Tag: সুমিত গাঙ্গুলী

  •  “বাংলাদেশে ভারতের কপাল পুড়তেছে” – সুমিত গাঙ্গুলী 

     “বাংলাদেশে ভারতের কপাল পুড়তেছে” – সুমিত গাঙ্গুলী
    গৌতম দাস
    ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪  সকাল ১০ঃ ৪১
    https://wp.me/p1sCvy-67F

     

    Sumit Ganguly

     

    চলতি বাইডেন প্রশাসন মানে যার ক্ষমতার আয়ু আগামি ২০ জানুয়ারি ২০২৫,  ট্রাম্পের শপথের মধ্য দিয়ে শেষ হতে যাচ্ছে – সেই বাইডেন প্রশাসনের ফেভরিট মিডিয়া ছিল আমেরিকার “ফরেন পলিসি” পত্রিকাটা; বাইডেন প্রশাসনের গৃহিত নীতি-পলিসি বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে এশিয়ায় আমাদের মত দেশে কী প্রতিক্রিয়া আনছে তা বুঝা ও বাইডেন প্রশাসনের কাছে পক্ষের লোকজনকে পৌছে দেওয়ার জন্য এখানে লেখালেখি করতেন। এই ছিল “ফরেন পলিসি”  এর সাথে এরেঞ্জমেন্ট। আবার এর মাধ্যমে যদি এশিয়ান স্থানীয় জনমতও প্রভাবিত করা যায় সেটাও বাড়তি। যেমন ধরেন এমনই এক থিঙ্কট্যাংক ফেলো কুগেলম্যান; তিনি এখানে প্রতি সপ্তাহে এশিয়াতে বাইডেন প্রশাসনের স্বার্থগুলো কোন দিকে হাঁটছে বা লাইনে আছে কিনা এর আগাম ইঙ্গিত প্রশাসনকে জানাতে নিয়মিত লেখা ছাপতেন তিনি এই ফরেন পলিসি পত্রিকায়।  আরো সুনির্দিষ্ট করে যেমন ধরেন, গত ১০ ডিসেম্বর ২০২২ বিএনপি এক কালজয়ী সমাবেশ করেছিল সায়েদাবাদ-গোলাপবাগ মাঠে; হাসিনার শত বাধা সত্বেও তা উপেক্ষা করে। অথচ এই কুগেলম্যান লিখলেন এটা তেমন কোন সমাবেশই নয়! কারণ, কুগেলম্যান সম্ভবত জানতেন, পরের সাত মাসের মধ্যেই মানে সেপ্টে. ২০২৩ বাইডেন-লু পল্টি মারবেন। বিরোধীদলকে রাস্তায় নামানোর পরে হঠাত তাদের হাত ছেড়ে দিবেন। আর উলটা হাসিনার হাত ধরেই “আমরা একসাথে কাজ করব” বলে হাসিনাকে চিঠি (৫ ফেব্রু.২০২৪) লিখবেন!  আর এসবের আগে, আরেকবার হাসিনাকে (৭ জানু.২০২৪) ভোটচুরির ক্ষমতায় হাসিনাকে আসীনে সহায়তা করবেন। ভোটচুরি দেখেন নাই ভান করবেন!  আশা করি পাঠক এখন বুঝতে পারছেন “ফরেন পলিসি”  কী ও কত প্রকার! তো সেরকমই “ফরেন পলিসি”  তে এমন আরেকজনও  প্রায়ই লিখেন এমন কলামিস্ট ব্যক্তিত্ব হলেন সুমিত গাঙ্গুলী।

    [যারা বিস্তারিত পড়তে চান না তারা নিচের প্যারাটা বাদ দিয়ে পরের প্যারায় চলে যেতে পারেন।]
    সুমিত গাঙ্গুলী নামটা শুনে মনে হতে পারে তিনি ইন্ডিয়ার মানে অন্তত কলকাতায় জন্ম ও বড় হয়েছেন নিশ্চয়! কথাটা আংশিক সত্য! যদিও হ্যা, তাঁর নাম থেকে বুঝা যায় তিনি মানে তাঁর ফ্যামিলি কলকাতার ব্রাহ্মণ কোন পরিবার। কিন্তু  সুমিত গাঙ্গুলীর জন্ম ও বেড়ে উঠা ঠিক কী কলকাতায় বা ইন্ডিয়ায়? না, নেটে খুঁজে তা কোথাও পাওয়া যায় না।  বরং জানলাম তিনি আমেরিকার কেন্টাকি রাজ্যের খুবই সস্তা টিউশন ফি [দানের চাঁদা তুলে চলা বলে] এর এক কলেজ হল Berea College । আর সেখান থেকে গ্রাজুয়েশন-অনার্স  দিয়ে তাঁর একাদেমিক লাইফ শুরু করেছিলেন। আর এখন? এখন তিনি পুরা দস্তুর এক আমেরিকান (ভারতীয় নয়) একাদেমিসিয়ান; আর অন্তত দুডজন ইন্সটিটিউট বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তিনি জড়িত।  শুধু আমেরিকান হুভার [Hoover Institution] ইন্সটিটিউট মানে প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডালিসা রাইস যার ডিরেকটর সেই হুভার ইন্সটিটিউট থেকে সুমিত গাঙ্গুলির যে পরিচয়টা হুভার দিয়েছে সে তথ্য প্রায় আধা পাতা জুড়ে ঠাসা বিশ্ববিদ্যালয় আর ইন্সটিটিউটের নামে। সেই লিঙ্ক এখানে দিলাম আগ্রহিদের জন্য।  তবে সবচেয়ে মজার কথা হল, উইকি যা লিখছে -“Sumit Ganguly is an American political scientist. He is a senior fellow at the Hoover Institution and a professor of political science at Indiana University … “। অর্থাৎ সুমিতের পড়াশুনার ভিত্তি হল পলিটিক্যাল সাইন্স কিন্তু তিনি আমেরিকান (কোন ভারতীয় নন) পলিটিক্যাল সাইনটিস্ট। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হুভার ইন্সটিটিউটে হান্টিংটন প্রোগ্রাম এর পরিচালক তিনি। আসলে ক্যালিফোর্নিয়ার স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে (খরচ-বাজেটের দিক থেকে নিজস্ব পরিচালনা বোর্ড আছে) এমন যে “হুভার ইন্সটিটিউশন”  যা মূলত এক কনজারভেটিভ থিঙ্কট্যাংক। আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল, হুভারে তিনি এখানে ইন্ডিয়া-আমেরিকা সম্পর্ক খুবই শক্ত করা যায় কী করলে [Huntington Program on Strengthening US-India Relations] তেমন এক প্রোগ্রাম চালান।
    তবে সম্ভবত আরো বিষ্ময়কর হল ব্লুমিংটন শহরে  যে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি আছে সেখানে ভারতীয় সংস্কৃতি চর্চার এক টেগোর চেয়ার [নামেই রবীন্দ্র গবেষণা ফান্ড বলতে পারি] এরও বড় কর্তা তিনি।

     

    কেন সুমিত গাঙ্গুলীঃ
    এতক্ষণ ধরে কেন সুমিত গাঙ্গুলীর পরিচয় নিয়ে এত কথা বললাম! এক নম্বর কারণ, তিনি আমেরিকা-ইন্ডিয়ার সম্পর্ক শক্ত রাখার এক গবেষণার বড় কর্তা। আর দুই নম্বর কারণ হল, তিনি ঐ “ফরেন পলিসি”তে গত ১৬ ডিসে. ২০২৪ এক কলাম লিখেছেন যার শিরোনাম হল, “বাংলাদেশে ভারতের কপাল পুড়তেছে” [India’s Fortunes Shift in Bangladesh]। এই একই লেখার বাংলা অনুবাদ করে অবশ্য ছেপেছে আমাদের মানবজমিন ২০ ডিসে. ২০২৪ শিরোনাম, “ঢাকা প্রসঙ্গে বদলাতে পারে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি“।

