Tag: CHINA

  • মোদি এখন যুদ্ধ না ডায়লগের ভক্ত ফেরিওয়ালা

    মোদি এখন যুদ্ধ না ডায়লগের ভক্ত ফেরিওয়ালা;
    আবার জি২০-ও তাই যদিও ভিন্ন কারণে

    গৌতম দাস
    ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩   সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-4Yr

     

                         G20 summit ends with India, Brazil and Russia boasting success

     

    মোদি এখন আর বিতর্কিত ভুখন্ড নিয়ে, উগ্র হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ববাদী জোশে ‘লড়কে লেঙ্গে’ বলে জবর দখলকারি হতে চান না। তাই তিনি এখন আর যুদ্ধ না। যেন,  ডায়লগে বিশ্বাসী। আপোষ আলোচনার ডিপ্লোমেসিতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিতর্ক-বিবাদ সমাধানের পক্ষের এক গভীর বিশ্বাসী লোক হতে চান তিনি! এমনকি এব্যাপারে আন্তর্জাতিক রুল ও আইনের সহায়তাতেও এবং এসবের অধীনে যেতেও ইচ্ছুক!

    তাহলে মোদিকে একটু মনে করিয়ে দেয়া যাক, গত ২০১৯ সালে মানে মোদি ভারতে দ্বিতীয় সরকার গঠনের পরের প্রথম সংসদে ৫ আগষ্ট, মোদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেছিলেন যে সারা কাশ্মীরই ভারতের, তা বলেছিলেন কেন? ৩৭০ ধারা বাতিল বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন কেন? যেখানে কাশ্মীরের রাজা কাশ্মীর ভারতের সাথে যুক্ত বলে যে দাবি তা অবৈধ, অগ্রহনযোগ্য বলে বাতিল  করে জাতিসংঘ রেকমন্ড করেছিল – কোন রাজা কী বলেন সেটা না, কাশ্মীরের বাসিন্দাদের সম্মতিই একমাত্র নির্ধারক মানে এক রেফারেন্ডাম বা গণভোট করে নিতে হবে; আর এটাই হবে ব্যাপারটা ফয়সালার ভিত্তি।  কিন্তু নেহেরু তা অমান্য করে সেই জাতিসংঘ সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব ফেলে রেখে দিয়েছিলেন। আর এই অবৈধ কাজ করে আবার সম্ভবত মনের অস্বস্তি মিটাতে সান্ত্বণা হিশাবে  নেহেরু ভারতের কনষ্টিটিউশনে আর্টিকেল ৩৭০ ধারা এনেছিলেন। যার সারকথা হল, কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদার রাজ্য করা কিন্তু সেটা আবার ভারতেরই যেন থাকে – এই ইচ্ছামত সংযোজনী আনা। যেটা বিবদমান কোন পক্ষের কেউ চায় নাই।  এমনকি ভারতের সুপ্রীম কোর্টের রায় হল, ৩৭০ ধারা বাতিল করা যাবে না।  অথচ এসবই অমান্য করে  মোদি-অমিত জোর করে সেই ৩৭০ ধারা বাতিল করেছেন; এবার দাবি করছেন পুরা কাশ্মীর ভুখন্ডই ভারতের। এই হল ২০১৯ সালের মোদি-শাহের সংযোজন। যদিও আবার এখানে কেন কাশ্মীর ভারতের হবে এনিয়ে কোন কারণ-যুক্তি বা দলিল কোন কিছুরই উল্লেখ করেন নাই!!  যা অনেকটা –  আমি বলেছি তাই ওটা আমার ধরণের গোয়ার্তুমি!!! অথচ সেই মোদি এখন ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসি এর অনুসারী হতে চাইছেন??? সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদি এক আন্তর্জাতিক সভার বন্তৃতায় এসব নয়া খায়েস নয়া ভান-ভনিতার কথা বলেছেন!!!

    তাহলে এই যে কাশ্মীর ১৯৪৭ সাল থেকেই এক বিতর্কিত ভুখন্ডই থেকে যাওয়া, আর একে ২০১৯ সালের ৫ আগষ্ট থেকে মোদি-শাহ এর জবরদস্তিতে পুরা কাশ্মীরই ভারতের অংশ-ভুখন্ড বলে দাবি করা এটা কোন বা কার সাথে ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসি করার পরে অথবা কোন “আন্তর্জাতিক আইনের শাসন” অথবা কোন “জাতিসংঘের প্রস্তাব” বলে  বিতর্ক মিটানো হয়েছিল????

    “Speaking at the East Asia Summit in the Indonesian capital Jakarta, Modi reiterated that “today’s era is not of war” and “dialogue and diplomacy” form “the only path to resolution” – a theme he has advocated for an end to the war in Ukraine ever since its invasion by Russia in February 2022.” – Indian Express September 8, 2023 

    উপরের এই উধৃতিটা নিয়েছি ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় এক সম্মেলনে ভারতের মোদির বক্তৃতা নিয়ে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার রিপোর্ট থেকে। দুদিন আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ সেখানে “ইস্ট এশিয়া সামিট” এর সম্মেলন ২০২৩’ [18th East Asia Summit (EAS)] এর ১৮তম অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।  “ইস্ট এশিয়া সামিট” বলতে বুঝতে হবে মূলত আশিয়ান দশ রাষ্ট্র আর এরপরেও আরো প্রায় আট রাষ্ট্রের এই সম্মেলন। সেই আট রাষ্ট্র হল – চীন, রাশিয়া, আমেরিকা – ভারত, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান।  এই সামিটে গিয়ে মোদি যে বক্তব্য রেখেছেন – সেটাতে চীনকে উদ্দেশ্য করে কিন্তু নাম না নিয়ে দেয়া মোদির এই স্ববিরোধী বক্তব্য। এখন ভিজা বিড়াল সাজা প্রধানমন্ত্রী মোদি বলতে চেয়েছেন – যে সে হল দুনিয়ায় আইনের শাসন দেখতে চাওয়া প্রধানমন্ত্রী’ আর চীন হল যে আইনের শাসন মানে না এমন রাষ্ট্র। আর যে বিতর্কিত ভুমি যা ভারতের চোখে অরুনাচল আর চীনের চেখে তা ঝাঙনান ‘Zangnan’ সেই বিতর্কিত ভুমি নিয়ে  চীনকে খোঁচা মারতেই মাদি এমন [ সরাসরি না এমন ফ্রি কিক] বক্তৃতা মেরেছেন।

    আর এভাবে ভাব ধরেছেন যেন সন্ন্যাসী ভারতের এটা খুবই পবিত্র এক সাধু অবস্থান যে কারো ভুমির দিকে তাকায় না পর্যন্ত এমনই যোগী এই মোদি!!! অতএব এটাই ইউক্রেন ইস্যুতেও মোদির অবস্থান যেন তিনি পুতিন-জেলেনেস্কিকে বলছেন – ভায়েরা আমার তোমরা ডায়লগের মাধ্যমে সব মিটসাট করে নেও”।  তবে ভুলে যাওয়া যাবে না যে এই বক্তব্য হল মোদির সাইনবোর্ড – যা লটকানো থাকে কেবল দেখানোর জন্য। আর কার্যত মোদি বলতে চেয়েছেন,  ভাই পুতিন তুমি আমাকে ৬০ ডলারেরও নিচে [বাজারের গড় দাম যেখানে ৮০ ডলার বা উপরে] সস্তায় তেল পাঠাতেই থাকো যাতে আমার আটটা রিফাইনারিতেই দিন রাত আমি তেল শোধনাগার চালিয়ে সেই তেল রফতানির পবিত্র সুবিধা খেয়ে যেতে পারি! ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসির খেদমতগার আমি মোদি তো – আছিই তোমাদের সাথে!!!

    সারকথায়, মোদির হিন্দুত্ববাদের ভারত যদি মনে করে সারা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড আর এব্যাপারটা হল ভারত রাষ্ট্র কী মনে করে একান্ত তার ব্যাপার – তাই এনিয়ে অন্যের কিছুই বলার নাই। েখন একই ফর্মুলা মেনে, চীন যদি বলে ঝাঙনান ‘Zangnan’ চীনা রাষ্ট্রের ভুখন্ড – তাহলে তো আর এখানে মোদির এটা “যুদ্ধের যুগ নয়” অথবা এটা “আন্তর্জাতিক আইনের শাসন যুগ” অথবা  এটা “ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসিতে সমাধান” অথবা কোন “জাতিসংঘের প্রস্তাব” বলার আর তো কোন সুযোগ নাই; খোদ মোদিরও না।  মানে মোদি নিজেই নিজের অবস্থানকে ব্লক করছেন – অবস্থা! মোদির সব কথাই তাই অর্থহীন প্রলাপ মাত্র হয়ে গেছে!

    ওদিকে, আনন্দবাজার মোদির এই বক্তৃতাটাকে উগ্র হিন্দুত্ববাদি জোশ আর দেশপ্রেমের উথলায়ে উঠেছে বলে ব্যবহার করেছে; তাই তারা জোশ তোলা এক শিরোনাম করেছেঃ জি২০ বৈঠকের আগে জকার্তায় চিনকে কড়া বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী – এভাবে। আর তাতে পাঠককুল যেন বলে উঠেছিল জিতে রহ মোদি!!!
    এছাড়াও আনন্দবাজার জানাচ্ছে মোদি সেখানে আরো বলেছেন, “বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ঘিরে রয়েছে অনিশ্চয়তা। সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদের পাশাপাশি ভূকৌশলগত সংঘাত সবার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। এর মোকাবিলা করার জন্য বহুপাক্ষিক আইনের শাসন মানা আন্তর্জাতিক বিধি ও ব্যবস্থা প্রয়োজন”। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে মোদি সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ কিছুই উল্লেখ করতে বাদ রাখেন নাই।

    “বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ঘিরে রয়েছে অনিশ্চয়তা। সন্ত্রাসবাদ,
    মৌলবাদের পাশাপাশি ভূকৌশলগত সংঘাত সবার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ।
    এর মোকাবিলা করার জন্য বহুপাক্ষিক আইনের শাসন মানা আন্তর্জাতিক বিধি ও ব্যবস্থা প্রয়োজন।”

    এর মানে মোদি সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ ইত্যাদি যাই তার কাছে তার শত্রু মনে হয়েছে এমন কিছুকেউ উল্লেখ রাখতে পিছুপা হন নাই। কিন্তু তিনি কী জানেন এসবের উদ্গাতা আসলে তিনি নিজেই??? কারণ, তিনি  যতবার তাঁর হিন্দুত্ববাদ নিয়ে আমাদের তাড়া করেন, আক্রমণ করেন ততবারই আমরা বাংলাদেশ থেকে যারা এটা প্রতিরোধ করি, রেজিস্ট [resistance] করি  এসব কিছুকেই ভারতের হিন্দুত্ববাদিরা নামকরণ করে মৌলবাদ হিশাবে। আমাদের প্রতিরোধ বা resistance – এটাই হিন্দুত্ববাদি চোখে মৌলবাদ!!!  বাংলাদেশে আমাদের অস্তিস্ত রক্ষার জন্য আমাদেরকে হিন্দুত্ববাদি সকল ততপরতাকে প্রতিরোধ করতেই হয় ও হবেই!! 

     

    জি২০ সম্মেলনের আজ শেষ দিনঃ
    তবে আগে সেলফির দিন নিয়ে অল্প কথাঃ

    ইতোমধ্যে এবারের জি২০ সম্মেলন ২০২৩ আয়োজন করা হয়েছিল ভারতে, ৯-১০ সেপ্টেম্বর। আজ তার শেষ দিন। গতকাল প্রথমদিনের বিকালে ছিল শো-অফ বা রাষ্ট্রপ্রধান নেতাদের ব্যক্তি ইমেজ বাড়ানো যেটাকে বলে “পাবলিক ইমেজ” ক্রিয়েট বা তৈরি করে নেওয়ার এক শান্ত বিকেল। যেটা বাংলাদেশে বসেও আমরা টের পেয়েছিলাম এক সেলফি-ময় হয়ে উঠা সর্বত্র!!  বাইডেনের লক্ষ্য ছিল এক উদার মনের প্রেসিডেন্টের ইমেজ তৈরি করা।  বিশেষ যে প্রধানমন্ত্রী তাকে উঠতে বসতে গালাগালি, তার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী, আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপকারি অথবা ২০ ঘন্টার লম্বা জার্নি করে দেখতে যাওয়ার মত আরও মহাদেশ আছে (মানে আমেরিকা আর যাবেন না বা পড়োয়া করেন না) ইত্যাদি এতসব বক্তব্য দেয়ার পরে তাঁকেই বাইডেনের সময় দেওয়ার দিক থেকে। ফলে এই বিচারে বাইডেন বাংলাদেশের সরকার নিয়ে যা রাজনৈতিক-কূটনৈতিক অবস্থান ও অসন্তোষ-ই থাক না কেন তিনি সেকারণে, মানবিক-সামাজিক সৌজন্য ভদ্রতা দেখানো আর নিজ উদার মনের পরিচয় অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি-ই আগিয়েছেন এটাই তিনি প্রমাণ করে নিয়ে গেছেন। কিন্তু বিপরীতে হাসিনা এই বিচারে তিনি ততটাই ইমেজ হারিয়েছেন।  যা বলেছেন তা তিনি মিন করেন এমনটা তিনি প্রমাণ রাখতে পারেন নাই। তিনি এজায়গায় শোচণীয় হেরেছেন।  যদিও এনিয়ে সাধারণ সম্পাদক ও. কাদের তার এক সেলফিতে বিএনপি নেতাদের ঘুম হারাম: ওবায়দুল কাদের বক্তব্যে এতে আওয়ামি দলীয় নেতা-কর্মির মনোবল চাঙ্গা করতে হয়ত কাজ করেছে কিন্তু এটা ততটাই হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ক্ষতি হয়েছে যে তাহলে রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ-কে আনার অর্থ কী দাড়ালো??? গতকাল বিকেলে লক্ষ্য করেছি প্রগতিশীল মানে  [প্রগতিবাদ=হিন্দুত্ববাদ] চিন্তার ব্যক্তি বা লেখকেরা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে যে তাহলে কী তাদের হাসিনাই টিকে গেল – বাইডেনের সাথে রফা হয়ে গেল!!! এই খুশি তারা আর লুকাতে পারেন নাই বা লুকিয়ে রাখার টেনশন সহ্য করতে চান নাই যে তারা ভারতপন্থি বা র-পন্থি!! তারা সরাসরি বা পরোক্ষে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন যে, তাহলে তো হাসিনা টিকেই গেল, তাই না!!!
    আমি অবশ্য তাদেরকে আর মানসিক যাতনা দিতে চাই নাই!  কারও অসুস্থতা কখনও কাম্য হতে পারে না! তবে অবাক হয়েছি তাদের চিন্তা করবার অক্ষ্মতাস দেখে যে তারা একটা সৌজন্য-ইমেজের স্বার্থ আর একই লোকের রাজনৈতিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থ  এদুটার ফারাক করতে শিখেন নাই। আপনার এনিমি-কে তার মেয়ের সামনেই খুন করতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা (essential-ness) কী আছে বা থাকতে পারে??? নাকি এমন চিন্তা এটাকেই তো গাধামি, এক মফস্বলি চিন্তা বলে!  কারণ, সেকাজটা অন্ততপক্ষে বাচ্চাটাকে চকলেট দিয়ে দূরে পাঠিয়ে করতে হবে  – আর এটাই স্বাভাবিক!  আর বাইডেন এক্ষেত্রে চকলেট-ই এস্তেমাল করেছেন!!!   আর তাতে শত্রুতা তো ভোতা হয়ে যায় নাই। শত্রুতা শত্রুতার জায়গাতেই বহাল আছে!!!

    সম্মেলনের যৌথ ঘোষণা প্রসঙ্গেঃ
    যেকোন দুই রাষ্ট্র অথবা বহুরাষ্ট্রীয় মোলাকাত বা সম্মেলন থেকে কোন যৌথ ঘোষণা আসাটা নুন্যতম তাদের মধ্যে কিছু ঐক্যমত্য আছে তা প্রকাশ করে। সেজন্য এটা খুবই কাম্য – সে কোন সামিট  মানে শীর্ষ দুই বা ততোধিক সরকারপ্রধান এর সাক্ষাত যাকে আমরা Summit বলে বুঝি; এমন সামিট মানেই এর সফলতার নুন্যতম মাপকাঠি হল যৌথ ঘোষণা – মনে করা হয় কূটনীতি চর্চায়! কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে গতবছর জি২০ সামিট থেকে ইউক্রেন যুদ্ধের ইস্যুতে রাশিয়াকে টার্গেট করে, দায়ী করে সমস্ত বক্তব্য সাজানো হয়েছিল। লন্ডন গার্ডিয়ানের ভাষায়  “.…..All references to Russia, Russian aggression and Russia’s withdrawal in relation to the war in Ukraine that featured in last year’s joint statement at the G20 summit in Bali” । 

    কিন্তু এবার আক্কেল হয়েছে। ঐ সমস্ত লিখে কী কী অর্জন হয়েছে তা তো আজ এক বছরের মধ্যে সব পক্ষই পরিস্কার বুঝতে পেরেছে। সবচেয়ে বড় কথা সারা পশ্চিম – মানে বাইডেন্সহ ইউরপের সব কুতুব রাষ্ট্রের সরকার প্রধানদের নিজ নিজ ইলেকশব ফেস করতে হবে। আর তাতে এরা কেউই নিজ নিজ জনগণের কাছে যুদ্ধের পক্ষে তাদের সাফাই অনুমোদন করিয়ে নেয়া মানে তাদের স্ব স্ব রাষ্ট্রের জনজীবন যুদ্ধের ফলে ভাল আছে আরামে বা বিশেষ সুবিধা পেয়েছে তা একেবারেই নয়। কাজেই অন্তত বাইডেনের কথা যদি বলি আহামি ২০২৪ নভেম্বর তাকে আমেরিকান নির্বাচনের মুখোমুখি দাড়াতে হবে।  অনেকবার যুদ্ধ চালানোর প্রার্থী জিতেছে যেমন বুশের দ্বিতীয় বা সেকেন্ড টার্মের জয়। কিন্তু আবার ওবামার দুবারের জয়  যুদ্ধ থেকে ফেরত আনবার প্রার্থী ছিলেন বলে! অনুমান করা হচ্ছে এবার যুদ্ধ থেকে ফেরত আনার প্রার্থির পক্ষে রায় যাব। তাই আগামি বছরের শুরু থেকেই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করাতে হবে বা বন্ধ দেখব বলে অনেকের অনুমান। ইত্যাদি এসব জল্পনা-কল্পনার ফলাফল হল এবার জ২০ এর যোথ ঘোষণায় আপোষের ভাষা চলে এসেছে।

    তাই গত বারের বালি সম্মেলন সেসব-ই বাদ রাখা হয়েছে এবার। রাশিয়াকে এবার দায়ী করা আর নয়।   সেটা তাদেরবি বিভক্তি আরো বাড়াবে আর এবার ভয় কাজ করছিল এ ঐ যুদ্তেধ তাদের যে কোন আসার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে […alleviating fears that disagreements over the Russia-Ukraine war would prevent a consensus for the first time.]। আর একারণের এর বদলে নতুন যেসব শব্দাবলির উপর জোর দিয়ে ঐক্যমত্য আনা হয়েছে তা হলো …।Instead, the declaration emphasised that states must “refrain from the threat or use of force to seek territorial acquisition” and that “the use or threat of use of nuclear weapons is inadmissible”.
    অর্থাৎ এমন প্রধান দুইটা ভাষ্য যা বাংলা করে লিখলে হবে – ১। কোন ভুখন্ড বিতর্কে কোন হুমকি দেয়া বা শক্তি ব্যবহার না করার আহবান জানানো হয়েছে। 
    এছাড়াও  ২। কোন পক্ষের কোন পারমানবিক অস্ত্রের ব্যবহার বা ব্যবহার করার হুমকি অনুমোদন-অযোগ্য বলা হয়েছে ঐ যৌথ সর্বসম্মতির ঘোষণায়।

    এককথায় বললে, কাউকে হেয় করার উপরে এটা ইতিবাচকতার জয় – এই লাইনে কথা বলার ধারার জয়লাভ!

    তবে একটা মন্তব্য এখানে করাই যায়ঃ
    সারা পশ্চিম মানে আমেরিকা ও ইউরোপ মিলে ইউক্রেন ইস্যুতে সব দায় রাশিয়ার উপর চাপানোর যে কূটনীতি সেটাই কিন্তু আসলে জি২০ এর যৌথ ঘোষণা লিখতে গিয়ে পিছু হঠেছে বা আপোষী হতে বাধ্য হয়েছে। আর তা হয়েছে এবারের ব্রিকস সম্মেলন (২২-২৩ আগষ্টে) আগে হওয়া আর এবার তারা নিজেরা ডালপালা বিস্তার করে বড় প্রভাব ও বড় আশা নিয়ে হাজির হয়েছে – বলে সেই জোটবদ্ধ প্রভাব জি২০ তে পিছন থেকে  ক্রিয়াশীল ছিল। আর তাদের চাপেই মূলত এই আপোষী যৌথ ঘোষণা ২০২৩। যেখানে রাশিয়াকে আগের বছরের মত অভিযুক্ত করা দূরে থাক – এবার যৌথ ঘোষণায় রাশিয়া শব্দটাই নাই, অনুপস্থিত!
    মজার কথা হল, এই পিছনের ঘটনাটা আমেরিকা প্রভাবিত মিডিয়ায় রিপোর্টেড হয় নাই। হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী এএফপি-ফ্রান্স২৪ তে মানে, AFP এই গ্লোবাল মিডিয়া এজেন্সিতে আর তা প্রকাশিত হয়েছে FRANCE24  এই টিভি-প্রিন্ট মিডিয়া গ্রুপের পত্রিকায়। এরা নাম প্রকাশ না করে লিখেছে,   ” আমরা পুরা জি২০ সম্মেলনকে ইউক্রেনাইজড করে ফেলার পশ্চিমা  প্রচেষ্টার হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি এবং সম্মেলন সফল করেছি।

    “We were able to prevent the West’s attempts
    to ‘Ukrainize’ the summit agenda,” the veteran
    diplomat said, dubbing the two-day gathering a “success”.

     এদিকে এই সুযোগে রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভও সুযোগ নিয়েছেন – ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানাচ্ছে তিনি বলেছেন, এক ইউক্রেন ইস্যু দিয়ে যেন যাতে এবার জি২০ সম্মেলনকে ঢেকে ফেলা না যায় সেব্যাপারে মূল কাজটা করেছে ‘গ্লোবাল সাউথ’ গ্রুপ [Global South helped avoid Ukraine issue overshadowing G20 agenda: Russia]।  গ্লোবাল সাউথ বলতে ব্রিকস-কে বুঝানো হয়ে থাকে।  আর এই সুযোগে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা আর সাউথ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামফোসা ভোকাল হয়ে উঠতে শুরু করেন।
    লুলা বলেন, জি২০ এর এজেন্ডাকে কোন বাইরের ঘটনা আমাদের মধ্যে বিভক্তি ঘটায় তা হতে দিতে পারি না। বাইরের ঘটনা বলতে তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের ইস্যু বুঝিয়েছেন। আরো বলেছেন, জি২০ কে বিভক্ত করার কোন শখ নাই আমাদের। দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বদলে আমাদের দরকার শান্তি ও সহযোগিতা!

    “We cannot let geopolitical issues sequester the G20 agenda
    of discussions,” Lula said, an implicit reference to wrangling over the Ukraine war.
    “We have no interest in a divided G20. We need peace and cooperation instead of conflict.”

     এদিকে আগামি বছরের জি২০ এর সভাপতি হচ্ছেন ব্রাজিলের লুলা। তাই তিনি এখনই ঘোষণা করে দিয়েছেন, তিনি যদি আগামি বছরও প্রেসিডেন্ট থাকেন (যদিও না থাকার কোন কারণ নাই) পুতিন ঐ সম্মেলনে আসবেন কারণ তিনি (পুতিনকে) গ্রেফতার হওয়ার কোন সুযোগ রাখবেন না [ If I’m the president of Brazil and if he comes to Brazil, there‘s no way that he will be arrested,” he told Indian news network Firstpost on Saturday.]। 

    আর এই সুযোগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভারভ এক মন্তব্য করে নিয়েছেন – এবারের জি২০ সম্মেলন এক “বাঁধভাঙ্গা সম্মেলন” – …  Calling it a “breakthrough summit”, Lavrov said 

    এই ছিল মোটাদাগে সম্মেলনে পক্ষ-বিপক্ষের মন্তব্য বা মনের কথাগুলো!! এথেকে অন্তত একটা জিনিষ পরিস্কার যে দুনিয়ার নেতৃত্ব অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব প্রবলভাবে পরিবর্তিত, বদলে যাওয়া শুরু হয়ে গেছে।  এবছরের ব্রিকস আর জি২০ সম্মেলন এর দুই ঐতিহাসিক চিহ্ন হয়ে থাকল। 

    শেষ কিছু কথাঃ
    কিন্তু জি২০ জিনিষটা কী? কারা এমন সম্মেলনের চাহিদা দাতা? কারণ, এই টপ জিডিপি-ওয়ালা দুনিয়ার ২০ রাষ্ট্র  এরা তো বিশেষ আমেরিকা-চীনা বলে মূল দুই পক্ষ-বিপক্ষে পরস্পরের চরম বিরোধী! তাহলে দুনিয়ায় এমন আ

    র কে আছে যে এমন ২০ দেশকে এই সম্মেলন প্রতি বছর জড়ো হতে বাধ্য করছে??? সেসব জানলে হয়তো এবারের সম্মেলনের ঘটনাগুলো আরো পরিস্কার বুঝতে তা সহায়ক হত!!

    হ্যা ঠিক তাই!  সেজন্য আগামিতে জি২০ গ্রুপ এরা কে কারা কী এদের উদ্দেশ্যে আর কে এর পরিচালক সে নিয়ে আগামিতে লেখা আনব; সেকথা বলে শেষ করছি!

     

    আপডেটেডঃ   আপডেট ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩  রাত ০৯ঃ ৪৮

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ভারতের স্বার্থে শাহরিয়ারের চীন বা হাসিনাবিরোধিতা দেখানোর বাড়াবাড়ি

    ভারতের স্বার্থে শাহরিয়ারের চীন বা হাসিনাবিরোধিতা দেখানোর বাড়াবাড়ি
    গৌতম দাস
    ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩   ১৯ঃ ৪৭ সন্ধ্যা
    https://wp.me/p1sCvy-4XV

     

           ‘চীনের উত্থান : উদ্বিগ্ন প্রতিবেশী’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন

    শাহরিয়ার কবীর এবার একেবারে ধরা খেয়ে গেছেন। এটা টু মাচ[too much] হয়ে গেছে; তিনি সীমা ছাড়িয়েছেন। এছাড়া, আরেকটু বারাবাড়ি করলে এবার হয়ত দেখব তাকে উপড়ে ফেলে দেয়া হয়েছে।হয়ত দেখব তিনি নিজেই লিখে দাবি করছেন যে তিনি বোবা হয়ে গেছেন!!! হা ব্যাপারটা আসলেই এতই সিরিয়াস!!
    বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচন কী করে পার হবে, হাসিনা সরকার টিকে যেতে পারবেন কীনা এটা একটা অনিশ্চয়তা যা কেউই কী দাঁড়াবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারে; তাতে আপনি যে-পক্ষেরই লোক হন। তবে আপনি আত্মবি্শ্বাস দেখাতে পারেন, প্রপাগান্ডা করতে পারেন বা এমন পক্ষ-বিপক্ষ অনেক কিছুই! কিন্তু অন্তত পরবর্তি ছয়-সাত মাসের পরেই একমাত্র নিশ্চিত জানা যাবে যে ঠিক কী ঘটল। এর আগে দুপক্ষই প্রাণপণ নিজের পক্ষে চেষ্টা করে যাবে এটাও স্বাভাবিক। কিন্তু পরিস্থিতি্তের কোন আন্দাজ ছাড়াই এমন সময়ে শাহরিয়ার ভারতের এক দালালির ঠিকাদারি নিয়ে এসেছেন। সেটা হল হাসিনা যেন চীন-ঘনিষ্ট না হন – ভারতকে ফেলে চীনা ঘোরতর সহযোগিতা নিতে না যান ইত্যাদি এমন সেসব প্রপাগান্ডা!
    এটা কে না জানে যে হাসিনা এই সংকটে নিজে যেকোনভাবে ক্ষমতায় টিকে যাবার চেষ্টা করবেন।  তাতে চীনের কোলে না কার কোলে উঠে এটা পার হবেন সেটা তো সেকেন্ডারি বিবেচনা!  প্রাইমারি বিবেচনা হল, সংকট পার হওয়া!  অথচ মামার বাড়ীর আবদারের মত ভারত বলছে  যে না তুমি চীনের কোলে উঠতে পারবা না!!!  আর শাহরিয়ারকে লাগিয়েছে ঠিকা দিয়ে এনিয়ে প্রপাগান্দা করতে! সব বিচারেই এটা অর্থহীন!  কারণ হাসিনার এক নম্বর বিবেচনা হল, ক্ষমতায় টিকে যাওয়া। আগেও তাকে টিকতে হবে। টিকে গেলে এরপরে যে হয়ত ভারতের জন্য কিছু করতেও পারে। অথচ ভারতের পোলাপানি আবদার হল যে না, হাসিনাকে সবার আগে ভারতের স্বার্থ মানতে হবে, বুঝতে হবে??? কোন সুস্থ মানুষ এভাবে চিন্তা করে না! আর এই অসুস্থ আর অবাস্তব চিন্তাটাকে বাংলাদেশে ফেরি করার ঠিকা নিয়ে এসেছে শাহরিয়ার কবীর! যেন ভারতের এই ঠিকা টা না পেলে বা নিলে আগামি বছর সে না খেয়ে থাকবে যেন এমন মরণপণ অবস্থ দশা তার!  যেন এক রেলওয়ে কুলি যে লাগেজটা বহন অযোগ্য কিনা তা বুঝবার অবস্থা নাই; বাসায় অভাব এত বেশি!!

    বাংলাদেশের প্রো-ইন্ডিয়ানদের এক প্রকাশ্যে মহড়া হয়েছে গতকাল। এরা সরকারের ঘরে উঠে বসে থাকা লোকজন এবং এরা সরকারের ঘরে বসেই সরকারের বিরোধীতা করতে চাইছেন।
    এরা সরকারের ঘরেই বসে থাকা লোক এবং বাংলাদেশিই; কিন্তু প্রো-ইন্ডিয়ান এলিমেন্ট। ভারতের বাংলাদেশ নীতি দেখভাল করার ঠিকাদার বলা যায় সম্ভবত এদেরকে!
    গতকাল, এক পুস্তক প্রকাশনী বা “মোড়ক উন্মোচন” অনুষ্ঠান হয়েছে – পত্রিকার ভাষায় বললে, “মঙ্গলবার বিকালে প্রেস ক্লাবে “চীনের উত্থান: উদ্বিগ্ন প্রতিবেশি” শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান” হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীর (মানিক) রচিত এই বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের সময় মূখ্য আলোচকের বক্তব্য দেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির”।

    বইয়ের নাম এর মধ্যে “উদ্বিগ্ন” শব্দটা আছে – আর সেই উদ্বিগ্ন প্রতিবেশিটা হচ্ছে বাংলাদেশ নয়, সেটা আসলে ভারত। কিন্তু সে তার সেই উদ্বিগ্নতা – এটা সে চালিয়ে দিতে চায় বাংলাদেশের নামে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে বর্তমান হাসিনা সরকারের নামে।

    শাহরিয়ারের সারকথা হল – চীন খারাপঃ
    কিন্তু কেন খারাপ?
    ১। শাহরিয়ার বলেছেন,  … “এই বইয়ে  (চীনের উত্থান: উদ্বিগ্ন প্রতিবেশি) প্রাসঙ্গিকভাবে উঠে এসেছে কীভাবে চীনের স্বাধীনতায় ভারত বিশাল অবদান রেখেছে। তখন স্লোগান ছিলো হিন্দি-চীনি ভাই ভাই। সেই সৌহার্দ্য থেকে কীভাবে সংঘাতে পৌঁছল…”।

    উপরে কথিত, চীনের স্বাধীনতায় ভারত বিশাল অবদান – এই তথ্য ভুল।  অন্তত গত ২০২২ ডিসেম্বরে কলকাতার প্রাক্তন সাংবাদিক ও গোয়েন্দার সংস্থার লোক সুখরঞ্জন দাসগুপ্তের এক লেখা ছাপা হয়েছে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় শিরোনামঃ চীন-ভারত সম্পর্ক কোন পথে। সেই লেখার ভাষ্য শাহরিয়ারের এই তথ্য সাপোর্ট করে না।

    আর খুবই অল্পকথায় বলতে ঘটনাটা আসলে, ১৯৬০ সালে  চীন-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ট করতে নেহেরু চৌএনলাইকে কলকাতায় এনেছিলেন। আর সেখানকার শ্লোগান ছিল হিন্দি-চীনি ভাই ভাই অথবা নেহেরুর পঞ্চশীলা নীতি ইত্যাদি। তাই এটা না চীন (১৯৪৯) না ভারত (১৯৪৭) এমন কারো স্বাধীনতায় কারো অবদানের ঘটনাই নয়।   আর সেটা আবার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট (1953 to 1961) আইসেনহাওয়ারের আমল। যিনি বিখ্যাত বা কুখ্যাত – সিআইএ পাঠিয়ে দেশ দখল- এর কারণে। তিনি নেহেরুকে পটিয়ে তিব্বতের দালাইলামাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও তাদেরকে মাও-বিরোধী ততপরতায় সহায়তা দিতে সি আইএ পাঠিয়েছিলেন ভারতের মাধ্যমে – যারা ভারতে থেকে এই ততপরতা করবে। কিন্তু মাও এর সরকার এসব টের পেয়ে যখন সামরিকভাবে ধাওয়া দেন তখন সিআইএ দালাইলামাকে সাথে নিয়ে তিব্বত ছেড়ে পালিয়ে ভারতের আশ্রয়ে পর্যন্ত তুলে দিয়ে গেছিল। কিন্তু  তাদের ভারতে প্রবেশ,  সেটা ভারতের হিমাচল প্রদেশ দিয়ে নয় যেখানে এখন দালাইলামা আশ্রিত। সিআইএ অনেক ঘুর পথে আসামের দিশপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে এসেছিল। আর চীনারা সেই ধাওয়া করতে এসেই তারা পুরা আসাম দখল করেছিল আর একমাস একদিন পরে নিজেরাই তা ছেড়ে দিয়ে চীনে ফিরে যায়।
    কাজেই শাহরিয়ারের উচিত একটু কষ্ট করা নেট ঘেটে দেখা সস্তা ভারতীয় যা মনে চায় লিখাগুলোর ফাঁদে না পরা!

    ২।  শাহরিয়ার ঐ সভায় বলেছেন, “…এদিকে নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বাইরে চীন কাউকে সাহায্য করেনি। তাই চীন-ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব আমাদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে কিনা সে বিষয়ে ভাবতে হবে”।
    এখানে হঠাত করে চীন-ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব – এর কথা বললেন কেন? বললেন কারণ “শাহরিয়ার ভারতের স্বার্থপন্থী” হয়ে এবার উলটা হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলছেন। আর তা বলছেন যেন ভারতের মুখপাত্র হয়ে যে, হাসিনা আপনি – “চীন ও ভারত দুদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছেন – এটা বাংলাদেশের জন্য বিপদ আনবে। তাই হাসিনা,  সেটা না করে আপনি কেবল ভারতের সাথে লেগে থাকেন”। ভারতের এমন খায়েসটা ভারত শাহরিয়ারকে দিয়ে অভিযোগের আকারে তুলিয়েছে।

    এতা বলাই বাহুল্য আসন্ন নির্বাচন ইস্যুতে হাসিনা ভীষণ আমেরিকান চাপে আছেন। কোনভাবে একটা নির্বাচন হয়েছে আর তিনি আবার জিতেছেন – এটা ঘোষণা দিতে পারলে এরপর বাকিটা মানে আমেরিকান পরের চাপ ডিঙিয়ে টিকে থাকার ব্যপারে চীন তাকে সাহায্য করবে – এমন একটা ঝাপসা বয়ান বাজারে চালু আছে।
    এটা আদৌ সত্য কিনা তেমন ডকুমেন্ট অর্থে তা কেউ দেখেছে জানা যায় না। কিন্তু মোদির ভারত এই ঝাপসা বয়ানের ভিত্তিতেই হাসিনা বিরোধিতা শুরু করেছে বা প্রপাগান্ডাও শুরু করেছে। আর এটাই এসব কথা ঢাকায় চালু হবার পিছনের কারণ।  আর এসব প্রপাগান্ডাই বাংলাদেশে চীন-হাসিনা বিশেষ সম্পর্কের রহস্য হয়ে ঝাপসা বয়ান হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে।  শাহরিয়ারের এই বক্তৃতা সেই (ঝাপসা বয়ান ছড়ানোর) ততপরতারই একটা অংশ! তবে মোদি এই অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে এর কারণেই, বাংলাদেশকে ব্রিকসে উঠতে দেয় নাই – মনে করা সম্ভবত ভুল হবে না!। যদিও মুখে মুখে বা প্রকাশ্যে হাসিনা-মোদির মধ্যে এখনও অনেক ভাব – সেটাও জারি আছে। হাসিনা জি২০ এর সভায় যাচ্ছেন। অতএব সারকথায় ভারতের চোখে চীন খারাপ – একথাটাই এখানে শাহরিয়ার বলছেন। অথচ শাহরিয়ারের এই ততপরতাই বলে দিচ্ছে ঝাপসা বয়ান ভাষ্যটা ভারতের। যেটা শাহরিয়ার ফেরি করতে এনেছেন।

    ৩। শাহরিয়ার আরো বলছেন, চীনের ঋণের ফাঁদে পড়েছে শ্রীলঙ্কা, এর আগে একইভাবে পাকিস্তানও ঋণের ফাঁদে পড়েছিল। অথবা আরও সার করে অন্য জায়গায় বলেছেন, “চীন ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য এই অঞ্চলে ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। তাদের কাছ থেকে ঋণ সহায়তা নেওয়ার আগে ভাবতে হবে”।
    শাহরিয়ারের প্রথম মন্তব্য ঋণের ফাঁদে প্রসঙ্গ বাংলাদেশের বেলায় সত্যি নয়। পরিসংখ্যান বলে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ প্রশ্নে চীনের ঋণ তৃতীয় বড় ঋণ। তা এনিয়ে আর কথা বাড়াবো না। তবে পরের কথা যেটা বলেছেন এটাই সঠিক আর এটাই মুখ্য সুত্র যে “ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য এই অঞ্চলে ঋণ সহায়তা” । তবে আমি কেবল ‘ভূরাজনৈতিক’ এই আধো-বোলের আন্দাজি শব্দটা ফেলে দিব। বদলে “গ্লোবাল ইকনমি” বলব।  আর পরের আধিপত্য শব্দটা ফেলতে বলব না তবে অর্থ আরো খুলবার জন্য সাথে প্রভাব বিস্তার শব্দটা লাগিয়ে নিতে বলব। আর কথাটাকে এবার সাজিয়ে বলব – গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য ঋণ দেয়া ঠিক তা নয় বরং, এটা সারা দুনিয়াকে ব্যাপক অবকাঠামো ঋণ দিবার মুরোদ – এটা এসে গেলে একটা দেশ এটা দিয়েই এরপর গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়ে উঠে – এভাবে বলব।
    যেমন ধরেন ভারত একই চীনের পথে হাটে না কেন? কারণ ভারতের অর্থনীতির সেই মুরোদ নাই, এখনও হয় নাই। আবার তাহলে এর আগে আমেরিকা কী করেছিল? হা ঠিক আজ চীন যা করে নেতা হতে চাইছে ১৯৪৫ সালের পরে আমেরিকা ঠিক সেকাজ করেই গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার বা গ্লোবাল নেতা হয়েছিল। এমনকি মোদির ক্ষমতার প্রথম পাঁচ বছরে ভারতেও চীনা ঋণ কত অথবা এমনকি মোদি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালিন গুজরাতে চীনা ঋণ কত ছিল – সেসব তথ্য মোদি লুকিয়ে রেখেছে কেন? পারলে তা বের করেন!!!!
    ভারত চীনা প্রভাবের বিরোধী হতেই পারে। কিন্তু তা বলে শাহরিয়ার চীনা ঋণ খারাপ বা অনৈতিক ধরণের বাজে কথা – এসব তার না করাই ভাল!
    মনে রাখবেন হাসিনা যে সর্বক্ষণ উন্নয়নের গল্প শুনাচ্ছে এই ‘উন্নয়ন’ আর (চীনের দেয়া) অবকাঠামো ‘ঋণ’ – এদুটা একই কথা – দুদিক থেকে দেখে বলা। হাসিনা চীনা-ঋণ না পেলে বা নিলে কী করত???  ভারতের ঋণ নিত? ভারতের সে মুরোদ আছে????? একারণে, শাহরিয়ারের এসব কথা ফালতু কথা!!! আজাইরা ভারতকে চীনের উপরে – যেন বিশাল মুরোদের এমন গল্প ছড়াতে এসেছেন। অথচ এসব অর্থহীন!!!

