Tag: রাষ্ট্র

  • নেপালে শ্রীলঙ্কার ভুত দেখছে নয়াদিল্লি

    নেপালে শ্রীলঙ্কার ভুত দেখছে নয়াদিল্লি

    গৌতম দাস
    ১৯ ডিসেম্বর ২০১৭, রবিবার, ০০:২১

    https://wp.me/p1sCvy-2oW

     

    অবশেষে এখন এ’কথা বলা যায় যে, নেপাল এখন নিজ রাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কায়েম করতে পেরেছে এবং তা এগিয়ে যেতে পারবে। নেপালের প্রধান তিন দলের মধ্যকার দুটোই কমিউনিস্ট পার্টি। দুই কমিউনিস্ট পার্টি এবারের নির্বাচনে এক কমিউনিস্ট  জোট (‘লেফট অ্যালায়েন্স’) গড়ে নির্বাচনে লড়ে জিতেছে। অ্যালায়েন্স গঠনের ঘোষণা দেয়ার সময় এক কমিউনিস্ট, মাওবাদী দলের চেয়ারম্যান পুষ্প কমল দাহাল বলেছিলেন, এই অ্যালায়েন্স তাঁরা করছেন নেপালের রাজনীতিকে স্থিতিশীলতা দেয়ার জন্য, স্থিতিশীল সরকার দেয়ার জন্য [grand Left alliance will “end Nepal’s elongated political instability” ]। নেপাল গত ৯ বছরে বিপুল রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ভেতর দিয়ে গেছে। এখন দাহালের আকাঙ্খা ও অনুমান সঠিক প্রমাণ হল। নেপালের এই নির্বাচনে কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স সংসদে ৭১ শতাংশের মতো আসন লাভ করেছে।

    গত ১৯৯৬ সাল থেকে যদি ধরি, সশস্ত্র রাজনৈতিক লাইনে চেয়ারম্যান পুষ্প কমল দাহালের ‘মাওবাদী সেন্টার’ দল অথবা CPN (Maoist Centre)  প্রথম যখন রাজতন্ত্র উৎখাত ও ক্ষমতা দখলের লড়াই ঘোষণা দিয়ে শুরু করেছিল। সেই থেকে হিসাব কষতে বসলে গত ২০ বছরের বেশি সময়, এটা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের দিক থেকে অবশ্যই নেপালের জনগণের এক বিরাট লম্বা পথপরিক্রমা। আর কে না জানে লক্ষ্যে পৌঁছানোতে পথ যত লম্বা হয়ে যায়, ততই সেখানে আরো বেশি অনিশ্চয়তা হাজির হয়ে যায়, আর তা বিপজ্জনক হয়। তবুও আজ প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম শেষে এক কথায় বললে নেপালের সাফল্য অনেক। আর এতে অন্তত তিনটি বড় অর্জন আছে।

    এক. শত বছরেরও বেশি পুরনো নেপালি রাজতন্ত্রের শাসনকে উৎখাত ও অবসান ঘটানো। দুই. দুইবারের চেষ্টায় অনিশ্চয়তার সাত বছরের শেষে নেপালকে সর্বপ্রথম একটি রিপাবলিক রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ রাজতান্ত্রিকতার বিপরীতে রিপাবলিক বা লোকতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন সফল হয়। কনস্টিটিউশন রচনার কাজ সফলভাবে সমাপ্ত করা এবং এই কাজ শেষে প্রথম কনস্টিটিউশন প্রক্লেমেশন – ২০১৫ ঘোষণা দিতে নেপাল সফল হয়। আর তিন. নতুন কনস্টিটিউশনের অধীনে প্রথমবার সাধারণ নির্বাচন বা সংসদের নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়। শুধু তাই নয়, ভোটের ফলাফলে নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের কিছু কম (গণনার প্রাথমিক পর্যায়ের ১৬৫ আসনের মধ্যে ৮০ আসন) পেয়েছে। এই দল হল, চেয়ারম্যান খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলির কমিউনিস্ট পার্টি (CPN-UML)  । আর এরা অপর কমিউনিস্ট ‘মাওবাদী সেন্টার’ দলের সাথে মিলে প্রায় ৭১ শতাংশ আসন পেয়েছে। অর্থাৎ এই তৃতীয় অর্জন সম্পর্কে বলা যায়, এখন সহজেই একটি স্থিতিশীল সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলির নেতৃত্বে নেপাল এক নতুন ও স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে পারবে।

    প্রায় ২০ বছর পরের নেপাল এই প্রথম স্থিতিশীলভাবেই পূর্ণ সময়কালের সরকার কায়েম করতে পারবে, আর সেই সরকার দৃঢ়তার সাথে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হবে। এর পিছনের প্রধান কারণ হল, অপর কমিউনিস্ট পার্টি  ‘মাওবাদী সেন্টার’-এর সাথে ইতোমধ্যে গত অক্টোবরে এরা যে জোটটা গঠন করেছে, সেটা শুধু কোনো নির্বাচনী জোট নয়,  বরং একটা এক দলে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটা জোট। [The two parties also said they would work for their formal merger……]।   ফলে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঘাটতি মিটানো নয়, সরকারের নানান রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নীতি সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে মতের অমিলগুলো সামলে এক সিদ্ধান্ত পৌছানোর সুযোগ এখানে বেশি থাকবে। এই নির্বাচনে মাওবাদীরা দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনপ্রাপ্ত দল (১৬৫ আসনের মধ্যে ৩৬ আসন), আর তৃতীয় নেপালি কংগ্রেস (১৬৫ আসনের মধ্যে ২৩ আসন)। তবে নতুন গঠিত এই কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্সে আরো একটা দল আছে। সেটা বাবুরাম ভট্টরায়ের নয়াশক্তি পার্টি, এই দলের একা তিনি জিতেছেন। তিনি আসলে ছিলেন মাওবাদী দলের সাবেক দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা, রাজতন্ত্রের পরাজয়ের পর ২০১১ সালের প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন, পরে দল ছেড়ে বের হয়ে যান। এখন জোটে ফিরে আসলেন। প্রথম কনষ্টিটিউশন গঠনকালীন সরকারের (২০০৮-২০১১) সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সরকার গঠন করে ছিল মাওবাদীরা। ফলে ঐ সময়ে ভারতের সাথে স্বার্থ বিরোধের বিষয়গুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি সংঘাতের মুখোমুখি হওয়া ও চাপ সামলানোর বিপদের ঝড়ঝাপ্টা গুলো সবচেয়ে তাদের উপর দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভারতীয়দের চাপের মুখে তা মোকাবিলা করতে গিয়ে বাবুরাম  “ভারতীয়দের সাথে পারা যাবে না” ফলে “নরম পথে আগাতে হবে” ধরণের অবস্থানের কারণে দাহালের সাথে বিরোধে, শেষে দল থেকে বিচ্ছিন্নই হয়ে যান। পরে আলাদা দল করেন, তিনি এবার জোটে ফিরে এসেছেন। তাহলে অল্পকথায় তিনটি গুরুত্বপুর্ণ অর্জন হলঃ রাজতন্ত্রের উৎখাত, নতুন লোকতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশন রচনা ও ঘোষণা আর শেষে এক স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার গঠন পথে এসে পৌছানো।

    নেপালের রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামো তিন স্তর বিশিষ্ট – ফেডারল (কেন্দ্র), প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকার – এভাবে এবং এভাবেই নতুন কনস্টিটিউশন অনুসারে গঠিত। বিশেষ দিকটা হল, তিন স্তরের নির্বাচন এ বছরই অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা এক বিরাট সাফল্য। কারণ গত বছরের এই সময়েও নেপালের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এত চরম অবস্থায় ছিল যে, এক বছর পরে সরকারের আয়ু শেষ হবার পরে এই সময়ে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অর্জন আজ এই উচ্চতায় উঠবে তা তখন বিশ্বাস করা যেত না।

    আচ্ছা, গত ২০ বছরের পথপরিক্রমায় কারা নেপালের গণস্বার্থের দিক থেকে বিচারে এর রাজনীতিক-ভিলেন ছিল? এই প্রশ্নের জবাব হবে, ২০০৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্বভাবতই সেই ভিলেন, তিনি ছিলেন নেপালের রাজা জ্ঞানেন্দ্র। তবে এরপর রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে  পাল্টা মাওবাদীসহ নেপালের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে নিয়ে জোট বাঁধা ও এর উপরে ভারত ও আমেরিকার সমর্থন আনা ইত্যাদি – এই ঘটনাগুলো ঘটার সময় নির্ধারক ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল ভারত। হ্যা, ইতিবাচক। তা সত্ত্বেও নতুন সরকারের আমলে কনস্টিটিউশন গঠনের কাল থেকে ক্রমেই ভারত নেতিবাচক বিরাট ভিলেনের ভূমিকায় হাজির হতে থাকে। সেই থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বাজে এক ভিলেন হয়ে আছে ভারত। গানের ভাষায় বললে- ‘ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়’। ভারত চাইতেই জানে না। নেপালের কাছে ‘কিভাবে’ আর ‘কী’ চাইতে হয় – কী চাওয়া যায় না – তা জানে না। নেহরুর হাতে ভিত্তি পাওয়া ও গড়া স্বাধীন ভারত, আর এ থেকে সবচেয়ে বাজে ও ভুল শিক্ষা পাওয়া আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের ভারত, এরাই মূলত সেই ভিলেন। নেহরু ভেবেছিলেন কলোনি-উত্তর স্বাধীন ভারত, একালে ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া সুবিধাগুলো তিনি ব্রিটিশদের মতই নিজেও ব্যবহার করবেন। এটা তার প্রিরোগেটিভ (prerogative) বা পড়ে পাওয়া চারআনা বিশেষ সুবিধা, প্রাধিকার। তিনি বুঝতেই পারেননি যে, এর অর্থ হল, তাতে ভারত এক কলোনিয়াল ক্ষমতা বলে আগাম কল্পনা করে নিতে হবে বা করা হয়ে যায়। এর চেয়েও আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিক। তিনি সে সময়কে মানে এর তাতপর্যকেও বুঝতে পারেন নাই। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যে নতুন দুনিয়া গড়ে তোলা হচ্ছিল, সেটা আর যুদ্ধের আগের মত কলোনি-শাসিত দুনিয়া নয়, কোনো ইউরোপীয় কলোনি-শাসকের দুনিয়া নয়। বরং এক বিরাট ভিন্নতায় আমেরিকার  নেতৃত্বের এক নতুন দুনিয়া। মৌলিকভাবে এটা বরং খোদ পুরনো কলোনি-অর্থনৈতিক-সম্পর্কেরই অবসান। আর আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের-অর্থনীতিক-সম্পর্কের দুনিয়া। কলোনি শাসনমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোসহ আমেরিকার গড়ে তোলা এটা নতুন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থনীতি সম্পর্কের দুনিয়া। যেখানে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক জাতিসংঘ ও বিশ্ববাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান – ইত্যাদির মত বহুরাষ্ট্রীয় (মাল্টিলেটারাল) প্রতিষ্ঠান এবারের নতুন দুনিয়ায় আছে।

    মূল কথায় এখানে অপর রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব ও সম্পর্ক রাখা এবং সুবিধা নেয়া ও কিছু দেয়ার তরিকাই আলাদা। এখানে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিনিময় সম্পর্ক আর পুরান কলোনিয়াল একেবারেই নয়, বরং আলাদা। নেহরু এর খবর নেন নাই বা রাখেননি। এ কথার সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল, নেহরুর করা ‘নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯৫০’। যেটা আসলে এর আগে ব্রিটিশদের করা ‘নেপাল-ব্রিটেন চুক্তি ১৯২৩’ এর কার্বন কপি। এই চুক্তি থেকে এটা পরিষ্কার, নেহেরু ভারতকে কলোনি-শাসকের ভূমিকায় নামিয়েছিলেন, দেখেছিলেন। আগে ব্রিটিশ কলোনির এক ভেসেল রাষ্ট্র বা করদরাজ্য ছিল নেপাল। ব্রিটিশদের নেপালকে সরাসরি কলোনি না করে ভেসেল রাষ্ট্র করে সুবিধা দেয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। পরবর্তিতে যোগ হওয়া নতুন এক কারণ হল, সিপাহী বিদ্রোহ কালে নেপালের রাজাদের বৃটিশের পক্ষে গোর্খা সৈন্য নিয়ে অবস্থান নেওয়া। এই বিদ্রোহের আগে পুরো নেপাল ব্রিটিশরা দখলে নিয়েছিল। কিন্তু সিপাহি বিদ্রোহে ব্রিটিশদের পক্ষ নেয়াতে বিদ্রোহ পরাজিত করার শেষে এই ভেসেল রাষ্ট্রের জন্ম আরও পাকাপোক্ত হয়। তাই নেপাল-ব্রিটেন এর মধ্যে আগের অনেক চুক্তি ছিল, আমরা জানতে পাই। বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশরা তাতে নতুন নতুন অনেক ছাড় যোগ করেছিল। এমন সর্বশেষের চুক্তিটিই হল, ১৯২৩ সালের চুক্তি। কিন্তু নেপালের ল্যান্ডলকড অবস্থার সুযোগ নিয়ে, পুরান সেই চুক্তি অনুসরণ বা অনুকরণ করে একই দাসত্ব চুক্তি করেছিল নেহরুর ‘রিপাবলিক ভারত’। ওই চুক্তিটিই এখনো বহাল আছে। প্রশ্নটা আসলে, একালে কারও দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাকে দাস বানানোর সুযোগ পেলেও আপনি তা নেবেন কি না? নেহরু সেটা দাবির সাথে নিয়ে নিয়েছিলেন। কারণ নেহরুর মৌলিক আগাম অনুমান হল, “স্বাধীন ভারত সেটা বৃটিশ কলোনি ভারতেরই উত্তরসুরি ও ধারাবাহিকতা”। অর্থাৎ ভারত নিজে স্বাধীন তবে এটা এখন নিজেই এক কলোনি শাসক। ফলে কন্টিনিউয়েশন বা ধারাবাহিকতা।  তাই, এই কলোনি ওরিয়েন্টেশনে বা ধাঁচে নিজ নতুন আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের ভিত গড়েছিলেন নেহেরু। নেহেরুর সেট করে দেওয়া ‘সেই ট্রাডিশন’ এখনও চলছে।

    গত অক্টোবরে কমিউনিস্টদের লেফট অ্যালায়েন্স গঠন হওয়ার পর তাদের যৌথ নির্বাচনী ম্যানুফেস্টো প্রকাশিত হয়। জাপান থেকে প্রকাশিত ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিন ১ ডিসেম্বর বলছে, ঐ ম্যানুফেস্টোতে বলা হয়েছে – লেফট অ্যালায়েন্স নির্বাচনে জিতলে পরে তাদের দ্বারা গঠিত অ্যালায়েন্স সরকার এরপর ‘ইন্ডিয়া-নেপাল শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি-১৯৫০’ বাতিল করবে এবং একটা নতুন চুক্তি করবে। এখন নির্বাচন সমাপ্ত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ওই আকাঙ্খা মত অ্যালায়েন্সের পক্ষে নির্বাচনী ফলাফল এসেছে। ফলে এখন স্বভাবতই ঐ চুক্তি বাতিলের প্রসঙ্গ উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ভারতের সাথে সংঘাতে আর এক পর্ব শুরু হবে, আর এক খাতা খোলা হবে।

    এই নির্বাচনের শুরু থেকে নয়াদিল্লি খুবই অস্বস্তিতে ছিল। আর ফল প্রকাশের পর সেটা আরো বেশি হয়ে এখন উলটা অনুভূতিশূন্য হয়ে গেছে। এমনিতেই গত অক্টোবরে নেপালের দুই কমিউনিস্ট পার্টির অ্যালায়েন্স গঠন হওয়ার পর থেকে নয়াদিল্লি আসন্ন নির্বাচনে নিজের জন্য নানান বিপদ আসন্ন বলে আঁচ করতে শুরু করেছিল। যেমন সুবীর ভৌমিকের নেপালের নির্বাচন প্রসঙ্গে ‘সাউথ এশিয়ান মনিটর’ অনলাইনে তার লেখা দিয়েছেন। সেই লেখার শিরোনাম দিয়েছেন, ‘নেপালের নির্বাচনকে ভারতের নিজের পরাজয় হিসেবে দেখা উচিত!’  তবে সুবীরের এবারের লেখাটি ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনকে সান্ত্বনা দেয়ার ভঙ্গিতে লেখা। তাই সম্ভবত ভারতের অনেক ভুলত্রুটি এখানে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। ভারতকে আমল না করে ২০১৫ সালের অক্টোবরে নেপালের কনস্টিটিউশন ঘোষণা করে দেওয়াতে টানা ছয় মাস ল্যান্ডলক নেপালে সকল ‘পণ্য  আমদানি অবরোধ’ করে রেখেছিল নয়াদিল্লি। নিত্যপ্রয়োজনীয় রান্নার গ্যাস থেকে যানবাহনের জ্বালানিসহ সব কিছু ছয়মাস বন্ধ রাখলে গরীব মানুষের জীবনে এর প্রভাব কী হতে পারে তা অনুমেয়। তাই বলা বাহুল্য ভারতের দিক থেকে এটা কাউন্টার-প্রডাকটিভ হয়েছে।  প্রচ্ছন্নে সুবীরের লেখায় ভারতের সিদ্ধান্ত ভুল এটা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। ঐ ঘটনাই নেপালের গরীব সাধারণ মানুষকে ভারতের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ও কঠোরভাবে বিমুখ করে তোলে, যার প্রভাব এখনো প্রবল।  আর খুব সম্ভবত, এসব ভোটারদেরই নিজের ব্যাগে তুলে নিতে পেরেছে,  চরম ভারত-বিরোধিতার লাইনের চেয়ারম্যান অলির কমিউনিস্ট দল। মোট ১৬৫ এর মধ্যে ৮০ আসন – এভাবে বিপুল সংখ্যার আসন পেয়েছে এই নির্বাচনে।ওদিকে সুবীর তাঁর লেখায়, আবার শ্রীলঙ্কার গত নির্বাচন ও এর পরবর্তী পরিস্থিতির সাথে নয়াদিল্লি এখন নেপালকে তুলনা করে দেখছে সে খবর জানিয়েছে। শ্রীলঙ্কা প্রসঙ্গে তাদের এখনকার মূল্যায়ন নাকি – শেষ বিচারে শ্রীলঙ্কায় সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও অন্যান্য ইস্যুতে চীনকে আসলে ঠেকানো যায়নি। নেপালেও গেল না। তাই সুবীর যেন শিরোনামে বলছেন, হতাশ হয়েন না ।

    শ্রীলঙ্কার মত নেপালের বেলায় কোন সমুদ্রবন্দর নির্মাণ তার ইস্যু ছিল না। শ্রীলঙ্কার হাম্মনটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ ২০১০ সালে শেষ হবার পরও তা ভারত চালু না করতে দিয়ে পাঁচ বছর আটকে রাখতে পেরেছিল, নির্বাচন রাজনীতিতে, সরকার গঠনে হাত ঢুকিয়ে। কিন্তু শেষ বিচারে বন্দর চালু হওয়া ভারত ঠেকাতে পারে নাই। ভারত ঘেঁষা চলতি সরকারই চীনের সাথে সংশোধিত চুক্তি করে বন্দর চালু করে ফেলেছে। তাই ভারত এখন এটাকে নিজের হার মনে করে, সেকথাই সুবীর তুলে এনেছে। তুলনায় নেপালে বন্দর না হলেও চীনের সাথে বাঁধ নির্মাণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের আড়াই বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প আছে বা ছিল। যে সরকারের অধীনে চলতি নির্বাচন সমাপ্ত হল সেটা নেপালি কংগ্রেস দলের। তবে তা মাওবাদী দলের সমর্থনে গড়া এক কোয়ালিশন সরকার। নেপালে পানিবিদ্যুতের প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সুবীর বলছেন, এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় মাত্র ৭৫৩ মেগাওয়াটের মত। ২০১৫ সালের শেষে কমিউনিস্ট অলির সরকারের আমলে চীনের সাথে তিনি ১২০০ মেগাওয়াটের ঐ বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি করেছিলেন, সেটাই আড়াই বিলিয়ন ডলারের চুক্তির। কিন্তু চলতি নেপালের প্রথমপর্যায়ের নির্বাচন শুরুর কয়েক দিন মা্ত্র আগে গত নভেম্বরে নেপালি কংগ্রেস সরকার ঐ চুক্তি বাতিল করে দেয়। তাই আইনত সেই চুক্তি ‘ছিল’ বলতে হচ্ছে। অজুহাত উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক টেন্ডার করা হয় নাই। এতে নেপালকে ঘিরে চীন-ভারত রেষারেষি আরো সরাসরি নির্বাচনে হাজির হয়ে পড়ে তখন থেকেই। স্বভাবতই কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স এখন নির্বাচনে বিজয় লাভ করাতে ওই প্রকল্প ও চুক্তি আবার জীবিত হবে বলে সবাই অনুমান করছেন। মজার কথা হচ্ছে, সুবীর ভৌমিক ওই চুক্তি জীবিত করার পক্ষে কথা বলেছেন। বলছেন এটাই নেপালের স্বার্থ। এই প্রকল্প চীনের চীনের বেল্ট-রোড মেগা প্রকল্পে অংশ বলে ঘোষণা করা ছিল। এমনকি তা সত্ত্বেও চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত হয়ে আরো অবকাঠামো প্রকল্প নেপালের আনার পক্ষে তিনি কথা বলছেন।

    নয়াদিল্লি ঘোরতরভাবে চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পের বিরোধী। এটা ভারতের প্রকাশ্য বিদেশ নীতি ও অবস্থান। ভারতের কোনো ‘বন্ধু’ বা পড়শি রাষ্ট্র বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত থাকুক এটা দেখতে বা সহ্য করতে সে একেবারেই রাজি নয় (ফলে বাংলাদেশের সাথেও এটা এক অনৈক্যের বিরাট ইস্যু)। কিন্তু নেপালের বেলায় সুবীর বলতে চাইছেন, নেপালের এখন দরকার বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোগত খাতে প্রচুর বিনিয়োগ। না হলে নেপালের অর্থনীতি দাঁড়াবে না। ইতোমধ্যে সদ্যগঠিত নেপালে জয়লাভ করা কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স, আগামী ১০ বছরের মধ্যে নেপালকে মাথাপিছু পাঁচ হাজার ডলার আয়ের অর্থনীতির দেশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে চীনের মতই ভারতকেও নেপাল কিছু বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করতে দিয়েছিল ২০১৫ সালের শুরুর দিকে। কিন্তু আজও সেসব প্রকল্পের কোনো কাজই শুরু হয়নি বলে সুবীর জানাচ্ছেন। অর্থাৎ একদিকে ভারতের সক্ষমতা দক্ষতা সামর্থ্য নেই, অন্য দিকে চীনের আছে, সুবীর এই তুলনা আনছেন। আবার চীনের বিনিয়োগ সক্ষমতার তুলনায় ভারত যে কিছুই না, সেটা শ্রীলঙ্কাতেও দেখা গেছে। ফলে সুবীর ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের কাছে ‘স্মার্ট হতে’ পরামর্শ রেখেছেন। আসলে সুবীরেরই খুবই স্মার্ট পরামর্শ এটা। কারণ তিনি যুক্তি তুলে ধরে বলছেন, প্রশাসনের উচিত চীন-নেপালের বিদ্যুৎ প্রকল্পে বাধা না দিয়ে বরং সহযোগিতা করা। পরামর্শ খুবই অ-ভারতীয় অথবা অ-চিরাচরিত ভারতীয় পরামর্শ। কিন্তু সেক্ষেত্রে সুবীর বুদ্ধি দিচ্ছেন, এইবার যে বাড়তি বিদ্যুৎ তৈরি হবে তা যেন ভারত কিনে নেয়। আর এইবার ইঙ্গিত দিয়েছেন ওই বিদ্যুৎ বাংলাদেশ বিক্রি করে দিবার টাউটারি নিতে, নগদ লাভ এখানেই। অর্থাৎ ভারত যে উতপাদন আয়োজনে অক্ষম তা স্বীকার করে নিয়ে সুবীর টাউটারিতে নামতে বলছেন, তাই কী? তবে টাউট মারচেন্ডাইজ (tout merchandise ) খারাপ ব্যবসা নয়, ভারত যেটুকু ভাল পারে। এখানে আমাদের জানা থাকা ভাল যে, ভারত নেপালকে এমন ‘কলোনি-চুক্তির’ মধ্যে রেখেছে যে, ভারতের অনুমতি ছাড়া অন্য কাউকে নেপাল নিজ উতপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে না।

    তবে আমাদের মতো দেশের বেলায় পাল্টা আরেকটা কথা সমান গুরুত্ব দিতে হবে। চীনের নেয়া অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে (যেমন বাংলাদেশেও) এক বিরাট কালো দাগ আছে। কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে এখানে প্রতিযোগিতামূলক বাজার যাচাই, কোনো ওপেন টেন্ডার হয় না। শুধু তাই না প্রকল্পের কোনো টেন্ডার করতে যাতে না হয়, বালাই যেন না থাকে, টেন্ডার করার আইনি বাধ্যবাধকতা যাতে এড়ানো যায়; তাই প্রকল্পগুলো জিটুজি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট)-এর অধীনে সম্পন্ন করার চুক্তি করা হয়। আর এতে টেন্ডার ডাকার বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যায় বলে স্বভাবতই প্রকল্প মূল্যের কোনো মা-বাপ থাকে না। এ ছাড়া লোকাল এজেন্টের নামে অর্থ সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা বা সুযোগও থাকে। বিশ্বব্যাংকের অনেক বদনাম আছে বা ছিল। তা সত্ত্বেও তুলনায় বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প অন্তত কোনো ওপেন আন্তর্জাতিক টেন্ডার ছাড়া সেক্ষেত্রে কো্ন প্রকল্প নিতে দেয়না।  বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে এটুকু অগ্রগতি তাদের ঝুলিতে আছে। এমনকি জাপান সরকার দাতা হলেও জাপানি ঠিকাদারকেই কাজ দেয়ার কোনোই বাধ্যবাধকতা থাকে না। এই নীতি কার্যকর করার সক্ষমতা তাদের আছে, ইতোমধ্যেই সেটা দেখিয়েছে। চীনের বিশ্বব্যাংক AIIB গঠনের প্রাক্কালে একে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাবি করাতে এর বিরুদ্ধে মোক্ষম এই অভিযোগই তুলেছিল আমেরিকা। যদিও আমেরিকা নিজের বিরাট স্বার্থক্ষুন্ন হওয়ার কারণে নিয়মিতভাবে AIIB গঠনের বিরোধিতা করে গেছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও আমেরিকান অভিযোগ মিথ্যা ছিল না, তা বাস্তব।

    তবে সেটা যাই হোক, সুবীরের লেখায় এই প্রথম ভারতের অভ্যন্তরীণ আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনকে নিজেদের দুর্বলতা ও সক্ষমতা-দক্ষতা সামর্থের অযোগ্যতা বা ঘাটতির দিকে নজর ফেরাতে তাগিদ দিতে দেখা গেল। সুবীরের এই লেখা থেকে মনে করার কারণ আছে যে, ভারতের প্রশাসন বিপদে আছে বলে অন্তত কেউ কেউ মনে করছেন, এ নিয়ে টনক নড়ারও কেউ কেউ আছে। আসলে ভারত বিপদ দেখছে; একের পর এক ভারতের পড়শি রাষ্ট্রে চীন প্রকল্প নিয়ে ঢুকে পড়ছে, আর ভারতের কিছু করার থাকছে না। এটা না দেখতে পাবার কারণ নাই, তবে স্বীকার করতে দেখা যায় না। সুবির তাই পরিস্কার করেই বলছে, ভারত এখন শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও আসলে শেষে কিছু ঠেকানো যায়নি বলে তারা মনে করে। অর্থাৎ ভারতের বিদেশ নীতিতে করণীয় – “শ্রীলঙ্কা মডেল বলেও কিছু দাড়ালো না।

    কিন্তু আসলেই ব্যাপারটি এমন হওয়ার কথা নয় কি? ভারতের যদি সক্ষমতা-দক্ষতা-সামর্থ্য না থাকে, আর তা থেকে সৃষ্ট নানা দুর্বলতা তাকে ঘিরে রাখে, তবে এমনই কি হওয়ার কথা নয়। আসলে প্রথম প্রশ্ন করা উচিত যে, ভারত কেন অর্থনৈতিক বা বৈষয়িক সক্ষমতার দিক থেকে নিজেকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য বলে বিবেচনা করছে? কিসের ভিত্তিতে?

    দেখা যাচ্ছে, ভিত্তিহীন সব অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসন পড়শিদের উপর ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে আর ধপাধপ পড়ছে – শ্রীলঙ্কা আর এরপর নেপাল…। সুবীর ভৌমিকই বলছেন, শ্রীলঙ্কার পর নেপালেও নাকি নয়াদিল্লি, শ্রীলঙ্কার ভূত দেখতে পাচ্ছে। [But again, the ghosts of Sri Lanka may return to haunt Delhi…] তা হলে? এরপর কোথায়?

