Tag: বিআরআই (BRI)

  • অর্থমন্ত্রীর কথিত সাক্ষাৎকার, ভারতের হাতে ব্যবহৃত!

    অর্থমন্ত্রীর কথিত সাক্ষাৎকার, ভারতের হাতে ব্যবহৃত!

    গৌতম দাস

    ১৫ আগস্ট ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-4cM

     

         Chinese loans: Developing countries must ‘think twice’

    গ্রামদেশে একটা শব্দ চালু আছে “ভাঙরি” দেয়া; মানে বিয়ে ভাঙরি দেয়া বা বিয়ে ভেঙে দেয়া। এর মানে, গ্রামের কোনো দুই পরিবারে হয়ত বিয়ে ঠিক হয়েছে; প্রস্তুতি চলছে। কিন্তু সব গ্রামে কিছু লোক থাকে যাদের কাজ হল, বিয়ে ভাঙরি দেওয়া। হতে পারে, তাদের বেশির ভাগ নিজের জীবন নিয়ে প্রচণ্ড হতাশ। হতে পারে তারা অবিবাহিত বা চিরকুমার ধরনের যাদের বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে, তাই জীবনের আশা দুর্বল। এরা ছেলের পরিবারে গিয়ে রটায় মেয়ের চরিত্র খারাপ অথবা মেয়ের পরিবারে গিয়ে বলে, ছেলের আগে একবার বিয়ে হতে গিয়েছিল বা হয়েছিল – এ ধরনের গল্প-গুজব ছড়ানো এদের কাজ!

    ভারতের এখনকার অবস্থা এই হতাশ ভাঙরি দেয়া মানুষের মত। উঠেপড়ে লেগেছে ‘চীন কত খারাপ’- সত্য-মিথ্যা যেভাবে পারে, তা দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কান ভারী করতে। আর ভারতীয় মিডিয়া এই প্রপাগান্ডার উপর ভর করেই দেশ এক দেশপ্রেম-জাগরণের জোশ রচনায় অস্থির হয়ে উঠেছে।  আবার আমাদের সরকারও সময়ে প্রলোভনে পড়ে ভারতের প্রপাগান্ডা শুনতে চাওয়ার ভান করতে গেছে – “যদি কিছু লাইগা যায়” ভেবে। মূলত চুরির অর্থ ডলারে পাচার করতে গিয়েই এই ডলার সঙ্কট যা থেকে এক চরম অস্থির-অনিশ্চয়তা আমাদের অর্থনীতিতে দেখা দিয়েছে। আর তাতে অসহায় বোধ করে সরকার কোথায় কী পাওয়া যায় যেন সব উলটা দেখতে চাইছে; অথচ আগেই জানে ওখানে কিছু পাওয়া যাবে না।

    ঘটনা হল, আমাদের সরকারের অর্থমন্ত্রী এ এইচ এম মুস্তফা কামাল কথিত এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ফাইনান্সিয়াল টাইমস [Financial Times, (FT)] পত্রিকাকে। সেখানে তিনি চীনা ঋণ কত খারাপ ও কেন বিপজ্জনক, তা বর্ণনা করেছেন বলে দাবি করেছে পত্রিকাটা। FT বা এফটি-এর গত ৯ আগস্ট প্রকাশিত ওই রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী চীনা বেল্ট ও রোড ঋণ নেয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন’ [Bangladesh’s Finance minister warns on Belt and Road loans from China]। এটা মনে করার ‘যথেষ্ট’ কারণ আছে যে, এই কথিত রিপোর্টের সাথে ভারতের ইন্টেলিজেন্সের সংশ্লিষ্টতা আছে। কারণ পরের দু’দিন ধরে ভারত এই কথিত রিপোর্ট-কে দিয়ে দিনরাত তার চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা চালিয়েছে। যেটা একটা দেশের পরিচালকদের যারা মানসিকভাবে সুস্থ তাদের পরিচালিত কোন কাজ ও তার নীতি-পলিসি হতে পারে না।

    ভারতে অন্তত দশটা পত্রিকায় [ economic Times India ,  AsiaFinancial ,   Swarajyamag , Hindustantimes ,  market.businessinsider , Newsonair , Theweek , Wionews ,  Sentinelassam , NewsBharati , Statecraft , News18 , OWSA , ANI  ……….. আরও আছে] ছেপে মিথ্যা প্রপাগান্ডার মাতম তুলে ফেলেছে।

    সবগুলো নিউজই একই Financial Times  এর বরাতে ছাপা হয়েছে যদিও সেসবের ভাষ্য, নতুন আরো শব্দ ঢুকানো বা লেখার ভলিউম ছোটবড় করা অথবা শিরোনাম আলাদা করা বা নয়া শব্দ ঢুকানো ইত্যাদি করা হয়েছে; যার মূলকথা হল, রিপোর্টটা স্পষ্ট করে চীন কত খারাপ, চীন বিভিন্ন দেশকে “ঋণের ফাঁদে” ফেলে আয় করে চলা একটা দেশ যেন এই টাউটারি-ই চীনের প্রধান আয়ের উতস আর এছাড়া , শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কটে চীন দায়ী – এসব অর্থ করে এভাবে সাজিয়ে লেখা।
    এভাবে পরবর্তীতে ভাষ্যগুলোর লিড আসে হিন্দুস্তান টাইমস থেকে [Bangladesh minister warns against China’s BRI lending, cites Sri Lanka’s example]। যেখানে শিরোনামের সাথে এবার বাড়তি শব্দ যোগ করা হয়, ‘শ্রীলঙ্কার উদাহরণের পরিপ্রক্ষিতে’ বা cites Sri Lanka’s example – এ বাড়তি শব্দগুলো। আর দশ তারিখ বিকালে বাংলাদেশের ‘মানবজমিন’ পত্রিকাও হিন্দুস্তান টাইমসের ভাষ্যটার বাংলা অনুবাদ করে ছাপে। মানে যেন ঘর পোড়ায় আলু পোড়া দিয়ে কিছু পয়সা কামানোর সুযোগ কেউ ছাড়ে নাই।

    এফটি [FT]-এর রিপোর্ট ছাপা হওয়ার পরে, প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পরে অর্থমন্ত্রী ও তার মন্ত্রণালয় এবার এক রিজয়েন্ডার [rejoinder] বা প্রতিবাদলিপি পাঠান; যা এমরা ১১ আগস্ট সন্ধ্যার পরে একমাত্র টের পাই। কিন্তু মন্ত্রীর প্রতিবাদলিপির ঠিক-ভাষ্যটা কী তা তখনও জানা যায় নাই। কেবল বাংলাদেশের ফাইন্যান্সিয়াল একপ্রেস পত্রিকা একটা সংক্ষিপ্ত ভাষ্য পাওয়া গেছিল। ফাইন্যান্সিয়াল একপ্রেস ওই রিপোর্টে জানায়, মন্ত্রী এক প্রতিবাদ দিয়েছেন যা তারা জেনেছে, “এক অফিস-কর্তার (অনুমান করছি অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাউকে বুঝিয়েছে) কাছ থেকে যে বিষয়টা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল [‘the official aware of the rejoinder told the FE.’]“। অর্থাৎ এর সোর্স তখনও খুবই দুর্বল।

    তবে এর পরের দিন ১২ আগস্ট ভোরবেলা বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টার একটু আগে, FT এবার অর্থমন্ত্রীর ওই প্রতিবাদলিপির মূল ভাষ্য প্রকাশ করে। অর্থাৎ আরো প্রায় ১২ ঘন্টা পরে, এর আগে পাবলিকলি কেউ জানতে পারে নাই যে প্রতিবাদলিপিতে কী ছিল। ্কিন্তু এতেই ভারতীয় সকল মিডিয়া আন-মুভড থাকে। মানে কেউই তাদের মিথ্যা প্রপাগান্ডা বন্ধ করে নাই। মানে  ১২ আগস্ট সারা দিন ভারতীয় পত্রিকাগুলো যারা এফটি-এর বরাতের নামে খবর ছেপেছিল এই প্রতিবাদলিপির কথা তারা সবাই চেপে গিয়েছে। এমনকি প্রভাবশালী দ্য প্রিন্ট; যার প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্ত যিনি নিজে নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন আর সাথে ঐ লেখার এক ভিডিও ক্লিপ-ভাষ্য তিনি নিজে তৈরি করে ইউটিউবে প্রচার করে থাকেন। তিনিও এফটি বরাতে কিন্তু হিন্দুস্তান টাইমসের ভাষ্যটার ওপর ভিত্তি করে তার ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করেছেন। সেটা চালিয়ে গেলেন প্রতিবাদ আসার পরেও; যা একটি খাসা চীনবিরোধী “দেশপ্রেমিক” ভারতের প্রপাগান্ডা হয়েছে অবশ্য। অর্থমন্ত্রীর প্রতিবাদলিপিটা ছাপানোর বদলে শেখর গুপ্ত বরং তার প্রপাগান্ডা ক্লিপটাই ১২ আগস্ট সারা দিন প্রচার করে গিয়েছেন, এমনই দেশপ্রেমিক তিনি!!!

    কী ছিল মন্ত্রী প্রতিবাদলিপিতেঃ
    সার কথায় তিনি লিখেছেন, এরিপোর্টে “মন্ত্রীর প্রকৃত অবস্থানের প্রতিফলন ঘটেনি” [does not properly reflect the minister’s actual position.]। কিন্তু মন্ত্রীর ‘প্রকৃত’ অবস্থানটা কী ছিল তাহলে? পরের প্যারায় মন্ত্রী প্রতিবাদলিপিতে লিখছেন, ‘The report mentioned Sri Lanka’। মানে যেন তিনি না রিপোর্টটা শ্রীলঙ্কার কথা এনেছে!! তাই কী? এমরা নিশ্চিত নই। যদিও এরপর মন্ত্রী শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণ উল্লেখ করেছেন।    উল্লেখ করে বলেছেন – যে (মূলত) “সভরেন লোন নেয়ার কারণে গত মে মাসে শ্রীলঙ্কা ডিফল্টার হয়ে গেছে এবং পরে আইএমএফ এর সাথে চুক্তিতে গিয়েছে”। মন্ত্রীর এই দাবিটা সত্য। আর মন্ত্রী তাই এখন দাবি করেছেন এই রিপোর্ট লিখেছে, বিআরআই (চীনা বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ লোন) লোনের কারণে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সঙ্কট চরম খারাপ হয়ে গেছে’- এটা তিনি বলেন নাই। অর্থাৎ চীনা লোনের কারণে শ্রীলঙ্কা ডিফল্টার হয়েছে এটা বলেন নাই; বরং আসলে ‘সভরেন ঋণের কারণে সমস্যা হয়েছে’।

    পরের প্যারায় মন্ত্রী বলছেন, ‘ চীনা লোন নেওয়ার ব্যাপারে (কাউকে) তিনি সতর্ক করেন নাই”। এ ছাড়া সবশেষে তিনি একটা তথ্যের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘২০২১ সালের হিসেবে আমাদের মোট বিদেশী ঋণ ৫১ বিলিয়নের মধ্যে মাত্র ৪ বিলিয়ন হচ্ছে চীনা লোন।’

    অর্থাৎ মন্ত্রী বলতে চাইছেন, বাংলাদেশের কোনো অর্থনৈতিক ক্রাইসিস চীনা লোনের কারণে নয়।
    তবে বাংলাদেশের টিবিএস পত্রিকা তারাও মনে করে মন্ত্রীর বক্তব্য  বদলানো (ডিস্টোর্ট distort) করা হয়েছে। তারা লিখেছে, “London-based daily Financial Times (FT) published a report recently distorting statements made by Finance Minster“। তাদের রিপোর্টের প্রথম বাক্য হল এটা। 

    মন্ত্রীর এ প্রতিবাদলিপিতে আমাদের প্রাথমিক মন্তব্যঃ
    দেখা যাচ্ছে এফটির রিপোর্টার হেরেও হার মানতে রাজি নয়। তিনি প্রতিবাদলিপিটা ছাপবার সময় একটা নয়া শিরোনাম দিয়েছেন, Letter: Why Bangladesh minister is phlegmatic on BRI loans , যেখানে একটা বাঁকা শব্দ তিনি ঢুকিয়েছেন – phlegmatic। অক্সফোর্ড যে শব্দের অর্থ করে আবেগশুন্য unemotional, মানে এক উচ্ছ্বাসশুন্য অবস্থা।  মানে বিআরআই ঋণ নিয়ে মন্ত্রী আবেগশুন্য কেন? এধরণের একটা ভাব বা বক্তব্য এর লেখক বেঞ্জামিন পারকিন দিচ্ছেন। এটা অন্যায় ও অসততা। কারণ প্রথমত একজন মন্ত্রী বলছেন তার কথা বিকৃত বা ডিস্টোর্ট করা হয়েছে। যেটা Financial Times (FT) ও এর রিপোর্টারের জন্য খুবই অসম্মানজনক অভিযোগ। যেটা আসলে বলা হচ্ছে এই পত্রিকা ও এর রিপোর্টার অসৎ ও বিশ্বাস করা যায় না- ইন্টিগ্রিটির অভাব আছে। যেটা একটা মারাত্মক অভিযোগ। অথচ রিপোর্টার সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে ফাজলামো করছেন। কেন? এইক রিপোর্ট-টা ইংল্যান্ডের এই অর্থনৈতিক দুর্দিনে কেউ পয়সা দিয়ে করিয়েছে??? তাই মন্ত্রীর এত মারাত্মক অভিযোগ শুনেও এক ইউরোপীয় মন অনড়, প্রতিক্রিয়াশুন্য??? তিনি তো অন্তত বলবেন যে মন্ত্রীর অভিযোগ সত্য না!!! নাকি??? সত্যি এটা এক অদ্ভুত সাংবাদিকতা!!!

    কিন্তু মন্ত্রীর এ প্রতিবাদলিপি-ও যেসব প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেঃ
    ১। প্রথমত এ প্রতিবাদলিপিতে এটা এখন সন্দেহতীতভাবে পরিষ্কার যে, মন্ত্রী এফটি-এর সাথে কথা বলেছেন যেটাকে তারা ইন্টারভিউ বলছে।

    ২. কিন্তু কোন দেশের মন্ত্রী সাক্ষাৎকারে বা সাংবাদিকের সাথে আলাপে কোনো একাডেমিক বা ইন্টেলেকচুয়াল আলাপ কথোপকথনে লিপ্ত হন না, হওয়ার কথা না। এটা তার করণীয় কাজ বা সাবজেক্ট না, এখতিয়ারও না। ফলে শ্রীলঙ্কা কেন সঙ্কটে ডুবেছে এ প্রসঙ্গে তিনি কথা বলবেন কেন? শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের মন্ত্রীর এক্তিয়ারের বাইরে – এটাও কী মন্ত্রী জানা নাই? শ্রীলঙ্কা এনিয়ে কোন আপত্তি বা ব্যাখ্যা চেয়ে বসলে তো আমাদের সরকার কঠিন বিব্রত হবে, মাফ চাইতে হবে??   মন্ত্রী বড়জোর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে কথা বলবেন। এটাই তার এখতিয়ার। বাংলাদেশে চীনা লোন নিয়েও কথা বলবেন যতটুকু একটা বিদেশি মিডিয়ার সাথে কথা বলার সময় মন্ত্রী হিসেবে তাঁর এখতিয়ার। তবুও সাবধান যে সেটাও – শ্রীলঙ্কা চীনের ঋণ নিয়ে ডুবেছে কিনা – এ বিষয়ে কোনো জবাব না দিয়ে, এড়িয়ে যাওয়া বক্তব্য হতে হবে। শ্রীলঙ্কায় তাদের সমস্যা কার জন্য কী হয়েছে, এর ব্যাখ্যা দেয়ার কাজ আমাদের মন্ত্রীর কোনভাবেই নয়। কোন বিদেশী সাংবাদিক তাকে তবু যদি উস্কানিতে শ্রীলঙ্কা চীনের লোনে ডুবেছে কিনা – এনিয়ে মন্তব্য জানতে চায় তাহলে, অর্থমন্ত্রীর উচিত হবে, ঠাণ্ডা মাথায় ভদ্রভাবে ঐ সাংবাদিককে বিদায় করে দেয়া। আর সাংবাদিককে মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে যে, তিনি অর্থমন্ত্রী –  বাংলাদেশের কোনো পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল না; তাই রিপোর্টার যদি আরও  প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন না করতে পারেন বা প্রশ্ন না থাকলে তিনি কথোপকথন শেষ করবেন। কিন্তু জানা যাচ্ছে, মন্ত্রী সেটা করেননি, সাংবাদিকের সাথে মেতেছিলেন। আর রিপোর্টার নির্লজ্জের মত তাঁকে বিক্রি করে দিয়েছে!!

