Tag: জো বাইডেন

  • গ্লোবাল ও লোকাল প্রেক্ষিতে বাইডেন পাঠ

    গ্লোবাল ও লোকাল প্রেক্ষিতে বাইডেন পাঠ

    গৌতম দাস

    ১৬ নভেম্বর ২০২০, ০০:০৫ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3gc

    US  President-elect Joe Biden

    গত কমপক্ষে সত্তর বছর ধরে রাজত্ব করা গ্লোবাল নেতা আমেরিকা শেষকালে এসে ট্রাম্পের হাতে পড়ে এক ঝটকায় সেটা  লোকাল-আমেরিকায় পরিণত হয়ে গেছিল। লোকাল মানে গ্লোবাল নেতার মফস্বলি হয়ে যাওয়া। যে মফস্বলি বলতে এখানে জাতিবাদি আমেরিকা বা ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ যেটা, সেটাই বুঝানো হয়েছে। অথচ যে আমেরিকা দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশনের দিকে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে গেল, সেই নেতা – সেই আমেরিকা কি করে “সংকীর্ণ ও আমি আগে” এই মফস্বলি অবস্থান নেয়? আবারীখন বাইডেন জিতেছে বলে, আমেরিকার আগের গ্লোবাল নেতা হয়ে থাকা অবস্থানে ফিরে যাওয়া সেটা কী আদৌ সম্ভব? সম্ভবত একেবারেই না। এছাড়া আমেরিকা যখন নেতা ছিল সে তো তখন আত্মভোলা  নিজের স্বার্থ-অবস্থান ভুলে থাকা কোন আমেরিকা ছীল না। বা কোন খেপা মাজারের পাগল ধরণের কেউ তো ছিল না। তাহলে জাতিবাদী, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ – এটাও কী ট্রাম্প আসলে আমেরিকাকে নিতে পেরেছিল?  আসলে আমেরিকার নেতৃত্বে যেখানে আশির দশক থেকে শুরু হয়ে যাওয়া গ্লোবালাইজেশন – বিশেষত গ্লোবাল পণ্য বিনিময় বাণিজ্য সেটা দুনিয়ায় চালু হয়ে গেলে তা থেকে ফিরে গিয়ে খোদ আমেরিকাই আবার জাতিবাদী হবে এটাই তো সম্ভবই না। তাহলে আমেরিকার জন্য গত চারবছরের ট্রাম্প কে ছিল?

    ডোনাল্ড ট্রাম্প ছিল একটা মশকরার নাম, একটা তামাসা। অনেক সময় কিছু কঠিন সত্যিকথা থাকে যা সরাসরি তা প্রকাশ করা যায় না, উচ্চারণও করতে চায় না অনেকে। যদিও সেটা ঘটে গিয়েছে। সেকথাটা হল, আমেরিকা  – গ্লোবাল নেতৃত্ব হারিয়েছে।  এই তিন শব্দের ছোট বাক্যটা আমেরিকার জন্য উচ্চারণ কঠিন বলে যেন একথাটাই আরেকভাবে ঘুরিয়ে বলা হয়েছিল যে জাতিবাদী  ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এর একজন ট্রাম্পের উত্থান ঘটেছে। একারণে ট্রাম্পের আরেক নাম “পাবলিক ন্যুইসেন্স” (Public nuisance)! ন্যুইসেন্স মানে কী?  মানে হল, আপনি যদি একবার নিজের পোষাক খুলে ফেলতে পারেন, শহরের প্রধান রাস্তায় ন্যাংটা হয়ে হাটতে পারেন তবে এরপর এর কোন দায় আর আপনার না। বরং তাঁদের সব দায় যারা আপনাকে ন্যাংটা দেখছে। আপনার পোষাক খুলে ফেলার মানে অন্য সব মানুষকে এবার  চোখেমুখে পোষাক এঁটে, ঢেকে চলাচল শুরু করতে বাধ্য করা। এটাই নিজের একার দায়দায়িত্ব অন্য সবার ঘাড়ে চড়িয়ে দেয়া! এটাই বেস্ট ন্যুইসেন্স! আমেরিকায় এই ন্যুইসেন্সের নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প;  তাঁর উত্থান ও চার বছরের শাসন। আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব হারিয়ে যাওয়া সরাসরি সে স্বীকার করতে পারেনি বা চায়নি বলে, আমেরিকা যেন ট্রাম্পের ন্যুইসেন্স দেখিয়ে সেটাই প্রকাশ করেছিল। সারা ইউরোপ  ট্রাম্পের আমেরিকার এই জাতিবাদ একেবারেই পছন্দ করে নাই। আর এখন বাইডেনের চ্যালেঞ্জ হল, সেই আস্থাহারানো ইউরোপকে আবার আস্থায় ফিরিয়ে আনা, যেটা প্রায় অসম্ভব। যেমন একজন বলছে, বাইডেন পুর্বাবস্থায় ফিরে যাবার প্রতিশ্রুতি দিলেও “US could swing back to Trump-ism, so they’re wary” – আমেরিকা যে আবার কোনদিন ট্রাম্পএর জাতিবাদে ফিরে যাবে না এর নিশ্চয়তা কী?

    এছাড়াও ইউরোপে ১৯৪৫ সালের পর থেকে আমেরিকান সেনা গ্যারিসন রেখে এসেছে এপর্যন্ত নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য। কিন্তু ট্রাম্পের আমেরিকা ২০১৮ সালে এসে হঠাত করে এজন্য ৪০০% হায়ার চার্জ চেয়েছিল ইউরোপের কাছে। সেটা কী আমেরিকা আবার চাইবে না? নিশ্চয়তা কী?

    “German Chancellor Angela Merkel also warned in 2018 that the European Union could no longer depend on the US, while core Asian allies, such as South Korea and Japan, suddenly found themselves faced with demands for up to 400% higher payments for the presence of US troops.”

    তাহলে এখন প্রশ্ন উঠবে, এখন আবার জোসেফ বা জো বাইডেন – তিনি কে? আগে ট্রাম্প-জোকার জাতিবাদী আমেরিকা  হয়ে তা  প্রকাশ করেছিল এবার বাইডেন এবার প্রকাশ্যে সরাসরি স্বীকার করে নিবেন যে আমেরিকা আর গ্লোবাল নেতা নাই। বড় জোর এটাই হবে।

    বাইডেনের আমেরিকাই যতটুকু যা শেষ নেতাগিরিঃ
    প্রভাবশালী সিএনএন একটা আর্টিকেল ছেপেছে যার শিরোনামঃ “সমমনা জোটবন্ধুদের আস্থা ফিরে অর্জন করা হবে বাইডেনের বিদেশনীতির কঠিনতম চ্যালেঞ্জ“(Biden’s toughest foreign policy challenge may be regaining allies’ trust)। তিন স্টাফ লেখকের এক যৌথ রিপোর্ট এটা। লেখায় বলতে চাওয়া হয়েছে, ট্রাম্প গত চার বছরে ইউরোপকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে আমেরিকা আর গ্লোবাল নেতা নয়। ইউরোপের দায় এবং ওর ভালমন্দ চিন্তা আর ট্রাম্পের নয়। ট্রাম্প হল – আপনি বাঁচলে বাপের নাম – এমন এক আমেরিকান প্রেসিডেন্ট। কাজেই সেই আমেরিকাকে এবার বাইডেন আবার তুলে এনে আগের জায়গায় কতটুকু বসাতে পারবে, নেতৃত্ব ফিরে আসবে কী করে? এছাড়া বাইডেনও আবার ট্রাম্পের মত ফেলে পালাবে না তো? এই আস্থা অর্জন বাইডেনের প্রধান চ্যলেঞ্জ। কিন্তু লেখাটা আসল যে কথাটা দেখতেই পারে নাই তা হল, এখন এটা একেবারেই এক ফ্যাক্টস হল, আমেরিকা আর আর নেতৃত্বে ফিরে আসবে না। পারবেই না।

    সারকথায়, আসলে ট্রাম্প আর বাইডেন একই ঘটনার দুইটা প্রকাশ। দুজনই বলছে,  আমেরিকা আর নেতা নয়। তবে ট্রাম্প কথাটা বলছে আমেরিকার সেসব লোকের হয়ে যেন যেমন, এক পরিবারের পিতা জীবনের শেষ বয়সে এসে বলছে আমি কেবল আমার জন্য ভাত রাধব, সবার ভাত যোগাড় করতে পারব না বলে, এভাবে। অন্যদিকে বাইডেন হচ্ছে সেই আশ্বাসবাদী যে ভাবধরতে চায় আমরা এখনও নেতা আছি; অথচ এটা সত্যি না। তবু এমন বলে সবাইকে আশ্বাস সে দিচ্ছে বটে কিন্তু কেউ তারকথায় আস্থা রাখছে না, রাখবে না।

