Tag: জাতিসংঘ

  • বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মোদি আবার বিবিসিকে ভাড়া করেছে

    বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মোদি আবার বিবিসিকে ভাড়া করেছে
    গৌতম দাস
    ১০ ডিসেম্বর ২০২৫   বিকাল ০৪ঃ ৩১
    https://wp.me/p1sCvy-6be

     

    দিল্লি-ঢাকা সম্পর্ক 

    গত পরশু আবার বিবিসি বাংলা ভাড়া নিয়েছে মোদি সরকার। হাসিনার পলায়নের পর গত পাঁচ মাসে  এটা হল মোদির তৃতীয়বার বিবিসি ভাড়া নেওয়া। টেম্পো-সিএনজিতে যেমন লেখা থাকে ভাড়ায় চালিত এটা অনেকটা সেরকম। বিবিসি বাংলার উচিত তার নিজের কপালে এমন একটা সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে দেয়া যে ভাড়ায় চালিত জার্নালিজম করি আমরা! এখন মোদি ভাড়ায় চালিত জার্নালিজম এর মানে কী, এমনটা তারা পছন্দ করে কেন?
    এর জবাব হল, দায়দায়িত্ব না নিয়ে মিডিয়ায় যা মনে চায় কথা ছড়ানো।  যেমন বিবিসি বাংলায় এধরণের রিপোর্ট করতেছে শুভজ্যোতি ঘোষ যিনি, আমি আগে অনেকবার বলেছি, আরএসএস নেতা তথাগত রায়ের শিষ্য! এতে মোদির সুবিধা হল তিনি দাবি করবেন যে শুভজ্যোতির এই লেখার সাথে আমার সরকারের সম্পর্ক নাই। এটা অনেকটা চিন্ময়-ইসকনকে দিয়ে বাংলাদেশে মোদি সরকারের দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা যেটাকে মোদি সরকার আবার অস্বীকার করবেন যে চিন্ময়-ইসকন মোদি সরকারের কেউ নয়! যদিও চিন্ময় গ্রেফতার হয়ে গেলে তখন কিন্তু মোদি খোলস ছেড়ে ন্যাংটা হয়ে চিন্ময়-ইসকনের পক্ষে বিবৃতি দিবে!  এই হল মোদির ভাড়ায় চালিত চিন্ময়-ইসকন ততপরতা অথবা ভাড়ায় চালিত বিবিসি জার্নালিজম কিনে পরিচালনা!

    এবারের শিরোনামঃ

    দিল্লি কি অবশেষে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক সহজ করতে চাইছে?

    বলাই বাহুল্য বিবিচির এমন রিপোর্টের স্টাইল হবে যেন বাংলাদেশের জন্য এটা সৌভাগ্য যে ইন্ডিয়া যেন দয়া করছে – এভাবে লেখা। যেমন এখানে আমরা দেখছি লেখা হয়েছে – দিল্লি কী (দয়া করে) ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক সহজ করতে চাইছে!  আর ভিতরে মানে রিপোর্টের বডিতে লেখা হয়েছে একটা মৌলিক অনুমানে ধরে নেয়া কথা যেন বাংলাদেশ এক ইন্ডিয়ান কলোনি; ফলে ইন্ডিয়া যা দাবি করবে বাংলাদেশকে সেটাই করতে হবে। এককথায়, বাংলাদেশ যেন ইন্ডিয়ান ডিকটেশন [dictation] বা ফরমানে চলা এক দেশ! অর্থাৎ স্বাধীন-সার্বভৌম কোন দেশ নয়; ফলে এটা ইন্ডিয়ার হুকুমে চলা। তাই এই লেখায় ইন্ডিয়ান যারাই কথা বলেছেন তারা বাংলাদেশ তো ইন্ডিয়ান হুকুমে চলা দেশ এই মিথ্যা ভ্যানিটি বা অনুমানে ধরে নেয়া ভাবনার উপর দাঁড়িয়ে কথা বলে গেছেন। আর যেখানে বিবিসির শুভজ্যোতির কাজ হচ্ছে এমন অনুমানকে প্রশ্ন না করে চলতে দেয়া। মোদির ইন্ডিয়ার এমন খায়েসকে জায়গা করে দেয়া। কারণ, শুভজ্যোতিও তো এক ভাড়ায় চালিত বালক!
    এটা আবার বলা যায় অনেকটা যেন ধরে নেওয়া যে গত ষোল বছরের (ইন্ডিয়ার বসানো) হাসিনা শাসন যেন এখনও আছে, চলছেই!  তাই এই ডিকটেশন স্টাইলে বক্তব্য বা দাবি! এজন্যই যেটাকে আমি ভদ্র ভাষায় বলেছি – এটাই ইন্ডিয়ান হেজিমনি বা আধিপত্যবাদ। এক হিন্দুত্ববাদী আধিপত্য কায়েমের প্রচেষ্টা!  কাজেই বাংলাদেশের আগামি রাজনীতির মুখ্য বৈশিষ্ট  ইন্ডিয়ান আধিপত্য-বিরোধী এটাই হবে!  যদি না হতে পারে যে রাজনীতির ঝোঁক টা বিএনপির মধ্যে উঁকি দিতে দেখা যাচ্ছে এর মুখ্য বৈশিষ্ট হবে ইন্ডিয়ান আধিপত্য এর পক্ষে!

    এবার সোজা আসা যাক মূল প্রসঙ্গেঃ
    বিবিসির এধরণের তৃতীয় রিপোর্ট দিয়ে মোদির ইন্ডিয়া যা বলতে চেয়েছে  তা হল, তারা এখন বাংলাদেশের সাথে দ্রুত সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়।  কিন্ততু এতে যেন তারা বাংলাদেশকে একটা বিরাট ফেবার করছে এই ভাব ফুটিয়ে ধরে তাদের ইউজুয়াল কিছু গোয়ার্তুমিও  সাথে রেখেছে যেমন, “তাদেরকে বড় ভাই মানতে হবে”।  যেটা অন্যভাষায় বললে তারা দুটা শর্ত দিয়েছে। বিবিসি লিখেছেঃ

    “ভারতের দিক থেকে এই প্রচেষ্টা হবে পুরোপুরি ‘শর্তাধীন’ – অর্থাৎ ভারতের দেওয়া বিশেষ কয়েকটি শর্ত পূরণ না হলে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে দিল্লি সম্ভবত খুব একটা গরজ দেখাবে না”।
    “…..আর এর মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দু তথা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কিংবা পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অন্তর্ভুক্ত করার মতো অতি স্পর্শকাতর বিষয়ও থাকতে পারে”।

    এতটুকুই না তবে এটাই মুল দাবি! মানে সাথে খুচরা দাবিও কিছু আছে সেকথায়  পরে আসব।

    তবে ইন্ডিয়ার আগ্রহ যে একেবারে গলে পড়তেছে তার ছাপ-ইঙ্গিত রেখে বিবিসি লিখছেঃ

    “গত তেসরা জানুয়ারি (শুক্রবার) দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিং-এ বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে মুখপাত্র নতুন দু’টো শব্দ যোগ করেন।
    মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল একটি প্রশ্নের জবাবে বলেন, “ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরের পরই প্রেস বিবৃতির আকারে এই মনোভাব স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, ভারত একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও প্রগতিশীল, ইনক্লুসিভ বাংলাদেশকে সমর্থন করে”।”

    বিবিসি এরপরে নিজেই মন্তব্য জুড়ে দিয়ে লিখছেঃ “বছরখানেক আগেকার চেয়ে ভারতের এই বক্তব্যে নতুন শব্দ দু’টো হচ্ছে – গণতান্ত্রিক আর ইনক্লুসিভ (অন্তর্ভুক্তিমূলক)“।

    ইন্ডিয়া আসলে বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর রাষ্ট্র ধারণাটা এখনও বুঝল নাঃ
    এভাবে শিরোনামে আ লিখেছি যে “ইন্ডিয়া আসলে বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর রাষ্ট্র ধারণাটা এখনও বুঝল না” – ঠিক এটাই বুঝাতে চেয়েছি।  আসলে এখন এটা বলাই যায় যে এখন পর্যন্ত দুনিয়ার ইতিহাসের মোটা দাগে তিনটা পর্যায় দেখা যাচ্ছেঃ এক. বিশ্বযুদ্ধ-পুর্ব কলোনিদখলের দুনিয়া  দুই. কলোনিমুক্ত আমেরিকান নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্ডারের দুনিয়া আর তিন. (এটা আসন্ন মানে হবু) চীনের গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বে উইন-উইন [win-win] এর দুনিয়া।ীভাবে তিনটা পর্ব ভাগ করেছিল একই কলোনিদখল ধারণাটার ভিত্তিতে। বিশ্বযুদ্ধ-পুর্ব মানে ১৯৪৫ সালের আগের দুনিয়াটা ছিল ছোট বড় পাঁচ (বৃটিশ, ফরাসী, ডাচ, স্পানিশ ও পর্তুগীজ) কলোনিদখলদারের দুনিয়া; যারা সারা দুনিয়ার কোন ভুখন্ড খালি ছিল না সবটাই এই পাঁচ কুতুবের কেউ না কেউ দখল করে রেখেছিল – এমনই সেই দুনিয়াটা। ফলে প্রধান বৈশিষ্ট কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য বাণিজ্য বিনিময় নয় (সেখানে ছিল না) বংরং কলোনি দখল আর লুট – আমাদের মত দেশের অর্থনীতির সারপ্লাস বা বাড়তি মূল্য বা সঞ্চয় সব লুট ও নিজ কলোনি মালিক দেশে পাচার – এই ছিল ওর মুখ্য বৈশিষ্ট।
    আর দুইঃ বা দ্বিতীয় ধারার মূল বৈশিষ্ট হল,  অন্যের ভুখন্ড কলোনি করে রাখা অপরাধ মানে একটা কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের দুনিয়া এবং এমন স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর সকলকে সদস্য করে নিয়ে একটা পুঞ্জীভুত [ইউনাইটেড] রাষ্ট্রপুঞ্জ [United Nations বা জাতিসংঘ] প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় গড়া একটা গ্লোবাল অর্ডার [Global Order] দাঁড় করানো।  যার আরেক বৈশিষ্ট হল, আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য বাণিজ্য এর গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ বা বিনিময় ব্যবস্থা স্থাপন [আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে]। প্রাতিষ্ঠানিকতা হিসাবে মুলত জাতিসংঘ,  আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক; এদের মাধ্যমে আমেরিকার নেতৃত্বে একটা গ্লোবাল অর্ডার (গ্লোবাল সিস্টেম) প্রতিষ্ঠা পায় তাতে যেটা মূলত এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম আর একটা  গ্লোবাল ইকোনমিক সিস্টেম গড়ে তুলেছে।  এভাবে এক
    আর তিনঃ এটাকে বলেছি চীনের গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বে উইন-উইন বৈশিষ্টের দুনিয়া। এই পর্বকে বুঝতে হবে আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য বাণিজ্য বিনিময়ের দ্বিতীয় পর্যায় হিসাবে। আর এই দ্বিতীয় পর্যায়টাই উইন-উইন পর্যায়।
    অর্থাৎ হবু চীনের নেতৃত্বের দুনিয়াতেও আগে তৈরি হওয়া গ্লোবাল অর্ডারেও আরো পরিবর্তন আসবে। কিন্তু সেটা পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক দুই ক্ষেত্রেই নয় বরং মূখ্যত সেটা ইকোনমিক অর্ডার বা সিস্টেমে। মানে গ্লোবাল বিকাশ পর্বের এই তিনটা পর্যায়কে যদি গরীব দেশের অর্থনীতির সারপ্লাস বা বাড়তি মূল্য বা সঞ্চয় সব লুট ও নিজ কলোনি মালিক দেশে পাচার – এই চিন্তা ফ্রেমের মধ্যে থেকে দেখি তবে প্রথম পর্বটা হলঃ সারপ্লাস পশ্চিমে নিয়ে যাওয়া আর যেখানে দ্বিতীয় পর্বটা হল, ঐ সারপ্লাস ফিরে পশ্চিম থেকে পুবে (এশিয়া ও আফ্রিকা ল্যাটিনো ভুখন্ডে) যার নতুন নাম বিনিয়োগ – এই নামে লূট করা সারপ্লাস এর ফিরে আসা।

    তাহলে তৃতীয় পর্বের বৈশিষ্ট কী? উইন-উইন কেন?
    এই পর্বের মূল বৈশিষ্ট হবে ১। স্বীকার করে নেয়া হবে পুরানা তৃতীয় বিশ্ব (বা একালে চীন যেটাকে গ্লোবাল সাউথ বলছে) ধারণার দেশগুলোকে। সেটা এই অর্থে যে গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থায় তোমরা আসলে  খুবই গুরুত্বপুর্ণ পার্টনার।   অর্থাৎ আগে যেমন ভাবা হয়েছিল  – তোমরা তৃতীয়বিশ্ব হইলা আমরা যাদের লুট করবো সে আইটেম মাত্র। তোমাদের ভুমিকা হইল নিজেকে লুট হতে দেওয়া। আর সেখান থেকে (দ্বিতীয় পর্ব বলেছি যেটাকে) আমেরিকান নেতৃত্ব যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য বাণিজ্য বিনিময় এর যাত্রা এতে ইতিবাচক দিকটা হল, আমাদের মত দেশ বিনিয়োগ পেয়ে পুরানা স্থবির অর্থনীতি সচল হয়েছিল। যদিও এই বিনিময়টাই ছিল অসম। তাই তৃতীয় পর্বে এসে এই অসাম্য অনেকটাই কমবে পুরাটা নির্মুল না হলেও। আর সবচেয়ে বড় কথা এখানে গরীবদেশকেই বড়লোকেরা সাহায্য করতে এসেছে তাই তারা দাতা এই ভাবনাটা ঢিলা হয়ে যাবে। এর জায়গা নিবে পার্টনার কনসেপ্ট। যেমন বাংলাদেশ একটা ভাল বিনিয়োগের জায়গা বলেই চিনা বিনিয়োগ গন্তব্য বাংলাদেশ! তাই বাংলাদেশে চীনের কাছেও তার জন্যও দরাকারি এক গুরুত্বপুর্ণ পার্টনার। এটাই একটা বিনিময়ের উভয় প্রান্তের রাষ্ট্রের লাভালাভ এর ধারণা – তাই এটা উইন-উইন! যে বিনিয়োগকারী রাষ্ট্র উইন-উইন দিকটা আমল না করবে সে ব্যবসা-সম্পর্ক হারাবে। এছাড়া শেয়ার্ড ভ্যালু চেন ধরনের এক নয়া উতপাদন ব্যবস্থা আসতেছে। এখানে সেসব দিক বিস্তার করলাম না।   আমাদের মূল প্রসঙ্গে ফিরে যাই।

    কিন্তু ইন্ডিয়া সেই তিমিরেঃ
    যেটা বলছিলাম ইন্ডিয়ান বুঝাবুঝিতে (একাদেমিক বা ব্যবহারিক রাষ্ট্র-সরকারে) সবখানে রাষ্ট্র তাদের কাছে কে কাকে কলোনিদখল করে আধিপত্য প্রভাবে রাখতে পারে এর বেশি কিছুই না। এটাই সেট করে দিয়ে যাওয়া নেহেরুয়ান রাষ্ট্র বুঝাবুঝি। এর সারকথা হল, রাষ্ট্র মানেই কে বুদ্ধি খাটিয়ে কার উপর আধিপত্য খাটাতে পারে যেন এই খেলা একটা। যেটা আসলে শাসক বলতে যদি আপনি বৃটিশ শাসক বুঝেন আর এটাই স্থায়ীভাবে শাসক সম্পর্কে ধারণা জ্ঞান করেন তাহলে যেখানে আপনি পৌছাবেন। কাজেই দুনিয়ার তাবত পরিবর্তনগুলো হচ্তেছে বা আসছে তাতে অন্যকোন দিকে তাকানো যাবে না বরং এতে অন্যরাষ্ট্রকে নিজ কলোনি বা আধিপত্যের ক্ষেত্র হিসাবে ব্যবহারের যেসব সুযোগ যদি দেখতে পাওয়া যায় তবে ঝাপায় পরে গ্রহণ করা -এটাই ইন্ডিয়ায় কংগ্রেস-বিজেপি নির্বিশেষে শাসক চিন্তা যা আসলে তাদের রাষ্ট্র-বোধ!  এটাই আসলে নেহেরুয়ান আধিপত্যকামী এক রাষ্ট্র-চিন্তা!  ইন্ডিয়া তাই সারা দুনিয়াতে না পারুক তার পড়শী এলাকায় এমন হেরুয়ান আধিপত্যকামী এক রাষ্ট্র-চিন্তা দিয়ে পরিচালিত হতে যায়। এটাই তার পররাষ্ট্রনীতি বা বোধ!
    অতএব বাংলাদেশ ইন্ডিয়ার চোখে আধিপত্য কায়েম করে একে নিয়ন্ত্রণ করার এক রাষ্ট্র মাত্র।
    তবে এই সুযোগটা সে পেয়েছিল ২০০৭ সালের আমেরিকা বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার হাতে তার আধিপত্যে আমাদেরকে সঁপে দিয়েছিল বলে। বিনিময়ে ইন্ডিয়া আমেরিকার  চীন ঠেকানী (অর্থনৈতিক উত্থান ঠকানী) হাতিয়ার হতে পারবে এই অনুমানে, এই চুক্তিতে। কিন্তু ধর্মের কল বাতাসে নড়ে!  মানে চীনের প্রভাব (যেটাতা চীনের ঋণ-বিনিয়োগদানের সক্ষমতা থেকে উতসারিত) এটা কমে যাওয়া বা আমেরিকার তা ঠেকিয়ে দেওয়া দূরে থাক কোনই ফয়দা আনে নাই।  বাংলাদেশে চীনা ঠেসে দেওয়া ঋণ-বিনিয়োগ এর বাস্তবতা ও চীনের সক্ষমতাই বলে দেয় আমেরিকার চিন্তা-আকাঙ্খা ছিল অবাস্তব!
    কাজেই বাংলাদেশের উপর ইন্ডিয়ার আধিপত্য খাটানোর কোন বাস্তব সুযোগ অনুপস্থিত!
    কিন্তু এসব বুঝাবুঝি ইন্ডিয়ার একাদেমিক, রাষ্ট্রীয় নীতি বা কূটনীতিক জ্ঞানের মধ্যে অনুপস্থিত।  নেহেরুয়ান রাষ্ট্র বুঝাবুঝি বা ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াটা আসলে কী সেই বোধ না থাকার জন্য।

    কাজেই আমরা এখন ফিরে যাই বিবিসি যেটা লিখেছে ভারতের “…প্রেস বিবৃতির নিজ মনোভাব আকারে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে,  (বাংলাদেশে) ভারত একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও প্রগতিশীল, ইনক্লুসিভ বাংলাদেশকে সমর্থন করে”। আর এই বিবৃতিতে নাকি দুইটা নয়া শব্দ আছে গণতান্ত্রিক আর ইনক্লুসিভ।
    যার অর্থ আবার বিবিসি-ই বলে দিয়েছে সেটা হল মানুষের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার সে দেশে ক্ষমতায় আসুক, আর দুই বা ইনক্লুসিভের অর্থ হল, – “সমাজজীবনে সংখ্যালঘুদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত” –  আর “রাজনীতিতে সব ধরনের শক্তিকে ঠাঁই দেওয়ার” মানে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে দেওয়া বুঝানো হয়েছে……।

    বাংলাদেশ কীভাবে চলবে সেটা কী ইন্ডিয়া ঠিক করে দিতে পারেঃ
    প্রথম প্রশ্ন হল, বাংলাদেশকে কী ইন্ডিয়ার কথা শুনে চলতে হবে? কেন? বাংলাদেশ কী ইন্ডিয়ার কলোনি?
    ইন্ডিয়া যদি বাংলাদেশের হিন্দুদের রক্ষাকর্তা হিসাবে নিজেকে হাজির করতে চায় তাহলে আমরাও কী ভারতের মুসলমানদের রক্ষাকর্তা হবো না কেন? মোদি সেটা মানবেন না কেন? সবার আগে মোদির ইন্ডিয়ার সবাইকে এর জবাব দিতে হবে।
    দুইঃ এটা বড়ই তামাসার যে ইন্ডিয়া এখন ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার চাইতেছে। কেন? তাহলে গত ১৬ বছর হাসিনা কীভাবে ক্ষমতায় ছিল? তখন কেন এমন শর্ত ইন্ডিয়ার মুখ থেকে বের হয় নাই? তার মানে ইন্ডিয়া আসলে ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার নয় হাসিনাকেই আবার যেকোন ভাবে ক্ষমতায় সরকারে দেখতে চাইছে।
    আসলে হাসিনা ও তার দল আগামি রাজনীতিতে বা নির্বাচনে অংশ নীতে পারবে কিনা সেটা ঠিক হবে আমাদের আদালতে! তাদের উপর যে গুম-খুন, অপহরণের মামলা আছে সেই মামলার রায়ের দ্বারা এটা নির্ধারিত হবে। আর এনিয়ে ইন্ডিয়ার কোন কিছু দাবি করার কোন সুযোগ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে নাই।
    অথচ বিনা সিক্রি যার জীবিনটা কেটেছে একজন পেশাদার কূটনীতিক হিসাবে তিনি এসব দাবি করছেন। যেন তিনি কূটনীতিক নয় এক দাইনি বুড়ির পরিচয় পেতে চাইছেন!!!

    যেমন শর্ত দিচ্ছেন আমরা পাকিস্তানের সাথে কেমন কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখব। বলছেন, “বাংলাদেশের মাটিকে পাকিস্তান যে কোনওভাবে ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের বিরুদ্ধে বা সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে ব্যবহার করবে না, সেটা নিয়ে শতকরা একশোভাগ নিশ্চিত হতে পারলে তবেই ভারত এই সম্পর্ক নিয়ে এগোতে পারবে”, বলেন ভিনা সিক্রি।  এখন তামাসাটা হল, মোদির ইন্ডিয়া ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক করেছে। এখন বিনা সিক্রির মত আমরা কী ভারতকে ইসরায়েল নিয়ে বলতে গিয়েছি? নাকি বিনা চাচ্ছেন আমরাও ইসরায়্বেল নিয়ে আমরাও মোদিকে পাল্টা শর্ত দেই???
    আবার বিবিসি লিখছে, “…ভিনা সিক্রির কথায়, “যত দ্রুত সম্ভব সে দেশে নির্বাচন আয়োজনের ওপর ভারত জোর দেবে। শুধু তাই নয়, সে নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হতে হবে, এবং তাতে সব দল ও মতাবলম্বীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।”
    আমরা নির্বাচন দ্রুত না দেরিতে করব এনিয়ে বিনা বলার কে? আর সব দল বলতে আমাদের আদালত হাসিনা ও লীগকে বাইরে রাখে কিনা তা ঠিক করবে সেখানে বিনা কথা বলার কে?

    আসলে যেকথা বলছিলাম, ১৯৪৫ সাল পরবর্তী রাষ্ট্র ধারণাটা কোনদিকে গিয়েছে এনিয়ে সারা ইন্ডিয়াতেই বুঝাবুঝি নাই।  তাই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে বিনা সিক্রি কী দাবি করতে পারেন না সেই লাগাম-বোধও তাদের গড়ে উঠে নাই। কাজেই বিনা সিক্রি আপনি পরে আসেন……।

    ইন্ডিয়ান হেজিমনি বা আধিপত্য উচ্ছেদই হবে বাংলাদেশে আগামি রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট! এটা হতেই হবে তা আমরা আরো নিশ্চিত হলাম!!!
    আর এমন হলে, মানে ইন্ডিয়া যদি আধিপত্যশীল এক কলোনি-মালিক যেন এমন থাকতেই চায় তবে,   ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক সহজ স্বাভাবিক হবার হবার দরকার কী, সুযোগই বা কৈ? যেখানে সহজ স্বাভাবিক সম্পর্ক মানেই হল ইন্ডিয়ান আধিপত্য! এর কী আমাদের দরকার আছে?

     

    লেখকঃ
    গৌতম দাস
    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ  সন্ধ্যা  ০৭ঃ ২৫   ১০  জানুয়ারি ২০২৫

  • সিরিয়ায় কী হচ্ছে; এ’ক্ষমতাবদলের অর্থ-তাতপর্য

    সিরিয়ায় কী হচ্ছে; এ’ক্ষমতাবদলের অর্থ-তাতপর্য
    গৌতম দাস
    ১১ ডিসেম্বর ২০২৪  রাত ০৯ঃ ৩৮
    https://wp.me/p1sCvy-61c

     

    মস্কোয় সিরিয়ার দূতাবাসে উড়ল বিরোধীদের পতাকা

    [সিরিয়ায় কী হচ্ছে; এ’ক্ষমতাবদলের অর্থ-তাতপর্য। এই লেখা অবশ্যই এক প্রাথমিক বুঝাপড়া থেকে। এতক্ষণ পর্যন্ত যতটুকু পর্দা উন্মোচিত হয়েছে; যার বেশির ভাহটাই ঘটে গেছে পর্দার অন্তরালে। যেখানে অতি অবশ্যই বাইডেন-পুতিন এর বুঝাপড়া আছে। সাথে কিছুটা  বলা বাহুল্য  বাইডেন-নেতানেহায়ু এরাও আছেন। গোলান-হাইট দখল এর ইঙ্গিত। 
    এক্ষণ এর সাথে কী ইউক্রেন-ও একই ডিলের অংশ!  এরকম একটা ভাষ্য ভেসে বেড়াচ্ছে যে ট্রাম্প বলছেন সিরিয়ার পর তাহলে ইউক্রেন ইস্যুও দ্রুত সামনে আনা উচিত! আমার অনুমান এমন অনেক কিছুই এখনও হিডেন বা পর্দার আরালেই রয়ে আছে বা রাখা আছে। তবে একটা মূলসুত্র বলে দেই যে কীভাবে দেখতে হবে এই অর্থে, আগামি ২০ জানুয়ারি ২০২৫ ট্রাম্পের ক্ষমতা আরোহনের শপথের দিন। এর আগে পর্যন্ত বাইডেন এমন অনেক কিছুই করে নিবেন। যার মধ্যে কতগুলো থাকবে ট্রাম্প প্রশাসনকে বিপদে ফেলে দিয়ে যাবার জন্য। আবার কতগুলো থাকবে বাই পার্টিজান মানে আমেরিকান সংসদগুলোর দুপার্টির মিলিত সিদ্ধান্তে নেয়া যা বাস্তবায়িত করে দিয়ে যাবেন এখনও যে আছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন!]

     

    সিরিয়ায় কী হচ্ছে, কী চলছে এনিয়ে একটা বাংলাদেশের উদাহরণ মনে পড়ল। ঘটনাটা হল বাংলাদেশে এরশাদের পতন। বাসার আসাদের পতন এর সাথে এরশাদের পতনের অনেক মিল আছে।   আচ্ছা, এরশাদের পতন কবে হয়েছিল?
    এটা শুনলে আমাদেরকে পুরান কাগজপত্র ওয়েবে বা কাগজের গাট্টিতে খুঁজতে বসতে হবে।  তারিখ হিসাবে সেটা হল, ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর। সেকালের মিডিয়া বলতে (মূলত ইত্তেফাক আর সংবাদ; এর বাইরে ইনকিলাব এসেছে কেবল আর ওদিকে দৈনিক খবর ছিল এরশাদের হাত ধরে তবে সবই মূলত খুচরা প্রপাগান্ডা পত্রিকা)। আর টিভি বলতে একমাত্র বিটিভি। ওয়েব বা নেট বলতে কী বুঝায় আমরা তখনও কেউ জানিই না, চিনতাম না।  সম্ভবত আমরা ছুটছিলাম ৬ ডিসেম্বর সকালে প্রেসক্লাব-পল্টনের দিকে, কারণ খবর যা কিছুই ঘটে বা হয় তা ওখানেই। যেন আমাদের কথিত “বিপ্লবের স্কয়ার”! আমিও বাসা থেকে রওনা দিয়েছিলাম। যদিও বাসা ভর্তি আমরা সকাল থেকেই কথা শুনেও নিশ্চিত বিশ্বাস করছিলাম না।
    এর আগে (ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের না), বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সম্মীলিত সবচেয়ে বড় আন্দোলন হয়ে গেছিল সেটাই ছিল “১০ নভেম্বর ১৯৮৭ ঢাকা ঘেরাও”। যে  কর্মসুচিতে গ্রেফতার হয়ে আমি ছয় মাস ডিটেনশনে জেল খেটেছিলাম। বের হয়ে (১০ মে ১৯৮৮) দেখি পুরা রাজনৈতিক পরিস্থিতি এরশাদের নিয়ন্ত্রণে।  ফলে এরশাদ বিরোধীদলকে কোন পাত্তাই না দিয়ে আর বিরোধীদল ঘরে বউ-বাচ্চা নিয়ে সবাই শান্তিতে এই ছিল পরিস্থিতি।  আর সেরকমই বজায় ছিল ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরেও।
    তাহলে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতন হল কী করে। সেদিন বা আশেপাশের সময়ে বিরোধীদলের কোন ঘরোয়া সভাও ডাকা ছিল না। তাহলে? কার হুমকি-তে এরশাদের পতন ঘটেছিল? এখনও কেউ বলতে পারবে? একেবারেই হাতে গোনা দু-একজন ছাড়া?

    আর ঠিক একই রকম প্রশ্ন  ঘটনা হল সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের বেলায়। আসাদের পতন হল কেন? কে করলো? ঠিক কোন ঘটনাটা এখানে স্পার্ক করলো, আগুন টা লাগলো? কোন ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়াতেও এর সমন্বিত কোন ব্যাখ্যা নাই। ঘটনাটা ঘটে যাবার পরে রাজধানীর দিকে সশস্ত্র কোন গ্রুপ কারা এগিয়ে আসছ্বে এসে কী করছে – এগুলোই নিউজ। আর সাথে আছে ওদের আয়নাঘরগুলো কেমন ও কোথায় কোথায় ছিল এগুলোকেই প্রধান করে নিয়ে খবর বিক্রি!
    ঠিক যেমন এরশাদের পতনের পরে বিজয়নগর নাংটিঙ্গেল রেস্তোরা সহ কী কী ভাঙ্গা হয়েছিল সেই বীরত্বগাথা গল্য়প নিয়ে মিডিয়ায় হৈ চৈ মাতম!
    সাম্প্রতিকালের কালে বাসারের বিরুদ্ধে বড় কোন চোখপড়ার মত বিদ্রোহি সশস্ত্র যুদ্ধের কথা জানা যায় না। যা ছিল তা সবই নিয়মিত হয়ে পড়েছিল যা। গত ২০১১ সালের মার্চ থেকে সিরিয়ার অভ্যন্তরে চারদিকেই অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ায় এক গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে থাকা দেশ ছিল। প্রতিটা পড়শি বর্ডারে অসংখ্য বিভক্তিতে ছোট ছোট সশস্ত্র গ্রুপ একে অপরের বিরুদ্ধে – পড়শি দেশের সমর্থনে আর বিপক্ষে। আর আসাদ কেবল রাজধানী দামাসকাসে সামলে সেখানে ক্ষমতায়, মোটাদাগে এই ছিল চিত্র।
    তাহলে আসাদ কেন দেশত্যাগ করে উড়াল দিলেন???

    এখানেই এরশাদের সাথে আসাদের গভীর মিলঃ
    এরশাদের পতন ঘটেছিল আমাদের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংঘাতের কারনে একেবারেই নয়! বাইরের বা গ্লোবাল রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ঘটনায় – শিরোনামে বললে, ইরাকের প্রেসিডেন্টের সাদ্দামের কারণে। যদিও সাদ্দামের সাথে এরশাদ সাদাচোখে কোনভাবেই সম্পর্কিত নয়! তবু এটা ঘটেছিল।
    সাদ্দাম ১৯৯০ সালের ২ আগষ্টে পড়শি দেশ কুয়েত দখল করে নিয়েছিল। বোকা কমিউনিস্টদের মতনই। যেমন বাংলাদেশের অনেক কমিউনিস্টো আছে যে মনে করে ওয়ার অন টেররে আমলে নির্বাচিত সরকারের সাথে যদি সশস্ত্র ইসলামি গ্রুপকে মিলিয়ে দিয়ে ততপরতায় নামিয়ে দেয়া যায় তাহলে সেটা নাকি বাংলাদেশে আমেরিকাবিরোধী (তাদের ভাষায় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী) একটা হেব্বি কাজ হবে সেটা!  আসলে জাতিসংঘ বা গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেম ব্যবস্থা টা সম্পর্কে কোনই ধারণা না থাকলে যা হয় এখানে তাই হয়েছে। এরা সত্যি একেবারেই জানে না এই গ্লোবাল ব্যবস্থাটা কী? এটা কী কী পারে আর কী এর সীমাবদ্ধতা! ইদানিং অনেক ময়ুখ নামের ইন্ডিয়ান লোক এমন সাদ্দাম হতে চাচ্ছে – চট্টগ্রাম দখল করে নিবে – খায়েশ করেছে কারণ, এটা ইন্ডিয়ার নাকি দরকার তাই!
    এরা (কমিউনিস্ট এন্ড গং) এখনও জানে না এরপর সাদ্দামের কী হয়েছিল? পতন হল কেন? কোন সুবিধাটা আমেরিকা নিয়েছিল……!
    কুয়েত দখলের পরের ঘটনা-সংক্ষেপ হল, জাতিসংঘ এই দখলকে কঠোরভাবে নিন্দা করে প্রস্তাব এনেছিল। আর তাতে প্রবলভাবে ভোট দিয়েছিল বিশেষ করে ছোট দেশগুলো। কারণ তারা ছোট বলে কুয়েতের মধ্যে নিজ নিজ দেশ ও ভাগ্যকে দেখে ফেলেছিল। জাতিসংঘের সদস্য দেশের দখল বা স্বীকৃত ম্যাপ চেঞ্জ করা যায় না এটা অনেকেই জানে না। মনে করে সবকিছুরই প্রধান নির্ণায়ক নিজ নিজ সামরিক শক্তি! আবার জাতিসংঘের এই নিন্দার মানে কিন্তু এই নয় যে এর ফলে কুয়েতের বাদশাদের কুয়েত ফেরত পেয়ে যাওয়া অবশ্যইনা! তাহলে এই নিন্দার গুরুত্ব কী, লাভালাভ কী? মনে রাখতে হবে তখনও সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যায় নাই অথবা সেটা ওয়ার অন টেররের আমল বা ওর প্রথম যুগ (২০০১-১৪) নয়। ফলে গ্লোবাল ভারসাম্য সোভিয়েত-আমেরিকা ব্লকে বিভক্ত আর ইরাক সোভিয়েত ব্লকে।

    জাতিসংঘের কোন নিন্দাতে কুয়েত তখনই দখলমুক্ত হয়ে যায় নাই। কিন্তু  এতে এমন একটা পরিস্থতি তৈরি হয়ে যায় যে কোন পরাশক্তি দেশ আমেরিকা লিড নিয়ে ইরাকের সাদ্দামের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে  সাদ্দদামের পিছন হটা ঘটতে বাধ্য হয়ে যায়। এর একেবারে মূল কারণ, সাদ্দামের নৈতিকভাবে জাতিসংঘের আসরে হেরে যাওয়া!  বাস্তবে তাই ঘটেছিল, আমেরিকা ইরাকের উপর নো-ফ্লাই জোন ঘোষণা [মানে হল ওদেশের যতই সামরিক-বিমানের সক্ষমতা থাকুক একটা হেলিকপ্টার উড়লেও তা আমেরিকার বোমা খেয়ে লুটায়ে পড়বে এই শর্ত, চাপ বা হুমকি আরোপ।] আরোপ করেছিল কোন ব্লক এর বিরোধিতা করতে আগায় আসে নাই।  পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে কুয়েত মুক্ত স্বাধীন হয় আবার।
    কিন্তু আমাদের প্রসঙ্গে আসি। সাদ্দামের কুয়েত দখলের সাথে শাসক এরশাদের সম্পর্ক হল, ঐ দখলের কারণে তেলের দাম ডাবল হয়ে যায়। আর এতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক আঘাতে গরীব-বড়লোক নির্বিশেষে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল আর স্বভাবতই কোন দেশের সব ক্ষোভ নিশ্চিতভাবে শাসকের বিরুদ্ধে যাবে, যায়।
    আর প্রগতিশীল প্রভাবিত রাজনীতি ও দল এই ক্ষোভকে দেশে দেশে আমেরিকার বিরুদ্ধে পরিচালিত করে দেওয়াতে আমেরিকার টনক নড়ে। তারা আমাদের মত সব দেশে বিশেষ কূটনীতিক প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল। তিনি ঢাকায় এসে আবিস্কার করেন নয়বছর এরশাদ ক্ষমতায় একছত্র ওদিকে বিরোধিরা সংসদেও নাই।  কাজেই আমেরিকান স্বার্থ হয়ে উঠে এরশাদকে বিদায় করে খোলা নির্বাচনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দিকে চলে যাওয়া; আর আর্মিকেও এরশাদের হাত-নিয়ন্ত্রণের বাইরে নেওয়া যাতে তিনি নিজ রাজনৈতিক শাসনক্ষমতায় একে আর ব্যবহার না করতে পারেন। আর আমেরিকা সেটা বাস্তবায়ন করেছিল নুরুদ্দিনের নেতৃত্বের  আর্মিকে (এরশাদের নিয়ন্ত্রণ-নেতৃত্বে আর নয়) নিয়ে যাওয়া আর তাদেরকে জাতিসংঘ মিশনে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে। সেই থেকে শুরু হয়েছিল আমাদের আর্মির জাতিসংঘ মিশন; প্রথম মিশন ছিল – কুয়েত মিশন ১৯৯১!   আর এরশাদ??? তিনি আর কারও কোন কাজে লাগে এমন কেউ রইলেন না!  মূলত পর্দার অন্তরালের এসব ঘটনার কারণেই ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদের ক্ষমতাচ্যুত-পদত্যাগ ঘটেছিল। এর চেয়েও বড় চিহ্ন হল, তখন মানে, ১৯৮৮ মে মাসের পর থেকে ১৯৯০ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক পাড়া একেবারে নিশ্চুপ ছিল তা সত্বেও বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত আশেপাশে কোন রাজনৈতিক দল বা জোটের কোনই কর্মসুচী না থাকা সত্বেও হঠাত ছয় ডিসেম্বর সকালে এরশাদের পদত্যাগের খবর ভেসে উঠেছিল। মূল কারণ, তেলের দামের কারণে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যেন প্রবল আমেরিকাবিরোধী না হয়ে উঠে (বিরোধিরা যার সুবিধা নিয়ে ফেলতে পারে) তাই আমেরিকা আমাদেরকে বিনা আন্দোলনেই এরশাদের পতন ঘটিয়ে দিয়েছিল।

    তাহলে সিরিয়া প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ হঠাত উড়াল দিলেন পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে যেখানে মাঠে বড় কোন সশস্ত্রতা বা কোন মুভমেন্ট ক্রিয়াশীল নাই তখন আসাদ এমন করলেন কেন?
    অর্থাৎ পর্দার অন্যরালের আয়োজনে এরেঞ্জমেন্ট যখন ঘটে তখন এরশাদ বা আসাদের এভাবেই পদত্যাগ করে থাকে! এর আরেক বড় লক্ষণ হল – শান্তিপুর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর!

    তাই সিদ্ধান্তগুলো দেখেন শিরোনাম আকারেঃ
    ১। আসাদেরই নিজ নিয়োজিত প্রধানমন্ত্রীই ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।
    ২। শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে যারা এদেরকে বলা হচ্ছে বিদ্রোহি কোয়ালিশন এইচ-টি-এস [The main rebel coalition is led by Hayat Tahrir al-Sham.]
    ৩। এটা খুবই মজার না যে আপনি দলেবলে সশস্ত্র হলে একটা রাজধানী শহরে ঢুকছেন বিনা বাধা-প্রতিরোধে; শুধু তাই না উপস্থিত প্রধানমন্ত্রী আপনাকে ক্ষমতা হস্তান্তরে তৈরি হয়ে অপেক্ষায়।.
    ৪। এবার মিলিয়ে দেখেন ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ আমরাও প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তায় বসে বাদাম চিবাতে চিবাতে এরশাদের গুষ্ঠি-উদ্ধার করে শ্লোগান দিলাম আর পরে শুনতেছি এটাই নাকি ছিল “এরশাদবিরোধী নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান”।  মজা না!!
    ৫। ছাত্র জনতার নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান  এই যে বিনা মেঘের নয়া নামকরণ হয়েছিল আমাদের বেলায়, সেটাই কী সিরিয়ার বেলায় বিদ্রোহি কোয়ালিশন এইচ-টি-এস!!! এই নামকরণ!
    ৬। আমি মনে করি সবচেয়ে তাতপর্যপুর্ণ চিহ্ন হল, পুতিনের রাশিয়ার মানে রাশিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ [sergey lavrov] এর সহযোগিতা।  ১। প্রথম ঘোষণা আসাদ নিজ প্লেন উড়ায়ে দেশত্যাগ করে অজানা গন্তব্যে রওনা দিয়েছে। ২। ৭-৮ ঘন্টা পরে লাভরভ জানাচ্ছেন আসাদ রাশিয়ার আশ্রয় নিয়েছেন।
    ৭। এই  বিদ্রোহি কোয়ালিশন এইচ-টি-এস [–এর মধ্যকার সবচেয়ে বড় গোষ্ঠি যেটা  তারা রাশিয়ার মস্কোতে অফিসে দলীয় পতাকা উড়াচ্ছেন।  এই ঘটনা এটা সবচেয়ে তাতপর্যময় ও ইঙ্গিতপুর্ণ।
    ৮। এটা ফরমাল বক্তব্যঃ  “রাশিয়া সব সময় সিরিয়া সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে ছিল এবং জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে”।

    [এই হল, মোটা দাগে ঘটনাবলীকে আমি যেভাবে দেখছি।
    এছারা আরও কিছু বাড়তি অংশ বা বাড়তি প্রসঙ্গ এতে যোগ করব। সেটা আজ রাতেই নয়ত কাল সকালে, ঘোষণা দিয়ে সবাইকে তা জানানো হবে। আপাতত এতটুকুই এই পর্বে!]