    ৩। বাংলাদেশের চলতি সরকারের একটি নিয়মিত সমস্যা দেখা গিয়েছে যে, কেন সে চীনের সাথেও সম্পর্ক রাখছে তা ভারতকে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া। তবু এই কান্ড যদি সরকার টু সরকার পর্যায়ে হয় যেখানে ফরমাল-ইনফরমাল বহু দিকেই আলাপ হয়ে থাকে যা স্বাভাবিক, সেখানে এমন কিছু হতে পারে। কিন্তু পাবলিকলি বা প্রকাশ্যে মিডিয়া-সাংবাদিকতায় এ্টা একেবারেই কাম্য নয়। কেননা তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ভারতকে ট্যাক্স দিয়ে আমাদের যেন চলতে হচ্ছে!!!

    ভারতও প্রায়ই এমন দাবি করে থাকে যে, তার পড়শি দেশগুলো যেন ভারতের নিজ বাসার পিছনের বাগানবাড়ি সে দেশগুলো যেখানে ভারত ইচ্ছামতো হাত ঢুকাতে পারে, ফুল তুলে আনতে পারে ইত্যাদি। [এনিয়ে আমার পুরানা কয়েকটা লেখা আছে যার একটা লেখা “এক মফস্বলী জেনারেল” দেখা যেতে পারে।] এই ধারণার আদিগুরু হলেন জওয়াহের লাল নেহরু। তিনি মনে করতেন মানে ভাব করতেন, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে ফিরে গেলেও ওর বদলে তখন থেকে নেহরু হলেন রানীর নয়া ‘ভাইসরয়’ বা প্রতিনিধি। ফলে ভারতের পড়শি দেশ যারাও ভারতের সাথে বা অংশ হয়ে ব্রিটিশ কলোনির অংশ ছিল, কিন্তু এখন এসব স্বাধীন দেশ হলেও সেই সূত্রে নেহরুর নয়া “কলোনি-অধীনস্থতা” তাদের মানতে হবে।

    ভারত এ কথাগুলোই রিপিট করা শুরু করেছিল যখন চলতি শতকে চীনা অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেড়ে যাওয়াতে এশিয়া-আফ্রিকা সবখানেই এর চীনা প্রভাব বাড়ছিল। ফলে  ভারতের পড়শি দেশগুলোর উপরও চীনা প্রভাব স্বাভাবিকভাবে বাড়ছিল। কিন্তু ভারত চীনের মতই পালটা নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা দিয়ে না, যে মুরোদ তার এখনো হয় নাই তাই, বরং নেহরুর সামন্ত-কলোনি স্টাইল দিয়ে কিছু করার খামোখা চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর আমাদের সরকারের নিজ দুর্বলতার কারণে বিদেশী সাংবাদিক বা ভারতীয় সাংবাদিক পেলেই তাকে তোষামোদ করতে চেষ্টা করা থেকে এসব সমস্যা তৈরি হয় বলে অনেকে অনুমান করে। খুব সম্ভবত এমন কিছুর ফ্যারে পড়েই মন্ত্রীর এই বিপর্যয়!

    ৪।  তবে কোন সূত্রে (FT)এফটির প্রতিনিধি অর্থমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছাতে অ্যাকসেস বা প্রবেশ-অনুমতি পায় ও কথা বলতে পেরেছিল সেটা এক বিরাট কৌতুহল ও রহস্য। অবশ্যই। কারণ মন্ত্রী এই সাংবাদিকের সাথেই চীন কেমন, শ্রীলঙ্কার সঙ্কটে চীনা ঋণের স্বভাব খাসলত কেমন ইত্যাদি যেন এটা তাদের খোশগল্প-আলাপের সাবজেক্ট ছিল, মন্ত্রী সে আলাপ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষে করেছেন! আর এমন বিশেষ আগ্রহ বিচার করলে এটা তো ভারতের পলিসি যে চীনকে এক দানব বলে তুলে ধরতে চায়। এছাড়া যেন এই চীন এমন যে, যার বাসার ভাত চড়ে অন্যদেশকে ‘ঋণের ফাঁদে ফেলে – বিভিন্ন দেশ থেকে লুটে আনা পয়সায়’!
    কাজেই Financial Times (FT) সাথে অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎ দেয়ার পেছনের ঘটনার সাথে ভারত আছে, তার ইন্টেলিজেন্স আছে এমন অনুমান প্রবল। বিশেষ করে, বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রীর মুখ দিয়ে চীনা ঋণের বিরুদ্ধে বলানো, আর এরপর সেটাকে আরেক দফায় ভারতের আরো দশটা পত্রিকায় আরো কঠোর চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা ভাষ্য হিসাবে দ্রুত উপস্থাপন যেখানে আবার সেন্ট্রাল রোলে হিন্দুস্তান টাইমসকে রাখা- এ এক বিরাট খবর ম্যানিপুলেশন, প্রপাগান্ডা-হিন্দুত্বের জাতিবাদী চীনবিরোধী জোশ তৈরি করে ভারতের এক মহা-প্রপাগান্ডা তৎপরতা অবশ্যই!  সেটা ভারত করলে করুক যা ভারত আর চীনের ব্যাপার; কিন্তু ভারত এই প্রপাগান্ডা করেছে আমাদের অর্থমন্ত্রীর কাঁধে বন্ধুক রেখে। যেটা অবশ্যই আমাদের সবার জন্য বদারিং পয়েন্ট! এটা ইনসাল্টিং; বিব্রতকর! তাতে এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, তিনি চীনা ঋণের নিন্দা করেন আর নাই করেন তার চেয়ে বড় ঘটনা হল, তিনি ভারতের হাতে ব্যবহৃত হয়ে গেছেন। এবং সেটা জেনে বা না-জেনে!

    ৫। এফটির রিপোর্টের শিরোনামে একটি শব্দ হল, ‘বিআরআই’ [BRI] লোন মানে বেল্ট-রোড প্রকল্পের লোন। অর্থাৎ এখানে ধরে নেয়া হয়েছে চীনা লোন মানেই যেন তা বিআরআই!  না, তা একেবারেই না। এটা ভারতীয় অনুমান এবং এটা মিথ্যা অনুমান। এর কারণ যখন বেল্ট-রোড প্রকল্প যার শুরুতে ২০১৩ সালে নাম ছিল ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড; আগে কয়েক বছর তা চলার পরে ২০১৭ সালে বিআরআই [Belt road Initiative] নাম দিয়ে সম্মেলন ডাকা হয়েছিল কেবল তখনি ভারত বিআরআই প্রকল্পের প্রকাশ্য বিরোধিতায় নেমেছিল। ভারতকেও দাওয়াত দেয়া হয়েছিল আর তাতে অপারগতা প্রকাশ করতে গিয়ে ভারত প্রথম তার বিরোধিতা প্রকাশ্যে এনেছিল। কাজেই সবকিছুকে  ‘বিআরআই’ বলে হাজির করা নিজের ঘৃণা-বিরোধিতা প্রকাশ এটাই তো ভারতের অবস্থান!
    আরেক মজার দিক হল, মোদির ভারতে কি চীনা অবকাঠামো ঋণ নেই? মোদি মূলত ২০১৪ সালের আগে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময়ই চীনা সখ্যতা, চীনা অবকাঠামো ঋণের পথ খুলেছিলেন। আর সেটাই তিনি প্রধানমন্ত্রী হবার পরে বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। কাজেই চীনা অবকাঠামো ঋণ  অবশ্যই আছে; মোদির প্রথম পাঁচ বছরে এ সখ্যতা ছিল ঘোরতর। ভারতের রেলওয়ে আধুনিকায়ন (স্টাফ ট্রেনিংসহ), এছাড়া ভারতের অন্তত পাঁচটা শহর আধুনিক অবকাঠামো নতুন করে গড়ে দেয়াসহ আরো অনেক অবকাঠামো প্রকল্প সেখানে নেয়া ছিল। কিন্তু বিআরআই বিরোধিতার পর থেকে ভারতে চীনা ঋণ বিষয়ে সব পাবলিক ইনফরমেশন সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তবে এখানের জন্য সার কথা হল, চীনা ঋণ মানে বিআরআই নয়। যেমন বাংলাদেশের বেশির ভাগ লোন বরং নন-বিআরআই।  যদিও কোনো নন-বিআরআই লোন পরে বিআরআই হিসেবে উভয়পক্ষ মেনে নিয়েছে এমনও হয়েছে। আবার পদ্মা সেতুকে বিআরআই বলে দেখাতে রাজি হননি হাসিনা।
    আবার যদি আরেকটু আগাই তবে  চার দেশীয় চীনের কুনমিং-বার্মা-(কক্সবাজার) ঢাকা-কলকাতা [BCIM] যে রেলপথ পরিকল্পনা ছিল সেটা এখন সেভাবে নাই, পরিত্যক্ত। এর বদলে সেটা এখন কুনমিং-বার্মা-(কক্সবাজার) ঢাকা বলে কাজ চলছে। তাতে ভারত সরে গেছে মানে ঢাকা-কলকাতা পদ্মার রেলপথ হলে সেটা দিয়ে কানেক্ট করার কথা ছিল; তা আবার আলাদাভাবে শুধু ঢাকা-কলকাতা হয়ে আছে। ফলে চার দেশীয় ঐ প্রকল্প ছিল সত্যিকার বিআরআই। কারণ কোন প্রকল্পকে BRI বলার প্রধান নির্ণায়ক হল যে মূল বিআরআই এর সাথে তা যুক্ত হবে কীনা!!  যেকোনো অবকাঠামো যা ইউরোপ থেকে সেন্ট্রাল এশিয়া হয়ে চীন হয়ে (সাথে অবশ্য সমুদ্রপথে আফ্রিকা যুক্ত) এরপর এশিয়ায় ছড়িয়ে বিভিন্ন দেশে – এটা হল সেই মূল বিআরআই। এমন মূল বিআরআইয়ে যুক্ত নয় তেমন চীনা প্রকল্পও বাংলাদেশে অনেক আছে। কাজেই সাধারণভাবে চীনা ঋণ না বলে সব ঋণ কে বিআরআই বলার মানে হল যেটা  একমাত্র ভারতই যার সুনির্দিষ্ট করে বিরোধিতা করে!

    কেন এসময়ে ভারতের বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগান্ডাঃ
    আগে যেমনই হোক, গত প্রায় দুই মাস ধরে ভারত বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগান্ডা  বাড়িয়েছে। এর প্রধান দুটা কারণ মনে করা হয়। প্রথমটা হল, গত এক দেড় বছর ধরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে বেশি; এটা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের ডাটা থেকে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এই ফিগার নিয়ে ভারতে মোদিবিরোধীরা মোদির অর্থনীতি খারাপ চলছে, ফেল করেছে এর প্রমাণ বলে পাবলিক পর্যায়ের সমালোচনা তুলে ধরে এসেছে। সেটা ভোটে প্রভাব ফেলেছে বা আরো ফেলবে বলে মোদির আশঙ্কা। কিন্তু এখন বাংলাদেশ ডলার সঙ্কটে বা আইএমএফের কাছে হাত পেতেছে – এ তথ্য ব্যবহার করে ও ব্যাপক প্রচার করে মোদি তার অভ্যন্তরীণ ভোট-কাটা বিরোধীদের সোজা বা শায়েস্তা করতে চান, এ কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট নিয়ে ভারত ব্যাপক প্রপাগান্ডা করে তুলে ধরছে।

    দ্বিতীয় কারণটাও ভারত এর সাথে যুক্ত করেছে। সেটা হল, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণ হল চীনা ঋণ – এই কথাটা মিথ্যা হলেও ভারতের খায়েস – মিথ্যা প্রপাগান্ডা দিয়ে এটা ছেয়ে ফেলা যাতে ভারত তার চীনবিরোধী প্রচারের সব কাজ সেরে ফেলতে পারে।

                                   Chinese naval Hi-tech Tracking Ship Yuan Wang 5 docking at Sri Lanka’s Hambantota Port

    এদিকে আমাদের সরকারের এখনকার চাওয়া হল, আমেরিকান অবরোধের চাপের সাথে সে এখন ডলার-অর্থনীতির সঙ্কটে পড়েছে, এখানে ভারত তাকে সহায়তা করুক। চাইছে গত ২০১৩-১৪ সালের মত, বাংলাদেশের ওপর আমেরিকান চাপ ভারত সামলে দিক। কিন্তু কঠিন বাস্তবতাটা হল, ভারত আর আমেরিকা বা বাইডেনের সম্পর্ক আর সেখানেই নাই; ভারত আর সেই প্রিয়পাত্র নাই। আসলে আমেরিকা আর ভারত, এদের উভয়ের স্বার্থ উভয়ের মৌলিক বিরোধী হয়ে দেখা দেয়া শুরু হয়ে গেছে। যদিও তাই বলে এখনই সম্পর্কচ্যুতির ঘোষণা দিলে তা আরো ক্ষতিকর হবে, তাই এটা রুটিন সম্পর্ক করে ফেলে রাখা হয়েছে; যদিও এখনকার পরিস্থিতিটা এমন যেমন,  মূল ফ্যাক্টর ভারত যতই রাশিয়ার সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে যাবে তত দ্রুত ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক সব ভেঙে পড়বে। যেমন সর্বশেষ উদাহরণটাই দেয়া যাক। গতকাল রয়টার্সের নিউজ হল – ভারত রাশিয়ার অশোধিত তেল গোপনে এনে শোধন করে অন্যদেশকে সরবরাহ করছে – U.S. says India hid Russian origin of fuel shipped to U.S.,] এতে স্বভাবতই বাইডেন ক্ষুব্ধ।
    কাজেই এঅবস্থায় আমাদের সরকারের আকাঙ্খা মোতাবেক ২০১৩-১৪ সালের সুখস্মৃতিতে ফিরে যাওয়া অসম্ভব। কিন্তু সব জেনেও এবাস্তবতা মানতে সরকারের মন সায় দেয় না। বিশেষ করে তার ভয়, সে একেবারে একা হয়ে যাচ্ছে। তাই বারবার হাত বাড়ায় আর একটা করে ভারতের ঝাপ্টা খাচ্ছে।
    বাংলাদেশ সরকারের এ’আকাঙ্খা ন্যূনতম কোন বাস্তব রূপ দিতে ভারত অক্ষম বটে কিন্তু তাতে কী বাংলাদেশকে লুটে খাওয়া, অপব্যবহার করা এটা এখন ভারতের একটা বড় সুযোগ ও কাজে দাঁড়িয়ে গেছে।

    তাহলে অপর কাজটা কী?
    পুরানা কাহিনী হল,  চীন-আমেরিকার সম্পর্ক ২০১০ সালের পর থেকে প্রথম তিতা হতে শুরু করেছিল। অন্যভাবে বললে, প্রেসিডেন্ট ওবামা যতই এটা টের পাচ্ছিলেন, ততই বেশি করে চীনকে – বাণিজ্যিক সুবিধায় ছাড় দিতে হবে – ওবামার এদাবিকে জায়গা করে দিয়ে চীন আমেরিকাকে ম্যানেজ করছিল। কিন্তু এটাও অকার্যকর হতে শুরু করে পরে স্পষ্টত ট্রাম্পের দ্বিতীয় বছর থেকে। তবু চীন যেটা মেইন্টেন করে গেছে তা হল – সে দ্বিপাক্ষিক ডায়লগের রাস্তা শক্ত মনোযোগে খোলা রেখে চলতে পেরেছিল। কিন্তু চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে স্পীকার পেলোসির তাইওয়ান উত্তেজনা সব ওলট-পালট করে দিয়েছে। তাতে চীন এখন বাইডেনের ওপর এত ক্ষুব্ধ যে, পাবলিকের ভাষায় বললে, চীন আমেরিকার ফোন ধরছে না। মানে সোভিয়েত ইউনিয়ন-আমেরিকাও, সেকালে কখনো দু’পক্ষ এমন ফোনের নাগালের বাইরে থাকেনি। কারণ এমন বাইরে থাকা মানে তাতে অনিচ্ছাতে বড় সামরিক সঙ্ঘাত যেকোনো সময় টার্ন নিতে পারে, যখন দু’পক্ষের হাতেই কঠিন মারণাস্ত্র মজুদ!

