Tag: Bangladesh Politics

  • ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে ইসলামবিদ্বেষ

    ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে আলী রিয়াজের ইসলামবিদ্বেষ
    গৌতম দাস
    ২৮ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার

    ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে ইসলামবিদ্বেষ

    গুলশান হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর পশ্চিমের “সন্ত্রাসবাদ” প্রসঙ্গে পুরান অকেজো আর ইসলামবিদ্বেষী কথাবার্তাগুলো আবার সচল হতে শুরু করতে দেখা যাচ্ছে। ফরেন অ্যাফেয়ার্স আমেরিকার “সম্ভ্রান্তজনদের” পত্রিকা। আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করে এমন পত্রিকা। সেখানে গত ৬ জুলাই এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। যার শিরোনাম ‘বাংলাদেশ’স হোমগ্রোন প্রবলেম, ঢাকা অ্যান্ড টেররিস্ট থ্রেট’। আর এর যুগ্ম লেখক, আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি। লেখার দুটো বড় সমস্যা। এ ধরনের লেখা আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের সুপরামর্শ দেয়ার বদলে মিথ্যা ভিত্তিহীন ধারণা দিয়ে বিভ্রান্তই করবে। এছাড়া কিছু জনস্বার্থবিরোধী বেকুবি কাজ খোদ আমেরিকানরাই অনেক সময় করে থাকে। [ফরেন এফেয়ার্সের মূল আর্টিকেলটা এখানে কপি করে রাখা আছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন। ]
    প্রথমত, যে চিন্তা-ফ্রেমের আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে লেখকদ্বয় কথা বলছেন তা হলো “সেকুলারিজম”। সেটা যেন আমাদের নজর না এড়ায় সে জন্য লেখায় দু’বার  শক্তভাবে সেকুলারিজমকে রেফারেন্স হিসাবে উল্লেখও করেছেন। লেখকেরা আওয়ামী লীগকে মিষ্টি ধমক দিয়েছেন এই বলে যেন বলছেন, “তোমরা না সবচেয়ে বড় সেকুলার দল। তোমাদের কী এমন করা সাজে?”- এ রকম। অথচ বাস্তবতা হল, আওয়ামি লীগই সবচেয়ে ভাল বুঝে – কী করে, কখন সেকুলারিজম নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়। আবার কেন লেখকদ্বয়ের ‘সেকুলার-বোধের’ ভেতরেই আমাদেরকে সমাধান খুঁজতে হবে এটাকে প্রশ্ন করা যায়। এমন প্রশ্ন কখনো তারা নিজেদের করেছেন কি না তাও জানা যায় না। ঐ বোধের ভিতরে, সেখানেই কোনো সমস্যা আছে কি না আগে সেটা তাদের যাচাই করা উচিত। সেকুলারিজমের অনেক ব্যাখ্যা আছে। আমরা তাদেরটার কথাই বলছি। এমনিতেই ভারতীয় উপমহাদেশে যে সেকুলারিজম ধারণা দেখতে পাওয়া যায় সেটা আসলে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
    ইসলামের বিরুদ্ধের তাদের ঘৃণা-বিদ্বেষকে আড়াল করতেই সেকুলার শব্দটা ব্যবহার করা হয়। কেউ যদি মনে ঘৃণা পুষে রাখে আর দাবি করতে থাকে যে তার বুঝের সেকুলারিজমের ভেতরই সমাধান হতে হবে- সে ক্ষেত্রে এখান থেকে আর কী বের হতে পারে তা বলাই বাহুল্য। ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা ঘটনাগুলোর জন্য সরকার আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করছে না, বিএনপি-জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে- এমন এক গিভেন বা আগাম অনুমিত কাঠামোর ওপর লেখাটা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এটা স্টার্টিং পয়েন্ট। উল্টো করে বললে লেখাটার ভাষ্যটা এমন নয় যেমন সরকারি ভাষ্যে বলা হয় যে, আইএস বা ইসলামি চরমপন্থীরা এগুলো করছে বটে তবে বিএনপি-জামায়াতই আইএস বা আলকায়েদা। অথবা ইসলামি চরমপন্থীরা আসলে ছদ্মবেশী বিএনপি-জামায়াত অথবা সহযোগী – তা-ও নয়। লেখায় একেবারে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ‘হাসিনা বরং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং এর এক রাজনৈতিক সহযোগী দল জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।’ (Instead, Hasina has passed the blame onto the principal opposition party, the Bangladesh Nationalist Party (BNP) and one of its allies, the Islamist Jamaat-i-Islami.)। এই পরিষ্কার চিরকুট সার্টিফিকেট বাক্যটা ইন্টারেস্টিং। অর্থাৎ সরকারের বয়ানের কিছুই লেখকেরা শেয়ার করছে না, মানছেন না। আর বলতে চাচ্ছেন সন্ত্রাসী ঘটনাগুলোর জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ বা দায়ী করা ঠিক নয়। এগুলো


    Islamophobia বা ইসলাবিদ্বেষ  বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছিঃ
    কারও বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী  বলা হয়। এখানে ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা ঘৃণা বা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। এর ধরণের রেসিজম।


    জেনুইন এবং এর আলাদা কর্তা আছে। তাহলে বাকি থাকল সরকারের আইএস বা আলকায়েদার উপস্থিতি স্বীকার করছে না কেন তা নিয়ে আলী রীয়াজের অভিযোগ। তবে অবশ্যই বলা যায়, সরকার এটা কেন করছে না তা অন্তত আলি রিয়াজের জানা থাকার কথা। কথাটা বলছি এ জন্য যে, এক কথায় বলা যায়, সরকারের স্বীকার না করার জন্য আমেরিকার পুরানো কিছু কৃতকর্ম দায়ী। বুশের আমলের বিশেষ করে বিগত ২০০৪-০৬ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়া যায়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের ওপর মুসলমান। শুধু এই ফিগারটাই তখন থেকে হয়ে গিয়েছিল দোষের। কারণ বুশের ওয়ার অন টেরর – এর লাইনের বোঝাবুঝি অনুসারে,  মুসলমান=টেররিস্ট। এখানে মুসলমান বলতে লিবারেলসহ যে কোন মুসলমান বুঝতে হবে, কারণ সেসময় তাই বুঝানো হয়েছিল ও হত। অতএব ৯০ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ মানেই এক ভয়ঙ্কর যায়গা। মুসলমানের বাংলাদেশ নিশ্চয় সব টেররিস্টে ভর্তি, গিজগিজ করছে। যদিও এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের কমবেশি সবসময় ছিল। আর ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বুশের আমলে এর সাথে যোগ দেয় বুশ প্রশাসন। আসলে এটাই হল গোড়ার ইসলামবিদ্বেষ। আর তাদের নিজেদেরই ধারণ করা ইসলামবিদ্বেষ সমস্যার সমাধান হল টোটকা বিশেষ সেকুলারিজম। টোটকা বিশেষ বলা হল এজন্য যে, যা নিজ বিশেষ ‘হিন্দু’ ধারণার ‘অপর’ – সেই অপর মুসলমানকে বুঝার বদলে একটি বিদ্বেষ, একটা বিদ্বেষের এপ্রোচ থেকে এর জন্ম। আর সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম সম্পর্কে আমরা জানি এটা সেই সেকুলারিজম নয়। যেমন মডার্ন স্টেট মানেই একধরনের সেকুলার বৈশিষ্ট্যের স্টেট এই ধারণা থেকে এর জন্ম নয়।
    যা-ই হোক, সেকালে বাংলাদেশের মত যে কোনো মুসলমান জন-আধিক্যের রাষ্ট্র-সমাজ মাত্রই – যারাই বুশের মুখোমুখি হয়েছিল তারা দেখেছিল – বুশের অজানা ভয় ও ইসলামবিদ্বেষমূলক ভাবনা থেকে উৎসারিত হয় ওয়ার অন টেরর। ফলে সে সময় বুশ প্রশাসন বারবার বিএনপি সরকারকে চাপ দিয়েছিল দেশে আলকায়েদা বা সন্ত্রাসী উপস্থিতি আছে স্বীকার করে নিতে। মুল কথা ছিল দেশে “সন্ত্রাসী” থাক আর না থাক, বুশের প্রেসক্রিপশন বা করণীয় তালিকা অনুসরণ করে যে কোন মুসলমান প্রধান রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজাতে হবে।  গ্লোবাল ইসলামবিদ্বেষের পোয়াবারো অবাধ চর্চা শুরু হয় তখন থেকে।
    কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তা হল, আলকায়েদার উপস্থিতি আছে কি না আছে সেটা নয়, বরং আছে এই অজুহাত তুলে হস্তক্ষেপ করে শেষে বিষয়টাকে ভিন্নদিকে নিয়ে আমেরিকা দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করেছিল আর ‘মাইনাস টু’ করার চেষ্টা নিয়েছিল। এটা সত্যি যে, ওই পরিস্থিতিতে হাসিনা নিজের নগদ লাভের বিবেচনায় ঐ সময় আমেরিকান সেই অবস্থানের পক্ষে প্রকাশ্যে সায় দিয়েছিল এবং আমেরিকানদের তালে তালে একই প্রচারে গিয়েছিল। অর্থাৎ সেকালের আলকায়েদা (বা একালের আইএস) আছে স্বীকার করিয়ে নেয়া ব্যাপারটা ঠিক স্বীকার অস্বীকারের ইস্যুতে বা এর মধ্যে আটকে থাকেনি – বরং হয়ে দাঁড়িয়েছিল ক্ষমতা দখল করে কোনো দীর্ঘস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম আর মাইনাস টুর ইস্যু হাজির করা। হাসিনার কাছে একালে তাই ব্যাপারটা একই আলোকে দেখবার, এমনই আমেরিকার ইচ্ছা কী না, আগের মতই করবে এমন ভাবা – এ্টাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই হাসিনার সরকারের আমলে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করতে তাঁর এত অনীহা। কারণ করলে কী হয় সেটা সে আগে দেখে ফেলেছে। সে ফল খেয়েই সে আজ ক্ষমতায়। অতএব একালে আমেরিকানদের পক্ষে আগের আলকায়েদার জায়গায় এবার আইএস স্বীকার করাতে গেলে প্রত্যক্ষ সাক্ষী হাসিনার অনীহা ও বাধার মুখোমুখি তো তাদের হতেই হবে।
    আবার আরো কতগুলো নতুন দিক আছে এবারের পরিস্থিতিতে। হাসিনার পক্ষে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করার অর্থ কী হবে? কী দাঁড়াবে? এর সোজা অর্থ হবে ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা রোধে সংশ্লিষ্ট বিদেশী-দেশী রাষ্ট্র প্রতিনিধির সমন্বয়ে প্রতিরোধে কমিটি না হলেও মনিটরিং ধরণের কিছু কমিটি তৈরি হয়ে যাবে বা করতে হবে। অন্ততপক্ষে দেশী-বিদেশীদের নিয়ে একটি মনিটরিং ও সমন্বয় কমিটি ধরনের কিছু একটা হবে। এর মানে হবে এখন যেমন কাউকে সন্ত্রাসী বলে ধরে তাকে ক্রসফায়ার করে দেওয়া অথবা কী করা হবে বা হল এর ব্যাখ্যাদাতা একক কর্তা সরকার। এখানে সে যা মনে চায় ব্যাখ্যা দিতে পারে, আর সেটা নিজের একক এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে থাকে ও আছে। কিন্তু মনিটরিং কমিটি একটি হয়ে গেলে সেক্ষেত্রে বিষয়টা তখন মনিটরিং ও সমন্বয় ধরণের কমিটির সাথে শেয়ার করতে হবে। এবং অন্তত সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ওই কমিটিতে ‘সন্ত্রাস’ দমন করেছি বলে সরকারের দাবি করা যে কোন কাজ- ততপরতার ব্যাখ্যা ঐ কমিটির কাছে হাজির করতে হবে। যেটা এখনকার সিস্টেম অনুসারে, জনগণের কাছে দেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা সরকার বোধ করে না, নাই। যেমন ক্রসফায়ার করলে ওই ধরনের কমিটির কাছে সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা হাজির করতে হবে। ফলে পরিণতিতে এক কথায় বললে এখন যেভাবে সরকারের বিরোধী বিএনপি-জামাত ধরণেরসহ সব রাজনৈতিক দলের যে-কাউকে যা খুশি করার বা ভয় দেখিয়ে দাবড়ে রাখার সুযোগ আছে, তা পুরোটা না হারালেও অনেকখানি  সীমিত হয়ে যাবে। এই অর্গল খুলে দিলে বা ঢিলা হয়ে গেলে আবার রাস্তার আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে যেতে পারে। এ সবকিছু মিলিয়েই সরকার আইএসের উপস্থিত আছে এটা স্বীকার করার বিরোধিতা করে যাচ্ছে। উলটা দেশের মানুষ অথবা সরকার নিজে বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, তাকে  বলে যেতে হচ্ছে যে “বিএনপি-জামাত সব জঙ্গী কার্যক্রম করছে”।
    বিএনপি আমলে যে পথে আমেরিকা একবার আকাম করেছে সেটা এখন উদোম হয়ে গেছে। তাই সেই একই পথে হাসিনা সরকারকে এবার পরিচালিত করা বা ঠেলে দেওয়া আমেরিকার জন্য কঠিন হচ্ছে। তবে সবচেয়ে তামাশার দিক হলো আলি রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি এখন বলছেন, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল মানে যুদ্ধাপরাধের বিচার নাকি বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। শব্দটা ব্যবহার করেছেন ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’, মানে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। (Meanwhile, a widely criticized International Criminal Tribunal has sentenced as many as nine key Jamaat-i-Islami members to the death penalty. Four have already died.) মানে সমালোচিত হওয়ার বিষয়টাকে আমলে নিচ্ছেন লেখকদ্বয়। অর্থাৎ ঐ ট্রাইবুনালের বিচার প্রক্রিয়ার কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। আর এ কথা তুলেছেন, ডেইলিস্টার ও প্রথম আলোর সম্পাদকদের বিরুদ্ধে কী কী আইনি অপব্যবহার ও হয়রানি করা হয়েছে অথবা পলিটিসাইজড জুডিশিয়ারি ব্যবহার করা হয়েছে এর উদাহরণের সাথে। কারা এই “ব্যাপকভাবে সমালোচিতকারী” সমালোচক?  এই সমালোচকদের দলে তো আমরা এই লেখকদ্বয়কে দেখিনি।অথবা  তাঁরা আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টকে এমন কোনো কী পরামর্শ রেখেছিলেন অথবা কোনো প্রকাশ্য আর্টিকেল? আমরা দেখিনি, জানা যায় না। বরং আমরা লক্ষ করেছিলাম ‘জামায়াত নেতাদের ফাঁসি হলে ইসলামি রাজনীতি নাকি বাংলাদেশে নির্মুল হয়ে যাবে’ এরই উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা। অতএব এখন সেসব কথা বলে লাভ কী? কারণ এই প্রশ্নবিদ্ধ বা ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’ বিচারের মধ্য দিয়ে পুরা বিচার বিভাগকেও পলিটিসাইজ করে ফেলার কাজটা হয়ে গিয়েছে। ইন্টারনাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সর্বশেষ রিপোর্টে (এশিয়া রিপোর্ট নং ২৭৭। ১১ এপ্রিল ২০১৬) বাংলাদেশের সংকট মিটানোর প্রথম কাজ হিসাবে এই পলিটিসাইজ বিচার বিভাগকে ডিপলিটিসাইজ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে কথাটা আমার না। কিন্তু এর দায় কার?  আজ আমেরিকা যদি মনে করে থাকে ওই বিচার বিতর্কিত ছিল তবে এর এমন কোনো প্রকাশ আমরা ‘যুদ্ধাপরাধবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টেফান জে র‌্যাপের তৎপরতায় দেখিনি কেন? সে প্রশ্ন তো লেখকদ্বয় তুলছেন না। ওই বিচারের পদ্ধতিগত দিকে কোনো মেজর ত্রুটির ব্যাপারে তিনি কখনো কথা তুলেছিলেন, আমরা দেখিনি। কেবল ফাঁসির বিরুদ্ধে তারা, মানে ফাঁসি ছাড়া অন্য যে কোন শাস্তির কথা বলেছেন। কিন্তু সেটা তো বিচারের ত্রুটির ইস্যু নয়। তাহলে আজ আমেরিকা যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ‘ব্যাপকভাবে সমালোচিত’ বিচার মনে করলে এর দায় থেকে আমেরিকাও বাইরে নয়। অন্তত আলী রীয়াজও এসব দায়ের কতটুকু বাইরে সে বিচারও তাকে নিজেই করতে হবে।

    এখনকার আইএসের উপস্থিতির স্বীকারোক্তি করা না করা নিয়ে আলী রীয়াজ এত কথা তুলছেন। এটা সবাই জানে আইএস সশস্ত্র ও রক্তাক্ত ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতাই তার প্রধান কাজ। আমরা যদি প্রকাশ্য গণতৎপরতা আর গোপন সশস্ত্রতা এদুইয়ের মাঝে মোটা দাগে একটা ফারাক বুঝতে পারি তাহলে ২০১৩ সালেই হেফাজতের প্রকাশ্য গণতৎপরতা দেখে অস্থির হওয়ার কী ছিল। ওটা নিশ্চয় আরযাই হোক  অন্তত ‘সন্ত্রাসবাদ’ ছিল না। ওটা ছিল একটা গণক্ষোভ। প্রধান কথা, ওটা মাস অ্যাকটিভিটি, কোনো ‘সন্ত্রাসবাদী’ ঘটনা নয়। যদি ওটাকে সন্ত্রাসবাদ বলেন, তাহলে আইএসকে কিছু বলার থাকে না। অথচ হেফাজতের তৎপরতাকে ভয়ঙ্করই মনে করা হয়েছিল। ভেবেছিলেন তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ দেখছেন। এই গণক্ষোভকে মিস হ্যান্ডলিং করার দোষেই কী আসল “সন্ত্রাসবাদ” আইএস এখন হাজির হয়নি? মিস ান্ডিলিংয়ের একটা প্রধান কারণ কী ইসলামবিদ্বেষ নয়? তাই মিস হ্যান্ডলিংয়ের কারণেই সরকার ইসলামবিদ্বেষী পরিচয় য়ার স্পষ্ট হয়েছে, সরকারের গণবিচ্ছিন্নতা বেড়ে চরম হয়েছে।
    আর কে না জানে যেকোনো সরকারের ‘ইসলামবিদ্বেষী’ পরিচয় আর ‘গণবিচ্ছিন্নতা’ এগুলোই আইএস ধরনের সংগঠনকে ডেকে আনে। তাদের হাজির হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফেবারেবল, লোভনীয় পরিস্থিতি মনে করে তাঁরা। এগুলোই পাঁচজন আঠারো বছরের ছেলে ১০ ঘণ্টা ধরে সরকার  কাপিয়ে দিয়ে গেল এমন হিরোইজম দেখতে সাধারণ মানুষকে একবার উদ্বুদ্ধ করে ফেলতে পারলেই
    সব শেষ।

    আলী রীয়াজের সেকুলার বুঝের ব্লাসফেমি ভুত দেখা
    আলি রিয়াজ বিগত ২০১৩ সাল থেকে হেফাজতের আন্দোলনে “ব্লাসফেমি আইনের নাকি দাবি” করা হয়েছে একথা মুখস্থের মত বলে যাচ্ছেন, অথচ এটা আর একটা মিথ্যা ও ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য। আর সবচেয়ে বড় কথা ব্লাসফেমি আইনের দাবি কখনোই হেফাজত করেনি। অথচ এটা যাচাই না করেই কেউ আগাম হেফাজতকে খারাপ দেখতে চাইলে যা হয় তাই হয়েছে। মজার ব্যাপার হল, সেই ব্রিটিশ আমল ১৮৬০ সাল থেকেই পেনাল কোডে এই আইনটা আছে। পেনাল কোডের ধারা ২৯৫ থেকে ২৯৮ সম্পর্কে তিনি জানেন, পাতা উল্টিয়েছেন মনে হয় না। অতএব হেফাজত দাবি করে থাকুক কী না থাকুক ব্লাসফেমি বা ধর্মের অবমাননা সংক্রান্ত আইন বৃটিশ আমলেই পেনাল কোডে রাখা আছে। আর তাই ব্লাসফেমি আইন করার জন্য বৃটিশরা নিশ্চয় বড় মৌলবাদী গোষ্ঠী? না কী?

    দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, ব্লাসফেমি ইংরেজি শব্দ। ফলে কওমি আলেমরা এমন ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করবেন কেন? আসলে, তাদের দাবি ছিল তাদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, তাকে অপমান করা হয়েছে, বেইজ্জতি করা হয়েছে। ফলে এর প্রতিকার চান তারা; আইন ও শাস্তি চান। যেকোনো গণক্ষোভের (বা সিভিল ডিস-অবিডিয়েন্সের) বেলায়  ব্যাপারটা এমনই হয়, এভাবেই গড়ায়। বরং তারা কোনো সশস্ত্র তৎপরতায় নয়, আইনসঙ্গতভাবে মাস তৎপরতায় সমাবেশ ডেকে সরকারের কাছে আইন দাবি করেছিলেন, শাস্তি চেয়েছিলেন। নিজেই কোনো ধর্মীয় আইন বা ফতোয়া জারি করেননি। সে আইন প্রয়োগ করেননি, কাউকে দায়ী করে কোতল করেন নাই। এ ছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল – হেফাজত কোন কল্পিত কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্রের কাঠামোতে নয়, একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতেই একটি আইন চাইছিলেন। অতএব দুইটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্ট হল – এক.  হেফাজত আইএস এর মত কোন গোপন ও সশস্ত্র কায়দার সংগঠন নয়, ফলে অমন কোন সংগঠন হয়ে  সে  ঢাকায় হাজির হয় নাই, আসে নাই। গণবিক্ষোভ জানাতে পাবলিক সমাবেশ করেছে। সবাইকে জানিয়ে, সবাইকে নিয়ে এবং প্রকাশ্যে। অথচ আমরা তাকে ট্রিট করেছি ওকে ‘সন্ত্রাসী’ দাবি করে। আমাদের সরকার ও জনগণের একাংশের গভীর ইসলামবিদ্বেষ থেকে তাঁরা প্ররোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় পয়েন্টঃ হেফাজত দাবি করেছে একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতে একটা আইন করে সমাধান। কিন্তু সেকুলারিজমের নামে আমাদের ইসলামি বিদ্বেষী মন সেটা দেখতেই পায় নাই। কারণ কী দেখে কী চিনতে হয় আমরা জানি না, আমরা এমনই দিগগজ! কিন্তু আমাদের মন ভর্তি হয়ে আছে ঘৃণা আর বিদ্বেষে। তাই জবরদস্তিতে দাবী করছি হেফাজত না কী ব্লাসফেমি আইন চাইছে!    এখন নিশ্চয় আমাদের সেকুলাররা পরিস্কার ভাবে মানবেন যে হেফাজতকে মিসহান্ডলিং করা হয়েছে। ইসলাম বিদ্বেষের কারণে তারা তা করেছেন। সেখান থেকে আস্তে আস্তে সরকার গণবিচ্ছিন্নতার শুরু। এর তলানীতে ঠেকা অবস্থায় আজ এভাবেই কী বাংলাদেশকে  আইএস ধরণের রাজনীতি বিকাশের জন্য সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র বানায়ে হাজির করা হয় নাই? যেটা আসলে আইএস ততপরতাকে দাওয়াত দেয়ার সামিল। অথচ আমরা কিছুই লক্ষই করিনি, বুঝতেই পারিনি। কারণ, কী লক্ষ্য করতে হবে আমরা তাই জানি না। আমরা খালি নাকি সেকুলারিজম বুঝি।

    আসলেই কী বুঝি? বিগত ২০১৩ সাল থেকে দেখছি আমাদের যাদের মন ইসলামিবিদ্বেষী তারা হেফাজত ঘটনার মিডিয়া রিপোর্ট করার সময় হুবহু কওমি আলেমদের দাবিটা উল্লেখ না করে নিজের বিদ্বেষের জ্ঞান জাহির করতে আলেমদের ভাবনাকে খ্রিষ্টীয় অনুবাদ করে লিখে দিলেন- “আলেমরা ব্লাসফেমি আইন চেয়েছে”। আলী রীয়াজ যাদের একজন। ওই রিপোর্টাররা কী জানেন ব্লাসফেমি খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় অবমাননাবিষয়ক শব্দ। এই শব্দ ইসলামের আলেমদের নয়, হতেই পারে না। অতএব এটা তাদের শব্দই নয়। এটা অবুঝ ও বেকুবদের শব্দ। আমরা সেটা আলেমদের মুখে জবরদস্তি সেঁটে দিতে দেখেছি। বিশেষ করে যারা ইংরেজি মিডিয়া রিপোর্ট করলেন তাদের কেউ কেউ গোলামি মনের সমস্যায় ভাবলেন নিশ্চয় ব্লাসফেমি শব্দ ব্যবহার করলে ইংরেজিতে ব্যাপারটা সঠিকভাবে ইংরেজিভাষী বা বিদেশীদের বুঝানো যাবে। আর কেউ কেউ ভাবলেন এটাকে সরকারের পক্ষে ক্রেডিট আনার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। দেশে বিদেশে সবাইকে জানালেন যে, ব্লাসফেমি আইনের জন্য নাকি বাংলাদেশে ইসলামি ‘পশ্চাৎপদ’ হুজুরদের সমাবেশ হয়েছিল। আর এতে সরকারকে হিরো হিসেবেও তুলে ধরা গেল যে ‘ইসলামি সন্ত্রাসবিরোধী’ কাজ হিসেবে সরকার কওমি আলেমদের ঠেঙিয়েছে। অথচ কোথায় আলেমদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে খারাপ কথার শাস্তি দেয়ার আইনের দাবি আর কোথায় একে ব্লাসফেমি আইন বলে হাজির করে তুচ্ছ পশ্চাৎপদ অচল পুরানা মাল বলে তাদের হাজির করা হল। এছাড়াও আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই ব্যাপারটাকে ‘ডিফেমেশন অব রিলিজিয়নের” বিষয় হিসেবে দেখা ও সে অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রতিকারের প্রতিশ্রুতির বিষয় হিসেবে দেখে এর সমাধান দেয়া সম্ভব ছিল। আমার ধারণা ছিল না অন্তত আলী রীয়াজ ২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলনের সময় থেকে আলেমররা ‘ব্লাসফেমি আইনের’ দাবি করেছে বলার ভুলটা এত দিনেও তিনি লালন করছেন। এই ভুলটা কাটানোর জন্য সেসময় থেকেই নানা আর্টিকেল বাজারে এসেছে।  তাহলে এমন ভুল ধারণা লালন যারা করেন তাদের কী ‘অবস্কিউরানিস্ট’ বা স্থবির অচল, যারা নতুন গ্রহণ করে না- বলা চলে! আলী রীয়াজ এই ‘অবস্কিউরানিস্ট’ শব্দটাই ব্যবহার করেছেন হেফাজতের আলেমদের বিরুদ্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘অবস্কিউরানিস্ট’ রিলিজিয়াস গ্রুপ দ্যাট ডিম্যান্ডেড দা ইন্ট্রোডাকশন অফ এন অ্যান্টি-ব্লাসফেমি ল ইন ২০১৩।’ (Hefazat-e-Islam, an obscurantist religious group that demanded the introduction of an anti-blasphemy law in 2013)
    সোজা কথায় বললে আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলির মতো আমেরিকান বন্ধুদের ও খোদ আমেরিকাকে আগে ঠিক করতে হবে তারা আসলে কী চান। সফল ইসলামবিদ্বেষ চাইলে অথবা আলেমদের অচল মাল বা পশ্চাৎপদ হিসেবে দেখানো, এগুলো খুবই সহজ কাজ। আমরা কেউ কাউকে আমার পছন্দের ধর্ম অথবা নিধর্মের সমাজ নাস্তিকতায় নিয়ে যেতে পারব না। কারো ধর্ম খারাপ প্রমাণ করে কিছুই আগাতে পারব না। এর প্রয়োজনও নেই। বরং আমাদের কমন সুন্দর দিকগুলার গৌরব তুলে ধরে এক রাজনৈতিক কমিউনিটি গড়ে অনেক দূর যেতে পারি। নাইলে আমাদের জন্যই হয়ত অপেক্ষা করছে আইএস অর্থাৎ আলকায়েদার পথ। আমরা যদি ওইটারই যোগ্য হই তবে তাই হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সান হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অন লাইনে ১৮ জুলাই ২০১৬ সংখ্যায় (প্রিন্টে ১৯ জুলাই) ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার তা নানা সংযোজন ও এডিটের পর ফাইলান ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

  • যখন ভয়ে মানুষ যেচে সত্য কথা বলে

    যখন ভয়ে মানুষ যেচে সত্য কথা বলে

    গৌতম দাস
    ১৪ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার
    http://wp.me/p1sCvy-1uG

    গত ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান কাফের ঘটনা দেশি-বিদেশি সকলকে ব্যাপক নাড়া দিয়েছে। সিএনএন, বিবিসি আর আল-জাজিরা এই তিন আন্তর্জাতিক নিউজ চ্যানেল পুরা দশ ঘন্টা জুড়ে সমানে কভার করাতে, এছাড়া সময়ে লাইভ ব্রডকাস্ট করাতে সারা দুনিয়ায় খবরটা এত ছড়িয়েছে বলে ধারণা করা যায়। এতদিন যে যা নিয়ম-নীতি মেনে অথবা কোন কিছুই না মেনে বেপরোয়াভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এই ঘটনা এবার এমন সবাইকে অভিমুখ বদলাতে, বিষয়টা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে। এর মূল কারণ সম্ভবত এটা আলকায়েদা বা আইএস ধরণের ততপরতায় ভারতীয় উপমহাদেশের কোন দেশের উপর প্রথম হামলার ঘটনা। যা এর আগে দেখা যায় নাই। ভারতীয় মিডিয়া এই হামলার ঘটনাকে গত ২০০৮ সালের তাদের বোম্বাই হামলার সাথে বার বার মিলিয়ে দেখাতে চেয়েছে। প্যারালাল টানার চেষ্টাও করছিল। ভারতের মিডিয়ার এই অক্ষম প্রচেষ্টা ২০০১ সালের ৯/১১ এ টুইন টাওয়ারে হামলার সময় থেকে করে আসছে। অথচ বোম্বাই হামলা – হামলার ঘটনা হিসাবে অনেক ঘটনার সাথে মিললেও আমাদের মনে রাখতে হবে ভারতের ক্ষেত্রে এই ধরণের ঘটনাগুলোর উৎস কাশ্মীর কেন্দ্রিক যা কোন আন্তর্জাতিক ঘটনা না, বড় জোর হয়ত তা আঞ্চলিক ঘটনা বলে দাবি করা যায়। আর তার চেয়েও বড় কথা কাশ্মীর ইস্যু বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ধরণের ক্যাটাগরির ঘটনা। নিশ্চয় আমাদেরকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আর গ্লোবাল ইসলামি ফেনোমেনা যা পশ্চিমের চোখে “আন্তর্জাতিক টেরর মুভমেন্ট” – এর তো ফারাক টানতেই হবে। আসলে দুই ধরণের ঘটনাকে মিলিয়ে গুলিয়ে মিডিয়ায় দেখানোর চেষ্টা ভারতের পররাষ্ট্র নীতির কৌশল মাত্র। এটা দোষের নয় হয়ত, নিজের বয়ান খাড়া করার জন্য অনেক রাষ্ট্রই এমন করে থাকে। তবে স্বভাবতই এমন বয়ানের খাতক সবাই হবে এমন আশা ভারতের মিডিয়ার না থাকাই ভাল। সবাইকে এটা মেনে নিতেই হবে তাও নয়। অন্যদিকে যারা আইএসের উপস্থিতির বিষয়টা যে কোন উদ্দেশ্যে অস্বীকার করে যাচ্ছিল, বলা যায় এরা সবাই এর পরিণতির দিকটা উপেক্ষা করে এক ধরণের বেপরোয়া চলছিলেন একথা সত্যি হলেও তাদের কাছে সম্ভাব্য হামলার ব্যাপারটা অজানা ছিল তা নয়। অথচ সকলেই একটা ভান কর গেছে যেন তারা এমন একটা কিছু ঘটবে বা ঘটতে যাচ্ছে জানতেনই না। অথবা অবস্থান হল যে দেখি না আগে বাস্তবে ঘটুক, ততদিনে আর একটু বেশিক্ষণ সুবিধাদি খেয়ে নেই। এজন্য এরাই হামলার ঘটনা ঘটবার পরেপরেই একেবারে উলটা গান ধরেছে, সব ছেড়ে ভদ্র সভ্য হবার চেষ্টা করছে,সেই সুবিধা খাওয়া শক্তি। হামলার ঘটনার শুরু পয়লা জুলাই রাত প্রায় পোনে নয়টা। তবে বাংলাদেশে এই প্রথম জিম্মি করার ঘটনা বলে ঘটনার ব্যাপকতা ও গভীরতার দিকটা বুঝতে সকলের সময় লেগেছিল। প্রায় রাত দশটার আগে কেউই ঘটনার মাত্রা ঠাহর করে বুঝতে সক্ষম হন নাই। এরপর সারারাত ধরে উতকন্ঠা শেষে জিম্মি উদ্ধার একশন অভিযান শুরু হয় সকালে অর্থাৎ ২ জুলাই সকাল সাতটা চল্লিশ মিনিটে। তাতে কী ঘটল সকালে, ফলাফল কী দাড়াল – সকাল দশটার আগে এর নিউজ মিডিয়ায় আসে নাই। তবে এরপর থেকে দিনভর ক্রমশ পরিস্কার হতে থাকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ।
    পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা ইদানিং মানে, গত কয়েকমাস ধরে বাংলাদেশের ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগী হয়ে উঠেছে। আগেকার দিনে দৈনিক পত্রিকা বলতে আমরা প্রিন্ট পত্রিকাই বুঝতাম। কিন্তু সেগুলো সবই এখন একই সাথে অনলাইনও হয়ে উঠেছে। অনলাইন মানে আগে যেমন ছিল, প্রতিদিনের খবর পরেরদিন সকালে একসাথে প্রিন্ট হয়ে বের হওয়া সে নিয়ম-ছন্দ এখানে ভেঙ্গে ফেলা। দিনের ঘটনা দিনেই যখন ঘটছে প্রায় তখনই প্রকাশিত করে ফেলা হল অনলাইনের বিশেষ বৈশিষ্ঠ। এমনকি ঘটনা উদ্ভাসিত হয়ে ঘটা শেষ পর্যন্ত ডেভেলপিং স্টোরি হিসাবে ক্ষণে ক্ষণে একাধিক রিপোর্ট বের করে ফেলা যায় ও হয় এখানে। এটাও অনলাইন পত্রিকার আর এক বিশেষ বৈশিষ্ঠ। আনন্দবাজার অনলাইন শুধু হয় নাই, নিয়মিত সম্পাদকের বাইরে অনলাইন সম্পাদক বলে আলাদা লোক নিয়োগ দিয়েছে। বাংলাদেশের পাঠক টানার জন্য আনন্দবাজার দিনের শুরুতে সরাসরি পাঠকের মেলবক্সে অনলাইন পত্রিকার লিঙ্ক পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। আরও আছে। পত্রিকায় আগে যে সাব-ক্যাটাগরি হেডিং করা খবর পরিবেশন করত যেমন – কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গের জেলা, রাজ্য, কেন্দ্র এরপর বিদেশ এভাবে মোটা দাগের ক্যাটাগরিতে ভাগ করে। এবার এর পাশাপাশি –কেন্দ্র আর বিদেশের মাঝখানে ‘বাংলাদেশ’ বলে নতুন ক্যাটাগরি যোগ করা হয়েছে। প্রতিদিন অন্তত এক বা একাধিক বাংলাদেশ সংক্রান্ত খবর সেখানে তোলা হয়ে থাকে। আর থাকে নতুন নিয়োগ পাওয়া– সম্ভবত বাংলাদেশ পাতার ভার যার উপর সেই “অমিত বসুর” একটা রিপোর্ট। যদিও এটা রিপোর্ট না কলাম, তা নিশ্চিত কর বলা মুশকিল। তবে যেটা নিশ্চিত তা হল অমিত বসুর রিপোর্ট মানেই – প্রধানমন্ত্রী হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে, উন্নতি হচ্ছে, পাকিস্তানের চেয়ে আগে যাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় মধ্যে ভাল বিনিয়োগ হচ্ছে, ইত্যাদির ঢেডা পিটানো প্রশংসাসুচক রিপোর্ট। আর বলা বাহুল্য এসবের বিপরীতে ‘বিএনপি-জামাত’ এর নানান নেতিবাচক ফেনোমেনায় তাদেরকে ভিলেন বানানো থাকে। সবমিলিয়ে এই হল অনলাইন সম্পাদক অঞ্জন বন্দোপাধ্যায়ের লেখা তাঁর আলাদা সম্পাদকীয়সহ সাজানো অনলাইন আনন্দবাজার, বাংলাদেশ যার বিশেষ ফোকাস।
    শুরুতে যেকথা বলছিলাম, ০২ জুলাই সকাল দশটার পর থেকে জিম্মি উদ্ধার কাহিনী নিউজ হয়ে প্রচারিত হওয়া শুরু করেছিল। দুপুর তিনটা চল্লিশ মিনিটে আনন্দবাজার অনলাইনের বাংলাদেশ নিউজ সেকশনে একটা রিপোর্ট আপলোড করা হয়। শিরোনাম “মধ্য এশিয়ার অর্থই অনর্থ ঘটাচ্ছে বাংলাদেশে!” – যার লেখক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী। লেখাটা মন্তব্য প্রতিবেদন ধরণের বলা যেতে পারে। লেখার প্রসঙ্গ বিচার করলে বুঝা যায়, বাংলাদেশের জিম্মি ঘটনার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা কী হতে পারে সে সম্পর্কে একটা প্রাথমিক ধারণা দেয়া এর উদ্দেশ্য। অথবা হয়ত লেখককে সম্পাদকের অনুরোধটা হয়ত এমনই ছিল।
    হোলি আর্টিজানের ঘটনায় ভারতের সংশ্লিষ্ট ইন্টারেষ্ট বা কনসার্ণ গ্রুপের কিছু সাধারণ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এর মধ্যে প্রধান কমন প্রতিক্রিয়া হল, স্বভাবতই ভয়ভীতি। এছাড়া এথেকে উতসারিত পরের প্রতিক্রিয়া হল – যতটা সম্ভব দুরত্ত্ব তৈরি করে দাঁড়ানো যাতে তা ভারত ‘অ-সংশ্লিষ্ট’ এই ভাব তৈরি করে। ভারত এসব ছুয়ে নাই তা দেখান। এর মূল উদ্দেশ্য ভারত এসবে সংশ্লিষ্ট না ফলে ভারত যেন বাংলাদেশের সাথে টার্গেট না হয়। হামলা যেন না ছড়িয়ে ভারতে প্রবেশ না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখা পদক্ষেপ। যেমন এব্যাপারটা সবচেয়ে প্রতীকী প্রতিক্রিয়ার রূপ হল, কোন স্পষ্ট ঘোষণা না দিয়ে অনির্দিষ্ট ও হঠাত করে ঢাকা-কলকাতা ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ ট্রেন বন্ধ করে দেয়া। সাদা চোখে এসব পদক্ষেপ হয়ত অস্বাভাবিক না। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে জায়গায় আজ এসে পৌছছে তা সে জায়গায় আনতে ভারতের বাংলাদেশ নীতির দায় আছে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে ভারতের নীতি অবস্থানকে সাথে নিয়ে দেখলে তা বুঝা যাবে। সেক্ষেত্রে বলা যায় এটা বাংলাদেশকে বিপদে ফেলে এখন পালিয়ে যাওয়া, সম্পর্ক ও দায়–হীন বলে হাত ধুয়ে ফেলা – এভাবে ভারতের নিজেকে হাজির করার চেষ্টা।
    উপরে ভারতের সাধারণ প্রতিক্রিয়া বুঝাতে প্রথম শব্দটা লিখেছে ‘ভয়ভীতি’। মানুষ ভয় পেলে বয়ান ১৮০ ডিগ্রী বদলে ফেলতে পারে তাই যেন বুঝা গেল সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরীর এই লেখায়। মোট ৬৭৬ শব্দের এই লেখার প্রথম ৫৩৮ শব্দ তিনি ব্যয় করেছেন ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদ ব্যাখ্যা করতে বা বলা যায় দায়ী করতে। বলা বাহুল্য সেটা এক অর্থনীতিবাদী ঝোকের ব্যাখ্যা। দুনিয়ার সব অঘটনের জন্য ‘পুঁজিবাদ দায়ী’ করা ধরণের। এছাড়া এই ব্যাখ্যা-ধারা বলতে চায় – দুনিয়ার ঘটনাবলী ঘটে নৈব্যক্তিকভাবে, বা ঘটবেই ধরণের। ফলে যেন মানুষ দায়ী না, ঘটনার কর্তাও সে নয়। অথবা কর্তা কেউ নয় ও নাই। এই ব্যাখ্যার ঝোক, ঘটনার কর্তা দেখতে পায় না বা চায় না। তবে লেখক সব্যসাচীর লেখায় ‘পুঁজিবাদ’ মূল প্রসঙ্গ নয়, বরং যা তিনি বলবেন এর পটভুমি রচনার উপাদান বলা যায়। কী তিনি বলবেন?
    এককথায় বললে তাঁর বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী। ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের এর হামলাকারিরা কোন কিসিমের মাদ্রাসা ছাত্র নয়। বরং একেবারে দেশ-বিদেশের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং তাঁরা উচু সমাজের সন্তান। এসব প্রকাশ হয়ে পড়ার পর অনেকেই ব্যাপক অস্বস্তিতে ভুগছেন। কারণ এতে ‘সন্ত্রাস’ বিষয়ে তাঁদের সব গালগল্প আর গরীব-ঘৃণা উদোম হয়ে গেছে। লেখক সব্যসাচীও তাদের একজন তবে একটু ভিন্নভাবে। সারকথায় বললে, তিনি বলতে চাইছেন, পুঁজিবাদের কারণে, মধ্যপ্রাচ্যে মাইগ্রেটেড লেবার গিয়েছে। সেই লেবাররাই বাংলাদেশের “জঙ্গীবাদ” সমস্যার জন্য দায়ী। সব্যসাচীর নিজের ভাষায় পড়েন, “……পাঠানো অর্থে তাঁদের পরিবারদের সমৃদ্ধ করে তুলছেন, তাঁরা কিন্তু নিজেরা দ্রুত আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন ওই দেশগুলোর স্বাভাবিক ‘আফিমের নেশা’ ধর্মীয় উন্মাদনায়, বাড়াবাড়িতে। দারিদ্র্য,অশিক্ষা বা অল্প শিক্ষার জন্যই এটা হচ্ছে। তাঁরা মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর কড়া ‘ডোজ’-এর মৌলবাদে আকৃষ্ট হচ্ছেন। আর যে বাংলাদেশিরা রুটি-রুজির টানে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোতে যাচ্ছেন, শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য তাঁদের তেমন নেই বলে (যাকে ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’ বলা হয়) তাঁরা চট করে ওই ‘সোনার হরিণ’-এর টানে মজে গিয়ে ওই ধর্মীয় ‘আফিম’-এর নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ছেন। তাঁদের মাধ্যমেই বাংলাদেশে ওই ‘আফিমের নেশা’ (মৌলবাদ) আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে”।
    প্রথমত, সব্যসাচীর ভুগোল-বোধে সমস্যা আছে। তিনি আসলে বলতে চাইছেন মিডল-ইষ্ট বা মধ্যপ্রাচ্যের কথা। কিন্তু শব্দে সেটাকে বলছেন, “মধ্য এশিয়া”। কিন্তু ইষ্ট মানে তো এশিয়া নয়, প্রাচ্য। যে অর্থে ওয়েষ্ট বলতে যেভাবে পাশ্চাত্য বুঝি। আবার সেন্ট্রাল এশিয়া বলে আলাদা রিজিয়ন আছে। বৃটিশ-ইন্ডিয়া কলোনি সাম্রাজ্যের যুগে যা আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্তের রুশ জার সাম্রাজ্য অঞ্চল। ফলে তিনি মধ্য এশিয়া বলতে সেন্ট্রাল এশিয়া বুঝাচ্ছেন কিনা পাঠক বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত সব্যসাচীর আর বাকী দিকটা হল, ইসলাম-বিদ্বেষ। আবার শুধু তাই না, বরং সাথে আছে শ্রেণী ঘৃণা। একেবারে “শিক্ষা,বংশ পরিচয়,সামাজিক কৌলিন্য” কথা তুলে তিনি ঘৃণা ছড়িয়েছেন। কিন্তু এতকিছু করেও সব্যসাচীর কোন লাভ হয় নাই। সব পানিতে পড়ছে। কেন? এই লেখা তিনি লিখছেন ২ জুলাই দুপুরে। আর্টজানের হামলাকারিদের “শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য” তখনও প্রকাশ হয় নাই। পরে পরিচয় প্রকাশিত হলে দেখা গেছে “হামলাকারি জঙ্গীদের” “শিক্ষা, বংশ পরিচয়, সামাজিক কৌলিন্য” অর্থাৎ হামলাকারিদের পারিবারিক পরিচয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগত পরিচয় সব্যসাচীরা নিজের জন্য যেমন কাম্য মনে করেন সেই একই শ্রেণীর অথবা সম্ভবত আরও উচু শ্রেণীর। অতএব বলার অপেক্ষা রাখে না সব্যসাচীর ঘৃণাতত্ত্ব বুমেরাং হয়ে ‘ধরা খেয়েছে’। ইংরাজিতে কথা বলা, স্বচ্ছল ঢাকার এলিটদের সন্তান, দামি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া যারা সম্ভবত সব্যসাচীর চেয়ে আপাদমস্তক আধুনিক তারাই আর্টিজান হামলাকারি। ফলে স্পষ্টত সব্যসাচীর গরীব ও মুসলমান-বিদ্বেষী অবস্থান এখানে সবার সামনে উন্মোচিত হয়ে গেছে।

    ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানো প্রথম ৫৩৮ শব্দের পরে সব্যসাচীর লেখার শেষ ১৩৮ শব্দ। এটাও ভীষণ কৌতুক কর। ঠাকুর ঘরে কে রে আমি কলা খাইনি – ধরণের। মানুষ অনেক সময় প্রচন্ড ভয় পেলে আগাম ও যেচে অনেক সত্য কথা বলা শুরু করে। এটা যেন তেমনই এক ঘটনা। সরাসরি সব্যসাচীর বক্তব্য উঠিয়ে আনছি, বলেছেন, “৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে যে ভাবে আদালতের নির্দেশের মাধ্যমে একের পর এক যুদ্ধাপরাধীকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হচ্ছে আর সে সব দ্রুত কার্যকর করা হচ্ছে, তাতে আমার মনে হয়, বাংলাদেশি যুব সমাজের কাছে এই বার্তা যাচ্ছে যে, হাসিনা সরকার প্রতিশোধস্পৃহায় ভুগছেন। তাঁরা এটা থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন যদি কোনও আন্তর্জাতিক আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হত বা বাংলাদেশি আদালতে ওই মামলাগুলোয় যদি অন্তত এক জন বিদেশি বিচারপতি রাখা যেত”।

    তার মানে সব্যসাচী একটা হামলা খেয়েই সাথে সাথে স্বীকার করছেন যে সরকার প্রতিশোধস্পৃহায় ভুগছে। এটা সত্যিই এক দেখার মত তামাশা। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ হয়েছে কথা সত্য, যা আইনী ভাষায় বললে, এটা আদালতে প্রমাণ করলে তা শাস্তিযোগ্য বিষয়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে অবিচার আর বেইনসাফি করা হয়েছে। তবে সেটাও তুলনায় খুবই ক্ষুদ্র বিষয়। এর তুলনায় এঘটনার ভিতর দিয়ে খোদ রাষ্ট্রের ভিত নাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, রাষ্ট্র আজ অন্যের দাস হয়েছে। রাষ্ট্র আজ ভেঙ্গে পড়ার দশায়। এটা আমার কথা নয়, প্রকারন্তরে এটাই আসলে সব্যসাচীই স্বীকার করছেন। তিনি এটাকে “সরকারের প্রতিশোধস্পৃহায়” করা কাজ বলছেন। তার মানে এখানে কোন বিচার হয় নাই, ‘প্রতিশোধস্পৃহায়’ করা কাজ হয়েছে। কিন্তু এঘটনাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ আউলিয়ে সব ধবংস হয়ে যাবার পর এখন সব্যসাচী এর কারেকশন খুজছেন। আদালতের স্টান্ডার্ড নিয়ে কথা তুলছেন। অর্থাৎ সাব-স্টান্ডার্ড আদালত ব্যবহার করা হয়েছে প্রকারন্তরে তা বুঝিয়েছেন। বলছেন, যদি “আন্তর্জাতিক আদালতে” বিচার করা হত এবং “বিদেশি বিচারপতি রাখা যেত” – এসব কথা বলছেন। তাহলে স্বভাবতই এখানে যে প্রশ্নটা নিরুত্তর থেকে যায় যে, এটা এতদিন তিনি আমাদের বলেন নাই কেন? এখন বলে তিনি কী হামলাকারিদের এক্টকে ন্যায্যতা দিলেন না? তবে এখানে একটা ফ্যাক্টস বলে রাখা ভাল। আর্টজানে হামলাকারিরা জামাত রাজনীতির খাতক না, এটা বলা যায়। কারণ আইএস খোদ তাদের মাসিক প্রকাশনাতে জামাতকে “মুরতাদ” মনে করে বলে জানিয়েছে।