     

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

    আপডেটঃ   রাত ১০ঃ ৪৯   ১১  ডিসেম্বর  ২০২৪
    শেষ আপডেটঃ   ডিসেম্বর  ২০২৪

     

     

     

  • ব্রিকস বুঝাবুঝিতে পিছিয়ে – আমার কেন আদার বেপারী 

    ব্রিকস বুঝাবুঝিতে পিছিয়ে – আমার কেন আদার বেপারী
    গৌতম দাস

    ২৫ জুন ২০২৩  সকাল ০৮ঃ ০৪

    https://wp.me/p1sCvy-4EQ

     

              BRICS

    আবার ব্রিকস [BRICS]! বাংলাদেশে এনিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে! তাতে এর সবটা না হোক মূল বিষয়টা কী তা বুঝি -না-বুঝি, অনেকেই এতে মেতে উঠেছে এই মনে করে যেন এটা বাইডেনের আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনের এক কড়া সিদ্ধান্ত-পদক্ষেপ।  আর হাসিনা বাংলাদেশকে ব্রিকসে নিয়ে উঠালে মানে সদস্য  করে ফেললে তা বাইডেনের আমেরিকাকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে। অথবা বাইডেনকে যেন এক কড়া জবাব দেয়া হবে। এই ভুল অনুমানের উপর মিডিয়া গরম!  কারণ ব্রিকস মানে যেন একটা অর্থনৈতিক পক্ষ-জোট!  এই এজাম্পশন বা ধরে নেওয়া অনুমান একেবারেই ভিত্তিহীন! এক ভুল অনুমান!  দাঁড়ানো এক ভুল বুঝাবুঝি! 

    কথা আরো আছে তাহলে ব্রিকস যদি নেহায়তই এক আমেরিকাবিরোধী অর্থনৈতিক জোট হয় আর এর জন্ম মাত্র ২০০৯ সালে – সেটা কী ২০০৯ এর জায়গায় গত শতকে ধরা যাক ১৯৯০ এর দশকে হত তবে কী এটা আমেরিকাকে আরো আগে বধ করে ক্ষতিগ্রস্থ করে দিতে পারত না? ব্যাপারটা কী তাই?  তাহলে তো এই প্রশ্নেরও জবাব পেতে হবে যে ব্রিকস উদ্যোক্তারা সেটা করে নাই কেন?  সারকথায় ব্রিকস কখন কার্যকর হবে – খুলবে  সেই সময় নির্ধারণ – সেটা কী উদ্যোক্তাদের ইচ্ছাধীন? নাকি অন্য কোন শর্ত (অবজেকটিভ) বা কিছু পুর্ব-প্রস্তুতি পূরণ  আগে হতে হবেই যেটা চীনের ইচ্ছাধীন নয়?  এই জবাবটা এখনই দিয়ে নেই। এটা চীন বা আমেরিকাবিরোধী কারও ইচ্ছাধীন নয়। বরং বেশকিছু বিষয়কে বাস্তবে যোগ্য হয়ে উঠতেই হবে, পেকে উঠতে বা যোগ্য- ম্যাচিউরিটি -তে পৌছাতে হবেই! যা এখনও হয় নাই। তবে হওয়ার দিকে হাঁটছে! এছাড়া আগেই বলেছি এটা কোন অর্থনৈতিক জোট একেবারেই নয়। কোন আশিয়ান [ASEAN] অথবা RCEP [Regional Comprehensive Economic Partnership ] ধরণের বিশেষ অর্থনৈতিক জোট একেবারেই নয়! তাই এটা ঠিক কে অ্যামেরিকান আর কে চীনের পক্ষ নিয়ে কথা বলব আর এই ভিত্তিতে কাকে সঠিক বলব ব্যাপারটা মোটেও তা নয়!  

    অতএব, এমনই অনেকগুলো ভুল বুঝাবুঝির মধ্যে প্রথম এক সমস্যা হল ব্রিকস নিয়ে রিপোর্টিংয়ের। যেমন বাংলাদেশে বেশির ভাগ মিডিয়ায় শিরোনাম – বাংলাদেশ ব্রিকসে যোগ দিতে যাচ্ছে – ধরণের। একথার মানে কী? বাংলাদেশ চাইলেই কী ব্রিকসে যোগ দিতে পারবে? নাকি আগে দাওয়াত আসতে হবে? মানে তারও আগে ব্রিকস নিজেরা কোন নয়া সদস্য নিতে চায় এমন এক তাদের আভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত হতে হবে। মানে ব্রিকস এর পক্ষে এটা এমন পরিপক্ক হয়েছে বসে সিদ্ধান্তে আসতে হবে! কিন্তু এসব প্রশ্ন এখনও এখানে সবটা পরিস্কার ঠিক তা নয়।

    তবে তুলনায় আপাতত এখানে ডেইলি স্টারের রিপোর্ট অনেক স্বচ্ছ ও সাবধানী। মানে যা জানে না, তা নিয়ে আগায় নাই; অনুমান করে ইচ্ছামত লিখে নাই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনকে কোট করে তারা লিখেছে, “We will surely join once they invite us. We have yet to receive any formal letter…. । বাংলা করলে হয়, “আমাদের একবার দাওয়াত করলেই আমরা নিশ্চয় সেখানে যোগ দিব। (এর আগে) আমাদেরকে এখনও তাদের আনুষ্ঠানিক (দাওয়াতের) চিঠি পেতে হবে”।  মানে আশা করা হচ্ছে যে আগামি আগষ্টে তাদের এবারের ব্রিকস সম্মেলনের আগে তারা নয়া সদস্য হতে আগ্রহী বা যাদেরকে তারা সদস্য হিশাবে নিতে আগ্রহী তারা দাওয়াত পত্র পেতে পারে। এরপরেই যোগ দেয়া না দেয়া নিয়ে নড়াচড়া শুরু হবে।

    ব্রিকস নিয়ে বিভ্রান্তিই বিভ্রান্তিঃ
    ব্রিকস নিয়ে যেকোন কিছুতেই বিভ্রান্তির শেষ নাই। এর এক অন্যতম কারণ, ব্রিকস যাদের লেখার বিষয় হয়েই যায় যেমন, মিডিয়া রিপোর্টার বা যারা কলাম লিখেন কমবেশি এদের সকলের মধ্যেই বিভ্রান্তি ঢুকে আছে, তা বর্তমান। যেমন ধরণ হিশাবে ব্রিকস কেমন সংগঠন – এই প্রশ্ন কে কিভাবে নাড়াচাড়া করছে কি লিখছে তাতেই বুঝা যায় যে তারা প্রায় সকলেই বিভ্রান্ত; মানে নিশ্চিত জানা নাই। প্রথমত, মিডিয়ায় অনেকেই “ব্রিকস-কে অর্থনৈতিক জোট” ভেবেছে।  যেমন প্রথম আলোর এক ‘বিশেষ প্রতিনিধি’ লিখছে,  “ব্রিকস হচ্ছে পাঁচ দেশের একটি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট”।  অর্থাৎ এই বিশেষ প্রতিনিধি ব্রিকস-কে শুধু অর্থনৈতিক জোট-ই না একে এক আঞ্চলিক জোটও বানিয়েছে। কিন্তু ব্রিকস আর যাই হোক কোন আঞ্চলিক বা ভৌগলিক জোট একেবারেই নয়। কোথায় দক্ষিণ আফ্রিকা আর কোথায় রাশিয়া আর কোথায় ভারত বা চীন – এসব একটা অঞ্চল বা একটা মহাদেশেই সব সদস্য তা তো নয়; কাজেই একটু কল্পনা করে দেখলেই তো এমন ভুল করার কথা না!
    আবার দ্যা বিজনেস স্টান্ডার্ড এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান- পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক ড. এম এ রাজ্জাক এর বরাতে জানাচ্ছে,  তিনি বলছেন – ‘আমাদের স্মরণে রাখতে হবে এটা কোনো বাণিজ্য জোট নয়, তাই যোগ দিলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে না।’  আবার ঐ একই রিপোর্ট,  এবার আরেক বরাতে জানাচ্ছে, – “যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম. হুমায়ুন কবির ব্রিকসকে একটি ‘শিথিল ধরনের অর্থনৈতিক জোট’ বলে অভিহিত করেন, যেখানে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা রয়েছে”।  এটাও এক শতভাগই ভুল অনুমান।
    জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বিডিনিউজও লিখেছেন, –  ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের অর্থনৈতিক জোট ব্রিক এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলন হয় ২০০৯ সালে। এটা তো এক ভিত্তিহীন ভুল অনুমান যে ব্রিকস এক অর্থনৈতিক জোট!
    আবার এক কলাম লেখক ব্রিকসকে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের জোট মনে করে – ধরে নিয়েই লিখেছে “বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্যঘাটতি, যেখানে আমদানি রপ্তানির চেয়ে অনেক বেশি, সেখানে ব্রিকসের সুবিধা আদায়ে একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে”;  তিনি আরও একই লেখায় অন্যখানে লিখেছেন, “…… ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য বিষয়ে উদারতার অভাব আছে“।
    অর্থাৎ সবার ভিতরেই দেখা যাচ্ছে একটা বিভ্রান্তি কাজ করছে যে ব্রিকস [BRICS] কী ধরণের জোট – এই প্রসঙ্গে। অনেকের লেখার রেফারেন্স আনলাম এবং অবশ্যই এসব কাউকে খাটো করার জন্য না। বরং একধরণের সার্ভের মত করে কয়েকজনের লেখা এনে দেখলাম যে সমাজে বিষয়টা নিয়ে আলোচনায় ভুল কোথায় হচ্ছে। সমস্যাটা কোথায়! আর এখন এই বিভ্রান্তি কাটাতে আমার বক্তব্য কী সেটাই নিচে বলব।

    ব্রিকস কোন অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট একেবারেই নয়ঃ
    হ্যা একথা সত্য যে ব্রিকস কোন অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট একেবারেই নয়। এই বুঝাবুঝি ভিত্তিহীন ও ভুল।  কথাটা যদি এভাবে বলি যে আইএমএফ [IMF] বা বিশ্বব্যাংক [ WB or IBRD] বা এডিবি [ADB] বা আইডিবি [Islami DB] এআইআইবি [AIIB] বা এনডিবি [NDB] ইত্যাদি – এরা হল কোন অর্থনৈতিক জোট অথবা কোন বাণিজ্য জোট তাহলে বুঝাবুঝিতে যে কঠিন সমস্যা সৃষ্ঠি হবে – এটা সেধরণের ভুল। দুনিয়ার প্রায় ১৯২+ রাষ্ট্র জাতিসংঘের সদস্য। আর এদের মধ্যে প্রায় সকল রাষ্ট্র-ই  আবার IMF ও WB এদুই প্রতিষ্ঠানের সদস্য। কিন্তু তবু কোন যুক্তি বা বাস্তবতাতে IMF ও WB কোন  অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট একেবারেই নয়।

    বরং সোজাসাপ্টা বললে,   দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের পরিস্থিতিতে ১৯৪৪ সালে Bretton Woods সংগঠন বলে এক গ্লোবাল কনফারেন্সে IMF-WB এদুই গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়া হয়েছিল। আবার এদেরকে ঠিক কোন জোট বা সমিতি বলা হয় না। বলা হয় মাল্টি ল্যাটারাল [multi-lateral] বা বহু-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।  আর এসব বহু-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান মূল উদ্দেশ্য হল, একটা আন্তরাষ্ট্রীয় ও গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সিস্টেম গড়ে তোলা। অনেক সময় যেটাকে Global Econimic order  – এক শৃঙ্খলাবদ্ধ নিয়মের ব্যবস্থা বলা হয়। আর তা গড়তে Bretton Woods সেই সভায় তাতে স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন এর মত দেশের প্রতিনিধি সহ অন্য আমেরিকাসহ লিডার দেশ এবং আমাদের মত ছোট দেশের প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত ছিল। এটা নিউ হ্যাম্পশায়ারের  Bretton Woods এলাকায় Bretton Woods নামে হোটেলে জন্ম নেয়া এক ঘটনা।  উদ্দেশ্য ছিল  – জাতিসংঘকে যদি বলি এক গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেম কায়েম ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান ঠিক সেই রকম IMF-WB হল এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক সিস্টেম কায়েম ও নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান কায়েম করা যাতে একটা গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বা সিস্টেম চালু করা যায়।

    তাহলে ব্রিকস কীঃ
    ব্রিকস হল সেকালের জায়গায় একালে আরেকটা উদ্যোগের নাম যাদের লক্ষ্য একাল এখন গ্লোবাল নেতৃত্বে এক পালাবদলের যুগ – সেই পালাবদলে মূলত চীনের নেতৃত্বে সেকালে  IMF-WB এর মতই তবে একালে এবং  আগামিতে বিকল্প এক গ্লোবাল বাণিজ্যিক ব্যবস্থা বা সিস্টেম কায়েমের লক্ষ্যে কাজ শুরু করা। আর সেকাজের উদ্যোক্তা সংগঠন হল ব্রিকস [BRICS] যার জন্ম ২০০৯ সালে।  তবে পরিস্কার থাকতে হবে ব্রিকস  নিজেই কোন বিকল্প  IMF অথবা WB সমতুল্য প্রতিষ্ঠান তা একেবারেই নয়। বিকল্প  IMF ও WB ধরণের প্রতিষ্ঠান হাজির করা একাজে অবশ্যই লম্বা প্রস্তুতি ও সময় লাগবে; আর তা করার জন্য উদ্যোক্তা তাও আবার একেবারে প্রাথমিক উদ্যোক্তা সংগঠন হল ব্রিকস। যেটা ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকা – এই পাঁচদেশের নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে তৈরি এক প্রাথমিক উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান মাত্র।  আর এই মাত্র পাঁচদেশ সদস্য থাকা অবস্থাতেই বিকল্প  IMF-WB গড়ার আগ্রহ থাকলেও কেবল বিকল্প WB গড়ার লক্ষ্যের এক ভ্রুণ প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে ইতোমধ্যেই তারা চালু করেছে গত ২০১৫ সালে। এর নাম নিউ ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক [NDB  বা এনডিবি], যেটাকে বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান বলে গণ্য করতে পারি। আর এই প্রথম ব্রিকসের সদস্য দেশ সম্প্রসারণের কালে ২০২১ সাল থেকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই এর সদস্য হয়ে গেছে। প্রথম আলো লিখেছে, ২০২১ সালের ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্রিকস-ব্যাংকের সদস্য হয়। যদিও আমার ধারণা এভাবে  ব্রিকস-ব্যাংকের সদস্য লিখাটাও এক ভুল বুঝাবুঝির উৎস বা ভুল হবে। বরং যদি বলা যেত ব্রিকস উদ্যোগের বিশ্বব্যাংক অথবা আরেকটু পরিস্কার করে ব্রিকস উদ্যোগের বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান – তাহলে এসব কথা নয়া ভুল বুঝাবুঝি তৈরি করত না। মূলকথা ব্রিকস-কে কখনই  অর্থনৈতিক জোট অথবা কোন বাণিজ্য জোট হিশাবে তো নয়ই এমনকি ব্রিকস নিজেই এক আইএমএফ অথবা বিশ্বব্যাংক হতে যাচ্ছে এভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়া যাবে না। তা ভুল হবে।

    মূলকথা ব্রিকস-কে কখনই  অর্থনৈতিক জোট অথবা কোন বাণিজ্য জোট হিশাবে তো নয়ই;
    এমনকি ব্রিকস নিজেই এক বিকল্প আইএমএফ [IMF] অথবা বিশ্বব্যাংক [WB] হতে
    যাচ্ছে এভাবেও পরিচয় করিয়ে দেয়া যাবে না। কারণ সেটাও ভুল। 

    বরং ব্রিকস হল স্রেফ উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান যার ইচ্ছা আছে আগামি দিনের দুনিয়াতে
    বিকল্প  IMF এবং WB প্রতিষ্ঠান গড়ে নিয়ে এক
    নয়া  গ্লোবাল  সিস্টেমের জন্ম দেয়া।
    আর ‘ব্রিকস উদ্যোগ’ যেন জন্ম নিয়ে নেয়, গড়ে উঠে – আমেরিকা নিজেই পরোক্ষে ইস্যুটাকে এদিকে ঠেলে দিয়েছে।    

     

    আমাদের বুঝাবুঝি পরিস্কার না থাকার পিছনের অন্তত দুই সমস্যাঃ
    যতদুর লিখেছি তাতে অন্তত এতটুকু পরিস্কার যে আমাদের সমাজে বুঝাবুঝিতে ব্যাপক সমস্যা আছে। এদিকে, আমরা চাই বা না-চাই আমাদের পরিচিত দুনিয়াটাতে ব্যাপক বদল ঘটে যাচ্ছে এটা অন্তত আমাদের টের পাবার কথা। এব্যাপারে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একেবারেই অপ্রস্তুত। পাবলিক বা সরকারি হলে সেখানকার মূল ইস্যু লীগ বা বিএনপি কোনটা ভাল!!!!! কে কোনদিকে!!
    অথচ হওয়া উচিত ছিল ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াকে বুঝব কী করে এবং গ্লোবাল সিস্টেম প্রতিষ্ঠান যেগুলো সেই ১৯৪৫ সালে যাত্রা শুরু করেছে এদের ততপরতায় যে দুনিয়ায় নয়া ব্যবস্থা চালু হয়েছিল একে বুঝবার উপায় কী? সেগুলোর ভাল-মন্দ দিক নিয়েও আলোচনা হতে পারত। আর সেকাজে তরুণদের যোগ্য করে  গড়ে তোলা এটাই হতে হত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালনার মূল লক্ষ্য। কিন্তু তা হয় নাই। আমরা এর বদলে কেন কমিউনিজম বা কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদিতায় ঈমান আনতেও হবে এবং এটাই নাকি সবচেয়ে “অগ্রসর জ্ঞান” তা মনে করে আমরা বাস্তবতা বা বাস্তব জীবনের বাইরে থাকতে চেয়েছি।  যেটা এখন পরিস্কার যে আমাদের এই অঞ্চলে কমিউনিস্ট-প্রগতিবাদিতাই আসলে এক হিন্দুত্ববাদী মাত্র। আর এটাই আমাদেরকে ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়ায় যে নয়া ধারা একটা গ্লোবাল সিস্টেম-ব্যবস্থা খাড়া হয়ে গেছে তা বুঝতেই দেয়নি।

    বরং ব্যাপারটা হয়েছে এমন যেন, একটা জিনিষ বাঘ না বিড়াল সেটা বুঝব শিখে ফেলব কী করে সেই বুঝাবুঝির ক্ষমতা শানানো বা চর্চা করা নয়; এর চেয়ে আমরা ভাগ হয়ে গেছি এভাবে যে আমাদের মধ্যে কে কে এটাকে বাঘ বলার পক্ষে আর কে কে বিড়াল বলার পক্ষে। ফলে এরই নিট ফলাফল হল আমরা কোন পক্ষই আজ দুনিয়াকে এসব ফেনোমেনাগুলোকে বুঝতে আমরা কেউ-ই সক্ষম নই, হই নাই।
    তাই, আমাদের বোকা বোকা প্রশ্ন হল জাতিসংঘ কেন “গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান” নয়। কেন কেউ কেউ ভেটো সদস্যধারী? এই খায়েস শুনলে মনে হবে প্রশ্নকর্তা খুবই বোদ্ধা! কিন্তু আসলে সে একটা পড়ালেখা না করা চটকদার তার্কিক! আবার অগ্রসরতার দাবিদার কমিউনিস্ট তাদেরও জাতিসংঘ  মানে, এই গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কোন ধারণা নাই।  আর  IMF-WB  সম্পর্কে ধারণা সেটা আরো করুণ অবস্থা। কমিউনিস্টদের চোখে এগুলো হলো “নিপাত যাক প্রতিষ্ঠান”।   মানে যেকথা বলছিলাম বাঘ না বিড়াল এর বুঝাবুঝি ও ফারাক করতে শিখা ও জানা – এসব জানার পদ্ধতি শিখার কাজ যেখানে মুখ্য হওয়া উচিত ছিল সেসব ফেলে আমরা হয়ে গেলাম কে বাঘকে বিড়াল বলে বা কে বিড়ালকে বাঘ বলবে এনিয়ে দুপক্ষের লড়াইয়ে বিভক্ত। IMF-WB “নিপাত যাক প্রতিষ্ঠান” -এধরণের হতেও পারে! কিন্তু এর আগে এসব প্রতিষ্ঠানকে চিনব কী করে, কী করে চিনতে হয় এর জানার পদ্ধতি-উপায় কী আমরা জানলাম না। এর ম্যান্ডেট কী, এটা কী করে, কী করার উদ্দেশ্যে জন্ম আমরা কমিউনিস্টেরা তা জানি না। প্রথমে তাদের বলতে দেখলাম এরা নাকি সুদ খেতে আসছে এমন লগ্নি প্রতিষ্ঠান!!!!!  এর সোজা মানে হল IMF-WB এদের সুদহার কত তাই কোন খবর কমিউনিস্টেরা জানেই না।  আবার আচ্ছা  IMF-WB “নিপাত যাক প্রতিষ্ঠান” মানে হল বাংলাদেশ যদি এদুই প্রতিষ্ঠানের সদস্যপদ ত্যাগ করে তাহলে কী বাংলাদেশ মানে ধরা যাক বাংলাদেশের অর্থনীতি কী টিকে থাকতে পারবে? কেন পারবে অথবা পারবে না তা আমাদের কমিউনিস্টেরা বলতে পারবে, মনে হয় না।  তাহলে?

    আবার দ্বিতীয় সমস্যাটা হল, একালে বিশেষ করে হাসিনার ১৫ বছরে অনেকেই আমেরিকায় বসবাসের রেসিডেন্ট পারমিট পেয়েছে। কিন্তু তাতে আবার এরা একটা কমপ্লেক্সে মানসিক জটিলতায় পড়েছে।  তারা চীন ভাল না আমেরিকা ভাল এই তর্কে অংশ নিতে চায়। তা খুবই ভাল কথা কোন অসুবিধা নাই। কিন্তু তাদের যে দ্বিধা তা হল, তাদের কী আমেরিকা ভাল – একথার পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বলা উচিত নয়!!!!  অর্থাৎ জাতিবাদের সমস্যায় পড়েছেন তারা; যেটা অবশ্য একেবারেই অপ্রয়োজনীয় বিবেচনা। আর আমেরিকা তো  হাসিনার বাংলাদেশ নয়।  তবুও কেউ কেউ আরেক ধাপ উপরে। তারা মনে করে তারা যদি অ্যামেরিকান প্রশাসনের অবস্থানের পক্ষ নিয়ে কথা না বলি তাহলে কী এটা পরে কখনও তাদের রেসিডেন্ট পারমিট বাতিলের পক্ষে যুক্তি হয়ে হাজির হয়ে যাবে? এসব!! “এক্ষেত্রে কে কী পক্ষ-বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন তা নিয়ে আমার বলার নাই। কিন্তু যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হল, যেমন ব্রিকস বুঝাবুঝির ক্ষমতা বাড়ানো বা বুঝাবুঝির পদ্ধতিটাই জানা এদিকে কারও আগ্রহ নাই।   বরং বাঘকে বিড়াল বলে বা কে বিড়ালকে বাঘ বলে চালিয়ে দিবে কিনা – কোনটা করবে এটা হল তাদের তর্ক। যা খুবই হতাশজনক!
    তাহলে কথা ছোট করি এখন। তাহলে যারা ১৯৪৫ সালের পরের গ্লোবাল সিস্টেমটা কেন এমন হয়ে খাড়া হয়েছিল তা বুঝতেই অক্ষম – বরং কেবল পক্ষ-বিপক্ষ হয়ে থাকতে চায় বা এসেছে তারা কীভাবে ব্রিকসকে ব্যাখা করতে পারবে বুঝাবুঝি শানাতে পারবে!
    আবার  কমিউনিস্টরা মনে করেন ক্যাপিটালিজম করা অথবা মুনাফা কামানো খারাপ কাজ। কিন্তু বাস্তবতা হল সেই রাম বা অযোধ্যা কোনটাই নাই, টিকে নাই। পুরানা চীনও নাই। সোভিয়েতেরও আগে সেই ১৯৫৮ সালের পর থেকে পুরান চীন নাই।   কাজেই সোভিয়েত বুঝ দিয়ে সোভিয়েতের বাইরের দুনিয়াকে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া কেন? তাতে তো বাইরের সবাইকেই পাপী মনে হবে। কারণ ‘বাইরের দুনিয়া” যেটা সেটাই এখন বাস্তব দুনিয়া। কাজেই সোভিয়েতের টুলস দিয়ে ব্রিকসকে বুঝবার চেষ্টা অর্থহীন!  তাইতারা তো ব্রিকস আলোচনায় ঢুকতেই সক্ষম হবেন না; তাদের অপ্রয়োজনীয় এবং নিপাত যাক অবস্থানের কারণে! তাই ব্রিকস বুঝাবুঝি তাদের জন্য নয়!

    এজন্যই বলছিলাম, যারা বুঝতে চান তাদের জন্য তাহলে সারকথায় এর মানে আমরা এখন আরেক সমস্যায় পড়লাম যে তাহলে আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক কেমন ধরণের সংগঠন যারা সেই ১৯৪৪ সালে একই [ Bretton Woods] বৈঠকে জন্ম নিয়েছিল, তা বুঝতে হবে আগে। আবার, তারা একই বৈঠকে জন্ম নেয়া হলে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক নামে আলাদা দুইটা হবার দরকার হল কেন? এসব দিকগুলো আমাদের জানতে হবে নইলে ব্রিকস উদ্যোগের কিছুই স্পষ্ট বুঝা যাবে না।  আরেকভাবে বললে, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক এদের ম্যান্ডেট বা কী দরকারে জন্ম দেয়া হয়েছিল সেসব কাহিনী ঘাটতে হবে। হ্যা কিছু করার নাই। কারণ, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংক তাহলে কী ধরণের প্রতিষ্ঠান – কোন অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট কী? না অবশ্যই না।  তাহলে কেমন প্রতিষ্ঠান এরা? এই হল মুখ্য জানবার প্রশ্ন!

    একটা ক্লু দিয়ে শুরু করা যাক!
    লক্ষ্য করলে দেখব এক আইএমএফ ছাড়া বাকি বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি – এসব প্রতিষ্ঠানের নামের শেষে ব্যাংক বা “ইংরাজিতে B” আছে। কাজেই নামের শেষে ব্যাংক আছে এমন প্রতিষ্ঠানকে  অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট মনে করা অবশ্যই অর্থহীন বা মিলল না – এটুক তো বুঝাই যায়! এরপর আরও ইতিবাচকভাবে বুঝতে চাইলে লক্ষ্য করব এসব প্রতিষ্ঠানের নামে ইংরাজিতে B লেখা থাকার আগে বা পরে দেখেন D আছে,  যেখানে D  হল ডেভেলবমেন্ট শব্দের আদ্যক্ষর।  মানে হল বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি ইত্যাদি এরা সবাই আসলে ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক ধরণের প্রতিষ্ঠান; মানে বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি  এরা কোন অর্এথনৈতিক জোট নয়, একেবারেই নয়। তবে এরা ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক অবশ্যই।

    আচ্ছা,  ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক বলতে ঠিক কী বুঝবঃ
    এর জবাব হল, ব্যাংক বলছে যেহেতু ফলে ঋণ দেয় তা হয়ত অনুমান করা যায়। কিন্তু এই অনুমান কী সঠিক? হ্যা একেবারে সঠিক।  কিন্তু এটা অবশ্যই আমাদের দেশের  প্রাইভেট ন্যাশনাল ব্যাংক বা সরকারি সোনালি ব্যাংকের মত ব্যাংক নয়। এটা হল ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক যেখানে ডেভেলবমেন্ট এর মানে করতে হবে ইংরাজিতে যেটাকে ইনফ্রাস্টাকচার ডেভেলবমেন্ট [অবকাঠামো উন্নয়ন] বলে। আর সেখান থেকে ছোট করে নেয়া শব্দ শুধু ডেভেলবমেন্ট কথাটাই বাংলায় উন্নয়ন।

    আর ইনফ্রাস্টাকচার বা অবকাঠামো শব্দের ব্যবহার অবকাঠামো ব্যাঙ্ক [DB] এভাবে এই শব্দের ব্যবহার ও ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। অনেকে মার্শাল প্ল্যান কথাটা শুনে থাকবেন। বিশ্বযুদ্ধে যেহেতু তাই সেখানে রাস্তাঘাট কারখানা বাড়িঘ্অর বা পানি-বিদ্যুতের উতপাদন অবকাঠামোর এসব দিক থেকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ জর্মানিসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের অবকাঠামোগুলো পুণঃর্গঠন ও উন্নয়ন [reconstruction & Development (RD)] জন্য নয়া উদ্যোগ পরিকল্পনার নামই মার্শাল প্ল্যান । এখানে আমেরিকা একাই মানে  অ্যামেরিকান প্রশাসনের দিক থেকে যে বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল সেটাই মার্শাল প্ল্যান নামে পরিচিত।  সেসময়ে (RD) খুবই এক চালু শব্দ ছিল। যেকারণে আজকের বিশ্বব্যাংকের (WB) মূল পুরা নাম হল [IBRD – International Bank for Reconstruction & Development ]।  আর অবকাঠামো [Infrastructure] বলতে ঠিক কী বুঝব? কোন দেশের অর্থনীতি চালু ও সরগরম থাকার পুর্বশর্ত হচ্ছে ভাল অবকাঠামো থাকা। মানে রাস্তাঘাট, ব্রিজ, বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট, পানির সাপ্লাই, নিস্কাষণ ব্যবস্থা, কারখানার বর্জ্য রিসাইক্লিং, নগর অবকাঠামো, শিল্পাঞ্চল অবকাঠামো, গ্রামীন রাস্তাঘাট ইত্যাদি গড়তে হয় আগেই। তবেই অর্থনীতি চাঙ্গা হতে পারে। আর সবচেয়ে বড় শর্ত হচ্ছে এসব গড়তে হবে নামমাত্র বা কমসুদের (১% এরও কমে) ঋণে।  সেসব অবকাঠামো গড়তে নামমাত্র সুদে সরকারকে ঋণ দেয়াই  বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি – এসব ডেভেলবমেন্ট ব্যাংকের ম্যান্ডেট বা মুখ্য কাজের লক্ষ্য। এককথায় এগুলো কর্মাশিয়াল বা বাণিজ্যিক ঋণ নয়, তাই সুদ নামমাত্র। এটা ডেভেলবমেন্ট ব্যাংকের মুখ্য বৈশিষ্ঠ। এটাই  যদিও অর্থনীতি উঠে দাড়ালে মাথাপিছু আয় বাড়তে শুরু করলে সরকারকে দেয়া এই ঋণের সুদ বেড়ে ৩% পর্যন্ত হতে পারে!
    তাহলে আমাদের মূল আলোচ্য প্রসঙ্গ – বিশ্বব্যাংক, এডিবি,  এআইআইবি, আইডিবি বা এনডিবি এই ধরণের প্রতিষ্ঠান কোনভাবেই কোন  অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যের জোট নয়। এমন মনে করা ভুল, ভিত্তিহীন। এগুলো আসলে ডেভেলবমেন্ট ব্যাংক ধরণের প্রতিষ্ঠান।

    তাহলে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা যেটা এখন আছে আগে তা বুঝলে পরে, আগানো যাবে ব্রিকস কীঃ
    নয়া প্রসঙ্গে যাবার আগে একটা সাবধানতাঃ
    ঘরে ঢুকার আগে বাইরে জুতা খুলে ঢুকার মত পাঠকেরা দয়া করে আপনি কোন পন্থী – প্রো অ্যামেরিকান নাকি প্রো চীন অথবা ধরেন কোল্ডওয়ার কালের মত আপনি সোভিয়েত না অ্যামেরিকান পন্থী – ইত্যাদি এসব ভাগ ও আলাপ গুলো এই আলোচনা পাঠের আগে বাইরে রেখে আসেন। তাহলে এই আলোচনার কথাগুলো বুঝতে সুবিধা পাবেন।  কারণ এখানে কথাগুলো যে পন্থীরই হোন এমন সবার জন্য লেখা হয়েছে। বরং আপনি নিজেকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীল বলে মনে রেখে পড়তে বসলেই বুঝতে ঝামেলা হতে পারে। পরে আরো বিস্তার করব সেসব কথা।

    তাহলে ব্রিকস কী ? কেমন ধরণের প্রতিষ্ঠান?
    এটা খুবই প্রতিষ্ঠত এক সত্য যে ১৯৪৫ সাল নাগাদ বিশ্বযুদ্ধে শেষে (কমিউনিস্ট নেতা স্তালিন সহ) সকলে মেনে নিয়েছিল যে আমেরিকাই গ্লোবাল নেতা। এর মূল কারণ হল বা তখনকার বাস্তবতা ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রপক্ষের সকলের প্রধান খরচ এককভাবে সকলকে  যুগিয়েছিল একনাগারে চারবারের (১৯৩২-১৯৪৪) নির্বাচিত অ্যামেরিকান  প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। অর্থাৎ মিত্রপক্ষ এই জোটের একমাত্র নেতা হয়ে দাড়িয়েছিলেন রুজভেল্ট। শুধু তাই নয় যুদ্ধে শেষে আবার ইউরোপের নানান দেশের ( এমনকি এবার কেবল মিত্রপক্ষের দেশগুলোকেই নয় সাথে হিটলারের পক্ষের দেশগুলোসহ) অবকাঠামোগুলো পুণঃর্গঠন ও উন্নয়ন এর খরচও যোগান  বা অবকাঠামো ঋণ হিশাবে দিয়েছিল ঐ আমেরিকা একাই। এজন্য আমেরিকা বাদে ইউরোপীয়-সহ প্রায় সকল দেশই পরে আমেরিকাকে ধরেছিল  একটা গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা দাঁড় করানোর জন্য উদ্যোগ নিতে। যত সহজে এই গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা কথাটা লিখলাম ততই কঠিন অনেকের জন্য এটা বুঝা বা ইমাজিন করে বুঝা কঠিন। বিশেষ করে কোন কমিউনিস্টের পক্ষে কমিউনিস্ট থেকে গিয়ে এটা বুঝা কঠিন হবে। এর অন্তত একটা কারণ হল, কমিউনিস্ট বুঝাবুঝিতে বাণিজ্য বিশেষ করে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য  (এবং গ্লোবাল বাণিজ্যও) একটা অপ্রয়োজনীয় বিষয়! কারণ যতই নিজেদের এরা কমিউনিস্ট বলে দাবি করুক এরা মূলত উগ্র জাতিবাদীদের মত গভীর অর্থনৈতিক জাতিবাদিও। মানে কোনকিছুই আমদানি করা যাবে না; পারলে অন্যদেশে কেবল রপ্তানি করেন – এমন চিন্তার। স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আজ ১৫ টা আলাদা রাষ্ট্র হয়েছে – এটা এত বড়। তাই ভিতরে প্রায় সব ধরণের প্রয়োজনীয় পণ্য একই নিজ সোভিয়েত দেশেই উতপাদন সম্ভব ছিল। যেটা আমাদের মত দেশের বেলায় অসম্ভব।  এই সুযোগে কমিউনিস্টদের  (অবাস্তব বা আইডিয়েল) অনুমান আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য  (এবং গ্লোবাল বাণিজ্যও) অপ্রয়োজনীয়। এছাড়া, বাণিজ্য মানে তো মুনাফা কামানো যা তাদের চোখে হারাম কাজ!  অথচ খোদ কার্ল মার্কস এর কাছে এক্সচেঞ্জ [exchange] (বাংলায় বিনিময় যেমন পণ্য বিনিময় থেকে প্রেম বিনিময় বা সম্পর্ক) কেন এত গুরুত্বপুর্ণ ও প্রায় সর্বব্যাপী এক ধারণা কেন?
    অথচ আবার খেয়াল করেন মোদি যে এক উগ্র অর্থনৈতিক জাতিবাদী এবং কট্টর চীনবিরোধী। অথচ ভারতে যে মোবাইল ব্যবহার হয় এর ৭৩% মার্কেট শেয়ার হল একা চীনের। আমি জানি না কমিউনিস্টেরা এই ফেনোমেনাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন! কেন এটা ঠেকানো যাচ্ছে না?

    তাই আরেক সাবধানতা -দুই বলে রাখি। গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থা জিনিষটা কী তা নিয়ে আলাপেঃ
    মূলত এটা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাই তবে এরচেয়েও বড় এরই গ্লোবাল রূপ।  আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা মানে যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বানিজ্য যাতে চলতে পারে এর একটা সিস্টেম গড়ে তোলা। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে এত জটিল সিরিয়াস ভাবা কেন? যদি এর মূল সমস্যাটা বুঝতে পারি তাহলে সবকিছু বুঝব।
    যেমন আপনার দেশীয় মুদ্রায় কেনা-বেচা আপানার দেশের সীমানার ভিতরেই কেবল চলতে পারে। সীমানা পার হয়ে গেলে আপনার পকেটের আপনার দেশীয় মুদ্রা ভিনদেশে আর গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই কিছুই কিনতে পারবেন না।তাই আন্তর্জাতিক মুদ্রা বলে ধারণা লাগবে, একটা সিস্টেম লাগবে। এর চেয়েও বড় কথা কোন প্রতিষ্ঠান লাগবে যার কাজ হবে যেকোন দেশের মুদ্রার প্রতিদিনের বিনিয়ময় হার কী হবে তা জানানো। আর একাজ সে টেকনিক্যাল ও ইম্পারশিয়াল নিউট্রাল কোন পদ্ধতি দাড় করিয়ে সে ভিত্তিতে প্রকাশ করবে। আর যে গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান এই কাজ করবে – সেই প্রতিষ্ঠানটারই নাম হল আইএমএফ।  এসব দিকের বিপরীতে কমিউনিস্টেরা মনে করে  আইএমএফ হল নাকি কেবল শর্ত দেওয়ার প্রতিষ্ঠান। না বুঝে কত কথাই না বলা যায়! কমিউনিস্টদের আরেক ভুয়া অনুমান হল, আইএমএফ এমন শর্ত দেয় বেশি মুনাফা কামানোর জন্য। এজন্য যে হাসিনা সরকার পরিণত হয়েছে বিদেশে অর্থপাচারের সরকারে ফলে হাতে ডলার শুণ্যতার সরকার, কমিউনিস্টেরা তাকে সাফাই যোগাতে চেয়ে বলছে ডলার সংকটের সব দোষ নাকি আইএমএফ এর।  কারণ নাকি আইএমএফ খালি শর্ত দেয়। আর এই ভুয়া আলাপের লেজ ধরে অর্থমন্ত্রীও সাফাই দিয়ে বলে সরকার  “আইএমএফ এর শর্তের কথা ভেবে” মানে আমল করে এবারের বাজেট দেয় নাই। মানে খুবই বিপ্লবী সরকার এটা! আর তা শুনে কমিউনিস্টেরা হাততালি দিয়ে উঠেছে।

    যে আলাপ তুলি নাইঃ
    প্রশ্ন হল ব্রিকস এক উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান বলছি যার লক্ষ্য আগামি দিনে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থার বিকল্প সিস্টেম আনা। এই ব্রিকস তাহলে নিজ জন্মের ১৪ বছর পেরিয়ে গেছে এখনও আইএমএফ নিয়ে কিছু করছে না কেন, অগ্রগতি ধীর কেন?  জবাবটা আপাতত এক বাক্যে শেষ করব। জবাব হল, চলতি গ্লোবাল অর্থনৈতিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থাটা অ্যামেরিকান ডলার কেন্দ্রিক। মানে এখন দুনিয়ায় বৈদেশিক বাণিজ্যে ৭০% এর বেশি পণ্য কেনাবেচা হয়, ইনভয়েস লিখা হয় অ্যামেরিকান ডলারে। সবার আগে এখানে বদল ঘটতে হবে; ঘটাতে হবে। অন্য মুদ্রা ইউয়ান অথবা  অন্যদেশের মুদ্রায় হতে হবে। এটাই সেই পুর্বশর্ত যা না হলে ব্রিকস উদ্যোগের সফলতা দেখাতে পারবে না। কিন্তু একালে আবার বাইডেন ডলারে বাণিজ্য করতে পারবে না এমন ডলার স্যাংশন যেকোন ব্যক্তি বা সরকারের উপর জারি করছে যথেচ্ছভাবে তা প্রয়োগ হচ্ছে। এটাই পরোক্ষে ব্রিকসকে আশা জাগানো হয়ে যাচ্ছে, বা সাহায্য করছে। যেটাকে আমেরিকার দিক থেকে দেখলে উপস্থিত লাভালাভ পেতে গিয়ে বাইডেন অপব্যবহার করে ফেলছেন – বলবেন অনেকে। এমন ডলারের সুবিধা অপব্যবহারের বিপদ বাড়ছে কথাটা সম্প্রতিকালে বাইডেনের  ট্রেজারি মন্ত্রী স্বীকারও করেছেন Yellen Says Sanctions May Risk Hegemony Of US Dollar।

    তাহলে আদার ব্যাপারী কথা তুললাম কেনঃ
    কথাটা আমার না স্বয়ং শেখ হাসিনার। বিডিনিউজের রিপোর্টার লিখছেন, প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক আরও জানতে চেয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক কোনো মুদ্রা চালু করার পরিকল্পনা বাংলাদেশের আছে কি না। উত্তর দিতে গিয়ে মুচকি হেসে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আদার ব্যাপারি জাহাজের খবর নিতে বলছেন”।

    এইকথাটাই প্রমাণ করে যে হাসিনা নিশ্চিত যে ব্রিকসের সদস্য হলে সেটা বাইডেনের আমেরিকাকে ছেড়ে যাওয়া বা বুড়া আঙুল দেখানো এসবের কোনটাই নয়। তিনি তো আদার ব্যাপারী, তাই এটা তিনি বুঝেন। এটা কেবল একটা ভাব ধরা যে ব্রিকসে যোগ দিয়ে হাসিনা বাইডেনের প্রভাবের বাইরে চলে যাবেন বা বাইডেনকে যেন একটা উচিত শিক্ষা দিলেন। তবে এসব কথা দলের কর্মীদের মনোবল বাড়াতে কাজে আসবে এতটুকুই মাত্র।

    এছাড়া সকল পাঠককে আরেকটা কথা মনে করিয়ে দিয়ে শেষ করব। ব্রিকসের জন্মদাতারা সহ সকল রাষ্ট্র আজও আইওএমএফ ও বিশ্যাব্যাংকের সদস্য হয়েই আছে। ছাড়ে নাই। কোনদিন যদি চীন আমেরিকার জায়গায় গ্লোবাল নেতার প্রতিষ্ঠা পায় কেবল তখনও হয়ত অনেক বিশ্বব্যাংকের মত সমতুল্য প্রতিষ্ঠান থাকলেও দুনিয়ায় আইএমএফ হবে একটাই; তবে অবশ্যই সেটা হবে ঢেলে সাজিয়ে নেয়া এক নয়া আইএমএফ!