    এখন আমাদের অনেকের নিশ্চয় মনে আছে ট্রাম্পের বিজয়ের পর থেকে মোদির বিজেপি শুধু না খোদ শেখ হাসিনাও খুশিতে নেচে আমাদের ভয় দেখাচ্ছিলেন যে এইবার তাদের ট্রাম্প-ভাইয়া এসে পড়েছেন; আর চিন্তা নাই; তিনি নিশ্চয় এবার মোদিকে দিয়ে বাংলাদেশে হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় বসায়ে দিবেন???
    সাথে আরো আছে যে আর চিন্তা কইরেন না তুলসি গাবার্ড [Tulsi Gabbard, এককালে ইসকনের চেলা ও দুবছরের জন্য কংগ্রেস মেম্বার ও ‘র’-এর সাথে কাজ করা]  ট্রাম্প বাবাজি তাঁর নির্বাচনি প্রচার কালে হঠাত করেই তুলসিকে তাঁর দলে ভিড়িয়ে নিয়ে স্টেজে তুলেছিলেন।  দলে ভিড়িয়ে নেয়া বললাম এজন্য যে মোদি যে তুলসি কে চিনতেন তিনি ডেমোক্রাট দলীয়। পরে তিনি ডেমোক্রাট দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। এবং এরপর থেকে ইন্ডিয়া বা র-এর সাথে  তুলসির আর সম্পর্ক আছে কিনা তা জানা যায় না। কিন্তু তবু কর্মিদের চাঙ্গা রাখতে বিজেপি মা মোদি তুলসি আসছে বলে প্রপাগান্ডা শুরু করে দিয়েছে।

    বাংলাদেশে ভারতের কপাল পুড়তেছে – কথার অর্থ তাতপর্য কীঃ
    এমনিতেই মোদির ট্রাম্প ভাইয়া আসতেছে প্রপাগান্ডায় ট্রাম্প আসলে – কী ইন্ডিয়া নীতি – নিয়ে এবার ক্ষমতাসীন হচ্ছেন সেদিকটা মোদি সামনে বা আমাদের জানতে আগ্রহী নন। কিন্তু কঠিন সত্যিটা হল আগামি ২০ জানু ২০২৫ শপথের পরের দিনগুলোতেই ট্রাম্পের ডিপোর্টেশন [deporation] মানে বিদেশি অভিবাসী (শ্রমিক, হোয়াইট কালার সব) খেদানো প্রোগ্রাম শুরু হয়ে যাবে। ইন্ডিয়ার দৈনিকগুলোর শিরোনাম হল প্রথম পর্যায়েই “18,000 Indians At Risk Of Deportation……”  মানে প্রাথমিক ধাক্কায় ১৮ হাজার ইন্ডিয়ানক্র বের করে দেয়া হবে। এটা গত ১৪ ডিসেম্বরের ইন্ডিয়ার প্রধান নিউজ ছিল। তবে এটা মনে করা ভুল যে এটা কেবল ইন্ডিয়ার বেলায়; বরং এটা কমবেশি সব দেশের বেলাতেই সত্য; এমনকি বাংলাদেশি যারা হাসিনার আমল দেখায় এই অজুহাতে আমেরিকা ঢুকেছে তারাও ডিপোর্টেশনের আওতায় আসবেন। আর ওদিকে ল্যাটিন আমেরিকা মেক্সিকো ইত্যাদি তো বটেই এমনকি কানাডার বিশেষ সুবিধা যা ছিল তাতে টান পড়বে (কানাডাকে আমেরিকান রাজ্য হয়ে যেতে বলা) ইত্যাদি এসব কিছু।
    এর সাথে আছে যারা এর আগে আমেরিকায় মাইগ্রেন্ট হয়ে পরে একটা (নাগরিকত্ব নয়) রেসিডেন্ট পারমিট হাতে পেলেই (মানে বসবাস ও কাজে যোগ  দেওয়ার অনুমতি প্রাপ্ত হয়েছে), এরপর এদের কোন সন্তান আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করলেই তারা আমেরিকান নাগরিক হয়ে যেত; এই শর্ত এখন ২০ জানু. ২০২৫ থেকে প্রত্যাহার করা হবে।  ফলে বাংলাদেশের যারা আগেভাগে দেশে ছুটে এসে এরা (বিএনপির খেদমতে বিশেষত মিডিয়া জগতে ঢুকে পড়ার জন্য) ডেনপারেট তারা ঠিক হাসিনা পতনের জন্য না ট্রাম্প এসে পড়ছে বলেই তাদের এই আমেরিকা ত্যাগের মরিয়া অবস্থা আর বিএনপির নেতাদের পিছনে লাইন দিয়ে খাড়া হয়ে যাওয়া।  এমনকি H-1B ভিসায় (টেকনোলজি জ্ঞান থাকাদের জন্য যেমন আইটি টেকনোলজি) বিশেষ করে ভারতীয়রা যেমন এতদিন ধরে নিত যে এই H-1B ভিসা থেকে তাদেরকে আমেরিকা সহজে বের করে দিতে পারবে না;  এমন ভিসাধারীরাও এখন একই ভাবে অনিশ্চিত নড়বড়ে হবে। একাজে ট্রাম্পকে বুদ্ধিদাতা আর সবচেয়ে ঘনিষ্ট দোস্ত হল ইলন মাস্ক [Elon Musk] যিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা [AI Tech] টেকনোলজিতে বড় বিনিয়োগকারি।  মানে হল। আইটি প্রোগ্রামার বলে যে পেশাটা আমাদের মত দেশগুলা চিনি এই পেশা বা এরা হল তাদের কাজে প্রোডাক্ট তৈরিতে সবচেয়ে শ্রমঘন লেবার অংশটা  – মানে কোড বসানোর কাজ হল এদের।  আর এটাই এলন মাস্ক মনে করেন AI Tech দিয়ে করানো সম্ভব।   ফলে H-1B ভিসায় টেকনোলজিস্টদের ভারত থেকে আনা আর তত জরুতি থাকবে না।  এই হল ইলন মাসকের দাবি!

    আর এবারের ট্রাম্প প্রশাসনে সবার উপরে  যে মূল নীতি-পলিসি হতে যাচ্ছে এর কেন্দ্রটা হল – টেকনিক্যাল ভাষায় ইকোনমিক ন্যাশনালিজম। [এনিয়ে আমার প্রথম পর্বের ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। পরে আরও দুই ডিটেল পর্ব আসতেছে] । সোজা বাংলায় আমদানি-রপ্তানি কমানো; বিশেষ করে আমদানি; আর সেজন্য অন্য যেকোন দেশের পণ্যের উপরেই নুন্যতম ১০% আমদানি ট্যাক্স বাড়ানো আর চীনের মত দেশের বেলায় নুন্যতম ৬০% ট্যাক্স আরোপের এক অর্থনীতি তিনি চালু করবেন। এক কথায় যাই নিজ দেশের মানুষ ভোগ-ব্যবহার করবে এমন সব পণ্য দেশেই যেন হয় সেই মুখি এক অর্থনীতি! তবে একটা হল সেই কল্পিত আকাঙ্খাটার [imagined aspiration] কথা বললাম। বাস্তবে তা কতদূর কী করা যাবে সেটা আলাদা প্রশ্ন!

