Tag: মুদ্রাস্ফীতি

  • ‘ইকোনমিস্টের’ খায়েশ কী পূরণ হতে পারে

    ‘ইকোনমিস্টের’ খায়েশ কী পূরণ হতে পারে

    গৌতম দাস

    ১৮ জুলাই ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4aK

     

     

    [ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিন চলতি আমেরিকা নিয়ে কিছু আকাঙ্খা ব্যক্ত করেছে। আর তা করতে গিয়ে আমেরিকায় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট কত গভীর এর আভাস দিয়ে ফেলেছে। আজকের প্রসঙ্গ এনিয়ে। ]

    অরিজিনালি এর পরিচয় ছিল “সাপ্তাহিক লন্ডন ইকোনমিস্ট” বলে। বিগত ১৮৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ‘ইকোনমিস্ট’ পত্রিকা একালে এসে তা আমেরিকাতেও নিজের বিস্তার ঘটিয়েছে – এমনকি ‘কোর এডিটরিয়াল অফিসটা’ এই আমেরিকা থেকেই পরিচালিত। আবার এখন এক ওয়েব ভার্সনও বের করেছে যাতে সে যেন এক দৈনিক পত্রিকাও হয়ে গেছে। কারণ, কী আর করা! শক্ত প্রতিযোগিতায় মিডিয়া বলতে একালে তাতে  “লোকাল” বলতে কিছু নাই কারণ সবই তা অনলাইনের দুনিয়া হয়ে গেছে। ফলে সাপ্তাহিক বলে কেউ এক সপ্তাহ হাতগুটিয়ে বসে থাকলে সেই মিডিয়ার বাজার তাতে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর দখলে চলে যেতে পারে। অতএব অনলাইনে হলেও দৈনিক উপস্থিতি বা হাজির নিশ্চিত করতে হয়েছে সকলকে।

    অবশ্য এর পিছনে অন্য আরেক বড় কারণ আছে। সেটা আমেরিকার এক সরকারি সার্ভে রিপোর্টের ভাষায় বললে, ‘গ্লোবাল পুঁজিপ্রবাহের অভিমুখ’ প্রসঙ্গে, যা দুনিয়ার বাকি সবকিছুর প্রবাহ – এদের অভিমুখ নির্ধারণ করে দিচ্ছে।  ঐ রিপোর্ট বলেছিল, গ্লোবাল বিনিয়োগপুঁজির প্রবাহের অভিমুখ একালে পশ্চিম থেকে পুবে মানে এশিয়ামুখী হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়; এই এশিয়ামুখী অভিমুখ আপাতত যেটা ফিক্সড বা এমন স্থিরতা লাভ করে অবস্থান নিয়ে ফেলেছে যে তা আর আগামীতে আবার কখনোই তা উলটে পশ্চিমামুখী হবে না;  অর্থাৎ এটা ই-রিভার্সিভ্যাল [irreversible] হয়ে গেছে। ঠিক যেভাবে লাগাতার গত ৪০০ বছর ধরে এটা পশ্চিমমুখী হয়ে কেন্দ্রীভূত ও সঞ্চিত হয়ে চলেছিল। সারা দুনিয়াকে কলোনি বানিয়ে লুট করে ইউরোপ নিজের হাতে দুনিয়ার সব অর্থনৈতিক উদ্বৃত্ত পশ্চিমমুখী করে কেন্দ্রীভূত ও সঞ্চিত করে নিয়েছিল। সেটাই এখন উল্টা, স্থায়ীভাবে এশিয়ামুখী হয়ে গেছে। আর এভাবেই উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের এক নয়া-কাল হতে শুরু করে দিয়েছে। এশিয়ান এক চীনা উত্থানে এসব উল্টে গেছে; যেটাকে অনেকে অবজেকটিভ বা প্রাকৃতিক প্রতিশোধের এক নয়াকাল বলতে শুরু করেছে।

    আমেরিকান ঐ সার্ভে রিপোর্টের মূল অর্থ-তাৎপর্যের আলোকে এখন গ্লোবাল মিডিয়াকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব। প্রায় ২০০ বছর আগের প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমা মিডিয়াগুলো একালের এই ‘অভিমুখ বদলের’ ব্যাপারটা তৎক্ষণাৎ বুঝে না ফেলার কোনো কারণ নাই, তারা বুঝে গেছিল। আর তারই প্রতিক্রিয়াজাত সিদ্ধান্তে পশ্চিমের প্রতিটা মিডিয়া হাউজ দুনিয়া থেকে হারিয়ে যাওয়ার আগেই টিকে যাবার জন্য, এশিয়ামুখী হয়ে নয়া অবস্থান সূচনা করে দিয়েছে। যেমন তাদের ফোকাস এখন এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রভাবশালী পাঠক বা প্রতিষ্ঠান কারা [মানে কাদের পাঠ এশিয়ার সমাজগুলোকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে] – দ্রুত এমন তাঁদেরকে খুঁজে বের করা আর নিজ নিজ মিডিয়া প্রডাক্ট এসব ব্যক্তিদের হাতে তুলে দিয়ে তাদের প্রভাবিত করতে না পারলে এশিয়া-কেন্দ্রিক নবউত্থিত গ্লোবাল-বাজার ওসব পশ্চিমা মিডিয়ার হাতছাড়া হয়ে যাবে; আর,  তাতে প্রভাবশূন্য হয়ে যেতেও পারে, তা বলাই বাহুল্য। ঠিক এটাই ঘটতে শুরু করেছে। এমনিতেই আমেরিকার ওয়াল স্ট্রীটের বাইরে সিঙ্গাপুরকেন্দ্রিক নয়া গ্লোবাল পুঁজিবাজার এর এক্সটেনশন –  এই শিফটিং অনেক আগেই ঘটে গেছে। সেই সাথে গত ১৪ বছর ধরে এখন হংকং, সিঙ্গাপুরকেন্দ্রিক নয়া মিডিয়া হাউজগুলোরও দ্রুত উত্থান হচ্ছে।  যেমন এশিয়া টাইমস অথবা সাউথ চায়না মর্ণিং পোস্ট ইত্যাদি সেন্ট্রাল ভুমিকা নিয়ে নিয়েছে।  অতএব, ইকোনমিস্টও এখন অনলাইনে হলেও দৈনিক ভার্সনে হাজির!

    ইকোনমিস্টের এমনই এক অনলাইন দৈনিকের ভার্সন, আমার মত অনেকের ই-মেল বক্সেও এসেছে এই সপ্তাহে। সেখানে গত ১৬ জুলাই সংখ্যা এর এক প্রধান আর্টিকেলের ছোট শিরোনাম হল – ‘ওয়েক আপ, ডেমোক্রাটস’ [Wake up, Democrats! (উপরের ছবিতে দেখেন)]! বাংলা করে বললে, “আমেরিকান ডেমোক্র্যাট দলের লোকেরা, এবার জেগে ওঠো!” নিচে যার আবার বড় আরেক শিরোনাম দেয়া আছে। সেটা হল এমন, “ডেমোক্র্যাটদের জেগে ওঠা দরকার আর তাদের অ্যাক্টিভিস্টদের চরমপন্থী খায়েশে সব তছনছ হয়ে যাওয়া বন্ধ করা উচিত” [The Democrats need to wake up and stop pandering to their extremes]।’ আবার একটা সারকথা শেষে লিখে দিয়ে বলেছে, ‘আমেরিকার ভালোর জন্য শাসক দলের জরুরিভাবে নিজ দলের অ্যাক্টিভিস্টদের নিয়ন্ত্রণ নেয়া উচিত” [For the good of America, the governing party urgently needs to take on its own activists] !’ বলাই বাহুল্য, কী সাংঘাতিক এসব কথা! কিন্তু ইকোনমিস্ট কেন এত গরম কথা বলছে? সেটা দেখা যাক।

    এরপর ঐ আর্টিকেলের প্রথম কয়েকটা বাক্য আমি এখানে তুলে আনছি। লিখছে, আমেরিকার “প্রত্যেক প্রেসিডেন্টের আকাঙ্ক্ষা থাকে, তিনি এক ঐতিহাসিক কালের প্রেসিডেন্ট হবেন। তবে সেটা যেন অবশ্যই জো বাইডেনের মত ঐতিহাসিক প্রেসিডেন্ট নয়”। পরের বাক্যে লিখেছে, “এপর্যন্ত বাইডেনের প্রেসিডেন্টগিরিতে দেখা যাচ্ছে, তাঁর পাবলিক রেটিং বা গ্রহণযোগ্যতা ১৯৫০ সালের পরে সর্বনিম্ন”। ইকোনমিস্ট কেন এমন লিখল, কারণ রয়টার্সের ১৩ জুলাই প্রকাশিত এক সার্ভে বলছে – বাইডেনের গ্রণযোগ্যতা মাত্র ৩৯%। আর বাইডেন “সরাসরি ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রকাশিত মতের” পাবলিক হল ৫৫%।

    Every president yearns to be historic—but not historic like Joe Biden. At this point in his presidency Mr Biden’s singular achievement is to have the lowest approval rating of any incumbent since the 1950s. Even among Democrats, 67% think the economy is doing poorly, 78% think the country is heading in the wrong direction and 64% want another presidential candidate on the ticket in 2024.

