Tag: রাশিয়া

  • বাইডেনের কলোনি ‘মূল্যবোধের’ বড়াই শুরু

    আটল্যান্টিক মানেই কলোনি,
    বাইডেনের কলোনি ‘মূল্যবোধের’ বড়াই শুরু

    গৌতম দাস

    ০৪ জুলাই ২০২২, ০০ঃ০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-49m

    NATO declares China a security challenge for the first time

     

    ন্যাটোঃ  এটা ইউরোপ-আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর এক বৃহৎ সামরিক জোট যার পুরো নাম- ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন’। গত সপ্তাহে ২৮-৩০ জুন ২০২২, স্পেনের মাদ্রিদ শহরে বহুদিন পরে ন্যাটো হৈচৈ ফেলে এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত করেছে, অথচ এতদিন এমন অনুষ্ঠানগুলো ন্যাটো যেন প্রায় সবার অলক্ষ্যেই কোনোমতে সেরে ফেলা হয়ে আসছিল। এখানেই শেষ না। আবার যেখানে একদিক থেকে দেখলে  ন্যাটো এখন ভেঙ্গে ফেলা উচিত; অথবা আমেরিকার ন্যাটো ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত – ধরণের কথাবার্তা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট এর মুখ দিয়ে উঠে আসা শুরু হয়েছিল সেখানে এখন উলটা হাওয়া। রাখঢাক ফর্মালিটি না করে সরাসরি বললে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন হঠাত ন্যাটো, জি-৭ ইত্যাদি পশ্চিমা রাষ্ট্রজোট খাড়া করে শেষ চেষ্টা হিসাবে উঠে দাড়াতে চাচ্ছেন। গ্লোবাল ইকোনমিক ও ততসহ এককথায় সংশ্লিষ্ট “প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্ব” কোন চিরস্থায়ী জিনিষ না। একটা সময়ের পরে এগুলোর আয়ু আপনাতেই শেষ হয়ে যায়। চাইলে তা বুঝাও যায়। জ্ঞানী ও বুঝমানেরা তা অনুসরণ করে সময় থাকতে উপযুক্ত জায়গা বেছে নিয়ে সরে যায়।  কারণ সামর্থ ও সক্ষমতা অনুসারে যথোপযুক্ত নেতৃত্ব-অবস্থান নিতে হয়, তার মধ্যে থাকতে হয়। নইলে শেষে অপমানিত হতে হতে পারে।  কিন্তু প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই প্রাকৃতিক দিকটা মানবেন না ঠিক করেছেন মনে হচ্ছে। যেন বলতে চাইছেন, বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা-শক্তি গ্লোবাল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নেতৃত্ব নিজের কোলেই রেখে দিবে। তারা ধরে নিতে চান আবার তাদের এনিমি (শত্রুতা বা মূলশত্রু) মূলত চীনের সাথে; ইউরোপের প্রেক্ষিতে যেটা রাশিয়ার সাথে। এই ধরে নেওয়ার ভিতরে একটু ভুল আছে। চীনের সাথে তাদের ঠিক এনিমিটি না প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। অনেকে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে জিদের চোখে দেখে একে শত্রুতা হিসাবে। এখানে তাই ঘটেছে।
    দুনিয়ার ইতিহাসের শেষ ৫-৬শ বছর ন্যায়-অন্যায় যেভাবেই হোক জনগোষ্ঠি হিসাবে পশ্চিমের সাদা ককেশীয়দের হাতে সারা দুনিয়া শাসিত হয়েছে; তারা দুনিয়ার উপর ঘুরে ফিরে রুল করে এসেছে, আধিপত্য বিস্তার করে এসেছে। ব্যাপারটাকে ঘটনাচক্র হিসাবে দেখাই সঠিক ছিল। দুনিয়াতে কোন ধর্ম-এথনিক জাতি দুনিয়া আজীবন শাসন করে যাবে এমন কোন চুক্তি বা শর্ত কোথাও লেখা নাই। অন্য এথনিক জনগোষ্ঠিও তা মেনে নিবার কোন কারণ নাই। কোন জনগোষ্ঠিরই এমন ধরে নিবার কোন ভিত্তি নাই যে যেহেতু তারা শাসক ছিল তাই তারা তা থেকেই যাবে আজীবন!   এই জবরদস্তির কর্তাগিরির চোখ সরিয়ে ব্যাপারটাকে অবজেকটিভ দিক থেকে যেমন বস্তুগত যোগ্যতা ও সামর্থ সক্ষমতার দিক থেকে দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ হত।

    কিন্তু বাইডেন বুদ্ধিমান হতে চান নাই। তিনি এবার এককালের বড় অর্থনীতির সাত দেশ যা জি-৭ বা গ্রুপ সেভেন কান্ট্রি – এই জোটকে আবার বুড়া হারে রঙ চড়িয়ে সাজাতে চেয়েছেন। তিনি এই জি-৭ আর ন্যাটো  কেগত সপ্তাহে সাজিয়ে এনেছেন, বুড়া হাড়েই জোর দেখাতে চেয়েছেন। অথচ  বাস্তবতা হল চলতি নয়া শতক থেকে জি-৭ নিজেকে বিগতযৌবনা বলে মেনে নিয়েছে। এটা আমার দাবি নয় বাস্তবতা। যেকারণে, এককালের জি-৭ গেলে তারা নিজেই এখন জি-২০ নামে নয়া গ্রুপ আকারে সাজিয়েছে। জি-২০ মানে যেখানে এই বুড়া সাত রাষ্ট্র আর সাথে নয়া রাইজিং অর্থনীতির দেশগুলোকে বেছে সাথে নিয়ে জি-২০ বানিয়ে নেয়া। মুল কারণ, বুড়া অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো স্থবির হয়ে গেছে। পুনরুতপাদন, পুন-বিনিয়োগের সক্ষমতা ও সামর্থ  অথবা কম্পিটিটিভনেস ঢলে পড়েছে। আর উলটা বসে বসে আয়েসে খাওয়া এমন ভোগের ঢিব্বা হয়েছে সেকারণে। “ওয়াল স্ট্রিট  বিনিয়োগ পাড়ার” কঠোর সমালোচনা এই বুড়ারা সহ্য করতে না পেরে অনেক আগেই তাই রাইজিং-দেরকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে জি-২০ গ্রুপ বানিয়ে নিয়্বেছিল। তাহলে  জি-২০ হিসাবে ঢেলে সাজানো ও এর উত্থানটাই কী যথেষ্ট প্রমাণ নয় যে জি-৭ গ্রুপ বা ন্যাটো এর নামে বাইডেন এর আবার আমেরিকার নেতৃত্বকে জাগানোর চেষ্টাটা একটা প্রতারণা!! অথচ বাইডেন চীন-কে বাইরে দূরে রাখতে চান। কেন? কী যুক্তি?

    আমেরিকার নেতৃত্বে ‘পশ্চিমা শক্তির’ ভ্যালুজ [Values] মানে মুল্যবোধ নাকি চীনের চেয়ে উন্নত!!! তারা উচুজাতের ও  জাত-শ্রেষ্ঠ তাই তারা চীন-রাশিয়া ইত্যাদিদের সাথে চলতে পারবে না। এককথায় বললে, অর্থনৈতিক ততপরতায় একুমুলেশন [accumulation] বা সঞ্চয় ও সম্পদ সৃষ্টির বিচারে  চীন এখন সবার উপরে – ঠিক যেমন এককালে আমেরিকা সারা ইউরোপকে ছাড়িয়ে উপর দিয়ে গেছিল। আর সেটাও ইউরোপের পছন্দ-অপছন্দ করার ব্যাপার ছিল না, থাকেও নাই। অথচ বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমাদেশ এখন অজুহাত তুলেছে তাদের খায়েশ তারা মূলত চীনকে একঘরে করবে। বাণিজ্য সম্পর্ক অর্থে কোনঠাসা বা একঘরে। যেখানে অজুহাত তাদের মুল্যবোধ নাকি নিচা!! আর এভাবেই তাদের ঢলে পড়া সামর্থ ও নেতৃত্ব তারা ছলনা করে হলেও ধরে রাখতে পারবে।

    কিন্তু নেতৃত্ব নিজের কাছে রেখে দেওয়া মানে কী? এটা কী সামরিক সক্ষমতার কথা বলছেন তারা? পশ্চিম এখানেই খোদ নিজেকেই বিভ্রান্ত করে রাখতে চায়। কোন রাষ্ট্রের মুল সক্ষমতা আসে অর্থনীতি থেকে। পরে ওর ভরসায় আরও আসে রাজনৈতিক, সামরিক, স্ট্রাটেজিক ইত্যাদি সবকিছু। যার আবার একমাত্র অর্থনৈতিকটাই অবজেকটিভ অর্থাৎ বস্তুগত সক্ষমতা। এটাকে কোন বা কর্তা ব্যক্তি-আমির ইচ্ছা মনে করাটা ভুল। অথচ বাইডেন এন্ড গং এটা জেনেও ভুল করেছে বলে দেখাচ্ছে। ওথচ সবাই জানে, কোন দেশ নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতাটা দেখাতে পারলে বা হাজির হয়ে গেলে এরপর এর ভরসায় অন্যান্য সব কর্তা বা ইচ্ছানির্ভর  যেমন  রাজনৈতিক, সামরিক, স্ট্রাটেজিক ইত্যাদি সব ইচ্ছা হাসিল করা যায়।  অথচ বাইডেন দেখাতে চাইছেন সবটাই তাদের যেন তাদের ইচ্ছা!!
    অতএব বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিম উন্নত মুল্যবোধের  – এই মিথ্যার আড়ালে,  নিজেদের হাতে দুনিয়ায় নেতৃত্ব ধরে রাখবে বলে হুঙ্কার তুলতে দেখছি আমরা!! গত ২৮-৩০ জুন ২০২২, এবারের  ন্যাটো সম্মেলনের তাতপর্য এটাই!!

    ন্যাটো উত্থানের পটভুমিঃ
    বাংলায় লেখা হয় ন্যাটো আর ইংরাজিতে NATO; অথবা খুলে ইংরাজিতে বললে তা – North Atlantic Treaty Organization।
    আর “পশ্চিমা” শব্দটা বলতে আমরা মূলত একটা জাতিগত পরিচয়কেই তুলে ধরতে চাই। যদিও সহসা সবাই তা বুঝি না, সাথে উহ্য থাকে বলে। কিন্তু কাদের? মূলত ইউরোপের যারা সবচেয়ে প্রভাবশালী এথনিক-জাতি মনে করা হয় তারা হল ককেশীয় [Caucasion]।  এসব মোটাদাগে বলা ভাষ্য; কোন গজ-ফিতা নিয়ে বসে মেপে বলা কথা নয়। কারণ ঐ একই ইউরোপে ককেশীয় ছাড়াও অসংখ্য এথনিক জনগোষ্ঠির বসবাস ছিল ও আছে। তবে যাদের প্রভাব বেশি এই অর্থে কথাটা প্রচলিত ও বলা। আসলে “আমরা সাদা চামড়ার লোক’ ফলে উন্নত – এই বলে অকথিত কিন্তু টের পাওয়া যায় যে আঁচ ও আওয়াজ এর কথা আমরা এশিয়া বা আফ্রিকার মানুষেরা জানি বা অভিজ্ঞতা রাখি, এগুলো সেসব কথা। এজন্য বলছি বাস্তবে গজ-ফিতা দিয়ে মেপে প্রমাণ পাওয়া যাবে না এসব উগ্রজাতিবাদি ভাষ্য। কিন্তু এসব ভাষ্য ও চর্চা আছে। বাইডেনের কথাগুলোর ভিতরে এর সুক্ষ ইঙ্গিত আছে!

    “…Beijing’s ambitions and its ‘coercive policies’ challenge the Western bloc’s ‘interests, security and values’ ”.  – aljazeera

    এখন এই ন্যাটো নিজেই নিজেকে চেনায় এই বলে যে তারা এক “পশ্চিমা ব্লক” রাষ্ট্র বা “পশ্চিমা শক্তি”। সর্বশেষ চলতি ন্যাটো সম্মেলনে এভাবেই তারা নিজেদেরজে পরিচিত করেছে “Western bloc’s” বলে।  আর এটা বলতে তারা আরো ভেঙ্গে বলে তারা হল সারা ‘ইউরোপ এবং আমেরিকা’ মিলে এক শক্তি। এই কথাটা ভৌগলিকভাবে ভেবে দেখলে বুঝা যাবে ইউরোপ এবং আমেরিকা বলতে এরা আসলে আটল্যান্টিক মহাসাগরের দুই তীর। একারণে লক্ষ্য করব ন্যাটো শব্দের ভিতরে ‘আটল্যান্টিক’ বলে একটা শব্দ আছে; ওর ‘এ’ -মানে আটল্যান্টিক। যদিও এর দুপাড়ের ফারাকটা হল  এক মহাসাগরের আর যার দৈর্ঘ গড়ে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার। অর্থাৎ যেকোন পুকুর বা নদীর দুপাড়ের মানুষের মধ্যে যেমন স্বভাব বা ভাষা ইত্যাদিতে মিল আমরা খুঁজে পাই তেমনই এক নিশ্বাসে – ইউরোপ এবং আমেরিকা – বলে মিল খুঁজা আমাদের করার কথা নয়।  কিন্তু আমরা খুঁজছি এমনকি কী খুঁজতে খুঁজতে আমরা ন্যাটো এসে পড়েছি! তাহলে মুখ্য প্রশ্ন দাড়াল, আমরা এক নিশ্বাসে – ইউরোপ এবং আমেরিকা  বলি কেন? মূলত কারণটা একেবারেই বাহ্যিক। অর্থাৎ আটল্যান্টিকের দু-পাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে বাইরে থেকে মিল ঘটানো হয়েছিল। কারণ তাদের মধ্যে কোন মিল থাকার কথা নয়, সুযোগও ছিল না। তাহলে সেটা কিভাবে?

    বেশিদিন আগের কথা নয়, এই তো মাত্র ১৬০৭ সাল থেকে। ইউরোপ এবং আমেরিকা, এভাবে প্রায়ই আমরা বলে ফেলি এর মুল কারণ হল – ইউরোপের প্রথম ও জবরদস্ত কলোনিই হল আমেরিকা। এমনকি ভারতবর্ষেরও আগে খোদ আমেরিকা ইউরোপের হাতে কলোনিদখল হয়েছিল। এটাই তাদের পারস্পরিক মূল সম্পর্ক।  আর এটাই ইউরোপের মূলত বৃটিশ-ফরাসিরা দখল করা শুরু করেছিল ১৬০৭ সাল থেকে শুরু করে; আজ যেটা আমেরিকার ভার্জিনিয়া রাজ্য সেটা দখল করার মাধ্যমে ১৬০৭ সালে। পরবর্তিতে আজকের আমেরিকার সব রাজ্য একইভাবে দখল হয়ে শেষে এককালে আমেরিকা (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) নামে আধুনিক রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল।  অর্থাৎ ব্যাপারটা এরকমঃ

    প্রথমে এক বৃটিশ, ধরা যাক নাম তাঁর কোন লর্ড ক্লাইভ, তিনি আজকের আমেরিকার কোন রাজ্য-ভুমি দখল করেছিলেন। যা আসলে ছিল আমেরিকার সেখানেকার স্থানীয় ট্রাইবাল বা এবরিজিন [aborigine] জনগোষ্ঠির বসবাসের ভুমি। কিন্তু পরবর্তিতে ক্লাইভ সাহেব জাহাজ ভরে গরীর বৃটিশ মানুষ নিয়ে গেছিলেন ভার্জিনিয়ায় এই বলে যে ওখানে গেলে তোমরা গরীব বৃটিশ বিনা পয়সায় বিস্তর জমি পাবে আর সাথে  উপকরণও দেয়া হবে। জমির লোভে তারা স্থানীয়দের মেরে-ভর্তা করেছে বা মাথা কেটে নিয়ে ফুটবল খেলেছে। আর নয়ত ভাল উর্বর জমিগুলো বৃটিশদের ছেড়ে দিয়ে  আরো গহীন বনে অনুর্বর জমিতে তারা নিজেদের স্থানান্তরিত করে নিতে বাধ্য হয়েছে।
    কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ে এই গরীব বৃটিশ কৃষক তারাই পালটা সমবেত প্রতিরোধ গড়ে ক্লাইভ এন্ড গং বৃটিশদেরকে আমেরিকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছিল। আর সেটাই ১৭৭৬ সালের আমেরিকান স্বাধীনতা। ঐ স্বাধীন আমেরিকানরাই আজকের আমেরিকান জনগোষ্ঠির এমনকি বাইডেন সাহেবের পুর্বসুরি। কেবল একটাই কালোদিক  থেকে গেছিল যেমন, এবরিজিন [aborigine] জনগোষ্ঠি তারা নিশ্চয় কোথাও চিপায় পড়ে থাকা মার্জিনালাইড হয়ে আছে।
    তবে এতে আরো কিছু নতুন মাত্রাও আঁকা হয়েছে বিশ্বযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশেষষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই সময়কালে আমেরিকাই উলটা এই প্রথম সারা ইউরোপের উপর প্রভাবশালী রাষ্ট্র অর্থনীতি ও জনগোষ্ঠি হিসাবে হাজির হয়েছিল। সেসময়ের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এর হাতেই সিদ্ধান্ত মেনেই সারা ইউরোপ এরপর তাদের বিশ্বযুদ্ধ কোন অভিমুখে গিয়ে শেষ হবে অথবা, পক্ষ-গুলো কেমন ও কে হবে তা নির্ধারিত হয়। কারণ যুদ্ধের খরচ যে যোগায় সেই তো এসব বিষয়গুলো নির্ধারণের কর্তা হয়ে যায়!  আর শুধু তাই না,  যুদ্ধ শেষে দুনিয়া থেকে কলোনি ব্যবস্থা ও শাসন  উচ্ছেদ এর কাজটা সারা ইউরোপ স্বেচ্ছায় প্রত্যাহার করে নেয়।  রুজভেল্টের শর্তে ইউরোপ দুনিয়াকে কলোনিমুক্ত করে দিয়েছিল।  সেই থেকে থেকে আমেরিকা গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার নেতা হিসাবে হাজির হয় যেখানে ইউরোপ আমেরিকান আধিপত্য মান্য করে নেওয়ার বিনিময়ে ছোট তরফের কর্তা হবার সুযোগ পায়। এরপরই  ইউরোপ এবং আমেরিকা শব্দদুটো পাশাপাশি লেখার রেওয়াজ শুরু হয়েছিল। কালক্রমে (১৯৪৯ সাল থেকে) সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধজোট হিসাবে ন্যাটো গড়ে তুলেছিল ছিল তেমনই একটা কাজ!

    এবার একালে আরেকটু বিস্তারে আগাই। একালে মানে পরে ১৯৯১ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবারও পরে চলতি শতকের কথা বলছি। বারাক ওবামা আমল থেকেই বলা যায় আগের মতোই একের পর এক আমেরিকান নয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন, আর আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের আয়ু আর কত দিন থাকবে এ-জাতীয় প্রশ্ন আকার-ইঙ্গিতে জবাব দেয়া শুরু হয়েছিল। এটা সেই আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পরিসমাপ্তিতে। তবে চলতি শতকের শুরুতে সেসব সময় থেকেই আমেরিকার জন্য এসব অস্বস্তিকর প্রশ্ন প্রবল হতে থাকে, বলা যায় যা প্রথম মুখোমুখি হয়েছিলেন ওবামা।

    কিন্তু তখন অথবা এখন, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট মানেই যেন তা একটা চরম অবস্থান! তখন মানে ২০১৯ সালের কথা বলছি আর এখন মানে ২০২২ সালের চলতি সময়। আর তখন ও এখন যে কমন প্রসঙ্গের কথা বলছি তা হল – এই ন্যাটো।  আগে বলেছি, ন্যাটো মানে আমেরিকা-ইউরোপ মিলে ১৯৪৯ সালে গঠিত এক যুদ্ধজোট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পরের নয়া পরিস্থিতিতে সোভিয়েত ও তার প্রভাবাধীন পূর্ব-ইউরোপ, এ অংশটা বাদ দিলে এর বাইরে আমেরিকার নেতৃত্বে বাকি ইউরোপীয় দেশের সামরিক জোট এটা। সংক্ষেপে বললে সেকালে (কোল্ডওয়ার আমলে [১৯৫০-৯১] ) যা আমেরিকা-সোভিয়েত লড়াই প্রতিযোগিতা, তাকে কেন্দ্র করে গঠিত পশ্চিমের মূল সামরিক জোট ছিল এটা। যদিও সেকালে ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তার পক্ষে সাফাই দিতে অনেকে একালে বলে থাকেন যে, সেকালের আমেরিকা-সোভিয়েত এ দুই জোটকে একটা “কোল্ডওয়ারের মধ্যে” আটকে রাখা সম্ভব হয়েছিল  নাকি এই ন্যাটো জোটের উপস্থিতির কারণে। মানে দুই পক্ষেই গোছানো সামরিক জোট-প্রস্তুতিতে ছিল বলেই নাকি ওই আমলে তারা মুখোমুখি কখনোই যুদ্ধে নামেনি বা করে নাই।

    যা হোক, ১৯৯১ ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ায়, এর পর থেকে ন্যাটো নিজেই কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ওবামার দ্বিতীয়বারের প্রেসিডেন্সির আমল (২০১৩-১৬) থেকে ন্যাটো মোচড় দিয়ে উঠেছিল – যেখানে মূল ইস্যুটা হয়ে উঠেছিল ন্যাটোর খরচ কে বইবে? যার মূল কারণ আসলে, আমেরিকার জন্য ন্যাটো-কে পরিচালনের ব্যয় তখন থেকে আমেরিকান অর্থনৈতিক  সামর্থ ও বা ইকনমির সক্ষমতার তুলনায় বিরাট বোঝা হয়ে গেছিল। কারণ ন্যাটো জন্ম থেকেই এর খরচের প্রধান দায়ভার আমেরিকা একাই ব্যয় করে আসছে; যেন অনেকটা আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা হিসেবে উত্থিত হওয়ায় ইউরোপের সবাই ধরে নিয়েছিল যে, ন্যাটো গঠনের সব উদ্যোগ ও খরচের ভার তো ‘ওস্তাদ’ আমেরিকাই নেবে। স্বাভাবিক। কিন্তু ওস্তাদ এখন বয়বৃদ্ধ, রমরমা অর্থনীতির সেই দিন আর নাই!

    ফলে  ন্যাটোর জন্মের সময় আমেরিকা যা হাসতে হাসতে নিয়েছিল তা ২০১৫ সালের আশাপাশের সময় থেকে আর একই না। আর সেই থেকে শুরু করে একেবারে ২০১৫ সালে ওবামার প্রথম প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল ন্যাটোর এক মিটিংয়ে ইউরোপকে খরচের দায় শেয়ার নেয়ার প্রসঙ্গ তুলে কড়া ভাষা ব্যবহার করেছেন, আর এতে পারস্পরিক খুবই মুখ কালো করা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল।

    কিন্তু অতটুকুই নয়, আমেরিকার জন্য আসলে খারাপ দিন ও যুগ এসেই পড়ছিল সেই থেকে। আর সেটা ওবামার পরে ট্রাম্পের আমলে এসে। ডোনাল্ড ট্রাম্প, তিনি সরাসরি ন্যাটো আর টিকিয়ে রাখার দরকার কী, এপ্রশ্নই তুলে বসেন; অন্য আরো অস্বস্তিকর বিভিন্ন আরো প্রশ্নের মত। এমনকি আফগানিস্তানের জন্যও আর ন্যাটো দরকার  নয় অথবা ‘ওয়ার অন টেররের’ জন্যও আর ন্যাটোর মতো প্রতিষ্ঠান রাখা ও এর খরচ বহনের প্রয়োজন তিনি দেখেন না বলে সরাসরি মন্তব্য করেছিলেন। পরে ২০১৯ সালে শুরু হয়েছিল লন্ডনে আরো মনকষাকষি তো বটেই।

    ট্রাম্প পার্সোনাল এক আলোচনায় বলেছিলেন, তিনি ন্যাটো থেকে আমেরিকার সদস্যপদ প্রত্যাহার করতে চান। নিউ ইয়র্ক টাইমসে তার এক সহকারীর বরাতে খবর ছাপা হয়েছিল, সেখানে তিনি ন্যাটো সম্পর্কে বলেছিলেন, এটি অবসলিট বা ‘পরিত্যক্ত বোঝা’। লাগাতার পঁচাত্তর বছরের গ্লোবাল নেতা আমেরিকা-এরই এক প্রতিনিধি ট্রাম্পের কথা ভেবে এসব শব্দ হজম করতে অনেকেরই এ কথা মানতে কষ্ট হয়েছিল। তাই অনেকেরই মনে হয়েছিল, এটি হয়তো একটা পাগলা ট্রাম্পের ‘চরমবাদ’।

    গত সপ্তাহে জুনের শেষ তিন দিনে এবার আমরা আবার আরেক চরমবাদের মুখোমুখি। এবার নায়ক জো বাইডেন- তিনি এবারের ন্যাটোর তিন দিনের সম্মেলনে আরেক চরমপ্রান্তে। ব্যাপারটা এক কথায় বললে, তা যেন আমেরিকার নেতৃত্বে ইউরোপ মানে সারা পশ্চিমা জগৎ যা চায়, এর বিরোধী বা তাদের পছন্দ নয় এমন কোনো কিছু চীন ও রাশিয়া করতে পারবে না। তাদের ভাবখানা এমন যে, তারা চাইলে তাদের ইচ্ছার বিরোধী চীনসহ সবাইকে তারা গ্লোবাল বাণিজ্যের বাইরে রেখে দিতেই পারে। এতই ক্ষমতা তাদের! যেনবা মাথায় করে এক ঝুড়ি গোবরও চীন-রাশিয়া চাইলেও বেচতে পারবে না!

    ওই ন্যাটো সম্মেলন থেকে এই প্রথম ঘোষণা দেয়া হয়েছিল যে, ‘চীন ন্যাটোর জন্য হুমকি’! আলজাজিরা লিখেছে, ন্যাটো মনে করছে, চীন তার জন্য হুমকি তাই সে চীনকে স্ট্রাটেজিক গুরুত্ব দিয়ে বলছে ‘চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ ও ‘চাপে ফেলে বাধ্য করার নীতি’- এগুলো ‘পশ্চিমা ব্লকের রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ, নিরাপত্তা ও মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ করছে’।

    NATO has listed China as one of its strategic priorities for the first time, saying Beijing’s ambitions and its “coercive policies” challenge the Western bloc’s “interests, security and values”.

    এরই মধ্যে ইউক্রেনের যুদ্ধ প্রায় চার মাস হল। এ প্রসঙ্গে বাইডেন পুরো ইউরোপকে তাতিয়ে রাশিয়াকেই এদের সবার শত্রু বলে হাজির করছিলেন। চীন এসব ক্ষেত্রেই আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। কিন্তু চীনকে আমেরিকার শত্রু বলা  আর প্রতিযোগী বলা এক অর্থ নয়। অথচ কেন ন্যাটো সম্মেলনে কোনো এক উছিলায় চীনকে ন্যাটোর হুমকিদাতা-শত্রু বলে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে এ কথারও কোনো যথোপযুক্ত সাফাই ন্যাটো এখনো হাজির করেনি? আবার এত দিন শত্রু দেখানো হচ্ছিল রাশিয়াকে, অথচ এখন হঠাৎ করে খোদ চীনকেই হুমকিদাতা বলা শুরু হচ্ছে।

    চীন বড় রাইজিং ইকোনমির দেশ। ফলে এখনো চীনে সবার চেয়ে পুঁজি সঞ্চয় ও সম্পদ গঠনের হার অনেক বেশি হবে। এর অর্থনৈতিক প্রকাশ ও প্রভাব তো প্রকাশিত হয়ে পড়বে এবং স্বভাবতই এর অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিদের মন খারাপ-অসন্তুষ্ট হবে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও এটা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, তাই এটা ফেয়ার। এছাড়া, এটা কোন সামরিক তৎপরতা নয়। তাহলে চীন চ্যালেঞ্জটা কোথায় করল? আর চ্যালেঞ্জমাত্রই তো খারাপ নয়। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কখনোই খারাপ নয়।

    তার মানে দাঁড়াল, চীন ‘কেন ন্যাটোর হুমকিদাতা’ তা বর্ণনা বা ব্যাখ্যা দিয়ে বলার আগেই চীনকে শত্রু বানিয়ে দেয়া হয়েছে!! এ ছাড়া মতবিরোধ মানেই কি শত্রু? এমনকি কোনো কাজে গিয়ে আমেরিকা চীনের সাথে মুখোমুখি হয়েছে সেই বিরোধের কথা কেউ জানায়নি! আবার যদি তা হয়ও চাইলে তা নিরসনের আইনি উপায়ও বের করে নেয়া সম্ভব। যদি চায়।

    অথচ ন্যাটোর সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত বোলচালে মনে হচ্ছে, বাইডেনের নেতৃত্বে মানতে রাজি হওয়া ইউরোপ-আমেরিকা এসেছে যেনবা বাইডেনকে সারা দুনিয়ার পালনীয় কর্তা বলে প্রতিষ্ঠিত করতে যা আমাদের যেন মানতেই হবে!

    বাইডেনের মনে রাখা উচিত ‘অবরোধ’ (মার্কিন ডলার ব্যবস্থার ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা) ও ‘হিউম্যান রাইটের’ কথা তুলে তিনি ইচ্ছামত যেসব দেশের উপর দাবড়ে বেড়াতে চাইছেন, তা আইনগতভাবে মানতে জাতিসঙ্ঘ-সদস্যপদপ্রাপ্ত কোনো দেশ মানতে বাধ্য? আইএমএফের চোখে এই অবরোধ বৈধ নয়, বড় জোর এটা আমেরিকার পড়ে পাওয়া অবৈধ কর্তৃত্ব। এটা আমেরিকা-রাষ্ট্রের নিজস্ব সিদ্ধান্ত কেবল। তাই এই অবরোধ আরোপ করার কারণে যারাই  ক্ষতিগ্রস্ত হবে ফলে আমেরিকা যা যা আচরণ ও অপব্যবহার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনীতির বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে, এর প্রতিটি আগামীতে আমেরিকার বিরুদ্ধে আরোপিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবেই।

    আমেরিকান মূল্যবোধঃ
    সবচেয়ে বড় কথা এটা কোন, কারও একার ‘মূল্যবোধের প্রশ্ন’ একেবারেই নয়। অর্থনৈতিক অবরোধ জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত হিসেবে কখনো আরোপিত হয় বটে। কিন্তু বর্তমানে বাইডেন প্রশাসনের দেয়া অবরোধ একান্তই আমেরিকার আরোপিত। সুযোগ পেলে ও মুরোদে কুলালে তা উপড়ে অন্য দেশ ফেলে দেবেই!

    ফিরে মূল্যবোধের কথা তুলা যাক, বর্তমান জাতিসঙ্ঘের এই রাষ্ট্রের দুনিয়ার এক রাষ্ট্রের সাথে অপর রাষ্ট্রের মূল্যবোধের সঙ্ঘাত দেখা দেয় তাহলে কী হবে?
    আসলে সব মূল্যবোধের পেছনেই থাকে ভিন্ন ভিন্ন ইডিওলজি, যে কারণে মূল্যবোধের ভিন্নতা দেখা দিতেই পারে। আর মূল্যবোধে ভিন্নতা দেখা দিলেও ভিন্নদের হলেই সেই মূল্যবোধটা খাটো আর নিজ মূল্যবোধটা শ্রেষ্ঠ এই আচরণ ও বয়ান এক কথায় বললে, তা এক রেসিজম বা ঘৃণিত জাতশ্রেষ্ঠত্ববোধ হতে পারে। আসলে এসব বকোয়াজ কথাবার্তা তাই সরিয়ে রাখাই ভালো! মূল কথাটা হল, জাতিসঙ্ঘ জন্মের আগেই বা এর সদস্যপদ নেয়ার ক্ষেত্রে মৌলিক কি কোনো মূল্যবোধ আছে? থাকলে কী? বা আদৌ বাইডেনের মূল্যবোধ যা সবাইকে মানতে হবে এমন কিছু ছিল নাকি? তাহলে আসেন প্রশ্ন তুলি, যেমন ইরাকের ওপর ২০০৩ সালে বুশের হামলা ও দখল – এটা আমেরিকা কোন মূল্যবোধ মেনে করেছিল? নিশ্চয় খুবই উন্নতমানের, বাইডেন বলতে পারবেন। বলা উচিত!

    প্রথম কথা, বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো এককভাবে এমনকি একত্রে কি জাতিসঙ্ঘের মা-বাপ বা মালিক? একেবারেই নয়। তবে আমেরিকার বাইডেনের যদি মনে হয়, অমুক দেশ মূল্যবোধ মানছে না, তাহলে কী হবে? তাহলে জাতিসঙ্ঘের উপযুক্ত স্থানে গিয়ে, যদি থাকে, সেখানে গিয়ে বাইডেন নালিশ রুজু করতে পারেন। সেটিই সমীচীন হবে। তাই না কি?? এর বাইরে পশ্চিমাদের আলাদা মুল্যবোধের স্টান্ডার্ড কী? তাতে কী এসে যায়?

    সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নঃ
    সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৫ সালের আগে, মানে সেই ১৯১৭ সাল থেকেই বিপ্লব করে ক্ষমতায় আসা কমিউনিস্ট দেশ ছিল। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এসব জানা সত্বেও তিনি সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্তালিনকে সম্মানের সাথে যুদ্ধে নিজপক্ষের পার্টনার হিসাবেই গ্রহণ করেছেন। কোন মুল্যবোধের সমস্যা দেখেন নাই। সোভিয়েত নেতা স্তালিন আপাদ্মস্তক এক কমিউনিস্ট এবং কমিউনিস্ট স্যহিরোমনি তি৯নি তাতে দুনিয়ার কারও কোন সন্দেহ নাই। তাহলে যুদ্ধে নিজপক্ষের এক পার্টনার গণ্য করতে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট তো কখনও কোন মুল্যবোধের অমিল বা অসুবিধার কথা কেউ শুনে নাই।স্তালিনের সাথে মিলেই হিটলারের বিরুদ্ধে রুজভেল্ট বিশ্বযুদ্ধ করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। এখন কি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেন আমাদের বলবেন, মূল্যবোধের সঙ্ঘাত তখন কোথায় ছিল? তাহলে এখন এসব নখড়া করছেন কেন?

    যুদ্ধ শেষে স্তালিনকে সাথে নিয়েই রুজভেল্ট ভেটো-সিস্টেম ওয়ালা এক জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং আলোচনায় স্তালিনকে রাজি করিয়ে জাতিসঙ্ঘ গড়ে নিয়েছিলেন। আর এতে জাতিসঙ্ঘ গড়ার যে ভিত্তি তখন উদ্যোক্তারা মিলে সেট করেছিলেন, সেটাই এখনো একই আছে। গ্লোবাল পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক সিস্টেমগুলোর মৌলিক কাঠামো হয়েই আছে; যদিও এতে এসব সিস্টেম ও কাঠামোগুলো সবই আমাদের একালের সব বিবাদ মেটাতে সক্ষম, তা নয়। খামতি আছে, ঘাটতি আছে, এসব নিয়ে আরো ও আবার কথা বলতে হবে, সামনে এগোতে হবে আর এসবই সবচেয়ে স্বাভাবিক।

    কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে আমেরিকা-ইউরোপ ভাব ধরছে, নেতা বাইডেনের সাথে তারা হলেন দুনিয়ার সবচেয়ে একচ্ছত্র মূল্যবোধ বা শ্রেষ্ঠ মূল্যবোধের কেউ একেকজন। অথচ এমন কথা ভিত্তিহীন ও গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল ধরণের। জাতিসঙ্ঘ বা কোনো গ্লোবাল সিস্টেম গড়ে তোলার পথ কখনো এটা ছিল না, নয়ও। তাহলে তো কমিউনিস্ট হওয়া সত্বেও স্তালিনের সাথে মিলে রুজভেল্ট জাতিসংঘ গড়তে পারতেনই না!!! তাহলে একালে বাইডেন এন্ড গং কোথা থেকে উদয় হলেন??  এরা আগেভাগে নিজের মূল্যবোধকে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করে একলাই রাজা হতে চান। তাতে অন্য কেউ তাদের মানুক আর নাই মানুক!! এরপর অন্যের ুপর নিজআধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করা- এটা একালের বাইডেনের ভুয়া পথ। অন্তত আমেরিকার অন্যতম ফোরফাদার রুজভেল্ট এমন নিকৃষ্ট কাজ বা পথে এগোননি – এসব নিয়ে তাদের পরামর্শকদের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

    সেকালের মাওয়ের চীনঃ
    আবার চীনের প্রসঙ্গটাই দেখেন। আজকের যা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চীন। এতে একালে অর্থনীতিতে গ্লোবাল নেতার হকদার বা দাবিদার তিনি। কিন্তু এর উত্থান এটা তো মাত্র ১৯৭৮ সাল থেকে উত্থিত।  আমেরিকার সাথে এই চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের যাত্রা শুরু ১৯৭৮ এর ১ জানুয়ারি থেকে। মাওয়ের চীন ১৯৪৯ সাল থেকেই চীনে (নয়াচীন) ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু তবু ১৯৭১ সালের অক্টোবরের আগে পর্যন্ত এই নয়াচীন জাতিসঙ্ঘের কেউ ছিল না। কারণ ১৯৪৯-৭১ এ বছরগুলোতে নয়াচীনের জাতিসঙ্ঘে সদস্যপদ ছিল না, স্বীকৃতি ছিল না। শুধু তা-ই নয়, চীনের নামে দেয়া জাতিসঙ্ঘের জন্ম থেকে বরাদ্দ ভেটোওয়ালা সদস্যপদটা ছিল তাইওয়ানের হাতে।

    আসলে মাওয়ের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই বিতর্ক ছিল জাতিসঙ্ঘে চীনের নামে দেয়া (ভেটোসহ) সদস্যপদের হকদার কে? তাইওয়ান না মাওয়ের বিপ্লবী নয়াচীন? নয়াচীন – মানে এটাকে এখনো অনেকে ‘মেনল্যান্ড চীন’ বলে থাকে। আর বস্তুত জাতিসংঘ সদস্যপদের হকদার কে এই প্রশ্নে আমেরিকা তাইওয়ানকেই হকদার মনে করত তখন। তাই আমেরিকার সেই অবস্থানের বিরুদ্ধে সবাই মিলে ভোট দিলেও আমেরিকার অবস্থানকে নাকচ করার সুযোগ ছিল না কারণ আমেরিকার হাতে ভেটো ক্ষমতা ছিল।  বলে যেকোন ভোটাভুটিতে আমেরিকার হকদার তাইওয়ানের পক্ষে; নয়া চীনের পক্ষে নয়।

    ২৫ অক্টোবর ১৯৭১, জাতিসঙ্ঘের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবঃ
    ১৯৭১ সালের অক্টোবরের জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ‘চীনা সদস্যপদটা কে পাবে’- এই প্রশ্নটা আবার এক ভোটাভুটিতে তোলা হয়েছিল।  সেবার কিন্তু হঠাৎ  ইস্কযুটা তোলা হয় নাই। তবে ততপরতা বা অগ্রগতিগুলো বেশির ভাগ ছিল আন্ডারগ্রাউন্ডে সঙ্গোপনে।

    ঘটনা সংক্ষেপে বললেঃ
    ১. মাওয়ের চীন, ১৯৫৮ সাল থেকে “কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব  এক ক্যাপিটালিজমের পথে”  –  যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আর এরই বাইরের ডাকনাম ছিল “১৯৫৮ সালের চীনা সাংস্কৃতিক বিপ্লব’। আমাদের এখনকার জন্য মূল প্রসঙ্গ – এসিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে চীনে ব্যাপক বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যা বলাইবাহুল্য। পশ্চিমা দেশের বা এক কথায় প্রতীকীভাবে আমেরিকার বিনিয়োগ পুঁজিবাজার ওয়ালস্ট্রিটের জন্য এটা ছিল এক বিরাট সুযোগ। আর এ সুযোগ দেয়ার আগে মাও এটা নিয়েই নিক্সন-কিসিঞ্জারদের সাথে দরকষাকষি করেন ও তাদের রাজি করান। মাও কী চেয়েছিলেন বিনিময়ে?

    জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ নয়া চীনের পক্ষে দিতে হবে, আমেরিকা ভেটোপ্রদান করতে পারবে না – এই দেয়ার মাধ্যমে তবেই মাওয়ের চীন আমেরিকার জন্য তিনি চীনে বিনিয়োগের দুয়ার খুলে দিতে রাজি হয়েছিলেন। এই ছিল ডিল!

    জাতিসঙ্ঘের ঐ ’৭১ সালের অক্টোবরে যে ভোটাভুটি হয়েছিল তাতে চীনে বাজার-বিনিয়োগে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ার লোভে আমেরিকা ভোটাভুটিতে ভোটদানেই বিরত ছিল; অর্থাৎ কোনদিকেই ভোট দেয় নাই। আর এতটুকু হলেই নয়া চীনের চলে। কারণ, এর আগে সবসময় সব ক্ষেত্রে আমেরিকা ভেটো দিয়ে তাইওয়ানকে ভোটাভোটিতে জিতিয়ে টিকিয়ে দিত। আর নয়া চীনের পক্ষে প্রস্তাব উঠলে আমেরিকার এক ভেটোতেই সব শেষ হয়ে যেত। এছাড়া আমেরিকা তার প্রভাবাধীন জাতিসঙ্ঘের সাধারণ সদস্যদের সেবার ১৯৭১ সালে আর বিরত থেকে নয়, বরং নয়া চীনের পক্ষে ভোট দিতে লবী অনুরোধ রেখেছিল।

    আর তাতেই মাও সেতুংয়ের চীনই আসল চীনের জাতিসঙ্ঘের (ভেটো ক্ষমতাসহ) সদস্যপদ একমাত্র হকদার, এ সিদ্ধান্ত পাস হয়েছিল ২৫ অক্টোবর ১৯৭১, ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবে। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে সাত দিনের চীন সফরে গিয়ে সব আলাপ-আলোচনা শুরু করেছিলেন, যা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে চীন-আমেরিকার সম্পর্ক স্বীকৃতি যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৭৮, ১ জানুয়ারি থেকে।

    তার সোজা মানে সেই ২৫ অক্টোবর ১৯৭১, ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাব থেকে তাইওয়ান-ই হয়ে যায় নয়া চীন- এই মূল ভূখণ্ডের অংশ। তাইওয়ান আর স্বাধীন নয়, কোনো আলাদা প্রদেশ নয়। কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামে তাইওয়ান স্বাধীন কোনো দেশ আর নয়। জাতিসংঘের চোখে, তাইওয়ান আইনত পিপলস রিপাবলিক অব চায়না (PRC) এর অংশ।

    এখন তাহলে তাইওয়ানকে নিয়ে বাইডেনের দরদ- এর অর্থ কী? এটা তো শঠতা! অবশ্যই তাই!

    এমনকি ১৯৭১ সালের পর থেকে চীন যখনই কোনো দেশের সাথে স্বীকৃতি বিনিময় করে সেখানে সে শর্ত রাখে যে, তাইওয়ান যে চীনের অংশ, এটা সে আগে স্বীকার করলে তবেই তারা পারস্পরিক স্বীকৃতি বিনিময় আরো আগিয়ে নিতে পারে। এটাকেই চীন ‘একচীন নীতি’ বলে থাকে। একচীন নীতি’ মেনে চলতে তাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বলে থাকে। সেই থেকে আমেরিকা একচীন নীতিতে স্বাক্ষর করা দেশ। কিন্তু তবু বারবার এটা নিয়ে সে প্রায়ই আমেরিকা উসকানি তৈরি করে চলছে। এমনকি গত বছর ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি,  বাইডেন ক্ষমতার শপথ নেয়ার পরও একই পিছলাপিছলি শুরু করেছিলেন। শেষে চীন হুমকি ও চাপ দেয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাইডেন আবার এবার সত্তরের দশকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে পাঠিয়েছিলেন।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০২ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “বাইডেনের মূল্যবোধ“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • বাইডেন বা ইউক্রেনের হার লুকানোর প্রক্রিয়া শুরু?

    বাইডেন বা ইউক্রেনের হার লুকানোর প্রক্রিয়া শুরু?

    গৌতম দাস

    ১৪ মার্চ ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Yo

    –

    শিরোনাম দেখে এটাই মনে হবে যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কি তাহলে শেষ? না, ঠিক শেষ নয়। তবে?
    তবে প্রায় শেষ!! বাইডেন-জেলেনস্কির কাছে এই যুদ্ধে তাদের হার কিভাবে লুকানো যায় সেই প্রক্রিয়া তারা উভয়ে শুরু করে দিয়েছেন – তা বলা যায়। অর্থাৎ বাইডেন-জেলেনস্কির আগাম অনুমানটা তাহলে এমন দাড়িয়েছে যে এই যুদ্ধে তাদের হার হচ্ছে এবং সেটা তারা মেনেও নিচ্ছেন? তাই কী? হ্যা, ঠিক তাই।

    তবে তাদের কথাটা আরেকভাবে বললে, মূলত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বাইডেন আর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি [Zelenskyy] নিজেদের মধ্যে ব্যাপারটা নিশ্চিত করেছেন  ধরে নেয়া যায় যে, এই যুদ্ধ তাঁরা এখন শেষ করবেন। মানে কি তাঁরা হার স্বীকার নিবেন? এটাই সবচেয়ে মুশকিলের কাজ। তাই যদিও এ কথাটা স্পষ্ট ভাষায় তারা উভয়ে স্বীকার করবেন না;  কিন্তু তারা যুদ্ধে হেরে গেছেন এটা মুখে স্বীকার না করেও কিভাবে যুদ্ধটা বাস্তবে শেষ করা যায় এটাই এখন তাঁদের মুল লক্ষ্য। এমন  এজেন্ডা তারা ইতোমধ্যেই বাস্তবায়ন করতে কিছু তৎপরতাতেও উভয়েই শুরু করে দিয়েছেন। আর সে তৎপরতার প্রথম এবং প্রধান প্রকাশ ঘটে গেছে এক সাক্ষাৎকারে।  অতএব যুদ্ধে তাঁদের হার হচ্ছে এবং তারা যুদ্ধে হেরে গেছেন এটা দেখানো এড়িয়ে যুদ্ধ শেষ করার পথে রওনা দিয়েছেন এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল এই এবিসি নিউজের এই সাক্ষাতকার।
    আমেরিকার স্থানীয় মানে অভ্যন্তরীণ দর্শকের (গ্লোবাল দর্শক নয়) কথা মাথায় রেখে প্রচারিত হয়, এমন এক টিভি চ্যানেল হল এবিসি নিউজ। নিউ ইয়র্কের এবিসি নিউজ আমেরিকান সময় গত ৭ মার্চ রাত আটটায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির এক সাক্ষাৎকার প্রচার করেছে । এজেন্ডা-ঘটনার প্রকাশ্য পাবলিক একটিভিটি শুরু হয়েছে এখান থেকে।

    The Zelenskyy Interview: David Muir Reporting | ABC News Exclusive

     

    বাইডেন ঠিক কিসে হারলেন?
    বাইডেন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন। কিন্তু কী ছিল এই যুদ্ধ, বাইডেনের কাছে? সেটাই আগে স্পষ্ট জেনে নেয়া যাক। সংক্ষেপে শিরোনামে বললে, ডেমোক্র্যাট নেতা বাইডেন যেন বলতে চেয়েছিলেন, রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্প মাথা মোটা প্রেসিডেন্ট।  তাই তিনি সহজেই নত মস্তকে মেনে নিয়েছিলেন যে আমেরিকার নেতাগিরির দিন শেষ। অতএব আমেরিকা আর গ্লোবাল নেতা বা রাজনীতি বলে দুনিয়ার কোন কিছুতে নাই ও থাকবে না। তারা এখন জাতিবাদি, সাদা-মানুষেরাই দুনিয়ায় শ্রেষ্ঠ – এই শ্রেষ্ঠত্বের রাজনীতি করবেন।   আর এখানেই বাইডেন পালটা বলতে চাইছেন,  তুলনায় তাঁর মাথা ঠাণ্ডা এবং সূক্ষ্ম ও কূটবুদ্ধি তাঁর বেশি। তাই তিনি দেখতে পেয়েছেন, আমেরিকার নেতাগিরির দিন আসলে ফুরিয়ে যায়নি। আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব এখনো অটুট আছে ও থাকবে আর তা রাখাও যাবে; যদি বাইডেনের মত প্রেসিডেন্ট আমেরিকার সক্ষমতা হিসেবে যেসব টুলস বা হাতিয়ার এখনো অ-ব্যবহারে পড়ে আছে সেগুলো ব্যবহার করতে শুরু করেন। এমন দু্টা  আমেরিকান অস্ত্র হল এক. অবরোধ [sanction] আরোপ (মানে অপছন্দ বা শত্রু বিবেচিত দেশকে আমেরিকান ডলারে বৈদেশিক বাণিজ্য করতে না দেওয়া) আর দুই. মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা।
    তাই এই দুই হাতিয়ার ব্যবহার করেই বিনা অস্ত্রে ও কোন সামরিক তৎপরতা ছাড়াই তিনি চীন ও রাশিয়া ধরণের দেশ যারা প্রতিদ্বন্দ্বি বা সম্ভাব্য শত্রুদেশ – এদেরকে সহজেই পরাজিত ও পর্যুদস্ত করতে পারবেন আর এভাবে আমেরিকার নেতৃত্ব অটুট রাখতে পারেন।

    বাইডেন এই উদ্দেশ্যেই ইইউকে পাশে নিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনকে যুদ্ধে এনেছিলেন। কিন্তু এখন বাইডেন  রাশিয়া-ইউক্রেন এই যুদ্ধেই নিজের হার দেখতে পাচ্ছেন। অতএব তিনি এখন রাশিয়া-ইউক্রেনের আপস কিভাবে ঘটানো যায় এছাড়া, যেন এই যুদ্ধে তাদের হারের বিষয়টা কতটা আড়ালে ফেলা যায় এই লক্ষ্যে ততপরতা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন!

    মজার কথা হল, আমরা এখন অনুমান করতে পারি যে, বাইডেন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার শপথ নেয়ার পরেই যখন তিনি এ দুই (অবরোধ ও মানবাধিকার) মহা-অস্ত্রের কথা ইইউ নেতাদের জানিয়েছিলেন তারা এটাতে বিশ্বাস করেছিলেন। পেছনের গল্প-ভাবনাটা ছিল সম্ভবত এরকম যে, আমেরিকার হাবিলদার হয়ে ইউরোপ যদি আরো কিছু দিন আমেরিকার কাছ থেকে দুনিয়ায় ‘রুস্তমি’র ভাগ পাওয়া যায় তা হলে আর চীনের পিছনে পিছনে লাইন ধরে ব্যবসা বদল করে, চীনের থেকে কিছু ব্যবসা হাওলাত করে বাঁচতে চাওয়ার দরকার কী!! সম্ভবত একারণেই চীনের সাথে ইইউ-এর সামগ্রিক বিনিয়োগ চুক্তি [EU-China Comprehensive Agreement on Investment (CAI)] স্বাক্ষরিত হয়ে যাবার পরও  বাইডেনের অনুরোধে সেই চুক্তি গত ২৭ মে ২০২১ স্থগিত করে ফেলে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ইইউ নেতারা।

    অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে বিনা যুদ্ধে ও বিনা অস্ত্র ব্যবহারে প্রতিদ্বন্দ্বি চীন ও রাশিয়ার উপরে অবরোধ আর মানবাধিকার এ দুই অস্ত্র ব্যবহার করে বিজয় লাভের ভাবনায় মশগুল হয়ে তারা পশ্চিম ( মানে আমেরিকা ও ইউরোপ) তখন কাজে নেমে পড়েছিলেন।
    আর এ কাজেই বলির বখরা বানিয়েছিল পুরনো সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেতরে ১৪ রাষ্ট্রের মধ্যে যারা এখনও ন্যাটোর সদস্য হয়নি, এদেরই এক রাষ্ট্র – ইউক্রেনকে।
    গত ২০১৪ সাল থেকে ইইউ, আমেরিকাসহ ন্যাটো ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য করে নেয়া হবে বলে প্রলুব্ধ করে আসছিল  – তাই ন্যাটোর সদস্যপদ ইউক্রেনের কাছে এক সোনার হরিণ করে গড়ে তোলা হয়েছিল। যদিও এমন কথার আবার এর উল্টা দিকও আছে।
    বলা হয় ১৫৪৭ সাল ষষ্ঠ ইভান [Ivan IV, Ivan Vasilyevich] এর আমল থেকে রাশিয়ায় জার সাম্রাজ্যের শাসন শুরু হয়েছিল। আর পরে, ১৬৬৭ সাল থেকে ইউক্রেন রাশিয়ার জার সাম্রাজ্যের অধীনস্থ হয়ে যায়; অর্থাৎ ৪০০ বছরের বেশি ধরে এই অধীনস্থতা যার শেষভাগটা মানে, ১৯১৭ সাল থেকে তা সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনস্থতায় কাটিয়েছিল। আর সেটাই একালে হাজির হয়েছিল বর্তমান পুতিনের রাশিয়ান আধিপত্য থেকে বাইরে থাকার খায়েশ হিসেবে। কারও শাসন-আধিপত্য থেকে বের হবার খায়েশ করা মোটেও খারাপ বা অন্যায় কিছু নয়। কিন্তু তা বলে বাস্তবতা ফেলে হারিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়াও যাবে না এবং এর মানে হয় না। তাই এখানে প্রধান সমস্যাটা হল, এবারের চেষ্টাটা আসলেই “আগের সব অধীনতা থেকে বের হওয়াই তো হবে না উল্টা, পশ্চিমের হাতেই ব্যবহৃত হয়ে যাওয়া হবে”! বাইডেনের হাতে বলি হয়ে আরেকবার “শহিদ” হয়ে যাবার দাঁড়প্রান্তে ইউক্রেন। এদিকটাই বাস্তব সম্মতভাবে ভেবে দেখেনি তারা! কাজেই এখন অন্তত অপমান ও বিড়ম্বনা মধ্যে দিয়েও যদি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে ব্যাপারটা শেষ হয় তবে সেটাই জেলেনস্কির ইউক্রেনের জন্য মন্দের ভাল, বলে তারা ভাবা শুরু করে দিয়েছে!! যদিও আরো কিছু খারাপ কিছু তাদের জন্য অপেক্ষা না করে থাকে!

    এটা বলার এখন সম্ভবত সময় হয়েছে যে, এই চলতি যুদ্ধ প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে এক কঠিন বাস্তবতার উপলব্ধিতে পৌঁছে দিয়েছে যে তিনি বোকা হয়ে গেছেন, প্রতারিত হয়েছেন – ন্যাটোর সদস্যপদ এক সোনার হরিণ ছিল – এই লোভ দেখিয়ে তাকে প্রতারণা করে বেপথে নেয়া হয়েছে।

    কিন্তু আবারো সেই মূল কথা। বাইডেন এই যুদ্ধে হেরে গেছেন, যাচ্ছেন। তারও যুদ্ধের শখ মিটে গেছে হয়ত! তবে তিনি হেরে গেছেন এ কথা আড়ালে ফেলে যুদ্ধের কী করে সমাপ্তি টানা যায় এটা এখনও বাইডেনকে অর্জন করতে হবে – এটাই তার প্রধান লক্ষ্য এবং সবচেয়ে কঠিন কাজের অংশ!

    বাইডেন কেন এবিসি নিউজ বেছে নিলেনঃ
    এখন আমরা আসি, এবিসি নিউজে। উপরে দেয়া ব্যাখ্যাগুলোর প্রমাণ মিলিয়ে নিব।  বাইডেন এবিসি নিউজকেই বেছে নিয়েছেন কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তাঁকে এখন ফেলে পালাতে হবে। আর পরাজিত ও পালিয়ে যাওয়াটা কোনো এক ভিন্ন গল্পের আড়ালে ফেলা, এই প্রধান কাজে বাইডেনের কাছে এখন সবচেয়ে মুখ্য শ্রোতা-পাবলিক হল আমেরিকার সাধারণ মানুষ, ভোটার। যেন তিনি আমেরিকাকে ইউক্রেন যুদ্ধে নেন নাই ও  হারাননি – অন্তত এটুকু প্রতিষ্ঠিত করাই তার এখন একমাত্র লক্ষ্য। কারণ আগামী নভেম্বর ২০২২ হবে বাইডেনের ‘বিচারের দিন’ – সেটা হবে, বাইডেনের পারফরমেন্স নিয়ে বিচার – এটাই হবে আমেরিকার এবারের মিডটার্ম [mid-term] নির্বাচনের প্রধান ইস্যু। যেখানে গত বছর থেকে মূলত মুদ্রাস্ফীতির কারণে আমেরিকার বিভিন্ন সার্ভে রিপোর্টে এটা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত যে, বাইডেনের দল এখানে খারাপ ফল করবে। এনিয়ে আমার পুরানো লেখা এখানে পাবেন।  এর ওপর যদি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে হেরে গেছেন বাইডেন এই বয়ান স্থিতি পায় তবে বাইডেন সব কুল-ই হারাবেন। এজন্য সম্ভবত  হেরে যাওয়ার বয়ানকে বিজয়ী বা থিতু হতে না দেয়া বাইডেনের প্রধান লক্ষ্য। এতে তিনি কতটুকু সফল, আদৌ হতে পারেন কিনা তা সামনে দেখার বিষয়!

    বাইডেন হেরেছেন, জেলেনস্কি প্রধান সাক্ষীঃ
    কথাটা হল আসলে, জেলেনস্কির হাতে বাইডেনের ভাগ্য আটকে গেছে – এটাই মূল কথা। কিভাবে?
    গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পুতিন ইউক্রেন হামলা শুরু করে ইউক্রেনের সবাইকে পর্যুদস্ত করা শুরু করেছেন। আর এতে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, জেলেনস্কি অবাক চোখে দেখেছিলেন তার পাশে কেউ নেই, কেউ আসেনি। না ন্যাটো, না ইইউর কোন দেশ, না আমেরিকা। তিনি এই ক্ষোভ ও অপমান না লুকিয়ে পরের দিন সকাল থেকে অভিযোগ করতে থাকেন যে, ‘কেউ পাশে আসেনি, তারা একাই লড়ছেন’ [‘We’re defending Ukraine alone’, ]। আমেরিকার জন্য এই অভিযোগ মারাত্মক!
    আসলে মারাত্মক না হয়ে উপায় কী? জেলেনস্কিকে দেয়া বাইডেনের মিথ্যা প্রতিশ্রুতির চাতুরি একদিন তো প্রকাশ্যে এসে যাবেই! সেটাই সেদিন ঘটেছিল!

    আর জেলেনস্কির এ অভিযোগই ছিল প্রথম সাক্ষ্য যে, বাইডেন হারতে যাচ্ছেন। আসছি সে কথায়। কিন্তু এতে বাইডেনের পক্ষে আর মূল সত্যটা লুকিয়ে রাখাই অসম্ভব হয়ে যায়। পরদিনই বাইডেনের মুখপাত্র জেন সাকিকে [Jen Psaki] দিয়ে বাইডেন পরিষ্কার করে বলে দেয়া ছাড়া উপায় ছিল না যে, আমেরিকা ইউক্রেনের পক্ষে কোনো যুদ্ধেই যাবে না; যাবার ইচ্ছাও কখনোই ছিল না। সেটা রাশিয়ার সাথে সরাসরি কোনো যুদ্ধে তো নয়ই [কোনো অবস্থাতেই রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ নয়: যুক্তরাষ্ট্র], এমনকি ইউক্রেনের মাটিতেও আমেরিকা কোনো যুদ্ধে যাবে না […the President has no intention of sending U.S. military or U.S. troops to fight in Ukraine.  ]। তাহলে, জেলেনস্কির ইউক্রেনকে যুদ্ধের মুখে ফেলা হল কেন? না, এর কোন জবাব পশ্চিম বা বাইডেনের কাছে নাই। তারা দিবে না!!! এই হল দায়ীত্বজ্ঞান-হীন ও দেউলিয়া গ্লোবাল নেতা!!!

    কারণ বাইডেনের কথিত মুল পরিকল্পনা অনুসারে রাশিয়ার সাথে তিনি তো লড়বেন বিনা-অস্ত্রে ও বিনাযুদ্ধে এবং তা কেবল অবরোধ ও মানবাধিকার এ দুই হাতিয়ার দিয়ে। কিন্তু এসবের চেয়েও সবচেয়ে অনৈতিক কথাটা হল, এ বিষয়টাই মানে আমেরিকা যে রাশিয়ার সাথে কোন যুদ্ধেই যাবে না একথা  জেলেনস্কিকে জানানো হয়নি। পশ্চিমের কেউ-ই তা জানাতেই চায়নি। শুধু তা-ই না, তাকে ন্যাটোর সদস্যপদের লোভ দেখিয়ে যুদ্ধে টেনে আনা হয়েছে। সরাসরি বললে, যেটা শ্রেফ একটা প্রতারণা; অর্থাৎ  এখন আগামীতে এ নিয়ে যদি জেলেনস্কি প্রতারণার অভিযোগ তোলেন তবে এটিই হবে বাইডেনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য যে, তিনি এই যুদ্ধে হেরে গেছেন এবং কেন হেরেছেন!

    তাই বাইডেন এখন থেকেই জেলেনস্কির সাথে নিজের ভাগ্যকে বাঁধাবাঁধি শুরু করেছেন। কারণ জেলেনস্কিও তো তার ইউক্রেনীয় নাগরিকদের ভুল ও মিথ্যা বুঝিয়েছেন, যুদ্ধে টেনে নিয়ে গেছেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবেও এটা তার অযোগ্যতা যে, তিনি বুঝতেও পারেননি যে, পশ্চিমের কেউই যুদ্ধে তাদের পাশে আসবেই না; আসলে সবই ছিল মিথ্যা প্রতিশ্রুতি; অর্থাৎ জনগণকে প্রতারণার মুখে ফেলে দেয়া এটাই এখন একা জেলেনস্কির সবচেয়ে বড় অপরাধ এবং অযোগ্যতাও যে তিনি বুঝতেই পারেননি, এরা প্রতারক!

    কাজেই জেলেনস্কি আর বাইডেনের ইজ্জত বাঁচানো এখন এক সূত্রে গাঁথা হয়ে গেছে! দু’জনকেই নিজ নিজ পাবলিকের হাত থেকে বাঁচতে হবে!! এটা এমনই এক পরিস্থিতির মুখোমুখি তারা!!

    [জেলেনস্কির এবিসিতে দেয়া সাক্ষাতকারের চুম্বক অংশের ইংরাজিতে টেক্সট আকারে রিপোর্টে এনেছে মূলত বার্তা সংস্থা এএফপি। আর সেটা পাওয়া যাচ্ছে ইংরাজিতে  FRANCE24  আর  Singapore Strait Times, এখানে। আর ফরাসী নিউজটারই  বাংলা অনুবাদ লিঙ্ক এখানে দেয়া হয়েছে। অনুবাদ করেছে সাইফুল ইসলাম, সব ক্রেডিট তাঁর।]

    সম্ভবত এ কারণেই জেলেনস্কির এই সাক্ষাৎকারটা আমেরিকার অভ্যন্তরীণ শ্রোতারাই মুখ্য টার্গেট শ্রোতা হোক এই বিবেচনায় এবিসি নিউজে আয়োজন করা হয়। আবার,এখানে  প্রশ্নও ইংরেজিতে করা হবে কিন্তু জেলেনস্কি এর জবাব দেবেন তার (ইউক্রেনীয়) স্থানীয় ভাষায়। যেটা আবার এবিসি অনুবাদ করে ইংরেজিতে প্রকাশ করবে। এই হলো অ্যারেঞ্জমেন্ট, অর্থাৎ জেলেনস্কির অনুমান যে, নিজ ভাষায় বললে নিজ ইয়ার জনগণ বুঝবে ভাল বুঝবে; এছাড়া তিনি কি বলেছেন, কেন বলেছেন তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবাদ যেটা নিকট আগামিতে উঠতে বাধ্য তাতে জেলেনস্কি ভাল অবস্থায় থাকবেন – এই হল অনুমান। আমরা এখানে মনে রাখতে পারি যে, কোনো যুদ্ধে পরাজিত হওয়া বা পাবলিককে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্যে ফেলার দায়ে যুদ্ধ শেষে সব শাসককেই ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়।  মানুষ কোন পরাজিত শাসককে দেখতে পছন্দ করে না, করে নাই। সবাইকে দায় নিয়ে শেষে “আইয়ুব খান-ই” হয়ে যেতে হয়। ফলে এ যুদ্ধ শেষ হওয়ামাত্রই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবাদ, কার দোষে এই দুর্ভোগ, মিস-হ্যান্ডলিং – এসব অভিযোগে্র জোয়ার উঠবেই আর তাতে ইউক্রেন শাসকের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবলই হবে। তাই এই সাক্ষাৎকারের জেলেনস্কির বয়ানের মধ্যে    যুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গে বাইডেনকে দায়ী না করে জেলেনস্কির কোন উপায় থাকে নাই। আবার এই দায়-অভিযোগে বাইডেনও হেরে গেছেন এটাই সাক্ষ্য দেয়াও হয়ে যাচ্ছে আর এর প্রধান সাক্ষী হয়ে থাকছেন ওই জেলেনস্কিই!!

    অতএব জেলেনস্কি এই সাক্ষাৎকারে তিনি পশ্চিম বা বাইডেনকে অভিযুক্ত না করে পারেননি। “ন্যাটো সদস্য না করা” আর ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর ওপর দিয়ে রাশিয়ার জন্য চলাচলে [unhappy Zelenskiy ] “নো ফ্লাই জোন” ঘোষণা না দেয়ার জন্য সরাসরি অভিযুক্তই করেছেন। এ সাক্ষাৎকারেই তিনি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, “ন্যাটোর এই প্রশ্নে আমি নিজেকে ঠাণ্ডা করে নিয়েছি [I have cooled down ...] বেশ আগেই; যখন আমি বুঝে গেছি, ন্যাটো ইউক্রেনকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়”। এটাই আসলে সববকথার এক কথা যে “ন্যাটো সদস্য হবার শখ মিটে গেছে“। আর পরিষ্কার করে বলা যে, মিথ্যা আশ্বাসে পশ্চিম (আমেরিকা ও ইইউ) ইউক্রেনের সাথে প্রতারণা করেছে। এ কারণে নিজেই নিজের আকাঙ্খাকে দমন করতে হয়েছে, মেরে ফেলতে হয়েছে যদিও এখন তাঁর এভাবে বলার কারণে ইউক্রেনবাসী কাকে মাফ করবেন, কাকে ছুড়ে ফেলবেন আমরা জানি না।

    “I have cooled down regarding this question a long time ago after we understood that … NATO is not prepared to accept Ukraine,” Zelensky said in an interview aired Monday night on ABC News.

    আর ন্যাটো নিয়ে তিনি পরোক্ষে বলে দিয়েছেন, ‘ন্যাটো জোট রাশিয়ার সাথে সঙ্ঘাতে যেতে বা বিতর্কে  [The alliance is afraid of controversial things, and confrontation with Russia,” ] জড়াতে ভয় পায়, ভীত” [সত্যি বলতে, সবাই ভয় পায়: জেলেনস্কি]।’ তিনি আরো বলছেন, ‘আর আমিও অন্যের কাছ থেকে ভিক্ষা করে পায়ের নিচে গড়াগড়ি খাওয়ার বিনিময়ে কিছু আনব, এমন প্রেসিডেন্ট হতে চাই না [not want to be president of a “country which is begging something on its knees.”]।’

    আর এটাই হল, যতটা সম্ভব বাইডেনের ইজ্জতের দিকে খেয়াল করে জেলেনস্কির নিজ ইজ্জত বাঁচানোর চেষ্টা। যদিও সেটা এই প্রচেষ্টা মনে হয় বৃথা যাবে কারণ তাহলে ইউক্রেনের জনগণকে ন্যাটোর কাছে নিয়ে গিয়েছিল কে? কিসের ভরসায়? কে দিয়েছিল সেই মিথ্যা প্রতিশ্রুতি – এসব প্রশ্নে জেলেনস্কি লা-জবাব থাকতে পারেন না।

    রাশিয়ার সাথেও কথা হয়েছেঃ
    এটা এখন পরিষ্কার যে, বাইডেন-জেলেনস্কির হার লুকানোর প্রক্রিয়ায় রাশিয়ার সাথেও তাদের কথা হয়ে গেছে। এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ এপর্যন্ত দুটো পাওয়া যাচ্ছে। এক হল, রাশিয়া যুদ্ধ থামাবে কি শর্তে, সে কথাটা আবার এক রাশিয়ান সরকারি মুখপাত্রকে দিয়ে স্পষ্ট করে বলানো। মুখপাত্র স্পষ্ট করে তিন শর্তের কথা বলেছেন, যেটা আগেও রাশিয়া-ফ্রান্স আলোচনায় পুতিন স্পষ্ট করে বলেছিলেন। তবে এবার বাড়তি হল যে, শর্ত মানলে রাশিয়া যুদ্ধ থামাবে তো? এর নিশ্চয়তাই নিশ্চিত করেন ক্রেমলিন  মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ। এনিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনামই স্পষ্ট। শিরোনাম হলো, “ইউক্রেনকে দেয়া শর্ত পূরণ হলেই ‘মুহূর্তের মধ্যে’ রাশিয়া থেমে যাবে – ক্রেমলিন” [Russia will stop ‘in a moment’ if Ukraine meets terms – Kremlin]।”

    এ নিয়ে বাইডেন-জেলেনস্কির যে কথা হয়েছে এর প্রমাণ হলসেটা বুঝা যায়, জেলেনস্কি যখন সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে বলেন, এক. তিনি আলোচনায় আপস করতে প্রস্তুত যে রাশিয়া প্রভাবিত ইউক্রেনের দুই প্রদেশের স্বাধীনতা নিয়ে আপসে তিনি প্রস্তুত [Zelensky said he is open to “compromise” on the status of two breakaway pro-Russian territories…]। তিনি এদের “নিরাপত্তার গ্যারান্টি” দিতে চেয়ে কথা বলেছেন।
    কিন্তু এত সহজে কেন জেলেনস্কির এই উদারতা? উত্তর আসলে খুব সোজা। কারণ ওদিকে পুতিনও আগেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, ঠিক জেলেনস্কিকে ক্ষমতাচ্যুত করা বা কোনো রেজিম চেঞ্জ করা আর রাশিয়ার আক্রমণের লক্ষ্য নয়। কেবল ওই তিন দফাই তার যুদ্ধ বন্ধের মূল শর্ত। তাই ‘ক্ষমতায় থাকছেন’ এ কথা শোনার পরে জেলেনস্কি জান হাতে ফিরে পেয়ে রাশিয়ার সাথে আপসে রাজি হয়েছেন। একথাটা আর কাউকে বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে না।

    আর পুতিনের শর্ত তিনটা হলঃ
    ১। ‘ইউক্রেন নিরেপেক্ষ হয়ে যাবে’ [ Kremlin says it insists on neutrality for Ukraine]। এ জন্য তার কনস্টিটিউশন সংশোধন করে এ কথাগুলো সেখানে ঢুকাবে। অন্য ভাষায় রাশিয়ার নিরাপত্তাবোধে অভাব সৃষ্টি করবে না, ন্যাটোর সদস্য হতেও আর চেষ্টা করবে না।
    ২। রাশিয়া ইউক্রেনকে অসামরিকীকরণের কাজ শেষ করবে [ Russia “will finish” demilitarisation of the country]।
    ৩। বিচ্ছিন্ন দুই প্রদেশ যার বাসিন্দারা এথনিক রাশিয়ান, সে দুই আবাসভূমিকে স্বাধীন দেশ বলে মানবে, ক্রাইমিয়ার বিচ্ছিন্ন হয়ে রাশিয়ার সাথে যুক্ত হওয়াকেও মেনে নেবে [Wants Kyiv to recognise breakaway regions, loss of Crimea]।

    এক কথায় তাহলে, এবিসির সাক্ষাৎকারটা হল, রাশিয়া-ইউক্রেন কী কী ব্যাপারে আপস করবে এরই আগাম প্রতিশ্রুতি বিনিময়ের সাক্ষাৎকার। এসব বক্তব্যের ভিত্তিতে এখন রাশিয়া-ইউক্রেন বসে ফাইনাল খুঁটিনাটি চুক্তিপত্র ঠিক করে নেবে। অতএব কেস ফরফিট এবং যুদ্ধ থামার পথে।

    তাহলে কী বাইডেনের অবরোধ এখন উঠে যাবে?
    সরাসরি বললে, বাইডেন আশা করে আছেন এটাই সেই জায়গা। কিন্তু তাতে এখন ইউক্রেন রাশিয়ার সাথে কি আরো খারাপ কোনো চুক্তি করে রাশিয়ার ভিতর ঢুকে গেল কিনা সেদিকে বাইডেনের কোনো আগ্রহ নেই। তিনি চেয়েছিলেন রাশিয়ার ওপর অবরোধ জারি করতে – এখন তাই তিনি তো তিনি কামিয়ে ফেলেছেন ফলে সেখানেই মনোযোগ দিতে চান। কিন্তু অন্তত এখানে কি বাইডেনের আশা পূরণ হবে?

    কোন সকাল-কে দেখলেই বোঝা যায় যে, দিনের বেলায় বাকি সময়ে আর কী হবে। এই তত্ত্ব-অনুসারে এবার ইউরোপ একেবারে পিছটান দিয়ে ভেগে যেতে চাইছে। তারা বাইডেনের হাত ছেড়ে দিয়েছে এরই মধ্যে বলা যায়। কিভাবে?

