Tag: নেপালি মাওবাদী প্রচন্ড

  • নেপালে প্রধানমন্ত্রীর অলি-যুগ সমাপ্ত

    নেপালে প্রধানমন্ত্রীর অলি-যুগ সমাপ্ত

    গৌতম দাস

    ২৬ জুলাই ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

     

    NC President Deuba meets with UML Chair Oliকে পি অলি ও শের বাহাদুর দিউবা। ছবি সংগৃহীত

    নেপালের প্রধানমন্ত্রী খড়গ প্রসাদ অলি [Khadga Prasad Sharma Oli] বা কে পি অলি  এখন থেকে ‘সাবেক’ প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলেন। দলের বিরুদ্ধে গিয়ে  বৈধ-অবৈধ সব ধরণের পথে  নিজের প্রধানমন্ত্রীত্ব ধরে রাখতে চেষ্টা করেও তিনি এবার একেবারে ব্যর্থ হলেন।  গত ২০১৮ সালের প্রথম নেপালি পার্লামেন্টের নির্বাচনে তিনি  এবারের ক্ষমতায় এসেছিলেন।  কিন্তু এবার তার ক্ষমতা চলে গেল সংসদের সিদ্ধান্ত বা তার নিজের পদত্যাগ ইত্যাদি এসবের কোনো কারণে নয়।  তিনি নিজেকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েই বসে ছিলেন। গত ১২ জুলাই ২০২১, নেপালি সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে তিনি পদচ্যুত হয়েছেন। আর সেই সাথে আদালত নেপালি কংগ্রেসের শের বাহাদুর দিউবাকে গত ১৩ জুলাই বিকাল ৫টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিতে বলেছিলেন। দিউবা শপথ নিয়েছেন। এতে দেড়-দুই বছর ধরে অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা নেপাল ও এর সরকার, নেপালি রাজনৈতিক দলগুলো অলির বিরুদ্ধে নানান অসন্তোষ ও অভিযোগ এসব কিছুর অবসান ঘটল। এ সময়ে বারবার অলির বিরুদ্ধে নিজ দল ও বিরোধীদের অভিযোগ ও অসন্তোষ জেগে উঠলেও তিনি বরং যেকোনো উপায়ে বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে হলেও ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করে গেছেন। এ সময়ে তিনি  দু-দু’বার ‘সংসদ ভেঙে দেয়া হয়েছে’ বলে প্রেসিডেন্টকে দিয়ে ঘোষণা করিয়েছেন। কিন্তু দু’বারই আদালত এই সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে দিয়েছেন। তাই আদালতের রায়ে অবৈধ ও ক্ষমতাচ্যুত হয়ে যাওয়া অলি এখন রাজধানী ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে। আর এই প্রথম দিউবা সরকার আগামী নির্বাচনের (২০২৩) আগে টানা দেড় বছর আইনগতভাবেই স্থিতিশীল ক্ষমতায় শাসন চালাতে পারবেন বলে নেপালের রাজনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা আশা দেখছেন। কিন্তু কেন এমন হল? ২০১৮ সালে দুই কমিউনিস্ট পার্টি মিলে টু-থার্ড মেজরিটিতে ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু এখন নেপালি কংগ্রেসই কিছু কমিউনিস্টের সমর্থনে সরকার গড়তে সক্ষম হল কেন?

    এক নেপালি দৈনিক কাঠমান্ডু পোস্টে শ্যাম শ্রেষ্ঠ নামে এক কমেন্টেটর যিনি বাম রাজনীতির পরিবর্তনগুলোর দিকে চোখ রাখেন তিনি কে পি অলি সম্পর্কে মূল্যায়ন করে লিখেছেন, ” ২০১৮ সালের নির্বাচনের রায়ে যে ঐতিহাসিক সুযোগ তাদের হাতে এসেছিল, অলি ক্ষমতার যথেচ্ছ অপব্যবহার করে তাকে হেলায় হারিয়ে ফেললেন। কারণ অলি এক দাম্ভিক, অর্থহীন একগুঁয়ে আর ইগো বা অহংবোধে আচ্ছন্নব্যক্তিত্ব [“Oli squandered a historic opportunity handed to him by the people because of his arrogance, stubbornness and ego,” । বোঝা যাচ্ছে, যথেষ্ট শক্ত অবজারভেশন এবং সম্ভবত তা সবচেয়ে সঠিক!

    গত ১৯৯৬ সালের আগে থেকেই অলির পুরনো রাজনৈতিক দল এক ‘কমিউনিস্ট পার্টি’ বলে পরিচিত। এর নাম কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনাইটেড মার্কসবাদী-লেনিনবাদী, UML)।  আমাদের সিপিবির মত দল হলেও কিন্তু এটা আবার নেপালের সেকালের পরিবেশে মূলত সংসদীয় ভোটে দাঁড়ানো দল। তাও নেপালে রাজতন্ত্রের আমলের (২০০৮ সালের আগের ২৪০ বছরের রাজতন্ত্র) এমন ভোটে দাঁড়ানো দলগুলো হতো রাজার দিকে মুখ চাওয়া দল; যদি রাজা তার দলকে সরকার গঠন করতে ডাকেন বা মন্ত্রিসভায় নেন তবে, সেটা হত তাদের সাফল্য; অর্থাৎ নেপাল তখন নাগরিকের হাতে ক্ষমতার রাষ্ট্র নয়, রাজার মালিকানাধীন এক রাজতান্ত্রিক নেপাল। তাই তাতে ওই সব দলের নামে কমিউনিস্ট শব্দ থাকুক কিংবা কংগ্রেস দল হোক কী-ই-বা আর আসে-যায়। আসা-যাওয়ার কোনো কারণ নেই, এমনই ঠুটা দল ছিল সেগুলো।

    কিন্তু সেকালে নেপালের রাজার সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক-ভারসাম্য এমন থাকলেও তাতে ব্যাপক ফাটল ধরে ও পরিবর্তনের সূচনা করেছিল ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির পর থেকে। কারণ ঐ বছর থেকে আরেক কমিউনিস্ট দল যারা ‘মাওবাদী’ নামেই বেশি পরিচিত; আনুষ্ঠানিক নাম তাদের যাই হোক না কেন, তাদের নাম নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী) বা কখনো এদের নাম ছিল নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী-কেন্দ্র)। একে অনেক নাম নিতে হয়েছিল, কারণ কোনো ছোট গ্রুপ মূল দলের ভেতর অঙ্গীভূত হলেই নামের একটু পরিবর্তন করা হয়েছে, এমন।

    এভাবে মূলত মাওবাদীরাই নেপালের রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন বা ভারসাম্যে পরিবর্তন এনেছিল। অথচ অন্য সবাই যেখানে আইনি রাজনৈতিক দল, মাওবাদীরা ছিল জন্ম থেকেই সশস্ত্র দল। শুধু তা-ই নয়, এরাই ১৯৯৬ সালে জন্ম নিয়ে দাবি তুলে ছিল যে, নেপালের রাজতন্ত্র উৎখাত করে একটি রিপাবলিক মানে “গণপ্রজাতান্ত্রিক নেপাল রাষ্ট্র” কায়েম করতে হবে। এই লক্ষ্য তারা শেষে ২০০৮ সালের জুনে অর্জন করেছিল। তাদের সব রাজনৈতিক দল মিলে জোট এক গণঅভ্যুত্থানে রাজাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল।  তারা নেপালে রাজতন্ত্র উৎখাত করে আর এতে একটি রিপাবলিক মানে গণপ্রজাতান্ত্রিক নেপাল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পথ খুলে যায়। তবে এরই মধ্যে রাজার আমলের পুরনো দলগুলোর সাথে মাওবাদীসহ সবাই ২০০৬ সাল থেকেই আইনি (প্রকাশ্য গণ-আন্দোলনের দল) দল হিসেবে নিজেদের যৌথ অবস্থান প্রকাশ করে নিয়েছিল। এর ভেতর দিয়েই মাওবাদী দলের প্রধান পুষ্পকমল দাহাল-ও ক্রমেই প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেন।

    কিন্তু তবু একটা ট্র্যাজিডি নেপালের রাজনীতিকে সবসময় অস্থির করে রেখেছে। তা হল আজ পর্যন্ত নেপালের রাষ্ট্র গড়ার কাজে যতটুকু অর্জন বা অগ্রগতি হয়েছে, এতে সবচেয়ে বড় অবদান মাওবাদীদের হলেও এই দলের নির্বাচনী ভাগ্য খুবই খারাপ। নেপালে ২০০৮ ও ২০১৩ সালে দু-দু’বার কনস্টিটিউশন প্রণয়নের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে হয়েছিল। কারণ, প্রথমবার ভারতের প্ররোচনায় ও প্রভাব হস্তক্ষেপে পড়ে প্রতিনিধি সভা নির্ধারিত সময়ে কনস্টিটিউশন প্রণয়নে ব্যর্থ হয়েছিল। তাই নেপালি সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তারা দ্বিতীয়বার কনস্টিটিউশন প্রণয়নের প্রতিনিধি নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ (২০১৩) পেয়েছিলেন। পরে ২০১৫ সালে কনস্টিটিউশন রচনা সমাপ্ত ও গৃহীত হওয়ার ঘোষণা দেয়ায় ভারত প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। পরে ২০১৮ সালেই নেপালের নতুন রিপাবলিকে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এসব নির্বাচনে কখনোই মাওবাদী দল একা সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ মানে পঞ্চাশ ভাগের বেশি আসন দখল করতে পারেনি। অথচ নেপাল এত দূর আসতে যত দেশী-বিদেশী বাধা নেপাল পার হয়েছে, তাতে দাহালের ভূমিকা সবার ওপরে, বিশেষ করে অন্য দলগুলোকে সাথে নিয়ে সঙ্কট মোকাবেলার মূল অর্গানাইজার হিসেবে দাহালই ভূমিকা রেখেছেন।