    এরপরে আরেকটা তথ্য যোগ করেছে ইকোনমিস্ট, যেটা আরো মারাত্মক! লিখছে, ‘এমনকি ডেমোক্র্যাট দল মানে বাইডেনের নিজ দলের ভেতরে তার গ্রহণযোগ্যতাবিষয়ক তথ্যে দেখা যাচ্ছে – ৬৭% দলীয় কর্মী মনে করেন বাইডেনের অর্থনীতির পারফরম্যান্স খুবই খারাপ। এমনকি “৭৮% পাবলিক মনে করেন দেশ ‘ভুল পথে’ চলছে আর সে কারণে, ৬৪% মনে করেন আগামি ২০২৪ সালের নির্বাচনে বাইডেন নয় ভিন্ন প্রার্থী খোঁজা দরকার”।

    গতবছর ক্ষমতাসীন হওয়ার সময়  মানে ‘১৮ মাস আগে বাইডেন জনগণকে একটু শান্তি দেবেন, ভালো দিন দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন”। কিন্তু ঘটেছে উল্টা। তাদের সব সুখ ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। চরমতম মুদ্রাস্ফীতি, সব সদিচ্ছা সু-বোধ সব হারিয়ে গেছে। এক গ্লোবাল মুদ্রাস্ফীতিই যেন সবকিছু খেয়ে ফেলেছে। আমেরিকার মুদ্রাস্ফীতি এখন ৯.১%। যেখানে কোন দেশে্র  মুদ্রাস্ফীতি ৫-৬% এর উপরে দেখা দিলে – ব্যবসায়ী নয়, তবে চাকরি করেন বা ছোট ব্যবসায়ী যারা, এমন সব নিম্নআয়ের মানুষের কাছে এমন মুদ্রাস্ফীতি খুবই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ, এটা তাদের ছোট ছোট সঞ্চয়ের উপর তারা সাধারণত যে ব্যাংক ইন্টারেস্ট পান, মুদ্রাস্ফীতি তাকেই ছাপিয়ে যায়, নেগেটিভ করে দেয়। এতে এককথায় সঞ্চয়ের মূল্য নেগেটিভ হয়ে যায় মানে, যেন সঞ্চয় ক্ষয়ে যায়।

    কাজেই আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আসন্ন মিড-টার্ম নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা গো-হারা হারবে তা নিয়ে তাদের নিজেদের আর কোনো সন্দেহ নেই। সার্ভে রিপোর্টগুলোও তা বলছে। এই ফাঁকে বলে নেয়া যাক, আমেরিকার মিড-টার্ম নির্বাচন মানে হল, তাদের চার বছরের প্রেসিডেন্ট টার্মের ঠিক প্রথম দু’বছর পূর্তিতে নয়া যে নির্বাচন। না, তাই বলে মিড-টার্ম এটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কিছুই নয়। যেমন, এখানে এবারের মিড-টার্মে ডেমোক্র্যাটরা হেরে গেলে তাতে প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে পদত্যাগ করে বাসায় চলে যেতে হবে না। তিনি বরং ২০২৪ সাল পর্যন্ত আগের মতই প্রেসিডেন্ট থেকে যেতে পারবেন। আসলে এই নির্বাচন হল, কংগ্রেস (আমাদের তুলনীয় ভাষায় বললে সংসদ) ও সিনেট (বা দ্বিতীয় সংসদ) এই দুই জায়গাতেই হবু নির্বাচন। তবে সব আসনে নয়, মিড-টার্মে কেবল এক-তৃতীয়াংশ আসনেই নতুন নির্বাচন হবে। আর সার্ভে প্রেডিকশন বলছে, এবারের মিড-টার্ম নির্বাচনে বাইডেনের পাপে ডেমোক্র্যাট দল বেশির ভাগ আসনেই গো-হারা হেরে যাবে। আর এতে পরবর্তীতে ফল হবে এই যে, পরে বাইডেন সরকার চালাতে গিয়ে পদে পদে বাধা পাবে। কারণ, ন্যূনতম সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে না বলে বাইডেন যাই করতে যাবেন তাতে আইনি সহায়তার দরকার হলে তাতে কংগ্রেস বা সিনেটের অনুমোদন না পেয়ে এর জ্বালায় প্রেসিডেন্টকে ভুগতে হবে।

    এরপর এক কড়া নেতিমানের মন্তব্য জুড়ে দিয়েছে ইকোনমিস্ট। শব্দটা হলো জেরোন্টো-ক্রাটিক [Geronto-cratic]। একে খাস বাংলা করে বলতে হয় – ‘বুইড়াদের’ শাসন বা সরকার। কেন এমন কথা? মানে ক্ষমতার শপথ নেয়ার পর থেকেই বাইডেন যে এক অনেক বয়স্ক ব্যক্তি একথাটা এর মধ্যে অনেকবারই প্রকট হয়ে উঠতে দেখা গেছে। বিশেষত, এক অসুস্থতায় বাইডেনকে ল্যাবটেস্ট করাতে গিয়ে তাকে ‘আংশিক অচেতন’ হতে হত। তাই ল্যাবে যাওয়ার আগেই তিনি ভাইস প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতা দিয়ে এরপর ল্যাবটেস্টে গিয়েছিলেন।

    আর এই ব্যাপারটাতে “প্রেসিডেন্ট আসলে অনেক বুইড়া” অথবা “এর বেশিদিন আয়ূ নাই”  এ্ধরণের কথা যেন নগদে প্রমাণ হিসেবে পাবলিকলি হাজির হয়েছিল। আবার ওদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প তিনিও যথেষ্ট বুড়া সেকথাটাও সত্যি বটে; আবার পাবলিক পারসেপশনেও তাই। একারণেই ইকোনমিস্ট মন্তব্য করেছে, যেন বুইড়া বাইডেন আগামী দু’বছর আরো খারাপ সরকার চালিয়ে শেষে সেই কারণেই না আবার আরেক বুইড়া ট্রাম্প – একেই না প্রেসিডেন্ট বানিয়ে নিয়ে হাজির করেন! অবশ্য মূল কথাটা এখানে আসলে আমেরিকান আম-মানুষের মধ্যে হতাশা, এক গণহতাশা এসে গেছে!  মানে সামনে আমেরিকানদের ভাগ্য বদলের কোনো আশা নেই – তাই খায়েশ হল একেই ঠীকঠাক করতে হবে; এটাই হল ইকোনমিস্টের মূল মেসেজ!