    ইইউর প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক ধরা হয় ফ্রান্স ও জার্মানিকে। মানে এদের প্রভাবকে। এরই মধ্যে জার্মানি, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডস পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছে, রাশিয়ান তেল ও গ্যাস ছাড়া তারা চলতে পারবে না। জার্মান ডয়েচে ভেলের বরাতে ঢাকার এক বাংলা পত্রিকা রিপোর্টের শিরোনাম, ‘রাশিয়ার তেল-গ্যাসে নিষেধাজ্ঞা চায় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের অসম্মতি’। রাশিয়ান তেল-গ্যাসে এমনিতেই জার্মানির নির্ভরশীলতা প্রায় ৪৫ ভাগ। অন্য সবাইও কমবেশি নির্ভরশীল। এ দিকে ডাচ ও ফরাসি সরকারপ্রধানদ্বয় যৌথ সংবাদ সম্মেলনে [Dutch PM: Not possible for Europe to cut off Russian oil and gas immediately ] পরিষ্কার করে বলে দিলেন, রাশিয়ার জ্বালানি ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য তা ‘আনসাসটেইনেবল’, মানে টেকা অসম্ভব […would be unsustainable for European Union member countries.]।

    সোজা ভাষায়, রাশিয়ান জ্বালানি ইস্যুতে আমেরিকা-ইইউ আলাদা আলাদা রাস্তা ধরে ফেলেছে এরই মধ্যে; অর্থাৎ পুতিনের হুমকিটাই যেন কার্যকর যে, তিনি বলেছিলেন, আমাদের তেল না নিলে ‘ব্যারেল তিন শ ডলারে কিনতে প্রস্তুত হও’।

    বাইডেন কি নাদান?
    বাইডেন যেকথা আগাম ধরে নিয়েছিলেন তা হল, রাশিয়া মূলত ইউরোপকে অবরোধের কারণে জ্বালানি বেচতে না পারলে আর তার ট্রিলিয়ন ডলার সম্পদ আমেরিকার হাতে  আটকে থেকে গেলে রাশিয়ার আর কিছুই করার থাকবে না – সব স্তব্ধ হয়ে যাবে!! অথচ আমেরিকার একজন প্রেসিডেন্ট এসব মনগড়া অনুমানে কি চলতে পারেন? বাইডেনের অনুমান আংশিক অবশ্য সত্য, সন্দেহ নেই। কিন্তু এটা ঘটনার একটি পিঠ; যার অন্য পিঠের  খবর ওখানে নাই, নেয়া হয়নি।
    আসলে, দুনিয়ার সব বেচাবিক্রি মানেই তা কেবল একপক্ষীয়ভাবে দেখা। কারণ যেটা বেচাবিক্রি সে্টাই আবার আরেক দিক থেকে একই সাথে কেনাও বটে। কাজেই রাশিয়া বেচতে না পারলে যেমন বিপদ প্রায় তেমনিই বিপদ জ্বালানি ক্রেতারও। বাইডেন ইউরোপীয় ক্রেতার দিকটা দেখতেই চাননি। ফলে বাস্তবতা হল, ক্রেতা ইইউর সব সদস্যের জন্যই এটা রাশিয়ার মতোই সমান সঙ্কটের। এছাড়াও কথা আরো আছে।
    যদি ইউরোপ রাশিয়ান তেল-গ্যাস না কিনে বিকল্পভাবে কাতার বা অন্য কোথাও থেকে কিনতে চায় তা হলে সেই বিকল্প জ্বালানি যদি পাওয়াও যায় তবু সেটা বিপদেরই হবে। কারণ অবকাঠামো কোথায়? এটা তো পাড়ার বাজার ফেলে বিকল্প হিশাবে কাওরানবাজারে বাজার করতে যাওয়া নয়। গ্যাস-তেলের জন্য এখন নতুন করে বিকল্প পাইপলাইন বসাতেও তো কমপক্ষে তিন বছর লাগবে। এছাড়া বিনিয়োগের খরচ তোলার ব্যাপার আছে, কে দিবে? যে তেলের দাম এত দিন আশি ডলারে আটকে রাখার কসরত চলছিল এর মাঝেই এই যুদ্ধ এটাকে এরই মধ্যে প্রায় দেড়গুণ বাড়িয়ে ১১২ ডলারে নিয়ে গেছে। আর তেল বাজারের অনুমান হল এটা এমন চলতে থাকলে ১২০ থেকে ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠে যেতে পারে।
    তাই, বাইডেনের তেল অবরোধের খায়েশ পূরণ করতে চাইলে তেলের দাম পুরনো ৮০ ডলারে ফিরে যাওয়া দূরে থাক এটা কি সত্যিই ৩০০ ডলারের দিকে যাত্রা শুরু করবে? করোনার ধাক্কা সামলাতে যেখানে সারা দুনিয়া মন্দা আর মুদ্রাস্ফীতির কবলে, সেখানে এই নতুন তেলের দামের বোঝা কয়টা দেশ সামলাতে পারবে? বাছবিচারহীন বাইডেনের এমন পদক্ষেপকেই সম্ভবত আক্কেলের অভাব বলে!
    ওদিকে তেলের দাম না কমার মূল কারণ বলা হচ্ছে এখনও কোন দেশ বা সোর্স থেকে কেন দেশ তেল কিনে থাকে সেই সোর্স ইচ্ছামত বদলাবার মত প্রচুর বিকল্প সোর্স নাই। আর তেলের বাজারটাই এখন চলে গেছে একেবারেই স্পেকুলেটিভ মার্কেটে; মানে যেভাবে গ্লোবাল শেয়ার বাজার  স্পেকুলেটিভ মার্কেট সেরকম। তাই এখানে ব্রিয়েল ক্রেতা আর বিক্রেতার মাঝেই হাত বদল হয় এমন কমপক্ষে আরো তিনটা পক্ষ-পার্টি, এমন শেয়ার ক্রেতা বা শুধু ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) ক্রেতা ঢুকে আছে। একারণে তেলের দাম যতই অস্থির ততই ডিও ক্রেতায় ভরপুর হয়ে উঠে এই বাজার। এরই নিট ফলাফল হল শেষে লজ্জার মাথা খেয়ে বাইডেন ভেনিজুয়েলাকে বা মধ্যপ্রাচ্যে ফোন করতে হচ্ছে। অথচ ভেনিজুয়েলাকে আগের আরোপিত স্যাংশন এখনও বহাল। তাই লোভ দেখানো হচ্ছে ইউরোপের বিক্রেতা হতে। রাজি হলে স্যাংশন তুলে নেয়া হবে। তবুও কোন নড়নচরন দেখা যাচ্ছে না। এটাই এই বাজারে হওয়ার কথা। সবাই ওয়েট করছে দাম আরো বাড়ার জন্য…। আগ্রহিরা তাও পড়তে পারেন –Why US can and EU can’t ban Russian oil। আর একেই বলে বাইডেনকে – “কত ধানে কত চাল হয় শিখিয়ে দেয়া”।
    যে কারণে রাশিয়ান জ্বালানি ইস্যুতে আমেরিকা-ইইউ আলাদা আলাদা রাস্তা প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। এজন্যই জর্মান ডয়েচ ভেলের রিপোর্ট, 
    European leaders wary of cutting off Russian oil and gas । তাই আপনি যদি বাইডেনের শুধু কথা শুনেন তো “গায়ে বল বল ঠেকবে”। কিন্তু বাস্তবতা? ঠিক উল্টাটা যে আপনি আটকে গেছেন, নিজের অবিবেচক গর্বের ফাঁদে নিজেই বন্দি হয়ে পড়েছেন!!!

    তাহলে এখন একা কে? পুতিন না বাইডেন?
    পশ্চিম এখন স্বীকার করছে  – Outside the West, Putin is less isolated than you might think।
    এর কারণ, খুব সম্ভবত পশ্চিমের নখড়া দেখতে দেখতে – যারা মিথ্যা বলে,  আর চাতুরি করে বলে একটা করে আরেকটা – আমরা বাকি দেশেরা ক্লান্ত ও বিরক্ত!!

    তাই, এখন আনপপুলার সিটিং প্রেসিডেন্টের প্রধান উদাহরণ হতে যাচ্ছেন বাইডেন!
    আর এথেকে বাইনারিতে এমন মানে করা ভুল হবে যে তাহলে পুতিন খুবই ভাল লোক বলা হচ্ছে এখানে!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১২ মার্চ  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ইউক্রেনের হার লুকানোর প্রক্রিয়া শুরু?“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কী ডলারের বিকল্প এনেই ছাড়বে

    রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কী ডলারের বিকল্প এনেই ছাড়বে

    ০৭ মার্চ ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Xx

     WHY GOLD? –  Gold rises 2% on fear of Russia-Ukraine war

    সারা দুনিয়াই এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে, একভাবে না একভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে গেছে। এবং বলাবাহুল্য তা পক্ষে অথবা বিপক্ষে। আবার এই যে কথাটা বললাম সেটাও নতুন কথা নয়। কেবল ফারাক হয়ত এতটুকুই যে, অন্যরা আমার মত করে নয় তারা তাদের মত করে অন্যভাবে বুঝে বলেছে।

    তা হলে নতুন যে কথাটা এখন বলতে যাচ্ছি সেটা হল, গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল এতে আরো আসন্ন হতে গতিপ্রাপ্ত  হয়ে যেতে পারে। এ কথা আমি ২০১৪ সাল থেকে নিশ্চিত করে বলে আসছি। আসন্ন সেই গ্লোবাল নেতৃত্বে বদলের দিকে একটা গ্রেট লিপ [great leap] বা বড় পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ার নতুন ঘটনাটাই হল ‘রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ’  – তবে এটা ঘটনার একদিক। মানে বাইরের দিক থেকে দেখে এটাকে  কেবল ‘রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ’ -ই মনে হচ্ছে।  অর্থাৎ  বড় পদক্ষেপে বদলের বাইরে দিকটাই মানুষ দেখছে ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ’ হিসেবে। আসলে গ্লোবাল নেতৃত্বের নেতাদেশ বদল মানে – আমেরিকা নেতৃত্ব হারানো আর চীনের উত্থান ঘটা, এটাই ধেয়ে আসছে। আর আমেরিকা নেতৃত্ব হারাচ্ছে – এ ঘটনাটাকে মুখে বলা তা মোটেই ব্যক্তির ইচ্ছা না। এমনকি সে চীনকে বেশি পছন্দ করে কি না তাতেও কিছু এসে যায় না। এটা এক ব্যক্তি-ইচ্ছা-নিরপেক্ষ বাস্তবতা – এমন এক অবজেকটিভিটি। তাই তা সিরিয়াসভাবে আমল করার বিষয়।

    সাম্রাজ্যের ইতিবাচক ভূমিকাঃ
    এম্পায়ার [empire] বা বাংলায় ‘সাম্রাজ্য’ শব্দটা অনুসরণ করা যাক। বহু পুরনো এই শব্দ, দুনিয়া যখন শাসন বলতে কেবল রাজার শাসন বা রাজতন্ত্র বুঝত, সে আমলের। তখনকারই আরেক প্রায় সমান্তরাল শব্দ হল এই সম্রাট বা সম্রাটের সাম্রাজ্য। পরবর্তিতে সম্রাটের শাসন পর্ব বা যুগ শেষ হবার পরে ইউরোপে, অন্যের দেশ দখলদার – এটাই যেসব দেশের প্রধান পেশা ও ব্যবসা, পরিচয়, এমন সবচেয়ে বড় পাঁচ রাষ্ট্র হল – ব্রিটেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল ও স্পেন – যারা সবাই ‘সাম্রাজ্য’ (যেমন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য) বলেই পরিচিত ছিল। এমনকি তারা ১৬০০ সালের পরে এরা ততদিনে রিপাবলিক জাতি-রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে উঠে গেলেও।
    আমাদের জন্য এখনকার প্রাসঙ্গিক কথাটা হল,  কোনকিছুকে রাজ্য আর সাম্রাজ্য বলে ডাকার ক্ষেত্রে একটা বড় ফারাক হল, ছোট হলে রাজ্য আর বড় হলে সাম্রাজ্য এমন একটা চিন্তা অবশ্যই কাজ করত; যদিও এদের মূল ফারাকটা আরো গভীরে। যেমন ধরেন, রাজা আর সম্রাট উভয়ে খাজনা তুলে খায় এটা কমন। কিন্তু দুটোর ফারাক বা বড় অমিলের দিকটা হল, রাজা খাজনা নেয়ার বিনিময়ে প্রজাকে কিছু দিতে সে বাধ্য নয় অথবা শাসন-সম্পর্ক চর্চায় সেটা ছিল না। যেমন দুনিয়ার যত রাজা ছিল তাদের এসব অর্থ আদায় হত যেসব নাম দিয়ে সেগুলো লক্ষ্য করা যাক। প্রথমত বলে রাখি এদের নানা নাম থাকলেও এখানে কমন নাম আকারে, সব কিছুকেই ‘খাজনা বলছি’। যেমন,  আমাদের পাহাড়ি এলাকায় রাজতন্ত্র অকেজো হয়ে গেলেও এখানে খাজনা আদায় হত ‘পুণ্যাহ’ এই নামে; এখনও এই নামে অনুষ্ঠানটা চালু আছে দেখা যায়। অর্থাৎ এখনো পাহাড়ি প্রজাদের [বাংলাদেশ রাষ্ট্র হয়ে গেছে বলে এই বিচারে পাহাড়িরা নাগরিক হয়ে গেলেও পুরানা রাজার বিচারে তারা প্রজা-ই ] থেকে তাদের রাজা অর্থ আদায় করতে পারুক আর না পারুক, সেই ‘পুণ্যাহ’ কালেকশন ও অনুষ্ঠানের স্মৃতি অন্তত রাজারা জারি রাখতে চান। রাজ-প্রশাসন বলে তেমন কিছু না থাকলেও তাদের সাংস্কৃতিক পরিসরে রাজার অনুভূতি থাকুক, এই চাওয়াকে কার্যকর রাখা হয় এ ঘটনায়। এখন এই শব্দটা পরীক্ষা করা যাক; এটা এক ধর্মতাত্বিক ইঙ্গিতমূলক শব্দ যা দিয়ে যেন বলতে চায় ‘খাজনা দেয়া পুণ্যের কাজ’। আর সারকথায় বলা যে, বস্তুগত লাভালাভের দিক থেকে কথাটার সোজা অর্থ হল, খাজনা দিলেও প্রজারা বিনিময়ে কিছু পাবে না।

    এসব ক্ষেত্রে এমনই আরেকটা শব্দে খাজনা তোলার রেওয়াজ ছিল  – ইংরেজিতে ‘ট্রিবিউট’ [tribute] শব্দে, যার একটা বাংলা করা যায় ‘শ্রদ্ধা’ জানানো। মানে হল যেমন, ভিজিটিং আওয়ারেই রাজাকে ভিজিট করতে গেছেন কিন্তু সেটাকে বলতে হবে – শ্রদ্ধা জানাতে গেছেন। এখানেই শেষ না। আপনি যে শ্রদ্ধা জানাতে গেছেন তা শুধু ‘ভাব-ভঙ্গিতে বুঝালে হবে না। পারিষদেরা বুঝবে কী করে যে রাজাকে আপনি শ্রদ্ধা-সালাম জানাতে গেছেন? সে জন্য আপনাকে নগদ অর্থ (অথবা জমির ফসল) দিতে হবে। দিলে পরে সেটাতে আপনার সালাম জানানোর ইচ্ছা প্রকাশিত হয়েছে, ধরা হবে। না, আমাদের বাংলা ভাষা বা সমাজেও দেখেন। সেখানে এটা এখনো তা আরেকভাবে চালু আছে। যেমন, কোন মার্কেটের দোকান ভাড়া নিতে গেছেন। মার্কেট মালিক বলছে ভাড়া মাসে তিন হাজার কিন্তু সাথে ‘সালামি’ দিতে হবে পাঁচ লাখ। এই সালামিটাই ইংরেজিতে ট্রিবিউট। সারকথায় রাজা মানে যারা সালামি, ট্রিবিউট, পুণ্যাহ ইত্যাদি নানান নামে খাজনা খায়। আর গুরুত্বপুর্ণ হল, বিনিময়ে রাজা প্রজাকে কিছু দেয় না। অথবা দিতে হবে এমন কোন অর্থ-ইঙ্গিত ওসব শব্দে থাকে না।

    রাজা-সম্রাটের ফারাকঃ
    আর ঠিক এ জায়গাটা হল রাজা-সম্রাটের ফারাক। যেমন সম্রাটের ক্ষেত্রেও,  সারকথায় সম্রাটও সালামি, ট্রিবিউট, পুণ্যাহ ইত্যাদি যা আছে সব নেয়। কিন্তু একই সাথে প্রজাদের জন্য অনেক সামাজিক দায়-কর্তব্য সে নেয়। কেমন সেটা? গঞ্জ-হাট-বাজার অনেক পুরনো জিনিস। সেকালে যে সম্রাট সে হয়ত এমন কমন জায়গার বাজারটা পাকা করার দায় নিবে, বর্ষাকালে খুব কষ্ট হয় তাই। এছাড়া বণিকদের হাটে আসা-যাওয়া চলাচলের নিরাপত্তা দিবে; সে জন্য পাইক-পেয়াদা নিয়োগ দিবে। এক কথায় কমন গুড [common good] মানে সবার কাজে লাগে, এমন কাজকর্মে সম্রাট মনোযোগ দিবে। সম্রাট জানে, এতে হাটবাজারে ব্যবসাটা ভালো জমলে খাজনা-আয় আপোষেই ভাল হবে। তার ভাবনা হল, এসব মিউনিসিপাল বা সিভিক [civic] সার্ভিস বাড়িয়ে দিয়ে যদি এবার খাজনা একটু বেশি চাই হাটের মানুষ তাও দেবে। এই হল সাম্রাজ্য ব্যবস্থা শুরুর গুরুত্বপূর্ণ দিক। এটাই ‘সাম্রাজ্য’ ধারণা ও শব্দটার বড় কিছু ইতিবাচক দিক; আর যদিও সাম্রাজ্যের বড় বড় অনেক খারাপ দিক দিয়েই মানুষ ধারণাটাকে চিনে থাকে।

    উপরে সাধারণভাবে যেকোন সাম্রাজ্যের বেলায় কথাগুলো প্রযোজ্য এমন অনুমানে কথাগুলো বলা। তবে আমাদের সাবধান হতে হবে ১৯৪৫ সালের আগের (১৬০০-১৯৪৫) সাড়ে তিন শ’ বছরের ইউরোপ নিয়ে; এ সময়ের তাদের দেশের সাম্রাজ্য শব্দটার অর্থ আমাদের মত এশিয়ান দেশের অভিজ্ঞতায় পুরাটাই নেতিবাচক ছিল; কারণ সাম্রাজ্য তৎপরতা বলতে তখন এর একটাই অর্থ, যারা কলোনি দখল ও শাসন করে। সাম্রাজ্য মানেই অন্যের দেশকে কলোনি দখল – এই দিকটা অনেক ভারী ও প্রধান ছিল।

    তবে ১৯৪৫ সালের পরে আমরা প্রথম দেখলাম এক নতুন ধরনের আমেরিকা শুধু না, সেটা একটা কলোনিমুক্ত দুনিয়াও বটে। তবে না এটা আবার কোন সম্রাটের রাজতন্ত্র ছিল বরং ছিল নাগরিকের ক্ষমতায় নির্বাচিত এক আমেরিকান রিপাবলিক। ফলে সেই অর্থে এখানে কোনো আমেরিকান সম্রাট থাকে নাই। কিন্তু এই আমেরিকার হাতেই তবু ১৯৪৫ সালের পরে – সেই প্রথম দুনিয়াতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তার নেতৃত্বে এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক ব্যবস্থা ও শৃঙ্খলা তৈরি করা হয়েছিল বলে বুঝা যেতে পারে; এবং এর খারাপ-ভালো সব দিকসহ-ই। কমিউনিস্টরা এই আমেরিকান কর্তৃত্বকে বিশেষ করে ১৯৫৩ সালের পরের আমেরিকাকে ‘আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ’ বলে থাকে এবং তা বলার পক্ষে এমন আমেরিকান ভূমিকাও আছে; যেমন সিআইএ পাঠিয়ে কোনো দেশে ক্ষমতা দখল ও সরকার বদল এবং তা বিশেষত প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের উদ্দেশ্যে। কিন্তু একই সাথে এই আমেরিকার এম্পায়ার রোলও আছে। যেটাকে আগে সাম্রাজ্যের ব্যতিক্রমী ইতি ভূমিকা বলেছি, তেমন এক ধারাবাহিকতা যেন, যেটা আমেরিকা একালেও পালন করেছে। কিভাবে?

    সেকালে সম্রাট যেমন রাজার চেয়ে এগিয়ে গিয়ে বসে বসে চাঁদা-খাজনা খাওয়া নয় – প্রজাদের সার্ভিস দেয়ার কাঠামোতে হাজির ছিল এবং এই বিনিময়ের মাধ্যমে একটা রাজ্য-প্রশাসন বা সাম্রাজ্য খাড়া করে ফেলা যার মুখ্য অবদান; ঠিক তেমনি ১৯৪৫ সালের পরে, আমেরিকা এক ইতি-এম্পায়ার ভূমিকাও নিয়েছিল। কারণ এক নয়া গ্লোবাল সিস্টেম সে গড়ে তুলতে চেয়েছিল।
    যার পিছনের কারণ গ্লোবাল সিস্টেমের নেতা হতে গেলে পজিটিভ এম্পায়ারের দায়-ভূমিকা যা থাকে সেটাও পালন করতে হয় এবং তা করে বলেই তো সে গ্লোবাল নেতা।  উদাহরণ, যেমন চলতি শতকের শুরু থেকেই, ব্যাপারটাকে ভাল / মন্দ যা বলেই দেখি,  আমেরিকা রাষ্ট্র  নিজে চলতে গিয়ে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি এই বেকায়দায় পড়ে সভরেন-লোন নিয়ে চলতে শুরু করেছিল আর তা, এখনও। সভরেন লোন [sovereign loan] মানে এখানে খোদ রাষ্ট্রকেই বন্ধক রেখে গ্লোবাল পুঁজিবাজার থেকে ঋণ নেয়া, আর এভাবেই ঋণ করে খরচ চালানো একটা দেশ আমেরিকা। আর সে-জন্য প্রায়ই আমেরিকাকে নিজ সংসদ থেকে নতুন লোন নেবার অনুমতি নিতে বা লিমিটটা বাড়িয়ে নিতে হয়। আর এনিয়ে প্রতিবারেই এক-দুই সপ্তাহের নাকানি-চুবানি খায় আমেরিকান প্রেসিডেন্টের। একবার ওবামা আমলে প্রেসিডেন্টের এমন নাকানি-চুবানি চলছিল কিন্তু এরই ভিতর ডব্লিউএফপি WFP (বিশ্ব খাদ্য সংস্থা – জাতিসঙ্ঘের খাদ্য সহায়তা-বিতরণ প্রতিষ্ঠান)-কে দেয়া তার রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য ওবামা এক শ’ মিলিয়ন ডলার ফান্ড রিলিজ করছেন। কারণ, ডব্লিউএফপি এই ফান্ড ব্যবহার করেই সোমালিয়ায় ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাদ্য পাঠানোর অপেক্ষায় ছিল। অথচ তখন আমেরিকার নিজ-বাজেটে অর্থ বরাদ্দ নেই বলে যারা বিভিন্ন সেক্টরে দিন-ভিত্তিতে স্যালারি পান এমন আমেরিকার  সরকারি কর্মচারীদের ‘কাজ নাই’ বলে বাসায় রেখে দিতে হয়েছিল।

    অর্থাৎ, নিজের অবস্থা যাই হোক, ডব্লিউএফপি-কে প্রতিশ্রুত অনুদানের ফান্ড আগে রিলিজ করতে হবে – এই হলো গ্লোবাল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এক ব্যবস্থায় গ্লোবাল নেতার ইতিবাচক দায়-ভূমিকা তাকে অগ্রাধিকারে পুরণ করতেই হয়েছে; যা পুরনো স্টাইলে বললে এটা ‘এম্পায়ারের ইতি-দায়’ বলা যায়। আমি অনেকবার লিখেছি, কোনো রাষ্ট্র গ্লোবাল নেতা হতে হলে এর একনম্বর শর্ত হল তার অর্থনীতিকে অবশ্যই উদ্বৃত্ত অর্থনীতি হতে হবে, মানে ভাল পরিমাণে সারপ্লাস বা উদ্বৃত্তের সম্পদ থাকতে হবে। এমন হতে হবে, যাতে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে নয়া অবকাঠামোগত খাতে স্বল্পসুদে ঋণ পাবার যে চাহিদা আছে তা নেতা দেশকে পূরণের যোগ্যতা সামর্থ্য থাকতেই হবে। যে যোগ্যতার জন্যই সে পজিটিভ এম্পায়ার, ফলে সে গ্লোবাল নেতা।

    গ্লোবাল ইকোনমিতে আরও ভাল একটি উদাহরণে যাওয়া যাক; গ্লোবাল ইকোনমি ও চলতি করোনা ভাইরাস প্রসঙ্গে। গ্লোবাল ইকোনমি কখনও ফেল করলে, খারাপ অবস্থায় পতিত হলে এটা কোনো খুশির খবর নয়। আমরা দুর্ভিক্ষ দেখেছি। “সারপ্লাস ভ্যালু চোরেরা” এবার ‘ধরা খাইবে’ যুক্তিতেও তাই এটা খুশি হওয়ার বিষয় নয়। দুর্ভিক্ষ বা জীবনের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ না হওয়ায় তা-জনিত কোন মানুষের মৃত্যু কাম্য বিষয় নয়। তাই গ্লোবাল ইকোনমিকে পতিত বা ফেল করে যাওয়া থেকে বাঁচানোর ক্ষেত্রে গ্লোবাল নেতার এক বিরাট দায়-ভূমিকা আছে থাকে, মানুষ ও বিশ্ব তা আশাও করে।

    গ্লোবাল নেতার কী করার আছে এখানে?
    করোনার টিকার পূর্ণ ডোজ নিলে আর করোনা হবে না অথবা শতভাগ করোনামুক্তি মিলবে, টিকা উৎপাদকেরাও কখনো এমন কথা দাবি করে না। তাহলে টিকা নিয়ে এত কী হৈচৈ, কাজ? কোনো “লকডাউন’ বা সব অর্থনৈতিক তৎপরতা বন্ধ যেটা প্রায়ই করতে দেখা যায় এর  বিরুদ্ধে আবার যদি মানুষ উঠে দাঁড়াতে চায়, আর এতে ন্যূনতম অর্থনৈতিক তৎপরতা যদি চালু করতে চায় তাহলে মানুষের হাতের নাগালে আছে আর যা কিছু পরিমাণ প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যা কিছুটা কাজ করে এমন একমাত্র উপায় হল টিকা – পাবলিককে টিকা দিয়ে নেয়া। যত দ্রুত দেশের বেশির ভাগ যোগ্য নাগরিককে তা দেয়া যায়। তাহলে এর অর্থ দাঁড়াল যে, গ্লোবাল অর্থনীতিকে যদি ফিরে দাঁড়াতে হয়- যতটা সম্ভব ফিরে উঠে দাঁড়ানোর ব্যাপারটা সে ক্ষেত্রে নির্ভর করে মানুষের কাছে টিকার প্রাপ্যতা, টিকা কিনবার ফান্ড যোগান দেয়া আর ম্যানেজমেন্ট – যাতে সুষ্ঠুভাবে টিকা দেয়ার কাজটা সুচারুভাবে করা যাবে বা গেছে কি না এর ওপর। অর্থাৎ টিকা ধনন্তরী না হলেও বন্ধ অর্থনীতি থেকে বের হবার হাতের নাগালে থাকে আপাতত এমন একমাত্র উপায় হল টিকা। আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতায় তাই দেখা যাচ্ছে।  আর এখানে গ্লোবাল নেতার বিরাট ভূমিকাটা হল, এখানেই এই তিন কাজে বিনিয়োগ জুটিয়ে আনা। কারণ টিকা উৎপাদন বা ক্রয়ে সামর্থ্যহীন অথবা লাইসেন্স দিলেও যে উৎপাদন করতে পারবে না; এমনকি টিকা শুধু পৌঁছে দিলেও হবে না; তা ঠিকমতো পুশ করার ম্যানেজমেন্টেও সহায়তা লাগবে এমন গরিব দেশ কম নয়, বরং এরাই সংখ্যায় বেশি। এ ছাড়া বড়লোক দেশগুলো নিজে সবাই টিকা নেয়ার পরও আরো দ্বিগুণ টিকা মজুদ করে রেখেছিল তাতেও “নয়া” করোনার বিস্তার ঠেকেনি। এমনকি এভাবে রেখে তারাও “নয়া” করোনার হাত থেকে বাঁচবে না। কারণ আফ্রিকায় টিকা না দিলে সেখান থেকেই এই ভাইরাস আরো ভয়ঙ্করভাবে নতুন ভ্যারিয়েন্ট বা নতুন রূপ নিয়ে আবার সারা দুনিয়াতে ছেয়ে যাবে। আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাই বলছে, আমরা ওমিক্রনে এসে ঠেকেছি।

    তা হলে এখন বিচার করা যাক আমেরিকা বা চীন কে কতটা এ জায়গাটায় গ্লোবাল ভূমিকা দেখিয়েছে; বিনিয়োগ করেছে? আফ্রিকার সব বয়সের মিলিয়ে মোট জনসংখ্যা ১.২ বিলিয়নের মত। চীন একাই আফ্রিকাতে এক বিলিয়ন টিকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি পূরণের চেষ্টায় রত হয়েছে। আর আমেরিকার একা নিজ প্রোগ্রামের কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না। বড়লোক দেশের জোট জি-৭ হিসেবে- ডব্লিউএইচও বা (হু WHO)-এর কাছে এদের সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি ছিল এক বিলিয়ন ডোজের যা তারা এখনো টার্গেটের ধারে কাছে নাই বলে অভিযোগ। তবে WHO-কে দেয়া ওই মজুদ থেকেই (আমেরিকার অনুরোধে) হু আমাদের দেশে যত যা মডার্না ফাইজার টিকা সরবরাহকারী। আর ঢাকার একাংশসহ সারা দেশের জন্য এখনকার টিকার একমাত্র সরবরাহকারী চীন। আর আমার জানা মতে, চীনের এখনকার টিকাগুলো একেবারে বিনাপয়সায় আমাদের দেয়া। এ ছাড়াও অল্প কিছু টিকা জাপান থেকে এসেছে, আমেরিকা-ভারতের মুখরক্ষা করতে। কারণ টিকা-ইস্যুতে কোয়াডের ভিতরেই ক্যাচাল, মনোমালিন্য, অভিযোগের শেষ নাই। আর বড়কথাটা হল, বাইডেনের আমেরিকাই কোয়াডে টিকার জন্য অর্থ দেয় নাই, দিয়েছে জাপান। টিকার গ্লোবাল দায়-ভুমিকায় আমেরিকা নাই নয়ত পিছিয়ে। আবার সেকালেই ভারতের অভিযোগ তাকে কোন অনুদানের অর্থ  দেয় নাই। আর টিকার কাঁচামাল পেতে  আমেরিকা বাধা দিয়েছে।

    অর্থাৎ টিকা প্রশ্নে এরই মধ্যে গ্লোবাল ভূমিকা দেখাতে এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে, আমেরিকার চেয়ে চীন অনেক বেশি গ্লোবাল নেতার ভূমিকা নিয়ে নিয়েছে। করোনা গত ২০১৯ সালের শেষের দিক থেকে বিশ্ব ছেয়ে ফেলা শুরু করেছিল। আর ২০২০ সালে ছিল ওর প্রথম ভয়ঙ্কর প্রকোপ। অথচ আমেরিকার মতো দেশের প্রেসিডেন্ট এটা আদৌ কোনো সিরিয়াস ভাইরাস নাকি সাধারণ সর্দি-কাশি এসব নিয়ে মশকরায় দিন কাটিয়েছেন। মজার কথা হল, যড়যন্ত্র-তত্ত্ব বিশ্বাসী কিছু কমিউনিস্টরা বলে থাকেন, করোনার আবির্ভাব নাকি বিল গেটসের ‘জীবাণুযুদ্ধের ষড়যন্ত্র’। আর এনিয়ে খোদ ট্রাম্পের অবস্থানও এর কাছাকাছিই ছিল, যেটা আবার এখন পুরোই উদাম। সর্বশেষ কানাডায় ট্রাক ড্রাইভারদের দিয়ে ভ্যাকসিনবিরোধী আন্দোলনে এসে দেখা গেল ইউরোপের যড়যন্ত্র-তত্ত্ব বিশ্বাসী কমিউনিস্ট আর আমেরিকা-কানাডার কনজারভেটিভ বা হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট এরা দু’পক্ষই ভ্যাকসিনবিরোধিতার প্রশ্নে একাকার। দুনিয়াতে এমন ঐক্য সম্ভবত এই প্রথম; সত্যিই বিরল! সবশেষে কানাডার আদালত তাদের এই কথিত আন্দোলনকারীদের ইজ্জত-সম্মান বাঁছিয়েছেন, আদালত আন্দোলনকে অবৈধ ঘোষণা করে সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে।

    আমেরিকার গ্লোবাল নেতাগিরির দিন যে ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে তা নিয়ে বাইডেনের পূর্বসূরি ট্রাম্প বা তার দল-গোষ্ঠীর অবস্থান। ট্রাম্প বলতে চাচ্ছিলেন যে, আমেরিকার জন্য তার আমলে গ্লোবাল দায়-দায়িত্ব নেয়া বিশাল ভারী হয়ে উঠেছে। অতএব ভানুর কৌতুকের মত, “তাহলে যুদ্ধেই যাবো না”; অর্থাৎ আমেরিকা আর ইকোনমিক গ্লোবালাইজেশন এবং আমেরিকান গ্লোবাল রোল এর কোনোটাতেই আর থাকবে না। তাই সম্ভবত টিকা নিয়ে ফাজলামির রাস্তা নিছিলেন তিনি। এ ছাড়া আরো যেমন – ট্রাম্প ন্যাটো ভেঙে দিতে চান; এছাড়া এটা রাখার দরকার কী – ইউরোপ কোন খরচের দায় নেয় না ধরণের যুক্তি তুলেছিলেন। আর ১৯৪৫ সাল থেকে জার্মানি-জাপানে মার্কিন সেনা ও ব্যারাক আছে; আর একালের আফগানিস্তান থেকেও সব সেনা ফিরিয়ে আনতে চান, অবস্থান নিয়েছিলেন। এসবই ছিল গ্লোবাল নেতৃত্ব ছাড়তে চান এর ইঙ্গিত-ততপরতা। আর সবশেষে ৬ জানুয়ারি ২০২১ ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের’ হাতে সংসদ ভবন আক্রমণকে সমর্থন করেন। বলা যায় করিয়েছিলেন ও এর বিল্ডিংয়ের মাথায় উঠে নৃত্য করান। তাহলে এই হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট কারা, কী তাদের পরিচয় ও চাওয়া, আর কেন ট্রাম্প তাদের সমর্থন করেন বা নেন?

    সব প্রশ্নের জবাব একখানেঃ
    সব প্রশ্নের জবাবের মাথা একখানে – চীনের কাছে আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব, অভ্যন্তরীণ বাজার ও অর্থনীতি সবকিছু ক্রমশ হারানোতে আমেরিকান সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ থেকে উঠা বিভিন্ন প্রতিক্রিয়ার একটা হল হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট হয়ে যাওয়া বা এর সমর্থক হয়ে যাওয়া। এরা বলতে চায় আমেরিকা অর্থনীতির পিছিয়ে পড়া, ডুবে যাওয়া, কাজ-ব্যবসা হারানো, সচ্ছলতা কমে যাওয়া – এসব কিছুর কারণ একটাই। তা হচ্ছে, আমেরিকা হল সাদা ককেশীয় নীল-চোখের মানুষের দেশ। কিন্তু সেখানে আজ কালো আর বাদামি সারা দুনিয়ার মানুষে ভরে গেছে। আর এরা আমেরিকায় ছেয়ে বসে যাওয়াতেই এদের ভারে তাদেরই কাজ না পাওয়া বা সম্পদ ভাগাভাগিতে সঙ্কট এসেছে। অতএব তাদের বয়ানের সারকথাটা হল –  আমরা সাদারাই শ্রেষ্ঠ ছিলাম; এখন সেই পুরানা জমানাটাই ফেরত আনতে হবে। কাজেই দুনিয়াতে আমাদের গ্লোবাল দায়-দায়িত্ব নেওয়ার কাজ কী? আমাদের তা নিতে হবে কেন? এসবের অর্থে এরা বুঝুক না বুঝুক, যা তারা দাবি করছে এর বাস্তবায়ন-যোগ্যতা দুনিয়ায় থাকুক না থাকুক এরা এক এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থানে ঢুকে পড়েছে। আর এখানেই কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্রবাদীদের সাথে অজান্তেই তাদের অবস্থানগত মিল হয়ে গেছে। অথচ এরা খবর নেয় নাই যে, তাদের আমেরিকাই গত পঁচাত্তর বছর ধরে সারা দুনিয়াকে গ্লোবাল বাণিজ্যের গ্লোবালাইজেশনে টেনে নিয়ে গেছে। এখন খিচুড়ি একবার রান্না হয়ে গেলে কি আর চাল-ডাল আলাদা করা যায়? সেই অবস্থা! তেমনি এক বেচারা অবস্থায় এরা ও তাদের আমেরিকা! এছাড়া আবার গত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রধান সমর্থক এই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরাই। মাঠের বিচারে এরাই মূল ফাইটার।

    তা হলে গ্লোবাল কর্তৃত্ব হারাতে থাকা আমেরিকার অর্থনৈতিক এলোমেলো দুর্দশা দেখে থেকে এর একটা প্রতিক্রিয়া যদি হয় ট্রাম্প, তাহলে এরই আরেক প্রতিক্রিয়া (মুদ্রার অপরদিক) হল বাইডেন। বাইডেন বলতে চাইলেন তিনি অনেক বোঝেন – কাজেই তাদের প্রাণের আমেরিকা হারতে, হারাতে পারে না। কারণ তিনি জানেন আমেরিকার হাতে চীন-রাশিয়াসহ যে কেউ দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার মত দুই মারাত্মক অস্ত্র আছে, যেটার কথা অন্যরা বুঝেইনি। এর একটা হল, বেয়ারা যারা এমন রাষ্ট্র ও ব্যক্তির উপর  অর্থনৈতিক অবরোধ (sanction) আরোপ আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরা। এ দুটো ব্যবহার করলেই আমেরিকাকে আর কারো কাছে গ্লোবাল নেতৃত্ব হারাতে হবে না। আর এ’কাজটারই এক ব্যবহারিক রূপ-পদ্ধতি বিষয়ক ঘটনা হল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যেমন, রাশিয়া যখন ইউক্রেন আক্রমণের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে কিন্তু একশনে যায়নি তখনই আমেরিকান প্রতিক্রিয়া হল, রাশিয়ার উপর স্যাংশন আরোপ। অর্থাৎ বাইডেন যে অনুমানের উপরে চলতে চাইছেন তা হল, আমেরিকা রাশিয়ার সাথে কোনো  প্রত্যক্ষ যুদ্ধে যাবে না; আর সে অনুযায়ী তিনি (যুদ্ধের খরচ দিবার ফলে এর সব নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আছে বলে) বলিয়েছেন,  ন্যাটো কোনো “নো ফ্লাই জোন আরোপ করবে না”। মানে ন্যাটোও যুদ্ধে জড়াবে না। তবু কেবল অবরোধ আরোপ করেই নাকি বাইডেন সব দিকে জিতে আসবেন। কেন তা ঘটবে? কারণ, তিনি মহা-অস্ত্র “অবরোধ” তা ব্যবহার করে দিয়েছেন! আর এতে মনে হচ্ছে বাইডেন “অবরোধ” নামের সোনার ডিম দেয়া হাঁসের পেট কেটে সব ডিম বের করার পথে রওনা দিয়েছেন! তাই এনিয়ে নিচে এক প্রফেসরের বক্তব্য শুনে শেষ করব।

    সব কিছুতেই একই অবরোধ-নির্ভরতার অর্থ কী?
    হংকং থেকে পরিচালিত  গ্লোবাল পুঁজিবাজার অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের এক পত্রিকা “এশিয়া টাইমস”(Asia Times)। তারা অবরোধকে প্রসঙ্গ করে প্রধান এক রিপোর্ট করেছে। আর সেখানে এক্সপার্ট হিসেবে কথা বলেছেন আইএমএফের এক সাবেক চিফ ইকোনমিস্ট কেনেথ রগঅফ (Kenneth Rogoff); যিনি বর্তমানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরও। তার শেষ কথাটা দিয়েই শুরু করিঃ

    এমনিতেই আমেরিকা যেকোনো স্যাংশন আরোপ বলে যা করছে এর পেছনে আইএমএফের কোনোই অনুমোদন নেই। তবু এমন এই অতিমাত্রায় স্যাংশন বা অবরোধের ব্যবহার যা আমেরিকা করছে এর পরিণতিতে কী হবে তা নিয়েই এই প্রফেসর বলছেনঃ “স্যাংশন অস্ত্রের ব্যবহারের ফলে ডলার-মুক্ত (ডি-ডলারাইজড) এক দুনিয়া হয়ে যাবার পথে হাটা এটা, সেই প্রক্রিয়ার দিকে যাওয়া এখন ব্যাপক গতি লাভ করবে। আর সেটাই ডলার আধিপত্যের কবর খোঁড়ার মতো সমতুল্য এক ঘটনা হবে” (the frequent use of the financial sanctions weapon will accelerate the process of de-dollarisation of the world, which is tantamount to digging a grave for dollar hegemony.)”।

    কেন এমন হবে এর আরও কিছু মুল্যবান বেজ ফ্যাক্টস তিনি তুলে এনেছেন। তিনি বলতে চাইছেন, স্যাংশনের ব্যাপারটা আর কেবল রাশিয়ার বেলায় সীমাবদ্ধ নাই। স্যাংশন   মানে এখন কেউ যেদেশ আমেরিকার কথা শুনে নাই বা নীতির বিরোধী, এমন সবার বেলায় ঘাড়ের উপর ঝুলানো এক তলোয়ার হয়ে ঝুলতে শুরু করেছে। কাজেই চীনও এখন এর আওতায়; তাতে সে আগামিতে তাইওয়ান আক্রমণ করতে যাক অথব না যাক কোন ফারাক নাই। আর এটাই চীনকে এখন বাইডেন আমেরিকান ডলারের বিকল্প – এখনই খুঁজে বের করতে বাধ্য করে দিয়েছে। কেন? এখনই কেন?

