Tag: হিন্দুত্ব

  • ভারতের নির্বাচনঃ কংগ্রেসও সরকার গড়ে ফেলতে পারে

    মোদি হেরেছেন আগামিতে কী?
    এর অর্থ, তাতপর্য ও মূল্যায়ন” –

     

    ভারতের নির্বাচনঃ কংগ্রেসও সরকার গড়ে ফেলতে পারে
    গৌতম দাস
    ০৫ জুন ২০২৪ সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৭
    https://wp.me/p1sCvy-5Fv

    নরেন্দ্র মোদি ও রাহুল গান্ধী

     

    প্রথম আলোসহ অনেক মিডিয়ায় আজ ভোরবেলায় দেয়া রিপোর্টের শিরোনাম –   ৫৪২ আসনের চূড়ান্ত ফল: বিজেপি ২৪০, কংগ্রেস ৯৯ আসন। এটা অবশ্য একা প্রথম আলো না, এমনকি সারা ভারতের ইংলিশ পত্রিকাগুলোরও প্রায় কমন শিরোনাম এটাই!
    কিন্তু এই ফলাফলের এমন উপস্থাপন আমাদের দেশে এতে অর্থ খোলসা হবে না। বলা যায় কিছুই বুঝা যাবে না। কিন্তু যদি একই তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে করা বা দেয়া অন্য শিরোনামটা হয় এমন যে – “বিজেপি একা সরকার গড়তে পারছে না – আবার কংগ্রেসও গড়ে ফেলতে পারার দাবিদারও” – তাতেও এই নয়া শিরোনামও সঠিকই থাকে মানে, একই তথ্য-সম্মত রিপোর্টের শিরোনামই  থাকে।  আর সেক্ষেত্রে আমাদের লাভালাভ হত এই যে আমরা ভারতের এবারের নির্বাচনী ফলাফলের অর্থ-তাতপর্য সহজেই ধরতে পারতাম!  কারণ এমন নয়া শিরোনাম শুনলে বাংলাদেশীরা সবাই নড়েচড়ে বসবেন।  হ্যা, কথা একেবারে সত্য! এতটুকু বাড়িয়ে বলা হয় নাই;  আর এতে কোন যদি-কিন্তুও নাই।

    এবার একটু খুলে বলা যাক, তবে স্বল্প কথায় বললে, ভারতে সরকার গড়তে কোন দলকে ২৭৩+ আসনে বিজয়ী হতেই হয়। আর বিজেপি এবার পেয়েছে ২৪০ আসন। অর্থাৎ মোদির বিজেপি তাই এবার  ৩২-৩৫ আসনের ঘাটতিতে আছে। একথার অর্থ হল বিজেপি কোনভাবেই একা সরকার গড়তে পারছে না। এই অর্থে বিজেপি এবারের ফলাফল হল, বিজেপি হেরে গিয়েছে।  সেজন্যই  গতকাল সকাল দশটার পর থেকেই বিজেপির সুর বদলে ফেলেছে। মোদি আর নিজ দলের সকলেই বিজেপির নাম মুখে নেয়া বন্ধ করেছে; এর বদলে তারা তাদের রাজনৈতিক জোট এনডিএ [NDA, National Democratic Alliance] এই নাম বলা শুরু করেছে। যেমন দাবি করছে, এনডিএ (বিজেপি নয়) আবার ক্ষমতায় আসতেছে। আসলে বিজেপি যে একা আর সরকার গড়তে পারছে না সেটা মোদির অজানা ছিল না। কিন্তু আগের মতই হামবড়া “ভাব” বজায় রাখতে না পারলেও কর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে এই “সুক্ষ্ম কারচুপি” বা কথার ফাঁকি তৈরি করেছে যে বিজেপি নয়, এনডিএ আবার ক্ষমতা আসতেছে!

    বিজেপি এখন নিজের নাম ভুলে কেবল এনডিএ এনডিএ করছে, কেনঃ
    আসলে এতদিন মানে পিছনের দুবারই সংখ্যাগরিষ্ঠতায় বিজেপিই সরকার গঠন করে থেকেছে। তাই বিজেপি যা চায় তাই জোটের বাকি সকলকে মেনে চলতে হয়েছে। এতে আবার, এতদিন এনডিএ আছে ঠিকই কিন্তু তেমন উচ্চারিতই নয়, এমন দশা হয়েছিল !  এছাড়া সবচেয়ে বড়কথাটা হল বিজেপির সবসময় যে  প্রধান নীতি মেনে চলেছে তা হল অন্যের দল ভাঙ্গিয়ে প্রার্থীকে নিজদলের প্রার্থী করা; আর তা করে গেছে অর্থ বা যেকোন “অবৈধ সুবিধার” লোভ দেখিয়ে। তাতে সেটা এনডিএ জোটের ভিতরের কেউ হতে পারে আবার বাইরেরও! কোন পরোয়া করে নাই। আর মোদির এসব কাজের অর্থের যোগান? সেটাও কোন অসুবিধাই নয়; কারণ, দলের ফান্ডের ভান্ডার আদানি বা আম্বানিরা তো আছেই! এরই পরিণতি হচ্ছে এনডিএ জোটের প্রায় সকল দলই (যাদের এবার মোট আসন হল ৫২) বিজেপি বা তাদের নিজ এনডিএ জোটের প্রতি আনুগত্যহীন! এতে সারকথাটা দাড়িয়েছে এই যে – না মোদি না তাঁর এনডিএ জোটের কেউ – কারোরই কোন স্থির কমিটমেন্টে আর কেউ নাই। সব পক্ষই যখন তখন অন্য জায়গায় সুবিধা দেখলেই এনডিএ জোট ভেঙ্গে ত্যাগ করে চলে যায় অথবা সময়ে জোটে ফিরে আসে  – এটাই এতদিনের কমন প্রাকটিস!  গতকাল সন্ধ্যা থেকেই তাই মোদির প্রধান দুর্দশাটা হল – বিজেপি এই নাম ভুলে গিয়ে এই জায়গায় এনডিএ জোটের নাম বসিয়ে উচ্চারণ।  এছাড়াও আরও সিরিয়াস দিক মানে, মোদির গত দশবছরের ইজ্জত ধুলায় মিটানোর মত দুর্দশা হল যে মোদিকে এখন থেকে দুই এন বা N  দিয়ে যাদের নাম নাইডু আর নীতিশ – এদের মন যুগিয়ে চলতে হবে, পা-ধরতে হবে।

    আজ ভোর থেকেই নিশ্চিত হওয়া এই কঠিন বাস্তবতা হল, মোদিকে এখন নিশ্চিতভাবেই এই ৫২ জনের হাত-পা চাটতে হবেই। আর তিনি তা ইতোমধ্যেই শুরু করে দিয়েছেন! যেমন এই ৫২ জনের মধ্যে বড় আসন ওয়ালা দুই এনডিএ জোট সঙ্গী দল হল – টিডিএ [তেলেগু দেশম পার্টি TDP] যেটা অন্ধ্রপ্রদেশ (হায়দ্রাবাদ) রাজ্যের দল; আর এরই মূল নেতা চন্দ্রবাবু নাইডু [Nara Chandrababu Naidu ]। আর আরেকজন হলেন বিহারের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার; দেখুন “এবার খেলা দেখাবেন নীতীশ কুমার, কার্ড তো তাঁর হাতেই, তাকিয়ে গোটা দেশ”। সবচেয়ে মজার কথা হল, কংগ্রেসসহ অন্যান্য মোদিবিরোধী দলের বর্তমান জোট ইন্ডিয়া [I.N.D.I.A] এর জন্ম বলা হচ্ছে মাত্র ১১ মাস আগে (July 2023)। আর এই জোট গঠনের উদ্গাতা ও প্রথম উদ্যোগীদের একজন হলেন কিন্তু এই নীতিশ কুমার; যিনি পরে আর এই জোটে আর থাকেন নাই কারণ, তিনি এসেছিলেন মোদির এনডিএ জোট ভেঙ্গে আর মোদি আবার তাকে বড় কোন “সুবিধার” বিনিময়ে আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন।  এককথায় গত দশবছরের মোদি জমানায় তিনি সমসময় মোদির পক্ষে, আর না-হয় মোদিবিরোধী  এদুই জোটের কোন একটার সাথে বারবার বদলাবদলিতে থেকেছেন।

    যদিও নীতিশের তুলনায় নাইডু – তিনি অনেক স্থির। বেশির ভাগ সময় তিনি কংগ্রেস ও তার বন্ধুদলের সাথে জোটের সঙ্গি থেকেছেন; কেবল এবারই সম্ভবত তিনি মোদির কোলে। তিনিই ইন্ডিয়ার আইটি খাতে যা সুনাম এর জনক! এককথায় গ্লোবাল আইটি খাতে একদিকে আমেরিকান গবেষণায় বুদ্ধি-পরিকল্পনা-ডিজাইন ইত্যাদি সবই তাদের আর অন্যদিকে তাতে ভারতের সস্তা কিছুটা এডুকেটেড শ্রমের অংশটা মাথা হল চন্দ্রবাবুর অন্ধ্রপ্রদেশ-হায়দ্রাবাদ রাজ্য। তাই ভারতের গৌরবজনক টেক সিটি [Tech city] বলতে এই হায়দ্রাবাদ।
    ওদিকে অন্ধ্রে কেন্দ্রের নির্বাচনের দিনই রাজ্য সরকারেরও নির্বাচন হয়ে যায় একই সাথে প্যারালাল, এমন চারটা রাজ্যের একটা সে। গতকাল পাঁচ বছর পরে নাইডু আবার রাজ্য নির্বাচনে (বিজেপির সাথে করা জোটে) বিপুল ভোটে ফিরেছেন। আর এদিকের হিসাবে, এবার নীতিশ-নাইডু মিলিয়ে তাদের মোট আসন প্রায় ২৮; নীতিশ ১২ আসন আর নাইডু ১৬ আসন। ফলে বুঝতেই পারছেন বর্তমানে এনডিএ জোটে থাকা  নীতিশ-নাইডু মোদির কাছে কত গুরুত্বপুর্ণ। যেমন নাইডুর বিজয়ে ইতোমধ্যেই নাইডুকে মোদি তোয়াজ করতে চলেছেন; বিজয়ে ফোন করেছেন। আগামি নয় জুন নাইডু নয়া মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিবেন আর তাতে উপস্থিত থাকবেন সম্ভবত মোদি স্বয়ং! দেখেন,  অন্ধ্র প্রদেশের বিধানসভায় শপথ নেবে, তখন সেখানে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং!  এর পরিকল্পনা চলছে।

    কিন্তু মোদির দিক থেকে দেখলে ভয়ঙ্কর কথাটা হল, বিজেপি জোটের নীতীশ-নাইডুর সঙ্গে যোগাযোগ করছে কংগ্রেস। খবরটা হিন্দুস্তান টাইমসের আমি নিজেই গতকাল রানিং এনডিটিভিসহ স্থানীয় হিন্দি চ্যানেলে দেখেছিলাম; তখন নির্বাচন নিয়ে কংগ্রেসের প্রেস ব্রিফিংয়ের পরে এই সংবাদ জেনেছিলাম। আর আজকে সব মিডিয়া লিখছে সব ছোট বড় দল এখন দিল্লিমুখি – মানে ধরাধরি পায়ে পরার কেনা বেচা এখন তুঙ্গে চলবে। আমাদের টিডিএস পত্রিকা সেগুলারই একটা সাম-আপ ছেপেছে – “মোদির ‘প্লেন’ ছেড়ে বিরোধী ‘প্লেনে’ নিতিশ? মাঝ-আকাশে জল্পনা তুঙ্গে!” । মানে হল নীতিশ কুমারকে নিয়ে টানা হেচড়া দরাদরি সম্ভবত চরমে উঠেছে।

    এসবের অর্থ কী?
    অর্থ খুব সোজা। মোদি একা (মানে কেবল বিজেপি) সরকার গড়ার দাবিদার নন; কারণ তাদের মোট আসন ২৪০ মাত্র, এটাই সব কিছু স্বাক্ষ্য! আর দ্বিতীয় কথা, আরো যে ৩২-৩৫ আসন মোদিকে যোগাড় করতেই হবে (যার মধ্যে নাইডু-নীতিশ মিলে ২৮ আসন থাকবে তা ধরে নেয়া আছে); আর এছাড়াও ৭-১০ জন আরো এমপি লাগবে; সাথে স্টান্ড-বাই আরো কিছু এমপি লাগবে। মজার কথা হল, এতে সব খুচরা আসন পাওয়া দলই এখন অনেক দাম হাকাবে। সবচেয়ে বড় কথা অলক্ষ্যে কংগ্রেসের ইন্ডিয়া জোটও যদি এতে মোদির চেয়ে বেশী সংখ্যায় এমপি যোগাড় করতে পারে তবে মোদিও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বাদ যাবেন। তাঁর তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার শখ খতম! যদিও ভারতের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রী হবার প্রথম সুযোগ ও আহবান মোদিই পাবেন; কারণ তার দলের অবস্থান ২৪০ এমপি।
    এমনকি আগামি দশদিনের মধ্যে যদি মোদি আপাতত এমপি যোগাড়ে সফলও হয়ে যান তবুও পরের দুমাসের মধ্যে আবার ক্রাইসিস দেখা দেওয়া – সেটাও অসম্ভব নয়। মোদির যোগাড় করা এমপিগুলো আগামি দিনগুলোতে নিজেই ভেগে যাবে বা কংগ্রেস ভাগায়ে নিয়ে যাবে – এমন শঙ্কার মধ্যেই কাটবে! এককথায় নিয়মিত এক ভাঙ্গাগড়ার ভিতর দিয়ে দুর্বলভাবে খাড়া করা কোন সরকারই বারবার গঠন হতে থাকবে!  এজন্য শিরোনামে বলেছি কংগ্রেসও দাবিদার হয়েই থাকবে। এনিয়ে আরো একটু বিস্তারে যাব পরবর্তিতে এলেখার শেষের দিকে।

    তাহলে আগামিতে ভারতে কী হতে যাচ্ছেঃ এক.
    আপাতত পয়েন্ট দুইটা।
    ১। ভারতের মোদির হিন্দুত্ববাদ এখানেই আটকে গেল; আরও আগানোর সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। ভারত হিন্দুত্ববাদ মুক্ত হতে থাকবে এখন থেকে; অন্তত উচ্চারিত হবে না আর! এটাকে বলা যায় হিন্দুত্ববাদের দিন শেষ; এর শুরু হল এখন থেকে!
    ২।  প্রমাণিত হল, হিন্দুত্বের সুরসুরি দিয়ে মানুষের পেটের ক্ষুধা বা কাজ না পাওয়া বেকারত্ব-কে ঢাকা দিয়ে সাময়িক চলতে পারলেও শেষে মোদি ফেল করতই; সেটা এবারই ঘটে গেল!

    হিন্দুত্ববাদের দিন শেষঃ
    গতকালই কলকাতা থেকে প্রথম আলোতে লিখেছে, নীতিশ-নাইডুর হাতে এখন বিজেপির বাঁচা-মরা। এটা আসলে খুবই কম করে বলা। কেন?
    গতকাল থেকেই কলকাতার আনন্দবাজার একেবারে মমতার পক্ষ আঁকড়ে ধরা অবস্থান নিয়ে ফেলেছে। আর কোন এদিক-ওদিক তাকানোর অবস্থায় নাই এই পত্রিকা! আজকেও এরা এক মুল্যায়ন রিপোর্ট লিখেছে। নিচে দেখেন।

    “ভোটের ফলপ্রকাশের পর মঙ্গলের সন্ধ্যায় ‘জয় জগন্নাথ’ দিয়ে মঙ্গলবার বক্তৃতা শুরু করলেন নরেন্দ্র মোদী (ঘটনাচক্রে, এ বার ওড়িশায় বিপুল জয়
    পেয়েছে বিজেপি)। দেশে তৃতীয় বার এনডিএ কেন্দ্রে সরকার গড়ার জাদুসংখ্যা পেরিয়ে যাওয়ার পর মোদীর ৩৪ মিনিটের বক্তৃতায় এক বারও
    ‘জয় শ্রীরাম’ শোনা গেল না। রামমন্দিরের কথা বললেন যদিও। বিজেপি নয়, জোর দিলেন এনডিএ নামক জোটের উপর। তাঁর ভাষণে বার বার
    শোনা গেল এনডিএ-র কথা”।

    আনন্দবাজারের অবজারভেশন তাতপর্যপুর্ণ! মোদির মুখে আর ‘জয় শ্রীরাম’ শোনা গেল না, নাই।  জোর দিলেন বিজেপি নয়, জোর দিলেন এনডিএ নামক জোটের উপর। আর এই কথাগুলোই আমিও উপরে বলেছি। কেন এমন হচ্ছে? এককথায় কারণটা হল, মোদির এখনও আবার প্রধানমন্ত্রী হবার সুযোগ থাকলেও সেটা অবশ্যই হতে হবে এক কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী!! আর কোয়ালিশন সরকার মানেই হল, বিজেপির শ্লোগান ও কর্মসুচী বা দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে চলবে না। এরই এককথায় বলা অর্থ হল, মোদির হবু কোন কোয়ালিশন সরকারে হিন্দুত্ববাদের বয়ান, বক্তব্য শ্লোগান চলবে না। এটা বলাই বাহুল্য।  হিন্দুত্ব বা হিন্দুত্ববাদের দাগ বা গন্ধ মোদির কোয়ালিশন শরীক কোন দলই নিতে চাইবে না। কারণ, বিশেষত মোদির চেয়েও কংগ্রেসের থেকে কখনও বেশী দাম পেতে কখন কোন শরীক দলকে কংগ্রেসের জোটের দরজায় টোকা দিতে হয় তা কে জানে? তাই ছোট দলগুলোর কেউই আগাম নিজ দলের সম্ভাবনা নষ্ট করতে চাইবে না! তাি মোদি এসব নিজেই বুঝে, আগাম নিজেই ঠান্ডা পায়ে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছেন!!! এটা বেশ মজার না?
    কে ভেবেছিল যে খোদ মোদিকেই হিন্দুত্ববাদ বা জয় শ্রীরাম ত্যাগ করে একদিন এসবকেই এড়িয়ে চলতেই হবে!! এর চেয়ে বড় তামাসা আর কী হতে পারে??? যদিও এরপরেও কোন কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কোন নিশ্চয়তা মোদির হাতে নাই!

    দুই. পেটের ক্ষুধা বনাম হিন্দুত্বের সুরসুরিঃ
    এটা ঠিক যে উগ্র জাতিবাদ মানে যেটা খোলাখুলি নিজ জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদ এর কথা সগর্বে বলে। তাও আবার সেই উগ্র জাতিবাদ  (ভাষা, ভুগোল বা অন্যকিছু ভিত্তিক জাতিবাদ না হয়ে যেটা ধর্মীয় জাতিবাদ) যদি ধর্মভিত্তিক উগ্র জাতিবাদ হয় সেক্ষেত্রে এমন উগ্র জাতিবাদী অনুসারী মাত্রই এক কমন সমস্যার মুখে তাদের পড়তে দেখা যায়। সেটা হল ধর্মবোধ এমনই উচ্চে উঠে যায় যে তিনি নিজ শরীরের কথা ভুলে যান বা অস্বীকার করতে বসে যান। অথচ কোন রক্তমাংসের মানুষের পক্ষে কী নিজ শরীরের কথা চাহিদা ভুলে যাওয়া সম্ভব? মানে হল, মানুষ মাত্রই সে বৈষয়িক; মানে সে রক্ত-মাংসের শরীর, তার ক্ষুদা লাগে। আর এই নানা ধরণের শারীরিক ক্ষুধা এটা সারাদিন ধর্মবোধে ডুবে বুঁদ হয়ে থাকলেও কমবে না, ক্ষুদা পুরণ হবে না। এটাকেই বলে নিজ শরীরের চাহিদা বা ক্ষুধা অস্বীকার করে কারও স্পিরিচুয়াল  বা ধর্ম-ভক্ত হয়ে উঠার সুযোগ নাই!  মানুষ আগে শরীর টিকায়ে বেঁচে থাকতে পারলে এরপরই কেবল সে স্পিরিচুয়াল  বা ধর্ম-ভক্ত হয়ে উঠতে পারে! অর্থাৎ আগে শরীর (মানে চাকরি বা কাজ) পরে হিন্দুত্ববাদ!

    এখন এখানে এককথায় বললে, শাসক হিসাবে মোদি অযোগ্য কারণ তিনি গত দশ বছরে দেশে নুন্যতম সংখ্যায় কাজ সৃষ্টি করতে পারেন নাই; এমন কোন অর্থনীতি খাড়া করতে পারেন নাই।  [একই সমস্যা ছিল মোদির আগের কংগ্রেস কোয়ালিশনের (২০০৪-১৪) দশ বছরেও]। ফলে এবার নির্বাচনের আগে এমন বহু সাধারণ মানুষ বা পাশ করা বেকারদেরকে নিয়ে ছোট ইন্টারভিউ দেখেছি তারা বলছেন, মোদির হিন্দুত্ববাদ তাঁদের ভাল লাগে [হিন্দুত্বের  জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদের সুরসুরি যেহেতু]; কিন্তু একই নিশ্বাসে তিনি বলছেন তিনি বেকার; এটা তাঁর খারাপ বা অসহ্য লাগে।
    মোদির হিন্দুত্ববাদ যাদের ভাল লাগে, মোদির এমন সাপোর্টার সবাই এবার মোদিকে ছেড়ে যান নাই; যদিও গেছেন কেবল একটা অংশ। ফলা ফল তাই বলছে! কিন্তু তাতেই মোদির এমন ভরাডুবি! শারীরিক ক্ষুধা সবসময়ই এমনই ধর্মবোধেরও  উপরে আগে বা প্রায়োরিটিতে অবস্থান করে থাকে! এর আরেকটা প্রমাণ হল, এত ঢাকঢোল পিটিয়ে সুপ্রীম কোর্টকেই হাত করে রায় নিয়ে মোদি বাবরি মসজিদের উপর রামমন্দির নির্মাণ শেষ করলেন। ভেবেছিলেন এটা তাকে এবার ভোটে ব্যপক মাইলেজ দিবে; তিনি ভোটে অনেক আগিয়ে থাকবেন। অথচ ঘটেছে উলটা।
    এবার উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী পার্টি (কংগ্রেসের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে) যে মূল শ্লোগান দিয়েছে তা আসলে এটাই যে হিন্দু-মুসলমানের অমীমাংসেয় ক্যাচাল উস্কে ঝগড়া বিতর্ক কিংবা রামমন্দির নির্মাণ ইস্যু এসব পাশে রাখেন, আগে কাজ সৃষ্টি করেন – মানুষ ক্ষুধার্ত সেদিকের তাকান!  সেদিকটা নিয়ে সরকারী কর্মসুচী, প্রকল্প তৈরি করেন আগে। আর এটাই এই দলকে পপুলারিটি দিয়েছে। মোদি-যোগীকে ভেঙ্গে তছনছ করে দিয়েছে। উত্তরপ্রদেশের মোট আশি আসনের ৪৪ টাই নিজেরা পেয়েছে সমাজবাদী দলের জোট!
    ঠিক একই জিনিষ ঘটেছে মমতার পশ্চিমবঙ্গে। মুসলমান প্রধান আসনগুলোতে বিজেপির বিরুদ্ধে মমতার শ্লোগানও ছিল একই। বুঝা গেল ধর্মবোধ গুরুত্বপুর্ণ অবশ্যই, কিন্তু শারীরিক ক্ষুধা চাহিদা ভুলে সম্ভবত দশ বছরের বেশী সমাজের একটা বড় অংশ এভাবে চলতে পারে না! মোদির বা হিন্দুত্ববাদের হার হয়েছে এখানেই!

    তাহলে কী দাড়ালো?
    মূলকথাটা হল ভারতের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে – রাইজিং ইন্ডিয়া হতে – ইন্ডিয়া এখনও অনেক দূরে। এবারের নির্বাচন যেন এমনই এক ম্যাসেজ বা রায় চোখ আঙুল দিয়ে দেখাল।  গালগল্প তুলে আর এক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের চাপাবাজির দক্ষতা দিয়ে রাইজিং ইন্ডিয়া হওয়া যায় না। দেশে কাজ সৃষ্টি করতে হয়! টানা দশবছর হিন্দুত্ববাদের উত্থান দেখে যারা এতদিন এটাকেই ভারত শ্রেষ্ঠ, উগ্র হিটলারি হিন্দুত্ববাদী জাতিবাদই ভরসা আর এগুলোই ভারতের অর্থনীতি রাইজিং ইন্ডিয়াতে পৌছে যাবার লক্ষণ মনে করেছিল – তারাই সেই আম জনতাই আবার ফিরে গেল তাদের মনে পড়ল তারা ভুল আর মোহ এর মধ্যে আটকে গেছে। তাদের পেটে ক্ষুধা চিনচিন করছে!  কারণ তাদের কাজ নাই, অর্থনীতি নাই মানে কাজ নাই! এবার প্রায় ১৮০০ কোটি রুপী খরচ করে বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। এটা ‘ফৈজাবাদ’ কনষ্টিটুয়েন্সী যার নাম বদলে অযোধ্যা করা হয়েছে। এই কথিত অযোধ্যেতেই বিজেপি হেরে গেছে, ৪৮ হাজারেরও বেশী ভোটে সমাজবাদি পার্টির কাছে।

    এতে ভারতের আগামি পরিণতি কী হতেপারেঃ
    আমি আগে অনেকবারই বলেছি নেহেরুর হাতে ভারত এই রাষ্ট্রগঠন – এটাই মারাত্মক ত্রুটিপুর্ণ। কারণ, “কেন্দ্র নামে” এই ভুতুড়ে ক্ষমতা-প্রতিষ্ঠানের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখে ভারতরাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল। আসলে বৃটিশ আমলেও ভারত বলে একই প্রশাসনের শাসনের অধীনে চলা কোন ভুখন্ড বলতে কিছুই ছিল না। ছিল কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক হেড কোয়ার্টার। আর এই কোম্পানি হেড কোয়ার্টার এর অধীনে আলাদা আলাদা কিছু রাজ্য এবং এরই পাশাপাশি ৫৫০ এরও বেশী আলাদা আলাদা করদ রাজ্য। এমন রাজ্য-প্রদেশ বা করদ রাজ্য এরাও আবার কেউ কারো অধীনে শাসিত নয়। সবাই আলাদা আলাদা ভাবে  এক কোম্পানি হেড কোয়ার্টার এর অধীনে শাসিত! তাই এক ভারত বলে কিছুইর অস্তিত্ব ছিল না। তাই নেহেরু একেবারে গায়ের জোরে সবকিছুকে এক ভুতুড়ে কেন্দ্রের অধীনে করে একটা ভারতরাষ্ট্র গড়তে গেছিলেন। আর এটাই আজ কাল হয়েছে।  এতে সবচেয়ে খারাপ ও বিপদের কথা হল, এই কেন্দ্র জিনিষটা আসলে কী? এটা কেমন ধরণের রাষ্ট্রচিন্তা? তা কখনই আমল করা হয় নাই। একাদেমিকেরাও না, রাজনীতিবিদেরাও না। এমন না হবার পিছনের মূল কারণ হল কমিউনিজম বা সবরোগ-হর সমাজতন্ত্রী ধারণা;  আর সমাজতন্ত্রী মানে সমাজের এক অংশ অপর অংশের উপর দাবড় দিয়ে রেখে চলে থাকে; ফলে চলতেই হবে – এমন ঘোষিত এক একনায়কতান্ত্রিক ধারণা। বিপরীতে এখানে রিপাবলিক বা পাবলিক ধারণাটাই অনুপস্থিত। পাবলিকের ক্ষমতা, গণ বা নাগরিক অধিকার ধারণাটাই অনুপস্থিত। এমনকি আমেরিকা কেন ফেডারল রাষ্ট্র -এর অর্থ বৈশিষ্ট কী তাও ভারতের কেউ, নুন্যতম কোন একাদেমিশিয়ান বুঝতে গেছেন জানা যায় না।   সবাই বড় জোর বাচ্চাদের মত করে আধো আধো বোলে (কেন্দ্রিয় সরকার না বলে) উচ্চারণ করে ইউনিয়ন গভর্মেন্ট। অথচ রাষ্ট্রই বুঝে না!

    এক কথায় বললে ভারতের কোথাও কোনও কোণায় না রাজনীতিক পাড়ায় না একাদেমিক পাড়ায় – রাষ্ট্রচিন্তা ও এর অলিগলি নিয়ে কোন ধারণাই নাই। তাই আপনা থেকে ভারতরাষ্ট্রের এই আদি ও মৌলিক ত্রুটি কখনও কাটবে না। আসলে সেই ১৯৮৯ সালে রাজীব গান্ধীর শেষ আমল থেকেই এটা পরিস্কার হয়ে উঠেছিল, নেহেরুর তৈরি কেন্দ্রের নামে জবাব্দীহিতা হীন একটা কথিত কেন্দ্রের হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রিভুত করে রাখা ভারতরাষ্ট্র এর দিন শেষ হয়েছে। এতে হয়েছে যেটা সারা ভারত শাসন করতে গেলে প্রথম শর্ত হল সারা ভারতে স্থানীয় কমিটি সংগঠন আছে (এটাকে ভারতে সর্বভারতীয় দল বলা হয়) এমন একটা কেন্দ্রীয় দল থাকা। নেহেরু মারা যান ১৯৬৪ সালে, আর ১৯৮৯ সালে এসে রাজীবের হাতের কংগ্রেস বুঝে যায় যে তারা আর সর্বভারতীয় দল নয়। সম্ভবত রাজীব মারা (১৯৯১) যাবার আগেই বুঝে গেছিলেন এই সংকটের কথা। সেজন্যই কী তিনি বিজেপিকে একটা সুযোগ দিতে গেছিলেন? যেটা প্রথমে ১৯৮৯ সালের কাশ্মীরের নির্বাচনে কারচুপি করে কাশ্মীরের ইসলামি রাজনীতিকে ভোটের রাজনীতি থেকে সশস্ত্র পথে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন; পরে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গাকে কেন্দ্র করে বিজেপির উত্থানের রাস্তা খুলে গেছিল সেদিকে ঠেলে দিছিলেন? কিন্তু তাতেই মোদির দশবছরের শাসন শেষেও বলা যায় বিজেপিও সর্বভারতীয় দল হতেই পারে নাই। এরই সোজা সাপ্টা মানে হল, এখন এর এক মাত্র  বিকল্প হল কোয়ালিশন সরকার!

    মোদির এবারের হারের তাতপর্য- এক. কোয়ালিশন সরকারঃ
    রাজীব গান্ধীই ছিলেন শেষ স সরকারের শাসন। যেন সেটা টের পেয়েই বিজেপির জন্য রাস্তা খুলে দিছিলেন তিনি। আর আজ এর পরিণতি হল, মোদির এবারের হারের ভিতর দিয়ে শুধু মোদির এবারেরই নয় আগামিতেও ভার শাসিত হতে থাকবে এক কোয়ালিশন সরকারের মাধ্যমে। মানে বিজেপি বা কংগ্রেসকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের কোয়ালিশন।  এটাই আবার আস্ত আস্তে বিজেপি বা কংগ্রেস দল দুটো আরো ছোট হতে হতে সেগুলো প্রভাব হারিয়ে ভারতের রাজনীতি হয়ে যাবে আঞ্চলিক দলগুলোর দলগুলোর কয়েকটা স্থায়ী জোটের সরকার। এমন কয়েকটা আঞ্চলিক দলের আঞ্চলিক জোটের কথা ভেবেই বলেছিলাম এমন প্রধান তিনটা আঞ্চলিক দলের জোট হবে সম্ভবত। যেমন দক্ষিণ ভারতীয় জোট, উত্তর ভারতীয় জোট আর পুর্ব ভারতীয় জোট ইত্যাদি।

    মোদির এবারের হারের তাতপর্য- দুই. দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকারঃ
    দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার – এটাই হয়ে উঠবে বাকি সবকিছুকে ছাপিয়ে প্রধান বৈশিষ্ঠ। এটা এবার থেকেই শুরু হয়ে যাবে। যে৪মন উপরে দেখিয়েছিম কেন খোদ মোদিকে ইতোমধ্যেই হিন্দুত্ববাদ বা রামমন্দির এসব ইস্যু নিয়ে কথা নিজের পেটেই দাফন করে দিতে হবে। কারণ কোয়ালিশন সরকারে শরীকের মন যুগিয়ে চলতেই হবে।
    এছাড়া আরো কথা আছে। যেমন ইতোমধ্যেই গতকাল বিকালে ভারতের হিন্দি নিউজ চ্যানেলে উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ সৃষ্টির কথা শোনা গেছে। এতদিন এই ব্যাপারটা ছিল বড় জোর রাজ্য সরকারের উপ-মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে। মানে শরীক দলকে মন যুগাতে উপ-মুখ্যমন্ত্রী পদ সৃষ্টি করে তাদের আসন দেয়া হয়েছে। কখনও সেটা আবার আরো দু-তিনটা উপ-মুখ্যমন্ত্রী দেখা গেছে। এবার সেই একই ভাবনা থেকেই সবচের‍্যে বেশী পিছলা শরীক বিহারের নীতিশকে উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদ অফার করা হতে পারে। আর সেক্ষেত্রে হায়দ্রাবাদের নাইডু সাহেব কেন বাদ পড়বেন? সেক্ষেত্রে তিনিওও আরেক উপ-প্রধানমন্ত্রীর হকদার হয়ে যেতে পারেন।
    অনেকের কাছে ব্যাপারটায় ব্যাপক তামাসার দিক নজরে পড়লেও একটু সিরিয়াস দিকে যাওয়া যাক। এই উপ-প্রধানমন্ত্রী বানানোর যে অভিমুখ এর সোজা মানে হবে সেই কোয়ালিশন সরকার যেকোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এটা মতভেদে ডুবে থাকবে। এককথায়, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয় সেসব ইস্যুতে সে ব্যাপারে একেবারেই অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়ে যাবে।  তাই দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকার এর খাঁড়া অর্থ হল সিদ্ধান্তহীনতার অকেজো সরকার!

    মোদির এবারের হারের তাতপর্য- তিন. ‘র’-এর মত প্রতিষ্ঠান দুর্বল ও অকেজো হতে থাকবেঃ
    অনেকে ব্যাপারটা খেয়াল করেছেন অথবা না। সামরিক বা ইল্টেলিজেন্স ধরণের প্রতিষ্ঠান; এগুলোর জন্য দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম এমন সরকার হতে হয়।  যেকোন সরকারী প্রতিষ্ঠানকেই কোন না কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে হতে হয়। আবার মন্ত্রণা লয়ের অধীনে চলে যাওয়া মানে দীর্ঘসুত্রিতা; কারণ মন্ত্রণালয় থেকে পরে আবার প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌছানি আর সিদ্ধান্ত ফাইনাল করা এটাই দীর্ঘসুত্রিতা। এজন্য ‘র’-এর মত প্রতিষ্ঠান এটা সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অধীনে সেটা একই সাথে হ্যা আবার না। আসলে দীর্ঘসুত্রিতা এড়াতে মাঝখানে কোন মন্ত্রী নাই ঠিকই কিন্তু অজিত দোভাল-কে উপদেষ্টা করে রাখা হয়েছে। তাঁর মাধ্যমেই এটা দ্রুত প্রধানমন্ত্রীকে জানানো বা অনুমোদনের ব্যাপারগুলো দ্রুত সেরে নেবার ব্যবস্থা সম্পন্ন। এটাই হল আদর্শ রূপ!

    কিন্তু সমস্যা হল যখন কোয়ালিশন সরকার ক্ষমতায় থাকে বিশেষত যখন শরীক দলও অনেক প্রভাবশালী বা ওজনদার – মানে কথা না শুনলে সরকার ভেঙ্গে যেতে পারে এমন। সেক্ষেত্রে একই প্রধানমন্ত্রী কিন্তু কোয়ালিশন সরকারের বলে তিনি আগেই প্রতিজ্ঞা করেছেন পার্টনারের কাছে তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও পার্টনার বা  উপ-প্রধানমন্ত্রীকে না জানিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিবেন না।

    এখন ধরা যাক, একটা আন্তরাষ্ট্রীয় অপহরণ ও গুমের কেস। অন্যদেশ থেকে এনে ভারতের কোন রাজ্যের সড়কে তাকে ফেলে রেখে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পরে ঐ শহরের এসপি গিয়ে সেটা উদ্ধার দেখানো হবে। এখন এতে র-কে জড়িত হতে হলে প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন স্বাক্ষর লাগবে – অফিস বা বিজনেস অর্ডারে মনে করেন এভাবেই নির্দেশিকায় লেখা আছে। এখন সেই ফাইল প্রধানমন্ত্রীর অফিসে পড়ে আছে কিন্তু কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন নাই। কেন?
    কারণ, গতবার এমনই এক সিদ্ধান্তগ্রহণের বেলায় এক উপ-প্রধানমন্ত্রীকে রাজী করানো হয়েছিল এভাবে যে তিনিও একটা বিজনেস ডিলে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন চান। প্রধানমন্ত্রী সেটা দিতে রাজি হলেই তবেই তিনিও আগের সিদ্ধান্ত অনুমোদন দিতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে নানান প্যাচে আর ঝামেলায় পড়ে প্রধানমন্ত্রী নিজ প্রতিশ্রুতি রাখতে পারেন নাই। কাজেই এখন র-এক্ষেত্রে এক-দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করলেও প্রধানমন্ত্রী তাদেরকে অনুমোদন দিবার অবস্থায় নাই!

    এতে ফলাফল কী হবে?
    ‘র’-এর মত প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল ও অকেজো হতে থাকবে। একদিক দিয়ে এটা ভাল হয়ত। যে র যেভাবে বেপরোয়া কানাডা-আমেরিকার মত দেশে গিয়ে গুম-খুন করে আসছে বীরদর্পে – সেগুলো ভারতে কোয়ালিশন ধরণের সরকারের কারনে সিদ্ধান্তহীনতায় দুর্বল ও অকেজো হতে থাকবে; এমন ততপরতা কমে আসবে।  অবশ্য অনেকে বলেন, এনিয়ে এক লেখা বইয়ে ভারতের অশোক রায়না এমনই ধারণা পোষণ করেছেন। 
    কিন্তু সাধারণভাবে যে কোন রাষ্ট্রস্বার্থ এমন হয় যেটা এমন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করতেই হয় যেমন অন্যদেশের জাশুশি-গোয়েন্দাগিরি ঠেকানো। সেক্ষেত্রে ঐ রাষ্ট্রের কোয়ালিশন সরকার রাষ্ট্র-কাঠামো ও এর ততপরতাকেই স্থবির করে দিতে পারে।

    এককথায় বললে, সিদ্ধান্তহীনতা যে কোন রাষ্ট্রের অস্তিত্বরক্ষার বা নরমাল ফাংশনের দিক থেকে সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা। আর নিয়মিত কোয়ালিশন সরকার মানেই সিদ্ধান্তহীনতা।
    এজন্যই বলেছিলেম এভাবে চললে ভারত রাষ্ট্র এভাবে ক্রমশ স্থবির হতে থাকবে সম্ভবত তিনটা আঞ্চলিক রাজ্য জোটে বিভক্ত হয়েও টিকতে না পেরে।

    মোদির এবারের হারের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বড় তাতপর্য এটাই!

    আর সবশেষে বলাই বাহুল্য, ভারতে যতই দুর্বল আর কোয়ালিশন সরকার গঠিত হবে ততই সেই সরকার দুর্বল হয়ে পড়বে বাংলাদেশের উপর তার অযাচিত সব হস্তক্ষেপ, সব প্রভাব ও আধিপত্য ঘটানোর ক্ষেত্রে !! নিজ মাথার ঘাঁয়ে পাগল এমন সরকার বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সময় দিতে চাইবে না। এমনকি ভারতের কোটারি সমর্থন স্বার্থের ও সহায়তার উপরে দাঁড়ানো বাংলাদেশের যেকোন সরকারো দুর্বল হয়ে পড়বে!

     

     

     

     

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখা কোন নিউজ নয়, ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্লেষণ মাত্র। ফলে পাঠকের এ’লেখা পড়ে কিছুই বহন করা বা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নাই। কেবল জানলেন যে এমন একটা মতামত আছে!]

    আপডেটঃ      ২০২৪  রাত
    শেষ আপডেটঃ   জুন মে ২০২৪, সকাল 

  • হাসিনা কি ভারতের চাপে ভুল পথ ধরতে আগাচ্ছেন

    হাসিনা কি ভারতের চাপে ভুল পথ ধরতে আগাচ্ছেন
    গৌতম দাস
    ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪  সন্ধ্যা ১৮ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-5la

     

     

    হাসিনা সম্ভবত  ভুল করতেছেন। ভুল পথে ধরতে যাচ্ছেন।  আর এতে চীনের থেকে “বাজেট সহায়তা” বলে নগদ ডলারে, প্রায় দুই ডিজিটের ঋণ আনা বোধহয় তাঁর হাত ছুটে যাবে! আর তাতে সব মিলিয়ে মানে কি দাঁড়াবে? বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে ভাঙ্গা অর্থনীতি! যা ক্রমশ আমাদেরকে দুর্ভিক্ষদের দিকে নিবে? আর আমরা তা দাঁড়ায় দাঁড়ায় দেখব?