    ৪। শাহরিয়ার আরো বলেছেন, “মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের ব্যবহৃত সব বুলেট চীনের: শাহরিয়ার কবির”। শাহরিয়ারের  এসব শুরশুরি উস্কানে আবেগ আওয়ামি লীগারেরাও খাবে না; প্রগতিবাদীরাও না। শাহরিয়ারের এটা হয়েছে আসলে পোপের চেয়েও বেশি খ্রীশ্চান হতে চাওয়া যেন! অনেক দেশেরই স্বাধীনতা যুদ্ধের শত্রু-মিত্র অনেক রকম ছিল, থাকে। ছিল বলছে মানে হল সেটা ধরে আজীবন বসে থাকা অবাস্তব চিন্তা। যেমন ধরেন ভিয়েতনামের (স্বাধীনতার যুদ্ধে) চেয়ে বড় আমেরিকান নিষ্পেষণ খুব কম দেশের ইতিহাসে আছে। এজেন্ট অরেঞ্জ (Agent Orange) শব্দটা গুগলে যেকেউ সার্চ দেন দেখেন কী বের হয়, কী এটা! এই কেমিক্যাল উড়োজাহাজ থেকে ছিটিয়ে ভিয়েতনামের গভীর বনজঙ্গল সব সাফ করা হয়েছিল যাতে বিদ্রোহিরা বনে লুকাতে না পারে; কারণ এই কেমিক্যাল toxic, plant-killing chemical (herbicide)।
    কিন্তু মানুষের জীবনের উপর এর প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ, যেদিকটা সকলেই উপেক্ষা ক্করেছিল। ভিয়েতনামিজদেরকে আমেরিকা মানুষ মনে করে নাই! এতই তীব্র ছিল তাদের নিজ স্বার্থবোধ। কারণ এটা মানুষের জীবনে cancer, congenital (birth) disorders and life-threatening health complications. নিয়ে আসে। আজও ভিয়েতনামের কোন দম্পতি জানে না যে তাদের বাচ্চা জন্ম নিতে গেলে কেমন বিকলাঙ্গ হবে – হাত স্বাভাবিক কিন্তু হঠাত করে কবজি থেকে  বা কনুই এর পর থেকে তা আর নাই, একইভাবে পা নাই – সারকথায় ডিফেক্টিভ বাচ্চা জন্ম নিচ্ছে এখনও যার কোন প্রতিকার নাই।  কিন্তু এই ভিয়েতনামেরই আজ সবচেয়ে বাণিজ্য সম্পর্ক ভাল আমেরিকার সাথে; অন্যতম রপ্তানি গন্তব্য!  এখন এর মানে কী ভিয়েৎনামিজরা খুব খারাপ!
    শাহরিয়ার  আপনি ভারতের স্বার্থে দালালির ঠিকাদারিতে বাংলাদেশের মানুষকে আবেগ-ইমোশনাল করে শুড়শুড়ি তুলার চেষ্টা করছেন? এখন বলেন কোনটা খারাপ? ভারতের কাছে আবার বেচবেন?  বাংলাদেশের  মানুষের আবেগ চটকাচ্ছেন কেন???

    ৫। শাহরিয়ারদের এই অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ফ্লপই হবে। ভারতের অর্থের অপচয়ই হবে। কারণ শাহরিয়ারদের টার্গেট শ্রোতার ঠিক নাই।
    এটা বলাই বাহুল্য যে যারা বাংলাদেশে এখন হাসিনাবিরোধী তারা শাহরিয়ারদের টার্গেট শ্রোতা গ্রুপ নয়। আর এমনিতেও বাংলাদেশের আম-মানুষ তারা খোদ শাহরিয়ার এন্ড গং এমন যেকারো বিরোধী সেই শাহবাগের দিন গুলো থেকেই। তাহলে শাহরিয়ারের টার্গেট শ্রোতা গ্রুপ কারা? যারা হাসিনার পক্ষের হাসিনার দলীয় লোক এরা? অথবা যারা ঠিক দলের নয় তবে লীগের সুবিধাভোগী? এরা?

    এরা শাহরিয়ারের কোন কথাতেই কান দিবে না তাতে তা যতই খোদ ভারতের স্বার্থকে প্রগতিবাদী জামা পড়িয়ে হাজির করলেও। এর মূল কারণ, এরা কেউই  ভারত ছেড়ে চীনের কোলে (হাসিনার) উঠাকে খারাপ ভাববে কেন? কোন কারণ নাই। এটা সারভাইবাল বা মরিয়া আত্মরক্ষার পর্যায়! এছাড়া এটা খারাপ ভাবার মধ্যে তো তাদের কোন স্বার্থই নাই!!! বরং হাসিনা টিকে গেলেই তাদের স্বার্থ!
    এছাড়া হাসিনার নেক নজরে যে আছে, পড়েছে একবার – সেই আবার এখন হাসিনাবিরোধীতা দেখাবে????? কেন? বরং হাসিনা এযাত্রায় টিকে গেলে তারা খুশি হবে। আর সেটা চীনের হাত ধরে কিনা তাতে তাদের কী এসে যায়? – সেটা কী তাদের জন্য কোন আপত্তি হবার কিছু????
    সারকথায় শাহরিয়ার গংদের পক্ষে এখন দাঁড়াবার কেউ নাই।তাদের বয়ান শুনবার মত কোন সামাজিক গ্রুপই এখন আমাদের সমাজে নাই।  এটা তো ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাইয়ের যুগ  একেবারেই নয়! যে প্রগতি-ওয়ালারা ঝাপিয়ে পড়বে!   আসলে শাহরিয়ার গংয়েরা সবাই   তারা এমন এক ভারতীয় ইচ্ছা-স্বার্থ ফেরি করার ঠিকা নিয়ে আসছেন যেটা এখন বাংলাদেশের কেউ খাবে না। আর বেশি বারাবাড়ি করলে হাসিনার উপর দিয়ে কথা বললে এরা নিজেরাই কেউ তাদেরকে ‘উপড়ে ফেলে দিবে’ – এমন রিস্ক নিচ্ছেন তারা।

    আর এটাই এক শাহরিয়ার কবীর আর ঐ বই লেখক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী (মানিক) ছাড়া ওখানে আর যারা বক্তব্য রেখেছেন তারা কেউই  – হাসিনা চীনা-ঘনিষ্ট হয়েছেন বা আরো হতে পারেন – এনিয়ে কোন অভিযোগ করে বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন। বরং সকলেই ভারসাম্য রেখে কথা বলেছেন। সারকথায় হাসিনাকে চটাতে চাচ্ছেন না -চটে যাক এমন কথা কেউ বলছেন না – যার সোজা মানে তারা সবার আগে হাসিনাকেই ছুয়ে থাকতে চান, আনুগত্য ঠিক রাখতে চান – এটা পরিস্কার রেখেছেন!!!

    ওখানে আর যারা বক্তৃতা দিয়েছেন তারা হলেন, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার ইত্যাদি কেউই ভারসাম্য না রেখে কথা বলেন নাই।  যেমন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মোহাম্মাদ আলী শিকদার। তিনি বলেন, চীন নিজের শক্তিতে উত্থান করেছে। চীনকে আমরা উপেক্ষা করতে পারবো না, তাই তাদের জানতে হবে। চীন যে প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছে- এতে সংঘাত অনিবার্য। এই অঞ্চলের দেশগুলোকে এই সংঘাত এড়াতে সচেষ্ট হতে হবে।

    এখন সবশেষে একটা কথা মনে করিয়ে দিব। কথিত হাসিনা-চীন আশ্বাস সেটা যদি সত্যিও ধরে নেই, তবুও এই সহায়তা পাওয়া তো শর্তযুক্ত। সে শর্ত বা বাস্তবতা বা যদির কথাটা হল,  যে হাসিনা সরকার চীনের সহায়তা পাবার পুর্বশর্ত  পুরণে নিজেকে কোনমতে করা একটা নির্বাচন দেখিয়ে নিজেকে বিজয়ী করতে পারতে হবে আগে। তবেই না এসব জল্পনা-কল্পনা!  কাজেই মোদির ভারত বা শাহরিয়ারের দালালির ঠিকাদারিতে  কি বললে এটা নিয়ে আমাদেরও এতে মনোযোগী হবার মত কিছুই নাই।  তবে এই লেখায় যা করা হল, তা হল, শাহরিয়ার গং যে মোদির ঝাপসা বয়ান টার উপর দাঁড়িয়ে প্রপাগান্ডা করতে এসেছেন সেটাই খুলে দেখিয়ে দেয়া!! এতটুকুই!

    একটা কথা লিখতে চেয়েছিলাম বাদ পড়ে গেছে। আগামি এক বছরের মধ্যে এটা একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে ভারত বাংলাদেশের রাজনীতি-তে কেউ না, কোন ফ্যাক্টর না। এটা ২০০৭ সালের আগে বাংলাদেশের কাছে যেমন ভারত ছিল, এটা সেই ভারত হয়ে যাবে। এর মূল কারণ, এখনো আমেরিকা ঘোষণা না দিয়ে যেটা করে যাচ্ছে তা হল – চীন ঠেকানোর ঠিকাদারিতে ভেট-উপহার হিশাবে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। বাইডেনের আমেরিকা সেই অবস্থানের ফাইনাল বদল বা সমাপ্তি টেনে দিলেও সেটা তিনি এখনও পাবলিক ঘোষণা দিয়ে করেন নাই।  অন্য আরেকটা ফ্যাক্টস হল, হাসিনা এখনও ক্ষমতায়। একারণে, মোদি  মিথ্যা ভাব ধরার সুযোগ নিতে পারছেন যেন ভারত এখনও আমেরিকার দেয়া খবরদারিটাই ব্যবহার করছে; সেটা তার যেন অটুট আছে। অথবা মোদির ভারত যা বাংলাদেশে করে মাতবরি দেখায় তা আমেরিকা অনুমোদিত অথবা মোদির ভারত চাইলেই সে আমেরিকার কাছে হাসিনার পক্ষ হয়ে সুপারিশ করতে পারে ইত্যাদি। অথচ  এসবই ভুয়া ভিত্তিহীন। আমেরিকা যা কিছু বাংলাদেশ প্রসঙ্গে  ২০০৭ সালে ভারতকে দিয়েছিল  সেসবই প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। কিন্তু হাসিনা এখনও ক্ষমতায় আছে বলে মোদি এই মিথ্যা ভাব ও অভিনয়টা এখনও করে যেতে পারছে। একারণেই অগ্নি রায়েরা মিথ্যা কথা বলে করে খেয়ে যেতে পারছে।

    আগামি এক বছরের মধ্যে এই জিনিষটাই এই মিথ্যা ভাব ধরা – এটাই উন্মুক্ত হয়ে যাবে যে বাংলাদেশের উপরে ভারত কেউ না। আর আমেরিকাও এমন কোন কর্তৃত্ব বাংলাদেশের উপর খাটাতে ভারতকে দেয় নাই; ফিরিয়ে নিয়েছে। এসবই স্পষ্ট উদাম হয়ে যাবে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের মে মাসের মধ্যে ভারতে নির্বাচন অনুষ্ঠান শেষ ফলাফলও প্রকাশ হয়ে যায় – এর পর থেকে।  ভারত কেউ না হয়ে যাবে। বাংলাদেশের উপর প্রভাব থাকবে কেবল আমেরিকা ও চীনের। একা ভারত, সে না আমেরিকা না চীনের ঘনিষ্ট থাকবে বা হবে। তবে ভারতের উপর আমেরিকান চাপ বাড়ার সম্ভাবনা (একেবারে বাংলাদেশের মত না হলেও ভারতের উপর আমেরিকার সাব-অর্ডিনেট হওয়ার চাপ বাড়বে) আর সে পরিস্থিতিতে ভারত হয়ত চীনের কোলে উঠতে চাইতে পারে।   ঘটনা যে দিকে গিয়েই থিতু হোক না কেন ভারত বাংলাদেশ কেউ না হয়ে যাবে ক্রমশ!! এই সম্ভাবনা এখন আমরা ক্রমশ উন্মুক্ত হতে দেখছি!

     

     

    আপডেটেডঃ   ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩;  রাত ০২ঃ ১৯ 

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • বিডিনিউজ বা চন্দন নন্দীর নাদানি

    বিডিনিউজ বা চন্দন নন্দীর নাদানি
    গৌতম দাস
    ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4WN

                                                                                         Caught in a cleft stick

    [রাজশাহী অঞ্চলের কিছু বিশেষ এক্সপ্রেশন-শব্দাবলী আছে – “মামু, কাকে লেড়েছো? সে খবর লিয়েছো?”
    খুবই কমিউনিকেটিং একটা আঞ্চলিক পদবাচ্য বটে! মানে হল, যা যথেষ্ট বুঝো নাই তা নিয়ে কথা বলতে গেছো কেন? এমনই কিছু অর্থ বিতে পারে এই ভাষ্য!
    চন্দন নন্দীর লেখার দশা হয়েছে তাই। তিনি এক অনিয়মিত সাংবাদিক, যার একটা লেখা আমাদের বিডিনিউজ২৪ মিডিয়া ছাপানোর পরে সবই ব্লক করে রাখা আছে। আজকের লেখা সেই প্রসঙ্গের ভাল-মন্দ দিক নিয়ে।
    বিডিনিউজ সরকার বা ভারতের ঘনিষ্ট বলে এমন এক পরিচিতি কারো কারো চোখে থাকা সত্বেও – এটা বিডিনিউজের দ্বিতীয়বার ব্লকড হওয়া, প্রথমটা ২০১৮ সালের। কেউ কোন একটা লেখা নিয়ে আসলেই সেটা বিডিনিউজ ছেপে দিবে তা হওয়ার কথা না। যেকোন লেখাই লেখা ছাপবার অনেক দায়দায়ীত্ব আছে। সেসব পূরণ ও পালন হচ্ছে কীনা সেসব দেখাও যেকোন দায়ীত্বশীল মিডিয়ার কাজ।  আবার কোন মিডিয়া বন্ধ করে দেয়া – এটাও খুব ভাল লক্ষণ না। ভাল সামাজিক প্রাকটিস নয়! তবে বাংলাদেশে আমরা এখন এমনই খারাপ অবস্থায় যে কোন নীতি-পলিসি বা তত্বকথা শুনার সময় নাই কারো। সবাই ক্ষমতা কেন্দ্রিক চিন্তা  ও ততপরতায় ব্যস্ত! এই অবস্থায়, চন্দন নন্দীর লেখা আলোচনার প্রসঙ্গ!]

    গত কয়েকদিন ধরে অনেক বিদেশী পত্রিকা, যার একটা বড় অংশই ভারতের মিডিয়া, তারা যা কিছুই লিখছে তাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছু থাকছে। ফলে চরম উন্মুখ উৎকন্ঠায় থাকা এখনকার বাংলাদেশের মানুষ সবকিছুর উপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে, তাদের কান খাড়া সবদিকে! তাই মুহুর্তেই সব ব্যক্তি জানাজানি সামাজিক হয়ে যাচ্ছে। এমন লেখাগুলো  যাদের মধ্যে নিউইয়র্ক টাইমসে মুজিব মাশাল [Mujib Mashal] নামের একজন যার লেখার শিরোনাম “নীরবে ধ্বংস করা হচ্ছে একটি গণতন্ত্রকে, বাংলাদেশে কাঠগড়ায় মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ [Quietly Crushing a Democracy: Millions on Trial in Bangladesh]”। যেটা আবার আমাদের মানবজমিন অনুবাদ করে ছেপেছে (লেখকের মুজিব মাশাল নামের বাংলা বানান আমি মানবজমিন -এরটাই অনুসরণ করেছি)।
    এই মুজিব সাহেবের লেখার প্রসঙ্গ তেমন কিছুই নতুন না, আমাদের আদালত পাড়ারই ঘটনা যা আমরা ফাঁসি ফাঁসি, ফাঁসি চাই এর সেকাল থেকে এপর্যন্ত  সব দেখছি, সহ্য করে চলছি। তবে এখন নতুন কেবল এতটুকুই যে এই মুজিব সাহেব এবার এদিকে চোখ ফিরিয়েছেন। কাজেই এনিয়ে আমাদের মন্তব্য একটাই যেটা উনি নিজে নিজেকেই জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন যে উনি এখন কেন, কী মনে করে এদিকে ফিরলেন!  তার সব প্রশ্নের জবাব ওখানেই আছে!!  আর আমরা ভিকটিম এর বেশি কী বলতে পারে!! শুনেছি ভিক্ষার চালের গুনাগুণ নিয়ে আলোচনা চলে না। অতএব আমাদের এমন সময়ে আমাদের নিয়ে, মনোযোগ ফিরানো সবাইকেই স্বাগত!

    সাথে আরও আছে; মানে আছে ভারতীয় এক চন্দন নন্দীর লেখা। এ’লাইনে পুরানা লোক; ২০১৮ সালের আগে বাংলাদেশ নিয়ে এখনকার মত বেশ ততপরতা দেখিয়েছিলেন। অনেকের মনে হত, তিনি ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের সাথে কানেকটেড লোক তবে, পুরানা কংগ্রেসি কোণায় পরে থাকা ধারার। আর সবচেয়ে বড় কথা সাংবাদিকতার চেয়ে পাগলামি করেন বেশি। আর তাঁর পাগলামিটাই অপ-সাংবাদিকতা হয়ে যায়।  তার এবারের লেখার শিরোনামঃ বিভক্ত দুপথের মাথায় আটকে যাওয়া [Caught in a cleft stick]। ঐ লেখার শুরুতেই দাবি করা হয়েছে এই লেখা আগে বাংলাদেশের বিডিনিউজ২৪ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। [যে ভার্সানটা আমার হাতে তা নর্থ-ইস্টের এক ওয়েব-সাইট থেকে নেয়া। আর বলে রাখি ভারতের নর্থ-ইস্টের কোন ওয়েব-সাইট মানে এরা কম-বেশি গোয়েন্দা ফান্ডেড।] এই সাইটে লেখাটার শুরুতেই দাবি করা হয়েছে লেখাটা আমাদের বিডিনিউজে প্রকাশিত হবার দুঘন্টা পরেই নাকি বিডিনিউজের বাংলা ও ইংরাজি ওয়েব সাইট এটা আর বাংলাদেশ ও ভারতের দর্শকেরা কেউ দেখতে পারছে না, ব্লক করে দেয়া হয়েছে।  কথা কতদুর সত্য-মিথ্যা জানি না। তবে ভারত থেকে নয়,এমন, অন্য-বিদেশ থেকে অন্তত ইংরাজি বিডিনিউজ তারা দেখতে পাচ্ছে বলে জানিয়েছে।

    [This article by Chandan Nandy first appeared in Bangladesh’s premier news portal www.bdnews24.com earlier this morning. In less than two hours after the article’s publication, both the English and Bengali websites of bdnews24.com was blocked for viewers/readers in Bangladesh as well as India]

    তবে এটা বাংলাদেশে মানে আমাদের বিটিআরসি [BTRC] থেকে ব্লক করে দেয়া অসম্ভব নয়। বরং দেয়াটাই আমার কাছে স্বাভাবিক পরিণতি মনে হয়!

    চন্দন নন্দীর আরেক দিক থেকে পরিচয়ঃ
    বাংলাদেশে এটা প্রতিষ্ঠিত যে গত ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সেবার একটা নিশিভোট বা রাতের ভোট হয়েছিল। মজার কথা হল এনিয়ে চন্দন নন্দীর স্টেক কী? এই পাগলের হাল কী? মানে ঐ নির্বাচন নিয়ে এর ততপরতা বা বয়ান কী ছিল?  কারণ, আজকের মত ২০১৭ সাল থেকেই সে বাংলাদেশ নিয়ে সক্রিয় ছিল, কোন একটা  পত্রিকা [মালয়েশিয়া থেকে প্রকাশিত সাউথ এশিয়া মনিটর নামে। southasianmonitor.com] এর সাথে সম্পর্কিত থেকে। পত্রিকাটা এখন খোলা দেখালেও সাইটটা আপডেট হয়না এভাবে খোলা আছে।
    কিন্তু যেটা এখন  গুরুত্বপুর্ণ তা হল, ২০১৮ আলের নির্বাচন হয়েছিল ৩০ ডিসেম্বর। আর এর পরের দিন চন্দন নন্দী নিজের টুইট একাউন্ট থেকে একটা টুইট করেছিলেন ৩১ডিসেম্বর ২০১৮, যেটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। তার সে টুইট একাউন্ট এখন খোলা যায় না। কিন্তু সংগ্রহ করে রেখে দেয়া একটা স্ন্যাপ সর্ট এখানে দিচ্ছি। ছবিতেই যা কথা বলার বলে তাই কোন বর্ণনা দিলাম না।

    কেন চন্দন নন্দীর লেখা বা বিডিনিউজ ব্লকডঃ
    এককথায় বললে, চন্দন নন্দীর লেখা জার্নালিজম হয় নাই। মানে এর নুন্যতম নীতি অনুসরণ করে নাই। এই লেখাটা শুধু ভুয়া নয় বরং প্রমানিত মনে করা যায় এমন কোন সোর্সের উল্লেখ তিনি করতে পারেন নাই, অথচ যা খুশি লিখে গেছেন; সে কারণে।

    এখন পালটা অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন তাহলে কিছুদিন আগে আনন্দবাজারের অগ্নি রায় এর লেখা ও পরে যা ডয়েচ ভেলে তে ছাপিয়ে এরপরে তা প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারে ছাপা হয়েছিল – সেই লেখা ও ততপরতাগুলোও তো জার্নালিজম ছিল না। তাহলে তাদের বেলায় আমাদের সরকার ‘কোন ব্লক করা’ বা কোন বাধাই দেয় নাই কেন?  এককথায়, এনিয়ে অনুমান করা জবাব হল, অগ্নি-আলো-স্টার এভাবে – এই গোষ্ঠির ততপরতাটা ছিল সরকারের পক্ষে যায় এমন প্রপাগান্ডা, আর বুঝাই যাচ্ছিল যে এটা দুদেশেরই সরকারের “জানাশুনা” লোকের মাধ্যমে ঘটানো কাজ। কিন্তু সেই মিথা প্রপাগান্ডা বাংলাদেশের সরকারি দলের কর্মিদের মনোবল বাড়াবে – এই মশলা আছে মনে করেছিল বলেই সম্ভবত তা চলতে দেয়া হয়েছিল – এটাই সম্ভাব্য কারণ বলে অনুমান!

    অথচ বিপরীতে চন্দন নন্দী – সবকিছুতেই তিনি একা, একাই সব। এমনিতেই সব সময় তার ভিতর একটা ঝোঁক দেখা যায় যে “তিনি সাহসী – সাহসী জার্নালিজম করেন” – এই আত্মম্ভরিতা বা নিজের সম্পর্কে অতি আত্মবিশ্বাসী ও মিথ্যা উচু ধারণা পোষণ করে লিখে থাকেন। সম্ভবত এই ‘অতি আত্মবিশ্বাসী’ অথচ ভিত্তিহীন সাহস দেখাতে গিয়ে  তিনি আলোচ্য লেখাটা লিখেছেন বাংলাদেশ সরকারকেই অভিযুক্ত করে অথচ কোন প্রমাণ দেন নাই! এটা গোয়ার মানুষের অতি সাহসী বোকামি বলা হয় সম্ভবত! যেমন তার পুরা লেখাটাই দাঁড়িয়ে আছে,   “senior Awami League sources” এই অস্পষ্ট ও অর্থহীন “সুত্র” এর বরাতে!  আওয়ামি লীগের সরকারের বিরুদ্ধে ভুয়া এক “আওয়ামি বরাতে” – যা খুশি তাই বলে দিবেন – এটা তো এক আত্মহত্যা-প্রবণ গাধামি!!   প্রায় প্রতি প্যারার শুরুতে তিনি এই অর্থহীন কথিত এই একই সোর্সের বরাতে  যা খুশি লিখে গেছেন; বেপরোয়াভাবে। অতএব এমন কান্ডগুলোতে তার না জানার কোন কারণ নাই যে এটা নুন্যতম কোন নীতি মেনে সাংবাদিকতা নয়। এটা কোন সাংবাদিক রিপোর্টই নয়।

    তার বোকা সাহসের আরো নমুনা আছেঃ
    প্রথমত তিনি বাংলাদেশ নিয়ে লিখতে এসেছেন ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ কোলে বসে; তারা যে অংশেরই হোক! অর্থাৎ তাঁর কোন লেখাই সাংবাদিকতা হবেই না!  কিন্তু তিনি সম্ভবত ভেবেছেন, যেহেতু এ’লেখা হাসিনার মোদির ভারতকে ফেলে কথিত চীনের কোলের উঠে যাওয়ার গল্প – তাই তিনি বীরবেশে সব বাধা পার হয়ে যেতে পারবেন!  অথচ তিনি কোন যুক্তি বোধবুদ্ধি তে কাজ করতে পারেন না,  আবার এটা তিনি খেয়াল করেন না। তিনি চীনবিরোধী ভারতীয় দেশপ্রেমিক উগ্র জাতিবাদী হতে চেয়ে হাসিনাকেই অভিযুক্ত করছেন। তার মানে এলেখার টার্গেট পাঠক ভারতীয়রা। কারণ,  একটা কথিত “ভারতীয় দেশপ্রেমিক উগ্র জাতিবাদী” মনকে টার্গেট করে লেখা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠির কোন অংশ পছন্দ করার কোন কারণ নাই। তিনি আওয়ামি লীগের সুবিধাভোগী হলেও না। এমনকি বাংলাদেশের হিন্দুরাও ভয় ও দ্বিধা করবে!

    তাহলে এই লেখা সরাসরি বাংলাদেশেই ছাপতে চাওয়ার এত মরিয়া আগ্রহ কেন??? এত অর্থ একটাই তা হল, আমি একটা ভারতীয় এক বেপরোয়া হিন্দু-মন দিয়ে বাঙ্গলাদেশ তো বটেই সারা দুনিয়াকে দেখতে চান! শুধু তাই না আপনার এই দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান আপনি বাংলাদেশের মাথায় চাপায় দিতে চান! এমনকি এটা এতই বেপরোয়া যে তা আওয়ামি লীগ তো বটেই হাসিনাকেও বাধ্য করতে চান!   এটাই এক অন্ধ ও বোকার গাধামি সাহস!

    চন্দন নন্দী নিজেকে এতই অযোগ্য ভাবে তুলে ধরেছেন যে তিনি মনে করেন বা ধরেই নিয়েছেন যে  বাংলাদেশের কোন স্বার্থ নাই, এনিয়ে কোন স্বার্থবোধও নাই; শুধু তাই না। খোদ প্রধানমন্ত্রী হাসিনারও ক্ষমতায় টিকে থাকবারও যেন কোন স্বার্থ নাই!  কেবল ভারতের স্বার্থই আছে আর সেটাই সহি। আর তাই, বাকি আমাদের সকলকে ভারতের পক্ষে তাও সেটা আবার মুরোদহীন এক ভারত – এর পক্ষে জয়গান করতে হবে, সেটা করাই আমাদের কাজ! সহজ ভাষায় বললে এটা এক স্টুপিডিটি; আর তা এমনই স্টুপিডিটি  যা কোন সুস্থ মানুষ করে না!

    তবে চন্দন নন্দীর এমন তিনটা স্টুপিডিটি আছেঃ

    প্রথম স্টুপিডিটি বা গাধামিঃ
    সম্ভবত গাধাও একটা পর্যায়ের পর আর গাধামি করে না। কিন্তু চন্দন নন্দী তাতে থামতেও রাজি না, এমনই তার স্টুপিডিটির লেভেল! তার লেখায় নিচের এই বাক্যটা আছে সেখান থেকে উঠিয়েছিঃ

    “However, the only concession that the Awami League government
    is likely to make is to partially reduce the level of repression on
    opposition party leaders, cadres and supporters.”

    নন্দী বলছে, আওয়ামি লীগ এবার একটাই কনসেশন বা ছাড় দিতে পারবে সেটা হল level of repression। এইটায় একটু ছাড় দিতে পারবে। মানে এবার বিরোধীদেরকে গুম, খুন অপহরণ একটু কম করে করবে। মজা না। আমাদের তো একথা শুনে হাততালি দেয়া উচিত। আর চন্দন নন্দীর নামে জয়ধ্বনি!! তাই না??
    কিন্তু ঘটনা হল উলটা? হাসিনা সরকারের এতে প্রচন্ড ক্ষেপে উঠাই স্বাভাবিক। কেন???
    কারণ, এই বক্তব্য দিয়ে নন্দী স্বীকার করে ফেলেছেন যে এর আগে হাসিনার দল বিনা concession এর হেভি level of repression তাহলে আওয়ামি লীগ করেছিল। আর সে তুলনায় এবার কম করবে – এটাই তো নন্দীর ভাষ্য???
    এটা স্টুপিড চন্দন নন্দী খেয়াল নাই। তিনি খেয়াল করছেন না। কিন্তু হাসিনা সরকারকে অবশ্যই এই স্বীকারোক্তি অপসারণ করতেই হবে! কারণ, সে তো স্টুপিড নন্দী না; হওয়ার কোন সুযোগও নাই। তাই স্বভাবতই সে নন্দী-ভৃঙ্গী সবাইকে সাথে বিডিনিউজ কেও আগাছার মত উপড়ে ফেলে দিয়েছে!!!
    এখন তামসাটা হল, এতে নন্দীও বেজায় খুশি হয়েছে। কারণ, “কোন লেখা নিষিদ্ধ হওয়া মানেই তা নিশ্চয় খুব দামি লেখা????” আর এই দামি লেখাটা প্রসব করেছে নন্দী!  আর তাতে নিশ্চয় আমরা বুঝতে পারছি গাধা কত প্রকার ও কী কী!!!!

    দ্বিতীয় স্টুপিডিটি বা গাধামিঃ
    এবার দেখি পরেরটা।  তার লেখায় পরের আরেক বাক্য হল এরকমঃ

    This time around, there are few reports of “disappearance” of opposition party cadres.

    এবারও তিনি আরো বড় গাধা হয়ে আমাদেরকে আশ্বস্ত করছেন যে এবার বিরোধীদেরকে গুম বা অপহরণ কম হচ্ছে বা হবে।  চন্দন নন্দী হিউম্যান রাইট হিশাবে “অপহরণ” শব্দের  অর্থ তাতপর্য কোন্দিনই বুঝেন নাই তাই বুঝা যাচ্ছে। ঠিক যেমন আমাদের দিপু মনি তিনি ২০১৩ সালে তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জেনেভায় জাতিসংঘের  (UPR) সভায় খোলাখুলি বলেছিলেন বাংলাদেশের আইনে  গুম বা অপহরণ (disappearance) বলতে কোন অপরাধের কথা নাই। অতএব বাংলাদেশে কোন disappearance নাই! এতে যে যা বুঝছেন বুঝে নেন! আর এখানে চন্দন নন্দী দেখা যাচ্ছে আরেক কাঠি সরেস! তিনি সরকারের হয়ে আশ্বস্ত করছেন এবার disappearance হবে তবে কম হবে!!!
    অথচ ঘটনা হল, একটা disappearance এর ঘটনা যদি ICC তে প্রমাণ করা যায় তো হুকুমের আসামি হিশাবে প্রধান নির্দেশদাতার সর্বোচ্চ শাস্তি হয়ে যাবে! আমি নিশ্চিত এসব দিক এই চন্দন নন্দী কখনও খবর নেন নাই। তাই অবলীলায় বলে যেতে পারছেন এবার disappearance কম হবে। মানে যেন এবছরের ধানের ফলনের হিসাব দিচ্ছেন!!!
    তাই এক্ষেত্রেও হাসিনা সরকারকে অবশ্যই নিজ স্বার্থে নিজে স্টুপিড নন্দী না হয়ে নন্দী-ভৃঙ্গীসহ বিডিনিউজ কেও আগাছার মত উপড়ে ফেলে দেয়া ছাড়া পথ ছিল না!!!

    তৃতীয় স্টুপিডিটি বা গাধামিঃ
    এলেখায় তিনি, কোন রাষ্ট্রের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে  সেটা যে কোন ধরণের চাপবিহীন ও বিশ্বাসযোগ্য হতেই হয় এবং তা উল্লেখ করা লাগে নাই নইলে কে জনপ্রতিনিধি হল?  আর জনপ্রতিনিধিত্বই যদি ফেয়ার ভাবে না হয় তো ওটা তো কোন রিপাবলিকই না – গণপ্রতিনিধির রাষ্ট্র না, সমাজের কোটারি গ্রুপের ক্ষমতা হল সেটা এটাই তো ফ্যাসিবাদ হয়েছে বা হবে। অথচ এলেখায় চন্দন নন্দী সব সময় বলে গেছেন, নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার একটা রিলেটিভ ধারণা মাত্র। হাসিনাও  নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার করতে পারেন। সেটা পিটার হাসের মাত্রায়  ফ্রি ও ফেয়ার নির্বাচন না হলেও চলবে। এটা সোজাসুজি একটা শয়তানি। একেবারে যেকোন ধর্মতত্বে শয়তানের যে বর্ণনা আছে সেই দানব এই চন্দন নন্দী। তিনি ভারতের নির্বাচনে গইয়ে তার এই শয়তানি তত্ব ফেরি করে না কেন?  আগে তিনি সেটা করে আসেন এরপর ………।
    তাই এসব শয়তানি বক্তব্য দেয়া তা বলার কোন মানে হয় না। অথচ তিনি কী বলেছেন দে৪খেনঃ

    the Western bloc, including the US, seek to play a role “far stronger than India”
    in shaping the road for a relatively free and fair elections in Bangladesh.

    অর্থাৎ তিনি সুজাতা সিং এর ২০১৩ সালের হস্তক্ষেপটাকে জায়েজ করতে সেটা এবারের পিটার হাসের ভুমিকার সাথে তুলনা করে দিলেন। আর কৌশলে দাবি করলেন এটা একটা relatively free and fair elections – মানে তুলনামূলক ঘটনা মাত্র বলে দেখাতে চাইলেন। মানে এটা মাত্রাজ্ঞানের ব্যবপার যা একেক জনের একেক রকম হয় =- সেই মাত্রাজ্ঞান।   এটা যেন “far stronger than India” মাত্র এতটুকুই।
    তামাসার দিকটা হল, এই দানব নন্দীর একটা সাধারণ নির্বাচনকে খুবই হাল্কা ব্যাপার হিশাবে দেখা আর সেটা নেহাতই ফ্রি-ফেয়ার  এর মাত্রজ্ঞান এর ব্যাপার বলে চালানোর চেষ্টা এটা হাসিনাও হজম করতে চান নাই। এরই বহিঃপ্রকাশ হল আপন স্বার্থে নিজে কোন স্টুপিড নন্দী না হয়ে নন্দী-ভৃঙ্গীসহ বিডিনিউজ কেও আগাছার মত উপড়ে ফেলে দিয়েছে সরকার!

    হাসিনার পাঁচমন্ত্রীতে ভারতের কথিত আপত্তি প্রসঙ্গঃ
    প্রসঙ্গটা সবার আগে তুলে ছিলেন সুবীর ভৌমিক যে হাসিনার পাঁচমন্ত্রী নাকি পাকিস্তানপন্থী! তিনি নামও উল্লেখ করেছিলেন সেবার। কিন্তু অর্থহীন একটা বিষয়কে ঘটনা বানানো মনে হবে যেকোন সিরিয়াস পাঠকের কাছে। অন্তত দুটা কারণে এক. বিভিন্ন দেশের সরকারে মন্ত্রীদের মধ্যে সিরিয়াস গ্রুপিং চলে আর তা একেবারে মতাদর্শিক লেভেলে। কোল্ডওয়ারের আমলে ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রীসভায় মোরার্জি দেশাই – এসব আসলে সেকালে সোভিয়েত নাকি আমেরিকান এভাবে পন্থী পরিচয়ের আড়ালে দ্বিবিভাগে বা গ্রুপিং চলত। তবে অবশ্যই তা আন্ডার কারেন্ট। মানে মূল স্রোত বা মেন স্ট্রিম বা মূল ধারাতেই বভক্তি না অবশ্যই না। মানে ইন্দিরার ক্ষমতাকে মেনে নিয়েই এরপর দুই ধারার মত।  এমনকি আমাদের ৭১ যুদ্ধের সময়েও ইন্দিরার আমেরিকান ধারার মন্ত্রীরা বিরোধিতা করেছে। তো এই অর্থে কোন মন্ত্রীসভার ভিতরে গ্রুপিং এর কথা জানা যায়।
    কিন্তু হাসিনার মন্ত্রীসভার মধ্যে গ্রুপিং? এটা যে না বাংলাদেশ  না হাসিনা কাউকেই চিনেনা কেবল – মন্ত্রীসভায় গ্রুপিং থাকে – এই তত্বীয় ধারণা যা খুশি বলে এদের কথার নুন্যতম গুরুত্বও নাই। তাই এর আমলও নাই।  আসলে দলের ভিতর দুই মতামত নিয়ে আপোষে ফ্রি-ভাবে তর্ক-বিতর্কের সুযোগ থাকলে এরপরে মন্ত্রীসভা পর্যন্ত তা কল্পনা করা যেতে পারে। কাজেই সুবীরের এই কথিত গ্রুপিং এর ধারণা তুলে তিনি হয়ত অন্য কিছু বলতে চেয়েছেন তাই যেকোন সুস্থ মানুষ মনে করেছে। কারণ নিজ মন্ত্রীত্ব থাকলে বেচে গেলে সেটা মন্ত্রীর বাপের নাম দশা  সেখানে এই মন্ত্রীরা আবার গ্রুপিং করবে। গ্রুপিং শুনলেই তো গুষ্ঠিশুদ্ধ বের করে দেয়া সহ যেকোন শাস্তি খাবে যেকোন ব্যক্তি মন্ত্রী!  কাজেই পাঁচমন্ত্রীর গল্প – এটা বানানো গল্পই!
    আর দ্বিয়=তীয় কারণটা হল, হিন্দুত্ববাদী ভারতের পাকিস্তান ম্যানিয়া বাংলায় যাকে চুলকানি বলে। মুসলমান বা পাকিস্তান নিয়ে হিন্দুত্বের চুলকানি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নাই! বট্ম লাইনটা হল আমাদের যেকোন কারো ভিনদেশে আত্মীয় স্বজন থাকতেই পারে। সালমান এফ রহমানের অনেক কাছের আত্মীয়ই পাকিস্তানের – তা হলেই পারে। সেজন্য তিনি পাকিস্তানপন্থী – এটা মূলত রেসিজম! সালমান রহমান খারাপ ব্যবসায়ী হতে পারেন, লোন ডিফল্টার হতে পারেন, ইত্যাদি মেলা অভিযোগ থাকতেই পারে  কিন্তু সেজন্য তার বিরুদ্ধে করা কোন রেসিস্ট মন্তব্য জায়েজ হয়ে যাবে না! কিন্তু ভারতীয় হিন্দু-মন এতে অভ্যস্ত, এটাই দুঃখের ব্যাপার!
    আর মোমেন যখন যাকিছু বলেছেন ধরে নিতে হবে তাতে প্রধানমন্ত্রীর সায় আছে। কে কোন পন্থী সেটা বাসায় বউয়ের কাছে রেখে এসে তবেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অধীনে মন্ত্রীত্ব করা সম্ভব। এটা যারা জানে না তারা এখনও মায়ের গর্ভে আছেন! বিকশিত প্রস্ফুটিত হন নাই। আমরা কয়জন কজানি বা মনে রেখেছি যে মোমেনের আগে হাসিনার সব পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন নাম কাওয়াস্তে – লো প্রফাইল। তাঁর অফিসই তখন প্রায় সবক্কিছু নিজে সরাসরি তদারকি করত। অবজারভেশন বলে,  মোমেন দায়ীত্ব নিবার পরই তাঁর অফিস অনেক কিছুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলে আলাদা কাউকে নির্দেশ দিয়ে করান। ভারতের যারা মোমেনের বিরুদ্ধে  বা কথিত গ্রুপিং ধরণের যা মনে চায় বলছেন তারা অন্যকিছু মিন করছেন সম্ভবত!  বাংলাদেশের কেউই বিশ্বাস করবে না যে মোমেন কোন স্বাধীনপন্থা বা গ্রুপিংয়ে চলেন! আসলে এসব কথা যারা বলছেন তারা গত ১৫ বছরের সরকার কেমন কী তার ঝোঁক কিছুই অবজার্ভ না করেই বরং ভিন্ন কিছু বলতে চেয়ে এমন ভুয়া কথা ছড়াচ্ছেন!  আবার এসব কথার মানে এমনও না যে হাসিনা সরকার বা মোমেন এর কাজ ততপরতা খুবই জন আদৃত! এরা সবাই নির্দোষ! অথবা নিঃস্পাপ ধরণের ইমেজের অথবা এমন ব্যক্তিত্বের।

    চন্দন নন্দীর এলেখা মহা-চীনবিরোধী ভাবের উপর দাঁড়িয়ে লেখাঃ
    চন্দন নন্দীর এই লেখা মহা-চীনবিরোধী ভাবের উপর দাঁড়িয়ে লেখা।  ভারতের নিজ মুখের খাদ্য “বাংলাদেশ” একে চীন ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে যেন – এমন অনুভব এর উপর দাঁড়িয়ে এটা লেখা হয়েছে। আমি বার বার বলেছি হিন্দুত্ববাদের মত একটা উগ্র জাতিবাদী দেশের হিন্দু-মন এরা দ্বিন-দুনিয়া বুঝতে অক্ষম।  এদের সাংবাদিকতাও এমন দোষে দুষ্ট একপেষে হবে।  আগে ভারতের জাতিবাদ ছিল মুসলমান বা পাকিস্তানকে চরম শত্রু জ্ঞান করে দারাকনো। সেজায়গায় এখন বসেছে চীন। ভারতের সব নিয়ে গেল চীন। এর বাইরে দুনিয়ায় আর কোন ঘটনা -ফেনোমেনা আছে কিনা তা এরা জানে না। জানতেও চায় না।
    একবাক্যে একটা কথা বলে শেষ করব। বাইডেনের আমেরিকার নয়া নীতি-পলিসির কারণে মোদির ভারতের উপর তাদের চাপ ক্রমশ বেড়েই চলেছে।  এটা এমনই যে তা যদি খুবই খারাপ অবস্থায় পৌছায় – এশিয়ায় বাইডেনের সাথে ভারত নীতি সরাসরি বিপরীতমুখী হয়ে দাড়ায় সেক্ষেত্রে ঐ সামলাতে না পেরে খোদ ভারতই চীনের কোলে গিয়ে উঠতে পারে। খোদ মোদি-জয়শঙ্করের বিবৃতির অর্থ এমন – আর তা প্রকাশিত হয়ে আছে। এবিষয়ে কী চন্দন নন্দীরা অবগত????
    যারা আরো গভীরে যেতে চান, ভারতের NDTV তে ছাপানো এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন গত ১১ আগষ্ট যা ছাপা হয়েছিল। আর পরেরদিন বাংলাদেশ তা অনুবাদ করে মানবজমিন ছেপেছিল বাংলায়।
    যে ভারত নিয়মিত চীনকে অভিযুক্ত করে অন্যের ভুমি দখল করেছে বলে সে কেন আচমকা ফিলিপাইন-চীনের সীমানাবিরোধে তাদেরকে শান্তিপুর্ণ সমাধান বা “Resolve Peacefully,”  বলে হাঁক পাড়ছে??? এটা তো অন্তত ২০১৭  কোয়াডে [QUAD]  বা আমেরিকার আনা সাউথ চায়না সি – বিতর্কে ভারতীয় অবস্থান ফেলে পালানো মানে এসবের জন্মের পর থেকে এপর্যন্ত ভারতের অনুসরণ করা ভারতীয় অবস্থানের বিপরীত! সেটা কেন হল??
    কাজেই কে কখন চীনের কোলে গিয়ে উঠতে চায়, কেন চায় কী দশায় সে বুঝে শুনে এসব উগ্র জাতিব্বাদ দেখানো উচিত চন্দন নন্দীদের। নাদান মানুষে ভরে উঠছে দুনিয়া!!!