    আপডেটঃ ২৫ জুন ২০২৩  সকাল ১০ঃ ১২
    আপডেটঃ ২৫ জুন ২০২৩  বিকাল ০৫ঃ ৫৫

    >>>>
    গৌতম দাস

    রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

  • পাকিস্তানকে আমেরিকা কাছে টানার পরে, আবার বে-ইজ্জতি করা কেন?

    পাকিস্তানকে আমেরিকা কাছে টানার পরে, আবার বে-ইজ্জতি করা কেন?

    গৌতম দাস

    ১৭ অক্টোবর ২০২২  রাত ০১ঃ১৮

    https://wp.me/p1sCvy-4gb

     

           Pakistan’s Foreign Minister Bilawal Bhutto-Zardari speaks following his meeting with U.S. Secretary of State…..

     

    একটা দৃশ্যমান স্ববিরোধ বা পরস্পরবিরোধী ঘটনা আজকের লেখার বিষয়। কোথায় ঘটেছে এটা? বাইডেনের আমেরিকার বিদেশ নীতি-পলিসিতে বা তাঁর সাম্প্রতিক কিছু ততপরতায়।  কী সেই পরস্পরবিরোধী দুই ঘটনা?
    এক. মূল বিরোধের স্থান হল,  গ্লোবাল নেতৃত্বের পালাবদলের যুগে চীন-আমেরিকার লড়াইয়ের পটভুমি। সেখানে ইউক্রেন যুদ্ধের ইস্যুকে কেন্দ্র করে ঘটনা গড়াতে গড়াতে এখন চীন-রাশিয়া-ভারত মিলে আমেরিকাবিরোধী এক মেরুকরণ ঘটিয়ে ফেলেছে। বিশেষত সর্বশেষ গতমাসে ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর চীনের সাংহাই কর্পোরেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও বা SCO) এর বার্ষিক সভা থেকে এই মেরুকরণ আরো দৃশ্যমান করে দেখানোর সুযোগ হিসাবে চীন-রাশিয়া-ভারত নিয়েছে। মনে রাখতে হবে, ভারত ও পাকিস্তান এর জন্মবিরো্‌ধ – এই প্রাচীনবিরোধকে উস্কে দিয়ে যেন আমেরিকা সেখান থেকে কোন নিজ সুবিধা বের করতে না পারে তাই ২০০১ সালে জন্ম নেয়া চীন-রাশিয়ার জোট এসসিও-তে ভারত-পাকিস্তান এদুইদেশকে একসাথে ২০১৫ সালে এসে একই দিনে SCO এর সদস্য করে নেয়া হয়েছিল। তা সত্বেও, বাইডেন ঐ মেরুকরণের পালটা প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের উপর সওয়ার হয়ে ভারত-পাকিস্তানের বিরোধ উস্কে তুলে দিল।
    সারকথায় বললে,  আমেরিকাবিরোধী চীন-রাশিয়া-ভারত মিলে তাদের নয়া মেরুকরণ-কে দুর্বল করতে সাম্প্রতিককালে আমেরিকা ভারত-পাকিস্তানের বিভেদ উস্কে তোলার কৌশল নিয়েছে। যেমন এর শুরুটা হল, পাকিস্তানকে এফ-১৬ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশসহ অন্যান্য প্রায় আধা বিলিয়ন ডলারের সহায়তার জন্য বাইডেনের হাত বাড়ানো। স্বভাবতই এটা ভারত-পাকিস্তানের রেষারেষি উস্কে তুলতে যথেষ্ট। যদিও জয়শঙ্কর চেষ্টা করেছেন বিরোধটাকে ঠিক পাকিস্তান-ভারত নয় বরং  ভারত-আমেরিকার বিরোধ হিসাবে কেন্দ্রীভুত রাখতে। তিনি ভারতে বসে বা আমেরিকা সফরে গিয়ে এনিয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে  খুবই কড়া মন্তব্য বা অসন্তোষ ব্যক্ত করেছেন। [এখানে বিস্তারিত ] যদিও তাতে পাকিস্তানে ইমরানকে হটিয়ে আমেরিকার বর্তমান ক্ষমতাসীন শাহবাজ সরকারকে ক্ষমতায় আনা-কেন্দ্রিক ততপরতা অথবা তাতে যে আমেরিকা-ঘনিষ্টতা শুরু হয়েছিল তা এখন আপত্তিকর ‘অতি ঘনিষ্ঠতা’ হয়ে গেছে, যা আন-এথিক্যাল। কারণ এটা আর এখন পাকিস্তানের স্বার্থে যতটা নয়, তার চেয়ে আমেরিকার স্বার্থে শাহবাজ সরকারকে জবেহ দেওয়ার সামিল হয়ে গেছে। ভারতের সাথে পাকিস্তানের অমীমাংসিত বিরোধ আছে এটা সত্য। কিন্তু তাই বলে সেটাকে অপব্যবহার ঘটানো আর তাকেই আমেরিকা যেন একমাত্র, মুখ্য ও চোখা করে উঠিয়েছে এবং নিজ বাজে স্বার্থে!

    কিন্তু আসলেই কী আমরা বাইডেনের পদক্ষেপ-গুলো বুঝেছিলামঃ
    বাইরের আমরাও ভেবেছিলাম আমরা বোধহয় ঘটনা, মেরুকরণ ইত্যাদির গতিপ্রকৃতি বুঝেতেছি। কিন্তু না আবার কিছু নতুন ঘটনা হাজির হয়েছে যাতে আমাদের ঘটনা বুঝতে এখনো অনেক বাকি – এটাই সবার উপরে ভেসে উঠেছে।
    কিন্তু কী সেটা? সে ঘটনা আবার দুইটা। এক, শাহবাজের পাকিস্তান তো এখন থেকে বাইডেনকে ভালই সার্ভিস দিতে থাকবে, এটাই ধরে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু না। আমরা দেখলাম, বাইডেন হঠাৎ গত পরশু (১৪ অক্টোবর) পাকিস্তান সম্পর্কে খুবই কঠোর, কটু ও অমর্যাদাকর মন্তব্য করেছে। যার ফলে পাকিস্তানে আমেরিকান রাষ্ট্রদুতকে শাহবাজ সরকার ডেকে এনে তাঁর হাতে পাকিস্তানের কড়া আপত্তি ধরিয়ে দিয়েছে। তাহলে কী দাঁড়ালো এটা?  পাকিস্তান সম্পর্কে বাইডেন বলেছেন, “পাকিস্তান হচ্ছে সম্ভবত দুনিয়ার সেসব মারাত্মক ক্ষতিকর বিপদজনক রাষ্ট্রগুলোর একটা যার হাতে পারমানবিক অস্ত্র আছে কিন্তু দায়ীত্ববান নিয়ন্ত্রণ নাই”। “may be one of the most dangerous” countries in the world which had “nuclear weapons without any cohesion”. …।।

    আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে তাইঃ
    আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে – একথার মানে কী বা বলতে কী বুঝব? অথবা কতটুকুর বেশি বুঝলে ভুল হবে?
    একালের বিচারে সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া বলতে বুঝতে হবে, কোন দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলেও রুটিন কিছু সম্পর্ক তবুও থেকেও যাওয়া।  অর্থাৎ  ভেঙ্গে যাওয়ার আগে যে  সম্পর্কে ‘বিশেষ ঘনিষ্ঠতার’ জায়গাগুলো ছিল কেবল সেসব ক্ষেত্রগুলোর তাতে পরিসমাপ্তি ঘটা। কিন্তু এরপরেও কূটনৈতিক সম্পর্কসহ রুটিন যেসব সম্পর্কে ঐ দুই দেশের মধ্যে আগেও ছিল যেমন, এসবের মধ্যে পারস্পরিক পণ্য-বিনিময় বাণিজ্যিক সম্পর্ক যেগুলো ছিল সেগুলো সবই তা চলতে থাকবে। এটাকে বলছি ‘একালের বিচারের’ ঘটনা। কেন? কারণ,  এর আগে মানে ১৯৯২ সালের আগে আমেরিকা-সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার সম্পর্ক এর কথাই যদি ধরি – এটাই মুখ্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটা ধরণ এবং এতাই স্টান্ডার্ড বলে মনে করা হত। আর এর মূল বৈশিষ্ট ছিল আমেরিকা-সোভিয়েত এ’দুই ব্লক রাষ্ট্রের মধ্যে কোন – পারস্পরিক পণ্য-বিনিময় বাণিজ্যিক সম্পর্ক’ই ছিল না –  এমনকি ভাষা, কালচার বা শিল্পকলার বিনিময় বলতেও তেমন কিছুই ছিল না। যার সারকথাটা হল – ‘নো এক্সচেঞ্জ’। এটাই ছিল সেকালের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের স্টান্ডার্ড রূপ। আর এর ঠিক উলটা হল একালের বিচারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক যেখানে সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া বললেও বুঝতে হবে তবু একধরণের রুটিন সম্পর্ক যেমন সাধারণ বাণিজ্য সম্পর্ক তবু থেকে যাবে। বিস্তারে যাব না কেবল সংক্ষেপে বলব, একালের সম্পর্ক মানে সকলেই একই আইওএমএফের সদস্য তাই বাণিজ্য সম্পর্ক থেকে যাবেই। আর তাছাড়া একবার বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি ও শুরু করে ফেললে কিছু কিছু পণ্যে পারাস্পরিক ও আন্তঃনির্ভরতা তৈরি হয়ে যাবেই। এটাই মনে রেখে কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া ধারণাকে একালে বুঝতে হবে।
    তাহলে একালের বিচারে  আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে বলতে কি বুঝায়, এর অন্তত কিছু বুঝলাম। আর তাতে ভারত যেসব সুবিধা হারিয়েছে সেগুলো হল যেমনঃ ১। আমেরিকার-ভারত একসাথে হয়ে আগে পাকিস্তান কোপাতে পারত। মানে আমেরিকার-ভারতের ইসলাম-বিদ্বেষকে তারা পাকিস্তানেরই দোষ বলে উলটা চাপিয়ে দিতে পারত। তাতে দাবি করত, পাকিস্তান একটা ‘নিচা’ দেশ – এরা পশ্চাদপদ, এরা জঙ্গী, আনকালচার্ড কিংবা এদের ধর্মটাই অপুষ্ট বা দুষ্ট ধরণের ঘৃণামূলক অবুঝ বা না-বুঝের কথাবার্তা  ইত্যাদি; এই ভাষ্যের উপর দাঁড়িয়ে এরা পাকিস্তানকে ডিকটেট করতেও সেকালে চাইতে পারত। বাস্তবত  আমেরিকার-ভারতই যে মূলত স্ব স্ব দেশে মুসলমানদের সাথে সীমাহীন বৈষম্য করে চলেছে, বৈষম্যের জাল ফেলে রেখেছে সেটাকে আড়ালে রেখে তাদের সব যৌথ ততপরতাই হল জঙ্গি, ইসলামি রাডিক্যালিজম নামে চালানো সব ঘটনার আদি উতস!
    সেটা যাক হোক,  আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক-জোট এলায়েন্স সম্প্রতি ভেঙ্গে গেছে আর এতেই ভারত আর যে পাকিস্তানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ এই ‘বয়ানের জায়গা নাই হয়ে গেছে  পাচ্ছে না, চালু থাকতে পারছে না। এর এক সরাসরি ক্ষতি হয়েছে মোদি সরকারের। তিনি ভারত “পাকিস্তানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ” এই  ভুয়া বয়ানের উপর দাড়িয়েই ভারতের মুসলমানেরাই খারাপ বা যেন এজন্যই  এরা নিপীড়িত হবার যোগ্য এই সাফাই তৈরি করেই হিন্দুত্ববাদের জজবা তুলে সেই জোশগুলোকে ভোটের বাক্সে জড়ো করে নিজ ক্ষমতা টিকায় রাখতে ব্যবহার করে চলতে পারত। এটা মোদির এক সরাসরি ক্ষতি।

    তেমনই ভারতের আরেক ক্ষতি হল বাংলাদেশেঃ
    আমেরিকা আর বাংলাদেশ – এরা সরাসরি নিজেরা দুই দেশের স্বার্থের ভাল-মন্দ বা পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে নিজেরাই ডিল করুক – এভাবেই আমেরিকা-বাংলাদেশের সম্পর্ক গড়ে উঠুক?? তাতে ভালবাসা বা শত্রুতা করুক এটা ভারতের কাম্য নয়! না তা নয়। ভারতের ইচ্ছা বাংলাদেশ আমেরিকা-বাংলাদেশ এর সম্পর্কটাকে সরাসরি নিজেরা নয়; বরং ভারতের মাধ্যমে ডিল করুক। মানে আমেরিকা-বাংলাদেশের সম্পর্ক – এর লেনদেন, সম্পর্ক রক্ষা ইত্যাদি সবটা ভারতের মাধ্যমে ঘটুক। আর এভাবে ভারতকে একটা আলগা মাতবরি বা কুতুবি করতে দেক। যেটা আদতে বাংলাদেশের উপর ভারত একটা আলগা দালালি ও খামখা অভিভাবকগিরি হয়ে উঠুক। বিনিময়ে যেটা বাংলাদেশের উপর ভারতের প্রভাব বলে যেন ভারত দাবি ও উপভোগ করতে পারে!! গত ২০০৭ সাল থেকে এটাই কায়েম হয়ে ভারতের রুস্তমি রাজত্বের ভিত্তি হয়ে থাকা শুরু হয়েছিল। হাসিনা নিজ ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে এটা মেনে নিয়েছিল বলেই এটা চালু হতে পেরেছিল।

    কিন্তু  আমেরিকার ভারতের সম্পর্ক-জোট এলায়েন্স সম্প্রতি ভেঙ্গে যাওয়াতে এসব কিছুই একেবারেই দুর্বল হয়ে গেছে। এতে বাস্তবতা হল খুব সহসাই আবার  আমেরিকার-ভারতের সম্পর্ক নুন্যতম জেগে উঠুক বা উঠবে এর কোন সম্ভাবনাই নাই, বরং আরো শত্রুতামূলক হয়ে উঠার সম্ভাবনা। তাই এই পরিস্থিতিতে ভারত নতুন কিছু করে বাংলাদেশের সরকারের উপর প্রভাব সামান্যও যদি ফেরত পায় এমন সব চেষ্টা জারি রেখেছে। এরই একটা রিপোর্ট হল, “বাংলাদেশের ১৯৭১ সালে ঘটা নৃশংসতাগুলোকে আমেরিকান কংগ্রেসে ‘গণহত্যা’ বলে চিহ্নিত করে প্রস্তাব পাশ”  ‘Resolution in US house to recognise 1971 atrocities in Bangladesh as genocide’ ।

    ঘটনা পুরানা একাত্তর সালের কিন্তু এটা এখন শাহবাগী রাজনীতি।  সংক্ষেপে বললে বিষয়টা হল, কোন রাষ্ট্রীয় নৃশংসতার ঘটনাকে জাতিসংঘের সংজ্ঞায় ও সীমানায় জেনোসাইড বা ‘গণহত্যা’ বলে চিহ্নিত করানো ও স্বীকৃতির ইন্টারন্যাশনাল লিগাল মুল্য অনেক। এছারা এতে ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি দেওয়ার অনেক কাছে চলে যাওয়াও হয়। কিন্তু নানান টেকনিক্যাল কারণে, বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতার ঘটনা জাতিসংঘের চোখে গণহত্যা বলে স্বীকৃত নয়। এখন এই আলোকে আমেরিকান কংগ্রেস যদি  এমন গণহত্যা বলে স্বীকৃতি দেয় তবু সেটা অবশ্যই সমতুল্য কোন ঘটনাই নয়। তবুও এর কেবল কিছুটা ক্যাম্পেইন, প্রপাগান্ডা মুল্য মাত্র এতে থাকবে। এছাড়া এটা লিগাল রায় নয়। পক্ষ-বিপক্ষেরের রাজনৈতিক জোটের মতামত মাত্র।

    কিন্তু তা হলেও এমন মতামত আমেরিকান সংসদ বা কংগ্রেস থেকে উদিত হতে পারল কেন?  এটা তো সত্তরের দশকেও হয় নাই। তাহলে এখন কেন?

    আমেরিকা লবির দেশ, লবি করা বৈধঃ
    বহু দেশের নাগরিকই পরবর্তিতে মাইগ্রেটেড হয়ে আমেরিকার নাগরিক হয়। আমেরিকান নাগরিক মানে এটাই। এটাই আমেরিকান নাগরিক হওয়াদের প্রধান ধারা। ফলে কেউ পুর্ণ নাগরিক হয়ে গেলেও তারা স্ব স্ব অরিজিন দেশের স্বার্থের প্রেশার গ্রুপের ভুমিকার ভোটার-নাগরিক হয়ে যেতে পারে। তবে সেটা একমাত্র একই অরিজিন দেশের আমেরিকানেরা সংগঠিত হতে পারলে তবেই এরা সম্মিলিতভাবে ফেলে আসা দেশের পক্ষে বিশাল লবি গ্রুপ হয়ে উঠতে পারে।  বাংলাদেশেরও বহু মানুষ একালে আমেরিকার নাগরিক হয়ে গেছে। কিন্তু তারা এখনো বাংলাদেশ লবি গ্রুপ হবার পরিবর্তে  বরং দেশের মতই দ্বিদলীয় ভাগ হয়ে দলদাস হতেই আগ্রহি।

    কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে, তারা অনেক জনসংখ্যার বলে, সরকারের দিক থেকে আমেরিকায় এমবেশি থেকে পরিচালিত এটা সংগঠিত করে নেয়া বলে এটা সবসময় ক্ষমতাসীন দলের হয়ে তবে বিশাল লবি গ্রুপ – এক র‍্যাকেট হয়ে ততপরতা করে থাকে। কংগ্রেস সদস্যও নির্বাচন করে থাকে। কোন সিনেটরের পিছনের সাপোর্ট গ্রুপ হয়েও কাজ করে থাকে সময়ে। তবে কংগ্রেসম্যান বা সিনেটর এসব জনপ্রতিনিধি সবসময় সরাসরি ভারতীয় অরিজিনের এমন ব্যক্তি নাও হতে পারেন। তবে অবশ্যই তাদের কনষ্টিটুয়েন্সি ভারতীয় অরিজিন আমেরিকান ভোটাররাই হয়ে থাকেন। এছাড়া আরেক ধরণের জনপ্রতিনিধিকে দেখা যায় যারা আমেরিকায় ভারতের স্বার্থের পক্ষে কাজ করে থাকেন। এরা হল, আসলে কোন এক বা একদল হোয়াইট আমেরিকান ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি যাদেরকে ভারত তাদের দেশের ব্যবসা পাইয়ে দিয়েছে, সহজ করে দিয়েছে। আর বিনিময়ে তারা ভারতের পক্ষে ও স্বার্থে কাজ করবে এমন এক বা একাধিক জনপ্রতিনিধি জুটিয়ে দিয়েছে হয়ত।

    আলোচ্য ক্ষেত্রেও আমেরিকান কংগ্রেসে যে প্রস্তাব পাশ হয়েছে,  দুই কংগ্রেসম্যান এই প্রস্তাবটা তুলে এসে পাশ করিয়েছেন –  স্টিভ শ্যাবট [Steve Chabot ] ও আরও খান্না [Ro Khanna ] নামের দুই আমেরিকান কংগ্রেসম্যান। স্বভাবতই খান্না  এই পাঞ্জাবি টাইটেল এর  মানে তিনি ভারতীয় অরিজিন।

    তাহলে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট “এই প্রস্তাব” তাদের এত আগ্রহ করে আনার কারণ কী? কারণ এটাই মোদি সরকারের আগ্রহ। কিন্তু সরকারের আগ্রহ কেন? কারণ, এই প্রস্তাব মানে হল,  বাংলাদেশ-আমেরিকান সম্পর্ক সরাসরি না হয়ে সেটা ভারতের মাধ্যমে  বাংলাদেশ-আমেরিকান সম্পর্ক করার বা হবার লাইনের প্রস্তাব – এরই আকুতি। আর এটাই এতদিন হাসিনা সরকারের স্বার্থ ছিল। বা স্বার্থের গৃহিত লাইন ছিল। যেটা এখন অকার্যকর। হাসিনা মনে করে ভারত এব্যাপারে এখন মুরোদহীন; যার নিজেরই আমেরিকার কাছে বেইল নাই। আর খোদ আমেরিকাই এখন হাসিনা সরকারের উপর বিলা! কিন্তু তবু ভারত নাছোড়বান্দা। যেন দেখাতে চায় এখনো আমার কিছু আমেরিকান জনপ্রতিনিধির উপর প্রভাব আছে আর সেটা আমরাই বাংলাদেশে বেচতে চাই!!

    তাহলে এখন এই লেখার মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সেটা হল, বাইডেন কেন চীন-আমেরিকার বিরোধ প্রসঙ্গে এখন ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে ব্যবহার কাজে লাগানো সম্পন্ন করেও আবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই পারমানবিক বোমার অধিকারি দেশ প্রশ্নে অযোগ্য [without any cohesion] রাষ্ট্র বললো?

    Biden in a speech said Pakistan “may be one of the most dangerous” countries in the world which had “nuclear weapons without any cohesion”.

    আসলে এর মূল কারণ, দুটা দুই কনটেকস্ট (context) বা পটভুমিতে। প্রথমটা ভারতের চীন-রাশিয়ার পক্ষে চলে যাওয়ার শাস্তি হিসাবে যেটা আগেই অনেক বলেছি। আর দ্বিতীয়টার হল, আমেরিকায় নির্বাচন আগামি ৮ নভেম্বর ২০২২, সেই প্রসঙ্গে ও পটভুমিতে। নির্বাচন মানে?

    বাইডেনের চার বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার দুইবছর বা অর্ধ-আয়ু পার হবার দিন হল আগামি ৮ নভেম্বর। আর ঐদিনই আবার আমেরিকান সিস্টেম অনুসারে এক-তৃতীয়াংশ সিনেট ও পুরা কংগ্রেসের সদস্যদের আসনে মেয়াদ শেষ ও নয়া-নির্বাচনের দিন। আরেকটু ভেঙ্গে বললে, আমেরিকার কংগ্রেসে (আমাদের ভাষায় সংসদে) সদস্যরা মাত্র দুবছরের জন্য নির্বাচিত হন। তাই প্রতিবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ও ওর সাথে একবার আর আরেকবার নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের দুবছর পার হলে পরে (যেটাকে মিড-টার্ম বলে) – এভাবে দুই সময়ে দুবছর পরপর আমেরিকান কংগ্রেস সব সদস্যদের (মোট ৪৩৫+২ ) আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

    আর আমেরিকান কংগ্রেসের নির্বাচনের সাথে একই সময়ে এভাবে সিনেটরদেরও নির্বাচন হইয়ে থাকে। যদিও এক্ষেত্রে এক জায়গায় শুধু একটু ফারাক আছে।   তা হল, সিনেটরেরা কংগ্রেসের মত দুবছরের মেয়াদে নয়, বরং টানা ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন। তবে প্রতি দুই বছর পরপর মোট আসনে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আসনে নয়া নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

    তাহলে সারকথায় মিড টার্ম নির্বাচন মানে কী দাড়ালো? তা হল, একঃ  সব কংগ্রেসের আসনেই (৪৩৫+২) নয়া নির্বাচন এর দিন সেটা। দুইঃ  সিনেটের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আসনে নয়া নির্বাচনের দিন সেটা। আর তিনঃ প্রতি নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের মেয়াদের অর্ধ-মেয়াদ বা দুবছর পার করার দিন সেটা। যদিও এই মিড-টার্মের নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের (বাইডেনের ডেমক্রাট) দলের জনপ্রতিনিধিরা কংগ্রেস ও সিনেটের যেকোন এক জায়গায় বা দুই জায়গাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও তাতে প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা হারাতে হবে না। মানে ডেমক্রাটেরা আগামি এই মিড টার্মে কংগ্রেস ও সিনেটের সবজায়গায় হেরে গেলেও বাইডেনই প্রেসিডেন্ট থেকে যাবেন। চারবছর পুর্ণ প্রেসিডেন্টই থেকে যাবেন।

    এবার আমাদের প্রাসঙ্গিক কথা হল, আসন্ন মিড-টার্মের নির্বাচনে ডেমোক্রাট কংগ্রেসম্যান যারা ভারত-প্রভাবিত তাদেরকে জিতাবার জন্যই বাইডেন পাকিস্তান-বিরোধী অমন কথা বলেছেন। অর্থাৎ এর সাথে ভারতের আমেরিকাকে ছেড়ে চীন-রাশিয়ার সাথে তাদের জোটে চলে যাবার কোন সম্পর্ক নাই।
    আমার একথা সবচেয়ে ভাল বুঝা যাবে বাইডেন কোথায় গিয়ে এইকথাগুলো বলছেন সেদিকে যদি খেয়াল করেন। লেখা আছে আসন্ন মিড-টার্ম নির্বাচন উপলক্ষ্যে ডেমোক্রাট কংগ্রেস প্রার্থীদের পক্ষে ক্যাম্পেইন শুরু করা হবে [……Biden made the comments during a reception of the Democratic Congressional Campaign Committee on Thursday ]। ঐ ক্যাম্পেইন শুরুর আগে ক্যাম্পেইন কমিটির সভায় তাদেরকে উতসাহ দিতে  বাইডেন সেখানে গিয়েছিলেন।  ঐ বক্তৃতাতেই তিনি পাকিস্তানকে ক্ষেপিয়ে ঐকথা বলেছেন।
    এককথায় বললে, যেমন  ডেমোক্রাট Ro Khanna [ROHIT KHANNA] এর মত ভারতীয় অরিজিন আমেরিকান কংগ্রেসম্যানদেরকে মিডটার্মে আবার জিতাবার জন্য বাইডেন পাকিস্তানকে ঠেস দেয়া বা নিচা দেখানো ঐ বক্তব্য দিয়েছেন। আবার যেমন Ro Khanna কে জিতাবার জন্য বাইডেন কাজ করছেন বলে এর মানে এমন নয় যে বাইডেন আমেরিকা-ভারতের ঘনিষ্ট আগেকার সম্পর্কটাই আবার ফিরিয়ে আনার পক্ষে কাজ করছেন। এমন বুঝা ভুল হবে!

    এই হল মূল কথা। আর এখন একটু বাড়তি কথা বলে নেই এই সুযোগে। এই মিড-টার্মে বাইডেনের দল ডেমোক্রাটেরা গোহারা হারবে বলে পুর্বাভাস বলছে। কারণ প্রায় ৯% মুদ্রাস্ফীতি আর এতে মিডল-ক্লাস ও নিম্ন মধ্যবিত্ত এরা প্রচন্ড ক্ষেপে ক্ষুব্ধ। এছারা প্রায় দেড় বছর ধরেই তাদের পছন্দের ও নাগালের মধ্যে মুল্যের চীনের তৈরি গৃহস্থলিতে ব্যবহার হয় এমন ওয়াসিং মেসিন বা এসি ইত্যাদি আমদানি পণ্যের উপর ২৫% বা এর উপরে কোথাও ৬৬% পর্যন্ত অতিরিক্ত ট্যাক্স বসানোতে ক্ষুব্ধ ছিল তারা। যদিও এই বাড়তি ট্যাক্স বসিয়েছিলেন ট্রাম্প তাঁর ক্ষতা ছাড়ার আগে কিন্তু এর এফেক্ট শুরু হয় বাইডেনের আমলে। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ট ভোটারেরা বাইদেনের দলের বিরুদ্ধে যাবে বলে অনুমান। এতে যদিও বাইডেন ক্ষমতাচ্যুত হবেন না। তবে, যেগুলো অর্থ-বিল মানে যেখানে প্রেসিডেন্ট কোথাও কোন দেশে অর্থ বরাদ্দ দিতে চান এমন প্রতিশ্রুতি দিতে চান সেগুলো আগে তাকে সংসদ-সিনেটে অনুমোদন নিতে হবে। আর এই অনুমোদন নিতে গিয়েই তিনি বাধার সম্মুখীন হবেন।

    গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

     

     

     

     

     

  • বাইডেনের কলোনি ‘মূল্যবোধের’ বড়াই শুরু

    আটল্যান্টিক মানেই কলোনি,
    বাইডেনের কলোনি ‘মূল্যবোধের’ বড়াই শুরু

    গৌতম দাস

    ০৪ জুলাই ২০২২, ০০ঃ০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-49m

    NATO declares China a security challenge for the first time

     

    ন্যাটোঃ  এটা ইউরোপ-আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর এক বৃহৎ সামরিক জোট যার পুরো নাম- ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন’। গত সপ্তাহে ২৮-৩০ জুন ২০২২, স্পেনের মাদ্রিদ শহরে বহুদিন পরে ন্যাটো হৈচৈ ফেলে এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত করেছে, অথচ এতদিন এমন অনুষ্ঠানগুলো ন্যাটো যেন প্রায় সবার অলক্ষ্যেই কোনোমতে সেরে ফেলা হয়ে আসছিল। এখানেই শেষ না। আবার যেখানে একদিক থেকে দেখলে  ন্যাটো এখন ভেঙ্গে ফেলা উচিত; অথবা আমেরিকার ন্যাটো ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত – ধরণের কথাবার্তা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট এর মুখ দিয়ে উঠে আসা শুরু হয়েছিল সেখানে এখন উলটা হাওয়া। রাখঢাক ফর্মালিটি না করে সরাসরি বললে, প্রেসিডেন্ট বাইডেন হঠাত ন্যাটো, জি-৭ ইত্যাদি পশ্চিমা রাষ্ট্রজোট খাড়া করে শেষ চেষ্টা হিসাবে উঠে দাড়াতে চাচ্ছেন। গ্লোবাল ইকোনমিক ও ততসহ এককথায় সংশ্লিষ্ট “প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্ব” কোন চিরস্থায়ী জিনিষ না। একটা সময়ের পরে এগুলোর আয়ু আপনাতেই শেষ হয়ে যায়। চাইলে তা বুঝাও যায়। জ্ঞানী ও বুঝমানেরা তা অনুসরণ করে সময় থাকতে উপযুক্ত জায়গা বেছে নিয়ে সরে যায়।  কারণ সামর্থ ও সক্ষমতা অনুসারে যথোপযুক্ত নেতৃত্ব-অবস্থান নিতে হয়, তার মধ্যে থাকতে হয়। নইলে শেষে অপমানিত হতে হতে পারে।  কিন্তু প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই প্রাকৃতিক দিকটা মানবেন না ঠিক করেছেন মনে হচ্ছে। যেন বলতে চাইছেন, বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা-শক্তি গ্লোবাল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নেতৃত্ব নিজের কোলেই রেখে দিবে। তারা ধরে নিতে চান আবার তাদের এনিমি (শত্রুতা বা মূলশত্রু) মূলত চীনের সাথে; ইউরোপের প্রেক্ষিতে যেটা রাশিয়ার সাথে। এই ধরে নেওয়ার ভিতরে একটু ভুল আছে। চীনের সাথে তাদের ঠিক এনিমিটি না প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। অনেকে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে জিদের চোখে দেখে একে শত্রুতা হিসাবে। এখানে তাই ঘটেছে।
    দুনিয়ার ইতিহাসের শেষ ৫-৬শ বছর ন্যায়-অন্যায় যেভাবেই হোক জনগোষ্ঠি হিসাবে পশ্চিমের সাদা ককেশীয়দের হাতে সারা দুনিয়া শাসিত হয়েছে; তারা দুনিয়ার উপর ঘুরে ফিরে রুল করে এসেছে, আধিপত্য বিস্তার করে এসেছে। ব্যাপারটাকে ঘটনাচক্র হিসাবে দেখাই সঠিক ছিল। দুনিয়াতে কোন ধর্ম-এথনিক জাতি দুনিয়া আজীবন শাসন করে যাবে এমন কোন চুক্তি বা শর্ত কোথাও লেখা নাই। অন্য এথনিক জনগোষ্ঠিও তা মেনে নিবার কোন কারণ নাই। কোন জনগোষ্ঠিরই এমন ধরে নিবার কোন ভিত্তি নাই যে যেহেতু তারা শাসক ছিল তাই তারা তা থেকেই যাবে আজীবন!   এই জবরদস্তির কর্তাগিরির চোখ সরিয়ে ব্যাপারটাকে অবজেকটিভ দিক থেকে যেমন বস্তুগত যোগ্যতা ও সামর্থ সক্ষমতার দিক থেকে দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ হত।

    কিন্তু বাইডেন বুদ্ধিমান হতে চান নাই। তিনি এবার এককালের বড় অর্থনীতির সাত দেশ যা জি-৭ বা গ্রুপ সেভেন কান্ট্রি – এই জোটকে আবার বুড়া হারে রঙ চড়িয়ে সাজাতে চেয়েছেন। তিনি এই জি-৭ আর ন্যাটো  কেগত সপ্তাহে সাজিয়ে এনেছেন, বুড়া হাড়েই জোর দেখাতে চেয়েছেন। অথচ  বাস্তবতা হল চলতি নয়া শতক থেকে জি-৭ নিজেকে বিগতযৌবনা বলে মেনে নিয়েছে। এটা আমার দাবি নয় বাস্তবতা। যেকারণে, এককালের জি-৭ গেলে তারা নিজেই এখন জি-২০ নামে নয়া গ্রুপ আকারে সাজিয়েছে। জি-২০ মানে যেখানে এই বুড়া সাত রাষ্ট্র আর সাথে নয়া রাইজিং অর্থনীতির দেশগুলোকে বেছে সাথে নিয়ে জি-২০ বানিয়ে নেয়া। মুল কারণ, বুড়া অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো স্থবির হয়ে গেছে। পুনরুতপাদন, পুন-বিনিয়োগের সক্ষমতা ও সামর্থ  অথবা কম্পিটিটিভনেস ঢলে পড়েছে। আর উলটা বসে বসে আয়েসে খাওয়া এমন ভোগের ঢিব্বা হয়েছে সেকারণে। “ওয়াল স্ট্রিট  বিনিয়োগ পাড়ার” কঠোর সমালোচনা এই বুড়ারা সহ্য করতে না পেরে অনেক আগেই তাই রাইজিং-দেরকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে জি-২০ গ্রুপ বানিয়ে নিয়্বেছিল। তাহলে  জি-২০ হিসাবে ঢেলে সাজানো ও এর উত্থানটাই কী যথেষ্ট প্রমাণ নয় যে জি-৭ গ্রুপ বা ন্যাটো এর নামে বাইডেন এর আবার আমেরিকার নেতৃত্বকে জাগানোর চেষ্টাটা একটা প্রতারণা!! অথচ বাইডেন চীন-কে বাইরে দূরে রাখতে চান। কেন? কী যুক্তি?

    আমেরিকার নেতৃত্বে ‘পশ্চিমা শক্তির’ ভ্যালুজ [Values] মানে মুল্যবোধ নাকি চীনের চেয়ে উন্নত!!! তারা উচুজাতের ও  জাত-শ্রেষ্ঠ তাই তারা চীন-রাশিয়া ইত্যাদিদের সাথে চলতে পারবে না। এককথায় বললে, অর্থনৈতিক ততপরতায় একুমুলেশন [accumulation] বা সঞ্চয় ও সম্পদ সৃষ্টির বিচারে  চীন এখন সবার উপরে – ঠিক যেমন এককালে আমেরিকা সারা ইউরোপকে ছাড়িয়ে উপর দিয়ে গেছিল। আর সেটাও ইউরোপের পছন্দ-অপছন্দ করার ব্যাপার ছিল না, থাকেও নাই। অথচ বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমাদেশ এখন অজুহাত তুলেছে তাদের খায়েশ তারা মূলত চীনকে একঘরে করবে। বাণিজ্য সম্পর্ক অর্থে কোনঠাসা বা একঘরে। যেখানে অজুহাত তাদের মুল্যবোধ নাকি নিচা!! আর এভাবেই তাদের ঢলে পড়া সামর্থ ও নেতৃত্ব তারা ছলনা করে হলেও ধরে রাখতে পারবে।

    কিন্তু নেতৃত্ব নিজের কাছে রেখে দেওয়া মানে কী? এটা কী সামরিক সক্ষমতার কথা বলছেন তারা? পশ্চিম এখানেই খোদ নিজেকেই বিভ্রান্ত করে রাখতে চায়। কোন রাষ্ট্রের মুল সক্ষমতা আসে অর্থনীতি থেকে। পরে ওর ভরসায় আরও আসে রাজনৈতিক, সামরিক, স্ট্রাটেজিক ইত্যাদি সবকিছু। যার আবার একমাত্র অর্থনৈতিকটাই অবজেকটিভ অর্থাৎ বস্তুগত সক্ষমতা। এটাকে কোন বা কর্তা ব্যক্তি-আমির ইচ্ছা মনে করাটা ভুল। অথচ বাইডেন এন্ড গং এটা জেনেও ভুল করেছে বলে দেখাচ্ছে। ওথচ সবাই জানে, কোন দেশ নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতাটা দেখাতে পারলে বা হাজির হয়ে গেলে এরপর এর ভরসায় অন্যান্য সব কর্তা বা ইচ্ছানির্ভর  যেমন  রাজনৈতিক, সামরিক, স্ট্রাটেজিক ইত্যাদি সব ইচ্ছা হাসিল করা যায়।  অথচ বাইডেন দেখাতে চাইছেন সবটাই তাদের যেন তাদের ইচ্ছা!!
    অতএব বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিম উন্নত মুল্যবোধের  – এই মিথ্যার আড়ালে,  নিজেদের হাতে দুনিয়ায় নেতৃত্ব ধরে রাখবে বলে হুঙ্কার তুলতে দেখছি আমরা!! গত ২৮-৩০ জুন ২০২২, এবারের  ন্যাটো সম্মেলনের তাতপর্য এটাই!!

    ন্যাটো উত্থানের পটভুমিঃ
    বাংলায় লেখা হয় ন্যাটো আর ইংরাজিতে NATO; অথবা খুলে ইংরাজিতে বললে তা – North Atlantic Treaty Organization।
    আর “পশ্চিমা” শব্দটা বলতে আমরা মূলত একটা জাতিগত পরিচয়কেই তুলে ধরতে চাই। যদিও সহসা সবাই তা বুঝি না, সাথে উহ্য থাকে বলে। কিন্তু কাদের? মূলত ইউরোপের যারা সবচেয়ে প্রভাবশালী এথনিক-জাতি মনে করা হয় তারা হল ককেশীয় [Caucasion]।  এসব মোটাদাগে বলা ভাষ্য; কোন গজ-ফিতা নিয়ে বসে মেপে বলা কথা নয়। কারণ ঐ একই ইউরোপে ককেশীয় ছাড়াও অসংখ্য এথনিক জনগোষ্ঠির বসবাস ছিল ও আছে। তবে যাদের প্রভাব বেশি এই অর্থে কথাটা প্রচলিত ও বলা। আসলে “আমরা সাদা চামড়ার লোক’ ফলে উন্নত – এই বলে অকথিত কিন্তু টের পাওয়া যায় যে আঁচ ও আওয়াজ এর কথা আমরা এশিয়া বা আফ্রিকার মানুষেরা জানি বা অভিজ্ঞতা রাখি, এগুলো সেসব কথা। এজন্য বলছি বাস্তবে গজ-ফিতা দিয়ে মেপে প্রমাণ পাওয়া যাবে না এসব উগ্রজাতিবাদি ভাষ্য। কিন্তু এসব ভাষ্য ও চর্চা আছে। বাইডেনের কথাগুলোর ভিতরে এর সুক্ষ ইঙ্গিত আছে!

    “…Beijing’s ambitions and its ‘coercive policies’ challenge the Western bloc’s ‘interests, security and values’ ”.  – aljazeera

    এখন এই ন্যাটো নিজেই নিজেকে চেনায় এই বলে যে তারা এক “পশ্চিমা ব্লক” রাষ্ট্র বা “পশ্চিমা শক্তি”। সর্বশেষ চলতি ন্যাটো সম্মেলনে এভাবেই তারা নিজেদেরজে পরিচিত করেছে “Western bloc’s” বলে।  আর এটা বলতে তারা আরো ভেঙ্গে বলে তারা হল সারা ‘ইউরোপ এবং আমেরিকা’ মিলে এক শক্তি। এই কথাটা ভৌগলিকভাবে ভেবে দেখলে বুঝা যাবে ইউরোপ এবং আমেরিকা বলতে এরা আসলে আটল্যান্টিক মহাসাগরের দুই তীর। একারণে লক্ষ্য করব ন্যাটো শব্দের ভিতরে ‘আটল্যান্টিক’ বলে একটা শব্দ আছে; ওর ‘এ’ -মানে আটল্যান্টিক। যদিও এর দুপাড়ের ফারাকটা হল  এক মহাসাগরের আর যার দৈর্ঘ গড়ে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার। অর্থাৎ যেকোন পুকুর বা নদীর দুপাড়ের মানুষের মধ্যে যেমন স্বভাব বা ভাষা ইত্যাদিতে মিল আমরা খুঁজে পাই তেমনই এক নিশ্বাসে – ইউরোপ এবং আমেরিকা – বলে মিল খুঁজা আমাদের করার কথা নয়।  কিন্তু আমরা খুঁজছি এমনকি কী খুঁজতে খুঁজতে আমরা ন্যাটো এসে পড়েছি! তাহলে মুখ্য প্রশ্ন দাড়াল, আমরা এক নিশ্বাসে – ইউরোপ এবং আমেরিকা  বলি কেন? মূলত কারণটা একেবারেই বাহ্যিক। অর্থাৎ আটল্যান্টিকের দু-পাড়ের বাসিন্দাদের মধ্যে বাইরে থেকে মিল ঘটানো হয়েছিল। কারণ তাদের মধ্যে কোন মিল থাকার কথা নয়, সুযোগও ছিল না। তাহলে সেটা কিভাবে?