    For the United States, the frequent use of the financial sanctions weapon will accelerate the process of de-dollarisation of the world, which is tantamount to digging a grave for dollar hegemony.”

    প্রফেসর রগঅফ হিসাব দিচ্ছেনঃ এক) “আজ যে ডলার আধিপত্যের গ্লোবাল অর্থনীতির দুনিয়ায় আমরা আছি, আপনারা যদি এর একটু দুরের ভবিষ্যতের ছবিতে তাকান – বিশ্বাস করেন চীনও এমনই ভবিষ্যতের দিকে তাকাবেই। কারণ তার আছে তিন ট্রিলিয়ন (৩০০০ বিলিয়ন) ডলারের রিজার্ভ যা রাখা আছে আমেরিকার রিজার্ভ ব্যাংকে”। দুই) আমেরিকান ট্রেজারির দুই বিলিয়ন ডলারের সিকিউরিটি বন্ড কেনা আছে চীনের। এখন কোন কারণে আমেরিকা চীনের উপরও কোন অবরোধ দিলে রশিয়ার মত চীনেরও এসব অর্থ আটকে যাবে। তাই প্রফেসর বলছেন এজন্য রাশিয়ার উপর অবরোধ আরোপ দেখে চীনেরও ক্ষুব্ধ-বিরক্ত হওয়াই নয়; এর চেয়েও বড় প্রতিক্রিয়া হবার কথা সেটা বা সেগুলো কী?

    যেকোন রাষ্ট্রের জন্য উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ ধরে রাখার সমস্যাঃ
    বাইডেনের স্যংশন আরোপ এককথায় এতে স্যংশনকে  অতিব্যবহার ফলে তা অপব্যবহারের স্তরে চলে গেছে। শুধু তাই না, যেকোন রাষ্ট্রের জন্য তার উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ ধরে রাখাকে উপায়হীন স্তরে নিয়ে ফেলেছে। বাইডেনের অবরোধ আরোপের সিদ্ধান্তের অর্থ  এখন হয়ে দাড়িয়েছে যে, প্রায় সব ব্যাপারে আমেরিকার ইচ্ছা ও স্বার্থের সাথে একমত থাকা বা তাল মিলিয়ে চলতে না চাইলে সব রাষ্ট্রেরই উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ ডলারে তা সংরক্ষণ হারাম করে দিবেন তিনি।  তাহলে এখন চীন তাইওয়ানের উপর আক্রমণ করুক বা না-করুক চীনের সমস্ত উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ সংরক্ষণ এখন হুমকির মুখে। এই ব্যাপারটার দিকেই প্রফেসর মনোযোগ আনছেন।
    অনেকের মনে হতে পারে তাহলে তো বাইডেনের আমেরিকা এখন খুবই শক্তিশালী দেশ! তাই কী? এর জবাবটা হবে হ্যা এবং না। অর্থাৎ সাময়িক ভাবে হ্যা আর একটু আগামিতে  দৃষ্টি ফেললে দেখা যাবে তারা আমেরিকার ডলারের আধিপত্য ভেঙ্গে নয়া বিকল্প বের করে ফেলার পথেই। ফলে আমেরিকা তখন আর শক্তিশালী থাকবে না, বরং কোণঠাসা হয়ে পড়বে।
    তাই প্রফেসর সমস্যাটা আমাদের বুঝাতে গিয়ে আবার বলছেন, “সোনা অবশ্যই সম্পদ ধরে রাখার এক ভাল বিকল্প  উপায়। কিন্তু এর সমস্যা হল, দুনিয়ার সবদেশের ব্যাঙ্ক রিজার্ভে যে পরিমণ সোনা রাখা আছে ডলারে এর মোট মুল্য হবে ২.৩ ট্রিলিয়ন। কিন্তু এক চীনের হাতে  যে বৈদেশিক মুদ্রা  মজুদ আছে এর পরিমাণ ৩.২ ট্রিলিয়ন।

    Gold is an alternative but China’s $3.2 trillion of foreign exchange reserves is greater than the $2.3 trillion value of all the world’s central bank gold reserves.

    মানে তিনি বলতে চাইছেন এতে সোনারই অভাব পড়বে। তত সোনা বিভিন্ন  দেশের মোট রিজার্ভেও নাই। ফলে  বাইডেন দুনিয়াতে রাষ্ট্রগুলো উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ রাখার যে ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছিল তাকেই ভালনারেবল বা নড়বড়ে করে দিয়েছেন। আর এটা বলাই বাহুল্য দুনিয়া যেহেতু উদ্বৃত্ব অর্থ-সম্পদ রাখার ব্যবস্থপনাকে নড়বড়ে করে রাখা সহ্য করবে না, মানে আমেরিকান খামখেয়ালিপনা বা সকলকে জিম্মি করে রাখা সহ্য করতে পারে না অতএব দুনিয়া একটা “ডলার বিকল্প” ব্যবস্থা গড়ে তুলবেই – এটাকেই প্রফেসর বলছে এক ডলার-মুক্ত বিশ্ব হবে সেটা!!!  আর এটাকেই সম্ভবত আমরা বলি আম-ছালা দুটাই হারানো দশা!!!
    আশা করি এখন পাঠক ধরতে পারবেন কেন সোনা? কেন সোনার দাম বাড়ছে? এখন অনেক মিডিয়ায় পাবেন আমেরিকান ডলার লেনদেন ব্যবস্থার SWIFT Code – এর বিকল্প  হিশাবে কেবল শুরু করা চীনের CIPS (Cross-Border Interbank Payment System) এর কথা কেন উঠতে শুরু করেছে!

    [একটা সতর্কতাঃ অনেকে দেখা যাচ্ছে ভুল বুঝছেন তাই একটা আগাম সতর্কতা যে এটা আমেরিকার বিপক্ষে আর রাশিয়ার (মানের চীনেরও) পক্ষ নিয়ে – এভাবে তৈরি কোন লেখা নয়। এই চোখে দেখা ভুল হবে। এখানে আমার কাজ হল এভেলাবেল ফ্যাক্টস বিশ্লেষণ করে দেখানো। এমন চাপা পড়া দিকগুলোকে সামনে এনে দেয়া। আর গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় এর প্রভাব পরিণতি কী হতে পারে তা বলা বা সে ধারণা নিয়ে কথা বলা।  আশা করি পাঠক “পক্ষ-বিপক্ষের” মধ্যে আটকে থাকবেন না! ]

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০৫ মার্চ  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যার বাইরের রূপ“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক নিম্নমুখী ভাটাতে 

    ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক নিম্নমুখী ভাটাতে 

    গৌতম দাস

    ২৪ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Tp

    Capitol Hill’s Advocacy on US-India Ties: Devolution of Three Decades Of Progress

     

    ঘটনা এখানে দু’টা কিন্তু কারণ একই। বাংলাদেশ মার্কিন অবরোধের পাল্লায় পড়েছে। আর ওদিকে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক দূর থেকে দূর-অস্তে চলে যাচ্ছে। সেই সুত্রে, কোন ভারত-ঘনিষ্ট ও নির্ভরশীল কোন ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্র্ককের সুযোগ ও সম্ভাবনাঢ় বাস্তবতা ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে। এখন বাংলাদেশে মার্কিন অবরোধ না হয় দেখা-বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু তা বলে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ভাটায় চলে যাবে কেন?

    যদিও এটা ঠিক, প্রথমটার জন্য দ্বিতীয়টা ঘটছে  ব্যাপারটা ঠিক এমন নয়। তবে, সম্পর্কিত। কিভাবে? যেমন গত ১০ ডিসেম্বরের মার্কিন অবরোধ আরোপের যে ঘোষণা সেটা কেবল বাংলাদেশের উপর না আরো অনেক দেশসহ সবার বেলাতেই সাধারণভাবে বলা হয়েছিল  এই মার্কিন অবরোধের মূল কারণ – “মানবাধিকার লঙ্ঘন”। আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেনের ভাষায়, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি আর মানবাধিকার জড়াজড়ি করে থাকা শুরু হয়েছে… [to infuse human rights into its foreign policy,] । আর তা থেকেই, হ্যাঁ সেখান থেকেই বাংলাদেশে অবরোধ আরোপ আর ভারত-মার্কিন সম্পর্ক ঝুলে পড়া – এ’দুই ঘটনার পেছনের কারণ একটাই আর তা হল – (আমেরিকার ভাষ্যমতে) মানবাধিকার লঙ্ঘন। যেটা বাংলাদেশের বেলায় র‌্যাব এই প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা বিষয়টা মুখ্য, আমেরিকা সেটাই বলছে। আর ভারতের বেলায় মুখ্যত কাশ্মিরের স্বাধীনতা-স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়া, ৩৭০ ধারা বাতিলসহ জবরদস্তি কাশ্মির ভারতের মূল ভূখণ্ড বলে জুড়ে নেয়া, এই মানবাধিকার লঙ্ঘন। ঘটনা দু’টার ‘মিলের জায়গা’ এখানেই।

    ভারতে নিজস্ব ব্যবসায়ীদের অর্থে পরিচালিত একমাত্র থিংকট্যাংক ওআরএফ [ORF] বা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন। এই ওআরএফ-এর এক নিজস্ব রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল গত বছর বাইডেনের শপথ গ্রহণের পরে ২৩ এপ্রিল ২০২১। ওই রিপোর্টের শিরোনাম : হিউমান রাইটস ও মার্কিন ফরেন পলিসি : ভারত ও চীনের ওপর এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া [Human Rights and US Foreign Policy: Implications for India and China]। যার প্রথম অংশে চীনের বিরুদ্ধে উইঘুরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যতকিছু অবরোধ দেয়া হয়েছে এর তালিকা দিয়ে ভারতের জন্য তা উপভোগের, এমন ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। কিন্তু রিপোর্টের দ্বিতীয় অংশ ছিল ভারত প্রসঙ্গেঃ বলাই বাহুল্য তা ভারতের জন্য ছিল খুবই হতাশার। এমনকি সেটা প্রকাশিত হয়ে পড়েছিল উপ-শিরোনামেই। সেটা এমন : ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের (বিরুদ্ধে) ক্যাপিটাল হিল-এর অ্যাডভোকেসিঃ পরিণতিতে গত তিন দশকের সম্পর্ক অগ্রগতির উল্টা-ভ্রমণ [Capitol Hill’s Advocacy on US-India Ties: Devolution of Three Decades Of Progress]।

    ‘ক্যাপিটল হিল’ বলতে আমেরিকান কংগ্রেস বা সংসদ বিল্ডিং কমপ্লেক্স বুঝানো হয় যেখানে কংগ্রেস সদস্যরা আইন প্রণয়নের জন্য বসেন বা মিলিত হয়ে থাকেন। যেখানে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বার্ষিক “স্টেট অব দা ইউনিয়নের” ভাষণও দিয়ে থাকেন। আর সেখানেই ট্রাম্প আমলের শেষের সময় থেকেই ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রসঙ্গে একের পর এক প্রস্তাব পাস হয়েছে। তা কখনো ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দু’দলই (বাই-পার্টিজান) মিলে, আবার কখনো একা ডেমোক্র্যাট সদস্যদের উদ্যোগে। ওআরএফ-এর ওই রিপোর্ট, পাস হওয়া ওমন সব প্রস্তাবের তালিকা দিয়েছে। এনিয়ে বিস্তারে যেতে আগ্রহিরা দেখতে পারেন – Table 2: Comparison of tabled resolutions on India’s abrogation of Article 370 in Kashmir]।  আর সেখান থেকেই এই রিপোর্টটা অনুসিদ্ধান্ত টেনেছে যে, বিগত ৩০ বছর ধরে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের যে ধারাবাহিক অগ্রগতি, তা এখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব প্রস্তাবের ভেতর দিয়ে উল্টা নিম্নগতি বা ভাটার পথে হাঁটা দিয়েছে। যদিও রিপোর্টটা শুরুতে আমেরিকা এতদিন ভারতকে কত কী খাতির করেছে ও গুরুত্ব দিয়েছে এ নিয়ে অজস্র প্রশংসা ও ভারতের সুখ স্মৃতির বর্ণনা দিয়েছে। এমনকি এটাও লিখেছে যে, আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও তৎপরতা বলে যা কিছু আমেরিকা করেছে তা ভারতের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে ও ফোকাসে রেখেই করা হয়েছিল। আর তা থেকেই তা আসলে এখন কত তীব্রভাবে ভেঙে গেছে, তিন দশের ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক অগ্রগতি এখন কতটা উল্টা-ভ্রমণ করছে বলে তা হতাশার, কত গভীর বেদনা-বিধুর তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ওই রিপোর্টে।

    কিন্তু পাক্কা তিন দশক বা ৩০ বছর কেন?
    দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানের কোনো ঘটনার অনেক স্মৃতি বা পুরানা গুরুত্বপূর্ণ দিক-পটভূমি হারিয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়; কাশ্মির ইস্যু যেখানে প্রায় পঁচাত্তর বছরের পুরানা ঘটনা। এদিকে ভারতের মিথ্যা প্রপাগান্ডায় অনেকের আজ মনে হতে পারে শুরু থেকেই (১৯৪৭-৪৮) কাশ্মিরিরা বোধহয় ‘সশস্ত্র’ প্রতিবাদ করা “জঙ্গি-টেরর” , ফলে তারা খারাপ লোক! অথচ এই প্রপাগান্ডা ভিত্তিহীন, একেবারে ফ্যাক্টস লুকানো বা উল্টেদেয়া কথা। অথচ মূল ঘটনা গত ১৯৮৭ সালের কাশ্মির রাজ্য নির্বাচনে পরিকল্পিত ব্যাপক কারচুপি। ঐ নির্বাচনে রাজীব গান্ধী-ফারুক আব্দুল্লাহ (মানে তখনকার কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ও কাশ্মির ন্যাশনাল কংগ্রেসের ফারুক আবদুল্লাহর দলকে জিতানোর) এদের যৌথ ও ব্যাপক কারচুপি করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেকেই কেবল সাধারণ কাশ্মিরিদের সশস্ত্র আন্দোলনের শুরু হয়েছিল। কিন্তু তাদের এই কারচুপির পক্ষে গোপন ভাষ্যে সাফাই কী ছিল?
    তাদের খোড়াযুক্তি আর কানে-কানে প্রচার করা সাফাইটা ছিল যেহেতু ঐবছর মুফতি মোহম্মদ সাঈদের নেতৃত্বে কিছু ইসলামি দলের একটা জোট নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং তারা পপুলার ও জিতে যাবার প্রবল সম্ভাবনা; অতএব এদেরকে যেকোন উপায়ে ঠেকানো জায়েজ।  এককথায় বললে রাজীব-আব্দুল্লাহর অন্যায় জোট কাশ্মিরে আইনি রাজনীতি, প্রকাশ্য ও কনষ্টিটিউশনাল রাজনীতি আর থাকবে কিনা সে পরোয়া করলেন না। এনিয়ে আরেকটু বিস্তারিত লেখা এখানে আগ্রহিরা পড়তে পারেন।  তারা আইনি রাজনীতিক ব্যবস্থায় কবর দিয়ে হলেও কারচুপি করে মুফতি সাঈদের জোটকে পরাজিত দেখানোর জিদে ডুবে গেলেন।  আর তা থেকেই আর নির্বাচন নয়, সশস্ত্রভাবে আন্দোলন ও প্রতিবাদ জড়ো করতে হবে – এই রাজনৈতিক ধারা কাশ্মিরে মূল ফোকাস হয়ে উঠেছিল। আর তাতে এর বিপরীতে আস্তে আস্তে বিজেপি নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ির উত্থান ঘটেছিল। কাশ্মিরের রাজনীতির এই সশস্ত্র প্রকাশের কারণ হিসেবে তিনিই প্রথম মিথ্যা বয়ান চালু করলেন। তিনি দাবি করতে থাকলেন, ভারতের নিকৃষ্ট কারচুপির তৎপরতা নয় বরং উল্টা ‘সীমা পার কি আতঙ্কবাদ’ এই ভাষ্য নিয়ে আসেন। অর্থাৎ পাকিস্তানই এর জন্য ‘দায়ী’। তারা সীমান্তের ওপার থেকে অস্ত্র ও জঙ্গি-টেরর ভারতের কাশ্মিরে পাঠানোর মাধ্যমেই ভাররের কাশ্মিরকে অশান্ত করা হয়েছে। এই মিথ্যা বয়ান তিনি শুরু করেছিলেন। আর আমেরিকা প্রথমে প্রচ্ছন্নভাবে পরে ২০০১ সালের পর থেকে খোলাখুলি ওয়ার অন টেররের নামে এর ভিত্তিতে ভারতের সাথে তথাকথিত জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বয়ানে গ্লোবাল জোট বেঁধে ছিল।

    সেই ১৯৮৭ সালের পর থেকে হিসাব করলে, গত তিন দশকের ভারত-আমেরিকা সেই সম্পর্কেরই এখনকার ভাটা বা নিম্নগতির শোক আর হতাশা নিয়েই ওআরএফ-এর এই রিপোর্ট। মজার কথা হল – এই বাজপেয়িকেই তিনি  নাকি এক ‘বিরাট নরম মনের মানুষ যিনি কাব্য এবং সাহিত্যচর্চাও করেন’ বলে ভারতের অনেকে প্রচার করে থাকেন। তার কবিতা নিয়ে গান রচনাও করা হয়েছে, এভাবে তার ইমেজ নির্মাণের চেষ্টাও আমরা দেখেছি। অথচ তিনি হলেন প্রথম হিন্দুত্ববাদী যিনি সেই থেকে কাশ্মিরকে অশান্ত করা ও হত্যাকাণ্ডকে সাফাই যোগানদার প্রধান নায়ক! ভারত যখন কাশ্মিরে ব্যাপক কারচুপি, এই বিরাট অনৈতিক কাজ করে আত্ম-অপরাধবোধে হতাশায় ভুগছিল তখন এই বাজপেয়িই অসৎভাবে উল্টা পাকিস্তানকে দায়ী করে ভারতীয়-মনকে আত্ম-অপরাধবোধ থেকে বের করে নিয়েছিলেন।

    বাজপেয়ি ২০০৪ সাল মে পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর ওদিকে আমেরিকাও ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক-বন্ধনের যাত্রা শুরু করেছিল এই বাজপেয়ির হাত ধরে এবং ওই একই মারাত্মক অসৎতার ওপর দাঁড়িয়ে; ব্যাপারটাকে আতঙ্কবাদ বা টেররিজমের বিরুদ্ধে তাদের ঐক্য হিসাবে দেখিয়ে। তাই ত্রিশ বছরের রেফারেন্সটা খুব হালকা কোনো দিন গণনা নয়। তবে ভারত-আমেরিকার ত্রিশ বছরের সম্পর্ক যে এবার ঢলে পড়ছে এর গুরুত্ব বাংলাদেশে ততটা টের পাওয়া না গেলেও গত বছর বাইডেনের আগমন বা শপথের সময় থেকেই তাই ভারত এ সম্পর্কে পরিষ্কার ছিল। বাইডেনের লক্ষ্য ছিল, তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা তুলে এর আড়ালে মূলত চীনকে বেকায়দায় ফেলবেন আর এভাবেই চীনের সাথে লড়বেন, এই ছিল পরিকল্পনা। আর এই সূত্রে ভারতকেও বধ করার ইচ্ছা জেগে ওঠে। কারণ এটা আমেরিকার সব দল ও প্রশাসনের কাছেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল যে, ভারতকে খাতির করে যা লুটবার তা শেষ হয়েছে। এবার এশিয়ায় আগে বাড়তে গেলে আমেরিকাকে আর মেঘের আড়ালে থাকা নয়, সরাসরি নিজে মঞ্চে হাজির হতে হবে। আর মূলত এ কারণেই ভারত-আমেরিকা সম্পর্ককে এবার আসলে ঢেলে সাজানো, নতুন রূপ দেয়ার ইচ্ছা বাইডেনের বা ভারতের ভাষায় ‘অধোগতিতে বা ভাটায়’ প্রবেশ করা। আর এখান থেকে আমেরিকার দীর্ঘদিনের সুপ্ত ইচ্ছা বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর মোতায়েন – ভারত যেটার ঘোরতর বিরোধী; যেটাকে সে তার কুঁড়েঘরের পাশে আমেরিকার সাততলা বানিয়ে সেখান থেকে ভারতের বেডরুমের দিকে নজরদারি হিসাবে দেখে থাকে – সেই সুপ্ত ইচ্ছা এবার ভারতকে উপেক্ষা করে তা বাস্তবায়নের ফেভারেবল বা  উপযুক্ত সময় হিসাবে দেখছে।

    অর্থাৎ বাইডেনের শপথের পর থেকেই ভারত জানত, ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ভাটায় প্রবেশ করে গেছে। তাই তাদের সুখের দিন, ভারতের নিজেকে ভুয়া হলেও ‘পরাশক্তি’ ভাব ধরার দিন, সেটাও এবার শেষ। এমনকি গত ৯-১০ ডিসেম্বর ২০২১ বাইডেন মানবাধিকার সম্মেলন বা ডেমোক্র্যাসি সামিট আয়োজনের দু’মাস আগে থেকেই ভারতও তৈরি হচ্ছিল। কারণ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর বা এক মাসেরও আগে থেকে ঐ সামিটের দাওয়াতি কার্ড বিলানো শুরু হয়েছিল এবং মোদিও ওই সামিটে আমন্ত্রিত হন। তবু ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের যে তাল কেটে গেছে এর সবচেয়ে ভাল প্রকাশ হল প্রথমতঃ, আমরা এখন খুজলে দেখব মোদি ওই আমেরিকান সামিটে অংশ নিয়েছিলেন কিনা আমরা বেশির ভাগ মানুষ তখন তা খেয়াল করিনি। যার মূল কারণ হল,  মোদির যোগদান তার নিজে দেশেই হাইলাইট পায়নি বা দেয়া হয়নি। ফলে বিদেশ মিডিয়াতেও তাই ঘটেছিল। অথচ ফ্যাক্টস হল মোদি ওই ডেমোক্র্যাসি সামিটে যোগ দিয়ে অনলাইনে বক্তব্য রেখেছিলেন। তবে ওটা মানবাধিকার সামিট হয়ে দাঁড়িয়েছিল মোদি যেখানে এক অনুচ্চারিত আসামি হয়ে ছিলেন!

    এসব অস্বস্তিকর সময় ও সভা মোদিকে মুখোমুখি হতে হবে; এ তো জানা কথাই ছিল। তাই এসব কিছুটা হাল্কা করতে ওর চার দিন আগে ৬ ডিসেম্বর ২০২১ মোদি রাশিয়ার পুতিনের (মাত্র পাঁচ ঘণ্টার) এক ভারত সফর আয়োজন করেছিলেন। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় তাদের কোনো তৎপরতাকে যা মানে দিতে চায় সেই ফরমায়েশ মাফিক  রিপোর্টটা পাওয়া যায় দ্য-প্রিন্টের জ্যোতি মালহোত্রার লেখায়। কিন্তু যেখানে আবার রেগুলার বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং, এটা পাওয়া যাবে ওই একই দ্যা প্রিন্টের নয়নিমা বসুর লেখায়। নয়নিমারা হল ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বিটের সেসব সাংবাদিক যাদেরকে মন্ত্রণালয় বিশ্বাস করিয়েছে যে “ভারত একটা পরাশক্তি” হয়ে গেছে। আর তারা কোন সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকুক বা না তারা এটা বিশ্বাস করা সাংবাদিক। তেমনই আরেকজন হল, দ্যা-হিন্দুর সুহাসিনী হায়দার। সে যাই হোক, গত ৬ ডিসেম্বর মালহোত্রা লিখলেন, পুতিনের সফর নাকি এক ‘ডিফাইনিং মোমেন্ট’। কিন্তু ঠিক কী কী ডিফাইন করে বা নয়া মানে দাঁড় করানোর মুহূর্ত ছিল সেটা – তা আজো কেউ বলল না বা জানে না। এর মূল কারণ, ভারতের সব মিডিয়া এমনকি ইন্ডিয়ান বিবিসিও এর মানে দেয়ার চেষ্টা করেছে যে, তারা চীনের নাম উল্লেখ করে “চীনকে মেসেজ দিচ্ছে_ বলে জানিয়েছে। অথচ ঘটনা তো এখানে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক ভাটায় পড়েছে, খতম হয়ে যাচ্ছে – সেটা! তাহলে চীন এলো কোথা থেকে ও কেন?

    আসলে বাইডেনের আমেরিকার সাথে ভারতের বিশেষ খায়-খাতির আর ভারতই হল ‘ইন্দো-প্যাসিফিকের ফোকাস” বা সব কিছু ইত্যাদি বলে  বা কোয়াডের সদস্য বলে যে হামবড়া ভ্যানিটি আগে দেখাত সেটার একেবারে  সমাপ্তি ঘোষণা না হইয়ে গেলেও সব ঢিলেঢালা হয়ে যাচ্ছে; এটা আর লুকানো থাকছে না। আর সেই কথা টের পেয়ে যেন এখনভারতের পাশে আমেরিকা আর নাই – ফলে  এই ভারত আবার কোনো চীনা হামলার শিকার না হয়ে যায় – মূলত এই ভুয়া অনুমানের ওপর দাঁড়িয়েই পুতিনের সফর এটাকে ভারতের ‘চীনকে দেয়া মেসেজ’ হিসেবে দেখতে বলছে ভারতের মিডিয়া। মালহোত্রার লেখার শিরোনাম খেয়াল করেন, [Putin’s visit is a defining moment for India-Russia ties. It’s a telling message to China]।

    এরপরেও এখন অনেকের মাথায় প্রশ্ন আসতে পারে, বুঝা যাচ্ছে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এখন ভাটায় চলে গেছে। তার মানে কি এটা আবার আগামীতে কখনো জোয়ারে উঠতে পারে?
    অথবা একই প্রশ্নকে অন্য দিক থেকে হাজির করলে – যেমনঃ ভারতের কাশ্মিরের মানবাধিকার লঙ্ঘন অথবা একালের প্রায় সারা ভারতের মুসলমানদের নির্মূল করো অথবা এথনিক ক্লিনজিং করো ইত্যাদিতে আরো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে পড়ে ভারত আমেরিকার হাতে অভিযুক্ত হয়ে যাবার ভয়েই কি ভারতের দিক থেকে ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া? এটাই কি একমাত্র কারণ?

    এর জবাব হলো – না, এর অন্য আরেক বিশাল কারণ আছে। সেটা হল, আগামী ২০২৪ সালের নির্বাচন!

    আগামী ২০২৪ সালে নির্বাচনে বিজেপি বা ওর হিন্দুত্ববাদই নির্মূল হয়ে যেতে পারে :
    একালের ভারতে বিজেপি-আরএসএস বা মোদি একেবারে চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া মানে হিন্দুত্ববাদ প্রথমবারের মত উৎখাত হয়ে যাবার মত অবস্থায় পড়েছিল গত বছর। গত মধ্য মার্চে ভারতে নেমে এসেছিল করোনাভাইরাস আক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় আক্রমণের ঝড়! সারা ভারত তাতে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। অক্সিজেন, বেড আর সৎকার, এসব পাওয়ার পুরাপুরি অনিশ্চয়তা – এটাই হয়ে উঠেছিল ভারতের মুখ্য পরিচয়। আর মোদি যার প্রতীকী এবং এক অসহায় প্রধানমন্ত্রী রূপ। সৌদি আরব অক্সিজেন ভরা ট্যাংকার পাঠিয়েছে কার্গো প্লেনে করে কিন্তু তা দেখাতে গিয়েও মোদির ইজ্জত যায় অবস্থা! যেন মুসলমান সৌদি আরব তো নিচা; তার সাহায্য মোদি নিয়েছে এটা কেমন দেখায়? আর তা দেখেই দ্যা-হিন্দুর সুহাসিনী হায়দার  প্রথম নিশ্চিত হয়েছিলেন যে ভারত আসলে  নিশ্চয় কোন পরাশক্তি নয়!!! নইলে সৌদি সাহায্য নিবে কেন???

    জীবিত মানুষ আর মৃত-লাশের গভীর সম্পর্কঃ
    মানুষ মারা যাবার পরে একটু সম্মানজনক সৎকারও যদি নাই জোটে তাহলে আর বেঁচে থাকতে আমি হিন্দু কি না, আমার হিন্দুত্ব শ্রেষ্ঠ কি না এসব গল্পে কাম কি? এসব কোনো কাজে লাগবে? এর কি কোনো জবাব আছে? আসলে এসব প্রশ্ন ছেয়ে ফেলেছিল সে সময়ের মোদির হিন্দুত্বের ভারতে!   মূল কারণ, মানুষ মূলত যেকোন মৃতব্যক্তির লাশের মধ্যে নিজেকে দেখে, দেখতে পায়, সে মরলেও তাকে কোনো অশ্রদ্ধা অসম্মান করা হবে কিনা – ব্রিজের উপর থেকে তাঁর লাশও নদীতে ফেলে দেয়া হবে কি না! বা নদীর ধারের বালিতে লাশ ফেলে পালিয়ে আসবে কি না কিংবা, নদীর পাড়ে কোনোমতে বালিচাপা দিয়ে পালাবে কি না; অথবা যা পরে ভাসেতে ভাসতে গঙ্গা নদী ধরে আরেক রাজ্যে পঁচা-গলা লাশ হিসাবে উঠবে কীনা …… ইত্যাদি। সারা ভারতের মানুষ এসব দেখে মানে নিজের সম্ভাব্য পরিণতি দেখে আঁতকে উঠেছিল!!! ভারতের মানুষেরা নিজের এই পরিণতি এই অপমান অশ্রদ্ধা দেখে ফেলেছিল। এসব কাণ্ড যেকোনো মানুষের জন্য নিজের বেলায়ও ঘটতে পারে, এই অনুমান- আর এই অনুমান নিয়েও এর পরে বেঁচে থাকা অর্থহীন! আর এসব ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন মোদি! এটা একা কোনো ভারতীয় মানুষ নয়। সারা ভারতের মানুষের কাছে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল এই জীবন, তাদের এই বেঁচে থাকা কী দরকার; এটা অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন? হিন্দুত্বের মোদি ভারতের প্রতিটা মানুষকে এমন অভিজ্ঞতা ও অনুভব এনে দিয়েছিলেন!
    মোদি এসব জানতেন যে তার সম্পর্কে মানুষের গভীর মনে অন্তঃস্থলে তিনি কী পরিচয়ে আছেন?? তিনি প্রচন্ড ভীত হয়ে পড়েন!

    সেই ঘটনাকাল ছিল মোদির দ্বিতীয় টার্মের মাত্র দ্বিতীয় বছর শেষে (২০১৯ সালের মে মাস থেকে তিনি সেকেন্ড টার্মের প্রধানমন্ত্রী)। তবু মোদি বুঝে যান, আশঙ্কিত হন যে, তার হিন্দুত্ববাদের আয়ু এবার এসব হতাশ মানুষের হাতে শেষ হয়ে যেতে পারে। তাই তখন থেকে মোদি বিজেপি-আরএসএস এদের সবার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে দাঁড়ায় – ২০২৪ সালের নির্বাচনে হবু বিপর্যয় অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদের সম্ভাব্য নির্মূল হয়ে যাওয়া- এটা যেকোনো উপায়ে ঠেকানোই তাদের বাকি তিন বছরের একমাত্র কাজ!

    কিন্তু তাতে কী? ঘুরেফিরে সব কথার শেষে যেখানে এসে ঠেকে সেই একই কথা। মুসলমান কোপাতে হবে, ইসলামবিদ্বেষ – এটাই একমাত্র ভরসা। হিন্দুত্ববাদের দিকে ভোটার ফিরানোর একমাত্র উপায়। এ কারণেই ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, বাইডেন যতই মোদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অবরোধের ভয় দেখান না কেন মোদিকে আরো বেশি করে এখন মুসলমান কোপাতেই হবে – তা কাশ্মিরে বা সারা ভারতে। এটাই তার রাজনৈতিক আয়ু লুপ্ত হওয়া ঠেকানোর একমাত্র উপায় যার সোজা মানে আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাইডেনের সাথে মোদি ভারতের সম্পর্ক আর ভাল হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই বরং আরো সঙ্ঘাতেরই সম্পর্ক হবে। অন্তত ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত!
    অবস্থা এখন এমন যে ইমরান খানের পাকিস্তান এই প্রথম এক নিজ ‘জাতীয় নিরাপত্তা পলিসি” [NSP] প্রণয়ন করেছে। যেটা আগের মত গতানুগতিক কেবল ভারতবিরোধিতার উপর দাঁড়ানো নয়। আর কেবল সরাসরি সরাসরি সামরিক নয় বরং সামগ্রিক। এটা নিয়ে ভারতের মিডিয়াও পাকিস্তানের সহবস্থানের মনোভাবে লেখা এই নীতির প্রশংসা করেছে। এছাড়া প্রফেসর আয়েশা সিদ্দিকা যিনি পাকিস্তান অরিজিন লন্ডন  SOAS এর শিক্ষক কিন্তু  যিনি তার সেনা-ঘৃণা ম্যানিয়াকের জন্য কুখ্যাত, তিনিও অংশত এই পলিসিকে খারাপ বলতে পারেন নাই। পরোক্ষে প্রসংসা করেছেন বলা যায়। কিন্তু এত কিছুর পরেও মোদি বা তার সরকার এর সুযোগে ইমরানের সঙ্গে সম্পর্ক ভাল করার দিকে আগাবেন সেই সুযোগ মোদির নাই। কারণ ইমরান কেন যেকোন পাকিস্তানই তার কাছে এখন একমাত্র একটাই প্রয়োজনীয় – পাকিস্তান কোপানো মানে মুসলমান কোপানো আর তাতে ততই হিন্দুভোট নিজ বাক্সে — এই চিন্তার বাইরে যাবার অবস্থায় নাই মোদি। বরং ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে আরেকবার ফেক একটা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হচ্ছে এই রচনা আর মোদি তাতে বিজয়ী এটা দেখানো যায় কী করে এটাই মোদির লক্ষ্য আর তিনি তা খুজছেন!!

    এই একই সুত্রে, কাজেই বাংলাদেশেও সরকারের সাথে ভারতপ্রীতির সম্পর্ক ঠিক যেমন আমরা আগে ২০১২ সালের পরে দেখেছিলাম, তেমন আর হওয়ার সম্ভাবনাময় নয়। অর্থাৎ মার্কিন অবরোধ হয়েছে বলে, হাসিনার ভারতপ্রীতির সম্পর্ক আগের মতই পুনরায় উত্থিত হচ্ছে না। মূল কারণ, এখনকার ভারত নিজেই বাইডেন প্রশাসনের চোখে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আসামি বলে দূরে দূরে থাকছে।  অর্থাৎ আগে ভারত-আমেরিকার স্ট্রাটেজিক বন্ধুত্ব জোরদার ছিল বলেই হাসিনা সরাসরি আমেরিকাকে এড়িয়ে ভারতের মাধ্যমে আমেরিকান চাহিদা পূরণের চেষ্টা করতে পারত। আর এতে ভারত সরকার এবং এমনকি ‘র’-এর বহু অন্যায় আবদার হাসিনাকে সহ্য করতে হত। সেসব পরিস্থিতি গত ১৬ ডিসেম্বরের পরে একেবারেই লক-আপ হয়ে গেছে। যা আর ফিরবে না। মূল কারণ, ভারত-আমেরিকান সম্পর্ক দূর অস্তে চলে গেছে। এটা কোনভাবেই আর আগের সময়কালে একেবারেই নাই। আর এটা যে নাই তা সবগুলো পক্ষের কাছেই উদাম।  উপায়ন্ত না পেয়ে  ওআরএফ-এর আরেক ফেলো, সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর লেখায় তার ছাপ পড়েছে। গত ১৬ ডিসেম্বর তিনি ওআরএফ-এর সাইটে যে লেখা দিয়েছেন তাতে চীনার পাকিস্তানকেই কোপানোর চেষ্টা করে গেছেন। সাথে যেমন বলেছেন, বাংলাদেশের সাথে ভারতের “অনন্য সম্পর্কটা” চীনের কারণে “উদ্বেগজনক প্রতিবন্ধকতা” হয়ে দাড়িয়েছে। ঐ লেখার লম্বা শিরোনামটা  হলঃ “এক অনন্য সম্পর্কের সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন: উদ্বেগজনক প্রতিবন্ধকতার মাঝেও ভারত এবং বাংলাদেশের উন্নয়নে অংশীদারিত্ব” – এর মূল  অর্থ এটাই। আরো সোজা করে বললে পিনাক সবকিছুকে নামিয়ে এনেছেন ভারতের অস্ত্র কেনায় বাংলাদেশের আপত্তিতে।
    ঠিক যেমন ও যে কারণে ভারত কোন চীনা অস্ত্র কিনে না, কিনবেও না; সস্তা ও মাঙনা হলেও নিবে না – ঠিক একই কারণে বাংলাদেশ ভারতের অস্ত্রের গুনাগুণ নুন্যতম ভাল কোয়ালিটির হলেও অথবা তা বাংলাদেশকে মাঙনা দিলেও বাংলাদেশ নিবে না।  এটা পানির মত সরল সত্য! এটা না বুঝার কিছু নাই। কিন্তু না বুঝার ভান ধরে পিনাক রঞ্জন এখন চীনের বিরুদ্ধে কামান দেগেছেন ঐ লেখায়। আবার এনিয়ে একটা মিথ্যা বা শব্দ বদল করে নেয়া ক্যাম্পেইনও করছে অনেকে। শিরোনাম লিখেছে,   “চীনের ওপরে বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে: পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী! – এভাবে। যেটা করেছে ক্যাম্পেইন পত্রিকা আমাদের সময়। অথচ পিনাক রঞ্জনের মূল বক্তব্যে ছিল,  “চিন থেকে আমদানি করা সামরিক সরঞ্জামের উপরে বাংলাদেশের অতি নির্ভরতা ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে”। মূল লেখা ওআরএফ-এর বাংলায় সাইট থেকে দেখতে পারেন এখানে।  অর্থাৎ সাধারণভাবে সব ব্যাপারে বাংলাদেশে চীন-নির্ভরতা নাকি কেবল অস্ত্র কিনাতে এই নির্ভরতা – এই দুটাকে এক করে প্রপাগান্ডা করা হচ্ছে। পিনাক রঞ্জন এখানে কেবল “অস্ত্র কেনার” ক্ষেত্রের কথা তুলেছেন।

    তবে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক ঢলে পড়া ভা ভাটায় চলে যাওয়া নিয়ে  ইতোমধ্যেই এর ছাপ পড়া শুরু হয়েছে ভারতের থিংকট্যাংকের লেখা বা রিপোর্টে। আমেরিকা ভারত থেকে অনেক দূরের কেউ – এই অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে তারা লিখছে আর সাথে আমেরিকার এশিয়ায় উপস্থিতিতে কী কী খামতি সেখানে আছে এমন মৃদু সমালোচনাও সেখানে এখন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। যেমনঃ “আমেরিকা কি অবশেষে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সঠিক ভাবে পা ফেলছে?” – এটা ওআরএফ-এর আরেক ফেলোর লেখা, এখান এমন সুর দেখা যাবে। যা অনেকটা ডিভোর্স হয়ে যাওয়া বউ/স্বামী এর সাথে সামাজিকভাবে দেখা হয়ে গেলে যেমন হয়, সেরকম! আমেরিকান থিংকট্যাংক কলামিস্ট রাইটার কুগেলমানও ব্যাপারগুলো আমল করছেন, দেখা যাচ্ছে।
    সব মিলিয়ে  নতুন করে এক ‘গ্লোবাল পোলারাইজেশন’ সাজিয়ে উঠা আসন্ন হয়ে উঠছে মনে হচ্ছে!
    আর ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে ভাটা – এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে ও আরও হবে ভারতের। বাংলাদেশ তী ভারতেরই – যেন তার গ্রামের বাগানবাড়ি – এই অতি আহ্লাদ এখন শুকিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে। অনেকের অনুমান এটা শেষ হবে  ২০০৬ সালের আগের ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের যায়গায় –  “ব্যাক টু দ্যা প্যাভেলিয়ানে”!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২২ জানুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে ভাটা, কার কাজে লাগবে”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নতুন মেরুকরণ, ভারতের কী কোয়াড ত্যাগ!