    আবার ইকোনমিস্ট আগেই ডিসক্লেমার করে বলে নিচ্ছে, ‘রাজনৈতিক দলকে পরামর্শ দেয়া এই পত্রিকার কাজ বা দায়িত্ব নয় [This newspaper does not usually hand out advice to political parties, but America’s sickly democracy requires urgent repair.]।’ এখন স্বভাবতই প্রশ্ন আসে তাহলে যে ইকোনমিস্টের এই আর্টিকেল ছাপানোর দরকার কী? তাই এর উত্তরে আগাম তারা বলে রাখছে, ‘আমেরিকার অসুস্থ গণতন্ত্র এর জরুরি মেরামত দরকার’ তাই এ বিশেষ ব্যবস্থা।

    তবে উপরে যে হতাশার কথা বলা হল সেটা অবশ্যই রেগুলার বা সাধারণ হতাশা একটা সমাজে যেমন দেখি তেমন বলে বুঝলে ভুল হবে। কেন?
    এর জবাব পাওয়া যাবে ইকোনমিস্টের কিছু আকার ইঙ্গিতে বলা পরের মন্তব্য থেকে।  যা আসলে বর্তমান আমেরিকান সমাজের অভ্যন্তরীণ গাঠনিক তন্তুতে দুর্বলতা ও নুন্যতম সামাজিক ঐক্যের অভাবে যা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ছোট ছোট শিরোনাম আকারে ইকোনমিস্ট তা উল্লেখ বা একটা তালিকা করে বলেছে  যেমন – ১. “ডি-ফান্ড দ্যা পুলিশ” মুভমেন্ট [a movement to “defund the police”, abolish immigration enforcement, ]; মানে হল পুলিশ যদি সমাজের ঐক্য ধরে রাখতে কাঙ্খিত ও প্রয়োজনীয় কর্তব্য পালন না করতে পারে তাহলে পুলিশ বাহিনীতে ফান্ড দেয়া বন্ধ করতে হবে – বলে গড়া এক সামাজিক আন্দোলনের কথা বলা হচ্ছে এখানে। এ ধরনের, অনেক আন্দোলনের কথা তুলেছে ইকোনমিস্ট। যেমন আরো আছে – ২। সীমান্তে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা কার্যকর না করে তুলে দেয়া বা ‘abolish immigration enforcement’; অথবা মেয়েদের জন্মদাত্রী মানুষ হিসেবে তুলে ধরার আন্দোলন [relabel women as birthing people]; অথবা ক্লাসরুম থেকেই ছাত্রদের অ্যান্টি-রেসিজম শেখানো (আসলে বলতে চাইছে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী চিন্তায় সমাজ ছেয়ে গেছে তাই এর বিরোধিতার কথা) ইত্যাদি। লক্ষ্য করার বিষয় এসব প্রতিটা দাবিই মূলত সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদিরা তুলে থাকে এমন দাবি।

    “……a movement to “defund the police”, abolish immigration enforcement, shun capitalism, relabel women as birthing people and inject “anti-racism” into the classroom……”

    আসলে সার কথায় অপ্রত্যক্ষভাবে ইকোনমিস্ট বলতে চাইছে, রিপাবলিকানরা একালে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী ধারায় বিভিন্ন সামাজিক ঝোঁক বা তা থেকে ওঠা অসন্তোষকে উসকে দিচ্ছে। তাই ইকোনমিস্ট চাইছে ডেমোক্র্যাটদের এর বিরোধিতায় পাল্টা এথিকস, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে কাজে উঠে আসতে হবে – এই হল ইকোনমিস্টের বাসনা। যদিও এমন আকাঙ্খা পূরণ হতে হলে এর  মূল  সমস্যা হল, বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বাঁধবে কে?

    কারণ, খোদ বাইডেনই আরেক ধরনের সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী [Colonial White Supremist Global Power হতে চায়] – যাকে হয়ত বলা যায় ‘গ্লোবাল সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী’। এই কায়দাতেই তিনি ইউরোপকে সাথে নিয়ে চীনবিরোধী এক আটল্যান্টিক জোট গড়তে নেমে পড়েছেন। বাইডেন তার “পশ্চিমা শক্তি” – ইউরোপ-আমেরিকা মিলে যে পশ্চিমা-মন, এই মনকে সুরসুরি দিচ্ছেন যে চীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বে এসে গেলে গত পাঁচ-ছয়শ বছর ধরে দুনিয়ার উপর সাদা মানুষের শাসন যা এখন প্রান্তে এসে ঠেকেছে এই রামরাজত্ব উবে যাবে। একে হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। তাই যেন তারা চীনবিরোধী সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী জোট গড়ে লড়তে এগিয়ে আসে। এভাবেই পশ্চিমা-মনকে উস্কে সকলকেই তিনি এক বর্ণবাদি-রেসিজমের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তিনি গ্লোবাল – এখানেই তিনি কেবল ট্রাম্প থেকে আলাদা। তাহলে  ডেমোক্কেরাট না রিপাবলিকান? কে কাকে নৈতিকতা শেখাবেন?

    তাছাড়া মূল সমস্যা তো এগুলোর একটাও নয়। আমেরিকান সমাজে অনৈক্য কেন?
    এর কারণ খুঁজবে কে?
    যেমন, গত পঁচাত্তর বছর ধরে আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়ে আছে। আর সেই থেকে নিজ সমাজে আমেরিকানরা যেসব আয়েসী জীবনের সুযোগ সুবিধার জীবনভর উপভোগ করে আর  সেই সাথে দুনিয়ার উপর মাতব্বরি করে এসেছে – এক চীনা অর্থনৈতিক উত্থানেই তা এখন এলোমেলো হয়ে গেছে। তবে এতে পুরনো আমেরিকান সমাজ যেন এর ধাক্কায় ধসে পড়বে তা তো হওয়ারও কথা ছিল না। যদি আমেরিকানরা বুদ্ধিমানের মত চীনের সাথে প্রয়োজনীয় পজিটিভ ডিল করে কিছু প্রয়োজনীয় রি-অ্যাডজাস্টমেন্ট করে, মেনে নিয়ে এগিয়ে যেত। বৃটিশদের টপকে আমেরিকা গ্লোবাল নেতা হয়ে যাওয়াতে তো সেই থেকে লন্ডন বসবাসের অযোগ্য শহর হয়ে যায় নাই!! তাই না!!  তাহলে?
    অথচ গত ছয় বছরে, না ট্রাম্প না বাইডেন কেউ চীনের সাথে সহবস্থান বা আপোষে প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থান খোঁজার পথে যায় নাই, সেদিকে যাননি। বরং ঘুরেফিরে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের নেতা হয়ে উঠতে চেয়েছে। যেন এই বর্টাণবাদি রাস্তাটাই তাদের কেবল চোখে পড়েছে আর খুবই পছন্দ হয়েছে। এখন নিজ সমাজকে সেদিকে ঠেলে দিয়েছেন। দুনিয়ার ওপর ছড়ি ঘুরাতে পারার ‘সীমাহীন লোভ’ তাদের চোখ-মুখে ঝিলিক দিয়ে গেছে, এখনো যাচ্ছে – বাস্তবে সব জায়গা থেকে নিজেরা হারিয়ে যাচ্ছেন এটা দেখার পরও।

    ফলে এখনকার আমেরিকান সমাজ হল সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের প্রতি ‘সীমাহীন লোভ থেকে জাত’ এক  অনৈক্ক্যযের সমাজ; এটা অনৈক্য কে কাটাতে আসবে, কে পাড়বে? কারণ, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দুই রাজনৈতিক ধারাই এখন সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের অনুসারি; কেবল, তাদের প্রকাশ ভিন্ন। এ অবস্থায় ইকোনমিস্ট প্রস্তাব করতে চাইছে ডেমোক্র্যাট দল কিছু এথিক্যাল দায়িত্ব পালন করুক।’ কিন্তু এটা কার্যত অসম্ভব! বরং আমেরিকান সমাজের খেয়াখেয়িই তাদের সমাজকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সেই ইঙ্গিত ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। যার মূল কারণ হচ্ছে আমেরিকান রাজনীতি এখন – ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান – বলে বিভক্ত নয় বরং তা পিছনে ফেলে ক্রমশ  – কে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ” আর কে এর বিপক্ষে – এই ভিত্তিতে দুইটা পক্ষ হয়ে উঠতে চাইছে। কিন্তু তাতেও সংকটটা হল, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান – দুইটা পার্টিই একে-অপরকে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের বিপক্ষের দল বলে দেখাতে চাইছে। এটাকেই ইকোনমিস্ট “সামাজিক অনৈক্য” বলে দেখাচ্ছে।

