Tag: হেনরি কিসিঞ্জার

  • কিসিঞ্জার ইউক্রেন যুদ্ধ কেন দ্রুত শেষ চান?

    কিসিঞ্জার ইউক্রেন যুদ্ধ কেন দ্রুত শেষ চান?

    গৌতম দাস

    ৩০ মে ২০২২, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-47y

     

                 Henry A. Kissinger, former U.S. secretary of state, seen in 2020. (Christoph Soeder/Picture Alliance/Getty Images)

    যুদ্ধ বা কোন বড় রাজনৈতিক ততপরতার মধ্যে একাজের পক্ষে ঘটনা শুরুর পরে এতে মরাল [moral]  ও এথিক্যাল [ethical] ভিত্তি দিতে বা দাঁড় করাতে দেখা যায়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এথেকে ব্যতিক্রম নয়। তবে এখানে সবার আগে পশ্চিম বিশেষত ইউরোপ এনিয়ে সক্রিয়তা দেখাতে শুরু করে। যেমন তাদের বয়ান শুরু হবে এভাবে যে এটা একটা রাশিয়ান আগ্রাসি (aggressive) কাজ। এই শব্দাবলীর ব্যবহার করতে পারা মানে বক্তা দাবি করছে যে আমি না উনিই প্রথম আক্রমণকারি। অতএব মরাল বা ন্যায়-অন্যায়ের বিচারে এবং এথিক্যাল  নীতি-নৈতিকতার বিচারে প্রতিপক্ষ দায়ী। ইউরোপ সবার আগে চেষ্টা করে যাচ্ছে এই ভিত্তিটা দাড় করাতে যাতে এরপরে তাদের সবকাজ জায়েজ মনে হয়, সব বয়ান জায়েজ হয়ে যায়।

    কিন্তু ভ্যাটিক্যান সিটির পোপ তাদেরকে ব্যতিক্রমিভাবে ফুটা বা অকেজো করে দিয়েছেন। পোপ বলেছেন, আপনি যদি কারও বাসার সামনে গিয়ে অনবরত চিৎকার করেন ভুকেন তো একসময় বাড়ির মালিক আপনাকে পিটাতে আসবে  এবং সাথে তিনি পরিস্কার করে দেন যে ন্যাটো নিজেই রাশিয়ার দরজায় গিয়ে প্রথমে ভুকেছে[barking of NATO at the door of Russia]।  অর্থাৎ তিনি কোন ছাড় না দিয়ে একেবারে মুখে মেরেছেন। এর মানে তিনি রাশিয়ান অনুপ্রবেশ কিনা সেটা নিয়ে কথা না তুলে বরং উলটা ন্যাটোকেই উস্কানিদাতা মনে করে বলছেন, এই উস্কানির জন্যই ন্যাটো দায়ী[ NATO Provoked Russian Invasion of Ukraine]। সোজা কথায় পোপ ফ্রান্সিস পশ্চিম-কেই মরালি-এথক্যালি ডুবিয়ে ছেড়েছিল গত ০৩ মে ২০২২। । 

    এবার আক্রমণ কিসিঞ্জারেরঃhenry
    আর চলতি মে মাসের শেষের সপ্তাহে এসে এবার আক্রমণ হেনরি কিসিঞ্জারের। নিজ ঘরের ভেতর বোমা ফাটানোর মতো ঘটনাটা ঘটিয়েছেন হেনরি কিসিঞ্জার [Henry Kissenger]! হ্যাঁ সেই কিসিঞ্জার! বাংলাদেশের আম মানুষের কাছে সেই কিসিঞ্জার যার অর্থ ‘কুচক্রী’ বা ‘ষড়যন্ত্রকারী’। তবে  আওয়াম মানুষের জগতের মত একাডেমিক জগৎ-এ  খোলা মনের ভাব সরাসরি বলা যায় না, পারে না বা চলে না। ফলে কিসিঞ্জার সম্পর্ক এখানে ভদ্র ও শোভন ভাষায় সমালোচনা করতে হয়। ভাব করতে হয় একে – কূটনীতি – বলে যে যেখানে এক আরেক জগৎ আছে। আর কিসিঞ্জারের ভাষ্য সেই কূটনীতিক জগতের চোখে গ্রহণযোগ্য, বৈধ!

    ঘটনাটা হল, ইউক্রেন ইস্যুতে কিসিঞ্জার কিছু পরামর্শসুচক মন্তব্য রেখেছেন তাতে ব্যাপক হইচই পড়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইম তাতে প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়ে সম্পাদকীয় লিখেছে। কিসিঞ্জার তার বক্তব্যে বলেছেন, ‘ইউক্রেনের উচিত হবে নিজ জায়গা জমি রাশিয়ার কাছে ছেড়ে দিয়ে হলেও এ’যুদ্ধ শেষ করা Ukraine: Cede territory to make peace with Russia.।’ কিসিঞ্জার আরো মনে করেন, ‘রাশিয়াকে অপমান-অবমাননাকর অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়ার পরিণতি পশ্চিমের জন্যই’ ভালো হবে না [would have dire long-term consequences for stability in Europe.]। সাথে মনে করিয়ে দেন যে, রাশিয়া কিন্তু ইউরোপেরই অংশ, এটা যেন কোনোভাবে অস্বীকার করা বা ভুলে যাওয়া না হয়। তাই এখন তার সোজা সিদ্ধান্ত যে‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে দুই পক্ষ যে যে অবস্থায় ভ‚মিতে আগে ছিল […force Ukraine into accepting negotiations with a “status quo ante,”], সেটিকে স্থিতাবস্থার লাইন মেনে দুই পক্ষই যেন সেই সীমার মধ্যে প্রত্যেকে নিজেকে ফিরিয়ে নেয় এবং এই ভিত্তিতে চুক্তি ও এর বাস্তবায়ন করতে হবে এবং তা আগামী দুই মাসের মধ্যেই [the dividing line should be a return to the status quo ante,” ]।’

    কে এই কিসিঞ্জারঃ
    বাংলাদেশে যারা আশির দশকের পরে জন্মেছেন তাদের কাছে কম পরিচিত হয়ত এই কিসিঞ্জার। এর একটি কারণ হতে পারে এই যে, গুরুত্বপূর্ণ সরকারে পদ-পদবিতে থেকে হেনরি কিসিঞ্জারের সবচেয়ে সক্রিয়তার বছর বলতে তা ছিল আসলে ১৯৬৯-৭৭ এই সময়কালকে। তিনি মূলত আমেরিকার দুই পরপর প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও ফোর্ড এদের আমলে ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার বা NSA মানে নিরাপত্তামন্ত্রী ছিলেন. এছাড়া কখনো বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী সমতুল্য উপদেষ্টাও ছিলেন। এমনকি কখনো এ দুটো পদেই এবং একই সাথে নিয়োজিত থেকেছেন। আর সেই যুগ শেষ হলে এরপর থেকে তিনি মূলত একাডেমিক কাজ যেমন, বইপত্র  লেখা বা থিঙ্কট্যাঙ্ক উপদেষ্টা হওয়া; অথবা কোন পরিচালনা বোর্ড বা কমিশন ধরনের সংগঠনের প্রধান বা স্থায়ী উপদেষ্টা হয়ে থেকেছেন। এখনো তিনি ডিকটেশন দিয়ে বই লেখাতে পারেন।  বলা যায়, মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ বা স্টেট ডিপার্টমেন্টের আশপাশে যারাই পদচারণা করেন, তাদের চোখে তিনি এখনো নমস্য এবং তার থেকে শেখার আছে বলে তারা মনে করেন!