    এদিকে এ’পরিস্থিতিতে চীনের একটা হাই-টেক ট্র্যাকিং জাহাজ হাম্বানটোটা বন্দরের দিকে আগাচ্ছিল বন্দর থেকে রিফুয়েলিং ইত্যাদি রুটিন সুবিধা গ্রহণের জন্য। এটা অসামরিক গবেষণা মনিটরিং-এর  এক হাইটেক জাহাজ নাম “ইউয়ান ওয়াং ৫“। রয়টার্স লিখেছে, ” Foreign security analysts describe the Yuan Wang 5 as one of China’s latest generation space-tracking ships, used to monitor satellite, rocket and intercontinental ballistic missile launches.”
    কিন্তু চীন নিয়ে মানসিকভাবে ম্যানিয়াক ভারত তবু এটা নিয়ে হাইপ বা হৈচৈ তুলবেই। তাই ভারত ততই আমেরিকার মনোযোগ আকর্ষণে যেন এনিয়ে তীব্র আপত্তি হইচই ভারতের অভ্যন্তরীণ মিডিয়ায় তুলেছিল; যদিও ভারতের শেষ লক্ষ্য এসবের কোন কিছু নয়।  আসলে শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সঙ্কটে ভারত নিজের ক্ষুদ্র সক্ষমতার ব্যবহার করে (নগদ বৈদেশিক মুদ্রায় লোন দেয়া নয়); তবে ভারতের ভেতরের বাজার থেকে যা যা রুপিতে কেনা যায় এমন প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার মূল্যের চাল-গম ধরনের খাদ্য আর তেল-গ্যাস জ্বালানি ইত্যাদি লোন হিসেবে শ্রীলঙ্কাকে পাঠিয়েছিল। এখন শ্রীলঙ্কায় আপাতত ভারত বা ভারতের সাথে চীনের কোন প্রতিদ্বন্দ্বিমূলক এন্ট্রি নেই; বরং আমেরিকা একা মাতবরি করছে আর সেই খুশিতে ভারত মেটেরিয়াল লোন-সহায়তা নিয়ে এগিয়েছিল। কিন্তু রনিল বিক্রমাসিং নয়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে গেলে ভারতের ভাগে অন্তত সাহায্য-সমতুল্য কর্তৃত্ব-প্রভাব কোন কিছুই আসেনি। কিন্তু এ্টা ভারত আশা করছে। সেই  মনোযোগ আকর্ষণের জন্য আমেরিকার চেয়েও উচ্চৈঃস্বরে চীনা জাহাজের এসফরের বিরোধিতা ও আপত্তি দায়ের করেছিল শ্রীলঙ্কার কাছে। কিন্তু আমেরিকা ভারতের সাথে মিলে শ্রীলঙ্কার সাথে দেনদরবার কিছু করতে যায় নাই। যা করেছে একাই।  ফলাফলে গতকাল সকালেও ভারতের মিডিয়া ভারত কত শক্তিশালী আর চীন কত দুর্বিনীত তার ঢাক পিটাচ্ছিল যেন, ভারত চীনকে ঠেকিয়ে দিয়েছে আর পারলে সে চীনা জাহাজ আর বন্দরের মাঝে ভারতীয়-নৌবাহিনী দাঁড় করিয়ে চীনকে ভাগিয়ে দেয়।
    আসলে এনিয়ে গত তিন দিন ধরে ভারতীয় মিডিয়ায় মোদি সরকারের চীনবিরোধী ‘দেশপ্রেম’ আর দেশের কত স্বার্থসচেতন তারা এরই মহিমা প্রদর্শিত হচ্ছিল। এজন্য এর সাথে মিলিয়ে, বাংলাদেশের মন্ত্রীকে ব্যবহার করে “চীন কত খারাপ” এটা তুলে ধরাটা এক বিরাট প্রপাগান্ডা মিডিয়া উচ্ছাস ঘটিয়েছিল।

    কিন্তু হায়! ভারতের এক পত্রিকা WIRE গত ১২ আগষ্ট সন্ধ্যায় ভারতের সব উত্তেজনায় ঠান্ডা পানি ঢেলে লিখেছে, শ্রীলঙ্কা সরকার চীন জাহাজকে বন্দরে ভিড়তে অনুমতি দিয়েছে। কারণ, চীন ও আমেরিকার এ বিরোধিতা কেন তারা করছে এর সপক্ষে  যুক্তিগ্রাহ্য যথেষ্ট কারণ তারা দেখাতে পারেনি। আসলে এই ঘটনায় শ্রীলঙ্কা দেখিয়ে দিল এখনও সে ভাত-আমেরিকার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম!!!

    সাংবাদিক না দেশপ্রেমিক, কেবল একটাই বেছে নিতে হবেঃ
    এটা এক তত্বকথার ‘হেদায়েত’ বাণী! কী হতে চান, সাংবাদিক না দেশপ্রেমিক? তার মানে হল যেকোন একটা নিতে হবে। দুটোই এক সাথে হওয়া যাবে না। হ্যাঁ, ঠিক তাই। কিন্তু জাতিরাষ্ট্রবাদী উগ্র দেশপ্রেমিকরা হিন্দুত্ববাদীদের মতই ব্যাপারটা বুঝতে নারাজ। আসুন,  তা নিয়ে আলাপ করি। সাংবাদিকতার প্রথম শর্ত হল, ফ্যাক্টস। এতা ফ্যাক্টস বেসজড হতে হবে! একেবারে অবিকৃত বা এদিক-সেদিক মানে করা নয় বা ইঙ্গিত করে বলিয়েছেন, ফেবার করেছেন ইত্যাদি, এমন করা যাবে না। ফ্যাক্টের ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করতে হবে।

    এখন এভাবে চললে এর অনেক কিছু আপনার দেশের স্বার্থের বিপক্ষে যেতেও পারে। তবু, বাস্তব-সত্য তো সত্যই তা ময়ানতেই হবে। এখন তাহলে আপনি কী চান? যদি সাংবাদিকতা চান তাহলে দেশপ্রেম প্রদর্শন তা হোক না-হোক তা পাশে ফেলে রেখে আপনাকে সাংবাদিকতা বা সাংবাদিক স্বার্থকে উপরে তুলে ধরতে হবে। জার্নালিজমকে ফাংশন করতে দিতেই হবে।
    কিন্তু ভারতীয় বর্ষীয়ান সম্পাদক শেখর গুপ্তা সাংবাদিকের আগে দেশপ্রেমিক হতে চান। তাই বাংলাদেশের এই মন্ত্রী-উপাখ্যান নিয়ে ভারতের  তার নির্মিত ভিডিও ক্লিপে তিনি কড়া দেশপ্রেমিক সেজেছেন। অথচ ভারতের পাঁচজন সিনিয়র সাংবাদিকের নাম নিলে তিনি নিজে একজন হবেন। এই হল, ভারতের সাংবাদিক দুর্দশা! সাংবাদিকতাকে চিপায় ফেলে দেশপ্রেমিকের মিথ্যা প্রপাগান্ডায় নেমেছেন তিনি! দেখুন তার ইউটিউব! 

    তিনি শেখর গুপ্তা এখানে দুইটা বড় মিথ্যা বলেছেনঃ
    এক। হাম্বানটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর নিয়ে, এর নির্মাণ ব্যয় নিয়ে এখন শ্রীলঙ্কা সরকারের উপর এই পয়সাও ঋণের বোঝা নাই। কারণ, চীনা সরকারি ঋণের অর্থে এটা নির্মাণের পরেই শ্রীলঙ্কায় এক প্রো-ইন্ডিয়ান সরকার এসেছিল।  তারা দাবি করতে থাকে যে সরকারের পক্ষে এর ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। এটাই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে চীনা সরকারকে জানায়। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাড়ায় এমন যেন চীনক্বে এখন শ্রীলঙ্কাকে দেয়া ঋণ ফেরত নিয়ে নিতে হবে। ফলে দুপক্ষের আলাপ-আলোচনায় এটা সাব্যস্ত হয় যে তাহলে চীনা সরকার এক প্রাইভেট চীনা কোম্পানী যোগাড় করে দিবে যে নির্মিত হাম্বানটোটা বন্দর কিনে নিবে আর এই বন্দরের আয় থেকে নিজের এই বিনিয়োগ ধীরে ধীরে তুলে নিবে। এটা সাব্যাস্তের পরে নতুন বিতর্ক উঠে বন্দরের কতভাগের মালিক হবে নয়া ক্রেতা। যেহেতু সব প্রকল্পেই অন্তত প্রকল্পের জায়গা-জমি দেয়া বা যাদেরকে সরিয়ে ঐ জায়গায় বন্দর নির্মাণ হয়েছে তাদের পুণর্বাসন ইত্যাদিতে সরকার খরচ করে বলে যেকোন বড় প্রকল্পের ৩০% এর শেয়ার মালিকানা সরকারের হয়-ই। তাই ঐ চীনা প্রাইভেট কোম্পানির শেয়ার মালিকানা এখন প্রকল্পমূল্যের ৭০%।  আর ঠিক একারণের শ্রীলঙ্কা সরকার  হাম্বানটোটা বন্দরের মালিকও নয়, এনিয়ে কোন চীনা ঋণপরিশোধের দায়ও সরকারের নাই। অর্থাৎ শ্রীলঙ্কা সরকার অর্থনীতি ফেল করার পিছনে হাম্বানটোটা বন্দরের কোন ভুমিকাই নাই। অথচ শেখরগুপ্তা হাম্বানটোটা বন্দর নিয়ে চীনবিরোধী মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালিয়েই যাচ্ছে।
    দুইঃ অন্যান্য চীনা ঋণ শ্রীলঙ্কাকে গছিয়ে দেওয়ার ভারেই ওদেশের অর্থনীতি ঢুবে গেছে?
    এটাও শতভাগ মিথ্যা।  এনিয়ে আমার আগের  ১৬ মে ২০২২ তারিখে লেখা শ্রীলঙ্কার দুঃখের নাম ‘ডলার সভরেন  বন্ড’ এখানে বিস্তারিত আছে। শেখর গুপ্তা দাবি করছেন চীনা ঋণই শ্রীলঙ্কার অর্থনঈতি ফেল করার কারণ। অথচ তিনি ফ্যাক্টস অনুসরণ করতে রাজি না। ্তিনি শ্রীলঙ্কা সরকারের দেয়া কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠানের কাছে কত ঋণ এই ফ্যাক্টস শীট অনুসরণ করে কথা বলতে চান না। সেটাই নিচে আবার তুলে এনেছি।

    এখানে শ্রীলঙ্কার সরকারের দেয়া তথ্য মতে, দেখা যাচ্ছে তাদের নেয়া মোট বিদেশি ঋণের মাত্র ১০% হল চীনা লোন। এজন্য যদি চীনকে দায়ী করা হয় তাহলে শ্রীলঙ্কায় জাপানের ঋণও ১০%, বিশ্বব্যাংকের আরেকটু কম ৯% এছাড়া এডিবিও আরেকটু বেশি ১৩% – এদের সকলকেও দায়ী করতে হয় সমানে!!!। কিন্তু তা না করে কেবল চীনকে দায়ী করা মিথ্যা ও খারাপ উদ্দেশ্যমূলক অবশ্যই, সেটাই শেখর গুপ্তা ও ভারত করে চলেছে।
    আর বাস্তবে শ্রীলঙ্কার দুর্দশা বা ডিফল্ট হবার মূল কারণ, নেয়া মোট ঋণের ৪৭%, এক বিশেষ ঋণ। যেটাকে বলে সভরেন ঋণ [Sovereign loan ] যার মানে হল শ্রীলঙ্কা সরকারের ডলার বন্ড বাজারে ছেড়ে বিদেশ (যারা মূলত ব্যক্তি বিনিয়োগকারি) থেকে ডলার সংগ্রহ করেছিল। [সভরেন লোন মানে সরাসরি রাষ্ট্রকেই বন্ধক রেখে ডলার বন্ড ছেড়ে নেয়া লোন।] আমাদের মত দেশের কিছু অতিচালাক নেতা-মন্ত্রীর কাছে এভাবে ডলার বন্ড ছেড়ে ডলার সংগ্রহকে খুব লোভনীয় খুব আরাম ও মজার মনে হয়। কিন্তু তা সব সময়ই ভীষণ রিস্কি এদিকটা তারা ভুলে থাকতে চায়। কারণ এই ঋণ ফেরত দেওয়ার যে কিস্তি তা প্রায়ই সরকার সময়ে ফেরত দিতে পারে না ফলে ডিফল্টার হয়ে যায়। যা থেকে গ্লোবাল ঋণ-বাজারে বদনাম ছড়ায় ব্যাপকভাবে! আর এটাই হয়েছে শ্রীলঙ্কার বেলায়। আর শ্রীলঙ্কার সভরেন বন্ড ছেড়ে নেয়া ঋণ সবচেয়ে বেশি ৪৭%। আর একারণে শ্রীলঙ্কা ডিফল্টার হয়ে আইএমএফের কাছে সারেন্ডার করে লোন চাইতে গেছে। যা বাংলাদেশের বেলায়, সে এখনও কোন ডিফল্টার নয় তবে আইএমএফের কাছে আগেই সারেন্ডার করে লোন চেয়েছে। মন্ত্রী নিজেও তাঁর প্রতিবাদলিপিতে ঠিক এদিকটায় দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এদিকটা  অর্থাৎ শেখর গুপ্তা একজন মিথ্যা প্রপাগান্ডার লোক যিনি নিজেকে কোন সম্পাদকের দাবি দূরে থাকে তিনি নিজেকে কোন সাংবাদিকই দাবি করতে পারেন না।

    সবশেষের কথা হল, বাংলাদেশের আইএমএফের কাছে চাওয়া ঋণ পেলেও আমাদের আরো ঋণ লাগবে যার সম্ভাব্য দাতা এক চীন ছাড়া সরকার কারো কথা ভাবতে পারছে না। এমনকি আইএমএফ দেরি করলেও এ ঋণ প্রয়োজনীয় বেশি। কিন্তু এ ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সম্ভবত চীনের শর্ত হতে যাচ্ছে, যেসব চীনা প্রকল্প আগে ভারতের আপত্তিতে বাদ পড়েছে বা ঠেকিয়ে রাখা আছে – সেসব এবার আমাদের সরকারকে অনুমোদন দিতে হবে। ভারত সম্ভবত সে জন্য এমন আগ্রাসী! কিন্তু অক্ষম ডেস্পারেট! তাহলে, অর্থমন্ত্রী কী বুঝে এফটি-কে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন? যা তাঁকে আবার ফিরিয়ে নিতে হয়!!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা দৈনিক “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার ১৩ আগষ্ট ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে “অর্থমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার“ এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়। আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

    বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

    গৌতম দাস

    ০৬ মে ২০১৯, 0১:৩৬

    https://wp.me/p1sCvy-2zV

     

    The Second Belt and Road Forum for International Cooperation

    চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প, গত ২৫-২৭ এপ্রিল ছিল এবিষয়ে তাদের দ্বিতীয় সম্মেলন বা সামিট। যার পুরা আনুষ্ঠানিক নাম হল “The Second Belt and Road Forum for International Cooperation”, সংক্ষেপে বিআরএফ [BRF]। গত ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সামিটের মত এবারও এটা বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বলা হয়, বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আইডিয়া চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালের অক্টোবরে কাজাখাস্তানের এক সম্মেলন থেকেই প্রথম হাজির করেছিলেন। সেই থেকে ধরলে গত ছয় বছরে এই মহা প্রকল্পের মুখ্যনাম এক-দু’টা থাকেনি, কয়েকটা হাজির হয়েছে। ঠিক যেমন চলতি এই দ্বিতীয় সম্মেলনে এর নাম দেয়া হয়েছে “বেল্ট ও রোড ফোরাম” বা বিআরএফ। প্রথম সামিটে যেখানে নাম ছিল “বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ” বা বিআরআই।