    যেমন রাজা উৎখাতের পরে ২০০৮ সালের প্রথম নির্বাচনে মাওবাদীরা জিতে ২৯.২৩ শতাংশ আসন, যদিও এটা মূল তিনটি দলের মধ্যে একক সর্বোচ্চ। অন্য দুই দল নেপালি কংগ্রেস পেয়েছিল ২১.১৪ শতাংশ আর অলির দল পেয়েছিল ২০.৩৩ শতাংশ; অর্থাৎ মোট ৬০০ আসনের (সেটা প্রতিনিধি সভা ছিল তাই মোট আসন ৬০০) মধ্যে টপ তিনটা দলের আসনসংখ্যা হিসাবে ফল যথাক্রমে মাওবাদী ২০০,  নেপালি কংগ্রেস ১১০ ও অলির দল ১০৩।

    অর্থাৎ নেপালের রাজনীতিতে ২০০৮ সাল থেকেই ভোটের ফলের এই ‘ত্রিভঙ্গ অবস্থা’ মানে, তিন দলের তিন ভাগে বিভক্ত ভোট, কেউই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (বা ৫০% এর বেশি আসন) পায় না  – এ্টা ২০০৮ সাল থেকে আজো একই অবস্থা বজায় থেকেছে; যদিও ২০১৩ সালের দ্বিতীয়বারের কনস্টিটিউশন সভার প্রতিনিধি নির্বাচনে সেবার নেপালের ভোটাররা মাওবাদীদের ওপর শুধু না, সামগ্রিক রাজনীতির ওপর প্রচণ্ড আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। এর প্রতিফলনে ফল হয়েছিল নেপাল কংগ্রেস ১৯৬, অলির দল ১৭৫ আর মাওবাদী হয়ে যায় মাত্র ৮০ আসন।

    নেপালি কংগ্রেস মানে হল ট্র্যাডিশিনাল ও বয়স্কদের দল; তুলনায় মাওবাদীরা তরুণ ও বিপ্লবীদের সমর্থক ভোটারদের দল; এভাবে হয়তো ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু ভারতের প্ররোচনায় প্রথমবারের প্রতিনিধি সভা নির্ধারিত সময়ে কনস্টিটিউশন প্রণয়নে ব্যর্থ হওয়ায় মানে রাজতন্ত্র ভেঙে দেয়ার পরও নিজ রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়ে নিতে ব্যর্থতা দেখে তারা প্রচণ্ড হতাশ হয়ে যায় তরুণেরা এরই প্রতিফলন ছিল ২০১৩ সালে ফল। কিন্তু তিন দলের কেউই যে একাই পঞ্চাশ ভাগের বেশি আসন পার হতে পারেনি, সেই ধারা ২০০৮ সালের মতো এখনো বজায় আছে।
    তবে সেবার অন্য একটি বড় ইতিবাচক দিক ছিল। তা হলো দাহালের উদ্যোগে ২০১৩ সালে এই তিন দল শপথ নেয় যে, একটা কনস্টিটিউশন প্রণয়নের কাজ শেষ করা অবধি তারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবে; ভারতের দিকে তাকাবেও না; যোগাযোগ সম্পর্ক করবে না। এর ফলেই ভারতকে চরমভাবে পরাস্ত করে এই তিন দল (যারা একত্রে ৭৫ ভাগ আসনধারী) ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নেপালের কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সম্পন্ন ও গৃহীত হয়েছে বলে ঘোষণা দিতে সক্ষম হয়। এটা ছিল ভারতকে পালটা জবাব দেয়া বা প্রকাশ্য বিরোধিতা ও উপেক্ষা। কারণ নেপালের এই কনস্টিটিউশন প্রণয়ন কেমন হবে তা নিয়ে ভারত দাবি, শর্ত বা চাপ দিয়ে যাচ্ছিল। বিশেষ করে ভারতের সাথে নেপালের সমতলী সীমান্ত এলাকার ‘মাধোসি ও তরাই অঞ্চলের’ মুখপাত্র সাজতে চাইছিল ভারত।

    কিন্তু নেপালের কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সম্পন্ন ও গৃহীত হয়েছে বলে ঘোষণা ভারত ঠেকাতে না পেরে শেষে ল্যান্ডলকড নেপালে যেখানে বাইরের পণ্য প্রবেশ করতে গেলে ভারতের অনুমতি ও সহযোগিতা লাগে- এরই ফিজিক্যাল বাধা তৈরি করে ভারত। তারা স্থলবন্দর বন্ধ করে দেয়। ফলে জ্বালানি তেল বা রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারসহ যা ভারতের স্থলবন্দর দিয়ে সরবরাহ করতে চুক্তিবদ্ধ ছিল, সেসবের যেকোনো পণ্যবাহী ট্রাক অবরোধ করে রাখে ভারত।

    এ ঘটনায় প্রতিক্রিয়ায় নেপালের রাজনীতিক সমাজে এক ব্যাপক পোলারাইজেশন ঘটে গিয়েছিল। দল নির্বিশেষে নেপালের নাগরিকমাত্রই ভারতবিরোধী হয়ে ওঠে। এমনকি নেপালি কংগ্রেসও যাকে সবচেয়ে ভারতঘেঁষা মনে করা হয়, সেও। বাস্তবে কথাটা এমন হয়ে যায় যে, কারো বাসায় রান্না হয়নি মূলত ভারতের কারণে। কারণ ভারতীয় গ্যাস বন্ধ। যেখানে নারীদের দুর্দশা সবার উপরে। কারণ পরিবেশ রক্ষার চাপে থেকে পাহাড়ের পাতা বা কাঠ টোকানি জ্বালানিতে রান্না তাদের বহু আগেই ত্যাগ করতে হয়েছিল। আর তারা অভ্যস্ত হয়েছিল ভারতীয় সিলিন্ডার গ্যাসে। অথচ তখনকার ভারতীয় অবরোধের দিনে চাইলেই আবার সে কাঠ টোকানি আর চুলার দিনে ফেরত যাওয়া খুবই কঠিন প্রায় অসম্ভব।

    এ দিকে সে সময় কনস্টিটিউশন চালুর পরে নেপালে তিন দলীয় বোঝাবুঝি অনুসারে, সরকার গড়ার পালা এসেছিল অলির দলের। তিনি ক্ষমতায় এসেই ভারতবিরোধী প্রবল সেন্টিমেন্ট সফল ব্যবহারকারী হয়ে ওঠেন আর এতে নিজের দলের সাংগঠনিক ভিত্তি বাড়িয়ে নেন। এই একটা ক্ষেত্রে অলি আনপ্যারালাল এ তিনি পাবলিক সেন্টিমেন্ট তৈরি বা সেতা কাজে লাগানো ভাল পারেন। তাই সেসময়  হয়ে ওঠেন ভারতবিরোধী জনতার কণ্ঠস্বর। আর তিন দলই সিদ্ধান্ত নেয় এই প্রথম চীনের সাথে নেপালের যোগাযোগ সম্পর্কের। কারণ অন্তত জ্বালানিসহ পণ্য আমদানির বিকল্প উৎস নেপালের লাগবেই।

    এভাবে ছয় মাস টানা অবরোধের পরে ভারত, ওদিকে চীনের আগমন মানে যোগাযোগ সম্পর্কে টের পেয়ে অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু তত দিনে চীন নেপালে প্রবেশ সম্পন্ন করে ফেলেছিল। তখন থেকেই এক নতুন নেপাল : এখান থেকেই নেপাল একেবারেই বদলে যায়; যাকে বলা যায় নেপালের একেবারেই ভারতের হাতের বাইরে চলে যাওয়া। আর বিপরীতে চীনের প্রভাব দ্রুত বেড়েই চলে, অথচ ভারত নিজের পায়ে কুড়াল না মারলে এমন হতো না।  আর এতে চীন শুধু পণ্য সাপ্লাইয়ের বিকল্প প্রধান উৎসই নয়। এমনকি বিভিন্ন অবকাঠামোর বিনিয়োগদাতা অবশ্যই। চীনের নিজের সড়ক হাইওয়ে বা হাইস্পিড ট্রেন লাইনের সাথে (কাঠমান্ডু পর্যন্ত) প্রায় শত কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণ ও নতুন রেল পেতে দিয়ে নেপালকেও চীনের নিজের অবকাঠামোর সুবিধার হাত বাড়িয়ে দেয়। এখানেই শেষ নয়।

    তত দিনে চীন নেপালের ক্ষমতাসীন ও বাইরের দুই কমিউনিস্টদের বন্ধু হয়ে উঠেছিল। তাই কনস্টিটিউশন চালু হওয়ার পরের ২০১৮ সালের প্রথম  সংসদীয় নির্বাচন লড়তে দুই কমিউনিস্ট দল একদল হয়ে গিয়ে লড়ুক,  তাদেরকে এ’পরামর্শ দিয়েছিল চীন। আপাত সেই ফল হয় সকলের জন্য যাকে বলে “বলতি বন্ধ” মানে বিরোধী সকলেই আর নিজের কোন সম্ভাবনা নাই যেন তা ধরে নিয়েছিল। যৌথ দু’দল দু-তৃতীয়াংশ আসনে ঐ নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল। দল দুটো এক হওয়ার প্রক্রিয়ার শুরু ঘোষণা দিয়ে (আইনগতভাবে একদল না হয়েই) ওই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ফলে আইনত ওটা নির্বাচনী জোটের বিজয় ছিল। দাহাল ও অলির দল দুটোর [UML-CPN] বছর খানেকের মধ্যে এক দল হয়ে যায়। ততদিনে তাদের সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে কেপি অলি আগের মতই নতুন সরকারেরও প্রধানমন্ত্রীই থেকে যান। তবে কথা ছিল পুরানা দুই অংশের প্রধানেরা একজন দলীয় সভাপতি হলে অন্যজন প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু অলি সেটা কখনোই বাস্তবায়ন করতে রাজি হননি, নানা অজুহাতে।