    কথাগুলোকে আরেকভাবে একটু আপন মনে হবে এভাবে বলা যাক! তাই সুনির্দিষ্ট করে বাংলাদেশের বেলায় ১৯৭১ সাল হল কিসিঞ্জারকে আমাদের সবচেয়ে স্মরণ ও স্মৃতিময় ঘটনাবলিতে ভরপুর হয়ে থাকার সময়! তাতে তিনি হয়ত তখন খলনায়ক! কারণ তখন তিনি এরই মধ্যে টানা (১৯৬৯-৭৫) আট বছর প্রেসিডেন্ট নিক্সনের NSA (ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার) ছিলেন। আর সেকালে তার প্রথম সবচেয়ে বড় ভুমিকাটা হল, তিনি ছিলেন প্রথম চীনা-আমেরিকান সম্পর্ক স্থাপনকারী দূত। কথাটা একটু ভেঙে বুঝতে হবে। চীনে মাওয়ের কমিউনিস্ট বিপ্লব সংঘটিত হয় ১৯৪৯ সালে। এরপর থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সময়কালে নয়াচীন আর আমেরিকার মধ্যে কখনোই কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। আনুষ্ঠানিকভাবে চীন বলতে তাই আমেরিকা তাইওয়ানকে ও এর সরকারকেই বুঝত। আর এই ২২ বছরের বিচ্ছেদ ও উপেক্ষার অবসান হতে নড়াচড়া প্রথম  শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালে। যখন আমরা যুদ্ধের মধ্যে ও পাকিস্তানি আক্রমণের মুখে আশ্রয়ের সন্ধানে ভারত সীমান্ত অভিমুখে অথবা তা ক্রস করে ছুটছিলাম। আর তখনই  ৯-১১ জুলাই ১৯৭১ কিসিঞ্জার পাকিস্তান সফরে এসেছিলেন সেখান থেকে গোপনে এরপর চীন যাবেন বলে। অথাৎ পাকিস্তান সফরের আড়ালে গোপনে পাকিস্তান থেকে সেই প্রথম মাওয়ের চীন সফর করেছিলেন কিসিঞ্জার। চীনে গিয়ে নয়াচীনের চেয়ারম্যান মাও জে দং ও প্রধানমন্ত্রী চৌএন লাইয়ের সাথে বৈঠক করেছিলেন।

           Photo: Premier Zhou Enlai and National Security Advisor Henry Kissinger. জুলাই ১৯৭১

    আর গোপন সফরের নির্ধারিত হয় যে পরের বছর প্রেসিদেন্ট নিক্সন চীন সফরে যাবেন। এনিয়ে সেকালে ২৬ জুলাই ১৯৭১ এর টাইমস ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ ছিল এমন। আর একালে আমেরিকার সাউথ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা চীন-আমেরিকা ইন্সটিটিউট খোলা হয়েছে। ঐ বিশ্ববিদ্যালয় কিসিঞ্জারের সেই সফর নিয়ে ডকুমেন্টারি করেছে। এই ছবি তাদের সাইট থেকে নেয়া।

    Visual search query image.    সেকালে ২৬ জুলাই ১৯৭১ এর টাইমস ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ

    কিন্তু আমাদেরর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ একটা দিক হল,  চীন-আমেরিকা সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ নিতে গিয়েই কিসিঞ্জারের আমেরিকা ততকালে হবু বাংলাদেশের স্বার্থকেই পরিত্যক্ত করে ফেলে রেখে হেঁটে চলে গেছিল। তা কার্যত হবু বাংলাদেশের বিপক্ষে ও পাকিস্তানের সামরিক একশনের পক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান হয়ে দাড়িয়েছিল। অবশ্য যুদ্ধকালীন ও পরের রিলিফ তৎপরতা বা মানবিক সাহায্যগুলো আমেরিকা বাংলাদেশে চালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঘটনার এখানেই শেষ নয়। পরবর্তীকালে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশ ভেসে যাওয়ার পরের সেবছরের সেপ্টেম্বরে শেখ মুজিব তাঁর আমেরিকা সফরকালে কিসিঞ্জারের সাথে এই প্রথম সাক্ষাৎ করেন। ঘটনাটাকে বলা যায় সেই প্রথম শেখ মুজিব, তাজুদ্দিন এন্ড গংয়ের কমিউনিস্ট ফ্যান্টাসি মানে কথিত “কমিউনিস্ট ইকোনমি” গড়ার ফ্যান্টাসি – এই বেকুবি শখ থেকে বাংলাদেশকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনার প্রথম কার্যকর এক্ট বলা যায়।  তিনি কিসিঞ্জারের সাথে দেখা করে সহায়তা চান। বিশ্বব্যাংকের সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতির যোগসূত্র স্থাপন ও তৎপরতা শুরু বলা যায় সেটাকে। কথাটা আরেকভাবে বলা যায় যে, ১৯৭১ সালের হবু বাংলাদেশ  উপায়ন্ত না পেয়ে সোভিয়েত ব্লকে ঢুকে অন্তর্ভুক্ত হয়ে এই একমাত্র পথেই  স্বাধীন হওয়ার সুযোগ দেখেছিল ও পেয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পরে সবার হুশ ছুটে যায়। শেখ মুজিব এই ফ্যান্টাসি ভাঙতে তাজুদ্দিন এন্ড গংয়ের  হাত থেকে সবক্ষমতা কেড়ে নেন, মন্ত্রীসভা ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। ফলে সেই প্রথম কিন্তু এবার উল্টো পথে মানে বাংলাদেশের  অন্তত প্রো-সোভিয়েত ব্লকে থেকে যাওয়াটার ইতি ঘটিয়েছিলেন। শেখ মুজিবের কিসিঞ্জারের সাথে সাক্ষাৎ ও যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে যার শুরু। ‘বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে কিসিঞ্জারের মন্তব্যটা তখনকার! যদিও ১৯৭৩ সালেই বাংলাদেশ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ নিয়েছিল কিন্তু তাহলেও তা কার্যত অকার্যকর করে ফেলে রাখা ছিল। সেই সম্পর্ক কার্যকর ও চালু করে প্রথম বিশ্বব্যাংকের ঋণ-অনুদান ঋণপ্রাপ্তি ঘটতে ঘটতে ১৯৭৬ সালের প্রথমার্ধ লেগে গিয়েছিল; তত দিনে শেখ মুজিব আর নাই।  মনে করা হয়,  কিসিঞ্জার অনেক কিছুই ওকে করেছিলেন কিন্তু আবার প্রবল পপুলার হয়ে উঠতে পারেন এই শেখ মুজিবকে বেঁচে থাকতে দেন নাই। সেকালে প্রচলিত আমেরিকান ফরেন পলিসির  বিভিন্ন ( ভিনদেশে অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতা চালানোর স্বভাব )  বৈশিষ্টের কথা মনে রেখে এই অনুমান প্রচলিত আছে। এসব ঘটনার কারণে, কিসিঞ্জার বাংলাদেশ ইস্যুতে খুবই নির্ধারকভাবে জড়িত ছিলেন মনে করা হয়। আসলে গোপন তৎপরতায় কাজ করা, মিটিং বা চুক্তি করা এগুলো যেন সেকালের কোল্ডওয়ারের যুগে কিসিঞ্জারের কূটনৈতিক তৎপরতার মুখ্য বৈশিষ্ট্য!!!

    একালে জেনেভায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের চলতি সভায় কিসিঞ্জারঃ
    বর্তমানে প্রায় ৯৮-৯৯ বছর বয়সের কিসিঞ্জার, সাম্প্রতিকালের খবর, চলতি সপ্তাহেই জেনেভায় অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক সভায় ভার্চুয়াল বা অনলাইনে যুক্ত হয়ে ইউক্রেন নিয়ে তিনি ওই সব মন্তব্য করেছেন। এটা ইউক্রেন যুদ্ধের এমন একটা সময় যখন প্রায় আপসরফায় সমাপ্তির দিয়ে চলে যাওয়া রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধকে বাইডেনের আমেরিকা উসকানি দিয়ে ফের চাঙ্গা করেছেন নতুন করে অস্ত্র ও অর্থ ঢেলে চলেছেন। একাজে ৪০ বিলিয়ন ডলার কংগ্রেস-সিনেট থেকে অনুমোদন এসেছে, যাতে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রসদ ঠিক থাকে। ঠিক এমন সময়ে ইউক্রেনকে জমি-ভূমি-সীমানা ছেড়ে দিয়ে হলেও রাশিয়ার সাথে আপসে যুদ্ধবন্ধের দিকে যেতে কিসিঞ্জার জেনেভার ভরা হাটে দাবি করেছেন। কিন্তু কেন?

    আসলে, খুব পরিষ্কার করে তা বুঝিয়ে বলা হয়নি, এর পেছনের কারণ। তবে কিসিঞ্জারের কয়েকটা বিচ্ছিন্ন বাক্য পাওয়া গেছে এ নিয়ে প্রকাশিত মিডিয়া রিপোর্টে। যেমন লন্ডন টেলিগ্রাফ, নিউজউইক, ওয়াশিংটন পোস্ট বা নিউ ইয়র্ক টাইমস ধরনের মিডিয়ায় যেভাবে এ খবর রিপোর্টেড হয়েছে তা থেকে; যেসবের সারকথা, ইউক্রেনকে নিজ ভূখণ্ড ত্যাগের বিনিময়ে হলেও রাশিয়ার সাথে আপসে যুদ্ধবন্ধের চুক্তি করতে উৎসাহ দিতে হবে। কারণ কিসিঞ্জার মনে করেন কোনোভাবে এতে রাশিয়ার জন্য এটা কোনো অসম্মানজনক হার হলে তাঃ

    ১. দীর্ঘ মেয়াদে ইউরোপের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করবে । কথাটা কিসিঞ্জার বলেছেন এভাবে‘যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা বিশ্ব ইউক্রেনে রাশিয়ার যে অপমানজনক পরাজয় আশা করছে, তা দীর্ঘ মেয়াদে ইউরোপের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করবে [it could worsen Europe’s long-term stability.]। অর্থাৎ তিনি যেনতেনভাবে রাশিয়ার কোন — এই হার সেই হার- একেবারেই চান না। কারণ লংটার্মে এটা ব্যাকফায়ার করবে মানে আরো বড় ক্ষতি ডেকে আনবে বলে তিনি মনে করেন।