    ২০১৭ সালে এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলনকে ডাকা হয়েছিল “বেল্ট রোড সামিট” বলে। সম্ভবত বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে প্রথম সম্মেলন ছিল সেটি, সেদিকটা মুখ্য করতে। ওদিকে জন্মের শুরুতে এর নাম ছিল সিল্ক রোড প্রকল্প, সিল্ক রুট প্রকল্প, ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইত্যাদি অনেক কিছু।
    আসলে প্রকল্পের আইডিয়া ও এর বাস্তবায়নের বিষয়টা ছিল খুবই ব্যাপক, যে কারণে এটাকে শুধু প্রকল্প না বলে মহাপ্রকল্প লিখছি। আর এর চেয়ে বড় ব্যাপার হল, বিষয়টার বহু কিছুই ইভলভিং [evolving] বা ফুলের পাপড়ি খোলার মত বীজ আইডিয়াটা ক্রমান্বয়ে বাস্তব ও স্পষ্ট হয়েছে। কাজেই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পে নতুন নতুন মুখ্যনাম বলাতে বিষয়টা একেক সময় একেকটা, এমন অবশ্যই নয়। বরং বলা যায় একই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আনফোল্ডিং [unfolding] মানে ক্রমেই ভাঁজ খুলে নিজেকে পূর্ণ আর স্পষ্ট অবয়বে হাজির করা হয়েছে। আর সেই সাথে অবশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে ক্রমেই নেগোসিয়েশনে বা পরস্পরের সুবিধা-অসুবিধাগুলো আমলে নিয়ে নতুন বোঝাপড়ায় যাওয়া – আর সেই ভিত্তিতে এসবের চুক্তি সম্পন্ন করা। “ক্রমেই ভাঁজ খোলা” বলতে আমরা এটাও বুঝতে পারি।

    দুনিয়ায় খুব সম্ভবত এটাই এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ এক অবকাঠামো প্রকল্প, যা কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের। জাতিসঙ্ঘের ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৭০-এর বেশি রাষ্ট্র এই প্রকল্পের অংশ হয়ে গেছে বা আনুষ্ঠানিক যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে। আর প্রাথমিক আগ্রহ জানিয়ে সম্মেলনে যোগ দিয়েছে মোট ১২৯ রাষ্ট্র। অপর দিকে ওই ৭০ রাষ্ট্র, যারা যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে, এদের বড় অংশই হল এশিয়ান বড় বা উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো, এছাড়া ইদানীং ইউরোপীয় রাষ্ট্রের যোগদান বাড়ছে। তবে এখানে এশিয়া বলতে তা মধ্য-এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ – এভাবে বুঝতে হবে, যেখানে এশিয়া ও ইউরোপ সড়ক ও রেল পথে সংযুক্ত হচ্ছে এই মধ্য এশিয়াকে মাঝখানে রেখে।
    এই মহাপ্রকল্পের সাথে আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় এমন ২৯ টা সংগঠনও জড়িয়ে আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ হল জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তোনিও গুতারেস [António Guterres] আর আইএমএফ-এর প্রধান ক্রিশ্চিয়ানা ল্যাগার্দে [Christine Lagarde] যারা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

    এই পর্যন্ত এই মহাপ্রকল্পে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হিসাবে ৯০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়ে গেছে, যা বছরে ৫.২% করে বেড়ে এমন হয়েছে। এছাড়া BRI এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোও একই সময়ে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এদিকে চীনের সাথে BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এখনই বাণিজ্য বাজার কেমন তা নিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, এটা ইতোমধ্যেই ৬ ট্রিলিয়ন ডলার পার হয়ে গেছে আর তা বছরে ৪% হারে বাড়ছে। এমন BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলো সব মিলিয়ে এদের সাথে চীনের বাণিজ্য, এখনই চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ২৭.৪% । অর্থাৎ এটা হেলাফেলা ফিগার হবার কথা নয়। আর বলাই বাহুল্য এই মহাপ্রকল্প যত সম্পন্ন হতে থাকবে এটাই চীনের প্রধান বৈদেশিক বাণিজ্যের রুটখাত হতে থাকবে।

    সম্মেলনে যোগ দেয়া রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কতজন? ২০১৭ সালের প্রথম সম্মেলনে সে সংখ্যাটি ছিল ২৯, আর এবার ২০১৯ সালে দ্বিতীয় সম্মেলনে তা আট বেড়ে হয়েছে ৩৭ জন। মানে এই ৩৭ রাষ্ট্র বাদে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো রাষ্ট্রপ্রধান নয় তবে, মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। আবার ইইউর সদস্য এমন রাষ্ট্রপ্রধান যারা এখানে উপস্থিত হয়েছে, এমন রাষ্ট্র ছিল অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল। ওদিকে কেবল পুর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া থেকেই যোগ দেয়া রাষ্ট্রপ্রধান ছিল প্রায় ১১ জন। এদের মধ্যে ছিলেন, যেমন পাকিস্তানের ইমরান খান, মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ, নেপালের রাষ্ট্রপতি ভান্ডারি অন্যতম। এছাড়া পুর্ব এশিয়ার এবারই প্রথম রাষ্ট্র বা সরকারের যেসব প্রধান যোগ দিয়েছে, এমন দুই রাষ্ট্র হল সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড। এতে ১০ সদস্যের আসিয়ান রাষ্ট্র জোটের প্রায় সবাই এবার যোগ দেন। বিশেষ করে থাইল্যান্ড খুবই উল্লেখযোগ্য।

    বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পকে বুঝবার সময় এখানে একটা কথা খেয়াল রাখতে হবেঃ সোভিয়েত যুগের মানে, কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫৩-৯১) চিন্তার অভ্যাসে আমাদের মনে গেঁথে থাকা কিছু ধারণা দিয়ে চিন্তা করলে আমাদের মনে হতে পারে যে, যেখানে নতুন গ্লোবাল নেতা চীনা সেখানে আমেরিকা বা তার জোটের কেউ যোগ দিবেই না। ঠিক যেমন সেকালে সোভিয়েত ব্লকের কোর রাষ্ট্রগুলা আমেরিকা ব্লকের রাষ্ট্রের সাথে কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লেনদেন-বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, ঠিক তেমনই একালেও বোধহয় ঘটনাগুলো সে রকম। এমন ধারণা মাথা থেকে ফেলে দিতে হবে। কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তি ও ব্লক ব্যবস্থা ১৯৯১ সালে ভেঙ্গে যাবার পর থেকে একালের দুনিয়া সেকালের সাথে পুরাটাই অমিল, তাই বরং মিল খুঁজতে যাওয়াটাই ভুল হবে।  যেমন একালের চীন-ভারত – এদের স্বার্থবিরোধের শেষ নেই, অথচ তাদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিশাল; এখনই তা ৮০ বিলিয়ন ডলারের, যা ১০০ বিলিয়নের পথে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। আবার খোদ চীন-আমেরিকা গত আশির দশকে তাদের সম্পর্কের শুরু থেকেই ব্যাপক ঘনিষ্টভাবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পণ্য ও বাজারে ব্যাপক লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক করে গেছে। কেবল একালেই তারা বাণিজ্যঝগড়ায় হাজির হয়েছে, যা আবার নিরসন মীমাংসারও চেষ্টা চলছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও চীনে আমেরিকান বিনিয়োগ আগের মতোই চলছে, বাণিজ্যও চলছে এবং তা আকারে এখনও বিপুল যদিও তা চলছে বাধা পেয়ে পেয়ে। এমনকি গত ২০১৭ সালের BRI সম্মেলনে আমেরিকার এক আমলা প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিল। আর যদিও এবারো এমনভাবেই যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল কিন্তু শেষে কোন কারণে আমেরিকার প্রতিনিধি আসে নাই।
    তাহলে এক কথায়, একালের মূল বৈশিষ্ট খেয়াল করতে হবে; তা হল, বাণিজ্যিক লেনদেনের সবসম্পর্ক রেখেই একই সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রস্বার্থ ইস্যু নিয়েও ঝগড়া চালাবে তারা। এখানে সেকালের মত “ও পুঁজিবাদি, আমি নই”- তাই কোন সম্পর্ক নাই – এসব নাই। আসলে এভাবে মতাদর্শের কথা তুলে এরই আড়ালে উভয় জোটের সদস্য  রাষ্ট্রগুলো রাশিয়া অথবা আমেরিকার ধামাধরা হত – এমন বাস্তবতাই আর নাই। ফলে তেমন কোন ভিত্তি একালে নেই। বরং ব্যাপারটা অনেকটা, বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক রেখেই যেমন সন্তানেরা অনেকসময় আরো বেশি সুবিধা পাওয়ার জন্য ঝগড়া করে, রাগ দেখায় বা উল্টাপাল্টা কিছু করে বসে, অনেকটা তেমনই। অর্থাৎ মূল কথা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পরের নতুন পরিস্থিতিতে এবার সম্পর্কের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ হল – এবার সব রাষ্ট্রই একমাত্র এবং একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এবং এরই অংশ হয়ে থেকে গেছে। আর এতে রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের পণ্য, পুঁজি, বিনিয়োগ, বাজার ইত্যাদি বিনিময়ে জড়িয়ে এক গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময়ের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু একই সাথে তারা নিজের যার যার স্বার্থের জন্যও লড়ে যাচ্ছে। আবার ক্যাপিটালিজমের বদ খাসলতগুলোর এখন তাহলে কী হয়েছে? এছাড়া সেগুলা কি মিথ্যা ছিল? অবশ্যই নয়। কিন্তু সেসব বদ-খাসলত এখনও বর্তমান হলেও ওর বিরুদ্ধে লড়ার আঙ্গিক, পাটাতন, কায়দা ইত্যাদি সবই এখন বদলে গেছে। তাই লড়াইও চলছে ও চলবেই; এমনকি জোট হয়ে বা আলাদাভাবে লড়ার ধরণ বদল হলেও। তাহলে এই পরিপ্রেক্ষিতে এবারের বিআরএফের বৈশিষ্ট্য ও অর্জন কী?

    কথিত ঋণফাঁদ আর গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডঃ
    এই সম্মেলনেও এবার এ’দু’টিই মুখ্য ইস্যু হয়েছে। কারণ, শি জিনপিং তাঁর মূলবক্তব্যে নিজেই সোজা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর এছাড়া সম্মলনের শেষ দিনে প্রকাশিত ৩৮ পয়েন্টের যৌথ ঘোষণা [Joint Communique ] থেকেও এই সম্মেলন এ’দুই ইস্যুকে এবার মুখ্য বিষয় করা হয়েছে। চীনা সরকারি মিডিয়া CGTN-এর ভাষায় বললে, এই মহা প্রকল্প নিয়ে চীনের কৌশলগত উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে পশ্চিমারা সন্দেহ সৃষ্টি করেছে, প্রেসিডেন্ট শি সেগুলোরই জবাব দিয়েছেন, যাতে সন্দেহ দূর হয়। [President Xi also responded to Western skepticism about China’s “strategic intentions” behind the landmark initiative. ]  এছাড়া হংকংয়ের SCMP লিখেছে, একটা সুক্ষ-কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। প্রেসিডেন্ট শি চীনের নেয়া প্রকল্পগুলোতে টেকসই ঋণ, পরিবেশ রক্ষা আর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা- এ দিকগুলো নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। [In a subtle shift …, Xi’s pledges over the past two days on debt sustainability, environmental protection and corruption control show Beijing is trying to expand its policy by paying heed to international concerns, according to analysts. এ থেকেই মনে হচ্ছে, তিনি পশ্চিমা সমালোচনা, প্রপাগান্ডা ও উদ্বেগগুলোর দিকে মনোযোগী হতে চাচ্ছেন।

    হংকং-ভিত্তিক ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ পত্রিকা কিছু এক্সপার্টকে উদ্ধৃত করে আমাদেরকে জানাচ্ছে, তারা মনে করেন, শি-এর এবারের বক্তব্য ছিল খুবই আপসমূলক টোনে। আর খুব সম্ভবত তা আমেরিকা, ভারত, জাপান আর ওদিকে জার্মানি ও ফ্রান্সের কথা মাথায় রেখে করেছেন। [The president’s conciliatory tone during the second Belt and Road Forum in Beijing was apparently aimed at critics in the United States, India, Japan and major European powers such as Germany and France.]

    এদিকে বেল্ট-রোড প্রকল্প চীনের একটা “ঋণের ফাঁদে” ফেলার বুদ্ধি, অথবা “ঋণফাঁদের ডিপলোম্যাসি” বলে প্রো-আমেরিকান গবেষক বা একাদেমিকেরা প্রচার প্রপাগান্ডা চালালেও  এক জর্মান থিঙ্কট্যাংক গবেষক, Lucrezia Poggetti, খাড়া কথাটাই বলেছেন এভাবে, “চীনের এমন অবকাঠামো ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার প্রতি বিভিন্ন দেশের নিঃসন্দেহে আগ্রহ বাড়ছে। একই সাথে এতে নেয়া প্রকল্পগুলাতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও মানদন্ড বজায় থাকার প্রতি আকাঙ্খাও প্রবল হচ্ছে”। […a research associate at the Mercator Institute for China Studies in Berlin, said that while interest in China’s infrastructure and investment plan was undoubtedly growing, there was an equal desire for the projects it encompassed to abide by international rules and standards.]

    ব্যাপারটা হল, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অবস্থায় আমরা এখনো আছি। এটাই ডমিনেটিং। আর এতে  তৈরি হওয়া এতদিনের নানান স্ট্যান্ডার্ড  বা মানদন্ডও অবশ্যই তৈরি হয়েছে এবং বহাল আছে। যদিও তা “চরম ভালো মানের বা আদর্শের” এ কথা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। এখন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব ব্যাপারে চীনের এত দিনের অবস্থান ছিল এ রকম – যেন চীন নিজেই একটা স্ট্যান্ডার্ড আর দুনিয়ায় যে স্ট্যান্ডার্ড চালু আছে, তা পশ্চিমা। যেন সে জন্য এটা খারাপ। কিন্তু আসল কথা হল, এ’পর্যন্ত দুনিয়ায় যা কিছু স্ট্যান্ডার্ড বা মানদন্ড, তা নিঃসন্দেহে আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়াতেই হয়েছে ও আছে। আর তা একেবারে চরম মানসম্পন্ন বা আদর্শ- ব্যাপারটা এমন তো নয়, বরং এর খামতির শেষ নেই, তা-ও হয়ত বলা যাবে। কিন্তু এর কোনো মানদণ্ড নেই- এমন ধারণা করা মানে, নিজেকেই ফাঁকি দেয়া হবে। তাই সারকথাটা হল, মানবাধিকারসহ সব বিষয়ে চীন নতুন নেতা হিসেবে নিজের মানদণ্ড বলে কিছু দেখাতে চাইলে তা করতে হবে পশ্চিমা মানদণ্ডকে শুরুর ভিত্তি ধরে। মানে, চীন এর চেয়ে আরো ভালো কী করতে পারে, সেটাই তাকে দেখাতে হবে। তাই বলাই বাহুল্য, এছাড়া চীনের সাবধান থাকাই ভাল যে, পশ্চিমা মানদণ্ডের নিচে সব কিছুই এখানে অগ্রহণযোগ্য হবে।

    বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ যতই থাক এরপরেও, আমাদের মত দেশে বিশ্বব্যাংক যেসব প্রকল্প নেয় তাতে সে বেশ কিছু মানদন্ড মেনে চলে। যেমন এর একটা হল, বিশ্বব্যাংকের নেয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্পে যে দেশই দাতা-পার্টনার থাকুক না কেন, খোলা প্রতিযোগিতার আন্তর্জাতিক টেন্ডারেই একমাত্র সাব্যস্ত হবে যে, কাজ কে পাবে। মানে, ঐ দাতা দেশকেই কাজ দিতে হবে- এমন কোনো শর্ত নেই। আমাদের যমুনা সেতু প্রকল্পে জাপান এক বড় ফান্ড-দাতা ছিল। অথচ পাঁচ আলাদা অংশের টেন্ডারে বিভক্ত ঐ প্রকল্পের কাজে জাপান একটাও পায় নাই বা জড়িত ছিল না। অথচ প্রায় সব চীনা প্রকল্পই এই মানদন্ডে অচল। চীনা-প্রকল্পের সাধারণ অভিমুখ হল, চীনারাষ্ট্র হয় দাতা, ঠিকাদার হবে চীনা কোম্পানি, আর তা হবে বিনা টেন্ডারে এবং গুরুত্বপূর্ণ হল, এক লোকাল এজেন্ট কোম্পানি থাকবেই, ব্যকডোরে যার মূল ভুমিকা বা কাজ হবে প্রকল্পগ্রহীতা দেশের প্রশাসনে ঘুষ-বন্দোবস্তের উপায় হিসাবে কাজ করা। তাই এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের জন্মের ৭৫ বছর পরে হাজির হয়ে, বিশ্বব্যাংকের মানদন্ডের চেয়ে নিচা-মানদন্ডে চীনা অবকাঠামো-প্রকল্প এভাবে চলতেই পারবে না। বেল্ট রোডসহ চীনা প্রকল্পগুলো এভাবে চলতে থাকলে এককথায়  চীনের ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার, সব ভেঙ্গেচুড়ে পড়বেই।

