Tag: CHINA

  • ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” এর ভিতর বাংলাদেশী টুপি

    ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এর ভিতরে বাংলাদেশী টুপি

    গৌতম দাস

    ২৪ জানুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার

    http://wp.me/p1sCvy-2cx

     

     

     

    আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়ম মোতাবেক গত ২০ জানুয়ারি শপথ নিয়েছেন। শপথ নেয়ার দিন রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে দাঙ্গাহাঙ্গামা প্রতিবাদ বিক্ষোভ যেমন হয়েছে, তেমনি ট্রাম্পের শপথের সব আনুষ্ঠানিকতাও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা ও দায়িত্বভার বুঝে নেয়ার জন্য গঠিত ট্রাম্পের দলবল গত দুই মাসে তাদের সব কাজের মধ্যে একধরনের প্রতিহিংসা মাখানো পদক্ষেপের চিহ্ন রেখেছে। সেই সাথে প্রবল চাপাবাজি, আর প্রপাগান্ডায় সব কাজে “আমরাই শ্রেষ্ট, আমরাই একমাত্র” ধরনের লোক-দেখানো কর্মতৎপরতায় ভরপুর। সেসব আচরণ শপথ নেয়ার সময় পর্যন্ত বজায় ছিল। এমনকি ট্রাম্পের প্রশাসনের হবু উপদেষ্টারা (আমাদের ভাষায় মন্ত্রী) যাদেরকে ট্রাম্প বেছে নিয়েছেন কিন্তু সিনেটের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছেন, তারাও সিনেটের শুনানিতে প্রশ্নের জবাবের সময়ও একই প্রপাগান্ডা, চাপাবাজি আর জনপ্রিয়তাবাদি ভাষায় কথা বলা চালিয়ে গেছেন। যেমন ট্রাম্পের হবু পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (মন্ত্রী) হলেন শীর্ষ তেল কোম্পানী Exxon Mobil Corp এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী রেক্স টিলারসন। তিনি সিনেটের শুনানি চাপাবাজি হুঙ্কার দিয়ে বলছেন সাগরপথে  চীনের প্রবেশপথ “দক্ষিণ চীন সাগরে বিতর্কিত দ্বীপে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না”। কিন্তু কিভাবে তিনি এই আওয়াজ বাস্তবায়ন করবেন তা নিয়ে তিনি বা ট্রাম্পের মুখপাত্ররা কেউ আর মুখ খুলতে নারাজ। ওদিকে এসব ছাড়া ট্রাম্পসহ সবাই এমন একটা ভাব বজায় রেখে কথা বলে গেছেন, যেন ট্রাম্পের আগে রিপাবলিকান বা ডেমোক্রাট নির্বিশেষে ওবামাসহ যত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ছিলেন এরা স্কলে ছিলেন এক একজন বিদেশি শোষক, বিদেশীদের স্বার্থের প্রতীক। বিশেষ করে ওবামা হল ট্রাম্পের বিশেষ টার্গেট। তাই শপথ অনুষ্ঠানের বক্তৃতার শুরুতেই ট্রাম্প বলছেন, “আজকের এই ক্ষমতা হস্তান্তর বিশেষ অর্থপূর্ণ। কারণ দীর্ঘ দিন ধরে আমাদের এক ক্ষুদ্র অংশ রাজধানীতে বসে সব মাখন খেয়েছে। ওয়াশিংটন ঝলমল করে উঠেছে কিন্তু জনগণের সাথে তারা সম্পদ শেয়ার করেনি। রাজনীতিবিদরা উন্নতি করেছেন আর ওদিকে চাকরি হারিয়ে গেছে, ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। এটা একদল আর একদলকে অথবা এক সরকার আর এক সরকারকে ক্ষমতা হস্তান্তর করার দিন নয়। আজ জনগণের ক্ষমতা জনগণকে ফিরিয়ে দেয়ার দিন”। যেন ট্রাম্প হয়ে গেছেন শ্রমিকের দুঃখ বেচে সহানুভুতি জড়ো করা ট্রেড ইউনিয়ন কমিউনিস্ট নেতা। আর টাম্পের সবকথার শেষ কথা হল, “এখন ট্রাম্প নির্বাচিত হয়ে এসে গেছেন, ফলে সব ঠিক হয়ে যাবে”। এ কারণেই যেন তিনি দেখাতে চাচ্ছেন, ওবামার নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক ও কর্মচারীরা যেন খুবই দ্রুত বিদায় নেন, পারলে ওবামা চলে যাওয়ার পরপরই আর তাদের কাউকে দেখা না যায়। তিনি ইঙ্গিত দিতে চান যেন, এরা সবাই গণস্বার্থবিরোধী তৎপরতার প্রতীক । । ট্রাম্পের এই বক্তৃতা শুনে মনে হয়েছে ব্রিটিশ কলোনি আমলে নেটিভ কোনো নেতা বক্তৃতা দিচ্ছে যেখানে ওবামা যেন লর্ড ক্লাইভ। আর ট্রাম্প হলেন জনদরদি একমাত্র দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী।

    এগুলো নিঃসন্দেহে বাড়াবাড়ি রকমের লোকরঞ্জন ততপরতা। ট্রাম্প আর এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ওবামা আমলের যত আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ছিলেন বিশেষ করে যারা পেশাদার কূটনীতিক নন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নিয়োগপ্রাপ্ত, তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দেশ পাঠানো হয়েছিল যেন তারা ২০ জানুয়ারির আগেই বিদেশে চাকরির দায়িত্ব ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। এই নির্দেশনা প্রতিহিংসার উদাহরণ। এই রাষ্ট্রদূতেরা এক-দুই মাস অথবা অন্তত দুই সপ্তাহ স্বপদে বেশি থেকে গেলে তাতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কিছু নেই। আমেরিকার প্রশাসনিক রেওয়াজও এটাই। অর্থাৎ রেওয়াজ ভাঙার অপ্রয়োজনীয় এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ইঙ্গিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে যে- ওবামাসহ পুরনো রাজনীতিবিদেরা সব বিদেশী চর। তাই তাদের ছায়া যেন ট্রাম্পের ওপর না পড়ে। এ নিয়ে অনেক কার্টুন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প একটা বড় খেলনা রঙের পিচকারি বন্দুক নিয়ে ওবামার অফিসে ঢুকে ওবামাসহ সবাইকে তাড়া করছেন, রঙ ছিটাচ্ছেন আর বলছেন অফিস থেকে বের হয়ে যেতে।
    এখানে ট্রাম্পের বক্তৃতা থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্ধারক অংশ হুবহু অনুবাদ হাজির করব যেখানে ট্রাম্পের সস্তা জাতিবাদী বুঝ এবং সুড়সুড়ি কত ভয়ানক হতে যাচ্ছে তা বোঝা যাবে, এ’থেকে। ট্রাম্প বলছেন, “বহু যুগ ধরে আমরা আমেরিকান শিল্পের ঘাড়ে চড়ে বিদেশী শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছি। অন্য দেশের সেনাবাহিনীকে ভর্তুকি দিয়ে পালছি আর আমাদের বাহিনী শুকিয়ে মেরেছি। বিদেশী অবকাঠামোর পেছনে ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছি আর আমেরিকার বেলায় সেগুলো রিপেয়ার না করায় ক্ষয়ে গেছে। আমরা অন্য দেশকে সমৃদ্ধ করেছি অথচ তা করতে গিয়ে নিজেদের সম্পদ, সামর্থ্য, আস্থা সব লোপাট করেছি। একটা একটা করে আমাদের ফ্যাক্টরি ভেঙে পড়ছে, আমাদের উপকূল ছেড়ে গেছে আর আমাদের লাখ লাখ শ্রমিককে বেকার ফেলে রেখে গেছে। আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ঘর থেকে তাদের সব সম্পদ টেনে বের করে সাড়া দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই দিন শেষ। এগুলো এখন অতীত। আমরা এখন শুধু ভবিষ্যতের দিকে তাকাব। আমরা আজ এখানে সমবেত হয়েছি এবং এক ডিক্রি জারি করছি, যা দুনিয়ার সব রাজধানীতে প্রতিটা ক্ষমতার কেন্দ্রে শোনা যাবে। আজ থেকে এক নতুন স্বপ্ন আমাদের ভূমিকে শাসন করবে। এখন এই মুহূর্ত থেকে সবসময় “সবার আগে আমেরিকা, আমেরিকার স্বার্থ”। বাণিজ্য, ট্যাক্স, ইমিগ্রেশন, বিদেশনীতি ইত্যাদি সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তা আমেরিকার শ্রমিক ও আমেরিকান পরিবারের বেনিফিটের দিকে তাকিয়ে নেয়া হবে”।

    এখানে তামাশার দিকটা হল, কমবেশি এই বক্তৃতাটাই এত দিন আমাদের মতো কম আয়ের বিভিন্ন রাষ্ট্রে জাতিবাদী বা কমিউনিস্টরা “আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ”-এর বিরুদ্ধে দিয়ে এসেছে। আজ ট্রাম্প তা নিজ দেশের রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে উগড়িয়েছেন।

    আসলে ট্রাম্প নির্বাচনে দাঁড়ানোর শুরু থেকে পুরো ব্যাপারটাই এমন। যেমন, ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের মূল স্লোগান – “Making America Great Again” বা অনুবাদ করে বললে, “আমাদের আমেরিকাকে আবার মহান বানাব”- এটাই সবচেয়ে বড় চাপাবাজি; অর্থহীন কথাবার্তা। খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসর প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্পের শ্লোগান – এখানে যে গ্রেট বলা হয়েছে, এই গ্রেট মানে কী? কী হলে তা গ্রেট হবে, এর সংজ্ঞাই বা কী? যদি এ শব্দ দিয়ে সম্পদ বা সম্পদের দিক থেকে গ্রেট বোঝানো হয়ে থাকে তবে তিনি এক পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলছেন, ‘১৯৮০ থেকে ২০১৪, মাত্র এই ৩৪ বছরেই আমেরিকার সম্পদ বেড়েছে ২১ গুণ। এর অর্থ আবার আমেরিকান ধনী মাত্র এক শতাংশ, এদের সম্পদের ১৯৪ গুণ বৃদ্ধি পাওয়া। তার অর্থ আমেরিকা গ্রেট ছিল না, এ কথা তো সত্যি নয়। কিন্তু সে আর কত গ্রেট হবে! তাই ধরে নেয়া যায়, সম্পদের চেয়েও ভিন্ন, সম্পদ ছাড়িয়ে আরো বড় কিছুর দিক থেকে গ্রেট হওয়ার কথা ট্রাম্প বলছেন। তা হল, সম্পদের সঞ্চয় নয়, সম্পদের বিতরণ। ওই প্রফেসর বলছেন, এ কথা দিয়ে আসলে ব্যাখ্যা করা যায় ট্রাম্প কাদের পটিয়ে ভোট নিয়েছেন; কলেজ-না-পৌঁছানো যে শ্রমগোষ্ঠী আছে প্রকারান্তরে তাদের কথা বলছেন। যাদের কথা বলছেন তাদের বেলায় হয়ত  কথা ঠিক কিন্তু তাদের জন্য তিনি তা আনতে পারবেন না। কারণ বিষয়টা এত সহজ-সরল নয়।’
    কোল্ড ওয়্যার যুগের সস্তা জাতিবাদী বুঝি। সব ধরনের আমদানি করা পণ্যের ওপর ৪৫ শতাংশ হারে কর আরোপ করলেই সব কিছু আমেরিকায় উৎপাদন করা আবার শুরু হয়ে যাবে এটা বোকার মতো কথাবার্তা। যদি তা-ই হতো তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সত্তর দশকের মধ্যে, এর আগে সুন্দর দিন কাটানোর আমেরিকা ভেঙে গ্লোবালাইজেশনে যাওয়া হয়েছিল কেন? খামোখা? নিজের পায়ে কুড়াল মারার জন্য? আমেরিকা নিশ্চয় বাংলাদেশ নয়। ফলে কে এবং কী তাকে বাধ্য করেছিল? নাকি আসলে প্রলুব্ধ করেছিল?
    আঙুর ফল মিঠা হলেও সময়ে তা হয় উল্টা, আঙুর ফল খাট্টা বলার সময় হয়ে যায় একটা সময়। আপনি অন্যকে বাজারে প্রবেশে বাধা দেয়া মানে, সেও তার বাজারে অন্য পণ্যে আপনাকে প্রবেশে বাধা দেবে। আবার খুব সাবধান, এখানে বাজার বলতে শুধু ‘তৈরী ভোগ্যপণ্যের বাজার’ বুঝানো হয় নয়। ‘বাজার’ মানে আসলে বিনিয়োগপুঁজি, কাঁচামাল, টেকনোলজি, মেশিনারি, শ্রম ইত্যাদি সব কিছুরই বাজার। ‘বাজার’ মানে শুধু প্রান্তিক ভোগ্যপণ্য যা কনটেইনার জাহাজে ভরে আনা-নেয়া করে শুধু তা-ই নয়  – বরং সব কিছুই। এমনকি পুঁজি এবং শ্রমও। ফলে আমেরিকা শুধু সে তার নিজ দেশে বিদেশী পণ্য রফতানি হতে দেবে না, তা বাস্তবে করা সম্ভব নয়। কারণ যে দেশ পণ্য রফতানি করবে সে পুঁজিবিনিয়োগও করবে। এটা ঠেকানো যাবে না সবকিছুই করবে – এর ব্যতয় ঘটানো এক কথায় অসম্ভব। যেমন আমেরিকা সরকারের আয়-ব্যয়ের এক বড় উৎস সরকারি বন্ড। দেশি বা বিদেশিরা এই বন্ড কিনে। আজ যেখানে চীন ও জাপান প্রত্যেকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি (চীনেরটা আরো বেশি) করে বন্ড কিনে রেখেছে, সেখানে পণ্য প্রবেশ বন্ধ করার যুদ্ধ কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব?

    তত্ত্ব দিয়ে এই প্রসঙ্গে আলোচনা অনেক করা যায়। দেখানো যায়, এটা কেন অসম্ভব। তবে এর চেয়ে বরং ট্রাম্পের শপথের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ট্রাম্পের সমর্থক তরুণ যারা নানান রাজ্য পেরিয়ে ট্রাম্পের ‘ভোট দেয়ার বিপ্লবে’ যোগ দিতে ওয়াশিংটনে এসেছিলেন তাদের কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরা যাক। সংবাদ সংস্থা ‘রয়টার্স’ ট্রাম্পের নির্বাচনে নানা ইস্যুতে শুরু থেকেই সমালোচক। বিশেষ করে, ট্রাম্পের ভোটে জয়লাভের পর থেকে যেসব ক্যারিকেচারও স্ববিরোধিতা ফুটে বের হচ্ছে সেগুলো তুলে আনার ক্ষেত্রে। শপথ নেয়ার দিনে রয়টার্সের এমন এক নিউজ হল, ‘ট্রাম্প রেড ক্যাপ’ প্রচার অভিযান নিয়ে। ‘ট্রাম্প রেড ক্যাপ’ বা লাল টুপির ঘটনা হল, উগ্র জাতিবাদী ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বাণীর বাস্তবায়ন করতে যাওয়া হয়েছে লাল টুপি পরে। রয়টার্স ওই তরুণদের টুপি খুলিয়ে দেখাচ্ছে যে, তাদের সব টুপিই বিদেশে তৈরি, হয় বাংলাদেশের, না হয় ভিয়েতনামের, না হয় চীনের। কেন? কারণ ট্রাম্পের টুপি প্রচারাভিযানের মূল প্রপাগান্ডা অফিসে যেসব টুপি বিক্রির জন্য রাখা ছিল ওগুলো খোদ আমেরিকায় তৈরি ফলে এর দাম বেশী, কমপক্ষে ত্রিশ ডলার বা তারও বেশি। কত বেশি? বিদেশী (বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম বা চীনের) টুপির  তুলনায় বেশি, বিদেশী ওই তিন দেশের টুপির দাম বিশ ডলার বা এর নিচে। ফলে স্বভাবতই ঐ প্রচারাভিযানে সবাই সস্তা নামে পাওয়া টুপি পড়েই এসেছে – বাজারের স্বভাব অনুসারে। অর্থাৎ আমেরিকার তৈরি টুপি নিজ সমর্থকেরাই কম পরেছে। এই হলো ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট”-এর তামাশা এবং পরিণতি।

    মনে রাখতে হবে, ট্রাম্পের এই আমেরিকাই গত সত্তরের দশক থেকে দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশন যেতে বাধ্য করেছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক-আইএমএফ আমাদেরকে নিজ বাজারের রক্ষণশীলতা ছেড়ে গ্লোবালাইজেশনে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাপাচাপির মাধ্যমে বাধ্য করে এসেছিল। আজ ট্রাম্প নিজেই গ্লোবালাইজেশন ছেড়ে উলটা সংরক্ষণবাদিতা বা প্রোটেকশনিজমে যাওয়ার কথা বলছেন।

    আজ সোজা কথাটা হল, গ্লোবাল বাণিজ্য বেচাকেনা বিনিময়ের মাধ্যমে একটা পরস্পর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়ে গেছে এবং তা যে স্তরে যে জায়গায় চলে গেছে, এ থেকে আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া কঠিন। চাল-ডাল মিশে গেলে যেমন এগুলোকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেয়া কঠিন। ট্রাম্পের জয়লাভের পর গত দুমাসে গ্লোবাল অর্থনীতির সমন্বয় আর গ্লোবাল বাণিজ্যবিষয়ক দু’টি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। প্রথমটা ল্যাটিন আমেরিকার পেরুর লিমা শহরে ‘এপেক’ (বাণিজ্য) সম্মেলন। আর দ্বিতীয়টা সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলন, যেটার অংশগ্রহণকারি গ্লোবাল। তবে দুটোতেই সুর পরিষ্কার, আমেরিকা সংরক্ষণবাদী হতে চাইলে তাকে পেছনে ফেলে বা উপায়ান্তে তার হাত ছেড়ে দিয়ে হলেও চীনের নেতৃত্বেই দুনিয়া গ্লোবালাইজেশনে এগিয়ে যাবে। যেতে হবে। জাপান ট্রাম্পের ওপর হতাশ হয়ে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে চাচ্ছে। চীন-ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক উষ্ণ হতে যাচ্ছে। দুনিয়া সাজানোর সব হিসাব নতুন করে সাজতে বাধ্য। আসলে বিষয়টা হল- গ্লোবাল বাজার নিজের শেয়ার বাড়ানোর, নিজ বাজার সংরক্ষণের নয়।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [লেখাটা এর আগে গত ২২ জানুয়ারী ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে যেকোন যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

  • ট্রাম্পের টুইট – তাঁর নিউক্লিয়ার জ্ঞান

    ট্রাম্পের টুইট – তাঁর নিউক্লিয়ার জ্ঞান

    গৌতম দাস
    ০৫ জানুয়ারি ২০১৭,  বৃহষ্পতিবার

    ট্রাম্পের টুইট – তাঁর নিউক্লিয়ার জ্ঞান

    রাজনীতিবিদ অথবা সরকারপ্রধান বা মন্ত্রীদের আজকাল সোস্যাল মিডিয়াতে পাওয়া খুবই সহজ বিষয় হয়ে গেছে। বিশেষ করে রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট অনেক খ্যাতিমানেরা প্রায়ই টুইটার ব্যবহার করেন। তুলনায় তারা অবশ্য ফেসবুকে কমই আসেন। তাদের টুইটার ব্যবহারে বেশি আগ্রহের মূল কারণ সম্ভবত টুইটারের ১৪০ অক্ষরের সীমা। এমন কোন সীমা ফেসবুকে নাই। টুইটারে অক্ষরের সীমা থাকার কারণে ফেসবুক থেকে এর বৈশিষ্ট অনেক দিক থেকে আলাদা হয়ে গেছে। যেমন- প্রথমত, এটাকে ব্লগ থেকে পৃথক ক্যাটাগরি ‘মাইক্রো-ব্লগ’ বা ছোট ব্লগ বলে আলাদা করা যায়। দ্বিতীয়ত, যে কথা লিখা হবে তা আগে চিন্তা করে গুছিয়ে এরপর লিখতে হবে। তবেই অল্পে কথা হবে। ফলে টুইটারের লেখা সাধারণত কম্প্যাক্ট হয়। তৃতীয়ত, টুইটার ইন্টারেকটিভ নয়, মানে মন্তব্য কথোপকথন এর মত করে সে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করে তৈরি করা হয়নি। এই অর্থে টুইটারকে আসলে ওয়ান ওয়ে বা একপক্ষীয় মিডিয়া বলা যায়। টিভির মতো যে একাধারে নিজে বলেই যায়, শ্রোতাকে বলতে দেয় না। এ দিকে অবশ্য এটাও ঠিক, সেলিব্রিটি বা খ্যাতিমানেরা কাউকে বলতে দিতে চান না, কেবল শোনাতে চান। আর তাদের শোনার সে সময় কই?
    এভাবে টুইটারের বৈশিষ্ট নিয়ে আরো অনেক পয়েন্ট লেখা যায় হয়ত। থাক সে কথা। আসল কথা হল – ১৪০ অক্ষর। ফলে এখানে অল্প লিখে ফাঁকি দেয়াও যায়। কিন্তু টুইটারের বিষয়ে আলাপ তুললাম কেন? আর তার সাথে ফাঁকির কী সম্পর্ক? সম্পর্কের নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। টুইট লিখলে যেহেতু কম কথা লিখতে হয়, ফলে লেখার সাথে আবার কোনো ছোট বা বড় ব্যাখ্যা লিখতে হয় না ফলে পাঠল কেউ আশা করে না। কারণ ব্যাখ্যা লেখার সুযোগ বা জায়গা নেই। এ এক বিরাট অজুহাত। ফলে যা লিখছি এর ব্যাখ্যা জানি আর না-ই জানি, তা ব্যাখ্যা করার দরকার হয় না বলে অজ্ঞদের জন্য টুইট খুবই কাজের জিনিস। না, আমি এটা বলছি না যে- যারা টুইট করেন তারা সব অজ্ঞ। তবে বলছি, অজ্ঞদের টুইট লেখার বিশেষ সুযোগ আছে।
    ডোনাল্ড ট্রাম্প নিউক্লিয়ার বা পারমাণবিক যুদ্ধের অস্ত্র বিষয়ে একটি টুইট লিখেছেন এভাবেঃ “The United States must greatly strengthen and expand its nuclear capability until such time as the world comes to its senses regarding nukes”। এখান থেকে আমার অনুমান অচিরেই হয়ত বেইজ্জতি এড়াতে ট্রাম্পকে টুইট লেখা বন্ধ করে দিতে হবে। কেন?
    টুইটের বক্তব্য বাংলা করে লিখলে হবে, “আমেরিকাকে অবশ্যই বেশ বিশাল করে তার নিউক্লিয়ার সক্ষমতা শক্তিশালী ও বৃদ্ধি করা উচিত, ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না দুনিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র সম্পর্কে হুঁশ আসে।” – এই ছিল বিদ্যাধর ডোনাল্ড ট্রাম্পের টুইট – ১৪০ অক্ষর।
    অনুবাদ লেখকের; যারা মূল খবরের উৎস থেকে পড়তে চান তারা দুই দিন আগে ২২ ডিসেম্বরের রয়টার নিউজ এজেন্সির রিপোর্ট দেখে নিতে পারেন। ট্রাম্পের টুইটের কয়েক ঘণ্টা পরই ওই রিপোর্ট লিখে প্রকাশিত হয়েছিল।

    সময়ের বিচারে দুনিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্রের ইতিহাস বা আয়ু খুবই স্বল্প। যুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে দুনিয়াতে এর প্রথম জোড়া ব্যবহারটাই শেষ ব্যবহার হয়েছিল। আর স্বল্প তিন দিনের গ্যাপে এই জোড়া ব্যবহার, দুটোই ঘটেছিল জাপানের ওপর; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট আমেরিকার হাতে এই তিন দিনের ব্যবধানে। তাও সেটা ওই যুদ্ধে শত্রু জাপানের বিরুদ্ধে আমেরিকার জয়-পরাজয় নির্ধারণের জন্য নয়, বরং জয় নিশ্চিত হয়ে গেলে পরেও, এ সুযোগে বোমা ব্যবহারের পরীক্ষা করে এর পরিণতি জেনে রাখার জন্য করা হয়েছিল। আর তাতেই – এর মারাত্মক ভয়াবহতা যা বোঝাবুঝি তা শেষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের চতুর্থ টার্মের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন হ্যারি ট্রুম্যান। ১৯৪৫ সালের জানুয়ারি মাসে চতুর্থবার প্রেসিডেন্টের শপথ নেয়ার কয়েক মাসের মধ্যে, ১২ এপ্রিল ১৯৪৫ রুজভেল্টের স্বাভাবিক মৃত্যু হলে পরে ওই দিন থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ৩৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। আর এর প্রায় চার মাসের মাথায় ঐ ৬ আগস্ট ও ৯ আগস্ট ১৯৪৫ ট্রুম্যান জাপানের ওপর পারমাণবিক বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত দেন এবং তা পালিত হয়।