    ট্রাম্পের ন্যুইসেন্স তৈরির ক্ষমতা আরো দুমাস আছেঃ
    এমাসের গত ৭ নভেম্বরের দিকে প্রথম জানা গেছিল যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল হিসাবে জো বাইডেন অন্তত ২৭৯ [এখন সর্বশেষ গণনা অনুসারে এটা ৩০৬] ইলেক্টোরাল কলেজের আসন পেয়ে বিজয়ী হতে যাচ্ছেন । কিন্তু তা সত্ত্বেও নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে বিতর্ক, আপত্তি বা মামলার নিষ্পত্তি এখনো খতম হয়নি। তবে ধীরে ধীরে প্রতিটি মামলা বা ঘটনায় ট্রাম্প-ক্যাম্পের তোলা আপত্তি বা অভিযোগের কোনো “প্রমাণ পাওয়া যায়নি” বলেই তা খারিজ হয়ে ক্রমে অনেক কিছুর নিষ্পত্তি হয়ে চলেছে [US election security officials reject Trump’s fraud claims]। তবু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল প্রসঙ্গে আমেরিকার আকাশের কালো মেঘ ও অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। এর পেছনের প্রধান কারণ সম্ভবত, খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু ঘোষণা ও পাল্টা পদক্ষেপ। যেমন- তিনি নিজেই হুমকি দিয়েছেন যে- ‘তিনিই এই নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন অথচ তাদেরকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তারা হেরেছেন বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে”। এটা তিনি মানেন না।  এতে এবার সংশ্লিষ্ট কিছু পদক্ষেপ বিপদজনক হয়ে উঠছে বলে মনে করা হচ্ছে। যেমন, জেনারেল সার্ভিস এডমিনিস্টেশন (জিএসএ) বলে হোয়াইট হাউজের একটা সেকশন আছে। এই অফিস নতুন প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর শপথ ইত্যাদির প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো করে থাকে। ট্রাম্পের বিশেষ নির্দেশে এই অফিস নড়াচড়াহীন বসে আছে। বিবিসি লিখছে এই অকার্যকারিতা আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকির ইস্যু হয়ে উঠতে পারে [could access “pressing national security issues”.]।
    কিন্তু ট্রাম্প-ক্যাম্প অনড়। তারা মূলত নানান ইস্যুতে  প্রমাণসহ অভিযোগ তুলে ধরতে আগ্রহী হওয়ার চেয়ে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা ছড়ানোর চেষ্টা করছে অনেক বেশি। ট্রাম্প স্টেট ডিপার্টমেন্টের পম্পেইকে দিয়ে ঘোষণা করিয়েছেন যে, আগামী ২০ জানুয়ারির (দেশের নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ নেয়ার দিন) পরে ট্রাম্পের সরকার কার্যক্রম অব্যহতভাবে চালু রাখবে। তাই নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অজানা আশঙ্কা যা আগে কখনো আমেরিকা দেখেনি তা এখন থেকেই তাদের সমাজে ছেয়ে বসে আছে। যদিও সেটা বাড়ছে, ঠিক এমনটাও বলা যাবে না।
    বরং ছোট ছোট পদক্ষেপে ক্রমে অভিযোগগুলো আদালতে বা নির্বাচনী কর্তাদের হাতে প্রত্যাখ্যান বা নাকচ হয়ে যাচ্ছে। ১৪ নভেম্বরের শুরুতে, ভোর রাতের হিসাবে কয়েক ঘণ্টা আগে প্রকাশিত কয়েকটা খবরের শিরোনাম এ রকম- ১. পেনসিলভানিয়ার নির্বাচনী কর্তারা নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে আদালতে ট্রাম্পের মামলার ফেডারেল বিচারককে জানিয়েছেন, তিনি মামলা বাতিল ঘোষণা করে দিতে পারেন এখন – রয়টার্সের প্রকাশিত রিপোর্ট। ২.আমেরিকার নিবার্চনী কর্তারা ট্রাম্পের কারচুপির অভিযোগ বা দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন- বিবিসি ইংরেজির রিপোর্ট। তারা আরো বলেছেন, ‘এবারের ভোট ব্যবস্থায় কোনো ভোট বাতিল হয়েছে বা হারিয়ে গেছে, পরিবর্তন করা হয়েছে অথবা কোনো ধরনের কালোদাগ লেগেছে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’ বরং আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ‘ভালো নির্বাচনগুলোর অন্যতম এবারের ভোট”। ৩. বাইডেন এরিজোনার আসনগুলোও পেয়ে নিজের ইলেক্টোরাল কলেজ আসন ২৯০ তে নিয়ে আরো পোক্ত হতে যাচ্ছেন- রয়টার্সের প্রকাশিত রিপোর্ট। ৪. এটা বিবিসি বাংলার ফ্যাক্ট চেক টিমের গবেষণা; মানে, তাদের ভাষায় ‘বিবিসির রিয়েলিটি চেক টিম’-এর ১০ নভেম্বরের রিপোর্ট। তারা বলছেন, “কোনো তথ্যপ্রমাণ না দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বক্তৃতা-বিবৃতিতে বেশ কয়েকটি পোস্টের কথা উল্লেখ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রচারণা শিবির”।
    এভাবেই ট্রাম্পের অভিযোগের পাটাতন ক্রমে নিজ পায়ের নিচের মাটি হারিয়ে চলেছে। তবু সব অভিযোগ শেষ হয়েছে এমন নয়। এর প্রধান কারণ, আমেরিকার নির্বাচনী ব্যবস্থায় আমাদের মতো কোন কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল নির্বাচনী অফিস বলে কিছু নেই। ভোট নেয়া, তদারকি ও ফলাফল ঘোষণা প্রত্যেকটা রাজ্যের দায়িত্ব এবং তা তাদেরই নিজ নিজ আইনে পরিচালিত হতে হয়; যাতে আবার রাজ্যে রাজ্যে কিছু আইনগত ভিন্নতাও আছে। তাই এখন ট্রাম্পের অভিযোগগুলো নিষ্পন্ন হচ্ছে, প্রতিটি রাজ্যে এবং মূলত নির্বাচন অফিস ও আদালতে। তবু একটা ধারণা হিসেবে বলা যায়, এগুলো নিষ্পত্তি করতে আগামী ২৩ নভেম্বরের মধ্যে রাজ্যের নির্বাচনী কর্মকর্তারা ফলাফল ঘোষণার কাগজে স্বাক্ষর করা শেষ করতে পারেন। তখন এই ফলাফল ‘অফিসিয়ালি ঘোষিত ফলাফল’ বলে বিবেচিত হবে।
    আর তখন ট্রাম্পের অফিস ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করতে বাধ্য হয়ে যাবে। তা না করলে আদালত ট্রাম্পের অফিসকে অকার্যকারিতার জন্য অভিযুক্ত করতে পারবেন এবং পাল্টা করণীয় নির্দেশ জারি করতে পারেন। অর্থাৎ ক্রমে ট্রাম্পের জন্য, ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু করার বাধ্যবাধকতা কঠিন ও শক্ত হয়ে আসছে।
    এভাবে অনুমান করা যায়, ট্রাম্প যতই হুমকি দেন তবু, ২০ জানুয়ারির আগেই ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু ও সম্পন্ন করতে ট্রাম্প বাধ্য হবেন। আর সবার উপরে আমেরিকার মানুষ স্থিতিশীলতা চায়, দেশে একটা ফাংশনাল সিস্টেম দেখতে চায়; মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো হতাশাগ্রস্ত জীবনের কোনো দেউলিয়া ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট হয়ে বলবেন, ‘আমি ক্ষমতা হস্তান্তর করব না’-এই দায়দায়িত্বহীন বাক্য কিংবা বিশৃঙ্খলা মানুষ দেখতে চায় না। জীবন ইতিবাচক এবং জীবন এমন আশা-ভরসা নিয়েই চলে। তাই আমরা বরং এখন জো বাইডেনের বিজয়ে ও হবু বাইডেন প্রশাসনের চলার পথের নীতি-পলিসি কী হতে যাচ্ছে আলোচনা সেদিকে নিচ্ছি।

    বাইডেন প্রশাসন সম্ভাব্য অবস্থান-বৈশিষ্ট কেমনঃ
    প্রথমত এ্তদিন ট্রাম্প গত চার বছরে যত ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন, এর উল্টা যাত্রায় বাইডেন এখন যতটা সম্ভব আগের ওবামা আমলের অভিমুখী হবেন। সাধারণভাবে যা “ডেমোক্র্যাট আইডিয়াল অবস্থান” মনে করা হয় তেমন অভিমুখে যাবে। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটা আরো প্রো-পাবলিক হতে চেষ্টা করবে, সাধারণ জনমত ঠিক যা আশা করে। যেমন- পরিবেশ ইস্যুতে ‘প্যারিস চুক্তিতে’ ফেরত যাওয়া আর হিউম্যান রাইটস ইস্যুতে অনেক কড়া অবস্থান নিয়ে আসছেন বাইডেন।
    তবে সব কিছুর উপরে যা প্রধান দ্বন্দ্ব, যার নিরসন হবে বাইডেনের মুখ্য ইস্যু – যা অনেকটা পরস্পর সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো চাকার মধ্যে প্রথম যে চাকাটা ঘুরে বাকি সব চাকাকে ঘুরতে বাধ্য করে, এমন সেই ‘প্রাইম মুভার’ ইস্যু হবে চীনের সাথে ‘বাণিজ্য ইস্যু’ নিয়ে আলোচনা (যাকে গত চার বছর বাণিজ্যযুদ্ধ বলে ডাকা হয়েছে) তা শুরু করা। সেকারণে, আগামি ২০ জানুয়ারি বাইডেনের শপথ নেয়ার পরেই এক নম্বর প্রায়রিটি হবে এই ইস্যু।

    যদিও ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের আমলেই তা তিন পর্বে মিটিয়ে ফেলার একটা পরিকল্পনা ছিল যার প্রথম পর্ব ট্রাম্পই আলোচনা ও ঐকমত্য শেষে স্বাক্ষরও সমাপ্ত করেছিলেন। কিন্তু আর অগ্রগতিতে না গিয়ে সব স্তব্ধ করে রেখে দিয়েছিলেন। সেসবই এবার ফাংশনাল হতে শুরু করবে। এটাই হবে বাইডেনের ‘প্রাইম মুভার’ ঘটনা। এ জন্য যে, ট্রাম্প বাণিজ্য আলোচনাকে বাণিজ্যযুদ্ধের জায়গায় নেয়াতেই আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব যা গত ৭৫ বছর ধরে রাজত্ব করার শেষে এর পালাবদলটা মসৃণ হওয়ার বদলে তা যুদ্ধপরিস্থিতির দিকে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ঠেলে দেয়ার দিকে নিচ্ছিলেন ট্রাম্প। আর এটাই এখন অভিমুখ বদলাবে, যেটা দুনিয়াজুড়ে সবার আশা। এই অর্থে, বাইডেনের বিজয়ের প্রাথমিক খবর মানুষকে এক সম্ভাব্য গ্লোবাল যুদ্ধপরিস্থিতি এড়াতে এক মুক্তির সূচনা করল মনে করেছে। এক সম্ভাব্য গ্লোবালযুদ্ধ এড়াতে পারা অর্থে এটা এক নাজাত।