    সর্বশেষ আপডেটঃ  ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩  সকালঃ ০৭ঃ ৪৫


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • ব্রিকসে নয়া ছয় সদস্য, বাংলাদেশ বাদ; এর অর্থ তাতপর্য কী

    ব্রিকসে নয়া ছয় সদস্য, বাংলাদেশ বাদ; এর অর্থ তাতপর্য কী
    গৌতম দাস
    ২৭ আগষ্ট ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4SM

     

                  BRICS new six Members

    ব্রিকস সম্মেলনের শেষদিনের সিদ্ধান্ত হল, নয়া ছয় দেশকে [সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, ইথিওপিয়া ও আর্জেন্টিনা], তারা এই প্রথম তাদের জোটকে সম্প্রসারিত করে নয়া সদস্য করতে চাইলো। কিন্তু বাংলাদেশ? এত ঢাকঢোল পিটানো বাংলাদেশ যে এই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব হাজির রেখেছিল সেই-ই  বাদ হয়ে গেছে; সে এই ছয় রাষ্ট্রের মধ্যে জায়গা পায় নাই! কিন্তু ঠিক কেন? ব্যাপারটা বড়ই অদ্ভুত! আমার আগের লেখায় শিরোনাম ছিল “মোদির আনা শর্ত ও পরিণতিতে বাংলাদেশ ব্রিকসে নাই’। কিন্তু ঠিক কীভাবে তা কার্যকর হয়েছিল তা বুঝতে একটু গভীরে যেয়ে এবার কথা বলব।
    ইতোমধ্যে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করা সুবীর ভৌমিক, সেও গতকাল (২৫ আগষ্ট) আবার বাংলাদেশকে নিয়ে এক লেখা দিয়েছে; যার শিরোনাম India, US narrow differences over Bangladesh ahead of elections]। । কিন্তু সুবীরের এই অবস্থান চারদিন আগের আনন্দবাজারের অগ্নি রায় বা দেবদীপ এদের অবস্থান থেকে একেবারে উলটা দিকে। তা একেবারে ভুতের মুখে রামনামের মত!  সুবীর লিখেছে,  বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের ইস্যুতে “সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে” দেখা আমেরিকান অবস্থান যে এদেশে একটা অবাধ ও সুস্থ নির্বাচনই হতে হবে – এই বিষয়ে অনেক আলাপ আলোচনার পরে ভারত আমেরিকার অবস্থানের পক্ষে সায় দিয়েছে […India has agreed to the US stand of putting “absolute priority” on a free and fair parliamentary election due in January 2024.] সত্যিকরে বললে, এটা আবার অগ্নি রায় বা দেবদীপ পুরোহিত-দের প্রপাগান্ডার উলটা আরেক প্রপাগান্ডা নিঃসন্দেহে। কিন্তু অগ্নিদের মতই সুবীরও কোন প্রমাণ বা কোন সোর্স উল্লেখ করা ছাড়াই আরেক চাপাবাজি বক্তব্য। ফলে এ’বক্তব্যের কোনই মুল্য নাই। তবে এটা নিঃসন্দেহে সত্যিকথা যে ভারতীয় কারও – সে মোদি-ই হোক বা যেই কেউ  – এদের কারও আর বাংলাদেশে কোন বিশ্বাসযোগ্যতা অবশিষ্ট নাই।  আমরা এখন বড় জোড় তাদের কথা শুনব – আর পাশে আবর্জনার ড্রামে তা ফেলে রাখব; কারণ আমরা তাদের কাউকেই বিশ্বাস করি না।

    আমার আগের লেখায় বলেছিলাম রয়টার্সের বরাতে জানা গেছে যে ভারতের আপত্তিতে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বাদ পড়েছে।  গত ২৩ আগষ্ট রয়টার্সের সেই রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ব্রিকসের সম্প্রসারণ শেষ মুহুর্ত এসে ব্রিকসের আভ্যন্তরীণ বিভক্তির মুখে আটকে গেছে; BRICS expansion faces eleventh hour hurdle as divisions persist। এটা হল,  ব্রিকসের ভিতরের খবর বের করে এনে তাদের লিখা। বলেছে ভারতের মোদি-ই  নিজেই শেষ মুহুর্তে নয়া দুই শর্ত  শেষে হাজির করেছে ।

    ঐ রিপোর্ট বলেছে ইলেভেন্থ আওয়ারে মানে শেষ মুহুর্তে ভারত নয়া সদস্য নেয়া হবে কী ভিত্তিতে মানে কী শর্তে এই বিষয়ে কিছু বক্তব্য পেশ করেছিল। শুধু তাই না একথাগুলো লেখা হয়েছিল “LAST-MINUTE SPOILER” এই নামের রয়টার্সের লেখার এক উপ-শিরোনামের নিচে। যার  অর্থ হল, শেষ মুহুর্তে যিনি সব ভন্ডুল [SPOILER] করে দেন। আর বলাই বাহুল্য সেই SPOILER হলেন ভারতে প্রধানমন্ত্রী মোদি।

    ঐ রিপোর্ট লিখেছিলঃ
    “but the source said it had been delayed after
    Indian Prime Minister Narendra Modi
    introduced new admission criteria.”

    কিন্তু কী ছিল সেই নয়া দুই শর্ত?
    “The BRICS country official said that admission criteria
    India’s Modi proposed included requiring members
    not be the target of international sanctions,
    ruling out potential candidates Iran and Venezuela.
    Modi was also pushing for a minimum per capital GDP requirement”

    কথাগুলো সোজা করে বাংলায় বললে, হবু ব্রিকস সদস্য হতে হলে – এরা কেউ আমেরিকান স্যাংশনের খাওয়া দেশ হতে পারবে না। তিনি অবশ্য আমেরিকা শব্দটা লুকিয়ে সে জায়গায় আন্তর্জাতিক লিখেছিলেন। আর দ্বিতীয় শর্তটা হল, ঐ হবু সদস্য দেশের অর্থনীতিতে  ওর নুন্যতম অর্জিত জিডিপি থাকতে হবে।

    এখন আমরা দেখব ব্রিকসের সদস্যপদ লাভে মোদির প্রথম শর্ত প্রসঙ্গেঃ
    মোদির একথার কোন মানেই হয় না যে হবু সদস্য দেশ আন্তর্জাতিক স্যাংশন খাওয়া দেশ হতে পারবে না। কারণ, স্যাংশন বা আন্তর্জাতিক স্যাংশন খাওয়া দেশ মানে কী? মানে আমেরিকার যথেচ্ছারে স্যাংশন চাপানো যেটা ঐ দেশের ডলারে বাণিজ্য এর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। কিন্তু আমেরিকা এমন স্যাংশন দেয়ার কে? কী তার অথরিটি? এটা লুকাছাপার কিছু নাই যে এবারের বাইডেন প্রশাসন ইচ্ছামত যার উপরে আরোপের ইচ্ছা এভাবে স্যাংশন আরোপ করে গিয়েছেন। কারণ, আমেরিকান ডলার আমেরিকা রাষ্ট্রের নিজের মুদ্রা হওয়াতে যে পড়ে পাওয়া সুবিধা আমেরিকার হাতে তাতে যেকোন দেশ যেন ডলারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় কেনা-বেচা না করতে পারে এই বাধা দিবার সুযোগ আমেরিকার হাতে আছে। আর আমেরিকা তার এই সুযোগ এর অপব্যবহার করবে না – এটাই আশা করা হয়েছিল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম-সভায়।  কিন্তু তা ছিল ভদ্রলোকি চুক্তির মত ঠিক আইনি বাধা নয়; আর সে অনুমানটাকেই আমেরিকা অমান্য করে চলেছে।  “পরে পাওয়া” সুবিধাটাই খেয়ে চলেছে।
    আর ওদিকে, ব্রিকস তৈরি হয়েছে যেসব রাষ্ট্র নিয়ে বা হবু সদস্যদের নিয়ে হতে চাচ্ছে তারা আমেরিকার এই অত্যাচার, যথেচ্ছাচারে অতিষ্ট হয়েছে বলেই তো নয়া ব্রিকস এর সদস্য হতে এসেছে। কাজেই আমেরিকান স্যাংশন কারো উপর  আরোপিত হলে সেই দেশকে আবার সদস্যপদ না দেয়ার মানে হল যেন, আমেরিকান ইচ্ছায় ব্রিকসের সদস্যপদ দেয়া। মানে ব্রিকস চালাবে যেন আমেরিকা – এমন অবস্থা তৈরি করা!  মানে কার্যত ব্রিকস-কে আমেরিকার খামখেয়ালি ইচ্ছার অধীনস্ত প্রতিষ্ঠান করে ফেলা।  আর এভাবেই ভারত যদি ব্রিকসের নয়া সদস্যপদ লাভের শর্ত করতে চায় তাহলে আর এদের ব্রিকস গড়ার দরকার কী?
    অথবা আরেকটা দিক আছে! তাহলে, চীনের মুদ্রা ইউয়ান ভিত্তিতে যদি ব্রিকস প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে তাহলে চীনও কী আমেরিকার মতই যেকোন ব্রিকস সদস্য দেশের উপর চীনা খামখেয়ালি রুস্তমি শুরু করতে পারবে?   আর ভারত সেটা মান্য করে চলবে? মোদি তার মানে এটাই চাইছেন???? তাই কি??? মোদি সাব কী বলেন!!! 

    আর তামাসার কথা যে, ভারত কী নিশ্চিত যে ইউয়ান-ভিত্তিক ব্রিকস এরপর ভারতের উপরেই চীন সেই প্রথম  (ইউয়ান) স্যাংশনটা আরোপ করবে না? কাজেই “স্যাংশন খাওয়া দেশ সদস্যপদ পাবে না” এই শর্ত তো ভারতের জন্যই সবচেয়ে বড় আত্মঘাতি হয়ে উঠতে পারে!!!  তাহলে ভারতের এই  গদগদ হওয়া “আমেরিকা তোষণ” এর মানে কী? এমন আত্মভোলা ছাগলামির মানে কী?

    আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে ভারত  ” আমেরিকান স্যাংশন খাওয়া দেশকে” – সদস্যপদ দিয়ে ঐ দেশের সাথে আমেরিকান  ক্যাচাল-সংঘাতের দায়গুলো ব্রিকসে আনতে চাচ্ছে না, এড়াতে চাইছে মানে এই প্রশ্নে আমেরিকার বিরাগভাজন হতে চাচ্ছে না। কিন্তু সেটা হলেও এভাবে আমেরিকার খামখেয়ালিপনা আমল করে এর ভিত্তিতে একটা  ব্রিকস খাড়া করা কী সম্ভব, নাকি এটা বাস্তব? বা এর কোন দরকার আছে? যেমন ধরেন এখনই সবচেয়ে বড় স্যাংশন খাওয়া দেশ হল খোদ পুতিনের রাশিয়া। তাহলে মোদির প্রস্তাবিত শর্ত অনুসারে তো রাশিয়াকেই ব্রিকসের সদস্যপদ থেকে বাদ দিতে হয়! অথবা ধরা যাক, কোন কারণে ভারতের উপরেই কোন আমেরিকান স্যংশন যদি আরোপিত হয় তাহলে কী ভারত সরল বালকের মত নিজেই ব্রিকসের বাইরে গিয়ে বসবে? তাতে রাজি থাকবে তো??? একথার মানে হল, যে আপনার বাসায়  আপনি নিজে ঢুকতে পারবেন কিনা সেটা আর কেউ না একেবারে কোন বাইরের লোক বা পড়শি তার খামখেয়ালি ইচ্ছার কথা আপনি মেনে চলবেন? আর তা মেনেই আপনি আপনার নিজের বাসায় ঢুকবেন, ঢুকতে হবে? অথচ সেটাই মোদির ভারত প্রস্তাব করছে? এটা এবসার্ড[absurd] অর্থহীন; আজীব ও অবাস্তব ঘটনা! ভারতের এটা এক আজীব আমেরিকা প্রীতি! যেটার কারণে ভারত খোদ নিজেই আমেরিকার কাছে নিজের অস্তিত্ব নিজেই বিলীন করতে হতে পারে তা জেনেও ভারত তা করতে এক পায়ে খাড়া!!!!  তাই কী?  এটা মানে হয় না এমনই এবসার্ড অবিশ্বাস্য ঘটনা!  যা বাস্তব পরিস্থিতিতে ভারত নিজেই অমান্য করবে!

    মূল কথাটা খেয়াল রাখতে হবে। ব্রিকসের সকল রাষ্ট্র যদি নাও চায়, তাহলেও ডলারের পাশাপাশি ডলারের বিকল্প কারেন্সি-ভিত্তিক (ধরা যাক চীনা ইউয়ান) ব্রিকস নামের আরেক অর্থনৈতিক  গ্লোবাল অর্ডার খাড়া করার চেষ্টা করার অর্থ হল ডলারের একছত্র অধীপতি থাকাকে টেনে নিচে নামানো। তাই ব্রিকস খাড়া করব এই মজা লুটতে এলাম  অথচ আমেরিকা বা তার ডলারের সাথে প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব না, এড়ায় চলতে পারব, চ্যালেঞ্জ করব না এই অনুমান ভিত্তিহীন এবং তা অর্থহীনও!! বোকার স্বর্গে বসবাস! মানে হল, মোদির ভারতের দশা হয়েছে সে  আমেরিকা ডাকলেই যদি তার বাসায় গিয়া ভারতকে পাশে  শুইতেই হয়, সঙ্গ দিতেই হয় –  তাহলে আর ঐ ভারতের আবার ব্রিকস নামের নয়া বিয়ে করতে যুক্ত হতে এসেছে কেন, দরকার কী?

    আসলেই মোদি এক আজব লোক!!!  সত্যি মোদি সাব পারেও বটে!!!
    [একটা ঘোষণাঃ উপরে যে গ্লোবাল অর্ডার কথা বা ধারণাটা  উল্লেখ করেছি – এটা খুবই ফান্ডামেন্টাল কনসেপ্ট।  তাই এনিয়ে আলাদা করে একটা লেখা প্রায় রেডি আছে, ‘ফাইনাল টাচ’ দিয়ে একদিন পরেই পোস্ট করব।]

    মোদির দ্বিতীয় শর্ত প্রসঙ্গেঃ
    এছাড়া  দ্বিতীয় শর্তও প্রায় একই রকমের অর্থহীন! মূল কারণ হল, ব্রিকস যদি পুরানা আইএমএফের বিকল্প প্রতিষ্ঠান হয়ে গড়ে উঠতেই চায় তাহলে হবু সদস্যদেশের নুন্যতম জিডিপি থাকতে হবে এমন শর্ত এর অর্থ কী? আমার দেশের নুন্যতম জিডিপি কেন উল্লেখযোগ্য কোন জিডিপি নাই বলেই তো আমি সদস্য হতে এসেছি, নাকি তামসা করতে? আর মূলকথায়, আইএমএফের জন্মের সময় কী সে এমন শর্ত দিয়ে নয়া সদস্য নিয়েছিল? দেয় নাই তো? তাহলে এখনই বা কেন এটা মোদির প্রস্তাব??  মোদির কনসালটেন্টেরা কি তাহলে গাধা-গরু, পড়াশুনায় ফাঁকি দেয়া ছাত্র যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক স্টাডি করে নাই? নাকি মাদী ব্রিকস-কে বড়লোক রাষ্ট্রগুলোর ক্লাব বানাতে চাইছে? কিন্তু তেমন ক্লাব হিশাবে জি৭ – গ্রুপ  প্রথম বড়লোক রাষ্ট্রের ক্লাব তো আছেই – মোদি সেখানে না গিয়ে ব্রিকসে এসেছে কেন?

    ন্যায্যতার প্রশ্ন ফান্ডামেন্টাল, তাই সবার আগে এই প্রশ্ন তুলতেই হবেঃ
    অর্থনীতিতে বঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রগুলোকে অন্তত সুযোগের দিক থেকে সাম্য – সবাই সমান সুযোগ পেয়েছে – এতটুকুই যদি না করতে পারে তাহলে নয়া ব্রিকস খাড়া করার দরকার কী? এর সাফাই ন্যায্যতা কী? আমেরিকা্র খামখেয়ালি মত একালে আর কাকে কোন কোন দেশকে এমন সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবে দুনিয়া?  এমন সুবিধা ব্রিকসের চীন বা চীনের মত অন্য কোন ব্রিকস সদস্যের হাতে যেন না থাকে, না উঠে সেজন্যই তো ব্রিকস এর প্রয়োজনীয়তা! নাকি??  ব্রিকস তখনই তো কেবল নুন্যতম ইনসাফের প্রতিষ্ঠান বলে দাবি করতে পারবে; নাকি? আর আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি মোদির ভারতের মত যারাই বে-ইনসাফিতে অন্যের জন্য গর্ত খুড়ে রাখলে সে অনেক সুবিধা খেতে পারবে মনে করছে – এরা নিজেরাই আগামিতে সেই গর্তে পড়বেই! এটাই ইনসাফের মহিমা! 

    তাহলে কী দাঁড়ালো, এটাই কী আগামি ব্রিকসের মাতবর সদস্য হিশাবে মোদির ভারতেরআমেরিকার মত এক খামখেয়ালি ক্ষমতার হাতা হয়ে উঠার খায়েসের ইঙ্গিত দিচ্ছে?  ্মানে বগলে ইট নিয়ে মুখে শেখ ফরিদ!!! আসলে এটাই তো বৃটিশ কলোলিদখলদারেরা চলে গেলে বা এর অবসান হলেও সেই বৃটিশ দখলদারের স্বভাব নিজে পেতে চাওয়া “নেহেরুর ভারত” হওয়ার পুরানা খায়েস!!!

    বাহা রে নন্দ! বাহ রে মোদি! তোর খায়েসের বলিহারি!! মোদি আসলেই পারে! এই দুনিয়ায় অসাম্যের নিয়ম-আইন কানুন যেখানে সমান থেকে উন্মুক্ত করার দাবি উঠছে, এই মোদি সেখানে যে নিজেকে অবলীলায় এর ভায়োলেটর (violator) অমান্যকারি এক দানব হিসাবেই পরিচিত করতে চাচ্ছে!

    যাহোক উপরে আমরা মোদির  হবু সদস্যদের সদস্যপদ লাভের শর্ত নিয়ে মোদির প্রস্তাবের পর্যালোচনা করলাম, দেখলাম। কিন্তু ফাইনালি ব্রিকস কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?  মানে কলোনিদখলদারি মনের মোদির ভারত নয়া শর্ত  জুড়ার যে প্রস্তাবই আনুক না কেন, শেষে ব্রিকসের এই সম্মেলন এবিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল?  নয়া সদস্যপদ লাভের কীশর্ত ঠিক করেছিল?

    ব্রিকসে নয়া সদস্যপদ লাভের শর্ত কী ঠিক হয়েছেঃ
    সেটা ব্রিকস ঠিক খোলাখুলি আমাদের জানায় নাই। বলা ভাল ব্রিকস আসলে  তা খোলাখুলি না বলার পরোক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা বে-ইজ্জতি হতে যায় না, তাই এতে বুঝা গেছে !

    কিন্তু নয়া ছয় সদস্য কারা হবে আর তাতে বাংলাদেশ নাই – এই সিদ্ধান্তের তাতপর্য কী?
    এই তাতপর্য ব্যাখ্যা করতে পারলেই বুঝা সহজ যে ব্রিকস এর সদস্য হবার ফাইনাল ক্রাইটেরিয়া বা শর্ত এখন কী দাঁড়িয়েছে।

    “সদস্য হতে শর্ত” শেষে কী দাঁড়ালো ও এর তাতপর্য কি; ঘটনা যখন ইরানঃ
    ব্রিকসের  সদস্যপদ লাভের শর্ত কী তা তারা প্রকাশ্যে জানায় নাই। কিন্তু তাদের কার্যকলাপ দেখে বুঝা সম্ভব যে তারা ঠিক কী চেয়েছে এবং হয়েছে বা হচ্ছে।  যেমন কারা এই ছয় রাষ্ট্র এর প্যাটার্ন যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখি ইরান এই রাষ্ট্র সদস্যপদ লাভ করেছে; যেটা একটা বিশেষ প্যাটার্ণ নির্দেশ করে। কী সেটা?  ইরানের অর্থনীতি সেই জন্মের সময় ১৯৭৯ সাল থেকেই আমেরিকার নিয়মিত ও অসংখ্য স্যাংশনে জর্জরিত। মানে ইমাম খোমিনীর বিপ্লবে স্বাধীন ইরান জন্ম থেকেই সে আমেরিকান খামখেয়ালিপনার শিকার হয়ে আছে। কিন্তু সেই ইরান এবার ব্রিকস এর সদস্যপদ পেয়েছে। যার সোজা মানে হল, এতদিন কেবল চীন বুক ফুলিয়ে ইরানের তেল কিনার ২৫ বছরের চুক্তি করেছিল। আজ ব্রিকস জানিয়ে দিল তারা ইরানের মুখের উপর যে অন্যায় লাগাম টেনে ধরার আমেরিকান খায়েস ছিল যা ইরানের অর্থনৈতিক সব সম্ভাবনাকে স্তব্ধ করতে রেখেছিল – তা ব্রিকস অন্যায় মনে করছে।  ব্রিকস অন্তত (আমেরিকান স্যাংশন) যে মানতে চাচ্ছে না এটাই পরিস্কার হয়ে গেছে ব্রিকসের এই সিদ্ধান্ত থেকে। মনে রাখতে হবে  এক, খোদ ভারত ট্রাম্পের সময় থেকে ইরানের তেল যেন কেউ না কিনে তা বাস্তবায়নের বাধা হিশাবে যে স্যাংশন-শর্ত দিয়েছিল সেবারই প্রথম- মোদির ভারত তা মেনে নিয়েছিল। ট্রাম্পের জাতিসংঘ প্রতিনিধি Nikki Haley এর সেসময়ের এমন মন্তব্য নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্ট দেখতে পারেন এখানে।  এমন অন্যায়-বেইনসাফি ভাবে সেকালে ভারতের বিক্রি হয়ে যাওয়াতে  ট্রাম্পের কাছ থেকে ভারত কী গোপন সুবিধা পেয়েছিল আমরা জানি না। তবে এরপর থেকে ভারত আর ইরানি তেল কিনে নাই, সস্তায় দিলে এমনকি নিরাপদে তেল ইরান নিজেই পৌছে দিলেও না করেছিল ভারত। আর মনে রাখতে হবে, এখনও  ব্রিকসের কোন সিদ্ধান্ত নিবার পদ্ধতি হল সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেদিকে তা নয়, বরং সর্বসম্মতিতে। এর মানে এবার মোদি সজ্ঞানে মেনে নিলেন যে ভারতও এবার ব্রিকস-এ ইরানের নয়া সদস্যপদ অনুমোদন করছে ভারত। অর্থাৎ ব্রিকসের সদস্যপদ লাভের নয়া শর্ত  যা মোদি আরোপ বা হাজির করতে প্রস্তাব করেছিল তা হাওয়া হয়ে গেছে। মোদি নিজেই  সেকথা আর আঁকড়ে ধরে বসে নাই; বরং নিজেই ফাইনালি আর কার্যকর করতে চায় নাই। কিন্তু কেন? আর তাহলে এসব ভুয়া শর্ত প্রস্তাব করেছিল কেন?

    কারণ, এককথায় মোদির আনা শর্ত ছিল ভুয়া ওজনহীন!  এই শর্ত সে প্রয়োগ হোক তা চায় নাই বরং অন্য কোন উদ্দেশ্য এর ছিল। সেকথায় পরে আসবো।

    “সদস্য হতে শর্ত” শেষে কী দাড়ালো ও এর তাতপর্য কি; ঘটনা যখন সৌদি, ইউএই (UAE) এবং মিসরঃ
    নয়া ছয় সদস্য এরা আর কে কে এর অর্থ তাতপর্য খুঁজলে পাই সেখানে আরেকটা প্যাটার্ণ। সেটা হল, আরও তিন রাষ্ট্র – সৌদি আরব, ইউএই আর এমনকি সাথে মিসর। [এখানে UAE বলতে যার সাত ভুখন্ডের বৃহত্তম ফলে বড় প্রভাবশালী হল দুবাই; তবে রাজধানী হল আবুধাবি]।  এছাড়া  মধ্যপ্রাচ্যের এই তিন রাষ্ট্রের সাথে ইরানও আছে (উপরের অর্থে নয় আরও অন্য অর্থে) – এটা যদি মনে রাখি তবে এর আরও অন্যান্য অর্থ-তাতপর্য আছে সে ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। তাই এখানে আবার ইরানের উল্লেখ সেটা প্রথম তাতপর্য হিশাবে উপরে যা লিখেছি এরও বাইরের ইরান। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিপ্লবের পর থেকে এতদিন কেউ কাউকে সহ্য করে না এমন প্রবল দুই প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল ইরান বনাম সৌদি। আর এই দ্বন্দ্ব লাগিয়ে রাখার বড় ফ্যাক্টর এই প্রধান শক্তি ও সমর্থক এবং সুবিধাভোগী হয়ে  সুবিধা খেয়ে গেছিল আমেরিকা।  কাজেই এখানে ইরান-সৌদি একসাথে ব্রিকসের সদস্যপদ লাভ – এই আলাদা বৈশিষ্ঠকে আমল করা চোখে তা দেখতে হবে।  এর পিছনের ঘটনা হল, সম্প্রতি  ইরান-সৌদির পুরানা সেসব বিবাদ পাশে সরিয়ে রেখে এদুই শক্তির হাত মিলিয়েছে; আর এভাবে চলার উদ্যোক্তা-মধ্যস্থতাকারি হল চীন। এতে প্রকাশিত চীনের এই সক্ষমতার কথা পশ্চিমের কেউ অস্বীকার করছে না। বরং চোখ বড় বড় করে ভীত ঈর্ষান্বিত চোখে হলেও তাদেরকেও ইরান-সৌদি ঐক্য, হাত মিলানোকে স্বাগত জানাতেই হচ্ছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ-কে ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন ও বিদ্রোহকে সৌদি দমন থেকে যা এতদিন এক মহা মানবিক সমস্যা তৈরি হয়ে ছিল তা মিটমাটের রাস্তা খুলে দিয়েছে। হুতি ইস্যু ও এর বিবাদ থেকে বের হবার – এই ইস্যু অবসান হতে যাবার সুযোগ আসাতে প্রবল প্রশংসা করতেই হয়েছে সংশ্লিষ্ট সকলকে।  কারণ কেউই নিজেকে বিবাদ পছন্দ করা মানুষ বলে হাজির করতে পারে না।    আর  ইউএই (UAE) যার সাত ভুখন্ডের বৃহত্তম ও প্রভাবশালী হল দুবাই – ওর আমীর ও তার বড় সন্তান হল বর্তমানে সৌদি আরবের MBA [প্রিন্স সালমান যিনি কার্যত সৌদি শাসক] এর সবচেয়ে কাছের বড় সমর্থক ও চিন্তা শেয়ার করা বন্ধু। অর্থনৈতিক অর্থে মধ্যপ্রাচ্যের বাদশা দেশগুলোতে আধুনিকতার সংস্কার আনার জন্য এদুই প্রিন্স নিজ উদ্যোগ ও কাজের জন্য যারা গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছেন।  একসাথে করতে একাজে এমনকি সৌদি যেসব কাজ করতে চায় কিন্তু নিজ নামে করতে চায় না তা করে দেয় দুবাই প্রিন্স – এমনটাও দেখা গেছে। বিশেষ করে বর্তমানে সৌদিতে যে অর্থনৈতিক সংস্কার বা ঢেলে সাজানো চলছে তাতে এদুই প্রিন্সের ভুমিকা খুবই গুরুত্বপুর্ণ।

    তাহলে সৌদি-দুবাই আর ইরান – এ তিনের মাঝে আবার চীন, এর এক আলাদা বিশেষ তাতপর্য আছে। কী সেটা?
    এটাই নব উত্থিত ব্রিকস  এই বিকল্প ব্যবস্থা কায়েমের পথে চীন প্রথম অর্থপুর্ণ পদক্ষেপ। আগে অনেকবার বলেছি ১৯৪৫ সালে আমেরিকান নেতৃত্বে এক গ্লোবাল রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক গ্লোবাল অর্ডার চালু হয়েছিল । ইতোমধ্যে প্রায় আশি বছর এটা চলতে পেরেছে, আজও চলছে কিন্তু এখন আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা যত কমছে এর চেয়ে বহু গুণে চীনের সক্ষমতা বেড়ে সে আমেরিকাকে জিডিপিতে  ছাড়িয়ে এক নম্বর অর্থনীতির দেশ হওয়ার পথে।  দুনিয়ার সবদেশকেই একেবারেই কম বা না সুদে অবকাঠামো বিনিয়োগ যোগানোর সক্ষমতা – এটাই কোন দেশের গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হওয়ার একেবারে প্রাথমিক যোগ্যতা। কারণ এমন বিনিয়োগ দানের সক্ষমতা যখন কোন দেশের অর্থনীতির হয়, এটাই দুনিয়ায় বেশির ভাগ দেশের উপর ঐ সক্ষম দেশের প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা হয়ে দাড়ায়, দাঁড়াবেই। আমেরিকার বদলে ওর এতদিনের গ্লোবাল নেতৃত্বের জায়গায় চীন উঠে আসতেছে, দখল করতেছে – এভাবেই দিন কে দিন দৃশ্যমান হাজির হয়ে উঠছে।ঙ্কারণ,  গরীব তো বটেই এমনকি মধ্যম আয়ের দেশগুলোও (যেমন আশিয়ান জোটের দেশগুলো) যারা অবকাঠামো ঋণ পেতে ৩% পর্যন্ত সুদ দিতে প্রস্তুত (কারণ, আমেরিকার নেতৃত্বের পুরানা ব্যবস্থাটা মানে বিশ্বব্যাংক এমন সরকারগুলোকে অবকাঠামো ঋণ আর দেয়ই না তবে এসবদেশের প্রাইভেট কোম্পানিকে হলে দিতে রাজি। এই নীতি ফলো করে বিশ্বব্যাংক।) তাই, এদের কাছে চীনা অবকাঠামো ঋণ খুবই কাম্য। ইতোমধ্যেই বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য চীনের AIIB -এই ব্যাংক তাই মধ্যম আয়ের দেশগুলোর কাছে খুবই আদরণীয়!   আর মনে রাখতে হবে, এখনকার চীনের মত একটা দেশ যখন একবার অর্থনৈতিক সক্ষমতার চরম বৃদ্ধির স্তরে পৌছে [মানে নিজ অর্থনীতি বিপুল সারপ্লাস জমা করতে থাকে বা উদ্বৃত্ব সম্পদে ভরে উঠে ] এমন হয়ে যাবার অর্থ হল এরপরের দশ বছরের মধ্যেই ঐ দেশ সামরিক শক্তি হিশাবে সে হাজির হতে, দৃশ্যমান হতে শুরু করতে পারে।  আর এসব সম্ভাবনা ও সুবিধার কারণে চীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বে আমেরিকার জায়গায় বসে যাবার সুযোগ পেতে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে, আর তা কমবেশি খোদ আমেরিকাই মেনে নেওয়া বা রেফার করে কথা বলা শুরু করে দিয়েছে।
    এটাকে আমি বারবার গ্লোবাল পালাবদল বলছি। আর এটা নিয়ে একদল আছে যাতা এটাকে কথিত ভুরাজনীতিক ঘটনা বলে পরিচয় করাতে চাচ্ছে। এভাবে নিজের অজ্ঞতা ঢাকার কিছু নাই, এটা অপ্রয়োজনীয়। ভূরাজনীতি বা জিও-পলিটিক্স  এই শব্দের মধ্যে যে ভূ [geo- জিও] শব্দটাই তো সঠিক নয়। কারণ এটা গ্লোবাল অর্ডার এরই নেতৃত্বের মধ্যে পালাবদলের ঘটনা।  যেখানে রূট শব্দ ও ধারণাটা হল গ্লোবাল [Global]। যা ভূ [geo- জিও] একেবারেই না। কারণ,  গ্লোবাল আর জিও- একই শব্দ না, এক অর্থও না। তবে গ্লোবাল না বলে অনেক বাংলায় “বিশ্বব্যবস্থা” লিখে; সেটা চলতে পারে।  এটা বোকা বোকা অবুঝ শব্দ  ভূ [geo- জিও]  বলার চেয়ে ভাল!

    নয়া গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠছে চীন – এই লক্ষ্যেই চীন পুরানা  গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট করে কেবল গ্লোবাল মুদ্রা ও বাণিজ্য ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক আইএমএফ আর অবকাঠামো ঋণ দেবার বিশ্বব্যাংক – এই দুই গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের পাল্টা ও বিকল্প সমতুল্য প্রতিষ্ঠান গড়তে উদ্যোগ নিতেই এমন এক জোট খাড়া করেছে যাকে আমরা ব্রিকস বলে চিনছি।
    তবে আইএমএফ আর বিশ্বব্যাংক এর সমতুল্য (কিন্তু চীনা নেতৃত্বে) এমন বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়া সহজ কাজ নয়। এছাড়া গড়ার কাজটা চীনের বেলায় শুরুতে সে কিছু দেশকে সাথে নিয়ে বসে কথা শুরু করেছে।  বৈঠকে বসে শুরু করলেই তা খাড়া হয়ে বা কার্যকর হয়ে যাবে না।  সে পথের প্রধান বাধাথল – এখনকার ব্যবস্থায় আমেরিকান ডলারেই বেশির ভাগ আন্তঃরাষ্টীয় লেনদেনবিনিময় বাণিজ্য  (আমদানি-রপ্তানি) সম্পন্ন হওয়া। আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা একেবারেই কমে গেলেও এ’জায়গায় ডলারের উপর ব্যবহার কারি দেশ ও মানুষের পুরানা আস্থা অভ্যাস সহসা বদলে দেয়া যায় না একারণে। ইতোমধ্যে বাইডেন প্রশাসন  স্যাংশন দেয়ার অতিব্যবহারের কারণে একটা বড় সংখ্যাক দেশ চাইছে ডলার নির্ভরতার বিকল্প – এমন দেশগুলোর শীর্ষে আছে রাশিয়া। হাসিনার বাংলাদেশও অতি আগ্রহী। কিন্তু আগেই বলেছি এটা ঘরে বসে বিকল্প খাড়া করে দিবার বিষয় নয়। তাতে রাশিয়া বা বাংলাদেশ এর মত দেশগুলো যতই ছটপট করুক! তাহলে ডলার মুদ্রা ভিত্তিক বাণিজ্যের আধিপত্য একে পিছনে ফেলে মানে ডলারে ব্যবসাকে সেকেন্ড অবস্থানে নামিয়ে দিয়ে, পরের সবচেয়ে চালু মুদ্রা ইউয়ান, একে সামনে আনার উপায় কী?