    এ ব্যাপারে অলির ট্র্যাক রেকর্ড খুবই খারাপ। তিনি কারো সাথে চলা, ক্ষমতা শেয়ার করা, সিদ্ধান্ত শেয়ার ইত্যাদি এসব কোনো কিছু করতেই অভ্যস্ত বা আগ্রহী নন। তাই বিরোধ বাড়তে থাকে। তবে এসবের জন্য অলিই যে মুখ্যত দায়ী এর এক বিরাট প্রমাণ আছে।  দুইদল এক হয়ে চলতে শুরু করায় দেখা গেল যারা অলির অংশের অলি ছাড়া অন্যান্য নেতা ছিল তাঁরা খুবই সহজে অপর অংশ মানে দাহালের অনুসারিদের সাথে মিলে দাহালের সাথে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তুলে। আসলে এরা যখন অলির সাথে এক দলে ছিল তখন থেকে এরা অলির একচেটিয়া নেতাগিরিতে চরম বিক্ষুব্ধ ছিল। একারণে মাধব কুমার নেপাল, ঝালানাথ খানাল, বামদেব গৌতম, নারায়ন কাজি শ্রেষ্ঠ প্রমুখ নেতারা (এরা দুই পক্ষের নেতা হলেও) এখন মিলে মিশে দাহালের অনুসারি হয়ে আছেন। আর বিপরীতে অলি এখন একা। অথচ যেমন এই মাধব কুমার নেপাল ছিলেন অলির অংশে দলের ১৫ বছরের সাধারণ সম্পাদক, দুবছরের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু অলির স্বভাব হল তার একার সিদ্ধান্ত সবাইকে মানতে বাধ্য করা। ফলে কোন দলীয় ফোরাম, সেখানে আলোচনা ইত্যাদি যেন তার অভিধানে নাই।

    কিন্তু  একদিকে দলের ভিতর সংঘাত যতই বাড়ছিল ততই চীনের পরামর্শও জোরদার হচ্ছিল  যেন কোনো সঙ্ঘাত বা বিরোধ না করতে। এজন্য দাহালেরা দুবার অলিওকে প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে সবাবার উদ্যোগ  নিয়েও পিছিয়ে এসেছিলেন। আসলে চীন উদ্বিগ্ন ছিল অলি দলে একঘরে হয়ে দল ভেঙ্গে গেলে কী হবে কেবল সেদিকে।  অথচ কেউই যে তার সাথে দল করতে  বা দলে থাকতে পারবে বা এদিকটাকে খাটো করে দেখছিল।  অর্থাৎ শুরু থেকেই এটাই ছিল বিরাট সমস্যা। ফলে বড় জোড় দুই দল মিলে একটা জোট করতে পারত হয়ত যেটা অবস্থা বুঝে যারা একদল হতে চায় তারা অবস্থা ভাল বুঝলে যেন তা হতে পারে এজন্য অপেক্ষা করতে পারত।

    খুব সম্ভবত চীনের অনুমিত কমিউনিস্ট পার্টি বলতে  নিজের অভিজ্ঞতা, আর সেটা দিয়ে নেপালের কমিউনিস্ট পার্টিকে চাওয়া থাকতে পারে। তাই এখন যা হল, সেটা চীনের পরামর্শে ২০১৮ সালের বিজয়ের পরে শুরু হওয়া বিরোধটাকে টেনে আজ প্রায় তৃতীয় বছরে টেনে শেষ করা হল। তবে এত লম্বা টানাটানি যে অর্থহীন ছিল তা হয়তো চীন এখন স্বীকার করবে। আর তা ছাড়া নেপালে দুই কমিউনিস্ট দলের এক না হতে পারার বিরোধে চীনের সংশ্লিষ্টতা (চীনের দলের লোক এসে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছে অথবা চীনা রাষ্ট্রদুত নেপালের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে খারাপ দেখায় এমন দীর্ঘ সময় বৈঠক করেছে কারণ, প্রেসিডেন্ট অলির দলের অনুসারি, এসব ঘটছিল) বিরাট দৃষ্টিকটুভাবে হাজির হতে শুরু করেছিল, যা চীনের পক্ষে যায়নি।

    সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী অলি নিজ দলকে (তত দিনে তা এক দল) অমান্য করেই বেপরোয়া হয়ে এককভাবে ক্ষমতায় ছিলেন,  [His unilateral style of running] । কিন্তু একা সব সিদ্ধান্তে চলা ব্যক্তিত্ব অলির সাথে থাকা তার দলের লোকজন তত দিনে তাকে ছেড়ে দাহালের পক্ষে চলে যায়। একপর্যায়ে অলি নিজের ক্ষমতার বিপদ বুঝে এবার এতদিনের প্রবল ভারতবিরোধী অলি ভারতের দ্বারস্থ হন। ভারতের ‘র’-এর প্রধানকে প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে দাওয়াত করে এনে সারা দিন মিটিং করেন। উদ্দেশ্য ছিল, নেপালি কংগ্রেসের সমর্থনে নতুন সরকার গড়া। কিন্তু তত দিনে কংগ্রেস দলের ভেতরেও উপদল থাকায় তা তত জমে ওঠেনি। বরং কমিউনিস্টদের যে অংশ নেপালি কংগ্রেসকে সমর্থন করবে, তাদের সাথেই তারা সরকার গঠন করবে সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল। কিন্তু বহু সংসদ সদস্য কেনাবেচা, এমনকি  অধ্যাদেশ জারি করে কনস্টিটিউশন বদলে নিজেকে প্রধানমন্ত্রী রাখার চেষ্টা- এসব কিছুর শেষে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট অলির এসব তৎপরতাকে অবৈধ বলে ঘোষণা দেয়ার পর এবার নেপালি কংগ্রেসের শের বাহাদুর দিউবা গত ১৩ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণের পথ খুলে যায় এবং তিনি এখন নেপালের প্রধানমন্ত্রী।

    অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে কে পি অলির রাজনৈতিক জীবন এরপর আর কোন গুরুত্ব কিছু থাকবে না। এদিকে জোর করে রাজনৈতিক ঐক্য হবে না; টিকবে না। তাতে সেটা আপনার জন্য যত দরকারিই অনুভব হোক না কেন! নেপালে কমিউনিস্ট দলদুটোর ঐক্যে থাকার পক্ষে চীনের অতিরিক্ত আগ্রহ দেখিয়ে ফেলা যে অপ্রয়োজনীয় ছিল, অনুমান করি চীন তা এখন অনুভব করবে ও শিক্ষা নেবে। দুনিয়ায় কারো জন্য কোন কিছু ঠেকে থাকে না। অলির জন্যও নয়!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২৪ জুলাই  ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “নেপালে প্রধানমন্ত্রী অলির যুগ শেষ“ – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা

    নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা
    গৌতম দাস
    ২৩ আগষ্ট ২০১৬, সোমবার

    নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা

     

     

    নেপালের রাজনীতিতে আবার কিছু উত্তাপ দেখা দিয়েছে। মাওবাদী নেতা ৬১ বছর বয়সী পুষ্পকমল দাহাল (প্রচণ্ড) আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আবার বলছি এ জন্য যে, তিনি নেপাল থেকে রাজতন্ত্র উৎখাতের নায়ক। রাজতন্ত্র উৎখাতের পর নেপালে ২০০৮ সালে এই মাওবাদী গেরিলা নেতা প্রথম নির্বাচিত ও পপুলার প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন । কিন্তু এর পরের ও সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে নেপালের ৫৯৫ জনের আসনের পার্লামেন্টে প্রাপ্ত আসন বিন্যাসে নেপাল রাজনীতিতে প্রধান তিনটা দলের অবস্থান ছিল, নেপালি কংগ্রেস ১৯৬ আসন, লিবারেল কমিউনিস্ট দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল বা সিপিএন (ইউএমএল) এর ১৭৫ আসন আর মাওবাদী কমিউনিস্ট ইউসিপিএন (মাওবাদী সেন্টার)-এর ৮০ আসন। এটাই চলতি   সংসদের আসন বিন্যাস। এভাবে মোট ৪৫১ আসন (৭৫% আসন) এই তিন দলের ভাগে আর বাকি ১৪৪টা আসন আরো প্রায় ২৭টা ছোট ছোট দলের (মাধেসি ও ত্বরাই অঞ্চলের দলসহ) মধ্যে বিভক্ত। ফলে এমন আসনবিন্যাস অনুসারে মূল তিন দলের প্রতি দুই দলের জোট হলেই সরকার গঠন সম্ভব। কারণ তাতে কোয়ালিশন অর্থে কোনো সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখানো সম্ভব। ২০১৩ সালের নির্বাচনের পর থেকে এর আগে দু-দু’বার কোয়ালিশন সরকার হয়েছিল, যা এবা্রেরটা নিয়ে তৃতীয়বারের কোয়ালিশন সরকার হল। প্রথমটা ছিল নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্বে লিবারেল কমিউনিস্টদের সমর্থনে সরকার গঠন । আর টিকেছিল ফেব্রুয়ারি ২০১৪ থেকে অক্টোবর ২০১৫ পর্যন্ত। যেখানে মাওবাদী ছিল বাইরে বিরোধী দলে। নেপালের প্রথম কনস্টিটিউশন অনুমোদিত ও গৃহীত হয়েছিল ঐ সরকারের আমলে, তবে প্রধান তিন দলেরই সক্রিয় জোটবদ্ধ সমর্থনে। এরপর ওই প্রথম কোয়ালিশন সরকার ভেঙে দ্বিতীয়বার কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়েছিল। সেবার তা হয়েছিললিবারেল কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে খাড়গা প্রসাদ অলিকে প্রধানমন্ত্রী করে  আর মাওবাদী কমিউনিস্টদের সমর্থনে, যা টিকেছিল গত ২৪ জুলাই ২০১৬ পর্যন্ত মাত্র ৯ মাস। আর সেখানে নেপালি কংগ্রেস ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দলে ছিল। আর এবার আবার মাওবাদী নেতৃত্বে আর নেপালি কংগ্রেসের সমর্থনে সরকার গঠন হয়েছে, আর লিবারেল কমিউনিস্টরা আছে ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দলে। অর্থাৎ সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে কারো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় ঝুলন্ত পার্লামেন্ট তৈরি হওয়ায় এটা স্বাভাবিক যে এ পর্যন্ত তৃতীয়বার কোয়ালিশন সরকার দেখা হয়ে গেল।

