। এখানে সেকালের মত “ও পুঁজিবাদি, আমি নই”- তাই কোন সম্পর্ক নাই – এসব নাই। আসলে এভাবে মতাদর্শের কথা তুলে এরই আড়ালে উভয় জোটের সদস্য  রাষ্ট্রগুলো রাশিয়া অথবা আমেরিকার ধামাধরা হত – এমন বাস্তবতাই আর নাই। ফলে তেমন কোন ভিত্তি একালে নেই। বরং ব্যাপারটা অনেকটা, বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক রেখেই যেমন সন্তানেরা অনেকসময় আরো বেশি সুবিধা পাওয়ার জন্য ঝগড়া করে, রাগ দেখায় বা উল্টাপাল্টা কিছু করে বসে, অনেকটা তেমনই। অর্থাৎ মূল কথা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পরের নতুন পরিস্থিতিতে এবার সম্পর্কের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ হল – এবার সব রাষ্ট্রই একমাত্র এবং একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এবং এরই অংশ হয়ে থেকে গেছে। আর এতে রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের পণ্য, পুঁজি, বিনিয়োগ, বাজার ইত্যাদি বিনিময়ে জড়িয়ে এক গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময়ের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু একই সাথে তারা নিজের যার যার স্বার্থের জন্যও লড়ে যাচ্ছে। আবার ক্যাপিটালিজমের বদ খাসলতগুলোর এখন তাহলে কী হয়েছে? এছাড়া সেগুলা কি মিথ্যা ছিল? অবশ্যই নয়। কিন্তু সেসব বদ-খাসলত এখনও বর্তমান হলেও ওর বিরুদ্ধে লড়ার আঙ্গিক, পাটাতন, কায়দা ইত্যাদি সবই এখন বদলে গেছে। তাই লড়াইও চলছে ও চলবেই; এমনকি জোট হয়ে বা আলাদাভাবে লড়ার ধরণ বদল হলেও। তাহলে এই পরিপ্রেক্ষিতে এবারের বিআরএফের বৈশিষ্ট্য ও অর্জন কী?

    কথিত ঋণফাঁদ আর গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডঃ
    এই সম্মেলনেও এবার এ’দু’টিই মুখ্য ইস্যু হয়েছে। কারণ, শি জিনপিং তাঁর মূলবক্তব্যে নিজেই সোজা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর এছাড়া সম্মলনের শেষ দিনে প্রকাশিত ৩৮ পয়েন্টের যৌথ ঘোষণা [Joint Communique ] থেকেও এই সম্মেলন এ’দুই ইস্যুকে এবার মুখ্য বিষয় করা হয়েছে। চীনা সরকারি মিডিয়া CGTN-এর ভাষায় বললে, এই মহা প্রকল্প নিয়ে চীনের কৌশলগত উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে পশ্চিমারা সন্দেহ সৃষ্টি করেছে, প্রেসিডেন্ট শি সেগুলোরই জবাব দিয়েছেন, যাতে সন্দেহ দূর হয়। [President Xi also responded to Western skepticism about China’s “strategic intentions” behind the landmark initiative. ]  এছাড়া হংকংয়ের SCMP লিখেছে, একটা সুক্ষ-কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। প্রেসিডেন্ট শি চীনের নেয়া প্রকল্পগুলোতে টেকসই ঋণ, পরিবেশ রক্ষা আর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা- এ দিকগুলো নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। [In a subtle shift …, Xi’s pledges over the past two days on debt sustainability, environmental protection and corruption control show Beijing is trying to expand its policy by paying heed to international concerns, according to analysts. এ থেকেই মনে হচ্ছে, তিনি পশ্চিমা সমালোচনা, প্রপাগান্ডা ও উদ্বেগগুলোর দিকে মনোযোগী হতে চাচ্ছেন।

    হংকং-ভিত্তিক ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ পত্রিকা কিছু এক্সপার্টকে উদ্ধৃত করে আমাদেরকে জানাচ্ছে, তারা মনে করেন, শি-এর এবারের বক্তব্য ছিল খুবই আপসমূলক টোনে। আর খুব সম্ভবত তা আমেরিকা, ভারত, জাপান আর ওদিকে জার্মানি ও ফ্রান্সের কথা মাথায় রেখে করেছেন। [The president’s conciliatory tone during the second Belt and Road Forum in Beijing was apparently aimed at critics in the United States, India, Japan and major European powers such as Germany and France.]