    কিন্তু এরপরই হ্যারি ট্রুম্যান মূলত এই বোমা ব্যবহারের বিরোধী হয়ে যান। যদিও কোরিয়া যুদ্ধে (১৯৫০-৫৩) আমেরিকার জড়িয়ে যাওয়ার পটভূমিতে ১৯৫০ সালের ৩০ নভেম্বর এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রশ্নের মুখে তাকে স্বীকার করতে হয় যে ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের জন্য তৈরি’। কিন্তু পরের বাক্য যোগ করে তিনি বলেন, ‘এই অস্ত্র দ্বিতীয়বার তিনি ব্যবহার করতে চান না’। এটাকে ‘এক ভয়ঙ্কর অস্ত্র’, এটা ‘কারো ব্যবহার করা উচিত না’ বলে কথা শেষ করেন। আর ১৯৫৩ সালে ১৫ জানুয়ারি (তিনি দুই টার্মে প্রেসিডেন্ট ছিলেন) কংগ্রেস বা আমেরিকান সংসদে তার বিদায় ভাষণে যিশুর নামে কসম কেটে তাকে কৃতকর্মের পক্ষে সাফাই-মূলক প্রচুর কথা খরচ করতে হয়। কেন তিনি পারমাণবিক বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন এর একটি দুর্বল সাফাই তার ছিল। যেমন- “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকানোর জন্য” নাকি তাকে এটা করতে হয়েছিল। এ ছাড়া আর এক দুর্বল সাফাই ছিল তাঁর যে, ইতোমধ্যে আমেরিকার বোমা ফেলার আট বছর পার হয়ে গেছে ইতোমধ্যে অন্যান্য রাষ্ট্রও (ব্রিটেন ১৯৫২, সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৯) এমন বোমার অধিকারী হয়ে গেছে। অর্থাৎ তিনি আর একা দোষী নন যেন এটাই বুঝে নিতে বলছিলেন। আর সেই সাথে তিনি বুঝেছিলেন তার সাফাই যথেষ্ট নয়। আর তাই প্রকারান্তরে তা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘স্টার্টিং আ অ্যাটমিক ওয়ার ইজ টোটালি আনথিঙ্কেবল ফর এ র‌্যাশনাল ম্যান’। বাংলা বললে, ‘যুক্তিবুদ্ধিতে চলা মানুষের পক্ষে একটা পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু করা অচিন্তনীয়’। মডার্ন যুগ মানে, আধুনিক রাষ্ট্র-কায়েমের কালে আধুনিক দুনিয়ায় পশ্চিমের পৌঁছানোর পর থেকে, সেই সমাজের মাপকাঠিতে ‘র‌্যাশনাল’ মানুষ মানে আল্লাহর ভয় থাকুক আর না-ই থাকুক কিন্তু ‘সর্বোচ্চ যুক্তিবুদ্ধিতে হুঁশজ্ঞানওয়ালা মানুষ’ মনে করা হয় যাকে।
    পরবর্তীকালে ১৯৬০ সালের মধ্যে চীন আর ফ্রান্সসহ আমেরিকা, ব্রিটেন আর সোভিয়েত ইউনিয়ন এই মোট পাঁচ রাষ্ট্র পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়ে যায়। যদিও ট্রুম্যান সেই ১৯৪৬ সাল থেকেই জাতিসঙ্ঘের অধীনে এই অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিষিদ্ধ করার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু অন্য চার রাষ্ট্র বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়ন তাকে বিশ্বাস করেনি। করার কারণও ছিল না। কারণ ট্রুম্যানের প্রস্তাবের মূল সমস্যা ছিল, তিনি এমন প্রস্তাব দিচ্ছেন যখন ইতোমধ্যে আমেরিকা বোমা প্রস্তুত ও ব্যবহারকারী এবং সব টেকনিক্যাল ও ব্যবহারিক ডাটা একমাত্র নিজ রাষ্ট্রের হেফাজতে। ফলে তিনি সব রাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়েই আছেন। মানে সে বাদে ওই পাঁচ রাষ্ট্র একেবারে বোমা হাসিল করে আমেরিকার সমান হওয়ার আগে এই বোমা নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণের পথ ধরা সঠিক মনে করার কোনো কারণ নেই। ইতিহাসে পাওয়া যায়, এ দিকটাও ট্রুম্যান প্রশাসনের মন্ত্রী-উপদেষ্টারা চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু তারা নিজেরাই বিভক্ত হয়ে পড়েন এভাবে যে, একদল সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে এই টেকনোলজির সব কিছু শেয়ার করার পক্ষে ছিল। অন্য পক্ষ মনে করে- সব কিছু শেয়ার করার পর এই বোমা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবে সোভিয়েতরা যদি উল্টে যায়, আমেরিকা যদি প্রতারিত হয় তাহলে কী হবে? সারকথায় বিশ্বাসের অভাব ছিল মারাত্মক। এ ছাড়া প্রত্যেকে বোমা হাতে পেলেই (মানে আসলে টেকনোলজি করায়ত্ত হওয়া) একমাত্র আমেরিকার সমান হবে এই ভাবনার কারণে বোমার নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার জন্য সমঝোতা হয়নি।
    কিন্তু তবু প্রস্তাব চালাচালি অব্যাহত ছিল। যেমন ট্রুম্যানের পরের প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ারও ১৯৫৩ সালের সাধারণ পরিষদের বক্তৃতায় প্রস্তাব রেখেছিলেন। ১৯৫৪ সালে লিখিত প্রস্তাবও রেখেছিলেন। তবে দুনিয়াব্যাপী পারমাণবিক বোমাবিরোধী মনোভাব বাড়ছিল। এটা ধরা পড়ে ১৯৫৮ সালে সারা দুনিয়ার ১০ হাজার বিজ্ঞানী একসাথে স্বাক্ষর করে জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারির দৃষ্টি আকর্ষণ করে এক আবেদন পাঠিয়েছিলেন। তবে ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেই বোমার অধিকারী হয়ে যাওয়াতে আর অনেক নিগোসিয়েশনের পর ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে প্রথম জাতিসঙ্ঘের অধীনে বোমা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ‘আন্তর্জাতিক অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন’ গঠিত হয়। এরপরও প্রায় ১০ বছর পরে ১৯৫৮ সালে প্রথম সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা পারমাণবিক বোমাবিরোধী আন্তর্জাতিক সমঝোতা চুক্তি এনপিটি বা নন প্রোলিফারেশন ট্রিটি তে স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুসারে এটা ২৫ বছর পরে রিভিউ হওয়ার কথা ছিল। ১৯৯৫ সালে এটা আবার রিভিউ হয়ে নতুন করে গৃহীত হয়। এবং সংযোজিত আর এক নতুন চুক্তিতে আরো পোক্ত হয়। এবার শুধু বোমা বানানো নয়, পারমাণবিক বোমা পাওয়ার লক্ষ্যে ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বোমা বানিয়ে বাস্তবে টেস্ট করাও নিষিদ্ধ করার চুক্তি ‘সিটিবিটি’ নতুন সংযোজন হিসেবে এবার এটাও স্বাক্ষরিত হয়। অবশ্য ১৯৯১-৯২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া ও কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তি এ ক্ষেত্রে এসব চুক্তি করতে পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করেছিল। ওদিকে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর বাইরে বোমা বানানোতে নিজে স্বীকৃত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভারত পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া যুক্ত হয়েছে। ভারত ১৯৭৪ সালে, পাকিস্তান ১৯৯৮ সালে সফল পরীক্ষাকারীর দলভুক্ত হয়। গত ১৯৯৮ সালে ভারত নতুন করে বোমা বানিয়ে সফল পরীক্ষা করার পর ক্লিনটনের আমেরিকা ভারতের ওপর অবরোধ আরোপ করেছিল। একইভাবে পাকিস্তানের ওপরও। কিন্তু এখনো এনপিটিতে স্বাক্ষর না করা রাষ্ট্র হিসেবে ভারত-পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া বহাল আছে। যদিও এই টেকনোলজি ও ম্যাটেরিয়াল পাওয়ার ক্ষেত্রে সরবরাহকারী রাষ্ট্রগুলোর ক্লাব নিউক্লিয়ার সাপ্লাই গ্রুপ (বা এনএসজির) সভায় ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তাদের শর্ত আরো কঠিন হয়ে আছে।
    সারসংক্ষেপে এটাই পারমাণবিক বোমার জন্ম ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ ইতিহাস। বললাম কেন? বললাম এ জন্য যে ট্রাম্প এক টুইট করে এই ৬৬ বছরের ইতিহাস মুছে ফেলে আবার যেন ১৯৫০ সালে আমেরিকায় ফেরত যেতে চান, তা-ই বলছেন। তিনি আমেরিকার নিউক্লিয়ার সক্ষমতা শক্তিশালী ও বৃদ্ধি করা দরকারের কথা অবলীলায় মাত্র ১৪০ অক্ষরের মধ্যে খুবই সহজে সেরে ফেলেছেন। এটা তাদের দ্বারাই সম্ভব, যারা পারমাণবিক বোমার জন্ম ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পৌঁছানোর ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ। কারণ অজ্ঞদের সুবিধা সবার চেয়ে বেশি। আমরা কল্পনা করতে পারি, এক খোশমেজাজি পার্টির কথা, যেখানে রাজনীতিবিদ বন্ধুদের সাথে সহপাঠী ব্যবসায়ী বন্ধুদের অনেক দিন পরে দেখা হয়েছে। তো ব্যবসায়ী বন্ধুরা যেভাবে সহজেই সরকার চালানো বন্ধুদের বিভিন্ন ইস্যুতে সবক দিয়ে থাকে তেমনই আর কী! যেন বলছে ও তোরা ওমুক জিনিসটা কন্ট্রোল করতে পারলি না? আমাকে একবার প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে দে, দেখো আমি দুই দিনে করে সব ঠিক করে দেখাচ্ছি!
    এমন কথা আমরা অনেকেই বলতে শুনেছি ও দেখেছি। অন্তত ‘এক দিনের মুখ্যমন্ত্রী’ এই কল্পনায় তৈরি হিন্দি সিনেমা ‘নায়ক’ দেখেছেন অনেকেই। তখন একজন ট্রাম্প হওয়া সহজেই সম্ভব। কিন্তু যেসব ইস্যু দুনিয়ার রাষ্ট্রস্বার্থগুলোর নানা লড়াই-ঝগড়া আর আপসের ফলাফলে সবসময় নির্মিত হয়ে চলে এগুলো নিয়ে তুড়ি বাজিয়ে পার্টিতে সমাধান বাতলানো তখনই সম্ভব, যখন আমরা ইতিহাসের ঘটনাবলি সম্পর্কে বেখবর থাকি। কারণ অজ্ঞতা এক বিশাল বাড়তি সুবিধা দেয়। কিন্তু ব্যবসায়ী ট্রাম্প যে এখন আর কোনো পার্টির চাপাবাজ নন, বাস্তবেই তিনি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট? তাহলে এখন কী হবে?
    ওপরে যে পারমাণবিক বোমার ধারাবাহিকতা আমরা দেখেছি তা আসলে এ বোমার উদ্ভব, তৈরি, ব্যবহার এবং পরিণতিতে এর ভয়াবহতা বোঝার পর সেই ১৯৪৫ সাল থেকে এ টেকনোলজিকে নিয়ন্ত্রণ এবং পরে সম্পূর্ণ বন্ধের দিকে গেছে। এখন এ গ্রাফের ঝোঁক হলো এ টেকনোলজি লুপ্ত করে ফেলা। এটা এ ইতিহাস দেখে যে কারো বোঝার কথা। আমেরিকার মতো দেশের যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন তার কী এতটুকু আক্কেলজ্ঞান নেই, যে টেকনোলজি গ্লোবাল ঝোঁক লুপ্তপ্রায়ের দিকে তাকে আবার জাগাতে চাওয়াটা কী সম্ভব, না করা উচিত? যেখানে এমনকি এ টেকনোলজির বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারও জার্মানি ও জাপানের মতো দেশ ২০২৫ সালের পর সম্পূর্ণ বন্ধ করার পরিকল্পনা করে ফেলেছে সেখানে এ টেকনোলজির ‘সক্ষমতা শক্তিশালী ও বৃদ্ধি করা উচিত’ এ কথা কী করে একজন হবু প্রেসিডেন্ট বলেন?
    প্রেসিডেন্টের মুখ ও লিখিত নির্দেশ কোনো (পার্টির চাপাবাজি ধরনের) বেফাঁস কথা বলে বিপর্যয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করা খুব সহজ। কারণ প্রেসিডেন্টকে সাহায্য করতে প্রত্যেক বিষয়ে অজস্র মন্ত্রী-উপদেষ্টা এক্সপার্ট নিয়োগ দেয়া থাকে। তাদের ব্রিফিং সব নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। কিন্তু টুইট করা? প্রেসিডেন্ট উপদেষ্টার পরামর্শ নিয়ে টুইট করবেন? না এটা খুবই হাস্যকর। কিন্তু কী আর করা। রয়টার জানাচ্ছে, এখনই ট্রাম্পের নিয়োজিত এক মুখপাত্র আছে। যাকে নিয়মিত মিডিয়ার চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। কারণ বোকা বোকা টুইট লিখে ট্রাম্প যেন খুব মজা উপভোগ করেন। মজার খেলা একটা তিনি পেয়েছেন আর ওদিকে মুখপাত্রের প্রাণ যায়। রয়টার্স বলছে, ওই মুখপাত্র নানাভাবে ট্রাম্পের টুইট খেলাকে গুরুগম্ভীর দিকে অর্থ টানার কসরত করেই চলছেন। তিনি এবার বলেছেন, ট্রাম্পের ওই টুইটকে যেন ‘এ বিষয়ে আমেরিকার কোনো নতুন পলিসি বদল হিসেবে কেউ না দেখে, প্লিজ’। আচ্ছা এ কথাটাই কী ট্রাম্প মজা করা এক বালক মাত্র, তাই বলছেন না?
    এখন একটাই পথ বাকি আছে। ট্রাম্প যদি টুইট করা বন্ধ না করেন, তবে শপথ নেয়ার পরের কয়েক মাসের মধ্যে তিনি ইজ্জত নিয়ে টানাটানির মুখোমুখি হবেন, সম্ভবত।
    ওদিকে ট্রাম্পের এ টুইটের বক্তব্য স্ববিরোধী। তিনি বলছেন, একালে আমেরিকার আসল শত্রু ‘টেররিজম’। ফলে কোল্ড ওয়ারে শত্রুতা সোভিয়েতের কথা ভেবে এখনো ন্যাটো টিকিয়ে রাখা অপ্রয়োজনীয়। এ ছাড়া জার্মানিতে বা জাপানের মতো যেখানে এখনো আমেরিকান মিলিটারি ব্যারাক আছে, তাদের খরচ নিজ নিজ রাষ্ট্র বহন করুক। তাহলে সেই ট্রাম্প আবার পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জা বাড়ানোর পক্ষে কথা বলেন কী করে? পোলাপান কখন কী করলে সে যে মজা পায়, সে নিজেও জানে না! তাই কী?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ২৫ ডিসেম্বর অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার এডিট করে আবার ছাপা হল।]

  • ট্রাম্পের তাইওয়ান ফোনালাপ, কেন তা সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত

    ট্রাম্পের তাইওয়ান ফোনালাপ, কেন তা সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত

    ট্রাম্পের তাইওয়ান ফোনালাপ, কেন তা সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত

    গৌতম দাস

    ২১ ডিসেম্বর ২০১৬ বুধবার

    ট্রাম্পের তাইওয়ান ফোনালাপ, কেন তা সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত

     

    আমেরিকার প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী মাসে ২০ জানুয়ারি পরবর্তি চার বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন। এই চার বছর পৃথিবীর ইতিহাস রুটিন ইতিহাস না হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। বরং মনে হচ্ছে, বিরাট উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলিতে পরিপূর্ণ হতে চলেছে। সে সম্ভাবনা এতই প্রবলতর হচ্ছে যে, যদি না মাঝপথে প্রেসিডেন্টকে ইমপিচের মতো কোনো ঘটনাতে সব কিছু থামিয়ে পথ বদলে যায়, তবে আমাদের পরিচিত দুনিয়া ও দুনিয়ার পরিবর্তন যেভাবে ও ধাপে ঘটে বলে আমাদের ধারণা বা অনুমান আছে, তা এবার ভেঙে যাবে। দুনিয়া অপরিচিত হয়ে উঠবে। এসব সম্ভাবনা বাড়ছে তো বাড়ছেই। ট্রাম্পের উত্থানের ফলে এমন উদাহরণ ও প্রমাণ হিসেবে অনেক ঘটনাই উল্লেখ করা যায়। আজ এখানে তেমনই এক বিষয় বা ইস্যু –  ট্রাম্প ও তাইওয়ানের চলতি প্রেসিডেন্টের (Tsai Ing-wen) ফোনালাপ নিয়ে আলোচনা করব। (more…)

  • বাংলাদেশের সাবমেরিন কেনায় …………

    বাংলাদেশের সাবমেরিন কেনায় …………
    গৌতম দাস
    ০৬ ডিসেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

    বাংলাদেশের সাবমেরিন কেনায় …………

    বাংলাদেশ সর্বপ্রথম দুটা সাবমেরিন কিনে নিজের প্রতিরক্ষা নৌবহর সক্ষমতাকে কিছুটা ওপরের স্তরে উন্নীত করেছে। এগুলো চীননির্মিত। বাংলাদেশ তুলনায় ছোট অর্থনীতির মানে, তুলনা বিচারে স্বল্প রাজস্ব আহরণের রাষ্ট্র। এমন রাষ্ট্র যে বিপদে থাকে, তা হল নিজের  প্রাকৃতিক সম্পদ ও সীমানা সুরক্ষা ও সংরক্ষণ করতে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম স্থায়ী সেনাবাহিনীর চাহিদা-খরচ পূরণে সব সময় টানাটানির মধ্যে থাকে। একারণে অর্থনীতি বড় ও সমৃদ্ধ হবার সাথে সাথে রাজস্ব আয় বাড়ে আর বহু জট খুলার রাস্তা দেখা যায়। সামরিক বাজেট বড় করার সক্ষমতা বাড়ে, পুরানা চাপাপড়া অভাব মিটানোর সক্ষমতা হাজির হয়। এছাড়া অর্থনীতি বড় হলে শত্রুও বাড়ে – সযন্তে রক্ষা করা মত নতুন অনেক স্টাটেজিক স্বার্থ (যেমন,  সমুদ্রপথে পণ্য আনা-নেয়ার প্রবেশপথ সুরক্ষা, সমুদ্র চলাচলের খোলা-জলরাশি (blue water) অবাধ রাখা ইত্যাদি) জলন্ত হাজির হয়ে যায় ফলে নতুন অর্থনীতিক সক্ষমতাসহ সবকিছুর সুরক্ষা এক বাড়তি প্রতিরক্ষা চাহিদা উপস্থিত হয়। এসব বিষয় নিয়ে আমাদের ইন্টেলেক্ট বা চিন্তাভাবনার জগত আস্তে আস্তে লায়েক হচ্ছে। আগের মত “আমাদের সেনাবাহিনীর কী দরকার” ধরণের  যে যেটা বুঝে না তা নিয়ে ফালতু কথা বলার চেষ্টা একেবারেই বন্ধ হয়ে না গেলেও অন্তত নিজেদের অযোগ্যতা খামতি অনেকেই বুঝতে পারছে বলেই মনে হয়। আবার সেনাবাহিনী প্রসঙ্গে এই বয়ান যে কোল্ড ওয়ারের কালে আমেরিকার বিরুদ্ধে সোভিয়েত প্রপাগান্ডা বৈ অন্য কিছু ছিল না, বিষয়টা যে নিজের বিচারবুদ্ধি খরচ করে বুঝবার বিষয় তা সম্ভবত অনেকেই ইদানিং হুশে আসছেন। যদিও ব্যারাক-ভিত্তিক বাহিনীই প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তার একমাত্র উপায় নয়, জনগণ ও সেনাবাহিনীর দূরত্ব ঘুচানোর ভালো উপায় কী অথবা প্রতিরক্ষায় খরচ কতটা করা উচিত, তা কী কাজে লাগে ইত্যাদি নিয়ে প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় এখনও তর্ক-বিতর্ক আছে। তা পাশে সরিয়ে রেখেও বলা যায়- বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ ও সীমানা রক্ষার জন্য উপযুক্ত সরঞ্জামনির্ভর একটা বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা সবাই স্বীকার করবেন। ব্যাপারটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোয়, যাদের তা দেখে বোঝার কথা, তারা বুঝে গিয়েছিলেন- বিশেষ করে বিগতকালে বার্মা বা মিয়ানমারের সাথে আমাদের স্থলসীমান্তে টেনশন এবং সমুদ্রসীমানায় আমাদের অংশে ২০০৮ সালে মিয়ানমারের তেল অনুসন্ধানের কার্যকলাপে বাংলাদেশে বাধা দেয়ার সময় থেকে। ফলে অন্ততপক্ষে মিয়ানমারের সাথে পেরে ওঠার পর্যায়ে আমাদের বাহিনীগুলোকে উন্নীত করা একটা তাগিদ তখন থেকে ছিল। ইতোমধ্যে সমুদ্রসীমানা নিয়ে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে বিরোধ জাতিসঙ্ঘে নিষ্পত্তি হয়েছে বলে এখন বলা হচ্ছে, এতে স্থলভাগের চেয়েও দ্বিগুণ বড় সমুদ্র-অঞ্চল এখন বৈধ আন্তর্জাতিক সীমানা হিসাবেই আমাদের ভাগে এসেছে। এগুলো বুঝেশুনে নেয়ার ও অন্তত ধরে রাখার কাজ সম্ভব করতে গেলে উন্নত নতুন স্তরে সশস্ত্রবাহিনীগুলোকে সাজানো খুবই প্রয়োজন। আরেক তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখযোগ্য দিক – বিকশিত হওয়া নতুন ঘটনা হল, বঙ্গোপসাগর নিয়ে আমেরিকা-চীন-ভারতের কাড়াকাড়ির টেনশন দিন দিন বাড়ছে। অনুমান করা যায়, সামনে আরো বাড়বে। এতে কারো দিকে ঝুঁকে না পড়া, কোনো পক্ষ না নিয়ে নিরপেক্ষ থাকতে হলেও আর শুধু নিজের সীমানা রক্ষা করতে গেলেও ন্যূনতম সামরিক সক্ষমতা থাকা জরুরি। ফলে অনুমান করাই যায়, এসব প্রয়োজন পূরণের পরিকল্পনার অংশ হল সাবমেরিন কেনা। আর একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমাদের প্রতিরক্ষা নীতি তা যতই অস্পষ্ট থাক না কেন তা আসলে কাউকে যেচে আক্রমণাত্মক নয়, নিজেকে সুরক্ষামূলক।
    কিন্তু ভারত-চীনের সম্পর্ক নিয়ে ভারতের মিডিয়া সব সময় আধা সত্য-মিথ্যা মেশানো তথ্য আর উগ্র দেশপ্রেমের সুড়সুড়ি দিয়ে সবসময় ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে খামাখা উত্তেজিত করে রাখে। কারণ এগুলোই তাদের ভোটের বাজারকে প্রভাবিত করার দিক থেকে খুবই ‘গুরুত্বপূর্ণ’ উপাদান। অনেক সময়, এই ভোট-বাজারে দেখিয়ে বেড়ানোর নির্বাচনী স্বার্থে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বহু মন্ত্রী পর্যায়ের সফরও ঘটানো হয়। সীমান্তে যুদ্ধাবস্থার ভাব টেনশন তৈরি করা হয় ইত্যাদি। ঠিক তেমনি, আমাদের সাবমেরিন ডেলিভারি পাওয়ার পর এর সাথে সম্পর্কিত ঘটনা নাকি ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পাররিকর এর এবার বাংলাদেশ সফর। ভারতীয় বিশ্লেষকেরাই বলছেন, এমন সফর নাকি স্বাধীন বাংলাদেশের গত ৪৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম। অনলাইন বাংলাট্রিবিউনে গত ১৬ নভেম্বর ভারতের সাংবাদিক রঞ্জন বসুর এ নিয়ে একটি আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। টিপিক্যাল আনন্দবাজারি প্রপাগান্ডা স্টাইলের এক রিপোর্ট এটা। পড়লে মনে হবে যেন, যা মনে চায় এমন মিথ্যা আর বাড়ানো-চড়ানো কথা বলে হাটে গামছা বেচতে এসেছেন। এর একটা নমুনা দেখুন, ঐ লেখার প্রথম বাক্য হল, “চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশের নৌবাহিনী দুইটি সাবমেরিন হাতে পাওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে নতুন করে ঝালিয়ে নিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পাররিকর এ মাসের শেষে বাংলাদেশ সফরে যাবেন”। মনে হচ্ছে, পাররিকর আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোকে বকা দিতে আসছেন। আর যেন বকা দিয়ে বলবেন – ‘কী, তোমরা আমাদের না জানিয়ে সাবমেরিন কিনে ফেললে কেন?’। সেজন্য সাবমেরিন হাতে পাওয়ার ঠিক ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পাররিকর এ দেশে আসতে হচ্ছে। আচ্ছা, এটা কি শিশুদের বাজারে  গিয়ে চুপে চুপে চকোলেট কেনা? তাই বড় ভাইয়ের বকা দিয়ে আসা? রঞ্জন বসু সাবমেরিনকে শিশুর চকোলেট কেনা ভেবেছেন! অথচ এটা সাবমেরিন – তাই কিনতে চাইলে অনেক আগে অর্ডার দিতে হয়। সে মোতাবেক ২০১৩ সালে এর অর্ডার দেয়া হয়েছিল। ফলে তখন থেকে দুনিয়াসুদ্ধ লোক যারা জানতে চায় সবাই প্রকাশ্যেই জানে এটা। তাই এ সাবমেরিন কেনা নিয়ে বাংলাদেশকে যদি জেনুইন কনসার্নে ভারতের কিছু বলার থাকে, তা তিন বছর আগে থেকেই ছিল। বাংলাদেশের সাবমেরিন হাতে পাওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত সিদ্ধান্ত নেয়ার কিছু নেই এখানে। তাহলে, ‘৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছে’ বলে রঞ্জন বসু কী বোঝাতে চাইলেন? যেন বোঝাতে চাইলেন, ভারতের হুকুম ছাড়া বাংলাদেশের গাছের পাতারও নড়ার কথা নয়। সেই পাতা নড়ল কেন, এর জবাব চাইতে পারিকর এসেছিলেন।
    রঞ্জন বসুর বোঝাবুঝির দৌড় হাস্যকর বললেও কম হবে। এ যেন রাস্তার ধারের চা দোকানে বসে আদার ব্যাপারীর আলাপের চেয়েও নিচু মানের। তিনি লিখছেন- “কিন্তু এ সপ্তাহের গোড়ায় চীন যেভাবে তাদের লিয়াওনিং প্রদেশের ডালিয়ান সমুদ্রবন্দরে সফররত বাংলাদেশের নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নিজামুদ্দিন আহমেদের হাতে দু’টি ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন তুলে দিয়েছে, তাতে ভারত মনে করছে পাররিকর এর সফর নিয়ে আর এতটুকুও দেরি করার কোনো অবকাশ নেই”। এখানে চীন ‘যেভাবে… সাবমেরিন তুলে দিয়েছে’- এই ‘যেভাবে’ কথার মানে কী? তাহলে, চীন সাবমেরিন বিক্রি করায় ভারতের অসুবিধা হয়নি; শুধু ‘যেভাবে… সাবমেরিন তুলে দিয়েছে’ তাতেই আপত্তি? ব্যাপারটা কি এ রকম? কিভাবে সাবমেরিন তুলে দিলে আপত্তি হতো না? এ ছাড়া পারিকরের আর ‘এতটুকুও দেরি করার কোনো অবকাশ নেই’- এ কথাটিরও মানে কী? চীন সাবমেরিন বিক্রি করে ভারতের নাকি ক্ষতি করে ফেলেছে, তাহলে পারিকর ‘এতটুকুও দেরি করার কোনো অবকাশ’ না রেখে বাংলাদেশে এলে কী হবে? বাংলাদেশ বকা খাবে? সাবমেরিন ফেরত দিয়ে দিতে ধমক দেবে? লেনদেন বিষয়ে একজন মুদি দোকানদারও যতটা বাস্তবজ্ঞান রাখেন, দেখা যাচ্ছে রঞ্জন বসু সেটাও রাখেন না।