    ২. পরের বাক্য আরো মারাত্মক। বলছেন ‘রাশিয়া তো তোমাদের ইউরোপই’। তাই বলছেন, “পশ্চিমা বিশ্বের এ বিষয়টি উপলব্ধি করা উচিত যে, রাশিয়া ইউরোপের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই পশ্চিমের উচিত হবে না ‘তড়িঘড়ি’ কোনো সিদ্ধান্তে আসা।” পশ্চিমা বিশ্বের এই বিষয়টি উপলব্ধি করা উচিত যে—রাশিয়া ইউরোপের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

    কিন্তু এতে কিসিঞ্জারের কথাগুলো মানে  তিনি রাশিয়াকেও কি সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের প্ররোচনার চোখে দেখে মানে ‘হোয়াইট ককেশিয়ান’ রেস-জাতির ধারণার চোখে গণ্য করে কথা বললেন? যেটা ক্রমেই এখন বাইডেনেরও অব্যক্ত এজেন্ডা হিসেবে উঁকি দিয়ে হাজির হচ্ছে? এক কথায় বললে এর জবাব হল – এখানে কিসিঞ্জারের অবস্থান পুরোপুরি স্পষ্ট নয়; অর্থাৎ কেন তিনি রাশিয়াকে ‘ইউরোপেরই অংশ’ গণ্য করতে বলছেন তা স্পষ্ট করেননি। এ ছাড়া রাশিয়ানরা জাতিগত পরিচয় হিসেবে মানে রেস-জাতির বিচারে আসলে প্রধানত তারা ইস্ট স্লাভিক ট্রাইব [East Slavic Tribe] ba  স্ল্যাভ -রেসের অংশ।  অর্থাৎ ঠিক ককেশীয় নয় যদিও ফেলে আসা সোভিয়েত ইউনিয়ন হিসেবে বিবেচনা করলে সোভিয়েতের ভেতরের একটি বড় অংশই ছিল সাদা ককেশীয় রেস-জাতির। সে যাই হোক, কিসিঞ্জার এর চেয়ে বেশি কিছু স্পষ্ট করেননি।

    ৩. কিসিঞ্জারের বক্তব্যের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, তিনি পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি আহবান জানিয়ে বলছেন যে, তারা যেন ইউক্রেনকে রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ‘আগের স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কো অ্যান্টি – status quo ante]’ ফিরিয়ে আনতে আলোচনায় চাপ প্রয়োগ করে। যেটা অনেকটা ২০১৪ সালের সময়কার অবস্থান, যখন ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অংশ বলে ইউক্রেন থেকে কেটে রাশিয়া নিজের সাথে যুক্ত করে নিয়েছিল।

    এখানে কিছু পুরনো ফ্যাক্টসঃ
    এখানে কিছু কথা পরিষ্কার করে রাখা যেতে পারে। ক্রিমিয়া বিগত রূশ সম্রাট বা জারের আমল থেকেই স্বতন্ত্র রেস-জাতি অর্থে আলাদা ছিল বিবেচিত হত। যদিও ক্রিমিয়া জার সাম্রাজ্যের অধীনস্ত প্রশাসনিক অংশ হিসেবে শাসিত ছিল। কিন্তু ১৯১৭ সালে লেনিনের রাশিয়ান বিপ্লবের পরে, ১৯২২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠনকালে ক্রিমিয়া অঞ্চল প্রশাসনিকভাবে রাশিয়ান ফেডারেশনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ক্রিমিয়ার কেউ কেউ হিটলারের জার্মানিকে সাহায্য করেছিল, এই অজুহাতে নেতা স্তালিন আমলে ক্রিমিয়ার বেশির ভাগ মানুষকেই শাস্তি হিসেবে ‘ফোর্সড’ সাইবেরিয়া [জারের আমল থেকেই রাজা বা কমিউনিস্ট সরকারবিরোধী ব্যক্তিকে নির্বাসনে পাঠাতে  সেই ভুমি বা অঞ্চল হিসাবে সাইবেরিয়া ঠান্ডা বনাঞ্চলে পাঠানো হত ] পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল; মাত্র  কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অপেক্ষামান  ট্রেনে তুলে দিয়ে। পরবর্তীকালে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে তারা আবার ক্রিমিয়ায় ফিরে আসে কিন্তু প্রশাসনিক দিক থেকে ক্রিমিয়া এবার রাশিয়ার সাথে আবার যুক্ত না হয়ে ক্রিমিয়া সীমান্তের অপর পাড়ে ইউক্রেনের সাথে প্রশাসনিকভাবে যুক্ত হয়েছিল। এদিকে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে ভেঙে গেলে রাশিয়াসহ মোট ১৫টা রাষ্ট্রে তারা আলাদা হয়েছিল। কিন্তু রাশিয়ার প্রভাব বাকি ১৪ নয়া রাষ্ট্রের ওপর থেকে জবরদস্তিতে হটাতে আমেরিকার নেতৃত্বে পাশ্চাত্য এক শর্টকাট ও দায়িত্বজ্ঞানহীন পথ নিয়েছিল। সেটা হল, তারা যেকোনো উপায়ে ওই ১৪ রাষ্ট্রকে ন্যাটোতে যোগদানের নীতি-পলিসিতে অগ্রসর হতে থাকে। আর এতেই রাশিয়ার নিজ ভূখণ্ড-রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দিক থেকে ব্যাপারটাকে হুমকি মনে করতে শুরু করেছিল। সব বিরোধের শুরু এখান থেকে।
    তাই একই এই কারণে ইউক্রেনের সাথে রাশিয়ার বিরোধ দেখা দিলে ২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়াকে  ইউক্রেন থেকে ফেরত নিয়ে নিজ প্রশাসনের অধীনস্ত করে নিয়েছিল। আর এরই প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকা সেই থেকে পুতিনের রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করতে এগিয়ে এসেছিল। নিজের একশনের পক্ষে সাফাই বয়ান যুক্তি শক্ত করার জন্য এটাকে রাশিয়ার ইউক্রেনের ভূমিদখলদার হিসাবে মানে জবরদখল হিসেবে উল্লেখ করতে শুরু করেছিল যেন ক্রিমিয়া তার অতীতে সবসময়ই ইউক্রেনের অংশ ছিল। অথচ মাত্র ১৯৯১ সাল থেকেই সোভিয়েত ভেঙে গেছিল বলেই রাশিয়া ক্রিমিয়াকে যে আপসে ইউক্রেনের প্রশাসনের অধীনে পরিচালিত হতে দিয়েছিল, এই ফ্যাক্টস চেপে যাওয়া হয়ে চলছে এখনও।

    ফলে এখন রাশিয়ার হাতেই ‘ক্রিমিয়াকে ছেড়ে দেয়া্র” কিসিঞ্জারের প্রস্তাব এটি ঠিক ইউক্রেনের কোন নিজস্ব ভূখণ্ড রাশিয়াকে ছেড়ে দেয়ার মত ঘটনা একেবারেই নয়। কারণ ইতিহাসে ক্রিমিয়া ইউক্রেনের অধীনস্থ অঞ্চল নয়। বরং ক্রিমিয়া ও ইউক্রেন উভয়েই কয়েক শ’ বছর ধরে রাশিয়ান জার সাম্রাজ্যের অধীনে শাসিত ও পরিচালিত ছিল। এই হিসেবে কিসিঞ্জার যেন নিজেই আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের শঠতা বয়ানের বাইরে দাঁড়াতে চাচ্ছেন। এ বিচারে পুতিনের রাশিয়ার কাছে ইউক্রেনকে ভূমি ছেড়ে দিয়ে রাশিয়ার সাথে সমঝোতা করার জন্য কিসিঞ্জারের আহবান – এটা ‘তেমন অস্বাভাবিক’ কিছু নয়। মূলকথা, ক্রিমিয়া ইউক্রেনের কোনো কোর-ভূখণ্ড বা নিজ রেস-জাতিগত ভূখন্ড তা একেবারেই নয়। এই ফ্যাক্টস যদি আমরা মনে রাখি, কেবল তাহলেই আজকের তর্কে পশ্চিমা বয়ানের অসারতার দিকটা  বুঝব।