    এর বিপরীতে চীনারা হয়ত বলবে, আমরা  পশ্চিমাদের মত কোন দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করি না, পলিটিক্যাল স্বার্থ নাই বা স্টেক রাখি না। তাই কোন দেশে যদি দুর্নীতি থাকে (আমাদের মত দেশে যা অফুরন্ত ও ঘুষ খাবার জন্য ওঁত পেতে আছে) তবে ঐ দুর্নীতি উচ্ছেদ আমার কাজ নয়। সেকারণেই যে দেশ ঘুষ নিয়েই কাজ দেয়, তাকে আমরা ব্যাপক ঘুষ দেই, আর যে নেয় না তাকে সাধাসাধিও করি না। অতএব ঘুষ দিয়ে কাজ নেব কি না, সেটা চীন কখনও ঠিক করেনি।

    আসলে এটা দায় এড়ানোর দায়িত্বজ্ঞানহীন যুক্তি। কারণ, চীনা রাষ্ট্র কোন নৈতিকতাহীন বাণিজ্যিক কোম্পানি নয় যে যেকোন উপায়ে তাকে মুনাফা করতেই হবে। এ ছাড়া চীন দুনিয়ার (অন্তত) অর্থনৈতিক নেতা হতে খায়েস রাখে। কাজেই নৈতিকতা পালনের দায়, অথবা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার দায়পাল্পনের ঊর্ধ্বে থেকে চীন নেতা হতে পারে না। অথচ পশ্চিমা মানে, আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কোনো কোম্পানির বিদেশে ঘুষ দিয়ে কাজ নেয়া অপরাধ; যদিও এর প্রয়োগ খুবই কম তবে এর কিছুটা প্রয়োগ একালে দেখা যাচ্ছে ওয়ার অন টেররের ইস্যুতে মানিলন্ডারিং আইনের কারণে। আরও কথা আছে, এনিয়ে জাতিসংঘের কনভেনশন আছে। স্বাক্ষরকারি হিসাবে চীনের দায় আছে, ফলে সে দায়মুক্ত নয়। এই বাস্তবতা ও মানদণ্ডকে এড়িয়ে মানদন্ডে পিছনে পড়ে থেকে চীন কিভাবে নেতা হতে পারবে? আমাদের মতো দেশগুলোকে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত করে দিয়ে এর জন্য প্রধান দায়ী হয়েও চীন কোন নেতাগিরির আশা করে? আমেরিকার দোষত্রুটির শেষ নাই। কিন্তু আমেরিকা  গায়ে বাতাস লাগিয়ে  দুনিয়াকে “আমেরিকান সেঞ্চুরি” করে নিতে এমনি এমনি সক্ষম হয় নাই। কিছু অন্তত অবদান রাখতে হয়েছে। চলতে চালাতে গিয়ে সে বহু কিছুর মানদন্ড, আইন কনভেনশন বা প্রতিষ্ঠান গড়া ইত্যাদি এসব অনেক কিছুই তাকে করতেই হয়েছে। এগুলোকে আন্ডারএস্টিমেট করা, তুচ্ছ বা নজর আন্দাজ করা অবশ্যই চীনের অযোগ্যতা ও আত্মঘাতি হবে তা বলাই বাহুল্য। তাই এককথায় বললে, ব্যাপারটা পশ্চিমা-অপশ্চিমার ইস্যুই নয়।

    এটাও ঠিক, চীনের নেয়া বেশির ভাগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক স্বার্থই একমাত্র নয়, এর বাইরে চীনা রাষ্ট্রের একধরনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থও থাকে, যেটা অস্বাভাবিক নয়। যেমন গোয়াদর বন্দর বা  চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প। এর নামই বলছে, চীনের ল্যান্ডলকড হয়ে থাকা ও পিছিয়ে পড়া পশ্চিমা ভূখন্ডকে [জিনজিয়াংয়ের উইঘুর বাসিন্দারা এখানেরই] মুক্ত করার লক্ষ্যে গোয়াদর বন্দর পর্যন্ত প্রবেশ – করিডোর নেয়াই- চীনের স্ট্র্যাটেজিক উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সোজা কথায় প্রকল্পের সুবিধাভোগী একা পাকিস্তান নয়, চীনও। কাজেই ঋণচুক্তির দায় ও শর্তাবলিতে এর ছাপ অবশ্যই থাকতে হবে। যেমন চীনা ঋণ শোধ দেয়ার সময় সাধারণত ২০ বছর হতে দেখা যায়। সে তুলনায় বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল ঋণের সাধারণ মানদন্ড হল, তা ৪০ বছরের, যার প্রথম ১০ বছর আবার সুদবিহীন। চীনারাও করিডোর পাওয়া সুবিধাভোগী, তাই একা পাকিস্তানের অর্থনীতির ওপর এর বিপুল ঋণ শোধের দায় চাপানো অনৈতিক ও অবাস্তব অবান্তর। কাজেই এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রথম ২০ বছর সুদ-আসল পুরো কিস্তিবিহীন করা ইত্যাদি এমন অনেক কিছুই করতে পারতে হত। সারকথায়, একটা ‘অবজেকটিভ ফাইন্যান্সিয়াল এনালাইসিস’ করে [সেক্ষেত্রে দরকার হলে চীনের অ-বাণিজ্যিক কোন সামরিক বা অন্যকোন রাষ্ট্রস্বার্থ থাকলে এরও একটা অর্থনৈতিক মূল্য ধরে নিয়ে সে হিসাব করা সম্ভব] পাকিস্তান-চীন উভয়কেই দায় ভাগ করে নিতে হবে, সেটাই হত সবচেয়ে ন্যায্য। কিন্তু আমরা দেখছি, কিস্তি দেওয়া শুরু হবার আগে পাকিস্তান এখনই ধুঁকছে। এই করিডোর ঋণের কিস্তি যদিও এখনো শুরুই হয়নি, সম্ভবত ২০২২ সালের আগে শুরু হবে না; তখন পাকিস্তানের কী হবে?

    পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা দেখিয়ে এখনই আমেরিকা এবং আইএমএফ টিটকারি দিয়ে বেড়াচ্ছে। যা আমেরিকার অর্থনীতি ঢলে পড়া ঠেকানোর স্বার্থে চালানো প্রপাগান্ডাকেই সাহায্য করছে। এটা নিশ্চয়ই চীনের পক্ষে যাচ্ছে না। কাজেই, বাণিজ্যিকের সাথে স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের প্রকল্পও হতেই পারে। কিন্তু দায় ভাগাভাগির একটা মানদন্ডও অবশ্যই থাকতেই হবে। পাকিস্তানের শাসকেরা চোর ও লোভী বলে চীন এর সুবিধা নিয়ে নিজের ভাগ্য গুছাবে আর এভাবে দুনিয়ার নেতা হতে পারবে কী করে? এটা কোন বুঝ? বস্তুত কোনো প্রকল্পের অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি মানে প্রকল্প গ্রাহক রাষ্ট্রের অর্থনীতি কোন প্রকল্প-ঋণ শোধের যোগ্য বা সম্ভব হবে কি না, এর যাচাই চীন আদৌ করে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে এমন চিন্তা একালে অকল্পনীয়।

    কেন? চীন কেন এখানে উদাসীন থাকে? ‘পুঁজিবাদী’ ব্যাপার বলে? চীনের সাফাই কী, আমরা জানি না। অথচ এমন হওয়ার কারণে আইএমএফের প্রেসিডেন্ট মিস লাগার্দের নসিহত শুনতে হচ্ছে চীনকে যে, ‘প্রকল্প গ্রহণের আগে এর ভায়াবিলিটি’ যাচাই কর”ন। চলতি BRF সম্মেলনের দাওয়াতের যোগ দিয়ে বক্তৃতায় তিনি মুখের উপর বলেছেন ব্যাপক বেল্ট-রোডের প্রকল্প সেখানেই যাওয়া উচিত আর যে অর্থনীতি এর ঋণশোধের দায়ভার বইতে সক্ষম। [“China’s massive Belt and Road infrastructure program should only go where it is needed and where the debt it generates can be sustained…] ব্যাপারটা চীন জানত না এমন নয়, লাগার্দে প্রথম বলছেন তা তো নয়ই।  আবার এটা অবিশ্বাস্য যে গ্রাহক রাষ্ট্রগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলাই চীনের বড়লোক হবার পথ, আর এটা চীন বিশ্বাস করে। এটা একটা রাষ্ট্রের দুনিয়ার নেতা হবার কোন স্ট্রাটেজিক উপায়ও তো হতেই পারে না, এই এবসার্ডিটি বা অবান্তর কথা চীন বুঝে নাই তেমন কঠিন কথা এতা নয়? তাহলে?

    এটা চরম গোয়ার্তুমি আর পশ্চিমকে তাদের চিন্তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা সম্ভবত এমনই কিছু একটা।  আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে থাকে আবার সময়ে তার দরকার থাকলে এই অজুহাতে হস্তক্ষেপও করে থাকে – একথা সত্য। চীন কী মনে করে, সহজে ঋণপ্রাপ্তি ও ঘুষের নহর বইয়ে দেয়া, এভাবে স্বৈরাচারদের টিকিয়ে রাখা – এটা যে আরও বড় হস্তক্ষেপ – এটা চীনের বুঝে ধরা পড়ে নাই।

    দুনিয়ার কোথাও শিল্পায়ন বা ক্যাপিটালিজম হয় নাই – রাষ্ট্রের অর্থ না মেরে দিয়ে। তারা বিশেষ করে কাস্টমসের টাকা, ব্যাঙ্কের টাকা মেরে দিয়েছে। পুঁজিপতিরা আদিম-পুঁজির সংগ্রহ সবসময় এভাবেই করেছে। কিন্তু এর মানে কী এই যে চীন উদ্দেশ্য করেই অর্থ লুটপাটকে উতসবে পরিণত করবে? এটা কোন ক্যাপিটালিজমের বুঝ? নাকি এটাই ইঙ্গিত করছে যে গ্লোবাল আইন, কনভেনশন, নাগরিক অধিকার, বেস্ট প্রাকটিস, মোডাল, ইন্সটিটিউশন গড়া, ইত্যাদি সম্পর্কে চীনের বুঝাবুঝিতে মারাত্মক ঘাটতি আছে?

    কাজেই ক্রিশ্চান লাগার্দের এই নসিহত বা কখনো টিটকারি শুনে চীনের কেমন লাগছে? কোন ইজ্জত বাড়ছে জানা যায় না। আর এখান থেকেই চীন ‘ঋণফাঁদ’ পেতেছে- এই আমেরিকান প্রপাগান্ডা করার সুযোগ তৈরি করছে এতদিন চীন নিজেই।

    হতাশার কথা থাক। মনে হচ্ছে, তাহলে কি এখন কানে পানি ঢুকেছে? এবারের বিআরএফ সম্মেলন থেকে আমরা কি সেই ইঙ্গিত পাচ্ছি? সম্ভবত হ্যাঁ। কিসের ভিত্তিতে এমন বলা যায়? খুব সহজ। উপরে আমরা দেখলাম বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্ট বা বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা ইত্যাদি সবই এটাই বলছে। কিন্তু এটা এখন এত সহজে এসে গেল আগে হয় নাই কেন, এর জবাব কী? গত মাসে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখান থেকে এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ হয়। দেখা যায়, অবকাঠামো প্রকল্পে যেসব স্টান্ডার্ড এপর্যন্ত তৈরি হয়েছে  চীন সুগুলো মেনে চলা আর এ নিয়ে আরও বিকশিত কাজ করতে চীন সেখানে ইইউর সাথে একমত জানিয়েছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা এখানে । কাজেই প্রেসিডেন্ট শি আসলে এবারের বিআরএফ থেকে বলতে চাইলেন, তিনি ইইউর সাথে ইতোমধ্যে যা যা একমত হয়েছেন, সেটাই এখন বিআরএফ ফোরামেও বাস্তবায়নে কাজ করবেন – এভাবে বলাটা কঠিন ছিল না। আর যাতে পরের বিআরএফ সম্মেলনে তিনি জার্মান চ্যান্সেলর আর ফরাসি প্রেসিডেন্টকেও হাজির করতে পারেন।

    এখন যদি আমরা আমেরিকার সাথে তুলনা করে বলি তাহলে ব্যাপারটা দারাল এই যে, ট্রাম্পের আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে নেতি প্রপাগান্ডা করেই গেল। আর ইইউ চীনকে মানদন্ডে আসতে বাধ্য করল, যাতে সম্ভাব্য গ্লোবাল নেতা চীনের পার্টনার হয়ে ইইউ নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।

    তাহলে এখন বেল্ট রোডে ভারতের কী হবে?
    ইইউর মতো ভারতের জন্যও চীনা প্যাকেজ আছে মনে হচ্ছে। তাই সম্ভবত চীনা পথ হতে যাচ্ছে, সঙ্ঘাত নয়। বরং আরো সুবিধা অফার করে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলে নেয়া হবে। সংক্ষেপে বললে, পাকিস্তানের কথিত জঙ্গি মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের জঙ্গি তালিকায় তুলতে চীনের আর আপত্তি না করা সম্ভবত সেটারই ইঙ্গিত। তবে এটা কেবল একা ভারতকে ছাড় দেয়া নয়। অনুমান করা যায়, ভারতকেও প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে যে, মাসুদ ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের ওপর এখন চাপ সৃষ্টি করতে বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো প্রপাগান্ডা বা সামরিক বা স্ট্র্যাটেজিক কোনো পদক্ষেপে যাবে না। তাই পাকিস্তানও চীনা সিদ্ধান্তে কোন আপত্তি প্রকাশ করে নাই, বরং গ্রহণ করেছে। আসলে চীন অনেক আগে থেকেই এমন সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। এমনকি সম্ভবত কাশ্মির ইস্যুতে লম্বা পথের হলেও একটা সুরাহা, অন্তত ডায়ালগ শুরু করে পথ খুঁজে পাওয়া- এত দূর পর্যন্ত পরিকল্পনায় আছে। চীন সে জন্য অরুণাচল বা কাশ্মিরের সাথে ম্যাপে কার কোনটা এলাকা – সে সংক্রান্ত অনেক দাবি থেকেও সরে এসেছে, তা ভারতের মিডিয়াই বলছে। অনেকে অবশ্য অনুমান করে বলছেন, চীনের এত ছাড়ের অর্থ- অন্য আর একটা । তা হল চীন সম্ভবত মনে করছে ভারতের চলতি নির্বাচনে মোদী নয়, নতুন সরকার আসছে – এটা তারই ইঙ্গিত। তাই নতুন হবু সরকারকে দেয়া এটা চীন উপহার। ওদিকে ভারতের নির্বাচন সমাপ্ত হলে চীনে সেকেন্ড য়ুহান [WUHAN] সম্মেলনেরও প্রস্তুতি চলছে।