    “গ্লোবাল ক্ষমতার অপব্যবহারকারী” বাইডেনঃ
    সবচেয়ে বড় কথা, বাইডেন আসলে চীন ঠেকাতে  বেপরোয়াভাবে হলেও আরো বড় ধরনের এক ‘আমেরিকান যারা  “গ্লোবাল ক্ষমতার অপব্যবহারকারী’ হতে রওনা দিয়েছেন। যেমন ধরেন,  বাইডেনের অপছন্দ যেকোন দেশের উপর খেয়াল-খুশিমত  “ডলার অবরোধ আরোপ” করা – এটা তো অপব্যবহার। আইএমএফ  জন্মের সময় (১৯৪৪) আমেরিকান ডলারভিত্তিক এক গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা তৈরি করে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু আইএমএফ তো ছিল এর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। ফলে আইডিয়ালি আইএমএফের পূর্ব-অনুমোদন সাপেক্ষে  একমাত্র কোন রাষ্ট্রের উপর আমেরিকার “ডলার অবরোধ আরোপ” করা সঠিক বা জায়েজ হত। কিন্তু বাইডেন ক্ষমতা অপব্যবহারকারি হতেই বেশি পছন্দ করেছে, বেপরোয়া হয়েছে! কিন্তু তাতে “অপব্যবহারকারিই হয়ে উঠেছে!

    আমেরিকান ডলার যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা, তা তো আসলে একই সাথে আমেরিকার-রাষ্ট্র এর ন্যাশনাল বা রাষ্ট্রীয় মুদ্রাও। জন্মের সময় নিরুপায় হয়ে এই টেকনিক্যাল ফাঁক থেকে গেছে বলে এর সুযোগ নিয়ে আমেরিকা যেকোন রাষ্ট্রের ওপর যা তার খেয়াল-ইচ্ছা, সে নিজ ডলারকে অবরোধ আরোপে হাতিয়ার বানিয়ে অপব্যবহার করে যাচ্ছে। কাজেই আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি, আগামীতে ডলারের বদলে অন্য যেকোনো মুদ্রা আন্তর্জাতিক মুল মুদ্রার জায়গা নিলে এর ‘কাফফারা’ তখন আমেরিকান ডলারকে দিতেই হবে।  আর আইএমএফ ভবিষ্যতে অবশ্যই পুনর্গঠিত করে নিতে হবে। কিন্তু সে উদ্দেশ্য তা করে নেয়া হবে নেয়া আইএমএফ অবশ্যই নতুন করে তখন গৃহীত যেকোন আন্তর্জাতিক মুদ্রার  উপর এই খেয়ালি অপব্যবহার বন্ধে শর্ত আরোপ করবেই। কাজেই বাইডেন এন্ড গং – এরা যতই অন্যান্য মুদ্রার রাষ্ট্রকে এখন অসন্তুষ্ট করবে ততই এখন থেকেই তারা ডলারকে এড়িয়ে এক নয়া বিশ্বব্যবস্থা গড়ার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাবেই। যার অর্থ বাইডেনের ডলার অবরোধ আসলে আমেরিকার স্থায়ী শত্রুর জন্ম দেয়াই হচ্ছে।

    বাইডেনেরই এমন আরেক অপব্যবহারের হাতিয়ারঃ
    আমাদের সরকার লুটপাটের সরকার করে, এতে জবাবদিহিতা নাই, জনপ্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা নাই; এগুলো সব ঠিক আছে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যে গ্লোবাল মুদ্রাস্ফীতি ছড়িয়ে পড়েছে, তা থেকে এটা এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক মহামন্দার দিকে ক্রমেই ঝুঁকছে। ফলে প্রত্যেক দেশের অর্থনীতি টালমাটাল আর তাতে নিজ ফরেন কারেন্সি রিজার্ভের অস্থিরতা ও সঙ্কটে ঢুকে পড়ছে। আর তাতে সকলে –  আমরা আগেই ব্যবস্থা নিতে চাই বা বিপদে পড়ার পরে হলেও নিতে চাই – তাই আইএমএফের সাথে কথা বলতে চাই বলে ভাবতে শুরু করেছে। আসলে ফরেন কারেন্সি রিজার্ভের সঙ্কট হলে, আমাদের কেবল আইএমএফের তত্ত্বাবধান আর আইএমএফের ঋণের শরণাপন্ন হতেই হয়, এর বিকল্প নাই। বলা যায়, আমরা বাধ্য। কেন?

    কথাটা এভাবে বলা যায়, ধরা যাক  যদি ১০ বিলিয়ন ডলার হলে আমাদের ফরেন কারেন্সি রিজার্ভের সঙ্কট মোচন হয় আর সেই অর্থ যদি আইএমএফ নয়, একা চীন থেকেই এনে নেই, তাহলেও আমাদের সঙ্কটমুক্তি ঘটবে না। কেন?

    এর মূল কারণ গ্লোবাল বাণিজ্য ও পুঁজিবাজারের অনাস্থা তাতে আমাদের অথনীতির উপর থেকে যাবে, তাই। যেমন এমনিতে চীন এখনো কমিউনিস্ট চীন। তাই চীনের যেকোনো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উপর হস্তক্ষেপ ঘটাতে কেবল চীনা সরকারের একটু ইশারাই যথেষ্ট বলে, গ্লোবাল লেনদেন জগতের বাণিজ্য বা পুঁজিবাজারের ধারণা। তবে  চীন ছাড়া অন্য অকমিউনিস্ট কোনো রাষ্ট্র এসব সাহায্য দিলেও তাতে বাজারের আস্থা আসবে কিনা বলা মুশকিল। তাহলে আস্থা কিসে আসবে? গত পঁচাত্তর বছর ধরে গ্লোবাল বাজারে আইএমএফ নিজের সম্পর্কে এই আস্থাটাই গড়ে তুলেছে বা নিয়েছে।  আসলে বাজার-বিনিয়োগে নিয়োজিত অর্থটা যার, একমাত্র  কেবল তারই আস্থায় আসতে হবে বাজারকে – এর কোনো বিকল্পও নেই। আর আপাতত বাজারের আস্থার একমাত্র প্রতিষ্ঠান হয়ে আছে আইওএমএফ, অন্য যেকোন বিকল্প প্রতিষ্ঠানের চেয়ে। এই হল বাস্তবতা!

    এখন আবার আইএমএফের সবচেয়ে বড় মালিক শেয়ারহোল্ডার আমেরিকা বলে এর ওপর আমেরিকার কর্তৃত্ব  সবার চেয়ে বেশি। এছাড়াও যেমন এখনকার বিশ্বব্যাংকের চেয়ারম্যান তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়োগ দেয়া, প্রায় তারই নিজ দোস্ত-জিগার তিনি। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি তিনি পেশাদার বুরোক্রাট নন, রাজনৈতিক বিচারে নিয়োগপ্রাপ্ত। যদিও কোনো দেশের রাজনীতিতে ন্যূনতম হস্তক্ষেপ ঘটানো আইএমএফের ম্যান্ডেট অনুসারে খুবই গর্হিত অপরাধ। কিন্তু এর পরেও বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্টকে হত্যায় মেরে ফেলার পরিকল্পক আইএমএফ, এমন রেকর্ড এর অভাব নাই।