    সবাই জানে, এমনকি বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীরাও বিভিন্ন সময়ে নিজেদের মনোবল বাড়ানোর জন্য বলে থাকেন, ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে আজও ভারতের সমর্থন তাদের সরকারের পিছনে আছে; সেই সমর্থনে সরকার টিকে আছে ইত্যাদি। কিন্তু সরকার ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারতের সমর্থন লেনদেন এক জিনিস, আর তাকে বাংলাদেশের সামরিক ক্রয় সিদ্ধান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত বলে বোঝানো, আরেক জিনিস। বলতে গেলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতি বা বড় ধরনের সামরিক কেনাকাটা- এসব বিষয়ের পরিকল্পনা করা বা প্রস্তাব তোলা, এটা এখনো সিভিলিয়ান বা রাজনীতিকেরা করার, অভ্যাস বা চর্চা বাংলাদেশে শুরু হয়নি। কাজেই ভারতের ইচ্ছামত যদি আমাদের সামরিক ক্রয় সম্পন্ন হতে হয়, এর ফলাফল হবে জটিল ও মারাত্মক। বুদ্ধিমান মানুষ এ কথা মনে রেখে মুখ খুলার কথা। জনগণের ভোট বা সমর্থনে নয় ভারতের সমর্থনে সরকার টিকে আছে এর মানে তারা প্রতিরক্ষা ক্রয়ে হস্তক্ষেপ করা পর্যন্ত ক্ষমতাবান – এটা নিজেকে ওভার-এস্টিমেট করা। ফলে অতি-মুল্যায়নের বিপদ তাদের অজানা থাকার কথা নয়।
    আরেক কঠিন সত্য হল, সাবমেরিন আমাদের (ভারতের কথিত জান-ই দুশমন) চীন থেকেই কিনতে হবে, ব্যাপারটা মোটেও সে রকম ছিল না। রাশিয়াও এর সাপ্লায়ার হতে পারত। কিন্তু রাশিয়ান কিলো সাবমেরিনের মূল্য এক বিলিয়ন ডলার চাওয়াতে এবং তার বিপরীতে চীনা অফার ৪৫০ মিলিয়ন হওয়াতে এটাই কেনা হয়।
    তবে খুশির কথা, ভারতের সবাই রঞ্জন বসু নন। বাস্তব জ্ঞানবুদ্ধির লোক ভারতে কম থাকার কথাও নয়। তেমনই একজন এম কে ভদ্রকুমার। গত প্রায় ৩০ বছরের কেরিয়ার কূটনীতিক ভদ্রকুমার ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত। এখন অবসরে গিয়ে, বিভিন্ন দেশী-বিদেশী পত্রিকায় কলাম লেখেন। তিনি অনলাইন স্ক্রোল (Scroll.com) পত্রিকায় বাংলাদেশের সাবমেরিন কেনা নিয়ে এক আর্টিকেল লিখেছেন। বলা ভাল মন শয়তানিতে ভরপুর এমন কিছু ভারতীয় ডিপ্লোম্যাটকে তিনি যেন চাবকে দিয়েছেন। কথিত এসব পণ্ডিতদের চিন্তাভাবনার দুরবস্থাকে তিনি তুলোধুনা করেছেন। এদের বেশির ভাগই আসলে আমেরিকার ফান্ডে চালানো প্রতিষ্ঠানের কর্মী। এই ক্যাতাগরিতে আছে কিছু আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের ভারতীয় শাখা অথবা ভারতেই রেজিষ্টার্ড আমেরিকা ফান্ডেড এনজিও, অথবা আমেরিকার উচ্চ শিক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে ইত্যাদি ধরণের। এককথায় বললে এগুলো আসলে বেশির ভাগই ভারতের স্বার্থের কোন থিঙ্কট্যাঙ্ক নয়। এদের পিছনে আমেরিকা পয়সা খরচ করে ভারতের কিছু ইন্টেলেক্টদেরকে আমেরিকার চওখে চীন-বিরোধী করে সাজানো যাতে ভারতীয় নীতি আর শহুরে মধ্যবিত্তকে প্রভাবিত করা যায়। একই কথা বলতে বলতে তিতা করে ফেলা আমেরিকার শিখানো এদের ক্লিশে বয়ানটা হল – “চীন ভারতকে ঘিরে ফেলেছে”,  “মুক্তামালার মত চীন ভারতকে ঘিরে ফেলছে”। সব জায়গায় এরা ঘিরে ফেলা দেখে। যেমন মুক্তমালার মত ভারতের চারদিকে গভীর সমুদ্র বন্দর গড়ে (পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও সম্ভাব্য বাংলাদেশ) চীন নাকি ভারতকে ঘিরে ধরার পরিকল্পনা করছে। এ’এক মহা আবিস্কার! এরা নিজের বোধশক্তি বুদ্ধি ব্যবহাস্র করা ভুলে আমেরিকার শিখানো চীন-বিরোধী বয়ান আউড়াচ্ছে। মনে মনে প্রবোধ নিচ্ছে তারা আমেরিকান স্কলারশিপে উচ্চশিক্ষা করছে। কত রাজা উজির মারছে। একএকটা গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে আর নুন্যতম অনুষঙ্গি বিদ্যুতগ্যাস টার্মিনাল রাস্তাঘাট সহ অবকাঠামো  মিলিয়ে বিনিয়োগ লাগে কমপক্ষে ৫ বিলিয়ন থেকে ৫০ বিলিয়ন। সে খবর এদের আছে। তো এই বিনিয়োগ কী সামরিক স্টাটেজিক প্রজেক্ট নাকি পুরাপুরি বাণিজ্যিক অর্থনৈতিক প্রজেক্ট? যেমন বাংলাদেশের জন্য গভীর সমুদ্র বন্দর কী  সামরিক স্টাটেজিক প্রজেক্ট? এমন স্বপ্ন-দোষ! এটা তো স্বপ্নে বা জ্ঞানতও ভাবা কী উচিত? এরা কী ভাত খাওয়া রক্তমাংসের মানুষ? কিন্তু আমেরিকা এমন মানুষই বানিয়েছে। অন্য আর একটা নমুনা দেখাই। এটা আমাদের সাবমেরিন কিনাতে ভারতের এক প্রাক্তন নেভি অভিসারের প্রতিক্রিয়ায় এক ম্যাগাজিন ডিফেন্স নিউজ-এ এমনই এক দিগগজ লিখছে, “নিঃসন্দেহে এই (সাবমেরিন) হস্তান্তর ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রকে (বাংলাদেশ চীনের ক্লায়েন্ট মানে ধামাধরা রাষ্ট্র) দিয়ে ভারতকে ঘিরে ফেলারই চীনা স্টাটেজি” (“Obviously this transfer is a step further in China’s strategy of encircling India with its client states,” Prakash added.)।

    যাহোক অনলাইন স্ক্রোল (Scroll.com) এর ভদ্রকুমারের কথায় ফিরে আসি। তিনি পাররিকরের সফর প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এসব দিগগজদের পরোক্ষে জবাব দিয়েছেন। প্রথমত, তিনি পাররিকরের সফরকে ‘বিস্ময়কর’ বলছেন। এরপর বলছেন, ১. “বাংলাদেশের জন্মের সময় ভারতের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সেকারণে ভারত-বাংলাদেশ মিলিটারি টু মিলিটারি সম্পর্ক অবশ্যই ভাল হতে হবে এটা মোটেও অবশ্যম্ভাবী কোন ব্যাপার নয়। মুখ্যত এর দু’টি কারণ। “প্রথমত, আমাদের (মানে ভারতীয়দের) এক আজব ভুয়া ধারণা হল, পাকিস্তান আর্মির সাথে বাংলাদেশের আর্মি নাকি এক নাভীমূল নাড়ির সম্পর্কের সুতায় বাঁধা আছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ আর্মিও তাদের দেশের উপর ভারতের কালোছায়া ধরনের ইচ্ছা-মনোভাব সম্পর্কে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত ধরণের এক সন্দেহ পোষণ করে”। এটা ফ্যাক্টস। “আসলে দুটা রাষ্ট্রের মধ্যে এ ধরনের মানসিক বাধা বা দূরত্ব কাটাতে সময় লাগে। তাহলে পাররিকরের এই সফরের মানে কি, সেই ‘কালোছায়া’ কেটে গেছে?” – ভদ্রকুমার প্রশ্ন রেখেছেন।
    আসলে ভদ্রকুমার নিজ দেশের অনেকের মুখের ওপর অনেক কথাই খাড়াভাবে বলেছেন। এর মূল কারণ সম্ভবত তিনি আমেরিকান সাপোর্টেড কোন থিঙ্কট্যাঙ্কের কেউ নন। তবে  এরপরেও যেসব কথাগুলো কোন কারণে তিনি বলেননি তা হল –

    রাষ্ট্রতত্ত্ব বলে, কোন রাষ্ট্র মানেই  তার নিজ জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে ঐ রাষ্ট্রের বাইরের সবার স্বার্থের ওপরে বলে মনে করা হয় যেখানে। ফলে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ অন্য সব রাষ্ট্রস্বার্থের চেয়ে উপরে প্রাধান্য পাবে – এই ভিত্তিতেই কেবল কোন রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, থাকে। তাহলে দুই দেশের মিলিটারি টু মিলিটারি কোন ভাল সম্পর্ক মানে কী? এটা অ্যাবসার্ড, সোনার-পাথর বাটি ধরণের এক আকাশকুসুম। অথবা বড়জোড় একটা ডিপলোমেটিক (বলে এক মানে হয় আর এক) ধরণের কথা। দু’টি আলাদা রাষ্ট্রস্বার্থের মধ্যে বড়জোর ঘটনাচক্রে, তাও সাময়িক কিছু বিষয়ে মিল হতে পারে। আর যদি তা না ভাল লাগে কারও তাহলে আরেক একমাত্র পথ হল, দুই রাষ্ট্র এক হয়ে যাওয়া- একমাত্র তখন দু’টি আলাদা রাষ্ট্রস্বার্থ বলে আর কিছু থাকবে না। একাকার হয়ে যাবে। অন্তত মুখে দাবি করা যাবে। অতএব, দুই সেনাবাহিনী এই শর্ত-সীমার মধ্যেই কেবল যতটুকু সম্ভব ততটুকুই ‘ভাল’ সম্পর্কের অধিকারী হতে পারে।

    ২. ভদ্রকুমার তুরস্কে ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি নিজ দেশের সহকর্মীদের সমালোচনা করেছেন। ভদ্রকুমার বলছেন, “ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, সাবমেরিন বিক্রি চীনের এক অসৎ উদ্দেশ্যে করা কাজ। তাই পাররিকর ভারতের তিন বাহিনীর উপপ্রধানদের নিয়ে চীনবিরোধী সফরে বেরিয়ে পড়েছেন। অন্ততপক্ষে ভারতীয় বিশ্লেষকের বরাতে বাংলাদেশের মিডিয়া তাই বলছে। এটা খুব দুর্ভাগ্যের যে, আমরাই আমাদের পড়শিদেরকে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে খাড়া করার বুদ্ধি দিচ্ছি। ভারতীয় বিশ্লেষকদেরই সিদ্ধান্ত হল – চীন ভারতকে ঘিরে ধরতেই সাবমেরিন বিক্রি করেছে। এগুলো এক আজব ব্যাখ্যা”। এই বলে তিনি এবার অনেকগুলো কারণ তুলে ধরে ভারতীয় বিশ্লেষকদের এমন সব ধারণা নাকচ করেছেন। আগ্রহিরা সেসব বিস্তারে জানতে পুরা লেখাটা পড়তে পারেন এখানে।  সেখান থেকে তাঁর এমন দুটো পয়েন্ট হল, তিনি বলছেন, ক. সাবমেরিন কেনা চীনের দেয়া কোনো দান-ধ্যান নয়, এটা বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত এবং তারা অর্থ দিয়ে কিনছেন। তাহলে এটা চীনের কাজ আর অসৎ উদ্দেশ্যে করা কাজ হলো কী করে? খ. বাংলাদেশের কাছে সম্ভাব্য বিক্রেতা ছিল রাশিয়া ও চীন। একা চীন নয়। বাংলাদেশ বেছে নিয়েছে চীনকে প্রধানত প্রায় অর্ধেক দামে দিচ্ছে বলে। আর চীনের বেশির ভাগ অস্ত্র সরঞ্জাম বিক্রির সময় কোন লুকানো শর্ত থাকে না (উটের সঙ্গে বিড়াল নিতে হবে ধরণের)। তাহলে এটা ‘চীনের অসৎ উদ্দেশ্যে করা কাজ’ তা প্রমাণ হয় কী করে?
    আমাদের বরং বাংলাদেশ কিসের তাগিদে সাবমেরিন কিনল, সেটা খুঁজে দেখা দরকার”।

    অর্থাৎ এর মানেটা সোজা। আগামিতে এই আমেরিকান সাপোর্টেড ভারতীয় দিগগজেরা আমাদেরকে আরও জ্বালাবে। এসব ফালতু ঈর্ষা আর প্রলাপের মোকাবিলায় পালটা বয়ান প্রস্তুতি আমাদের লাগবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে ০৪ ডিসেম্বর ২০১৬ অনলাইন দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকা (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার তবে নতুন ভার্সান হিসাবে আরও সংযোজন ও এডিট করে এবং নতুন শিরোনামে ছাপা হল।]

  • কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

    কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

    গৌতম দাস

    ২৯ নভেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

    কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

    ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হয়েছেন প্রায় তিন সপ্তাহ হতে চলেছে। ইতোমধ্যে তিনি তাঁর প্রশাসন কাদের নিয়ে সাজাবেন এর ঝাড়াই-বাছাইয়ের ব্যস্ততার মধ্যে আছেন। সেই নেয়া আর না-নেয়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এবং নানান জল্পনা-কল্পনাও চলছে। রিপাবলিকান দলের কোন অংশ ও কারা ট্রাম্পের সঙ্গী হচ্ছেন, কেন হচ্ছেন তা নিয়েও মিডিয়ায় জল্পনা-কল্পনা্র অন্ত নাই। ইতোমধ্যে গত ২২ নভেম্বর ট্রাম্প তাঁর ক্ষমতার শপথ নিবার পরের প্রথম ১০০ দিনে করণীয় কাজ কী হবে এর তালিকা প্রকাশ করেছেন। এটাকে বলা যেতে পারে প্রথম বাস্তব প্রতিশ্রুতি; আর সেটা এই অর্থে যে, আগে যা কিছু তিনি বলেছিলেন, সেগুলো ভোট পাওয়ার আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সাধারণত বাড়িয়ে কথা বলার ফুলঝুরিতে ভরপুর থাকে। আবার বাস্তব প্রতিশ্রুতি যেগুলোকে বলছি, এর মানে এই নয় যে, এগুলো অবশ্যই ভালো ফল বয়ে আনবে বা ট্রাম্প এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবেনই। মূলত বাস্তব প্রতিশ্রুতি বলতে আমরা বুঝব, নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পর আগের দেয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো সংশোধন করে নেয়ার একটা সুযোগ পাওয়া এবং নেওয়া। ট্রাম্প সেটাই নিচ্ছেন। এর কতটুকু তিনি কাজে লাগানোর সুযোগ নিচ্ছেন, সেটাই দেখার বিষয়।

    কয়েকটি মিডিয়া এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছে উলটা করে, কী কী নাই তা নিয়ে। অর্থাৎ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কী কী প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় নাই। যেমন- ২২ নভেম্বর ২০১৬ সিএনএন ও ২২ নভেম্বর ২০১৬ বিজনেস ইনসাইডার রিপোর্ট করেছে, ওবামা প্রশাসনের করা বিখ্যাত স্বাস্থ্যসেবা আইন (অ্যাফোর্ডেবল হেলথ অ্যাক্ট) বিষয়টি নিয়ে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বলেছিলেন এই আইন তিনি বাতিল করবেন। কিন্তু এই আইন বাতিল করা অথবা এর কোন সংশোধনী আনা – কোনটাই প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নাই। অবশ্য নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পরের দিন ওবামার সাথে ঝাকুনি-বিহীন ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে আলাপ করে ফিরে এসেই ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই আইন সম্ভবত তিনি বাতিল করছেন না, তবে কিছু সংশোধনী আনবেন। যদিও আমরা এমন বলতে পারি না যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় এ ইস্যুটি নেই মানে, ১০০ দিন পরে এটা আসবে না তা-ও নয়।
    এবার দ্বিতীয় যে বিষয়টি ১০০ দিনের তালিকায় নাই তা হল, আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তুলে দেয়া প্রসঙ্গ। বলা হয়েছিল, ড্রাগ পাচারকারী বা অবৈধ অভিবাসীর অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য সীমান্তে দেয়াল তুলে বাধা দেয়া হবে।
    এ ছাড়া আরেকটি বহুল বিতর্কিত বিষয়, আমেরিকায় মুসলমানদের প্রবেশ ঠেকানো বা মুসলমানদের নাম রেজিস্ট্রি করা। এ বিষয়েও কোনো উল্লেখ ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নেই।
    তবে ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় যা আছে, তা হল টিপিপি (বা ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) –  এই মুক্তবাণিজ্য জোট থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার। আর এটা আছে একেবারে এক নাম্বারে। টিপিপি আসলে ইচ্ছা করে চীনকে বাইরে রেখে আমেরিকাসহ ১২টি প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাষ্ট্রের মধ্যকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তি। ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তি আমেরিকার জনগণের কাজের সংস্থান সীমিত বা নষ্ট করবে; তাই তিনি এটা বাতিলের পক্ষে। ওবামার এই উদ্যোগে মার্কিন কংগ্রেস এখনও অনুমোদন দেয়া শেষ করে নাই। বলেছিল ট্রাম্প বা নতুন প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত আসা পর্যন্ত স্থগিত করে রেখেছিল। আর এখন  ১০০ দিনের করণীয়তে ট্রাম্পের এই ঘোষণায় জাপান ইতোমধ্যে হতাশ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, “আমেরিকা না থাকলে আর টিপিপি করার কোনো অর্থ নেই”। (TPP ‘has no meaning’ without US, says Shinzo Abe)। বিশ্ববাণিজ্যের ৪০ শতাংশ বাণিজ্য এই টিপিপি রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে হয়ে থাকে। ট্রাম্প ইতোমধ্যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় জানিয়েছেন, টিপিপি থেকে তিনি আমেরিকার নাম প্রত্যাহারের জন্য নোটিশ পাঠাবেন। এ থেকে স্পষ্ট যে, তিনি সত্যি সত্যিই গ্লোবালাইজেশনের বিরুদ্ধে এবং প্রটেকশনিস্ট বা সংরক্ষণবাদী অর্থনীতির পথে হাঁটার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। টিপিপি থেকে নাম প্রত্যাহারকে কেন ট্রাম্পের গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী অবস্থান বলে অর্থ করছি? সেটা আমার নিজের বরাতে বলার চেয়ে আমেরিকা, চীন ও জাপান এর নেতাদের বরাতে বলা যাক। ট্রাম্পের বিজয়ের পরে পরেই অনুষ্ঠিত প্রথম এক বাণিজ্য জোটে এপেক (APEC, Asia-Pacific Economic Cooperation) গত ২০ নভেম্বর ২০১৬ পেরুর রাজধানী লিমাতে আগেই নির্ধারিত এবছরের শীর্ষ বৈঠকে মিলিতে হয়েছিল। আমেরিকা, চীন ও জাপান সহ অন্যান্যরা এপেকের সদস্য এবং এই তিন রাষ্ট্র প্রধান ঐ সভায় উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের বরাতে মানে এপেকের বরাতে কথা বলব। ট্রাম্পের বিজয়ে তাঁর হবু প্রশাসনের টিপিপি বা নাফটা (NAFTA, North American Free Trade Agreement) থেকে বের হয়ে আসার ঘোষণা-অবস্থান জানান। এই অবস্থানকে এপেকের নেতারাই সবার আগে এটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের “এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থান” ফলে এটা তাঁর সংরক্ষণবাদী (Protectionist) অবস্থান – এভাবেই চিহ্নিত করেছেন। ট্রাম্পের অবস্থানে এই তিন নেতা এতই বিপদ দেখেছেন যে এপেকের সভায় শেষ দিনে গৃহীত এক ঘোষণা-প্রস্তাব পাস করেছেন। তাহল এরকম, “আমরা আমাদের বাজার খুলে রাখা এবং সব ধরণের প্রটেকশনিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পক্ষে আমাদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি”। (We reaffirm our commitment to keep our markets open and to fight against all forms of protectionism -Members’ closing declaration)

    এখানে বলে রাখা ভাল আমার আগের লেখায় বলেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে আমেরিকা গ্লোবাল অর্থনীতির নেতৃত্ব নিজের হাতে নিতে পেরেছিল। আর আগের সীমিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯) পর থেকে পরের ২৫ বছর প্রায় পুরাপুরি স্থবির হয়ে ছিল। আমেরিকা সেই স্থবিরতাই শুধু কাটায় নাই বরং  আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু হতে পুর্বশর্ত  আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসাবে সর্ব-সম্মতিতে সেকালের একমাত্র যোগ্য ডলারকে কেন্দ্র করে নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থা সাজায়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই নতুন মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করা আর এর ভিতর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা চালু করতে ১৯৪৪ সালে গঠন করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ (IMF)। এরপর (১৯৪৫-১৯৭৩) এই সময়কালটাকে বলা যায় যুদ্ধপরবর্তি ইউরোপের পুনর্গঠন আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গেড়ে বসার কাল। ১৯৭৩ সালে আইএমএফ আবার পুনর্গঠন করা হয়। এরপর থেকেই প্রত্যেক রাষ্ট্র নিজ নিজ আভ্যন্তরীণ বাজার বিদেশের পণ্যের প্রবেশ থেকে বাধা দিয়ে রাখার সংরক্ষণবাদী বা প্রটেকশনিষ্ট অবস্থান যেটা দুনিয়ায় ক্যাপিটালিজমের শুরু থেকেই সবাই অনুসরণ করত, তা ভেঙ্গে “গ্লোবালাইজেশন” এর পথে চলা করেছিল গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। আস্তে আস্তে গ্লোবালাইজেশন মূল ধারা হয়ে যায়। ভিন্ন ভাষায় এটাই “এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকনমি” বা রপ্তানী অভিমুখি করে অর্থনীতি সাজানোর যুগ। বাজার আগলে রাখার প্রটেকশনিষ্ট অবস্থানের সাথে তুলনায় এই নতুন পথে ভাল এবং মন্দ দুটা দিকই আছে। আবার ভাল-মন্দ সেটা যাই থাক করণীয় অপশন হিসাবে কী কী পথ খোলা আছে এর মধ্যে কম-খারাপটা বেছে নেয়া অর্থে গ্লোবালাইজেশন অবশ্যই ভাল অপশন। কারণ আমাদের মত রাষ্ট্রের সাথে অসম বাণিজ্য আছে এবং তা এমনি এমনি চলে যাবে না। মাথাব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলা যেমন কোন সমাধান বা অপশন নয় তেমনি। বাংলাদেশে এটা শুরু হয় মোটা দাগে বললে আশির দশকের শুরু থেকে, বিশেষ করে এরশাদের ক্ষমতা নিবার পর থেকে। সংরক্ষণবাদী হয়ে এক পাট-রপ্তানিতে আর আকড়ে না থেকে তৈরি পোষাক বা চামড়া ইত্যাদিতে ধরে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে প্রবেশ – এই হল ফেনোমেনাটা। আর বটম লাইন হল, অন্যের বাজারে প্রবেশ করতে গেলে অন্যকেও নিজের বাজারে প্রবেশ করতে দিতে হবে। তবে অসম ক্ষমতা, অসম বাণিজ্য সম্পর্কের কারণে সেটা অন্যকে বেশি দেয়া হয়ে যায়। কিন্ত সে জন্য কোন বাণিজ্য লেনদেনেই যাওয়া যাবে না এটাই মাথাব্যাথায় মাথাকাটার তত্ত্ব হয়ে যাবে। তবে মজার কথা হল,  সেই আমেরিকা এখন একালে ট্রাম্পের হাতে পরে মুক্তবাণিজ্য থেকে পালাইতে চাইতেছে।

    দুইঃ
    হেনরি কিসিঞ্জারের নাম বাংলাদেশে নানা কারণে পরিচিত। আমেরিকার অন্ত্যত দুজন প্রেসিডেন্টের সাবেক বহুলালোচিত পররাষ্ট্র সেক্রেটারি এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন এবং আমেরিকান ফরেন সার্ভিসের অনেক আমলার তাত্ত্বিক গুরু তিনি। এখন বয়স প্রায় ৯৩ বছর, তবুও সক্রিয় কাজকর্ম করেন; ডিকটেশন দিয়ে বই ছাপান। বৈদেশিক নীতি ও তত্ত্ব দিয়ে বেড়ান এখনো। বর্তমানে “কিসিঞ্জার অ্যাসোসিয়েটস” নামে এক কনসাল্টিং ফার্ম বা পরামর্শদাতা কোম্পানি চালাচ্ছেন। বিগত আশির দশকের পর থেকে সব প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সাক্ষাৎ করে তাদেরকে নিজের পরামর্শ দিয়েছেন। সেই কিসিঞ্জার ট্রাম্পের সাথেও দেখা করেছেন গত ২০ নভেম্বর।
    অভ্যন্তরীণভাবে, আমেরিকাতেও ট্রাম্পকে নিয়ে বিতর্কও কম নয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পরিবেশ রক্ষার (এনভায়রণমেন্ট-বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো সহ) সম্মেলনে আমেরিকার দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো থেকে ট্রাম্প সরে আসতে চান, একারণে। কারণ তিনি এগুলো সব ‘চীনাদের ভুয়া প্রচার’ বলে দাবিতে উড়িয়ে দিতে চান। শুধু তাই নয়, প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকার দ্বিতীয় নম্বরে আছে ওবামা প্রশাসনের দেয়া – নানান প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছিলেন – ট্রাম্প সেসব জায়গা থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করতে চান। এছাড়া ওবামা জ্বালানিবিষয়ক যেসব বিধিনিষেধ মেনে নিয়েছিল, গ্রিন হাউজ গ্যাস ২০৩০ সালের মধ্যে ৩২ শতাংশ কমিয়ে আনবেন বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; ট্রাম্প সেসব থেকে বেরিয়ে আগের জায়গায় ফিরে যেতে চান। ট্রাম্পের যুক্তি হল, জ্বালানি উৎপাদনে এসব বিধিনিষেধ আরোপের কারণে আমেরিকান জনগণ চাকরি হারিয়েছে। এগুলো ‘জব-কিলিং’ বাধানিষেধ। অর্থাৎ ট্রাম্প বলতে চাইছেন, পরিবেশের চরম ক্ষতি করে হলেও নোংরা জ্বালানি উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট চাকরিগুলা চালু রাখতে হবে। তিনি সস্তা জনপ্রিয়তার পথে হাঁটাকে প্রাধান্য দিয়ে চলতে চাইছেন।
    এমন পরিস্থিতিতে কিসিঞ্জার ট্রাম্পকে নিয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, অন্তত দুটা সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি কী বলেছেন, ট্রাম্পকেইবা কী পরামর্শ দিলেন আর আমাদেরই বা ট্রাম্প সম্পর্কে তাঁর কী মূল্যায়নের কথা জানাতে চান; এটা জানতে দেশে-বিদেশে আগ্রহ আছে। কিসিঞ্জার ট্রাম্পের কাছে গিয়ে দেখা করার পর সোজা চলে যান সিএনএনের অফিসে ফরিদ জাকারিয়ার কাছে; যেখানে তিনি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।
    সাধারণভাবে বললে, কিসিঞ্জার ট্রাম্প সম্পর্কে সহানুভূতির সাথে কথা বলেছেন। কেমন ট্রাম্পকে তিনি দেখলেন প্রথমেই এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন, “এমন ট্রাম্পকে তিনি দেখে এলেন যে নানা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেয়ার অবস্থা থেকে বের হয়ে আমেরিকাকে নেতৃত্ব দিতে বাস্তব সবচেয়ে ভালো নীতি-পলিসির কৌশল বা স্ট্র্যাটেজি কী হতে পারে, তিনি তা হাতড়াচ্ছেন। এমন মধ্যবর্তী স্থানে ট্রাম্পকে আমি দেখে এলাম”। এরপর ট্রাম্পের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে তিনি বলছেন, তার দেখা প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ট্রাম্প “সবচেয়ে ইউনিক বা অনন্য”। কারণ ট্রাম্প আগে কখনো কোনো স্তরেরই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। সেজন্য তিনি সমাজের চেনা কোনো গোষ্ঠী প্রতিনিধি নন, তার পছন্দের নীতি-পলিসি সম্পর্কেও কোনো আগাম ধারণা-অনুমান বেশির ভাগেরই নেই। ফলে তিনি পুরনো কোনো দায়ভারহীন অথবা চিহ্নবিহীন। কিসিঞ্জার আরও বলেছেন, ট্রাম্পের কোনো ‘ব্যাগেজ নেই’। তা বটে; কথা সত্য। কিন্তু জাকারিয়া এবার চীন প্রসঙ্গে ট্রাম্পের রক্ষণশীল অবস্থানের কথা তুললেন। কিন্তু কিসিঞ্জার তাতে সরাসরি ব্যক্তি ট্রাম্প সম্পর্কে বলা এড়িয়ে গেলেন। আর, গিয়ে এবার তত্ত্বের দিক দিয়ে জবাব দিলেন। তিনি এক তত্ব-কথায় জবাব দিলেন। বললেন, “গ্লোবালাইজেশনের ফলে এর ফলে কেউ লুজার বা হারু পার্টি আর কেউ উইনার বা জেতা পার্টি হয়ে তো হাজির হবেই। ফলে হারু পার্টি তখন নানাভাবে নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ্যে আনবেন”।