    কথাটা শুনে এলেখার বেশির ভাগ পাঠক নীতি হিসাবে এটাকে খুবই ভাল মনে করবেন হয়ত; কারণ আমরা বেশির ভাগ পাঠক আসলে জাতিবাদি – নিজেই কামাবো আর নিজেই খাব এর চেয়ে ভাল আর কী নীতি হতে পারে। ধারণাটা মোটা দাগে এধরণের।  আমরা, আমরা আর আমরাই! কিন্তু আমি সরি; এই নীতি এখন যতই শুনতে ভাল লাগুক না কেন এটা এখন অকেজোই শুধু না বাস্তবায়নও অসম্ভব। স্রেফ এককালের কাগুজে কল্পনা।  বিশেষ করে ১৯৮০ সালের পরে দুনিয়ার অর্থনীতি এ্টা ত্যাগ করে অন্যদিকে চলে গেছে।  এমনই অন্যদিকে যে সেটা আর পুরানা দিনে বা চেহারায় ফেরানো অসম্ভব, ফলে অ-বাস্তবানযোগ্য এক কল্পনা মাত্র।
    কেবল একটা মন্তব্য করব এখানে বিস্তারে যাব না,  কমিউনিজম এর (মার্কসের নয় স্টালিনের বুঝের মার্ক্সবাদি) অর্থনীতি এর বুঝও ছিল ঠিক এটাই। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প যেটা করতে চাইছেন এটা সেটাই। যদিও মিলটা কাকতলীয় মানে, ট্রাম্প কমিউনিস্ট হতে চলেছেন ব্যাপারটা  ঠিক তা নয়। তবে সারকথাটা হল আন্ত-রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য অদরকারি জিনিষ!  মনে করা – এমন এই বোকা বোধ! আর একটা লাইনে বলিঃ এর মানে হল, কল্পনা করেন বাংলাদেশ থেকে সব গার্মেন্টস বা লেদার প্রডাক্ট রফতানি বন্ধ ফলে কারখানাও বন্ধ; কিংবা আপনাদের গর্বের পাট রপ্তানি অপ্রয়োজনীয় – এমনটা মবনে করলে যা হবে এটা তাই! বিস্তারে পরে অন্য কোথাও আনবো ইস্যুটা। আর এটাই টেকনিক্যাল ভাষায় ইকোনমিক ন্যাশনালিজম; যেটা ট্রাম্প প্রশাসনের মুখ্য নীতি পলিসি হতে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদেরেকে এই লেখার মূল প্রসঙ্গে ফিরে যেতে হবে, ফলে নিচে সেদিকে যাচ্ছি…।

    অর্থাৎ  ইন্ডিয়া -আমেরিকা সম্পর্ক যেটা মুখ্যত ক্রম-উত্থিত গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হয়ে উঠতে চাওয়া চীন, এই চীনকে ঠেকাতে ভারতকে ব্যবহার করা (বিনিময়ে বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার হাতে তুলে দেয়া) – এটাই ছিল এই নয়া শতক ২০০১ সাল থেকে আমেরিকান নীতি। যার আয়ু এখন প্রায় ২৪ বছর; আর এতদিনে এখন আমেরিকান নীতি-নির্ধারণী মহলের অনুভব হল এই নীতি-পলিসি আকামের; এতে কোনই লাভ হয় নাই; সব পন্ডশ্রমে গেছে। তাই ২০০০ সালেরও আগের ইন্ডিয়াবিরোধী (বঙ্গোপসাগর, আন্দামান বা উপরের নর্থ-ইস্ট বা বার্মা ইত্যাদি কেন্দ্রিক) যা কিছু স্ট্রাটেজি আমেরিকার ভাবনায় ছিল (কিন্তু ভারতকে জড়িত করে চীন ঠেকানোর লোভে) পরে  সেসব নীতি কার্পেটের নিচে লুকায় ফেলে রেখেছিল এতদিন আমেরিকা। সেসব নীতি-ইচ্ছা-খায়েশগুলো আমেরিকার এখন বের করে আনছে।

    দুঃখ আর হতাশার কথা সুমিত এখনও কলকাতার হিন্দুত্ববাদী জমিদার ব্রাহ্মণের দৃষ্টিভঙ্গিতেঃ
    উপরে ইন্ডিয়া-আমেরিকা সম্পর্কে যে ব্যাপক পরিবর্তন ট্রাম্প আনতে যাচ্ছেন সে সম্পর্কে সুমিত গাঙ্গুলী টের পেয়েছেন বা জানেন এমন কোন বাক্য বা ধারণার ইঙ্গিত তার পুরা লেখার মধ্যে কোথাও নাই! মূলত াজকের নয়া পরিস্থতিতে মোদি বাংলাদেশের উপর আগের মত আধিপত্য এর কিছুই পাবেন না; সব সে খুইয়েছে। আর এটার কারণেই সুমিতের দেয়া শিরোনাম “বাংলাদেশে ভারতের কপাল পুড়তেছে” এর আসল অর্থ; যদিও তা বুঝে সুমিত এই শিরোনাম দেন নাই। তিনি মূলত বলতেছেনঃ  হাসিনা ইন্ডিয়ার বসানো পুতুল-ক্ষমতা ছিল ফলে ইন্ডিয়ার তাতে সব সুবিধা ছিল কিন্তু হাসিনা এখন উতখাত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না যে হাসিনা আবার ক্ষমতায় ফিরতে পারবেন – অতএব একারণেই ভারতের কপাল পুড়েছে।

    সুমিত যিনি প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে আমেরিকায় একাদেমিক জীবনে আছেন এবং বিরাট পদবী ও ক্ষমতায় আমেরিকা-ইন্ডিয়া সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ বলে পরিচিত; অথচ ট্রাম্পের হাত ধরে  আমেরিকা-ইন্ডিয়া সম্পর্ক যে নয়া মোড় উলটা যাত্রা নিচ্ছে; ইন্ডিয়া আর আমেরিকার জন্য অত গুরুত্বপুর্ণ থাকছেনা – (কারণ চায়না কনটেইনমেন্ট  বা গত ২০১০ সাল থেকে নেয়া “চীন ঠেকানোর” আমেরিকান নীতি আজ অকেজো প্রমাণিত) অথচ এদিকটা নিয়ে সুমিত একেবারেই বেখবর? এটা অবিশ্বাস্য এবং এতে তাঁর চিন্তার স্টুপিডিটি বা সীমাবদ্ধতা বাইরে প্রকাশিত! আর এতে ফাইনালি তিনি যে এক ইসলামবিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদী জমিদারি আধিপত্যের মধ্যেই আছেন তাও প্রতিভাত!  পঞ্চাশ বছর আমেরিকায় কাটানো একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একাদেমিক  আর  উনার পাশাপাশি একজন যে এই পুরাটা সময় কলকাতা নিবাসী আম-হিন্দুত্ববাদী বাসিন্দা ছিলেন – এমন দুজনকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করলে দেখা যাবে  এদের মধ্যে আসলে কোন ফারাকই জন্ম নেয় নাই!!!! অবিশ্বাস্য! ছোট থেকে মা, দাদি-নানির কোলে শুয়ে যে মুসলমানবিদ্বেষী গল্প শুনেছে সেগুলোও একজন আমেরিকা নিবাসী লাগাতর পঞ্চাশবছর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একাদেমিককে কী এখনও তাড়া করে? কীভাবে? তিনি কীভাবে এসব আবর্জনাকে এখনও তাঁর চিন্তার মূল কাঠামো বানিয়ে রাখতে পারেন???

     পঞ্চাশ বছরের আমেরিকান একাদেমিক লাইফ কাটানো সুমিত বেচারার দুঃখঃ 
    এক. সুমিত লিখছেন, “যারা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সাহায্য করেছিল তাদের মধ্যে ইসলামপন্থী এবং ভারতবিরোধী দল রয়েছে” ????? আচ্ছা এর মধ্যে অস্বাভাবিক জিনিষটা কী? হাসিনা আর মোদি মিলে যদি বাংলাদেশকে গুম-খুন-অপহরণের আয়নাঘর বানায় রেখে  ১৫ বছর ধরে দেশটা চালায় তো তাতে তো  হাসিনা উতখাতে বাংলাদেশের সব অংশের জনগণের অংশগ্রহণ থাকাটাই স্বাভাবিক; নাকি? ইসলামপন্থি মানে ইসলামি রাজনৈতিক দল হলে এটা অপরাধ হবে? – এটা কেমন বোধ উনার? এটাই তো গভীর মুসলমান ঘৃণা!  কিন্তু উত্তরপ্রদেশের বুলডোজার মুখ্যমন্ত্রী যোগী যাকে ভারতের সুপ্রীমকোর্ট তিরস্কার করেছেন, কাজকে অপরাধের ঘটনা বলে সাব্যস্ত করেছেন অথবা বজরং দলের ততপরতা হলে এসব কী সুনিত দেখতেই পান না?  সব মাফ হাততালি দিবেন উনি? মানুষ হিসাবে নিজের সব ইন্দ্রিয়-বোধ সব ভোতা করে রেখে দিয়েছেন উনি? তাইকি?