    কিন্তু অবাক কান্ড যে আনন্দবাজার সব্যসাচীকে দিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনা করা ধরণের আর্টিকেলে কারেকশনের কথা বলে সেই আনন্দবাজারই আবার গত ৮ জুলাই এই অবস্থানের ঠিক উলটা কয়েকটা “পেজ ফর সেল” রিপোর্ট ছেপেছে। গত ৮ জুলাইয়ের বাংলাদেশ নিয়ে ছয়টার বেশি রিপোট ছেপেছে যার সবগুলাই “পেজ ফর সেল” ধরণের রিপোর্ট। অর্থাৎ আনন্দবাজার তার পত্রিকার পাতা বা জায়গা কোন বিশেষ গ্রাহককে বিক্রি করেছে। আর ঐ গ্রাহক ঐ পাতায় যা মনে চায় তাই লিখে ভরিয়েছে। এরপর আনন্দবাজার আবার তা ছাপলেও কিন্তু নিজে মনে করে গ্রাহক ঐ পেজে যা লিখেছে তার দায়দায়িত্ত্ব আনন্দবাজারের নাই। এই হল ‘পেজ ফর সেল’।

    গত ৮ জুলাই প্রকাশিত সেসব রিপোর্টের মধ্যে দুই দুখানা হল জমিদারি-রুস্তমি আমলের কিশোরগঞ্জের জমিদারদের জমিদারি চলে যাবার হাহুতাশ ও হাহাকার বিষয়ক। প্রথমত কিশোরগঞ্জ কেন? কারণ এবার ঈদের দিন শোলাকিয়া ঈদের জামাতকে টার্গেট করে সেই মাঠে পৌছানোর রাস্তায় পুলিশ চেকপোস্টে সশস্ত্র হামলা করা হয়েছিল। ফলে সেই সুত্রে কিশোরগঞ্জ এখানে বিষয়। কিন্তু কাদের দিয়ে আনন্দবাজার কিশোরগঞ্জ নিয়ে আর্টকেল লিখে ছাপাচ্ছে? কিশোরগঞ্জের জমিদারের দুই উত্তরাধিকারী। এটাই হল ইন্টারেস্টিং রগড়ের দিক। আমাদের অনেকের পরিচিত The Autobiography of an Unknown Indian বইয়ের লেখক নীরদ চন্দ্র চৌধুরীর পিতা ছিলেন কিশোরগঞ্জের নবগ্রামের জমিদার পরিবারের সন্তান। সেই নীরদ চন্দ্র চৌধুরী আবার এই শতকে বসেও পুর্ববঙ্গের মানে একালের বাংলাদেশের মুসলমানদেরকে বাঙালী বলে স্বীকার করেন না। এটা অবশ্য উনি একা নন, বৃটিশ কলকাতা হল জমিদারির আয় পয়সায় বেড়ে ঊঠা শহর। ভেঙ্গে বললে, বাংলার জমিদার-প্রজা সম্পর্কের কৃষি থেকে পাওয়া উদ্বৃত্ত লুটেরা সম্পদ পুঞ্জিভুত হয়ে যে শহর গড়ে উঠেছিল তার নাম কলকাতা। আর কলকাতায় এতে যে ধরণের চিন্তা, রাজনীতি, সাহিত্য সংস্কৃতি বা লাইফ ষ্টাইল যা গড়ে উঠেছিল এককথায় এটার প্রতীকী শব্দই “বাঙালী”। সেজন্য শব্দ হিসাবে কলকাতা ও বাঙালী প্রায় সমার্থক শব্দ। তবে এই বাঙালী ধারণাতে অবশ্যই আমরা পুর্ববঙ্গের কেউ অন্তর্ভুক্ত নই, গণ্য নই। আর ঐ কলকাতা বা বাঙালী – এটা জমিদার ঔরসের বাঙালি, বা সংক্ষেপে “জমিদার বাঙালি”। পুর্ববঙ্গের আমরা, আমাদের দুটা কথা এখানে মনে রাখা দরকার, এক. বাংলার জমিদার প্রজা সম্পর্কের কৃষির সেসময়ের শোষিত প্রজাদের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ট অংশ ছিল মুসলমান। আর দুই, ‘কলকাতা’ বা ‘বাঙালী’ প্রকল্প প্রজা মুসলমানদের বাঙালি মনে করতে না, স্বীকৃতি ছিল না। ফলে বলা যায় ‘জমিদার বাঙালি’ প্রকল্প খুবই ‘ক্লাস কনশাস’ প্রকল্প ছিল।

    সেই সুত্রে এজন্য নীরদ চন্দ্র চৌধুরি (১৮৯৭-১৯৯৯) নিজ জীবদ্দশায় গত আশির দশকেও আনন্দবাজার পত্রিকায় পুর্ব্বঙ্গের মুসলমানদের সম্পর্কে লিখেছিলেন “তথাকথিত বাঙালী”। সেই নীরদ চৌধুরির সন্তান হলেন ধ্রুবনারায়ণ চৌধুরী। আর নীরদ চৌধুরিরই আপন বড় ভাইয়ের মেয়ে হলেন কৃষ্ণা বসু। (কৃষ্ণা বসু নিজেই তার আর এক পরিচয় জানিয়ে বলেছেন তিনি, ভারতের প্রাক্তন লোকসভা সাংসদ এবং সুভাষচন্দ্র বসুর পরিবারের সদস্যা।) ধ্রুবনারায়ণ চৌধুরী এবং কৃষ্ণা বসু এরা দুজন আনন্দবাজার পত্রিকায় দুটো আর্টিকেল ছাপিয়েছেন গত ৮ জুলাই। তাদের বাপ-দাদাদের জমিদারি আমলে কিশোরগঞ্জে কত দুধ-ননীর নহর বয়ে যেত এরই বর্ণনা দিয়ে। এবারের ঈদের শোলাকিয়ায় হামলার বিরুদ্ধে তাদের মনে পড়ছে বাপ-দাদার কিশোরগঞ্জের কথা। তারা তুলনা করছেন বাপ-দাদাদের জমিদারির কিশোরগঞ্জ কত ভাল ও আদর্শ ছিল। যদিও দুজন মানছেন কিশোরগঞ্জ তারা দুজনই প্রায় কখনও যান নাই। আনন্দবাজারের এই প্রজেক্টটাই আসলে ইন্টারেস্টিং। যেন “জঙ্গীবাদ” খেদিয়ে আনন্দবাজার বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে আবার জমিদারি ফেরত আনার স্বপ্ন দেখছে! আমরা আজ জঙ্গীবাদের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি এর মানে কী পরিত্যক্ত পরাজিত জমিদারি ব্যবস্থা আমরা এখন ভাল মনে করব? আনন্দবাজারের ধারণা এটাই জমিদার নীরদ চৌধুরির উত্তরাধিকারদের দিয়ে হাহুতাশ ছড়ানোর ভাল সময়। তাই জঙ্গীবাদের চেয়ে জমিদারি শোষণ নিষ্পেষণ ব্যবস্থা ভাল ছিল এমন তুলনা ইঙ্গিত টানছে। অথচ আনন্দবাজারের কী খেয়াল রাখা উচিত ছিল না যে “জমিদারি” শব্দটা কলকাতায় না-বুঝা গৌরবের ভাবতে পারে। ওর বনেদিয়ানাকে কুর্নিস জানাতে পারে এমনকি তা কারো পেয়ারের হলেও বাংলাদেশ “জমিদারি” খুবই ঘৃণিত একটা শব্দ। আর কোন প্রজারই জমিদারের দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণের কথা না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আনন্দবাজারের চেষ্টা হচ্ছে পরাজিত জমিদারের দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখা কিশোরগঞ্জের বর্ণনা একালে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দেয়া। বাংলাদেশ মূলত মুসলমান প্রজাদের আবাসভুমি। বৃটিশ উপনিবেশ মাস্টারের কোলে বসে কিশোরগঞ্জের জমিদার নীরদচন্দ্র চৌধুরীরা কী মৌতাতে হুকায় টান দিতেন,ইংলিশ নাটক মঞ্চস্থ করতেন কী না এসব গল্পগুলো এপার বাংলাদেশ খাবে না। খাবার কোন কারণ নাই। বরং ক্রোধ হবার সম্ভাবনা।

    সবশেষে মুরোদ তত্ত্ব দিয়ে শেষ করব। দানব সরকারের বিরুদ্ধে যখন নিজের গুম খুন হয়ে যাওয়া অথবা সরকারের দাবরানির চোটে নিজের জান বাঁচাতে যখন নুন্যতম সরকার বিরোধীরা সবাই ব্যস্ত ঠিক সেই সময়টাই হল সবচেয়ে বিপদজনক। কেন? কারণ সেই সময় জনগণ মুরোদ ওয়ালাদের খুঁজে,তাদের মর্দানি দেখতে পছন্দ করে ফেলতে পারে। মানে দানব সরকারের বিরুদ্ধে যে কেউ সশস্ত্র সবল প্রতিরোধ করতে মুরোদ রাখে তাদের দেখতে পছন্দ করে ফেলতে পারে। অর্থাৎ ফাঁকা রাজনীতির কথা না “মুরোদ”। তাই এটা আমাদের সবার জন্য ভীষণ বিপদজনক সময়। অন্যভাষায় এটা তাই “জঙ্গীবাদ” জন্মাবার জাগবার সবচেয়ে ফেবারেবল সময়। এভাবে জঙ্গীবাদ জনগণের মৌন সমর্থন পেয়ে যায় ‘যদি’ সেটাই সবার জন্য সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক হবে। অনেকে এধরণের সময়কে নকশাল যুগ বলে। এটাই মুরোদ তত্ত্ব। আশা করি আমরা মুরোদ তত্ত্ব মনে রাখব।

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১০ জুলাই দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (১১ জুলাই প্রিন্টে)ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও পরিবর্ধিত ও এডিট করে ফাইনাম ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    goutamdas1958@hotmail.com

  • জাসদ ও আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব ও সম্পর্ক

    জাসদ ও আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব ও সম্পর্ক
    গৌতম দাস
    ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-bY

    সম্প্রতিকালে জাসদ নিয়ে বিস্তর আলোচনা উঠেছে। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা জাসদের ১৯৭২-৭৫ সালের আওয়ামি লীগের বিরুদ্ধে চরম ততপরতা কার্যকলাপের প্রসঙ্গ তুলছে। তাঁরা দাবি করছে শেখ মুজিব হত্যার জন্য জাসদের নেতা বিশেষত হাসানুল হক ইনু মত নেতারা দায়ী। যেমন মানবজমিন ২৭ আগষ্ট লিখেছে, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, জাসদই বঙ্গবন্ধু হত্যার পথ পরিষ্কার করে দিয়েছিল। স্বাধীনতা বিরোধীরা কখনোই বঙ্গবন্ধুর ওপর আঘাত হানতে পারতো না যদি গণবাহিনী,জাসদ বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করে বিভিন্ন জায়গায় ডাকাতি, মানুষ হত্যা করে এমপি মেরে পরিবেশ সৃষ্টি না করতো। বঙ্গবন্ধু যেদিন মারা যান সেদিন কর্নেল তাহেরও রেডিও স্টেশনে যান”। পরের দিন “শেখ ফজলুল করিম সেলিমের বক্তব্য সমর্থন করে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ। একইদিনে প্রাক্তন জাসদ ছাত্রলীগ নেতা,বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দাবি করেন, ১৯৭৪ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও কালে হাসানুল হক ইনু এবং অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনই প্রথম গুলি করেন”। এরপরে জাসদ ইনুও পালটা আওয়ামী লীগের নেতাদের শেখ মুজিব হত্যা উত্তর মোস্তাক মন্ত্রীসভায় যোগদানে কাড়াকাড়ির প্রসঙ্গ তুলে খোচা দেয়া জবাব দেন। নিশ্চয় এই সময়ে প্রত্যেকের বক্তব্যের পিছনের প্রত্যেকের উদ্দেশ্য কী তা তাঁরাই ভাল বলতে পারবেন। তবে আওয়ামী লীগ ও জাসদ উভয়ের উদ্দেশ্যের একটা কমন দিক এখানে দেখা গেছে। তা হল, কে কতটা শেখ মুজিবের কাছের থাকেন নাই বা ছিলেন না তা নিয়ে হাসিনার কাছে নালিশ দিয়ে কান ভারী করা।

    ঘটনার পিছনের উদ্দেশ্য যাই থাক, ১৯৭২ সালে স্বাধীনের পরের সাড়ে তিন বছরে শেখ মুজিব বেঁচে থাকা এবং সরকার প্রধান থাকা অবস্থায় আওয়ামী সরকারের সবচেয়ে চরম ও কার্যকর রাজনৈতিক বিরোধীতা করেছিল জাসদ। এটাই স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সেসময়ে সবচেয়ে বড় অধ্যায় জুড়ে থাকা ঘটনা ছিল। ততকালীন সরকারের রক্ষীবাহিনী দিয়ে বলপ্রয়োগে দমন নির্যাতনের শাসনের বিরুদ্ধে কার্যকর বিরোধীতা সক্ষম করে দেখাতে পেরেছিল একমাত্র জাসদ। এই অর্থে জনগণের উপরে সরকারের দানবীয় দমন নির্যাতনকে জনগণের সামনে উদোম করে দেখিয়ে সরকারকে চরম অ-জনপ্রিয় করে তোলা এবং সরকারের রাজনৈতিক পতনের শর্ত তৈরি হয় এমন মৌলিক কাজটা ঘটেছিল জাসদের হাতে। ফলে জাসদ ১৫ আগস্ট সরাসরি ভুমিকা নিয়ে থাকুক অথবা না – এটা ঐতিহাসিক সত্য যে শেখ মুজিব সরকারকে অ-জনপ্রিয় করা ও পতন ত্বরান্বিত করার দিকে ঠেলে দেয়ার রাজনৈতিক পটভুমি জাসদের রাজনৈতিক ততপরতাতেই নির্মিত হয়েছিল। জন্মের পর থেকে সেসময় এটাই ছিল জাসদের ঘোষিত লক্ষ্য। এদিক থেকে শেখ সেলিম অথবা মোহম্মদ হানিফ ইত্যাদি যেসব আওয়ামি নেতা জাসদের নেতা হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তুলছেন তা জেনুইন। যদিও আওয়ামি লীগের কিছু নেতাদের দিক থেকে জেনুইন অভিযোগ আর জাসদের দিক থেকে দেখলে  এটাই তার জেনুইন গর্ব। এখনকার চলতি সরকার বা দলের সাথে সম্পর্ক রাখে না এমন যেকোন জাসদ কর্মী এটাকে গর্ব বলে মনে করবে। কারণ এটাই জাসদের ইতিহাস। এটা নিজের গর্ব মনে করেই জাসদ জাসদ হয়েছিল। নইলে তো সে আওয়ামী লীগ থাকত। একালে এই গর্বের চেয়ে মন্ত্রীত্ব ক্ষমতা দামি হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেজন্য ইতিহাসকে তো এখন আর বদলে নেয়া যাবে না। তবুও আওয়ামী নেতারা এখন এসব অভিযোগ কেন তুলছেন সে টাইমিং বা সময়জ্ঞান অর্থে তাদের উদ্দেশ্য কী সে প্রশ্নটা আলাদা হয়ে থেকে যাচ্ছে।

    আর এক কারণে টাইমিং এর প্রশ্ন উঠাও খুবই স্বাভাবিক। কারণ ২০০৯ সালে চলতি সরকার গঠনের শুরু থেকে জাসদ আর আওয়ামি লীগ যেন একাকার দুজনে দুজনার,পরস্পর পরস্পরের জন্য যেন জন্মিয়েছে এমন এক ঐতিহাসিক মিথ্যা ধারণা তৈরি করে সেটা শুরু করা হয়েছিল। বাইরের দিক থেকে যদি দেখি, জাসদ ও আওয়ামি লীগ ১৪ দলীয় জোটের পরস্পর দুই সাথী ও গঠিত সরকারের জোটসঙ্গী মাত্র। দুটো দল মানেই দুটো রাজনীতি। আর অবশ্যই তা পরস্পরের বিরোধী রাজনীতি। এই আলাদা রাজনীতিতে গভীর ভাবে পরস্পরের রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও কোন একটা জোটে আবার দুই দলেরই তাতে যোগ দেয়া, জোটে আবদ্ধ হওয়া এবং সে জোটের সরকার গঠন করে ফেলা- সারা দুনিয়ার রাজনীতিতে এমনটা কোন অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। ফলে এবিচারে জাসদ আর আওয়ামি লীগ এই দুদলের রাজনৈতিক সখ্যতার বিরুদ্ধে কোন প্রশ্ন তোলার কিছু নাই। এরপরেও জাসদ আর আওয়ামি লীগের রাজনৈতিক সখ্যতার বিরুদ্ধে প্রশ্নটা উঠছে সম্ভবত এজন্য যে এটার পিছনে এক আনহোলি এলায়েন্স বা অশুভ আঁতাত কাজ করছে; যার নাম প্রতিহিংসার রাজনীতি।
    কোন দেশেই নিজের ইতিহাসের বয়ান একটা থাকে না। একাডেমিক পর্যায়ে ইতিহাস নিয়ে নানান বিতর্ক তো থাকেই। আর এছাড়া রাজনৈতিক পর্যায়ে ব্যাখ্যা বয়ানের ফারাক থাকে। এটা স্বাভাবিক। বাংলাদেশেও স্বাধীনতার পরবর্তী ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক আছে। বিশেষত পঁচাত্তর পরবর্তী ঘটনাবলী নিয়ে। আর নভেম্বরের ঘটনাবলী নিয়ে আওয়ামী লীগ, জাসদ এবং বিএনপি এই তিন দলের কোন কমন ভাষ্য নাই ঘটনার সময় থেকেই। অথচ জাসদের জন্ম ১৯৭২ সাল থেকে চলতি সরকার গঠনের আগে পর্যন্ত এতে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে যেন বাংলাদেশের কোন কালেই এই দুই দলের মধ্যে রাজনৈতিক অবস্থানে কোন ভিন্নতা ছিল না।

    যে কোন দুটো দল মানেই দুটো ভিন্ন রাজনীতি। ফলে তাদের মধ্যে সমাজের বিভিন্ন বিরোধ ইস্যুকে দেখবার ক্ষেত্রে ভিন্নতা, ফলে রাজনৈতিক অবস্থানের ভিন্নতা আছে। এমনটা থাকবেই। এটা স্বতসিদ্ধ, আপনা আপনি সত্য। কারণ ভিন্নতা আছে বলেই তো ওরা আলাদা আলাদা দুটো রাজনৈতিক দল। এমন ভিন্নতা যদি না-ই থাকত তবে তো তারা আসলে একই দল। বলা হয়ে থাকে কোন রাজনৈতিক দলের মধ্যে কখনও যদি দুটো পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক লাইন বা চিন্তা জন্ম নেয় যে সে বিরোধ নিরসন করে তারা এক কমন অবস্থানে পৌছাতেই পারল না। সম্ভব হল না। এর অর্থ ঐ দল তখন থেকে বাস্তবত দুটা আলাদা দলে পরিণত হয়ে গেছে। ফলে এরপর থেকে ওরা আনুষ্ঠানিক আলাদা দল হয়ে যাবার পথে রওনা দিবে বা দিয়েছে। সেটা আনুষ্ঠানিক কবে ঘটবে কেবল সেই সময়ের অপেক্ষা। অতএব জাসদ ও আওয়ামী লীগ দুটো আলাদা দল বলা মাত্র বুঝতে হবে দল দুটোর রাজনীতি আর এক নয়। কিন্তু ২০০৯ সা্ল থেকে এই মিথ্যা ভান তৈরি করা হয়েছিল।
    এটা কমবেশী অনেকেই জানেন যে আওয়ামী লীগের ভিতর থেকে যারা ১৯৭২ সালে স্বাধীনতা পরবর্তীতে জাসদ নামের রাজনৈতিক দল হিসাবে নিজেদের হাজির করেছিল সে উপধারার মুল নেতা সিরাজুল আলম খান। তখন থেকেই সিরাজুল আলম খানের রাজনীতি আর আওয়ামী লীগের রাজনীতি এক নয়। যদিও পাকিস্তান আমলে ষাটের দশক থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের ভিতরেই একটা উপধারা এবং সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাবশালী ঐ উপধারার মূল নেতা। আবার আওয়ামী লীগ বললাম বটে কিন্তু সিরাজুল আলম খান নিজে কখনও আওয়ামী লীগের কোন সাংগঠনিক কমিটির আনুষ্ঠানিক সদস্য ছিলেন তা জানা যায় না। তবে ষাটের দশকের শুরুর দিকে তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি হবার পর থেকে পরবর্তি গঠিত প্রত্যেক কেন্দ্রিয় কমিটিতে (তখনকার দিনে প্রত্যেক বছর সম্মেলন হত ফলে প্রতি বছর নতুন নেতৃত্বের কমিটি) প্রভাবশালী ধারাটা হত বা থাকত ব্যতিক্রমহীনভাবে সিরাজুল আলম খানের অনুসারীদের। অনুসারীদেরকে নিয়ে পরিচালিত এই গ্রুপটাকে নিজেদের মধ্যে “নিয়ক্লিয়াস” বলে হত। নিউক্লিয়াস কথাটার সারার্থ হল যারা ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের রাজনীতি ছাড়িয়ে এক র্যা ডিকাল বিপ্লব করতে চায় তাদেরই আলাদা গ্রুপ,আওয়ামী লীগের ছাত্র লীগের ভিতরে তাদেরই ভ্রুণ – এই অর্থে নিউক্লিয়াস। বাইরে থেকে দেখলে ততকালীন কোল্ড ওয়ারের যুগে যে কোন রাজনৈতিক সংগঠনের ভিতরেই যেমন বামপন্থী আর ডানপন্থী বলে উপধারা দৃশ্যমান দেখা যেত,যারা পরস্পর লড়াই ঝগড়া করত আবার কোন কাজ কর্মসুচিতে সিদ্ধান্তের বেলায় আপোষ মীমাংসা করে একসাথে একই সংগঠনে কাজ করত। ঠিক তেমনই আওয়ামী ছাত্রলীগের মধ্যেকার এই “নিউক্লিয়াস” নিজেদেরকে বামধারা মনে করত। এখানে নিউক্লিয়াস বা সিরাজুল আলম খানের রাজনীতি সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে তা আমার মুল্যায়্নের দিক থেকে বলা নয়, তার চেয়ে তাঁরা নিজেরা নিজেদের কি মনে করত সেদিক থেকে লেখা। সিরাজুল আলম খানের বিশেষ কৃতিত্ত্ব ছিল,শেখ মুজিবের আপন ভাগনে শেখ মনিকে নিজের গ্রুপের পক্ষে ও নিজের নেতৃত্বের অধীনে রাখতে পারা। এভাবে রাজ্জাক,তোফায়েল,রব,শাহজাহান সিরাজ এরা সবাই ছিল নিউক্লিয়াসের সদস্য। নিউক্লিয়াসের বিপরীতে বা বাইরে ছিলেন নুরে আলম সিদ্দিকী,আব্দুল কুদ্দুস মাখন, ফেরদৌস কোরেশী ইত্যাদি এদের মত নেতারা যারা আওয়ামী লীগের নানান কেন্দ্রীয় নেতার অনুসারি। কিন্তু সিরাজুল আলম খানের চেয়ে বেশী প্রভাব ছাত্রলীগের উপর কেউই রাখতেন না। ওখানে একছত্র প্রভাব সিরাজুল আলম খানের। আবার বিষয়টা এমন নয় যে সিরাজুল আলম খান মুল আওয়ামি লীগের বাইরের কেউ। কিন্তু আওয়ামী লীগের সাথে তাঁর সম্পর্কটা কেবল শেখ মুজিবের সাথে ও মাধ্যমে আর সরাসরি। এই দুজনের পারস্পরিক বোঝাপড়া আস্থা ছিল খুবই গভীর। ব্যক্তিগত সম্পর্কও গভীর,সৎ এবং স্পর্শকাতর। যদিও সব কিছুর উপরে রাজনৈতিক মুল্যায়ন ও বিশ্বাসের দিক থেকে সিরাজুল আলম খান নিজেকে “বিপ্লবী” আর শেখ মুজিবকে “বুর্জোয়া” মনে করতেন। ফলে মনে করা যেতে পারে যে, মূলত তাঁর এই ধারণার দিনকে দিন যথেষ্ট শক্তিশালী হয়েছিল বলে সিরাজুল আলম খান ১৯৭২ সালে নবগঠিত মুজিবের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্রভাবে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। সঠিক অথবা বেঠিক রাজনৈতিক লড়াই করেছেন। যদিও ১৯৭২ সালের জানুয়ারীতে শেখ মুজিবের পাকিস্তানের বন্দীদশা থেকে ফেরার পর থেকে পরের তিন মাস সিরাজুল আলম খান নিজের “বিপ্লবী” অবস্থান ও রাজনীতি নিয়ে মুজিবের সাথে দীর্ঘ আলাপ আলোচনা করার সুযোগ পেয়েছিলেন বা নিয়েছিলেন। তাদের উভয়ের রাজনৈতিক সম্পর্ক, ঘনিষ্ঠতা এবং বিতর্ক কোন তাত্ত্বিক ধরণের ছিল না। বা তত্ত্ব নিয়ে করেন নাই। তাঁরা কথা বলেছিলেন, সিরাজুল আলম খানের তোলা বিভিন্ন ইস্যু বা দাবীতে একমত হতে পারেন কি না। ফলে তাত্ত্বিক রাজনীতির বদলে একেবারেই ব্যবহারিক রাজনীতির – পদক্ষেপ ও করণীয় বিষয়ের দিক থেকে ছিল তাদের তর্ক ও মতভেদ। ফলে শেষ দিন পর্যন্ত সিরাজুল আলম খানের একটা আশা ছিল, হয়ত তিনি তাঁর “মুজিবভাইকে” বুঝিয়ে রাজি করাতে পারতেও পারেন – যুক্তির জোরে নয় ব্যবহারিক সম্পর্কের জোরে।
    যেমন স্বাধীনের পর প্রথম ১৯৭২ সালের মে মাসে ছাত্রলীগের কেন্দ্রিয় সম্মেলন ডাকা হয়। একই দিনে একই রাজধানী শহরে কিন্তু দু জায়গায় আলাদা আলাদা দুই আহবায়ক সে সম্মেলন ডেকেছিল। আর দুই সম্মেলনেই প্রধান অতিথি হিসাবে পোস্টারে নাম ছিল শেখ মুজিবের। স্বভাবতই শেখ মুজিব শেষমেষ সিরাজুল আলম খানের সমর্থিত অংশের বদলে এর বিরোধী অংশের সম্মেলনে অতিথি হিসাবে গিয়েছিলেন। আর এর মাধ্যমে এর পর থেকে শেখ মুজিব ও সিরাজুল আলম খানের মধ্যকার রাজনৈতিক অবস্থান বিরোধ প্রকাশ্য ও চিরস্থায়ী আলাদা পথে এবং দলে পরিচালিত হতে শুরু করেছিল। আলাদা রাজনৈতিক দল জাসদ গঠনের ঘোষণা এসেছিল আরও পাঁচ মাস পরে অক্টোবরে। কিন্তু সম্ভাব্য হবু জাসদ নামের রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন হিসাবে আলাদা ছাত্রলীগ ঐদিন থেকেই আলাদা ও প্রকাশ্য সংগঠন হয়ে যায়। শুরু হয় শেখ মুজিব ও সিরাজুল আলম খানের মধ্যকার প্রথম রাজনৈতিক বিচ্ছেদ। এই বিচ্ছেদ ঘটানো বাংলাদেশের জন্য সঠিক হয়েছিল কি না সেটা আলাদা মুল্যায়ন। ফলে আলাদা সময়ে করতে হবে। কিন্তু আপাত প্রসঙ্গের প্রয়োজনের এই বিরোধটাকে সার করে এভাবে বলা যায় যে, শেখ মুজিব ও সিরাজুল আলম খানের একসাথে করা আন্দোলন লড়াই ও সশস্ত্র যুদ্ধের শেষে ফসল হিসাবে গঠিত শেখ মুজিবের নেতৃত্বের রাষ্ট্রটাকেই এবার সরাসরি ও মুখোমুখি সশস্ত্রভাবে বিরোধীতা করা শুরু করেছিলেন সিরাজুল আলম খান। আগেই বলেছি এটা ঠিক না ভুল ছিল সেদিকে যাব না । কেবল জাসদ ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিরোধ জন্মের শুরু থেকেই যে গভীর এবং চিন্তার পার্থক্য মৌলিক, সেদিকটা নজর করাব। এর ফলে তখন থেকে সিরাজুল আলম খানের সাথে রাজনৈতিক বিচ্ছেদ ঘটিয়ে শেখ মনি রাজ্জাক,তোফায়েলকে সাথে নিয়ে মামা শেখ মুজিবের পক্ষে চলে যান।
    অতএব সারকথা দাঁড়াল, শেখ মুজিব ও সিরাজুল আলম খানের ব্যক্তিগত সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ থাক না কেন উভয়ের রাজনৈতিক বিরোধ হয়ে পড়েছিল খুবই তীব্র,যার তুলনায় ব্যক্তিগত সম্পর্ক খাটো পড়ে গেছিল। ফলে সেটা খুবই ম্লান। যেমন ৬৯ সালে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু বানানোসহ তাকে কাল্ট ও ক্যারিসমায় মুল জননেতা হিসাবে হাজির করার পরিকল্পনা ও কৃতিত্ব মূলত সিরাজুল আলম খানের। কিন্তু জাসদ গঠনের পর থেকে দলের আভ্যন্তরীণ কালচারে অথবা পাবলিক বক্তৃতায় আর কখনই জাসদের কোন নেতা শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু ডাকে নাই,কেবল শেখ মুজিব বলেছেন। এ’যেন নিজের দেয়া খেতাব মুকুট নিজেই খুলে নিতে চেয়েছিলেন তারা আর,বলতে চেয়েছিলেন জাসদের বিপ্লবী রাজনীতির চোখে শেখ মুজিব ও তাঁর রাজনীতি বিশ্বাসঘাতক।

    শুরুতে যেকথা বলছিলাম ২০০৯ সালে তবু এক মিথ্যা ভান তৈরি করা হয়েছিল যে জাসদ ও আওয়ামী লীগ যেন একই দল ছিল। যেন বলার চেষ্টা করা মুসলীম লীগ করা লোকেরাই তো আওয়ামি লীগ করেছে,ফলে তারা একই লোক ও একই রাজনীতি করে। তবে ইনুর জাসদ এর চেয়েও আরও বড় শঠতার আশ্রয় নেয়। হঠাত করে গোপনে ইনু জাসদের নেতারা বঙ্গবন্ধু বলতে শুরু করে দেন।
    যে কোন রাজনৈতিক দল নিজের অতীতের কোন কোন রাজনৈতিক অবস্থান ভুল ছিল বলে পরবর্তিকালে মুল্যায়ন করতেই পারেন। সেটা কোন অনৈতিক বা অন্যায় নয় অথবা অস্বাভাবিক বিষয় নয়। কিন্তু তা হতে হবে প্রকাশ্য প্রক্রিয়ায়,ঘোষণা দিয়ে এবং কারণ ব্যাখ্যা করে। জন্মের সময় থেকে চলে আসা জাসদীয় কালচারের চর্চা এবং আওয়ামি লীগের সাথে তার উল্লেখযোগ্য প্রতীকী ফারাক নির্দেশক ঘটনা ছিল “বঙ্গবন্ধু” আর না বলা। অথচ সেসব মৌলিক দিক ও সততার দিক বেমালুম ভুলে অস্বীকার করে ইনুর জাসদ হঠাত করে বঙ্গবন্ধু বন্ধবন্ধু বলে ঢলে পড়া শুরু করে দেয় ২০০৯ সালের সরকার গঠনের পর থেকে। এটা হল প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে ব্যক্তিগত ফয়দা বের করা। আর বিনিময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাসদের যেটুকু ইতিবাচক অবদান ছিল এর গায়ে কালি লাগিয়ে তাকে ধুলায় লুটায় দেয়া।
    তাই ঐ একই সময় থেকে গোপনে আর এক সমঝোতা হতে দেখা যায়। সেটা হল, খালেদ মোশারফের ক্যু এর ঘটনাকে কেন্দ্র করে। এই ঘটনা ১৯৭৫ সালের ২ ও ৩ নভেম্বরের মাঝের রাতে্। ১৯৭৫ এর নভেম্বরের পর থেকে ঐদিনের ঘটনা সম্পর্কে দল হিসাবে আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক অবস্থান ছিল,এটা এক ক্যু এর ঘটনা। আর এর নায়কদের সাথে আওয়ামী লীগের কোন ধরণের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা দায় ছিল বলে স্বীকৃতি না দেয়া । লীগ ২০০৯ সালের আগে পর্যন্ত এই অবস্থান থেকে সরে নাই। বরং আওয়ামী লীগ যে কোন ক্যু, ক্ষমতাদখল বা হত্যার রাজনীতির নীতিগত বিরোধী; “বেসামরিক সরকার” উচ্ছেদ করে “সামরিক সরকার” কায়েমের বিরোধী – এই ছিল আওয়ামী লীগের সাধারণ ও নীতিগত অবস্থান। ১৯৮১ সালে হাসিনা ভারত থেকে দেশে ফিরে এসে দলের সভাপতির হাল ধরার পরও এই অবস্থান বজায় ছিল। বরং খালেদ মোশারফের ক্যু এর ঘটনার প্রতি কোন বিশেষ প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে তেসরা নভেম্বর (চার নেতার) “জেল হত্যা দিবস” প্রতিবছর পালন করে এসেছে আওয়ামি লীগ। এটাই লীগের দলীয় অবস্থান। বিপরীতে জাসদ খালেদ মোশারফের ক্যু এর ঘটনাকে ঘটনার পরের দিন থেকে নিজে দেখেছিল এবং লিফলেট ছড়িয়ে জনগণকে দেখিয়েছিল যে এই ক্যু আওয়ামী লীগ ও ভারতের সমর্থনের এক ক্ষমতা দখল। মনে রাখতে হবে, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তাহেরের পাল্টা ক্ষমতা দখলের পক্ষের লিফলেটে ন্যায্যতা টানার তাহেরের ভাষ্য ছিল সেটা। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ও ভারতের সমর্থনের এক সামরিক ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করতেই তাহের পাল্টা “সিপাহি-জনতার ক্ষমতা দখলে” প্ররোচিত হয়েছেন। এই ছিল তাহেরের ক্ষমতা দখলের পক্ষে দেয়া সাফাই। এই অর্থে ৭ নভেম্বর সম্পর্কে জাসদের সোজা ব্যাখ্যা বয়ান হল, “৭ নভেম্বর হল, ভারতীয়-আওয়ামী ক্যু এর বিরুদ্ধে জাসদের প্রতিরোধ”। জাসদের এই বয়ান ২০০৮ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল। এবং বলাই বাহুল্য যে এই বয়ান আওয়ামীকে অভিযুক্ত করা বয়ান। অনুসন্ধিৎসু আগ্রহিরা এবিষয়ে ফলে একালেও এখান থেকে আওয়ামী লীগ ও জাসদের বয়ানের মিল খুজে আনা অসম্ভব।

    ২০০৯ সাল। এই দুই বিপরীত ভার্সনের বিরোধ নিরসন মিটমাটের গোপন সমঝোতায় নতুন কমন ভার্সন খুঁজার চেষ্টা শুরু হয় ২০০৯ সাল থেকে। সেই চেষ্টায় শেষে আসে “মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস” বলে চিহ্নিত করে আওয়ামী লীগের প্রপাগান্ডা কমিটিগুলোর পক্ষ থেকে ৩-৭ নভেম্বরের যে কোন দিনকে পালনের চেষ্টা করা হয়। একইভাবে জাসদও এমন মুল্যায়নেই পালন করতে চায় এবং করে; তবে কেবল ৭ নভেম্বরের দিনটা বাদ দিয়ে। কারণ ১৯৭৫ সাল থেকে জাসদ এটাকে সিপাই-জনতার অভ্যুত্থান দিবস হিসাবে পালন করে আসছে। যেটা আবার আওয়ামী লীগের পক্ষে একইভাবে অন্তত ৭ নভেম্বরকে পালন করা, মনে করা অসম্ভব। আওয়ামি লীগ ও জাসদের “মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস” নামে একটা কমন ভার্সান চালু করার পিছনের তাগিদ হল এই বয়ান হাজির করা যে জিয়াউর রহমান বা বিএনপি ঐ দিনগুলোতে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছে এই অভিযোগ তোলা, যাতে এসব বয়ান দিয়ে আওয়ামি লীগ ও জাসদের কমন শত্রু বিএনপির বিরুদ্ধে কামান দাগানো যায়। এটাই তাদের কমন এবং ২০০৯ সাল থেকে চালু করা নতুন মুল্যায়ন। এটা নিঃসন্দেহে এক প্রতিহিংসার রাজনীতি।
    কিন্তু এরপরেও এই কমন মুল্যায়ন যে সাধারণ যুক্তিবুদ্ধিতে সিদ্ধ,তালমিল আছে তা দেখানো যায় নাই। কারণ সত্য হল, ১৯৭৫ সালের আগষ্ট থেকে নভেম্বর এই সময়কালেও আওয়ামি লীগ ও জাসদ আগের মতনই পরস্পর পরস্পরের বিনাশ নিশ্চিহ্ন দেখতে চায় এমন দুই রাজনৈতিক দল ও শত্রু ছিল। ফলে এই শত্রুতাকে আজ ঢেকে আড়াল করে, তারা সেসময়ে “বন্ধু ছিল” বলে এমন কোন কমন বয়ান খুজে হাজির করা এককথায় বললে অসম্ভব। কারণ তাহলে জিয়াউর রহমানকে ২-৩ নভেম্বর ১৯৭৫ এর রাতে বন্দী করে খালেদ মোশারফের সামরিক ক্ষমতা দখলকে জায়েজ বলতে হবে যেটা -আওয়ামি লীগ ও জাসদ উভয়ের কেউই দাবি করতে রাজি হবে না। তাই এমন কোন কমন বয়ান খাড়া করা এককথায় অসম্ভব। তাতে আজকে তারা উভয়ে যতই বিএনপিকে তাদের কমন শত্রু মনে করে কামান দাগাতে চাক না কেন।
    প্রতিহিংসা সবসময়ই এক মারাত্মক ধ্বংসের কাজ, নেতিবাচক কাজ। মানুষের সম্ভাবনার অপব্যবহার। এরচেয়েও বড় বাজে ব্যাপার হল,ঐ প্রতিহিংসাকেই রাজনীতি করা বলে মনে করা। রাজনীতি বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টাই তবু এখন চলছে। প্রতিহিংসা বড়জোর কোন সাইকিক পেসেন্টের মনের ব্যক্তিগত জ্বালা মিটায় হয়ত। কিন্তু তাঁর রোগ ভাল হয় না তাতে। এছাড়া তবু এরপরেও তা রাজনীতি নয়।

    এভাবেই গত কয়েক বছর ধরে আমরা আওয়ামি লীগ-জাসদের প্রতিহিংসার আগুন দেখছিলাম। কিন্তু হঠাত করে গত এক মাসে তাতেও আবার ছন্দপতন দেখছি আমরা। হাসিনা নিজের মুখে বলেন নাই সত্য কিন্তু শেখ সেলিম অথবা মোহম্মদ হানিফ যারা দুজনেই শেখ হাসিনার ঘনিষ্ট আত্মীয় এরা ইনু জাসদের কাপড় খুলে দেবার চেষ্টা লক্ষ্য করার মত ছিল। এর এক সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে এমনঃ
    সম্প্রতি একটা বিষয়ে হাসিনার সরকারের বিগত দুবছরের অবস্থান পল্টি খেতে দেখা গেছে। শুরু হয়েছিল পুলিশের আইজি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মন্ত্রীসভা কমিটি আর সবশেষে খোদ প্রধানমন্ত্রী আর এরও পরে সংস্কৃতিসেবী রামেন্দ্র মজুমদার –এভাবে। আমরা দেখলাম হঠাত করে সবাই বলতে শুরু করলেন যে, – ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত দেয়া, ধর্মবিদ্বেষ ছড়ানো জাগানো এবং ঘৃণা ছড়ানোর কাজ করলে অন্যের মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়; ফলে এই লঙ্ঘন কেউ ঘটালে তাকে ১৪ বছরের সাজা দেয়া হবে। এমন পোল বদল, এটা আক্ষরিক অর্থেই নাস্তিকের আল্লাহর পথে ফিরে আসার মত ঘটনা। অথচ গত দুবছর ধরে সরকার এর উলটা নীতিই অনুসরণ করেছে। ব্লগার নামের উতপাতকারিদের অন্যের “মানবাধিকার লঙ্ঘনের” কাজকে সরকার সুরক্ষা দিয়ে গেছে। নবীকে অপমান করা ও কুৎসা রটনা করার কাজকে সেকুলারিজমের স্বাধীনতা চর্চা বলে প্রশ্রয় দিয়ে গেছে। আর এর প্রতিবাদকারিদেরকে “জঙ্গী আসছে” অথবা এগুলো “জঙ্গী ততপরতা” বলে দাবি করে তাদেরকে গুলি নির্যাতনের মুখোমুখি করা হয়েছে। আর একে কেন্দ্র করে সমাজে অস্বস্তিকর পোলারাইজেশন বিভেদ বিভক্তি চরমে পৌচেছে। সমাজের গাঠনিক তন্তু ভেঙ্গে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।

    কিন্তু সরকারের হঠাত এমন উল্টাপথে পিছটানের কারণ কী? তবে কী এটা সরকারের জনগণের প্রত্যক্ষ মুখোমুখি হওয়া অর্থাৎ ভোট চাইতে যাওয়া আসন্ন? এরই ইঙ্গিত?
    কে না জানে হাসিনার নির্বাচনে ভোট চাওয়ার রাজনীতি হল মাথায় কালো কাপড় বেধে তিনি ভোট চাইতে যান। আবার ক্ষমতাসীন হয়ে গেলে এবার সেকুলারিজমের নামে পাবলিক ন্যুইসেন্স করা লোকেদেরকে সুরক্ষার দেয়ার কাজে নামেন। একবার ক্ষমতাসীন হয়ে গেলে এসময় তাঁর ক্ষমতার ন্যায্যতার বয়ান যোগাড়ের জন্য তিনি ভর করতে চান তথাকথিত বাম প্রগতিশীলতার নস্টামির উপর। অথচ আবার নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়া যখন আসন্ন হয় তখন এই তথাকথিত বাম প্রগতিশীলতার সঙ্গ তিনি অসহ্য মনে করতে শুরু করেন,ভোটের রাজনীতিতে লায়াবিলিটি দায় মনে করেন।

    শেখ সেলিম অথবা মোহম্মদ হানিফ কি তাহলে হাসিনাকে সেই দায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছেন? সে ইঙ্গিত আরও খোলসা হওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে নানাদিকে নানাভাবে আর একটা প্রহসনের নির্বাচন আয়োজন কিভাবে করা যায় নানাদিকে সেসব কথাবার্তা উঠছে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

    [এই লেখাটা আগে অন্যদিগন্ত পত্রিকায় ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ছাপা হয়েছিল। এখানে আরও এডিট করে আবার ছাপা হল।]

  • চীনের বিশ্বব্যাংকঃ ঋণ বিতরণ শর্ত কেমন হতে যাচ্ছে

    চীনের বিশ্বব্যাংকঃ ঋণ বিতরণ শর্ত কেমন হতে যাচ্ছে

    গৌতম দাস
    ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-bO

    চীনের বিশ্বব্যাংক মানে “এশিয়ান ইনফ্রাষ্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক” (সংক্ষেপে এআইআইবি) এর কথা বলছি। আগামি বছর ২০১৬ এর শুরু থেকে এই ব্যাংক অফিস খুলে পাবলিকলি কার্যকর হবে বলে আমাদের জানাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক ধরণের ব্যাংক মানে অবকাঠামো খাতে ঋণ দেয়ার এমন ব্যাংকের বিরুদ্ধে ক্রিটিক যারা তাদের প্রধান অভিযোগ হল এই ব্যাংক বিশাল বিশাল শর্তের জাল বিছায়,অহেতুক শর্ত দেয়,শর্তে বেধে ফেলে ইত্যাদি। এই ক্রিটিকদের একটা বড় অংশ হল, বাম এক্টিভিস্ট। তবে শর্ত দেয় বলেই এরা খারাপ এতটুকু বুঝ নেয়া ভুল হবে। কারণ যেকোন ধরণের ঋণদাতা তা সে পাড়ার মাহাজন হোক কিংবা কোন ব্যাংক অথবা বিশ্বব্যাংক যেই হোক শর্ত দেয় না এমন ঋণদাতা কেউ নাই। ফলে প্রশ্নটা কেবল শর্ত দেয় এখানে না। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বা বিশ্বপুজিবাদের বাজার নিরন্তর করতে রাখতে অথবা অন্য ভাষায় বললে,  বিশ্বপুঁজির বাজারে পুঁজির চাহিদাকে জিইয়ে রাখতেই বিশ্বব্যাংকের জন্ম, তার প্রতিটা সিদ্ধান্তের পিছনের কারণ। এদিকগুলো আমরা যত গভীরে বুঝব ততই সমস্ত সমালোচনা কেবল “শর্ত দেয়” – এর মধ্যে সীমিত করব না। কেন শর্ত গুলো এমন তা বুঝব। আর এসম্পর্কে বুঝ পরিস্কার থাকলে আমরা আমাদের স্বার্থ বুঝে শর্ত নিয়ে নিগোশিয়েশনের টেবিলে কথা বলতে শিখব। প্রাকটিক্যাল করণীয় প্রস্তাব করতে শিখব। যাই হোক, বিশ্বব্যাংকের ৭০ বছর শেষে এবার ইতোমধ্যে চীনের বিশ্বব্যাংকের যুগে আমরা পড়েছি।  ফলে স্বাভাবিক প্রশ্ন, এসব বিষয়ে এআইআইবি ব্যাংক কী বিশ্বব্যাংকের চেয়ে আলাদা কিছু হবে? কথাটা অন্যভাবে গুছিয়ে আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, এআইআইবি ব্যাংক এর অপারেশনাল ম্যানুয়াল বিশ্বব্যাংকের চেয়ে কতটা আলাদা হবে? অপারেশনাল ম্যানুয়ালের ড্রাফট নিয়ে কাজ চলছে। বিশ্বব্যাংক ও এডিবিতে আগে কাজ করতেন এমন প্রাক্তন কিছু কর্মীদেরকে নিয়োগ দিয়ে একটা দল গঠন করা হয়েছে যারা বিশ্বব্যাংক ও এডিবির ম্যানুয়ালগুলোর পুনর্মুল্যায়ন করতে বসেছেন, বিশেষ করে এর নিয়মের বিরুদ্ধে সমালোচনাগুলো মাথায় রেখে। উদ্দেশ্য পুরানা সমতুল্য প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক বা এডিবি এর চেয়ে এআইআইবি এর অপারেশনাল ম্যানুয়াল যেন তুলনামূলকভাবে কম সমালোচনার হয়। এটা খুব স্বাভাবিক যে এআইআইবি এর হবু ম্যানুয়াল কেমন হতে যাচ্ছে এনিয়ে বাজারে প্রচুর কৌতুহল তৈরি আছে। এপরিস্থিতিতে, এই কৌতুহল পূরণে আন্তর্জাতিক নিউজ এজেন্সী “রয়টার” গত পয়লা সেপ্টেম্বর এক এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট ছেপেছে। রিপোর্টটা এক্সক্লুসিভ অর্থাৎ কেবল তাঁরা একাই ছেপেছে এবং একই সঙ্গে এটা মুলত এক আনফিসিয়াল রিপোর্ট – অর্থাৎ এআইআইবি ব্যাংকের তরফে পাওয়া কোন অফিশিয়াল তথ্য এগুলো নয়। বরং অপারেশনাল ম্যানুয়াল খাড়া করার কাজের সঙ্গে জড়িত এমন চারজন গুরুত্বপুর্ণ সোর্সের বরাতে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে লেখা। কিন্তু স্বভাবতই এসব সোর্স লোকেরা অফিসিয়ালি তাদের কাজের বিষয় নিয়ে মিডিয়াতে কথা বলার জন্য অনুমোদিত ব্যক্তি নয়।এই অর্থেও তাদের পরিচয় জনসমক্ষে লুকানো বলে তা আনফিসিয়াল। ঐ রিপোর্টে হবু ম্যানুয়ালের কিছু প্রসঙ্গে প্রকাশিত তথ্য নিয়ে এখন এখানে কথা বলব।