    এদিকে বেল্ট-রোড প্রকল্প চীনের একটা “ঋণের ফাঁদে” ফেলার বুদ্ধি, অথবা “ঋণফাঁদের ডিপলোম্যাসি” বলে প্রো-আমেরিকান গবেষক বা একাদেমিকেরা প্রচার প্রপাগান্ডা চালালেও  এক জর্মান থিঙ্কট্যাংক গবেষক, Lucrezia Poggetti, খাড়া কথাটাই বলেছেন এভাবে, “চীনের এমন অবকাঠামো ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার প্রতি বিভিন্ন দেশের নিঃসন্দেহে আগ্রহ বাড়ছে। একই সাথে এতে নেয়া প্রকল্পগুলাতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও মানদন্ড বজায় থাকার প্রতি আকাঙ্খাও প্রবল হচ্ছে”। […a research associate at the Mercator Institute for China Studies in Berlin, said that while interest in China’s infrastructure and investment plan was undoubtedly growing, there was an equal desire for the projects it encompassed to abide by international rules and standards.]

    ব্যাপারটা হল, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অবস্থায় আমরা এখনো আছি। এটাই ডমিনেটিং। আর এতে  তৈরি হওয়া এতদিনের নানান স্ট্যান্ডার্ড  বা মানদন্ডও অবশ্যই তৈরি হয়েছে এবং বহাল আছে। যদিও তা “চরম ভালো মানের বা আদর্শের” এ কথা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। এখন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব ব্যাপারে চীনের এত দিনের অবস্থান ছিল এ রকম – যেন চীন নিজেই একটা স্ট্যান্ডার্ড আর দুনিয়ায় যে স্ট্যান্ডার্ড চালু আছে, তা পশ্চিমা। যেন সে জন্য এটা খারাপ। কিন্তু আসল কথা হল, এ’পর্যন্ত দুনিয়ায় যা কিছু স্ট্যান্ডার্ড বা মানদন্ড, তা নিঃসন্দেহে আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়াতেই হয়েছে ও আছে। আর তা একেবারে চরম মানসম্পন্ন বা আদর্শ- ব্যাপারটা এমন তো নয়, বরং এর খামতির শেষ নেই, তা-ও হয়ত বলা যাবে। কিন্তু এর কোনো মানদণ্ড নেই- এমন ধারণা করা মানে, নিজেকেই ফাঁকি দেয়া হবে। তাই সারকথাটা হল, মানবাধিকারসহ সব বিষয়ে চীন নতুন নেতা হিসেবে নিজের মানদণ্ড বলে কিছু দেখাতে চাইলে তা করতে হবে পশ্চিমা মানদণ্ডকে শুরুর ভিত্তি ধরে। মানে, চীন এর চেয়ে আরো ভালো কী করতে পারে, সেটাই তাকে দেখাতে হবে। তাই বলাই বাহুল্য, এছাড়া চীনের সাবধান থাকাই ভাল যে, পশ্চিমা মানদণ্ডের নিচে সব কিছুই এখানে অগ্রহণযোগ্য হবে।

    বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ যতই থাক এরপরেও, আমাদের মত দেশে বিশ্বব্যাংক যেসব প্রকল্প নেয় তাতে সে বেশ কিছু মানদন্ড মেনে চলে। যেমন এর একটা হল, বিশ্বব্যাংকের নেয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্পে যে দেশই দাতা-পার্টনার থাকুক না কেন, খোলা প্রতিযোগিতার আন্তর্জাতিক টেন্ডারেই একমাত্র সাব্যস্ত হবে যে, কাজ কে পাবে। মানে, ঐ দাতা দেশকেই কাজ দিতে হবে- এমন কোনো শর্ত নেই। আমাদের যমুনা সেতু প্রকল্পে জাপান এক বড় ফান্ড-দাতা ছিল। অথচ পাঁচ আলাদা অংশের টেন্ডারে বিভক্ত ঐ প্রকল্পের কাজে জাপান একটাও পায় নাই বা জড়িত ছিল না। অথচ প্রায় সব চীনা প্রকল্পই এই মানদন্ডে অচল। চীনা-প্রকল্পের সাধারণ অভিমুখ হল, চীনারাষ্ট্র হয় দাতা, ঠিকাদার হবে চীনা কোম্পানি, আর তা হবে বিনা টেন্ডারে এবং গুরুত্বপূর্ণ হল, এক লোকাল এজেন্ট কোম্পানি থাকবেই, ব্যকডোরে যার মূল ভুমিকা বা কাজ হবে প্রকল্পগ্রহীতা দেশের প্রশাসনে ঘুষ-বন্দোবস্তের উপায় হিসাবে কাজ করা। তাই এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের জন্মের ৭৫ বছর পরে হাজির হয়ে, বিশ্বব্যাংকের মানদন্ডের চেয়ে নিচা-মানদন্ডে চীনা অবকাঠামো-প্রকল্প এভাবে চলতেই পারবে না। বেল্ট রোডসহ চীনা প্রকল্পগুলো এভাবে চলতে থাকলে এককথায়  চীনের ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার, সব ভেঙ্গেচুড়ে পড়বেই।

    এর বিপরীতে চীনারা হয়ত বলবে, আমরা  পশ্চিমাদের মত কোন দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করি না, পলিটিক্যাল স্বার্থ নাই বা স্টেক রাখি না। তাই কোন দেশে যদি দুর্নীতি থাকে (আমাদের মত দেশে যা অফুরন্ত ও ঘুষ খাবার জন্য ওঁত পেতে আছে) তবে ঐ দুর্নীতি উচ্ছেদ আমার কাজ নয়। সেকারণেই যে দেশ ঘুষ নিয়েই কাজ দেয়, তাকে আমরা ব্যাপক ঘুষ দেই, আর যে নেয় না তাকে সাধাসাধিও করি না। অতএব ঘুষ দিয়ে কাজ নেব কি না, সেটা চীন কখনও ঠিক করেনি।

    আসলে এটা দায় এড়ানোর দায়িত্বজ্ঞানহীন যুক্তি। কারণ, চীনা রাষ্ট্র কোন নৈতিকতাহীন বাণিজ্যিক কোম্পানি নয় যে যেকোন উপায়ে তাকে মুনাফা করতেই হবে। এ ছাড়া চীন দুনিয়ার (অন্তত) অর্থনৈতিক নেতা হতে খায়েস রাখে। কাজেই নৈতিকতা পালনের দায়, অথবা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার দায়পাল্পনের ঊর্ধ্বে থেকে চীন নেতা হতে পারে না। অথচ পশ্চিমা মানে, আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কোনো কোম্পানির বিদেশে ঘুষ দিয়ে কাজ নেয়া অপরাধ; যদিও এর প্রয়োগ খুবই কম তবে এর কিছুটা প্রয়োগ একালে দেখা যাচ্ছে ওয়ার অন টেররের ইস্যুতে মানিলন্ডারিং আইনের কারণে। আরও কথা আছে, এনিয়ে জাতিসংঘের কনভেনশন আছে। স্বাক্ষরকারি হিসাবে চীনের দায় আছে, ফলে সে দায়মুক্ত নয়। এই বাস্তবতা ও মানদণ্ডকে এড়িয়ে মানদন্ডে পিছনে পড়ে থেকে চীন কিভাবে নেতা হতে পারবে? আমাদের মতো দেশগুলোকে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত করে দিয়ে এর জন্য প্রধান দায়ী হয়েও চীন কোন নেতাগিরির আশা করে? আমেরিকার দোষত্রুটির শেষ নাই। কিন্তু আমেরিকা  গায়ে বাতাস লাগিয়ে  দুনিয়াকে “আমেরিকান সেঞ্চুরি” করে নিতে এমনি এমনি সক্ষম হয় নাই। কিছু অন্তত অবদান রাখতে হয়েছে। চলতে চালাতে গিয়ে সে বহু কিছুর মানদন্ড, আইন কনভেনশন বা প্রতিষ্ঠান গড়া ইত্যাদি এসব অনেক কিছুই তাকে করতেই হয়েছে। এগুলোকে আন্ডারএস্টিমেট করা, তুচ্ছ বা নজর আন্দাজ করা অবশ্যই চীনের অযোগ্যতা ও আত্মঘাতি হবে তা বলাই বাহুল্য। তাই এককথায় বললে, ব্যাপারটা পশ্চিমা-অপশ্চিমার ইস্যুই নয়।