    কিন্তু তাহলে বাংলাদেশের ভাগে কী?
    আপাতত ফুটা কড়ি। নির্বাচিত হওয়ার পরই আমাদের সরকার ভারতীয় মিডিয়ায় এক হুঙ্কার দেয়া সাক্ষাৎকার দিয়েছিল। সেটা এখন ফাঁপা বলে হাজির হয়েছে। সেখানে ধারণা দেয়া হয়েছিল ভারতের আপত্তি উপেক্ষা করে আমাদের সরকার নিজেই চীনা বেল্ট রোড প্রকল্পসহ চীনের সাথে ব্যাপক সম্পর্কে যাচ্ছে । সে ইঙ্গিত, সেসব ফেলে এখন বাস্তবত সরকার মুরোদহীন বলে নিজেকে প্রমাণ করছে। কারণ, ওই সাক্ষাৎকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ হত গত ২৫-২৭ এপ্রিলের বিআরএফ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চীনে টিম যাওয়ার, তা ঘটেনি। ২৩ এপ্রিল একমাত্র ইত্তেফাক বলেছিল, প্রধানমন্ত্রী নয়, একা শিল্পমন্ত্রী নাকি যাচ্ছেন। আর কোন মিডিয়া ইস্যুটা নিয়ে কিছু না করে উলটা ব্ল্যাক আউট করে দেয়। ইস্যুটিকে মিডিয়া এভাবে অগুরুত্বপূর্ণ করে ট্রিট করেছে, এতে অনুমান হয়-সরকারের কাছেও এটা অগুরুত্বপূর্ণ; তাই এমন। তাহলে জানুয়ারীতে প্রধানমন্ত্রীর ভারতের মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেয়ার বোল্ড অবস্থানের পর এখন এই গুরুত্বহীন করে দেওয়ার অর্থ কী?
    খবর না থাকাটাই একটা খবর। সেক্ষেত্রে সোজা অর্থ হল, জানুয়ারিতে সাক্ষাতকারে যাই দাবি  করে থাকুক এখন সরকার বুঝাতে চাইছে, তাঁর এখন কোনো সক্ষমতা নেই যে, ভারতের স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিজ স্বার্থে সে চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যায়। ব্যাপারটি দাঁড়াল এমন যে, নির্বাচিত হলেও ভারতের স্বার্থ ুপেক্ষা করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে কোনো অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা সরকারের নেই বলে সরকারেরই অনুমান। তাই সে আবার স্ট্যাটাস কো ফিরে গেল; যা ছিল তাই আগের জায়গায়। ভারতের স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে থাকা। ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা আমাদের সরকারের এখনো নাই, এতাই সারকথা। ইতোমধ্যে ভারতের এক মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে, চীন এবারের BRI  এর নেয়া প্রজেক্টের তালিকায় BCIM কে রাখে নাই। [China drops BCIM from BRI projects’ list]। বিসিআইএম মানে- বার্মা হয়ে আমাদের চীনের কুনমিং যাওয়ার এবং সোনাদিয়া বন্দর – এই পুরা প্রকল্পই চীন নাকি গুটিয়ে ফেলেছে। এই ক্ষবর কতটা সত্য অথবা কেন আমরা এখনও জানি না।
    ফলে আপাতত, বাংলাদেশের জন্য সব কিছুর প্রাপ্তি শূন্য। আসলে বাস্তবত পেছনের জনসমর্থন ছাড়া এক সক্ষমতাহীন ক্ষমতা আমাদের সরকারের -= এদিকটা আঁচ করেই সম্ভবত চীন বা ভারত আমাদের সরকারকে তুচ্ছ জ্ঞান করছে। তাই ভারতের স্বার্থ পূরণের অগ্রাধিকারের নিচেই চাপা পড়া আমরা। নিঃসন্দেহে তা খুবই হতাশাজনক!

    এদিকে আবার আরেক কাহিনী। আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এক সাক্ষাৎকার দিয়ে বলছেন, “সরকার চীনের বিকল্প ফান্ড দাতা খুঁজছে”। সেই খবরের শিরোনামটাই হল – “Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans…।  সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের [SCMP] ২৩ এপ্রিল ছাপা এই খবরের রিপোর্টার বাংলাদেশে এসে ওই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ভারতের প্রো-আমেরিকান কথিত বিজ্ঞদের বক্তব্য সেখানে ছাপা হয়েছে, যার সারকথা বাংলাদেশের চীনা ঋণ নিতে যাওয়া ঠিক নয়। ব্যাপারটা আসলে বড়ই রহস্যময়! প্রধানমন্ত্রী চীনা বেল্ট রোডে যোগ দিতে চেয়ে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। আর তিন মাসের মাথায় সরকারের প্রতিমন্ত্রী বলছেন, তারা চীনা বেল্ট রোডের বিকল্প ফান্ড খুঁজছেন!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত  ০৪ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “বেল্ট রোড ফোরাম সম্মেলন আমরা কি নাই হয়ে যাচ্ছি“ – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

     

  • ভারতের মিথ্যা সার্ক-দরদি সাজ ধরা খেয়েছে

    ভারতের মিথ্যা সার্ক-দরদি সাজ ধরা খেয়েছে

    গৌতম দাস

    ১৬ জুলাই ২০১৮, ০০:০২

    https://wp.me/p1sCvy-2sE

    File photo of 1st China-South Asia Cooperation Forum ((CSACF), Fuxian Lake Initiative – ORF

    ভারতের অন্যতম বেসরকারি দাতব্য থিংকট্যাংক বা বেসরকারি পলিসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলো ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ বা সংক্ষেপে ওআরএফ (Observer Research Foundation, ORF)। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে অনেকেই থাকেন রিসার্চ ফেলো হিসেবে, যারা সাধারণত হন দীর্ঘ পেশাদার জীবন কাটানো কোনো কূটনীতিক, জার্নালিস্ট বা একাডেমিক ইত্যাদি পেশাজীবী। কিন্তু ওআরএফ রিসার্চ ফেলোদের নিয়ে এক আজব ঝোঁক দেখা যাচ্ছে যে, তারা তাদের সহকর্মী একই বিষয়ের কী নিয়ে কাজ করছে, কোথায় কী বলছে, সেসবের খবর রাখে না। তাই একই প্রতিষ্ঠান ওআরএফের এক সহকর্মী যা বলছেন, অপর সহকর্মী ঠিক এর উল্টো বলছেন।

    ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য খারাপ নাম কামিয়ে বাংলাদেশের চোখে পড়ে যাওয়া ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। পরবর্তী সময়ে কূটনীতিক চাকরির জীবন শেষ করে তিনি ২০১৬ সালে ভারতের ওআরএফ নামের থিংকট্যাংকের ফেলো হয়েছিলেন। এমনিতেই ভারতের থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাধারণ ঝোঁক হলো প্রো-আমেরিকান পলিসি অনুসরণ করা অথবা তাদের জন্মই হয় আমেরিকান অর্থে আমেরিকান নীতি-পলিসি প্রচারের জন্য। আরো স্পষ্ট করে বললে, বিপুল উদীয়মান চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ পলিসির পক্ষে প্রচারণা চালাতে ভারতের প্রায় সব থিংকট্যাংকই ভাড়া খাটে। এর মূল কারণ, এদের বেশির ভাগেরই জন্ম এবং প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ডিং এ কারণে। তেমনই, প্রো-আমেরিকান পলিসির পক্ষে ভাড়া খাটা, আর আমেরিকান বলে বলীয়ান এক সোচ্চার কণ্ঠস্বর হলেন পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী। যদিও কপাল খারাপ, এখন ট্রাম্পের জমানা, আর তাতে এসব ভাড়াটেদের অবশ্য অবস্থা খুবই শোচনীয়। ট্রাম্পের চলতি “বাণিজ্য যুদ্ধের” নীতির ঠেলায় আমেরিকান পলিসির পক্ষে দাঁড়ানো ও ওকালতি তারা করুক এব্যাপারে ট্রাম্পই তেমন আগ্রহী না, গুরুত্ব দেয় না। সময়ে বেইজ্জতি করে দেয়। আর ভারতের বিরুদ্ধেও যে আমেরিকা বাণিজ্য যুদ্ধের ঘোষণা করে দিয়েছে সেই প্রো-আমেরিকান পলিসির পক্ষে ভাড়া খেটে ইজ্জত রক্ষা করা অসম্ভব। অর্থহীন এক দালালিতে পরিণত হয়েছে একাজ।  কিন্তু তা হলেও সেই ২০১৬ সালেও পিনাক রঞ্জনদের ডাটফাট ছিল আলাদা, খুবই আক্রমণাত্মকভাবে আমেরিকান ক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে তারা চোটপাট করে যেতেন।

    দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্র-জোট সার্কের (SAARC) ২০১৬ সালে অক্টোবরের সম্মেলন ভণ্ডুল করে দিতে সক্ষম হয় ভারত। সেবারের সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল পাকিস্তানে। ভারতের প্ররোচনায় বাংলাদেশও পাকিস্তানে ওই সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করার পক্ষে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছিল। প্রথম আলোর ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬ রিপোর্ট ছিল, সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যাচ্ছে না বাংলাদেশসহ চার দেশ । সার্ক ভন্ডুল করার ক্ষেত্রে ভারতের সফলতা হিসাবে প্রথম আলো লিখেছিল, সার্কের ভবিষ্যৎ গভীর সংকটে।

    ভারতের কূটনৈতিক লবিতে অবজারভার সদস্য আফগানিস্তানসহ চার রাষ্ট্র (বাংলাদেশ, ভারত, আফগানিস্তান ও ভুটান) পাকিস্তানের সার্কের সম্মেলনে যেতে অপারগতা জানায়। আনন্দবাজার লিখেছিল ভারতের মনের গোপন কথাটা। অক্টোবর ২০১৬ তে লিখেছিল, পাকিস্তানকে এড়িয়ে ‘সার্ক-টু’ করতে চায় নয়াদিল্লি। ভারতের অমিত বসু কালের কন্ঠে কলাম লিখে ছিলেন, “ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক সুতোয় ঝুলছে। ছিঁড়ে পড়তে পারে যেকোনো সময়। দুই দেশের মৈত্রী উধাও”। শুধু তাই নয়, আবার কবে সার্ক সচল হবে, সেটাও অনিশ্চিত করে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। ভারতের উদ্দেশ্য ছিল একটাই- তার জন্মজন্মান্তরের শত্রু পাকিস্তানকে একঘরে করা।

    ইতোমধ্যে ১৯৯৭ সালে এক ‘বে অব বেঙ্গল উদ্যোগ’ হিসেবে এবং ‘বিমসটেক’ (BIMSTEC) নামে আর এক রাষ্ট্র জোট গঠন হয়েছিল। যেখানে পাকিস্তান ছাড়া সার্কের বাকি পাঁচ রাষ্ট্র আর সাথে বাড়তি নতুন মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড এ দুই রাষ্ট্র, এভাবে মোট সাত রাষ্ট্র নিয়ে এটা গঠিত ছিল।

    ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী সার্কের বিরুদ্ধে ভারতের বিদেশনীতির পক্ষে ২০১৬ সালে প্রচারণার কাজ হাতে নেন। সে সময় তার বক্তব্য ছিল এ রকম- ‘সার্কের দিন শেষ’। ফলে পাকিস্তানও একঘরে হয়ে শেষ। এখন থেকে এর বদলে, এর জায়গায় এখন সবাইকে ‘বিমসটেক’ নিয়ে ভাবতে হবে। গত ৪ অক্টোবর ২০১৬ যুগান্তর লিখেছিল,  ‘এখন সার্কের কথা ভুলে যান। বিমসটেকের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে আমি বাংলাদেশকে আহ্বান জানাই।’

    আসলে ব্যাপারটা হয়েছিল এমন যে, এ ঘটনার প্রায় একই কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশের কিছু প্রো-গভর্নমেন্ট সাংবাদিক ভারত সফরে গিয়েছিলেন। তাদের সফরসূচির অংশ হিসেবে তারা ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জনের সাথে দেখা করেছিলেন। দেশে ফিরে ওসব সাংবাদিকরা পিনাক রঞ্জনের বরাতে বিরাট নিউজ করেছিলেন, ‘সার্ক ভুলে বিমসটেকে নজর দিন’। উপরে যুগান্তরের রিপোর্টের ঐ সাংবাদিকও ছিলেন ঐ সফরে। এছাড়া, ৪ অক্টোবর ২০১৬ তারিখে অনলাইন বিডিনিউজ২৪-এর রিপোর্টের শিরোনাম দেখতে পারেন। বিডিনিউজের রিপোর্টারও ছিলেন ঐ ভারত সফরে। আর তাতে মূল খবরটি ছিল এভাবে- ‘সার্ক ভুলে বঙ্গোপসাগর-ভিত্তিক দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের ওপর জোর দিতে বাংলাদেশকে পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক এক ভারতীয় কূটনীতিক।’

    তাহলে এতক্ষণের সার কথা হল, গত ২০১৬ সালেই সার্কের “কবর দিতে” বা “ভুলিতে দিতে” ভারত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিল। এবং এর পালটা হিসাবে ‘বিমসটেক’ (BIMSTEC) কে হাজির করার সিদ্ধান্ত সকলকে প্রকাশ্যেই ভারত জানিয়েছিল।

    কিন্তু, আসলে সবই ভাগ্যের পরিহাস। নীতিগত অবস্থান পলিসি দিয়ে নয়, ঈর্ষা আর প্রপাগান্ডা দিয়ে অথবা ভাড়া খেটে থিংকট্যাংকের রিসার্চ ফেলোর কাজ করা যায় না, এটাই প্রমাণিত হলো। সার্ক প্রসঙ্গে ভারতের ঘৃণা ও প্রচারণায় এই ফেলা থুথু এখন সেই ভারতকেই এখন ফিরে চাটতে হইতেছে।

    কারণ, বেশি দিন লাগেনি, প্রায় দেড় বছর না যেতেই গত ১০ জুলাই ২০১৮ ওই একই ওআরএফের সাইটে এবার আরেক রিপোর্ট ছাপা হয়েছে, ‘সার্ক কোমায়, চীন আর এক নতুন আঞ্চলিক জোট হাজির করেছে।’ [SAARC in coma, China throws another challenging regional initiative]। তার মানে এই রিপোর্ট এখানে সেই সার্কের প্রতি ভারত এখন কত সহানুভুতিশীল তাই দেখাতে চাইছে। একেবারে পুরা উল্টা-রথ।

    যদিও এবারের রিপোর্টটা আর পিনাক রঞ্জনের করা নয়, করেছেন আরেক রিসার্চ ফেলো ‘এন সত্য মূর্তি’। আর এখানে এবার বিশেষ করে লক্ষণীয় হল, দেড় বছর আগে যে ওআরএফ একই ‘সার্ক’ এবং সাথে পাকিস্তানের ‘ডুবে যাক’ চাচ্ছিল, সবারই ‘ভুলে যাওয়া’ চাচ্ছিল; এবার সেই একই সার্কের পক্ষে ওআরএফের দরদ ও প্রীতি ঝরে পড়তে শুরু করেছে। অর্থাৎ ভারতের এখন বিপরীত মুডে, সার্কের পক্ষে ভারতের প্রীতি এখন উপচানো। সত্যি এ’এক বড়ই আজব ঘটনা! ভারতের এই উল্টো যাত্রা কেন? ঘটনা কী?

    ঘটনা হল, গত মাসে চীনের গুয়াংজুতে চীনা উদ্যোগে এক আঞ্চলিক জোট গঠনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। জোটের নাম চীন-দক্ষিণ এশিয়া সহযোগিতা ফোরাম, [China-South Asia Cooperation Forum] (CSACF)। নামের মধ্যেই উদ্দেশ্য পরিষ্কার। আগের সার্ক আর সাথে উদ্যোক্তা চীন। দক্ষিণ এশিয়া রাষ্ট্র জোটের সাথে চীনের সহযোগিতার নতুন প্ল্যাটফর্ম এটা। অর্থাৎ এটা মূলত (সেই ভারত-পাকিস্তানসহ) সার্ক প্লাস চীনের জোট।

    এখন তাহলে অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন বা সংক্ষেপে ওআরএফের আগে কি আগে স্বীকার ও ব্যাখ্যা দেয়া উচিত ছিল না যে, ২০১৬ সালে ‘সার্ককে ডুবিয়ে দেয়ার পক্ষে’ ভারতের যে বিদেশনীতি ছিল আর যেটা ওআরএফের ফেলো পিনাক রঞ্জন প্রশংসা ও সমর্থন করেছিলেন, সেটা থেকে এখনকার ওআরএফ সরে এসেছে? এবং কেন এই সরে আসা, সে ব্যাখ্যাই বা কী? নাকি ওআরএফ এর আরেক রিসার্চ ফেলো ‘এন সত্য মূর্তি এখনো জানেনই না যে, পিনাক রঞ্জন এবং ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ২০১৬ সালে এমন একটি অবস্থান ছিল?

    তবে এটা হওয়াও অসম্ভব নয়, এখন নতুন চীনা উদ্যোগে আগের ‘সার্ক +’ জোট একটা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে দেখে রাতারাতি ভোল বদলে ওআরএফ এখন সার্কের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর অবস্থান নিচ্ছে? অর্থাৎ এই সহানুভূতিও ফাঁপা, ওআরএফের দরকার চীনের বিরুদ্ধে খোঁড়া হলেও একটি যুক্তি (নিজের স্ববিরোধিতা প্রকাশ হয়ে গেলেও তা) হাজির করা। কিন্তু তাতেও, প্রশ্ন আরো আছে।

    কারণ, ওআরএফ এবার নিজেই জানাচ্ছে, চীনে এই সম্মেলনের খবর ভারতে খুব বেশি প্রচারিত হয়নি। (এমনকি বাংলাদেশের কোনো মিডিয়ায় এসেছে চোখে পড়েনি, অথচ বাংলাদেশের প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিল।) কিন্তু ভারতে প্রচার হয়নি কেন?