    শুরু করার আগে,একটা কথা মনে করিয়ে দেয়া ভাল যে, এআইআইবি ব্যাংকের উদ্যোক্তা সদস্যরাষ্ট্র হবার জন্য যখন স্বাক্ষর দেবার শেষ দিন এগিয়ে আসছিল সেসময় ঐ পুরা মাস জুড়ে আমেরিকা একরকম প্রকাশ্যেই ইচ্ছুক উদ্যোক্তা সদস্যরাষ্ট্রগুলোর উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল যাতে তারা এই উদ্যোগে সামিল না হয়। যেমন এই চাপ, কুটনৈতিক লবিইং  গুরুত্বপুর্ণ সদস্য অষ্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদির মত হবু সদস্যদেরকে বিভ্রান্ত ও থমকে দাঁড়িয়ে দ্বিধাগ্রস্থ করতে পেরেছিল। যদিও ইউরোপের বৃটেন ও জর্মানি লীড নিয়ে এআইআইবি ব্যাংকের উদ্যোক্তা সদস্য হয়ে তাতে তাদের যোগদানের সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর সব দ্বিধা বাধা হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ে বিলীন হয়ে যায়। নিসন্দেহে এটা আমেরিকার জন্য বিশাল কূটনৈতিক পরাজয়। আর এই পরাজয়ের পরেই কেবল আমেরিকা নিজের বাজে অবস্থানের কারণ ব্যাখ্যা করে নিজের মুখ রক্ষার চেষ্টা করেছিল। সেই ব্যাখ্যায় বলেছিল, হবু নতুন ব্যাংকের স্বচ্ছতা, ষ্টান্ডার্ড, পেশাদারীত্ব ও জবাবদিহিতায় এআইআইবি ব্যাংক আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে পারবে কি না তা নিয়ে আমেরিকার সংশয় আছে। তাই এমন আগাম কানকথা ছড়িয়ে বিয়ে ভেঙ্গে দেবার আচরণে আমেরিকা নাকি লিপ্ত হয়েছিল। আমেরিকার এই সাফাই এসব কথা চীন মনে রেখেছে,তা আমরা ধরে নিতে পারি। ফলে ম্যানুয়াল তৈরির এখনকার সময়ে এতে তা প্রতিফলিত হয় এমন এক জবাব চীন দিবে তাও আমরা ধরে নিতে পারি। এতে সমতুল্য দুই অবকাঠামো ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এক প্রতিদ্বন্দ্বীতার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশের মত দেশের দিক থেকে বিচারে যা সম্ভবত ইতিবাচক হবার কথা।

    রয়টারের রিপোর্টে সম্ভাব্য ম্যানুয়ালে কি থাকবে সেবিষয়ে বলা হয়েছে, প্রথমত, ঋণদানের ক্ষেত্রে এআইআইবির বেলায় এখানে নাকি সমতুল্য প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংকের চেয়ে কম শর্ত সংশ্লিষ্ট থাকবে। দ্বিতীয়ত, আইনগত দিক থেকে এআইআইবি এর নেয়া প্রজেক্ট স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে এবং যেকোন প্রজেক্টের সামাজিক ও পরিবেশতগত বিরূপ প্রভাব যেন সৃষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে সেগুলো নিশ্চিত করার পরই কেবল গ্রহণ করবে। তৃতীয়ত, অনেক সময় দেখা যায় যে ঋণ দেবার ক্ষেত্রে শর্ত থাকে যে, কিছু প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারিকরণ করতে হবে অথবা ওসব প্রতিষ্ঠানের উপর সরকারের কর্তৃত্ব নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে হবে। অথবা অনেক সময় দেখা যায় “মুক্তবাজার নীতি” বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের আগে থেকে তৈরি এক সাধারণ ম্যানুয়াল আছে – শর্ত হিসাবে তা মানতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। রয়টারের ঐ রিপোর্ট বলছে এআইআইবির বেলায় ‘বেসরকারিকরণ করতে হবে’ ধরনের শর্ত থাকবে না। এছাড়া সরকারের কর্তৃত্ব শিথিল করার শর্তও সম্ভবত থাকবে না। এছাড়া এমনিতেই মুক্তবাজার নীতি বলে সুনির্দিষ্ট কিছু আছে কিনা এর ব্যাপারে খোদ চীনেরই সন্দেহ আছে ফলে ম্যানুয়ালে এমন কথা প্রতিফলিত হবে না। বরং মুক্তবাজার নীতি বলে কিছু থাকবেনা বলে এসব প্রজেক্ট পরিচালনা তুলনামুলক সহজ হবে বলে এখানে বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন। এবিষয়ে বিস্তার করতে রিপোর্টে এক উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে, যেমন দেখা যায় কোন পানি সরবরাহ প্রকল্পে অর্থায়ন করতে গিয়ে পানির দাম বাড়ানোর শর্ত জুড়ে দেওয়া থাকে, বিশেষত অনেক সময় স্থানীয় পরিস্থিতি দাম বাড়ানোর জন্য উপযুক্ত কি না সে বিবেচনার দিকটা উপেক্ষা করেই তা করা হয়। এআইআইবির বেলায় তারা এসব দিক গভীর বিবেচনায় নিয়ে সতর্ক থাকবে, দরকার হলে ভিন্ন উৎস থেকে অর্থের সংস্থান,ভর্তুকি দেয়া ইত্যাদি বিকল্প বের করার চেষ্টা করবে, ইনোভেটিভ হবে। চতুর্থত, এআইআইবির বেলায় কয়েকটা ব্যাপারে নীতিগত অবস্থান তারা স্থির করেছে। যেমন, প্রজেক্ট দেরি করিয়ে দেওয়া বা মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখা, লাল ফিতায় আটকে রাখা তাঁরা অবশ্যই এড়িয়ে চলবে। একাজের সক্ষমতার জন্য তারা নিজস্ব “সহজ আভ্যন্তরীণ মুল্যায়ন” ও “আগাম রিস্ক অনুমানের ব্যবস্থার” বিষয়ক মেকানিজমের উপর নির্ভর করবে। পঞ্চমত, এআইআইবির বেলায় নিজ প্রতিষ্ঠান চালানোর খরচ একটা সীমার মধ্যে বেধে রাখার কথা তারা ভাবছে। সে জন্য ফিল্ড অফিস ছোট রাখা, মোট স্টাফ ৫০০-৬০০ জনের মধ্যে সীমিত রাখার পরিকল্পনা তারা করছে। আর সে মোতাবেক আকারের দিক থেকে এডিবির ছয়ভাগের একভাগ তারা কমাবে এবং বিশ্বব্যাংক পরিচালনা খরচের চেয়ে অন্তত ৫ পারসেন্ট কমাবে। স্বভাবতই এগুলো শুনতে ভালই লাগছে। তবে কতদুর কী বাস্তবে হবে দাঁড়াবে তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কারণ এগুলো কোনটাই অফিশিয়াল নয়।

    এআইআইবি ব্যাংক কী বাংলাদেশকে ঋণ দেয়ার যোগ্য ভাবতে পারবে
    অবকাঠামো খাতে ঋণে সুদের হার একটা গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। সেপ্রসঙ্গে বিস্তারে যাবার আগে, ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক নাকি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক – এই দুই ধরণের ব্যাংকের মধ্যে ফারাক কী? এনিয়ে কিছু কথা তুলব। এখানে অন্তত নামের ভিতর দিয়ে আপাত একটা ফারাক করতে দেখা যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না যে ডেভেলবমেন্ট বা উন্নয়ন শব্দটা একালে সমাজের সব স্তরেই বিশাল পরিচিত এক শব্দ হয়ে গেছে। অবস্থা এমন যে ডেভেলবমেন্ট নিজেই যেন বাংলা শব্দ হয়ে গেছে। কিন্তু শব্দটার অর্থ কি? কোথা থেকে কোন সুত্রে?
    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এটা গ্লোবাল অর্থনীতি বিষয়ের সাথে জড়িয়ে যাওয়া একটা শব্দ হয়েছে। সংক্ষেপে সারকথায় বললে, অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত্ব বা সঞ্চয় বলা হয় যেটাকে আর একদিক থেকে দেখলে এটাই নতুন বিনিয়োগ অর্থাৎ বিনিয়োগ সক্ষমতা। আর এই সক্ষমতাকে বাস্তব করে তুলতে গেলে প্রয়োজন বিনিয়োগের বাজা্রের ক্রেতা। শুধু তাই না প্রয়োজন হয় বিনিয়োগের বাজারকে যেন নিরন্তর বড় থেকে বড় দেখতে পাওয়া যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে, গ্লোবাল পুঁজি বাজারে নিরন্তর ক্রেতার চাহিদা হাজির দেখতে পাবার এক সহজ উপায় বের করা হয়েছিল। তা হল বিনিয়োগ সক্ষম পুঁজির কিছু অংশ খুবই কম সুদে, পারলে ব্রেক-ইভেনে বড় বড় প্রজেক্টে বিনিয়োগ করা। এটাই নতুন নতুন বিরাট পুঁজির চাহিদার বাজার তৈরি করবে। এভাবে সেই তৈরি বাজারের পুঁজির চাহিদা মিটানো মানে মুল পুঁজি বিনিয়োগ ব্যবসা – সুদ মুনাফার ব্যবসাটা আরামে করা সম্ভব।
    তো মোট বিনিয়োগ সক্ষমতার যে অংশ বাজার আরও বড় করে তৈরি বা হাজিরের উদ্দেশ্যে খুবই কম সুদে বড় প্রজেক্টে বিনিয়োগ করা হয় সেটাকে বলা হয় অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ। এই “অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ” লম্বা কথাটাকে ছেটে সংক্ষেপে বলা হয় ডেভেলবমেন্ট বা উন্নয়ন বলা হয়। তাহলে উপরের কথাগুলো সার করে আর একবার সংক্ষেপে কিছু বৈশিষ্ট আকারে চিহ্নিত করে বলা যাক।

    ১। সাধারণভাবে গ্লোবাল পুঁজির বিনিয়োগ বিষয়টা দুভাবে ঘটতে পারে বা ঘটে – ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অথবা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এর মাধ্যমে। ২। প্রথম ধরণের ব্যাংকের উদ্দেশ্য দ্বিতীয় ধরণের ব্যাংকের জন্য ক্রেতা চাহিদা তৈরি। যেন গ্লোবাল পুঁজি বাজারে নিরন্তর পুঁজি গ্রাহক পাওয়া যায় এমন পুঁজিবাজার তৈরি। অর্থাৎ প্রথমটা হল অবকাঠামো খাতে ঋণ দেবার ব্যাংক বা উন্নয়ন ব্যাংক। এই ব্যাংক খোলা মানে এর উদ্দেশ্য গ্লোবাল পুঁজিবাজারে পুঁজির চাহিদা বৃদ্ধির বা ক্রেতা বৃদ্ধির শর্ত তৈরির পক্ষে কাজ করা। ৩। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য অবকাঠামো ব্যাংক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে জন্ম দেওয়া ব্যাংক নয়। এটা তাই মুনাফার মোটিভ থেকে পরিচালন করা হয় না। তবে সর্বোচ্চ কম সুদে বা না-লাভ-না-ক্ষতি ভিত্তিতে ব্রেক ইভেনে এটা পরিচালনা করা হয়। কেবল অফিস পরিচালনা খরচটা তুলে আনার জন্য সার্ভিস চার্জ নেয়া হয়। অনেক সময় কিছু বিনিয়োগ লিল্লাহ বা অনুদানেও  একে দিতেই হয়।  কারণ অনেক সময় অবকাঠামো ঋণ নেবারও যোগ্য করে তুলতে তা দিতে হয়। এতে সবমিলিয়ে গড়ে মুনাফা না হোক কিন্তু আসল পুঁজি যেন কমে না যায় কেবল সেদিকে লক্ষ্য রাখলেই চলে। ৪। মুনাফা অর্জনের আসল জায়গা হল, গ্লোবাল পুঁজি বাজার – অর্থাৎ বিনিয়োগ ব্যাংক বা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক নামে যেখানে প্রতিষ্ঠান খুলে রাখা আছে। এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়েই পুঁজি বাজার। আর গ্লোবাল পুঁজি বাজার মাত্রই তা বাণিজ্যিক এবং মুনাফা এর উদ্দেশ্য। এর অধীনস্ত থাকে সমস্ত আরও নানান বাণিজ্যিক কায়কারবারি প্রতিষ্ঠান। ৫। আবার দেখা গেছে পোর্ট, ব্রীজ-রাস্তাঘাট, এনার্জি প্লান্ট, পানি সরবরাহ ও নিস্কাষণ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে অবকাঠামো ধরণের বিনিয়োগ করলে সে দেশের অর্থনীতিতে গতি আসে, অর্থনীতির সাইজ বড় হয় অর্থাৎ সে অর্থনীতিতে আরও পুঁজি পাওয়ার চাহিদা তৈরি হয়। এথেকে দুটা কথা আছে। পোর্ট, ব্রীজ-রাস্তাঘাট, এনার্জি প্লান্ট, পানি সরবরাহ ও নিস্কাষণ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে অবকাঠামো ধরণের বিনিয়োগ করে এসব ফল পাওয়া যায় বলে উলটা করে এসব খাতকেই অবকাঠামো খাত বলা হয়। আর দ্বিতীয়ত, ফলাফলে কার্যকরভাবে পুঁজি বিনিয়োগের চাহিদা তৈরি হয় কিন্তু সে বিনিয়োগ বাজারের ক্রেতা চাহিদা মিটায় (এবার এটা আর অবকাঠামো ব্যাংক নয়) বাণিজ্যিক বিনিয়োগ (ইনভেস্টমেন্ট) ব্যাংক। ঐ অর্থনীতি হয় ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এর ঋণখাতক বা ক্রেতা। সামগ্রিকভাবে গ্লোবাল পুঁজির ততপরতার দিক থেকে দেখলে কার্যকর মুনাফা কামানোর বিষয়টা কেবল এই ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক অংশে ঘটে।
    ৬। এই উদ্দেশ্যেই বাণিজ্যিক ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের থেকে আলাদা করে ১৯৪৪ সালে বিশ্বব্যাংক নামে অবকাঠামো খাতে ব্যাংক খোলা হয়। আর প্রায় বিনা সুদে খোদ বিশ্বব্যাংককে এর আদি পুঁজি সরবরাহ করা হয়েছিল ওয়াল স্ট্রীট বা গ্লোবাল পুঁজি বাজার থেকে। ৭। ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক আর ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এর মধ্যে আর এক উল্লেখযোগ্য ফারাক হল, ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক মাত্রই তা রাষ্ট্রের মালিকানা ব্যাংক, সাধারণত একাধিক ফলে মাল্টি-ষ্ট্রেট বা বহু পক্ষীয়। কোন এক মুরুব্বিয়ানা রাষ্ট্রের নেতৃত্বে তবে বাকি সবাইকে অবশ্যই রাষ্ট্র হতে হয়। মাল্টি-রাষ্ট্রের বাইরে এর মালিকানা নাই। বিপরীতে ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক মাত্রই তা বাণিজ্যিক বিনিয়োগ ব্যাংক -এক বা একাধিক ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক।
    ৮। এই পয়েন্ট এটা সতর্কতামূলক, বিভ্রান্তি কাটানোর জন্য বলা পয়েন্ট । পোর্ট, ব্রীজ-রাস্তাঘাট, এনার্জি প্লান্ট, পানি সরবরাহ ও নিস্কাষণ এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতে বিনিয়োগ করতে দেখা মানেই এসব খাতে হলেও এগুলো অবকাঠামো বিনিয়োগ নাও হতে পারে। অথবা সেজন্য এগুলোকে অবকাঠামো খাত বলে বুঝতে হবে অথবা এগুলো কেবল বিশ্বব্যাংকেরই খাতক খাত – এভাবে কিছু ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে এমনটা সত্যি নাও হতে পারে। তাই অবকাঠামো বিনিয়োগ নাকি বাণিজ্যিক বিনিয়োগ তা বুঝাবুঝিতে বিভ্রান্তি এড়ানোর বেস্ট উপায় হল সুদের হারের দিকে লক্ষ্য করা; যে কোন বিনিয়োগ ঋণকে অবকাঠামো না বাণিজ্যিক বলে বুঝব এর মূল নির্ধারক হল সুদের হার। যদি দেখা যায় প্রায় বিনা-সুদ, এর মানে সেটা অবকাঠামো বিনিয়োগ অর্থাৎ অবকাঠামো ধরণের ব্যাংকের বিনিয়োগ। কোন খাতে বিনিয়োগ তা দেখে সেটা অবকাঠামো বিনিয়োগ বলে বুঝলে ভুল হতে পারে।

    তত্ত্বগত তথ্য দেয়া শেষ। চলতি গ্লোবাল পুঁজি বাজারের দুনিয়াতেই চীন এশিয়ান ইনফ্রাষ্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক নিয়ে হাজির হয়েছে। বলা হচ্ছে এই ব্যাংক বিশ্বব্যাংক ধরণের ব্যাংক; মানে অবকাঠামো বা ইনফ্রাষ্ট্রাকচার ধরণের ব্যাংক। কিন্তু চীনের ব্যাংকের নামের দিকে যদি তাকাই এর নামের মধ্যে দেখতে পাই “ইনফ্রাষ্ট্রাকচার” এবং “ইনভেস্টমেন্ট” দুটা শব্দই আছে। তবু আমরা বিভ্রান্ত না হয়ে এটাকে ‘ইনফ্রাষ্ট্রাকচার’ ব্যাংক বলেই বুঝব। অন্তত একটা কারণ যে, বলা হচ্ছে এটা বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য বা প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যাংক।

    কিন্তু রয়টারের রিপোর্টে এআইআইবি ব্যাংকের সুদের হার কি হতে যাচ্ছে সে প্রসঙ্গে দ্বৈত-অর্থ হয় এমন কথা লেখা হয়েছে। ওর গুমোর পাঠকের কাছে পরিস্কার করতেই উপরের লম্বা তত্ত্বগত তথ্য দিয়ে নিতে হল।
    “মাত্র ১০০ বিলিয়ন ডলারের ব্যাংক বলে এটা শিশু অবস্থায় গ্রাহকের ক্রেডিং রেটিং কেমন সেদিকে বেশি চোখ রেখে আগ্রহ ততপরতা দেখাবে। এর অর্থ খুব সতর্ক এপ্রোচে সে আগাবে। এর আরও অর্থ এটা বিনিয়োগ (ইনভেস্টমেন্ট) ব্যাংকের স্টাইলে আগাবে, কেবল বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক দেখা গেলেই সেসব প্রজেক্টে বিনিয়োগে আগাবে, যেখানে সম্ভব প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশীপে, তবে বাজারের সুদ হার চার্জ করবে যেটা সম্ভবত সমতুল্য বিশ্বব্যাংকের সুদহারের চেয়ে বেশি হবে”। এই বাক্যগুলো সরাসরি রয়টারের রিপোর্ট থেকে অনুবাদ করলাম।
    এখানে দুটা প্রসঙ্গ। বলা হয়েছে “বিনিয়োগ(ইনভেস্টমেন্ট) ব্যাংকের স্টাইলে আগাবে” আর “বাজারের সুদ হারে চার্জ করবে” কথা দুটোর মিলিত ইঙ্গিত আর সবশেষে স্পষ্ট করে বলা “সমতুল্য বিশ্বব্যাংকের সুদহারের চেয়ে বেশি” একথা থেকে একটা জিনিষ পরিস্কার – সেটা হল চীনের এআইআইবি ব্যাংক বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল সুদ হারে (০.৭৫%) ঋণ গ্রহিতা যেসব সদস্য রাষ্ট্র আছে (যেমন বাংলাদেশ) তাদের জন্য অবকাঠামো ব্যাংক হতে পারছে না। সম্ভবত ঋণদাতা হতে পারছে না। অর্থাৎ এই সুদ হারের গ্রাহক স্তরে (মানে বাংলাদেশের মত গ্রাহক স্তরে) এআইআইবি ব্যাংক বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান হবে না। যেমন ফিলিপাইন, এই রাষ্ট্র বহু আগেই বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল সুদ হারে (০.৭৫%) ঋণ পাবার যোগ্য নয়। কারণ তার অর্থনৈতিক অবস্থা ভাল। ফলে কনসেশনাল ক্যাটাগরির উর্ধে। অর্থাৎ বাংলাদেশের চেয়েও বেটার ক্যাটাগরির অর্থনীতির। এই স্তরের গ্রাহক রাষ্ট্রের সুদ হার সাধারণত ৪% বা এর বেশি হয়। এই বিচারে যেসব রাষ্ট্রের অর্থনীতি কনসেশনাল ক্যাটাগরির উর্ধে (৪% সুদ দেওয়ার যোগ্য) শুরুতে তাদের দিকে মনোযোগ দিয়ে এআইআইবি ব্যাংক নিজের কার্যকারিতা শুরু করতে পারে।

    সারকথায় রয়টারের (আনঅফিসিয়াল) রিপোর্টের ভাষ্য সত্যি হলে শুরুর পর্যায়ে বাংলাদেশ এআইআইবি ব্যাংক থেকে কোন ঋণ পাবার যোগ্য সম্ভবত বিবেচিত হবে না। তবে অবশ্যই পুরা অফিসিয়াল ভাষ্য না আসা পর্যন্ত আপাতত আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে।

  • “মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামাত-মুক্ত বিএনপির” রাজনীতি

    “মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামাত-মুক্ত বিএনপির” রাজনীতি
    গৌতম দাস
    ২৬ আগষ্ট ২০১৫
    http://wp.me/p1sCvy-bf

    গত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। সে সফরের পর দেশের সরকার বা বিরোধী দল অথবা কোন বিদেশী কূটনীতিক কেউ দায়িত্ব নিয়ে বলেনি নরেন্দ্র মোদি কী মেসেজ রেখে গেলেন। কিন্তু কানাঘুষা,আর অনুষঙ্গী ঘটনাবলিতে ক্ষমতাসীনদের আচরণ বক্তব্য থেকে দিনে দিনে এটা স্পষ্ট হচ্ছে যে, মোদি-হাসিনা এবং মোদি-খালেদা আলোচনায় একটা নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার বিষয় ইস্যু হিসাবে উঠেছিল। অনুমানে ধরে নেয়া এই আলোচনার পক্ষে সাক্ষ্য দেয় এমন দু’টি শব্দ এরপর থেকে রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত হয়ে উঠতে দেখা যায় – “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি”। এই ব্যাপারটাকে উল্টো করে বলা যায় যে, “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” এই দু’টি বাক্য চালু হওয়া থেকে বোঝা যায় মোদির সফরে নির্বাচন বিষয়ে একটা ইস্যু সেখানে উঠেছিল। আর একটু স্পষ্ট করে বলা যায়, নির্বাচন বিষয়ে অনুমান করা ঐ আলাপের সারকথা সম্ভবত এরকম যে, “সকলকে নিয়ে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা দরকার কারণ রাজনৈতিক সঙ্কট এভাবে ফেলে রাখাটা আমাদের সবার জন্যই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে”। মোদির সফর- উত্তরকালে মোদির এই মেসেজের অর্থ কী অথবা কেমনে কী অর্থ দাঁড়িয়ে যায় সেসব সম্ভাবনার আগেই সম্ভবত শেখ হাসিনার সরকার এবং ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা নিজেই এর অর্থ নিজের মত করে সাজানো শুরু করে দেয়। সে অর্থটাই সম্ভবত “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” এই দু’টি বাক্য চালু করেছে। তবে এথেকে “মধ্যবর্তী নির্বাচন” কথাটার অর্থ কমবেশি সহজে বোঝা যায় কিন্তু “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” কথাগুলোর অর্থ তাৎপর্য কী?

    এখানে তামাশার দিকটা হল, বিএনপির রাজনীতি কেমন হবে জামায়াত ছাড়া না জামায়াত সহ এই শর্ত আওয়ামী লীগের মুখ থেকে আসছে। এক্ষেত্রে এমন একটা ভাব তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে যেন এখানে আওয়ামী লীগ দাতা আর বিএনপি গ্রহীতা। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিএনপির ক্ষমতাদাতা নয়। আওয়ামি লীগ নিজে বড়জোর নিজের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে আবার নিজের মত করে একটা নির্বাচন দিতে পারে, তাই নয় কি? কারণ এটা কারো না বুঝতে পারার কারণ নেই যে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে অনেক কিছু হয়ত দিতে পারে কিন্তু এর পরেও যা কখনই দিতে পারে না তা হল ক্ষমতা। আর যাই হোক, আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ক্ষমতাদাতা হতে পারে না। হওয়ার কথাও নয়।
    তবু এই সরল কথাটা আড়াল করে একটা ভাব ছড়ানো হয়েছে যেন এক শর্ত সাপেক্ষে ক্ষমতাসীন সরকার বিএনপির ক্ষমতাদাতা হতেও পারে। কি শর্তে? যে, বিএনপি যদি জামাতমুক্ত হয় তবে যেন সে লীগের কাছে থেকে ক্ষমতাও পেয়ে যেতে পারে! তাই আওয়ামি লীগ এখান থেকেই বিএনপিকে নির্দেশদাতা হবার ভান ধরেছে, বলছে যে জামাতমুক্ত হয়ে যাও তুমি!

    এ’এক সত্যি বিরাট তামশা। শুধু তাই না। এছারা এখানে এভাবে আর একটা ইঙ্গিত তৈরি করা হয়েছে যেন ৫ জানুয়ারিতে কোনো নির্বাচন না করা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ এর পক্ষে সাফাই দিচ্ছে এমন যেন নেহায়ত বাধ্য হয়ে ৫ জানুয়ারিতে কোনো নির্বাচন না করা সত্ত্বেও আওয়ামি লীগ নিজেকে বৈধ সরকার বলে দাবি করেছে। যেমন, লীগের হস্তক্ষেপ ছাড়া একটা ফেয়ার নির্বাচন হলে তাতে বিএনপি নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসে পড়লেও যেন আওয়ামী লীগের আপত্তি ছিল না,থাকত না। কিন্তু লীগের হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে এজন্য যে, ওই নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতযুক্ত থেকে যাবার কারণে সহযোগী জামায়াত ক্ষমতায় চলে আসবে আর কেবল ঠিক এখানেই আওয়ামী লীগের আপত্তি। জামাত ঠেকানোর মহান কর্তব্য সম্পন্ন করার জন্যই যেনবা জবরদস্তিতে আওয়ামি লীগ নির্বাচন না হতে দিয়েও নিজেকে নির্বাচিত দাবি করছে! তাই কী? আওয়ামী লীগের এমন সাফাই, এমন ইঙ্গিত অবশ্য কেউই বিশ্বাস করে না, এমনকি তারা নিজেরাও না। এটা যে ছলনামূলক মিথ্যা কথা, কেউ বিশ্বাস করবে না জেনেও মুখরক্ষার জন্য বলা কথা তা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সবাই জানে, মানে। তবু তাদের এই কথা বলা ছাড়া মুখরক্ষার সাফাই হিসেবে আর কিছু বলার নেই। এই হল, “জামাতমুক্ত বিএনপি দেখতে চাওয়া” আওয়ামি লীগের আবদারের সারকথা।
    তবে এ বিষয়ে আরও করুণ অবস্থা ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের। গত ৫ জানুয়ারি ২০১৪ নির্বাচনের আগের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেখানেও হবু নির্বাচনের পক্ষে শক্ত হয়ে দাঁড়ানো এবং এরশাদকেও হবু নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য যে যুক্তি তিনি এরশাদকে দিয়েছিলেন এরশাদের সাথে সুজাতার মিটিং শেষে তা গরম থাকতে থাকতেই এরশাদ নিজেই মিডিয়াকে স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন। সুজাতা সিং বলেছিলেন জামায়াত ক্ষমতায় এসে যাবে তা ঠেকানোটা এরশাদের আসল কাজ। মহান দায়িত্ত্ব। আর জামায়াত ঠেকাতে হবে সে জন্য এরশাদকে হাসিনার সাথে নির্বাচনে যেতে হবে। আর এই মহৎ কাজের জন্যই বিএনপি-জামায়াতকে বাইরে রাখার যে সুযোগ পাওয়া গেছে তা ব্যবহার করতে এরশাদের নির্বাচনে যেতে যেন দ্বিধা না করেন। সুজাতার যুক্তির সারকথা ছিল বাংলাদেশের ক্ষমতাকে “জামাতমুক্ত” দেখতে যাওয়ার খায়েশ। বুঝা যাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামি লীগকে ভোট না দিলেও জবরদস্তিতে লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চাওয়ার ভারতের ব্যকুলতা কত তীব্র ছিল যে একটা ভাল সাফাই যুক্তি যোগাড় করতে না পারলেও বাংলাদেশে এমন ন্যাংটা হস্তক্ষেপের পক্ষে কথা বলতে সুজাতা কত ডেসপারেট ছিলেন।
    সুজাতা সিং সেসময়ের ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের মধ্যে শীর্ষ কূটনীতিক। এই শীর্ষ কূটনীতিকের এটা নিঃসন্দেহে তার করুণ দুর্দশার চিত্র। তিনি তার হস্তক্ষেপের কাজকে,এরশাদের সাথে মিটিংয়ের বক্তব্যের স্বপক্ষে পাবলিকলি কোন সাফাই হাজির করতে পারেন নাই। এর ফলে তাঁর কথা হয়ে গেছে এমন যে, বাংলাদেশের মানুষ যদি চায়ও বিএনপি-জামায়াতকে ভোট দেবে, নিজেদের প্রতিনিধি বলে নির্বাচন করবে তবু সুজাতার ভারত তা হতে দিতে পারে না। আচ্ছা, এটা কি কোনো অতিথি পররাষ্ট্র সচিব বলতে পারেন? সেটা কি বাংলাদেশের জনগণ কাকে নির্বাচন করবে, নেতা প্রতিনিধি মানবে এর বিরুদ্ধে সুজাতার সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং বাধা দেয়ার সফর ছিলো না? সম্ভবত সে জন্য এর পর থেকে তিনি আর কখনো বাংলাদেশে মিডিয়ার মুখোমুখি হননি।
    সেই থেকে এবারও ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের একই দুর্দশা দেখা যাচ্ছে। তারা তাদের বক্তব্যের পক্ষে এবারও র‍্যাশানালিটি বা যুক্তি-বুদ্ধি হাজির করতে পারছে না। তাদের সব যুক্তির প্রধান কথা সবসময় যা থাকে তা হচ্ছে, বাংলাদেশের “ইসলামি সন্ত্রাসবাদ বা তাদের উত্থান” – এই বিষয়ে তারা উদ্বিগ্ন। খুবই ভালো কথা। ফ্যাকটস হিসেবে ভারতের এমন উদ্বিগ্নতার পক্ষে সত্যতা আছে কি না সে তর্ক না তুলেই ভারতের উদ্বিগ্নতা স্বীকার করে নেয়া যাক।
    কিন্তু সে জন্য তারা বাংলাদেশের জনগণ কাকে ভোট দেবে তা কি ঠিক করে দিতে পারে? একটা হস্তক্ষেপের নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়াতে পারে? জনগণ কোন দলকে কোন নেতাকে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা তাতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে? ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের পছন্দের দল ও নেতার পক্ষে যদি জনমত না থাকে,তাদের পছন্দের নেত্রীর পাবলিক রেটিং যদি না থাকে তারপরও কি তাদের জিতিয়ে আনার পক্ষে কিছু করার সুযোগ থাকে?
    আমরা এখানে খুবই সাধারণ একটা প্রশ্ন তুলেছি। প্রশ্নটা হলো, ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের পছন্দের দল ও নেতার পক্ষে যদি জনমত না থাকে, নেত্রীর নিজ গুণেই যদি নিজেদের পাবলিক রেটিং ধরে রাখতে না পারেন, না থাকে তাহলে কি তারা বাংলাদেশে একটা হস্তক্ষেপবিহীন নির্বাচন হতে দেবে না? এসব বিষয় মোটেও কোনো বিশাল কিছু নয়। এসব প্রশ্ন তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ১৯৪১ সালে রুজভেল্ট-চার্চিলের বিখ্যাত আটলান্টা চার্টারে সমাধা হয়ে গেছে, সেকালেই। এটা এখনও যারা মানতে পারে না তারা নিশ্চয় এখনো কলোনি শাসনের পক্ষের লোক। অথচ সে সময়ই এটা দুনিয়াতে সমাধা হয়ে গেছিল যে, জনগণকে পছন্দের নেতা প্রতিনিধি নির্বাচন করতে না দেয়া, নেতা বেছে নিতে না দেয়া মারাত্মক অপরাধ। অন্য রাষ্ট্রের এমন কাজের কোনো অধিকারই নেই। ভিন রাষ্ট্র বা পড়শি রাষ্ট্র প্রতিবেশী দেশের নির্বাচিত কোনো নেতাকে বড় জোর প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু কোন নেতাকে নির্বাচিত হতে,বেছে নিতে জনগণকে কোনোক্রমেই বাধা দিতে পারে না। ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের একালে এমন অধপতিত দশায় পড়তে হয়েছে যে তারা প্রত্যক্ষ বাধা দিচ্ছেন। আবার তাদের কাজের পক্ষে যুক্তিবুদ্ধি সাজিয়েও দাঁড়াতে পারছেন না। খোলাখুলি হাসিনার গায়ের জোরের পক্ষে গিয়ে দাঁড়াতে হচ্ছে।
    তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গোড়ার সঙ্কট হলো, হাসিনার আওয়ামী লীগ পাবলিক রেটিং নেই। অথচ ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা সেই হাসিনার ওপর সব বাজি ধরে বসতে চান। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন একটা করিয়ে নিয়েছেন,কিন্তু শান্তি নেই। নতুন নির্বাচনের প্রয়োজন এটা এখন স্বীকার না করে পারছেন না। রা নির্বাচন না দিলে আরো বড় বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। ঘটনা পরিস্থিতি সেক্ষেত্রে হাতছুট হয়ে যেতে পারে সে সম্ভাবনার রিস্ক নিতে হবে।
    তাই লজ্জার মাথা খেয়ে আওয়ামী লীগ নিজেকেই মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামায়াতমুক্ত বিএনপির কথা পাড়তে হচ্ছে। অথচ বুঝতে চাইছেন না যে আওয়ামী লীগের মুখ দিয়ে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপির’ শর্ত আওড়ানোর কোনো মানে হয় না। কারণ এর মানে কী বিএনপি জামায়াতমুক্ত হলে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ক্ষমতা দেবে? ক্ষমতায় এনে দিবে? আর বিএনপি যদি জামাতমুক্ত না হয় তাহলে লীগ কোন ফেয়ার বা হস্তক্ষেপহীন নির্বাচন হতে দিবে না? এটাই কী ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের অবস্থান বক্তব্যের স্বপক্ষে যুক্তি? ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ কথাটার পক্ষে সাফাই?

    অন্য আর একদিক থেকে বললে, জামায়াতমুক্ত বিএনপির বাসনা অবশ্য আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের থাকতেই পারে – যদি সেটা তাদের বাসনা মাত্র হয়। কারণ আইনগতভাবে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’র শর্ত আরোপ করতে পারে জনগণ অনুসমর্থিত কনস্টিটিউশনাল একটা রেফারেন্ডাম। দেশের ভিতর কে কেমন পার্টি হবে এটা বিএনপির আওয়ামী লীগের উপর কিংবা আওয়ামী লীগের বিএনপির উপর আরোপ করার বিষয় নয়। ঠিক যেমন বিএনপি আওয়ামী লীগকে বা ভাইসভারসা কেউ কাউকে ক্ষমতায় আনতে পারে না,এমনটা অবাস্তব ঠিক তেমনই শর্ত দিতে কিংবা শর্ত পূরণ করলে তবেই অন্যকে ক্ষমতায় আনব এটাও অবাস্তব। অর্থহীন কথাবার্তা। এ ছাড়াও মনে রাখতে হবে এ বিষয়ে কথা বলার দিক থেকে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা কেউ না, কোনো পার্টিই নয়।
    এ কারণে বিএনপির কোনো নেতা অথবা কোনো সুশীল বুদ্ধিজীবী অথবা প্রথম আলোর উপসম্পাদকের মতো কোনো মিডিয়া কর্মী যখন এমন কথা ছড়ায় যে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ হতে হবে এটা হাস্যকর। অবাস্তব। এক্ষেত্রে তারা অবশ্যই আদতে আওয়ামী কর্মী না হলে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দার স্বার্থ পালনকারী।

    এখানে বলে রাখা ভাল, আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা “জামায়াতমুক্ত” অথবা “জামায়াত বিরোধিতা” এমন কথা বলে বা লিখে কেবল জামায়াত রাজনৈতিক দলকে বুঝায় না। তারা আসলে বুঝাতে চায় যেকোনো ইসলামি রাজনীতি বা রাজনীতির সমর্থক; এক কথায় বললে ইসলামি ফেনোমেনা বা পুরা ইসলামি কনস্টিটুয়েন্সি। এখন আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা তারা সবাই আসলে বুঝাতে চায় তারা বাংলাদেশে কোনো ইসলামিক রাজনৈতিক অভিপ্রকাশ, রাজনীতিতে কোনো ইসলামি ফেনোমেনা তারা দেখতে চায় না। যদি তাদের চাওয়াটা ন্যায্য বলে ধরেও নেই তবু এটা বাস্তবায়ন করার উপায় লীগ-বিএনপির এক দল অপর দলকে শর্ত দেয়া নয় বরং জনসমর্থিত (রেফারেন্ডাম বা তুল্য কোনো কিছুর মাধ্যমে) এমন একটা কনস্টিটিউশন হাজির করে তা নিশ্চিত করা। কারণ এক দল অন্য দলকে ক্ষমতায় আনার কেউ নয়। কোন রাজনীতি কে করতে পারবে তা একে অপরকে ডিকটেক্ট করার তারা পরস্পরকে বলার কেউ নয়।
    আবার বাংলাদেশে কোনো “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতি থাকতে পারবে না” আর বাংলাদেশে কোনো “ইসলামিক রাজনৈতিক অভিপ্রকাশ,রাজনীতিতে কোনো ইসলামি ফেনোমেনা থাকতে পারবে না” বলা এক কথা নয়। প্রথম বক্তব্যটা কনস্টিটিউশনে বলার পরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকতে পারে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু দ্বিতীয় বক্তব্যটার বেলায় ইসলামি নাম নিয়ে আইনত কিছুই থাকতে পারবে না। তবে অবশ্যই নাম না নিয়েও তা থেকে যাবে। কারণ আইন করে একটা রাজনৈতিক চিন্তাকে স্তব্ধ করা যায় না। আবার প্রথম কথাটা পড়শি ভারতসহ যেকোনো বিদেশী আশা করতে পারবে। মানে “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির” বিরুদ্ধে বলতে পারবে, আশা করতে পারবে। কিন্তু এরপরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকলে তা নিয়ে বলার ক্ষেত্রে বিদেশীরা কিছু বলার কেউ নয়।
    আমাদের এখানকার প্রসঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওপরের শেষ বাক্যটা। অর্থাৎ ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ বলে কিছু হবে কি না এ নিয়ে ভারতের কিছু বলার নেই। ভারত বলার কেউ নয়। ‘সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতি থাকতে পারবে না’ এমন ধরনের কথা বাংলাদেশের কনস্টিটিউশনে বলার পরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকতে পারে কোনো অসুবিধা নেই। আর এ নিয়ে ভারতের কথা বলার কোনো সুযোগ নেই।
    কিন্তু এসব আইনি সাংবিধানিক কাজের দিক দিয়ে না এগিয়ে আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের মুখ দিয়ে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপির’ কথা বলানো খুবই বিপজ্জনক। কারণ একটা কথা মনে রাখতে হবে, বাস্তবতা হলো, “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির” বিরুদ্ধে মেজরিটি মানুষের একটা কনসেনসাস জনমত আছে। জনমত জরিপেও সেটা প্রতিফলিত হবে। কিন্তু যদি বলা যায় “কোনো ইসলামি রাজনৈতিক দলই বা ফেনোমেনাই বাংলাদেশে থাকতে পারবে না” সে ক্ষেত্রে দেখা যাবে এই একই জনগোষ্ঠী বা জনমতের মেজরিটি উল্টো রায় দেবে। শুধু তাই নয়,চাপাচাপি করতে যাওয়ার জন্য নিজের দেশ ভূমি জমিতে ‘সন্ত্রাসবাদ’ দেখতে চায় না এর সপক্ষের মেজরিটির ঐকমত্যের জনমতটাও এরপর আর থাকবে না। হত্যা করা হবে।
    এ ছাড়া একটা কথা সুনির্দিষ্ট করে বলার সময় হয়েছে যে বাংলাদেশে ‘সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির’ হতে পারে বা থাকতে পারে এটা ভারতের স্বার্থের বা উদ্বিগ্নতার বিষয় নয়। ভারত বরং এসব বিষয়ে তত সিরিয়াস নয়। বিষয়টাও তত সিরিয়াস নয়। রাষ্ট্রের রুটিন তৎপরতাতে সেসব দিক নিয়ন্ত্রণ করে রাখা সম্ভব এবং তাই হচ্ছেই। বরং ভারতের সিরিয়াস প্রসঙ্গ হলো, ক. বিনা শুল্কে, বিনা বিনিয়োগে, বিনিয়োগের দায় না নিয়ে ট্রানজিট হাসিল করা খ. বাংলাদেশ চীনের সাথে অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সম্পর্কে কতটা পক্ষে বা দূরে থাকবে তা বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থে নির্ধারণ করার বদলে ভারতের স্বার্থে নির্ধারণ করতে বাধ্য করা। ভারত তার নিরাপত্তার উদ্বিগ্নতার কথা বলে এর আড়ালে এসব অর্থনৈতিক রাজনৈতিক স্বার্থ বাংলাদেশ থেকে হাসিল করতে জবরদস্তি করে চলছে। এ কাজে কোনো পাবলিক রেটিংয়ে দুর্বল রাজনৈতিক দলই তার জন্য বেশি উপযুক্ত। কারণ যত জনসমর্থন বেশি ভারতের কথা তত সে শুনবে না।

    দুই.
    গত এক সপ্তাহে খালেদা জিয়ার কথিত এক মন্তব্যকে নিয়ে দু’টি প্রপাগান্ডা রিপোর্ট বের হয়েছে। প্রথমটি ভারতের ‘দি হিন্দু’ (THE HINDU) পত্রিকার খোদ সম্পাদকীয়। দ্বিতীয়টি স্টাটফোর (STRATFOR) নামে আমেরিকান গোয়েন্দা ইনটেলিজেন্স পত্রিকার এনালাইসিস রিপোর্ট। দু’টি রিপোর্টের প্রসঙ্গ একই এবং এটা পরিষ্কার যে, ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের প্রভাবে এই রিপোর্ট দু’টি তৈরি। বাংলাদেশে তারা যে অবস্থান বা নীতিতে পরিচালিত সেই নীতির পক্ষে এ দুটোই প্রপাগান্ডা রিপোর্ট। হিন্দু সম্পাদকীয় বের হয়েছে ২৮ জুলাই আর স্টাটফোরেরটা বের হয়েছে ৩০ জুলাই। দু’টি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ‘খালেদা জিয়া নাকি নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসেছেন। ফলে তাতে নাকি বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।’

    হিন্দু দাবি করছে, ‘BNP’s decision to drop its demand for the formation of a caretaker government। আর স্টাটফোর দাবি করছে, Khaleda Zia has indicated that parts of the opposition might be willing to drop some of their demands — such as imposing a neutral caretaker government to oversee elections.
    প্রথমত তথ্য হিসেবে এটা মিথ্যা যে, খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ছেড়ে দিয়েছেন, বা সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত ২৫ জুলাই খালেদা জিয়া তার গুলশানের অফিসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইনজীবীদের সাথে সাক্ষাতের সময় নাকি এ কথা বলেছেন। বিডিনিউজ২৪ পত্রিকার রাজনৈতিক লাইন বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক লাইনের সবচেয়ে কাছাকাছি। ফলে এখানে পর্যবেক্ষণ হল, সরকার আর ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের কমন অবস্থানটাই সবচেয়ে ভালো প্রতিফলিত হয় এই পত্রিকার রিপোর্টে। সেই বিডিনিউজ ঐদিনের প্রসঙ্গে খালেদার কথা কী বুঝেছে তা দেখা যাক। বিডিনিউজ২৪ ইংরাজী শিরোনাম করেছে, Khaleda says fairness is the key, caretaker or no caretaker’। আর ভেতরে কোট আনকোট লিখছে, ‘It is not necessary that elections should be under a caretaker government. Whatever it is called, we want a neutral government to ensure free and fair elections’। এতটুকু পড়ে যে কারো নিশ্চিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট যে, খালেদা কেয়ারটেকারের দাবি ত্যাগ করেছেন এমন বুঝ এখান থেকে বের করার সুযোগ নেই। কারণ সারকথা হলো, খালেদা জিয়া ‘কেয়ারটেকার’ শব্দ নিয়ে আঁকড়ে বসে থেকে ঝোলাঝুলি না করে ‘হস্তক্ষেপবিহীন নির্বাচন’ দাবি তার মূল কথা এটাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। অর্থাৎ বিডিনিউজ অন্তত ভুল বা উল্টো বোঝেনি। তবু হিন্দু আর স্টাটফোর বুঝেছে।
    তবু কি আর করা যাবে এবার তাদের বোঝার যুক্তিবুদ্ধি বা লজিকটা কী তা পরখ করা যাক।

    খালেদা জিয়া কেয়ারটেকার দাবিটা যদি ত্যাগ করেই থাকেন তো সেটা ইতিবাচক বা তার মধ্যে আশার আলো দেখার কি আছে?
    গত দু-তিন বছরে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনগুলোর ন্যূনতম ফেয়ারনেস বা গ্রহণযোগ্যতা প্রসঙ্গে যদি এই দুই মিডিয়া রিপোর্টারের ধারণা না থাকে তবে বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের এমন সম্পাদকীয় বা বিশেষণ লেখার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সুতরাং ধরে নিতে হবে শেখ হাসিনার অধীনে যেকোনো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার গুরুতর সঙ্কট যে আছে এটা তারা জানেন। আর কে না জানে হাসিনার অধীনে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নেই এ জন্য নয় যে বিরোধীরা তাতে অংশগ্রহণ করেনি। অংশগ্রহণ করলেও সেখানে আরো মারাত্মক সঙ্কট আছে। সর্বশেষ ঢাকা সিটি নির্বাচন এর সাক্ষী যেখানে খোদ খালেদার গাড়িতে নিয়মিত আক্রমণ করতেও শেখ হাসিনা দ্বিধা করেনি। ভোট কারচুপির ডেস্পারেটনেস দেখার মতো। তাহলে এ অবস্থায় খালেদা কেয়ারটেকারের দাবি ছেড়ে দিয়েছে সুতরাং এটা ভালো খবর হিসেবে উদযাপন করা উচিত, তাই কী? তার মানে এই পত্রিকা দু’টি একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হওয়াটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না, গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন খালেদার কথিত কেয়ারটেকারের দাবি ছেড়ে দেয়া, এটাকে আবার তাদের ভালো এক ‘আপসরফাও’ মনে হয়।

    পত্রিকায় রিপোর্ট লিখতে গেলে ন্যূনতম কিছু এথিকসের ওপর দাঁড়াতেই হয়। একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে সব পত্রিকা দাঁড়াবে এটাও তো স্বাভাবিক। আমরা এখানে দেখছি পত্রিকা দুটো বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়ানো দরকার মনে করছে না। এর চেয়ে বরং না করে কথিত আপসরফা করে ফেললে আমাদেরকে খুশি হতে তাগিদ দিচ্ছে। পত্রিকা দুটো নিজেরাও দেখা যাচ্ছে এ খবরে খুশি হয়েছে। নির্বাচনটা এখন বিশ্বাসযোগ্য না হলেই বরং এই দুই পত্রিকা খুশি দেখা যাচ্ছে। এ কেমন খুশি? কেমন এথিকসবোধ?