    কিসিঞ্জারের এমন জবাবের অর্থ কী? তিনি কী বলতে চাইছেন – ট্রাম্পের আমেরিকা গ্লোবালাইজেশন করতে গিয়ে ওর ফলাফলে এখন হারু পার্টি? তাই ট্রাম্পের হাত ধরে আমেরিকা এখন গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী প্রটেকশনিস্ট অর্থনীতির ভূমিকায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে চাচ্ছে? আর সেজন্যই ট্রাম্পের এমন অবস্থানকে কিসিঞ্জার সহানুভুতির-সমর্থন দিচ্ছেন? তাই কি? এর জবাবে সম্ভবত বলা যায় – হ্যাঁ কিসিঞ্জার স্পষ্ট করে না বললেও এটাই, তার সহানুভূতি টাম্পের দিকে। আর প্রত্যক্ষভাবে না হলেও তত্ত্বের মাধ্যমে বলে তিনি স্বীকার করে নিচ্ছেন, আমেরিকা হারু পার্টি। এরপর তিনি এক গুরুতর কথা বলছেন। তিনি স্বগতোক্তি করে বলছেন, ‘ট্রাম্পকে ইতিবাচকভাবে লক্ষ্য খুঁজে নিতে আমাদের সুযোগ দেয়া উচিত।’

    মাসিক ‘দ্য আটলান্টিক’ এর সাক্ষাতকার
    আমেরিকার একটি মাসিক ম্যাগাজিনের নাম ‘দ্য আটলান্টিক’। সেই পত্রিকায় কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল আগে থেকেই। এক লম্বা আর বিভিন্ন সেশনে ভাগ করে, নতুন-পুরনো বহু ইস্যুতে কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল। নির্বাচনের পরের দিন ১০ নভেম্বরে নেয়া সাক্ষাৎকারে চলতি ‘গরম বিষয়’ ট্রাম্পের বিজয় প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল। ঐ সাক্ষাতকারে রিপাবলিকান হেনরি কিসিঞ্জার স্বীকার করেন যে তিনি মনে করেছিলেন নির্বাচনে ট্রাম্প নয়, হিলারিই বোধহয় জিতবেন। ওখানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রশ্নেও কিসিঞ্জার একইভাবে ‘ট্রাম্পকে সুযোগ দেয়া উচিত’ বলেছেন। প্রচ্ছন্নভাবে স্বীকার করছেন আমেরিকা হারু পার্টি ইত্যাদি। যেমন দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, ট্রাম্পের জেতার ফলে দুনিয়াকে আমেরিকার নেতৃত্ব দেয়ার ভূমিকা কী হবে বলে আপনি মনে করেন? কিসিঞ্জার বলেন, ‘আসলে, এই জেতাটা আমাদের বিদেশ নীতি আর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে।’ [অর্থাৎ তিনি ‘সামঞ্জস্য নেই’ এটা ধরে নিয়ে কথাটা বলেছেন। পরের বাক্যেই তিনি সেটা স্পষ্ট করছেন। বলছেন, ‘আমেরিকার বৈদেশিক ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জনগণের ধারণা আর এলিটদের ধারণার মাঝে নিঃসন্দেহে গ্যাপ বা ফারাক আছে। আমার মনে হয়, নতুন প্রেসিডেন্ট আমাদের এই ফারাক ঘুচাতে সুযোগ নিতে পারেন। তিনি সুযোগ পাবেন; কিন্তু তা নিতে পারবেন কি না এটা তার ওপর নির্ভর করে।’
    তৃতীয় প্রশ্নটি ছিল ট্রাম্পকে বেশ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। প্রশ্ন, ‘ট্রাম্পের যোগ্যতা, সক্ষমতা বা সিরিয়াসনেস সম্পর্কে কি আপনি আস্থা রাখেন?’ কিসিঞ্জার কিছুটা অথরিটির ভূমিকায় জোর দিয়ে জবাব দেন, ‘এ রকম তর্ক আমাদের বন্ধ করা উচিত। তিনি আমাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তার শাসন-দর্শন (ফিলোসফি) তৈরি করার জন্য আমাদের অবশ্যই তাকে সুযোগ দিতে হবে।’
    ‘ট্রাম্প আমাদের প্রেসিডেন্ট’ এ কথা বলে আসলে কিসিঞ্জার ধমকালেন কেন? এ জন্য যে, ট্রাম্পকে নিয়ে হিলারি-শিবিরসহ তথাকথিত লিবারেলরা হাসি-মশকারা করে কথা বলে, যেটা প্রশ্নকর্তার (তিনি নিজেই ওই পত্রিকার সম্পাদক) প্রশ্নের মধ্যেও ছিল। কিসিঞ্জার যেন বুঝাতে চাইছেন, গ্লোবালাইজেশনের প্রতিযোগিতায় পড়ে আমেরিকা হারু পার্টি হয়ে গেছে- যেটা বুঝতে আমেরিকান পাবলিক আর এলিট পারসেপশনে ফারাক আছে। ফলে আপাতত ট্রাম্পকে মফস্বলের মনে হচ্ছে বটে, কিন্তু ট্রাম্প আসলে তা নন। উপায়ান্তর নেই বলে ট্রাম্প কিছুটা প্রটেকশনিস্ট হয়ে বিপদ কাটিয়ে আমেরিকাকে উঠে দাঁড় করাতে চাইছেন। এ দিকটা কিসিঞ্জার বুঝতে পারছেন বলেই ট্রাম্পকে নিয়ে হাসি-মশকারা তিনি কাউকে করতে দিতে রাজি নন। তাই কি? কিসিঞ্জার সাক্ষাৎকারে কথাগুলো এভাবে স্পষ্ট করে বলেননি, আকার-ইঙ্গিতে বলেছেন- এমন অনুমান করার সুযোগ আছে।
    একটা সমান্তরাল উদাহরণ টেনে শেষ করব। অনেকের প্রটেকশনিস্ট বা রক্ষণশীল কথাটি বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। অথচ ব্যাপারটা আমাদের কাছেরই। সত্তরের দশকে মোটাদাগে বললে, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একমাত্র উপায় আমাদের ছিল পাট। এটা সেই প্রটেকশনিস্ট সময়। এর বিপরীতে, আশির দশকের শুরু থেকেই বিশেষ করে ১৯৮২ সাল থেকে আমরা গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশ করি। এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকোনমি, অকস্মাৎ রফতানিমুখী নারী মেশিন, মাল্টিফাইবার এগ্রিমেন্ট, আমেরিকা-ইউরোপের দয়ায় তাদের বাজারে তৈরী পোশাকের প্রবেশাধিকার, বিনিময়ে নিজের বাজার পুরো খুলে দেয়া, বৈদেশিক বিনিয়োগ পাওয়া ইত্যাদি আমাদের গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশের চিহ্ন। এ দুই দশার মধ্যে কোনটা আদর্শ বা ভালো, সে তুলনা করে বলা অপ্রয়োজনীয়। কারণ বিষয়টি হলো, যেসব অপশন আমাদের হাতে ছিল ও আছে, এমন অ্যাভেলেবল অপশনের মধ্যে তুল্য বিচার করা দরকার। এ বিচারে গ্লোবাইজেশনই ভালো। অবশ্য যে কারণে প্রশ্নটি তুলেছি, তাতে ভালো-মন্দ বিচার এখনকার প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, গ্লোবালাইজেশনের ভেতরে একবার ঢুকে গেলে সে অর্থনীতি আর কি ফিরে প্রটেকশনিস্ট অবস্থানে যেতে পারে, সম্ভব? ব্যবহারিক বিবেচনার জায়গা থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, এটা অসম্ভব। গ্লোবালাইজেশনের সারকথা হলো- বিপুলভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে দুনিয়াব্যাপী বিনিয়োগ, পণ্য, টেকনোলজি, কাঁচামাল বাজার ইত্যাদির পারস্পরিক লেনদেন ও বিনিময়ে একবারে জড়িয়ে পড়া এবং তাতে অসাম্য থাকলেও জড়িয়ে যাওয়া; কিন্তু একবার এমন লেনদেন বিনিময়ে জড়িয়ে পড়লে তা থেকে আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া যায় না। অতএব প্রশ্নটা হল, ট্রাম্প আমেরিকাকে প্রটেকশনিষ্ট পথে নিয়ে যাবেন কীনা তা একেবারেই নয়, বরং একালে আমরা কী প্রটেকশনিষ্ট পথে আবার ফিরে যেতে পারব? সম্ভব? এককথায় অবশ্যই না।

    তাহলে ট্রাম্প কেন প্রটেকশনিস্ট অবস্থান নিচ্ছেন বলে অন্তত দেখাচ্ছেন? তিনি বা তার পরামর্শকেরা নিশ্চয়ই এর অর্থ বোঝেন। কারণ প্রটেকশনিস্ট জায়গায় ফেরা আর সম্ভব নয়। তাহলে? আসলে প্রটেকশনিস্ট মনে হওয়া এটা আপতিক। সম্ভবত গ্লোবালাইজেশনের মধ্যেই থেকে, কিন্তু প্রটেকশনিস্ট হওয়ার ভাবভঙ্গি করে নতুন করে এক লেনদেন-বাণিজ্য ‘বেটার ডিল’ পেতে চাইছেন ট্রাম্প। কিসিঞ্জারের অনুমান, ট্রাম্প এতে সফল হতে পারেন এবং সেটাকে ওবামাসহ পুরনো আমেরিকান প্রশাসনগুলোর ধারাবাহিকতা বলে হাজির করাও সম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রথম ছয়-নয় মাসের পরে চীন-রাশিয়াও এতে আস্থা পাবে, এটাকে মানবে। কিসিঞ্জার এমনটিই মনে করেন।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে ২৭ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও অনেক এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে প্রকাশিত হল।]

  • আমেরিকার উত্থান-পতনে অস্থিরতা

    আমেরিকার উত্থান-পতনে অস্থিরতা
    গৌতম দাস
    ২৬ নভেম্বর ২০১৬, শনিবার
    http://wp.me/p1sCvy-26p

    বড় এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন অস্থিরতা আবার এই প্রথম। সাম্প্রতিক নির্বাচনে অনেক উত্তেজনা ছড়ানোর পর আমেরিকা এক নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পেয়েছে, এ জন্যই কি অস্থিরতা? কিন্তু প্রেসিডেন্ট তো পেয়েই গেছে, তাহলে আর অস্থিরতা কেন? আসলে আমেরিকার নির্বাচনকে মাধ্যম করে অস্থিরতা এর ভেতর দিয়ে বাইরে প্রকাশ্যে এসেছে। তাহলে ভেতরের দিক, মানে অস্থিরতা উৎস কোথায় ও কেন? তাই এখন বোঝা দরকার।
    যে প্রসঙ্গ ধরে এর জবাব খুঁজব তা হল, গ্লোবাল নেতৃত্ব। গ্লোবাল নেতৃত্বে এখন আছে কে, কবে থেকে? এবং কোন প্রক্রিয়ায় সে সমাসীন হয়েছিল এই দিকগুলো খুজে দেখে আগাব। আমাদের অনেকের হয়ত পছন্দ হবে না। বিশেষ করে যারা স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নের বয়ানের বাইরে আর কোন বয়ান এবং বিশেষত, ঐ বয়ানের সাথে মিলে না এমন কোন ফ্যাক্টস বা ইনফরমেশন থাকতেই পারে না বলে মনে করেন, তাদের কথা বলছি। তাদের পছন্দ না হলেও কথা সত্য যে , আমেরিকা বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ার নেতৃত্ব নিয়েছে ও নেতৃত্ব দিয়ে আসছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল থেকে। তাতে আমাদের পছন্দ অনুযায়ী আমরা এ’ঘটনাকে ভাল অথবা মন্দ বলে যে যাই বিবেচনা করি না কেন, এটাই কঠিন সত্যি। আর মোটা দাগে বললে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) মাঝামাঝি ১৯৪১ সালের আগস্টে আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রত্যক্ষ পক্ষ নেয়ার, অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। ততকালের পরপর চারবারের (১৯৩২-১৯৪৪) নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হলেন ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট (Franklin Delano Roosevelt, known as FDR)। আর বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন উইলস্টন চার্চিল (Sir Winston Leonard Spencer-Churchill)। রুজভেল্ট-চার্চিল ১৯৪১ সালের ১৪ আগষ্ট স্বাক্ষরিত বিখ্যাত চুক্তির নাম আটল্যান্টিক চার্টার (Atlantic Charter 1941)। এই আটল্যান্টিক চুক্তিকে বলা যায় সেরা কলোনি মাস্টার ও বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে লিখে দেওয়া দাসখত স্বাক্ষর। আর আর এক দিক থেকে বলা যায় ঐ চুক্তি হাতে পেয়ে রুজভেল্ট নিশ্চিত হন যে দুনিয়ায় তখন থেকে আমেরিকান নেতৃত্বে আসা নিশ্চিত হয়েছে। কেন এমন বলছি? ঐ চুক্তিকে দাসখত বলছি এজন্য যে ঐ চুক্তিতে আটটা পয়েন্ট আছে যার তৃতীয় পয়েন্টে হল যে, যে কোন রাষ্ট্রের নাগরিকের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার (self government) এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ত্ব (sovereign rights) এই নাগরিক অধিকার ঐ দুই নেতা স্বীকার করেছিলেন ও সম্মান দেখাতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আমরা হয়ত এখনও বুঝি নাই তাতে কী? তাতে বিরাট কিছু। কারণ আমরা তখনও ছিলাম বৃটিশ কলোনি – কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়ার বাসিন্দা। তার মানে ঐ চুক্তিতে চার্চিল স্বীকার করে নিয়েছেন যে বৃটিশ-ইন্ডিয়ার নাগরিক আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার (self government) এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ত্ব (sovereign rights) এই দুই নাগরিক অধিকার আছে। আর এই অধিকার থাকার অর্থ বৃটিশ সরকারের ইন্ডিয়াকে কলোনি করে রাখা অবৈধ। আর এটাই খোদ বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী আটলান্টিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে স্বীকার করে নিয়েছেন।  কে স্বীকার করছেন? করছেন বৃটিশ মাস্টার। যে বৃটিশ কলোনি সাম্রাজ্য দম্ভ আর গর্ব  করে বলত, “বৃটিশ কলোনি সাম্রাজ্যের সুর্য নাকি কোনদিন অস্ত যাবে না”।আর এটাই ছিল রুজভেল্টের চার্চিলের বৃটেনকে যুদ্ধে সামরিক সাহায্য সহযোগিতা ও হিটলারের বিরুদ্ধে তাদের পক্ষ নেবার শর্ত। এজন্যই যুদ্ধের পর দুনিয়া জুড়ে  কলোনি-মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যেতে দেখেছিলাম। এর সাথে অবশ্য বৃটিশ বিরোধী বা কলোনি বিরোধী স্থানীয় জনগণের যেসব আন্দোলন ছিল এসবের ভুমিকাও ফেলনা নয়। অর্থাৎ কোনটাই অগুরুত্বপুর্ণ না, সংযুক্ত উপাদান।

    তবে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল কেন রুজভেল্টের শর্তে আটল্যান্টিক চুক্তি করেছিলেন? আর তাতে কলোনি শব্দটা উচ্চারণ না করেও তবে ভিন্ন ভাষায় কোন রাষ্ট্রকে “কলোনি করে রাখা অবৈধ” – তা স্বীকার করেছিলেন কেন? এর প্রধান কারণ, হিটলারের জর্মানির হাতে ততদিনে ফ্রান্সের পরাজয় ঘটে গিয়েছে। মানে ফ্রান্স ১৯৪০ সালের জুন থেকে জর্মানির দখলে চলে গেছে। আর ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডের মাঝে হল ইংলিশ চ্যানেল। অর্থাৎ বৃটেনের দিক থেকে দেখলে চার্চিল, বৃটেন থেকে ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে ফ্রান্সকে দেখছিলেন যে হিটলারের হাতে ইতোমধ্যে চলে গিয়েছে। যার মানে শত্রু ইংলিশ চ্যানেলের অপর পাড় পর্যন্ত এসে গিয়েছে। ওদিকে ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই বৃটেনের গোলাবারুদসহ যুদ্ধের উপকরণের অভাব চলছিল। একমাত্র সাপ্লায়ার আমেরিকার নিজের “ক্যাশ এন্ড ক্যারি আইন ১৯৩৭”, আর “নিউট্রালিটি এক্ট ১৯৪০” (যে সে যুদ্ধে কোন পক্ষে জড়াবে না) – এই দুই আইনের কারণে কেবল নগদ সোনায় মুল্য পরিশোধের শর্তে তাও সীমিত পর্যায়ে সাপ্লাই বজায় রেখেছিল। বৃটেনের নগদ সোনার সামর্থও ১৯৪০ সালের শেষ নাগাদ ফুরিয়ে আসে। এই মরিয়া অবস্থাকে বাঁচার জন্য চার্চিলের একমাত্র পথ খোলা ছিল রুজভেল্টের শর্তে আটলান্টিক চার্টার স্বাক্ষরে রাজি হওয়া।

    অতএব তখন থেকেই যুদ্ধের পরিণতি, যুদ্ধের বিজয়, বিজয়-পরবর্তী নতুন করে দুনিয়া সাজানো ইত্যাদি সব কিছুতে নির্ধারক ভূমিকা নিয়ে আমেরিকা নেতৃত্বে চলে আসার সুযোগ তৈরি হয়ে এসেছিল। কিন্তু রুজভেল্টের দিক থেকে কলোনি অবৈধ বা কলোনি মুক্তি শর্ত হল কেন?  আর তাতে আমেরিকার কী লাভ? প্রথমত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বব্যাপী একটা যুদ্ধ ছিল ঠিকই, তবে সেদিকের চেয়ে এর প্রধান গুরুত্ব হল- এই যুদ্ধের হাত ধরে তদানীন্তন দুনিয়ার এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়ায় প্রবেশ ঘটেছিল। কী সে নতুন সম্পর্ক? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় ১৯৪৫ সালে। ফলে ১৯৪৫ সালকে বেঞ্চমার্ক ধরলে তার আগের দুনিয়ার বৈশিষ্ট্য ছিল, সেটা কলোনি শাসন সম্পর্কের দুনিয়া। ইউরোপের ব্রিটিশ ও ফরাসিরাসহ মোট পাঁচ-ছয়টি সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র সমগ্র দুনিয়ার বাকি রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিজেদের কারো না কারো ভাগের দখলি কলোনি করে নিয়ে রেখেছিল। এশিয়া ও আফ্রিকা দুটা পুরা মহাদেশকে উপনিবেশ বা কলোনি বানিয়ে রাখা কলোনিকর্তা ছিল ইউরোপ। কেবল আমেরিকা এসবের ভেতরে ছিল না, আলাদা অবস্থান ছিল তার। এই ছিল সেই কলোনি-সম্পর্কের দুনিয়ার শাসন চিত্র। আর এর বিপরীতে ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়ার বৈশিষ্ট্য হল – কলোনি শাসন-সম্পর্কের অবসান। দুনিয়া কলোনিমুক্ত হওয়ার যুগ। ফলে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও তারা এরপর থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র; অন্তত প্রত্যক্ষ বিদেশী শাসনের অধীনে আর তারা রইল না। তবে এক নতুন সম্পর্ক – আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সম্পর্কের ভেতরে তাদের প্রবেশ ঘটে। বলা বাহুল্য, আগের কলোনি শাসন সম্পর্কের বদলে এটা তুলনামূলক অর্থে, অবশ্যই ভাল। কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র তারা বটে, তবে নিজের দুর্বল অর্থনীতি, অগ্রসর অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোর সাথে অসম সম্পর্ক, দুর্বল চুক্তি করার ক্ষমতা, দুর্বল বিনিয়োগ সক্ষমতা ইত্যাদি এগুলো বৈশিষ্ট্য তাদের। এক ভিয়েতনাম (১৯৭৫) বাদ দিলে এশিয়ার কলোনিমুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হতে পুরো পঞ্চাশের দশক পার হয়ে যায়। আর আফ্রিকায় দক্ষিণ আফ্রিকাকে (১৯৯৪) বাদ দিলে কলোনি শেষ হতে সেখানে সত্তরের দশক পর্যন্ত লেগে যায়। এভাবে বহু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এটাই সেই আমেরিকার নেতৃত্বে ক্যাপিটালিজমের এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়া। কলোনি-ক্যাপিটালিজমের সাথে তুলনায় বিপরীতে আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল-ক্যাপিটালিজমের এক নয়া দুনিয়া। ততকালে উঠে আসা ব্যাপক পুজি বিনিয়োগ সক্ষমতার গ্লোবাল পুজি বাজারের আড়ত – ওয়াল স্ট্রিট – এর স্বার্থ ছিল আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল-ক্যাপিটালিজম।
    দ্বিতীয়ত, আমেরিকার পক্ষে এই নেতৃত্ব নেয়া বা দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেয়া কেন সম্ভব হয়েছিল, এ দিক থেকে ঘটনা ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, এর মৌলিক কারণ আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা। বলা হয় ১৮৮০ সাল থেকেই অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত সঞ্চয় ও পুঞ্জীভবনের দিক থেকে আমেরিকা সেকালের সবচেয়ে বড় কলোনিমাস্টার, এম্পেরিয়াল ইংল্যান্ডকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নাৎসিবিরোধী অ্যালায়েড ফোর্স – এই জোটের সব রাষ্ট্রকেই আমেরিকা এককভাবে সাহায্য করতে সক্ষম ছিল এবং তা করেছিল। অর্থাৎ মোট যুদ্ধখরচের এক প্রধান অংশ আমেরিকা একাই বহন করতে সক্ষম ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নসহ নাৎসি ব্লক-বিরোধী সবাইকে আমেরিকা অর্থ (তৈরী পণ্য পাঠিয়ে যেমন- যুদ্ধজাহাজ, প্লেন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের খাদ্যদ্রব্য বা সেনা-ইউনিফর্মসহ সবকিছু) ধার দিয়েছিল। ধার লিখলাম বটে; কিন্তু কবে কিভাবে এটা পরিশোধ হবে, তা উহ্য রেখে এই সাহায্য দেয়া হয়েছিল। আমেরিকার ‘লেন্ড অ্যান্ড লিজ অ্যাক্ট’ নামে এক আইনের অধীনে এটা দেয়া হয়েছিল। এই আইনের অনেকগুলো ভার্সন আছে। আইনটি শুরু হয়েছিল ১৯৩৫ সাল থেকে cash & Carry act এবং  Neutrality act নামে বিভিন্ন সংশোধিত ভার্সান থেকে। এরপর ‘Lend-Lease Act”  ১৯৩৯ আর শেষে ১৯৪১ সালের সংশোধিত ভার্সনই এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। কংগ্রেস ও সিনেটে পাস হওয়া এই আইনের মূল কথা- আমেরিকার নিরাপত্তার স্বার্থে প্রেসিডেন্টকে এক অবাধ ক্ষমতা দেয়া হয়। যেমন- প্রেসিডেন্ট যদি মনে করেন অমুক রাষ্ট্রকে একটা নতুন যুদ্ধজাহাজ দেয়া কিংবা ১০০ টন চিনি পাঠিয়ে দেয়া আমেরিকা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি, তবে প্রেসিডেন্ট ওই রাষ্ট্রকে এই আইনে তা দিতে পারেন। অর্থাৎ মূল শর্ত হল, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ‘মনে করলেই’ (deem) যথেষ্ট। এখানে লক্ষণীয় হল, এটা অনুদান বলা হয় নাই। বরং সুনির্দিষ্ট করে আমেরিকা সরকারের দেয়া ধার অথবা লিজ। ফলে তা পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু কবে কিভাবে, তা নিয়ে কোনো শর্ত নেই। উল্লেখও নাই। ইচ্ছা করে এ দিকটি উহ্য রাখার নিয়ম করা  হয়েছিল, যাতে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট সেটা পরে কোনো এক সময় উভয় রাষ্ট্রের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় নিয়ে তা ঠিক করতে পারেন। চাই কী মাফ করে দিতে পারেন। যুদ্ধ শেষে এক হিসাবে দেখা যায়, আমেরিকা এই আইনে ধার অথবা লিজ দেয়া মোট সম্পদ হস্তান্তর করে ফেলেছে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের। (এখনকার ২০১০ সালের সমতুল্য মুল্যে এটা ৭৫০ বিলিয়ন ডলার)। ওর মধ্য কেবল সোভিয়েত ইউনিয়নকে দেয়া হয়েছিল ১১ বিলিয়ন ডলারের (মোট ৫০ বিলিয়ন ডলারের ২২% ) সাহায্য-পণ্য। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে আমেরিকার লেন্ড এন্ড লিজ আইনে করা সাহায্য চুক্তির প্রটোকল এখানে দেখা যেতে পারে। যুদ্ধ শেষে এই খরচের বেশির ভাগই মওকুফ করে দেয়া হয়। কোনো জাহাজ বা প্লেন যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট হলে তা নিজেদের এলায়েড যুদ্ধজোটের  পক্ষ থেকে হয়েছে বলে তার কোনো দাম ধরা হয়নি। আর বাকিটা দীর্ঘ ৬০ বছরের কিস্তিতে ২ শতাংশ সুদে পরিশোধ করার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এই পরিশোধের চেয়েও তখন বড় প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছিল, সারা ইউরোপে যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে বিনিয়োগ কে কোথা থেকে জোগাড় করবে? কে দেবে? সে সময় সক্ষম একমাত্র রাষ্ট্র ছিল আমেরিকা। ইতালিতে দুর্ভিক্ষাবস্থা সামলাতে অনুদান দেয়া থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটসহ সারা ইউরোপে ভেঙে পড়া অবকাঠামো আবার নির্মাণ, কারখানা পুনর্নির্মাণ এবং তা চালু করার পুঁজি, এভাবে সব কিছুতেই বিনিয়োগ ঢেলে দেয় একা আমেরিকাই। বলা হয়, যুদ্ধের খরচের প্রায় সমপরিমাণ বিনিয়োগ শুধু অবকাঠামো পুনর্নির্মাণেই ব্যয় করতে হয়েছিল। ইতোমধ্যে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ আর ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গঠন করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এই প্রথম সচল হতে শুরু করেছিল। অপর দিকে, ইউরোপের জার্মানি আর এশিয়ায় জাপানের যুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসেবে পুনর্গঠনের জন্য আমেরিকা বিশেষ বিনিয়োগ প্রোগ্রামে ‘মার্শাল প্লান’ নিয়েছিল। এভাবেই আমেরিকার নেতৃত্বে এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম গড়ে উঠেছিল। সেই থেকে নানা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, জাতিসঙ্ঘ এবং ১৯৪৮ সালের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ইত্যাদির মাধ্যমে গ্লোবাল নিয়মশৃঙ্খলার এক অর্ডার কায়েম করেছিল আমেরিকার নেতৃত্ব। আর স্বভাবতই নিজের স্বার্থকে প্রাধান্যে রেখে একক দুনিয়া চালিয়ে আসছিল দেশটি।
    ইউরোপের কলোনি ক্যাপিটালের ভেতরেই যেমন আমেরিকার অর্থনৈতিক উত্থান ঘটেছিল ১৮৮০ সালের দিকে, ঠিক তেমনি ১৯৭২ সাল থেকে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে ফাইনালি চলতি একুশ শতক থেকে নতুন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীন হাজির হয়েছে। আর ততটাই চীন আমেরিকান সক্ষমতার বিপরীতে চ্যালেঞ্জ আকারে হাজির হচ্ছে। আমেরিকার ক্রমেই সক্ষমতার দিক থেকে ঢলে পড়ছে। আর এই পথে সে যেতে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনা হল, আমেরিকার আফগানিস্তান (২০০১) ও ইরাকে(২০০৩) হামলা। এক দিকে সমাপ্তিহীন এ যুদ্ধ, আবার যুদ্ধের ফলাফল নিজের পক্ষে তেমন না আসা, আর সব কিছুর ওপর যুদ্ধের সীমাহীন ব্যয়- এসব কারণে আমেরিকার অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খায় সে এখান থেকে। এছাড়াও আবার এরপর গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা নেমে আসে ২০০৭ সালের শেষে। এভাবে অর্থনৈতিক দিক থেকে রাষ্ট্রকে পুরাপুরি বিপদে ফেলার কাজটি ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট বুশ তার দুই টার্মে (২০০১-০৮)। এরপর বারাক ওবামা। প্রথম টার্মে তিনি প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়েছিলেন জানুয়ারি ২০০৯ সালে। আর দ্বিতীয় টার্মে ২০১৩ সালে। এর মধ্যে সর্বপ্রথম ২০১১ সালে, আমেরিকার পুরাতন নীতি-পলিসিগুলো নতুন করে সাজানোর প্রথম সুযোগ পান ওবামা। ইতোমধ্যে তিনি যুদ্ধ থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের সময়সীমা সাব্যস্ত করেছিলেন ২০১৪ সাল। কিন্তু দেশের অর্থনীতির শুকিয়ে যাওয়া দেখে তো বটেই, সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত দেখে (আমেরিকান অহঙ্কারে ঘা লেগেছে) এগুলো যে আমেরিকার নেতৃত্ব ও সক্ষমতা ঢলে পড়ার ইঙ্গিত- এ নিয়ে দেশের ভেতরে আলোচনা প্রবল হতে থাকে। ওদিকে ২০১১ সালেই ওবামা প্রথম অনেকটা সরাসরি চীন ঠেকানোর “এশিয়া নীতি” (PIVOT to Asia Policy) ঘোষণা করেছিলেন। আর ঐ বছরেরই মে মাসে ওবামা একসাথে ইউরোপের ছয় রাষ্ট্র সফরে বের হয়েছিলেন।
    প্রথমেই আয়ারল্যান্ড ও ব্রিটেন সফরের সময় থেকেই তিনি মনোবল বাড়ানো বা ফেরানোর জন্য বক্তৃতা শুরু করেছিলেন। ‘আমরাই এখনো দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেবো’, ‘পাশ্চাত্য এখনো দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেবে’, এই ছিল তার নতুন বয়ান। বৃটিশ পার্লামেন্টে বক্তৃতায় ওবামা যা বলেছেন তা নিয়ে ২৫ মে ২০১১ বিবিসির ভাষ্য ছিল এরকম,

    “……But he rejected arguments that the rise of superpowers like China and India meant the end for American and European influence in the world.
    “Perhaps, the argument goes, these nations represent the future, and the time for our leadership has passed. That argument is wrong. The time for our leadership is now,” he said.
    “It was the United States, the United Kingdom, and our democratic allies that shaped a world in which new nations could emerge and individuals could thrive.”