    এটাও ঠিক, চীনের নেয়া বেশির ভাগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক স্বার্থই একমাত্র নয়, এর বাইরে চীনা রাষ্ট্রের একধরনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থও থাকে, যেটা অস্বাভাবিক নয়। যেমন গোয়াদর বন্দর বা  চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প। এর নামই বলছে, চীনের ল্যান্ডলকড হয়ে থাকা ও পিছিয়ে পড়া পশ্চিমা ভূখন্ডকে [জিনজিয়াংয়ের উইঘুর বাসিন্দারা এখানেরই] মুক্ত করার লক্ষ্যে গোয়াদর বন্দর পর্যন্ত প্রবেশ – করিডোর নেয়াই- চীনের স্ট্র্যাটেজিক উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সোজা কথায় প্রকল্পের সুবিধাভোগী একা পাকিস্তান নয়, চীনও। কাজেই ঋণচুক্তির দায় ও শর্তাবলিতে এর ছাপ অবশ্যই থাকতে হবে। যেমন চীনা ঋণ শোধ দেয়ার সময় সাধারণত ২০ বছর হতে দেখা যায়। সে তুলনায় বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল ঋণের সাধারণ মানদন্ড হল, তা ৪০ বছরের, যার প্রথম ১০ বছর আবার সুদবিহীন। চীনারাও করিডোর পাওয়া সুবিধাভোগী, তাই একা পাকিস্তানের অর্থনীতির ওপর এর বিপুল ঋণ শোধের দায় চাপানো অনৈতিক ও অবাস্তব অবান্তর। কাজেই এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রথম ২০ বছর সুদ-আসল পুরো কিস্তিবিহীন করা ইত্যাদি এমন অনেক কিছুই করতে পারতে হত। সারকথায়, একটা ‘অবজেকটিভ ফাইন্যান্সিয়াল এনালাইসিস’ করে [সেক্ষেত্রে দরকার হলে চীনের অ-বাণিজ্যিক কোন সামরিক বা অন্যকোন রাষ্ট্রস্বার্থ থাকলে এরও একটা অর্থনৈতিক মূল্য ধরে নিয়ে সে হিসাব করা সম্ভব] পাকিস্তান-চীন উভয়কেই দায় ভাগ করে নিতে হবে, সেটাই হত সবচেয়ে ন্যায্য। কিন্তু আমরা দেখছি, কিস্তি দেওয়া শুরু হবার আগে পাকিস্তান এখনই ধুঁকছে। এই করিডোর ঋণের কিস্তি যদিও এখনো শুরুই হয়নি, সম্ভবত ২০২২ সালের আগে শুরু হবে না; তখন পাকিস্তানের কী হবে?

    পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা দেখিয়ে এখনই আমেরিকা এবং আইএমএফ টিটকারি দিয়ে বেড়াচ্ছে। যা আমেরিকার অর্থনীতি ঢলে পড়া ঠেকানোর স্বার্থে চালানো প্রপাগান্ডাকেই সাহায্য করছে। এটা নিশ্চয়ই চীনের পক্ষে যাচ্ছে না। কাজেই, বাণিজ্যিকের সাথে স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের প্রকল্পও হতেই পারে। কিন্তু দায় ভাগাভাগির একটা মানদন্ডও অবশ্যই থাকতেই হবে। পাকিস্তানের শাসকেরা চোর ও লোভী বলে চীন এর সুবিধা নিয়ে নিজের ভাগ্য গুছাবে আর এভাবে দুনিয়ার নেতা হতে পারবে কী করে? এটা কোন বুঝ? বস্তুত কোনো প্রকল্পের অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি মানে প্রকল্প গ্রাহক রাষ্ট্রের অর্থনীতি কোন প্রকল্প-ঋণ শোধের যোগ্য বা সম্ভব হবে কি না, এর যাচাই চীন আদৌ করে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে এমন চিন্তা একালে অকল্পনীয়।