    স্টাটফোরের নামে সম্প্রতিকালে দাগ লেগেছে। সম্প্রতি উইকিলিকস সিআইএর সাথে তাদের অনৈতিক যোগাযোগের ফাইল ফাঁস করে দিয়েছে। নইলে এর আগে এটা যথেষ্ট সম্মানজনক পত্রিকা ছিল। কিন্তু ‘হি্ন্দু’ (১৮৭৮ থেকে প্রকাশিত) মাদ্রাজ থেকে বের হওয়া প্রায় দেড় শ’ বছরের পুরানো ইংরেজি পত্রিকা। যেকোনো পত্রিকা তার দেশে-বিদেশের রিপোর্ট করতে গিয়ে তার সরকারের অবস্থান তাকে কাঁধে করে ঘুরতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, যদি না মনিকাঞ্চন বা অনুগ্রহ লাভের কোনো ব্যাপার না থাকে। এ ছাড়া এটা সম্ভবও নয়। কারণ সরকার অনেক সময় অনেক অবস্থান নেয় অনেক কারণে, অনেক স্বার্থে। এর সবগুলো সবসময় ওই পত্রিকারও স্বার্থ হবে এমন কোনো কারণ নেই। বরং না হওয়াই স্বাভাবিক। যেমন নিজের দেড় শ’ বছরের ইমেজ রাখার স্বার্থ আর আমলা-গোয়েন্দা বাহিনীর প্রপাগান্ডা রিপোর্ট এই দুই স্বার্থ স্ববিরোধী হতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে তা আত্মঘাতী হয়েছে।

    এক বিচারে ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা সফল যে তারা দুটো পত্রিকাকে তাদের প্রপাগান্ডায় শামিল করতে পেরেছে। এতে পত্রিকা দুটো যে এথিক্যাল সঙ্কটে জড়িয়ে গেছে এর দায় ক্ষতি তাদের নিজেদেরই বহন করতে হবে। তবে স্টাটফোর আবার হিন্দুর থেকে এককাঠি সরেস। স্টাটফোর দাবি করছে শেখ হাসিনা নাকি গত দু-তিন বছরে যা করেছেন এটা নাকি বিরোধী দল দমন নয়, সন্ত্রাসবাদ দমন। তাই যদি হয় তাহলে আবার খালেদার সাথে আলোচনা, কম্প্রোমাইজ এসবের মানে কি? যে সন্ত্রাসী তার সাথে আবার আলোচনা নিগোশিয়েশন কম্প্রোমাইজ কি হতে পারে? তাকে তো দমন ও নির্মূল করারই কথা। এই প্রশ্ন দেখা যাচ্ছে স্টাটফোরের মাথায় আসেনি। এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে একটা স্পেস ভাড়া দেয়ার রিপোর্ট তারা করছে এটা তাদের কাছেও পরিষ্কার।

    তাহলে, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামায়াতমুক্ত বিএনপি’র রাজনীতির অর্থ হলো এক আকাক্সক্ষা যে আশা করছে বিএনপি যেমন-তেমন এক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে আওয়ামী লীগকে পুনর্বার যেভাবে হোক বিজয়ী ঘোষণা করে দেয়ার জন্য। মানুষের আকাঙ্খার রকমফেরের আসলে কোনো শেষ নেই।

    [লেখাটার প্রথম ভার্সান সংক্ষিপ্ত আকারে আগে ছাপা হয়েছিল গত ০৯ আগষ্ট ২০১৫, মাসিক অন্যদিগন্ত পত্রিকায়। এখানে আবার নতুন করে লিখে, এডিট করে ছাপা হল।]

  • পুরান প্রধানমন্ত্রীর আলখাল্লা গায়ে চড়িয়ে মোদি বাংলাদেশ সফর করলেন

    পুরান প্রধানমন্ত্রীর আলখাল্লা গায়ে চড়িয়ে মোদি বাংলাদেশ সফর করলেন

    গৌতম দাস
    ০৬ জুলাই, ২০১৫

    লেখার লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-aw

    গত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে মোদির বাংলাদেশ সফর শেষ হয়েছিল। মোদি নিজে আগাম অনুমান করে বলেছিলেন তাঁর ফেরত যাবার পরে এই সফর নিয়ে চর্চা শুরু হবে। তা তো অবশ্যই হবে, হচ্ছেও। তবে, এগুলোর সার কথা হচ্ছে দেনা পাওনার দিক থেকে। “হিসাব কিতাবে মোদির দিকেই পাল্লাই ভারি”– এই সফর শেষে এটাই আমরা শুনছি। এমনটা না হবার কোন কারণ নাই। সাত জুন তারিখ দিন শেষে রাত বারোটায় (আইনত আট তারিখের শুরুতে ) সংবাদ পর্যালোচনায় চ্যানেল আই টিভিতে এসেছিলেন ভারতের দৈনিক টেলিগ্রাফ পত্রিকার এক বাঙলি সাংবাদিক,দেবদ্বীপ পুরোহিত। তিনিও বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করছিলেন বাংলাদেশ সবকিছুই দিচ্ছে,এটা একপক্ষীয় লেগেছে তাঁর কাছেও। তিনি বলছিলেন বাণিজ্যিক স্বার্থের দিক থেকে কিছু দেয়া আর বিনিময়ে কিছু পাওয়া এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু এমন কিছু তিনি দেখতে পাচ্ছে না। শেষে ব্যাপারটা তিনি ব্যাখ্যা খুজে না পেয়ে বললেন, “শেখ হাসিনা খুবই উদার। মোদি তাঁকে বিনিময়ে কি দিবেন সেদিকে তিনি কিছুই চিন্তা করেন নাই”। আগের দিন বাংলাদেশের কোন সাংবাদিক নাকি তাঁকে বলেছিলেন, “ভারত কিছু চেয়েছে, পেতে আগ্রহ জানিয়েছে অথচ বাংলাদেশ তাকে তা দেয়নি এমনটা কখনও ঘটে নাই!” – দেবদ্বীপ অবলীলায় এসব স্বীকার করছিলেন। ওদিকে প্রতিদিনই মিডিয়া অসম লেনদেনের বিভিন্ন ইস্যু তুলে ধরছে। ভারতীয় ব্যবসায়ীদেরকে অসমভাবে বেশি সুবিধা দেয়ায় কিছু দেশী ব্যবসায়ী নরম স্বরে কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে আপত্তি জানানো শুরু করেছে। সারকথায় সবাই বলতে চাইছে মোদীর সফর ছিল এক বিরাট অসম বিনিময়ের সফর – কূটনৈতিক ইতিহাসে দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের মধ্যে এই ধরণের অসম বিনিময়ের নজির পাওয়া কঠিন।
    আসলে কি তাই? না,কোন অসম বিনিময় এখানে হয় নাই। বাংলাদেশের দিক থেকে ১০০ ভাগের বিনিময়ে যদি ভারতের দিক থেকে মাত্র ১ ভাগ দেয়ার চুক্তি হয়ে থাকে তবু এটাও অসম নয়, হবে না। এজন্য যে যখন বিনিময়ে কারও ক্ষমতায় থাকার পক্ষে সমর্থন যোগানোর ব্যাপারটা লেনদেনের মধ্যে একটা ইস্যু হিসাবে হাজির থাকে; তখন ভারত বিনিময়ে কিছুই না দিলেও সেটা সম-বিনিময় অবশ্যই। কারণ এখানে সাথে বিনিময় হয়েছে ক্ষমতায় থাকার ন্যায্যতা লাভ।
    বাংলাদেশের ক্ষমতায় থাকার জন্য শেখ হাসিনা আভ্যন্তরীণভাবে যেসব রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছেন এসবের মধ্যে মুখ্য বিষয়টা হল,তাঁর নিজের করুণ পাবলিক রেটিং বা জনসমর্থনের ঘাটতি। মোদির সফরের ফলে বাংলাদেশের মানুষ যে বার্তা পেল তা হল যে হাসিনার বাংলাদেশকে দিল্লির খুবই দরকার,অন্তত গোয়েন্দা-আমলাদের ভারতের পারসেপশনে। যেসব সুবিধা তারা পাচ্ছে সেটা সহজে দিল্লি ত্যাগ করতে চায় না, করবে কেন! হাসিনা তাদের জন্য “সন্ত্রাসবাদ” মোকাবিলা করে দিচ্ছে, “তারা বাংলাদেশে গনতন্ত্র চায় মৌলবাদ ও সন্ত্রাসবাদ চায় না” এসব কথার আড়ালে বাংলাদেশকে দিল্লি নিজেদের পক্ষে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ষ্ট্রাটেজিক সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে। বিনিময়ে হাসিনাকে একক বৈদেশিক সমর্থনের যোগানদাতা হয়ে থাকাটা খুবই যুক্তিসংগত পররাষ্ট্র নীতি। এই সুবিধা তারা ছাড়তে চাইবে কেন!
    কিন্তু মনে রাখতে হবে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে বৈদেশিক বা বিদেশীদের সমর্থন মানে সেটা দেশের জনগণের সমর্থনের প্রকাশ নয়। এতে মানুষ বড় জোর বুঝল যে এই ক্ষমতা যেভাবেই হোক নিজের পক্ষে ভারতীয় সমর্থন যোগাড় করতে পারছে হয়ত কিন্তু সেটা নিজের প্রতি পাবলিক রেটিং বা জনসমর্থন বাড়বার লক্ষণ নয়। অর্থাৎ শেখ হাসিনার মুল প্রয়োজন যদি জনসমর্থন হয় সেটা ভারতের সমর্থনের কারণে পুরণ হচ্ছে না,হবে না, হবার নয়। ব্যাপারটা এমনও নয় যে ভারত হাসিনার পক্ষে প্রবল সমর্থন তৈরি করেছে এতে হাসিনার বিদেশী ক্ষমতার ভিত্তি শক্তিশালী দেখে নত ও ভীত হয়ে হাসিনার প্রতি পাবলিক সমর্থন ঘুরে যাবে। না,এমন ভাবার কোন কারণ নাই। কিছুটা এমন হতেও পারত যদি বাংলাদেশের মানুষের কাছে ভারতের অন্তত কিছুটা সুনাম থাকত। চুক্তি করে ৬৮ বছর ধরে খেলাপী হয়ে থাকা ভারত রাষ্ট্র এবার সবে স্থল সীমান্ত চুক্তি সম্পন্ন করে বিরাট এক কাজ করেছে বলে দেখাতে চাইছে। আবার যেন এই সীমান্ত চুক্তির সুবিধা কেবল বাংলাদেশই পাবে, ফলে বাংলাদেশকেই যেন দয়া করছে দিল্লি এমন একটা ভাব তৈরির চেষ্টা করেছে। তাই এই উপস্থাপন, এতেও দিল্লীর প্রতি বাংলাদেশের জনগণের বড় একটি অংশ বিরক্ত হয়েছে। ছিটমহলের হবু বাংলাদেশি জনগণ এর সুবিধা ভোগ করবে তাই যেন ভারত এই চুক্তি সম্পন্ন করে একতরফা এক বিরাট অনুগ্রহ বা ফেবার বাংলাদেশকে করল। এই মিথ্যা ইমেজ থেকে আমাদের সকলের মুক্ত থাকা দরকার। এই চুক্তির আসল ভোক্তা যারা ভারতের হবু নাগরিক হতে চায় তারাও। ফলে এটা বাংলাদেশকে একতরফা দেয়া ভারতের কোন অনুগ্রহ একেবারেই নয়। আর এটা বার্লিন ওয়াল ভেঙ্গে পড়ার সাথে তুলনা দেয়া শুধু অতিকথন নয়, ডাহা অর্থহীন। কারণ কাঁটা তারের বেড়া এতে উঠে যায় নি, সীমান্তে বাংলাদেশিরা নিয়মিত মরছেই। এই লেখা যখন লেখা হচ্ছে তার আগের দিনও ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বাংলাদেশীদের হত্যা করেছে।
    লাইন অব ক্রেডিট
    গত ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পরের বছর হাসিনার প্রথম রাজভেট দেবার ভারত সফর ছিল বিগত ২০১০ সালের জানুয়ারি। সেবারই সফর শেষে দেশে ফিরে এসে, তিনি ভারত থেকে এক বিলিয়ন ডলারের ঋণ এনেছেন – এটাই তাঁর পক্ষে সবচেয়ে বড় বিশাল অর্জন বলে দাবি করেছিলেন। তখনকার প্রধানমন্ত্রী হাসিনার ভারত সফরের বিরাট অর্জন হল ঋণ প্রাপ্তি – এই কথাটাকে হাসিনা নিজের মিডিয়া হাইলাইট ও মটিভেশনের প্রধান ইস্যু করেছিলেন। তখন থেকেই জানা যায় লাইন অফ ক্রেডিটের রহস্য। সবাই জানি, ভারতের অর্থনীতি এমন স্তরে পৌছায় নাই যে ভারত বাংলাদেশকে বিলিয়ন ডলার ঋণ সাধতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশকে কনশেসনাল সুদ হারে (১শতাংশের নীচে) ঋণ দিবার চেয়ে বরং এমন ঋণ পেলে ভারতই নিতে আগ্রহী। তাহলে এই লাইন অব ক্রেডিট ব্যাপারটা কি?
    এককথায় বললে, ভারতের কিছু পণ্য বিশেষত সেই পণ্য ভারতীয় ইস্পাত যার কাঁচামাল — যেমন রেল লাইন, বগি, বাস ট্রাক ইত্যাদি – সেই সকল উৎপাদিত পণ্যের বিরাট অংশ প্রতি বছর অবিক্রিত থেকে যায়। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কোম্পানীগুলোকে এসব অবিক্রিত মালামালের দায় থেকে পরিত্রাণ পাইয়ে দিতে নিজে একটা ফান্ড তৈরি করেছে। এই ফান্ড পরিচালিত হয় সরকারি বিশেষ ব্যাংক “এক্সিম ব্যাংক” এর মাধ্যমে আর Export-Import Bank of India Act 1981 আইনের অধীনে। এই ব্যাংকের কাজ হল, সম্ভাব্য ক্রেতাকে লাইন অব ক্রেডিট এর আওতায় লোন দিয়ে এসব অবিক্রিত মালামাল ঋণে কিনতে সাহায্য বা বাধ্য করা। আর এভাবে প্রকারন্তরে অবিক্রিত পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা যাতে বছর শেষে উতপাদক কোম্পানীগুলোর বিক্রি না হবার লোকসান কমে আসে। সারকথায়,এই ব্যাংকের উদ্দেশ্য হল, ভারতের নিজেদের অবিক্রিত মালামাল লোনে বিক্রির ব্যবস্থা করা,যাতে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলো চালু থাকে, প্রায় ৫০ হাজার কর্মচারি যেন বেকার না হয়। লাইন অব ক্রেডিটে পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করলে শ্রম বেকার হওয়ার হাত থেকে বাঁচে ভারতের এমন শ্রমিকের সংখ্যা কত এর একটা ধারণা আমাদেরকে দিয়েছে ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকা। তারা এই ইস্যুতে ভারতের Export Import Bank of India (সংক্ষেপে এক্সিম ব্যাংক) এর চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াদুয়েন্দ্র মাথুরের এক সাক্ষাতকার নিয়ে ছাপিয়ে আমাদেরকে সংখ্যাটা জানিয়েছেন, (দেখুন, মোদি বাংলাদেশ সফরের দ্বিতীয় দিন,৭ জুন ২০১৫ এর টাইমস অব ইন্ডিয়া)।
    সেজন্য এই আইনের আরও কিছু মূলশর্ত আছে। যেমন এই লোনের খাতক বাংলাদেশকে কিছু শর্ত মানতে হবে। যেমন,
    ১. যেসব ভারতীয় পণ্য (ভারতীয় ইস্পাত যার কাঁচামাল যেমন রেল লাইন, বগি, বাস ট্রাক ইত্যাদি) এই আইনে ঋণে বিক্রিযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে কেবল তাই কিনতে হবে। ভারতের বা ভারতের বাইরের যে কোন পণ্য নয়।
    ২. এই ঋণের টাকায় অন্তত ৭৫% মামামাল ও সার্ভিস অবশ্যই ভারতীয় উৎস থেকে কিনতে হবে। অর্থাৎ এই ঋণ ভারত ছাড়া অন্য দেশ থেকে কোন পণ্য কিনতে ব্যবহার করা যাবে না। যেটাকে আইনি ভাষায় সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট বলা হয়।
    ৩. পারফরমেন্স গ্যারান্টি বলে আরও একটা ক্লজ আছে যার সুদ বাংলাদেশের বেলায় আরও আড়াই পার্সেন্ট যেটার কথা এখানে আড়ালে রেখে কেবল ১% সুদের বিষয়টাই উল্লেখ করা হচ্ছে। (আগ্রহিরা দেখুন Export-Import Bank of India – Role, Functions and Facilities, clause 1.2.5 Guarantee Facilities)
    ৩. বিশ্বব্যাংকের লোনের বেলায়, তুলনা করে বললে এর পরিশোধের সময় ৪০ বছর, প্লাস শুরুতে ১০ বছর গ্রেস পিরিয়ড মানে পরিশোধের হিসাব শুরু হবে ১০ বছর পরে থেকে। এর তুলনায় ভারতের লাইন অফ ক্রেডিটের বেলায় পরিশোধের সময় এখানে ২০ বছর প্লাস ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ড।
    ৫. এটা বিক্রেতার দেয়া ঋণে ক্রয় বলে, বিক্রেতা মালামালের মুল্য কত নিবে তা বাজার যাচাই করে কিনার সুযোগ নাই। বিক্রেতার ইচ্ছা মাফিক দামই শেষ কথা।
    যেহেতু এই ঋণের উদ্দেশ্য মালামাল উতপাদক ভারতীয় কোম্পানীকে অবিক্রিত মালামালের লোকসানের হাত থেকে বাচানো ফলে, মালামালের ক্রেতা দেশটির স্বার্থ দেখা এই ঋণের কোন উদ্দেশ্যই নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশকে এই ঋণের খাতক বানানো মানে ভারতীয় উৎপাদক কোম্পানীর স্বার্থ পরিপুরণই এখানে প্রধান। এই শর্তগুলো মেনে নিয়েই বাংলাদেশ নিজেকে জড়িত করছে। ভারতীয় কোম্পানীর স্বার্থকে প্রাধ্যন্যে মেনে নিয়ে নিজেকে ঐ কোম্পানীর অবিক্রিত মালামালের খাতক বানানো। এই হল লাইন অব ক্রেডিট। এর সম্ভাব্য ক্রেতা সার্ক দেশ, এই হিসাবে মোট ৬ বিলিয়ন ডলারের একটা ফান্ড তৈরি করা আছে এক্সিম ব্যাংকে।

    বিশেষজ্ঞ বা সিপিডির দুর্দশা
    হাসিনার সাথে মোদিও বলছেন, “কানেকটিভিটি (যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা) শুধু দুই দেশের জন্য নয়,এই অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ”। কানেকটিভিটি নিশ্চিত করার মানে কি? বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিতে পারবে কিনা, পছন্দের নেতা নির্বাচিত করতে পারবে কি না – এসব রাজনৈতিক মৌলিক বিষয় বাধাগ্রস্থ রেখে কানেকটিভিটি নিশ্চিত করা? এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়া কার্যকর হতে না দিয়ে “কানেকটিভিটিকে এই অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ” বলে মনে করা খুবই বিপদজনক বক্তব্য। এই বিষয়ে প্রিন্ট পত্রিকায় যতগুলো আলোচনা বের হয়েছে সেখানে বিশেষজ্ঞ বা সিপিডির দুর্দশা দেখার মত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রশ্ন সংকটগুলোকে উহ্য বা লুকিয়ে রেখে এই সফর শেষ হয়েছে কিন্তু বিশেষজ্ঞরা কেউ তা নিয়ে কথা তুলতে চাচ্ছেন না। রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো বাদে অর্থনীতিক বাণিজ্যিক মূল্যায়ন বা বিচারেও কি হাসিনা-মোদির স্বাক্ষরিত এই ২২ চুক্তি ঠিক আছে? প্রথম আলো শিরোনামে বলছে “ভারতের সুবিধা বেশি, সুযোগ আছে বাংলাদেশেরও”। বলার এই ধরণটাই বলছে অর্থনীতিক বাণিজ্যিক বিচারেও এই চুক্তি ঠিক নাই। এটা অসম।

    “সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিগুলো খুবই ইতিবাচক। কিন্তু এগুলোর আলোকে পরিকল্পিত বিনিয়োগ করতে হবে, প্রকল্প ঠিক করতে হবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে”।
    সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, “সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিগুলো খুবই ইতিবাচক। কিন্তু এগুলোর আলোকে পরিকল্পিত বিনিয়োগ করতে হবে, প্রকল্প ঠিক করতে হবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, ‘বাংলাদেশের বন্দর, সড়ক, নৌপথ বা অন্য কোনো সুবিধা ব্যবহারের জন্য মাশুলের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্য হার রয়েছে। সেই অনুযায়ী মাশুল নিতে পারলে আমরা লাভবান হব।’ – প্রথম আলো ০৯ জুন ২০১৫। অর্থাৎ মোস্তাফিজ আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাতে চান যে এই সফরে ট্রানজিটে দিবার চুক্তিতে গুরুত্বপুর্ণ পুর্বশর্ত বিদেশি বিনিয়োগ পরিকল্পনার কোন খবর নাই। তাই তিনি যেন বলতে চাইছেন – চুক্তি হয়ে গেছে কিছু করার নাই কিন্তু এখন বিদেশি বিনিয়োগ সংগ্রহ করতে হবে, অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। ট্রানজিটের মাসুল প্রদান পরিকল্পনারও কোন খবর নাই। অথচ যেটাকে মাসুল প্রদান পরিকল্পনা বলছি ওটাই আসলে ট্রানজিট অবকাঠামোর জন্য বিদেশি বিনিয়োগ নিলে তা পরিশোধ যোগ্য হবে কি না তা বুঝবার একমাত্র উপায়। কারণ সংগ্রহিত মাসুল বা টোল থেকে নেয়া ঋণ কিস্তিতে পরিশোধ সম্ভব এটা কাগজ কলমে প্রমাণ করে না দেখাতে পারলে কোন বিনিয়োগ দাতা বিনিয়োগ দিবার প্রশ্ন আসে না, আগ্রহি হবে না। মোদি-হাসিনা স্বাক্ষরিত “সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিগুলোর” মধ্যে এগুলো মারাত্মক নেতিবাচক দিক। কিন্তু এই মারাত্মক নেতি কথাগুলোকেই তিনি ইতিবাচক ভাব তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। সারকথায় বললে, তিনি আসলে বলছেন, “সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিগুলো খুবই ইতিবাচক। কিন্তু এগুলোর আলোকে বিনিয়োগ পরিকল্পনা নাই বলে এগুলো নেতিবাচক। কে না জানে, মাসুল প্রদান হার বা আদায় পরিকল্পনার উপর নির্ভর করছে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা, বিনিয়োগ পাওয়া আদৌ সম্ভব হবে কি না। আপাতত ভারতের দিক থেকে বিনা বিনিয়োগে পারলে বিনা মাশুলে যা পাওয়া যায় তাই আদায়ের চেষ্টা আছে –দেখছি এই স্তরে আছি আমরা। অথচ কথা তো পরিস্কার যে মাসুল আদায় পরিকল্পনা এবং তা এমন পরিমাণ হতে হবে যেন তা ট্রানজিট অবকাঠামো বিনিয়োগ পরিশোধের সামর্থের হয় – এই প্রসঙ্গটা ছাড়া ট্রানজিট বা কানেকটিভিটি নিয়ে বাংলাদেশের কারও ভারতের সাথে গলায় গলা মিলিয়ে কথা বলা মানে নিজের সাথে প্রতারণা করা। কারণ অবকাঠামোতে বিনিয়োগ কেমন করে যোগাড় করা হবে সে কথা তোলা এবং চিন্তা না করার মানে হল, বাংলাদেশের নিজ অর্জিত রাজস্ব আয় ব্যয় করে গড়ে তোলা উপস্থিত ট্রানজিট অবকাঠামো ভারতের বাণিজ্য পেতে খরচ হতে দেওয়া। আর দুএক বছরের মধ্যে উপস্থিত ও সীমিত অবকাঠামো অতি ব্যবহারে ভেঙ্গেচুরে পড়ার পর ঐ সমস্ত পথ-অবকাঠামোকে বাংলাদেশের নিজেরও অর্থনীতিকে অবকাঠামোর অভাবকে সংকটে স্থবির করে ফেলা। সোজা কথা, বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, প্রতিশ্রুতি ও বাজার ব্যবস্থার হিসাব কষে সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিনিয়োগ উঠে আসা ও লাভের মুখ দেখার হিসাব নিকাশ পরিচ্ছন্ন না করে ট্রানজিট চুক্তি করা মানে বাংলাদেশের নিজের অর্থনীতিকেই মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটে ঢুকিয়ে দেয়া।
    অর্থনৈতিক যুক্তির দিকে থেকে বলা সহজ ভারতকে ট্রানজিট অবশ্যই দেয়া সম্ভব হয়ত তবে এর প্রথম শর্ত হল, ট্রানজিটের রাস্তাঘাট অবকাঠামো বিনিয়োগ মাসুল ইত্যাদি শুরু থেকেই পরিকল্পনার মধ্যে রাখা এবং এই বিনিয়োগে দুই দেশের জনগণ কেমনে লাভবান হবে তার অর্থনৈতিক হিসাবনিকাশ স্পষ্টভাবে করা । মোদি-হাসিনার যে চুক্তি সম্পন্ন হল তাতে এমন পরিকল্পনা একেবারে অনুপস্থিত। এই বিষয়ে আলোচনার কেন্দ্রিয় বিষয় – অবকাঠামো বিনিয়োগ – মাসুল আদায়। এটা মোস্তাফিজ অস্বীকার করতে পারছেন না। তাই প্রথম আলোর বেলায় বলেছিলেন – যদি অবকাঠামো বিনিয়োগ – মাসুল ইত্যাদি পরিকল্পনা থাকে তবে “সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিগুলো খুবই ইতিবাচক”। মোস্তাফিজ ভাল মতই জানেন এসব পরিকল্পনার খবর স্বাক্ষরিত চুক্তিতে নাই। বলাবাহুল্য ট্রানজিট প্রসঙ্গে আমরা কেবল অর্থনৈতিক অবস্থানের জায়গা থেকে কথা বলছি। রাজনৈতিক বিতর্ক – বিশেষত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটি এসবের বাইরে ভিন্ন একটি গুরুতর রাজনৈতিক বিষয়।
    কিন্তু সমকাল পত্রিকার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে মোস্তাফিজ এবার আর বুদ্ধিমান থাকলেন না, নিজেকে সারেন্ডার করালেন। সমকাল পত্রিকার বেলায় এসে আরও বড় ধরণের মিথ্যায় মাতলেন, যাকে তথ্যগত জোচ্চুরি বলা যায়। “সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন”, সমকাল জানাচ্ছে, “বর্তমানে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ৯০ ভাগই হয় স্থলপথে। উপকূলীয় বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন হলে সমুদ্রপথে বাণিজ্য বৃদ্ধির ব্যাপক সুযোগ তৈরি হবে। তিনি বলেন, ভারত কিংবা এ অঞ্চলের সঙ্গে ‘কানেক্টিভিটি’ প্রশ্নে বাংলাদেশে অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের দরকার হবে। ভারত নতুন যে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা দিয়ে রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন করা যাবে”। মোস্তাফিজের শেষ বাক্যটা ডাহা মিথ্যা কথা, মিথ্যা প্রলোভনের প্রলাপ।
    প্রথম কথা হল, ট্রানজিটের অবকাঠামো খাতে ব্যবহারের জন্য ভারত আমাদের কোন ঋণ অফার করে নাই। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ট্রানজিট অবকাঠামোতে বিনিয়োগের দায় ভারত নিবে কি না তা আমরা কেউই জানি না। আলোচনার টেবিলে বিষয়টি এখনও ইস্যু হতে পারে নাই। এছাড়া ট্রানজিট ব্যবহার করে ভারত আদৌ মাসুল দিবে কিনা – দিলেও সেটা নাম কা ওয়াস্তে হবে নাকি এর পরিমাণ বিদেশি অবকাঠামোগত বিনিয়োগ পরিশোধের মত পরিমাণের হবে কি না – তা আমরা কেউ এখনও পর্যন্ত কিছুই জানি না।
    এই পরিস্থিতিতে মোস্তাফিজ খামোখা দাবি করে বলছেন, “ভারত নতুন যে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা দিয়ে রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন করা যাবে”। তাঁর এই দাবির ভিত্তি কি আমরা জানি না। বরং আমরা ইতোমধ্যেই এটা জানি যে, ভারতের লোনের প্রতিশ্রুতি ভারতের অবিক্রিত ইস্পাত মালামাল বিক্রিকে প্রমোট করার জন্য – এটাই এর মুল ঘোষিত উদ্দেশ্য।
    এসব নিয়ে মোস্তাফিজকে চ্যালেঞ্জ করে অনেক কথা অবশ্যই বলা যায়। সেসব তর্ক-বিতর্কমুলক বক্তব্য নিজে না তুলে মোস্তাফিজেরই সিনিয়র, তাঁর সংগঠন সিপিডির ডিষ্টিংগুইজ ফেলো দেবব্রত ভট্টাচার্যের মুখ থেকে শোনা যাক।
    প্রথম আলোর ঐ একই রিপোর্টে দেবপ্রিয় বলছেন, “২০০ কোটি ডলার অনুদান হিসেবে রূপান্তরিত করে বহুপক্ষীয় যোগাযোগের জন্য অনুদান হিসেবে দেওয়াটাই উত্তম বলে মনে করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন,১০০ কোটি ডলারের মধ্যে ২০ কোটি ডলার পদ্মা সেতুতে অনুদান দেওয়া ছাড়া বাকি ঋণের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়”।
    অতএব দেবপ্রিয় আমাদের পরিস্কার করছেন, নিজের রিডিং আমাদের বলছেন,
    ১। এবারের মোদি সফরের লাইন অব ক্রেডিটে ২০০ কোটি বা ২ বিলিয়ন লোন এটা ট্রানজিটের (বহুপক্ষীয় যোগাযোগের) জন্য দেয়া নয়, দেবপ্রিয় আশা করেন এটা হওয়া উচিত।
    ২। এই অর্থ বাংলাদেশকে বিনা সুদে ও বিনা আসল ফেরতে অনুদান হিসাবে দেয়া উচিত।
    ৩। ২০১০ সালে হাসিনার ভারত সফরে তিনি প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলেন ১০০ কোটি ডলারের। দেবপ্রিয় ব্যাপারটা ন্যাংটা করে না খুলে সংক্ষেপে এবং ভদ্রলোকের ষ্টাইলে ও ভাষায় বলছেন, ঐ “ঋণের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়”।
    অর্থাৎ “ভারত নতুন যে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে” – মোস্তাফিজুর রহমানের এই মিথ্যা দাবি দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যই বিরোধীতা করছেন, সঠিক মনে করছেন না। এখানে সিপিডির দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এর বাইরে থেকে আমরা আর বাড়তি কি যোগ করব!
    দক্ষ ও ভোকাল প্রাক্তন আমলা্দের মধ্যে একমাত্র আকবর আলি খানকেই দেখা যায় বিভিন্ন সময় সরাসরি ট্রানজিট নিয়ে কথা বলছেন। ট্রানজিট প্রসঙ্গে তাঁর অবস্থান হল, (এবং এটাই সঠিক অবস্থান) ভারত ট্রানজিট পেতে চাইলে এবং বাংলাদেশের নিজের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের দিক থেকে যদি ট্রানজিট দেওয়া ইতিবাচক মনে করে থাকে তাহলে ট্রানজিট অবকাঠামোর সমস্ত খরচ ভারতের বাংলাদেশকে বিনা সুদে বিনিয়োগ হিসাবে দেওয়া উচিত। অর্থাৎ বিনা সুদে বিনিয়োগ জোগাড়ের দায়িত্ব ভারতকে নিতে হবে। এছাড়া, বাংলাদেশ বিনিয়োগ পরিশোধ করতে হয় এমন পরিমাণের মাসুল দিতে ভারতকে প্রস্তুত হতে হবে। আকবর আলির বক্তব্যের যুক্তি হোল, যেহেতু বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে বাংলাদেশ নিজেই নিজস্ব রাজস্ব বিনিয়োগ করে ফেলেছে এবং ব্যবহার করছে। ফলে ভারত নিজের জন্য যে অবকাঠামো ব্যবহার করবে বিনা সুদে তার বিনিয়োগ বাংলাদেশকে প্রদান বা যোগাড় করে দেবার দায়দায়িত্ব একান্তই ভারতের। এবং স্বভাবতই ঐ অবকাঠামো ব্যবহারের মাসুল এমন হতে হবে যেন তা থেকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ পরিশোধ করতে সমর্থ হয়।
    যেমন নৌট্রানজিট , — যেটা এবার চুক্তি হয়েছে — সেটা একেবারেই অসম ও মাঙনায় করা হয়েছে, উপরের এই ন্যূনতম নীতিও মানা হয় নাই। শেখ মুজিবের আমলের এই চুক্তিতে লামসাম মাসুল অর্থ বছরে পাঁচ কোটি টাকা ধরা ছিল। এখন এটাকে আবার লামসাম হাঁকাও পরিমাণ ১০ কোটি টাকা করা হয়েছে। অনেকের মনে হতে পারে ভারতকে নৌট্রানজিটে দিতে আবার অবকাঠামোগত খরচ কি? কাষ্টমস অফিস আর ষ্টাফ বসানো ছাড়া বাংলাদেশের কোন খরচ এখানে নাই। ধারণাটা একেবারেই ভিত্তিহীন। নৌচলাচল উপযোগী রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং করা গুরুত্বপুর্ণ নইলে ঐপথ চলাচলের অনুপযোগী হবে। ইতোমধ্যেই ভারতের তাগিদে ড্রেজিং করা হচ্ছে। আর ভারতের দেয়া লোনে ভারতের নির্ধারিত দামেই ভারতীয় ড্রেজার কিনতে হচ্ছে। এছাড়া নৌট্রানজিট মাসুল বাণিজ্যিকভাবে নির্ধারিত হয় নাই। ঠিক আছে আপনারা চাপানি খাইয়েন – জাতীয় এক লামসাম পরিমাণ সেখানে আছে। তাও সে চা খাওয়ার পয়সাও নিয়মিত পরিশোধ করা হয় না, কয়েক বছরের বাকি পড়ে আছে।
    যাই হোক, দ্বিতীয় পয়েন্টে দেবপ্রিয় সম্ভবত আকবর আলি খানের অবস্থানটাই নিতে চাইছেন। কিন্তু দেবপ্রিয়ের একটা শব্দের অর্থে গড়মিল আছে – “অনুদান”। অনুদান শব্দটা দেবপ্রিয় ব্যবহার করেছেন যেটা ইংরাজি গ্রান্ট শব্দের বাংলা। অর্থ হল, কাউকে কিছু একটা করতে যেমন একটা স্কুল গড়তে এককালীন অর্থ গ্রান্ট দিয়ে সাহায্য করা। স্বভাবতই দিয়ে দেওয়া এই অর্থের আসল এবং সুদ কোনটাই ফেরত দেবার বালাই নাই, থাকে না। বিদেশি দাতাদের আমাদের সরকারকে দেয়া grant aid শব্দটার অর্থ এটাই। কিন্তু দেবপ্রিয় সুদ দিতে হবে না তবে আসল ফেরত দিতে হবে এই অর্থে ‘অনুদান’ শব্দটা ব্যবহার করেছেন। দেবপ্রিয়ের জন্য সঠিক শব্দ হত “বিনা সুদের ঋণ” – অনুদান নয়।
    মোদি দক্ষ সেলসম্যান
    মোদির সফর নিয়ে কংগ্রেস প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন নাকি বলেছেন মোদি তার চেয়ে বেশি দক্ষ সেলসম্যান। কারণ মনমোহন কোন প্রতিশ্রুতিই পূরণ না করেই ২০১১ সালে বাংলাদেশ সফরে ট্রানজিট নিতে এসেছিলেন, পারেন নাই। কিন্তু মোদি সেই একই প্রতিশ্রুতি না মিটানোর বান্ডিল নিয়েই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন কিন্তু এবার ট্রানজিট হাসিল করে নিয়ে গিয়েছেন। মোদির বেলায়, তাঁর মালামাল না দিবার লিষ্ট ভিন্নভাবে প্যাকেজ করার জন্যই নাকি মোদির এই সফলতা। বিষয়টা সত্যিকারের খবর নাকি কংগ্রেসের মিডিয়ার জল্পনা-কল্পনা ছাপিয়ে দেওয়া খবর তা নিশ্চিত নই। কিন্তু ইস্যুটা যেহেতু উঠেছে ওর সারকথা হল, হাসিনা ২০১১ সালে ট্রানজিট দেন নাই। সম্ভবত ভেবেছিলেন কাকাবাবু প্রণব প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে বাড়াবাড়ি করে ফেলছেন, তাকে বাংলাদেশের মানুষের সামনে বেইজ্জতি করছেন তাই তিনি থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। এছাড়া তিনি তখন তাঁর বৈধ সরকারের ক্ষমতাকালের মাঝমাঝি, ফলে বৈধতার কোন সংকটে ছিলেন না। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন, হাসিনার নিজেরই গরজ বড় প্রবল। আভ্যন্তরীণ পাবলিক রেটিং, রাজনৈতিক সংকটের তীব্রতা ভারতের সমর্থন দিয়ে পুরণ হবার বিষয় নয় জেনেও যতটা যা পাওয়া যায় তাই পুরনের কোশেশে লেগে পড়েছেন। এটাই মনমোহনের পুরানা প্রতিশ্রুতি বা পুরানা মালামাল মোদির হাত থেকে সাদরে কিনবার জন্য হাসিনার আগ্রহ বলে দাবি করা হচ্ছে। স্বভাবতই এটা পুরাপুরি মিথ্যা পাঠ।
    তবে এবারের সফর থেকে উঠে আসা এক তাৎপর্যপুর্ণ দিক হল, আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের হাহুতাশ আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষত পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বিদ্যুতপ্লান্ট তৈরির কাজ ভারতের কোম্পানী রিলায়েন্স ও আদানির লুটে নেওয়ায়। এপর্যন্ত শুধু এই ইস্যুতে এর বিরুদ্ধে প্রথম আলো দশটা রিপোর্ট করে ফেলেছে। এথেকে বোঝা যায় পশ্চিমা ও তাদের সমর্থক সুশীল রাজনীতি গ্রুপের হতাশা কত তীব্র ও গভীর। তবু এপ্রসঙ্গেও আকবর আলি খানের মন্তব্য সঠিক। তিনি বলেছেন, আমাদের চলতি রাজনৈতিক সংকটের উত্তরণে মোদির এই সফরের কোন ভুমিকা নাই। হাসিনার জন্য কোন লিভারেজ নয় এটা।
    গত ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসার সময় পরিকল্পনা ও শর্ত ছিল ভারতকে ট্রানজিট দিয়ে দেওয়া। হাসিনার ২০১০ সালের ভারত সফরের ফিরতি সফর ছিল মনমোহনের ২০১১ সালের বাংলাদেশ সফর। সেখানেই ট্রানজিট দেওয়ার চুক্তি হবার কথা ছিল। এই অর্থে ষ্টেজ যেভাবে সাজানো ছিল,সে পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১১ সালে যা অভিনীত হবার কথা ছিল তা পিছিয়ে যায়। অঙ্ক কিছুটা স্থগিত হয়ে যায়। ইতোমধ্যে একালে এসে রাজাই খোদ বদল হয়ে যায়, মনমোহনের বদলে মোদি। তবু পুরান সেই অভিনয়টা যেহেতু এইবার খোদ হাসিনারও শেষ করার আগ্রহের প্রাবল্য, তাই মোদি এবারের সফরটা হল, প্রণবের প্রম্পটে বহু আগেই নির্ধারিত প্রধানমন্ত্রীর ভুমিকায় অভিনয় করতে আসা; যেন মোদি এখন নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়েও মোদির ভুমিকায় নন, পুরান প্রধানমন্ত্রী মনমোহনের পেন্ডিং ভুমিকায় – তারই হয়ে পুরানা আলখাল্লার ভাড়া খেটে গেলেন। এই অর্থে মোদির এবারকার সফর তাঁর আমলা-গোয়েন্দার প্রম্পটের অধীনতার সফর। এটা মোদির নয়, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পদটার কিছু পুরানা দায় বহন করা। সেভাবে দেখতে হবে। তাই, আগামি ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে মোদি নিজের নতুন বাংলাদেশ নীতি দেখাতে না পারলে বুঝতে হবে তার “বিকাশের” রাজনীতি, “সবকা বিকাশ সবকা সাথ” – এসবই ভুয়া বলে প্রমাণিত হবে। বাংলাদেশের জনগণ কি নিজের পছন্দ মত ভোট দেয়া ও নেতা নির্বাচনের সুযোগ কি পাবে!