    পাঠকের জন্য একটা সতর্কতা দিয়ে শেষ করব। বাইরের মিডিয়ার মত দেশেরও অনেক মিডিয়া – নেপালে একটা কমিউনিস্ট এলায়েন্স তৈরি হয়েছে আর চীন (মানে সেটাও তো কমিনিস্ট) – এভাবে সব মিলিয়ে বিষয়টাকে “চীনপন্থী”, বা “কমিউনিস্ট” ঘটনা বলে ইঙ্গিত হাজির করার চেষ্টা করছে। এই অনুমান ইঙ্গিত শতভাগ ভুল, ভিত্তিহীন। যে চিন্তা কাঠামোতে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলা হচ্ছে তা কোল্ড ওয়ারের যুগের; যেন ষাটের দশকের দুনিয়ায় আমরা এখনও দাঁড়িয়ে আছি – এই ভিত্তিহীন অনুমানে বলা কথা। আমরা এখন একুশ শতকে, সকল রাষ্ট্র যখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে পরস্পরের সাথে গভীর বিনিময় সম্পর্কে লেপ্টে গেছি ও আছি। সবচেয়ে বড় কথা এই লেপ্টে যাওয়া আর কখনও  কোল্ড ওয়ারের মত আগের যুগে ফেরত যাবে না। তাই পুরানা চিন্তা কাঠামো আর বাস্তবতায় পুরানি টার্ম ব্যবহার করে কথা বলা আর সঠিক নয়। তাই এই ঘটনা কোনভাবেই আর “নেপালি কমিউনিস্ট আর চীনের” কোন বামপন্থা ততপরতা একেবারেই নয়। যেমন আগামিতে নেপালে দুই কমিউনিস্টকেই বাদ দিয়ে নেপালি কংগ্রেসের সাথে চীনের ঘনিষ্ট হওয়া খুবই সম্ভব। আসলে একালে ‘বামপন্থা’ বা ‘ডানপন্থা’ বলে কোন কিছুকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা অর্থহীন।

    আর একটা তথ্যঃ নেপালের কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য নির্বাচন শেষ হয় নাই। মোট আসন ২৭৫ যার মধ্যে ১৬৫ আসন আসবে সরাসরি প্রত্যেক আসনের ভোট কাউন্টে, একজনকে নির্বাচিত ঘোষণা করে। এই রচনাটা লেখা হয়েছে প্রাপ্ত ১৬৫ আসনের ফলাফলের ভিত্তিতে।  আর বাকি ১১০ আসনের ফলাফল পুরণ হবে দলগুলোর আনুপাতিক ভোট প্রাপ্তি থেকে। অর্থাৎ সব আসন মিলিয়ে একটা দল মোট ভোটারের কত পার্শেন্ট ভোট পেয়েছে সে অনুপাতে এই ১১০ আসন ভাগ করে দেয়া হবে। অর্থাৎ কোন দল একটা আসনেও সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে জিততে না পারে যদি, তাহলেও এবার আনুপাতিক ১১০ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবার সুযোগ আছে।  আনুপাতিক ১১০ আসনের গণনা এটা ঘরে বসে গণনা করে কয়েকদিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করে দিবে। এই রচনাটা লেখা হয়েছে ১৬৫ আসনের ভিত্তিতে বলে আনুপাতিক আসন এরপর যোগ হলে আনুপাতিক ভাবেই সব দলের আসন বাড়বে, তাই তেমন কোন হরফের হবে না। এভাবে নেপালের (ফেডারেল) সংসদে মোট আসন বা সংসদ সদস্য ২৭৫ জনেরই নির্বাচন সম্পন্ন হবে।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ‘নেপালে নির্বাচনের ফলাফল : শ্রীলঙ্কার ভূত দেখছে নয়াদিল্লি’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • চালের বাজারে সরকার নিয়ন্ত্রণ হারালো কেন

    চালের বাজারে সরকার নিয়ন্ত্রণ হারালো কেন

    গৌতম দাস

    ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭,রবিবার,  ০০ঃ১৫

    http://wp.me/p1sCvy-2id

    বাজার মানে, চাহিদা-যোগানের লড়াইয়ে এক পর্যায়ে দরদাম কোথাও যেখানে থিতু স্থির হয়। বাংলাদেশের চালের বাজার কোন “তথাকথিত মুক্ত বাজার অর্থনীতির” ফেনোমেনা নয়। এখানে বাজার আছে, তা ফাংশন করে ঠিক যেভাবে কোন বাজারের করার কথা, নিয়ম মত। তবে ছাড়া-গরুর মত এই বাজারে সরকার অর্থাৎ আমাদের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হাতে এক মেকানিজম আছে যা দিয়ে সে বাজারের সবচেয়ে বড় কুতুব-প্রভাবক। সব মজুতদারের বাপ হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু সরকার সেই মেকানিজম নিজেই নষ্ট করে ফেলাতে  এখন খোদ সরকারই বাজার থেকে আউট। বাজারের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে সরকার।

    ‘চড়া চালের বাজার’, ‘চালের দাম নাগালের বাইরে’ বা এর চরম অবস্থা ‘দুর্ভিক্ষ’ শব্দগুলোর ব্যবহার বাংলাদেশে কমবেশি লোপ পেতে শুরু করেছিল। চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের পর তুলনামূলকভাবে ভাল লম্বা সময় কাটলেও দাম চড়া বা চালের অভাব ঘটার মত উল্লেখযোগ্য বছর ছিল ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম বছর। ওই বছরের মাইলস্টোন বা রেকর্ড হল, মোটা চালের দাম ৪২ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়া। কিন্এতু এর দশ বছর পরে এবার ২০১৭ সালে আবার অনাকাঙ্খিতভাবে চালের দাম চড়া। আর এবারের নতুন রেকর্ড হল – মোটা চালের দাম বেনাপোল বন্দরেই ৪৮ টাকা বা এর উপরে উঠেছিল।

    তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, অনেকে খেয়াল করেন নাই হয়ত, চুয়াত্তরের চালের বাজার আর আজকের চালের বাজারের মধ্যে বিরাট এক মৌলিক ফারাক আছে। তা হল, সেকালে চালের বাজার ছিল ‘কমিউনিস্ট সোভিয়েত মডেলে কথিত পরিকল্পিত অর্থনীতির’ আলোকে সাজানো – যার অর্থ আমরা সমাজে তখন চাল বিতরণ করা হত  – ‘রেশনে’ মানে ভর্তুকী দামের চাল। একালের অনেকের কাছে বিশেষত তরুণদের কাছে ‘রেশন’ শব্দটা অপরিচিত হয়ত। ‘রেশন’ শব্দের অর্থ হল, বিপুল ভর্তুকি দিয়ে বাজারের চালের দাম নামিয়ে রাখে সরকার। আর প্রত্যেক পরিবারের সদস্য গুণে সে অনুযায়ী, পরিবারের সাপ্তাহিক চাহিদার পরিমাণ চাল নির্দিষ্ট দোকান (ডিলারের) থেকে বাজারের চেয়ে প্রায় অর্ধেক দামে বিক্রি করা।

    কমিউনিস্ট অনুমানের অর্থনীতির জ্ঞানে তাদের এক বিরাট ক্ষোভের জায়গা হল – ‘বাজার’ ও এই ধারণার উপরে। বাজার তাদের কাছে নাকি শত্রু, সম্ভবত শ্রেণীশত্রু। ফলে দেশ সমাজে বাজারকে কার্যকর বা ফাংশনাল হতে না দেয়া, কাবু করে রাখতে হবে। এই হল তাদের অনুমান। কারণ তাদের চোখে বাজার জিনিষটা  ম্যানেজেবল না। নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তাই বাজার ভেঙে দিতে হবে। আর তাদের কাছে এরই বিকল্প হল রেশনিং বা ভর্তুকিব্যবস্থা। আর বাজার ধারণার বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ আপত্তি হল, ‘বাজার’ মুনাফা বা শোষণে সহায়তা করে। এটা সম্ভব হয়, কারণ মজুদদারেরা বাজারের মধ্যে ‘নোঙরা অযাচিত হাত’  ঢুকিয়ে বাজারকে স্বাভাবিক থাকতে দেয় না। অর্থাৎ চাহিদা ও জোগানের লড়াইয়ের ভিতর দিয়ে পণ্যের মূল্য থিতু বা স্থির হওয়ার ক্ষেত্রে দাম নির্ধারণের ফ্যাক্টরগুলোকে অবজেকটিভ না থাকতে দিয়ে সাবজেকটিভ ইচ্ছার হাত ঢুকিয়ে দেয়ার সুযোগ নেয়া হয়। এটা সত্যি যে, বাজারকে অবজেকটিভ রেখে দেয়া খুবই কঠিন। কে কোথা থেকে বাজারের মূল্যকে প্রভাবিত করতে হস্তক্ষেপ করে বসে, তা ঠেকানো শক্ত আইনকানুন ও মেকানিজম তৈরি করেও এটা সহজে সম্ভব হয় না। এই সমস্যা তো আছেই, কিন্তু অন্য দিকে আবার পালটা সমস্যাও তো আছে। চাল আমাদের মত দেশে মানুষের প্রধান খাদ্য, ফলে এই মুখ্য ভোগ্যপণ্যে ভর্তুকী ঢেলে এক ভর্তুকীর অর্থনীতি জারি রাখলে রাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণে অর্থ সংস্থান জোগাড় করতে হয়। তা জোগাড় করতে যেকোনো সরকারকে হিমশিম খেতে হয়। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ভর্তুকি কোথা থেকে আসবে? সরকারের আয়ের কোন খাত থেকে?

    স্বাভাবিকভাবেই এটা রাজস্ব আয়ের ওপর এক বিরাট চাপ সৃষ্টি করে। ফলে সরকারি ব্যয়ের অন্যান্য খাতকে প্রায় সময় ছেঁটে ফেলতে হয়। কারণ চালে ভর্তুকি দেয়ার অন্য সব কিছুর চেয়ে চাল বেশি দরকারি। এর প্রায়োরিটি অন্য খরচের প্রয়োজনগুলোর চেয়ে বেশি। অন্যদিকে আবার, চালের মূল্যের সাথে শ্রমের ন্যূনতম মজুরি সরাসরি সম্পর্কিত। চালের মূল্য কম তো, ন্যূনতম মজুরি তুলনামূলকভাবে কম হবে। তাই সমাজে মোট উৎপাদনের বেশির ভাগ অংশই যদি বেসরকারি খাতে হয়, তাহলে চালে ভর্তুকির সুফল আসলে যাবে কারখানা মালিকের ঘরে, কম মূল্যে শ্রম কিনবেন তিনি। মানে, পাবলিক মানি যাবে ব্যক্তি মালিকের ঘরে। এ ছাড়া ভর্তুকির সবচেয়ে বড় অসুবিধা হল, এর ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনা। ঠিক যার ভর্তুকি দরকার তিনি ছাড়াও অজস্র লোক যাদের দরকার নেই, তারাও ভর্তুকির আওতায় এসে যায়। ফলে ভর্তুকির চাল উঠিয়ে নেয়, বাজারে বিক্রি করে, ভুয়া নামের রেশন কার্ড থাকে ইত্যাদি এক বিরাট অপচয় ও বোঝা হয়ে হাজির হয়। তবে ভর্তুকির বিরুদ্ধে অথবা স্বপক্ষের যুক্তি আর যাই থাক, আশির দশকের শুরুতে বাংলাদেশ থেকে খাদ্যে ভর্তুকি বা রেশনিং ব্যবস্থা একেবারেই উঠিয়ে দেয়া হয়েছিল।

    এর মূল কারণ, সরকার চালানোর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা আনা আর সরকার চালাতে ব্যয় কমানো, এটা করতে খরচের খাত ও  প্রয়োজনগুলোকে সুনির্দিষ্ট করা আর অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ করা, এভাবে ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানো যাতে খরচ কম হয় আর সেই সাথে ব্যবস্থাপনা দক্ষ হয়, ইত্যাদি এসব করতে নেয়া হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের এক প্রকল্প। এর শর্ত মান্য করতে গিয়ে বাংলাদেশের রেশনিং ব্যবস্থা উঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। এতটুকু পড়ার পর অনেকে সিদ্ধান্তে যাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠতে পারেন যে, ‘দেখছ, বিশ্বব্যাংক কত খারাপ’ ইত্যাদি।  না এমন চিন্তা অতিসরলীকরণের দোষে দুষ্ট হবে।  আসলে উঠিয়ে দিবার এই ব্যাপারটাকে বলা যায়, চালের বাজারকে ভিন্নভাবে ম্যানেজ করার দিকে চলে যাওয়া, ঠিক রেশনিং উঠানো বা ভর্তুকি বন্ধ করে দেয়া নয়।

    যেসব মূল কথার উপরে নতুন ব্যবস্থাটা কাজ করে সে তত্ত্বটা হল- ১. চালের বাজারকে ফিরে ফাংশন করতে দেওয়া। ২. সরকার হবে নতুন এই সিস্টেমের মনিটরিং আর ম্যানেজমেন্ট কর্তা। ৩. কোন মজুদদারি মোকাবেলার সবচেয়ে সহজ পথ হবে যে, সরকার নিজেই হবে সবচেয়ে বড় এক বিরাট মজুদদার; ফলে ব্যক্তি-মজুদদারের হয়ে যাবে অকার্যকর ক্ষমতার চুনোপুঁটি। ছোট মজুদদারিও লাভজনক হবে কি না সে সিদ্ধান্ত ও নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে চলে আসবে। ৪. ধান ওঠার পর সংগ্রহমূল্য সরকার নিজে নির্ধারণ করে দিয়ে চালের দাম কোন সীমার মধ্যে থাকবে এর ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিবে। ৫. আর সবশেষে একটা সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকবে।
    অর্থাৎ এর আগে বলা সব ব্যবস্থাগুলো নেয়ার পরেও যদি বাজারে চালের দাম সরকারের কাঙ্খিত রেঞ্জের বাইরে চলে যায় তাহলে এই ব্যবস্থা নেয়া হবে। যেমন এক সপ্তাহে চালের দাম অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে গেলে সরকার ডিলারের মাধ্যমে ট্রাকে করে বাজারে চাল ছাড়বে। এভাবে সরাসরি বাজারে হস্তক্ষেপ করতে নেমে পড়বে। শুধু তাই না বাজারে আগে যে কম দাম ছিক সেই দামে সে চাল বেচা শুরু করবে। এভাবে চাল ছাড়তেই থাকবে যতক্ষণ বাজারে চালের দাম আগের পর্যায়ে না নেমে আসবে। এই জায়গাটায়ই হলো আসল লড়াই। বাজারের মোট মজুদের চেয়ে সরকারের মজুদ সবসময় অনেক বেশি বলে একপর্যায়ে বাজারের ব্যক্তি মজুদদার হেরে যাবে। সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
    বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার হিসাবে দশ থেকে চৌদ্দ লাখ (দশ লাখের নিচে নয়) টনের খাদ্য মজুদ থাকলে ব্যক্তি-মজুদদারেরা সরকারের কাছে হারবেই।  বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার এই নিয়ম ও মাপকাঠিই সাব্যস্ত হয়েছিল আশির দশকের প্রথমার্ধ থেকে। আর কোনো বড় ধরনের বিপর্যয় ছাড়াই নতুন ব্যবস্থা ফলদায়কভাবে চলেছিল ২০০৭ সালের আগ পর্যন্ত। এই হিসাবে বলা যায় পুরনো রেশনিং ব্যবস্থা উঠিয়ে দিয়ে বাস্তবায়িত, বিকল্প এই পরিকল্পিত ব্যবস্থা ছিল সফল। কিন্তু ব্যাপারটার তাৎপর্য কী? একবাক্যে বললে, কমিউনিস্টরা বাজার ম্যানেজেবল নয় সিদ্ধান্তে গিয়ে বাজারকে অকেজো করে দিয়েছিল, ভর্তুকীর এক রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছিল। এর বিকল্প হল, চালের বাজার ফিরিয়ে আনা। আর বাজারের চাহিদা-জোগানোর খেলায় সরকার নিজেই এই বাজারের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় হিসেবে নেমে সব ছোট খেলোয়াড়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এটাকে আমরা এখন থেকে ‘বিকল্প বাজার ব্যবস্থা’ নামে অভিহিত করব।

    এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমান চালের বাজারের হাল এটা প্রমাণ করে যে, বিশ্বব্যাংকের প্রতিষ্ঠিত এবং প্রমাণিতভাবে কার্যকর ‘বিকল্প বাজার ব্যবস্থা’ এবার দ্বিতীয়বার পরাজিত হয়েছে, ব্যক্তি মজুদদারদের কাছে। এটা ঠিক যেমন ২০০৭ সালে পরাজিত হয়েছি্‌ তেমনই। কিন্তু কেন এটা হল?

    দুইবারের পরাজয়ে একটা অভিন্ন বিষয় আছে। তা হল, সরকারি চালের মজুদ ১০ লাখ টনের অনেক নিচে নেমে যেতে দেওয়া হয়েছিল। ২০০৭ সালে আইলা ঘূর্ণিঝড়ের পর এটা মাত্র দেড় লাখ টনে নেমে গিয়েছিল। অথচ এর আগেই খাদ্য মন্ত্রণালয়ে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের উপদেষ্টা প্রকাশ্যে টিভিতে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন যে, সরকারি গুদামে মজুদের পরিমাণ মাত্র দেড় লাখ টন। আর সাথে তিনি এটাও বলেছিলেন, এখন সরকারের কিছু করার নেই।

    আর এবারও সরকারের চাল মজুদের পরিমাণ তিন লাখ টনের নিচে নেমে গেছে। এর অর্থ ব্যক্তি মজুদদারেরা বাজারের ডমিনেটিং কর্তা হয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তবে আরো কারণ আছে। ২০০৭ সালে বাজারে হেরে যাওয়ার পরেও সরকার কিছু গুরুত্বপুর্ণ পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি অনেকটাই নিজের পক্ষে এনে ফেলেছিল যীগুলো এবার মারাত্মকভাবে অনুপস্থিত। অথচ ২০০৭ সালের রিকভারি বা নিয়ন্ত্রণ পুণরুদ্ধারমূলক পদক্ষেপ নিয়ে বাজারে নিজের নিয়ন্ত্রণ  ফিরিয়ে আনতে সরকার কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ও সফল হয়েছিল, যা বেঞ্চমার্ক হয়ে আছে। কিন্তু আমরা নিশ্চিত যে, সেসব বেঞ্চমার্ক বা অভিজ্ঞতা থেকে এবার শিক্ষা নেয়া হয়নি।

    সেটা হল একঃ চাল আমদানির এলসি উন্মুক্ত করে দেয়া। কিন্তু তা করতে পারার পেছনে আরেক শর্ত মানতে হয়। তা হল, সরকারের হাতে যথেষ্ট বিদেশী মুদ্রা থাকতে হবে। এর ঘাটতি থাকলে হবে না। ব্যাপারটা আমরা তুলনা করতে পারি চুয়াত্তর সালের সাথে। সেবার দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ, কোষাগারে বিদেশী মুদ্রা ছিল না যে চাল দ্রুত আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কমিউনিস্ট পরিকল্পিত অর্থনীতির আরেক সাধারণ ও মারাত্মক নেগেটিভ বৈশিষ্ট্য থাকে যে, ওমন সরকারগুলো সবসময় বিদেশী মুদ্রার বিপুল অভাবের মধ্যে থাকে। ফলে সে সময় খাদ্য আমদানি উন্মুক্ত হওয়া দূরে থাক, আমদানির এলসি পর্যন্ত খুলতে দেয়া যায়নি। এখানে ‘উন্মুক্ত’ বলতে বুঝতে হবে যে, যে নিয়মিত চাল আমদানিকারক নয় তাকেও আমদানির এলসি খুলতে দেয়া। এককথায় বললে ২০০৭ সালের সরকার, যে-ই আগ্রহী তাকেই এলসি খুলতে দিতে পেরেছিল – এটাই ছিল ক্রাইটেরিয়া। কেন? তাতে কী সুবিধা পাওয়া গিয়েছিল?

    যখনই আমাদের দেশে চালের অভাব হয় তখন পড়শি রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে ভারত, সরকারি পর্যায়ে চাল বেচতে আর দরদাম ঠিক করতে নানা গড়িমসি করে, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে অনেক দেরি করে থাকে। আর এসব বাধা টপকে তা উপেক্ষা করার সবচেয়ে ভাল উপায় হল, আমাদের ব্যক্তি ব্যবসায়ীদের দিয়ে ওদের ব্যক্তি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দ্রুত চাল কিনে আনা। এ ছাড়া এই পথেই সবচেয়ে কম দামে আমদানিকারকেরা  চাল আমদানি করতে পারেন। ব্যক্তি ব্যবসায়ীরা যদি প্রতি টন ৩৮৪ ডলারে আনেন, তবে সরকারি পর্যায়ে এর দাম ৪৫০ ডলারের কম হবে না। তাই সব মিলিয়ে এসব বাধা টপকানোর সবচেয়ে ভাল মেকানিজম হল, চাল আমদানির এলসি উন্মুক্ত করে দেয়া। ২০০৭ সালে তো ভারতের সরকারি পর্যায়ে প্রতিশ্রুতি দেয়া পাঁচ লাখ টন চাল আজও ভারতের সরকার আনতে দেয়নি, সিদ্ধান্ত দেয়নি। ফলে ভারত থেকে যা চাল এসেছিল এর সব চালই আনা সম্ভব হয়েছিল ব্যক্তিপর্যায়ে। সেটাও ভারত সরকার একপর্যায়ে বন্ধ করে দিয়েছিল ভারতের কাস্টমসের একের পর এক নতুন আরোপিত নিষেধাজ্ঞায়। যেমন সার্কুলারে বলা হয়েছিল – প্রথমে ৪০০, কয়েকদিন পরে ৫০০ আর সবশেষ ১০০০ ডলারের নিচে কোনো এলসির রফতানি ছাড়পত্র দেয়া হবে না।

    ২০০৭ সালের দ্বিতীয় বেঞ্চমার্ক সিদ্ধান্ত ছিল নতুন চালের সংগ্রহমূল্য প্রসঙ্গে। এর আগে বোরো ধানের সরকারি সংগ্রহ মূল্য ২১-২২ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। বন্যা দুর্যোগে চাল মজুদ কমের সমস্যার চার মাসের মধ্যে বোরো ধান উঠতে শুরু করেছিল। আর ঐবারই প্রথম থেকেই কোনো দ্বিধা না রেখে সরকারের সংগ্রহমূল্য এক লাফে ২৮ টাকা করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য একই। মজুদদার বা চালের মিলারদের চেয়ে বড় ক্রেতা হিসেবে সরকারের বাজারে প্রবেশ করা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিদের হারিয়ে দিয়ে নিজে মুখ্য ক্রেতা হওয়া। ঐ ঘটনার সাথে একটা তুলনা করা যাক। এবারের বোরো চাল ক্রয় শুরু হয়েছিল বিগত মে মাসের শুরু থেকে, লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাত লাখ টন। ২৫ জুন বণিকবার্তা পত্রিকার রিপোর্ট হল, সংগ্রহ অভিযান শুরুর পর এক মাস ২৫ দিন পার হয়ে গেলেও লক্ষ্যমাত্রার এক শতাংশ চালও সংগ্রহ করা যায়নি। কেন? কারণ, ধানের সংগ্রহমূল্য করা হয়েছিল ২৪ টাকা। এটা খুবই কম। আসলে সংগ্রহমূল্য কম না বেশি, তা বুঝবার পেছনে আরেকটা ফ্যাক্টর আছে, সেদিক থেকে ব্যাপারটা বুঝতে হবে।

    স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের চালের উৎপাদন খরচ আমদানি করা চালের চেয়ে কম। কম দাম পড়ে  কিন্তু আমাদের চালের ‘বিকল্প বাজার ব্যবস্থা’ যদি কোনো বছর ফেল করে তবে এর অর্থ হল, তখন ঐ বছর ব্যক্তিপর্যায়ে চাল আমদানি করতে দিতেই হবে। এর ফলে ওই বছর স্থানীয় উৎপাদন খরচ নয়, বরং আমদানির মূল্যই চালের বাজারে মুল মুল্যনির্ধারক হয়ে যায়। স্থানীয় চাল-ধান কী দামে বেচাকেনা হবে তাও আমদানি মুল্য দিয়ে বিবেচিত হতে শুরু করে। আমাদের উতপাদন খরচ কত পরছে এটা কোন বিবেচ্যই থাকে না। অর্থাৎ তখন গত বছরের দামের চেয়ে চালের সংগ্রহ মুল্য বেশি হয়ে যায়। বেশি রাখতে হয়। এই বিচারে (২৪ টাকা ধান অথবা) ৩৪ টাকা চালের সংগ্রহমূল্য কম বলে বিবেচিত হয়েছে। এটা সম্ভবত কমপক্ষে ৩৬ টাকা হওয়া উচিত ছিল। অর্থাৎ সরকারের গুদামে মজুদ কম বলে আগ্রাসী দাম অফার করে সরকারকে বাজারে ঢুকতে হত – এই বাজার নীতি সরকার অনুসরণ করেনি। এক কথায় সরকার বাজার বুঝে না, তাই প্রমাণ করেছে। এমনকি স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করতে অক্ষম হলে তো সরকারকে নিজ সংগ্রহমূল্যের চেয়েও  অনেক বেশি দামে আমদানি করতেই হবে। এই বিচারে আগেই সংগ্রহমূল্য বেশি অফার করে রাখাটাই স্বাভাবিক হত, বুদ্ধিমানের সিদ্ধান্ত হত। অথচ সেটা সরকার করেনি।

    তৃতীয়ত, এর আগে কখনো চালের আমদানি শুল্ক কার্যকর ছিল বলে জানা যায় না। তবে অযথা ব্যক্তির আমদানি ঠেকাতে ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে রাখা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যখন আমদানি ছাড়া উপায়হীন অবস্থা হয়ে গেছে, তখন শুল্ক কমাতে দ্বিধা ও দেরি করানো অদক্ষতা ও অযোগ্যতার প্রমাণ। এটাও এবার চালের দাম বাড়ার একটা কারণ।

    চাল ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনায় খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম দাবি করেছেন দেশে চালের কোনো সঙ্কট নেই এবং সারা দেশে ব্যবসায়ীদের কাছে প্রায় এক কোটি টন চাল আছে। মন্ত্রী তার এই দাবির ভিত্তি কী তা কোথাও বলেন নাই।   অবশ্যি চালের সঙ্কট আছে। আর সেসব কথা বাদ রাখতে হবে।  কারণ ব্যবসায়ীদের কাছে যে পরিমাণই থাকুক, সরকারের গুদামে ১০-১৪ লাখ টন খাদ্য মজুদ থাকতে হয়। তবেই তো কথিত এক কোটি টন মজুদের ব্যবসায়ীদেরকে বাধ্য করা যাবে চাল ছাড়তে। সরকারের হাতে ব্যবসায়ীদেরকে বাধ্য করার  কোন মেকানিজম নাই, নিজের বেকুবিতে সে অস্ত্রহীন, ঠুটো জগন্নাথ। এভাবে নিজের হাতের অস্ত্র হারানো এটা তো একটা ক্ষমাহীন অপরাধ। যে বাজার মেকানিজম বুঝে না সে মন্ত্রী হতে আসে কেন? এটা কতটা ইচ্ছাকৃত তা হোক আর নাই হোক এই ব্যর্থতা এক অপরাধ।  সরকারের হাতের বাজার নিয়ন্ত্রণের মেকানিজম একমাত্র সেই ‘বিকল্প বাজারব্যবস্থা’ কোন যুক্তিতেই সরকার হাতছাড়া করতে পারে না।  কিন্তু তা রাখতে মন্ত্রণালয় ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতা, এই সঙ্কটের দায় মন্ত্রণালয় নিতে হবে।

    এই বিচারে আমাদের চালের ‘বিকল্প বাজারব্যবস্থা’ চালানোর ক্ষেত্রে বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী ব্যর্থ ও অযোগ্য। সে তুলনায় আগের খাদ্যমন্ত্রী (হাসিনার প্রথম পাঁচ বছরের) ড. আবদুর রাজ্জাক সফল ছিলেন। অন্কাতত বড় কোন বিপর্রযয় হয় নাই এই অর্থে।  তিনি সিস্টেমটা বুঝেছিলেন।

    শিক্ষাগুলো কীঃ
    এর আগে কখনও চালের আমদানি শুল্ক কার্যকর ছিল বলে জানা যায় না। অথবা থাকলেও যে মুহুর্ততে জানা যায় যে সরকারের নিয়ন্ত্রণ মেকানিজম অকার্যকর হয়ে গেছে সেই মুহুর্তে সবার আগে আমদানি শুল্ক (তা জারি থাকলে) প্রত্যাহার করে নেয়া উচিত।  এটা হতে পারে অযথা ব্যক্তি আমদানী ঠেকাতে সাধারণ সময়ে ৩০% শুল্ক আরোপ করে রাখা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যখন আমদানি ছাড়া উপায়হীন অবস্থায় পৌছে গেছে তখন শুল্ক উঠিয়ে নিতে দ্বিধা ও দেরি করানো এক চরম অদক্ষতা ও অযোগ্যতা। এটাও এবার চালের দাম বাড়ার একটা কারণ। দেরি হওয়াতে সবচেয়ে ক্ষতিকর হয়েছে যে চাল ভারতীয় সীমান্তে আনার পরও তা কাস্টমসে ক্লিয়ার করা হয় নাই যে দু একদিনে শুল্ক উঠে যাবে। এতে বাজারে খুবই খারাপ ম্যাসেজ গিয়েছে। বাজার উলটাপালটা তোলপাড় হয়ে গেছে।

    অনলাইন “সাপ্তাহিক” পত্রিকার গোলাম মোর্তোজা বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসুর নাকি টক শো তে বলেছেন, ‘দাম কে বাড়িয়েছে, সরকার বাড়িয়েছে? মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে বাজার পরিস্স্থিতি দাম নিয়ন্ত্রণ করে। বাজারে চালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণেই ওএমএসের চালের দাম বাড়ানো হয়েছে।’ শুভাশীষের এই বক্তব্য আপাত দৃষ্টিতে খুব স্মার্ট মনে হলেও এই বক্তব্য মিথ্যা আর এটা আসলে সচিব হিসাবে তাঁর অজ্ঞতার প্রমাণ। মিথ্যা এজন্য যে সরকারের চালের বাজার নিয়ন্ত্রণের শক্ত মেকানিজম আছে যেটাকে উপরে এখানে ‘বিকল্প বাজার ব্যবস্থা’ নামে ব্যাখ্যা করেছি। হয় তিনি এই মেকানিজম সম্পর্কে জানেনই না। অথবা জেনেই পাবলিক মাইন্ডে এর পরিস্কার তথ্য ও চিত্র না থাকার সুবিধা নিয়ে চমক লাগানো ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’ কথা বিরাট জ্ঞানী ভাব ধরে আউড়ালেন। ফেক্টস হল, বাংলাদেশের চালের বাজারে কোন ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’ নাই। বরং সরকারের নিয়ন্ত্রণ মেকানিজম আছে। কেবল অযোগ্য, অদক্ষ দুর্নীতিবাজ না হলে এই মেকানিজম ব্যবহার করতে পারলে সরকারের কখনও চালের বাজারের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর সুযোগ নাই।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া অনলাইন দুরবীন পত্রিকায় তা ছাপা হয়েছিল ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

    উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

    গৌতম দাস

    ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  বুধবার, ১৫ঃ১৭

    http://wp.me/p1sCvy-2hU

    আগের পর্বে বলেছিলাম, বার্মার হিউম্যান রাইট পরিস্থিতির অবনতিতে আমেরিকা অবরোধ আরোপ শুরু করেছিল  ১৯৯৩ সাল থেকেই। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম অবরোধ আরোপিত ছিল। কিন্তু ২০০৬-৭ সালের দিকে ব্যাপারটাকে প্রথম ভিন্ন দিক থেকে দেখা বা নতুন মুল্যায়ন আসতে শুরু করেছিল।  ভারতের দুতায়ালি মধ্যস্থতা আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের সমর্থনে অবরোধ তুলে নেয়ার নতুন ফর্মুলা তৈরি শুরু হয়েছিল। আর তাতে সুচি কে ‘সামরিক কর্তাদের রাষ্ট্রের উপর সিভিলিয়ান ফেস এর প্রলেপ’ – সম্ভবত এটাই হবে এর সঠিক মুল্যায়ন, এই নীতিতে বার্মার সামরিক রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে কোন সংস্কারই তাতে হয় নাই, ছিল না তা বলা ভুল হবে। কিন্তু খোদ বার্মা রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া; ওর কর্তৃত্ব সার্বভৌমত্ব জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া অর্থে এক নুন্যতম মর্ডান রিপাবলিক হয়ে উঠা – না এটা ঐ ফর্মুলাতে ছিলই না। বরং সামরিক বাহিনীর একা নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে লেখা ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনকে ভিত্তি করে নতুন রাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল, এটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রাষ্ট্রের ভিতর সেনাবাহিনী বলে প্রতিষ্ঠান থাকে। কিন্তু এখনকার বার্মা হল, সেনাবাহিনীই সার্বভৌম যার অধীনে রাষ্ট্র বলে আবার একটা প্রতিষ্ঠানও আছে। সেটা বুঝা যায়, রাষ্ট্রের  সিভিল নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া যে কোন সিদ্ধান্তে ভেটো দিবার ক্ষমতা আছে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চীফের। আবার তিনিই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তরক্ষার মত গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয় মন্ত্রী নিয়োগ দেয়াসহ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেন, ২৫% সংসদীয় (কেন্দ্র ও প্রাদেশিক উভয় জায়গায়) আসন সেনাসদস্যদের জন্য এবং বিনাভোটে বরাদ্দ রাখা ইত্যাদি এগুলা হল সেই দগদগে চিহ্ন যা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় বার্মা কেমন ধরণের রাষ্ট্র। আর এটাই নাকি সংস্কার। আর এসব সংস্কারই তার প্রতিশ্রুত সবগুলো কাজ শেষ করার আগেই ২০১০ সালেই পশ্চিমা বিনোয়োগ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল মায়ানমারে। পশ্চিমের সাথে ২০০৮ সালের আজীব কনষ্টিটিউশনের ভিত্তিতে নতুন মায়ানমারের হানিমুন শুরু হয়ে গেছিল এখান থেকে। কিন্তু জেনারেলেরা একটা কথা ভুলে যায় নাই, তা হলো মায়ানমারিজম। যেটা আসলে ইসলাম বিদ্বেষী মশলা দেয়া এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ; এর চর্চা, এবং একেই মায়ানমার রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসাবে সাজানো। ফলে ২০১২ সালে আবার নব উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সেই পুরানো রোহিঙ্গা নিধন। যার মূল যুক্তি হল, নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুসারে রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক নয় – এই গান। ফলে বাংলাদেশে শরণার্থীর ঢল নামানো। অনুমান করা হয় যে ভারত বার্মার জেনারেলদেরকে আশ্বস্ত করেছিল ও উতসাহ দিয়েছিল এই বলে যে এবার এই নব সাজের মায়ানমার যেখান থেকে পশ্চিমারা বিপুলভাবে বার্মায় বিনিয়োগ করতে পারার সুখ আর মাখন খাওয়াতে ব্যস্ত আছে, ফলে এবার তারা হিউমান রাইট ভায়োলেশন, গনহত্যা ইত্যাদি বলে আওয়াজ তেমন জোরালো না তুলে চেপে যাবে।  আমাদের এই অনুমান পোক্ত হয়, ২০১২ সালে  বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা নীতির বদলে যাওয়া দেখে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিবে না, প্রথম এই নীতি নেয়া হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ তখনও বর্ডার সীল করে রাখা এই বলে যে, আমরা অনেক নিয়েছি, ওথবা বলা যে রোহিঙ্গারা জঙ্গী ফলে জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে পড়বে বলে কথা ছড়িয়ে আভ্যন্তরীণভাবে জনমানুষের মন বিষিয়ে দেওয়ার আওয়াজ  ইত্যাদি অজুহাতগুলো বাংলাদেশ সেকালে প্রথম তুলেছিল। কিন্তু যে মায়ানমারকে রোহিঙ্গা তাড়াতে ও নির্মুল করতে উতসাহ দিয়েছিল সেই ভারত বাংলাদেশকেও এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ এই নীতি নিতে প্ররোচিত করেছিল। ফলে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা গণহত্যার আর এক জোয়ার আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সেবারের ঘটনাবলীতে আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট সংগঠনগুলোর মধ্যে হিউম্যান রাইট ওয়াচের রিপোর্ট ছিল ভয়াবহ, মায়ানমারের জেনারেলদের জন্য বড় রকমের অস্বস্তির। সমস্ত ভায়োলেশনগুলো লিগাল পয়েন্টে বিস্তারিত বর্ণনা সেখানে ছিল।  ওদিকে সময়টা ছিল বারাক ওবামার জন্য তার সেকেন্ড টার্মের নির্বাচন চলাকালীন সময়। ২০১২ সালের নভেম্বরের সাত তারিখের নির্বাচনে জয়লাভের পরই, আকস্মিক তাঁর মায়ানমার সফরের  প্রোগ্রাম ঘোষিত হয়।

    আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পরবর্তিকাল থেকে এপর্যন্ত বার্মা পশ্চিমের জন্য ‘নো গো’ এলাকা বা অগম্য স্থান হয়ে ছিল। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যতটুকু পশ্চিমাদেশের ছোয়া বার্মায় ছিল তা হল কেবল বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সুত্রে যা ততটুকুই। কিন্তু তা ছিল কলোনি সম্পর্ক – অর্থাৎ উদ্বৃত্ব উঠিয়ে নিয়ে যাবার, বার্মায় পশ্চিমের বিনিয়োগ আনার নয়। আর সেই সাথে বৃটিশ আধুনিক মূল্যবোধের প্রভাবের ভাল দিক তা ঐ প্রথম আর সেই শেষ। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কনষ্টিটিউশন রচনা ও নানান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল মত গড়ে তোলার আগেই সময় পাবার আগেই মাত্র ১০ বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ সামলাতে সিটিং জেনারেল নে উইনকে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছিল।  বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ দমন সামলার পাশাপাশি আবার ঐ সময়টা ছিল আসলে বিদেশী বিরোধীতার মানে চরম জেনোফোবিয়া চর্চার যুগ, বিশেষত বিদেশী হিসাবে ভারত ছিল এক নম্বর তালিকায়। সেসব বিষয়ে এখানে বিস্তারে না গিয়ে কেবল একটা বাক্যে তা বলে রাখি। তা হল, জাতীয়তাবাদ আর ‘বিদেশী মাত্রই (অথবা বিদেশী বিনিয়োগ মানেই) তা আমাদের শত্রু – এই দুটা এক ধারণা নয়। তা সত্বেও এভাবে দুটাকে অনেকে ভুলে সমার্থক  জ্ঞান করেন বটে। কিন্তু এদুটো এক ধারণা বা সমার্থক ধারণা নয়। সেটা ছিল ঐ এমন জেনোফোবিয়ার যুগ। নে উইনের ঐ দুই বছর ছিল সেই লৌহ দানবীয় দমনের যুগ। ঐ দমন শেষে ১৯৬০ সালে তিনি সাধারণ নির্বাচন দেন। আর সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন উ নু (নে উইনের পুরান ৩০ কমরেডের একজন) যিনি নে উইনকে সামরিক প্রধান হওয়া সত্ত্বেও আগের সময়ে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। সে যাত্রায় উ নু সিভিল সরকার গড়েছিলেন কিন্তু  দুবছরের আগেই ১৯৬২ সালে  ঐ সিভিল নির্বাচিত ক্ষমতার বিরুদ্ধেই নে উইন ক্যু করে ক্ষমতা নেন, আর তাঁর ব্রান্ডের সমাজতন্ত্র কায়েম করেন; যা চলেছিল ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। সারকথায় ১৯৪৮ সালের পরে, সারা দুনিয়া ততদিনে আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে সাজানো হয়ে গেলেও আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমের কাছে বার্মা তখনও  ‘নো গো’ বা প্রবেশহীন হয়ে থেকে গেছিল। না পশ্চিমের কোন বাণিজ্য বিনিয়োগ, না কোন রাজনৈতিক চিন্তা মুল্যবোধ – কোনটারই ছোঁয়া মায়ানমার আর পায় নাই ২০১০ সালের আগে পর্যন্ত। দীর্ঘদিন পশ্চিমের ছোঁয়া না লাগা, পড়ে থাকা মাটির নিচের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় সম্পদের বার্মা, এই অর্থে ভারজিন ল্যান্ড সেই বার্মায় সেবার প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সফরে এসেছিলেন। এই ছিল ওবামার সফরের এক গুরুত্বপুর্ণ তাতপর্য।  কিন্তু না আরও বড় এক তাতপর্য ছিল – হিউম্যান রাইট। আসলে বারাক ওবামা হিউম্যান রাইট ওয়াচের অভিযোগগুলো নিয়ে বার্মার শাসক জেনারেলদেরকে কড়কে দিতে এসেছিলেন। না ঠিক কেবল সেগুলোই নয়, সফরে এসে বক্তৃতায় প্রথমে বার্মা সংস্কার করতে রাজী হওয়ায় আর সেসবের কিছু করে দেখানোর জন্য প্রথমে প্রশংসা করেন তিনি শাসকদের আর এরপরে কঠোর সমালোচনা করেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের। এই ইস্যুতে আমেরিকার সাথে ভারত  পরস্পর বিরোধী নীতিতে চলে যায়; বার্মা নীতিতে একটা ফারাক হয়ে যায় তবে তা আন্ডারষ্ট্রীমে রাখতে সক্ষম হয়। ওদিকে আমেরিকার বিনিয়োগ মহল ওবামার সফরকে খুশিভাবে নেয় নাই। বরং বাণিজ্য বিনিয়োগের জন্য খারাপ সংকেত হিসাবে দেখেছিল। সেজন্য তারা সে অস্বস্তি ভিন্নভাষায় তুলে ধরেছিল এভাবে যে সামনে আরও কয়েক বছর ধরে সংস্কার হওয়ার পরে ওবামার সফরে আসা উচিত ছিল। যেন তারা বলতে চাচ্ছিল ওবামা উনি এখন জেনারেলদেরকে ধমকাধমকি করেন কেন, আমরা ভয় পাচ্ছি। এব্যাপারে আগ্রহীরা নুইয়র্ক টাইমসের ০৮ নভেম্বর ২০১২ সালের এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন। তবে বার্মা সফরে গিয়ে ওবামার রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিরাট হেদায়েতি বক্তব্য রেখেছিলেন। যেন রাষ্ট্র কী, তার ক্ষমতা কিভাবে কংগ্রেসের দ্বারা চেক এন্ড ব্যালেন্সড। এছাড়া হিউম্যান রাইট কী, নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদীহীতা কী জিনিষ এসবের এক হেদায়েত করা বক্তৃতাটা করেছিলেন রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে। রোহিঙ্গাদের ‘মর্যাদার’ প্রসঙ্গে তার শক্ত অবস্থানের কথা ওখানে জানা যায়। তিনি বলেছিলেন,
    “Today, we look at the recent violence in Rakhine State that has caused so much suffering, and we see the danger of continued tensions there.  For too long, the people of this state, including ethnic Rakhine, have faced crushing poverty and persecution.  But there is no excuse for violence against innocent people.  And the Rohingya hold themselves — hold within themselves the same dignity as you do, and I do.
    National reconciliation will take time, but for the sake of our common humanity, and for the sake of this country’s future, it is necessary to stop incitement and to stop violence.  And I welcome the government’s commitment to address the issues of injustice and accountability, and humanitarian access and citizenship.  That’s a vision that the world will support as you move forward”.
    কিন্তু প্রশ্ন হল ওবামা ঠিক কেন ওমন সুর বদলিয়ে ছিলেন কেন?

    হেনরি কিসিঞ্জার ও হিউম্যান রাইট
    কিসিঞ্জার এখনও আমেরিকার ডিপ্লোমেটিক ও একাদেমিক জগতে খুব গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব। কিসিঞ্জার হলেন চীনকে বাইরের দুনিয়ায় বের করে আনার মানে, যেমন  চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে আজকের জায়গায় আনার কারিগর। এই ‘জায়গায়’ বলতে, এর আগের চীনের কমিউনিস্ট-গিরির ব্লক বা ঘেরাটোপ ছেড়ে বের হয়ে আসা, আমেরিকার জন্য চীন বিপুল বিনিয়োগে ও বাজারের স্থান উঠা; আবার সেখান থেকে  পাল্টা চীন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে নিজেই আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠা ইত্যাদি। সেই চীন প্রসঙ্গে  কিসিঞ্জারের এক অন্যতম সাবধানবাণী বা পরামর্শ আছে। তিনি বলছিলেন, ভবিষ্যতের আমেরিকার চীনকে আয়ত্বের মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় টুলস হল, হিঊম্যান রাইট; যা চীন সবসময় একটা ঘাটতিতে থাকবে। ফলে তা দিয়ে চীনকে বেকায়দা বা কাবু রাখা যাবে, অনেকটাই।  কিন্তু একটা শর্ত আছে। তা হল, আমেরিকাকে এই হাতিয়ার হাতে পেতে গেলে কিছু আগাম করণীয় আছে, যা করে রাখতে হবে। আমেরিকাকে দুনিয়া জুড়ে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ড স্থাপন ও তা ধরে রাখার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে চর্চায় থাকতে হবে। কেবলমাত্র তাহলেই এই হিউম্যান রাইট হাতিয়ার আমেরিকার হাতে উঠে আসবে, নইলে নয়। মনে করা হয়ে থাকে, কিসিঞ্জারের এই বাণীর বাস্তব রূপ দেখতেই আমেরিকান দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ কে সাজানো হয়েছে। সেটা হল, কোন দেশে আমেরিকা কী বিদেশ নীতি অনুসরণ করে তা খেয়াল না করেই তা থেকে বরং স্বাধীনভাবে ‘রাইট ভায়োলেশনের’ রিপোর্টগুলো করে থাকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ । যেখানে ওর নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনেরা বেশিরভাগ সময় আমেরিকান প্রশাসনিক অবস্থান ও নীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলতে চায়। না, একথা থেকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ সম্পর্কে কোন ‘অভিযোগশুন্য আর ওর সবভালো’ এমন কোন সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে না। বা সেজন্য কথাগুলো বলা হচ্ছে না। তবে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচের’  এভাবে তুলনামূলক স্বাধীন অবস্থান নিয়ে হাজির থাকার সুবিধাটা হল যে তাতে আমেরিকান প্রশাসন চাইলে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ এর রিপোর্টের আলোকে  নিজেকে কারেক্ট করে নিতে পারে। মানে নিজেকে সংশোধন করে নিবার সুযোগ প্রশাসন চাইলে নিতে পারে।  কারণ আমেরিকান প্রশাসন অথবা ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ – এরা কেউ কারও অবস্থান একমাত্র স্বেচ্ছায় অনুসরণ ছাড়া কারও অবস্থান অন্যের জন্য বাধ্যবাধকতার নয়।  ফলে ওবামার ঐ বার্মা সফরকে তাঁর প্রশাসনের  কারেকশনের সফর ছিল বলে আমরা গণ্য করতে পারি। ঐ সফর নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম ছিল – “ওবামা ঐতিহাসিক মায়ানমার সফরে প্রশংসা করেছেন আবার চাপও দিয়েছেন” (Obama offers praise, pressure on historic Myanmar trip)। একদিকে প্রশংসা (অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে) আবার অন্যদিকে চাপ (অর্থাৎ হিউম্যান রাইটের জন্য চাপ দেয়া, রোহিঙ্গা ইস্যুকে বক্তব্যের প্রসঙ্গ করা) – এই দুটোই আমরা দেখছি।

    সে আমলে ইতোমধ্যে মায়ানমারের তথাকথিত সংস্কার যা হয়েছে তা হয়েছে সাবেক জেনারেল আগের রাষ্ট্রপতি থিন সিন (Thein Sein) এর হাতে। কিন্তু আমেরিকান প্রশাসন “রোহিঙ্গাদের মর্যাদা” নিয়ে চাপ আর বিপরীতে থিন সিনের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কায়েমের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকতে নাই বলে তাদেরকে নির্মুল করার স্বার্থ – এই দুটো অবস্থান কোথায় গিয়ে তাহলে রফা হবে? কীভাবে তারা এক পয়েন্ট মিলতে পারে?

    প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থিন সিন বলেছিলেন, রাখাইন রাষ্ট্রের রোহিঙ্গা যাদেরকে মায়ানমার সরকার বাঙালী বলে ডাকে তাদের উপর চলতি কমিউনাল দাঙ্গার সমাধান হল, হয় তাদের UNHCR এর রিফিউজি ক্যাম্পে অথবা তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। মায়ানমানের ইংলিশ দৈনিক মায়ানমার টাইমস লিখছে,  According to the president’s official website, U Thein Sein told Mr Guterres that the solution to communal violence in Rakhine State was to send the Rohingya – known in Myanmar as Bengalis – to either UNHCR refugee camps or a third country। তো একথা শুনে UNHCR এর প্রধান আন্তেনিও গুতাররেস থিন সিনের সাথে দেখা করে এক টেকনিক্যাল প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলতে চাইছিলেন আমরা তো রিফিউজি নিয়ে কাজ করি। রিফিউজি মানে যারা নিজের দেশ ছেড়ে আর এক দেশে আশ্রয় প্রার্থী বা আশ্রয় নিয়েছেন, তারা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট থিন সিন তিনি কথা বলছেন মায়ানমানের রাখাইনে যারা এখন আছেন, বসবাস করছেন এমন রোহিঙ্গা মানুষদের কথা। ফলে তারা তো UNHCR এর কাজের এক্তিয়ারের বাইরের। অর্থাৎ এন্টেনিও বলতে চাইছিলেন যারা মায়ানমারের ভিতরে আছে তারা তো রিফিউজি নয়। ফলে সেই থেকে থিন সিনসহ বার্মিজ জেনারেলদের সমস্যার একমাত্র সমাধান হয়ে দাড়ায়, যারা ভিতর আছে এমন রোহিঙ্গাদেরকে মেরে ধরে সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যাতে তাদের স্টাটাস তখন রিফিউজি হয়ে যায়। সেই ফর্মুলা থিন সিন চেষ্টা করে গেছেন। সেকাজেই তারা এতদিন চেষ্টা করেছে ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়া এবং ২০১৪ সালে আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের গণনা থেকে মানে নাগরিক গণ্য করা থেকে বাদ দেওয়া।
    ইতোমধ্যে থিন সিনের আমল ২০১৬ সালে এপ্রিলে শেষ হয়ে যায়। এরপর সু চির পছন্দের নিয়োগ দেয়া প্রেসিডেন্টের আমল আসে; যেখানে সব সিভিল ক্ষমতা কার্যত স্টেট কাউন্সিলর নাম ধারণ করে থাকা সু চির হাতে। সেই সু চি এর অফিস ও কফি আনানের আনান ফাউন্ডেশনের মধ্যে করা চুক্তিতে রাখাইন রাজ্য বিষয়ে এক পরামর্শক কমিশন গঠন করা হয় সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে। এটা কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না, স্থানীয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান যার মোট নয় সদস্যের মধ্যে ছয়জনই স্থানীয়। এছাড়া বার্মায় চলমান দাঙ্গা বা হত্যার বিষয়ে কে দায়ী সেসব বিবেচনা করাও এই কমিশনের এক্তিয়ার দেওয়া হয় নাই। তবে কমিশনের কাজ হল “রাখাইন রাজ্য যেসব জটিল সমস্যার মধ্যে আছে এর জন্য সমাধান কী হতে পারে তা প্রস্তাব করা”। এই কমিশন তার ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেছে গত আগষ্টের ২৪, ২০১৭ সালে। কিন্তু এই রিপোর্টে যাই লেখা থাক রোহিঙ্গাদের ঘরছাড়া করা আর তাদের শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার কাজ কৌশলে কোন বাধা এই রিপোর্ট হতে পারে নাই। কারণ ইতোমধ্যে এবারের গণহত্যা ও ক্লিনজিং অপারেশনে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার পর ও সু চির সিভিল সরকার ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জানিয়ে দিয়েছেন আনান কমিশন তারা অনুসরণ করবেন। আর, কেবল যারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে কেবল তাদেরকেই সরকার ফেরত নিবে। ফলে আনান কমিশনের রিপোর্টে যাউই থাক তা অনুসরণ করতে সু চি সরকারের কোন সমস্যা নাই।

    ইতোমধ্যে আরসা (Arakan Rohingya Salvation Army, ARSA) নামে এক সশস্ত্র সংগঠনের খবর উঠে এসেছে। “জঙ্গী” অভিযোগ থেকে দূরে থাকতে আরসা বলেছে, “তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ জেহাদ নয় বরং তারা জাতিগত মুক্তিকামী। মিয়ানমারের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য”। গত “২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিক্রিয়া থেকেই আরসার জন্ম বলে বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানান সংগঠনের প্রধান নেতার মুখপাত্র ‘আবদুল্লাহ’। তিনি বলেন, আরসা ধর্মভিত্তিক নয়, জাতিগত অধিকারভিত্তিক সংগঠন”। এই সংগঠনের নেতৃত্বে দাবি করা হয়েছে যে গত ২৫ আগষ্ট ২৫-৩০ টা পুলিশ চৌকি ও একটা সামরিক চৌকিতে হামলা করা হয়েছে। তারা দাবি করেছে “আগস্টের হামলা ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরে পাওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবে বলে তারা ঘোষণা করেছে”। এই খবরটা বাইরের দুনিয়ায় এসেছে হংকংভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত আবদুল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে। আমাদের প্রথম আলো যেটা আবার অনুবাদ করে ছেপেছে। এই প্রসঙ্গে আমেরিকার এক পুরানা নীতির কথা জানা যায় যে তারা ১৯৯০ এর দশকে এক স্বাধীন আরাকানি রাষ্ট্র গড়তে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সহায়তা দিতে আগ্রহী ছিল। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী অফিসের সচিব ছিলেন এমন একজনও খবরটা নিশ্চিত করেছেন যে স্থানীয় এমবেসির আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে এব্যাপারে কথা বলেছিল। ফলে আরসা  এর ততপরতার পিছনে আমেরিকান ব্যাকিং থাকা অসম্ভব নয়, মনে করা যেতে পারে। এছাড়া শাহবাগের ইমরানের নেতৃত্ব শাহবাগ আন্দোলন এবার রোহিঙ্গাদের সমর্থনে মিছিল করেছে এটাও আমেরিকান সমর্থন থাকার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। কারণ ইমরান মূলত এখন আমেরিকান ‘ইয়ুথ মুভমেন্টের’ এর অংশ। এটাই তার মূল ততপরতা। ওদিকে  আমেরিকান প্রশাসনে সাউথইষ্ট এশিয়ার দায়িত্বে আছেন এমন ডেপুটি এসিটেন্ট সেক্রেটারি প্যাট্রিক মার্ফি ওয়াশিংটনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক “বার্মা পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিং” করেছেন।  তিনি আবার বার্মা বিষয়ে প্রশসনের বিশেষ প্রতিনিধি এবং পলিসি কো-অর্ডিনেটরও। সেখানে প্রথমে এই সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংএ তিনি জানান যে  মিডিয়া ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাখাইন রাজ্যের আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত প্রবেশ করতে পারে এব্যাপারে বার্মা সরকারকে চাপ দেয়া এটা একেবারেই তাদের আশু ও প্রথম কাজের ফোকাস। তিনি বলছেন এতে পরিস্থিতি সম্পর্ক সঠিক এসেসমেন্ট করার সুযোগ আসবে। কথা খুবই সঠিক। কিন্তু তিনি এক নিঃশ্বাসে বিবিধ ধরণের আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে  আসলে সব কিছু জটিল করে ফেলেছেন। (তিনি বলেছেন, “We continue to condemn attacks of a variety of nature – attacks on security forces; attacks on civilians; attacks by civilians”)।  যেমন মিডিয়া  বলেছে আরসাও নিজেরা বলেছে যে  সুনির্দিষ্টভাবে তারা পুলিশ ও সামরিক চৌকিওতে আক্রমণ করেছে, কোন সিভিলিয়ান কিছুতেও বা কারও উপরে নয়। তাহলে বার্মা সরকারের বা সেনাবাহিনীর পালটা প্রতিক্রিয়ায় নিরীহ সিভিলিয়ান মারা হল কেন, তাদের বসতি জালিয়ে ঘরছাড়া করা হল কেন? আর তা এতই মারাত্মক যে এপর্যন্ত তিন হাজার জনকে হত্যা করা হয়েছে আর তিন লাখ বাংলাদেশেই শরণার্থী হয়েছেন? কেন? তাহলে মার্ফি যেভাবে বলছেন, কোন সিভিলিয়ান আর এক সিভিলিয়ানকে মেরেছে বলা হচ্ছে? কথা এভাবে তুলে পুরা ব্যাপারটাতে তিনি বার্মা সরকারকে বাচিয়ে আবছা ভুতুড়ে করে দিয়েছেন। তাই নয় কী! ব্যাপারটাতে এতই দৃষ্টিকটুভাবে আমেরিকার তোষামোদি অবস্থান প্রকাশ হয়ে পড়েছিল যে ঐ সংক্ষিপ্ত ব্রেফিং শেষে পাঁচ সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন। তাদের একজন সিবিএস নিউজের সাংবাদিক, (Kylie Atwood with CBS News ) ঠিক এটা নিয়েই প্রশ্ন করে বসেন। তিনি বলেন, “আমি পরিস্কার বুঝার জন্য কথাটা বলছি, তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ যে সুনির্দিষ্ট করে মুসলমানদেরকে এখানে টার্গেট করা হয় নাই। আর তুমি মনে কর রাখাইন রিজিয়নের সবাই এখানে টার্গেট (বা আক্রান্ত) হয়েছে?” (I just want to clarify that at this point you do not think that Muslims are being targeted specifically; you think it’s anyone in the Rakhine region?)

    স্বভাবতই এই প্রশ্নের কোন সরাসরি জবাব মার্ফি দেন নাই। যদিও ঘুরায় পেচায় অনেক কথা বলেছেন। আগ্রহীরা পাঠেকেরা তা লিঙ্কে গিয়ে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু মার্ফির কথার সবচেয়ে বিপদজনক অংশ হল,  “attacks on security forces” – এই কথা কয়টা খুবই বিপদজনক এবং আইনি বিবেচনায় তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কোন নিরাপত্তা বাহিনী আক্রান্ত হলেই তারা নিরীহ সিভিলিয়ানদেরকে হত্যা করতে অথবা তাদের ঘরছাড়া শরনার্থী করতে পারে না। এটা তার ফোর্স এনগেজমেন্টের শর্তাবলি নয়। এখানে বরং শর্ত ভঙ্গ হয়েছে।  এটা একসেসিভ বলপ্রয়োগের অভিযোগে ঐ বাহিনী অভিযুক্ত হবার মত অপরাধ করেছে। অথচ এই কাজকেই উতসাহ দেয়া হয়েছে ঐ ব্রিফিং। আমেরিকার এভাবে তোয়াজ করে চলা সেটা এখানে স্পষ্ট।  এটাই সামনে এনেছে আমেরিকান প্রশাসনের অবস্থান দুর্বলতা কোথায়, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। নুন্যতম হিউম্যান রাইট রক্ষার পক্ষে আমেরিকা দাঁড়াতেই পারছে না।

    তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে এই যে বার্মার সর্বেসর্বা জেনারেলেরা (সু চি যাদের পকেটের খেলনা) বার্মার প্রাকৃতিক সম্পদ, সেখানে বাণিজ্য বিনিয়োগের সুবিধা বা ব্যবসা কাকে দিবে না দিবে সেটা নিয়ে তারা একসাথে মূলত চীন-আমেরিকা-ভারতকে বেধে ফেলেছে আর নাচাচ্ছে। ফলে জেনারেলদের বাহিনী কাকে হত্যা খুন নির্মুল গায়েব করবে এর এক নৈরাজ্যকর ক্ষমতা বলয় তৈরি করে নিতে পেরেছে তারা। এতে আজ চীন-আমেরিকা-ভারত কারই জেনারেলেরা বিরাগ হয় এমন কথা তুলার অবস্থা নাই। এই তিন শক্তির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এখানে দেখা যায়।  এতে আজ মুসলমানদেরকে বাগে পেয়েছে বলে সব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে রোহিঙ্গারা। এতে অন্যেরা নিজেকে আজ প্রবোধ দিতে পারে যে রোহিঙ্গারা আমার ধর্মের কেউ না, অথবা এটা আমার জনগোষ্ঠির উপর হচ্ছেনা। কিন্তু তাদের কী কেউ আশ্বাস নিশ্চয়তা দিয়েছে যে আগামিকাল তারা আক্রান্ত হবে না? মনে রাখতে হবে প্রশ্নটা নীতির, রাষ্ট্র রাজনীতিতে একটা স্টান্ডার্ডের। কিসিঞ্জার কথাটা যা ভেবেই বলে থাকুক না কেন সেটা অনুসরণ করে আমরা অন্তত কিছুটা গ্লোবাল স্টান্ডার্ড তৈরির পথে আগিয়ে যেতে পারতাম, পারি। দুনিয়াতে গ্লোবাল ষ্টান্ডার্ড বা রীতি কনভেনশন তৈরিতে অবদান আমেরিকার তো কম নয়।

    একথা সত্যি যে হিউম্যান রাইট ইস্যুর মধ্যেও অনেক দুর্বলতা আছে, ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের পক্ষে এর অপব্যবহার হয়। কিন্তু তবু রাইটের ইস্যুটা ফেলনা হয়ে যায় নাই। ফলে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠাও দরকার, সামনে আগানোর পথ সেটাই। আমেরিকা আজ এর পক্ষে দাড়ালে চীনকেও সে বাধ্য করতে পারত যে রাইট ভায়োলেট করে কোন ব্যবসা বিনিয়োগ নয় – এটাই গ্লোবাল স্টান্ডার্ড হয়ে উঠতে পারত। দুনিয়াকে টিকিয়ে রাখা, আমাদের প্রত্যেকের জনগোষ্ঠি হিসাবে টিকে থাকার কমন স্বার্থগুলো তো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় নাই। যাবে না। আজকে গ্লোবাল পরিবেশ ইস্যু নিয়ে এবং এর ষ্টান্ডার্ডের জন্য সকলের কাজ করা এর প্রমাণ। ট্রাম্প তা ভাঙ্গার চেষ্টা করে কঠোর সমালোচনার শিকার।

    চীন আমাদের কারও খালু নয়। চীন সম্ভাবনাময় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতা হয়ে উঠবে হয়ত, কিন্তু সেটা সম্ভাবনা মাত্র। যেটা আবার সম্ভাবনার কিন্তু পাথর হয়েই তা আটকে থেকে যেতে পারে। একালে চীন একটা নীতি অনুসরণ করে বুঝা যায় যে, অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীন নিজের জন্য কোন  পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগীদার  (আমেরিকার মত) সে হতে চায় না।  তবে অর্থনৈতিক স্টেক ভাগীদারি তার প্রবলভাবে থাকে। না, এটা চীনের কোন মহানুভবতার লক্ষণ নয়। তা বলা হচ্ছে না। আপাতত রাজনৈতিক ভাগিদার না হলেও চীনের চলে। অর্থনৈতিক ষ্টেকের ভাগীদারি পেলেই চীনের গ্লোবাল  শক্তি ও সক্ষমতার নেতা ভালভাবে সে হতে পারবে, কম জটিলতায়; এটাই চীনের এমন নীতি অবস্থান অনুসরণের কারণ। তাই সে আপাতত পলিটিক্যাল ষ্টেক না নিবার নীতি নিয়ে আছে। ভবিষ্যতে অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীনের রাজনৈতিক স্টেক স্বার্থগুলো চীনের ভিতরে কীভাবে উদয় হয়, আর চীন তাতে কী অবস্থান নেয় তা দেখার বিষয়। এছাড়া সবকিছুই আমেরিকার অনুকরণে এখনকার মতই  হবে এমন কোন কথাও অবশ্য নাই। বরং কোন অগ্রসর অর্থনীতি আর আমাদের মত কোন অর্থনীতির প্রত্যেকটা বিনিময় সম্পর্ক একালে আগের মত একপক্ষীয়, সাম্রাজ্যবাদী বলতাম যাকে তেমন না হয়ে আরও ভিন্ন, শিথিল এবং  উভয় পক্ষের জন্য লাভালাভেরও নতুন রূপের কিছু হতেই পারে।  কিন্তু তাই বলে চীনের নিজের অথবা যার সাথে সে ব্যবসা করছে তার হাতে “রাইট ভায়োলেশনের বিষয়ের দিকে চীনের কোন ভ্রুক্ষেপ নাই, থাকবে না। আর এতে চীনের কিছু আসে যায় না – এই নীতি অনুসরণ করে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে পারবে না, এটা হতেই পারে না; তা আগেই বলে দেওয়া যায়। তাই চীনের যত সম্ভাবনাই থাক, সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা তার ছিল কিন্তু হতে পারে নাই, পাথর হয়েই থেকে যেতে পারে। প্রাণ শুধু জীব জীবন নয়, ওর আরও অনেক কিছু লাগে। পাশে গণহত্যা চলবে আর আমরা তা উপেক্ষা করে মনোযোগ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করব এটা মানুষের সম্ভাবনার কথা হতেই পারে না। আমাদের অবশ্যই সকলের পালনীয় নানান বিষয়ে একএকটা ষ্টান্ডার্ড লাগবেই। সেটা আমরা সকলে যত তাড়াতাড়ি বুঝি ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। অতএব সমাধান একটাই আজ অথবা কাল, যুদ্ধে বাধ্য করে অথবা আপোষে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ডের পক্ষে আমাদের সকলকে আসতে হবে।
    বার্মা বৌদ্ধত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র করতে চাচ্ছে। এটাই সমাধান ভাবছে। আর ভারত হিন্দুত্বের ভিত্তিতে নিজের রাষ্ট্র সাজিয়ে বার্মার সমর্থক হতে চাচ্ছে। আশা করি এখান থেকেও আমাদেরও অনেক কিছু বুঝবার আছে। [শেষ]

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

  • উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

    উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

    গৌতম দাস

    ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০১:৪৫

    http://wp.me/p1sCvy-2hx

    গত ২৫ আগস্ট থেকে শুরু করে এবারের পর্যায়ে, রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল ক্রমে বেড়েই চলেছে। গত প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে জাতিসংঘের হিসাবে, শুধু এই ক’দিনেই তা তিন লাখ ছাড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে রাখাইন (আগের নাম আরাকান রাজ্য)  রাজ্যের  রোহিঙ্গাদের নির্মূল করতে অত্যাচার নির্যাতন ও গণহত্যায় আরো নৃশংস হয়ে উঠেছে। জাতিসঙ্ঘের ভাষায়, দুনিয়ার সবচেয়ে নির্যাতিত ও নির্মূল হয়ে যাওয়া সহ্য করা জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা। একালে মানে ২০১২ সাল থেকে নতুন করে শুরু নির্মুল ততপরতার এই পর্যায়ে এমন অভিযান বেড়ে যাওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ হল, মিয়ানমারে চীনা বিনিয়োগে সেখানে চীনের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় ভারতের অস্বস্তি। আর তা কাটাতে ভারত নীতি নিয়েছে, মিয়ানমার সরকারকে উৎসাহ ও সমর্থন দিয়ে এই হত্যাযজ্ঞকে বাড়িয়ে বার্মা বা মায়ানমারে সুনির্দিষ্ট করে রাখাইন প্রদেশকে অস্থিতিশীল করে দেওয়া। অজুহাত রোহিঙ্গা ‘মুসলমান মাত্রই এরা সন্ত্রাসী’। অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদ নির্মুলের আড়ালে ফেলে বার্মার রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠির উপর ক্লিনজিং বা সাফা অভিযান পরিচালনা করতে সাহায্য করা।

    এমন পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি মিয়ানমার সফরে এসে আক্ষরিকভাবেই সু চির পাশে দাঁড়িয়ে জানিয়েছেন, “তিনি সু চির পাশে আছেন”। সম্প্রতি বার্মা ভ্রমণরত বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক ব্যাখ্যা করে বলছেন, ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো’। ‘সম্ভাব্য উদ্দেশ্য- ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাবাবেগ ব্যবহার করে বার্মিজ জাতীয়তাবাদীদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা।’  অর্থাৎ অর্থনৈতিক সুবিধা হারানোর জন্য অথবা অন্যের পাওয়াতে কেউ গণহত্যা ও নির্মূল অভিযানের সমর্থক হতে পারে মিয়ানমারে এর উদাহরণ সৃষ্টি করেছে ভারত।

    অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে চীনের উত্থান ঘটেছে চলতি এই শতক থেকে। ফলে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বদলে গিয়ে নতুন গ্লোবাল লিডার হিসাবে চীনা নেতৃত্বে তা আবার সাজানো আসন্ন হয়ে উঠেছে।  উত্থিত এই চীনের বার্মায় (মিয়ানমারে আগের নাম)  চীনা বিনিয়োগের দৃশ্যমান ভাবে শুরু ২০০৩ সাল থেকে। কিন্তু আরও পরে সম্প্রতিকালে চীনের বিনিয়োগ সুনির্দিষ্ট করে ঘটেছে বার্মার রাখাইন রাজ্যে। কারণ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশেরই পড়শি হল, চীনের ল্যান্ডলকড প্রদেশ ইউনান যার রাজধানী কুনমিং। এ রাজ্যে বৌদ্ধ রাখাইন আর মুসলিম রোহিঙ্গাদের বসবাস।  সমুদ্র উপকূলব্যাপী বিস্তৃত রাখাইন রাজ্য কুনমিংকে ল্যান্ডলকড দশা থেকে মুক্ত করবে – এজন্য রাখাইন রাজ্যে চীনের এই বড় বিনিয়োগ।  এখানে চীনের বড় বিনিয়োগ প্রজেক্ট যেগুলো এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – কিয়াকপিউতে (Kyaukpyu) এক গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা বা শিল্পপার্ক স্থাপন যেখানে কম্পোজিট টেক্সটাইল ও তেল শোধনাগারের মতো ভারী শিল্প স্থাপন করা যায়। এছাড়া ঐ বন্দর থেকে চীনের কুনমিংয়ে তেল শোধনাগার পর্যন্ত ৭৭০ কিলোমিটার লম্বা তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন ইতোমধ্যেই চালু হয়ে গেছে। রাখাইন সমুদ্র উপকুলে সম্ভাব্য ঐ গভীর সমুদ্রবন্দরের অবস্থান যেখানে ওর নাম কিয়াকপিউ বা Kyaukpyu ।

    চীনের কাছে এই প্রজেক্টগুলো আরো গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে, এই পাইপলাইন হবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল চীনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে, নৌজাহাজে মালাক্কা প্রণালী ও সিঙ্গাপুর ঘুরে পূর্ব চীন সাগরের বন্দর মানে চীনের মুল বন্দরে যাওয়ার বদলে বিকল্প ও শর্টকাট পথ। কারণ এই বিকল্প পথ কয়েক হাজার কিলোমিটার নৌপথই বাচাবে না, এতে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরত্ব কমে যাওয়ায় এই তেলের ল্যান্ডিং কস্ট অনেক কম হবে। এ ছাড়া স্ট্রাটেজিক নিরাপত্তার দিক আছে। এতে তেলবাহী জাহাজকে আর ব্যস্ত ও সঙ্কীর্ণ বা চিকন গলার মালাক্কা প্রণালী পার হতে হবে না বলে পাইপলাইনে নেয়া তেলের নিরাপত্তা বেশি হবে। চলতি ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে মিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্টের চীন সফরকালে মায়ানমারকে প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এনিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের অবসান করে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আসলে বিগত ১০ বছর ধরে ঝুলে ছিল এই পরিকল্পিত প্রকল্প। নানান সেসব বাধা কাটিয়ে পাইপলাইন পাতার চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল এবং তেল পাইপলাইন পাতার কাজ গত ২০১৫ সালের সমাপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু এই পাইপলাইন নির্মাণ শেষ হলেও তা এতদিন চালু হয় নাই কারণ, হুইল চার্জ বা বার্মার ভুমি ব্যবহারের জন্য বার্ষিক প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এই নিয়ে বিতর্ক ছিল। যদিও আবার  তেল পাইপলাইন এই বছর চালু হলেও মিয়ানমারের নিজস্ব গ্যাস ২০০৯ সাল থেকেই ওই তেল পাইপলাইনের প্যারালাল করে পাতা আলাদা গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে কুনমিংয়ে ইতোমধ্যে যাচ্ছে, চালু আছে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের ২০১৭ এপ্রিলের ওই সফরেই কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ৭.৩ বিলিয়ন ডলারের আর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার ২.৩ বিলিয়ন – এভাবে মোট প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি হয়।

    নির্মিতব্য বন্দরের ৮৫ ভাগ মালিকানা চীনা কোম্পানি (China International Trust and Investment )  বা CITIC কে দিতে মিয়ানমার রাজি হয়েছে। চীনের নিজস্ব সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট “বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ”; এতে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৬৫টি দেশজুড়ে তা বয়ে যাবে। ঐ নৌ-সড়ক মেগা-অবকাঠামোর সাথে কিয়াকপিউ বন্দরও যুক্ত হওয়ার কথা।
    ২০১৭ সালের মে মাসে চীনা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের’ প্রথম সম্মেলন হয়ে যাওয়ার পর থেকে ভারত সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি, এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। কিন্তু কী দিয়ে সে বাধা দিবে? কারণ এটা অর্থনৈতিক সক্ষমতার আর এথেকে জাত প্রভাবের। ফলে  চীনের উত্থানকে ভারতের অমান্য করা সম্ভব যদি পাল্টা একমাত্র অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া না হলেও অন্তত সমান্তরাল অর্থনৈতিক সক্ষমতায় ভারত পৌঁছাতে পারে।

    কিন্তু সেপথ ভারতের জন্য আপাতত দুরস্ত; সময় সাপেক্ষ এবং যদি কিন্তু ব্যাপার। সারকথায় এখনকার ইস্যুই না। কিন্তু ব্যাপারটাকে অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয় হলেও আর সে সক্ষমতা আমার আপাতত না থাকলেও স্যাবোটাজ করে হলেও বাধা দেওয়া – এই চুলকানি তো তোলাই যায়।  ব্যাপারটা নিয়ে আমেরিকার অস্বস্তিও কম না। যেমন আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল মেরিটাইম বাণিজ্য বিনিয়োগের যে কমিউনিটি আছে, সে কমিউনিটিতে চালু এমন এক ম্যাগাজিন হল মেরিটাইম-একজিকিউটিভ। ঐ পত্রিকা চীনের কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর প্রজেক্টকে কিভাবে দেখছে তা নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে; এর শিরোনাম “মায়ানমারে স্ট্রাটেজিক পোর্টের নিয়ন্ত্রণ খুজছে চীন” ( China Seeks Control of Strategic Port in Myanmar)। ষ্ট্রাটেজিক শব্দটার সোজা ভাবার্থ “একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনা” করা যেতে পারে। বিনিয়োগ প্রকল্প যত বড় ধরণের হয় যেমন গভীর সমুদ্র বন্দর ততই ব্যাপারটা শুধু অর্থনৈতিক না থেকে ঐ প্রকল্প সেফ বা নিরাপদ থেকে করতে পারারবিষয়টাও মুখ্য হয়ে উঠে। অর্থাৎ সামরিক নিরাপত্তার দিকটাও প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। সব মিলিয়ে একটা ‘একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনার’ দিক তৈরি হয়।  এর প্রতিক্রিয়ায় এখন পুরান কুতুব আমেরিকা অথবা ভুয়া কুতুব ভারত (এমনকি সত্যিকারের কোন হবু কুতুব) সবারই ব্যাপারটায় ঈর্ষা অস্বস্তি হয়। মেরিটাইম-একজিকিউটিভ এর ঐ রিপোর্টকে সে জায়গা থেকে দেখা যায়। সে বলছে,
    The deal would give China control over an oil receiving terminal that feeds a cross-border pipeline to Yunnan province, bypassing the Strait of Malacca, the strategic choke-point between the Indian Ocean and the Western Pacific. ………In addition, the ongoing unrest in Rakhine – including alleged human rights abuses perpetrated by the Myanmar government against the region’s Rohingya Muslim minority – brings added uncertainty and controversy to the proposal.

    এতে প্রথম বাক্য অংশটাতে, চীনের নতুন জ্বালানি তেল পরিবহণ পথ এখানে সিঙ্গাপুরে মালাক্কা প্রণালী এই স্ট্রাটেজিক চোকপয়েন্ট এড়িয়ে যাওয়াতে, চীনের গলা চেপে ধরার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার একটা দুঃখ আমরা লক্ষ্য করতে পারি। কিন্তু পরের বাক্য বেশি গুরুত্বপুর্ণ। বলছে, “চলমান রাখাইন অসন্তোষ – যেখানে ঐ অঞ্চলের রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর পরিচালিত বার্মা সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে – এটা ঐ চীনা প্রকল্পে বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ করেছে”।  তার মানে  “বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ” করার স্বার্থ যাদের তাদের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

    সম্প্রতি  গত মে মাসে চীনের বেল্ট এন্ড রোড উদ্যোগের প্রথম সম্মেলন হয়ে যাবার পর থেকে ভারত এবার সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধীতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়ের’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধ্মান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। যদিও ভারতের এই সিদ্ধান্ত আসলে অর্থহীন। চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা যা থেকে চীনের এসব প্রভাব উতসারিত তা ভারতসহ কারও মানা না মানার বিষয় নয়, কারণ এটা বস্তুগত বাস্তবতা কোন সাবজেকটিভ বা ব্যক্তির ইচ্ছাপ্রসুত কিছু না। ফলে অন্যের বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতার পালটা হতে পারে নিজে বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন। অর্থাৎ এটা বস্তুগতভাবে অর্জন করে ভারতকে দেখাতে হবে। এমনকি চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে কোন ঈর্ষার চর্চা, কোন স্যাবোটোজ, কাউন্টার ইন্টেজেন্স, অন্তর্ঘাতমূলক কাজ, বিদ্রোহ বা এনার্কিতে উস্কানি অথবা গণহত্যা ও ক্লিনজিংয়ে ‘আমরা পাশি আছি’ বলে দাঁড়ানো ইত্যাদি এগুলোর কোনটা দিয়েই তা ভারতের অর্জিত হবে না, পথও নয়। বরং এটা ভারতের জন্য খুবই বিপদজনক ও আত্মঘাতি রাস্তা।

    প্রো-আমেরিকা ভারতের একাদেমিক, প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাঙ্ক  ব্যক্তিত্ব ও ষ্ট্রাটেজিক থিঙ্কার সি রাজামোহন, বিষয়টাকে তিনিও মানেন। তিনি এবিষয়ে তার লেখা সাপ্তাহিক কলামে (চীনের সাথে ভারতের সক্ষমতার গ্যাপটা খেয়াল কর শিরোনামে ) ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করে ভারতের রাজনীতিবিদদের সাবধান করেছেন। তিনি দশ বিলিয়ন ডলারের চীনের এই কিয়াকপিউ বন্দর প্রজেক্ট সম্পর্কে সরাসরিই বলেছেন,  “দিল্লীর আসলে কিয়াকপিউ প্রজেক্টে চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়  যাওয়ার মুরোদ নাই। একনকি অন্য কোন আন্তর্জাতিক খেলোয়ারও চীনের বিকল্প হয়ে হাজির হতে পারবে না।……  যদি চীন যেভাবে কথা দিয়েছে তা মেনে কিয়াকপিউ বন্দরকে সে সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের মত বাণিজ্যিক হাব হিসাবে গড়ে তুলতে থাকে তবে ভারতের নীতি নির্ধারকদেরকে এনিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্টই করতে হবে। বিশেষত এখানকার বাণিজ্যিক স্বার্থ নিশ্চিত করা ও বিনিয়োগকে  নিরাপদ করতে ভবিষ্যতে চীনকে প্রয়োজনীয় সমতুল্য মেরিন ও সামরিক শক্তি সমাবেশ ঘটাতেও হবে”। কিন্তু তবু চীনের সাথে ভারতের সামর্থের ফারাকের কথা খেয়াল রেখে পথচলার পরামর্শ রেখেছেন তিনি। কিন্তু সেকথায় কান দিবার অবস্থায় মোদি সরকার অথবা ভারতের হামবড়া আমলা-গোয়েন্দাদের নাই। এই অবস্থায় বিনিয়োগ সক্ষমতা না থাকা ভারতের যদিও গোয়েন্দা সংগঠন দিয়ে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ  আর দাঙ্গায় উস্কানি, গণহত্যায় নির্মুল করা দিয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলা ছাড়া ভারতের হাতে অন্য কিছু নাই। মোদি এই পথেই হাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবারের পর্যায়ে আবার নতুন করে প্রায় তিন লাখ হতে যাওয়া রোহিঙ্গাকে শরনার্থী বানানো সে পরিকল্পনারই ফলাফল।

    গতকালকে সু চির সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিডিয়াতে দাবি করে বলেছে রোহিঙ্গারা নাকি “নিজেরা নিজের বসত ঘর পাড়ায় আগুন দিয়ে স্বেচ্ছায় রিফিউজি হতে বাংলাদেশ সীমান্তে গিয়েছে। বাংলাদেশের নিউজ২৪ টিভিতে ঐ উপদেষ্টার বক্তব্যের ক্লিপ দেখিয়েছে। সব দোষের দোষী, “জাত খারাপ” রোহিঙ্গা মুসলমানদের সম্পর্কে আর কত হাস্যকর আজীব অভিযোগ শুনতে হবে কে জানে। কিন্তু রাখাইন রাজ্যের হিন্দুদেরকেও কেন উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা উতখাত করল?  তারাও যে বাংলাদেশে রিফিউজি হয়ে এসেছে এটা সম্পর্কে বাংলাদেশের হিন্দু খ্রীশ্চান বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের নেতা রানা দাসগুপ্তের সাক্ষ্য ও অভিযোগের ভিডিও মিডিয়াতে আমরা দেখেছি। এরা কী কেন কোন সুখে (নিজের ঘরে!) আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন আমাদের জানার বাইরে, যদিও সু চির দাবি সে এটা জানে।। ভারতের মোদির চোখে এরাও তাহলে সন্ত্রাসবাদী! অর্থাৎ মানে দাড়াল, “মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী” মোদি-সুচির সস্তা ফর্মুলার উপর দাঁড়ানো এই  বয়ান – এবার এরা নিজেরাই মিথ্যা ও অচল বলে প্রমাণ করছেন। মায়ানমারের বৌদ্ধ মং দের সংগঠন মা-বা-থা গোষ্ঠি এরা বিজেপি-আরএসএস শিবসেনার মত তবে এরা বার্মার সামরিক বাহিনীর প্রচন্ড পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সংগঠন; চরম ইসলাম বিদ্বেষী এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী। সারাক্ষণ রাখাইন রাজ্যে এরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বিষ উগলে যাচ্ছে। সরকার ও সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় এই গোষ্ঠি তৈরি করা হয়েছে। এরাই রাখাইন রাজ্যের স্বল্প হিন্দু জনগোষ্ঠিকেও রেহাই দেয় নাই। রাখাইন রাজ্যের খুবই সংখ্যালঘু এই জনগোষ্ঠির পাঁচশ এর মত হিন্দুর শরনার্থী হওয়ার এই ঘটনা মোদি-সু চির ইসলাম বিদ্বেষী ঘৃণ্য এলায়েন্সকে ফুটা করে দিয়েছে। মোদি-সু চি কে অবশ্যই ব্যাখ্যা দিতে হবে কারা কোন সুখে হিন্দু-মুসলমান রাখাইনরা  নিজের ঘরে আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন!

    [প্রথম পর্ব এখানে শেষ করা হল। দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করা হয়েছে  ইতোমধ্যে। এখানে দেখুন। এই পর্যন্ত দুই পর্বের মধ্যে চীন ও ভারতের প্রসঙ্গই মূলত বিস্তারিত করে শেষ করা হল। তাতে আর একটা প্রসঙ্গ এখানে বাকি থেকে গেছে। সেটা হল, আমেরিকার ভুমিকা। তা নিয়ে আর এক পর্ব অর্থাৎ তৃতীয় ও শেষ পর্ব আলাদা করে লেখা হবে। আগামি দুদিনের মধ্যে তা আসবে।]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে, কয়েক পর্বে।  আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • পরিস্থিতি কাতারের পক্ষে ঘুরে গেছে

    পরিস্থিতি কাতারের পক্ষে ঘুরে গেছে, দুনিয়া মজলুমের পক্ষেই দাঁড়াবে

    গৌতম দাস

    ১৩ জুন ২০১৭, মঙ্গলবার ০০ঃ০৪

    http://wp.me/p1sCvy-2g5

     

    ট্রাম্পের সৌদি সফরে (২০-২১ মে ২০১৭) সৌদি ড্যান্সের তিন সপ্তাহের মধ্যে সৌদি আরব আবার খবরের প্রধান শিরোনাম। যদিও এবার সাথে নিয়েছে বা বলা ভাল এবারের সৌদি টার্গেট কাতার। কাতারকে সাইজ করা। সংক্ষিপ্ত করে বললে খবরটা হল, মধ্যপ্রাচ্যের রাজাতন্ত্রী ছয় রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্র-জোট আছে নাম GCC জিসিসি বা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল।  কাতার, সৌদি আরব, ইউএই (এটা আবার দুবাই ও আবুধাবিসহ সাত আমির-শাসিত রাষ্ট্র বা আমিরাতের এক ফেডারেশন), ওমান, কুয়েত, বাহরাইন এই ছয় রাষ্ট্রকে নিয়ে জিসিসি গঠিত। হঠাৎ করে গত ৫ জুন ২০১৭ এর খবর হল,  জিসিসির সৌদি আরব, ইউএই, বাহরাইন আর জিসিসির বাইরের মিসর, এই চার রাষ্ট্র কাতারের সাথে সব ধরণের কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা করেছিল। আর, নৌ, আকাশ ও সড়ক পথ ও সীমান্ত বন্ধ করে সব বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।  কাতারি কূটনীতিকদেরকে এই চার রাষ্ট্র, তারা ৪৮ ঘন্টার মধ্যে তাদের প্রত্যেকের রাষ্ট্র ত্যাগ করে চলে যেতে বলেছিল।  প্রাথমিক খবর হিসাবে প্রথম কয়েক ঘন্টা আমরা শুনেছিলাম যে, সরকারি ‘কাতার নিউজ এজেন্সী হ্যাক হয়ে গিয়ে সেখান থেকে সৌদি বাদশাকে নিন্দা করে কিছু খবর প্রচার করা হয়েছিল। তা থেকেই নাকি ক্ষুব্ধ সৌদি প্রতিক্রিয়া এটা। গত ২৩ মে, সেঘটনার ধোঁয়া থেকে সব শুরু। খুব সংক্ষেপে মুল ঘটনাটা বললে, ট্রাম্পের সৌদি সফরের পরের দিন কাতারের আমির শেখ তামিম আল থানি কাতারের মিলিটারি একাদেমি সফর করতে গিয়েছিলেন। সেখানে নাকি ট্রাম্পের ঐ সফর আর সৌদি বাদশার সমালোচনা করে তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন আর সেটাই সরকারী কাতার নিউজ এজেন্সী প্রচার করেছিল। আর এই খবরকে রেফার করে সৌদি আরব ও দুবাইয়ে খবর প্রচার করা শুরু হয়েছিল। কিন্তু পালটা বার্তা দিয়ে কাতারের আমির জানায়, এটা সম্পুর্ণ মিথ্যা। হ্যাকারের হাতে কাতার নিউজ এজেন্সী হ্যাকড হয়ে এটা একটা মিথ্যা খবর প্রচার করা থেকে এটা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা রয়টার নিউজ এজেন্সীকে কাতারী আমীর জানিয়েছিলেন যে তিনি মিলিটারি একাদেমিতে গেছিলেন কথা সত্য কিন্তু তিনি সেখানে কোন বক্তৃতাই সেখানে দেন নাই, অথবা কোন বিবৃতিও দেন নাই।  এদিকে জুনের ঐ ৫ তারিখেই কয়েক ঘন্টার মধ্যে আমরা আল জাজিরার মাধ্যমে শুনলাম ‘কাতার নিউজ এজেন্সীর ওয়েব সাইট হ্যাকের ঘটনার সাথে – আমেরিকায় দুবাইয়ের রাষ্ট্রদুতের ইমেল একাউন্ট – এর সংশ্লিষ্টতা আছে এর প্রমাণ মিলেছে।  কিন্তু আরও কয়েক ঘন্টার মধ্যে কাতারের বিরুদ্ধে ঐ চার রাষ্ট্রের সরব অভিযোগ যেমন – কাতার নিউজ এজেন্সীর কথিত খবর, কাতারের আমীরের সৌদি বাদশার নিন্দা ইত্যাদি সব ছেড়ে এবার সৌদিসহ অভিযোগকারিরা তাদের ‘আসল’ অভিযোগ দায়ের করতে শুরু করে।

    সার কথায় সেসব অভিযোগ হল, কাতার এক “সন্ত্রাসী রাষ্ট্র”, কারণ সে সন্ত্রাসবাদকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়। যেমন বিবিসি [যদিও বিবিসির রিপোর্ট ও ভুমিকা বড়ই তামাসাময়  ও খুবই নিচা স্টান্ডার্ডের। কাতারের আমীরের কোন বক্তব্যই না দিয়ে কেবল সৌদি বয়ানের উপর দাঁড়িয়ে পুরা স্টোরি তৈরি করে হয়েছে।] তারা কেবল সৌদি বয়ানের উপর ভর করে এসম্পর্কে সৌদি সরকারি এজেন্সীকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল,”সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিপদ থেকে সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থসংরক্ষণকে নিরাপদ করতে তারা কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে”। ঐ একই বিবিসি রিপোর্টে আবুধাবিও একই রকম মন্তব্যে জানিয়েছিল, “তারা মনে করে কাতারের দোহা সরকার, সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা নিয়ে চলে ও তাদেরকে সমর্থন ও অর্থ দিয়ে তাদের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে”। অর্থাৎ কে কী প্রচার করেছে সেটা আর প্রসঙ্গ নয়। কাতারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন, অর্থ দেয়া প্রশ্রয় দেয়া ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এটাই আসল ইস্যু, আর তা সামনে এসে গেছে।

    কিন্তু কাতার ‘সন্ত্রাসবাদী’, এটা আবার কোন সন্ত্রাসবাদ? কাছকাছি সময়ের ঘটনায় “এই সন্ত্রাসবাদের” স্পষ্ট হদিস রেফারেন্স পাওয়া যায় গত ২০-২১ মে ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরকালে। “ইরান সন্ত্রাসবাদ করে” আর এর বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বক্তৃতা করেছিলেন তিনি। আর এটা বলতেই যেন সৌদি বাদশা তাকে হায়ার করে এনেছিলেন। আর এই সন্ত্রাসবাদ বলতে – প্যালেস্টাইনের হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও মিসরের ব্রাদারহুড এদের ততপরতাকে ট্রাম্পের আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ মনে করে। এটা আমেরিকার অনেক পুরানা বয়ান, [যদিও মাঝে “আরব স্প্রিংয়ের চলার সময়” আমেরিকা ও সৌদি আরব উভয়েই ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করা ভুলে গেছিল, বলা যায় সন্ত্রাসী মনে করতে বিরতি বা ক্ষমা দিয়েছিল। তারা ব্রাদারহুডকে মিসরে ক্ষমতায় আনতে একসাথে কাজ করেছিল। যাই হোক, সৌদি আরবের যারে দেখতে নারি তার চলন বাকা ফর্মুলায় আমেরিকাকে অনুসরণ করে যাকে পছন্দ হয় না, হুমকি মনে হয় তার গায়ে সন্ত্রাসীর ট্যাগ লাগায় দেয় তারা। ফলে ইরান সন্ত্রাসী, আর কাতার সন্ত্রাসী। এই “বাড়তি সন্ত্রাসবাদ”  ধারণা, সৌদি আরব ট্রাম্পকে তাল দিতে নিজে দেশে ডেকে এনে উচ্চারণ করিয়ে নিয়েছিল। ইরান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হলে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ রাষ্ট্র + জার্মানি এই (পি৫+১) এরা একসাথে এবং জাতিসংঘের কাঠামোর মধ্যে ‘সন্ত্রাসী’ ইরানের সাথে কোন আন্তর্জাতিক চুক্তি করেছিল কী করে?

    কিন্তু কাতার জিসিসির সদস্য হয়েও এসব প্রতিরোধ আন্দোলন সংগঠনকে, বিশেষ করে হামাসকে সর্বতভাবে সমর্থন করে, তাদের ততপরতার  প্রতি সহমর্মিতা দেখায়, সমর্থন দেয়, আশ্রয় দেয় সহযোগিতা করে। এই সুত্রে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদিদের “সন্ত্রাসবাদের” অভিযোগ। আমেরিকান “সন্ত্রাসবাদ” ধারণাকেও নিজের সংকীর্ণ স্বার্থ মোতাবেক টেনে লম্বা করে নেওয়া।

    এখন তাহলে পুরা ঘটনায় একেবারে আসল, মূল বিষয়টা কী? এক শব্দে বললে, বিষয়টা হল, সৌদি রাজতন্ত্রের আয়ু সমস্যা। এখানে রাষ্ট্র বা ভুখন্ড হিসাবে সৌদি আরবের আয়ুর কথা বলা হচ্ছে না। ঐ রাষ্ট্র পরিচালনের সিস্টেম হিসাবে “রাজতন্ত্র” – এর ভবিষ্যত বা আয়ুর কথা বলা হচ্ছে। সম্ভবত আরও সঠিক ভাষ্য হবে – সৌদি রাজ-সরকার নিজের ভবিষ্যত, আয়ূ বা হুমকি প্রসঙ্গে নিজের পারসেপশন বা ধারণা কী সেটাই এখানে মূল ইস্যু বা সমস্যা।

    সৌদি আরব মনে করে তার রাজতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি ইরান, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পরের ইরান। দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা ইসলামি জনগোষ্ঠি নিজেদের মাঝে ইসলামের নানা ফ্যাকড়ায় তাদের বিভক্তি বা ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সব জনগোষ্ঠিই তাদের স্ব স্ব রাজনৈতিক লড়াইয়ে প্রথম আর সবচেয়ে কমন অবস্থান হল – কাম্য সিস্টেম হিসাবে তারা রাজতন্ত্রকে নাকচ করা। আর খুবই সহজে ইরান এই কথাটাই তাদের মনে করিয়ে দেবার কাজ করে ফেলতে পারে — এটাই সৌদি আরবের চোখে সবচেয়ে বড় “সন্ত্রাসী” কাজ। সবাই জানেন ইরান সুন্নি নয়, তাসত্ত্বেও হামাস, হিজবুল্লাহ ও ব্রাদারহুডের মত দলের রাজনৈতিক প্রতিরোধ  লড়াই সংগ্রামের প্রতি ইরানের সক্রিয় সমর্থন অবস্থান এটা ইরান মুল্যায়নে খুবই নির্ধারক।  কারও ইরানের ব্যাপারে রিজার্ভেশন থাকলেও তাসত্ত্বেও ইরানের সারা দুনিয়ার মজলুমদের প্রতিরোধ আন্দোলনকে সক্রিয়  সমর্থন দেয় এই কারণে – এই ভুমিকাকে মুসলমানেরা অন্তর থেকে ইতিবাচক মনে করে।

    তবে সৌদি আরবের ইরান মুল্যায়ন শেষে তার দ্ব্যার্থহীন অবস্থান হল,

    একঃ যে কেউ শিয়া বা সুন্নি যাই হোক, ইরানের সাথে যে কোন ধরণের সম্পর্ক রাখে সে সৌদি আরবের শত্রু। তাকে কোন ধরণের সহানুভুতি বা সমর্থন, অনুমোদন কিছুই দেয়া যাবে না। শুধু তাই নয় তাকে উচ্ছেদ করে দেওয়াতেই সৌদি আরবের শান্তি, এটাই তার নীতি।

    দুইঃ সৌদি রাজতন্ত্রের ফাস্ট লাইন অব ডিফেন্স স্বভাবতই তার নিজ সেনা বাহিনী। আর এর পরের বলয় হল জিসিসি; যার মূল পরিচয় এরা সৌদির  মতই মধ্যপ্রাচ্য ভুগোলের রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র। এছাড়া জিসিসি কেবল সাধারণ কোন রাজনৈতিক জোট নয়, বরং এই ছয় রাষ্ট্র নিজেদের সামরিক সক্ষমতাগুলোকে একপাত্রে নিয়ে কমন একটা অবস্থান থেকে পরস্পরকে রক্ষায় তা ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এজন্য জিসিসির স্টিয়ারিং হাতে রাখা সৌদি আরব  – মূলত সৌদি প্রভাবে, ইয়েমেনে হুতিদের দমনে কাতারের ভিন্নমত দৃষ্টিভঙ্গী থাকলেও নিজের যুদ্ধবিমান নিয়ে যোগ দিতে সেও বাধ্য হয়েছে। তাতে বিষয়টাতে কাতারের যতই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী থাক। আর ওদিকে জিসিসির পরের লাইন অব ডিফেন্স হল, একদিকে অন্যান্য মুসলিম জনসংখ্যা-প্রধান রাষ্ট্রগুলো (তবে খোদ জনগোষ্ঠি নয়, কেবল সরকার) আর অন্যদিকে বড় কুতুব আমেরিকা।

    তিনঃ সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন অস্বস্তিকর দুস্থবোধ এনে দিয়েছিল ওবামা, ২০১৪ সাল থেকে। এবিষয়ে আরও বিস্তারিতের জন্য আগের লেখা  এখানে দেখুন।  সে বছর থেকে ইরান বিপ্লবের পরে এই প্রথম প্রকাশ্য সমঝোতায়  ইরান-আমেরিকা ‘নিউক্লিয়ার চুক্তি’ (পি+৫) করার আলাপ শুরু হয়েছিল। যদিও ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের এতদিন পরে ওবামা প্রশাসনের হঠাত এই মতি বদলের পিছনে প্রধান কারণ ছিল ইরাকে আইএস ততপরতা বৃদ্ধি আর তা নিজে সামলাতে গেলে আমেরিকাকে আবার মাঠে আমেরিকান মেরিন নামানোর সিদ্ধান্ত নিতে হত। যে খরচ বিতে সে অপারগ। তাই এই কাজটা সে ইরান এবং ইরান প্রভাবিত ইরাক এবং শিয়া মিলিশিয়া ইত্যাদি দিতে করাতে চাওয়ার আমেরিকান  স্বার্থ এটাই ইরানের সাথে ওয়ার্কেবল সম্পর্ক পাতানোর তাগিদ অনুভবের  মূল কারণ ছিল। তাই ‘নিউক্লিয়ার চুক্তি’  মানে নিউক্লিয়ার অস্ত্র পাওয়ার চেষ্টা সে আর করবে না – এই প্রতিশ্রুতি আর তা মনিটরিং করতে দেওয়ার বিনিময়ে ইরানের উপর থেকে আমেরিকাসহ পশ্চিম এবার সব অর্থনৈতিক অবরোধ ধাপে ধাপে তুলে নিবে এই নিগোশিয়েশন শুরু হয়েছিল। এই সফল নিগোশিয়েশন  আলাপের সমাপ্তিতে গত  ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তা স্বাক্ষরিত ও কার্যকর হয়ে যায়। মনিটরিংসহ নানা শর্ত সাপেক্ষে হলেও এতে অবরোধ তুলে নেওয়াতে ইরান বিরাট শক্তি সঞ্চয় করে আবার ফিরে উঠে আসতে থাকে। অর্থনীতি আবার প্রাণ পায়। আর তাই উলটা দিকে সৌদি আরবের ভালনারেবল অবস্থা ভীতি অস্বস্তি বোধ – সেখান থেকে।  গত ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পরও সৌদি আরব এমন দুস্থ অসহায় বোধ করে নাই। অথচ এই চুক্তির কারণে, ইরানের সাথে আমেরিকার নীতি অবস্থান স্বার্থবিরোধ কিছু কিন্তু মিটে যায় নাই। কেবল একটা একসাথে সহবস্থানের একটা ওয়ার্কেবল অবস্থান তৈরি হয়েছে মাত্র। যা আবার স্থায়ী নয়, প্রতি বছর মনিটরিং মুল্যায়নের অধীনে ও ভাল রিপোর্ট সাপেক্ষে চালু থাকবে, আছে। তবু এটাও সহ্য করা সৌদি আরবের কাছে অসম্ভব, অগ্রহণযোগ্য।
    আমেরিকা-ভিত্তিক ‘সৌদি-আমেরিকান পাবলিক রিলেশন এফেয়ার্স কমিটি’  – এটা এক লবিষ্ট ফার্ম এর নাম। এর সভাপতি  সালমন আল-আনসারি। তিনি তাঁর ক্লায়েন্ট সৌদি আরবের পক্ষে এক ক্ষুব্ধ মন্তব্য করে বলেছেন, “কাতারের আমীর – সন্ত্রাসবাদী ইরান সরকারের পক্ষে তোমার অবস্থান আর কাস্টডিয়ান অব টু হলি মস্ক – তাকে অপমান করেছ। আমি তোমাকে মনে করায় দিয়ে চাই মিসরের মোরসি ঠিক একই কাজ করেছিল আজ সে খতম হয়ে গেছে, জেলে পচতেছে”।   আনসারির এই কথা গুলো খুবই প্রতীকী, সৌদি মনোভাব অবস্থানের আসল প্রতিফলন। এভাবে বলা কথাটা ‘সহি কিনা’ সেটা এখানে একেবারেই বিচার্য নয়।

    চারঃ সৌদি আরব যা বলতে চাইছে এর সারকথা হল,  কাতারে বিদেশনীতি আমার চেয়ে ভিন্ন হতে পারবে না। কাতার নুন্যতম ভিন্ন চোখে ইরানকে দেখতে পারবে না।  কাতার সেটা করার চেষ্টা করেছে তাই সে কাতারকে আসলে শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদ না, কাতারকে সে সাধারণ খাদ্য ও পণ্যেও সরবরাহের বিরুদ্ধে অবরোধ করবে। কোন ব্যবসা করতেও দিব না। আমার কথা না শুনলে এমনকি তোমাকে সরিয়ে তোমার কোন জ্ঞাতি ভাইকেও ক্ষমতার আনার চেষ্টা করব।

    সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেল আল-যুবেইর প্যারিস সফরে ছিলেন। সেখান থেকে রয়টারের সংগৃহিত তাঁর বক্তব্য পরের দিন ছয় জুন ছাপা হয়। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে সৌদিদের মনের অনেক কথা বলে দিয়েছেন।  তার সোজা কথা, আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক রাখতে গেলে কাতারকে অবশ্যই হামাস এবং ব্রাদারহুডের সাথে সম্পর্ক ছিন্নসহ আরও অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে। [Qatar must take several steps, including ending its support for the Palestinian group Hamas and the Muslim Brotherhood, to restore ties with other Arab states.]  তিনি আরও বলছেন, “সন্ত্রাসবাদী চরমপন্ন্থা (এটা বলতে হামাস, ব্রাদারহুড বুঝতে হবে),  হোস্টাইল বা বেয়াদব মিডিয়াকে সোজা করা (আল জাজিরা পড়তে হবে) আর ভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপ (এটা বলতে বাহারাইনের আন্দোলনকারিদের প্রতি সহানুভুতি বুঝতে হবে) বন্ধ করবে“ – বিগত কয়েক বছরে আমরা এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলছি আর কাতার তাতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন কাতার এগুলো বাস্তবায়ন করেছে আমরা দেখতে চাই”। এই বক্তব্য রয়টার থেকে কোট-আনকোট নেয়া। সরাসরি ইংরাজিটা তুলে দিচ্ছি, “We want to see Qatar implement the promises it made a few years back with regard its support of extremist groups, regards its hostile media and interference in affairs of other countries,” Jubeir told reporters in Paris.