    নতুন মেরুকরণ, ভারতের কী কোয়াড ত্যাগ!

    গৌতম দাস

    ০২ এপ্রিল ২০২১, ০০ঃ০৬
    https://wp.me/p1sCvy-3uj

    বাংলাদেশের ৫০ বছরপুর্তির ২০২১ সালের ২৬ মার্চ পার করেছে। আর এ’বছরেরই ২০ জানুয়ারি মানে মাত্র দুমাস আগে প্রেসিডেন্ট বাইডেন ক্ষমতাসীন হবার শপথ নিয়েছেন। আমরা অনেকেই দেখার জন্য উদ্গ্রীব ও আগ্রহি ছিলাম যে ট্রাম্পের পাগলামি-উত্তর বাইডেন নতুন কী রাজনীতি নিয়ে আসেন। বাংলাদেশে এর কী প্রভাব পরে ইত্যাদি। অপেক্ষার পালা একটু দীর্ঘ হয়ে যাওয়াতে আমাদের মন-সংযোগ একটু ঢিলা পড়ে গিয়েছিল হয়ত আর এই ফাঁকে বেশকিছু গুরুত্বপুর্ণ ইঙ্গিত বা ঘটনার প্রকাশ ঘটে গিয়েছে। এই বিচারে গত ২৬ মার্চ মোদীর মত আরএসএসের ক্যাডার তিনি বাংলাদেশের ৫০ বছরপুর্তির প্রধান অতিথি হয়েছেন বলে নয়, এর চেয়েও বড় তাতপর্যপুর্ণ ছিল মোদীর এই সফর। যেটা বাইডেনের ২০ জানুয়ারিতে শপথের সময় কেন ২০ ফেব্রুয়ারিতেও আগাম বুঝা যায় নাই যে পরের মাসে ২৬ মার্চ এত তাতপর্যপুর্ণ হয়ে যাবে। যেমন এখন হয়ত আমাদের মনে পড়বে,  আমরা মনে করতে পারি, এবার ২৬ মার্চের প্রধান অতিথি কে হবেন ভারতের কসাই মোদী না তুরস্কের এরদোয়ান, এই আলাপ উঠতেও আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু বরং মার্চ মাস শুরু হবার পর ক্রমশই মোদীরই প্রধান অতিথি হওয়া ক্রমশ এক বিরাট গুরুত্ব নিয়ে হাজির হতে শুরু করেছিল। কেন?

    নতুন করে গ্লোবাল পোলারাইজেশনঃ আমাদের অনুমানের চেয়েও দ্রুতগতিতে এটা আগাচ্ছে। আর বলাই বাহুল্য ট্রাম্পের আমল পর্যন্ত আমরা কোয়াড (চীনবিরোধী চার রাষ্ট্রীয় জোট- আমেরিকা-ইন্ডিয়া-অষ্ট্রেলিয়া-জাপান) আর  সাউথ চায়না সি কেন্দ্রিক ইন্দো-প্যাসিফিক স্টাটেজি (উদ্যোগ) – এদুটার কথা জোরেশোরে শুনে আসছিলাম। ফলে “কোয়াড” ও “ইন্দো-প্যাসিফিক” কেন্দ্রিক পোলারাইজেশনই আগামিতে প্রধান হবে ও বাড়বে এমনটা ধরে নিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু না, তা আর হচ্ছে না। এই ইঙ্গিত এখন পরিস্কার। বাইডেনের শপথ নেয়ার দুমাসের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে বহু উলট-পালট হতে শুরু করেছে। আর এরই মাঝে বাইডেনের নিজের ফরেন পলিসির প্রায়োরিটি এর নিজের নতুন বৈশিষ্টগুলো নিয়ে দোকান সাজিয়ে বসা মাত্র পালটা প্রতিক্রিয়াও শুরু এবং তা থেকেই নতুন করে নতুন পোলারাইজেশন এবং তা ব্যাপকভাবে ঘটতে শুরু করেছে। এছাড়া আবার  এককথায় মেরুকরণ যা ভাবা হয়েছিল বাইডেলের আমলে পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই বাইডেনের ইচ্ছা আকাঙ্খার বাইরে চলে যাচ্ছে। যেমন, কোয়াড থেকে ভারতকে বেরিয়ে যেতে হবে – এটা ধরে নিয়ে ভারত ইতোমধ্যেই আগানো শুরু করে দিয়েছে।

     এবার পোলারাইজেশনের রঙ্গমঞ্চ বঙ্গোপসাগরঃ আগের অনুমিত সাউথ চায়না সি,যেটা সমুদ্রপথে চীনে প্রবেশমুখ, ঠিক সেটা এখানে আর মূল রঙ্গমঞ্চ বা থিয়েটার থাকছে না। নতুন কেন্দ্র হতে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগর। এর উপর আবার এতে ভারত, বাংলাদেশ বা মায়ানমারের – এভাবে বঙ্গোপসাগর এই তিনদেশের  মধ্যে থাকলেও বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরই হচ্ছে ফোকাস।  অন্তত আমেরিকান ফোকাস। কেন এমনটা ঘুরে গেল?

    দুটা কারণে এই পরিবর্তন। পরপর বলে যাব। তবে পাঠক চাইলে নিজের মত আগেপিছে করেও পড়তে ও বুঝতে পারেন।

    প্রথমটাঃ  এখানে পরপর দুটা ট্রিগার টিপা হয়েছে। প্রথম ট্রিগার টানার ঘটনাটাই প্রথমে রেখে বলছি। এশিয়ায় আমেরিকা নতুন রূপে হাজির হয়েছে, এটাই ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের হানিমুনের সমাপ্তি ঘোষণার ট্রিগার হতে যাচ্ছে। চীনবিরোধী আমেরিকা-ভারত এই ঘনিষ্ঠতার ব্যাকগ্রাউন্ড অনেক পুরানা, তৈরি শুরু ২০০৪ সালে। অবশ্য এরও আগেই বিজেপির বাজপেয়ির আমলে আমেরিকার ওয়ার অন টেররের নৌকায় ভারত নিজ কিছু শর্ত দিয়েছিল যে তাদের আতঙ্কবাদের (মানে পাকিস্তানকে টেরর-কান্ট্রি ধরে নিয়ে সেই চোখে দেখতে হবে) উঠে গিয়েছিল। পরে ভারতের ২০০৪ সালের মে মাসে মনমোহন সিংয়ের প্রথম টার্মের প্রধানমন্ত্রীত্ব শুরু হয়েছিল। আর ২০০৬ সালের মার্চে বুশ প্রথম ভারত সফরে আসেন। আর তাতে যুগান্তকারি ঘটনা ছিল প্রথম আমেরিকান অস্ত্র এমনকি পারমানবিক কাঁচামালও ভারতকে বিক্রি এবং ভারতকে চীনবিরোধী করে (বয়ান মুখে তুলে দেয়াসহ) আকার-প্রকার দেয়া সবই এই সফর থেকে শুরু হয়েছিল। এরই ফরমা্ল নাম ছিল চায়না কনটেইনমেন্ট মানে চীন ঠেকানোর কাজটা ভারতকে ঠিকা দেওয়া।
    আমেরিকার এতে মূল উদ্দেশ্য ছিল রাইজিং ভারতকেও চীনেরবিরুদ্ধে ব্যবহার। কিন্তু মুদ্রার এপিঠের উল্টোদিক মানে তাতে আমেরিকান উলটা আরেক ফরেন পলিসিও ছিল, যেটা তখন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। সেটা হল, বঙ্গোপসাগরে আমেরিকান সপ্তম নৌবহর স্থায়ীভাবে নোঙর করার ইচ্ছা। যেটাকে ভারত জেনে সবসময়ই দেখে এসেছে গরীবের একতলা বাডির পাশেই বড়লোকের সাততলা বাড়ি বানানো আর ভারতের ঘরের ভিতরে কী ঘটছে সেদিকে নজরদারির চোখ ফেলা। আমেরিকা তার এই লুকিয়ে ফেলে রাখা জিনিষটা এতদিন লুকিয়ে রেখেই চীনবিরোধী নানাকিসিমের “ভারত-আমেরিকান সহযোগিতা” বলে ভারতকে দিয়ে কাজ করিয়ে চলছিল। সেটাই এবার স্থগিত, একাবারেই শুকিয়ে যাবে।

    কারণ, বাইডেনের আমলে তিনি এখন চায়না কনটেনমেন্টের চেয়েও বঙ্গোপসাগরে পড়শি সকলের ঘরে নজরদারি ফেলা – এটা আমেরিকার জন্য গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ মনে করে আগানো শুরু করেছে। মানে এতদিন এশিয়ায় ভারতের পড়শিদেশগুলোতে (বা ভারতের কথিত নিজ-প্রভাবাধীন অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর) সবখানে চীন ঢুকে পড়তেছে বলে অনবরত খামোখা ভারতের ন্যাগিং দেখছিলাম আমরা। যার ভিতর আমেরিকা ভারতকে আরো তাল দিত, আর বলত চীন ভারতকে নাকি মুক্তামালার মত ঘিরে ফেলছে। কিন্তু এখন? সেখানে এখন চীন-ভারতের কথিত প্রতিযোগিতার মধ্যেই বাইডেনের আমেরিকা নিজেও এক প্রার্থী হিসাবে মঞ্চে হাজির হবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এনিয়ে হাতের কাছে ভাল ইঙ্গিত-প্রমাণ হল, আলী রীয়াজের প্রস্তাব বাংলাদেশ যেন আমেরিকার সাথে মিলে “বঙ্গোপসাগরকে হাব” বানায় অথবা “বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশেরই উচিত নিজেদের স্বার্থ ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে অগ্রসর হওয়া”……।

    আমেরিকান এমন অবস্থান থেকেই আসলে ট্রিগার পয়েন্ট হল বাইডেনের আমেরিকার “বঙ্গোপসাগরের খায়েস” প্রকাশ হয়ে পড়া। কিন্ত এথেকে ভারতের প্রতিক্রিয়ায় তাতে এরচেয়েও বড় ট্রিগার টিপতে প্রস্তুত এখন ভারত। কি সেটা?

    দ্বিতীয়টাঃ আগেই বলেছি আমেরিকার এতদিন লুকিয়ে রাখা এই খায়েস যেকোন সময়ের জন্যই ছিল ভারত-আমেরিকার মাঝে চরমতম শত্রুতা শুরু করার সুপ্ত পয়েন্ট। ভারত এতই কঠোরভাবে সবসময় আমেরিকান এই খায়েসের বিরুদ্ধে ছিল ও আছে। ভারতের এত শত্রুতা-জ্ঞানবোধ চীনের বিরুদ্ধেও সম্ভবত নাই। ভারতের সব সরকারই এবং ইল্টেলেক্টরাও মনে করে এসেছে এটা ভারতের জন্য এতই ক্ষতিকর যে আমেরিকা এতে ভারতের সব উত্থান সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দিবে। তাই বাইডেন যতটা না ট্রিগার টেনেছেন এর চেয়েও প্রকাশ্যে ট্রিগার ইতোমধ্যেই ছোড়া শুরু করে দিয়েছে ভারত। এরই একটা পর্ব ছিল ২৬ মার্চ মোদীর বাংলাদেশ সফর। সেটা কী রকম?

    কমন এনিমির বিরুদ্ধে এক হওয়াঃ  অর্থাৎ এবার আমরা জানতে পারছি যে  এতদিনের ভারত-আমেরিকার চীনবিরোধী যে গভীর আত্মীয়তা চলেছিল এর দিন শেষ হয়েছে। আমেরিকাই এখন ভারতের প্রধান এনিমি। এদিকে আমরাও অনেকবার দেখেছি ও বলে এসেছি যে, আমাদের সরকার গত চৌদ্দবছরের চড়াই-উত্রাইয়ে  সবচেয়ে কম আস্থা রেখে এসেছে আমেরিকার উপর; তা সে ওবামা,  ট্রাম্প বা বাইডেন যারই আমেরিকা হোক। এমনকি সরকারের আয়ু বাড়ানো প্রস্তাব বা আলী রীয়াজের প্রস্তাব যতই লোভনীয়ভাবে হাজির করা হোক না কেন এথেকে দূরে থাকলেই তা সরকারের আয়ুর স্বার্থে যাবে বলে আমাদের সরকার মনে করে এসেছে।  এই সুত্রেই  এবার মাঠে ভারত-বাংলাদেশ দুই সরকারের এক কমন এনিমির আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থানের প্রশ্নে ঘনিষ্ট হওয়া ও পরস্পরকে রক্ষায় সহায়তা করার এক বাস্তবতা হাজির হয়েছে, মনে হচ্ছে। প্রায় ঠিক যেমনটা এর আগে সুজাতা সিংয়ের সফর থেকে ২০১৪ সালের শুরুতে যে নির্বাচন ওর প্রাক্কালে যেটা হয়েছিল। অনুমান করা যায় গত ২৬ মার্চ ছিল এই গুরুত্বপুর্ণ প্রসঙ্গে তাদের সিরিয়াস আলোচনার এক ভাল সময়। এটাই স্বাভাবিক।

    তাহলে বাইডেন কী বোকা মানুষ, তিনি কেন বঙ্গোপসাগর সেভেন্থ-ফ্লিট মোতায়েনের আকাঙ্খার ইঙ্গিত এসময় হাজির করতে এলেন? না; অবশ্যই তিনি বোকা নন। মূল কারণ ইতোমধ্যেই  আমেরিকা ভারতকে কোয়াড থেকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারে এর সম্ভাবনা শুরু হয়েছে। যেমন ব্যাপারটা দেখছে রাশিয়া। রাশিয়ান ভাষ্য হল, US Will ‘Expel’ India From Quad।   আবার ভারত নিজেই নিজেকে কোয়াড থেকে বের করে নিতে যাচ্ছে তা আসন্ন  – এটা ভারত-আমেরিকা দুপক্ষের কাছেই পরিস্কার হয়ে উঠেছে। কিভাবে?

    দুই ইস্যু এস-৪০০ আর হিউম্যান রাইটঃ
    এস-৪০০ এটা রাশিয়ার তৈরি এক এন্টি এয়ারক্রাফট সিস্টেম যা আমেরিকার এফ-৩৫ এর মত যত বোমারু বিমান আছে সেসবের ‘যম’ মনে করা হয়। যেমন আমেরিকার ভাষায়, “এস-৪০০ এর কাছাকাছি স্থানে এফ-৩৫ চালানো অনুচিত”। কারণ, তা ঐ বোমারু বিমানকে নামিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু এনিয়ে আমেরিকার মূল নীতি অবস্থানটা হল আরো কঠিন। তা হল, একই দেশের হাতে একসঙ্গে এস-৪০০ আর এফ-৩৫ এর মত কোন বোমারু বিমান থাকতে পারবে না। তাই সোজা সিদ্ধান্ত যে দেশ এস-৪০০ কিনবে আমেরিকা তার উপর বাছবিচার ছাড়াই অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করবে। অনেকেই ভেবেছিল এটা বোধহয় কেবল পাগলা ট্রাম্পের কথা। কিন্তু এখন সবাই পরিস্কার যে এটা বাইপার্টিজান – খোদ পেন্টাগনের অবস্থান। তাই যে এস-৪০০  কেনাটা শুরু হয়েছিল তুরস্ককে দিয়ে তা এখন পাকিস্তান, ভারতসহ যারা যারা এমন যে কেউ কিনবে ভেবেছে, তারা সবাই আবার সাথে ভেবেছিল যে কেবল তার বেলায় অনুরোধ করলে আমেরিকান প্রশাসন বিশেষ ছাড় দিবে – কিন্তু এখন সবাই বুঝে গেছে, এটা সবার ক্ষেত্রেই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
    শুধু তাই না, ব্যাপারটা আরো এগিয়ে কঠিন হয়েছে ভারতের বেলায়। এপ্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান অনেক শক্ত ও আগাম নির্ধারিত। এতদিন  ভারত মনে করে এসেছিল ভারতকে আমেরিকারই নিজ স্বার্থে দরকার আর ভারতও রাইজিং। ফলে আমেরিকা যদি বিশেষ ছাড় না দেয় তবে ভারত আমেরিকাকেই ত্যাগ করে হলেও এস-৪০০ কিনে নিজের সামরিক বহর সাজাবেই। এই প্রসঙ্গে সর্বশেষে দেনদরবার হয়ে গেল গত ১৯ মার্চ থেকে তিনদিনের বাইডেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিনের ভারত সফরে [Russian Arms Sale Clouds U.S.-India Ties]। এতে দুপক্ষই কড়া শেষকথা শুনে বুঝে যায় কোন পক্ষই সরতে পারছে না।
    ওদিকে ইতোমধ্যে বহু আগে মানে নির্বাচনে প্রচারণার সময় থেকেই বাইডেন পরিস্কার করে উল্লেখ করে আসছেন কাশ্মীর ইস্যু ও মুসলমানদের উপর হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের ইস্যুতে তিনি ক্ষমতাসীন হলে সরব অবস্থান নিবেন।  কিন্তু এদুটাই মোদীর ভারতের নির্বাচনে হিন্দু মেরুকরণ করে তাদের ভোট বিজেপি-বাক্সে তোলার গুরুত্বপুর্ণ কৌশল যা তিনি কোনভাবেই ত্যাগ করতে চান না বা পারবেন না। অতএব এস-৪০০ আর হিউম্যান রাইট – এদুই বড় সংঘাতের ইস্যুতে আমেরিকা-ভারত বিচ্ছেদের ঘোষণা এখন  যেকোন সময়ের ব্যাপার।

    ইতোমধ্যেই প্রথম প্রকাশঃ বার্মা
    গত শনিবার ২৭ মার্চ ছিল বার্মার সামরিক বাহিনী দিবস। মায়ানমার যা কার্যত সামরিক বাহিনীর মালিকানাধীন এক রাষ্ট্র সেখানে এই দিবসের তাতপর্য আমরা অনুমান করতে পারি। এক রিপোর্ট বলছে, বার্মায় ৪২ বিদেশি মিশন আছে যাদের এমবেসিতে “মিলিটারি এটাসে” পদ আছে আর তাতে কেউ আসীন হয়ে বার্মায়  উপস্থিত  আছেন। এদের মধ্যে আটজন এটাসে [attaché] ঐ প্যারেড অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন।  জাপানি নিক্কি পত্রিকা বলছে ঐ দেশগুলো হল, Russia, China, India, Pakistan, Bangladesh, Vietnam, Laos and Thailand ।  মানে ঐ আট রাষ্ট্রের মধ্যে ভারত গুরুত্বপুর্ণ এক রাষ্ট্র। এর মানে  যে ভারত  তার কোয়াডের সব বন্ধুদের  ত্যাগ করেছে যা পক্ষ বদল করেছে বলা যায়, আর এভাবে প্রকাশ্যে তার মিলিটারি এটাচে হিসাবে একজন ঐ প্যারেডে যোগ দিয়েছিল। এমনকি  বাংলাদেশও রোহিঙ্গা ইস্যু বর্তমান তাসত্বেও “ব্যবহারিক কারণে”, [pragmatic attitude]ভারত-চীন-রাশিয়াকে অনুসরণ করেছে। তার চেয়েও বড় কথা এতে সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী অতিথি ছিলেন রাশিয়ার ডেপুটে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আলেকজান্দার ফোমিন।
    মূলকথা,বাইডেন তার নিজের পলিসি-স্বার্থগুলো খুলে বসাতে এবার নতুন করে এক ব্যাপক গ্লোবাল পোলারাইজেশন এর বাস্তবতা হয়ে গেছে। শুধু তাই না এই আট দেশের মিলিটারি এটাসে দের একসাথে অংশগ্রহণ এটা যেন বাইডেনের বিপরীতে চীন-রাশিয়া পক্ষ দেখাতে চেয়েছে যে তাদের পক্ষে কে কে আছে। আসলে ভারত পক্ষ বদলিয়েছে এটাই পুরা প্রদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। আর যেন বাইডেনকে দেখানো যে তোমার পক্ষের ভারত আর তোমার সাথে নাই।

    কে কোন পক্ষে থাকছেঃ
    জিনজিয়াং-উইঘুরে মানবাধিকার ভায়োলেশন ইস্যুতে বাইডেন ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সাথে পেয়েছিল। একসাথে তারা এই ইস্যুতে চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান দেখিয়েছিল। কিন্তু তাতে আবার বড় ক্ষত ও বাইডেনের দুর্বলতার দিকটা সব সময় আছে যে, উইঘুরে মানবাধিকার নিশ্চিত করার চেয়ে চীনবরোধী জোট পাকায়ে চীনের থেকে বৈষয়িক সুবিধা হাসিল করা এতদিন পশ্চিমের মূল উদ্দেশ্য  হয়ে এসেছে।  সোজা কথায়,  পশ্চিম এখন পর্যন্ত সবসময় এভাবে মানবাধিকার ইস্যু তুলেছে কিন্তু শেষে তা বিক্রি করেই খেয়েছে। কাজেই পশ্চিম এই নৈতিকতার সংকট খুবই মারাত্মক থেকেছে। যেমন বার্মার ২০০৮ সালের গঠিত কনস্টিটিউশনে  আর্মি রাজনীতিতে অংশ নিবে সহ সব নির্বাহী ক্ষমতার ভাগীদার থাকবে  – সেকথা লেখাই আছে। আর সেসব কথা থাকা সত্বেও কি আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জেনারেলদের প্রশংসা করে গো এহেড অনুমোদন দেয় নাই, জেনারেলেরা গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু কল বলে সার্টিফিকেট দেয় নাই? তাহলে আজ প্রতিদিন বার্মায় প্রতিবাদকারিরা হত্যার শিকার হলে এখন সহানুভুতির নাকিকান্নার উদ্দেশ্য কী? ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা খেদানো যখন চলছিল তখন আমেরিকা চীন-ভারতের সাথেও গলা মিলিয়ে কথিত আরসা আক্রমনের গল্প ফেঁদেছিল যেটা ছিল বার্মার জেনারেলদের হল্প আর সেটাই আমেরিকানেরা আমাদের কাছে সাফাই দিয়েছিল যে আরসার কথিত আক্রমণের কারণেই নাকি পাল্টা রোহিঙ্গা খেদানোর শুরু।
    সোজা কথায় মানবাধিকারের ইস্যু বিক্রি করে চীনের কাছ থেকে সুবিধা আদায় – এদিকটাই প্রধান পশ্চিমা স্বার্থ, সেটাই অনেকদিন থেকেই এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে।  ফলে বাইডেনের যে মেরুকরণ দাড়াচ্ছে চীন-রাশিয়ার বিরুদ্ধে – এই বাইডেন জোট এখনও বড় বড়  নৈতিকতা সংকটে আছে এবং থাকবে।

    ফলে বাইডেনের জোট -কোন নৈতিক বা নীতি-পলিসিগত ভিত্তির সমস্যায় আছে  ও এমন ইমেজ সংকটে হাজির হয়েছে। আর এমন মিস-ফায়ার হওয়াতে এর সুযোগ নিয়ে পালটা চীন-রাশিয়ার জোটে আর তাতে (কোয়াড ভেঙ্গে) ভারতের যোগ দেয়া আর তাতে হবু বাংলাদেশ বা বার্মার যোগদান – এটাই বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক নতুন রঙ্গমঞ্চ।

    সবমিলিয়ে বাইডেন যা করলেন তাতে তার পক্ষীয় জোটের নৈতিক বা গ্লোবাল কমন পলিসিগত শক্ত ভিত্তির উপর দাড়ানোর প্রশ্নে তিনি মারাত্মক খাটো হয়ে হাজির হলেন। শুধু তাই না, আবার একই সাথে তারা দুপক্ষজোটের সামরিক ঝোঁকগুলোকে তিনি জেনে অথবা না-জেনে উসকিয়ে দিলেন যা খুবই অবিবেচক অবশ্যই!

    সর্বশেষ জন কেরিঃ
    জন কেরি ক্লাইমেট ইস্যুতে বাইডেনের বিশেষ দুত। তিনি আগামি ৯ এপ্রিল ঢাকায় আসছেন। সম্ভবত আগামি ২২ এপ্রিলে ওয়াশিংটনে যে ৪০ দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে এর দাওয়াত দিতে। আর সেখানে কী সাইড লাইনে আলী রীয়াজ যেভাবে বলেছিলেন “বঙ্গোপসাগরকে সঠিকভাবে ব্যবহার করা  আর অর্থনৈতিক করিডরের একটি ‘হাবে’ পরিণত করার আলাপ প্রস্তাব – সেটাই কী সেরে নেয়া হবে? মনে হচ্ছে সেটাই এজেন্ডা। যদি তাই হয় তাহলে একদিকে বাংলাদেশ নিয়ে মানবাধিকার অবণতির রিপোর্ট আর এদিকে এমন বঙ্গোপসাগর এজেন্ডা – ঠিক এটাই বাইডেনের জোটের সংকট, এই চরম নৈতিক সংকটের কারণের তার জোট ও তিনি ঠুঠো আর ধান্দাবাজ বলেই মানুষ দেখবে!
    বাইডেনকে একটা বেছে নিতে হবে – বঙ্গোপসাগর না হলে মানবাধিকার!

    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

  • ইরানে হামলার নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্পের পলায়ন

    ইরানে হামলার নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্পের পলায়ন

    গৌতম দাস

    ২৪ জুন ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-2Bo

     

    ড্রোন বিতর্ক, ইরানের হামলা খেয়ে হরমুজ প্রণালিতে কোথায় পড়েছিল
    [ড্রোন বিতর্ক, ইরানের হামলা ভুপাতিত আমেরিকান ড্রোন হরমুজ প্রণালিতে কোথায়, সেই ছবি – নিউইয়র্ক টাইমসের সৌজন্য]
    শুক্রবারের সকালটা শুরু হয়েছিল অদ্ভুত আর অবিশ্বাস্যভাবে। প্রথমে হালকাভাবে শুরু হলেও দিন শেষে পরিণতি ছিল ‘পাক্কা’। আসলে কোনো আমেরিকান প্রেসিডেন্টের বেইজ্জতি হওয়ার দিন যেন শুরু হয়ে গেছে। আমেরিকার ‘প্লেবয়’ প্রেসিডেন্ট Trump এবার এক বোকা-ক্যাবলা হয়ে হাজির হয়েছেন। গতকাল প্রথম দেখা গেল – ঢলে পড়া হলেও এখনও গ্লোবাল নেতা আমেরিকা; অথচ এর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন বন্ধুহীন, ইউরোপও তাঁকে বিশ্বাস করে না, তাঁর সাত-পাঁচে নেই বা থাকে না। এমনকি আন্তর্জাতিক মিডিয়াও তাকে বিশ্বাস করতে পারছে না, তাঁরা প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের বাইরে খবর খোঁজে। কেন?

    বাংলাদেশের শুক্রবার সকাল ৭টায় ঘুম থেকে উঠে জানা গেল রয়টার্সের ব্রেকিং নিউজ জানাচ্ছে,[ United Airlines suspends Newark-Mumbai flights…] আমেরিকার ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের নিউ ইয়র্ক-মুম্বাই ফ্লাইটটা বাতিল করা হয়েছে।কারণ হিসেবে বলা হয়েছে আগের দিনের এক ঘটনা। আমেরিকান একটি ড্রোন (সামরিক কিন্তু মানুষবিহীন রোবট) বিমান ইরানের আকাশে গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়েছিল, যেটা ইরান মিসাইল ছুড়ে ধ্বংস ও ভূপাতিত করে ফেলেছে, এরই প্রতিক্রিয়ায় ঐ ফ্লাইট বাতিল। এ খবর কিছুটা গরমিলের আবার কিছুটা টেনশনেরও মনে হয়েছিল। কারণ, আগের দিন ইরান আমেরিকান ড্রোন [RQ-4 Global Hawk, Drone] ফেলে দিয়েছে কথা সত্য এবং ইরান-আমেরিকা উভয় পক্ষই এটা মিডিয়ায় স্বীকার করেছে। তবে যেটা গুরুত্বপুর্ণ – এটা কোন খেলনা ড্রোন নয়, বরং খুবই উঁচুমানের বা হাইটেক সফিস্টিকেটেড। এর একেকটার মূল্য ১৩০ মিলিয়ন ডলার। সাধারণত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্যাসেঞ্জার বিমান চলাচল করে ৩০-৪২ হাজার ফুট উচ্চতায়। কিন্তু এই ড্রোন ৬০ হাজার ফুট পর্যন্ত উচ্চতায় চলাচল এবং নিখুঁত ছবি বা নানান তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। তাই আমেরিকার কাছে এটা ছিল মহাবিস্ময় যে, এত উচ্চতার এই ড্রোনও নিখুঁতভাবে ভূপাতিত করার সক্ষমতা ইরানের আছে। এধরণের ড্রোন ভুপাতিত করার জন্য উপযুক্ত একমাত্র টেকনোলজি হল মিসাইল ছুড়ে একে নামানো। তা করতে হলে, ভূমি থেকে আকাশে ছুড়ে যুদ্ধবিমান নামানো যায় – এমন টেকনোলজির মিসাইল দিয়ে এটা করা সম্ভব। ইরান সম্ভবত রুশ ‘এস-৪০০’ [Russian S-400 missile] এখানে ব্যবহার করেছে, যা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে।

    খবরের গরমিলটা হল – সাধারণত কোনো রাষ্ট্রের আকাশসীমা নিরাপদ মনে না হলে তা এড়িয়ে ঘুরপথে অন্য দেশের ওপর দিয়ে বাণিজ্যিক বিমান চলাচল করে থাকে। সে ক্ষেত্রে বড়জোর বাড়তি সময় লাগে এবং তেল বেশি খরচ হতে পারে মাত্র। কিন্তু এক্ষেত্রে একেবারে ফ্লাইট বাতিল করা হলো কেন?

    দিন গড়াতেই সেসব প্রকাশ পেয়ে গেল। বাংলাদেশের বেলা ১১টার মধ্যে নিউ ইয়র্ক টাইমসে পাওয়া গেল বিস্তারিত [Strikes on Iran Approved by Trump, Then Abruptly Pulled Back] আসল খবরটা হল, ড্রোন ভূপাতিত করার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের ওপর হামলা পরিচালনার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্দেশ দিয়েছিলেন, যা গত শুক্রবার ভোরবেলায় (আমেরিকান সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে) ঘটার কথা ছিল। ওই নির্দেশ পাওয়ার পরে আমেরিকান যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ প্রস্তুতিতে নেমেও পড়েছিল। কিন্তু হামলা শুরুর মাত্র ১০ মিনিট আগে হঠাৎ পাল্টা নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্প ওই হামলার নির্দেশ প্রত্যাহার করে নেন। ইরানের ওপর কোন বিদেশী হামলার বিরুদ্ধে তাদের নেয়া যেসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আছে যেমন- রাডার, মিসাইল ব্যাটারি ইত্যাদির এমন তিনটা টার্গেটে হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

    খবরটা তখনও আর কোন মিডিয়া বা কোন সরকারি ভাষ্য- কোথাও আসেনি।  এমন প্রাথমিক পর্যায় বলে সেজন্য নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, [Here’s what we know so far… Here’s what we don’t know…] কেন ট্রাম্প ওই হামলা স্থগিত বা বাতিল করলেন তা এখনো জানা যায়নি, এমনকি ওই হামলা আবার করা হবে কি না, তাও জানা যায়নি।

    পরবর্তিতে আমেরিকান সময় সন্ধ্যা ৭টা, ২১ জুনে ট্রাম্প নিজে দুইখানা টুইট করেন। আর সেখানেই মুখরক্ষার সাফাই দেন তিনি, এটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হবে বলে হামলার নির্দেশ বাতিল করেছেন। 

    তিনি টুইটে যা লেখেন এর সারকথা হল, ‘আমার জিজ্ঞাসায় যখন জেনারেলরা বললেন, এই হামলায় ১৫০ জনের মতো লোক মারা যাওয়ার সম্ভাবনা, তখন এটা অসামঞ্জস্য [disproportionate] হবে মনে করে বাতিল করে দিই। তবে এখানে তার “অসামঞ্জস্য” বলার যুক্তি সম্ভবত এই যে, মানুষবিহীন ড্রোন হারানোর বিরুদ্ধে দেড় শ’ মানুষ মারা – এভাবে তুলনা। কিন্তু এগুলো মুখরক্ষার মিছা কথা। কারণ এর মানে হল, ট্রাম্পের এমন উপদেষ্টা কেউ নেই যিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈঠকে মানুষ মারা যাওয়ার ব্যাপারটা আমলে নিতে পারেননি অথবা বলতে হয়, ইরানের কাছে আমেরিকার ড্রোন হারানোর পালটা উপযুক্ত ব্যবস্থা কী হতে পারে, এর পরামর্শও কেউ ঠিকমতো দিতে পারেনি। সবচেয়ে বড়কথা, ট্রাম্পের এই কথিত পাল্টা হামলার নির্দেশে যে যুদ্ধ শুর্টাহয়ে যাবে তা শুধু আমেরিকা-ইরান নয়, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে তো পড়বেই, এমনকি এখান থেকে নতুন বিশ্বযুদ্ধও শুরু হতে পারে – এটাও তারা কেউ ভাবতেই পারেনি – এমন বোকা-বোকা কথা – এটাই কি ট্রাম্প বলতে চাইছেন? সত্যিই অবিশ্বাস্য! তাহলে আমেরিকা শুধু নয়, সারা দুনিয়া কার নাদানিতে বা কাদের হাতে পড়েছে? আমেরিকান কোন প্রেসিডেন্ট এর আগে এমন আনস্মার্ট, বোকা কথা বলেন নাই; আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হওয়ার মানে কী, দায়দায়িত্ব কী, তাঁর যেকোন পদক্ষেপের দুনিয়াজুড়ে পড়া প্রভাব ও পরিণতি কী হয় সেটা তাঁর অজানা বেখবর এমন নাদানি আচরণ কোন প্রেসিডেন্ট কখনও করেন নাই। ট্রাম্পের বেইজ্জতির শুরু এখান থেকেই।

    আসলে বাস্তবে খুব সম্ভব যে, সৌদি আরবের অনুরোধে ট্রাম্প এই ইরান হামলার নির্দেশ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কারণ, ইরানে কোন হামলা হলে এর পাল্টা প্রথম ইরানি হামলার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা সৌদি আরবের সবচেয়ে বেশি।

    এরপর শুক্রবার বাকি সারা দিনের ঘটনা হল, সৌদি আরব ছাড়া আর কেউ ট্রাম্পের পাশে দাঁড়ায়নি। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং রাশিয়া ও ভ্যাটিকানসহ সবাই ট্রাম্পকে সাবধান করে বিবৃতি দিয়েছে [‘Brink of war’: World leaders push for Iran-US restraint]। কিন্তু কোন দায় কেউ নেয়নি। বরং ট্রাম্পকে সংযত হতে ইরানের সাথে ডায়লগে যেতে পরামর্শ দিয়েছে। এ ছাড়া কেউই ইরানের নিন্দা করা দূরে থাক, ইরানের আমেরিকান ড্রোন ভূপাতিত করাতে কোন আপত্তিও জানায়নি। আমেরিকার নেতৃত্বের গত ৭০ বছরের দুনিয়ায় এটা এক বড় ব্যতিক্রম।

    এমন হওয়ার পেছনে অন্তত দু’টি কারণ পাওয়া যায়। এক. এখন পর্যন্ত ২০১৫ সালে ইরানের সাথে করা নিউক্লিয়ার চুক্তি বাতিল করে কেন ট্রাম্প বের হয়ে এলেন তা তিনি ইসরাইল ও সৌদি আরব ছাড়া আর কারো কাছে উপযুক্ত ব্যাখ্যা ও সাফাই দিয়ে বলতে পারেননি। ট্রাম্পের একা হয়ে পড়ার শুরু এখান থেকেই। দুই. এ ছাড়াও সে চুক্তি বাতিলের পর ট্রাম্প আসলে ঠিক কী চাচ্ছেন, ইরানকে কোথায় নিতে চান? তা তিনি নিজ কথার মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে বলতে পারছেন না। যেমন এখন বলছেন, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র উঠতে দেবেন না। ভাল কথা। কিন্তু তাই যদি হবে, তবে আগের চুক্তি ভেঙে দিলেন কেন? কারণ, চুক্তিতে পরমাণু সমৃদ্ধকরণ, তা কেবল জ্বালানিতে ব্যবহারযোগ্যতার মধ্যে রাখতে হবে এই বাধ্যবাধকতা ছিল; আর তা জাতিসঙ্ঘের নিরপেক্ষ এক্সপার্টের তদারকিতে ছিল।

    আসল ব্যাপার হল, ইসরাইল আর সৌদি আরব চায় চুক্তি বাতিল করে আর ইরানকে অবরোধে ফেলে অর্থনৈতিকভাবে চরম দুর্বল করে রাখতে। তাদের এই বায়না – এটাকে ট্রাম্প আর কারও কাছেই ন্যায্য বলে হাজির করতে পারেননি। এমনকি এতে আমেরিকার নিজের কী স্বার্থ, তাও দেখাতে পারেননি। কেবল ট্রাম্পের যুদ্ধবাজ জন বোল্টন অ্যান্ড গং – এসব উপদেষ্টা্রা আড়ালে [Bolton: ‘Our Goal Should Be Regime Change in Iran’] ইরানে ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর কথা আওড়াতে দেখা যায়। অথচ চাইলেই কী আমেরিকা তা করতে পারবে? আমেরিকা এ ব্যাপারে দিনকে দিন মুরোদহীন হয়ে পড়ছে সে খবর নাই।

    আবার এ কথাগুলো খোদ ট্রাম্পেরই মৌলিক নীতিবিরোধী। কারণ, তিনি ২০১৭ সালে ক্ষমতা নেয়ার পর থেকে তার জাতিবাদী “আমেরিকা ফাস্ট” [AMERICA FAST] নীতিতে তিনি বলে আসছেন, গ্লোবাল নেতা হিসেবে তাঁর আমেরিকা আর কোনও যুদ্ধে তিনি আর নেই। যুদ্ধবিষয়ক যা কিছু স্থায়ী “কাঠামোগত স্থাপনা” আছে সেগুলোর সব কিছুতেই খরচ কমানো – এমনকি ন্যাটো বা জাতিসঙ্ঘ থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন তিনি। অর্থাৎ কোন গ্লোবাল দায়দায়িত্ব বা কোন যুদ্ধে জড়ানো থেকে তিনি আমেরিকাকে বের করে আনার পক্ষে – এই নাকি তাঁর মৌলিক নীতি। তাই যদি হয়, তবে ইরানের সাথে চুক্তি ভেঙে দিলেন কেন? আরো এগিয়ে এখন তিনি ইরানে হামলা করে শুধু আমেরিকা নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যসহ সমগ্র দুনিয়াকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে চাইছেন। কেন? এমনকি তিনি তো আসলেই “অন্ধ”, যিনি আমেরিকাকে রাস্তা দেখানো ও গাইড পরিচালনা করার দড়ি নেতানেহায়ুর ইসরাইলের হাতে ছেড়ে দিয়ে বসে আছেন! এটা তার কোন ধরনের নীতি?