    গত ২০১৫ সালে চীনা ইউয়ান মুদ্রাকে আইএমএফ অনুমোদিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিশাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তার আগে এমন আইএমএফ অনুমোদন দেয়া মুদ্রাগুলো হল (শুরুতে মার্কিন ডলার ছাড়াও) বৃটিশ পাউন্ড, জাপানিজ ইয়েন, ইইউ এর ইউরো। আর এসবের সাথে সেবার পঞ্চম কারেন্সি তখন হয়েছিল ইউয়ান[Yuan]। কিন্তু ইউয়ান ইতোমধ্যেই লেনদেনের মুদ্রা হিশাবে ডলার বাদে বাকি মুদ্রাগুলোকে ছাড়িয়েছে।  তাই এব্যাপারে চীনা গবেষণা অনুমান যা পরোক্ষে প্রকাশিত – এর ভাষ্য অনুযায়ী এমন চাবিকাঠিটা হল চীন প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কিনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে দ্বিতীয় বড় অর্থনীতির দেশ হিশাবে। তাই সুস্থির চীন আর সাথে অস্থির রাশিয়া উভয়েই মনে করে যে এসব জ্বালানি ক্রয়ের পেমেন্ট যদি ডলারের বদলে ইউয়ানে বদলে দেয়া যায় তাহলে মার্কিন ডলার ডমিনেন্সের উপর এক বড় ধাক্কা দেয়া সম্ভব। আর তাতেই ইউয়ান হয়ে যেতে পারে গ্লোবাল বাণিজ্য-লেনদেনের প্রধান মুদ্রা । মানে গ্লোবাল বাণিজ্য ঘটবার প্রধান মুদ্রা হয়ে উঠতে পারে ইউয়ান।  যেটা গ্লোবাল বাণিজ্যে  মোটামুটি ৬০% এর বেশি হয়ে কোন মুদ্রা পৌছাতে পারলে তবে এরপর তা ক্রমশ বাড়তে থাকে  – আর তাকে সহসাই নামানো যায় না।  যে পথে এখন ডলার উত্থিত হয়ে আছে! চীনা ইউয়ান উত্থানে এক নম্বর মুদ্রা হয়ে উঠতে এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য পরিকল্পিত পথ এটাকেই মনে করা হয় – তাত্বিক ও অর্থনীতিবিদ পর্যায়ের ধারণায়। আর, এপথেই চীন আগাচ্ছে বলে মনে করা হয়। এনিয়ে গত ২০১৫ সালে আমারই অনেক লেখা আছে।

    কাজেই এটা এখন বলাই বাহুল্য যে এই পথে গ্লোবাল বাণিজ্যকে ঠেলে দেবার ক্ষেত্রে সৌদি আরব কেন চীনের কাছে গুরুত্বপুর্ণ ও অন্যতম এক নির্ধারক শক্তি।  ইউএই(UAE) এর তেলবিক্রির সক্ষমতা খুবকিছু না থাকলেও সে সৌদির যেকোন কাজ-উদ্যোগের এক নম্বর সহযোগী-সমর্থক। আর এবার এদের সাথে ইরান,  যে ১৯৭৯ সাল থেকেই জ্বালানি বিক্রি সক্ষমতা থাকা সত্বেও গরীব দেশ হয়ে আছে, ইরানি অসুস্থ বাচ্চার জন্য ওষুধ কিনে দিতে অর্থনীতি অক্ষম হয়ে পড়ে ছিল – সেই ইরান গত ৪৪ বছরে খুব কম সময়েই সে নিজের তেল বিক্রি করতে পেরেছে। এই ইরানও এবার যুক্ত হয়ে গেছে যেটা এর আগে সৌদি-ইরান বিরোধ লাগিয়ে রাখার জন্য ইরান আরো অসহায় হয়ে ছিল। এখন হবে উলটা। এবার ঠিক তেল বিক্রি না তবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির গ্লোবাল ভুমিকার নায়ক হয়ে উঠবে এই তিন দেশ।  আমরা মনে রাখতে পারি ইরান-চীন ২৫ বছরের বাণিজ্য-বিনিয়োগ চুক্তির কথা। যার সার কথা ইরানের তেলের বিনিময়ে চীনা ঋণ, বিনিয়োগ টেকনোলজি আর চীনা বাজার সবই উন্মুক্ত হবে ইরানের কাছে।   এছাড়া এর আরো সম্ভাবনা – মানে কোন দিকে সম্ভাব্য কী হতে পারে সেদিকে তাকালে পাই তুরস্কের এরদোয়ান-কে। যদিও তিনি শুরুতেই যোগ দিতে অপারগ হবেন। তা হলেও এটা বলাই যায় যে ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্য এখন চীনের পক্ষে ও হাতে চলে গেছে।  তাই সৌদি, ইউএই (UAE) এবং মিসর কে ব্রিকসের সদস্য করে নেয়া এটা ছিল চীনের  কাছে বিরাট প্রায়োরিটি; অন্তত বাংলাদেশের তুলনায়। যদিও বাংলাদেশ চীনের জন্যও খুবই গুরুত্বপুর্ণ – এখানে ভারতের চেয়েও চীনকে প্রভাবশালী হয়ে উঠতেই হবে! কিন্তু বর্তমান অস্থিরতায় সে হাসিনার টিকে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে দেখে – আর তা বুঝা যায় কেন সে বাংলাদেশের চেয়েও মধ্যপ্রাচ্যকে প্রায়োরিটীতে উপরে রাখলো

     এতদিন মিসর ছিল আমেরিকান সক্ষমতার এক প্রধান হাতা, এক নির্ভরশীল ফ্যাক্টর। এখন কী হবেঃ
    মূলকারণ, ১৯৭৮ সালে আমেরিকান মধ্যস্থতায় ইসরায়েলকে মিসরের সাথে ক্যাম্প-ডেভিড চুক্তি করতে বাধ্য করেছিল আমেরিকা। আর এর মাধ্যমেই কিসিঞ্জারের মধ্যপ্রাচ্য পলিসির (তেলের উপর খবরদারি সহ) [Kissinger ME policy] এতদিন প্রধান পশ্চিমা-নীতি মধ্যপ্রাচ্যে কার্যকর হয়ে ছিল। আর এর সুযোগেই আমেরিকা ইসরায়েলকে দিয়ে বারবার ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ হাতে পেয়েছে, ব্যবহার করে। মধ্যপ্রাচ্য আমেরিকার হাতের মুঠোয় হয়ে যাওয়ার  চাবি কাঠি হয়ে ছিল এতদিন। আমেরিকার এই বিশেষ প্রভাব ও সক্ষমতাটাই এখন দুর্বল হয়ে শুরু করবে; চীনা প্রভাব এর উপরে জায়গা নিবে। এটাই গ্লোবাল অর্থনৈতিক পালাবদল বা এর আরেকটা প্রকাশের দিক!
    কিন্তু এবার চীনা মধ্যস্ততায়  সৌদি, ইউএই (UAE) এবং ইরানের সাথে মিসরও এসে যাওয়াতে ইসরায়েল – সেও এখন আমেরিকার চেয়েও সরাসরি চীনের সাথে যোগাযোগ করে নিজ নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা খুঁজে নিতে বাধ্য হবে। ইরানকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আক্রমাণাত্মক অবস্থান যদি কমাতে চায় তবে চীনের কাছে যেতে হবে। চীনের মাধ্যমে ইরানের কথা শুনতে হবে।  ক্রমশ মধ্যপ্রাচ্য মানেই  চীনই সেখানকার একমাত্র কার্যকর শক্তি ও জায়গা  – এমন বলে মেনে নিতে হবে  – যারই মধ্যপ্রাচ্যে স্বার্থ আছে এমন সকলকেই  – ঘটনা ফেনোমেনোর অভিমুখ এখন সেদিকে আগিয়ে গেল। আমেরিকার চেয়ে চীন এখন ইসরায়েলের কাছে নিজ নিরাপত্তার নিশ্চিত করার স্বার্থে অনেক বেশি ওজনদার প্রভাবের দেশ হয়ে উঠার সম্ভাবনা। এককথায় ইসরায়েল-মিসর সহ সারা মধ্যপ্রাচ্যে চীন এখন আমেরিকার চেয়ে শক্তিশালী ও বড় প্রভাব নিয়ে হাজির হতে থাকবে। আর এসব ততপরতা পিছনের এক  নয়া গ্লোবাল অর্থনৈতিক ভিত্তির যোগানদার হয়ে হাজির হবে ব্রিকস ও চীনা নেতৃত্ব।

    তাহলে মোদির দেয়া সদস্যপদ লাভের শর্তের কী পরিণতি হলঃ 
    এক বা্ক্যে  সারকথাটা বললে, মোদির ভারত চেয়েছে হাসিনার বাংলাদেশ যেন অন্তত এবার ব্রিকস সদস্যপদ লাভ নাকচ হয়ে যায়। আর সেটাই মোদি ঘটিয়েছে বিনিময়ে, চীনের অন্যস্বার্থে সে সম্মতি দিবে এই কৌশল করে। এটাকে আপাতত মোদি নিজের বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য মনে করতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এতে সারা বাংলাদেশ এখন মোদির ভারতকে প্রবল বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী এক দানব রাষ্ট্র যাকে পরাজিত করতেই হবে বলে গণ্য করা শুরু করে দিয়েছে পপুলার বাংলাদেশ। এতে বলাই বাহুল্য বাংলাদেশে ভারতের নুন্যতম প্রভাবও যেন না থাকে এটাই তারা আগামি যেকোন সরকারের কাছে দেখতে চাইবে। আর এটা ভারতের যেকোন শাসক শত কান্নাকাটি অথবা শত ষড়যন্ত্র করেও ফিরাতে পারবে না।
    শেষ বিচারে মোদি তাই এতে ভারতের লাভের চেয়ে বরং বিশাল ক্ষতি ডেকে আনলেন। মোদি সেই কাজটাই করলেন! যেটা অন্যের জন্য খাল কাটা! আগামিতে বাংলাদেশে কোন দলের পপুলার ক্ষমতার উপর ভর করে আসার একনম্বর ফ্যাক্টর হয়ে গেল ভারতের প্রভাবশুন্য করার নীতি-পলিসি দেখানো।

    বাংলাদেশ যেন অন্তত এবার ব্রিকস সদস্যপদ লাভ নাকচ হয় এটা মোদি ঘটিয়েছে বিনিময়ে, চীনের অন্যস্বার্থে সে সম্মতি দিবে এই কৌশল করে।
    এটাকে আপাতত মোদি নিজের বিরাট কূটনৈতিক সাফল্য মনে করতে পারে।
    কিন্তু মনে রাখতে হবে এতে সারা বাংলাদেশ এখন মোদির ভারতকে প্রবল বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী এক দানব রাষ্ট্র যাকে পরাজিত করতেই হবে
    বলে গণ্য করা শুরু করে দিয়েছে পপুলার বাংলাদেশ। এতে বলাই বাহুল্য বাংলাদেশে ভারতের নুন্যতম প্রভাবও যেন না থাকে এটাই তারা আগামি
    যেকোন সরকারের কাছে দেখতে চাইবে। আর এটা ভারতের যেকোন শাসক শত কান্নাকাটি অথবা শত ষড়যন্ত্র করেও ফিরাতে পারবে না।
    শেষ বিচারে মোদি তাই এতে ভারতের লাভের চেয়ে বরং বিশাল ক্ষতি ডেকে আনলেন। মোদি সেই কাজটাই করলেন! যেটা অন্যের জন্য খাল কাটা!
    আগামিতে বাংলাদেশে কোন দলের পপুলার ক্ষমতার উপর ভর করে আসার একনম্বর ফ্যাক্টর হয়ে গেল ভারতের প্রভাবশুন্য করার নীতি-পলিসি দেখানো। 

     

    কিন্তু আপাতত বাংলাদেশের হাত ছাড়তে কেন চীন এতে রাজি হলঃ
    এর উত্তরটা, প্রশ্নটাকে আরেক ভাবে বুঝে বা পেশ করে দেয়া যাক। ছয়টা দেশ এবার সদস্যপদ লাভ করলো – এর সোজা অর্থ তাহলে এর স্বপক্ষে মোদির ভারতও সমর্থন দিয়েছে নইলে তা সর্বসম্মত হত না – তা পাশও হত না।  আর মোদি এই সমর্থন দিয়েছে – অবশ্যইচীনের সাথে একটা কিছুর বিনিময়ে। আর এটাই বাংলাদেশে সদস্যপদ সওদা [bounty] হয়ে যাওয়া!
    আসলে, চীন বাংলাদেশ বাদে যাদেরকে সদস্যপদ এবার দিতে চায় তাতে মোদির সম্মতি কিনে নিয়েছে। আর এই কেনা-বেচার সওদা হয়েছে বাংলাদেশের সদস্যপদ না পাওয়া। বাংলাদেশ যেন সদস্যপদ না পায় এতে চীনকে রাজি করিয়ে বিনিময়ে মোদি ঐ ছয় রাষ্ট্রের সদস্যপদ লাভে নিজ অনুমোদন দিতে রাজি হয়েছে। বলা যায় এই হল, চীনের সাথে মোদির ডিল বা গিভ এন্ড টেক!  কাজেই এখানে মোদি এখানে ব্রিকসের নয়া সদস্যপদ লাভের শর্ত যাই পেশ করুক প্রকৃতপক্ষে সবই ছিল ভুয়া, দেখাইন্না এক বাহানা মাত্র। আর ওদিকে সবকিছু শেষ হয়েছে এই ডিলের মাধ্যমে! কিন্তু মোদি কেন এমন চরম হাসিনাবিরোধি অবস্থান নিল?
    এটা কমবেশি অনেকের  কাছেই পরিস্কার যে ২০১৯ সাল থেকে হাসিনা ভারতের চেয়ে অনেক বেশি চীনের সাথে কমিটেড। ২০১৮ এর নির্বাচন যেমনই হোক, কথিত ঐ নির্বাচনের ব্যয় চীন যোগানোর মাধ্যমে এই সম্পর্ক যাত্রা শুরু করেছিল। সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর বা চীনা তিস্তা প্রকল্প ইত্যাদি চীনের আগ্রহ যেগুলোতে বিশেষ করে যেগুলো ভারতের আপত্তি বা হাসিনাকে ফুসলিয়ে নিজের পক্ষে নিয়ে এতদিন যেসব প্রজেক্ট ভারত হাসিনাকে নিতেই দেয় নাই। নাকচ বা বন্ধ করে দিয়েছে মূলত সেগুলোতেও তখন থেকেই চীন চেয়েছে হাসিনাকে সিদ্ধান্ত নিতে রাজি করানো – এটাই ছিল চীনেরর মূল লক্ষ্য।  আর এগুলো সবকিছুর উপর যেকোন উপায়ে বাধা দেয়া – এটাই গত সাড়ে চার বছর মোদির ভারত চেষ্টা করে গেছে। যেমন, চীনা তিস্তা প্রকল্পে ভারতের সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের দিকে ১৬ কিমি পর্যন্ত চীনারা কোন কাজ করতে পারবে না বলে ভারত আপত্তি  তুলে রেখেছে।  তিস্তার মত প্রকল্পগুলোতে চীনকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন না দেয়ার পিছনে এমন ভারতীয় আপত্তিকে উপেক্ষা করে হাসিনা কাজ করতে পারে নাই। তবে সব প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন এগিয়ে যেতে পারে নাই আর বাধা সৃষ্টি করে রাখার বেশি কিছু ভারত করতে পারে নাই – এই হল এক খামোখা ব্যলেন্সিং পয়েন্ট এমন হয়ে থেকেছে। কিন্তু আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে পরিকল্পনা হল আগামিতে হাসিনা যদি নিজেকে আবার বিজয়ী বলে যেভাবেই হোক ঘোষণা করতে পারে তাহলে এরপরেই ভারতের আপত্তিগুলো পায়ে মারিয়ে চীনের সাথে হাসিনা এগিয়ে যাবে এই ছিল চীনের সাথে সরকারের বুঝাবুঝি – অনুমিত ধারণাটা এরকম। পশ্চিমা গোয়েন্দা ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট গুলোও এরকম ধারণা দিচ্ছে। অথচ অন্য কোন কিছু দিয়ে হাসিনাকে ফিরাতে মোদি ব্যর্থ হয়ে থাকছিল।  এতে হাসিনার যুক্তি ছিল সে চীনের সাথে এমন ডিল না করলে ক্ষতায় ফিরতে পারবে না – আমেরিকান চাপ ফেরানো অসম্ভব। আর মোদির যুক্তি হাসিনা-চীনের এই ঘনিষ্ঠতা মোদির ভারতের কাছে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।  এই ত্রিভুজ সংকট পরিস্থিতিতে না পেরে মোদি হাসিনাকে থামাতে গিয়ে শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করেছে – মোদি খোদ চীনের সাথেই ডিল করে বসেছে।
    তাহলে চীনের দিক থেকে – সেই-ইবা কেন মোদির প্রস্তাবে রাজি হল?

    চীনকে দেয়া  মোদির ডিল-প্রস্তাব যে হাসিনার হাত ছেড়ে দিতে হবে – এতে চীন কেন রাজি হল?
    এখন এটা তো সবাই জানে দেখাই যাচ্ছে যে বাস্তবতা হল,  চীন ও মোদি উভয়েই  বা এরা দুপক্ষই  হাসিনার হাত ছেড়ে দিয়েছে। বা বাংলাদেশকে ব্রিকসের সদস্যপদ না দিতে তারা এক ঐক্যমত্য কায়েম করেছে।  এর মানে মোদির ডিল-প্রস্তাবে চীন হ্যা দিয়েছে। তাহলে চীন এমন করল কেন? বাস্তবত  চীনের এতে রাজি হয়ে যাওয়া এটাই সব বলে দিচ্ছে যে খুব সম্ভবত চীনের  ক্যালকুলেশন-অনুমান হল, হাসিনা আর আগামিতে ক্ষমতায় থাকতে বা ফিরতে পারছে না। তাই, মোদির ডিল-প্রস্তাব চীনের মেনে নিয়ে হাসিনাকে ছেড়ে দেয়া আর বিনিময়ে বাজি ছয় রাষ্ট্রকে সদস্যপদ দেওয়া প্রশ্নে মোদির ভারতকে দিয়ে সমর্থন দেওয়ানো – এই ডিল গ্রহণই চীনের জন্য সহি বেটার ডিল এবং সবচেয়ে লাভজনক!

    অর্থাৎ মোদি যা চেয়েছিল তা পেয়ে নিয়ে বাসায় গেছে। চীনও যেটা বেশি লাভজনক তাই পেয়ে নিয়ে ফিরে গেছে। মাঝখানে হাসিনা এদুইয়ের বেচা-বিক্রির ডিলের মধ্যে পরে সবই হারিয়েছে।
    এছাড়া চীনের দিক থেকে দেখলে  তার ইউয়ানকে ডলারের স্থান নেওয়ার  পক্ষে  কাজ শুরু করার  স্বার্থ মানে এর পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যকে কাজে লাগানো এটা অনেক বেশি অর্থপুর্ণ। ও বড় প্রায়োরিটি। সেটাই সে পেয়ে গেছে।

    শেষ করব তাহলে ইথিওপিয়া আর আর্জেন্টিনা কেন সদস্যপদ পেলো এর তাতপর্যঃ
    ইথিওপিয়া সম্পর্কে  বাইরের বিশেষ করে এশিয়ার মানুষের ধারণা খুবই কম। সৌভাগ্যবশত আমার প্রায় তিন বছর ওর রাজধানী আদ্দিস আবাবা-তে বসবাসের অভিজ্ঞতা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করেই কিছু কথা বলব।
    ইথিওপিয়ার বৈশিষ্ট একঃ
    বাইরের দুনিয়া থেকে বা অন্য মহাদেশ থেকে আফ্রিকার প্রবেশের গেটওয়ে মূলত তিনটা। বিশেষ করে বাণিজ্যিক বিমানের রূটগুলো লক্ষ করলে বুঝা যায়। আপনাকে সবার আগে কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা আর না হয় ইথিওপিয়াতে ঢুকতে হবে।  এসব ফ্লাইট নিতে হবে। পরে যে আফ্রিকান দেশে যেতে চান  সেদেশের ফ্লাইট বদলে নিতে হবে কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা আর না হয় ইথিওপিয়া থেকে। মানে এই তিন দেশই হয়ে উঠেছে আফ্রিকার যেখানে যেতে চান এরই হাব বা প্রথম মোকাম দেশ।
    ইথিওপিয়ার বৈশিষ্ট দুইঃ
    আফ্রিকা থেকে কলোনি দখল উঠে গেছে এশিয়ার পরেপরেই – ১৯৬০-৮০ এই সময়ের মধ্যে  ব্যাতিক্রম কেবল সাউথ আফ্রিকা ১৯৯৪।  আর একেবারেই ব্যতিক্রম হল ইথিওপিয়া যে কখনও কলোনিদখলও হয় নাই। শুধু তাই না, পুরা দুই বিশ্বযুদ্ধের সময় ইথিওপিয়া রাজা হাইলে সেলাসি শাসিত দেশ ছিল। রাজা ক্ষমতায় ছিল ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। যতক্ষণ তা এক সোভিয়েত কমিউনিস্ট সমথিত  সামরিক ক্যু ঘটেছিল হাইলে মেঙ্গাস্তু [Mengistu Haile Mariam] -র হাতে। আরও পরে ১৯৯১ সালে চীনাস্ইটালে গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে ফেলার মত আরেক কমিউনিস্ট গ্রুপ এখন ক্ষমতায়। আর সেনাবাহিনী হল ঐ গেরিলা বাহিনীর সদস্যরা।
    সারা আফ্রিকার আর বড় পিছনে পড়ে অক্ষমতা হল, নুন্যতম পুজি বিকশিত বা শহরায়ন ঘটবার আগেই কলোনিদখল হয়ে যাওয়া। কথাটা অন্যভাবে বললে, সারা আফ্রিকার মানুষ আগে শহর কী জিনিষ তা দেখেনি। কলোনি মাস্টারেরা দখলের পর তারাই শহর গড়েছিল – মানে এসব মাস্টারের হাত ধরেই আফ্রিকার মানুষ শহর কী তা চিনেছিল। তুলনায় ভারতে বৃটিশেরা দখল নিবার আগেই আমাদের অন্তত তিনটা বড় বড় সমৃদ্ধ শহর (লক্ষ্ণৌ, হায়দ্রাবাদ আর দিল্লি) গড়ে উঠে গিয়েছিল।  আর এসব শহরের শহুরে পোষাক-ই হলো পাঞ্জাবি, এজন্য এটা কোন ধর্মের পোষাক নয়। শহরের প্রতীকী পোষাক বলে তা এখনও ভারতের সামাজিক অনুষ্ঠানে বা বিয়ের মুখ্য পোষাক!
    আফ্রিকার এই মারাত্ম পিছনে পড়ে থাকা এটা এতই মারাত্মক যে কলোনি শাসকেরা ফিরে গেলে সাধারণ ট্রেডিং  মুদিখানা বা পষাকের মত নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ট্রেডিং – এটা শুরু করার মত মধ্যবিত্ত আফ্রিকার প্রায় সব দেশেই গড়ে উঠে নাই। আর এজায়গাটাই দখল করে আছে বৃটিশদের হাত ধরে আফ্রিকার মাইগ্রটেড ভারতীয় শ্রমিক পরিবারেরা। অথচ এই কমন চিত্রের একমাত্র ব্যতিক্রম হল ইথিওপিয়া।
    একালে অবকাঠামো পুঁজি ও সাথে FDI বা বিদেশি কারখানা পুঁজিও চীনের চীনের কারণে পাওয়া সহজ হয়েছে বলে এমন পুঁজি কাজে লাগানোর সক্ষমতা ইথিওপিয়ার সবচেয়ে বেশি। একারণের চীনের চোখে এক গুরুত্বপুর্ন গন্তব্য হল ইথিওপিয়া! মানে এটাও আফ্রিকায় চীনেরই বড় স্বার্থের দেশ যাকে চীন ব্রিকস এর সদস্য করে নিল!

    সবশেষে আর্জেন্টিনাঃ
    গত কমপক্ষে সাত বছর ধরে লাগাতর আর্জেন্টিনা অর্থনৈতিক অবস্থা ডুবন্ত। যার মুদ্রাস্ফীতি ১০০% এর বেশি আর ৪০% এর বেশি লোক দারিদ্র সীমার নিচে চলে গেছে। এঅবস্থায় ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা  আর্জেন্টিনার কেস ব্রিকসে নিয়ে আসে, বিশেষ করে চীনের নজর ও বিবেচনায়।  ভেনেজুয়েলা যেমন সেবার চীনের কাছে কিউবান সুপারিশ  পেয়েছিল।  তেমনই আর্জেন্টিনাওপক্ষে পাওয়া শক্ত সুপারিশের কারণে চীনের নজরে আসায় এর পরিণতিতে র্আজেন্টিনাও এবার ব্রিকসের সদস্যপদ লাভ করে যায়। আর এতে চীনের আরেক বড় লাভ হয় নিজের পক্ষে ব্রাজিলের সমর্থন ও আস্থা আরো পোক্ত হল।

    তাহলে এককথায় বললে ছয় নয়া সদস্যই অনুমোদন পেয়েছে মূলত চীনের আগ্রহ ও সমর্থনের কারণে।  কারণ,  মোদি যতই ভাব দেখাক ব্রিকস বলতে এর মূল সক্ষমতা তো চীনের।  একমাত্র চীনেরই আমাদের মত দেশকে অবকাঠামো বা অন্যধরণের পুঁজি ঋণ দিবার সামর্থ আছে। তাতে ব্রিকস এর উদ্যোক্তা সদস্য আরো চার রাষ্ট্র হলেও এরা হল ডেকোরেশন!  বাস্তবত কার্যত চীনই মূল চালিকাশক্তি। তাতে ভারতের মোদি যতই ভাব দেখাক! বাংলাদেশকে ব্রিকসের বাইরে রাখুক!
    এরই রিফ্লেকশন ঘটতে বা ছাপ পড়তে দেখেছি আমরা এবারের নয়া সদস্যপদ বিতরণে!

    আপডেটেডঃ  ২৮  আগষ্ট  ২০২৩; রাত ২ঃ ১৩
    সর্বশেষ  আপডেটেডঃ  ২৯ আগষ্ট ২০২৩;  সকাল ০৮ঃ ১১ 

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • আনন্দবাজার-অগ্নি রায়ের গায়েবী “সুত্রে” যা খুশি লিখা 

     

    আনন্দবাজার-অগ্নি রায়ের গায়েবী “সুত্রে” যা খুশি লিখা
    গৌতম দাস
    ২০ আগষ্ট ২০২৩   মধ্যরাত ১২ঃ ৩৬

    https://wp.me/p1sCvy-4Ox

     

            হাসিনাকে দুর্বল করলে ক্ষতি সবার, বার্তা আমেরিকাকে

     

    ঘটনা বড়ই অদ্ভুত! ভারত বাংলাদেশ বা হাসিনা সরকারকে নিয়ে তাদের ভাষায় “বাংলাদেশের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের বার্তা”  এমন কোন বার্তার অস্তিত্ব আদৌ আছে কিনা এর কোন খবর নাই। আনন্দবাজার, ডয়েচ ভেলে, প্রথম আলো অথবা  ওবায়দুল কাদের (সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী) এমন কারো কাছেই এমন খবরের নিশ্চয়তা নাই; কেউই নিশ্চিত করেন নাই বা এমন খবরের রেফারেন্স কী তা বলেন নাই। অথচ গতকাল থেকে এখনও কথিত এই ভারতীয় বার্তা নিয়ে প্রায় সব পক্ষই কথা বলে চলেছে। “ভারতীয় বার্তা” বলে কিছুর অস্বিত্ব কী? তা না বলে  যারা এনিয়ে কথা বলছেন তারা অন্যায় করছেন।  এভাবে “ভারতীয় বার্তা” বলে কিছু থাকলে তার কথা এই…... এভাবে শর্ত সাপেক্ষে নিজের কথা বলছেন। অথচ এভাবে কথা চলতে পারে না, মানে হয় না। খুব সম্ভব কয়েকদিনের মধ্যে ভারতের এক সরকারী ভাষ্য এখন আসন্ন যেখানে তারা বলবেন –  না তো এমন কোন ভাষ্য তো আমরা দেই নাই!!!!!
    অথচ এবার আনন্দবাজারের সাথে একইভাবে খবরের উৎস কী সেটা উল্লেখ না করে গায়েবী লিউজ ছেপেছে ডয়েজ ভেলে।  আর এই মিথ্যা গায়েবী খবর প্রথম আলো ডয়েচ ভেলের বরাতে ছেপেছে।  দাবি করেছে “কূটনৈতিক নোটে ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার দুর্বল হয়ে পড়লে ভূরাজনৈতিক দিক থেকে তা ভারত এবং অ্যামেরিকা কারও পক্ষেই সুখকর হবে না”। কিন্তু কোথায় ভারত এমন  কূটনৈতিক নোটে জানিয়েছে এর কোন হদিস নাই। মানে এরাও প্রথম আলো, স্টার, আনন্দবাজার এর মত একই দলে যোগ দিল। এতে বলাই বাহুল্য ডয়েচ ভেলে কেও মূল্য চুকাতে হতে পারে।   যেন সকলে এরা হাই স্টেকে জুয়ারি জুয়া খেলতে নেমেছে সাংবাদিকতা নামে!!!!

    আনন্দবাজারের অগ্নি রায় যা শুরু করেছিলেনঃ
    প্রথম কথা হল আজকের আনন্দবাজারে অগ্নি রায়ের লেখাটা এটা কোন সাংবাদিকতা-ই নয়। এটা আসলেই এক বাজারি লেখা যার পায়ে কেবল ঘুঙ্ঘুরটাই নাই!  একটা মনগড়া  আর কোন রেফারেন্স ছাড়া কিছু  রচিত বাক্যের গল্প বলা যায় একে বড় জোর। যেমন এই বানানো গল্পটা মোট ৪৪৪ শব্দের। কিন্তু তাতেই এর ভিতর অগ্নি রায় চার বার  “সুত্র বলছে” ব্যবহার করেছেন। মানে সোজাসাপ্টা এটা গায়েবী কথাবার্তা যার বাপ-মা নাই।  আর এধরণের চাপাবাজি শব্দ আর মিথ্যা কথাই সেখানে আছে। তবে আনন্দবাজারি লেখায় “সুত্র” মানে তা ইংরাজি সোর্স [source] এর বাংলা করেছে তারা এভাবে। আর এভাবে কথিত “সুত্র” এর কথা বলে আনন্দবাজার সাংবাদিকতায় খবরের সোর্স বলার বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যেতে চায়। এটাই অসৎ জার্নালিজম!   জার্নালিজমে নুন্যতম ফেয়ার [fair] বা সৎ জার্নালিজমের প্রধান ও নুন্যতম শর্ত হল খবরের সোর্স উল্লেখ করতেই হয়; পাঠক-কে জানাতেই হয়। অথচ এই ৪৪৪ অক্ষরের গল্পটার মধ্যে কোন উপযুক্ত সোর্সের কথা উল্লেখ নাই। অথচ সমানে যা খুশি তাই দাবি করে চলা হয়েছে। অথচ আনন্দবাজার প্রবর্তিত সেই অস্তিত্বহীন কথিত “ভারতীয় বার্তা” প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের আর মির্জা ফকরুল পর্যন্ত কথা বলে ফেলেছেন!!
    তবে আরো সব প্রসঙ্গে ঢুকবার আগেই পাঠককে মনে করিয়ে দেই। বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের এবার এখন একেবারে ঘুম নাই অবস্থা তৈরি হয়েছে। সেকথা ভারতের ভাষাতেই বললে, ভিসানীতি ধরণের স্যাংশন দিয়ে হাসিনাকে নির্বাচন করতে বাধ্য করা হলে সেটাতে নাকি ভারতের স্বার্থ খুন্ন হবে। এটা আবদি বা সুবীর ভৌমিক আমাদেরকে খোলাখুলিই জানিয়েছে।  যার মানে হল, হাসিনাকে ভোট কারচুপি বা রাতের ভোট করতে দিলেই একমাত্র ভারতের স্বার্থ রক্ষিত হবে।  যার সারকথাটা হল, নির্বাচন এর নামে যা হবে হোক কিন্তু শেষে হাসিনাকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে নাহলে নাকি ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ ক্ষুন্ন হবে। এমনকি তাদের বিদেশ মন্ত্রণালোয়ের মুখপাত্রও অরিন্দম বাগচি আমাদেরকে কনষ্টিটিউশন মাফিক মানে হাসিনার মাপে চলতে হেদায়েত করেছে।

    এখন এসবের সারকথাটাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভারতের মিডিয়ায় লেখা হচ্ছে। এবং খুব সম্ভবত এটা চলতি বছরের দ্বিতীয় বড় ঢেউ তোলা ফাঁপা উচ্ছ্বাস এর চেষ্টা।  যার প্রথমটা তোলা হয়েছিল মোদির আমেরিকা বা বাইডেন সফরের কালে (২১-২৪ জুন ২০২৩), আগে ও পরের সময়ে। কিন্তু এসব মিথ্যা হাইপ তোলার দায় দায়িত্ব না নিয়ে ও অস্বীকার করে ভারতের বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর ২ জুলাই জানায়ছিলেন একেবারে উলটা কথা – যে ভারত নাকি “প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে”।  [এপ্রসঙ্গে আমার সেসময়ের লেখা – “জয়শঙ্করের কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’!” – লেখাটার লিঙ্ক এখানে]।  তার মানে অগ্নি রায়দের মত মিথ্যা প্রপাগান্ডা লেখকদের পরিণতি মাত্র গত মাসেই আমরা দেখেছি; যখন জয়শঙ্কর এসবের কোন দায়দায়িত্বই নেন নাই। অথচ তাসত্বেও  আনন্দবাজার ও অগ্নি রায়েরা এবার আবার দ্বিতীয় বড় ঢেউ তোলা ফাঁপা উচ্ছ্বাস শুরু হয়েছে।

    তবে খুব সম্ভবত এবারের পটভুমি হল আগামি মাসে [৯-১০ সেপ্টেম্বর] অনুষ্ঠিতব্য ভারতে G20 নেতাদের সম্মেলন। নিচে সংক্ষেপে G20 জিনিষটা কী তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যাদের হাতে সময় কম তারা এটা পার হয়ে এরপরের প্যারাতেও চলে গিয়ে সেখান থেকে পড়া শুরু করতে পারেন। ভারতের জনসংখ্যা এখন চীনের চেয়েও বেশি। ফলে সে পটেনশিয়াল বা সম্ভাব্য বিনিয়োগ গ্রহিতা। তাই এবারের সম্মেলন সেখানে।

    G20 নেতাদের সম্মেলন কীঃ
    দুনিয়াতে যেসব রাষ্ট্রের জিডিপি সবার চেয়ে উপরের দিকে এমন টপ ২০টারাষ্ট্রের  কমন অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে কথা বলার এক জোট হল এই G20। প্রতিবছর নানান দেশে এর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এটা গড়ে উঠার ইতিহাস হল, এক কথায়, এটা মূলত ওয়াল স্ট্রিট [wall Street]  নিউইয়র্ক,  এর আগ্রহ ও আবেদনে গঠিত ও সৃষ্ট।  ওয়াল স্ট্রিট এক প্রতীকী নাম বা শব্দ যার অর্থ এটা বিরাট বিরাট পুঁজি (ঋণ দেয়া) বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠান। এর এতই বড় প্রতিষ্ঠান যা কমিউনিস্টদের কল্পনাতেই নাই। নাই কারণ, এবিষয়ে তাদের প্রধান গুরু জোসেফ স্তালিনেরও কোন ধারনা ছিল না। কিন্তু তামাসাটা হল,  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রধান যুদ্ধের খরচ যোগানদার ও নেতা ছিলেন অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। রুজভেল্টের অর্থনৈতিক-সহ সবধরণের সহযোগিতাতেই স্তালিন তার সোভিয়েত ইউনিয়নকে হিটলারের জার্মানির হাতে আক্রান্ত ও পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এখানে আসল কথাটা হল, রুজভেল্টের পিছনে ছিল এই ওয়াল স্ট্রিট -ই। ওয়াল স্ট্রিট এর বৃহত ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে করিতকর্মা ও দক্ষ কর্মিরাই ছিল রুজভেল্টের মন্ত্রী, প্রশাসক, পরামর্শদাতা, বিভিন্ন সরকারি কমিশনের প্রধান ইত্যাদি সবকিছুতে...। আর স্তালিন মারা যান ১৯৫৩ সালে, মারা যাবার আগে তিনি জানতেন যে ওয়াল স্ট্রিট  কী জিনিষ এমন প্রমাণ কেউ দেখে নাই।  সম্ভবত একারণেই, পরবর্তিতে স্তালিনের অনুসারি কমিউনিস্টদের কল্পনায় সবচেয়ে বড় পুঁজির কারবারী  হল, বহুজাতিক কোম্পানি [MNC: Multi National Corp.] বা কর্পোরেট হাউজগুলো। আর আমাদের মত দেশের কমিউনিস্টেরা অনুসরণ করে ইউরোপীয় কমিউনিস্টদের। যেখানে ইউরোপীয় কমিউনিস্টদের চোখেও ওয়াল স্ট্রিট বলেই কিছু নাই। তাই বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের তো খবরই নাই।
    এই MNC দেরই বাপ হল ওয়াল স্ট্রিট। সেটা এই অর্থে যে MNC গুলোকেই  বড় বড় পরিমাণ পুঁজি ঋণ বা বিনিয়োগ হিশাবে দেয় ওয়াল স্ট্রিট; মানে ওয়াল স্ট্রিটের বড় বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো।  তাই ওয়াল স্ট্রিট শব্দের আলোচ্য প্রসঙ্গে মানে হল যাদেরকে বিনিয়োগ পুঁজির বাজারকে বাড়াতে সব সময় নয়া বাজারের খোঁজে বেরাতে হয়। এজন্য এরা প্রভাবশালী রাষ্ট্র বা অর্থনীতিগুলোকে তারা চাপ দিয়ে বেড়াতে হয়।  ওয়াল স্ট্রিট এর আবেদন ও দাবি হল, তোমরা  G20 দেশগুলো বছরে একবার করে নিজেদের মধ্যে বসে সমন্বয় বাড়াও, এতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য আরো বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাধাগুলো কী তা নিয়ে আলাপ করে বড় ২০ দেশ কোঅর্ডিনেটশন বাড়াও। কারণ, একমাত্র তাহলেই ওয়াল স্ট্রিট এর বাজার বাড়বে; মানে এতে তোমাদের অর্থনীতিও বাড়বে দ্রুত।  এই হল সংক্ষেপে G20।

    কিন্তু মোদির ছেঁচড়ামো গেল না। ভারতের জনসংখ্যা এখন চীনের বেশি হয়ে গেছে বলে ভারত এখন চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া অর্থনীতি যেন হয়ে গেছে  তা একেবারেই নয়। তবে ওয়াল স্টিটের চোখে ভারত পটেনশিয়াল রাইজিং বলে সে  বড় জোর সম্ভাব্য পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে বিনিয়োগ ঋণ গ্রহিতা। এতটুকুই। আর মোদিকে এই সম্ভাবনাটাকেই বাস্তব করে দেখাতে পারতে হবে, ভারতের অর্থনীতিকে  বাস্তব গতি দিতে পারতে হবে। মানে ভারত জি-২০ সম্মেলন করেছে বলেই ভারতের অর্থনীতি তেমন উচা হয়ে গেছে তা একেবারেই নয়। কিন্তু মোদির ছেচরামি হল, তাকে ভারতের অর্থনীতি সে জায়গায় উচা করার আগেই এর ফায়দা নিতে হবে – এই লাইনে রওনা দিয়েছে। আর সেই সাথে ভাব করতে হবে ভারত যেন পরাশক্তি। তবে এই ভাব-ভাষ্যটাই মোদি আভ্যন্তরীণ ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার করে ভোট তুলতে চায়।  আর এরই সাথে হাসিনার বাংলাদেশ জি-২০ দেশগুলোর ধারেকাছেরও কেউ না হওয়া সত্বেও মোদি হাসিনার বাংলাদেশ তার অধস্থন  হাতা-ল্যাসপেন্সার এই অপমান করার বিনিময়ে হাসিনাকে  জি-২০ এর দাওয়াত করে এনে দেখাতে চায়। তার নিজ দেশে দেখাতে চায় যে মোদির ভারতেরও অধস্থন এক  হাতা-ল্যাসপেন্সার দেশ-সরকার আছে!!! এটাই মোদির ছেচরামি!!! অথচ কার্যত অনাহুত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে আমরা ঐ সভায় কী সম্মান পাবো সেখানে??  বড়লোক বন্ধুর বিয়েতে যেতে পেরেছি তা অনেক গরীর বন্ধু এক বিরাট অর্জন বা জাতে উঠা বলে মনে করতে পারে, এটা সেরকমই কিছু একটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি!!!

    সেটা কী দাঁড়াবে তা দেখা যাবে। এর আগে অনেক কিছুই ঘটবে। তবে এনিয়ে আপাতত আনন্দবাজার ও অগ্নি রায়েরা এবার আবার দ্বিতীয় বড় ফলস এক ঢেউ তুলতে চাইছে।   যেমন শিরোনাম থেকেই বিশ্লেষণ শুরু করা যাক। অগ্নি রায় বলছে “হাসিনাকে দুর্বল করলে ক্ষতি সবার, বার্তা আমেরিকাকে”। এখানে সবারটা কে কে? একা মোদির ভারত ছাড়া তো কেউ নাই। আমেরিকাই তো ভারতের সাথেই নাই। অগ্ন রায় যেটা এককালে ছিল যেন সেটা এখনও আছে এই মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে একথা বলছেন। মানে ২০০৭ সালের যে আমেরিকা বাংলাদেশে হাসিনাকে বসিয়ে সেই বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল – সেই আমেরিকা তো এখনকার আমেরিকা নয়। দেখাই যাচ্ছে হাসিনা সরকারই বলতেছে, আমেরিকা তাকে উতখাত করতে চায়। সর্বশেষ ১৬ আগষ্ট সরকার বলছে, আমাকে সরানোর চেষ্টা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী, লিঙ্ক দেখেন। অথচ অগ্নি রায় গল্প ফেঁদেছে হাসিনা সরকার দুর্বল হলে নাকি সেটা আমেরিকারও ক্ষতি?? মানে সোজাসাপ্টা একটা আরেকটার বিপরীত কথা!
    এরপরে স্টোরির শুরুতে অগ্নি রায়ের প্রথম বাক্য “বাংলাদেশে হাসিনা সরকার দুর্বল হলে তা ভারত এবং আমেরিকা কারও পক্ষেই সুখকর হবে না বলে মনে করে নয়াদিল্লি”। যেটা নিয়ে আমরা উপরে দেখলাম এটা এক ভারতের ছাড়া আর কোন দেশের স্বার্থ নয়।  এরপর পরের বাক্যঃ

    “কূটনৈতিক সূত্রের খবর, একাধিক স্তরের বৈঠকে নয়াদিল্লি
    এ কথা জানিয়েছে বাইডেন প্রশাসনকে।
    সূত্রের খবর— বাংলাদেশের
    আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আমেরিকার বর্তমান ভূমিকায় ভারত যে খুশি নয়,
    ওয়াশিংটনকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে সেই বার্তাও”।

    এটা অগ্নি রায়ের সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী মন্তব্য।  গত জুনেই মোদির আমেরিকা সফরে এটা ফকফকা স্পষ্ট হয়ে যায় যে বাইডেনের সাথে মোদির, বাংলাদেশ নিয়ে কোন কথাই হয় নাই। এছাড়া পরে জয়শঙ্কর উলটা ক্রেডিট নিয়েছে এই বলে যে প্রতিবেশি দেশে ভারত কম জড়াচ্ছে। তাহলে এসব সুত্রের খবর বলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা কেন??  ফ্যাক্টস হল, ত এনিয়ে ওয়াশিংটনকে ভারত কিছুই জানায় নাই। কারণ বাংলাদেশকে নিয়ে একই স্বার্থের পাটাতনে ভারত-আমেরিকা আর নাই।   ভারতের সাথে মিলে আমেরিকার এশিয়াকে দেখার দিন শেষ হয়েছে। বাইডেনের আমেরিকা এখন এশিয়াকে দেখতে চায় ভারতকে ছাড়াই। বরং ভারতের স্বার্থবিরোধি অবস্থান নিয়ে।  আর তা শুধু আগামিতে মোদিকে হারিয়ে রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোটকেই ২০২৪ সালের ক্ষমতায় দেখতে চাওয়া  এতটুকুই নয়। আরো আছে!  কী সেটা?

    বাইডেনের আমেরিকার নয়া এশিয়া নীতি-পলিসি সেখানে কেবল রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোট এর ভারত নয়, সেই ভারত এমন হবে যে হবে যে হবে সম্ভাব্য সারা দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকার পদচারণা করতে চাইছে সেই আমেরিকাকেই সমর্থন করবে, এমন এক অধস্তন অনুসারী ভারতকেই আমেরিকা দেখবার আকাঙ্খা করছে। আরো আছে – আর তা শুরু বাইডেনের বার্মা পলিসি-ই নয়; মানে বাইডেন যেমন আগামি বার্মা দেখতে চায় সেটাকেই ভারত সমর্থ করবে মানে, ওর বিরোধিতার বদলে বরং অ্যামেরিকান স্বার্থের ভিতরেই ভারত নিজের স্বার্থ খুজে নিচ্ছে বা খাপ খাইয়ে নিচ্ছে এমন হতে হবে – শুধু তাও নয়।  এটা হল, সপ্তম নৌবহর কেবল বঙ্গোপসাগরে নয় আন্দামানেও হাজির থাকতে চায়।

    ঠিক যেমন বাংলা ট্রিবিউন লিখেছে, 
    ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে নানা খেলা চলছে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই এলাকাটাকে
    নিয়ে নানা ধরনের খেলার একটা চক্রান্ত। যেহেতু আমি জানি
    , আমি বুঝি যে কীভাবে আমাকে ক্ষমতা থেকে
    সরাবে। তাদের কিছু কেনা গোলাম আছে
    , পদলেহনকারী আছে, তাদের বসিয়ে এই জায়গাটাকে নিয়ে খেলবে।
    সেটাই হচ্ছে প্রচেষ্টা। সেটা আমি ভালোভাবে বুঝতে পারি”।

    কিন্তু হাসিনার এসব বক্তব্যের কারণে কিছুই বদলাবে না। যেমন, ২০০৬ সালের শেষে যদি ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন নিয়ে,  আজ সরকার যেমন বক্তব্য রাখছে, তখনকার  বিএনপি যদি একই রকম বক্তব্য দিত তাতে ওয়ান-ইলেভেন ঘটা বা কিছুই ঘটা আটকাতো না। তখনও ভারত মহাসয়াগরের কথার মত অন্য কথাও তো ছিল। যেমন যদি বিএনপির দিক থেকে  বলা হত এভাবে  যে,  আমাদের বদলে আমেরিকা আওয়ামী সরকারকে ক্ষমতায় আনবে, বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিবে ……ইত্যাদি! তাতে কী কিছু ওয়ান-ইলেভেন ঘটা আটকাতো? মোটেও না।
    এসরের মূল ইস্যুটা হল জনপ্রতিনিধিদের গণবিচ্ছিন্নতা।   এমনকি আজ গণ বিচ্ছিন্নতার দিক থেকে আজকের  হাসিনা সরকারের সেকালের বিএনপির চেয়ে বেশি গণবিচ্ছিন্ন। সেটা এই অর্থে যদি অন্তত একটা ফ্যক্টর বিবেচনা করি যে আমাদের মত দেশে জনপ্রতিনিধিদের অন্তত কিছুটা ভয় বা লজ্জা থাকে যে দিন শেষে আমাকে আবার জনগণের কাছেই ভোট চাইতে যেতে হবে। কিন্তু সেটা এখন থাকত হয়ে গেছে।  গত ১৫ বছর ধরে  সরকার প্রশাসন আমলা পুলিশ এমনকি যেকোন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি তা একেবারে আওয়ামি মাঠকর্মীটারও আর সেসবের পরোয়া করা বালাই নাই। কারণ, সেটাও ম্যানেজ করার মেকানিজম মাঠকর্মী-নেতাদের হাতে পর্যন্ত এসে গেছে। জনপ্রতিনিধিদেরকে ভোট চাইতে আর পাবলিকের কাছে যেতে হয় না – এটাই সে মেকানিজম।  কাজেই  এখন ক্ষমতাসীনদে্রা এখন আম-জনতাকে সব ধরণের পরোয়ার বাইরে বা উর্ধে উঠে গেছেন। এরই উলটা দিকটার নামই হল এক  “জনবিচ্ছিন্ন জনপ্রতিনিধি ব্যবস্থা” যা জন্ম দিয়েছে এক গণবিচ্ছিন্নতার দল ও সরকার ব্যবস্থার রাজনীতি।  তাই আগেই বলা যায় এসব “ভারত মহাসাগরের গল্প” বলে এবারও আরো কিছুই ফিরানো যাবে না।

    সারাংশটা হল্‌  এখন কেন আমাদের মত দেশে কেন কিছু “ফিরানো” যায় না – এর আসল কারণ পাওয়া যাবে একজন জনপ্রতিনিধির আবার গণবিচ্ছিন্নতা কী? এটা তো স্ববিরোধি কথা!!! হা এই স্ববিরোধের আরেক নাম নিশিভোট!  এথেকে সে কেন গণবিচ্ছিন্ন এর অর্থ  কিছুটা হলেও বুঝা যাবে।  আবার, মূলত  এখনকার বাংলাদেশের রাজনীতির এই – গণবিচ্ছিন্নতা বৈশিষ্ট – এর কারণেই এখন গণ-অভ্যুত্থানের কথা বকোয়াজ, ফাকা-আওয়াজে উলটা বরং তা জুতসই “ভারতের দালালি” করার বক্তব্য হয়ে থাকবে।  যেটা অনেকেই গণ-অভ্যুত্থানের কথার আড়ালে তা করছেন।  আর এতেই কার্যত তৃতীয় শক্তির হস্তক্ষেপ জাতীয় কথা ও শব্দাবলী এসবই মুখ্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়,  দাঁড়াবেই! সেটা আমরা পছন্দ করি বা নাই করি!