    গত ৪ আগস্ট ২০১৬ মাওবাদী নেতা ৬১ বছর বয়সী পুষ্পকমল দাহাল প্রচণ্ড প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এর আগের দিন পার্লামেন্ট ভোটে এই নেতা দাহাল, কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন লাভ করেছিলেন। কিন্তু সরকার বদলের ঘটনায় আনসিন বা অদেখা অংশে কী ঘটেছিল?
    বলা হয়ে থাকে নেপালের প্রধান তিন দল নেপালি কংগ্রেস, লিবারেল কমিউনিস্ট দল সিপিএন (ইউএমএল) আর মাওবাদী কমিউনিস্ট ইউসিপিএনের মধ্যে ভারত নিজের দিক থেকে সে যার ওপর সবচেয়ে খাপ্পা সে দল হলো বিগত প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রসাদ অলির লিবারেল কমিউনিস্ট। ভারতের এক থিংকট্যাংক জাতীয় সংগঠন যার নাম  “সাউথ এশিয়া অ্যানালাইসিস গ্রুপ”। তাদের রাগ-ক্ষোভ পাঠ করে আমরা ব্যাপারটাকে বুঝতে চেষ্টা করব। নেপালের রাজনৈতিক পরিবর্তনে মাওবাদী দাহাল সরকার শপথ নেয়ার দিন ছিল গত ৪ আগস্ট আর ওই দিন প্রকাশিত হয় ড. এস চন্দ্রশেখরের নামে একজনের লেখা তাদের এই রিপোর্ট। বিগত প্রধানমন্ত্রী অলি সম্পর্কে তিনি লিখছেন, “অলি ছিল তিতা। (বলতে চাচ্ছেন পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী অলির সমাপনী বক্তৃতার ভাষা ছিল তিতা) তাঁর তিতা হওয়ার কারণ আছে। কারণ নেপালি কংগ্রেস আর মাওবাদী দুই দলই তাকে নিচু করেছে, নিচু দেখিয়ে ছেড়েছে। অলি বলেছেন, যেভাবে তার সরকারকে নামানো হয়েছে এটা নীতিবিহীন ও তা কাম্য ছিল না”। লেখক চন্দ্রশেখর নেপালের সংসদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলির দেয়া ১১০ মিনিটের সমাপনী বা শেষ বক্তৃতার কথা বলছিলেন। চন্দ্রশেখর বলছেন, ‘সবাই অলিকে অদক্ষতা ও অযোগ্য শাসকের অপবাদ দিয়ে ক্ষমতা থেকে নামিয়েছে অথচ এসবই আগের সব সরকারের ব্যর্থতার ফসল”। না, চন্দ্রশেখর সবটা ঠিক বললেন না। কারণ, নেপালের বিরুদ্ধে চালানো ভারতের সাড়ে চার মাসের সড়ক-রফতানি অবরোধের কারণে বাজারে জ্বালানি তেলের যে কালোবাজারি তৈরি হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে অলি সরকার কড়া অ্যাকশন নিতে সক্ষমতা দেখাতে পারলে জনগণের কিছু কষ্ট লাঘব নিশ্চয়ই করা যেত। কিন্তু সরকার তা পারেনি। এটা তো অন্যের সরকারের আমলের কাহিনী না। ফলে অলি সরকার যার সমর্থনের সরকার ছিল, সেই মাওবাদীরা আগেই কয়েকবার অলি সরকারের এই অযোগ্যতার কঠোর সমালোচনা করেছিল, সরকারকে সাবধান করেছিল। আসলে চন্দ্রশেখর যেন বলতে চাইছেন অন্যেরা অলি সরকারের বিরুদ্ধে যা অভিযোগ এনেছিল সেগুলো ভুল। বরং চন্দ্রশেখর বিগত অলি সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বিশেষ অভিযোগ আনতে চান যে অভিযোগগুলোি একমাত্র সাচ্চা। খোঁচা মেরে তিনি বলছেন, “অলির যদি নেপালের রাজনীতিতে কোনো অবদান থাকে তা হল, তিনি নেপালের রাজনীতিকে পাহাড়ি আর মাধেসি বলে পুরোপুরি দুই ভাগে বিভক্ত করে ছেড়েছেন”। এই বয়ানেও চন্দ্রশেখর ভারতের সব আকামের দায় আবর্জনাও অলির মাথায় ঢেলে দেয়ার চেষ্টা করলেন। ফ্যাক্টস হল, ভারতের অবস্থা এখন সব হারিয়ে কাশ্য গোত্র। ভারতের ভুল নীতির কারণে নেপালের প্রধান তিনটা দলের সাথেই ভারতের কাজের সম্পর্ক অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে ভারতের স্বার্থ তাদের মধ্য দিয়ে এই তিন দলের কোন একটার ভিতর দিয়ে পার করে আনার ন্যূনতম সুযোগ সেখানে আর ভারতের জন্য অবশিষ্ট নেই। ভারত তাই সব হারিয়ে কম বা ছোট প্রভাবের মাধেসিদের দলগুলোকে একমাত্র ভরসা করতে গিয়েছে। এই নিরুপায় অবস্থা এটাই ভারতের ভালনারেবিলিটির প্রকাশ।  আবার সেসব ছোট দল গুলোকেও প্রভাবিত করেছে যাতে তারা সব ধরনের চরম আপসহীন লাইন ধরে। যাদেরকে কেবল সবকিছুতে ‘মানি না’ বলতে পারাটাকে অর্জন বলে বুঝানো হয়েছে। অথচ শেষ বিচারে অপরাপর নেপালি জনগোষ্ঠির প্রতিনিধির সাথে একটা কার্যকর কাজের সম্পর্কে পৌছানো, নিগোশিয়েশন এখানেই তাদের আসতে হবে। এরা জানে না, নিজের স্বার্থ আদায় অর্জনের পথ কোনটা। ভারত সাড়ে চার মাসের  তাদের সহায়তায় অবরোধ চালিয়েছে। এভাবে চলে অবস্থা এখন এমন যে মাধেসিদেরও নেপালের রাজনীতিতে তাদের যতটুকু গুরুত্ব ছিল তা খুইয়ে তাদের পথে বসিয়ে ছেড়েছে ভারত। ভারত এখন নিজের সব আকামের ফলাফল থেকে হাত ধুয়ে ফেলে এর সব দায়ও অলির ওপর চাপাচ্ছে।
    চন্দ্রশেখর এর পরও বলছেন, ‘আমিই বরং আমার আরো কিছু নিজের গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ অলির ওপর চাপাব।’ বলছেন, অলি নাকি “ভারত-নেপাল সম্পর্কের ওপর আর কিছুতেই কাটানো যাবে এমন কিছু ক্ষতি” করে ফেলেছেন। চন্দ্রশেখরের দাবি, “আগামীতে অলিকে সবাই স্মরণ করবে ভারতের ওপর নেপালের অতি নির্ভরতা কমানোর উদ্যোক্তা পিতার ভূমিকার জন্য এবং চীনের সাথে সম্পর্কের রাস্তা খোলার জন্য। যদিও এটা সম্ভবত খুব একটা সফলতা দেখাতে পারবে না। তবে তার উদ্যোগ নেপালে প্রশংসার চোখে দেখা হবে”। অর্থাৎ মনে চরম ক্ষোভের কথা কিছু মিষ্টি শব্দে প্যাঁচ দিয়ে হাজির করলেন তিনি। চন্দ্রশেখরণের এই মন্তব্য নিয়ে খুব কিছু বলার নেই, কারণ এটা প্রকারান্তরে ভারতেরই আপন দোষ স্বীকারের আর স্বব্যাখ্যাত ধরনের। তবে ভারত নিজেকে আত্মজিজ্ঞাসায় ফেলার, নিজ দোষ মূল্যায়নের একটা এক্সারসাইজ করে দেখতে চাইলে তা করার সুযোগ নিতে পারে। আমাদের সিপিবি বা মেননের গোত্রের স্ট্যান্ডার্ডের এক লিবারেল কমিউনিস্ট দল হল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অলির দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট লেলিনিস্ট)। ভারত এমন কী নীতি নিল যে, কেন এরা এমন চরম ভারতবিরোধী হয়ে গেল, নেপালের অতি ভারতনির্ভরতা কমানোর আর চীনের সাথে যেচে সম্পর্ক গড়ার নায়ক হয়ে গেল? অথচ এরা তো নামেই কমিউনিস্ট কিন্তু আজীবন এরা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়া দূরে থাক, রাজতন্ত্রের অধীনে আইন মানা এক নির্বাচনী দল ছিল মাত্র। সেই দল কেন কিসের ফেরে পড়ে এমন ভারতবিরোধী রেডিক্যাল অবস্থানের দল হয়ে গেল? ভারতের থিংকট্যাংক ওয়ার্কিং অ্যাকাডেমিকদের এর জবাব সবার আগে নিজেকে নিজে দেবেন। একমাত্র এরপরই তাদের উচিত হবে তাদের সরকারকে কোনো পরামর্শ দেয়া। তাই নয় কী! মনে রাখতে হবে, আমরা অলির দলের কথা বলছি। আমরা মাওবাদী দাহালের কথা বলছি না। যেটা হলে সহজেই এরা নিজেদের বেকুবি আড়াল করতে পারতেন আর এসব অ্যাকাডেমিকদের পণ্ডিতি ফলানো সহজ হতো হয়তো।
    এটা কমবেশি এখন পরিষ্কার যে মাওবাদী আর নেপালি কংগ্রেস জোটের বর্তমানের নতুন গঠিত সরকার আগামী ২০১৮ সালে নেপালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ভাগাভাগি পালা করে ক্ষমতায় থাকার এক চুক্তি করেছে এবং এর প্রথম টার্মে মাওবাদী দাহাল ক্ষমতা নিয়েছে। এ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী দাহালের সরকার ক্ষমতায় থাকবে আগামী ১১ মাস। চন্দ্রশেখরণ এবার তার লেখায় প্রধানমন্ত্রী দাহালের সমস্যা কী হবে তা নিয়ে কথা বলছেন। চন্দ্রশেখরণের ভাষায়, দাহালের সমস্যাঃ
    ১. “দাহাল কোনো ঐকমত্যের সরকার গড়তে পারবেন না। কারণ মাধেসি ইস্যুতে কনস্টিটিউশন সংশোধনের দরকারে অলির দল তাতে বাধা সৃষ্টি করবে”। কথাটা বদ-দোয়ার মত শোনালেও কথা সত্য সংসদের আসনের বিন্যাসের হিসেবে অলির দলের সমর্থন ছাড়া দাহালের পক্ষে এমন কোনো বিল পাস সম্ভব নয়। কিন্তু মজার দিক হলো, এর ভেতর দিয়ে মাওবাদী দাহাল এক গঠনমূলক ও সঠিক উদ্যোগ নেয়ার মত এবং যোগ্যতা দেখানোর মত এক রাজনীতির নেতা – একথা ভারতের এই অ্যাকাডেমিক স্বীকার করে নিচ্ছেন। আর তাহলে মাধেসি ইস্যুতে এবং মাধেসিদের বিরুদ্ধে দাহালের কোনো ক্ষোভ-ঘৃণা তো না-ই, বরং নিজ সমগ্র জনগোষ্ঠীকে একক রাজনৈতিক কমিউনিটিতে গড়ার কাজটা সম্পর্কে তিনি খুবই সচেতন, এমনটাই প্রমাণ হচ্ছে। মাধেসিরা অবরোধের সাড়ে চার মাসে ভারতের স্বার্থের পুতুলের ভূমিকাকে প্রধান করে ভারতেরই রাজনীতি করে গেছে। তবুও সেটা নিয়েও দাহাল তাদেরকে কোনো শাস্তি দিতে চান এমন মনোভাব নেই। এখন তাহলে বাকি থাকল অলির দল। সে ক্ষেত্রে অলির দল কেন মাধেসি ইস্যুতে শুধুই বিরোধিতা করবে? মাধেসিদের ওপর অথবা দাহালের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসায়? এটা খুব ভালো কনভিন্সিং ব্যাখ্যা হলো না। এটা আসলে ভারতের স্বার্থের খায়েশ হয় তো! যদি অলি খামাখা এক বিরোধী অবস্থান নেয় তবে সেটা ভারতকে নেপালি রাজনীতিতে ঢুকে পড়ার বা অনবোর্ড হওয়ার একটা অছিলা হয়ে হাজির হতে পারে? কিন্তু শকুনের বদ-দোয়ায় কি গরু মরে!
    ২. দাহালের দ্বিতীয় সমস্যা হিসেবে চন্দ্রশেখরণ লিখছেন, “দ্বিতীয়টা হলো ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন কমিশন ইস্যু”। একথা ঠিক, এবার প্রধানমন্ত্রিত্বে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার দাহালের আগ্রহের পেছনে অন্যতম কারণ এই ইস্যু।  চন্দ্রশেখরণ লিখছেন, “মাওবাদীদের সশস্ত্র রাজনীতি করার সময়ে ঘটা কিছু নিষ্ঠুরতার ঘটনা থেকে নিজেদের বেমালুম খালাস করিয়ে নেয়ার তাগিদ কাজ করেছে। এ ধরনের কয়েক হাজার মামলা থেকে সহজে এরা পার পাবে না”। এই উপস্থাপনও তো দেখা যাচ্ছে চন্দ্রশেখরের বদ-দোয়া দেয়ার।
    প্রথম কথা হল, নেপালের রাজনীতিতে বেইল হারানো, প্রভাব হারানো ভারত নিজেকে গোনায় ধরানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। খড়কুটোও আঁকড়ে ধরতে চাইছে। এমনকি তারা নিজের জ্ঞানবুদ্ধির ওপরও ভরসা রাখতে পারছে না। তাই নেপালের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কার কী দুর্বলতা বা ভুল আছে, সেগুলো খুঁজে খুঁজে ভারত তা ক্যাশ করার তালে নেমেছে। কিন্তু সেকাজেও তারা পটু নয়। যথেষ্ট হোম-ওয়ার্ক করে তারা নামে নাই। বরং নেপালের দলগুলো প্রতিহিংসার রাজনীতি করুক এটা কামনা করছে। যেগুলো আসলে কামনা না বদমানুষের বদ-দোয়া। এভাবে কারো কিছুই অর্জন হয় না। দিন চলে না, চলবে না। কারণ শেষ বিচারে জীবন খুবই ইতিবাচক। ভারতেরও এই সত্য আঁকড়ে ধরা উচিত।
    এবার প্রসঙ্গের আরো ভেতরে যাওয়া যাক। কথা সত্য যে, এই ইস্যুতে দাহাল বহু সময় উদ্বিগ্ন হয়েছেন। কারণ বিশেষ করে এই ইস্যু থেকে হিউম্যান রাইটের ভায়োলেশনের কোনো কেস বানিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত আইসিসিকে প্রভাবিত করতে ভারতের তৎপরতা আছে, যাতে দাহালকে যদি ফাঁসাতে পারে তবে শকুনের বদদোয়ায় গরু মরার মতো হয় ব্যাপারটা। ফলে ভারতের আঙুল ঢুকানোর আর খোঁচাখুঁচির খবর দাহাল পাচ্ছিলেন। ফলে তিনি এই ইস্যুটা ফেলে রাখা, হেলেদুলে গাফিলতি দেখানো অদক্ষতা করার বিরুদ্ধে বিগত সরকার অলির কাছে বৈঠক করে অসন্তোষ জানিয়েছিলেন। কিন্তু চন্দ্রশেখরণের এটাকে দ্বিতীয় সমস্যা বলে হাজির করতে গিয়ে – এর বয়ানে ভারতের বদ মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করে ফেলেছেন।
    চন্দ্রশেখরণ খেয়াল করেননি তিনি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন’ নিয়ে কথা বলছেন। কোন আদালতের বিচার নিয়ে নয়।  দক্ষিণ আফ্রিকার ডেসমন্ড টুটুর দেখানো এই পথ অবশ্যই এক ন্যায়বিচার ইনসাফের রাস্তা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা থেকে জাত। কিন্তু তা প্রচলিত আদালতের পথে নয়। কারণ এটা আজকাল সবাই মানেন যে, আদালতের পথেও ন্যায়ভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে প্রয়োজনীয় আরো অনেক কিছু মানবিক উপাদান উপেক্ষায় হারিয়ে যেতে পারে। তাই সবচেয়ে বড় কথা ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন’ কোনো ধরনের প্রতিহিংসার পথ নয়। যে্মন প্রতিহিংসা চন্দ্রশেখরণ তার এই পুরো রচনার ছত্রে ছত্রে হাজির রেখেছেন। ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনে একটা সত্য, তা সে যতই তিতা হোক তাকে সামনে আনতে হয় আর সেটি কমিউনিটির সব মানুষকে নিয়ে পুনর্গঠন করার পথ। কেবল আদালতে ধরে এনে শাস্তিই দিয়ে এটা অর্জন করা যাবে না। কষ্ট দেয়া আর কষ্ট পাওয়া এমন উভয়ের আত্মশুদ্ধি আর ক্ষত সারানো এক লম্বা প্রক্রিয়া এটা। একটা সামাজিক ও কমিউনিটি পুনর্গঠন এর লক্ষ্য। কোনো হিংসার বদলে প্রতিহিংসার শাস্তি  – এমন কোনো চেইন কোথাও তৈরি থাকলে তৈরি হয়ে গেলে তা ভেঙে দেয়াই এর লক্ষ্য। আর সোজা কথা আগে বলেছি, এটা কোনো আদালতের পথ নয়। তবে অবশ্যই ইনসাফ সন্ধানের পথ। এখন দাহালের সমস্যা দূরে থাক, সমস্যা আসলে চন্দ্রশেখরণের। তার মনে রয়ে গেছে যেন কোন আফালতের বিচার নিয়ে তিনি কথা বলছেন অথচ মুখে তিনি দাবি করছেন যে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনের কথা তিনি বলছেন। অথবা হতে পারে অজ্ঞতায় দুটাই তার চোখে একই ঠেকে। অথচ তিনি এর ভেতর এটা দাহালের ‘হোয়াইট ওয়াশ অব এট্রোসিটি’ আকাক্সক্ষা খুঁজছেন, দেখতে পাচ্ছেন? মানে একটা  ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনকে তিনি দেখছেন এটা নাকি নিষ্ঠুরতা থেকে হাত ধুয়ে ফেলে বেচে যাওয়ার উপায় হিসাবে। তার মানে ডেসমন্ড টুটুও তাই করেছিলেন। এটা তার উদ্দেশ্য ছিল বলে তিনি অভিযোগ করছেন। তার মানে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনে কি কেউ নিজেকে হোয়াইট ওয়াশ অব এট্রোসিটি করতে পারে? একথা বলে চন্দ্রশেখ্রণ প্রমাণ করলেন তিনি ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এর প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোন ধারণাই তাঁর নাই। অথচ এই পদ্ধতি হল, কেউ কাউকে যে কষ্ট দিয়েছে তা খোলা মনে নিজেই স্বীকার করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটা। শুধু তা-ই নয়, তা আবার এমন খোলা নিষ্পাপ মনে হতে হবে যেন তা ভিকটিমের মন ছুঁয়ে যায়। স্পর্শ করলে বুঝতে হবে খোলা মনে সব স্বীকার করেছে। তবেই ভিকটিম বা তার আত্মীয় স্বজনের মনের সব ক্ষোভ দূর হবে সব হিংসা-প্রতিহিংসা মিলিয়ে যাবে। এখানে পুরা প্রক্রিয়ায় কারো কোনো নিষ্ঠুরতার “হোয়াইট ওয়াশ” বা ধুয়ে আনা দেখার সুযোগ কোথায়? আসলে চন্দ্রশেখরের কথার মানে কেউ অপরাধ করেছে আর তিনি এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে নিজের জিঘাংসা চরিতার্থ ব্যবহার করতে চাইছেন। মন ভর্তি জিঘাংসা নিয়ে থাকলে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন কেউ মুখে যতই উচ্চারণ করুক না কেন তিনি বিষয়টিই বুঝবেন না। আসলে ভারতের বা সেই অর্থে চন্দ্রশেখরের সমস্যা হল, দাহালের ওপর প্রতিহিংসার শাস্তি দেয়ার সুযোগটি হারিয়ে যাওয়ার জন্য তারা আক্ষেপ শুরু করেছেন। আর কেন দাহাল তাদের এই সুযোগ দিচ্ছে না, এতেও দাহালের দোষ খুঁজছেন। সত্যিই অপূর্ব মানুষের জিঘাংসা মনের প্রতিহিংসা!