    বেশিদিন আগের কথা নয়, এই তো মাত্র ১৬০৭ সাল থেকে। ইউরোপ এবং আমেরিকা, এভাবে প্রায়ই আমরা বলে ফেলি এর মুল কারণ হল – ইউরোপের প্রথম ও জবরদস্ত কলোনিই হল আমেরিকা। এমনকি ভারতবর্ষেরও আগে খোদ আমেরিকা ইউরোপের হাতে কলোনিদখল হয়েছিল। এটাই তাদের পারস্পরিক মূল সম্পর্ক।  আর এটাই ইউরোপের মূলত বৃটিশ-ফরাসিরা দখল করা শুরু করেছিল ১৬০৭ সাল থেকে শুরু করে; আজ যেটা আমেরিকার ভার্জিনিয়া রাজ্য সেটা দখল করার মাধ্যমে ১৬০৭ সালে। পরবর্তিতে আজকের আমেরিকার সব রাজ্য একইভাবে দখল হয়ে শেষে এককালে আমেরিকা (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) নামে আধুনিক রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল।  অর্থাৎ ব্যাপারটা এরকমঃ

    প্রথমে এক বৃটিশ, ধরা যাক নাম তাঁর কোন লর্ড ক্লাইভ, তিনি আজকের আমেরিকার কোন রাজ্য-ভুমি দখল করেছিলেন। যা আসলে ছিল আমেরিকার সেখানেকার স্থানীয় ট্রাইবাল বা এবরিজিন [aborigine] জনগোষ্ঠির বসবাসের ভুমি। কিন্তু পরবর্তিতে ক্লাইভ সাহেব জাহাজ ভরে গরীর বৃটিশ মানুষ নিয়ে গেছিলেন ভার্জিনিয়ায় এই বলে যে ওখানে গেলে তোমরা গরীব বৃটিশ বিনা পয়সায় বিস্তর জমি পাবে আর সাথে  উপকরণও দেয়া হবে। জমির লোভে তারা স্থানীয়দের মেরে-ভর্তা করেছে বা মাথা কেটে নিয়ে ফুটবল খেলেছে। আর নয়ত ভাল উর্বর জমিগুলো বৃটিশদের ছেড়ে দিয়ে  আরো গহীন বনে অনুর্বর জমিতে তারা নিজেদের স্থানান্তরিত করে নিতে বাধ্য হয়েছে।
    কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ে এই গরীব বৃটিশ কৃষক তারাই পালটা সমবেত প্রতিরোধ গড়ে ক্লাইভ এন্ড গং বৃটিশদেরকে আমেরিকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছিল। আর সেটাই ১৭৭৬ সালের আমেরিকান স্বাধীনতা। ঐ স্বাধীন আমেরিকানরাই আজকের আমেরিকান জনগোষ্ঠির এমনকি বাইডেন সাহেবের পুর্বসুরি। কেবল একটাই কালোদিক  থেকে গেছিল যেমন, এবরিজিন [aborigine] জনগোষ্ঠি তারা নিশ্চয় কোথাও চিপায় পড়ে থাকা মার্জিনালাইড হয়ে আছে।
    তবে এতে আরো কিছু নতুন মাত্রাও আঁকা হয়েছে বিশ্বযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশেষষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই সময়কালে আমেরিকাই উলটা এই প্রথম সারা ইউরোপের উপর প্রভাবশালী রাষ্ট্র অর্থনীতি ও জনগোষ্ঠি হিসাবে হাজির হয়েছিল। সেসময়ের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এর হাতেই সিদ্ধান্ত মেনেই সারা ইউরোপ এরপর তাদের বিশ্বযুদ্ধ কোন অভিমুখে গিয়ে শেষ হবে অথবা, পক্ষ-গুলো কেমন ও কে হবে তা নির্ধারিত হয়। কারণ যুদ্ধের খরচ যে যোগায় সেই তো এসব বিষয়গুলো নির্ধারণের কর্তা হয়ে যায়!  আর শুধু তাই না,  যুদ্ধ শেষে দুনিয়া থেকে কলোনি ব্যবস্থা ও শাসন  উচ্ছেদ এর কাজটা সারা ইউরোপ স্বেচ্ছায় প্রত্যাহার করে নেয়।  রুজভেল্টের শর্তে ইউরোপ দুনিয়াকে কলোনিমুক্ত করে দিয়েছিল।  সেই থেকে থেকে আমেরিকা গ্লোবাল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার নেতা হিসাবে হাজির হয় যেখানে ইউরোপ আমেরিকান আধিপত্য মান্য করে নেওয়ার বিনিময়ে ছোট তরফের কর্তা হবার সুযোগ পায়। এরপরই  ইউরোপ এবং আমেরিকা শব্দদুটো পাশাপাশি লেখার রেওয়াজ শুরু হয়েছিল। কালক্রমে (১৯৪৯ সাল থেকে) সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধজোট হিসাবে ন্যাটো গড়ে তুলেছিল ছিল তেমনই একটা কাজ!

    এবার একালে আরেকটু বিস্তারে আগাই। একালে মানে পরে ১৯৯১ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবারও পরে চলতি শতকের কথা বলছি। বারাক ওবামা আমল থেকেই বলা যায় আগের মতোই একের পর এক আমেরিকান নয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন, আর আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের আয়ু আর কত দিন থাকবে এ-জাতীয় প্রশ্ন আকার-ইঙ্গিতে জবাব দেয়া শুরু হয়েছিল। এটা সেই আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্ব যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পরিসমাপ্তিতে। তবে চলতি শতকের শুরুতে সেসব সময় থেকেই আমেরিকার জন্য এসব অস্বস্তিকর প্রশ্ন প্রবল হতে থাকে, বলা যায় যা প্রথম মুখোমুখি হয়েছিলেন ওবামা।

    কিন্তু তখন অথবা এখন, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট মানেই যেন তা একটা চরম অবস্থান! তখন মানে ২০১৯ সালের কথা বলছি আর এখন মানে ২০২২ সালের চলতি সময়। আর তখন ও এখন যে কমন প্রসঙ্গের কথা বলছি তা হল – এই ন্যাটো।  আগে বলেছি, ন্যাটো মানে আমেরিকা-ইউরোপ মিলে ১৯৪৯ সালে গঠিত এক যুদ্ধজোট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পরের নয়া পরিস্থিতিতে সোভিয়েত ও তার প্রভাবাধীন পূর্ব-ইউরোপ, এ অংশটা বাদ দিলে এর বাইরে আমেরিকার নেতৃত্বে বাকি ইউরোপীয় দেশের সামরিক জোট এটা। সংক্ষেপে বললে সেকালে (কোল্ডওয়ার আমলে [১৯৫০-৯১] ) যা আমেরিকা-সোভিয়েত লড়াই প্রতিযোগিতা, তাকে কেন্দ্র করে গঠিত পশ্চিমের মূল সামরিক জোট ছিল এটা। যদিও সেকালে ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তার পক্ষে সাফাই দিতে অনেকে একালে বলে থাকেন যে, সেকালের আমেরিকা-সোভিয়েত এ দুই জোটকে একটা “কোল্ডওয়ারের মধ্যে” আটকে রাখা সম্ভব হয়েছিল  নাকি এই ন্যাটো জোটের উপস্থিতির কারণে। মানে দুই পক্ষেই গোছানো সামরিক জোট-প্রস্তুতিতে ছিল বলেই নাকি ওই আমলে তারা মুখোমুখি কখনোই যুদ্ধে নামেনি বা করে নাই।

    যা হোক, ১৯৯১ ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ায়, এর পর থেকে ন্যাটো নিজেই কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ওবামার দ্বিতীয়বারের প্রেসিডেন্সির আমল (২০১৩-১৬) থেকে ন্যাটো মোচড় দিয়ে উঠেছিল – যেখানে মূল ইস্যুটা হয়ে উঠেছিল ন্যাটোর খরচ কে বইবে? যার মূল কারণ আসলে, আমেরিকার জন্য ন্যাটো-কে পরিচালনের ব্যয় তখন থেকে আমেরিকান অর্থনৈতিক  সামর্থ ও বা ইকনমির সক্ষমতার তুলনায় বিরাট বোঝা হয়ে গেছিল। কারণ ন্যাটো জন্ম থেকেই এর খরচের প্রধান দায়ভার আমেরিকা একাই ব্যয় করে আসছে; যেন অনেকটা আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা হিসেবে উত্থিত হওয়ায় ইউরোপের সবাই ধরে নিয়েছিল যে, ন্যাটো গঠনের সব উদ্যোগ ও খরচের ভার তো ‘ওস্তাদ’ আমেরিকাই নেবে। স্বাভাবিক। কিন্তু ওস্তাদ এখন বয়বৃদ্ধ, রমরমা অর্থনীতির সেই দিন আর নাই!

    ফলে  ন্যাটোর জন্মের সময় আমেরিকা যা হাসতে হাসতে নিয়েছিল তা ২০১৫ সালের আশাপাশের সময় থেকে আর একই না। আর সেই থেকে শুরু করে একেবারে ২০১৫ সালে ওবামার প্রথম প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল ন্যাটোর এক মিটিংয়ে ইউরোপকে খরচের দায় শেয়ার নেয়ার প্রসঙ্গ তুলে কড়া ভাষা ব্যবহার করেছেন, আর এতে পারস্পরিক খুবই মুখ কালো করা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল।

    কিন্তু অতটুকুই নয়, আমেরিকার জন্য আসলে খারাপ দিন ও যুগ এসেই পড়ছিল সেই থেকে। আর সেটা ওবামার পরে ট্রাম্পের আমলে এসে। ডোনাল্ড ট্রাম্প, তিনি সরাসরি ন্যাটো আর টিকিয়ে রাখার দরকার কী, এপ্রশ্নই তুলে বসেন; অন্য আরো অস্বস্তিকর বিভিন্ন আরো প্রশ্নের মত। এমনকি আফগানিস্তানের জন্যও আর ন্যাটো দরকার  নয় অথবা ‘ওয়ার অন টেররের’ জন্যও আর ন্যাটোর মতো প্রতিষ্ঠান রাখা ও এর খরচ বহনের প্রয়োজন তিনি দেখেন না বলে সরাসরি মন্তব্য করেছিলেন। পরে ২০১৯ সালে শুরু হয়েছিল লন্ডনে আরো মনকষাকষি তো বটেই।

    ট্রাম্প পার্সোনাল এক আলোচনায় বলেছিলেন, তিনি ন্যাটো থেকে আমেরিকার সদস্যপদ প্রত্যাহার করতে চান। নিউ ইয়র্ক টাইমসে তার এক সহকারীর বরাতে খবর ছাপা হয়েছিল, সেখানে তিনি ন্যাটো সম্পর্কে বলেছিলেন, এটি অবসলিট বা ‘পরিত্যক্ত বোঝা’। লাগাতার পঁচাত্তর বছরের গ্লোবাল নেতা আমেরিকা-এরই এক প্রতিনিধি ট্রাম্পের কথা ভেবে এসব শব্দ হজম করতে অনেকেরই এ কথা মানতে কষ্ট হয়েছিল। তাই অনেকেরই মনে হয়েছিল, এটি হয়তো একটা পাগলা ট্রাম্পের ‘চরমবাদ’।

    গত সপ্তাহে জুনের শেষ তিন দিনে এবার আমরা আবার আরেক চরমবাদের মুখোমুখি। এবার নায়ক জো বাইডেন- তিনি এবারের ন্যাটোর তিন দিনের সম্মেলনে আরেক চরমপ্রান্তে। ব্যাপারটা এক কথায় বললে, তা যেন আমেরিকার নেতৃত্বে ইউরোপ মানে সারা পশ্চিমা জগৎ যা চায়, এর বিরোধী বা তাদের পছন্দ নয় এমন কোনো কিছু চীন ও রাশিয়া করতে পারবে না। তাদের ভাবখানা এমন যে, তারা চাইলে তাদের ইচ্ছার বিরোধী চীনসহ সবাইকে তারা গ্লোবাল বাণিজ্যের বাইরে রেখে দিতেই পারে। এতই ক্ষমতা তাদের! যেনবা মাথায় করে এক ঝুড়ি গোবরও চীন-রাশিয়া চাইলেও বেচতে পারবে না!

    ওই ন্যাটো সম্মেলন থেকে এই প্রথম ঘোষণা দেয়া হয়েছিল যে, ‘চীন ন্যাটোর জন্য হুমকি’! আলজাজিরা লিখেছে, ন্যাটো মনে করছে, চীন তার জন্য হুমকি তাই সে চীনকে স্ট্রাটেজিক গুরুত্ব দিয়ে বলছে ‘চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ ও ‘চাপে ফেলে বাধ্য করার নীতি’- এগুলো ‘পশ্চিমা ব্লকের রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ, নিরাপত্তা ও মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ করছে’।

    NATO has listed China as one of its strategic priorities for the first time, saying Beijing’s ambitions and its “coercive policies” challenge the Western bloc’s “interests, security and values”.

    এরই মধ্যে ইউক্রেনের যুদ্ধ প্রায় চার মাস হল। এ প্রসঙ্গে বাইডেন পুরো ইউরোপকে তাতিয়ে রাশিয়াকেই এদের সবার শত্রু বলে হাজির করছিলেন। চীন এসব ক্ষেত্রেই আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। কিন্তু চীনকে আমেরিকার শত্রু বলা  আর প্রতিযোগী বলা এক অর্থ নয়। অথচ কেন ন্যাটো সম্মেলনে কোনো এক উছিলায় চীনকে ন্যাটোর হুমকিদাতা-শত্রু বলে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে এ কথারও কোনো যথোপযুক্ত সাফাই ন্যাটো এখনো হাজির করেনি? আবার এত দিন শত্রু দেখানো হচ্ছিল রাশিয়াকে, অথচ এখন হঠাৎ করে খোদ চীনকেই হুমকিদাতা বলা শুরু হচ্ছে।

    চীন বড় রাইজিং ইকোনমির দেশ। ফলে এখনো চীনে সবার চেয়ে পুঁজি সঞ্চয় ও সম্পদ গঠনের হার অনেক বেশি হবে। এর অর্থনৈতিক প্রকাশ ও প্রভাব তো প্রকাশিত হয়ে পড়বে এবং স্বভাবতই এর অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিদের মন খারাপ-অসন্তুষ্ট হবে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও এটা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, তাই এটা ফেয়ার। এছাড়া, এটা কোন সামরিক তৎপরতা নয়। তাহলে চীন চ্যালেঞ্জটা কোথায় করল? আর চ্যালেঞ্জমাত্রই তো খারাপ নয়। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কখনোই খারাপ নয়।

    তার মানে দাঁড়াল, চীন ‘কেন ন্যাটোর হুমকিদাতা’ তা বর্ণনা বা ব্যাখ্যা দিয়ে বলার আগেই চীনকে শত্রু বানিয়ে দেয়া হয়েছে!! এ ছাড়া মতবিরোধ মানেই কি শত্রু? এমনকি কোনো কাজে গিয়ে আমেরিকা চীনের সাথে মুখোমুখি হয়েছে সেই বিরোধের কথা কেউ জানায়নি! আবার যদি তা হয়ও চাইলে তা নিরসনের আইনি উপায়ও বের করে নেয়া সম্ভব। যদি চায়।

    অথচ ন্যাটোর সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত বোলচালে মনে হচ্ছে, বাইডেনের নেতৃত্বে মানতে রাজি হওয়া ইউরোপ-আমেরিকা এসেছে যেনবা বাইডেনকে সারা দুনিয়ার পালনীয় কর্তা বলে প্রতিষ্ঠিত করতে যা আমাদের যেন মানতেই হবে!

    বাইডেনের মনে রাখা উচিত ‘অবরোধ’ (মার্কিন ডলার ব্যবস্থার ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা) ও ‘হিউম্যান রাইটের’ কথা তুলে তিনি ইচ্ছামত যেসব দেশের উপর দাবড়ে বেড়াতে চাইছেন, তা আইনগতভাবে মানতে জাতিসঙ্ঘ-সদস্যপদপ্রাপ্ত কোনো দেশ মানতে বাধ্য? আইএমএফের চোখে এই অবরোধ বৈধ নয়, বড় জোর এটা আমেরিকার পড়ে পাওয়া অবৈধ কর্তৃত্ব। এটা আমেরিকা-রাষ্ট্রের নিজস্ব সিদ্ধান্ত কেবল। তাই এই অবরোধ আরোপ করার কারণে যারাই  ক্ষতিগ্রস্ত হবে ফলে আমেরিকা যা যা আচরণ ও অপব্যবহার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনীতির বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে, এর প্রতিটি আগামীতে আমেরিকার বিরুদ্ধে আরোপিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবেই।

    আমেরিকান মূল্যবোধঃ
    সবচেয়ে বড় কথা এটা কোন, কারও একার ‘মূল্যবোধের প্রশ্ন’ একেবারেই নয়। অর্থনৈতিক অবরোধ জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত হিসেবে কখনো আরোপিত হয় বটে। কিন্তু বর্তমানে বাইডেন প্রশাসনের দেয়া অবরোধ একান্তই আমেরিকার আরোপিত। সুযোগ পেলে ও মুরোদে কুলালে তা উপড়ে অন্য দেশ ফেলে দেবেই!

    ফিরে মূল্যবোধের কথা তুলা যাক, বর্তমান জাতিসঙ্ঘের এই রাষ্ট্রের দুনিয়ার এক রাষ্ট্রের সাথে অপর রাষ্ট্রের মূল্যবোধের সঙ্ঘাত দেখা দেয় তাহলে কী হবে?
    আসলে সব মূল্যবোধের পেছনেই থাকে ভিন্ন ভিন্ন ইডিওলজি, যে কারণে মূল্যবোধের ভিন্নতা দেখা দিতেই পারে। আর মূল্যবোধে ভিন্নতা দেখা দিলেও ভিন্নদের হলেই সেই মূল্যবোধটা খাটো আর নিজ মূল্যবোধটা শ্রেষ্ঠ এই আচরণ ও বয়ান এক কথায় বললে, তা এক রেসিজম বা ঘৃণিত জাতশ্রেষ্ঠত্ববোধ হতে পারে। আসলে এসব বকোয়াজ কথাবার্তা তাই সরিয়ে রাখাই ভালো! মূল কথাটা হল, জাতিসঙ্ঘ জন্মের আগেই বা এর সদস্যপদ নেয়ার ক্ষেত্রে মৌলিক কি কোনো মূল্যবোধ আছে? থাকলে কী? বা আদৌ বাইডেনের মূল্যবোধ যা সবাইকে মানতে হবে এমন কিছু ছিল নাকি? তাহলে আসেন প্রশ্ন তুলি, যেমন ইরাকের ওপর ২০০৩ সালে বুশের হামলা ও দখল – এটা আমেরিকা কোন মূল্যবোধ মেনে করেছিল? নিশ্চয় খুবই উন্নতমানের, বাইডেন বলতে পারবেন। বলা উচিত!

    প্রথম কথা, বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো এককভাবে এমনকি একত্রে কি জাতিসঙ্ঘের মা-বাপ বা মালিক? একেবারেই নয়। তবে আমেরিকার বাইডেনের যদি মনে হয়, অমুক দেশ মূল্যবোধ মানছে না, তাহলে কী হবে? তাহলে জাতিসঙ্ঘের উপযুক্ত স্থানে গিয়ে, যদি থাকে, সেখানে গিয়ে বাইডেন নালিশ রুজু করতে পারেন। সেটিই সমীচীন হবে। তাই না কি?? এর বাইরে পশ্চিমাদের আলাদা মুল্যবোধের স্টান্ডার্ড কী? তাতে কী এসে যায়?

    সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়নঃ
    সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৫ সালের আগে, মানে সেই ১৯১৭ সাল থেকেই বিপ্লব করে ক্ষমতায় আসা কমিউনিস্ট দেশ ছিল। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এসব জানা সত্বেও তিনি সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্তালিনকে সম্মানের সাথে যুদ্ধে নিজপক্ষের পার্টনার হিসাবেই গ্রহণ করেছেন। কোন মুল্যবোধের সমস্যা দেখেন নাই। সোভিয়েত নেতা স্তালিন আপাদ্মস্তক এক কমিউনিস্ট এবং কমিউনিস্ট স্যহিরোমনি তি৯নি তাতে দুনিয়ার কারও কোন সন্দেহ নাই। তাহলে যুদ্ধে নিজপক্ষের এক পার্টনার গণ্য করতে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট তো কখনও কোন মুল্যবোধের অমিল বা অসুবিধার কথা কেউ শুনে নাই।স্তালিনের সাথে মিলেই হিটলারের বিরুদ্ধে রুজভেল্ট বিশ্বযুদ্ধ করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। এখন কি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেন আমাদের বলবেন, মূল্যবোধের সঙ্ঘাত তখন কোথায় ছিল? তাহলে এখন এসব নখড়া করছেন কেন?

    যুদ্ধ শেষে স্তালিনকে সাথে নিয়েই রুজভেল্ট ভেটো-সিস্টেম ওয়ালা এক জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং আলোচনায় স্তালিনকে রাজি করিয়ে জাতিসঙ্ঘ গড়ে নিয়েছিলেন। আর এতে জাতিসঙ্ঘ গড়ার যে ভিত্তি তখন উদ্যোক্তারা মিলে সেট করেছিলেন, সেটাই এখনো একই আছে। গ্লোবাল পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক সিস্টেমগুলোর মৌলিক কাঠামো হয়েই আছে; যদিও এতে এসব সিস্টেম ও কাঠামোগুলো সবই আমাদের একালের সব বিবাদ মেটাতে সক্ষম, তা নয়। খামতি আছে, ঘাটতি আছে, এসব নিয়ে আরো ও আবার কথা বলতে হবে, সামনে এগোতে হবে আর এসবই সবচেয়ে স্বাভাবিক।

    কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে আমেরিকা-ইউরোপ ভাব ধরছে, নেতা বাইডেনের সাথে তারা হলেন দুনিয়ার সবচেয়ে একচ্ছত্র মূল্যবোধ বা শ্রেষ্ঠ মূল্যবোধের কেউ একেকজন। অথচ এমন কথা ভিত্তিহীন ও গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল ধরণের। জাতিসঙ্ঘ বা কোনো গ্লোবাল সিস্টেম গড়ে তোলার পথ কখনো এটা ছিল না, নয়ও। তাহলে তো কমিউনিস্ট হওয়া সত্বেও স্তালিনের সাথে মিলে রুজভেল্ট জাতিসংঘ গড়তে পারতেনই না!!! তাহলে একালে বাইডেন এন্ড গং কোথা থেকে উদয় হলেন??  এরা আগেভাগে নিজের মূল্যবোধকে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করে একলাই রাজা হতে চান। তাতে অন্য কেউ তাদের মানুক আর নাই মানুক!! এরপর অন্যের ুপর নিজআধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করা- এটা একালের বাইডেনের ভুয়া পথ। অন্তত আমেরিকার অন্যতম ফোরফাদার রুজভেল্ট এমন নিকৃষ্ট কাজ বা পথে এগোননি – এসব নিয়ে তাদের পরামর্শকদের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

    সেকালের মাওয়ের চীনঃ
    আবার চীনের প্রসঙ্গটাই দেখেন। আজকের যা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চীন। এতে একালে অর্থনীতিতে গ্লোবাল নেতার হকদার বা দাবিদার তিনি। কিন্তু এর উত্থান এটা তো মাত্র ১৯৭৮ সাল থেকে উত্থিত।  আমেরিকার সাথে এই চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের যাত্রা শুরু ১৯৭৮ এর ১ জানুয়ারি থেকে। মাওয়ের চীন ১৯৪৯ সাল থেকেই চীনে (নয়াচীন) ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু তবু ১৯৭১ সালের অক্টোবরের আগে পর্যন্ত এই নয়াচীন জাতিসঙ্ঘের কেউ ছিল না। কারণ ১৯৪৯-৭১ এ বছরগুলোতে নয়াচীনের জাতিসঙ্ঘে সদস্যপদ ছিল না, স্বীকৃতি ছিল না। শুধু তা-ই নয়, চীনের নামে দেয়া জাতিসঙ্ঘের জন্ম থেকে বরাদ্দ ভেটোওয়ালা সদস্যপদটা ছিল তাইওয়ানের হাতে।

    আসলে মাওয়ের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই বিতর্ক ছিল জাতিসঙ্ঘে চীনের নামে দেয়া (ভেটোসহ) সদস্যপদের হকদার কে? তাইওয়ান না মাওয়ের বিপ্লবী নয়াচীন? নয়াচীন – মানে এটাকে এখনো অনেকে ‘মেনল্যান্ড চীন’ বলে থাকে। আর বস্তুত জাতিসংঘ সদস্যপদের হকদার কে এই প্রশ্নে আমেরিকা তাইওয়ানকেই হকদার মনে করত তখন। তাই আমেরিকার সেই অবস্থানের বিরুদ্ধে সবাই মিলে ভোট দিলেও আমেরিকার অবস্থানকে নাকচ করার সুযোগ ছিল না কারণ আমেরিকার হাতে ভেটো ক্ষমতা ছিল।  বলে যেকোন ভোটাভুটিতে আমেরিকার হকদার তাইওয়ানের পক্ষে; নয়া চীনের পক্ষে নয়।

    ২৫ অক্টোবর ১৯৭১, জাতিসঙ্ঘের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবঃ
    ১৯৭১ সালের অক্টোবরের জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ‘চীনা সদস্যপদটা কে পাবে’- এই প্রশ্নটা আবার এক ভোটাভুটিতে তোলা হয়েছিল।  সেবার কিন্তু হঠাৎ  ইস্কযুটা তোলা হয় নাই। তবে ততপরতা বা অগ্রগতিগুলো বেশির ভাগ ছিল আন্ডারগ্রাউন্ডে সঙ্গোপনে।

    ঘটনা সংক্ষেপে বললেঃ
    ১. মাওয়ের চীন, ১৯৫৮ সাল থেকে “কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব  এক ক্যাপিটালিজমের পথে”  –  যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আর এরই বাইরের ডাকনাম ছিল “১৯৫৮ সালের চীনা সাংস্কৃতিক বিপ্লব’। আমাদের এখনকার জন্য মূল প্রসঙ্গ – এসিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে চীনে ব্যাপক বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যা বলাইবাহুল্য। পশ্চিমা দেশের বা এক কথায় প্রতীকীভাবে আমেরিকার বিনিয়োগ পুঁজিবাজার ওয়ালস্ট্রিটের জন্য এটা ছিল এক বিরাট সুযোগ। আর এ সুযোগ দেয়ার আগে মাও এটা নিয়েই নিক্সন-কিসিঞ্জারদের সাথে দরকষাকষি করেন ও তাদের রাজি করান। মাও কী চেয়েছিলেন বিনিময়ে?

    জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ নয়া চীনের পক্ষে দিতে হবে, আমেরিকা ভেটোপ্রদান করতে পারবে না – এই দেয়ার মাধ্যমে তবেই মাওয়ের চীন আমেরিকার জন্য তিনি চীনে বিনিয়োগের দুয়ার খুলে দিতে রাজি হয়েছিলেন। এই ছিল ডিল!

    জাতিসঙ্ঘের ঐ ’৭১ সালের অক্টোবরে যে ভোটাভুটি হয়েছিল তাতে চীনে বাজার-বিনিয়োগে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ার লোভে আমেরিকা ভোটাভুটিতে ভোটদানেই বিরত ছিল; অর্থাৎ কোনদিকেই ভোট দেয় নাই। আর এতটুকু হলেই নয়া চীনের চলে। কারণ, এর আগে সবসময় সব ক্ষেত্রে আমেরিকা ভেটো দিয়ে তাইওয়ানকে ভোটাভোটিতে জিতিয়ে টিকিয়ে দিত। আর নয়া চীনের পক্ষে প্রস্তাব উঠলে আমেরিকার এক ভেটোতেই সব শেষ হয়ে যেত। এছাড়া আমেরিকা তার প্রভাবাধীন জাতিসঙ্ঘের সাধারণ সদস্যদের সেবার ১৯৭১ সালে আর বিরত থেকে নয়, বরং নয়া চীনের পক্ষে ভোট দিতে লবী অনুরোধ রেখেছিল।

    আর তাতেই মাও সেতুংয়ের চীনই আসল চীনের জাতিসঙ্ঘের (ভেটো ক্ষমতাসহ) সদস্যপদ একমাত্র হকদার, এ সিদ্ধান্ত পাস হয়েছিল ২৫ অক্টোবর ১৯৭১, ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবে। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে সাত দিনের চীন সফরে গিয়ে সব আলাপ-আলোচনা শুরু করেছিলেন, যা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে চীন-আমেরিকার সম্পর্ক স্বীকৃতি যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৭৮, ১ জানুয়ারি থেকে।

    তার সোজা মানে সেই ২৫ অক্টোবর ১৯৭১, ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাব থেকে তাইওয়ান-ই হয়ে যায় নয়া চীন- এই মূল ভূখণ্ডের অংশ। তাইওয়ান আর স্বাধীন নয়, কোনো আলাদা প্রদেশ নয়। কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামে তাইওয়ান স্বাধীন কোনো দেশ আর নয়। জাতিসংঘের চোখে, তাইওয়ান আইনত পিপলস রিপাবলিক অব চায়না (PRC) এর অংশ।

    এখন তাহলে তাইওয়ানকে নিয়ে বাইডেনের দরদ- এর অর্থ কী? এটা তো শঠতা! অবশ্যই তাই!

    এমনকি ১৯৭১ সালের পর থেকে চীন যখনই কোনো দেশের সাথে স্বীকৃতি বিনিময় করে সেখানে সে শর্ত রাখে যে, তাইওয়ান যে চীনের অংশ, এটা সে আগে স্বীকার করলে তবেই তারা পারস্পরিক স্বীকৃতি বিনিময় আরো আগিয়ে নিতে পারে। এটাকেই চীন ‘একচীন নীতি’ বলে থাকে। একচীন নীতি’ মেনে চলতে তাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বলে থাকে। সেই থেকে আমেরিকা একচীন নীতিতে স্বাক্ষর করা দেশ। কিন্তু তবু বারবার এটা নিয়ে সে প্রায়ই আমেরিকা উসকানি তৈরি করে চলছে। এমনকি গত বছর ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি,  বাইডেন ক্ষমতার শপথ নেয়ার পরও একই পিছলাপিছলি শুরু করেছিলেন। শেষে চীন হুমকি ও চাপ দেয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাইডেন আবার এবার সত্তরের দশকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে পাঠিয়েছিলেন।

     

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০২ জুলাই  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “বাইডেনের মূল্যবোধ“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • পশ্চিমের শেষ ভরসা কী সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ?

    পশ্চিমাশক্তির শেষ ভরসা কী সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ??

    গৌতম দাস

    ০৬ জুন ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-48q

      US Treasury Secretary Janet Yellen

    Antony Blinken

    সামনের দিনগুলোতে গ্লোবাল পরিসরে যুদ্ধ-লড়াই ক্রমেই ‘জাত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই হিসেবে’ খাড়া করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। মানে, কারা নৃতাত্ত্বিক-জাতি হিসেবে শ্রেষ্ঠ যেন এ নিয়ে হতে যাচ্ছে লড়াইটা – এ ভাব ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হবে। কথাটা আরো সরাসরি করেও বলা যায়। যেমন পশ্চিমা শক্তি আসলে সোজা বলতে চাইছে, আগামী যেকোনো যুদ্ধ-লড়াই তারা ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ব’-এর লড়াই হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা শুরু করে দিয়েছে। অর্থাৎ বাস্তবে তারা আগেই জানত ও জানে যে, দুনিয়াতে কোন নৃতাত্ত্বিক-জাতি শ্রেষ্ঠ – এই অনুমান বা তুলনা করাটাই অর্থহীন। প্রতিটি জনগোষ্ঠীরই একেক দিকে বিশেষত্ব থাকে, থাকতে পারে। কিন্তু মূল কথা, কোন অজুহাত বা জুতসই সাফাই-যুক্তি কেউ দিলেও আমরা কেউ কারো অধীনে অধীনস্থ নই বা করতে দিতে পারি না। অতএব ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ব’ প্রতিষ্ঠার লড়াই বলে কিছুই নেই।

    তবু দুনিয়াতে আমরা দেখেছি টানা সাড়ে তিন শ’ বছরের কলোনি দখল ও লুটেরা শাসন চলেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত যার ভুয়া সাফাই ছিল এই যে, পশ্চিমা সাদা ককেশীয়রা ছিল নাকি ‘বেশি সভ্য’। কাজেই তারা আমাদের মত দেশের  উপর শাসন কায়েম করবে লুট করবে, এ উছিলায় যে, তারা আমাদের সভ্য বানাবে ইত্যাদি।

    সবচেয়ে বড় কথা, মনে করা হয়েছিল বিশ্বযুদ্ধে মুখ্যত জার্মান হিটলার ও তার দোসর-বন্ধুদের উত্থান ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাদের পতনের মধ্য দিয়ে হয়তো দুনিয়া যথেষ্ট শিক্ষা পেয়েছে। ফলে বর্ণবাদ বা রেসিজম [RACISM] এই জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদ সেবার পরাজিত হওয়ার পর ক্রমেই এই চিন্তা হয়তো চাপা পড়ে যাবে। এছাড়া তখন ধরে নেয়া হয়্বেছিল যে মানুষ শ্রেষ্ঠত্ববাদের বিপদ ও চরম খারাপ দিক সম্পর্কে  নিশ্চয় ইতোমধ্যে অনেক জেনেছে। ফলে কোন রেসিজমের চিন্তা আবার জেগে উঠার সুযোগ নেই। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে এই পশ্চিমা শক্তিই খোদ এবার রেসিজম, এই পুরনো ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ হয়ে ফিরতে চাচ্ছে।

    এমনিতে নয়া চলতি শতক হল অর্থনৈতিক দিক থেকে আমেরিকার পতন ও চীনের উত্থানের সময়কাল। তাই বারবার মনে করিয়ে দিয়েছি এটা অবজেকটিভ মানে মানুষের ইচ্ছা নিরপেক্ষ এক ফেনোমেনা। যেমন আমেরিকান কোনো প্রেসিডেন্ট কোনো যুদ্ধ লাগিয়ে চীনা উত্থান ঠেকানোর চেষ্টা করবেন হয়ত কিন্তু তাতেও এটা ঠেকবে না। অন্তত সেই ২০১৪ সাল থেকে তাই নিয়মিত বলে আসছি যে, এককালে পুরনো ব্রিটিশ কলোনি সাম্রাজ্যও পেছনে পড়ে যেমন উত্থিত আমেরিকার কাছে হেরে গিয়েছিল আর নানা ঘটনাপ্রবাহ শেষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা এক গ্লোবাল নেতা হয়ে উঠেছিল, আজ প্রায় ৭৫ বছর পরে এটাও আবার পরিবর্তিত হতে যাচ্ছে। এবার চীনা উত্থান মানে চীনের অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত সম্পদ সঞ্চয়, এই পুঞ্জিভবন [accumulation] ব্যাপক ও সবাইকে ছাড়িয়ে হাজির হওয়া শুরু হয়েছে। এটা চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতাতে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে; ঠিক যেমন এককালে আমেরিকা ব্রিটিশ অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

    আমেরিকার এই ক্রমেই পতন ও চীনের ক্রমেই উত্থান প্রমাণিত সত্য হিসেবে আমেরিকার ন্যাশনাল সার্ভেতেও ২০০৮ সাল থেকে স্পষ্ট হয়ে চলেছে। গত ২০০৮ সাল ছিল এ নিয়ে প্রথম পরিসংখ্যানগত প্রকাশিত সার্ভে রিপোর্ট ও প্রমাণ, যা এরপর থেকে প্রতি চার বছর পরপর এর বিকাশ আরো স্পষ্ট করে একই রিপোর্ট তুলে ধরছে। এ নিয়ে বুশ বা ওবামা আমলে তারা উভয়েই দুই টার্ম করে ক্ষমতায় থাকলেও তাদের মিলের দিকটি হল – এদুই প্রেসিডেন্টই সার্ভে রিপোর্ট হাতে পেয়েছেন ঠিকই কিন্তু নিজ সার্ভে রিপোর্টও মানতে চাননি। অস্বীকার করে গেছেন, ‘এতে তেমন কিছু হবে না’ ধরনের কথা দাবি করে। তবে তলায় তলায় উভয়েই এশিয়ায় চীন ঠেকানো বা China Containment পলিসি নিয়েছেন। সেটা হল, ভারতের পিঠে হাত রেখে চীনকে ঠেকানোর নীতি।

    সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটা হল তারা উভয় তাদের প্রেসিডেন্টশিপের মোট ১৬ বছর ধরে দেখেছেন এতে আমেরিকার ফেভারে কোনো অগ্রগতি নেই। তবে কেবল কয়েক বছর পরে পরে চীনের উপরে চাপ সৃষ্টি করে আমেরিকার জন্য নয়া কিছু বাণিজ্য সুবিধা আদায় করেছেন, চীনের কাজ থেকে। চীনও কখনোই তাদের নিরাশ করেনি। এভাবেই চলে আসছিল এমনকি এত পাগলাটে ও জাতিবাদী ভাব দেখানো ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর আমলেও। তিনিও একইভাবে চীনের কাছে দাবি করেছেন আর এতে নয়া কিছু বাণিজ্য সুবিধা তিনিও পেয়েছেন। এমনকি সর্বশেষ তা ২০১৭ সালেও যে বছর প্রথম ‘কোয়াড’ বা QUAD (আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত এই চার দেশের) জোটকে চাঙ্গা করা হয়েছিল তখনো ট্রাম্প সুবিধা পেয়েছিলেন।

    কিন্তু এরপরই আমেরিকাকে ট্রাম্প এক মহাপরিবর্তনের দিকে মোচড় দিয়েছিলেন। সেটা হল “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ” [White Supremacist]। মানে আমরা সাদারাই দুনিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠ জাতি – এই ধারণা। এখানে সাদা বলতে ফর্সা হলেই হবে না। ককেশীয় ]Caucasian] নৃগোষ্ঠির  গায়ের সাদাচামড়ার অর্থে ‘সাদা’ হতে হবে।  ট্রাম্প দল হিসাবে নিজে রিপাবলিকান দলের লোক।  এর উপর নিজেকে  “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদ” [White Supremacist] এর দিক ঝোঁক দেখানো! এটা স্বভাবতই এক ভয়ঙ্কর রেসিজম। কিন্তু ২০১৬ সালে নির্বাচন করতে আসার শুরু থেকেই এই ঝোঁক-অভিমুখ ট্রাম্পের সাথেই ছিল। তবে প্রথম দিকে খাপ ছাড়া বা অস্পষ্টতার কারণে সাধারণ্যে তা হয়ত স্পষ্ট হয়নি। যেমন ধরা যাক স্টিভ ব্যাননের [Steve Bannon] কথা। তিনি ছিলেন আগে ট্রাম্পের  ২০১৬ সালের নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। আর পরে ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণের পরে হন, প্রেসিডেন্ট অফিস হোয়াইট হাউজের প্রধান উপদেষ্টা হন ব্যনন। যদিও তিনি মাত্র সাত মাস এই পদে ছিলেন। আর এরপর ওই সৃষ্টপদটাই আবার অবলুপ্ত করে দেয়া হয়। রাজনৈতিক চিন্তার দিক থেকে এই ব্যানন ছিলেন ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী বড় নেতা, তাত্বিক। তবে প্রেসিডেন্টশীপের  শুরুর থেকেই তাঁর এত উগ্র অবস্থান ট্রাম্প নিতে পারেননি; তাই ব্যননকেই সরে যেতে হয়েছিল। যদিও ট্রাম্প যতই ক্ষমতামলের শেষের দিকে গেছেন ততই তিনি আরো বেশি ও প্রকাশ্যে সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী (হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট) গ্রুপের ওপর তাঁর নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে গেছেন।

    পরেরবার গত ২০২০ সালের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প পরাজিত হলে এরপরের বাকি তিন মাস তিনি লাগাম ছাড়া, তিনি আর রিপাবলিকান না, যেন সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের মূল নেতা হয়ে উঠেন। আর এরই সবচেয়ে বড় প্রকাশ তিনি ঘটান ৬ জানুয়ারি ২০২১ সালে। ঐদিন সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা আমেরিকান সংসদ বা কংগ্রেস [Congress] ভবন দখল করে নিয়েছিল ও এর শিখরে উঠে কংগ্রেস বিল্ডিংয়ে তাদের রাজত্ব কায়েম করে ছাদে দেয়ালে নাচানাচি-বিজয় প্রকাশ করেছিল। সরকারি হিসেবে ওদিন সাতজনের মৃত্যু ও কয়েকজনের আহত হওয়ার মধ্যে দিয়ে ঘটনা শেষ হয়েছিল।

    সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী বা জাত-শ্রেষ্ঠত্ববাদী বলতে এরা কারাঃ
    বাংলাদেশের মত পাঠকদের মধ্যে সাধারণ্যে ‘জাত শ্রেষ্ঠত্ব’ কথাটা অনেকের কাছে আবছা ধারণায় থাকতে পারে বা তা খুব একটা পরিষ্কার না এমন হতে পারে। তাই এনিয়ে আগে একটু কথা বলে নেই। শব্দটার মূল বিষয় ‘শ্রেষ্ঠত্ববাদিতা’ বা নিজেকে সব ব্যাপারে, অন্য এথনিক জনগোষ্ঠীর চেয়ে ধর্ম-জাতি ইত্যাদি যেকোনো দিকে শ্রেষ্ঠ-বোধ করার দাবি তুলে ধরে। ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে সুপ্রিমেসিস্ট [Supremacist]। আর, ইংরেজি ‘সুপার’ বা সবার চেয়ে ভাল – এ ধারণা থেকে ‘সুপ্রিমেসিস্ট’ শব্দ তৈরি করা হয়েছে। এই সুপ্রিমেসিস্ট শব্দেরই খাস বাংলা হল শ্রেষ্ঠত্ববাদী। বলাবাহুল্য, সুপ্রিমেসিস্ট বা শ্রেষ্ঠত্ববাদী এগুলো নেতিবাচক শব্দ। এগুলো শুধু নেতিবাচক শব্দই নয়, এটাকে ইংরেজিতে বলে ‘ডেরোগেটরি’ [derogatory] শব্দ মানে, কাউকে – নিচা দেখানোর-  শব্দ। বাংলায় বললে কাউকে ইচ্ছা করে ‘নিচা দেখানোর’ জন্য এসব শব্দ ব্যবহার করা হয়।

    কিন্তু কোন জনগোষ্ঠীর মানুষের নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ – এই বোধ তাদের কেউ কেউ আনে কেন? এটার দরকার কী?  আসলে যখন থেকে মানুষ টের পেয়েছে নিজের গায়-গতরের শ্রমে সম্পদ জোগাড়ের চেয়ে সহজ ভিন্ন পথ আছে; তখন থেকে শুরু হয়েছে এই সমস্যা। সেটা হল, অন্যের শ্রম-সম্পদ লুটে খাওয়া ও নেয়া, অন্যের কাঁধে চড়ে খাওয়া ইত্যাদির জন্য অন্য পুরো জনগোষ্ঠীকেই নিজ অধীনস্থ করা বা বাধ্য করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে যারা।