  • বাংলাদেশে গণতন্ত্রঃ দিল্লি-ওয়াশিংটনের নতুন সম্পর্কের আলোকে

    বাংলাদেশে গণতন্ত্রঃ দিল্লি-ওয়াশিংটনের নতুন সম্পর্কের আলোকে

    গৌতম দাস

    ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-99

    ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ phil reiner

    যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র পরিচালক ফিল রেইনার (Phil Reiner) গত ০৩ ফেব্রুয়ারি এক প্রেস কনফারেন্স আয়োজন করেছিলেন। বিষয় ছিল সদ্য সমাপ্ত ওবামার ভারত সফর সম্পর্কে প্রেসকে অবহিত করা। ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস ২৬ জানুয়ারি। এ বছরের প্রজাতন্ত্র দিবস অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসাবে ওবামা ২৫-২৭ জানুয়ারি ভারত সফরে এসেছিলেন। ফিল রেইনার ওবামার ভারত সফরে সঙ্গী ছিলেন। ঐ প্রেস কনফারেন্স ছিল মূলত ভারত সফরে ওবামার দিক থেকে নিজের তাৎপর্য বিশেষত অর্জনগুলো তুলে ধরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ স্টেটের ওয়েবসাইটে রেইনারের প্রেস কনফারেন্সটিকে সেই ভাবেই পেশ করা হয়েছে। (আগের লিঙ্কে দেখুন, From President Obama’s Trip to India: Perspectives on U.S.-India Relations।
    গত কংগ্রেস সরকারের শেষ তিন বছর ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ক্রমশ অমীমাংসিত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিরোধে জড়িয়ে স্থবির হয়ে পড়েছিল। এসব বিরোধগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ইস্যুতে বিশেষত বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে ঘিরে উভয়ের বিরোধ আরও প্রকাশ্য ও চরমে উঠেছিল। জানুয়ারি ২০১৪ সফরটা ছিল স্বল্প সময়ের মধ্যে ওবামা-মোদীর দ্বিতীয় মুলাকাত। গতবছর মে মাসে ভারতের নির্বাচনের ফলাফলে মোদীর জয়লাভ ও সরকার গঠনকে ভারত এবং আমেরিকা উভয়েই তাদের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে বিরোধ মিটানোর উপায় হিসাবে দেখেছিল। কারণ উভয়ে অনুভব করছিল যে সম্পর্ক স্থবির রাখাতে উভয়েই ভালোরকম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ফলে মোদীর দিক থেকে আটমাসের সরকারের সাফল্য হল, দ্রুততর সময়ে বিরোধ নিষ্পত্তি। সেখানে ওবামা-মোদীর নানান দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের প্রসঙ্গে আলাপের সময় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছিল।

    ফিল রেইনার এর প্রেস কনফারেন্সের খবরটা আমাদের মিডিয়ায় প্রচার হতে শুরু হয়েছিল গত সপ্তাহে, ৪ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে। খবরটা হল, গত মাসের শেষে ওবামার ভারত সফরে ওবামা-মোদী দুজনের আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছিল। আসারই কথা, এটা অনুমান করা খুব কষ্টকল্পিত কিছু ছিল না। কিন্তু তাদের আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এসেছে ব্যাপারটা তথ্য হিসাবে কোন সংবাদপত্রে আসা এক কথা আর যেচে তার প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি ভিন্ন। শেষেরটা অবশ্যই কষ্টকল্পিত। যদিও ভারত অথবা আমেরিকার দিক থেকে এই স্বীকারোক্তি দেয়া বা না দেয়াটা খুব জরুরি নয়। এমনকি ভারত-আমেরিকার শীর্ষ আলাপে ভিন্ন দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে মন্তব্য রেওয়াজ সম্মতও নয় বলে কেউই এ বিষয়ে তেমন কিছু প্রকাশ্যে আশা করে নাই। ফলে বাংলাদেশ বিষয়ে কোন কথা হয়ে থাকলে সেক্ষেত্রে হয়ত আমরা ভারত বা আমেরিকার সরকারি ভাবে না, বরং শুনতাম বড়জোর কোন অনুসন্ধানী দেশি বা বিদেশি মিডিয়া কর্মীর বিশেষ রিপোর্ট থেকে। এভাবেই কূটনৈতিক বিষয়গুলো প্রকাশিত হওয়া রেওয়াজ।

    কিন্তু আমরা ব্যতিক্রম দেখছি। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র পরিচালক ফিল রেইনার না চাইতে বৃষ্টির মত অনেক তথ্য আমাদের ঢেলে দিয়ে জানাচ্ছেন, যার মধ্যে বাংলাদেশ প্রসঙ্গও আছে। লক্ষ্য করার মত বিষয় হল, তিনি প্রেসিডেন্টের হোয়াট হাউস অথবা স্টেট বা পররাষ্ট্র ডিপার্টমেন্টের নেহায়েতই কোন মুখপাত্র নন। অর্থাৎ আমেরিকা তার স্টেট ডিপার্টমেন্টের কোন মুখপাত্রের মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ বা প্রচার করতে চাইছেন না। সাদামাটা রুটিনের বদলে চাইছেন এই প্রকাশ ও প্রচার গুরুত্ব পাক। তাই বক্তব্য এসেছে একজন একজিকিউটিভ কর্মকর্তার মুখ দিয়ে। ফিল রেইনার মিডিয়াতে এসে অনেক প্রশ্নের সরাসরি জবাব দিচ্ছেন। এটাও একটা ব্যতিক্রম। যেমন “বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ হয়েছে কি না” । এই তথ্য বড়জোর মিডিয়া কর্মীর মাধ্যমে প্রকাশ্যে এলেই যেখানে যথেষ্ট হত। তা ছাড়িয়ে — অফিসের মুখপাত্রও না — একেবারে আমেরিকার দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের এক পরিচালকের মুখ দিয়ে প্রকাশ করা হল। এখানে কেবল একটাই স্বাভাবিক অথবা বলা যেতে পারে দৃশ্যমান ছুতা: সদ্য সমাপ্ত ওবামার ভারত সফরে তাঁর অর্জন প্রেসকে অবহিত করা। এখানে ইংরেজি ‘রিড আঊট’ কথাটা ‘তাৎপর্য “অর্জন” ইত্যাদি অনুবাদে সতর্কভাবেই ব্যবহার করতে হচ্ছে কারণ এটা আমেরিকার দিক থেকে শুধু বিরাট অর্জনই নয়, ওবামার এই সফরকে রেইনার ‘গেম চেঞ্জিং’ বলে উল্লেখ করেছেন।
    অর্থাৎ পাশা খেলায় দান বা চাল দিয়ে খেলার অভিমুখ উলটানোর মত ঘটনা। তা সেটা ছিল অবশ্যই। অনেক মিডিয়াতেও এই শব্দটাই ব্যবহার করা হয়েছে। সে প্রসঙ্গের বিস্তারে এখানে যাব না। তবে ঐ প্রেস কনফারেন্স বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এসেছিল অবশ্য সাইড টক হিসাবে। তবু সেই “সাইড টকের” প্রসঙ্গেই ফিল রেইনার অনেক বেশি লম্বা সময় ব্যয় করেছেন। আর সেসব কথা বলতে গিয়ে ফিল রেইনার অনেকটা যেচে বাড়তি তথ্য দিয়েছেন।
    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশের প্রতি মার্কিন নীতি বুঝতে হলে সরকারী ভাষ্যগুলো সরাসরি ইংরেজিতে মূল দলিলে পড়াই ভাল। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের অনুবাদ বা ব্যাখ্যা নয়। মুল মানে অরিজিনাল ইংরাজি হুবহু বক্তব্য পাঠ করার পিছনে আরও একটা কারণ আছে। মানবজমিন তাদের প্রতিবেদনে “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” বলে একটা কথার অনুবাদ যেভাবে ব্যবহার করেছে তাতে বিভ্রান্তির সুযোগ আছে। ফিল রাইনার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” মানে ইংরাজিতে “পারটিসিপেটরি ইলেকশন” বা “অল পার্টি ইলেকশন” ধরণের কোন কথা বলেন নাই। বরং তাঁর বক্তব্যে তিনি কখনও “ডেমোক্রাটিক প্রসেস” আবার কখনও “ডেমোক্রাটিক ফোর্স” শব্দ ব্যবহার করেছেন । অর্থাৎ তিনি গণতন্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করে ওর শক্তি দেখিয়ে -এই পথে দেশি-বিদেশি সবার অন্তর্ভুক্তির তাগিদ নিয়ে আগাতে চান। যাতে আওয়ামি লীগ, বিএনপিসহ কোন ‘গণতান্ত্রিক’ পক্ষ বাদ না পড়ে। আবার ওদিকে ভারত ও আমেরিকাও ঐক্যমত্যে আসতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে মানবজমিন এটাকেই তার পাঠকের জন্য “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” বলে অনুবাদ করেছে। গণতন্ত্রিক ব্যবস্থা চালু আর ওর শক্তি দেখানোর কথা বলে আসলে ফিল রাইনার বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির মত নির্বাচনকে ভারতের সমর্থন করার সমালোচনা করেছেন। নিজ দেশে কোন দলকে কায়দা করে নির্বাচনে জিতিয়ে আনার কথা ভারত যেমন ভাবতেই পারবে না সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশে একটি দলকে ভারতের জিতিয়ে আনার কথাও ভাবা যায় না। কিন্তু এ ধরনের নীতি দিল্লি নিল কি করে? এই দিকটা নিয়ে ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রশংসা করে আর এর সাথে তুলনা করে ফিল রেইনার প্রকারান্তরে বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারির মত নির্বাচনের প্রতি ভারতের সমর্থন করারই সমালোচনা করেছেন। আবার “ডেমোক্রাটিক প্রসেস” বা “ডেমোক্রাটিক ফোর্স” এর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবার আহ্বান জানিয়ে ভারত-আমেরিকার ঐকমত্যের ভিত্তি দাঁড় করাতে চাইছেন। ফিল রেইনার বলছেন,
    “আমি একটি বিষয় লক্ষ্য করেছি, প্রেসিডেন্ট ওবামা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেছি, যেটি একটি উদাহরণ। আমরা সাম্প্রতিক শ্রীলংকায়ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখেছি। নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা উত্তেজনাপূর্ণ। এ সফরে দুই নেতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শক্তি ও নাগরিক শক্তির যে উত্থান হয়েছে তাতে একমত পোষণ করেছেন। আমরা বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই নেতার মধ্যে এখনও আলোচনা অব্যাহত আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন”। (দেখুন, মানব জমিন, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)
    অনেক লম্বা বক্তব্য। আর এতে প্রথমেই তার বক্তব্য নিবদ্ধ করেছেন “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” শব্দ দিয়ে। অর্থাৎ বাংলাদেশে যে সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” হয়নি – কথা সেদিক নিবার প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। সাধারণভাবে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় বিভিন্ন দেশের “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের” উদাহরণ তুলে তিনি বলতে চেয়েছেন ভারত ও শ্রীলঙ্কায় “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়নি।

    ফিল রেইনারের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে প্রসঙ্গ করার আর এক তাৎপর্য আছে। বাংলাদেশে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার আর ওবামা সরকারের মধ্যে বড় ধরণের প্রকাশ্য বিরোধ দেখা দেয়। সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রশ্নে আমেরিকা পক্ষে আর ভারত বিপক্ষে অবস্থান প্রকাশ করে। শুধু তাই না ভারতের এই অবস্থানের প্রাকটিক্যাল মানে হল, হাসিনার পাবলিক রেটিং যত নিচেই হোক, নির্বাচনের নামে যা হয় হোক, বাংলাদেশের মানুষ কাকে ভোট দিতে চায় তাতেও ভারতের কিছুই আসে যায় না, যে কোনো উছিলায় দিল্লি আওয়ামী লীগকেই আবার ক্ষমতায় দেখতে চায়। রেইনার সম্ভবত সেকথা স্মরণ করে আমাদের জানালেন যে, এসব নিয়ে ভারত-আমেরিকার বিরোধ আগে যে জায়গায়ই থাক এবারের মোদী-ওবামা আলোচনায় ভারত-আমেরিকার নীতি ও স্বার্থ বিষয়ে পুরানা অনেক বিরোধে এলোমেলো সংঘাতময় অবস্থান এবার ইস্ত্রি করে সোজা করা হয়েছে। সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” এই কমন নীতিগত অবস্থান তেমনি একটা। কিন্তু রেইনার এখানেও থামেন নাই। আরও বাড়তি বলছেন, “বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিটিকে (দুটি দেশ) অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে” নিয়েছেন। অর্থাৎ অতীতের সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে এখন ভারত-আমেরিকা একমত হয়েছে শুধু তাই নয়, বরং ঐ ভুয়া নির্বাচনের পরিণতিতে বাংলাদেশের বর্তমান “অস্থিতিশীল পরিস্থিতির” দিকেও তারা নজর রেখেছেন। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল শেষ বাক্য –“বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই নেতার মধ্যে এখনও আলোচনা অব্যাহত আছে”। অর্থাৎ তাদের অতীতের গুরুতর অনৈক্য ঘটে যাওয়া বিষয়ে এখন শুধু ঐকমত্য প্রকাশ করা নয়, বরং এখন সেই ঐকমত্যের বাস্তবায়ন বা কারেকশনের জন্য তারা কাজ করে যাচ্ছেন।

    যেচে এসে ফিল রেইনারের এসব তথ্য প্রকাশ ও প্রচারের আর এক উদ্দেশ্য সম্ভবত আছে। বাংলাদেশ নীতি প্রশ্নে আমেরিকা-ভারতের অবস্থানের সংঘাত ২০১১ সাল থেকে। এরপর সেই স্বার্থ বিরোধ ২০১৩ সালে এসে চরম স্থবির অবস্থায় পড়ার কথা আমরা সবাই জানতাম। এই স্থবির দশা এরপর কোনদিকে যাবে আদৌ কোনো দিকে যাবে কিনা, নাকি কতদিন এমনই দিশাহীন পড়ে থাকবে এসব কেউ জানত না। পরবর্তিতে ২০১৪ সালের মে মাসে মোদীর প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নির্বাচিত হয়ে আসা, আর আস্তে আস্তে ভারত-আমেরিকার পুরান স্থবির বিরোধের ঝাঁপি খুলে দেখতে দেখতে এটা ছিল মোদী-ওবামার খুবই স্বল্প সময় মাত্র সাড়ে তিন মাসের মধ্যে মোদীর দ্বিতীয়বার ওবামার সাথে সাক্ষাত। এর আগের লেখায় বলেছিলাম, ভারত-আমেরিকার বিরোধ যতটা না ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস সরকার ও রাজনীতিবিদের এর চেয়ে সম্ভবত আরও বেশি আমেরিকার সাথে ভারতের গোয়েন্দা-আমলার পর্যায়ের বিরোধ। এপ্রসঙ্গে আমরা আমেরিকায় ভারতের কূটনৈতিক দেবযানী খেবড়াগোড়া কাহিনী আর এর পালটা ভারতে আমেরিকান কূটনীতিকদের বিশেষ সুবিধা কেড়ে নেওয়া এমনকি নিরাপত্তা কমিয়ে দেওয়ার বিষয়টা স্মরণ করতে পারি।
    ভারতের ২০১৪ নির্বাচনের আগে এবং পরে বহুবার আমরা বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ কে বলতে শুনেছি যে ভারতের নির্বাচনের ফলাফলে কংগ্রেস-ভিন্ন অন্য দলের বিজয়ে সরকার বদল হলেও ভারতের বৈদেশিক নীতিতে এর প্রভাব পড়ে না, বদল হয় না, হবে না। একথার অর্থ আরও পরিষ্কার করে তিনি গত জুন ২০১৪ সালে অর্থাৎ মোদীর জয়লাভে প্রধানমন্ত্রীত্ব নিবার পরেও বলেছিলেন, বাংলাদেশে “০৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রয়োজনে। আমরা ঐ ইস্যু এখন আর আবার ফিরে মূল্যায়ন করতে চাই না কারণ এখন এজেন্ডা ভিন্ন হয়ে গেছে”।( About the January 5 elections, Pankaj Saran said that was a constitutional requirement. “I do not see that issue will be revisited today because today the agenda is different.” – ১৫ জুন ২০১৪ ঢাকা ট্রিবিউন।)
    পঙ্কজ শরণের এমন কথার অর্থ কি? এর মুল উদ্দেশ্য হাসিনাকে সাহায্য করা এভাবে যে, কংগ্রেস সরকার আবার জিতে না আসতে পারছেনা টের পেয়ে যাতে হাসিনার কর্মি-সমর্থক নিজের নিজের ভাগ্য গুছাতে হাসিনাকে ফেলে কেটে না পড়ে। বলাবাহুল্য এটা একজন হাইকমিশনারের সীমাছাড়ানি কাজ । পঙ্কজের বাড়াবাড়ি। অথচ পঙ্কজ জানেন, একদিকে ভারত-আমেরিকার সামগ্রিক সম্পর্ক স্থবির হয়ে আছে, বাংলাদেশ নীতিতে উভয়ে দুই মেরুতে আছে, পরবর্তীতে এই সম্পর্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন অমীমাংসিত ইস্যু উভয়পক্ষের জন্য এক জায়গায় আসা জরুরি এই তাগিদ আছে। সেটা আদৌ হবে অথবা হবে না তার কোন দিশা নাই। অন্যদিকে মে মাসের ২০১৪ সালেই ভারতের নতুন দল ক্ষমতায় এসেছে। নির্বাচনের আগেথেকেই জানা যাচ্ছিল নতুন প্রধান মন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রায়োরিটি ও এজেন্ডা কংগ্রেস থেকে একেবারেই আলাদা হবে। নতুন প্রধানমন্ত্রী মোদী আমেরিকার সঙ্গে ভারতের নিজস্ব অমীমাংসিত ইস্যুগুলো (এবং এরই ফাঁকে বাংলাদেশ নীতিতে বিরোধ) নিয়ে ভারতের নিজের কারণেও নতুন করে সমাধানে উদ্যোগী হতে বাধ্য । ফলে তা কোনদিকে মোড় নিয়ে কিভাবে কোথায় গিয়ে দাড়ায়, ঐক্যমত্যে আসে কি না সেসব আগাম অনুমান করা কঠিন। কিন্তু সে যাই হোক পঙ্কজ শরণ এর জন্য অপেক্ষা করতে একেবারেই রাজি নন। তিনি আগেই হাসিনার সমর্থকদের চাঙ্গা করে রাখতে চান। সেজন্য আগেই নিজ দায়িত্বে জবরদস্তিতে ঘোষণা দিয়ে রাখলেন যে মোদী প্রধানমন্ত্রী হলেও তাতে ভারতের নীতিতে কোন বদল হবে না, ভারত যেভাবেই হোক হাসিনাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষেই থাকবে, ইত্যাদি। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ভারতের গোয়েন্দা-আমলা যতই শক্তিশালী হোক না কেন রাজনীতিকরাই শেষ কথা বলার ক্ষমতা রাখেন এবং এটা আইনি, আমলাদের বিজনেস রুল ও রেওয়াজের দিক থেকেও সত্য। ভারতের গোয়েন্দা-আমলারাও এটা মেনে চলতে অভ্যস্ত। তবু পঙ্কজ যেন কি বিশেষ কারণে মরিয়া। তিনি ধরেই নিতে চান এবং প্রমাণ করতে চান নতুন দলের প্রধানমন্ত্রী মোদী আমেরিকার সাথে স্থবির অমীমাংসিত ইস্যুতে যাই করেন, যেভাবে নতুন আকার দেন না কেন তা পঙ্কজ তথা গোয়েন্দা-আমলাদের হিসাব, পথ ও কথা না শুনে মোদী করতে পারবেন না। যেন করতে দেয়া হবে না। এককথায় বললে, এটা রাজনীতিবিদদের উপর আমলাদের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার বালখিল্য ধারণা প্রসূত এক কল্পনা। রাজনীতিবিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য খোলা স্পেস ছেড়ে না দিয়ে উলটা তাদের নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা।
    বালখিল্য ওমন কাজের ফলাফলেই কি ইতোমধ্যেই মোদীর হাতে সচিব পর্যায়ের তিনজনের বাধ্যতামূলক অপসারণ? এমন মনে করার কারণ আছে। যাই হোক আপাতত আমাদের প্রসঙ্গের দিক থেকে এসবের সারকথা হল, গোয়েন্দা-আমলা বিশেষত সুজাতা সিং বা পঙ্কজ শরণ ধরণের ব্যক্তিত্বের মনোভাব এবং ভারতের বিদেশনীতিতে সাধারণ ভাবে গোয়েন্দা-আমলাদের প্রভাবের একটা ফলাফল হল মোদী ক্ষমতায় আসার পর দিল্লী তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে কী ধরণের সম্পর্ক রচনা করতে চায় সেই বিষয়ে অ্নিশ্চয়তা। দৃশ্যত মোদী কংগ্রেসের চেয়ে আলাদা এবং নতুন এজেন্ডা নিয়ে আবির্ভূত হাজির। সাড়ে তিন মাসের মধ্যে দু’বার ওবামার সঙ্গে সাক্ষাত করে এক নতুন নীতিগত ঐক্যমত্যের আবহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি নীতিতে ভারত-আমেরিকা কোন ঐকমত্যে আসতে পেরেছে কি না সেটা এরপরও বোঝা যাচ্ছিল না। বিশেষত সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে। যদিও বোঝা যাচ্ছিল তাঁরা একটা একমতে এসেছেন সে ব্যাপারে বেশ কিছু আলামত দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে এতদিন নিশ্চিত হয়ে কেউই কিছু বলতে পারছিলেন না। পুরানা এক ষ্টেলমেট পরিস্থিতিই বিরাজ করছিল। কোনদিকে নড়াচড়া করছিল না। এমনকি গত ২৬ জানুয়ারি ওবামা-মোদীর মধ্যে এইসব বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করলেও এর কোন ছাপ অন্তত বাংলাদেশে পড়ছিল না। দৃশ্যমান হচ্ছিল না। ফিল রেইনার যেন ওবামা-মোদীর নীতিগত ঐকমত্যের দিকটা দৃশ্যমান করতেই ঐ প্রেস কনফারেন্সে স্পষ্ট ও বিস্তৃত স্বীকারোক্তি হাজির করেছিলেন।
    এতে একটা জিনিষ পরিষ্কার হয়েছে। মোদীর জয়লাভের পরও পঙ্কজ শরণের “সাংবিধানিক প্রয়োজনে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন” হয়েছিল, অথবা “এটা অতীতের মৃত ঘটনা এটা নিয়ে আবার ভেবে দেখার কিছু নাই” – এধরণের বক্তব্য যেটা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে এখন চাকরি হারানো পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং এর বক্তব্যেরই কপি – এই সব কিছুকে ফিল রেইনারের বক্তব্য সরাসরি নাকচ করে। বিশেষ করে রেইনারের সবার “অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন” প্রসঙ্গে বক্তব্য পঙ্কজ শরণের ভারতের অবস্থান বলে যা প্রচার করছেন তাকে সরাসরি নাকচ করে। গত ৩ জানুয়ারি রেইনারের বক্তব্য প্রচারের পর দশ দিনের বেশি দিন গত হতে চলল, কিন্তু এখনও খোদ পঙ্কজ শরণ নিজে অথবা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেইনারের বক্তব্য নিয়ে কোন আপত্তি অথবা ভিন্ন বক্তব্য জানাতে আমরা দেখি নাই।

    ফিল রেইনারের বক্তব্যের সারকথার আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি দাবি করছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় “শান্তি ও স্থিতিশীলতার” ব্যাপারে দুই নেতা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন। এই বিষয়টা ওবামা-মোদীর স্বাক্ষরিত ৫৯ দফা “যৌথ ঘোষণার” ৪৬ নম্বর দফায় এবং আলাদা করে স্বাক্ষরিত “এশিয়া নীতি বিষয়ে যৌথ ষ্ট্রাটেজিক ভিশন”র শুরুতেও উল্লেখিত হয়েছে। এগুলো ভারত-আমেরিকার নীতিগত ঐকমত্যের দিক। কিন্তু কি উপায়ে এসব নীতি বাস্তবায়ন করা হবে এপ্রসঙ্গে ফিল রেইনার দাবি করছেন, -ওবামা ভারতের সক্রিয় “গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া” ও “এর নির্বাচন” এবং “এটা যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে” এবং এর মাধ্যমে “গণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা”, এবং “জনগণের সব অংশের ক্ষমতাবান হয়ে উঠা” এসব কিছু হতে পারে সেই উপায়। এব্যাপারে উভয় নেতা একমত হয়েছেন। তাই এই ‘উপায়কে’ তারা উভয়ে খুব গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন এবং উৎসাহিত করতে থাকবেন। “উভয় নেতার কথোপকথন দেখে (I was able to see in terms of the conversation)” এটাই ফিল রেইনারের অনুভব ও মন্তব্য।
    মোদী-ওবামার মিটিংয়ে সম্পর্কের অগ্রগতি দেখে উচ্ছ্বসিত ফিল রেইনার বক্তব্য এভাবে উপস্থাপনের আর একটা কারণ আছে। ওবামার ভারত সফরের পরে সিএনএনের ফরিদ জাকারিয়ার সঙ্গে কথোপকথনে, ওবামা চীন প্রসঙ্গে কথা বলছিলেন। কারণ ইতোমধ্যে এই সফর চীনের বিরুদ্ধে ভারত-আমেরিকার জোট পাকানো কিনা তা নিয়ে মিডিয়ায় কথা উঠে গিয়েছিল। ওবামা জানিয়েছেন, এসব “বুলি” বা উস্কানিমূলক ধরণের আলোচনা থেকে দূরে থেকে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের বন্ধনের পক্ষে কাজ করে যেতে চান তিনি।
    এশিয়ায় চীন-আমেরিকা-ভারতের অবস্থা এখন এমনই যে কোন দৈব ঘটনাবলে এরা তিন পক্ষ মিলে কোন চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারলে এরপরেও পারস্পরিক কিছু সন্দেহ অবিশ্বাসের বাস্তবতা থেকেই যাবে। এর মূল কারণ বাকি দুপক্ষের তুলনায় চীনের উত্থিত অদম্য “অর্থনৈতিক সক্ষমতা” এবং তীব্র প্রতিযোগিতা। এর ফলাফলে এই তিন পক্ষের যে কেউ অন্য দুইয়ের চেয়ে, তুলনামূলকভাবে আগের চেয়ে ভাল অবস্থানে থাকার চেষ্টা করবেই। এক্ষেত্রে চীনের চেয়ে ভারত ও আমেরিকার অন্তত একটা বাড়তি সুবিধা হল, ভারত ও আমেরিকা নিজেদেরকে “আভ্যন্তরীণভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা অনুসরণের শক্তি” মনে করে। তাদের বিচারে যা চীনের নাই। ফলে যদি তারা উভয়ে মিলে একাগ্রভাবে এশিয়ার জন্য প্রত্যেক দেশে ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুসরণের পক্ষে’ থাকে তবে এশিয়ায় জোট পাকানোর ক্ষেত্রে তারা চীনের চেয়ে এগিয়ে থাকবে বলে তাদের উভয়ের দৃঢ় অনুমান। চীনের উত্থান দেখে পালটা যতদূর সম্ভব গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের পক্ষে থাকা, ড্রাম বাজানো – এই অনুমানের অরিজিনাল উদ্গাতা হলেন এখনও সক্রিয় তবে বুড়ো তাত্ত্বিক হেনরি কিসিঞ্জার। যদিও চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের এইকালে পাশাপাশি একই সাথে ইসলাম কিছু প্রশ্ন তুলে সামগ্রিকভাবে পশ্চিমকে কুপোকাত করে ফেলেছে। আর একে ওয়ার অন টেররের নীতিতে মোকাবিলা করতে গিয়ে কিসিঞ্জারের তত্ত্বও অকেজো এবং কথার কথা হয়ে আছে। এসব আমেরিকাসহ পশ্চিমের অজানা নয়। তবু যেসব অঞ্চলে চীনের সাথে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার বিষয় আছে সেসব জায়গায় কিসিঞ্জারের তত্ত্ব কিছু কাজে লাগতে পারে এই আশা আমেরিকা ছেড়ে দেয় নাই। যেমন, ভারত-আমেরিকার প্রসঙ্গ উঠলেই আমরা কূটনীতিতে সেখানে দেখব বলা হচ্ছে দুনিয়ার দুই “বৃহৎ কার্যকর গণতন্ত্র চর্চার দেশ”, “গণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা” – ইত্যাদি। অর্থাৎ ওবামা তাঁর চীনকে ঘায়েল করার “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির ফাঁদের মাহাত্ম ও সুবিধার লোভ দেখিয়ে ভারতকে কাছে টানতে চাচ্ছে। চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতায় ভারত-আমেরিকার “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির কমননেস বা সাধারণ দিক এরই ভিত্তি বলে ড্রাম পিটতে চাইছে।
    তবে ভারত-আমেরিকা ড্রাম বাজাতে চাইছে কথা সত্য হলেও এতে ভারতের কিছু পুরান জামা খুলে পড়ারও লক্ষণ এটা। যেমন, নেহেরু আমলের ভারত তখনও বৃহৎ “গণতান্ত্রিক” নাকি তথাকথিত “সমাজতান্ত্রিক” রাষ্ট্র ছিল এর ফয়সালায় কোন স্পষ্ট উচ্চারণ আজ এখনও নাই। কেউ সাহস করে নাই এখনও । তবু মাঝামাঝি ষাটের দশকের সময়ে রাশিয়া-আমেরিকার বাইরে “জোটনিরপেক্ষ দেশের” একটা তকমা নেহেরুর ভারতের ছিল অনেকদিন। তাসত্ত্বেও ঐ অবস্থাতেই কালক্রমে নেহেরুর আমল থেকেই অস্ত্রের চালানের প্রয়োজনে ভারত যতই রাশিয়া মুখি হয়েছিল ততই ভারতের মুখে আর “আমাদের বৃহৎ গণতন্ত্রের” ঢাক শোনানোর দরকার দেখা যায় নাই। বরং সত্তর দশক থেকে ইন্দিরা আমলে “সমাজতন্ত্র” আর “সেকুলারিজম” ভারতের প্রধান পরিচয় বলে তিনি স্পষ্ট দাবি করতে শুরু করেন। তামাশার দিকটা হল, সেটাই আবার ইন্দিরার “জরুরী আইন” জারি করে ভারত চালানোর কাল। এরপর ১৯৮৫ সালের পর থেকে নেহেরুর নাতি রাজীবের আমলে ক্রমশ “সমাজতান্ত্রিক” রাষ্ট্র কথাটা কার্পেটের তলে চলে যেতে থাকে আর “বৃহৎ গণতন্ত্র” কথাটা প্রথম সামনে আসতে থাকে। তবুও তখনও একটা জিনিষ – আমেরিকা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কিনা এই সার্টিফিকেট ভারত আমেরিকাকে দেয় নাই, মূলত রাশিয়ান ব্লক রাজনীতির পুরান দায় বা লিগ্যাসির কারণে। না দিয়ে চলতে হয়েছিল। শেষে গত ২০০৪ সাল থেকে কংগ্রেসের ইউপিএ এর সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে আমেরিকার সাথে ষ্ট্রাটেজিক এলায়েন্সের দিকটা স্পষ্ট আকার নিতে থাকে। কংগ্রেসের প্রণব মুখার্জির মুখে আমরা ভারত দুনিয়ার “বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ” এই বয়ান শুনেছি। অর্থাৎ তিনি আর ভুয়া “সমাজতন্ত্রের” জামা পড়তে চাচ্ছেন না। ভারত এবার পরিষ্কার করে “বৃহৎ গণতন্ত্রের” ভারত হল। আর এর সম্ভবত আরও চূড়ান্ত দিকটা ঘটল এবারের মোদী সরকারের হাতে। ভারতের কনষ্টিটিউশন গ্রহণ ও কার্যকর হবার দিন ২৬ জানুয়ারি, যেটা তাদের ভাষায় প্রজাতন্ত্র দিবস। সম্ভবত ২০০৪ সাল থেকে ভারতে গত কয়েক বছরের এক নতুন রেওয়াজ চালু করা হল যে, ঐদিন কোন বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রধান অতিথি করে আনা হবে। আর গত বছর থেকে। আমেরিকার সাথে ভারতের জটিল ও জট পাকিয়ে যাওয়া সম্পর্কের গিট-ছুটাতে একটা শো-আপ করা মোদীর খুবই দরকার হয়ে পড়েছিল। মোদী তাই ওবামার প্রতি আন্তরিকতা ও ব্যক্তিগতভাবে ছুঁয়ে থাকার ইমেজ দেখাতে ওবামাকে হঠাৎ করে প্রজাতন্ত্র দিবসের মূল অতিথি হিসাবে এবার দাওয়াত দেন। শুধু তাই নয়, প্রকাশ্য এই ঘোষণা প্রথম তিনি নিজেই প্রকাশ করেন নিজের টুইটার একাউন্ট বার্তা থেকে। কিন্তু প্রজাতন্ত্র দিবস তো নিজেই রাষ্ট্রের জন্য প্রতীকী। “প্রগতিশীলতার” শ্লোগান ধরে রাখার লোভে আমেরিকাকে “সাম্রাজ্যবাদ” বলে নিজের প্রজাতন্ত্র দিবসে দাওয়াত দিবার কথা এর আগে সম্ভবত ভারতের কোন নেতা কেউ ভাবতেও চায়নি। মোদী সেটাই করে দেখায়ে দিলেন। কিন্তু এটা ভাবা ভুল হবে যে মোদী আমেরিকাকে সাম্রাজ্যবাদ তকমার বদলে গণতন্ত্রী বলে সার্টিফিকেট দিতে চান বলে এটা করেছেন। মনে রাখতে হবে, এবারের মোদী-ওবামা সাক্ষাতে যৌথ ঘোষণায় যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এর প্রায় সব ইস্যুগুলোই গত কংগ্রেসের আমলে ২০০৫ থেকে চালু ছিল তবে অকেজো অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। এবার সেগুলোই অর্থাৎ আমেরিকার সাথে সব পুরান চুক্তিই এবারের চুক্তিগুলোর বিষয়। কারণ বাস্তবায়নের শুরু থেকেই নানান বিরোধ সংঘাত একটা করে বের হতে হতে গত দশ বছরে ভারত-আমেরিকা সামগ্রিক সম্পর্কই স্থবির হয়ে গিয়েছিল। ভারতের দিক থেকে মোদীর সাফল্য এই যে তিনি মাত্র আট মাসে ওবামার সাথে দ্বিতীয় সাক্ষাতেই প্রত্যেক ইস্যুতে জটগুলো মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন, চুক্তিগুলো নবায়ন করেছেন। ভারতের বৈদেশিক সম্পর্কের নানান সমস্যা ও সম্ভাবনার ক্ষেত্রে যেমন, চীন বা জাপানের সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অর্থনৈতিক মুখ্য ইস্যু, আমেরিকার সাথে ঠিক তেমনটা নয়। আমেরিকার সাথে ভারতের সম্পর্ক অর্থনৈতিকও বটে তবে মুখ্য ইস্যুগুলো হল সামরিক, ষ্ট্রাটেজিক এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ-ঝগড়া বিষয়ক নীতি নিয়ে। ফলে তা যথেষ্ট জটিলও। মোদীর দিক থেকে, আমেরিকার সাথে এসব মুখ্য ইস্যুগুলোকে সুরাহা করে, পার হয়ে তবেই নিজের মুখ্য ফোকাস – অর্থনীতি বা ইনফ্রাষ্টাকচার উন্নয়নের দিকে তাঁকে যেতে হবে। তাই কাজের মানুষ মোদীর এই তাড়া। কিন্তু এই বিষয়গুলো ভারতের জন্য কি লাভালাভ আনবে, কতটুকু কাজে লাগবে সেই বিস্তারিত আলোচনা এখন না অন্য কোথাও তুলতে হবে।
    এখনকার প্রসঙ্গে আমাদের জন্য এতটুকুই প্রাসঙ্গিক যে এযাত্রায় মোদী ওবামার সাথে মিলে “গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের” নীতির মাহাত্মে যদি মেতে উঠেন, ফিল রেইনারের বক্তব্য যদি অর্থপূর্ণ হয় তাহলে অন্তত – বাংলাদেশের ভোট, ভোটার বা নির্বাচন আমরা কিছু বুঝি না, ভারতের জন্য বাংলাদেশের ওমুক দলকেই আমরা ক্ষমতায় দেখতে চাই ভারতের এই অন্যায় দুঃসহ আবদার থেকে আমাদের আপাতত মুক্তি মিলতে পারে। আমাদের নগদ লাভ এখানেই। তবে এখানে এসব কথার অর্থ আরও পরিষ্কার করার দরকার আছে। যেমন এর অর্থ এমন নয় যে আমাদেরকে চীনের বা আমেরিকার পক্ষপুষ্ট হয়ে বা যেয়ে ভারতের বিরুদ্ধে যাওয়া। এমন মনে করা ভুল হবে। সাধারণভাবে বললে, এশিয়ায় ভারত, চীন বা আমেরিকা এই তিন শক্তির কোন একটার ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের দিকে ঢলে পড়ে অপর দুটোর কোন একটার বিরুদ্ধে এটাকে ব্যবহার করার চিন্তা করাই যাবে না। বরং কারও ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের পক্ষে না গিয়ে বিশেষত কারও ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের বিপক্ষে অন্যকে সুবিধা দিবার আত্মঘাতী পথে না গিয়ে বাংলাদেশের নিজের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে এক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান অবশ্যই নিতে হবে। এটাই একমাত্র রাস্তা আমাদের টিকে থাকার জন্য খোলা আছে। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসের দশা এক্ষেত্রে সেরকমের উদাহরণ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে এমন রাজনৈতিক ক্ষমতার দল করা যাবে না যে, নিজের জনসমর্থন হারিয়ে, আকণ্ঠ লুটপাটে নিমজ্জিত হয়ে এরপর চীন অথবা ভারতকে বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে নিজে ক্ষমতায় থাকতে চায় – এই দুর্গতির পথে হাটা যাবে না। এটা বর্তমান আওয়ামী লীগের সরকার, আগামী সম্ভাব্য বিএনপি অথবা আসন্ন যেকোনো দলের বেলায় কঠিন ভাবে সত্যি। এদিকটা খেয়াল রেখে এজন্য উপযোগী রাজনৈতিক ক্ষমতা, পদ্ধতি কাঠামো তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। তবেই আমরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে সক্ষম হতে পারি। এছাড়া আভ্যন্তরীণ কোন বিভাজনের ইস্যু যেমন সেকুলারিজম বনাম ইসলাম ধরণের বিভাজন পরিহার করে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির দিকে মনোযোগী হতে হবে।
    এসব ঘটনাবলী ঘটছে খুবই দ্রুত। স্বভাবতই ফিল রেইনারের এই প্রেস বক্তব্য হাসিনা সরকার ও সমর্থকদের মনোবল ভাঙ্গার জন্য যথেষ্ট। ফলে এর পালটা কিছু প্রোপাগান্ডাও আমরা লক্ষ্য করছি। দৃশ্যত এর কেন্দ্রবিন্দু বিবিসি, তবে বিবিসি কলকাতার বাংলা বিভাগ। প্রথম রিপোটটা এসেছিল কেন্দ্রীয় বিজেপি নয়, কলকাতা বিজেপি সুত্রে। দুদিন পরে, এরপর ছাপা হয়, “বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে হাসিনা সরকার পঙ্কজ সরণকে আশ্বস্ত করেছেন”। পঙ্কজের নামে চালানো তবে পঙ্কজ নয় “বিশেষ সুত্রে পাওয়া” এমন বরাতে, যে পঙ্কজ সরণকে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে হাসিনা সরকার কি বলেছেন। অর্থাৎ যেন পঙ্কজ সেটা ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের কাছে কিভাবে রিপোর্ট করেছেন সেই ভঙ্গিতে। আদৌও পঙ্কজ সেটাই রিপোর্ট করেছেন কি না তা আমরা কেউ জানি না। আর এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলাদেশের কোন সরকারই ফরমালি পঙ্কজ সরণকে এটা বলবে না যে নিজ সরকারের হাতে দেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নাই। ফলে বাংলাদেশের সরকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছেন, ড্রাইভিং সিটে আছেন এমনটাই স্বাভাবিকভাবে হাসিনা পঙ্কজকে বলবেন। আস্থা রাখতে বলবেন। কিন্তু তাতে ভারতের হাইকমিশনার আশ্বস্ত হয়ে গেছেন কিনা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব রিডিং কি সেটা একেবারেই আলাদা বিষয়। এরপর আবার ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ও সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব পঙ্কজের রিডিং কতটুকু কিভাবে গ্রহণ করবেন, একমত হবেন বা হয়েছেন সেটা আরও আলাদা। কিন্তু বাংলা বিবিসির রিপোর্টে এই পুরা বিষয়টাকে প্রোপাগান্ডা করতে শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে, “আশ্বস্ত করেছেন” বলে দাবি করে। একথা সত্যি যে হাসিনা সরকার পঙ্কজকে “আশ্বস্ত করাতেই চাইবেন”। কিন্তু সেটাকে পঙ্কজের আশ্বস্ত হওয়া এবং তাতে ভারতের সচিব ও রাজনৈতিক নেতৃত্বও “আশ্বস্ত হয়েছেন” বলে ইঙ্গিত করে চালিয়ে দেয়া মিডিয়া টুইষ্টিং। এটা আর নিউজ নয়, বড় জোর এক লেখকের কলাম বা ভিউজ। কারও রাজনীতির প্রোপাগান্ডার হাতিয়ার হওয়া এমনটা হয়ত মিডিয়ায় হয়, করে থাকে কিন্তু সেটাকে অন্তত নিউজ দাবি করে করা যায় না। তবু আপাতত এসব প্রোপাগান্ডার চল আমরা দেখছি।

    [লেখা এই রচনা এর আগে গত ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫  চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে সামান্য এডিট করে আবার ছাপা হল।]

  • মোদীর ভারত এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে বদল (২)

    মোদীর ভারত এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে বদল (২)

    গৌতম দাস


    http://wp.me/p1sCvy-91

    ২৩ জানুয়ারি ২০১৫

     

    পরাশক্তি হওয়ার নির্ণায়ক
    কোন রাষ্ট্রের পরাশক্তি (সুপার পাওয়ার অথবা গ্লোবাল পাওয়ার বলে যেটা আমরা বুঝাই) খেতাব পাবার নির্ণায়ক কি? অনেকের মনে হতে পারে পারমাণবিক বোমা বানানোর ক্ষমতা আর সে বোমা কোন রাষ্ট্রের সংগ্রহে থাকলেই তাকে বোধহয় পরাশক্তি বলা যায়। আসলে এই ধারণার কোন ভিত্তি নাই। তবু কারও কারও এমন ধারণা থাকে। সেটা তৈরি হবার পিছনের কারণটা হল – কোন রাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা এটা নিঃসন্দেহে তার সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতার একটা মাত্রা ও সেই মাত্রাকে প্রকাশ করা মাত্র। কিন্তু শুধু ঐ একটা মাত্র দিয়ে ঐ রাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা প্রকাশ পায় একথা সত্যি না – ভুল অনুমান এখানে। অর্থাৎ সার কথাটা হল, কেবল পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতাকে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা বলে বুঝা – এটা ভুল। আবার পরাশক্তি ধারণা মানে  কেবল কোন সামরিক সক্ষমতার প্রশ্নও নয়, বরং সামরিকের সাথে ষ্ট্রাটেজিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন এবং সর্বোপরি সব ধরণের সক্ষমতার মূল ভিত্তি হল ঐ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন। কারণ কারও পরাশক্তি হয়ে উঠার প্রথম শর্ত নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হলে, উদ্বৃতের অর্থনীতিতে পৌছালে তা বাকি সামরিক, স্ট্রাটেজিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার পুর্বশর্ত বলে এরপর পরাশক্তি হয়ে উঠা কিছু সময়ের ব্যাপার কেবল। যদিও, এটা ঠিক যে নিজের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র হাতে থাকলে শত্রুর কাছ থেকে বড় বা সর্বাত্মক ধরণের হামলা বা আক্রমণ আসার সম্ভাবনা এটা কমায় মাত্র। আবার শত্রুর উপর এই বোমা ব্যবহার করে পাল্টা হামলা চালানোর সুযোগও একই কারণে খুবই সীমিত হয়ে যায়। যেমন ভারত-পাকিস্তান কখনও কোন বড় বা সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়ায় না একারণেই। দুদেশের হাতেই পারমাণবিক অস্ত্র আছে বলে কেউই যুদ্ধকে বড় করতে বা ছড়াতে চায় না – সীমিত স্তরে রাখতে চায়। কারণ কোন পক্ষ অপর পক্ষের হাতে চরম নাস্তানাবুদ হয়ে গেলে সে অপমাণিত বোধ থেকে এটা তাকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে উস্কানি দেয়া হয়ে যেতে পারে। এছাড়া এই অস্ত্র ব্যবহারের আগে প্রকৃতি ও মানুষের উপর বিকিরণ বিষয়ে পার্মানেন্ট ক্ষতির কথাও বিবেচনায় নিতে হয়। না নিয়ে গত্যন্তর থাকে না। কারণ বিকিরণের প্রভাব তার নিজ ভুখন্ডেও আসতে পারে। ফলে সামগ্রিক বিবেচনায় পারমাণবিক বোমা মূলত আত্মরক্ষামূলক; এবং তাও সীমিত অর্থে।
    আত্মরক্ষামূলক কথার আরও মানে হল সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা যাই থাক না কেন, কোন রাষ্ট্রের সে সক্ষমতা তার প্রতিপক্ষের তুলনায় ছাড়িয়ে গেলেও হামলা করার সময় আক্রমণকারী যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করবে। করবে এই ভয়ে যে সেক্ষেত্রে উপায়হীন দেখে আক্রান্ত প্রতিপক্ষ, দুর্বল হলেও, নিজের কাছে মজুদ থাকা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা ভেবে বসতে পারে, সেদিকে যেন উস্কানি দেয়া না হয়। আবার আক্রমণকারী শত্রুরও যদি পারমাণবিক সক্ষমতা থাকে সেক্ষেত্রে উভয় পক্ষই যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করে থাকে, উভয়কেই কড়া সর্তক থাকতে হয় যেন কেউ কাউকে পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে না দেয়। সর্বশেষ ভারত-পাকিস্তান কারগিল যুদ্ধে এই প্রবণতাই দেখা গিয়েছিল। ফলে নিট ফলাফল হচ্ছে পারমাণবিক বোমা সংগ্রহে থাকার কারণে উভয় পক্ষকেই যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করতে হয়, উভয়কেই একটা স্ব-আরোপিত সীমা তৈরি করে ও তা মানতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ পারমাণবিক বোমা প্রয়োগ করে শত্রুকে ঘায়েল বা ক্ষতি করার জন্য নয়, বরং ভয় দেখানো এবং ভয় পাবার দিক থেকে এটা আত্মরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করে।
    আবার ২০০১ সালের পরে আমেরিকার আফগানিস্তান বা ইরাক হামলার বেলায় ব্যাপারটা কিছুটা ভিন্ন; ঐক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন নয় যে আমেরিকার পারমাণবিক সক্ষমতা আছে বলেই সে সহজে ঐ দুই দেশকে আক্রমণ করে পদানত ও দখল জারি করতে পেরেছিল। যদিও আফগানিস্তান বা ইরাকের হাতে পারমানবিক বোমা থাকলে ফারাক কিছু হতেও পারত। পারমাণবিক বোমা মূলত ভয় দেখানোর অস্ত্র, যতটা ঠেকিয়ে রাখার অস্ত্র ততটাই তা ব্যবহারের নয়। এসব কারণে, জাপানে ১৯৪৫ সালে এই বোমা ব্যবহারের পর বিশ্বে কোন যুদ্ধ সংঘাতে আর কোথাও এর ব্যবহার হয় নাই। এছাড়া ইদানীং বোমা কেন, পরমাণু এনার্জির ব্যাপারেও প্রত্যেক দেশেই জনগণ যেভাবে শঙ্কিত হয়ে উঠেছে, ব্যবহার-বিরোধী জনমত প্রবল হচ্ছে তাতে বোমা সংগ্রহে থাকলেও তা ব্যবহারের বিরুদ্ধে খোদ নিজ জনগণেরই মনোভাব প্রবল বাধা হয়ে উঠতে পারে, এটা নাকচ করা যায় না। অতএব বাস্তবে এই অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োগ সম্ভাবনা খুবই সীমিত।
    আবার আর একদিক থেকে দেখলে, পারমাণবিক সক্ষমতা মানে নুইসেন্স করার ক্ষমতাও বটে; যেমন উত্তর কোরিয়া। সে তার পারমাণবিক সক্ষমতাকে ব্যবহার করছে দেশের ভিতরে ও বাইরে একটা ভয়ের রাজত্ব তৈরির কাজে। একদিক থেকে মনে হতে পারে উত্তর কোরিয়ার শাসক এই বোমার জোরে নিজ সার্বভৌমত্ত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হচ্ছে। কিন্তু আবার অন্যদিক থেকে যদি প্রশ্ন করি, সার্বভৌমত্ব রক্ষা মানে কি? এর অর্থ খুঁজতে ভিতরে ঢুকলে দেখা যাবে, উত্তর কোরিয়ায় এর আসল অর্থ হয়ে আছে নিজ অর্থনীতিকে ক্ষুদ্র বামন করে রাখা, এমনকি বর্তমান ক্ষমতার অধীনেই ন্যূনতম সংস্কার করার আগ্রহ না দেখানো, জনগণের উদ্যমকে দাবিয়ে রাখা, জীবনের মান অচলায়তনে আটকে ধুঁকে ধুঁকে মরা ইত্যাদি। ফলে এগুলো করে কার সার্বভৌমত্ব রক্ষা হচ্ছে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হই আমরা। সবমিলিয়ে দেশের ভিতরে বাইরে সবার কাছেই উত্তর কোরিয়ার বর্তমান ক্ষমতাসীনদের হাতে পারমাণবিক সক্ষমতা অন্যদের চোখে ‘নুইসেন্স’ হিসাবেই হাজির হয়ে আছে। অতএব এখানেও আমরা দেখছি, উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক বোমার অধিকারী বলেই পরাশক্তি হিসাবে গণ্য নয়।
    যদিও পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়ে উঠাকেই পরাশক্তির হয়ে উঠা বলে ভুল অনুমানের ধারণা এক সময় বেশ প্রকট হয়েছিল। কিন্তু ইতোমধ্যে নতুন বিশ্ব বাস্তবতায় কোন রাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা বলতে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়া বাদে অন্যান্য দিক বিকশিত করবার দিকে ঝোঁক ক্রমশ বেড়েছে। আগের কিস্তিতে বলেছিলাম সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কোন রাষ্ট্রের কেমন থাকবে কি থাকবে না অথবা তা কতটা হবে এটা মূলত নির্ভর করে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও শক্তি অর্জনের উপর। পারমাণবিক সক্ষমতা তো নয়ই এমনকি সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কথাটাও ঠিক কারও পরাশক্তি হবার পরিমাপক অথবা নির্দেশক নয়। কারণ সামরিক খরচ বইবার মত একটা সামঞ্জস্যপুর্ণ উপযুক্ত ও যোগ্য অর্থনীতি সবার আগে থাকতে হবেই। এর উপরই দাঁড়াতে পারে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কথাটার অর্থ। এক্ষেত্রে এখনকার রাশিয়া এক আদর্শ উদাহরণ। সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে থাকার সময় এর যে সামরিক সক্ষমতা ছিল এখন রাশিয়ান ফেডারেশন হয়ে যাবার পর সে নিজ অর্থনীতির মাপে নিজের আগের সামরিক সক্ষমতাকে ছেঁটে কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। সেটাও বহাল রাখতে পারছে অর্থনীতির ইন্ডাষ্টিয়াল সক্ষমতা্র ভিত্তি দিয়ে নয়, মাটির নিচের তেল-গ্যাস বিক্রির অর্থনীতি দিয়ে, ধুঁকে ধুঁকে।
    অতএব, নতুন পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় যে কোন রাষ্ট্রের জন্য সবার আগে দরকার একটা দ্রুত প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি অর্জনের সক্ষমতা নীতি গ্রহণ করা। এর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে সম্পদ বিতরণ ও বণ্টনের নীতি ও কার্যকর ব্যবস্থা যেন আভ্যন্তরীণ সংকট রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে ভেতর থেকে দুর্বল করতে না পারে। এই দুটো দিক অর্জিত হলে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা আসা কোন ব্যাপারই নয়। কিন্তু তারপরও কোন দেশ নিজেকে পরাশক্তি বলে গণ্য নাও করতে চাইতে পারে। অর্থাৎ গণ্য হওয়াটা ঠিক অনিবার্য বা জরুরিও নয়।
    মনে রাখতে হবে পরাশক্তি ধারণাটা মূলত ঐতিহাসিক। অর্থাৎ দুনিয়ায় একটা বিশেষ সময়ে বিশেষ শর্তে এই ফেনোমেনা হাজির হয়েছে যেটা ভিন্ন সময় শর্ত পরিস্থিতি এটা উধাও হতে পারে। ফলে অনিবার্য বা চিরন্তন কিছু নয়। দুনিয়ায় কলোনি শাসনের আবির্ভাবের কাল থেকে ধারণাটার উদ্ভব। ধারণাটা মূলত কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল প্রভাব আধিপত্য কেমন এরই এক নির্দেশক। আবার অন্যদিক থেকে নেতিবাচক। আন্তঃরাষ্ট্রীয় লেনদেন বিনিময় সম্পর্ককে কেবল জবরদস্তি খাটানো বিনিময় সম্পর্ক হিসাবে জারি রাখা, জবরদস্তিতে নিজের মতাদর্শগত দিকটা দুনিয়ার অন্য জনগোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দেওয়া, নিজেকেই একমাত্র সভ্যতার ধারক-বাহক, আদর্শ বিবেচনা করা -এগুলো হল পরাশক্তি ধারণাটার ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য। পরাশক্তির এটা খারাপ অর্থ। তবে আগামী দিনের নতুন কোন গ্লোবাল অর্ডারে যদি পরাশক্তি ধারণার প্রত্যক্ষ ও খারাপ অর্থগুলো কমতে কমতে নাই হয়ে যায় তবু এরপর কোন রাষ্ট্রের নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতার উপর ভর করে সামরিক সক্ষমতার সূত্রে গ্লোবাল প্রভাব রাখার বিষয়টা থেকে যাবে, সম্ভবত সহসাই উবে যাবে না।