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    Goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় গত ৭ আগষ্ট ২০১৬ অনলাইনে (প্রিন্টে ৮ আগষ্ট ২০১৬) ছাপা হয়েছিল। তা আবার আরও এডিট ও সংযোজন করে এখানে আবার ছাপা হল।]

     

  • নেপালে আবার নড়াচড়া

    নেপালে আবার নড়াচড়া
    গৌতম দাস
    ১৭ মে ২০১৬,  মঙ্গলবার
    http://wp.me/p1sCvy-1bK

    ভারতের সাথে তার সব পড়শি রাষ্ট্রের সম্পর্কই নানান রকম খটমট ও সঙ্ঘাতে পরিপূর্ণ। ব্যতিক্রম বা ভারতেরই ভাষায় ‘সফলতা’, কেবল বাংলাদেশে। গত সপ্তাহে ৯ মে নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারির সরকারিভাবে ভারত সফরে যাওয়ার কথা ছিল। আনুষ্ঠানিকতার দিক থেকে এটা হওয়ার কথা ছিল ভারতের রাষ্ট্রপতির অতিথি হিসেবে তাঁর ভারত সফর। কিন্তু সফরের মাত্র দুই দিন আগে ৬ মে নেপাল থেকে সরকারিভাবে জানানো হয় যে, নেপালের রাষ্ট্রপতি এই সফর বাতিল করেছেন। এই খবর মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয়নি। কিন্তু খবরটার গুরুত্ব ছিল আরো কয়েক গুণ বেশি। কারণ একটা বাড়তি খবরও সাথে ছিল, নেপাল সরকার ভারতে নেপালের রাষ্ট্রদূত দীপ কুমার উপাধ্যায়কেও প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কূটনীতিতে ‘প্রত্যাহার’ শব্দটির বিশেষ অর্থ আছে। অর্থাৎ প্রত্যাহার বা recall এই শব্দটি কী কী অর্থ নিশ্চিত করে আর কী কী করে না, তা সুনির্দিষ্ট থাকে। যেমন নিশ্চিত অর্থ হল, তার সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে  ঐ রাষ্ট্রদুতকে দেশে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। এরপর, কেন বলা হয়েছে এর কারণের দিক থেকে এর আবার দুটো মানে হতে পারে- এক. ঐ রাষ্ট্রদূতকে চাকরিচ্যুত বা দায়িত্বচ্যুত করা হয়েছে। অথবা দুই. কেবল ওই দেশ থেকে রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে কিন্তু তাঁর চাকরি বহাল আছে। ফলে এরপর অন্য কোথাও তাঁকে নিয়োগ দেয়া হবে। কিন্তু নেপালের রাষ্ট্রদূতের বেলায় তার প্রত্যাহারের কারণও মিডিয়ায় উল্লিখিত হতে থাকে। আর কারণটা সরকার নিজে মিডিয়ায় প্রচার করতে না চাইলেও মিডিয়া নিশ্চিত করছে যে নেপালি সরকার রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মিডিয়ায় প্রকাশিত হিসেবে অভিযোগ তিনটার: প্রথমটাই বড় সাঙ্ঘাতিক, কাটমান্ডুতে থাকার সময় চলতি প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলির (K P Sharma OLI অথবা K P OLI নামে তিনি বেশি পরিচিত) সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা করেছেন। দ্বিতীয় অভিযোগ, দিল্লিতে বসে অফিস চালিয়েছেন এমনভাবে যে সেখানে তিনি কী করছেন কিভাবে করছেন তা নিজ দেশে তার কাজের হিসাব নেয়া রিপোর্টিং কর্তৃপক্ষ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে না জানানো। আর তৃতীয় অভিযোগ, ভারতের রাষ্ট্রদূত রণজিত রায়ের (Ranjit Rae) সাথে নেপালের পশ্চিম সীমান্ত সফরে গিয়েছেন অথচ দেশের নিজ মন্ত্রণালয়কে কিছুই জানাননি। অনুমান করা যায়, মূল অভিযোগ আসলে শেষেরটাই। আর সেটা করতে গিয়ে প্রথম দু’টি অভিযোগ তৈরির অবস্থা সৃষ্টি করেছেন।