    কিন্তু তাতেও পেছনে আরো বড় কাহিনী আছে। দুনিয়াতে মানুষের থিতু হয়ে কৃষিকাজভিত্তিক জীবনযাপন শুরু করা বলা হয় মোটামুটি প্রায় ছয় হাজার বছর বয়সী। সে কারণে এখান থেকেই আমাদের তৎপরতাকে আমরা সভ্যতা বলি বা ‘সিভিলাইজেশন’-এর শুরু বলা হয়। আর দুনিয়াতে এমন সভ্যতার জীবন বা কৃষিকাজে মানে থিতু হয়ে কোনো ভূগোলে বসবাস শুরু করা, যাযাবর জীবন ত্যাগ করা- এসবই শুরু হয়েছিল আর এটাই সভ্যতার শুরু। আসলে অন্তত দশের অধিক বিভিন্ন সভ্যতা যারা প্রায় কাছাকাছি সময়ে (কিন্তু পরস্পর সম্পর্কে একেবারেই না জেনে, যোগাযোগ ছাড়াই) শুরু হয়েছিল। যেমন এসব সভ্যতার বিচারে আমরা ‘সিন্ধু সভ্যতার’ অংশ (যার মূল ভূখণ্ড এখন পাকিস্তানের অংশ)। আর এর ভেতরেও আবার অনেক নৃতাত্ত্বিক-জাতির জন্ম ও বিকাশ ঘটেছিল, যার মধ্যে আমরা বৃহত্তরভাবে সিন্ধু সভ্যতার অংশ হলেও এর ভেতরের “বাঙালি” – এই নৃতাত্ত্বিক-জাতির অন্তর্ভুক্ত বা অংশ। যেমন এশিয়ায় আমাদের কাছাকাছি সবচেয়ে প্রভাবশালী আরেক সভ্যতার নাম হল মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক-কুয়েত), টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর তীরের এই সভ্যতা।

    আগের দিনে এথনিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বা সভ্যতাগতভাবে তাদের মধ্যে কোন সঙ্ঘাত হয়নি এমন নয়। তবে ধরনটা ছিল যেমন, দেখা গেছে দেশ যুদ্ধ-মারামারিতে অন্যের দখলে চলে গেছে পেয়েছে অথচ এরপর থেকে  দখলদারও সেই ভূমিতেই (যেভুমি থেকে সে এসেছে তা ফেলে) এর পর থেকে নিজেও বসবাস শুরু করেছে। এটাই প্রধান ধরণ ছিল। মোগল শাসকেরা এমন ধারার ছিল। তাই এতে সম্পদ পাচার বা নিজ পুরানা দেশে লুটে ফেরত নিয়ে যাওয়া এমন ফেনোমেনো তা ছিল না।   পরবর্তীতে টেকনোলজি বিকাশের সুযোগ নিয়ে এক কলোনি দখল যুগ (১৬০৭-১৯৪৫) শুরু হয়েছিল। আর এ্রতে একমাত্র দখলদার হাজির হয়ে যায় ইউরোপ যারা,  এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা সব মহাদেশকেই কলোনি, নিজের শিকার বানিয়ে নিয়েছিল। প্রায় সাড়ে তিন শ’ বছরের এই লুটেরা শাসন চলেছিল। কিন্তু এটি বিশেষ লক্ষণীয় যে, এই প্রথম ইউরোপীয় কলোনিবাজ দখলদাররা দখলের পরে সাথে এ কাজের পক্ষে সাফাই বক্তব্যও দেয়া শুরু করেছিল। আর সেই প্রথম আমরা কে সভ্য আর কে নয় এ নিয়ে  শঠতাপুর্ণ তুলনা হতে দেখেছিলাম। আর এ থেকে দেয়া সাফাইটা হয় যেমন, এশিয়ায় আমাদের চেয়ে ইউরোপীয় দখলদাররা “ভালো সভ্য” বা “বেশি সভ্য” বলেই সবার আগে তাড়া দাবি করেছিল। পরে এই মিথ্যা  সাফাই দিতে শুরু করেছিল যে  “যেন তারা আমাদের সভ্যতা শিখাতেই আমাদের দেশ দখল করেছে। এ থেকেই শুরু হয় সভ্যতা শব্দটার শঠতা বা ছলনার নেতি ব্যবহার। যেন ইংল্যান্ড বৃটিশ-ইন্ডিয়া দখল করেছিল আমাদের সভ্যতা শিখাতে এসে আর এতে  আমাদের স্থায়ী মজুদ বা উদ্বৃত্ত সম্পদ সবই নিরন্তর লুট করে নিয়ে যাওয়াই ছিল তাদের কাজ।
    আসলে সরাসরি বললে আমরা শ্রেষ্ঠ কিংবা আমরা অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ – এ ধারণা, এ অনুভবটা থেকেই সব অপরাধের উতস বা শুরু হতে পারে। কারণ আপনি হয়ত সতর্ক থাকলেন কিন্তু অন্যে হয়ত আপনার না করে দেয়া ধারণা-কথাটাই অন্য জনগোষ্ঠীকে পদানত বা অধীনস্থ করার সাফাই হিসেবে কেউ ব্যবহার করবেন।

    যেমন আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশের ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট’ ধরণের চিন্তাচর্চার ঘাঁটিঁ বা ফেবারেবল অঞ্চল। এদের মূল কথা হল, তাদের গায়ের চামড়ার সাদা (বলতে চায় সাদা ককেশীয় নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী) অতএব তাঁরা অন্য সব নৃ-গোষ্ঠির মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যেখানে কেউ শ্রেষ্ঠ কিনা এটা অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রমাণিত ধারণা, এর চেয়েও বড় কথা এর কারণে কাউকে লুটে নেয়া, নিজ অধীনস্ত করে নেয়া অথবা  একই দেশের ভিতরে সহ-নাগরিকের সাথে কাউকে বৈষম্য করা  ইত্যাদি সব এগুলো ক্রিমিনাল অপরাধ। অথচ কেউ যখন জাত শ্রেষ্ঠত্বের মুইথ্যা বড়াই করে সে আসলে ইঙ্গিতে বলতে চায় তাদের ন্রৃ-গোষ্ঠি চার-পাঁচ শ’ বছর ধরে অনেক জনগোষ্ঠীকেই অধীনস্থ করে রাখতে পেরেছিল তাই তারা এখনও শ্রেষ্ঠ। তবে একালে ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট’ চিন্তা ফিরে জেগে ওঠার কারণ আরেকটু ভিন্ন।

    গ্লোবাল ইকোনমি যেখানে পরিবর্তিত হচ্ছে এর অভিমুখ হল, চীনের উত্থানে আমেরিকান ইকোনমির পতন বা তাদের অন্ততপক্ষে রি-অ্যাডজাস্টমেন্ট (ভিন্ন কাজ ভিন্ন দেশ ইত্যাদি) একটি খুবই স্বাভাবিক বা প্রায়ই ঘটা ঘটনা হিসেবে উঠে আসছে। বড়লোক অবস্থাপন্ন অনেকেই তো বটেই, মিডল ক্লাসের ব্যবসা বা চাকরি প্রায়ই টলায়মান হয়ে উঠছে। আগের বাজার, আগের নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার হাতে টিকে থাকছে না। আর এ’বস্থায় তাদের ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট’ বয়ানটা  মুখরোচক হয়ে উঠে আসছে এমন যে, “আগে তারা সুন্দর দিন ‘কাটাইত”! কিন্তু অ-সাদা মানুষেরা সব নষ্ট করে দিয়েছে। মানে এখন কালো বা বাদামি চামড়ার লোকেরা তাদের পশ্চিমাদেশে এসে ছেয়ে ফেলাতেই নাকি তাদের চাকরি-ব্যবসার সব সুবিধা এরা নিয়ে গেছে।

    আসলে, স্বভাবতই এখানে অর্থনৈতিক গ্লোবালাইজেশনের কারণ, পশ্চিমা দেশ থেকে সাদা চামড়ার মানুষ অন্য দেশে ব্যবসা-কাজের লোভে বেরিয়েছে বা অন্য চামড়ার কিন্তু সস্তা শ্রমিক বলে তাঁরা পশ্চিমা দেশে কাজ ও থাকার অনুমতি পেয়েছে। কিন্তু যেকোনো উগ্র জাতিবাদের মত এই হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্টরা সত্য-মিথ্যা মিলিয়েই কথা বলবে। মূলকথাটা সোজা  – যখন পশ্চিমা কোনো দেশের অর্থনীতি ভাল চলে তখন বাইরের আমাদের মত দেশের সস্তা শ্রমিক পেতেই তো মাইগ্রেটেড শ্রমিক সে আমদানি করবে। কাজেই অ-সাদা চামড়াদের তখন ভালো লাগবে যখন পশ্চিমা দেশে অর্থনীতি ভালো চলবে। অতএব এর সাথে কোনো রঙের গায়ের চামড়ার মানুষ ভাল অথবা শ্রেষ্ঠ – এটা ডাহা মিথ্যা ও ভুয়া কথাবার্তা। কিন্তু তবু পশ্চিমের ঘৃণায়, নরওয়ে-তে হত্যা বা সর্বশেষ নেদারল্যান্ডসে মুসলমান বলে হত্যাকাণ্ডগুলো প্রায়ই উঠে আসছে।

    আবার গ্লোবাল ইকোনমিতে  চীনা উথান ও চীন নেতা হলেই সেটা সাদা চামড়া জনগোষ্ঠীর মানুষেরা না খেয়ে মরবে, বা তাদের জন্য খারাপ ঠিক তা নয়। তবে সুযোগ সুবিধা কমে বা ভিন্ন হয়ে যেতে পারে। আবার তারাও এশিয়ায় মাইগ্রেটেড (লেবার, টেকনিশিয়ান বা যেকোনো স্পেশালাইজড) হলে তারাও ভালো করবে যেভাবে গত অন্তত শ’বছর আমরা এশিয়ানরা এভাবেই নিজেদের ভাগ্য খুলবার চেষ্টা করে এসেছি। তবে একটা জিনিষ, দুনিয়াতে গত প্রায় ছয়শ বছর ধরে একনাগাড়ে সাদা ককেশীয়দের একচেটিয়া শাসন চলে আসছে।  এখন গ্লোবাল ইকোনমিতে  পরিবর্তনের মোচড়ে যদি সাদা ককেশীয়দের একচেটিয়া শাসন দূর হয়ে যায় তাতে চীনের কী করার আছে??  আবার পশ্চিমাদেশের আধিপত্য চলে যাওয়া মানে সব হারানো তা তো নয়! আমেরিকা বৃ্টিশদের থেকে গ্লোবাল নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছে বলে লন্ডন তো পরিত্যক্ত শহর হয়ে যায় নাই। একালেও এখন অনেকেই নন্ডনে সেটেল হতে চাচ্ছেন। সৎ মনোভাব নিয়ে তাকালে অনেক কিছুই খারাপ লাগার কথা নয়!

    একই সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের দুই রূপ ট্রাম্প ও বাইডেনঃ
    ট্রাম্প সম্পর্কেই উপরে বেশি কথা লিখেছি তবে তাতে ট্রাম্পই কেবল খারাপ আর বাইডেন ভাল, তিনি জাত শ্রেষ্ঠত্ববাদী বা হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট নন অথবা কম? তাই কি? না, তা একেবারেই নয়।
    তবে নতুন যেটা তা হল, বাইডেন তাঁর যুগে সবচেয়ে বড় হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট হিসেবে হাজির হতে চাইছেন। এটাই একালের সবচেয়ে বড় শিফট! এখন এটা একেবারেই পরিষ্কার যে, বাইডেন আরো বড় হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়েই ২০২১ সালে্র জানিয়ারিতে শপথ নিয়েছিলেন। তা হলে ট্রাম্প ও বাইডেন দু’জনই কি সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী? সাধারণ উত্তর হ্যাঁ-সূচক। কিন্তু তবু দু’জনের কাজের ফিল্ড বা ফোকাস ভিন্ন। যেমন, ট্রাম্প অভ্যন্তরীণভাবে মূলত আমেরিকার ভিতরে অর্থে হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট। আর বাইডেন সারা পশ্চিমাশক্তি মিলে, যার মধ্যে ইউরোপীয় নেতারা শামিল আর ব্যতিক্রমী জাপানিজরা। তারা মনে করে, গত পঁচাত্তর বছরে  আমেরিকার পুরনো গ্লোবাল নেতৃত্ব তারা আরো কিছু দিন যেভাবেই হোক ধরে রাখবেন।

    এতে বাইডেন এন্ড গংয়ের সবচেয়ে যেটা বড় বিভ্রম ও জিদ তা হল ইকোনমিক নেতৃত্বটা যেন সাবজেক্টটিভ বা ব্যক্তি ইচ্ছায় নির্ধারিত হয়। যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধটা প্রধানমন্ত্রী চার্চিল প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের দাসখতে রাজি বা বাধ্য না হয়েও বৃটিশ সাম্রাজ্য তার পুরনো গ্লোবাল অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব হিটলারের হাত থেকে চাইলেই বাঁচতে ও বাঁচাতে পারত। বাইডেন আসলে এর থেকেও এককাঠি উপর দিয়ে চলেছেন। বাইডেন মনে করছেন, পাঁচ-ছয় শ’ বছর ধরে সাদা চামড়ার শাসন দুনিয়ায় চলছে। এ শাসন চীনের (অ-সাদা) নেতৃত্বের তলে পড়তে পারে না, যেভাবেই হোক টিকিয়ে রাখতেই হবে – এই জবরদস্তির উসকানি দিয়ে বাইডেন নিজ গ্লোবাল নেতার সুপ্রিমিজম যেন তিনি ধরে বা টিকিয়ে রাখতে সফল হবেন – এই হল তার বাজনার মূল সুর!

    কিন্তু বাইডেনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের খাস প্রমাণ কী?
    বাইডেন প্রশাসন এতদিন ঠিক কী বলে ইউরোপকে ইউক্রেন যুদ্ধে শামিল করেছেন, তা পাবলিকলি খোলাসা করেননি। যারা বারবার রাশিয়ান তেন-গ্যাস ছাড়া চলতে পারবে না বলে অনবরত বেঁকে বসছিল! কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল বাইডেন নিজেদের সাদা শাসন হারিয়ে যাবে এমন ভয়-উস্কানি দেখিয়ে থাকতে পারেন। সম্প্রতি তা নিয়ে একটু ডিটেইল ব্যাখ্যা করেছেন বর্তমানে বাইডেন প্রশাসনের দুই মন্ত্রী কর্তা- পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন [Antony Blinken ] ও ট্রেজারি বা অর্থমন্ত্রী জ্যানেট ইয়েলেন [Janet L. Yellen], তবে দুই আলাদা আসরে। দুটোই লম্বা পলিসি বক্তব্য।  আটলান্টিক কাউন্সিল [Atlantic Council] নামে আমেরিকার এক থিংকট্যাংক আছে, এর এক বক্তৃতায় জ্যানেটের বক্তব্য গত ১৩ এপ্রিলে। জ্যানেটের দেয়া বক্তব্যের ট্রান্সক্রিপ্ট ওরেই তাদের সাইটে দিয়ে দিয়েছে এখানে।  আর ওদিকে ব্লিঙ্কেন জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বক্তৃতা দিয়েছেন গত ২৬ মার্চ ২০২২। সেখানেই তিনি ‘চীনা সরকারের প্রতি বাইডেন প্রশাসনের পলিসির রূপরেখা’ দিচ্ছেন বলে এ বক্তৃতা দিয়েছেন। ইইউ এর পলিটিকো মিডিয়া তার রিপোর্টের শিরোনাম দিয়েছে, “Blinken calls China ‘most serious long-term’ threat to world order”। এককথায় চীনকে ওয়ার্ল্ড অর্ডার মানে বিশ্বব্যবস্থার শৃঙ্খলার জন্য হুমকি বলে বর্ণনা করছেন ব্লিঙ্কেন। সোজা করে বললে, চীনা অর্থনৈতিক উত্থানে আমেরিকার কষ্ট হচ্ছে অথচ সেকথাটা ব্লিঙ্কেন লুকিয়ে হাজির করছেন এভাবে যে চীন ওয়ার্ল্ড ব্যবস্থার জন্য ফিট নয়!!!  আসলে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা বা গড়ে যাবার প্রায় পচাত্তর বছর পরে এসে এসব কথা অর্থহীন!  আগ্রহিরা লেখা দুইটা সরাসরি পড়ে নিতে পারেন। আমি কিছু ক্যাচি অংশ তুলে আনব। 

    এখনকার সার কথাগুলো বোঝা খুব কঠিন না। আমি ব্লিঙ্কেনে কিছু মুখ্য ভাব-শব্দ তুলে আনছি। মুখ্য শব্দগুলোর দিকে খেয়াল রাখলেই মূল বক্তব্য বুঝা যাবে। যেমন –

    এক. ইউনিভার্সাল ভ্যালু [ …… Beijing’s vision would move us away from the universal values]; ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার, ইন্টারন্যাশনাল রুল বেজড অর্ডার [we will defend and strengthen the international law, agreements, principles, and institutions that maintain peace and security] ;

    দুই. ইকোনমিক অর্ডার, ইন্টারন্যশনাল ল, প্রিন্সিপাল ও প্রতিষ্ঠান;

    তিন. রাশিয়ার সাথে চীনের অ্যালায়েন্স [……potential security risks to the U.S. and its allies posed by China’s alliance with Russia. ] ইত্যাদি।

    এসব কিছুর সার কথা একটাই – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত যেন আমেরিকার নেতৃত্বে জাতিসঙ্ঘ ও আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রভৃতি যেসব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল চীন এগুলোর কেউ নয়। এ-সংক্রান্ত সব মূল্যবোধ ও ইউনিভার্সাল মূল্যবোধের বাইরে চীন।

    তা হলে ব্লিঙ্কেন এখন কী করবেন?
    তিনি স্বীকার করে বলছেন, ‘চীন হল একমাত্র দেশ যার আন্তর্জাতিক অর্ডার বদলে ফেলার ইচ্ছা ও সামর্থ্য আছে- যে সামর্থ্য বলতে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, কূটনীতিক, সামরিক ও টেকনোলজিক্যাল সব বোঝায়। কিন্তু চীনের আর আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ এক নয়।’ [……“China is the only country with both the intent to reshape the international order and, increasingly, the economic, diplomatic, military and technological power to do it,” ]

    তা হলে ব্লিঙ্কেনের প্রতি এখন প্রথম প্রশ্ন হল, যদি চীন আর আমেরিকার মধ্যে ন্যূনতম রাজনৈতিক অর্থনৈতিক মূল্যবোধ বা কাম্য ও প্রতিষ্ঠিত দুনিয়ার নিয়ম-শৃঙ্খলা বা গ্লোবাল অর্ডারে মিল না থেকে থাকে তা হলে চীনের সাথে আমেরিকার এত দিন চলল কী করে? জাতিসঙ্ঘ গঠন হতে পেরেছিল কী করে? যদি ধরে নেই চীন (মাওয়ের চীন) পরে এসেছে, তবু জাতিসঙ্ঘের জন্মের থেকে সবচেয়ে প্রবল্ভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন সক্রিয় সদস্য ছিল। কিন্তু তাই বলে কী লুটেরা কলোনি মাস্টার (বৃটিশ-ফরাসির) ইউরোপ নিশ্চয় সেকালের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মূল্যবোধ ও অর্ডার-শৃঙ্খলা (ব্লিঙ্কেন কথিত) কায়েমের পক্ষে বা দোস্ত ছিল না। তা হলে এর পরেও সেকালের রুজভেল্ট একমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নকেই গোনায় ধরে গ্লোবাল অর্ডার সাজাতে হয়েছিল? তা হলে আজ অন্য যে কারও প্রতি বাইডেনের এত বিতৃষ্ণা কেন? এর সাফাই কই??  রুজভেল্ট কী জানতেন না যে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্তালিন পাক্কা কমিউনিস্ট ছিলেন? তবু ব্লিঙ্কেন সাহেব আজ যে মুল্যবোধের বড়াই অমিল দেখছেন তা রুজভেল্ট আমলই করেন নাই। তা করলে তো জাতিসংঘের জন্মই হওয়ার কোন কারণ নাই। আর তা হয় নাই। কাজেই ব্লিঙ্কেন অবশ্যই অর্থহীন কথা বলছেন! মূলকথা রাজনৈতিক ভিন্নতা সত্বেও তাঁরা একসাথে জাতিসংঘ গঠন করেছিলেন। আর আজ ব্লিঙ্কেন নয়া বৈরাগী হতে চাইছেন, মুল্যবোধ বুঝাবুঝির তর্ক উঠিয়েছেন!!!

    আবার চীনের কথায় আসিঃ  সত্তরের দশকে কিসিঞ্জারের আমেরিকা ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের স্বার্থসহ দুনিয়ার সব মূল্যবোধকেই পায়ে দলে চীনের মন পেতে কি গোপনে বেইজিং ছুটে যাননি? তখন সেটা কি আমেরিকার বৈষয়িক স্বার্থের ভিত্তিতে বাকি সবভুলে পা ফেলা ছিল না? তা হলে তখন আজকের তোলা মূল্যবোধের কথা কোথায় ছিল? ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক মিটিংয়ে মাওয়ের চীনকে ভেটোক্ষমতাসহ সদস্যপদ ফিরে দেয়া হয়।  আবার টানা সাত বছর (১৯৭১-৭৭) চীন-আমেরিকার নেগোসিয়েশন চলেছিল – উভয় উভয়কে যা কিছু সব বুঝে নেবার যথেষ্টের চেয়েও অতিরিক্ত সময়  দিয়েছিল। এই হিসাব শেষে ১৯৭৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তাদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক চালু হয়েছিল। তা হলে তখনকার আরো কড়া কমিউনিস্ট চীনকে সহ্য হলে এখন লিবারেল চীনকে অসহ্য লাগা শুরু হবে কেন? আমেরিকান পুঁজি ওয়াল স্ট্রিটের সেকালে অবাধে চীনের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ায়, চীন অনুমতি দেয়ায় যদি তখন চীনকে ভালো মনে হয়ে থাকে – মূল্যবোধে কোনো সমস্যা না দেখা দিয়ে থাকে, তা হলে এখন এমন কী ঘটেছে সেটা অবশ্যই বাইডেন-ব্লিঙ্কেনকে আগে স্পষ্ট বলতে হবে। সুপ্রিমিজম করতে দেয়া হবে না।
    আবার আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের ইস্যুতে যদিও চিয়াংকাইশেকের জাতিবাদী চীন ১৯৪৫ সাল থেকেই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সদস্য।  কিন্তু ১৯৪৯ সালে মাওয়ের বিপ্লব হয়ে যায় মূল চীন ভূখণ্ডে। চীন জাতিসঙ্ঘেরও সাধারণ সদস্য ছিল না তখন। পরে ১৯৭১ সালে তাইওয়ানকে বাদ দিয়ে মূল চীন (জাতিসঙ্ঘ জন্মের সময়ের )ভেটো-ওয়ালা সদস্যপদ ফিরে পেয়েছিল। আর একইভাবে চীন আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সক্রিয় মেম্বার হয়েছে ১৯৮০ থেকে। এমনকি মাওয়ের চীন, মূলচীন ডব্লিউটিওয়ের সদস্যপদ নেয় আরো পরে, ২০০১ সালে। তা হলে জাতিসঙ্ঘ বা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠানের ইন্টারন্যাশনাল মূল্যবোধ না বুঝে থাকাটার আর কি চীনের বুঝতে বাকি ছিল? আর মুল্যবোধ বুঝা নিয়ে কোন সময় কোন আপত্তি আমেরিকা তুলে নাই কেন? মুখ খোলার আগে ব্লিঙ্কেন কী এতটুকু বুঝেন নাই কথা বুঝে বলতে হয়!!! গুছিয়ে মিলিয়ে কথা বলতে হয়!!

    আসলে এসব প্রশ্নের উত্তরে ব্লিঙ্কেনের খবর নেই। যেন তাদের কথা একটাই, তাদের সাদা চামড়ার নেতৃত্ব দুনিয়াতে তাদের স্থায়ী করে দিতেই হবে। না হলে চীনা মূল্যবোধ নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলতেই থাকবেন???

    সবশেষে, ব্লিঙ্কেন  সম্ভবত বুঝেছিলেন তারা কথার মেরুদণ্ড নেই – খামোখা কথা বলছেন। তাই এবার তিনি বলে বসেন, “চায়নার বন্ধু রাশিয়ার’ হুমকিতে তারা ভীত [security risks to the U.S. and its allies posed by China’s alliance with Russia]। অতএব, এটা চীনের দায়। ইউক্রেনের যুদ্ধও চীনের দায়!
    এক কথায় বললে, সাদা চামড়া সুপ্রিমিজম, জাত শ্রেষ্ঠত্ব এর আওয়াজ তুলে এভাবেই ডুবে যাবে বাইডেনের আমেরিকা!! এ’ভিন্ন কোন পরিণতি নাই!

    বাইডেন আসলে কোথায় যেতে চাইছেন? কোন বাস্তবোচিত কোন চিন্তা তিনি করতে পারতেছেন তা মনে হয় না। তবে খুব সম্ভবত বাইডেন-ব্লিঙ্কেন-জ্যানেট এদের যে এক অলীক কল্পনাটা আছে সেটা খুব সম্ভবত এই যে, কোল্ডওয়ার যুগের মত মুখ্যত, একটা মূল আইওএমএফ-বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রিক বাণিজ্যের দুনিয়া আরেকটা বাকিদের ব্লক এর বাইরে; এমন দুটা ব্লকে দুনিয়া ভাগ করা। এমন শখ বা কল্পনা অনেকের মধ্যেই প্রায় দেখা যায়। কিন্তু হার্ড ফ্যাক্টস হল, দুনিয়াতে আর কখনও দুই অর্থনৈতিক ব্লক ফিরে আসবে না। চাইলেও ফেরা যাবে না।  দুনিয়ায় ফিরে আসবে না। মূল কারণ, আমরা এখন (১৯৯১ সালের পর থেকে) সব দেশই একই  আইওএমএফ কেন্দ্রিক বাণিজ্যের দুনিয়া চালু করে ফেলেছি। আমরা  আইওএমএফ বদল করে আরেকটা আইএমএফ বানাতে পারি, নামে বদল হিসাবে। কিন্তু আইএমএফ টাইপের কিছুই বানাবো না এটা হবে না। আর যেমন এক ঘরে দুটা পীর থাকতে পারে নাই, তাই দুনিয়াতে একসাথে দুটা ‘আইএমএফ’ থাকবে না।  মূলকথা, সকলকেই একই আইএমএফ (ধরণের প্রতিষ্ঠান) এর এবং এমন একটাই প্রতিষ্ঠানের সবাই সদস্য এভাবে – হয়েই থাকব!!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ০৪ জুন  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   “ট্রাম্প ও বাইডেন, সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদের দুই রূপ“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল।]

  • জমিদারি-হিন্দুত্ব জাগিয়ে বলা ওআইসি ‘সাম্প্রদায়িক’!

    জমিদারি-হিন্দুত্ব জাগিয়ে বলা ওআইসি ‘সাম্প্রদায়িক’!

    গৌতম দাস

    ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3Vn

     

     

          MEA spokesperson Arindam Bagchi. | Photo Credit: twitter/@abagchimea

    ইংরেজি কমিউনাইজ [communize] শব্দটি খুবই ইতিবাচক এক শব্দ। যার রুট শব্দ কমিউন [commune]। ল্যাটিন অরিজিন কমিউনিস [communis] সেখান থেকে ইংরাজিতে যার অর্থ কমন [common] বা সাধারণ। সেখান থেকে সম্ভবত ফ্রেঞ্চ comuner (মানে ভাগাভাগি শেয়ার করা), হয়েও অরিজিনাল কমিউনাল [communal] (জোর করে দেয়া হিন্দু-ভারতীয় নেতি অর্থটা না) খুবই ইতিবাচক শব্দ যার অর্থ যে কমিউনিটিতে স্বেচ্ছাশ্রম দেয়, কমিউনিটির জন্য কাজ করে, আর কমিউনিটির কষ্ট-আরামসহ সবই যে শেয়ার করে; এবং এক সম্প্রদায় হিসেবে মিলেমিশে থাকে। এছাড়া, অনেক সময় প্রকৃতির সাথে স্পিরিচুয়ালি সম্পর্কিত করে দেখা অর্থে ‘কমিউনাইজ’ শব্দটা ব্যবহার করা হয়। দেখা যাচ্ছে রুট কমিউন এর যতগুলা অর্থ হয় সবই ইতিবাচক। কোন নিচা মানে যেটাকে ইংরাজিতে নেতিবাচক বা derogatory অর্থে ব্যবহার হয় এমন কোন ডেরিভেটিভ শব্দ বা অর্থই নাই।

    অথচ বৃটিশ-ইন্ডিয়ান সমাজের জমিদার-হিন্দুরা রাজনৈতিক, সামাজিক বা কালচারাল আধিপত্য খাটাতে গিয়ে  সেই দরকারে অরিজিনাল  কমিউনাল শব্দের অর্থ-বিকৃতি ঘটিয়েছিল। তাই ডিকসনারিতে না থাকলেও হিন্দুত্ববাদী ধারণা ও ঘৃণায় হিন্দুত্ব-জাতির জোশে তারা সব ঢেকে ফেলতে চেয়েছিল। আর তাতে সবচেয়ে ইতিবাচক কমিউন শব্দটাকেও জবরদস্তিতে নেতিবাচক অর্থ দিয়ে ছেড়েছে। কিন্তু শব্দটা ইংরাজি, ফলে ইংলিস ডিকসনারি তাদের এই নেতি অর্থ গ্রহণ করে নাই। একারণে বলা যায় জমিদার-হিন্দুরা  কমিউন শব্দের বাংলা – ‘সম্প্রদায়’ শব্দটাকে করেছে ‘সাম্প্রদায়িক’ যা খুবই নেতিবাচক অর্থ। তাই ভারতে ছেপে নেওয়া ছাড়া অন্য কো্ন ইংরেজি ডিকশনারিতে নেতি ‘কমিউনাল’ শব্দটাই পাওয়া যাবে না। কমিউন বা কমিউনিটি অথবা ইতিবাচক-কমিউনাল শব্দ পাওয়া যাবে। যার সবগুলোও অবশ্যই ইতিবাচক শব্দ।

    এখন জমিদার-হিন্দুর দেয়া এই কমিউনাল শব্দের অর্থ কী? তারা কী বোঝাতে চান?
    প্রথমত তারা বলতে চান, অবিভক্ত বাংলায় মুসলমানেরা বাঙালি না। আর জমিদার-হিন্দুর রাজনৈতিক সামাজিক কালচারাল আধিপত্য অবিভক্ত বাংলার সবাইকে মানতেই হবে। আর সেই জবরদস্তি ক্ষমতার জমিদার-হিন্দুর দাবি  – বাঙালি মানেই কেবল হিন্দু; মুসলমানেরা এথনিক পরিচয়ে বাঙালিই নয়। মানে যেন কারও এথনিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় অন্য কারও রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারণ করে দেয়া যায়।
    সারা মোগল আমলের নিয়ম  খাজনা দেয়া সাপেক্ষে জমিতে যেই চাষাবাদ করে জমি ভোগ-দখলের অধিকার তাঁর। বৃটিশ কলোনি-দখলদার শাসকেরা প্রথম এই জমি মালিকানা ভিত্তি ভেঙ্গে দেন। তারা জোর করে জমির আগের টাইটেল এবার অর্থের বিনিময়ে ‘জমিদার নামে নয়া গোষ্ঠির কাছে সেই জমির টাইটেল হস্তান্তর বা লিখে দিয়েছিল। অথচ তখনও জমি ভোগ-দখলের অধিকার পুরানা জমির চাষাবাদ-কারিদেরই ছিল।

    তাই এই জমিদার-হিন্দু শ্রেণী নিজ ক্ষমতা আধিপত্য দেখাতে  মুসলমানদের এথনিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় নিজ রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারণ চালু করেন। দাবি করেন মুসলমানেরা বাঙালি না। এরই বিপরীতে দুবার জবাব দিয়েছে বাঙালি মুসলমানেরা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান কায়েমের প্রধান সংখ্যা-শক্তি হয়ে দেখিয়েছে তারা অবশ্যই মুসলমান। আর পরে ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে সশস্ত্রযুদ্ধ করে দেখিয়েছে – তারা বাঙালিও।  জমিদার কলকাতা তাদের বাঙালিত্ব কেড়ে নিতে পারে নাই, পারবে না। ব্রাহ্মণ্য বর্ণপ্রথায় নিষ্পেসিত অন্তজ কিন্তু লড়াকু বাঙালির যে অংশটা ভালভাবে বাঁচতে ও লড়াবার সুবিধার জন্য ইসলাম গ্রহণ করেছিল এরা বাঙালি মুসলমান অবশ্যই। কিন্তু একারণে তার এথনিক-জাতি পরিচয়, যে ভাষায় সে মায়ের সাথে কথা বলে সম্পর্ক করে তা বদলে যাবে কেন? মুসলমানদের বাঙালি পরিচয় কোন জমিদার-হিন্দু মাতবর কেড়ে নিতে পারে না। মুসলমানদের বাঙালি পরিচয় কেড়ে নিবার ক্ষমতা জমিদার-হিন্দুর নাই,  জমির মালিকানা টাইটেলের মত এই বাঙালি পরিচয় কেড়ে নেয়া যায় না সম্ভব নয়। মানুষের এথনিক পরিচয় প্রায় অর্গানিক; ফলে তা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আমরা যে ঘরে জন্ম নেই সে ভিত্তিতে এই পরিচয় সেখানেই নির্ধারিত হয়ে যায়। এজন্য  এথনিক-সাংস্কৃতিক অর্থে জাতি বা জাতিবোধ কথাটা আগে বুঝতে হবে। এটা জবরদস্তির বিষয় না। মুসলমান বাঙালি তাই বাংলা ভাষা ছাড়ে নাই ছাড়তে পারে না, বাঙালি খাদ্যাভাস ইত্যাদিও ছাড়বে না আর সর্বোপরি মুসলমানিত্বও ছাড়ে নাই। তাতে শরতচন্দ্র হয়ে যতই আপনি “বাঙালি বনাম মুসলমানের খেলা” দেখানোর উপন্যাস লেখেন না কেন!

    কিন্তু বৃটিশ-ভারতের কলকাতার জমিদার হিন্দু সেই জবরদস্তিটাই করেছিল। বিশেষত মুসলমানেরা তাদের মানতে না চাইলে অথবা পাল্টা তাদেরকে ভিন্ন কোন নিজ ধর্মীয় সামাজিক চিহ্ন দেখানোর চেষ্টা করলে তাদেরকে “সাম্প্রদায়িক ডাকা হবে” – এটা ছিল জমিদারশ-হিন্দুর সিদ্ধান্ত। তাদের আধিপত্যের সমাজে থাকতে গেলে তাদের সংজ্ঞায়িত করা ধারণা মানতে বাধ্য করার কায়দা হল এটা। মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দেয়া তাদের কথিত সব শিষ্টাচার ও কোড ফলো করলেই কেবল তারা স্কুল-কলেজ বা চাকরিতে তাদের সমাজে প্রবেশাধিকার দেবে, পাশে বসতেও দিতে পারে। আর যে তাদের কোড মানে না, ডমিনেন্স মানে না তাকে জমিদারেরা ‘সাম্প্রদায়িক’ বলত।  একারণেই আজও সাম্প্রদায়িক শব্দটাই জমিদার-হিন্দুর সেই অত্যাচারেরই স্মারক চিহ্ন। কাজেই  এই সাম্প্রদায়িক শব্দটা ব্যবহারে আমাদের সতর্কতা প্রয়োজন! প্রয়োজন ব্যবহার বাদ দেয়া।
    মনে রাখতে হবে  মুসলমানের বিরুদ্ধে জমিদার-হিন্দুর  বুকভরা বিদ্বেষ আর ঘৃণার ঝড় তোলা শব্দটাই হল ‘সাম্প্রদায়িক’।

    ভারতের বিদেশ বিভাগ বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্তমান মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি একজন বাঙালি হিন্দু; উনার ‘বাগচি’ টাইটেল তাই নির্দেশ করে। এদিকে হিজাব ইস্যুতে স্বভাবতই ওআইসি বা ইসলামি ঐক্য সংস্থা [Organisation of Islamic Cooperation (OIC)]  ভারতের মুসলমান বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানোর নীতির নিন্দা করে অন্যান্যদের মতই বিবৃতি দিয়েছিল। এটা সহ্য হয় নাই ভারতের বিদেশ বিভাগের। ব্যাপারটাকে তারা দেখেছে যেন পুরানা জমিদার-হিন্দুর চোখে, তাদের আধিপত্য অস্বীকারের চেষ্টা হচ্ছে যেন। তাই পুরা জমিদার-হিন্দুর ঘৃণার হুঙ্কার দিয়েছেন অরিন্দম বাগচি। বলেছেন এটা নাকি ওআইসির সাম্প্রদায়িক মাইন্ডসেট। এছাড়া অরিন্দম দাবি করছেন ভারতে নাকি একটা “কনষ্টিটিউশনাল ফ্রেমওয়ার্ক ও মেকানিজম” কার্যকর আছে আর ওর সাথে নাকি  আছে – “ডেমোক্রাটিক ইথোস (মুল্যবোধ) ও পলিটি (রাজনৈতিকতা)” ।

    ……constitutional framework and mechanisms, as well as democratic ethos and polity. The communal mindset of the OIC Secretariat does not allow for a proper appreciation of these realities

    কিন্তু সরি,  অরিন্দম! ভারতে এগুলোর কোনটাই নাই, ভারতের জন্ম থেকেই নাই। আছে কেবল দগদগে ঘা, এক হিন্দুত্ব। পলিটি, ইথোস কিছুই থাকতে দেয়া হয় নাই।  এমনকি কান পেতে শুনেন আরএসএস প্রধানের ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা দিবার পরিকল্পনা শুনতে পাবেন। উত্তরপ্রদেশ ও উত্তরাখন্ড রাজ্যকে মুসলমান-শুণ্য করতে হবে, শেখানে তারা থাকতে পারবে না – এই ডাক ও পরিকল্পনাও শুনতে পাবেন।  আর চলতি নির্বাচন উপলক্ষ্যে সব হারিয়ে মোদির ভোট যোগাড়ের এতে একমাত্র উপায় মুসলমান গণহত্যার হুমকি, মুসলমান বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানো আর বিজেপি প্রার্থী না জিতলে মুসলমান মারবেন, বুলডোজার চালাবেন এই হুমকি দিচ্ছে। এগুলো কী কনষ্টিটিউশনাল আচরণ ?? ভারতে কী সুপ্রীম কোর্ট অথবা কোন নির্বাচন কমিশন বলে কিছু আর আদৌ আছে??? যাদের প্রত্যক্ষ কনষ্টিটিউশনাল দায়িত্ব ছিল মুসলমান ভোটারদের উপর এত চরম হুমকির বিরুদ্ধে তাতক্ষণিক সকল ব্যবস্থা নেয়া। অথচ এমন কোন কিছুই করা হয় নাই। মানে  ভারতের দুর্বল যে কনষ্টিটিউশন যে কনষ্টিটিউশনালিজম তাই তো  আজ একেবারেই নিস্ক্রিয় ও অকেজো হয়ে গেছে। এবং এটা প্রমাণিত। সে কারণে এসবের বিরুদ্ধে ওআইসি তো কোন ইসলামি আলেম ডেকে আনার কথা বলে নাই, পরামর্শ দিতে যায় নাই।  বরং আহবান রেখেছে [……OIC called upon the U.N. and the Human Rights Council to take “necessary measures”] জাতিসংঘ ও এর হিউম্যান রাইট কাউন্সিলের কাছে তাদেরকে “প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” নিতে বলেছে। অথচ দেখা যাচ্ছে এটাও মুখপাত্র অরিন্দমের সহ্য হয় নাই।   তাহলে?

    … ভারতে আছে কেবল দগদগে ঘা – যার নাম হিন্দুত্ব। যেখানে পলিটি, ইথোস কিছুই থাকতে দেয়া হয় নাই, পারে না।

    অর্থাৎ  মুখপাত্র অরিন্দম এখনও জানেনই নাই যে ও আইসি-কে সাম্প্রদায়িক বলা – এটা একটা এথনিক ঘৃণা ছড়ানোর কাজ। কারণ এই “সাম্প্রদায়িক” শব্দ ও ধারণাটাই জমিদার-হিন্দুর মুসলমান-বিদ্বেষী ধারণা ও সেকালে তাদের হাতেই যার আবির্ভাব ঘটানো হয়েছিল।  অন্যের এথনিক পরিচয় অরিন্দম আপনি পছন্দ না করতে পারেন। কিন্তু আপনি অন্য এক জনগোষ্ঠিকে তার এথনিক পরিচয় ও ইতিহাস তুলে কথা বলতে পারেন না; জমিদার-হিন্দুর মুসলমান-বিদ্বেষের ইতিহাসের পক্ষে সাফাই দিতে পারেন না। বিশেষ করে আপনি যখন একটা দেশের বিদেশবিভাগের মুখপাত্র!! খেয়াল করেন, হিজাব নিয়ে বিবৃতি, আপত্তি তো আমেরিকাও তুলেছে। ওখানে অরিন্দম বাগচির মুরোদ হয় নাই  “সাম্প্রদায়িক মাইন্ডসেট” শব্দ ব্যবহার করে আমেরিকার বিরুদ্ধে  কথা বলার!
    এদিকে বর্তমান চালু নির্বাচনে মরিয়া মোদিকে জিতাতে,  খুঁচিয়ে ঘা করা এক পদক্ষেপ হল ভারতের স্কুল-কলেজে হিজাব ইস্যু খাড়া করা। এতে চরম এক মুসলমানবিদ্বেষ-ঘৃণায় বৈষম্যমূলক আচরণে সমাজ তোলপাড় করা ফেলা, এটাই চলছে এখন। এতে আমেরিকা, ইউরোপ আর এদিকে পাকিস্তান বা ওআইসির নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছে;  আর আসলে এতে ভারত কূটনৈতিক সঙ্কটে পড়ে যায়। কারণ, কূটনৈতিক রেওয়াজে এ’বিষয়টা হল,  আপনি আপনার দেশের সব চিহ্ন-পরিচয় নির্বিশেষে আপনার নাগরিকের প্রতি অ-বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক সাম্যের চোখে দেখতে বাধ্য থাকবেন ও দেখবেন – এটাই “আন্তর্জাতিক পলিটিক্যাল অর্ডার” আশা করে। এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই এবার  ভারতের নিন্দা করা হয়েছে।  আর তাতেই কূটনৈতিক ভাষা ও ভাষ্য হারিয়ে বেহাল দেউলিয়া অবস্থায় পড়ে যায় ভারত।  এমন বে-দিশায় পড়ে, ওআইসি-কেই ঐ পুরানা জমিদার-হিন্দুর বয়ানের সাহায্যে “সাম্প্রদায়িক” বলে গালি দেয়া হয়েছে। আর এতে যেন সারা দুনিয়াটা জমিদার-হিন্দুর রাজত্ব – এটাই ধরে নেয়া হয়ে গেছে!  আবার তাদের হিসাব টনটনে, একইভাবে তারা আমেরিকাকে তাদের নিন্দার জবাব দিতে যায় নাই! অর্থাৎ দুনিয়ার মুসলমান মাত্রই তারা যেনবা জমিদার-হিন্দুর প্রজা এই অনুমান শেখানে খাটাতে যায় নাই!
    তাই, এরপরে আমাদের আশা থাকবে যে “সাম্প্রদায়িক” শব্দটার অর্থ-ইতিহাস-তাতপর্য বুঝে এটাকে কিভাবে আমল ও সুলুক করতে হবে তা আমরা নিজেরাই বুঝে নিতে পারব। কারণ জমিদার-হিন্দুর এমন মুসলমান-বিদ্বেষে ভরপুর শব্দের ইতিহাসের পক্ষে আমরা দাড়াতে বা প্রমোট করতে পারি না।

    মুসলমান কোপাতে হবে ও ইসলামবিদ্বেষ একমাত্র ভরসা মোদিরঃ
    প্রায় তিন সপ্তাহ আগের এক লেখায় পরিষ্কার করে লিখেছিলাম যে, একালের ভারতে বিজেপি-আরএসএস বা মোদি একেবারে চ্যালেঞ্জ হয়ে যাওয়া বা হিন্দুত্ববাদ প্রথমবারের মতো উৎখাত হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পড়েছিল গত ২০২১ সালে। সেবারের মধ্য মার্চে ভারতে নেমে এসেছিল করোনাভাইরাস আক্রমণের সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় আক্রমণের ঝড়! সারা ভারত তাতে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। অক্সিজেন, বেড আর সৎকার, এসব পাওয়ার পুরোপুরি অনিশ্চয়তা – এটাই হয়ে উঠেছিল ভারতের মুখ্য পরিচয় আর মোদি যার প্রতীকী এবং এক অসহায় প্রধানমন্ত্রীর রূপ। সৌদি আরব অক্সিজেন ভরা ট্যাংকার পাঠিয়েছে কার্গো প্লেনে করে কিন্তু তা তিনি দেশে  না দেখিয়েও পারছেন না আবার দেখালে মোদির ইজ্জত যায় অবস্থা! যেন মুসলমান সৌদি আরব তো ‘নিচা’; তার সাহায্য মোদি নিয়েছে এটা কেমন দেখায়? তাই তিনি ঐ ট্যাংকারের উপর রঙ লাগিয়ে সৌদি সব চিহ্ন ঢেকে ঐ অক্সিজেনই ব্যবহার করেছেন, ক্রেডিট নিয়েছেন!  আর তা দেখেই দ্যা-হিন্দু দৈনিকের কূটনীতিক এডিটর সুহাসিনী হায়দার প্রথম নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, তাদের ভারত আসলে, মোদি তাকে যা বুঝায়ছিলেন, এমন কোনো পরাশক্তি নয়! যা নিয়ে মৌদির বয়ানে এতদিন তিনি বিশ্বাস করেছিলেন।  কেবল তখন সেটা তাস্র কাছে পরিস্কার হয়েছে যে ভারত কোন পরাশক্তি নয়। বলেছেন, ভারত নইলে সৌদি সাহায্য নিবে কেন? এ’এক অদ্ভুত ভারতের মিথ্যাবলা প্রধানমন্ত্রী মোদি আর তার সাংবাদিক যার নিজস্ব বুঝাবুঝির মেকানিজমই বিকশিত হয় নাই!