    তাহলে এখন কী হতে পারে?
    খুব সম্ভবত বাণিজ্য আলোচনায় আসলে যা হবে চীনের দিক থেকে দেখলে তাকে বলা যায়- এটা হবে, যত বেশি সম্ভব আমেরিকাকে বাজার ছাড় দিয়ে এর বিনিময়ে চীন নিজের গ্লোবাল নেতৃত্ব নেয়া- এই হস্তান্তর মসৃণ ও বাধাহীন করার নিশ্চয়তা ‘কিনে নেয়া’। বাণিজ্য আলোচনায় এই দেয়া-নেয়াই সম্পন্ন হতে পারে। যদিও  এটা আবার দুইভাবে ঘটতে পারে। এক, মুখে স্বীকার করে নিয়ে শুরু করা যে, আমরা পরস্পর এটাই বিনিময় করছি। অথবা তা হতে পারে মুখে স্বীকার না করে দুইপক্ষই মনে মনে এটা ধরে নিয়ে। তবে মুখে স্বীকার না করে নেয়ার কৌশলগত সুবিধা বেশি।
    এভাবে বাণিজ্য আলোচনা-নেগোসিয়েশনের আগের পথেই দ্বিতীয় পর্ব একটা চুক্তিতে পৌঁছালেই এরপর জো বাইডেন-শি জিনপিংয়ের যৌথ সামিট অনুষ্ঠিত হতে পারবে ও হবে। আর দুইপক্ষের উপরই দ্রুত এমনটা করার জন্য গ্লোবাল অর্থনীতি ও বাজারের চাপ থাকবে প্রচন্ড। কারণ করোনাকালে দ্বিতীয়বারের আক্রমণের ধাক্কাও আসন্ন। ফলে নিরন্তর মন্দা বাজারে মধ্যে ইতিবাচক মেসেজ পেতে সবাই আগ্রহী যাতে বাজার চাবুক খেয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

    এতে গ্লোবাল বাজার ও ক্ষমতার করিডোরে কী মেসেজ যাবে?
    সামগ্রিকভাবে মূল মেসেজটা হবে ইন্দো-প্যাসিফিক এবং কোয়াড [QUAD] উদ্যোগ ও স্ট্র্যাটেজিকে কেন্দ্র করে। ট্রাম্প মূলত মরিয়া হয়ে এদুটাকে একই সাথে সামরিক জোট ও বাণিজ্য জোট হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়ে চলেছিলেন। ট্রাম্প জানতেন এটা ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের পরে অকেজো দিশেহারা স্থবির হয়ে যাবে, কারণ নির্বাচনে পরাজিত হয়ে গেলে তো এমনই দশা হওয়ার কথা।
    চীনের সাথে বাণিজ্য আলোচনায় একবার প্রথমপর্বের আলোচনার শেষে  ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে এবং প্রকাশ্যে প্রেসের সামনে বলেছিলেন, চীন বাকি নেগোসিয়েশন আর করল না, আগালোও না – বাইডেনের ভরসায়। মানে নিজ ক্ষমতাসীন থাকার দু’বছরের মধ্যেই সে সময় ট্রাম্প বুঝাতে চেয়েছিলেন আগামীতে রিপাবলিকান প্রার্থী বাইডেন জিতে আসবে, এই ভরসায় আছে চীন। আর তারা তখন বেটার সুবিধা পাবে ও নিবে (ট্রাম্পের কাছে পাচ্ছে না) চিন্তা করে এখন ট্রাম্পের সাথে কম্প্রোমাইজ ডিলে যাচ্ছে না। তাই তিনি ওখানে ঘোষণা করেন, আগামীতে বাইডেনের ক্ষমতাসীন হওয়া বন্ধ করতে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন। তাই ধীরে ধীরে চীনবিরোধী জোট গড়া – আর সেটা খাঁড়া করা খুবই কঠিন হলেও তিনি ইন্দো-প্যাসিফিক ও কোয়াড গড়ে এটাতে সামরিক জোট ও বাণিজ্য জোট এ দুই লক্ষ্য জুড়ে দিয়েছিলেন।
    আর এখন ঠিক এ জায়গাটাতেই বাইডেন বদল ঘটাবেন। কৌশলগতভাবে ইন্দো-প্যাসিফিক ও কোয়াড উদ্যোগ ভেঙে না দিয়ে বরং এখন এটা কেবল বাণিজ্যের জোট এমন ধারণা সেট করে দেবেন। অর্থাৎ চীনের সাথে বাইডেন কী দেয়া-নেয়া করতে যাচ্ছেন বা করে ফেলবেন এর ছাপ-ইঙ্গিত তিনি এভাবে প্রকাশ করবেন।
    স্বভাবতই, আড়াই লাখ আমেরিকানের কোভিড-১৯-এ মৃত্যু আর প্রায় ৯ কোটি বেকারের আমেরিকায় বাইডেনের চীনা ডিল বা সম্ভাব্য এই ‘দেয়া-নেয়া’ – এটা একটা ইতিবাচক আবহাওয়া তৈরি করবে। যেকোনো অর্থনীতিই বেকারত্ব ও মহামারী থেকে বের হয়ে আসতে চায়। কারণ ‘উহান ভাইরাস’ বলে ট্রাম্পের নিজের সব শোচনীয় ম্যানেজমেন্ট ব্যর্থতা চীনের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া নির্বাচন পার হওয়ার জন্য হয়তো চলে। কিন্তু বাস্তবতা খুব কঠিন। তাই, না আমেরিকান অর্থনীতি না বেকার মানুষ এসব কথাকে এতদিন ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে। অতএব, যদি এভাবেই আগানো হয় তবে বাইডেন-শি জিনপিংয়ের সামিট তখন আমেরিকায় এক শীতল-পরশের মতো ভূমিকা নিয়ে হাজির হবে বলে অনুমান করা যায়।

    তাহলে ভারত তখন কোথায় যাবে?
    সীমান্তে চীন ভারতের সব দখল করে ১৯৫৯ সালের পুরনো সীমান্তকে ভিত্তি করে বসে পড়াতে ভারতের ইন্টেলিজেন্সিয়া বিশেষত মিডিয়া ফোরফ্রন্টে যারা আছেন তারা বুঝে গেছেন, মোদি তাদের সবাইকে বেইজ্জতি করে ফেলেছেন। কিন্তু তবু তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত ইজ্জত ও নিরাপত্তা হারানোর অসহায়ত্ব একালে ফুটে উঠেছে। তারা পরিষ্কার জানেন, কেন চীন ১৯৫৯ সালের পুরনো সীমান্তকে ভিত্তি মেনে ভারতের সব কেড়ে নিয়েছে। কেন ‘এলএসি’ [LAC] বলে এখন কিছুই নেই। মোদীর হামবড়া ভাব আর পুরা কাশ্মির ভারতের বলে দখলের দাবি – এসব অবিবেচক অবস্থাই ভারতে তাদেরকে ইজ্জত ও নিরাপত্তা হারানোর অসহায়ত্ব অনুভবে ফেলে দিয়েছে, তা তারা কমবেশি সকলেই জানেন। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত হল – তবু কথিত ‘জাতীয় স্বার্থের’ নামে মিথ্যা কথার জার্নালিজমই তাদের করতে হবে। অথচ যা মিথ্যা তা কখনই জার্নাজিলম-ই নয়। তাই তাদের দেখে  বাইরে থেকে মনে হবে তারা মোদীর পক্ষেই দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু আসলে এটা তাদের ইজ্জত ও নিরাপত্তা হারানোর অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি পাবেন, তাদের রিলিফ দিবে মনে করেই এই মিথ্যার চর্চার মহড়া যাতে তারা এখন যুক্ত ও মত্ত হয়েছেন।

    এ কারণে আগামীতে বাইডেন-জিনপিংয়ের সামিট যতই আসন্ন হয়ে উঠবে ভারত ততোধিক অস্থির হয়ে ভারত-চীন সম্পর্ক আবার আগের মত অবস্থায় ফিরে পেতে মরিয়া ও ন্যাংটা হয়ে উঠবে। চীনের সাথে ৫ আগস্ট ২০১৯ সালের কাশ্মিরের স্ট্যাটাস বদলে দিবার আগের সময়ের চীন-ভারত সম্পর্ক যে জায়গায় ছিল সেখানে ফিরে যাওয়ার জন্য অস্থির ও মরিয়া হয়ে উঠবে। অবশ্য একালের মোদীর ভারত জানবে যে, বাইডেনের আমেরিকা ভারতকে আর ‘চীন ঠেকানোর’ কাজের কোনো ঠিকা দেবে না। ফলে বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া- সেই ঠিকা ফেরত পাওয়া – না, এরও কোনো বালাই থাকবে না। তবু চীন-আমেরিকার সম্পর্কের টেনশনের আড়ালে ভারত নিজেকে লুকায় রাখার কৌশল নিবে যাতে বাইডেনের “ঝারি” একটু কম ভারতের গায়ে লাগে।