    এটা তিনি চালিয়ে গিয়েছিলেন ২০১৪ সাল পর্যন্ত। আমেরিকার ওয়েস্ট পয়েন্ট মিলিটারি অ্যাকাডেমির গ্র্যাজুয়েশনে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘উদাহরণ হয়ে আমেরিকাকে দুনিয়াতে নেতৃত্ব দিতে হবে।’ পরের সপ্তাহেই চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্যাপারটা নিয়ে ঠাট্টা করেন।  সে যাই হোক, কিন্তু আসল কথা তত দিনে সবাই বুঝে গেছে, আর কিছুই ফিরবে না। আমেরিকার অ্যাকাডেমিক, থিঙ্কট্যাঙ্ক ইত্যাদি সব জায়গায় একই বিতর্ক বিষয়, আমেরিকান নেতৃত্ব, সক্ষমতার ঢলে পড়া। ইতোমধ্যে ২০১১ সালে আমেরিকার ভেতরের চাকরি বা কাজের সুযোগ, উৎপাদন ও পড়ে যাওয়া বাজার ঠিক করতে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ককে পুনঃদরকষাকষিতে নিয়ে কিছু চাকরি এবং সুবিধা ফিরিয়েছিলেন ওবামা। কিন্তু খুব বেশি কিছু হয়নি বা আগায় নাই তাতে। আমেরিকান প্রডাক্ট অথবা লেবার, প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়েছে, এটা এখন প্রতিষ্ঠিত। এসব কিছুর প্রভাবে এক ব্যাপক সামাজিক হতাশা চার দিকে ছেয়ে বসেছে।

    এইবারের (২০১৬) আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মূল ইস্যু ছিল আসলে এটাই। এ কাজে ‘রেগুলার পলিটিক্যাল অ্যাপ্রোচ’ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার যারা গিয়েছেন সেই লিবারেলদের পক্ষে কোনো আবেদন ছিল না। তাই যার রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, কখনো কোনো স্তরে জনপ্রতিনিধি ছিলেন না যিনি, এমন এক ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পই নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের কাছে প্রধান ভরসা হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। নির্বাচনে জেতার পর আমেরিকার এখন দরকার এক কল্পিত শত্রু – যার বিরুদ্ধে জনগণকে ক্ষেপিয়ে অভ্যন্তরীণ গণসংহতি তৈরি করতে হবে। স্বভাবতই চাকরির দিক থেকে অবৈধ অভিবাসী, বিদেশী এবং ‘মুসলমান’ এদের বিরুদ্ধে লোক ক্ষেপানো তুলনামূলকভাবে সহজ ও ফলদায়ক বলে মনে করা হয়। অভ্যন্তরীণভাবে এই কৌশলকে যারা সঠিক ও উপযুক্ত মনে করেন, তাদের নতুন নামকরণ হয়েছে উগ্র ডানপন্থী অথবা বিকল্প ডানপন্থী বলে। এরা মনে করেন, এই পথ এখন সবচেয়ে কার্যকর। যেমন ট্রাম্প জিতে গেছেন এখন কে কে ট্রাম্পের সাথে প্রশাসনে বসবেন – তাদেরকে বেছে নিবার লড়াই চলছে। সে লড়াইয়ে এখনও কারা “মুসলমানদের আলাদা রেজিস্ট্রিতে নাম লেখাতে হবে” এর পক্ষে থাকতে চান এটা সেখানে ইস্যু। বিকল্প ডানপন্থীরা মনে করছে, এমন অবস্থান না নিলে নির্বাচিত হিসেবে ক্ষমতার জনভিত্তি দেয়া যাবে না। আবার উল্টো দিকে বিকল্প ডানপন্থীদেরই কারবার দেখে প্রচলিত রিপাবলিকান যারা আছেন, তারা রেসিজম বা ইসলামোফোবিয়ার অভিযোগ বিরোধীরা আনবেন এই ভয়ে বা লিবারেলদের প্রচারণার ভয়ে ভীত। তারা চাচ্ছেন, বিকল্প ডানপন্থীরা যেন ট্রাম্পের আশপাশে মন্ত্রী-উপদেষ্টা হয়ে না আসেন। এই লড়াইটাই এখন এ দু’পক্ষের।
    অপর দিকে, ট্রাম্পের মাধ্যমে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার চাপের মুখোমুখি চীন হতে যাচ্ছে, তা তারা বুঝে গেছে। তাই চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উদ্বিগ্ন হয়ে আগেই বলে বেড়াচ্ছেন, (ট্রাম্পকে) মাথা ঠাণ্ডা করে মুখোমুখি বসতে হবে। ডায়ালগ ছাড়া আমাদের উভয়ের বিকল্প নেই। অর্থাৎ শঙ্কা, ট্রাম্পের কোনো গোঁয়ার্তুমিতে গ্লোবাল মন্দায় পড়ে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না। চার দিকে এক বিশাল অস্থিরতা বিরাজ করছে। সব মিলিয়ে এটা স্পষ্ট, সামনের পথ আরো অস্থিরতার, কোনো সহজ পথের আলো কোথাও নেই।
    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইন ২২ নভেম্বর সংখ্যায় (প্রিন্টে পরের দিন) কিছুটা ছোট করে ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার অনেক সংযোজন ও এডিট করে নতুন এডিশন হিসাবে আবার ছাপা হল।]

  • সার্ক ভুলিয়ে দেওয়া যায় নাই

    সার্ক ভুলিয়ে দেওয়া যায় নাই

    গৌতম দাস
    ১৪ নভেম্বর ২০১৬,সোমবার,

    সার্ক ভুলিয়ে দেওয়া যায় নাই

    গত সেপ্টেম্বর মাসে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার “বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক দিনব্যাপী এক আলোচনার আয়োজন করেছিল যার আমন্ত্রণে ঢাকায় এসেছিলেন সুহাসিনী হায়দার। তিনি দক্ষিণী ভারতের প্রাচীন এক ইংরেজি দৈনিক ‘দি হিন্দু’ পত্রিকার ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর বা পররাষ্ট্রবিষয়ক সম্পাদক। দেশে ফিরে যাওয়ার আগে তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেটা গত ১৪ অক্টোবর “দি হিন্দু” পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।
    সেই সাক্ষাৎকারটা নেওয়া হয়েছিল এমন এক সময়ে যখন এ’বছরের পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক সম্মেলন বাংলাদেশসহ কিছু দেশের বয়কট এবং বাতিল ঘোষণা হয়েছিল, এর পরপরই। প্রফেশনাল সাংবাদিক সুহাসিনীর একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড হল, তিনি আমেরিকার বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে ব্রডকাস্টিং জার্নালিজম বিষয়ে এমএ করেছেন। এরপর প্রায় ২০ বছর ধরে সাংবাদিকতা পেশায়। এর আগে তিনি ভারতীয় সিএনএন-আইবিএন টিভির এঙ্কর ও পররাষ্ট্রবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। ফলে একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড আর কেরিয়ার দেখে এটা বলার সুযোগ নেই যে তিনি অভিজ্ঞ নন। তাই, প্রধানমন্ত্রীকে করা তার প্রশ্ন কোনো নাদানের প্রশ্ন তা মনে করার কারণ নেই। কিন্তু লক্ষণীয় দিকটি হল, তার করা প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী হাসিনাও বিরক্ত হয়েছেন। আমার ধারণা, যারা এই সরকারের বিরোধী, বাংলাদেশের এমন যে কেউও সুহাসিনীর প্রশ্নে বিরক্ত হবেন এবং অপছন্দ করবেন।
    কিন্তু কী ছিল সে সাক্ষাতকারে? বাংলাদেশে গত সংসদ নির্বাচনের (২০১৪ জানুয়ারি) আগে-পরের সময় থেকে হাসিনা সরকারের নির্বাচনী বৈধতার ব্যাপারটি বিতর্কিত হয়ে আছে। ঐ নির্বাচনের আগের মাসে, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের তখনকার পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসে স্পষ্ট প্রকাশ করে দিয়ে যান যে, এক “অনির্বাচিত নির্বাচনই” তাদের পছন্দ ও সমর্থনের। এভাবেই তারা আওয়ামী লীগ সরকারকেই “নির্বাচিত” দেখতে চান। আর সেই থেকে বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অগ্রহণযোগ্য হয়ে আছে; যদিও বাংলাদেশ সরকারের সাথে ব্যবহারিক কাজের সম্পর্ক তারা রেখেছেন। তবে নির্বাচনী বৈধতার ব্যাপারটি বিতর্কিত হয়ে আছে, সেটা জানাতেও ভোলেন না। এরপর থেকে “ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থে” বাংলাদেশ চলে, এমন বয়ান অনেকেই রাখেন। বাংলাদেশ একটা Vassal State বলে জাপানভিত্তিক ‘ডিপ্লোম্যাট’ পত্রিকা এক আর্টিকেল ছেপেছিল। সারকথায়, এটা ভারতের দয়ায় চলা ভারতের দিকে ঝুঁকে থাকা সরকার, এমন অভিযোগ মাথায় নিয়েই এই সরকার চলছে। অনেক সময় মন্ত্রী ও নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে এমন অভিযোগের অনুকূলে কথা প্রকাশ হয়ে পড়ে। এই হলো পটভূমিগত পরিস্থিতি। এমন পরিস্থিতির কথা সুহাসিনী হায়দারের অজানা থাকার কোনো কারণ নেই। এসব বিষয়ে তার নিজেরই অনেক রিপোর্ট আমরা দেখেছি। অথচ ঐ সাক্ষাতকারে ঠিক এর বিপরীত – সুহাসিনীর প্রায় সব প্রশ্নের পেছন এক ধরে নেয়া অনুমান থেকেছে যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কেন যথেষ্টভাবে ভারতের তল্পিবাহক হচ্ছেন না অথবা তার আরো হওয়া উচিত, এ ধরনের। এ ছাড়া তার প্রায় সব প্রশ্নই ভিতরেই একধরনের বোকামি বা নাদানিতে ভরপুর উপাদান রয়েছে। যেমন সব রাষ্ট্রেরই সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন  ইস্যুতে তার নিজস্ব কিছু বয়ান-অবস্থান থাকে, যা একান্তই তার বয়ান। আর সেটা অন্য রাষ্ট্র বা ভিন নাগরিককেও মানতে হবে, এটা সে আশা করে না বা সেদিকে তাকিয়ে ঐ বয়ান অবস্থান নেয় না। কিন্তু এর পরও সে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে পারস্পরিক স্বার্থে বিভিন্ন মাত্রায় সম্পর্কে জড়ায়। অর্থাৎ নিজের অবস্থানের সাথে অপর রাষ্ট্র একমত না হয়েও সম্পর্ক গড়ে ওঠে, আগায়। সেখানে  অপর রাষ্ট্রকে নিজ রাষ্ট্রের সাথে একমত হতে হবে এমন কোন পূর্বশর্ত থাকে না বা সেটা জরুরিও নয়। এসব বিষয়গুলো ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর হিসেবে সুহাসিনীর জানা না থাকার কিছু নেই। কিন্তু প্রতিটি প্রশ্নে সুহাসিনী বলতে চেয়েছেন, হাসিনা কেন বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের বয়ান-অবস্থানের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন না? কখনও কখনও এটা এমন জায়গায় গেছে যে মনে হয়েছে  হাসিনা কেন ভারতীয় অবস্থান নিচ্ছেন না সে প্রশ্ন তুলে হাসিনাকে অভিযুক্ত করতে বা জবাবদিহিতা চাইতেই যেন এই সাংবাদিক দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং বাংলাদেশে এসেছেন। অর্থাৎ তিনি পেশাদার সাংবাদিক কম বরং জাতীয়তাবাদী সৈনিক বেশি হয়ে উঠা বেশি – হয়ে পড়েছিলেন।
    তার প্রথম প্রশ্ন ছিল, এবারের পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক সম্মেলন বাতিল হওয়া এবং বাংলাদেশের তাতে না যাওয়া প্রসঙ্গে। তিনি প্রশ্ন করছেন- এর ফলে সার্ক কি শেষ হয়ে গেল?
    এখানে আগে এই প্রশ্নের পিছনের কিছু তথ্য বলে নেয়া ভাল। ভারতের উরি সামরিক ঘাঁটিতে কথিত হামলার পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য মোদি সরকার জনমতকে ক্ষিপ্ত করে তুলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষে যুদ্ধে না গিয়ে ‘বিদেশের সাথে সম্পর্কের দিক থেকে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করব’ এটাই মোদির চরম অ্যাকশন হবে বলে তিনি কথা শেষ করেছিলেন। আর পরদিন থেকে ভারতের সব মিডিয়া ‘জাতীয়তাবাদী জোশে’ বাস্তবতা ভুলে মোদির কথা সফল করতে উঠে পড়ে লেগেছিল। ফলে সুহাসিনীর প্রশ্নের ভেতর সেই সস্তা জোশই আমরা দেখেছিলাম। যেন সাংবাদিকতায় অবজেক্টিভ থাকার বিষয়টা তিনি  ‘জাতীয়তাবাদী’ থাকা দিয়ে বদলে নেয়েছেন। অথচ সস্তা জাতীয়তাবাদ কোনো পেশাদার সাংবাদিকের সাথে কোনোভাবেই মানানসই নয়। আসলে ভারতের মিডিয়ার এক রেওয়াজ হল, পাকিস্তানের সাথে যে কোন যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে (সত্য-মিথ্যা অথবা সরকারের সংকীর্ণ নিজ দলের পক্ষে ভোট পাবার স্বার্থের কারনে যুদ্ধের হুঙ্কার বা পরিস্থতি তৈরি করলেও) বিচার-বিবেচনা শুণ্য উগ্র জাতীয়তাবাদী হয়ে সরকারের পক্ষে দল বেধে দাঁড়িয়ে যাওয়াটাই সাংবাদিকতা হয়ে যায় তখন। সেই রেওয়াজে এবারও ভারতের প্রায় সব মিডিয়া চিন্তাশূন্য হয়ে বেকুবের মতো বিশ্বাস করে নিয়েছিল, মোদির হুঙ্কার সত্যি জেনুইন। অথচ জোশ কিছু ঢিলা হবার পরে এই মিডিয়াই লিখেছিল যে আসন্ন ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে ভাল রেটিং পাবার সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে মোদী সরকার পাকিস্থানের সাথে যুদ্ধ-যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করেছিলেন। অর্থাৎ পেশাদারিত্ব ভুলে  ভারতের মিডিয়া এভাবেই বাস্তবতার বিচার-বিবেচনা শুণ্য হয়ে যাওয়া কোন ব্যাপারই না। যেমন মোদীর যুদ্ধের দামামা বা পাশা উল্টে যাবার পরে, (সুহাসিনীর ঐ প্রশ্ন প্রকাশের ছয় দিন পরে) ২০ অক্টোবর আনন্দবাজার লিখেছিল, “পাকিস্তানকে সন্ত্রাসের জন্মদাত্রী হিসেবে তুলে ধরতে মোদির আহ্বানে সাড়া দেয়নি বেইজিং। …ব্রিকসে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করতে চেয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু আগবাড়িয়ে খেলার সেই রণকৌশল নিয়ে আখেরে যে কোনো লাভ হয়নি, বারবার তা সামনে চলে আসছে। চীন, আমেরিকার পরে ব্রিটেনও জানিয়ে দিলো, পাকিস্তানকে সন্ত্রাসের জন্মদাত্রী আখ্যা দিয়ে মোদির সুরে সুর মেলাতে রাজি নয় তারা। এমনকি বেইজিংয়ের সুরেই লন্ডনের ব্যাখ্যা, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ত্যাগ স্বীকার করেছে ইসলামাবাদ”। অর্থাৎ এবার খোদ আনন্দবাজারই নিজ দেশের সরকারের সমালোচনা করা ছাড়া উপায় দেখে নাই।

    ওদিকে  পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করবেনই – মোদীর এমন প্রতিজ্ঞার প্রকাশের পর এটা নিয়েও ভারতের মিডিয়া – ‘রাজা যত বলেন পারিষদ বলে তার ততগুণ’ – অবস্থা করে ছেড়েছিল। যেন মোদী তা করেই ফেলেছেন। ব্রিকস – রাইজিং ইকোনমির পাঁচ দেশের অর্থনৈতিক জোটের এবারের সামিট সম্মেলন ডাকা হয়ে ছিল ভারতের গোয়ায়। সাথে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল যে ব্রিকসের শেষদিনে আর এক দক্ষিণ এশিয়া জোট (BIMSTEC) (The Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) এর সাথে মিলে যৌথ বৈঠক হবে। বিমসটেক ((BIMSTEC)) আসলে সার্কের পাঁচ রাষ্ট্র আর সাথে বার্মা ও থাইল্যান্ডকে সাথে নিয়ে তৈরি। আর ওদিকে ভারতের কূটনৈতিক খায়েশ ছিল (খায়েশ বলতে হচ্ছে কারণ এটা ভারতের এক এবসার্ড মুরোদধীন কল্পনা। নিজের বাস্তব মুরোদে না, অন্যের ঘাড়ে চড়ে স্বপ্ন-জাল বুনা) যে বিমসটেককে এমনভাবে সামনে আনা যাতে সার্কের প্রয়োজন বা অস্তিত্বের কথা আর মনে না পড়ে। তা সার্কের বিকল্প হয়ে উঠে। ফলে পাকিস্তান বাদ পড়ে। বাস্তবে থাকুক আর নাই, কথার ফুলঝুড়ি তুলতে ওস্তাদ কলকাতার আনন্দবাজার, ০৪ অক্টোবর এক রিপোর্ট লিখেছিল যার শিরোনাম হল, “পাকিস্তানকে এড়িয়ে ‘সার্ক-টু’ করতে চায় নয়াদিল্লি” । আর তাতে প্রথম বাক্য লিখেছিল, “পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে সার্ক সম্মেলন!”। আসলে স্বপ্ন দেখাটা সমস্যা নয়। সমস্যা হল কেন সেই স্বপ্ন বাস্তব হবে না তা ভেবে দেখা ত্যাগ করাটাই সমস্যা।  আর সাথে তো আছেই  ‘মুই কী হনু রে’ ভাব নেয়া। ব্যাপারটা যেন সবচেয়ে বেশি লেপ্টে গেছে বাংলাদেশে ভারতের এক প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত (২০০৭-০৮ সালে) পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীকে ঘিরে। তিনি বর্তমানে আমেরিকান সাপোর্টে চলা একটি ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক ওআরএফের (Observer Research Foundation (ORF)) ফেলো। তার ঢাকায় পোস্টেড থাকার সময়ও তিনি ‘মুই কী হনু রে’ ভাব রেখে গেছেন।  প্রায় একই ঐসময়ে বাংলাদেশের কিছু বিশেষ সাংবাদিক ভারতে গিয়েছিলেন। গত ৪ অক্টোবর যুগান্তর সেকথা ছেপেছিল এক রিপোর্ট। পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর জবানে যুগান্তর লিখছিল, তিনি বলেন, “এখন সার্কের কথা ভুলে যান। বিমসটেকের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে আমি বাংলাদেশকে আহ্বান জানাই”। কথাগুলো পিনাক বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় বলেছেন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে  পিনাক চক্রবর্তীও মোদির কথা সত্যি হয়ে গেছে বা আছে বলে বিশ্বাস করেছিলেন।

    ব্যাপারটা কীভাবে শেষ হল?  আমাদের প্রথম আলো পত্রিকায় গত ২৬ অক্টোবর এক রিপোর্টের শিরোনাম হল, “সার্কের বিকল্প হচ্ছে না বিমসটেক”। আসলে কোন কিছু বিশ্বাস করার ভিত্তি কী এরা কী করে তা চিন্তা করে আল্লায় জানে। যেন “ভারত চাইছে” – এটুকুই যথেষ্ট সেকথা বিশ্বাস করা জন্য। আসলে গ্লোবাল অর্থনীতির বিকাশ ও এর সাথে ছড়িয়ে পড়া জটিল সম্পর্কের কারণে চীন ও আমেরিকার (আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমাস্বার্থের ওয়ার অন টেররের লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় স্প্রিংবোর্ড রাষ্ট্র হল পাকিস্তান) পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের গভীরতা ও নির্ভরশীলতা ভারত পড়তে অক্ষম – এটা তাই প্রমাণ করে। যেন ভারত এমনই এক আদুরে সন্তান যার খেয়ালকে চীনসহ পশ্চিমারাষ্ট্রগুলোকে নিজ স্বার্থ ভুলে গুরুত্ব দিতেই হবে। এবং এটা সম্ভব। এসবের নিট ফয়াফল হল এমন এবসার্ড স্বপ্ন-জাল বুনা। আর এদের চক্কড়ে পড়েছে চিন্তাভাবনা ত্যাগ করা বাংলাদেশেরও কিছু মিডিয়া ও সাংবাদিক। প্রথম আলোর রিপোর্টার রাহীদ এজাজ লিখেছেন, ‘গত মাসে নাটকীয়ভাবে স্থগিত হয়ে যায় সার্ক শীর্ষ সম্মেলন। এরপর থেকেই গোয়ায় ব্রিকস-বিমসটেক আউটরিচ শীর্ষ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জোটের নতুন মেরুকরণ নিয়ে জল্পনা শুরু হয়। পাকিস্তানকে ছাড়া সার্ক, এমন একটি ভাবনা সামনে এলেও শেষ পর্যন্ত সেটি ফলপ্রসূ হয়নি। বিশেষ করে সার্কের বিকল্প জোট হিসেবে বিমসটেক যে যথেষ্ট কার্যকর হবে না, সেটি স্পষ্ট হয়েছে গোয়ায় ১৬ অক্টোবর শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের পর”। এখন কথা হল যে ভারতের মিডিয়া এসব গ্লপগাথা বিশ্বাস করছে করুক কিন্তু প্রথম আলো বা রাহিদ এজাজ এরাও এটা বিশ্বাস করেছিল। কেন? কোন টানে বা সুত্রে?
    মূলত এমন ঘটনাগুলো ঘটবার পিছনের আর কিছু সমস্যা হল, এটা ঠিক যে  চীন ঠেকাতে মরিয়া হয়ে আমেরিকা ভারতকে পাশে চায়। আর তাতে ভারতকে হিতাহিত জ্ঞান ও বাস্তবতা ভুলে অসম্ভব বায়না ধরা বালকের মতো আচরণ করতে হবে কেন? বাস্তবতার মধ্যে বিচরণ করলে তো কোন সমস্যা নাই। তাও হয়তো এটা তেমন সমস্যা মনে হতো না। কারণ আমেরিকার দুর্দশা থেকে ভারত ফায়দা লুটতে চাইলে বলার কী আছে? আর ভারতের তা না নিবার কিছু নাই। কিন্তু বড়ভাই পিঠে হাত রেখেছে বলে, ভারত নিজেই আপনা আপনি এক অর্থনৈতিক বা স্ট্রাটেজিক পরাশক্তি হয়ে গেছে, এই ‘মুই কী হনু রে’-এমন ভাবনাই ভারতের ইন্টেলিজেন্সিয়ার আসল সমস্যা। পিনাকি বা সুহাসিনী এর নমুনা। অথচ মূল সূত্র হল, সবার আগে রাষ্ট্রকে নিজ মুরোদে অর্থনৈতিক অর্থে পরাশক্তি হয়ে উঠতে হয়। সেটাও কেউ বিপদে পড়ে ঘুষ দিয়েছে বা পিঠে হাত রেখেছে- এভাবে অর্জনের জিনিস নয়। দুনিয়ার প্রথম সারির উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের অর্থনীতির দেশ হতে হয় আগে। এটা অর্জনের বিষয়। কারও দান অনুগ্রহে বা বিপদে পড়ে দেয়া ফেবার থেকে এটা অর্জন করা যায় না।