    সেখানে আরো বলেছিলাম, চলতি এই নির্বাচনে “মুসলমান কোপাতে হবে, ইসলামবিদ্বেষ – এটাই হবে মোদির একমাত্র ভরসা। হিন্দুত্ববাদের দিকে ভোটার ফেরানোর একমাত্র উপায়। আর তাই ঘটছে। এ’কারণেই ব্যাপারটা এখন দাঁড়িয়েছে এমন যে, বাইডেন যতই মোদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনে অবরোধের ভয় দেখান না কেন, মোদিকে আরো বেশি করে এখন মুসলমান কোপাতেই হবে – তা কাশ্মিরে বা সারা ভারতে। এটাই মোদির রাজনৈতিক আয়ু লুপ্ত হওয়া ঠেকানোর একমাত্র উপায় ঠাউরানো যার সোজা মানে, আগামী ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাইডেনের সাথে মোদি ভারতের সম্পর্ক আর ভালো হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, বরং আরো সঙ্ঘাতেরই সম্পর্ক হবে। অন্তত ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত!”

    নির্বাচন শুরু হয়েছে, খবর ভালো নাঃ
    শিডিউল মোতাবেক গত ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ভারতের কিছু রাজ্য বা বিধানসভা নির্বাচন শুরু হয়েছে। আর এর সাথে  মোদির পক্ষে পরিকল্পিতভাবে দুটো চরম ঘৃণা ছড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি করে নেয়া হয়েছে। প্রথমটি ঘটানো হয়েছে, গত ২০২১ সালের ডিসেম্বরের ১৭-১৯ লাগাতার এই তিন দিন। দুই কথিত ‘সাধু’ নরসিংহআনন্দ ও প্রবোধানন্দ গিরি, তারা এর আয়োজক ও বক্তা। এরা আবার বিজেপি-আরএসএসের বিভিন্ন নামের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের প্রধান নেতা। তারা শেখানে বলেছেন, “প্রত্যেক হিন্দুকে ‘সাফাই অভিযান’ পরিচালনার জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হবে। এ ছাড়া আর কোনো সমাধান নেই”। [every Hindu must pick up weapons and we will have to conduct this cleanliness drive (safai abhiyan). There is no solution apart from this.”] আর প্রথমজন বলেছেন, ‘সারা দুনিয়ায় যদি মানুষকে টিকে থাকতে হয় তবে আমাদেরকে জিহাদিদের উপর সাফাই অভিযান চালাতে হবে” [“In the entire world, if we want humanity to last, we will need to clean it of jihadis. ]। এর পরও কারো বুঝতে অস্পষ্টতা যাতে না থাকে তাই বলে দেই, এখানে এই সাফাই অভিযান মানে হল জাতিগতভাবে (মুসলমানদের) সবাইকে নির্মূল করা বোঝাতে ইংরেজিতে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বলে বোঝায়। দুনিয়াতে প্রথম হিটলার ও তার সহযোগীদের এই এথনিক ক্লিনজিং’ এর অভিযোগে বিচার হয়েছিল। সেই থেকে আন্তর্জাতিক আদালতের চোখে এটা সবচেয়ে ঘৃণিত অপরাধ। যার বেলায় শাস্তি হল সর্বোচ্চ দন্ড। সেই থেকে ‘এথনিক ক্লিনজিং’ – এটাই একাডেমিক বইপত্রে ও আইন-আদালতের ভাষাও সবচেয়ে বড় গোত্রের এক অপরাধ মানা হয় বটে।  এটাই এখন মোদি ও তাঁর গোষ্ঠির প্রধান রাজনৈতিক পরিচয়। অথচ মোদি সরকারের বিদেশ বিভাগের মুখপাত্র সমালোচকদেরই উলটা “সাম্প্রদায়িক” বলছেন!

    গত ডিসেম্বরে কথিত সাধুদের ঘৃণা-সভার পরে প্রায় এক মাস ধরে চলে এদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না দেয়ার-নেয়ার পুলিশি প্রচেষ্টা; এছাড়া কোনো বাদি-অভিযোগকারী পাওয়া যাচ্ছে না, এ অজুহাতও খাড়া করা হয়েছিল। এরপরে ১৫ জানুয়ারি কেবল নরসিংহ-আনন্দকে গ্রেফতার করা হয়। তবুও এমন সব আইনে গ্রেফতার দেখানো যাতেসে সহজেই জামিন পেতে পারে। অথচ ‘জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ’ বা ‘জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি’ – শুধু এ’অভিযোগে কাশ্মির বা নর্থ-ইস্টে অনবরত এমন আইন প্রয়োগ ও গ্রেফতার করে কয়েক বছরের জন্য ফেলে রাখা হচ্ছে; এমন অন্তত চারটি আইন আছে। এসব আইন প্রয়োগ করে তারা, জঙ্গি বা সশস্ত্র সন্ত্রাসী বলে থাকে। অথচ নরসিংহআনন্দের উপর একটা পুরা কমিউনিটিরর উপর এথনিক ক্লিনজিং,  গণহত্যা বা হত্যার হুমকি এসবের কোনটাই অভিযোগ আনা হয় নাই। কেবল ৫০৯ দারার একটা অভিযোগ দেয়া হয়েছিল যে নারী ও সাংবাদিকদের উপর আপত্তির ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে [under section 509 of the Indian Penal Code (IPC) for making objectionable remarks against women and abusing a journalist.]। ফলে স্বভাবতই   ইতোমধ্যে তাঁর জামিনে মুক্তিও  হয়ে গেছে।

    এখন এমন গণহত্যার হুমকির ঘটনার পর এক মাস কেন বিভিন্ন অজুহাতে কোনো গ্রেফতার বা মামলা না করে অপেক্ষা করা হল? মূল কারণ এবছরের পাঁচ রাজ্য নির্বাচন শুরু হয়েছে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় এক মাস ধরে কয়েক পর্বে। তাই ১৭-১৯ ডিসেম্বর ২০২১ সালে ঐ এথনিক ক্লিনজিং আর চরম মুসলমানবিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়ানোর বক্তব্য দেয়ার পরও কোনো পুলিশ অ্যাকশন না ঘটানোতে – হিন্দু ভোটারদের মনে উসকানির ঝড় তুলে মানসিকভাবে তাদের প্রভাবিত করার সুযোগ নেয়া হয়। এভাবে এক মাস কাটিয়ে দেয়ার পরে নরসিংহআনন্দ এরপরে গ্রেফতার হয়েছে কি না বা জামিন হয়েছে কি না তা এসব আমজনতা হয়ত ব্যাপারটা আর খেয়াল রাখবে না; বেশির ভাগই মনে রাখবে না – এই ভরসায়। কিন্তু এদিকে হিন্দু ভোটারদের উসকানি দিয়ে এর নগদ ফলাফলে মোদির ভোটের বাক্স পর্যন্ত আনার লক্ষ্যে তাদের মনের ওপর ছাপ ফেলার ঘটনাটা ঘটিয়ে দেয়া তো হয়েই গেছে। এই ছিল পরিকল্পনাটা।

    এবার দ্বিতীয় ঘটনা – স্কুল-কলেজে হিজাবঃ
    নির্বাচন শুরু হয়ে গেলে সেসব রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বিষয়টা নির্বাচন কমিশনের অধীনে চলে যায়। কমিশনের যেকোনো নির্দেশনা মান্য করা সব-বাহিনীর জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। সে কারণে হিজাবের ইস্যুটা উঠানো হয়েছে এমন এক বিজেপিশাসিত রাজ্যে যেখানে এবছর নির্বাচন নাই। ফলে নির্বাচন কমিশনেরও কিছু বলার নাই। কিন্তু আবার ইস্যুটা হাজির করা হয়েছে এমনভাবে যার এফেক্ট ভারতব্যাপী বিস্তৃত হয়। স্কুল-কলেজে হিজাব নিষিদ্ধকরণ ইস্যু যে কারণে এটা কেবল কর্নাটক রাজ্যের ঘটনা। এর ওপর আবার এটা এক-দু’টা স্কুল-কলেজের স্থানীয় পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত। সারা  রাজ্যে বা কর্নাটক শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকেও নয়। একটা জেলার দু-একটা স্কুল-কলেজে। কিন্তু পাশের আরো দুটো জেলায় জবরদস্তিতে হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাই শুরু করে দেয়া, আন্দোলন, এসব শুরু হয়েছে মোদির ছাত্র সংগঠনকে দিয়ে; অথচ  সংশ্লিষ্ট স্কুল-কলেজ পরিচালনা কমিটি নিশ্চুপ।

    এতে কার্যত হিজাদ নিষিদ্ধ ইস্যুটা সারা কর্নাটক তো বটেই, সারা ভারতের সব রাজ্য ছাপিয়ে ভারতের বাইরে আমেরিকার নিন্দা প্রস্তাব, ওআইসি নিন্দা প্রস্তাব ঘটিয়ে এটা এখন ভারতের জন্য এক গ্লোবাল কূটনীতিক ইস্যু হয়ে গেছে। এতে বলাবাহুল্য এর এফেক্ট নির্বাচন চলছে এমন পাঁচ রাজ্যের উপরই পরিপূর্ণভাবে কার্যকর প্রভাব ফেলেছে। আর এবার তা সেখানকার প্রতিটি ব্যালট বাক্সে গিয়ে আছড়ে পড়বে, বিজেপির ভোটের বাক্সগুলো এখন নিশ্চয় উপচে পড়বে আর মোদি-বিজেপি এরই অপেক্ষায়! এ হল পরিকল্পনা!

    কথিত নিরপেক্ষ হিন্দুত্বের আদালতঃ
    এছাড়া এবার ঘটনাকে আরো পোক্ত করতে কোনো উপায়ই ছাড়া হয়নি; তাই আদালতও।  এদিকে আদালত মানেই ভীষণ বিজ্ঞ, জ্ঞানী মানুষে তা ভরপুর থাকে। তাদের সামাজিক সম্মানও অনেক উঁচুতে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট থেকেও এ’ইস্যুতে বলা হল, তারা এখন হস্তক্ষেপ করবে না; কখন করবে তা তারাই ঠিক করবে বলে রায় দেয়া হয়েছে। আর এ সুযোগে স্থানীয় রাজ্য হাইকোর্ট বিরাট নিরপেক্ষতার ভান নিয়ে হাজির। তারা এক সাময়িক রায় দিয়ে দিয়েছে। সেটা হল, “স্টাটাস কো”;  যার আইনি মানে হল বিবদমান পক্ষগুলো বিবাদ শুরুর আগে যে যেখানে ছিল, সেখানে ফিরে গিয়ে স্থিতাবস্থায় থাকবে, যত দিন আদালত ইস্যুটা নিয়ে বিচার বিবেচনা করে কোনো ফাইনাল রায় না দেয়। এটাই ইউজুয়াল প্র্যাকটিস হয়ে থাকে।

    কিন্তু এখানে বাড়তি একটি টুইস্ট দেয়া হয়েছে। বলছে ‘স্ট্যাটাস কো’; কিন্তু সাথে ব্যাখ্যাও দিচ্ছে যে, এর মানে হল, এই অন্তর্বর্তী বা সাময়িক সময়ে কেউ কোনো ধর্মীয় পোশাকে স্কুল-কলেজে যেতে পারবে না। অথচ এ বলাটাই বেআইনি। এটা নিজেই এক বিরাট বৈষম্য – একেবারে এক সূক্ষ্ম কারচুপি করা যাকে বলে।

    কারণ হিজাব ইস্যু হওয়ার আগে যে যেমন খুশি হিজাব, পাগড়ি, ঘোমটা প্রভৃতি পরে স্কুল-কলেজে যেতে পারত ও আসতও। কাজেই ‘পূর্বাবস্থা’ বলতে এটাকেই বুঝায়। কিন্তু ব্যাখ্যায় তা না বলে উল্টো ধর্মীয় পোশাক পড়া যাবে না [we restrain all the students regardless of their religion or faith from wearing]  এ কথা বলে আসলে কথিত এই সাময়িক সময়ের রায়ের কথা বলে যারা হিজাববিরোধী মোদি-বিজেপির লোক এদের দাবিকেই মেনে নেয়া ও এদের পক্ষেই রায় দিয়ে দেয়া হয়ে গেছে। অর্থাৎ দুপক্ষের কথা শুনে বিচার বিবেচনা করে ফাইনালি রায় হবার আগেই we restrain বলে হিজাবকেই বাদ দেওয়ার কর্তৃত্ব কোন বিচারকেরই নাই। কিসের ভিত্তিতে আপনারা we restrain বললেন???  কারণ, এই সাময়িক রায়টাও তো কোন শুনানির শেষে দেয়া নয়,  করা হয়নি। অথচ, আদালত যেন খুবই একটি নিরপেক্ষ সাময়িক সিদ্ধান্ত দিয়েছে এই ভাব করে তাদের হিন্দুত্বের খেয়াল এটাই চাপিয়ে দিয়েছে।

    “Pending consideration of all these petitions, we restrain all the students regardless of their religion or faith from wearing saffron shawls (Bhagwa), scarfs, hijab, religious flags or the like within the classroom, until further orders.”

    এখন পরে কী ফাইনাল রায় হবে তা আগেই বলে দেয়া যায়। এ’বছরের নির্বাচন কেবল এই পাঁচ রাজ্যে আর তা কেবল ১০ মার্চ পর্যন্ত। এর মানে হল ১০ মার্চের পরে আদালত ফাইনাল রায় দিলে আর সেখানে আবার হিজাব পরে স্কুল-কলেজে আসার পক্ষেও যদি আদালত রায় দেয় তো বিজেপির আপত্তি হবে না; কারণ পরের বছরের আগে আর নির্বাচন নাই। অর্থাৎ এখনকার এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞাটা যেঁ বিজেপির পক্ষে কাজ করে দিয়ে আদালত বিজেপির হিন্দুত্ব ও ভোট জোগাড়কে সাহায্য করল। আবার ফাইনাল রায় হিজাব পড়ার পক্ষে  দিবার পথ খুলে রেখে বিচারক বিরাট উদার সাজবার পথ পরিষ্কার রেখে দিলেন, এবং তেমন রায়ও দিতে পারবেন।

    ভারতের উচ্চ আদালতগুলোর ভেঙে পড়ার ইতিহাসঃ
    এমনিতে ভারতের উচ্চ আদালতগুলোকে নিয়ে বাংলাদেশের চোখে আমাদের দেশের অনেকে ভূয়সী প্রশংসা করতে দেখা যায়। কিন্তু বটম অব দ্য ফ্যাক্টস হল, ভারতের আদালতগুলো রাজনীতি বা সরকারের কাছে স্বেচ্ছায় নিজেদের সব ক্ষমতা সমর্পণ করার পেশাগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ১৯৭৫ সালে। কেন ও কখন? প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী কারচুপির জাজমেন্টে তাকে দোষীকরে রায় দেয়া হয়ে যায়। এরপর বাকি ছিল তিনি কিভাবে শাস্তি হিসাবে জেলে যাবেন তার ব্যবহারিক সিদ্ধান্ত নেয়া কেননা তিনি সিটিং প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আর এরপর ইন্দিরার উপর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ত্যাগ করে নিয়ে এরপর শাস্তিভোগের জন্য তৈরি হয়ে আসতে আদালতের সিদ্ধান্ত-রায় দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ইন্দিরা আদালতের সেই নির্দেশ পালন না করে, রায় উপেক্ষা করে –  ক্ষমতায় থেকেই উল্টো দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে বসেন। এভাবে তিনি এই শাস্তি গ্রহণ  জীবনেও আর করেন নাই।

    আর সেই থেকে আইন পেশার সব লোক, রাজনীতিবিদ মিলে মূল্যায়নে গিয়েছিলেন যে, জাজদের অমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সাথে সংঘাতে যাওয়াতে তাতে কোন লাভই হয়নাই  উলটা ভারত-রাষ্ট্রই নাকি  দুর্বল হয়ে গেছে। তাই তাদের আপস করা উচিত ছিল।’ এমন সঙ্ঘাতের এই নাকি মহিমা। অর্থাৎ আদর করে যেন বলা যে “রাজনীতিবিদেরা খুব দুষ্ট”।  অতএব মন্দের ভাল হিসেবে ক্ষমতার সাথে আপস করাই নাকি ভাল – এই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত। কেন?

    কারণ না হলে জরুরি অবস্থা দিলে তো তা রাষ্ট্রই না থাকার সমান, এই ক্ষতি হয়। ফলাফলে জরুরি অবস্থা পাওয়ার চেয়ে তাই নির্বাহী ক্ষমতার সাথে আপস করা অথবা এড়িয়ে চলা হলো -এটাই সর্বোত্তম পন্থা। এটাই নাকি আদালতের পথ। যদিও এর কোনো লিখিত প্রস্তাব পাওয়া যাবে না, তবে এটাই সেই থেকে তাদের অলিখিত চর্চা ও বুদ্ধিজীবিতা!  আর এ সুযোগে দেখা যাচ্ছে এখন যেটা হয়েছে, একদল বিচারক হয়েছেন যারা এ সুযোগে প্রধান নির্বাহীর কাছ থেকে নানা পার্সোনাল সুবিধা আদায় করে নেয়ার সূক্ষ্ম তৎপরতা চালিয়ে, কে কত বুদ্ধিমানের মত মোদির সাথে সঙ্ঘাত এড়িয়েছেন সেই ক্রেডিটের গর্ব ও এর প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছেন। তাতে  ভারতের পরপর গত দুই প্রধান বিচারপতি যে এই দোষ দুষ্ট আছে তা আমাদের দেখার সুযোগ হয়েছে। একজন বিশেষ মটর সাইকেল চড়ার খায়েস মিটালেন। অপরজন আসাম জাতিবাদের পক্ষে জাতির-সৈনিক হয়ে গেলেন!
    এতে প্রায়ই ভারত-রাষ্ট্রের বড় বড় দুর্বলতা বা ‘ফুটাফাটা’ এসবের কারণে, এটি ভেঙে পড়ার দিকে এগোচ্ছে বলা হয় – সে পথের সবচেয়ে বড় এক গর্ত হল, এই নির্বাহী ক্ষমতার সাথে আপস, এড়িয়ে যাওয়া তথা হবু জরুরি অবস্থা এড়ানোর বিরাট বুদ্ধি প্রয়োগ-কথা!

    মুসলমান কোপানো, ঘৃণা ছড়ানোর সাথে ভোটের সম্পর্কঃ
    অনেকের মনে হতে পারে মোদির মুসলমান কোপানো, ঘৃণা ছড়ানোর নীতি-পদক্ষেপের সাথে ভোটের সম্পর্ক কী? আমরা বোধহয় বাড়িয়ে দেখছি ব্যাপারটাকে। তা অবশ্যই না। ভারতে এখন রাজ্য নির্বাচন চলছে পাঁচ রাজ্যে যেখানে সবচেয়ে বড় উত্তরপ্রদেশ রাজ্যও আছে। কত বড়? ভারতে কেন্দ্র সরকার গড়তে মোট ন্যূনতম ২৭২ আসনে জিততে হয়। এই ২৭২টার ৮০ আসন সংগ্রহ করা সম্ভব একা এই উত্তরপ্রদেশ থেকেই, যার মানে ২৭২ এর প্রায় তিনের এক ভাগ আসন পেয়ে যাওয়া। একারণে বলা হয়, কেউ কেন্দ্রে সরকার গড়তে চাইলে উত্তরপ্রদেশে জেতা গুরুত্বপূর্ণ’ যদিও এখন যা চলছে তা কেন্দ্রের নির্বাচন না; রাজ্য নির্বাচন। কিন্তু এখন উত্তরপ্রদেশ রাজ্য নির্বাচনে জিতলে তবেই না ২০২৪ সালে কেন্দ্র নির্বাচনেও  উত্জেতরপ্তারদেশের আশি আসনের বেশির ভাগ পাওয়া সম্ভব! একারণে এবারের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে মোদি মুসলমান কোপায়ে যেকোনোভাবে জিততে মরিয়া!

    ঘটনার কেন্দ্র কৃষি আইনবিরোধী আন্দোলনঃ
    এই প্রথম এটা রেকর্ড যে, একটা কৃষক আন্দোলন ১৫ মাস ধরে লাগাতার ভারতের হাইওয়ে রাস্তায় বসে থেকে প্রতিবাদ করে শেষে জয়ী হয়েছে। দিল্লি-উত্তরপ্রদেশের সংযোগ হাইওয়ে সড়কের মুখ্য শহর গাজিপুর। এটাই ছিল সেই আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি। হিন্দু জাতিবাদী আনন্দবাজার পত্রিকাও একে ‘ধাত্রীভূমি’ [ইতিহাসের ধাত্রীভূমিতে কি ক্ষতির আশঙ্কায় বিজেপি? ] বলে উচ্ছ্বাস দেখিয়েছে। এঅঞ্চলটাকে ‘পশ্চিম উত্তরপ্রদেশও’ বলা হয়। এটাই মোদির জন্য কাঁটা বিছানো ভূমি। এখানে মোদি হাঁটলে পায়ে কাঁটা বিঁধবে খালি। অথচ বিরোধী অন্যদের বেলায় হবে উল্টোটা। দিল্লিসহ এ অঞ্চলের আবহাওয়া হল – গ্রীষ্মে যত তপ্ত গরম, শীতকালে ততই শীত। অথচ এখানেই ১৫ মাস ধরে অনেকেই বউ-সংসার সাথে নিয়ে রাস্তায় বসে-শুয়ে কষ্ট করে গেছেন। শেষে মোদি তাদের সবার কাছে হার স্বীকার করে মাফ চেয়েছেন, চালু করা তার তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার বা বাতিল করেছেন। কেন?
    এ অঞ্চলটা আশপাশের হরিয়ানা, পাঞ্জাব বা উত্তরপ্রদেশের বাকি যারা বাণিজিক কৃষিকাজ করে থাকেন, তাদের সবার চেয়েও সমৃদ্ধ এবং আসলে অগ্রগামী স্বার্থের বড় কৃষক লোকেদের বসবাসের স্থল। এদের জাট বা জাঠ, ইংরেজিতে জাঠল্যান্ডার বলা হয়; এমন এদের বৈশিষ্ট্য হল – মিনিমাম পাঁচ একর বা বেশি ও উর্বর জমিকে ঘিরে এদের কারবার এবং পাইকারি কৃষিপণ্যের বাজারের  (মান্ডির) বড় সাপ্লায়ার এমন কৃষক এরা। পাকিস্তানের করাচিতে বা কাশ্মিরেও এমন ‘জাঠদের’ দেখা মিলবে। আর তত্ত্বটা হল, যত আরবাইনাইজেশন বা শহুরেকরণ ঘটবে, ততই জাঠ কালচার বড় হবে, তাদের প্রভাব বাড়বে। এরাই ছিল ঐ কৃষক আন্দোলনের মূল আপসহীন অংশ। কিন্তু এমন জাঠ অঞ্চলে হিন্দু-মুসলমান জাঠের টেনশন প্রায়ই ঘটে থাকে, হয়েছেও স্থানীয় ভাষায় এটাকে তারা আবার জাঠ ও মুসলমান দ্বন্দ্ব বলে বুঝে।

    মোদির ২০১৪ সালের প্রথম কেন্দ্রে সরকার গঠনে নির্বাচনের আগের প্রায় এক বছর অমিত শাহ, ‘দা মাস্টারমাইন্ড অব দাঙ্গা’ – তিনি এসে এই উত্তরপ্রদেশে কাটিয়েছেন। তারই পদক্ষেপে মুজাফফরনগরে তিনি পরিকল্পিত দাঙ্গা ঘটিয়েছিলেন, যার নগদ পরিণতি হল জাঠ-মুসলমান শত্রুতাকে চরমে তোলা, ভোট ভাগ হয়ে যাওয়া। আর সেটারই ব্যালট ফলাফল ছিলল, ২০১৪ নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের মোট কেন্দ্রিয় ৮০ আসনের ৭২ আসন মোদির ব্যাগে। এমনকি অমিত শাহের এই ‘শত্রুতা’ বিক্রি করেই বিজেপি পরে ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশ বা ইউপি রাজ্য নির্বাচনে বিজয় লাভ করেছিলেন।  এবং পরে ২০১৯ সালে মোদির দ্বিতীয়বার সরকারের আসার জয়ও সম্পন্ন করেছিলেন, একই জাঠ-মুসলমান বিভক্তির কাধে চড়ে। কিন্তু এবার আর নয়। কেন?

    এরই মধ্যে এবার এই জাঠ ও মুসলমান একযোগে মোদির বিরুদ্ধে রাস্তায় কৃষি আন্দোলন করে ফেলেছেন এবং জয়ী হয়েছেন। আর এতেই মোদি মাফ চেয়েও যে এই বিরোধী ঐক্যের পাথর সরাতে পারবেন না, তা জেনেও যতটা যা করা যায় মনে করে লজ্জ্বার মাথা খেয়ে মাফ চেয়েছেন। আর তার একমাত্র করণীয় করেছেন যে মুসলমান কোপানো আর বিদ্বেষ-ঘৃণা ছড়ানো তুঙ্গে তোলা প্রবলতরভাবে তা সম্পন্ন করতে গেছেন, আর এখান থেকেই বাড়তি হিজাব বিতর্ক। স্কুলের ছোট বা টিন-এজ মেয়েগুলোকে মানুষের মর্যাদা হারিয়ে অপমানের অভিজ্ঞতায় অবলীলায় ডুবিয়ে দেয়ার এই নিষ্ঠুরতা।

    ইউপি নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ৫৮ ও ৫৫ আসনের এলাকায় নির্বাচন সম্পন্ন হয়ে গেছে ইতোমধ্যে; বিশেষ করে প্রথম ৫৮ আসন – এই-ই সেই জাঠ অঞ্চলের। মোদির ভাগ্য এখানেই নির্ধারিত হবে। তবে এর ফলাফল পেতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী ১০ মার্চ। যদিও এরই মধ্যে আগাম মিডিয়া পূর্বাভাস মোদির বিরুদ্ধেই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ১৯ ফেব্রুয়ারি  ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে    “কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব, ওআইসিকে বলে সাম্প্রদায়িক!” – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

     

  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরে

    গৌতম দাস

    প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০২১ ২০ঃ২৩ পিএম

    https://wp.me/p1sCvy-3Qi

     

    The War That Changed The Course of History | The First World War

    ইতিহাস পড়ার অনেক পদ্ধতিই হতে পারে। এর মধ্যে একটা উল্লেখ করা যায় যেমন, কোন বিষয়ের আগে-পরের তুলনা করে বা এদুই সময়ের পার্থক্য জেনে পড়া। এভাবে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে আর পরে – এর মধ্যে পার্থক্য কী দেখা দিয়েছিল? আগে কী কী ছিল, যা পরে পরে আর থাকে নাই – এমনই বিষয়ে কিছু কথা বলব।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালটা হল ১৯১৪-১৮ সাল। সেসময়ের দুনিয়ায় বাণিজ্য ব্যবস্থা কেমন ও তা কতদূর বিকশিত হয়েছিল; এ ছাড়া বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পড়ে এর হাল কী হয়েছিল? মুলত এখানে সেই বাণিজ্যের দিকটা ফোকাস করে আগাবো।  এ’নিয়ে সবার আগের কথাটা হল, ১৯১৪ সালের আগে পর্যন্ত মানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগের জমানায়  গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের কথা যদি বলি, এটা নিজেই তেমন কিছুই বিকশিত ছিল না। কেন? এবং কী দেখে বুঝলাম?

    প্রথমত,  বিশ্বযুদ্ধের আগের পরিস্থিতিতেই এটা সারা ইউরোপের সমস্যা। কথাটা আরেকটু ভেঙ্গে বললে, গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বলতে বুঝাচ্ছি, দুনিয়াজুড়ে ছোট-বড় যেকোন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে কোন বাণিজ্য বা পণ্য লেনদেন বিনিময় কিছু ছিল কী না?  জবাব হল, তেমন কিছু ছিলই না। এই না থাকার প্রধান কারণ প্রথমত ও প্রধানত যা ছিল তা হল যোগাযোগ বা কমিউনিকেশন ছিল না।  আমরা কিন্তু যোগাযোগ বলতে সবকিছুকে বুঝাই। যেমন পথঘাট মানে আকাশ, সড়ক রেল এবং  সব ধরণের জলপথ। আবার আরেক যোগাযোগ মানে হল, কথা বলা। মানে হল, সরাসরি দেখা করে কথা বলা থেকে টেলিগ্রাফ, ফোন থেকে একালের ইমেল থেকে ফেসবুক ইত্যাদি সব। এছাড়া আরেকটা আগাম কথা বলাই হয় নাই – তা হল ভাষা। পরস্পরকে বুঝা আর বুঝানোর মত কমন ভাষা বা জানা ভাষা থেকে কত দূরে ছিল, এটা এক বড় পয়েন্ট। আবার, আমরা জাস্ট চিন্তা করেন এখন বাংলাদেশে এক যোগাযোগ বলতে – সড়ক, সেতু, রেল, বিমান নৌ ইত্যাদি থেকে টিএন্ডটি বা আইসিটি ইত্যাদি সব মন্ত্রণালয়কেই বুঝাবে।  তাই মূল কথাটা হল, সেকালে এক মহাদেশের সাথে অন্য মহাদেশের কোন ধরণের যোগাযোগই ছিল না। এইটা হল বেজ ফ্যাক্টস। তাহলে যোগাযোগটা কে প্রথম ঘটালো? আর এখানে যে “সেকালে” বলছি এই সেকালে বলতে কোন সময় বা কোন বছর-কালের কথা এটা?

    সরাসরি প্রথম কথাটা আগে বলেও নেই। পরে তা ব্যাখ্যা করে বলি। সেকথাটা হল, রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের বা আসলে মহাদেশের সাথে মহাদেশের যোগাযোগটা সর্বপ্রথম ও একমাত্র ঘটতে পেরেছিল কলোনি দখলদারদের হাতে। যতটুকু যা প্রথমে ঘটেছিল তা তাদের  অন্যদেশ দখল করে তা লুটতে বেরিয়ে পড়া ও সম্পদ লুটে নিজ দেশে ফিরে আসা এই ছিল কাজ বা লক্ষ্য। আর এটা করাই হত একটা কোম্পানি খুলে ব্যবসা হিসাবে। একাজ প্রথম শুরু করেছিল  ইউরোপের কিছু রাষ্ট্র। আর তাদের কলোনি দখলের স্বার্থেই এই নেতি কাজের সুত্রেই তাদেরই প্রয়োজন মিটাতে গিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। সোজাকথা, এর আগের দুনিয়ায় এই লুটেরাদের দাঁড় করানো যোগাযোগ ব্যবস্থাটাও ছিল না।
    কাজেই কলোনি শাসক মানে ব্যবসায়ী  মালিক যিনি মানে আমাদের বেলায় যেমন বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এরা তাদের কলোনি লুটের স্বার্থের যেটুক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়েছিলেন তা খুব খারাপ তা বলা যাবে। কিন্তু সেটুকুও কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিস্তারে কাজে লাগে নাই। কেন?
    কারণ,  কলোনি লুটেরা স্বার্থ আর বাণিজ্য স্বার্থ এক জিনিষ নয়। এনিয়ে আরও বিস্তারিত পরে আসছি।

    তাই গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য কেন চালু হয় নাই সেটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরে বলে কথা নয়। কারণ, কলোনি লুটের কাজ ও স্বার্থ  এটা বাণিজ্য করতে আসাই নয়। মূলত একারণের যতদিন কলোনি অর্থনীতি টিকে ছিল (১৯৪৫ সাল পর্যন্ত) ততদিন  গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য তেমন বিকশিত কিছু ছিল না। তাতে সেটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই হোক বা পরে।
    তাই এটা ঠিক বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরে বলে নয়। বরং আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য নিজেই ছিল অবিকশিত ও বাধাগ্রস্থ। এই বাধার পেছনের মূল কারণ বলেছি ‘কলোনি ব্যবস্থা’। অর্থাৎ ইউরোপজুড়ে একটা ক্যাপিটালিজম বিকশিত হয়েছিল ঠিকই; আর এর সময়কাল ধরতে পারি মোটামুটি ১৬০৭ -১৯৪৫, এই প্রায় সাড়ে তিনশ বছর। কিন্তু তা  অবশ্যই এক ‘কলোনি ক্যাপিটালিজম’। এটা কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণভাবে বিকশিত ক্যাপিটালিজম নয়, এমন কি তা বিদেশের সঙ্গে ব্যবসা করেও অর্জন করা নয়। এটা এশিয়া, আফ্রিকা বা ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে কলোনি দখল করে সেই বেপরোয়া লুটে ইউরোপে এনে জড়ো করা সম্পদ সংগ্রহে হাজির করা এরই এক প্রায় একমুখি এক  ‘কলোনি ক্যাপিটালিজম’।  এজন্য বলছি, আমরা যদি ১৬০৭ সালের পর থেকে বিচার করি মানে যখন থেকে সংগঠিত কলোনি দখল ব্যবসা একেবারে কোম্পানি খুলে তাতে আমাদের বেলায় বৃটেনে বিনিয়োগ ঢেলে অর্থনীতির প্রধান খাত হিসেবে শুরু হয়েছিল তখন থেকে পরের প্রায় সাড়ে তিনশ বছর এই সময়কালকে কলোনি যুগ বলতে পারি।
    তবু আবার এ’সময়ের শুরুতে ধরে নেওয়া যায় যে, কোয়ালিটি স্টিল ও যুদ্ধজাহাজ তৈরির জ্ঞানবুদ্ধি আবিষ্কার ততদিনে চালু ও সহজপ্রাপ্য হয়ে গেছে। এককথায় ততদিনে ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী বিনিয়োগের ব্যবস্থা দাঁড়িয়েও গেছে জাহাজ বহর কিনে চারদিকে কলোনি দখল করতে বেরিয়ে পড়া।

    পরের তিন-সাড়ে তিনশ’ বছর ইউরোপ এইভাবেই কলোনি দখল ব্যবসায় লিপ্ত থেকেই কাটিয়েছিল। তবে তাতে এমন দখলদার কোম্পানিগুলোর পরস্পরের মধ্যে লড়াই প্রতিযোগিতার ফলে কেবল যতটুকু যা পরিবর্তন এসেছিল। যেমন প্রথমত, কোম্পানিগুলোর লড়াই ও প্রতিযোগিতা আর শেষে তা আর কোম্পানিগুলোর মধ্যে না থেকে সংশ্লিষ্ট দেশের মধ্যে লড়াই ও প্রতিযোগিতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর তাতে একেকটা কলোনি লুটেরা কোম্পানি বা তার নিজ দেশ একেকটা মহাদেশে শক্তিশালী ফোকাস করে নিজেকে গড়ে নিয়েছিল। যেমন প্রথমে ইউরোপের কলোনি দখলদার দেশের সংখ্যা সীমিত হয়ে যায় কেবল ইংলিশ, ফ্রেঞ্চ, ডাচ, পর্তুগিজ ও স্প্যানিস এই পাঁচ রাষ্ট্রের মধ্যে। তাও আবার তাদের লড়াই ও প্রতিযোগিতায়ও নিজেরা তারা  মহাদেশে ভাগ হয়ে যায়। যেমন, পর্তুগিজ ও স্প্যানিস কলোনি দখলদার কোম্পানি নিজেদের নিবদ্ধ করে কেবল ল্যাটিন আমেরিকা এই মহাদেশের মধ্যে। আর এদিকে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে ব্রিটিশ আর ফরাসি কলোনি দখলদার কোম্পানিগুলো নিজেদের নিবদ্ধ করেছিল। আর ডাচ কোম্পানি নিজেদের জড়ো করেছিল ইস্ট এশিয়ায় যেমন ফিলিপাইন বা ছোট কোন দ্বীপে।

    এজন্যই বলেছি,  কলোনি দখলদারী যুগ শুরু হবার আগে, মানে মোটামুটি ১৬০৭ সালের আগের দুনিয়ায় দেশ-রাষ্ট্রগুলো পরস্পর পরস্পরকে তেমন চিনত না। অন্য ভাষায় বললে, মূলত যোগাযোগ ছিল না। ফলে বিনিময় বাণিজ্য-সম্পর্ক অনেক দূরের কথা ছিল। ফলে কলোনি দখলদারী শুরু হলে এর মাধ্যমে এই প্রথম তাদের মধ্যে যোগাযোগ ঘটে তবে সেটা এক কলোনি-সম্পর্ক, এটাই তৈরি হয়। এটা ঠিক বাণিজ্য সম্পর্ক একেবারেই নয়। যেমন আজকের দিনের মত (১৯৪৫ সালের পরে) আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বলতে যা বুঝায়, সেটা কখনই তৈরি হয়নি।
    এর পিছনের মূল কারণ বলেছি, সম্পর্কটা যেখানে লুটের সেখানে দেশ-রাষ্ট্রের পরস্পরের মধ্যে কোনো আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্পর্ক হতে পারে না। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটা এক পক্ষীয়। আর যেটা হল, কলোনিকৃত দেশ থেকে সম্পদ ও পুঁজি-পণ্য পাচার (উদ্বৃত্ত সঞ্চয় বা সারপ্লাস পাচার)। ফলে এটা ঠিক বাণিজ্য না, তবে সম্পদ পাচারের সম্পর্ক।

    কমিউনিস্ট চোখঃ
    এখানে আরো একটা মজার অবজারভেশনের কথা বলা যায়। কোনো কমিউনিস্ট চোখ কখনো বাণিজ্য নিয়ে বুঝাবুঝিতে আগ্রহী নয়। বরং যা নিয়ে সে আগ্রহী তা হল, উদ্বৃত্ত সঞ্চয় বা সারপ্লাস পাচার নিয়ে। তাই আসলে সে নিশ্চিতভাবে বলতেও পারে না যে বাণিজ্য করা কী হারাম, না হালাল বলবে। ব্যবসা বা মুনাফা করা নিয়েও তাদের একই দ্বিধা। তবে মুনাফা নিয়ে সম্ভবত তারা প্রায় নিশ্চিত যে, এটা প্রায় সারপ্লাস চুরি করার মত। তাই এটাকে তাদের চোখে হারাম বা অগ্রহযোগ্য মানতে দেখা যায়। তাই শেষ বিচারে সামগ্রিকভাবে বাণিজ্য জিনিসটা তাদের চোখে অননুমোদিত বা অনাগ্রহের বিষয় হয়ে আজও থেকে গেছে। অথচ দেশ-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তঃবাণিজ্য মানেই তো পণ্য বিনিময় লেনদেন এবং সব ধরনের বিনিময় ভাষা, ভাব-ভালোবাসাসহ সবকিছুর বিনিময়ের শুরু এখান থেকেই। আর সর্বোপরি এটাই সবচেয়ে দক্ষ, মানে কম শ্রম খাটিয়ে নানান পণ্য পাবার পথের উপযুক্ত ও একমাত্র উপায়; কিন্তু বাণিজ্য নিয়ে নিশ্চুপ থাকলে এর কোনো সম্ভাবনা নাই। তবে সার কথাটা হল, কলোনি যুগের প্রায় সাড়ে ৩০০ বছরে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সম্পর্ক তাই দুনিয়ায় তেমন বিস্তৃত হতে পারে নাই, মূলত সেটা কলোনি যুগ বা একপক্ষীয় সম্পর্কের কারণে। তবুও একটা খুবই সীমিত পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য চালু ছিল। যদিও তা আবার কেবল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত কার্যকর ছিল। আমরা এখন সেপ্রসঙ্গে যাব।

    কিন্তু কীভাবে তা বোঝা গেল যে “খুবই সীমিত পণ্য-বিনিময় বাণিজ্য” চালু ছিল? এর ভালো প্রমাণ আছে কী?
    হ্যাঁ আছে। ‘রথশিল্ড ব্যাংক’ [Rothschild bank]। এটা মূলত জার্মানির এক পারিবারিক মালিকানাধীন ব্যাংক, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ময়োর আমশেল রথশিল্ড (Mayer Amschel Rothschild) যার জীবনকাল (১৭৪৪-১৮১২)। তিনি ইউরোপের অন্তত পাঁচ বড় শহরে তার সন্তানদের দিয়ে ব্যাংকের শাখা খুলে পুরা ব্যবসাটা পরিচালিত করতেন। আর জর্মানিতে নিজে বসে সেগুলোর সমন্বয় করে আসলে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন  এক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা। মানে ইউরোপের একমাত্র প্রধান মুদ্রাগুলোর মধ্যে এক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা; কিন্তু সীমিত পণ্য-বিনিময় বা সীমিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য চালু থাকার সঙ্গে এর সম্পর্ক কী?