    আর এটাই মোদীর সবচেয়ে বড় “বাইডেন-অস্বস্তি” ইতোমধ্যেই মোদীকে কঠিনভাবে অস্থির করে তুলেছে। সে কারণে বাইডেন আসছে এই খবর পাওয়ার পর থেকে ভারতীয় মিডিয়ার সুর বদলে গেছে।  ট্রাম্পকে বাপ ডাকা আক্ষরিক অর্থেই পুজা করা মোদীর ভারতের জন্য বাইডেন জিতাতে এখন আঙুর ফলে একেবারেই টক হয়ে গেছে! যেমন আনন্দবাজার লিখছে, “অ্যামেরিকায় গদি বদলালে ভারতের কী”! যেন সমাজ-সংসারে নিরাসক্ত এক যোগী কথা বলছে। মানে তারা এখন ভেক ধরে বলছে, “আমেরিকার নির্বাচনে কে জিতল তাতে ভারতের কিছুই যায় আসে না”। অর্থাৎ তারা আসলে যেন বলতে চাইছে,  “হে মহান বাইডেন সাব, আমরা ভুল করেছি; আমাদের মাফ করে দাও। আমাদের মোদি ‘হাউ ডি মোদী’ করেছিল, হিউস্টনে আর গুজরাটে। যেখানে মোদী নিজে মুখে সমস্ত প্রটোকল ইজ্জত সম্মান ভেঙ্গে “আব কি বার ট্রাম্প সরকার” (পরের নির্বাচনে ট্রাম্পই জিতবেন) বলে স্লোগান ধরেছিল। এটা গর্হিত কাজ, অসৌজন্যমূলক। কারণ একজন সিটিং প্রধানমন্ত্রী এভাবে পক্ষপাতিত্বপূর্ণ অবস্থান প্রকাশ্যে নিয়েছে। ফলে এখন বাইডেন-মোদী কখনো সাক্ষাৎ হলে (বা একারণেই হয়ত সাক্ষাত হতে অনেক দেরি হবে) মোদী মুখ দেখাবেন কী করে, সেই অস্বস্তি এড়াবেন কী করে? এমন ন্যূনতম হুঁশজ্ঞান নেই এমন লোকই এখন ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার প্রধান। আর সেসব ঢাকতেই মোদী এখন মিডিয়াকে কিনে-বশ করে এমন রিপোর্ট ছাপানোর তোড়জোড়। বিবিসি বাংলার ট্রাম্পের নামে আগেভাগে ‘আব কি বার ট্রাম্প সরকার’ জয়ধ্বনি দিয়ে মোদি কি এখন বিড়ম্বনায়?’ এই শিরোনামের রিপোর্টটা বলে দেয়, মোদী কোন বেইজ্জতিতে আছেন। ভারতের কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মী দুই সপ্তাহ আগে যারা ট্রাম্পকেই তাদের নিরাপত্তাদাতা মনে করতেন এরাই এখন বলছেন, বাইডেনের সাথে ভারতের সম্পর্ক যেন কতকাল আগের। আসলে তামাশার বোধ হয় কোনো সীমা থাকে না!

    এদিকে চীন-ভারত লাদাখ সীমান্তে সেনা প্রত্যাহার নিয়ে আলোচনা ইতোমধ্যেই হঠাৎ গতি পেয়েছে, মনে হচ্ছে।

    কিন্তু বাংলাদেশে?
    কিন্তু বাইডেন জিতবার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশে সম্ভবত হবে সবার চেয়ে ভিন্ন। এর মূল কারণ, হিউম্যান রাইট মেনে চলার প্রশ্নে বাইডেনের কড়া অবস্থান নিবেন অনুমান করা হচ্ছে তাই। এটাই মোদীর জন্যও সবচেয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ার কারণ হয়েছে ইতোমধ্যেই। বাইডেন আগেই তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে কাশ্মিরে রাইট ভায়োলেশন নিয়ে সোচ্চার হবেন জানিয়ে দিয়েছিলেন। যদিও হিউম্যান রাইট ইস্যুতে কড়া অবস্থানের কারণ হল,  সাধারণভবে এটা ছিল সবাইকে দেয়া, মূলত হেনরি কিসিঞ্জারের পরামর্শ যে, একালে চীনকে বেকায়দায় রাখতে চাইলে হিউম্যান রাইট মেনে চলার প্রশ্নে আমেরিকার নিজ প্রশাসনের কড়া অবস্থান জরুরি। তাই ব্যবসা পাওয়ার লোভে আমেরিকার মানবাধিকারে ছাড় দেয়া যাবে না। এই নীতি অবশ্য ডেমোক্র্যাটরা তুলনামূলক বেশি অনুসরণ করেছেন। বাইডেনের কড়া অবস্থানের পেছনে এটাই কারণ।

    আর এটাই হাসিনা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। অনেকে বলতে পারেন, এটাই একই সাথে চীনের উপরেও চাপ, যাতে হাসিনা-চীন ঘনিষ্ঠতা কমে। এক থিঙ্কট্যাঙ্ক কনসালট্যান্ট কুগেলমানের [Michael Kugelman] বরাতে বাংলাদেশের একটি পত্রিকা লিখেছে, এই “ঘনিষ্ঠতা কমানো হবে” বাইডেনের বাংলাদেশ অবস্থানের মূল নির্ণায়ক।

    “I do imagine that he will view Bangladesh through the lens of US-China rivalry, and he will aim to engage with Dhaka in order to encourage it to distance itself from Beijing.

    কিন্তু কুগেলমানের একথা আসলে ‘ওভার এস্টিমেশন’। কারণ ‘বেসিক ফ্যাক্টস’ হল – অবকাঠামোর- ঋণদাতা বিনিয়োগকারী  হিসাবে আমেরিকা বাংলাদেশে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী একেবারেই নয়, এমনকি চাইলেও তা হতে পারবে না। আমেরিকার এমন বিনিয়োগ সক্ষমতা নাই বলেই তো গ্লোবাল নেতা হবার পদ হারাচ্ছে, চীন সে জায়গায় বসতে যোগ্য হয়ে গেছে। তাই আমেরিকার বাংলাদেশের ‘চীনা ঘনিষ্ঠতা’ ছুটানোর কোনো মুরোদই নেই। মনে রাখাই ভাল ধমকিয়ে কারো মন পাওয়া যায় না, এর সম্ভাবনা নেই। সে জন্য মন পাওয়ার ‘তরিকা’ ধরতে হয়। তবে অবশ্য বাংলাদেশে ইন্টারভেন করার মুরোদ আমেরিকার এখনো শেষ প্রান্তে হলেও আছে এবং খুব সম্ভবত এই বাইডেন প্রশাসনই হবে বাংলাদেশে ইন্টারভেন করার ব্যাপারে আমেরিকার শেষ প্রশাসন। আরেক বটম লাইন হল – চীন বাংলাদেশের কাছে অবকাঠামো-ঋণদাতা বিনিয়োগকারী থাকবেই, তাতে বাংলাদেশে যেই ক্ষমতায় থাক অথবা একটা নির্বাচিত সরকার থাকুক কি না থাকুক কিংবা ওই ঋণ থেকে অর্থ সরানোর সুযোগ কারো থাকুক আর নাই থাকুক। কাজেই কুগেলমান যেভাবে কথাটা চীনকে জড়িয়ে হাজির হয়েছেন তাতে ব্যাপারটা এক “সস্তা ভয় দেখানো’  হয়েছে। ভদ্র ভাষায় বলতে হয়, এটা কুগেলমানের “অতিসরলীকৃত এক বুঝ” বলা যায়।

    কিন্তু বাংলাদেশে হিউম্যান রাইট মেনে চলার রেকর্ড সঠিক করার চাপ আসন্ন, একথা বাস্তব ও সত্য। ট্রাম্প নয়, এটা বাইডেন জিতেছে বলে, ভারত আর বাইডেনের পিঠে চেপে চলা বা আসা কোনো ‘ব্যাগেজ’ নয়। তাই সরাসরি আমেরিকান চাপই আমাদের সরকারের এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে আসছে। কিন্তু তাই বলে ভারতের কোন চাপ নয়। হবার সম্ভাবনাও নাই। আবার ওদিকে রাতারাতি বাংলাদেশের সরকার ভাল হয়ে যাবে, হিউম্যান রাইটের সব রেকর্ড ভালো করে ফেলবে – তা সম্ভবই নয়। করা যায় না। তবে বাইডেন হিউম্যান রাইট মেনে চলার জন্য সরকারকে চাপ দিলে এর ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষের একটা সমর্থন আমেরিকার পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়াবে অবশ্যই। ঠিক যে অর্থে হাসিনা সরকারের জনসমর্থন বা পাবলিক রেটিং প্রায় নেই বলে, বাইডেনের চাপের বিরুদ্ধে, ইন্টারভেনশনের বিরুদ্ধে জনমতকে সরকার কাজে লাগাতে ব্যর্থ হবে।

    তবু ‘কী হতে যাচ্ছে’ তা নিয়ে এসব আসলে অনুমানের কথা। বাস্তবে কিভাবে ব্যাপারটা ঘটবে, তা দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। যদিও চ্যালেঞ্জগুলো বাস্তব!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

    [এই লেখাটা  গত  ১৪ নভেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “গ্লোবাল ও লোকালি ‘বাইডেন পাঠ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • নেপাল রাজনৈতিক অস্থিরতায়, অভিমুখ কোনদিকে

    নেপাল রাজনৈতিক অস্থিরতায়, অভিমুখ কোনদিকে

    গৌতম দাস

    ০৯ নভেম্বর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3fv

    ‘র’ এর প্রধান সীমান্ত কুমার গোয়েল, নেপালের প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রসাদ অলি ও মাওবাদী নেতা পুষ্পকমল দাহাল প্রচন্ড

    Democrat Joe Biden won the U.S. presidential election on Saturday after a bitter campaign…… REUTERS