    আরও স্ববিরোধের দিক হল, ইরানের সাথে চুক্তি থেকে বের হওয়ার পর আবার এখন ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টিতে অবরোধ দিয়ে রাখার পথ ধরেছেন ট্রাম্প। কিন্তু কেন করছেন, এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য কী? ট্রাম্প দাবি করছেন, তার লক্ষ্য নাকি ইরানকে টেবিলে বসানো। কিন্তু এটা ইরান বিপ্লবের (১৯৭৯) পর থেকে কখনো করা যায়নি, শতচাপের মুখেও তা কাজ করেনি। ফলে এখনো তা হওয়ার কোনো কারণ নেই।

    আবার ট্রাম্পের এই চাপ সৃষ্টি করে ইরানকে টেবিলে বসানোর আশা করার কায়দাটা ছেলেভুলানো হাস্যকর খেলা বললেও কম বলা হয়। রয়টার্স বলছে [Exclusive: Trump warned Iran via Oman that U.S. attack was imminent, called for talks] ইরানে হামলার নির্দেশ যেটা পরে পিছু হটেছে এটার সাথে নাকি ওমানের মাধ্যমে ইরানকে একটা ম্যাসেজ পাঠিয়েছিল ট্রাম্প। আচ্ছা, এটা কী রাস্তায় ছিনতাই বা গুন্ডামি করার মত কাজ? যে বলবে যা আছে সব দিয়ে দেও নাইলে ছুরি মেরে দিব?  সেভাবে – ট্রাম্প বলে পাঠিয়েছে ইরান তুমি আলোচনায় বস, না হলে বোমা মারতে পাঠালাম!

    স্বভাবতই এতে ইরান কেন, কোন রাষ্ট্রেরই রাজি হবার কোনই কারণ নাই। তাই উল্টো ইরান বলছে,যাকে আস্থা-ভরসা করা যায়, ট্রাম্প এমন লোক নন, তাই সে কথা বলবে না, ট্রাম্পের সাথে ডিল করবে না। অর্থাৎ অন্য গ্যারান্টার দরকার। এটা ট্রাম্পের বড় সমস্যা। আসলে ট্রাম্প যা বলেন তাতে কেউ ভরসা রাখে না, মিডিয়াও না। যার কথার দাম নাই তিনি এমন প্রেসিডেন্ট। যেমন- ট্রাম্প ইরানে হামলা করার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এতে দুনিয়া অখুশি। আবার হামলা না করে ফেরত এলেন, যেটা এই প্রথম আমেরিকা করল। কিন্তু এটাকে মানুষ আমেরিকার দুর্বলতা মনে করে, যদিও প্রকাশ্যে বলছে না কেউ।

    আবার ওদিকে  ইরান-আমেরিকার মধ্যে বিতর্ক আছে যে স্থানে ইরান আমেরিকান ড্রোন ভূপাতিত করেছে, সেটা ইরানের ভূখণ্ডে নাকি বাইরে – মজার কথা হল এই তর্কে কোন রাষ্ট্র বা কোন মিডিয়া কেউ আমেরিকার পক্ষ নেয়নি, পরিস্কার দূরত্ব বজায় রেখেছে। এছাডা দেখা যাচ্ছে এ ব্যাপারে মিডিয়ায় আমেরিকার সরবরাহ করা তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা তুলনায় কম। ড্রোন ইরানি আকাশসীমায় ঢুকেছিল কি না এ ব্যাপারে আলজাজিরার ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর জেমস বেসের মন্তব্য, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ইরানের সরবরাহ করা জিপিএস থেকে নেয়া তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা আমেরিকার দেয়া তথ্যের চেয়ে বেশি। নিউ ইয়র্ক টাইমসই প্রথম ডিটেইল ম্যাপ জোগাড় করে ছেপেছিল। আর তাতে দেখিয়েছিল, ড্রোন যখন ইরানি হামলার শিকার হয় তখন আমেরিকা ও ইরানের দাবি করা স্থান দুটো কোথায়। এই দুই দেশের দাবির ফারাক কতটা। নিউ ইয়র্ক টাইমস তার সে রিপোর্ট আপডেট করেছে ইরানের পার্স টিভির দেয়া তথ্য থেকে।

    ড্রোন হামলা বা পরে ট্রাম্পের পাল্টা হামলার সিদ্ধান্ত ও সেখান থেকে পিছিয়ে আসা- এই পুরো ব্যাপারটা জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে তোলাই হয়নি। কোনো বৈঠকও ডাকা হয়নি। কারো যেন আগ্রহ নেই। আমেরিকার বন্ধুহীনতার বেলায় এটা বিরাট ব্যতিক্রম। সবশেষে জানা গেল, আমেরিকা নিজেই সোমবার মানে আরো ৭২ ঘণ্টা পরে এই বৈঠক চেয়েছে।

    কিন্তু সেখানেও ট্রাম্পের জন্য আরো বিপদ। কারণ, এটা এক অদ্ভুত ব্যতিক্রম যে, আমেরিকার নিজের ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার পরে সে কূটনৈতিক পথে যায়নি, নিরাপত্তা পরিষদে আসেনি; বরং এককভাবে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছিল। তাহলে এখন আবার সেটা ত্যাগ করে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে এসেছে কেন? এমন পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা কারো নেই। ফলে আমেরিকার অবস্থান আসলে ঠিক কোনটা- সামরিক না কূটনৈতিক, এ ব্যাপারে নিরাপত্তা পরিষদের সবাই অনিশ্চিত ও অস্পষ্টতায়, অনাস্থায়। ব্যাপারটাকে তুলে ধরতে আমেরিকার প্রভাবশালী ব্লুমবার্গ মিডিয়ার রিপোর্টের শিরোনাম করেছে- ‘ট্রাম্প ইউটার্ন নিয়েছেন, ইরানে আকাশ হামলা বন্ধ করে রেখেছেন; কিন্তু তবু সাথী বন্ধুরা অস্বস্তিতে” [Trump Leaves Iran, Allies Uneasy Even After Stopping Airstrike]।’

    সব দেখেশুনে আলজাজিরার এক কমেন্টেটর বলছেন, পুরো ঘটনা শেষে ইরান এখন ঘটনার ড্রাইভিং সিটে আছে। তা বিশেষত ইরানের দু’টি দাবির কারণে। ইরান বলছে, ওই ড্রোনটা চার ঘণ্টা ধরে আকাশে উড়ছিল। শেষের দিকে সেটাতে ইরান রেডিও মেসেজ পাঠায় যে, তুমি ইরান সীমায় ঢুকে যাচ্ছো, সামলাও নিজেকে। এই ড্রোনে মানুষ না থাকলেও ওর বেজ স্টেশনের সাথে সব সময় যুক্ত থেকেই ওটা পরিচালিত হয়। তাই সে বাইরের রেডিও মেসেজ পেলে সেটা বেজ স্টেশনের কাছে পাঠিয়ে করণীয় জানতে চেয়ে, জেনে সে মোতাবেক কাজ করতে পারে। কিন্তু ওই ড্রোন বা সংশ্লিষ্ট বেজ স্টেশন সব মেসেজ উপেক্ষা করে গেছে। সব আকাশযানের নিচে সাধারণত ওর পরিচিতিসূচক শব্দ লেখা বা চিহ্ন দেয়া থাকে, যা ভূমি বা নিচ থেকে পড়া যায়; যা থেকে বুঝা যায় ওটা কোন দেশের বা কী কাজের।

    ইরান দাবি করছে, ওই ড্রোনের সেসব পরিচিতি সূচক লেখা বা চিহ্ন ঢেকে রাখা ছিল, যার মানে, সেটা গোয়েন্দাগিরি ইঙ্গিত। এ ছাড়া ইরান নিজের সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা দেখানোর জন্য আর একটা তথ্য দিয়েছে। ইরান বলছে, একই সময়ে আর একটা আমেরিকান (সম্ভবত) গোয়েন্দা বিমানও আকাশে ছিল। ইরানের দাবি, তা তেত্রিশ জন মানুষ বহনের যান ছিল, তাই ইরান তাতে হামলা করেনি। চাইলে করতে পারত। সেটা না করে তাদেরকেও সতর্ক রেডিও বার্তা পাঠালে তারা ইরানি আকাশসীমা ছেড়ে চলে যায়। শেষে ইরান মানুষবিহীন ওই ড্রোনকেই ভূপাতিত করেছে। এ কারণে মন্তব্যকারীরা বলছেন, ঘটনা শেষে ইরানই ‘ড্রাইভিং সিটে’। ট্রাম্প সম্ভবত এই প্রথম বুঝছেন যে, একজন ‘আমেরিকান প্রেসিডেন্ট’ হওয়া বলতে ঠিক কী বুঝায়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২২ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)  “ট্রাম্প আমাদের যুদ্ধে নিচ্ছিলেন প্রায় “ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

    বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

    গৌতম দাস

    ০৬ মে ২০১৯, 0১:৩৬

    https://wp.me/p1sCvy-2zV

     

    The Second Belt and Road Forum for International Cooperation

    চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প, গত ২৫-২৭ এপ্রিল ছিল এবিষয়ে তাদের দ্বিতীয় সম্মেলন বা সামিট। যার পুরা আনুষ্ঠানিক নাম হল “The Second Belt and Road Forum for International Cooperation”, সংক্ষেপে বিআরএফ [BRF]। গত ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সামিটের মত এবারও এটা বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বলা হয়, বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আইডিয়া চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালের অক্টোবরে কাজাখাস্তানের এক সম্মেলন থেকেই প্রথম হাজির করেছিলেন। সেই থেকে ধরলে গত ছয় বছরে এই মহা প্রকল্পের মুখ্যনাম এক-দু’টা থাকেনি, কয়েকটা হাজির হয়েছে। ঠিক যেমন চলতি এই দ্বিতীয় সম্মেলনে এর নাম দেয়া হয়েছে “বেল্ট ও রোড ফোরাম” বা বিআরএফ। প্রথম সামিটে যেখানে নাম ছিল “বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ” বা বিআরআই।

    ২০১৭ সালে এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলনকে ডাকা হয়েছিল “বেল্ট রোড সামিট” বলে। সম্ভবত বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে প্রথম সম্মেলন ছিল সেটি, সেদিকটা মুখ্য করতে। ওদিকে জন্মের শুরুতে এর নাম ছিল সিল্ক রোড প্রকল্প, সিল্ক রুট প্রকল্প, ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইত্যাদি অনেক কিছু।
    আসলে প্রকল্পের আইডিয়া ও এর বাস্তবায়নের বিষয়টা ছিল খুবই ব্যাপক, যে কারণে এটাকে শুধু প্রকল্প না বলে মহাপ্রকল্প লিখছি। আর এর চেয়ে বড় ব্যাপার হল, বিষয়টার বহু কিছুই ইভলভিং [evolving] বা ফুলের পাপড়ি খোলার মত বীজ আইডিয়াটা ক্রমান্বয়ে বাস্তব ও স্পষ্ট হয়েছে। কাজেই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পে নতুন নতুন মুখ্যনাম বলাতে বিষয়টা একেক সময় একেকটা, এমন অবশ্যই নয়। বরং বলা যায় একই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আনফোল্ডিং [unfolding] মানে ক্রমেই ভাঁজ খুলে নিজেকে পূর্ণ আর স্পষ্ট অবয়বে হাজির করা হয়েছে। আর সেই সাথে অবশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে ক্রমেই নেগোসিয়েশনে বা পরস্পরের সুবিধা-অসুবিধাগুলো আমলে নিয়ে নতুন বোঝাপড়ায় যাওয়া – আর সেই ভিত্তিতে এসবের চুক্তি সম্পন্ন করা। “ক্রমেই ভাঁজ খোলা” বলতে আমরা এটাও বুঝতে পারি।

    দুনিয়ায় খুব সম্ভবত এটাই এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ এক অবকাঠামো প্রকল্প, যা কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের। জাতিসঙ্ঘের ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৭০-এর বেশি রাষ্ট্র এই প্রকল্পের অংশ হয়ে গেছে বা আনুষ্ঠানিক যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে। আর প্রাথমিক আগ্রহ জানিয়ে সম্মেলনে যোগ দিয়েছে মোট ১২৯ রাষ্ট্র। অপর দিকে ওই ৭০ রাষ্ট্র, যারা যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে, এদের বড় অংশই হল এশিয়ান বড় বা উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো, এছাড়া ইদানীং ইউরোপীয় রাষ্ট্রের যোগদান বাড়ছে। তবে এখানে এশিয়া বলতে তা মধ্য-এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ – এভাবে বুঝতে হবে, যেখানে এশিয়া ও ইউরোপ সড়ক ও রেল পথে সংযুক্ত হচ্ছে এই মধ্য এশিয়াকে মাঝখানে রেখে।
    এই মহাপ্রকল্পের সাথে আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় এমন ২৯ টা সংগঠনও জড়িয়ে আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ হল জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তোনিও গুতারেস [António Guterres] আর আইএমএফ-এর প্রধান ক্রিশ্চিয়ানা ল্যাগার্দে [Christine Lagarde] যারা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

    এই পর্যন্ত এই মহাপ্রকল্পে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হিসাবে ৯০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়ে গেছে, যা বছরে ৫.২% করে বেড়ে এমন হয়েছে। এছাড়া BRI এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোও একই সময়ে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এদিকে চীনের সাথে BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এখনই বাণিজ্য বাজার কেমন তা নিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, এটা ইতোমধ্যেই ৬ ট্রিলিয়ন ডলার পার হয়ে গেছে আর তা বছরে ৪% হারে বাড়ছে। এমন BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলো সব মিলিয়ে এদের সাথে চীনের বাণিজ্য, এখনই চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ২৭.৪% । অর্থাৎ এটা হেলাফেলা ফিগার হবার কথা নয়। আর বলাই বাহুল্য এই মহাপ্রকল্প যত সম্পন্ন হতে থাকবে এটাই চীনের প্রধান বৈদেশিক বাণিজ্যের রুটখাত হতে থাকবে।

    সম্মেলনে যোগ দেয়া রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কতজন? ২০১৭ সালের প্রথম সম্মেলনে সে সংখ্যাটি ছিল ২৯, আর এবার ২০১৯ সালে দ্বিতীয় সম্মেলনে তা আট বেড়ে হয়েছে ৩৭ জন। মানে এই ৩৭ রাষ্ট্র বাদে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো রাষ্ট্রপ্রধান নয় তবে, মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। আবার ইইউর সদস্য এমন রাষ্ট্রপ্রধান যারা এখানে উপস্থিত হয়েছে, এমন রাষ্ট্র ছিল অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল। ওদিকে কেবল পুর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া থেকেই যোগ দেয়া রাষ্ট্রপ্রধান ছিল প্রায় ১১ জন। এদের মধ্যে ছিলেন, যেমন পাকিস্তানের ইমরান খান, মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ, নেপালের রাষ্ট্রপতি ভান্ডারি অন্যতম। এছাড়া পুর্ব এশিয়ার এবারই প্রথম রাষ্ট্র বা সরকারের যেসব প্রধান যোগ দিয়েছে, এমন দুই রাষ্ট্র হল সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড। এতে ১০ সদস্যের আসিয়ান রাষ্ট্র জোটের প্রায় সবাই এবার যোগ দেন। বিশেষ করে থাইল্যান্ড খুবই উল্লেখযোগ্য।

    বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পকে বুঝবার সময় এখানে একটা কথা খেয়াল রাখতে হবেঃ সোভিয়েত যুগের মানে, কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫৩-৯১) চিন্তার অভ্যাসে আমাদের মনে গেঁথে থাকা কিছু ধারণা দিয়ে চিন্তা করলে আমাদের মনে হতে পারে যে, যেখানে নতুন গ্লোবাল নেতা চীনা সেখানে আমেরিকা বা তার জোটের কেউ যোগ দিবেই না। ঠিক যেমন সেকালে সোভিয়েত ব্লকের কোর রাষ্ট্রগুলা আমেরিকা ব্লকের রাষ্ট্রের সাথে কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লেনদেন-বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, ঠিক তেমনই একালেও বোধহয় ঘটনাগুলো সে রকম। এমন ধারণা মাথা থেকে ফেলে দিতে হবে। কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তি ও ব্লক ব্যবস্থা ১৯৯১ সালে ভেঙ্গে যাবার পর থেকে একালের দুনিয়া সেকালের সাথে পুরাটাই অমিল, তাই বরং মিল খুঁজতে যাওয়াটাই ভুল হবে।  যেমন একালের চীন-ভারত – এদের স্বার্থবিরোধের শেষ নেই, অথচ তাদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিশাল; এখনই তা ৮০ বিলিয়ন ডলারের, যা ১০০ বিলিয়নের পথে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। আবার খোদ চীন-আমেরিকা গত আশির দশকে তাদের সম্পর্কের শুরু থেকেই ব্যাপক ঘনিষ্টভাবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পণ্য ও বাজারে ব্যাপক লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক করে গেছে। কেবল একালেই তারা বাণিজ্যঝগড়ায় হাজির হয়েছে, যা আবার নিরসন মীমাংসারও চেষ্টা চলছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও চীনে আমেরিকান বিনিয়োগ আগের মতোই চলছে, বাণিজ্যও চলছে এবং তা আকারে এখনও বিপুল যদিও তা চলছে বাধা পেয়ে পেয়ে। এমনকি গত ২০১৭ সালের BRI সম্মেলনে আমেরিকার এক আমলা প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিল। আর যদিও এবারো এমনভাবেই যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল কিন্তু শেষে কোন কারণে আমেরিকার প্রতিনিধি আসে নাই।
    তাহলে এক কথায়, একালের মূল বৈশিষ্ট খেয়াল করতে হবে; তা হল, বাণিজ্যিক লেনদেনের সবসম্পর্ক রেখেই একই সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রস্বার্থ ইস্যু নিয়েও ঝগড়া চালাবে তারা। এখানে সেকালের মত “ও পুঁজিবাদি, আমি নই”- তাই কোন সম্পর্ক নাই – এসব নাই। আসলে এভাবে মতাদর্শের কথা তুলে এরই আড়ালে উভয় জোটের সদস্য  রাষ্ট্রগুলো রাশিয়া অথবা আমেরিকার ধামাধরা হত – এমন বাস্তবতাই আর নাই। ফলে তেমন কোন ভিত্তি একালে নেই। বরং ব্যাপারটা অনেকটা, বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক রেখেই যেমন সন্তানেরা অনেকসময় আরো বেশি সুবিধা পাওয়ার জন্য ঝগড়া করে, রাগ দেখায় বা উল্টাপাল্টা কিছু করে বসে, অনেকটা তেমনই। অর্থাৎ মূল কথা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পরের নতুন পরিস্থিতিতে এবার সম্পর্কের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ হল – এবার সব রাষ্ট্রই একমাত্র এবং একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এবং এরই অংশ হয়ে থেকে গেছে। আর এতে রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের পণ্য, পুঁজি, বিনিয়োগ, বাজার ইত্যাদি বিনিময়ে জড়িয়ে এক গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময়ের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু একই সাথে তারা নিজের যার যার স্বার্থের জন্যও লড়ে যাচ্ছে। আবার ক্যাপিটালিজমের বদ খাসলতগুলোর এখন তাহলে কী হয়েছে? এছাড়া সেগুলা কি মিথ্যা ছিল? অবশ্যই নয়। কিন্তু সেসব বদ-খাসলত এখনও বর্তমান হলেও ওর বিরুদ্ধে লড়ার আঙ্গিক, পাটাতন, কায়দা ইত্যাদি সবই এখন বদলে গেছে। তাই লড়াইও চলছে ও চলবেই; এমনকি জোট হয়ে বা আলাদাভাবে লড়ার ধরণ বদল হলেও। তাহলে এই পরিপ্রেক্ষিতে এবারের বিআরএফের বৈশিষ্ট্য ও অর্জন কী?

    কথিত ঋণফাঁদ আর গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডঃ
    এই সম্মেলনেও এবার এ’দু’টিই মুখ্য ইস্যু হয়েছে। কারণ, শি জিনপিং তাঁর মূলবক্তব্যে নিজেই সোজা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর এছাড়া সম্মলনের শেষ দিনে প্রকাশিত ৩৮ পয়েন্টের যৌথ ঘোষণা [Joint Communique ] থেকেও এই সম্মেলন এ’দুই ইস্যুকে এবার মুখ্য বিষয় করা হয়েছে। চীনা সরকারি মিডিয়া CGTN-এর ভাষায় বললে, এই মহা প্রকল্প নিয়ে চীনের কৌশলগত উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে পশ্চিমারা সন্দেহ সৃষ্টি করেছে, প্রেসিডেন্ট শি সেগুলোরই জবাব দিয়েছেন, যাতে সন্দেহ দূর হয়। [President Xi also responded to Western skepticism about China’s “strategic intentions” behind the landmark initiative. ]  এছাড়া হংকংয়ের SCMP লিখেছে, একটা সুক্ষ-কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। প্রেসিডেন্ট শি চীনের নেয়া প্রকল্পগুলোতে টেকসই ঋণ, পরিবেশ রক্ষা আর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা- এ দিকগুলো নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। [In a subtle shift …, Xi’s pledges over the past two days on debt sustainability, environmental protection and corruption control show Beijing is trying to expand its policy by paying heed to international concerns, according to analysts. এ থেকেই মনে হচ্ছে, তিনি পশ্চিমা সমালোচনা, প্রপাগান্ডা ও উদ্বেগগুলোর দিকে মনোযোগী হতে চাচ্ছেন।

    হংকং-ভিত্তিক ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ পত্রিকা কিছু এক্সপার্টকে উদ্ধৃত করে আমাদেরকে জানাচ্ছে, তারা মনে করেন, শি-এর এবারের বক্তব্য ছিল খুবই আপসমূলক টোনে। আর খুব সম্ভবত তা আমেরিকা, ভারত, জাপান আর ওদিকে জার্মানি ও ফ্রান্সের কথা মাথায় রেখে করেছেন। [The president’s conciliatory tone during the second Belt and Road Forum in Beijing was apparently aimed at critics in the United States, India, Japan and major European powers such as Germany and France.]

    এদিকে বেল্ট-রোড প্রকল্প চীনের একটা “ঋণের ফাঁদে” ফেলার বুদ্ধি, অথবা “ঋণফাঁদের ডিপলোম্যাসি” বলে প্রো-আমেরিকান গবেষক বা একাদেমিকেরা প্রচার প্রপাগান্ডা চালালেও  এক জর্মান থিঙ্কট্যাংক গবেষক, Lucrezia Poggetti, খাড়া কথাটাই বলেছেন এভাবে, “চীনের এমন অবকাঠামো ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার প্রতি বিভিন্ন দেশের নিঃসন্দেহে আগ্রহ বাড়ছে। একই সাথে এতে নেয়া প্রকল্পগুলাতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও মানদন্ড বজায় থাকার প্রতি আকাঙ্খাও প্রবল হচ্ছে”। […a research associate at the Mercator Institute for China Studies in Berlin, said that while interest in China’s infrastructure and investment plan was undoubtedly growing, there was an equal desire for the projects it encompassed to abide by international rules and standards.]

    ব্যাপারটা হল, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অবস্থায় আমরা এখনো আছি। এটাই ডমিনেটিং। আর এতে  তৈরি হওয়া এতদিনের নানান স্ট্যান্ডার্ড  বা মানদন্ডও অবশ্যই তৈরি হয়েছে এবং বহাল আছে। যদিও তা “চরম ভালো মানের বা আদর্শের” এ কথা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। এখন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব ব্যাপারে চীনের এত দিনের অবস্থান ছিল এ রকম – যেন চীন নিজেই একটা স্ট্যান্ডার্ড আর দুনিয়ায় যে স্ট্যান্ডার্ড চালু আছে, তা পশ্চিমা। যেন সে জন্য এটা খারাপ। কিন্তু আসল কথা হল, এ’পর্যন্ত দুনিয়ায় যা কিছু স্ট্যান্ডার্ড বা মানদন্ড, তা নিঃসন্দেহে আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়াতেই হয়েছে ও আছে। আর তা একেবারে চরম মানসম্পন্ন বা আদর্শ- ব্যাপারটা এমন তো নয়, বরং এর খামতির শেষ নেই, তা-ও হয়ত বলা যাবে। কিন্তু এর কোনো মানদণ্ড নেই- এমন ধারণা করা মানে, নিজেকেই ফাঁকি দেয়া হবে। তাই সারকথাটা হল, মানবাধিকারসহ সব বিষয়ে চীন নতুন নেতা হিসেবে নিজের মানদণ্ড বলে কিছু দেখাতে চাইলে তা করতে হবে পশ্চিমা মানদণ্ডকে শুরুর ভিত্তি ধরে। মানে, চীন এর চেয়ে আরো ভালো কী করতে পারে, সেটাই তাকে দেখাতে হবে। তাই বলাই বাহুল্য, এছাড়া চীনের সাবধান থাকাই ভাল যে, পশ্চিমা মানদণ্ডের নিচে সব কিছুই এখানে অগ্রহণযোগ্য হবে।

    বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ যতই থাক এরপরেও, আমাদের মত দেশে বিশ্বব্যাংক যেসব প্রকল্প নেয় তাতে সে বেশ কিছু মানদন্ড মেনে চলে। যেমন এর একটা হল, বিশ্বব্যাংকের নেয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্পে যে দেশই দাতা-পার্টনার থাকুক না কেন, খোলা প্রতিযোগিতার আন্তর্জাতিক টেন্ডারেই একমাত্র সাব্যস্ত হবে যে, কাজ কে পাবে। মানে, ঐ দাতা দেশকেই কাজ দিতে হবে- এমন কোনো শর্ত নেই। আমাদের যমুনা সেতু প্রকল্পে জাপান এক বড় ফান্ড-দাতা ছিল। অথচ পাঁচ আলাদা অংশের টেন্ডারে বিভক্ত ঐ প্রকল্পের কাজে জাপান একটাও পায় নাই বা জড়িত ছিল না। অথচ প্রায় সব চীনা প্রকল্পই এই মানদন্ডে অচল। চীনা-প্রকল্পের সাধারণ অভিমুখ হল, চীনারাষ্ট্র হয় দাতা, ঠিকাদার হবে চীনা কোম্পানি, আর তা হবে বিনা টেন্ডারে এবং গুরুত্বপূর্ণ হল, এক লোকাল এজেন্ট কোম্পানি থাকবেই, ব্যকডোরে যার মূল ভুমিকা বা কাজ হবে প্রকল্পগ্রহীতা দেশের প্রশাসনে ঘুষ-বন্দোবস্তের উপায় হিসাবে কাজ করা। তাই এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের জন্মের ৭৫ বছর পরে হাজির হয়ে, বিশ্বব্যাংকের মানদন্ডের চেয়ে নিচা-মানদন্ডে চীনা অবকাঠামো-প্রকল্প এভাবে চলতেই পারবে না। বেল্ট রোডসহ চীনা প্রকল্পগুলো এভাবে চলতে থাকলে এককথায়  চীনের ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার, সব ভেঙ্গেচুড়ে পড়বেই।

    এর বিপরীতে চীনারা হয়ত বলবে, আমরা  পশ্চিমাদের মত কোন দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করি না, পলিটিক্যাল স্বার্থ নাই বা স্টেক রাখি না। তাই কোন দেশে যদি দুর্নীতি থাকে (আমাদের মত দেশে যা অফুরন্ত ও ঘুষ খাবার জন্য ওঁত পেতে আছে) তবে ঐ দুর্নীতি উচ্ছেদ আমার কাজ নয়। সেকারণেই যে দেশ ঘুষ নিয়েই কাজ দেয়, তাকে আমরা ব্যাপক ঘুষ দেই, আর যে নেয় না তাকে সাধাসাধিও করি না। অতএব ঘুষ দিয়ে কাজ নেব কি না, সেটা চীন কখনও ঠিক করেনি।

    আসলে এটা দায় এড়ানোর দায়িত্বজ্ঞানহীন যুক্তি। কারণ, চীনা রাষ্ট্র কোন নৈতিকতাহীন বাণিজ্যিক কোম্পানি নয় যে যেকোন উপায়ে তাকে মুনাফা করতেই হবে। এ ছাড়া চীন দুনিয়ার (অন্তত) অর্থনৈতিক নেতা হতে খায়েস রাখে। কাজেই নৈতিকতা পালনের দায়, অথবা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার দায়পাল্পনের ঊর্ধ্বে থেকে চীন নেতা হতে পারে না। অথচ পশ্চিমা মানে, আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কোনো কোম্পানির বিদেশে ঘুষ দিয়ে কাজ নেয়া অপরাধ; যদিও এর প্রয়োগ খুবই কম তবে এর কিছুটা প্রয়োগ একালে দেখা যাচ্ছে ওয়ার অন টেররের ইস্যুতে মানিলন্ডারিং আইনের কারণে। আরও কথা আছে, এনিয়ে জাতিসংঘের কনভেনশন আছে। স্বাক্ষরকারি হিসাবে চীনের দায় আছে, ফলে সে দায়মুক্ত নয়। এই বাস্তবতা ও মানদণ্ডকে এড়িয়ে মানদন্ডে পিছনে পড়ে থেকে চীন কিভাবে নেতা হতে পারবে? আমাদের মতো দেশগুলোকে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত করে দিয়ে এর জন্য প্রধান দায়ী হয়েও চীন কোন নেতাগিরির আশা করে? আমেরিকার দোষত্রুটির শেষ নাই। কিন্তু আমেরিকা  গায়ে বাতাস লাগিয়ে  দুনিয়াকে “আমেরিকান সেঞ্চুরি” করে নিতে এমনি এমনি সক্ষম হয় নাই। কিছু অন্তত অবদান রাখতে হয়েছে। চলতে চালাতে গিয়ে সে বহু কিছুর মানদন্ড, আইন কনভেনশন বা প্রতিষ্ঠান গড়া ইত্যাদি এসব অনেক কিছুই তাকে করতেই হয়েছে। এগুলোকে আন্ডারএস্টিমেট করা, তুচ্ছ বা নজর আন্দাজ করা অবশ্যই চীনের অযোগ্যতা ও আত্মঘাতি হবে তা বলাই বাহুল্য। তাই এককথায় বললে, ব্যাপারটা পশ্চিমা-অপশ্চিমার ইস্যুই নয়।

    এটাও ঠিক, চীনের নেয়া বেশির ভাগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক স্বার্থই একমাত্র নয়, এর বাইরে চীনা রাষ্ট্রের একধরনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থও থাকে, যেটা অস্বাভাবিক নয়। যেমন গোয়াদর বন্দর বা  চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প। এর নামই বলছে, চীনের ল্যান্ডলকড হয়ে থাকা ও পিছিয়ে পড়া পশ্চিমা ভূখন্ডকে [জিনজিয়াংয়ের উইঘুর বাসিন্দারা এখানেরই] মুক্ত করার লক্ষ্যে গোয়াদর বন্দর পর্যন্ত প্রবেশ – করিডোর নেয়াই- চীনের স্ট্র্যাটেজিক উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সোজা কথায় প্রকল্পের সুবিধাভোগী একা পাকিস্তান নয়, চীনও। কাজেই ঋণচুক্তির দায় ও শর্তাবলিতে এর ছাপ অবশ্যই থাকতে হবে। যেমন চীনা ঋণ শোধ দেয়ার সময় সাধারণত ২০ বছর হতে দেখা যায়। সে তুলনায় বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল ঋণের সাধারণ মানদন্ড হল, তা ৪০ বছরের, যার প্রথম ১০ বছর আবার সুদবিহীন। চীনারাও করিডোর পাওয়া সুবিধাভোগী, তাই একা পাকিস্তানের অর্থনীতির ওপর এর বিপুল ঋণ শোধের দায় চাপানো অনৈতিক ও অবাস্তব অবান্তর। কাজেই এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রথম ২০ বছর সুদ-আসল পুরো কিস্তিবিহীন করা ইত্যাদি এমন অনেক কিছুই করতে পারতে হত। সারকথায়, একটা ‘অবজেকটিভ ফাইন্যান্সিয়াল এনালাইসিস’ করে [সেক্ষেত্রে দরকার হলে চীনের অ-বাণিজ্যিক কোন সামরিক বা অন্যকোন রাষ্ট্রস্বার্থ থাকলে এরও একটা অর্থনৈতিক মূল্য ধরে নিয়ে সে হিসাব করা সম্ভব] পাকিস্তান-চীন উভয়কেই দায় ভাগ করে নিতে হবে, সেটাই হত সবচেয়ে ন্যায্য। কিন্তু আমরা দেখছি, কিস্তি দেওয়া শুরু হবার আগে পাকিস্তান এখনই ধুঁকছে। এই করিডোর ঋণের কিস্তি যদিও এখনো শুরুই হয়নি, সম্ভবত ২০২২ সালের আগে শুরু হবে না; তখন পাকিস্তানের কী হবে?

    পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা দেখিয়ে এখনই আমেরিকা এবং আইএমএফ টিটকারি দিয়ে বেড়াচ্ছে। যা আমেরিকার অর্থনীতি ঢলে পড়া ঠেকানোর স্বার্থে চালানো প্রপাগান্ডাকেই সাহায্য করছে। এটা নিশ্চয়ই চীনের পক্ষে যাচ্ছে না। কাজেই, বাণিজ্যিকের সাথে স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের প্রকল্পও হতেই পারে। কিন্তু দায় ভাগাভাগির একটা মানদন্ডও অবশ্যই থাকতেই হবে। পাকিস্তানের শাসকেরা চোর ও লোভী বলে চীন এর সুবিধা নিয়ে নিজের ভাগ্য গুছাবে আর এভাবে দুনিয়ার নেতা হতে পারবে কী করে? এটা কোন বুঝ? বস্তুত কোনো প্রকল্পের অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি মানে প্রকল্প গ্রাহক রাষ্ট্রের অর্থনীতি কোন প্রকল্প-ঋণ শোধের যোগ্য বা সম্ভব হবে কি না, এর যাচাই চীন আদৌ করে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে এমন চিন্তা একালে অকল্পনীয়।

    কেন? চীন কেন এখানে উদাসীন থাকে? ‘পুঁজিবাদী’ ব্যাপার বলে? চীনের সাফাই কী, আমরা জানি না। অথচ এমন হওয়ার কারণে আইএমএফের প্রেসিডেন্ট মিস লাগার্দের নসিহত শুনতে হচ্ছে চীনকে যে, ‘প্রকল্প গ্রহণের আগে এর ভায়াবিলিটি’ যাচাই কর”ন। চলতি BRF সম্মেলনের দাওয়াতের যোগ দিয়ে বক্তৃতায় তিনি মুখের উপর বলেছেন ব্যাপক বেল্ট-রোডের প্রকল্প সেখানেই যাওয়া উচিত আর যে অর্থনীতি এর ঋণশোধের দায়ভার বইতে সক্ষম। [“China’s massive Belt and Road infrastructure program should only go where it is needed and where the debt it generates can be sustained…] ব্যাপারটা চীন জানত না এমন নয়, লাগার্দে প্রথম বলছেন তা তো নয়ই।  আবার এটা অবিশ্বাস্য যে গ্রাহক রাষ্ট্রগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলাই চীনের বড়লোক হবার পথ, আর এটা চীন বিশ্বাস করে। এটা একটা রাষ্ট্রের দুনিয়ার নেতা হবার কোন স্ট্রাটেজিক উপায়ও তো হতেই পারে না, এই এবসার্ডিটি বা অবান্তর কথা চীন বুঝে নাই তেমন কঠিন কথা এতা নয়? তাহলে?