    এখন এ ঘটনায় ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট জেলেনেস্কি যেন,  দিনকে দিন এক রাজনীতিবিদ রাজনৈতিক দায়-দায়িত্ব নিয়ে কথা আচরণের পরিবর্তে অভিনেতার একটিং তাও আবার ভাঁড়ামো কমেডিয়ান হতে চাচ্ছেন বেশি। ইনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি এক মাস আগেও তিনি মিডিয়ায় নিজেই বলেছেন তিনি ইউক্রেনকে আর ন্যাটোর সদস্যপদ নিতে বা পেতে আগ্রহী নন। কারণ আমেরিকান প্ররোচনায় পড়ে – এটা ছিল  তাঁর লোভে পড়া, এটাই এখন ইউক্রেনের দুঃখের কারণ হয়েছে। তিনি খোলাখুলি স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি আমেরিকার প্ররোচনায় পড়েছিলেন ঠিকই কিন্তু তিনিও তখন আমেরিকার ওপর হতাশ সে কথাই খোলাখুলি বলেছিলেন। আর এর পরই তুরস্কের মধ্যস্থতায় রাশিয়ার সাথে জেলেনস্কি সমঝোতা এগিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু আবার সেই বাইডেন তখন অস্ত্র-অর্থের লোভ দেখাতে লাগলেন। সেই জেলেনস্কি আলোচনার টেবিল ফেলে এবার আমেরিকান উসকানি তার আবার ভালো লাগতে শুরু করেছিল। তিনি আবার ভোল বদলে ফেলেন। সেই জেলেনস্কি এখন কিসিঞ্জারের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে স্বভাবতই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
    জেলেনস্কি বলেছেন, ‘রাশিয়ার সাথে শান্তি আলোচনার পূর্বশর্ত হল –  দুই দেশই তাদের মধ্যকার আগের সীমানায় ফিরে যাবে যার সহজ অর্থ রাশিয়া ইউক্রেনের অভ্যন্তরে যা দখল করেছে তার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে যেতে হবে;’ অর্থাৎ তিনি এখন ‘বাইডেন-মুডে’ আছেন।

    আসলে কিসিঞ্জারের বক্তব্য অনেককেই প্রভাবিত করতে শুরু করেছে। এদের একজন হলেন উরসুলা লেয়েন [Ursula von der Leyen]। উরসুলা বর্তমানে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলছেন, ‘যুদ্ধ কেবল ইউক্রেনের টিকে যাওয়া নয়, অথবা এটি কেবল ইউরোপীয় নিরাপত্তার ইস্যু নয়, বরং এটি সব গ্লোবাল কমিউনিটির কাজ ও দায় [……war is not only “a matter of Ukraine’s survival” or “an issue of European security” but also “a task for the entire global community.”]। একথা শুনে অনেকের কোন মহা-জ্ঞানের কথা শুনছেন মনে হলেও আসলে তা এর উলটা। যেমন তিনি এরপর দুঃখের ভঙ্গিতে বলছেন, এতে ‘পুতিনের ধ্বংসাত্মক ক্ষোভের খেলাও আছে [Vladimir Putin’s “destructive fury” ।’ আবার সম্ভাবনার দিকে তাকিয়ে যেন বলে রাখতে চাইছেন, ” রাশিয়া এক দিন হয়ত ইউরোপে তাদের বিশেষ জায়গা নিয়ে ফিরে আসবে। তা আসতেই পারে যদি সে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, আন্তর্জাতিক নিয়মশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় ফিরে আসার পথ খুঁজে নেয় – কারণ রাশিয়া তো আমাদেরই পড়শি! […Russia could one day recover its place in Europe if it “finds its way back to democracy, the rule of law and respect for the international rules-based order … because Russia is our neighbor.”]। আসলে জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদে সবাই কমবেশি আক্রান্ত!!

    একালে বাইডেনের আবির্ভাব ও সবকিছুকেই তিনি পশ্চিমাগোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠত্ব হিসেবে নিজেদের হাজির করার কায়দা শুরু করেছেন। আর এতে যারাই আমেরিকান নেতৃত্বের বা অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি – তাদের নিচা দেখানোর এই রেসিয়াল (racial) শ্রেষ্ঠত্ব শো করা যে, তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিরা হলো রেস-জাতির দিক থেকে নিচা। মানে নয়া এক ‘বাইডেন রেসিজম বা পশ্চিমা রেসিজমের প্রদর্শন শুরু হয়ে গেছে। আর তাতে মেতে ওঠে এই উরসুলা লেয়েনো ভালোই প্রভাবিত হয়েছেন দেখা যাচ্ছে। তিনি পশ্চিমের গণতন্ত্র, আইনের শাসন বা আন্তর্জাতিক নিয়ম-শৃঙ্খলা দেখানো গর্ব শুরু করে দিয়েছেন। আচ্ছা তিনি  কি জানেন তিনি কী করছেন? জানলে তিনি দেখতে [পেতেন, এই কথিত গর্ব-উপাদানের বয়স কত?

    অর্থাৎ পশ্চিমের গণতন্ত্র, আইনের শাসন বা আন্তর্জাতিক নিয়ম-শৃঙ্খলা ইত্যাদি এর বয়স মাত্র ৭৫ বছর। আর এর আগে তারা কী ছিলেন? তাদের সারা ইউরোপ ছিল পেশাদার ডাকাত!!! ডাকাত মানে তাদের রাষ্ট্রের প্রধান অর্থনীতি বলতে তা ছিল  কলোনি দখলদারের লুটেরা ডাকাত ব্যবসা!! হা তাই, একটুও বাড়ায় বলা হয় নাই। লাগাতার সাড়ে তিন শ’ বছর ধরে যাদের প্রধান ব্যবসা-অর্থনীতি ছিল জাহাজে বিনিয়োগ আর এমন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খুলে  ঐ জাহাজ নিয়ে কলোনি দখলদার লুট আর ডাকাতি করতে বেরিয়ে পড়া। এভাবেই ওসব দেশের প্রধান অর্থনীতি ছিল লুট আর ডাকাতি। অথচ তারা এখন সবাইকে আইনের শাসন শেখান! যেন এটা তাদের সভ্য জীবন ছিল, যেন  তারা  এভাবেই সেই থেকে কথিত সভ্যতায় এগিয়ে ছিলেন!!! উরশুনার উচিত হবে সবার আগে কলোনিদখলদারদের জীবন কাহিনী তার পুর্বপুরুষদের চিনে নেওয়া……

    এনিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্টের শেষে আরো কিছু কথা জুড়ে দেয়া হয়েছে,  থেকে নেয়া। তারা লিখছে, কিসিঞ্জার ইউরোপীয় লিডারদেরকে উদাত্ত আহবান জানিয়ে বলছেন – ইউরোপে রাশিয়ার ভুমিকা অবস্থানকে খাটো করে দেখানো বা, দৃষ্টিশক্তির আড়ালে ফেলা না। আর? আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, রাশিয়াকে চীনের সাথে কোনো স্থায়ী অ্যালায়েন্সে যেতে দিও না; এতে ইউরোপের নিজেকেই রিস্কের মধ্যে ফেলা হবে! [ ……urged European leaders to not lose sight of Russia’s place in Europe and risk the country forming a permanent alliance with China.}

    আশা করি এবার পাঠক পরিস্কার বুঝতে পাবেন যে তা হলে কিসিঞ্জার ঠিক কী চাচ্ছেন? কিসিঞ্জার বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা শক্তির মত তিনিও আসলে চীনা উত্থানে ভীত। কিন্তু তবু একটা জায়গায় তিনি বাইডেন ও ইউরোপের রাশিয়া-ঘৃণার দৃষ্টি থেকে আলাদা। সেটা হল –  চীনের ভয়ে তিনিও ভীত, কিন্তু পশ্চিমাশক্তি মানে বাইডেন ও ইউরোপ মিলে যেমন রাশিয়াকে সমানে কোপাচ্ছে, এটাকে তিনি ঠিক মনে করছেন না। কেন? কারণ তিনি মনে করেন এভাবে কোপাতে থাকলে চীন ও রাশিয়ার স্থায়ী অ্যালায়েন্স তৈরি হয়ে যাবে বা অ্যালায়েন্স করতে রাশিয়াকে ঠেলে দেয়া হয়ে যাবে, যা পশ্চিমা স্বার্থের বিরোধী হয়ে হাজির হবে। সারকথায় কিসিঞ্জার মনে করেন চীন ও রাশিয়ার স্থায়ী অ্যালায়েন্স তৈরি হতে দিলে তা আমেরিকার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।  একথাটাই তিনি ফেলো পশ্চিমাদের বুঝাতে চাইছেন।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২৮ মে  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “আবার কিসিঞ্জার! ইউক্রেন ইস্যুতে কেন?“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

    উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

    গৌতম দাস

    ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  বুধবার, ১৫ঃ১৭

    http://wp.me/p1sCvy-2hU

    আগের পর্বে বলেছিলাম, বার্মার হিউম্যান রাইট পরিস্থিতির অবনতিতে আমেরিকা অবরোধ আরোপ শুরু করেছিল  ১৯৯৩ সাল থেকেই। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম অবরোধ আরোপিত ছিল। কিন্তু ২০০৬-৭ সালের দিকে ব্যাপারটাকে প্রথম ভিন্ন দিক থেকে দেখা বা নতুন মুল্যায়ন আসতে শুরু করেছিল।  ভারতের দুতায়ালি মধ্যস্থতা আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের সমর্থনে অবরোধ তুলে নেয়ার নতুন ফর্মুলা তৈরি শুরু হয়েছিল। আর তাতে সুচি কে ‘সামরিক কর্তাদের রাষ্ট্রের উপর সিভিলিয়ান ফেস এর প্রলেপ’ – সম্ভবত এটাই হবে এর সঠিক মুল্যায়ন, এই নীতিতে বার্মার সামরিক রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে কোন সংস্কারই তাতে হয় নাই, ছিল না তা বলা ভুল হবে। কিন্তু খোদ বার্মা রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া; ওর কর্তৃত্ব সার্বভৌমত্ব জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া অর্থে এক নুন্যতম মর্ডান রিপাবলিক হয়ে উঠা – না এটা ঐ ফর্মুলাতে ছিলই না। বরং সামরিক বাহিনীর একা নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে লেখা ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনকে ভিত্তি করে নতুন রাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল, এটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রাষ্ট্রের ভিতর সেনাবাহিনী বলে প্রতিষ্ঠান থাকে। কিন্তু এখনকার বার্মা হল, সেনাবাহিনীই সার্বভৌম যার অধীনে রাষ্ট্র বলে আবার একটা প্রতিষ্ঠানও আছে। সেটা বুঝা যায়, রাষ্ট্রের  সিভিল নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া যে কোন সিদ্ধান্তে ভেটো দিবার ক্ষমতা আছে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চীফের। আবার তিনিই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তরক্ষার মত গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয় মন্ত্রী নিয়োগ দেয়াসহ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেন, ২৫% সংসদীয় (কেন্দ্র ও প্রাদেশিক উভয় জায়গায়) আসন সেনাসদস্যদের জন্য এবং বিনাভোটে বরাদ্দ রাখা ইত্যাদি এগুলা হল সেই দগদগে চিহ্ন যা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় বার্মা কেমন ধরণের রাষ্ট্র। আর এটাই নাকি সংস্কার। আর এসব সংস্কারই তার প্রতিশ্রুত সবগুলো কাজ শেষ করার আগেই ২০১০ সালেই পশ্চিমা বিনোয়োগ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল মায়ানমারে। পশ্চিমের সাথে ২০০৮ সালের আজীব কনষ্টিটিউশনের ভিত্তিতে নতুন মায়ানমারের হানিমুন শুরু হয়ে গেছিল এখান থেকে। কিন্তু জেনারেলেরা একটা কথা ভুলে যায় নাই, তা হলো মায়ানমারিজম। যেটা আসলে ইসলাম বিদ্বেষী মশলা দেয়া এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ; এর চর্চা, এবং একেই মায়ানমার রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসাবে সাজানো। ফলে ২০১২ সালে আবার নব উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সেই পুরানো রোহিঙ্গা নিধন। যার মূল যুক্তি হল, নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুসারে রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক নয় – এই গান। ফলে বাংলাদেশে শরণার্থীর ঢল নামানো। অনুমান করা হয় যে ভারত বার্মার জেনারেলদেরকে আশ্বস্ত করেছিল ও উতসাহ দিয়েছিল এই বলে যে এবার এই নব সাজের মায়ানমার যেখান থেকে পশ্চিমারা বিপুলভাবে বার্মায় বিনিয়োগ করতে পারার সুখ আর মাখন খাওয়াতে ব্যস্ত আছে, ফলে এবার তারা হিউমান রাইট ভায়োলেশন, গনহত্যা ইত্যাদি বলে আওয়াজ তেমন জোরালো না তুলে চেপে যাবে।  আমাদের এই অনুমান পোক্ত হয়, ২০১২ সালে  বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা নীতির বদলে যাওয়া দেখে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিবে না, প্রথম এই নীতি নেয়া হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ তখনও বর্ডার সীল করে রাখা এই বলে যে, আমরা অনেক নিয়েছি, ওথবা বলা যে রোহিঙ্গারা জঙ্গী ফলে জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে পড়বে বলে কথা ছড়িয়ে আভ্যন্তরীণভাবে জনমানুষের মন বিষিয়ে দেওয়ার আওয়াজ  ইত্যাদি অজুহাতগুলো বাংলাদেশ সেকালে প্রথম তুলেছিল। কিন্তু যে মায়ানমারকে রোহিঙ্গা তাড়াতে ও নির্মুল করতে উতসাহ দিয়েছিল সেই ভারত বাংলাদেশকেও এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ এই নীতি নিতে প্ররোচিত করেছিল। ফলে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা গণহত্যার আর এক জোয়ার আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সেবারের ঘটনাবলীতে আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট সংগঠনগুলোর মধ্যে হিউম্যান রাইট ওয়াচের রিপোর্ট ছিল ভয়াবহ, মায়ানমারের জেনারেলদের জন্য বড় রকমের অস্বস্তির। সমস্ত ভায়োলেশনগুলো লিগাল পয়েন্টে বিস্তারিত বর্ণনা সেখানে ছিল।  ওদিকে সময়টা ছিল বারাক ওবামার জন্য তার সেকেন্ড টার্মের নির্বাচন চলাকালীন সময়। ২০১২ সালের নভেম্বরের সাত তারিখের নির্বাচনে জয়লাভের পরই, আকস্মিক তাঁর মায়ানমার সফরের  প্রোগ্রাম ঘোষিত হয়।

    আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পরবর্তিকাল থেকে এপর্যন্ত বার্মা পশ্চিমের জন্য ‘নো গো’ এলাকা বা অগম্য স্থান হয়ে ছিল। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যতটুকু পশ্চিমাদেশের ছোয়া বার্মায় ছিল তা হল কেবল বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সুত্রে যা ততটুকুই। কিন্তু তা ছিল কলোনি সম্পর্ক – অর্থাৎ উদ্বৃত্ব উঠিয়ে নিয়ে যাবার, বার্মায় পশ্চিমের বিনিয়োগ আনার নয়। আর সেই সাথে বৃটিশ আধুনিক মূল্যবোধের প্রভাবের ভাল দিক তা ঐ প্রথম আর সেই শেষ। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কনষ্টিটিউশন রচনা ও নানান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল মত গড়ে তোলার আগেই সময় পাবার আগেই মাত্র ১০ বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ সামলাতে সিটিং জেনারেল নে উইনকে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছিল।  বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ দমন সামলার পাশাপাশি আবার ঐ সময়টা ছিল আসলে বিদেশী বিরোধীতার মানে চরম জেনোফোবিয়া চর্চার যুগ, বিশেষত বিদেশী হিসাবে ভারত ছিল এক নম্বর তালিকায়। সেসব বিষয়ে এখানে বিস্তারে না গিয়ে কেবল একটা বাক্যে তা বলে রাখি। তা হল, জাতীয়তাবাদ আর ‘বিদেশী মাত্রই (অথবা বিদেশী বিনিয়োগ মানেই) তা আমাদের শত্রু – এই দুটা এক ধারণা নয়। তা সত্বেও এভাবে দুটাকে অনেকে ভুলে সমার্থক  জ্ঞান করেন বটে। কিন্তু এদুটো এক ধারণা বা সমার্থক ধারণা নয়। সেটা ছিল ঐ এমন জেনোফোবিয়ার যুগ। নে উইনের ঐ দুই বছর ছিল সেই লৌহ দানবীয় দমনের যুগ। ঐ দমন শেষে ১৯৬০ সালে তিনি সাধারণ নির্বাচন দেন। আর সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন উ নু (নে উইনের পুরান ৩০ কমরেডের একজন) যিনি নে উইনকে সামরিক প্রধান হওয়া সত্ত্বেও আগের সময়ে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। সে যাত্রায় উ নু সিভিল সরকার গড়েছিলেন কিন্তু  দুবছরের আগেই ১৯৬২ সালে  ঐ সিভিল নির্বাচিত ক্ষমতার বিরুদ্ধেই নে উইন ক্যু করে ক্ষমতা নেন, আর তাঁর ব্রান্ডের সমাজতন্ত্র কায়েম করেন; যা চলেছিল ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। সারকথায় ১৯৪৮ সালের পরে, সারা দুনিয়া ততদিনে আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে সাজানো হয়ে গেলেও আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমের কাছে বার্মা তখনও  ‘নো গো’ বা প্রবেশহীন হয়ে থেকে গেছিল। না পশ্চিমের কোন বাণিজ্য বিনিয়োগ, না কোন রাজনৈতিক চিন্তা মুল্যবোধ – কোনটারই ছোঁয়া মায়ানমার আর পায় নাই ২০১০ সালের আগে পর্যন্ত। দীর্ঘদিন পশ্চিমের ছোঁয়া না লাগা, পড়ে থাকা মাটির নিচের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় সম্পদের বার্মা, এই অর্থে ভারজিন ল্যান্ড সেই বার্মায় সেবার প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সফরে এসেছিলেন। এই ছিল ওবামার সফরের এক গুরুত্বপুর্ণ তাতপর্য।  কিন্তু না আরও বড় এক তাতপর্য ছিল – হিউম্যান রাইট। আসলে বারাক ওবামা হিউম্যান রাইট ওয়াচের অভিযোগগুলো নিয়ে বার্মার শাসক জেনারেলদেরকে কড়কে দিতে এসেছিলেন। না ঠিক কেবল সেগুলোই নয়, সফরে এসে বক্তৃতায় প্রথমে বার্মা সংস্কার করতে রাজী হওয়ায় আর সেসবের কিছু করে দেখানোর জন্য প্রথমে প্রশংসা করেন তিনি শাসকদের আর এরপরে কঠোর সমালোচনা করেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের। এই ইস্যুতে আমেরিকার সাথে ভারত  পরস্পর বিরোধী নীতিতে চলে যায়; বার্মা নীতিতে একটা ফারাক হয়ে যায় তবে তা আন্ডারষ্ট্রীমে রাখতে সক্ষম হয়। ওদিকে আমেরিকার বিনিয়োগ মহল ওবামার সফরকে খুশিভাবে নেয় নাই। বরং বাণিজ্য বিনিয়োগের জন্য খারাপ সংকেত হিসাবে দেখেছিল। সেজন্য তারা সে অস্বস্তি ভিন্নভাষায় তুলে ধরেছিল এভাবে যে সামনে আরও কয়েক বছর ধরে সংস্কার হওয়ার পরে ওবামার সফরে আসা উচিত ছিল। যেন তারা বলতে চাচ্ছিল ওবামা উনি এখন জেনারেলদেরকে ধমকাধমকি করেন কেন, আমরা ভয় পাচ্ছি। এব্যাপারে আগ্রহীরা নুইয়র্ক টাইমসের ০৮ নভেম্বর ২০১২ সালের এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন। তবে বার্মা সফরে গিয়ে ওবামার রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিরাট হেদায়েতি বক্তব্য রেখেছিলেন। যেন রাষ্ট্র কী, তার ক্ষমতা কিভাবে কংগ্রেসের দ্বারা চেক এন্ড ব্যালেন্সড। এছাড়া হিউম্যান রাইট কী, নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদীহীতা কী জিনিষ এসবের এক হেদায়েত করা বক্তৃতাটা করেছিলেন রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে। রোহিঙ্গাদের ‘মর্যাদার’ প্রসঙ্গে তার শক্ত অবস্থানের কথা ওখানে জানা যায়। তিনি বলেছিলেন,
    “Today, we look at the recent violence in Rakhine State that has caused so much suffering, and we see the danger of continued tensions there.  For too long, the people of this state, including ethnic Rakhine, have faced crushing poverty and persecution.  But there is no excuse for violence against innocent people.  And the Rohingya hold themselves — hold within themselves the same dignity as you do, and I do.
    National reconciliation will take time, but for the sake of our common humanity, and for the sake of this country’s future, it is necessary to stop incitement and to stop violence.  And I welcome the government’s commitment to address the issues of injustice and accountability, and humanitarian access and citizenship.  That’s a vision that the world will support as you move forward”.
    কিন্তু প্রশ্ন হল ওবামা ঠিক কেন ওমন সুর বদলিয়ে ছিলেন কেন?

    হেনরি কিসিঞ্জার ও হিউম্যান রাইট
    কিসিঞ্জার এখনও আমেরিকার ডিপ্লোমেটিক ও একাদেমিক জগতে খুব গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব। কিসিঞ্জার হলেন চীনকে বাইরের দুনিয়ায় বের করে আনার মানে, যেমন  চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে আজকের জায়গায় আনার কারিগর। এই ‘জায়গায়’ বলতে, এর আগের চীনের কমিউনিস্ট-গিরির ব্লক বা ঘেরাটোপ ছেড়ে বের হয়ে আসা, আমেরিকার জন্য চীন বিপুল বিনিয়োগে ও বাজারের স্থান উঠা; আবার সেখান থেকে  পাল্টা চীন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে নিজেই আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠা ইত্যাদি। সেই চীন প্রসঙ্গে  কিসিঞ্জারের এক অন্যতম সাবধানবাণী বা পরামর্শ আছে। তিনি বলছিলেন, ভবিষ্যতের আমেরিকার চীনকে আয়ত্বের মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় টুলস হল, হিঊম্যান রাইট; যা চীন সবসময় একটা ঘাটতিতে থাকবে। ফলে তা দিয়ে চীনকে বেকায়দা বা কাবু রাখা যাবে, অনেকটাই।  কিন্তু একটা শর্ত আছে। তা হল, আমেরিকাকে এই হাতিয়ার হাতে পেতে গেলে কিছু আগাম করণীয় আছে, যা করে রাখতে হবে। আমেরিকাকে দুনিয়া জুড়ে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ড স্থাপন ও তা ধরে রাখার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে চর্চায় থাকতে হবে। কেবলমাত্র তাহলেই এই হিউম্যান রাইট হাতিয়ার আমেরিকার হাতে উঠে আসবে, নইলে নয়। মনে করা হয়ে থাকে, কিসিঞ্জারের এই বাণীর বাস্তব রূপ দেখতেই আমেরিকান দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ কে সাজানো হয়েছে। সেটা হল, কোন দেশে আমেরিকা কী বিদেশ নীতি অনুসরণ করে তা খেয়াল না করেই তা থেকে বরং স্বাধীনভাবে ‘রাইট ভায়োলেশনের’ রিপোর্টগুলো করে থাকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ । যেখানে ওর নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনেরা বেশিরভাগ সময় আমেরিকান প্রশাসনিক অবস্থান ও নীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলতে চায়। না, একথা থেকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ সম্পর্কে কোন ‘অভিযোগশুন্য আর ওর সবভালো’ এমন কোন সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে না। বা সেজন্য কথাগুলো বলা হচ্ছে না। তবে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচের’  এভাবে তুলনামূলক স্বাধীন অবস্থান নিয়ে হাজির থাকার সুবিধাটা হল যে তাতে আমেরিকান প্রশাসন চাইলে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ এর রিপোর্টের আলোকে  নিজেকে কারেক্ট করে নিতে পারে। মানে নিজেকে সংশোধন করে নিবার সুযোগ প্রশাসন চাইলে নিতে পারে।  কারণ আমেরিকান প্রশাসন অথবা ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ – এরা কেউ কারও অবস্থান একমাত্র স্বেচ্ছায় অনুসরণ ছাড়া কারও অবস্থান অন্যের জন্য বাধ্যবাধকতার নয়।  ফলে ওবামার ঐ বার্মা সফরকে তাঁর প্রশাসনের  কারেকশনের সফর ছিল বলে আমরা গণ্য করতে পারি। ঐ সফর নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম ছিল – “ওবামা ঐতিহাসিক মায়ানমার সফরে প্রশংসা করেছেন আবার চাপও দিয়েছেন” (Obama offers praise, pressure on historic Myanmar trip)। একদিকে প্রশংসা (অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে) আবার অন্যদিকে চাপ (অর্থাৎ হিউম্যান রাইটের জন্য চাপ দেয়া, রোহিঙ্গা ইস্যুকে বক্তব্যের প্রসঙ্গ করা) – এই দুটোই আমরা দেখছি।

    সে আমলে ইতোমধ্যে মায়ানমারের তথাকথিত সংস্কার যা হয়েছে তা হয়েছে সাবেক জেনারেল আগের রাষ্ট্রপতি থিন সিন (Thein Sein) এর হাতে। কিন্তু আমেরিকান প্রশাসন “রোহিঙ্গাদের মর্যাদা” নিয়ে চাপ আর বিপরীতে থিন সিনের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কায়েমের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকতে নাই বলে তাদেরকে নির্মুল করার স্বার্থ – এই দুটো অবস্থান কোথায় গিয়ে তাহলে রফা হবে? কীভাবে তারা এক পয়েন্ট মিলতে পারে?