    বিশ্বের চলতি প্রধান ঘটনায় এখন, সবশেষের কথাটা সবার আগে বলবার সময়।  জো বাইডেন বিজয়ী নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। যদিও ট্রাম্প এখনও ভুয়া আপত্তিতে ঘোঁত ঘোঁত শব্দ তুলছেন! যা এক সপ্তাহের মধ্যে মিলিয়ে যাবে। তবে এর আগের ঘটনাবলীতে গত ৩ নভেম্বরের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল যেখানে ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনকে জিতে যাবার পক্ষে আগাচ্ছিল। কিন্তু বিজয়ী হতে প্রয়োজনীয় ২৭০ ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের শেষ ৬টা পূরণ হওয়ার আগেই মনে হচ্ছিল তা থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সেটা পুনঃগণনার ফ্যারে পরে পিছিয়ে ২৫৩ হয়ে যায়। এদিকে তাতে অন্তত একটা রাজ্যে (জর্জিয়া) ভোট পুনঃগণনা শুরু হয়েছিল। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ফলাফলের পার্থক্য ১% এর নিচে হলে সেখানে ঐ পরিস্থিতিতে কেউ অনুরোধ না করলেও আপনাতেই পুনঃগণনা শুরু হয়ে যায়। তাতে আগে যদিও ফলাফলের সামগ্রিক ঝোঁকটা বাইডেনকে বিজয়ী করার দিকে ছিল তা থমকে দাঁড়িয়ে যায়। আর যতক্ষণ ফলাফল নিশ্চিত নয় ততক্ষণ এ নিয়ে এর চেয়ে বেশি কথা তখনই  আর না বলা ভাল মনে হয়েছিল। যদিও আভাস বলে সে শব্দটা আছে সেটা বিচারে এসব বুঝাবুঝির ক্ষেত্রে আমার চোখে এক অদ্ভুত ও সঠিক ইঙ্গিত দিবার উৎস হাজির হয়েছিল – ওয়াল স্ট্রিট বা আমেরিকান শেয়ার মার্কেটকে, যা স্বার্থসংশ্লিষ্টরা ছাড়া খুব কম মানুষই জানে বা আমল করে থাকে। ঘটনা হল, নির্বাচনি ফলাফল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তাতে রাজনীতিবিদের চেয়েও মারাত্মকভাবে যায়-আসে যাদের তারা হল ওয়াল স্টিটে যারা সারাদিন কাটান তাদের স্বার্থ। তাই মার্কেটের প্রতিক্রিয়া্ হল, নির্বাচনি ফলাফলের অভিমুখ বুঝবার বেস্ট উপায়। হয়েছেও তাই। আমেরিকান বাজার বাইডেন জিততেছে ধরে নিয়ে গত তিনদিন ধরে বাজার চাঙ্গা!

    সর্বশেষ পেলসিলভানিয়ার ইলেক্টোরাল কলেজ আসন সাথে গোনায় ধরে বাইডেন এখন ২৭৩ অর্থাৎ তিনিই প্রথম ২৭০ মার্ক ছাড়িয়ে গেলেন ফলে বিজয়ী তিনি। এছাড়া এখনও যে কয়টা গণনার সমাপ্তি টানতে বাকি তা সাথে ধরলে অনুমান করা হচ্ছে বাইডেন ৩০৬ পর্যন্ত যেতে পারে।

    ওদিকে ফলাফল পুরা প্রকাশিত হওয়ার আগেই এখনও ক্ষমতাসীন ট্রাম্প নিজের বিজয় ঘোষণা করে বক্তৃতা প্রচার করে দিয়েছেন। আর সাথে তিনি এমন একটি ধারণা প্রচার করে চলেছেন যেন, তিনি বা তাঁর দল এখন আমেরিকান সুপ্রিম কোর্টে অসংখ্য (ভিত্তিহীন হলেও) অভিযোগ নিয়ে একবার হাজির হতে পারলেই আদালত ট্রাম্পের বিজয়ের পক্ষে রায় দিয়ে দেবেন। কিন্তু কেন এমন হবে? এর জবাবটাও তিনি প্রচার-প্রপাগান্ডা করছেন আরেক কানকথা ছড়িয়ে যে, এখনকার সুপ্রিম কোর্টের ৯ জন বিচারকের মধ্যে ৬ জনের নিয়োগ হয়েছে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টদের হাতে; মানে তারা কনজারভেটিভ চিন্তার মানুষ এ’হল অনুমান। অতএব এ’কারণে ট্রাম্পই নিজের জিতে যাবার পক্ষে আদালতের রায় পাবেন। কিন্তু এটা খুবই আবেগি এবং সরল দলবাজি চিন্তা। আমেরিকার সাধারণ সমাজ ও বিচার সমাজ কি এতই নিচা ও হাল্কা-চিন্তা করা লোক – গর্ধব বোকা আর অবিবেচক? এখানে সবচেয়ে বড় ভুল-অনুমানটা হল সাধারণ  আমেরিকানদেরকে আবেগি মনে করা।  কাজেই এই অনুমান ভিত্তিহীন। যদিও বিচারকদের কেউ রক্ষণশীল চিন্তার হতেই পারেন; তাই বলে কোনো যুক্তি-প্রমাণ বা শক্ত কারণ ছাড়াই কি তাঁরা রায় দিতে পারেন? এটা বেশি কথা বলা। এছাড়া আরেকটা কথা মনে রাখতে হবে, প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী ধরনের নির্বাহী ক্ষমতাধারীরা যা করতে পারেন একজন বিচারক তা পারেন না। সেটা হল, কোন নির্বাহী কোন সিদ্ধান্ত নিলে সে সিদ্ধান্তের পক্ষে কারণ তিনি প্রকাশ্যে নাও বলতে পারেন; ‘রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা’ ইত্যাদির কথা তুলে। কিন্তু একজন বিচারক রায় লেখার সময় কারণ উল্লেখ করে সেটা যে ন্যায়সঙ্গত এর সপক্ষে সাফাই দিয়েই তাকে রায় লিখতে হয়। অতএব ট্রাম্পের চাপাবাজি বা বুলি বন্ধ হবে!
    আর ঠিক সে কারণে এখন আমেরিকান বিশ্লেষকরাই মিডিয়াতে মন্তব্য করছেন, বিচারককে কেবল প্রমাণ হাতে পাওয়ার পরেই আর ন্যায়সঙ্গত কারণ দেখিয়েই রায় লিখতে হবে। আর এর চেয়েও বড় কথা, বাস্তবে যেসব নির্বাচনী অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে মামলা করা হয় বা এবার হয়েছে সেখানে কথা একটাই বলা হচ্ছে, ‘অভিযোগ দেয়া হয়েছে’ কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রমাণসহ অভিযোগ তোলা হয়নি। ফলে বিচারক তা আমলে না নেয়ার সম্ভাবনাই প্রবল হচ্ছে। তাই এক কথায় বললে, ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দলের ভূমিকা এখন এতই নোংরা ও ধ্বংসাত্মক যে, যেকোন সময় জনমত উল্টে তাদের এসব তৎপরতার বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে। আমেরিকার সাধারণ নাগরিক সারা দিন এত কঠিন বাস্তবতার মধ্যে কষ্টকর জীবনযাপন ও বসবাস করতে হয় যে, কোনো আবেগে প্রভাবিত হওয়ার চেয়ে এরও আগে কঠিন বাস্তব দিকটা তাদের আগে চোখে পড়ে। তাদের কাছে আবেগ যেন বিলাসিতা, তাই দূরে থাকে আগে থেকেই। ফলে তারা যখন দেখতে পেয়ে যাবে যে, ট্রাম্প প্রমাণ দেয়ার চেয়ে অভিযোগ তোলার দিকেই বেশি আগ্রহী তখন তারা খোদ ট্রাম্পেরই হাত ছেড়ে হতাশ হয়ে সরে যেতে দেরি করবেন না। এভাবে একবার জন-মনোযোগ হারিয়ে ফেললে এটাই ট্রাম্পের হেরে যাওয়ার বাস্তব অবস্থা পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলতে পারে। মানুষকে কষ্ট দিতে আর হতাশ করে ফেলতে ট্রাম্প ও তার দল বা সরকারের এসব কাজও আরেক দিকে প্রচণ্ড নষ্টা ভূমিকা পালন করেছে।

    গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদলের কালের নির্বাচনঃ
    আমেরিকার এবারের নির্বাচনটা হচ্ছে এমন এক সময়ে যখন একই সাথে গ্লোবাল নেতৃত্ব পালাবদলের কাল এটা। যেখানে বাস্তবে গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলে যাবার আগে, খুব সম্ভবত, এটাই শেষ আমেরিকান নির্বাচন অথবা যুদ্ধবাজ রিপাবলিকানদের জন্য শেষ সুযোগ। অর্থাৎ এবার ট্রাম্প যদি জিতেন, তবে গ্লোবাল নেতৃত্ব বদল তাতে থামবে না যদিও। কিন্তু একটা যুদ্ধের ভেতর দিয়ে ফলাফল হিসাবে গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলটা আসবে হয়ত। অর্থাৎ একটি যুদ্ধপরিস্থিতির পরেই কেবল গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল ঘটবে। ট্রাম্পের এই মনোভাবের প্রতিক্রিয়াতেই যেমন সারা এশিয়া বিশেষত সাউথ-এশিয়ায় ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোর উপর প্রচণ্ড আগ্রাসী ও চাপ সৃষ্টিকারী হয়ে আমেরিকা গত কয়েক মাস থেকে গত সপ্তাহ পর্যন্ত তৎপর হয়েছিল। পম্পেই বা স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্তারা বাংলাদেশসহ নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ইত্যাদি দেশে সফরে গিয়ে এমন মরণ-চাপ তৈরি করে চলেছিলেন।
    এটি সত্য যে, এবারের আমেরিকান নির্বাচন এত চাপের মধ্যে হওয়ার মূল কারণ গ্লোবাল অর্থনীতির অর্ডারের নেতৃত্বের পালাবদল একেবারেই আসন্ন, তাই। তবে বাইডেন জিতলে সেটা তুলনামূলকভাবে কম উত্তেজনা ছড়িয়ে শান্তিপূর্ণ ডায়লগের মধ্য দিয়ে ঘটার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। কিন্তু এসব কিছুকে যা ছাড়িয়ে গেছে তা হল, বাংলাদেশ ছাড়াও নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, পাকিস্তানেও- এসব দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে নোংরামি আর খোয়াখেয়িতে ভরপুর করে তুলেছে ভারত-আমেরিকা। এরা বাধ্য করছেন এসব দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে আমেরিকা, ভারত না চীন এভাবে কোনো একটার ‘পা-চাটা দালাল’ হয়ে তারা নিজ দেশটাকেই যেন বিভক্ত করে ফেলে এমন বেপরোয়া হোক। আর এতে আস্তে আস্তে সব হারানো ভারতের ভূমিকাও আরো মরিয়া আমেরিকান বরকন্দাজ যেন, যার কাজ হলো নিজের সঙ্কীর্ণ স্বার্থে এসব নোংরামিকে আরো তুঙ্গে তোলা।