    যুবেইরের এসব মন্তব্যের সবচেয়ে মজার অংশ হল, তিনি বলছেন কাতার “প্যালেস্টাইন অথরিটি আর মিসর সরকারকে আন্ডারমাইন” করেছে বা নীচা দেখিয়েছে।  আসলে তিনি বলতে চাইছেন আমাদের ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে অবস্থানের ফলে পরে পাওয়া সুবিধায় মিসরের সিসি এখন আরামে ক্ষমতায় আছে। আর আমরা সেই সুবিধা তৈরি করে দেওয়ার বিনিময়ে সিসির চোখ বন্ধ করা সমর্থন আমাদের পক্ষে পেয়েছি। আসলে  তিনি স্পষ্ট করেই বলছেন, হামাসের নেতা মিশেল অথবা ব্রাদারহুডের কোন নেতা-কর্মীকে ভাত-কাপড়-আশ্রয় কিছু দেয়া যাবে। বাস্তবে আসলে চাপে পড়ে, কাতারের আমীর  অনেক আগেই সবাইকে বের করে দিতে হয়েছে। সম্ভবত এখন ইসলামি স্কলার কারযাভিকেই একমাত্র আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। কিন্তু তাতেও সৌদিরা নিজেদের নিরাপদ বোধ করতে পারছেন না। বেচারা থানি, তিনি কাতারের আমীর হলেও তার একটা শক্ত নীতি হল, কোন মানুষ সে যেই হোক সে আশ্রয় চাইলে তাকে তিনি ভাত-কাপড় আশ্রয় দিতে নিজের কাছেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু আমীর থানির মেহমানেরা সৌদি চাপে আশ্রয়দাতার দুরবস্থা দেখে আমীর তাদেরকে কিছুই না বললেও  নিজেই নিজের করণীয় হিসাবে কাতার ত্যাগ করে চলে গিয়েছেন।  এরপরেও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঐ বক্তব্য শেষে হুমকি দিয়ে বলছেন,   “সঠিক পথ নিতে কাতারের ‘কমন সেন্স ও লজিক’ জাগবে। আর যদি না হয় তবে আমার মনে হয় না কাতারিরা এর মুল্য পরিশোধ করতে পারবে”। আসলে পুরা পরিস্থিতিতে সৌদি-ইচ্ছার সারকথা এখানে আছে।

    কিন্তু বিরাট একটা লিগ্যাল প্রশ্ন আছে। যুবেইরের ফরমাল এই অবস্থান এটা সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, ফলে একারণে সৌদি আরবকেই অভিযুক্ত করা সম্ভব। কাতার কী বিদেশ নীতি নিবে তা করতে বাধ্য করার চেষ্টা এটা কাতারের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন। এছাড়া সৌদি ইচ্ছায় বিদেশনীতি না সাজালে কাতারের বাসিন্দাদেরকে খাদ্য পাণীয়ের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হবে – এটাও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। WTO এর আইন অনুযায়ী না-হক কাজ।  উপরে ম্যাপের ছবির দিকে তাকালে আমরা দেখবে কাতার আসলে ঠিক ল্যান্ড-লকড দেশ নয়। বরং সৌদি আরবের তীরে, পারস্য উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত। ফলে কাতারের চারদিকের প্রায় ৮০ ভাগ  সীমানা এলাকাই উপসাগরের স্পর্শে। অর্থাৎ পোর্ট সুবিধা চাইলে তৈরি করা সম্ভব। আর ২০ ভাগ এলাকা সরাসরি ভুমিতে সৌদি আরবের সাথে সীমান্ত। সম্ভবত নিজ জনসংখ্যা মাত্র ২৩ লাখ (2.235 million (2015) World Bank) বলে নিজ খরচে আলাদা এক্সক্লুসিভ নিজ ভুখন্ডে গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে যায় নাই। এর চেয়ে খুবই চালু  গভীর সমুদ্র বন্দর পাশের দুবাইয়ে বলে, সেই পোর্টে মালামাল নামিয়ে ট্রাকে করে সৌদি আরব হয়ে সে পণ্য নিজ দেশে প্রবেশ করে নেয়।  কিন্তু এখন  সৌদি ভুমি দিয়ে ট্রাক প্রবেশ এটাকেই চাপ দিবার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে – এই সুবিধা নিয়ে সৌদি আরব ট্রাক চলাচল আটকে পণ্য পরিবহণে বাধা তৈরি করার সুবিধা নিচ্ছে। যাহোক, তবে দেরিতে হলেও এই পয়েন্টটা তুলে ধরে আল জাজিরা কিছু প্কিরচার রিপোর্ছুট তৈরি করাতে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষন করতে পেরেছে। এমেনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ইস্যুতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তাতে  খোদ ট্রাম্প সৌদি আরবের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন।  কাতারে বসবাসকারি দেশি বিদেশি সাধারণ মানুষের স্বার্থে ট্রাম্প নিজেই শিথিলভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আহবান জানাতে বাধ্য হয়েছেন। আসলে এটা ছিল ট্রাম্পের সৌদি সিদ্ধান্তের দায়দায়িত্ব থেকে নিজেকে আলাদা করে নেয়া। অর্থাৎ আইন লঙ্ঘনের দায় তিনি সৌদিদের কাধে ফেলায় দিলেন। ট্রাম্প এটা কেন করলেন? কারণ ইতোমধ্যে তিনি এক বিরাট কেলেঙারির

    পাঁচঃ ট্রাম্পের আমেরিকা; অনেকেই বিভ্রান্ত আমেরিকার অবস্থান ঠিক কোথায়? এনিয়ে। হা ট্রাম্প, নিজ অবস্থানের সবচেয়ে উপর পর্দা দিয়ে সেটা বিভ্রান্ত করে রেখেছেন। সব আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা আমেরিকান রাজনীতিতে   “লবি ব্যবসা” (বিভিন্ন বিদেশী রাষ্ট্রের স্বার্থে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রশাসনে লবি করে দেওয়ার জন্য ভাড়া খাটার ব্যবসা”) এর স্বার্থের ভিতরেই বসবাস করেন ও আর এর মধ্যেই কাজ করে থাকেন। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে সেটা খুবই এক বাড়াবাড়ি জায়গায় গিয়েছে দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের দোস্ত-বেরাদরেরা  বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে  লবির ফি এর নামে কমিশন নিয়েছেন (আমেরিকান আইনে এটা আইন বিভাগের রক্ষিত খাতায় নিজে গিয়ে লিখিত বলে দিতে হয় এবং তাহলে এটা আর অবৈধ না। ইতোমধ্যে ১৪০ মিলিয়ন ডলারের কাহিনী আমরা নিইয়র্ক টাইমসে দেখেছি।)  এমন দোস্ত-বেরাদরেরা ট্রাম্পের একদম চারপাশে ও কোলের মধ্যে বসে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেজন্য  এমনকি মনে হয়, ট্রাম্প তাঁর মন্ত্রী-উপদেষ্টাদেরকেও বলে দিয়েছেন যে, এডমিনিষ্ট্রেশনের অবস্থান-বক্তব্যেরও থেকে দূরে তিনি ভান করে কখনও কখনও সরে যাবেন, কখনও ভুয়া কথার কথায় “লিপ-সার্ভিস” দিবেন। যেন ট্রাম্পের দোস্ত বেরাদরেরা যে ফি নিয়েছেন তা কাভার দিয়ে যায়েজ করে নিতে পারেন – তা বলে দিয়েছেন তিনি। তবে  মন্ত্রী-উপদেষ্টাদেরকে তিনি বলতে চাচ্ছেন  কিন্তু তাসত্ত্বেও তোমরা তোমাদের এডমিনিষ্ট্রেশনের মুল অবস্থান-বক্তব্যের মধ্যেই থেকে যাবা, কাজ করে যাবা। এখানে মজার কথা হল, এতদিন আমেরিকান রাজনীতির ভোকাবুলারিতে – ‘এডমিনিষ্ট্রেশন’ বলতে নির্বাহী রাষ্ট্রপতির ফরমাল নীতি-অবস্থান বুঝাত। যেমন ‘ওবামা প্রশাসন’ কথাটার মানে ওবামার নিজের কথা আর তাঁর আমলা, নীতি-নির্ধারকদেরসহ সবারই ফরমাল অবস্থান – এটা  বুঝাত। তবে যদিও এই ফরমাল অবস্থানের নিচে আবার ‘আন্ডারকারেন্ট’ হিসাবে স্টেট ডিপার্টমেন্ট আর পেন্টাগণের অবস্থানের লড়াই ঝগড়ায় খুচরা নানা অবস্থান ভিন্নতাও থাকতে দেখা যেত। কিন্তু এখন ট্রাম্পের আমলে এসে আমরা দেখছি,  ট্রাম্পের বক্তব্য (লিপ সার্ভিস) আর ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান-বক্তব্য এই দুটা এক নাও হতে পারে। ফলে ট্রাম্প – এটা ভুয়া কথা বলে লবি ব্যবসা ধরার এক স্বর্ণযুগ তৈরি করেছেন বলা যায়।
    তাই এর আরেক তামাসার দিকটা হল, সৌদি আরবেরও সেটা অজানা নয়। তাঁরা ট্রাম্পের লিপ-সার্ভিসও জেনে শুনে কিনতে চায়। সেটাই তাদের কাছে নাকি অনেক। গত মাসে ট্রাম্প সৌদি সফরে এসে “ইরান সন্ত্রাসবাদী” – এই ফাঁপা বাড়তি বা এক্সটেনডেড মিথ্যা সংজ্ঞা আউড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি। অথচ এটা আমেরিকা প্রশাসনের অবস্থান নয়। যেমন ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যেই ওবামা আমলের শেষ বছরে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সাথে করা ‘নিউক্লিয়ার ডিল’ – এটা “সঠিকভাবেই চুক্তির শর্ত মোতাবেক কোন ব্যার্তয় না ঘটিয়ে” আগিয়ে যাচ্ছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারশনের লিখিত স্বাক্ষ্য- রিপোর্ট তিনি কংগ্রেসকে  জানিয়েছেন ইতোমধ্যেই। অর্থাৎ নির্বাচনের সময় ট্রাম্পের যে চাপাবাজি ছিল যে নির্বাচিত হলে তিনি ‘ইরান ‘নিউক্লিয়ার ডিল’  বাতিল করে দিবেন। কিন্তু তিনি এখন ইতোমধ্যেই ঐ চুক্তি “ঠিকঠাক” চলছে, মানে তিনি এটা গ্রহণ করেছেন বলে স্বাক্ষ্য-রিপোর্ট দিয়ে দিয়েছেন কংগ্রেসকে।
    ফলে ট্রাম্পের ইরান বিরোধী চাপাবাজি নির্বাচনের আগের অবস্থান যাই থাক তিনি এখন ওবামার ইরানী “নিউক্লিয়ার ডিল” সহি বলে অনুমোদন করে দিয়েছেন। এটা গত ১৮ মে এর খবর। তাই, ২০ মে সৌদি আরবে গিয়ে “ইরান সন্ত্রাসবাদী” বলে যা কিছু চাপাবাজি করেছেন সেটা তাহলে আসলে লিপ সার্ভিস ছাড়া কিছু ছিল না। আর এটাই সৌদি আরব ‘কিনেছে’।

    এমনকি কাতার ক্রাইসিস তৈরি করার পর সৌদি আরব আবার লিপ সার্ভিস কিনতে এসেছে, দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের এবারের চাপাবাজি হল তিনি টুইট করছেন আর এই ক্রাইসিস তৈরি করার ক্রেডিট নিজে নিবার চেষ্টা করছেন।  টুইট করতে আমোদ পাওয়া ট্রাম্প এক টুইট করে  বলছেন যে, “আমার সৌদি সফর ফল দেওয়া শুরু করেছে। কাতারের দিকে আঙ্গুল তুলে টেররিষ্ট ফান্ডিং এর বিরুদ্ধে তারা সবাই শক্ত অবস্থান নিয়েছে, অচিরেই টেররিজমের ভীতিকর দিন শেষ হবে”। “So good to see the Saudi Arabia visit with the King and 50 countries already paying off. They said they would take a hard line on funding extremism, and all reference was pointing to Qatar. Perhaps this will be the beginning of the end to the horror of terrorism!” Trump wrote on Twitter.     একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট কত নিচে নামতে পারে এর উদাহরণ হয়ে থাকল এটা। কিন্তু এটাও ট্রাম্পের নীচা হবার শেষ নয়। তিনি ঐদিক শুধু টুইট নয়, বক্তৃতা করে বলেছিলেন, কাতারকে নাকি টেররিজম ফাইন্যান্সিং করে আর এটা তাকে ছাড়তেই হবে। কিন্তু পরের দিনই তার একেবারে উলটা মুর্তি। সিএনএনের ভাষায় অলিভ গাছের ডাল মাথায় বেধে নিয়ে (এটা শত্রু বা বিরোধীকে ইঙ্গিত দেয়া যে বিরোধীর সাথে আপনি এখন আপোষ করতে চান।) ট্রাম্প কাতারের আমীরকে ফোন করেছেন। নানান মিঠা কথা বলেছেন কারণ এক বিলিয়ন ডলার খরচ করে বানানো ঐ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় আমেরিকান সামরিক ঘাটি আছে কাতারে। এছাড়া আর এক কারণ হল, ঐদিক তিনি যখন কাতারকে ধুয়ে ফেলতেছিলেন, সৌদিদের কোলে উঠে প্রশংসা করতেছিলেন, ঠিক সেই সময় তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলার সন ঠিক তার উলটা কথা বলছিলেন, যে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বে আরবদের অবরোধ শেষ করা উচিত কারণ এতে ঐ “সামরিক ঘাটির ততপরতা ব্যহত হচ্ছে”। অর্থাৎ টিলারসন কাতার ক্রাইসিস থেকে আমেরিকাকে নিউট্রাল জোনে নিতে চাচ্ছেন। আর ট্রাম্প সেখানে কাতার ক্রাইসিস তৈরি করার ক্রেডিট নিচ্ছেন। এই স্ববিরোধীতা সামলে নিতে, বেকুবি আড়াল করতে ট্রাম্প তাই মিষ্ট কথায় ফোন করেছেন কাতারের আমীরকে। এছাড়া রয়টার্স লিখছে,  ট্রাম্প যখন কাতার ইস্যুতে এভাবে আরবদের পিঠ চাপড়াচ্ছিলেন, পেন্টাগন ঠিক তখন  কাতারের সাথে ফোনে ছিলেন আর প্রশংসা করছিলেন যে, “কাতার সরকার আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রতি নিজের দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে কাতারে আমেরিকান সামরিক ঘাটির হোস্ট হিসাবে নিরলস খেদমত করে যাচ্ছেন আমরা এর প্রশংসা করি”। এভাবেই আমেরিকার প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাতারি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে ফোনে কথা বলেছেন বলে আমেরিকান মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন। [U.S. Defense Secretary Jim Mattis spoke on Tuesday by phone with his Qatari counterpart, a Pentagon spokesman said, without disclosing the details of their discussion] রয়টার্স আমেরিকান এক কূটনৈতিকের বরাতে জানাচ্ছে, “ট্রাম্পের টুইট একটু অস্বস্তিকর হলেও আমেরিকা নিরবে সৌদি আর কাতারের উত্তেজনা ঠান্ডা করার পক্ষে কাজ করছে কারণ কাতার আমাদের কাছে সামরিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপুর্ণ”।

    এই হল লিপ সার্ভিসের কথা। তবু কাতার সরকারকে সৌদিরা উঠিয়ে ফেলে দিতে পারে, নিজ পছন্দের যে কাউকে আমীর বানাতে পারে। এককথাট বললে সৌদিরা কাতারে সামরিক হস্তক্ষেপ করে বসতে পারে সে সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু, তা মিটিয়ে নষ্ট করে দিয়েছে তুরস্কের এরদোগান। প্রথম দিন তিনি এক বিবৃতি দিয়ে বয়ানে নিজের পক্ষে পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেন। বলেন যে কাতারের বিরুদ্ধে ‘টেররিজমের অভিযোগ সত্য’ হলে তিনি নিজেই আগে ব্যক্তিগতভাবে আমল ও হস্তক্ষেপ করতেন। [ “Presenting Qatar as a supporter of terrorism is a serious accusation,” the Turkish leader said. “I know [Qatar’s leaders] well and if that had been the case, I would have been the first head of state to confront them.”] অর্থাৎ তিনি আসলে বলছেন, টেররিজমের অভিযোগ ছাড়েন, কাতারকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে আমি দিব না।

    এটাকে বলা যায়, সৌদিরাই কী দুনিয়ায় মুসলিম কমিউনিটির প্রধান নেতা হবেন? নাকি নাকি তিনি কেউ নন?  – এই প্রশ্নে এরদোগানের জিত হয়েছে। তিনি আসলে বলেছেন আমি দুনিয়ায় মুসলিম কমিউনিটির মনঃকামনা পুরণের নেতা।  আর তাই পরেরদিন তুরস্ক ২০১৪ সালের এক চুক্তি মোতাবেক কাতারে এক সামরিক ঘাটি স্থাপন করেছে, জানতে পারি।  তুরস্কের পার্লামেন্ট এটা অনুমোদন দিয়েছে।  আর এটাই সম্ভাব্য যে কোন সৌদি সেনা পাঠানোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এক বিরাট ডিটারেন্ট, পাল্টা অবস্থান যা সৌদিদের যে কোন গোপন-প্রকাশ্য ইচ্ছাকে একাবারে নাকচ করে ফেলেছে। তাই এক কথায় বলা পরিস্থিতি এখন স্টেলমেট। অর্থাৎ গায়ের জোর বা সামরিক মাসল দেখানোর আর সুযোগ নাই। এখন খুব সম্ভবত পরিস্থিতি বাতচিত ডায়লগ এই লাইনে আগাবে ও শেষ হবে – বিবদমান সবপক্ষের জন্য এটাই একমাত্র খোলা পথ।  ওদিকে জার্মানীর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এক সাক্ষাতকারে ট্রাম্পকে কাতার পরিস্থিতির জন্য এক হাত নিয়েছেন। তিনি অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করাসহ ট্রাম্পের এই নীতিকে কঠোর সমালোচনা করেছেন। এটাও কম তাতপর্যপুর্ণ নয়।

    খুব সম্ভবত সৌদিদের হার এখন ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকবে। রাশিয়া সফররত কাতারি পররাষ্ট্র মন্ত্রী (সন্তান থানি) যখন মিডিয়া সাক্ষাতে বলেন “হামাস রাজনৈতিকভাবে এক বৈধ  প্রতিরোধ আন্দোলন” – এই বয়ানের ওজন ভয়ানক। মজলুমের পক্ষে দুনিয়াব্যাপী মুসলমান জনগোষ্ঠি এই বয়ানের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে ও যাবে, যা অপ্রতিরোধ্য।

    এঘটনায় সবচেয়ে বড় সুযোগ এসেছে সৌদি বাদশার। তিনি চাইলে ছেলের বুদ্ধিসুদ্ধির ব্যাপারে কিছু শিক্ষা নিতে পারেন। নাকি ২০৩০ সালে সব শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করতে চান! আমরা অপেক্ষা করব হয়ত দেখার জন্য।

     

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১১ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • ভ্যালু অ্যাডেড চেইনে চীন আছে, ভারত নেই

    ভ্যালু অ্যাডেড চেইনে চীন আছে, ভারত নেই

    গৌতম দাস

    ০২ মার্চ ২০১৭, বৃহস্পতিবার

    http://wp.me/p1sCvy-2db

    Eminent economist Prof Rehman Sobhan speaks at a dialogue on “Bangladesh-India relations: progress made and challenges ahead”, jointly organised by The Daily Star and the Institute for Policy, Advocacy, and Governance, at The Daily Star Centre in Dhaka yesterday. Photo: Star
    Eminent economist Prof Rehman Sobhan speaks at a dialogue on “Bangladesh-India relations: progress made and challenges ahead”, jointly organised by The Daily Star and the Institute for Policy, Advocacy, and Governance, at The Daily Star Centre in Dhaka yesterday. Photo: Star

    গত বছর ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে “ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক” বিষয়ে ঢাকায় এক ‘সংলাপ’-এর আয়োজন করা হয়েছিল। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার এবং আইপিএজি (ইনস্টিটিউট ফর পলিসি অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড গভর্নেন্স) নামে এক সংগঠনের যৌথ নামে  ও উদ্যোগে তা করা হয়েছিল। দিনব্যাপী ভারত ও বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, কূটনীতিক, সরকারি প্রতিনিধি ও একাডেমিকরা এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান এতে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছিলেন। তিনি গত ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকেই ভারতকে করিডোর দেয়ার পক্ষে কখনো ট্রানজিটের কথা তুলে, কখনো কানেকটিভিটির কথা তুলে সবার আগে থেকে যুক্তির হাল ধরার কাজ করে এসেছেন।
    গ্লোবাল অর্থনীতিতে সত্তরের দশক থেকেই গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে ঝাণ্ডা উড়তে শুরু করেছিল।  আমেরিকা গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে ব্যাপক তাগিদ তৈরিতে নেমে পড়েছিল। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের অবস্থানে। ইতিবাচকভাবে বললে, এরই প্রকাশ্য দিক হল – আমাদের মনে আছে নিশ্চয়, “রফতানিমুখী অর্থনীতির” শ্লোগান। মানে, কেবল জাতিবাদী অভ্যন্তরীণ বাজারমুখিতা আর নয়; এর বদলে রফতানিমুখী করে নিজ অর্থনীতি সাজানো। এর এক মৌলিক স্বীকৃত দিক হল, নিজের বাজারে অন্যকে ঢুুকতে দেয়া এবং অন্যের বাজারে প্রবেশের সুযোগ নেয়া। তবে বাস্তবে এই দেয়া-নেয়ার কোনো কিছুই একেবারে অবাধ নয়। মূল কথাটা  বললে, গ্লোবাল অর্থনীতি কেবল কিছু পরাশক্তিগত বিশেষ ক্ষমতার অধীনেই কার্যকর, ফলে অসাম্য পণ্য বিনিময় এক বাস্তবতা। সুতরাই এখানে এ ক্ষেত্র ‘অবাধ’ বলে কিছু নেই। দুনিয়ায় উপস্থিত সেসব ক্ষমতাবান রাষ্ট্র ও তাদের অর্থনীতির আধিপত্যের অধীনে এবং তাদের মাতব্বরি মেনে নিয়েই এটা কেবল ঘটতে পারে। এই “রফতানিমুখী অর্থনীতির” ফাংশনাল দিকটাই এমন। যেমন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের পণ্য ঢুকতে গেলে  সেটা অবাধে নয়; বরং কোটা, মাল্টি ফাইবার এগ্রিমেন্ট বা তেমন অনুমতি থাকলেই কেবল ঢুকতে পারে। নইলে রক্ষণশীল প্রটেকটিভ বিশাল অঙ্কের শুল্ক দিয়ে “অবাধে” ঢুকতে হবে। বিপরীতে বাংলাদেশে আমেরিকার পণ্যের বেলায় সেটা অবাধ। এই সমস্যা ছিল এখনও আছে। ফলে অসাম্য পণ্য বিনিময়ে আছে। এমন অসাম্যের পরও বাজার যতটুকু আমাদের দখলে থেকে যায়, সে ফ্যাক্টর হল নিজ শ্রম-দক্ষতা আর কোয়ালিটি পণ্য বা সস্তা প্রতিযোগী পণ্য দিয়ে নিজের জন্য তুলনামূলক বাড়তি সুবিধা যেখানে যার বেশি, সে ভিত্তিতে ও কারণে। এসব সীমিত অর্থে এই গ্লোবালাইজেশন – তবু এটা রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদী ধারণা ও অবস্থানের বিপরীত একটা অবস্থান অবশ্যই। এটাকে অনেকে পশ্চিমের “মার্কেট লিবারালাইজেশন” বলেও চেনাতে চান। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এই গ্লোবালাইজেশনের সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থান হল, দুনিয়াজোড়া সবার মধ্যে এক এক্সচেঞ্জ ব্যবস্থা- এক গ্লোবাল পণ্যবাণিজ্য, পণ্যবিনিময় ব্যবস্থা তৈরি করে ফেলছে এটা। আর ইতোমধ্যেই এটা যে জায়গায় বিকশিত হয়ে বা পৌছে  গেছে তাতে এটা আর আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেয়া প্রায় অসম্ভব।
    গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে তত্ত্বগত ও প্রচারের দিকগুলো যখন প্রথম আনা হয়েছিল, বিশেষ করে আমাদের মতো দেশে, তখন এখানে ১৯৮২ সালের সামরিক ক্ষমতা দখল ও সংস্কার কর্মসূচি চালু করার সময় ছিল। রফতানিমুখী অর্থনীতির নেতিবাচক দিকগুলো বাদ রেখে কেবল  ইতিবাচক দিকগুলো আদর্শিকভাবে হাজির করলে যা হবার কথা, সে প্রসঙ্গে সে সময় একাডেমিক জগতে এক বয়ান চালু ছিল। যেমন, বলা হত – কল্পনা করুন, প্রত্যেক রাষ্ট্র বা জনগোষ্ঠী একটা বা কয়েকটা করে পণ্য উৎপাদনে সবচেয়ে দক্ষ হয়ে উঠলে, সারা দুনিয়ার বাজারের জন্য তৈরি করে এরপর সেসব পণ্য প্রত্যেক রাষ্ট্র নিজেদের পরস্পরের মধ্যে বাধাহীন বিনিময় ঘটাতে পারলে এই বেনিফিট সব জনগোষ্ঠীই পেতে পারে। সবাই কোনো-না-কোনো পণ্য উৎপাদনে দক্ষতা অর্জন করবে এবং দক্ষ শ্রমের অধিকারী হয়ে উঠবে। এতে একটা গ্লোবাল বাজার ও বিনিময়ের মধ্য দিয়ে এবং এর মাধ্যমে এক গ্লোবাল বাণিজ্য গড়ে ওঠার কারণে গ্লোবালাইজেশন ঘটানো সম্ভব। সবাই যার সুফল ভোগ করবে। জাতীয়তাবাদী রক্ষণশীল ক্যাপিটালিজমের বিপরীতে এটাই এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার (বাস্তবায়ন করতে হবে এমন) মডেল ধারণা।

    গত বছর ২০১৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ‘ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক’ বিষয়ে ঐ সংলাপে রেহমান সোবহান এই গ্লোবালাইজেশনেরই আরোও এক কোয়ালিফায়েড বৈশিষ্ট্য আরোপ করে কথাটা পেড়েছিলেন। সে কথাটা হল – ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ (value addition chain) তৈরির দিক থেকে প্রসঙ্গটাকে বিচার করা। ভ্যালু এড মানে কোন কাঁচামালে অথবা আধা-সম্পুর্ণ পণ্যে আবার শ্রমের প্রবেশ ঘটিয়ে তাকে আরও-সম্পুর্ণ পণ্য বা একেবারে সম্পন্ন পণ্যে রূপান্তর করা। একই দেশে কাঁচামাল থেকে সম্পুর্ণ পণ্যে রূপান্তর না ঘটিয়ে নানান দেশে তা সম্পন্ন করা এটাকে ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ পণ্য উতপাদন বলা হয়।   গ্লোবালাইজেশনের মধ্যে এটা আর এক জটিল ধাপ উপরে উঠে এটা এক ধরণের পণ্য উতপাদন ও  বিনিময়। রেহমান সোবহান বলছিলেন  ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’-এর দিক থেকে দেখে তুলনা করে বলছিলেন সিনসিয়ার মনোযোগী হওয়ার কারণে চীন কেন সফল আর ভারত কেন বিফল, সে আলোচনা তুলেছিলেন। চীনের ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ মানে হল, একটা প্রডাক্টের কয়েকটা অংশ কয়েকটা চীনের পড়শি দেশ থেকে তৈরি হয়ে আসার পর অর্থাৎ ভ্যালু যোগ হয়ে আসার পর সেগুলো চীনে জড়ো হবে, এরপর সেগুলো সব চীনে অ্যাসেম্বল বা সংযুক্ত হয়ে একটা ফাইনাল প্রডাক্ট হিসাবে বের হবে। অর্থাৎ চীন পড়শি কয়েকটা দেশকে সাথে নিয়ে একটা ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’-এর মাধ্যমে তৈরী প্রডাক্ট এবার রফতানি করবে। এতে সংশ্লিষ্ট সব অর্থনীতিই পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে একসাথে বেড়ে উঠবে, সবাই লাভবান হবে। এ ছাড়া, পুরাটাই চীনে করতে হবে এমন জাতীয়তাবাদী ধারণা নয় এটা। ফলে এটা শুধু সবার ফিনিসড পণ্য বিনিময় বাণিজ্য ক্রবে তা নয়। পণ্য উতপাদনেই শেয়ার করা এক পণ্য উতপাদন। তিনি চীনের প্রশংসা করছিলেন চীনের পড়শিদের সাথে এমন ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ প্রডাক্ট তৈরির সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছে সে জন্য। প্রফেসর রেহমান সোবহানের বক্তব্যসহ পুরা অনুষ্ঠানের প্রায় এক ঘন্টার ভিডিও ক্লিপ ইউটিউবে পাওয়া যায়, যা আগ্রহীরা দেখতে পারেন।
    চীনের পথ ধরে বাংলাদেশের সাথে ভারত ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’-এর সম্পর্ক গড়তে পারেনি বলে তিনি ভারতের সমালোচনা করছিলেন। তিনি বলছিলেন, ৩৯০ বিলিয়ন ডলারের ভারতের আমদানি ব্যবসার ০.২ শতাংশও বাংলাদেশ পায়নি। এই তথ্য হাজির করে তিনি সমালোচনা করছিলেন। বলছিলেন, “অথচ বাংলাদেশ নাকি ভারতে বিনা কোটায় ও বিনাশুল্কে পণ্য রফতানির সুবিধাপ্রাপ্ত” “বন্ধুরাষ্ট্র”। এই হল ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত বন্ধুরাষ্ট্রের”  দশা। আসল বাংলাদেশের দশা বুঝানোর জন্য তিনি আরো শক্ত উদাহরণ তুলেছিলেন। তিনি তুলনা দিয়ে বলেছিলেন, ভারত নানা পণ্য রফতানিকারী যেসব দেশ ভারতে বাংলাদেশের মত কথিত কোনই ফ্রি ট্রেড সুবিধাপ্রাপ্ত নয়, যেমন- ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, এমনকি মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কার মতো এসব রাষ্ট্রও ভারতে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি রফতানি করে থাকে।
    অর্থাৎ, রেহমান সোবহান এখন ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’-এর জায়গায় দাঁড়িয়ে ভারতের সমালোচক হতে চাইছেন। সেটা প্রশংসনীয় সন্দেহ নাই। তবে ২০০৭ সাল থেকেই আমরা তাঁর মুখ থেকে  ট্রানজিট বা কানেক্টিভিটির কথা শুনে আসছি, কিন্তু কখনো ‘ভ্যালু অ্যাডিশনের চেইন’ এই ক্রাইটেরিয়া দিয়ে তিনি কথা বলেছেন, এমন শোনা যায়নি। এখন সমালোচক হওয়াতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান দশার দায় তার ওপর কি কমে আসবে? তা দেখতে হবে।