    কেন? চীন কেন এখানে উদাসীন থাকে? ‘পুঁজিবাদী’ ব্যাপার বলে? চীনের সাফাই কী, আমরা জানি না। অথচ এমন হওয়ার কারণে আইএমএফের প্রেসিডেন্ট মিস লাগার্দের নসিহত শুনতে হচ্ছে চীনকে যে, ‘প্রকল্প গ্রহণের আগে এর ভায়াবিলিটি’ যাচাই কর”ন। চলতি BRF সম্মেলনের দাওয়াতের যোগ দিয়ে বক্তৃতায় তিনি মুখের উপর বলেছেন ব্যাপক বেল্ট-রোডের প্রকল্প সেখানেই যাওয়া উচিত আর যে অর্থনীতি এর ঋণশোধের দায়ভার বইতে সক্ষম। [“China’s massive Belt and Road infrastructure program should only go where it is needed and where the debt it generates can be sustained…] ব্যাপারটা চীন জানত না এমন নয়, লাগার্দে প্রথম বলছেন তা তো নয়ই।  আবার এটা অবিশ্বাস্য যে গ্রাহক রাষ্ট্রগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলাই চীনের বড়লোক হবার পথ, আর এটা চীন বিশ্বাস করে। এটা একটা রাষ্ট্রের দুনিয়ার নেতা হবার কোন স্ট্রাটেজিক উপায়ও তো হতেই পারে না, এই এবসার্ডিটি বা অবান্তর কথা চীন বুঝে নাই তেমন কঠিন কথা এতা নয়? তাহলে?

    এটা চরম গোয়ার্তুমি আর পশ্চিমকে তাদের চিন্তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা সম্ভবত এমনই কিছু একটা।  আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে থাকে আবার সময়ে তার দরকার থাকলে এই অজুহাতে হস্তক্ষেপও করে থাকে – একথা সত্য। চীন কী মনে করে, সহজে ঋণপ্রাপ্তি ও ঘুষের নহর বইয়ে দেয়া, এভাবে স্বৈরাচারদের টিকিয়ে রাখা – এটা যে আরও বড় হস্তক্ষেপ – এটা চীনের বুঝে ধরা পড়ে নাই।

    দুনিয়ার কোথাও শিল্পায়ন বা ক্যাপিটালিজম হয় নাই – রাষ্ট্রের অর্থ না মেরে দিয়ে। তারা বিশেষ করে কাস্টমসের টাকা, ব্যাঙ্কের টাকা মেরে দিয়েছে। পুঁজিপতিরা আদিম-পুঁজির সংগ্রহ সবসময় এভাবেই করেছে। কিন্তু এর মানে কী এই যে চীন উদ্দেশ্য করেই অর্থ লুটপাটকে উতসবে পরিণত করবে? এটা কোন ক্যাপিটালিজমের বুঝ? নাকি এটাই ইঙ্গিত করছে যে গ্লোবাল আইন, কনভেনশন, নাগরিক অধিকার, বেস্ট প্রাকটিস, মোডাল, ইন্সটিটিউশন গড়া, ইত্যাদি সম্পর্কে চীনের বুঝাবুঝিতে মারাত্মক ঘাটতি আছে?

    কাজেই ক্রিশ্চান লাগার্দের এই নসিহত বা কখনো টিটকারি শুনে চীনের কেমন লাগছে? কোন ইজ্জত বাড়ছে জানা যায় না। আর এখান থেকেই চীন ‘ঋণফাঁদ’ পেতেছে- এই আমেরিকান প্রপাগান্ডা করার সুযোগ তৈরি করছে এতদিন চীন নিজেই।

    হতাশার কথা থাক। মনে হচ্ছে, তাহলে কি এখন কানে পানি ঢুকেছে? এবারের বিআরএফ সম্মেলন থেকে আমরা কি সেই ইঙ্গিত পাচ্ছি? সম্ভবত হ্যাঁ। কিসের ভিত্তিতে এমন বলা যায়? খুব সহজ। উপরে আমরা দেখলাম বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্ট বা বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা ইত্যাদি সবই এটাই বলছে। কিন্তু এটা এখন এত সহজে এসে গেল আগে হয় নাই কেন, এর জবাব কী? গত মাসে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখান থেকে এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ হয়। দেখা যায়, অবকাঠামো প্রকল্পে যেসব স্টান্ডার্ড এপর্যন্ত তৈরি হয়েছে  চীন সুগুলো মেনে চলা আর এ নিয়ে আরও বিকশিত কাজ করতে চীন সেখানে ইইউর সাথে একমত জানিয়েছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা এখানে । কাজেই প্রেসিডেন্ট শি আসলে এবারের বিআরএফ থেকে বলতে চাইলেন, তিনি ইইউর সাথে ইতোমধ্যে যা যা একমত হয়েছেন, সেটাই এখন বিআরএফ ফোরামেও বাস্তবায়নে কাজ করবেন – এভাবে বলাটা কঠিন ছিল না। আর যাতে পরের বিআরএফ সম্মেলনে তিনি জার্মান চ্যান্সেলর আর ফরাসি প্রেসিডেন্টকেও হাজির করতে পারেন।