    আর একালে আমরা ট্রাম্প-বাইডেনের আমলে দেখছি তারা (তাদের ভাষায় চীনের কর্তৃত্ব খর্ব করতে) আইএমএফকে দিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রে অ্যাবিউজ বা অপব্যবহার করছে। যেমন বর্তমানের কারেন্সি মজুদ সঙ্কটে – কোনো দেশে আইএমএফ পুরনো সরকারের সাথেই সব আলাপ শুরু করছে, চুক্তির শর্তও ঠিক করছে, ইত্যাদি সবকিছু। কিন্তু চুক্তি সম্পন্ন করছে না। বরং উপস্থিত সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে – এটা বলাচ্ছে বা নিজেই বলছে। এতে আভ্যন্তরীণ ও বাইরে থেকে যৌথ রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে সরকার ফেলে দিয়ে এরপর  নয়া সরকার না এলে চুক্তি করা বা পরে অর্থ ট্রান্সফার, কোনোটাই আইএমএফ করছে না। এভাবেই বাইডেনের ইচ্ছার বরকন্দাজ সেজে চলেছে আইএমএফ।  পাকিস্তানের ইমরান ২০১৮ সালে ক্ষমতায় এলে ট্রাম্প তার উপরও একইভাবে আইএমএফ-কে দিয়ে চাপ সৃষ্টি করেছিল। বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় গোটাবায়ে-কে ক্ষমতা ছেড়ে যেতে হল একইভাবে বাইডেনের আইএমএফ-কে ব্যবহারের কারণে। বাংলাদেশও একই ফাঁদে পড়ে গেছে বলে অনুমিত হয়। যদিও আমাদের সরকার ভাবছে ভারতীয় অরিজিন এমন আইএমএফের শীর্ষ  স্টাফদের মাধ্যমে তার কথা আগাচ্ছে ফলে গোতাবায়ের মত ভয়ের কারণ নাই। সরকারের এই অনুমান ভুল প্রমাণ হবার সম্ভাবনাই প্রবল!  মুল কারণ, আমরা আমেরিকার আইএমএফের মুরুব্বি হওয়াকে বাইডেনের অপব্যবহার – এই যুগে প্রবেশ করে ফেলেছি।

    এদিকে এবিষয়ে পাবলিক পারসেপশন আবার হাসিনার বিরুদ্ধে। তারা মনে করে হাসিনা অসহ্য এক টেরর ক্ষমতার মানুষ। ফলে বাইডেন  আইএমএফ-কে অপব্যবহার করলেও তাদের এখন এটা অনুমোদন করা উচিত।  তাদের এখন হাসিনার হাত থেকে মুক্তি দরকার, পরেরটা পরে!!!  এদেশের মত সরকারগুলোর প্রতি জনগণ অতিষ্ঠ থাকার কারণে এ অপব্যবহার বা হস্তক্ষেপের সুযোগটা বাইডেনের পক্ষে যাচ্ছে। যদিও এটা নিরেট বাইডেনের ক্ষমতার অপব্যবহার। তাই আজ বাদে কাল এই হস্তক্ষেপের ‘কাফফারা’ আমেরিকাকে  চুকাতে হবেই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৬ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “‘ইকোনমিস্টের’ খায়েশ অপূর্ণ থাকবে“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • ট্রাম্পের জাতিবাদ ফেল, কিন্তু ঘায়েল বাইডেন

    ট্রাম্পের জাতিবাদ ফেল, কিন্তু ঘায়েল বাইডেন

    গৌতম দাস

    ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

    Biden caught up under TRUMP’s wrong decision; Trade War US and China

    [সার-সংক্ষেপঃ ট্রাম্পের স্বদেশীপনার জাতিবাদ প্রবলভাবে এখন পরাজিত ফলাফল নিয়ে হাজির হয়েছে। পরিণতিতে হাজির হয়েছে মুদ্রাস্ফীতি; আর তাতে নাভিশ্বাস উঠেছে আমেরিকান ভোটারদের। তাই, আগামি মিডটার্ম নির্বাচনে বাইডেনের হারের পুর্বাভাস আসা শুরু হয়েছে। ট্রাম্পের জাতিবাদী আকামের সাথে গলা মিলিয়েছিলেন বাইডেন। তাই ট্রাম্পের সস্তা এবং পরাজিত জাতিবাদের সব দায় এখন বাইডেনের কান্ধে। ওদিকে বাইডেনের উপর ব্যবসায়ী সমিতিদের চাপ। তারা সদলে চীনাপণ্যের উপর বাড়তি আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহার করা আর চীনের সাথে বাণিজ্য আলোচনা পুনরায় শুরু করার দাবি তাদের। দুদেশের এক্সপার্টরাও উদ্বিগ্ন এই মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কীভাবে ফিরে আনা যায়! কারণ এই ব্যর্থতা চীনকেও ক্ষতিগ্রস্থ করে ফেলতে পারে। ]

    _

    বাইডেনের পাবলিক রেটিং বা জনপ্রিয়তা ঢলে পড়েছে। গত জুনে ছিল ৫৪ শতাংশ আর তা থেকে কমছিল প্রতি মাসেই। আগস্টের শেষ দিকে তার প্রতি জনগণের আস্থা ৪৭ শতাংশেরও […By Tuesday, Biden’s average approval rating had fallen to 47%, the lowest so far in his presidency.] নিচে নেমে গেছিল। পরে আমেরিকান মিডিয়া এনপিআর বলছে, এটা আরো নিচে ৪৩%। এতে প্রধান কারণ ছিল আফগানিস্তান ফেলে পালিয়ে আসা, এর ওপর আবার অনেকে এটাকে ‘অগোছালো ভাবে পালিয়ে আসায়’ আমেরিকার মত পরাশক্তির ইজ্জতে লেগেছে বলে মনে করে।  আর আমেরিকার ইজ্জত নষ্ট করেছেন বাইডেন এই হল অজুহাত। যদিও আমেরিকান এই কথিত ইজ্জত এমনিতেই ক্রমাগত মিলিয়ে যাচ্ছিল এবং তা বহু আগে থেকেই। কিন্তু যারা একালে আমেরিকা প্রবাসী হয়েছেন তারাসহ পুরনো নাগরিক আমেরিকানদের অনেকেই আমেরিকার গর্ব ও ভ্যানিটি এতদিন উপভোগ করতেন। তারা কিছুতেই এই ঢলে পড়াটা দেখিয়ে দিলেও মানতে চাচ্ছিলেন না। কিন্তু এবার সবটা মিলে আর না মেনে উপায় নাই কারোই।

    কিন্তু কারণ?
    কারণ কেবল আফগানিস্তান নয়, আরো বড় অন্য কারণ আছে। মাঝে সাময়িক আফগান-ইস্যুটা গরম হয়ে বসাতে যেটাকে সবাই ভুলে গিয়েছিল – সেটা হল, ট্রাম্প আমলে তুঙ্গে তোলা চীন-আমেরিকার বাণিজ্য যুদ্ধ, যা বাইডেন আমলেও ধারাবাহিকতায় বহমান রয়েছে এবং এই বাণিজ্যযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বাকি সব ধরনের টেনশন আর রেষারেষি্র ভিত্তি এটা!

    চীনের সাথে আমেরিকার বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়েছিল মানে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার প্রশাসন এটা শুরু করেছিলেন এক আমেরিকান জাতিবাদ দিয়ে। হ্যাঁ, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’-এর কথা বলছি। যা সেই থেকে ট্রাম্পের এক না-বুঝ ও অবুঝ অবস্থান। এটা শুনতে অনেকের কাছে অবাস্তব ঠেকলেও ট্রাম্প এটাই করেছিলেন। আর সেটাই এখনকার আমেরিকার সবচেয়ে বড় সংকটের নাম! কোন্ আমেরিকায়? যে আমেরিকা গত আশির দশকে থেকে দুনিয়ায় গ্লোবাল বাণিজ্য বা গ্লোবালাইজেশনের নেতৃত্ব দিয়ে সবাইকে বাধ্য করেছিল, সেই আমেরিকায়!

    দুনিয়ায় আমাদের এদিকটায় এশিয়ায় মানুষে্ররা আবার কিছু পরিস্কার বুঝুক বা আধা অথবা না বুঝুক, ‘জাতিবাদ’ খুবই পপুলার। এরা অন্যকে বা অন্যের ‘জাতিবাদ’ খারাপ বললেও নিজের আরেকটা বা নিজধর্মীয় জাতিবাদই সবচেয়ে ভালো পথ বলে মনে করে থাকে। এমনকি কমিউনিস্টরাও কলাম লিখে [“নানা জাতিগোষ্ঠীর আফগানদের আগে ‘আফগান’ হতে হবে”] তালেবানদের আফগান-জাতিবাদী হতে পরামর্শ দিচ্ছেন। ব্যাপারটা এমনই কৌতুকের!