    সম্ভাবনা সম্পন্ন হয়তো, কিন্তু ভারত পরাশক্তি নয়
    পরাশক্তি শব্দটার এই স্বল্প ব্যবচ্ছেদ থেকে আমরা এতটুকু স্পষ্ট হতে পারি যে, পরাশক্তি ধারণার বিচারে ভারত কোন পরাশক্তি এখনও নয়। কিন্তু তবু আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভারতকে পরাশক্তি বিবেচনা করার কথা উঠেছে। এর কিছু কারণ নিশ্চয় আছে, সেদিক যাব। যেমন, ২০০৪ সালের মে মাসে কংগ্রেসের ইউপিএ সরকারের প্রথম টার্মে ক্ষমতায় আসার পরের বছর ২৭ জুন ২০০৫, ভারত-আমেরিকা একটা “ডিফেন্স প্যাক্ট” সই করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার সহায়তায় ভারতের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো। এ উপলক্ষে টাইমস অব ইন্ডিয়া ২৯ জুন ২০০৫ এর রিপোর্টিং এর প্রথম বাক্যটা এরকম, “India and the United States have signed a 10-year defence relationship agreement that gives credence to the Bush administration’s pledge to help India become a major world power in the 21st century.” এই বাক্যের ভিতরের পরের অংশটা ইন্টারেস্টিং। বলছে, “ভারতকে ২১ শতকে ‘মেজর ওয়ার্ল্ড পাওয়ার’ বা পরাশক্তি হতে সাহায্য করার যে প্রতিশ্রুতি আমেরিকা দিয়েছিল এই চুক্তি তার পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে”। এখন পরাশক্তি কথার আমরা আসল যে অর্থ, গ্লোবাল অর্থনীতিতে ন্যূনতম শীর্ষ তিন-চার জনের একজন হওয়া -এমন অর্থবোধে গত দশ বছরেও ভারত পরাশক্তি হয়েছে এমন কোন রিপোর্ট অথবা দাবি আমরা কোথাও দেখি নাই। তাহলে এই মিডিয়া রিপোর্টটা এমন কেন? এটা পড়ে অনুমান করা যায় যে অর্থে ভারতের পরাশক্তি হওয়া মানে করা হয়েছে, তাও আবার আমেরিকার সহায়তায়, এটা কারো পরাশক্তি হওয়া বুঝায় কি না? অন্য রাষ্ট্রের সহায়তায় কেউ পরাশক্তি হতে পারে কি না এমন প্রশ্ন বা সন্দেহ এই রিপোর্টে নাই। এছাড়া এই রিপোর্টটা মূলত ভারতকে আমেরিকার সামরিক হার্ডওয়ার ও টেকনোলজি সরবরাহ সংক্রান্ত। অর্থাৎ এতে ভারতের বড়জোর সামরিক সক্ষমতা বাড়বে। কিন্তু তাতে ওয়ার্ল্ড পাওয়ার বা পরাশক্তি হবার সম্পর্ক কি – সে প্রশ্ন করতে মিডিয়া ভুলে গেছে। রিপোর্টের এসব ভুয়া অনুমান উদোম করতে এই রিপোর্ট থেকে আরও কিছু প্রসঙ্গ তুলে আনব।
    প্রথমত রিপোর্ট জানাচ্ছে, “Hugely ambitious in its size and scope, the agreement envisages a broad range of joint activities, including collaborating in multinational operations ‘when it is in their common interest,’ ”। অর্থাৎ ঐ ডিফেন্স প্যাক্টে আছে, দুই রাষ্ট্রের কমন স্বার্থ বলে উভয়ে মনে করলেই ‘টেররিজম ধ্বংস’ জাতীয় কোন কিছুর উছিলা তুলে ভারত আমেরিকার সাথে বহুজাতিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে ঐ “টেররিষ্ট” দেশের বিরুদ্ধে লড়তে সম্মতি জানাচ্ছে। এই পত্রিকার রিপোর্ট নিজে অবশ্য চুক্তিতে কেবল এমন অনুচ্ছেদ থাকাকে ভারতের “উচ্চাকাঙ্ক্ষা” হিসাবে দেখছে। আর এই চুক্তি অনুমান করছে এভাবেই নাকি “two militaries to promote security” তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পক্ষে আগিয়ে যাবে। রিপোর্টের আর এক অংশ বলছে, “The framework agreement also envisages what is tantamount to the U.S and India jointly policing the world.”। এখানে পত্রিকা প্রতিরক্ষা চুক্তিটা সম্পর্কে নিজস্ব মন্তব্য লিখে বলছে, যেন ভারত-আমেরিকা যৌথভাবে বিশ্ব-পুলিশের ভূমিকায় নামতে যাচ্ছে। অর্থাৎ বিশ্ব-পুলিশী করার খায়েস রাখার বিপদের দিকটা নিয়ে পত্রিকা আপত্তি তুলছে। তৃতীয়ত, ঐ ডিফেন্স প্যাক্টে সই করেছিলেন, যুদ্ধবাজ বুশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফিল্ড আর ভারতের তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী প্রণব মুখার্জি। চুক্তি স্বাক্ষর শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে প্রণবকে এক রিপোর্টার প্রশ্ন করেছিলেন, এটা “playing a subservient role to a uni-polar US agenda” অর্থাৎ ভারতের দিক থেকে দুনিয়াতে এক মেরুর মাতবর আমেরিকার এজেন্ডার অধীনস্থ হওয়া হয়ে যাচ্ছে কি না। এর জবাবে প্রণব আমেরিকাকে বিশাল ঠকান ঠকিয়ে এই চুক্তি জিতে এনেছে এমন এক মিচকি হাসি দিয়ে বলেছেন, “This is the real deal…we have both put down what we want for the next decade… “he didn’t expect convergence or agreement on all issues at all times.”। তর্জমা করলে, “এটাই তো আসল খেলা, … পরের দশক পর্যন্ত আমরা কি চাই তা উভয়েই ওখানে লিখে রেখেছি।… সব ইস্যুতে সবসময় আমাদের উভয়ের একমত হতে বা মিলতে হবে এটা আমি আশা করি না”। প্রণবের এমন আস্থাবাচক মুচকি হাসির কারণ, ঐ প্যাক্টের আর এক অনুচ্ছেদ হল এরকম, “এই চুক্তি ভারতের স্বতন্ত্র অবস্থান নেয়ার অধিকার খর্ব করে না”। “ The agreement does not preclude India’s right to its independent views.”। এই হোল প্রণবের “ভারত পরাশক্তি” নামক প্রপাগান্ডার ফানুস। তবে ফানুস উড়িয়ে একটা ভাব তো ছড়ানোই যায় যে আমরা এই তো চাঁদে চলে যাচ্ছি। সে যাক, কিন্তু ‘আমেরিকাকে মহা ঠকিয়েছে’ ভাবটা প্রণব বেশিদিন ধরে রাখতে পারেন নি। ভারত প্রথম ধাক্কা খায়, ২০১১ সালের প্রথম অর্ধে যখন বঙ্গোপসাগরে আমেরিকার সপ্তম নৌবহর রাখার পরিকল্পনা প্রকাশ হয়ে পড়ে। স্বভাবতই ওবামার এই ইচ্ছার ভিতরে ভারত এবার খোদ নিজেরই নিরাপত্তার জন্য হুমকি আর বিপদের দিকটা দেখেছিল। ভারত আমেরিকান পরাশক্তির যাঁতাকাঠি ধার পেয়েছিল ২০০৬ সালের শেষ থেকে; বাংলাদেশে কে সরকারে আসবে থাকবে, কি শর্তে থাকবে তা ঠিক করার কর্তা হওয়ার ভিতর দিয়ে। এটাও প্রণবের চোখে পরাশক্তি ভাবার সুখবোধ হতে পারে।

    দুই হাজার চৌদ্দ সালের সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে কথাবার্তার পর নরেন্দ্র মোদী ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে মার্কিন কম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। ভারতে প্রতিরক্ষা খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সীমা ছিল ২৬%, সেটা এখন বাড়িয়ে ৪৯% করা হয়েছে। দুই হাজার পনেরো সালে ভারত ও মার্কিন প্রতিরক্ষা চুক্তি শেষ হবার কথা ছিল। মোদীর মার্কিন সফরের পর সেটা আরও দশ বছর বাড়ানো হয়েছে।

    কিন্তু ধরাকে সরা জ্ঞান করার ভারতের সেই সুখবোধে টান পড়তে শুরু করে প্রায় একই সময় ২০১১ সাল থেকে। এরই এক প্রকাশ্য রূপ হল, বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে ভারত-আমেরিকার দুই মেরুতে অবস্থান। অর্থাৎ আমেরিকার বিদেশনীতি আর ভারতের বিদেশনীতি হরিহরাত্মার মত একই আত্মা না হলেও “নিরাপত্তা”, “টেররিজম” এসব শব্দের আড়ালে উভয় রাষ্ট্র উভয়কে এভাবে ফাঁকি দিয়ে চলছিল। এই হরিহর মিলনের মধ্যে কোন খটমটর নাই, আসবে না এই ভাব ছড়ানো হয়েছিল। এমন মিথ্যা ধারণাটা উন্মোচিত হয়ে যেতে শুরু করেছিল ২০১১ সাল থেকে। অথচ ভারত ও আমেরিকা দুজনেই জানত যে মূলত আমেরিকার চীন ঠেকানোর ইচ্ছা থেকে এসব ঘটছে এবং ঘটানো হচ্ছে। যদিও আসলে চীন ঠেকানো অসম্ভব এটাই অবজেক্টিভ বাস্তবতা। একেই আগের কিস্তিতে “উদ্বৃত্ত বাস্তবতা” বলেছিলাম। এই বাস্তবতা অস্বীকার করে যতটুকু ও যতদিন আমেরিকা পরাশক্তি হিসাবে নিজের উঁচু জায়গা জাগিয়ে রাখতে পারে সেই উদ্দেশ্য সাধনে সাময়িক সে ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল। কিন্তু উভয়েই এই জানা জিনিষটা লুকানোর ভাব ধরেছিল। বিশেষত ভারত ভাব ধরে ছিল যে সাদা চোখে ধরা পড়া জিনিষটাও সে দেখেও দেখে নাই। যেন এটাই তার পরাশক্তি হবার পথ, যেন আমেরিকা তাকে পরাশক্তি হতে সহায়তা করছে, এই ধারণা প্রণবের সরকারই মিডিয়াতে ছড়িয়েছিল।

    আজকের দুনিয়ার মুল দ্বন্দ্ব
    আজকে চীন আমেরিকার প্রতিযোগিতা দ্বন্দ্বের মুল বিষয় হল, আগামি গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার কে নিয়ন্ত্রণ করবে? একালেও ব্রিটেনের সাথে আমেরিকার ছোটখাটো স্বার্থবিরোধ দ্বন্দ্ব আছে কিন্তু এই দ্বন্দ্ব তুলনায় তেমন একেবারেই কিছু নয়। তবে এককালে, ব্রিটেন ও আমেরিকার সত্যিকারের একটা বড় দ্বন্দ্ব ছিল, যা ক্রমশ চরমে উঠা আর ফয়সালার সময়কাল ছিল দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়টা (১৯১৪-১৯৪৪), এই ত্রিশ বছর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উপনিবেশিক সাম্রাজ্যের কর্তা হিসাবে ব্রিটেনের পতন ও পরাজয় নিশ্চিত করে আমেরিকার মাতব্বরিতে নতুন গ্লোবাল অর্ডার সাজিয়ে নেয়া হয়েছিল। যদিও বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে হাজারো বই-পুস্তক সিনেমায় হাজির বয়ান আছে। যেখানে যুদ্ধের মুল প্রতিপাদ্য হল হিটলারের জার্মানি, ইটালি বনাম বাকি পশ্চিমা শক্তি – যেন এমন এক “ন্যায়ের যুদ্ধ” সেটা। জেনারেলদের বীরত্বের এক এক গাথা সেগুলো। কিন্তু কোন বর্ণনায় যেটা বলে না তা হল, ঐ যুদ্ধের সবচেয়ে নির্ধারক তাতপর্য। তা হল, সারা দুনিয়াকে উপনিবেশ বা কলোনিতে ভাগ করে নেয়া, এক একটা সাম্রাজ্যের অধীন করে রেখে দেয়া আর শিরোমনি হিসাবে থাকা বৃটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা সীমিত বিকশিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারটা ঐ বিশ্বযুদ্ধ শেষে হস্তান্তর হয়ে আমেরিকার হাতে চলে যাওয়া। সেটা ছিল আমেরিকার দিক থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণে -এই প্রথম জাতিসংঘ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ইত্যাদি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিকতা দিয়ে এক নতুন গ্লোবাল অর্ডার সাজিয়ে নেয়া আর নিজের পরাশক্তিগত উত্থান। অর্থাৎ আগে বৃটিশ সাম্রাজ্যের নেতৃত্বে নড়বড়ে অবিকশিত এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার ছিল কিন্তু এর কোন আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তো ছিলই না। এমনকি কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও ছিল না, ছিল Rothschild family এর পারিবারিক ব্যাংকের মত কিছু প্রতিষ্ঠান মাত্র। এসবের বিপরীতে কায়েম হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে এক প্রাতিষ্ঠানিক গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার। তবে তা ছিল তখনকার “উদ্বৃত্ত বাস্তবতায়” আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতার জোরে, সামরিক বা গায়ের জোর দেখিয়ে নয়। আর, ব্রিটেন সেকালের উদীয়মান শক্তি আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজের পুরানা কলোনি ব্যবস্থা অর্থাৎ তখনকার গ্লোবাল অর্ডারকে টিকানো বাস্তবত অসম্ভব ছিল বলে কিছুই করতে পারে নাই। তবে পরাজিত হবার পর ব্রিটেন আবার আমেরিকার নেতৃত্বে যে নতুন গ্লোবাল অর্ডারটা খাড়া হল সেখানে আমেরিকার খুবই ছোট পার্টনার হয়ে আমাদের মত ছোট অর্থনীতির উপর রুস্তমির ভাগ যতদূর পায় তা টুকিয়ে সেই থেকে দিন চালাচ্ছে।

    আজ চীন আমেরিকার প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব ১৯৪৪ সালের ব্রিটিশ-আমেরিকান প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বড় দ্বন্দ্বের মতই। দ্বন্দ্বটা একই ধরণের, পুরান ঢলে পড়া গ্লোবাল অর্ডার বনাম আসন্ন নতুন গ্লোবাল অর্ডার; এর নিয়ন্ত্রণ করবে কে –সেটাকেই আমরা আর এক অর্থে মাতবর বা পরাশক্তি হবার লড়াই বলছি। আজ চীন আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারটা চ্যালেঞ্জ করে ফেলেছে। এটা ভেঙ্গে দিয়ে নিজের নেতৃত্বে নতুন গ্লোবাল অর্ডার কায়েম করতে চাইছে। দ্বন্দ্বের সারকথা এটাই। ফলে চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব লড়াইয়ের মুখে আমেরিকা ভারতকে পাশে রাখতে চায় যাতে ভারত চীনের সাথে নতুন গ্লোবাল অর্ডার খাড়া করবার সহযোগী সাথী না হয়ে ওঠে। সে লক্ষ্য হাসিল করতে আমেরিকা ভারতকে পরাশক্তি হবার মিথ্যা লোভ দেখিয়েছে। মিথ্যা এজন্য যে, পরাশক্তি হওয়াটা কারও সহযোগিতায় পাওয়া না পাওয়ার উপর নয় বরং আপন অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করার উপর নির্ভর করে। ফলে বিষয়টা দাঁড়িয়েছে আমেরিকা প্রলুব্ধ করেছে আর প্রণবের কংগ্রেস সে লোভে মশগুল থেকেছে। এভাবেই স্বপ্ন দেখতে দেখতে কংগ্রেস ইউপিএ সরকারের দশ বছর পার হয়েছে। আর সেই থেকে ভারত একটা পরাশক্তি এমন ভুয়া ধারণা মিডিয়ায় খামাখা চালু হয়ে রয়েছে।

    আগে বলেছি ভারতের সামরিক শক্তিতে শ্রীবৃদ্ধি হলেও এর মানে তার পরাশক্তি হওয়া নয়। তাছাড়া মুল কথা, কোন রাষ্ট্র কাউকে সহযোগিতা দিয়ে পরাশক্তি বানিয়ে দিতে পারে না। তবু সামরিক হার্ডওয়ার টেকনোলজির আকাঙ্ক্ষা ও লোভে ভারত আমেরিকার এই প্ররোচনায় পা দিয়েছে। তাও হয়ত হতে পারে। কিন্তু, আমেরিকা কি চীন ঠেকাতে গিয়ে ভারতকে পরাশক্তি হবার সম্ভাবনা বাস্তব করে তুলতে পারে? অর্থাৎ আমেরিকা যদি চীনের পরাশক্তি হওয়া খর্ব করতে চায় সেই আমেরিকা আবার আর এক পরাশক্তি হতে ভারতেকে কি সহযোগিতা আদৌ করতে পারে? কেন করবে? জবাব হল করতে পারে না, কোন কারণ নাই। তবু ভারত সেটা বিশ্বাস করে যে সে পরাশক্তির হতে চলেছে বা হয়ে গয়েছে। এমন স্বপ্নে দিল্লী বিভোর থেকেছে।

    তাহলে সারকথা, ভারতের পরাশক্তি হবার আকাঙ্ক্ষা থাকতেই পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সঠিক মৌলিক করণীয় কাজ হল সবার আগে অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করা, সবার আগে অর্থনীতি ফোকাস করে এগিয়ে যাবার নীতি গ্রহণ করা। “নিরাপত্তার” নামে বাকচাতুরি, আমেরিকাকে ফাঁকি দিতে পারছে মনে করা -এগুলো আসলে নিজেকেই ফাঁকি দেওয়া, সদর রাস্তা থুয়ে ব্যাকডোরে কাজ হাসিল করার মত শর্টকাট কাজ – পণ্ডশ্রম। আবার অন্যদিকে প্রণবের কংগ্রেসের দশ বছরে সর্বোচ্চ জিডিপি ছিল একমাত্র ২০১০ সালের প্রথম দুই মাস, ডাবল ডিজিটে। এরপর এটা পড়তে পড়তে কংগ্রেসের বাকি আমল ছিল পাঁচের নিচে। গত বছর কংগ্রেসের পতনের পরে, এসবের বিপরীতে যা কিছু বুঝে বা মনে করেই হোক মোদীর ভারতের উত্থান অর্থাৎ অর্থনীতি ফোকাস করে নিজের আগানোর নীতি নির্ধারণ স্বভাবতই সঠিক পদক্ষেপ। যদিও মোদী আমেরিকার সাথে ডিল করবে কি করে সে প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিতই রয়েই গেছে।

    জুন-সেপ্টেম্বর মোদীর ক্ষমতার প্রথম চার মাসের পরে
    আগের কিস্তিতে বলেছিলাম বিগত কংগ্রেসের শেষ কাল থেকে আমেরিকার সরে গেলেও ‘পরাশক্তি ভাব’ ধরা ভারতের তিতে বলেছিলাম বিগত কংগ্রেসের শেষ কাল থেকে আমেরিকার সরে গেলেও ‘পরাশক্তি ভাব’ ধরা ভারতের গোয়েন্দা-আমলাদের মানসিক আমোদ, আদর্শ এবং সুখবোধের উৎস হয়ে থেকে গেছে। আমলাদের এমন মনোগাঠনিক প্রভাব সত্ত্বেও মোদি নিজেকে পরিচালিত করতে সুযোগ পেয়েছিলেন প্রথম চার মাস। এর মধ্যেই ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে ওবামার সাথে শীর্ষ বৈঠকের সময় ঘনিয়ে আসে। ফলে আমেরিকার সাথে ভারতের সামরিক হার্ডওয়ার পাবার বিষয়সহ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সামনে আসে, গোয়েন্দা-আমলাদের মনোগাঠনিক প্রভাবের বাইরে মোদি আর থাকতে পারেন নাই। এর সম্ভাব্য কারণ, মোদী এবং তাঁর টিম ভারতকে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাব্য যে পথে পরিচালিত করতে চান এনিয়ে স্বপ্ন পরিকল্পনায় যতটা হোমওয়ার্ক করেছেন ততটা সময় আমেরিকার সাথে ডিলিং এর বিষয়ে দিতে পারেন নাই। এর কারণ ভারত-আমেরিকার দেনাপাওনার ফোকাস সিম্পল অর্থনৈতিক নয়। এছাড়া ভারতের চাওয়াগুলো কি করে আদায় করবেন, এমনকি তা কোন জায়গায় রেখে কংগ্রেস সরকার বিদায় নিয়েছে সেখান থেকে এর বাধাগুলো চিহ্নিত করা এবং উত্তরণের পথ কি হতে পারে এনিয়ে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তার টিমকে স্টাডির কাজ দিয়ে হয়ত শুরু করতে হত। আর মুখ্য বিষয় কংগ্রেসের অকেজো “নিরাপত্তা” লাইনের বদলে নিজের “অর্থনীতি” লাইনে চলতে চাইলেও আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের সামরিক হার্ডওয়ার পাবার বিষয়সহ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সেই একই রয়ে গেছে।
    ওদিকে নতুন গ্লোবাল অর্ডার যা ভারতেরও অর্থনৈতিক স্বার্থ, তা নির্মাণে BRICS ও AIIB মত প্রতিষ্ঠানগুলো গড়তে মোদী কি চীনের মতই পাশে থেকে সক্রিয় উদ্যোগ নিবেন? নাকি আমেরিকার প্ররোচনায় সেই উদ্যোগে গড়িমসি করে বিনিময়ে আমেরিকার থেকে নিজের অমীমাংসিত স্বার্থগুলো আদায়ে একে ব্যবহার করবেন? বিগত কংগ্রেস এই বিনিময়ের লাইন বজায় রেখে এগিয়েছিল, যদিও বাস্তবে তাতে ভারতের কোন স্বার্থই হাসিল হয়নি, কোনদিকে তেমন ফল দেয় নাই।

    সমান মালিকানা শেয়ার, সমান ভোট ফলে মতামতের সমান ওজন
    দ্বিতীয় আর এক দোনোমনা অবস্থা ভারতের রয়ে গেছিল। BCIM অথবা BRICS গড়ার প্রশ্নে। যেসব প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত বা নতুন সিস্টেম গড়ার প্রাইমারি মূলধন বিনিয়োগের প্রশ্ন ছিল সেখানেই চীনের শেয়ার যাতে কোনভাবেই বেশি না হয় তা ঠেকানোর বিষয়টাকে মুখ্য বিবেচনা করে এগিয়েছে। অন্যভাবে বললে ভারত এমন নিয়ম আরোপের পক্ষে কাজ করেছে যাতে উদ্যোক্তাদের সবার বিনিয়োগ সমান হতে হবে, এই নিয়ম আরোপের পক্ষে যুক্তি তুলেছিল। বাস্তবে যে কথার মানে হল, BCIM অথবা BRICS প্রতিষ্ঠানগুলো আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্যারালাল প্রতিদ্বন্দ্বী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাঁড়াতে নিজস্ব প্রাইমারি মূলধন চাহিদা যাই থাক এবং তা পূরণের চাহিদা সম্মিলিতভাবে থাক আর না থাক, তাকে ছেঁটে ভারতের নিজের নিচু বিনিয়োগ ক্ষমতার মাপের সীমায় আটকে বামন ও অকার্যকর করে রাখা। ফলাফলে এগুলো প্রভাবশালী কার্যকর প্রতিষ্ঠান হোক না হোক তা ভারতের বিবেচনার বিষয় নয়। অথবা সেকেন্ডারি বিবেচনা। একথা ঠিক আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের গঠন নীতি অনুসারে, ওসব প্রতিষ্ঠানে আমেরিকান শেয়ার সবার চেয়ে বেশি বলে, যে কোন বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাধারণ মালিকানা নীতি অনুসারে মালিকানা শেয়ার যার বেশি মানে ভোটের ক্ষমতা তার বেশি, মানে তার নিজের অবস্থান মতামতের ওজন অন্য সবার চেয়ে বেশি। এর ফলাফলে এগুলো হয়েছে আমেরিকান স্বার্থে কান্নি মারা প্রতিষ্ঠান। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের গঠন নীতি অনুসরণে নতুন করে BCIM অথবা BRICS গড়তে গেলে তা একই সমস্যার জন্ম দিবে। ফলে ভারতের উদ্বেগ জেনুইন। কিন্তু এই উদ্বেগের সমাধান করবার ফর্মুলা কোনভাবেই উদ্যোক্তা মালিকানা সবার শেয়ার সমান করে দেয়া হতে পারে না। কারণ এর অর্থ তাতে প্রতিষ্ঠানগুলো বামন ও অকার্যকর করে রাখা হবে। ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাপ মানে ততোধিক নিচু মূলধন বিনিয়োগের ক্ষমতা। মনে রাখতে হবে আমরা এই প্রাইমারি মূলধন বিনিয়োগ বলতে বাণিজ্যিক বিনিয়োগের কথা বলছি না। এটা অবকাঠামোগত অথবা নতুন অর্থনৈতিক সিস্টেম গড়ার প্রাইমারি বীজ-পুঁজির কথা বলছি। যে বিনিয়োগের লক্ষ্য মুনাফা নয়, এই বিনিয়োগ থেকে মুনাফা আসবে আধা পার্সেন্টের নিচে অথবা হয়ত কোন মুনাফাই নয় এমন। ফলে ভারতের এমন বিনিয়োগ সক্ষমতা বাণিজ্যিক বিনিয়োগ সক্ষমতার চেয়েও কম হবে। তাহলে আমাদের এই পথে নয়, অন্য সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। অর্থাৎ ভারতের উদ্বেগ অস্বস্তি জেনুইন, কিন্তু সমাধানের প্রস্তাবনা নয়। কি হতে পারে সম্ভাব্য সমাধান?
    মালিকানা শেয়ার ভিত্তিতে ভোট বা বক্তব্যের ওজন – সিদ্ধান্ত ও পরিচালনা নীতি এমন না করে সদস্যদের মালিকানা শেয়ার অবশ্যই অসমান হবে আর তা যার যাই হোক, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি যদি হয় কনসেনসাস বা ঐক্যমত্য এবং অবজেক্টিভ টেকনিক্যাল সিদ্ধান্ত বিবেচনা তাহলে সহজেই এই সমস্যার একটা সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে। অর্থাৎ কারও মালিকানা ভোটকে তার অবস্থান বক্তব্যের ওজন থেকে বিচ্ছিন্ন করা। অবস্থান মতামতকে নিজ মেরিটে গুরুত্বপূর্ণ বা প্রভাবশালী হতে হবে, ভোটের ক্ষমতার জোরে নয়। এটা করতে পারলে প্রধান সুবিধা যা পাওয়া যাবে তা হল, চীনের হাজির প্রবল বিনিয়োগ সক্ষমতাকে BCIM অথবা BRICS ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়তে পরিপূর্ণভাবে সদ্ব্যবহার করা। যেটা BCIM অথবা BRICS বা AIIB এসব প্রতিষ্ঠানকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মত প্যারালাল সমতুল্য প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হিসাবে হাজির করতে পারে। ঠিক এরকম অন্য কারও কোন প্রস্তাবও হতে পারে। কিন্তু মূলকথা, মালিকানা ভোটের ভয়ে নব প্রতিষ্ঠানগুলোকে বামন করে রাখা যাবে না। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বিপরীতে নতুন কিন্তু বামন প্রতিষ্ঠান করা আর না করা সমান। কোন অর্থ হয় না তাতে।
    প্রণবের বিপরীতে মোদীর ভারত কি এসব দিকে ভাবতে রাজি? আমরা একেবারেই নিশ্চিত নই। আমরা অপেক্ষা করছি। মোদী সম্পর্কে মূল্যায়নে শেষকথা বলার সময় এখনও আসেনি। আর তাঁর “অর্থনীতি” ফোকাসের নীতির কারণে এই নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মোদীর পক্ষে এমন চিন্তা করা অবশ্যই সম্ভব হলেও তিনি তা করবেন, তাঁর গোয়েন্দা-আমলাদেরকে পিছনে ফেলে আগাতে পারবেন এতদূর এখনই বলা ঠিক হবে না। তবে আরও কিছু ফেভারেবল দিক আছে; যেমন, চীনের প্রতি তাঁর সাধারণ মনোভাব অন্তত প্রণবের মত নয়। আমেরিকার প্রতি সাধারণ মনোভাবও অন্তত প্রণবের কংগ্রেস বা ভারতের গোয়েন্দা-আমলাদের মত নয়। আমেরিকা ভারতকে একটা “পরাশক্তি ভাব” দিবার সক্ষমতা বাস্তবতায় থাক আর না থাক তাকে ঢলে পড়তে হবে, না দিলে আবদার অথবা আকাঙ্ক্ষার সুখবোধে বিভোর থাকতে হবে – এমন একেবারেই নয়। তবুও মোদীর অবস্থান দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ওবামার সাথে মুলাকাতের প্রথম পর্ব মোদীর শেষ হয়েছে গত বছরের সেপ্টেম্বরে। তাতে মোদীর ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের অমীমাংসিত এবং জট পাকিয়ে যাওয়া ইস্যুগুলোর সাথে সাক্ষাত বাস্তবতার সাথে পরিচিত হয়েছেন। আমরা অনুমান করতে পারি, আমেরিকার সামরিক হার্ডওয়ার টেকনোলজি পাবার বিষয়ে তিনি যতদূর নমনীয় হওয়া সম্ভব হবেন। কিন্তু সেটা BRICS বা AIIB এসব প্রতিষ্ঠানকে অকেজো করে রাখার বিনিময়ে নয়। এই ভরসা রাখছি এজন্য যে শেষ বিচারে মোদী তাঁর অর্থনীতি” ফোকাস থেকে সম্ভবত কোনভাবেই সরবেন না। কারণ তাঁর “অর্থনীতি” ফোকাস আকাঙ্ক্ষাকে জীবিত রাখতে চাইলে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব তাঁর চেয়ে ভাল আর কে বুঝে। এই পটভূমিতে ওবামা এমাসেই ভারত সফরে আসছেন বিশেষ দাওয়াতি হিসাবে। ভারতের “প্রজাতন্ত্র দিবস” মানে কনষ্টিটিউশন গৃহীত হবার দিন, ২৬ জানুয়ারি উৎযাপনে, প্রধান অতিথি হিসাবে। থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অবজারভার হিসাবে খ্যাত সি রাজামোহন এটাকে বলছেন ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের দিক থেকে মোড় ঘুরার সফর। অর্থাৎ ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে যে দোলাচল আছে তা অনেকটা থিতু হবার সফর। তিনি একটা বিশেষ দিকে নজর এনেছেন যার সারকথা হল, গত সেপ্টেম্বরের মোদীর সফরের সময় ওবামা-মোদী উভয়ে তাদের আমলা প্রশাসনের অবস্থান মতামতকে পিছনে ফেলে বাণিজ্য বিষয়ে ঝগড়ার মীমাংসা করেছিলেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, পত্রিকায় তিনি লিখছেন, … suggests that the two leaders had personally driven their bureaucracies to bring the dispute on trade facilitation to an end.। ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে সামরিক ইস্যু ছাড়াও অন্য মুল ইস্যু হল WTO সম্পর্কিত বাণিজ্য সুবিধাদি নিয়ে বিতর্ক। অর্থাৎ আমলা প্রশাসনের মতামতের ভিত্তিতে পুরাপুরি পরিচালিত না হয়ে বরং এর উপরে নিজেদের রাজনৈতিক বিবেচনাকে স্থান দেবার একটা চল মোদী-ওবামা উভয়ের মধ্যে আছে। এই বিচারে ওবামার এই সফর থেকে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক কোথায় গিয়ে থিতু হচ্ছে এর আরও কিছু অগ্রগতি এখানে আমাদের দেখতে পাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও রাজামোহনের দৃষ্টিতে এই সফরকে দেখার করার দরকার নাই। মনে রাখতে হবে, তিনি ভারতকে আমেরিকার “ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার” হিসাবে দেখতে চাইবার লোক। এখানে “ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার” কথাটা ভাঙলে এর সারার্থ, চীন বিরোধী হয়ে ভারত-আমেরিকার আগানোর ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ জোট।

    নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রতি প্রণব মুখার্জির দৃষ্টিভঙ্গী
    প্রণবের বিপরীতে মোদীর ভারত কি এসব দিকে ভাবতে রাজি? সে প্রসঙ্গে যাবার আগে পুরানা গ্লোবাল অর্ডারের প্রতি প্রণবের মনোভাব সম্পর্কে কিছু কথা বলে নেয়া যাক। এটা শুধু প্রণবের মনোভাব নয় বরং বিগত কংগ্রেসের সরকার যে রাজনৈতিক লাইন অনুসরণ করেছে তা হল – ভারত চীনের সাথে এসব প্রতিষ্ঠান গড়তে চলে যেতে পারে আমেরিকাকে এই ভয় দেখিয়ে এটাকে জিম্মির বুটি বানিয়ে এ থেকে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা। সারকথায় পুরানা গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারটার আয়ু আরও লম্বা করে দেওয়া। যেমন, ভারতের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি হয় নি সেটা বিবেচ্য না, কিন্তু ভারতের লোভ বর্তমান জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে চীন বা আমেরিকার মতই ভেটো মেম্বার কিভাবে হওয়া যায়। আর এই লোভের কথা টের পেয়ে আমেরিকারও তাকে মুলা ঝুলিয়ে নাচিয়ে বেড়াচ্ছে। এই মিথ্যা লোভের তীব্রতা বুঝার জন্য ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে হাসিনার প্রথম ভারত সফরে মনমোহন-হাসিনার যে ৫১ দফা যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষর হয়েছিল এর ৪৮ নম্বর দফা দেখা যেতে পারে। ঐ দফা বলছে, “ভারতের ভেটো মেম্বার হবার খায়েসে বাংলাদেশ ভারতকে সমর্থন করে”। অর্থাৎ এর অর্থ হল, প্রণবের ভারত কল্পনায় নিজেকে এমন এক আগামী দুনিয়ার স্বপ্ন দেখে যেখানে আদতে পুরানা গ্লোবাল অর্ডারটাই থাকবে আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম ভারতকে চীন ঠেকানোর পুরস্কার হিসাবে তাদের স্বার্থে সাজানো গ্লোবাল অর্ডারকে টিকিয়ে রাখে এমন জাতিসংঘের মত প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের মতই সমান গ্লোবাল ক্ষমতায় ভারতকে পাশে বসাবে। এভাবে পুরান ময়লার ভিতরে প্রণবের ভারত নিজের ভবিষ্যৎ দেখে, এর বেশি ভাবতে পারে না। এটা ভারতের কংগ্রেস নেতৃত্বের চিন্তা-প্রতিবন্ধতার সমস্যা, তারা স্বপ্ন দেখতেও শিখেনি। তারা জানতে শিখতে খবর করতে এখনও অক্ষম যে ১৯৪৪ সালে কোন শর্ত বা পরিস্থিতিতে পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এসব গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো আমেরিকা গঠন করে নিতে পেরেছিল। কাদের মধ্যে ভেটো ক্ষমতা ভাগ করে নেয়া হয়েছিল, কেন তা সম্ভব হয়েছিল। এ সম্পর্কে স্টাডি করে সেটা না বুঝলে এটা বুঝা যাবে না এই অর্ডার ভেঙ্গে পড়বে কেন এবং কখন। কোন্‌ আলামত দেখলে তা বুঝা যাবে। অথবা কেন তারা আজ গ্লোবাল অর্ডারের পড়তি দশায় ভারতকে তাদের সমান আসনে বসাবে অথবা আদৌ বসিয়ে দিতে পারে কি না। একদম মৌলিক প্রশ্ন – জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা কি কেউ কাউকে অনুগ্রহ করে অথবা চীনকে জিম্মি করার বুটি হিসাবে দিবার বিষয়? নাকি নিজেই নতুন গ্লোবাল অর্ডার গড়ে নিজেই তা নিবার বিষয়? প্রণবের কংগ্রেস চিন্তা কতবড় নাবালক এরই প্রমাণ এগুলো। ভারতের ভেটো সদস্য হবার স্বপ্ন দেখাটা শুধু স্বপ্ন অর্থ কোন সমস্যার নয়। কিন্তু চিন্তার দেউলিয়াত্ব বা সমস্যা হল, নতুন গ্লোবাল অর্ডার গড়ে উঠার উদ্যোগে সামিল না হয়ে বরং আমেরিকার অনুগ্রহে পাবার চেষ্টা আর পুরান অর্ডারের ময়লা ঘেঁটে এর মধ্যেই নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপায় মনে করা। তারা ভুলে থাকতে চায় অথবা খেয়াল করেই হয়ত দেখেনি যে, আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম ভারতকে তাদের সমমর্যাদা দিবার লোভ দেখানোর অর্থ কি? এটা কি পশ্চিমের নিজেদেরই ঢলে পড়া গ্লোবাল অর্ডারে নিজেদের গুরুত্ব বা মর্যাদাকে চ্যুত করা নয়? সারকথায় পশ্চিমের উপস্থিত সমস্যা হল, পুরান গ্লোবাল অর্ডারের পড়ে যাওয়াটাকে কি করে ঠেকানো যায় অথবা অন্ততপক্ষে দেরি করিয়ে দেয়া যায়। সেই দশায় সে কাকে কি দিতে পারে? কেন দিবে? আমাদের সৌভাগ্য যে প্রণবের এসব এবসার্ড স্বপ্ন তাদের সরকার ক্ষমতা থাকা অবস্থাতেই অকেজো, ফলহীন বৃক্ষ হয়ে হাজির হয়ে গিয়েছিল। তাসের ঘরের মত প্রণবের স্বপ্নের ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক নন-ফাংশনাল হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এটা আজ প্রমাণিত যে এই লাইন অনুসরণ করে ভারতের পাতে কিছুই আসেনি। আমেরিকার সাথে তার জমে উঠা দূরে থাক, এশিয়ায় আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থকে জায়গা করে দিতে গেলে এখন খোদ ভারতের মৌলিক স্বার্থ জলাঞ্জলি যায় এটা আজকের বাস্তবতা। ফলাফলে আমেরিকার সাথে মনোমালিন্য আর ঝগড়া তুঙ্গে নিয়ে কংগ্রেস ভারতের ক্ষমতাকাল শেষ করেছিল।
    তাৎপর্যপূর্ণ হল, প্রণবের এই অবাস্তব ও অকেজো আমেরিকান অনুগ্রহ পাবার স্বপ্নের বলয়ের মধ্যেই বাংলাদেশে শেখ হাসিনার রাজনীতি ঘুরপাক খেয়েছে। হাসিনা-প্রণব সম্পর্কের গভীরতা বাংলাদেশকে দিল্লি হয়ে মার্কিন অনুগ্রহের মধ্যে রাখা সম্ভব হয়েছিল, ঢাকা ওয়াশিংটনের বিভিন্ন ইস্যুতে দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও। প্রণবের দিল্লি বোঝাতে চেয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার দায় দিল্লির, বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন মনোমালিন্য সেই ক্ষেত্রে বড় কোন সংকট হয়ে ওঠে নি। প্রশ্ন হচ্ছে দিল্লীর মার্কিন অনুগ্রহ পাবার মধ্যে বাংলাদেশের স্বার্থ কি? সেটা বোঝা যাবে ভারতের মনমোহনের সাথে শেখ হাসিনার যৌথ ঘোষণার মধ্যে। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে যা স্বাক্ষরিত হয়েছে। অর্থাৎ হাসিনার ক্ষমতায় আসার প্রায় ঠিক একবছর পর। এটা ভারতের সমর্থনে হাসিনার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার স্বপ্ন, হাসিনা মানে দিয়েছিলেন যে তার স্বার্থই বাংলাদেশের স্বার্থ। এমনকি দল হিসাবে এটা আওয়ামী লীগের স্বার্থ এটাও অনিবার্য ধরে নেয়ার কারণ নাই। প্রণবের সরকারের আয়ু-দশাতেই এটা প্রমাণিত যে প্রণব ও কংগ্রেসের স্বপ্নটাই অবাস্তব। ইতোমধ্যে ভারতে সরকারই বদলে গিয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা এখনও সে পথেই আছেন। ভারতের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যে সকল বিষয় ভারতের স্বার্থে যায় তাকেই হাসিনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানদণ্ড মেনে সিদ্ধান্ত দিয়ে যাচ্ছেন।। এই ভরসায় যে দিল্লী তাতে অনুরাগ বোধ করবে এবং মূল্য হিসাবে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা ভারতের স্বার্থ হয়ে উঠবে। প্রণব যেমন ছিলেন, এখন মোদীও যেন হাসিনার পক্ষে ভারতের সমর্থন নিয়ে হাজির হন বা হবেন। কিন্তু এর মিসিং লিঙ্ক হল, প্রণব বা কংগ্রেস সরকার ক্ষমতাচ্যুত। যদিও একই চিন্তার লাইনের গোয়েন্দা-আমলারা রয়ে গেছেন। কিন্তু মোদী কি গোয়েন্দা-আমলাদের দ্বারা প্ররোচিত প্রভাবিত হবেন? এখনও কিছুই স্পষ্ট নয়। আপাতত এতটুকু বলা যায় যে মোদীর সরকার পরিচালনা নীতি স্পষ্টতই সেদিকে নয়। মোদী প্রণবও নন।

    [এই রচনা প্রথমে চিন্তা ওয়েবে ছাপা হয়েছিল এখানে গত ১৮ জানুয়ারী ২০১৫। এখন এখানে আরো আপডেটসহ আবার এডিট করে ছাপা হল।]

     

  • মোদি কি হাসিনার থেকে ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” কিনতে আগ্রহী

    মোদি কি হাসিনার থেকে ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” কিনতে আগ্রহী
    হাসিনা লোভনীয় সম্পদ নাকি দায়

    গৌতম দাস

    ০২ জুলাই ২০১৪।
    ভারতের নবগঠিত মোদি সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তিনদিনের সফরে বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন। তাঁর সফরকে কেন্দ্র করে ভারতীয় মিডিয়ায় দাদাগিরি মন্তব্য আর মুই কি হনুভাব আবার চেগে উঠেছে। ভারতের নির্বাচন শুরু হবার পর থেকে ফলাফল প্রকাশ শেষে সুষমার বাংলাদেশ সফরের আগে পর্যন্ত – সব মিলিয়ে প্রায় চার-পাঁচ মাস এসব উতপাতে ভাটা পড়েছিল। এমনিতেই ভারতের সব তরফের দাদাগিরিতে আমরা অস্থির অসহ্য থেকেছি গত প্রায় ছয় বছর। এর উপরে আরও সবচেয়ে অসহ্য ঠেকে ভারতের মিডিয়া, সেরের উপর যেন সোয়া সের। “রাজার চেয়ে পারিষদ বলে শতগুণ”। এরা বুঝতেই পারে না সবকিছুর একটা সহ্য সীমা লিমিট আছে। এরপর সেটা বুমেরাং হয়।
    ভারতীয় মিডিয়া তবু যদি গ্লোবাল ইকোনমিক বা পলিটিক্যাল অভিমুখ বুঝতে নজর দেবার ক্ষমতা দেখিয়ে তাতে ভারতের কি সম্ভাবনা – ভারত কোন উচ্চতায়, সম্ভাব্য কোন ভুমিকায় তার অবস্থানের গুরুত্ত্ব, মোদি সেটা কিভাবে পাঠ করছেন ও নীতি নিচ্ছেন এনিয়ে যদি তাদের উগ্রজাতিবাদী জোশমুক্ত ও নির্মোহ কোন বাস্তব মুল্যায়নের উপরে দাঁড়ানো কথা বলতে দেখা যেত তাও নাহয় সহ্য করা যেত। সেদিকে না গিয়ে বরং গায়ে মানে না আপনি মোড়লি মন্তব্যের নামে উস্কানিমূলক কলাম আবার প্রতিদিন একটা না একটা পত্রিকায় ছাপা শুরু হয়েছে।
    কাকে ফেলে কার কথা দিয়ে শুরু করব? দ্যা হিন্দু পত্রিকার সুহাসিনী হায়দার, না টাইমস অব ইন্ডিয়ার এডিটোরিয়াল নাকি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের শুভজিত রায়ের কথা? এছাড়া বিখ্যাত আঁতেল ডঃ সুবীর ভৌমিক তো নিয়মিতই আছেন। মোদির বিপুল জয়লাভের পর আবার দেখা গেল কেউ কেউ পুরা ভোল পালটিয়ে ফেলেছেন। যেমন, ডঃ সি রাজামোহন, গত দশ বছরের কংগ্রেস শাসনে তিনি নয় বছরই কংগ্রেসের বাংলাদেশ নীতির সমর্থক ছিলেন। যা আসলে সেসময়ের ভারতের পিঠে হাত রাখা আমেরিকার সমর্থিত কংগ্রেসের নীতি ছিল। কিন্তু কংগ্রেসের সাথে আমেরিকার বিবাদ শুরুর পরের সময়ে তিনিও কংগ্রেসের শেষের বছর একটু দুরত্ত্ব রাখছিলেন। আর সেই তিনি এখন একেবারে মোদি ভরসা। সপ্তাহ দুয়েক আগে তিনি বাংলাদেশে এসে সভা সেমিনারে বক্তৃতা দিয়ে গিয়েছেন। সেই সাথে গত ১৩ জুন চ্যানেল আই টিভিতে টকশোর সময়ে এক সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সুবীর আর রাজামোহন মূলত আমেরিকান খুটি ভরসা মানে আমেরিকা ভারতের পিঠে হাত রাখায় বলশালী অনুভব করে কথা বলতেন। তাদের ভারতই বিশাল রুস্তম এই ভাবের উপর দাঁড়িয়ে তাঁরা বাংলাদেশের রাজনীতি ও জনগণকে তুচ্ছ জ্ঞান করে কথা বলতেন।