    বড় উদাহরণ বা শিকার এখন নেপালঃ
    গত দু’সপ্তাহ ধরে এমনই হুমকির মুখে পড়া দেশ হল নেপাল। ইংরেজিতে ‘র’ [RAW] হল ভারত-রাষ্ট্রের বহিস্থ গোয়েন্দা সংস্থা, যার ঘোষিত প্রধান কাজই হল, প্রতিবেশী দেশে অন্তর্ঘাতমূলক ক্ষতিকর কাজ করে বেড়ানো। এসব অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করে হাত পাকানো ‘র’ এর অপারেশন ডিরেকটর ছিলেন বি রমন। যখন একটা বড় সময় ‘র’ এর প্রধান ছিলেন আর এন কাও। তাই রমনের লেখা এক বইয়ের নাম “দ্যা কাও-বয় এন্ড ‘র’ ” – আগ্রহীরা পড়তে পারেন। আবার মূলত পড়শি দেশে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করে বেরায় একারণে ভারতের পক্ষে ‘র’ নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনার সুযোগ নাই। তাই তা ভারত সরকার নিজেই করে না বা প্রায় হয় না বললেই চলে। আর এটাই স্বাভাবিক। ঠিক যেমন ওয়াশরুমে গিয়ে আমরা কী করি তা নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো আলোচনা করি না, এমন ‘নোংরা কিছু’ যেন এই প্রতিষ্ঠান। তবু নেপালে ঘটনার শুরু এই ‘র’ এর কারবার থেকেই। বর্তমান ‘র’-এর প্রধান, সীমান্ত কুমার গোয়েল তিনি, নেপাল সফরে গিয়েছিলেন গত ২১ অক্টোবর প্রকাশ্যে এবং প্রটোকল ভেঙে ‘ওয়ান-টু-ওয়ান’ নেপালের প্রধানমন্ত্রীর সাথে ২ ঘণ্টা ধরে বৈঠক করে ওই দিনই ফিরে এসেছেন। এতদিন ‘র’-এর প্রসঙ্গ উঠলে তা লিখেছি – ‘ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা’ এভাবে সৌজন্যে। আজ প্রকাশ্যে লিখতে হবে। কারণ ‘র’-এর প্রধান ৯ সদস্যের টিম নিয়ে ভারতীয় বিমানবাহিনীর এক বায়ুযানে চড়ে ভিন দেশে গিয়ে প্রকাশ্যে একনাগাড়ে ১৬ ঘণ্টা (যেখানে শিডিউল ছিল ৯ ঘণ্টার) তৎপরতা চালিয়ে মধ্যরাতে নিজ দেশে ফিরেছেন। অথচ ভারতীয়দের দিক থেকে দেখলেও এমন কাজ, এটা লক্ষণ বা ইঙ্গিত হিসেবে খুবই খারাপ উদাহরণ হয়েছে। একজন প্রধানমন্ত্রীর সাথে কেন ‘র’-এর প্রধানকে মিটিং করতে হবে, বা তিনি তা করবেন? যেমন, মানুষ নিজ শরীরের মধ্যেই নিজের বর্জ্য নিয়ে ঘোরে। এর মানে এই নয় যে, আমরা তা প্রদর্শন করে বেড়াবো। এটা তো প্রটোকলেও পড়ে না। এই সফর এটা ভারতের কোনো হামবড়া ভাব বাড়বে না বা ক্রেডিট নয়। কারণ এর উল্টা মানেটা হল, ভারত যেন নিজের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কাজ ‘র’-এর হাতে তুলে দিয়েছে। যার মানে তাহলে এটা কি ইঙ্গিত যে, ভারতের বিদেশ বিভাগ ফেল করেছে, তারা অযোগ্য? কাজেই ভারতের নিজ প্রশাসনের কিছু নিয়ম প্রটোকল তো অন্তত ভারতের নিজের জন্যই মানা উচিত ছিল! এখন একটা উদাহরণ থেকে গেল যে, চাইলে ভারত সরকার এমন ‘ন্যুইসেন্স আচরণ’ করতে নেমে যেতে পারে! এছাড়া গোয়েলের এই সফরকে আড়ালে রাখতে বা ঝাপসা করে ফেলতে অনেক ভারতীয় মিডিয়া পুস্পদাহালের সাথে গোয়েলের সাক্ষাত হয়েছে বলে মিথ্যা দাবি করেছে। অনেক মিডিয়া মাধব চন্দ্র নেপাল সহ আরো নেতাদের কথা বলএছে। কিন্তু দাহালসহ সকলেই পরে মিডিয়ার সামনে জানিয়েছে এসব কথা মিথ্যা অনুমান। বরং পুস্পদাহাল ও মাধব এই খবরকে উড়িয়ে দিয়েছেন Former prime ministers Dahal and Madhav Kumar Nepal on Thursday morning refuted reports suggesting their meetings with Goel.. তাঁরা এই সভাকে ভুল কাজ ও অপরিপক্ক কূটনীতিবোধ [wrong and termed it diplomatic immaturity.] বলে চিহ্নিত করেছেন।

    আবার নেপাল মানেই কেবল ওর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী খাড়্গা প্রসাদ অলি (কেপি অলি), তা তো না। নেপালের অন্যান্য ডেজিগনেটেড নেতা বা জনপ্রতিনিধিরাও আছেন। আছে অলির নিজ রাজনৈতিক দল অন্যান্য নেতৃত্ব। কিন্তু ব্যক্তি অলির কোনো দুর্বলতায় তাঁকে বেকায়দায় ফেলে এই সফরের অনুমতি ‘র’-এর প্রধান আদায় করে নিয়েছেন বলে মনে করার কারণ আছে। যেমন এই সফরের ফরমাল উদ্দেশ্য কী? তা প্রধানমন্ত্রী অলি না নিজের দলে, না মন্ত্রিসভায়, না মিডিয়ায় কখনো আলোচনা করেছেন বা জানিয়েছেন। এমনকি নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও কিছু জানাননি।  করোনাকালে ভারত-নেপাল ফ্লাইট বন্ধ। তাই কেবল গোয়েলকে সামরিক বিমানে করে নেপালে আসতে গেলে আগাম অনুমতি যেটা দরকার, এর অনুরোধের ফাইলটাই কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চালু করে দেয়া হয়েছিল। এছাড়া আর কোথায়ও কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না যদিও নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষমতাসীনদের দলে অলিরই উপদলের লোক। আবার এটা কি ফরমাল না ইনফরমাল সফর, তা নিয়ে নেপালের মিডিয়ায় আলোচনা হচ্ছে; যার জবাবে এটা ফরমাল তা কেউ বলতে পারছে না। বিশেষত যখন এই সফরে আলোচনার এজেন্ডা বলেও কিছু ছিল না। আবার প্রধান প্রটোকল ভঙ্গের ঘটনাটা হল, বিদেশী সফর হয়ে থাকে সবসময় কাউন্টারপার্টের (মন্ত্রী হলে মন্ত্রী, সচিব হলে সচিব, জেনারেল হলে জেনারেল এভাবে) আমন্ত্রণে ও মূলত তাঁর সাথেই এবং আগাম ঠিক হয়ে থাকা এজেন্ডা ধরে। তবে সেটা কখন সাথে যেমন, প্রধানমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ পর্যন্তও হতে পারে। কিন্তু কোথাও কোন আলোচনা-সাক্ষাৎ পুরাটা ওয়ান-টু-ওয়ান হবে না, প্রতিনিধিদল থাকবে সাথে। কিন্তু অলি প্রথম যে প্রটোকল ভেঙে নিজেকে অপমান বা নিচা করেছেন  (‘র’ তা হতে দিয়েছে) তা হল, তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়ে আরেক দেশের গোয়েন্দা প্রধানের (সচিব বা সচিবের নিচে প্রটোকলে যার অবস্থান) সাথে এবং ওয়ান-টু-ওয়ান বৈঠক করেছেন এবং তাও কোন এজেন্ডা ছাড়া বৈঠক; কিভাবে তিনি করেন এটা? ন্যূনতম আত্মসম্মানবোধ থাকলেও এটা তাঁর করার কথা নয়।