    আবার তার আরেক নয়া আবিস্কার দেখেন।
    দুই. তিনি লিখেছেন, “ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে, বাংলাদেশ থেকে অনিয়মিত অভিবাসন সর্বদাই একটি জটিল সমস্যা ছিল-যে সরকারই অফিসে থাকুক না কেন……“।  আমি খুবই সরি, এটা আসলে একটা গাধার বক্তব্য।  অভিবাসন বা মাইগ্রেশন শব্দের  অর্থ উনি বুঝেন না এটা ভাবা আমাদের জন্য কঠিন। কোন একটা দেশ যেমন ইন্ডিয়া তাদের বাড়তি লেবারের চাহিদা থাক আর না থাক সেখানে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের হিন্দুরা প্রবেশ করে বসবাস করে। এখন ১৯৪৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা ভারতে বা মুসলমানেরা বাংলাদেশে আসা – এটা কী কারও শখের অভিবাসন? এটা কে কী অভিবাসন বা ইমিগ্রেশন বলছেন উনি কোন বুদ্ধিতে?  নাকি এটা ফোর্সড বা বাধ্য করার এক সামাজিক অবস্থা।  – যা ১৮১৫ সালের রাজা রাম মোহনের চিন্তাততপরতা থেকে শুরু করে কংগ্রেসের জন্ম ও হিন্দুত্ববাদী ভারত বানানোর ইমাজিনেশন পরিকল্পনারই এক করুণ পরিণতি!!! দ্বিতীয়ত ও সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস হল,  বাংলাদেশ থেকে মূলত তুলনামূলক অবস্থাপন্ন  হিন্দুরাই ভারতে গিয়েছে অর্থাৎ তারা তাদের সঞ্চিত সম্পদও সাথে নিয়েই গিয়েছে যেটা কলকাতার অর্থনীতিতে বাড়তি পুঁজির সরবরাহের উতস হিসাবে কাজ করেছে। ফলে কোন সংজ্ঞায় – বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের যাওয়া – এটাকে তিনি অভিবাসন বলছেন? আসলে গাধা-গরুর ধরনের চিন্তারও একটা ক্লাস থাকে! আবার ১৯৪৭ এর পরে কলকাতার অর্থনৈতিক পতন হয়েছে পুর্ববাংলা হাতছাড়া হওয়াতে। কারণ পুর্ববাংলার জমিদারেরা তাদের কালেকশন কী ঢাকায় রাখতেন???  না কলকাতায়? এটা বুঝতে কী ডক্টরেট ডিগ্রি লাগে?  আর সেটাই মানে সেই জমিদারিই তো উচ্ছেদ হয়ে যায় পুর্ববাংলা থেকে  পাচার হওয়া সেই বাড়তি সঞ্চিত পুঁজি থেকে বঞ্চিত হয় কলকাতা!!! এখন সুমিত আপনি বলেন, আপনি এজন্য কাকে দায়ী করবেন? এর জন্য দায়ী যারা হিন্দুত্বভিত্তিক অখন্ড ভারত বানাতে চেয়েছিল সেই কংগ্রেস নয় কী? সাহস আছে আপনার? থাকলে চিল্লায় বলেন দেখি?  বুঝা যাচ্ছে যা উনার সাবজেক্ট না, দখল নাই তা নিয়ে তিনি কথা বলছেন!!!

    তিন. তিনি লিখছেন, “…কিছু ভারতীয় প্রতিবেদন বাংলাদেশের মাটিতে পরিস্থিতিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে, কিছু ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ হিসাবে চিত্রিত করা হয়েছে”!  অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন মোদির এই বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগ – এটাকে তিনি ঠিক মনে করছেন না। ভালো, এটা তিনি বুঝছেন! তাই বলছেন এটা তারা  ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে, তাই কিছু ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ হিসাবে চিত্রিত দেখানোটা ভুল মনে করছেন।

    কিন্তু আবার সেই ঘৃণার লাইনঃ
    লিখেছেন,  “হাসিনা বাংলাদেশের ইসলামপন্থী বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন,
    ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনকে আশ্রয় দেননি এবং ভারতীয় বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে এসেছেন। প্রতিক্রিয়ায়, নয়াদিল্লি হাসিনার অধীনে ঢাকায়  গণতন্ত্রের অভাব উপেক্ষা করতে, ভারতীয় বাজারে প্রবেশাধিকার প্রদান করতে এবং আন্তঃসীমান্ত রেল ও সড়ক যোগাযোগ বাড়াতে ইচ্ছুক ছিল।”
    এর মানে কী এখন বাংলাদেশের “ইসলামপন্থী বাহিনীকে” তাহলে নিয়ন্ত্রণ করছে কে? মোদি??? দেখেন এই লোকের কথার কোন তাল আছে? আবার দেখেন আগে লিখতেছিলেন শুধু ইসলামপন্থী, আর এখন সাথে লিখতেছেন ইসলামপন্থী বাহিনী? সারা দুনিয়াতেই বুশ যদি ওয়ার অন টেরর এর নামে সন্ত্রাস চালায় তো এর প্রতিক্রিয়ায় সারা দুনিয়ায় ইসলামপন্থী বাহিনী বা ইসলামপন্থী  হওয়া ছাড়া আর কী হবে? মানে বাংলাদেশের কেউ বুশের প্রতিবাদ করবে না?   আর বাংলাদেশ কী দুনিয়ার বাইরে?
    এছাড়া আরেকটা মারাত্মক দিক আছে। সুনিত নিজেই বলছেন বাংলাদেশে হাসিনা মোদির সাথে মিলে ঢাকায়  গণতন্ত্রের অভাব উপেক্ষা করেছে – তাহলে এই দোষ কার? আবার মোদি বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার একচেটিয়া বাজার বানিয়েছে আর বিনা পয়সায় করিডোর সুবিধা নিয়ে গেছে – এসব কথা সুমিত নিজেই স্বীকার করছেন। তাহলে বাংলাদেশের মানুষ যেকোন পন্থি হয়ে হাসিনাকে উতখাত তো করবেই, নাকী? তো তাহলে ইসলামপন্থী হওয়াটা অস্বাভাবিক কীভাবে???

    হাসিনা তার শাসন আমলে যত কী তার রাজনৈতিক বিরোধী ছিল তাদেরকে তিনি গুম-খুন আয়নাঘর করেছেন – তাদের গায়ে মিথ্যা ইসলামি জঙ্গীর ট্যাগ লাগিয়ে তাদেরকে নিচা দেখায়ছেন।। মজার কথা হল এটা আমার কথা না। এবার মানে ২০২৩ সালের আমেরিকান সন্ত্রাস বাদ ও প্রতিরোধ রিপোর্ট ২০২৩ যা সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে  এতে বাংলাদেশ চাপ্টারে আমেরিকাই একথা লিখে স্বীকার করেছে।  কিন্তু আমেরিকায় বসে থেকে এই হিন্দুত্ববাদের চেলা কলকাতা বামুন সুমিত গাঙ্গুলী সেটা টের পান নাই; খবর করে নাই! নেন প্রথম আলোর বাংলা করা অংশটাই দিলাম। শিরোনাম দেখেন, …“রাজনৈতিক বিরোধিতাকে সন্ত্রাসবাদ বলে চালিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার“।  আবার এখানে ইংরাজি মূল রিপোর্টটাও দিয়ে রাখলাম সুমিত গাঙ্গুলীর জন্য [Country Reports on Terrorism 2023: Bangladesh] – আমেরিকায় বসে উনি এটা নাও খুঁজে পেতে পারেন!!!