    এটা চরম গোয়ার্তুমি আর পশ্চিমকে তাদের চিন্তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা সম্ভবত এমনই কিছু একটা।  আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে থাকে আবার সময়ে তার দরকার থাকলে এই অজুহাতে হস্তক্ষেপও করে থাকে – একথা সত্য। চীন কী মনে করে, সহজে ঋণপ্রাপ্তি ও ঘুষের নহর বইয়ে দেয়া, এভাবে স্বৈরাচারদের টিকিয়ে রাখা – এটা যে আরও বড় হস্তক্ষেপ – এটা চীনের বুঝে ধরা পড়ে নাই।

    দুনিয়ার কোথাও শিল্পায়ন বা ক্যাপিটালিজম হয় নাই – রাষ্ট্রের অর্থ না মেরে দিয়ে। তারা বিশেষ করে কাস্টমসের টাকা, ব্যাঙ্কের টাকা মেরে দিয়েছে। পুঁজিপতিরা আদিম-পুঁজির সংগ্রহ সবসময় এভাবেই করেছে। কিন্তু এর মানে কী এই যে চীন উদ্দেশ্য করেই অর্থ লুটপাটকে উতসবে পরিণত করবে? এটা কোন ক্যাপিটালিজমের বুঝ? নাকি এটাই ইঙ্গিত করছে যে গ্লোবাল আইন, কনভেনশন, নাগরিক অধিকার, বেস্ট প্রাকটিস, মোডাল, ইন্সটিটিউশন গড়া, ইত্যাদি সম্পর্কে চীনের বুঝাবুঝিতে মারাত্মক ঘাটতি আছে?

    কাজেই ক্রিশ্চান লাগার্দের এই নসিহত বা কখনো টিটকারি শুনে চীনের কেমন লাগছে? কোন ইজ্জত বাড়ছে জানা যায় না। আর এখান থেকেই চীন ‘ঋণফাঁদ’ পেতেছে- এই আমেরিকান প্রপাগান্ডা করার সুযোগ তৈরি করছে এতদিন চীন নিজেই।

    হতাশার কথা থাক। মনে হচ্ছে, তাহলে কি এখন কানে পানি ঢুকেছে? এবারের বিআরএফ সম্মেলন থেকে আমরা কি সেই ইঙ্গিত পাচ্ছি? সম্ভবত হ্যাঁ। কিসের ভিত্তিতে এমন বলা যায়? খুব সহজ। উপরে আমরা দেখলাম বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্ট বা বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা ইত্যাদি সবই এটাই বলছে। কিন্তু এটা এখন এত সহজে এসে গেল আগে হয় নাই কেন, এর জবাব কী? গত মাসে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখান থেকে এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ হয়। দেখা যায়, অবকাঠামো প্রকল্পে যেসব স্টান্ডার্ড এপর্যন্ত তৈরি হয়েছে  চীন সুগুলো মেনে চলা আর এ নিয়ে আরও বিকশিত কাজ করতে চীন সেখানে ইইউর সাথে একমত জানিয়েছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা এখানে । কাজেই প্রেসিডেন্ট শি আসলে এবারের বিআরএফ থেকে বলতে চাইলেন, তিনি ইইউর সাথে ইতোমধ্যে যা যা একমত হয়েছেন, সেটাই এখন বিআরএফ ফোরামেও বাস্তবায়নে কাজ করবেন – এভাবে বলাটা কঠিন ছিল না। আর যাতে পরের বিআরএফ সম্মেলনে তিনি জার্মান চ্যান্সেলর আর ফরাসি প্রেসিডেন্টকেও হাজির করতে পারেন।

    এখন যদি আমরা আমেরিকার সাথে তুলনা করে বলি তাহলে ব্যাপারটা দারাল এই যে, ট্রাম্পের আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে নেতি প্রপাগান্ডা করেই গেল। আর ইইউ চীনকে মানদন্ডে আসতে বাধ্য করল, যাতে সম্ভাব্য গ্লোবাল নেতা চীনের পার্টনার হয়ে ইইউ নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।

    তাহলে এখন বেল্ট রোডে ভারতের কী হবে?
    ইইউর মতো ভারতের জন্যও চীনা প্যাকেজ আছে মনে হচ্ছে। তাই সম্ভবত চীনা পথ হতে যাচ্ছে, সঙ্ঘাত নয়। বরং আরো সুবিধা অফার করে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলে নেয়া হবে। সংক্ষেপে বললে, পাকিস্তানের কথিত জঙ্গি মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের জঙ্গি তালিকায় তুলতে চীনের আর আপত্তি না করা সম্ভবত সেটারই ইঙ্গিত। তবে এটা কেবল একা ভারতকে ছাড় দেয়া নয়। অনুমান করা যায়, ভারতকেও প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে যে, মাসুদ ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের ওপর এখন চাপ সৃষ্টি করতে বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো প্রপাগান্ডা বা সামরিক বা স্ট্র্যাটেজিক কোনো পদক্ষেপে যাবে না। তাই পাকিস্তানও চীনা সিদ্ধান্তে কোন আপত্তি প্রকাশ করে নাই, বরং গ্রহণ করেছে। আসলে চীন অনেক আগে থেকেই এমন সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। এমনকি সম্ভবত কাশ্মির ইস্যুতে লম্বা পথের হলেও একটা সুরাহা, অন্তত ডায়ালগ শুরু করে পথ খুঁজে পাওয়া- এত দূর পর্যন্ত পরিকল্পনায় আছে। চীন সে জন্য অরুণাচল বা কাশ্মিরের সাথে ম্যাপে কার কোনটা এলাকা – সে সংক্রান্ত অনেক দাবি থেকেও সরে এসেছে, তা ভারতের মিডিয়াই বলছে। অনেকে অবশ্য অনুমান করে বলছেন, চীনের এত ছাড়ের অর্থ- অন্য আর একটা । তা হল চীন সম্ভবত মনে করছে ভারতের চলতি নির্বাচনে মোদী নয়, নতুন সরকার আসছে – এটা তারই ইঙ্গিত। তাই নতুন হবু সরকারকে দেয়া এটা চীন উপহার। ওদিকে ভারতের নির্বাচন সমাপ্ত হলে চীনে সেকেন্ড য়ুহান [WUHAN] সম্মেলনেরও প্রস্তুতি চলছে।

    কিন্তু তাহলে বাংলাদেশের ভাগে কী?
    আপাতত ফুটা কড়ি। নির্বাচিত হওয়ার পরই আমাদের সরকার ভারতীয় মিডিয়ায় এক হুঙ্কার দেয়া সাক্ষাৎকার দিয়েছিল। সেটা এখন ফাঁপা বলে হাজির হয়েছে। সেখানে ধারণা দেয়া হয়েছিল ভারতের আপত্তি উপেক্ষা করে আমাদের সরকার নিজেই চীনা বেল্ট রোড প্রকল্পসহ চীনের সাথে ব্যাপক সম্পর্কে যাচ্ছে । সে ইঙ্গিত, সেসব ফেলে এখন বাস্তবত সরকার মুরোদহীন বলে নিজেকে প্রমাণ করছে। কারণ, ওই সাক্ষাৎকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ হত গত ২৫-২৭ এপ্রিলের বিআরএফ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চীনে টিম যাওয়ার, তা ঘটেনি। ২৩ এপ্রিল একমাত্র ইত্তেফাক বলেছিল, প্রধানমন্ত্রী নয়, একা শিল্পমন্ত্রী নাকি যাচ্ছেন। আর কোন মিডিয়া ইস্যুটা নিয়ে কিছু না করে উলটা ব্ল্যাক আউট করে দেয়। ইস্যুটিকে মিডিয়া এভাবে অগুরুত্বপূর্ণ করে ট্রিট করেছে, এতে অনুমান হয়-সরকারের কাছেও এটা অগুরুত্বপূর্ণ; তাই এমন। তাহলে জানুয়ারীতে প্রধানমন্ত্রীর ভারতের মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেয়ার বোল্ড অবস্থানের পর এখন এই গুরুত্বহীন করে দেওয়ার অর্থ কী?
    খবর না থাকাটাই একটা খবর। সেক্ষেত্রে সোজা অর্থ হল, জানুয়ারিতে সাক্ষাতকারে যাই দাবি  করে থাকুক এখন সরকার বুঝাতে চাইছে, তাঁর এখন কোনো সক্ষমতা নেই যে, ভারতের স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিজ স্বার্থে সে চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যায়। ব্যাপারটি দাঁড়াল এমন যে, নির্বাচিত হলেও ভারতের স্বার্থ ুপেক্ষা করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে কোনো অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা সরকারের নেই বলে সরকারেরই অনুমান। তাই সে আবার স্ট্যাটাস কো ফিরে গেল; যা ছিল তাই আগের জায়গায়। ভারতের স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে থাকা। ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা আমাদের সরকারের এখনো নাই, এতাই সারকথা। ইতোমধ্যে ভারতের এক মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে, চীন এবারের BRI  এর নেয়া প্রজেক্টের তালিকায় BCIM কে রাখে নাই। [China drops BCIM from BRI projects’ list]। বিসিআইএম মানে- বার্মা হয়ে আমাদের চীনের কুনমিং যাওয়ার এবং সোনাদিয়া বন্দর – এই পুরা প্রকল্পই চীন নাকি গুটিয়ে ফেলেছে। এই ক্ষবর কতটা সত্য অথবা কেন আমরা এখনও জানি না।
    ফলে আপাতত, বাংলাদেশের জন্য সব কিছুর প্রাপ্তি শূন্য। আসলে বাস্তবত পেছনের জনসমর্থন ছাড়া এক সক্ষমতাহীন ক্ষমতা আমাদের সরকারের -= এদিকটা আঁচ করেই সম্ভবত চীন বা ভারত আমাদের সরকারকে তুচ্ছ জ্ঞান করছে। তাই ভারতের স্বার্থ পূরণের অগ্রাধিকারের নিচেই চাপা পড়া আমরা। নিঃসন্দেহে তা খুবই হতাশাজনক!

    এদিকে আবার আরেক কাহিনী। আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এক সাক্ষাৎকার দিয়ে বলছেন, “সরকার চীনের বিকল্প ফান্ড দাতা খুঁজছে”। সেই খবরের শিরোনামটাই হল – “Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans…।  সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের [SCMP] ২৩ এপ্রিল ছাপা এই খবরের রিপোর্টার বাংলাদেশে এসে ওই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ভারতের প্রো-আমেরিকান কথিত বিজ্ঞদের বক্তব্য সেখানে ছাপা হয়েছে, যার সারকথা বাংলাদেশের চীনা ঋণ নিতে যাওয়া ঠিক নয়। ব্যাপারটা আসলে বড়ই রহস্যময়! প্রধানমন্ত্রী চীনা বেল্ট রোডে যোগ দিতে চেয়ে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। আর তিন মাসের মাথায় সরকারের প্রতিমন্ত্রী বলছেন, তারা চীনা বেল্ট রোডের বিকল্প ফান্ড খুঁজছেন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত  ০৪ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “বেল্ট রোড ফোরাম সম্মেলন আমরা কি নাই হয়ে যাচ্ছি“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

  • সাংহাই গ্রুপ ও আফগান তালেবানদের সাথে প্রথম অস্ত্রবিরতি

    সাংহাই গ্রুপ ও আফগান তালেবানদের প্রথম অস্ত্রবিরতি

    গৌতম দাস

    ২৩ জুন ২০১৮, ০০:০২

    https://wp.me/p1sCvy-2sl

     

     

    SCO, সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন – এই সংগঠন শুরুর ইতিহাস বহু পুরনো। এর আজকের জায়গায় আসার পেছনে কয়েকটা ঘটনা পটভূমি হয়ে আছে। সেখান থেকে জানা যায়, এসসিও বা সাংহাই গ্রুপের আজকের ভূমিকা এবং এর সম্ভাবনা ও অভিমুখ। এসসিও (SCO) বা সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন কী ও কেন?

    এমনিতেই পুরনো ইতিহাস অর্থে সাধারণভাবে বললে, সেন্ট্রাল এশিয়ার (মধ্য এশিয়া বলতে পাঁচ রাষ্ট্র বুঝায় কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরঘিজস্তান ও তুর্কমেনিস্তান। যদিও এর বাইরে মঙ্গোলিয়াসহ অন্যান্য অনেক রাষ্ট্রের অংশকেও মধ্য এশিয়া বলতে বুঝানো হয়ে থাকে।) সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী ঘটনা ঘটেছিল ইসলাম যখন বাগদাদ কেন্দ্রিক আব্বাসীয় (abbasid dynasty) খলিফা শাসন (৭৫০-১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ) আমলে। আগের শাসক চীনা ‘তাং রাজবংশ’ (Tang dynasty) আব্বাসীয়দের হাতে পরাজিত হলে সেন্ট্রাল এশিয়া সদলবলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। আর দ্বিতীয় বড় প্রভাবের ঘটনা হল, কলোনি দখলদারি যখন দুনিয়ার মুল অভিমুখ ও সাম্রাজ্য শাসনের স্টাইল সেই আমলে রাশিয়ান জার এম্পায়ারের। সে আমলে ১৮৩৯-৮৫ খ্রিস্টাব্দ মধ্যে নানান যুদ্ধে রাশিয়ার প্রাচীন জার সাম্রাজ্যের সেন্ট্রাল এশিয়াকে নিজের সাম্রাজ্যের অংশ করে নেয়। যতক্ষণ না এর পালটা বৃটিশ এম্পায়ার বৃটিশ-ইন্ডিয়ার দিক থেকে পাকিস্তানের পাঞ্জাব হয়ে আফগানিস্থানে না পৌছেছিল।

    আর একালের প্রথম ঘটনা হল, সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়া (১৯৯১) যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সদস্য ছিল রাশিয়াসহ সেন্ট্রাল এশিয়ার ঐ পাঁচ রাষ্ট্রই। তবে রাশিয়াসহ কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও কিরঘিজস্তান এরা সবাই এখন সাংহাই গ্রুপের সদস্য। আসলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে এক জোট গঠন তাদের হাতে শুরু হয়েছিল ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ- এই নাম দিয়ে ১৯৯৬ সালে; তবে তখনো উজবেকিস্তান এতে যোগ দেয়নি বলে তখন ছিল পাঁচ রাষ্ট্র, তাই ‘সাংহাই ফাইভ’।

    দ্বিতীয় ঘটনাটা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে রাশিয়াকে সবচেয়ে বড় যে ভয়ে সবসময় দিন কাটাতে হত তা হল, আমেরিকা বা ইউরোপ অর্থে, পশ্চিমা শক্তি যেন ভেঙে যাওয়া সোভিয়েত থেকে আলাদা হয়ে পড়া ১৫ রাষ্ট্র বিশেষ করে, সেন্ট্রাল এশিয়ার কোন রাষ্ট্রে বন্ধুত্ব ও খাতির জমিয়ে ঢুকে না পড়ে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক ধরণের সম্পর্ক জমিয়ে এগিয়ে যেতে না শুরু করে। যদি তা পারে তাহলে প্রায় ১৮৮৫ সালের পর থেকে নিশ্চিত থাকা রাশিয়ার এশিয়ার দিক থেকে নিরাপত্তা এবার হুমকির মুখে পড়বে। তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও রাশিয়া সবসময় চেষ্টা করে গেছে নানা উছিলা, নানান জোট, সামাজিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক করে এর মধ্য দিয়ে সেন্ট্রাল এশিয়ার সাথে জড়িয়ে থাকতে। [তবে সেন্ট্রাল এশিয়া বলতে একটা রাষ্ট্রের কথা এতক্ষণ বাদ পড়ে যাচ্ছে, তা হলো তুর্কমেনিস্তান। কারণ, দেশটি সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশনের সদস্য নয় বলে উল্লেখ করা হচ্ছে না।]

    এখন গুরুত্বপূর্ণ কথা, সেন্ট্রাল এশিয়ার নিজের সবচেয়ে বড় দুর্বল দিক হল এটা ল্যান্ডলকড এবং চার দিকে পাহাড় পর্বতের ভেতর ডুবে থাকা, এক কথায় বদ্ধ। এশিয়ার সর্বোচ্চ উত্তরে, গহীন পাহাড়ি অঞ্চল। ফলে যত বিদেশী শাসক এর জীবনে এসেছে শেষ বিচারে সে কলোনিপ্রভু এ যেমন সত্য, ততোধিক সত্য হয়ে যে, সেইই তার বদ্ধ-দশা বিশেষত বদ্ধ অর্থনৈতিক জীবনে প্রাণ সঞ্চারের ভূমিকা ও গতি আনার ক্ষেত্রে, ত্রাতা হয়ে কম বেশি ভূমিকা রেখেছে। সেন্ট্রাল এশিয়া গহীন পাহাড় ঘেরা অঞ্চল বলে সেকালের পশ্চিমা শক্তি ইউরোপও এদের দখলে নিতে আসতে পারেনি অথবা এটা তাদের পোষায়নি। তবু শেষ দিকে ব্রিটিশেরা একবার উঁকি মেরেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ এম্পায়ার তার উপনিবেশ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া থেকে আজকের পাকিস্তান তথা পাঞ্জাব হয়ে আফগানিস্তানে প্রবেশের চেষ্টা চালাতেই সেন্ট্রাল এশিয়া আরো নিশ্চিতভাবে রাশিয়ার জার সাম্রাজ্যের অধীনে পোক্ত হয়ে যায়।

    বলা যায়, সেই থেকে জার সম্রাটের উপনিবেশ হয়ে গিয়েছিল সেন্ট্রাল এশিয়া। এই সত্য পূর্ণ স্বীকার করেও বলা যায়, এই সম্রাট ও সাম্রাজ্যই ছিল তার একমাত্র আশার বাতি। কেন? কারণ ল্যান্ডলকড সেন্ট্রাল এশিয়ার আবদ্ধতা ঘোচানোর ক্ষেত্রে তিনিই একটু সম্ভাবনা। এখান থেকে বের করে সমুদ্রে পৌঁছানোর রাস্তা অথবা অন্য রাষ্ট্রের ভূমি পেরোনোর পর সমুদ্রে পৌঁছানোর সুযোগ কেউ যদি দেখাতে পারেন, তিনি হলেন ঐ উপনিবেশবাদী শাসক জার সম্রাট। ইতোমধ্যে জার সম্রাটের উচ্ছেদ ঘটিয়ে লেনিনের বিপ্লব (১৯১৭) হয়ে গেলেও ‘সেন্ট্রাল এশিয়া হল পুরনো জারের কলোনি’- এই সম্পর্কটাই থেকে যায় কিছুটা নতুন সোভিয়েত কাঠামোতেও। যা হোক, আজো সেন্ট্রাল এশিয়ায় যা কিছু কলকারখানা তা সোভিয়েত সূত্রের এবং তার সমুদ্র দর্শনও। আর অনেক কথার এক কথা হিসেবে বলা যায়, সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পরে, এখনো সেন্ট্রাল এশিয়ার পাঁচ রাষ্ট্রের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী অনবরত রাশিয়ান ভাষায় কথা বলতে পারেন। এটা তাদের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা। হয়তো নিজ নিজ স্কুলগুলোতে রুশ ভাষা শেখার সুযোগ আগের মতোই তারা এখনও চালু রেখেছেন।

    আর একাল? পুতিনের রাশিয়ার উদ্বেগের মূল কথা উপরে বলেছি। কিন্তু সামর্থ্য বা মুরোদ পুতিনের নেই। সেন্ট্রাল এশিয়ায় আমেরিকাসহ পশ্চিমের কোনো প্রভাব ঠেকাতে হলে আগেই ব্যাপক অর্থনৈতিক অবকাঠামো ব্যয় ও বিপুল বিনিয়োগের সামর্থ্য থাকতে হবে। তা হলেই হয়ত সেন্ট্রাল এশিয়ায় পশ্চিমা প্রভাব ঠেকানো সম্ভব। এই বিবেচনা থেকেই পুতিনের সব সামর্থের মূল উৎস হল চীন। পুতিনকে সাথে নিয়ে চীন ১৯৯৬ সালে ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ’ তৈরি করেছিল। এটা একই সাথে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাবিষয়ক জোট হিসেবে হাজির হয়েছিল। তুলনায় আর অন্য সব জোটের কথা আমরা শুনি এরা মূলত সবগুলোই অর্থনৈতিক জোট। এছাড়া এই জোটের ক্ষেত্রে কয়েক বছরের মধ্যে আরো সহজেই আগানোর সুযোগ এর হাতে আসে।

    নাইন-ইলেভেনের (২০০১) হামলার পর আমেরিকার আফগানিস্তান ও ইরাক হামলা সাংহাই উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে প্রথম ধাক্কায় মনে হলেও পরে (২০১১) বুঝা যায়, এটা আসলে আশীর্বাদ হয়েই এসেছে। তবে মনে রাখতে হবে, নাইন-ইলেভেনের আগেই ২০০১ সালের জুন মাসে আগের ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ’ নিজেকে SCO, (সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন)- এই নতুন নামে ও ম্যান্ডেটে নিজেদের পুনর্গঠিত করে নিয়েছিল। এই লেখায় সংক্ষেপে এরপর থেকে একে ‘সাংহাই গ্রুপ’ লিখব।

    ওবামার আমেরিকার ২০১১ সালে এসে আফগানিস্তান থেকে হাত গুটিয়ে এ দেশকে বিধস্ত করে ফেলে পালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মূল কারণ ওই যুদ্ধ অনন্তকাল অমীমাংসিত থেকে যাওয়ার দিকে চলে গিয়েছিল। এ ছাড়াও যুদ্ধের ব্যয় বেড়েই চলেছিল। এ এক বিরাট জগাখিচুড়ি। জট পাকানো এই দশা থেকে বের হওয়ার সব উপায় আমেরিকা হারিয়ে ফেলেছিল। ওদিকে যুদ্ধের ব্যয় বহন করতে গিয়ে আমেরিকা অপারগ হয়ে শুধু নিজ অর্থনীতি ভেঙে ফেলা নয়, বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দাও ডেকে এনেছিল। এই পরিস্থিতিই SCO -এর জন্য বড় আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দেয়।

    লক্ষণীয় ব্যাপার হল, ভৌগোলিক অবস্থান হিসেবে সাংহাই গ্রুপের সদস্য সবাই আফগানিস্তানের পড়শি এবং আফগানিস্তানের সাথে তাদের সীমান্ত আছে। ফলে আমেরিকা নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার পরের পরিস্থিতিতে কারা তালেবান ও প্রো-আমেরিকান আফগান সরকারকে সহায়তা করবে, কে শান্তি স্থিতিশীলতার দিকে নেবে, এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা কারা তালেবানদের সাথে শান্তি আলোচনার কোন রফায় পৌঁছাতে পারবে – এমন শক্তির অনুপস্থিতি ও অভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয়। বলা বাহুল্য, ওই অঞ্চলের সবকিছুকে গভীর সঙ্কটে হ-য-ব-র-ল করে ফেলা আমেরিকা নিজেরও স্বার্থ ছিল এখানে। কিন্তু সে কাজে তার নিজের কোনো ভূমিকার গ্রহণযোগ্যতা কোথাও ছিল না।

    স্বভাবত এই পরিস্থিতিতে চীনের নেতৃত্বে সাংহাই গ্রুপ দুনিয়াজুড়ে সবার কাছেই ‘একমাত্র ত্রাতা’ হয়ে হাজির হয়। কারণ আফগানিস্তানে পশ্চিমা শক্তির তুলনায় যে কারো চেয়ে চীন হল সবচেয়ে বড় গ্রহণযোগ্য শক্তি। এর মূল কারণ, আফগানিস্তানে একমাত্র চীনের হাতেই কোনো অস্ত্র নেই। ফলে অসহায় আমেরিকা প্রকাশ্যে চেয়েছে এবং স্বীকার করেছে চীন আফগানিস্তানে ভূমিকা নিক। সাংহাই গ্রুপ ভূমিকা রাখুক। অন্তত যুদ্ধে ভেঙে পড়া আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে, অবকাঠামো গড়তে।

    মোটামুটি ২০১৫ সাল থেকেই চীন আফগান তালেবানদের সাথে ডায়লগে এক খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। তবে এর আগেও এবং পাশাপাশি, আফগানিস্তানে সামাজিক পুনর্বাসন, পুনর্গঠনসহ বহু অর্থনৈতিক অবকাঠামো খাতে চীন বিনিয়োগ নিয়ে তৎপর হয়ে গেছিল। এ ছাড়াও আফগানিস্তানকে এখন সাংহাই গ্রুপের ‘অবজারভার সদস্য’ করে নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত ও পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রই এ বছর থেকে এর পূর্ণ সদস্য। ফলে সব মিলিয়ে আফগানিস্তান বুঝে গিয়েছিল আমেরিকার মতো চীনের হাতে অস্ত্র নেই, অথচ চীনের হাতে আছে পলিটিক্যাল নেগোসিয়েশনের সামর্থ্য ও যোগ্যতা। আর শান্তি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যা প্রধান উপাদান, মানুষকে পুনরায় অর্থনৈতিক জীবন ও তৎপরতায় ফিরিয়ে নেয়ার বাস্তব শর্ত- বিনিয়োগ সক্ষমতা, যা একমাত্র চীনের এবং সে তা দিতে অপেক্ষা করছে।  ফলে চীনা উদ্যোগ এবং তার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা – সহজেই কাজ করতে শুরু করেছিল। এখন শুধু কাজ করতে নয়, ফল দিতেও শুরু করেছে।

    এটা টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটা রিপোর্ট। এখানে মূল ঘটনাটা হল চীনের তালেবান ইস্যুতে অর্জন। ঘটনাটা হচ্ছে, সদ্য শেষ হওয়া এই ঈদে তালেবান বনাম সরকার যুদ্ধে এই প্রথম উভয় পক্ষ তিন দিনের অস্ত্রবিরতি পালন করেছে। তাই খবরের শিরোনাম, “Taliban agrees to unprecedented Eid ceasefire with Afghan forces”।  ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে এই প্রথম এক সত্যিকারের ঈদ অনুভব। তাঁরা এই প্রথম আত্মীয়স্বজনে মিলে ঈদ পালন করেছে। ওই রিপোর্ট লিখছে, ‘তালেবানেরা ২০০১ সালের পর এই প্রথম আফগান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে এক অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করে। চিন্তাও করা যায় না এমন ঘোষণাটা আসে আফগান সেনাবাহিনী তালেবানদের বিরুদ্ধে তাদের তৎপরতা সপ্তাহব্যাপী স্থগিত ঘোষণা করার দু’দিন পরে। [“The Taliban announced its first ceasefire in Afghanistan since the 2001 US invasion today against the country’s security forces.  The unexpected move came two days after the Afghan government’s own surprise announcement of a week-long halt to operations against the Taliban.] তবে তালেবানদের শর্ত ছিল, এই বিরতি ‘বিদেশী দখলদার’ [আমেরিকা বা তার বন্ধুদের বুঝানো হয়েছে] জন্য প্রযোজ্য হবে না।
    ইতোমধ্যে পাকিস্তানের মিডিয়া রিপোর্ট হল, পাকিস্তান ও চীনের প্রবল তৎপরতার কারণেই কেবল তালেবানেরা যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। [Afghan Eid truce ‘backed by Pakistan, China’] কারণ এব্যাপারে তালেবান নেতাদের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল যে, “কেবল চীন ও পাকিস্তান গ্যারান্টার হলে তবেই আমরা যুদ্ধবিরতিতে যাবো। কারণ আমরা বাকিদের (আমেরিকা) বিশ্বাস করি না”।

    ডিপ্লোম্যাট মহলে এখন এমন আলোচনা উঠেছে, চীন এমন এক ক্ষমতাবান মধ্যস্থতাকারীর আস্থা অর্জন করেছে যে, চাইলে এক দিকে আফগান সরকারের ওপর চাপ খাটাতে পারে, অন্য দিকে সে কারণে চাপ খাটাতে পারে তালেবানদের ওপরেও। কেন এবং কী করে এটা সম্ভব হয়েছে? কারণ, গত ডিসেম্বর থেকে আফগান-পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে চীন নিয়মিত ডায়লগ অনুষ্ঠান করে আসছে। ফলে স্বভাবতই এখন যেকোনো সময় আফগানিস্তানে অস্ত্রবিরতি ডাকা, নেগোসিয়েশনে বসানো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে চীন ঘন ঘন দেখতে পা্রবে বলে সবাই আশা করছে। নিঃসন্দেহে, এটা এক বিরাট আশার আলো।

    এখন এর পাল্টা ঘটনাটা স্মরণ করা যেতে পারে। ঘটনাটা হল, গত বছরের আগস্টে ট্রাম্পও তাঁর আফগান পলিসি দিয়েছিলেন। সেখানে ভারতকে আফগানিস্তানে ব্যবসার সুবিধা নিতে ডাকা হয়েছিল আর পাকিস্তানকে তালেবানদের (হাক্কানি গ্রুপ) সহায়তার দায়ে অভিযুক্ত করে সাবধান করা হয়েছিল। সাথে আমেরিকান ৮০০ মিলিয়ন ডলারের সাহায্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছিল। আসল ঘটনা ছিল অন্য।

    পাক-আফগান সীমান্ত চিহ্নিতকরণ নিয়ে বিতর্ক সেই ১৮৯৩ সালের আফগান যুদ্ধ-পরবর্তী “ডুরান্ড লাইন” টানা থেকে। এটা অবাস্তাবায়িত থেকে যাওয়ার মূল কারণ মূল পশতুন বা পাঠান জনগোষ্ঠিকে ভাগ করে ফেলে এই লাইন। ফলে লাইন ফেলে রেখে সীমান্ত পোস্ট বৃটিশ আমল থেকেও বৃটিশ-ভারতের [বর্তমান পাকিস্তান] ভিতরে গাড়া হয়, তাতেও সুরাহা আসে নাই।  এ ছাড়া একালের কয়েক লাখ আফগান উদ্বাস্তু হয়ে পাকিস্তানে এসেছে, এখন তারা প্রায় স্থায়ী। ফেরার নাম নাই।  স্থানীয় পাকিস্তানিদের মতোই সব ব্যবসায় ওরা জড়িত। এসব খুবই স্পর্শকাতর ইস্যু। এর বিতর্ক খুবই গভীর কিন্তু তালেবান ইস্যু সামনে থাকাতে এর আড়ালে তা কাজ করে থাকে।  খুব সম্ভবত আগাম পদক্ষেপ হিসেবে পাকিস্তান আফগানিস্তানে নিজ প্রভাব তৈরির কথা ভেবে কিছু তৎপরতা পরিচালনা করে থাকে। তাই আফগান তালেবানদের হাক্কানি গ্রুপের সাথে পাকিস্তান বিশেষ সম্পর্ক রাখে। এটাকেই ট্রাম্প প্রচার করেছেন যেন ‘পাকিস্তানের প্ররোচনাতেই তালেবানেরা তালেবান হয়েছে’- এমন প্রপাগান্ডায় শামিল হয়ে। অপর দিকে, এটাই ট্রাম্পের সাথে ভারতের নীতির মিল। ‘পাকিস্তান মানে তালেবান’- এই প্রপাগান্ডা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে মাইলেজ দেয়। ট্রাম্পের এই প্রপাগান্ডা যেন বলতে চায়, পাকিস্তানই টুইন টাওয়ারে হামলা করেছিল। পাকিস্তানই তালেবানের জনক। অথচ কঠিন বাস্তব তা হল, ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখলের প্রতিক্রিয়া থেকে পাকিস্তান আমেরিকার ইচ্ছায় বাধ্য হয়ে তালেবান দায় নিয়ে আমেরিকার প্রক্সি যুদ্ধ করে গেছে, যাচ্ছে।

    যা হোক, ট্রাম্পের আমেরিকার পাশাপাশি চীনা কূটনীতির অ্যাপ্রোচ লক্ষণীয়। চীন শুরু করেছে পাক-আফগান অমীমাংসিত বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা থেকে এবং তাদের ডায়লগ এখান থেকেই। ট্রাম্পের মত পাকিস্তানকে তালেবান বলে গালি দিয়ে, সব দায় চাপিয়ে ওরা শেষ করেনি।
    এ ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট, গ্লোবাল এম্পায়ার বা লিডারের কিছু ভূমিকায় ইতোমধ্যেই চীন আমেরিকাকে সরিয়ে জায়গা নিয়ে ফেলেছে, ক্রমশ আগিয়ে আসছে চীন।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২১ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “সাংহাই গ্রুপ ও তালেবানের প্রথম অস্ত্রবিরতি”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

  • চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

    Talks over dinner: Prime Minister Narendra Modi with U.S. President Donald Trump, Japanese Prime Minister Shinzo Abe and other leaders at a dinner in Manila on Sunday. | Photo Credit: PTI

    চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

    গৌতম দাস
    ২৮ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার ০০:০৪

    https://wp.me/p1sCvy-2lK

     

     

    চলতি নভেম্বর মাসে প্রথম দুই সপ্তাহ জুড়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এশিয়াতে নানান রাষ্ট্রে এক সিরিজ সফরে এসেছিলেন। তিনি ৩ নভেম্বর হাওয়াই দিয়ে সফর শুরু করেছিলেন। এরপর পাঁচটি রাষ্ট্রের (জাপান, দ: কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন) প্রত্যেক রাষ্ট্রে তিনি কমপক্ষে এক দিন করে কাটিয়েছেন। এ ছাড়া এই সফরকালে দুটি ‘রাষ্ট্রজোটের সম্মেলন’ হওয়ার সিডিউল ছিল – ভিয়েতনামে ২১টি রাষ্ট্রের এপেক সম্মেলন আর ফিলিপাইনে ১০ রাষ্ট্রীয় আসিয়ান সম্মেলন। ফলে ওই দুই সম্মেলনসহ মিলিয়ে ট্রাম্পের অংশগ্রহণ হিসাব করলে আরও প্রায় দুই ডজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ট্রাম্প এই স্বল্পকালে মোলাকাত করেছেন। এদের মধ্যে বার্মার সু চিও ছিলেন। এর বাইরে, এই সফরে ট্রাম্পের যাওয়া হয়নি এমন আরো কিছু এশিয়ান রাষ্ট্রে (আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার) কাছাকাছি সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) রেক্স টিলারসন সফর করেছেন। সব মিলিয়ে গত এক মাস এশিয়া ছিল আমেরিকান কূটনীতির টগবগে মুখ্য ফোকাস।

    ট্রাম্পের এই এশিয়া সফরকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখা যায়। তাতে এর একটা অংশে ছিল বলা যায় ট্রাম্পের চীন সফর; মানে চীনের কাছ থেকে সঙ্ঘাতহীন পথে, তবে স্বার্থে অটল থেকে, আমেরিকান বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থ বুঝে নেয়া বা আদায় করার আলাপ। আর এর সাথেই এই অংশে ছিল, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে চীনের ভূমিকা আমেরিকার জন্য ইতিবাচক – এই অনুভব নিয়ে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ কোরিয়া, তাকে আশ্বস্ত করার সফর। ট্রাম্পের বাকি এশিয়ান রাষ্ট্র সফর ছিল অন্য ভাগে। সেটার নাম দেয়া যায়, এশিয়ায় চীনের পাল্টা প্রভাব সৃষ্টি ও বিস্তারের লক্ষ্যে সফর। আগের ওবামার প্রশাসন বলেছিল, তাঁর ভাষায়, ‘এশিয়ায় এখনো আমরাই নেতা আছি’। এই ভাব ধরে তিনি এশিয়া সফর করেছিলেন; তবে এটা কূটনীতিক ভাষার আড়াল। এখান থেকে লুকিয়ে থাকা কথার তাৎপর্য খুব বোঝা যাবে না। তাই সরাসরিভাবে বললে, এশিয়ায় আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment’) নীতি জারি আছে সেই ২০০৭-০৮ সাল থেকে। সে সময় সেটা প্রথম প্রেসিডেন্ট বুশ তাঁর কর্মসূচি হিসাবে চালু করেছিলেন। সেটা ওবামার হাতে আরও গোছানো আকার পেয়ে নাম হয়েছিল ‘এশিয়া পিভট’ বা ভরকেন্দ্র নীতি (Asia pivot)। সেই নীতিটাকেই আরেকবার অন্তত নামের কিছু পরিবর্তন করে তা নিয়ে এবার ট্রাম্প এশিয়ায় গিয়েছিলেন। বদলে নেয়া সে নাম হল, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ পলিসি (indo-pacific)। এটাকেই আগে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ নীতি বলা হত। এখন ট্রাম্পসহ তার প্রশাসনের লোকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে একে ডাকছেন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতি বলে। বলছেন, ‘একটা মুক্ত অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিকের অঞ্চল’ (“free and open Indo-Pacific” ) বজায় রাখার পক্ষে আমেরিকা সবার অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নামে ডাকার পরে এ নিয়ে মিডিয়া-প্রতিক্রিয়া হল, এটা কোনো নতুন নীতি নয়। অর্থাৎ চীন ঠেকাও নীতি আমেরিকার যেটা ছিল – সেটাই নতুন মোড়কে এখনও মূল লক্ষ্য হয়ে আছে। তবে একালে এর ভেতর কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও তার বন্ধুজগতে।

    তবে ‘চীন ঠেকানো’ – এই ধারণার অরিজিনাল উৎস অন্যখানে, অন্য কারণে। সেটা হল, আমেরিকা একক পরাশক্তির এক গ্লোবাল পাওয়ার হলেও তা আর থাকছে না – নিজ সার্ভে-স্টাডি  থেকে পাওয়া ফ্যাক্টস আমেরিকা যেদিন নিজ সরকারি গবেষণা অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন থেকেই প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার করণীয় পদক্ষেপ হিসাবে  ‘চীন ঠেকানোর’ চিন্তাভাবনার শুরু ঘটেছিল। দুনিয়ার আমেরিকান নেতৃত্বের (অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব) অবস্থান চীনের হাতে চলে যাওয়া এবং স্টাডি বলছে তা আর ঠেকানো অসম্ভব বলে আমেরিকান অবস্থান হল, তাহলে  অন্তত বিলম্বিত করিয়ে দেয়া যায় কি না, এর লক্ষ্যেই ঐ  ‘চীন ঠেকানোর’  পদক্ষেপ নিয়েছিল আমেরিকা। সেই পদক্ষেপ হিসেবে যেমন, এশিয়ায় আরেক রাইজিং অর্থনীতি হল ভারত, আমেরিকা সিদ্ধান্ত নেয় যে তাহলে ভারতের পিঠে হাত রাখা, আর কাছে টেনে ফেভার করে অন্তত ভান করে একে চীনের বিরুদ্ধে লাগানো –  আমেরিকার এই ভারত নীতিও চীন ঠেকানোর মতলবে। তবে আমেরিকা সেকাজ  ‘একটি মুক্ত অবাধ এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’- এর গুরুত্ব বুঝানোর আড়ালে এটাকেই তার ‘এশিয়া নীতি’ বলে হাজির করেছে।

    সাইড লাইন
    যেকোনো রাষ্ট্রজোটের আহূত সম্মেলনে মূল অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশগ্রহণ করেও এর ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও সেরে নিয়ে থাকেন। আসিয়ান সম্মেলনে তেমনি এক “বিশেষ বৈঠক” হয়েছে। এই বৈঠকের ব্যাপারটা, মানুষের অনেক গোপন সম্পর্ক থাকে এবং মরার বয়সে পৌঁছলে সে পাবলিকলি তা স্বীকার করে ফেলে, অনেকটা যেন সেরকম। তবে এর গুরুত্ব ভিন্ন অর্থে আসিয়ান সম্মেলনের চেয়ে বেশি বলে অনেক মিডিয়া গুরুত্ব দিয়েছে। সেই “বিশেষ বৈঠকের” নাম হল, এক ‘কোয়াড’ ব্লকের মিটিং।

    আসিয়ান সম্মেলনের সাইড লাইনে এশিয়ায় চীনবিরোধী এক  নিরাপত্তা জোটের আদলে তবে প্রকাশ্যে – আমেরিকা, জাপান, ইন্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়া – এই চার রাষ্ট্রপ্রধানেরা এক সাথে বসেছিলেন। কিন্তু সেটা আবার কোনোভাবেই যেন শোরগোল না তুলে ফেলে, চীন যেন ক্ষেপে না যায়, সে দিকে খেয়াল রেখে তা তারা করতে চেয়েছে। যেমন এভাবে চার রাষ্ট্রের একসাথে বসার নাম কী, সে দিকে তারা নিজেরা এর কোন নাম দেননি। কিন্তু  মিডিয়া এটাকে নিজ উদ্যোগে বা নিজের রিপোর্টিংয়ের স্টাইলে  “কোয়াড ব্লক”  [QUAD BLOC] (ইংরেজি কোয়াড মানে চার – ফলে যেন চার মুরব্বির জোট) বলা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোনো যৌথ ঘোষণাও ঐ বৈঠক থেকে দেয়া হয়নি। নেহায়েতই চার নেতার এক ডিনার যেন এভাবে লো-প্রফাইলে রেখে, তবে যারা ট্রাম্পের এশিয়া নীতি- ‘একটি খোলা এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’-এর গুরুত্ব বোঝানোর কাজে একমত, তারাই যেন জড়ো হয়েছেন। তবে এই ‘কোয়াড’ করার আইডিয়াটা অনেক পুরনো। ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এই চার রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রস্তাবটা পেশ করেছিলেন। কিন্তু এত দিন সেটা আলোর মুখ দেখেনি। আর এখন যৌথ ঘোষণা না দিতে পারা ‘কোয়াড’, ওই ডিনার অনুষ্ঠানের পরবর্তীকালে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সচিবপর্যায়ে একসাথে বসলেও শেষে যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় – (ভারতের প্রাচীন দক্ষিণী দৈনিক ‘দি হিন্দু’ অনুসারে), ‘চার দেশের বিবৃতি চার রকমের।’ সার কথায় বললে, এখন আমরা দেখছি, আসলে তাদের পরস্পরের অবস্থানে বড় ধরণের ভিন্নতা আছে। সেসব নিরসন করে নিবার আগেই কিংবা তা নিরসণযোগ্য কিনা সেসব যাচাইয়ের আগেই তারা তাড়াহুড়াতে একসাথে বসে গিয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ভারত, এটা চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সরাসরি বিরোধিতাকারী জোট হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু বাকিরা মনে হচ্ছে সেখান থেকে সরে গেছেন। বিশেষ করে ট্রাম্পের এ মাসের চীন সফরে তিনি, চীন-আমেরিকার যৌথ ৪০ বিলিয়ন ডলারের এক ‘সিল্ক রোড ফান্ড’ গঠনের চুক্তি করে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?