    এর ওপর আছে, এই জাতিবাদীরা কখনো “রাজনৈতিক জাতিবাদী” হয় তো, কখনো “অর্থনৈতিক জাতিবাদী” হয়। ‘রাজনৈতিক জাতিবাদী’ মানে যেমন হিন্দু বা মুসলমান জাতিবাদ, যারা একে অপরের জাতিবাদ করাকে খারাপ কাজ মনে করে কিন্তু নিজ জাতিবাদ ‘সহি’ মনে করে। আর সুনির্দিষ্ট করে অর্থনৈতিক জাতিবাদী মানে যারা যেকোনো বিদেশী পণ্য আমদানি করাকে নিজ দেশকে ভালোবাসায় ঘাটতি মনে করে। এখানে কৌতুক হল, এটাই আসলে কমিউনিস্টদের গর্ভ থেকে বের হয়েছে। অর্থাৎ সব কমিউনিস্টই আসলে মুখে প্রকাশ্যে জাতিবাদি।  আবার অন্য দেশে রফতানি করে চকচকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লোভও এরা ছাড়তেই পারে না। নমুনা হিসাবে যে আদর্শ লোভী সম্ভবত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মোদি। যেমন, আরএসএসের এক অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ’ যে ভারতে চীনাপণ্য বর্জনের হাঁক দেয়; কিন্তু চীনাপণ্য আমদানি ভারতে তাতে না কমে আরো বেড়েছে।

    বাস্তবতা হল, গত আশির দশক থেকে আমেরিকা সব দেশকেই গ্লোবালাইজেশনে যুক্ত হতে বাধ্য করে ফেলেছিল। যেমন ‘এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন’ বা ‘ইপিজেড’ [EPZ] অথবা ‘রফতানির জন্য উৎপাদন’ এই শব্দগুলো আজ গ্রামের অনেক টিনএজ মেয়েটাও জেনে গেছে। কারণ সে জানে গার্মেন্টে কাজ পাওয়া যায় এভাবে বা এর কারণে। সার কথায়, আমাদের এশিয়ান সমাজে তাই অনেক আগে থেকেই জাতিবাদ ও দেশপ্রেম বলে একটা ভুয়া-বুঝ চালু আছে। আবার অন্য দিকে সেই গার্মেন্টের মত রফতানি পণ্যের কারখানাতেই সবাই কাজ পেতে প্রচণ্ড ‘আগ্রাসী’।

    বড় কৌতুকটা হল, ২০১৭ সালে আমেরিকায় ক্ষমতায় আসা ট্রাম্পও একই জাতিবাদ- দেশপ্রেম এই ভুয়া বুঝেরই আরেক স্লোগান “আমেরিকা ফার্স্ট” চালু করেছিলেন। অথচ কনসেপ্ট হিসাবে  “আমেরিকা ফার্স্ট” আর “গ্লোবাল রফতানিবাণিজ্য”  ততপরতা হিসাবে একেবারেই পরস্পরবিরোধী।

    এমনকি এ দুটোর মধ্যে কোনটা বেশি ভাল এমন বোকা বা না-বুঝাদের তুলনাও যারা অনেক পড়াশোনা জানা এক্সপার্ট তারাও করেন। বলে রাখি বর্তমান সরকার হিসাবে ‘কালো দাগি’; ফলে অগ্রহণযোগ্য কিন্তু সরকার সম্প্রতি চীনের নেতৃত্বে আরসিইপি [RCEP] বাণিজ্য জোটে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আবেদন করেছে এবং এটা এক সাহসী ও সঠিক সিদ্ধান্ত। এটাই সস্তা জাতিবাদ ফেলে আগিয়ে যাওয়া অবশ্যই। এই জোটে যোগ দিতে হলে অন্য দেশের পণ্যের আমদানির উপর শুল্ক ধার্যে সর্বোচ্চ আট শতাংশের কাছাকাছিও যাওয়া যাবে না। মানে, বিদেশী পণ্যে শুল্ক আরোপকে সরকার চালাতে বার্ষিক রাজস্ব আয়ের আর বড় উৎস গণ্য করা যাবে না। ফলে মারাত্মক চ্যালেঞ্জিং; আবার জিতলে কিন্তু একেবারে গাজী! এমনকি যেমন জাপান ও অস্ট্রেলিয়া হল এরা দাবি করে যেতারা নাকি প্রচন্ড চীনবিরোধী এবং  কোয়াডের সদস্য। অথচ তারা প্রথমেই আরসিইপি জোটের সদস্য হয়ে নিয়েছে; তা হতে এরা মরিয়া হয়েছিল যে, এই লোভ সামলাতে পারেনি। মানে আরসিইপি-এর লোভে কোয়াডের প্রতি ‘ঈমান’ রাখতে পারেনি। অর্থাৎ এরা নিজেরাই জাতিবাদ-দেশপ্রেম এই ভুয়া স্লোগানটা কিন্তু মানেনি।

    তামাশা হল, এটাই ছিল ট্রাম্পের নতুন রাজনৈতিক স্লোগান। কিন্তু বাইডেনের পাবলিক রেটিংয়ের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এখানে কেন এলাম? হ্যাঁ, এবার সেই সংযোগটা দেখাব।

    ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই “এই জাতিবাদ” দেখিয়ে আমেরিকান পাবলিককে মোদির মত সস্তা সুড়সুড়িতে নাচিয়ে চীনের সাথে বাণিজ্যিক দরকষাকষি বা বারগেইন [bargain] করতে গিয়েছিলেন। সাধারণভাবে বললে বারগেইন  কোনো অন্যায় বা সমস্যা নয়। এটা অবশ্যই একটা ফেয়ার বা ইনসাফের সীমার মধ্যে থাকা। কারণ এটা পরস্পর নিজের নিজের লাভালাভ এক্সপ্লোর করে দেখে  যে – কার, কী, কোথায় সুবিধা-অসুবিধা এর খোঁজাখুঁজি করে বাজিয়ে দেখে থাকে। এটা গভীর দেয়া-নেয়ার সম্পর্কের সন্ধানে থাকা; কিন্তু কোনোভাবেই এটা ঠিক ‘যুদ্ধ’ নয়। বড়জোর বাণিজ্য প্রতিযোগিতা অর্থে লড়াই। কিন্তু ট্রাম্প এই বাণিজ্য লড়াইয়ের প্রথমপর্ব বাৎচিত শেষ করে একেবারে চুক্তি করে ফেলেছিলেন। কিন্তু এরপরে আর কখনোই আগাতে পারেননি। ফলে পুরো বাণিজ্য সম্পর্ক সেই থেকে ঢলে পড়েছিল। এরপর জোশে আরো দেশপ্রেম দেখাতে গিয়ে চীন থেকে আমদানি পণ্যের ওপর বাড়তি ২৫ শতাংশ করে শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করে দেন। এতে বুদ্ধিমানেরা চুপ হয়ে যায় আর গর্দভেরা হাততালি দিয়ে উঠেছিল। শুধু তাই নয়, ট্রাম্প প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন, তিনি তার টার্ম শেষের আগে এমন ব্যবস্থা করে যাবেন যাতে পরের অন্য কোনো নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট তার জাতিপ্রেম নীতি থেকে সরতে না পারেন। এরপরে তিনি আরো আগ বাড়িয়ে সরাসরি বাইডেনের নাম ধরে বলেছিলেন, আমি চলে গেলে পরের টার্মে চীনারা ডেমোক্র্যাট বাইডেনের সাথে চুক্তি করতে পারবেন এই কূটচিন্তাতেই তারা আমার সাথে চুক্তি করলেন না। এমন অনুমাননির্ভর এক দাবিও করেছিলেন। এতে আরো হাততালি পাওয়া গিয়েছিল যে হ্যাঁ, এবার আমেরিকায় এক খাঁটি দেশপ্রেমিক পাওয়া গেছে।

    শুরুতে ঘটনা ছিলও তাই। এমনিতে পপুলার ইমেজের ভাষায় বললে, ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বাইডেন তো উদার; যার বিপরীতে ট্রাম্প আগ্রাসী আনকুথ মানে এক ‘গাঁইয়া’, অসভ্য। কিন্তু বাইডেনের প্রেসিডেন্টের শপথের পরে দেখা গেল তিনি কথা মিষ্টি করে বললেও তার মুখ্য নীতি-পলিসি সবই আসলে ট্রাম্পের ফেলে যাওয়া নীতিরই কুড়িয়ে নেয়া অনুসরণ। এ দেখে আমেরিকানরা হয় ভেবেছিল যে, ট্রাম্প আসলেই কত জাতিপ্রেমী ও দূরদর্শী!