    কেন বলছি একথা?
    এটা আর লুকানোর কিছু না যে সরকারের অর্থনৈতিক সংকট কাঁধে নিয়ে হাসিনার একটা খেলনা নির্বাচন শেষে নিজেকে তাতে বিজয়ী-প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা কললেন বটে কিন্তু তাতে করে তার ক্ষমতায় খাড়ায় যাবার চেয়েও আরো বড় ও মারাত্মক সঙ্কট হল ‘অর্থনৈতিক’  – সেটাই এখন সরকারকে জাপটে চেপে ধরেছে! গত মাসে নয়া সরকার গঠনের পর থেকেই ঢাকার চীনা রাষ্ট্রদুত প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন মন্ত্রীর অফিসে গিয়ে সাক্ষাতের রিপোর্ট  হচ্ছে মিডিয়ায়। আর এসব রিপোর্টে কেন চীনের এসব সাক্ষাত হচ্ছে বা ইস্যু কি; তা নিয়ে আমাদের জল্পনা কল্পনাও করতে হচ্ছে না। যেমন চীনা রাষ্ট্রদুত ইয়াও ওয়েন এর সাথে নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ এর যে প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাত হয়েছে এনিয়ে হাতের কাছে দুটা রিপোর্ট দেখছি। বিবিসি বাংলার বেলায় শিরোনাম, “বাংলাদেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন ‘পাশে থাকবে’ কীভাবে?” –  আর বণিকবার্তায় শিরোনাম, বাংলাদেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে পাশে থাকবে চীন— রাষ্ট্রদূত” – মানে দুটাই প্রায় একই ভাষার শিরোনাম।

    “ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন গত বেশ কয়েকমাস যাবত বলে আসছেন যে বাংলাদেশ
    রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন পাশে দাঁড়াবে। কয়েকদিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সাথে বৈঠকের
    পর চীনের রাষ্ট্রদূত আবারো একই কথা বলছেন,
    যেটি সংবাদমাধ্যমে রিপোর্ট হয়েছে।” – বিবিসি

    অর্থাৎ আমাদের জল্পনা-কল্পনার কিছু নাই, কারণ ব্যাপারটা খোলাখুলি-ই যে বাংলাদেশের কঠিন রিজার্ভ সংকট বর্তমান। আর এতে সহায়তা দিতে চীন আগ্রহী বা রাজিও আছে। এরই ইঙ্গিত দেয়া হচ্ছে।  এছাড়া বিবিসি দুজন মন্তব্যকারীকেও নিয়ে এসেছে সংকট নিয়ে তাদের মতামত দিবার জন্য। একজন হলেন সিপিডির কর্তা দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। আর অন্যজন ডঃ জাহিদ হোসেন যিনি নিজ কেরিয়ার গড়তে সেই আশির দশকের শেষ থেকেই বিশ্বব্যাংক ওয়াশিংটনের এর সাথে কাটিয়ে শেষটা বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের চীফ ইকোনোমিস্ট হিসাবে শেষ করেছেন। এরপর আনুষ্ঠানিক অবসর নিলেও কনসালটেন্ট হিসাবে বিশ্বব্যাংক ঢাকার এক্সটারনাল বা ছুটাকাজ-সম্পর্কে জড়িত ও অভিজ্ঞ মতামত দিয়ে থাকেন।

    দেবপ্রিয় সম্পর্কেও আরেকটু বিস্তারে পরিচয় বলা দরকার। এককথায়, দেবপ্রিয় এখন শুধু সিপিডির কর্তাব্যক্তি শুধু তাই নয়, তিনি প্রায় যেন ভারতের মুখপাত্র হয়েছেন। যদিও বলা হয় সিপিডির জন্ম ১৯৯৩ সালে কিন্তু এটা প্রথম লাইম-লাইটে  এসেছিল ২০০৪ সালে। তাও আবার পরের ১/১১ এর ক্ষমতাদখলের পক্ষে প্রস্তুতিমূলক কাজ ২০০৪ সাল থেকেই শুরু হয়েছিল বলে। কিন্তু সার অর্থে সেটা ছিল আসলে ভারতের স্বার্থের পক্ষে ‘কনসালটেন্সি’ এবং তা খোলাখুলি। বিশেষত বাংলাদেশের উপর দিয়ে ভারতের নর্থ-ইস্টকে বিনা পয়সায় সব ধরণের করিডোর দেয়ার ওকালতি। এমনকি যারা সিপিডির এই দালালি ব্যবসার সাথে একমত নয় তারা সবই নাকি “অশিক্ষিত” এমন মন্তব্যও করেছিলেন রেহমান সোবহান।

    এটুকুই নয়, একেবারে সাম্প্রতিককালে দেবপ্রিয় একেবারে রানা দাসগুপ্তের সাথে পাল্লা দিয়ে তবে একসঙ্গে বাংলাদেশের প্রো-ইন্ডিয়ান প্রধান হিন্দু লিডার হতেও আপত্তি করছেন না। দেবপ্রিয়ের মুল পেশা “উন্নয়ন কনসালটেন্সি” কিন্তু একালে তিনি (সাথে সিপিডির বস রেহমান সোবহানও)  এই পরিচয় ছাপিয়ে ভারত-সমর্থিত হিন্দু নেতা হতে দ্বিধা করছেন না। কোন প্রফেশনাল মানুষের এমন কাজ ও নিচা মানের কমবিনেশন  (কনসাল্টেন্সি আর প্রো-ইন্ডিয়ান প্রধান হিন্দু লিডার একত্রে) আমরা আগে দেখি নাই। কিন্তু এমন কেন? কারণ, দেখতে দেবপ্রিয়র এটা দুটা পেশা-ততপরতা হলেও এদের মিলটা হল দুইটাই ভারতের স্বার্থ আর তিনি বাংলাদেশে থেকেও সেই স্বার্থের প্রতিনিধি।

    মুল ও গুরুতর প্রসঙ্গ হল বাংলাদেশ রিজার্ভঃ
    উপরে দেখলাম আমরা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা বা রিজার্ভের মারাত্মক সংকট আছে, তা এখন সরকারিভাবেও স্বীকৃত। তা চীনা রাষ্ট্রদুত আর নয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে প্রথম আলাপেই আলোচিত ও রিপোর্টেড। আর এই সংকট মিটাতে চীন সবচেয়ে সম্ভাব্য এক মুশকিল আহসান বটে! কিন্তু এক বড় কিন্তু আছে।  সেটা হল, চীন কেন বাংলাদেশকে বৈদেশিক মুদ্রা দিবে?

    এছাড়া এখানেও আবার সব পরিসরেই আরেকটা ভুল বুঝাবুঝি আছে সেটা হল – রিজার্ভ সংকটে পড়লে চীন ‘পাশে থাকবে’ ; এই রিজার্ভ সংকট মানে ঠিক আসলে কি? বাংলাদেশের হাতে বা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঞ্চয় বা মজুদে ‘যথেষ্ট’ নগদ ডলার নাই। আর এটা কমপক্ষে গত দুবছরের ফেনোমেনা।  বলা যায় ২০২২ সালের আগষ্টে তেলের দাম ৫১% বাড়ানোর সময়কাল থেকেই রিজার্ভ সংকট মারাত্মক হয়ে উঠেছিল যা এখন সম্ভবত চরমকাল পার করছে।
    কিন্তু যে “রিজার্ভ সংকট” শব্দে এটা বলা হচ্ছে সেটা কি চীন যে ২০১৬ সাল থেকে ঢেলে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প দিয়েছে সেসব প্রকল্পের বৈদেশিক মুদ্রা ছাড় দেয়া ত্বরান্বিত করা অথবা নতুন করে চীন বাংলাদেশকে আরো বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে কি??
    এর সরাসরি জবাব হল  -‘না’ সেটা না। আসলে বলা হচ্ছে ১. চীনের বাংলাদেশকে নগদ ডলার এবং ২. তা বড় পরিমাণ (ধরা যাক দশ বিলিয়নের মত) নগদ ডলার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সাথে চালু চীনা উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থছাড়ের কথা অবশ্যই আছে। কিন্তু সেটা এখানে গৌণ ও ভিন্ন বিষয়! চীনের আমাদেরকে নতুন করে নগদ ডলার ঋণ দেয়া আর  চীনা উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থছাড় – এদুইটা একই জিনিষ একেবারেই না। আর এখানেই এদুটাকে মাখামাখি করে অনেকের মধ্যেই বুঝাবুঝিতে জট পাকানো ধারণা আছে।
    বাংলাদেশের রিজার্ভের দিক থেকে দেখলে একটা ২০ বিলিয়ন ডলারের চীনাসহ যে কারো কোন উন্নয়ন প্রকল্প শুনতে অনেক বড় মনে হলেও প্রতিবছর এর  অর্থছাড় বড় জোর মাত্র এক বিলিয়ন ডলার হবে। কারণ প্রকল্প যত বড়ই হোক পুরা প্রকল্পের অর্থ (বৈদেশিক মুদ্রা) তো শুরুতে বা একবারেই বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়া হয় না। বরং প্রকল্প যতটুকু বাস্তবায়ন হয় ততটুকুই অর্থছাড় ঘটে। এছাড়া প্রতিবছরের অর্থছাড়ের সব অর্থ দিয়েই তো যা কেনা হয় এর সবকিছুই বাংলাদেশি পণ্য বা শ্রম নয়। অর্থাৎ বিদেশি পণ্য কেনা মানেই সেই অর্থ (বৈদেশিক মুদ্রা) আবার বিদেশেই চলে যাবেই। তাই সারকথায়, উন্নয়ন প্রকল্পের বৈদেশিক মুদ্রা দেশে্র মধ্যে ধরে রাখা খুবই কঠিন। কারণ, অর্থছাড় ব্যাপারটা আসলে ধীরগতির কাজ-বাস্তবায়ের হারের উপর নির্ভরশীল বা সম্পর্কিত; এছাড়া অর্থছাড় হলেও তা দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য বা শ্রম কেনা হবে যতটুকু কেবল ততটুকু বৈদেশিক মুদ্রাই বাংলাদেশের রিজার্ভে থেকে যাবে। একারণে আমাদের রিজার্ভ সংকট – এটা যত বড়ই বিদেশি উন্নয়ন প্রকল্প নেই না কেন – এটা মিটবে না।

     আমাদের দরকার নগদ ডলারঃ
    অর্থাৎ আমাদের রিজার্ভ সংকট মিটাতে গেলে আরো বড় বড় নতুন বা পুরানো প্রকল্পের দ্রুত অর্থছাড় দিয়েও মিটবে না। তাই আমাদের রিজার্ভ সংকট মিটানোর চাহিদাকে পরিস্কার করতে বুঝাতে বলা হবে নগদ ডলার (বৈদেশিক মুদ্রা) লাগবে। আর এটা অবশ্যই উন্নয়ন প্রকল্প ঋণ একেবারেই নয় – এভাবেই বুঝতে হবে।

    কিন্তু কি নামে দেশে সাধারণত এসে থাকে নগদ ডলার?
    এককথায় জবাব – বাজেট সহায়তা নামে এসে থাকে। এটাই এর টেকনিক্যাল বা খাতওয়ারি নাম! মানে সরকারের বাৎসরিক বাজেটের বৈদেশিক মুদ্রা অংশের দায় মিটাতেই কেবল সরকার এই নগদ ডলার ব্যবহার করতে পারবে।  এজন্য অনেকে এটাকে “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের দায়” মিটানোও জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রাও বলে থাকে। তবে মূল কথাটা হল, এটা প্রকল্প ঋণ সহায়তা নয়। আমরা যেন দুটা ধারণাকে মাখায় না ফেলি।
    ব্যাপারটা আমরা দেখছি একমাত্র স্পষ্ট করে ধরতে পেরেছেন ও ব্যাখ্যা করেছেন ডঃ জাহিদ হোসেন,  ঢাকা বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ।

    “চীন তো বলেনি যে বিনিয়োগে সমস্যা হলে, তারা বাংলাদেশের পাশে থাকবে। তারা বলেছে, রিজার্ভের সমস্যা হলে পাশে থাকবে।
    তার মানে তোমার ক্যাশ নাই, আমরা তোমাকে ক্যাশ দেব। এটাই তো মিন (বোঝানোর) করার কথা।”
    জাহিদ হোসেন মনে করেন, তিনভাবে এই সহায়তা বা পাশে থাকার বিষয়টি হতে পারে। … বাজেট সহায়তা কিংবা ব্যালেন্স
    অব পেমেন্ট সহায়তা হতে পারে।” – বিবিসি

    কিন্তু কোন দাতাদেশই নগদ ডলার বা বাজেট সহায়তা দিতে চায় নাঃ
    কেন? কারণ, ২০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন প্রকল্প দেয়া তুলনায় সহজ; অথচ ৫-৭ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা দেয়া কঠিন। দাতা দিতে চায় না।  তুলনা করে বললে, ৫-৭ বিলিয়ন ডলারের কোন উন্নয়ন প্রকল্পের সব অর্থ যদি দাতা একবারেই একাউন্ট ট্রান্সফার করে দেয় তবে সেটাই তখন কার্যত বাজেট সহায়তা হয়ে যায়। এতে তাহলে সরকার কাজ বাস্তবায়ন অনুযায়ী বছরে মাত্র কয়েক মিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে পারে আর বাকি ডলার আমদানি ব্যয়-সহ এমন সব কাজেই ব্যবহার করতে পারবে। একারণে, বাজেট সহায়তা ঋণ কোন সীমার বাইরে খরচ-ব্যবহার করা যাবে না তা কড়াভাবে বলা বা শর্তে বলা থাকে। এই অর্থে বাজেট সহায়তা হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্প ঋণের চেয়েও অনেক বাড়তি সুবিধা ঋণ গ্রহিতা পাবে বা তাকে দেয়া হয় এমন এক ঋণ। এক স্পেশাল ঋণ, যার মোবিলিটি বা ব্যাবহারযোগ্যতা ঋণ গ্রহিদার জন্য বহুগুণ!

    তাহলে কোন দাতা দেশ এমন বহুল সুবিধা সম্পন্ন ‘বাজেট সহায়তা’ ঋণ কখন ও কেন দিতে রাজি হবেঃ
    এককথায় জবার, দাতাও যখন বিনিময়ে অন্য অনেক সুবিধা পাবে! যেমন বাংলাদেশে চীন ‘বাজেট সহায়তা’ ঋণ দিবে তখন যখন সে বিনিময়ে বিশেষ স্ট্রাটেজিক সুবিধা পাবে; এমন হতে পারে !  এককথায় বিশেষ সুবিধার ঋণ তাই দাতাও এথেকে বিনিময়ে তার বিশেষ সুবিধা আদায় করতে বা পেতে চাইবেই।  সম্প্রতি শেয়ার বিজ পত্রিকা ভারতের ঋণ প্রসঙ্গে একটা রিপোর্টের শিরোনাম হল, “পাইপলাইনে আটকে আছে ৮০ শতাংশ ঋণ” । তাও আবার সেটা ১৩ বছর ধরে। এছাড়া এসব ঋণের ৭৫% পণ্য বা শ্রম ক্রয় ভারত থেকে হতে হবে এমন শর্ত দেয়া। এমনিতেই ভারতের এসব প্রকল্প মানেই হল যা বাস্তবায়ন হলে সুবিধা কেবল ভারত পাবে – এমন! মানে বাংলাদেশ থেকে কড়িডোরের সুবিধা নিবে ভারত তাও বিনা পয়সায় আর সেজন্য যে রাস্তাঘাট ব্যবহার ভারত করবে – বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঐ রাস্তাঘাট নির্মাণের খরচ মানে ঋণ গ্রহণ ও সুদ পরিশোধ করবে বাংলাদেশ। এই হল ভারতীয় স্টাইল! যেমন ভারত কলকাতা-ত্রিপুরা রোড বা ট্রেন চলাচলের সুবিধা নিবে; ভারত পদ্মা সেতু ব্যবহার করবে আর সেতুর চীনা-ঋণ নেয়া ও পরিশোধের দায় বাংলাদেশ নিবে। আর ভারত কেবল আখাউড়া থেকে  ত্রিপুরা লাইনে পাঁচ-ছয় কিমি ট্রেন লাইন প্রকল্পে অর্থ খরচ করে (যেন পুরা প্রকল্পেই) সেটাতে ভারত বাংলাদেশকে ঋণ দিয়েছে বলে দেখাবে।  এককথায় বললে এভাবেই ভারত সমস্ত স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা একপক্ষীয় ভাবে ব্যবহার করবে। আর দাবি করবে ভারত নাকি বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী ঋণদাতা! এমনকি আজকাল অনেক তরুণ ফেসবুকার কেও পাওয়া যাবে যে প্রমান করে দিবে যে বাংলাদেশকে ভারতের দেয়া ঋণ চীনের চেয়েও পরিমাণে বেশী!

    কেন এভাবে এই তুলনা করে দেখালাম?
    দেখালাম এজন্য যে জাহিদ হোসেনের সাথে একই প্রশ্ন দেবপ্রিয়কে করেছিল বিবিসি। দেবপ্রিয়-ই ভারতের সাথে তুলনা ডেকে এনেছিলেন। বিবিসি লিখেছে “…ভারতের দেয়া ক্রেডিট লাইনের কথা উল্লেখ করে মি. ভট্টাচার্য…”। এটা কি তুলনীয় ঘটনা? ভারত কি অবকাঠামো ঋণ দেয়ার মত নিজে যোগ্য অর্থনীতি হয়েছে? দেবপ্রিয় এর সেখবর নাই, তবুও তিনি কোশেশ চালিয়ে গেছেন। এমনই খেদমতগার তিনি! যে ভারত বিনা পয়সায় স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা একপক্ষীয়ভাবে নিচ্ছে তার সাথে চীনের অবকাঠামো উন্নয়নের ঋণদাতা ভুমিকার তুলনা করেছেন তিনি। শুধু তাই নয়, কেন বাংলাদেশ চীনের নগদ ডলার দেওয়ার বাজেট সহায়তা শিরোনামের ঋণ নিতে পারবে না – এম মিথ্যা ও ভুয়া ধারণায় ভয় দেখিয়েছে।

    “তবে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নেবার ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা হতে পারে বলে
    উল্লেখ করেন মি. ভট্টাচার্য। কারণ, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ঋণ নিয়েছে এবং সামনে ঋণের আরো কিস্তি আসবে।
    এমন অবস্থায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নিতে গেলে আইএমফ বিষয়টা মানবে কি না সেটাও একটা দেখার বিষয়, বলছিলেন মি. ভট্টাচার্য।” – বিবিসি

     

    দেবপ্রিয় মস্কোর প্লেখানভ রাশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা ও পিএইচডি। ফলে সারাজীবন তিনি “পশ্চিমা পচা-গলা পুঁজিবাদের”  বিরোধীতা ও নিন্দা করে এসেছেন। যা বুঝি না তার নিন্দা করা তো খুব আরামেরই।  আর এখন মোদির “হিন্দুত্ববাদের পুঁজিবাদ” তাঁর কাছে খুব মিস্টি ও উপাদেয়। অথচ আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক তার কাছেও নিপাত যাক সংগঠন। সুযোগ পেলেই তিনি এ’সংগঠনের বিরুদ্ধে বিষ উগলে দেন। অথচ উনার নিজ অযোগ্যতা হল, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এটা কি ও কেমন প্রতিষ্ঠান অথবা ১৯৪৫ সালের পরে গ্লোবাল পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক ব্যাবস্থা হিসাবে এটা কিভাবে কাজ করে? আবার এটা কোথায় কোথায় গরীব দেশের বিরোধী আবার কোথায় ঐ গরীব দেশের কাছেই “অন্ধের  কাছে তাঁর লাঠির” মতই সহায়ক – ইত্যাদি এসব দিকে তিনি বেখবর! এই গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেমটা চালু আছে বলেই কিন্তু তিনি আয়-ইনকাম করার সুযোগ পেয়েছেন সেতাই তিনি মনে হয় খেয়াল করেন নাই!

    প্রথম কথা হল, কোন দেশ রিজার্ভ সংকটে পড়লে ওর একটা দিক হল (সবটা নয়) নগদ ডলারের অভাব বা প্রয়োজন হয়ে পরে। এর সবটা আইএমএফ দেয় না বা যোগান দিতে পারে না। এছাড়া এমন সংকটে আইএমএফের কাজ ও প্রধান ভুমিকাটা ঠিক ঋণ দেয়া বা নগদ ডলার যোগান দেয়া না। বরং ১৯৪৫ সাল থেকে আইএমএফের কাজের মধ্যে দিয়ে তৈরি হওয়া যে পেশাদার অভিজ্ঞতা তা দিয়ে সে কোন দেশের পড়ে যাওয়া অর্থনীতিকে টেনে তোলার পথ বাতলানো (যেটাকে কমিউনিস্টেরা আধো বোলে শর্ত দেয়া বলে না-বুঝা হৈ চৈ করে থাকে)। মানে পড়ে যাওয়া ট্রেনকে আবার লাইনে তোলার মত! সেকারণে গ্লোবাল পুঁজি বাজার সংশ্লিষ্ট যেকেউ এসব ক্ষেত্রে ঐ পতিত দেশের অর্থনীতি কারকশন পদক্ষেপগুলো নিয়ে উঠে এসেছে কিনা এব্যাপারে কেবল আইএমএফ এর বক্তব্য-কেই বিশ্বাস করে। এখন অসুবিধা হল মাঙনা পরামর্শ দিলে পতিত দেশ তা আমল করতে চায়না; যেন এতে সিরিয়াসনেস আনতেই বা সেটা ঠেকাতেই কিছু ঋণ ঐ সংকটে পতিত দেশকে আইএমএফও দিয়ে থাকে। যেমন, বাংলাদেশের এখন ৫-১০ বিলিয়ন ক্যাশ ডলার লাগবে বলে কথা উঠেছে সেখানে আইএমএফের দেয়া এখনকার (বছর দেড় আগে শুরু হওয়া) ঋণ হল ৪.৭ বিলিয়ন। কিন্তু তা দেয়া হবে প্রতি ছয় মাসে মাত্র ৬৮২ মিলিয়ন (৬৮.২ কোটি) ডলার করে; মানে সাড়ে তিন বছর ধরে। এভাবে সাত কিস্তিতে অর্থ পাবে। তাও আবার প্রতিবার উন্নতির (রিকভারির) যে টার্গেট  আইএমএফ দিবে তা পূরণ সাপেক্ষে পরের কিস্তির অর্থ ছাড় হবে – এভাবে।
    কিন্তু ছয় মাসে ৬৮২ মিলিয়ন মানে মাসে ১০০ মিলিয়ন ডলারের মত; এটা কোন অর্থই না।  যেখানে শুধু জ্বালানি আমদানিতে আমাদের প্রতি মাসে ব্যয় এক বিলিয়ন ডলার। মানে শুধু জ্বালানি আমদানির মোট অর্থের দশভাগের একভাগ মাত্র আইএমএফের দেয়া ঋণ প্রতি মাসে। অর্থাৎ আইএমএফের ঋণটা “টোকেন” (token) ; বা নাম কা ওয়াস্তে!
    আগের অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন এই কিস্তির ডলার উনি একলা নিজেই বাংলাদেশকে দিতে পারেন। যেটা এতই অল্প!

    অথচ জ্ঞানী দেবপ্রিয় আন্দাজে বলতেছেন যেহেতু “বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ঋণ নিয়েছে এবং সামনে ঋণের আরো কিস্তি আসবে।”– তাই আমরা আর এখাতে চীনের থেকে নগদ ডলার বা বাজেট সহায়তা খাতে নাকি ঋণ নিতে পারব না। যেন বাচ্চা বয়সে আমাদেরব শোনা সেই ডায়লগ যে বলতে চাচ্ছেন-  “না না অমন করেনা মা বকবে”।  তাই সেই ভাষায় দেবপ্রিয় বলছেন, “এমন অবস্থায় চীনের কাছ থেকে ঋণ নিতে গেলে আইএমফ বিষয়টা মানবে কি না সেটাও একটা দেখার বিষয়”।

    আসলে দেবপ্রিয় বলতে চাচ্ছেন বাংলাদেশ বা হাসিনা যেন চীনের কাছে না যায়। এ্যটাই তাদের মন-কামনা!!!  আর এখানে এই তাদের মানে ভারতীয় স্বার্থের বুঝতে হবে!  হাসিনা যেন চীনের থেকে বাজেট সহায়তার নগদ ডলার ঋণ করতে না যায়।  কেন? এতে দেবপ্রিয় এর কি অসুবিধা?
    দেবপ্রিয় বলতে চাইছেন এতে ভারত রাগ করবে। কারণ, হাসিনার চীনের কাছে যাওয়া মানে তিস্তা প্রকল্প জাতীয় আরো অনেক (ভারতের মাতব্বরি অস্বীকার করে সম্মতি দেয়া) প্রকল্পে হাসিনার সম্মতি দেওয়া বা হাসিনাকে নগদ ডলার সহায়তা ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে চীনকে স্ট্রাটেজিক সুবিধা দেয়া। এখন বাংলাদেশ তার নিজ স্বার্থে চীনকে কি দিবে নিবে সেটা একান্তই বাংলাদেশের স্বার্থ! এখানে ভারতের বলার কি আছে? কিন্তু দেবপ্রিয় মনে করেন এটা তার ও ভারতের স্বার্থবিরোধী!

    এবার এর উলটা দিক থেকে দেখি। হাসিনা নগদ ডলার সহায়তা যদি না আনতে পারে তাহলে কি হবে? আগামি মাস থেকেই আমদানি ব্যয় মিটাবার সামর্থ ভেঙ্গে সব এলোমেলো হয়ে পড়বে বলা হচ্ছে। অর্থনীতি চরম বিশৃঙ্খলায় পড়বে। মুদ্রাস্ফীতি আকাশ ছুবে করবে – ধরাম করে ছাদে ঠেকবে। মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বি হওয়া কথাটার-ই আরেক ভাষ্য হল, গরীব মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শেষ। নুন্যতম খাদ্য কেনার সামর্থটাও নাই হয়ে যাবে। এটাই দুর্ভিক্ষের আরেক নামে। এজ্জন্য কোন দেশের ফরেন রিজার্ভ শুণ্যের দিকে কিনা এটাও দুর্ভিক্ষ আসবার একটা বড় সিগনাল!  অর্থাৎ ভারত বা তার এজেন্ট দেবপ্রিয় আমাদের হুমকি-ভয় দেখাচ্ছেন যেন হাসিনা চীন না ভ্রমণে না যায়। কারণ, এতে নাকি ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ চীনের কাছে ক্ষুন্ন হবে! কি আবদার!! অথচ এতে বাংলাদেশের অর্থনীতি ফেল করলে যে দুর্ভিক্ষের দিকে যাবে তবু হাসিনা তা ঠেকাতে ব্যবস্থা না নেক এটাই ভারতের আবদার!
    অথচ এনিয়ে ক্রমান্বয়ে ভারত হাসিনার উপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। সর্বশেষ বিনা পাবলিক ঘোষণায় অজিত দোভালের সফরও বাংলাদেশ সফরও সেকারণে বলে কানাঘুষা চলছে!

    একটা সমতুল্য অভিজ্ঞতাঃ
    করোনার টিকা আমরা কোথা থেকে কিনবো?  এই টিকা প্রথম অনুমোদন পেলে দেখা দিয়েছিল কাড়াকাড়ি। কারণ, বড়লোক পশ্চিমা দেশগুলো তাদের মোট চাহিদার ছয়-সাত গুণ বেশী টিকা নিজেদের জন্য সংগ্রহ-মজুত শুরু করেছিল। খামোখা নিজ সাদা শ্রেষ্ঠত্বের আকাঙ্খায়। আর এটাই আমাদের মত গরীর দেশের অবস্থা আরো শোচণীয় করেছিল। চীন অফার দিয়েছিল তাদের টিকার গবেষণার শেষ বা তৃতীয় ফেজে যুক্ত হবার বিনিময়ে টিকা পাওয়ার। কিন্তু এতে ভারতের চেয়েও চীনের বাংলাদেশের উপর প্রভাব বেড়ে যাবে তাই এক শয়তানি চাল দিয়েছিল ভারত। বাংলাদেশ প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৪০০ মিলিয়ন ডলার ভারতের টিকা কারখানায় বিনিয়োগ করলে তারা  আমাদের প্রয়োজনীয় টিকা সরবরাহ করবে। তাহলে টিকা ক্রয় নিয়ে বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যবসায়ী- মন্ত্রী উপদেষ্টারা এই সুযোগে বিরাট আয় করে নিতে পারবে। অর্থ্বের লোভে সরকারও সেদিকেই রওনা দিয়েছিল; সরকারি সহায়তায় বেসবকারি বিনিয়োগও দিয়ে যুক্ত হয়েছিল ভারতের সাথে।  তবু চীন এনিয়ে একটাও কথা পাবলিকলি বলে নাই। রয়টার্স মুখে মাইক ধরলেও বলেছিল – নো কমেন্ট!
    আর সরকার-বেসরকারি দালালেরা ভেবেছিল তারা সহজেই জিতে গিয়েছে। ভেবেছিল চীন কি বোকা যে সহজেই ওয়াক ওভার দিয়ে দিছিল। আর তারা স্বপ্নে ৪০০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে কত হচ্ছে তা গুণা-গুনতি শুরু করেছিল!
    কিন্তু না, সব হিসাব ভুল!
    কয়েকমাসের মধ্যে মোদি ঘোষণা করে বলেছিলেন বাংলাদেশে টিকা পাবে না। আগে ভারতের জনগণ সকলে টিকা পাবে এরপর দেখা যাবে! কিন্তু তখন হাসিনা টিকা পাবেন এমন বিকল্প কোথায়? পশ্চিম উতপাদকেরা সবাই নিজেকে বা অন্য পশ্চিমাদের নিয়েই ব্যস্ত!  ফলে হাসিনার আবার সেই চীনের কাজে গিয়েই হাতেপায়ে ধরা! স্বভাবতই চীন এবার হেসেছিল কিনা আমরা জানি না! কিন্তু বাংলাদেশ থেকে চীন তাদের স্টাটেজিক সুবিধা যা তারা আগের বেছে রেখেছিল তা এবার উসুল করে নেওয়ার বিনিময় আমাদেরকে টিকা দিয়েছিল। সেজন্য টিকা চুক্তি করতে চীনা স্বাস্থ্যমন্ত্রী না এর বদলে  তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এসেছিল। বড় শিরোনামে বললে, এটাই কক্সবাজারে ছয় কিলোমিটারের (রিফুয়েলিং) রানওয়ে নির্মাণ ও এর সাথে আরো অনেক চীনা স্ট্রাটেজিক স্বার্থ বিষয়ক বিষয়ে তা পাইয়ে দিতে চুক্তিতে উপণীত হতে হয়েছিল আমাদেরকে। তার মানে দাঁড়ালো সেকালে হাসিনাকে এই কাজে ভারত-ই ঠেলে দিয়েছিল!  এবারও বাজেট সহায়তা আনতে হাসিনার সম্ভাব্য চীন সফরকে কেন্দ্র করে কি একই ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে?

    এখন ভারতের মোদিসহ বিরাট বিরাট সব স্ট্রাটেজিক এনালিস্ট, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা সব যারা যারা আছেন তারা হিসাব দেন! বলেন, বাংলাদেশকে শুরুতে চীনা টিকা গবেষণায় যুক্ত হয়ে টিকা যোগাড়ে বাগড়া দিয়ে ভারতের কি লাভ হয়েছে? অবশ্যই কোন লাভ হয় নাই। উলটা ক্ষতি হয়েছে। স্ট্রাটেজিক দিক থেকে চীনারা ভারতের ও আমেরিকার উপরেও আগিয়ে গেছে।  আর ভারতের এসব তথাকথিত স্ট্রাটেজিক পরিকল্পকেরা আপনারা তো নিজের স্বার্থই রক্ষা করতে জানেন না। এটাই প্রমাণিত হয়েছে।  মনে করেন অর্থের লোভ আর মনি-পরী হানিট্রাপের মাধ্যেমেই সব অর্জন করে ফেলবেন। আপনারা এতই বুদ্ধিমান! আর ‘র’-এর কাজ আগানোর ভিত্তিও এই অর্থ আর মেয়েমানুষ দিয়ে ট্রাপ করা! অথচ আপনারা ভাবছেন চীনের বুদ্ধি-পরিকল্পনার উপরে আপনি এই অর্থ আর মেয়েমানুষ দিয়ে ট্রাপ দিয়ে জিতে যাবেন; রাজত্ব করবেন!    এর সোজা মানে দাঁড়ালো এখন জবাব নাই আপনাদের কাছে? বাংলাদেশের করোনার টিকা চীন থেকে সংগ্রহের প্রথম পরিকল্পনাকে ফেল করিয়ে দিয়ে ভারতের কি লাভ হয়েছে? নাকি আলটিমেটলি ভারতই বাংলাদেশকে আরো বেশী করে চীনে কোলে উঠিয়ে দিয়েছে?
    ভারতের স্ট্রাটেজিক জ্ঞানীরা এখন আমাদের দিকে না তাকিয়ে ভারতের নিজের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে মুল্যায়ন করেন আগে; সাহস থাকলে!

    এরপরে এর ভিত্তিতে ঠিক করেন হাসিনাকে আবার এখন চীন সফরে (বাজেট সহায়তা আনতে) যেতে বাধা দিবেন কোন সাহসে? কোন লক্ষ্যে ও যোগ্যতায়? আপনাদের মূল সমস্যা তো অর্থনৈতিক সামর্থ নয়, হিংসা-ভিত্তিক চিন্তা! তাই চিন্তা, বুদ্ধি পরিকল্পনা সবই এখানে এসে সব শুকিয়ে যাবে আপনাদের!  অথচ সেই পুরানা পথ; অজিত দোভালকে পাঠিয়ে চাপ দিবেন??? পেটি (petite বা উচ্চারণে পেতিত মানে ক্ষুদ্র বা সংকীর্ণ) চিন্তা, পেটি দোকানদারি মানসিকতা বা হাভাতে এরা অবশ্য এগুলাই করে থাকে! যারা বিরাট চকচকে লোভের চিন্তায় শেষে সবসময় আত্মঘাতি হয়ে থাকে! মোদি কেন এর ব্যতিক্রম হবেন!

    ভারত-চীনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের শিকার না হইঃ
    এই বক্তব্যটা মন্ত্রী ওয়ায়দুল কাদেরের। গত ৪ ফেব্রুয়ারি পুরা বক্তব্যটা নিয়ে মিডিয়া শিরোনাম ছিল – আমরা যেন চীন-ভারতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত না হই: ওবায়দুল কাদের ।  দেখে পড়ে মনে হতে পারে যে হাসিনা খুবই সতর্ক বোধহয় তাই চীন-ভারত দুটা দেশ থেকেই দূরে থাকতেই হাসিনা সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। না, এই অনুমান ভাবনাটা ভুল! কারণ, এটা হল আসলে সম্ভবত হাসিনা এখন আর চীন সফরের কথা ভাববেন না! আর তাতে সবকিছু সিদ্ধান্তহীনতায় ফেলে বসে থাকতে চাইছেন। কারণ, হাসিনার চেয়ে কে সবচেয়ে বেশী জানে যে চীনের কাছ থেকে নগদ ডলার না আনা মানে অর্থনৈতিক রিকভারি হবে না; মানে দেশকে ক্রমশ এক দুর্ভিক্ষ এ’দিকে ঠেলে দেয়া হবে?

    হাসিনার কাছে পরিস্থিতিটা এখন কোন দুরাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের শিকার জড়িয়ে যাওয়া বা না যাওয়ার  হিসাবে দেখতে যাওয়াটাই ভুল! হাসিনার জন্য বাংলাদেশের জন্য লক্ষ্যটা হল  অর্থনৈতিক রিকভারি আর তা করে, দুর্ভিক্ষ এড়ানো। সবচেয়ে বড় কথা এতে কোন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যাওয়া বা না যাওয়া যাই ঘটুক – তবুও দুর্ভিক্ষ যদি এড়াতে পারে তবে সবের দায় জনগণ এর কাছে সারেন্ডার করলে তারা তা শেয়ার করবে। কিন্তু কেবল মনে রাখেন একটা চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ – এটা বাংলাদেশের অভিমুখ, গতিপথ অপরের প্রত এটিচ্যুড ইত্যাদি সব বদলে দিয়েছিল। পুরা পঁচাত্তর সালটা আমাদের খুনাখুনিতে কেটেছে। ১৯৮১ সালের আগে কিছুই নুন্যতম থিতু হয় নাই! আর সেই থেকে খুড়িয়ে চলা, পড়ছি আর উঠছি, খুড়িয়ে চলছি – জনমত বিভক্ত! কোন রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থেকেই এরপরে আমরা নুন্যতম বের হতে পারছি না! প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা ইত্যাদি নেগেটিভ এটিচ্যুড বার বার ছাপিয়ে উঠছে!

    হাসিনা কি করতেছেন তা তিনি নিজেই স্থির মনে এখানে খুঁজে দেখতে পারেন। যেমন, তিনি মনে করেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর হয়ে ক্ষমতা নিয়েছেন। ধরে নিলাম তিনি ঠিক ও সৎ ও ন্যায্য কথাই বলছেন। কিন্তু তাহলে স্কুলের পাঠ্যবই তা ভারতে পাঠিয়ে ছাপানোর নামে তাদের অনুমোদন নিতে পাঠান কেন? এটা কি কোন মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর কাজ হতে পারে? সালমন রহমান কখনও বইয়ের ব্যবসা করেন নাই, ছিলেন না। অথচ তাকেই কেন বই ছাপিয়ে আনার দায়ীত্ব দেয়া হয়েছে কেন? পাঠ্যবই ছোটখাট জিনিষ না।  ভারতীয়দের সম্পাদিত বই পড়ালে কি বাংলাদেশ থেকে মুসলমানদের কথিত জঙ্গীবাদী মানসিকতা দূর হয়ে যাবে? কথিত ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ হয়ে গেলে জঙ্গীবাদ চলে যাবে – এটাই কি মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর এসব চিন্তার ভিত্তি নয়? অথচ এটাই তো ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের নিচে বাংলাদেশকে রেখে দেওয়া; নয় কি? আচ্ছা ভারতের পাঞ্জাবের খালিস্তান মুভমেন্ট কি জঙ্গীবাদ নয়, এটাও কি ভারতের সরকারি পাঠবই পড়েই আর তা পড়ার পরেও জন্মাইছে। তাই নয় কি? হায় মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী!!! তাহলে আমরা কোথায় দাড়াবো? আমাদের কোথায় নিয়ে চলেছেন আপনারা?

    তাহলে মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর শত্রু হল  ইসলামি জঙ্গীবাদ মানসিকতা আর এটাকে ধুয়ে পরিস্কার করতেই গঙ্গায় ডুব দেওয়ানো্র জন্যই এমন পাঠ্যবই ব্যবস্থাপনা?  এভাবে আমরা কি আমাদের মুসলমান পরিচয়কে এভাবে শুদ্ধ ও হিন্দুত্ববাদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে নিতে পারবো? নাকি এরপরও মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী বলে কিছু অবশিষ্ট থাকবে? আসলে, হিন্দুত্ববাদের অধীনস্ত হয়ে একটা “মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণী” বা হাসিনার বাংলাদেশ বলেও কিছুই থাকবে না! মানে হবে না!! কারণ, নিজের অস্তিত্বের অর্থ তাতপর্য নিজেকেই তৈরি করতে হয়!

    ভারত তার পেটি স্বার্থে যতই বাধা সৃষ্ট করুক সিদ্ধান্ত নিতে হবে একান্তই নিজ দেশ-মানুষের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে তাতে চীনের খুশি-অখুশি নাকি ভারতের  খুশি-অখুশি এসব অনেক নিচের প্রায়োরিটি! বাংলাদেশের কাছে নিজ স্বার্থের উপরে কেউ নাই, থাকতে পারে না!
    অর্থনৈতিক রিকভারি আর তা করে , দুর্ভিক্ষ এড়ানো এটাই আমাদের মুখ্য স্বার্থ। আমরা আরেকবার দুর্ভিক্ষ দেখতে পারি না!  এতে ফেল করা বা পরাজিত হওয়া যাবে না!!!
    কাজেই “আমরা যেন চীন-ভারতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ক্ষতিগ্রস্ত না হই”-এটা হতাশা আর সংকটে পালিয়ে যায় যারা তাদের কথা!

    আমাদের শাসকদের নিজ স্বার্থ বুঝতে অন্তত সুমতি হোক!

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ  ০৬ ফেব্রুয়ারি   ২০২৪, সন্ধ্যা  সাতটা

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • টাইমস অব ইন্ডিয়ার চশমা বদলঃ বাংলাদেশে ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসনে নিজের বিপদ দেখছে

    টাইমস অব ইন্ডিয়ার চশমা বদলঃ
    বাংলাদেশে ‘কর্তৃত্ববাদী’ শাসনে নিজের বিপদ দেখছে

    গৌতম দাস
    ২৬ নভেম্বর ২০২৩  সন্ধ্যা ১৮ঃ ২৭
    https://wp.me/p1sCvy-59d

     

     

    “Halting Hasina: India should worry about Bangla PM’s authoritarian…”

    বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের অন্তত একটা মিডিয়া টাইমস অব ইন্ডিয়া,  গত ২২ নভেম্বর ২০২৩ এক উলটা হাওয়া বইয়ে দিয়েছে। এটা হল, কংগ্রেসের প্রণব মুখার্জির আমল বা একালের বিজেপির মোদির আমল মিলিয়ে গত সতেরো বছর ধরে অনুসরণ করে চলা ভারতের মিডিয়াগুলোর নীতির বিরুদ্ধ বা বিপরীত অবস্থান। বাংলাদেশের রাজনীতি বা ক্ষমতায় যেই আসুক ভারতের মিডিয়া এর কোন ভালমন্দ দেখতে পাবে না। তবে কেবল যে ঘটনায় ভারতের স্বার্থ আছে সেটাই সহি – এই হল বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের মিডিয়াগুলোর অবস্থান!
    আবার যেমন,  কোন পত্রিকায় অনেক রকমের লেখাই ছাপা হয় – নিউজ রিপোর্ট, ভিউজ-মতামত, সত্য-মিথ্যা প্রপাগান্ডা বা ফিচার  অথবা এমনকি উপ-সম্পাদকীয় ইত্যাদি সবই ছাপা হয়। কিন্তু পত্রিকায় যেটা সম্পাদকীয় বা এডিটরিয়াল [editorial] লেখা ছাপা হয় সেটাই একমাত্র পত্রিকার মালিক, সম্পাদক বা সম্পাদকীয় গ্রুপ বা বোর্ডের সকলের স্পষ্ট নিজস্ব  অবস্থান বা রাজনৈতিক বক্তব্য। এটা পত্রিকার পরিচালনাকারীদের নিজস্ব অবস্থান এবং নিজ দায় নিয়ে বলা কথা!  তা হলেও বাংলাদেশের রাজনীতি বা ক্ষমতা কেমন কী চলছে সেখানে এনিয়ে ভারতের প্রিন্ট- মিডিয়াগুলোর কোন সম্পাদকীয় মন্তব্য কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না! তবে বাংলাদেশে যেটা ভারতের স্বার্থ সেটাই সহি ধরে নিয়ে প্রিন্ট-মিডিয়ার অবস্থান দেখতে পাওয়া যায়!