    অর্থনৈতিক উন্নতি বনাম রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা
    মোদির উত্থানে কংগ্রেস টানা দশ বছর ক্ষমতায় কাটানোর সমাপ্তি ঘটল। এই শাসনকালের শুরুটা কেটেছিল ওয়ার ওন টেররের রমারমা কোলে। বুশের আমেরিকার দরকার ছিল ভারতকে কোলে তুলে নিবার, পিঠে হাত রাখার। কিন্তু কংগ্রেসের ভুল ছিল সে ঐকালকে বুঝেছিল আমেরিকা পিঠে হাত রাখায় আশেপাশে পড়শির উপর রুস্তমি দেখাবার কাল হিসাবে। কংগ্রেসের অযোগ্যতা হল ঐ সময়ের আসল দিকটা পাঠ করতে না পারা। সেটা হল, গ্লোবাল ইকোনমিক বা পলিটিক্যাল অভিমুখ মোচড় দিয়ে পরিবর্তিত হয়ে, এশিয়ামুখি হয়ে পাশ ফিরে শুতে চাচ্ছে। তথাকথিত “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা” হাসিলের নামে রুস্তমি করলে নিজ অর্থনীতি বিকশিত হবে নাকি গ্লোবাল অর্থনীতি এশিয়ামুখি হওয়াতে যেসব সুবিধা ভারতের জন্য ধেয়ে হাজির হচ্ছে তাকে কাজে লাগানোই নিজ অর্থনীতি বিকশিত করার পথ – রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নাকি অর্থনীতি কোনটা ফোকাস হবে এখান থেকেই এর পয়েন্ট অব ডিপারেচার; পথ আলাদা হয়ে বিভক্ত। কংগ্রেস তথাকথিত “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা” বলে বিষয়টাকে বুঝছিল। আর এরই তৈরি আবর্জনার নাম বাংলাদেশের বর্তমান হা্লের হাসিনার সরকার। গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে এটা সবার কাছে দিনের মত পরিস্কার ছিল যে বিগত কংগ্রেস সরকার হাসিনাকে তাদের বিশেষ পছন্দের সরকার হিসাবে পেয়েছিল। অবস্থা এমনও দেখা গেছে যেন বাংলাদেশ আলাদা রাষ্ট্র হলেও নিজের স্বার্থকে ভারতের স্বার্থের অধীনস্ত রেখে সরকার চালানো – এমন নীতিতে সাজানোর জন্যই হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সেটা ভরা নদী ভরাট করে ভারতীয় যান চলাচলে বিনা খরচের ট্রানজিট দেয়া থেকে শুরু করে সীমান্তে বিএসএফের নির্বিচারে বাংলাদেশি হত্যার জন্য উলটা ভারতের পক্ষেই সাফাই গাওয়া পর্যন্ত সবকিছুতে। এছাড়া খুবই কৌশলে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে অসংখ্য অমীমাংসিত ইস্যু থাকা সত্ত্বেও সেগুলো যেন কেবল দুটো -তিস্তার পানি আর সীমান্তে ভুমি বিনিময় – এভাবে নামিয়ে আনতে মিডিয়া প্রচার প্রপাগান্ডায় সফলতা দেখিয়েছেন হাসিনা। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে ঐ দুটা ইস্যুও কোন ধরণের মীমাংসা ছাড়াই কংগ্রেস সরকারের সময়কাল শেষ হয়েছে। এরপরও হাসিনার পাঁচ বছর শাসনের শেষে ভারতের আবদার আর হাসিনার খায়েসের শেষ হয়নি। বাংলাদেশে ভারতের হাসিনাকেই আবার ক্ষমতায় চাই, তাতে বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্খা জাহান্নামে যাক – এই অবস্থান নীতি নিয়েছিল। এভাবে বাংলাদেশ ছিল ভারত সরকারের তাদের তথাকথিত “নিরাপত্তা স্বার্থের” নামে এক অবারিত অভয়ারণ্য – কংগ্রেসের এই আগ্রাসী ও জবরদস্তির নীতির সহায়ক ছিল ভারতের আমলা, কূটনীতিক ও গোয়েন্দা বিভাগ, আর সবার উপরে ছিল ভারতীয় মিডিয়ার ঐ দঙ্গল। সবাই একটা বিষয়ে একমত হয়ে কাজ করেছিল যে ভারতের “নিরাপত্তার স্বার্থের” নামে তাদের পড়শি অপর রাষ্ট্রে যা খুশি করার জন্য বাংলাদেশকে নিজেদের অবারিত অভয়ারণ্য করে নিতে পারে। যেন এটা জায়েজ। আর এটাই নাকি বাংলাদেশের ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র, ভারতের সাথে সম্পর্ক ভাল হয়ে থাকার মডেল। এই প্রচার ভারতের মিডিয়ায় তুঙ্গে করে রেখেছিল এই খেদমতগারেরা। বাংলাদেশের সাথে ভারতের অমীমাংসিত ইস্যু নাকি কেবল দুইটা এটা প্রতিষ্ঠা করার পরও তা নিয়ে কোন অগ্রগতি না হওয়াতে ভারতের ঐ ম্যানেজড মিডিয়াও লজ্জায় পড়ে। মুখ লুকানোর জায়গা খুজে না পেয়ে এদের কেউ কেউ শেষ বছরে কংগ্রেস সরকারের মৃদু সমালোচনা শুরু করে, সরকারের সাথে নিজেদের দুরত্ত্ব প্রকাশের চেষ্টা করে। দায়দায়িত্ত্ব অস্বীকার করে।
    এটা পরিস্কার যে নতুন মোদির সরকার কংগ্রেসের এই নীতি ভারতের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকারক হয়েছে এমন ভাবতে শুরু করেছে। বহুবার বলেছি, মোদি বিজেপির প্রধানমন্ত্রী এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু বিজেপির অতীত কেমন তা দিয়ে এবারের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে বুঝতে চাওয়া ভুল হবে। অন্তত মোদির প্রথম দুই বছরে কি ফলাফল অভিমুখ তৈরি হয় সেটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ফলে বিজেপির মোদি নয়, মোদির বিজেপি কি তা বুঝতে চেষ্টার দরকার আছে। মোদির বিদেশনীতির মুখ্য ফোকাস অর্থনৈতিক উন্নতি বা নিজের জনগণকে কাজ দেবার চ্যালেঞ্জ। অন্যভাবে বললে, আসন্ন গ্লোবাল অর্থনৈতিক উলটপালটের সুবিধা বুদ্ধিমানের মত ব্যবহার করে এক ফাইন টিউনের মধ্য দিয়ে নিজের বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে হাজির হবার যে সুযোগ দেখা দিয়েছে তাকে উপযুক্তভাবে ব্যবহার করা। বিপরীতে কংগ্রেসের ফোকাস ছিল তথাকথিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা। মোদির হুশজ্ঞানের সাথে যদি তুলনা করি তবে বলতে হয় কংগ্রেস অবুঝ শিশু, পোলাপান। প্রথমত ভারতের গ্লোবাল সম্ভাবনার কথা কংগ্রেস বুঝেই নাই। অথবা বুঝেছে আমেরিকান স্বার্থের ফাঁদে পড়ে। ওয়ার অন টেররের নীতির দিক থেকে। যেটা আগে বলেছি কংগ্রেস মনে করেছে গ্লোবাল অর্থনৈতিক উলটপালটে হাজির সুবিধা কথার অর্থ আমেরিকার ভারতের পিঠে হাত রাখা। আর তাতে ভারত অর্থনৈতিক অর্থে নয় রাজনৈতিক ষ্ট্রাটেজিক অর্থে পরাশক্তির ভুমিকায় এসে গেছে। এভাবে এতটুকুই বুঝেছে। কিন্তু নিজেকে মৌলিক প্রশ্নটা করে নাই যে নিজের অর্থনৈতিক ভিতের উপর না দাঁড়িয়ে কেউ রাজনৈতিক পরাশক্তি হতে পারে কি না। কারও যাতাকাঠি ধার করে রাজনৈতিক পরাশক্তি ভাবের মাসল দেখিয়ে পড়শিকে ধরব মারব কাটব – এটা কি ধার করে দেখানোর জিনিষ? কংগ্রেস আমেরিকার ওয়ার অন টেররের মধ্যে নিজের বিশাল সম্ভাবনা দেখেছে, আমেরিকান যাতাকাঠি হাতে পেয়ে নিজের আঞ্চলিক মোড়ল হবার চকচকে লোভে পড়েছে, ফাঁদে পড়েছে। অথচ গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরাশক্তিগত যে উলটপাল্ট চলছে এর প্রধান অভিমুখ ও ইঙ্গিত হল ভারতের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হবার সম্ভাবনা। আর কোন রাষ্ট্র নিজ সক্ষমতায় অর্থনৈতিক পরাশক্তি হলে সেই সাথে এবার তার রাজনৈতিক ষ্ট্রাটেজিক পরাশক্তি হিসাবে উদয় হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর সেটা এমন নিজের পায়ে দাঁড়ানো যা অন্য কেউ চাইলেও অস্বীকার করতে পারে না। মোটা বুদ্ধির শর্টকাটে মারা লোভি কংগ্রেস এসব দিকে খবর না রেখে নিজদেশের গত দশ-বার বছর নষ্ট করেছে পিছিয়ে দিয়েছে – শুধু নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছে, নিজের অর্থনীতি ধুঁকে মরার অবস্থায় নিয়ে গেছে তাই নয়, এই অঞ্চলে সবচেয়ে ক্ষতি করেছে বাংলাদেশের।
    এই ব্যাপারটাকে এককথায় বললে, কংগ্রেসের ফোকাস ছিল অর্থহীন তথাকথিত “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা” আর বিপরীতে মোদির ফোকাস অর্থনীতি। আবার এর মানে এমন নয় যে মোদি ভারতের সত্যিকারের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে খাটো করছেন, তা নয়। যেমন উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, পাকিস্তানের নওয়াজ শরীফকে তিনি কি বলতে পারেন? ডিল রফা করবেন এভাবে যে কাসাবদের বোম্বাই হামলার মত বিষয়গুলো আর না ঘটার বিষয়ে তিনি পাকিস্তানের নীতিগত সক্রিয়তা ও নিশ্চয়তা চান। আর এই নিশ্চয়তা নিয়েই তিনি পাকিস্তানসহ এই অঞ্চলের সকলে মিলে এক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট করে সব দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির পথে হাটতে চান। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটা আসলে বিচ্ছিন্ন আলটপকা আলাদা বিষয় নয়, গ্লোবাল অর্থনৈতিক উলটপাল্টের সুবিধায় এশিয়ার যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে সেই অর্থনীতি ফোকাসে পথ চলার অবিভাজ্য অংশ।
    অর্থনৈতিক উন্নতি বনাম রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা – বলে দুই ফোকাসের ভাগ দেখালাম এটা কি কাল্পনিক? মোদির উপরে নিজের মনের ভালভালাইয়া সৎ খেয়ালে আরোপ করা? মোটেও নয়। মোদির সরকারের বয়স মাত্র একমাস। ওর নীতিগত দিক কি হতে যাচ্ছে তার অনেককিছু অনুমান করা, অপ্রত্যক্ষে জানা গেলেও লিখিত ডকুমেন্টে এখনও তা যথেষ্ট হাজির নয়। কিন্তু তবু সুষমার এই সফরে তাঁর এক লিখিত বক্তব্য আমরা ইতোমধ্যেই হাতে পাই। সুষমার টাইট কর্মসুচীতে বিকেলে এক সেমিনারে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। ওখানে এক লিখিত বক্তব্য তিনি পড়েছিলেন যা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটেও গুরুত্ত্বের সাথে পাবলিক করে দেয়া হয়েছে। সুষমার এই সফরে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক প্রস্তুতি করেই যে তিনি এসেছিলেন এর ছাপ সব জায়গায় আছে। যেমন ভারতের নতুন সরকারের দিক থেকে দেখলে প্রথমত গত ছয় বছরে কংগ্রেস বাংলাদেশে যথেচ্ছাচার তান্ডব করেছে, অথচ তাতে অর্থনৈতিক বা ষ্ট্রাটেজিকভাবে ভারতের জন্য এমন কোন লাভালাভ ফল আনে নাই যা নিজে টিকে থাকে। বরং এটা অজস্র দায় ও আবর্জনা তৈরি করেছে। বিশেষত ঐ আবর্জনা পরিস্কার না করে ওর উপরে মোদির নতুন কোন নীতি কার্যকর হবে না – তা মোদি ও তাঁর নীতিনির্ধারক টিমের লোকজনের উপলব্দি হয়েছে বলে মনে করার কারণ আছে। যেমন ভারতের অর্জনের দিক থেকে দেখলে এখন ভারতের সামনে আষ্টেপৃষ্টে বাধা এক হাসিনার বাংলাদেশ আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু এটা ভারতের জন্য এক বিশাল দায়। এর মূল কারণ ক্ষমতা ভিক্ষা করা হাসিনার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশই হাসিল করে আছে ঠিকই কিন্তু হাসিনারই নিজ দেশে কোন বেইল নাই। অন্তত পাবলিক রেটিং এর দিক থেকে যদি বলি এটা যতটাই শুণ্য এটা ভারতের জন্য ততটাই বোঝা। হাসিনা ও তার কিছু সুবিধাভোগি ছাড়া সারা বাংলাদেশের সব কোনা আজ ভারত বিরোধি হয়ে উঠেছে। এমনকি বাম রাজনীতিক যারা এর আগে কখনই ভারতের জবরদস্তির বিরুদ্ধে কিছু বললে সেটা নাকি “সাম্প্রদায়িক হয়ে যাবে” এই পবিত্র শুদ্ধ থাকার লোভে কখনও এনিয়ে কথা বলে নাই সেই বামেরাও এখন সোচ্চার হতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি বহু আওয়ামি বন্ধুকে বলতে শুনেছি হাসিনা নিজেকে বিক্রি করছে কাজটা খারাপ। কিন্তু কি করব আমি আমার ফয়দাটাই কেবল এখান থেকে তুলে নিচ্ছি কিন্তু কোন দায় নিব না। কংগ্রেসের হাসিনার বাংলাদেশ রেটিং আজ এমন দুরবস্থায়। কিন্তু তবু এই রেটিং শুণ্য হাসিনাকে দিয়েই বাংলাদেশ থেকে কোন লাভালাভ সুবিধা ভারত যদি আদায় করতে চায় তবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আরও জবরদস্তির উজান নৌকা তাকে বাইতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্খার সরাসরি বিরুদ্ধে গিয়ে মোদির ভারতকে দাঁড়াতে হবে। স্বভাবতই এটা ভারতের সুবিধা নয়, লায়াবিলিটি। ওদিকে মোদি যে স্বপ্ন দেখে তাতে তাঁর দরকার বাংলাদেশকে এক গুরুত্ত্বপুর্ণ অর্থনৈতিক পার্টনার হিসাবে, কংগ্রেসের মত ভারতের তথাকথিত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে এক দাস বাংলাদেশ নয়। যেমন প্রেমের বেলায় পুর্বশর্ত হল, কেউ কারও দাস হলে চলবে না, পার্টনার উভয়কে উভয়ের জবরদস্তি থেকে মুক্ত হতে হবে। যে মাত্রায় মুক্ত সেই মাত্রায় লেবেলের প্রেম-সম্পর্ক হবে। জমিদারের প্রেমাকাঙ্খা নিজ কুলবধুর সাথে মিটে না, কারণ ওখানে বধুর ভুমিকা কেবল কুল বা বংশরক্ষা ও বিস্তারের মধ্যেই সীমিত। তাই জমিদার দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাতে বাঈজির কাছে যায়। আসলে জমিদারের দরকার কুলবধু আর বাঈজি এই দুই ভুমিকার মিলিত এক বধু। আবার সেটা যদি হাসিলই হয় তখন দেখা যাবে জমিদার আবার জমিদার নাই। জমিদারি পরিচয় লোপ পেয়ে নিজেই অর্থনৈতিক উতপাদনের উদ্যোক্তা হয়ে গেছে। মোদি জানে নিজের উদ্যোক্তা ভুমিকা। ফলে তাঁর দাস নয় বা দাসের বোঝা নয়, এক মুক্ত ও সক্রিয় পার্টনার বাংলাদেশকেই তার চাই।
    মুক্ত ও সক্রিয় পার্টনার বাংলাদেশকেএগুলো কোন সুখস্বপ্ন কল্পনা নয়। সুষমা লিখিত বক্তব্যে বলছেন, “We are convinced that India’s development cannot be complete and sustainable unless we succeed in building productive partnerships with our immediate neighbours. We will, therefore, devote our energy to working much more closely with our neighbours in pursuit of our development goals. We will walk the extra mile to create opportunities and to build virtuous cycles of prosperity in the region. We will pursue the goal of economic integration and interconnectedness through trade, investment, transportation, capacity building, environment friendly practices and means that promote equitable development in the region”। নিজ দায়িত্ত্বের এর বাংলা করে বললে সুষমা বলছেন, “আমরা বুঝতে পেরেছি ভারতের (অর্থনৈতিক)বিকাশ নিজে টিকে থাকার মত স্থায়ী ও সম্পুর্ণ হতে পারে না যদি সংলগ্ন পড়শীদের সাথে কার্যকর সক্রিয় পার্টনার সম্পর্ক আমরা তৈরি করতে না পারি। তাই আমরা আমাদের বিকাশের লক্ষ্য অভিমুখে আমাদের পড়শিদের সাথে আরও ঘনিষ্টভাবে কাজ করতে আমাদের শক্তি ব্যয় করব। এই অঞ্চলের এমন সুযোগ সুবিধা আর দায়িত্ত্ববান সমৃদ্ধির চক্র (virtuous cycles of prosperity) তৈরি করতে আমরা নিজেই আগবাড়িয়ে বাড়তি পথ হাটব। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যাতায়াত,অবকাঠামোগত সক্ষমতার এক প্রকৃতি-পরিবেশ সহায়ক চর্চা তৈরির মাধ্যমে ও উপায়ে আমাদের অর্থনীতিগুলোকে পারস্পরিক পরিপূরক ও আন্তঃনির্ভরশীল করার লক্ষ্যে আমরা জোর দিব যা এই অঞ্চলে সবার সমান বিকাশ (equitable development)আগিয়ে নিবে”।

    BCIM জোটের তাতপর্য
    অনেকের মনে হতে পারে কুটনীতিক বাকচাতুরি ভাষায় এরকম অনেক কথাই তো বলা হয়,এটাকে এত গুরুত্ত্ব দিবার কি আছে। না, এটা কুটনীতিক বাকচাতুরি ভাষার কথার কথা নয়। সেজন্য আরও কিছু পটভুমির কথা বলব, যে পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আমাদের কথাগুলো পাঠ করতে হবে।
    অনেকবার বলেছি,১)গ্লোবাল অর্থনীতি এখন এশিয়ামুখি। ২)দুনিয়ার আগামি নির্ধারক দুই অর্থনীতি চীন ও ভারতকে কেন্দ্র করেই এশিয়ামুখি গ্লোবাল অর্থনীতি আবর্তিত হবে। ৩) চীন ও ভারতের মধ্যে অর্থনৈতিক সক্ষমতার উচানিচা আছে আর এই দেশদুটোর ঠিক মাঝেই বাংলাদেশের অবস্থান। ফলে সক্ষমতার উচানিচার ভিতর জোটের (BCIM জোট, বাংলাদেশ,চীন,ভারত ও মায়ানমার মিলিয়ে যে অর্থনৈতিক জোট)নীতিগত সাম্য এবং ভারসাম্য তৈরিতে বাংলাদেশের ভুমিকা খুবই গুরুত্ত্বপুর্ণ হবে। [আমেরিকার প্ররোচনায় পড়ে কংগ্রেসের ভারত এতদিন এই সম্ভাবনাকে ছুপিয়ে রেখেছিল, উপেক্ষা করেছিল। মাত্র গত ২০১৩ সালের অক্টোবরে বিষয়টাকে আমেরিকার উপর প্রতিহিংসা ও রাগ দেখানোর বিষয় হিসাবে উপস্থাপন করে এবার সে নিজেই BCIM ঢোল পিটিয়েছিল।ঐ সময় চীনের সাথে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ভিতর দিয়ে ভারত-চীনের পারস্পরিক সীমান্ত হামলার সন্দেহের সমাপ্তি হয়।যদিও ভারতের বেশির ভাগ মিডিয়াই এখনও এই তথ্য আড়াল করে ভারত-চীনের কোন প্রসঙ্গ আসলেই তাকে সেনসেটিভ করে উস্কানি দেয়ার খাসিলত ত্যাগ করে নাই।] ৪) BCIM জোট খাড়া করা মানে এটা কোনভাবেই আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা মিটানো নয়। আমেরিকার কাছে নিজের দাম বাড়ানোর জন্য চীনের কোলে চলে যাবার ভয় দেখানো নয়। আমাদেরকে কাজ করে দেখাতে হবে। এই চার দেশের অর্থনীতিতে সব অঞ্চলে সম উন্নয়নের সিরিয়াস বিষয় এটা। ৫) কেবল ভৌগলিক অবস্থান নয়,BCIM জোটের তাতপর্য যতটা না এই অঞ্চলের চার দেশের বাইরের বাকি দেশগুলোর সাপেক্ষে নিজেদের জোটবদ্ধ শক্তি হওয়া এরচেয়েও বেশি গুরুত্ত্বপুর্ণ হল জোটের বাইরে নয় বরং এই চার দেশের প্রত্যেকের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সুষম বিকাশের দিকটা। মূল কারণ এই BCIM অঞ্চলটা মুলত চীন ও ভারত উভয়েরই ল্যান্ডলকড পুর্বাঞ্চল। যার আবদ্ধ অবস্থা থেকে সরাসরি সড়ক রাস্তাঘাটের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত যোগাযোগের দুয়ার খোলার উপায় BCIM জোট। ফলে তা এই অবরুদ্ধ অঞ্চলগুলোতেও স্ব স্ব মূল রাষ্ট্রের সব জায়গার মতই সমান অর্থনৈতিক বিকাশের উপায়। আর এই মুক্তি ঘটবে বাংলাদেশ ও বার্মার ভুমির উপর দিয়ে এবং বাংলাদেশে নির্মিতব্য গভীর সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে। ফলে “ভারতের বিকাশ পড়শিদের উপর নির্ভরশীল আর স্থায়ী ও সম্পুর্ণ হবার উপায়” – একথাটা একেবারেই বাকচাতুরি কূটনৈতিক রেঠরিক নয়। সুষমা বা মোদি একথা “বুঝতে পেরেছে” তা স্বীকার করলে বা না করলেও তখনও এটা সত্যি। এছাড়া প্রত্যেকের আভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিকাশের দিক মুখ্য করে এই অর্থনৈতিক সহযোগিতার জোট যদি ঠিকমত দাঁড়িয়ে যেতে পারে তবে এশিয়ার বাকি অঞ্চলের উপরে এই জোট ভারকেন্দ্র ভুমিকায় চলে আসবে। কল্পিত সে পরিস্থিতি -এটা আর শুধু বাংলাদেশ থেকে সংকীর্ণ ভারতের জবরদস্তিতে ও বিনাপয়সায় ট্রানজিট আদায় করার মত মুদি দোকানি ভাবনা নয়। যেমন, কংগ্রেসের ভারত যে কতবড় ছেচড়া খুদে মুদি দোকানি তা বুঝা যায় তাদের আগাবার পদ্ধতির দিকে দেখলে। তারা জোর দিয়েছিল বাংলাদেশ থেকে ট্রানজিট অনুমতির কাগজ যোগাড়ে এবং তা বিনা পয়সায় হতে হবে। কিন্তু অনুমতি সে তো একটা কাগজ মাত্র। কাগজের উপর দিয়ে তো ভারতীয় মালামাল পারাপার হবে না,বাস্তব রাস্তাঘাট অবকাঠামো লাগবে,আর সেটা যে সে না ভারি যানবাহন চলার অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক ট্রাফিক রুল,প্রটোকল, ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি অনেক কিছু। এমনকি বাংলাদেশের নিরাপত্তা স্বার্থকথা যদি বাদও দেই তো তবু তাতে ভারতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলে একটা কিছু লাগবে। ফলে অন্তত ৫০০ কিমি ভারি রাস্তানির্মাণের বিনিয়োগ লাগবে যেটা তা বাংলাদেশ দূরে থাক ভারতও যোগানোর সামর্থ রাখে না। ফলে BCIM কেই জোটবদ্ধভাবে এর প্রয়োজনীয় ফান্ড যোগাড় করতে হবে। এবং এটা অবশ্যই সম্ভব শুধু নয় অন্য বিনিয়োগ দাতারা অপেক্ষা করছে। কিন্তু এই বাস্তব দিকে ভারতের কোন আগ্রহ নাই। মুদি দোকানি যেন ধরেই নিয়েছে ভারতের ট্রানজিটের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ চাহিদা বাংলাদেশের অর্থনীতিই পূরণ করবে। কিন্তু কেমন করে – এটা ভারতের ভাবনার বিষয় নয়। বরং ভাবটা এমন যেন হাসিনার ক্ষমতায় রাখার বিনিময়ে ওর কাছ থেকে একটা অনুমতির কাগজ হলেই তো ভারতের হবে। এজন্যই একে মুদি দোকানি বলছি যে নিজেকেও ক্ষুদ্র করে রাখে,নিজেকে অবাস্তব ও ক্ষুদ্রস্বার্থের আলোকে হাজির করে। অন্যদিকে ব্যাপারটাকে আবার বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে তার ভারতের শত্রু হয়ে থাকার কোন কারণ নাই,মতলব উদ্দেশ্য লক্ষ্যও হতে পারে না,কোন ফয়দা নাই,যদি না সেটা যে করেই হোক বাংলাদেশের স্বার্থ নয় সংকীর্ণ কেবল হাসিনার ক্ষমতায় থাকতেই হবে এই স্বার্থ হয়। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের অমীমাংসিত ইস্যুর শেষ নাই বরং বাড়ছে। সেগুলোকে জবরদস্তিতে অমীমাংসিত ফেলে রেখে কেবল ভারতের এবং সংকীর্ণ করে তা ট্রানজিটের কাগজ ধরণের উপস্থাপনের চিন্তায় কংগ্রেস গত ছয় বছর চালিয়ে গেছে। বাংলাদেশের অমীমাংসিত সব ইস্যুগুলোর একটা প্যাকেজ ফয়সালা হলে ভারতের সাথে BCIM এ জোটবদ্ধভাবে সবার অর্থনৈতিক বিকাশে সামিল না হতে বাংলাদেশের আপত্তির কিছু নাই, থাকতে পারে না। সেখানে তখন কেবল ভারতের ট্রানজিট খুবই ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ বিষয়। বরং BCIM এর ট্রানজিট হাব হওয়ার মধ্যেই আসলে বাংলাদেশের স্বার্থ লুকিয়ে আছে। তবে অবশ্যই তা কোন জবরদস্তিতে নয় সমান ও সমলাভের জোট পার্টনার হিসাবেই।
    সুষমা এই কথারই প্রতিধ্বনি করছেন। তাঁর virtuous cycles of prosperity শব্দ ব্যবহার যেটার অনুবাদ করেছি “দায়িত্ত্ববান সমৃদ্ধির চক্রে প্রবেশ” -একথার অর্থ বুঝতে হবে অন্য আর এক অনুমিত বিপরীত শব্দের প্রেক্ষিতে। “দায়িত্ত্ববান সমৃদ্ধি” শব্দের বিপরীতটা হল, পরস্পর রেষারেষি তথাকথিত “দেশের নিরাপত্তা স্বার্থ” এই নীতি থেকে যা উতসারিত। যেটা এতদিন কংগ্রেস অনুসরণ করেছে। মোদির সুষমা এর বিপরীতে “দায়িত্ত্ববান” হতে, হয়ে সম্ভাবনাময় সমৃদ্ধির চক্রে প্রবেশ করতে আহবান রাখছেন। ফলে এটা কংগ্রেসের নীতি সম্পর্কে মোদির মূল্যায়ন এবং তা পরিত্যাগও।
    সুষমা আগের উদ্ধৃতির শেষে আরও বলছেন,”Building a comprehensive and equitable partnership with Bangladesh is essential for the realization of our vision of a stable, secure and prosperous South Asia. History and geography have destined us to live together. How we do so is within our hands, and our hands alone.”- এর বাংলা করে বললে,”এক সুস্থির,সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া দেখার আমাদের স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ এক সামগ্রিক ও সমমর্যাদার পার্টনার, এই সম্পর্ক তৈরি করা মৌলিকভাবে জরুরি। আমাদের ইতিহাস ও ভুগোল আমাদের একত্রে বসবাসের ভাগ্য ঠিক করে দিয়েছে। এটা কি করে করব তা আমাদেরই হাতে, একান্তই আমাদের হাতে”। এখানে comprehensive and equitable partnership অর্থাৎ অনুবাদে “সামগ্রিক” ও “সমমর্যাদার পার্টনা” শব্দদুটো বিশেষ গুরুত্ত্ব বহন করে।

    সাত রাজ্যের বিদ্রোহ সমস্যাটা আসলে কি
    অর্থনীতি বনাম তথাকথিত নিরাপত্তা – কার কি ফোকাস প্রসঙ্গে এভাবে কংগ্রেস ও মোদির বিজেপির তুলনা করছি। কংগ্রেস মনে করেছিল উত্তরপুর্ব ভারতের সাত রাজ্যের বিদ্রোহ সমস্যাটা নাকি ভারতের নিরাপত্তার সমস্যা। জবরদস্তি উত্তরপুর্ব ভারতে ওদের পিটাপিটি দিয়ে আর বাংলাদেশে শিখন্ডি হাসিনার ক্ষমতা থাকা নিশ্চিত করার ভিতরেই ভারত সাত রাজ্য সমস্যার সমাধান। গত সাত বছর কংগ্রেস সমস্যাটা দেখেছে “সাতরাজ্য যেন বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়” এই নীতিতে। ফলে কংগ্রেসের চোখে এটা ভারতের নিরাপত্তা ইস্যু হিসাবে থেকেছে, আর এই নষ্টা বয়ানকে মিডিয়া তাল দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মোদির দেখবার চোখ সম্পুর্ণ ভিন্ন। মোদি অত্যন্ত সঠিকভাবে সমস্যার গোড়ায় তাকাতে পারেন। মোদির চোখে ভারতের পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলোর এমন সমস্যার সমাধান বলপ্রয়োগ বা নিরাপত্তা নয়। রিসোর্স এলোকেশন মানে সম্পদের বরাদ্দ বিনিয়োগ বাড়াতে পারলেই একমাত্র এর সমাধান। এসব রাজ্যগুলো ছোট অর্থনীতির ফলে উদ্বৃত্ত সম্পদ মানে বিনিয়োগেরও ক্ষমতা কম,ফলে নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি। মোদি কথাটা তুলেছিলেন ঠিক সাত রাজ্যকে কেন্দ্র করে নয়,মমতার পশ্চিমবঙ্গের প্রসঙ্গে। মমতার দেখার মধ্যেও সংকীর্ণতা আছে,আছে অর্থনীতিকে মানবতা দেখানোর কাজ ভেবে বিচার করার ঝোক। তিনি গরীব মানুষকে প্রায় সরাসরি নগদ অর্থ বিতরণ ধরণের বছরে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের এক কর্মসুচী চালাচ্ছেন। মমতা বলছেন তিনি তার রাজ্যের অর্থমন্ত্রীকে অর্থ যোগাড় সম্ভব কি না জিজ্ঞাসা করেছিলেন তিনি যোগাড়ে সমর্থ হয়েছেন। তাই তিনি এটা চালাচ্ছেন। ছোট অর্থনীতির পশ্চিমবঙ্গও এমনিতেই ছোট উদ্বৃত্ত সম্পদের ফলে সবসময় সক্ষমতা্র অভাবে ভুগবে এটাই স্বাভাবিক। আর এই অভাবের আকাঙ্খা মিটাতে মমতা মনে করেন কেন্দ্রের বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। এভাবেই এর সমাধান। বিপরীতে মোদি গত নির্বাচনের আগে এই সাক্ষাতকারে বলছেন,এটা কোন সমাধান নয়। বসিয়ে ভর্তুকিতে খাওয়ানো নয়,বরং কাজ সৃষ্টি ফলে বিনিয়োগ এর সমাধান। ফলে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বিনিয়োগ যোগাড় করে দেয়া কেন্দ্রের দায়িত্ত্ব মনে করেন তিনি। তিনি কেন্দ্রে গেলে এটাই করবেন।অর্থাৎ আমরা দেখছি কংগ্রেস যেটাকে যুদ্ধবাজি দমনের সংকীর্ণ চোখে “নিরাপত্তার” সমস্যা হিসাবে দেখে মোদি সেটাকে বিনিয়োগ অর্থনীতিক বিকাশে সমাধান দেখেন। দুটো এপ্রোচের আকাশ-পাতাল ফারাক এখানে।

    সুষমার আমলা বাঁচানো নাকি ড্যামেজ কন্ট্রোল তৎপরতা
    গত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কংগ্রেসের সক্রিয় হস্তক্ষেপে পক্ষ নেয়া ও কূটনীতিক সীমালঙ্ঘন করে হাসিনাকে পুন-ক্ষমতায় আনা এটা আমাদের দেশে ও বিদেশে সবাই অবাক বিস্ময়ে নজর করেছে। বাংলাদেশের জনগণ যাকেই ভোট দিতে চাক নিজেদের প্রতিনিধি মনে করতে চাক সেগুলো তুচ্ছ। কংগ্রেসের হাসিনাকেই ক্ষমতায় চাই – এই ছিল কংগ্রেসের নীতি অবস্থান। ভারতের পররাষ্ট সচিব সুজাতা সিং নির্বাচনের ঠিক আগে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশে এসে প্রকাশ্যেই সেসব ততপরতা চালিয়েছিলেন। এর কয়েকমাসের মধ্যে ভারতের নির্বাচনে খোদ সেই কংগ্রেস মোট আসনের ১০ ভাগেরও কম আসনপ্রাপ্তিতে ভরাডুবি এবং বিপুল ভোটে মোদির উত্থান – এই পটভুমিতে নতুন সরকা্রের সুষমার বাংলাদেশ সফর ঘটেছে। কংগ্রেসের ভুমিকা হাসিনা ও তার কিছু সুবিধাভোগী ছাড়া বাংলাদেশের সবার মনে দগদগে ঘাঁ এর মত জ্বলজ্বলে হয়ে আছে। সুজাতা ছাড়াও এর আর এক প্রকাশ্য প্রবক্তা হলেন হাইকমিশনার পঙ্কজ সরণ। তিনিও চাকুরিজীবি আমলার সীমায় থাকেন নাই। কংগ্রেসী হয়ে গেছিলেন। তিনিও ভারতের নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের আগে পর্যন্ত বলে গেছেন ভারতের বাংলাদেশ নীতি অপরিবর্তিত থাকবে বলে। অন্তত দুবার প্রকাশ্যে তা উচ্চারণ করেছিলেন। এটা তাঁর সীমা লঙ্ঘন। চাকুরিজীবি আমলাকে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বের অধীনতা মেনেই কাজ করতে হয়। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ত্বই রাষ্ট্রের নীতি ঠিক করেন যেখানে সেটা অনুসরণ করাই তার আমলা ভুমিকা। আর তিনি কিভাবে জানবেন কে নির্বাচিত হতে যাচ্ছে? আর কংগ্রেস আবার নির্বাচিত হলেও তো নিজের আগের নীতিতে সবটা অথবা কিছু পরিবর্তন করতে পারেন। কিন্তু তিনি প্ররোচিত হয়ে হাসিনার সমর্থকদের আশঙ্কা দূর করতে নিজেকে বলি দিলেন। নিজেকে কংগ্রেসী রাজনীতির অংশ করে ফেললেন। কিন্তু মোদির বিপুল বিজয়ের পর পঙ্কজ ঠিক সময়মত তওবা পড়ে নিয়েছেন। একাত্তর টিভিতে দেয়া সাক্ষাতকারে যেটা বিডিনিউজ২৪ ট্রান্সস্ক্রিপ্ট করে ছাপিয়েছিল। ট্রান্সস্ক্রিপ্ট থেকে এবিষয়ের প্রয়োজনীয় অংশ তুলে আনছি। ইমরোজ খালিদী প্রশ্নকর্তা, বিডিনিউজের মালিক সম্পাদক।
    খালিদী: আপনি আগে বলেছিলেন, সরকার পাল্টালেও স্বার্থের পরিবর্তন হয় না। দিল্লিতে ক্ষমতার পালাবদল হলেও ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের হেরফের হবে না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের কোন কোন স্বার্থগুলো কখনোই পরিবর্তন হবে না বলে আপনি মনে করেন?
    সরণ: আমি আমার সেই বক্তব্য স্পষ্ট করতে চাই। আমি বলতে চেয়েছি, সাধারণ বিবেচনায় দুই দেশের স্বার্থ একই থাকে এবং তা রক্ষায় সম্পর্কের মূল নীতিতে খুব একটা পরিবর্তন হয় না। কিন্তু আমি আগে যে বক্তব্য দিয়েছিলাম তার সঙ্গে আজকের সময়ের অনেক পার্থক্য আছে। সবচেয়ে বড় তফাত হলো আমাদের এখন নতুন একটি সরকার আছে। ফলে যে প্রশ্নগুলো উঠেছিল, সেগুলোর উত্তর দেয়াটাও জরুরি।
    খালিদী: তাহলে আগের ওই বক্তব্য নিয়ে আপনি একটু চিন্তিত?
    সরণ: না, ওটা নিয়ে আমি চিন্তিত নই। আমি যা বলতে চাই তা হলো- নতুন সরকারের অগ্রাধিকার ঠিক করে প্রেসিডেন্ট লোকসভায় একটা বক্তব্য দিয়েছেন।
    বলছে। তবে ভারত ওই নির্বাচনকে ‘সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিও কি একই রকম থাকবে?
    সরণ: আমার মনে হয়, সেসময় আমাদের বক্তব্য ছিল- সাংবিধানিক প্রয়োজনেই নির্বাচন হয়েছে, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে- এমনটাই আশা করা হয়েছিল। আমি মনে করি, আমাদের এখন বর্তমানকে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। পুরনো বিষয় নতুন করে সামনে আনার কোনো প্রয়োজন আমি দেখি না, এখনকার এজেন্ডাই ভিন্ন।

    যদিও এটা ঘরের “আমরা আমরাই তো” ধরণের সাক্ষাতকার তবু পঙ্কজের পিছ-পালানোটা বেশ রগড়-তামশার। পঙ্কজ বলছেন, “কিন্তু আমি আগে যে বক্তব্য দিয়েছিলাম তার সঙ্গে আজকের সময়ের অনেক পার্থক্য আছে। সবচেয়ে বড় তফাত হলো আমাদের এখন নতুন একটি সরকার আছে”। “সময়ের অনেক পার্থক্য আছে”, “বড় তফাত হলো আমাদের এখন নতুন একটি সরকার” – এই বাক্যাবলিতে তিনি এবার আগের পাপের হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। সুজাতা বলেছিলেন, “সাংবিধানিক প্রয়োজনেই নির্বাচন হয়েছে” এই প্রসঙ্গ সেখানে এসেছিল। সুজাতার বক্তব্য তিনি এখানেও সমর্থন করেন তবে একটু পুনঃব্যাখ্যা করে নিয়ে। কিন্তু পঙ্কজ নিশ্চয় মানবেন, বাংলাদেশের জনগণ খোদ সংবিধানই বদলে নিতে পারেন, ১৯৯১ সালের মত অমান্য করতে পারেন এমন বহু কিছু। আর গুরুত্ত্বপুর্ণ হল এটা তো বাংলাদেশের জনগণ ও রাজনীতির আভ্যন্তরীণ প্রশ্ন এবং বাংলাদেশের রাজনীতি এই ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে আছে। সেখানে ভারতের কোন একপক্ষের দিকে পছন্দ প্রকাশ মারাত্মক গর্হিত ও এমন “মন্তব্য করাটা ভারতের জন্য ধৃষ্টতার সামিল”। এবং লজ্জার মাথা খেয়ে সুজাতা তাই করেছিলেন।
    এই “এরেঞ্জড সাক্ষাতকার” দিয়ে পঙ্কজ তওবা পড়ার ব্যবস্থা করে নিয়েছেন,ফলে বাংলাদেশে তাঁর চাকরি রক্ষা করে তিনি টিকে আছেন। অনুমান করা যায় এই তওবা পড়ার কাজটা সুষমাকে না জানিয়ে পঙ্কজ ঘটান নাই।এতে সুষমার এক সমস্যা মিটল এতে।কিন্তু আরও বড় কালপ্রিট সুজাতা সিং তিনি তো এখনও পররাষ্ট্র সচিব। এখানে সুষমার সমস্যা হল,নিজের মন্ত্রণালয়ের সচিবকে ছাড়া তিনি বাংলাদেশে আসতে পারেন না। অন্তত খারাপ দেখাবে সেটা। আবার সুজাতার কৃতকর্মের জন্য তিনিও বাংলাদেশে প্রেসের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে যেতেও পারেন। এই সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে সুষমার এই সফর ছিল কংগ্রেসের কৃত পাপ-আবর্জনা থেকে নিজ সরকারকে মুক্ত করার সফর। ড্যামেজ কন্ট্রোলের সফর। তাই,সুষমা নিজেকে এবং সুজাতাকেও বাংলাদেশে মিডিয়া থেকে দূরে রেখেছিলেন। ভারতের মন্ত্রী বা সচিবের বাংলাদেশ সফরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এর আগে কখনই সঙ্গি হন নাই। কিন্তু এবার মন্ত্রী ও সচিব দুজনই আসা সত্ত্বেও তিনি এসেছেন এবং একা এককভাবে প্রেস সামলানোর ভার তাঁর উপরে। সেই সাথে অবশ্য নিয়ে এসেছেন,আসার আগে নিজ সরকারের সবাই মিলে হোমওয়ার্কে সাব্যস্ত করা বক্তব্যটা। সেটাই তিনি সব জায়গায় বলেছেন, -”সরকার সরকারের সাথে কাজ করে” আর সেই সাথে “তারা বাংলাদেশের জনগণের সাথেও কাজ করতে চান”। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট হাসিনা তাদের আগ্রহের বিষয় নয় – একথাটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রকাশ করলেন। অনেকে মনে করতে পারেন এটা জোর করে অর্থ টেনে বের করে ভারতীয় মুখপাত্রের কথা পাঠ করছি। আসলে তা নয়। এর প্রমাণ হিসাবে আগে উদ্ধৃত সুষমার ঐ লিখিত বক্তব্যের আর কিছু অংশ তুলে আনব।
    “I am aware that the Indian general elections in April and May this year were followed closely in Bangladesh. I thank you for all the good wishes that we received. These elections were not just the largest democratic exercise in the world. They mark a turning point in the evolution of India’s democratic polity. They were an election of Hope. I stand before you as the representative of a Government that has come to power through an election process, in which, after a gap of nearly 30 years, the people of India have given a clear verdict in favour of a single political party. … My Government’s foreign policy will be based on the principles of developing peaceful and friendly relations with all countries, anchored in enlightened national self-interest. … We know from experience that democracy requires building strong institutions and promoting a culture of tolerance, inclusion and respect for differences. The strength of democracy lies in its ability to manage differences and resolve them through peaceful means. We all espouse same universal values where there can be no place for violence. We will be glad to share our experiences and best practices, if asked to do so.নিজ দায়িত্ত্বের বাংলায় বললে,“ আমি জানি এবছরের এপ্রিল মে মাসে ভারতীয় নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি বাংলাদেশে খুব মনোযোগের সাথে অনুসরণ করা হয়েছে। অনেকে আমাদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এজন্য আমি ধন্যবাদ জানাই। এই নির্বাচন কেবল দুনিয়ার এক বৃহত্তম গণতান্ত্রিক চর্চা ছিল না। এটা একই সাথে ভারতের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিকতা পরিমাপে এক মোড় ঘুরানোর মত ঘটনা ছিল। এটা ছিল আশাভরসার নির্বাচন। আমি আপনাদের সামনে সরকারের এক প্রতিনিধি হিসাবে দাঁড়িয়ে আছি যারা একটা নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে; যেটা বিরাট এক ত্রিশ বছরের গ্যাপ, এবারই ভারতের জনগণ কোন একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে পরিস্কার রায় দিয়েছে।…… আমার সরকারের বিদেশনীতি হবে সব দেশের সাথে শান্তিপুর্ণ ও বন্ধুত্ত্বপুর্ণ সম্পর্কে উন্নতি করার নীতিতে অ-সংকীর্ণ করে দেখা (enlightened) জাতীয় স্ব-স্বার্থ অনুসরণ করবে। …… অভিজ্ঞতা দিয়ে আমরা বুঝি গনতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী (রাষ্ট্রীয়) প্রতিষ্ঠান তৈরি আর মতভিন্নতাকে সহ্য করা, সাথে নেবার ও সম্মান করার সংস্কৃতি দরকার হয়। মতভিন্নতাকে সামলানোর এবং শান্তিপুর্ণ উপায়ে তা মীমাংসার সক্ষমতা ভিতর দিয়ে গণতন্ত্রের শক্তি প্রমাণ করা যায়। আমরা কিছু সার্বজনীন মুল্যবোধ ধারণ করি যেখানে সহিংসতার কোন জায়গা নাই। এব্যাপারে যদি চাওয়া হয়, আমরা আমাদের চর্চার ভালমাপের উপায় ও আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো অন্যান্যদের সাথে আনন্দে শেয়ার করতে পারি”।

    বিএনপির প্রেস ব্রিফিং
    উদ্ধৃতিটা টুকে এনেছি তিনটা অংশ থেকে। সে প্রসঙ্গে কিছু বলার আগে একটা অন্য কথা। খালেদা জিয়ার সাথে সুষমার সাক্ষাতে কি কথা হয়েছে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসম্পর্কে বিএনপির মঈন খান জানিয়েছেন —“বাংলাদেশে গণতন্ত্র অনুপস্থিত। তথাকথিত সংসদ জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত করে না। বিশ্বের সর্ববৃহত্ গণতন্ত্রের দেশ তার প্রতিবেশী দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেখতে চায় কি না,তা আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে”(২৭ জুন প্রথম আলো থেকে)। মঈন খানের এটা খুবই দাসত্ত্বমূলক মনোভাব। যদিও খালেদা ঠিক এই ভাষায় সুষমাকে এই প্রসঙ্গে বলেছেন কিনা জানার উপায় নাই। বলে থাকলে সেটাও দাসত্ত্বমূলক। অর্থাৎ বিএনপি কোন হোমওয়ার্ক করে যায় নাই অথচ মনের ভিতর ভারতের দাসত্ত্বভাব রয়ে গেছে;এরই প্রকাশ এটা। ভারত বাংলাদেশে কেমন অথবা এমন গণতান্ত্রিক পরিবেশ দেখতে চায় কি না – ভারতকে এই সুযোগ বা অপশন আমরা দিতে পারি না। এটা যেচে ভারতের দাসত্ত্ব নেয়া। দেশ একাজ করতে বিএনপিকে দায় দেয় নাই। বরং বিএনপির দিক থেকে যেটা খাড়া অথচ কূটনৈতিক শোভন কথা হতে পারত -”বাংলাদেশের গত নির্বাচন উপলক্ষ্যে ভারতের বিগত সরকারের নেয়া একপেশে ও পক্ষপাতিত্ত্বমূলক (ইচ্ছা ও সাহসে কুলালে “কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভুত” শব্দ বিএনপি যোগ করতে পারে) অবস্থান আমাদের হতাশ করেছে। এরই ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্র অনুপস্থিত। তথাকথিত সংসদ জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত করে না। ভারতের নতুন সরকার বিষয়টাকে কিভাবে দেখে আমরা জানতে আগ্রহী” -এভাবে বলা যেত। ঠিক এভাবেই বলতে বলা হচ্ছে না,তবে মূলভাবটা অবশ্যই এমনই হতে হত। অর্থাৎ ভারতকে নাক গলানোর কোন অপশন দেয়া নয় বরং তাদের নীতি কি,ওর পরিণতি কি এসম্পর্কে অসন্তুষ্টি জানানো। বিএনপির মত “অবিপ্লবী” দলের পক্ষে ভারতের নীতিতে “হতাশা” জানানো কঠিন কোন কাজ নয়। এটা খুবই স্বাভাবিক কূটনৈতিক রেওয়াজি শব্দ।
    টুকে আনা সুষমার উদ্ধৃতির প্রথম অংশঃ এতে স্পষ্টতই সুষমার পরোক্ষে হাসিনাকে নিজেদের মনোভাব বুঝিয়ে দেয়া যে ভারত গণতন্ত্র বা জনগণের প্রতিনিধিত্ত্বের মত কোর বিষয়কে কিভাবে দেখে এবং হাসিনা তেমন প্রতিনিধি নয় সেটাই মনে করিয়ে দেয়া। সুষমার দলের মত ত্রিশ বছর অপেক্ষা করে হলেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশন ধরণের প্রাতিষ্ঠানিকতাগুলোকে দুর্বল করে দেয়া উচিত নয়,জবরদস্তি খাটিয়ে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করা উচিত নয়। ঝিকে মেরে বঊকে শিখানোর মত করে কথাগুলো এভাবেই সুষমা বলে গেছেন।

    “enlightened” মোদি
    উদ্ধৃতির মাঝের অংশঃ এটা একটাই বাক্যের, এই উদ্ধৃতিটা সাদামাটা কূটনৈতিক বাক্যই তবে একটা শব্দ ছাড়া। শব্দটা হল enlightened national self-interest। বাংলা করেছি,“অ-সংকীর্ণ করে দেখা (enlightened) জাতীয় স্ব-স্বার্থ”। শব্দটা ইন্টারেষ্টিং। যে কোন রাষ্ট্রের কাজই হল স্ব-স্বার্থ মানে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ দেখা, সেজন্যই ওটা রাষ্ট্র। মুখ্যত কেবলমাত্র নিজ ভুখন্ডের জনগোষ্ঠির কমন স্বার্থ দেখভাল করাই ওর কাজ। কিন্তু স্ব-স্বার্থ মানে কি? অনেক সময় আঞ্চলিক স্বার্থের ভিতর নিজের মুখ্য স্বার্থ থাকে সেগুলো সংকীর্ণ চোখে না দেখাই বুদ্ধিমানের, আরও বড় লাভের দিক থেকে দেখার মত চোখ সেখানে খুব গুরুত্ত্বপুর্ণ। এই অর্থে enlightened। শব্দটা প্রয়োগের প্রশংসাই করতে হয়। ছোট মুদি দোকানদারের চোখ থাকে দুএক পয়সার দিক পর্যন্তও। একজন বড় রপ্তানিকারক সফল ব্যবসায়ী হতে চাইলে এত ছোট চোখে চলে না। তাঁর যে ডিষ্টিবিউটর যার মাধ্যমে তার মালামাল খুচরা বাজারে ছড়িয়ে পড়ে তাদেরও স্বার্থের ভিতরে নিজের স্বার্থ দেখে বড় ব্যবসায়ী উতপাদক। ফলে সে ব্যবসায়ীকে enlightened বলা যায় অবশ্যই।
    টুকে আনা সুষমার বক্তৃতার শেষ অংশঃ মতভিন্নতাকে জায়গা করে দেয়া, অন্তর্লীন করে নেয়া বা একপাত্রে ধরা -কেন গুরুত্ত্বপুর্ণ সে প্রসঙ্গে এটা সুষমার সবক। এখানে বড় তামাশাটা হল,হাসিনার আওয়ামি লীগ নিজেদের সেকুলার রাজনৈতিক শক্তি বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করে,বিপরীতে বিজেপি সম্পর্কে তাদের রিডিং হল ওটা সাম্প্রদায়িক দল। কিন্তু এখানে সেই বিজেপি সরকারের কাছ থেকেই হাসিনাকে জনগণের প্রতিনিধিত্ত্বের অর্থ কি, গণতন্ত্রের কোর ভ্যলু মতভিন্নতাকে কিভাবে দেখতে হয় এর সবক শুনে যেতে হল।
    সুষমার এই সফরকে সামগ্রিক দিক থেকে বলা যায়,কংগ্রেসের বাংলাদেশ নীতির বিপদ ও আত্মঘাতি দিক মোদির বিজেপি উপলব্দি করেছে। কিন্তু অন্য দেশ সফরে এসে তা প্রকাশ্যে খোলাখুলি বলতে পারেনা, বলা যায় না। এটা হাসিনার কারবার নয় যে নিউইর্য়কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মিটিংয়ে গিয়ে বিগত খালেদা সরকারের নীতির বিরুদ্ধে কথা বলবে। কিন্তু তাদের উপলব্দি কি সেটা তারা পরিস্কার করেছে সুষমার ঐ সেমিনারের লিখিত বক্তৃতায়। আর সেই সঙ্গে সামনে এগিয়ে যাবার নতুন নীতির কথা বলে আসলে পুরানো কংগ্রেসের নীতি যে ভুল ছিল সেটাই পরোক্ষে বলে গেলেন সুষমা। মোদি পরিস্কার করেছেন তাঁর স্বপ্ন অনেক উচু। অনেক উচুতে বসে enlightened হয়ে তিনি নিজের স্বার্থ দেখতে পারেন। এটা কংগ্রেসের মত ফাকা বুলি ও আকামের তথাকথিত “ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ” নয়।