    আসলে এসব সুমিত গাঙ্গুলীরা আমেরিকার জন্যও  কলঙ্ক! এরা এখনও কুয়ার ব্যাঙ হয়ে জমিদার-হিন্দুর বয়ান আগলে ওর উপরে বসে আছে। অথচ সুমিত খোদ আমেরিকান সরকারের বয়ান না পড়ে, আমেরিকাতেই বসে আছে্ন।  আর তীব্র মুসলমানবিদ্বেষী হয়ে আমাদেরকেই ইসলামপন্থী (যারা হাসিনাকে উতখাত করেছে) বলে ট্যাগ লাগাইতেছেন; এছাড়া আমরা নাকি সশস্ত্র এর ইঙ্গিত দিতে  ইসলামপন্থী বাহিনী লিখেছে!!!

    আবার কত নিচা মনের কলকাতার কোন স্টেশনের এক  ফেরিওয়ালা যেন তিনি!!! তাই তার এই লেখা শুরু করেছেন,  কেন বাংলাদেশে পাকিস্তান থেকে বাণিজ্যের মালবাহী জাহাজ কেন বাংলাদেশে ভিড়ল। আবার লিখেছেন …Dhaka has also boosted its acquisition of arms and ammunition from Islamabad। মানে ইউনুস সাহেব পাকিস্তান থেকে নাকি অস্ত্র আমদানি করেছেন। অথচ এই তথ্যের কোন সোর্স কোথাও নাই।  কলকাতার কোন বস্তিবাসীও এমন নাইভ বা ভোতা চিন্তার মানুষও এমন বক্তব্য দিবে না।  অথচ তীব্র মুসলমান ঘৃণা মনে পুষে রেখে স্মিত গাঙ্গুলী –   মুসলমান মানেই খারাপ, মুসলমান মানেই জঙ্গী, মানেই অস্ত্রবাজ এসব হচ্ছে তার বমি!!!! …… সুমিত গাঙ্গুলী একজন স্কলার পেশার লোক এত ঘৃণা আর এত মিথ্যা লিখতে গিয়ে টায়ার্ড হয় না?????

    তবে শেষকথাটা হল, বাংলাদেশে মোদির খবর আছে এইটা যেদিক দিয়েই তিনি বুঝছেন বলে আমাদের জানাইছেন! তাই শিরোনাম দিছেন  [India’s Fortunes Shift in Bangladesh]।

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ  বিকাল ৪ঃ ৩২    ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪

  • “ভূমিধস বিজয়” দেখে ভারতের মিডিয়ায় শঙ্কা

    “ভূমিধস বিজয়” দেখে ভারতের মিডিয়ায় শঙ্কা

    গৌতম দাস

    ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৩

    https://wp.me/p1sCvy-2wO

     

    –

    বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে; অফিসিয়াল ফলাফল প্রকাশ, শপথ নেয়াসহ মন্ত্রিসভা গঠন পর্যন্ত সম্পন্ন হয়ে গেছে। সরকারের দেশি-বিদেশি সুবিধাভোগীরা এই বিজয়কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইংরেজি শব্দ ‘ল্যান্ড-স্লাইড ভিক্টরি’ [Land Slide Victory], বা বাংলায় “ভূমিধস বিজয়” শব্দ দিয়ে নির্বাচনী ফলাফল ব্যাখ্যা করছে। কারণ, দাবি অনুযায়ী এই ফলাফলে  ২৯৮ আসনের মধ্যে ২৮৮ আসন আওয়ামী জোটের ব্যাগে এসেছে। অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ আসন পেয়েছে সরকার। তাই অফিসিয়ালি ফলাফলে ৯৭ শতাংশের বিজয়কে ব্যাখ্যা করতে গেলে ভূমিধস ধরনের শব্দ খুঁজে এনেই সম্ভবত একমাত্র এমন পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করা যায়।

    কিন্তু ভারতের মিডিয়ায় বিস্ময়কর এক “কিন্তু” আমরা লক্ষ করছি। নির্বাচনী ফল প্রকাশিত হওয়ার অন্তত এক দিন পর থেকেই ভারতের মিডিয়ায় এই ফলাফল নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ শুরু হতে দেখা যাচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে ততই তারা বিভিন্ন মত ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে তাদের অস্বস্তিকর মন্তব্যগুলো প্রকাশ করে যাচ্ছে। আর এতে প্রায় প্রত্যেকের রিপোর্টের শিরোনামে ‘যদি’, ‘কিন্তু’ ধরনের শব্দ দেখা যাচ্ছে। যে বক্তব্যগুলোর সারকথা হল, তাদের অনুমান এই নির্বাচনী ফলাফল ভারতের স্বার্থের জন্য অন্তত লং টার্মে বা শেষ বিচারে শুভ ইঙ্গিত নয়। খারাপ কিছুর কু-ইঙ্গিত। তাই এখান থেকেই ফলাফল গ্রহণে অস্বস্তির শুরু। ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত এমন মন্তব্য-প্রতিক্রিয়াগুলো থেকে কয়েকটা এখানে তুলে এনে আলোচনা করা হল।

    একঃ কাঞ্চন গুপ্ত
    যেমন ভারতের এমন ‘কিন্তু’ দৃষ্টিভঙ্গির মন্তব্যের এক লেখক হলেন কাঞ্চন গুপ্ত। তিনি সবার চেয়ে আগে, অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর, নির্বাচনের পরের দিনই কাঞ্চন গুপ্তের লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। আর তার লেখা ছেপেছে আবার ভারতের প্রভাবশালী বেসরকারী থিঙ্কট্যাঙ্ক “অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন”। যদিও কাঞ্চন গুপ্ত তাদের নিজেদের স্টাফ নন, তাই বাইরের লেখকের লেখা হিসেবে তারা ছেপেছে। কাঞ্চন গুপ্তের পরিচয় খুবই কম করে বললেও তা হল, তিনি একসসময়ের বাংলাদেশ (পুরানা পুর্ববঙ্গের) এক ব্রাক্ষ্মসমাজ পরিবারের সদস্য, এখন দিল্লি-নিবাসী এক প্রবীণ সাংবাদিক; যার আবার চলতি শতকের শুরুতে বিজেপি প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ি বা মন্ত্রী আদভানির টেকনিক্যাল এইড বা মিডিয়াসংক্রান্ত সহকারী হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে। তারই লেখার শিরোনাম হল, “বাংলাদেশে এখন একদলীয় গণতন্ত্র’[Bangladesh now one-party democracy] । একদিক থেকে দেখলে এটা কোন খাতির বাছবিচার ছাড়া খুবই খাড়াভাবে তাঁর বক্তব্য হাজির করা হয়েছে। এছাড়া ঐ লেখার ভেতরের বিশেষ জোর দেয়া কিছু বুলেট বক্তব্য আছে। সেখান থেকে তুলে আনা এমন চারটা বক্তব্য হলঃ
    যেমন- ১. “সব ব্যবহারিক অর্থে বাংলাদেশ এখন একটা একদলীয় রাষ্ট্র, যদিও ঐ দেশে এখনও “কিছু আসে-যায় না” ধরণের কয়েকটি দল রয়ে গেছে – যেন এটি প্রমাণ করার জন্য যে কনস্টিটিউশনাল বর্ণনায় বাংলাদেশ বহুদলীয় রাষ্ট্র”। [For all practical purposes Bangladesh is now a single-party state with inconsequential parties keeping alive the country’s constitutional description as a multiparty democracy.]
    ২. ” অভিযোগ হল, আওয়ামি লীগ ভিন্নমতকে নিশ্চুপ করে এক নির্বাচন আয়োজন করেছে যেটা না প্রভাবমুক্তভাবে স্বাধীন না ন্যয়নীতিতে পরিচালিত – এখন সেই অভিযোগকারিদেরকে অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলা হয়েছে”। [Equally irrelevant are those who accuse the Awami League of silencing dissent and organising an election that was neither free nor fair.]