    এদিকটাই আরেক ভাষায় বললে, গত পনেরো বছরের বেশি হবে কোন ভারতীয় পত্রিকা বাংলাদেশের মানুষের হিউম্যান রাইট বা নাগরিক অধিকার রক্ষার পক্ষে কথা বলেছে – এমন রেকর্ড নাই। এমনিতেই,  যদিও ১৯৪৭ সালে কলোনিমুক্ত স্বাধীন তবে বিভক্ত ভারতের জন্মের আগে থেকে এখনও পর্যন্ত “হিউম্যান রাইট ও নাগরিক মৌলিক অধিকার” কখনই ভারতীয় রাজনীতিতে ইস্যু ছিল না। উচ্চারিত হয় নাই; এমনকি তা ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও উচ্চারিত নয়। কারণ, সেই ১৮১৫ সাল থেকেই ভারতে রাষ্ট্র-রাজনীতি বলতে জাতি-রাষ্ট্র বা নেশন স্টেট বুঝা হয়ে এসেছে। আর এতে বলাই বাহুল্য এখানে জাতি মানে একমাত্র সেটা উগ্র হিন্দু-বোধের এক হিন্দুত্ববাদ। অধিকার বা নাগরিক ধারণার যেখানে বালাই নাই! সারকথায়, ভারতে রাজনীতি বলতেই সেটা হল – জাতিবাদ এবং তা এক উগ্র-জাতিবাদ; যা এর বাইরের সব এথনিক-জাতিকে অস্বীকার, তাঁদের উপর চাপায় দেয়া মার্জিনালাইজ বা কোনঠাসা করে রেখে অ-হিন্দু বিশেষ করে মুসলমান নাগরিক এর উপর সামাজিক, কালচারাল ও রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম করে রাখার রাজনীতি।
    হিন্দুত্ববাদ মানে যেখানে অধিকার বা নাগরিক ধারণা নাই; কাজ করে না। হিন্দু-শ্রেষ্ঠত্ববাদের এক হিন্দুত্ববাদ ও বোধ সেখানে সব। আর এর বাইরে সবাই কে তারা মেরে, পিটিয়ে অবাধে নির্মুল করবে; এক আধিপত্যের জগত কায়েম করবে করতে হবে এই হল যার সারকথা। এমনকি পড়শি বা অন্যরাষ্ট্র তাঁদেরও যেন নিজ স্বার্থ বলে কিছু নাই। পড়শিসহ অন্য সকল (ছোট) রাষ্ট্রকেই যেন ভারতের রাষ্ট্রস্বার্থকেই  নিজস্বার্থের উপর জায়গা দিতে হবে, তুলে রাখতে হবে। এমনকি খেলাধুলাতেও ভারতের কোন হেরে যাবার দুঃখে ভিন-রাষ্ট্রকেও দুখী হতে হবে, দুঃখবোধ দেখাতে বা প্রকাশ করতে হবে! এটা হিটলারকেও ছাড়িয়ে যাওয়া এমনই এক চরম উগ্র-জাতিবাদ!

    ফলে এসব কারণে, ভারতের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে যা কিছুই জানি না দেখি তা দেখলেও সেখানে মানুষের মৌলিক মানবাধিকার বা নাগরিক অধিকার ধরণের কোন ধারণাই ভারতের রাজনীতিতে বা সামাজিক কালচারে নাই।

    ভারত ভিন-রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠার বিরোধীঃ
    কিন্তু এই প্রথম ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া নিজের অবস্থান জানিয়ে সম্পাদকীয়তে বলছে, “হাসিনাকে থামাতে হবে। কারণ তিনি কর্তৃত্ববাদী; বিরোধীশুন্য করতে-দেখতে চান। আর এটা নাকি ভারতেরও স্বার্থবিরোধী ও উদ্বিগ্ন হওয়ার মত হাসিনার এমন এই কর্তৃত্ববাদী স্বভাব!”। এই কথাগুলো তুলে এনেছি,  টাইমস অব ইন্ডিয়া-তে তাঁদের  নয়া অবস্থান জানিয়ে যে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে তার শিরোনাম থেকে। সেটা হল, ” Halting Hasina: India should worry about Bangla PM’s authoritarian streak. It will hurt her interests as well as New Delhi’s” । আমাদের মানবজমিন এর অনুবাদ রিপোর্ট ছেপেছে।

     

    “Halting Hasina: India should worry about Bangla PM’s authoritarian
    streak. It will hurt her interests as well as New Delhi’s” –

    সবচেয়ে মজার কথা শুরুতেই বুকফুলিয়ে টাইমস বলছে, “টাইমস অব ইন্ডিয়ার এডিটরিয়াল টিম যা সিনিয়র জার্নালিস্টদের নিয়ে গঠিত তারা নিজেদের মধ্যে নাকি বিস্তর তর্ক-বিতর্ক শেষে একালের খবরাদি সম্পর্কে নিজেদের মতামত-অবস্থান নিয়ে থাকে [Times of India’s Edit Page team comprises senior journalists with wide-ranging interests who debate and opine on the news and issues of the day] । তাহলে, মানে কী দাঁড়ালো?

    গত ১৯৪৭ সালের আগের কথা বাদই রাখলাম। একালে মানে ইন্দিরা গান্ধীর ছেলে রাজীব গান্ধীর আততায়ীর হাতে মৃত্যু হয়েছে ১৯৯১ সালে। অনেকের মনে হতে পারে একালে ভারত উগ্র হিন্দুত্ববাদী হয়ে উঠেছে বোধহয় বিজেপির মোদীর হাতে। না এটা মিথ্যা। বরং এর আগেই রাজীব গান্ধীর হাত ধরেই একালে মুসলমান এথনিক ক্লিঞ্জিং যেটাকে বলে বা “মুসলমান-নির্মুল” নীতি- এর শুরুটা হয়েছে ১৯৮৯ সালে। সেসময়ে এটা হয়েছিল কাশ্মীরে। সেখানে ১৯৪৭ থেকে যতই অস্থিতিশীলতা বা বিরোধ-সমস্যা থাকলেও রাজনীতিতে কোন সশস্ত্রতার ধারা নয় বরং  সেখানকার রাজনীতি ছিল চলে আসা নির্বাচনকেন্দ্রীক এক রাজনীতি। প্রকাশ্য এক গণ বা মাঠের রাজনীতি! রাজীব গান্ধী ১৯৮৯ সালের রাজ্য নির্বাচনে   কারচুপির করে জিতবার সিদ্ধান্ত  ও নীতি নিয়েছিলেন। সেটা এই অজুহাতে যে সেবার ১৯৮৯ এর নির্বাচনে ওমন কারচুপি না করলে নাকি বেশিরভাগ আসনে অ-কংগ্রেসি কাশ্মীরি মুসলমান সেখানে জিতে যাবেন। আর তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ফারুক আবদুল্লাহর পরামর্শে ও তাঁকে সাথে নিয়ে। ফারুক আবদুল্লাহও ঠিক কংগ্রেসি নন তবে তাঁর বাপের আমল থেকে তাঁদের দল প্রো-কংগ্রেসী!

    আর এরপরে বাবরি মসজিদ আক্রমণ থেকে শুরু করে ১৯৯৯ সালে ভারতে বাজপেয়ীর বিজেপির কোয়ালিশন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে ক্রমশ বিজেপি-আরএসএসের উত্থান ঘটে। ইতোমধ্যে নাইন-ইলেভেন মানে (২০০১ সালের ওয়ার অন টেরর) মানে আমেরিকা-ইন্ডিয়ার “জঙ্গী-মারার নামে” এলায়েন্স মানে এশিয়ায় হিন্দুত্ববাদের এক রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল প্য়রথমে। কিন্তু  অচিরেই সেখান থেকেও আবার সরে গিয়ে সেটা আমেরিকার হয়ে ভারতে চীন ঠেকানোর অজুহাতে ভারতকে ঠিকা দেওয়া; মানে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া – যেটা এভাবে এখন বাংলাদেশ ১৭ বছর পার করেছে। স্বভাবতই এর স্বপক্ষে পুরা সময় জুড়েই ভারতের সমগ্র মিডিয়া ইসলাম কোপানোর বয়ান তুলে মশগুল থেকেছে।
    আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের প্রতি ভারতীয় মিডিয়ার এটিচ্যুড  সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা হয়েছে মোদির গত দশ বছরে। এমনিতেই কোভিডের কারণ ভারতের মিডিয়া নিজে চলতে পারে নাই, ঠিকমত বেতন দিতে পারে না। অতএব পত্রিকা চালানোর খরচ মিটাতে মোদির হয়ে মিথ্যা প্রপাগান্ডার হাতিয়ার হয়ে উঠো – সব জায়েজ! আর তাতে ভারতের ‘র’-এর বা গোয়েন্দা বিভাগের প্রমোটেড  ঘরে বসে বানানো রিপোর্ট – ভারতে যারা ছাপে তাঁদের শিখন্ডি মিডিয়া হয়ে উঠো! এই ছিল সেসময়ের মূলনীতি! তাঁদের সে এক মহা কসরত, কার উপর দিয়ে কে যাবে! যার ফলশ্রুতিতে ফাইনালি দাড়ায় মূলত হিন্দুস্তান টাইমসের রেজাউল লস্কর অথবা শিশির গুপ্তা এবং টাইমস অব ইন্ডিয়ার দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী – এরা হয়ে উঠেন ‘র’-এর হয়ে শ্রেষ্ঠ প্রপাগান্ডিস্ট! যারা র-এর চাহিদা মত রিপোর্ট লিখতে ওস্তাদ! আগ্রহিরা এবিষয়ে আমার পুরানো লেখা পড়ে নিতে পারেন।  আমরা ভারত টাইমস অব ইন্ডিয়াকে এভাবেই চিনতাম!

     

    কিন্তু এখন এটা কী হলঃ
    কিন্তু হায়!! এটা কোন টাইমস অব ইন্ডিয়া??? যে হাসিনাকে কর্তৃত্ববাদি শাসক বলছে? মোদিকে হাসিনা থেকে সাবধান করে ইডিটরিয়াল লিখছে??? গত ২২ নভেম্বর ২০২৩ টাইমস অব ইন্ডিয়ার এডিটরিয়াল কম করে বললেও গত পন্বরো বছরের একেবারে ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত! কেন?
    এটা বুঝা কঠিন না যে ২০০৬-৭ সাল থেকে আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিবার পর থেকে ভারতীয় মিডিয়া অবাস্থান ছিল যে – যেভাবে পারো বাংলাদেশকে ভারতের পক্ষে লুটে নেও! সব জায়েজ আছে!  বাংলাদেশের উপর দিয়ে আসামের করিডোর থেকে শুরু করে সবকিছু বিনা পয়সায় খাবলে তুলে নিয়ে খাওয়া, বিনা পয়সায় পোর্ট ব্যবহার কিংবা সব নদীর পানি, বাংলাদেশকে ভারতের বাজারে পরিণত করা, সীমান্তে সমানে বাংলাদেশি হত্যা ইত্যাদি যাকিছু ভারতের স্বার্থের পক্ষে যায় বলে তারা মনে করেছে তাই ভারতের মিডিয়া সঠিক ও জায়েজ মনে করে মিথ্যা প্রপাগান্ডা রিপোর্ট লিখে গেছে! সাথে ছিল জঙ্গী আবিস্কার আর জামায়াত কোপানোর নামে ইসলাম কোপানো মুসলমানবিদ্বেষে ভরপুর এক মহোৎসব চালিয়ে গেছে ভারতের মিডিয়া। বাংলাদেশের  প্রতিটা নির্বাচনে ভোটবিহীন তামাসা চলেছে – অথচ ভারতের একটা মিডিয়া এগিয়ে আসে নাই, টু শব্দটাও করে নাই! তখন তারা কোথাও হাসিনার কর্তৃত্ববাদ দেখে নাই; রাতের ভোট হয়েছে তারা জানে নাই! সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল ২০১৩ সালের ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের সফর। বিএনপি ও জামায়াত-কে বাদ দিয়ে নির্বাচন করতে হবে; আর এরশাদের জাতীয় পার্টিকে বিরোধি দল বানাতে হবে। এই ব্যববস্থাপনার কারিগর ছিলেন সুজাতা সিং যা এরশাদের সাথে মিটিয়ের পরেই খোদ এরশাদ-ই তা মিডিয়ার সামনে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু মজার কথা কোন ভারতীয় মিডিয়া এনিয়ে কোন রিপোর্ট করে নাই। কারণ তাঁদের নীতি ছিল দুনিয়াতে ন্যায়-অন্যায়, সাংবাদিকতা-অসাংবাদিকতা, সঠিক-মিথ্যা বলে কিছু নাই। যাই ভারতের স্বার্থে তাই জায়েজ এই ছিল তাঁদের নীতি; তাই পুরাটাই মিথ্যা ও অন্যায় হলেও সেই অন্যায়ের পক্ষেই ভারতের মিডিয়াকে থাকতে হবে…!  এই ছিল গত পনেরো বছরের (দু-একটা ব্যতিক্রম বাদে) ভারতীয় সাংবাদিকতা! যা এখনও বর্তমান!!!
    কিন্তু তাহলে এর ভিতরে – এটা কোন টাইমস অব ইন্ডিয়া??? যে হাসিনাকে কর্তৃত্ববাদি শাসক বলে বুঝছে???

    কথা আরও আছেঃ
    টাইমসের রিপোর্টের ছন্দ-মিলানো প্রথম বাক্যটাই রীতিমত শায়েরি! বলছে, বাংলাদেশ ৭ জানুয়ারি যাচ্ছে নির্বাচনে [POLL]; কিন্তু বিরোধীরা যাচ্ছে সাজাপ্রাপ্ত আসামী হিশাবে জেলে[JAIL] । ইংরাজিতে পোল আর জেলের অলংকার মিলিয়েছে। আর এর চেয়েও মারাত্মক হল কোন ভারতীয় মিডিয়ার সম্ভবত এই প্রথম জামা‍য়াতে ইসলামী এই রাজনৈতিক দলের প্রতি সহানুভুতি প্রকাশ। লিখছে, [one big party stays banned.]; মানে জামায়াত নিষিদ্ধ করে দেয়া রায় বলবত রাখাকে এক ভারতীয় মিডিয়া ইউজুয়াল বদ-দোয়া দেওয়ার বদলে সহমর্মিতা জানিয়ে রিপোর্ট করছে!  যার ইঙ্গিতটা হল, এটা মতপ্রকাশের অধিকার, কনষ্টিটিউশনের সীমার মধ্যে থেকে রাজনৈতিক  দল খুলার ও জমায়েতের অধিকারকে জবরদস্তিতে কেড়ে নেওয়া, কোনঠাসা করা – মানে এককথায় রাজনীতিক ও দৈহিক নিপীড়ন করা হয়েছে এই রাজনৈতিক দলকে। তাই রিপোর্টটা একারণে জামায়াত-কে এই প্রথম ভিকটিম হিশাবে দেখছে ও দেখাচ্ছে!!! তাহলে এটা কোন টাইমস অব ইন্ডিয়া!!!  অথচ একালের এই ভারতই অন্তত গত ১৭ বছর ধরে লাগাতরভাবে জামায়াতের একাত্তর সালের ভুমিকার বিরোধিতার আড়ালে ইসলাম-মুসলমান রিলেটেড সবকিছুর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ চালিয়ে গেছে; শত্রুতা চালিয়ে গেছে। জামায়াত জঙ্গী-সংগঠন বলে প্রচার চালিয়ে নিজেদের সব অনৈতিক ততপরতাকে জায়েজ করতে গিয়েছে!
    একইভাবে বিএনপির পক্ষেও সহানুভুতিশীল হয়ে রিপোর্ট করেছে; যা অবিশ্বাস্য! বলেছে বিএনপির ১৩৯ জন নেতাকে সাজা শুনিয়ে দিয়েছে; তারা যেন নির্বাচন থেকে দূরে থাকে এর ব্যবস্থা করেছে!  এমনকি হাসিনার নিজে ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন মানে কোন কেয়ার-টেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন করার যে আইনটা ছিল সেটা হাসিনারই বাতিলের জন্যও এই প্রথম হাসিনাকেই দায়ী করলো এক ইন্ডিয়ান মিডিয়া!! মানে টাইমস অব ইন্ডিয়া, বাংলাদেশে তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়া উচিত এই দাবির প্রতি (তবে পরোক্ষে) সমর্থন জানিয়ে দিল!!!  আর এভাবে বিএনপির রাস্তার আন্দোলনকে জায়েজ করে দিয়ে এই মিডিয়া লিখেছে BNP is just doing street theatre when demanding restoration of the caretaker system.। যা নিয়ে একটা ভারতীয় মিডিয়াকে আমাদের বলার আছে একটাই – এটা আন-ইউজুয়াল! আমরা ভারতের মিডিয়ায় এটা দেখতে অনভ্যস্ত ছিলাম!

    “one big party stays banned.
    The top court upheld a previous ban
    on Jamaat-e-Islami – Bangladesh’s
    largest Islamist party – from contesting elections.”

    এতদুর পর্যন্ত যা দেখলাম তাতে এটা পরিস্কার ভাবে বুঝা গেছে যে টাইমসের এটা এক বড় ধরণের অবস্থানের পরিবর্তন। এতদিন যা ছিল ‘র’-এর মুখপাত্র হয়ে সার্ভিস দেওয়ার এক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান সেই টাইমস অব ইন্ডিয়া এখন বাংলাদেশের শাসক শক্তি অথরিটিটিয়ান – মানে বাংলাদেশের শাসক কত খারাপ তা দাবি করে দেখানোর প্রতিষ্ঠান – হয়ে উঠতে চাইছে! তাহলে এই পরিবর্তনের কারণ কী? আবার যেখানে এটা ভারতের অন্য আর কোন মিডিয়ার মধ্যে এমন পরিবর্তন এখনও দেখা যায় নাই!
    এককথায় বললে, ভারতের মিডিয়া এখনও একালেও এমন নুন্যতম পলিটিক্যাল এথিক্স মেনে কেনে চলার প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে নাই। যেমন আগে এতদিন যা ছিল ‘র’-এর মুখপাত্র হয়ে সার্ভিস দেওয়ার এক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান; বুঝাই যেত সেটারও মূল চালিকাশক্তি ছিল অর্থ; কোন আদর্শিক অবস্থান তা ছিল না! তাহলে এখনকার এই পরিবর্তনও  অনুমান করি কোন আদর্শিক অবস্থান নয়! যার সোজা মানে বিক্রেতা-মিডিয়ার ক্রেতা-গ্রাহক সম্ভবত এখন বদলে গিয়েছে! আগে ছিল ক্রেতা ভারত সরকারের এক প্রতিষ্ঠান ‘র’-এর মুখপাত্র হয়ে  সার্ভিস দেওয়ার প্রতিষ্ঠান। আর তাহলে এখন?

    টাইমস অব ইন্ডিয়ার সার্ভিস ক্রেতা এখন কেঃ
    তাহলে টাইমস অব ইন্ডিয়ার  এখন এই অবস্থান বদল হওয়াতে এখনও কী মোদি সরকারই আছে? তা মনে হচ্ছে না। যদিও এটা সত্য যে জয়শঙ্করের অফিস বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হাসিনা আবার ক্ষমতায় আসুক কিংবা না – সেব্যাপারে তার খুব কিছু করণীয় আছে তা মনে করা না। যদিও তাই বলে কিছু লিপ-সার্ভিস বা কিছু রুটিন সম্পর্ক অবশ্যই আগের মত ভালই বহাল আছে।  তবুও বাংলাদেশের সরকার কর্তৃত্ববাদী কী না সেটা  টাইমসের এই দ্দেখে ফেলার সাথে কখনই মোদির রাজনীতির কোন সম্পর্ক নাই। কাজেই টাইমস অব ইন্ডিয়ার নয়া অবস্থানের পৃষ্টপোষক-অর্থদাতা অন্তত বিজেপি-মোদি নন। তাহলে কে হতে পারে?

    এর তালাশে আমরা এখন টাইমস অব ইন্ডিয়ার এই সম্পাদকীয়ের বাকি অংশে ফোকাস করব। যদিও কোন সম্পাদকীয় ছোট লেখাই হয় আর টাইমসের এই সম্পাদকীয়ও ছোট পাঁচশ- অক্ষরের নিচে। তাহলে এই শেষের অংশে কী আছে?

    সম্পাদকীয়ের শেষ অংশ ‘মারাত্মক’ কী আছেঃ
    সংক্ষিপ্তভাবে মারাত্মক সেই কথা হলঃ উপরে আমরা দেখেছি, টাইমস অভিযোগ হাসিনা সরকার অথরিটি-টেরিয়ান যে নিজেকে বিরোধিশুন্য দেখতে চায় মানে তার রাজনৈতিক সকল বিরোধী শক্তিকে সমাজ থেকে নির্মুল করতে ও দেখতে চায় ক্ষমতাসীনেরা। এবং সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। এখন বিরোধীশুন্য কথা টার অর্থ-তাতপর্য কী? কারণ, যেকোন ক্ষমতাসীনরা দাবি করতেই পারে যে বিরোধী দল আমাদের চাপ সহ্য করে মাঠের রাজনীতিতে টিকে থাকতে না পারলে আমরা কী করতে পারি – এমন বয়ান দিতেই পারে। কিন্তু এমন বয়ান কী জায়েজ? নাকি এটা ইনোসেন্ট বা নিঃস্পাপ বয়ান যে ভাজা মাছ উলটে খেতে জানে না?

    না অবশ্যই না। এই বয়ান জায়েজ নয়! এর সোজা সহজ উদাহরণ হল, ক্ষমতাসীন যদি নির্বাচনে কৌশলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে বিরোধীদলের জন্য সুবিধাজনক নয় – এভাবে করে সাজায়? মানে হল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দল নিরেপেক্ষ করে না সাজায়? মানে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে কান্নি মেরে থাকা পুলিশ ও প্রশাসন হয়ে হাজির হয়?
    এখন এই ব্যাপারটাই হয়েছে কীনা এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল – ক্ষমতাসীনদের কিছু বয়ান এর দিকে তাকাতে হবে। যেমন বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন হাসিনা সরকারের এক প্রিয় শ্লোগান হচ্ছে তারা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি আর অন্যদিকে জামাত-বিএনপি এর বিপক্ষের! এতদুর শুনে কেউ মনে করতে পারে এর মধ্যে খারাপ কী আছে?  অথচ এটাই হল, সরকারের দিক থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া ম্যাসেজ যে তোমরা এখন বিরোধীদের সাথে সবকিছুতে বৈষম্যমূলক আচরণ করতেই পার, এটা জায়েজ আছে! কারণ তারা সবাই তো মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি! আমি সরকার সেটা বলে দিয়েছি! সুতরাং এটাই তোমাদের প্রটেকশন ভাষ্য! যেমন খেয়াল করে দেখেন বাংলাদেশের একজন অভিনেতা সম্প্রতি ক্রিকেটে ভারতীয়দের হারে খুশি হওয়া যাবে না – যারা খুশি হয় তারা  মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি বলে ব্যাখ্যা খাড়া করছে! আর এমন বয়ান এটারই চরমতম রূপ হল, আমাদের রাষ্ট্রটাকে গুম-খুনের  রাষ্ট্র হিশাবে হাজির করা – এটাই হয়ে যাবে আর যার সাফাই হবে যারা “মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি!” বলে সরকার প্রচার করবে তাঁদের কোনই রাজনৈতিক নাগরিক অধিকার তো নাই-ই!  তাই তাদেরকে গুম-খুন অপহরণ ইত্যাদি সব তো করাই যায়! এবং যাবে!!!

    তাহলে সারকথাটা হল, আমি ক্ষমতায় আর আমার রাজনৈতিক-বিরোধিদের যদি আমি আমার মতই সমান রাজনৈতিক, নাগরিক অধিকার না দিয়ে (নানা উসিলায়)  দাবায় রাখতে পারি তাহলে সেটাই পরিণতিতে ২০১৪, ২০১৮ বা ২০২৪ সালের মত নির্বাচনই হবে! শুধু তাই না, সেটা এবার এই রাজনীতিক মাঠশুন্যতা – এটাই কাশ্মীরের মত রাজনীতি আর তখন নির্বাচন-কেন্দ্রিক থাকবে না। সশস্ত্রতার রাজনীতির পথে পা বাড়াতে চাইবে!

    ঠিক এদিকটা খেয়াল রেখে তাই টাইমস তার সম্পাদকীয়ের শেষের দিকে বলছেঃ “But what raises eyebrows and concerns is the vacuum previously occupied by the opposition. Marginalising mainstream opposition parties is an invitation to radical elements in Bangladeshi politics”।
    মানে হল, বিরোধীদলদেরকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে জেলে রেখে নির্বাচন, মাঠে মিটিং মিছিল জমায়েত, মতপ্রকাশ ইত্যাদি সবকিছু থেকে তাঁদের বঞ্চিত করে দেওয়া – মানে এক শুন্যতা বা ভ্যাকুয়াম তৈরি করা – এর সোজা মানে হল, সশস্ত্র রেডিক্যাল রাজনীতিকে দাওয়াত দেয়া। বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান ধারা হয়ে উঠতে সশস্ত্র রাজনীতিকে দাওয়াত দেয়া বা ঠেলে দেওয়া।

    এরপরে আরো দুইটা প্যারা আছে। এর প্রথমটায় বলছেঃ
    “Then there is the US factor. Washington is clearly concerned about charges of authoritarianism against Hasina and is viewing Bangladesh as part of its larger strategic tussle with China.”
    মানে হল বলছেঃ “এর সাথে আছে আমেরিকা ফ্যাক্টর। যারা তাই হাসিনার এভাবে কর্তৃত্ববাদী উত্থানে উদ্বিগ্ন বিশেষ করে এর সাথে চীন-আমেরিকার যে কৌশলগত টানা-হেচড়া আছে সেদিক থেকে দেখলে”।  অর্থাৎ টাইমস ইঙ্গিত দিচ্ছে আমরা অনুমান করি যে এর অর্থ হবেঃ কর্তৃত্ববাদী হাসিনার থেকে যাওয়া মানে তাতে বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়বে!


    আর টাইমস অন ইন্ডিয়ার লেখার শেষ বা সিদ্ধান্ত বাক্য টা হল এভাবেঃ

    “Unless the opposition is given the space it should have, radical elements will create space they don’t currently have. That’s terrible news for India. A radicalised Bangladeshi establishment can bring Pakistan back into play. New Delhi should tell Hasina to change tack, in its, and her, interest.”

    অর্থ হলঃ “হাসিনা যদি তার রাজনৈতিক বিরোধীদেরকে রাজনীতিক-বিরোধীতা করার জায়গা না দেন (অর্থাৎ জেলে রেখে নির্বাচন, মাঠে মিটিং মিছিল জমায়েত, মতপ্রকাশের অধিকার ইত্যাদি সবকিছু থেকে বঞ্চিত করে দেয়) তবে রেডিক্যাল বা সশস্ত্র রাজনীতিক ধারা ঐ স্থানটা দখল করবে যাদের জায়গা এখনও বাংলাদেশে তেমন নাই! আর এটাই ভারতের জন্য খুবই ভয়ঙ্কর সংবাদ হবে!”।

    এরপরের বাক্যের অর্থ এটা একেবারেই কোন ভারতীয় লেখকের হিন্দুত্ববাদী ঘৃণা। এছাড়া তারা কখনই কোন রেফারেন্সে-ছাড়াই পাকিস্তানকে না জড়িয়ে বা গালি না দিয়ে থাকতে পারে না। সেই পটভুমিতে পরের বাক্যটা হলঃ একটা রেডিক্যাল (সশস্ত্র) বাংলাদেশ এটা পাকিস্তানকে মাঠে ফিরে ডেকে আনতে পারে! (অর্থাৎ এরমধ্যে পাকিস্তান কোথা থেকে এল কেউ জানে না) “তাই নয়াদিল্লির উচিত হবে হাসিনাকে সামলানো তাকে স্বার্থ-অভিমুখ বদলাতে বাধ্য করা!”।

    এই শেষের বাক্যটাও একই মিথ্যা হামবড়া তবে মুরোদহীন ভারতকে জাগানোর বা এর এখনও হাসিনাকে নিয়ন্ত্রণের যেন ক্ষমতা আছে এই ভাব নিয়ে বলা কথা! কারণ, ভারত যেন একটা বিরাট ক্ষমতাবান কুতুব  এই ভাব না ধরলে ভারতীয় সাংবাদিকের কলমের আগায় যেন কালি আসে না !  অথচ এতদিন হাসিনা যতটুকু চীনের সাথে সম্পর্ক বা ঘনিষ্ঠতা কায়েম করেছে তা কী ভারত ঠেকাতে পেরেছে? কাজেই হাসিনার যা সক্ষমতা সেটার সবই যেন ভারতের দেয়া এমন ভুয়া দাবির দরকার কী??? আর ভারত যা চায় এর বাইরেও হাসিনার নিজস্ব স্বার্থ বলে অনেক কিছু আছে এবং তা থাকাই স্বাভাবিক! তাতে হাসিনার স্বার্থের কোন ন্যায্যতা থাকুক আর নাই থাকুক!


    তাহলে টাইমসের এই অবস্থান বদল কেন ঘটলঃ

    টাইমসের এই অবস্থান বদল কেন ও এর তাতপর্য কী, এনিয়ে কিছুটা উপরে দাবি করে বলেছি যে, এই বদল বিজেপির মোদির আগ্রহে ঘটে নাই। কারণ টাইমসের বদলি অবস্থান কোনভাবেই সেটা মোদির রাজনীতি নয় যে মোদি হিউম্যান রাইট বা নাগরিক অধিকারের পক্ষে কথা বলবেন বা টাইমস-কে বলতে বলবেন বা অর্থ দিবেন!
    আর টাইমস মানে টাইমস অব ইন্ডিয়া কোন অর্থপ্রাপ্তি ছাড়াই এমন সম্পাদকীয় লিখার কারণ নাই! তাহলে?

    খুব সম্ভবত এটা কোন আমেরিকান উদ্যোগ! এমন অনুমান করাটা আশা করি ভুল হবে না!  যা সাধারণত কোন থিঙ্ক-ট্যাংক বা এনজিও এর মাধ্যমে হয়ে থাকে। আর এটা বাইডেনের মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার বা স্যাংশনের পররাষ্ট্রনীতির সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ, মানে সাথে যায়!
    তবে মূলকথাটা হল, হাসিনা যদি এবারও ২০১৪, ২০১৮ এর মত একই পথে বিজয়ী হতে পারে তবে টাইমস অব ইন্ডিয়ার মুখ দিয়ে প্রকাশিত এই আশঙ্কা সত্যি হবার সম্ভাবনা!

     

    আপডেটঃ  ২৬ নভেম্বর  ২০২৩,  সন্ধ্যা ০৭ঃ ৪০
    সর্বশেষ আপডেটঃ ২৭ নভেম্বর  ২০২৩,  রাত ১২ঃ ৪৭

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • কী তামসা! দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়

    কী তামসা! দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়
    গৌতম দাস
    ১০ নভেম্বর ২০২৩  ২১ঃ ৫৮ রাত

    https://wp.me/p1sCvy-57i

               দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায় – স্টিফেন ইবেলি বলেন, রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের ভারতে ‘টু প্লাস টু’ বৈঠকে যোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।

    আবার শুরু হয়েছে। সেই পুরানা বানানো গল্প –  ভারত নাকি আমেরিকার সাথে দেন-দরবার করে হাসিনাকে বাঁচাবে। ফিরে হাসিনাকেই ক্ষমতায় রাখবে ইত্যাদি! মানে সেই পুরানা “আনন্দবাজারি” ও  “অগ্নি রায়” আর তাঁদের ঢাকার সহযোগী – মার্কা মিথ্যা প্রপাগান্ডা। আর তা শুনে কিছু না বুঝে হাহাকার করে উঠা লোকের সংখ্যাও কম নয় যারাই মূলত – ভারত আবার হাসিনাকে বোধহয় ক্ষমতায় রেখে দিল – এই প্রপাগান্ডাকে পরোক্ষে আয়ু দিচ্ছেন। আর তাতে মিথ্যা প্রপাগান্ডার অপ-সাংবাদিকতা করে হিট বাড়ানোর অসৎ ততপরতার জয়জয়কার শুরু হয়েছে। এবার একাজের লিড হল, বিবিসি বাংলার শুভজ্যোতি ঘোষ। তিনি নেমেছেন যে নিজে ভারতীয় আর ভারতীয় বলেই যেন এক আরএসএসের কর্মির মত আচরণ করে আসছেন তিনি। আর তাত এই আচরণের পিছনে আছে আরেক পরিচয়।

    কলকাতার আরএসএস এর এককালের (২০১৬) দায়ীত্বে থাকা নেতা তথাগত রায় এখানে দেখেন তার পরিচয়,
    এরই চ্যালা-শিষ্য ছিলেন এই শুভজ্যোতি ঘোষ! 
    তথাগতের আমলে (সে সময়
    জঙ্গীবাদের নামে যা খুশি লিখতে-করতে-চালাতে পারত এরা), তাতেই এই শুভজ্যোতির উত্থান!

    শুভজ্যোতি ঘোষ, তিনিই এবার প্রপাগান্ডা লিড-নেতা! বাংলা বিবিসি-তে তিনি সত্য-মিথ্যায় মিশানো এক প্রপাগান্ডা রিপোর্ট করেছেন। আর তা থেকেই প্রধান প্রপাগান্ডাটা শুরু হয়েছে। আর এটাই বাংলাদেশে প্রথম আলো, কালের কন্ঠ ইত্যাদি এরা বিবিসির নাম না নিয়েই ঐ মেটারিয়াল দিয়ে সুত্রবিহীন স্ব স্ব রিপোর্ট করেছে।  যদিও গতদিনটা শুরু হয়েছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এরও এক মিথ্যা প্রপাগান্ডা রিপোর্ট দিয়ে। সেটা এখানে দেখতে পাবেন।

    মিথা প্রপাগান্ডার শিরোনাম কীঃ
    গতকাল ১০ নভেম্বর ছিল আভ্যন্তরীণ রুটিন ঘটনা হিশাবে ভারত-মার্কিন সংলাপের দিন। আর সে উপলক্ষ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন তাঁদের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনকে সাথে নিয়ে আগের দিনই ভারত সফরে পৌছে গেছিলেন। বলাই বাহুল্য এতে বাংলাদেশের কোনই সংশ্লিষ্টতা নাই; থাকার কোন কারণও নাই। কিন্তু তা সত্বেও এই ইন্ডিয়ার হাসিনাকে দেয়া মিথ্যা মিডিয়া প্রপাগান্ডা সার্ভিস যে এই সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় আসবে! কেউ কেউ সাবধানী খাড়া মিথ্যা বলতে ভয় পেয়েছে।  যেমন কালের কন্ঠ লিখেছে  “ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপ : উঠতে পারে বাংলাদেশ প্রসঙ্গও” ।  আবার প্রথম আলো তো খুবই সাহসী মিথ্যাবাজ। তাই সে বুক ফুলিয়ে শিরোনাম করেছে,দিল্লিতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ।  কিন্তু প্রকাশ করার পর বুঝেছে এত হারাম কাজ দুনিয়া সহ্য করবে না। রাত দশটার মধ্যেই ঢাকার মানুষ চোরামি জেনে গেছে। মানে প্রথম আলো – এরা এত নিচে নেমেছে যে প্রথম প্রপাগান্ডা নিউজটা গায়েব করে দিয়েছে। লক্ষ্য করবেন এর রেফারেন্স লিঙ্কটা প্রিয়.কম এর। এই ওয়েবে কারো অনেকের প্রকাশিত লেখাই অটো কপি করে রাখা থাকে। তাই আমি সেখান থেকে লিঙ্ক দিয়েছে। এছাড়া ফেসবুকে যারা স্ন্যাপ কপি করে স্টাটাস দিয়েছিল ততক্ষণাত তাঁদের স্টাটাসে প্রথম আলোর প্রথম রিপোর্টটা এখনও লটকানো আছে।
    তাই এবার শিরোনাম সহ সবই বদল। বলা যায় এবার দিল্লির সৌমের বরাতে প্রথম আলোর একেবারে ভাল মানুষী এবং পুরা উলটা শিরোনাম – যুক্তরাষ্ট্রকে বলল ভারত নির্বাচন কীভাবে হবে, তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় ।

    তাহলে শুভজ্যোতি কী করেছিলঃ
    শুভজ্যোতি একদিকে প্রায় তেরশ অক্ষরের প্রপাগান্ডা রিপোর্ট-টা করছেন, শিরোনামে কায়দা করে উস্কানি দিয়ে লিখছেন দিল্লিতে ভারত-মার্কিন সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় আসবে!!!  অপরদিকে লেখা সেই রিপোর্টের একেবারে শেষে ভারতীয় মুখখপাত্র অরিন্দম বাগচির উদ্ধৃতি দিয়ে লিখছেন, “বাগচি বলেছেন, আমরা তৃতীয় কোনও দেশের নিজস্ব নীতি নিয়ে মন্তব্য করি না, এখানেও করতে চাই না”। 

    “বাংলাদেশের নির্বাচন একান্তভাবেই তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা তৃতীয় কোনও দেশের নিজস্ব
    নীতি নিয়ে মন্তব্য করি না, এখানেও করতে চাই না”, -জানিয়েছেন ওই মুখপাত্র। সেই সঙ্গেই তিনি যোগ
    করেছেন, “বাংলাদেশের মানুষ নিজেরাই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন। ঘনিষ্ঠ মিত্র ও পার্টনার
    হিসেবে আমরা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে মর্যাদা দিই।”

    যার সোজা মানে হল, শুভজ্যোতির পুরা রিপোর্বটের বক্তব্যটাই ভুয়া প্রপাগান্ডা! কারণ, অরিন্দম বাগচির কথা সত্য হলে শুভজ্যোতির কথা যে ভারত-মার্কিন সংলাপে নাকি  বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গ আলোচনায় – এটা মিথ্যা।  অদ্ভুত, এরপরেও এমন রিপোর্ট আবার বিবিসি বাংলায় ছাপা হয়েছে সাংবাদিকতা বলে!!!!

    ঘটনা হল, পিটার হাস নাকি দিল্লি গেছেনঃ
    সকাল থেকেই বাংলাদেশে প্রপাগান্ডা শুরু যেখান থেকে যে ঘটনা হল, পিটার হাস নাকি দিল্লি গেছেন! প্রপাগান্ডিস্ট কালবেলার কথাই ধরেন, তার এই রিপোর্ট দেখেন।  এরা পিটার হাসকে দিল্লি পাঠিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সকাল থেকেই এই মিথ্যা প্রপাগান্ডার খারাপ  প্রভাব পড়েছে! কারণ পিটার হাস দিল্লি চলে গেছেন!

    তো – তাতে কী হবে? না, তাঁদের থামার সময় নাই। পিটার হাস ইন্ডিয়া গেছে মানেই যেন ফিরে এসে তিনি হাসিনা কে নির্বাচিত ঘোষণা করে দিবেন! তাই কান্নাকাটি???
    তাঁদের কে বলি – এখন থামেন, একটু শ্বাস নেন ভাল করে; এবার শুনেন!

    প্রথম কথা হল, আজ সন্ধ্যা সাতটায় সমকালে ছাপানো ছবি-সহ নিউজ বলছে, দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়। এখন বুঝেন প্রপাগান্ডার হাত-পা, ডালপালা কতদুর বিস্তৃত!

    দিল্লি নয়, পিটার হাস ঢাকায়

                                                                                     এটাই বিবিসির প্রপাগান্ডা রিপোর্ট 

     

     


    এমনকি হাস যদি ইন্ডিয়া যেতেন তবুও কিছুই মানে হত না কেনঃ

    কারণ, আজ দশ নভেম্বর দিল্লিতে ভারত-মার্কিন ২+২ সভা শুরু হবে আর তাই সেখানে আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন আগের দিনই এসেছেন। কিন্তু সেক্ষেত্রেও হাস যদি যেতেন তিনি মূলত বড় জোর ব্লিঙ্কেনের সাথেই দেখা করতে যেতেন। তবু কোনভাবেই পিটার হাস ভারত-মার্কিন ২+২ সভার কেউ হতেন না। কারণ তিনি এর কেউ নন।

    আর তাতেও কী কী ‘সত্য না’ থেকেই যেতঃ
    ১। পিটার হাস ২+২ সংলাপ-সভার কেউ নন, হবেনও না। তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদুত মাত্র!
    ২। এখানে ২+২ সংলাপ মানে আসলে কী? তা হল, ভারত-মার্কিন দুপক্ষেরই দুই পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর সাথে ভারতেরও পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, ( তাই, ২+২) – একসাথে ডাকা নিয়মিত সভা – এমন সভার কাঠামোর নাম হল  ‘টু প্লাস টু’ মন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপে; যা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। এর উদ্দেশ্যে ছিল প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারত-মার্কিন একসাথে কাজ করা কার্যত যা, ভারতকে আমেরিকান অস্ত্র বিক্রি এবং কী কী শর্তে বিক্রি সেসব নিয়ে আলোচনা। কারণ রাশিয়ার কী কী অস্ত্র ভারত কিনলে আমেরিকা অস্ত্র ভারত পাবে না সে তর্ক আছে। আর দ্বিতীয়ত, পারস্পরিক সামরিক রিসোর্স ও স্টোর-গুদাম শেয়ার করতে পারে কিনা যা পরে পূরণ করে দেয়া হবে এধরণের এক আলাপের সম্ভাব্যতা যাচাই দিয়ে এই সংলাপ শুরু হয়েছিল।  সুতরাং বলাই বাহুল্য, এই সংলাপে বাংলাদেশে কোন ইস্যুই না। এটাই আমাদের জন্য মূল কথা।  একারণেই বলছি পিটার হাস  ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের কেউই নন।
    ৩। মনে রাখতে হবে ২০১৮ সাল মানে সেটা ট্রাম্পের আমল। আর এবার বাইডেনের আমলেই এই সভাতেও এবার যুক্ত করা হয়েছে ইন্দো-প্যাসেফিক ইস্যু। যা আসলে এশিয়ায় চীন ইস্যুতে ভারত-মার্কিন একসাথে কাজ করতে পারে কিনা, কতটুকু? এনিয়ে তাঁদের আলোচনা। অর্থাৎ, এখানে এটাতেও বাংলাদেশ কোন ইস্যু-ই না!