    এছাড়া, আরো বেশ কিছু সিরিয়াস ‘কেন’ প্রশ্ন আছে?
    কারণ, ওআরএফ ছদ্ম সার্ক-দরদি সেজে এক খোঁচামারা মন্তব্য করে বলেছে, “চীনা উদ্যোগের এই CSACF ফোরাম কি আসলে চীনের বেল্ট রোডেরই এক সহযোগী উদ্যোগ, যার ভেতর দিয়ে সার্কের মৃত্যুঘণ্টা বাজবে?” [The parallel, yet unasked question, either at or outside the CSACF venue, was if the new Chinese initiative, alongside the more-visible Belt and Road Initiative (BRI) could ring the death-knell for the South Asian Association for Regional Cooperation (SAARC), where it had failed to go beyond the ‘Observer’ status, to obtain full membership.]

    ওআরএফের এ কথা শুনে মনে হচ্ছে, যেন সার্কের মৃত্যু হলে ভারতের জান চলে যাবে। এতই পতিপ্রাণা, অথচ কারপেটের নিচে লুকিয়ে ফেলা কথাটা হল,  ২০১৬ সালে ঘোষণা দিয়ে ভারত আগেই সার্কের মৃত্যু ঘটিয়ে দিয়েছে। আর এখন দরদি সাজছে। কুমিরের চোখে যেন জল।

    এ ছাড়া, আরেকটা খোঁচা দিয়ে ওআরএফ বলছে যে, সার্ক থেকে চীনকে কখনোই অবজারভারের বেশি মর্যাদা ভারত দিয়ে দেয়নি। আর যেন তা ভারতের বিরাট সাফল্য ছিল? এতে পরিষ্কার যে, ভারত কখন কী চেয়ে কী করে আর তাতে লক্ষ্যই বা কী- এসবের পেছনে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করার কোনো পরিকল্পনাই থাকে না।

    এবারের চীনা উদ্যোগের এই CSACF ফোরামের সভায় খুব ভালোভাবেই ভারতের প্রতিনিধিত্ব ছিল। প্রতিনিধিত্ব করেছেন গুয়াংজুতে ভারতের কনসাল জেনারেল সাইলাস থাংগেল (Sailas Thangal)। ভারতের প্রতিনিধি ওই সভায় এই জোট উদ্যোগকে বহুল প্রশংসা করেছেন, বলেছেন এই উদ্যোগ এ অঞ্চলকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাজার হিসেবে হাজির করবে। [Praising Beijing’s initiative, Indian Consul General in Guangzhou, Sailas Thangal said the CSACF boasts of the world’s biggest market. But the region also boasts of being home to millions of poor people.] শ্রীলঙ্কার এক অনলাইন পত্রিকা দ্য আইল্যান্ড এই খবর দিয়েছে। এ ছাড়া, চীনের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের এক ডিরেক্টর জেনারেল লি জিমিংয়ের বরাতে আইল্যান্ড লিখেছে, ‘CSACF’ ফোরাম আসলে বেল্ট রোড উদ্যোগেরই অংশ, যেটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে চীনের ভৌগোলিক নৈকট্য ও সাংস্কৃতিক বন্ধন গাঢ় করবে।’ [He declared that the CSACF was a part of the BRI, “which is expected to bring together South Asian countries that share a geographical vicinity and cultural affinity with China” ]

    মজার কথা হলো এসব খবর ওআরএফ নিজেই নিজের রিপোর্টে লিখে জানাচ্ছে। তাহলে এর মানে কি এই এক ফাইন মর্নিংয়ে আমরা উল্টো প্রশ্নের সম্মুখীন হব যে, ভারত তখন উল্টো আমাদের জিজ্ঞেস করবে, ভারত কবে চীনা বেল্ট রোড উদ্যোগের বিরোধী ছিল?

    এসব কারবার দেখে মনে হয় থিংকট্যাংক, রিসার্চ, পলিসি ইত্যাদি এসব শব্দ এসব ব্যক্তি এখনো গুরুত্বের সাথে নেয়নি। যথার্থ ওজন বুঝে ব্যবহার করে না। আসলে নীতিগত অবস্থান পলিসি দিয়ে নয়, ঈর্ষা আর প্রপাগান্ডা দিয়ে অথবা ভাড়া খেটে থিংকট্যাংকের রিসার্চ ফেলোর কাজ করা যায় না, এটা তাদের বোঝানোর কেউ নেই।

    তবে তামাশার কথাটা হল, ভারত চীনা উদ্যোগের এর CSACF সভায় ঠিকই পাকিস্তানের সাথে ও পাশে বসতে পেরেছে। বস্তুত CSACF  ফোরামটা হল আগেরই সার্ক + চীন। তাহলে, সার্ককে চলতেই না দিলেও এবার চীনা দাবড়ে এই ফোরামে ঠিকই পাকিস্তানের পাশে অবলীলায় বসতে পারছে ভারত! আসলে ভারত হল শক্তের ভক্ত, তাই কী?

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ১৪ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের সার্ক দরদের স্বরূপ”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

  • ভারত কী চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিতে যাচ্ছে!

    ভারত কী চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিতে যাচ্ছে!

    গৌতম দাস

    ২ জুন ২০১৮, ০০:০৩, শনিবার

    https://wp.me/p1sCvy-2rS

     

     


    Illustration: Ajit Ninan, Times of India – মোদীও সওয়ার হওয়ার কথা ভাবছেন!

     

    আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের পয়লা টার্গেট ছিল চীন, তবে সেই সাথে দ্বিতীয় বা সহ-টার্গেট ছিল ভারতও। এই নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমেরিকা হয়ে পড়ে একা। অন্যদিকে, এই নতুন পরিস্থিতি চীন-ভারতকে কাছাকাছি এনে ফেলেছে। উল্টো করে বলা যায়, আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতির খেদমতে ও সমর্থনে ভারতেরও আর আমেরিকান ঐ নীতি পো-ধরে আগিয়ে চলার  বাস্তবতা লোপ পায়। ফলে মোদী ও ভারতের চীন নীতিও আমূল বদলে যাচ্ছে। আগে যতই উসকানিমূলক অবস্থান থাকুক না কেন, ভারত এবার থুক্কু বলে সব ভুলে চীনের সাথে সহযোগী সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবেই ২৭ এপ্রিল মোদির চীন যাত্রা ঘটেছিল। চীনে মাওয়ের অবসর যাপনের শহর য়ুহানে (Wuhan), চীন-ভারত “ইনফরমাল শীর্ষ সামিট” বা মোদী-জিনপিং এই দুই শীর্ষ রাষ্ট্র নির্বাহীর অনানুষ্ঠানিক কিন্তু ওজনদার ও গুরুত্বপূর্ণ আলাপের শুরু হয় সেখান থেকে।

    ট্রাম্পের আমেরিকা হল এখন এক ‘একাকী আমেরিকা’ হতে রওনা দিয়েছে। এই অবস্থায় মানে “এন্টি গ্লোবাইজেশন” আর “সবার আগে আমেরিকা” এ দুই নীতিতে চলে যাওয়ার পর চাইলেও আর ভারতের পক্ষে আমেরিকার কোলে বসে আর কোনো কৌশলগত বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক আগের মতো চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া উদীয়মান ভারতের অর্থনীতির প্রবল ও বিপুল বিনিয়োগ চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রেও দেখা গেল, আমেরিকা এক্ষেত্রে ভারতের জন্য দরকারি কেউই না। অথচ চীন-ভারত সম্পর্ককে মোদী সংঘাতময় করে ফেলে রাখা সত্ত্বেও চীনই ছিল ভারতের জন্য একমাত্র উপযুক্ত বিনিয়োগদাতা। ফলে য়ুহান সম্মেলনে অন্তত ভারতের বিনিয়োগ সম্পর্কের দিক বা বিনিয়োগ প্রয়োজনের গুরুত্ব মোদি ভালোভাবেই বুঝেছিলেন।

    গত ২৭ এপ্রিল ভারত ত্যাগের আগে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, এই সম্মেলন থেকে ‘চীন-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ককে জোরদার করা’ তার বিশেষ লক্ষ্য। [“Modi stresses on strengthening economic ties]

    আগামী বছর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বা ক্ষমতার নির্বাচন। ফলে ক্ষমতার আকাঙ্খী বিরোধী অপর দল কংগ্রেসে এবার মা সোনিয়া গান্ধী ছেলে রাহুল গান্ধীকে দলের নতুন নেতা করে নামিয়েছেন। রাহুলও তৎপর হয়ে প্রায় প্রত্যেক ইস্যুতেই প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আক্রমণ ও সমালোচনা করে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে চলেছেন। ফলে মোদীর য়ুহান যাত্রার আগেও ব্যতিক্রম করেননি। কিন্তু হায়! গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও অভিমুখ সম্পর্কে রাহুল গান্ধীর মত ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্ভবত যথেষ্ট সচেতন হন নাই, হোমওয়ার্ক করেন না – এমন আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করলেন রাহুল এক টুইট বার্তা দিয়ে। য়ুহান যাত্রার প্রাক্কালে তিনি মোদীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে লিখলেন – তিনি যেন “ডোকলাম ইস্যু” ও “চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের আপত্তির” কথা তুলে ধরতে ভুলে না যান।

    এর সোজা অর্থ মোদি-জিনপিং শীর্ষ বৈঠকের পিছনের কথা বা ব্যাকগ্রাউন্ড এবং গ্লোবাল অর্থনীতির দিক থেকে এই সম্মেলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য এবং ভারতের অর্থনীতির জন্য তা কেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ আশীর্বাদ হয়ে আসবে সেসব সম্পর্কে একেবারেই বেখবর রাহুল। প্রথমত, মোদির কাছে বা ভারতের দিক থেকে এই সফর হল বিগত দুই বছরে চীন-ভারতের সম্পর্ক যে সঙ্ঘাত ও বৈরিতার পথে চলে গিয়েছিল, তা ছেড়ে পারস্পরিক সহযোগিতার পথে উঠে আসার জন্য ভারতের সুযোগ নেয়ার সফর। ফলে এই সফর থেকে ভুটানের ডোকলাম সীমান্ত নিয়ে নতুন করে সঙ্ঘাত তুলে আনা কোনোভাবেই মোদির বা ভারতের লক্ষ্য নয়। বরং ডোকলামের সঙ্ঘাত যা মূলত ডেড ইস্যু যা মোদী শেষে সফলভাবে চাপা দিতে পেরেছিল; চীনের সাথে কোনো বড় সঙ্ঘাতের দিকে তা চলে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পেরেছিল, এটাই মোদীর বিরাট অর্জন ছিল। ফলে ডোকলাম ভারতের কাছে, অন্তত মোদীর জন্য কোন অমীমাংসিত ইস্যু নয়, ভালভাবে ও কমপক্ষে আপাত হলেও মীমাংসিত ইস্যু। অথচ রাহুল মোদীকে ডোকলাম ইস্যুতে চীনের সাথে আলাপ তুলে পুরান ঘা খোঁচাখুচি করতে মনে করিয়ে দিচ্ছেন।

    [Congress president Rahul Gandhi said the PM looked tense in the live TV feed of the China visit. “Saw the live TV feed of your “No Agenda” China visit. You look tense! A quick reminder: 1. Doklam. 2. China Pakistan Economic Corridor passes through PoK. That’s Indian territory. India wants to hear you talk about these crucial issues. You have our support,” Rahul Gandhi said on Twitter.]

    রাহুল দ্বিতীয় প্রসঙ্গ তুলছেন, চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের আপত্তি নিয়ে। এই দাবিও অপ্রাসঙ্গিক। মোদী য়ুহান সামিটে যাচ্ছেন মূলত চীন-ভারত সামগ্রিক অর্থে অর্থনৈতিক ও বিশেষ করে বিনিয়োগ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে এর ভিত্তিমূলক আলাপ করতে। বোঝা যাচ্ছে, এর খবর রাহুলের কাছে নেই। মোদীর এই উদ্যোগ সরকার বিরোধী নেতা বলে রাহুলের তো তা ভন্ডুল করে দেয়া বা বেখবর থাকা কোন দায়ীত্ববান লোকের কাজ না।  অথচ তিনি ভেবেছেন যেন মোদী চীন যাচ্ছেন চীন-ভারত সীমান্ত বিতর্কে কোনো অমীমাংসিত ইস্যুতে ভারতের স্বার্থ আদায় করতে। দেখা যাচ্ছে রাহুল তো ইস্যুই বুঝেন নাই!

    আসলে চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি এক বিনিয়োগ প্রকল্প। এটা মূলত চীনের নিজের স্বার্থের অবকাঠামো প্রকল্প। পশ্চিম বা দক্ষিণ-পশ্চিম চীন যেটা পাহাড় পর্বতমালায় পুরোপুরি ল্যান্ডলক্ড অবস্থায়; সেই অঞ্চলকে  গভীর সমুদ্রবন্দরে প্রবেশসহ সব আবদ্ধতা ভেঙে ফেলে উন্মুক্ত করার অবকাঠামো প্রকল্প। এটা পাকিস্তানের উত্তর-দক্ষিণ বরাবর পুরা পাকিস্তানের বুকচিরে চলা এক হাইওয়ে যোগাযোগব্যবস্থা, যার একদিকে গভীর সমুদ্র বন্দর গোয়াদর আর অন্য প্রান্তে শেষে এটা চীনের অবরুদ্ধ পশ্চিম চীনের ভেতরে পর্যন্ত ঢুকে গেছে। এ ছাড়া এটাই চীনের ট্রিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ বিআরআই (BRI) এর অংশ; যা দুনিয়ার ৬৫টি রাষ্ট্রকে সংযুক্ত করে এমন অবকাঠামো প্রকল্প।

    ভারত এই প্রকল্পে অংশ নিতে চায় না – একথা বলে ভারত এখন নিজের দাম বাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টার মোডে আছে; এই স্তরে আছে। এরই অজুহাত হিসেবে ভারত এখন এক নন-সিরিয়াস অভিযোগ তুলে রেখেছে যে এই করিডোর প্রকল্প পাকিস্তানের কাশ্মিরের ভেতর দিয়ে গেছে। আর ভারতের চোখে কাশ্মীর এক বিতর্কিত ভূমি এবং দাবি যে কাশ্মীর পুরোটাই ভারতের। ফলে এই সুত্র এটা ভারতের সার্বভৌমত্বের রক্ষার প্রশ্ন। ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এই আপত্তি তুলে রেখেছে সত্য কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার মনের আসল ইচ্ছা হল, ভারতকে বিআরআই (BRI) প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে চীন ভারতকে আরো কী কী ছাড় ও সুবিধা দেয় তার দরকষাকষি করা। এ ব্যাপারে চীনে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ছিলেন অশোক কান্থা; তিনি অবসরে যাওয়ার পরে গণমাধ্যমে নিজেই এক বয়ান দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ক্ষমতাবান ‘ক্রমবর্ধমান ধেয়ে আসা চীনের প্রভাব’ মোকাবেলা করাই হলো ‘ভারতের কূটনীতির জন্য আগামীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’। আর এই কাজে চীনকে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না দিতেই ভারত বিআরআই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত না হতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। [……”how to deal with an increasingly assertive China… in an uncertain, fluid international environment, this is going to be possibly the biggest challenge in India’s foreign policy in years to come,” ]

    তিনি মূলত বলেছিলেন BRI/OBOR প্রকল্পে যোগ দিলে ভারত চীনের জুনিয়র পার্টনার হয়ে যাবে। তাই ভারতের যোগদানের সম্ভাবনা নাই। [……joining OBOR, which is going to have strategic agenda for China, as a junior partner is highly unlikely for India. It might work for smaller countries, but for India it is a difficult proposition,”]