    ৩. “নিজস্ব কায়দায় চালানো শেখ হাসিনার এক ওয়ার অন টেররের তৎপরতা আছে। এই ততপরতায় টার্গেট করে হত্যা করা বা গুম করে দেয়ার অভিযোগ সম্পর্কে অনেক কথা লেখা হয়েছে, বলা হয়েছে। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের ক্রমেই ভায়োলেন্ট রেডিক্যালিজমের দিকে গড়িয়ে পড়া থেমেছে – এ কথার পক্ষে যায় এমন কোনো প্রমাণ নেই বললেই চলে”। [Much has been said and written of Sheikh Hasina’s own war on terror through targeted killings and alleged disappearances. There is little evidence to suggest that has halted Bangladesh’s slide towards violent radicalism.]
    কাঞ্চন গুপ্তের এই বাক্যটা সম্পর্কে একটা মন্তব্য করা জরুরি যে, তাঁর একথাগুলো রাখঢাক না করে আবেগহীন ভাবে বলা সত্য, যা ভারতের স্বার্থের পক্ষে গেল কী না এই বিবেচনা না রেখেই তিনি বলেছেন।

    তবে সব ছাড়িয়ে কাঞ্চন গুপ্তের গুরুত্বপূর্ণ তিন মন্তব্য আছে যা এখানে এখন আনা হবে। এর প্রথমটা হল তাঁর লেখার প্রথম বাক্য। খুবই চাচাছোলাভাবে তিনি আমাদের বলছেন, “প্রথম ভোটটা বাক্সে পড়া বা বাক্স গণনা শেষ হওয়ার আগে জানাই ছিল ফলাফল কী আসবে। কেবল বাকি ছিল এ কথা জানা যে, তিনি কত আসন সাথে নিয়ে আসবেন – যা প্রমাণ করবে হাসিনার আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে যোগ্য কেউ নাই”। [The results of the 11th parliamentary election in Bangladesh were known even before the first vote was cast last Sunday or the first ballot was counted in the evening on the same day. It was only a question of how many seats would Sheikh Hasina Wajed’s Awami League tote up to prove its point that it faces no opposition worth its name.]

    এ ছাড়া কাঞ্চন গুপ্তের প্রথম মন্তব্য শুনে যাতে পাঠক আবার আশাবাদী না হয়ে যান সেটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাঁর দ্বিতীয় মন্তব্য হলঃ “বিরোধী দল এখন যতই ফ্রেশ নির্বাচনের দাবি জানাক সেটা ঘটবে না; তাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা আমেরিকা এর পক্ষে কোনো আগ্রহ নিয়ে হাজির হবে বলে মনে হয় না”।’ [The opposition can keep demanding fresh elections but that will never happen. It is unlikely that either the US or the EU will strike a particularly harsh posture on the quality of Sunday’s election …… ]

    এই হলেন কাঞ্চন গুপ্ত ও ভারতের মিডিয়ায় তাঁর আবেগহীন পর্যবেক্ষণ, যেটা এক অস্বস্তিকর প্রকাশও বটে।আর তার নিচের বাক্যটা হল চীনভীতি হতাশার। বলছেন, হাসিনা যেভাবে ব্যাখ্যা করছেন যে, ভোটাররা উন্নয়নের পক্ষে রায় দিয়েছে। এ কথাটি অনুসরণ করে সবার চেয়ে বেশি খুশি হবে আসলে চীন। [……would bear testimony to her claim that Bangladeshis have voted for development and progress. China would be more than willing to oblige.] তিনি বলতে চাইছেন এই বাক্য ত চীনের পক্ষে গেল!

    দুইঃ ‘এশিয়ান এজ’ পত্রিকায় ভরত ভূষণ
    এবার দ্বিতীয় মিডিয়া মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া হল, ৩ জানুয়ারিতে ‘এশিয়ান এজ’ পত্রিকায় ভরত ভূষণের লেখা। তার লেখার শিরোনাম, “গণতন্ত্রের জন্য বা ভারতের স্বার্থের জন্য এটা কোনো অর্জনই নয়”।[No gain for democracy, or for India’s interests]। এছাড়া পরে বিস্তারে ভেঙে বলছেন, “বাংলাদেশের নির্বাচনী ফলাফল ঐ দেশের গণতন্ত্র অথবা দক্ষিণ এশিয়া বা বাইরে ভারতের লংটার্ম স্বার্থের জন্য কোন অগ্রগতি বয়ে আনবে না”। [The Bangladesh election results are neither going to further democracy in that country nor India’s long-term interests in South Asia, and beyond.]
    তবে একটা মিলের দিক হল, ভরত ভূষণও উপরের কাঞ্চন গুপ্তের মত মনে করেন, “বিরোধীদের পুনর্নির্বাচনের দাবি বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন যাকে বিরোধীরা সরকারি দলবাজ বলছেন, সেও আমল করবে না”। কিন্তু ভরত ভূষণের অভিযোগ আরও খাড়া এই অর্থে যে তিনি খোদ হাসিনা সরকারের দিকে সরাসরি অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। তিনি মনে করেন, “সরকারের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে দেশটার বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন তাদের ইমেজ হারিয়েছে। মিডিয়াও সরকারি খবরদারির বয়ানের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে। সরকার ও সরকারের বাইরে যারা আছেন তাদের মানে, এমন কর্তাব্যক্তিদের রেকর্ড আছে যে তারা বিরোধীদের ওপর হামলা করেছেন। এ অবস্থার মুখে গণস্বার্থ নিয়ে কথা বলা বুদ্ধিবৃত্তির লোকেরা ও স্বাধীন ব্লগাররাও জীবনের ভয়ে ভীত হয়ে উঠেছে”।’ [Due to political manipulation by the State, the judiciary and the Election Commission have also lost their sheen in the country. The media has fallen in line with state diktats. Given a history of attacks by both state and non-state actors, public intellectuals and independent bloggers fear for their lives.]

    তবে ভরত ভূষণের মূল উদ্বেগের পয়েন্ট হলঃ তিনি লিখছেন, “ভিন্নমত প্রকাশ হতে দেয়ার সুযোগ না রাখায় দমবন্ধ পরিবেশে আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভিন্নমতের লোকদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাতে এটা এই রাষ্ট্রের জন্য খুবই বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলা হচ্ছে, যেখানে ইতোমধ্যেই ইসলামী রেডিক্যালদের তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থিতি আছে। দেশে সুস্থ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বজায় না রাখার ব্যর্থতা – এটাই যেকোনো ধরনের রেডিক্যাল রাজনীতির জন্ম ও বিস্তারের জন্য তা খুবই উর্বর ভূমি হিসেবে হাজির হয়। এধরনের অবস্থা-পরিস্থিতিগুলোই মানুষকে ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়তে ঠেলে দেয়, ঠিক যেমন মিসর বা আলজেরিয়ায় ঘটেছিল। [The absence of democratic safety valves and with institutions of the state “weaponsied” against dissent, is a particularly dangerous situation for countries which have a significant presence of Islamic radicals. The failure of political processes creates a fertile ground for the expansion of radical politics. The people can then easily turn to Islamic radicalism, as happened in Egypt and Algeria.]।

    তিনি সঠিকভাবেই মূল সমস্যাকে চিহ্নিত করে বলছেন, রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপগুলোকে অকেজো করে ফেলা হচ্ছে তড়িত নগদ কিছু ফল পাবার আশায় অথচ ক্ষমতাসীনেরা যারা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকতে চায় ইয়াদের হাতেই এটা হচ্ছে”। [The democratic institutions of Bangladesh have been eroded for short-term gains by those in power for a long time.]

    শেষ কথা হিশাবে তিনি বলছেন, “এ ছাড়া এই নির্বাচনী ফলাফল থেকে আসন্ন স্ট্র্যাটেজিক প্রভাব যা নিয়ে আসবে তা শেষ বিচারে এর ফসল চীনের পক্ষেই যাবে আর তাতে বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ শুকিয়ে চিপার মধ্যে পড়ে কি না, সেটাই দেখার বিষয় হবে। [China wants a strategic foothold in Bangladesh to counter the United States, and secondarily, India…….As this great game unfolds, it remains to be seen whether or not Indian intersts will get squeezed out of Bangladesh.]