    প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থিন সিন বলেছিলেন, রাখাইন রাষ্ট্রের রোহিঙ্গা যাদেরকে মায়ানমার সরকার বাঙালী বলে ডাকে তাদের উপর চলতি কমিউনাল দাঙ্গার সমাধান হল, হয় তাদের UNHCR এর রিফিউজি ক্যাম্পে অথবা তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। মায়ানমানের ইংলিশ দৈনিক মায়ানমার টাইমস লিখছে,  According to the president’s official website, U Thein Sein told Mr Guterres that the solution to communal violence in Rakhine State was to send the Rohingya – known in Myanmar as Bengalis – to either UNHCR refugee camps or a third country। তো একথা শুনে UNHCR এর প্রধান আন্তেনিও গুতাররেস থিন সিনের সাথে দেখা করে এক টেকনিক্যাল প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলতে চাইছিলেন আমরা তো রিফিউজি নিয়ে কাজ করি। রিফিউজি মানে যারা নিজের দেশ ছেড়ে আর এক দেশে আশ্রয় প্রার্থী বা আশ্রয় নিয়েছেন, তারা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট থিন সিন তিনি কথা বলছেন মায়ানমানের রাখাইনে যারা এখন আছেন, বসবাস করছেন এমন রোহিঙ্গা মানুষদের কথা। ফলে তারা তো UNHCR এর কাজের এক্তিয়ারের বাইরের। অর্থাৎ এন্টেনিও বলতে চাইছিলেন যারা মায়ানমারের ভিতরে আছে তারা তো রিফিউজি নয়। ফলে সেই থেকে থিন সিনসহ বার্মিজ জেনারেলদের সমস্যার একমাত্র সমাধান হয়ে দাড়ায়, যারা ভিতর আছে এমন রোহিঙ্গাদেরকে মেরে ধরে সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যাতে তাদের স্টাটাস তখন রিফিউজি হয়ে যায়। সেই ফর্মুলা থিন সিন চেষ্টা করে গেছেন। সেকাজেই তারা এতদিন চেষ্টা করেছে ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়া এবং ২০১৪ সালে আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের গণনা থেকে মানে নাগরিক গণ্য করা থেকে বাদ দেওয়া।
    ইতোমধ্যে থিন সিনের আমল ২০১৬ সালে এপ্রিলে শেষ হয়ে যায়। এরপর সু চির পছন্দের নিয়োগ দেয়া প্রেসিডেন্টের আমল আসে; যেখানে সব সিভিল ক্ষমতা কার্যত স্টেট কাউন্সিলর নাম ধারণ করে থাকা সু চির হাতে। সেই সু চি এর অফিস ও কফি আনানের আনান ফাউন্ডেশনের মধ্যে করা চুক্তিতে রাখাইন রাজ্য বিষয়ে এক পরামর্শক কমিশন গঠন করা হয় সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে। এটা কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না, স্থানীয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান যার মোট নয় সদস্যের মধ্যে ছয়জনই স্থানীয়। এছাড়া বার্মায় চলমান দাঙ্গা বা হত্যার বিষয়ে কে দায়ী সেসব বিবেচনা করাও এই কমিশনের এক্তিয়ার দেওয়া হয় নাই। তবে কমিশনের কাজ হল “রাখাইন রাজ্য যেসব জটিল সমস্যার মধ্যে আছে এর জন্য সমাধান কী হতে পারে তা প্রস্তাব করা”। এই কমিশন তার ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেছে গত আগষ্টের ২৪, ২০১৭ সালে। কিন্তু এই রিপোর্টে যাই লেখা থাক রোহিঙ্গাদের ঘরছাড়া করা আর তাদের শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার কাজ কৌশলে কোন বাধা এই রিপোর্ট হতে পারে নাই। কারণ ইতোমধ্যে এবারের গণহত্যা ও ক্লিনজিং অপারেশনে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার পর ও সু চির সিভিল সরকার ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জানিয়ে দিয়েছেন আনান কমিশন তারা অনুসরণ করবেন। আর, কেবল যারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে কেবল তাদেরকেই সরকার ফেরত নিবে। ফলে আনান কমিশনের রিপোর্টে যাউই থাক তা অনুসরণ করতে সু চি সরকারের কোন সমস্যা নাই।

    ইতোমধ্যে আরসা (Arakan Rohingya Salvation Army, ARSA) নামে এক সশস্ত্র সংগঠনের খবর উঠে এসেছে। “জঙ্গী” অভিযোগ থেকে দূরে থাকতে আরসা বলেছে, “তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ জেহাদ নয় বরং তারা জাতিগত মুক্তিকামী। মিয়ানমারের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য”। গত “২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিক্রিয়া থেকেই আরসার জন্ম বলে বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানান সংগঠনের প্রধান নেতার মুখপাত্র ‘আবদুল্লাহ’। তিনি বলেন, আরসা ধর্মভিত্তিক নয়, জাতিগত অধিকারভিত্তিক সংগঠন”। এই সংগঠনের নেতৃত্বে দাবি করা হয়েছে যে গত ২৫ আগষ্ট ২৫-৩০ টা পুলিশ চৌকি ও একটা সামরিক চৌকিতে হামলা করা হয়েছে। তারা দাবি করেছে “আগস্টের হামলা ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরে পাওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবে বলে তারা ঘোষণা করেছে”। এই খবরটা বাইরের দুনিয়ায় এসেছে হংকংভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত আবদুল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে। আমাদের প্রথম আলো যেটা আবার অনুবাদ করে ছেপেছে। এই প্রসঙ্গে আমেরিকার এক পুরানা নীতির কথা জানা যায় যে তারা ১৯৯০ এর দশকে এক স্বাধীন আরাকানি রাষ্ট্র গড়তে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সহায়তা দিতে আগ্রহী ছিল। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী অফিসের সচিব ছিলেন এমন একজনও খবরটা নিশ্চিত করেছেন যে স্থানীয় এমবেসির আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে এব্যাপারে কথা বলেছিল। ফলে আরসা  এর ততপরতার পিছনে আমেরিকান ব্যাকিং থাকা অসম্ভব নয়, মনে করা যেতে পারে। এছাড়া শাহবাগের ইমরানের নেতৃত্ব শাহবাগ আন্দোলন এবার রোহিঙ্গাদের সমর্থনে মিছিল করেছে এটাও আমেরিকান সমর্থন থাকার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। কারণ ইমরান মূলত এখন আমেরিকান ‘ইয়ুথ মুভমেন্টের’ এর অংশ। এটাই তার মূল ততপরতা। ওদিকে  আমেরিকান প্রশাসনে সাউথইষ্ট এশিয়ার দায়িত্বে আছেন এমন ডেপুটি এসিটেন্ট সেক্রেটারি প্যাট্রিক মার্ফি ওয়াশিংটনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক “বার্মা পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিং” করেছেন।  তিনি আবার বার্মা বিষয়ে প্রশসনের বিশেষ প্রতিনিধি এবং পলিসি কো-অর্ডিনেটরও। সেখানে প্রথমে এই সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংএ তিনি জানান যে  মিডিয়া ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাখাইন রাজ্যের আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত প্রবেশ করতে পারে এব্যাপারে বার্মা সরকারকে চাপ দেয়া এটা একেবারেই তাদের আশু ও প্রথম কাজের ফোকাস। তিনি বলছেন এতে পরিস্থিতি সম্পর্ক সঠিক এসেসমেন্ট করার সুযোগ আসবে। কথা খুবই সঠিক। কিন্তু তিনি এক নিঃশ্বাসে বিবিধ ধরণের আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে  আসলে সব কিছু জটিল করে ফেলেছেন। (তিনি বলেছেন, “We continue to condemn attacks of a variety of nature – attacks on security forces; attacks on civilians; attacks by civilians”)।  যেমন মিডিয়া  বলেছে আরসাও নিজেরা বলেছে যে  সুনির্দিষ্টভাবে তারা পুলিশ ও সামরিক চৌকিওতে আক্রমণ করেছে, কোন সিভিলিয়ান কিছুতেও বা কারও উপরে নয়। তাহলে বার্মা সরকারের বা সেনাবাহিনীর পালটা প্রতিক্রিয়ায় নিরীহ সিভিলিয়ান মারা হল কেন, তাদের বসতি জালিয়ে ঘরছাড়া করা হল কেন? আর তা এতই মারাত্মক যে এপর্যন্ত তিন হাজার জনকে হত্যা করা হয়েছে আর তিন লাখ বাংলাদেশেই শরণার্থী হয়েছেন? কেন? তাহলে মার্ফি যেভাবে বলছেন, কোন সিভিলিয়ান আর এক সিভিলিয়ানকে মেরেছে বলা হচ্ছে? কথা এভাবে তুলে পুরা ব্যাপারটাতে তিনি বার্মা সরকারকে বাচিয়ে আবছা ভুতুড়ে করে দিয়েছেন। তাই নয় কী! ব্যাপারটাতে এতই দৃষ্টিকটুভাবে আমেরিকার তোষামোদি অবস্থান প্রকাশ হয়ে পড়েছিল যে ঐ সংক্ষিপ্ত ব্রেফিং শেষে পাঁচ সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন। তাদের একজন সিবিএস নিউজের সাংবাদিক, (Kylie Atwood with CBS News ) ঠিক এটা নিয়েই প্রশ্ন করে বসেন। তিনি বলেন, “আমি পরিস্কার বুঝার জন্য কথাটা বলছি, তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ যে সুনির্দিষ্ট করে মুসলমানদেরকে এখানে টার্গেট করা হয় নাই। আর তুমি মনে কর রাখাইন রিজিয়নের সবাই এখানে টার্গেট (বা আক্রান্ত) হয়েছে?” (I just want to clarify that at this point you do not think that Muslims are being targeted specifically; you think it’s anyone in the Rakhine region?)