    আর এক মজার দিক হল, সার্কের ম্যান্ডেট যেভাবে লেখা আছে সেই ম্যান্ডেট হিসেবে সার্ক বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নিয়ে কথা ওঠার কথাই নয়। ফলে সার্ক বৈঠকে বসতেতে না চাওয়ার পক্ষে কোন শক্ত যুক্তি নাই। তবুও এটাই সত্য যে ভারতের কূটনৈতিক লবির ‘সাফল্য হিসেবে’ বাংলাদেশ ও ভারত এবং আরো দুই রাষ্ট্র সার্ক বর্জন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এই বর্জনের আসল কারণ প্রকাশ্যে স্বীকার করতে হবে, ব্যাপারটা এমন একেবারেই নয়। কিন্তু সুহাসিনী জিদ ধরেছেন, হাসিনাকে প্রশ্নের চাপে ফেলে এটা স্বীকার করাবেনই। তাই তাঁর প্রশ্ন, “পাকিস্তান সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদ ছড়ানো দেশ। এটা কি আপনার সার্ক বর্জনের প্রধান কারণ নয়? সার্ক পরিত্যাগ কি পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য নয়?”। মহা সমস্যা, এই সুহাসিনীকে কে বুঝাবে যে এই ব্যাখ্যা বয়ান একান্তই ভারতের। এটা ভারতের আভ্যন্তরীণ কনজাম্পশনের জন্য। ভারতের পক্ষে কাজ করতে চাইলেও হাসিনা এই বয়ান তারও বয়ান-অবস্থান বলে স্বীকার করে নেয়া জরুরি না।  কিন্তু সুহাসিনীরা মনে করেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ‘ভারতের পক্ষে সার্ভিস ও কূটনৈতিক সাড়া’ সুহাসিনী যেভাবে দেখতে চাইছেন ঠিক সেভাবে দিতেই হবে। অন্য  কোনভাবে হলে এতেও তার মন ভরবে না। তবুও শেখ হাসিনা ধৈর্য ধরে ঠাণ্ডা মাথায় জবাব দিয়ে বলেছেন, “পাকিস্তানের ভেতরের কিছু কারণে (অর্থাৎ পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদের জন্য বা ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্বে ভারতের পক্ষে থাকার জন্য নয়) আমরা সার্কে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ভারত-পাকিস্তানেরও দ্বিপক্ষীয় বিরোধ আছে। কিন্তু আমি এটা নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না। ভারত উরির জন্য সার্কে যায়নি, আর বাংলাদেশের কারণ এ থেকে ভিন্ন”। অর্থাৎ “মন্তব্য করতে না চাওয়ার কথা” বলে হাসিনা ইঙ্গিত দিচ্ছেন তাকে চাপাচাপি করা সুহাসিনীর ঠিক হচ্ছে না। তবু এমন জবাব পেয়েও সুহাসিনী সন্তুষ্ট নন। তিনি আবার প্রশ্ন করছেন, “আপনি কি কাশ্মিরের সীমান্তরেখা এলওসি পার হয়ে পাকিস্তানে ঢুকে সন্ত্রাসী মারতে ভারতের যাওয়া সমর্থন করেন না?”। হাসিনা আবারো মাথা ঠাণ্ডা রেখে জবাব দিচ্ছেন, “আমার মনে হয়, এলওসি বরাবর উভয় পক্ষের নীরবতা বজায় রাখা উচিত, যাতে তা শান্তি আনে”। কিন্তু সুহাসিনী হাসিনার মুখ দিয়ে যেন ভারতের বয়ান-অবস্থানের ভাষায় কথা বলাবেনই বলে জিদ ধরেছেন। তাই তিনি আবার প্রশ্ন করেছেন, “আপনি কি এর নীতিগতভাবে সমর্থক নন? গত বছর সরকার ঘোষণা করেছিল, তারা সীমানা পেরিয়ে মিয়ানমারে সন্ত্রাসবাদীর সন্ধানে যাবে। আপনি কি বাংলাদেশের এমন অ্যাকশন করা সমর্থন করবেন?”।
    এবার হাসিনার পক্ষে আর ধৈর্য রাখা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, “শোনেন, এই প্রশ্ন আপনি আপনার সরকার আর প্রধানমন্ত্রীকে গিয়ে করুন। আমি মনে করি, ভারত-পাকিস্তান সীমান্তরেখা, এই এলওসি মান্য করতে হবে”।

    এতে সুহাসিনীর কী শিক্ষা হয়েছিল, তিনি কী বুঝেছিলেন আমরা বলতে পারব না। তবে তার দ্বিতীয় ধারার প্রশ্ন এবারঃ “আপনি কিছু দিন আগে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বলেছিলেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নেবেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তৎপর হতে এত সময় লাগল কেন, বিশেষত যেখানে অনেক মৌলবাদী গ্রুপ এর আগে অনেক হিন্দু আর ব্লগারকে মেরে ফেলেছে?”।
    জবাবে অনুমান করি প্রধানমন্ত্রী আবার ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তিনি বলেছেন, “কথা সত্য নয়। বাংলাদেশই প্রথম সন্ত্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে অ্যাকশনে গেছে। তদন্ত করতে সময় লাগে, শুধু আমার দেশে নয়, সব দেশেই। তাই বলে এটা বলা ঠিক নয় যে, আমরা তৎপর হচ্ছি ধীরগতিতে”।
    এবার সুহাসিনীর রাস্তা ভিন্ন, যা দিয়ে প্রশ্ন করলে শেখ হাসিনা ‘জব্দ’ হবেন আর সুহাসিনীর ক্রেডিট বাড়বে, এমন লাইনের প্রশ্ন।
    “মানবাধিকার গ্রুপগুলো অভিযোগ করছে যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হেফাজতে থাকা আসামিকে হত্যা, গুম অথবা হাঁটুতে গুলি করছে…”। সুনির্দিষ্ট করে হাটুতে গুলির কথা এসেছে এজন্য যে এর আগের সপ্তাহে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ‘হাঁটুতে গুলি’ করা নিয়ে এক লম্বা রিপোর্ট করেছিল, সেই বরাতের প্রশ্ন। ফলে এইবার শেখ হাসিনা তাকে থামিয়ে দিয়ে জবাব দিয়েছেন, ‘এটা খুবই দুর্ভাগ্যের যে, মানবাধিকার গ্রুপগুলো আজকাল ভিক্টিমের মানবাধিকারের বদলে ক্রিমিনালের মানবাধিকার নিয়ে বেশি সোচ্চার। আমেরিকায় কী হচ্ছে? তাদের স্কুলে বা কোথাও যখন টেরর আক্রমণ হয়, তখন তাদের বাহিনীগুলো কী করে? তারা কি আক্রমণকারীদের মেরে মানুষকে উদ্ধার করে না? আমাদের বাহিনী কি সন্ত্রাসীদের মারবে? না, যারা আক্রমণ করেছে, তাদের মারবে?’। মনে হচ্ছে এতে সুহাসিনী কিছু ঠান্ডা হয়েছেন।
    এরপর সুহাসিনীর সেই পুরান প্রশ্ন, আইএস আছে, আইএস নেই। “আইএস নিজেই বলছে, প্রধান সন্দেহভাজনদের তারাই ট্রেনিং দিয়েছে। আপনি অস্বীকার করছেন- এই অভিযোগ করলে আপনার জবাব কী?”।
    হাসিনা এখানে এসে আগের এতদিনের অস্বীকারের জায়গা থেকে একটু হেলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘হতে পারে আইএস ওদের কাউকে কাউকে আকর্ষণ করে। কিন্তু আমাদের এখানে আইএসের ঘাঁটি নেই। কেউ যদি দাবি করে, তাহলে আগে প্রমাণ দিক। আমরা আক্রমণকারীদের চিহ্নিত করেছি। আমরা জানি, তারা কোথা থেকে এসেছে এবং এরা সবাই স্থানীয়”।
    সুহাসিনী বলছেন, “আপনি বলছেন যুদ্ধাপরাধের বিচার জনগণের দাবি। কিন্তু নির্বাচিত জামায়াত নেতারা ফাঁসিতে ঝুলছেন, না হলে জেলে। অনেক বিএনপি নেতা গ্রেফতার না হলেও বিদেশে পালিয়েছেন। আপনি কি আপনার রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনকে যুদ্ধাপরাধের বিচার বলে চালিয়ে দিচ্ছেন না?”।
    “না, এটা আমার রাজনৈতিক বিরোধীদের বিষয় নয়। আপনি যদি একটা স্বাধীন দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, তাহলে আপনি স্বাধীনতাবিরোধীদের কিভাবে সমর্থন করেন? বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। বিএনপি নেতাদের নিয়ে মামলার বিষয়গুলো আলাদা, এগুলো হয় দুর্নীতি, না হয় অপরাধের মামলা। যদি এসব নেতা মনে করেন তারা নির্দোষ, তারা বিচারপ্রক্রিয়া মোকাবেলা করুন। আমি যখন বিরোধী দলে ছিলাম, তারা আমার বিরুদ্ধেও ডজন ডজন মামলা দিয়েছিল”। (এই শেষের বাক্যটি বলে হাসিনা কিন্তু অজান্তে প্রকারান্তরে অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছেন।)

    প্রসঙ্গ আপাতত এখানেই শেষ করতে হচ্ছে। এই সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থা স্বস্তিকর নয়। আমরা জানি না, পরে আর কখনো এই মহিলাকে সাক্ষাৎ দেয়া যাবে না, এমন সিদ্ধান্ত সেখানে হয়েছে কি না!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -২

    ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -২

    গৌতম দাস
    ০৪ নভেম্বর ২০১৬, বৃহস্পতিবার

    ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -২

    দ্বিতীয় ও শেষ পর্বঃ
    গত পর্বে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতের্তের প্রসঙ্গে বলেছিলাম, গত ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬, তিনি প্রেসিডেন্ট ওবামাকে “বেশ্যার ছেলে” ( ‘son of a whore’) বলে প্রকাশ্যে গালি দিয়ে ছিলেন। এমন শব্দের ব্যবহার খুব ভালো কথা নয় নিশ্চয়ই। ফলে তা প্রশংসার বিষয় নয়। কিন্তু এসবের পেছনে অর্থাৎ আমেরিকার বিরুদ্ধে দুতের্তের ক্ষোভের কারণ ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়াগুলো বোঝার দরকার আছে। সাধারণভাবে বললে, গালি দেয়ার কারণ – প্রেসিডেন্ট দুতের্তে নিজ দেশে অবৈধ ড্রাগের বাড়াবাড়ি বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে ড্রাগ ডিলার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিচারবহির্ভূতভাবে শুধু গুলি করেই মারছে না। দুতের্তে প্রকাশ্যেই দাবি করে বলছেন, “ড্রাগ ডিলাররা তার বৈধ টার্গেট। এরা আরো মরবে”। এ পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় চার্চ, মানবাধিকার সংগঠন, জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর সবশেষে ওবামা মানবাধিকার লঙ্ঘনের আপত্তি তোলায় সবাইকে অশ্লীল ভাষায়, প্রেসিডেন্টের পদমর্যাদার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ভাষায় তিনি পাল্টা গালাগালি করেছেন। দুতের্তে বলতে চান, বিচারবহির্র্ভূতভাবে হত্যাকাণ্ডগুলোকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার দিক থেকে দেখে অথবা দেখার সুযোগ নিয়ে অন্য কারো আপত্তি বা সমালোচনা তিনি শুনতে চান না। “তিনি বা তার দেশ যেহেতু এখনো স্বাধীন সার্বভৌম এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রের উপনিবেশ নয়, তাই তাদের ডিকটেশন বা সমালোচনা তিনি শুনবেন না”। এ কথা ঠিক যে, যে কোন রাষ্ট্রের যে কোন উছিলায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ নাই, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনাকে ইস্যু করে আমেরিকার কাছে এমন মানবাধিকার ইস্যু ভিনদেশে হস্তক্ষেপ করার হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা করা হয় সময়ে – এটাও গ্রহণযোগ্য নয়। ফিলিপাইনে ড্রাগের সমস্যা সঙ্কট মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছেছে, তা সমাধানের পদক্ষেপ নেয়া জরুরি, সে কথাও ঠিক। কিন্তু এসব কিছু ছাপিয়ে বড় কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রেসিডেন্ট দুতের্তে, তাঁর যে কোন সমালোচককে অভদ্র ভাষায় বাপ-মা তুলে গালি দিয়ে বেড়াচ্ছেন। সবার মূল কথা তাই হয়ে দাঁড়িয়েছে এই যে, অন্তত ভদ্রতার খাতিরে ভদ্র ভাষা ব্যবহার করেও তো দুতের্তে তার পয়েন্ট, তার সমস্যা ও বক্তব্য  তুলে ধরতে পারতেন। এমন না করার দোষে তিনি দুষ্ট।
    যা হোক, গালাগালি করার এমন পরিস্থিতির ফলে স্বভাবতই ওবামা এরপরে দুতের্তের সাথে তাদের নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করে দেন। যদিও এর পরের দিন দুতের্তে সাংবাদিকদের মাধ্যমে ওবামাকে ‘স্যরি’বলে ক্ষমা চেয়েছিলেন। কিন্তু তা কোন কিছুকেই আগের মত স্বাভাবিক করেনি; বরং তা ন্যূনতম একটি কাজ চালানোর মতো কার্যকর সম্পর্কের স্তরেও আর ফিরে আসেনি। এটা সেই থেকে আমেরিকা-ফিলিপাইন সম্পর্ককে পুরান গভীর ঘনিষ্টতার বিপরীতে বিরাট অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

    ওবামা-দুতের্তে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, আঞ্চলিক জোট ‘আসিয়ান’-এর সভা, যা এবার আয়োজিত হয়েছিল লাওসে, সেখানেই সাইড লাইনে। মানে মূল অনুষ্ঠান সূচির ফাঁকে। ফলে দুতের্তে-ওবামা দ্বিপক্ষীয় সভা বাতিল হলেও পরোক্ষে তাদের দেখা হয়েছিল ওই আসিয়ান সম্মেলনে, সভার সদস্য হিসেবে। কিন্তু সরি বলার পরও কেন সম্পুরক-পরিস্থতিতে কোন উন্নতি হয় নাই এ বিষয়ে আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ম্যাগাজিন এক এক্সক্লুসিভ বিশেষ রিপোর্ট ছেপেছিল। কিছু ব্যক্তিগত রেফারেন্স থেকে পাওয়া এটা এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। ঐ রিপোর্ট বলছে, দুতের্তে  সাংবাদিকদের মাধ্যমে ওবামাকে ‘স্যরি’ বলার পর দুতের্তে-ওবামা দ্বিপক্ষীয় সভা আবার আয়োজনের চেষ্টা হচ্ছিল। কিন্তু সম্মেলনেই এক ডিনারের টেবিলে এক ফাঁকে দুতের্তে ওবামার সাথে কথা বলতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেষ্টা করেছিলান। কিন্তু ওবামা দুতের্তের সাথে ঠিকমত কোনো মুখের কথাও বলেনি শুধু তাই নয় ওবামা উল্টো নিজের জুনিয়র স্তরের আমলা প্রতিনিধির সাথে দুতের্তেকে বৈঠকে বসতে প্রস্তাব করেছিলেন। (Mr. Obama said a follow-up would come from White House staff, not himself) এতেই দুতের্তে প্রচণ্ড অপমানিত বোধ করেন এবং আমেরিকা-ফিলিপাইন গভীর সম্পর্ক এরপর একেবারে আরো খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ায়।

    বলা হইয়ে থাকে, আমেরিকা-ফিলিপাইন এদুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিগত প্রায় সত্তর বছরের পুরনো এবং সেকালের আসন্ন কমিউনিস্ট বিপ্লব ঠেকাতে গিয়ে বন্ধুত্বের ঘনিষ্ঠতা, আর সেই থেকে আমেরিকান সেনাঘাঁটি স্থাপন হয়ে আছে ফিলিপাইনে। সেই সম্পর্ককে একেবারেই ছিন্ন করে উল্টো পথে হাঁটতে চাইছেন দুতের্তে। অন্তত রাগের মাথায় তাই বলছেন তিনি। সে দিকে বিস্তারে যাওয়ার আগে কোন পশ্চাৎ পটভূমিতে এসব ঘটনাবলি ঘটছে, সেগুলোর একটু স্মরণ ও ঝালাই করে নেব।

    একালে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীনের অর্থনৈতিক আসন্ন ও চলতি  উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকার ওবামা প্রশাসন বিগত ২০১১ সালে এক ‘এশিয়া নীতি’ ঘোষণা করেছিল। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ঠেকাও, এই লক্ষ্যে সাজানো ওই নীতিতে আমেরিকা নিজের ভূমিকাকে কেন্দ্রীয় ত্রাতার (পিভোটাল রোল) জায়গায় দেখিয়ে প্রকাশ করেছিল। ভৌগোলিক দিক থেকে আমেরিকার এই এশিয়া নীতির কেন্দ্রীয় প্রসঙ্গ সমুদ্রপথে চীনা ভূখণ্ডে প্রবেশদ্বার- চীন সাগর; বিশেষত দক্ষিণ চীন সাগরের কথা মনে রেখে।।
    চীনা মূল ভূখণ্ড থেকে সমুদ্রে অথবা সমুদ্র থেকে মূল ভূখণ্ডে প্রবেশের প্রবেশদ্বার একটাই- চীনের পূর্ব দিকে। এই সাগর আসলে একই চীন সাগরের দুই দিক, দুই নামে তা দক্ষিণ চীন সাগর আর পূর্ব চীন সাগর নামে পরিচিত। এর মধ্যে দক্ষিণ চীন সাগরাঞ্চল আরো এগিয়ে তা মহাসাগরে মিশে যাওয়ার আগে চীনের প্রবেশদ্বারের চার দিকে ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম ও তাইওয়ান- এসব দেশের সমুদ্রসীমান্ত। ফলে এসব দেশের সবার সাথে সমুদ্রসীমান্ত বিষয়ে চীনের অমীমাংসিত বিরোধ বিতর্ক আছে। বাইরে থেকে বলা হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগরের পানির নিচ, সেটা পুরোটাই তেলসহ নানান সমুদ্র সম্পদে সমৃদ্ধ। সে জন্যই এই বিরোধে সবাই সিরিয়াস। কিন্তু এসব সম্পদের হিসাবের কথাগুলো সত্যি না হলেও চীনের কাছে এর গুরুত্ব আলাদা ও বিশেষ ভাবে থাকে, আছে। কারণ, দক্ষিণ চীন সাগর চীনের কাছে নিজের একমাত্র সমুদ্রপথে চলাচল অবাধ রাখা, এবং তা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা – খুবই জরুরি ও নির্ধারক। কারণ নিজের মরা-বাঁচার মত ইস্যু এটা। এদিক তাক করেই আমেরিকা চীনকে বিরক্ত করার এশিয়া নীতি সাজিয়েছে। যার মধ্যে আমেরিকার ভান করার দিক হল, চীনের পড়শিদের স্বার্থ রক্ষা করতেই যেন আমেরিকার এই সুদূর এশিয়ায় সামরিক উপস্থিতিতে আসার উদ্দেশ্য। নিজেকে পিভোটাল (pivotal বা ক্ষমতা কেন্দ্র) ত্রাতার ভূমিকায় দেখিয়ে হাজির করা। আমেরিকার তৎপরতার ভেতর এসব দিকের কথা চীনের পড়শি সব রাষ্ট্র জানতে পেরেছে সেই ২০১১ সাল থেকে। কিন্তু তারা কেউ সেসময়ই আমেরিকার কথায় মাতেনি। কেন? সারকথায় বললে, তারা আমেরিকার পক্ষে চীন-বিরোধী কোনো যুদ্ধপক্ষের জোট বা ঘোটের মধ্যে ঢুকে নিজেদের জড়াতে বা দেখতে চান না। যুদ্ধ রিস্কি জিনিষ -পুঁজিপাট্টা গায়েব হয়ে যায়। তবে নিজ নিজ ভুখন্ড সীমান্ত-সার্বভৌমত্ব রক্ষার করতে কোন আপোষ করতে তারা যায় না। তাই আশা করে কোনো নীতির ভিত্তিতে সব বিতর্ক সমাধান হয়ে যাক, এটা তারা চায়। এব্যাপারে শুরুতে সবচেয়ে ভোকাল ছিল ফিলিপাইন, যদিও ইতোমধ্যে আমেরিকার প্ররোচনায় সেই ফিলিপাইনই একমাত্র রাষ্ট্র, যে সমুদ্রসীমা বিরোধ মীমাংসার জাতিসঙ্ঘের ট্রাইব্যুনাল ‘আনক্লস’ ( UNCLOS, United Nations Convention on the Law of the Sea)-এ মামলা করেছিল। এই মামলায় আমেরিকার প্রভাবে ফিলিপাইন সম্প্রতি চীনের বিরুদ্ধে নিজের পক্ষে একটা রায় পেয়েছে। যদিও ওই আদালত গঠন নিয়ে আগেই চীনের আপত্তি ছিল আর তা উপেক্ষা করার কারণে চীন মামলা চলার সময়ে সক্রিয়ভাবে কনটেস্ট করেনি। তাই রায় প্রকাশের পরে চীন এই রায় গ্রহণ করেনি বলে জানিয়েছে। তবে রায় প্রকাশের পরে কোনো পক্ষ থেকেই তা সামরিক পদক্ষেপের দিকে যায়নি। তবে রায় প্রকাশের অনেক আগে থেকেই (২০১২ সালে) বাস্তব মাঠে, মাছ ধরার দিক থেকে ফিলিপাইনকে মাছ ধরা থেকে বিরত রেখে আসছিল চীন, সেটাও এখনও তেমনই আছে। এক কথায় বললে, রায় প্রকাশের পর ফিলিপাইনের দিক থেকে তারাও কোনো সামরিক দখল উদ্যোগের দিকে যায়নি বা যাওয়ার কোনো নীতি গ্রহণ করেনি। ইতোমধ্যে ২০১৬ সালের ৩০ জুন দুতের্তে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের শপথ নেন। এরপর থেকে সমুদ্রসীমা বিতর্কে ফিলিপাইনের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে নিজ অবস্থানের কথা তিনি জানান। কিন্তু এ নিয়ে কোনো যুদ্ধে জড়ানোর আশঙ্কা তিনি নাকচ করে দেন। ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট দুতের্তে খোলা ভাষায় পরিষ্কার করে বলছিলেন, চীনের সাথে কোনো যুদ্ধের ব্যাপারে তিনি আগ্রহী নন; বরং দুতের্তে ক্ষমতা নেয়ার পর মাছ ধরার ইস্যু নিয়ে চীনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিল। এগুলো সবই ‘ওবামাসহ সবাইকে গালাগালির প্রসঙ্গ’ হাজির হওয়ার আগেকার ঘটনা। তাই গালাগালির প্রসঙ্গ এবার চীন-ফিলিপাইন সম্পর্ক, আমেরিকার এশিয়া নীতি, আমেরিকা-ফিলিপাইন সামরিক সম্পর্ক ইত্যাদি সব কিছুকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর দিকে ঠেলে দিয়েছে।

    আসিয়ানের লাওস সম্মেলন ছিল গত ৬ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। ওখান থেকে দেশে ফিরে দুতের্তে খুব দ্রুত আমেরিকার সাথে পুরনো সম্পর্ক প্রায় ছিঁড়ে ফেলা আর বিপরীতে চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক করার উদ্যোগ নিতে থাকেন।

    আমেরিকা বা ওবামার সাথে শুধু সম্পর্ক ছিন্ন নয়, বরং আমেরিকার সাথে নতুন বিরোধে জড়াতে গত ১৯ অক্টোবর ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট দুতের্তে নিজেই চীন সফরে যান। শুধু তাই নয়, ২০ অক্টোবর রয়টার্স জানাচ্ছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাকে আমরা ‘দুই ভাই’ বলে বরণ করে নিয়েছেন। রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনামই হল, ‘Brothers’ Xi and Duterte cement new-found friendship।  দুতের্তে সেখানে ঘোষণা করেছেন, পুরনো বন্ধু আমেরিকা বাই বাই, দক্ষিণ চীন সাগরে আমেরিকার সাথে যৌথ টহল বাতিল, আর এখন থেকে রাশিয়া ও চীন থেকে অস্ত্র কিনবেন তিনি ইত্যাদি। তিনি আরো পরিষ্কার করে বলেছেন, ফিলিপাইন নিজেকে ঢেলে সাজিয়েছে। ফলে এখন ফিলিপাইন, চীন আর রাশিয়া এই হলো তাদের নতুন কৌশলগত অ্যালাইনমেন্ট ইত্যাদি। অর্থাৎ পুরো উল্টো দিকে বেয়ে চলছেন তিনি। তবে এটা সত্যি যে, দুতের্তের ভাষ্যে অনেক রেঠরিক বা বাকচাতুরির প্রপাগান্ডা শব্দ মেশানো আছে। তাই আমরা দুতের্তের নীতিকে ঠাণ্ডা মাথায় বুঝতে তার বদলে তাঁর অর্থনৈতিক উপদেষ্টার মন্তব্য শুনব। চীন সফর শুরু হওয়ার পর তিনি এক বিবৃতি দিয়ে ব্যাখ্যা করে বলছেন, ‘এশিয়ান অর্থনৈতিক সমন্বয়ের বিষয়টি অনেক দিন ধরেই ছিল, আপডেট করা হয়নি আমরা সেগুলোতে মনোযোগ দিয়েছি; এর মানে আমরা পশ্চিম থেকে পিঠ ফিরিয়ে নিচ্ছে ঠিক তা নয়।’ …(his top economic policymakers released a statement saying that, while Asian economic integration was “long overdue”, that did not mean the Philippines was turning its back on the West.)

    অপর দিকে ফিলিপিনো অর্থসচিব কার্লোস ডোমিঙ্গোজ এবং অর্থপরিকল্পনা সচিব আর্নেস্তো পারনিয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমরা পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক আগের মতোই বজায় রাখব। কিন্তু আমরা প্রতিবেশীর সাথে গভীর সম্পর্কের সমন্বয় কামনা করছি। আমরা আমাদের অঞ্চলের প্রতিবেশীদের সাথে একই কালচার শেয়ার করি আর তাদের ভালো বুঝতে পারি।’ (“We will maintain relations with the West but we desire stronger integration with our neighbors,” said Finance Secretary Carlos Dominguez and Economic Planning Secretary Ernesto Pernia in a joint statement. “We share the culture and a better understanding with our region.”)