    মূল কিছু কথা হাতে গুনে মনে রাখতে হবেঃ
    এক. এশিয়ায় বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতকে নিয়ে আমেরিকা আর যৌথ কিছুই করবে না। যেটা ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া ঘটেছিল। সে সময় এক্ষেত্রে আমেরিকান লক্ষ্য ছিল ভারতকে চীন ঠেকানোর কাজে ব্যবহার করার ঠিকা দেয়া। সেই ঠিকা দেয়া-নেয়া এখন ওভার! মানে শেষ বা ইতিটানা হয়েছে। যার প্রাথমিক কাজটা করে রেখেছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০১৭ সালেই। তিনি এই ঠিকার বিনিময়ের বস্তুগত সুবিধায় ভারতকে আমেরিকায় (কম বা না-শুল্কে) ১৬ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সুবিধা বাতিল করেছিলেন।  আর পুরা এসাইনমেন্ট-ঠিকা অবলুপ্তি ঘটিয়েছে বাইডেন প্রশাসন। তবে এসাইনমেন্ট বা ঠিকা দেওয়াটাও যেমন আনুষ্ঠানিক ভাবে দেয়া যায় না (এসব কাজ পাবলিকলি করা হয় না) সম্ভব ছিল না; সেকারণে এই ঠিকা বাতিল টাও আনুষ্ঠানিকভাবে করার কিছু নাই। যদিও এতে ঠিক কি ঘটেছে সেটা আমরা জেনেওবুঝে নিতে পারি বাস্তবতা দেখে। এর আগে আমার পুরানা লেখায় বিরোধী কংগ্রেস নেতা শশী থারুর লেখা থেকে – এই ঠিকা দেওয়ার –  রেফারেন্স আছে আমি দেখিয়েছিলাম! আলী রিয়াজেরাও এটা স্বীকার করতে চায় নাই!

    তবুও এর স্বপক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, বাইডেনের নয়া নীতি-পলিসিগুলো যদি খেয়াল রাখি। যেমন বার্মা এক্ট, বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর রাখার আগ্রহ কিংবা আন্দামান নিয়ে আমেরিকান পরিকল্পনা (ও আমেরিকান খায়েসও বলতে পারি) ইত্যাদি এসবের দিকে যদি নজর রাখি। এসব কোন ইস্যুতেই ভারত আমেরিকার খায়েসের সাথে চলতে পারবে না – ভারতেরও ঘোষিত নীতি-পলিসি এর বিরোধী। তাই এখানে এসে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক – এই কবি এখানে নীরব থাকবে। ভারত আমেরিকান খায়েস-কে আপন করে নিতে পারবে না শুধু না বরং ভারতের অবস্থান এর চরমতম-বিরোধী! এমনকি ২০২৪ সালে যদি মোদির পরাজয়ে রাহুল বা অন্য কেউ ক্ষমতায় আসে সেক্ষেত্রেও আমেরিকান খায়েস সম্ভবত পূরণ হবে না! এককথায়, আমেরিকান খায়েস – এই ইস্যুটার ভাগ্য অনিশ্চিত!
    সুতরাই এককথায়, বাংলাদেশে কে ক্ষমতায় আসবে বা থাকবে এই প্রশ্নে আমেরিকান অবস্থান আর কখনও ভারতের সাথে শেয়ার করে এই সিদ্ধান্ত আমেরিকা আর গ্রহণ করবে না। অর্থাৎ সেটা হবে আমেরিকার একক সিদ্ধান্ত।

    দুই.
    কিন্তু তাই বলে কী এশিয়ায় চীনবিরোধী অবস্থান, স্বার্থ ততপরতা প্রশ্নে ভারত-আমেরিকা  কমন স্বার্থেও কোন সম্পর্ক বা এক সাথে কমন স্ট্রাটেজিতে কাজ সব নাই হয়ে যাবে? অবশ্যই না। এটা থেকেই যাবে কারণ এটা আলাদা ইস্যু। এমনকি বাংলাদেশে হাসিনার সাথে চীন কী সম্পর্ক রচনা করছে তা নিয়েও ভারত-মার্কিন আলাপ হতে পারে কিন্তু সেটা হবে – বাংলাদেশের ক্ষমতায় কোন সরকার থাকবে সেই প্রশ্ন বাদ দিয়ে –  যেটা একান্তই আমেরিকার একক বিষয় হয়েই থেকে যাবে!
    আমাদের সমস্যা হল, কেন ভারত হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে থাকছে সেটা আমরা ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের সংঘাত ও প্রেক্ষিত থেকে দেখা বুঝা করি। যেন এর বাইরে অন্য কোন কারণ থাকতেই পারে না। ব্যাপারটা যেন হিন্দু-মুসলমানের পুরানা বিরোধই! আমি সবাইকে অনুরোধ করব একটু অন্যদিক থেকেও দেখেন! প্লিজ!! 

     তিন.  তবে এক্ষেত্রে মানে ভারত-মার্কিন সংলাপে কিছুটা  গোলমাল পাকিয়ে ফেলতে পারেন ডোনাল্ড ল্যু (সবাই নয়)। তিনিই এবার   ‘টু প্লাস টু’ সংলাপের মধ্যে ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি বা আইপিএস (IPS) ঢুকিয়ে ফেলার মূল কারিগর। বাইডেনের ইলেকশনী প্রচার স্ট্রাটেজি সাজানোর সময় থেকেই নির্ধারিত ল্যু-এর এই অবস্থান ও পদ। কিন্তু সরি ল্যু! সো ফার তার সাকসেস প্রায় জিরো!  পাকিস্তানে আর সর্বশেষ হাসিনার বাংলাদেশে ল্যু-এর আইপিএস স্ট্রাটেজির এর অর্জন শুন্যই বলা যায়। তবে এবার তিনি ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। আর খুব বেশি এটা আগাবে এমন সম্ভাবনা কম!

    চার. ভারত চাইবে এই আলাপের ছায়ায় এক ফাঁকে চীন ঠেকানোর ঠিকাদারি-টা আবার পাওয়া যায় কিনা! সেদিকটা উস্কে তুলতে; আবার যদি লাইগ্যা যায় – আর কী!  একদম আগের মতই না হলেও ভিন্ন মোড়কে অথবা কিছু অংশের কাজ!
    কিন্তু না। আমেরিকা এদিকে ভারতকে আবার এই ইস্যুতে ছাড় বা ঠিকা দিবার জায়গা এবং পরিকল্পনা কোনটাই নাই। আর তা থেকেই আলোচনায় ভারত বিরোধাত্মক ইস্যুগুলোকে সামনে তুলতে শুরু করে ফেলতে পারে। তাহলে, ভারত-আমেরিকার এবারের সংলাপ মোদির শেষ জমানা খারাপ পরিণতি ফলাফলের দিকে রওনা দিবে!

    পাঁচ. অথচ বিবিসি লিখেছে, “বৈঠকে দুই দেশের চারজন মন্ত্রী মিলে সার্বিকভাবে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েও আলোচনা করবেন বলে ডোনাল্ড লু নাকি মন্তব্য করেছেন। কিন্তু এই প্রসঙ্গে কোনও বিশেষ দেশের নাম তিনি উল্লেখ করেননি। আসলে দোনাল্ড ল্যু এর বরাতে যা যা বিবিসিতে শুভজ্যোতি লিখেছেন এর সবটাই মিথ্যা প্রপাগান্ডা! তাই কোন রেফারেন্স এখানে নাই যে ল্যু এসব কথা কোথায় বলেছেন???

    এসব কথা থেকে পরিস্কার যে বিবিসির এই কথিত রিপোর্ট একেবারেই ভুঁয়া। ঘরে বসে ইচ্ছামত বানানো! ভারত-মার্কিন সংলাপে ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়ে কোন আলোচনা এমনিতেই হওয়ার সুযোগ নাই। কারণ, ১। তা সংলাপ কাঠামোর মধ্যে পরে না। ২। এসময়ে ভারত বা  বাংলাদেশের কারো ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েই আলোচনা তোলাটাই ভারতের জন্য রিস্কি। কারণ, তাতে ভারতের নিজের ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ নিয়েও আলোচনা উঠে যেতে পারে।‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি’ ইস্যুটাই মোদির জন্য সেনসেটিভ। সেই খবর যার নাই তিনি বিবিসির এই মনগড়া রিপোর্ট লিখতে গেছেন বলেই এই সমস্যা।

    তাহলে কী দাঁড়ালোঃ
    ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ নিয়ে আজ বাংলাদেশ প্রসঙ্গের নামে যা কিছু হয়েছে এর কোন বিশ্বাসযোগ্যতাই নাই। বিশেষ করে বিবিসি এনিয়ে অপরাধী-সাংবাদিকতা করেছে।
    কিছুক্ষণ আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কাত্রার বয়ানে মানবজমিনে যা ছাপা হয়েছে সেটার উপর বিশ্বাস মানবজমিনও রাখে নাই; এমন না রেখেই মানবজমিন এই রিপোর্ট ছেপেছে।
    আবার ভারত-মার্কিন যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কাত্রার আবার বক্তব্য কেন? তিনি কিভাবে এটা দিতে পারেন? উনি কে এখানে? দুই পররাষ্ট্র-মন্ত্রীর যৌথ বক্তব্যের পরে তিনি কে?? কী তার প্রটোকল????
    ভারতের চেষ্যেটা হল, গায়ের কাপড় খুলে গেলেও ন্নযাংটা হয়েও যদি  হাসিনার ক্ষমতাকে যেকোন উপায়ে কিছু প্রাণ পাইয়ে দেয়া যায় কীনা – এরই এক মিথ্যা প্রাণান্তকর প্রয়াস!
    ভারতের এই খামোখা প্রচেষ্টা উলটা হাসিনা ও লীগের বিরুদ্ধে যাবার সম্ভাবনাই বেশি! মানুষ বিরক্তবোধ করবে, যে এত মিথ্যা বলার কী দরকার!  মিথ্যা কারো সঙ্গি হয় না!

     

     

    সর্বশেষ আপডেটঃ   ১১ নভেম্বর  ২০২৩,   দুপুর ০১ঃ ৩৫

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ভারতের পালিওয়াল গং – মুখে হারের সুর;

    ভারতের পালিওয়াল গং – মুখে হারের সুর;
    বাংলাদেশের ভারত সমালোচকদের সাথে আপোষের পরামর্শ!

    গৌতম দাস
    ০৭ নভেম্বর ২০২৩    ১৮ঃ ৫৭
    https://wp.me/p1sCvy-56t

     

              “The AL believes the use of force and mounting casualties in the Opposition camp will rupture party supremo Tarique Rahman’s command and control over the BNP.”

     

    ওরা ভয় পেয়েছে! কমরেড!
    সিপিবি-মার্কা স্টাইলে লিখলাম!

    কিন্তু ওরা কারা!
    অবিনাশ পালিওয়াল এন্ড গং; মনে হচ্ছে এরা ভয় পেয়েছে!  অবিনাশ পালিওয়াল [Avinash Paliwal]; তার নামটা ইংরাজিতে যেভাবে হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে তা উচ্চারণ করার সময়ে সেটা অনুসরণ না করে বরং, আমাদের  বাংলা শব্দে লিখলে যেমন হবে সেভাবে লিখলাম – অবিনাশ পালিওয়াল। এই অবিনাশ আবার একটা লেখা দিয়েছে; তাঁর লেখায় তিনি সাধারণত বাংলাদেশের আর্মি নিয়ে হালকা টাচ রেখে লিখে থাকেন, এবারও তাই করেছেন। তাঁর স্টাইলে তিনি ব্যাপারটাকে সবসময় তিনি লিখে থাকেন সিভিল-মিলিটারি রিলেশন [civil-military relations in Bangladesh] – এভাবে। এবারও ব্যতিক্রম হয় নাই।
    তাঁর লেখা হিন্দুস্তান টাইমসে ৪ নভেম্বর ছাপা হয়েছে। শিরোনাম Elections in sight, churn in Bangladesh politics , যার অনুবাদ মানবজমিন ছেপেছে গতকাল ৬ নভেম্বর; শিরোনাম নির্বাচন এবং বাংলাদেশের রাজনীতি, ভারতের যা করা উচিত...। অনেকে বলেছেন মানজমিনের শিরোনামটা মূল লেখার শিরোনামের বাংলা অনুবাদ নয় কেন? প্রথমত বাংলা অনুবাদ দিতে মানবজমিন বাধ্য নয়। আর এর চেয়েও বড়কথা এই শিরোনামটা লেখাটার বিষয়বস্তু যা আছে এর সঠিক প্রতিফলন! অবিনাশ সত্যিই  ভারতের যা করা উচিত তাই নিয়েই লিখেছেন।

    কিন্তু অবিনাশ কে? কেমন লেখা তিনি লেখেন?
    অফিসিয়ালি তিনি লন্ডনের এইক বিশ্ববিদ্যালয় সোয়াস [SOAS University] এর সিনিয়র লেকচারার যেখাকনে তাঁর ফ্যাকাল্টি সাবজেক্ট হল ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস [IR]। লন্ডনের কিংস কলেজ আর এই সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাথে ( আমেরিকা বা পশ্চিমের অর্থে নয়) বরং ভারতের শীর্ষ ব্যাবসায়ীদের অর্থে পরিচালিত এক থিঙ্কট্যাংক ORF [Observer Research Foundation] আর, এসবের সাথে জড়িয়ে থাকা ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান র’ – এভাবে সবটা মিলিয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট ততপরতা তারা চালিয়ে থাকে লন্ডন শহরে বসে। যেটা দেখে মনে হতে পারে যে এরা তো ভারতের বাইরের কেউ, আলাদা। কিন্তু আসলে এরা ভারত সরকার নিয়ন্ত্রিত ও সংগঠিত। অবিনাশ পালিওয়াল এদেরই নিয়োজিত [assigned] একজন! বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ (বিশেষত বাংলাদেশ আর্মি) তাঁর সাবজেক্ট! অনেক সময় তাঁর মাধ্যমেই ভারতের প্রতিক্রিয়া আমাদের কাছে পৌছানো হয় বা আমাদেরকে জানানো হয় – এভাবেও মনে করতে পারি।

    এবার অবিনাশ কী ভারতীয় ম্যাসেজ নিয়ে এসেছেনঃ 
    তিনি শুরুতেই বলছেন, “ঢাকায় সরকার ও বিরোধীদের অচলাবস্থা এটা নির্বাচনী গণতন্ত্রের উপর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, এমনকি সিভিল-মিলিটারী সম্পর্কের উপরও ছাপ ফেলবে [The Government-Opposition stand-off in Dhaka will have consequences for electoral democracy, may impact civil-military relations]”। এই বাক্যের নির্বাচনী-গণতন্ত্র না হয় বুঝলাম কিন্তু এতে  সিভিল-মিলিটারী সম্পর্কের উপর ছাপ কথাটা কোথা থেকে এলো আমরা জানি না। কারণ এটা একটা ইঙ্গিতপুর্ণ কিন্তু অস্পষ্ট করে রেখে দেয়া বাক্য! সাধারণত যার উদ্দেশ্য থাকে লেখক নিজে না বলে পাঠককে নিজ অনুমান করে নেয়া কোনহ অর্থ করে নিয়ে বুঝতে বাধ্য করা বা ঠেলে দেয়া।
    এটা তো পরিস্কার যে সরকার ও বিরোধীদের অচলাবস্থা বা সংঘাত যেটা লেখক ইঙ্গিত করছেন সেখানে বাংলাদেশের মিলিটারি তো কোন পক্ষই নয়।  বর্তমান দৃশ্যপটের কোথাও মিলিটারির কোন উপস্থিতিই নাই, কোন পক্ষ নয় সে! তাহলে, তা সত্বেও মিলিটারির প্রসঙ্গ তুলে উস্কানি দিচ্ছেন তিনি, এটাই আমরা দেখছি। কেন? এমন কোন ঘটনা মানে আরো গভীর ভারতীয় ধারার কোন ঘটনার মধ্যেই কী তিনি ভারতীয় স্বার্থ দেখতে পাচ্ছেন? এনিয়ে অবিনাশকে আমাদের একটা কথাই বলার আছে তা হল, এটা ২০০৭ সাল নয়! ফলে সেসময়ের মত আরো গভীরভাবে ভারতীয় স্বার্থের পক্ষে কোন ক্ষমতার উত্থান এবার ঘটবে না। মূল কারণ এবার বাংলাদেশকে আবার আরো ভারতীয় স্বার্থময় করে ভারতের হাতে তুলে দেয়া ঘটতে দেয়া হবে না। আমাদের  আম-জনগণ এবার নিজ স্বার্থের পাহারাদার।

    শিয়াল যেমন মুরগি ধরতে পারলে খুশিতে লোভে চকমকে হয়ে উঠে তেমনি এক শব্দ ধুর্ততা বা ধুর্তামি শব্দ হল কানেকটিভিটি [connectivity]।  যার আসল মানে হল ভারতের নর্থ-ইস্ট অঞ্চল থেকে বাংলাদেশের উপর দিয়ে ইচ্ছামত এবং বিনা পয়সায় করিডোর ও পোর্ট সুবিধা নেয়া! তা এমন ভাবে নেয়া যেন এই সুবিধা নেয়াটা ভারতের বাপের সম্পত্তি। আর কানেকটিভিটির নামে বাংলাদেশ নিজ স্বার্থ খুইয়ে ভুলে গিয়ে ভারতের জন্য কাজ করাই যেন বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কাজ! এমনকি করিডোরের জন্য রাস্তাঘাট সহ সব অবকাঠামো বা পোর্ট অবকাঠামো বিনির্মাণের জন্য যে সরকারকে যে বিদেশি ঋণ নিতে হবে এটাও আমাদের জনগণের দায়! আর ভারত এখান থেকে বিনা পয়সায় এই সকল নির্মিত অবকাঠামো ব্যবহার করবে – এর নামই কানেকটিভিটি!!!
    ঘটনা হল আসামসহ নর্থ-ইস্ট তো বাকি ভারতের সাথে শিলিগুড়ি দিয়ে এখনও ১৯৪৭ এর দেশভাগের  যুক্তই আছে।  সেকালে নেহেরু এসব সুবিধাতেই সন্তুষ্ট ছিলেন বলেই তো তিনি নর্থ-ইস্টের আরোও কোন  করিডোর ও পোর্ট সুবিধা চান নাই। তিনি পুর্ণ সন্তুষ্ট ছিলেন বলেই তো আর কোন কথা তিনি নিজ তার কালে এমনকি পুরা গত শতকে কখনও খায়েজ করেন নাই, কাউকে জানান নাই! অরররথাত করিডোর ও পোর্ট ভারতের জন্য অত জরুরি কিছু নয়।
    কিন্তু একালে একটা বিশেষ সরকারকে জবরদস্তিতে ক্ষমতায় রাখার পক্ষে ভারতের সমর্থনের বিনিময়ে বাংলাদেশকে বিনা পয়সায় কানেকটিভিটির ব্যবস্থা করে দিতে হবে সেটা তো বাংলাদেশের সেই সরকারের দায় ও স্বার্থ! এটা কোনভাবেই বাংলাদেশের আম-জনগণ এর স্বার্থ নয়! কাজেই কানেকটিভিটি শব্দটার আমাদের কাছে অর্থ হল রক্তচোষা-লুটেরা!  ।

    তামাসার কথা হল, এই রক্তচোষা-লুটেরা! শব্দ কানেকটিভিটি এর দোহাই দিয়েই অবিনাশ নিজের খুশি প্রকাশ করেছেন; আর ভারতের কোর স্বার্থও দেখেছেন। শুধু তাই না দাবি করেছেন যেহেতু বাংলাদেশের কানেকটিভিটি নিতে ভারতের স্বার্থ আছে তএব বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে ভারত শেয়ার হোল্ডার মহয়াজন! [Such deepening of infrastructural connectivity inevitably raises India’s stakes in Bangladesh’s politics.]
    অবিনাশ নিজেকে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস এর শিক্ষক বলে পরিচয় দেন। অথচ কান্ড দেখেন!  এর মানে হল ভারতের কোন বিদেশি ব্যবসায়ীর যদি বিনিয়োগ থাকে তবে ভারতের রাজনীতিতে আবার বলছি ভারতের রাজনীতিতে ঐ ব্যবসায়ীর ভাগীদারি বা স্টেক [stakes] আছে! সোজা কথা অর্থনীতিক বিনিয়োগে ভাগ থাকলে রাজনীতিতেও আপনি ভাগীদার? একথা একজন  ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস এর শিক্ষক বলেন কেমন করে????
    সবই আসলে মামার বাড়ীর আবদার! যা ইচ্ছা যা দরকার সবই তারা আবদার করতে পারে। বাস্তবতা হল, বাংলাদেশে এবারের রাজনীতিক অসন্তোষের পরিণতিতে  যদি হাসিনার ক্ষমতার যুগের অবসান ঘটে তবে ভারতের মামার বাড়ী উপভোগের অবসান ঘটবে!  অবিনাশ পালিওয়ালের  উচিত হবে সেসব পরিণতিতে কী করবেন তা নিয়ে মনোযোগী হওয়া!  সবচেয়ে বড়কথা এবারের আমেরিকান স্বার্থ শুধু হাসিনার বাংলাদেশের জন্য বৈরি তাই নয়। এটা মোদির ভারতের জন্যও সমান বৈরি! বাইডেন মোদিকে আবার নির্বাচিত দেখতে চায় না – এর ছায়া ইতোমধ্যেই ভারতের রাজনীতিতে পড়ে গেছে, সরগরম হয়েছে। তা এমনকি ফেসবুকের মজা-তামাসা করার বা ব্যক্তি-নিজেকে তুলে ধরার যে রিল [reel] স্টাটাস; সেখানেও তা ছড়িয়ে পড়েছে। যার মূল ইস্যু মোদি গত প্রায় দশবছর ক্কোথায় কী মিথ্যা বলেছেন তা নিয়ে ভিডিও প্রমাণসহ ট্রল করা!  সেদিকে এত বড় একটা বিষয় থাকতে অবিনাশ খামোখা বাংলাদেশ নিয়ে পড়ে আছে!!! তাই নয় কী??

    অবিনাশ ইতোমধ্যেই হাসিনাবিরোধী অবস্থানেঃ
    কিন্তু লক্ষ্যণীয় যে অবিনাশের এই লেখায় ইতোমধ্যেই তিনি হাসিনার হাত ছেড়ে দিয়েছেন, এই অর্থে যে তিনি হাসিনার অসংখ্য ভুল ত্রুটি তুলে ধরেছেন আর তা করেছেন বিরোধী অবস্থানে বসে। যেমন তিনি হাসিনাকে ডায়লগ-বিরোধী বলে [Hasina refusing dialogue  দোষারোপ করেছেন। সরকারের পরিচালিত দানবীয় দমন [ State-led crackdowns] চলছে বলেছেন। এমনকি বিএনপির প্রশংসা করে লিখছেন [politics in Bangladesh has evolved along expected lines. ]। বিএনপি সক্ষমতা দেখিয়েছে demonstrated the capability ,  হাসিনাবিরোধীদের জড়ো করেছেন [capitalise politically on widespread discontent against Hasina], আর সবচেয়ে বড় সার্টিফিকেটটা না দিয়ে পারেন নাই। বলেছেন, বিএনপি project itself as a secular-liberal actor by at least publicly disassociating from the Jamaat-e-Islami and mobilise considerable diplomatic support in the West।   যার সোজা মানে হল, অবিনাশ পালিওয়াল ঘুড়িয়ে স্বীকার করে নিছেন যে তার মত ভারতীয়রা হেরে গেছেন, তাঁদের প্রপাগান্ডা ফেল করেছে। তাঁরা এখন হাসিনার পতন দেখছেন টের পেয়েছেন তাই যত দ্রুত সম্ভব হাসিনার হাত ছেড়ে বিএনপির কোলে উঠতে কসরত শুরু করেছেন!

    বিএনপি এক শৃঙ্খলা মেনে চলা শক্তিঃ
    পালিওয়াল বিএনপিকে এই লেখায় এত বেশি সব সার্টিফিকেট দিয়েছেন যা ধরে রাখার পাত্রের অভাব দেখা দিয়েছে।   গত পনেরো বছর ধরে আমরা শুনে আসছে হাসিনা ছাড়া বিএনপি-জামাত সহ বাকি সবাই আমরা জঙ্গি! আমাদের চিন্তা-রাজনীতি সবই জঙ্গি; মানে হল বাস্কিরা আমরা ভারতের সাথে একই টেবিলে বা একই আসরে বসারই অযোগ্য মানুষ! যেন আমাদের চেহারাটা মা-কালির মত রুদ্র-মুর্তির,  হাতে কোপ-মেরে মাথা আলাদা করার খাঁড়া, আর গা-থেকে পোষাক থেকে রক্ত ঝড়ছে ইত্যাদি। ভারতের চোখে ফলে সেই সুত্রে বাংলাদেশের হিন্দুত্ববাদী প্রগতিবাদীদের চোখে বাংলাদেশের হাসিনা বাদে বাকি আমরা সবাই জামাত-বিএনপির দানব সব একেক জন!  গত প্রায় পনেরো বছর ধরে আমাদের এই চিত্র-কল্প, এই গল্প-গাথা এই ভিতরেই ছিল আমাদের বসবাস; কোন রকমে দিন গুজরান!

    কিন্তু অবিনাশ পালিওয়াল আজ আমাদের কী কথা শুনালেন?
    BNP’s image as being a disciplined force

    তিনি বড় বড় অক্ষরে লিখেছেন –  BNP’s image as being a disciplined force। বাংলায় বললে, বিএনপির আজ ইমেজ নাকি এক সুশৃঙ্খল শক্তির। শুধু তাই না, আরো সাংঘাতিক সব প্রশংসাবাণী! পরে যোগ করেছেন এই বিএনপি নাকি এতই অহিংস যে উলটা তারাই ভিকটিম যারা আওয়ামি ত্রাস গুপ্ত-হত্যাকারী এবং পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে আত্মরক্ষা করে টিকে আছে ...that is defending itself from AL henchmen and the police.।

    প্রথম কথা কথা হল, গত পনেরো বছর ধরে ভারতের কোন একাদেমিকের বয়ান মানেই ছিল তাঁরা জামাত-বিএনপি নাম করলেই বুঝতে হল এরপর তারা আমাদের সকল হাসিনা-বিরোধীদের বিরুদ্ধে কুতসা আর ঘৃণামূলক বাক্য বলবেন! এই ছিল রুল!! আর তাতে সবচেয়ে বড় ক্রিমিনাল যেন হয়ে থাকতে দেখা যেত তারেক রহমান-কে। কিন্তু আজ এই লেখায়, একেবারেই উলটা। এই আন্দোলনে “বিএনপির অর্জন” এভাবে না বলে, পালিওয়াল লিখছেন  From Rahman’s viewpoint, মানে রহমানের (তারেক রহমান) দৃষ্টিভঙ্গিতে… এভাবে।  যদিও এটা বলার পরের বাক্যে কিছু গড়বড় করেছেন যেটা নিচে সরাসরি কোট করে তুলে আনা হয়েছে আগ্রহিরা দেখতে পারেন। পালিওয়াল দেখছেন, হাসিনা যথেষ্ট কোনঠাসা হয়ে গেছেন। কিন্তু আবার লিখে ফেলেছেন বিএনপি সামরিক হস্তক্ষেপ ডেকে আনতে পারে। যদিও পালিওয়াল বলেছেন, এই ডেকে আনাটা “বিএনপিকে সারবস্তুতে কোন সুবিধা দিবার সম্ভাবনা কম, কিন্তু এই বাহিনী যাই করুক তা রহমানের পক্ষেই যাবে”!
    প্রথমকথা বাহিনী নিয়ে এসব আলোচনা অস্বস্তিকর; তাও আবার বিদেশির মুখে! দ্বিতীয়ত, জল্পনা-কল্পনায় এমন যা খুশি লিখে দেওয়া আর আমাদের তাতে অংশ নেয়ার মানে হয় না, তাতে তা যতই পাঠকের আকাঙ্খার পক্ষের বক্তব্য মনে হোক না কেন! আর কিছু শব্দ ও বাক্য যেখানে বাস্তবতা-বর্জিত! কাজেই পালিওয়ালদের এই পল্টি-মারার দিকটা যে বিএনপি-জামাত এখন খুব ভাল সুশৃঙ্খল – এদিক্টা  দেখানো ছাড়া আর কোন দকে আমরা আলোচনা নিব না!

    From Rahman’s viewpoint, Hasina is cornered enough
    to either step down or engage in violence triggering
    wider civil strife. The former can enable the formation
    of a caretaker government,
    the latter could
    invite military intervention.
    The army’s re-entry into politics is unlikely
    to benefit the BNP substantially, but it could
    even the playing field in Rahman’s favour.

    এছাড়াও LG (retired) Hasan Sarawardi এর গ্রেফতার নিয়েও তিনি অনেক গল্প আর ইঙ্গিত রচনা করেছেন। যেসব অর্থহীন! এসব ভারতের পক্ষেও যায় নাই, পালিওয়াল অনেক করিতকর্মা ও জ্ঞানী বা অনেক জানেন ইত্যাদি এসবের কোনটাই মানে হয় নাই, প্রমাণ হয় নাই। বরং তার নাদানি-ই তুলে ধরেছে!  বুঝা গেছে তিনি প্রপাগান্ডা রচনার জন্যও কত আনফিট!

    সবশেষে, মোদি সরকারের জন্য পালিওয়ালের পরামর্শঃ
    হ্যা, পালিওয়ালের মোদিকে দেয়া পরামর্শটা বরং ইন্টারেস্টিং।  প্রথমত কথাগুলো তিনি ছোট করে এক বাক্যেই লিখেছেন।
    যার সারকথাটা হল, হাসিনার দিন শেষ – এটা পালিওয়াল এন্ড গং এরা বুঝে গেছে! যেমন তারা ভারতকে (মানে মোদি সরকারকে) বলছে ইতিবাচক হতে। কোন বলপ্রয়োগে দমনের রাস্তাকে সমর্থন করা ত্যাগ করতে। আর বরং একটা নিরপেক্ষ অবস্থান তৈরি করে নিতে। যাতে বাংলাদেশে যারা ভারতের সমালোচক আছে তাঁদের জন্য দুয়ার খুলে রাখা হয়। বাংলাদেশে যে ঝড় উঠেছে (হাসিনা পতনের লক্ষ্যে) তা পুরণ-সমাপ্ত হলে যেন তাঁদের সাথে একটা আপোষ করে নেয়া যায়!

    The best way to ensure that India preserves some positive equities,
    and is not compelled to explore high-cost coercive options, is to
    craft an impartial position that leaves the door open to
    reconciliation with the numerous India critics in
    Bangladesh after the storm passes.

    কিন্তু অবিনাশ পালিওয়াল এর আহবান ও ততপরতা কী বাংলাদেশের মানুষের মনে আগ্রহ জাগাবে?   সম্ভাবনা কম। কারণ , গত পনেরো বছর যারা লুটে-চুষে খেয়েছে তাদেরকে বাংলাদেশ কীভাবে ও কেন বিশ্বাস করবে? আর কাদেরকে করবে? ভারতের হিন্দুত্ববাদ-কে? আর আমরা তো অনেক দুরের! সবার আগে ভারতের মুসলমান বা মোদি-বিরোধিদের প্রতি যে বৈষম্য চলছে এর অবসান করে দেখান! তাদেরকে সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে দেখান! নাকি? সবার আগে এই পরীক্ষায় পাশ করে দেখান! এসব একাদেমিশিয়ানেরা এব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন। আগে এরা নিজের অবস্থান জানাক!
    আর হাসিনা পরবর্তি (যদি হয়) বাংলাদেশের কাছে ভারত, এটা ক্রমশ ২০০৬ সালের ভারত হতে চলেছে। দিন একই রকম থাকে না, বদলে যায়; গুজর গেয়া!  তাই সেই আগামি দিন থিতু হয়ে উঠার পরে দেখা যাবে! এখন সব পতন আর ভাঙনের দিন! আর কত!
    আর আগামিতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভাল হবার কোন কারণ দেখিনা। তাতে সেই ভারত ২০২৪ সালের মে মাসের নির্বাচন পরবর্তি যতই নয়া ভারত বা হিন্দুত্ববাদ-বিরোধীই হোক না কেন! মূল কারণ, বাংলাদেশের আম-মানুষের ভারতের উপর নুন্যতম আস্থা-বিশ্বাস নাই!  আর বলাই বাহুল্য নয়া সবকিছু শুরু হতে পারে একটা ন্যায়-ইনসাফে পুরান ঘটনাবলীর বিচার থেকে যার কোন সম্ভাবনা আপাতত দেখা যাচ্ছে না! তাই আপাতত ফুলস্টপ! সব ফেলে রাখেন!!!

    সর্বশেষ আপডেটঃ  রাত ০৯ঃ ৩৭, ০৭ নভেম্বর    ২০২৩,

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • মোদি কীভাবে পশ্চিমাদের তদন্তে সহযোগী হবেন

    কানাডায় ‘র’-এর খুনঃ
    মোদি কীভাবে পশ্চিমাদের তদন্তে সহযোগী হবেন

    গৌতম দাস
    ২৭ সেপ্টেম্বর  ২০২৩  সন্ধ্যা ১৮ঃ ৫৯
    https://wp.me/p1sCvy-52J

     

            …Canada row wake-up call on rival India

    কানাডায় নাগরিকত্ব নিয়ে বসবাসকারি এক শিখ নেতাকে খুন করতে মোদির ভারত রাষ্ট্রের এক অন্তর্ঘাতমুলক খুনাখুনির প্রতিষ্ঠান ‘র’ [RAW] কানাডায় গিয়ে একাজ করে এসেছে। কানাডায় ‘র’ এর স্টেশন চিফ, যিনি নিজের আসল পরিচয় লুকিয়ে মিথ্যা ‘তিনি যেন কূটনীতিক’ এই ছুপা পরিচয় নিয়ে কানাডায় ছিলেন। তিনি এই খুনের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করেছেন বলে ইন্টেলিজেন্স তথ্য থেকে ধারণা করা  ও অভিযোগ উঠেছে। তাই তাকে, কানাডা সরকার ‘বহিস্কার’ [‘অনাকাঙ্খিত ব্যক্তি ঘোষণা’ বা persona non grata] করে দিয়েছে।
    এই ঘটনা নিয়ে খোদ  আমেরিকা থেকেই বহু মিডিয়া রিপোর্ট  প্রকাশিত হয়েই চলেছে। এখনও আসছে। বিশেষ করে শুরুর দিকে রয়টার্সের খবরগুলো আর পরে  নিউ ইর্য়ক টাইমসে এই রিপোর্টটা সারা ফেলেছে। এতে প্রকাশিত ভাষ্য থেকে এর স্টোরির সারাংশটা এরকম যে, আমেরিকা প্রতিদিনই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে অসংখ্য বিদেশি দুব্যক্তির কথোপকথনের মধ্যে বা-হাত-ঢুকিয়ে [intercept]  তা শুনে থাকে। কিন্তু এত তথ্যের ভিড়ে এক কথোপকথন (যেটার এক প্রান্তে ছিলেন এখন বহিস্কৃত কানাডায় কানাডায় ‘র’ এর স্টেশন চিফ বলে অনুমান করা হচ্ছে) আমেরিকার হাতে এসে যায়। সেই তথ্যসহ আরো অনেক কিছুই আমেরিকা কানাডা সরকারের সাথে শেয়ার করেছিল। এমনিতেই সাধারণভাবে এদুই রাষ্ট্র পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় অনেক কিছুই তারা শেয়ার করে, পরস্পরকে সাহায্য করে থাকে, যেন একই রাষ্ট্র এর দুই অংশ তারা।
    খুনের ঘটনাটায় ভুক্তভোগীর নাম [Hardeep Singh Nijjar] হরদীপ সিং নির্জ্জার,  যিনি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন স্বাধীন এক শিখ রাষ্ট্র কায়েমের  – মানে খালিস্তান আন্দোলনের কর্মী; এই অর্থে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের রাজনীতির অনুসারী।
    অনেকের ধারণা হতে পারে যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন মানেই তা টেররিজম বা একালে জঙ্গীবাদের ক্যাটাগরিতে ফেলে একে নিন্দা করা যায়। ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। আপনি যদি দাবি তুলেন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার জন্য আমি রেফারেন্ডাম চাই – আর এটাই আমার দাবী সেক্ষেত্রে নেতিভাবে দেখিয়ে কোন শাসকেরই এথেকে  সুবিধা খাবার সুযোগ থাকে না। কানাডায় বসে শিখ কমিউনিটি এভাবে তাদের দাবি পরিচালিত করছে। যা সম্পুর্ণ আইনিভাবেও বৈধ আন্দোলন!
    হরদীপ সিং তিনি কানাডায় খুন হন চলতি বছরের গত জুন মাসে। এরপর পরেই ব্যাপারটা ভারত-কানাডার মধ্যে সরকারি পর্যায়েই আলোচনা হয়েছিল, তবে তা মিডিয়া থেকে গোপন রাখা হয়েছিল। এমনকি সদ্য সমাপ্ত গত ৯-১০ সেপ্টেম্বর ভারতে অনুষ্ঠিত জি২০ এর সম্মেলন চলার কালেই কূটনৈতিক চক্রে কিছু পশ্চিমা রাষ্ট্রের মধ্যে একসাথে এবং সাথে মোদিকে নিয়েও কিন্তু গোপনে আলোচনাও হয়েছিল। (যেটা এখন জানা যাচ্ছে এমন সংশ্লিষ্ট পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো তা মিডিয়ায় স্বীকার করছে)। বিশেষ করে ইন্টেলিজেন্স তথ্য শেয়ার করার  আরেক অপ্রকাশ্য গ্রুপ ‘৫ আই’ [5 EYE] – এই গ্রুপ যার নাম বাংলা করলে হয় পাঁচ চোখের গ্রুপ। আর এর সদস্যরা হল, আমেরিকা, ইউকে, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। সোভিয়েতের সাথে কোল্ড ওয়ার রেষারেষির আমলে এটা আমেরিকা, ইউকে এর মধ্যে এক গোপন চুক্তিতে প্রথম এর জন্ম হয়েছিল যার সাথে কালক্রমে অন্য তিন দেশ যুক্ত হয়েছিল। কেবল ২০১০ সালে এমন জোটের তথ্য প্রকাশ্যে এনে উন্মোচিত করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার জি২০ সম্মেলনে এই জোটও তা গোপনে বিস্তর আলোচনা করলেও  এ’থেকে কোন অগ্রগতি, দিশা বা পরের পদক্ষেপ কী তা বের না হওয়াতে এখন খোলাখুলি একে-অপরের  কূটনীতিক বহিস্কার-সহ, এখন আমেরিকা খোলাখুলি ভারতকে – খুনী কে তা বের করতে – কানাডিয়ান তদন্তে সহযোগিতা করার জন্য প্রকাশ্যে শক্ত আহবানে এসে ঠেকেছে। যার মানে হল, ভারতকেই এখন ‘র’ এর দিক থেকে যারা যারাই এই খুনের সাথে জড়িত ছিল তাদেরকে বিচারের জন্য কানাডার হাতে তুলে দিতে হতে হবে – এই হল সারা পশ্চিমের হয়ে ভারতকে আমেরিকান পরামর্শ ও অনুরোধ।  আর আমেরিকান অনুরোধ মানে এখন এটা ক্রমশ ভারতের জন্য বাধ্যবাধকতা হতে থাকবে!  আর বলাই বাহুল্য যে এটা হল আপোষে ব্যাপারটা সবচেয়ে কম আন্দোলিত করে সমাপ্তি টানার প্রস্তাব। এখন মোদি এতে একমত না হলে ক্রমশ ভারতের উপর চাপ বাড়বে এবং অবশ্যই এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে পশ্চিমাদেশের সাথে ভারতের শত্রুতার চরমে যেতে থাকবে – এতে কোনই সন্দেহ নাই।
    আপনি একটা রাষ্ট্র মানে একটা রাষ্ট্রস্বার্থ হলেও অপর এক রাষ্ট্রের ভিতরে ঢুকে গোপনে সেদেশের নাগরিক কাউকে খুন করে আসতে পারেন না। এটা আন্তর্জাতিক বা দেশীয় আইনেও ক্রিমিনাল অপরাধ। তাতে ঐ খুন হওয়া ব্যক্তি আপনার কাছে আপনার রাষ্ট্রের যতবড়ই শত্রু বিবেচিত থাক না কেন! এই যে অপর দেশ-ভুমিতে ঢুকে ঐ দেশের নাগরিককে হত্যা এটা সেই অন্যদেশের সাথে যুদ্ধ ঘোষণার সামিল!  এতে আইনি পথ ছিল মানে হতে পারত যে ভারত কানাডা সরকারের কাছে হরদীপ সিং এর নামে ভারতে মামলা আছে তাই তাঁকে ভারত সরকারের হাতে হস্তান্তরের দাবি করা। কিন্তু এখন যা হয়েছে তা হল কানাডার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে ফেলার মত এক্ট করে ফেলার কুটনীতিক-সামরিক দিক তো আছেই এছাড়াও হরদীপ সিং কে নিয়ে ভারত কোন বিচার প্রক্রিয়া অনুসরণের আগেই  মানে ভারতে চোখেও তো  বিচার-প্রমাণ প্রক্রিয়া শেষে প্রমাণিত কোন  অপরাধী নয় তাহলে তাকে আগেই খুন করা হল কেন? মানে ভারত হরদীপ সিং কে কোন বিচার প্রক্রিয়ায় আনতেই চায় না যুদ্ধের এনিমি যেন এমন বিবেচনায় খুন করেছে!!!  অর্থাৎ বলা যায় মোদি সরকার তাঁকে নিয়েই বিচারের পথে না গিয়ে আইন বহির্ভুত [extra judicial] খুন বা কিলিং ঘটিয়েছে !! এটা তো ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার প্রধান প্রধানমন্ত্রী মোদির সরাসরি নির্দেশে এক কিলিং!!!! আর না হলে যুদ্ধের এনিমি হিশাবে ট্রিট করেছে – এর দুটোতেই মোদির ভারত অপরাধী!