    এখন যদি আমরা আমেরিকার সাথে তুলনা করে বলি তাহলে ব্যাপারটা দারাল এই যে, ট্রাম্পের আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে নেতি প্রপাগান্ডা করেই গেল। আর ইইউ চীনকে মানদন্ডে আসতে বাধ্য করল, যাতে সম্ভাব্য গ্লোবাল নেতা চীনের পার্টনার হয়ে ইইউ নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।

    তাহলে এখন বেল্ট রোডে ভারতের কী হবে?
    ইইউর মতো ভারতের জন্যও চীনা প্যাকেজ আছে মনে হচ্ছে। তাই সম্ভবত চীনা পথ হতে যাচ্ছে, সঙ্ঘাত নয়। বরং আরো সুবিধা অফার করে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলে নেয়া হবে। সংক্ষেপে বললে, পাকিস্তানের কথিত জঙ্গি মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের জঙ্গি তালিকায় তুলতে চীনের আর আপত্তি না করা সম্ভবত সেটারই ইঙ্গিত। তবে এটা কেবল একা ভারতকে ছাড় দেয়া নয়। অনুমান করা যায়, ভারতকেও প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে যে, মাসুদ ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের ওপর এখন চাপ সৃষ্টি করতে বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো প্রপাগান্ডা বা সামরিক বা স্ট্র্যাটেজিক কোনো পদক্ষেপে যাবে না। তাই পাকিস্তানও চীনা সিদ্ধান্তে কোন আপত্তি প্রকাশ করে নাই, বরং গ্রহণ করেছে। আসলে চীন অনেক আগে থেকেই এমন সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। এমনকি সম্ভবত কাশ্মির ইস্যুতে লম্বা পথের হলেও একটা সুরাহা, অন্তত ডায়ালগ শুরু করে পথ খুঁজে পাওয়া- এত দূর পর্যন্ত পরিকল্পনায় আছে। চীন সে জন্য অরুণাচল বা কাশ্মিরের সাথে ম্যাপে কার কোনটা এলাকা – সে সংক্রান্ত অনেক দাবি থেকেও সরে এসেছে, তা ভারতের মিডিয়াই বলছে। অনেকে অবশ্য অনুমান করে বলছেন, চীনের এত ছাড়ের অর্থ- অন্য আর একটা । তা হল চীন সম্ভবত মনে করছে ভারতের চলতি নির্বাচনে মোদী নয়, নতুন সরকার আসছে – এটা তারই ইঙ্গিত। তাই নতুন হবু সরকারকে দেয়া এটা চীন উপহার। ওদিকে ভারতের নির্বাচন সমাপ্ত হলে চীনে সেকেন্ড য়ুহান [WUHAN] সম্মেলনেরও প্রস্তুতি চলছে।