    আসলে গত ৬ মে ছিল নেপালের জন্য ঘটনাবহুল দিন। সেটা শুধু রাষ্ট্রপতির সফর বাতিল আর ভারত থেকে নেপালি রাষ্ট্রদূতের প্রত্যাহারে ঘটনার কারণে নয়। এ দুটো যদি দেশের বাইরের ঘটনা বলি তবে ঐদিনের বাকি ঘটনাবলি ছিল অভ্যন্তরীণ। এর আগের দিন মানে, ৫ মে অলি সরকারের অন্য পার্টনার দল হল নেপাল মাওবাদী পার্টি, যার সমর্থনে (কিন্তু তারা সরকারে অংশ না নিয়ে বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েছে) অলির সরকার ক্ষমতায় টিকে আছে সেই মাওবাদী দলের প্রধান পুষ্প কমল দাহাল প্রচন্ড মিডিয়ায় জানিয়ে দিয়েছিলেন তার দল ওলি সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের কথা ভাবছে। তবে এও জানিয়েছিলেন ঐদিনের সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাঁর মিটিং আছে। পরের দিন ৬ মে প্রচন্ড জানান, তিনি আপাতত সমর্থন প্রত্যাহার করছেন না; বরং এপ্রসঙ্গে নয় দফা দাবিতে তাদের সমঝোতা হয়েছে। ফলে সরকার আগের মতোই থাকছে।
    এরপর ঘটনাবলী নিয়ে আরো কিছু বর্ণনায় যাওয়ার আগে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পেছনের পটভূমি সংক্ষেপে বলে নেয়া ভালো হবে যাতে এখনকার অবস্থা বুঝতে সুবিধা হয়।
    সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনের ফল অনুসারে নেপালের মোট ৬০১ আসনের পার্লামেন্টের মধ্যে প্রধান তিন দলের মোট আসন সংখ্যা, এরা প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বা ৪৫১ আসন দখল করে আছে। কিন্তু কেউই নিরঙ্কুশ বা অর্ধেকের বেশি ৩০১ আসন পায়নি বলে, কেউ একক সরকার গঠনে সক্ষম নয়। আর আসনসংখ্যা অনুসারে ওপরের প্রথম দল নেপালি কংগ্রেস (১৯৬ আসন), দ্বিতীয় (চলতি প্রধানমন্ত্রীর) নেপালি কমিউনিস্ট ইউএমএল (১৭৫ আসন) আর তৃতীয় মাওবাদী কমিউনিস্ট (৮০ আসন)। বিগত রাজতান্ত্রিক সরকার উচ্ছেদ করার পরে নেপালে প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্রের স্থাপন করার ক্ষেত্রে সোচ্চার মূলত মাওবাদীরা হলেও এদের সাথে অপর দুই দলও ছিল। ফলে এই তিন দল সে সময় থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্রের সংবিধান রচনা ছিল দ্বিতীয় প্রচেষ্টার নির্বাচনী ফলাফল। কারণ প্রথম প্রচেষ্টা ফেল করেছিল। আর এই তিন দলের আসন সংখ্যা মোট করে দেখানোর কারণ হল, ২০১৩ সালের নির্বাচনের পর এই তিনটা দলই ভারত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। খুব সম্ভবত এই তিন দলের মধ্যে ভারত প্রসঙ্গে কমন কিছু অবস্থান আছে, যা ইনফরমাল এবং অপ্রকাশ্য। এটাই ভারত থেকে চরমভাবে এই তিন দলকে দূরে নিয়ে যায় আবার এটাই তাদের পরস্পরের মধ্যে বন্ধনের হেতু, ও ভিত্তি।
    আসলে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজতন্ত্র উচ্ছেদের (মে ২০০৮) পরে, প্রথমবারের কনষ্টিটিউশন প্রণয়ন ও রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টায় নির্বাচিত সরকার গঠনের পর থেকে ভারতের সাথে এক এক করে প্রধান তিনটি দলেরই সঙ্ঘাতময় সম্পর্ক হয়ে যায়। অথচ রাজতন্ত্র উচ্ছেদে রাজনৈতিক পরিকল্পনার শুরুর সময় থেকে ভারতের ভূমিকা ছিল খুবই ইতিবাচক। সেসময় আমেরিকানদের কূটনীতির সহযোগী অবস্থান ছিল খুবই নির্ধারক। ফলে আমেরিকার সাথে সমন্বিত ভারতের সে ভূমিকা ছিল গঠনমূলক। কিন্তু রাজতন্ত্র উচ্ছেদ উতখাতের পর তৎকালীন প্রথম অন্তর্বর্তি নির্বাচিত সরকার ছিল মাওবাদীদের সরকার। আর ভারত ক্রমেই কাজের ও স্বার্থের দিক থেকে গড়ে ওঠা এতদিনের ভালো সম্পর্ককে প্রথমে মাওবাদী সরকারের সাথে ও পরে অন্য দুই পার্টির সাথে ক্রমেই আস্থা হারিয়ে তিক্ত করে ফেলেছিল। ফলে মাওবাদী সরকার সংবিধান রচনা সম্পন্ন হয়েছে, এ ঘোষণা করতে ব্যর্থ হয়। বলা যায়, তিন পার্টির সাথে সম্পর্ক হারিয়ে, ‘কনষ্টিটিউশন রচনা সম্পন্ন হয়েছে’ এই ঘোষণা ঠেকিয়ে দেয়াকেই ভারত নিজের সাফল্য মনে করেছিল। ভারত নেপালের প্রধান এই তিনটি দলকেই প্রভাবিত করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে বা হাতছাড়া হয়ে যায়। অথচ লক্ষ্যণীয়, ভারতের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী সেখানে ছিল না। সংক্ষেপে কয়েক বাক্যে এর কারণ চিহ্নিত করলে বলতে হবে- ১৯৪৭ সালে জন্মের পর থেকেই নেহরুর হাতে যে ভারত হাজির হয়েছিল, তাতে পড়শিনীতি বা বিদেশনীতির মৌলিক কিছু জন্মত্রুটি ছিল। যেমন নেহরু যেন মনে করতেন, পড়শি বা বিদেশনীতি মানেই বিগত ব্রিটিশ কলোনির বিদেশনীতিই। কথাটা এভাবে বলার পিছনের কারণ হল, মনে রাখতে হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর পঞ্চাশের দশক ছিল দুনিয়া ব্যাপী “উপনিবেশ মুক্তির” যুগ। [কিন্তু খুব সতর্কভাবে ‘উপনিবেশ মুক্তি’ কথাটার  মানে বুঝতে হবে।  এসম্পর্কে বাড়তি বিস্তারিত কিছু কথা আলাদা করে নিচে সবশেষের কয়েক প্যারায় আনা হয়েছে।  আগ্রহীরা এসম্পর্কে বিস্তারিত সেখানে পড়তে পারেন।] নেহেরুর চোখে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের রূপ উপনিবেশকালীন রূপ – ‘প্রভু-দাস’ এই রূপেরই ধারাবাহিকতা। এরই ছাপ আমরা দেখি নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তিতে। সেই থেকে ভারতের পড়শি বা বিদেশ নীতি এই আলোকে সাজানো হয়ে আছে। মানে জবরদস্তি, চাপ খাটানো, অন্যের সার্বভৌমত্বকে সম্মানের কোনো বিষয় সেখানে রাখার দরকার কী এমন ভাবনায় পরিচালিত এক অবস্থা! অথচ উপনিবেশ-উত্তর সে যুগে উপনিবেশ মুক্তিই বা পড়শির সাবভৌমত্বকে সম্মান করার বিষয় তখন স্পষ্ট প্রধান বিষয় হয়েছিল। এসব পালনীয় শেষ করে বা সুরক্ষিত রেখেও ভারত পড়শি দেশসহ যেকোন দেশে বিদেশ নীতি পরিচালনা করা সম্ভব করতে পারত। ভারতের জনসংখ্যা বড় মানে অর্থনীতিও বড়। এছাড়া ভারত ভাগ হয়েছে বটে কিন্তু কলোনিয়াল শাসনকালের মাখনটা মূল ভারত ভুখন্ডেই থেকে গিয়েছে। পরবর্তিতে আজ পর্যন্ত একটা ভাল রকমের পুজিতান্ত্রিক বিকাশ এই ভারতে ঘটে গিয়েছে। এই অগ্রসর অবস্থার কারণে পড়শী যেকোন দেশের সাথে ভারতের পণ্য বাণিজ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফেয়ার এক বাণিজ্য বিনিময় সম্পর্ক হলেও সেখানে পড়ে পাওয়া ভাবে ঐ বিনিময়ের ভারসাম্য ভারতের পক্ষেই থাকবে। ফলে এক দেয়ানেয়ার ফেয়ারনেস-ন্যায্যতা বজায় রাখলেও সেই অর্জন ভারতের জন্য যথেষ্ট। অথচ প্রজাতান্ত্রিক ভারতের জন্মের পরে সত্তর বছর পেরিয়ে একুশ শতকে এসেও ভারতের বিদেশনীতির পুরনো তরিকাকেই আছে আর একেই তার নীতি ও সাফল্যের কাঠি মনে করে যাচ্ছে। ল্যান্ডলকড কোনো কিছু শর্তের বিনিময়ে রাষ্ট্রেরও পড়শির সমুদ্রবন্দরের প্রবেশ ও ব্যবহারের অধিকার আছে- জাতিসঙ্ঘের এমন আইন কনভেনশন যখন প্রণীত হতে যাচ্ছে তখন এই আমলে ল্যান্ডলকড নেপালকে প্যাঁচে ফেলে তার সাথে কলোনি-দাসের মতো আচরণ করতে চাইলে পালটা ঝাপ্টা তো খেতেই হবে।
    নেপালের জনগণ নিজ রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়ে একে উচ্ছেদ করেছে। সে কাজে ভারতের সাহায্য পেয়েছে, কিন্তু সেটা ফিরে আবার ভারতের কলোনি হওয়ার জন্য নয় নিশ্চয়ই। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু ভুল নীতিতে পরিচালনের কারণে নেপালের প্রধান তিনটি দলই এর পর থেকে ভারতের প্রভাবের একেবারে বাইরে চলে গেছে। ভুল বিদেশনীতিতে সব হারিয়ে উপায়হীন হয়ে ভারত এর পর থেকে মাধেশি ও জনজাতির জনগোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে নিজের শক্তি দেখাতে গিয়েছে। ফলে একদিকে সরকারসহ তিন নেপালি দল আর অন্যদিকে ভারত – এরকম পক্ষাপক্ষিতে পরস্পরের প্রতি শক্তি প্রদর্শনের ঘটনা হলো গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ – ওই তিন দলের নেপালের সংবিধান রচনা সম্পন্ন ও গৃহীত হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়ে বসা। আর তা প্রতিরোধে ভারত নিজের সীমান্ত শুল্ক বিভাগ আর সাথে মাধেশি অঞ্চলের ছোট দলের মাধ্যমে ভারত থেকে ল্যান্ডলকড নেপাল অভিমুখে পণ্য চলাচলে অবরোধ আরোপ করে। যদিও মুখে তা স্বীকার করে নাই। এখানে প্রথমত যে প্রশ্নটা ওঠে, নেপালের সংবিধান ঘোষণাতে এর বিরুদ্ধে ভারতের কী বলার আছে! ভারত ভিন রাষ্ট্র, তার কী বলার থাকে না থাকতের পারে? ভারত কী নেপালের মাধোশি বা জনজাতি জনগোষ্ঠিগুলোর প্রতিনিধি? নাকি ভারত ভিন রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতিনিধি হবার কোন সুযোগ সেখানে আছে?  