    অন্তর্ঘাতমুলক [subversive] মানে কীঃ
    ভারতের বিদেশে গোয়েন্দাগিরি ও অপততপরতার সংগঠন হল ‘র’ [RAW]। এসব অপততপরতাকে বাংলায় অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতা বলাই সঠিক! যদিও অনেকে এটাকে স্যাবোটাজ [sabotage] শব্দে ব্যাপারটাকে ধরতে চেষ্টা করেন।
    অন্তর্ঘাত শব্দটা ডিকশনারী মানে দেখলেই বুঝা যায় এটা কত ভয়ঙ্কর। এর ডিকশনারি মানে হল, ভিতরে থেকে বসবাস করেও গোপনে কারো ক্ষতি করা। এখানে ভিতরে বলতে যাকে খুন করবে বা ক্ষতি করবে তার দেশে কিংবা খোদ তাঁর বাড়িতেই মেহমান হয়েও এবং বন্ধু সেজে এমন খুন বা ক্ষতি করবে। অর্থাৎ শব্দটা নিজ থেকেই এক ক্ষতিকর শব্দ। এর উপর আছে এর বিশ্বাসঘাতক দিকটা।  এখানেই শেষ না, আরো আছে। সব মিলিয়ে সেটা মানে, মানুষের এমন কাজ হল চরম অনৈতিক ও অসৎ[immoral] কাজ। তাহলে  এটা তো এমনিতেই অধঃপতিত এক ধারণা  তবু, মানুষের সমাজেই তো এমন অন্তর্ঘাতমূলক কাজের প্রতিষ্ঠান যেমন ‘র’-কে লুকিয়ে থাকতে/আছে পাওয়া যায়!!! হ্যা একথা সত্য তবে কেবল একটা জায়গায় অন্তর্ঘাত ততপরতার পক্ষে কিছু সমর্থকও পাওয়া যায়। সেখানে আসছি পরে, এর আগে…।

    এর মূল ইংরাজি  শব্দটা হল সাবভারসিভ [subversive] যারই সংস্কৃত ঘেঁষা এক বাংলা করা হয় অন্তর্ঘাতমুলক; বা এমন কাজ বা ততপরতা। সাবভারসিভ এর আক্ষরিক মানে হল ‘উপড়ে ফেলা’ [overthrow something]।  আর এই উপড়ে ফেলার অর্থ সরকার উপড়ে ফেলা, ব্যক্তিকে উপড়ে ফেলা মানে খুন করা এবং তার বাসায় গিয়ে খুন করা সহ কোন সরকার বা কোন প্রতিষ্ঠানকেই দমন করা, দাবড়ে দেয়া ইত্যাদি। ভারতের ‘র’ হল তেমনই এক সাবভারসিভ প্রতিষ্ঠান।
    সবচেয়ে বড়কথা যে কোন রাষ্ট্রের আইনের বিচারে ও চোখে সাবভারসিভ কাজটা সবসময়ই ‘অবৈধ’। তাতে এটাও সম্ভব যে, সাবভারসিভ কাজ মানেই প্রো-একটিভ মানে নিজেই আগাম “আইন নিজের হাতে তুলে” নিয়ে – উপড়ে ফেলার খুন জখম বলতে যা যা বুঝায় এর সবই করে আসা। আর মনে রাখতে হবে,  ‘র’ ভারতের হলেও সেই  ভারতেরই আইনেও ভিনদেশের কোন  ‘র’  সমতুল্য প্রতিষ্ঠান ও এর ততপরতাও চলে তবে সেটাও অবৈধ। শুধু তাই না, ভিনদেশে গিয়ে ‘র’ এর মত প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা সে দেশের বিরুদ্ধে ভারতের যুদ্ধ ঘোষণার সামিল!!  একারণে, ধরা যাক বাংলাদেশে কোন ‘র’ এর এজেন্ট এসে প্রকাশ্যে বলতেই পারবে না যে সে ‘র’ এর এজেন্ট। কারণ, ‘র’ সাবভারসিভ কাজের প্রতিষ্ঠান বলেই তা এক অবৈধ প্রতিষ্ঠান।  আপনি ‘র’ – এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এই পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশের (বা যেকোন দেশের) ভিসা পাবার প্রশ্নই আসে না!  আর এই অনৈতিক ও অসৎ সংগঠন বলেই এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে আপনার অফিস বা বাসার ড্রয়িং রুমে প্রবেশ-বসবাস অনুমতি পাবে না!

    কোথায় অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতার পক্ষে কিছু সমর্থকঃ
    উপরের পুরা প্যারাগ্রাফটাই অন্তর্ঘাত শব্দটার নেতি ও বিশ্বাসঘাতক দিকটা উন্মোচন করা হয়েছে এর প্রতিটা বাক্যে। তাহলে অন্তর্ঘাত কাজের এর পক্ষে এর সমর্থক কারা? কারা হয় এমন সমর্থক?

    এককথায় এর জবাব উগ্র জাতিবাদি চিন্তার লোকেরা!
    লক্ষ্য করলে দেখা যাবে উগ্র জাতিবাদি চিন্তা বা রাজনীতির যেখানে রমরমা বা ইতিহাসের যেসব যুগে তা রমারমা ছিল সেসব কালে উগ্র জাতিবাদি চিন্তার পাশে বসে থাকতে আমরা পেয়েছিলাম সাবভারসিভ বা অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা ও প্রতিষ্ঠানকে। ১৯৫০ সালের আগের সাড়ে তিনশ বছর ছিল পশ্চিমাদেশে বিশেষত ইউরোপ ছিল জাতিরাষ্ট্র বা উগ্র জাতিবাদি চিন্তার যুগ। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নানান কারণে এর অনেক কিছুই একেবারেই বদলে যায়। সবচেয়ে বড় কারণ, খোদ ইউরোপই জাতিরাষ্ট্র ধারণার রাষ্ট্র চর্চা বন্ধ করে অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে নিজেদের রূপান্তরিত করে নিয়েছিল। এছাড়া আরও  পরে কোল্ড ওয়ারের আমলে তা কিছুটা দেখা দিলেও তা সীমিত ও নিয়ন্ত্রিতই থেকে যায়। এককথায় এর মূলকারণ আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু ও এর বিস্তার। কারণ, রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের সাথে অন্তর্ঘাতমূলক ততপরতাও চালাবে আবার আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যও চালাবে এটা কঠিন। মানে এদুটো একসাথে চালানো খুবই মুশকিল। যেমন ইতোমধ্যেই কানাডা-ভারত আবার কানাডা-ইউকে যে বাণিজ্য আলোচনা চলছিল তা এখন পিছনে পরে সব এলোমেলো হয়ে গেছে।    তাই যেমন,  সোভিয়েত ব্লক আর পশ্চিমাদেশ এদের মধ্যে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ছিল না, সম্ভবও ছিল। একারণে এদের – পরস্পরের বিরুদ্ধে পরস্পর অন্তর্ঘাত্মূলক ততপরতা  চলতে পেরেছিল কোল্ড ওয়ার আমলে। তাই পশ্চিমাদেশে এটা কমে গেলেও এশিয়ায় বিশেষত ভারতে তা ব্যতিক্রম। দুটা কারণে। এক .  ভারতে এটা হিন্দুত্ববাদ এই উগ্রজাতিবাদে আচ্ছন্ন এক জাতিরাষ্ট্র। আর দ্বিতীয় কারণ, জন্ম থেকেই ভারত-পাকিস্তান রেষারেষি সম্পর্ক। যদিও সাধারণভাবে সাবভারসিভ বা অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা চালানোর মত প্রতিষ্ঠান অনেক রাষ্ট্রই সক্ষম থাকে। কিন্তু  তা করে না, কেবল গোয়েন্দা ততপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ সে সক্ষমতা সীমাবদ্ধ রাখে। আর ভারত-পাকিস্তান এদের মধ্যেই এর ব্যাপক ব্যবহার – এটাই গুরুত্বপুর্ণ জায়গা। এর উপর এসব প্রতিষ্ঠানের অন্য দেশে গিয়ে অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা ঘটানোর পরে দেখা যাবে কেবলমাত্র উগ্র জাতিবাদি দেশেই দেখা যাবে যে শাসক একাজকে গৌরবের বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে বা ওদেশের মিডিয়া প্রকাশ্যে এটা গৌরবের কাজ বলছে।

    তাই উগ্র জাতশ্রেষ্ঠত্ববাদ- হিন্দুত্ববাদী ভারত আর এই ভারতের প্রতিষ্ঠান র-এর কোন ততপরতা পাকিস্তানে ঘটিয়ে এলে তা ভারতের মিডিয়া প্রকাশ্যে তাতে উতযাপনের বিষয় হিশাবে তুলে ধরে থাকে।
    কানাডায় হরদীপ সিং-কে খুন করা আসার প্রেক্ষিতে কলকাতার আনন্দবাজার ঠিক একাজটাই করেছে।

    কলকাতার আনন্দবাজারের র-এর অন্তর্ঘাতি ততপরতার পক্ষে প্রকাশ্য উতযাপনঃ
    উপরে বলেছি, অনেক রাষ্ট্রেরই  সাবভারসিভ বা অন্তর্ঘাতমুলক ততপরতা চালানোর মত সক্ষম প্রতিষ্ঠান থাকলেও এমন ততপরতায় তারা যায় না বা এনিয়ে কথিত দেশপ্রেমি উতযাপন তারা করে না। সম্ভবত কাজটার মধ্যে অনৈতিক, অসততার দিক আছে তা খেয়াল রাখে বলে। কিন্তু মফস্বলী কলকাতার কাছে এই খারাপ দিকটার কথা খেয়াল রেখে বা ভেবে এথেকে দূরে থাকার মত কোন ক্রিটিক্যাল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠে নাই। এর উপর ক্ষমতায় যখন মোদি তখন সে আরেক হিন্দুত্ববাদী রাহুলের বাবা রাজীব গান্ধীর আমলের র-এরও আবার বিশেষ অন্তর্ঘাত-বাহিনী (‘টিম জে’) বানিয়ে কী করে পাকিস্তানে অপ-ততপরতা চালিয়ে এসেছিল সেই কথিত গর্বের কাহিনী এখন ছেপেছে আনন্দবাজার। অন্তর্ঘাত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজটা যেন খুবই গর্বের তা একালেও এই পত্রিকা পাঠকের মনে এখন হরদীপ হত্যার সময় যাতে জনমত কানাডার হত্যাকে গৌরবের মনে করে সে উস্কানি তুলতেই আনন্দবাজারের এই উদ্যোগ। এর শিরোনামেই ব্যাপারটা খুবই গৌরবের এমন উস্কানি তুলতে লেখা হয়েছে – “পাকিস্তানের ঘরে ঢুকে শত্রু নিধন, খলিস্তানিদের ঠেকাতে রাজীব গান্ধীর গোপন তাস ছিল ‘টিম জে’ “। এই ‘টিম জে’ হল র-এর ভিতরেই আরেক বিশেষ বাহিনী যা রাজীব গান্ধী তৈরি করিয়েছিলেন। মনে রাখতে পারি ইন্দিরা গান্ধী খুন হয়েছিলেন শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমন করতে গিয়ে শিখদের কাছে পবিত্র “স্বর্ণমন্দিরে হামলা ও তছনছ করে সেখানে আশ্রয় নেয়া সকল আন্দোলনকারীদেরকে হয় হত্যা করেছিল বা বের করে গ্রেফতার করেছিলেন। আর স্বর্ণ মন্দিরে সেনা অপারেশনের বদলা নিতেই ১৯৮৪ সালের ৩১শে অক্টোবর তারা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল। রাজীব গান্ধীও প্রায় একইভাবে শ্রীলঙ্কার তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যুতে খুন হয়ে গেছিলেন। এমনকি খোদ দিল্লিতেই ইন্দিরার হত্যা হয়ে যাবার কয়েকদিন পরে শিখ-জাতির বাসিন্দা পেলেই তাদের উপর কংগ্রেসিরা এথনিক ক্লিনজিং করেছিল!

    সাধারণভাবে বললে, ভারতে বারবার বিচ্ছিন্নতাবাদের সমস্যা হাজির হচ্ছে জন্মের সময়ে ভারত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রগঠনে কিছু মারাত্মক ত্রুটির কারণে। নেহেরুর রাজনৈতিক চিন্তার বৈশিষ্ট হল ১। এটা কলোনিশাসক মডেল। জবরদস্তিতে ঘাড়ে চড়তে হবে আর শুষে নিতে থাকতে হবে  তাতে সেটা আভ্যন্তরীণভাবে কেন্দ্রিভুত ক্ষমতার নামে অথবা পড়শির উপরে চড়াও ধরণের হলেও একই ফর্মুলা। ২। ভারতের রাজ্যগুলোর উপরে একমাত্র তথাকথিত কেন্দ্রের কড়া নিয়ন্ত্রণেই ভারতকে এক রাখা সম্ভব। এটা নেহেরু বিশ্বাস করতেন। আর এরই প্রতিফলন তিনি ঘটিয়ে রেখেছেন যা এখনও বর্তমান ভারত রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে।   আর একারণেই পালটা প্রতিক্রিয়ায় সব সময় কোন না কোন রাজ্যে ভারত ভেঙ্গে রাজ্যগুলোর আলাদা হবার উপক্রম!! উল্টোদিক থেকে পড়লে অন্যভাষায় বললে, এটাই বিচ্ছিন্নতাবাদ। আর তা ঠেকাতে উগ্র জাতিবাদী প্রপাগান্ডা যে বিচ্ছিন্নতাবাদ মানেই অপরাধ! সোজা ভাষায় বললে, নেহেরুর কাছে শাসন বলতে কলোনিশাসক যেভাবে ভারতকে অধীনস্ত রেখে শাসন করেছিল, সেটাই মডেল। এর বাইরে ১৭৭৬ সাল থেকে স্বাধীন আমেরিকা যে ফেডারল বলে আরেক রাষ্ট্র ধারনার হাজির ও সবচেয়ে স্টেবল-থিতু ধারণা বলে প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে এটা তিনি বেখবর। বরং বৃটিশেরা চলে গেলেও তিনি নেহেরুই যেন তখনও বৃটিশ রানীর ভাইসরয় এই মনে করে তিনি ভারত রাষ্ট্র কাঠামো ও শাসন সাজিয়েছেন।
    আবার এর সাথে ছিল উগ্র হিন্দুত্ব জাতিবাদী ও এর কথিত অর্থহীন দেশপ্রেম!!! আর সেটাই তবে আরো উগ্র উপস্থাপনায় একালে মোদির আমলে তা হয়ে উঠেছে হিন্দুত্ববাদী শাসনের প্রধান হাতিয়ার। আর তা থেকেই কথিত হিন্দুত্বের দেশপ্রেম এর আবেগ তুলে ভোটের বাক্স ভরা। তাই শিখ কমিউনিটির উপর যে নিরবিচ্ছিন্ন নিপীড়ন এটাকেই মিথ্যা করে ইতিবাচকভাবে হাজির করতে উগ্র জাতিবাদী দেশপ্রেম ছড়িয়ে দেয়া উস্কে তোলা – একাজটাই করেছে আনন্দবাজার। তাতে আরেক দেশে গিয়ে গোপন ও গুপ্ত হত্যা করে আসা যে আন্তর্জাতিক অপরাধ এমন কোন বোধ তাদের নাই। অথচ ভারতে  ২০০৮ সালে পাকিস্তানের ২৬/১১ মুম্বাই হামলা সেই একই ঘটনার উলটা পিঠ। মানে একই জিনিষ ভারত করলে তা দেশপ্রেম ও বীরত্ব; কিন্তু পাকিস্তান করলে সেটা অন্যায় আর মুসলমানের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষ দিয়ে একে প্রতিবাদ ও বিচার করে দেখাতে হবে!!! এই হলো উগ্র জাতিবাদের মূলনীতি।  সেটা অনুসরণ করেই আনন্দবাজার বলতে চাচ্ছে কানাডায় গিয়ে হরদীপ সিং-কে হত্যা এই অন্তর্ঘাতি ততপরতা এটা ভারতীয় দেশপ্রেম এবং এটা যেন বৈধ এবং ভারতীয় দেশপ্রেম ও বীরত্বের নজির! জনমনে এই উগ্র হিন্দুত্বের জাতিবাদ এবং এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করেছে আনন্দবাজার যাতে তারা কানাডায় গিয়ে হত্যা করাটাকে অন্যায়-অবৈধ না একেবারে উলটা দেশপ্রেমের বীরত্ব হিশাবে দেখে!

    মফস্বলি আনন্দবাজারের বেকুবিটা হল, তারা ভেবেছে সারা দুনিয়াটাই যেন মুসলমানের পাকিস্তান তাই মুসলমানদেরকে তো যা খুশি শাস্তি দেয়া যায় এই হলো অনুমান! তাই পাকিস্তানে ভারতের র-এর ‘টিম জে’ যেটা করতে পেরেছে সেটা যেন সে কানাডাতেও করতে পারবে!! এটা যেন কোন ব্যাপারই না!!! এই হলো তাদের হিন্দুত্ববাদের গাধামি! তারা বুঝেই নাই যে কানাডার গায়ে হাত মানে এটা অলিখিতভাবে আমেরিকার [সাদা ককেশীয়] গায়ে হাত তোলার সামিল! এর উপর কানাডা আমেরিকার সাথে জি৭ জোটের সদস্য! শুধু তাই নয় কানাডা ন্যাটোর সদস্য এবং ইন্টেলিজেন্স শেয়ার গ্রুপ ফাইব আই [Five EYE]  এর সদস্যও বটে! তাই মোদি যদি আমেরিকান “সহযোগিতার প্রস্তাবে” রাজি না হন তবে এই বিরোধ ক্রমশ চরমে না উঠে উপায় থাকবে না।

    ওদিকে মোদি হরদীপ সিং হত্যার পথে পা বাড়িয়েছেন আরেক কারণে! শুধু ভারত দেশের বাইরের হিসাবের কথাটা হল, পশ্চিমাদের চীন-ঠেকানোর কাজে ভারত গুরুত্বপুর্ণ পিলার ও বন্ধু তাই সেই ভারত এক্ষেত্রে কানাডায় গিয়ে খুন করেও পার পেয়ে যাবে; এছাড়া এতটুকুই না। মোদি আসন্ন আগামি নির্বাচনে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে শায়েস্তার পদক্ষেপ নিয়ে বীরত্ব আর গর্ব প্রকাশ করে হিন্দু শ্রেষ্ঠত্বের জজবা উঠাবে -ভোটারদের আবেগী করেও তুলবে যাতে এর প্রভাব মোদি-বিজেপির ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হয়!  কাজেই আমেরিকার দাবি যে “কানাডার সাথে  তদন্তে ভারতকে সহযোগিতা” এই আহবান – মোদির এতে সায় দেয়া এটা প্রায় অসম্ভব ও অবাস্তব একটা ঘটনা হয়ে থাকার সম্ভাবনা বেশি! আর সেক্ষেত্রে আমেরিকার নেতৃত্বের পশ্চিমের কাছে ভারত যতই চীন-ঠেকানোর দেয়াল- এই গুরুত্বের দেশ হোক না কেন মোদির ভারতকে পশ্চিম এক্ষেত্রে তারা পাচ্ছে না!!! সে সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি!

    আবার অন্যদিকে; আগামি বছরের শুরুতেই এপ্রিল-মে মাসের মধ্যে ভারতে নির্বাচন, তাতে কংগ্রেসের রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধীদলকে ক্ষমতায় দেখতে চায় বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিম; যা কানাডায় খুনের ঘটনার বহু আগে থেকেই একটিভ হয়ে ছিল। মোদির হিন্দুত্ববাদের এক ব্যবহারিক রূপ হল মুসলমানের উপর চরমতম বৈষম্য ও পায়ের নিচে দাবিয়ে রাখার নানান বেআইনি পদক্ষেপ নেয়া – অন্যদিকে ভয় আর প্রলোভন দেখিয়ে  বিচার বিভাগকেই নিস্ক্রিয় রাখা, বদলি বা ডিপার্টমেন্ট বদল পর্যন্ত ঘটিয়ে বিচার বিভাগ বা নির্বাচন কমিশনকে স্থবির রাখা -সহ সবকিছু করে মোদি এক রামরাজত্ব কায়েম করে রেখেছেন। আর এসব করেই আবার বাড়তি হিশাবে মুসলমান ঘৃণা বা শিখদের প্রতি ঘৃণা উস্কে তা বিক্রি মানে, এভাবে ভোটের বাক্স ভরার নীতিতেই মোদি গত দশবছর ধরে ক্ষমতায় টিকে আছে।
    কিন্তু এখন মোদির সেসব পরিকল্পনা ও ছকের কী হবে, কী প্রভাব পড়বে সেসবও দেখার বিষয়!  আসন্ন নির্বাচনের সময়ে, কানাডায় অন্তর্ঘাত কাজ যে যুদ্ধ ঘোষণার সমান কাজ তা হলেও – সেটা করা মোদির ঠিক আছে এমন জোশ তুলে আনা  – এটামোদির বিজেপি করতে যাবে আর টিকাতে পারবে?  আবার মোদি যদি পেরে যায় তাহলে এই মোদিকে বাইডেনের নেতৃত্বের পশ্চিম কী বোকার মত দাঁড়িয়ে দেখবে??? এসবই হয়ে উঠবেই আগামির ঘটনাবলীতে মুখ্য নির্ধারক সব প্রশ্ন!!!

    সর্বশেষঃ একটু আগে প্রথম আলো জানাচ্ছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর পালটা কানাডাকে অপরাধীদের আশ্রয় দিবার অভিযোগ করেছেন। এর অর্থ বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমের সাথে কোন আপোষের পথ বের করার পথে মোদির ভারত হাটবে না, যাচ্ছে না।

    সর্বশেষ আপডেটঃ   ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩; দুপুর ০১ঃ ৪৫
    সর্বশেষ আপডেটঃ  

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • এখন ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা নিয়ে কথা বলার মানে কী?

    এখন ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা নিয়ে কথা বলার মানে কী?
    গৌতম দাস
    ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩    রাত ০৭ঃ ৫৮
    https://wp.me/p1sCvy-507

    Civil Rights Movement Concept Pro Vector

    আমরা আজকাল অনেকে “ভোটাধিকার”, “মতপ্রকাশের অধিকার” বা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা” নিয়ে মানে, এসব শব্দ ব্যবহার করে কথা বলছেন বা বক্তৃতা করছেন – দেখছি আমরা। শাহবাগে বসে মিটিং-বক্তৃতা করছেন তারা – এসব খুবই কমন দৃশ্যাবলী ইদানিং আমরা দেখতে পাচ্ছি। মানে এখন আর এসব কোন নয়া জিনিষ না। আসলে হাসিনার ১৫ বছরের শাসন আমলে ভোট দেয়া জিনিষটার আর বালাই নাই; সব উঠে গেছে বলে – এজন্যই “ভোটাধিকার” শব্দটা আমরা কোন কোন কর্ণার থেকে উঠছে – এমনই মোটামুটি অনুমান করছি।

    এখানে ‘ভোটাধিকার’ বলতে ‘ভোট দেওয়ার অধিকার’ – আমার ধারণা, শব্দের ব্যবহারকারীরা এটাই বুঝাতে চেয়েছেন। আর এতে মনে পড়ল ‘অধিকার’ শব্দটাও আমাদের রাজনৈতিক সাহিত্যে অত প্রচলিত কোন শব্দটা নয়। যতটা ধরা যাক, ‘প্রগতিশীল’ শব্দটা – এটা যতটা প্রচলিত। প্রগতিশীল শব্দটা বরং ‘একটা রাজনৈতিক ধারার” মধ্যে অনবরতই ব্যবহার হয় এমন শব্দ। সে প্রসঙ্গে আসব।

    ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা মানে কী ও কেনঃ
    এখন “ভোট” বা “ভোট দেয়া” -এই ভোট ব্যাপারটা কী আসলে? আমরা কে কবে থেকে ভোট ব্যাপারটা শুনেছি অর্থে কিছু জানি বা জেনেছি? আমার কথা দিয়েই শুরু করলে বলতে হয়, তখন আমি সম্ভবত আট বছর বয়সের আর আমার মা আর দাদি ভোট দিতে গেছিলেন পাড়ারই আরেক কোণের এক স্কুলে, এটুকু মনে করতে পারি। কারণ কিছু গোলযোগ হয়েছিল আর মা-দাদি সেটা বাসায় ফিরে এসে বিশাল আসর জমিয়ে তা বর্ণনা করেছিল আর আমরা ছোটরা আশেপাশের কৌতুহলী ঘোরাঘুরিতে যতটুকু বুঝেছিলাম আর তা আবার এখনও যতটুকু মনে আছে সেই বর্ণনা; এছাড়া তখনকার আধো আধো ধারণায় জেনেছিলাম মানে, একটা নাম শুনেছিলাম ফাতেমা জিন্নাহ। আমার মা-দাদি তাঁকেই ভোট দিয়ে এসেছিলেন। পরে একালে বইপত্র-নেট ঘেটে নিশ্চিত হয়েছি সেটা ছিল পাকিস্তানের জেনারেল আয়ুব খানের প্রথম নির্বাচন ১৯৬৪-৬৫, তবে সেটাও পরোক্ষ নির্বাচন – মানে ইলেকটোরাল কলেজ নির্বাচন যা আমাদের দেশি-ভাষায় (৮০,০০০ ডেলিগেটের) বেসিক ডেমোক্রাসির নির্বাচন। আর সে নির্বাচনেই বিরোধী রাজনৈতিক দলের দিক থেকে সম্মিলিত প্রার্থী ছিলেন ফাতেমা জিন্নাহ। মানে যিনি হলেন সম্পর্কে – পাকিস্তান জন্মের নায়ক, মূল ব্যক্তিত্ব মোহম্মদ আলী জিন্নাহ এর ছোট বোন।
    বাংলাদেশ মানে সেকালের পুর্ব-পাকিস্তানের ইতিহাস ধরে এভাবে আরো পিছনে গেলে যে নির্বাচন পাই তা হল ১৯৫৪ সালে, পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। আরো পিছনে গেলে বৃটিশ-ভারতে ১৯৩৭ ও  ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন। মানে আমরা কলোনি-দখলদারের অধীনে থাকলেও প্রাদেশিক (রাজ্য বা প্রদেশ ওয়ারী) স্তরে নির্বাচন এর সুযোগ ঘটেছিল।  অথবা অন্যভাবে বললে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা – এই মূল ক্ষমতাটাকে বাদ দিয়ে নিচের বড় জোর প্রাদেশিক সরকারগুলো পর্যন্ত ভোট-নির্বাচনের এক সীমিত ব্যবস্থা চালু হয়েছিল – সেটার কথাই বলছি। তাও এটুকু পেতেই অনেক কাঠখড় লেগেছিল মানে ১৮৫৭ সালের একটা সিপাই বিদ্রোহ লেগেছিল। আর তাতে হাজার হাজার সিপাই ও সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ লেগেছিল। যদি আমরা ১৭৫৭ সালের কলোনি-দখলদারদের হাতে নবাব সিরাজদৌল্লার পতনের বছরকে মনে রাখি তবে এর প্রথম ১০০ বছরে কোন ভোট-নির্বাচন কী জিনিষ আমরা অখন্ড ভারতের কেউই জানতামই না। আমাদের জানার সুযোগ হয় নাই। তবে সেই প্রথম একশ বছর এক বাণিজ্যিক (বৃটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া) কোম্পানির দখলে থাকা যে বৃটিশ- ভারত তা পেরিয়ে, ১৮৫৮ সালের বৃটিশ-ভারত যখন কোম্পাস্নি শাসন ছেড়ে সরাসরি বৃটিশ সরকারের শাসনের অধীনে চলে যায় এরপরেই ক্রমশ ধীরে ধীরে পরিবর্তনের এক পর্যায়ে  “রাজনীতি” শব্দটার সঙ্গে আমরা প্রথম পরিচিত হতে থাকি। এখানে সরাসরি একটা অনুসিদ্ধান্ত টেনে দেয়া যায় যে, সবার আগে একটা সমাজ-ভুখন্ডের বাসিন্দাদেরকে “রাজনীতি”  শব্দটার সাথে পরিচিত হতে হয়। আর এরপরেই কেবল ক্রমশ ভোট-নির্বাচন ইত্যাদি আনুষাঙ্গিক শব্দ ও ধারণার সাথে সেই সমাজ পরিচিত হতে পারে , আগে নয়। যেমন ১৮৮৫ সালে বৃটিশ-ভারত সরকার প্রথম কোন ভারতীয় রাজনৈতিক দল খুলার অনুমতি দিয়েছিল। মানে ১৮৫৮ সাল থেকে সরাসরি ইংল্যান্ডের বৃটিশ সরকারের অধীনে ভারত শাসিত হতে শুরু করার পরে – এবং এরপরেও আরো ২৮ বছর পরে নেটিভ ভারতীয়রা নিজের রাজনৈতিক দল খুলার অনুমতি পেয়েছিল। আর মাঝের এই ২৮ বছরে আমরা আরো কিছু ছাড় পেয়েছিলাম যেমন, পাড়ার ক্লাব, সংঘ, দাতব্য প্রতিষ্ঠান বা সাধারণভাবে যেকোন ধরণের সামাজিক প্রতিষ্ঠান (রাজনৈতিক দল বাদে) খুলবার অনুমতি দেয়া শুরু করেছিল বৃটিশ শাসকেরা।

    আর বলাই বাহুল্য “রাজনীতি” এই শব্দটার ফলে অনুষঙ্গী হিশাবে ভোট-নির্বাচন শব্দ ও ধারণাটা আমরা পেয়েছিলাম। আর তা পেয়েছিলাম, ইংল্যান্ডে বৃটিশ শাসন ব্যবস্থাটা কেমন তা জেনে-দেখে, মানে আমাদের মধ্যে একেবারেই এলিট, সমাজের উপরের মাখন অংশ যারা ইংল্যান্ডে ঘুরবার সুযোগ ও ব্যয়নির্বাহের সক্ষমতা রাখতেন তারাই সরার আগে শিখেছিলেন যে, “রাজনীতি” রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ভোট-নির্বাচন ইত্যাদি মিলিয়ে ব্যাপারটা কী ও কেমন। কেন এমন বলছি? আর এত নিশ্চিত ভাবে বলছি কী করে?

    আমাদের মোগল শাসনামলে রাজনীতি, পাবলিক-জনগণ বা ভোট ইত্যাদি শব্দ ও ধারণা ছিল না, কেনঃ 
    রাজার রাজ্য বা সম্রাটের সাম্রাজ্য বলতে কী বুঝব? কেমন শাসন ব্যবস্থা এটা? এনিয়ে আরও মুখ্য প্রশ্ন মানে, আসলে ক্ষমতার প্রশ্ন!  কথাটা হল, রাজা-বাদশা বা সম্রাটকে শাসন ক্ষমতা কে দিয়েছে? 
    এককথায় উত্তর হল, আমরা বৃটিশ দখল ও শাসনের অধীনে যাবার আগে আমরা ছিলাম মোগল শাসনে। মানে যা ছিল একটা মনার্কি [monerchy] বা রাজতন্ত্র মানে, যেটাকে আমরা রাজা, বাদশা, সম্রাট, খলিফা, আমীর ইত্যাদি যে নামেই ডাকি এমন রাজার রাজ্য বা সম্রাটের সাম্রাজ্য – সেটা ছিল এমনই এক “রাজতান্ত্রিক” শাসন ব্যবস্থা।
    এখানে একটা কথা পরিস্কার রাখার সুযোগ নিতে চাই। দুনিয়াতে কোন-না-কোন শাসন ব্যবস্থা হাজির থাকা শুরু করা মোটামুটিভাবে মানুষের সমাজবদ্ধভাবে বসবাসের শুরু থেকেই। মানে যেমন শুরুতে গোত্রভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা থেকেই যদি ধারাবাহিকভাবে বলি তাহলে ওর পর থেকে পরে ব্যক্তিবোধ এই ধারণার উদয় (তবে শুরুতে অসচেতন উদয় হলেও পরে সেটা অনেক সচেতন উদয়) হবার পর থেকে ক্রমশ ব্যক্তিভিত্তিক শাসন শুরু হয়েছিল।  অবশ্য এর শুরুটা ছিল সাধারণত ছোটখাট রাজার রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা দিয়ে। এভাবে একটা না একটা ধরণের শাসন ব্যবস্থা আমরা তখন থেকেই সবকালের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাব। কিন্তু কোন একটা শাসন ব্যবস্থা থাকা মানেই তা রাষ্ট্র নয় মানে,  একে “রাষ্ট্র গড়ে শাসন ব্যবস্থা” কায়েম হিশাবে গণ্য করা ভুল হবে। কারণ রাষ্ট্র গড়তে চাইলে এর আগে সমাজে পাবলিক-জনগণ ধারণা হাজির থাকতেই হবে, যা রাজার সমাজে গরহাজির, মানে থাকে না।   সারকথায়, সমাজে একটা শাসন ব্যবস্থা থাকা মানেই সেখানে তখনও তা এক রাষ্ট্র ছিল – এভাবে এই অনুমান ভুল ও ভিত্তিহীন!  আসলে “শাসন ব্যবস্থা” মানে হল একটা শাসকের রুল [rule বা শাসন] ও রুলার[ruler বা শাসক] থাকা।   কিন্তু কোন রাজতান্ত্রিকতা [monerchy] শাসন ব্যবস্থা হলেও তা রাষ্ট্র ব্যবস্থা নয়। কাজেই শাসন ব্যবস্থা মানেই তা রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা তা মোটেও নয়। আর কোন শাসন ব্যবস্থাকে রাষ্ট্র-শাসন ব্যবস্থা হতে হলে সেখানে পাবলিক (public বা জনগণ) ধারণাটা থাকতে হবে। আর এরই পিছনের রুট ধারণা হল “রাজনীতি” ( politics বা পলিটিক্স) এই শব্দ ও ধারণাটাই সমাজে আবির্ভাব ও চালু থাকতে হবে। মানে রাজনীতি ধারণাটা সমাজে পরিচিত থাকলে তবেই সেখানে “পাবলিক” ধারণাটাও পাওয়া যাবে; এর আগে নয়।

    লক্ষ্য করবেন কোন রাজা, বাদশা আমীর খলিফার দেশে তাই তারা শাসক কিন্তু সেখানে ‘রাজনীতি’ বলে শব্দ নাই। তাই পাবলিক বলেও কোন শব্দ-ধারণা নাই। যে কারণে মোগল শাসনের ভারতেও ‘রাজনীতি’ বা ‘পাবলিক’ ইত্যাদি এসব শব্দ-ধারনাগুলো শব্দ নাই। মধ্যপ্রাচ্যের কোন বাদশা-আমীরের দেশে ‘রাজনীতি’ বা ‘পাবলিক’ ইত্যাদি নাই –  মানুষ আছে, বাসিন্দারা আছে কিন্তু পাবলিক নাই; তাই কোন রাজনৈতিক দলও নাই।

    মনার্কি আর রিপাবলিক শাসনব্যবস্থার তুলনা ও ফারাকঃ
    ‘রাজনীতি’ বা ‘পাবলিক’ ইত্যাদি এসব শব্দ নাই তা না হয় বুঝলাম কিন্তু  একটা মনার্কি (রাজতন্ত্র) আর রিপাবলিক শাসনব্যবস্থার মধ্যে মূল ফারাকটা কী?
    আগে বলে নেই আমি উপরে যে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্র ব্যবস্থা বলে যা লিখেছে সেটা বলতে আসলে “রিপাবলিক রাষ্ট্রে শাসন ব্যবস্থা” বুঝিয়েছিল।
    এই বাক্যে লক্ষ্য করবেন re-public মানে পাবলিক ধারণাটা পরোক্ষে এনেছি আর সাথে আছে “শাসন ব্যবস্থা” শব্দটা। বহু পুরান কাল মানে, ধরেন যীশুর জন্মের আগে থেকেই সে আমলেরও আগে থেকেই একটা না একটা ‘শাসন ব্যবস্থা’ [রুল বা রুলার] আমরা দেখতে পাব। কিন্তু “পাবলিকের শাসন ব্যবস্থা” সেই প্রথম সমাজ দেখেছিল তখন। তাই এটাকে রিপাবলিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা নামে আলাদা বৈশিষ্টে ডাকা হয়।

    তাহলে কোন একটা শাসন ব্যবস্থা সেটা একটা রিপাবলিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা বলে নিশ্চিত বুঝবার উপায় কী?
    কেউ রিপাবলিক কিনা তা বুঝবার সহজ উপায় হল একে রাজতান্ত্রিক বা মনার্কি ব্যবস্থার সাথে তুলনা করে বুঝতে হবে। তবেই ভাল ভাবে বুঝা যাবে।
    একটা রাজতন্ত্রে থাকে রাজা আর প্রজা (বা বাসিন্দা)। লক্ষণীয় যে যেকোন রাজার প্রজা মানে কিন্তু “পাবলিক” নয়। এর চেয়েও বড় কথা কোন প্রজাই স্বাধীন ব্যক্তি নয়। কারণ, প্রজা মানেই তো সাবঅর্ডিনেট [sub-ordinate] বা অধীনস্ত;  অথবা টেনেন্ট [tenant] বা যে শাসককে খাজনা দেওয়ার বিনিময়ে চাষাবাদের রাইট পায়; তাই সে রাজার অধস্তন। এছাড়া আরেক মূলকথা হল, রাজার সমান বা মতনই আরেক ব্যক্তি তো কোনভাবেই সে নয়ই।  বরং  রাজা-সম্রাট এরা হল শাসক আর, প্রজা হল রাজার অধস্তন ও শাসিত। অধীনস্ত কেউ মানেই সে স্বাধীন  ব্যক্তি নয়, স্বাধীন অস্তিত্ব তার নাই;  freedom, free – ধারণাগুলো তার জন্য নয়। বরং রাজার ইচ্ছাই প্রজার ইচ্ছা।
    বিপরীতে রিপাবলিকেও শাসক-শাসিত থাকলেও  – মৌলিক ফারাক হল, শাসনের ক্ষমতায়। শাসককে শাসন করার ক্ষমতা কে দিয়েছে? এই হল ফান্ডামেন্টাল প্রশ্ন। যেটা উপরে কিছুটা বলেছি।
    এই প্রশ্নের জবাবে রাজা মাত্রই নিরুত্তর থাকবে। জবাব দিতে পারবে না। আর নয়ত শেষে হয়ত বলে ফেলবে যে, গায়ের জোরে তিনি নিজেই  বা তাঁর পুর্বপুরুষ একসময় ক্ষমতা নিয়েছিল আর এরপর থেকে এটা ডায়নেস্টি [dynasty] মানে,  রাজার সন্তান বলে সেই রাজার মৃত্যুর পরের রাজা। অথবা আরেকটু বুদ্ধিমান কোন রাজা হলে সে দাবি করবে গড বা ভগবান তাকে ক্ষমতা দিয়েছেন – এই অর্থে তা গড় গিফটেড। আর এই মিথ্যার স্বপক্ষে স্বাক্ষ্য দিতে সে কোন পুরোহিত বা পাদ্রী ধরণের কাউকে হাজির করবে।
    সারকথায় যে শাসক নিজ ক্ষমতার উৎস কী, কে দিয়েছে এর সদুত্তর, ব্যাখ্যা করতে পারে না সেই রাজা-সম্রাট।

    আর এর বিপরীতে রিপাবলিকে ক্ষেত্রে এমন রাষ্ট্র মাত্রই সে বলতে পারবে আমার ক্ষমতার উৎস আমার ভুখন্ডের বাসিন্দা জনগণ বা পাবলিক। তারা আমাকে তাদের জনপ্রতিনিধি মেনেছে, নির্বাচিত করেছে; কিছু সুনির্দিষ্ট কথার উপর ভিত্তি করে ম্যান্ডেট দিয়েছে।    তারা নির্দিষ্ট সময় অন্তর (যেমন পাঁচ বছর) যাকে সম্মতি দিয়ে মানে ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করে আমিই সেই জনগণের শাসক এবং আমি তাদের সেই ম্যান্ডেট প্রাপ্ত প্রতিনিধি হিশাবে ক্ষমতার প্রধান নির্বাহী; তা প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী। অতএব আমার ক্ষমতার উৎস জনগণ। কথাগুলো আইডিয়ালি [ideally]  মানে কী হওয়া উচিত সেই অর্থে বললাম।
    আর বাস্তবের শাসক আমরা হয়ত কোথাও হাসিনা সরকারকে দেখব; সে অন্যকথা। কিন্তু অবু একটা মজার কথা হল হাসিনা অনেক চোখ উল্টানো মিছা কথা বললেও তিনি কখনও এটা বলেন  না যে তার বাবা তাঁকে শাসন ক্ষমতা দিয়ে গেছে – একটা ডায়নেস্টিক রাজতন্ত্রে যেমন হয়। অর্থাৎ এজায়গাটাই তিনি মেনে নিচ্ছেন যে শাসন ক্ষমতার উৎস জনগণ হওয়া উচিত বা হতে হবে। রাজার সন্তান রাজা এমন রাজতান্ত্রিক শাসন অন্তত তাঁর টা নয়। কিন্তু কেবল একটা জায়গায় তিনি  মিছা কথা বলতেছেন যে জনগণ তাকে জনপ্রতিনিধি বানায়েছে, তাঁর দলকে ভোট দিয়েছে – সে “রাতের ভোট” করে নাই ইত্যাদি; এগুলোই তিনি চোখ উলটানো মিছাকথা বলতেছেন।

    তাই এখানে জনপ্রতিনিধি বা নির্বাচিত পাবলিক রিপ্রেজেন্টেটিভ খুবই গুরুত্বপুর্ণ ধারণা। আর এখানে আরেকটা সাবধানতা দরকার আছে। অনেকের মনে হতে পারে, জনপ্রতিনিধি বলতে সমাজের এলিটদের থেকে এলিটদের দ্বারা বেছে নেওয়া ব্যক্তিকে এমন জনপ্রতিনিধি বলে চালিয়ে দিলেই তো হয়; বিশেষ করে কোন ‘জ্ঞানী’ কিন্তু অনির্বাচিত ব্যক্তিকে!  সরি এটা অগ্রহণযোগ্য। এটা মারাত্মক ভুল। যেমন ব্যবহারিকভাবে কল্পনা করা যাক, ধরেন এটা হল কেবল ঢাকার তাও আবার গুলশান-বারিধারার এলিট লোকেরা, তারা তাদের মধ্য থেকে এমন যাকে ভোট না, হুদাই বেছে নিবেন – প্রধানমন্ত্রী ঠিক করবেন তাহলেই তো হয় – এমনই এক ধারণা। কিন্তু না , সরি। এটা ভুল। এটা এলিটের বেছে নেয়া কেউ হলে হবে না।  কারণ,  এর সঙ্গে “পাবলিক” বা ‘রিপাবলিক’ ধারণার কোন সম্পর্ক নাই। পাবলিক আর একমুঠো এলিট কখনও এককথা নয়। এছাড়া, ওপেন অবাধ নির্বাচনে তাকে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হতে হবে।
    রিপাবলিকে পাবলিক এই ধারণা আর পাবলিকের ক্ষমতা তাই এই সেন্ট্রাল ধারণা।  সেটা একেবারেই আম-আদমিকে-সহ সকল নাগরিককে আমল করে আর সবচেয়ে মারজিনালাইজড ব্যক্তিকেও তিনি কী বলেন তা শুনতে হবে, শোনা নিশ্চিত করতেই হবে। এই পাবলিক বা জনগণ ধারণা – এখান থেকেই যেমন, জন-প্রশাসন [public admin] মন্ত্রণালয়, জনস্বাস্থ্য [public health], জন-পরিবহণ (পাবলিক ট্রান্সপোর্ট), জনস্বার্থ (পাবলিক ইন্টারেস্ট) ইত্যাদি ধারণাগুলো। যেমন “জনস্বার্থে” আদালতে রীট করা সম্ভব যেটাকে পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন (PIL) বলা হয়। জনস্বার্থ রক্ষার্থে কোন ব্যক্তির জমি অধীগ্রহণ বা একোয়ার [acquire] করে তাকে বাজার দরে দাম শোধ করে দিয়ে ঐ ভুমিতে যেকোন পাবলিক অবকাঠামো (রাস্তা, ব্রিজ, স্টেশন ইত্যাদি) যেকোন কিছু গড়ে তোলা সম্ভব। এটাই প্রতীকীভাবে সাধারণ ইচ্ছা বা কমন ইন্টারেস্ট।

    তাহলে এর সারকথাটা হল, রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণাটা বুঝতে গেলে তা কখনই বুঝা পুর্ণ হবে না যদি না তা এর আগের শাসন ব্যবস্থা-  মানে, আমরা কোন রাজতন্ত্রের শাসনের সাথে তুলনা করে একে না বুঝি। বিশেষ করে একালে্র প্রজন্ম যারা আমরা কোন রাজা-সম্রাটের শাসন দেখি নাই। আবার এমনও হতে পারে নাটক-সিনেমায় কোন কোন সম্রাটের শাসনের কিছু একটা দেখে তাঁর ভাল লেগে যায়। অর্থাৎ এরা কোন মনার্কি শাসন ব্যবস্থা দেখেই নাই। এমনকি এরপরের কলোনিদখল ওয়ালাদের শাসন সেটাও দেখে নাই। তা সত্বেও! কিন্তু  কেবল বড়জোর হয়ত ভোটে দেয়া দেখেছে। আবার রাজনীতি বলে কী জানি একটা আছে দেখেছে। আর ধরে নিয়েছে ওমন একটা সম্রাটের শাসন ফিরিয়ে আনলে সমস্যা কী???  তাদের জন্য কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র সম্পর্কে বুঝাবুঝি এবং পাবলিক  – এই ধারণাটাকে বুঝা  কেন গুরুত্বপুর্ণ তা উপলব্দি করা খুবই জরুরি এবং তা করতে হবে রিপাবলিক ধারণা বা স্বাধীন ব্যক্তি ও তার অধিকারের ধারণার আলোকে।  তবে  এমন তরুনেরা আবার ভেবেও দেখতে পারেনযে  একটা রাতের ভোটের সরকারই আপনার কাছে অসহ্য লাগছে, প্রতিবাদ করছেন! তাহলে একটা মনার্কি সহ্য করবেন কী করে???