    তবে রেহমান সোবহান এখন কড়া সমালোচক হলেও পুরনো স্টাইলে ভারতের প্রশংসা করা এবং ভারতের সাথে সম্পর্কের উন্নতি নিয়ে পঞ্চমুখ হওয়ার লোক অনেকে এখনো বোধ হয় আগের মতোই আছেন। এদের একজন হলেন সাবেক কূটনীতিক ফারুক সোবহান। তিনি আমেরিকাকেন্দ্রিক থিংকট্যাংক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী। তিনি গত ২৬ ডিসেম্বর ২০১৬ প্রথম আলোর সাথে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, যেখানে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের চারটি উন্নতি তিনি দেখেছেন বলেন। জানিয়েছেন, উন্নতির ক্ষেত্র এর চেয়ে বেশি থাকলেও তিনি সদয় হয়ে বেছে কেবল চারটি উল্লেখ করেছেন; যার প্রথম আর সবচেয়ে বড় সফলতার ক্ষেত্রটা নাকি “বিদ্যুৎ সহযোগিতা”। অথচ সোজা কথায় বললে, আসলে ভারতকে “বিদ্যুৎ ট্রানজিট” দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে ভারতের এপার ওপার যোগ করে নেয়া হয়েছে। অথচ তিনি বলছেন, এই অবকাঠামো নাকি আমাদেরকে ভারতীয় বিদ্যুৎ বিক্রির জন্য সদয় হয়ে করা হয়েছে। ফলে এটাই নাকি আমাদের স্বার্থে উন্নয়ন। আর ভবিষ্যতে নেপাল ও ভুটানে আকাশকুসুমে কল্পিত বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে কল্পিত সেই বিদ্যুৎ আমাদের কেনার পথ সুগম হয়েছে এতে। এটাই ‘সফলতা’। অথচ এখনই নেপালে যেসব বিদ্যুৎ কোম্পানী ভারতীয় মালিকানায় নয় তাদের বিদ্যুৎ বিক্রিতে জটিলতা শুরু হয়েছে।  তাঁর দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, ভারতের বাজারে বাংলাদেশ নাকি  কোনো শুল্ক অথবা কোটা ছাড়াই অবাধ রফতানি সুবিধা ভোগ করছে। এমনকি নন-ট্যারিফ যেসব বাধা ছিল সেগুলোও নাকি অপসারণ হয়েছে। প্রকৃত পরিস্থিতি যে পুরা উল্টা, সেটা আমরা ওপরে খোদ রেহমান সোবহানের বরাতে জেনেছি। তিনি পরিসংখ্যান হাজির করে প্রশ্ন তুলেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের তৃতীয় ও চতুর্থ অর্জন হিসেবে ফারুক সোবহান এনেছেন বাংলাদেশ ভারতকে নিজের দু’টি পোর্ট ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করতে দিয়েছে। আর চতুর্থ হল ভারতের নর্থ-ইস্ট নাকি এখন আমাদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। অথচ হয়েছে ঠিক উল্টা। ট্রানজিট দেয়াতে বাংলাদেশী পণ্যের চেয়ে ভারতের অপর অংশের পণ্য তার নর্থ-ইস্টে আমাদের বেশি প্রতিযোগী হচ্ছে। এ ছাড়া আমাদের দু’টি পোর্টই বিনা শুল্কে ভারতকে ব্যবহার করতে দেয়ায় তাতে আমাদের কিভাবে উন্নতি হয়েছে তা তিনি ব্যাখ্যা করে কিছুই বলেননি।
    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [লেখাটা এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

  • ট্রাম্পের পর ভারতও – ‘এক-চীন’ নীতিতেই

    ট্রাম্পের পর ভারতও, ‘এক-চীন’ নীতিতেই

    গৌতম দাস

    ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার

    http://wp.me/p1sCvy-2d3

    ভারতও এক-চীন নীতি মেনে চলতে চায় বা মেনে চলছে – পরোক্ষে সেকথাই ভারত চীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। একচীন নীতি মানে হল, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’- এটা স্বীকার করা। ‘এক চীন নীতি’ মেনে নিয়ে গত ০৯ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনালাপ করেছেন, সে খবর জেনে দুনিয়া হাঁফ ছেড়ে একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়েছিল। কারণ চীন-আমেরিকার কোন স্বার্থ সংঘাত থেকে কোন সামরিক উত্তেজনা তৈরি করুক সেটার মুখোমুখি হতে দুনিয়ার বেশির ভাগ সংশ্লিষ্ট পক্ষ এখন চায় না।  কিন্তু এ খবর শুনে কেউ কেউ দুঃখে হতাশও হয়েছিল। সম্ভবত তেমন রাষ্ট্র হল ভারত। ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে বিশেষ করে জয় লাভের পরে, আরও শক্ত করে ক্রমাগত চীনবিরোধী ‘রেঠরিক’ তুলে চলছিল। যেমন- আমেরিকায় চীনা পণ্যের প্রবেশের উপর ৪৫ শতাংশ ট্যাক্স বসাব, চীন কারেন্সি ম্যানিপুলেটর (মুদ্রা বিনিময় হারের উপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ করা), চীন আমেরিকানদের চাকরি নষ্ট করছে, পরিবেশবাদীদের পরিবেশ ক্ষতির আওয়াজ আসলে চীনা প্রচারণা, এক চীন নীতি মানতে আমরা বাধ্য নই ইত্যাদি আপত্তির বোলচাল হাজির করেছিল। এভাবে এক কথায় বললে ট্রাম্প যেন বিশাল এক ‘চীন-লড়ানি’ দিতে আসতেছেন বক্তব্যের এমন ভাব তৈরি করে ট্রাম্প দুনিয়াকে উদ্বিগ্নতায় অস্থির করে ফেলেছিলেন। বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্পের সেসব তৎপরতা ও বোলচালে সবচেয়ে বেশি আস্থা স্থাপন করেছিল ভারত। ট্রাম্প এভাবে  সামনে খাড়ায় গেলে তাঁকে আড়াল হিসেবে রেখে সে আড়ালকে ব্যবহার করার সুযোগ দেখেছিল ভারত। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে ট্রাম্পের আমেরিকার ওপর ভারতের আস্থা রাখা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। মানুষ অন্যের মাথায় কাঁঠাল রেখে খায়, কথা সত্য। কিন্তু বুদ্ধিমানেরা কেবল এই সুবিধার দিকটাই দেখে না, সম্ভাব্য অনুষঙ্গি অসুবিধা বা ক্ষতির দিকেও চোখ রাখে। মনে হচ্ছে, ভারত সেটা রাখতে পারেনি।  দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প ‘পল্টি’ দিয়ে অবস্থান বদল করলে কী হবে, সেটা নিয়ে কমই ভেবেছিল ভারত। তাই ভারত তাইওয়ানের এক সরকারি প্রতিনিধিদলকে (তিনজন এমপিসহ ব্যবসায়ীরা) ভারতে তিন দিনের সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে সফরের আয়োজন করেছিল। ইতোমধ্যে সে সফর সম্পন্নও হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আফটার এফেক্ট বা পরবর্তি-প্রতিক্রিয়া রেখে গেছে।

    বিগত ’৭০-এর দশক থেকেই এক চীন নীতি মেনে চলার আমেরিকান প্রতিশ্রুতি অস্বীকার করে ট্রাম্প তা মানতে না চাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন- এই মাসল ফুলানো দেখে ভারত সেটাকে নিজের মাসল মনে করে বসেছিল। ভুলে গিয়েছিল যে ভারতও এক চীন নীতি মেনে এই শর্তেই চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ও সে সম্পর্কে আছে। ফলে স্বভাবতই ভারত তাইওয়ানকে স্বাধীন সরকার গণ্য করতে পারে না। অর্থাৎ তাইওয়ানের সাথে ভারতের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। কিন্তু ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে, যেটা চীন সরকারও আপত্তি করে না।
    যেমন তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেতে ভারতের ‘কার্যত এক অ্যমবেসি’ আছে যেটার আনুষ্ঠানিক নাম হল ইন্ডিয়া-তাইপে সমিতি (ভারত-বাংলাদেশ সমিতির মত)। কারণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি সম্পর্ক নেই বলে তাইপে-তে ভারতীয় অ্যামবেসি খোলা সম্ভব নয়। তবে লক্ষ করার বিষয় রাষ্ট্র পরিচয়ে ইন্ডিয়া বলা হলেও এর সমান্তরালে ‘তাইওয়ান’ বলা হয়নি, ধরা হয়নি। তাইওয়ানকে রাষ্ট্র বিবেচনা করা হয়নি। (রাষ্ট্রের নামের জায়গায় রাজধানীর নাম) তাইপে বলা হয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে এখানে নাম বলার লজিকে মিল নেই, ইচ্ছা করে রাখা হয়নি। কারণ বলতে হত হয় ইন্ডিয়া-তাইওয়ান, না হলে দিল্লি-তাইপে। এর কোনোটাই না হয়ে নাম রাখা হয়েছে ইন্ডিয়া-তাইপে অ্যাসোসিয়েশন (সমিতি)। আর এর বিপরীতে  দিল্লিতে তাইওয়ানের সমিতি অফিসের সমতুল্য হিসাবে তাইপে-তে অফিসটির নাম রাখা হয়েছে – ‘তাইপে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’, মাত্র ১৯৯৫ সালে যা প্রতিষ্ঠিত। চীনের সাথে অন্য যেকোনো রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক বিনিময়ের শর্ত হলো তাইওয়ান চীনের অংশ, এটা মানতে হবে। ফলে কোন রাষ্ট্র তাইওয়ানের সাথে রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সম্পর্ক রাখতে পারবে না। তবে তাইওয়ানের সাথে ‘অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক’ সম্পর্ক রাখা যাবে। যেমন, তাইওয়ানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কও ‘অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক’। কোনো কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই। আসলে এটাই কোনো রাষ্ট্রের একই সাথে তাইওয়ান ও চীনের সাথে সম্পর্ক রাখার একমাত্র উপায় – এই একটাই উপায়  চীন খুলে রেখেছে। আমেরিকা, ভারত বা বাংলাদেশসহ সবাই তাই এই পথের পথিক।

    যেটা বলছিলাম ভারত ট্রাম্পের আড়ালে সুযোগ নিতে চেয়েছিল। তাইওয়ানের সংসদীয় দলের প্রতিনিধি হিসেবে তিন এমপিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এবং গত সপ্তাহে তাদের ভারত সফর সমাপ্ত হয়। এরপরই চীনা কড়া প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। প্রতিশ্রুত এক চীন নীতি থেকে ভারতের সরে যাওয়ার কথা চীন স্মরণ করিয়ে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কড়া’ আপত্তি জানায়। কূটনৈতিক ভাষায় এ ধরনের আপত্তি তোলাকে ‘সলেম রিপ্রেজেন্টেশন’ (solemn representation) বলে। অর্থ হল, যথেষ্ট ভাবনা চিন্তা করে শপথ করে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলার জন্য দেখা করা।  দু’টি উৎস থেকে চীনের এই আপত্তির খবর জানা যায়। এক. চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের প্রেস-ব্রিফিংয়ের প্রশ্ন-উত্তরে। আর দুই. চীনের গ্লোবাল টাইমস পত্রিকা থেকে। এটা ‘বিশেষ’ এক সরকারি পত্রিকা। চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয় যেসব কথা, মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া বা মনোভাব যেটা তাদের মনের আসল কথা কিন্তু নানান জটিলতা এড়াতে আনুষ্ঠানিকভাবে তা বাইরে বলতে চায় না অথচ চীনা সরকারি অবস্থান কী, কী ভাবছে তারা এটা দেশে-বিদেশে সবাইকে জানাতে চায়, সেই প্রয়োজন আর এমন সব পাঠকের কথা চিন্তা করে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে আসছে। দেশী-বিদেশী মিডিয়া পাঠকেরা তাই এই চোখেই গ্লোবাল টাইমস পাঠ করে থাকে। বিশেষ করে এই পত্রিকার নিয়মিত সম্পাদকীয় এর মাধ্যমে চীনা সরকারি অবস্থান অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে বলে মনে করা হয়। গ্লোবাল টাইমস ১২ ফেব্রুয়ারিতে লেখা এক সম্পাদকীয়তে তাইওয়ানিজ প্রতিনিধি দলের ভারত সফর সম্পর্কে চীনের বিস্তারিত মনোভাব ও আপত্তির দিক জানিয়েছে। এর শিরোনাম হল – “নয়াদিল্লি তাইওয়ান কার্ড খেললে হারার ক্ষতিতে ভুগবে”। (New Delhi will suffer losses if it plays Taiwan card)।

    ইতোমধ্যে চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং বলেছেন,  “We hope India would understand and respect China’s core concerns and stick to the One-China principle and prudently deal with Taiwan-related issues and maintain sound and steady development of India-China relations.”। বাংলা করে বললে, “আমরা আশা করি, এক চীন নীতি চীনের মুখ্য স্বার্থ এটা ভারত জানে। ফলে তা ভারতের বোঝা ও সম্মান করা উচিত। অতএব বুদ্ধিমানের মতো করে সে তাইওয়ান সম্পর্কিত ইস্যু নাড়াচাড়া করবে এবং চীন-ভারতের সম্পর্ককে নিস্তরঙ্গে ও ধারাবাহিকতায় বিকশিত করবে”। ওই মুখপাত্র এক চীন নীতিতে তাইওয়ান সম্পর্কিত ভারতের দেয়া প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “আমরা সব সময় (তাইওয়ানের সাথে) সরকারি যোগাযোগ, কূটনৈতিক সম্পর্ক বা কোনো সরকারি প্রাতিষ্ঠানিকতা গড়ার বিরোধিতা করে এসেছি”। এ বিষয়টা মিডিয়ায় সবচেয়ে বিস্তারিতভাবে এসেছে ভারতের হিন্দুস্তান টাইমসের বেইজিং প্রতিনিধি- সুতীর্থ পত্রনবীশের এক বিস্তারিত রিপোর্টে। যেটা হিন্দুস্তান টাইমসসহ অন্যান্য বিদেশী পত্রিকাতেও অনুমতি নিয়ে কপি ছাপা হয়েছে।

    চীনা গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে লেখা প্রথম বাক্য হল – এক চীন নীতিতে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টে গেছেন তখন ভারত উসকানিদাতা (‘provocateur’) হতে চাচ্ছে। এ সফর আয়োজনে ভারতের মতলব কী ছিল, সে সম্পর্কে চীন কী মনে করে তা জানা যায় পরের প্যারা থেকে। এখানে তা অনুবাদ করে তুলে আনছি : ‘কিছু ভারতীয় তাইওয়ান প্রশ্নকে চীনের গোড়ালিতে কাঁটা মনে করে। এরা দীর্ঘ দিন ধরে তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর ও দালাই লামা ইস্যুকে চীনের বিরুদ্ধে দরকষাকষিতে ব্যবহার করতে চেয়ে আসছে। সাম্প্রতিককালে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর [এটা প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প; পাকিস্তানের গভীর সমুদ্রবন্দর Gwadar Port থেকে দক্ষিণ-উত্তর এভাবে সারা পাকিস্তানের বুক চিরে যে সড়ক চীনের ল্যান্ড লকড পশ্চিমাংশে প্রবেশ করেছে – এই ব্যাখ্যা আর্টিকেল লেখকের] প্রকল্পের অগ্রগতিতে চীনের বিরুদ্ধে ভারতের স্ট্রাটেজিক সন্দেহ বাতিকতা বাড়ছে। ভারত জেনেশুনে গোঁয়ারের মতো চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্পকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছে, যেটা আসলে যেসব রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে যাবে তাদের সবাইকে সুবিধা দেবে- এমনকি ভারতকেও একইভাবে (যদি ভারত চায়)। ওই অর্থনৈতিক করিডোর যেহেতু পাকিস্তান কাশ্মিরের ভেতর দিয়ে কিছু অংশ যাবে (কাশ্মিরের পাকিস্তান অংশ তুলনায় রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হলেও ভারতের চোখে যেহেতু পুরো কাশ্মিরই বিতর্কিত) ফলে সেটা বিতর্কিত ভারতের কিছু কূটবুদ্ধিদাতা এই যুক্তিতে মোদি সরকারকে তাইওয়ানিজ কার্ড খেলার পরামর্শ দিয়েছেন। উদ্দেশ্য হল, ভারত চীনের এক চীন নীতি মেনে চীনের সাথে সম্পর্ক করেছে তাই এর বিনিময়ে (পুরো কাশ্মির ভারতের এই) ‘এক ভারত’-এর পক্ষে চীন সমর্থন চেয়ে বসুক। কিন্তু তাইওয়ান প্রশ্নে চীনকে চ্যালেঞ্জ করে ভারত আসলে আগুন নিয়ে খেলছে। এই দ্বীপ (তাইওয়ান) ভারতের কোনো কাজে আসবে না, না তাকে ব্যবসা বিনিয়োগের উন্নতিতে, না মেনল্যান্ড চীনকে ঠেকিয়ে দিতে। ওদিকে স্টিল, টেলিকম ও আইটি ব্যবসায় মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিতে তাইওয়ানিজ বিনিয়োগ বাড়ছে। তবে মেনল্যান্ড-চীন ভারতের এক মেজর ট্রেডিং পার্টনার আর এই সম্পর্কের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধও কিছু পুরনো ঝগড়ার কারণে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সময়ে কঠিন হয়ে যায়”।

    এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্প
    এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্প

    এত দূর বলে সম্পাদকীয় এবার দুটো বাক্যে – একটি সাবধান বাণী আরেকটিতে পরামর্শ রেখেছে। সাবধান বাণী হল, তাইওয়ান ও মেনল্যান্ড চীনের বিবাদে ভারত যেন ব্যবহৃত না হয়ে যায়, তাইওয়ানের এমন উদ্দেশ্য আছে। আর পরামর্শ হল – ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পে [যেটা এশিয়া (পাকিস্তান) থেকে ইউরোপ পর্যন্ত এক সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা, যার বিভিন্ন স্থানে গভীর সমুদ্রবন্দরের কানেকশন থাকবে] যোগদানের সুবিধা নিয়ে ভারত চীন থেকে প্রচুর বিদেশী বিনিয়োগ আনতে পারে।
    এ তো গেল চীনের প্রতিক্রিয়া। কিন্তু ট্রাম্পের পিছু হটার পর এবং ভারতের কেসে চীনের শক্ত আপত্তি তোলার পর ভারতের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? চীনের একটা শক্ত আপত্তির পয়েন্ট ছিল তাইওয়ান-ভারতের সম্পর্ককে কখনোই সরকারি ছাপ দেয়ার চেষ্টা বা সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা অতীতে করা হয়নি। এখন কেন ভারত দাওয়াত দিচ্ছে? এ প্রশ্নে বাস্তবতা কী তা সহজে সবচেয়ে ভালোভাবে আমরা জানতে পারি হিন্দুস্তান টাইমসের পত্রনবীশের লেখা রিপোর্ট থেকে। সবচেয়ে মুল্যবান রিপোর্ট সেটা। তিনি জানাচ্ছেন এই গত বছর মে মাসের কাহিনী, সময়টা ছিল এখনকার তাইওয়ানিজ প্রেসিডেন্টের নির্বাচিত হওয়ার পর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের। তিনি ভারতকে সরকারি পর্যায়ে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু ভারত সেখানে কোনো প্রতিনিধি পাঠাতে রাজি হয়নি। এই উদ্ধৃতি দেয়ার পর পত্রনবীশ প্রশ্ন তুলে বলছেন, তাই এখন “তাইওয়ানিজ ডেলিগেশনকে দাওয়াত দেয়ার অর্থ ভারত তার নীতি থেকে সরে গেছে, বদল ঘটিয়েছে”। অর্থাৎ পত্রনবীশের চোখেও ভারতের আচরণ অস্বাভাবিক ও বেমিল।
    ভারতের দিক থেকে চীনা অভিযোগের জবাবে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপের সাফাই বক্তব্য আছে। ভারতের লাইভমিন্ট পত্রিকা থেকে নিয়ে তা অনুবাদ করে বললে তা এ রকম : “ব্যবসা, ধর্মীয় বা টুরিজমের উদ্দেশ্যে এমন বেসরকারি (ইনফরমাল) ভারত সফর এর আগেও হয়েছে। আমার জানা মতে তাঁরা এমন সফরে চীনেও যায়। তাই এই সফরের মধ্যে নতুন বা অস্বাভাবিক কিছু নেই। আর এর ভেতরে রাজনৈতিক মানে খোঁজারও কিছু নেই”।

    কূটনীতির ভাষা হয় ক্যালকুলেটিভ, আগেভাগে হিসাব-কিতাব করে বলা কথা। বিকাশ স্বরূপ তাই করেছেন। তার বক্তব্যের মূল অর্থ বহনকারী শব্দগুলো হল – ‘ইনফরমাল’, ‘নতুন বা অস্বাভাবিক’, ‘রাজনৈতিক মানে’ ইত্যাদি। তিনি প্রথমেই সব কিছু ঠাণ্ডা করতে এই সফর বা দাওয়াত সরকারি নয়, ‘ইনফরমাল’- এই অস্ত্র চেলে দিয়েছেন। এভাবে সব অভিযোগ নাল ও ভয়েড করে দিয়েছেন তিনি।  যদিও ডেলিগেশনে ‘সংসদীয় প্রতিনিধি কেন’ এই প্রশ্নে তিনি কিছু বলতে না পারায় এটা তাঁর সাফাইকে একটু দুর্বল করেছে। তাই তিনজন ‘সংসদীয় এমপি’ এদের এই পরিচয়টি উহ্য রেখে আড়াল করে তিনি বলতে ছেয়েছেন – ওরা ব্যবসা, ধর্মীয় বা টুরিজমের উদ্দেশ্যে ভারতে আসা লোকজন। এই বলে পরিচয়টি হালকা করতে চেয়েছেন। দ্বিতীয়ত, তাইওয়ানিজরা চীন সফরে যায় এ কথাও সত্য। এমনকি তারা চীনের বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য যে নতুন ব্যাংক (AIIB) হয়েছে, তারও আলাদা সদস্য হয়েছে তাইওয়ান। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এ কথাগুলো সত্ত্বেও একটাই ফারাক যে, এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টতা বা সফরের একটাও চীনের সরকারি পর্যায়ে দেয়া দাওয়াত নয়। চীনা নীতি হল রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সম্পর্ক বা স্বীকৃতি না হলেই হল। মূলত ব্যবসায়ী যোগাযোগ, এটা করা জায়েজ। বিকাশ স্বরূপ তাই ব্যবসার কথা এনে সবশেষে তাইওয়ানিজদের সাথে এই যোগাযোগের কোনো ‘রাজনৈতিক মানে’ নেই দাবি করছেন। অর্থাৎ এটা রাজনৈতিক যোগাযোগ বা সম্পর্ক নয়, তাই তিনি বলে সাফাই আনতে চাইছেন।

    তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ মিডিয়ার অনেকে এটা ভারতের নীতি পরিবর্তন বলে ভারত সরকারকে অভিযোগ করেছে। আবার অনেকে এটাকে – চীনা দাবি ভারতের ‘উড়িয়ে দেয়া’ এমন বিশেষণ লাগিয়ে হাজির করেছেন। স্বভাবতই ‘উড়িয়ে দেয়া’ বিশেষণ এটা জাতীয়তাবাদী ব্যাখ্যা। কিন্তু আসলেই কি এটা বিকাশ স্বরূপের চীনকে ‘উড়িয়ে দেয়া’?
    অবশ্যই নয়। প্রথমত, ভারতের বক্তব্যের সারকথা হল, আমরা এক চীন নীতি ভাঙিনি, নীতির বাইরে যাইনি, নতুন কিছু করিনি। এটা আগের মতোই। এবং সর্বপরি, এটা ইনফরমাল” – এই কথাটা গুরুত্বপুর্ণ।  কথার সোজা অর্থ হলো ভারত এক চীন নীতিকে দেয়া প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে চায়, চলেছে এবং মেনে চলা দরকার মনে করে। অমান্য করতে চায় না। ভারতও এক-চীন নীতি মেনে চলতে চায় বা মেনে চলছে – পরোক্ষে সেকথাই ভারত চীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে ভারত। ফলে তাইওয়ানের সাথে সরকারি যোগাযোগ ভারত করতে চায় না। অর্থাৎ আমি আইন মানা ভারত- এটাই বলতে চাওয়া। ভারত চীনকে চ্যালেঞ্জও করছে না। ট্রাম্পের মতো উড়িয়ে দেয়া নয় এটা।
    অতএব এটা ট্রাম্পের মতো অবস্থান নয়। ভারত বলছে না এক চীন নীতি মানতে হবে কেন? অথবা মানব কি না তা নিয়ে দরকষাকষি করতে চাই; অথবা আমাকে অমুকটা দিলে তাহলে মানব- এমন অবস্থান এটা নয়। তাহলে এটা উড়িয়ে দেয়া হয় কী করে? এটা উড়িয়ে দেয়া নয়।
    আরো স্পষ্ট করে বললে ভারত মনে করে, মেনল্যান্ড চীনের সাথে সম্পর্ক ভারতের কাছে তাইওয়ানের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ ভাবটাই ভারত প্রকাশ করেছে। ব্যাপারটা বাস্তবেও তাই।
    আসলে ব্যাপার হল, চীনের সাথে কোন রাষ্ট্রের এক চীন নীতি মানতে না চাওয়ার মানে হল ওই রাষ্ট্র চীনের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলতে পরোয়া করে না। ক্ষেপাটে ট্রাম্প চিন্তা-ভাবনা ছাড়া এমন অনেক কথা বলতেই পারেন। কারণ পরিণতি চিন্তা না করে তা বলা একেবারেই সহজ। কিন্তু সম্পর্ক ছিন্নের অর্থ চীনে আমেরিকার যেসব ছোট বা বড় ব্যবসায়ী, ওয়ালস্ট্রিট বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে ভালো বোঝেন। যারা  চীনে ব্যবসা করে টিকে আছেন, এখন তাদের সবাইকে চীনের সাথে সম্পর্কহীন হতে হবে। এটা কি সম্ভব? এটা কেউ কি রাজি হবেন? অর্থাৎ এই এখানে ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নেয়ার আসলে কেউই নন। আর ভারতের ক্ষেত্রেও কি ব্যাপারটা কম-বেশি এমন নয়? বাস্তবতা হল চীনের বিনিয়োগ, ভারতে শিল্পায়ন, বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য ভাইটাল। অবশ্যই চীনের কাছেও এই সম্পর্ক কোনোভাবেই তুচ্ছ নয়। ছয় মাস আগে ভারতের প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল চীনা বিনিয়োগ আনতে চীন সফরে গিয়েছিল। চীনের সাথে ভারতের বিনিয়োগ আনার সম্পর্ক এটা রিয়েলিটি। আসলে দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় উদ্বৃত্ত বিনিয়োগ পুঁজি, সক্ষমতা যে কালে যেখানে যে রাষ্ট্রে আছে, বিনিয়োগ সেখান থেকেই আসবে। সেদেশ সবচেয়ে অপছন্দের হলেও। এটাই স্বাভাবিক। তবুও ট্রাম্পের কোলে চড়ে কিছু যদি বাড়তি ভারতের হাতে লেগে যায়- এমন ব্যর্থ প্রচেষ্টার ব্যতিক্রমও আমরা দেখতে পাবো।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে গত ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

  • লিবারেল স্পেস ও ক্ষমতা

    লিবারেল স্পেস ও ক্ষমতা

    গৌতম দাস
    ২৫ অক্টোবর ২০১৬,সোমবার
    http://wp.me/p1sCvy-1S5

    উদারতা বা লিবারেলিজম

     

     

    [এই পুরাতন ২০১৬ সালের লেখাটা আস আবার ফেসবুকে দিয়েছি। সাথে নতুন বক্তব্য যেটুকু জুড়ে দিয়েছি তা এই ছোট প্যারাগ্রাফ অংশটা। 

    আজ ০৩ জানুয়ারি ২০২৫ পুনরায় প্রকাশিত
    প্রথম প্রকাশঃ ২৫ অক্টোবর ২০১৬,সোমবার
    _
    বাংলাদেশ রাষ্ট্র একটা ক্রাইসিসে মানে, এক বিরাট মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে; এখন কোনদিকে যাবে! আগামি সাত থেকে পনেরো দিনের মাথায় এটা শেষে কোন পথ বা অভিমুখ বেছে নিবে তা স্পষ্ট হয়ে যাবে; সময়ের সীমা আছে বলে।
    ইউনুস সাব রাষ্ট্র-ক্ষমতা বা এর প্রয়োগ বুঝতে অপরিপক্ক; ফলে যখন যেখানে দরকার সেই উপযুক্ত টাইমিং তিনি প্রায়শই মিস করেন। ইদানিং তা মারাত্মক পর্যায়ে হাজির হচ্ছে। ক্ষমতার বর্তমান এলোমেলো অবস্থার পিছনের মুখ্য কারণ এটাই। যদিও সাথে অন্যান্য কারণও অনেক, ডালপালা ছড়াচ্ছে।
    “রাষ্ট্রের মুখ্য কাজ হল জনগণকে সেবা দান” – এমন একটা বোকা রিডিং এটাও বাজারে চালু আছে। অর্থাত, রাষ্ট্র মানে এর ক্ষমতা নয়, ক্ষমতার বলপ্রয়োগও নয়; রাষ্ট্র হল জনগণকে সেবাদানকারি এক প্রতিষ্ঠান মাত্র। অথবা এর মুখ্য কাজ ও উদ্দেশ্য হল সেবাদান এমন একটা ভাষ্য অনেকেই বুঝে না বুঝে আউড়ায়ে থাকে।
    শুধু তাই না, এমন চিন্তার এক গালভরা নামও এরা দিয়েছেন; তা হল লিবারেলিজম [liberalism] অথবা এর আরো সুশীল এক বাংলাও আছে “উদারতাবাদ”। যে রাষ্ট্র বা শাসক বলপ্রয়োগের জায়গায় উদারতা দিয়ে কাজ সম্ভব বলে মনে করে সেই হল ভাল শাসক; এমন এক অলীক, অর্থহীন, অবাস্তব অকেজো বুঝাবুঝিও এরা খাঁড়া করে ফেলেছে।
    পশ্চিম বা ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো নাকি এক “লিবারেল” শাসন কায়েম করে ফেলেছে!! যার অনুষঙ্গি শব্দ হল পোস্ট -মডার্ণিজম!!! তাহলে ইউক্রেন যুদ্ধটাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?? খবর নাই! ক্ষমতা বা রাষ্ট্রক্ষমতা না বুঝতে পারা লোকেদের চিন্তার স্টুপিডিটি (বোকামি) সম্ভবত এমন পরিণতিই হয়!
    সংজ্ঞা হিসাবে বাংলাদেশের বর্তমান ক্রাইসিস টা মূলত যেখানে ক্ষমতা কী তা বুঝাবুঝি থেকে এর উপযুক্ত প্রয়োগ দরকার ছিল সেখানে তা না করে উদারতা চর্চা করতে গিয়ে একেবারে মাখায় ফেলা অবস্থায় পৌছিয়েছে ইউনুস সাব। এই প্রেক্ষিতে আগে (২৮ ডিসেম্বর) এরদোয়ানের রেফারেন্সে লিখেছিলাম – ক্ষমতা মানে মারো নয়ত মরো। আজ এই পুরান লেখাটা পড়তে আহবান রাখছি; যার সারকথা হল, লিবারেলিজম বা উদারতাবাদ বলে আসলেই কী কিছু আছে?
    তবে যে উসকানি থেকে এটা লিখতেছি তা হল, আমার অনেক পাঠক আমার আগের “মারো নয়ত মরো লেখাটা পড়ে মন্তব্য করেচঘেন – ” কঠিন কথা এত সহজ করে অন্য কেউকে লিখতে দেখিনা ” – এধরণের বাক্য!
    তা থেকে মনে হল এই পুরানা লেখাটা তাদেরকে “উদারতা বা লিবারেলিজম বলে যে আসলে কিছুই নাই” তা বুঝতে দেয়া উচিত!]
    May be an image of text]