    কিন্তু না, চার দিকে হা-হুতাশ উঠে গেছে এবার। আমেরিকার মানুষ বিশেষত, মিডল ক্লাস একেবারেই নাভিশ্বাস ও আশাহত হয়ে পড়েছে। কিন্তু তা বাইডেনের জন্য এতবড় সমস্যা কেন? কারণ, বাইডেনের চার বছর মেয়াদের দু’বছর শেষ অর্থাৎ অর্ধেক সময়কাল পার হলে পরের বছর নভেম্বরে এক নির্বাচন হবে যাকে ‘মিডটার্ম নির্বাচন’ বলে। এতে হাউজের ৪৩৫ আসনের পুরোটাই আর সিনেটের তিন ভাগের এক ভাগ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে অনেক স্টাডি সার্ভে বা জনমত জরিপ সংগ্রহ ও তার ফলাফল আসা শুরু হয়েছে গত মাস থেকে। এর সার সংক্ষেপটা, এশিয়ান পুঁজিবাজারকেন্দ্রিক রাজনৈতিক পত্রিকা ও হংকংভিত্তিক পত্রিকা এশিয়া টাইমসের রিপোর্ট মতে – রিপাবলিকান ও ক্ষুব্ধ নিরপেক্ষ ভোটাররাই ইতোমধ্যে ৭০% হয়ে গেছে, যারা এবার ডেমোক্র্যাট বাইডেনের পার্টির বিরুদ্ধে ভোট দেবেন।

    “Republicans and independents together comprise more than 70% of the American voting public, and their view of US economic conditions plunged to new record lows in August as inflation ground higher. That’s already provoked a revolt in the Democratic Party against White House spending plans, and sets the stage for a Republican landslide in the 2022 Congressional elections.”

    তাতে ডেমোক্র্যাট দলের সমর্থকদের ভেতরেই বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে, ফলে রিপাবলিকানরা একচেটিয়া জিতে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। কিন্তু পাবলিক ঠিক কী দেখে এত ক্ষিপ্ত হয়ে গেল? এটা হল মুদ্রাস্ফীতি [inflation]। ওখানে বলা হয়েছে, গত সাত মাসে ‘ইউএস কনজুমার প্রাইজ সাডেনলি জাম্পড ৫% + ইয়ার-টু-ইয়ার; দ্যা থ্রেটস আর রিয়াল’ [US consumer prices suddenly jumped 5%-plus year-on-year, the threats were real.]।

    এদিকে মুদ্রাস্ফীতিতে একটা খুবই কমন যে ফেনোমেনা তা হল , এতে কেউ সন্তুষ্ট নয়। কারণ এতে বেতনও বাড়বে, ভোগ্যপণ্যের দামও বাড়বে। আমেরিকার অভ্যন্তরীণ মিডিয়া সিএনবিসি লিখছে, মজুরি মাসপ্রতি লাফ দিয়ে বেড়েছে ১.৩% যা বছরে বেড়েছে ১০.৩%, হারে [wages jump 1.3% for the month and 10.3% on the year.]। আর সিএনবিসির ঐ খবরের শিরোনাম, ‘এ শার্প রাইজ ইন ওয়েজেস ইজ কন্ট্রিবিউটিং টু ওরিজ ওভার ইনফ্লেশন’ [A sharp rise in wages is contributing to worries over inflation]। মানে ‘লাফিয়ে বেড়ে চলা মজুরি মুদ্রাস্ফীতির ওপরে আরো উদ্বেগ বাড়িয়েছে’।

    এদিকে ভোক্তাদের ক্ষুব্ধ মনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক গবেষণা স্টাডি শুরু হয়েছে। আর তাতে প্রকাশিত ফলাফল বলছে, বাড়ি বা গাড়ির ভাড়া সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। আগের ভাড়াটের চেয়ে ১৭% বাড়ির ভাড়া বেড়েছে [renters signing a new lease paid an average of 17% more than the previous tenant]। ২০% পর্যন্ত বেড়েছে পুরনো গাড়ির দাম। ভোক্তামূল্য সূচক যা গড়ে বছরে ২% বৃদ্ধির মধ্যে থাকত তা এখন ১২% এর উপরে উঠে গেছে [just 2% for rent of primary residence as of July, compared with more than 12%, ]। গবেষণা স্টাডি নিয়ে প্রত্যেকটা মিডিয়া রিপোর্ট এরকমই।

    কিন্তু কেন এমন মুদ্রাস্ফীতি, পেছনের কারণ কী?
    এ নিয়ে এশিয়ান টাইম্সের ১০ সেপ্টেম্বরে রিপোর্টের শিরোনাম, ‘এটা তো মুদ্রাস্ফীতি নয়রে বোকা’, বাইডেন বিদ্রোহের মুখোমুখি [‘It’s the inflation, stupid’ – Biden faces revolt]। আর ভিতরে এবার কারণ বর্ণনা করে লিখেছে, “গত বিশ বছর ধরে চীনাপণ্য আমদানি করে আমেরিকা নিজ ভোক্তার জন্য তৈরি করা বহু ভোগ্যপণ্যের দাম কমিয়ে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু গত ২০২০ সাল থেকে চীন থেকে আমেরিকার আমদানি করা পণ্যের মূল্য (বাড়তি শুল্ক আরোপ করে) বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে”।

    For twenty years, US imports from China helped reduce the cost of finished goods in the United States, but US import prices from China began rising in 2020.

    গত ৭ আগস্ট এশিয়ান টাইমস আরেক রিপোর্টে বলেছিল, ‘ট্রাম্পের আমলে চীনা পণ্যের ওপর তার বাড়তি শুল্ক আরোপ আমেরিকায় রেকর্ড মুদ্রাস্ফীতির কারণ ঘটিয়েছে যেটা আবার এখন আগামী ২০২২ সালের মিডটার্ম নির্বাচনে বাইডেনের দলের জেতার সম্ভাবনাকে হুমকিতে ফেলেছে।’ এ কারণে এই রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ‘ইউএস বিজনেস পুশ বাইডেন ফর অ্যা চায়না ট্রেড ডিল’ [US business pushes Biden for a China trade deal]। কেন?

    ভেতরের খবরের সারকথাটা হল, “আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাসে যা কখনো আগে ঘটেনি তা হলো আমেরিকার পুরো ব্যবসায়ী মহল- আমেরিকার ৩০টির বেশি ব্যবসায়ী সমিতি  [Never before in US political history has the whole of the American business community—more than thirty major business organizations] (রয়টার্সের হিসাবে ৩৬টিরও বেশি), এরা এক জোটে ও এক স্বরে গত ৫ আগস্ট বাইডেন প্রশাসনের কাছে চীনের সাথে বাণিজ্য আলোচনা আবার শুরু করা এবং চীনা পণ্য আমদানিতে বাড়তি শুল্ক আরোপ বাতিলের দাবি জানিয়েছে”।

    বিবিসি বলছে, ‘২০১৯ সালের মে পর্যন্ত ট্রাম্প শুল্ক বাড়াতে বাড়াতে তা ২৫% পর্যন্ত করেছিলেন।’ তবে সিএনএন বলেছে, কোনো কোনো পণ্যে এটা আসলে ৬৬% পর্যন্ত [The US still has tariffs on 66% of Chinese exports]।

    ট্রাম্পের স্বদেশীপনার ঠেলায় বাইডেন ‘নিহত’ হতে যাচ্ছেন!
    হ্যাঁ ঠিক তাই। এটাই হল ট্রাম্পের জাতিবাদী স্বদেশীপনার পরিণতি। তবে আত্মঘাতী এই আকামটা ট্রাম্প করেছিলেন নিজ আমলে। কিন্তু এর ফলাফল পরিণতি আসতে সময় লেগেছিল। আর বোকা বাইডেন, ট্রাম্পের চীনা বাণিজ্যযুদ্ধ ও শুল্কহার পলিসি যেমন ছিল তা বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের শুল্কহার বাড়ানোর খারাপ প্রতিক্রিয়া ও পরিণতি যখন দেখা দেয়া শুরু করে তখন সেটা বাইডেনের আমল বলে এবার তিনি তাতে ‘কাটা পড়ছেন’। তার দলের আগামী মিডটার্ম নির্বাচনে ফল খারাপ করবেন বলে পূর্বাভাস বেরিয়েছে।