    ভারতের মিডিয়ায় অসময়ী কংগ্রেসী প্রপাগান্ডা
    ভারতের মিডিয়ার কথা দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম। এরা মোদির চিন্তা অভিমুখ নীতি কি সেদিকে খবর নাই। সুষমার সফরকে ঘিরে এরা কংগ্রেসের “ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ” নামের নীতি অনুসরণ করে পরামর্শ কলাম রিপোর্ট লিখেই চলেছে। এর কতটা পুরানা অভ্যাস আর কতটা হাসিনা-গওহরের মিডিয়া প্রভাবিত করা বা পেজ কিনে নেবার ক্ষমতা তা আলাদা করা মুশকিল। এমন রিপোর্টেগুলোর মধ্যে ভয়াবহ সীমা ছাড়ানি লেখাটা হল টাইমস অব ইন্ডিয়া। এটা মূলত টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকার এডিটোরিয়াল তাই লেখকের কোন নাম ছাপা হয় নাই। ১৯৭৪ সাল থেকে পেন্ডিং ইন্দিরা-মুজিব সীমান্ত চুক্তি বা ছিটমহল বিনিময় চুক্তি ভারতীয় সুপ্রিম আপিল কোর্টের রায় হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও এখনও লটকে আছে। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা এবার এর বিস্তর আলাপ আলোচনা টেকনিক্যাল কাজ শেষে কেবল ভারতীয় সংসদে পাস হওয়া বাকি। কিন্তু টাইমস অব ইন্ডিয়া সেটাকে আবার নতুন করে ঘোলাটে করার উদ্যোগ নিয়েছে। বলছে, বাংলাদেশের তেতুলিয়া সীমান্তে নতুন করে চার কিলোমিটার করিডোরে দিলে ভারতের পুর্বাঞ্চলে পৌছানোর রাস্তা ৮৫ কিমির মত কমবে তাই মোদির এব্যাপারে বাংলাদেশকে চাপ দেওয়া দরকার। যেন ব্যাপারটা এমন যে ভারত বাংলাদেশকে চাপ দিলেই সব পেয়ে যেতে পারে। তো হাসিনাকে চাপ দিয়ে গোটা বাংলাদেশটাই নিয়ে নিলেই তো হয়? নাকি? যদি প্রশ্ন করা হয় বাংলাদেশ কেন দিবে? একথার পিছনে টাইমসের যুক্তি জ্ঞানবুদ্ধি কি? না সেসব কিছু পাওয়া যায় নাই। দাদাগিরি একটাই কথা ভারতের দরকার। ভারতের দরকার এটাই একমাত্র র্যাাশনালি। এটা কংগ্রেসের দাদাগিরির চেয়ে বড়, মিডিয়া দাদাগিরি।
    আবার, দ্যা হিন্দু পত্রিকার ডিপলোমেটিক এডিটর সুহাসিনী হায়দার। তিনিও হিন্দু পত্রিকায় এক উপসম্পাদকীয় লিখেছেন। টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতই বুঝা যায় সুহাসিনীরও মোদির লক্ষ্য নীতি সম্পর্কে তার কিছুই জানা হয় নাই। জানার দরকার অনুভব নাই। বরং এখনও কংগ্রেসের নীতিতে বিভোর আছেন। কংগ্রেস-হাসিনা নীতির পক্ষে মিথ্যা প্রপাগান্ডার সোরগোল তোলাই এর লক্ষ্য। তাঁর লেখা তথ্যের সত্য-মিথ্যায় ভরপুর এবং কষ্ট না করে আওয়ামি পছন্দের লোকে ব্রিফে লেখা এই উপসম্পাদকীয়। যেমন সুহাসিনী লেখার আগেই অযাচিতভাবে ঠিক করেছেন আবার বিএনপি-জামাতের ক্ষমতায় আসা ভারতের স্বার্থের বিরোধী ফলে এটা প্রমান করবেন যে তাদের আগের আমলে ভারতের স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়েছে। সুহাসিনী ২০০৩ সাল থেকে কাহিনী শুরু করেছিলেন। জামাত-বিএনপির ঐ আমলে বাংলাদেশ ভয়াবহ এন্টি-ইন্ডিয়ান সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্র হয়ে গিয়েছিল এর ঘটনাবলির ইতিহাস ধারা বর্ণনা দিচ্ছেন। কিন্তু একথা বলতে বলতে হঠাত বছর সাল পিছিয়ে ২০০১ সালে পদুয়ার ১৬ বিএসএফ জওয়ানের মৃত্যর কথায় চলে আসলেন। কিন্তু সুহাসিনী খবর রাখেন নাই যে পদুয়ার ঘটনা শুধু ২০০১ সালের বলে নয় এটা তাঁর প্রিয় হাসিনা সরকারের আমলেরই ঘটনা। ইণ্ডিয়া টুডে এর ঐ সময়ের এক রিপোর্ট বলছে ২২ এপ্রিল ২০০১ প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে ফোন করে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ির ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ফলে সুহাসিনী যে প্রেমিজের উপর দাঁড়িয়ে তাঁর লেখার যে বিএনপি মানেই ভারতের স্বার্থবিরোধী সন্ত্রাসের বাংলাদেশ এটা ডাহা মিথ্যা কথা। আর ১৬ বিএসএফ জওয়ানের মৃত্যুর ঘটনাকে যদি তিনি ভারত বিরোধী সন্ত্রাসের নমুনা হিসাবে উপস্থাপন করতে চান তবে ঐ সন্ত্রাসের কারিগর হন শেখ হাসিনা। নিশ্চয় এটা তার পছন্দ হবে না। সুহাসিনী আরও বলছেন ২০০৩ সালে বিএনপির-জামাতের আমলে হুজির হেড কোয়ার্টার নাকি হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ফ্যাক্টস হল, আমরা পছন্দ করি আর নাই করি আফগান ফেরত বাংলাদেশিদের ইসলামি রাজনীতিক উত্থান ১৯৯৩ সালের পর থেকে, হুজিও তাদের তেমনই এক সংগঠন ও প্রকাশ। হুজির হামলাগুলো তাই হাসিনার ১৯৯৬-২০০১ পাঁচ বছরের আমলেও ছিল, উদিচী, নারায়নগঞ্জ ঘটনা পর্যন্ত। অর্থাৎ হুজির এই উত্থানের সাথে হাসিনা অথবা খালেদা কার সরকারের আমল এমন কোন তাল মিল রেখে ঘটেছে এমন কোন সম্পর্কই নাই। অর্থাৎ বাংলাদেশের বোমাবাজির ঘটনাগুলো কোন সরকারের আমলে ঘটেছে এর ভিত্তিতে ঐ সরকারের তাতে পৃষ্ঠপোষকতা আছে এমন বয়ান খাড়া করে প্রপাগান্ডা চালাতে চাইলে অভিযোগ করলে হাসিনাও দোষী হবেন। একথা সুহাসিনী খেয়াল রাখেন নাই। ফলে বলা বাহুল্য সুহাসিনীর এই রিপোর্ট মিথ্যা ও বায়াসড অথবা পেজ বিক্রি করার চুক্তিতে এক প্রপাগান্ডা রিপোর্ট।
    সুষমার সফর উপলক্ষ্যে ভারতের মিডিয়া রিপোর্টগুলো কমবেশি এরকমই। ব্যতিক্রম হিসাবে চোখে পড়েছে ইংরাজি অনলাইন ফাষ্ট পোষ্ট এর এসএনএম আবদির লেখা আর্টিকেল যেখানে তিনি মোদিকে সাবধানে বাংলাদেশকে মোকাবিলা করতে পরামর্শ রেখেছেন। আর ওদিকে রয়েছে হিন্দুস্তান টাইমসের এক কলাম যেটা থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষক Syed Munir Khasru এর লেখা। এই কলামে তিনি বাংলাদেশের অসন্তুষ্টি এবং স্বার্থক্ষুন্ন হওয়ার ইস্যুগুলো এবং প্রণব বন্দোপাধ্যায়ের দেয়া প্রতিশ্রুতির বরখেলাপের তালিকা – সব তুলে এনেছেন। ওদিকে আর এক আগ্রাসী নীতির ডঃ সুবীর ভৌমিক সুষমার সাথে বাংলাদেশেও এসেছিলেন কিন্তু নির্বাচনের পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ নিয়ে কিছু লিখেছেন চোখে পড়েনি।

    শেষের কথা
    সামগ্রিক বিচারে সুষমার সফরে হাসিনা বেচতে চেষ্টা করেছেন ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” রক্ষার্থে তিনি কত কিছু করেছেন সেকথা। কিন্তু মোদির চিন্তাভাবনার গতিপ্রকৃতি নীতি কিছুই হাসিনা ষ্টাডি করেন নাই। মোদি আসলে এগুলো কিনতেই আসেন নাই। ভারতের “নিরাপত্তা স্বার্থ” কিনতে তিনি আগ্রহী নন। এটা তাঁর ফোকাসও নয়। তার ফোকাস আঞ্চলিক অর্থনীতিতে এক বড় ভুমিকা রাখা যেখানে তাঁর লক্ষ্য আরও অন্য অনেক কিছু, দেয়ানেয়ার equitable partner পার্টনার হিসাবে বাংলাদেশ। ফলে বলা বাহুল্য অপ্রতিনিধিত্ত্বের হাসিনাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে কোন মদদে তাঁর ঠেকা নাই। হাসিনা মোদির কাছে নিজ চাহিদার পক্ষে কোন সম্পদ নয়, লায়াবিলিটি। ফলে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সুষমার সফর শেষ হচ্ছে, হাসিনার দিক থেকে অবিক্রিত পসরা মাথায় তিনি হাট থেকে ফিরছেন। আর সুষমার দিক থেকে তাঁর পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং যে ইমেজ ড্যামেজ করে রেখেছিলেন তা পুনরুদ্ধার করতে পেরেছেন এমন ধারণায় এটা গুড ষ্টার্টার ভাবছেন।।

  • ওবামার এশিয়া নীতির মুখ থুবড়ানো পরিণতি (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

    ওবামার এশিয়া নীতির মুখ থুবড়ানো পরিণতি (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

    গৌতম দাস
    ১৬ জুন  ২০১৪    ০৩ঃ ৪৪

    https://wp.me/p1sCvy-7m

     

    প্রথম পর্ব এখানে দেখুন

     

    রবার্ট ডি কাপলানঃ
    তাঁকে আমেরিকার এক প্রভাবশালী নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মনে করা হয়। প্রভাবশালী Stratfor ম্যাগাজিনের চীফ ভুরাজনৈতিক বিশ্লেষক তিনি। আমেরিকান রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক পরামর্শক কমিটির সদস্যও তিনি। “Beijing’s Caribbean Logic” শিরোনামে গত মার্চ ২০১৪ তিনি এক আর্টিকেল (আসলে তাঁর নতুন বইয়ের এক আর্টিকেল) লিখেছেন। ওখানকার সারকথা হলঃ বৃটিশ বা ফরাসী সাম্রাজ্য যখন দুনিয়াকে লূট দখলের কলোনী রাজত্ত্ব করে রেখেছিল এর শেষের দিকে আর বিপরীতে আমেরিকার যখন অর্থনৈতিকভাবে ক্রমশ পরাক্রমশালী হয়ে উঠছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধেরও আগের সেই সময়ে আমেরিকা প্রথম ক্যারেবিয়ান সাগরের কর্তৃত্ত্ব নিয়েছিল কলোনী মাষ্টার বৃটিশ সাম্রাজ্য শাসকের বিরুদ্ধে। ক্যারেবিয়ান সাগর হল, মার্কিন দেশের দক্ষিণ দিকে যেখানে আমেরিকা মানে উত্তর আমেরিকা আর দক্ষিণ (বা ল্যাটিন) আমেরিকা বিভক্ত হয়েছে সেই বিস্তৃর্ণ সাগর জলরাশি। ক্যারেবিয়ানের উত্তরদিকে আমেরিকার মিয়ামি, মেক্সিকো আর ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র পানামা, কিউবা জামাইকা ইত্যাদি আর দক্ষিণদিকে কলম্বিযা, ব্রাজিল ইত্যাদি রাষ্ট্র – সেই অঞ্চল। এটাই উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাকে এক চিকন ভুখন্ডগত (সবচেয়ে চিকন অংশটাই পানামা রাষ্ট্র) সংযোগে ধরে রেখেছে। আবার বলা যায় ঐ চিকন ভুখন্ড পুবে আটলান্টিক মহাসাগর অঞ্চল আর পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চল এভাবে মহাসাগর দুটোকে বিভক্ত করে রেখেছে। আমেরিকা নিজের অর্থনৈতিক পরাশক্তিগত উত্থানের যুগে প্রথমেই সে তার নিজ ভুন্ডের দক্ষিণের ক্যারেবিয়ান সাগরের দখল নিয়েছিল, বৃটিশদের থাকতে দেয়নি। এখন কাপলান ঐ লেখায় যুক্তি দিচ্ছেন, তাহলে আজকের রাইজিং ইকোনমির চীন কেন এশিয়ায় জলরাশিতে আমেরিকাকে ঢুকতে দিবে? চীন তো আসলে আমেরিকার “ক্যারেবিয়ান লজিকই” প্রয়োগ করছে। তাই কাপলানের লেখার শিরোনাম “বেইজিং এর ক্যারেবিয়ান লজিক”।
    কাপলানের কথার এক ধরণের গুরুত্ত্ব আছে সন্দেহ নাই। তবে তিনি এম্পেয়ার নষ্টামির পিছনের ভাবাদর্শগত ন্যায্যতা খুজতে গিয়েছেন। কিন্তু এতে যেদিকটা আড়ালে পড়ে গিয়েছে তা হল, চীন নিজে প্রথমে কাউকে হটিয়ে এশিয়ার জলরাশিতে নিজের কর্তৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে যায় নাই। উত্তেজনাহীন নিঃতরঙ্গ এশিয়ার জলরাশিতে জাহাজ নৌরুটে পণ্য আনা-নেয়ার কাজে ব্যবহার করে চীন তার অর্থনীতিতে বিকাশ সাধন করে যাচ্ছিল। তার পড়শিরাও যার যার মত নিজের অর্থনীতিতে মশগুল ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে চীনের পড়শিদেরকে আমেরিকার নৌ-সামরিক শক্তি অফার করা, নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ করার উস্কানি থেকে। স্বভাবতই এটা চীনের দিক থেকে বিরাট হুমকি মনে করারই বিষয়। বিশেষত তার নৌবাণিজ্য বা পণ্য আনা-নেয়ার প্রধান রুট এশিয়ার জলরাশি বিশেষত সাউথ চায়না সি অবাধ চলাচল এলাকা রাখার স্বার্থে, এই কারণে। দাবার পালটা চালের মত, আমেরিকার ঐ পদক্ষেপের ফলে চীনের এতদিনের -দুনিয়ার কারো সাথে সামরিক সংঘাতের সম্পর্কে সে নাই – এই নীতি থেকে সরে গিয়ে চীনের এখনকার নীতি হয়ে দাড়িয়েছে – যারাই আমেরিকার কাছে আশ্রয় খুজছে, সামরিক জোটে আবদ্ধ হতে চাইছে বা হয়ে আছে এমন সব দেশের প্রতি চীনের ভুমিকা মাসল দেখানোর। যেমন উদাহরণ হিসাবে জাপানের প্রসঙ্গঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের জাপান ঐ অঞ্চলের সকলের কাছেই এক কলোনী মাষ্টার হিসাবে পরিচিত; চীনসহ দুই কোরিয়াকে সে কলোনী দখল করে রেখেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর মৃত এবং জীবিত জাপানী যারা যুদ্ধাপরাধী হিসাবে ফাঁসি সাজাপ্রাপ্ত এদের সহ সকলের উদ্দেশ্য নির্মিত স্মৃতিসৌধে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে কখনই প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ফুল দিতে যান নাই। কিন্তু এবার গিয়েছেন। এঘটনাটা চীন ও কোরিয়াকে বিক্ষুব্ধ করেছে। এরচেয়ে হাস্যকর হল তিনি নিজের ফুল দিতে যাওয়ার পক্ষে যে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলছেন, দুনিয়ার সব রাজনৈতিক নেতারাই নিজ দেশের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন তাদের সকলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে থাকেন তাই তিনি গিয়েছেন। বিপরীতে চীনের প্রতিক্রিয়া হল, পিছনের ইতিহাস না ঘেটে যখন আমরা সামনের দিন নির্মাণের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার দ্বার উন্মোচনের চেষ্টা করছি তখন এই আচরণ খুবই বিভেদমূলক ও শত্রুতা উস্কে দেয়ার। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ক্ষোভ জানিয়ে বলেছে এটা কোরিয়ান জনগণের অনুভুতিকে পায়ে মাড়ানো। এছাড়া ছোট্ট যে দ্বীপের মালিকানা নিয়ে জাপান-চীনের বিবাদ সেটাও কলোনী দখল যুগের মালিকানার বিবাদ। স্পস্টতই জাপানের ভুমিকা মাসল ফোলানোর, খুচিয়ে পুরান ঘা তাজা করার, টেনশন তৈরি করার। এর পিছনের কারণ হল, আমেরিকার সাথে বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাপানের সামরিক চুক্তি আছে যে জাপান আক্রান্ত হলে সেটাকে আমেরিকা নিজের উপর আক্রমণ মনে করবে, ফলে জাপানের শত্রুর বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নিবে। এসব কিছু মিলিয়ে এককথায় বললে, চীন বর্তমান অবস্থান নিয়েছে, এশিয়ার জলরাশিতে আমেরিকার কোন ভুমিকা সে দেখতে চায় না – এটাই তার নীতি ও আকাঙ্খা।

    সাংগ্রিলা ডায়লগঃ
    এশিয়ায় জলরাশিতে উস্কানি তৈরি করে আমেরিকার নিজের কদর বাড়ানো, বিপরীতে চীন আমেরিকান জোট পাকানোর বিরোধীতা তার বর্তমান নীতি, এর ফলে এখনকার সময়টাকে বলা যায় এটা এশিয়ার জন্য মাসল দেখানো, টেনশনের পিঠে টেনশন তৈরি করার এক সময় চলছে। কিন্তু এটা কোথায় গিয়ে শেষ হতে পারে বা কিভাবে থিতু হতে পারে – সেই ছবিটাকে ধরার জন্য গতমাসের শেষদিকে ৩০ মে থেকে তিনদিন সিঙ্গাপুরের সাংগ্রিলা হোটেলে এশিয়ার বার্ষিক (১৩তম) নিরাপত্তা সম্মেলন হয়ে গেল, সেখানকার রিপোর্টিং কে ব্যবহার করব।
    বৃটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক International Institute for Strategic Studies (IISS)এর দায়িত্ত্বে পরিচালিত সাংগ্রিলা ডায়লগ মূলত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের ২৮ দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদেরকে নিয়ে বার্ষিক আলোচনাসভা বা ডায়লগের স্থান। থিঙ্কট্যাঙ্ক IISS এটাকে “The IISS Asia Security Summit” বলে পরিচিত করিয়ে থাকে। শুরুতে মূল উদ্যোক্তা ছিল আমেরিকা; থাইল্যাণ্ডকে সাথে নিয়ে এর আয়োজক হয়েছিল ২০০২ সালে। উদ্দেশ্য পরাশক্তিগত স্বার্থগুলো ডায়লগ আলোচনার মাধ্যমে যতটা সম্ভব বুঝে শুনে নেয়া। ঐ ২৮ দেশের মধ্যে আমেরিকা বৃটেন রাশিয়া চীন জাপান কোরিয়া ভারত পাকিস্তান অষ্ট্রেলিয়া ইত্যাদি প্রায় সকলেই অন্তর্ভুক্ত। এটাকে বলা যায় গ্লোবাল অর্থনীতি এশিয়ামুখি ভারকেন্দ্রে চলে আসার আর এক প্রতিক্রিয়া। “সাংগ্রিলা ডায়লগ” (Shangri-La Dialogue বা সংক্ষেপে SLD) নাম হবার পিছনের কারণ এটা শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক চেন হোটেল সাংগ্রিলার “সিঙ্গাপুর সাংগ্রিলায়” আহুত হয় বলে সেখান থেকে এই নেয়া নাম।
    Shangri-La Dialogue 2014 সভার এবার উদ্বোধনী বক্তৃতা করেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। খুবই আক্রমাণাত্মক তাঁর বক্তৃতার সারকথা হল, রুল অব ল এট সি অর্থাৎ সমুদ্র বিষয়ে আইনের শাসনে চলতে হবে সবাইকে। মানে সীমানা বিবাদ মীমাংসায় চীনকে আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশন ইত্যাদির মধ্যে আসতে হবে। “আইনের শাসন” কথাটা শুনলে সকলের সহজেই আকৃষ্ট হবার ইচ্ছা জাগে, তাই তাঁর এই শব্দ দিয়ে বলা। সেকথায় পরে আসছি। শিনজোর পরে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল তাঁকে সমর্থন করে বক্তৃতা উত্তেজনা আরও এক ধাপ সুরে চড়িয়ে দেন। চাক হেগেল চীনকে অভিযুক্ত করেন,“অস্থিতিশীল করার দেশ” “আগ্রাসী শক্তি” ইত্যাদি বলে। মিডিয়া রিপোর্ট বলছে, আগে থেকেই আমেরিকা ও জাপানের উপর ক্ষিপ্ত ছিল বলে চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্ত্ব চীনাদল আসেনি, এর বদলে এসেছে চীনা সামরিক জেনারেলদের নেতৃত্বে এক চীনাদল। সেই জেনারেলও বক্তৃতায় পালটা জাপানের দানবীয় সামরিক অতীতের কথা তুলে মুখ ছুটিয়েছিল। বলেছেন, “চীন যে কোন “নির্মম ফ্যাসিষ্ট এবং সামরিক দাঙ্গাবাজ আগ্রাসনকারীর আসরে ফিরে আসা প্রতিহত করবে”। আর আমেরিকা সম্পর্কে বলেছে্ন, “চীনের বিরুদ্ধে ঘোট পাকাচ্ছে, সকলকে খেপিয়ে তুলছে”। চাক হেগেলের বক্তৃতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে বলেছে এটা “কল্পনাতীত”, “আধিপত্যসুলভ, হুমকির মত এবং হস্তক্ষেপমূলক” বক্তব্য। এবিষয়ের সারকথাটা বলবার জন্য পশ্চিমা সাপ্তাহিক “ইকোনমিষ্ট” থেকে ধার নিব। সাংগ্রিলা ডায়লগ শুরুর দিন তিনেক আগে ওবামা “ওয়েষ্ট পয়েন্ট” বলে খ্যাত আমেরিকার এক মিলিটারি একাডেমিতে বক্তৃতায় ক্যাডেটদের আশ্বস্ত করার ছলে বলেছিলেন, ”আমেরিকা অবশ্যই বিশ্ব পরিসরে নেতৃত্ত্ব দিয়ে যাবে” এবং “আমেরিকার জোট-বন্ধুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সে এক-পক্ষীয়ভাবে সামরিক বল প্রয়োগ করবে”। ইকোনমিষ্ট বলছে,এসব কথা চীনের নজরে না আসার কারণ নাই, তাই সম্ভবত চীনা জেনারেলের এমন প্রতিক্রিয়া। এছাড়া ইকোনমিষ্টের রিপোর্টের কিছু শেষকথা চীনা অবস্থান ভাবনাকে সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছে মনে করা যেতে পারে। অনুবাদ করে বললে তা দাঁড়ায়,- “…… চীন আমেরিকা জাপানের এসব কথাবার্তা, এক ‘পুরানা বিশ্বব্যবস্থার’ মাতবরদের কথা হিসাবে দেখছে যা তার কাছে গ্রহনীয় নয়। চীনের দিক থেকে দেখলে ‘পুরানা বিশ্বব্যবস্থা’ মানে পশ্চিমের স্বার্থে বিশেষত আমেরিকার নেতৃত্ত্বে জারি করা অর্ডার, এক নিয়ম-কানুন শৃঙ্খলা। যা নিজ শাসন-শৃঙ্খলার বাসার ভিতর উত্থিত চীনকে অন্তর্ভুক্ত হতে দেয় অবশ্যই, কিন্তু ততটুকুই যতটুকুতে চীন ঐ বাসাতে আগে থেকে সেট করা নিয়ম-শৃঙ্খলা অনুগত হয়ে মেনে নেয় আর ওদিকে অন্য দেশগুলো ঘোট পাকিয়ে চীনের বিরুদ্ধে সমালোচনা জারি রাখে। এসব তারা করে এই বিশ্বাসে যে এভাবে চীনের বিরাট শক্তি হিসাবে উত্থানকে দমায়ে রাখতে পারবে”।

    এশিয়া নীতির সম্ভাব্য পরিণতি
    “সাংগ্রিলা ডায়লগে” কি ঘটেছে সে প্রসঙ্গে এরপরে নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট থেকে নেয়া কিছু কথা বলে শেষ করব। এই লেখার পরের নিচের অংশ বেশিরভাগই টাইমসের রিপোর্ট থেকে টুকে নেয়া ছোট ছোট ঘটনা বর্ণনা, সাথে নতুন কিছু ব্যাখ্যামূলক পয়েন্ট তাতে যোগ করে লেখা হবে। টাইমসের মূল ইংরাজি রিপোর্ট এখানে আগ্রহীরা দেখে নিতে পারেন।
    টাইমসের রিপোর্টের শিরোনামটাই মজার,“জোটবন্ধুরা চীনা চ্যালেঞ্জের মুখে, আমেরিকা কাপাকাপি দশায় এশিয়ায় ডুবতে বসেছে” । শিরোনাম থেকেই যথেষ্ট সরাসরি কথাবার্তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
    সম্প্রতিকালে পড়শিদের সাথে চীন যেসব বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে বিশেষ করে ভিয়েতনাম ও জাপানের সাথে; যেমন, ভিয়েতনামের এক মাছধরা নৌকা ডুবিয়ে দেয়া ও সাগরের নিচের তেল তোলার রিগ বসানো নিয়ে ভিয়েতনামের সাথে বিরোধ আর জাপানের সাথে এক ছোট দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বিরোধ, জাপান গোয়েন্দা সার্ভিলেন্স স্থাপনার খুব কাছে দিয়ে চীনা যুদ্ধজেট বিমানের উড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছে ঐ অঞ্চলে। অন্যদিকে আগেই বলেছি, ঐ অঞ্চলে চীনের পড়শিদের সাথে আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং পার্টনারশীপ ডায়লগ প্রোগ্রামে আমেরিকা নিরাপত্তা ফেরি বিক্রির চেষ্টায় রত; যাতে এশিয়ায় চীনের বিরুদ্ধে এক শক্ত জোট খাড়া করে আমেরিকা নিজের পরাশক্তিগত উপস্থিতির ন্যায্যতা তৈরি করতে পারে। এসব বিষয়কে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায় তা নিয়ে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং প্রাক্তন এক অষ্ট্রেলিয়ান প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা হলেন Hugh White। ওয়াশিংটনের সাথেও তাঁর ঘনিষ্টভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। তাঁর বরাতে টাইমস পত্রিকা লিখছে, চীনের লক্ষ্য আমেরিকাকে দেখানো যে সে যদি এশিয়ায় এভাবে এন্টি-চীন শক্তিজোট খাড়া করতে চায় তবে তাকে চীনের সাথে মুখোমুখি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ার রিস্ক নিতে হবে। White বলছেন, “চীন উদ্দেশ্যপুর্ণভাবে দেখতে চায় যে আমেরিকা চীনের সাথে ভাল সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তার পড়শিদের সাথে জোট বাধার চেষ্টা – এভাবে এই অঞ্চলে আমেরিকার নেতৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা -এটা টিকাতে পারবে না”। চীন যেন বাজি ধরে বসেছে সবশেষে ক্লান্ত ও ঘরমুখে গুটানো আমেরিকা পিছু হটবেই আর এতে এশিয়াতে নিজের প্রভাব যতটুকু আছে তা খুইয়ে প্রকারন্তরে এটা চীনের শক্তিকেই বাড়িয়ে তুলবে।
    টাইমস আরও জানাচ্ছে, ওবামা প্রশাসনের কর্তাব্যাক্তিরা ব্যক্তিগতভাবে ভিতরের অনেক খবর দিচ্ছেন। বলছেন, চাক হেগেল ও আমেরিকা প্রশাসন জনসমক্ষে জাপানের পিছনে সমর্থনে দিয়ে যাবার কথা বলে চলবে এমনকি কিছুটা মাত্রায় ফিলিপাইন, ভিয়েতনামের মত অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও তা করে যাবে। কিন্তু প্রশাসন আসলে নিজেকে চীনের সাথে মুখোমুখি সংঘাত অবস্থাতেই দেখছে। এটা দেখে প্রশাসনে হতাশা বাড়ছে যে নিজে সকলকে নিয়ে এমন এক খেলার প্যাচে জড়িয়ে যাচ্ছে যা যুদ্ধের পরিণতি ডেকে আনতে পারে। টাইমস ম্যাগাজিন আরও লিখছে, প্রশাসনের আর এক সিনিয়র কর্মকর্তা আমেরিকান নীতির সমস্যাগুলো নিয়ে মন খুলে কথা বলতে নাম প্রকাশ না করে বলছেন, “দেশগুলোর (বিবদমান চীনের পড়শিরা) কেউ বিষয়টা সামলাতে সাহায্য করছে না”; জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির বাধ্যবাধকতার কারণে আমেরিকা যদিও জনসমক্ষে সবসময় জাপানকে সমর্থনের কথা বলে যাবে কিন্তু প্রশাসনের কর্মকর্তারা সমপর্যায়ের জাপানী কর্মকর্তাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে বারবার বুঝাচ্ছেন যে যে কোন পদক্ষেপ নেবার আগে সাতবার ভাবতে; আর তারা যেন কোনভাবেই চীনকে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়ার অবস্থায় না নেয়।
    ওদিকে আর এক কর্মকর্তা বিক্রম জে সিং, গত ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত যিনি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার দায়িত্ত্বের আমেরিকার উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন তিনি বলছেন, “ তাদেরকে যদি স্কুলের বাচ্চা ধরি তাহলে বলতে হয় তারা আসলে হাতে কাঁচি নিয়ে চারিদিকে খেলা করে বেড়াচ্ছে”। “ছোটখাট জিনিষ থেকেই দুর্ঘটনায় বা হিসাবের ভুলের ফলে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যেমন যুদ্ধপ্লেন চলতে চলতে খামোখা বিপদজনক গোত্তামারা মোড় নেয়া থেকে দুর্ঘটনা বা আগ্রাসী মনোভাবের প্রকাশের ফলে অযাচিত পালটা সামরিক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখিতে পড়তে হতে পারে”।
    সাংগ্রিলা ডায়লগের সভায় চাক হেগেল ও তার সাথী সামরিক বাহিনীর অনুগামি দল জয়েন্ট চীফ অব ষ্টাফের চেয়ারম্যানসহ বাঘা জেনারেলরা খুবই ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন ব্যাডমিন্টন খেলার কর্কের মত দৌড়াদৌড়ি করে। কেন? কারণ, ঐ সভায় প্রধান উস্কানিদাতা বক্তা ছিলেন জাপানী প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। প্রধান বক্তা হিসাবে তার বক্তৃতার পর ডায়াসে থাকা অবস্থায় তিনি এক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এক তরুণ চীনা অফিসার তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, দ্বীপের মালিকানা বিরোধকে কেন্দ্র করে তিনি কি চীনের সাথে যুদ্ধে যাওয়ার কথা ভাবতে রাজি আছেন? প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে ছুপা জবাবে তিনি বলেছেন, “আমরা সবাই মিলে উদ্যোগ নিয়ে রাখাটা জরুরী” যাতে কোন “অজানা, যদি ঘটে যায় এমন ঘটনাকে ঠেকানো যায়”। আমেরিকান জেনারেলরা তাই দৌড়াদৌড়ি করে সবার কাছে গিয়ে নিশ্চয়তা নিচ্ছিলেন “অজানা, যদি ঘটে যায় ঘটনা” যেন কোনভাবেই না ঘটে।
    এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর ও পুর্ব এশিয়া বিশেষজ্ঞ Andrew L. Oros বলেছেন,”কোন বিরোধ সংঘাতের মুখোমুখিতে ওর রেফারি হওয়ার চেয়ে বরং যেকোন ভাল শিক্ষক জানেন বাচ্চাদেরকে সব কিছুর আগে ডিসিপ্লিন আচরণ শিখিয়ে নিতে হয়”। এখানে “রেফারি” প্রসঙ্গে টিটকিরি করে বলা হয়েছে। এমন হওয়ার কারণ,ওবামার প্রথম টার্মে তার নতুন “এশিয়া পলিসি” হাজির করেন যেখানে রেফারি মানে “এশিয়ায় আমেরিকার pivot বা ভারকেন্দ্র ভুমিকা” থাকবেই একথা বারবার উচ্চারিত হয়েছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন আমেরিকান ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে অক্টোবর ২০১১ সালে নিজে এনিয়ে এক আর্টিকেল লিখেছিলেন, America’s Pacific Century শিরোনামে। ঐ আর্টিকেলের প্রথম বাক্য ছিল “As the war in Iraq winds down and America begins to withdraw its forces from Afghanistan, the United States stands at a pivot point”. ফলে এখান থেকেই ওবামার এশিয়া পলিসি মানেই শব্দটা কয়েন হয় নতুন শব্দে “এশিয়াতে আমেরিকার পিভোটাল রোল” বা রেফারি ভুমিকা – এভাবে। আমেরিকান একাদেমিকরা সেকথার সুত্র ধরে এখন ঠাট্টা মশকরা করে বলছেন, “ওবামার রেফারি ভুমিকা”। কারণ অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, ওবামার এশিয়া পলিসির অর্থ এন্টি চীন মাতবরির আমেরিকান জোট এভাবে না ব্যাখ্যা দাঁড়িয়ে যায়। এবং সেক্ষেত্রে এই নীতি অকার্যকরে হয়ে যাবে।

    ওবামা্র মানে গ্লোবাল পুঁজির স্ববিরোধ
    উপরে এন্ডারসন সাহেবের রিপোর্টের ম্যাপে দেখিয়েছিলাম লাল গোল দাগ দেয়া “চোকিং পয়েন্ট”। চোকিং পয়েন্ট এর আক্ষরিক মানে শ্বাসরুদ্ধ করে চেপে ধরার এমন সহজ জায়গা। অর্থাৎ চীনের অর্থনীতির শ্বাসরুদ্ধ করে দেবার মত সহজ জায়গা কোনটা – চীনের পণ্য বাণিজ্য জাহাজের নৌচলাচল পথে এমন দুটো জায়গা যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই চিকন হয়ে থাকা কিছু অংশ পার হতে হয়। এর একটা ইরানের নৌসীমায় হরমুজ প্রণালী (সমুদ্র নৌপথের চিকন অংশকে বাংলায় প্রণালী আর ইংরাজিতে strait বলা হয়ে থাকে) আর অন্যটা ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া ভুখন্ডের মাঝে মালাক্কা প্রণালী [Malacca Strait মালাক্কা প্রণালী]। প্রণালীতে কোন যুদ্ধজাহাজ আড়াআড়িভাবে রেখে দিলে অথবা ঠিক প্রণালীর উপর কোন বাণিজ্যিক জাহাজও ডুবিয়ে দিতে পারলে ঐ নৌচলাচল পথকে সহজেই কয়েক মাসের জন্য স্থবির রুদ্ধ করা সম্ভব। ফলাফল এটা চীনের অর্থনীতিকে অকেজো করে দেয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়। তাই টুটি চেপে ধরার চোকিং পয়েন্ট।
    আমেরিকার সাথে চীনের ১৯৭১ সালে প্রথম সম্পর্ক স্থাপনের সময় দেনা-পাওনার মৌলিক যেদিকটা নিয়ে রফা হয়েছিল তা হল, চীন আমেরিকার ওয়াল ষ্ট্রিটের পুঁজি নিজ ভুখন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিবে, পুঁজিকে প্রয়োজনীয় আইনী সুরক্ষা দিবে। বিদেশী পুঁজি রাষ্ট্রায়ত্ত্ব করে নেয়ার মত কোন পদক্ষেপ নিবে না। (এগুলো আজকাল আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের ঋণ পাবার ক্ষেত্রে প্রাথমিক শর্ত হয়ে গেছে।) বিনিময়ে আমেরিকান রাষ্ট্র চীনকে জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতাওয়ালা সদস্যপদ পাবার সহযোগিতা থেকে শুরু করে চীনের বিকাশে অর্থনৈতিক, ষ্ট্রাটেজিক,পণ্যবাজার সুবিধা ইত্যাদি চীনা স্বার্থের দিকগুলোতে বাধা তো হবেই না বরং সহযোগিতা করবে। এটা চীনের দিক থেকে খুব স্বাভাবিক চাওয়া। কারণ চীনে বিদেশী পুঁজি এসে উতপাদন বাণিজ্য করতে গেলে এগুলো তার স্বাভাবিক অনুষঙ্গ চাওয়া। কারণ মূলত তা ওয়াল ষ্ট্রিটের পুঁজির স্বার্থেই, কারবার ভায়াবল হওয়া, তার মুনাফাসহ আরও স্ফীত হওয়ার স্বার্থেই। কিন্তু সে প্রসঙ্গটা এখানে এখন তোলার কারণ আছে। আমেরিকা-চীনের প্রথম সম্পর্কের সময়ের মৌলিক দিকটা খুবই সংক্ষেপে এখানে বলা হলেও তবু এটুকু থেকে একটা জিনিষ পরিস্কার যে এই রফার ভিতর আমেরিকান রাষ্ট্রের জন্যই এক বড় বিপদ লুকিয়ে ছিল, এখনও আছে। বিশাল ভুখন্ড ও জনসংখ্যার চীন মানে বিশাল আভ্যন্তরীণ বাজার আর ওদিকে সস্তা শ্রমে প্রতি জোড়া হাতে সস্তায় রপ্তানিযোগ্য ও কমপিটিটিভ পণ্য উতপাদন – এতে চীনের দুনিয়া কাপানোর কথা সন্দেহ নাই। এতে এক বিশাল অর্থনৈতিক উত্থান চীনকে সবদিক থেকেই পরাশক্তি করে তুলবে, তা সকলেরই জানা ছিল। যেটা আবার খোদ আমেরিকা রাষ্ট্রের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী ও হুমকি। কিন্তু শুরু থেকেই এটা টের পাবার পরও আমেরিকান রাষ্ট্রের কিছুই করার ছিল না। কারণ এটাই গ্লোবাল পুঁজির আপন স্ববিরোধীতা। যেমন, একদিকে ওয়াল ষ্ট্রিটের স্বার্থ হল সবসময় নতুন নতুন অফুরান বিনিয়োগের বাজার তাকে পেতেই হবে,ওটাই তার প্রাণভোমরা। যেভাবেই হোক অফুরান বিনিয়োগের বাজার তাকে পেতেই হবে। অন্যদিকে ওয়াল ষ্ট্রিট পুঁজির নিজেরই আকার দেয়া দানব এমপায়ার বা দুনিয়ায় সবাইকে পিটায় ধমকায় বেড়ানো “সাম্রাজবাদ” রাষ্ট্র। কিন্তু আমেরিকান রাষ্ট্রের এমন কিছু নিজস্ব স্বার্থ আছে যা সব সময় তারই ওয়াল ষ্ট্রিটের স্বার্থের সাথে হাত ধরাধরি করে চলে না, চলতে পারে না। এমনিতেই ওয়াল ষ্ট্রিটের মালিক রাষ্ট্র নয় ব্যক্তিবর্গ, যার মুনাফা লাভালাভে আকার বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রের এর উপর কোন নগদ লাভ নাই কর্তৃত্ত্ব নাই। ফলে ওয়াল ষ্ট্রিটের একান্ত নিজ স্বার্থে খোদ আমেরিকান রাষ্ট্রকে বিপদে হুমকির মুখে ফেলে হলেও তার বিনিয়োগ বাজার চাই। ফলে রাষ্ট্র টিকে থাকার স্বার্থ আর ওয়াল ষ্ট্রিটের টিকে থাকার স্বার্থ এখানে এক নয়, এক তালে নয়। এজন্য একদিকে চীনে প্রবাহিত গ্লোবাল পুঁজি (ওয়াল ষ্ট্রিট যার কেন্দ্র বা প্রতীকী নাম) এর ফুলেফলে বেড়ে উঠা সুরক্ষা করতে ওবামা কমিটেড ও বাধ্য আবার বিপরীতে রাইজিং চীন রাষ্ট্র আমেরিকান রাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে ওর চেয়েও বড় পরাশক্তি হয়ে উঠার বিপদে নিজেই হুমকিতে, দুনিয়ায় নিজের একছত্র সাম্রাজ্য বা এম্পায়ার ভুমিকার মুকুট যায় যায় অবস্থা। তাই একদিকে ওবামা চীনের চোকিং পয়েন্ট মানে টুটি টিপে ধরার জায়গাটা খুজে বেড়ায় আবার ওর খুজে বেড়ানো দেখে রাইজিং চীনের খারাপ প্রতিক্রিয়া হুমকিতে তটস্থ হয়ে যায় সে। নিজেই জাপানকে উস্কানি দেয় আবার নিজেই তাকে জোরে চিৎকার করতে না করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যেসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের (জাতিসংঘ,আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক, ডব্লিউটিও ইত্যাদি) গড়ে এগুলো নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ত্বের মাধ্যমে আমেরিকান রাষ্ট্র দুনিয়ায় তার সাম্রাজ্যের রুস্তমি চালায়, আমেরিকান মাতবরিতে সাজানো তৈরি এসব প্রতিষ্ঠানে ঢুকার চেয়ে চীন বরং আবার নতুন করে নতুন ভারসাম্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলতে চায়। এর ভিতরই নিজের স্বার্থ দেখে স্বস্তিবোধ করে। BRICS যার সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। ওদিকে ওয়াল ষ্ট্রিটের এক বিশাল মোড়ল “গোল্ডম্যান স্যাসে” কোম্পানী তাই নিজেই BRICS গড়তে পরামর্শ উতসাহ জুগিয়েছে কারণ এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেই তা তাকে নতুন আয়ু দিবে। তাতে আমেরিকান রাষ্ট্র ডুবে মরল না বাচল এটা তার কাছে গৌণ, মুখ্য হল কে তাকে অফুরন্ত নতুন নতুন বিনিয়োগ বাজার এনে দিচ্ছে। ওয়াল ষ্ট্রিটের বাইরে আফ্রিকাকে মাথায় রেখে দুবাই আর চীনকে মাথায় রেখে সিঙ্গাপুরে পুঁজি বাজার ক্রমশ বড় ও বিকশিত কেন্দ্র হয়ে উঠছে। ওবামা তাই একদিকে এশিয়ায় এন্টি চীন নয়, এশিয়ায় নিজের পিভোট বা ভারকেন্দ্র অথবা রেফারির ভুমিকা দেখে। আবার একইসাথে এখনও দুনিয়াকে নিজ রাষ্ট্রের সাম্রাজ্য নেতৃত্ত্ব চালিয়ে যাবার স্বপ্নে চীনের চোকিং পয়েন্ট হাতড়ে বেড়ায়। গ্লোবাল পুঁজির স্ববিরোধীতা স্বভাব এভাবে চারদিক থেকে ফুটে উঠে।
    এখন ফলাফল? টাইমসের ঐ রিপোর্টের শেষ অংশে চীনের সাঙহাইয়ের ফুদান ইউনিভার্সিটির ‘আমেরিকান ষ্টাডি সেন্টার’ এর ডিরেক্টর Wu Xinbo এর উধৃতি দিয়ে বলছে, “ওবামা প্রশাসন সম্ভবত এশিয়ার আকাশ ও নৌ-সীমা বিষয়ক বিবাদ্গুলোকে হাওয়া দিয়ে জাগিয়েছে আমেরিকার এশিয়া নীতির দিকে মনোযোগ দিবার কথা তুলে”। সে আসলে চীনের নার্ভ পরীক্ষা করতে গেছিল। “একারণে চীন আর কখনও এশিয়ায় আমেরিকার নেতৃত্ত্বে শক্তিজোট পাকানোর বিষয়্টাকে স্বাগত জানাবে তা যেন কেউ আর আশা না করে। চীনের স্বার্থের দিকটাই এরা উপেক্ষা করেছে”। অবস্থা দেখে ওদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট গত মাসের ১৯ মে তারিখে “নতুন এশিয়ার নিরাপত্তা কৌশলের” রূপরেখা হাজির করেছেন এক আন্তর্জাতিক সভায়। ওখানে আহুত সম্মেলনে উপস্থিত দেশগুলো ছিল চীন রাশিয়া ও অন্যান্য এশিয়ান দেশ। কিন্তু আমেরিকাকে বাইরে রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছে, এটা চীনের জেনেবুঝে নেয়া সিদ্ধান্ত।

    কয়েনের উলটা দিক
    কিন্তু কয়েনের আর একটা দিক থেকে কিছু কথা বলা দরকার। আমেরিকার সাথে এই টানাপোড়েন করতে গিয়ে চীন সাগরের পড়শি বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোর কাছে চীন একটা খারাপ ম্যাসেজ পাঠিয়ে ফেলেছে। আকাশ বা নৌপথ অথবা সাধারণভাবে সীমানা বিষয়ক কোন বিবাদ বিতর্ক উঠলে এর সমাধান কি তবে সামরিক পথেই লাঠির জোরে করতে চায় নতুন রাইজিং চীন? নাকি জাতিসংঘের আনক্লজ পদ্ধতি পছন্দ না হলে আরও ভাল কোন আন্তর্জাতিক সালিসের পথে করতে চায়? এদিকটা নিয়ে চীনকে অবশ্যই ভাবতে হবে। যদিও মূলত চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্ত্বে আর এক পলিটিক্যাল জোট হাজির হয়েছে দেখা যাচ্ছে, নামঃ Conference on Interaction and Confidence Building Measures in Asia (CICA)। এর নামের মধ্যে ইন্টার-একশন আর কনফিডেন্স বিল্ডিং মানে “পারস্পরিক আলাপ আলোচনা” ও “পরস্পরের আস্থা অর্জন” শব্দ দুটোর তাতপর্য আছে অনুমান করা যায়। কারণ CICA এর সিদ্ধান্ত নেবার প্রক্রিয়া জানা গেল, ওখানে সব সিদ্ধান্ত হতে হবে সকলের সর্বসম্মতিক্রমে। জাতিসংঘ জন্ম দেবার আগের ৫-৭ বছর ধরে এমনিভাবেই বিভিন্ন ধরণের নানান জোটের জন্ম হয়েছিল, সবগুলো টিকে নাই বটে তবে সবগুলো উদ্যোগের মিলিত পরিণতি্তে জন্ম হয়েছিল জাতিসংঘ। বলা বাহুল্য, একদিকে CICA উদ্যোগের আর অন্যদিকে চীনের পড়শিদের সাথে চীনের বিরোধ মীমাংসার পথ – এদুটো পরস্পর অসামঞ্জ্যপুর্ণ। আমরা আশা করব এদিকগুলোতে চীন মনোযোগী হবে।

    আপডেটঃ ২৪ মে ২০২৩, সকাল নয়টা সাত