    এবার ইতিহাসের সময়কালের দিক থেকে কথা বলি, দুনিয়াতে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে এর বিপরীতে রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণাটা এসেছিল। তবে এটা ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা। আর আমেরিকার অভিজ্ঞতাটা  আরেকটু আলাদা। কমন আমেরিকান তারাও  তাদের কলোনি শাসক যারা তাদের মত সাদা ককেশিয় হলেও মূলত বৃটিশ কলোনি মাস্টারদের বিরুদ্ধে তাদেরকে লড়তে হয়েছিল সশস্ত্রভাবে আর তাতেই ১৭৭৬ সালে বিজয়ী হয়ে তবেই তাঁরা তাদের স্বাধীন রিপাবলিক গড়েছিল। আর তাদের অভিজ্ঞতার বাইরে এশিয়ার আরেক কোনের আমরা, আমাদের মত দেশগুলো কলোনিদখলদার শাসকদের কাছ থেকেই প্রথম রিপাবলিক রাষ্ট্র সম্পর্কে জেনেছিল। তবে সেক্ষেত্রে এটাকে রিপাবলিক রাষ্ট্র এই নামের চেয়ে একে নেশন স্টেট বা এক জাতিরাষ্ট্রের ধারণা হিশাবে তাঁরা জেনেছিল। তবে এটাকেই অনেকে আধুনিক রাষ্ট্র বলেও চিনে থাকে।
    এখন থেকে আমি বেশি বিস্তারে না গিয়ে সংক্ষেপে মূলকথাগুলো বলে এলেখা শেষ করতে চাইব। লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে তাই; তবে পরে লেখা আরো বিস্তার করব কেমন সাড়া পাওয়া যায় সেই সাপেক্ষে!

    ইউরোপে প্রথম রিপাবলিক প্রতিষ্ঠাঃ
    সময়কাল হিশাবে বললে ইংল্যান্ডের ক্রমওয়েলের বিপ্লব [Cromwellian revolution] যেটাকে ইংলিশ সিভিল ওয়ার (১৬৪২-৫১) বলা হয়; তা সংগঠিত হয়েছিল রাজাকে উতখাত করে একটা রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিশাবে। যদিও ক্ষমতাদখল সম্পন্ন হলেও একটা থিতু ব্যবস্থা হয়ে তা টিকতে পারে নাই; ফেল করেছিল।  সাধারণভাবে সারা ইউরোপের রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার সবগুলো প্রথম প্রচেষ্টার মত এটাও ফেল করেছিল। মানে রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা করেই টিকাতে বা থিতু হতে পারে নাই। রাজতন্ত্র আবার ফিরে এসেছিল। ফরাসী দেশে এসেছিল ১৭৮৯ সালের বিপ্লবের পরে। আর আগেই বলেছি আমেরিকার ক্ষেত্রে সেটা ১৭৭৬ সালে। যদিও ইউরোপ জুড়ে, রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার চিন্তা তা দানা বাধা, পোক্ত হওয়ার সামাজিক তর্কাতর্কি মোটাদাগে সেটা ১৬০০ সালের পর থেকেই শুরু হয়েছিল। আর একটা নোক্তা দিয়ে রাখি (বিস্তারে যাব না এখন) যেটাকে আমরা কলোনিদখল বলে চিনি মানে যেটা আসলে সেকালের মত কোম্পানি বানিয়ে জাহাজ ( যুদ্ধজাহাজ ও দেশ দখলের উপযোগী) কিনে এরপর  কলোনিদখল ব্যবসায় নেমে যাওয়া – সেটাও শুরু হবারও কাল। প্রথম এমন দখল অভিযান ছিল ১৬০৭ সালে, আজকের আমেরিকার ভার্জিনিয়া রাজ্যের জেমসটাউন [Jamestown, Virginia]। কিন্তু কেন  রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার আলাপের মধ্যে এসব কথা কেন তুললাম?

    কারণ, রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা নিশ্চয় খুবই ভাল কাজ একটা, অন্তত রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধ বিবেচনায়। কিন্তু ওর সবচেয়ে কালো দিকটা হল নিজে রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াই করছে ঠিকই কিন্তু বিপরীতে আমাদের মত দেশগুলোকে একই সাথে জাহাজ কোম্পানি খুলে কলোনিদখল শুরু করেছে। এটাই ছিল সেকালের ইংল্যান্ডের প্রধান ও সবচেয়ে প্রফিটেবল ব্যবসা। কথাটা আরো সোজা করে বললে, ইউরোপের এমন আসন্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল কলোনিদখল ব্যবসা – একথাটাও আমাদের মনে রাখতে হবে। তবু এভাবেই পশ্চিমাদেশে প্রথম রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল। পরে অখন্ড ভারত কলোনিদখল হয়ে গেলে রাজা রামমোহন রায় এর গুরুত্ব প্রথম আমল করেছিলেন বলে মনে করা হয়।

    কিন্তু পরাজয়ের একটা কালো দাগঃ
    রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা কথাটা যত মহান কিছু মনে হয় এর প্রথম রূপটা তেমন মহান থাকে নাই। মানে হিন্দু দেবতা শিব গড়তে গিয়ে কারিগর বানর বানিয়ে ফেলা যেন!  রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা ধারণার ব্যবহারিক রূপ হয়ে গেছিল  – আমরা একটা জাতি এমন একটা নেশন স্টেট বা জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার কাজ যেন তা। অথচ আমরা কেউ কোন এথনিক জাতি কিনা সেটা তো রিপাবলিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিল না। কেন এমন হয়েছিল সেসব বিস্তারে এখন যাব না; তা আরেকটা পরের ভার্সানে বা বিস্তারিত লিখব। এই পরিণতির সারকথাটা হল রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা মানে হয়ে যায় জাতিরাষ্ট্র। মানে বাঘ হয়ে যায় বিড়াল!! তবে আমার এই কথার স্বপক্ষে এখন কেবল একটা ক্লু বা কিছু চিহ্ন দিয়ে যাব। প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক এর নাম অনেকেই শুনেছেন; যাকে শিক্ষকদের শিক্ষক বলেন অনেকে।  যত প্রগতিবাদী কুতুব আছেন – রেহমান সোবহান , আনিসুজ্জামান থেকে  যারা ১৯৮০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকেন্ড ইয়ারে ছিলেন এই অর্থে যারা কমবয়েসী কিন্তু একালে বুদ্ধিবৃত্তিক কথা বলেন এমন সকলেই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে যার প্রভাবে গড়ে উঠেছেন। আর আহমদ ছফা যাকে নিয়ে যদ্যাপি আমার গুরু রচনা করেছেন। তবে আমার নিজের কানে শোনা আশির দশকে প্রগতিশীল জগত তাঁকে একজন মুসলিম লীগার বলে তুচ্ছ করতেন।  সেই প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক সবসময় নেশন স্টেট বলতেন, তার রচনা পড়ে দেখতে পারেন। যা অবশ্যই ঠিক কোন রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা তো নয়ই!
    আসলে আমার কথা সেদিকেও নয় তাই সেদিকে আর এখন যাব না। আমি আসলে নজরে আনতে চাচ্ছি যে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক এর সেটা জাতিরাষ্ট্র ধারণা মানে,  সেটা কোন জাতীয়তাবাদ বা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র ধারণা কিন্তু নয় কিন্তু তা আমাদের মনে রাখতে হবে। কেন?

    জাতিরাষ্ট্র আর জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র এদুইয়ের ফারাক কীঃ
     অনেকেরই ধারণা জাতিরাষ্ট্র আর জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র  হয়ত একই কথা। চাইকি অনেকে মনে করতে পারেন  – জাতীয়তাবাদ শব্দ এটা তো অগ্রসর মানে প্রগেসিভ ধারণা!!! তাই এটা আরো ভাল!! কিন্তু  কারা এরা?
    বলাই বাহুল্য এই প্রগেসিভ [Progressive] এরাই মূলত প্রগতিশীল! যাদেরকে আরেকভাবে কমিউনিস্টদের লিবারেল ভার্সান বা আগমনি গান গাওয়া ছোটভাই মনে করা যেতে পারে।  তবে জাতিরাষ্ট্র ধারণাটা কেন বদলে গিয়ে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র হলে গেছিল সে বিস্তারে এখন যাব না। কেবল বলব এটা প্রগতিবাদী চিন্তার দৌরাত্ম বা দুর্দশা! পাঠক নিজেও খুঁজে দেখতে পারেন।

    তবে কথা এখন অন্যদিক থেকে শুরু করব। উপরে বলেছি কবে ইউরোপের সকল রাষ্ট্র রিপাবলিক রাষ্ট্র হতে চেয়ে বাস্তবে তা জাতিরাষ্ট্র হয়ে গেছিল? আর এভাবে জাতিরাষ্ট্র -কেই যেন রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা একই বলে মনে করা শুরু করেছিল? কিন্তু এরও তো একটা শেষ আছে। অর্থাৎ কখন সারা পশ্চিম ইউরোপ জাতিরাষ্ট্র গড়া শেষ বা একাজকে ফুলস্টপ বলে দিয়েছিল??  এর জবাবঃ  সেটা কে বলা যায় ১৯৪৫ সালের পরে। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, ১৯৫০ সালে ইউরোপের ৪৭টা রাষ্ট্রের এক সম্মেলন ডেকেছিল। সেটার নাম কাউন্সিল অফ ইউরোপ [Council of Europe – CoE].। আগ্রহীরা বিশেষ করে আইনের ছাত্রেরা এটা নিয়ে ঘাটাঘাটিতে গভীরে যেতে পারেন!  তবে সাবধান এর সাথে ইইউ [EU] বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোন সম্পর্ক নাই, একই নয়। সেই সম্মেলন থেকেই ৪৭টা ইউরোপীয় রাষ্ট্র নিজেদের জাতিরাষ্ট্র এই জাতি-ভিত্তি থেকে সরে গিয়ে নিজ নিজ রাষ্ট্রকে নয়া এক অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র করে গড়ে নিয়েছিল। আর তা কার্যকর হয়েছিল ১৯৫৩ সাল থেকে। কিন্তু তামাশার কথা হল যখন ইউরোপ অতিষ্ঠ হয়ে ওদের জাতিরাষ্ট্র ধারণাকে ছুড়ে ফেলে দিল আর সেসময়েই তাদের সেই ছুড়ে ফেলে দেয়া  ধারণাকেই আমরা কুড়িয়ে নিয়েছিলাম। অথচ আমরা কলোনি-মুক্ত হয়ে নিজেদেরকেই সেই জাতিরাষ্ট্র  হিশাবে গড়তে গর্তে ঢুকে গেছিলাম – যে গাড্ডার মধ্যে আমরা এখনও আছি। কোন ধর্মীয় জাতিরাষ্ট্র শ্রেষ্ঠ নাকি উগ্র হিন্দুত্ববাদ-ই আনপ্যারালাল সবার উপরে এর তান্ডবকালে আছি আমরা

    প্রগতিশীলতা কোনভাবেই আধুনিকতা নয়ঃ 
    কেন আধুনিকতার মধ্যে প্রগতিশীলতার কোন স্থান নাই, সম্পর্কিত চিন্তাই নয় – এনিয়ে কালকে আরেকুটা লেখা আলাদা করে দিবে। তাই এখানে সেদিকে যাচ্ছি না। কেবল সিদ্ধান্তটা ব্যবহার করব।
    তাই স্পষ্ট করে বললে, প্রগতিবাদিরা ঠিক রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার আগ্রহ নয়।  এদের কী করে চেনা যাবে?  একেবারেই সোজা। যারা রাষ্ট্র কী বা রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা কী তা বুঝতে বা বুঝাতে একেবারেই আগ্রহী নয় – এরাই প্রগতিশীল।   এরা সম্পর্কটাও ধরতে পারে মনে হয় না। সবচেয়ে বড় কথা এদের আরেক প্রিয় কিন্তু অর্থহীন শব্দ ও ধারণা আছে সেকুলার। তামাসাটা হল, এটা রিপাবলিক  এই মুখ্য লক্ষ্যের ধারণাই বুঝল না, নিজে এর আমল-যোগ্য হল না । অথচ অবুঝ-নাবুঝ সেকুলার আর  জাতিয়তাবাদ শব্দের জপ শুরু করে দিল।
    কেন এমন হয়ে গেল তারা? কারণ এরা মূলত প্রথমে ছিল হিন্দু জাতিবাদের সমর্থক যারা সত্তর দশকে এসে নিজের হিন্দুত্ব আড়াল করতে সেকুলার আর জাতিয়তাবাদ নিয়ে এসেছিল। এরা ক্লাসিক সেকুলারিজমের (১৬৪৮) কেউ নয়, এরা উপরে পালক লাগানো সেকুলার। এদেরকে চিনবার সবচেয়ে সহজ উপায় হল, এরা মনে করে কনষ্টিটিউশনে সেকুলার শব্দটা লিখে সেকুলার হতে হয়। যেটা কার্যত মুসলমান বিদ্বেষ। কথ্য ভাষায় বললে মুসলমান কোপানোর স্পৃহা! আর পরে এদেরই আড়াল ভাঙ্গা রূপ্টাই হচ্ছে মোদির বিজেপি – উগ্র হিন্দুত্ববাদ। বাংলাদেশে এটাই প্রগতিশীলতা! যা ইউরোপের প্রগতিশীলতা থেকে অল্প ফারাকের হয়ত!

    কথা আরো আছেঃ

    কমিউনিস্ট চিন্তা বা তাদের ভোকাবুলারিতে
    অধিকার [right] বলে কোন ধারণা নাই।

    যারা এখন ভোটাধিকার বা বাক-স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলছেন এদের অনেকেই নিজেকে পরিচয় করাচ্ছেন যে ” আমি প্রগতিশীল লেখক” এই বলে!  আগে বলেছি প্রগতিশীলতা কমিউনিস্টদের সাথে সম্পর্কিত ছোট বা ভাইরাভাই!
    তামাসার কথা হল এরা একালে অধিকার নিয়েও কথা বলছে।  যেমন “মতপ্রকাশের অধিকার” বা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা” এসবের কথা বলছেন। কিন্তু একেবারে পরিস্কার করে দেই, কমিউনিস্ট চিন্তা বা তাদের ভোকাবুলারিতে অধিকার [right] বলে কোন ধারণা নাই। “স্বাধীনতা” [freedom] বলে ধারণাও নাই।  এসব শব্দ ও ধারণা রিপাবলিক ধারণার অনুষঙ্গি ধারনা। সমাজে ব্যক্তিবোধ এর উত্থানের পরে এ’থেকেই অধিকার, স্বাধীনতা ইত্যাদি ধারণা উঠে এসেছে। তবে পাঁড় কমিউনিস্ট বা রিয়েল প্রগতিশীল যারা এরা বুঝেন ব্যক্তিবোধ এর উত্থান –  এটাও তাদের শব্দ-ধারণা নয়।  আসলে কমিউনিস্ট বা প্রগতিশীল রাষ্ট্র ধারণা হল রাষ্ট্র মানে  শ্রেণীর রাষ্ট্র। আর তারা কেবল শ্রমিক শ্রেণীর এক একনায়ক রাষ্ট্র গড়ার সৈনিক। যার সোজা মানে তাদের চোখের বাকি সব শ্রেণী (যাদেরকে বুর্জোয়া খেতাব দিয়ে) তারা এদেরকে গুম, খুন, উঠায় নিয়ে যাওয়া, গায়েব অপহরণ, এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং সবকিছু করাই জায়েজ। [চীনে এখনও পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিরক্ষামন্ত্রীরও  ভাগ্যে এমনটা একালেও হচ্ছে আর হওয়াটা এই চিন্তারই পরিণতি।]
    এজন্য অনেক বুদ্ধিমান কমিউনিস্ট নিরন্তর এক বিরাট দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগেন এই বলে যে, একজন কমিউনিস্ট হিশাবে তিনি ১৯৭১ সালের এপ্রিলের রাষ্ট্রঘোষণায় থাকা তিন নীতি – সাম্য, ইনসাফ আর মানবিক মর্যাদা –  এটা সমর্থন করবেন কী করে? শ্রেণীর রাষ্ট্রবোধের কোন কমিউনিস্ট তো একাজ করতে পারে না।  শেষে এরা নিজের বিরুদ্ধে নিজেই চাতুরি করে তিন নীতিও ফেরি  হয়ে হাজির হয়ে থাকেন। অথচ এদের মন পড়ে থাকে তিন নীতির বিরোধিতায়!!

    আসলে মূল কথাটা হল গ্লোবাল পরিসরে ১৯৪৫ সালের পরে (আমাদের এদিকে) ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন ও দুই রাষ্ট্র হয়ে যাবার পর থেকে আগের  রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার ধারণাটাকে প্রথম জবেহ করেছিল কমিউনিস্টেরা, তাদের শ্রেণীর রাষ্ট্র-বোধ দিয়ে। এখানে একটা কথা মনে করিয়ে দেই তাহলে সবকিছু পরিস্কার হয়ে যাবে। খেয়াল করবেন ১৯৪৭ সালের পর থেকে কমিউনিস্ট জোয়ার উঠেছিল – বিশেষ করে ১৯৫৩ সাল থেকে –  যারাই  অধিকার, স্বাধীনতা, ভোট বাক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা তখনও বলত কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল চোখে এদের সকলকে তারা বলত ডানপন্থী বা রাইটিস্ট।  মানে তারা হল তারা নিজেদের বামপন্থি মনে করে তাই এই সাপেক্ষে এরা ডানপন্থী। তাই রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা বা স্বাধীনতা, অধিকারের কথা যারা বলে এরাই ডানপন্থি। আর বলাই বাহুল্য  বামপন্থী চোখে এরা নিচা চিন্তার মানুষ।  অতএব ডানপন্থিরা হল প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল।  এমনকি একালে বিডিনিউজ২৪, এরা “অধিকার” এই মানবাধিকার সংগঠনের আদিলুর রহমানের নাম লিখার আগে বিশেষণ যোগ করে তারা লিখেছে ডানপন্থি  আদিলুর রহমান শুভ্র। কারণ সম্ভবত মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলা লোক তো প্রগতিশীলদের চোখে ডানপন্থী-ই!!!

    তাহলে এই লেখার সারকথাটা কী? সারকথাটা হল – যারা ‘ভোটাধিকার”, “মতপ্রকাশের অধিকার” বা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা”, অধিকার বা স্বাধীনতা শব্দ ব্যবহার করতে চান তারা অবশ্যই তা করেন যত বেশি পারেন, অবশ্যই বক্তৃতা করেন। সেটা কড়ারই সময় এটা। কিন্তু যদি এটাই আপনার এখনকার রাজনীতিক অবস্থা হয়ে থাকেন তবে আর আপনি আর প্রগতিশীল নন। থাকেন না। একথাটা ভাল করে বুঝে নেন। আর যদি প্রগতিশীল থাকতেই চান,  ইউ আর ওপেন – তবে সেক্ষেত্রে আর  ভোটাধিকার”, “মতপ্রকাশের অধিকার” বা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা”, অধিকার বা স্বাধীনতা ইত্যাদি শব্দগুলো ব্যবহার বন্ধ করেন।

    আসলে একটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা যদি বুঝে থাকেন তবে প্রগতিশীলতার হাত ছাড়তে হবে আপনাকে। কারণ, প্রগতিশীলতার সাথে সামঞ্জস্য ধারণা হল শ্রেণীর রাষ্ট্র । আর সেটা কেমন তা তো আপনারা বানিয়েই দেখিয়েছেন। গত পনেরো বছরে বাংলাদেশ যে গুম-খুন অপহরণের রাষ্ট্র হয়ে হাজির হয়েছে সেটাই তো প্রগতিশীল রাজনীতির সমর্থনে গড়ে উঠা  শ্রেণীর রাষ্ট্র – এক মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীর রাষ্ট্র – চেতনার রাষ্ট্র!  বাংলাদেশের বাকি অ-মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণীকে গুম, খন, অপহরণ এর জন্য পারফেক্ট এক রাষ্ট্র – হয়ে আছে সেই থেকে। আর এটাই কী প্রগতিশীলতার সমর্থনে হাসিনার বর্তমান রাষ্ট্র-টা নয়?
    এজন্যই কী ২০১৪ বা ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে আমরা কোন  “ভোটাধিকার”, “মতপ্রকাশের অধিকার” বা “মতপ্রকাশের স্বাধীনতা”, অধিকার বা স্বাধীনতা ইত্যাদি নিয়ে সমাবেশ বক্তৃতা দেখি নাই…??????

    শেষ কথাঃ
    আমাদের কোন জাতিবাদ নয়, অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র এর পক্ষে দাড়াতে হবে। এটাই হবে আমরা সবাই নাগরিক এই একমাত্র পরিচয় – যেখানে আপনি আর কোন জাতিবাদের সমর্থক নন; অথবা কোন পাহাড়ি জুম্মু জাতিবাদ কিনা তাও  আর নন। সব ফেলে এই ভুখন্ডের সকলেই এক পরিচয় তারা সকলেই নাগরিক। শুধু তাই না। এর চেয়েও বড় কথা  নাগরিক অধিকার এর দিক থেকে সকলের তারা সমান। কেউ সংখ্যাগরিষ্ট বলে সে একটু বেশি অধিকারের বা সামাজিক বা কালচারাল আধিপত্য যাতে সে ফেলো নাগরিক এর উপর করতে পারবেন না – এমন বৈষম্যহীন ফলে সমান অধিকারের রাষ্ট্র হতে হবে সেটাকে। সেকুলার বলে কোন ধান্দাবাজিতে হিন্দুত্ববাদ বা এর আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করা এখানে নিষেধ। এই সুযোগে ভারতের দালালিও নিষেধ।  রাষ্ট্র প্রসঙ্গে  ইত্যাদি এসব খুটিনাটি দিক নিয়ে আমাদের বিস্তর চিন্তা করতে হবে।

    এটা গণতন্ত্র শব্দটাও নয়। এটা অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েমের কাজ।  প্রশ্ন করতে পারেন করে দেখেন, ১৭৭৬ সাথে আমেরিকায় রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার (এক ফেডারল রিপাবলিক আমেরিকা রাষ্ট্র সেটা) পরে আরো পনেরো বছর পার হয়ে গেছিল। এরপরে আমেরিকান কনষ্টিটিউশনে ফাস্ট এমেন্ডমেন্ট  এর মাধ্যমে কেন অধিকারের প্রসঙ্গগুলো আনা হলো? সেসব নিয়ে চিন্তা করে দেখেন।  আগেই কেন ছিল না? কার্যত সেই থেকে রিপাবলিক মানে যে তথাকথিত গণতন্ত্র নয় তা অন্তত পরিস্কার হয়ে গেছিল। কাজের রিপাবলিক ধারণাতে মনোযোগ দেন, গণতন্ত্র এই বিদ্ঘুটে ধারণাটা্র সাথে একে মাখায় ফেলবেন না, প্লিজ!

    এমন রাষ্ট্র যেখানে নাগরিক অধিকার বা মানবাধিকারের প্রশ্নে নাগরিকেরা সকলে সমান। এটাই হল আমরা যে যে ধরণের রাজনীতিই  অনুসরণ-চর্চা করিনা কেন সকলে এই রাষ্ট্রে সমান অধিকারের এবং আমরা প্রত্যেকের কাজেই  তাঁর যে অপর তারও আমার সমান অধিকার স্বীকার করে নেওয়া ও  প্রতিশ্রুতিবদ্ধতায় আসলে  সকলে আমরা সকলের কাছে আবদ্হধ থাকব এমন হতে হবে। এটাই আমাদের আমাদের কমন পয়েন্ট, তাতে আমাদের রাজনীতি ভিন্ন হলেও! অর্থাৎ মুসলমানদের মানবাধিকার নাই, মুসলমানে তো জঙ্গি – এসব ইতরোচিত ভাষ্যকে আমাদের পিছনে ফেলে সামনে আগাতে হবে!!! কারণ, জঙ্গি মানে অপরাধী কেউ হতেই পারে। এর জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় অনুসরণে যা হবে তা হতেই পারে। কিন্তু তা বলে রাষ্ট্র বা আদালতের চোখে তার মানবাধিকার নাই এটা মিথ্যা। আর এটাই মুসলমানবিদ্বেষ! এখান থেকে বের হতে হবে আমাদেরকে! আমাদের কমন পয়েন্ট আমরা সকলেই নাগরিক, সকলেই সমান অধিকারের নাগরিক!  আমরা অপরের সমান অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে এক রাষ্ট্রগঠন করতে সক্ষম হলে অনেক মেজর সমস্যা থেকে সবপক্ষই মুক্তি পাব!!!

    আপডেটঃ  ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩; রাত ০৮ঃ ২৮
    সর্বশেষ আপডেটঃ  ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩; ভোর ০৬ঃ ৩৮

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • মোদি এখন যুদ্ধ না ডায়লগের ভক্ত ফেরিওয়ালা

    মোদি এখন যুদ্ধ না ডায়লগের ভক্ত ফেরিওয়ালা;
    আবার জি২০-ও তাই যদিও ভিন্ন কারণে

    গৌতম দাস
    ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩   সন্ধ্যা ০৬ঃ ৫৫
    https://wp.me/p1sCvy-4Yr

     

                         G20 summit ends with India, Brazil and Russia boasting success

     

    মোদি এখন আর বিতর্কিত ভুখন্ড নিয়ে, উগ্র হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্ববাদী জোশে ‘লড়কে লেঙ্গে’ বলে জবর দখলকারি হতে চান না। তাই তিনি এখন আর যুদ্ধ না। যেন,  ডায়লগে বিশ্বাসী। আপোষ আলোচনার ডিপ্লোমেসিতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিতর্ক-বিবাদ সমাধানের পক্ষের এক গভীর বিশ্বাসী লোক হতে চান তিনি! এমনকি এব্যাপারে আন্তর্জাতিক রুল ও আইনের সহায়তাতেও এবং এসবের অধীনে যেতেও ইচ্ছুক!

    তাহলে মোদিকে একটু মনে করিয়ে দেয়া যাক, গত ২০১৯ সালে মানে মোদি ভারতে দ্বিতীয় সরকার গঠনের পরের প্রথম সংসদে ৫ আগষ্ট, মোদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেছিলেন যে সারা কাশ্মীরই ভারতের, তা বলেছিলেন কেন? ৩৭০ ধারা বাতিল বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন কেন? যেখানে কাশ্মীরের রাজা কাশ্মীর ভারতের সাথে যুক্ত বলে যে দাবি তা অবৈধ, অগ্রহনযোগ্য বলে বাতিল  করে জাতিসংঘ রেকমন্ড করেছিল – কোন রাজা কী বলেন সেটা না, কাশ্মীরের বাসিন্দাদের সম্মতিই একমাত্র নির্ধারক মানে এক রেফারেন্ডাম বা গণভোট করে নিতে হবে; আর এটাই হবে ব্যাপারটা ফয়সালার ভিত্তি।  কিন্তু নেহেরু তা অমান্য করে সেই জাতিসংঘ সিদ্ধান্ত-প্রস্তাব ফেলে রেখে দিয়েছিলেন। আর এই অবৈধ কাজ করে আবার সম্ভবত মনের অস্বস্তি মিটাতে সান্ত্বণা হিশাবে  নেহেরু ভারতের কনষ্টিটিউশনে আর্টিকেল ৩৭০ ধারা এনেছিলেন। যার সারকথা হল, কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদার রাজ্য করা কিন্তু সেটা আবার ভারতেরই যেন থাকে – এই ইচ্ছামত সংযোজনী আনা। যেটা বিবদমান কোন পক্ষের কেউ চায় নাই।  এমনকি ভারতের সুপ্রীম কোর্টের রায় হল, ৩৭০ ধারা বাতিল করা যাবে না।  অথচ এসবই অমান্য করে  মোদি-অমিত জোর করে সেই ৩৭০ ধারা বাতিল করেছেন; এবার দাবি করছেন পুরা কাশ্মীর ভুখন্ডই ভারতের। এই হল ২০১৯ সালের মোদি-শাহের সংযোজন। যদিও আবার এখানে কেন কাশ্মীর ভারতের হবে এনিয়ে কোন কারণ-যুক্তি বা দলিল কোন কিছুরই উল্লেখ করেন নাই!!  যা অনেকটা –  আমি বলেছি তাই ওটা আমার ধরণের গোয়ার্তুমি!!! অথচ সেই মোদি এখন ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসি এর অনুসারী হতে চাইছেন??? সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদি এক আন্তর্জাতিক সভার বন্তৃতায় এসব নয়া খায়েস নয়া ভান-ভনিতার কথা বলেছেন!!!

    তাহলে এই যে কাশ্মীর ১৯৪৭ সাল থেকেই এক বিতর্কিত ভুখন্ডই থেকে যাওয়া, আর একে ২০১৯ সালের ৫ আগষ্ট থেকে মোদি-শাহ এর জবরদস্তিতে পুরা কাশ্মীরই ভারতের অংশ-ভুখন্ড বলে দাবি করা এটা কোন বা কার সাথে ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসি করার পরে অথবা কোন “আন্তর্জাতিক আইনের শাসন” অথবা কোন “জাতিসংঘের প্রস্তাব” বলে  বিতর্ক মিটানো হয়েছিল????

    “Speaking at the East Asia Summit in the Indonesian capital Jakarta, Modi reiterated that “today’s era is not of war” and “dialogue and diplomacy” form “the only path to resolution” – a theme he has advocated for an end to the war in Ukraine ever since its invasion by Russia in February 2022.” – Indian Express September 8, 2023 

    উপরের এই উধৃতিটা নিয়েছি ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় এক সম্মেলনে ভারতের মোদির বক্তৃতা নিয়ে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার রিপোর্ট থেকে। দুদিন আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩ সেখানে “ইস্ট এশিয়া সামিট” এর সম্মেলন ২০২৩’ [18th East Asia Summit (EAS)] এর ১৮তম অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।  “ইস্ট এশিয়া সামিট” বলতে বুঝতে হবে মূলত আশিয়ান দশ রাষ্ট্র আর এরপরেও আরো প্রায় আট রাষ্ট্রের এই সম্মেলন। সেই আট রাষ্ট্র হল – চীন, রাশিয়া, আমেরিকা – ভারত, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান।  এই সামিটে গিয়ে মোদি যে বক্তব্য রেখেছেন – সেটাতে চীনকে উদ্দেশ্য করে কিন্তু নাম না নিয়ে দেয়া মোদির এই স্ববিরোধী বক্তব্য। এখন ভিজা বিড়াল সাজা প্রধানমন্ত্রী মোদি বলতে চেয়েছেন – যে সে হল দুনিয়ায় আইনের শাসন দেখতে চাওয়া প্রধানমন্ত্রী’ আর চীন হল যে আইনের শাসন মানে না এমন রাষ্ট্র। আর যে বিতর্কিত ভুমি যা ভারতের চোখে অরুনাচল আর চীনের চেখে তা ঝাঙনান ‘Zangnan’ সেই বিতর্কিত ভুমি নিয়ে  চীনকে খোঁচা মারতেই মাদি এমন [ সরাসরি না এমন ফ্রি কিক] বক্তৃতা মেরেছেন।

    আর এভাবে ভাব ধরেছেন যেন সন্ন্যাসী ভারতের এটা খুবই পবিত্র এক সাধু অবস্থান যে কারো ভুমির দিকে তাকায় না পর্যন্ত এমনই যোগী এই মোদি!!! অতএব এটাই ইউক্রেন ইস্যুতেও মোদির অবস্থান যেন তিনি পুতিন-জেলেনেস্কিকে বলছেন – ভায়েরা আমার তোমরা ডায়লগের মাধ্যমে সব মিটসাট করে নেও”।  তবে ভুলে যাওয়া যাবে না যে এই বক্তব্য হল মোদির সাইনবোর্ড – যা লটকানো থাকে কেবল দেখানোর জন্য। আর কার্যত মোদি বলতে চেয়েছেন,  ভাই পুতিন তুমি আমাকে ৬০ ডলারেরও নিচে [বাজারের গড় দাম যেখানে ৮০ ডলার বা উপরে] সস্তায় তেল পাঠাতেই থাকো যাতে আমার আটটা রিফাইনারিতেই দিন রাত আমি তেল শোধনাগার চালিয়ে সেই তেল রফতানির পবিত্র সুবিধা খেয়ে যেতে পারি! ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসির খেদমতগার আমি মোদি তো – আছিই তোমাদের সাথে!!!

    সারকথায়, মোদির হিন্দুত্ববাদের ভারত যদি মনে করে সারা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড আর এব্যাপারটা হল ভারত রাষ্ট্র কী মনে করে একান্ত তার ব্যাপার – তাই এনিয়ে অন্যের কিছুই বলার নাই। েখন একই ফর্মুলা মেনে, চীন যদি বলে ঝাঙনান ‘Zangnan’ চীনা রাষ্ট্রের ভুখন্ড – তাহলে তো আর এখানে মোদির এটা “যুদ্ধের যুগ নয়” অথবা এটা “আন্তর্জাতিক আইনের শাসন যুগ” অথবা  এটা “ডায়লগ বা ডিপ্লোমেসিতে সমাধান” অথবা কোন “জাতিসংঘের প্রস্তাব” বলার আর তো কোন সুযোগ নাই; খোদ মোদিরও না।  মানে মোদি নিজেই নিজের অবস্থানকে ব্লক করছেন – অবস্থা! মোদির সব কথাই তাই অর্থহীন প্রলাপ মাত্র হয়ে গেছে!

    ওদিকে, আনন্দবাজার মোদির এই বক্তৃতাটাকে উগ্র হিন্দুত্ববাদি জোশ আর দেশপ্রেমের উথলায়ে উঠেছে বলে ব্যবহার করেছে; তাই তারা জোশ তোলা এক শিরোনাম করেছেঃ জি২০ বৈঠকের আগে জকার্তায় চিনকে কড়া বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী – এভাবে। আর তাতে পাঠককুল যেন বলে উঠেছিল জিতে রহ মোদি!!!
    এছাড়াও আনন্দবাজার জানাচ্ছে মোদি সেখানে আরো বলেছেন, “বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ঘিরে রয়েছে অনিশ্চয়তা। সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদের পাশাপাশি ভূকৌশলগত সংঘাত সবার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। এর মোকাবিলা করার জন্য বহুপাক্ষিক আইনের শাসন মানা আন্তর্জাতিক বিধি ও ব্যবস্থা প্রয়োজন”। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে মোদি সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ কিছুই উল্লেখ করতে বাদ রাখেন নাই।

    “বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ঘিরে রয়েছে অনিশ্চয়তা। সন্ত্রাসবাদ,
    মৌলবাদের পাশাপাশি ভূকৌশলগত সংঘাত সবার জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ।
    এর মোকাবিলা করার জন্য বহুপাক্ষিক আইনের শাসন মানা আন্তর্জাতিক বিধি ও ব্যবস্থা প্রয়োজন।”

    এর মানে মোদি সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ ইত্যাদি যাই তার কাছে তার শত্রু মনে হয়েছে এমন কিছুকেউ উল্লেখ রাখতে পিছুপা হন নাই। কিন্তু তিনি কী জানেন এসবের উদ্গাতা আসলে তিনি নিজেই??? কারণ, তিনি  যতবার তাঁর হিন্দুত্ববাদ নিয়ে আমাদের তাড়া করেন, আক্রমণ করেন ততবারই আমরা বাংলাদেশ থেকে যারা এটা প্রতিরোধ করি, রেজিস্ট [resistance] করি  এসব কিছুকেই ভারতের হিন্দুত্ববাদিরা নামকরণ করে মৌলবাদ হিশাবে। আমাদের প্রতিরোধ বা resistance – এটাই হিন্দুত্ববাদি চোখে মৌলবাদ!!!  বাংলাদেশে আমাদের অস্তিস্ত রক্ষার জন্য আমাদেরকে হিন্দুত্ববাদি সকল ততপরতাকে প্রতিরোধ করতেই হয় ও হবেই!! 

     

    জি২০ সম্মেলনের আজ শেষ দিনঃ
    তবে আগে সেলফির দিন নিয়ে অল্প কথাঃ

    ইতোমধ্যে এবারের জি২০ সম্মেলন ২০২৩ আয়োজন করা হয়েছিল ভারতে, ৯-১০ সেপ্টেম্বর। আজ তার শেষ দিন। গতকাল প্রথমদিনের বিকালে ছিল শো-অফ বা রাষ্ট্রপ্রধান নেতাদের ব্যক্তি ইমেজ বাড়ানো যেটাকে বলে “পাবলিক ইমেজ” ক্রিয়েট বা তৈরি করে নেওয়ার এক শান্ত বিকেল। যেটা বাংলাদেশে বসেও আমরা টের পেয়েছিলাম এক সেলফি-ময় হয়ে উঠা সর্বত্র!!  বাইডেনের লক্ষ্য ছিল এক উদার মনের প্রেসিডেন্টের ইমেজ তৈরি করা।  বিশেষ যে প্রধানমন্ত্রী তাকে উঠতে বসতে গালাগালি, তার বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী, আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপকারি অথবা ২০ ঘন্টার লম্বা জার্নি করে দেখতে যাওয়ার মত আরও মহাদেশ আছে (মানে আমেরিকা আর যাবেন না বা পড়োয়া করেন না) ইত্যাদি এতসব বক্তব্য দেয়ার পরে তাঁকেই বাইডেনের সময় দেওয়ার দিক থেকে। ফলে এই বিচারে বাইডেন বাংলাদেশের সরকার নিয়ে যা রাজনৈতিক-কূটনৈতিক অবস্থান ও অসন্তোষ-ই থাক না কেন তিনি সেকারণে, মানবিক-সামাজিক সৌজন্য ভদ্রতা দেখানো আর নিজ উদার মনের পরিচয় অর্জনের ক্ষেত্রে তিনি-ই আগিয়েছেন এটাই তিনি প্রমাণ করে নিয়ে গেছেন। কিন্তু বিপরীতে হাসিনা এই বিচারে তিনি ততটাই ইমেজ হারিয়েছেন।  যা বলেছেন তা তিনি মিন করেন এমনটা তিনি প্রমাণ রাখতে পারেন নাই। তিনি এজায়গায় শোচণীয় হেরেছেন।  যদিও এনিয়ে সাধারণ সম্পাদক ও. কাদের তার এক সেলফিতে বিএনপি নেতাদের ঘুম হারাম: ওবায়দুল কাদের বক্তব্যে এতে আওয়ামি দলীয় নেতা-কর্মির মনোবল চাঙ্গা করতে হয়ত কাজ করেছে কিন্তু এটা ততটাই হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ক্ষতি হয়েছে যে তাহলে রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ-কে আনার অর্থ কী দাড়ালো??? গতকাল বিকেলে লক্ষ্য করেছি প্রগতিশীল মানে  [প্রগতিবাদ=হিন্দুত্ববাদ] চিন্তার ব্যক্তি বা লেখকেরা খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে যে তাহলে কী তাদের হাসিনাই টিকে গেল – বাইডেনের সাথে রফা হয়ে গেল!!! এই খুশি তারা আর লুকাতে পারেন নাই বা লুকিয়ে রাখার টেনশন সহ্য করতে চান নাই যে তারা ভারতপন্থি বা র-পন্থি!! তারা সরাসরি বা পরোক্ষে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন যে, তাহলে তো হাসিনা টিকেই গেল, তাই না!!!
    আমি অবশ্য তাদেরকে আর মানসিক যাতনা দিতে চাই নাই!  কারও অসুস্থতা কখনও কাম্য হতে পারে না! তবে অবাক হয়েছি তাদের চিন্তা করবার অক্ষ্মতাস দেখে যে তারা একটা সৌজন্য-ইমেজের স্বার্থ আর একই লোকের রাজনৈতিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থ  এদুটার ফারাক করতে শিখেন নাই। আপনার এনিমি-কে তার মেয়ের সামনেই খুন করতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা (essential-ness) কী আছে বা থাকতে পারে??? নাকি এমন চিন্তা এটাকেই তো গাধামি, এক মফস্বলি চিন্তা বলে!  কারণ, সেকাজটা অন্ততপক্ষে বাচ্চাটাকে চকলেট দিয়ে দূরে পাঠিয়ে করতে হবে  – আর এটাই স্বাভাবিক!  আর বাইডেন এক্ষেত্রে চকলেট-ই এস্তেমাল করেছেন!!!   আর তাতে শত্রুতা তো ভোতা হয়ে যায় নাই। শত্রুতা শত্রুতার জায়গাতেই বহাল আছে!!!