    তবে সবচেয়ে চোখে পড়ার মত তার মারাত্মক ক্রিটিকাল পয়েন্ট হল, তিনি এমন একতরফা নির্বাচনের নিন্দা বা অসম্মতি প্রকাশ করতে বলছেন, “ভারতের জন্য নিরন্তর যেটা ভয়ের বিষয় বাংলাদেশে কোন ইসলামি রেডিকেলের উত্থান আর সীমান্ত পেরিয়ে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা – এমন একপক্ষীয় নির্বাচন সেই আশঙ্কাকেই আয়ু দিবে। ভারতের দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থের দিক থেকে দেখলে পকেটে গানপাউডার নিয়ে ঘুরা এক বাংলাদেশের চেয়ে সুস্থির নিয়মতান্ত্রিক বাংলাদেশই ভারতের জন্য কাম্য”। [As for India’s primary bugbear, the rise of Islamic radicals in Bangladesh and its consequences across the border, a one-sided election may have given it a new  breath of life. In the long run, it might be easier to deal with a stable and democratic Bangladesh than one that may become a powder keg.]

    তিনঃ একাডেমিক স্কলার সুমিত গাঙ্গুলী
    আমাদের তৃতীয় উদাহরণ হল, একাডেমিক স্কলার সুমিত গাঙ্গুলির লেখা এক রচনা। সুমিতের পরিচয় হল, তিনি রাজনীতি বিজ্ঞানের প্রফেসর। এ ছাড়া, তিনি আমেরিকান ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় কালচার ও সভ্যতা বিষয়ের রবীন্দ্র চেয়ারের অধ্যাপক। আর তাঁর লেখা ছাপা হয়েছে আমেরিকান ‘ফরেন পলিসি’(Foreign Policy)  পত্রিকায় ৭ জানুয়ারিতে।

    তার লেখার শিরোনাম হল, ‘বিশ্বের বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যর্থতার দিকে নজর করা উচিত”। [The World Should Be Watching Bangladesh’s Election Debacle]। আর এই লেখার দ্বিতীয় শিরোনাম হল, “ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন প্রক্রিয়াকে একটা তামাশা বানিয়ে ছেড়েছে, ইসলামী চরমপন্থার অসুস্থ ইচ্ছাকে প্রলুব্ধ করেছে আর দেশকে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেছে”। [The ruling party is making a mockery of the electoral process, pandering to Islamic extremists, and turning the country into an authoritarian state]। তাঁর অস্বীকৃতি প্রকাশের লক্ষ্যে খুবই কড়া কড়া শব্দ প্রয়োগ সন্দেহ নাই। যদিও এই লেখকের দেখার অবস্থান একজন ইসলাম-বিদ্বেষী আন-ক্রিটিক্যাল সেকুলারের। কিন্তু সেদিকটাকে পাশে ফেলে রেখে আমরা তাঁর কথা আমল করব এখানে।

    প্রথমত, তিনি একে ‘প্রশ্নবিদ্ধ ফলাফলের (questionable results)’ নির্বাচন মনে করেন। তাঁর লেখা শুরুর দ্বিতীয় বাক্য হল এরকম  The questionable results ended in a sweeping victory …।] এবার তাঁর লেখা থেকে তিনটি বুলেট বাক্য উঠিয়ে আনব এখানে।

    তিনি মনে করেন- ১. ‘সস্তা রাজনৈতিক লাভালাভের স্বার্থে এই দল (মানে আওয়ামী লীগ) ধর্মীয় সহিংস দলের উত্থানের বিরুদ্ধে কার্যকর কৌশল গ্রহণের বদলে ধর্মীয় ভোটারদের [হেফাজতের সাথে আপোষ সম্পর্ককে বুঝিয়েছেন] সাথে আপস করেছে। [For reasons of political expediency the party has failed to fashion a concerted strategy to curb the rise of such religious militancy; it prefers to court religious voters.]
    ২. আওয়ামী লীগের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনী বিজয় বাংলাদেশের জন্য খারাপ খবর, যেখানে গণতন্ত্রের আলখাল্লায় ঢেকে এটা এক কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি পয়দা ও সংহত হতে সাহায্য করবে। [The Awami League’s questionable electoral victory is bad news for Bangladesh, where it will aid the consolidation of an authoritarian political order with a democratic facade.]
    ৩. এই দানব ক্ষমতার বিরোধীদের ওপর আগ্রাসী আক্রমণাত্মক ভূমিকা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আমল না করার একমাত্র চিহ্ন নয়। [The regime’s hostility toward the opposition was not the only marker of its disregard for democratic procedures.]

    উপরের বাক্যগুলো নিজেই নিজের ব্যাখ্যা, তাই বিস্তারে যাওয়া হল না। তবে এছাড়া, সবশেষে সুমিত গাঙ্গুলিও মনে করেন, “ট্রাম্প বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলের অন্যান্য জায়গায় রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছে না। এর বদলে আফগানিস্তানে আমেরিকার ভবিষ্যত নিয়েই সে বেশি চিন্তিত। ফলে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তথা বাংলাদেশের সুস্থ নির্বাচন প্রক্রিয়া সঠিক করা বা ঘাটতি পুরণের জন্য শক্তি খরচ সে করবে বলে মনে হয় না”। [Finally, the Trump administration, to the extent it has devoted any attention to South Asia, has mostly been preoccupied with the future of the U.S. involvement in Afghanistan. It has paid little attention to political developments in Bangladesh or elsewhere in the region. Consequently, it seems highly unlikely that Washington will expend much energy, let alone political capital, to address the shortfalls of this election.

    চারঃ প্রাক্তন সচিব অভিজিত চক্রবর্তী
    চতুর্থ ও শেষ উদাহরণ টানব অভিজিত চক্রবর্তীর লেখা। অভিজিত ভারত সরকারের কেবিনেট সেক্রেটারিয়েটের সাবেক বিশেষ সচিব ছিলেন বলে লিখেছেন। অনুমান করা হয়, এ ধরনের বিশেষ সচিবের মানে এরা আসলে গোয়েন্দা বিভাগের কর্তা হয়ে থাকেন। সে যাই হোক, তার লেখা ছাপা হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার ইকোনমিক টাইমসে, (Economic Times), ৭ জানুয়ারি।

    তার লেখার শিরোনাম, “বাংলাদেশের রাজনৈতিকতা রেডিক্যাল হয়ে যাচ্ছে ভারতের শঙ্কিত হওয়া উচিত”। [India should be wary of radicalisation of Bangladesh’s polity]। রেডিক্যাল বলতে আমরা সাধারণভাবে সব ধরনের “সশস্ত্র রাজনীতি” বলে  বুঝতে পারি। যদিও তিনি এখানে সুনির্দিষ্ট করে ইসলামি রেডিক্যাল বুঝাতে চেয়েছেন। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি এক মারাত্মক হাতেগণা অকাট্য প্রমাণ দেখিয়েছেন। বলছেন, “আওয়ামী লীগের ৯০ শতাংশের বেশি আসনে বিজয় এবং সাঙ্ঘাতিক রকমের সংখ্যার ব্যবধানে বিজয় দেখানো, এই নির্বাচন পরিচালনাকে প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে; বিশেষত যদি, আমরা বিএনপি ও জামায়াতের নিশ্চিত সমর্থক ভো্টার ভিত্তির কথা মনে রাখি”। [The win in over 90% of the seats contested by the Awami League and some with astounding victory margins have contributed to the questionable conduct of the elections, given the committed vote base of the BNP and JeI. অর্থাৎ তিনি বলতে চাইছেন, এই ৯০% এর বিজয় যদি মানি তাহলে একা বিএনপির প্রায় স্থায়ী ভোটার বেজ ৩০-৩৫% যা বলা হয় সেটাকে ব্যাখ্যা করব কী করে? এছাড়া জামাতের ভোট ত আছেই!

    এছাড়া তিনি আরও বলছেন, ‘এই নির্বাচন শুধু বিরোধীরা নয় আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছেও প্রশ্নবিদ্ধ; তারা এর তদন্ত দাবি করেছেন”। [The latest election falls short of widespread acceptability as not only the opposition parties, but also the EU and US have questioned the process and demanded investigation into the reports of harassment, intimidation and violence.]