    কিন্তু তাহলে বাংলাদেশের ভাগে কী?
    আপাতত ফুটা কড়ি। নির্বাচিত হওয়ার পরই আমাদের সরকার ভারতীয় মিডিয়ায় এক হুঙ্কার দেয়া সাক্ষাৎকার দিয়েছিল। সেটা এখন ফাঁপা বলে হাজির হয়েছে। সেখানে ধারণা দেয়া হয়েছিল ভারতের আপত্তি উপেক্ষা করে আমাদের সরকার নিজেই চীনা বেল্ট রোড প্রকল্পসহ চীনের সাথে ব্যাপক সম্পর্কে যাচ্ছে । সে ইঙ্গিত, সেসব ফেলে এখন বাস্তবত সরকার মুরোদহীন বলে নিজেকে প্রমাণ করছে। কারণ, ওই সাক্ষাৎকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ হত গত ২৫-২৭ এপ্রিলের বিআরএফ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চীনে টিম যাওয়ার, তা ঘটেনি। ২৩ এপ্রিল একমাত্র ইত্তেফাক বলেছিল, প্রধানমন্ত্রী নয়, একা শিল্পমন্ত্রী নাকি যাচ্ছেন। আর কোন মিডিয়া ইস্যুটা নিয়ে কিছু না করে উলটা ব্ল্যাক আউট করে দেয়। ইস্যুটিকে মিডিয়া এভাবে অগুরুত্বপূর্ণ করে ট্রিট করেছে, এতে অনুমান হয়-সরকারের কাছেও এটা অগুরুত্বপূর্ণ; তাই এমন। তাহলে জানুয়ারীতে প্রধানমন্ত্রীর ভারতের মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেয়ার বোল্ড অবস্থানের পর এখন এই গুরুত্বহীন করে দেওয়ার অর্থ কী?
    খবর না থাকাটাই একটা খবর। সেক্ষেত্রে সোজা অর্থ হল, জানুয়ারিতে সাক্ষাতকারে যাই দাবি  করে থাকুক এখন সরকার বুঝাতে চাইছে, তাঁর এখন কোনো সক্ষমতা নেই যে, ভারতের স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিজ স্বার্থে সে চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যায়। ব্যাপারটি দাঁড়াল এমন যে, নির্বাচিত হলেও ভারতের স্বার্থ ুপেক্ষা করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে কোনো অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা সরকারের নেই বলে সরকারেরই অনুমান। তাই সে আবার স্ট্যাটাস কো ফিরে গেল; যা ছিল তাই আগের জায়গায়। ভারতের স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে থাকা। ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা আমাদের সরকারের এখনো নাই, এতাই সারকথা। ইতোমধ্যে ভারতের এক মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে, চীন এবারের BRI  এর নেয়া প্রজেক্টের তালিকায় BCIM কে রাখে নাই। [China drops BCIM from BRI projects’ list]। বিসিআইএম মানে- বার্মা হয়ে আমাদের চীনের কুনমিং যাওয়ার এবং সোনাদিয়া বন্দর – এই পুরা প্রকল্পই চীন নাকি গুটিয়ে ফেলেছে। এই ক্ষবর কতটা সত্য অথবা কেন আমরা এখনও জানি না।
    ফলে আপাতত, বাংলাদেশের জন্য সব কিছুর প্রাপ্তি শূন্য। আসলে বাস্তবত পেছনের জনসমর্থন ছাড়া এক সক্ষমতাহীন ক্ষমতা আমাদের সরকারের -= এদিকটা আঁচ করেই সম্ভবত চীন বা ভারত আমাদের সরকারকে তুচ্ছ জ্ঞান করছে। তাই ভারতের স্বার্থ পূরণের অগ্রাধিকারের নিচেই চাপা পড়া আমরা। নিঃসন্দেহে তা খুবই হতাশাজনক!

    এদিকে আবার আরেক কাহিনী। আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এক সাক্ষাৎকার দিয়ে বলছেন, “সরকার চীনের বিকল্প ফান্ড দাতা খুঁজছে”। সেই খবরের শিরোনামটাই হল – “Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans…।  সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের [SCMP] ২৩ এপ্রিল ছাপা এই খবরের রিপোর্টার বাংলাদেশে এসে ওই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ভারতের প্রো-আমেরিকান কথিত বিজ্ঞদের বক্তব্য সেখানে ছাপা হয়েছে, যার সারকথা বাংলাদেশের চীনা ঋণ নিতে যাওয়া ঠিক নয়। ব্যাপারটা আসলে বড়ই রহস্যময়! প্রধানমন্ত্রী চীনা বেল্ট রোডে যোগ দিতে চেয়ে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। আর তিন মাসের মাথায় সরকারের প্রতিমন্ত্রী বলছেন, তারা চীনা বেল্ট রোডের বিকল্প ফান্ড খুঁজছেন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত  ০৪ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “বেল্ট রোড ফোরাম সম্মেলন আমরা কি নাই হয়ে যাচ্ছি“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]