    সম্মেলনের যৌথ ঘোষণা প্রসঙ্গেঃ
    যেকোন দুই রাষ্ট্র অথবা বহুরাষ্ট্রীয় মোলাকাত বা সম্মেলন থেকে কোন যৌথ ঘোষণা আসাটা নুন্যতম তাদের মধ্যে কিছু ঐক্যমত্য আছে তা প্রকাশ করে। সেজন্য এটা খুবই কাম্য – সে কোন সামিট  মানে শীর্ষ দুই বা ততোধিক সরকারপ্রধান এর সাক্ষাত যাকে আমরা Summit বলে বুঝি; এমন সামিট মানেই এর সফলতার নুন্যতম মাপকাঠি হল যৌথ ঘোষণা – মনে করা হয় কূটনীতি চর্চায়! কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে গতবছর জি২০ সামিট থেকে ইউক্রেন যুদ্ধের ইস্যুতে রাশিয়াকে টার্গেট করে, দায়ী করে সমস্ত বক্তব্য সাজানো হয়েছিল। লন্ডন গার্ডিয়ানের ভাষায়  “.…..All references to Russia, Russian aggression and Russia’s withdrawal in relation to the war in Ukraine that featured in last year’s joint statement at the G20 summit in Bali” । 

    কিন্তু এবার আক্কেল হয়েছে। ঐ সমস্ত লিখে কী কী অর্জন হয়েছে তা তো আজ এক বছরের মধ্যে সব পক্ষই পরিস্কার বুঝতে পেরেছে। সবচেয়ে বড় কথা সারা পশ্চিম – মানে বাইডেন্সহ ইউরপের সব কুতুব রাষ্ট্রের সরকার প্রধানদের নিজ নিজ ইলেকশব ফেস করতে হবে। আর তাতে এরা কেউই নিজ নিজ জনগণের কাছে যুদ্ধের পক্ষে তাদের সাফাই অনুমোদন করিয়ে নেয়া মানে তাদের স্ব স্ব রাষ্ট্রের জনজীবন যুদ্ধের ফলে ভাল আছে আরামে বা বিশেষ সুবিধা পেয়েছে তা একেবারেই নয়। কাজেই অন্তত বাইডেনের কথা যদি বলি আহামি ২০২৪ নভেম্বর তাকে আমেরিকান নির্বাচনের মুখোমুখি দাড়াতে হবে।  অনেকবার যুদ্ধ চালানোর প্রার্থী জিতেছে যেমন বুশের দ্বিতীয় বা সেকেন্ড টার্মের জয়। কিন্তু আবার ওবামার দুবারের জয়  যুদ্ধ থেকে ফেরত আনবার প্রার্থী ছিলেন বলে! অনুমান করা হচ্ছে এবার যুদ্ধ থেকে ফেরত আনার প্রার্থির পক্ষে রায় যাব। তাই আগামি বছরের শুরু থেকেই ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করাতে হবে বা বন্ধ দেখব বলে অনেকের অনুমান। ইত্যাদি এসব জল্পনা-কল্পনার ফলাফল হল এবার জ২০ এর যোথ ঘোষণায় আপোষের ভাষা চলে এসেছে।

    তাই গত বারের বালি সম্মেলন সেসব-ই বাদ রাখা হয়েছে এবার। রাশিয়াকে এবার দায়ী করা আর নয়।   সেটা তাদেরবি বিভক্তি আরো বাড়াবে আর এবার ভয় কাজ করছিল এ ঐ যুদ্তেধ তাদের যে কোন আসার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে […alleviating fears that disagreements over the Russia-Ukraine war would prevent a consensus for the first time.]। আর একারণের এর বদলে নতুন যেসব শব্দাবলির উপর জোর দিয়ে ঐক্যমত্য আনা হয়েছে তা হলো …।Instead, the declaration emphasised that states must “refrain from the threat or use of force to seek territorial acquisition” and that “the use or threat of use of nuclear weapons is inadmissible”.
    অর্থাৎ এমন প্রধান দুইটা ভাষ্য যা বাংলা করে লিখলে হবে – ১। কোন ভুখন্ড বিতর্কে কোন হুমকি দেয়া বা শক্তি ব্যবহার না করার আহবান জানানো হয়েছে। 
    এছাড়াও  ২। কোন পক্ষের কোন পারমানবিক অস্ত্রের ব্যবহার বা ব্যবহার করার হুমকি অনুমোদন-অযোগ্য বলা হয়েছে ঐ যৌথ সর্বসম্মতির ঘোষণায়।

    এককথায় বললে, কাউকে হেয় করার উপরে এটা ইতিবাচকতার জয় – এই লাইনে কথা বলার ধারার জয়লাভ!

    তবে একটা মন্তব্য এখানে করাই যায়ঃ
    সারা পশ্চিম মানে আমেরিকা ও ইউরোপ মিলে ইউক্রেন ইস্যুতে সব দায় রাশিয়ার উপর চাপানোর যে কূটনীতি সেটাই কিন্তু আসলে জি২০ এর যৌথ ঘোষণা লিখতে গিয়ে পিছু হঠেছে বা আপোষী হতে বাধ্য হয়েছে। আর তা হয়েছে এবারের ব্রিকস সম্মেলন (২২-২৩ আগষ্টে) আগে হওয়া আর এবার তারা নিজেরা ডালপালা বিস্তার করে বড় প্রভাব ও বড় আশা নিয়ে হাজির হয়েছে – বলে সেই জোটবদ্ধ প্রভাব জি২০ তে পিছন থেকে  ক্রিয়াশীল ছিল। আর তাদের চাপেই মূলত এই আপোষী যৌথ ঘোষণা ২০২৩। যেখানে রাশিয়াকে আগের বছরের মত অভিযুক্ত করা দূরে থাক – এবার যৌথ ঘোষণায় রাশিয়া শব্দটাই নাই, অনুপস্থিত!
    মজার কথা হল, এই পিছনের ঘটনাটা আমেরিকা প্রভাবিত মিডিয়ায় রিপোর্টেড হয় নাই। হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী এএফপি-ফ্রান্স২৪ তে মানে, AFP এই গ্লোবাল মিডিয়া এজেন্সিতে আর তা প্রকাশিত হয়েছে FRANCE24  এই টিভি-প্রিন্ট মিডিয়া গ্রুপের পত্রিকায়। এরা নাম প্রকাশ না করে লিখেছে,   ” আমরা পুরা জি২০ সম্মেলনকে ইউক্রেনাইজড করে ফেলার পশ্চিমা  প্রচেষ্টার হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি এবং সম্মেলন সফল করেছি।

    “We were able to prevent the West’s attempts
    to ‘Ukrainize’ the summit agenda,” the veteran
    diplomat said, dubbing the two-day gathering a “success”.

     এদিকে এই সুযোগে রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভও সুযোগ নিয়েছেন – ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানাচ্ছে তিনি বলেছেন, এক ইউক্রেন ইস্যু দিয়ে যেন যাতে এবার জি২০ সম্মেলনকে ঢেকে ফেলা না যায় সেব্যাপারে মূল কাজটা করেছে ‘গ্লোবাল সাউথ’ গ্রুপ [Global South helped avoid Ukraine issue overshadowing G20 agenda: Russia]।  গ্লোবাল সাউথ বলতে ব্রিকস-কে বুঝানো হয়ে থাকে।  আর এই সুযোগে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা আর সাউথ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামফোসা ভোকাল হয়ে উঠতে শুরু করেন।
    লুলা বলেন, জি২০ এর এজেন্ডাকে কোন বাইরের ঘটনা আমাদের মধ্যে বিভক্তি ঘটায় তা হতে দিতে পারি না। বাইরের ঘটনা বলতে তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের ইস্যু বুঝিয়েছেন। আরো বলেছেন, জি২০ কে বিভক্ত করার কোন শখ নাই আমাদের। দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বদলে আমাদের দরকার শান্তি ও সহযোগিতা!

    “We cannot let geopolitical issues sequester the G20 agenda
    of discussions,” Lula said, an implicit reference to wrangling over the Ukraine war.
    “We have no interest in a divided G20. We need peace and cooperation instead of conflict.”

     এদিকে আগামি বছরের জি২০ এর সভাপতি হচ্ছেন ব্রাজিলের লুলা। তাই তিনি এখনই ঘোষণা করে দিয়েছেন, তিনি যদি আগামি বছরও প্রেসিডেন্ট থাকেন (যদিও না থাকার কোন কারণ নাই) পুতিন ঐ সম্মেলনে আসবেন কারণ তিনি (পুতিনকে) গ্রেফতার হওয়ার কোন সুযোগ রাখবেন না [ If I’m the president of Brazil and if he comes to Brazil, there‘s no way that he will be arrested,” he told Indian news network Firstpost on Saturday.]। 

    আর এই সুযোগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভারভ এক মন্তব্য করে নিয়েছেন – এবারের জি২০ সম্মেলন এক “বাঁধভাঙ্গা সম্মেলন” – …  Calling it a “breakthrough summit”, Lavrov said 

    এই ছিল মোটাদাগে সম্মেলনে পক্ষ-বিপক্ষের মন্তব্য বা মনের কথাগুলো!! এথেকে অন্তত একটা জিনিষ পরিস্কার যে দুনিয়ার নেতৃত্ব অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব প্রবলভাবে পরিবর্তিত, বদলে যাওয়া শুরু হয়ে গেছে।  এবছরের ব্রিকস আর জি২০ সম্মেলন এর দুই ঐতিহাসিক চিহ্ন হয়ে থাকল। 

    শেষ কিছু কথাঃ
    কিন্তু জি২০ জিনিষটা কী? কারা এমন সম্মেলনের চাহিদা দাতা? কারণ, এই টপ জিডিপি-ওয়ালা দুনিয়ার ২০ রাষ্ট্র  এরা তো বিশেষ আমেরিকা-চীনা বলে মূল দুই পক্ষ-বিপক্ষে পরস্পরের চরম বিরোধী! তাহলে দুনিয়ায় এমন আ

    র কে আছে যে এমন ২০ দেশকে এই সম্মেলন প্রতি বছর জড়ো হতে বাধ্য করছে??? সেসব জানলে হয়তো এবারের সম্মেলনের ঘটনাগুলো আরো পরিস্কার বুঝতে তা সহায়ক হত!!

    হ্যা ঠিক তাই!  সেজন্য আগামিতে জি২০ গ্রুপ এরা কে কারা কী এদের উদ্দেশ্যে আর কে এর পরিচালক সে নিয়ে আগামিতে লেখা আনব; সেকথা বলে শেষ করছি!

     

    আপডেটেডঃ   আপডেট ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৩  রাত ০৯ঃ ৪৮

    >
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • বিডিনিউজ বা চন্দন নন্দীর নাদানি

    বিডিনিউজ বা চন্দন নন্দীর নাদানি
    গৌতম দাস
    ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩
    https://wp.me/p1sCvy-4WN

                                                                                         Caught in a cleft stick

    [রাজশাহী অঞ্চলের কিছু বিশেষ এক্সপ্রেশন-শব্দাবলী আছে – “মামু, কাকে লেড়েছো? সে খবর লিয়েছো?”
    খুবই কমিউনিকেটিং একটা আঞ্চলিক পদবাচ্য বটে! মানে হল, যা যথেষ্ট বুঝো নাই তা নিয়ে কথা বলতে গেছো কেন? এমনই কিছু অর্থ বিতে পারে এই ভাষ্য!
    চন্দন নন্দীর লেখার দশা হয়েছে তাই। তিনি এক অনিয়মিত সাংবাদিক, যার একটা লেখা আমাদের বিডিনিউজ২৪ মিডিয়া ছাপানোর পরে সবই ব্লক করে রাখা আছে। আজকের লেখা সেই প্রসঙ্গের ভাল-মন্দ দিক নিয়ে।
    বিডিনিউজ সরকার বা ভারতের ঘনিষ্ট বলে এমন এক পরিচিতি কারো কারো চোখে থাকা সত্বেও – এটা বিডিনিউজের দ্বিতীয়বার ব্লকড হওয়া, প্রথমটা ২০১৮ সালের। কেউ কোন একটা লেখা নিয়ে আসলেই সেটা বিডিনিউজ ছেপে দিবে তা হওয়ার কথা না। যেকোন লেখাই লেখা ছাপবার অনেক দায়দায়ীত্ব আছে। সেসব পূরণ ও পালন হচ্ছে কীনা সেসব দেখাও যেকোন দায়ীত্বশীল মিডিয়ার কাজ।  আবার কোন মিডিয়া বন্ধ করে দেয়া – এটাও খুব ভাল লক্ষণ না। ভাল সামাজিক প্রাকটিস নয়! তবে বাংলাদেশে আমরা এখন এমনই খারাপ অবস্থায় যে কোন নীতি-পলিসি বা তত্বকথা শুনার সময় নাই কারো। সবাই ক্ষমতা কেন্দ্রিক চিন্তা  ও ততপরতায় ব্যস্ত! এই অবস্থায়, চন্দন নন্দীর লেখা আলোচনার প্রসঙ্গ!]

    গত কয়েকদিন ধরে অনেক বিদেশী পত্রিকা, যার একটা বড় অংশই ভারতের মিডিয়া, তারা যা কিছুই লিখছে তাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছু থাকছে। ফলে চরম উন্মুখ উৎকন্ঠায় থাকা এখনকার বাংলাদেশের মানুষ সবকিছুর উপরেই ঝাঁপিয়ে পড়ছে, তাদের কান খাড়া সবদিকে! তাই মুহুর্তেই সব ব্যক্তি জানাজানি সামাজিক হয়ে যাচ্ছে। এমন লেখাগুলো  যাদের মধ্যে নিউইয়র্ক টাইমসে মুজিব মাশাল [Mujib Mashal] নামের একজন যার লেখার শিরোনাম “নীরবে ধ্বংস করা হচ্ছে একটি গণতন্ত্রকে, বাংলাদেশে কাঠগড়ায় মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ [Quietly Crushing a Democracy: Millions on Trial in Bangladesh]”। যেটা আবার আমাদের মানবজমিন অনুবাদ করে ছেপেছে (লেখকের মুজিব মাশাল নামের বাংলা বানান আমি মানবজমিন -এরটাই অনুসরণ করেছি)।
    এই মুজিব সাহেবের লেখার প্রসঙ্গ তেমন কিছুই নতুন না, আমাদের আদালত পাড়ারই ঘটনা যা আমরা ফাঁসি ফাঁসি, ফাঁসি চাই এর সেকাল থেকে এপর্যন্ত  সব দেখছি, সহ্য করে চলছি। তবে এখন নতুন কেবল এতটুকুই যে এই মুজিব সাহেব এবার এদিকে চোখ ফিরিয়েছেন। কাজেই এনিয়ে আমাদের মন্তব্য একটাই যেটা উনি নিজে নিজেকেই জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন যে উনি এখন কেন, কী মনে করে এদিকে ফিরলেন!  তার সব প্রশ্নের জবাব ওখানেই আছে!!  আর আমরা ভিকটিম এর বেশি কী বলতে পারে!! শুনেছি ভিক্ষার চালের গুনাগুণ নিয়ে আলোচনা চলে না। অতএব আমাদের এমন সময়ে আমাদের নিয়ে, মনোযোগ ফিরানো সবাইকেই স্বাগত!

    সাথে আরও আছে; মানে আছে ভারতীয় এক চন্দন নন্দীর লেখা। এ’লাইনে পুরানা লোক; ২০১৮ সালের আগে বাংলাদেশ নিয়ে এখনকার মত বেশ ততপরতা দেখিয়েছিলেন। অনেকের মনে হত, তিনি ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের সাথে কানেকটেড লোক তবে, পুরানা কংগ্রেসি কোণায় পরে থাকা ধারার। আর সবচেয়ে বড় কথা সাংবাদিকতার চেয়ে পাগলামি করেন বেশি। আর তাঁর পাগলামিটাই অপ-সাংবাদিকতা হয়ে যায়।  তার এবারের লেখার শিরোনামঃ বিভক্ত দুপথের মাথায় আটকে যাওয়া [Caught in a cleft stick]। ঐ লেখার শুরুতেই দাবি করা হয়েছে এই লেখা আগে বাংলাদেশের বিডিনিউজ২৪ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। [যে ভার্সানটা আমার হাতে তা নর্থ-ইস্টের এক ওয়েব-সাইট থেকে নেয়া। আর বলে রাখি ভারতের নর্থ-ইস্টের কোন ওয়েব-সাইট মানে এরা কম-বেশি গোয়েন্দা ফান্ডেড।] এই সাইটে লেখাটার শুরুতেই দাবি করা হয়েছে লেখাটা আমাদের বিডিনিউজে প্রকাশিত হবার দুঘন্টা পরেই নাকি বিডিনিউজের বাংলা ও ইংরাজি ওয়েব সাইট এটা আর বাংলাদেশ ও ভারতের দর্শকেরা কেউ দেখতে পারছে না, ব্লক করে দেয়া হয়েছে।  কথা কতদুর সত্য-মিথ্যা জানি না। তবে ভারত থেকে নয়,এমন, অন্য-বিদেশ থেকে অন্তত ইংরাজি বিডিনিউজ তারা দেখতে পাচ্ছে বলে জানিয়েছে।

    [This article by Chandan Nandy first appeared in Bangladesh’s premier news portal www.bdnews24.com earlier this morning. In less than two hours after the article’s publication, both the English and Bengali websites of bdnews24.com was blocked for viewers/readers in Bangladesh as well as India]

    তবে এটা বাংলাদেশে মানে আমাদের বিটিআরসি [BTRC] থেকে ব্লক করে দেয়া অসম্ভব নয়। বরং দেয়াটাই আমার কাছে স্বাভাবিক পরিণতি মনে হয়!

    চন্দন নন্দীর আরেক দিক থেকে পরিচয়ঃ
    বাংলাদেশে এটা প্রতিষ্ঠিত যে গত ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সেবার একটা নিশিভোট বা রাতের ভোট হয়েছিল। মজার কথা হল এনিয়ে চন্দন নন্দীর স্টেক কী? এই পাগলের হাল কী? মানে ঐ নির্বাচন নিয়ে এর ততপরতা বা বয়ান কী ছিল?  কারণ, আজকের মত ২০১৭ সাল থেকেই সে বাংলাদেশ নিয়ে সক্রিয় ছিল, কোন একটা  পত্রিকা [মালয়েশিয়া থেকে প্রকাশিত সাউথ এশিয়া মনিটর নামে। southasianmonitor.com] এর সাথে সম্পর্কিত থেকে। পত্রিকাটা এখন খোলা দেখালেও সাইটটা আপডেট হয়না এভাবে খোলা আছে।
    কিন্তু যেটা এখন  গুরুত্বপুর্ণ তা হল, ২০১৮ আলের নির্বাচন হয়েছিল ৩০ ডিসেম্বর। আর এর পরের দিন চন্দন নন্দী নিজের টুইট একাউন্ট থেকে একটা টুইট করেছিলেন ৩১ডিসেম্বর ২০১৮, যেটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। তার সে টুইট একাউন্ট এখন খোলা যায় না। কিন্তু সংগ্রহ করে রেখে দেয়া একটা স্ন্যাপ সর্ট এখানে দিচ্ছি। ছবিতেই যা কথা বলার বলে তাই কোন বর্ণনা দিলাম না।

    কেন চন্দন নন্দীর লেখা বা বিডিনিউজ ব্লকডঃ
    এককথায় বললে, চন্দন নন্দীর লেখা জার্নালিজম হয় নাই। মানে এর নুন্যতম নীতি অনুসরণ করে নাই। এই লেখাটা শুধু ভুয়া নয় বরং প্রমানিত মনে করা যায় এমন কোন সোর্সের উল্লেখ তিনি করতে পারেন নাই, অথচ যা খুশি লিখে গেছেন; সে কারণে।

    এখন পালটা অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন তাহলে কিছুদিন আগে আনন্দবাজারের অগ্নি রায় এর লেখা ও পরে যা ডয়েচ ভেলে তে ছাপিয়ে এরপরে তা প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারে ছাপা হয়েছিল – সেই লেখা ও ততপরতাগুলোও তো জার্নালিজম ছিল না। তাহলে তাদের বেলায় আমাদের সরকার ‘কোন ব্লক করা’ বা কোন বাধাই দেয় নাই কেন?  এককথায়, এনিয়ে অনুমান করা জবাব হল, অগ্নি-আলো-স্টার এভাবে – এই গোষ্ঠির ততপরতাটা ছিল সরকারের পক্ষে যায় এমন প্রপাগান্ডা, আর বুঝাই যাচ্ছিল যে এটা দুদেশেরই সরকারের “জানাশুনা” লোকের মাধ্যমে ঘটানো কাজ। কিন্তু সেই মিথা প্রপাগান্ডা বাংলাদেশের সরকারি দলের কর্মিদের মনোবল বাড়াবে – এই মশলা আছে মনে করেছিল বলেই সম্ভবত তা চলতে দেয়া হয়েছিল – এটাই সম্ভাব্য কারণ বলে অনুমান!

    অথচ বিপরীতে চন্দন নন্দী – সবকিছুতেই তিনি একা, একাই সব। এমনিতেই সব সময় তার ভিতর একটা ঝোঁক দেখা যায় যে “তিনি সাহসী – সাহসী জার্নালিজম করেন” – এই আত্মম্ভরিতা বা নিজের সম্পর্কে অতি আত্মবিশ্বাসী ও মিথ্যা উচু ধারণা পোষণ করে লিখে থাকেন। সম্ভবত এই ‘অতি আত্মবিশ্বাসী’ অথচ ভিত্তিহীন সাহস দেখাতে গিয়ে  তিনি আলোচ্য লেখাটা লিখেছেন বাংলাদেশ সরকারকেই অভিযুক্ত করে অথচ কোন প্রমাণ দেন নাই! এটা গোয়ার মানুষের অতি সাহসী বোকামি বলা হয় সম্ভবত! যেমন তার পুরা লেখাটাই দাঁড়িয়ে আছে,   “senior Awami League sources” এই অস্পষ্ট ও অর্থহীন “সুত্র” এর বরাতে!  আওয়ামি লীগের সরকারের বিরুদ্ধে ভুয়া এক “আওয়ামি বরাতে” – যা খুশি তাই বলে দিবেন – এটা তো এক আত্মহত্যা-প্রবণ গাধামি!!   প্রায় প্রতি প্যারার শুরুতে তিনি এই অর্থহীন কথিত এই একই সোর্সের বরাতে  যা খুশি লিখে গেছেন; বেপরোয়াভাবে। অতএব এমন কান্ডগুলোতে তার না জানার কোন কারণ নাই যে এটা নুন্যতম কোন নীতি মেনে সাংবাদিকতা নয়। এটা কোন সাংবাদিক রিপোর্টই নয়।

    তার বোকা সাহসের আরো নমুনা আছেঃ
    প্রথমত তিনি বাংলাদেশ নিয়ে লিখতে এসেছেন ভারতের গোয়েন্দা বিভাগ কোলে বসে; তারা যে অংশেরই হোক! অর্থাৎ তাঁর কোন লেখাই সাংবাদিকতা হবেই না!  কিন্তু তিনি সম্ভবত ভেবেছেন, যেহেতু এ’লেখা হাসিনার মোদির ভারতকে ফেলে কথিত চীনের কোলের উঠে যাওয়ার গল্প – তাই তিনি বীরবেশে সব বাধা পার হয়ে যেতে পারবেন!  অথচ তিনি কোন যুক্তি বোধবুদ্ধি তে কাজ করতে পারেন না,  আবার এটা তিনি খেয়াল করেন না। তিনি চীনবিরোধী ভারতীয় দেশপ্রেমিক উগ্র জাতিবাদী হতে চেয়ে হাসিনাকেই অভিযুক্ত করছেন। তার মানে এলেখার টার্গেট পাঠক ভারতীয়রা। কারণ,  একটা কথিত “ভারতীয় দেশপ্রেমিক উগ্র জাতিবাদী” মনকে টার্গেট করে লেখা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠির কোন অংশ পছন্দ করার কোন কারণ নাই। তিনি আওয়ামি লীগের সুবিধাভোগী হলেও না। এমনকি বাংলাদেশের হিন্দুরাও ভয় ও দ্বিধা করবে!

    তাহলে এই লেখা সরাসরি বাংলাদেশেই ছাপতে চাওয়ার এত মরিয়া আগ্রহ কেন??? এত অর্থ একটাই তা হল, আমি একটা ভারতীয় এক বেপরোয়া হিন্দু-মন দিয়ে বাঙ্গলাদেশ তো বটেই সারা দুনিয়াকে দেখতে চান! শুধু তাই না আপনার এই দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান আপনি বাংলাদেশের মাথায় চাপায় দিতে চান! এমনকি এটা এতই বেপরোয়া যে তা আওয়ামি লীগ তো বটেই হাসিনাকেও বাধ্য করতে চান!   এটাই এক অন্ধ ও বোকার গাধামি সাহস!

    চন্দন নন্দী নিজেকে এতই অযোগ্য ভাবে তুলে ধরেছেন যে তিনি মনে করেন বা ধরেই নিয়েছেন যে  বাংলাদেশের কোন স্বার্থ নাই, এনিয়ে কোন স্বার্থবোধও নাই; শুধু তাই না। খোদ প্রধানমন্ত্রী হাসিনারও ক্ষমতায় টিকে থাকবারও যেন কোন স্বার্থ নাই!  কেবল ভারতের স্বার্থই আছে আর সেটাই সহি। আর তাই, বাকি আমাদের সকলকে ভারতের পক্ষে তাও সেটা আবার মুরোদহীন এক ভারত – এর পক্ষে জয়গান করতে হবে, সেটা করাই আমাদের কাজ! সহজ ভাষায় বললে এটা এক স্টুপিডিটি; আর তা এমনই স্টুপিডিটি  যা কোন সুস্থ মানুষ করে না!

    তবে চন্দন নন্দীর এমন তিনটা স্টুপিডিটি আছেঃ

    প্রথম স্টুপিডিটি বা গাধামিঃ
    সম্ভবত গাধাও একটা পর্যায়ের পর আর গাধামি করে না। কিন্তু চন্দন নন্দী তাতে থামতেও রাজি না, এমনই তার স্টুপিডিটির লেভেল! তার লেখায় নিচের এই বাক্যটা আছে সেখান থেকে উঠিয়েছিঃ

    “However, the only concession that the Awami League government
    is likely to make is to partially reduce the level of repression on
    opposition party leaders, cadres and supporters.”

    নন্দী বলছে, আওয়ামি লীগ এবার একটাই কনসেশন বা ছাড় দিতে পারবে সেটা হল level of repression। এইটায় একটু ছাড় দিতে পারবে। মানে এবার বিরোধীদেরকে গুম, খুন অপহরণ একটু কম করে করবে। মজা না। আমাদের তো একথা শুনে হাততালি দেয়া উচিত। আর চন্দন নন্দীর নামে জয়ধ্বনি!! তাই না??
    কিন্তু ঘটনা হল উলটা? হাসিনা সরকারের এতে প্রচন্ড ক্ষেপে উঠাই স্বাভাবিক। কেন???
    কারণ, এই বক্তব্য দিয়ে নন্দী স্বীকার করে ফেলেছেন যে এর আগে হাসিনার দল বিনা concession এর হেভি level of repression তাহলে আওয়ামি লীগ করেছিল। আর সে তুলনায় এবার কম করবে – এটাই তো নন্দীর ভাষ্য???
    এটা স্টুপিড চন্দন নন্দী খেয়াল নাই। তিনি খেয়াল করছেন না। কিন্তু হাসিনা সরকারকে অবশ্যই এই স্বীকারোক্তি অপসারণ করতেই হবে! কারণ, সে তো স্টুপিড নন্দী না; হওয়ার কোন সুযোগও নাই। তাই স্বভাবতই সে নন্দী-ভৃঙ্গী সবাইকে সাথে বিডিনিউজ কেও আগাছার মত উপড়ে ফেলে দিয়েছে!!!
    এখন তামসাটা হল, এতে নন্দীও বেজায় খুশি হয়েছে। কারণ, “কোন লেখা নিষিদ্ধ হওয়া মানেই তা নিশ্চয় খুব দামি লেখা????” আর এই দামি লেখাটা প্রসব করেছে নন্দী!  আর তাতে নিশ্চয় আমরা বুঝতে পারছি গাধা কত প্রকার ও কী কী!!!!

    দ্বিতীয় স্টুপিডিটি বা গাধামিঃ
    এবার দেখি পরেরটা।  তার লেখায় পরের আরেক বাক্য হল এরকমঃ

    This time around, there are few reports of “disappearance” of opposition party cadres.

    এবারও তিনি আরো বড় গাধা হয়ে আমাদেরকে আশ্বস্ত করছেন যে এবার বিরোধীদেরকে গুম বা অপহরণ কম হচ্ছে বা হবে।  চন্দন নন্দী হিউম্যান রাইট হিশাবে “অপহরণ” শব্দের  অর্থ তাতপর্য কোন্দিনই বুঝেন নাই তাই বুঝা যাচ্ছে। ঠিক যেমন আমাদের দিপু মনি তিনি ২০১৩ সালে তখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জেনেভায় জাতিসংঘের  (UPR) সভায় খোলাখুলি বলেছিলেন বাংলাদেশের আইনে  গুম বা অপহরণ (disappearance) বলতে কোন অপরাধের কথা নাই। অতএব বাংলাদেশে কোন disappearance নাই! এতে যে যা বুঝছেন বুঝে নেন! আর এখানে চন্দন নন্দী দেখা যাচ্ছে আরেক কাঠি সরেস! তিনি সরকারের হয়ে আশ্বস্ত করছেন এবার disappearance হবে তবে কম হবে!!!
    অথচ ঘটনা হল, একটা disappearance এর ঘটনা যদি ICC তে প্রমাণ করা যায় তো হুকুমের আসামি হিশাবে প্রধান নির্দেশদাতার সর্বোচ্চ শাস্তি হয়ে যাবে! আমি নিশ্চিত এসব দিক এই চন্দন নন্দী কখনও খবর নেন নাই। তাই অবলীলায় বলে যেতে পারছেন এবার disappearance কম হবে। মানে যেন এবছরের ধানের ফলনের হিসাব দিচ্ছেন!!!
    তাই এক্ষেত্রেও হাসিনা সরকারকে অবশ্যই নিজ স্বার্থে নিজে স্টুপিড নন্দী না হয়ে নন্দী-ভৃঙ্গীসহ বিডিনিউজ কেও আগাছার মত উপড়ে ফেলে দেয়া ছাড়া পথ ছিল না!!!

    তৃতীয় স্টুপিডিটি বা গাধামিঃ
    এলেখায় তিনি, কোন রাষ্ট্রের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে  সেটা যে কোন ধরণের চাপবিহীন ও বিশ্বাসযোগ্য হতেই হয় এবং তা উল্লেখ করা লাগে নাই নইলে কে জনপ্রতিনিধি হল?  আর জনপ্রতিনিধিত্বই যদি ফেয়ার ভাবে না হয় তো ওটা তো কোন রিপাবলিকই না – গণপ্রতিনিধির রাষ্ট্র না, সমাজের কোটারি গ্রুপের ক্ষমতা হল সেটা এটাই তো ফ্যাসিবাদ হয়েছে বা হবে। অথচ এলেখায় চন্দন নন্দী সব সময় বলে গেছেন, নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার একটা রিলেটিভ ধারণা মাত্র। হাসিনাও  নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার করতে পারেন। সেটা পিটার হাসের মাত্রায়  ফ্রি ও ফেয়ার নির্বাচন না হলেও চলবে। এটা সোজাসুজি একটা শয়তানি। একেবারে যেকোন ধর্মতত্বে শয়তানের যে বর্ণনা আছে সেই দানব এই চন্দন নন্দী। তিনি ভারতের নির্বাচনে গইয়ে তার এই শয়তানি তত্ব ফেরি করে না কেন?  আগে তিনি সেটা করে আসেন এরপর ………।
    তাই এসব শয়তানি বক্তব্য দেয়া তা বলার কোন মানে হয় না। অথচ তিনি কী বলেছেন দে৪খেনঃ

    the Western bloc, including the US, seek to play a role “far stronger than India”
    in shaping the road for a relatively free and fair elections in Bangladesh.

    অর্থাৎ তিনি সুজাতা সিং এর ২০১৩ সালের হস্তক্ষেপটাকে জায়েজ করতে সেটা এবারের পিটার হাসের ভুমিকার সাথে তুলনা করে দিলেন। আর কৌশলে দাবি করলেন এটা একটা relatively free and fair elections – মানে তুলনামূলক ঘটনা মাত্র বলে দেখাতে চাইলেন। মানে এটা মাত্রাজ্ঞানের ব্যবপার যা একেক জনের একেক রকম হয় =- সেই মাত্রাজ্ঞান।   এটা যেন “far stronger than India” মাত্র এতটুকুই।
    তামাসার দিকটা হল, এই দানব নন্দীর একটা সাধারণ নির্বাচনকে খুবই হাল্কা ব্যাপার হিশাবে দেখা আর সেটা নেহাতই ফ্রি-ফেয়ার  এর মাত্রজ্ঞান এর ব্যাপার বলে চালানোর চেষ্টা এটা হাসিনাও হজম করতে চান নাই। এরই বহিঃপ্রকাশ হল আপন স্বার্থে নিজে কোন স্টুপিড নন্দী না হয়ে নন্দী-ভৃঙ্গীসহ বিডিনিউজ কেও আগাছার মত উপড়ে ফেলে দিয়েছে সরকার!

    হাসিনার পাঁচমন্ত্রীতে ভারতের কথিত আপত্তি প্রসঙ্গঃ
    প্রসঙ্গটা সবার আগে তুলে ছিলেন সুবীর ভৌমিক যে হাসিনার পাঁচমন্ত্রী নাকি পাকিস্তানপন্থী! তিনি নামও উল্লেখ করেছিলেন সেবার। কিন্তু অর্থহীন একটা বিষয়কে ঘটনা বানানো মনে হবে যেকোন সিরিয়াস পাঠকের কাছে। অন্তত দুটা কারণে এক. বিভিন্ন দেশের সরকারে মন্ত্রীদের মধ্যে সিরিয়াস গ্রুপিং চলে আর তা একেবারে মতাদর্শিক লেভেলে। কোল্ডওয়ারের আমলে ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রীসভায় মোরার্জি দেশাই – এসব আসলে সেকালে সোভিয়েত নাকি আমেরিকান এভাবে পন্থী পরিচয়ের আড়ালে দ্বিবিভাগে বা গ্রুপিং চলত। তবে অবশ্যই তা আন্ডার কারেন্ট। মানে মূল স্রোত বা মেন স্ট্রিম বা মূল ধারাতেই বভক্তি না অবশ্যই না। মানে ইন্দিরার ক্ষমতাকে মেনে নিয়েই এরপর দুই ধারার মত।  এমনকি আমাদের ৭১ যুদ্ধের সময়েও ইন্দিরার আমেরিকান ধারার মন্ত্রীরা বিরোধিতা করেছে। তো এই অর্থে কোন মন্ত্রীসভার ভিতরে গ্রুপিং এর কথা জানা যায়।
    কিন্তু হাসিনার মন্ত্রীসভার মধ্যে গ্রুপিং? এটা যে না বাংলাদেশ  না হাসিনা কাউকেই চিনেনা কেবল – মন্ত্রীসভায় গ্রুপিং থাকে – এই তত্বীয় ধারণা যা খুশি বলে এদের কথার নুন্যতম গুরুত্বও নাই। তাই এর আমলও নাই।  আসলে দলের ভিতর দুই মতামত নিয়ে আপোষে ফ্রি-ভাবে তর্ক-বিতর্কের সুযোগ থাকলে এরপরে মন্ত্রীসভা পর্যন্ত তা কল্পনা করা যেতে পারে। কাজেই সুবীরের এই কথিত গ্রুপিং এর ধারণা তুলে তিনি হয়ত অন্য কিছু বলতে চেয়েছেন তাই যেকোন সুস্থ মানুষ মনে করেছে। কারণ নিজ মন্ত্রীত্ব থাকলে বেচে গেলে সেটা মন্ত্রীর বাপের নাম দশা  সেখানে এই মন্ত্রীরা আবার গ্রুপিং করবে। গ্রুপিং শুনলেই তো গুষ্ঠিশুদ্ধ বের করে দেয়া সহ যেকোন শাস্তি খাবে যেকোন ব্যক্তি মন্ত্রী!  কাজেই পাঁচমন্ত্রীর গল্প – এটা বানানো গল্পই!
    আর দ্বিয়=তীয় কারণটা হল, হিন্দুত্ববাদী ভারতের পাকিস্তান ম্যানিয়া বাংলায় যাকে চুলকানি বলে। মুসলমান বা পাকিস্তান নিয়ে হিন্দুত্বের চুলকানি নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নাই! বট্ম লাইনটা হল আমাদের যেকোন কারো ভিনদেশে আত্মীয় স্বজন থাকতেই পারে। সালমান এফ রহমানের অনেক কাছের আত্মীয়ই পাকিস্তানের – তা হলেই পারে। সেজন্য তিনি পাকিস্তানপন্থী – এটা মূলত রেসিজম! সালমান রহমান খারাপ ব্যবসায়ী হতে পারেন, লোন ডিফল্টার হতে পারেন, ইত্যাদি মেলা অভিযোগ থাকতেই পারে  কিন্তু সেজন্য তার বিরুদ্ধে করা কোন রেসিস্ট মন্তব্য জায়েজ হয়ে যাবে না! কিন্তু ভারতীয় হিন্দু-মন এতে অভ্যস্ত, এটাই দুঃখের ব্যাপার!
    আর মোমেন যখন যাকিছু বলেছেন ধরে নিতে হবে তাতে প্রধানমন্ত্রীর সায় আছে। কে কোন পন্থী সেটা বাসায় বউয়ের কাছে রেখে এসে তবেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অধীনে মন্ত্রীত্ব করা সম্ভব। এটা যারা জানে না তারা এখনও মায়ের গর্ভে আছেন! বিকশিত প্রস্ফুটিত হন নাই। আমরা কয়জন কজানি বা মনে রেখেছি যে মোমেনের আগে হাসিনার সব পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন নাম কাওয়াস্তে – লো প্রফাইল। তাঁর অফিসই তখন প্রায় সবক্কিছু নিজে সরাসরি তদারকি করত। অবজারভেশন বলে,  মোমেন দায়ীত্ব নিবার পরই তাঁর অফিস অনেক কিছুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলে আলাদা কাউকে নির্দেশ দিয়ে করান। ভারতের যারা মোমেনের বিরুদ্ধে  বা কথিত গ্রুপিং ধরণের যা মনে চায় বলছেন তারা অন্যকিছু মিন করছেন সম্ভবত!  বাংলাদেশের কেউই বিশ্বাস করবে না যে মোমেন কোন স্বাধীনপন্থা বা গ্রুপিংয়ে চলেন! আসলে এসব কথা যারা বলছেন তারা গত ১৫ বছরের সরকার কেমন কী তার ঝোঁক কিছুই অবজার্ভ না করেই বরং ভিন্ন কিছু বলতে চেয়ে এমন ভুয়া কথা ছড়াচ্ছেন!  আবার এসব কথার মানে এমনও না যে হাসিনা সরকার বা মোমেন এর কাজ ততপরতা খুবই জন আদৃত! এরা সবাই নির্দোষ! অথবা নিঃস্পাপ ধরণের ইমেজের অথবা এমন ব্যক্তিত্বের।

    চন্দন নন্দীর এলেখা মহা-চীনবিরোধী ভাবের উপর দাঁড়িয়ে লেখাঃ
    চন্দন নন্দীর এই লেখা মহা-চীনবিরোধী ভাবের উপর দাঁড়িয়ে লেখা।  ভারতের নিজ মুখের খাদ্য “বাংলাদেশ” একে চীন ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে যেন – এমন অনুভব এর উপর দাঁড়িয়ে এটা লেখা হয়েছে। আমি বার বার বলেছি হিন্দুত্ববাদের মত একটা উগ্র জাতিবাদী দেশের হিন্দু-মন এরা দ্বিন-দুনিয়া বুঝতে অক্ষম।  এদের সাংবাদিকতাও এমন দোষে দুষ্ট একপেষে হবে।  আগে ভারতের জাতিবাদ ছিল মুসলমান বা পাকিস্তানকে চরম শত্রু জ্ঞান করে দারাকনো। সেজায়গায় এখন বসেছে চীন। ভারতের সব নিয়ে গেল চীন। এর বাইরে দুনিয়ায় আর কোন ঘটনা -ফেনোমেনা আছে কিনা তা এরা জানে না। জানতেও চায় না।
    একবাক্যে একটা কথা বলে শেষ করব। বাইডেনের আমেরিকার নয়া নীতি-পলিসির কারণে মোদির ভারতের উপর তাদের চাপ ক্রমশ বেড়েই চলেছে।  এটা এমনই যে তা যদি খুবই খারাপ অবস্থায় পৌছায় – এশিয়ায় বাইডেনের সাথে ভারত নীতি সরাসরি বিপরীতমুখী হয়ে দাড়ায় সেক্ষেত্রে ঐ সামলাতে না পেরে খোদ ভারতই চীনের কোলে গিয়ে উঠতে পারে। খোদ মোদি-জয়শঙ্করের বিবৃতির অর্থ এমন – আর তা প্রকাশিত হয়ে আছে। এবিষয়ে কী চন্দন নন্দীরা অবগত????
    যারা আরো গভীরে যেতে চান, ভারতের NDTV তে ছাপানো এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন গত ১১ আগষ্ট যা ছাপা হয়েছিল। আর পরেরদিন বাংলাদেশ তা অনুবাদ করে মানবজমিন ছেপেছিল বাংলায়।
    যে ভারত নিয়মিত চীনকে অভিযুক্ত করে অন্যের ভুমি দখল করেছে বলে সে কেন আচমকা ফিলিপাইন-চীনের সীমানাবিরোধে তাদেরকে শান্তিপুর্ণ সমাধান বা “Resolve Peacefully,”  বলে হাঁক পাড়ছে??? এটা তো অন্তত ২০১৭  কোয়াডে [QUAD]  বা আমেরিকার আনা সাউথ চায়না সি – বিতর্কে ভারতীয় অবস্থান ফেলে পালানো মানে এসবের জন্মের পর থেকে এপর্যন্ত ভারতের অনুসরণ করা ভারতীয় অবস্থানের বিপরীত! সেটা কেন হল??
    কাজেই কে কখন চীনের কোলে গিয়ে উঠতে চায়, কেন চায় কী দশায় সে বুঝে শুনে এসব উগ্র জাতিব্বাদ দেখানো উচিত চন্দন নন্দীদের। নাদান মানুষে ভরে উঠছে দুনিয়া!!!