    ভারত জামাতে ইসলামি বলে কী বুঝাতে চায়ঃ
    আনন্দবাজার বা অগ্নি রায় তাদের এই ৪৪৪ শব্দের লেখায় প্রথম ১১৫ শব্দের পরের ১৮০ শব্দ কেবল ব্যয় করেছে জামাতে ইসলাম বলে এক শব্দ আর ধারণা নিয়ে। এনিয়ে সবার আগে পাঠককে একটা সাবধান করে দেই। ঐ লেখায় “জামাতে ইসলাম” লেখা হলেও এশব্দ শুধু রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলাম  বুঝান হয় নাই। এটা একটা দলের নাম করার আড়ালে একটা প্রতীকী শব্দ হিশাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এশব্দ দিয়ে বুঝতে হবে বাংলাদেশে ইসলাম সম্পর্কিত যেকোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ – এর কথা বুঝানো হয়েছে।   এভাবে জামাতে ইসলাম বলে সব জিঘাংসা বিদ্বেষ উগড়ে দেওয়ার শুরু ২০০৮ সাল থেকে, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে যারাই গেছেন সকলেই  জামাতে ইসলাম এদুটো শব্দ দিয়ে গত ১৫ বছর ধরে  জিঘাংসা বিদ্বেষ ছড়িয়ে কথা বলে গেছেন।  ভারতও সেটাই রপ্ত করে কথা বলছে। এটা হল ভারতের কাছে অনেকটা ১৯৪৭ সালের আগের জমিদারি শাসনে শাসিত পুর্ববঙ্গে ফিরে যাবার (মৃত) আকাঙ্খার মত। এটাই জামাতে ইসলাম শব্দে এর বিরুদ্ধাচারণ।
    কথাটা স্পষ্ট হবে, যদি উত্তর খুঁজি যে ভারত বা  আনন্দবাজার বা অগ্নি রায় এরা জামাতে ইসলাম শব্দগুলো বলে কীসের বিরোধিতা করছে? অথবা আরো স্পষ্ট করে তারা এর বদলে কী দেখতে চাইছে?

    এরা সকলেই [এবং এমনকি খুব সম্ভবত বাংলাদেশের এখনকার বেশির ভাগ হিন্দু-সহ প্রগতিশীলেরা ] এদের কাছে যে আদর্শ বাংলাদেশ কাম্য সেটা হল ১৯৪৭ সালের আগের জমিদার হিন্দুর আধিপত্যের যে পুর্ববঙ্গ – সেটাই, সেখানে যদি ফেরত যাওয়া যেত। ভেঙ্গে বললে সেটা হল কোন নাগরিক সাম্য নয়, আইনের চোখের ধর্ম-নির্বিশেষে সব নাগরিক অধিকারে সাম্য নয় বরং জমিদার হিন্দু আধিপত্য করবে আর ইসলাম-মুসলমানের কোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ – সেটাকে অবশ্যই দমানো হবে শুধু না এদের সকলকে জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স মেনে নিতে হবে।
    এক্ষেত্রে মুসলমানদেরকে কী কী মেনে নিতে হবে? সেই তালিকার নাম সেটা অন্য শব্দে বললে তা হল – মুসলমানদেরকে অসাম্প্রদায়িক-  হয়ে থাকতে হবে। এটা শুধু বাংলাদেশের বেলায় নয়, এখনকার সারা ভারতের – মানে কেবল মোদির ভারতের না বা হিন্দুত্ববাদের ভারতের নয় – সারা ভারতের বেশীর ভাগ হিন্দু নাগরিকের আকাঙ্খা। এমন এক ভারত রাষ্ট্রই এদের কল্পনা।  আসলে যেকোন থিওলজি-তে দাঁড়িয়ে কল্পনায় যে কোন মর্ডার্ণ রাষ্ট্রের অনুমান এমন হয় ও হবেই।  আসলে যেকোন এথনিক বৈশিষ্ট ভিত্তিক আধিপত্যের কল্পনা এটা দিয়ে জাতিরাষ্ট্র কায়েম হবে হয়ত কিন্তু তা রিপাবলিক রাষ্ট্র হবে না যেটা ‘নাগরিক সাম্য’ অথবা “ধর্ম-নির্বিশেষে সব নাগরিক অধিকারে সাম্য” এটা হবে না।
    এককথায় বললে, ভারতের হিন্দুত্ববাদ (সাথে একালের ওয়ার অন টেরর) এটাই কিন্তু বাংলাদেশে  -ইসলাম সম্পর্কিত যেকোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ  জোরেসোরে ঘটিয়েছে।  এটা হল হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ।  অথচ তামাসাটা হল, হিন্দুত্ববাদের ভারত বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ ঘটিয়ে যে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ সেটাকেই “জামাতে ইসলাম” বলে প্রতীকী নামে বিরোধিতা করছে!
    আর ঐ যে জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স এর চিহ্ন ও নমুনা হিশাবে মুসলমানদেরকে “অসাম্প্রদায়িক” হয়ে থাকতে বলার দাবি ও বয়ান এটাই সবচেয়ে বেশি করে বয়ে বাংলাদেশের নিয়ে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ ফেরত মুসলমানেরা
    ।  কারণ কলকাতায় থাকার সময়ে এসব মুসলমানেরা অসাম্প্রদায়িক থাকবে এই শর্তেই তো শিক্ষিত হতে সুযোগ পেয়েছিল।    অথচ বাংলাদেশে ফিরে এরাই প্রগতিবাদের নামে হয়ে গেল হিন্দুত্ববাদের (জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স ধারণার) ক্যারিয়ার।
    তবে এত শব্দ থাকতে বাংলাদেশের চেতনাবাদী বা “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি” কেন ইসলাম কোপাতে “জামাতে ইসলাম” বলে প্রতীকী শব্দটা বেছে নিল?  এর কারণ হল, “জামাতে ইসলাম” নামে ডেকে কাউকে কোপানো এর  পরে এমন নৃশংসতার পক্ষে কোন সাফাই হাজির করা ওদের জন্য খুবই জরুরি।  আর ইসলাম কোপানোর স্বপক্ষে সেই সাফাই বয়ানটা হল, যে এটা সাধারণ ভাবে “বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশকে” কোপানোর নৃশংসতা করা নয়; বরং এটা যেনবা  ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামের অপরাধের বিরোধিতা করা হচ্ছে। 

    কঠিন সত্যিটা হল,   বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক যেকোন প্রকাশকে কোপানোর নৃশংসতা করা – এটা তো রেসিজম। ঘোরতর এক Racism; এক নির্মুল আকাঙ্খা।  এক এথনিক[ethnic] জাত-ধর্ম বিদ্বেষ – ইসলামবিদ্বেষ! এথনিক ক্লিনজিং [ethnic cleansing] বা অন্যের জাত-ধর্ম নির্মুলের ভয়াবহ আকাঙ্খা!!   অথচ এটাই প্রগতিশীলতা বলে চালানোর চেষ্টা  চলছে।

    তাহলে আনন্দবাজার কেন এখানে জামাতে ইসলাম শব্দ দিয়ে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ নিল?
    কারণ, সে আমেরিকাকে ভয় দেখাতে চায় যে হাসিনা আগামিতে ক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশে ইসলামিজম ছেয়ে যাবে। কাজেই হাসিনাই ক্ষমতায় থাক! এই হল তাদের ছদ্ম-পরিচয়ে থেকে বলা সাজেশন!

    কিন্তু এনিয়ে অ্যামেরিকান অবস্থান কীঃ
    এটা বলাই বাহুল্য যেকেউই  ক্ষমতাসীন যখন থাকে তখন সে কখনই  বিরোধি যেকোন “রেডিক্যালিজম” মানে ক্ষমতাসীনকে সশস্ত্রভাবে উতখাত করতে চাওয়া যেকোন শক্তির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর বা নির্মমই হবে।  একারণের সবদেশের কনষ্টিটিউশনেই লেখা থাকে এসব “রেডিক্যালিজম”  করলে ওর শাস্তি হল মৃত্যুদন্ড। তাই  ইসলামি রেডিক্যালিজমের বিরুদ্ধে আমেরিকার অবস্থান থাকা তা কোন নতুন জিনিষ নয় বরং অনস্বীকার্য বা obvious ঘটনা অবস্থান। এছাড়া ওয়ার অন টেরর এর টানা বিশ বছর এর বেশি হয়ে গেল; এখন   আমেরিকার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা-শিক্ষা তো হয়েছেই ধরে নিতে পারি। সম্ভবত সেকারণের আমাদের মত দেশে অ্যামেরিকান নীতি এখন ইসলামি রাজনীতি মানেই এর বিরোধী হতেই হবে ঠিক তা নয়। মানে কোন মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রে ইসলামি রাজনীতি করা যাবে না ঠিক তা নয়। তবে মূল অবস্থানতা হল এই যে, নাগরিক অধিকারের দিক থেকে সব ধর্মের নাগরিকের অধিকার সমান বা সাম্য ধারণার মধ্যে থাকলে  ইসলামি রাজনীতি করতে কোন দলেরই সমস্যা নাই। তবে এর সাথে কথা আরো কিন্তু কথা বা ফারদার ব্যাখ্যা তারা সাথে দিয়ে বা করে থাকে। যেমন তারা সমাজে প্লুরালিজম [Pluralism]  থাকবে মানে হল,  ওদেশে বহু এবং বিরোধি মতামত-রাজনীতি থাকবে এটা মানতে রাজি থাকতে হবে। এছাড়া একথাটাই আরেকভাবে বলা ইনক্লুসিভ [Inclusive] বলে আরেক শব্দের কথা তারা বলে দেয়। যেমন যেকোন রাজনীতি-চিন্তাকে তার সকল বিরোধিতাকারীদেরকেও সাথে পাশাপাশি নিয়ে চল্তে পারতে হবে।  মানে কোন বিরোধি মতামত বক্তব্যকে চাপিয়ে কোনায় ফেলে দেয়া বা কোনঠাসা করে রাখা  – সেটা না করে বরং সবার বক্তব্যই বলতে দিতে হবে, তাতে শেষে কার বক্তব্য ও তা কতটুকু পাবলিক গ্রহণ করবে সেটাই হবে সবকিছুর নির্ধারক। এসবই মোটা দাগে অ্যামেরিকান অবস্থান। মানে সারাংশে বললে, ভারত বা আনন্দবাজারি গোষ্ঠি  ইসলামি রাজনীতি বা ইসলামি জুজুর ভয় দেখালেই আমেরিকা ভয় পেয়ে পালাবে বা হাসিনাকে ফরে ক্ষমতায় রেখে দিবে আর  এই বাজারি গোষ্ঠি এতে সফল হয়ে যাবে – এগুলা বেকুরি সর্টকার্ট ও ধান্দালি চিন্তা।

    এগুলো আসলে কলকাতার কিছু মফস্বলি চিন্তা।  তাদের দুনিয়া বলতে তা কলকাতার মধ্যেই আবদ্ধ বলে মনে করে – এরা আমেরিকাকে আন্ডার এস্টিমেট করছে খামোখা। এসব তো এমনকি জয়শঙ্করই আমল করবে না,  করার কথা না। মোদি-জয়শঙ্কর বরং  ভারতে বাইডেনের পলিসিকে  কৌশলে পাশ কাটিয়ে কিভাবে মোদিকে আবার ক্ষমতাসীন করবে – এই চিন্তায় নির্ঘুম! নিজ মাথার ঘায়ে তারা নিজেরাই পাগল অবস্থায়! যদিও হাসিনাকে জি-২০ এর সভায় ডেকে আনতে পেরেছে বলে এটা মোদি সরকারের বিরাট কূটনৈতিক  সাফল্য বা মোদি আন্তর্জাতিক জগতে এক বিশাল নেতা এসব কথা ছড়িয়ে ভোটের বাক্সে এর ইতি প্রভাব যেন পড়ে ইত্যাদি এসব কান্ড তো মোদি অবশ্য করবেনই!!  এমনকি বাইডেনও জি২০ এর সভায় আসতেছেন; তাই বাংলাদেশের হাসিনার জন্য মোদিই যেন বাইডেনের কাছে সুপারিশ করবেন বলে মোদি প্রপাগান্ডাও করবেন। সেটা নিজে বলবেন না অবশ্যই – তবে কয়েকটা মিডিয়ায় এমন জল্পনা-কল্পনা রিপোর্টও করাতে পারেন। যদিও তা অবশ্যই ওখানেই শেষ হবে; মানে সত্যিই মোদি কী বাইদেনের সাথে কথা বলেছিলেন তা নিয়ে আর কোন রিপোর্ট হবে না। ফুলস্টপ!

    হাসিনা জি-২০ মিটিংয়ে গেলেও বাইডেনের সাথে কোন সাইড-লাইন টকঃ
    আমরা এখনও কেউ জানিনা (এছাড়া এখনও সময় আছে) যে হাসিনা শেষে জি-২০ এর সভায় ভারত সফরে নিশ্চিত যাবেন কী না! ধরে নেয়া যাক তিনি যাবেন। যদি যানও তবু হাসিনার সরাসরি বাইডেনের সাথে বা মোদির মধ্যস্ততায় কোন কথা কী হবার সম্ভাবনা আছে? সাইড লাইনে? অনুমান হচ্ছে এর সম্ভাবনা খুবই কম। এর অন্তত একটা কারণ হল, আমেরিকার সাথে বসে কোন আর লাভ বা পরিস্থিতি হাসিনার পক্ষে আগাবে এমন বাস্তবতা সম্ভবত আর নাই। তা এখন ঢাকায় একেবারেই স্পষ্ট!  যেমন সর্বশেষ যে দুজন কংগ্রেস-ম্যান ঢাকা সফরে এসেছিলেন তা সরকারের জন্য কোন সুখকর কিছু ছিল না। এই সফরে কংগ্রেস-ম্যানদের বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জবাব ছিল এর এক মাপকাঠি। কারণ, মোমেনের জবাব দেখে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল যে কংগ্রেস-ম্যানদের প্রশ্নগুলো কাম্য বা ওয়েলকামিং  নয়! খাস বাংলায় বললে মোমেন -টেরা উত্তর- দিয়েছিলেন।  এছাড়া অতিথিরা ঢাকার পৌছানোর আগেই মোমেন অনেকবারই বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই আগমন ওয়েলকামিং নয়। তিনি বলে দিয়েছেন, নির্বাচনের আগে সরকার আমেরিকার সাথে আর কোন চুক্তিতেই যাবেন না।  অথবা হাসিনার নিজেরই ভারত মহাসাগরে কী ঘটতে যাচ্ছে সংক্রান্ত বক্তব্য থেকে বুঝা যায় তিনি আমেরিকার সাথে সম্পর্কের উন্নয়নের কোন আশা আর সম্ভবত দেখেন না।
    কাজেই এই পরিস্থিতিতে তিনি জি-২০ এর সভায় বাইডেন বা অন্য কারও সাথে কথা বলার আগ্রহে আছে – এটা আমাদের জন্য কষ্ট কল্পিত!
    আর এসব খুটিনাটি দিক বা এর ডেভেলবমেন্ট বিবেচনায় রেখে কথা বলা – এটা আনন্দবাজার বা অগ্নি রায়ের মুরোদের মধ্যে তা আছে এমন মনে হয় না। তার আসলে একটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালানো তাও আবার সেটা মফস্বলি বুঝাবুঝির উপর ভর করে করতে যাওয়া …… না এটাকে এখানেই ছেড়ে যেতে হচ্ছে আমাদের!

    আপডেটেডঃ    ২০ আগষ্ট ২০২৩;  রাত ০১ঃ ৫৩
    আপডেটেডঃ     ২০২৩;

    >>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • অজ্ঞতায় থেকে কথা বললে নুইসেন্স তৈরি করবে

     

    অজ্ঞতায় থেকে কথা বললে নুইসেন্স তৈরি করবে
    গৌতম দাস
    ২৭ জুলাই ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4Kk

     

                    পরাশক্তিগুলোকে আর কী দেওয়ার আছে, 

    বামপন্থী নুইসেন্সেঃ
    চলতি নয়া শতকের রাজনৈতিক ঘটনা ফেনোমেনাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে চাইলে গত শতক (২০০০ সাল) পর্যন্ত যেসব টুলস বা  ব্যাখ্যার হাতিয়ার আমাদের হাতে এসেছিল তা এই নয়া শতকের একেবারেই কাজে আসবে না; নতুন নতুন মেজর ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করতে আমরা সক্ষমতা দেখাতে পারব না। বিশেষ করে না-বুঝ বা অবুঝ কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল নামে পরিচিত ধারণাগুলোর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সবার আগে সচেতন হতে হবে। এরপর একালে সেসবের পুরাপুরি একটা রিভিউ বা পুনর্মুল্যায়ন আগে করে না নিয়ে সেসব পুরানা ধারণা এই শতকে ব্যবহার করতে গেলে একটা বিপর্যয় আসতে বাধ্য।  আর এ’থেকে  সকলের পরিত্রাণের  একমাত্র উপায় নিজ চিন্তাকে নয়া হাতিয়ারে সাজানো, চিন্তার নয়া যোগ্যতা, নয়া দক্ষতা মানে সক্ষমতায় যোগ্য হয়ে আমাদের উঠতেই হবে; এটাই এথেকে বের হবার একমাত্র  পথ।
    কাজেই উপায় একটাই, নিজ সক্ষমতা সম্পর্কে আগে মুল্যায়ন ও সঠিক মাপামাপি-এস্টিমেট করে নেন – যাদের সক্ষমতা নাই টের পান তারা নিজ দায়িত্বে নিজ খামতি পূরণে রত হন। কিন্তু তবু এই পরিস্থিতিতে  দয়া করে পরিপুর্ণ না জেনে নিশ্চিত না হয়ে কোন সন্দেহ বা ষড়যন্ত্র তত্ব দিয়ে পুরান কথা ও অনুমানগুলোই আবার অবলীলায় ব্যবহার ও বলতে শুরু করলে সেটা শুধু ভুল না, অপরাধ হবে। এছাড়া এমন করলে সেটা একটা বিপর্যয়কর ও বিব্রতকর অবস্থা –  একটা নুইসেন্স তৈরি সে তো হবেই।
    যেমন কেউ মনে করতেই পারে যে সে ন্যাংটা হয়ে মাঝরাস্তা দিয়ে আমি হাঁটবে, এটাই নাকি তাঁর অধিকার! মানে সমাজের জন্য নুইসেন্স তৈরি করাটাই যেন তাঁর অধিকার – এমনটা ভাবলে নগরের বাকি মানুষের আর কী করার থাকবে!!

    বিডিনিউজ২৪ লিখেছে, “সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু সম্মেলন কক্ষে ছাত্র ইউনিয়নের একাংশ আয়োজিত ‘দক্ষিণ এশিয়ার ভূ–রাজনৈতিক বাস্তবতা ও পুঁজির পরিবর্তিত বৈশিষ্ট্য: বামপন্থীদের করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা হয়েছে”। সেখানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ও  ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক প্রতীপ চট্টোপাধ্যায় বক্তা ছিলেন।
    কেউ গত শতকে যা বলতেন সেই একই কথা চলতি শতকেও কোন রিভিউ ছাড়াই আগের মত বলে গেলে একটা বিপর্যয়কর ও বিব্রতকর অবস্থা তৈরি হবেই। বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার প্রায় ত্রিশ বছর পার হয়ে গেল এরপরে যেন কিছুই ঘটে নাই ধরে নিয়ে আমরা পুরান কথা চালায় যেতে পারি না।

    BRICS বলে একটা ধারণা  ও প্রতিষ্ঠান ২০০৯ সাল থেকে মানে গত ১৪ বছর ধরে এসে গেছে। আজকের ইউক্রেন যুদ্ধ ও বাইডেনের যথেচ্ছভাবে স্যাংশন প্রয়োগের পটভুমিতে ব্রিকস এবার দ্রুত বিকাশের জন্য সচল ও সক্রিয় হতে চেষ্টা করতে শুরু করছে।  এই সময় অধ্যাপক প্রতীপ চট্টোপাধ্যায় বলছেন, “বর্তমানে কোয়াড ও ব্রিকস নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য পদ পাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আমার কাছে এগুলো আধিপত্যবাধের আরেকটা নতুন রূপ। “এগুলোতে আপনি দেখবেন না শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশকে মুখ্য ভূমিকায় আনতে। বৈদেশিক শক্তি বা আমাদের অঞ্চলের বাইরের ক্ষমতাশালী দেশগুলো কিন্তু এই অঞ্চলে এসে তাদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। এটা বিভিন্ন সময় নাম বদলাচ্ছে।”  –

    “বর্তমানে কোয়াড ও ব্রিকস নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য পদ পাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আমার কাছে এগুলো আধিপত্যবাধের
    আরেকটা নতুন রূপ
    । “এগুলোতে আপনি দেখবেন না শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশকে মুখ্য ভূমিকায় আনতে। বৈদেশিক শক্তি বা আমাদের অঞ্চলের বাইরের ক্ষমতাশালী
    দেশগুলো কিন্তু এই অঞ্চলে এসে তাদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। এটা বিভিন্ন সময় নাম বদলাচ্ছে।
    ”  – অধ্যাপক প্রতীপ চট্টোপাধ্যায়

    কোন কমিউনিস্ট-বামপন্থীর পক্ষেই এমন না জেনে বলা বক্তব্য দেয়া সম্ভব। ব্রিকস সম্পর্কে কারও না জানা বা কম জানা থাকতেই পারে। কিন্তু তা সত্বেও নিজের অজ্ঞতাকে বুক ফুলিয়ে জানানো এটাকেই ‘বোকার সাহস’ বলে!
    এমনিতেই গত শতকের সমস্যা হল, স্তালিন-সহ পরের বাংলাদেশে পর্যন্ত কোন কমিউনিস্ট এর আর আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক জিনিষটা কী  তা জানা হয় নাই। দুইটা বিশ্বযুদ্ধ শেষে গত ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়াতে এই প্রথম একটা গ্লোবাল ইকোনোমিক সিস্টেম ও একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম গড়ে উঠেছে। হতেই পারে যে আপনার চোখে এটা ভুল কাজ হয়েছে, ভুল রাস্তায়। তাই আপনি তা পছন্দ করেন নাই, অনুমোদন করেন না। কিন্তু তাতেও আপনি ওসব প্রতিষ্ঠানগুলো কী, ঠিক কী করে থাকে ইত্যাদির কোন বেসিক তথ্য না জেনে অন্ধকারে থেকে মন্তব্য করা কী ঠিক?

    কঠিন সত্যি বা ফ্যাক্টস টা হল, কোন কমিউনিস্টই দুনিয়া যে ১৯৪৫ সালের পরে সেই প্রথম একটা গ্লোবাল ইকোনোমিক সিস্টেম ও একটা গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম মানে এর প্রতিষ্ঠান হিশাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এবং দ্বিতীয় পলিটিক্যাল সিস্টেমের জন্য জাতিসংঘ গড় তুলেছে – এদিকটা টের পায় নাই।  স্থানীয়ভাবে একটা দেশ-ভুখন্ডে যেমন রিপাবলিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেচে তেমনই গ্লোবাল পরিসরে (তবে সীমিতভাবে) গ্লোবাল এক রাষ্ট্রব্যবস্থার মতই জাতিসংঘ গড়ে উঠেছিল – যার ভিত্তি হল, কোন ভুখন্ডের বাসিন্দাদের কলোনিদখল করা অবৈধ কাজ। এই ভিত্তিতে জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণায় ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারিতে প্রথম যে চার রাষ্ট্র স্বাক্ষর করেছিল তার একটা হল স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন।  এই ফ্যাক্টস ও এর তাতপর্য কমিউনিস্টেরা বুঝেছে বা জানে  তা নিয়ে সন্দেহ করার জেনুইন কারণ আছে। খোদ স্তালিন কী মনে করতেন এনিয়ে তার কোন লেখা বা উচ্চবাচ্যের কথাও জানা যায় না।
    দ্বিতীয়ত, ১৯৪৪ সালে আমেরিকার নিউ হ্যাম্পশায়ারের এই হোটেলে এক সম্মেলনে [Bretton Woods Conference] টানা ২২ দিন ধরে চলা আসর থেকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক নামের দুই প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল। একটা গ্লোবাল ইকোনোমিক সিস্টেম দাঁড় করানোর জন্য। যাতে দুনিয়াব্যাপী “আন্তঃরাষ্ট্রীয় এক বাণিজ্য” ব্যবস্থা চালু করা যায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট স্তালিনের প্রতিনিধি ঐ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। তবে প্রতিষ্ঠান দ্বয়ের জন্ম ম্যান্ডেট যে কেন কী উদ্দেশ্যে এটা জন্ম দেয়া হচ্ছে, এর এক্তিয়ার কী ইত্যাদি সেসব রচনার পরে সেই সম্মেলন শেষ হয়ে যায়।  এরপরের কাজ ছিল প্রত্যেকটা রাষ্ট্রের চাঁদা পরিশোধ সাপেক্ষে ওদুই প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ লাভের আবেদন করা ও সদস্যপদ নেয়া। এই অংশে কোন সোভিয়েত প্রতিনিধি আর সেখানে হাজির হন নাই।  সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ অংশ হল এটা। কিন্তু কেন স্তালিন সদস্যপদ নেন নাই, কারণ কী – অথবা  দুই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তার ধারণা অনুমান কী অথবা আপত্তি কী ইত্যাদি এসব নিয়ে তিনি কোথাও কিছু লিখেছেন জানা যায় না।

    পরবর্তিতে কমিউনিস্ট জগতেও এনিয়ে কোন আলোচনা উচ্চবাচ্য কোথাও শুনা যায় নাই। বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের পরিচালিত ১৯৮২ সালের প্রশাসনিক সংস্কার চলার সময় সরকারি পাটকলের শ্রমিকেরা চাকরিচ্যুত হলে সেই প্রথম আমাদের কমিউনিস্টেরা এদুই প্রতিষ্ঠানের নাম জানতে পারে। তারা এদুই প্রতিষ্ঠানের নামে – নিপাত যাক – শ্লোগান দেয়া সেই থেকে চালু হয়। অতটুকুই; তবু এদুই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানাশুনা তখনও আর কিছু হয় নাই বা আগায় নাই।
    ওদুই প্রতিষ্ঠানের জন্ম পরবর্তিতে সোভিয়েত ব্লক বলে কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫৩-৯১) আমেরিকা বনাম সোভিয়েত – এই ব্লক রাজনীতির কালে সোভিয়েত ব্লকের কোন রাষ্ট্র ওদুই প্রতিষ্ঠানের সসস্যপদ গ্রহণ করে নাই। বা পায় নাই। এটা প্রমাণ করে যে  এর মানে এই ব্লকের রাষ্ট্রগুলোর নিজেদের মধ্যেও কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা বলতে কিছু ছিল না।  তবে গুরুত্বপুর্ণ হল, ১৯৯১ ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পরেই ১৯৯২ সালেই ভেঙ্গে তৈরি হওয়া ১৫ রাষ্ট্রের সকলেই ওদুই প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ গ্রহণ করেছিল।

    এসবই হোল বেস ফ্যাক্টস [Base Facts]। এবার আসি ব্রিকস [BRICS] প্রসঙ্গে। একবাক্যে শেষ করব।  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গড়ে উঠেছিল আমেরিকার নেতৃত্বে। এর অর্থ তাতপর্য  করা যেতে পারে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর গঠন ছিল শেয়ার মালিকানার কোন ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের মত, যেখানে আমেরিকার এত বেশি শেয়ার যা অন্যেরা মিলিতভাবে চ্যালেঞ্জ উপযোগী নয়।  আর ব্রিকস হল সেই উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান  যার লক্ষ্য হল চীনের নেতৃত্বে এবার নয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সমতুল্য প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া।

    কাজেই গত প্রায় আশি বছর ধরে চলা গ্লোবাল অর্ডার হিশাবে নয়া প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাটাকে [এর সীমাবদ্ধতা বা বড়লোক দেশগুলোর দিকে কান্নি মারা বিষয়ক খামতি সহ ] যে বুঝেই উঠতে পারে নাই, জানার [মানার কথা বলি নাই] চেষ্টা করে নাই,  সে একালে গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের কালে ব্রিকসের উত্থানকে কিভাবে বুঝবে? আবার তেমন জানাবুঝা নাই একারণেই হয়ত এটা বলাও সহজ মনে হতে পারে যে কোন রাষ্ট্রের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্যপদ না নিলে যেন ঐ রাষ্ট্রের লাভ-ক্ষতি নাই!!! সদস্যপদ না নিয়েও যেন দুনিয়ায় অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকা যাবে!!! তাই কী??? এরা তাই মনে করে। জানাবুঝা না থাকার এই এক বিরাট সুবিধা; যাখশি বলা যায়। আজকের দুনিয়াতে অন্যকোন দেশের সাথে আমদানি-রপ্তানিতে না জড়িয়ে কী অর্থনীতি টিকানো সম্ভব? মনে হয় না এনিয়ে কেউ ভেবে একথা  বলছে!!!

    আনু মুহম্মদের বক্তব্যঃ
    কিছু কঠিন বাস্তব সত্য হল,  খোদ কার্ল মার্কস বা লেনিন তাদের বইতে কী লিখে গেছেন সেটা নয়। সারা দুনিয়ার মানুষের কাছে কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্র কী সেটা স্তালিন যেটা ব্যবহারিক ভাবে মানে করেছিলেন সেটাই  কমিউনিজম বলে দুনিয়ায় পরিচিত হয়ে আছে। সে বাস্তবতায়, স্তালিন প্রবর্তিত – উতপাদন ব্যবস্থা থেকে ব্যক্তিমালিকানা উচ্ছেদ করে উতপাদন করলেই “বাড়তি মূল্য ফেরত”-সহ সবকিছু সমাধান – এটাই কমিউনিস্টদের সমাজতন্ত্র।

    কিন্তু এটা কী বাস্তবে ‘বাড়তি মূল্য ফেরত’ করেছিল কিনা এমনকি এই সমাজতন্ত্র নিজে কী ভায়াবল এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা? নিজে টিকে থাকতে পেরেছিল কিনা এটা নিয়ে চিন্তা করতেও রাজি না এই কমিউনিস্টেরা।
    এছাড়া স্তালিনের সমাজতন্ত্র  বাড়তি মূল্য ফেরত দেয়ার সুরাহার ব্যাপারটা ছাড়াও মৌলিক যেসব সমালোচনা মুখোমুখি তা হল – এটাও কী আরেক ক্যাপিটালিজম নয়, এক রাষ্ট্রীয় বা স্টেট ক্যাপিটালিজম! যা ক্যাপিটালিজমের চেয়ে বাইরে নয়। ফলে এতে জমা হওয়া বাড়তি মূল্য সেটাও কী শ্রমিক ফেরত পেয়েছে? পায় নাই, কারণ, পার্টি মালিকানায় চলে গিয়েছে। তাই তা ভোগ করেছে পার্টি এলিট – উপর মহলের নেতা কর্তা ও তাদের পরিবারেরা!
    সবচেয়ে বড় কথা এটা ছিল চরম অদক্ষ উতপাদন ব্যবস্থা – প্রত্যকেটা উতপাদিত পণ্যে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অদক্ষ বাড়তি শ্রমের বোঝা চাপানো। ম্যানেজমেন্ট বলে কোন ধারণা সেখানে কাজ করত না।

    স্তালিনের আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ধারণাঃ
    বাণিজ্য হারাম নাকি হালাল মানে জায়েজ কিনা, বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পর্যায়ের কমিউনিস্ট এরাও বলতে পারে না; অস্পষ্ট হয়ে থাকে। কারণ বাণিজ্য করতে গেলে তো মুনাফা করা হয়ে যাবে! মুনাফা করা কী জায়েজ? এটা তো আরো বড় অস্পষ্ট জায়গা! এর উপর আবার আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য? ফলাফলে কমিউনিস্টেরা স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারে না।

    ফ্যাক্টস হল, স্তালিন ব্যক্তি-মালিকানাহীন সমাজতন্ত্রী তো বটেই এছাড়াও তিনি যে অর্থনৈতিক (সমাজতন্ত্র) ভাবনার অনুসারী, সেটা মূলত এক উগ্র অর্থনৈতিক-জাতিবাদী ধারণা। সেটা এই অর্থে যে মনে করে আমার দেশের মানুষ যা কিছু ভোগ ব্যবহার করবে তা কেবল দেশেই তৈরি হতে হবে – এমন এক ইকোনমিক ন্যাশনালিস্ট এরা।
    অনেকের কাছে একালেও যথেষ্ট চিন্তাভাবনা না করে মনে হতে পারেন, এটা খারাপ কী!
    এর খারাপটা হল, সবদেশই সোভিয়েত ইউনিয়নের মত বিশাল বড় ও প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর নয়। এছাড়া, সবদেশ সব ধরণের পণ্য উতপাদ্নই আসম্ভব নয়, এছাড়া সমান দক্ষ নয় সে তো আছেই। দক্ষতার উপর পণ্যমুল্য নির্ভর করে। আমি যে দেশ যে পণ্য উতপাদনে দক্ষ সেটা নিজে ভোগ ও রপ্তানি করে অন্যের ভাল দক্ষ্যতায় তৈরি পণ্য আমদানি – এই নীতি সবচেয়ে কাজের।
    কিন্তু  মোদির মত উগ্র অর্থনৈতিক জাতিবাদীরা এক ফলস দেশপ্রেম কপচাবে চীনা টিভি ভাঙছে দেখাবে কিন্তু ভারতের ৭০% চীনা মোবাইল ব্যবহার করবে সস্তা বলে; ভারতের ওষুধ কোম্পানিগুলো ৪০% চীনা কাচামাল ব্যবহার করে ওষুধ বানাবে।

    স্তালিন যে বাণিজ্যবিরোধী ও সমাজতন্ত্রের নামে মূলত এক ‘উগ্র অর্থনৈতিক জাতিবাদী’ ছিলেন এর প্রমাণ কী? কিসের ভিত্তিতে একথা বলছি? বলছি এজন্য যে সোভিয়েত ব্লকে নিজেদের মধ্যে কোন  আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাই ছিল না। কেন? সেটা বুঝতে চেয়াষ্টা করেন জেনে যাবেন। সবচেয়ে বড় কথা একটা নিজেদের মত করে  হলেও আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সমতুল্য প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোন “আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা” গড়া সম্ভবই নয়। সোভিয়েতে ব্লকের এই তাগিদই ছিল না।

    সোভিয়েত ব্লক ব্যবস্থাটাও টিকতে না পারার এটাই কারণ।
    গত ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে ঐ সোভিয়েন ইউনিয়ন রাষ্ট্রই একেবারে ভেঙ্গে যায়। মানে, বাইরের কারও আক্রমণ ছাড়াই নিজগুনে নিজেকে রক্ষা করতে না পেরে কথিত সোভিয়েত রাষ্ট্র  – এই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে অকেজো ও টুকরা হয়ে পরেছিল। তাই ভাঙনের পরে তারা আপোষে ১৫টা দেশে (রাশিয়া-সহ) নিজেরা নিজেকে বিভক্ত করে নিয়েছিল। পরের বছর ১৯৯২ সালের মধ্যেই রাশিয়াসহ ১৫টা রাষ্ট্রই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সদস্য হয়ে নিয়েছিল।

    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কী, কেমন প্রতিষ্ঠান সেসব না জানা থাকলে যা ইচ্ছা তাই বলে ফেলা, মাইক কাপানো ইত্যাদি তো অবশ্যই সম্ভব। গত ১৯১৬ সালে লেনিন “সাম্রাজ্যবাদ” বইটা লিখেছিলেন। লেখার পরে ক্যাপিটালিজম ইস্যুতে মুখ্য করে লেখা রচনা আর নাই। ১৯২৪ সালের জানুয়ারিতে তিনি মারা যান। ঐ বইয়ে তিনি লগ্নি পুঁজির ধারণা ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু দুনিয়া কী আজও সেই জায়গায় আছে? লেনিনের দেখা দুনিয়া ছিল কলোনি হয়ে থাকা দুনিয়া। কলোনিদখল অবৈধ ঘোষণা যে হয়েছে, এর উপর ভিত্তি করে জাস্তিসংঘ প্রতিষ্ঠান হয়েছে তা কয়জম=ন কমিউনিস্ট জানে। খোদ স্টালিনই আমল করেন নাই। আর একালের ১৯৪৫ সালের পরে যে গ্লোবাল অর্ডার চালু হয়েছিল তা আপনার অপছন্দের এবং অনুমোদিত হতে পারে; অবু এর সম্পর্কে এই নয়া দুনিয়া সম্পর্কে আপনার অজ্ঞ থাকা গ্রহণযোগ্য নয়। আপনি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এর সুদের হার সম্পর্কেই খবর নেন নাই। অথচ বলে দিলেন এগুলো হল লগ্নি পুজি। মানে পুঁজি খাতায় সুদ খাবার ব্যবস্থা।  অথচ বিশ্বব্যাংকের সুদের হার হলো – বিনাসুদে এবং আসলও ফেরত দিতে হবে না এমন অনুদান এখান থেকে শুরু করে ০.৭৫% মানে ১% এর নীচে সুদে এবং চল্লিশ বছর ধরে আসল ফেরত যার আবার প্রথম দশবছর সুদ আরোপ হবে না – এসব কী লগ্নি পুজি? টাকা খাটিয়ে সুদ খাবার কারবার??? না জেনে আমরা কেন কথা বলব?

    আব্বার তাই বলে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক কী খুবই বাংলাদেশের ফেবারেবল সংগঠন? অবশ্যই না।  কিন্তু ঠিক কোথায় সেটা? এসব জেনে এরপরেই কেবল মুখখোলা উচিত নয় কী?

    আনু মুহম্মদ ঐ সভায় বলেচ্ছেন, পুঁজিবাদের আধিপত্য প্রতিহত করতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে ‘সাউথ এশিয়ান ইউনিয়ন’ গঠন করতে বামপন্থিদের কাজ করতে হবে। “দক্ষিণ এশিয়ায় যে পুঁজির আধিপত্যের মধ্যে আমরা আছি, সেখান থেকে বের হতে গেলে পুরো দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে আমাদের একটা ভিশন চিন্তা করা উচিৎ। এই ভিশনটা একমাত্র বামপন্থিরাই ধারণ করতে পারে।”

    পুঁজিবাদের আধিপত্য – এটা কী জিনিষ? এর তো কোন মানুষ-কর্তা নাই দেখা যাচ্ছে। মানে অবজেকটিভ? আবার ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ভেঙ্গে যাবার পরে দুনিয়ার কোথাও কী ক্যাপিটালিজম ছাড়া অন্য কোন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আছে? বাস্তব সেটা?  আবার চীন যে বহু আগেই স্তালিনের স্টাইলের কথিত সমাজতন্ত্র ছেড়ে দিয়েছে  শুধু তাই না, যে ১৯৩০ সালের মধ্যে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে দুনিয়ার এক নম্বর অর্থনীতি হতে চলেছে এই ফেনোমেনা কে কেমনে ব্যাখ্যা করবো? কথিত পুঁজিবাদ-বিরোধিতা জিনিষটা এক কল্পনা হয়ে থেকে গেছে। বাস্তবতার সাথে যার কোন সম্পর্ক নাই। এই বাস্তবতায় ‘সাউথ এশিয়ান ইউনিয়ন’ পুঁজিবাদ-বিরোধিতার এজেন্ডা কার? কে সেই ফোর্স? দক্ষিণ এশিয়ার কোন দেশ? এমনকি শুধু বাংলাদেশেও এরা কারা? এমন কে আছে? তাহলে এই যে “দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে আমাদের একটা ভিশন চিন্তা” বলা – একটা স্বপ্নে পোলাও খাওয়াও তো এত খারাপ নয়!!!