    তবে পরের দিন দেশে প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে তিনি নিজের প্রেস উপদেষ্টাকে দিয়ে এক ছোট্ট প্রেস নোটে বলালেন যে, “ভারতের ‘গুপ্তচর সংস্থা’ ‘র’-এর প্রধান সামন্ত গোয়েল প্রধানমন্ত্রী অলির বাসভবনে এসে সাক্ষাৎ করেছেন। বৈঠকের সময় নেপাল-ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে বিপর্যস্ত হতে না দেয়া, আলোচনার মধ্যমে সমস্যার সমাধান, পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে তিনি নিজ ধারণা ব্যক্ত করেন।…… সূর্য থাপা, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উপদেষ্টা”।

    নেপাল-ভারতের তিতা হয়ে থাকা সম্পর্কঃ
    নেপাল-ভারত সম্পর্ক আগেও তিতা কম ছিল না, কিন্তু গত এক বছর ধরে তা ‘ভীষণ তিতা’ হয়ে আছে। মূলত কালাপানি, লিপুলেখ আর লিম্পিয়াধুরা- এই জায়গাগুলো বর্তমানে ভারতের দখল নিয়ন্ত্রণে রয়েছে; যা নেপাল মনে করে এগুলো তার ভূখণ্ড। তাই পাল্টা এগুলো অন্তর্ভুক্ত করে নেপাল এক নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে যা আগে নেপালের সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ করে নিয়েছিল।
    প্রধানমন্ত্রী অলি, তার দলের নাম এখন, নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি। আমাদের সিপিবি ধরনের; তবে অনেক গণভিত্তি এর হয়ে গেছে নির্বাচনী রাজনীতি করতে করতে। নেপালের এক মাওবাদী দলটা ছাড়া নেপালের আর সব রাজনৈতিক দলই আগের রাজতন্ত্রের আমলে রাজার অনুগত হয়ে চামচামি করে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগ করে ক্ষমতার কিছু স্বাদ পেত। কিন্তু মাওবাদীদের উত্থানের কারণে আগের সেই ভারসাম্য উৎখাত হয়ে যায়। তাতে সেই রাজতন্ত্রও উৎখাত হয়ে নেপাল এক রিপাবলিক গণক্ষমতার রাষ্ট্র এখন। গত সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে এক নয়া কনস্টিটিউশন চালুর পরে, যেটা ভারত মেনে না নেওয়া থেকেই চরমবিরোধের শুরু হয়। ভারতে নেপালে সমস্ত পণ্য আমদানির পথ অবরোধ করে রাখে প্রায় টানা ছয় মাস। আর তা থেকে সাধারণ নেপালবাসীরা প্রায় সকলেই চরমতম ভারতবিরোধী হয়ে যায়। এরপর থেকেই এই ভারতবিরোধী অল-আউট সেন্টিমেন্ট – এই পপুলিজমের নেতা হয়ে বসেন অলি। অথচ এর আগে তিনিই ছিলেন নেপালি কংগ্রেসের পরের গুরুত্বের চরম ভারতপ্রেমী রাজনৈতিক দল।  এখনকার গোয়েল-সফর সংকটে নেপালের মিডিয়া লিখছে, সে সময় নাকি অলির খাতির ভারতের রাজনীতিবিদ বা নেতাদের চেয়েও বেশি ছিল ‘র’-এর সাথে।
    তাই নেপালের এক সিনিয়র সাংবাদিক লিখছেন, “ওলি সেই ব্যক্তি ২০১৫ সালের অবরোধের আগে যাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করত ভারত। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চেয়েও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হতো ওলির। মনে হচ্ছে, ভারতের সাথে সম্পর্কের অচলাবস্থা নিরসনের জন্য তার প্রচেষ্টাতেই গোয়েল নেপাল সফর করলেন”। এমন একটা সম্ভাবনা হিসাবে  ব্যাখ্যা করেছেন নেপালের সিনিয়র সাংবাদিক Yubaraj Ghimire। তার সাবধানি ব্যাখ্যাটা হল, অলির উপদেষ্টা সুর্য থাপার কথা বিশ্বাস করলে ভারত গত একবছরের তিতা সম্পর্কের সময় থেকে উঠে আসার জন্য আবার ‘র’-কেই ব্যবহারের জন্যই সামনে এগিয়ে দিয়েছে। এমন একটি মুখ-আড়ালের ব্যাখ্যা ভারত থেকেই দেয়া হচ্ছে। কিন্তু অবিশ্বাস্য দিকটা হল, নেপালের সব মিডিয়া গত দু’সপ্তাহ ধরে হন্যে হয়ে খুঁজছে কেন ‘র’-এর প্রধান গোয়েল এসেছিলেন। কেউ হদিস করতে পারেনি কিন্তু সবাই আশঙ্কা করছে, এগুলো সামনে নেপালে আকস্মিক সরকার বদল বা খারাপ সময়ের ইঙ্গিত!

    নেপালের দুই কমিউনিস্ট পার্টির এক হওয়াঃ
    এদিকে গত সাধারণ নির্বাচনের (২০১৭ নভেম্বর) আগে থেকে আরেক বড় পরিবর্তন নেপালে ঘটেছিল । নেপালে ২০১৫ সালের কনস্টিটিউশন চালুর পর থেকেই কেবল নেপালের রাজনীতিতে  চীনের উপস্থিতি ঘটেছিল। তাও সেটা ঘটেছিল ভারতের পণ্য অবরোধের বিপরীতে বিকল্প হিসাবে চীনের ভিতর দিয়ে নেপাল বাইরের দুনিয়ার সাথে পণ্য আমদানি-রপ্তানির বাণিজ্য সম্পর্ক করতে পারে কিনা, এরই খোজ করতে গিয়ে। তাই  নেপালের রাজনীতিতে সেই প্রথম চীনের উত্থান ঘটেছিল। এতে ক্রমশ চীনের সাথে সারা নেপালের ব্যাপক সম্পর্ক হয়েছিল। বিশেষত সেটা আবার অলির কমিউনিস্ট পার্টি আর মাওবাদী পার্টির সাথেও। তাই চীনের পরামর্শ ও অনুরোধে এই দুই পার্টি এক পার্টি হওয়ার প্রক্রিয়া চালু করে। আর একসাথে ঐ নির্বাচনে লড়ে তারা ক্ষমতায় এসেছিল, দু-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে যেটা এখনও আছে। কিন্তু এক হওয়ার প্রক্রিয়া খুব সুখকর হয়নি। বেশির ভাগ সময় যে মূল অভিযোগটা সবার উপরে ভেসে থেকেছে তা হল, অলি দলের কাউকেই না বলেকয়ে বা আলোচনা না করে চলেন। দলীয় ফোরামে কোনো সিদ্ধান্ত নেন না, সব সিদ্ধান্ত নেন একাই। আর তা সবাইকে মানতে বাধ্য করেন। আর দ্বিতীয় বড় অভিযোগ হল, তাদের নতুন দলের নীতি ও সিদ্ধান্ত হল কেন নেতা একসাথে একের অধিক পদ ধারণ করে রাখবেন না। কেউ প্রধানমন্ত্রী হলে, তাহলে একইসাথে দলীয় প্রধানের পদ দখল করে থাকলে যেকোন একটা ছেড়ে দিতে হবে, এরকম। অথচ অলি সেটা আজও মেনে চলেন নাই, প্রয়োগ করেন না।
    অবস্থা এমনই চরমে যে, অনেকেই মনে করছে এই দ্বন্দ্বের এখন একটাই সমাধান – কমিউনিস্ট পার্টি আবার ভাগ হয়ে যাওয়া। যেটা এখন কেবল চীনের অনুরোধে খুবই হাল্কাভাবে এক হয়ে আছে। কিন্তু বাস্তবতা অসহনীয় পর্যায়ে। তবে এবার দল ভাগ হলে, তা আবার আগের মতোই আগে যে যার গ্রুপ বা উপদলে ছিল, সেভাবে ফিরবে না। বড় অংশটা বরং মাওবাদী পুষ্প কমল দাহালের পক্ষে চলে যাবে। যেমন যারা ওলির আগের কমিউনিস্ট দলের সিনিয়র নেতা হিসাবে অলির সাথে ছিলেন, মাধব কুমার নেপাল বা ঝালানাথ খানাল; দল ভাগ হলে এরা এখন পুস্পকমলের সাথেই যাবেন। এরা অলির আচরণ দেখতে দেখতে এতই বিরক্ত।  কিন্তু দল ভাগ হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান ফ্যাক্টর হল, যেকোন ভাগ হওয়া মানেই ভারত সেই ফ্রাকশনকে মদত দিবে। আর সর্বোপরি, প্রো-ইন্ডিয়ান নেপালি কংগ্রেসে দলের সাথে কোয়ালিশনে সরকার করা যায় কি না সে দিকে পরিস্থিতি টার্ন নিবে। মূল কথায়, নেপালে আবার ঘরোয়া অস্থিতিশীলতা প্রবেশ করবে।

    সংবাদ না থাকলে যা হয়, নেপালজুড়ে গুজবঃ
    কিন্তু আজব ঘটনাটি হল নেপালজুড়ে একটি পক্ষ যে গুজব ছড়াচ্ছে তা হল, পুষ্প দাহালের মাওবাদী ফ্রাকশন ভারতের সহযোগিতায় অলিকে পদচ্যুত করতে চাইছে। এই গল্পটা অলি ছড়িয়েছিলেন সেই গত জুলাই থেকে। এখানেও দেখুন, “ভারতকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য, নেপালের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি’। অথচ এই গল্পটার সবচেয়ে স্ববিরোধী বা বে-মিলের অংশটা হল, ভারত যদি অলিকেই ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাহলে সেই অলির সাথে একান্তে  ‘র’ এর প্রধান গোয়েল এই সাহসী মোলাকাত করছেন কেন? কী করে করবে? তাই এই অ্যাবসার্ড প্রপাগান্ডাটা পাবলিক খাবে এমন মনে হয় না! এর মানে আবার এও নয় যে এমন ঘটনা ঘটাবার চেষ্টা অলি করতে পারে না। মরিয়া অবস্থায় পৌছালে নিরুপায় হয়ে তিনি তা করতেও পারেন। কিন্তু আগেই বলে দেয়া যায় তা এক ব্যর্থ প্রচেষ্টায় পরিণত হবার সম্ভাবনাই বেশি হবে।