    আধুনিক রাষ্ট্রধারণার গুরুত্বপূর্ণ এক অনুষঙ্গী ধারণা হল ‘লিবারেল স্পেস’। রাষ্ট্রধারণার সাথে জড়াজড়ি করে আছে এই ধারণা। ইংরেজি স্পেস শব্দের সাধারণ বা আক্ষরিক অর্থ জায়গা। তবে সুনির্দিষ্ট পটভূমিতে বললে এর অর্থ জায়গা দেয়া। ‘জায়গা’ কী অর্থে? রাষ্ট্র তার নিয়মকানুন, আইন ও ক্ষমতার কারণে ও প্রয়োজনে জনগণকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখবে না। একটু ঢিলেঢালা রাখবে, এই অর্থে জায়গা। মানে হল, রাষ্ট্র, আমি তোমার নিয়মকানুনের মধ্যেই আছি। কিন্তু আমাকে একটু জায়গা দাও খোলামেলা শ্বাস নেয়ার জন্য, ভালোভাবে দাঁড়ানোর জন্য কিংবা মুক্ত অনুভব করার জন্য, যাতে করে আরামে দাঁড়াতে ও নড়াচড়া করতে পারি। তবে এর সাথে অব্যক্ত ও অনুল্লেখ থাকে আর এক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা অংশ। তা হল – তাতে আমি তোমার ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করব না, করছি না। অথবা উল্টো করে বলা যায়, তোমার ক্ষমতা যাতে চ্যালেঞ্জ না হয়ে পড়ে ওই পর্যায়ে পৌঁছানোর আগের মাত্রা পর্যন্ত আমাকে একটু মুক্ত জায়গা দাও। সারকথায়, এটা এক রিলেটিভ মানে তুলনামূলক বা সাপেক্ষ অবস্থা; ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করা হবে না এই ‘সাপেক্ষে মুক্ত’ থাকতে চাই, এটাই এর সূক্ষ্মতর ও অনুল্লেখিত দিক। ওদিক স্পেস এর আগের শব্দ লিবারেল, ইংরেজি ‘লিবারেল’ কথাটার অর্থ মুক্ত। ‘লিবার্টি’ শব্দ থেকে এসেছে এটা।
    তাহলে পুরো কথা দাঁড়াল, লিবারেল স্পেস কথার ভেতর লিবারেল শব্দটি ঠিক অবাধ অর্থে ‘মুক্ত’, এমন ধারণা বহন করে না, বরং ‘সাপেক্ষে মুক্ত’- এই ধারণা ও অর্থ বহন করে। যেমন কোনো স্বামী-স্ত্রীর বেলায় আমরা প্রায়ই এমন শুনি, এদের কোনো একজন অপরজনের বিরুদ্ধে অনুযোগ করছেন, সে স্পেস দেয় না। অর্থাৎ এখানে অনুযোগ করে বলা ‘স্পেস’ শব্দের আদর্শ অর্থ হল, প্রথমজন বলতে চাচ্ছেন তার আকাঙ্খা হল, তাদের দাম্পত্য সম্পর্কের ওপর প্রভাব না পড়ে অথবা দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য কোনো ক্ষতিকর না হয় ইত্যাদি দিক খেয়াল রেখে বা এই সাপেক্ষে সে তৃতীয় লোকজনের সাথে ওঠাবসা, মেশামিশি ও চলাফেরা করতে চায়। এতে অন্যজন সেটা অনুমোদন করছে না। এই অর্থে এখানে স্পেস কথার মানে, ‘সাপেক্ষে মুক্ত’ থাকতে চাওয়ার এক আকাঙ্ক্ষা।

    রাজনীতিতে লিবারেল স্পেস
    আমরা সমাজ বা পরিবারের মধ্যে ‘লিবারেল স্পেস’ শব্দের অর্থের দিক আলোচনা করলাম। রাজনীতিতে লিবারেল স্পেস ধারণা পরিবারের ভেতরের মতো সরল নয়। রাজনীতির একটা অর্থ হল, আইডিয়া বা মতাদর্শ। অন্য আর এক অর্থ হল, ক্ষমতা। এই ক্ষমতা সম্পর্কিত ধারণা লিবারেল স্পেস কথার সাথে আরো স্পষ্ট করে সম্পৃক্ত ও ঘনিষ্ঠ। আমরা অনেকে ‘লিবারেল ধারার’ রাজনীতি বলে একধরনের রাজনীতির কথা শুনে থাকি। এ ছাড়া, পশ্চিমা জগতের রাষ্ট্র এবং ওই জগতের প্রায় সব রাজনৈতিক ধারা প্রত্যেকেই নিজেকে লিবারেল রাজনীতিক ধারার রাজনীতি, এমন নাম-পরিচয় ও বৈশিষ্ট্যে চেনাতে পছন্দ করে। যদিও পশ্চিমের ট্র্যাডিশনাল বা যারা চিন্তাভাবনা সহজে বদলাতে চায় না, এমন অর্থ ও বৈশিষ্ট্যের রাজনৈতিক দল বুঝতে বলা হয়, রক্ষণশীল (ইংরেজিতে কনজারভেটিভ, যেমন ইংল্যান্ডের টোরি দল, যার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ডেভিড ক্যামেরন) দল বলা হয়। আর এই দলের বিপরীত বুঝাতে ‘লিবারেল’ শব্দ ব্যবহার করে লিবারেল দল বলার রেওয়াজও আছে। তবে এগুলো দাবি করা অর্থে। মূলত উভয় ধারাই মোটা দাগে লিবারেল ধারার রাজনীতি করে। সোজা কথায়, রাজনৈতিক দলকে লিবারেল বলার ভেতরেও একধরনের বাড়াবাড়ি দাবি সেখানে থাকে। যেমন পশ্চিমের লিবারেল ধারা মুখে যা-ই বলুক, আসলে সে যে ক্ষমতায় আছে, এটা অটুট থাকা সত্ত্বেও সে একটা মিথ্যা ভাব বজায় রাখতে চায় যে, তার ‘অপর’ বা বিরোধী যারা- এরা ঠিক যেন ‘তার ক্ষমতাসাপেক্ষে শুধু মুক্তই’ না, তার সমাজ-রাষ্ট্রে যেন সবাই পুরোপুরি ও অবাধভাবেই মুক্ত। ফলে যেন দাবি করা হয়, ঐ সমাজ ও রাষ্ট্রে ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। ফলে যেন কোনো ক্ষমতার সাপেক্ষে লিবারেল স্পেস নয়, অথবা যেন কোনো বলপ্রয়োগ সেখানে অনুপস্থিত। অতএব ওই সমাজে সবাই মুক্ত এবং সবাই কোনো বাধাহীন অর্থে এক লিবারেল স্পেসে বসবাস করে। অর্থাৎ সমাজে জলজ্যান্ত ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগের উপস্থিতি সত্ত্বেও তাকে আড়াল করে দাবি করা যে, সবাই পুরো স্বাধীন বা মুক্ত। এটাই সেই বাড়াবাড়ি মিথ্যা দাবি। এই অর্থে, এটাকে পশ্চিমের ছলনা বলছি। তাহলে সারকথা হল, লিবারেল ধারার রাজনীতি যত লিবার্টি বা মুক্তসমাজের কথার প্রপাগান্ডা চালাক, অথবা এমন ছলনা করুক না কেন- সব সময় মনে রাখতে হবে, আসলে এখানে মুক্ত মানে অটুট একটা ক্ষমতার সাপেক্ষে মুক্ত, যদি আপনি ওই ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ না করেন, এই সাপেক্ষে এই শর্তে ও সীমায় আপনি অবশ্যই মুক্ত। যতক্ষণ না ক্ষমতাকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ করেন ততক্ষণ আপনি মুক্ত। পশ্চিমের লিবারেল ধারার এমন রাজনীতিরই ব্রান্ড নাম ‘গণতন্ত্র’- এই ব্র্যান্ডেই এটা প্যাকেটজাত হয়ে আমাদের দেশেও হাজির আছে।

    রাজনৈতিক আইডিয়া বা মতাদর্শে লিবারেল স্পেস
    সব সমাজেই রাজনীতিতে নানা আদর্শ বা আইডিওলজি সদর্পে আছে ও থাকে। এভাবেই এটা কাজ করে এবং থাকবেই। এমন নানান রাজনৈতিক আইডিয়ার ধারাগুলোকে মোটা দাগে তিনটি ভাগ বা প্রকরণে ফেলতে পারি – কমিউনিস্ট, গণতান্ত্রিক (পশ্চিমা অথবা লিবারেল) আর ইসলামি। লিবারেল স্পেস ধারণাটির প্রতি এই তিন ধারারই মনোভাব কেমন অথবা কিভাবে এরা দেখে, সেদিক থেকে এখন কথা তুলব। যেকোনো রাজনৈতিক আইডিয়ায় কোনো লিবারেল স্পেস ধারণা আছে কি না, কেমন করে আছে আর থাকলে কিভাবে কতটুকু কী অর্থে আছে, তাই পরখ করব। এ কাজটি করার একটা সহজ উপায় নিব তা হল, তিন রাজনৈতিক ধারারই প্রত্যেক প্রবক্তাকে জিজ্ঞেস করা, তার রাজনৈতিক ধারার বিরোধীদের প্রতি তার মনোভাব কী? যারা তার বিরোধী বা ‘অপর’, তাদের তিনি কিভাবে দেখেন? যারা তার আইডিয়া বা বয়ানের সাথে একমত হবে না, একমত নয় বলে জানাবে, তাদেরকে তিনি কী করবেন? কোথায় রাখবেন?
    প্রথমে কমিউনিস্ট ধারা- দেখা যাক এ ক্ষেত্রে কী বের হয়। এরা বলবে, লিবারেল স্পেস, সেটা  আবার কী? সমাজ মাত্রই শ্রেণী বিভক্ত সমাজ। শ্রেণী বিভক্ত সমাজে, শ্রমিক-কৃষক শ্রেণীর প্রতিনিধি হয়ে আমরা এখন ক্ষমতায় আছি (অথবা যাব)। আমার বিরোধী ‘অপর’ মানে, সে তো আমার শ্রেণী-শত্রু। তাকে আবার ‘লিবারেল স্পেস’ দেয়ার কী আছে? বরং শত্রু-শ্রেণীকে দাবড়ের উপর তটস্থ রাখাই তো আমার কাজ। সঠিক শ্রেণী সংগ্রাম। অর্থাৎ লিবারেল স্পেস বলে ছোটখাটো ছলনা অথবা অবাধ ও লিবার্টিতে মুক্ত দাবি করে বড় কোনো ছলনা – কমিউনিস্টরা এমন কোনটারই ধার ধারতে চায় না। এ জন্য এদেরকে ঘোষিত ‘নো লিবারেল স্পেস’ ধারা গোত্রের বলা যায়।
    এবার পশ্চিমা লিবারেল গণতন্ত্রের ধারা- এর ক্ষেত্রে দেখা যাক। প্রথমত এরা বলবে মানে ভুয়া হলেও দাবি করবে, আমার সব ‘অপরই’ মুক্ত। ওরা মুক্ত থাকবে; আমাকে সমালোচনা ও প্রতিবাদ করবে, মানি না বলে স্লোগান দেবে, আমার বিরুদ্ধে আর্টিকেল লিখবে- কোনো অসুবিধা নেই। কেবল একটা খালি ‘কিন্তু’ আছে। সেটা হল, খালি আমি যদি বুঝি যে, ওরা আমার ক্ষমতার জন্য বিপদ, আমাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে বা করছে, তাহলে কিন্তু রাষ্ট্রের আইনে থাকুক আর না-ই থাকুক, আইন ছাড়াই অথবা নতুন আইন বানিয়ে নিয়ে (আমেরিকায় যেমন প্যাট্রিয়ট ল, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইত্যাদি এবং বাংলাদেশে বিশেষ ক্ষমতা আইন) অথবা নানান নিবর্তনমূলক নির্যাতনের আইনের মাধ্যমে আমি তাদের কোনো ধরনের খাতির না করে,  একেবারে নির্বিশেষে সরাসরি নির্মূল করব। দেখা যাচ্ছে, এরা প্রকৃতপক্ষে লিবারেল না, বরং কিছু শর্তসাপেক্ষে লিবারেল। অবশ্য মুখে এরা দাবি করে যাবে, তারা অবাধ ও লিবারেল।

    এবার পরের ধারার যাবার আগে বর্তমান সরকারকে একটু মূল্যায়ন করা যাক। উপরের দুই ক্যাটাগরি অনুসারে বর্তমান সরকারকে  কোন ক্যাটাগরিতে ফেলব? অবশ্যই প্রথমটা। তবে একটা জায়গায় একটু বদল হবে। কমিউনিস্টদের বেলায় তারা বলে তারা শ্রমিক-কৃষক শ্রেণীর ক্ষমতা। এখানে সে জায়গায় হবে – মুক্তিযোদ্ধা-শ্রেণী অথবা চেতনা-শ্রেণীর ক্ষমতা। যেমন সরকার বলছে এই সরকারের চেতনার মানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার। ফলে এই শ্রেণীর অথবা সরকারের বিরোধী বা শত্রু যারা, তারা তাহলে রাজাকার। ক্ষমতাসীন সরকারের দৃষ্টিতে এই সরকারের বিরোধী বা ‘অপর’ যারা তারা যেহেতু রাজাকার অতএব তাদের তাদের দমন ও দাবড়ে রাখাই তো সরকারের কাজ। অতএব তাদের জন্য আবার স্পেস কী?

    এবার ইসলামি ধারার ক্ষেত্রে দেখা যাক- বাংলাদেশে হয়ত অনেককে পাওয়া যাবে, যাদের এমন ধারার ক্যাটাগরিতে ফেলা যায়। কিন্তু সবার আগে একটা কথা বলে নেয়া দরকার। এই রচনার পুরো অংশজুড়ে এটা ধরে নেয়া হয়েছে যে, এখানে ক্ষমতা বলতে, গণ-আন্দোলনের পথে বা কনষ্টিটিউশন মেনে নির্বাচিত হতে – এভাবে ক্ষমতা পেতে যারা আগ্রহী তাদেরকেই ধরে নেয়া হয়েছে। যেসব ক্ষমতা কনষ্টিটিউশন মেনে নির্বাচিত নয়, সেগুলো নিয়ে আলোচনার সুযোগ এই রচনার বাইরে। তাই নির্বাচিত ক্ষমতাগুলোর ক্ষেত্রে সবার সাধারণ দিকটি আমল করে কথা বলব। এদের অনেকে হতে পারে যারা নিজের রাজনীতি ইসলামি বলে মনে করে ও দাবি করে। এখন তারা যদি নির্বাচিত হয় তবে নিজেদের ক্ষমতাকে তাদের কেউ কেউ ইসলামি ক্ষমতা বা ইসলামি শাসন বলে দাবি করবে। অবশ্য কেউ কেউ নাও করতে পারে। তবে যারা তাদের ক্ষমতাকে আল্লাহর শাসন বা কুরআনের শাসন বলে দাবি করবে, তাদের কথা বলছি। নির্বাচিত নিজের ক্ষমতাকে আল্লাহর শাসন অথবা ইসলামি রাজনীতির শাসন বলার বা দাবি করার ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা আছে। কারণ, যেকোনো ক্ষমতা মাত্রই কেউ না কেউ এর বিরোধিতাকারীও হবে, থাকবেই এবং এটা স্বাভাবিক। জটিলতা দেখা দেবে সে ক্ষেত্রে। এ জন্য যে, ওই নির্বাচিত ক্ষমতার বিরোধিতা করলে সেটা আল্লাহর শাসন বা কুরআনের শাসনের বিরোধিতা করা হচ্ছে কি না, এই প্রশ্ন উঠতে পারে। অথচ যে বিরোধিতা করছে, তার এমন কোনো সচেতন ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য না-ও থাকতে পারে। ফলে একটা জটিলতা দেখা দেবে। তাই এ দিকটি নিয়ে ভাবার দরকার আছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা পুর্ব-পাকিস্তানের বৈষম্য-বিরোধী যে কোন বক্তব্য বয়ানকে নিজেদের শাসনের বিরোধী ফলে তা ইসলামি রাজনীতির বিরোধী বলে পাল্টা প্রপাগান্ডা হাজির করত। স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি ইসলামি শাসনের বিরোধীতা বলে চিনানোর চেষ্টা করত। এটা কনষ্টিটিউশনে কী লেখা আছে বা ছিল সে মামলা নয়। যেমন বর্তমানে কনষ্টিটিউশনে যাই লেখা থাক ফ্যাক্টস হল, বাস্তবে এই ক্ষমতার বিরোধী হবার সুযোগ খুবই সীমিত। একইভাবে নিজেকে ইসলামি ক্ষমতা বলে দাবি করতে চায় যারা তারা নিজেদের সম্ভাব্য ক্ষমতার বিরোধী বা সমালোচককে কিভাবে দেখা হবে, এই প্রশ্নেও চিন্তা করার দরকার আছে। ইসলামি রাজনীতিতে লিবারেল স্পেস ধারণা নিয়ে খুব বেশি চিন্তাভাবনা করা হয়নি। এটা করা উচিত। পুরনো উদাহরণ যেগুলো আছে, সেগুলোর বেশির ভাগই ‘নো লিবারেল স্পেস’ ক্যাটাগরির।

    পাবলিক পারসেপশনে রাজনৈতিক দল
    রাজনৈতিক দল কেমন হবে? একালের পাবলিক পারসেপশনে মানে – ঠিক বাস্তবের কথা নয়, বাস্তবে সেটা কী ঠিক তা নয় তবে পাবলিক সেটা সম্পর্কে কী মনে করে ধারণা করে। আবার পাবলিকের মনে আঁকা ছবিতে থাকা আকাঙ্খা বা গণ-অনুমিত আকাঙ্খাটা কেমন? সেটা বোঝার চেষ্টা করব। কিন্তু ‘একালের’ কেন? বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের পর থেকে রাজনৈতিক শাসনে এক বিশেষ ধারার বৈশিষ্ট্যের শাসন যুক্ত হয়েছে। অবশ্য মাঝের দুই বছর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক শাসন- এই ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে পপুলার ভাষায় বললে, একটা দ্বিদলীয় রাজনীতির শাসন শুরু হয়েছিল। আর এই দ্বিদল স্বীকার করে নিয়েছিল, লিবারেল স্পেস আছে বা রাখতে হবে। সেটা যেমন চেহারার বা ছলনার হোক না কেন, একটা লিবারেল স্পেসের ধারণার অন্তত মৌখিক স্বীকৃতি সেখানে ছিল।অবশ্য এটা হওয়া সম্ভব হয়েছিল, এর মূল কারণ হল সোভিয়েত ইউনিয়ন বা সোভিয়েত ব্লকের পতন। েই ঘটনার সাথে সম্পর্কিত করেই কেউ দেখতে পারে। তবুও ১৯৯১ সাল থেকে পরের তিন টার্মের বেশি আমরাও ক্ষমতার বিরোধীদের লিবারেল স্পেস আর দিতে পারিনি।
    মাঝের দুই বছর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক শাসনে তো বটেই এবং এরপর থেকে যে শাসন খাড়া হল, তা যেন পরিকল্পনা করেই নিজেকে লিবারেল ‘স্পেস রাখার দরকার কী’ বলে সাজিয়েছে। “এর কোন দরকার নেই”- এই ধারার ক্ষমতা হিসেবে নিজেকে হাজির করেছে। বিশেষত ২০১৪ সাল থেকে তৈরি করা ক্ষমতা। আগেই বলেছি এটা কমিউনিস্ট উদাহরণের ‘নো লিবারেল স্পেস’ ধারণাটিকে অনুসরণ করে বেড়ে উঠেছে। যার ভয়ানক জায়গা হল, যারা ‘চেতনার বিরোধী’, তাদের জন্য আবার সরকার বিরোধিতার অধিকার বা ‘লিবারেল স্পেস কী’- এই ধারণার ওপর দাঁড়ানো।

    অনেকের মনে হতে পারে আমি ১৯৯১ সাল কেন রেফারেন্স হিসাবে টানছি? এরশাদের পতন আর এরপর পরপর তিনি নির্বাচিত সরকার গঠন হয়েছিল – সেজন্য। এককথায় বললে শুধু সেজন্য তা একেবারেই না। আরও বড় গ্লোবাল পটভুমি একটা আছে। পুরান সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯৯০ সাল থেকেই নিজেই ভেঙে যাওয়ার এক প্রক্রিয়া শুরুর ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। যা আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায় ১৯৯২ সালে। ফলে শুরু থেকেই এর আর আগের নিজ প্রভাবিত দুনিয়া অংশকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় এর মুঠি আলগা হতে শুরু করেছিল। আর এর ফলে আমেরিকা এক মেরুর এক দুনিয়া পেয়ে যায়। ফলে এটাই আমেরিকার পক্ষে এবার দুনিয়ায় নতুন করে (সামরিক শাসন দিয়ে সরকার চালানোর বদলে ) “লিবারেল দ্বিদলীয় শাসনের” সূত্রপাত করার মতো নতুন শর্ত হিসেবে উপস্থিত হয়। আমেরিকা সেটাকে আমল করে কাজে লাগিয়ে বাস্তব করে তুলেছিল। আমাদের মতো দেশে এরই মধ্যে আবার এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত জনগণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এখান থেকেই একালে রাজনীতি সম্পর্কে পাবলিক পারসেপশনে বা গণ-অনুমিত আকাঙ্ক্ষাটা হলো রাজনৈতিক দলমাত্রই সেটা তো এক ‘লিবারেল’ দলই হবে। আমাদের পপুলার ভাষায় ভোটের রাজনীতির দল।

    অন্য আর একটা বিষয়, কনষ্টিটিউশনাল রাজনৈতিক দল, বা আইনী রাজনৈতিক দল কথার মানে আসলে কী? কথাটাকে বুঝতে হবে মোটা দাগে রাজনৈতিক দল দুই ধরণের হয়। মানে তার ঘোষিত লক্ষ্য হাসিলের জন্য শুরু থেকেই সশস্ত্র অথবা নিরস্ত্র পথের দল হতে হয়। নিরস্ত্র পথের দল মানেই ‘মাস লাইন’ বা গণ-আন্দোলনের দল। এই ‘মাস লাইন’ বা গণ-আন্দোলনের দলকেই কনষ্টিটিউশনাল রাজনৈতিক দল, বা আইনী রাজনৈতিক দল বলা যায়। কারণ সে সশস্ত্র নয় বলে অন্তত কৌশল্গত কারণে আর দলের লিখিত দলিলে সে ঐ দেশের কনষ্টিটিউশন মেনে চলে। সম্ভব হয়। তাই এটাকে আইনি দল বলা যেতে পারে। সশস্ত্র দল মানেই তা কনষ্টিটিউশনের চোখে বেআইনি দল হবেই। সে হিসাবে যেমন, সর্বশেষ ৮০’র দশকেও কমিউনিস্টদের মধ্যে রাজনৈতিক তর্কের এক বড় ইস্যু ছিল পার্টি কেমন হবে ‘মাস লাইনের’ না ‘সশস্ত্র লাইনের’। একালের ভোকাবুলারিতে ‘মাস লাইন’ কথাটাও পরিচিতি হারিয়ে ফেলেছে। এখন অচল, হারিয়ে যাওয়া ধারণা। ইংরেজি রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘মাস’ মানে, জনগণ বা ‘গণ’ বলতে যা বুঝি তাই। তাই মাস লাইন মানে হল, দলকে আগানোর জন্য দলের তৎপরতা ‘গণ-আন্দোলনে’ সংগঠিত করে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে আগাবে। সবকিছুই হবে প্রকাশ্য তৎপরতার মাধ্যমে; জনগণকে আকৃষ্ট করে সরাসরি অংশগ্রহণ করানোর এক প্রকাশ্য ‘পপুলার উইল’, ‘রাজনৈতিক পরিসর’ ‘কমিউনিটি’  তৈরি করার মাধ্যমে। এমন দলকে কনস্টিটিউশনাল দলও বলা হয়। কারণ অন্তত মুখে ও পার্টির প্রকাশ্য কাগজপত্র দল দেশের কনস্টিটিউশন মানে বলে স্বীকার করে সে তৎপর থাকে। এছাড়া মনে বা রাজনৈতিক চিন্তায় যাই থাক, সে ভাব ধরে যে, উপস্থিত রাজনৈতিক শাসন ক্ষমতাকে সে চ্যালেঞ্জ করছে না। ফলে লিবারেল স্পেসে নড়াচড়া তৎপরতার সুযোগ সে চায় এবং পায়। এমনকি নির্বাচন কমিশনে দলের নাম রেজিস্ট্রেশন নেয়ার সুযোগও নিয়ে থাকতে পারে। তবে চলতি হাসিনা সরকারের আমলে এ লিবারেল স্পেস ক্রমেই নাই হতে চলেছে।

    তবে একালের পাবলিক পারসেপশন বা গণ-আকাঙ্ক্ষায় এটা এখন স্পষ্ট- জনগণের আকাঙ্খা হল, আপনি যে ধারার রাজনীতি নিয়ে আসেন না কেন – একটা লিবারেল স্পেস দেওয়ার বিষয়টা আপনার রাজনৈতিক চিন্তার প্যাকেজে থাকতেই হবে। লিবারেল স্পেস থাকা বিষয়ে জনগণের আকাঙ্খা এবং পারসেপশন আপনাকে পুরণ করেই একমাত্র আপনি হাজির হতে পারেন। চিন্তার একটা লিবারেল স্পেস থাকতেই হবে। লিবারেল স্পেসে নড়াচড়া, তৎপরতার সুযোগ থাকতেই হবে, এ আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে উঠছে ক্রমেই।

    আসলে আপনি আপনার ক্ষমতার বিরোধীকে কী করতে চান, বিরোধী অপরের বিরোধিতা কীভাবে মোকাবিলা বা হ্যান্ডেল করতে চান সেকথা আপনাকে আগাম বলতেই হবে। আর এর ভিতর দিয়েই আপনার চিন্তা-রাজনীতি কেমন – তা ধরা পড়ে যাবে। আপনাকে চিনা যাবে।

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    Goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে গত ০৮ অক্টোবর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার নতুন কিছু সংযোজন ও এডিট করে আবার ছাপা হল। লেখাটা এরও আগে একেবারেই ভিন্ন কোণ থেকে গত বছর দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশেও ছাপা হয়েছিল।   ]

  • ভারতে এবার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার কথা উঠেছিল কেন

     ভারতে এবার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার কথা উঠেছিল কেন

    গৌতম দাস

    ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬

    ভারতে এবার ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার কথা উঠেছিল কেন

    বাংলাদেশে খবরটা সবাই পড়েছেন বেশ উতসুক হয়ে আগ্রহের সাথে। কারণ বিষয়টা  জন্মলগ্ন থেকে বাংলাদেশকে ভাটির দেশ হিসাবে পাওনা পানি থেকে বঞ্চিত করার ভারতের জুলুম ও অত্যাচারের কাহিনীর অংশ। জুলুম ও অত্যাচার সহ্য করা বাংলাদেশে বিষয়টা উস্কে তোলার মত খবরটা হল, ভারতের বিহার রাজ্যের চলতি মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার, তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাথে দেখা করে ফরাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দিতে দাবী করেছেন। এই ফারাক্কা বাঁধ তৈরি করে গঙ্গা নদীর পানির উপর ভাটির দেশ হিসাবে বাংলাদেশের যা ন্যায্য হিস্যা সেই পানি জবরদস্তি করে ভারত আটকে নিয়ে রেখেছে। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা দিয়ে রেখেছে শুধু তাই না, সেই পানি খাল কেটে পশ্চিমবঙ্গের অন্য নদীতে নিয়ে গেছে। তাই বাংলাদেশের সকলের চোখে, এটা বাংলাদেশের চরম স্বার্থহানিকর ঘটনা। ফলে  ভারতের দুষমনির প্রতীক হল ফারাক্কা বাঁধ। এবার সেই ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দেবার কথা তুলেছেন ভারতের বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি ২২ আগষ্ট ২০১৬ প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাথে দেখা করেন। আনন্দবাজার পত্রিকার ২৪ আগষ্টের রিপোর্ট বলছে – নিতীশ কুমারের অভিযোগ, “বিহারে গঙ্গা অববাহিকায় বন্যার জন্য ফরাক্কা বাঁধ দায়ী। বক্সার থেকে ফরাক্কা পর্যন্ত গঙ্গার নাব্যতা অনেকটাই কমেছে। ফলে জল জমে তা দু’পার ছাপিয়ে যাচ্ছে। ফলে বন্যা কবলিত এলাকা বাড়ছে। তাই ফরাক্কা বাঁধের পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। ফরাক্কা বাঁধ ভেঙে দেওয়া উচিত বলেও মনে করেন নীতীশ”। এই খবর বাংলাদেশের কাছে যেন আল্লার দুনিয়ার ন্যায়-ইনসাফের ঘন্টা আপন উদ্যোগে বেজে উঠার ইঙ্গিত ইশারা এটা। যদিও মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার এই দাবি করেছেন বাংলাদেশের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে নয়, বিহারের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে। কারণ বিহার এখন গঙ্গা নদী প্রবাহের উপচানো পানিতে বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। উতপত্তিগত দিক থেকে গঙ্গা নদী ভারতের যেসব প্রদেশ আগে ডিঙ্গিয়ে এরপর বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ক্রমানুসারে ভারতের সেসব প্রদেশ বা রাজ্যগুলো হল – সবার আগে উত্তরপ্রদেশ এরপর বিহার, এরপর পশ্চিমবঙ্গ হয়ে শেষে বাংলাদেশের চাপাই-নবাবগঞ্জ ও রাজশাহী জেলা। তো নীতিশ কুমারের দাবি কী আমাদের জন্য ইনসাফের ইশারা? এটা বুঝবার জন্য আমাদের সবার কান খাড়া হয়েছিল, সন্দেহ নাই।

    ঐ সাক্ষাত ছিল এক মুখ্যমন্ত্রীকে দেয়া এক প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক এপয়েন্টমেন্ট করে দেয়া সাক্ষাত। অতএব এতে অনুমান করা ভুল হবে না যে তা অনেক আগেই ঠিক করা হয়েছিল। তবে এটা নেহায়েতই এক মুখ্যমন্ত্রীকে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত ছিল না। এর আরও বহু গভীর মাত্রা আছে। প্রথমত নীতিশ বিহারের এক আঞ্চলিক দল জনতা দল (ইউনাইটেড)এর সভাপতি ও মুখ্যমন্ত্রী। না এতটুকুই নয়। গত ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপির মোদী নিরঙ্কুশভাবে জিতে আসার পর ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে যে মোদী ঝড় উঠেছিল সে ঝড় ঐ নির্বাচনের পরেও অন্যান্য রাজ্য নির্বাচনেও থামছিলই না। শেষে গত নভেম্বর ২০১৫ বিহারের প্রাদেশিক (বিধানসভা) নির্বাচনে প্রথম সবচেয়ে শক্তভাবে থেমে উলটা দিকে তা ঘুরেছিল। বিজেপি শোচনীয়ভাবে হেরেছিল। আর নীতিশ কুমারের নেতৃত্বের বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়েছিল। ঐ জোটে বিহারের আর এক বড় আঞ্চলিক দল, লালু প্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর ছিল সোনিয়া গান্ধীর খোদ কংগ্রেস পার্টিও। এককথায় বললে বিজেপি বিরোধী শক্ত জোট ছিল সেটা। ফলে সেই শক্ত জোটের সবার প্রতিনিধি ও নেতা ছিলেন নীতিশ কুমার । নীতিশের পরিচয়-বৈশিষ্ঠের আরও কিছু বাকী আছে। আগামি বছর ২০১৭ ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ঐ নির্বাচনেও যদি বিজেপির হার হয় তবে তা ভারতের রাজনীতিতে আর এক নতুন দিকে মোড় ঘুরানো ঘটনা হবে সেটা। ঐ হারকে পুজি করে ভারতের পরবর্তি লোকসভা (২০১৯) নির্বাচনে বিজেপির মোদীকে হারানোর লক্ষ্যে বিজেপি-বিরোধী জোট গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। কারণ আগামি নির্বাচনে বিজেপি-বিরোধী দল কংগ্রেস হবে না। আঞ্চলিক দলগুলোর গঠিত জোট হবে মোদীর বিজেপির প্রধান বিরোধী, প্রধান চ্যালেঞ্জ।  এই লক্ষ্যে সম্ভাব্য ঐ জোট গড়ে তোলার খুবই তাতপর্যপুর্ণ ঘটনা। সম্ভাব্য ঐ আঞ্চলিক দলের জোট গঠনের মূল নেতা ও উদ্যোক্তা হবেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।  এই জোটের মূল লক্ষ্য হবে বিজেপি ও মোদীর ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে কেন্দ্রের ক্ষমতা দখল। গত কেন্দ্রীয় নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে কংগ্রেস ক্রমশ শুকিয়ে ছোট হতে হতে অনেক আগেই কোন এক আঞ্চলিক দলের সমান প্রভাবের দল হয়ে গেছে। ফলে নীতিশ-মমতাসহ নানান আঞ্চলিক দলের মিলিত জোট বনাম বিজেপির মোদী – এই হবে ঐ নির্বাচনে মূল ক্ষমতার লড়াই।