    গ্লোবাল বা রিজিওনাল রাজনীতি বোঝাবুঝির দিক থেকে, বিশেষ করে ‘জাতীয়তাবাদী’ অবস্থান বলতে  কী বুঝায় আর তা একালে বুঝাবুঝির দিক থেকে তা কী আগের কোল্ড ওয়ার কালের মতই নয়? জবাব হল যে না, চলতি শতক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই বুঝাবুঝির দিক থেকে ভিন্ন হয়ে গেছে। বোঝাবুঝি এখন বদলে গেছে। আমরা যে জাতীয়তাবাদী ধারণা নিয়ে গত শতকে যেসব অভিজ্ঞতায় বড় হয়েছি তার অনেক কিছুই এই শতকে আর মিলছে বা মিলবে না, অচল। সংক্ষেপে বললে এর মূল কারণ হল, সেগুলোর পটভূমি ছিল কোল্ড ওয়ারের ‘গ্লোব’, অর্থাৎ যেকালে দুনিয়া একই তা সত্বেও সেটা দুটা বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির ব্লক, দুটা রাষ্ট্রজোট হয়ে দুনিয়ায় বিরাজ করত। অর্থাৎ যোগাযোগ সম্পর্কের দিক থেকে দুটোই আলাদা, বিচ্ছিন্ন। পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির বিনিময়ের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি অর্থনীতিতে বড় হয়ে ঐ শতক কাটিয়েছি আমরা। ক্যাপিটালিজম সম্পর্কে বা এর বিস্তারিত বিনিময় সম্পর্ক সম্পর্ককে আমরা যা জেনেছি বুঝেছি, তা কোল্ড ওয়ারের বিচ্ছিন্ন দুই ব্লকের অর্থনীতির পটভূমিতে। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে (চীনের বেলায় আরো আগেই, ১৯৭৮ সালের পর থেকে) ভেঙে যাওয়ার পর ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা আগের দুনিয়া তখন থেকে আর বিভক্ত থাকল না, এবার এক্‌ একটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে সকলে এসে গেছিল। এতে আমরা সবাই এবার ভাগহীন, দুনিয়াজুড়ে এক ব্যাপক বিনিময় সম্পর্কের – পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির ব্যাপক বিনিময়ের যুগে প্রবেশ করে গেছি। যেটা আবার আর কখনও উলটা পিছনে ফিরে যাবে না  (irreversible)।  আর এর ভেতরে আগের রক্ষণশীল ব্লক যুগের জাতীয়তাবাদের ধারণা যেটা ছিল, তা একালে অচল হয়ে যায়। কারণ আগেকার কালের পারস্পরিক বিনিময় সম্পর্কহীন যে দশা দুনিয়া ছিল তার আর  কোনো অবশেষও নেই এখন, এমন সেইকালের জাতীয়তাবাদ ধারণা এখন পালটিয়ে গেছে। আমরা এখন দুনিয়াজুড়ে সবাই  ওতপ্রোতভাবে পরস্পরের সাথে গভীর পণ্য লেনদেনে ও বিনিময় সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। চলতি পটভূমিতে তখনকার জাতীয়তাবাদবোধ তো অচল হবেই। তাই এই নতুন গ্লোবাল বিনিময়ের দুনিয়ায় কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্রজোট খাড়া করা এবং তা টেকানো খুবই কঠিন ও জটিল। যেমন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার অন্যদের নিয়ে কোনো রাষ্ট্রজোট করে টিকানো খুবই কঠিন ও জটিল হবে। তাই আমরা দেখছি। কারণ খোদ আমেরিকাসহ হবু জোটের সব রাষ্ট্রই প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে আবার চীনের সাথে নানা পণ্য বিনিময়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। তবে সেই সাথে যার যার মত স্বার্থবিরোধও আছে। কিন্তু তা থাকলেও চীনের বিরুদ্ধে সবার স্বার্থ-ঝগড়া  কমন নয়, একরকম নয়। অর্থাৎ চীনের সাথে বিরোধ আছে; কিন্তু একেক রাষ্ট্রের ইস্যু একেকটা। সেখান থেকে একটা কমন স্বার্থ বের করা খুবই মুশকিল। এ ছাড়া ‘কোয়াডের’ চার রাষ্ট্র তাদের নিজেদের মধ্যেও তো পরস্পরবিরোধী গুরুতর স্বার্থবিরোধ আছে। যেমন-  বিদেশি ব্যাংক, বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্সিং খাতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া নানা ইস্যুতে তৎপরতায় খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের স্বার্থ-অবস্থান আছে। আবার এবিষয়ে চীনের সাথে তাদের গভীর স্বার্থ সম্পর্ক। ফলে তারা চীনের সাথে এখানে হাত মিলিয়ে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। ওদিকে আমেরিকার বিরোধী রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে গঠিত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোট ‘সাংহাই কো-অপারেশন’ গড়ে উঠে জমে উঠছে। আর তাতে সদ্য যোগ দেয়া সদস্য হল ভারত। ফলে  চীন যেমন গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার স্থান নেয়ার জন্য ধাবমান, প্রায় তেমনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দেয়ার আকাঙ্খা তো ভারতেরও আছে। কারণ আগের নেতা মাতবরের মাতবরি ঢিলা না হলে চীন বা ভারত উঠবে কেমন করে। ফলে সেই আকাঙ্খা পূরণের দিক থেকে দেখলে, অন্তত এই ব্যাপারে ভারতের কাছে চীন বাস্তব সঙ্গী ও বন্ধু; এক পথের পথিক। এই অবস্থায় আগেরকালের জাতীয়তাবাদ দিয়ে একালের রাষ্ট্রস্বার্থবোধ বুঝতে চাইলে মারাত্মক ভুল হবে; আগের জাতীয়তাবাদী বোধের ধারণা একালে এজায়গায়  অচল। জটিলতা হল একালে যার সাথে বড় স্বার্থবিরোধ আছে, তার সাথেই আবার গভীর বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়েও থাকে।

    আরো কথা আছে। রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষক, বিরাট অভিজ্ঞতা-দাতা। মানুষের কী হবে, মানুষ কে, কী – এসবের জবাব উত্তর একালে জানতেই লাগবে। মানুষের মর্যাদা কী হবে, এটা কি অর্থনীতির বাইরের প্রশ্ন? মানুষের মর্যাদা, মৌলিক মানবিক-রাজনৈতিক অধিকার এগুলো পাশ কাটিয়ে কি আমরা একটি গ্লোবাল অর্থনীতি চালাতে টিকাতে পারব, এর এক অর্ডার, নিয়মশৃঙ্খলা কায়েম করতে পারব?

    জবাবে সারকথাটা হচ্ছে, আসলে মানুষের মর্যাদা, মানুষের মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে দুনিয়ায় সবার জন্য পালনীয় এবং তা সবাইকে রক্ষা করতে বাধ্য ও কমিটেড হতে হবে – এমন এক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবশ্যই লাগবে, এটা পূর্বশর্ত। এটা ছাড়া কোন গ্লোবাল অর্থনীতি হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে এ’বিষয়ে নুন্যতম কিছু কমিটমেন্টে যেতে হতেছিল।
    কেবল অর্থনীতিই সব, জীবনের সব লক্ষ্য অর্জন মানেই বৈষয়িক অর্জন- এটা সবচেয়ে ভুল কথা, এক অর্থহীন ধারণা এর প্রমাণ?

    এই যে ‘কোয়াড ব্লক’, আমেরিকা জাপান ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মিলে চারটি রাষ্ট্র – চীনের বিরুদ্ধে, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের বিরুদ্ধে জোট হয়ে উঠতে চেয়েছিল। চীনের বিরুদ্ধে এটাই তাদের কমন লক্ষ্য হওয়ার কথা। তাহলে রোহিঙ্গারা, সামান্য এগারো লাখের এক জনগোষ্ঠী – এক রোহিঙ্গা ইস্যু তাদের কোথায় নিয়ে গেল? আমরা দেখলাম মোটা দাগে বললে যে প্রক্রিয়াতে যাক, চীন আর ভারত এক দিকে  বা পক্ষে, আর আমেরিকা আরেক দিকে, কেন? ‘কোয়াড’ গড়ার খায়েশ যাদের আছে তাদের তো এই আলাদা আলাদা পরিণতি হওয়ার কথা নয়। কোয়াড ব্লকের সাথে মিলের দিকে তাকিয়ে বললে চীন একা আর বাকি চার বিপরীত পক্ষে এমন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয় নাই। কেন?

    এটা প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো জোট বা কোনো কমন স্বার্থ খাড়া করা যায় না, যাবে না। টিকবে না। মানুষকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ বলেও কিছু নেই।

    ভারতের এক আঁতেল, থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব হলেন সাবেক নৌ-কমডোর সি উদয়ভাস্কর।  ‘কোয়াড’ গঠনে তিনি মহা খুশি, উদ্বেলিত আবেগি। তিনি বলছেন, চার রাষ্ট্রজোট গঠনে উচ্ছসিত তিনি শিরোনামেই লিখছেন, এটা নাকি “ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স” বলে। বলছেন, ‘কোয়াড’ যাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে তারা হলেন সব ‘গণতন্ত্রের লোক’। ‘গণতন্ত্র তাদের লক্ষ্য, তাদের ধ্রুবতারা-চোখের মণি। [Democracy as a lodestar for partnership is enticing.] সে দিকে তাকিয়ে নাকি হাঁটছে ওই ‘কোয়াড’। ‘এটা হলো গণতন্ত্রীদের ঐক্যতান কনসার্ট’(concert of democracies ) । হতে পারে হয়তো; তবে সেটা স্ব স্ব রাষ্ট্রসীমার ভেতরে। আর চীনকে নিচু দেখানোর উদ্দেশ্যে বললে, তা বটে, ঐ চার তারা নির্বাচনের দেশ। কিন্তু তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো ‘কোয়াডের’ সদস্যরা (like-minded democracies) একমত নন কেন? একপক্ষে নন কেন? ‘গণতন্ত্রীদের ঐক্যতানের’ পক্ষরা এক দিকে; আর বিপক্ষরা চীনের সাথে অন্য দিকে – এই ভিত্তিতে অবস্থান নিতে পারলেন না কেন? আর তারা যদি গণতন্ত্রকে “ধ্রুবতারা মেনে হেঁটেই” থাকেন, সে ক্ষেত্রে তাদের এই গণতন্ত্রবোধ নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমায় থেমে যায়? বাইরে অকেজো কেন? বার্মার জেনারেল বা সু চির উপর প্রযোজ্য নয় কেন? উদয়শঙ্করের ভারতের “গণতন্ত্রবোধ”  রাষ্ট্রসীমার ভেতরেই কেবল কাজ করে, কেন? আর বাইরে কাজ করে না বলেই রোহিঙ্গারা মরবে, ১৯৯২ সালের নাগরিকত্ব আইন ওদের ওপর প্রয়োগ করা হবে কেন? গ্লোবাল ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইট বলে কিছু থাকবে না বা নেই কেন? অথচ উদয় শঙ্করেরা এ ব্যাপারে উদাসীন হবেন। হায়রে গণতন্ত্রী!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

    আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

    গৌতম দাস

    ২২ আগস্ট ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০০ঃ১১

    http://wp.me/p1sCvy-2hc

     

    সম্প্রতিকালে সামগ্রিকভাবে চীনের সামরিক শক্তি বিশেষত নৌশক্তি চোখ টাটানোর মত বেড়েছে। আর তা নিয়ে আমেরিকার মধ্যে উদ্বিগ্নতা তৈরি করেছে। সাপ্তাহিক লন্ডন টাইমসের ভাষায়, চীনের শক্ত নেভি সক্ষমতা গড়ে তোলা আমেরিকার অফিসিয়ালদের উদ্বিগ্ন করেছে। “China’s naval build-up worries American officials”। কিন্তু একই নিঃশ্বাসে ইকোনমিস্ট বলছে, আমেরিকার এতে উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে বরং স্বাগত জানানো উচিত। কেন?

    ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল পরিসরে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র- এ তিন শক্তির মাঝে পারস্পরিক শত্রুতা আছে। আবার সেই সাথে বন্ধুত্ব না হলেও কে কার কতটুকু কাজে আসে, আসছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতোমধ্যে চীনের পিএলএ মানে ‘পিপলস লিবারেশন আর্মির’ ৯০ বর্ষপূর্তি খুবই ঘটা করে পালিত হলো গত ৩০ জুলাই। এই পিএলএ (PLA) হল চীনের রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর নাম। বিগত ১৯২৭ সাল থেকে ক্ষমতা দখলের জন্য চীনা কমিউনিস্ট পার্টির গঠিত সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগঠনই হল এই পিএলএ। জন্মের ২২ বছর পরে ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবের বিজয়ের পরে ঐ সংগঠনই নয়াচীনের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী হিসেবে জায়গা নেয়। সেই পিএলএ’র ৯০তম বার্ষিকী এবার খুবই ঘটা করে পালন করা হল।

    এর প্রধান উদ্দেশ্য, চীনের এতদিনের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হওয়ার পর সে ফলাফল ও সক্ষমতা ব্যবহার করে একটু একটু করে চীনের সামরিক সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছিল। কিন্তু এই নিজের সামরিক সক্ষমতা কী কী অর্জিত হয়েছে, এরই এক প্রদর্শনী করা হল। এর বিশেষ তাৎপর্য আছে। ইতোমধ্যে যুদ্ধবিমান বহনকারীর কোন যুদ্ধজাহাজ চীনের ছিল না, যেটা সে অর্জন করেছে। এরকম আরও বহু কিছু যেগুলো আগে আমেরিকার আছে দেখে নিজেদেরও একদিন হবে বলে চীনারা স্বপ্ন দেখেছিল।  আসলে পিএলএ এবারের ৯০তম বার্ষিকী জাঁকজমক করে পালন করে এটাই দেখাতে চেয়েছে যে, গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তারা চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ রেখেছিল  এবং ইতোমধ্যেই তা অর্জিত হয়েছে। এবার সেই সামর্থ্য খরচ করে সামরিক শক্তি কতটুকু হয়েছে তাই প্রদর্শন করতে নেমেছে তারা।

    গত ২৯ জুলাই লন্ডনের ইকোনমিস্ট সাময়িকী এসব বিষয় নিয়ে দুটো বিশেষ আর্টিকেল ছেপেছে।  যার প্রথমটা মূলত এই ইস্যুতে তবে চীন-আমেরিকা সম্পর্কে ফোকাস করে। আর পরেরটা চীন-রাশিয়ার সম্পর্কের দিক থেকে।  ইকোনমিস্ট লিখেছে, ‘ চীনা নেভির এই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমেরিকা উদ্বিগ্ন। কখনো কোনো একটা সপ্তাহ বাদ যায়নি যে, চীনাদের একটা না একটা সামরিক সক্ষমতার অগ্রগতির খবর সেখানে নেই। গত এপ্রিলে তারা স্থানীয়ভাবে তৈরী এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার যুদ্ধজাহাজ ভাসিয়েছে। আর জুনে আমেরিকার সমতুল্য ১০ হাজার টনের এক ডেস্ট্রয়ার ভাসিয়েছে। আর এ মাসে চীনা সৈন্য বোঝাই করে যুদ্ধজাহাজ সুদূর আফ্রিকার জিবুতি রওনা হয়েছে। জিবুতিতে জায়গাজমি লিজ নিয়ে এই প্রথম নিজ সীমানার বাইরে চীনা এক সামরিক ঘাঁটি চালু করা হল। আর এই সপ্তাহে রাশিয়ার সাথে যৌথভাবে বাল্টিক সাগরে (সুইডেন, ডেনমার্ক বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো যার উপকূলে) যৌথ সামরিক মহড়া করেছে চীন।’ ইকোনমিস্টের মতে, স্বভাবতই এটা চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তির মহড়া প্রদর্শন। [নিচের এক প্যারা জিবুতি সম্পর্কে নোটটা বাড়তি আগ্রহিদের জন্য। যারা সময় বাঁচাতে চান তাদের না পড়লেও চলবে।]

    [জিবুতি প্রসঙ্গে একটা ছোট নোট দিয়ে রাখা ভাল। জিবুতি (Djibouti) আফ্রিকা মহাদেশের অংশ। লোহিত সাগর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যেকে ভাগ করেছে, মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে। মধ্যপ্রাচ্য অংশে ইয়েমেন আর এপারে জিবুতি। আফ্রিকার অংশ সোমালিয়ার উপরের জিবুতির অবস্থান। প্রাচীন সোমালিয়ার আরব মুসলিম জনগোষ্ঠির অংশ ছিল জিবুতি, পরে ফরাসী উপনিবেশ হয়। আর তা থেকে স্বাধীন হয় ১৯৭৭ সালে। খুবই ছোট ভুখন্ড জিবুতির, বাংলাদেশের চারভাগের একভাগ।  আর জনসংখ্যা মাত্র নয় লাখ। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভুমির মত গরমের দেশ বলে দুপুরে সব কাজকর্ম ১২টা থেকে বিকেল চারটা বন্ধ রাখতে হয়, পরে আবার সব খুলে। গুরুত্বপুর্ণ যেটা তা হল এই জিবুতিতে একা চীনের ঘাঁটি নাই, বরং চীনের ঘাটিটাই সবার শেষে স্থাপিত হল। সবার বড় আর আগের ঘাটি যাদের তারা হল, আমেরিকার ও ফ্রান্সের। পরে একালে সৌদি আরবের আর শেষে চীনের। এককথায় বললে এই ঘাঁটি স্থাপন নিয়ে চীনের উদ্দেশ্যে নিজের নৌ-চলাচল – এই বাণিজ্য স্বার্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।  তা নৌদস্যু বা জলদস্যু হতে পারে কিংবা অন্য রাষ্ট্র এসে চীনের নৌ-চলাচল পথ অবরোধ করতে চাইতে পারে। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে গেলে এসব সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন বাণিজ্য স্বার্থের অংশ হয়ে যায়। আমেরিকা জিবুতিতে তার ঘাঁটি রাখার জন্য জিবুতিকে  বছরে লিজের ভাড়া দেয় ৮০ মিলিয়ন ডলার, আর চীনারা একালে চুক্তি করেছে বলে সে দেয় ১০০ মিলিয়ন ডলার। ওদিকে সোদিরা ইরানের ভয়ে ভীত হয়ে ঐ জিবুতিতে ছোট ঘাটি তৈরি করেছে একালে। ইয়েমেনের হুতিদের সাথে ইরানের যোগাযোগ স্থাপন সাথে রসদ এবং নানান টেক ইকুইপমেন্ট পাঠানো হচ্ছিল এই পথে তা রুখে দিতে সৌদি অবস্থান।  আর আমেরিকার ইরাক-আফগানিস্তানের যুদ্ধে অনেক যুদ্ধবিমান জিবুতি থেকে অপারেট করিয়েছিল। ওদিকে ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া এক রাষ্ট্র ছিল ১৯৯৩ সালের আগে পর্যন্ত। প্রতিশ্রুতি অনুসারে ইথিওপিয়া আপোষে ইরিত্রিয়াকে আলাদা হতে দিলে তাদের দুইটা বন্দরই ইরিত্রিয়ার ভুখন্ড ভাগে পড়ে। ক্যাচালে না থাকতে চেয়ে ইথিওপিয়া দুইটা সমুদ্র বন্দরের দাবি ছেড়ে দেয়। আর জিবুতির বন্দর ব্যবহারের জন্য জিবুতি-ইথিওপিয়া  এক স্থায়ী চুক্তি করে। জিবুতি ইথিওপিয়াকে পেশাদার পোর্ট সার্ভিস দেওয়ার জন্য নিজের পোর্ট পরিচালনার দায়িত্বে দুবাই পোর্ট অথরিটিকে ভাড়া করে এনেছে। সব মিলিয়ে এতে জিবুতির ভালই আয় হয়। এই হল সংক্ষেপে জিবুতি।]

    কোল্ডওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা স্বদেশপ্রেম একালে অচল কেন?
    সাধারণত আমাদের মধ্যে যে জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম কাজ করে, তা গড়ে উঠেছে গান্ধীবাদীদের ‘বিদেশী কাপড়ে আগুন লাগাও আর দেশী চরকায় সুতা কাটো’ এর অনুসরণে। অর্থাৎ মনে করা হয়, বিদেশী মানে খারাপ, দেশী মানেই ভালো বা কাম্য। কোন জটিল জিনিষ নয়, ব্যাপারটা সহজেই বুঝা যায়।  এই চিন্তা কাঠামোতেই কোল্ড ওয়ার যুগেও (১৯৫০-১৯৯২) জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম চর্চা হয়েছে। আর ওদিকে  কোল্ড ওয়ার মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়াকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা এই দুই পরাশক্তির দুই ব্লকে ভাগ করে সব রাষ্ট্রকেই কোন না কোন ব্লকের সমর্থক হতে বাধ্য করা। আর এরপর পরস্পর ঠিক যুদ্ধ নয়, কিন্তু সব সময় একটা যুদ্ধের রেষারেষি জীবন্ত রেখে তারা চলত, ফলে তা এক ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধ’ যেন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে এই ব্লক পরিস্থিতির অবসান হয় এবং দুনিয়া আমেরিকার ‘একক’ পরাশক্তির কবলে চলে যায়। ফলে এর পর থেকে স্বজাতিবোধ ও দেশপ্রেম আর কোল্ড ওয়ারের পটভূমিতে তৈরি নয়, হয় নাই। আর তাতে আগে ও পরের জাতীয়তাবোধ, স্বদেশপ্রেম মধ্যে বহু ফারাক এসে গেছে।

    যেমন- কোল্ড ওয়ারে কেউ যদি  শত্রুরাষ্ট্র হয়, এর মানে তার সাথে আর কোনো সম্পর্ক নাই; অর্থনৈতিক বাণিজ্যসহ কোনো ধরনের সামাজিক লেনদেন নেই। কোল্ড ওয়ারে দুনিয়া মূলত তা বিভক্ত হয়ে থাকত দুনিয়া ব্যাপী দু’টি আলাদা অর্থনীতির ব্লকে। কিন্তু যখন থেকে কোল্ড ওয়ার ভেঙ্গে গেছে, এমন দুনিয়ায় আমরা বাস করতে শুরু করেছি, তখন থেকে  অর্থনীতির দুই ব্লকও ভেঙ্গে গেছে। বদলে সব রাষ্ট্রের অর্থনীতিই  একই- ‘এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে’ অন্তর্ভুক্ত ও কানেকটেড হয়ে গেছে। ফলে সেই থেকে বাণিজ্য বিনিয়োগের কেনাবেচাসহ সব ধরনের লেনদেনের এক গ্লোবাল সমাজে আমরা ঢুকে গিয়েছি, বাস করছি। ফলে একালে অন্য কোন রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য বিনিয়োগে খুব ভাল সম্পর্কের পাশাপাশি ঐ রাষ্ট্রের সাথে আবার যুদ্ধ লাগার মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে বটে।

    তবে সে ক্ষেত্রে স্বভাবতই যুদ্ধ বড় বাস্তবতা হয়ে উঠলে বাকি সব সম্পর্ক অন্তত সাময়িকভাবে স্থগিত ও চাপা পড়ে যাবে, সব বন্ধ হয়ে যাবে। তবে ভবিষ্যতে যদি তা থিতু হলে আবার সব সম্পর্ক শুরু হতে পারে। আবার একালে কোনো যুদ্ধ লেগে যাওয়া পরিস্থিতি দেখা দিলে ঐ সম্ভাব্য যুদ্ধকে  দেরি করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্ক একটা  ভুমিকা থাকতে পারে, উছিলা হিসাবে দাঁড়ায় যেতে পারে। এছাড়া যে দেশে বোমা ফেলা দরকার মনে করছি, সে দেশে আমার নিজেরই ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ থাকলে বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে হবে। এসব সমস্যাগুলো কোল্ড ওয়ারের যুগে ছিল না। ফলে যুদ্ধ লড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া তখন সহজ ছিল। একালে যুদ্ধ লাগিয়ে দিব নাকি বাণিজ্য স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দেখব, কোনটা আসলে নিজের জন্য উত্তম, এসব বিবেচনা করে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে একালে এবং স্বভাবতই তা জটিল কাজও; অনেক চিন্তাভাবনা করে সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একালে নিজ দেশের স্বার্থ কোনটা তা ঠিক ঠিকভাবে বুঝতে পারা সহজ হয় না। অনেক চিন্তাভাবনা করার দরকার হয়। আমরা সবাই এখন এমন দুনিয়াতে বসবাস করি। ফলে পুরনো বোধ নিয়ে চলে দেশের ভাল করতে চেয়ে উল্টো খারাপ করে ফেলারও সম্ভাবনা আছে। তাই কোল্ড ওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম একালে অচল।

    অতএব একালে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার সম্পর্ক এক দিকে বাণিজ্য বিনিয়োগের, একই সাথে তা সম্ভাব্য যুদ্ধেরও হতে পারে- এই আলোকে দেখতে ও বুঝতে হবে। এখানে একই সম্ভাব্য শত্রুর সাথে গভীর বাণিজ্য-স্বার্থের সম্পর্ক হয়, থাকতে পারে এবং থাকাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। ইকোনমিস্ট বলছে, চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু হল পশ্চিমা স্বার্থ, বিশেষ করে কমন শত্রু হল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকা এখনও গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের পুরনো বা চলতি যে ব্যবস্থা, এর নেতা, তুলনায় চীন নতুন সাজানো হবে যে ব্যবস্থা ধীরে ধীরে জাগছে যে এর নেতা। ফলে আমেরিকার নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জকারী হলো চীন ও তার সহযোগী রাশিয়া। তবে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জের মুরোদ রাশিয়ার অর্থনীতির নিজের নয়, নেইও। তবে চীন বিজয়ী হলে তাতেই রাশিয়ারও লাভ, এই হলো সূত্র। ফলে এক ‘কমন এনিমি’র ধারণা। তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমের অবরোধ চলছে, তা জারি আছে; এখানে ইকোনমিস্ট সে বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

    পশ্চিমের বিশেষ করে আমেরিকার অভিযোগ, রাশিয়া জবরদস্তি করে ইউক্রেনের ভূমি দখল করে আছে। তাই আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জগৎ রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। অবশ্য এখানে ইউক্রেনের ভূমি বলতে তা সরাসরি ইউক্রেন নয়, এ ক্ষেত্রে আসলে ক্রিমিয়া বলে আলাদা প্রদেশের কথা বলা হচ্ছে। সোভিয়েত ভেঙে (১৯৯১) যাওয়ার পরে আপোষ আলোচনায় ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের সাথে যোগ করে দেয়া হয়েছিল, যদিও সেটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ থাকবে বলা হয়। ফলে আইনি সম্পর্কের দিক থেকে ক্রিমিয়া ইউক্রেন রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। পরে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিলেও কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু পশ্চিমারা জোর দেয়, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে রাশিয়া বাদে যে ১৪টি রাষ্ট্র হয়েছে, সেগুলোর ওপর রাশিয়ার প্রভাব শূন্য করে দিতে হবে। আমেরিকা ও ইউরোপের এই কৌশলগত অবস্থান সব জটিলতা তৈরি করেছে।  এই নীতির ফাঁদে ইউক্রেন ঝুঁকতে চাইলে রাশিয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপ নিজের দখলে নিয়ে নেয়। আর রাশিয়া নিজের পক্ষে ক্রিমিয়ায় একটা কথিত গণভোট করিয়ে নেয়। ফলে সারকথায় অন্যের ভুমি দখল বলতে যা বুঝায় এটা তেমন কোন সোজাসাপ্টা ‘ইউক্রেনের ভূমি’ দখল নয়।

    কিন্তু ইকোনমিস্ট বলছে, রাশিয়াকে পশ্চিমের অবরোধ আরোপ করে রাখার এক পালটা কাফফারার দিক আছে। এটাই রাশিয়াকে চীনের সাথে লেপ্টে থেকে যেতে বাধ্য করেছে। কারণ চীনের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, রাশিয়ার গ্যাস-তেল চীনকে বিক্রি করা আর চীনা বিনিয়োগ নিয়ে আসা- এভাবেই রাশিয়া সেই থেকে অর্থনৈতিকভাবে টিকে আছে। কিন্তু ইকোনমিস্ট ‘ চীন কেন ইউক্রেন নিয়ে কথা বলে না’, অপর দিকে ‘রাশিয়া কেন দক্ষিণ চীন সাগর চীনা দখলে রাখার বিরুদ্ধে কথা বলে না’, এগুলো উল্লেখ করে  একটা ‘নৈতিকতা ভঙ্গ হয়েছে’ বলে পশ্চিমের স্বার্থের পক্ষে সাফাই দিতে চেয়েছে। ব্যাপারটাকে পুরান কমিউনিস্টদের উপরে ইকোনমিস্টের  পুরান রাগ-বিরাগ অথবা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতি ব্যবস্থার প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব – এর বেশি অন্য কোনভাবে ব্যাখ্যা করার মত কিছু পাওয়া যায় না।

    এভাবে ইকোনমিস্ট চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বকে ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু সবশেষে আপাত উল্টো এক কথা বলেছে। বলছে, চীনের সামরিক সক্ষমতা বিশেষ করে নেভির সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং তা প্রদর্শনে আমেরিকার ভীত হওয়া উচিত নয়। কেন? অনেকের কাছে ব্যাপারটা স্ববিরোধী মনে হতে পারে। কিন্তু ইকোনমিস্টের যুক্তি কী? আর কেনই বা এ কথা বলছে?

    ইকোনমিস্ট নিজেই সাফাই দিয়ে বলছে, ‘রাশিয়া চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে কথা সত্য, কিন্তু একই ধরনের অস্ত্র চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকেও বিক্রি করে। আবার চীনা প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার ওপর পশ্চিমের আরোপিত অবরোধ উপেক্ষা করে রাশিয়াকে সাহায্য, বাণিজ্য সম্পর্ক করে থাকেন। কিন্তু তা তিনি করেন কারণ চীনের পুরনো বড় পড়শি রাশিয়ার সাথে চীন একটা থিতু সম্পর্ক চায় বলে।  অতএব চীন কোন সুদূরে ইউরোপের বাল্টিক সাগরে রাশিয়ার সাথে নৌ-মহড়া করেছে বলে তাতে ভয় না পেয়ে আমেরিকার বরং স্বাগত জানানো উচিত। চীনের যুদ্ধজাহাজ কোন সুদূরে গিয়ে অপারেট করলেো তা এক সম্পূর্ণ সঠিক কাজ। কারণ “গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ার” হিসেবে এটা চীনের এক বৃহত্তর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া; বাণিজ্যের নৌচলাচল পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে চীনেরও কিছু গ্লোবাল ভূমিকা ও দায় নেয়া উচিত। কারণ এই নিরাপত্তা প্রদানের ওপরই গ্লোবাল অর্থনীতি বাণিজ্য নির্ভর করছে।

    ইকোনমিস্ট নিজেই আরও সাফাই দিয়ে বলছে যেমন – “চীন ইতোমধ্যেই জিবুতির ঘাঁটি থেকে জলদস্যুবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এভাবে এডেন উপসাগরের আশপাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে”। ইকোনমিস্ট তার লেখায় এই অংশের উপশিরোনাম দিয়েছে ‘দায়িত্ববোধের চর্চা’  বা (Exercising responsibility)। তবে সবশেষে ইকোনমিস্ট আমেরিকার এম্পায়ার ভূমিকার পক্ষে থেকেছে। বলেছে, “চীন  এখন এই সুদূরে নৌবহর নিয়ে এসেছে। ফলে এখন আমেরিকা কেন এশিয়ায় নৌ-উপস্থিতি রেখেছে বা রাখে, তা এখন চীনারা সহজে বুঝবে। গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিয়োগের বৃহত্তর দিক এই স্বার্থরক্ষার দায় তো নিতেই হবে”।

    তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? ইকোনমিস্ট আসলে কী বলতে চায় ? কথা খুব সহজ। প্রথমত, তারা আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে কথা বলছেন না।

    আমাদের অনেকের কাছে ব্যাপারটা আজব লাগছে হয়ত। কারণ আমরা ধরে নিয়েছি, ইকোনমিস্ট ত আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থে কথা বলছে ও বলবে। না তা বলছে না।  তাহলে কার পক্ষে কথাগুলো বলছে?  ইকোনমিস্ট এখানে  দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কার্যকর ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে কথা বলছে। এটা সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রস্বার্থ নয়। এ জন্য সে বারবার ‘বৃহত্তর’ বা ‘গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ারের লার্জার পার্টের’ ভূমিকার কথা টানছে।

    একই ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ ভেতরে এখানে কাছাকাছি বা দেখতে একই মনে হয়, কিন্তু তা নয় এমন তিনটা  আলাদা স্বার্থ আছে। সেগুলো হল যেমন – রাষ্ট্রস্বার্থ (যেমন আমেরিকান রাষ্ট্র), কোনো সুনির্দিষ্ট করপোরেশন বা ব্যক্তি পুঁজি মালিকের স্বার্থ আর সাধারণভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম এই ব্যবস্থার স্বার্থ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সাধারণভাবে নিজস্ব অভিন্ন এই স্বার্থ, যেটা অনেকটাই গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থের ভেতর দিতে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। অর্থাৎ আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ আর ওয়াল স্টিটের গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থ সব সময় এক নয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটের  নেতা বড় প্রভাবশালী কোম্পানী গোল্ডম্যান স্যাসে (Goldman Sachs) এর  পরামর্শেই চীন (আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী) ব্রিক ব্যাংক (BRICS) চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল।

    ওয়াল স্ট্রিট তাই আসলে আমেরিকায় অবস্থিত হলেও সে কোনো রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে নয়; এমনকি রাষ্ট্রস্বার্থ, সীমানা, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি সব উবে যাক যাতে পুঁজি অবাধ চলাচল করতে পারে – এটাই এর মনোভাব।

    ইকোনমিস্ট ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তার এই স্বার্থ, চীন পাহারা দিচ্ছে না আমেরিকা, তাতে তার কিছু আসে-যায় না।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ২০ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২১ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]