    এই কথাগুলো কান্থাসহ প্রো-আমেরিকান ধারার আমলারা যখন বলছিলেন, ভারত আমেরিকায় ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি নিজ ভর্তুকির পণ্য রফতানির সুযোগ তখনও বজায় ছিল। বিনিময়ে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতি নিজেরও নীতি, ভারতকে এটা আমল করে নিজ মুকুটে পালক হিসেবে লাগিয়ে রাখতে হয়েছিল। অশোক কান্থাসহ আমলাদের এই আমেরিকান ধারা এখন পরাজিত বলেই গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে চীন-ভারত য়ুহান সম্মেলন হতে পেরেছিল। বোঝা যাচ্ছে কংগ্রেসের রাহুল একেবারেই এতই নাদান যে বাস্তবের এসব ঘটনার কোনো ন্যূনতম তথ্যও তার কাছে নেই। তাই তিনি চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের সার্বভৌমত্বের আপত্তি নিয়ে কথা বলতে মোদীকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। যেন মোদী চীন সফরে যাচ্ছিলেন, পাকিস্তান অংশের কাশ্মীরে ভারতের নিজের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই করতে।

    ভারতের আরেক রাজনীতিক কাপিল সিবাল। তারও দল হল, সোনিয়া-রাহুলের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। মূলত তিনি দিল্লির চাঁদনী চক নির্বাচনী এলাকা থেকে সাধারণত নির্বাচনে দাঁড়ান। কিন্তু গত ২০১৪ সালের কেন্দ্র-নির্বাচনে তিনি এই আসন থেকে দাড়িয়ে হেরে গিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে তিনি ভারতীয় সংসদের দ্বিতীয় কক্ষ, রাজ্যসভার সদস্য। পেশাগতভাবে তার মূল পরিচয় মূলত তিনি হলেন দিল্লি সুপ্রিম কোর্টের উকিল, যিনি দিল্লি বার অ্যাসোসিয়েশনের তিনবারের সভাপতি। বিগত কংগ্রেস সরকারের দুই টার্মের তিনি অনেক মন্ত্রণালয়ের যেমন আইনমন্ত্রী, টেলিকমমন্ত্রী, মানবসম্পদমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। তাকে কংগ্রেসের সিনিয়র রাজনীতিবিদদের একজন মানা হয়।
    কাপিল গত ২১ মে টাইমস অব ইন্ডিয়া নিজের এক মতামত ছেপেছেন। এটা ছিল টাইমস অব ইন্ডিয়ার ব্লগে কাপিল সিবালের লেখা। এই লেখাটাকে পড়া যেত হয়ত রাহুল গান্ধীর তথ্য ও চিন্তার খামতি পূরণের একটা উদ্যোগ হিসেবে। কিন্তু তা যায়নি এ জন্য যে, এটা কাপিল সিবালের ব্যক্তিগত মতামত বলে উল্লেখ করেই ছাপা হয়েছে।

    কাপিলের এই লেখা বরং মোদিকে সার্টিফিকেট দেয়া বা এগিয়ে যেতে বাহবা দেয়া বলে মনে করা যায়। যেমন শিরোনামটাই তেমন বিনয়ের যদিও তা খোঁচা দেয়ারও। [Modi gets real on China: Wuhan summit demonstrated that a weak economy gives India few cards to deal]

    এতদিন আমেরিকার কথায় নেচে ফাঁপা হামবড়া দেখানো যে ভুল ছিল কাপিল তা স্বীকার করছেন। কিন্তু স্বীকার করেও এর দায় কেবল মোদীর ওপর ফেলতে চাচ্ছেন। বাংলায় কাপিলের লেখার শিরোনামটা হল, “আসল চীনের সামনে মোদী এখন বুঝছেঃ য়ুহান সম্মেলন দেখাল নিজের দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে চীনকে মোকাবেলা করতে যাওয়া ভারতের হাতে কার্ড খুব কমই আছে”। মোদী এখন বুঝুক – টাইপের কাপিলের এই বয়ান পুরাপুরি অন্যায্য। যেন মোদী একাই আমেরিকার প্ররোচনায় চীনের সাথে মিথ্যা হামবড়া করে বা এমন হামবড়া দেখিয়ে চলেছিল। অথচ সোনিয়া-প্রণবের কংগ্রেসের আমলেও (২০০৪-১৪) চীন মোকাবেলার ক্ষেত্রে তারাও কি আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর উসকানিতে’ তাল দিয়ে একই মিথ্যা হামবড়া করে চলেনি? আর কাপিল কি সেই দুই টার্মের কংগ্রেস সরকারের মন্ত্রী ছিলেন না? তাহলে একা মোদীকে দায় দেয়া কেন?

    যা হোক কাপিল তার লেখায় এবার সোজা দেনা পাওনার আলাপে চলে এসেছেন। বলছেন, “বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, বার্মা, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা – এসব দেশে চীন প্রায় দেড় শ’ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ভারতের অর্থনীতিতেও প্রধান সেক্টরগুলোতে চীন আমাদের বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ করবে। আমাদের ১৮টা বড় শহরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে সব বিনিয়োগ চীনাদের”। ইত্যাদি সব কথাই আছে সেখানে।
    কিন্তু এবার তিনি এক মজার আলাপ তুলেছেন।  চীনের বিরুদ্ধে কংগ্রেস সরকার যেসব অভিযোগ করত বা এখনো যেসব অভিযোগ, তিনি তার সব ফিরিয়ে নিচ্ছেন আর মোদীকেও তা ফিরিয়ে নিতে সুপারিশ করছেন। এটাই খুবই ইন্টারেস্টিং, স্রোত বদলের সরাসরি ইঙ্গিত।  “কিছু সত্য আমাদের মেনে নিতে হবে” – এই শিরোনাম দিয়ে তিনি এক তালিকা দিয়েছেন।

    বলছেন, “কিছু সত্য আমাদের মেনে নিতে হবে”।
    “চীন কখনো পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্ব ছাড়বে না। জাতিসঙ্ঘের উচ্চ আসনে চীনারা আমাদের প্রার্থিতা সমর্থন করবে না। [এই কাগুজে প্রার্থিতা  চীনের সমর্থন করার কোন কথা কোথায় হয় নাই। বুশ_ ওবামা দুজনের আশ্বাস দিয়েছিল। ] আবার নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপে সদস্য হিসেবে ঐ সংগঠনে আমাদের অন্তর্ভুক্তি চীনারা মেনে নেবে না। আমাদের বাজারে চীনের প্রবেশাধিকার থাকলেও প্রতিদানে আইটি সেক্টরসহ তাদের বাজারে আমাদের তারা প্রতিদান দেবে না। যদিও চীনারা সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে আমাদের তৈরী ওষুধ চীনা বাজারে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। এরকম অনেক তালিকা আছে। কিন্তু এখানে মূল কথাটা হলো, নিজে মেনে নেয়া এবং সবাইকে মেনে নিতে সুপারিশ করা”।

    আসলে ব্যাপার হল, এগুলো চীনের বিরুদ্ধে ঠিক ভারতের তোলা অভিযোগ নয়। বরং ভারতকে আমেরিকার দেয়া মিথ্যা আশ্বাসের তালিকা। যেমন জাতিসঙ্ঘ বা সাপ্লায়ার্স গ্রুপে ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করিয়ে দেবে, এই আলাপ ছিল ভারতকে দেয়া আমেরিকার মিথ্যা আশ্বাস।  আসলে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বও ছিল এতটাই নাদান যে, তারা এটা বিশ্বাস করেছিল। ধরে নিয়েছিল আ-মে-রি-কা; এই আমেরিকা চাইলে সবই যেন সে কাউকে দিতে পারে। তবে মূল কথা কাপিলের এসব বক্তব্য তাদের দলের নাদান সভাপতি রাহুলের বক্তব্যের চেয়ে অনেক বাস্তবে পা দিয়ে চলা – এমন কথা। অন্তত বক্তব্যের পটভূমি বুঝে তিনি কথা বলেছেন।

    তবে এই প্রসঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশেষ করে আমাদের কাকাবাবু প্রণব মুখার্জির গ্লোবাল ইতিহাসবোধের উদাহরণ না তুলে ধরে পারছি না। বুশ এবং ওবামার আমলেও  (বিশেষ করে ২০০৯ সালে ওবামা ক্ষমতায় আসার পর) ভারতকে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার সদস্যপদ ভারতকে এনে দেয়া হবে। আর প্রণব মুখার্জির মত নীতি নির্ধারকেরা তা বিশ্বাস করেছিল। এমনকী ভেটো ক্ষমতা পেলে সবার আগে পাবার সম্ভাবনা একালে মার্কেলের জার্মানী। সেই জর্মানি রাষ্ট্রও কেমন (P5+1) হয়ে ঝুলে আছে সেটাও লক্ষ্য করতে ভারত ভুলে গেছে। আর এর চেয়েও বড় কথা হল কেন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে ভেটোক্ষমতা সম্পন্ন রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাব করে, এর জন্ম দিতে হয়েছিল সে ইতিহাস জানলে যে কেউ বুঝবে কেন এখন পাঁচ ভেটো ক্ষমতাধর সদস্য একালে বাড়াতে যাবার সোজা মানে হল রাষ্ট্রসংঘের পুণর্গঠন। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একক ক্ষমতাধর আমেরিকা এখন একালে আর  সেই ক্ষমতাধর নয় অথবা কখনই ফিরে আসবে না। ফলে রাষ্ট্রসংঘ পুনর্গঠনের মুরোদ আর আমেরিকার নাই। আগামিতে ঠিক কার বা কার কার এই মুরোদ হতে পারে সবটাই আবছা। এছাড়া “রাষ্ট্রসংঘের পুণর্গঠন” এর জন্য কী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটবার প্রয়োজনীয় পুর্বশর্তের মত এবারও একটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগবে, তাই কী! বিশেষত যখন আমেরিকার এক নম্বর ক্ষমতাধর জায়গা থেকে বিদায়ের আলামত চারিদিকে ফুটে উঠেছে। অথচ সেই ঢলে যাওয়া লোলচর্ম  আমেরিকার পকেটেই যেন গ্লোবাল ক্ষমতা ধরা আছে এই হল কাকাবাবুদের গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে রিডিং।

    তবে আসল তামাশার কথা বলাটা এখনও বাকি। গত ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি শেষ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে প্রথম ভারত সফর করেছিলেন। সেখানে হাসিনাকে দিয়ে পঞ্চাশেরও বেশি পয়েন্টে হাসিনাকে দিয়ে স্বাক্ষরিত এক যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছিল। ওর ৪৭ নম্বর দফা ছিল এরকমঃ

    Responding to the Prime Minister of India, the Prime Minister of Bangladesh conveyed her country’s support in principle for India’s candidature for the permanent membership of the United Nations Security Council as and when the reform of the UN Security Council is achieved. Bangladesh conveyed its support to the Indian Candidature for a non-permanent seat in the UNSC for the term 2011-2012. India also conveyed its support to the Bangladesh’s candidature for a non-permanent seat in UNSC for the term 2016-2017.

    অর্থাৎ ঐ ঘোষণার ৪৭ নম্বর পয়েন্ট ছিল এরকম, “বাংলাদেশ ভারতের ভেটো সদস্যপদের দাবি সমর্থন করছে”। মানে বাংলাদেশকে দিয়ে যা মনে চায় তাই স্বাক্ষর করে নেয়া যায় বলে কাকাবাবু এটাও ছাড়তে রাজি হয় নাই। তার কোন মুল্য থাক আর নাই থাক। যদি লাইগা যায়! আসল কথাটা হল রাষ্ট্রসংঘের ভেটো সদস্যপদ ভারত আমেরিকার কাছে আবদার করেছিল। অথচ এটা আমেরিকার কাছে আবদার করে পাবার জিনিষ নয়, আমেরিকাও তা একক ইচ্ছায় কাউকে দান করার কখনই কেউ নয়, কেউ ছিলও না। এটাই কাকাবাবুরা বুঝেন না!

    এবার সবশেষে সুবীর ভৌমিকের দেয়া এক তথ্য। বিসিআইএম (BCIM) অর্থনৈতিক করিডোর কথাটা গণমাধ্যমে অনেক দিন উচ্চারিত হয়নি। উচ্চারিত হওয়া বন্ধই হয়ে গিয়েছিল ভারতের আপত্তি, অনাগ্রহের কারণে। বিসিআইএম হল, বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার এই চার দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে লেখা নাম। এই নাম দেয়া হয়েছে কলকাতা থেকে বাংলাদেশ হয়ে এরপর বার্মার গুমদুম হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত এক অর্থনৈতিক করিডোর অবকাঠামো প্রকল্প, যার নাম বিসিআইএম (BCIM)। সুবীর বলছেন, “য়ুহানে মোদি-শি জিংপিংয়ের বৈঠকের একটা ইতিবাচক ফল মনে হচ্ছে আসন্ন হয়ে উঠেছে”। কলকাতায় চীনা দূতাবাসের এক কনসাল জেনারেল লেবেলের অফিস আছে। সেই কনসাল জেনারেল  (Ma Jhanwu ) মা ঝানয়ু-এর বরাত দিয়ে সুবীর জানাচ্ছেন, তিনি এক প্রেস কনফারেন্সে বলেছেন, বিসিআইএম প্রকল্প এখন শুরু হবে কারণ এ দুই শীর্ষ নেতা একমত হয়েছেন যে, এই প্রক্রিয়া সামনে এগিয়ে নিতে হবে।’ [……”BCIM would take off now because the two leaders had agreed to take the process forward”. ]

    খুবই তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি, যদিও খুবই কম তথ্য এটা সন্দেহ নেই। বিশেষ করে সড়ক ও রেল যোগাযোগের বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর ব্যবস্থা চালু হয়ত হয়ে যাবে কখনও। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর, যেটা ছিল বিসিআইএম প্রকল্পের সাথে সংযুক্ত, এক গভীর সমুদ্রবন্দর অবকাঠামো। এ ছাড়া আরেকটা দিক আছে। বন্দর সুবিধাসহ সব মিলিয়ে বিসিআইএম প্রকল্পও চীনা ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ একটা অংশ হওয়ার কথা। ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি গভীর সমুদ্রবন্দরের সংযোগ সুবিধা থাকার কথা, বিসিআইএম প্রকল্প তার একটি। তাহলে ভারত কি আস্তে ধীরে বেল্ট-রোড উদ্যোগের অংশীদার হওয়ার পথে?

    না এটা এখনই অতিরিক্ত আশা। যদিও তা কোনো দিন হবে হয়ত, এমন অনুমান করা অবাস্তব হবে না। তবে খুব সম্ভবত আমরা অনেক আগেই এবং বেশি দ্রুত তা অনুমান করছি। যদিও একটা বিষয় এখনই পরিষ্কার করে রাখা যায়।

    য়ুহান সম্মেলনের কোনো ফলাফল যদি আসতে শুরু করে, তবে তা হবে সবার আগে শুরু হবে, ভারতের একান্ত নিজের জন্য নেয়া চীনা অবকাঠামো প্রকল্পগুলো থেকে। চীন-ভারত সম্পর্ক সবার আগে এদিক দিয়ে উন্মুক্ত হবে। কিন্তু এর অর্থ বাংলাদেশেরও চীনা অবকাঠামো প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় বর্তমান যে আপত্তিগুলো আছে তা আপনাতেই সরে যাওয়া নয়। ভারতীয় কূটনীতিতে এ দুটো আলাদা বিষয়। বাংলাদেশে চীনা অবকাঠামো প্রকল্প ভারতের আপত্তি এখনও সক্রিয় আছে বলেই সম্ভবত এবার প্রধানমন্ত্রীর শান্তিনিকেতন সফরের সময়, কথিত ভারতের কাছ থেকে “প্রতিদান” পাওয়ার আলাপ উঠতে আমরা দেখেছি। সেই সাথে আমরা দেখেছি, কথিত “প্রতিদান” পাওয়ার জন্য সরকারের বেপরোয়া কাছাখোলা ও মরিয়া অবস্থা। যদিও এ ব্যাপারে আবার সরকারের সর্বশেষ অবস্থান হল, নিজের মরিয়া দুর্দশা সে আর বাইরে দেখাতে চাচ্ছে না। গত বুধবারের প্রেস কনফারেন্সে তাই বোধহয় একটু ইউ-টার্ণ। যদিও আগের দিন ২৮ মে সরকারি প্যানেল সাংবাদিক নেতাদের আলোচনা সভা ছিল অভুতপুর্ব, দেখার মত।  খুব সম্ভবত, প্রতিদান পাবার বেপরোয়া দেখালেও কোনো ফল আসবে না বা আসছে না, এমন হয়ত তাদের অনুমান।

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে গত ৩১ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিচ্ছে ভারত!”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]