এভাবে আজিব প্রতিনিধি সাজার চেষ্টা এটাই তো ভারতের জন্য বিপদজনক। বাজে উদাহরণ নয় কী? ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনীতিক ও আমলারা নিজেদের ব্যার্থতা ঢাকতে এন অবস্থার সৃষ্টি করেছে।  কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশন গৃহিত হবার ঘোষণার বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতে পারে সে দেশেরই কোনো অসন্তুষ্ট জনগোষ্ঠী। পড়শির আপত্তি করার বিষয়ই নয় এটা। লিগ্যাল এই পয়েন্টটি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখান থেকেই পড়শির ওপর হস্তক্ষেপের জেনুউন অভিযোগ উঠে আসে। এটা সম্ভবত দুনিয়ায় প্রথম উদাহরণ এবং ভারতের দিক থেকেও খুবই বাজে উদাহরণ। কারণ এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারতের পড়শি রাষ্ট্রের কোনো অসন্তুষ্ট জনগোষ্ঠীর পক্ষে দাঁড়িয়ে সেই পড়শি রাষ্ট্রের  বিরুদ্ধে আপত্তি তোলার পথ দেখিয়ে রাখল ভারত। অথচ বিষয়টা এত জটিল ছিল না। একটা স্থিতিশীল নেপালের জন্য অথবা অন্য কোনো যুক্তিতে ভারতের নিজ স্বার্থের দিক থেকে উদ্বেগ থাকতেই পারে। কিন্তু সেটা প্রকাশ করার ভঙ্গী খুব গুরুত্বপুর্ণ। ভারতকে সেটা প্রকাশ করতে গেলে অবশ্যই ন্যুনতম পড়শির সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষা করেই তা হতে হবে এবং তা করা সম্ভবও। সে লক্ষ্যে ভারত পড়শি সরকার বা দল্গুলোকে লেগে থেকে বুঝানোর চেষ্টা করতে পারত। কিন্তু এটা যে প্রচেষ্টা করা হয়েছে তা খুবই নিকৃষ্ট। আসলে নেপালের রাজতন্ত্র উৎখাতে সাহায্য সহযোগিতা করার সময় থেকেই ভারত নিজেরও স্বার্থগুলো স্পষ্ট করে এই প্রধান তিন দলের মধ্যে বুঝিয়ে রাজি করার উদ্যোগ নিতে পারত। যেটাকে আমরা পারশু (pursue) বা লেগে থেকে বুঝানোর চেষ্টা বলি। কিন্তু ভুল বিদেশনীতি, ভুয়া আত্মগরিমা, নকল উপনিবেশী ভ্যানিটি ভারতকে সে পথে যেতে দেয়নি। এই ভুলের মূল্যায়ন ভারতের ভেতর থেকেই একদিন উঠে আসবে। কারণ তবেই ভারতের সামনে আগানোর বাধা সরাতে সক্ষম হবে।
    এমনিতেই টানা সাড়ে চার মাস ধরে চলা নেপালের সাথে পণ্য চলাচলে অবরোধের ফলাফলও শেষ বিচারে ভারতের বিপক্ষে গেছে। উদ্দেশ্য ছিল নেপালি জনগণকে শাস্তি দেয়া। কিন্তু ভারতের শাস্তিও কম হয় নাই। এই সাড়ে চার মাস আসলে যেন উভয় পক্ষের কার কত দূর সহ্যক্ষমতা তারই পরীক্ষা চলেছে। পরিশেষে এতে নেপালের দিক থেকে দেখলে তার বিজয়ের দিকটি হল, নেপালের জনগণের কাছে এত দিন যেটা অকল্পনীয় মনে হয়েছিল যে ভারতের ভেতর দিয়ে ছাড়া তাদের অন্যভাবে অন্য কোন দিক দিয়ে বাইরের দুনিয়ায় বের হওয়ার উপায় নেই। কিন্তু ভয়াবহ ঐ নিরুপায় পরিস্থিতিই অপর পড়শি চীনের ভেতর দিয়ে বের হওয়ার বিকল্প উপায় অবরোধের এই দুর্যোগের সময়ে হাজির হয়ে গিয়েছিল। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী অলি চীনের সাথে এ বিষয়ে চুক্তি সম্পন্ন করে ফেলেছেন। নানান সুবিধাজনক স্পটে ৯টা রেল ও সড়কপথ হবে বের হবার পথ। আর এরই লক্ষ্যে সার্বিক পরিকল্পনা, ভায়াবিলিটি স্টাডি ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। ভারতের মিডিয়া টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, একবার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়ে গেলে সেই নেপালকে আর কোনো কথাই শুনানো ভারতের পক্ষে সম্ভব হবে না। বরং এত দিন ভারতের দাবড়ে মুখচাপা দিয়ে রাখা আচরণের বিরুদ্ধে সব অর্গল খুলে ওই নেপালি জনগণ যা করার তাই করবে। বলা বাহুল্য সম্পর্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যাবে। ভারতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানগত। ওদিকে অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার দিক থেকে নতুন রেল ও সড়কপথে ব্যয় শুরুতে কিছুটা বেশি হলেও এক দিকে সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাম চুকানোর স্বার্থে আশা করা যায় নেপালের জনগণ তা বইতে রাজি হবে। আর এতে ক্রমেই আরো বাড়তি উৎপাদন ও চলাচল বেড়ে যাওয়ার মুখে আস্তে আস্তে ব্যয়ও কমে আসতে শুরু করবে। তবে এখান থেকে এমন মনে করা ভুল হবে যে চীন এটাকে পড়ে পাওয়া ফায়দা হিসেবে দেখবে কি না। এ প্রসঙ্গে চীন অনেক আগেই পরিষ্কার করে রেখেছে। এশিয়ার অর্থনৈতিক পড়শি শক্তি হিসেবে ট্র্যাডিশনালি বা নিজ যোগ্যতায় যেসব বাজার বা সম্পর্ক সুবিধা তার আছে এর শেয়ার ভারতকে দেয়া চীন নিজের বৃহত্তর স্বার্থের দিক থেকে করণীয় মনে করে। কারণ সে জানে ও মানে দুনিয়াতে নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার কায়েমের ক্ষেত্রে ভারত তার সঙ্গী। নতুন অর্ডার তৈরির ক্ষেত্রে চলতি নেতা আমেরিকা হবে অতীত নেতা আর ভারত হবে আগামী সহযোগী। ভারত সেসবের পক্ষে নিজের ভূমিকা বুঝে এগিয়ে আসার আগেই চীন ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে নিজ আমন্ত্রণের মনোভাব স্পষ্ট করে রাখতে চায়।
    যেমন নেপালের আমদানি তেলের চাহিদার মাত্র ১৩ ভাগ চীন থেকে আসার চুক্তি হয়েছে। এখন বাকিটা নির্ভর করে ভারতের ওপর। ভারত যদি অবরোধ-সম্পর্কের পথেই থাকতে চায়, তবে এই ভাগের হার শতভাগ হওয়ার দিকে যাওয়া ছাড়া যে উপায় থাকবে না তা বলাই বাহুল্য।
    ইতোমধ্যে ভারত আরেক হুমকি তৈরির চেষ্টা করেছে। ভারতের ভাষায় চাপ সৃষ্টি করার কৌশল। বিগত মাওবাদীদের সশস্ত্র রাজনীতি পরিচালনার সময়ের পুরনো মানবাধিকার ভঙ্গের মামলা, এ ছাড়া একালে সাড়ে চার মাসের অবরোধের সময় মাধেশি জনগোষ্ঠীর অনেকে আহত, নিহত হয়েছেন। প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসঙ্ঘের ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ বা ইউপিআরের মুখোমুখি হতে হয়। গত বছরের শেষে সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের নেপাল প্রসঙ্গের সভায় ভারত ওপরের উল্লেখ করার দুই ইস্যুতে আপত্তি দায়ের করে। যাতে সরকার ও মাওবাদীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু ব্যাপারটা ভারতের দিক থেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া খুব সহজ নয়। কারণ এখানেও ভারত একইভাবে নিজের বিরুদ্ধে অন্য যেকোনো দেশের অভিযোগের আঙুল উঠানোর রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছে। যেমন সেই অভিযোগ হতে পারে ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মির ও উত্তর-পূর্বের রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী দমনে মানবাধিকার লঙ্ঘনসংক্রান্ত। এটা ভারতও জানে। ফলে ভারতের এক মিডিয়া জানাচ্ছে ইউপিআর ইস্যু নিয়ে বেশি দূর যেতে ভারতের ইচ্ছা নেই।
    কিন্তু তবু এই পদক্ষেপের কথা ভেবেই মাওবাদী দলনেতা প্রচন্দ অলির ওপর সমর্থন প্রত্যাহার করার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন গত ৫ মে, নতুন কিছু পালটা পদক্ষেপে নিতে চেয়েছিলেন। তার প্রস্তাব ছিল, এই তিন দলের সমন্বয়ে একটা সর্বসম্মতির সরকার হোক যাতে সম্মিলিত কৌশলে ভারতের যেকোনো সিদ্ধান্ত মোকাবেলা করতে পারে। আর যদি তা না করা যায়, সবাই রাজি না হয়, সে ক্ষেত্রে নেপাল কংগ্রেস দলের সমর্থনে সে নিজেই প্রধানমন্ত্রী হয়ে সরকার গড়তে চায়। এমন সিদ্ধান্তের কারণ, অলি সরকারের ওপর জনগণের ক্ষোভ বাড়ছে। যার মূল কারণ সরকারের অদক্ষতা বা নন-পারফরম্যান্স। আর সবচেয়ে বড় হলো, এখন অবরোধ উঠে গেলেও জ্বালানি তেল, চিনি ইত্যাদি এজাতীয় জিনিসের দাম কমেনি। ব্যাপক চোরাচালানি মজুদদারি কারবার চলছে সরকার ও দলের প্রশ্রয়ে। ফলে কোনো পদক্ষেপ ছাড়া ওলির হাতে সরকার ছেড়ে রাখতে ভরসা পাচ্ছেন না মাওবাদী নেতা প্রচন্দ। এতে গত ৬ মে নেপাল ঘটনাবহুল হওয়ার পেছনে ভারতের চাপ সামলানোর নতুন কৌশল ও পদক্ষেপ হিসেবে কী করা যায়, এর অংশ মনে করা যেতে পারে। আর এ প্রসঙ্গে ভারতের মিডিয়ার ব্যাখ্যা হলো, অলি সরকার এসব ঘটনায় ভারতকে দায়ী করে নিজ জনগণের কাছে দেখাতেই নেপালের প্রেসিডেন্টের ভারত সফর আচমকা বাতিল করায়। এতে নিজ সরকারের ব্যর্থতার অনেক কিছুই আড়াল করার কিছু সুযোগ পেতে পারেন, এটাও ভেবে থাকতে পারেন।