    সর্বশেষ আপডেটঃ  ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩  সকালঃ ০৭ঃ ৪৫


    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

  • আনন্দবাজার-অগ্নি রায়ের গায়েবী “সুত্রে” যা খুশি লিখা 

     

    আনন্দবাজার-অগ্নি রায়ের গায়েবী “সুত্রে” যা খুশি লিখা
    গৌতম দাস
    ২০ আগষ্ট ২০২৩   মধ্যরাত ১২ঃ ৩৬

    https://wp.me/p1sCvy-4Ox

     

            হাসিনাকে দুর্বল করলে ক্ষতি সবার, বার্তা আমেরিকাকে

     

    ঘটনা বড়ই অদ্ভুত! ভারত বাংলাদেশ বা হাসিনা সরকারকে নিয়ে তাদের ভাষায় “বাংলাদেশের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারতের বার্তা”  এমন কোন বার্তার অস্তিত্ব আদৌ আছে কিনা এর কোন খবর নাই। আনন্দবাজার, ডয়েচ ভেলে, প্রথম আলো অথবা  ওবায়দুল কাদের (সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী) এমন কারো কাছেই এমন খবরের নিশ্চয়তা নাই; কেউই নিশ্চিত করেন নাই বা এমন খবরের রেফারেন্স কী তা বলেন নাই। অথচ গতকাল থেকে এখনও কথিত এই ভারতীয় বার্তা নিয়ে প্রায় সব পক্ষই কথা বলে চলেছে। “ভারতীয় বার্তা” বলে কিছুর অস্বিত্ব কী? তা না বলে  যারা এনিয়ে কথা বলছেন তারা অন্যায় করছেন।  এভাবে “ভারতীয় বার্তা” বলে কিছু থাকলে তার কথা এই…... এভাবে শর্ত সাপেক্ষে নিজের কথা বলছেন। অথচ এভাবে কথা চলতে পারে না, মানে হয় না। খুব সম্ভব কয়েকদিনের মধ্যে ভারতের এক সরকারী ভাষ্য এখন আসন্ন যেখানে তারা বলবেন –  না তো এমন কোন ভাষ্য তো আমরা দেই নাই!!!!!
    অথচ এবার আনন্দবাজারের সাথে একইভাবে খবরের উৎস কী সেটা উল্লেখ না করে গায়েবী লিউজ ছেপেছে ডয়েজ ভেলে।  আর এই মিথ্যা গায়েবী খবর প্রথম আলো ডয়েচ ভেলের বরাতে ছেপেছে।  দাবি করেছে “কূটনৈতিক নোটে ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকার দুর্বল হয়ে পড়লে ভূরাজনৈতিক দিক থেকে তা ভারত এবং অ্যামেরিকা কারও পক্ষেই সুখকর হবে না”। কিন্তু কোথায় ভারত এমন  কূটনৈতিক নোটে জানিয়েছে এর কোন হদিস নাই। মানে এরাও প্রথম আলো, স্টার, আনন্দবাজার এর মত একই দলে যোগ দিল। এতে বলাই বাহুল্য ডয়েচ ভেলে কেও মূল্য চুকাতে হতে পারে।   যেন সকলে এরা হাই স্টেকে জুয়ারি জুয়া খেলতে নেমেছে সাংবাদিকতা নামে!!!!

    আনন্দবাজারের অগ্নি রায় যা শুরু করেছিলেনঃ
    প্রথম কথা হল আজকের আনন্দবাজারে অগ্নি রায়ের লেখাটা এটা কোন সাংবাদিকতা-ই নয়। এটা আসলেই এক বাজারি লেখা যার পায়ে কেবল ঘুঙ্ঘুরটাই নাই!  একটা মনগড়া  আর কোন রেফারেন্স ছাড়া কিছু  রচিত বাক্যের গল্প বলা যায় একে বড় জোর। যেমন এই বানানো গল্পটা মোট ৪৪৪ শব্দের। কিন্তু তাতেই এর ভিতর অগ্নি রায় চার বার  “সুত্র বলছে” ব্যবহার করেছেন। মানে সোজাসাপ্টা এটা গায়েবী কথাবার্তা যার বাপ-মা নাই।  আর এধরণের চাপাবাজি শব্দ আর মিথ্যা কথাই সেখানে আছে। তবে আনন্দবাজারি লেখায় “সুত্র” মানে তা ইংরাজি সোর্স [source] এর বাংলা করেছে তারা এভাবে। আর এভাবে কথিত “সুত্র” এর কথা বলে আনন্দবাজার সাংবাদিকতায় খবরের সোর্স বলার বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যেতে চায়। এটাই অসৎ জার্নালিজম!   জার্নালিজমে নুন্যতম ফেয়ার [fair] বা সৎ জার্নালিজমের প্রধান ও নুন্যতম শর্ত হল খবরের সোর্স উল্লেখ করতেই হয়; পাঠক-কে জানাতেই হয়। অথচ এই ৪৪৪ অক্ষরের গল্পটার মধ্যে কোন উপযুক্ত সোর্সের কথা উল্লেখ নাই। অথচ সমানে যা খুশি তাই দাবি করে চলা হয়েছে। অথচ আনন্দবাজার প্রবর্তিত সেই অস্তিত্বহীন কথিত “ভারতীয় বার্তা” প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের আর মির্জা ফকরুল পর্যন্ত কথা বলে ফেলেছেন!!
    তবে আরো সব প্রসঙ্গে ঢুকবার আগেই পাঠককে মনে করিয়ে দেই। বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের এবার এখন একেবারে ঘুম নাই অবস্থা তৈরি হয়েছে। সেকথা ভারতের ভাষাতেই বললে, ভিসানীতি ধরণের স্যাংশন দিয়ে হাসিনাকে নির্বাচন করতে বাধ্য করা হলে সেটাতে নাকি ভারতের স্বার্থ খুন্ন হবে। এটা আবদি বা সুবীর ভৌমিক আমাদেরকে খোলাখুলিই জানিয়েছে।  যার মানে হল, হাসিনাকে ভোট কারচুপি বা রাতের ভোট করতে দিলেই একমাত্র ভারতের স্বার্থ রক্ষিত হবে।  যার সারকথাটা হল, নির্বাচন এর নামে যা হবে হোক কিন্তু শেষে হাসিনাকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে নাহলে নাকি ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থ ক্ষুন্ন হবে। এমনকি তাদের বিদেশ মন্ত্রণালোয়ের মুখপাত্রও অরিন্দম বাগচি আমাদেরকে কনষ্টিটিউশন মাফিক মানে হাসিনার মাপে চলতে হেদায়েত করেছে।

    এখন এসবের সারকথাটাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভারতের মিডিয়ায় লেখা হচ্ছে। এবং খুব সম্ভবত এটা চলতি বছরের দ্বিতীয় বড় ঢেউ তোলা ফাঁপা উচ্ছ্বাস এর চেষ্টা।  যার প্রথমটা তোলা হয়েছিল মোদির আমেরিকা বা বাইডেন সফরের কালে (২১-২৪ জুন ২০২৩), আগে ও পরের সময়ে। কিন্তু এসব মিথ্যা হাইপ তোলার দায় দায়িত্ব না নিয়ে ও অস্বীকার করে ভারতের বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর ২ জুলাই জানায়ছিলেন একেবারে উলটা কথা – যে ভারত নাকি “প্রতিবেশী রাজনীতিতে ভারত কম জড়াচ্ছে”।  [এপ্রসঙ্গে আমার সেসময়ের লেখা – “জয়শঙ্করের কাছে এখন ‘আঙুর ফল টক’!” – লেখাটার লিঙ্ক এখানে]।  তার মানে অগ্নি রায়দের মত মিথ্যা প্রপাগান্ডা লেখকদের পরিণতি মাত্র গত মাসেই আমরা দেখেছি; যখন জয়শঙ্কর এসবের কোন দায়দায়িত্বই নেন নাই। অথচ তাসত্বেও  আনন্দবাজার ও অগ্নি রায়েরা এবার আবার দ্বিতীয় বড় ঢেউ তোলা ফাঁপা উচ্ছ্বাস শুরু হয়েছে।

    তবে খুব সম্ভবত এবারের পটভুমি হল আগামি মাসে [৯-১০ সেপ্টেম্বর] অনুষ্ঠিতব্য ভারতে G20 নেতাদের সম্মেলন। নিচে সংক্ষেপে G20 জিনিষটা কী তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যাদের হাতে সময় কম তারা এটা পার হয়ে এরপরের প্যারাতেও চলে গিয়ে সেখান থেকে পড়া শুরু করতে পারেন। ভারতের জনসংখ্যা এখন চীনের চেয়েও বেশি। ফলে সে পটেনশিয়াল বা সম্ভাব্য বিনিয়োগ গ্রহিতা। তাই এবারের সম্মেলন সেখানে।

    G20 নেতাদের সম্মেলন কীঃ
    দুনিয়াতে যেসব রাষ্ট্রের জিডিপি সবার চেয়ে উপরের দিকে এমন টপ ২০টারাষ্ট্রের  কমন অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে কথা বলার এক জোট হল এই G20। প্রতিবছর নানান দেশে এর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এটা গড়ে উঠার ইতিহাস হল, এক কথায়, এটা মূলত ওয়াল স্ট্রিট [wall Street]  নিউইয়র্ক,  এর আগ্রহ ও আবেদনে গঠিত ও সৃষ্ট।  ওয়াল স্ট্রিট এক প্রতীকী নাম বা শব্দ যার অর্থ এটা বিরাট বিরাট পুঁজি (ঋণ দেয়া) বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠান। এর এতই বড় প্রতিষ্ঠান যা কমিউনিস্টদের কল্পনাতেই নাই। নাই কারণ, এবিষয়ে তাদের প্রধান গুরু জোসেফ স্তালিনেরও কোন ধারনা ছিল না। কিন্তু তামাসাটা হল,  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রধান যুদ্ধের খরচ যোগানদার ও নেতা ছিলেন অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। রুজভেল্টের অর্থনৈতিক-সহ সবধরণের সহযোগিতাতেই স্তালিন তার সোভিয়েত ইউনিয়নকে হিটলারের জার্মানির হাতে আক্রান্ত ও পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এখানে আসল কথাটা হল, রুজভেল্টের পিছনে ছিল এই ওয়াল স্ট্রিট -ই। ওয়াল স্ট্রিট এর বৃহত ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে করিতকর্মা ও দক্ষ কর্মিরাই ছিল রুজভেল্টের মন্ত্রী, প্রশাসক, পরামর্শদাতা, বিভিন্ন সরকারি কমিশনের প্রধান ইত্যাদি সবকিছুতে...। আর স্তালিন মারা যান ১৯৫৩ সালে, মারা যাবার আগে তিনি জানতেন যে ওয়াল স্ট্রিট  কী জিনিষ এমন প্রমাণ কেউ দেখে নাই।  সম্ভবত একারণেই, পরবর্তিতে স্তালিনের অনুসারি কমিউনিস্টদের কল্পনায় সবচেয়ে বড় পুঁজির কারবারী  হল, বহুজাতিক কোম্পানি [MNC: Multi National Corp.] বা কর্পোরেট হাউজগুলো। আর আমাদের মত দেশের কমিউনিস্টেরা অনুসরণ করে ইউরোপীয় কমিউনিস্টদের। যেখানে ইউরোপীয় কমিউনিস্টদের চোখেও ওয়াল স্ট্রিট বলেই কিছু নাই। তাই বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের তো খবরই নাই।
    এই MNC দেরই বাপ হল ওয়াল স্ট্রিট। সেটা এই অর্থে যে MNC গুলোকেই  বড় বড় পরিমাণ পুঁজি ঋণ বা বিনিয়োগ হিশাবে দেয় ওয়াল স্ট্রিট; মানে ওয়াল স্ট্রিটের বড় বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো।  তাই ওয়াল স্ট্রিট শব্দের আলোচ্য প্রসঙ্গে মানে হল যাদেরকে বিনিয়োগ পুঁজির বাজারকে বাড়াতে সব সময় নয়া বাজারের খোঁজে বেরাতে হয়। এজন্য এরা প্রভাবশালী রাষ্ট্র বা অর্থনীতিগুলোকে তারা চাপ দিয়ে বেড়াতে হয়।  ওয়াল স্ট্রিট এর আবেদন ও দাবি হল, তোমরা  G20 দেশগুলো বছরে একবার করে নিজেদের মধ্যে বসে সমন্বয় বাড়াও, এতে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য আরো বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাধাগুলো কী তা নিয়ে আলাপ করে বড় ২০ দেশ কোঅর্ডিনেটশন বাড়াও। কারণ, একমাত্র তাহলেই ওয়াল স্ট্রিট এর বাজার বাড়বে; মানে এতে তোমাদের অর্থনীতিও বাড়বে দ্রুত।  এই হল সংক্ষেপে G20।

    কিন্তু মোদির ছেঁচড়ামো গেল না। ভারতের জনসংখ্যা এখন চীনের বেশি হয়ে গেছে বলে ভারত এখন চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া অর্থনীতি যেন হয়ে গেছে  তা একেবারেই নয়। তবে ওয়াল স্টিটের চোখে ভারত পটেনশিয়াল রাইজিং বলে সে  বড় জোর সম্ভাব্য পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে বিনিয়োগ ঋণ গ্রহিতা। এতটুকুই। আর মোদিকে এই সম্ভাবনাটাকেই বাস্তব করে দেখাতে পারতে হবে, ভারতের অর্থনীতিকে  বাস্তব গতি দিতে পারতে হবে। মানে ভারত জি-২০ সম্মেলন করেছে বলেই ভারতের অর্থনীতি তেমন উচা হয়ে গেছে তা একেবারেই নয়। কিন্তু মোদির ছেচরামি হল, তাকে ভারতের অর্থনীতি সে জায়গায় উচা করার আগেই এর ফায়দা নিতে হবে – এই লাইনে রওনা দিয়েছে। আর সেই সাথে ভাব করতে হবে ভারত যেন পরাশক্তি। তবে এই ভাব-ভাষ্যটাই মোদি আভ্যন্তরীণ ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার করে ভোট তুলতে চায়।  আর এরই সাথে হাসিনার বাংলাদেশ জি-২০ দেশগুলোর ধারেকাছেরও কেউ না হওয়া সত্বেও মোদি হাসিনার বাংলাদেশ তার অধস্থন  হাতা-ল্যাসপেন্সার এই অপমান করার বিনিময়ে হাসিনাকে  জি-২০ এর দাওয়াত করে এনে দেখাতে চায়। তার নিজ দেশে দেখাতে চায় যে মোদির ভারতেরও অধস্থন এক  হাতা-ল্যাসপেন্সার দেশ-সরকার আছে!!! এটাই মোদির ছেচরামি!!! অথচ কার্যত অনাহুত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে আমরা ঐ সভায় কী সম্মান পাবো সেখানে??  বড়লোক বন্ধুর বিয়েতে যেতে পেরেছি তা অনেক গরীর বন্ধু এক বিরাট অর্জন বা জাতে উঠা বলে মনে করতে পারে, এটা সেরকমই কিছু একটা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি!!!

    সেটা কী দাঁড়াবে তা দেখা যাবে। এর আগে অনেক কিছুই ঘটবে। তবে এনিয়ে আপাতত আনন্দবাজার ও অগ্নি রায়েরা এবার আবার দ্বিতীয় বড় ফলস এক ঢেউ তুলতে চাইছে।   যেমন শিরোনাম থেকেই বিশ্লেষণ শুরু করা যাক। অগ্নি রায় বলছে “হাসিনাকে দুর্বল করলে ক্ষতি সবার, বার্তা আমেরিকাকে”। এখানে সবারটা কে কে? একা মোদির ভারত ছাড়া তো কেউ নাই। আমেরিকাই তো ভারতের সাথেই নাই। অগ্ন রায় যেটা এককালে ছিল যেন সেটা এখনও আছে এই মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে একথা বলছেন। মানে ২০০৭ সালের যে আমেরিকা বাংলাদেশে হাসিনাকে বসিয়ে সেই বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল – সেই আমেরিকা তো এখনকার আমেরিকা নয়। দেখাই যাচ্ছে হাসিনা সরকারই বলতেছে, আমেরিকা তাকে উতখাত করতে চায়। সর্বশেষ ১৬ আগষ্ট সরকার বলছে, আমাকে সরানোর চেষ্টা হচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী, লিঙ্ক দেখেন। অথচ অগ্নি রায় গল্প ফেঁদেছে হাসিনা সরকার দুর্বল হলে নাকি সেটা আমেরিকারও ক্ষতি?? মানে সোজাসাপ্টা একটা আরেকটার বিপরীত কথা!
    এরপরে স্টোরির শুরুতে অগ্নি রায়ের প্রথম বাক্য “বাংলাদেশে হাসিনা সরকার দুর্বল হলে তা ভারত এবং আমেরিকা কারও পক্ষেই সুখকর হবে না বলে মনে করে নয়াদিল্লি”। যেটা নিয়ে আমরা উপরে দেখলাম এটা এক ভারতের ছাড়া আর কোন দেশের স্বার্থ নয়।  এরপর পরের বাক্যঃ

    “কূটনৈতিক সূত্রের খবর, একাধিক স্তরের বৈঠকে নয়াদিল্লি
    এ কথা জানিয়েছে বাইডেন প্রশাসনকে।
    সূত্রের খবর— বাংলাদেশের
    আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আমেরিকার বর্তমান ভূমিকায় ভারত যে খুশি নয়,
    ওয়াশিংটনকে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে সেই বার্তাও”।

    এটা অগ্নি রায়ের সবচেয়ে বড় মিথ্যাবাদী মন্তব্য।  গত জুনেই মোদির আমেরিকা সফরে এটা ফকফকা স্পষ্ট হয়ে যায় যে বাইডেনের সাথে মোদির, বাংলাদেশ নিয়ে কোন কথাই হয় নাই। এছাড়া পরে জয়শঙ্কর উলটা ক্রেডিট নিয়েছে এই বলে যে প্রতিবেশি দেশে ভারত কম জড়াচ্ছে। তাহলে এসব সুত্রের খবর বলে মিথ্যা প্রপাগান্ডা কেন??  ফ্যাক্টস হল, ত এনিয়ে ওয়াশিংটনকে ভারত কিছুই জানায় নাই। কারণ বাংলাদেশকে নিয়ে একই স্বার্থের পাটাতনে ভারত-আমেরিকা আর নাই।   ভারতের সাথে মিলে আমেরিকার এশিয়াকে দেখার দিন শেষ হয়েছে। বাইডেনের আমেরিকা এখন এশিয়াকে দেখতে চায় ভারতকে ছাড়াই। বরং ভারতের স্বার্থবিরোধি অবস্থান নিয়ে।  আর তা শুধু আগামিতে মোদিকে হারিয়ে রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোটকেই ২০২৪ সালের ক্ষমতায় দেখতে চাওয়া  এতটুকুই নয়। আরো আছে!  কী সেটা?

    বাইডেনের আমেরিকার নয়া এশিয়া নীতি-পলিসি সেখানে কেবল রাহুলের নেতৃত্বে বিরোধী জোট এর ভারত নয়, সেই ভারত এমন হবে যে হবে যে হবে সম্ভাব্য সারা দক্ষিণ এশিয়ায় আমেরিকার পদচারণা করতে চাইছে সেই আমেরিকাকেই সমর্থন করবে, এমন এক অধস্তন অনুসারী ভারতকেই আমেরিকা দেখবার আকাঙ্খা করছে। আরো আছে – আর তা শুরু বাইডেনের বার্মা পলিসি-ই নয়; মানে বাইডেন যেমন আগামি বার্মা দেখতে চায় সেটাকেই ভারত সমর্থ করবে মানে, ওর বিরোধিতার বদলে বরং অ্যামেরিকান স্বার্থের ভিতরেই ভারত নিজের স্বার্থ খুজে নিচ্ছে বা খাপ খাইয়ে নিচ্ছে এমন হতে হবে – শুধু তাও নয়।  এটা হল, সপ্তম নৌবহর কেবল বঙ্গোপসাগরে নয় আন্দামানেও হাজির থাকতে চায়।

    ঠিক যেমন বাংলা ট্রিবিউন লিখেছে, 
    ভারত মহাসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে নানা খেলা চলছে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই এলাকাটাকে
    নিয়ে নানা ধরনের খেলার একটা চক্রান্ত। যেহেতু আমি জানি
    , আমি বুঝি যে কীভাবে আমাকে ক্ষমতা থেকে
    সরাবে। তাদের কিছু কেনা গোলাম আছে
    , পদলেহনকারী আছে, তাদের বসিয়ে এই জায়গাটাকে নিয়ে খেলবে।
    সেটাই হচ্ছে প্রচেষ্টা। সেটা আমি ভালোভাবে বুঝতে পারি”।

    কিন্তু হাসিনার এসব বক্তব্যের কারণে কিছুই বদলাবে না। যেমন, ২০০৬ সালের শেষে যদি ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন নিয়ে,  আজ সরকার যেমন বক্তব্য রাখছে, তখনকার  বিএনপি যদি একই রকম বক্তব্য দিত তাতে ওয়ান-ইলেভেন ঘটা বা কিছুই ঘটা আটকাতো না। তখনও ভারত মহাসয়াগরের কথার মত অন্য কথাও তো ছিল। যেমন যদি বিএনপির দিক থেকে  বলা হত এভাবে  যে,  আমাদের বদলে আমেরিকা আওয়ামী সরকারকে ক্ষমতায় আনবে, বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিবে ……ইত্যাদি! তাতে কী কিছু ওয়ান-ইলেভেন ঘটা আটকাতো? মোটেও না।
    এসরের মূল ইস্যুটা হল জনপ্রতিনিধিদের গণবিচ্ছিন্নতা।   এমনকি আজ গণ বিচ্ছিন্নতার দিক থেকে আজকের  হাসিনা সরকারের সেকালের বিএনপির চেয়ে বেশি গণবিচ্ছিন্ন। সেটা এই অর্থে যদি অন্তত একটা ফ্যক্টর বিবেচনা করি যে আমাদের মত দেশে জনপ্রতিনিধিদের অন্তত কিছুটা ভয় বা লজ্জা থাকে যে দিন শেষে আমাকে আবার জনগণের কাছেই ভোট চাইতে যেতে হবে। কিন্তু সেটা এখন থাকত হয়ে গেছে।  গত ১৫ বছর ধরে  সরকার প্রশাসন আমলা পুলিশ এমনকি যেকোন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি তা একেবারে আওয়ামি মাঠকর্মীটারও আর সেসবের পরোয়া করা বালাই নাই। কারণ, সেটাও ম্যানেজ করার মেকানিজম মাঠকর্মী-নেতাদের হাতে পর্যন্ত এসে গেছে। জনপ্রতিনিধিদেরকে ভোট চাইতে আর পাবলিকের কাছে যেতে হয় না – এটাই সে মেকানিজম।  কাজেই  এখন ক্ষমতাসীনদে্রা এখন আম-জনতাকে সব ধরণের পরোয়ার বাইরে বা উর্ধে উঠে গেছেন। এরই উলটা দিকটার নামই হল এক  “জনবিচ্ছিন্ন জনপ্রতিনিধি ব্যবস্থা” যা জন্ম দিয়েছে এক গণবিচ্ছিন্নতার দল ও সরকার ব্যবস্থার রাজনীতি।  তাই আগেই বলা যায় এসব “ভারত মহাসাগরের গল্প” বলে এবারও আরো কিছুই ফিরানো যাবে না।

    সারাংশটা হল্‌  এখন কেন আমাদের মত দেশে কেন কিছু “ফিরানো” যায় না – এর আসল কারণ পাওয়া যাবে একজন জনপ্রতিনিধির আবার গণবিচ্ছিন্নতা কী? এটা তো স্ববিরোধি কথা!!! হা এই স্ববিরোধের আরেক নাম নিশিভোট!  এথেকে সে কেন গণবিচ্ছিন্ন এর অর্থ  কিছুটা হলেও বুঝা যাবে।  আবার, মূলত  এখনকার বাংলাদেশের রাজনীতির এই – গণবিচ্ছিন্নতা বৈশিষ্ট – এর কারণেই এখন গণ-অভ্যুত্থানের কথা বকোয়াজ, ফাকা-আওয়াজে উলটা বরং তা জুতসই “ভারতের দালালি” করার বক্তব্য হয়ে থাকবে।  যেটা অনেকেই গণ-অভ্যুত্থানের কথার আড়ালে তা করছেন।  আর এতেই কার্যত তৃতীয় শক্তির হস্তক্ষেপ জাতীয় কথা ও শব্দাবলী এসবই মুখ্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়,  দাঁড়াবেই! সেটা আমরা পছন্দ করি বা নাই করি!

    ভারত জামাতে ইসলামি বলে কী বুঝাতে চায়ঃ
    আনন্দবাজার বা অগ্নি রায় তাদের এই ৪৪৪ শব্দের লেখায় প্রথম ১১৫ শব্দের পরের ১৮০ শব্দ কেবল ব্যয় করেছে জামাতে ইসলাম বলে এক শব্দ আর ধারণা নিয়ে। এনিয়ে সবার আগে পাঠককে একটা সাবধান করে দেই। ঐ লেখায় “জামাতে ইসলাম” লেখা হলেও এশব্দ শুধু রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলাম  বুঝান হয় নাই। এটা একটা দলের নাম করার আড়ালে একটা প্রতীকী শব্দ হিশাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এশব্দ দিয়ে বুঝতে হবে বাংলাদেশে ইসলাম সম্পর্কিত যেকোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ – এর কথা বুঝানো হয়েছে।   এভাবে জামাতে ইসলাম বলে সব জিঘাংসা বিদ্বেষ উগড়ে দেওয়ার শুরু ২০০৮ সাল থেকে, মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টে যারাই গেছেন সকলেই  জামাতে ইসলাম এদুটো শব্দ দিয়ে গত ১৫ বছর ধরে  জিঘাংসা বিদ্বেষ ছড়িয়ে কথা বলে গেছেন।  ভারতও সেটাই রপ্ত করে কথা বলছে। এটা হল ভারতের কাছে অনেকটা ১৯৪৭ সালের আগের জমিদারি শাসনে শাসিত পুর্ববঙ্গে ফিরে যাবার (মৃত) আকাঙ্খার মত। এটাই জামাতে ইসলাম শব্দে এর বিরুদ্ধাচারণ।
    কথাটা স্পষ্ট হবে, যদি উত্তর খুঁজি যে ভারত বা  আনন্দবাজার বা অগ্নি রায় এরা জামাতে ইসলাম শব্দগুলো বলে কীসের বিরোধিতা করছে? অথবা আরো স্পষ্ট করে তারা এর বদলে কী দেখতে চাইছে?

    এরা সকলেই [এবং এমনকি খুব সম্ভবত বাংলাদেশের এখনকার বেশির ভাগ হিন্দু-সহ প্রগতিশীলেরা ] এদের কাছে যে আদর্শ বাংলাদেশ কাম্য সেটা হল ১৯৪৭ সালের আগের জমিদার হিন্দুর আধিপত্যের যে পুর্ববঙ্গ – সেটাই, সেখানে যদি ফেরত যাওয়া যেত। ভেঙ্গে বললে সেটা হল কোন নাগরিক সাম্য নয়, আইনের চোখের ধর্ম-নির্বিশেষে সব নাগরিক অধিকারে সাম্য নয় বরং জমিদার হিন্দু আধিপত্য করবে আর ইসলাম-মুসলমানের কোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ – সেটাকে অবশ্যই দমানো হবে শুধু না এদের সকলকে জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স মেনে নিতে হবে।
    এক্ষেত্রে মুসলমানদেরকে কী কী মেনে নিতে হবে? সেই তালিকার নাম সেটা অন্য শব্দে বললে তা হল – মুসলমানদেরকে অসাম্প্রদায়িক-  হয়ে থাকতে হবে। এটা শুধু বাংলাদেশের বেলায় নয়, এখনকার সারা ভারতের – মানে কেবল মোদির ভারতের না বা হিন্দুত্ববাদের ভারতের নয় – সারা ভারতের বেশীর ভাগ হিন্দু নাগরিকের আকাঙ্খা। এমন এক ভারত রাষ্ট্রই এদের কল্পনা।  আসলে যেকোন থিওলজি-তে দাঁড়িয়ে কল্পনায় যে কোন মর্ডার্ণ রাষ্ট্রের অনুমান এমন হয় ও হবেই।  আসলে যেকোন এথনিক বৈশিষ্ট ভিত্তিক আধিপত্যের কল্পনা এটা দিয়ে জাতিরাষ্ট্র কায়েম হবে হয়ত কিন্তু তা রিপাবলিক রাষ্ট্র হবে না যেটা ‘নাগরিক সাম্য’ অথবা “ধর্ম-নির্বিশেষে সব নাগরিক অধিকারে সাম্য” এটা হবে না।
    এককথায় বললে, ভারতের হিন্দুত্ববাদ (সাথে একালের ওয়ার অন টেরর) এটাই কিন্তু বাংলাদেশে  -ইসলাম সম্পর্কিত যেকোন কথা, ভাব বা আইডেনটিটি সব মিলিয়ে যেকোন কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ  জোরেসোরে ঘটিয়েছে।  এটা হল হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ।  অথচ তামাসাটা হল, হিন্দুত্ববাদের ভারত বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশ ঘটিয়ে যে হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ সেটাকেই “জামাতে ইসলাম” বলে প্রতীকী নামে বিরোধিতা করছে!
    আর ঐ যে জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স এর চিহ্ন ও নমুনা হিশাবে মুসলমানদেরকে “অসাম্প্রদায়িক” হয়ে থাকতে বলার দাবি ও বয়ান এটাই সবচেয়ে বেশি করে বয়ে বাংলাদেশের নিয়ে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ ফেরত মুসলমানেরা
    ।  কারণ কলকাতায় থাকার সময়ে এসব মুসলমানেরা অসাম্প্রদায়িক থাকবে এই শর্তেই তো শিক্ষিত হতে সুযোগ পেয়েছিল।    অথচ বাংলাদেশে ফিরে এরাই প্রগতিবাদের নামে হয়ে গেল হিন্দুত্ববাদের (জমিদার হিন্দুর ডমিনেন্স ধারণার) ক্যারিয়ার।
    তবে এত শব্দ থাকতে বাংলাদেশের চেতনাবাদী বা “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি” কেন ইসলাম কোপাতে “জামাতে ইসলাম” বলে প্রতীকী শব্দটা বেছে নিল?  এর কারণ হল, “জামাতে ইসলাম” নামে ডেকে কাউকে কোপানো এর  পরে এমন নৃশংসতার পক্ষে কোন সাফাই হাজির করা ওদের জন্য খুবই জরুরি।  আর ইসলাম কোপানোর স্বপক্ষে সেই সাফাই বয়ানটা হল, যে এটা সাধারণ ভাবে “বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক প্রকাশকে” কোপানোর নৃশংসতা করা নয়; বরং এটা যেনবা  ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামের অপরাধের বিরোধিতা করা হচ্ছে। 

    কঠিন সত্যিটা হল,   বাংলাদেশে ইসলামের কালচারাল বা রাজনৈতিক যেকোন প্রকাশকে কোপানোর নৃশংসতা করা – এটা তো রেসিজম। ঘোরতর এক Racism; এক নির্মুল আকাঙ্খা।  এক এথনিক[ethnic] জাত-ধর্ম বিদ্বেষ – ইসলামবিদ্বেষ! এথনিক ক্লিনজিং [ethnic cleansing] বা অন্যের জাত-ধর্ম নির্মুলের ভয়াবহ আকাঙ্খা!!   অথচ এটাই প্রগতিশীলতা বলে চালানোর চেষ্টা  চলছে।

    তাহলে আনন্দবাজার কেন এখানে জামাতে ইসলাম শব্দ দিয়ে মুসলমানবিদ্বেষ ছড়ানোর সুযোগ নিল?
    কারণ, সে আমেরিকাকে ভয় দেখাতে চায় যে হাসিনা আগামিতে ক্ষমতায় না থাকলে বাংলাদেশে ইসলামিজম ছেয়ে যাবে। কাজেই হাসিনাই ক্ষমতায় থাক! এই হল তাদের ছদ্ম-পরিচয়ে থেকে বলা সাজেশন!

    কিন্তু এনিয়ে অ্যামেরিকান অবস্থান কীঃ
    এটা বলাই বাহুল্য যেকেউই  ক্ষমতাসীন যখন থাকে তখন সে কখনই  বিরোধি যেকোন “রেডিক্যালিজম” মানে ক্ষমতাসীনকে সশস্ত্রভাবে উতখাত করতে চাওয়া যেকোন শক্তির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর বা নির্মমই হবে।  একারণের সবদেশের কনষ্টিটিউশনেই লেখা থাকে এসব “রেডিক্যালিজম”  করলে ওর শাস্তি হল মৃত্যুদন্ড। তাই  ইসলামি রেডিক্যালিজমের বিরুদ্ধে আমেরিকার অবস্থান থাকা তা কোন নতুন জিনিষ নয় বরং অনস্বীকার্য বা obvious ঘটনা অবস্থান। এছাড়া ওয়ার অন টেরর এর টানা বিশ বছর এর বেশি হয়ে গেল; এখন   আমেরিকার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা-শিক্ষা তো হয়েছেই ধরে নিতে পারি। সম্ভবত সেকারণের আমাদের মত দেশে অ্যামেরিকান নীতি এখন ইসলামি রাজনীতি মানেই এর বিরোধী হতেই হবে ঠিক তা নয়। মানে কোন মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রে ইসলামি রাজনীতি করা যাবে না ঠিক তা নয়। তবে মূল অবস্থানতা হল এই যে, নাগরিক অধিকারের দিক থেকে সব ধর্মের নাগরিকের অধিকার সমান বা সাম্য ধারণার মধ্যে থাকলে  ইসলামি রাজনীতি করতে কোন দলেরই সমস্যা নাই। তবে এর সাথে কথা আরো কিন্তু কথা বা ফারদার ব্যাখ্যা তারা সাথে দিয়ে বা করে থাকে। যেমন তারা সমাজে প্লুরালিজম [Pluralism]  থাকবে মানে হল,  ওদেশে বহু এবং বিরোধি মতামত-রাজনীতি থাকবে এটা মানতে রাজি থাকতে হবে। এছাড়া একথাটাই আরেকভাবে বলা ইনক্লুসিভ [Inclusive] বলে আরেক শব্দের কথা তারা বলে দেয়। যেমন যেকোন রাজনীতি-চিন্তাকে তার সকল বিরোধিতাকারীদেরকেও সাথে পাশাপাশি নিয়ে চল্তে পারতে হবে।  মানে কোন বিরোধি মতামত বক্তব্যকে চাপিয়ে কোনায় ফেলে দেয়া বা কোনঠাসা করে রাখা  – সেটা না করে বরং সবার বক্তব্যই বলতে দিতে হবে, তাতে শেষে কার বক্তব্য ও তা কতটুকু পাবলিক গ্রহণ করবে সেটাই হবে সবকিছুর নির্ধারক। এসবই মোটা দাগে অ্যামেরিকান অবস্থান। মানে সারাংশে বললে, ভারত বা আনন্দবাজারি গোষ্ঠি  ইসলামি রাজনীতি বা ইসলামি জুজুর ভয় দেখালেই আমেরিকা ভয় পেয়ে পালাবে বা হাসিনাকে ফরে ক্ষমতায় রেখে দিবে আর  এই বাজারি গোষ্ঠি এতে সফল হয়ে যাবে – এগুলা বেকুরি সর্টকার্ট ও ধান্দালি চিন্তা।

    এগুলো আসলে কলকাতার কিছু মফস্বলি চিন্তা।  তাদের দুনিয়া বলতে তা কলকাতার মধ্যেই আবদ্ধ বলে মনে করে – এরা আমেরিকাকে আন্ডার এস্টিমেট করছে খামোখা। এসব তো এমনকি জয়শঙ্করই আমল করবে না,  করার কথা না। মোদি-জয়শঙ্কর বরং  ভারতে বাইডেনের পলিসিকে  কৌশলে পাশ কাটিয়ে কিভাবে মোদিকে আবার ক্ষমতাসীন করবে – এই চিন্তায় নির্ঘুম! নিজ মাথার ঘায়ে তারা নিজেরাই পাগল অবস্থায়! যদিও হাসিনাকে জি-২০ এর সভায় ডেকে আনতে পেরেছে বলে এটা মোদি সরকারের বিরাট কূটনৈতিক  সাফল্য বা মোদি আন্তর্জাতিক জগতে এক বিশাল নেতা এসব কথা ছড়িয়ে ভোটের বাক্সে এর ইতি প্রভাব যেন পড়ে ইত্যাদি এসব কান্ড তো মোদি অবশ্য করবেনই!!  এমনকি বাইডেনও জি২০ এর সভায় আসতেছেন; তাই বাংলাদেশের হাসিনার জন্য মোদিই যেন বাইডেনের কাছে সুপারিশ করবেন বলে মোদি প্রপাগান্ডাও করবেন। সেটা নিজে বলবেন না অবশ্যই – তবে কয়েকটা মিডিয়ায় এমন জল্পনা-কল্পনা রিপোর্টও করাতে পারেন। যদিও তা অবশ্যই ওখানেই শেষ হবে; মানে সত্যিই মোদি কী বাইদেনের সাথে কথা বলেছিলেন তা নিয়ে আর কোন রিপোর্ট হবে না। ফুলস্টপ!

    হাসিনা জি-২০ মিটিংয়ে গেলেও বাইডেনের সাথে কোন সাইড-লাইন টকঃ
    আমরা এখনও কেউ জানিনা (এছাড়া এখনও সময় আছে) যে হাসিনা শেষে জি-২০ এর সভায় ভারত সফরে নিশ্চিত যাবেন কী না! ধরে নেয়া যাক তিনি যাবেন। যদি যানও তবু হাসিনার সরাসরি বাইডেনের সাথে বা মোদির মধ্যস্ততায় কোন কথা কী হবার সম্ভাবনা আছে? সাইড লাইনে? অনুমান হচ্ছে এর সম্ভাবনা খুবই কম। এর অন্তত একটা কারণ হল, আমেরিকার সাথে বসে কোন আর লাভ বা পরিস্থিতি হাসিনার পক্ষে আগাবে এমন বাস্তবতা সম্ভবত আর নাই। তা এখন ঢাকায় একেবারেই স্পষ্ট!  যেমন সর্বশেষ যে দুজন কংগ্রেস-ম্যান ঢাকা সফরে এসেছিলেন তা সরকারের জন্য কোন সুখকর কিছু ছিল না। এই সফরে কংগ্রেস-ম্যানদের বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জবাব ছিল এর এক মাপকাঠি। কারণ, মোমেনের জবাব দেখে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল যে কংগ্রেস-ম্যানদের প্রশ্নগুলো কাম্য বা ওয়েলকামিং  নয়! খাস বাংলায় বললে মোমেন -টেরা উত্তর- দিয়েছিলেন।  এছাড়া অতিথিরা ঢাকার পৌছানোর আগেই মোমেন অনেকবারই বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই আগমন ওয়েলকামিং নয়। তিনি বলে দিয়েছেন, নির্বাচনের আগে সরকার আমেরিকার সাথে আর কোন চুক্তিতেই যাবেন না।  অথবা হাসিনার নিজেরই ভারত মহাসাগরে কী ঘটতে যাচ্ছে সংক্রান্ত বক্তব্য থেকে বুঝা যায় তিনি আমেরিকার সাথে সম্পর্কের উন্নয়নের কোন আশা আর সম্ভবত দেখেন না।
    কাজেই এই পরিস্থিতিতে তিনি জি-২০ এর সভায় বাইডেন বা অন্য কারও সাথে কথা বলার আগ্রহে আছে – এটা আমাদের জন্য কষ্ট কল্পিত!
    আর এসব খুটিনাটি দিক বা এর ডেভেলবমেন্ট বিবেচনায় রেখে কথা বলা – এটা আনন্দবাজার বা অগ্নি রায়ের মুরোদের মধ্যে তা আছে এমন মনে হয় না। তার আসলে একটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালানো তাও আবার সেটা মফস্বলি বুঝাবুঝির উপর ভর করে করতে যাওয়া …… না এটাকে এখানেই ছেড়ে যেতে হচ্ছে আমাদের!

    আপডেটেডঃ    ২০ আগষ্ট ২০২৩;  রাত ০১ঃ ৫৩
    আপডেটেডঃ     ২০২৩;

    >>
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com