    বিএনপি এর চেয়ে বেশি কী দেবেঃ
    রাজনীতি বা ক্ষমতা মানেই দেশের তেল-গ্যাস সম্পদ বিদেশিদেরকে দিয়ে দেয়া – এভাবে রাজনীতি ও ক্ষমতাকে ব্যাখ্যা করা এই হাতুড়ে গিরি আর কতদিন? এথেকে বুঝা যায় ‘রিয়েল’ কোন ক্ষমতা পাওয়া বা দখল সম্পর্কে তার কোন ধারণাই নাই।   বিএনপি কোন বিপ্লবী দল নয়, কিন্তু তাবলে তা কল্পনায় পোলাও খেয়ে চলা বামপন্প্নথী চেয়ে বেতার নয় কী? এই অর্থে যে বিএনপি রিয়েল পাওয়ার নিয়ে ডিল করে থাকে!  আনু মুহম্মদ কী বলতে পারবেন বিএনপির ক্ষমতা পেতে বাধা কী কী অথবা হাসিনার ক্ষমতা ধরে রাখতে চ্যালেঞ্জ কী কী? বাস্তব ক্ষমতা কী, কী তার সমস্যা ও সম্ভাবনা বামপন্থীদের কখনও জানা হয় নাই।  আবার, ভারতের সাথে বিএনপির  সম্পর্ক কেমন কী? কোন ধারণা আছে? কিছুই ধারণা নাই। । ক্ষমতা বুঝতে গেলে আগে ক্ষমতার লবি সম্পর্কে অন্তত জানা থাকতে হয়। লবি – হোটেলের লবি যে অর্থে। ক্ষমতার করিডোর যেখানে ক্ষমতা ঘুরাফিরা করে – এর ধারণা যে কখনও ক্ষমতায় যায় নাই অন্তত একবার তার কোন ধারণা থাকবে না। আর না জানা থাকার বিরাট সুবিধাটা হল না জেনে সহজে অবলীলায় সব বলে দেয়া যায়।
    আসলে এক “সারপ্লাস ভ্যালু থিওরি” নিয়ে কিছু বুঝ ছাড়া বামপন্থীরা বাস্তবের ক্ষমতা বা রাজনীতি সম্পর্কে আর কী জানে?  এভাবে আর কতদিন?

    আরো কিছু ধারণাঃ
    “পরাশক্তিগুলোকে আর কী দেওয়ার আছে, তাই খুঁজে পাচ্ছে না বিএনপি: আনু মুহাম্মদ” – এটা বিডিনিউজের রিপোর্টের শিরোনাম। আচ্ছা এই পরাশক্তি মানে কী সোভিয়েত বনাম আমেরিকা? মানে সে জায়গায় রাশিয়া বনাম আমেরিকা?  নাকি চীন বনাম আমেরিকা?
    এছাড়াও এই পরাশক্তি মানে কী সামরিক ক্ষমতা?

    কিন্তু না সরি, এটা এখনকার তো নয়ই, সোভিয়েত আমলেরও বয়ান নয়। সেকালেও “পরাশক্তিগুলোকে আর কী দেওয়ার আছে” এমন, বলা হত না। কারণ সোভিয়েত বা চীন তো কমিউনিস্টদের ঘরের জিনিষ তাই এভাবে তারা বলত না।  তবে হ্যা পরাশক্তি বলতে  সোভিয়েত বনাম আমেরিকাকে যেটা বুঝানো হত সেখানে পরাশক্তি বলতে সামরিক শক্তিই বুঝা বা বুঝানো হত।

    ১। তবে একালে এসে এটা এখন পরিস্কার যে পরাশক্তি মানে সামরিক শক্তি নয়। বরং পরাশক্তি মানে অন্য রাষ্ট্রের উপর প্রভাব বিস্তার বা তার সিদ্ধান্তের উপর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা বুঝায়।  এখানেই শেষ নয়।  অন্য রাষ্ট্রের উপর প্রভাব বিস্তার এর ক্ষমতা এটাই বা আমেরিকার হাতে আসে কেন? আমেরিকার সামরিক শক্তির ভয়ে? না, একেবারেই না।  বাংলাদেশের মত দেশের সাথে আমেরিকার সামরিক ক্ষমতার তুলনা অবান্তর। তাহলে অ্যামেরিকান ক্ষমতাটা কী থেকে এসেছে?  এটা অর্থনৈতিক সক্ষমতা। আরো স্পষ্ট করে বললে বাংলাদেশের মত দেশকে আমেরিকার খুবই কম সুদের বিনিয়োগ পুঁজি (অবকাঠামো ও ডাইরেক্ট বিনিয়োগ দুটাই) যোগান দিবার ক্ষমতা।
    হা আমি উলটা করে বলছি, কমিউনিস্টেরা যা বুঝে এর উলটা। কমিনিস্টদের জানাই নাই যে গত দুশবছরের কলোনি শাসনাধীনে থাকায় তা  আমাদের অর্কেথনীতিকে ব্যপকভাবে পুঁজির অভাবে বুভুক্ষ এক দেশ করে দিয়ে গেছে। পুঁজি নাই তো নয়া কাজ সৃষ্টি নাই। তাতে আপনি পুজিবাদ নাকি কথিত সমাজতন্ত্র যাই করেন। কমিউনিস্টেরা একথাটাই উলটা বুঝছে – তারা বিনিয়োগ নেয়াকে হারাম বুঝেছে।  ভারতের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক সমস্যার মুলে হল এই ভুল ধারণা। নেহেরু ১৯৬৪ সালে মারা গেলেও তার পুঁজিবিরোধী ভারতের অর্থনীতি টিকে ছিল ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। যখন এটা নিজ গুনেই ভেঙ্গে পড়ে আইওএমএফের কাছে হাত পেতেছিল ও সংস্কার করেছিল। কমিউনিস্ট উলটা বুঝের মারাত্মক সমস্যাগুলো এটাই। বাংলাদেশে আমরা সংস্কার করে নিয়েছিলাম ১৯৮২ সালেই।  যেকোন আধা বুঝ আরো বেশি স্মস্যা তৈরি করে। আবার ভারতকে পরাশক্তি বানায় দেয়া হয়েছে। কোন যুক্তিতে ভারত পরাশক্তি?
    যেকথা বলছিলাম পরাশক্তি আসলে একটা বিনিয়োগ দেয়া বিশেষত অবকাথামো মানে কম সুদে বিনিয়োগ দিবার ধারণা। আর কোন দেশের অর্থনীতি যখন বিপুল সারপ্লাস জমার মত অর্থনীতি হয়ে উঠতে পারে সেটাই ও পরাশক্তি হয়ে উঠার পুর্বাভাস। যে ক্ষেত্রে চীন এখন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করেছে।      কাজেই “পরাশক্তিগুলোকে আর কী দেওয়ার আছে” মানে পরাশক্তিগুলোকে তেল–গ্যাস উপ্টৌকন দিলে তবেই ক্ষমতায় যাওয়া যায় এটা আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়ার গত সত্তর বছর ফেনোমেনা কোথাও ছিল না। এখনও চীন  নাকি আমেরিকাকে তেল-গ্যাসের খনি দিলে তবে ক্ষমতায় যাওয়া যায় এটাও বাস্তবতা নয়। কেবল ২০১৮ সালের পরে কোয়াড বা কে কন দেশের দেশের বলয়ে যাবে এনিয়ে ইন্দো-প্যাসেফক স্তাতেজি বিষয়ক আলাপ উঠেছে। তাও সেটা আবার কোন অ্যামেরিকান প্রেসিদেন্ট এনিয়ে কী অবস্থান নেয় তার উপর নির্ভরশীল। কাজেই আন্দাজি কথা বলা ত্যাগ করাই ভালো।

    ২। এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাঃ
    কথাটা আলোচনার শিরোনামে আছে। কিন্তু ভুরাজনীতি জিনিষটা কী? কেউ এনিয়ে কথা আগায় নাই। এছাড়া এখন একালে মানে আরো ছট করে বলা যায় ২০১০ সালের পরে আগে নয়, এই শব্দটার ব্যবহার চালু হল কেন? কী বুঝাতে চায়? কোন খবর নাই। বরং একটা সহজ নির্ণায়ক দেই । দেখবেন কেউ যদি ভুরাজনীতি শব্দতা ব্যবহার করে তো বুঝবেন যা সে বলছে  তার এনিয়ে জানার মধ্যে কোথাও অস্পষ্টতা আছে। আর এই অস্পষ্টতা ডাকার মোক্ষম শব্দ হল ভুরাজনীতি। শব্দটা কেবল সেই বিষয় নিয়ে কথা বলে যখন কোন দেশের ভৌগলিক অবস্থানই ঐ দেশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপুর্ণ করে তোলে কোন বিশেষ কালে। এজন্যি ভূ বা জিও [GEO] শব্দটা। শব্দটা ১৯৪০ দশকে স্বল্প সময়ের জন্য চালু হয়েছিল। পরে যুদ্ধ শেষের গ্লোবাল পরিবর্তনে নয়া সিস্টেমে শব্দটা অপ্রয়োহনীয় হয়ে যায়। প্রতীক চট্টোপাধায় বলছেন, ” ভূ-রাজনীতি এখন জটিল অবস্থায় আছে। সেখানে পুজির স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে, নির্দিষ্ট জাতি রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে”। এটা ব্যাপক এক জ্ঞানের কথা বলেছেন মনে হলেও এটা অর্থহীন কিছু কথা।  ভূ-রাজনীতি জিনিষটা কী? কেন তা এখন জটিল এর কোন মা-বাপ নাই। শেষে এলো পুঁজির স্বার্থ। আচ্ছা বলেন তো দুনিয়ায় এখন কোন অর্থনৈতিক ততপরতাটা পুঁজির নয়? কাজেই এসব বকোয়াজি কেন?

    সবশেষ  প্রতীক চট্টোপাধায় দেখা যাচ্ছে অজ্ঞতার সীমা ছাড়িয়ে গেলেন। বলছেন, প্রতীক চট্টোপাধায় বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বটি মেকি আখ্যায়িত করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই শিক্ষক বলেন, “গত পরশু হেনরি কিসিঞ্জার চীন ভিজিট করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের কোনো ঝামেলা নাই। এগুলো হচ্ছে আইওয়াশ”।

    ৩। যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্বঃ
    প্রতীক সাহেবকে সবার আগে বলতে হত যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্ব এটাকে তিনি কী বলে বুঝেছেন? যেটাকে আবার তিনি ঝামেলা নাই-ও বলছেন?  কিভাবে বুঝলেন? এরপরেই কেবল আমরা শুনতাম কেন এটা তিনি মেকি বলছেন? তিনি তো জানেনই না তাদের দ্বন্দ্ব না হলেও ঝগড়া বিরোধটা কী নিয়ে? এছারা আবার হেনরি কিসিঞ্জার চীন ভিজিট করতে গিয়ে কে কী বলেছে তিনি কী জানেন ফলো করেছেন? কমিউনিস্টদের স্মস্যা হচ্ছে সারপ্লাস ভ্যালু নিয়ে কথা তোলা – এটা ছাড়া ছাড়া বাকি সব প্রসঙ্গই ভুয়া মেকি ইত্যাদি। এজন্য তারা জবরদস্তিতে হলেও যেকোন সমস্যা-জটিলতাকে সারপ্লাস ভ্যালুর সমস্যা বলে রিডিউস করে নাস্মিয়ে দেখাতে ভালো বাসে। একদম গরুর রচনা করে ছাড়ে সবকিছুকে! এভাবে নিজেকে অর্থহীন কথাবলার লোক হিশাবে তুলে ধরেন কেন? মফস্বলের চা দোকানে বসে চাঁদে যাওয়াকে মিছা কথা বলে তুমুল তর্কের মত!

     

     

    আপডেটেডঃ  ২৭  জুলাই ২০২৩; রাত
    আপডেটেডঃ     জুলাই ২০২৩;

    >>>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

     

     

     

  • একালেও কিসিঞ্জার আমেরিকা-চীনের জন্য দরকারি সফরে

    একালেও কিসিঞ্জার আমেরিকা-চীনের জন্য দরকারি সফরে
    গৌতম দাস

    ২৩ জুলাই ২০২৩  মধ্যরাত ০০ঃ ০৩
    https://wp.me/p1sCvy-4Jj

    Henry Kissinger with President Xi Jinping

     

    হেনরি কিসিঞ্জার এর কথা বাংলাদেশের মনে থাকার কথা। তাঁর বয়স এখন একেবারেই শত বছর। ফলে ব্যক্তিগত সবকাজেই এইড[aid]  বা সাহায্যকারীর সহায়তায় চলে তার জীবন। কিন্তু তবু  তাঁর এই জীবন খুবই সচল ও সক্রিয় এক জীবন। মানে বেড-রিডেন [bed-ridden] বা বিছানায় বেশিরভাগ সময় কেবল শুয়েই কাটায় বলতে সিনিয়র-বয়স্ক সিটিজেনদের যেমন কাটে তাঁর বেলায় এটা ঠিক তেমন নয়। যেমন কম করে গত বিশবছর যদি ধরি তো তিনি নিজ লিখা লিখেন না টাইপও করে লিখেন না। বরং মুখে বলে ডিকটেশন [dictation] দিয়ে লেখান – এইডদের সহায়তায়।
    হেনরি কিসিঞ্জার এখন রীতিমত বিমানে উড়ে  চীন সফরে এসে গেছেন। তবে যতগুলো পশ্চিমা মিডিয়া রিপোর্ট পড়েছি – CNN, REUTERS, BBC, BLOOMBERG ইত্যাদি এমনকি চীনা জিনহুয়া কোথাও উল্লেখ করা নাই  যে কিসিঞ্জার কারও আমন্ত্রণে চীন গিয়েছেন কিনা! বরং সব জায়গায় লেখা আছে যে কিসিঞ্জার চীন সফরে গেছেন; অর্থাৎ নিজেই গিয়েছেন এবং গত শনিবার তিনি প্রেসিদেন্ট শি এর সাথে মিটিং করেছেন। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্ররা জানাতে ভুলেন নাই যে এই সফর ব্যক্তিগত; মানে তিনি বাইডেনের কোন দুত হিশাবে যান নাই। অথবা কেউ জানিয়েছেন, “কিসিঞ্জার অবশ্যই কোন সরকারি পদ বা প্রশাসনকে প্রতিনিধিত্বকারি কেউ নন”। হোয়াইট হাউজের বাইডেন প্রশাসনের স্টাফদের ভাষায়, তিনি ‘এখন এক প্রাইভেট সিটিজেন এবং সে হিসাবেই তিনি চীন সফরে’ আছেন।
    তবে বেশিরভাগ মিডিয়া রিপোর্ট শুরু হয়েছে প্রেসিডেন্ট শি অথবা হেনরি কিসিঞ্জার এদুইয়ের কেউ না কেউ অথবা উভয়েই কী উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন তা দিয়ে। যেমন  রয়টার্স লিখেছে, প্রেসিডেন্ট শি কিসিঞ্জারকে শুধু পুরানা বন্ধু-ই [old friends] বলেন নাই সাথে বলেছেন, তাঁর মত পুরাতন বন্ধুকে কখনও ভোলা যাবে না। […Chinese President Xi Jinping told Henry Kissinger that “old friends” like him will never be forgotten,…।]  একইভাবে বিবিসি লিখেছে, আমাদের পুরানা বন্ধুকে আমরা কখনো ভুলতে পারি না এবং চীন-আমেরিকার (প্রথম কাছে আসা) বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে কিসিঞ্জারের ঐতিহাসিক অবদান আমরা ভুলব না –[ “We will never forget our old friends, and will not forget your historical contributions to develop US-China relations and friendship]। এছাড়া বিবিসি অবশ্য কিসিঞ্জারের এই সফরকে সাপ্রাইজ সফর বলেছে আর শিরোনামে বলেছে, আমেরিকা চাচ্ছে,  চীনের সাথে সম্পর্কের বরফ ভাঙতেই কিসিঞ্জার আসুক তাই তিনি  এসেছেন […US seeks to defrost China ties]।

                                KISSINGER & MAO 1971

    কেন কিসিঞ্জার বিখ্যাত – ব্যাকগ্রাউন্ড অবদানঃ
    কিসিঞ্জার নিয়ে কোন কিছু পড়ার সময় সংক্ষেপে আমাদের দুটা জিনিষ অবশ্যই মনে রাখতে হবে যা আমাদেরকে তাঁকে বুঝতে সহায়তা করবে। প্রথমত.  আমজনতা হিশাবে আমরা ১৯৭১ সালের কিসিঞ্জারকে চিনব যিনি সেসময় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধী মানে আমাদের স্বাধীনতার পক্ষে ভুমিকা রাখেন নাই। যদিও হবু বাংলাদেশকে রিলিফ অর্থে সাহায্য-সহায়তা চালু রেখেছিলেন। এসব কথা সত্য হলেও খেয়াল রাখতে হবে এসবই এখনকার প্রাসঙ্গিক আলাপের বিষয়ের দিক থেকে এক লোকাল বা স্থানীয় ঘটনা। আর এই লোকাল দিকটার বাইরে আরেক গ্লোবাল দিক আছে – যেটা আমাদের এখনকার আলোচ্য মূল বিষয়। তাই গ্লোবাল ভুমিকার দিক নিয়ে আমরা এখন কথা তুলব।  যখন ঐ একই ১৯৭১ সালের তো বটেই সাথে সেই সত্তর দশক জুড়েই কিসিঞ্জারের ভুমিকা ছিল গ্লোবাল রাজনীতিতে তাতপর্যপুর্ণ।
    তিনি প্রেসিডেন্ট নিক্সন আর পরের প্রেসিডেন্ট ফোর্ড এই দুজনের আমলেই (১৯৬৯-১৯৭৭) এই পুরা সময়কাল জুড়ে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (মন্ত্রী) ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (মন্ত্রী) [ সেক্রেটারি স্টেট ডিপার্টমেন্ট] ছিলেন এবং এই আট বছর ধরে তিনি সবকিছু কাঁপিয়ে বেরিয়েছেন তাঁর সারা জীবনের গুরুত্বপুর্ণ সময়কাল হিশাবে। মূলত এসময়কালে তিনি দক্ষ নিগোশিয়েটর বা মধ্যস্ততাকারী পরিচয়ে মুখ্য অবদান রেখেছেন। যেমন দাবি করা হয় তিনি আমেরিকার সেনা প্রত্যাহার করিয়ে ভিয়েতনাম যুদ্ধকে সমাপ্তির দিকে নিতে বিবদমান সবপক্ষের জন্য কাজ করেছেন। যেটা অন্যভাবে বললে সেকালের অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্টকেও মানাতে পেরেছিলেন যুদ্ধ আর আগালে সেটা আমেরিকার পক্ষে যাবে না। তবে মূলকথা এসবই আসলে অ্যামেরিকান দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে কথা বলা এক কিসিঞ্জারের অবস্থান। ভিয়েতনাম ইস্যুটা ছাড়াও আমেরিকার জন্য আরেক বড় অর্জন হল – সেটা ছিল কিসিঞ্জারের আরেক ধাক্কা তৈরি করা ঘটনা যা সাধারণ্যে চীন-আমেরিকার পারস্পরকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দান ও ঘনিষ্ট সম্পর্ক ঘটানো।
    যার ভিতরের মূল ঘটনাটা হল, ১। চীনের মাও তার বিপ্লবের দশবছরের মধ্যে বা পরে টের পান যেভাবে ভাবা হয়েছিল কথিত সমবায়ে কৃষি উতপাদন সেভাবে বাড়ছে না। ২। কৃষিসহ সবখানেই মালিকানা যেমনই হোক বিনিয়োগ পুঁজির স্বল্পতা এক বড় ফ্যাক্টর জ্ঞান করেন। তাই তিনি নয়াপথ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এক ক্যাপিটালিজম করাকে সঠিক জ্ঞান করে সিদ্ধান্ত নেন।  যদিও এই নয়াপথে যেতে নিজে পার্টি সংগঠন কে ঢেলে সাজাতে গিয়ে মাও-কে কমপক্ষ ২০ বছর সময় ব্যায় করতে হয়েছিল। ৩। এর শেষ দশ বছর মাও আমেরিকার সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে ব্যয় করেছিলেন। হবু বাংলাদেশের স্বার্থকে তাই নিজ চীনের এই নয়াস্বার্থে বলি দিয়ে দিছিলেন। খুবই সংক্ষেপে শিরোনামে বললে, এই প্রথম ১৯৭১ সালে চীন জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করেছিল এবং সেটা ভেটোক্ষমতা-সহ সদস্যপদ। যা জাতিসংঘ জন্মের সময়ে চীনকে দেয়া হলেও ১৯৭১ সালের আগে পর্যন্ত তা (১৯৪৯ সালের চীনাবিপ্লবের পর থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত) ব্যবহার করত শুধু তাইওয়ান। সেটাই তখন তাইওয়ানকে বাদ দিয়ে -সমগ্র চীন বলতে – সেটা মাওয়ের চীনই জাতিসংঘ স্বীকৃতি করে আর বিচ্ছইন্ন হয়ে যায় অফিসিয়ালি ও জাতিসংঘের চোখেও ঐ মাওয়ের মূল চীনের অংশ।  এই বিষয়টাকে সংক্ষেপে মাওয়ের চীনের একচীন নীতি বলে আখ্যায়িত করা শুরু হয়েছিল; আর আমেরিকা তখন এটাই এটাই তার নীতি-অবস্থান বলে ঘোষণা করেছিল।  েসব কিছু শেষ করতে মাওয়ের ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যায়।  পরে ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পুর্ব-ঘোষণা দিয়ে দিয়ে উভয় দেশ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দান করে অর্থনৈতিক-সহ বাকি সব পারস্পরিক ততপরতা শুরু করেছিল।

    কিন্তু এতে আমেরিকার কী লাভ হয়েছিল?
    গত ১৯৭৮ সাল থেকে পরের অন্তত ৩২ বছর মানে ২০১০ সাল পর্যন্ত ডাবল ডিজিট জিডিপির চীনা অর্থনীতি গড়তে  যত বিনিয়োগ পুঁজি লেগেছিল এর মাখন অংশ সবই আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট [wall street] এই গ্লোবাল পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ-পুঁজি। এসবের মধ্যে কাজের সবচেয়ে জটিল অংশটা ছিল চীন-আমেরিকার প্রতিটা পদে পদে পারস্পরিক স্বার্থ-ঝগড়ার ইস্যুগুলোকে আপোষ মীমাংসায় পৌছানোর নিগোশিয়েশন – এরই প্রধান নায়ক উদ্যোক্তা ছিলেন হেনরি কিসিঙ্গার। মানে একদিকে অ্যামেরিকান রাজনীতির পক্ষগুলো ও সরকার-প্রশাসনকেই শুধু আস্থায় নেয়াই নয় আবার সাথে অন্যদিকে ওয়াল স্ট্রিট ব্যবসায়ীদেরকেও তাদের স্বার্থের দিকটা-সহ আস্থায় নেয়া – এসবই ঘটাতে পেরেই এর পুরা নিগোশিয়েশনটা সম্পন্ন করতে হয়েছিল কিসিঙ্গার-কে।  ক্যাপিটালিজমের আদি-সংকট হল দুদিন পরপর পুঁজি বিনিয়োগের বাজার সঙ্কুচিত হয়ে যায় আর তা থেকে তৈরি হয় ব্যাপক সংকট হাহাকার।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সফলভাবে নিজের পক্ষে পরিসমাপ্তি দেয়া যা ছিল প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট- ট্রুম্যানের এক ব্যাপক অর্জন। কারণ, তা এই প্রথম (অন্যান্যদিকে আর যাই হোক)  ১৯৪৫ সালের পর থেকে অন্তত আমেরিকাকান ওয়াল স্ট্রিট এর গ্লোবাল পুঁজিবাজারের জন্য এক ব্যাপক গ্লোবাল বিনিয়োগ বাজার যোগাড় করে এনে দিয়েছিল। সেবার চীন স্বীকৃতিতে ১৯৭৮ সালে আরেকবার প্রায় একইভাবে আরেকবার ওয়াল স্ট্রিটকে  ব্যাপক গ্লোবাল বিনিয়োগ বাজার যোগাড় করে দিয়েছিল – মানে আবার নয়া বাজার খুলেছিল কিসিঞ্জারের হাত দিয়ে অ্যামেরিকান প্রশাসন।

    আমেরিকা কী জানত না যে এতে এই চীন এককালে [৩০-৫০ বছরের মধ্যে] আমেরিকারই প্রতিদ্বন্দ্বি হয়ে উঠবে? জবাবটা ধরে নেয়া যাক তারা জানত! কিন্তু তাতে কী? কারণ গ্লোবাল পুঁজি বিনিয়োগের বাজার তার নিয়মিত বাজার ফুরিয়ে আসার সংকট বাসঙ্কুচিত হওয়া এভাবেই – ‘নগদ যা পাও হাত পেতে নাও’ আর ‘বাকিটা বা পরেরটা আবার পরে দেখা যাবে’ – এভাবেই পথ মারিয়ে চলে থাকে। তাই অনুমান করা হচ্ছে ২০৩০ সালের আশেপাশে চীনা অর্থনীতি আমেরিকাকেই ছাড়িয়ে যাবে  – যা হলেও কিছুই করার নাই!!! এটা তখনও কিছুই করার ছিল না, এখনও নাই।  এরই এক ভাল উদাহরণ হল, ২০০৯ সালে চীনকে ব্রিকস [BRICS] উদ্যোগে নতুন করে চীনা নেতৃত্বে রাইজিং অর্থনীতিগুলোকে নিয়ে নয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা শুরু করার পরামর্শটা দিয়েছিল এই ওয়াল স্ট্রিট থেকেই।

    আমরা এখানে সীমাবদ্ধ থাকব কিসিঙ্গার প্রসঙ্গের মধ্যে। তাহলে কিসিঙ্গারের ঐ সময়টা গুরুত্বপুর্ণ ছিল কারণ, নিগোশিয়েশন দক্ষতা – এটা অ্যামেরিকান অর্থনীতিকে আরেক প্রাণ দিয়েছিল। আবার সেটাই পুরানা চীনকে আজকের চীন বানানোর সুযোগ এনে দিয়েছিল। এই অর্জন এটাই এক খ্যাতিমান কিসিঞ্জার এর জন্ম দিয়েছিল। এছারা দ্বিতীয়ত, কিসিঞ্জার খ্যাত হয়েছেন আরেক কারণে। তা হল, তাঁর এই  নিগোশিয়েশন দক্ষতা  ও কর্ম আমেরিকায় তো বটেই সারা একাদেমিক জগতে সাড়া ফেলে ও তত্বায়িত করা হয়ে গেছে, নিবিড় পাঠের জন্য। বিশেষ করে অ্যামেরিকান প্রফেশনাল ডিপ্লোম্যাট, আমলা, স্ট্রাটেজিস্ট, নীতি-নির্ধারক, কনসালটেন্ট ইত্যাদি সকল পেশাদারদের কাছে তিনি কিসিঞ্জার নিজেই হয়ে উঠে আছেন এক পাঠযোগ্য সাবজেক্ট [reading material]  হিশাবে।  এটাই কিসিঞ্জার খ্যাতিমান হয়ে উঠার দ্বিতীয় কারণ।
    পাঠকদের প্রতি অনুরোধ – খুঁটিয়ে কিসিঞ্জার পাঠ করতে মনোযোগী হতে।  এটা একেবারেই ভুল পথ যে তাই ভুলে যান যে আপনি আমেরিকা নাকি চীনের সমর্থক।  আপনি কার সমর্থক তা জাহির করে এরপর কিছু বুঝতে-পড়তে শিখা এটা সবচেয়ে কমকথায় বললেও এক পন্ডশ্রম – গাধামি! বরং আপনার লক্ষ্য হতে হবে ঘটনা-ফেনোমেনা চীন নাকি আমেরিকার তাতে কিছুই এসে যায় না, আপনাকে তা যতটা সম্ভব স্পষ্ট বুঝতে ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে দেখানোর ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এই সক্ষমতাই আপনার নীট অর্জন যা আপনাকে সম্মান ও গুরুত্ব এনে দিবে। কেবল বোকারাই সমর্থক হবার জন্য লাফালাফি করে সময় নষ্ট করে।

    একালের কিসিঞ্জারও গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠছেন কেনঃ 
    এই সময়কালে বিশেষত, বাইডেনের বর্তমান আমলে চীন-আমেরিকান সম্পর্ক সম্ভবত শীতলতম বলা যায়!  এদিকে ব্যক্তিটা কিসিঞ্জার বলেই হয়ত অনেক বেশি (প্রায় দশটা মিডিয়ায়) পশ্চিমা ও চীনা ভাষ্য পড়তে হয়েছিল। আর তাতেই লক্ষ্যণীয় যে  চীন-আমেরিকান সম্পর্ক সম্ভবত শীতলতম হওয়া সত্বেও এসময়ে সব মিডিয়া গুরুত্ব দিয়েছে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সহ সকলেই কিভাবে কিসিঞ্জারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন।  এখন চীনের দিক থেকে দেখলে কিসিঞ্জারকে নিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর উচ্ছসিত বা কিছু আবেগী মন্তব্য প্রকাশ – এটা বাস্তবতই তাই কারণ সেসময়ে কিসিঞ্জারের “ঐতিহাসিক অবদান ভুলা যায় না” কথাটা চীনের দিক থেকে আজও বাড়িয়ে বলা নয়। কিন্তু তাই বলে সবটাই কী চীন বা শি জিনপিংয়ের আবেগ আর উচ্ছাস????
    সম্ভবত একেবারেই না। বরং চীন আর আমেরিকা এই উভয় পক্ষই – ইনফরমালি ফরমাল – এই ভঙ্গিতে সব জানে এবং সবটাই পরোক্ষে। তবে সেটা যাই হোক বিবিসি ইতোমধ্যে চীন-আমেরিকার সম্পর্কের ঢলে পরা সম্পর্ককে উন্নতি ঘটাতে  কিসিঞ্জারের ভুমিকা রাখার সম্ভাবনা দেখে এক ম অন্তব্য করেছে। বিবিসি বলেছে কিসিঞ্জার যত বড় ব্যক্তিত্ব তাতে তিনি পিছনের ঘরের মাধ্যমে আমেরিকা-চীনের এর আলাপ-আলোচনা রফায় পৌছানোর পক্ষে ভুমিকা রাখতে পারেন  […But given his outsized stature in China, he could act as a backchannel for US-China negotiations.]।
    কিন্তু কী সেটা, বা এর সাবজেক্ট বা লক্ষ্য কী? লক্ষ্য হল, বাইডেন তিন বছরের প্রান্তে এসে তাঁর আর সময় আর অনেক কমই বাকি। এই অর্থে যে আর ১৬ মাসের মধ্যে (নভেম্বর ২০২৪) তাঁকেও পরবর্তি  নির্বাচন ফেস করতে হবে।   তাই নির্বাচনের আগের করণীয়ের জন্য যে এক বছর সময় লাগে বা পাওয়া যায় মানে [নভেম্বর ২০২৩ – নভেম্বর ২০২৪] – এই সময়কাল এর জন্য কিছু প্রস্তুতিতে তিনি ঘাটতিতে আছেন।

    ২০২৪ নির্বাচনে বাইডেনের অন্তত দুইটা ইস্যুতে চীনকে তাঁর দরকারঃ
    প্রথম শিরোনাম হল, বাইডেন ইউক্রেন ইস্যুতে সময় আর অর্থ দুটাই যথেষ্ট বেশি ব্যবহার করে ফেলেছেন; কথাটা নির্বাচনী প্রেক্ষিতে বুঝতে হবে যা বাইডেনের জন্য যথেষ্ট নেতিবাচক। এমনিতেই প্রতি দশবছরের আগেই অ্যামেরিকান রাষ্ট্র যে অন্তত েকবার করে  থেকে ঋণ করে খোদ রাষ্ট্রের ঋণগ্রহণের সীমা বাড়িয়ে তবেই  [৩১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার পার হয়ে গেছে] তার ব্যয়নির্বাহ করে চলছে – এই আমেরিকা রাষ্ট্রকে ঋণ করার অনুমতি বা সিনেট-সংসদের দেয়া সিলিং তাকে বার বার বাড়িয়ে নিতে হচ্ছে।  তাই আমেরিকা নিজে ধার করে সেই অর্থে ইউক্রেনের মানুষ ও অথনীতি বাঁচিয়ে রাখা আবার এই যুদ্ধের ব্যয় মিটানো – এটা একটা তিতা সীমায় পৌছে গেছে। আগামি সেপ্টেম্বরের আগে ইউক্রেনকে আবার দেওয়ার মত কোন ঋণের বিলে সেনেটে আসছে না। এরপরে কী হবে সেটাও এখন অনিশ্চিত।  অথচ এই যুদ্ধ চালানো অবস্থায় অ্যামেরিকান নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এটা বাইডেনের প্রার্থীতার বিরুদ্ধে যাবে বলেই অনুমান। তাই নির্বাচনের আগেই যুদ্ধের শেষ হওয়া দরকার!
    কিন্তু ইতোমধ্যেই তাইওয়ান ইস্যুতে স্পিকার, সংসদ নেতা বা সদস্য পাঠানোকে কেন্দ্র করে চীনের সাথে সম্পর্ককে তিতা করে ফেলা হয়ে গেছে। বাইডেনের একালে স্যাংশন শুধু রাশিয়া বা বাংলাদেশ না, খোদ চীনের উপরেও কোন কম হয় নাই! আগের ট্রাম্পের আমল থেকেই মধ্যবিত্ত ভোক্তা যেসব চীনা হাউজহোল্ড আইটেম কিনতে আস্থা পায় এর উপর ৯০% পর্যন্ত বাড়তি শুল্ক  আরোপ করে রেখে গেছিলেন; তা বাইডেন হাত দেন নাই। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়এ পরোক্ষে হলেও চীনের সাথে টেনশন কম নাই।  এককথায় গত তিনবছরে চীনের সাথে নুন্যতম ওয়ার্কিং রিলেশন থাকছে বা থাকবে কিনা এটা চিন্তা না করে বেপরোয়া হয়ে বাইডেন সব পদক্ষেপ নিয়ে গেছেন। এসবই এখন থামাতে বা কমাতে চাইছেন!!  আর সেটা অন্তত নিজ নির্বাচনী কাজে লাগবে এমন কৌশল ও কাজের খাতিরে।
    এবারের ঋণ সিলিংয়ের ব্বিল পাশ হয়েছিল গত ৩ জুন আর এরপর থেকেই বাইডেন চীনের সাথে কিভাবে দরজা খুলে নেয়া যায় তা ভাবতে থাকেন।  আর প্রায় একই সময়ে [২-৪ জুন ২০২৩] এবারের সিঙ্গাপুরের সাংগ্রিলা নিরাপত্তা সম্মেলন   অনুষ্ঠিত হয়। এটা হল, চীন-আমেরিকা সহ প্রায় সকল মুখ্য প্রভাবের রাষ্টড়্গুলোর সিকিউরিটি ইস্যুতে পরস্পরের অবস্থানকে বুঝাবুঝি বাড়ানোর এক ব্যতিক্রম সম্মেলন।  বাইডেন চীনের সাথে এতদিনের বেপরোয়া দুরত্ব তৈরির প্রয়াস এবার ক্ষান্ত দিতে চাচ্ছিলেন এই সাংগ্রিলা সম্মেলন থেকেই।  অ্যামেরিকান প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন চেয়েছিলেন উপস্থিত চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে সাইডলাইনে বৈঠকে বসেন। কিন্তু চীনামন্ত্রী এই আগ্রহে ঠান্ডা পানি ঢেলে দেন। পিছনের কারণ যা জানা গেছিল তা হল বর্তমান চীনামন্ত্রীর বিরুদ্ধে অ্যামেরিকান স্যাংশন আরোপ করা আছে – চীন কিছু রাশিয়ান অস্ত্র আমদানি করেছিল বলে।
    তবে আমেরিকা ঐ ব্যর্থতা সত্বেও  প্রচেষ্টা অব্যহত রেখেছিল। তাই কিছুদিনের মধ্যেই ব্লিকেনের চীন সফর ঘটেছিল। কিন্তু এত শীতল সফর কেউ আগে দেখেনি যেন; কোন মিডিয়াতেই এই সফর থেকে নুন্যতম আশাবাদ  রাখার কিছু নাই এটাই বর্ণনা করেছিল; হয়েছিলই তাই। কিন্তু ব্লিঙ্কেনের সফরের পরে আসেন আমেরিকার অর্থমন্ত্রী জেনেট ইয়েলেন।  এবার এতে দেখা যায় চীনারা কিছু মুখ খুলেছে – অন্তত কিছু ইস্যুতে সবটা না হলেও অনেক অগ্রগতির দেখা মিলেছিল। যদিও সফর প্রথম দিনেই জেনেট ঝাড়ি দিয়ে কথা বলে শুরু করেছিলেন। এজন্য যে চীন কেন অ্যামেরিকান কিছু

    ইয়েলেন এর সফর নিয়ে আলাদা বিস্তারে লিখতে হবে। তবে এখনকার প্রাসঙ্গিকতা হল, কিসিঞ্জার ইয়েলেনের এই এপ্রোচ এর সমালোচনা করেছেন। তবে ইয়েলেনের কথায় পরিস্কার যে বাইডেনের আগামি নির্বাচন তিনি লড়বেন অন্তত দুটা এজেন্ডাকে সামনে নিয়ে – জলবায়ু-পরিবেশ আর গ্লোবাল অর্থনৈতিক পুনর্গঠন । এই ধারণাওটা পাওয়ায় আযায় ইয়েলেনের সফরের বক্তব্য থেকে। তিনি গত ৯ জুন থেকে শুধু চীন সফরে গেছিলেন তাই না। তিনি এরপরে ভারতের গুজরাতে  -জি২০- অগ্রসর অর্থনৈতিক দেশের জোট    এর সভায় যোগ দিতে গেছিলেন। সেখানেই তিনি জানান বাইডেন সরকারের এদুই পরিকল্পনার কথা [দেখেন ……Yellen ‘eager’ to work with China on debt, other global challenges।]।
    আর জলবায়ু প্রসঙ্গে আলাপ করার জন্য এরপরে বাইডেন প্রশাসনের জলবায়ু বিষয়ে বিশেষ দুত জন কেরি চীন গেছিলেন। খুব সম্ভবত রিপাব্লিকান প্রার্থী হিশাবে ট্রাম্প বা অন্য যেই আসেন তাদের জলবায়ু প্রোগাম নিয়ে নির্বাচনী ইস্যু নাই থাকতে পারে, ট্রাম্পের মতন। আর এই সুযোগটাই সম্ভবত নিতে চান বাইডেন।
    আর ঋণ পরিশোধিত না হওয়া গরীব দেশের ঋণকে রি-শিডিউল  বা ঢেলে সাজাতে গেলে এরজন্য অর্থের চাপ নিবার ক্ষমতা চীনের বেশি বলে আমেরিকা এই ইস্যুতে চীনের সাথে গাটছাড়া বাধতে চায়।  যার মানে চীনা ঋণের ফাঁদ এই বক্তব্য এখন হজম করে লুকিয়ে ইয়েলেন এখন চীনা এলায়েন্স গড়ে তুলতে চাইছে।

    তাই এসব কাজে হেনরি কিসিঞ্জার ভুমিকা রাখেন যেন এটা বাইডেনের পরোক্ষে চাওয়া।
    এটা ঠিক ততটা পরোক্ষে থাকবে না। কারণ কিসিঞ্জার আগেই ঘোষণা দিয়েছেন যে আমেরিকা ফিরে গিয়ে তিনি নিজেই বাইডেন প্রশাসনকে এনিয়ে ব্রিফ করবেন। আর ওদিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে বাইডেন মটিঙ্গোয়ে বসে সম্পর্ক আবার ঘনিষ্ট করতে চান স্টা বাইডেন জানিয়ে দিয়েছেন। খুব সম্ভবত বাইডেন ইউক্রেন যুদ্ধের শেষ চান আর যেকাজে চীন মধ্যস্থকারির ভুমিকা নেক – এটাই হবে সম্ভবত বাইডেনের চাওয়া।মটা দাগে এসবই হোল আগামি দিনের চীন-আমেরিকার সম্পর্কের রূট বা অভিমুখ। এখন প্রশ্ন হল যত সহজে এটাকে গত প্রায় তিনবছর ধরে ডিকাপলিং [decoupling] বা বিচ্ছিন্নতার লাইনে বাইডেন ঠেলেছেন তাতে এখন চাইলেই কী স্বাভাবিক সম্পর্কে ফেরা যাবে – এটাই বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। আস্থা ভাঙ্গা যত সহজ তত সহজে তা আবার গড়ে নেয়া যায় না!!!