    মূল সম্পর্কটা হলো, আসলে মুদ্রা মানেই কোনো না কোনো দেশ-রাষ্ট্রেরই মুদ্রা। দেশের ভেতরে বিনিময় ওই একই মুদ্রার মাধ্যমে ঘটে থাকে, আর তা সহজও; কিন্তু আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য বিনিময় হতে হলে তা কোনো এক দেশীয় মুদ্রায় করা সম্ভব না। সেক্ষেত্রে সবার আগে আন্তঃরাষ্ট্র মুদ্রাগুলোর মধ্যে ‘বিনিময় যোগ্যতা’ থাকতে হয়। আর বিনিময় যোগ্য হওয়া মানে সবার আগে তাদের ‘বিনিময় হার’ জানতে হয়; বা বলা যায় সাব্যস্ত হতে হয়। যার সোজা মানে হলো, কেউ বিনিময় হার সাব্যস্ত করে দিতেই পারে, কিন্তু তিনি বিশ্বাসযোগ্য ও আস্থার হতে হবে। তবেই তা কাযর্কর ও এর এই বিনিময় হার অর্থপুর্ণ হবে!

    ঠিক যেমন মুদ্রা মানেই আসলে আস্থা, বিশ্বাস। যেমন আমাকে কেউ একটা ১০০ টাকার নোট দিলে, যদি আমি নিশ্চিত হই সেই নোটটা এরপরে অন্যকে দিলেও অনায়াসে এটাকে ১০০ টাকার নোট বলে সে গ্রহণ করবে- তবেই আমি তা নিব। ঠিক যেমন যদি রটে যায় যে একশ টাকার নোট ব্যাপক নকল হচ্ছে, তাহলে ব্যাংক থেকে আসা নয়া নোটও বাজারের কেউ আর নিতে চাইবে না বা দ্বিধা করবে।

    সেকালে ইউরোপের এই আস্থাভাজন বিশ্বস্ত লোকটাই হয়ে উঠেছিলেন আমশেল রথশিল্ড। প্রতিদিন সকালে তিনি ওই দিনের ইউরোপের প্রধান মুদ্রাগুলোর বিনিময় হার টানিয়ে দিতেন। কিন্তু সেটা কী কাজে লাগত? কেউ ধরা যাক জার্মানি থেকে ইংল্যান্ডে এসে কোনো পণ্য কিনে তার দেশে গিয়ে বিক্রির ব্যবসায়ী। তাহলে তিনি বিনিময় হার জেনে সেই পণ্যের পাউন্ডে দামের তুল্য পরিমাণ জার্মান মার্ক পরিশোধ করে কিনতে পারতেন। তবে রথশিল্ড ব্যাংকের কারণে একমাত্র বিনিময় হার জানা থাকাতেই এই বিনিময় সহজেই সম্ভব হত।

    কিন্তু রথশিল্ড নিজে জানতেন কীভাবে যে আজকের বিনিময় হার কী রাখতে হবে? তার পদ্ধতি ছিল সোজা। সেকালে যেকোন দেশের মুদ্রা বলতে যে পরিমাণ কাগুজে নোট ছাপা হবে তা ছাপার আগে সমমান পরিমাণ সোনা ভল্টে জমা রাখা হত। যাতে সত্যি সত্যিও নোটের বাহক চাইলে সমপরিমাণ আসল সোনা তাকে দিয়ে দেয়া যায়।  কথা আরো আছে। সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক বলতে ধারণাটা আসে ১৯৪৫ সালের পর থেকে।  ফলে ব্যাংক ব্যবসা করত একমাত্র প্রাইভেট কোম্পানী। ব্যবসায়ীরা সরকারকে কখনও বাজার ব্যবস্থায় ঢুকতে দেয় নাই বা দেওয়ার সাফাই খুজে পায় নাই।  এসবই শুরু হয়েছে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থা চালু বিশেষ করে প্রত্যেক সদস্য দেশে একটা করে কেন্দ্রীয় ব্যংক থাকার প্রয়োজন মিটাতে গিয়ে।  যেমন ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ব্যাংক অব ইংল্যান্ড” এক প্রাইভেট ব্যাংক ছিল। একে ইংল্যান্ডের কেন্দ্রিয় ব্যাংক করতেই সরকার এই প্রথম এই ব্যাংককেওধিগ্রহণ বা মালিকানা নিয়ে নিয়েছিল। এর আগে সরকারের অনুমতি নিয়েই ওই ব্যাংক মুদ্রা ছাপাত। ফলে চাহিবামাত্র সোনা ফিরিয়ে দিবার দায় ছিল ঐ ব্যাংকের। এজন্য ঐ মুদ্রাব্যবস্থাকে বলা হত, “গোল্ড ব্যাকড মানি”। অর্থাৎ যে ব্যাংক কাগুজে নোট বা মুদ্রা ছাপাবে সেইই কোন মুদ্রার হোল্ডার বা ধারক মালিক তিনি সোনা ফেরত চাইলে তাঁকে তা দিতে বাধ্য থাকত।
    যেকথা বলছিলাম, মুদ্রা গোলড় ব্যাকড মুদ্রা হত বলে দেশের সোনার প্রবেশ বা বের হয়ে যাওয়া এর একাউন্টিং ভিত্তিক ছিল এই মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ ব্যবস্থা।  তাই   প্রতিদিন সকালে তিনি খবর নিতেন গত দিনে ধরা যাক পাউন্ডে মোট কেনার চেয়ে বিক্রি কত কম/বেশি হয়েছে। বিক্রি বেশি হওয়ার অর্থ হলো, তাহলে অন্য দেশের বেশি সোনা ইংল্যান্ডে এসে ঢুকেছে। তাই এটা পরদিন সমান করতে গেলে  যার অর্থ বিক্রি কমাতে হবে। বিক্রি কমানো মানে অন্যদেশের কম সোনা এসে ইংল্যান্ডে আগের দিনের চেয়ে কম ঢুকা। অর্থাৎ এটাই ছিল তার পরদিন হার সমান করার উপায়। এখন কতটা কমাবেন বা বাড়াবেন এটা অভিজ্ঞতা দিয়ে নির্ধারণ করে নিতেন। আর তাঁর পাঁচ ছেলের কাজ ছিল ওসব দেশের মুদ্রার হার নিয়ে একই খবরা খবর পিতার সঙ্গে দেয়া-নেয়া করা। এভাবে একটা আস্থা-বিশ্বাসের ওপর মানে রথশিল্ডের ভরসায় সীমিত আকারে আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্য সেকালে চালু ছিল।

    কিন্তু ১৯১৪ সালে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে পর থেকে এই ব্যবস্থাটাও আর টিকে থাকতে পারেনি। যদিও পেছনের মূলকারণ যুদ্ধ-বিশৃঙ্খলা ঠিক তা নয়। মূল কারণ, মুদ্রাস্ফীতি। অর্থাৎ যুদ্ধে খরচ যোগাতে বা মিটাতে গিয়ে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি করেছিল। যে কারণে, নিজ দেশেই সোনা ভল্টে রেখে সমপরিমাণ নোট ছাপানোর রেওয়াজ বজায় থাকেনি, মানে ‘গোল্ড ব্যাকড কারেন্সি’ বলে য়াসলে কিছু বজায় না থাকা শুরু হয়েছিল।  পরিণতিতে ‘গোল্ড ব্যাকড কারেন্সি’ ব্যবস্থার ওপর দাঁড়ানো মুদ্রা বিনিময় হার নির্ণয়ের রথশিল্ডের ব্যবস্থাটাও আস্থা-বিশ্বাস হারিয়ে অকেজো হয়ে গেছিল। আমরা মনে রাখতে পারি  মুদ্রাস্ফোত শব্দটার খাস মানে হল  সোনা আগাম ভল্টে না রেখে মুদ্রা ছাপানো। যুদ্ধের খরচ মিটাতে ইউরোপের সব মাতবর দেশই এভাবে মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়ে ছিল। এরই ফাইনাল প্রতিক্রিয়া হল আমেরিকার। ১৯৩৩ সালের ২০ জানুয়ারি এফডিআর [Franklin Delano Roosevelt ] বা  প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট প্রথমবার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেন। শপথের পরেই তার প্রথম সিদ্ধান্ত ছিল ডলারের মুদ্রাস্ফীতি ঘটানো। তার যুক্তি ছিল সারা ইউরোপ ঘটিয়েছে তাই তাদের সাথে সমান করতে তার এই সিদ্ধান্ত।  তিনি আগের এক আউন্স সোনার দাম ছিল ২৫ মার্কিন ডলার। তা বাড়িয়ে তিনি করেন ৩৫ ডলার। পরে ১৯৪৫ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থা চালু করার সমও গোল্ড ব্যকড কারেন্সি ব্যবস্থা চালু ছিল আর ১ আউন্স সোনা ৩৫ ডলারের এই রেটই বজায় ছিল।  দুনিয়ায় গোল্ড ব্যকড কারেন্সি ব্যবস্থা ভেঙ্গে যায় আসলে ১৯৫৮ সালে যা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থায় প্রয়োগ করে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ব্যবস্থাকে পুণঃজন্ম দেয়া হয় ১৯৭৩ সালে। সে প্রসঙ্গ আলাদা, তাই এখানেই ইতি।
    ১৯১৪ সালে বিশ্বযুদ্দ্ধধে যে রথশিল্ডের ব্যবস্থা ভেঙ্গে যায় তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও এটা আর কখনো ফিরে কার্যকর হতে পারেনি। বরং কলোনি ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ায় আর ইউরোপের প্রবল অনুরোধে আমেরিকার নেতৃত্বে রথশিল্ডের কাজটিই আরও ব্যাপকভাবে করতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠান গড়ে নেওয়া হয় ব্রেটেনহুড সম্মেলনে ১৯৪৪ সালে। দুনিয়ায় ব্যাপকভাবে গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় বাণিজ্যের শুরু হয় তখন থেকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে কেন্দ্র করে।

    লেখক- রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  সাপ্তাহিক দেশকাল পত্রিকার  ০৪ ডিসেম্বর ২০২১ ওয়েবে  আর  ০২ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে প্রিন্টে   “প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে ও পরের ফারাক”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ নিবে না

     চীন-ভারত সংঘাতে

    বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ নিবে না

    গৌতম দাস

    ০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০৬ সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3PL

    _

    [সার-সংক্ষেপঃ   চীন-ভারত সামরিক সংঘাত আসন্ন কোন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কার পক্ষ নিবে? চীন না ভারতের পক্ষে? নাকি নিজেরই একটা পক্ষে? সম্প্রতিকালে এসব নিয়ে ‘অনুমিত’ দৃশ্যকল্প এঁকে নিয়ে এর আলাপ তুঙ্গে নিয়েছে মূলত ভারত। আর তাতে ভারতের মন রক্ষার্থে সাথে তাল দেয়া শুরু করেছে আমেরিকাও। এনিয়ে এদিক সেদিক, কার মনে কী আছে তা নামে-বেনামে এমন প্রচুর লেখা ছাপা হচ্ছে। আমেরিকা যদিও ভাব ধরেছে যে সে ভারতকে সাপোর্ট করতে নাকি এই প্রসঙ্গে প্রবেশ করে নাই। আমেরিকা বরং নাকি “ভারতের চোখ দিয়ে বাংলাদেশ দেখা” ছেড়ে দিতে বাংলাদেশকে ভারত থেকে আলাদা নিজের এক পররাষ্ট্র ডেস্ক সাজিয়েছে যেখান  থেকে এখন বাংলাদেশ ইস্যু দেখাশুনা করার পরিকল্পনা নিয়েছে – এসব চাপাবাজি-মূলক বক্তব্য এক সাক্ষাতকারে প্রকাশ করেছে। অথচ ফরেন পলিসি পত্রিকার এই আর্টিকেল উলটা সাক্ষ্য দেয় যে খাসিলত বদলায় নাই, বদলাবেও না।
    কিন্তু এসময়ে হঠাত চীন-ভারত সংঘাতের কথা উঠছে কেন? এটা আমেরিকা বা ভারত স্পষ্ট উচ্চারণ না করে এড়িয়ে যাচ্ছে যদিও তা করা হচ্ছে “যেন সংঘাত আসন্ন” এমনটা (given) ধরে নিয়ে। তবে ভারত পরোক্ষে এক আর্টিকেল ছাপিয়ে তা বলেছে। সেখানেও আগাম (given) ধরে নেয়া ঘটনাটা হল ভারত তো জীবনেও তিস্তার পানি দিবে না ফলে এক চীনা তিস্তা প্রকল্প যেহেতু বাংলাদেশ ভাবছে; তা ভাববেই স্বাভাবিক। সেটা হলে এর উলটা প্রভাবে ভারত কী কী হারাবে তা নিয়ে এক এজেন্সি রিপোর্ট ছাপিয়েছিল আমেরিকার ভোয়া বাংলায় মতিউর রহমান চৌধুরী। যেখানে ভারতের পক্ষে এক “ছায়া-ব্যক্তিত্ব”  অংশ নিয়েছিল। যেখানে বেপরোয়া ভয়াবহ সব কথা লেখা হয়েছে। যেমন, বাংলাদেশকে ভারতের সাথে চুক্তি করতে হবে যাতে চীন-ভারত যুদ্ধের সময় ভারত বাংলাদেশের উপর দিয়ে সামরিক যান চলাচল করতে পারে। যেমন লিখেছে – “… বাংলাদেশের সাথে একটি চুক্তি সই করা, যে চুক্তিবলে সংঘর্ষের সময় সামরিক, বেসামরিক এবং ট্রাফিক ক্যারি করা যাবে”। মানে এক ন্যাংটা খোকার মামা বাড়ির আলাপ আর কাকে বলে!!!
    এমন এসব এজেন্সী ততপরতায় বাংলাদেশ ভরে গেছে। ডেইলি স্টার এমন  আরেক রিপোর্ট এখানে। এক পুরানা এজেন্ট সিপিডি (CPD) এবার ভারতের আরআইএস (RIS) নামের এক ছুপা থিঙ্কট্যাংকের সাথে যৌথ সেমিনার করেছে ঢাকায়।  ছুপা এজন্য যে এরা একদিকে দাবি করছে তারা স্বাধীন থিঙ্কট্যাংক প্রতিষ্ঠান। অথচ এর পরিচালনা পরিষদ বা গভর্ণিং বডিতে দেখা যাচ্ছে  ভারত সরকারের পাঁচ মন্ত্রণালয়ের সচিব (পররাষ্ট্র, বাণিজ্য, অর্থনীতি ইত্যাদি) এবং সাথে আর এছাড়াও আরএসএস নেতা ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ডিরেকটরেই পরিপুর্ণ।  আর এমন RIS এই প্রতিষ্ঠানের সাথে CPD যৌথভাবে বাংলাদেশের ৫০ বছর পালন করেছে ঢাকায়! কী করে?? সিপিডির রেহমান সোবহান ভারতকে করিডোর দেওয়ার পক্ষের এজেন্সীর হয়ে ২০০৭ সাল থেকে সোচ্চার এবং বিরোধীতাকারীদের মুর্খ ও অশিক্ষিত বলেছিলেন তিনি। আবার এখন   ভারতের রাষ্ট্রপতির বাংলাদেশ সফর নিয়ে কিছু লোক অতি উতসাহে আলোড়ন তোলার চেষ্টা হচ্ছে কিন্তু তা অনাগ্রহে গণবিচ্ছিন্ন আড়ম্বরেই আটকে থেকে যাচ্ছে।

    আসলে সিপিডি  এমনই ভারত অনুগত যে, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ নিয়ে কথা উঠায় কিন্তু সারা ভারতে গত আট বছর ধরে একটা প্রবল হিন্দুত্ববাদের যোয়াড় বইতেছে আর ভারতের এই বন্ধু হওয়া সত্বেও বাইডেন এই প্রসঙ্গে কথা তোলা ছাড়ে নাই। অথচ আমাদের সেকুলার রেহমান সোবহান সাহেব মুখে কুলুপ দিয়েছেন; কি জানি মহাজন রাগ করে নাকি!!  এমন যতই আনুগত্য [subordination] বা অধীনস্ততা দেখাক এথেকে ভারত কোন কিছু অর্জন করতে পারবে না।

    তবু নিশ্চিত বলা যায় যত  প্রচেষ্টাই নেয়া হোক, চীন-ভারতের কোন কল্পিত যুদ্ধে বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ নিবে না। এর কোন সুযোগই আর নাই। বাংলাদেশ ভারতের পক্ষ তো নিবেই না এডিশনালি সাথে বাংলাদেশের নিজের সার্বভৌম বুঝের কোন অবস্থানও থাকতে পারে।  এমনকি তা হাসিনার নেতৃত্বের বাংলাদেশেও না।  মনে রাখা যেতে পারে, কোন শর্তে বা চাপে ফেলেও বাংলাদেশকে কোনদিকে নেওয়ার দিন শেষ, সেই পরিস্থিতিটাই লুপ্ত  হয়ে গেছে। এটা ভারত যত তাড়াতাড়ি  বুঝবে ততই সেটা ভারতের জন্য মঙ্গল হবে। তবে এর আগে নানা গণবিচ্ছিন্ন আড়ম্বর অথবা বহু চাটুকার বা এজেন্টদের ততপরতা  আমরা চলতে দেখব অবশ্যই। আর হাইকমিশনকেও আমাদের মিডিয়া কিনার জন্য আরো বহুদিন ফান্ড ঢেলে যেতে দেখব। ]

    DON’T LOOK AT BANGLADESH WITH INDIAN PRISM : USA MEDIA

     

     

    ‘ফরেন পলিসি’ (Foreign Policy Magazine), ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই আমেরিকান পত্রিকা; দীর্ঘ দিন ধরে এটা মূলত ডিপ্লোমেসি ও রাজনীতিক ইস্যু নিয়ে চর্চার এক ম্যাগাজিন। আর বলাবাহুল্য, এ’কাজ তারা আমেরিকান স্বার্থের দিক থেকে তাকিয়ে করে থাকে। আর বাইডেন ক্ষমতায় আসার আগে এই ম্যাগাজিনের অনুসৃত লাইন যাই থাক, চলতি বছর থেকে এটা এখন বাইডেনের বড় ‘একটিভ সাপোর্টিং’ পত্রিকা; বিশেষ করে সাউথ এশিয়ার জন্য আর তা কাভার করার দিক থেকে। মাইকেল কুগেলম্যান [Michael Kugelman] ‘উড্রো উইলসন সেন্টার’ [Wilson Center] এই আমেরিকান থিংকট্যাংকের ডেপুটি প্রোগাম ডিরেক্টর ও সিনিয়র ফেলো। তিনি এখন ফরেন পলিসি পত্রিকায় নিয়মিত এক সাপ্তাহিক ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফ’ লেখার তত্ত্বাবধান ও প্রকাশ করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত যেটা আসলে বাইডেনের সাউথ এশিয়া নীতির ছাপে ও পক্ষে এই অঞ্চলের বার্নিং ইস্যুগুলোতে তাদের অবস্থান মেলে ধরে। আর তাতে এ অঞ্চলের খুঁটিনাটি ইস্যুতে বাইডেন প্রশাসনের মনোভাব সম্পর্কেও কিছু  আঁচ পাওয়া যায়। এছাড়া অনেক সময় এ’অঞ্চলের মিডিয়াগুলো কী লিখেছে তার ছোটখাটো রিভিউও দেখতে পাওয়া যায় এই ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফে’। অর্থাৎ বাইডেনের পক্ষেরই যেন এটি একটা আলাদা ভার্সন কিন্তু যারা বাইডেন প্রশাসনের সাথে অ-সরকারিভাবে ও ইনফরমালি যুক্ত।

    বুড়া সিংহ আমেরিকাঃ
    এদিকে চলতি শতক থেকে প্রায়ই আমেরিকান প্রশাসনকে অনেকে ‘বুড়া সিংহ’ বলে থাকে। টানা পঁচাত্তর বছর ধরে আমেরিকা দুনিয়াকে ভালো-মন্দ যাই হোক একভাবে দাবড়িয়ে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছে। কিন্তু তার সেসব বহু সক্ষমতাই আজ গত হয়েছে; সোজা নাই হয়ে গেছে; বিগত যৌবন হয়ে গেছে। ফলে যেন এটা এখনো সিংহ বটে তবে চামড়া ঢলে পড়া বুড়া সিংহ হয়ে গেছে।

    গত ১৯৪৫ সালকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে একটা ভাল ‘জংশনের বছর’ বলা যায়। এই জংশন হল, এক দিকে  বিশ্বযুদ্ধে দুনিয়ায় ভেঙে পড়া পুরনো অসংলগ্ন [discrete] রাজনৈতিক অর্ডার মানে যেটুকু রাজনৈতিক সিস্টেম ছিল তা ভেঙ্গে, পরে ওর অবশিষ্ট নিয়ম শৃঙ্খলাগুলো ক্রমেই সে ত্যাগ করছে আর অন্যদিকে নতুন এক অর্ডারে এক সুষম সংগঠিত ও গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমে দুনিয়া পুনর্গঠিত করে  নিজে চলতে শুরু করার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। নতুন সেই গ্লোবাল রাজনৈতিক সিস্টেমে এর  গ্লোবাল ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার বা এই নয়াবিধি ‘ব্যবস্থা’ শুরু হচ্ছে মূলত জাতিসঙ্ঘকে কেন্দ্রে রেখে [এটাই প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের ড্রিম]  এবং অন্তত তিনটা বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে নিয়ে। এই বিগত অর্ডারটাকে যদি বলি কলোনি যুগ বা কলোনি ক্যাপিটালিজমের কাল তবে, নতুন যা সেসময়ে গড়ে উঠছে তা আমেরিকান নেতৃত্বে এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম।  যদিও সোভিয়েত কমিউনিজম, যা তখন ইতোমধ্যে ২৮ বছর বয়স্ক, সে এটা সরাসরি স্বীকার করতে চায়নি। কেবল জাতিসঙ্ঘ গঠনের সময়ে নিজের ভেটো সদস্যপদটা ঠিকঠাক থাকে তা বুঝে নিয়ে বাকি ব্যাপারে  প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে তালে তাল দিয়ে গেছে। অর্থাৎ   আমেরিকা যা করে করুক, পরোক্ষে এভাবে মেনে নিয়েছিল। আর অন্য দিকে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যাপক কোন বাণিজ্য যেটা ১৯৪৫ এর আগের দুনিয়ায় যা কোনদিন ছিল না  তা এবার পূরণে এক বিশাল গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থা চালু করতে বা তার নিয়ন্ত্রক বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এদের জন্ম দেয়া হোক;  আর  তা আমেরিকা গড়ে তুলুক এটাই ইউরোপ মনেপ্রাণে চেয়ে ও সাপোর্ট করে গেছিল। তাই আমেরিকা এভাবে এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম চালু করে নিতে পেরেছিল।
    আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক জন্মের টানা ২২ দিনের জন্মসভার হোটেলে বসবাসে সোভিয়েত ইউনিয়নও আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত থেকেছিল; অংশ নিয়েছিল। কিন্তু ১৯৪৫ সাল থেকে এর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা শুরু হয়ে গেলে তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আর চাঁদা দিয়ে সদস্যপদ নেয় নাই বা নিতে আসে নাই। আবার কোনো বাধাও দেয়নি। কেন কী হয়েছিল, কেন সোভিয়েত ইউনিয়নের এমন সিদ্ধান্ত তা প্রকাশ্যে, স্টালিন তখনো জীবিত ও ক্ষমতাসীন- তা সত্ত্বেও কোথাও তিনি তা জানাননি। লিখিত কিচ্ছু নেই। তবে আমেরিকা তার নয়া গ্লোবাল অর্ডার নিয়ে  ঠিকই এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই থেকে টানা পঁচাত্তর বছর পরে আমেরিকা এখন এক বুড়া সিংহ যার যৌবন কেটেছে ‘রুস্তমি’ করে। যখন সে কোন কিছু চেয়েছে জানলেই তখন অনেক কিছু হয়ে যেত। সেসব দিন আর নাই। এর বড় কারণ এখন আমেরিকা কাউকে দুর্নীতির  অজুহাতে ধরে অনুগত করতে বেকায়দায় ফেললে এটাই সুযোগ হয়ে উঠে – এই সুযোগে চীন বিপুল অনকাঠামো নিয়ে সে দেশে প্রবেশ করে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকই একমাত্র ও একচেটিয়া বিকল্পহীন সেসব দিন আর নাই। ওদিকে ইতোমধ্যে আমেরিকান আমাদের মত দেশকে অবকাঠামো বিনিয়োগ দিবে সেই সক্ষমতাও শুকিয়ে আসে।

    চলতি শতক বা দুই হাজার সাল থেকে আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা যে ঢলে পড়ছে তা আর লুকিয়ে রাখা যায়নি। বিশেষ করে আফগানিস্তানে ফলহীন যুদ্ধে একতরফা অর্থ ঢালার পর থেকে আরো মারাত্মকভাবে। আর এর বিপরীতে চীনের উত্থান এবং সমৃদ্ধ ও প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে চীন সেই নেতৃত্বের জায়গা নিতে উঠে আসা, সেটাও স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল।
    মজার কথা হলো, ওবামা আমল (২০০৯-২০১৬) পর্যন্ত যত প্রেসিডেন্ট তারা কেউ স্বীকার করেননি যে, চীন উঠে আসছে, আমেরিকা বুড়া সিংহ হচ্ছে। এই বাস্তব সত্য স্বীকার না করাটাই যেন আমেরিকান সব প্রশাসনের অফিসিয়াল অবস্থান। একমাত্র কিছু ব্যতিক্রম দেখা যায় জিবিগনিউ ব্রেজনিস্কি যিনি চীন-আমেরিকা সম্পর্ককে প্রথম (১৯৭৮) পারস্পরিক স্বীকৃতির রূপ দিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলেন, তার বেলায়। যখন তিনি ছিলেন (১৯৭৭-৮১) প্রেসিডেন্ট কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (NSA)। তিনি খোলাখুলি চীনা উত্থান প্রসঙ্গে নিজের বইয়ে লিখেছেন। এমনকি ওবামাও আমেরিকান নেতৃত্ব আরো বজায় থাকবে কি না এ নিয়ে সেকালেই যেসব প্রশ্ন উঠে গেছিল তা তিনি মানেন না দেখাতে উলটা দাবি করে বেড়াতেন যে, আমেরিকাই আরো বহুদিন গ্লোবাল নেতৃত্বে থেকে যাবে।

    কিন্তু কেন এখানে চীনের গ্লোবাল নেতৃত্বে উত্থান বা আমেরিকান বুড়া সিংহ হয়ে যাওয়ার স্বীকার-অস্বীকার নিয়ে কথা তুলছি?
    কারণ উপরে উল্লিখিত ‘ফরেন পলিসি’ ম্যাগাজিনে এবারের ‘সাউথ এশিয়া ব্রিফে’ কুগেলম্যানের সাথে যৌথভাবে লেখা একটি আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। ওতে সহলেখকের নাম আনু আনোয়ার [Anu Anwar], জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির যিনি পিএইচডি প্রার্থী। আর ঐ লেখার শিরোনাম হল “আমেরিকার বাংলাদেশকে নিয়ে বাজি ধরা উচিত” [America Should Bet on Bangladesh]। আর উল্লেখ্য যে এ’লেখায় চীনের চেয়ে আমেরিকা অক্ষম হয়ে পড়েছে এর স্বীকারোক্তি করা হয়েছে। সেসব প্রসঙ্গে ঢুকব এখন।

     কিন্তু লেখার প্রসঙ্গ কেন এমন?
    গত মাসে, মানে নভেম্বরের মাঝমাঝি এক আমেরিকান ডেপুটি সহকারী মন্ত্রী (সাউথ এশিয়া) কেলি কেইডারলিং [Kelly Keiderling] বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন কোনো এক বহুরাষ্ট্রীয় সভায় যোগ দিতে। ফিরে যাওয়ার আগে তিনি ডেইলি স্টারকে এক সাক্ষাৎকার দেন যার প্রসঙ্গ হল – তিনি দাবি করেন, আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টে বাংলাদেশ আলাদা গুরুত্ব লাভ করেছে, যে কারণে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এখন থেকে আর ভারতের সাথে একই ডেস্ক থেকে দেখাশোনা করা হবে না। এতে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল যে, বাংলাদেশকে আর ‘ভারতের চোখ দিয়ে’  দেখা আমেরিকা  বন্ধ করেছে। তাই কুগেলম্যান ও আনু আনোয়ারের যৌথ লেখাটা হল, সেই বক্তব্যের গুরুত্ব আরো বিস্তারিত একটা সাফাইয়ে তুলে ধরা।
    ওই যৌথ লেখা নিয়ে কোন সেন্সিবল বাংলাদেশের যে প্রতিক্রিয়া হবে সবার আগে তা শিরোনাম আকারে বলে রাখি। বাস্তবে ফরেন পলিসির এই আর্টিকেল ভারতের চোখ দিয়ে আমেরিকার দেখার অভ্যাস ত্যাগ করা দূরে থাক, বরং আরো পোক্তভাবে ভারতের তথাকথিত নিরাপত্তাস্বার্থের চোখ দিয়েই বাংলাদেশকে দেখেছে। মানে ভারতের তথাকথিত নিরাপত্তাস্বার্থ বাংলাদেশ কতটা দেখবে অথবা না, সেই আলোচনাই ওখানে করা হয়েছে।

    আগাম অনুমান  
    কোন লেখা শুরু করার আগে লেখকের কিছু আগাম অনুমান সেখানে থেকে থাকে। সেই অনুমানটা আমরা এখানে দেখব। যেমন আনুদের লেখাটা সে অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে আছে তা এখানে আমরা পাব। আনু লিখছেন, “ভবিষ্যতের কোনো সঙ্কটে বাংলাদেশ যদি চীন অথবা ভারত কোনোটার পক্ষ নিতে হয় অথবা  কোনো নিজস্ব ভূমিকায় হাজির হয়, তা সামরিক অথবা কূটনীতিক যাই হোক না কেন, তাহলে তা এঅঞ্চল বিপদে পড়ার মত ভূরাজনৈতিক পরিণতি ডেকে আনবে [If Bangladesh were to take the side of China or India, or to exert any role, whether diplomatic or military, in future crises, there would be considerable geopolitical consequences for the region. অর্থাৎ মূলকথা বাংলাদেশের নিজের ভুমিকা নেওয়াটাই ভারতের জন্য হবে মারাত্মক – এটাই তিনি বলতে চাইছেন।

    “If Bangladesh were to take the side of China or India, or to exert any role, whether diplomatic or military, in future crises, there would be considerable geopolitical consequences for the region.”

    এখানে একটি কথা বলে রাখি। এ লেখাটায় জিও-পলিটিক্যাল [geopolitical] এই অস্বচ্ছ শব্দটা যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে একেবারে বিরক্তির পর্যায়ে।  এমনিতেই যারা ‘জিও-পলিটিক্স’ শব্দ ব্যবহার করেন তাদের ওপর ভীষণ বিরক্তি লাগে। মনে হয় এসব মানুষের যখন কোনো কিছু বুঝতে বা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিজের ক্ষমতা টের দেয়, তখন এরা সোজা সেখানে জিও-পলিটিক্স শব্দটা ব্যবহার করে পার পেতে চায়। ফলে এক অর্থহীনতা তৈরি করে। অথচ তারা কোথাও কোন রাষ্ট্রের (কূটনৈতিক) সিদ্ধান্তগুলো বা ততপরতার কারণে যখন  তার স্থানীয় পড়শি রাষ্ট্রের উপরে এর প্রভাব পড়া শুধু নয়, তাতে শুধু আঞ্চলিকও নয় একেবারে গ্লোবাল পর্যায়েও প্রভাব পড়ে – এরা সেই গ্লোবাল প্রভাব কথাটাকে বুঝতে বুঝাতে না পেরে সম্ভবত সেটাকে “জিও-পলিটিক্স” বলে চালাতে চেয়ে থাকে।
    এর পেছনের মূল কারণ দুনিয়ায় ক্রমেই গ্লোবাল হয়ে ওঠা অর্থনীতি। এতে সব কিছুই এখন গ্লোবাল; মানে কোনো কিছুই আর স্থানীয় থাকছে না যেহেতু বাণিজ্য এখন গ্লোব-জুড়ে মানে গ্লোবাল হয়ে উঠেছে; ফলে পণ্য-বিনিময়ও গ্লোবাল রূপ নিয়েছে। তাই একটি ভূগোলে (জিও) কিছু একটা ঘটলে এর প্রভাব-পরিণতি স্থানীয় থাকছে না, বরং স্বতঃই তা গ্লোবাল হয়ে উঠছে।

    ঠিক আছে, তাহলে লেখক এখন কী নিয়ে উদ্বিগ্ন? বাংলাদেশের সামর্থ্যবান হয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন?  সেটাই বা কেন? কারণ প্রধান প্রশ্ন, তা হলে এর মধ্যে আমেরিকান স্বার্থটা কী? বাংলাদেশ সামর্থবান হলে যদি ভারতের ক্ষতি হয়ে যায় তার মধ্যে আমেরিকান স্বার্থটা কী? এবং কোথায়?

    আসলে এখানে আমেরিকার সরাসরি কোনো স্বার্থ নেই। স্বার্থটা মূলত ভারতের আর এটিই আমেরিকার উদ্বেগের কারণ। এই হলো আমেরিকার ধরে নেয়া অনুমান বা নিজের স্বার্থসংক্রান্ত বুঝ। মানে আবার বোঝা যাচ্ছে তা হলে, আমেরিকার বাংলাদেশের জন্যও কোনো উদ্বেগ নেই।

    নিজের নয়, কিন্তু ভারতের স্বার্থ নিয়ে আমেরিকা উদ্বিগ্ন কেন? জবাব হল, আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে যা কিছু ভারতীয় স্বার্থ, এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন।

    তাহলে দাঁড়াল যে, এই আর্টিকেলটা বাংলাদেশ নিয়ে মনে হলেও আসলে এটা ভারতের স্বার্থরক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন আমেরিকার পক্ষে লেখা এক আর্টিকেল। তার মানে, সেই একই পুরান কথাটাই হল যে, এখানেও আসলে আমেরিকার ভারতীয় প্রিজমের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশকে দেখছে – সেই পুরনো অভ্যাসের ধারাবাহিকতা। সেই ২০০৭ সাল থেকে চলে আসা আমেরিকার পুরনো কায়দাটাই।
    তা হলে যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, ‘বাংলাদেশ যদি চীন অথবা ভারত কোনোটার পক্ষ নেয় মানে নিজের কোনো ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়,…তো খারাপ ভূরাজনৈতিক পরিণতি ডেকে আনবে’  – এর মধ্যে সারকথাটা হল, বাংলাদেশ যদি চীনের পক্ষ নেয় বা আরও নিজের কোনো ভূমিকা নিয়ে হাজির হয় – এসব ক্ষেত্রে এক উদ্বিগ্ন আমেরিকাকে আমরা দেখতে পাচ্ছি।

    অথচ কথাটা একেবারেই সোজা।  চীন-ভারত দ্বন্দ্বের ইস্যুতে এমন দুটোর মধ্যে বাংলাদেশ ঠিক কী করবে তা যাই করুক সেটা তো বাংলাদেশের একান্ত সিদ্ধান্ত এবং স্বভাবতই বাংলাদেশ চাইবে তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিজের কাছে রেখে দিতে। এমনিতেই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সঠিক অবস্থান হবে কোন দুপক্ষের বিবাদে কোনই পক্ষ না নেয়া; এ বিষয়ে তাদের উভয় থেকে দূরে থাকা।

    আর এখানে আবার আমেরিকা চাচ্ছে আমরা যেন ভারতের পক্ষে থাকি, যেটা অ্যাবসার্ড ও অলীক। আর সেটা কোন ভারত বা কোন আমেরিকা? যে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে?  আহা রে কিউট বাবুটা! সত্যি এ এক অদ্ভুত আবদার!

    এ ছাড়া এই প্রসঙ্গে আরেকটা মজার দৃশ্যপট পরীক্ষা করা যাক। আসলেই কি চীন-ভারত কোনো সঙ্ঘাতে খোদ আমেরিকাই ভারতের পক্ষে দাঁড়াবে? যুদ্ধ করবে? সত্যি?  এটা তো সুখে কান্না চলে আসার মত বেবি!  আচ্ছা, দুই বছর আগে লাদাখে চীন-ভারত সীমান্ত সঙ্ঘাতে কমপক্ষে ২০ ভারতীয় সৈন্য নিহত ও বহু আহত হয়েছিল (যখনিকার ভারতীয় সৈন্যদের কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বা কান্নার দৃশ্যের ভিডিও নেটে প্রায়ই প্রকাশিত হতে দেখি আমরা), সেই উত্তেজনার সময়েও কি আমেরিকা ভারতের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল? প্রশ্নই আসে না। আমেরিকা আসেনি। এমনকি আমেরিকার পক্ষ থেকে ভারতকে কোন সান্ত্বনাবাণী দানের কথাও আমরা জানি না। তাহলে? আমেরিকা আসলে কার পক্ষে? আর আমরা কোন পক্ষ নিব তা নিয়ে আমেরিকা উদ্বিগ্ন হওয়া কী সাজে???  টু উ উ মাচ!

    এ নিয়ে ইদানীংকালের প্রশাসন, বাইডেন প্রশাসনের দুর্গতি আরো ভয়াবহ। একালের এই আমেরিকা এখন সব ব্যাপারে আসলে লিম্ব মানে ঝুলে থাকে, কোনো পরিস্থিতিতে কোন  দিকে নড়ে না। যেমন আমেরিকান (Countering America’s Adversaries Through Sanctions Act) বা CAATSA আইনে কেউ রাশিয়ান এস-৪০০ মিসাইল কিনলে সেই রাষ্ট্রের উপর আমেরিকান অবরোধ আরোপ হবে। সে বিচারে এমন মিসাইল কেনায় ভারতের উপরে অবরোধ আরোপ হয়ে যাবার কথা। কিন্তু তা কী স্টাটাস অবস্থায় আছে কেউ ঠিক জানে না- ব্যাপারটা ‘লিম্ব’ হয়ে ঝুলে আছে।
    আবার ওদিকে তাইওয়ান নিয়ে অযথা খোঁচাখুঁচি ব্যাপারটা আবারো একেবারে ছেচড়ামোর পর্যায়ে নেয়া হয়েছে। “এক চীননীতি” [One china policy] মানে হল তাইওয়ান আলাদা দেশ নয়;  বরং একই চীনা ভূখণ্ডের অংশ – এটা কোন রাষ্ট্র না মানলে সে রাষ্ট্রের সাথে চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক করে না। সেই বিচারে ১৯৭১-৭৭ সাল পর্যন্ত নানান ইস্যুতে দীর্ঘ আপস আলোচনার পরে আমেরিকার এক চীননীতি মেনে নিয়েই চীন-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ১৯৭৮ সালের শুরু থেকে।
    এভাবেই দীর্ঘ পথ চলার পরে  ট্রাম্পের আমলে এসে তিনিই প্রথম এক চীননীতি মানি-মানি না টাইপের লিম্ব তৈরি  করেন। । শেষে এবছর গত  অক্টোবর মাসে এসে চীন তাইওয়ান ইস্যুতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করলে বাইডেন এবার তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুলেভানিকে দ্রুত চীনের সাথে বৈঠকে বসেই সোজা ১৯৭৮ সালের এক চীননীতিটাই বাইডেনের আমেরিকা এখনো বজায় রেখেছে বলে ঘোষণা দিয়ে দিলেন। এভাবে চীনের সব ক্ষোভ মিটিয়ে দিলেন। কিন্তু আবার গত দুই সপ্তাহ ধরে পুরানা চুলকানি! বাইডেন তার ‘গণতন্ত্র সম্মেলনে’ এবার তাইওয়ানকেও রাষ্ট্র হিসেবে দাওয়াত করেছেন।  অথচ তাইওয়ান জাতিসংঘের সদস্য নয় ঐ ১৯৭১ সাল থেকে। যখন থেকে সেটা কেড়ে নিয়ে মাওয়ের চীনকে আসল চীন বলে ভেটোসহ ঐ সদস্যের হকদার বলে মানা হয়েছিল। তাই মূল চীনাভুখন্ডের একচীন নীতি জাতিসংঘের চোখেও ভ্যালিড। এটা স্রেফ কোন গোয়ার্তুমি নয়। )  তাই আবার খামোখা টেনশন! অর্থাৎ এ কালের  বুড়া সিংহ  আমেরিকা  যে মুরোদ হারাচ্ছে তার আরেক প্রমাণ হল এসব ছেচরামো। এরই আরেক প্রকাশ হল, সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বারবার ঝুলে থাকতে সবচেয়ে ভালো পারে!

    বাংলাদেশ কেন চীনের বিনিয়োগ পাওয়ার দিকে ঝুঁকেছে তা বর্ণনা করতে গিয়ে আনু নিজেই বলছেন, “চীনের অল্প সময়ের ভেতর বিপুল বিনিয়োগ সমাবেশ ঘটানো বা জোগাড়ের ক্ষমতা এবং তাও আবার তুলনামূলক অল্প কিছু শর্তে। যেটা নয়াদিল্লি তো বটেই ওয়াশিংটনেরও কম্ম নয়, তাদের এমন মুরোদ নেই” [Bangladesh, like many countries housing BRI investments, is attracted to Beijing’s ability to quickly deploy large amounts of capital with relatively few conditions. This is not something that New Delhi—or, for that matter, Washington—is able to do.]”।

    “Bangladesh, like many countries housing BRI investments, is attracted to Beijing’s ability to quickly deploy large amounts of capital with relatively few conditions. This is not something that New Delhi—or, for that matter, Washington—is able to do.”