    স্বভাবতই এই প্রশ্নের কোন সরাসরি জবাব মার্ফি দেন নাই। যদিও ঘুরায় পেচায় অনেক কথা বলেছেন। আগ্রহীরা পাঠেকেরা তা লিঙ্কে গিয়ে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু মার্ফির কথার সবচেয়ে বিপদজনক অংশ হল,  “attacks on security forces” – এই কথা কয়টা খুবই বিপদজনক এবং আইনি বিবেচনায় তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কোন নিরাপত্তা বাহিনী আক্রান্ত হলেই তারা নিরীহ সিভিলিয়ানদেরকে হত্যা করতে অথবা তাদের ঘরছাড়া শরনার্থী করতে পারে না। এটা তার ফোর্স এনগেজমেন্টের শর্তাবলি নয়। এখানে বরং শর্ত ভঙ্গ হয়েছে।  এটা একসেসিভ বলপ্রয়োগের অভিযোগে ঐ বাহিনী অভিযুক্ত হবার মত অপরাধ করেছে। অথচ এই কাজকেই উতসাহ দেয়া হয়েছে ঐ ব্রিফিং। আমেরিকার এভাবে তোয়াজ করে চলা সেটা এখানে স্পষ্ট।  এটাই সামনে এনেছে আমেরিকান প্রশাসনের অবস্থান দুর্বলতা কোথায়, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। নুন্যতম হিউম্যান রাইট রক্ষার পক্ষে আমেরিকা দাঁড়াতেই পারছে না।

    তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে এই যে বার্মার সর্বেসর্বা জেনারেলেরা (সু চি যাদের পকেটের খেলনা) বার্মার প্রাকৃতিক সম্পদ, সেখানে বাণিজ্য বিনিয়োগের সুবিধা বা ব্যবসা কাকে দিবে না দিবে সেটা নিয়ে তারা একসাথে মূলত চীন-আমেরিকা-ভারতকে বেধে ফেলেছে আর নাচাচ্ছে। ফলে জেনারেলদের বাহিনী কাকে হত্যা খুন নির্মুল গায়েব করবে এর এক নৈরাজ্যকর ক্ষমতা বলয় তৈরি করে নিতে পেরেছে তারা। এতে আজ চীন-আমেরিকা-ভারত কারই জেনারেলেরা বিরাগ হয় এমন কথা তুলার অবস্থা নাই। এই তিন শক্তির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এখানে দেখা যায়।  এতে আজ মুসলমানদেরকে বাগে পেয়েছে বলে সব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে রোহিঙ্গারা। এতে অন্যেরা নিজেকে আজ প্রবোধ দিতে পারে যে রোহিঙ্গারা আমার ধর্মের কেউ না, অথবা এটা আমার জনগোষ্ঠির উপর হচ্ছেনা। কিন্তু তাদের কী কেউ আশ্বাস নিশ্চয়তা দিয়েছে যে আগামিকাল তারা আক্রান্ত হবে না? মনে রাখতে হবে প্রশ্নটা নীতির, রাষ্ট্র রাজনীতিতে একটা স্টান্ডার্ডের। কিসিঞ্জার কথাটা যা ভেবেই বলে থাকুক না কেন সেটা অনুসরণ করে আমরা অন্তত কিছুটা গ্লোবাল স্টান্ডার্ড তৈরির পথে আগিয়ে যেতে পারতাম, পারি। দুনিয়াতে গ্লোবাল ষ্টান্ডার্ড বা রীতি কনভেনশন তৈরিতে অবদান আমেরিকার তো কম নয়।

    একথা সত্যি যে হিউম্যান রাইট ইস্যুর মধ্যেও অনেক দুর্বলতা আছে, ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের পক্ষে এর অপব্যবহার হয়। কিন্তু তবু রাইটের ইস্যুটা ফেলনা হয়ে যায় নাই। ফলে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠাও দরকার, সামনে আগানোর পথ সেটাই। আমেরিকা আজ এর পক্ষে দাড়ালে চীনকেও সে বাধ্য করতে পারত যে রাইট ভায়োলেট করে কোন ব্যবসা বিনিয়োগ নয় – এটাই গ্লোবাল স্টান্ডার্ড হয়ে উঠতে পারত। দুনিয়াকে টিকিয়ে রাখা, আমাদের প্রত্যেকের জনগোষ্ঠি হিসাবে টিকে থাকার কমন স্বার্থগুলো তো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় নাই। যাবে না। আজকে গ্লোবাল পরিবেশ ইস্যু নিয়ে এবং এর ষ্টান্ডার্ডের জন্য সকলের কাজ করা এর প্রমাণ। ট্রাম্প তা ভাঙ্গার চেষ্টা করে কঠোর সমালোচনার শিকার।

    চীন আমাদের কারও খালু নয়। চীন সম্ভাবনাময় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতা হয়ে উঠবে হয়ত, কিন্তু সেটা সম্ভাবনা মাত্র। যেটা আবার সম্ভাবনার কিন্তু পাথর হয়েই তা আটকে থেকে যেতে পারে। একালে চীন একটা নীতি অনুসরণ করে বুঝা যায় যে, অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীন নিজের জন্য কোন  পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগীদার  (আমেরিকার মত) সে হতে চায় না।  তবে অর্থনৈতিক স্টেক ভাগীদারি তার প্রবলভাবে থাকে। না, এটা চীনের কোন মহানুভবতার লক্ষণ নয়। তা বলা হচ্ছে না। আপাতত রাজনৈতিক ভাগিদার না হলেও চীনের চলে। অর্থনৈতিক ষ্টেকের ভাগীদারি পেলেই চীনের গ্লোবাল  শক্তি ও সক্ষমতার নেতা ভালভাবে সে হতে পারবে, কম জটিলতায়; এটাই চীনের এমন নীতি অবস্থান অনুসরণের কারণ। তাই সে আপাতত পলিটিক্যাল ষ্টেক না নিবার নীতি নিয়ে আছে। ভবিষ্যতে অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীনের রাজনৈতিক স্টেক স্বার্থগুলো চীনের ভিতরে কীভাবে উদয় হয়, আর চীন তাতে কী অবস্থান নেয় তা দেখার বিষয়। এছাড়া সবকিছুই আমেরিকার অনুকরণে এখনকার মতই  হবে এমন কোন কথাও অবশ্য নাই। বরং কোন অগ্রসর অর্থনীতি আর আমাদের মত কোন অর্থনীতির প্রত্যেকটা বিনিময় সম্পর্ক একালে আগের মত একপক্ষীয়, সাম্রাজ্যবাদী বলতাম যাকে তেমন না হয়ে আরও ভিন্ন, শিথিল এবং  উভয় পক্ষের জন্য লাভালাভেরও নতুন রূপের কিছু হতেই পারে।  কিন্তু তাই বলে চীনের নিজের অথবা যার সাথে সে ব্যবসা করছে তার হাতে “রাইট ভায়োলেশনের বিষয়ের দিকে চীনের কোন ভ্রুক্ষেপ নাই, থাকবে না। আর এতে চীনের কিছু আসে যায় না – এই নীতি অনুসরণ করে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে পারবে না, এটা হতেই পারে না; তা আগেই বলে দেওয়া যায়। তাই চীনের যত সম্ভাবনাই থাক, সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা তার ছিল কিন্তু হতে পারে নাই, পাথর হয়েই থেকে যেতে পারে। প্রাণ শুধু জীব জীবন নয়, ওর আরও অনেক কিছু লাগে। পাশে গণহত্যা চলবে আর আমরা তা উপেক্ষা করে মনোযোগ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করব এটা মানুষের সম্ভাবনার কথা হতেই পারে না। আমাদের অবশ্যই সকলের পালনীয় নানান বিষয়ে একএকটা ষ্টান্ডার্ড লাগবেই। সেটা আমরা সকলে যত তাড়াতাড়ি বুঝি ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। অতএব সমাধান একটাই আজ অথবা কাল, যুদ্ধে বাধ্য করে অথবা আপোষে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ডের পক্ষে আমাদের সকলকে আসতে হবে।
    বার্মা বৌদ্ধত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র করতে চাচ্ছে। এটাই সমাধান ভাবছে। আর ভারত হিন্দুত্বের ভিত্তিতে নিজের রাষ্ট্র সাজিয়ে বার্মার সমর্থক হতে চাচ্ছে। আশা করি এখান থেকেও আমাদেরও অনেক কিছু বুঝবার আছে। [শেষ]

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com