     

    আপডেটেডঃ  ২৩  জুলাই ২০২৩; রাত ০২ঃ ০৮
    আপডেটেডঃ     জুলাই ২০২৩;

    >>>>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • ব্রিকস বুঝাবুঝিতে পিছিয়ে – আমার কেন আদার বেপারী 

    ব্রিকস বুঝাবুঝিতে পিছিয়ে – আমার কেন আদার বেপারী
    গৌতম দাস

    ২৫ জুন ২০২৩  সকাল ০৮ঃ ০৪

    https://wp.me/p1sCvy-4EQ

     

              BRICS

    আবার ব্রিকস [BRICS]! বাংলাদেশে এনিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে! তাতে এর সবটা না হোক মূল বিষয়টা কী তা বুঝি -না-বুঝি, অনেকেই এতে মেতে উঠেছে এই মনে করে যেন এটা বাইডেনের আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনের এক কড়া সিদ্ধান্ত-পদক্ষেপ।  আর হাসিনা বাংলাদেশকে ব্রিকসে নিয়ে উঠালে মানে সদস্য  করে ফেললে তা বাইডেনের আমেরিকাকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। অথবা বাইডেনকে যেন এক কড়া জবাব দেয়া হবে। এই ভুল অনুমানের উপর মিডিয়া গরম!  কারণ ব্রিকস মানে যেন একটা অর্থনৈতিক পক্ষ-জোট!  এই এজাম্পশন বা ধরে নেওয়া অনুমান একেবারেই ভিত্তিহীন! এক ভুল অনুমান!  দাঁড়ানো এক ভুল বুঝাবুঝি! 

    কথা আরো আছে তাহলে ব্রিকস যদি নেহায়তই এক আমেরিকাবিরোধী অর্থনৈতিক জোট হয় আর এর জন্ম মাত্র ২০০৯ সালে – সেটা কী ২০০৯ এর জায়গায় গত শতকে ধরা যাক ১৯৯০ এর দশকে হত তবে কী এটা আমেরিকাকে আরো আগে বধ করে ক্ষতিগ্রস্থ করে দিতে পারত না? ব্যাপারটা কী তাই?  তাহলে তো এই প্রশ্নেরও জবাব পেতে হবে যে ব্রিকস উদ্যোক্তারা সেটা করে নাই কেন?  সারকথায় ব্রিকস কখন কার্যকর হবে – খুলবে  সেই সময় নির্ধারণ – সেটা কী উদ্যোক্তাদের ইচ্ছাধীন? নাকি অন্য কোন শর্ত (অবজেকটিভ) বা কিছু পুর্ব-প্রস্তুতি পূরণ  আগে হতে হবেই যেটা চীনের ইচ্ছাধীন নয়?  এই জবাবটা এখনই দিয়ে নেই। এটা চীন বা আমেরিকাবিরোধী কারও ইচ্ছাধীন নয়। বরং বেশকিছু বিষয়কে বাস্তবে যোগ্য হয়ে উঠতেই হবে, পেকে উঠতে বা যোগ্য- ম্যাচিউরিটি -তে পৌছাতে হবেই! যা এখনও হয় নাই। তবে হওয়ার দিকে হাঁটছে! এছাড়া আগেই বলেছি এটা কোন অর্থনৈতিক জোট একেবারেই নয়। কোন আশিয়ান [ASEAN] অথবা RCEP [Regional Comprehensive Economic Partnership ] ধরণের বিশেষ অর্থনৈতিক জোট একেবারেই নয়! তাই এটা ঠিক কে অ্যামেরিকান আর কে চীনের পক্ষ নিয়ে কথা বলব আর এই ভিত্তিতে কাকে সঠিক বলব ব্যাপারটা মোটেও তা নয়!  

    অতএব, এমনই অনেকগুলো ভুল বুঝাবুঝির মধ্যে প্রথম এক সমস্যা হল ব্রিকস নিয়ে রিপোর্টিংয়ের। যেমন বাংলাদেশে বেশির ভাগ মিডিয়ায় শিরোনাম – বাংলাদেশ ব্রিকসে যোগ দিতে যাচ্ছে – ধরণের। একথার মানে কী? বাংলাদেশ চাইলেই কী ব্রিকসে যোগ দিতে পারবে? নাকি আগে দাওয়াত আসতে হবে? মানে তারও আগে ব্রিকস নিজেরা কোন নয়া সদস্য নিতে চায় এমন এক তাদের আভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত হতে হবে। মানে ব্রিকস এর পক্ষে এটা এমন পরিপক্ক হয়েছে বসে সিদ্ধান্তে আসতে হবে! কিন্তু এসব প্রশ্ন এখনও এখানে সবটা পরিস্কার ঠিক তা নয়।

    তবে তুলনায় আপাতত এখানে ডেইলি স্টারের রিপোর্ট অনেক স্বচ্ছ ও সাবধানী। মানে যা জানে না, তা নিয়ে আগায় নাই; অনুমান করে ইচ্ছামত লিখে নাই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনকে কোট করে তারা লিখেছে, “We will surely join once they invite us. We have yet to receive any formal letter…. । বাংলা করলে হয়, “আমাদের একবার দাওয়াত করলেই আমরা নিশ্চয় সেখানে যোগ দিব। (এর আগে) আমাদেরকে এখনও তাদের আনুষ্ঠানিক (দাওয়াতের) চিঠি পেতে হবে”।  মানে আশা করা হচ্ছে যে আগামি আগষ্টে তাদের এবারের ব্রিকস সম্মেলনের আগে তারা নয়া সদস্য হতে আগ্রহী বা যাদেরকে তারা সদস্য হিশাবে নিতে আগ্রহী তারা দাওয়াত পত্র পেতে পারে। এরপরেই যোগ দেয়া না দেয়া নিয়ে নড়াচড়া শুরু হবে।

    ব্রিকস নিয়ে বিভ্রান্তিই বিভ্রান্তিঃ
    ব্রিকস নিয়ে যেকোন কিছুতেই বিভ্রান্তির শেষ নাই। এর এক অন্যতম কারণ, ব্রিকস যাদের লেখার বিষয় হয়েই যায় যেমন, মিডিয়া রিপোর্টার বা যারা কলাম লিখেন কমবেশি এদের সকলের মধ্যেই বিভ্রান্তি ঢুকে আছে, তা বর্তমান। যেমন ধরণ হিশাবে ব্রিকস কেমন সংগঠন – এই প্রশ্ন কে কিভাবে নাড়াচাড়া করছে কি লিখছে তাতেই বুঝা যায় যে তারা প্রায় সকলেই বিভ্রান্ত; মানে নিশ্চিত জানা নাই। প্রথমত, মিডিয়ায় অনেকেই “ব্রিকস-কে অর্থনৈতিক জোট” ভেবেছে।  যেমন প্রথম আলোর এক ‘বিশেষ প্রতিনিধি’ লিখছে,  “ব্রিকস হচ্ছে পাঁচ দেশের একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট”।  অর্থাৎ এই বিশেষ প্রতিনিধি ব্রিকস-কে শুধু অর্থনৈতিক জোট-ই না একে এক আঞ্চলিক জোটও বানিয়েছে। কিন্তু ব্রিকস আর যাই হোক কোন আঞ্চলিক বা ভৌগলিক জোট একেবারেই নয়। কোথায় দক্ষিণ আফ্রিকা আর কোথায় রাশিয়া আর কোথায় ভারত বা চীন – এসব একটা অঞ্চল বা একটা মহাদেশেই সব সদস্য তা তো নয়; কাজেই একটু কল্পনা করে দেখলেই তো এমন ভুল করার কথা না!
    আবার দ্যা বিজনেস স্টান্ডার্ড এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান- পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক ড. এম এ রাজ্জাক এর বরাতে জানাচ্ছে,  তিনি বলছেন – ‘আমাদের স্মরণে রাখতে হবে এটা কোনো বাণিজ্য জোট নয়, তাই যোগ দিলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে না।’  আবার ঐ একই রিপোর্ট,  এবার আরেক বরাতে জানাচ্ছে, – “যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির ব্রিকসকে একটি ‘শিথিল ধরনের অর্থনৈতিক জোট’ বলে অভিহিত করেন, যেখানে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা রয়েছে”।  এটাও এক শতভাগই ভুল অনুমান।
    জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বিডিনিউজও লিখেছেন, –  ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের অর্থনৈতিক জোট ব্রিক এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলন হয় ২০০৯ সালে। এটা তো এক ভিত্তিহীন ভুল অনুমান যে ব্রিকস এক অর্থনৈতিক জোট!
    আবার এক কলাম লেখক ব্রিকসকে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের জোট মনে করে – ধরে নিয়েই লিখেছে “বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্যঘাটতি, যেখানে আমদানি রপ্তানির চেয়ে অনেক বেশি, সেখানে ব্রিকসের সুবিধা আদায়ে একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে”;  তিনি আরও একই লেখায় অন্যখানে লিখেছেন, “…… ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য বিষয়ে উদারতার অভাব আছে“।
    অর্থাৎ সবার ভিতরেই দেখা যাচ্ছে একটা বিভ্রান্তি কাজ করছে যে ব্রিকস [BRICS] কী ধরণের জোট – এই প্রসঙ্গে। অনেকের লেখার রেফারেন্স আনলাম এবং অবশ্যই এসব কাউকে খাটো করার জন্য না। বরং একধরণের সার্ভের মত করে কয়েকজনের লেখা এনে দেখলাম যে সমাজে বিষয়টা নিয়ে আলোচনায় ভুল কোথায় হচ্ছে। সমস্যাটা কোথায়! আর এখন এই বিভ্রান্তি কাটাতে আমার বক্তব্য কী সেটাই নিচে বলব।

    ব্রিকস কোন অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট একেবারেই নয়ঃ
    হ্যা একথা সত্য যে ব্রিকস কোন অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট একেবারেই নয়। এই বুঝাবুঝি ভিত্তিহীন ও ভুল।  কথাটা যদি এভাবে বলি যে আইএমএফ [IMF] বা বিশ্বব্যাংক [ WB or IBRD] বা এডিবি [ADB] বা আইডিবি [Islami DB] এআইআইবি [AIIB] বা এনডিবি [NDB] ইত্যাদি – এরা হল কোন অর্থনৈতিক জোট অথবা কোন বাণিজ্য জোট তাহলে বুঝাবুঝিতে যে কঠিন সমস্যা সৃষ্ঠি হবে – এটা সেধরণের ভুল। দুনিয়ার প্রায় ১৯২+ রাষ্ট্র জাতিসংঘের সদস্য। আর এদের মধ্যে প্রায় সকল রাষ্ট্র-ই  আবার IMF ও WB এদুই প্রতিষ্ঠানের সদস্য। কিন্তু তবু কোন যুক্তি বা বাস্তবতাতে IMF ও WB কোন  অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট একেবারেই নয়।

    বরং সোজাসাপ্টা বললে,   দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের পরিস্থিতিতে ১৯৪৪ সালে Bretton Woods সংগঠন বলে এক গ্লোবাল কনফারেন্সে IMF-WB এদুই গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া হয়েছিল। আবার এদেরকে ঠিক কোন জোট বা সমিতি বলা হয় না। বলা হয় মাল্টি ল্যাটারাল [multi-lateral] বা বহু-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।  আর এসব বহু-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মূল উদ্দেশ্য হল, একটা আন্তরাষ্ট্রীয় ও গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সিস্টেম গড়ে তোলা। অনেক সময় যেটাকে Global Econimic order  – এক শৃঙ্খলাবদ্ধ নিয়মের ব্যবস্থা বলা হয়। আর তা গড়তে Bretton Woods সেই সভায় তাতে স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন এর মত দেশের প্রতিনিধি সহ অন্য আমেরিকাসহ লিডার দেশ এবং আমাদের মত ছোট দেশের প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত ছিল। এটা নিউ হ্যাম্পশায়ারের  Bretton Woods এলাকায় Bretton Woods নামে হোটেলে জন্ম নেয়া এক ঘটনা।  উদ্দেশ্য ছিল  – জাতিসংঘকে যদি বলি এক গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেম কায়েম ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান ঠিক সেই রকম IMF-WB হল এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম কায়েম ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান কায়েম করা যাতে একটা গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বা সিস্টেম চালু করা যায়।

    তাহলে ব্রিকস কীঃ
    ব্রিকস হল সেকালের জায়গায় একালে আরেকটা উদ্যোগের নাম যাদের লক্ষ্য একাল এখন গ্লোবাল নেতৃত্বে এক পালাবদলের যুগ – সেই পালাবদলে মূলত চীনের নেতৃত্বে সেকালে  IMF-WB এর মতই তবে একালে এবং  আগামিতে বিকল্প এক গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বা সিস্টেম কায়েমের লক্ষ্যে কাজ শুরু করা। আর সেকাজের উদ্যোক্তা সংগঠন হল ব্রিকস [BRICS] যার জন্ম ২০০৯ সালে।  তবে পরিস্কার থাকতে হবে ব্রিকস  নিজেই কোন বিকল্প  IMF অথবা WB সমতুল্য প্রতিষ্ঠান তা একেবারেই নয়। বিকল্প  IMF ও WB ধরণের প্রতিষ্ঠান হাজির করা একাজে অবশ্যই লম্বা প্রস্তুতি ও সময় লাগবে; আর তা করার জন্য উদ্যোক্তা তাও আবার একেবারে প্রাথমিক উদ্যোক্তা সংগঠন হল ব্রিকস। যেটা ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকা – এই পাঁচদেশের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে তৈরি এক প্রাথমিক উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান মাত্র।  আর এই মাত্র পাঁচদেশ সদস্য থাকা অবস্থাতেই বিকল্প  IMF-WB গড়ার আগ্রহ থাকলেও কেবল বিকল্প WB গড়ার লক্ষ্যের এক ভ্রুণ প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে ইতোমধ্যেই তারা চালু করেছে গত ২০১৫ সালে। এর নাম নিউ ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক [NDB  বা এনডিবি], যেটাকে বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান বলে গণ্য করতে পারি। আর এই প্রথম ব্রিকসের সদস্য দেশ সম্প্রসারণের কালে ২০২১ সাল থেকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই এর সদস্য হয়ে গেছে। প্রথম আলো লিখেছে, ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্রিকস-ব্যাংকের সদস্য হয়। যদিও আমার ধারণা এভাবে  ব্রিকস-ব্যাংকের সদস্য লিখাটাও এক ভুল বুঝাবুঝির উৎস বা ভুল হবে। বরং যদি বলা যেত ব্রিকস উদ্যোগের বিশ্বব্যাংক অথবা আরেকটু পরিস্কার করে ব্রিকস উদ্যোগের বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান – তাহলে এসব কথা নয়া ভুল বুঝাবুঝি তৈরি করত না। মূলকথা ব্রিকস-কে কখনই  অর্থনৈতিক জোট অথবা কোন বাণিজ্য জোট হিশাবে তো নয়ই এমনকি ব্রিকস নিজেই এক আইএমএফ অথবা বিশ্বব্যাংক হতে যাচ্ছে এভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়া যাবে না। তা ভুল হবে।

    মূলকথা ব্রিকস-কে কখনই  অর্থনৈতিক জোট অথবা কোন বাণিজ্য জোট হিশাবে তো নয়ই;
    এমনকি ব্রিকস নিজেই এক বিকল্প আইএমএফ [IMF] অথবা বিশ্বব্যাংক [WB] হতে
    যাচ্ছে এভাবেও পরিচয় করিয়ে দেয়া যাবে না। কারণ সেটাও ভুল। 

    বরং ব্রিকস হল স্রেফ উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান যার ইচ্ছা আছে আগামি দিনের দুনিয়াতে
    বিকল্প  IMF এবং WB প্রতিষ্ঠান গড়ে নিয়ে এক
    নয়া  গ্লোবাল  সিস্টেমের জন্ম দেয়া।
    আর ‘ব্রিকস উদ্যোগ’ যেন জন্ম নিয়ে নেয়, গড়ে উঠে – আমেরিকা নিজেই পরোক্ষে ইস্যুটাকে এদিকে ঠেলে দিয়েছে।    

     

    আমাদের বুঝাবুঝি পরিস্কার না থাকার পিছনের অন্তত দুই সমস্যাঃ
    যতদুর লিখেছি তাতে অন্তত এতটুকু পরিস্কার যে আমাদের সমাজে বুঝাবুঝিতে ব্যাপক সমস্যা আছে। এদিকে, আমরা চাই বা না-চাই আমাদের পরিচিত দুনিয়াটাতে ব্যাপক বদল ঘটে যাচ্ছে এটা অন্তত আমাদের টের পাবার কথা। এব্যাপারে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একেবারেই অপ্রস্তুত। পাবলিক বা সরকারি হলে সেখানকার মূল ইস্যু লীগ বা বিএনপি কোনটা ভাল!!!!! কে কোনদিকে!!
    অথচ হওয়া উচিত ছিল ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াকে বুঝব কী করে এবং গ্লোবাল সিস্টেম প্রতিষ্ঠান যেগুলো সেই ১৯৪৫ সালে যাত্রা শুরু করেছে এদের ততপরতায় যে দুনিয়ায় নয়া ব্যবস্থা চালু হয়েছিল একে বুঝবার উপায় কী? সেগুলোর ভাল-মন্দ দিক নিয়েও আলোচনা হতে পারত। আর সেকাজে তরুণদের যোগ্য করে  গড়ে তোলা এটাই হতে হত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনার মূল লক্ষ্য। কিন্তু তা হয় নাই। আমরা এর বদলে কেন কমিউনিজম বা কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদিতায় ঈমান আনতেও হবে এবং এটাই নাকি সবচেয়ে “অগ্রসর জ্ঞান” তা মনে করে আমরা বাস্তবতা বা বাস্তব জীবনের বাইরে থাকতে চেয়েছি।  যেটা এখন পরিস্কার যে আমাদের এই অঞ্চলে কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদিতাই আসলে এক হিন্দুত্ববাদী মাত্র। আর এটাই আমাদেরকে ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়ায় যে নয়া ধারা একটা গ্লোবাল সিস্টেম-ব্যবস্থা খাড়া হয়ে গেছে তা বুঝতেই দেয়নি।

    বরং ব্যাপারটা হয়েছে এমন যেন, একটা জিনিষ বাঘ না বিড়াল সেটা বুঝব শিখে ফেলব কী করে সেই বুঝাবুঝির ক্ষমতা শানানো বা চর্চা করা নয়; এর চেয়ে আমরা ভাগ হয়ে গেছি এভাবে যে আমাদের মধ্যে কে কে এটাকে বাঘ বলার পক্ষে আর কে কে বিড়াল বলার পক্ষে। ফলে এরই নিট ফলাফল হল আমরা কোন পক্ষই আজ দুনিয়াকে এসব ফেনোমেনাগুলোকে বুঝতে আমরা কেউ-ই সক্ষম নই, হই নাই।
    তাই, আমাদের বোকা বোকা প্রশ্ন হল জাতিসংঘ কেন “গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান” নয়। কেন কেউ কেউ ভেটো সদস্যধারী? এই খায়েস শুনলে মনে হবে প্রশ্নকর্তা খুবই বোদ্ধা! কিন্তু আসলে সে একটা পড়ালেখা না করা চটকদার তার্কিক! আবার অগ্রসরতার দাবিদার কমিউনিস্ট তাদেরও জাতিসংঘ  মানে, এই গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কোন ধারণা নাই।  আর  IMF-WB  সম্পর্কে ধারণা সেটা আরো করুণ অবস্থা। কমিউনিস্টদের চোখে এগুলো হলো “নিপাত যাক প্রতিষ্ঠান”।   মানে যেকথা বলছিলাম বাঘ না বিড়াল এর বুঝাবুঝি ও ফারাক করতে শিখা ও জানা – এসব জানার পদ্ধতি শিখার কাজ যেখানে মুখ্য হওয়া উচিত ছিল সেসব ফেলে আমরা হয়ে গেলাম কে বাঘকে বিড়াল বলে বা কে বিড়ালকে বাঘ বলবে এনিয়ে দুপক্ষের লড়াইয়ে বিভক্ত। IMF-WB “নিপাত যাক প্রতিষ্ঠান” -এধরণের হতেও পারে! কিন্তু এর আগে এসব প্রতিষ্ঠানকে চিনব কী করে, কী করে চিনতে হয় এর জানার পদ্ধতি-উপায় কী আমরা জানলাম না। এর ম্যান্ডেট কী, এটা কী করে, কী করার উদ্দেশ্যে জন্ম আমরা কমিউনিস্টেরা তা জানি না। প্রথমে তাদের বলতে দেখলাম এরা নাকি সুদ খেতে আসছে এমন লগ্নি প্রতিষ্ঠান!!!!!  এর সোজা মানে হল IMF-WB এদের সুদহার কত তাই কোন খবর কমিউনিস্টেরা জানেই না।  আবার আচ্ছা  IMF-WB “নিপাত যাক প্রতিষ্ঠান” মানে হল বাংলাদেশ যদি এদুই প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ ত্যাগ করে তাহলে কী বাংলাদেশ মানে ধরা যাক বাংলাদেশের অর্থনীতি কী টিকে থাকতে পারবে? কেন পারবে অথবা পারবে না তা আমাদের কমিউনিস্টেরা বলতে পারবে, মনে হয় না।  তাহলে?

    আবার দ্বিতীয় সমস্যাটা হল, একালে বিশেষ করে হাসিনার ১৫ বছরে অনেকেই আমেরিকায় বসবাসের রেসিডেন্ট পারমিট পেয়েছে। কিন্তু তাতে আবার এরা একটা কমপ্লেক্সে মানসিক জটিলতায় পড়েছে।  তারা চীন ভাল না আমেরিকা ভাল এই তর্কে অংশ নিতে চায়। তা খুবই ভাল কথা কোন অসুবিধা নাই। কিন্তু তাদের যে দ্বিধা তা হল, তাদের কী আমেরিকা ভাল – একথার পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বলা উচিত নয়!!!!  অর্থাৎ জাতিবাদের সমস্যায় পড়েছেন তারা; যেটা অবশ্য একেবারেই অপ্রয়োজনীয় বিবেচনা। আর আমেরিকা তো  হাসিনার বাংলাদেশ নয়।  তবুও কেউ কেউ আরেক ধাপ উপরে। তারা মনে করে তারা যদি অ্যামেরিকান প্রশাসনের অবস্থানের পক্ষ নিয়ে কথা না বলি তাহলে কী এটা পরে কখনও তাদের রেসিডেন্ট পারমিট বাতিলের পক্ষে যুক্তি হয়ে হাজির হয়ে যাবে? এসব!! “এক্ষেত্রে কে কী পক্ষ-বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন তা নিয়ে আমার বলার নাই। কিন্তু যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল, যেমন ব্রিকস বুঝাবুঝির ক্ষমতা বাড়ানো বা বুঝাবুঝির পদ্ধতিটাই জানা এদিকে কারও আগ্রহ নাই।   বরং বাঘকে বিড়াল বলে বা কে বিড়ালকে বাঘ বলে চালিয়ে দিবে কিনা – কোনটা করবে এটা হল তাদের তর্ক। যা খুবই হতাশজনক!
    তাহলে কথা ছোট করি এখন। তাহলে যারা ১৯৪৫ সালের পরের গ্লোবাল সিস্টেমটা কেন এমন হয়ে খাড়া হয়েছিল তা বুঝতেই অক্ষম – বরং কেবল পক্ষ-বিপক্ষ হয়ে থাকতে চায় বা এসেছে তারা কীভাবে ব্রিকসকে ব্যাখা করতে পারবে বুঝাবুঝি শানাতে পারবে!
    আবার  কমিউনিস্টরা মনে করেন ক্যাপিটালিজম করা অথবা মুনাফা কামানো খারাপ কাজ। কিন্তু বাস্তবতা হল সেই রাম বা অযোধ্যা কোনটাই নাই, টিকে নাই। পুরানা চীনও নাই। সোভিয়েতেরও আগে সেই ১৯৫৮ সালের পর থেকে পুরান চীন নাই।   কাজেই সোভিয়েত বুঝ দিয়ে সোভিয়েতের বাইরের দুনিয়াকে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া কেন? তাতে তো বাইরের সবাইকেই পাপী মনে হবে। কারণ ‘বাইরের দুনিয়া” যেটা সেটাই এখন বাস্তব দুনিয়া। কাজেই সোভিয়েতের টুলস দিয়ে ব্রিকসকে বুঝবার চেষ্টা অর্থহীন!  তাইতারা তো ব্রিকস আলোচনায় ঢুকতেই সক্ষম হবেন না; তাদের অপ্রয়োজনীয় এবং নিপাত যাক অবস্থানের কারণে! তাই ব্রিকস বুঝাবুঝি তাদের জন্য নয়!

    এজন্যই বলছিলাম, যারা বুঝতে চান তাদের জন্য তাহলে সারকথায় এর মানে আমরা এখন আরেক সমস্যায় পড়লাম যে তাহলে আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক কেমন ধরণের সংগঠন যারা সেই ১৯৪৪ সালে একই [ Bretton Woods] বৈঠকে জন্ম নিয়েছিল, তা বুঝতে হবে আগে। আবার, তারা একই বৈঠকে জন্ম নেয়া হলে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক নামে আলাদা দুইটা হবার দরকার হল কেন? এসব দিকগুলো আমাদের জানতে হবে নইলে ব্রিকস উদ্যোগের কিছুই স্পষ্ট বুঝা যাবে না।  আরেকভাবে বললে, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক এদের ম্যান্ডেট বা কী দরকারে জন্ম দেয়া হয়েছিল সেসব কাহিনী ঘাটতে হবে। হ্যা কিছু করার নাই। কারণ, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক তাহলে কী ধরণের প্রতিষ্ঠান – কোন অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট কী? না অবশ্যই না।  তাহলে কেমন প্রতিষ্ঠান এরা? এই হল মুখ্য জানবার প্রশ্ন!

    একটা ক্লু দিয়ে শুরু করা যাক!
    লক্ষ্য করলে দেখব এক আইএমএফ ছাড়া বাকি বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি – এসব প্রতিষ্ঠানের নামের শেষে ব্যাংক বা “ইংরাজিতে B” আছে। কাজেই নামের শেষে ব্যাংক আছে এমন প্রতিষ্ঠানকে  অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট মনে করা অবশ্যই অর্থহীন বা মিলল না – এটুক তো বুঝাই যায়! এরপর আরও ইতিবাচকভাবে বুঝতে চাইলে লক্ষ্য করব এসব প্রতিষ্ঠানের নামে ইংরাজিতে B লেখা থাকার আগে বা পরে দেখেন D আছে,  যেখানে D  হল ডেভেলবমেন্ট শব্দের আদ্যক্ষর।  মানে হল বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি ইত্যাদি এরা সবাই আসলে ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক ধরণের প্রতিষ্ঠান; মানে বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি  এরা কোন অর্এথনৈতিক জোট নয়, একেবারেই নয়। তবে এরা ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক অবশ্যই।

    আচ্ছা,  ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক বলতে ঠিক কী বুঝবঃ
    এর জবাব হল, ব্যাংক বলছে যেহেতু ফলে ঋণ দেয় তা হয়ত অনুমান করা যায়। কিন্তু এই অনুমান কী সঠিক? হ্যা একেবারে সঠিক।  কিন্তু এটা অবশ্যই আমাদের দেশের  প্রাইভেট ন্যাশনাল ব্যাংক বা সরকারি সোনালি ব্যাংকের মত ব্যাংক নয়। এটা হল ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক যেখানে ডেভেলবমেন্ট এর মানে করতে হবে ইংরাজিতে যেটাকে ইনফ্রাস্টাকচার ডেভেলবমেন্ট [অবকাঠামো উন্নয়ন] বলে। আর সেখান থেকে ছোট করে নেয়া শব্দ শুধু ডেভেলবমেন্ট কথাটাই বাংলায় উন্নয়ন।

    আর ইনফ্রাস্টাকচার বা অবকাঠামো শব্দের ব্যবহার অবকাঠামো ব্যাঙ্ক [DB] এভাবে এই শব্দের ব্যবহার ও ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। অনেকে মার্শাল প্ল্যান কথাটা শুনে থাকবেন। বিশ্বযুদ্ধে যেহেতু তাই সেখানে রাস্তাঘাট কারখানা বাড়িঘ্অর বা পানি-বিদ্যুতের উতপাদন অবকাঠামোর এসব দিক থেকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ জর্মানিসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের অবকাঠামোগুলো পুণঃর্গঠন ও উন্নয়ন [reconstruction & Development (RD)] জন্য নয়া উদ্যোগ পরিকল্পনার নামই মার্শাল প্ল্যান । এখানে আমেরিকা একাই মানে  অ্যামেরিকান প্রশাসনের দিক থেকে যে বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল সেটাই মার্শাল প্ল্যান নামে পরিচিত।  সেসময়ে (RD) খুবই এক চালু শব্দ ছিল। যেকারণে আজকের বিশ্বব্যাংকের (WB) মূল পুরা নাম হল [IBRD – International Bank for Reconstruction & Development ]।  আর অবকাঠামো [Infrastructure] বলতে ঠিক কী বুঝব? কোন দেশের অর্থনীতি চালু ও সরগরম থাকার পুর্বশর্ত হচ্ছে ভাল অবকাঠামো থাকা। মানে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট, পানির সাপ্লাই, নিস্কাষণ ব্যবস্থা, কারখানার বর্জ্য রিসাইক্লিং, নগর অবকাঠামো, শিল্পাঞ্চল অবকাঠামো, গ্রামীন রাস্তাঘাট ইত্যাদি গড়তে হয় আগেই। তবেই অর্থনীতি চাঙ্গা হতে পারে। আর সবচেয়ে বড় শর্ত হচ্ছে এসব গড়তে হবে নামমাত্র বা কমসুদের (১% এরও কমে) ঋণে।  সেসব অবকাঠামো গড়তে নামমাত্র সুদে সরকারকে ঋণ দেয়াই  বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি – এসব ডেভেলবমেন্ট ব্যাংকের ম্যান্ডেট বা মুখ্য কাজের লক্ষ্য। এককথায় এগুলো কর্মাশিয়াল বা বাণিজ্যিক ঋণ নয়, তাই সুদ নামমাত্র। এটা ডেভেলবমেন্ট ব্যাংকের মুখ্য বৈশিষ্ঠ। এটাই  যদিও অর্থনীতি উঠে দাড়ালে মাথাপিছু আয় বাড়তে শুরু করলে সরকারকে দেয়া এই ঋণের সুদ বেড়ে ৩% পর্যন্ত হতে পারে!
    তাহলে আমাদের মূল আলোচ্য প্রসঙ্গ – বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি এই ধরণের প্রতিষ্ঠান কোনভাবেই কোন  অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট নয়। এমন মনে করা ভুল, ভিত্তিহীন। এগুলো আসলে ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক ধরণের প্রতিষ্ঠান।

    তাহলে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা যেটা এখন আছে আগে তা বুঝলে পরে, আগানো যাবে ব্রিকস কীঃ
    নয়া প্রসঙ্গে যাবার আগে একটা সাবধানতাঃ
    ঘরে ঢুকার আগে বাইরে জুতা খুলে ঢুকার মত পাঠকেরা দয়া করে আপনি কোন পন্থী – প্রো অ্যামেরিকান নাকি প্রো চীন অথবা ধরেন কোল্ডওয়ার কালের মত আপনি সোভিয়েত না অ্যামেরিকান পন্থী – ইত্যাদি এসব ভাগ ও আলাপ গুলো এই আলোচনা পাঠের আগে বাইরে রেখে আসেন। তাহলে এই আলোচনার কথাগুলো বুঝতে সুবিধা পাবেন।  কারণ এখানে কথাগুলো যে পন্থীরই হোন এমন সবার জন্য লেখা হয়েছে। বরং আপনি নিজেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল বলে মনে রেখে পড়তে বসলেই বুঝতে ঝামেলা হতে পারে। পরে আরো বিস্তার করব সেসব কথা।

    তাহলে ব্রিকস কী ? কেমন ধরণের প্রতিষ্ঠান?
    এটা খুবই প্রতিষ্ঠত এক সত্য যে ১৯৪৫ সাল নাগাদ বিশ্বযুদ্ধে শেষে (কমিউনিস্ট নেতা স্তালিন সহ) সকলে মেনে নিয়েছিল যে আমেরিকাই গ্লোবাল নেতা। এর মূল কারণ হল বা তখনকার বাস্তবতা ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রপক্ষের সকলের প্রধান খরচ এককভাবে সকলকে  যুগিয়েছিল একনাগারে চারবারের (১৯৩২-১৯৪৪) নির্বাচিত অ্যামেরিকান  প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। অর্থাৎ মিত্রপক্ষ এই জোটের একমাত্র নেতা হয়ে দাড়িয়েছিলেন রুজভেল্ট। শুধু তাই নয় যুদ্ধে শেষে আবার ইউরোপের নানান দেশের ( এমনকি এবার কেবল মিত্রপক্ষের দেশগুলোকেই নয় সাথে হিটলারের পক্ষের দেশগুলোসহ) অবকাঠামোগুলো পুণঃর্গঠন ও উন্নয়ন এর খরচও যোগান  বা অবকাঠামো ঋণ হিশাবে দিয়েছিল ঐ আমেরিকা একাই। এজন্য আমেরিকা বাদে ইউরোপীয়-সহ প্রায় সকল দেশই পরে আমেরিকাকে ধরেছিল  একটা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা দাঁড় করানোর জন্য উদ্যোগ নিতে। যত সহজে এই গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা কথাটা লিখলাম ততই কঠিন অনেকের জন্য এটা বুঝা বা ইমাজিন করে বুঝা কঠিন। বিশেষ করে কোন কমিউনিস্টের পক্ষে কমিউনিস্ট থেকে গিয়ে এটা বুঝা কঠিন হবে। এর অন্তত একটা কারণ হল, কমিউনিস্ট বুঝাবুঝিতে বাণিজ্য বিশেষ করে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য  (এবং গ্লোবাল বাণিজ্যও) একটা অপ্রয়োজনীয় বিষয়! কারণ যতই নিজেদের এরা কমিউনিস্ট বলে দাবি করুক এরা মূলত উগ্র জাতিবাদীদের মত গভীর অর্থনৈতিক জাতিবাদিও। মানে কোনকিছুই আমদানি করা যাবে না; পারলে অন্যদেশে কেবল রপ্তানি করেন – এমন চিন্তার। স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আজ ১৫ টা আলাদা রাষ্ট্র হয়েছে – এটা এত বড়। তাই ভিতরে প্রায় সব ধরণের প্রয়োজনীয় পণ্য একই নিজ সোভিয়েত দেশেই উতপাদন সম্ভব ছিল। যেটা আমাদের মত দেশের বেলায় অসম্ভব।  এই সুযোগে কমিউনিস্টদের  (অবাস্তব বা আইডিয়েল) অনুমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য  (এবং গ্লোবাল বাণিজ্যও) অপ্রয়োজনীয়। এছাড়া, বাণিজ্য মানে তো মুনাফা কামানো যা তাদের চোখে হারাম কাজ!  অথচ খোদ কার্ল মার্কস এর কাছে এক্সচেঞ্জ [exchange] (বাংলায় বিনিময় যেমন পণ্য বিনিময় থেকে প্রেম বিনিময় বা সম্পর্ক) কেন এত গুরুত্বপুর্ণ ও প্রায় সর্বব্যাপী এক ধারণা কেন?
    অথচ আবার খেয়াল করেন মোদি যে এক উগ্র অর্থনৈতিক জাতিবাদী এবং কট্টর চীনবিরোধী। অথচ ভারতে যে মোবাইল ব্যবহার হয় এর ৭৩% মার্কেট শেয়ার হল একা চীনের। আমি জানি না কমিউনিস্টেরা এই ফেনোমেনাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন! কেন এটা ঠেকানো যাচ্ছে না?

    তাই আরেক সাবধানতা -দুই বলে রাখি। গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা জিনিষটা কী তা নিয়ে আলাপেঃ
    মূলত এটা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাই তবে এরচেয়েও বড় এরই গ্লোবাল রূপ।  আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা মানে যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বানিজ্য যাতে চলতে পারে এর একটা সিস্টেম গড়ে তোলা। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে এত জটিল সিরিয়াস ভাবা কেন? যদি এর মূল সমস্যাটা বুঝতে পারি তাহলে সবকিছু বুঝব।
    যেমন আপনার দেশীয় মুদ্রায় কেনা-বেচা আপানার দেশের সীমানার ভিতরেই কেবল চলতে পারে। সীমানা পার হয়ে গেলে আপনার পকেটের আপনার দেশীয় মুদ্রা ভিনদেশে আর গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই কিছুই কিনতে পারবেন না।তাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে ধারণা লাগবে, একটা সিস্টেম লাগবে। এর চেয়েও বড় কথা কোন প্রতিষ্ঠান লাগবে যার কাজ হবে যেকোন দেশের মুদ্রার প্রতিদিনের বিনিয়ময় হার কী হবে তা জানানো। আর একাজ সে টেকনিক্যাল ও ইম্পারশিয়াল নিউট্রাল কোন পদ্ধতি দাড় করিয়ে সে ভিত্তিতে প্রকাশ করবে। আর যে গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান এই কাজ করবে – সেই প্রতিষ্ঠানটারই নাম হল আইএমএফ।  এসব দিকের বিপরীতে কমিউনিস্টেরা মনে করে  আইএমএফ হল নাকি কেবল শর্ত দেওয়ার প্রতিষ্ঠান। না বুঝে কত কথাই না বলা যায়! কমিউনিস্টদের আরেক ভুয়া অনুমান হল, আইএমএফ এমন শর্ত দেয় বেশি মুনাফা কামানোর জন্য। এজন্য যে হাসিনা সরকার পরিণত হয়েছে বিদেশে অর্থপাচারের সরকারে ফলে হাতে ডলার শুণ্যতার সরকার, কমিউনিস্টেরা তাকে সাফাই যোগাতে চেয়ে বলছে ডলার সংকটের সব দোষ নাকি আইএমএফ এর।  কারণ নাকি আইএমএফ খালি শর্ত দেয়। আর এই ভুয়া আলাপের লেজ ধরে অর্থমন্ত্রীও সাফাই দিয়ে বলে সরকার  “আইএমএফ এর শর্তের কথা ভেবে” মানে আমল করে এবারের বাজেট দেয় নাই। মানে খুবই বিপ্লবী সরকার এটা! আর তা শুনে কমিউনিস্টেরা হাততালি দিয়ে উঠেছে।

    যে আলাপ তুলি নাইঃ
    প্রশ্ন হল ব্রিকস এক উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান বলছি যার লক্ষ্য আগামি দিনে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থার বিকল্প সিস্টেম আনা। এই ব্রিকস তাহলে নিজ জন্মের ১৪ বছর পেরিয়ে গেছে এখনও আইএমএফ নিয়ে কিছু করছে না কেন, অগ্রগতি ধীর কেন?  জবাবটা আপাতত এক বাক্যে শেষ করব। জবাব হল, চলতি গ্লোবাল অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থাটা অ্যামেরিকান ডলার কেন্দ্রিক। মানে এখন দুনিয়ায় বৈদেশিক বাণিজ্যে ৭০% এর বেশি পণ্য কেনাবেচা হয়, ইনভয়েস লিখা হয় অ্যামেরিকান ডলারে। সবার আগে এখানে বদল ঘটতে হবে; ঘটাতে হবে। অন্য মুদ্রা ইউয়ান অথবা  অন্যদেশের মুদ্রায় হতে হবে। এটাই সেই পুর্বশর্ত যা না হলে ব্রিকস উদ্যোগের সফলতা দেখাতে পারবে না। কিন্তু একালে আবার বাইডেন ডলারে বাণিজ্য করতে পারবে না এমন ডলার স্যাংশন যেকোন ব্যক্তি বা সরকারের উপর জারি করছে যথেচ্ছভাবে তা প্রয়োগ হচ্ছে। এটাই পরোক্ষে ব্রিকসকে আশা জাগানো হয়ে যাচ্ছে, বা সাহায্য করছে। যেটাকে আমেরিকার দিক থেকে দেখলে উপস্থিত লাভালাভ পেতে গিয়ে বাইডেন অপব্যবহার করে ফেলছেন – বলবেন অনেকে। এমন ডলারের সুবিধা অপব্যবহারের বিপদ বাড়ছে কথাটা সম্প্রতিকালে বাইডেনের  ট্রেজারি মন্ত্রী স্বীকারও করেছেন Yellen Says Sanctions May Risk Hegemony Of US Dollar।

    তাহলে আদার ব্যাপারী কথা তুললাম কেনঃ
    কথাটা আমার না স্বয়ং শেখ হাসিনার। বিডিনিউজের রিপোর্টার লিখছেন, প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক আরও জানতে চেয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক কোনো মুদ্রা চালু করার পরিকল্পনা বাংলাদেশের আছে কি না। উত্তর দিতে গিয়ে মুচকি হেসে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আদার ব্যাপারি জাহাজের খবর নিতে বলছেন”।

    এইকথাটাই প্রমাণ করে যে হাসিনা নিশ্চিত যে ব্রিকসের সদস্য হলে সেটা বাইডেনের আমেরিকাকে ছেড়ে যাওয়া বা বুড়া আঙুল দেখানো এসবের কোনটাই নয়। তিনি তো আদার ব্যাপারী, তাই এটা তিনি বুঝেন। এটা কেবল একটা ভাব ধরা যে ব্রিকসে যোগ দিয়ে হাসিনা বাইডেনের প্রভাবের বাইরে চলে যাবেন বা বাইডেনকে যেন একটা উচিত শিক্ষা দিলেন। তবে এসব কথা দলের কর্মীদের মনোবল বাড়াতে কাজে আসবে এতটুকুই মাত্র।

    এছাড়া সকল পাঠককে আরেকটা কথা মনে করিয়ে দিয়ে শেষ করব। ব্রিকসের জন্মদাতারা সহ সকল রাষ্ট্র আজও আইওএমএফ ও বিশ্যাব্যাংকের সদস্য হয়েই আছে। ছাড়ে নাই। কোনদিন যদি চীন আমেরিকার জায়গায় গ্লোবাল নেতার প্রতিষ্ঠা পায় কেবল তখনও হয়ত অনেক বিশ্বব্যাংকের মত সমতুল্য প্রতিষ্ঠান থাকলেও দুনিয়ায় আইএমএফ হবে একটাই; তবে অবশ্যই সেটা হবে ঢেলে সাজিয়ে নেয়া এক নয়া আইএমএফ!