    ভারত রাষ্ট্রের জন্মগত সুত্রে দুর্বলতা বা ত্রুটি হল ওখানে কেন্দ্র কে, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কোথায় কিভাবে তৈরি হয় তা রাজ্যে বসে টের পাওয়া যায় না। ফলে ভুতুড়ে কেন্দ্র বনাম রাজ্য এর বিবাদ জন্ম থেকেই। ফলে বিজেপি বনাম আঞ্চলিক দলের জোট এর লড়াই  এর তাতপর্য  এবার পুরানা ‘কেন্দ্র-রাজ্য’ ক্ষমতার লড়াইকে আবার মুখ্য হয়ে তুলতে যাচ্ছে। অতএব মোদী সেই বিশেষ নীতিশ কুমারকে সাক্ষাতের এপয়েন্টমেন্ট দিয়েছিলেন।

    ফসলের মাঠ ও শহরও ডুবে যাওয়া বিহারের এবারের বন্যার প্রভাব হয়েছিল মারাত্মক। টানাটানিতে চলা রাজ্য আর তুলনামূলক উদ্বৃত্তে চলা রাজ্য এই ভিত্তিতে যদি ভারতের রাজ্যগুলোকে ভাগ করি তবে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার টানাটানিতে চলা রাজ্যের অন্তর্গত। ফলে বন্যায় ব্যাপক ত্রাণের আয়োজন করার সীমাবদ্ধতা এখানে আছে। আর এই সীমাবদ্ধতা সমস্যাটা ব্যক্তি নীতিশ কুমার অথবা তার দল-জোটের কারণে নয়।  ওদিকে এই বন্যায় মানুষের যা ক্ষয়ক্ষতি এককথায় বিহার রাজ্য সরকারের পক্ষে তা পুরণ অসম্ভব। ফলে যেটা সম্ভব তা হল তাতক্ষণিক কিছু ত্রাণ বিতরণ। সারকথায় বিহারের জনগণের ক্ষোভ মোকাবিলা আসলেই কঠিন। ফলে৪ জনগণের ক্ষোভকে কেন্দ্রের উপর ঠেলে দেয়ার তাগিদ নীতিশের আছে। ওদিকে এই বন্যা কেন হল, এর সাথে কী ফারাক্কায় বাঁধ দেওয়ার কোন সম্পর্ক নাই? অবশ্যই আছে। গঙ্গার মত প্রবল বিপুল পলিমাটিবাহী নদীর ক্ষেত্রে এর উপর বাঁধ দিলে সে প্রভাব আরও জটিল ও মারাত্মক হওয়ার কথা, হয়েছেও। অতএব সবমিলিয়ে এর দায় কার কেন্দ্রে না রাজ্যের এই বলে দায় ঠেলাঠেলির এক বিরাট ক্ষেত্র হল বন্যা ও বাঁধ ইস্যু। বিশেষত যখন বাঁধ দেয়া ও মেন্টেনেন্স ব্যবস্থাপনার প্রশাসন চলে সরাসরি কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত – তাই এই দায় কেন্দ্রের; ওদিকে বন্যা হলে তা মোকাবিলা ও ত্রাণ বিতরণ রাজ্যের দায়। এসব কথা সাক্ষাতের আগেই আগাম ভেবে নিয়েছিলেন নীতিশ ও মোদী দুজনেই। কারণ, ঐ সাক্ষাত থেকে দায় ঠেলাঠেলি শুরুর এক বিরাট সম্ভাবনা আছে তা দুজনেই জানতেন। নীতিশ মোদীর কাছে এসে নিজ বিহার জনগণকে বুঝাতে ও দেখাতে চেয়েছিলেন মুল সমস্যা ফারাক্কা বাঁধ। অর্থাৎ দায় কেন্দ্রের। মোদীর কাছে বাঁধ ভেঙ্গে দেওয়ার কথা তুলে, দাবি জানিয়ে তিনি সে অর্থ করতে চেয়েছিলেন যে দায় কেন্দ্রের। আর মোদী সেকথা টের পেয়ে সাথে সাথে বাঁধ কর্তৃপক্ষকে  বাঁধের সব গেট খুলে দেবার নির্দেশ জারি করেন। এভাবে তিনিও বুঝাতে চাইলেন রাজ্য যা চেয়েছে তিনি ততক্ষণাত তাই দিয়ে দিয়েছেন, সুতরাং কেন্দ্রের দায় নাই।  বন্যায় কারণে  বিহারের জনগণের যদি কোন কষ্ট-ক্ষোভ থেকে থাকে তবে এর দায় ত্রাণের পরিমাণ কম  অথবা বিতরণে রাজ্য সরকারের সমস্যাজাত। ফলে ২৩ আগষ্ট নীতিশ-মোদীর সাক্ষাত ছিল আসলে আগামি ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে কার ইমেজ ক্রেডিট ভাল তা এখন থেকেই ঠিকঠাক রাখার প্রতিযোগিতা। ফলে ঐদিনের প্রথমার্ধে ঘটনাবলী ছিল নীতিশের বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবী জানান আর মোদীর ততক্ষণাৎ সবগুলো গেট খুলে দিবার নির্দেশের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছিল।

    কিন্তু কেবল নীতিশ আর মোদী নন গঙ্গার ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে ভারতেই আরও পক্ষ আছে। যেমন পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান হল ফারাক্কা বাঁধ থাকা তার স্বার্থের পক্ষে। কারণ গঙ্গার পানি শেষে বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পৌছানোর বদলে সেই পানি বাংলাদেশে ঢুকবার আগেই তা কেটে গতিপথ বদলে আলাদা খাল খুড়ে টেনে ভাগীরথী-হুগলী নদীতে ফেলা হয়েছে। এভাবে হুগলী নদী ধরে শেষে ঐ বাড়তি পানি কলকাতা বন্দরে নিয়ে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে ফেলা হয়েছে। মমতার মুল উদ্বেগ হুগলী নদীতে পড়া পলিমাটির চরের কারণে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার বন্দরের নাব্যতা সঙ্কটে পড়েছে, এথেকে বন্দরকে রক্ষা করা, বন্দরকে সচল রাখা। ফারাক্কা বাঁধ তৈরির আগে মনে করা হয়েছিল যে খাল কেটে আনা অতিরিক্ত বা বাড়তি পানির চাপের তোড়ে হুগলী নদীতে পড়া পলিমাটি অপসারণ হয়ে যাবে যাতে এভাবে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার বন্দরের নাব্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। কিন্তু এখন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে পানি টেনে আনার পরও তা দিয়ে পলিমাটি পর্যাপ্ত বা কাম্য মাফিক কিছুই সরানো যায় নাই। ফলে  বন্দরের এই নাব্যতা সংকট খুব মিটে নাই তো বটেই উলটা নাব্যতা রক্ষা যতটুকু হচ্ছে তা বজায় রাখতে গিয়ে প্রত্যেক বর্ষা মৌসুমে ঐ সংযোগ খাল (৪০ কিমি লম্বা) ও নদীর দুই পাড় উপচে পড়া পানিতে এলাকায় বন্যা হচ্ছে। ফলে বিহার ছাড়াও নাব্যতা রক্ষার কাফফারা হিসাবে পশ্চিমবঙ্গেও প্রতিবছর বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ব্যাপক।

    কিন্তু এসব সত্ত্বেও নীতিশের বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবির কয়েক ঘন্টা পরে ঐদিনই ভারতের এনডিটিভি মমতাকে প্রতিক্রিয়া জিজ্ঞাসা করেছিল। জানতে চাওয়া হয়েছিল যে নীতিশের ঐ দাবীর পর মমতার প্রতিক্রিয়া কী? ক্লিপে দেখা যাচ্ছে, মমতা এর কোন জবাব না দিয়ে এড়িয়ে চলে যান।   এতে এনডিটিভির রিপোর্টার মন্তব্য করে এটা মমতার কৌশলগত নিশ্চুপ থাকা। পরে কলকাতার নদী ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ কল্যাণ রুদ্র ক্যামেরার সামনে (ঐ একই ক্লিপে দেখুন শেষ ভাগে) দাবি করেন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দিলে নাকি এখন ২০০ কিমি নদী শুকিয়ে যাবে। তাই তাঁর মতে নীতিশের দাবী আজিব রিডিকুলাস, তিনি বলেন। পরে ঐ রিপোর্টের অন্য অংশ থেকে জানা যায় মমতা বলছেন, বিহারে বন্যার কারণ মনুষ্য-সৃষ্ট। কারণ সঠিক সময়ে বাঁধের পানি ছাড়া হয় নাই। ফলে পুরা ব্যাপারটায় কেন্দ্রের দায়।

    মমতার এই বক্তব্যের পরে ঐদিনই (২৩ আগষ্ট পরের দ্বিতীয়ার্ধে) বিজেপি শিবিরে টনক নড়ে। তারা আবার ভেবে মুল্যায়ন করে দেখে যে ভোটের রাজনীতির দিকে লক্ষ্য রেখে রাজনীতিকদের কথা সাজানো ও পরস্পরের বিরুদ্ধে দোষারোপের লড়াইয়ে তারা পিছিয়ে পড়ে গেছে। কারণ নীতিশ আর মমতার ভাষ্যে ভিন্নতা আছে। অথচ এর সুবিধা বিজেপির পক্ষে কাজে লাগানো হয় নাই। তাই আবার নতুন করে দোষারোপ সাজানোর উদ্যোগ নেয় তারা। বিহারের রাজনীতিতে নীতিশ কুমারের প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিত্ব হলেন বিজেপি নেতা হলেন সুশীল কমার মোদী। তিনি একদিন পরে অর্থাৎ ২৫ আগষ্ট মিডিয়ায় এক বিবৃতি পাঠিয়ে তাই এবার তিনি দাবি করলেন, নীতিশের ফারাক্কা বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবীর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই। তিনি আরও ব্যাখ্যা দিতে থাকলেন, “বরং যেহেতু নীতিশের বিহার সরকার বন্যা মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি নেয় নাই, ত্রাণ ঠিক মত বিতরণ করতে পারে নাই – সেই খামতি আড়াল করতে সে এখন বাঁধ ভেঙ্গে দিবার দাবী তুলেছে”। অর্থাৎ  তিনি মমতার পক্ষে ছদ্মভাবে দাঁড়িয়ে মমতা-নীতিশের বক্তব্য বা অবস্থানের বিরোধ বড় করে দিতে চাইলেন। এছাড়াও বন্যার কারণ ফারাক্কা বাঁধ নয় – বলে বাঁধকে দায়ী হওয়ার হাত থেকে বাচিয়ে দিতে চাইলেন তিনি। আর এর চেয়েও বড় কথা তিনি ইচ্ছা করে এক বিভ্রান্ত তৈরি করলেন। বন্যা হওয়া না হওয়ার জন্য বাঁধ দায়ী কীনা এটা এক জিনিষ। কিন্তু তিনি দাবী করলেন ফারাক্কা বাঁধ নয়, রাজ্য সরকারের ত্রাণ ঠিকমত বিতরণ ব্যবস্থাপনা না করতে পারাটাই যেন বন্যার কারণ। যেন ত্রাণ পরিমানে প্রচুর আর  ঠিকমত বিতরণ করতে পারলে তাহলে আর বিহারে বন্যা হত না।  এই হল ভারতের আগামি কেন্দ্র-রাজ্য লড়াই প্রকট হয়ে উঠার আগেই পরস্পরের দোষারোপ করে দায় ঠেলাঠেলির – ভোটের রাজনীতি।

    ঘটনার এখানেই শেষ না। কারণ গঙ্গা ও ফারাক্কা বাঁধ দেয়ার সাথে যুক্ত পক্ষ শুধু ভারতে না, ভারতের বাইরেও বাংলাদেশ আছে। তাই এবার বাংলাদেশ অংশ। এখানে দুই মন্ত্রীর পরস্পর বিরোধী দুই বক্তব্য নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে সরকার ঘনিষ্ট বিডিনিউজ২৪ গত ২৮ আগষ্ট।  তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর নির্বাচনী এলাকা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা, যেটা এবারের ফারাক্কা বাধের গেট খুলে দিবার কারণে বন্যায় অন্যতম ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা। রোববার ভেড়ামারা উপজেলার চর গোলাপনগরে পদ্মা নদীর পাড়ে বন্যাদুর্গতদের মধ্যে  ত্রাণ বিতরণের সময় ফারাক্কা ব্যারেজের প্রভাব নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানাচ্ছেন। তিনি লিখছেন তথ্যমন্ত্রী ইনু বলেন, “অভিন্ন নদীর উপর একতরফা গেইট খুলে দেওয়াটা সঠিক কাজ নয়। এ বিষয়ে আমাদের যে ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে, তার হিসাব করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আর্কষণ করব।” একই সময়ে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যববস্থাপনামন্ত্রী মায়া চাঁদপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক মতবিনিময় সভায় ফারাক্কা ব্যারেজ নিয়ে কথা বলেন। আওয়ামী লীগ নেতা মায়াকে উদ্ধৃত করে বিডিনিউজ২৪ লিখেছে,“এক সময় আমরা বলেছি ফারাক্কার বাঁধ আমাদের জন্য মরণ ফাঁদ। কিন্তু এখন তা ভারতের জন্য মরণ ফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা ফারাক্কার পুরো বাঁধ ছেড়ে দিলে কিংবা ভেঙে দিলে আমাদের দেশে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। পদ্মার পানি এখনও বিপদসীমার নিচে আছে। ফারাক্কার পানি আমাদের কোনো ধরনের সমস্যা হবে না বলে আমরা মনে করি”। অর্থাৎ সংকীর্ণ চোখে যার যার নির্বাচনী এলাকার মানুষকে বুঝ দিবার বক্তৃতা এগুলো। ঠিক সামগ্রিক দেশ ও জনগণের স্বার্থের দিক থেকে দেয়া অবস্থান নয়।

    নিতীশ-মমতার অবস্থানের বিরোধকে বড় করে দেখানোর সুযো নিবার জন্য এবার এগিয়ে আসেন ভারতের রঞ্জন বসু। তার সে তৎপরতা আমরা পাই গত ০২ সেপ্টেম্বর কলকাতার সাংবাদিক রঞ্জন বসুর লেখা বাংলা ট্রিবিউনে “ফারাক্কার গেট খোলা নিয়ে অপপ্রচারে ‘বিরক্ত’ বাংলাদেশ” শিরোনামে। ঐ লেখায় দাবী করা হয়েছে, নতুন করে ফারাক্কা বাধের গেট খোলার কোন ঘটনাই আসলে ঘটে নাই। কারণ বর্যার সময় সবগেট খোলাই থাকে। ফলে নতুন করে গেট না খুললেও মিডিয়ার তা প্রচার হয়েছে। হয়ত রঞ্জন বসুর এই দাবী সত্য। কিন্তু ঐ লেখায় দাবী করা হয়েছে আমাদের দিল্লী দুতাবাস নাকি দাবি করেছে রাজশাহী বা অন্য কোথায় কোন বন্যা হয় নাই। রঞ্জন বসু লিখেছেন, “……পদ্মায় বাড়তি পানির স্রোতে রাজশাহী বা অন্য কোথাও কি বন্যা হয়েছে বলে খবর এসেছে?” পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। অর্থাৎ দেখা যাছে, রঞ্জন বসুর লেখার এই অংশ আবার আর এক চরমপ্রান্ত বা সবকিছু অস্বীকারের চেষ্টা। উপরের দুই মন্ত্রীর বক্তব্যসহ বিডিনিউজের রিপোর্ট এর প্রমাণ। জানিয়ে রাখা ভাল গত ২৮ আগষ্ট খোদ ঐ  বিডিনিউজ২৪ এর ১.৪৬ মিনিটের এক ভিডিও ক্লিপ রিপোর্টের শিরোনাম হল “রাজশাহীর শহর রক্ষা বাঁধে ফাটল”। ফলে রঞ্জন বসু এবং দিল্লীর বাংলাদেশ দুতাবাসের নামে তার দাবি একশ ভাগ মিথ্যা। এটা বড় জোড় মমতা-নীতিশের বিরুদ্ধে মোদীর পক্ষে রঞ্জন বসুর এক মিথ্যা প্রচারণা মাত্র।

    সারকথায় বললে,এই লেখায় ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশ নিয়ে প্রকাশিত সব পক্ষের বক্তব্যগুলোকে একসাথে পাখির একটা চোখ দিয়ে দেখলে যেমন হয় তেমনই এক সঙ্কলন। এককথায় বললে, বাংলাদেশের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে এসব কথোপকথন গুলো একটাও নয়। ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াইয়ে ফারাক্কা ইস্যু হয়েছিল মাত্র।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [লেখাটা এর আগে  মাসিক অন্যদিগন্তের চলতি প্রিন্ট সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তা আবার সংযোজন ও এডিট করে ফাইলান ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

     

  • জয়শঙ্করের স্ববিরোধিতা

    জয়শঙ্করের স্ববিরোধিতা

    গৌতম দাস

    ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬, শুক্রবার

    জয়শঙ্করের স্ববিরোধিতা

    বাংলাদেশের দু-একটি দৈনিকে খবরটা আসে গত ৯ সেপ্টেম্বর যে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর  নয়াদিল্লীর এক সেমিনারে “ঢাকাকে সমর্থন দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান” জানিয়ে বক্তব্য রেখেছেন।  দক্ষিণ ভারত ভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য হিন্দুর’ বরাত দিয়ে ঢাকার মিডিয়া খবরটি প্রকাশ করে। এর এক দিন পর অর্থাৎ  ১০ সেপ্টেম্বর কলকাতার আনন্দবাজার জয়শঙ্করের ঐ বক্তব্য নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে। তবে ঢাকার মিডিয়াসহ সব জায়গায় পাঠকের মনে একটা কমন বিভ্রান্তি ছিল যে, জয়শঙ্কর কোথায় এবং কেন এই বক্তব্য রেখেছেন। কারণ গত ২৯ আগস্ট আমেরিকার প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (আমাদের ভাষায় মন্ত্রী) জন কেরির বাংলাদেশ সফরের পর থেকে এ পর্যন্ত কোনো বিদেশী প্রভাবশালী ব্যক্তি বাংলাদেশ সফর করেনি। আবার বাংলাদেশের কোনো সরকারি নেতা বা মন্ত্রীও ভারত অথবা কোনো প্রভাবশালী দেশ সফরে নেই। ফলে কোন পটভূমিতে জয়শঙ্করের বক্তব্যের অর্থ বুঝব, সেই পটভূমি সবাই জানতে চাইছিল। যেমন- মানবজমিন লিখেছিল, ‘জয়শঙ্কর দিল্লিতে ২০১৬ ইস্ট-ওয়েস্ট মিডিয়া কনফারেন্সে’ বক্তব্য রাখেন। এখন ‘ইস্ট-ওয়েস্ট মিডিয়া কনফারেন্সটা কী জিনিস এটা ওই রিপোর্ট থেকে কিছুই জানা যাচ্ছে না। অর্থাৎ জয়শঙ্করের বক্তব্যের একটা কনটেক্সচ্যুয়াল বা পটভুমিগত দিক আছে। তাই সংক্ষেপে সেই পটভূমি বা ইস্ট-ওয়েস্ট মিডিয়া কনফারেন্সটি কী তা খুঁজে দেখা দরকার হয়ে পড়ে। এরপ্র তা খুঁজে দেখে জানা যাচ্ছে যে আমেরিকার হাওয়াই দ্বীপরাজ্যের এক একাডেমিক ইন্সটিটিউট হল ঐ “ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার”। আর প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত ছিল বা আছে, এমন ভারতীয় প্রফেশনালদের একটি সংগঠন আছে দিল্লিতে, যার নাম ‘ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার অ্যাসোসিয়েশন’ (বাংলাদেশসহ এশিয়ার অনেক দেশে এমন শাখা আছে)। এই অ্যাসোসিয়েশন তিন দিনব্যাপী এক কনফারেন্স (ইস্ট-ওয়েস্ট ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া কনফারেন্স নামে) ডেকেছিল দিল্লিতে ৮-১১ সেপ্টেম্বর, যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন জয়শঙ্কর ও অন্য আরেক নোবেল সেলিব্রিটি। জয়শঙ্কর সেখানে যে লিখিত বক্তৃতা দিয়েছিলেন, সেটারই সারাংশ ঐ খবরের উৎস, যা মিডিয়া রিপোর্টে এসেছে। এখন এরপরেও আরো প্রশ্ন থেকে যায় যে ‘ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার’ এটা আবার কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান?

    ‘ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার’ আমেরিকার ৫০তম রাজ্য হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে একটি থিঙ্কট্যাঙ্ক জাতীয় নন-প্রফিট একাডেমিক প্রতিষ্ঠান। হাওয়াই আমেরিকান মূল ভূখণ্ডের বাইরে প্রশান্ত মহাসাগরে এক দ্বীপপুঞ্জ রাজ্য। আমেরিকার সাথে এশিয়ার ভূখণ্ডগত দূরত্বের দিক থেকে এ দ্বীপ মাঝে অবস্থিত।  হাওয়াইয়ে ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠানের বিরাট ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হয়। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠানটি জন্ম বা উদ্বোধনের সময় সাবেক সিনেটর  ও সেকালের আমেরিকান ভাইস প্রেসিডেন্ট লিন্ডসে জনসন বলেছিলেন, এটা “পশ্চিম (আমেরিকার) আর পুবের (এশিয়ার) ইন্টেলেকচ্যুয়ালদের মিলনস্থল হবে”।
    আরো প্রশ্ন, আমেরিকা এ ধরনের প্রতিষ্ঠান খুলে কেন? এর জবাবে প্রেক্ষিতের দিকটি হল বিশাল পরিসরে দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। এই বৃহত্তর প্রেক্ষিত থেকে দেখে বললে, গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের মধ্যে বসবাস ও অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো অসমভাবে বিকশিত হয় বা হচ্ছে, ফলে পরস্পরবিরোধী নানা স্বার্থবিরোধ এর ভিতর সবসময় তৈরি হতে থাকে। এই দ্বন্দ্ব-বিরোধগুলোকে নিয়ে বসে কথা বলে সমন্বয়ের মাধ্যমে তা যতটা কমানো বা লঘু করে দেয়া যায়, আমেরিকার দিক থেকে বুঝ তৈরি করা যায়, কাউকে কাউকে কিনে ফেলা বা প্রভাবিত করে রাখা যায় – এসব প্রয়োজনে আমেরিকা ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টারের মত একাডেমিক থিঙ্কট্যাংক অথবা নীতি গবেষণা ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ার তাগিদ আমেরিকা বোধ করে থাকে। তবে থিঙ্কট্যাঙ্ক-জাতীয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ে এই ‘ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টার’ কিছুটা ভিন্ন এক অর্থে যে, এ সেন্টার নিজ খরচ চালানোর একটা বড় ফান্ড আমেরিকান সরকার থেকে আসে, আর বাকিটা অন্যান্য আমেরিকান দাতব্য প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা তুলে চলে। যেখানে থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোর বেলায় তারা প্রায় সবাই প্রাইভেট দাতব্য প্রতিষ্ঠানের (সরকারি ফান্ড নয়) অর্থে চলে।
    জয়শঙ্করের বক্তৃতা লিখিত ও তাতে ১৭টা পয়েন্ট ছিল। যার মূলকথাগুলো সার করেই ‘দ্য হিন্দু’ নিয়ে এসেছিল তিনটা শিরোনামে : চীন প্রসঙ্গ, টেররিজম ও পাকিস্তান এবং শেষে বাংলাদেশ। সেখান থেকে বাংলাদেশের মিডিয়া কেবল বাংলাদেশ অংশটিই তুলে রিপোর্ট করেছে।
    এ সম্মেলনে জয়শঙ্করের টার্গেট শ্রোতা পশ্চিম, বিশেষত আমেরিকা। অর্থাৎ ঠিক বাংলাদেশ বা এ দেশের জনগণ নয়। কারণ আমেরিকা যেন এশিয়া নিয়ে ভারতের কথা শুনতে এসেছে। ফলে ভারতের চোখে এশিয়ায় দ্বন্দ্ব বা খোঁচা-বিরোধ তৈরি হয়ে থাকা জায়গা হল এই তিন ইস্যু। জয়শঙ্কর আমেরিকাসহ পশ্চিমকে বলতে চাচ্ছেন, শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদের ঝামেলায় আছে। বিগত ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের ওপর ভর করে শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতা ধরে রাখার বিরুদ্ধে আমেরিকার অবস্থান আছে কথা সত্য। এবং তা প্রকাশ্যই ফলে সবাই জানে। তাই জয়শঙ্কর বলছেন, “এটা সমালোচনার সময় নয়। সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আমাদেরও উদ্বেগ রয়েছে। আর এ জন্যই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সরকারকে সমর্থন দেয়া উচিত”। শেষ বাক্যটা ‘দ্য হিন্দু’ থেকে নিয়ে অনুবাদ করে লেখা হল। ওদিকে আনন্দবাজার কথাটা লিখেছে এভাবে, “বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদকে রক্ষা করা না গেলে সেখানে জঙ্গিপনা আরো বাড়বে”। তবে জয়শঙ্করের ১৭ পয়েন্টের বক্তব্য যেটা সরাসরি ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের সাইটে পাওয়া যায়, তার ১৪ নম্বর পয়েন্ট হল, ‘বাংলাদেশ সেকুলারিজম ও বহুত্ববাদ চাপের মুখে আছে, এই অবস্থায়  আমাদের দ্বিধা ঝেড়ে সমর্থন করা উচিত। ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা করে প্রত্যেক দিকে অতিরিক্ত গুরুত্বের সাথে না তাকিয়ে আমাদের বরং সামগ্রিক উন্নয়নের অভিমুখের দিকে তাকানো উচিত, সুনির্দিষ্ট করে এটা গুরুত্বপূর্ণ”। এ অনুবাদ আমার করা এবং এখানে লেখা।
    জয়শঙ্কর বলতে চাইছেন, সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন হয়েছে কি না, অভিমুখ ঠিক আছে কি না সেটা আগে চেক করলেই তো হয়। তা হয়ে থাকলে সেটা অর্জনে গুম-খুন-নিপীড়ন-দলন ধরনের কিছু হয়ে থাকলে সেগুলো আর আলাদা আলাদা করে বিশেষ দৃষ্টি দিয়ে বিচার করে গুরুত্ব দেয়ার কিছু নেই। কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয় এখানে, আমাদের এই বাক্য দুটো পড়ার সময় প্রথম বাক্যটির আগে দ্বিতীয় বাক্যটি পড়তে হবে। কারণ দ্বিতীয় বাক্যটি নিজেই জয়শঙ্করের প্রথম বাক্যটির বিরোধী।
    জয়শঙ্করের দ্বিতীয় বাক্যের সারকথা হল – সামগ্রিক বিচারে উন্নয়নের অভিমুখ ঠিক আছে তো, সব ঠিক আছে। তাহলে যদি তাই হয়, তবে প্রথম বাক্য আর বলার দরকার থাকে না। কারণ “সেকুলারিজম ও বহুত্ববাদ বিপদে থাকুক আর নেই থাকুক, দুনিয়ার কোন সরকারেরই আর হাসিনা সরকারকে দ্বিধাহীন সমর্থন করার কিছু থাকে না। কারণ উন্নয়ন তো হয়েছেই। উন্নয়ন ঠিকমতো হয়ে থাকলে “সেকুলারিজম ও বহুত্ববাদ বিপদে” আছে অথবা না আছে তা আবার দেখতে যাব কেন?” সেকুলারিজম ও বহুত্ববাদকে আবার রক্ষা করা কেন? কারণ উন্নয়ন ছাড়া আর কোনো কিছু নিয়ে ফোকাস না করতেই কি জয়শঙ্কর দ্বিতীয় বাক্যে আমাদের পরামর্শ দেননি? উন্নয়ন হলেই তো সব হচ্ছে!
    তাহলে দাঁড়াল, বাংলাদেশ সম্পর্কে জয়শঙ্কর দু’টি বাক্য লিখেছেন, যার একটি অপরটিকে নাকচ করে দেয়। এ ধরনের স্ববিরোধী পরিস্থিতিতে আমরা বলতে পারি, ভারতের বিদেশ সচিব জয়শঙ্করের ‘কথা হয় না’! কারণ তা স্ববিরোধী। আচ্ছা, একটা সেকেন্ড থট দেয়া যাক।
    ‘বহুত্ববাদ’ এই শব্দটি কি ভারতের বিদেশনীতিতে আছে বা ছিল?  জবাব হল – না, তা আগে জানা যায়নি। তাহলে কী আমেরিকাকে খুশি করতে কেবল জয়শঙ্কর এখন এই শব্দ ব্যবহার করতে চাইছেন? আমাদের সন্দেহ প্রবল হচ্ছে। কেন? কারণ, বহুত্ববাদ বলতে আমেরিকা আমাদেরকে বোঝাতে চায় কেবল কোন সরকারের বক্তব্য নয়, সরকারবিরোধীদেরও সমালোচনা বক্তব্য থাকবে, থাকতে দিতে হবে। বিরোধীরাও অবাধে তাদের কথা বলতে পারবে। তাদের কোনো আপত্তি, বিরোধিতা থাকলে তা আমলে নিতে হবে। ইনক্লুসিভ অর্থে সবাইকে কথা বলতে দিতে হবে ও ক্ষমতাসীনদের তা যতই অপছন্দ লাগুক তা শুনতে হবে। আর বিনা বাধায় তা সরকারকে সহ্য করতে হবে। জয়শঙ্কর কি বহুত্ববাদ বলতে এটাই বুঝেছেন বা বুঝাচ্ছেন? তাই যদি হয়, তবে ২০১৪ নির্বাচনে ‘সবাইকে নিয়ে’ নির্বাচনের বিপক্ষে কেন ভারত অবস্থান নিয়েছিল? কেন ভারতের বিদেশ সচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসে জানালেন সবাই নয়, যারা যারা হাসিনার অধীনে আসে এই অর্থে মেজরিটি নিয়ে নির্বাচনের পক্ষে ভারতের অবস্থান? অর্থাৎ বহুত্ববাদকে ভারত নিজেই বহু আগে থেকে চাপের মুখে বিপদে ফেলে ত্যাগ করে রেখেছে। তাই নয় কী? তাহলে এখন কান্নাকাটি করে লাভ কী? বোঝা যাচ্ছে, জয়শঙ্কর খুব খারাপ ছাত্র! এসব পুরানা দিক নিয়ে  হোমওয়ার্ক করে ক্লাসে আসেননি!
    আসলে আমাদের মানতেই হয় সুজাতা জয়শঙ্করের চেয়ে অনেক বুদ্ধিমান ছিলেন। কারণ ভেবে দেখলে বোঝা যায়, এখন থেকেই বহুত্ববাদের কথা তুলে জয়শঙ্কর কি আগামিতে নিজের বিপদ ডেকে আনার রাস্তা খুলছেন! যেটা সুজাতা কখনোই করেননি। যেহেতু ২০১৪-এর নির্বাচন বলে রাখা হয়েছিল যে ২০১৯ সালে ঐ সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে, তার মানে সরকারকে ২০১৯ সালে আবার নির্বাচনের ঝামেলা পোহাতে হবে। সেই আলোকে আগে থেকেই বহুত্ববাদের কথা মাঠে এনেছেন বলে জয়শঙ্করের বেলায়  বিপদের আশঙ্কা প্রবল। সুজাতা বুদ্ধিমান ছিলেন বলে ‘বহুত্ববাদ’ বলে কোনো কথাই তোলেননি। এবার সুজাতার জায়গায় জয়শঙ্কর কী বলবেন?
    আসলে কঠিন এক বাস্তবতা হল, আমরা মানি আর না-ই মানি, ক্ষমতা বলে কিছু থাকলে ক্ষমতার বিরোধী বলেও কেউ কেউ থাকবে। এখন বিরোধী বলতে যদি কোনো বিরোধী দল না থাকতে দেই, মানে আমার দলের বাইরে বিরোধী কাউকে থাকতে না দেই – তাহলে আমার দলের ভেতরেই এক সবল বিরোধী গ্রুপ হবে। এ ছাড়া আরো এক বিপদ আছে। লিবারেল বা আইনি বিরোধী দলের সবাইকে যদি গুম-খুন করে দমিয়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেলি, তো এবার এক সশস্ত্র বিরোধী দল হাজির হবে।  এর অর্থ হল – আসলে আমিই ঠিক করি আমার বিরোধীরা কেমন হবে, কোথায় থাকবে, ভেতরে না বাইরে, সশস্ত্র না নিরস্ত্র ইত্যাদি। অর্থাৎ ক্ষমতা থাকলে ক্ষমতার বিরোধীও থাকবেই। শুধু তাই না, ঐ বিরোধী বেছে নেয়ার দায় এবং ক্ষমতা আসলে ক্ষমতাসীনের। দেখেন কোনটা নেবেন! অন্যকে দোষ দিয়ে কোন লাভ নেই।
    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় অনলাইনে ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ (প্রিন্টে ১২ সেপ্টেম্বর) ছাপা হয়েছিল। তা আরও সংযোজন ও এডিট করে এখানে আবার নতুন ভার্সান হিসাবে তা ছাপানো হল।]