    কিন্তু কেন এমন খারাপ ফলাফল-প্রতিক্রিয়া হল? এর পেছনের কারণ কী?
    অল্প কথায় বললে মূল বিষয়টা এখানে ‘ন্যূনতম মজুরি’ [minimum wages]। পশ্চিমা বা অগ্রসর ইকোনমির দেশে সাধারণ জীবনযাত্রার ব্যয় আমাদের মত দেশের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে থাকে, ফলে সে মোতাবেক তাদের মজুরিও বেশি রাখতে হত। এর মানে পশ্চিমের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য বেশি হত তাতে। এমনকি, পশ্চিমের তুলনায় এশিয়ায় (এমনকি চীনেরও) ‘ন্যূনতম মজুরি’ কম। আবার আমাদের মত দেশের ন্যূনতম মজুরি চীনের চেয়েও কম। ফলে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য পশ্চিমের চেয়ে অনেক কম রাখা যায়, রাখা সম্ভব।

    তাই পাশ্চাত্য আমাদের এশিয়ান উতপাদিত ভোগ্যপণ্য (আমদানি করে) তা তাদের শ্রমজীবীদের ব্যবহার করতে দিয়ে তাদের দেশের নিজ ন্যূনতম মজুরি-ই কম (যা প্রকারান্তরে নিজ উৎপাদিত পণ্যের মূল্য কম রাখতে পারবে) রাখার একটা কৌশল বের করেছে। যেমন, আমাদের মত দেশ থেকে তাদের মজুর বা ওয়ার্কিং ক্লাসের ভোগ্যপণ্যের আমদানি বাড়ানো। যেমন গার্মেন্টস যা উতপাদনে শ্রমঘন ও কম জটিল টেকনোলজি এতে জড়িত। তাই এমন পণ্য আমাদের দেশ থেকে আনলে পশ্চিম তার শ্রমিককে দেয় মজুরিতে (পোশাকের মূল্য অংশটা) আরো ছাটাই বা কম দিলেও চলবে। আর এতে সামগ্রিক ন্যূনতম মজুরি কম রাখতে পারবে। এ জন্যই ‘পশ্চিম’ আমাদের দেশ থেকে গার্মেন্টস আমদানি করে থাকে। আর যদিও ভাব করে যে, আমাদেরই যেন দয়া করছে!

    ঠিক একইভাবে পশ্চিমের ভোগ্যপণ্যে আরেকটা শব্দ ব্যবহার করা হয় ‘ডিউরেবল গুডস’ [durable goods]। বাংলায় বললে, যা অনেক দিন ধরে ব্যবহার করলেও টিকে এমন পণ্য। মানে হল, মধ্যবিত্ত ক্রেতা যে পণ্য কিনে আরামে নুন্যতম তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তা ব্যবহার করে থাকে। যেমন একটা ওয়াশিং মেশিন বা কাপড় ধোয়ার মেশিন।

    চীনে তৈরি এমন ‘ডিউরেবল গুডস’ এতে আমেরিকান মধ্যবিত্ত বা ওয়ার্কিং ক্লাসের কাছে খুবই কাম্য। কারণ এটা আমেরিকায় তৈরি করা হলে দাম বেশি পড়ত যা হয়ত তার নাগালের বাইরে চলে যেত; যার সোজা মানে এসব ভোগ্যপণ্য আমেরিকায় তৈরি হলে এর বাড়তি মূল্যের যোগাতে হত বলে সে কারণে আমেরিকার ন্যূনতম মজুরি অনেক বেশি হয়ে হত।

    এখন চীনা পণ্যের উপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করে – ট্রাম্প বা বাইডেন সেই একই অবস্থা তৈরি করেছেন; যদিও ভিন্নভাবে। ট্রাম্প এসব ‘ডিউরেবল গুডস’-এর ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপ করে ভেবেছেন, এতে চীনা পণ্য আমেরিকায় ঢুকে পড়া ঠেকিয়ে দেবেন। আর এতে চীন খুবই চাপে পড়বে। কিন্তু প্রতিক্রিয়া আসতে সময় লেগে যাওয়ায় তিনি ‘বেঁচে গেছেন’। ফল হয়েছে উল্টো, আমেরিকা উল্টো চাপে পড়েছে- আর তা বাইডেনের সময়ে।

    বাড়তি শুল্ক আরোপের এই বুদ্ধি অনেক পুরানা। এটা কখনই ফলদায়ক হয় নাই। কারণ, বাড়তি শুল্কটা চীন আমেরিকায় ওয়াশিং মেশিন রপ্তানি  করেছে বলে এতে আরোপিত বাড়তি শল্ক কিন্তু চীনকে দিতে হয় না। চীনের বিক্তি কম বা আমদানি কিমি. হতে পারে অতটুকুই ওর শাস্তি। আর ঐ বাড়তিশুল্ক কিন্তু যোগাতে হয় গরীব ক্রেতাকে। ফলে এতে তার নাভিশ্বাস উঠে। আবার সরকার তাদের অবস্থার কোন সুহাল করতে গেলে এটাসি শেষে মুদ্রাস্ফীতির জন্ম দেয়।

    কিন্তু ফলটা কেন এমন হলো? কারণ ট্রাম্প বা বাইডেন হিসাব করেননি যে তারা এশিয়ান দেশ থেকে সস্তা ভোগ্যপণ্য আমদানি করেই নিজ দেশে ন্যূনতম মজুরি কম করে রাখতে পারেন। আর নিজ উৎপাদিত পণ্যমূল্য প্রতিযোগিতামূলক ও কম রাখার এটাই একমাত্র চাবিকাঠি। অর্থাৎ পাশ্চাত্য এশিয়ার ওপর পুরোটাই নির্ভরশীল আর এই নির্ভরশীলতা স্থায়ী।

    এক কথায় এটাই গ্লোবাল বাণিজ্য, লেনদেন বিনিময় ধেয়ে আসা বা ক্রমবৃদ্ধির পেছনের মূল কারণ।

    এ কারণে ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ, বাড়তি শুল্ক আরোপ, জাতিবাদ-দেশপ্রেম এবং আমেরিকা ফার্স্ট ইত্যাদি সব ফেল করে যাচ্ছে। তাই ট্রাম্পের সব বয়ানই আসলে ভুয়া, মৃত ও অকার্যকর! গ্লোবাল বাণিজ্যের বিপরীত প্রতিপাদ্য বলে, (অর্থনৈতিক ধরনের) জাতিবাদ এক মিথ্যা স্লোগান!

    খুব সম্ভবত ঠিক এ কারণেই বাইডেন এই সপ্তাহে চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনালাপ (বাইডেন ক্ষমতায় আসার পরে এটা দ্বিতীয়) করে নিয়েছেন [Biden and China’s Xi speak by phone for first time since February]।

    এ ছাড়া ইতোমধ্যে ক্লিনটনের আমলের আমেরিকান এক প্রাক্তন ট্রেজারি সেক্রেটারি প্রফেসর লরেন্স সুমারস [Lawrence Summers] বেইজিংয়ে গিয়ে চীনের এক প্রাক্তন অর্থমন্ত্রীর সাথে [former finance minister, Lou Jiwei] এক প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন [China, US share inflation risks that will not go away soon, their former top finance officials agree]। তিনি সেখানে মন্তব্য করেছেন, তিনি ‘আমেরিকার মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন’ [……I do have considerable concerns about inflation…… ]।

    এখন তাহলে, ডেমোক্রাট-রিপাবলিকান নির্বিশেষে আমেরিকা কি ‘আরেকবার বলিলেই খাইব’ দশায় যে, চীন-আমেরিকা বাণিজ্য আলোচনা অচিরেই বসবে?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ১১ সেপ্টেম্বর আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “কিভাবে ট্রাম্পের ‘স্বদেশীপনা’য় বাইডেন আহত “– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]