    আপডেটঃ ২৫ জুন ২০২৩  সকাল ১০ঃ ১২
    আপডেটঃ ২৫ জুন ২০২৩  বিকাল ০৫ঃ ৫৫

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • মোদি-বাইডেন সাক্ষাতে কি হবে তা এখনই জেনে নেন

    মোদি-বাইডেন সাক্ষাতে কি হবে তা এখনই জেনে নেন
    গৌতম দাস

    ২২ জুন ২০২৩      সকাল ০৯ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-4E8

     

                   Biden hosts Indian Prime Minister Modi at White House

     

    মোদির বাইডেন সাক্ষাত হবে আজকে। কিন্তু এর আগেই ভারত একটা হাইপ [HYPE] তুলেছে মানে মিথ্যা প্রপাগান্ডার ‘ওভার-পাবলিসিটি’ শুরু করেছে গত কমপক্ষে প্রায় দশদিন ধরে।
    এর উদ্দেশ্য দুইটা। এক.  আভ্যন্তরীণভাবে ভারতের ভোটারদের দেখানো যে মোদি এক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব পরাশক্তি নেতা হয়ে গেছে। আর দুই. বাংলাদেশে হাসিনা সরকার টিকবে কিনা সেই নির্ধারক ভাগ্যবিধাতা হলেন মোদি, সেটা সত্য-মিথ্যা যাই হোক এই ইমেজ তিনি গড়তে চান।
    ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ২১-২৪ জুন তার আমেরিকা সফরে ইতোমধ্যেই আমেরিকায় পৌছেছেন। আজ ২২ তারিখ প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সাথে তার সাক্ষাতের কথা।
    এদিকে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য অ্যামেরিকান নয়া ভিসা পলিসিতে দেয়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর থেকে, বাংলাদেশে ভিতর সরকার বা বিরোধী দলগুলোর যেখানে আমেরিকান এই নীতির বিরুদ্ধে কোন আপত্তি জানিয়ে বক্তব্য প্রায় নাই বললেই চলে; বরং এর চেয়ে এই নিষেধাজ্ঞা অপর দলের জন্য কত খারাপ হয়েছে  আর তাতে অন্যদলটা কত বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে এনিয়ে সরকারি  প্রপাগান্ডাটাই মুল আসর দখল করেছে; যদিও এতে ব্যাপারটা মানুষ তামাসা হিশাবে দেখেছে। অন্তত ফেসবুক কে যদি আমার সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জানার (সোশাল মিডিয়া) উৎস বলে  ধরি তাহলে  এমনটাই সোশাল মিডিয়ার ডমিনেটিং মুড।  আর মানুষের কাছে যে ওয়েলকামিং মেসেজ গেছে তা হল, অ্যামেরিকান ভিসা পলিসি এবার মানুষকে একটা ভাল কিছু দিবে কারণ, এটা হাসিনা সরকারের উপর মারাত্মক চাপ তৈরি করতে শুরু করেছে!
    ওদিকে আবার ভারতের প্রতিক্রিয়া হয়েছে উলটা। ভারতের মিডিয়া, কলাম লেখক, একাদেমিক বা থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ইত্যাদিতে যুক্ত যারা তাদের সবার একই ভাষ্য আমেরিকা “কত্ত-ই না খারাপ দেশ” – যে তারা বাংলাদেশের উপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে! আর এতে বাংলাদেশের উপর ভারতের আলগা খবরদারি মানে তাদের ভাষায় “বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ” সেটা আর কিছুই এখন উসুল করা যাবে না; আগের সাজানো বাগান থেকে কত সহজেই না লুট ততপরতা চালানো যে অবারিত সুযোগ ছিল যেন সেটা এখন বন্ধ বা ক্ষুন্ন হতে যাচ্ছে আর এই ম্যাসেজ তারা পাঠ করে ফেলেচ্ছে। আর একারণে তারা রীতিমত কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে।
    এতে সবচেয়ে অসুবিধা যেটা তা হল তাদের স্বার্থের পক্ষে ন্যায্যতা কী? সাফাই বয়ান কী? এমন কিছু তো একটা থাকতেই হবে। নইলে “বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ” হারিয়ে যাচ্ছে বললেই এর অর্থ হবে সেটা অবৈধ স্বার্থ নয়, ন্যায্য স্বার্থ অথবা হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার বিনিময়ে নেয়া কোন অসম চুক্তি বা ঘুষের চুক্তি নয় এমন একটা নুন্যতম বয়ান অবশ্যই হতেই হবে। আর এখানেই অসাঞ্জস্যতা এক বিরাট ঘাটতি ভারতের সব বক্তব্য বা দাবিকে দুর্বল করে রেখেছে।

    পেড মিডিয়া প্রপাগান্ডাঃ
    এই সুযোগে প্রথম আলোর মত পত্রিকাগুলো যারা ভারতের গোয়েন্দাবিভাগের মিথ্যা সাজানো প্রপাগান্ডা খবর নিজেরা একে সত্যি বলে নিজ পত্রিকায় খবর ছাপে; তাদের এই দালালি ততপরতারর রেট মনে হচ্ছে বেড়ে গেছে। অথবা গোয়েন্দাবিভাগ নিজেরাই যেচে রেট বাড়িয়ে দিয়েছে হয়ত যাতে  মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছাপতে এরা আরো দুঃসাহসী হয়ে উঠে, লোভনীয় পরিমাণ অর্থের লোভে অস্থির, ডেসপারেট। বেচাইন হয়ে যায় যেন!
    সম্ভবত সেকারণেই আমরা  নিউজ দেখছি প্রথম আলোতে যেখানে মরিয়া হয়ে বিপদে পড়বে জেনেও এসব প্রপাগান্ডার আবর্জনা  তারা খবর বলে ছাপছে। ধরা পড়লে শিরোনাম বদলে লঘু করার চেষ্টা করছে তবু প্রপাগান্ডা কাজ চালিয়েই যাচ্ছে। এসব মিথ্যা খবর তৈরির ভঙ্গিটা হল এমন দাবি করা যেন ভারতের মোদিই হচ্ছে বাংলাদেশে বাপ! তাই যেন বাংলাদেশে কী ঘটবে এর একমাত্র নির্ধারক ও ভাগ্যবিধাতা হলেন মোদি! মোদি যেন বাংলাদেশকে তাঁর কোন বাপের তালুক হিশাবে পেয়েছেন। তাই মোদিই একমাত্র হাসিনা সরকারকে ভিসা নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদির অ্যামেরিকান চাপ থেকে বাঁচাবেন, উদ্ধার করবেন। এই হল এসবের সারকথা!

    যেমন, গতকাল ২১ জুন সকাল থেকে দেখা গেল আরেক প্রপাগান্ডা যে বাংলাদেশ মানে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন নাকি জয়শঙ্কর বা ভারতকে অনুরোধ করেছে যেন মোদি তার আমেরিকার সফরে বাইডেনের কাছে হাসিনার জন্য কিছু সুপারিশ করে। যার সার ইঙ্গিতটা হল, লেম্যানের ভাষায় বললে মোদি যেন হাসিনা সরকারকে আরেকবার রেখে দেয়ার বন্দোবস্ত করে দেয়, আমেরিকাকে বলে!

    ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বারানসিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ ভুক্ত
    দেশগুলোর
    মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকের ফাঁকে গত ১২ জুন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে
    বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
    এ কে আব্দুল মোমেনের সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে। সূত্র বলছে, বিভিন্ন
    পর্যায়ে ভারতের কর্মকর্তাদের কাছে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বিষয়টি তুলেছেন।

    যদিও ভারতের মিডিয়ার এই দাবি আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন ও সেতুমন্ত্রী কাদের অস্বীকার করেছেন। তার মানে ভারতের দাবি একপক্ষীয়, সকলেই বিনা তর্কে গ্রহণ করে এমন দাবি নয়।
    আর এটাই ছিল ২১ জুন সকাল থেকে প্রথম আলোর প্রপাগান্ডা এসাইনমেন্ট। অথচ প্রথম আলোর এই কাজটা এক মারাত্মক জার্নালিস্টিক অসততা। কেন?

    বর্তমান বাংলাদেশ প্রশ্নে, আমাদের মোমেন অথবা আমেরিকা সফররত মোদির ভারত এদের যে কেউ নানা প্রপাগান্ডা করতেই পারে যার সোজা অর্থ ফ্যাক্টস লুকাইতে পারে। তাহলে এক্ষেত্রে প্রথম আলোর অবস্থান হওয়া উচিত অন্তত নিজে ফ্যাক্টস না লুকানো বা কাউকে লুকাতে না দেওয়া বা সাহায্য না করা। এই সাপেক্ষে মানে এটা করার পরেই কেবল ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার অর্থের ভান্ডে প্রথম আলো একটু-আধটু মুখ দিতে পারে; যতটুকু যা পায়। কিন্তু প্রথম আলো – খোদ জার্নালিজম – এই কাজটাই ত্যাগ করে চলে গিয়েছে।

                                                                TIMES

    যেমন, ভারতের কিছুপক্ষের নানান দাবি বা মোমেনের দাবিতে তা সব তোলপাড় করে ফেলতে পারে, এমনকি মোদির অ্যামেরিকান সফরকে কেন্দ্র করে মিথ্যা আশা বা প্রপাগান্ডা যে হাসিনা আবার টিকে যাচ্ছে বলে হৈচৈও শুরু করতে পারে। আর এক্ষেত্রে মোদি ও বিজেপির প্রধান লাভের লক্ষ্যটা হল মিথ্যা হলেও এটা দিয়েই মোদির ইমেজ গড়া; মানে মোদিকে এক পরাশক্তি নেতা হিশাবে তুলে ধরা যে বাংলাদেশে সরকারকে বাঁচায় – এই ইমেজ গড়াটাই বিজেপির সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ। তাতে এটা পুরাটাই মিথ্যা  হয় যে বাইডেন মোদির কথা শুনবেই না অথবা আদৌও এনিয়ে মোদি-বাইডেন হয়ত আলাপই হবে না – এমন হলেও ক্ষতি নাই। কারণ মোদির এই পরাশক্তি বা মিথ্যা গ্লোবাল নেতার ইমেজ – এটাই আগামি ভারতের নির্বাচনে বিজেপি ব্যবহার করবে আর দাবি করবে মোদির নেতৃত্বে ভারত কত উঁচুতে উঠেছে। আর এতে হাসিনা মিথ্যা আশা আকাঙ্খা তৈরি করে এর ছলনায় আরো হতাশ হয়ে যাবে কিনা সেটা তো মোদির বিবেচনাই নয়!
    অতএব এই ভুয়া উচ্ছাস তুলে হলেও ভারত মরিয়া হয়ে হাসিনার -জান যাওয়া অবস্থায়- এই মিথ্যা পরাশক্তি নেতার ইমেজ কামাতে নেমেছে। এমনকি পরোক্ষে তিনি হাসিনাকেও ট্রাপে ফেলেছেন, তা হলেও।
    আর এই পরিস্থিতিতে এখানে প্রথম আলো যেপথ নিল, তা হল এর মধ্যে ফ্যাক্টস বা সত্যটা কী? সেটা বের করতে না যাওয়া।  মোদি কী আসলেই বাইডেনকে বলে হাসিনার সব বালা-মুসিবত মানে আরেকবার ক্ষমতায় থেকে যাবার বন্দোবস্ত করে দিতে পারবেন? নাকি এর কোন আদৌ সুযোগই নাই?
    না, প্রথম আলো এবিষয়ে ফ্যাক্টস উদ্ধার সেদিকে গেল না – বরং সে গেল মোদির মিথ্যা প্রপাগান্ডাকে হাইপ বা উচ্ছাস তোলা বা যোগানো – যেটা সরাসরি একটা প্রতারণা???
    অথচ জার্নালিজমে সৎ থাকলে প্রথম আলোর ন্যায্য কাজ হত ফ্যাক্টসের সন্ধানে যাওয়া; যে অন্তত মোদির আদৌ কিছু করার সুযোগ আছে কিনা! সেটা যাচাই করে আসা!

    অনেকের মনে সন্দেহ হতে পারে সেটা কী খুবই সহজ হবে? এমন ভেবে! হা এটা এখানে একেবারেই সহজ এবং তৈরিই ছিল। যেমন, মোমেন বা মোদির ভারতের অনেকের দাবির প্রসঙ্গ হল বাইডেন বা অ্যামেরিকান অবস্থা নিয়ে – মানে বাইডেন-মোদি সামিটে (বাংলাদেশ প্রসঙ্গে) বাইডেন কী অবস্থানে থেকে কথা বলবেন? তাতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আলোচনায় উঠে আসুক বা না আসুক – বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বাইডেনের অবস্থান আগে থেকেই কী জানা যায় না, সেই তালাসে যেতে হত।

    এই প্রসঙ্গে অথেনটিক নিউজ পাবার এক বেস্ট জায়গা ও এক ব্যক্তি হল জন কিরবি [John Kirby ]। যিনি হোয়াইট হাউসে বসেন কারণ তিনি হলেন হোয়াইট হাউসের ন্যশনাল সিকিউরিটির স্ট্রাটেজিক কমিউনিকেশনের কো-অরডিনেটর কাম মুখপাত্র [National Security Council coordinator]। যিনি নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং দিয়ে থাকেন। মোদির এই সফরটা দুই রাষ্ট্রের দুই এক্সিকিউটিভ হেড এর মধ্যে। মানে অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্টের সাথে। তাই কোন অথেনটিক নিউজ পেতে হলে, হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র এখান key personality বিবেচ্য হবে। আর জার্নালিস্ট তো বটেই এমনকি  যারা এডভান্স পাঠক  এটা এদের কারোরই অজানা নয়। আর বাংলাদেশে বসে তাঁর [কিরবি-র] যেকোন ব্রিফিং পাবার সবচেয়ে উপযুক্ত উপায় হল অ্যামেরিকান সরকারি ওয়েব সাইটে [সাধারণত যেটা https://www.state.gov] যাওয়া যেখানে সব বিস্তারিত থাকে। যেমন মোদি-বাইডেন হবু সাক্ষাত উপলক্ষ্যে আগাম যে ব্রিফিং সেটা ছিল ২০ পৃষ্ঠারো বেশি তাহলেও পুরাটাই ঐ ওয়েব সাইটে দেয়া আছে। এখন জার্নালিজম করতে চাইলে এসব খবর জানা ও সংগ্রহ করা ছিল প্রথম আলোর সরাসরি দায়ীত্ব!

    এখন দেখা যাক প্রথম আলো হিন্দুস্থান টাইমস এর যে প্রপাগান্ডা রিপোর্ট ২১ তারিখ ভোর থেকে লোড করেছে সেটার সময় হল আমাদের ভোর পাঁচটায়। অথচ জন কিরবি এর ব্রিফিং হয়ে গেছে অ্যামেরিকান ২০ তারিখ সকাল ১১টায়। মানে এর ব্রিফিং আমরা বাংলাদেশে বসে রিপোর্টটা সংগ্রহের যোগ্য হয়ে গেছিল  ঐদিনই (২০ জুন) তবে আমাদের মোটামুটি রাত বারোটার পর থেকেই।
    অর্থাৎ প্রথম আলো জন কিরবি এর ব্রিফিং বক্তব্য আমলেই নেয় নাই; নেওয়ার দরকারও মনে করে নাই। বলতে গেলে উপেক্ষা করে লুকিয়েছে আর বরং এরই পালটা প্রপাগান্ডা রিপোর্টটাই পরের (২১ জুন) ভোরবেলা থেকে প্রচারণায় এনেছে।

    জন কিরবি – তিনি কী বলেছিলেনঃ
    জন করবি এর ব্রিফিং সাধারণত অনেক লম্বা হয়, সারা দুনিয়ার নানান দেশ প্রসঙ্গ হিশাবে থাকে তাই! তাই এটা ছিল জন কিরবির বিশ পৃষ্টা জুড়ে দুনিয়ার প্রসঙ্গ এর ব্রিফিং এখানে পাবেন ;  তা হলেও ওর ভিতর বাংলাদেশ প্রসঙ্গটা আছে ওর চতুর্থ পৃষ্টায়। পুরাটা ডাউনলোড করে চতুর্থ পৃষ্টায় খুজেন। 

                         NSC Coordinator John Kirby


    জনকিরবি বলছেনঃ

    বাইডেন-মোদি হবু আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ উঠুক বা নাই উঠুক; অথবা এমনকি মোদি সেখানে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে যাই বলেন না কেন –  বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অ্যামেরিকান অবস্থান আগে থেকেই নির্ধারিত। আর তা হচ্ছেঃ আমরা ইতোমধ্যেই পরিস্কার করে বলেছি যে আমরা চাইব বাংলাদেশে একটা ফ্রি ও ফেয়ার নির্বাচন হবে। আর আমরা ভিসা পলিসিতে ট্রাভেল নিষেধাজ্ঞা তো এজন্যই দিয়েছি যাতে কেউ এই ইলেকশনে যা ইচ্ছা তাই না করতে পারে। অতএব এপ্রসঙ্গে এভাবে আমি কেবল আমাদের অবস্থান থেকেই কথাগুলো বলে দিলাম। আর আপনারারো বুঝলেন আমাদের স্পষ্ট অবস্থানটা কী। আর আমরা এব্যাপারে একেবারের পাবলিক সামনে খোলাখুলিও তবে একই সাথে আমরা ভারতীয় সরকারকে তাদের বাংলাদেশ সরকারের সাথে যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সেটা যাই থাক সেনিয়ে চাইলে তাদের কথা বলতেই দিব বা আমাদের শুনাতেও পারবে।

    We have already made clear our desire to free and fair elections in Bangladesh, and you’re right, we adapted our visa policy to restrict travel to individuals who undermine Bangladeshi elections.  So I can only speak for ourselves.  You know where we are.  We’ve been pretty public about that, but we would let the Indian Government talk about their bilateral relations.

    মূল বিষয়টা হচ্ছে আগে বলেছি অ্যামেরিকান ভিসানীতি প্রকাশের পরে ভারত নিশ্চিত হয়ে যায় যে গত ১৫ বছর ধরে হাসিনাকে ক্ষমতায় সমর্থন জুগিয়ে বাংলাদেশ উপর যে জুলুম লুটপাটের রাজত্ব গড়ে যে সমস্ত অসম সুবিধা খেয়ে এসেছিল সেসবের ইতি হতে যাচ্ছে। তারা নিজেরাই লিখছে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের কথিত নির্বাচনে যেসব কান্ডকীর্তির ভোট করে বারবার নিজের ক্ষমতাকে হাসিনা বাড়িয়ে নিয়ে এসেছিলেন তা আর এবার আগামিতে হচ্ছে না। এটাই অ্যামেরিকান ভিসানীতির সবচেয়ে বড় ইম্পিকেশন বা খাঁড়া অর্থ। যেটা ভারত ও হাসিনার উপর ও বিরুদ্ধে সরাসরি প্রয়োগ হতে যাচ্ছে।
    ভারতীয় মিডিয়ায় সকলেই কমবেশি একথা ছাপছেঃ

    Washington’s intention is crystal clear. It has put Prime Minister Sheikh Hasina’s Awami League government on a tight leash to dissuade it from resorting to undemocratic, illegal, and extra-constitutional methods to win the upcoming general elections like the previous rigged elections in 2014 and 2018. But New Delhi, in contrast, wants Hasina to win by any means.    

    তাহলে, এই হলো দুধ আর পানির আলাদা হয়ে যাওয়া। কিন্তু প্রথম আলোর এই এভেলএবেল ফ্যাক্টস টা তুলে আনে নাই। বরং এর উলটা মিথ্যা প্রপাগান্ডাকেই গতকাল সকাল থেকে প্রচার করে গেছে।

    এখন এই প্রথম আলো; এই জার্নালিজম কী টিকে থাকতে পারবে? না পারে?

     

    আপডেটঃ ২৩ জুন ২০২৩ ০১ঃ ৫৪ am

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • চীন ভাইসাবের সমস্যা

    চীন ভাইসাবের সমস্যা
    গৌতম দাস
    ১৬ জুন ২৩  মধ্যরাত  ০০: ০৪
    https://wp.me/p1sCvy-4CP

           আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আমরা প্রস্তুত: চীন। [চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন]

    চীনা এমবেশির ফেসবুক পেজ থেকে গতকাল মিডিয়ার কিছু খোরাক এসেছিল [মুল ইংরাজিটা এখানে]। এরপর সবাই নিজ নিজ মত করে ফোকাস সাজিয়ে সে খবর মিডিয়ায় এনেছে। এর মধ্যে সবাইকে ছাড়ানো ফোকাসে প্রথম আলোও তা হাজির করেছে। তাতে মনে হইয়েছে চীন এবার বোধহয় যেন  হাসিনার বাংলাদেশকে সাথে নিয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে। দুনিয়াকে সব অনাচার থেকে মুক্ত করবে ইত্যাদি এমনই বোধহয় এর শপথ!
    না বাস্তবতা একেবারেই তা নয়। আমরা একসাথে কাজ করব এতটুকু তো বলাই যাই। কিন্তু পরের শব্দটা যখন নীতিগতভাবে, মানে মূলত কমন পলিসিতে তহ্ন একথার একরকম মানে হবে। আর যখন সরাসরি বা আকার ইঙ্গিতে বলা হবে যুদ্ধের বা বলপ্রয়োগের কথা তাহলে সেটা অন্যরকম! অনেকেই চীনাদের কথাটা –  “We stand ready to work together with Bangladesh and other countries to oppose all forms of hegemonism and power politics,…।” কথাটাকে নীতিগত সমর্থনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন নাই। বাইরে নিতে চেয়ে ইঙ্গিত রেখে মানে করেছেন। তাতেই এটা সাংঘাতিক শুনাচ্ছে। খুব সম্ভবত এটাই ভারতের ইচ্ছা যেকারণে প্রথম আলো এসব কথার এক্সট্রিম অর্থের ইঙ্গিত এনেছে।

    কিন্তু কোর ফ্যাক্টস-টা মানে মর্মশাসটা হল, আমেরিকা হাসিনাকে সরাতে পারলে, মোদিকেও সরাতে পারলে এতে লাভের গুড়ের এক বড় অংশ যাবে চীনের পক্ষে আর তা কিছুই না করেই!

    আমাদের উচিত হবে, “একসাথে কাজ” বলতে এইটারে নীতিগত পর্যায়ে রাখা ও বুঝা পর্যন্তই; তা ছাড়িয়ে ফিজিক্যাল যুদ্ধ, বা পাশে দাড়ায় যুদ্ধ এসবের ইঙ্গিত দেয়াটা হল উস্কানি তোলার চেষ্টা – এটা যেন মনে রাখি।

    এখন তাহলে চীন ভাইসাবের সমস্যাটা কীঃ
    চীনের মুখপাত্র অভিযোগ করেছেন, যে আমেরিকা “hegemonism and power politics”করে।
    আচ্ছা, চীনই কী প্রথম বা এবারই প্রথম যে আমেরিকার “hegemonism and power politics” এর নিন্দা করে কথা বলছে বা তুলছে?

    মোটেও না, একেবারেই না। এমনকি ১৯৫৩ সাল থেকে একেবারে আনুষ্ঠানিকভাবে আমেরিকা একাজ করে চলেছে। সেবারই প্রথম সিআইএ বাহিনী পাঠিয়ে ইরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে শাহের রাজতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিল আমেরিকা। এটা দুনিয়া সকলেই জানে শুধু তাই নয়, এটা একালে আমেরিকা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকারও করে নিয়েছে। পরে একালে ২০১৩ সালে এই স্বীকারোক্তি নিয়ে নিউজ রিপোর্ট এখানে CIA admits role in 1953 Iranian coup

    । 
    কিতু তামাশা হল আমেরিকার এসব বিশেষ স্বভাব পরিচয় জানার পরও আজকের চীন [১৯৫৮ সাল থেকে মাওয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে ঢেলে সাজানো যে চীন]  সেও কী সেই আমেরিকার সাথে ঘনিষ্ঠতম সুসম্পর্ক করে নাই; আর সেটা অন্তত ২০১০ সাল পর্যন্ত????
    শুধু তাই না এই চীন-আমেরিকা হানিমুন এমনই হানি-ময় ছিল হবু বাংলাদেশকে বিক্রি করে দিয়ে আমেরিকা-চীন এর সখ্যতা কী তখন ঘোষণা দিয়ে  এরা একসাথে সেসময়ের (১৯৭১) পাকিস্তানের আয়ুব-ইয়াহিয়ার পক্ষ নেয় নাই?
    আর তখন কী আমেরিকা  hegemonism and power politics নীতিতে ছিল না??? আমি নিশ্চিত কোনপক্ষই এটা অস্বীকার করবে না।  এমনকি ২০১০ সালের পর থেকে আজকের আবার আমেরিকা-চীন প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ক্রমশ এটা মুখোমুখি সংঘাতের সম্ভাবনা হাজর করার দিকে যাচ্ছে – এটাই তো বাস্তবতা!

    কাজেই আজকে হঠাত আমেরিকাকে আবার hegemonism and power politics এর কর্তা বলে আবিস্কার কেন? এটা পরিস্কার করে বলা উচিত ছিল চীনা মুখপাত্রের। এটাই সেই ফ্যাক্টস যে আজ আমেরিকাকে আবার hegemonism and power politics এর জন্য দায়ী করে কথা তোলা এটা চীনের এখনকার বাংলাদেশ নীতি! আবার এটাই সত্য কাল যদি আর কোন দৈব দুর্বিপাকে হাসিনা ক্ষমতা হারায় ফেলেন তাহলে আবার তখনও চীনা অবস্থান আবার বদলে যাবে, আর সেটাও স্বাভাবিকই হবে!
    সারকথায় তাহলে মূল বিষয়টা হল চীনা স্বার্থ। এটাই সবক্ষেত্রেই সবকিছুর নির্ণায়ক আর তাই এর মধ্যে আমেরিকা ভাল কী খারাপ কিংবা hegemonism and power politics কিনা সেটা খোজা অর্থহীন।কাজেই বাংলাদেশেও তো রাজনৈতিক ধারাগুলোর স্বার্থ – এর অন্তত দুইটা পক্ষ তো আছে আমরা ধরে নিতে পারি যে তারা হল – “প্রো  আর এন্টি” – হাসিনা। চীন যেমন তার যখন যেমন স্বার্থ সে ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তেমনই  তারাও তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ মোতাবেক অবস্থান নিবে, কোনটাকে সঠিক বা কোনটাকে বেঠিক বলবে! তাই না? এটাই তো স্বাভাবিক!

    কথা আরও আছে খানিকটাঃ
    এই যে চীন আজ হাসিনার পক্ষে দাঁড়িয়ে আমেরিকার hegemonism and power politics বলে খারাচ্ছে [নীতিগতভাবে] – তাতে, চীন নিশ্চয় জানে এটা কোন ক্ষমতার হাসিনা!

    ওয়ান-ইলেভেন বা ২০০৭ সালে বাংলাদেশে যে নয়া (অ্যামেরিকান) ক্ষমতার উদয় হয়েছিল এর সরাসরি সুবিধাভোগী এবং সরাসরি সেই ততপরতার গন্তব্য ও পরিণতিই তো হাসিনা ক্ষমতাসীন হয়ে উঠে যেটা আজ পনেরো বছর ধরে বহাল। এটা কী চীনের অজানা? তা তো নয়। তাহলে সেটাও তো এই আমেরিকারই hegemonism and power politics এর এক সদম্ভ প্রকাশই ছিল। অথচ চীন কী তখন এই আমেরিকারই অথবা আমেরিকার কোলে উঠে ক্ষমতা নেওয়ার জন্য কী হাসিনা সরকারের কোন সমালোচনা করেছিলেন? কোন অ্যামেরিকান hegemonism and power politics তখন চীন দেখতে পায় নাই কেন????

    বরং চীন কী করেছিল?
    ২০১০ সাল থেকেই চীন শুধু হাসিনা সরকারই নয়, পার্টি টু পার্টির কথা বলে আওয়ামী লীগের সাথে বিশেষ সম্পর্ক শুরু করেছিল। ঐ বছরের ঈদের ছুটিতে ততকালীন লীগের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম চীন সফরে গেছিলেন। আর চীন সরকার তক্কে তক্কে ছিল কীভাবে বিশ্বব্যাংকের পাশ দিয়ে হলেও অবকাঠামো ঋণদাতা হিশাবে বাংলাদেশে ঢুকা যায় কিভাবে। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে তা পেতে চীনের (বিশেষত ভারতীয় বাধা পেরিয়ে) ২০১৬ সাল লেগে যায়। কিন্তু কখনই চীন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অ্যামেরিকান হেজিমনির (hegemonism and power politics) সমালোচনা করেই নাই। কেন? হোপ চীন এই সত্যের সাথে একমত হবে।
    তাহলে এখানেও সারকথা হল চীন যেটাকে তখন স্বার্থ মনে করেছিল সেটাই ছিল নির্ণায়ক! তাতে আমেরিকা hegemonism and power politics এর শক্তিধর – সেটা হ্যা কিংবা না তাতে কিছু আসে যায় নাই।

    তাহলে এখন শেষ কথাটা চীনকে শুনতে হবেঃ।
    তাহলে এখন সেই আমেরিকারই একই হাসিনা সরকারের উপর স্যাংশন দেয়া – এটা আসলে কী?

    সম্ভবত বাংলাদেশের মেজরিটি মানুষ বলবে এটা কাফফারা! আমেরিকার ২০০৭ সালে আমাদেরকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত! তবে স্বভাবতই এগুলো আমজনতার ভাষা যারা থিওলজি বা ম্যাটোফোরে [matafor] কথা বলে থাকে তাই! – ঠিক রাজনৈতিক ভাষা বা ভাষ্য হয়ত নয় তা বলতে পারেন!

    তাহলে রাজনৈতিক ব্যাখ্যা বা পরিভাষাটা কী?
    সেটা হল, এখন অ্যামেরিকান স্বার্থ হল এশিয়ায় একটা ওলটপাল্ট বা ঢেলে সাজানো। গত ২৩ বছর ধরে অনুসৃত অ্যামেরিকান এশিয়া নীতি ঢেলে সাজানো। আর এই নয়ানীতিতে বাইডেন প্রশাসন  এখন আর হাসিনাকে আর দেখতে চাইছে না। কেন?

    কম করে বললেও এতে একটা সংযোগ হল ভারত মানে মোদির ভারতের! সেখানেও বাইডেন মোদিকে দেখতে চাইছে না। খাড়া ভাবে (ব্যক্তি বাদ দিয়ে) বললে, গত ২৩ বছর আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল, চীন ঠেকানোতে ভারতকে ব্যবহার করবে বলে। আর এরই মজুরি ছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া।
    কিন্তু এখন সময়টা হল অ্যামেরিকান বদল যাওয়ার –  মানে গত ২০০১ সালে ওয়ার অন টেরর বা এর কিছু আগে যার শুরু হয়েছিল সেই নীতি-পলিসির পল্টে যাওয়া বা পল্টানি শুরু হয়েছে এখন। যখন প্রেসিডেন্ট বুশ ভারত এনপিটি [NPT] এর সদস্য না হওয়া সত্বেও তাকে পরমানুর কাচামাল পাওয়া, পরমানু এনরিচমেন্ট ইত্যাদিয়ে সাহায্য করে ভারতের মন জয় করে বুশের আমেরিকা ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করেছিলেন। কাশ্মীর নির্বাচনি ব্যবস্থা রাজীব থেকে বাজপেয়ি সকলেই ভেঙ্গে দিয়ে কাশ্মীরকে সশস্ত্র আন্দোলনের ভুমি এই নতুন দিকে ঠেলে দিলেন অথচ বুশ এটাকে মুসলমানদেরই দোষ, সশস্ত্রতা – কথিত “জঙ্গীবাদই” সমস্যা বলে সুর মিলিয়েছিলেন সেই সময়ে।

    ঘটনা হল আমেরিকা এখন হায় হায় করছে পুরানা সেই নীতি নেওয়াটা ভুল মনে করছে, সেটা মুখে না বললেও এক্ষণকার পদক্ষেপগুলো তা বলছে। তারা মনে করে ভারতের পিঠে হার রাখার জন্যই ভারত যেন ‘বেয়াদব’ হয়ে গেছে ভুয়া পরাশক্তির দাবিদার হয়ে গেছে। তুলনায় আমেরিকার খুব একটা কোন লাভ হয় নাই। এটাই পরোক্ষে সেসময়ের নীতি-পলিসিটা ভুল বলা হয়ে যাচ্ছে – কারণ তা বলেই না তা এখন বদলে দিতে চাচ্ছে।   তাই এখনকার অ্যামেরিকান লক্ষ্যকে ভারতের শব্দে বললে এটা যেন আমেরিকার “ভারতকে আওকাত শিখানোর” সময় এটা। কথাটা জামা পড়িয়ে বললে এককথায়, এক সাব-অর্ডিনেট বা অধীনস্ত ভারত দেখতে চায় আমেরিকা। যেটা সারকথায় কোন চীন-রাশিয়া-ভারত জোট এর হয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে দাড়াবার হুমকি দিবে না। যদিও আপাতদৃষ্টিতে চীনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভারতের প্রপাগান্ডা যাতে ভারত মানে করে থাকে চীনই তার প্রধান শত্রু – এধরণের কথাই আমরা এখনও দেখছি। কিন্তু অ্যামেরিকান চাপ যত বাড়বে তাতে ভারত চীনের কোলে গিয়ে উঠবে এটাই সবার স্থির অনুমান!

    মোদি বাইডেনের দাওয়াতেঃ
    মজার কথা হল এমাসেই ২১-২৪ জুন  মোদি বাইডেনের আমন্ত্রণে আমেরিকা যাচ্ছেন। সেখানে বাইডেন ভারতকে নিয়ে যেন তোলায় তোলার সুযোগ নিবে; দরদামে নিবদ্ধ হবে।  সারকথায় বাইডেন সম্ভবত মোদিকেই বলবেন, সাব-অর্ডিনেট হয়ে ভারতকে তেমন সাইজে ছোট হয়ে যেতে। না হলে তিনি রাহুলের পক্ষ হয়েই  নিশ্চিত দাঁড়াবেন।
    বিপরীতে মোদি চাইবেন তাকে জিততে দিতে আর জিতবার পর ভারত-আমেরিকা এক কমন স্টাটেজিক দোস্ত হবেই এই ওয়াদা করতে চাইবেন তা যত গভীরে সম্ভব এমনটাই হতে পারবেন তিনি। এমনকি, এটা বলাও বিচিত্র নয় যে মোদি বলবেন বাকি সবদেশের সাথে সম্পর্কের উপর আমেরিকার সাথে সম্পর্ককে তিনি জায়গা দিতে চান ইত্যাদি।
    স্বভাবতই মোদি একবার নির্বাচন করে ফেললে আর মোদিকে আটকানোর কোন সুযোগ আমেরিকার হাতে থাকবে না, তাই বলাই বাহুল্য  যা করার আমেরিকাকে আগেই করতে হবে। কাজেই এই আলাপ থেকে কোন ডিলে বা রফায় এবারে পৌছানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ। প্রায় তা  যাবে না।
    তবে বাইডেনের দিক থেকে এটা মোদিকে একবার শেষ বাজিয়ে দেখা বা নেওয়া যে মোদির দিকে গেলে বাইডেনের জন্য কোন ভাল ডিল ছিল না –  এখন ২৪ জুনের পরে এব্যাপারে বাইডেন নিশ্চিত হয়ে যাবেন হয়ত। এবং দেখা যাচ্ছে বাইডেনের গন্তব্য ক্রমশ  মোদিবিরোধীদের দিকে, মানে  রাহুলের দিকে! এদিকে শেষে যাবে হয়ত!
    তাহলে সেক্ষেত্রে এই পুরা প্রক্রিয়ায় শেষে ভারতের আসল সাইজ সক্ষমতাটা কী সেটাই উদোম হওয়ার দিকেই যাচ্ছে। এভাবে ভারতের সক্ষমতাটা প্রকাশ্য হয়ে যাওয়াটা এতে তো তা চীনের জন্যও কম লাভজনক হচ্ছে না- তাই নয় কী???
    তবে আমার কথা হল, ঘটনাটাক যেদিকেই যাক মোদি বা রাহুল বা মোদিবিরোধী জোট যাদের হাতেই ক্ষমতা গিয়ে শেষে ঠেকুক – ভারতরাষ্ট্র এতে এক্ষণকার চেয়ে মারাত্মকভাবে সক্ষমতায় এক দুর্বল ভারত হিশাবে পরিণত হবেই। ভাই পিঠে হাত রেখেছিল বলে এত দিনকার সব রোয়াবি পরাশক্তির ভাব সব চুপসে যাবে! আর এথেকে পরে পাওয়া চার আনা আসবে বাংলাদেশের পকেটে! এছাড়াও এতে সেই নয়া ভারতও কী চীনের দিক থেকে এক কাম্য-ভারত নয়, হবে না!! অবশ্যই!
    তার মানে আমেরিকার নীতি-অবস্থান চীনের জন্যও লাভজনক হতে পারে!

    তাহলে বাংলাদেশে আমেরিকা যদি কোন প্রায়শ্চিত্য করতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে তাতে চীনের বিরোধী অবস্থান অপ্রয়োজনীয়; বাংলাদেশের কেউ কেউ এরমধ্যে এটা তার পক্ষের মনে করে দাঁড়িয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক, তাই না! সময় দুনিয়ার ঘটনাবলী ঘুর্ণিঝড় ভুমিকম্প ইত্যাদির মত করে অবজেকটিভলি দেখাও খারাপ হয় না!

    শেষকথাঃ
     এবিষয়ে আমার নিজের রিডিং নিয়ে দুটা কথা বলব।
    এক. আমি মনে করি এই মন্তব্য বাংলাদেশ বা হাসিনার নাম ধরে চীন বললেও এর টার্গেট বাংলাদেশ নয়। এর টার্গেট হল গ্লোবাল শ্রোতা এই অর্থে যে যেন বলা যে, চীন নয় আমেরিকাই এশিয়াকে আউলা ঝাউলা [প্লানডার বা plunder] করছে।  তোমরা অযথাই সবকিছুতে চীনকে দোষী করছো [বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির কথা যদি মনে রাখি।]। চ্চীন এটা বলবারই মওকা নিয়েছে – বাংলাদেশ ইস্যু বা এই ইস্যুর মাথায় দাঁড়াবার সুযোগ নিয়ে। কাজেই এসব চীনা কথা বার্তায় বাংলাদেশ ঠিক কোন প্রসঙ্গই না।

    দুইঃ দুনিয়াতে হিউম্যান রাইট ইস্যুটা ইস্যু হতে পেরেছে এই সেদিন, জাতিসংঘের জন্মেরও পরে ১৯৪৮ সালে। তাও কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলো এখনও জাতিসংঘ এর হিউম্যান রাইট বিষয়ক কোন কথায় মানে না আমল করে না; তা মানে না। মূল কারণ কমিউনিস্ট চিন্তায় রাজনীতিতে হিউম্যান রাইট বলে কিছু নাই।  বিপরীতে জাতিসংঘের ভিতরের যেকোন ফোরামে কোনটাই ইস্যু হিশাবে উঠাবে হবে কোনটা হবে না, এসবের চেয়েও বড় কথা কতটা গুরুত্ব দিয়ে কোন ইস্যুকে উঠানো হবে এসব ব্যাপারে আমেরিকা এখনও একলাই রাজা।  সে আগ্রহ দেখালে হবে না হলে কিছুই হবে অথবা দাফনায় দেয়া হবে – এই হল বাস্তবতা! এসবই আমেরিকাকে নির্ণায়কের এক বশাল ভুমিকা দিয়ে রেখেছে। কাজেই যখন আমেরিকা কোন হিউম্যান রাইট ইস্যু তুললে তাতেআমেরিকা যদি নিজের কোন স্বার্থ দেখে কেবল  তখনই সে উঠবে; নইলে দাফন হয়ে যাবে। যেমন দেখেন হাসিনার গুম খুন তো প্রথম পর্বে সবচেয়ে একচেটিয়া ছিল ২০১৬ সাল পর্যন্ত। অথচ সবকিছু আমেরিকার জানা সত্বেও তা কোথাও এক চিলতেও ইস্যু হয় নাই। কারণ আমেরিকা আগ্রহী ছিল না, ইস্যু মনে করে নাই যা তার কাজে লাগবে!  আজ মনে করছে বলেই তো এটা বিরাট ইস্যু! এসব দিক দিয়েই ইস্যুটা বুঝতে হবে।
    আবার উল্টা কথাটা হল, এবারর বাইডেনের আমলে এসে ইইউ শেষ বেলায় বাইডেনের নীতির মধ্যে মিশে গেল। এটা যদি না হত তাহলে কী দেখতাম?
    আমরা দেখতাম ইইউ এর পাঠশালায় চীন হিউম্যান রাইট এর  ক্লাস করছে। এবিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে আমার ২০১৯ সালের পুরানা লেখা এখানে দেখতে পারেন আগ্রহীরা।   এব্যাপারটা দুদুবারের চীন-ইইউ যৌথ ঘোষণাতেও উল্লেখ আছে। কাজেই হিউম্যান রাইট যদি কোন ইস্যুই নয় বা বাজে কথা হয় – তা নিশ্চয় নয়; তাহলে তো চীন ইইউ এর পরামর্শ নিত না। সমস্যাটা হিউম্যান রাইট ইস্যু কী গুরুত্বপুর্ণ ইস্যু নয় না বা তা নিয়ে অন্যদেয়াশ কথা বলতে পারবে সেটাই বরং বাজে কথা। সবাইওই বলতে পারবে। কিন্তু ইস্যু হল বলবে কিনা। আর কোন রাষ্ট্র তখনই বলবে পক্ষে অথবা বিপক্ষে যেদিকে নিজের স্বার্থ দেখব। এই হল বটম লাইন!

    আপডেটঃ ১৬ জুন ২০২৩  ভোর রাত ০১ঃ ৩৭
    আপডেটঃ ১৭ জুন ২০২৩  বিকাল ০৫ঃ ৩৫

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com