    উপরে তিন সচিবের দুই বিবৃতি প্রথমত, এটা প্রেসিডেন্ট দুতের্তের গরম ভাষ্যগুলোর থিতু ভার্সন। তবে এটা আমেরিকার সাথে একেবারে সম্পর্ক ছিন্ন নয় অবশ্যই। কিন্তু এটা ফিলিপাইনের সত্যি সত্যিই, আমেরিকার কৌশলগত বলয় থেকে দূরে চলে যাওয়া নির্দেশ করে। ওদিকে এ বিষয়ে আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের ভাষ্য ছিল, ফিলিপাইন আমাদের এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে আগামী সপ্তাহে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে আমেরিকার সেক্রেটারি ডেনিয়েল রাসেল ফিলিপাইন সফর করে নতুন ব্যাপারগুলোর ব্যাখ্যা চাইবেন।

    এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে, আমেরিকা-ফিলিপাইনের সম্পর্কের শুরু সেই ষাটের দশকে সশস্ত্র কমিউনিস্ট গেরিলা বিপ্লব ঠেকাতে সরাসরি সামরিক উপস্থিতি দিয়ে সহযোগিতা করা থেকে এখনো ফিলিপাইনে আমেরিকান সামরিক উপস্থিতি আছে। সামরিক বাজেট খরচের অনেক কিছুই এখনো আমেরিকা শেয়ার করে। ফলে আমেরিকাকে ছাড়তে গেলে বহু কিছু এখন ঢেলে সাজাতে হবে। যদিও দুতের্তে প্রকাশ্য ঘোষণায় বলা শুরু করেছেন, তিনি দীর্ঘ সময় প্রেসিডেন্ট থাকলে ফিলিপাইনের সাথে আমেরিকার সামরিক ‘ডিফেন্স ডিল’-এর কথা আমেরিকাকে ভুলে যেতে হবে।

    তাহলে মূল বিষয় চীন-ফিলিপাইন সমুদ্রসীমা বিতর্ক বা দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক- নতুন পরিস্থিতিতে এখন কী হবে? দুতের্তে জানাচ্ছেন, সমুদ্রসীমা বিতর্ককে আপাতত তিনি পেছনের বেঞ্চে ফেলে রাখতে চান। বিশেষত যত দিন চীনের সাথে বর্তমানে শুরু করা আলোচনা একটা নির্দিষ্ট আকার না নেয়। অথবা এরপর চীনারা নিজে এ বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী না হওয়া পর্যন্ত। (Duterte on Wednesday said the South China Sea arbitration case would “take the back seat” during talks, and that he would wait for the Chinese to bring up the issue rather than doing so himself.)

    আর চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট শি-এর বরাতে তারা বলেছেন, যেসব বিতর্ক তাৎক্ষণিক সমাধান করা যাচ্ছে না, সেগুলো আপাতত সরিয়ে রাখা হবে। দুতের্তে জানাচ্ছেন এসবের অর্থ, তিনি “জাতিসঙ্ঘের হেগ ট্রাইব্যুনালে ফিলিপাইনের পক্ষে পাওয়া রায়কে ত্যাগ করছেন বা ছুড়ে ফেলে দিচ্ছেন না, অথবা ফিলিপাইনের সার্বভৌমত্ব কোথাও চীনের কাছে বন্ধকও রাখছেন না।’ আর চীন এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় বলছে, ‘তারা দুতের্তের এই সেন্টিমেন্টকে সমর্থন করেন”। (China has welcomed the Philippines approaches, even as Duterte has vowed not to surrender any sovereignty to Beijing, which views the South China Sea Hague ruling as null and void.)
    তাহলে মাছ ধরার ব্যাপারটা কী হবে? গত ২০১২ সালে ‘স্কারবোর্গ শোল’ নামে দ্বীপ থেকে ফিলিপিনো জেলেদেরকে চীন বের করে দিয়ে দখল নিয়েছিল। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী লি এই শোল দ্বীপের বিষয়ে বা জেলেদের মাছ ধরার অধিকার বিষয়ে কিছু উল্লেখ না করে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন- আমরা উভয় দেশ কোস্টগার্ড ও জেলেদের বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা করতে একমত হয়েছি। আর আমেরিকান সিএনএন দাবি করছে দুতের্তে বলেছেন, ‘মাছ ধরার বিষয়টি আমি চীনাদের ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’

    হেগ ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে আমার আলাদা বিস্তারে লেখার পরিকল্পনা আছে। তবে আপাতত একটা সারসংক্ষেপ করে বলা যায়, দক্ষিণ চীন সাগর সীমানা বিতর্ককে উসকে দিয়ে আমেরিকা তার এশিয়া পলিসি সাজিয়েছিল, যেখানে আমেরিকা নিজের ভূমিকা কেন্দ্রীয় বা পিভটাল বলে মনে করে। কিন্তু এটা এখন পরিষ্কার যে, আমেরিকার এশিয়া নীতি এই প্রথম মারাত্মক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেল। ফিলিপাইনের আমেরিকাকে ত্যাগ করা এটা আমেরিকার জন্য মারাত্মক থাপ্পড় খাওয়া। বিশেষ করে ফিলিপাইনের পথ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাকি সব রাষ্ট্রের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে – সেদিক থেকে দেখলে। কারণ আমেরিকান এশিয়া নীতি ঘোষণা করার আগে এদের সবার অবস্থান ছিল তারা কেউ কোনো সামরিক বিবাদে জড়াতে চায় না; বরং সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে চীনের সাথে যুক্ত থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদনে উন্নতি করতে চায়।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই দ্বিতীয় পর্ব আগে দৈনিক নয়াদিগন্তে ৩০ অক্টোবর ২০১৬ (প্রিন্টের পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। আজ এখন সেটা আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ছাপা হল। ]

  • ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -১

    ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -১

    গৌতম দাস
    ০২ নভেম্বর ২০১৬, বুধবার

    ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -১

    কোল্ড ওয়ারের শুরুর দিকের পটভুমিতে একাত্তর বছর আগে জন্ম নেয়া এক সম্পর্ক হল ফিলিপাইন-আমেরিকার সম্পর্ক। সম্পর্কের এমন ঘনিষ্ঠতার পিছনে একটা বড় কারণ ছিল সেকালের ফিলিপাইনে সশস্ত্র কমিউনিস্ট আন্দোলনকে মোকাবিলা। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত সেই থেকে ফিলিপাইনে আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি স্থাপনা পর্যন্ত গড়ায়। সেই থেকে একাল পর্যন্ত আমেরিকা ফিলিপাইনের এক নম্বর বন্ধু হিসাবেই ছিল। ছিল বলছি এজন্য যে এই সম্পর্কে ভাল রকমের চির ধরেছে। ফিলিপিনো সদ্য নির্বাচিত বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন রডরিগো দুতের্তে। সর্বশেষ গত ২০ অক্টোবর ২০১৬, তিনি চীন সফরে গিয়ে আমেরিকাকে প্রকাশ্যে “বাই বাই” বলেছেন। না এটা ভাবা ভুল হবে যে তিনি নিজ ভাষায় না ইংরাজিতে বলেছেন ফলে কোন ভাষান্তর সমস্যা হয়েছে কিনা। কারণ তিনি জানিয়েছেন তিনি নিজ মাতৃভাষার চেয়ে ইংরাজিতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। সেকথার সাথে নিচের ইংরাজি উদ্ধৃতি দেখুন।

    Duterte did not hesitate to say that America, which is part of the New World Order, “has lost now. I’ve realigned myself in your ideological flow [China], and maybe I will also go to Russia to talk to Putin and tell him that there are three of us against the world—China, the Philippines, and Russia. It’s the only way.”

    Keep in mind that Duterte is not against the West’s achievement in science, medicine, and even in language. Duterte admitted to a reporter that “I am more articulate in English than in my own dialect.”

    তো দীর্ঘ এত পুরানা বন্ধু হঠাত উলটা বইতেছেন কেন তা এখানে জানব। ফিলিপাইন সম্পর্কে বিশেষ করে ওর আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গঠন ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের দেশে খুব বেশী জানাশুনা নাই। তাই প্রেসিডেন্ট দুতের্তের চিন্তা বা কর্মসুচীর মুল ফিচারগুলো কী তা বলবার উছিলায় আগে ফিলিপিনো রাজনীতি জনগণ সম্পর্কে পটভুমির দিক থেকে কিছু বলে নিব। তাই লেখাটার দুই অংশ। দ্বিতীয় অংশ আলাদা পোষ্ট হিসাবে আসবে। সেখানে আমেরিকার সঙ্গে ফিলিপাইনের সম্পর্কের অবনতির বিস্তারিত দিকটা জানা যাবে।

    প্রথম ভাগঃ ক্রসফায়ার : বাংলাদেশ ও ফিলিপাইন
    ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতের্তে। নির্বাচনে জিতে চলতি বছর, ২০১৬ সালের জুন থেকে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। আর এর আগে ছিলেন দক্ষিণ ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের সবচেয়ে অগ্রসর শহর ডাভাও এর মেয়র। দুতের্তের নিজ ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি রাজনৈতিক ফ্যামিলির সন্তান। বাবা ভিনসেন্ট গনজালেস দুতের্তে ছিলেন ফিলিপাইনের ডাভাও প্রদেশের গভর্নর এবং সিনেটর।  নিজে আইনে গ্র্যাজুয়েট, আইনজীবী ও প্রাক্তন সরকারি প্রসিকিউটর। প্রেসিডেন্ট হয়ে ক্ষমতায় আসার পর তিনি এক কঠিন কর্মসূচি নিয়েছেন। ফিলিপাইনে ড্রাগ ব্যবসার দাপট আর ড্রাগ এডিক্টেট মানুষ ও পরিবারের সংখ্যা দুইই  সামাজিক রাজনৈতিক সমস্যার এক বিরাট ইস্যু। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট দুতের্তে বলছিলেন, পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে এমন ড্রাগগ্রহীতার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। এও সংখ্যা তার আমলসহ ধরে।  ড্রাগের সাথে সম্পর্কিত সমস্যা ও অপরাধের ব্যাপকতা বা সংখ্যা – এটাই দুতের্তের বিচার-বহির্ভুত হত্যা করে অপরাধীদের মেরে ফেলার পক্ষে একমাত্র যুক্তি। (যারা আরও ডিটেল চান তাদের জন্য। এমন পাঠকেরা এবিষয়ে তাঁর পয়েন্টগুলো ডিটেইল শুনতে আগ্রহী হলে গত ১৫ অক্টোবর আলজাজিরা টিভির নেয়া দুপর্বের সাক্ষাতকার ইউটিউবে দেখুন।) দুতের্তের আমলের মাত্র প্রায় তিন মাস – এর মধ্যেই প্রায় সাড়ে তিন হাজার লোক বিচার বহির্ভুতভাবে নহত হয়েছেন।  তবে অন্য যে কোন কারও চেয়ে দুতের্তে স্পষ্ট করে বলেন, “আমি যদি এখন সবল হস্তক্ষেপ না করি আমাদের পরবর্তি প্রজন্মের ভবিষ্যত শুন্য হয়ে যাবে। অতএব এই ক্রিমিনাল এরা আমার বৈধ টার্গেট  আমি তাদের হত্যা করব”।  বুঝা যাচ্ছে আইনী দিক থেকে ব্যাপারটা অ-অনুমোদনের সন্দেহ নাই। কিন্তু এধরণের মরিয়া কথা থেকে  ফিলিপিনো সমাজে ড্রাগের ভয়াবহতার রূপ প্রকাশ পায় হয়ত। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট দুতের্তের পক্ষে জনমতের সমর্থন নিয়ে এক জরিপে দেখা গেছে তাঁর রেটিং ৭৬ ভাগ। অর্থাৎ সেই পুরানা কথা যা পপুলার তা আইন সম্মত বা সমর্থিত নাও হতে পারে।

    আমাদের দেশে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ওয়্যার অন টেরর কর্মসূচিতে প্রেসিডেন্ট বুশের আমেরিকার দেয়া ফর্দ ও টার্গেটের বাধ্যবাধকতা পূরণ ও পালন। যদিও স্থানীয়ভাবে সে কথা মানুষকে বলার নয় বলে সেকথা আড়ালেই থেকে গেছে। অপর দিকে ফেলে যাওয়া এর আগের মানে হাসিনার প্রথম আওয়ামী সরকারের (১৯৯৬) আমলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে মানুষজন অতিষ্ঠ ছিল। ফলে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে র‌্যাবের হাতেই বিচার বহির্ভুত হত্যার সংস্কৃতি বা ‘ক্রসফায়ার’ ফেনোমেনা শুরু হয়েছিল। এতে র‌্যাব বিশাল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যেন ত্রাতা। যেন ক্রসফায়ার করার জন্যই র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল, এমন আড়ালও এসে যায় এতে। ক্ষমতায় আসার পর দুতের্তেও এমন জনপ্রিয় একটি কর্মসূচি নেন, যে ড্রাগ ডিলার বা ব্যবসায়ী অথবা ড্রাগ সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িত যে কেউ, এদের দেখামাত্র গ্রেফতার ও গুলি। যার আনুষ্ঠানিক আর আইনি আড়াল দেয়ার নাম ক্রসফায়ার, তা চালু করেন। তবে একটু সংশোধন দরকার। এর আগে থেকেই দুতের্তে আসলে বিখ্যাত হয়ে এসেছেন ড্রাগ অপরাধীদের ক্রসফায়ার করেই। ফলে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর নতুন না, বরং মেয়র থাকার সময় এটাই ছিল প্রথম  তাঁর মুখ্য কাজ ও পরিচিতি। দুতের্তে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন এ বছর, ২০১৬ সালের ৩০ জুন। এরপর প্রথম দুই মাসেই এমন মৃত্যুর সংখ্যা হয় ২৪০০-এর বেশি, এটা সরকার-ঘোষিত সংখ্যা। অর্থাৎ গড়ে বিরতিহীনভাবে প্রতিদিন নিয়মিত ৪০ জন করে হত্যা করা হয়েছে। (উপরে বলা আলজাজিরাকে দেয়া ঐ সাক্ষাতকারে আপডেটেড সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার বলে প্রথম স্বীকৃত হয়)
    ক্রসফায়ার, সোজা কথায় এটা হল খুন করে মেরে ফেলার পর যে শব্দ দিয়ে খুনটা আড়াল করা হয়। মানবাধিকার ও আইনের চোখে এ ধরনের ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে। সমাজে কোনো অপরাধের বিচারের দায়িত্ব দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্র পুলিশকে দেয় না। অপরাধের বিচারের দায়দায়িত্ব বিচার বিভাগের, মানে একমাত্র আদালতের। আর সেখানে ঐ আদালতে পুলিশের কাজ হল যাকে পুলিশের অপরাধী মনে হবে, সন্দেহ হবে, তাকে আদালতের সামনে হাজির করে, অভিযোগ এনে তা প্রমাণের চেষ্টা করতে পারে তাঁরা। এতটুকুই। সে অপরাধী কি না সে সিদ্ধান্ত দেয়ার এখতিয়ার পুলিশের নেই। এই এখতিয়ার একমাত্র আদালতের এবং আদালতও সে রায় দিতে পারেন একমাত্র বিচার-আচার মূল্যায়ন পরীক্ষার সবশেষে। কিন্তু এসবের পাল্টা ক্রসফায়ারকারী পুলিশ বা সরকারের পাল্টা বক্তব্য হল – এমন বিচার-আচারের পথ, এটা অনেক লম্বা সময়ের ব্যাপার, আসামি জামিন নিয়ে বের হয়ে যায় ইত্যাদি। তবে একথাও তো সত্য যে আবার অনেক সময় জেনুইন অপরাধ আদালতে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, উপযুক্ত প্রমাণ ও আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রমাণের অভাবে। এ দিকে সমাজে অপরাধী বেড়েই চলে। অতএব আমরা নিজেরাই কাউকে অপরাধী বলে শনাক্ত করি ও সিদ্ধান্ত নেই। তাকে শাস্তি হিসেবে মেরে ফেলি। আর আইনের চোখে বিষয়টিকে ন্যায্যতা দিতে ক্রসফায়ারের গল্প বানিয়ে এভাবে বলি যে, আমার হেফাজতের আসামিই আমাকে আক্রমণ করাতে আত্মরক্ষার্থে তাকে গুলি করে মেরেছি।ীসব পালটা যুক্তির পরও দেশি বা আন্তর্জাতিক আইন এমন হত্যার পক্ষে কোনভাবেই সমর্থন দেয় না।  আর সবচেয়ে বড় কথা হল, ক্রসফায়ারের বিচারবহির্ভূত দিক ছাড়াও আরো বড় এক অপরাধ হল, সরকার যাকে তাকে এই পদ্ধতিতে মেরে ফেলতে পারে। তাকে ‘জঙ্গি’ বা ‘ড্রাগ ডিলার’ অথবা যেকোন কিছু বলে সাজিয়ে। সরকারের অপছন্দ, রাজনৈতিক বিরোধী, প্রতিদ্বন্দ্বী যে কাউকে মেরে সরিয়ে দেয়া সহজ হয়ে যায়। মূল ত্রুটি বা সমালোচনার কথা হল, নিহত ব্যক্তি  যে কথিত অপরাধেই অপরাধী ছিল তা তো কোন আদালতের মত প্রক্রিয়া পদ্ধতিতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভাবে পরীক্ষা করা হয় নাই। এটাই সরকারের হাতে যাকে তাকে খুন করার লাইসেন্স হিসাবে হাজির হয়।

    ফলে স্বভাবতই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ও অপরাধকে মানবাধিকার ও আইনের চোখে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলা হয়। অর্থাৎ পুলিশের দায়িত্ব হল যেখানে অপরাধীকে কেবল বিচারের আওতায় আনা, বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা, সেখানে পুলিশই তাকে কোন বিচার ছাড়াই মেরে ফেলেছে। ফলে এখানে বিচার বা শাস্তি প্রক্রিয়া সেটা ব্যাহত হয়েছে বলে এটা বিচারবহির্ভূত এবং তা সাদা এক হত্যাকাণ্ড। যদিও সারা দুনিয়ায় বিভিন্ন দেশে যত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, এর গল্প কিন্তু একই- ক্রসফায়ার। যেমন ভারতে একই অর্থে তবে অন্য প্রচলিত শব্দ হল – এনকাউন্টার। যা হোক শব্দে কিছু যায় আসে না, ঘটনাটা সারমর্মে একই।

    বিগত অক্টোবর মাসের ১ তারিখে এক মার্কিন উপসহকারী মন্ত্রী (ডেমোক্র্যাসি, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লেবার শাখা) রবার্ট বারশিনস্কি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তিনি ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে আলাপকালে ক্রসফায়ার প্রসঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান ব্যক্ত করছিলেন। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানে ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উল্টো ফল দিতে পারে।’ এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্যের বিস্তার গত ০৪ অক্টোবর প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছিল। আমি সেখান থেকে একটু লম্বা অংশ টুকে আনছি। রবার্ট বারশিনস্কি বলেন, “৯/১১-এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ, মানবাধিকার সংস্থা ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ে নানা বিতর্ক হয়ে আসছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ খুবই বিপজ্জনক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও দায়িত্বরত অবস্থায় পুলিশ নিহত হয়। কিন্তু তার পরও দোষী ব্যক্তির ক্ষতি করা বা তাকে আঘাত করার বিষয়টি কখনোই মেনে নেয়া হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যখনই সম্ভব, তখনই দায়ী ব্যক্তিকে গ্রেফতার বা আটক করা হয়। কারণ, তাহলেই ওই নেটওয়ার্কের সবাইকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। যেকোনো পরিস্থিতিতে আমাদের অবস্থান হলো, প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও স্বচ্ছ তদন্ত হতে হবে”।
    তিনি আরও বলেন, “ক্রসফায়ার’ বা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ কারণ হিসেবে প্রায়ই বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করা হয়। এতে সুবিচার নিশ্চিত করা যায় না, আসামি জামিনে বের হয়ে যান বলে বিভিন্ন যুক্তি দেয়া হয়। এ সম্পর্কে রবার্ট বারশিনস্কির মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। এ দেশের সাক্ষ্য আইন ঔপনিবেশিক আমলের। শুধু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর ওপর নির্ভর করায় বিচারপ্রক্রিয়ায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে আসামির ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি জানান, আইনগুলোর আধুনিকায়নে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা দিচ্ছে”। আশা করি পাঠক যা বোঝার বুঝেছেন। আমেরিকান মন্ত্রীর বক্তব্য মিথ্যা নয়। তবে তাঁর বক্তব্য তুলে আনায় তাঁকে ও আমেরিকাকে কোন ‘ন্যায়ের আদর্শ প্রতীক’ বলে ধারণা করা ভুল হবে। আর নেপথ্যে বলে রাখি, আমেরিকার এত সাধু সাজার সুযোগ নেই। কারণ র‌্যাব তাদের সরাসরি পরামর্শে আর তাদের আসামিকে বাংলাদেশে এনে টর্চার করে স্বীকারোক্তি বের করার জন্যই গঠন করা হয়েছিল। কারণ তাদের দেশে রেখে টর্চার করলে তা সংশ্লিষ্ট ওই অফিসারের জন্য বেআইনি ও ব্যক্তিগত অপরাধ বলে গণ্য হবে। আমেরিকান পরিভাষায় এটাকে রেনডিশন বলে। ওবামা রেনডিশন করার প্রশাসনিক অভ্যাস তুলে দেয়ার প্রতিজ্ঞা করে ক্ষমতায় এসেছিলেন, কিন্তু রাখতে পারেননি।
    তবে আরেক বাস্তবতা হল, উপরে বাংলাদেশের ক্রসফায়ার প্রসঙ্গে আমেরিকান বক্তব্য সঠিক। আবার সরকারের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের কথা তুলে এমন বক্তব্যের ভেতর দিয়ে আমেরিকা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর একটা যেন অথরিটি হিসেবে হাজির হওয়ার সুযোগ নেয়। এটাও আরেক সত্যি। আর তা নেয়ার সুযোগ থাকে এ জন্য যে, জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস তদারকির প্রতিষ্ঠানকে আমেরিকা প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে।
    ফলে হিউম্যান রাইটস ইস্যুটি দু’ধারী তলোয়ারের মতো আমেরিকার হাতে অস্ত্র হিসেবে হাজিরও হয়। এক দিকে আমাদের সরকারগুলো ক্রসফায়ার করার দোষে দোষী। ফলে আমেরিকা সে অভিযোগ সঠিকভাবে তুলে আনে ঠিকই। আবার সেটা তুলে বাংলাদেশের ওপর নিজের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিতে একে ব্যবহার করে এ কথাও সত্যি।

    প্রেসিডেন্ট দুতের্তের ক্ষেত্রে তার ড্রাগ-ডিলারের হত্যার বেলায় একই ঘটনা ঘটেছিল। প্রেসিডেন্ট ওবামা এ প্রসঙ্গে তার সাথে দেখা করে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও তার উদ্বিগ্নতা ইত্যাদি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। এর আগে দীর্ঘ দিন ধরেই ম্যানিলার ক্যাথলিক চার্চ, জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সংগঠন ও অন্যান্য দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু সেগুলোকে দুতের্তে সবলে উড়িয়ে দিতে আর উপেক্ষা করতে পেরেছিলেন। দুতের্তের সাথে প্রেসিডেন্ট ওবামার সাক্ষাতের কথা ছিল গত ৫ সেপ্টেম্বর, লাওসের ভিয়েনতিয়েনে আসিয়ান জোটের সভায় দুই প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের সময়ে, সাইডলাইনে বসে। কিন্তু ওবামার সাথে কথিত সেই সাক্ষাতের আগেই দুতের্তে এক কাণ্ড করে বসেন। লাওস রওনা দেয়ার আগেই তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে সেই কান্ড করেন। এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন যে, “ওবামা কি তাঁকে বিচারবহির্ভূত ড্রাগ-ডিলার হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলবেন না”- এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি রাগে ফেটে পড়েন। সম্ভবত দুতের্তে ওবামার সাথের ওই সাক্ষাৎ এড়াতে চেয়েছিলেন তাই ওই রকম জবাব। তিনি অকথ্য ও অশ্লীল ভাষায় ওবামার মাকে বেশ্যা বলে গালি দিয়ে কথা বলেছিলেন; যেটা স্বভাবতই কোনো প্রেসিডেন্টের পদমর্যাদার সাথে মানানসই নয়। তবে কোন প্রেসিডেন্ট অবশ্যই ক্ষুব্ধ হতে পারেন। এমনকি সে ক্ষেত্রে যদি “তিনি ক্ষুব্ধ” একথাটাই মুখে বা আচরণে এতটুকুই প্রকাশ করেন- এটাই তার উদ্দেশ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট হত। কিন্তু তিনি বলেন, “তার (ওবামার) সম্মান বজায় রেখে কথা বলা উচিত। আমার ওপর যেন যা মনে চায় প্রশ্ন আর স্টেটমেন্ট ছুড়ে না দেয়। এমন হলে, বেশ্যার ছেলে, ওই ফোরামে আমি তাকে ছিঁড়ে ফেলব। উনি যদি তা করেন তবে আমরা তাকে শুয়োরকে যেমন করে কাদায় পুঁতে তেমন করে পুঁতে ফেলব”।

    আচ্ছা, দুতের্তে কি হঠাৎ এমন কথা বলছেন; নাকি তিনি এমনই? তা বুঝতে পেছনের কিছু তথ্য দেখা যাক। এর আগে তিনি ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের দাভাও শহরের মেয়র ছিলেন। ড্রাগের সমস্যা আর খুনোখুনি সেখানে লাগাতার ছিল। সেখানেও তিনি ড্রাগ ডিলারদের সম্পর্কে বলতেন তারা “আরো মরবে। অনেকে মরবে। যতক্ষণ না শেষ মাদকপাচারকারীকে বের করা সম্ভব হবে, ততক্ষণ আমরা কাজ চালিয়ে যাবো”। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের সেকালের রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, তিনি বলছিলেন, ‘যদি আমার সিটিতে আপনি অবৈধ কাজ করেন, যদি আপনি ক্রিমিনাল হন, কোনো সিন্ডিকেটের অংশ হন, যারা শহরের নিরীহ লোকদের শিকার বানায়, তবে যতক্ষণ আমি মেয়র আছি ততক্ষণ আপনি আমার হত্যার বৈধ টার্গেট।’ এটা ২০০৯ সালে মেয়র হিসেবে তার বয়ান। শেষ বাক্যটি মারাত্মক আপত্তিকর। এখানে আইনি লুকোছাপা তিনি রাখেননি। একেবারে প্রকাশ্যে স্পষ্ট ভাষায় সরাসরি হত্যা করার কথা বলছেন। এই বাক্যটাই তার অভিযুক্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। ওদিকে প্রায় একই ভাষায়, একই কারণে ইইউকে এবং জাতিসঙ্ঘকেও তিনি গালাগালি করেন।
    স্বভাবতই দুতের্তের খারাপ গালাগালির পরে ওবামা সেই সাক্ষাৎ বাতিল করেন। কিন্তু পরের দিন পরিস্থিতি রিভিউ করার পর (খুব সম্ভবত তার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পরামর্শকদের কারণে) দুতের্তে সাংবাদিকদের মাধ্যমে ওবামাকে স্যরি বলে ক্ষমা চেয়ে নেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রায় ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফিলিপাইনের সাথে নিরবচ্ছিন্ন কৌশলগত মিত্র ছিল আমেরিকা। ফিলিপাইন-আমেরিকান সেই সম্পর্ক এখন খারাপ থেকে চরম খারাপ হয়ে এখন প্রায় পুরো বিচ্ছিন্ন হওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা দুই আলাদা দিনে দুই অংশ ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় – ২৩ অক্টোবর ২০১৬ প্রথম বা চলতি পর্ব অনলাইনে (প্রিন্টে ২৪ অক্টোবর)। এখানে সেই লেখা পর পর দুই পোষ্ট আকারে আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ছাপা হল। এটা প্রথম পর্ব।] পরের পর্ব আগামিকাল পরশুর মধ্যে।

  • স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস

    একা ভারত এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস
    গৌতম দাস
    ০৭ জুন, ২০১৬