    [ওদিকে ভারতে নেপালের রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহার পর্ব খুবই খারাপভাবে শেষ হয়। রাষ্ট্রদুত প্রত্যাহারের আদেশ মানতে অস্বীকার করেন। ফলে স্বভাবতই অলি সরকার তাঁকে বরখাস্ত করেন এবং ভারত সরকারকে নোটিফাই করেন। পরে এই ঘটনা আর এক মোড় নেয়। কূটনৈতিক পাড়ায় খবর উঠতে থাকে৪ যে এই ইস্যুতে নেপালে ভারতের রাষ্ট্রদুত রণজিত রাওকে নেপালে “পারশন নন গ্রাটা” বা ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করতে যাচ্ছে। কোন কূটনীতিকের বিরুদ্ধে হোস্ট দেশ কোন ক্রিমিনাল চার্জ আনার সুযোগ নাই জেনেভা কনভেন অনুসারে। তিনি যে অপরাধই করেন না কেন। এর বদলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা হল ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা। যার বাস্তব ফলাফল ঐ দেশ থেকে বের করে দেয়া। এই প্রচার তুঙ্গে উঠার এক পর্যায়ে উত্তেজনার পারদ নামাতে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিবৃতি দিতে এই জল্পনাকল্পনা নাকচ করেন।]

    goutamdas1958@hotmail.com

    [লেখাটা গতকাল ১৬ মে অনলাইনে (আজ প্রিন্টে ) দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। তা এখানে আবার নানা সংযোজনে ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

    ফুটনোটঃ
    ‘উপনিবেশ মুক্তি’ কথাটার অর্থ
    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা ইউরোপের ইতিহাস আমরা বৃটিশদের চোখ দিয়ে পড়েছি ও জানি।  ফলে ঐ যুদ্ধে “আর কখনও কলোনি করব না” আমেরিকাকে দেয়া বৃ্টিশদের এই দাসখতের কথা আমাদের জানা হয় নাই। এই যুদ্ধ সম্পর্কে এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টস বৃটিশ বয়ান এডিয়া গিয়েছে। সোজা কথায় বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার কৃতীত্ব হল সে সারা ইউরোপের কলোনি প্রভুদের কাছ থেকে কলোনি আর না করার দাসঅখত লিখায় নিয়েছে। আর সারা দুনিয়াকে এক ‘উপনিবেশ মুক্ত দুনিয়া’ উপহার দেবার রাস্তা খুলে দিয়েছে।  অনেকের কাছে এটা অবাক লাগতে পারে। তারা “আটলান্টা চার্টার” পড়ে দেখতে পারেন, যেটা আসলে কলোনি প্রভুদের আমেরিকাকে দেয়া দাসখত। আর আমাদের সৌভাগ্য যে আমেরিকার ওয়াল স্ট্রীট বুঝেছিল দুনিয়া থেকে উপনিবেশ তুলে দেয়াই তার স্বার্থ, ক্যাপিটালিজম আরও গ্লোবাল ও  বিকাশিত হয়ে উঠার পুর্বশর্ত। ফলে হিটলারের হাত থেকে আক্রান্ত ও বিধ্বস্ত কলোনি প্রভু-শিরোমনি বৃটিশসহ ইউরোপকে  বাচাতে আমেরিকা এগিয়ের আসার পুর্বশর্ত হিসাবে এই দাসখত স্বাক্ষর করিয়ে নেবার সুযোগ নিয়েছিল।
    কিন্তু আমাদের এখানকার প্রসঙ্গের জন্য সেসব কথার প্রাসঙ্গিকতা এতটুকুই যে জওহরলাল নেহেরুও দুনিয়া থেকে উপনিবেশ উঠে যাবার উপরে উল্লেখিত দিকটা সম্পর্কে ওয়াকেবহাল ছিলেন না। তাঁর বিচারে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের রূপ কেবল একটাই, মাস্টার-স্লেভ বা প্রভু ও দাস এর বাইরে অন্য কিছু হতে পারে না।  নেপালের সাথে পুরানা বৃটিশ-নেপাল ১৯২৬ সালের চুক্তির আদলে করা নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তি করা এই সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। নেহেরু ধরতেই পারেন নাই আটলান্টা চার্টার চুক্তি কেমন আগামি দুনিয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।  ফলে এখন থেকে রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের রূপ আর কেবল কলোনি মাস্টারের প্রভু-দাস রূপ ছাড়াও অন্যরূপে বিকশিত হবার শর্ত তৈরি হয়েছে।  এবসলিউট অর্থে নয় তবে এটা তুলনামূলক অর্থে আগের সরাসরি উপনিবেশ রূপের চেয়ে লিবারেল রূপ সম্পর্ক আকারে হাজির হবে।