    এরপর তিনি সবশেষে একটা মন্তব্য জুড়ে দিচ্ছেন, “এসব ফ্যাক্টর একটা দেশে স্থিতিশীল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার দিক থেকে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে, যে দেশ অতীতে ধারাবাহিকভাবে বিরতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ দেখে এসেছে”। [All these factors may pose a challenge to the establishment of a stable democracy in a country that has seen periodic military interventions in the past.]।
    স্যরি, অভিজিত চক্রবর্তীকে বলতেই হচ্ছে, এই শেষ বাক্য তিনি না জুড়ে দিলেই ভালো হত। সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে এই মন্তব্য খুবই হাল্কা ও উস্কানিমূলক হয়েছে। এতে তিনি নিজের বিদ্যাবুদ্ধি, পেশা, তথ্য যোগাড় ও দক্ষতার মান নিচে নামিয়ে দিলেন।

    সে যাই হোক তিনি হেফাজতের সাথে আওয়ামি লীগের আপসে চরম ক্ষুব্ধ। তিনি বলছেন, “গত দশ বছর তিনি শাসন ক্ষমতায় একনাগাড়ে থাকলেও ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। এতে সমাজে দেশের ইসলামী পরিচয়কে মুখ্য করে তোলার রাজনীতির সামাজিক সুবাতাস পেয়েছে”। [The wooing of radical elements by all the political parties is an indication that despite 10 years of the Awami League government, the societal winds continue to favour a strong Islamist identity in the country. ] এটা বেশ ইন্টারেস্টং যে তিনি হাসিনার বিরুদ্ধে “ইসলামী রেডিক্যাল রাজনীতিকে” প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
    তবে তিনি মূলত বলতে চাচ্ছেন, “এই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে বাংলাদেশকে রেডিক্যাল রাজনীতির দিকে ঠেলে দেয়া হল”। এ ছাড়া সেকুলারিজমের মৌলিক বীজ ও চিহ্নগুলোকে ক্ষয়ে ফেলা হয়েছে। [The erosion of secular ethos will not only affect minorities, ………. ] ফলে তিনি এবার এক সাঙ্ঘাতিক কথা বলেছেন। বলছেন, সব মিলিয়ে “এটা ভারতের নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারত”।  [These developments could pose security challenges for India, especially in the northeast.] অর্থাৎ তার কথা সঠিক বলে মানলে হাসিনার এ নির্বাচনী ফলাফল ও পরিচালনা ভারতের জন্য নিরাপত্তার ক্ষতি বয়ে এনেছে বা আনবে।
    এসব কথার সূত্র ধরে তিনি এবার নতুন হাসিনা সরকারে চীনের প্রভাব বেড়ে যাবে বলে দেখছেন। তাই তার শেষ কথা “ভারত এসব দেখে শঙ্কিত না হয়ে” ব্যাপারটাকে উপেক্ষা করতে পারে না।
    তার পু্রা কথার মধ্যে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল, এটাকে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন বলছেন আর এতে তিনি ভারতের জন্য বিপদ দেখছেন।

    সবশেষেঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
    আনন্দবাজার পত্রিকার উদাহরণ দিয়ে শেষ করব। এটা ১ জানুয়ারির রিপোর্ট, শিরোনাম হল– ‘ভোটে জিততে মুখ চাই, কংগ্রেসের হারের সাথে বিএনপির মহাবিপর্যয়ের তুলনা টানলেন হাসিনা।’ আনন্দবাজারের শিরোনাম এমন পেঁচানো হয় যে, খবরটা আগে পড়া শেষ না করলে শিরোনামের অর্থ জানা যায় না। এই রিপোর্টেরও সারকথা – আনন্দবাজারেরও একই উদ্বেগ, জয়লাভের পারসেন্টেজ বেশি হয়ে গেছে- বিরোধী দল থাকল না।

    লিখেছে, “ঘোষিত ২৯৮টি আসনের মধ্যে, জাতীয় পার্টি এবং আরও ৬টি দলকে নিয়ে শেখ হাসিনার মহাজোট পেয়েছে ২৮৮টি”।  অর্থাৎ সরকারি জোট একাই ৯৭% আসন পেয়ে গেছে। “সেই অর্থে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আর তেমন কোনো অস্তিত্বই থাকল না”। এই হল আনন্দবাজারের উদ্বেগ। এখন এখানে এক তামশা দেখলাম আমরা। আনন্দবাজারের এই উদ্বেগ তাড়াতে একপর্যায়ে উপায় না পেয়ে হাসিনাকেই বলতে হল, “আগামীতে বিএনপি আবার ক্ষমতায় এসে যেতে পারে”। এর উদাহরণ হিসেবে বললেন, “আজকের বিজেপিও তো একসময় ভারতের সংসদে মাত্র দু’টি আসন পেয়েছিল”। এ ছাড়া, হাসিনাকে বিএনপির হারের ব্যাখ্যাও নিজেই কান্ধে নিয়ে দিতে হয়েছিল। হাসিনা ব্যাখ্যায় বলেছেন, বিএনপি জিতলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, সেটি না বলাতেই নাকি তারা মূলত হেরেছে।
    যা হোক সারকথাটা হল, ৯৭ শতাংশের মত আসন পেয়ে আওয়ামি লীগের শান্তি ছুটে গিয়েছে। উল্টো আওয়ামী লীগকেই বিএনপির আগামী সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে আপাতত নিজের জিতবার সাফাই দিতে হয়েছিল।

    তবে এর বাইরেও অনেক রিপোর্ট, মন্তব্য, কলাম আছে পাওয়া যাবে; যা এখানে আনা হয়নি। যেমন সরাসরি ট্রাম্পকে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপের আহবান জানিয়েছে এমন রচনাও আছে। তবে ভারতের এসব মুল্যায়ন প্রকাশের সাধারণ সুরটা হল, এই নির্বাচনে ৯৭ শতাংশ আসনে আওয়ামী লীগের বিজয়কে ভারত আগামী দিনে নিজ দেশের জন্য লুকানো বিপদ বলে মূল্যায়ন করছে। সে কারণেই এত অস্বস্তি।
    আর একটা সোজা ফ্যাক্ট হল, আমেরিকার মুখ ফিরিয়ে নেয়া। এতে যে ঐ খালি জায়গার দখল পাচ্ছে সেই লাভের ফসল যাচ্ছে মূলত চীনের ঘরে। কারণ, রাজনৈতিক অধিকারের (Political Right) বদলে “উন্নয়নের রাজনীতির” – হাসিনার এই রাজনীতিতে বিজয়ের সোজা অর্থ -ক্রমশ  হাসিনার কাছে আপন হয়ে উঠবে চীন যেখানে ভারত হবে তুচ্ছ, পরাজিত পার্টি! যার অন্তত কিছু কারণ ভারতের কোনো বিনিয়োগ সক্ষমতা নাই। আর আমেরিকার হবু কোন হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা প্রায় নাই বলে এর বিরুদ্ধে  ভারতের সুপারিশ আর জরুরি না।  যার ফলাফল, চীনের সাথে আরো ঘনিষ্ঠ এক বাংলাদেশ। আর তাতে ততই শিরশিরে ঠাণ্ডা চিলিং অনুভুতির এক ভারত – হতে দেখছি আমরা।
    এ ছাড়া মানুষের রাজনৈতিক অধিকার  দাবড়ে রেখে হেলমেট বাহিনী আর গুম-খুন দিয়ে রাষ্ট্র চালানো, “উন্নয়নের রাজনীতির” আওয়াজে সব আড়াল করা এসব কিছুর ফলে  সত্যি সত্যিই  রেডিক্যাল – শুধু ইসলামের নয় যেকোন – রাজনীতি বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা, সেটা তো আছেই।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “‘ভূমিধস’ বিজয়ে ভারতের মিডিয়ার শঙ্কা“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]