    স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস

    যুদ্ধে প্রথম পারমানবিক বোমা ব্যবহারের অভিজ্ঞতা আমেরিকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ফলাফল আমেরিকার পক্ষে আসন্ন এটা নির্ধারিত হয়ে উঠার পরও আমেরিকা ১৯৪৫ সালে এই বোমা জাপানের উপরে ব্যবহার করেছিল। এমন করার পিছনের কারণ যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে এর ব্যবহারের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাখা এবং এর ভয়াবহতার মাত্রা কেমন হয় সেটাও বুঝে রাখতে। বলা বাহুল্য কোন হুশজ্ঞানওয়ালা চিমটি কাটলে লাগে টের পায় এমন মানুষের জন্য সেটা খুবই খারাপ ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। সম্ভবত সেটাই এরপর থেকে আজ পর্যন্ত  দুনিয়া আর কোথাও এই অস্ত্রের ব্যবহার আমরা আর দেখেনি। কিন্তু এসব বাজে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তবু বিভিন্ন রাষ্ট্রের পারমানবিক অস্ত্র অর্জন এবং ভান্ডারে রাখার আগ্রহ কমাতে পারে নাই। বিগত ১৯৭৬ সালের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান পারমানবিক বোমা অর্জন করে ফেলেছিল। এটা উপমহাদেশীয় বা একদিকের পরিস্থিতি। কিন্তু ততদিনে অন্যদিকে অর্থাৎ পশ্চিমে বা কোল্ড ওয়ার লড়ার দুই মাতবর আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দুনিয়ার পরিস্থিতি তাদেরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে – এটা বিপদ বুঝতে পেরে গিয়েছিল।  তাই, পারমানবিক অস্ত্র আর ব্যবহার করবে না বলে পরস্পর পরস্পরের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক চুক্তি স্বাক্ষর দিয়ে ফেলেছিল।  এটাই Non-Proliferation Treaty অথবা NPT – সেই আন্তর্জাতিক চুক্তি, ১৯৬৮ সালে যা স্বাক্ষরিত হয়। সে বিষয়ে পরে আসছি। কিন্তু এখানে আলোচনার জন্য গুরুত্বপুর্ণ হল, ভারত ও পাকিস্তান; যাদের পারমানবিক অস্ত্র আছে তা সবাই জানে। কিন্তু এরা দুজন আজ পর্যন্ত কখনই এনপিটি তে স্বাক্ষর করে নাই। এটা ঠিক যে অস্ত্র হিসাবে পারমানবিক অস্ত্র পশ্চিমের কাছে ডেড ইস্যু, খামোখা পয়সা নষ্ট ধরণের বিষয় আর এর সবচেয়েও বড় দিক খতরনাক। কিন্তু এতটুকুওই সব বা শেষ কথা নয়। যেমন, এই অস্ত্রই যদি আবার এশিয়ার কোন দেশ যদি এখনও তা অর্জন করতে চায় তবে সে ঘটনাতে পশ্চিমা যে কোন মাতব্বর দেশ নড়চড়ে বসে আর নিজের জন্য হুমকি গণ্য করে থাকে।

    তা সত্ত্বেও এই পরিস্থিতিতে “ভারত ও এনপিটি” আবার এখন ইস্যু। সারকথায় বললে এর মূল কারণ, ভারত এনপিটিতে স্বাক্ষর না করলেও একালে আমেরিকা যেচে পড়ে ভারতকে পারমানবিক টেকনোলজি ও মালামাল দিবে বলে উস্কানি দিয়েছে। এবং সেটা ভারত এনপিটিতে এবার স্বাক্ষর না করেই হাসিল করতে পারে এমন লোভের মুলা ঝুলিয়েছে আমেরিকা। এর উদ্দেশ্য হল, ভারতের কথিত চীন-ভীতির বিপরীতে দেখানো যে ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে আমেরিকা কত কেয়ার করে! ভারত আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার হয়ে আরও কাছে আসুক। এছাড়াও আমেরিকান খায়েসটাকে গুছিয়ে বললে তা হল এরকম যে প্রতিদানে, নতুন যে গ্লোবাল অর্থনীতিক অর্ডার আসন্ন, যাতে মনে করা হচ্ছে চীনের স্টেক হবে হাই বা অনেক বেশি। তাতে ভারত যেন আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনের সাথে সে নতুন অর্ডারের পক্ষে অবস্থান না নেয়। অর্থাৎ পুরান বা চলতি গ্লোবাল অর্ডার, যেটা আমেরিকান নেতৃত্বে সাজানো তা এখনও ভারতের স্বার্থের দিক থেকে লোভনীয় বলে যেন ভারত মনে করে। পারমানবিক ইস্যুর দিক থেকে এই বিষয়টা বুঝতে আজকের প্রসঙ্গ সেদিকে নিব।

    গত ২০০৫ সাল, সেটা ছিল প্রেসিডেন্ট বুশের প্রথম টার্মের শাসন রাজত্বের শেষ বছর। আর একই সাথে আমেরিকার দিক থেকে সেটা ছিল ভারতকে কাছে টানার কৌশলের অথবা চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে উস্কে তোলা শুরুর বছর। চীন ও ভারতের নিজেদের পারস্পরিক স্বার্থে নিজেদের ভিতর মিল-অমিল, ঝগড়া-বন্ধুত্ব বহু কিছু আছে। থাকাও স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘস্থায়ী দিক থেকে দেখলে তাদের কিছু গভীর কমন স্বার্থ আছে ফলে এই অর্থে তারা ঘনিষ্ট বন্ধু, কিন্তু আপাত দিক থেকে এটাই আবার পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতারও এবং নানান স্বার্থ-বিরোধেরও। তাই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বুশের লক্ষ্য ছিল, চীন-ভারতের সম্পর্কের ভিতর যতই ভালভালাইয়া থাকুক সেটার ফলাফল হিসাবে তা থেকে উভয়েই যেন একসাথে আমেরিকা তাদের ‘কমন এনিমি’ এই জ্ঞান না করে বসে, এই প্রশ্নে যেন তারা এককাট্টা হয়ে দাড়িয়ে না যায়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বুশ জুলাই ২০০৫ সালে প্রথম ভারত সফরে আসেন। এক যৌথ ঘোষণাও স্বাক্ষরিত হয় ১৮ জুলাই ২০০৫। সেই সাথে এই প্রথম পাবলিক হয়েছিল যে ভারত ও আমেরিকার সামরিক সম্পর্কই শুধু নয় কী ভিত্তিগত কাঠামোর মধ্যে ভারত-আমেরিকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পর্ক  হবে তাও ইতোমধ্যেই তারা চুড়ান্ত করে ফেলেছে।

    একেবারে জন্মের সময়ের পটভুমির দিক থেকে বললে,  ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একচেটিয়া সরবরাহকারী ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বা বর্তমান রাশিয়া) কে কেন্দ্র করে সাজানো অর্থাৎ কোল্ড ওয়ার সময় থেকেই ওর মূল সরঞ্জাম ও এর সরবরাহ মূলত রাশিয়া ঘরাণার। কোল্ড ওয়ার মানে দুনিয়াটা দুই ব্লকে বিভক্ত থাকবার সময় বা বিভক্ত হয়ে ছিল যখন। ছোট-বড় সব রাষ্ট্রকে যখন হয় সোভিয়েত ব্লক নয়ত আমেরিকান ব্লকে ঢুকে যেতেই হয়েছিল। যখন দুটা থেকেই বাইরে থাকার উপায় ছিল না বা যেত না। এটা ছিল সেই ব্লক যুগ বা কোল্ড ওয়ারের যুগ। কোল্ড ওয়ার – মানে ঠিক যুদ্ধ লাগিয়ে জড়িয়ে যাওয়া নয় কিন্তু সব সময় যুদ্ধে জড়িয়ে থাকার মতই টেনশনে থাকা। আর গোয়েন্দা আর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স, সাবভারসিভ এক্টের ষড়যন্ত্র চারদিকে।  সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে (১৯৯২) যাবার পর থেকে কার্যত সেই কোল্ড ওয়ার এখন মৃত, দুনিয়া আর এখন ব্লকে ভাগ করা নাই। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে সে সময়ের তৈরি হওয়া অস্ত্রের ঘরানা সেই হিসাব, কেবল তাই এখনও প্রচ্ছন্নে বহাল আছে।

    ইতোমধ্যে ১৯৯২ সাল নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আলাদা ১৫ রাষ্ট্র হয়ে যাওয়া – এটাকে কোল্ড ওয়ার যুগের সমাপ্তি সুচনা বলা যায়। ওদিকে এই ঘটনার পরের দুই টার্ম (১৯৯৩-২০০১) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিল ক্লিনটন। আর ক্লিনটন যুগের পরিসমাপ্তিতে, এরপরেই ২০০১ সাল থেকে জুনিয়র বুশও পরপর দুই টার্ম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ক্লিনটনের সময়কালটা ছিল –“কোল্ড ওয়ার শেষ হয়েছে এখন তারা একলাই রাজা” ধরণের আমোদে থাকার। কারণ কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তিতে দুনিয়াতে আর আমাদের মত দেশগুলোকে সোভিয়েত অথবা আমেরিকান কোন না কোন ব্লকে ঢুকে টিকে থাকতে হবে এই বাস্তবতার অবসান ঘটেছিল। একথাকেই আর একভাবে বলা যে দুনিয়া তখন থেকে আর বাইপোলার নয়। মানে, পরাশক্তি অর্থে দুনিয়া আর দুই মেরুতে বিভক্ত থাকে নাই। এতে স্বভাবতই আমেরিকান বিদেশ নীতিতে সেই প্রথম বিরাট পরিবর্তন এসেছিল। নতুন মৌলিক কিছু বদল তখনই মানে, ক্লিনটনের আমলেই হয়েছিল। যেমন আমাদের মত দেশে আমেরিকা সমর্থিত কোন সরকার ক্ষমতায় থাকলে তাকে আর ‘আগের মত’ সামরিক সরকার হতে হবে না। স্টেট ডিপার্টমেন্টের নতুন নির্দেশিকা অবস্থান হল, বেসামরিক সরকারের পক্ষে থাকতে হবে। সর্বোতভাবে চেষ্টা করতে হবে ক্ষমতা বেসামরিক হাতে রাখতে। কোল্ড ওয়ারের যুগে আমেরিকা ব্যতিক্রমহীনভাবে আমাদের মত যে কোন দেশে কোথাও বেসামরিক সরকার টিকাতে পারে নাই। ফলে আমেরিকা সমর্থিত সরকার মানেই সেটা সামরিক সরকারই হতে দেখা গিয়েছিল। এই অর্থে ক্লিনটনের সময়কালটা ছিল আমেরিকার দিক থেকে বেসামরিক সরকার টিকানোর সফলতা উপভোগের কাল। অবশ্য এটাও বাইরের দিক থেকে তাকিয়ে বলা। আর ভিতরে ভিতরে তা ছিল নতুন পরিস্থিতিতে এক মেরুর কালে আমেরিকান নতুন বিদেশনীতিতে আর কী বৈশিষ্ট আনা যেতে পারে,  কী হওয়া উচিত তা নিয়ে আরও বিস্তারে ভাবনা চিন্তার কাল। তবে আমেরিকান নতুন বিদেশ নীতির আরও পোক্ত রূপ হাজির করতে এবং তার বাস্তবায়ন শুরু হতে হতে ক্লিনটন আমল পেরিয়ে বুশের আমল চলে আসে।  আর এসব নতুন চিন্তা ভাবনা থেকেই পুরানা চিন্তা ও ব্লক ভেদাভেদ দৃষ্টিভঙ্গী ভেঙ্গে আমেরিকা ভারতের দিকে এগিয়ে আসার নতুন নীতি নেয়। বুশের আমল থেকে আমরা আমেরিকার নতুন ও পোক্ত বিদেশ নীতির বাস্তবায়নের কাল হিসাবে দেখতে পারি।

    ওদিকে জুনিয়র বুশের প্রথম টার্মই আবার একই সাথে ভিন্ন আর এক ফেনোমেনা স্পষ্ট দৃশ্যমান হাজির হবার বছর। সেটা ছিল চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের দু’দশকের কালপর্ব (১৯৯০-২০১০), ডাবল ডিজিট জিডিপি গ্রোথের সেকেন্ড ডিকেড বা দ্বিতীয় দশ বছর। যদিও চীনের এই উত্থানের ফলে আমেরিকা-রাষ্ট্রের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের উপর এর প্রভাব পরিণতি কী হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আমেরিকান সরকারি স্পষ্ট গবেষণা লব্ধ ফল আসা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালের পর থেকে, যার চুড়ান্ত রিপোর্ট এসেছিল ২০০৮ সালে। এসবের আগে যদিও অনুমান নির্ভর কিছু খবর যেমন, প্রজেক্টেড রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল ২০০৪ সালেই (ষ্টাটিষ্টিক্যাল প্রজেকশন রিপোর্টের জন্য আমেরিকান বিখ্যাত ম্যাগাজিন)  ফর্বস ম্যাগাজিনের সৌজন্যে। ফলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন-ভারত একজোটে কোন কমন স্টাটেজিতে যেন না দাঁড়ায়  সে উদ্দেশ্যে ভারতকে কাছে টেনে বাড়তি খাতির করে চীন ও ভারতের মধ্যে দুরত্ত্ব তৈরি করা ছিল সেকালে আমেরিকান বিদেশ নীতির এক বিশেষ বৈশিষ্ট। জুনিয়র বুশের ২০০৫ সালের জুলাইয়ের ভারত সফরকে এই আলোকে দেখলে অনেক প্রশ্নের ব্যাখ্যা মিলবে। ঐ সফরের ফোকাস ঘটনা ছিল, ভারতকে আমেরিকার নিউক্লিয়ার টেকনোলজিসহ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বা বিক্রির সিদ্ধান্ত।

    আগেই বলেছি, নিউক্লিয়ার বোমা বা পারমাণবিক বোমা পশ্চিমের হাতে এসে মারাত্মক অস্ত্র হিসাবে কার্যকর হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ কালে। এরপর সেখান থেকে এই অস্ত্রের গবেষণা ও বিকাশ বিস্তা্র সবচেয়ে বেশি ঘটে কোল্ড ওয়ারের সময় (মোটামুটি ১৯৫০-১৯৯২) কালে। যদিও ঠিক এর উলটা অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্রের উতপাদন বৃদ্ধি ও বিস্তার রোধে পরাশক্তিগত ততপরতাও শুরু হয় ১৯৬৮ সাল থেকে। স্বাক্ষরিত হয় NPT চুক্তি। অর্থাৎ প্রো-লাইফারেশন কথার সোজা বাংলা অর্থ “আয়ু দেয়া” বা “সহজেই যা বিস্তার লাভ করে”। কাজেই পারমাণবিক NPT  কথার মানে বাংলা করলে দাড়ায়, পারমানবিক অস্ত্র বা এর টেকনোলজির বিস্তার রোধের চুক্তি। আমেরিকান সরকারি ইতিহাস অনুসারে ১৯৬১-৬৮ প্রায় এই ৭ বছর ধরে নিগোশিয়েশনের ফসল হল এই চুক্তি। এর আবার তিন পৃথক পর্যায় বা অংশ আছে – নন-প্রোলিফারেশন, ডিসআর্মামেন্ট ও পিসফুল ইউজ। অর্থাৎ বিস্তার রোধ (অস্ত্রে ব্যবহারের লক্ষ্যে গবেষণা ও উতপাদন বন্ধ), নিরস্ত্রীকরণ (যে অস্ত্র তৈরি হয়ে গেছে এর ধ্বংস বা ব্যবহার বন্ধ করা) ও (যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে নয় তবে এই টেকনোলজির) শান্তিপুর্ণ ব্যবহার। প্রথম চোটে আমেরিকা, বৃটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এতে স্বাক্ষর করেছিল ১৯৬৮ সালে। কিন্তু তবুও  চীন ও ফ্রান্স  ১৯৯২ সালের আগে স্বাক্ষর করে নাই বলে একমাত্র এরপরই জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্যরেই স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়। অন্যভাবে বলা যায় এই চুক্তিতে স্বাক্ষরের বিষয়টাই ১৯৯২ সালের আগে অর্থাৎ  কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তির আগে কার্যকর করা যায় নাই। বিশেষ করে যারা ভেটো-ক্ষমতাধারী এবং যাদের সবার হাতে পারমানবিক অস্ত্র মজুদও আছে, একারণে। এছাড়া যাদের হাতে অস্ত্র মজুদ নাই তারাসহ বর্তমানের মোট স্বাক্ষর করা দেশের (তাইওয়ানসহ) সংখ্যা ১৮৯। কিন্তু স্বাক্ষর করতে একেবারেই ইচ্ছুক নয় (এদের মধ্যে যাদের পারমানবিক অস্ত্র আছে জানা যায় বা অনুমান করা যায়) এমন রাষ্ট্র হল  ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও সাউথ সুদান। সাউথ আফ্রিকাকেও এই দলে ফেলা যেত সে সময়। কিন্তু ১৯৯৪ সালে বর্ণবাদিতা বিরোধী সরকার কায়েমের পরে সে এনপিটি স্বাক্ষর করা দেশ হয়ে যায়। ওদিকে উত্তর কোরিয়া স্বাক্ষর করেছিল প্রথমে কিন্তু আবার প্রত্যাহার করেছে ২০০৩ সালে। এদের মধ্যে কেবল ভারত ও পাকিস্তান হল এমন রাষ্ট্র যাদের হাতে পারমানবিক অস্ত্র থাকার ব্যাপারটা সবাই জানে এবং তারা নিজেরাও স্বীকার করে। নিজ স্বীকারোক্তির ১৯৭৪-৬ সাল থেকেই পারমানবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হলেও এরা এনপিটি তে স্বাক্ষর করতেও চায় না। চলতি একবিংশ শতকের আগে এনপিটি বিষয়টা এভাবেই ছিল।  আর এসবের টেকনিক্যাল খুটিনাটি দিক তদারক করা এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে রিপোর্ট করার প্রতিষ্ঠান হল IAEA (ইন্টারন্যাশনাল এটমিক এনার্জি এসোশিয়েশন)।

    এনপিটি স্বাক্ষরিত দেশগুলোর মধ্যে পশ্চিমের যেসব দেশের হাতে পারমানবিক অস্ত্র ও টেকনোলজি আছে এবং যারা সেটা অন্য রাষ্ট্র কাউকে (কেবল শান্তিপুর্ণ ব্যবহারের জন্য) দিতে চায় তাদের সেই  দেওয়ার বিষয়টা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ৪৮ সদস্যের এক নিয়ন্ত্রণ গ্রুপ আছে যার নাম NSG, নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ বা এনএসজি। গ্রুপের সদস্যরা মূলত পারমানবিক টেকনোলজি অথবা মালামাল সরবরাহে সক্ষম। ফলে শান্তিপুর্ণ ব্যবহার যেমন বিদ্যুৎ উতপাদনে এবং বৈধভাবে ব্যবহার করতে চাইলেও কোন এক এনএসজি গ্রুপের সদস্যকে ধরতে  হবে।  তবে কিছু ব্যতিক্রমি পরিস্থিতি এখানে স্পষ্ট করা দরকার। যেমন ইরান, অনুমান করা হয় সে পাকিস্তান (ব্যক্তিগতভাবে বিজ্ঞানী কাদের খান) বা উত্তর কোরিয়া অথবা উভয়ের কাছ থেকে মালামাল ও টেকনোলজি সংগ্রহ করেছে। অর্থাৎ এনএসজি এর কেউ তাকে সরবরাহে রাজি হয় নাই। ভিন্ন আর এক ব্যতিক্রম ভারত। ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশ ভারত সফরে পারমানবিক টেকনোলজি ও মালামাল সরবরাহ বিষয়ে চুক্তি করেছিল।

    এই হল পিছনের পটভুমি। এখন ভারত ঐ চুক্তি কার্যকর হয়েছে দেখতে চাইলে তাকে আর এক বাধা পার হতে হবে। সেটা হল, উপরে যে নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ বা এনএসজি এর কথা বলেছি, ভারতকে ঐ গ্রুপের সদস্য হয়ে নিতে হবে। কারণ ভারতের সাপ্লায়ার আমেরিকা ভারতকে সরবরাহ দিতে পারে যদি ভারত এনএসজি এর সদস্য হয়। অন্য ভাষায় বললে এই গ্রুপের পালনীয় নিয়মকানুন মেনে সরবরাহকৃত মালামাল ও টেকনোলজি ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতি দেয়। আমেরিকার সরবরাহ পেতে ভারতকে আগে এনএসজি এর সদস্যপদ পেয়ে নিতে হবে এব্যাপারে খোদ ভারত বা আমেরিকার কোন বিতর্ক নাই। তাহলে বিতর্ক কী নিয়ে? বিতর্কে ভারতের দাবি, আমার অতীত আচরণ ও ট্রেক রেকর্ড ভাল ফলে আমি আমেরিকা এই NSG থেকে সাপ্লাই পাবার যোগ্য।  কিন্তু স্পষ্ট করে যেটা ভারত বলছে না তা হল, এর অর্থ কী ভারতের NSG এর সদস্য গণ্য করে নিতে হবে, অথবা আর কোন বিবেচনায় না গিয়ে সদস্যপদ দিয়ে দিতে হবে? এছাড়াও NPT স্বাক্ষরের কী হবে? ভারত NPT তে স্বাক্ষর না করলেও NSG এর সদস্য গণ্য হতে পারে? এর মানে NPT তে স্বাক্ষর করা NSG এর সদস্য হবার ক্ষেত্রে পুর্বশর্ত নাও হতে পারে? তাই কী?

    যারা এনপিটি এর সদস্য অর্থাৎ পারমানবিক মালামাল ও টেকনোলজি যারা কেবল শান্তিপুর্ণ কাজে, অস্ত্র নয় বিদ্যুৎ উতপাদনের মত কাজে ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বলে স্বাক্ষর করেছে কেবল তাদেরকে নিয়েই এনএসজি বা সরবরাহকারিদের গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। অর্থাৎ এনএসজি এর সদস্য হবার পুর্বশর্ত হল এনপিটি তে স্বাক্ষর করে আসা, এর সদস্য হওয়া। কিন্তু ভারত কখনই এনপিটিতে স্বাক্ষর করে নাই। ফলে সে এনপিটি এর সদস্যই নয়। ফলে তর্কের বিষয় এটা যে, এনপিটি সদস্য না হয়েও ভারত এনএসজি এর সদস্য বলে গৃহীত হবে কী না?

    সোজা ভাষায় ভারত চাচ্ছে বা চেষ্টা করছে, এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেই সে আমেরিকার টেকনোলজি ও মালামাল পেতে চায়। কিভাবে?

    ভারতের মিডিয়া চলতি মে মাসে অভিযোগের রিপোর্ট ছেপেছে যে আমেরিকা থেকে ভারতের নিউক্লিয়ার বিষয়ক সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে  চীন বাধা সৃষ্টি করছে।  যেমন ইংরাজি ‘দি হিন্দু’ এর শিরোনাম “চীন ও পাকিস্তানের আপত্তি উল্টায়ে দিয়ে আমেরিকা বলছে ভারত এনএসজি এর সদস্য হবার জন্য রেডি”। এটা শিরোনাম, আর রিপোর্টের বডিতে আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র জন কিরবি এর উদ্ধৃতিতে বলা হচ্ছে, তিনি বলেছেন, “ ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট (ওবামা) ভারত সফরের সময় তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে, আমেরিকার ব্যাখ্যায় ভারত মিসাইল টেকনোলজি কনট্রোল রেজিমের শর্তাবলী পূরণ করে এবং ভারত এনএসজি এর সদস্য হবার জন্য রেডি (India meets missile technology control regime requirements and is ready for NSG membership,)”। বুঝাই যাচ্ছে আমেরিকা সরাসরি একথা বলছে না যে ভারত এনপিটি এর সদস্য না হলেও এনএসজি এর সদস্য বিবেচিত হতে পারে কীনা। এছাড়া আমেরিকার বুঝ ব্যাখ্যার কথা বলা হচ্ছে। তার মানে অন্য কারো ব্যাখ্যা আর এক রকম হতেও পারে। এসবের বিপরীতে চীন বলছে। আমেরিকার সাথে ভারতের চুক্তি সেটা এখানে ইস্যু নয়। সেটার ভিতর চীনের আপত্ দেখার কিছু নাই। তার অবস্থান হল, ভারত এনপিটি এর সদস্য হয়ে নিলেই সব সমাধান। এর কারণ হিসাবে চীন বলছে গত বছর এনএসজি এর সভায়, এনপিটি এর সদস্য হতে হবে আগে – এটাই এনএসজি এর সদস্য হবার পুর্বশর্ত হিসাবে বলা হয়েছে। ফলে এখানে চীনের বাড়তি পরামর্শ হল বিষয়টা নিয়ে এনএসজির যারা সদস্য তাদের সাথে কথা বলে ভারত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারে। অর্থাৎ এটা পরিস্কার ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক বা তাদের কোন চুক্তির বিরোধিতা বা ঠেকায় দেয়া দিবার কোন ইচ্ছা এখানে চীনের নাই।

    ‘দি হিন্দু’ স্টেট ডিপার্টমেন্টের জন কিরবিকে উদ্ধৃত করে আরও বলছে, “কেউ এনএসজি এর সদস্য হতে পারবে কীনা তা নিয়ে দেয়া বক্তব্য বর্তমান সদস্যদের আভ্যন্তরীণ বিষয়”। অর্থাৎ এনিয়ে ভারতের বলার কিছু নাই।

    তাহলে শেষে কোথায় দাড়াল বিষয়টা? শেষ কথা হল, মিডিয়াগুলোকে – ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক জমে উঠতে চীন বাধা দিচ্ছে এমন এক ধারণা – ছড়াতে ব্রিফ করা হয়েছে। আর এই খামোখা চীন বিরোধিতা তাতিয়ে দিয়ে খোদ ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি এখন চীন সফরে আছেন। আর আলোচনার মূল বিষয় এনএসজি এর সদস্যপদ, একেবারে ‘হর্সেস মাউথ’ ফয়সালা।

    কে না জানে, এনপিটি স্বাক্ষরের সোজা অর্থ পরমাণুর অস্ত্রে ব্যবহার তাহলে এরপর আর করা যাবে না। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের পাঁচ ভেটো ক্ষমতার রাষ্ট্র সহ প্রায় সকলে এই কনভেনশনে স্বাক্ষরদান করে ফেলেছে। ফলে কারই আর যে সুবিধা নাই এবং সবাই স্বাক্ষর দিয়ে প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ যে আর পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না। তাহলে কীসের ভিত্তিতে কেন আমেরিকা বা এদের কারো সহয়তাতেই অস্ত্র বানানো ও প্রয়োগের ভারতের একা সুবিধা থাকবে? এবং থাকবে সেটা আমেরিকার হাত দিয়ে, সুপারিশে? ভারত কী আশা করে দুনিয়ায় এনপিটি স্বাক্ষর না-কারি রাষ্ট্র হবে একমাত্র ভারত! যাকে আবার তোলা তোলা করে বিশেষ খাতিরে আমেরিকা পরমাণু টেকনোলজি ও মালামালও দিবে। কারণ আমেরিকার চীনের উত্থানের এতই ঠেকেছে! আর এই সুবিধা আর কারো থাকবে না। তবে একা ভারত ঐ টেকনোলজি ও মালামাল দিয়ে অস্ত্র বানানোর দিকেও চাইলে চলে যেতেও পারবে! কী তামশা! বলা বাহুল্য ভারত স্বপ্নের ঘোরে আছে। আর কেউ স্বপ্নে খেলে পোলাও খাওয়াই উচিত!

     

    [লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্তের ৩০মে ২০১৬ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও বর্ধিত আকারে ও এডিট করে ছাপা হল।]