    আরেকটা গুজব হল, পুষ্প দাহাল অংশ থেকে বেরিয়ে অলি ভারতের প্ররোচনা ও সহযোগিতায় নেপালি কংগ্রেসের সাথে মিলে প্রো-ইন্ডিয়ান সরকার গড়তে চাইছে। হয়ত ভারত এটা চায় তা নিয়ে কিঞ্চিত সত্যতা আছে। কিন্তু এই গুজব-গল্পটারও বিরাট দুর্বল দিকটা হল, গত পাঁচ বছরে অলি ভারতবিরোধী অবস্থান ও বক্তব্যের জন্য ‘চ্যাম্পিয়ন’ – সবার উপরে – এভাবেই তিনি নিজেই নিজের ইমেজ তৈরি করে এসেছেন। এমনকি এই তো গত বছর এসময়ে লিপুলেখ ভারত দখল করেছে বলে ভারতবিরোধী যে ইমেজ তিনি নিজের জন্য দাঁড় করিয়েছেন, সেই তিনি এখন আবার এক প্রো-ইন্ডিয়ান সরকার গড়বেন, কেমন করে? তাও আবার নেপালি কংগ্রেসের সাথে মিলে যার ইমেজ হল গত নির্বাচনের পর থেকে যতদূর সম্ভব ভারতের কোলের ভেতরে ঢুকে যেয়ে বসা দল। তবে সেটা যাই হোক দ্বিতীয় এই গল্পটার সত্যতাো হয়ত কম নয়। কারণ?

    ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট দলের অলি-দাহাল সংঘাতঃ
    অনুমান করা হচ্ছে, পুরান দুই ধারার দুই কমিউনিস্ট নেতার সংঘাত আবার মারাত্মক জায়গায় যাচ্ছে বা চলে গেছে। সর্বশেষ গত জুন-জুলাইয়ে এই সংঘাত তুঙ্গে উঠলে সেসময় চীনা পরামর্শে সে যাত্রায় সেবারের সংঘাত সেসময়ের মত মিটিয়ে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে তা আর মিটবে না। এই অনুমানকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে গত পরশু ৬ নভেম্বরের নেপালের সেতপতি [Setopati] নামের এক ওয়েব মিডিয়া রিপোর্ট থেকে।  সেখানে দলের বিরোধের বহু কিছুরই উল্লেখ আছে।  সারকথায়, এই দলীয় ভিতরের সংঘাতই ভারতের জন্য সুযোগ বয়ে আনবে মনে করছে ভারত। তাই হয়ত গোয়েলের এই সফর!

    কিন্তু গোয়েল-অলির কোন পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্র একেবারেই ফেল করার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।  বিরাট বিপদে পরে এটা বরং অলির খড়কুটো আকড়ে ধরার মত প্রচেষ্টা। তাঁর প্রধান সমস্যা হল, তিনি ভারতবিরোধী চ্যাম্পিয়ান ইমেজ ব্যবহার করে পরিত্রাণ পেতে চান, কিন্তু বাস্তবতা হল তাকে আবার ভারতের কোলেই আশ্রয় নিতে হচ্ছে। ফলে তার চ্যাম্পিয়ান ইমেজ বিশ্বাস অযোগ্য ও বিক্রি অযোগ্য হয়ে হাজির হবেই। এটাই অলির প্রধান সংকট।

    দ্বিতীয়ত ভারতের আরেক বড় সংকট হল, নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯৫০। এটা দাসখত চুক্তি বলে দাবি ও প্রচার করেই মাওবাদী রাজনীতি ১৯৯৬ সাল থেকে আন্দোলন সুচনা করে আজ ক্ষমতায়। তাই নেপালে সাধারণ্যে একথাটা প্রতিষ্ঠিত যে এই টা দাসত্ব-চুক্তি। পরবর্তিতে তাই দুদেশের কিছু সিনিয়র সিটিজেনকে প্রতিনিধিত্ব দিয়ে তারা মিলে একটা কমিটি এই চুক্তির রিভিউ ও প্রস্তাব করার জন্য দুদেশ থেকে গঠিত হয়েছিল। তারা পর্যালোচনা শেষ করে, চুক্তি বাতিল করে নতুন কিছু করার প্রস্তাব করেছে। কিন্তু মোদী গত ২০১৮ সাল থেকে সময়াভাবের অজুহাতে কমিটির সাথে দেখা করছে না; যার ব্যবহারিক মানে হল, ঐ যৌথ রিপোর্টকে স্বীকার বা আমলে নিতে চাচ্ছেন না মোদী। ফলে ভারত চাইছে একবার কোন প্রো-ইন্ডিয়ান দল বা জোট ক্ষমতায় গেলে ঐ প্রস্তাবকে স্থায়ী ধামাচাপা দেওয়ার ব্যবস্থা করে।

    নেপালি রাজনীতিতে নুন্যতম করণীয়ঃ
    তবে গ্লোবাল নেতার পালাবদলের কালে, সাবধানে থাকতে নেপালের করণীয় কাজের গাইড লাইন কী হতে পারে সে হিসাবে দুটা  সার কথা বলা যায়। এটা বাইডেনের জিতা বা না-জিতা নিরপেক্ষ। এক, নেপালের দলগুলো কেউ ভারতের, কেউবা চীনের, কেউবা আমেরিকার দালালির এজেন্সি নিয়ে বসে পড়লেই সব শেষ! তাই কোনমতেই এটা হওয়া যাবে না। আর দুই, এসব এড়িয়ে নেপাল যেন এই তিন দেশের যেকোন প্রস্তাবে ‘না’ বলার ক্ষমতাটা কখনো নিজে্দের হাতছাড়া করে, এদুইটা জিনিষ ঠিক থাকলে নেপালের অনেক কিছুই করা সম্ভব! ওদিকে বাইডেনের বিজয় নিশ্চিত হয়েছে। তাতে কী নেপাল কোন সুবিধা পাবে?

    বাইডেনের বিজয়ের প্রভাব কতটুকু পড়বেঃ
    খুব বেশি না। নেপালের একটা সুবিধা হবে এতটুকুই যে বাইডেন আসাতে নেপালের উপর আমেরিকার সরাসরি চাপ কিছুটা কমবে। যেটা ট্রাম্পের শেষ আমলে অনেক আগ্রাসী হতে চাচ্ছিল। আর দুই, মূলত বাইডেনের বিজয়ে ভারতের পিছনে আমেরিকান সমর্থন বেশ কিছুটা ঢিলা হয়ে যাবে। ফলে নেপালের উপর চাপ দিবার ক্ষেত্রে ভারতের কিছু সক্ষমতাও। মুল কারণ ইন্দো-প্যাসেফিক সহ যেকোন চীনবিরোধী জোটের উদ্যোগ গত ছয়মাসে যেভাবে দানব হয়ে উঠেছিল সেটা এখন ঝিমিয়ে পড়ার সম্ভাবনা বড়বে। এই বড় পরিবর্তন সম্ভবত আসন্ন। বাইডেনের আমলেও আমেরিকার চীনবিরোধী কোন জোটের উদ্যোগ হয়ত এখনও থেকেই যাবে কিন্তু তা আগে যেমন সামরিক ও অর্থনৈতিক দুটারই জোট হতে চেয়ে আগে বাড়ছিল সেটা প্রথমত এখন কেবল “অর্থনৈতিক” হওয়ার দিকে নেমে, ছোট হয়ে যাবে। সামরিক দিকটা বাদ যাবে।  ফলে বাইডেনের বিজয় ভারতের মোদীর জন্য এক বিরাট ক্ষত এবং ক্ষতি নিতে আসতে পারে।

    তাই চীনের চাপে ভারত এতদিন আমেরিকার যত আগ্রহ ও যাকিছুকে নিজের জন্য সম্ভাবনা এতদিন দেখছিল তা অনেককিছুই এখন গুটিয়ে যাবার সম্ভাবনা। ফলে ততটাই নেপালের উপর ভারতের প্রভাব ফেলার ক্ষমতা। আর যদিও বাংলাদেশ এখানে প্রসঙ্গ না তবু একটা বাক্য বলে দেয়া উচিত। এই একই আলোকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ বিচার করতে যাওয়া ভুল হবে। কারণ বাইডেন সাথে করে আনবেন হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান। এই অবস্থান, যেটা বাংলাদেশের উপর প্রচন্ড চাপ তৈরি করতে এগিয়ে আসবে। বাংলাদেশ সরকারের জন্য যা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হবার সম্ভাবনা।  ওদিকে ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার ইতোমধ্যেই পদত্যাগপত্র রেডি করেছেন; কিন্তু যাকে কাজ চালিয়ে যেতে অনুরোধ করা হয়েছে। আর ট্রাম্পের দ্বিতীয় লোক, ট্রাম্পের ‘পার্টনারস ইন ক্রাইম’ – পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেই, তিনি এখন কোথায় তা জানা যায় না। তবে যদি তিনি আগামি সপ্তাহে আবার কোন ভিনদেশ ভ্রমণে না বের হন তবে এটাকে আমরা কোয়াড আর ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে হৈচৈ তোলা, চাপ তৈরি সমাপ্তির প্রথম লক্ষণ বলে গণ্য করতে পারি!

    তবুওও নেপালের উপর চাপ-প্রভাব তৈরির ভারতের রুটিন চেষ্টা সেটা অব্যাহতই থাকবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ০৭ নভেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “নেপাল থেকে শিক্ষা ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]