    আমার মনে হয়, লেখক আনু আনোয়ারের  এত খোলাখুলিভাবে চীনের চেয়ে আমেরিকার অক্ষমতার কথা এই কঠিন সত্যকে প্রকাশ করা, কোনো আমেরিকান লেখায় আগে আসেনি। এ্ইটা বুড়া সিংহের নিজেকে বুড়া হিসাবে  এক আপন স্বীকারোক্তি!

    তবু লেখক এখানেই থামেননি। পরামর্শ দিয়েছেন আমেরিকাকে আবার তার যৌবন কালের মতো নয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ বাংলাদেশে আনতে [By funnelling more investments into Bangladesh……]। কারণ একথাটা অবাস্তব তিনি জানেন। কিন্তু এটা বলা ছাড়া তার লেখাটাই দাড়ায় না, অর্থহীন হয়ে দাড়ায়।  সবাই জানে, আমেরিকার সে ‘ব্যবসা’ মানে যোগ্যতা চলে গেছে বহু বছর আগেই। তবু ‘গপ্প ফলিয়ে বেড়ানো’ আমেরিকা ত্যাগ করেনি। গত জি-৭’ বৈঠকে সবাইকে সাথে নিয়ে তারা নতুন উদ্যোগে অবকাঠামো বিনিয়োগ আনবেন, যেটা নাকি আবার চীনা বেল্ট-রোডেরও প্রতিদ্বন্দ্বী হবে। কিন্তু এসবই গল্প যা এখন পর্যন্ত কোনো রকমের বাস্তব প্রকল্প হিসেবে শোনা যায়নি। তাই শেষে আনু নিজেই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, ‘চীনের মতো দ্রুত আর বিশাল বিনিয়োগ সমাবেশ ঘটানোর মুরোদ আমেরিকার নেই”।

    তাই সারকথায় ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের এই আর্টিকেলটা লেখা অথবা বাংলাদেশের আলাদা ডেস্কের কথা বলে লোভ দেখানো  – এসবই আসলে লিপ সার্ভিস বা কথার কথা। সিংহ বুড়া হয়ে গেলে তারা আর কী করে?  তবু তাদেরকে এসব চাপাবাজি করে যেতেই হয়। তাই এসব করেই চীনের বিরুদ্ধে “ভারত নাকি পরাশক্তি” একথা বলেই পরিচয় করিয়ে দিতে হয় আমেরিকাকে।

    খামোখা কূটনৈতিক শোডাউনঃ
    গত মাসের শেষ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এদিকে আরেক চাপাবাজি চলবে, একই কারণে। মানে ফরেন পলিসির আর্টিকেলের সাথে ঢাকায় ভারতের কূটনৈতিক নড়াচড়া সম্পর্কিত ঘটনা ততপরতার কথা বলছি। যেমন, দোরাইস্বামীর প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ, বিদেশ সচিব হর্ষবর্ধনের ৭ ডিসেম্বরে ঢাকা সফর  –  আর এসবই আগামী ১৬ ডিসেম্বর ভারতের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর উপলক্ষে।

    “বাংলাদেশ ভারতের সৃষ্টি, ভারতেরই ফসল, কাজেই বাংলাদেশ ভারতের প্রভাব বলয়ের বাইরে যায় কী করে” – ভারত যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো কথা উচ্চারণ করে তখন অলক্ষ্যে এ খামোখা বয়ানটাই তার কূটনীতিকরা তাই মনে মনে আওড়াতে থাকেন। অতএব চীন-ভারতের কোনো সঙ্ঘাতে বাংলাদেশ তো ভারতেরই, ভারতের প্রভাব বলয়ের জবাইযোগ্য এক নধর খাসি যেন!  কাজেই বাংলাদেশ আর যাবে কোথায়! এই দুই সপ্তাহ ধরে ভারতীয় স্বার্থগুলো এসব বয়ানেরই জপ করতে থাকবে।

    কিন্তু তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল, মানে কোন রিটার্ন কী আসবে? না, আসবে না। বরং ফলাফল একদম হবে শূন্য। এমনকি বর্তমান  হাসিনার বাংলাদেশও ভারতের পক্ষে যাবে না, মুভ করার সে সুযোগটুকুও নেই। বাস্তবতা এমনই। কিন্তু তাই বলে সে বাস্তবতার কথা আবার সরকারের দিক থেকে ভারতের কাছে মুখে উচ্চারণও করা হবে না। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ঢাকা সফর উপলক্ষে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিডিয়াকে বলছেন, “আমি ঢাকায় থাকলে তার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ হতে পারে”। কাজেই কী পরিমাণ প্রাণহীনভাবে এ’দুই সপ্তাহ কাটবে, এখান থেকে অনুমেয়; অর্থাৎ কেবল মুখেই বলা হবে না যে, বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে নেই। আর কার্যত এটা ভারতেরও পরিস্কার করেই অজানা নয়। তা হলে ভারত চীনের কাছে তার ‘হবু ও কথিত’ শিলিগুড়ি করিডোর অথবা সাত রাজ্য হারানোর কথা যে লেখক আনু তুলেছেন, তার কী হবে?

    আমেরিকান থিংকট্যাংকের দিগগজেরা আর কথিত ‘পরাশক্তি’ ভারত কী করে নিজেদের রক্ষা করবে, তা তো তাদেরই বিষয়। সাধারণভাবে বললে, এটা তাদের জবরদস্তিতে তোলা ইস্যুতে  খানিক এক ভীষণ উত্তেজনা মাত্র। আর বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন কোন মানুষ এর ভেতরে নিজেকে সংশ্লিষ্ট করে না। তাই সাধারণ মানুষের কাছে এটা মৃত এক ভারতীয় উদ্বেগ যাকে চাবুক মেরে জাগানোর চেষ্টা দেখছি আমরা। এমনকি যার শেখ হাসিনা সরকারের কাছেও কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। সত্য নয়।

    তবুও ঢাকায় দুই সপ্তাহ ধরে নয়াদিল্লি-ঢাকা কত কাছাকাছি, কত নিকটাত্মীয় ও বাংলাদেশ ভারতের প্রভাবাধীন তা প্রদর্শনের এ ধরনের কিছু ইমেজ ফাঁপা ডেকোরেটেড উত্তেজনা তৈরি করা হতে দেখব অবশ্যই!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    এই লেখাটা  গত  ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “বাংলাদেশ ভারতের পক্ষে যাবে না”  – এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

  • রাজা না জনপ্রতিনিধি? কী হতে চান?

    আফগানিস্তান ও জনপ্রতিনিধিত্বঃ

    রাজা না জনপ্রতিনিধি? কী হতে চান?

    গৌতম দাস

    ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৬  সোমবার

    https://wp.me/p1sCvy-3JQ

     

    গত সপ্তাহের শুক্রবার জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে নয়া আফগান শাসক তা=লে=বা=নদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে এক প্রস্তাব পাস হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘‘আফগানিস্তানের জন্য এক ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার’ গঠন দরকার” (Ta-lib-an rulers need to establish an inclusive government )। অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার বলতে অবশ্য অনেকে অনুমানে অনেক কিছু মনে করে থাকে। যেমন অনেকে মনে করে, এটা বোধহয় শয়তান পশ্চিমা বা আমেরিকানরা বলছে যে, আগের কারজাই বা গণি সরকারের লোকদের সাথে নিয়ে সরকার গঠন করতে বলা হচ্ছে। ভারতও হয়তো মনে করছে, এতে তার পছন্দের এক আফগান সরকার আবার আসবে। কিন্তু এটা ঠিক তা নয়। এমনিতেই মোদ্দাকথা বুঝানো হচ্ছে এমন এক সরকার গঠন করা দরকার যেন সেখানে জনগোষ্ঠীর সব ধরনের মানুষের প্রতিনিধিত্বই থাকে যাকে অন্তর্ভুক্ত করে তা গঠিত হয়। জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্ত অবশ্য পুরানা যেটা ট্রায়কা+ বলে একটা কমিটি গঠনের সময়ও উঠেছিল। যা নিয়ে আমার আগের রচনা আগ্রহিরা এখানে দেখে নিতে পারেন।

    এখানে ‘সব ধরনের মানুষের প্রতিনিধিত্ব’ বলতে যেমন ওই দেশের সব অঞ্চলের লোক (দেশে কয়েকটা ভাষা বা কালচার প্রচলিত থাকলে), সব ভাষাভাষী ও কালচারের লোক, (যেমন প্রায় সবাই বাঙালি হলেও ধরা যাক কেউ কেউ বিহারি অথবা মনিপুরী ইত্যাদি যাদেরকে আলাদা ‘এথনিক’ জনগোষ্ঠী বলে এরা একেকটা কয়েক লাখের বেশি নয় হয়তো, এমন হলে) সব এথনিক জাতিগোষ্ঠীর লোক, আবার (আফগানিস্তানে যেমন হাজারা-রা এমন হলে) পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর লোক, সব ধর্মের লোক, (সমাজের নারী-পুরুষ এমন বিভক্তি আছে তাই) পুরুষরা তো থাকবেই সাথে নারীদেরও প্রতিনিধিত্বের লোক, দেশে পাহাড়ি-সমতলী বলে আলাদা বা বিভক্তি কিছু থাকলে সব ভুগোলের লোক – এভাবে ঐ দেশের মানুষের মধ্যে যত ভাগ-বিভক্তি আছে তার সব অংশের প্রতিনিধিত্ব নতুন রাষ্ট্র ও সরকারে থাকতে হবে। এটা বুঝাই সঠিক হবে। এ ছাড়া আরো আছে, সুনির্দিষ্টভাবে অন্য ধর্মীয় বা অন্য মতবাদের লোক বলে কেউ থাকলে তাদের বাদ দেয়া যাবে না।

    একটা ছোট উদাহরণ দেয়া যাক; ২০১৫ সালে নেপাল হল নবগঠিত করে নেয়া এক রাষ্ট্র। এখন থিতু হয়ে গেছে বলে এর মোট জনপ্রতিনিধি বা এমপির সংখ্যা ২৭৫ যারা নেপালের মোট প্রায় তিন কোটি জনসংখ্যাকে প্রতিনিধিত্ব করেন। কিন্তু এর কনস্টিটিউশন গঠনের সময় তাতে মোট জনপ্রতিনিধি আরো বাড়িয়ে করা হয়েছিল ছয় শতাধিক। কারণ নেপাল মূলত পাহাড়ি ও প্রাচীন বলে ভিতরে জনগোষ্ঠীর এথনিসিটি অনেক ভাগে বিভক্ত। তাই সেখানে কনস্টিটিউশন যা একবারই বানানো হয় ফলে তাতে জনগণের সব অংশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে প্রতিনিধির সংখ্যা বাড়ানো হয়েছিল।

    এসময়ের কাজটাকে আসলে বলা হয়, সমাজের সবার পলিটিক্যাল হয়ে ওঠা; সবাইকে নিয়ে এক পলিটিক্যাল কমিউনিটি বা পলিটি (Polity) গড়ে নেয়ার সদর রাস্তা। আর এর নীতি একটাই – প্রত্যেককে বলতে দিতে হবে, তাকে শোনা হতে হবে, মার্জিনালাইজ করে ফেলে রাখা হবে না। আরেকভাবে দেখলে এটাই একটা কনস্টিটিউশন রচনায় পৌঁছানো উপায় যেখানে সমাজের সবার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছিল। ফলে এটা ঠিক একটা নারী-মন্ত্রী রাখা না রাখায় সীমাবদ্ধ রেখে পরিস্থিতি মুল্যায়ন করা নয়। তালেবানরা খারাপ না ভালো বলে ফতোয়া দেয়াও নয়।

    নেপালের বেলায় পরে রেগুলার সংসদীয় এমপি নির্বাচনের সময় প্রতি এক-সোয়া লাখ ভোটার পিছু একেকটা কনস্টিটিউয়েন্সি নির্ধারণ করে নেয়া হয়েছিল। এমন ছবিটাই আফগানিস্তানেও আঁকতে পারলে খারাপ হতো না – “এটাই ইনক্লুসিভনেস”। আবার ইনক্লুসিভ মানে সবাইকেই এখনকার অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রিসভায় জায়গা দেয়াও না। মূলত ওই কনস্টিটিউশন রচনার সভায় সবারই উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। আর পরে নির্বাচন-ভোট হলে যারা সকলেই অংশ নিবে কিন্তু সবাই তো ক্ষমতায় আসবে না কিন্তু  তারাও বস্তুত ঐ সরকারে ইনক্লুসিভ বলে বুঝতে হবে অবশ্যই। ফলে জাতিসংঘের ওই ইনক্লুসিভ সংক্রান্ত প্রস্তাবের ব্যাপ্তি অনেক দূর, এমন মনে করার সুযোগ আছে।

    তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ইংরেজিতে শব্দটা হল ইনক্লুসিভ (Inclusive), যার সোজা মানে হল সমাজের সব অংশের প্রতিনিধি সেখানে থাকতে হবে তাতে প্রভাবশালী গোষ্ঠীদের চোখে অনেককেই তাদের পছন্দের না হলেও। উল্টা করে বললে সমাজের কোনো অংশ আগে থেকে মার্জিনালাইজড বলে, কোণঠাসা বলে অথবা গরিব ও ক্ষমতাহীন বলে এই সুযোগে তাদের বাদ দেয়ার সুযোগ নিতে যাবে না – এই হল ‘প্রতিনিধিত্ব’ কথার মূল মেসেজ।

    কথা আরো কিছু আছে। একটা দেশে মানুষের মধ্যে অনেক ধরনের ভাগাভাগি থাকে যার মধ্যে জেন্ডার বা নারী-পুরুষ বিষয়ক বিভক্তিটা সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। কেন? কারণ একটা সমাজে সাধারণত দেখা যায় যে নারী-পুরুষ প্রত্যেকেই প্রায় ৫০ ভাগাভাগির মতো হয়। ব্যাপারটা অনেকে হয়ত খেয়াল করে দেখেন নাই। যেমন, বাংলাদেশের নারী-পুরুষের হার (৪৯.৪-৫০.৬), আমেরিকায় এটা (৪৮.৯ – ৫১.১), ইউকে তে (৪৯-৫১) অর্থাৎ সার কথাটা হল, বিশেষ ব্যতিক্রম না থাকলে সবদেশেই নারী-পুরুষ সংখ্যায় প্রায় সমান সমান হয়ে থাকে। তাহলে এর মানে হল, রাষ্ট্র-সরকারে শুধুই পুরুষ আর পুরুষকে দিয়ে সব প্রতিনিধিত্ব করানো ও থাকার মানে, বাকি ৫০ ভাগ যারা নারী নাগরিক তাদের আমরা অ-প্রতিনিধিত্বে বাইরে রেখে দিচ্ছি এবং  আফগানিস্তানের মত রাষ্ট্রে এই ক্ষতিটাই হচ্ছে। অর্থাত, আমাদের এখানে আলাপের প্রসঙ্গ কিন্তু জনপ্রতিনিধিত্ব, মানে কি উপায়ে আমরা রাষ্ট্র-সরকারে একটা দেশ-সমাজের সব অংশ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারি। যাতে সেটাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র-সরকার বলতে পারি।

    তবে এখানে আরেকটি সত্যও বলে রাখা দরকার। ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তায় নারীদেরকে কিভাবে প্রতিনিধিত্ব দেয়া হবে আদৌ হবে কি না, এই বিতর্ক শেষ হয়নি। সব দেশে তাই এক রূপ নয়। বরং এটা তাদের চিন্তায় এক দুর্বল জায়গা হয়ে আছে। আর এর সুযোগ নিয়ে আমেরিকা গত ২০ বছর ধরে জাতিসঙ্ঘের চোখেই আফগানিস্তান  অবৈধভাবে দখল করে রেখেছিল। অথচ এই অপরাধটা ঢাকতে আমেরিকা উলটা এমন বয়ান দিয়ে এসেছে  যেন অবৈধভাবে আফগানিস্তানে সম্পদ লুটতে না, বরং আফগান নারীদের মুক্ত করতেই যেন তারা আফগান দেশটা দখল করেছিল। আমেরিকার এই লজ্জাজনক তৎপরতা বাংলাদেশ পর্যন্ত গড়িয়েছিল। গত ২০০৭ সালে আমেরিকা প্রকারান্তরে আমাদেরও ‘দখল’ করলে ঐ ‘এক-এগারো’র সরকার গড়া হয়েছিল আর তা ছিল মঈন-ফখরুদ্দীনের কথিত সিভিল-মিলিটারি সরকার।

    ওদিকে কমিউনিস্ট সিপিবির নারী সংগঠন “বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ” পাকিস্তান আমলে জন্ম এমন পুরোনা সংগঠন। সারা জীবনে তাদের বার্ষিক সম্মেলনে তারা কখনো শেখ মুজিবকেও প্রধান অতিথি করতে পারেনি। সম্ভবত তাদের মাপকাঠিতে তিনি “গুরুত্বপুর্ণ যথেষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব” মনে হওয়ার মাপকাঠি পেরোতে পারেননি। অথচ মহিলা পরিষদ ২০০৭ সালেই ফখরুদ্দীনকে মহিলা পরিষদের সম্মেলনের প্রধান অতিথি করেছিলেন; যে ফখরুদ্দীন আসলে ছিল অবৈধ ক্ষমতাধর ও ‘ছুপা’ আমেরিকান দখলদারের প্রতিনিধি। আর ঐ সম্মেলনে তিনি সংবর্ধিত হয়েছিলেন আমেরিকা আফগানিস্তানে নারীমুক্তি ঘটিয়ে ‘কত কিছু করেছে’- এর নায়ক বলে ও সেই প্রশংসায়। কেন? কারণ, ‘বুশ-বাবাজি’ ২০০১ সাল থেকে মুসলমান কুপায় হাত পাকিয়েছেন আর তা দেখে বাংলাদেশের কথিত কমিউনিস্ট যারা আসলে ‘হিন্দু-জমিদার’ স্বার্থের প্রতিনিধি, এরা এইবার আহ্বাদিত হয়ে বুশের কোলে উঠে যাবার সুবিধা নিতে। অথচ কেউ যদি কমিউনিস্টই হয় তো সেই আবার বুশের কোলে উঠে যায় কেমনে? এরই নমুনা ছিল ফখরুদ্দীনের ওই প্রধান অতিথি হওয়া। একইভাবে তালেবানরা এবার ক্ষমতায় আসায় সবদিক দিয়ে এতিম হওয়া ভারতও এখন প্রধান অভিযোগ বানিয়েছে আফগানিস্তানের নারীদের দুরবস্থাকে। এরা এতই মরিয়া যে, পাকিস্তানে আফগান দূতাবাসের সামনে জনা পঞ্চাশ নারী সমাবেশ ঘটিয়ে আফগান নারীদের জন্য সংহতি জানানোর ব্যবস্থা করেছে। অর্থাৎ আমেরিকার মত ভারতও আফগান নারীমুক্তির মহান ‘দূত’ হওয়ার রাস্তা ধরেছে; যদিও আমরা সবাই জানি তারাই তাদেরও দেশের নারীদের কিভাবে রাখেন।

    তবে নারী ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের ইসলামী রাজনীতি নিজের দুর্বলতায় ভুগতে না চাইলে তাদেরও কিছু স্পষ্ট অবস্থান নিয়ে থাকতেই হবে। একালের রাষ্ট্র-সরকারে নারীদের প্রতিনিধিত্ব কিভাবে নিশ্চিত করবেন তা আর উপেক্ষা করে যাওয়ার মতো ইস্যু নয়। কারণ নারীরা যেকোনো দেশের প্রায় ৫০ ভাগ জনগোষ্ঠি। এই নারী নাগরিকের প্রতিনিধিত্ব তারা কিভাবে নিশ্চিত করবেন, এর সদুত্তর একটা লাগবেই। ঠিক এ কারণেই নিরাপত্তা পরিষদের ওই পুরো প্রস্তাব যা ১৫ সদস্যের সবাই ওর পক্ষে ভোট দিয়েছে। সেটা বলেছে – এক অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার লাগবে যারা নারীদের ‘পূর্ণ, সমান ও অর্থপূর্ণভাবে নারী অংশগ্রহণ ও মানবাধিকার রক্ষা নিশ্চিত করবে।’

    “Taliban rulers need to establish an inclusive government that has “the full, equal and meaningful participation of women” and upholds human rights.”

    উপরে যা নিয়ে কথা বলেছি ওখানে মুখ্য প্রসঙ্গ হল আসলে প্রতিনিধিত্ব (representation); যদিও অনেকের মনে হতে পারে বোধহয় রাষ্ট্র-সরকার নিয়েই কথা বললাম। আসলে কথা বললাম ‘রাষ্ট্র-সরকারে বাসিন্দাদের প্রতিনিধিত্ব কিভাবে নিশ্চিত করা হবে’ তাই নিয়ে এবং একালে এটাই হতে বাধ্য।

    ১৯৪৫ সালের পরে এক নয়া যুগঃ
    পুরনো দিন আর কত থাকে, সব ‘নাই’ হয়ে গেছে, বিশেষ করে ১৯৪৫ সালের পর থেকে মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। এর আগে একদিকে রাজ-রাজড়া, সুলতান, আমির, বাদশাহ ইত্যাদির নানান নামে রাজতন্ত্রের শাসন এবং অন্য দিকে সর্বোপরি ইউরোপের ব্রিটিশ-ফরাসিদের কলোনি দখল হয়ে থাকা (যেমন বৃটিশ-ইন্ডিয়া) – এসব কিছুরই স্বর্ণযুগ ছিল সেটা, এভাবে এক অবাধ লুণ্ঠনের ক্ষমতা চর্চার যুগ ছিল সেটা। আর এসব কিছুরই সমাপ্তি ঘোষিত হয়ে গেছিল ১৯৪৫ সালে জাতিসঙ্ঘ জন্ম ও কার্যকারিতা দেয়ার পর থেকে। তাতে আপনি জাতিসঙ্ঘের যত কিছু অযোগ্যতা বা অসম্পূর্ণতা দেখান না কেন অথবা জাতিসঙ্ঘ অপছন্দ করেন না কেন! ঘটনা হল, আমরা কেউ আর চাইলেও ১৯৪৫ সালের আগে্র কালে ফিরতে পারব না। এমনকি যারা চাইব বা কামনা করব তাদের জন্যই এটা এখন আত্মঘাতী হতে পারে!

    জাতিসঙ্ঘ যে জন্মভিত্তিমূলক বক্তব্য বা বাণীর উপরে দাঁড়িয়ে আছে তা হলো, যেকোনো দেশ-ভুখণ্ড কার কথায় চলবে, কার কথা চূড়ান্ত ও একমাত্র বৈধ বলে মানা হবে? এই প্রশ্নের জবাব হল, ওই ভুখণ্ডের সংশ্লিষ্ট বাসিন্দাদের কমন ইচ্ছা বা সম্মিলিত ম্যান্ডেট কী এর উপরে। আর এটা তো বলাই বাহুল্য, আম-বাসিন্দারা কোনো এক রাজার শাসন চাইবে নাকি নিজেরাই নিজেদের শাসন করবে এমন প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের শাসন চাইবে – এই দুইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়টাই চাইবে। অর্থাৎ নানা নামে বলা ও চালানো রাজতন্ত্রের দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে এখন থেকে। এ কারণে প্রতিনিধিত্ব, জনগণ, নাগরিক বা পাবলিকের সরকার এসব শব্দ ছাড়া দুনিয়া এখন অচল।

    তাহলে রাজনীতি, কবে থেকে?
    পাঠক সবাইকে খেয়াল করতে অনুরোধ করব, ‘রাজনীতি’ শব্দটা কবে প্রথম শুনেছেন? হদিস করেন। বা আপনার দাদা কবে প্রথম শুনেছিলেন? ব্রিটিশ কলোনি দখলের আগে মানে মোগল সাম্রাজ্য (রাজতন্ত্রের বড় ভার্সন হল সাম্রাজ্য) শাসনের আমলে “রাজনীতি” শব্দটি ছিল না। কেন? রাজার দেশে ‘রাজনীতি’ বলে কিছু থাকে না কেন? রাজনৈতিক দল থাকে না কেন? তাহলে ‘রাজনীতি’ মানে আসলে কী?
    এ কারণে লক্ষ করলে বা খুঁজলে পাবেন, রাজার শাসনের বিরুদ্ধে বা বিপরীতে জনগণ বা পাবলিকের শাসন এই ধারণা শুরু বা চালু হয়েছে ‘রাজনীতি চর্চা’ শুরু হওয়া থেকে; ব্যক্তির নিজেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গণ্য করা থেকে। তাই কোনো রাজা নয়, দেশ-রাষ্ট্র পরিচালনার সব ক্ষমতার উৎস জনগণ – এটাই সেই ভিত্তি অনুমান। জনগণই তার প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমেই একমাত্র রাষ্ট্র-সরকার পরিচালনা করতে পারে। বাকি সব কিছুই এই শাসন পরিচালনেরই উপর ঘটানো নানান বিকৃতি।

    কাজেই একালে ১৯৪৫ সালের পরে দুনিয়াতে ‘ইসলামী রাজনীতি’কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সে কোন দিকে যাবে? রাজতন্ত্র নাকি পাবলিকের শাসন? এমনকি তা  একটা “এলিট শাসনের” আড়ালে রাজতন্ত্র হলেও হবে না। যেমন যেটা তালেবানরা প্রস্তাব করে এখন ক্ষমতায় আছে এটি কার্যত একটি ‘এলিট শাসনব্যবস্থা’ হবে যাদের কেউ নির্বাচিত করেনি। অর্থাৎ আফগান পাবলিকের সাথে তালেবানদের কী সম্পর্ক তা কেউ জানে না।এর ব্যাখ্যা বা বর্ণনা করতে কেউ চায় না। আবেগী থাকতে চায়। আবার তালেবানদের তাদের চোখে এই শাসনের নাম “আফগানিস্তান আমিরাত”। মানে এক আমিরের শাসন, তাই তো নাকি? এ বিষয়ে স্পষ্টতা আনতেই হবে।

    আবার বিপরীতে যদি পাবলিকের শাসন, জনমতের শাসন, জনগণের অনুমোদন নিয়ে একটা শাসনব্যবস্থা তৈরি করতে চান সেটাও আগে যথেষ্ট বুঝেসুঝে বলতে হবে। যদি তালেবানরা এই পথে যায় তবে এক্ষেত্রে এই প্রথম এর মানে হবে তালেবানরা ‘রাজনীতিতে’ প্রবেশ করল। পাবলিক বা জনগণ আছে এর স্বীকৃতি কোনো শাসক করলে তবেই একমাত্র রাজনীতি শব্দটি তাদের জন্যও ব্যবহারযোগ্যতা লাভ করবে।
    এমনিতেই শাসনের বহু ধরন হতে পারে। কিন্তু শাসন বা শাসক থাকলেই সেখানে রাজনীতি নাও থাকতে পারে। সৌদি আরবে শাসক আছে অবশ্যই কিন্তু তাই বলে সেখানে কিন্তু রাজনীতি নাই, দল নাই। কারণ পাবলিক, নাগরিক বা জনগণের অনুমোদন কিংবা প্রতিনিধিত্ব এসব ধারণার তখনই দরকার পড়ে যখন সে দেশের শাসক আর রাজা নয়, ব্যবস্থাটা আর  রাজতন্ত্র নয়। যখন শাসক ও সরকার নিজেই স্বীকার করে বলে  যে সে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেশের নাগরিকরা তাকেই ক্ষমতা দিয়েছে।

    তাহলে কথাটি এভাবে বলা যায়, তালেবানের শাসনের নাম যদি হয় “আফগানিস্তান আমিরাত” – তাহলে সেক্ষেত্রে এটা আর কোনো ধরনেরই ইসলামী রাজনীতি নয়। কারণ তখন সেটা আর কোনো রাজনীতিই নয়। রাজনীতি মানেই তা রিপাবলিক; মানে জনগণের ক্ষমতা ও গণশাসন ক্ষমতার রাজনীতি। আফগানিস্তান আমিরাত হলে সেক্ষেত্রে, তাই ‘রাজনীতি’ শব্দটি; আনফিট মানে অমানানসই ও অপ্রয়োজনীয় শব্দ। যদিও তখন এটাকে এক ধরনের ইসলামী শাসন বলা যেতে পারে। আর উল্টাভাবে বললে কোনো আমিরাত কখনোই পাবলিকের শাসন নয়। আমিরাত (সংযুক্ত আরব আমিরাতের দৃষ্টান্ত) কোনো জনশাসন ব্যবস্থা নয়। না রাজনীতি, না পাবলিক, না জনপ্রতিনিধি ইত্যাদি কোনো ধারণার অস্তিত্ব সেখানে থাকে না। বরং থাকে ও আছে আমিরের শাসন। মজার কথা হল, এখানকার দুবাই এর আমির তার কন্যা রাজকুমারীকে ঘরে বন্দী করে রেখেছেন বলে তিনি  বেঁচে আছেন কিনা এর নিন্দা করে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সংগঠন উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দেন। কেন? এই বিষয়গুলোর পরিষ্কার বোঝাবুঝি রেখে “ইসলামী রাজনীতি” নিয়ে কোনো কথা বললে তবেই তা অর্থপূর্ণ হতে পারে।

    এখন পথ বা রাস্তা একেবারেই সোজাঃ
    তালেবানরা যদি মনে করে তারা এক আমিরাত-ই গড়বে, তাহলে এর অর্থ হবে তারা ১৯৪৫ সালেরও আগের দুনিয়াতে ফিরে ও থেকে যেতে চাইছে। তা চাইতেই পারে অবশ্যই। তবে সে ক্ষেত্রে তাদের জন্য জাতিসঙ্ঘ আর কোনো প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান নয়। জাতিসংঘের সদস্যপদ আর তাদের জন্য আগ্রহের বস্তু নয়।
    এছাড়া আর তাতে ব্যবহারিক দিকগুলো কী কী হবে?  প্রথমত যেমন, একালে রাষ্ট্রগুলো একে অপরের কাছে পণ্য বেচাবিক্রি করে মানে পণ্য দেয়া-নেয়া বা বিনিময় করে বেঁচে থাকে, নিজ নিজ অর্থনীতি টিকিয়ে রাখে। এক কথায়, এক গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় সদস্য ও সংযুক্ত হয়ে নেয় রাষ্ট্রগুলো সবার আগে। কিন্তু, তালেবানরা আফগানিস্তানে এমন সুযোগ নিতে পারবে না। মানে তালেবানরা না কিছু অন্য দেশ থেকে কিনতে পারবে, না বেচতে পারবে! কারণ সে তো জাতিসঙ্ঘেই থাকবে না।  ফলে গ্লোবাল বাণিজ্য ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারবে না। নিজেই যেন নিজেকে একঘরে করা হবে। দ্বিতীয়ত, যেমন দুনিয়ায় বহু গরিব অর্থনীতির রাষ্ট্র নিজের অর্থনৈতিক অবস্থা অনুসারে, জাতিসঙ্ঘ-আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক মিলে যে ‘গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা’ একটা আছে এর মাধ্যমে তার দেশের গরিব মানুষ খাদ্য, চিকিৎসা ধরনের বেশ কিছু বিষয়ে সাহায্য পায়। আর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের যতই খারাপ দিক থাক আপনার চোখে লাগুক এটা এখন এত অর্গানাইজড একটা ব্যবস্থা যে এটা এখন গরিব দেশের মানুষের জন্য তাদের হকের মত হয়ে গেছে। এখন এরই সাহায্য ব্যবস্থার উপরে টিকে আছে আফগানিস্তানের শিশুদের এক বিরাট অংশ। এ ছাড়া গর্ভবতী মহিলা ও শিশুদের জন্য সহায়তা এবং কিছু স্কুল এই সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তালেবানেরা জাতিসংঘের বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নিলে আফগানিস্তানে এই সাহায্য পাবার  ব্যবস্থাটা তখন থেকে নড়বড়ে হতে থাকবে। বর্তমানে অবশ্য তালেবানরা কী করবে তা উহ্য রেখে দেয়াতে জাতিসঙ্ঘ তাতে কোনো স্বীকৃতি দেয়নি। আবার সে জন্য সব সাহায্য স্থগিত করে দিলে আফগান গরিবরা সবচেয়ে কষ্টে পড়বে বিবেচনায় মানবিক কারণে সাহায্য অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই মাসেই দাতারা যারা বেশির ভাগই পশ্চিমা দেশ। ভারতও নিজেকে বিরাট মহান দেশ হিসাবে দেখাতে ঐ দাতাদের সভার আগে বক্তৃতা মেরেছে।  আসলে আফগানিস্তানের যত সম্পদই থাক চরম অব্যবস্থার সরকারে অদক্ষতা দুর্নীতিতে ডুবে এটা এখন লাগাতরভাবে বিদেশি  সাহায্য ও অনুদানে চলা একটি দেশ। প্রতি বছর এর বাজেট রচনা করতে বিদেশী প্রতিশ্রুতি ও সাহায্য [Taliban thanks international community for aid pledges] লাগে; তবেই তা রচনা করা যায়; বর্তমান আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুত্তাকির বয়ানে সেটি স্পষ্ট। কিন্তু তালেবানরা জাতিসঙ্ঘের বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নিলে এ দিকটিও তখন অনিশ্চিত হয়ে যাবে। কল্পনা ও ফ্যান্টাসিতে অনেক বিল্পবের স্বপ্ন দেখা যায়। কমিউনিস্টেরাও এথেকে বাইরে ছিল না। কিন্তু বাস্তবে একটা সরকার পরিচালনা সম্পুর্ণ অন্য জিনিষ। কারণ এটা আর কল্পনার হাতিঘোড়া মারা নয়। বাস্তবে করে দেখানো, অর্জন করে দেখানোর বিষয়। এথিক্যাল কিছু বাণী দিয়ে একটা অব্যবস্থাকে সুব্যবস্থায় আনা যায় না। সুব্যবস্থাই খাড়া করতে হয়। গ্লোবাল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যা আছে একে ব্যবহার করে একটা নুন্যতম সুব্যবস্থার গড়ার লড়াই এটা। তাই বন্ধুকের লড়াইয়ের চেয়ে কঠিন এটা। প্রতিটা আফগান মা ও শিশুকে অব্যবস্থার শিকার হতে বাচানোর লড়াই এটা।

    তাই আসলে খোলাখুলি স্পষ্ট ভাষায় বললে, তালেবানরা এখন ক্ষমতায় আসার পর তাদের মূল সমস্যা জাতিসঙ্ঘ নয়। মূল সমস্যা আফগানিস্তান মূলত এক ট্রাইবাল সমাজ। এই ট্রাইবাল অতীত ভেঙ্গে সে এখনও বের হয়ে আসতে পারে নাই। তাই তারা এক ট্রাইবাল অর্থনীতিতে যার মানে ট্রাইবাল জীবনযাপন। অচল প্রায় স্থবির এক ব্যবস্থা। একে ভাঙতে হবে। নতুন উতপাদন ও এক ব্যাপক বেচা-কেনা বিনিময় ব্যবস্থায় প্রবেশ করতেই হবে; বিনিয়োগ আনতে হবে। বিনিয়োগদাতারাও আগ্রহী। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে থিতু ব্যবস্থা দেখাতে না পারলে কেউ আগাবে না। আর এখানেই তালেবানদের মুনশিয়ানা দেখাতে হবে। নিজের সম্ভাবনা নিজেদের বুঝতে হবে। বাণিজ্যসম্পর্ক সবার সাথেই  করতে তাদের প্রস্তুত হতে হবে; এবং তা প্রতিযোগিতামূলকভাবে। এমনকি তা শুধু মাত্র চীন-রাশিয়ার সাথেই নয়, আমেরিকানদের সাথেও। কিন্তু সবার আগে  সুনির্দিষ্ট ও একই পলিসি ও নিয়মনীতির ভিত্তিতে। যা সবার আগে তৈরি করে নিতে হবে। নইলে টেন্ডার, কাজ দেয়া-নেয়ার মধ্যে, বিদেশীরা তালেবানদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগিয়ে  বাড়িয়ে সব বিশৃঙ্খল করে ফেলবে। নিজেদের মধ্যে মারামারি লেগে যাবে!

    মূল কথাটা হল – তাদের সঠিক সিদ্ধান্ত ও বিচক্ষণতায় তারা হয় হিরো না হয় জিরো হয়ে যেতে পারে। উল্টা বললে, যেকোনো ইসলামিজমের ‘ফ্যান্টাসি’ তাদের পাতালে নিতে পারে। তাই এখনো ঝোঁক ভেসে উঠতে দেখা যাচ্ছে যে, কড়া শাস্তিমূলক কড়া শাসন হবে তালেবানদের ব্র্যান্ড – সরি, না। এটা ফ্যান্টাসি হবে। মানুষের সামাজিক অর্থনৈতিক জীবনকে কঠিন করে দিচ্ছে কি না, অদক্ষ করে দিচ্ছে কি না ইত্যাদি সেদিকে খেয়াল করতে হবে; এসব ব্যবহারিক দিকের সাফল্য হতে পারে তাদের ব্র্যান্ড।

    জাতিসঙ্ঘ প্রসঙ্গে বাকি কথাগুলো অর্থাৎ গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থা যেটি আছে এর বহু অযোগ্যতা এবং আপনার জন্য বোঝা বা বিরুদ্ধবাদী আচরণের মনে হয় ইত্যাদি সব নেতি দিক আছে আপনি দেখতে পান, কথা সত্য। তা সত্বেও এটা এক বারো মুরুব্বির ন্যূনতম ফাংশনাল ব্যবস্থা। তাই এটা উপেক্ষা করা খুবই কঠিন। তবু তা যদি করেন তবে হয়ত  এর জন্য কড়া মাশুল দিতে রাজি থাকতে হবে।

    আবার বিপরীতে এতে আফগানিস্তানকে ছাড়া বাকি দুনিয়া তার গ্লোবাল পলিটিক্যাল ব্যবস্থাসহ কি ভালো থাকবে? বা খুশি হবে? তাও না। এখনই সবচেয়ে নিশ্চিত যেটা তা হল , সেক্ষেত্রে আফগান-পড়শি প্রত্যেকটা দেশ “সশস্ত্র ইসলামী তৎপরতা” মোকাবেলার বিরাট সঙ্কটে পড়বে।

    সর্বশেষ, জাতিসঙ্ঘের পাঁচ ভেটো ক্ষমতার রাষ্ট্র একমত হওয়া খুবই দুর্লভ মানে কম দেখা যাওয়া ঘটনা। আবার বিপরীতে তাদের ভেটো ক্ষমতার যেকোনো এক দেশের একটা না-ভোট মানে জাতিসঙ্ঘের সে প্রস্তাবই নাকচ। তাই এখানে আলোচ্য বিষয় এটা পাঁচ ভেটো ক্ষমতাধরদের এক সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। এর সোজা অর্থ, যে দেশের বিরুদ্ধে এই সিদ্ধান্ত সে দেশের জন্য এটা শনির দশা। আন্তর্জাতিক পলিটিক্যাল ইকোনমিক সব ব্যবস্থা এখন ঐ দেশের (মানে আফগানিস্তানের) বিরুদ্ধে যাবে এর ইঙ্গিত দিচ্ছে তা বলা যায়। আর আফগানিস্তানের জন্য সময় কম অবস্থা। তাই একটা আকার ইঙ্গিতের মেসেজ এখানে বলে রাখি। যেকোনো দেশের জন্য এটি বিরাট বোকামি যে, সে এই পাঁচ ভেটো ক্ষমতার কোন সর্বসম্মত সিদ্ধান্তকে একমতে থাকতে দেয়া। এদের বিভক্তিই আফগানদের জন্য বাচোয়া। তাই এমন অবস্থা তালেবানদের জন্য ভুল যা পাঁচ ভেটো ক্ষমতাকে কোন সর্বসম্মত সিদ্ধান্ন্ততে আনে।

    তাও আবার এখন যখন আমেরিকার পাশে চীনও বিরাট প্রভাবশালী অর্থনীতি এবং তার সাথে রাশিয়া আছে মানে তালেবানরা যদি ব্যবহার করতে জানে তবে দুই ভেটো সদস্যকে তার পক্ষে রাখতে পারে। কাজেই বুদ্ধিমানরা দুই ভেটো সদস্য তার পক্ষে থাকে এভাবে পা ফেলবে। মানে জাতিসঙ্ঘকে অসুবিধা বা বিরোধিতা অস্বস্তির প্রতিষ্ঠান হিসেবে না দেখে একে নিজের পক্ষে ব্যবহারের মত করে সাজানোর জন্য যোগ্য প্রতিষ্ঠান করে দেখতে হবে, কাজে লাগাতে হবে।
    দুনিয়ার কিছু আপনার পক্ষের প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকে না, করে নিতে হয় যতটা সম্ভব।

    শেষ কথা, তালেবানরা কি আফগানদের জনপ্রতিনিধি? নাকি রাজা হতে চায়?  এনিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া কী তাদের জন্য এতই কঠিন? 
    যা কিছু অতীতে কোন ইসলামি সমাজে প্রচলিত ছিল তাই শ্রেষ্ঠ – এই বিচারকাঠি সবল নয়। তাই তালেবানদের জন্য অনুকরণীয় তা নাও হতে পারে। দরকার আসলে শক্ত বিচার-বিবেচনাবোধ, বাস্তবতাবোধ এবং এসবের স্পষ্ট গাইডলাইন। কোনটা কাজ করবে না ফল দিবে না সেটা আগেই দেখতে পেয়ে যাওয়া এমন হতে হবে। নইলে তালেবানেরা অচল হয়ে যাবে। অনেক কিছুই অতীতে স্পষ্ট ছিল না; পরে হয়েছে এমন তো হতেই পারে! ব্যক্তির উন্মেষের দিক বুঝতে হবে, আবার সময়ে লাগামও টেনে দিতে হবে। কোনটা ট্রাইবাল সমাজ  আর কোনটা ব্যক্তি সমাজ এর ফারাক কী আর এর লক্ষণ কোনটা তা বুঝে ফেলতে হবে। সে ভিত্তিতে গ্রহণ-বর্জনের দিক আছে তা আমল করতে হবে।
    কাজেই  রাজা না জনপ্রতিনিধি হবেন – (দুটো রাস্তা কিন্তু পরিস্কার আলাদা) এই সিদ্ধান্ত তালেবানদের সবার আগে নিতেই হবে , পারলে এখনই ঘোষণা দিতে হবে! আর এই এক ঘোষণাতেই বাকি সব সমস্যার হাল করার রাস্তা খুলে যাবে!

    লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    goutamdas1958@hotmail.com

     

    [এই লেখাটা  গত  ২৫ সেপ্টেম্বর আগষ্ট ২০২১, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে   “আফগানিস্তান ও জনপ্রতিনিধিত্ব“– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।
    নয়াদিগন্তে ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন। পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]